Author: তাহের আলমাহদী

  • থানা থেকে আসছি

    থানা থেকে আসছি

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায়

    থানা থেকে আসছি

    B. Priestleyর “An Inspector Calls” নাটক-অনুপ্রাণিত

    “থানা থেকে আসছি” স্বনামধন্য নাট্যকার Mr. J. B. Priestleyর “An Inspector Calls” নাটকের অনুসরণে রচিত। ঋণ স্বীকার করবার অনুমতি দিয়ে Mr. J. B. Priestley আমাকে কৃতজ্ঞতার ঋণে ঋণী করে রেখেছেন। মুখের কথায় ধন্যবাদ জানিয়ে সে ঋণ পরিশোধ করা যায় না। তাঁর কাছে আমি ঋণী হয়েই থাকলাম। বাংলা নাটক “থানা থেকে আসছি”র যা কিছু দোষত্রুটি তার দায়িত্ব আমার। এর গুণগত বৈশিষ্ঠ্যের জন্য প্রশংসা মূল নাট্যকার Mr. J. B. Priestleyর প্রাপ্য।

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায়

    উৎসর্গ

    শ্রী উৎপল দত্ত

    সুহৃদবরেষু

    ‘থানা থেকে আসছি’ প্ৰসঙ্গে

    এ নাটক মঞ্চস্থ করতে গিয়ে নাট্য-আন্দোলনের বয়ঃকনিষ্ঠ পরিচালকরা একাধিক সমস্যার সম্মুখীন হবেন। এদিকে লিটু থিয়েটার গ্রুপও এ নাটকের মহড়া দিয়েছেন এবং প্রয়োগপদ্ধতি সম্বন্ধে আমরা কিছু চিন্তা করেছি। ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনদের কিছুটা লাভ হতে পারে এই আশায় আমাদের বক্তব্য এখানে উপস্থিত করছি।

    এ নাটকে অন্ততঃ একটি জটিল তত্ত্ব কাহিনীর মধ্যে জড়িয়ে আছে। অলাতচক্রের মত সময়ের গতি; কোনো এক মুহূর্তে মশাল নিভিয়ে দিলেও সে অলাতচক্রের আভাস অন্ধকারের বুকে কিছুক্ষণ জেগেই থাকে। একটি সুখী পরিবারের চায়ের আসরেও এমনি দপ করে কৃত্রিম আনন্দের মশাল নিভিয়ে দেওয়া যাক। কি দেখতে পাব? তাদের জীবনের বৃত্ত আরো কয়েক পাক ঘুরে গেল, প্রায় অবাস্তব আলেয়ার আলোর মত। আর সেই অস্পষ্ট আলোয় যে মুখগুলি দেখতে পাচ্ছি, সেগুলি বড় ভীষণ। আবার মশাল জ্বলতেই সেই আনন্দোচ্ছল সুখী পরিবার। “Time moves in & spiral” বলেছেন জনৈক ইংরাজ মনীষী; তাই সেই ঘুরানো সিঁড়ির যে কোনো ধাপই নিন না কেন তার থেকে একটা লম্ব মাটিতে টানলে তার তলার অসংখ্য ধাপ এক লাইনে গাঁথা হয়ে যাবে। অতএব, একই ঘটনা বার বার ঘুরে আসে সময়ের বৃত্তাকার ঊর্ধ্বারোহণে, যদিও প্রতিবারই সে আরো উন্নত রূপ পরিগ্রহ করতে থাকে। তাই বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মাঝে যে দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর আমরা কল্পনা করে থাকি, বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। অতএব ধরা যাক কোনো অভাবনীয় উপায়ে (এ ক্ষেত্রে এক পুলিস অফিসারের মাধ্যমে) আগামী ঘটনার একটা ছায়াময় পুর্বাভিনয় বর্তমানেই ঘটে গেল; অবস্থাটা কি দাঁড়ায়?

    কিন্তু নাটক মঞ্চস্থ করতে গেলে তত্ত্বের অংশটি সচেষ্ট হয়ে বাদ না দিলেও অন্ততঃ অবহেলা করা উচিত। কারণ ও তত্ত্বটা গৌণ হয়ে গেছে; মুখ্য হয়ে উঠেছে কাহিনীর বিন্যাস এবং বিষয়বস্তু। শুধুমাত্র ঐ ধরনের সুক্ষ্ম তত্ত্ব বিচারে নিমজ্জিত থাকলে নাটক নাটকই হোত না।

    তবে ইনস্পেক্টর্ কে? পুর্ববর্ণিত লম্ব বেয়ে তিনি উপরের ধাপ থেকে সময়-বৃত্তের নীচের ধাপে নেমে আসতে পারেন, কিন্তু বাস্তব জীবনের কঠিন পরিবেশে তিনি কি অবলম্বন করে আসবেন? ভৌতিক অফিসার হলে আবার প্রশ্ন থাকে তিনি এত সত্য কথা জানলেন কি করে? প্ল্যানচেটে মর্ত্যে আহুত হয়ে তিনি যে সমাজের স্তম্ভস্বরূপ ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে রিসার্চ চালাবার সময় পাবেন তা তো মনে হয় না ৷ তবে তিনকড়ি হালদার কে?

    এমনও হতে পারে তিনকড়ি হালদার চন্দ্র মাধববাবুদের বিবেক। এবং এই সকল বড়লোকদের বিবেকের গায়ে যে পুলিসের উর্দি থাকবে এটা তো সহজেই অনুমেয়। ভয় তাঁরা করেন একমাত্র পুলিসকে, কোর্টকে, সংবাদপত্রকে। আদর্শের বা প্রতিবেশী মানুষের প্রতি মমত্ব বোধের পাট তাঁরা অনেক আগেই চুকিয়ে দিয়েছেন; না দিলে হয়তো তিনকড়িবাবু আবার ক্রসে ঝুলে তাঁদের চক্ষু উন্মীলিত করতে চেষ্টা করতেন। কিন্তু পিতঃ ইহাদিগকে ক্ষমা করিলে এঁরা আজকাল হেসে বলেন—যাক ধরতে পারে নি। তিনকড়িবাবু কৌপীন পরে নদীয়ার পথে চন্দ্রমাধববাবুর ড্রয়িং রুমে পৌঁছুলে কলসির কানাই পেতেন. প্রেম দেওয়া আর হয়ে উঠত না। কিন্তু এঁরা ঢিট হয়ে গেলেন ঐ চামড়ার বেল্ট, টুপী আর খাকী পোষাকের সামনে। বাস্তব জীবনে পুলিস হিসাবের খাতা দেখতে চাইলে কয়েকটি টাকা গুঁজে দিয়ে, এবং দাতব্য হাসপাতালে কিছু দান করে হাসিমুখে চায়ে চুমুক দেওয়া যায়; কল্পনার তিনকড়িবাবু ডিউটিতে সিগারেটও খান না। এ হেন কুলিস কঠিন পুলিস অফিসারকে অনেক ধনীই রাত্রে নিভৃত দুঃস্বপ্নে দেখেন, আঁতকে ওঠেন, এবং পরদিন অনিদ্রা রোগের ঔষধের চাহিদা বাড়ে—এটা বর্তমান যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাই সেই দুঃস্বপ্নই মূর্তিমান কায়াময় হয়ে থানা থেকে এসে হাজির হয়েছে— ট্যাক্‌স্‌ ফাঁকি থেকে সুরু করে নারীহত্যা পর্যন্ত সব তাঁর নখদর্পণে। নাট্যকার এইখানেই তাঁর মননশীলতার সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ দিয়েছেন। এদিক থেকে তিনকড়ি হালদার আমাদের যাত্রার বিবেকের নব্যতান্ত্রিক রূপ, উত্তরাধিকারী, এবং সে শুধু নাটকের মূল বক্তব্যকে তুলে ধরে না, সে অভিযুক্ত করে অপরাধীদের, সে যুগধর্ম্ম পালন করে।

    এটুকু স্পষ্ট হয়ে গেলে পরবর্তী কাজ অত্যন্ত সহজ। আমরা যতদূর ভেবেছি—তাতে মনে হয়েছে একটি হঠাৎ বড়লোকের উগ্র রুচির ছাপ থাকা উচিত ড্রয়িং-রুমের দেয়ালে, পিয়ানোয়, আসবাবে, রেডিওগ্রামে। প্রথমাংশে অভিনয়ও হওয়া উচিত সাবলীল, স্বাভাবিক। তার যে মুহূর্তে ভৃত্য ঘোষণা করে— “থানা থেকে ইন্‌পেক্টরবাবু এসেছেন।”—সে মুহূর্ত থেকে আলো যেন কেমন কমে আসে, চন্দ্রমাধববাবুদের হাঁটাচলা, কথা বলায় আসে কেমন একটা মাদকতা, একটা সম্মোহিতের ভাব। তিনকড়িবাবু ভাবেভঙ্গীতে হবেন পুরোদস্তুর পুলিস অফিসার, এবং বোধহয় তাঁর বসা উচিত দর্শকের দিকে পেছন ফিরে, নীচুধরনের কোনো আসনে আর তাঁর সামনে অর্ধ বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে থাকবে অভিযুক্তের দল।

    আবার আরো স্পর্ধিত পরীক্ষা চাল। বারও অনেক সুযোগ রয়েছে, যেহেতু পুরো জিনিষটাই কয়েক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখছেন বলা চলে। অতএব অত্যন্ত রংচঙে কিছু সার্কাস-মার্কা ক্লাউন যদি একটা বিষম রঙীন পর্দার সামনে লাফাঝাঁপি করতে থাকেন, তাহলেও চন্দ্রমাধববাবুদের চায়ের আসরের প্রকৃত রূপ ধরা পড়ে না কি? আবার তিনকড়িবাবু টেনে টেনে তাঁদের এনামেল করা চকচকে মুখোসগুলো খুলে দিলে বীভৎস কঙ্কালসার কতকগুলি অবয়ব বেরিয়ে পড়লেই বা কেমন হয়?

    এক কথায় পরিচালক অনেক কিছুই করতে পারেন এ নাটক নিয়ে। উপরের কথাগুলি তাঁদের কল্পনাশক্তিকে পুর্বনির্ধারিত কোনো পরিকল্পনার গণ্ডীর মধ্যে বেঁধে ফেলার জন্যে বলা হয়নি; তাঁদের কল্পনাকে আরো উদ্বুদ্ধ করার জন্যেই বলা হোলো । এমনও হতে পারে শক্তিমান যুবক পরিচালক উপরোক্ত মন্তব্য পড়ে হেসে উড়িয়ে দিয়ে নিজস্ব ধারায় নাটকটিকে ঢালবেন। সেটাই আমাদের কাম্য। তবে প্রগতিশীল সংগঠনের কাছে আমাদের একটি আবেদন : তিনকড়ি হালদারের শেষ ক’টি লাইন অনুধাবন করুন। শ্রী অজিত গঙ্গোপাধ্যায় বহুবার প্রমাণ করেছেন যে তিনি প্রগতিশীল নাট্য-আন্দোলনের একজন শক্তিমান লেখক ৷ এ নাটকেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। যে ইংরাজি নাটক দ্বারা এ নাটক অনুপ্রাণিত, সে নাটকের প্রথম অভিনয় ইংলণ্ডে হয়নি, হয়েছিল প্রগতির যাঁরা শিখরে উঠেছেন—সেই সোবিয়েৎ ইউনিয়নে।

    — উৎপল দত্ত।

    বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে বিভিন্ন পেশাদারী নাট্যসংস্থা এই নাটকটি মঞ্চে সফল উপস্থাপনা করেছে যেমন: চতুর্মুখ, মাস থিয়েটার্স ইত্যাদি।

    এই নাটকটি দুইবার চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে।

    ‘থানা থেকে আসছি’-র প্রথমবার চলচ্চিত্র হয় ১৯৬৫ সালে।

    সুর সংযোজনা— তিমিরবরণ, পরিচালনা— হীরেন নাগ, পরিবেশনা— চণ্ডীমাতা ফিল্মস প্রাঃ লিঃ। রূপায়ণে— উত্তম কুমার, ছায়াদেবী, কমল মিত্র, দিলীপ মুখার্জী, জহর রায়, অঞ্জনা ভৌমিক ও মাধবী মুখার্জী।

    ‘থানা থেকে আসছি’-র দ্বিতীয়বার চলচ্চিত্র হয় ২০১০ সালে।

    পরিচালনা— সারণ দত্ত, পরিবেশনা— মরফিউস মিডিয়া ডেনচার।

    রূপায়ণে— সব্যসাচী, পাওলি, পরমব্রত, রুদ্রনীল, দুলাল ইত্যাদি।

    ‘থানা থেকে আসছি’-র মঞ্চে পেশাদার প্রযোজনা ১৯৭৮ সালে অগাস্ট মাসে। আলো— তাপস সেন, পরিচালনা– শ্যামল সেন, অভিনয়ে– অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃপ্তি মিত্র, এন বিশ্বনাথন, দেবরাজ রায় ইত্যাদি।

    ‘থানা থেকে আসছি’-র মঞ্চে স্বপ্ন সন্ধানীর প্রযোজনা ২০১৩ সালের মে মাসে। পরিচালনা— কৌশিক সেন। অভিনয়ে— কাঞ্চন মল্লিক, কৌশিক সেন, রেশমি সেন ইত্যাদি।

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা নাট্যজগতের এক স্বনামধন্য পুরুষ। জন্ম— কলিকাতায়, ২৮শে জুন, ১৯২১ । শিক্ষা— কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়– অর্থনীতির ও গণিতের ছাত্র। গভীর জীবনবোধ, কাব্যময় সংলাপ, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, বাস্তব মনস্তত্ত্বের চুলচেলা বিচার এঁর প্রত্যেক নাটকের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য মৌলিক নাটক— নচিকেতা, মৃত্যু, পোষ্টমাস্টারের বৌ, সূর্যের মত সমুদ্র, এই সব স্বগোতক্তি ইত্যাদি। বিদেশী নাটক এবং উপন্যাস অনুসরণে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান— শকুন্তলা রায় (হেড্ডা গাবলার) নির্বোধ (ইডিয়ট), আকাশ বিহঙ্গী, (সীগার্ল) মালবাজারের মা মালতী (ডি হাইলিশে ইয়োহান্না ডের সলাখট হফে), থানা থেকে আসছি (এ্যান ইন্সপেক্টর কলস) প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথের ‘যে’ ও ‘ঘরে বাইরে’ এবং বঙ্কিমচন্দ্রের ‘মুচিরাম গুড়’-এর নাট্যরূপ তাঁর বিস্ময়কর কৃতিত্ব। এই নাট্যকার কৃত শেক্সপীয়রের হ্যামলেট ও রিচার্ড দি থার্ড’-এর বঙ্গানুবাদ বিশেষ সুপ্রসিদ্ধি পেয়েছে। অজিতবাবুর নাটক সম্বন্ধে বহু বিদ্বজন বিভিন্ন সময়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এঁর হ্যামলেটের বঙ্গানুবাদকে আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘পাস্তেরনাকের’ রুশ ভাষায় অনুবাদের সঙ্গে সমতুলনা করেছেন। সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশী বলেছেন— ‘ইব সেনের হেড্ডাগাবলার অজিতের হাতে হয়ে উঠেছে সার্থক রক্ত মাংসের শকুন্তলা রায়। নাট্যবিদ উৎপল দত্ত বলেছেন— ‘নাটকে সাহিত্য রস সঞ্চরিত করার কাজে অজিত ছিলেন বর্তমান নাট্যজগতে অনন্য। প্রতিটি বাক্যের ব্যাকরণগত সঠিকতার সঙ্গে যোজিত হত ধ্বনিগত মাধুর্য। যেমন— নচিকেতা নাটক, গ্রীক নাট্যশৈলীকে, খাঁটি দেশজ ভাবের বাহন করেছে নচিকেতা।” বহুরূপী থেকে রূপকার, এলটিজি থেকে নান্দীকার, চতুর্মুখ থেকে চতুরঙ্গ— প্রমুখ নাট্যসংস্থা এঁর বিবিধ নাটক মঞ্চে সফল উপস্থাপনা করেছে। অজিতবাবুর অকাল প্রয়াণ (৫ জুলাই, ১৯৮৪)। বাংলা নাট্যজগত এক দেদীপ্যমান জ্যোতিষ্ককে হারাল।

    চরিত্রলিপি

    চন্দ্রমাধব সেন বিখ্যাত ধনী, কয়েকটি বাণিজ্য-প্রতিষ্ঠানের অংশীদার ও ডিরেক্টর
    রমা সেন চন্দ্রমাধব সেনের স্ত্রী
    শীলা সেন ঐ কন্যা
    তাপস সেন ঐ পুত্র
    গোবিন্দ ঐ ভৃত্য
    অমিয় বোস চন্দ্রমাধব সেনের বন্ধুপুত্র
    তিনকড়ি হালদার পদ্মপুকুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর
    স্থান পদ্মপুকুরে চন্দ্রমাধব সেনের ড্রয়িং-রুম
    কাল ১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহের এক সন্ধ্যা
  • প্রথম অঙ্ক

    প্রথম অঙ্ক

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায়

    [book]

    প্রথম অঙ্ক

    [চন্দ্রমাধব সেনের বাড়ি। সুসজ্জিত ড্রয়িং-রুম। পর্দা উঠিলে দেখা গেল সোফা, কাউচ ইত্যাদিতে বসিয়া চন্দ্রমাধব সেন, শ্রীমতী রমা, শীলা, তাপস ও অমিয় গল্প করিতেছেন। সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। ঘড়িতে সাতটা বাজে]

    চন্দ্রমাধব॥ আচ্ছা শীলা বল তো, আজকের টি-পার্টির সবচেয়ে remarkable ব্যাপারটা কি?

    শীলা॥ কি বাবা?

    চন্দ্রমাধব॥ বাঃ —আজকের কাটলেট থেকে আরম্ভ করে পুড়িং পর্যন্ত সবই তো তোর মার হাতের তৈরি। করিমের তো আজ সারাদিন ছুটি।

    অমিয়॥ তাই নাকি! তাই প্রত্যেকটা আইটেম অত চমৎকার হয়েছিল—

    রমা॥ (মৃদু তিরস্কারের ভঙ্গিতে) আচ্ছা, তুমি কি বল তো? শীলা-তাপসের সামনে না হয় যা ইচ্ছে তাই বললে— কিন্তু তাই বলে— (মৃদু হাসিয়া অমিয়র দিকে ইঙ্গিত করিলেন)

    চন্দ্রমাধব॥ ও অমিয়? তা অমিয়র সামনে লজ্জা কিসের? ও তো ঘরের ছেলে!

    অমিয়॥ না কাকীমা, এ আপনার ভারী অন্যায়। আপনি এখনও আমাকে পর বলে মনে করেন?

    তাপস॥ সত্যি মা, এ তোমার ভারী অন্যায়! শেখরকাকার টেলিগ্রাম, চিঠি, দুই-ই এসে গেছে—

    শীলা॥ বাঃ শুধুই তাই? আজ বিলিতি মতে এনগেজমেন্ট হয়ে গেল—সাতদিন বাদে দিশী মতে পাকা-দেখা—

    তাপস॥ শুধু পাখা-দেখা? এক মাস বাদে বিয়ে—

    অমিয়॥ না না তাপস,—বাবার চিঠি, টেলিগ্রাম, বিয়ের দিন ঠিক হওয়া, এসব না হয় আজকালের ব্যাপার। আগের কথাটা ধর। কাকাবাবু বাবার ছোটবেলার বন্ধু, ছোটবেলা থেকে আমার এখানে আসা-যাওয়া। মাঝে যে ক’বছর বিলেতে ছিলাম, সেই ক’বছরই যা আসতে পারিনি। নইলে দেখ, ফিফটি ওয়ানের ডিসেম্বরে ফিরেছি—আজ তিন বছর হতে চলল—নিয়মমতো এ বাড়িতে আমার আসা যাওয়া—

    শীলা॥ উঁহু—অঙ্কে ভুল হয়ে গেল! ফিফ্‌টি-থ্রির মে-জুন-জুলাই, এ বাড়িতে তোমার টিকিটি দেখতে পাওয়া যায়নি—

    অমিয়॥ বাঃ রে, আমি তোমাকে বলিনি—ফ্যাক্‌ট্রিতে ভীষণ কাজ পড়েছিল—

    শীলা॥ না না—বলনি—সে কথা কি আমি একবারও বলেছি? দেখলাম হিসেবে ভুল করছ—তাই মনে করিয়ে দিলাম।

    রমা॥ এ তোর ভারী অন্যায়, শেলী! বেচারীকে ভাল-মানুষ পেয়ে শুধু শুধু জ্বালাতন করা! কাজের চাপে দু-তিন মাস যদি না-ই আসতে পারে! পুরুষ-মানুষের কাজের তুই বুঝিসটা কি? ওদের কত কাজ—

    চন্দ্রমাধব॥ নিশ্চয়। শেখর তো আজ দু-বছর হলো সব ওরই ওপর ছেড়ে দিয়েছে।

    রমা॥ তবে? (শীলা বলিতে আরম্ভ করিয়াছিল — ‘কিন্তা মা’— তাহাকে বাধা দিয়া) আচ্ছা, তুই কি ভাবিস বল তো শীলা? বিয়ের পর দিনরাত ও তোর আঁচল ধরে ঘরে থাকবে? ও একজন বিজনেসম্যান! সময় সময় দেখবি কাজের চাপে, বাড়িঘর কোন কথাই ওর মনে নেই! না না, তুই ধারণা বদলাতে চেষ্টা কর শেলী—

    শীলা॥ চেষ্টা করে দেখেছি মা—পারিনি! আর কোন দিন যে পারব তাও মনে হয় না! অতএব অমিয়বাবু, তুমি এখন থেকে সাবধান! (তাহার এই শেষের কথাগুলি শুনিয়া, দুই রকমই মনে হইতে পারে। মনে হতেই পারে, হয়তো সে অমিয়র সহিত রসিকতা করিতেছে—হয়তো সত্য সত্যই তাহাকে সাবধান হইতে বলিতেছে।)

    অমিয়॥ না না, তুমি দেখে নিও শীলা—ঐ একবারই যা হয়ে গেছে— (কোথাও কিছু নাই অমিয়র কথা শুনিয়া তাপস হঠাৎ জোরে হাসিয়া উঠিল। মিঃ ও মিসেস সেন বিস্মিত হইয়া তাহার দিকে তাকাইলেন।)

    শীলা॥ উঃ হেসে লুটিয়ে পড়লেন একেবারে! কেন, কিসের এত হাসি শুনি?

    তাপস॥ (তখন অল্প হাসিতে হাসিতে) তা তো জানি না— হঠাৎ কি রকম হাসি পেয়ে গেল—

    শীলা॥ (ক্রুদ্ধ স্বরে) তা তো পাবেই! হাসি পাবার মত কথা বললাম আমরা— আর উনি হেসে আমাদের তুড়িতে ফুঁ করে দিলেন!

    তাপস॥ না, কক্ষনো না—আমি কোন কিছু ভেবে হাসিনি—

    রমা॥ আঃ— আবার দু’জনে ঝগড়া আরম্ভ করলি? আর শীলা, তোকেও বলি। কি সব কথাবার্তা বলছিস আজকাল? তুড়িতে ফুঁ করে দিলেন!—কোত্থেকে শিখেছিস এসব?

    তাপস॥ তুমি বোধহয় ওর কথাবার্তা বিশেষ কান করে শোনো না মা—আজকাল ও ওই রকম কথাই তো বলে—

    শীলা॥ দেখ মা—আমি কারুর মান-টান রেখে কথা বলতে পারব না বলে দিচ্ছি! ছোড়দাকে ও রকম গাধার মত কথা বলতে বারণ করে দাও—

    তাপস॥ দেখ শীলা —

    রমা॥ (বাধা দিয়া) আঃ তোরা থামবি কিনা! দু’জনে দেখা হবার জো নেই একেবারে! দেখা হলেই ঝগড়া! (শীলাকে) আর ঝগড়া তো খুব করছিস? আজকের দিনে বাবাকে একটা প্রণাম করতে হয়, সে কথাটা মনে আছে কি?

    শীলা॥ ঐ যাঃ — একেবারে ভুলে গেছি! (উঠিয়া মিঃ ও মিসেস সেনকে প্রণাম করিল—সেই সঙ্গে সঙ্গে অমিয়ও প্রণাম করিবার সময় মিঃ সেনকে ‘থাক বাবা থাক, হয়েছে’—বলিতে শোনা গেল।)

    চন্দ্রমাধব॥ (রমাকে) বুঝলে, ওরা ভাবছে, আজ ওদেরই দিন। তোমার আমার কথাটা তো জানে না! শীলার সঙ্গে অমিয়র বিয়ে—এ আমাদের কতদিনের ইচ্ছে! অমিয় যখন বিলেতে, তখন থেকে কথাবার্তা চলছে। এ বছর হবে সমস্ত ঠিক! এমন সময় শেখর বৌকে নিয়ে চলে গেল বম্বে। ভাবলাম এ বছরও হলো না। তারপর হঠাৎ কাল শেখরের টেলিগ্রাম—সামনের শনিবার পাকা-দেখা, সব ব্যবস্থা কর, আমি যাচ্ছি।

    রমা॥ ওঃ—কাল যদি টেলিগ্রাম পাবার পর আমাদের অবস্থা দেখতে। কি যে করব, কাকে যে বলব, যেন কিছু ভেবে পাচ্ছিলাম না! আমি তো বলেছিলাম, আমাদের সার্কেলের সবাইকে আজকের পার্টিতে বলা হোক—

    চন্দ্রমাধব॥ সেটা আমিই বারণ করেছিলাম অমিয়! আচ্ছা তুমিই বল, আজকের এই যে ঘরোয়া ব্যাপার—এটাই বেশ চমৎকার হলো না?

    অমিয়॥ না না কাকীমা, এটা খুব ভাল হয়েছে। শনিবার একটা পাবলিক কিছু করলেই হবে।

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ, তারপর কি যেন বলছিলাম—? ও, শেখর আর আমি— আজই আমরা ফ্রেণ্ডলি রাইভ্যালস—কিন্তু একমাস বাদে? তখন আমরা আত্মীয়। সত্যি, আজ আমি স্বপ্ন দেখি—অমিয়, শেখর আর আমি এক হয়ে গেছি। অবিশ্যি শেখরের কনসার্ন আমার চেয়ে অনেক বড়, অনেক পুরোনো—তা হোক, তবু আমার মনে হয় দুইএ মিলে এক হবেই! বিরাট বিজনেস ট্রাস্ট গড়ে উঠবে—নাম হবে ধর, চন্দ্রশেখর নগর, কি শেখর-মাধব নগর—ট্রেডমার্ক হবে এনভিল আর হ্যামার। (উত্তেজিত হইয়া) তখন আর আমরা রাইভ্যালস নয় অমিয়, তখন আমরা এক হয়ে কাজ করছি, for lower costs and higher prices!

    অমিয়॥ And for more profits! আমার মনে হয় বাবাও এতে রাজী হলেন কাকাবাবু।

    রমা॥ আচ্ছা, তুমি যেন কি! আজকের দিনে আর কথা পেল না? সেই বিজনেস, বিজনেস আর বিজনেস।

    শীলা॥ সত্যি বাবা— কোথায় সানাই বাজবে, না তোমরা দু’জনে খেরো খাতা নিয়ে বসলে!

    চন্দ্রমাধব॥ না না, ও আমি এমনি কথায় কথায় বলছিলাম। কিন্তু যাই বল রমা— শীলা, অমিয়, এরা সত্যিই ফরচুনেট—

    অমিয়॥ (শীলার দিকে চাহিয়া মৃদু হাসিয়া) অন্তত আমি যে ফরচুনেট এ বিষয়ে তো কোন সন্দেহ নেই!

    রমা॥ (অল্প তর্জনের সুরে) কিন্তু শীলা—

    শীলা॥ কি হলো মা? আবার কি করলাম!

    রমা॥ বাঃ—কি করলাম মানে? (তাপসের দিকে ইঙ্গিত করিলেন)

    শীলা॥ (ইঙ্গিত বুঝিতে পারিয়া) ঐ দেখ এক্কেবারে ভুলে গিয়েছিলাম! (তাপসকে প্রণাম করিয়া) আজকের দিনে তুই আমায় মাফ কর ছোড়দা—

    তাপস॥ (শীলার হাত ধরিয়া উঠাইয়া) দূর পাগলি! মাফ কিসের? তুই কি কোন দোষ করেছিস যে মাফ করব? বুঝলে অমিয়— শীলা একটু বদ-মেজাজি বটে, কিন্তু এরকম মেয়ে হয় না—

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁগো, শীলার এ আংটিটা নতুন গড়ালে বুঝি? বেশ চমৎকার হয়েছে তো!

    রমা॥ আমি গড়াব কেন? ওটা যে অমিয় আজ শেলীকে প্রেজেন্ট করেছে—

    চন্দ্রমাধব॥ বাঃ বেশ হয়েছে! শেলী— মাই গার্ল! সত্যি এ একটা বিয়ের মতো বিয়ে হচ্ছে, কি বল, আমার মেয়ে শেখরের ছেলে! পরে তুমি আমার কথা মিলিয়ে নিও—এ বিয়েতে ওরা দু’জনেই খুব খুশি হবে। হ্যাঁ, কিন্তু একটা কথা (শীলাকে তখনও আঙুলের আংটির দিকে তাকাইয়া থাকিতে দেখিয়া) ওরে শোন শোন, কথাগুলো শুনে রাখা তোরও দরকার— আজ বাদে কাল একটা ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টের বউ হতে চলেছিস—

    শীলা॥ না না, তুমি বল বাবা—আমি শুনছি—

    চন্দ্রমাধব॥ না—মানে ঐ যে বলছিলাম না—সত্যিই তোরা খুব সুখী হবি! আর কেন হবি না বল? সত্যিই খুব ভাল সময়ে তোদের বিয়ে হচ্ছে। তুমি বল না অমিয়, সময়টা কি এমন খারাপ! বাইরের অবিশ্যি দু-চারজন লোকের মুখে সব সময়েই শুনতে পাবে— বাজার মন্দা, সময়টা বড্ড খারাপ! কিন্তু আমিও তো একজন দুঁদে বিজনেসম্যান? আমি তোমায় বলছি অমিয়, ওসব কথার কোন মানেই হয় না! যারা কোন কালে কিছু করতে পারে না তারাই ঐ সব কথা বলে! আরে—এখন তো সময় ভাল যাচ্ছেই, এরপর আরো ভাল সময় আসছে। বাইরে অবিশ্যি ঐরকম দু-চারজনের মুখে শুনতে পাবে— কোথায় সময় ভাল? আজ অমুক মিলে স্ট্রাইক, কাল তমুক ফ্যাক্টরিতে কাজ বন্ধ। ঐ যে—ওমাসে জেনারেল স্ট্রাইক না কি একটা হলো না—আরে সে কি হৈ-চৈ। এইবার লেবার-ট্রাবল আরম্ভ হলো—আর রক্ষে নেই—হেন-তেন সাত-সতের সে সব আরো কত কি! আরে, যতই যাই হোক — ফরটি-সিক্সের মত তো আর হবে না! কিন্তু কই, কিছু হলো কি? রায়ট বাধার সঙ্গে সঙ্গে কোথায় ভেসে গেল ইনকিলাব-জিন্দাবাদের দল! তারপর আমরা এমপ্লয়াররাও তো কিছু চুপ করে বসে নেই! আমরাও দেখছি যাতে ক্যাপিটালের ইন্টারেস্ট প্রপারলি প্রটেক্টেড হয়। আমি তোমায় বলছি অমিয়, আমাদের এখন ধনস্থানে বৃহস্পতি— ফল সম্ভোগ, অর্থ-বৃদ্ধি—বুঝলে—

    অমিয়॥ আমারও তাই মনে হয় কাকবাবু—

    তাপস॥ আর পাঁচজনে কিন্তু অন্য কথা বলছে বাবা। তারা বলছে বিপ্লব, শ্রেণী-সংগ্রাম, ইনকিলাব জিন্দাবাদ—আরো সব কত কি!

    চন্দ্রমাধব॥ থামো থামো! বিপ্লব, শ্রেণী সংগ্রাম! সব অত সস্তা কিনা। মাঠে ময়দানে, দু-চারটে মিটিঙে লাল ঝাণ্ডা নিয়ে ইনকিলাব ইন-কিলাব করলে যদি বিপ্লব আসত, তাহলে আর ভাবনা থাকত না। আগে দেখ লোক কি চায়? এদেশের লোকের প্যাসিভ নেচার! তারা ওসব ঝঞ্ঝাটের মধ্যে যাবে কেন? ওসব হাঙ্গামায় তাদের লাভটা কি? আর বুদ্ধিমান লোক তো মোটেই ওসবের মধ্যে যাবে না। তারা এ বাজারে বেশ দু-পয়সা করে খাচ্ছে! তোমার আমার মতো নরম্যাল লোকের ওসব ঝঞ্ঝাট করে লাভ তো কিছুই হবে না—বরং লোকসান! এক লাভ হতে পারে কাদের—যারা অ্যাবনরম্যাল অকর্মা, বোকা, তাদের। কিন্তু তাদের সে শক্তি কই?—সে ক্ষমতা কোথায়?

    তাপস॥ সব বুঝলাম— কিন্তু তবু—

    চন্দ্রমাধব॥ আবার তবু কিসের শুনি, তবু কিসের? তোদের ধরনই এই! জানিস তো কত—কিন্তু তবু দেখ সব কথায় একটা করে তবু-কেন-কিন্তুর ফোড়ন আছেই। ওরে বাবা, আমিও তো একটা দুঁদে বিজনেসম্যান, আমার কথারও তো একটা দাম আছে। দুনিয়াটার দিকে তাকিয়ে দেখ— দেখ how fast it is developing। যারা একটু বুদ্ধিমান, একটু চিন্তা করে, তাদের এখন ওসব কথা ভাববার সময় কই? এটা কি উনিশ শো আঠারো সাল—না রাশিয়া! জীবনের কমফর্টস লাক্সারি কত বেড়ে গেছে এখন! এই চোখের ওপর দুর্গা মিত্তিরকেই দেখছি! ছিল একটা পেটি বিজনেসম্যান! যুদ্ধের বাজারে দুটো পদে ব্যবসা আরম্ভ করলে, দেশী পদে চাল আর পুরনো লোহা, আর বিলিতি পদে বীফ! দু’দিনে একেবারে আঙুল ফুলে কলাগাছ। যা একটু বাকি ছিল, ব্যাঙ্কট্যাকে ফেল করিয়ে তাও পুষিয়ে নিলে। প্রথম প্রথম সবাই নাক সেঁটকাতে। আজ? আজ সে আমাদেরই একজন। কে বলবে সে একদিন বীফের ব্যবসা করত! গোহত্যা নিরোধের আজ সে একজন বড় পাণ্ডা! এই তো পরশু প্রসেশনের সঙ্গে মোটরে করে গেল, আবার মোটর থেকে নেমে গিয়ে পুলিশের লাঠি খেলে। আগে একখানা ভাঙা ফোর্ড ছিল — এখন দেখ চারখানা নতুন মডেলের গাড়ি। আগে কোন রকমে সেকেণ্ড ক্লাসে ট্রাভেল করত, এখন প্লেন ছাড়া কথা বলে না। এই তো কালই বলছিল— ছাতে প্লেন নামাতে পারলে ভারী সুবিধে হয়! আরে এখন কি দেখছিস? আবার তোদের ছেলেমেয়ের বিয়েতে যখন পার্টি দিবি, তখন দেখবি—লোকে দিব্যি আরামে রয়েছে, চারধারে র‍্যাপিড প্রগ্রেস, মালিকেরা সব এক জোট, লেবার ট্রাবলের কোন চিহ্নই নেই! দেখবি প্রত্যেকটা দেশ তখন আমেরিকার সঙ্গে সমান তালে পা ফেলে এগিয়ে চলেছে—অবিশ্যি রাশিয়া চীন-ফিন বাদে! ওসব জায়গায় আজও ব্যক্তিস্বাধীনতা নেই, সেদিনও থাকবে না—কাজেই নো প্রগ্রেস।

    রমা॥ (বিরক্ত হইয়া) আচ্ছা, তোমার আজ কি হয়েছে বল তো? আবার আজকের দিনে ঐ সব বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করলে—

    চন্দ্রমাধব॥ না, মানে—

    রমা॥ না, কোন মানে নয়, চুপ একেবারে।

    চন্দ্রমাধব॥ আচ্ছা আচ্ছা, এই চুপ করলাম—হয়েছে তো! কিন্তু না বলেই বা কি করি বল? বাইরে তো ঘুরতে হয় না, ঘুরলে দেখতে পেতে! যত ব্যাটা হতভাগা, অকর্মার দল! কেউ নাটক লেখেন, কেউ লেখেন গল্প-কবিতা, কেউবা খুচরো পলিটিক্স করেন! আর সব কথা বলছে কি! শুনলে মনে হবে দেশের নাড়ীনক্ষত্র সব কিছু জেনে বসে আছে একেবারে! আরে—দেশের বুঝিসটা কি? জীবনের দেখলি কি? ক্যাপিটাল আমাদের, বিজনেস আমাদের! যেটুকু বোঝবার, সেটুকু তো আমরাই বুঝি! তুমি কথা বলার কথা বলছ? এতদিন তো চুপ করেই ছিলাম। আজ ওরা আবোল-তাবোল বকছে বলেই না আমরা একটু-আধটু বলছি! অন্তত এটা তো ঠিক কথা— আমরা যেটুকু বলব, তা সলিড এক্সপিরিয়েন্স থেকেই বলব— ওদের মতো আবোল-তাবোল নয়!

    (গোবিন্দর প্রবেশ)

    গোবিন্দ॥ মা, স্যাকরা এসেছে, তাকে কি এখানে নিয়ে আসব?

    রমা॥ না, ভেতরের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসা, আমি যাচ্ছি। শীলা, প্যাটার্ন আর ডিজাইনটা পছন্দ করে দিবি চল—অমিয়, চলে যেও না যেন বাবা, এখুনি আসছি—(অমিয় ‘না না আমি আছি কাকীমা’ বলিলে, মিসেস সেন ও শীলা উঠিয়া দরজার দিকে অগ্রসর হইলেন! বাহিরে যাইতে যাইতে তাপসকে) তুই একটু আয় তো তাপস, দরকার আছে! (তাঁহাদের পশ্চাতে তাপসের প্রস্থান।)

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ, একটা কথা অমিয়, অবিশ্যি তোমার আমার মধ্যে! আমি যতদূর জানি, তোমার মার বোধহয় বিশেষ মত ছিল না এ বিয়েতে—তাঁর বোধহয় ইচ্ছে ছিল স্যার এ এনের নাতনীর সঙ্গে তোমার বিয়ে হয়—তাই না? (অমিয়কে ‘না মানে না মানে’ বলিতে দেখিয়া) না না, আমি বলছি না তাঁর অন্যায়। শেখর আমার বন্ধু হতে পারে—কিন্তু ঘর হিসেবে তোমরা আমার চেয়ে অনেক বড়। বিশেষ করে তোমার মা তো স্যার বীরেন মিত্তিরের মেয়ে। তবে আমারও পোজিশন খুব একটা নিচু এখন নয়! বার দুয়েক বিলেতেও ঘুরে এসেছি— আর অনার্স-লিস্ট এখন নেই তাই—থাকলে স্যার না হলেও একটা রায় বাহাদুর অন্তত হতাম। তবে একটা ভরসা আভাসে তোমার মাকে দিতে পার… এবার বোধহয় অ্যাসেম্বলিতে যাচ্ছি—

    অমিয়॥ তাই নাকি?

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ, রিসেন্টলি ভুপেন মিত্তিরের সিটটা খালি হয়েছে না? ঐ সিটে—

    অমিয়॥ বাঃ— ফিরে এলেই মাকে আমি খবরটা দেব—

    চন্দ্রমাধব॥ না না, এখনও সেন্ট পারসেন্ট সারটেন নয়—তবে তুমি তোমার মাকে বলতে পার। নমিনেশনটাও জাঁদরেল ব্লকের, আর এলাকাটাও ভাল। বেশির ভাগ ভোটারই ব্যবসাদার—খালি গোটা দুয়েক বস্তি আছে। কিছু যদি ভাঙতে পারি, আর মনে হয় পারব— তাহলে আর দেখতে হবে না—ইলেকশন সারটেন!

    অমিয়॥ তাহলে মাকে খবরটা পরিষ্কার জানিয়েই দিই, কি বলেন?

    চন্দ্রমাধব॥ না না, বলা কি যায়। ধর শেষ পর্যন্ত একটা স্ক্যান্ডালই হয়ে গেল—কোর্ট ঘর করতে হলো—

    অমিয়॥ শুধু শুধু স্ক্যাণ্ডলই বা হতে যাবে কেন?

    চন্দ্রমাধব॥ তা কি বলা যায়? চারদিকে কত পুয়োর রিলেশন্স। কখন যে কি কুকর্ম করে বসে তার ঠিক কি? তুমি বরং তোমার মাকে একটা হিন্ট দিয়ে রেখ—(তাপসকে প্রবেশ করতে দেখিয়া) কিরে, তোকে যে তোর মা দরকার বলে ডেকে নিয়ে গেল?

    তাপস॥ দরকার না ছাই! স্যাকরা ডিজাইন-বুক দিয়ে চলে গেল, আর ওঁরা শাড়ি জর্জেটের কথা আরম্ভ করলেন। আমায় যে দরকার বলে ডেকে এনেছে, সে হুঁশই নেই কারুর! আমি একটা মজা দেখেছি বাবা, মেয়েরা কাপড় আর গয়নার কথা যখন আরম্ভ করে তখন বিশ্বসংসার ভুলে যায়!

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু কাপড় আর গয়নাটা তোদের কাছে তুচ্ছ বলে মনে হতে পারে— তবে ওদের কাছে নয়। তুই কি ভাবিস, মেয়েরা তাদের সুন্দর দেখাবে বলেই ওসব নিয়ে এত মাথা ঘামায়? কাপড় আর গয়না ওদের সেলফ-রেসপেক্টের একটা চিহ্ন— তা জানিস!

    অমিয়॥ ঠিক বলেছেন আপনি —

    তাপস॥ (ব্যস্তভাবে) হ্যাঁ হ্যাঁ আমারও মনে পড়েছে, (একটু থামিয়া) না মানে—

    চন্দ্রমাধব॥ (বাধা দিয়া) না মানে? না মানে কি? তোর কি মনে পড়েছে?

    তাপস॥ (অপ্রতিভ হইয়া) না, মানে—ও কিছু নয়—এমনি বলছিলাম—

    অমিয়॥ (ঠাট্টা করিয়া) উঁহু তাপস, ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক বলে মনে হচ্ছে—

    চন্দ্রমাধব॥ তা যা বলেছ—কিছু বিশ্বাস নেই এদের! হাতে অবসরও প্রচুর, টাকাও প্রচুর। কাজেই কখন যে কি করতে পারে, আর কি করতে পারে না— তা জোর করে কিছু বলা যায় না। অথচ আমাদের ছেলেবেলার কথা মনে আছে—বাড়িতে এক মিনিট বসে থাকতে সময় পেতাম না। কিছু না থাকলে ঘরে কাজ করতে হতো। আর টাকা-পয়সা? মনে আছে যখন প্রেসিডেন্সিতে পড়তে যেতাম তখন বাসভাড়া আর জলখাবার মিলিয়ে দশটা করে পয়সা পেতাম। কিন্তু কেমন চলে যেত আমাদের—আবার ওরই মধ্যে একটু-আধটু আমোদ-আহ্লাদও করেছি—

    অমিয়॥ তা তো করতেই হবে একটু আমোদ-আহ্লাদ, না করলে চলবে কেন?

    চন্দ্রমাধব॥ সেই কথাই তো বলছি! তাপস ভাবছে, আমি আবার হয়তো বক্তৃতা শুরু করব। কিন্তু বক্তৃতা কোথায়—এটা একটা দরকারী কথা। কথাটা তোমাদের কারুই মনে থাকে না—বোঝও না বোধহয় তোমরা। আজকে তোমরা যা পাচ্ছ—এ তো তৈরি জিনিস। আমরা তা পাইনি—আমাদের তৈরি করে নিতে হয়েছে। তোমাদের এগিয়ে যাওয়া কত সহজ—কিন্তু পারছ কই তোমরা আমাদের মতো এগুতে? কেন পারছ না জান? ঐ দরকারী কথাটা কেউ বোঝ না বলে। জানবে আজকের দিনে বড় হতে গেলে দুনিয়ায় নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দেখার নেই। জেনে রেখ— first you yoruself, second you yourself, and last you yoruself! তবে ফ্যামিলি থাকলে ফ্যামিলির কথাটাও কনসিডার করতে হবে। এই সেলফের নীতি-কথাটি যদি মনে থাকে, তবেই দেখবে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছ। আর নইলে বাইরের ঐ সব মাথা খারাপ হতচ্ছাড়াদের কথায় কান দিয়েছ কি মনে হবে—উঁহু, সেলফ তো ঠিক কথা নয়, সমাজের সকলের সুখ-দুঃখ দেখতে হবে। আর যত সব ননসেন্স কথা মনে আসবে, — সমাজ রাষ্ট্র, কো-অপারেশন, ব্রাদারফিলিং! —আর ঐ সব মনে হয়েছে কি তলিয়ে গেছ! আরে বাবা— আমি একাট দুঁদে বিজনেসম্যান, অভিজ্ঞতার পাঠশালায় আমার পাঠ নেওয়া! আমি তোমাদের বলছি—দুনিয়ার কোন লোকের জন্য এতটুকু দায় তোমাদের নেই! খালি নিজেকে দেখ, নিজের ফ্যামলিকে দেখ। আর তেল যদি দেবার দরকার হয়— দাও তেল—কিন্তু নিজের চরকায়।

    (গোবিন্দর প্রবেশ)

    গোবিন্দ॥ আজ্ঞে, থানা থেকে সাব-নেসপেক্‌টার বাবু এসেছেন—

    চন্দ্রমাধব॥ কে এসেছে?

    গোবিন্দ॥ আজ্ঞে সাব-নেসপেকটার বাবু—

    চন্দ্রমাধব॥ (বিরক্তির সহিত) সাব-ইন্‌স্‌পেক্‌টর? কিসের?

    গোবিন্দ॥ আজ্ঞে পুলিসের। পদ্মপুকুর থানা থেকে আসছেন। নাম বললেন তিনকড়ি হালদার।

    চন্দ্রমাধব॥ তিনকড়ি হালদার! (বোধহয় মনে করিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু ও নামে কাহাকেও মনে পড়িল না।)— তা চায় কাকে?

    গোবিন্দ॥ আজ্ঞে বললেন, আপনার সঙ্গে জরুরী দরকার।

    চন্দ্রমাধব॥ আমার সঙ্গে? নন্‌সেন্স্! (উঠিবার উপক্রম করিয়া) আচ্ছা, বাইরের ঘরে বসা, আমি—(পুনরায় বসিয়া পড়িয়া) আচ্ছা, থাক, এখানেই পাঠিয়ে দে। (গোবিন্দর প্রস্থান)—ও হয়েছে— বুঝলি, রমেশ বোধহয় কোন দরকারে পাঠিয়েছে। (অমিয়কে) আমার ভাগ্নে রমেশ, সাউথের ডিসি, থাকেও পদ্মপুকুর থানার ওপরে, তাই বোধহয়—

    অমিয়॥ (ঠাট্টার ছলে) কিংবা হয়তো দেখুন, আমাদের তাপস কিছু করে-টরে বসেছে কিনা!

    চন্দ্রমাধব॥ (ঐ একই সুরে) তা হতে পারে! তোমাদের—মানে আজকালকার ছেলেদের বিশ্বাস নেই কিছু!

    তাপস॥ (অস্বস্তির সহিত অমিয়কে) তার মানে? কি বলতে চাও তুমি?

    অমিয়॥ (হাসিয়া উঠিয়া) কি মুশকিল! কিচ্ছু বলতে চাই না! আচ্ছা পাগলকে নিয়ে পড়া গেছে যাহোক! ঠাট্টা বোঝে না?

    তাপস॥ (পূর্ববৎ, অস্বস্তির সহিত) না, ঠাট্টা যদি ওরকম হয় তাহলে বুঝি না!

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধ স্বরে) তাপস! আজ তোর কি হয়েছে বলতো?

    তাপস॥ (উদ্ধত স্বরে) হবে আর কি? কিচ্ছু নয়!

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধ স্বরে) তাপস! (আরও কি যেন বলিতে যাইতেছিলেন, এমন সময় সাবইন্সপেক্টর তিনকড়ি হালদারের প্রবেশ। তাঁহার পরিধানে সাবইন্সপেক্টরের পরিচ্ছদ। গুরুত্ব আরোপ করিয়া কথা বলার অভ্যাস, এবং কথা বলেন খুব সাবধানে, যেন কোথাও ফাঁক না থাকিয়া যায়, অথবা কোন অপ্রয়োজনীয় কথা না বলিয়া ফেলেন! লক্ষ্য করিবার মতো আরও একটি বিশেষত্ব আছে। কাহারও সহিত কথা বলিবার সময় তাঁহার অপ্রীতিকর প্রখর দৃষ্টি উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে রীতিমত বিচলিত করিয়া তোলে।)

    তিনকড়ি॥ নমস্কার, আপনিই মিস্টার চন্দ্রমাধব সেন?

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ, আপনি?

    তিনকড়ি॥ সাব-ইন্সপেক্টর তিনকড়ি হালদার— পদ্মপুকুর থানা থেকে আসছি।

    চন্দ্রমাধব॥ (চেয়ার দেখাইয়া দিয়া) বসুন—(তিনকড়িবাবু বসিলে, সিগারেট কেস খুলিয়া সম্মুখে ধরিলেন) সিগারেট?

    তিনকড়ি॥ নো, থ্যাঙ্কস।

    চন্দ্রমাধব॥ (নিজে সিগারেট ধরাইতে ধরাইতে) আপনি বুঝি সিগারেট খান না?

    তিনকড়ি॥ খাই তবে অন ডিউটি নয়!

    চন্দ্রমাধব॥ (তিনকড়ির মুখের দিকে তাকাইয়া) আপনি পদ্মপুকুরে নতুন এসেছেন, না?

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ নতুনই, আজ নিয়ে পাঁচদিন।

    চন্দ্রমাধব॥ আমারও মনে হচ্ছিল। আমার ভাগ্নে রমেশ, মানে আপনাদের সাউথের ডি-সি, ও তো থাকে ঐ থানার ওপরেই। ওর ওখানে প্রায়ই যাই তো— কিন্তু আপনাকে কখনও…

    তিনকড়ি॥ (বাধা দিয়া) না, আমাকে আর দেখবেন কি করে—আমি তো মোটে পাঁচদিন হলো এসেছি।

    চন্দ্রমাধব॥ না, মানে আমিও তাই বলছিলাম। কিন্তু আপনি এ সময়ে,— রমেশ কোন দরকারে পাঠিয়েছে নিশ্চয়?

    তিনকড়ি॥ না মিস্টার সেন।

    চন্দ্রমাধব॥ (অসহিষ্ণু হইয়া) তবে?

    তিনকড়ি॥ আমি এসেছি দু-একটা খবর জানতে। অবশ্য আপনি যদি কিছু মনে না করেন।

    চন্দ্রমাধব॥ খবর জানতে? এখানে?

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ। আজ বিকেলে একটি মেয়ে কার্বলিক অ্যাসিড খেয়ে মারা গেছে। হসপিটালে পাঠানো হয়েছিল সঙ্গে সঙ্গে, কিন্তু কিছুতেই বাঁচানো গেল না, ভেতরটায় কিচ্ছু ছিল না— সমস্ত জ্বলে গিয়েছিল!

    তাপস॥ (শিহরিয়া উঠিয়া) উঃ! বলেন কি?

    তিনকড়ি (তাপসকে) হ্যাঁ, সে বড় ভীষণ যন্ত্রণা, চোখে দেখা যায় না! (চন্দ্রমাধবকে) বুঝতেই পারছেন—সুইসাইড—

    চন্দ্রমাধব॥ সে তো বুঝতেই পারছি—it’s a horrible business! কিন্তু আমার সঙ্গে এসবের সম্পর্ক কি?

    তিনকড়ি॥ মেয়েটি যেখানে থাকত সেখানে আমি গিয়েছিলাম। তার একটা চিঠি আর ডায়েরি আমি পেয়েছি। জানেন তো, অভিবাবকহীন অবস্থায় বিপদে-আপদে পড়লে মেয়েরা অনেক সময় অন্য নাম নেয়? এ মেয়েটিও নিয়েছিল। আমি অবশ্য আসল নামটা ডায়েরি থেকে বার করে নিয়েছি— সন্ধ্যা চক্রবর্তী—

    চন্দ্রমাধব॥ সন্ধ্যা চক্রবর্তী?

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ, সন্ধ্যা চক্রবর্তী। মেয়েটিকে মনে আছে আপনার?

    চন্দ্রমাধব॥ (ধীরে ধীরে) না—মানে—নামটা যেন কিরকম শোনা শোনা বলে মনে হচ্ছে—কোথায় যেন শুনেছি! কিন্তু সে যাই হোক—এসবের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কি?

    তিনকড়ি॥ আপনাদেরই একটা কনসার্ন—দয়াময়ী কুটীরশিল্প প্রতিষ্ঠান— মেয়েটি সেখানে এক সময় কাজ করত।

    চন্দ্রমাধব॥ ও তাই বলুন। কিন্তু সেখানে তো একটা মেয়ে কাজ করে না। আর যারা করে তাদেরও কেউ পারমানেন্টলি নেই—আজ দুজন আসছে, কাল দুজন যাচ্ছে।

    তিনকড়ি॥ এ-মেয়েটি খুব একটা সাধারণের পর্যায় পড়ে না মিস্টার সেন। আমি তার বাসা থেকে একটা ছবিও জোগাড় করেছি—আপনি হয়তো ছবিটা দেখলে চিনতে পারবেন। (তিনকড়ি হালদার একটি পোস্ট-কার্ড সাইজের ছবি পকেট হইতে বাহির করিয়া মিস্টার সেনের নিকট গেলেন। অমিয় ও তাপস দুইজনেই ছবিটি দেখিতে গেল। কিন্তু তিনকড়িবাবু ছবিটিকে আড়াল করিয়া ধরায় তাহারা দেখিতে সক্ষম হইল না। তিনকড়িবাবুর এইরূপ ব্যবহারে তাহারা বিস্মিত তো হইয়াছিলই, বিরক্তও হইল। দেখা গেল মিস্টার সেন ছবিটি খুব ভাল করিয়া দেখিতেছেন, এবং মনে হইল যেন চিনিতেও পারিয়াছেন। তিনকড়িবাবু ছবিটিকে পকেটে রাখিয়া স্বস্থানে ফিরিয়া আসিলেন।)

    অমিয়॥ (বিরক্তির সহিত) আচ্ছা তিনকড়িবাবু, ছবিটা আমাকে দেখতে দিলেন না কেন? বিশেষ কোন কারণ আছে কি?

    তিনকড়ি॥ (শান্ত অথচ কঠোর দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া) হয়তো আছে।

    তাপস॥ আমার বেলায়ও কি তাই, তিনকড়িবাবু?

    তিনকড়ি॥ নিশ্চয়। আপনি কি ভাবছিলেন আপনার জন্যে একটা আলাদা কিছু হবে?

    অমিয়॥ কিন্তু কারণটা কি?

    তাপস॥ সেটা তো আমার মাথাতেও ঢুকছে না—

    চন্দ্রমাধব॥ তিনকড়িবাবু আমিও কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছি না, কেন আপনি ওদের…

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে, আমার কাজ করার রীতিই এই। এক-একবারে এক-একজন। নইলে, সকলকে একসঙ্গে ধরলে বড় গণ্ডগোল হয়।

    চন্দ্রমাধব॥ (কিছুটা চঞ্চল হইয়া) তাহলে অবিশ্যি বলবার কিছু নেই!

    তিনকড়ি॥ (চন্দ্রমাধবের এই চাঞ্চল্য তিনি লক্ষ্য করিয়াছিলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন করিলেন) আপনি তাহলে মেয়েটিকে চিনতে পেরেছেন, কি বলেন মিস্টার সেন?

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ, এখন মনে পড়েছে। মেয়েটি দয়াময়ীতে কাজ করত—আমরা তাকে বরখাস্ত করি—

    তাপস॥ (উত্তেজিত হইয়া) বাবা, তাহলে কি সেইজন্যেই মেয়েটি…

    চন্দ্রমাধব॥ তাপস! চুপ করে বসতে পারিস বস—নইলে এ ঘর থেকে যা। (তিনকড়িবাবুকে) কিন্তু এ আজ দু’বছর আগের কথা তিনকড়িবাবু, ফিপটি-টুর সেপ্টেম্বরের শেষে।

    অমিয়॥ আমি এখন তাহলে বাইরে যাই, কি বলেন কাকা?

    চন্দ্রমাধব॥ না না, বাইরে যাবার মতো হয়েছেটা কি!—কি তিনকড়িবাবু, অমিয়র এ ঘরে থাকাতে আপনার নিশ্চয়ই কোন আপত্তি নেই? (হয়তো আপত্তি থাকিতে পারে এই মনে করিয়া তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিলেন)—মানে, আমার বন্ধু বোস ইনডাসট্রিজ-এর শেখর বোস—নাম শুনেছে নিশ্চয়? বাংলাদেশের একটা অতবড় বিজনেস ম্যাগনেট! অমিয় তাঁরই ছেলে—

    তিনকড়ি॥ কি বললেন? অমিয় বসু—না?

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ—মানে, অমিয় আর আমার শীলা—সামনের মাসেই ওদের বিয়ে। তাই আজ একটু—

    তিনকড়ি॥ (চিন্তা করিতে করিতে অমিয়কে) ও, আপনি আর শ্রীমতী শীলা—আপনাদের এই সামনের মাসেই বিয়ে, না?

    অমিয়॥ (মৃদু হাসিয়া) এখনো অবধি আশা তো সেই রকমই, তবে—

    তিনকড়ি॥ (গম্ভীরভাবে) না অমিয়বাবু, তাহলে আপনার বাইরে না যাওয়াই ভাল। আপনি বরং এ ঘরেই থাকুন।

    অমিয়॥ (বিস্মিত হইয়া) আশ্চর্য! তা না হয় রইলাম, কিন্তু—

    চন্দ্রমাধব॥ (অধৈর্য হইয়া) দেখুন তিনকড়িবাবু, আপনি যে ভাবছেন মিষ্টিরিয়াস কেলেঙ্কারি গোছের একটা কিছু হয়েছিল—তা মোটেই হয়নি, এর মধ্যে বাঁকা-চোরা কিছু নেই। স্ট্রেট কেস! তাও হয়েছে কবে?—না দু’বছর আগে। তার সঙ্গে এ সুইসাইডের সম্পর্কটা কি?—কিছুই নয়!

    তিনকড়ি॥ না মিস্টার সেন, আমি আপনার কথা মেনে নিতে পারছি না।

    চন্দ্রমাধব॥ কেন পারছেন না?

    তিনকড়ি॥ কারণ খুব সোজা। চাকরি যাওয়ার পর যা কিছু ঘটেছে, তা হয়তো ঘটত না, যদি না তার ঐ চাকরিটা যেত। হয়তো ঐ পরের ঘটনাগুলোই তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে। দেখুন—হয়তো ঐ চাকরি যাওয়া থেকে তার আত্মহত্যা অবধি সব এক চেনে বাঁধা!

    চন্দ্রমাধব॥ আপনি যদি ওভাবে বলেন, তাহলে অবশ্য আপনার কথা খানিকটা ঠিক। কিন্তু আমি ওভাবে বলি না—কাজেই এ ব্যাপারে আমার কোন দায়িত্ব আছে বলে আমি মনে করি না। আপনি যা বলছেন ও তো একটা কথার কথা! ওভাবে কাজ করতে গেলে কি চলে? চলে না। কত লোকের সঙ্গে আমাদের কাজ! আপনি কি বলতে চান তাদের জীবনে যা কিছু ঘটেছে সব দায়-দায়িত্ব আমাদের? বলুন না—আপনিই বলুন—কথাটা কি খুব অকওয়ার্ড নয়?

    তিনকড়ি॥ নিশ্চয়, অকওয়ার্ড বইকি, খুবই অকওয়ার্ড।

    চন্দ্রমাধব॥ আমাদের অবস্থাটা কি হবে একবার ভাবুন দেখি? কি রকম একটা ইমপসিবল সিচুয়েশনের মধ্যে গিয়ে পড়ব বলুন তো?

    তাপস॥ ঠিক বলেছ বাবা। তুমি তো একটু আগেই বলছিলে, আগে নিজে তারপর অন্য কেউ—

    চন্দ্রমাধব॥ যাকগে, ওসব বাজে কথা এখন থাক—

    তিনকড়ি॥ কি কথা মিস্টার সেন?

    চন্দ্রমাধব॥ ও কিছু নয়। আপনি আসবার আগে আমি এদের দু’একটা গুড অ্যাডভাইস দিচ্ছিলাম। যাকগে ওসব কথা, এখন কাজের কথায় আসা যাক। হ্যাঁ, কি যেন নাম বলছিলেন মেয়েটির?—ও মনে পড়েছে, সন্ধ্যা চক্রবর্তী। হ্যাঁ, মেয়েটি আমাদের দয়াময়ীতে কাজ করত—এমব্রয়ডারি সেকশনে। বেশ চালাক চতুর, দেখতে শুনতেও ভাল। হাতের কাজও চমৎকার। বোর্ড-মিটিঙে তো আমরা ঠিকই করেছিলাম—ওকে সেকশন-ইন-চার্জ করে দেব। কিন্তু হঠাৎ গোলমাল বাধল পুজোর বন্ধের ঠিক পরেই। সকলে মিলে স্ট্রাইক করে কাজ বন্ধ করলে! কি? না, প্রত্যেকের পাঁচ টাকা করে মাইনে বাড়িয়ে দিতে হবে। বুঝতেই পারছেন—আমরা refuse করলাম—

    তিনকড়ি॥ না, ঠিক বুঝতে পারলাম না। কেন, refuse করলেন কেন?

    চন্দ্রমাধব॥ (বিস্মিত হইয়া) কেন refuse করলাম?—মানে?

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ, refuse কেন করলেন?

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধ হইয়া) দেখুন তিনকড়িবাবু, business আমার, আমার ইচ্ছে মতো সেটা আমি চালাই। এ নিয়ে আপনার মাথা ঘামাবার দরকার আছে বলে আমার তো মনে হয় না।

    তিনকড়ি॥ আপনি কি করে জানলেন? দরকার হয়তো সত্যিই আছে, তাই মাথা ঘামাচ্ছি।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু আপনি ওরকম চোখ রাঙিয়ে কথা বলছেন কাকে?

    তিনকড়ি॥ তা যদি আপনার মনে হয়, তাহলে I am sorry। আমি আপনার প্রশ্নের জবাব দিয়েছি মাত্র।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু আমি যা বলছি তা যুক্তিসঙ্গত—আর আপনি যা বকছেন, তা অবান্তর!

    তিনকড়ি॥ কিন্তু আমি আপনাকে যা জিজ্ঞেস করেছি, তা আমার ডিউটির মধ্যে বলেই করেছি, নইলে করতাম না।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু একটা কথা ভুলে যাচ্ছেন। চাকরির দিক থেকে আপনারও যেমন একটা ডিউটি আছে, ব্যবসার দিক থেকে আমারও তেমনি একটা ডিউটি আছে!

    তিনকড়ি॥ সেটা কি, জানতে পারি?

    চন্দ্রমাধব॥ কেন পারেন না, নিশ্চয় পারেন? আমার ডিউটি হল labour costকে যতটা সম্ভব কমের মধ্যে রাখা। আমরা ওদের মাসে তিরিশ টাকা করে দিচ্ছিলাম। সেই জায়গায় যদি পঁয়ত্রিশ টাকা করে দিতে হত, তাহলে labour cost কত বাড়ত জানেন? Sixteen percent-এর উপর! এবার আপনার কেনর উত্তর নিশ্চয়ই পেয়েছেন? সব জায়গায় যা দেয়, আমরাও তাই দিচ্ছিলাম। তাদের পছন্দ হয় কাজ করুক, না হয় অন্য কোথাও যাক! আমি তো তাদের বলেই দিয়েছিলাম—it is a free country–এখানে না পোষায়, অন্য কোথাও যাও। আমি তো আর কাউকে ধরে রাখিনি।

    তাপস॥ তাহলে এটা free country নয়! এ দেশে অন্য কোথাও যেতে চাইলেই কি যাওয়া যায়—না গেলেই কাজ পাওয়া যায়?

    তিনকড়ি॥ ঠিক কথা।

    চন্দ্রমাধব॥ (তাপসকে) আচ্ছা, তোর কি সব ব্যাপারে কথা বলা চাই! আমি তো তোকে বলেছি তাপস—চুপ করে বসে থাকতে পারিস বস, নইলে যা। সব তাতে কথা! (তিনকড়িবাবুকে) হ্যাঁ, কি বলছিলাম যেন? ও, স্ট্রাইকের কথা। স্ট্রাইক অবশ্য বেশিদিন চলেনি—

    অমিয়॥ তা কখনো চলে! পুজোর বন্ধের পরই যে! হাতে তো কারো একটি পয়সা নেই, অফিস থেকে লোন না পেলে খাবে কি?

    চন্দ্রমাধব॥ হলও ঠিক তাই! চারদিন পেরিয়ে পাঁচদিন গেল না, স্ট্রাইকও শেষ! আমরা অবশ্য কোন স্টেপ নিইনি। সকলকেই নিলাম—তবে হ্যাঁ, তিন-চারজন রিংলিডার বাদে। তা আপনার ঐ সন্ধ্যা চক্রবর্তী—তিনি ঐ তিন-চারজনেরই একজন! অনেকদূর এগিয়েছিলেন কিনা—তাই চাকরিটা গেল!

    অমিয়॥ তা তো যাবেই! চাকরি এখানে থাকে কি করে?

    তাপস॥ কেন থাকবে না? বাবা ইচ্ছে করলেই থাকত। বাবার ইচ্ছে ছিল না, তাই তার চাকরিও রইল না! বাবা তো তাড়িয়েই খালাস—মেয়েটার অবস্থাটা ভাব তো একবার—

    চন্দ্রমাধব॥ রাবিশ! তুই এসব ব্যাপারের জানিস কতটুকু? আজ পাঁচ টাকা দে, কাল দশ টাকা চেয়ে বসবে! দে আবার দশ টাকা—দেখবি, পরদিনই বলছে, গোটা দুনিয়াটা আমাদের দাও!

    অমিয়॥ ঠিক কথা।

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ, তা ঠিক কথা—তবে ঐ চাইবে, ঐ পর্যন্ত—নিয়ে বসবে না।

    চন্দ্রমাধব॥ (তিনকড়িবাবুর দিকে এক দৃষ্টিতে দেখিয়া) আচ্ছা কি যেন বললেন আপনার নামটা?

    তিনকড়ি॥ তিনকড়ি হালদার।

    চন্দ্রমাধব॥ ও, তিনকড়ি হালদার—না! আচ্ছা রমেশের সঙ্গে আপনার দেখা-সাক্ষাৎ হয়? রমেশ—মানে—আমাদের ডি সি?

    তিনকড়ি॥ ডি সি যখন, তখন দেখা-সাক্ষাৎ হয় বই কি। তবে খুব বেশি নয়—

    চন্দ্রমাধব॥ আপনি বোধ হয় জানেন না— রমেশ আমার ভাগ্নে। এখানে তো আসেই—তাছাড়া প্রায় রোজই ক্লাবে আমাদের দেখা হয়। আমিও আপনাদের পুলিস ক্লাবে টেনিস খেলতে যাই কিনা—

    তিনকড়ি॥ কি করে জানব বলুন?—আমি টেনিস খেলিও না আর খেলা দেখিও না।

    চন্দ্রমাধব॥ (বিরক্তি-মিশ্রিত স্বরে) আঃ—কে বলছে যে আপনি টেনিস খেলেন বা দেখেন! আপনি যে টেনিস খেলেন না তা আমিও জানি—কিন্তু—

    তাপস॥ (হঠাৎ উত্তেজিত হইয়া) কিন্তু যাই বল বাবা, এটা খুবই লজ্জার কথা—

    তিনকড়ি॥ কেন, লজ্জার কি আছে এতে? আমি খেলা জানি না, তাই খেলি না, আর দেখতে ভাল লাগে না, তাই দেখি না।

    তাপস॥ না না, খেলা নয়—আমি ঐ মেয়েটির কথা বলছি, মানে ঐ সন্ধ্যা চক্রবর্তী! কেনই বা সে বেশি মাইনের জন্য চেষ্টা করবে না? আমরা চেষ্টা করি না, আমাদের জিনিস যাতে বাজারে বেশি দামে কাটে? আর পাঁচটা মেয়ের চেয়ে সে একটু বেশি স্পিরিটেড, কিন্তু তাই বলে তার চাকরিটা যাবে? (চন্দ্রমাধবকে) তুমি তো নিজেই বলছিলে বাবা, মেয়েটি কাজ করত ভালই! তাই যদি হয়, তবে তাঁকে ছাঁটাই-ই বা করলে কেন? কি জানি বাবা, আমি তো এর কোন যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না! আমি হলে তো রেখেই দিতাম!

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধ স্বরে) তুই চুপ করবি কিনা! উঃ, আমি হলে তো রেখেই দিতাম! আরে রাখবি কোত্থেকে?—সে ক্ষমতা আছে তোর? অমুককে রাখব, তমুককে ছাঁটাই করব, এসব করতে গেলে মাথার দরকার—তোমার ঐ মোটা মাথার কর্ম ওটা নয়! আশ্চর্য, এত পয়সা খরচ করে লেখাপড়া শেখালাম, এতটুকু বুদ্ধি হল না তোর! যে গাধা সেই গাধাই রয়ে গেলি!

    তাপস॥ (ক্ষুব্ধ স্বরে) এসব কথা কি তিনকড়িবাবুর সামনে না বললেই নয় বাবা?

    চন্দ্রমাধব॥ তিনকড়িবাবুর সামনে আমার আর কোন কথা বলারই দরকার নেই! বলবার আছেই বা কি? ঐ সব ইনকিলাব জিন্দাবাদ আমাদের পছন্দ হয়নি, তাই তাকে ছাঁটাই করেছিলাম! তারপর তার কি হয়েছিল না হয়েছিল, তার কোন খবরই আমি রাখি না। কি হয়েছিল তিনকড়িবাবু? Did she get into trouble?

    তিনকড়ি॥ (ধীর স্বরে) ট্রাবল—মানে হ্যাঁ ট্রাবলও বলতে পারেন— (শীলার প্রবেশ)

    শীলা॥ (প্রবেশ করিতে করিতে লঘু স্বরে) ট্রাবল? কিসের ট্রাবল বাবা—পেটের নাকি? (তিনকড়িবাবুকে দেখিয়া) Oh sorry! আমি জানতাম না, আপনি এখানে আছেন! হ্যাঁ বাবা—মা জিজ্ঞেস করে পাঠালেন, তোমাদের কি খুব দেরি হবে? তাহলে না হয়—

    চন্দ্রমাধব॥ না, না দেরি কিসের? কথাবার্তা আমাদের শেষ হয়ে গেছে—(তিনকড়িবাবুকে দেখাইয়া দিয়া) এবার উনি উঠবেন—

    তিনকড়ি॥ কিন্তু আমি তো এখন উঠব না।

    চন্দ্রমাধব॥ তার মানে?

    তিনকড়ি॥ কথাবার্তা তো আমাদের এখনও শেষ হয়নি।

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধ স্বরে) তার মানে? যা জানি সবই তো আপনাকে বললাম!

    শীলা॥ (কৌতূহলী হইয়া) কি হয়েছে বাবা?

    চন্দ্রমাধব॥ কিছু হয়নি। তুই এখন এঘর থেকে একটু যা তো শীলা—আমরা এক্ষুনি আসছি।

    তিনকড়ি॥ কিন্তু আমার যে ওঁকেও দরকার মিস্টার সেন।

    চন্দ্রমাধব॥ তার মানে?

    তিনকড়ি॥ মানে, ওঁকেও আমার দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করবার আছে—

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধ ও উত্তেজিত কণ্ঠস্বরে) না—ওকে আপনার কোন কথা জিজ্ঞেস করবার নেই! দেখুন তিনকড়িবাবু, যেটুকু ডিউটি সেটুকু করুন! তার বাইরে এভাবে ওপর-পড়া হয়ে কথাবার্তা বললে—আমি আপনার নামে রিপোর্ট করব! যেটুকু বলবার তো তো আমিই আপনাকে বললাম! তারপর তার কি হল না হল, তার সঙ্গে আমার কি? এরকম একটা বেয়াড়া ব্যাপারের মধ্যে আমার মেয়েকে টেনে আনবার কি অধিকার আছে আপনার?

    শীলা॥ কি হয়েছে বাবা? ইনি তো দেখছি পুলিসের লোক। কোত্থেকে আসছেন ইনি?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে, আমি আসছি পদ্মপুকুর থানা থেকে। ওখানকার সাব-ইন্সপেক্টর—নাম তিনকড়ি হালদার।

    শীলা॥ কিন্তু আপনি এখানে—মানে—

    তিনকড়ি॥ আমি একটু এনকোয়ারিতে এসেছি। আজ বিকেলে একটি মেয়ে কার্বলিক অ্যাসিড খেয়ে মারা গেছে—

    শীলা॥ কী সর্বনাশ! কার্বলিক অ্যাসিড?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ। মরবার আগে সে কি যন্ত্রণা!

    শীলা॥ (অসহায়র কণ্ঠস্বরে) কিন্তু কেন খেল বলুন তো?

    তিনকড়ি॥ কি জানি? বোধহয় মনে হয়েছিল আর বেঁচে থাকার কোন মানে হয় না।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু তাই বলে আপনি বলতে চান—দু’বছর আগে তাকে ছাঁটাই করেছিলাম বলে, আজ দু’বছর পরে সে আত্মহত্যা করেছে?

    তাপস॥ কিন্তু বাবা, হয়তো ওই ছাঁটাই থেকেই তার দুঃখের শুরু—

    শীলা॥ সত্যি বাবা? তুমি তাকে ছাঁটাই করেছিলে?

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ, করেছিলাম। মেয়েটা দয়াময়ীতে কাজ করত। খুব গণ্ডগোল আরম্ভ করেছিল, তাই তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। অন্যায় কিছু আমি করিনি—

    অমিয়॥ না, অন্যায় কিসের? আমাদের হলে আমরাও তাই করতাম। (শীলাকে অতিমাত্রায় বিচলিত দেখিয়া) কিন্তু তুমি এত moved হচ্ছ কেন? সে তো তোমার কেউ নয়—

    শীলা॥ কি জানি—তা তো জানি না। আমার খালি মনে হচ্ছে—আমরা যখন এখানে এত হাসি-ঠাট্টা করছি, তখন আর একজন কার্বলিক অ্যাসিড খেয়ে হসপিটালে যন্ত্রণায় ছটফট করছে! (তিনকড়িবাবুকে) আচ্ছা কত বয়স হবে মেয়েটির? খুব বেশী নিশ্চয় নয়?

    তিনকড়ি॥ না না, খুব বেশী কোথায়? তেইশ-চবিবশের মধ্যে—একেবারে ফোটা-ফুলের মতো দেখতে। তবু তো আজ আমি তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখিনি। যখন গেছি তখন সে যন্ত্রণায় ছটফট করছে!

    চন্দ্রমাধব॥ আচ্ছা তিনকড়িবাবু, এখনও কি যথেষ্ট হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না আপনার?

    অমিয়॥ আমি তো কিছুতেই বুঝতে পারছি না—এভাবে এনকোয়ারি করে আপনার লাভটা কি? আপনার জানা দরকার—দয়াময়ী থেকে চাকরি যাওয়ার পর যা যা হয়েছিল। কিন্তু আমরা তার কি জানি বলুন?

    তিনকড়ি॥ একেবারেই কি কিচ্ছু জানেন না মিস্টার বোস?

    চন্দ্রমাধব॥ (অমিয় ও শীলার দিকে ইঙ্গিত করিয়া, বিস্মিত কণ্ঠস্বরে) তার মানে? আপনি বলতে চান — হয় এ, নয় ও মেয়েটির সম্বন্ধে কিছু না কিছু জানে?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ!

    চন্দ্রমাধব॥ আপনি তাহলে শুধু আমার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে এখানে আসেন নি?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে না।

    চন্দ্রমাধব॥ (নরম সুরে) এ কথাটা আগে বললেই পারতেন কোন গণ্ডগোলই হত না! আমি কি করে জানব বলুন? আমি ভাবছি, আমার যা বলার সবই তো আমি বলেছি—তবে কেন শুধু শুধু আপনি আমাদের উত্যক্ত করছেন। কিন্তু আপনি সব fact পেয়েছেন তো?

    তিনকড়ি॥ কিছু কিছু পেয়েছি বই কি!

    চন্দ্রমাধব॥ খুব একটা মারাত্মক কিছু নয়—কি বলেন?

    তিনকড়ি॥ মানে—একটি মেয়ে কার্বলিক অ্যাসিড খেয়ে মারা গেছে। এটা যদি মারাত্মক কিছু হয় তবে মারাত্মক—নইলে নয়।

    শীলা॥ তার মানে? আপনি বলতে চান ঐ মেয়েটির মৃত্যুর জন্যে আমরা দায়ী?

    চন্দ্রমাধব॥ তুই চুপ কর দেখি—যা বলবার আমি বলছি। (নরম সুরে তিনকড়িকে) আচ্ছা তিনকড়িবাবু তার চেয়ে আসুন না—আমি আর আপনি—মানে একটু নিরবিলিতে বসে ব্যাপারটা সেটল করে ফেলি?

    শীলা॥ কিন্তু বাবা, তুমিই বা কথা বলবে কেন? ওঁর তো তোমার কাছে এনকোয়ারি শেষ হয়ে গেছে। এখন তো উনি বলছেনই, হয় অমিয় না হয় আমি—

    চন্দ্রমাধব॥ আরে, তোরা ছেলেমানুষ এসবের বুঝিস কি? আমি তোদের হয়ে কথাবার্তা বলে যা হোক একটা কিছু ঠিক করে নিচ্ছি—

    অমিয়॥ কিন্তু আমার তরফ থেকে ঠিক করার কিছু নেই কাকাবাবু। সন্ধ্যা চক্রবর্তী বলে কাউকে আমি চিনিই না।

    তাপস॥ ও নামে আমিও তো কাউকে চিনি না।

    শীলা॥ কি নাম বললে? সন্ধ্যা চক্রবর্তী?

    অমিয়॥ হ্যাঁ—

    শীলা॥ আমি তো শুনিই নি কোনদিন—

    অমিয়॥ (ব্যঙ্গের হাসি হাসিয়া) এখন কি রকম মনে হচ্ছে তিনকড়িবাবু?

    তিনকড়ি॥ কেন? ঠিক আগে যেমন মনে হচ্ছিল। আমি তো আগেই আপনাদের বলেছি, মেয়েরা বিপাকে পড়লে অনেক সময় নাম পালটায়। এ মেয়েটিও পালটেছিল। তিরিশ টাকার জায়গায় পঁয়ত্রিশ টাকা চাওয়ার জন্যে মিস্টার সেন যখন তাকে ছাঁটাই করলেন তখন হয়তো তার মনে হল সন্ধ্যা চক্রবর্তী নামটা অপয়া—তাই সে নতুন একটা নাম নিলে—

    তাপস॥ খুবই স্বাভাবিরক—

    শীলা॥ পাঁচটা টাকা বাড়ালে কী এমন ক্ষতি হত বাবা? হয়ত সেজন্যেই—

    চন্দ্রমাধব॥ রাবিশ! চাকরি গেছে দু’বছর আগে, আর আত্মহত্যা করেছে সে আজ। তার জন্যে কি আমি দায়ী? আচ্ছা তিনকড়িবাবু চাকরি যাওয়ার পর কি হয়েছিল, কিছু জানেন আপনি?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ। মাস-দুয়েক চাকরি ছিল না। বাপ-মা মরা মেয়ে, কাজেই যাবারও কোন জায়গা ছিল না। দয়াময়ীতে চাকরি করত, কাজেই বুঝতেই পারছেন, জমাতেও কিছু পারেনি। দু’মাস বেকার অবস্থায় কাটাবার পর, অবস্থা যা হবার ঠিক তাই হল। আত্মীয়-স্বজন নেই যে কারো কাছে চলে যায়, তেমন বন্ধু-বান্ধব নেই যে তাকে সাহায্য করে, হাতে এমন পয়সা নেই যে দু’দিন বসে খায়। কাজেই অবস্থাটা তো বুঝতেই পারছেন। প্রথম ক’দিন চলে অর্ধাহার, তারপর প্রায় অনাহার! এর চেয়ে ডেসপারেট অবস্থা আর কি হতে পারে বলুন?

    শীলা॥ এর চেয়ে ডেসপারেট অবস্থা তো ভাবাই যায় না। সত্যিই বড় লজ্জার কথা! এভাবে যদি একটি মেয়েকে আত্মহত্যা করতে হয়—

    তিনকড়ি॥ শুধু একটি মেয়ে কেন? আজকের দিনে কলকাতার মত প্রত্যেকটা শহরে গিয়ে আপনি দেখুন—দেখবেন, হাজার হাজার ছেলেমেয়ে ঠিক এইভাবে দিন কাটাচ্ছে। তাই যদি না হবে—তবে আজকের দিনে এমপ্লয়ারের সাধ্য কি যে, যে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ টাকায় একটা কুকুর-বেড়াল পোষা যায় না, সেই তিরিশ-পঁয়ত্রিশ টাকায় একটা মানুষ রেখে কাজ করায়! হাজার হাজার বেকার সন্ধ্যা চক্রবর্তী আত্মহত্যার দিন গুনছে বলেই না আজ মালিকদের এত সুবিধে। আজ তারা বেশ ভাল করে জানে— কোথায় গেলে তারা cheap labour পাবে। আমার কথা বিশ্বাস না হয়, আপনার বাবাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন—

    শীলা॥ কিন্তু এই সন্ধ্যারা তো cheap labour নয় — এরা যে আস্ত মানুষ তিনকড়িবাবু।

    তিনকড়ি॥ আমারও তো মাঝে মাঝে তাই মনে হয়। মনে হয় আমরা যদি মাঝে মাঝে ওদের ছেঁড়া কাঁথার ওপর যাই, আর ওরা যদি আমাদের এই সোফা-কৌচের ওপর আসে, তাহলে আর কারো কিছু হোক আর না হোক আমাদের অন্তত কিছুটা ভাল হয়।

    শীলা॥ তা যা বলেছেন। আচ্ছা তারপর কি হল?

    তিনকড়ি॥ ওই এক ভাবেই চলছিল—আর চলতও তাই। কিন্তু মাসখানেক কাটার পর মনে হল, বোধহয় তার সুদিন আবার ফিরে আসছে। ধর্মতলার ঐ বড় চেন স্টোরটা আছে? ওখানে তার একটা চাকরি জুটে গেল— ক্লোদিং সেকশনের কাউন্টার গার্ল।

    শীলা॥ চেন স্টোর! আমাদের জিনিসপত্রও তো সব ওখান থেকেই আসে! ওখানকার কাজ তো বেশ ভাল কাজ। ওদের মাইনেও ভাল, বেশ লাকি বলতে হবে।

    তিনকড়ি॥ তারও নিজেকে খুব লাকি বলেই মনে হয়েছিল। আগের কাজটা ছিল ছোট একটা ঘরের মধ্যে। ঘিঞ্জির মধ্যে বসে সারাদিন শুধু ছুঁচের কাজ। এ ধরুন, বড় জায়গা, চারধারে দিনের বেলায় নিওন লাইটের আলো, মাইনেও সামান্য একটু বেশি। তার ওপর আবার ডিপার্টমেন্টটাও পোশাকের। জানেই তো মেয়েরা একটু শাড়ি-টাড়ি নাড়াচাড়া করতে বেশী ভালবাসে! মনে মনে ঠিক করলে, জীবনটাকে বেশ গুছিয়ে নিয়ে নতুন করে আরম্ভ করতে হবে। মানে, কি বলব, আপনি তো খানিকটা বুঝতেই পারছেন তার মনের ভাব-ভাবনাটা!

    চন্দ্রমাধব॥ তারপর, ওখানেও আবার গণ্ডগোল বাধল বুঝি?

    তিনকড়ি॥ মাস-দুয়েক বেশ কেটে গেল। দু’মাস পর সবে একটু স্থিতু হয়ে বসতে আরম্ভ করেছে—ম্যানেজারের হুকুমনামা সই হয়ে এল—চাকরি নেই।

    চন্দ্রমাধব॥ নিশ্চয় কাজকর্ম সুবিধেমত করত না—

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে না—দোকানে জিজ্ঞেস করলে তো উল্টোটাই শোনা যেত!

    চন্দ্রমাধব॥ একটা কিছু গণ্ডগোল নিশ্চয় হয়েছিল—

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে শোনা তো কিছু যায়নি। সে শুধু খবর পেয়েছিল কোন কাস্টমার নাকি তার নামে কমপ্লেন করেছে, আর চাকরি যাওয়ার কারণই নাকি তাই!

    শীলা॥ (উত্তেজিত ও ব্যাকুল কণ্ঠস্বরে) কবে হয়েছিল ব্যাপারটা বলতে পারেন?

    তিনকড়ি॥ গেল বছর জানুয়ারির শেষে—

    শীলা॥ মেয়েটিকে কি রকম দেখতে?

    তিনকড়ি॥ (উঠিয়া, পকেট হইতে ছবি বাহির করিয়া) আপনি যদি একটু এদিকে আসেন—(শীলা তিনকড়িবাবুর নিকটে আসিলে, তিনি সকলকে আড়াল করিয়া অতি সাবধানে আলোর দিকে রাখিয়া ছবিখানি শীলাকে দেখাইলেন। ভাল করিয়া দেখিবার পর শীলার মুখ-চোখের ভাব পরিবর্তিত হইয়া গেল। বোঝা গেল ছবিটি দেখিয়া সে চিনিতে পারিয়াছে। চিনিতে পারিবামাত্র সে অশ্রুরুদ্ধ অস্ফুট চীৎকার করিয়া দ্রুত ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। তিনকড়িবাবু ছবিটি যথাস্থানে রাখিয়া শীলার গমনপথের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। দেখিয়া মনে হইল কি যেন চিন্তা করিতেছেন। বাকি তিনজনের চোখে-মুখে বিস্ময়, অবস্থা হতভম্বের ন্যায়।)

    চন্দ্রমাধব॥ (তিনকড়িবাবু আসন গ্রহণ করিবার পর) কি আশ্চর্য! শীলার হল কি?

    তাপস॥ বোধহয় ছবিটা দেখে চিনতে পেরেছে শীলা। তাই না তিনকড়িবাবু?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ।

    চন্দ্রমাধব॥ যত নষ্টের মূল তো আপনি! কেন আপনি মেয়েটাকে এভাবে আপসেট করে দিলেন?

    তিনকড়ি॥ ভুল করছেন। আমি আপসেট করিনি—উনি নিজেই আপসেট হয়ে গেলেন।

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধ স্বরে) সেইটাই তো জিজ্ঞেস করছি— কেন?

    তিনকড়ি॥ আবার ভুল করছেন। কেন যে আপসেট হলেন তা তো আমি এখনও জানতে পারিনি। ওটা জানতেই তো আমার এখানে আসা।

    চন্দ্রমাধব॥ বেশ, তাহলে আগে আমিই জেনে আসি—

    অমিয়॥ চলুন, আমিও বরং আপনার সঙ্গে যাই কাকাবাবু, দেখি শীলাকে জিজ্ঞেস করে—

    চন্দ্রমাধব॥ (উঠিয়া) না না, আগে আমিই দেখি ব্যাপারটা কি হল। তারপর তোমার কাকীমাকেও তো বলা দরকার। দেখি তিনি কি বলেন। (বাহির হইয়া যাইতে যাইতে তিনকড়িবাবুকে ক্রুদ্ধস্বরে) আশ্চর্য! একটা এতবড় আনন্দের দিন। কেমন ছিলাম সন্ধ্যেবেলা, আর কোথা থেকে শনি এসে জুটলেন আপনি, সমস্ত আমোদটা পণ্ড হয়ে গেল একেবারে।

    তিনকড়ি॥ (এতটুকু বিচলিত না হইয়া) আজ পাণ্ডে হসপিটালে ডেডবডিটার দিকে দেখতে দেখতে আমারও ওই একটা কথা কেবলি মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল—কত আমোদ আহ্লাদ, কি সুন্দর ফুটফুটে একটি জীবন—কোথা থেকে কারা এসে কি বিশ্রীভাবে পণ্ড করে দিয়ে গেল। (মিস্টার সেন যাইতে যাইতে উত্তর দিবার জন্য ফিরিয়া দাঁড়াইলেন। পরে হয়তো মনে হইল কিছু না বলাই ভাল, তাই কিছু না বলিয়াই বাহির হইয়া গেলেন। তাপস ও অমিয়র অস্বস্তিভরা দৃষ্টি পরস্পরের প্রতি নিবদ্ধ। তিনকড়িবাবু কিন্তু এসব কিছু গ্রাহ্যের মধ্যেই আনিলেন না।)

    অমিয়॥ এবার ছবিটা আমি একটু দেখতে চাই তিনকড়িবাবু।

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে না। সময় হলেই আপনাকে আমি দেখাব।

    অমিয়॥ আশ্চর্য! আমি তো বুঝতে পারছি না, কেন আপনি—

    তিনকড়ি॥ (বাধা দিয়া গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বরে) দেখুন আমি তো আগেই একবার বলেছি—আমার এনকোয়ারি করার রীতিই এই রকম। আমি দেখেছি, সবাইকে একসঙ্গে ধরলে বড় গণ্ডগোল হয়। আপনাকেও আমি একটু পরেই ধরব। তখন আপনার যা বলার আছে বলবেন।

    অমিয়॥ (অস্বস্তির সহিত) না না, মানে—বলবার আমার কিছু নেই, মানে—

    তাপস॥ (হঠাৎ উঠিয়া দাঁড়াইয়া তিনকড়িবাবুকে) দেখুন মশাই, আমি আর পারছি না—

    তিনকড়ি॥ (গম্ভীরভাবে) না পারাটাই স্বাভাবিক।

    তাপস॥ না—মানে—আজ আমাদের এখানে একটা ছোটখাট পার্টি গোছের ছিল। আর কি জানেন? মানে, ঐ পার্টি জিনিসটা একেবারেই আমার ধাতে সয় না। আমার এখানে থাকা মানেই আপনাদের কাজের অসুবিধে। তাছাড়া মাথাটা বড্ড ধরেছে। তাই বলছিলাম কি—মানে আপনি যদি কিছু মনে না করেন—তাহলে আমি এখন বরং ভেতরেই যাই—কি বলেন?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে না, আমি তা বলি না।

    তাপস॥ বলেন না? মানে? কি বলেন না?

    তিনকড়ি॥ ওই আপনাকে ভেতরে যেতে।

    তাপস॥ (প্রায় চিৎকার করিয়া) কিন্তু কেন?

    তিনকড়ি॥ তাতে আপনার কষ্টটা কম হত। ধরুন, আপনি এখন ভেতরে গেলেন, কিন্তু হয়ত একটু পরেই আপনাকে আবার এ ঘরে আসতে হবে। এ ঘরে থাকলে এই যাওয়া-আসার কষ্টটা হত না।

    অমিয়॥ আপনার কথাবার্তাটা কি একটু বেশি কড়া হয়ে যাচ্ছে না?

    তিনকড়ি॥ হয়ত হচ্ছে। আপনারা সহজভাবে কইলে, আমিও সহজভাবেই কইব।

    অমিয়॥ না—মানে—আমরা তো আর ক্রিমিনাল নই, রেসপেকটেবল সিটিজেনস—

    তিনকড়ি॥ দেখুন—এই ক্রিমিনাল আর রেসপেকটেবল সিটিজেনস—এ দুটোর মধ্যে তফাতটা কি খুব পরিষ্কার? আমার তা মনে হয় না। কতটা অবধি রেসপেকটেবল, আর কোনখান থেকে ক্রিমিনাল, এ যদি আমাকে কেউ বলতে বলে, আমি তো বলতে পারব না।

    অমিয়॥ অবশ্য আপনাকে কেউ বলতে বলেও না—তাই না?

    তিনকড়ি॥ না, ঠিক তা নয়। সবটা না বলতে বললেও খানিকটা বলতে বলে। এই ধরুন আজকের এই এনকোয়ারির ব্যাপারটা—এটা তো আমার মতো লোকেই করে। (শীলার প্রবেশ। মুখ দেখিয়া মনে হয়, খুব খানিকটা কাঁদিয়াছে। ভিতরে আসিয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিল।)

    শীলা॥ (তিনকড়িবাবুকে) আচ্ছা এর মধ্যে আমি যে আছি, এ বোধহয় আপনি গোড়া থেকেই জানতেন—না?

    তিনকড়ি॥ মেয়েটির লেখা ডায়েরিটা পড়ে মনে হয়েছিল, হয়ত আপনি আছেন।

    শীলা॥ আমি বাবাকে সব বলেছি। তিনি তো বেশ বললেন— ও কিছু নয়, ও নিয়ে মন খারাপ করার কোন মানেই হয় না। কিন্তু আমার মন মানছে কই? এত বিশ্রী লাগছে যে কি বলব আপনাকে! আচ্ছা সত্যি বলুন তো, ওখান থেকে চাকরি যাওয়ার পর অবস্থাটা কি বড্ড খারাপ হয়ে পড়েছিল?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ, দুরবস্থার একেবারে চরম। চাকরিটা গেল অকারণে। তারপর এধার-ওধার চেষ্টা যে করেনি তা নয়—করেছিল। কিন্তু কিচ্ছু হয়নি। কাঁহাতক আর মানুষ না খেয়ে থাকে বলুন? ভাবলে, ভাল রকমে যখন হল না, তখন দেখা যাক একটু রকমফের করেছি পেটটা অন্তত ভরে।

    শীলা॥ (অসহায় কণ্ঠস্বরে) সত্যি,আমিই তাহলে দায়ী, তাই না?

    তিনকড়ি॥ না না, একেবারে আপনি দায়ী বললে ভুল বলা হবে। চেন স্টোরের চাকরি যাওয়ার পরেও তো কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবে হ্যাঁ, আপনি আর আপনার বাবা—আপনারা খানিকটা দায়ী তো বটেই।

    তাপস॥ কিন্তু শীলা করেছিলটা কি?

    শীলা॥ করেছিলাম যা, তা খুবই অন্যায়। ম্যানেজারের কাছে মেয়েটির নামে কমপ্লেন করেছিলাম।

    তাপস॥ কিন্তু ম্যানেজারই বা কি রকম লোক? তুই গিয়ে বললি, আর মেয়েটাকে ওরা ছাড়িয়ে দিলে?

    শীলা॥ ওদের ম্যানেজার হীরেনবাবু যে ভয়ানক ভীতু লোক। তার ওপর দোকানের মালিক তো এক রকম অনন্ত জ্যাঠা। হীরেনবাবু তো জানে, অনন্ত জ্যাঠা শেলী-মা বলতে অজ্ঞান।

    তাপস॥ কিন্তু তা হলেও—

    শীলা॥ না না, তা হলেও নয়। কমপ্লেনটা আমি খুব সাধারণ কমপ্লেন করিনি। সোজা গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম—মেয়েটিকে পেলেন কোত্থেকে? হীরেন বাবু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন— কেন, কিছু করেছে টরেছে নাকি? আমি বললাম— করেছে মানে? আমার দিকে তাকিয়ে অসভ্য ইঙ্গিত করেছে, অশ্লীল রসিকতা করেছে! কাল যদি এসে ওকে এখানে দেখতে পাই তো আপনার নামে জ্যাঠার কাছে রিপোর্ট করব—বলব, আপনি বিশেষ সুবিধে পাবার জন্যে যত সব খারাপ মেয়েছেলে এনে দোকানে ঢোকাচ্ছেন।

    তিনকড়ি॥ কিন্তু কেন বললেন আপনি এসব কথা?

    শীলা॥ আপনি বিশ্বাস করুন তিনকড়িবাবু—রাগে তখন আমার মাথার ঠিক ছিল না!

    তিনকড়ি॥ কিন্তু সে কি এমন করেছিল যাতে আপনার মাথাটা ঐরকম বেঠিক হয়ে গেল?

    শীলা॥ আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখি— মেয়েটি আমার দিকে চেয়ে মুচকি হাসছে। মনটা সেদিন এমনিই খারাপ ছিল। ঐ মুচকি হাসিটুকুতে—কি বলব—সর্বাঙ্গ রাগে যেন একেবারে জ্বলে উঠল!

    তিনকড়ি॥ কিন্তু সেটা কি তার দোষ?

    শীলা॥ না না, তার দোষ হবে কেন? দোষ আমার নিজেরই! (হঠাৎ অমিয়কে) কি অমিয়, চোখ যে আর নামাতে পারছ না! বড় মান্ বলে মনে হচ্ছে আমাকে—না? আরে আমি তবু তো সত্যি কথা বলবার চেষ্টা করছি, কিন্তু তুমি? তুমি কি বলতে চাও লজ্জা পাবার মতো কোন কাজ কোনদিন তুমি করনি?

    অমিয়॥ (বিস্মিত হইয়া) করিনি—আমি বলেছি কি একবারও? আমি তো বুঝতে পারছি না, কেন তুমি আমাকে শুধু শুধু—

    তিনকড়ি॥ (অমিয়কে থামাইয়া দিয়া) থাক, আপনাদের ও ব্যাপারটা পরে সেটল করে নেবেন। (শীলাকে) হ্যাঁ, কি হয়েছিল সব বলুন তো?

    শীলা॥ আমি সেদিন ওখানে গিয়েছিলাম একটা লং কোট ট্রাই করতে। কোটটা নিয়ে এসে হেড-অ্যাসিস্ট্যান্ট বলল, এই কাটটা বোধহয় আপনাকে ঠিক ফিট করবে না, এটা এই রকম গড়নে ভাল ফিট করে। এই বলে ওই মেয়েটির কাছে গিয়ে তার কাঁধের সঙ্গে লাগিয়ে আমাকে দেখালে। দেখলাম সুন্দর ফিট করেছে। কিন্তু আমারও কি জানি কেমন জেদ চেপে গেল। বললাম, না ঐ কোটটাই আমি নেব। কিন্তু পরে দেখি, একেবারে মানায় নি, বিশ্রী দেখাচ্ছে। ঠিক সেই সময় আয়নার ওপর চোখ পড়ল। দেখি মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। মনে হল, যেন বলতে চাইছে, মেয়েটাকে কি বিশ্রী দেখাচ্ছে দেখ। রাগে পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে উঠল। কোটটা হেড-অ্যাসিসট্যান্টের গায়ের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ছুটে চলে এলাম ম্যানাজারের কাছে। তারপর—তারপর যা হয়েছে সবই তো আপনাকে বলেছি। (অসহায় কণ্ঠস্বরে) না—জানেন, যদি মেয়েটিকে দেখতে একটা মন্দ-নয়-গোছেরও কিছু হত, তাহলে হয়ত আমি কমপ্লেনই করতাম না। কিন্তু ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল মেয়েটিকে! এতটুকু অসহায় বলে মনে হয়নি, তাই কমপ্লেন করে দুঃখও এতটুকু হয়নি।

    তিনকড়ি॥ আপনার তাহলে বেশ একটু হিংসে হয়েছিল—কেমন?

    শীলা॥ (অসহায়ভাবে) তাই হবে বোধহয়। তা নইলে, আমিই বা কেন কমপ্লেন করলাম—

    তিনকড়ি॥ আর হিংসে হয়েছিল বলেই, অনন্ত জ্যাঠার ভাইজি হিসেবে, আর আপনার বাবার মেয়ে হিসেবে আপনার যেটুকু ক্ষমতা আছে, তা প্রয়োগ করলেন একটা নিরীহ মেয়ের ওপর। — ফলে তার চাকরিটা গেল! আর এত কাণ্ড করার কারণটা কি? না তার একটু মুচকি হাসি আপনার মাথাটাকে বেঠিক করে দিয়েছিল—এই তো?

    শীলা॥ হ্যাঁ। কিন্তু আপনি বুঝে দেখুন—ব্যাপারটা যে এত সাংঘাতিক হতে পারে, তা আমার মাথাতেই আসেনি তখন! এখন আমি বুঝেছি! এখন যদি তার সাহায্যের দরকার হত, আমি তাকে যথাসাধ্য সাহায্য করতাম!

    তিনকড়ি॥ (রূঢ়স্বরে) হ্যাঁ, বুঝেছেন ঠিক, কিন্তু বড্ড দেরী করে বুঝেছেন! এখন কোথায় পাবেন তাকে যে সাহায্য করবেন। সে তো আর বেঁচে নেই?

    তাপস॥ মাই গড। ব্যাপারটা বেশ জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে—

    শীলা॥ (ঝড়ের বেগে) You shut up ছোড়দা! ব্যাপারটা যে বেশ জটিল, তা কি তোকে বলে দিতে হবে নাকি? আমি বুঝি না, কত বড় অন্যায় আমি করেছি? আপনি বিশ্বাস করুন তিনকড়িবাবু, ব্যাপারটার গুরুত্ব আমি বুঝেছি! যা করেছি, তা এই একবারই করেছি, আর কখনও করব না। আজ বিকেলে আমি চেন স্টোরে গিয়েছিলাম। তখন গ্রাহ্যের মধ্যে আনিনি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ওখানে ক’জন যেন আমার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিল। বোধহয় আমাকে দেখে ওই মেয়েটির কথা তাদের মনে পড়ে গিয়েছিল! (দুইহাতে মুখ ঢাকিয়া) ওঃ কি লজ্জা! কোনদিন আমি আর ও পথ মাড়াতে পারব না! ওঃ—কেন এমন অঘটন ঘটল বলতে পারেন?

    তিনকড়ি॥ (কঠোর স্বরে) আজ পাণ্ডে হসপিটালে, মেয়েটির মৃত্যুশয্যার পাশে দাঁড়িয়ে, আমিও নিজেকে ঠিক ঐ প্রশ্নটাই করেছিলাম। মনে মনে বলেছিলাম, বুঝতে চেষ্টা কর তিনকড়ি, কেন ব্যাপারটা ঘটল, এ অঘটন না ঘটলে কি চলত না! তাই বুঝতেই আমার এখানে আসা—আর না বুঝে আমি এখান থেকে যাবও না।—কি কি Facts আমি পেয়েছি? দয়াময়ী কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠান আপনার বাবার একটা কনসার্ন। সন্ধ্যা চক্রবর্তী নামে একটি মেয়ে সেখানে কাজ করত। মাসে মাইনে পেত তিরিশ টাকা। পঁয়ত্রিশ টাকা মাইনে চেয়ে তারা স্ট্রাইক করে। স্ট্রাইক ফেল করার সঙ্গে সঙ্গে আপনার বাবা সন্ধ্যাকে ছাঁটাই করেন। ভয়, পাছে ও থাকলে আবার ঐ রকম স্ট্রাইক হয়। মাস-দুয়েক বেকার বসে থাকার পর ধর্মতলায় চেন স্টোরে আবার একটা চাকরি সে যোগাড় করে। এই নতুন চাকরিতে যখন সবে সে স্থিতু হয়ে বসতে আরম্ভ করেছে, ঠিক সেই সময় আবার তার চাকরি চায়। কারণ কি? না, লংকোটটা মানাচ্ছে না বলে আপনি নিজের ওপর বিরক্ত হয়েছিলেন। সেই বিরক্তির জের গিয়ে পড়ল তার ওপর। ফলে এ চাকরিটাও তার গেল। এর পরেও এধার-ওধার চাকরির চেষ্টা সে করেছিল, পায়নি। কিন্তু বাঁচতে তো হবে? কাজেই ঠিক করলে একটু রকম-ফের করে দেখবে। কিন্ত রকমটার নেচারটা খুব ভাল নয়। কাজেই নামটা বদলাতে হল। প্রথমে ছিল সন্ধ্যা চক্রবর্তী, মাঝে চেন স্টোরে কি ছিল তা আমার জানা নেই, এবার নাম বদলে হল ঝরনা রায়।

    অমিয়॥ (ভীষণভাবে চমকিত হইয়া) কি, কি নাম বললেন?

    শীলা॥ (কঠোর দৃষ্টিতে অমিয়কে দেখিতে দেখিতে) ঝরনা রায়। (দেখা গেল শীলা একদৃষ্টিতে অমিয়র দিকে চাহিয়া রহিয়াছে।)

    অমিয়॥ (শীলার দিকে চোখ পড়িতে থতমত অবস্থায়) না—মানে—শীলা মানে—

    তিনকড়ি॥ (উঠিয়া) আপনার বাবা কোথায় গেলেন মিস সেন?

    শীলা॥ বাবা? বাবা ভেতরের ড্রয়িংরুমে মার সঙ্গে কথা কইছেন। আপনি যাবেন তাঁর কাছে? (তাপসকে) ছোড়দা, এঁকে একটু ভেতরে নিয়ে যা তো।

    (তাপস উঠিয়া ‘আসুন তিনকড়িবাবু’ বলিলে, তিনকড়িবাবু একবার শীলার মুখের দিকে, আর একবার অমিয়র মুখের দিকে তাকাইলেন। তারপর ‘চলুন’ বলিয়া তাপসের সঙ্গে বাহির হইয়া গেলেন।)

    শীলা॥ তারপর অমিয়?

    অমিয়॥ কি বল?

    শীলা॥ সন্ধ্যা চক্রবর্তীকে তাহলে তুমি জানতে?

    অমিয়॥ না।

    শীলা॥ মানে ঐ ঝরনা রায়কে? একই তো ব্যাপার—

    অমিয়॥ ঝরনা রায়কেই বা আমি জানতে যাব কেন?

    শীলা॥ বোকার মতো কথা বোলো না অমিয়! হাতে আমাদের খুব বেশি সময় নেই। তিনকড়িবাবুর মুখ থেকে ঝরনা রায় নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে তোমার মুখের চেহারা পাল্টে অন্য রকম হয়ে গিয়েছিল!

    অমিয়॥ আচ্ছা বেশ—জানতাম। কিন্তু এ কথার এখানেই শেষ হোক।

    শীলা॥ কিন্তু কি করে এখানে শেষ হবে— সেটা বল?

    অমিয়॥ কিন্তু শীলা, তুমি বুঝতে পারছ না—

    শীলা॥ (বাধা দিয়া) আমি খুব বুঝতে পারছি। তুমি শুধু তাকে চিনতে না, খুব ভাল করে চিনতে! তাই নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই তোমার সঙ্গেই মুখ কালো হয়ে উঠেছিল। নিশ্চয় চেন স্টোর ছাড়ার পর তোমার সঙ্গে তার আলাপ হয়েছিল। তখন সে নাম বদলে ঝরনা রায়, একটু রকমফের করে দেখছে, বাঁচতে পারে কি না! আজ আমি বুঝতে পারছি, গেলো বছর মে-জুন-জুলাইতে কেন তুমিএদিক মাড়াওনি। এখানে ওখানে দেখা হলে বলতে, ভয়ানক কাজ। ওই তিন মাস তুমি ওর সঙ্গেই ছিলে!

    অমিয়॥ কিন্তু শীলা, সে ঐ তিন মাসেই শেষ হয়ে গেছে। তারপর এতদিন কেটে গেছে, একবারও তার সঙ্গে দেখা হয়নি আমার। সত্যি বলছি শীলা, তুমি বিশ্বাস কর, এ আত্মহত্যার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই!

    শীলা॥ আধঘন্টা আগে আমারও ঐ ধারণা ছিল। আমারও মনে হয়েছিল, এ ব্যাপারের সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই!

    অমিয়॥ সম্পর্ক তো নেই। কিন্তু দোহাই তোমার, এসব কথা যেন ঐ সাব-ইন্সপেক্টরটাকে বলো না।

    শীলা॥ কি কথা বল তো? তুমি মেয়েটিকে জানতে, এই?

    অমিয়॥ হ্যাঁ, ওটা তোমার আমার মধ্যেই থাক—

    শীলা॥ (অদ্ভুতভাবে হাসিয়া উঠিয়া) তুমি কি বোকা অমিয়! সাব-ইন্সপেক্টর এ সমস্ত কথা জানে! আর শুধু এটুকু কেন? হয়ত দেখ—এমন অনেক কথা জানে, যা আজও আমরাই জানি না! দেখে নিও তুমি — এ যদি ঠিক না হয় তো কি বলেছি! (এতক্ষণ অমিয়র কাছে নিজেকে বড় ছোট মনে হইতেছিল। এবার অমিয়র মুখ শুকাইয়া গিয়াছে দেখিয়া তাহার মুখে বেশ একটু হাসিও ফুটিয়া উঠিল। ঠিক এমন সময় দরজা খুলিয়া সাব-ইন্সপেক্টরের আবির্ভাব।)

    তিনকড়ি॥ (দুইজনের মুখের উপর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া অমিয়কে প্রশ্ন করিলেন) তারপর মিষ্টার বোস?

    (এই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে পর্দাও নামিয়া আসিল।)

  • দ্বিতীয় অঙ্ক

    দ্বিতীয় অঙ্ক

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায়

    [book]

    দ্বিতীয় অঙ্ক

    (প্রথম অঙ্কের শেষই দ্বিতীয় অঙ্কের আরম্ভ। ঘরের ভিতর শীলা ও অমিয়। দরজার নিকট তিনকড়িবাবু।)

    তিনকড়ি॥ (শীলা ও অমিয়র মুখের উপর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া, দরজা খোলা রাখিয়া অমিয়র দিকে অগ্রসর হইয়া আসিতে আসিতে) — তারপর, মিস্টার বোস?

    শীলা॥ (বিকারগ্রস্তের ন্যায় হাসিয়া উঠিয়া) দেখেছ অমিয়? আমি ঠিক বলেছি—

    তিনকড়ি॥ (শীলাকে) কিছু বলেছেন বুঝি ওঁকে? কি বলেছেন বলুন তো?

    অমিয়॥ দেখুন তিনকড়িবাবু—মানে আমি বলছিলাম কি, (বেশ চেষ্টা করিয়া নিজেকে আয়ত্তের মধ্যে আনিয়া) আমি বলছিলাম কি, মিস সেনকে এসবের মধ্যে টেনে আনাটা আর উচিত হবে না। আপনাকে যা বলবার ছিল, তা তো উনি বলেই দিয়েছেন। আজ সারাদিন ওঁর ঘোরাঘুরিও বড় কম হয়নি। তার ওপর সন্ধ্যেবেলা আজ এখানে একটা পার্টি গোছের ছিল। এর চেয়ে বেশি স্ট্রেন ওঁর নার্ভে সইবে বলে আমার তো মনে হয় না। আর আপনিও তো দেখছেন—মানে ধরুন যদি—

    শীলা॥ (হাসিয়া) মানে, উনি বলছেন আমি যদি অজ্ঞান-টজ্ঞান হয়ে যাই—

    তিনকড়ি॥ হবেন বলে মনে হচ্ছে নাকি?

    শীলা॥ ঠিক বলতে পারছি না। হলেও হতে পারি!

    তিনকড়ি॥ তাহলে আপনি যেতে পারেন। আমার আর আপনাকে কোনো প্রয়োজন নেই।

    শীলা॥ কিন্তু আপনার এনকোয়ারি তো এখনও শেষ হয়নি?

    তিনকড়ি॥ না।

    শীলা॥ (অমিয়কে) দেখেছ, আমি বলেছিলাম। (তিনকড়িকে) কিন্তু তাহলে তো আমি যাব না—আমি এখানেই থাকব।

    অমিয়॥ কিন্তু কেন? এসব unpleasant ব্যাপারের মধ্যে থেকে লাভটা কি?

    তিনকড়ি॥ ও, আপনিও তাহলে এই কথাই বলেন? মেয়েদের এসব unhpleasant ব্যাপার থেকে দূরে সরিয়ে রাখাই ভালো?

    অমিয়॥ যদি সম্ভব হয় নিশ্চয় ভালো।

    তিনকড়ি॥ আমরা সবাই কিন্তু একটি মেয়েকে জানি — যাকে খুবই unpleasant কতকগুলো ব্যাপার থেকে দূরে সরিয়ে রাখার কোনো চেষ্টাই করা হয়নি।

    অমিয়॥ এটা বোধহয় আমার পাওনা ছিল, কি বলেন তিনকড়িবাবু?

    শীলা॥ কিন্তু সাবধান অমিয়—এর পরের পাওনাটা হয়তো আর সহ্য করতে পারবে না।

    অমিয়॥ কিন্তু শীলা, আমি বলছিলাম এখানে থেকে সত্যিই তোমার কোনো লাভ হবে না। এখন তো খারাপ লাগছেই — পরে আরও খারাপ লাগবে।

    শীলা॥ কিন্তু যা হয়েছে— তার থেকে আর খারাপ কি হবে? বরং এখানে থাকলে হয়তো একটু ভালো হলেও হতে পারে।

    অমিয়॥ (তিক্তস্বরে) ও, বুঝেছি—

    শীলা॥ কি বুঝলে?

    অমিয়॥ তোমার নিজের এনকোয়ারি হয়ে গেছে, এখনতুমি দেখতে চাও আমার অবস্থাটা কি হয়!

    শীলা॥ (তিক্ত স্বরে) ও, আমার সম্বন্ধে তাহলে তোমার এই ধারণা! যাক, ভালোই হল — সময় থাকতে জানিয়ে দিয়ে ভালোই করলে।

    অমিয়॥ না না, আমি ওকথা মীন করিনি—

    শীলা॥ (বাধা দিয়া) মীন করোনি মানে? নিশ্চয় মীন করেছ! যদি তুমি সত্যিই আমাকে ভালোবাসতে, তাহলে বলতে পারতে ওকথা? কখখনো বলতে পারতে না! বেশ একটা মজার গল্প শুনেছ-শুনেছ যে আমি একটা মেয়ের চাকরি খেয়েছি। এখন আমাকে কত কি বলে মনে হবে! মনে হবে আমি একটা ইতর—আমি একাট ছোটলোক—আমি একটা স্বার্থপর!

    অমিয়॥ কখ্‌খনো না, ওসব কথা আমার মনেই হয়নি।

    শীলা॥ নিশ্চয় হয়েছিল! তাই যদি না হবে, তবে কেন ওকথা বললে? — আমার হয়ে গেছে বলে আমি তোমার অবস্থা দেখে মজা পাব?

    অমিয়॥ বেশ, ভালো কথা! I am sorry।

    শীলা॥ হ্যাঁ সরি ঠিকই—কিন্তু ঐ সরি পর্যন্তই। আমার কথা তুমি মোটেই বিশ্বাস করোনি—

    তিনকড়ি॥ (গম্ভীর স্বরে) মিস সেন! (শীলাকে থামিতে ইঙ্গিত করিয়া, অমিয়কে) আমি আপনাকে বলতে পারি কেন উনি এখানে থাকতে চেয়েছেন, আর কেনই বা উনি বললেন—এখানে থাকলে হয়তো ওঁর মনটা একটু ভালো হলেও হতে পারে। একটি মেয়ে আজ একটু মারা গেছে। সুন্দর ফুটফুটে একটি মেয়ে—কারো এতটুকু ক্ষতি সে কোনদিন করেনি। কিন্তু তবু তাকে মরতে হল যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে। ঘেন্নায়, লজ্জায় নিজেকে শেষ করে দিতে হল!

    শীলা॥ (কাতর স্বরে) দোহাই আপনার, আর বলবেন না! আমি এমনিতেই ভুলতে পারছি না!

    তিনকড়ি॥ (শীলার কথা গ্রাহ্য না করিয়া) কিন্তু একটু আগে, মিস সেন জানতে পেরেছেন, এই আত্মহত্যার খানিকটা দায়িত্ব তাঁর ওপরও গিয়ে পড়েছে। এখন যদি তিনি এ ঘরে না থাকেন, যদি আমার এনকোয়ারির বাকিটা না শোনেন, তাহলে তাঁর মনে হবে, হয়তো সমস্ত দোষটা তাঁরই। এ শুধু আজ বলে নয়, দিনের পর দিন — যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন, ততদিন এ দায়িত্বের গুরুভার তাঁকেই বয়ে বেড়াতে হবে।

    শীলা॥ (ব্যাকুলস্বরে) হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন! আমি জানি দোষ আমারও আছে—কিন্তু তাই বলে সবটা নয়! মেয়েটির আত্মহত্যার জন্যে আমিও দায়ী। কিন্তু দায়িত্বটা কি শুধু আমার একারই? কখখনো না—এ আমি বিশ্বাস করি না!

    তিনকড়ি॥ (দু’জনকেই কঠোরভাবে) এখন বুঝতে পারছেন—’আমি একা’ বলে কিছু নেই—আমরা সবাই সবায়ের ভাগীদার? ভাগ করার যদি কিছুও না থাকে, তাহলে অন্তত অপরাধের দায়-দায়িত্বটাও ভাগ করে নিতে হয়!

    শীলা॥ (একদৃষ্টিতে সাব-ইন্সপেক্টরকে দেখিতে দেখিতে) হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। কিন্তু দেখুন—আমি আপনাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না—

    তিনকড়ি॥ অকারণে আমাকেই বা বুঝতে যাবেন কেন? (তিনকড়িবাবুর শান্ত দৃষ্টি গিয়া পড়িল শীলার মুখের উপর। শীলার মুখে চোখে ফুটিয়া উঠিল বিস্ময় ও সন্দেহ। ঠিক এমন সময় রমা সেনের প্রবেশ। তাঁহার মুখে চোখে একটা আত্মপ্রত্যয়ের ভাব। যে ঘটনা এখানে ঘটিতেছে তাহার পটভূমিকায় তাঁহাকে যে একেবারেই মানাইতেছে না, ইহা বুঝিতে শীলার বিশেষ দেরি হইল না।)

    রমা॥ (মুখে হাসি ফুটাইয়া) ও, আপনি এসেছেন থানা থেকে? নমস্কার।

    তিনকড়ি॥ (নমস্কার করিয়া) আজ্ঞে হ্যাঁ। পদ্মপুকুর  থানা থেকে আসছি, নাম তিনকড়ি হালদার—সাব-ইন্সপেক্টর।

    রমা॥ দেখুন তিনকড়িবাবু—আমার স্বামী—মানে মিস্টার সেনের কাছ থেকে আমি সব ব্যাপারটা শুনলাম। অবশ্য আপনাকে সাহায্য করতে পারলে আমি নিশ্চয়ই করতাম—কিন্তু এ ব্যাপারে আমাদের কিছু করবার আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।

    শীলা॥ (শঙ্কিত কণ্ঠস্বরে) মা!

    রমা॥ (অতিমাত্রায় বিস্মিত হইয়াছেন এইরূপ ভান করিয়া) কি রে, কি হল?

    শীলা॥ (ইতস্তত করিতে করিতে) না—মানে—

    রমা॥ মানে? মানে কিসের?

    শীলা॥ মানে আর কি? একেবারে গোড়াতেই তুমি ভুল করছ কিনা, তাই বলছি। শেষকালে দুমদাম করে কোথায় কি বলে বসবে—পরে যখন হুঁশ হবে, তখন দেখবে, আর হায় হায় করেও কোনো কুল পাচ্ছ না!

    রমা॥ (শীলাকে) কি সব আবোলতাবোল বকছিস বল তো?

    শীলা॥ আমরাও ঠিক ঐ ভুলটাই করেছিলাম মা। ভেবেছিলাম, কোথায় কি হল না হল তাতে আমাদের কি! কিন্তু যেই উনি মুখ খুললেন—সব বদলে গেল!

    রমা॥ (তিনকড়িবাবুকে) আপনি দেখছি আমার মেয়ের মনে বেশ একটা ছাপ ধরিয়ে দিয়েছেন!

    তিনকড়ি॥ ওটা কিন্তু আপনার মেয়ে বলে নয়—ঐ বয়সী প্রায় মেয়েদের বেলাই হয়। ওঁদের তো ছাপ নেবারই বয়স। (দেখা গেল, তিনকড়িবাবুরও মিসেস সেনের দৃষ্টি পরস্পরের মুখের উপর নিবদ্ধ, কিন্তু সে বোধহয় মুহূর্তের জন্য।)

    রমা॥ (শীলাকে) আচ্ছা, এখন এসব আবোলতাবোল কথা ছেড়ে শুতে যা দেখি। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে—

    শীলা॥ না মা, তা হয় না। একটু আগে তিনকড়িবাবুও আমাকে এঘর থেকে যেতে বলেছিলনে। কিন্তু আমি যাইনি। কেন মেয়েটিকে মরতে হল তা আমায় জানতেই হবে। না জেনে এঘর থেকে যাওয়া আমার হতেই পারে না!

    রমা॥ আশ্চর্য! এই বাজে কৌতূহলের কোনো মানে হয়!

    শীলা॥ না মা, এটা মোটেই বাজে কৌতূহল নয়—

    রমা॥ মুখের ওপর চোপা করিস না শীলা! আমি বলছি, তোর এঘরে থাকার কোনো মানেই হয় না! আর তাছাড়া, মেয়েটা কেন অ্যাসিড খেয়েছে, তা আমরা কি করে জানব? ওসব মেয়েদের আবার…

    শীলা॥ (বাধা দিয়া) তুমি কি কিছুতেই শুনবে না মা? কেন তুমি এইসব কথাবার্তা বলছ?

    রমা॥ (বিরক্ত হইয়া) কি সব কথাবার্তা বলছি? দেখ শীলা—!

    শীলা॥ তুমি ভাবছ—আমরা আলাদা আর মেয়েটি আলাদা। কিন্তু তা হচ্ছে না মা! তোমার ও দেওয়ালের আড়াল বেশিক্ষণ থাকছে না, তিনকড়িবাবুর একটি কথায় এক্ষুনি চুরমার হয়ে যাবে!

    রমা॥ কি বলছিস তুই? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না! (তিনকড়িবাবুকে) আপনি পারছেন?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ — উনি ঠিক কথাই বলছেন।

    রমা॥ (ক্রুদ্ধ স্বরে) তার মানে?

    তিনকড়ি॥ মানে—আমি ওঁর কথা বেশ ভালোই বুঝতে পারছি। উনি ঠিক কথাই বলেছেন।

    রমা॥ দেখুন—যদি কিছু মনে না করেন, আপনার কথাবার্তার ধরনটা আমার কিন্তু বেয়াড়া বলে মনে হচ্ছে। (শীলা হাসিয়া উঠিলে) হেসে উঠলি যে বড়—হাসির কথাটা কি হল শুনি?

    শীলা॥ কি জানি মা, তোমার ঐ বেয়াড়া কথাটা বড় বেখাপ্পা শোনাল—তাই হেসে ফেললাম—

    রমা॥ অবশ্য উনি যদি কিছু মনে করেন — তাহলে—

    তিনকড়ি॥ (শান্ত কণ্ঠস্বরে) আজ্ঞে না। মনে করাটা আমার ডিউটির বাইরে।

    রমা॥ অবশ্য মনে করার কথা আমাদেরই।

    তিনকড়ি॥ দেখুন—ও মনে করা-করির ব্যাপারটা বাদ দিলে হয় না?

    অমিয়॥ আমি তাই বলি—

    রমা॥ না—মানে—

    শীলা॥ থাক না মা ও কথা—

    রমা॥ আচ্ছা, কথা হচ্ছে ওঁতে আমাতে—তোরা কেন কথা বলছিস বল তো? দেখুন, আপনি বললেন, আপনি এখানে এসেছেন একটা এনকোয়ারি করতে। কিন্তু যা শুনলাম, আর যা দেখছি—তাতে আপনার এনকোয়ারির ধরনটা খুবই বেয়াড়া বলে মনে হচ্ছে। আপনি বোধহয় আমার স্বামীকে—মানে, মিস্টার সেনকে খুব ভালো করে জানেন না। এমনিতে তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি তো যথেষ্ট আছেই, তার ওপর আবার হয়তো দু-পাঁচ মাসের মধ্যে মিনিস্টার-টিনিস্টারও হয়ে যেতে পারেন—অন্তত এম.এল.এ যে হবেন, তাতে তো কোনো সন্দেহই নেই! আর রমেশ—রমেশকে তো জানেনই—সে আবার আমাদের ভাগনে—

    শীলা॥ (শঙ্কিত কণ্ঠস্বরে) কি পাগলের মতো যা তা বকছ মা! দোহাই তোমার, একটু চুপ করো—

    তিনকড়ি॥ (মিসেস সেনকে) আপনি যা যা বললেন, সবই আমি জানি। এখন মিস্টার সেনকে যদি একটু খবর পাঠান, তাহলে বড় ভালো হয়।

    রমা॥ তিনি এক্ষুনি আসছেন। আমার ছেলে—মানে তাপস—মানে— (থামিয়া গেলেন)

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ বলুন—কি হয়েছে তাঁর?

    রমা॥ না, মানে হয়নি কিছু—সারাদিন ঘোরাঘুরি গেছে—তার ওপর সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে একটা ছোটখাট পার্টি গোছের ছিল, তাই…

    তিনকড়ি॥ (বাধা দিয়া) আচ্ছা—তাপসবাবু মদ খান তো?

    রমা॥ মদ? তাপস? কি বলছেন আপনি? ঐটুকু বাচ্চা ছেলে মদ খাবে কি?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে না, বাচ্চা তো নয়। বছর পঁচিশেক বয়স হবে। ও বয়সের অনেক ছেলেকে আমি বোতল-বোতল মদ খেতে দেখেছি!

    শীলা॥ ছোড়দা তাদেরই মধ্যে একজন তিনকড়িবাবু।

    রমা॥ শীলা!

    শীলা॥ আচ্ছা মা, এ না জানার ভান করে লাভটা কি? এটা কি তোমার মিসেস তলাপাত্রর বাড়ির পার্টি — যে রেখে-ঢেকে কথা বলছ? এখানে যত ঢাকবে, বিপদ তত বাড়বে। আর একটু পরেই হয়তো দেখবে ছোড়দা এমন জালে জড়িয়ে আছে আর বিন্দু-বিসর্গও আমরা কেউ জানি না। (তিনকড়িকে) না তিনকড়িবাবু— ছোড়দা আজ বছর ছয়েক ধরে ড্রিঙ্ক করছে আর বেশ রীতিমতো ভাবেই করছে। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে এক একদিন রাতে বেশ মাতাল হয়েই বাড়ি ফেরে। আমি দরজা খুলে দিই কিনা।

    রমা॥ কখ্‌খনো না—মিথ্যে কথা। আচ্ছা, তুমিই বলো অমিয়—তাপস মদ খায়?

    অমিয়॥ দেখুন সত্যি কথা বলতে কি—আমার চোখে বড় একটা পড়েনি। তবে বাইরে যা শুনি—তাতে তো মনে হয় আজকাল ডিঙ্কের মাত্রাটা খুবই বাড়িয়েছে।

    রমা॥ (তিক্তস্বরে) এ কথাটা কি এখানে না বললে চলত না বাবা?

    শীলা॥ না মা, না বললে সত্যিই চলত না! এ কথাটা বলার এইটাই তো ঠিক সময়। এইজন্যেই তো তোমাকে বলেছিলাম, দেয়াল তোলবার চেষ্টা করো না—ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে—

    রমা॥ কিন্তু চুরমারটা তো উনি করছেন না—সেটা তো করছিস তুই!

    শীলা॥ হ্যাঁ। কিন্তু বুঝতে পারছ না—উনি তো এখনও আরম্ভই করেননি!

    রমা॥ (নিজেকে আয়ত্তের মধ্যে আনিয়া) আরম্ভ করলে হবেটা কি শুনি? করুন না ওঁর যা জিজ্ঞেস করবার আছে—আমি তো তৈরি হয়েই আছি। আর কি জিজ্ঞেসটা করবেন উনি আমাকে? আমি জানি কিছু, যে বলব?

    তিনকড়ি॥ (গম্ভীরভাবে) হয়তো কিছু জানেন। তার হিসেবটা আপনার টার্ন এলেই নেব।

    রমা॥ (বিস্মিত ও হতভম্ব অবস্থায়) ও, তাই নাকি— (মিস্টার সেন প্রবেশ করিয়া দরজাটা আবার বন্ধ করিয়া দিলেন।)

    চন্দ্রমাধব॥ (কণ্ঠস্বরে বিরক্তির আভাস) তাপসটাকে পঞ্চাশবার বললাম শুতে যা, কিছুতে গেল না! বলে, আপনি নাকি তাকে জেগে থাকতে বলেছেন?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ।

    চন্দ্রমাধব॥ কারণটা জানতে পারি কি?

    তিনকড়ি॥ নিশ্চয় পারেন। তাঁকে আমার দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করবার আছে।

    চন্দ্রমাধব॥ তাপসকেও আপনার কথা জিজ্ঞেস করবার আছে? আশ্চর্য। আমার তো মাথাতেই আসছে না, তাপসের সঙ্গে আপনার কি কথা থাকতে পারে।

    তিনকড়ি॥ আপনার মাথাতে তো আসবে না। জিজ্ঞেস করব তো আমি।

    চন্দ্রমাধব॥ (গরম সুরে) তাহলে দয়া করে সেটা এখন করে নিন—করে ছেলেটাকে ছেড়ে দিন।

    তিনকড়ি॥ কিন্তু এখন তা নয়। I am sorry—তাঁকে ওয়েট করতেই হবে।

    চন্দ্রমাধব॥ দেখুন তিনকড়িবাবু—

    তিনকড়ি॥ আমি তো বলে দিয়েছি—তাঁর টার্ন না এলে নয়।

    শীলা॥ (মিসেস সেনকে) দেখলে তো মা?

    রমা॥ না, আমি কিচ্ছু দেখিনি! তুই থামবি!

    চন্দ্রমাধব॥ দেখুন তিনকড়িবাবু আমি আগেও আপনাকে বলেছি, এখনও বলছি—কি আপনার কথাবার্তা, কি আপনার এনকোয়ারি, কোনোটাই আমার পছন্দ নয়। আমি এতক্ষণ আপনাকে চান্স দিয়েছি কিন্তু আর নয়।

    শীলা॥ (কিছুটা অপ্রকৃতিস্থের ন্যায় হাসিয়া উঠিয়া) তুমি ভুল করলে বাবা, চান্স তো উনিই আমাদের দিচ্ছেন! আমাদের লজ্জা পাবার কোনো চান্সই তো কোনোদিন ছিল না, সেটা উনিই করে দিচ্ছেন!

    চন্দ্রমাধব॥ শীলার কি হয়েছে বলো তো?

    রমা॥ হবে আবার কি? মাথা গরমের ধাত! ও তো বরাবরই ঐরকম। কোথাও একটু কিছু শুনল তো মেয়ের একেবারে খাত ছেড়ে গেল। বলছি তখন থেকে — ওরে শুতে যা, তো কে কার কথা শোনে! (হঠাৎ তিনকড়িবাবুর দিকে ফিরিয়া ক্রুদ্ধস্বরে) আপনি চুপ করে শুনছেন কি? বলুন, আপনার কি জানবার আছে?

    তিনকড়ি॥ (গম্ভীরভাবে, এতটুকু বিচলিত না হইয়া) গেল বছর জানুয়ারির শেষে এই সন্ধ্যা চক্রবর্তীর আবার চাকরি যায়। কেন? না, মিস সেন নিজের ওপর একটু বিরক্ত হয়েছিলেন বলে। এর পরেও এধার ওধার চাকরির চেষ্টা সে করেছিল কিন্তু পায়নি। তখন ঠিক করলে নামটা বদলে একটু রকমফের করে দেখবে। (হঠাৎ অমিয়র দিকে ফিরিয়া) সন্ধ্যা চক্রবর্তীর নাম বদলে হল

    অমিয়॥ (ফস করিয়া বলিয়া ফেলিল) ঝরনা রায়। (শীলা উচ্চহাস্য করিয়া উঠিল, অমিয়র থতমত অবস্থা।)

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ। এখন বলুন তো মিস্টার বোস, এই ঝরণা রায়ের সঙ্গে কবে আপনার প্রথম দেখা হয়েছিল?

    অমিয়॥ (নিজেকে আয়ত্তে আনিবার চেষ্টা করিয়া) না মানে—

    শীলা॥ মিছিমিছি সময় নষ্ট করে কোনো লাভ নেই অমিয়—

    অমিয়॥ বেশ, তাহলে শনুন। ঝরনার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় গেল বছর মার্চ মাসে প্যালেস ম্যাসেজ ক্লিনিকে, মানে পার্ক স্ট্রীটের ঐ ম্যাসজে ক্লিনিকটা—

    শীলা॥ ওটা যে পাক স্ট্রীটে, শ্যামবাজারে নয় তা বোধহয় উনি জানেন অমিয়—

    অমিয়॥ থ্যাঙ্কস শীলা। (হঠাৎ চটিয়া উঠিল) আচ্ছা শীলা, তোমার যা বলার ছিল, তা তো বলা হয়ে গেছে। এখন এখানে থেকে লাভটা কি? এসব কথা তোমার খুব ভালোও লাগবে না—

    শীলা॥ ভালো না লাগলেও আমাকে এখানে থাকতে হবে অমিয়।

    অমিয়॥ (অসহিষ্ণু হইয়া) কিন্তু কেন?

    শীলা॥ বাঃ, খুব কাজ ছিল বলে, গেল বছর মে-জুন-জুলাই তুমি একেবারে এদিক মাড়াওনি! এরপর যখন এ রকম হবে, তখন অন্তত বুঝব যে তোমার একটা কাজ আছে, আর সে কাজটাও যে কি রকম তারও একটা আন্দাজ পাব!

    তিনকড়ি॥ (শীলাকে থামাইয়া দিয়া) আচ্ছা থাক ও কথা— আপনাদের ঝগড়াটা না হয় পরেই সারবেন। (অমিয়কে) তারপর মিস্টার বোস? প্যালেস ম্যাসেজ ক্লিনিকে আপনার সঙ্গে ঝরনা রায়ের প্রথম দেখা— কেমন?

    অমিয়॥ (অল্প ইতস্তত করিতে করিতে)—মানে—ওসব জায়গায় আমি এমনিতে বড় একটা—

    তিনকড়ি॥ বুঝেছি অমিয়বাবু—আপনি ওসব জায়গায় এমনিতে বড় একটা যান না। কিন্তু সেদিন গিয়েছিলেন—

    অমিয়॥ হ্যাঁ—মানে, শরীরটা ঠিক ফিট মনে হচ্ছিল না। তাই মনে হল একবার ঘুরেই আসি। ম্যাসেজের পর ঘর থেকে বেরিছি এমন সময় মানে—জানেনই তো—ওসব জায়গায় ঐ টাইপের মেয়েই বেশি আসে—

    রমা॥ (কৌতূহলী হইয়া) ঐ টাইপের মেয়ে—?

    তিনকড়ি॥ যাকগে, টাইপটা এখন নাই বা আলোচনা করলেন। বিশেষ করে ওঁর সামনে—(শীলাকে দেখাইয়া দিলেন)

    রমা॥ (চটিয়া উঠিয়া) আমি যে তখন থেকে বলছি — শীলা, তুই এঘর থেকে যা!

    শীলা॥ তুমি ভুলে যাচ্ছ মা—আজ বাদে কাল অমিয়র সঙ্গে আমার বিয়ে!—তারপর অমিয়? ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছ, এমন সময় জানতে পারলে ওখানে ঐ টাইপের মেয়েরাই বেশি আসে—তারপর?

    অমিয়॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) খুব মজা লাগছে শুনতে—না শীলা! আচ্ছা শীলা, তোমার এতটুকু লজ্জা করছে না—

    তিনকড়ি॥ (বাধা দিয়া) Come along মিস্টার বোস, তারপর?

    অমিয়॥ না—মানে বেরিয়ে এসেছি—এমন সময় দেখি—মানে—ঐ মেয়েটি—মানে ঝরনা—একেবারে সামনে—(কিছুটা আত্মবিস্মৃতের ন্যায়) রঙ ফরসা, ঘন কালো চুল, টানা চোখ—(হঠাৎ থামিয়া গিয়া)—My god!

    তিনকড়ি॥ কি হল মিস্টার বোস?

    অমিয়॥ না, মানে—আমার ঠিক মনে ছিল না—

    তিনকড়ি॥ (রূঢ়স্বরে) যে মেয়েটি একটু আগে মারা গেছে, এই তো সে?

    শীলা॥ আর আমরাই তাকে মেরেছি, তাই না?

    রমা॥ শীলা!

    শীলা॥ তুমি চুপ করো মা!

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ, ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখেন ঐ মেয়েটি—তারপর?

    অমিয়॥ দেখি আমাদের ধীরেশ তার একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরেছে। আর মেয়েটি প্রাণপণ চেষ্টা করছে তাকে বাধা দেবার। তার মুখ চোখের ভাব দেখে মনে হল, ম্যাসাজ ক্লিনিকে খুব বেশি দিন সে আসেনি—

    রমা॥ কিন্তু ধীরেশ? কোন ধীরেশ, অমিয়?

    অমিয়॥ আমাদের ধীরেশ, কাকিমা—এস, এন-এর ছেলে—

    রমা॥ সত্যি?

    শীলা॥ হ্যাঁ মা, সত্যি। তুমি ভাব, বোকা-বোকা মুখ করে খোনে আসে, তোমাকে কাকীমা-কাকীমা করে, চা-টা খায়—অয়ন ছেলে আর হয় না। আমরা তো এসব ব্যাপার বহুদিন জানি! পাশের বাড়ির প্রতিভাদিকে চেনো?

    রমা॥ কে প্রতিভা! ও—ঐ স্কুল-মিস্ট্রেস?

    শীলা॥ হ্যাঁ। প্রতিভাদি ধীরেশের ছোট বোনকে পড়াত। দু-মাস পরে টিউশান ছেড়ে দিতে হল। কেন জানো? তোমাদের ঐ এস, এন-এর ছেলে দীরেশ দু-একদিন তার হাত ধরে—

    চন্দ্রমাধব॥ (জোর ধমক দিয়া উঠিলেন) শীলা! (শীলা থামিয়া গেল)

    তিনকড়ি॥ (অমিয়কে) আপনি থামলেন কেন? বলে যান—

    অমিয়॥ মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে আমার যেন কি রকম মায়া হল। ধীরেশের হাত থেকে ছাড়িয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তাকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম—

    তিনকড়ি॥ সেদিন কোথায় উঠলেন?

    অমিয়॥ পাশের রয়াল হোটেলে।

    তিনকড়ি॥ কিছু কথাবার্তা হয়নি?

    অমিয়॥ হয়েছিল—তবে অল্প। নাম বললে ঝরনা রায়। কথায়-কথায় জানতে পারলাম, বাপ-মা কেউ নেই। আগে চাকরি করত, দু-দু’বার চাকরি যাওয়ায় কোথাও কিছু না পেয়ে, শেষে এই ম্যাসাজ ক্লিনিকে চাকরি নেয়। ম্যাসাজ ক্লিনিকের ব্যাপার যে খানিকটা জানত না তা নয়—জানত। কিন্তু অন্য কিছু না পেয়ে ওখানে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এদিকে কথা বলে খুব কম। আমাকে তো আগের কথা কিছু বললেই না—আমিও অবশ্য জোর করিনি। তবে কথার ফাঁকে শুধু এইটুকু জানতে পারলাম—হাতে টাকা-পয়সা কিচ্ছু নেই। না আছে আত্মীয়স্বজন, না আছে বন্ধুবান্ধব। কি জানি কেন বড্ড মায়া হল। হাতে কিছু টাকা দিয়ে আর ঐ হোটেলেই দিন পনেরো থাকবার ব্যবস্থা করে দিয়ে সেদিনের মতো আমি চলে এলাম।

    তিনকড়ি॥ তারপর—দিন পনেরো বাদে আপনি ঠিক করলেন—মেয়েটিকে আপনার নিজের কাছেই রাখবেন—এইতো?

    রমা॥ অমিয়!

    শীলা॥ এতে অবাক হওয়ার কিছু তো নেই, মা! গল্পের গোড়া দেখলেই তো শেষটা বোঝা যায়।—যাকগে অমিয়, তুমি বলো—মা তো একটু চমকাবেই!

    অমিয়॥ পনেরো দিন বাদে আবার আমাদের দেখা হয়। সেদিন কি জানি কেন মনে হল, একা এই নিঃসঙ্গ অবস্থায় তাকে ছেড়ে যাওয়া খুবই অন্যায়। সে-সময় আমার এক বন্ধু মাস-পাঁচেকের জন্যে বম্বে গিয়েছিলেন। তাঁর ফ্ল্যাটের চাবিটা আমার কাছে ছিল।আমি তাকে ঐ ফ্ল্যাটটায় এনে রাখলাম। কিন্তু বিশ্বাস করুন তিনকড়িবাবু, কোনো অভিসন্ধি আমার ছিল না। আমি শুধু তার একটু উপকার করতেই চেয়েছিলাম—কোনো প্রতিদান আমি চাইনি—

    তিনকড়ি॥ ও—

    শীলা॥ (নিজের দিকে ইঙ্গিত করিয়া) দেখ অমিয়—কাকে বলার কথা, আর কাকে বলছ—

    অমিয়॥ I am sorry শীলা, মানে—

    শীলা॥ না না, মানে আমি বুঝি অমিয়—তুমি তো বলছ না, উনি তোমাকে দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছেন—

    তিনকড়ি॥ আচ্ছা, তারপর থেকে ঝরনা আপনার সঙ্গেই রয়ে গেল — কেমন?

    অমিয়॥ (হঠাৎ ক্রদ্ধস্বরে) সেটাও কি আপনাকে জিজ্ঞেস করে জানতে হবে? কিচ্ছু বোঝেন না আপনি?

    তিনকড়ি॥ বুঝি বই কি, তার দিকটা বেশ ভালো করেই বুঝি। একা অসহায় স্ত্রীলোক। আপনিই বোধহয় তার জীবনের প্রথম বন্ধু! কিন্তু আপনি? আপনি কি সত্যিই তাকে ভালবেসেছিলেন?

    চন্দ্রমাধব॥ দেখুন তিনকড়িবাবু,—আমি চাই না, আমার বাড়িতে এসব কথাবার্তা হয়—

    তিনকড়ি॥ কিন্তু, আপনি না চাইলেও হচ্ছে। মেয়েটিকে আপনিই প্রথম তাড়িয়েছিলেন।

    চন্দ্রমাধব॥ সেটা শুধু আমি নয়, আমার মত যে কোনো এমপ্লয়ারই তাকে তাড়িয়ে দিত। যাকগে সে কথা। আমি চাই না আমার বাড়িতে, আমারই মেয়ের সামনে, এ ধরনের অভব্য কথাবার্তা হয়।

    তিনকড়ি॥ আপনার মেয়ে কিছু চাঁদের দেশে নেই—ইঁটকাঠের দুনিয়ায় তাকে পা ফেলে চলতে হয়!—হ্যাঁ, তারপর মিস্টার বোস—আপনি কি সত্যিই মেয়েটিকে ভালবেসেছিলেন?

    অমিয়॥ না—মানে, সে আমাকে—

    তিনকড়ি॥ না না, তার কথা আমি জানি। সে আপনাকে ভালবেসেছিল—কিন্তু আপনি?

    অমিয়॥ আমার একটা মোহ থাকা খুব অস্বাভাবিক কি?

    শীলা॥ আর এই মোহটা বোধহয় তোমার মাস তিনেক ছিল, না অমিয়? তাই বোধহয় তিন মাস এখানে আসতে পারোনি? ঐ যে, গেল বছরের মে-জুন-জুলাই?

    অমিয়॥ কিন্তু শীলাআমি তোমাকে মিথে কথা বলিনি। ঐ তিন মাস সত্যিই আমার কাজ খুব বেশি ছিল।

    শীলা॥ কিন্তু ওখানে বোধহয় তুমি রোজই যেতে?

    অমিয়॥ না, মোটেই যেতাম না—

    তিনকড়ি॥ কিন্তু প্রায়ই যেতেন তো?

    অমিয়॥ হ্যাঁ—

    রমা॥ ছিঃ অমিয়—যত সব ডিসগাস্টিং ব্যাপার—

    অমিয়॥ কিন্তু কাকীমা—আপনি ঠিক বুঝতে পারছেন না—

    রমা॥ তার মানে?

    তিনকড়ি॥ মানে, ব্যাপারটা আপনার কাছে ডিসগাস্টিং হলেও ওঁর কাছে নয়।

    অমিয়॥ আপনার আর কিছু জিজ্ঞেস করবার আছে?

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ—শেষে কি হল?

    অমিয়॥ অগস্টের শেষে হপ্তা দুয়েকের জন্যে আমার বাইরে যাবার কথা হয়। যাবার আগে বেশ ভালো করে ভেবে দেখলাম—দেখলাম আর জের টানার কোনো মানেই হয় না। আমার আসা-যাওয়া কম দেখে ঝরনাও বুঝতে পেরেছিল। একদিন তাকে সব খুলে বললাম—

    তিনকড়ি॥ কিভাবে নিলে সে?

    অমিয়॥ খুব সহজভাবে। আশ্চর্য এত সহজভাবে যে নেবে সে, তা ভাবতেই পারিনি!

    শীলা॥ (বঙ্গের সুরে) তোমার তো খুব ভালোই হল—

    অমিয়॥ তুমি কত কম বোঝ শীলা, অথচ কথাবলো কত বেশী! সে আমায় কি বলেছিল জানো? বলেছিল, এত সুখ সে জীবনে কোনোদিন পায়নি। জানো শীলা, ঝরনা আমার ওপর এতটুকু রাগ করেনি। জিজ্ঞেস করতে বলেছিল—রাগ করতে যাব কেন? আমি তো গোড়া থেকেই জানি এ-সুখ আমার সইবে না! (দুই হাতে চোখ ঢাকিয়া অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠস্বরে) ওঃ, আজ যদি সে একবারও ফিরে এসে বলে যেত—যত দোষ, সব তোমার অমিয়, যত দোষ সব তোমার!—তাহলে বোধহয় আমি বেঁচে যেতাম শীলা!

    তিনকড়ি॥ তারপর অমিয়বাবু—ঝরনাকে ঐ ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিতে হল, কেমন?

    অমিয়॥ হ্যাঁ, অবশ্য যাবার আগে আমি তাকে কিচু টাকা দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে নেয় নি। বললে—আমি যা দিতাম, তা থেকেই কিছু তার হাতে পড়ে আছে। আমি অনেক বললাম। কিছুতেই রাজী হল না। বলল, দু-একটা মাস, কোনো রকমে চলে যাবে—তার মধ্যে একটা-না-একটা কিছু জুটে তার যাবেই—

    তিনকড়ি॥ কোথায় যাবে, কিন্তু বলেছিল আপনাকে?

    অমিয়॥ না, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি। তবে কথার আভাসে মনে হয়েছিল বোধহয় কলকাতায় থাকবে না। — আপনি জানেন কিছু?

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ—মাসখানেকের জন্যে সে কলকাতার বাইরে চলে গিয়েছিল—নির্জন ছোট্ট একটা জায়গায়—

    অমিয়॥ একা?

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ, একা থাকবার জন্যেই তো গিয়েছিল। ছোট্ট নির্জন একটা জায়গা—বসে বসে সারাদিন ভাবত আপনার কথা, তার নিজের কথা—আর মনে রাখবার মতোঐ মে-জুন-জুলাইয়ের কথা—

    অমিয়॥ কিন্তু আপনি এসব কথা জানলেন কি করে?

    তিনকড়ি॥ ঐ যে বললাম—সে একটা ডায়েরি রেখে গেছে। সুদিনের খতা কে না মনে রাখতে চায় বলুন? দেখলে, সামনেই তার সময় খারাপ। তাই মনে রাখতে চায় বলুন? দেখলে, সামনেই তার সময় খারাপ। তাই সামনে না তাকিয়ে ঐ একটা মাস শুধু পেছনের কথাই ভাবলে—পেছনের ঐ তিনটে মাস।

    অমিয়॥ ও—কিন্তু এর পরের খবর তো আমি রাখি না—

    তিনকড়ি॥ আপনার কাছ থেকে এই খবরটাই আমি চেয়েছিলাম—এর পরেরটা নয়।

    অমিয়॥ দেখুন—তাহলে—মানে—আমি যদি এখন একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি—(তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল) অবশ্য আপনার যদি কোনো আপত্তি না থাকে—

    তিনকড়ি॥ কোথায় যাবেন? বাড়ি?

    অমিয়॥ না না, বাড়ি নয়—এই বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসব। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, আমি ঠিক ফিরে আসব।

    রমা॥ তার মানে? এখানেই তাহলে শেষ নয়?

    অমিয়॥ কি জানি কাকিমা, আমার তো মনে হয়— না। তারপর—উনি জানেন—(তিনকড়ির দিকে ইঙ্গিত করিয়া বাহির হইয়া গেল।)

    শীলা॥ কিন্তু তিনকড়িবাবু, আপনি তো ছবিটা অমিয়কে দেখালেন না?

    তিনকড়ি॥ দরকার মনে করলাম না—মনে হল, না দেখানোই ভালো।

    রমা॥ আপনার কাছে মেয়েটার ছবি আছে নাকি?

    তিনকড়ি॥ আছে। একবার দেখবেন নাকি?

    রমা॥ আমি কেন দেখতে যাব? দরকারটা কি আমার?

    তিনকড়ি॥ না, দরকার কিছু নেই। তবু একবার দেখলে পারতেন?

    রমা॥ আচ্ছা, কই দেখি—নিয়ে আসুন—(তিনকড়িবাবু মিসেস সেনের নিকট আসিয়া পকেট হইতে ছবি বাহির করিলেন। মিসেস সেনের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। মনে হইল খুব ভালো করিয়া ছবিটি দেখিতেছেন।)

    তিনকড়ি॥ (ছবিটি যথাস্থানে রাখিয়া) চিনতে পারছেন নিশ্চয়?

    রমা॥ তার মানে? আমি কি করে চিনব?

    তিনকড়ি॥ সে কি? ছবিটা অবশ্য আগেকার তোলা। মুখের চেহারা একটু-আধটু বদলাতেও পারে। কিন্তু তাই বলে এত বদলে গেল যে, একেবারে চিনতেই পারলেন না!

    রমা॥ দেখুন, আমি আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না। কি বলতে চান আপনি?

    তিনকড়ি॥ বুঝতে পারছেন না—না, বুঝতে চাইছেন না?

    রমা॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) তার মানে?

    তিনকড়ি॥ মানে, আপনি মিথ্যে কথা বলছেন।

    রমা॥ তিনকড়িবাবু, ভদ্রভাবে কথা বলতে চেষ্টা করুন—

    চন্দ্রমাধব॥ তার মানে? আগে উনি তোমার কাছে মাফ চাইবেন, তারপর অন্য কথা।

    তিনকড়ি॥ কিন্তু ভুল করছেন—যা করছি, তা আমার ডিউটি, তার জন্যে মাফ চাইব কেন?

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু গালাগাল দেওয়াটা আপনার ডিউটি নয়। আপনি আমাদের রাম-শ্যাম-যদু-মধু পেয়েছেন নাকি? আমরা শহরের একটা নামজাদা ফ্যামিলি, তা জানেন?

    তিনকড়ি॥ কিন্তু একটা কথা ভুলে যাচ্ছে মিস্টার সেন, নামজাদা হিসেবে আপনাদের যেমন সুবিধেও আছে, তেমনি দায়িত্বও কিছু আছে।

    চন্দ্রমাধব॥ তা হয়তো আছে। কিন্তু আপনাকে এখানে পাঠানো হয়েছে কি জন্যে? দায়িত্বের কথাটা আমাকে মনে করিয়ে দেবার জন্যে?

    শীলা॥ খুব ঠিক করে কিন্তু বলা যায় না বাবা—হয়তো তা হলেও হতে পারে—

    রমা॥ শীলা!

    শীলা॥ আচ্ছা মা, তোমরা যে এই বড়মানুষী ভড়ং দিয়ে ব্যাপারটাকে ঢাকবার চেষ্টা করছ, কোনো মানে হয় এর? পাঁচটা টাকা বেশি মাইনে চেয়েছিল বলে বাবা তাকে তাড়িয়ে দিলেন। আমার চেয়ে দেখতে ভালো বলে, আমি রেগে গিয়ে তার চেন স্টোরের চাকরিটা খেলাম। অমিয় তার খেয়ালখুশিমতো তাকে নিজের কাছে এনে রাখলে—আর যেই দরকার ফুরোল, তাকে বিদায় করে দিলে। আর তুমি? তুমি ছবিটা নিয়ে দেখলে! পরিষ্কার বোঝা গেল, তুমি চিনতে পেরেছ! তুমি চিনতে পেরেও বললে — চিনি না, অথচ ওঁকে বলছ মাফ চাইতে! কেন উনি মাফ চাইবেন?

    রমা॥ শীলা, তুই চুপ করবি! আমি যা ভালো বুঝেছি তাই বলেছি!

    শীলা॥ কিন্তু ভালো যে তুমি বোঝ নি মা। তোমার এ মিথ্যে ভড়ঙে ব্যাপারটা যে ক্রমশঃ খারাপের দিকে যাচ্ছে— (সদর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শোনা গেল)

    চন্দ্রমাধব॥ আঃ—আবার কে এল—?

    রমা॥ বোধহয় অমিয় ফিরে এল—

    তিনকড়ি॥ কিংবা দেখুন, হয়তো তাপসবাবু বাইরে গেলেন —

    চন্দ্রমাধব॥ আমি দেখে আসি, বুঝলে? (দ্রুত বাহির হইয়া গেলেন)

    তিনকড়ি॥ (রমাকে) আচ্ছা মিসেস সেন, আপনি তো নারীসহায়ক সমিতির প্রেসিডেন্ট—না? (মিসেস সেন চুপ করিয়া রহিলেন)

    শীলা॥ বলো মা—চুপ করে রইলে কেন? এটাতে তো হ্যাঁ বলতে কোনো বাধা নেই! (তিনকড়িকে) হ্যাঁ, উনি প্রেসিডেন্ট, কিন্তু কেন বলুন তো?

    তিনকড়ি॥ আচ্ছা, শুনেছি মেয়েরা বিপদে-আপদে পড়লে, আপনাদের কাছে আবেদন-টাবেদন করে—আপনারা নাকি নানারকম সাহায্য টাহায্য করে থাকেন—সত্যি?

    রমা॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) সাহায্য-টাহায্য নয়—দরকার হলে রীতিমতো টাকা পয়সাও দিই—এমন অনেক কেসে আমরা দিয়েছি!

    তিনকড়ি॥ আচ্ছা, হপ্তা-দুয়েক আগে আপনাদের একজিকিউটিভ কমিটির একটা মিটিং হয়ে গেছে, না?

    রমা॥ আপনি যখন বলছেন,—তখন হয়েছে নিশ্চয়—

    তিনকড়ি॥ (দৃঢ়স্বরে) আমি বলছি বলে নয়, আপনিও জানেন—হয়েছে। সে মিটিঙে আপনিই ছিলেন প্রেসিডেন্ট—

    রমা॥ যদি থাকিই প্রেসিডেন্ট, তাতে আপনার কি?

    তিনকড়ি॥ (কঠোর স্বরে) সাদা কথায় বলব আপনাকে? সহ্য করতে পারবেন?

    (চন্দ্রমাধবের প্রবেশ)

    চন্দ্রমাধব॥ বুঝলে, তাপসই—

    রমা॥ আশ্চর্য—কোথায় গেল বলো তো! এই বলছিল শরীরটা খারাপ—

    চন্দ্রমাধব॥ আরে শরীর খারাপ কি? তখন দেখলাম আবোল-তাবোল বকছে। বললাম — শুতে যা—তো কে কার কথা শোনে! বললে—ইন্সপেক্টর আমাকে জেগে থাকতে বলেছেন! আমি তবু বললাম—বলুক ইন্সপেক্টর—আমি বলছি, তোকে দরকার হবে না—

    তিনকড়ি॥ আপনি ভুল বলেছেন, মিস্টার সেন — তাঁকে আমার সত্যিই দরকার। আর তিনি যদি শিগগির না ফেরেন, তাহলে আমাকেই গিয়ে খুঁজে-পেতে নিয়ে আসতে হবে—(মিস্টার ও মিসেস সেন ভীতবাবে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিলেন)

    শীলা॥ (তিনকড়িকে) না না, ব্যস্ত হবার কিছু নেই। এখানেই কোথাও আছে—এক্ষুনি আসবে।

    তিনকড়ি॥ এলেই ভাল।

    রমা॥ কেন—ভাল কেন?

    তিনকড়ি॥ আগে আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিন, তারপর আমি আপনারটার দেব।

    চন্দ্রমাধব॥ আর যদি উনি না দেন—

    তিনকড়ি॥ উত্তর দিতে উনি বাধ্য—

    চন্দ্রমাধব॥ কেন—জানতে পারি কি?

    তিনকড়ি॥ নিশ্চয় জানতে পারেন। একটু আগে মিস্টার বোস বলে গেলেন, সেপ্টেম্বর মাস থেকে তাঁর সঙ্গে সন্ধ্যার আর দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। আমার মনে হয় কথাটা তিন মিথ্যে বলেন নি। কিন্তু মাত্র দু-হপ্তা আগে—(মিসেস সেনকে দেখাইয়া) ওঁর সঙ্গে তার দেখা হয়েছে—আর শুধু দেখাই হয়নি, কথাবার্তাও হয়েছে!

    শীলা॥ মা—!

    চন্দ্রমাধব॥ সত্যি রমা?

    রমা॥ (এক মুহূর্ত চুপ করিয়া থাকিয়া) হ্যাঁ।

    তিনকড়ি॥ সে এসে আপনাদের সমিতির কাছে সাহায্য চেয়েছিল?

    রমা॥ হ্যাঁ।

    নতকিড়ি॥ কিন্তু সন্ধ্যা চক্রবর্তী নামে নয়।

    রমা॥ না—ঝরনা রায় নামেও নয়।

    তিনকড়ি॥ তবে কি নামে?

    রমা॥ রেবা সেন।

    তিনকড়ি॥ আর কিছু বলেনি—বিয়ে হয়েছে, কি হয়নি—?

    রমা॥ প্রথমে তো বলেছিল—বিয়ে হয়েছে। সিঁথিতে সিঁদুরও ছিল।

    তিনকড়ি॥ তার স্বামীর নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন?

    রমা॥ কিন্তু বিয়ে তার মোটেই হয়নি—

    তিনকড়ি॥ যা জিজ্ঞেস করছি তাই বলুন। তার স্বামীর নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন?

    রমা॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) করেছিলাম কিন্তু বলেনি—

    তিনকড়ি॥ কোথায় বিয়ে হয়েছিল, জিজ্ঞেস করেছিলেন?

    রমা॥ করেছিলাম—

    তিনকড়ি॥ কি বলেছিল সে?

    রমা॥ কিন্তু বিয়ে তার—

    তিনকড়ি॥ (বাধা দিয়া) কি বলেছিল সে?

    রমা॥ প্রথমে সে কিছুই বলেনি। তারপর যখন তাকে বললাম, সমস্ত ঠিকানা না দিলে হবে না, তখন সে বললে — তার স্বামীর ঠিক নাম সে জানে না—তবে তার স্বামী কথায় কথায় একদিন বলেছিলেন যে, তিনি নাকি ঘুঘডাঙার সেন-বাড়ির ছেলে।

    চন্দ্রমাধব॥ সে কি?

    তিনকড়ি॥ (চন্দ্রমাধবকে) ঘুঘুডাঙার সেনেদের আপনি চেনেন নাকি?

    শীলা॥ আমরাই ঘুঘুডাঙার সেন, তিনকড়িবাবু।

    রমা॥ আরে—ঐ শুনেই তো আমার রাগ হয়ে গেল! মিথ্যে কথা কেন বললে?

    তিনকড়ি॥ আপনি তাহলে গোড়া থেকেই তার ওপর রেগে ছিলেন?

    রমা॥ রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক!

    তিনকড়ি॥ কিন্তু সেদিন কমিটিতে আপনি হ্যাঁ বললে সে নিশ্চয় সাহায্য পেত তাই না?

    রমা॥ তা হয়তো পেত।

    তিনকড়ি॥ হয়তোর কথা হচ্ছে না। আপনি হ্যাঁ বললে সে সাহায্য পেত কি না?

    রমা॥ হ্যাঁ, পেত। কিন্তু কেন হ্যাঁ বলব! প্রথমত সে মিথ্যে কথা বলেছিল—

    তিনকড়ি॥ কি করে জানলেন?

    রমা॥ জেরা করতে নিয়েই বলে ফেললে। তখন শুনলাম, তার বিয়েই হয়নি—আর ঘুঘুডাঙার সেন-বাড়ির নামটা তার প্রথমেই মনে এসেছিল, তাই বলেছিল!

    তিনকড়ি॥ সে সাহায্যটা চেয়েছিল কেন?

    রমা॥ সেটা তো আপনি নিজেও জানেন—

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ, আসল কারণটা জানি, কিন্তু আপনাদের ওখানে সে কি বলেছিল?

    রমা॥ এখানে সেটা আলোচনা করবার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না।

    তিনকড়ি॥ আপনি না মনে করতে পারেন, কিন্তু আলোচনা আপনাকে করতেই হবে!

    রমা॥ আমার সঙ্গে ওভাবে কথা বলে কোন লাভ হবে না, তিনকড়ি বাবু। একটা ব্যাপারে আপনি গোড়া থেকেই ভুল করছেন। লজ্জা পাবার মতো কোন কিছু আমি করিনি। মেয়েটি সাহায্যের জন্যে আমার কাছে এসেছিল। সোজা এসে সত্যি কথা বললে, হয়তো সে সাহায্য পেত। কিন্তু তা সে বলেনি। তাই কমিটি যাতে তাকে সাহায্য না করে, সেই ব্যবস্থাই আমি করেছিলাম। পরে হয়তো মেয়েটি আত্মহত্যা করতে পারে। কিন্তু তার জন্যে আমার লজ্জা পাবার কোন কারণই নেই! কাজেই, বুঝতে পারছেন — আমি যদি আর কথা বলব না বলে ঠিক করি, আপনার সাধ্য নেই আমাকে দিয়ে কথা বলান!

    তিনকড়ি॥ আমি কিন্তু আপনাকে দিয়ে কথা বলাতে পারি, সে ক্ষমতা আমার আছে।

    রমা॥ না, নেই! আমি কোন অন্যায় কাজ করিনি, কাজেই আপনার কোন জোর আমার ওপর খাটবে না।

    তিনকড়ি॥ কিন্তু ওখানেই আপনার ভুল, মিসেস সেন। আপনি যে শুধু অন্যায় করেছেন তাই-ই নয়—এমন একটা অন্যায় করেছেন, যার জন্যে সারা জীবন আপনাকে অনুতাপ করতে হবে। আজ যদি আপনি আমার সঙ্গে হসপিটালে যেতেন, তাহলে দেখতেন —

    শীলা॥ তিনকড়িবাবু—দোহাই আপনার, ও কথাটা না হয় থাক—

    তিনকড়ি॥ কিন্তু আপনি থাক বললেই কথাটা থাকছে না, মিস সেন। মেয়েটি মা হতে চলেছিল—

    শীলা॥ (আর্তস্বরে) তিনকড়িবাবু—কি বলছেন আপনি—(দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া) না, তিনকড়িবাবু, বলুন—বলুন, একথা সত্যি নয়! ওঃ—কি করে সে অ্যাসিড খেল!

    তিনকড়ি॥ কি করবে বলুন? এখান থেকে তাড়ায় ওখানে যায়, ওখান থেকে তাড়ায় এখানে আসে—এর শেষই তো এই!

    শীলা॥ তুমি জানতে মা?

    তিনকড়ি॥ নিশ্চয় জানতেন। ওই জন্যেই তো মেয়েটি ওঁদের কাছে গিয়েছিল।

    চন্দ্রমাধব॥ দেখুন—মানে, এর মধ্যে আমাদের অমিয় নেই তো?

    তিনকড়ি॥ না। তার সঙ্গে এ ব্যাপারের কোন সম্পর্কই নেই।

    চন্দ্রমাধব॥ (স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়া) যাক তবু ভাল—

    শীলা॥ এটুকু ভাল নাই বা হ’ত বাবা—

    তিনকড়ি॥ (মিসেস সেনকে) আপনার তাহলে আর কিছু বলবার নেই—কি বলেন?

    রমা॥ তাকে যা বলেছিলাম, আপনাকেও ঠিক তাই বলব। এ ব্যাপারে সত্যিই যার দায়িত্ব, তার খোঁজ করুন—সেই লোকটার—

    তিনকড়ি ) কিন্তু দায়িত্বটা কি আপনারও কিছু কম মিসেস সেন। আপনার কাছে সে কখন সাহায্য চাইতে গিয়েছিল ভেবে দেখুন। কিন্তু আপনি নিজে তো তাকে না বললেনই, তার ওপর এমনভাবে কেসটা প্রেজেন্ট করলেন—যাতে কমিটির আর সকলে তাকে না বলে। আপনার নিজেরও ছেলেমেয়ে আছে—মা হওয়া যে কি, তা আপনি বেশ ভাল করেই বোঝেন! একবারও ভাবলেন না—সে অসহায়, নিঃসম্বল। আপনি তাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারতেন, নিজের মেয়ের মতো উপদেশ দিতে পারতেন—বন্ধু হিসেবে তাকে কাছে টেনে নিতে পারতেন। কিন্তু আপনি সোজা তার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলেন!

    শীলা॥ ছিঃ—মা—

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু রমা, ব্যাপারটা করোনারেই গোলমেলে দাঁড়াতে পারে—আর কাগজওলাদের তো কথাই নেই—

    রমা॥ চুপ করবে তোমরা! আচ্ছা, তোমরা আমাকে দোষ দাও কি করে? দয়াময়ী থেকে তাকে তাড়িয়েছিলে তুমি! চেন স্টোর থেকে তাকে তাড়াল শীলা! (তিনকড়ির দিকে ফিরিয়া) আমি তো এখনও বলছি—আমি কোন অন্যায় করিনি! মেয়েটা তো আরম্ভই করলে মিথ্যে দিয়ে! তারপর দেখলাম—আসল লোকটাকে সে ভাল করেই জানে। তখন আমি তাকে বললাম—সেই লোকটার কাছে যেতে! বিয়ে না করুক, সে অন্তত টাকাকড়ি দিয়ে সাহায্য করতে পারত!

    তিনকড়ি॥ কি বললে সে?

    রমা॥ যত সব বাজে কথা—

    তিনকড়ি॥ সেটা কী তাই বলুন না?

    রমা॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) কি বলব কী? আমার ভাল মনে নেই! ন্যায় অন্যায় বিবেক—সে সব বড়ো বড়ো কথা কি? আরে তোর মতো মেয়েদের মুখে আবার ওসব কথা কেন?

    তিনকড়ি॥ (রুঢ়স্বরে) কার মতো মেয়ে মিসেস সেন? মড়া-কাটা টেবিলে আজ যে শুয়ে আছে—তার মতো? (চন্দ্রমাধব যেন প্রতিবাদে কি বলিতে চাইতেছিলেন — তাঁহাকে বাধা দিয়া) চুপ করুন—তখন থেকে বাজে বক-বক করছেন আপনি! জানবেন—আমারও ধৈর্য্যের একটা সীমা আছে! (মিসেস সেনকে) হ্যাঁ, কি বলেছিল সে?

    রমা॥ (ভীতস্বরে) মানে—বলেছিল, লোকটার বয়স অল্প—তার ওপর মদ বড্ড বেশি খায়, বিয়ে হলে কারুরই ভাল হত না—

    তিনকড়ি॥ লোকটা তাকে টাকাকড়ি দিত না?

    রমা॥ হ্যাঁ, আগে দিত, কিন্তু পরে নিতে রাজী হয়নি—

    তিনকড়ি॥ কেন, জিজ্ঞেস করেছিলেন?

    রমা॥ হ্যাঁ, করেছিলাম। কিন্তু উত্তরে যা বলেছিল, তা মোটেই বিশ্বাস করা যায় না।

    তিনকড়ি॥ আপনি বিশ্বাস করেছেন কি না, তা আমি জিজ্ঞেস করিনি। সে কি বলেছিল তাই বলুন। কেন সে ঐ লোকটার কাছ থেকে টাকা নিতে রাজী হয়নি?

    রমা॥ বলছি তো, যা বলেছিল তা মিথ্যে! দেখেছেন কখনও—ঐ টাইপের মেয়েরা টাকা দিতে এলে নিচ্ছে না!

    তিনকড়ি॥ (অত্যন্ত রূঢ়স্বরে) দেখুন, এই টাইপের খথা বলছেন যত, কেস তত খারাপ হচ্ছে! যা জিজ্ঞেস করছি, তাই বলুন। কেন মেয়েটি টাকা নিতে রাজী হয়নি?

    রমা॥ ছেলেটা নাকি একদিন মদের ঘোরে বলেছিল—টাকাটা তার নিজের নয়!

    তিনকড়ি॥ তবে কার?

    রমা॥ চুরির—

    তিনকড়ি॥ তাহলে দেখুন, চুরির টাকা নেবে না বলেই সে আপনাদের কাছে গিয়েছিল—

    রমা॥ কিন্তু বুঝতে পারছেন না, প্রথমে সে এক রকম বললে, তারপর আর এক রকম। প্রথমটা যদি মিথ্যে হতে পারে তো পরেরটাই বা হবে না কেন?

    তিনকড়ি॥ কিন্তু ধরুন ব্যাপারটা সত্যি—ছেলেটা চুরির টাকাই এনে দিত। তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে বুঝতে পারছেন? ছেলেটা যাতে বিপদে না পড়ে, সেই জন্যেই মেয়েটি আপনাদের সমিতিতে গিয়েছিল।

    রমা॥ হয়তো তাই। কিন্তু ওরকম অবান্তর কথাই বা আমি ধরব কেন? আমার কাছে ব্যাপারটা সাজানো বলে মনে হয়েছিল, তাই আমি কমিটিকে দিয়ে না বলিয়েছিলাম—

    তিনকড়ি॥ ও, তাহলে মেয়েটি অ্যাসিড খেয়ে মরেছে বলে আপনার কোন দুঃখ নেই?

    রমা॥ দুঃখ থাকবে না কেন? ওভাবে কেউ মরেছে শুনলে সকলেরই দুঃখ হয়—কিন্তু তার জন্যে আমি কোন দোষে দোষী নই।

    তিনকড়ি॥ দোষটা তাহলে কার?

    রমা॥ প্রথমত তার নিজের—

    শীলা॥ কি করে হল মা? একবার চাকরি খেল বাবা, আর একবার আমি—আর দোষটা হল তার?

    রমা॥ (শীলার খথা কানে না তুলিয়া) আরে—দোষ সেই ছেলেটার! মেয়েটা যা বলেছিল, তা যদি সত্যি হয়, তাহলে ঐ রকম অকর্মা মাতালের শাস্তি হওয়াই উচিত। মেয়েটার আত্মহত্যার জন্যে যদি কাউকে দায়ী করতে হয়, তবে দায়ী করুন তাকে, দায়িত্ব তার।

    তিনকড়ি॥ তাহলে আপনি বলছেন, যদি মেয়েটার কথা সত্যি হয়, যদি ছেলেটা চুরির পয়সা—

    রমা॥ হ্যাঁ, যদি হয়। কিন্তু তা তো নয়! তখন থেকে তো বলছি, কথাটা মিথ্যে—

    তিনকড়ি॥ কিন্তু যদি কথাটা মিথ্যে না হয়—

    রমা॥ (ধৈর্যচ্যুত হইয়া) তাহলে বলছি তো ছেলেটা দায়ী। ছেলেটার জন্যেই মেয়েটার ঐ অবস্থা। আর ঐ অবস্থায় পড়েছিল বলেই সে আমাদের কাছে এসেছিল, নইলে আসত না—

    তিনকড়ি॥ তাহলে যত দায় ঐ ছেলেটির — কি বলেন?

    রমা॥ ধরে তাকে এমন শাস্তি দিন যাতে চিরকাল মনে থাকে—

    সীলা॥ (হঠাৎ শঙ্কিত হইয়া) মা—কি বলছ কি!

    চন্দ্রমাধব॥ শীলা!

    শীলা॥ কিন্তু বাবা, তুমি বুঝতে পারছ না—

    রমা॥ (বাধা দিয়া) দেখ শীলা, চুপ করে থাকতে পারিস তো থাক, নয়তো শুতে যা! (তিনকড়ির দিকে ফিরিয়া) আশ্চর্য, আপনি এখনও এখানে দাঁড়িয়ে রইলেন? এখানে সময় নষ্ট করে লাভটা কি? তারচেয়ে বরং ছেলেটাকে ধরবার চেষ্টা করুন, আর যদি ধরতে পারেন, তো কোর্টে উঠিয়ে দিন। সেটাই আপনার ডিউটি।

    তিনকড়ি॥ আপনার কিচ্ছু ভাবনা নেই মিসেস সেন, আমার ডিউটি আমি ঠিকই করব। (হাতঘড়ি দেখিতে দেখিতে) তাহলে বলছেন—রেখে-ঢেকে কোন লাভ নেই, সোজা কোর্টে উঠিয়ে দেওয়াটাই ঠিক—

    রমা॥ নিশ্চয়, আপনার ডিউটিই তো তাই! তাহলে এখন আসুন— নমস্কার—(হাত তুলিলেন)

    তিনকড়ি॥ কিন্তু আমাকে তো এখন এখানেই থাকতে হবে মিসেস সেন—

    রমা॥ এখানেই থাকতে হবে?—কেন?

    তিনকড়ি॥ ঐ যে আপনি বললেন, আমার ডিউটি—

    শীলা॥ (ভীতস্বরে) মা!

    রমা॥ (এতক্ষণে বুঝিতে পারিয়া) কিন্তু—মানে, না কখনো না! এ কি বলছেন আপনি—(চোখ তুলিতে স্বামীর সহিত তাঁহার দৃষ্টি-বিনিময় হইল। উভয়েরই শঙ্কিত দৃষ্টি।)

    চন্দ্রমাধব॥ (ভীতস্বরে) কিন্তু তিনকড়িবাবু—মানে আপনি বলতে চান—মানে—তাপস—

    তিনকড়ি॥ ধরুন যদি তাপসবাবুই হন, তাহলে করতে যে কি হবে তা তো উনি বলেই দিয়েছেন—

    রমা॥ (উত্তেজিত স্বরে) না, কখনো না, — তাপস হতেই পারে না— আপনি মিথ্যে কথা বলেছেন—বুঝলেন, আমি আপনার কথা বিশ্বাস করি না—

    শীলা॥ তখন যদি আমার কথা শুনতে মা, কথা যদি না বাড়াতে…

    (তিনকড়িবাবু হাত তুলিয়া সকলকে চুপ করিতে বলিলেন। সদর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শোনা গেল। সকলে ঘরের দরজার দিকে চাহিলেন। দেখা গেল তাপস প্রবেশ করিতেছে, তাহার মুখ-চোখ শুকাইয়া গিয়াছে। ঘরে প্রবেশ করিয়া দেখিল সকলের অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি তাহার মুখের উপর নিবদ্ধ। পর্দাও এই সঙ্গে নামিয়া আসিল।)

  • তৃতীয় অঙ্ক

    তৃতীয় অঙ্ক

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায়

    [book]

    তৃতীয় অঙ্ক

    (ঐ একই ঘর। দ্বিতীয় অঙ্কের যেখানে শেষ, তৃতীয় অঙ্কের সেখানে আরম্ভ। তাপসের দিকে সকলে তাকাইয়া আছেন)

    তাপস॥ আপনি বোধহয় এতক্ষণে সবই জানতে পেরেছেন—না?

    তিনকড়ি॥ শুধু আমি নয় তাপসবাবু—এঁরা সবাই— (তাপস দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া অগ্রসর হইয়া আসিল।)

    রমা॥ তাপস, কি বলছিস তুই! এখানে কি কথা হয়েছে, তা তুই জানিস?

    শীলা॥ না জেনেছে, ভালই হয়েছে মা—

    তাপস॥ কেন?

    শীলা॥ এইমাত্র মা তিনকড়িবাবুকে বলছিল, মেয়েটির ঐ অবস্থার জন্যে যে দায়ী, তাকে সোজা নিয়ে গিয়ে আদালতে তুলতে—

    তাপস॥ মা!

    রমা॥ আমি কি করে জানব বল? আমি স্বপ্নেও ভাবিনি তুই এ-কাজ করতে পারিস তাপস। তাছাড়া শুনলাম—লোকটা মাতাল—

    শীলা॥ ছোড়দাও তো মদ খায় মা, আমি তো তোমায় একটু আগেই বললাম।

    তাপস॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) কেন বললি তুই?

    শীলা॥ তুই মিথ্যে রাগ করছিস ছোড়দা। এতদিন কি কিছু বলেছি? আজ দেখলাম—আমি বলি আর না বলি, জানতে সকলে পারবেই! তাই মাকে আগে থাকতে জানিয়ে দিলাম! আর তুই কি ভাবছিস আমি পার পেয়েছি,—আমিও পার পাইনি।

    রমা॥ শীলা, তোর ভাবটা কি বলতো—

    চন্দ্রমাধব॥ কি জানি! আমি রইলাম, তোর মা রইল—তাপস তোর ছোড়দা—

    তিনকড়ি॥ (মিসেস সেনকে) দেখুন, আপনাদের এই ঘরোয়া ঝগড়াটা না হয় পরেই সারবেন! এখন দয়া করে একটু চুপ করুন। (তাপসকে দেখাইয়া দিয়া) ওঁর কি বলবার আছে শুনতে দিন। (পকেট হইতে সিগারেট কেস ও দেশলাই বাহির করিয়া তাপসের দিকে বাড়াইয়া দিলেন) নিন, ধরান—

    (তাপস হাত বাড়াইয়াছিল, কিন্তু পিতার মুখের দিতে তাকাইয়া ইতস্তত করিয়া হাত সরাইয়া লইল।)

    চন্দ্রমাধব॥ (ধমকের সুরে) তাপস, তেরা কি কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই! আমি রয়েছি, তোর মা রয়েছেন—

    তিনকড়ি॥ (এইবার তাঁহার ধৈর্যচ্যুতি হইয়াছে) দেখুন মশাই—সিগারেট তো ছোট কথা, তাপসবাবু মদ খান—তিনি একটি পাকা মাতাল। আপনার সামনে একটা সিগারেট খেলে মহাভারতটা এমন কিছু অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। দেখতে পাচ্ছেন, ওঁর কপালসুদ্ধ ঘেমে উঠেছে, সিগারেট এখন ওঁকে অনেক হেল্প করবে। (তাপস ইতস্তত করিতেছে দেখিয়া) নিন নিন—আমি বলছি, আপনি ধরান না—(জোরে ধমক দিয়া উঠিলেন) — আবার বসে থাকে! ধরান—

    (তাপস একবার তিনকড়িবাবুর মুখের দিকে তাকাইয়া সত্যিই কেস হইতে একটি সিগারেট লইয়া ধরাইল।)

    তাপস॥ (তিনকড়িবাবু সিগারেট কেস পকেটে পুরিলেন) আপনি?

    তিনকড়ি॥ আমি অন ডিউটি স্মোক করি না।

    তাপস॥ (ধোঁয়া ছাড়িয়া) দেখুন, একটু আগে আপনার অনেক কথা বুঝতে পারিনি, কিন্তু এখন বেশ পরিষ্কার মনে হচ্ছে—

    তিনকড়ি॥ (রূঢ়স্বরে) আগের কথা আগে হয়ে গেছে, তাপসবাবু, এখন আপনার কথা বলুন। মেয়েটির সঙ্গে আপনার প্রথম দেখা হয়েছিল কবে?

    তাপস॥ গেল বছর নভেম্বর মাসে—

    তিনকড়ি॥ কোথায়? (তাপস নিরুত্তর) শুনতে পাচ্ছেন না—কোথায় দেখা হয়েছিল?

    তাপস॥ (সিগারেটটা ফেলিয়া দিয়া, একবার চন্দ্রমাধব আর মিসেস সেনের মুখের দিকে তাকাইল। এরপর তিনকড়িবাবুর মুখের দিকে চাহিয়া মরিয়া হইয়া বলিয়া ফেলিল) চিৎপুরে একটা মদের দোকানের পাশে—

    তিনকড়ি॥ তারপর? থামলেন কেন? বলে যান—

    তাপস॥ দোকান থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সিতে উঠেছি, এমন সময় দেখি একটি মেয়ে! নেমে গিয়ে কথাবার্তা কইলাম, বললাল ট্যাক্সিতে উঠে আসতে। রাজী হল না—

    তিনকড়ি॥ রাত তখন ক’টা?

    তাপস॥ ঠিক মনে নেই—তবে দশটা বেজে গিয়েছিল।

    তিনকড়ি॥ মেয়েটি কি বললে?

    তাপস॥ খুব ভাল মনে নেই। কি যেন বললে—তার থাকবার জায়গা নেই না কি—আগে যে ম্যাসাজ ক্লিনিকে কাজ করত, সেখানকার একটি মেয়ে নাকি তাকে ওখানে অপেক্ষা করতে বলেছে—

    তিনকড়ি॥ ও, তারপর সে বুঝি আপনার গাড়িতে উঠে এল?

    তাপস॥ প্রথমে রাজী হয়নি, তারপর পুলিশের ভয় দেখাতে উঠে এল—

    তিনকড়ি॥ তাহলে, মেয়েটি যে ও-রাস্তায় নতুন—তা বেশ বুঝতে পেরেছিলেন?

    তাপস॥ হ্যাঁ, কি জানি কেন দেখেই মনে হয়েছিল—একেবারে সাধারণ রাস্তায়-দাঁড়ানো মেয়ে এ নয়।

    তিনকড়ি॥ কোথায় নিয়ে তুললেন তাকে?

    তাপস॥ কাছাকাছি—আমারই এক চেনা বাড়িতে, দু’খানা ঘর খালি ছিল, তারই একটাতে—

    তিনকড়ি॥ তারপর, তখন বাড়ি ফিরে এলেন? (তাপসকে নিরুত্তর দেখিয়া উত্তর দিচ্ছেন না যে, বলুন তখনি কি বাড়ি ফিরে এলেন?

    তাপস॥ না।

    তিনকড়ি॥ তবে কখন?

    তাপস॥ (মুখ নীচু করিয়া) প্রায় ঘন্টা দুয়েক বাদে। (ব্যাকুল কণ্ঠস্বরে) তিনকড়িবাবু, মেয়েটির হয়ে আপনি আমাকে ক্ষমা করে যান—আমি অতি হতচ্ছাড়া!

    তিনকড়ি॥ (এতটুকু বিচলিত না হইয়া) কেন, আপনার মতো লোকেরা তো এই রকমই করে থাকে—

    তাপস॥ না না, আপনি বুঝতে পারছেন না—আমি লম্পট, আমি বদমায়েশ—কিন্তু সেদিনের মতো জঘন্য কাজ আমি কোনদিন করিনি! জানেন, সে রাতে তার ঘরে ঢুকে—কি করেছি না করেছি, কিচ্ছু আমার মনে ছিল না। তখন আমি কাণ্ডজ্ঞানহীন, চূড়ান্ত মাতাল—(দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া) ওঃ how stupid it all is!

    রমা॥ (শিহরিয়া উঠিয়া) তাপস—এ তুই কি করেছিস—

    চন্দ্রমাধব॥ (শীলাকে দেখাইয়া দিয়া) শুনছ তোমরা একটু ভেতরে যাও তো—

    শীলা॥ কিন্তু বাবা—

    চন্দ্রমাধব (জোরে ধমক দিয়া উঠিলেন) শীলা, যা বলছি তাইশোন, — তোর মাকে নিয়ে ভেতরে যা—(চন্দ্রমাধব দরজা খুলিয়া ধরিলেন। শীলা মাকে লইয়া বাহির হইয়া গেল।)

    তিনকড়ি॥ তারপর, আবার কবে দেখা হল আপনাদের?

    তাপস॥ প্রায় দিন চোদ্দ বাদে—

    তিনকড়ি॥ আপনি কি ওঁর কাছেই যাবার জন্যে বেরিয়েছিলেন?

    তাপস॥ না, আমার ভাল মনেই ছিল না। ওখান দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল। দেখলাম সেই ঘরটাতেই আছে—আমি যা টাকা দিয়ে এসেছিলাম, তাতেই চলছে—

    তিনকড়ি॥ সেদিনও বোধহয় খুব প্রকৃতিস্থ ছিলেন না?

    তাপস॥ সেদিন তখনও মদ খাইনি—

    তিনকড়ি॥ কি কথাবার্তা হল সেদিন?

    তাপস॥ প্রথমে সে আরম্ভ করল—তার নিজের কথা। তার বাপ-মা নেই—আগে চাকরি করত, তারপর চাকরি যায়। শেষে ম্যাসাজ ক্লিনিক, তারপর রাস্তায়—

    তিনকড়ি॥ কত রাত অবধি ছিলেন সেদিন?

    তাপস॥ ঠিক মনে নেই—তবে ফিরতে বারোটা পেরিয়ে গিয়েছিল—

    তিনকড়ি॥ আচ্ছা আপনি যে এত রাত করে বাড়ি ফেরেন, বাড়িতে কেউ কিছু সন্দেহ করে না?

    তাপস॥ না, বাড়িতে জানে আমি ক্লাবে থাকি —

    তিনকড়ি॥ (চন্দ্রমাধবের দিকে দেখিয়া) ও, তা বেশ!—(তাপসের দিকে ফিরিয়া) হ্যাঁ তারপর—সেদিন কি মনে হল, মেয়েটিকে আপনি ভালবেসে ফেলেছেন?

    তাপস॥ দেখুন—মানে—ভালো তাকে আমি সেদিনও বাসিনি—তার পরেও না।

    তিনকড়ি॥ তবে?

    তাপস॥ মানে — কি বলব —মানে — কি রকম একাট চোখে লেগে গিয়েছিল —

    তিনকড়ি॥ ও, যেই না চোখে লেগে যাওয়া, অমনি তার ঘরে রাত কাটাতে আরম্ভ করলেন, কেমন?

    তাপস॥ (ক্ষুব্ধ স্বরে) হ্যাঁ করলাম—দেখে বুঝতে পারছেন না আমারও বিয়ের বয়স হয়েছে—

    তিনকড়ি॥ ও, তাহলে আপনাদের বিয়ের বয়স হলেই একটি করে মেয়েকে কার্বলিক অ্যাসিড খেতে হবে—কেমন?

    তাপস॥ (লজ্জিত হইয়া) না—মানে—

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু বিয়ে যদি করবার ইচ্ছেই হয়েছিল, তো আমাকে বলিসনি কেন হতভাগা?

    তাপস॥ (ক্ষুব্ধস্বরে) তোমাকে কি বলল বাবা, তুমি এমনিতেই তো গাধা-বাঁদর ছাড়া কথা বল না। বিয়ের কথা বললে তো বাড়ি থেকে তাড়িয়েই দিতে—

    চন্দ্রমাধব॥ (গর্জন করিয়া) তুই বলে দেখিসনি কেন?

    তিনকড়ি॥ (তাপস কি বলিতে যাইতেছিল, বাধা দিয়া চন্দ্রমাধবকে) থাক, ছেলের পাকা-দেখাটা না হয় আমি যাওয়ার পরই সেটল করে নেবেন। (তাপসকে) হ্যাঁ, তারপর থেকে রোজই যেতে আরম্ভ করলেন, কেমন?

    তাপস॥ হ্যাঁ।

    তিনকড়ি॥ তারপর, আসল খবরটা কবে জানতে পারলেন?

    তাপস॥ তখন বোধহয় মার্চের লাস্ট উইক। একদিন গিয়ে শুনলাম— মানে—(পিতার দিকে চাহিয়া থামিয়া গেল)

    তিনকড়ি॥ যে, you are going to be a father, এই তো?

    তাপস॥ (মুখ নীচু করিয়া) হ্যাঁ।

    তিনকড়ি॥ তার মনের অবস্থাটা কি রকম দেখলেন?

    তাপস॥ দেখলাম খুব ভাবনায় পড়েছে! আমার ভাবনাটাও অবিশ্যি কম হয়নি—

    তিনকড়ি॥ সে আপনাকে বিয়ের কথা কিছু বলেছিল?

    তাপস॥ না। তাকে বিয়ে করার ইচ্ছে আমার নিজেরও ছিল না— তবে বললে কি করতাম বলা যায় না। সে কিন্তু একবারও বলেনি।

    তিনকড়ি॥ আপনি একবারও বলেন নি?

    তাপস॥ না।

    তিনকড়ি॥ আচ্ছা, কেন সে বলেনি, বলতে পারেন?

    তাপস॥ না—ঠিক বলতে পারি না। তবে তার কথায়-বার্তায় মনে হত—সে যেন আমাকে কি রকম ছেলেমানুষ বলে মনে করে—

    তিনকড়ি॥ তারপর, আপনি কি করবেন বলে ঠিক করলেন?

    তাপস॥ আমি আর কি করতে পারি বলুন? তবে দেখলাম, তার চাকরি-বাকরি নেই, আর চেষ্টা করে বোধহয় কিছু পাবেও না— তাই মাঝে মাঝে কিছু টাকা দিয়ে আসতাম। শেষ পর্যন্ত তাও আর সে নিতে রাজী হল না।

    তিনকড়ি॥ সবশুদ্ধ কত টাকা দিয়েছিলেন তাকে?

    তাপস॥ একবার দেড়’শ, আর একবার দু’শ—সবশুদ্ধ সাড়ে-তিন’শ। এর পরেও একবার দু’শ টাকা নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু সে নিতে রাজী হয়নি।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু ওই এক-একবারে দেড়’শ-দু’শ করে টাকা পেতিস কোত্থেকে তুই?

    তিনকড়ি॥ (তাপসকে নিরুত্তর দেখিয়া) বলুন তাপসবাবু, কোত্থেকে পেতেন?

    তাপস॥ (মুখ নীচু করিয়া) অফিস থেকে…

    চন্দ্রমাধব॥ অফিস থেকে? মানে—আমার অফিস থেকে?

    তাপস॥ হ্যাঁ।

    চন্দ্রমাধব॥ তার মানে—টাকাটা তুই চুরি করতিস?

    তাপস॥ না, মানে ঠিক চুরি নয়—

    চন্দ্রমাধব॥ তার মানে? চুরি ছাড়া আর কি বলব ওকে?

    (শীলা ও মিসেস সেনের প্রবেশ)

    শীলা॥ আমার কিন্তু কোন দোষ নেই বাবা—

    রমা॥ (ব্যাকুল স্বরে) সত্যি, আমি আর থাকতে পারলাম না—তার পর কি হল গো!

    চন্দ্রমাধব॥ কি হয়েছে শুনবে? মেয়েটার ঐ অবস্থার জন্যে দায়ী তোমার ঐ গুণধর ছেলে! আবার এলেম কত? উনি আবার অফিস থেকে টাকা চুরি করে তার হাতে দিয়ে আসতেন!

    রমা॥ তাপস—তুই চুরি করতিস!

    তাপস॥ টাকা আমি পরে শোধ করে দিতাম—

    চন্দ্রমাধব॥ ও গল্প আমরা অনেক শুনেছি! কোত্থেকে শোধ করতে শুনি?

    তাপস॥ সে আমি যেখান থেকে হোক শোধ করে দিতাম।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু এই যে খেপে খেপে তুই টাকা নিতিস—কেউ জানতে পারেনি?

    তাপস॥ না। এগুলো ছোটখাট অ্যাকাউন্ট—আমি নিজেই কালেক্ট করে অফিসিয়াল রিসিট দিয়ে দিতাম।

    চন্দ্রমাধব॥ বেশ করতে! এখন দয়া করে ওগুলোর একটা লিস্ট আমাকে দিও, আমায় দেখতে হবে তো কোথায় কি করে বসেছ। ওঃ—এত কাণ্ড করার আগে তুই আমার কাছে আসিসনি কেন হতভাগা!

    তাপস॥ কি জানি বাবা—অনেকবার অনেক মুশকিলে পড়েছি, কিন্তু কখনো মনে হয়নি তোমার কাছে যাই!

    চন্দ্রমাধব॥ তা মনে হবে কেন? এখন যে রাস্তার লোক এসে দাঁড়িয়েছে তোমার জন্যে? তোমার আসল মুশকিলটা কোথায় জান? আদরে আদরে একটি বাঁদর তৈরি হয়েছ!

    তিনকড়ি॥ (রূঢ়স্বরে) দেখুন, আমিও বড়ো মুশকিলে পড়েছি—আমার হাতে আর সময় বেশি নেই। কে কতটা বাঁদর তৈরি হয়েছে সে হিসেবটা না হয় আমি চলে গেলেই করবেন! আমার আর একটাই প্রশ্ন আছে তাপসবাবু—মেয়েটি কি জানতে পেরেছিল, আপনি যে টাকাটা দিচ্ছেন, সেটা আপনার নিজের নয়—চুরির?

    তাপস॥ হ্যাঁ, কি জানি কেন, তার মনে হয়েছিল—টাকাটা আমার নিজের নয়। ওঃ—আজ আমার নিজেকে এত ছোট বলে মনে হচ্ছে! যেদিন জানতে পারল — টাকাটা তো নিলই না—উলটে আমাকে পর্যন্ত যেতে বারণ করে দিল—পরদিন গিয়ে আর তার কোন খোঁজই পেলাম না। কিন্তু আপনি—আপনি কি করে জানলেন? সে আপনাকে বলেছে?

    তিনকড়ি॥ না তাপসবাবু।—আমার সঙ্গে যখন তার দেখা হয়েছে তখন সে জ্যান্ত নয়, লাস।

    শীলা॥ মেয়েটি মার কাছে এসেছিল ছোড়দা—

    রমা॥ শীলা!

    শীলা॥ চেপে রাখার কথা ওটা নয় মা। ছোড়দারও জানা দরকার।

    তাপস॥ সে তোমার কাছে এসেছিল মা?— তোমার কাছে? এখানে? কিন্তু এখানকার ঠিকানা তো সে জানত না! (মিসেস সেনকে নিরুত্তর দেখিয়া) চুপ করে ওভাবে তাকিয়ে আছে কেন মা? বল—যাহোক কিছু বল—কী হয়েছিল কি—(চীৎকার করিয়া) মা!

    তিনকড়ি॥ আমি আপনাকে বলছি তাপসবাবু। মেয়েটি নারী-স,হায়ক সমিতির কাছে গিয়েছিল সাহায্য চাইতে। আপনার মা ঐ সমিতির প্রেসিডেন্ট। উনি কমিটিকে দিয়ে না-বলিয়ে দিয়েছিলেন।

    তাপস॥ (স্রোধে, ক্ষোভে, লজ্জায় ভাঙিয়া পড়িয়া) তাহলে তুমি—তুমিই তাকে মেরেছ মা! আমাকে আড়াল করবার জন্যে সে তোমাদের সমিতির কাছে গিয়েছিল—তুমি তাকে তাড়িয়ে দিলে মা! তুমি নিজে সন্তানের মা—একবার ভাবলে না—সেও সন্তানের মা হতে চলেছে, ছিঃ মা ছিঃ—

    রমা॥ (ব্যথিত স্বরে) আমি জানতাম না তাপস, সে তোর-মানে আমি বুঝতে পারিনি—ওরে, সত্যি আমি বুঝিনি!

    তাপস॥ কোন জিনিসটা কবে তুমি বুঝতে পেরেছ বলতে পার? কি করে বুঝবে? বুঝতে চেয়েছ কোনদিন? (সমস্ত ভুলিয়া গিয়া রমাদেবীর দিকে অগ্রসর হইয়া আসিতে আসিতে) কি বলব তোমাকে—

    শীলা॥ (ভীতস্বরে) ছোড়দা—ছোড়দা—

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধস্বরে তাপসের সম্মুখে গিয়া) গাধার মত চেঁচাতে তোর লজ্জা করছে না হতচ্ছাড়া? আর একটা কথা তোর মুখ দিয়ে বার হোক! দেখ—তোকে আমি কি করি—

    তিনকড়ি॥ (সকলের কণ্ঠস্বরকে চাপা দিয়া) চুপ, চুপ সকলে। কারো মুখ থেকে আর একটাও কথা আমি শুনতে চাই না। (তিনকড়িবাবুর বলার ভঙ্গীতে সকলে চুপ করিয়া তাঁহার মুখের দিকে তাকাইল) হ্যাঁ, শুনুন—আমার এনকোয়ারি শেষ হয়ে গেছে, আমি এখন যাচ্ছি। আজ একটি মেয়ে কার্বলিক অ্যাসিড খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। আপনারা কেউ তাকে সাক্ষাৎভাবে খুন করেন নি ঠিক কথা। কিন্তু আপনারা তাকে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দিয়েছেন। (প্রত্যেকের মুখের দিকে দেখিতে দেখিতে) আপনি মিসেস সেন—যখন তার সাহায্যের সবচেয়ে বেশি দরকার, তখন সে গিয়েছিল আপনাদের কমিটির কাছে। আপনি যে শুধু নিজে না বলেছিলেন তাই নয়, কমিটিও যাতে না বলে সে ব্যবস্থাও করেছিলেন। আর তাপসবাবু—যতদিন বাঁচবেন, ততদিন মনে রাখবেন—কাণ্ডজ্ঞানহীন মাতাল অবস্থায়, নেশার ঝোঁকে, আপনি একটি মেয়ের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে আরম্ভ করেছিলেন। নেশায় মজা পাবেন বলে তাকে ট্যাক্সিতে তুলেছিলেন। আপনার কাছে সে ছিল একটা ভালো-দেখতে মেয়েমানুষ—যাকে নেশার ঘোরে পাশে শোয়ানো যায়, কিন্তু বিয়ে করা যায় না। আর আপনি শীলা দেবী—

    শীলা॥ (তিক্তস্বরে) আমি জানি তিনকড়িবাবু—আমার থেকেই তো আরম্ভ—

    তিনকড়ি॥ না না, আপনি দায়ী, কিন্তু আরম্ভ আপনি করেননি। (হঠাৎ চন্দ্রমাধববাবুর দিকে ফিরিয়া, অত্যন্ত রূঢ়স্বরে) আরম্ভ করেছিলেন আপনি! মাসে মাত্র পাঁচটা টাকা বেশি চেয়েছিল, আপনি তার সমস্ত জীবনটা দাম হিসেবে ধরে নিলেন। কিন্তু, পার আপনিওপান নি—আপনার কাছ থেকে অনেক বেশি দাম সে আদায় করে নেবে!

    চন্দ্রমাধব॥ (কাতর স্বরে) তিনকড়িবাবু, টাকা আমি এক্ষুনি আপনাকে দিচ্ছি—বলুন কত টাকা লাগবে?

    তিনকড়ি॥ কিন্তু দেবার যখন দরকার ছিল মিস্টার সেন, তখন পাঁচটা টাকাও দিতে পারেননি! (নোট-বুক ইত্যাদি বন্ধ করিলেন। দেখিয়া মনে হইল, এনকোয়ারি তাঁহার শেষ হইয়াছে। নোটবুক, পেনসিল ইত্যাদি যথাস্থানে রাখিয়া, সকলের মুখের দিকে তাকাইলেন। তাঁহার মুখে ফুটিয়া উঠিয়াছে নিষ্ঠুর হৃদয়হীন এক হাসির আভাস। সকলের মুখের দিকে দেখিতে দেখিতে) না, সন্ধ্যাকে আপনারা কোনদিনই ভুলতে পারবেননা। আপনাদের ওই মিস্টার বোসও নয়! সন্ধ্যাকে—এক দেখলাম উনিই বা একুট ভালবেসেছিলেন—কিন্তু উঁহু, ওঁর পক্ষেও ভোলা সম্ভব নয়। ওয়েল মিস্টার সেন—আজ আর সন্ধ্যা চক্রবর্তী নেই—আপারা আজ আর তার কিছুই করতে পারবেন না—না ভাল —না মন্দ—

    শীলা॥ (অশ্রুরুদ্ধকণ্ঠে) সেটাই তো সবচেয়ে বড় দুঃখ তিনকড়িবাবু—

    তিনকড়ি॥ তার চেয়েও বড় দুঃখ আছে মিস সেন। একজন সন্ধ্যা নেই কিন্তু এখনও লাখে লাখে সন্ধ্যারা রয়েছে। তাদেরও আশা আছে, ভরসা আছে, ভাবনা আছে! আমার আপনার মত তাদেরও মন আছে, আঘাত সেখানে গিয়েও পৌঁছয়। একটু ভেবে দেখবেন, দেখবেন কাউকে আলাদা করতে পারছেন না, দেখবেন আপনার সুখ তাদের ওপর, তাদের সুখ আপনাদের ওপর। মনে রাখবেন—সবাই মিলে আমরা এক, কেউ আমরা আলাদা নই। যার যেকানে যা কিছু হচ্ছে সব দায় আমার, আপনার, সকলের—কেউ বাদ নেই এর থেকে! আজ হয়তো ভাবছেন, আমি একবার গেলে হয়! তবে সেদিন খুব বেশি দূর নয় যেদিন প্রত্যেকটা মানুষকে আমার এই কথাগুলো ভাবতে হবে। তখন কিন্তু হাজার মাথা খুঁড়েও আপনারা কোন পথ পাবেন না, আপনাদের চারপাশে তখন আগুন, চারধার আপনাদের রক্তে লাল! আচ্ছা—চলি আজ, গুড নাইট—(সাব ইন্সপেক্টর সোজা বাহির হইয়া গেলেন। সকলে তাঁহার গমনপথের দিকে হতচকিত ও বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাইয়া রহিলেন। দেখা গেল শীলা নিঃশব্দে কাঁদিতেছে। মিসেস সেনের আর দাঁড়াইয়া থাকিবার ক্ষমতা নাই—তিনি চেয়ারে বসিয়া পড়িয়াছেন। তাপস গালে হাত দিয়া আকাশ-পাতাল ভাবিতেছে। একমাত্র চন্দ্রমাধবেরই স্বাভাবিক অবস্থা, তিনকড়িবাবু বাহির হইয়া গেলে, ঘরের দরজার নিকট দাঁড়াইয়া তিনি সদর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনিলেন। তারপর সন্তর্পণে দরজা ভেজাইয়া দিয়া তাপসের দিকে অগ্রসর হইয়া আসিলেন।)

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) তুই হলি যত নষ্টের গোড়া—

    তাপস॥ হ্যাঁ, এখন তো আমিই—

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) না, তুমি নও, রাস্তার লোক! বুঝতে পারছিস, কি করেছিস? সমস্ত ব্যাপারটা কাগজে বেরুল বলে! চারধারে ঢি-ঢিক্কার, একটা পাবলিক স্ক্যান্ডাল, ছিঃ ছিঃ!

    তাপস॥ স্ক্যাণ্ডালে আমার আর কিছু এসে যায় না বাবা!

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) তোমার যে কিছু এসে যায় না, তা আমিও জানি! কিন্তু আমার যে এসে যাচ্ছে। ইলেকশনটা যে পণ্ড হয়ে যাবে রে হতচ্ছাড়া—অপোন্টে পার্টি ছড়া বার করবে, ছড়া।

    তাপস॥ (চন্দ্রমাধবের দিকে আঙুল দেখাইয়া অপ্রকৃতিস্থের ন্যায় হো হো করিয়া হাসিতে হাসিতে) ইলেকশন! এখনো ইলেকশন বাবা! এখন তুমি ইলেকটেড হলে আর না হলে, কি এসে যায় তাতে?

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) কি এসে যায় তাতে! তোর মত রাস্কেলের কিসে এসে যায় বলতে পারিস? মদ খেয়ে মেয়েছেলে নিয়ে বেলেল্লাপনা করতে তোর লজ্জা করে না? কাল থেকে তুই অফিসের বিনা মাইনের চাকর! আমি তোর অ্যালাওয়েন্স বন্ধ করে দিলাম। টু-দি-পাই—আমি এ টাকা আদায় করে নেব! তারপর আর একবার যদি শুনি এই সব কাণ্ড-কারখানা, তোমায় চাবকে যদি না বাড়ি থেকে বার করে দিই তো আমার নাম নেই!

    রমা॥ ছিঃ তাপস—ভাবতেও আমার লজ্জা করছে—

    তাপস॥ আমি তো লজ্জার কাজ করেইছি। কিন্তু তোমরা? তোমরা কি কিছুই করনি?

    চন্দ্রমাধব॥ আমরা যা করেছি তার যথেষ্ট গ্রাউণ্ড আছে রাস্কেল! ব্যাপারটা আনফরচুনেট টার্ন নিয়েছে তাই, নইলে—

    শীলা॥ বাঃ, চমৎকার বাবা—

    চন্দ্রমাধব॥ তার মানে?

    শীলা॥ মানে, আবার তোমরা সেই গোড়া থেকে আরম্ভ করেছ! — যেন কিছুই হয়নি—

    চন্দ্রমাধব॥ কে বলেছে কিচ্ছু হয়িন! এতেও যদি স্ক্যান্ডাল না হয়, তাহলে তো জানব খুব লাকি! ওঃ কেমন ছিলাম সন্ধ্যেবেলা— (তাপসকে দেখাইয়া) আর এই হতচ্ছাড়াটার জন্যে—

    তাপস॥ (উত্তেজনা ও ব্যঙ্গভরা স্বরে) সত্যি, সন্ধ্যেবেলা তুমি বেশ ছিলে বাবা! কি রকম সব অ্যাডভাইস দিচ্ছিলে! সেই যে, first you yoruself, second you yourself, and last you yourself, কারো দায়িত্ব আমাদের নেই, সবায়ের কথা যারা ভাবে তাদের মাথা খারাপ। আর ঠিক সেই সময় এলেন ঐ মাথা খারাপদেরই একজন (পাগলের ন্যায় হাসিতে হাসিতে) সাব-ইন্সপেক্টর তিনকড়ি হালদার! কই বাবা, তিনকড়িবাবুকে তো কিছু বললে না, তোমার থিয়োরি-টিয়োরির কথা?

    শীলা॥ আচ্ছা ছোড়দা, ঠিক ঐ সময় তিনকড়িবাবু এসেছিলেন, না?

    তাপস॥ হ্যাঁ, কেন—কি হয়েছে?

    শীলা॥ (ধীরে ধীরে) ব্যাপারটা কিন্তু বড় অদ্ভুত—

    রমা॥ (উত্তেজিত স্বরে) আমারও কিন্তু কি রকম যেন মনে হচ্ছে—

    শীলা॥ (চিন্তা করিতে করিতে) ভদ্রলোক সত্যিই সাব-ইন্সপেক্টর তো?

    চন্দ্রমাধব॥ (উত্তেজিত হইয়া) ঠিক বলেছিস, এটা তো মনে হয়নি!

    শীলা॥ কিন্তু তাতেও কিছু আর এসে যায় না বাবা—

    চন্দ্রমাধব॥ কি পাগলের মত বকছিস, একশবার এসে যায়!

    শীলা॥ কি জানি বাবা, তোমার হয়তো যায়, আমার যাচ্ছে না—

    রমা॥ কি ছেলেমানুষের মত কথা বলছিস শীলা—

    শীলা॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) ছেলেমানুষের মত আমি কথা বলছি, না তোমরা বলছ মা! যা সত্যি, তাকে কি ওভাবে আড়াল দেওয়া যায়? — যায় না।

    চন্দ্রমাধব॥ মুখের ওপর কথা বলিসনি শীলা! চুপ করে থাকতে পারিস থাক নইলে শুতে যা—

    শীলা॥ আমি এক্ষুনি যাচ্ছি বাবা! কিন্তু একটা কথা। ব্যাপারটা যদি সত্যি হয়, তাহলে এর জন্যে দায়ী আমরাই! আমি ধরলাম, ভদ্রলোক সত্যিই সাব-ইন্সপেক্টর নন—কিন্তু দায়িত্বটা আমরা অস্বীকার করি কি করে? আর ব্যাপারটা যে সত্যি তা তুমিও জান, আমিও জানি! প্রথম তাকে চাকরি থেকে তাড়াও তুমি, দ্বিতীয় চাকরিটা যায় আমার জন্যে। অমিয় নিজের খেয়াল-খুশি মত তাকে নিয়ে এল আর শখ যেই মিটে গেল অমনি দূর করে তাড়িয়ে দিলে। তারপর ছোড়দা আর শেষে মা! এরপর ভদ্রলোক সাব-ইন্সপেক্টর হলেন আর না হলেন।

    তাপস॥ কিন্তু ভদ্রলোক কি সত্যিই সাব-ইন্সপেক্টর—!

    শীলা॥ কিন্তু ছোড়দা, ভদ্রলোক যদি সাব-ইন্সপেক্টর নাই হন! সে তো আমারও মনে হচ্ছিল—ভদ্রলোকের ভাব-গতিটা ঠিক সাধারণ সাব-ইন্সপেক্টরের মত নয়—কিন্তু—

    চন্দ্রমাধব॥ (বাধা দিয়া) ঠিক কথা—আমরাও তাই মনে হচ্ছিল। (রমাকে) হ্যাঁগো, তোমার মনে হয়নি?

    রমা॥ কথাবার্তা তো মোটেই সাব-ইন্সপেক্টরের মত নয়, যেন লাটসাহেব।

    চন্দ্রমাধব॥ সত্যি সাব-ইন্সপেক্টর হলে কি আমাকে অমন করে ধমকাতে পারত! আমি কি একটা যা-তা লোক নাকি, ঘাড় ধরে বার করে দিতাম না! তার ওপর পদ্মপুকুর থানার তো হতেই পারে না, রমেশ সেখানে ও-সি, ব্যাটারা আপনি-আজ্ঞে ছাড়া কথাই বলে না—

    তাপস॥ কিন্তু বাবা, উনি সাব-ইন্সপেক্টর না হলেও কিছু এসে যাচ্ছে না।

    চন্দ্রমাধব॥ তোমার তো যথেষ্ট এসে যেত! রাস্কেল, জানিস তোকেও কোর্ট পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারত, তখন?

    শীলা॥ (কি যেন চিন্তা করিতে করিতে) কিন্তু একটা মজা দেখেছ বাবা, আমরা তিনকড়িবাবুকে কতটুকুই বা বলেছি—প্রায় সব ব্যাপারটাই তাঁর আগে থাকতে জানা—

    চন্দ্রমাধব॥ সেটা কিছু আশ্চর্য নয়। এধার-ওধার থেকে দু-একটা খবরা-খবর পেয়েছে। তারপর বাকিটা আন্দাজ! আমি তো কিছুতেই ভেবে পেলাম না, কেন তোরা সব গড় গড় করে বলতে আরম্ভ করলি!

    শীলা॥ নিজে থেকে কেউই আমরা কিছু বলিনি বাবা, উনি আমাদের বলতে বাধ্য করেছিলেন।

    রমা॥ না, কক্ষনো না! আমি এমন খুব বেশি একটা কিছু বলিনি! আমি তো মুখের ওপর বলে দিলাম, যা উচিত বলে মন হয়েছে, তাই করেছি!

    চন্দ্রমাধব॥ তবে হ্যাঁ, ধাপ্পা খানিকটা দিয়েছিল—

    রমা॥ না—কক্ষণো না, তুমি বললেই শুনব আমি—

    চন্দ্রমাধব॥ না না, তোমাকে আমাকে নয়—এদের। আরো, সে তো গোড়া থেকেই খারাপ চোখে দেখেছে আমাদের। সাব-ইন্সপেক্টর না কচু! পুলিশের লোক হলে কখনো ওরকম কম্যুনিস্টিক কথাবার্তা হয়! আর এরা কি ভীতু দেখ, কোথায় চোখ পাকিয়ে দাঁড়াবি, তা নয় ‘আমি তো আমি তো’ করেই গেল।

    তাপস॥ সেটা তো তুমি কিছু কম করলে না বাবা?

    চন্দ্রমাধব॥ কি করি বল? তোমার মত গুণধর ছেলে—কি কাণ্ডটি করে বসেছিলে! ওখানে আমি চটাচটি করলে তো হিতে-বিপরীত হত! এখন তাই মনে হচ্ছে। লোকটাকে বাইরে থেকে বিদেয় করে দিলেই হত!

    শীলা॥ কিন্তু তা হত না বাবা, ভেতরে উনি আসতেনই।

    রমা॥ (তিক্তস্বরে) কি জানি শীলা, তোর কথাবার্তা শুনে তো মনে হচ্ছে তোর বাবাকে ধরে নিয়ে গেলে তুই খুশি হতিস! (চন্দ্রমাধবকে) যাকগে, এখন কি করবে ঠিক করলে?

    চন্দ্রমাধব॥ করতে একটা কিছু হবেই—আর খুব তাড়াতাড়িই করতে হবে, নইলে তো কেলেঙ্কারির শেষ থাকবে না!

    (সদর দরাজ দিয়া কে যেন বাড়িতে প্রবেশ করিল। সকলে সচকিত হইয়া উঠিলেন। অমিয়র প্রবেশ)

    রমা॥ এই যে বাবা অমিয়—আমরা তো ভেবেছিলাম, তুমি আজ আর এলে না!

    অমিয়॥ আপনাদের জন্যেই ফিরে এলাম কাকীমা। সাব ইন্সপেক্টরটা গেল কখন?

    শীলা॥ এই তো একটু আগে। কাউকে ছেড়ে কথা কন নি—সবাইকে শেষ করে তবে গেছেন।

    রমা॥ শীলা!

    শীলা॥ বাঃ, অমিয় ছিল না তাই বলছি—

    অমিয়॥ আচ্ছা, লোকটাকে কি রকম মনে হচ্ছিল আপনাদের?

    শীলা॥ আমার তো মাঝে মাঝে বেশ ভয় করছিল।

    চন্দ্রমাধব॥ লোকটার কথাবার্তা মোটেই সুবিধের নয়, আমার তো গোড়া থেকেই কি রকম একটা সন্দেহ হচ্ছিল—

    রমা॥ কথাবার্তা তো সুবিধের নয়ই! দেখলে না, তোমার আমার সঙ্গে কি রকম চড়াচড়া কথা বলছিল? লোকটা এক নম্বরের চোয়াড়!

    অমিয়॥ (ধীরে ধীরে) ও কিন্তু পুলিশের লোক নয়!

    চন্দ্রমাধব॥ (যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করিতে পারেন নাই) সে-কি!

    রমা॥ বলছ কি অমিয়!

    অমিয়॥ আমি ঠিকই বলছি কাকীমা—এই খবরটা দেবার জন্যেই তো ফিরে এলাম।

    চন্দ্রমাধব॥ কি করে জানতে পারলে?

    অমিয়॥ আপনাদের এখান থেকে তো বেরোলাম একটু ঘুরে আসব বলে। এধার-ওধার একটু ঘুরে-ফিরে আসছি, হঠাৎ মনে হল — যাই না, থানাটা একটু ঘুরেই আসি! থানার ওখানে গিয়ে আর একজন সাব-ইন্সপেক্টরের সঙ্গে দেখা। সে ঐ পদ্মপুকুরেই রয়েছে প্রায় বছর পাঁচেকের ওপর! তাকে জিজ্ঞেস করতেই বললে — তিনকড়ি হালদার বলে কেউ নেই—কি রকম দেখতে তাও বলেছিলাম। বললে, না।

    চন্দ্রমাধব॥ এসব ব্যাপার কিছু বলনি তো?

    অমিয়॥ পাগল হয়েছেন আপনি? জিজ্ঞেস করতে বললাম — তিনকড়িকে আমি চিনতাম, শুনলাম সে এখানে সাব-ইন্সপেক্টর হয়ে এসেছে, তাই খোঁজ করতে এসেছিলাম।

    চন্দ্রমাধব॥ যাক—লোকটা তাহলে সত্যিই বাজে, কি বলো?

    রমা॥ আমি তো তখন থেকেই বলছি, পুলিশের বাপের সাধ্যি কি, আমাদের সঙ্গে ওভাবে কথা কয়।

    চন্দ্রমাধব॥ তবু একবার রমেশের ওখানে ফোন করি, কি বলো?

    রমা॥ খুব সাবধান কিন্তু—দেখো যেন আবোল-তাবোল কিছু বলে ফেলো না।

    চন্দ্রমাধব॥ আরে না না—(উঠিয়া গিয়া ফোন তুলিয়া নাম্বার বলিলেন। এদিকে মুখ ফিরাইয়া) আমি অবিশ্যি ফোন করতামই, আমার গোড়া থেকেই কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছিল —(ফোনে) হ্যালো, কে—রমেশ? কোথায়? ওপরে আছে? একবার ডেকে দিন—হ্যাঁ, হ্যাঁ, বললেই আসবে – বলুন তার বড় মামা ডাকছে—(অল্পক্ষণ পরে) কে রমেশ? শুয়ে পড়েছিলি নাকি? ও! হ্যাঁরে, পদ্মপুকুরে তিনকড়ি হালদার বলে কোন সাব-ইন্সপেক্টর আছে?—নেই, ঠিক জানিস তো—রং ময়লা, মুখখানা ভারি, গোঁফ দাড়ি কামানো।—ও, নেই? না, এমনি জিজ্ঞেস করছিলাম, একজনের সঙ্গে তর্ক হচ্ছিল—আচ্ছা ফোন রাখছি।—কাল একবার আসিস না এখানে বৌমাকে নিয়ে—(ফোন রাখিয়া চন্দ্রমাধব ফিরিয়া আসিলেন) যা বলেছি তাই, পুলিশ নয়।

    রমা॥ আমি তো গোড়া থেকেই বলছি—পুলিশ ওর কোনোখানটাই নয়।

    চন্দ্রমাধব॥ আগাগোড়া ব্যাপারটা কিন্তু অন্য রকম দাঁড়িয়ে গেল, বুঝলে অমিয়।

    শীলা॥ (ব্যঙ্গের সুরে) হ্যাঁ, আমরা আবার ভদ্রলোক হয়ে গেলাম।

    চন্দ্রমাধব॥ আবার তুই বাজে বকছিস শীলা!

    তাপস॥ খুব বাজে কিন্তু শীলা বকছে না বাবা!

    চন্দ্রমাধব॥ তুই এখনও কথা বলছিস তাবস! — আজ যদি সত্যিই লোকটা সাব-ইন্সপেক্টর হত! তোর অবস্থাটা কি হত ভেবে দেখেছিস?

    রমা॥ আঃ—চুপ কর না—কি হচ্ছে কি?

    শীলা॥ বঝলে অমিয়, তোমার আর বাকি গল্পটা শোনা হল না।

    অমিয়॥ আর শোনবার দরকারই বা কি! (চন্দ্রমাধবকে) ব্যাপারটা তাহলে পুরো ধাপ্পা কি বলেন?

    চন্দ্রমাধব॥ ধাপ্পা বলে ধাপ্পা! নিশ্চয়ই কেউ বদমায়েসি করে ব্যাটাকে এখানে পাঠিয়েছিল। শক্রুর তো অভাব নেই। তার ওপর এখন ইলেকশনে দাঁড়িয়েছি—অপোনেন্ট পার্টিরও কেউ হতে পারে। খানিকটা আঁচ আমি গোড়াতেই পেয়েছিলাম। তবে কি জান? একটা লাইট মুডে ছিলাম, ফস করে এসে আরম্ভ করলে—তাই বেশি কিছু বলতে পারলাম না, নইলে—

    রমা॥ (বাধা দিয়া) তোমরা বলে তাই! গোড়া থেকে যদি আমি এখানে থাকতাম, তাহলে দেখতে। ও জিজ্ঞেস করবার সাহস পেত? তার আগে আমি ওকে জিজ্ঞেস করতাম না—দেখতে হতভাগা পালাবার পথ পেত না।

    শীলা॥ বলা খুব সোজা মা।

    রমা॥ তার মানে? তোদের মধ্যে এক আমাকেই সে বাগে আনতে পারেনি।

    চন্দ্রমাধব॥ আচ্ছা, তুমিও ওর সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমানুষ হলে! এখন একটু মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবা দরকার। ও তো ধাপ্পা মেরে চলে গেল—কিন্তু ধাপ্পাতেই যদি এর শেষ না হয় তখন?

    অমিয়॥ ঠিক কথা, ধাপ্পাই হোক, আর যা-ই হোক—লোকটা সমস্ত ব্যাপারটা জেনেই এখান থেকে গেছে।

    চন্দ্রমাধব॥ সেই জন্যেই তো বলছি। (তাপসকে দাঁড়াতেই দেখিয়া) দাঁড়ালি কেন, বস

    তাপস॥ আমি ঠিক আছি বাবা।

    চন্দ্রমাধব॥ না, তুমি ঠিক নেই, কথাটা শোনা তোমারই সবচেয়ে বেশি দরকার, বুঝলে রাস্কেল!

    তাপস॥ আমার কিন্তু খুব দরকার বলে মনে হচ্ছে না বাবা।

    শীলা॥ ছোড়দা ঠিক কথাই বলছে বাবা।

    চন্দ্রমাধব॥ (রমাকে) আচ্ছা, এরা কি বলতো? কোত্থাকার একটা জোচ্চোর—কি না কি বলে গেল—তাই নিয়ে মাথা গরম করে মরছে।

    রমা॥ শীলা! তাপস! ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখ, বাবা ঠিক কথাই বলছেন।

    তাপস॥ (হঠাৎ যেন ফাটিয়া পড়িল) আচ্ছা মা, তোমরা কি! এ ভান করে লাভটা কি? তোমরা না বললেই না হয়ে যাবে! একটা মেয়ে একটু আগে অ্যাসিড খেয়ে জ্বলতে জ্বলতে মারা গেছে—পার তোমরা তাকে বাঁচিয়ে ফিরিয়ে আনতে? পার না! লোকটা যদি পুলিশের লোক নাই হয়, গল্পটা কি মিথ্যে হয়ে যাবে? (চন্দ্রমাধবকে) একটু আগে তুমি বলেছিলে না, আমি তোমার অফিসের টাকা ভেঙেছি—ব্যাপারটা কোর্টে উঠবে—একটা কেলেঙ্কারি হবে — একবারও মনে হল না তোমার, কথাগুলো কত বাজে, কত ছোট। না বাবা, এখন আর তোমার কথা শোনার মতো মন আমার নেই—সে ইচ্ছেও নেই!

    চন্দ্রমাধব॥ আচ্ছা, এরা স্ক্যান্ডালটার কথা কেন বুঝছে না বলতো?

    তাপস॥ (চীৎকার করিয়া) বলছি তো—তোমার স্ক্যান্ডাল হল বা না হল তাতে কিছু এসে যায় না। একটা মেয়ে কার্বলিক অ্যাসিড খেয়ে মারা গেছে—এর চেয়ে বড় কথা আর কিছু নেই বুঝলে?

    চন্দ্রমাধব॥ (চীৎকার করিয়া) চুপ! কথা বলতে তোর লজ্জা করে না? অন্য বাপ হলে তোর মত ছেলেকে লাথি মেরে বিদায় করে দিত, জানিস?

    তাপস॥ (তিক্তস্বরে) এখন এ বাড়িতে থাকলাম আর না থাকলাম, বাবা।

    চন্দ্রমাধব॥ আগে চুরির টাকাটা শোধ দে, তারপর যাবার কথা ভাবিস!

    শীলা॥ কিন্তু তাতে সন্ধ্যা চক্রবর্তী কি ফিরে আসবে বাবা?

    তাপস॥ আর আমরা যে তাকে মেরেছি, সেটাও কিছু না-হয়ে যাবে না।

    অমিয়॥ কিন্তু আগে দেখ ব্যাপারটা সত্যি কিনা, তারপর চেঁচিও।

    তাপস॥ নিশ্চয়ই সত্যি। তুমি তো এখনো শেষটা শোনই নি।

    শীলা॥ ও, তুমি তাহলে সাব-ইন্সপেক্টরকে যা বলেছ, তা একটা ঘোরে বলে ফেলেছ—কি বলো অমিয়?

    অমিয়॥ না, মোটেই না। আম যা বলেছি তা আমি সত্যিই বলেছি, আর তার জন্যে আমি তোমার কাছে ক্ষমাও চাইছি।

    শীলা॥ আমাদের চেয়েও তোমার ওপর পুলিশ ভদ্রলোকের ধারণাটা কিন্তু ভাল, বুঝলে অমিয়?

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধস্বরে)আবার বলে পুলিশ! লোকটার চোদ্দগুষ্টিতে কেউ পুলিশ নয়।

    শীলা॥ কিন্তু পুলিশি তিনি ঠিকই করে গেছেন বাবা। সন্ধ্যা চক্রবর্তী যে অ্যাসিডটা খেয়েছে সেটা তো আমাদেরই জন্যে।

    অমিয়॥ কিন্তু তার তো কোন প্রমাণ নেই।

    শীলা॥ তার মানে?

    অমিয়॥ মানে, লোকটা যে পুলিশের লোক, তারই যখন কোন প্রমাণ নেই তখন এটাই বা দাঁড়ায় কি করে?

    শীলা॥ কিন্তু এটা যে দাঁড়িয়ে গেছে, তা তুমি নিজেও বেশ বুঝতে পারছ অমিয়?

    অমিয়॥ মোটেই না। ব্যাপারটা ভাল করে ভেবে দেখ। একজন এসে স্রেফ ধাপ্পা দিয়ে বললে যে সে পুলিশের লোক, সাব-ইন্সপেক্টর! এধার-ওধার থেকে দু-একটা খবরও হয়ত পেয়েছিল— তাই দিয়ে দিব্যি এক গল্প ফেঁদে স্রেফ ব্লাফের ওপর আমাদের দিয়ে স্বীকার করিয়ে নিলে যে আমরা সবাই এ মেয়েটির ব্যাপারে জড়িয়ে আছি।

    তাপস॥ হ্যাঁ, জড়িয়ে তো আছিই!

    অমিয়॥ কিন্তু প্রত্যেক কেসে যে একই মেয়ে, তা তুমি কি করে বুঝছ—

    চন্দ্রমাধব॥ (উত্তেজিত হইয়া) দাঁড়াও-দাঁড়াও অমিয়, হয়েছে হয়েছে—উঁহু হল না—

    তাপস॥ কিন্তু তা কি করে হবে? আমরা নিজেরাই তো সব স্বীকার করে নিয়েছি—

    অমিয়॥ ঠিক কথা, তুমি একটি মেয়েকেই জানতে। কিন্তু কি করে জানলে আমার মেয়েটিই তোমার মেয়ে? (অমিয় সকলের মুখের দিকে তাকাইল। দেখিয়া মনে হইল যেন এইমাত্র একটা যুদ্ধ জয় করিয়া ফেলিয়াছে। আর সকলের তখন—হ্যাঁ, তাই তো, ভেবে দেখিনি—এই অবস্থা। কয়েক মুহূর্ত পরে চন্দ্রমাধবকে) আপনিই বলুন না কাকাবাবু, সন্ধ্যা চক্রবর্তী নামে একটি মেয়েকে আপনি বরখাস্ত করেছিলেন! মেয়েটিকে আপনার মনে ছিল না তাই লোকটা আপনাকে একটা ছবি দেখায়—তখন আপনারও মনে পড়ে, এই তো?

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ, কিন্তু তারপর?

    অমিয়॥ তারপর শীলা ধর্মতলার চেন স্টোরের একটি মেয়ের চাকরি যাওয়ার ব্যাপারে জড়িয়ে পড়েছিল—দেখা গেল লোকটা সে ব্যাপারটা জানে। সে দিব্যি বলে বসল—চেন স্টোরের মেয়েটি আর সন্ধ্যা চক্রবর্তী আলাদা নয়! আর সেই সঙ্গে শীলাকে একটা ছবি দেখালে—

    শীলা॥ হ্যাঁ, সে একই ছবি—

    অমিয়॥ কি করে জানলে? তোমার বাবাকে যখন ছবিটা দেখিয়েছিল তখন তো আর তুমি দেখনি?

    শীলা॥ না।

    অমিয়॥ আর তোমাকে যখন ছবিটা দেখাচ্ছিল, তখন কাকাবাবুও তো দেখতে আসেননি—

    শীলা॥ না (ধীরে ধীরে) আমি বুঝেছি অমিয়, তুমি কি বলতে চাও।

    অমিয়॥ তাহলেই দেখতে পাচ্ছ—ছবি যে একটাই তার কোন প্রমাণ নেই। কাজেই বারবার যে একই মেয়ে, তারও কোন প্রমাম নেই! এই আমার কথাই ধর না—আমাকে তো সে কোন ছবিই দেখায়নি! ফস করে বললে—মেয়েটা নাম বদলে হয়েছিল ঝরনা রায়, আমিও ঘাবড়ে গিয়ে বলে ফেললাম, ঝরণা রায়কে আমি চিনি।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু ঝরনা রায়ই যে সন্ধ্যা চক্রবর্তী, তার তো এতটুকু প্রমাণ নেই! লোকটার মুখের কথাই আমরা সত্যি বলে মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি লোকটাই জাল। কাজেই কিচ্ছু বলা যায় না—হয়ত আগাগোড়াই মিথ্যে কথা বলেছে।

    অমিয়॥ হয়ত কেন, বোধহয় তাই বলেছে!—আচ্ছা তারপর আমি চলে যাওয়ার পরে কি হল?

    রমা॥ আমি কি রকম সব গণ্ডগোল করে ফেললাম।

    অমিয়॥ কেন?

    রমা॥ লোকটা যেই শুনলে তাপস বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, অমনি বলে বসল, তাপসকে তার দরকার। যদি তাপস তাড়াতাড়ি না ফেরে, তাহলে সে নিজে গিয়ে ওকে ধরে নিয়ে আসবে। ওঃ, তখন যদি তার কথা বলার ধরণটা দেখতে—সে কড়া চাউনি কি! আমিও কি রকম যেন নার্ভাস হয়ে গেলাম! তাই ফস করে যখন বলে বসল — দু’হপ্তা আগে সন্ধ্যা চক্রবর্তীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে—তখন আমিও বোকার মত বলে বসলাম—হ্যাঁ, হয়েছে।

    চন্দ্রমাধব॥ আচ্ছা, কেন বললে বলতো? মেয়েটা যে তোমাদের কমিটির কাছে হেলপের জন্যে অ্যাপলাই করেছিল—সন্ধ্যা চক্রবর্তী নাম দিয়ে তো করেনি?

    রমা॥ না। কিন্তু ঐ যে বললাম — একে তাপসটার জন্যে ভাবনা, তার ওপর ঐ রকম ফস করে জিজ্ঞেস করে বসল—আমিও সব গোলমাল করে হ্যাঁ বলে বসলাম।

    শীলা॥ কিন্তু মা, তুমি ছবি দেখে তো তাকে চিনতে পেরেছিলে?

    অমিয়॥ আর কেউ ঠিক ঐ সময় ছবিটা দেখেনি তো?

    রমা॥ না।

    অমিয়॥ তাহলেই বুঝতে পারছেন কাকীমা—এ যে একই মেয়ে তার কোন প্রমাণ নেই। আপনাদের কমিটিতে তো ওরকম কত মেয়েই অ্যাপলাই করে থাকে—তাদেরই একজনের ছবি হয়ত আপনাকে দেখিয়েছে—সে যে সন্ধ্যা কি ঝরনা, তা আমরা কি করে জানব বলুন!

    চন্দ্রমাধব॥ ঠিক—অমিয় ঠিক বলেছ! আমরা প্রত্যেকেই হয়ত আলাদা-আলাদা মেয়েরই ছবি দেখেছি।

    অমিয়॥ নিশ্চয়! হ্যাঁ তাপস, তোমাকেও কি ছবি দেখিয়েছিল নাকি?

    তাপস॥ আমার বেলায় আর ছবি দেখাবার দরকার ছিল না। মার আর আমার কেসের মেয়ে যে এক তাতে কোন সন্দেহই নেই।

    অমিয়॥ কেন?

    তাপস॥ বাঃ—কমিটিতে সে কি বলেছে দেখ, চুরির টাকা নেবে না বলেই সে কমিটিতে গিয়েছিল। আমাকেও সে ঐ বলেই আসতে বারণ করে দিয়েছিল।

    অমিয়॥ তা হোক, তবু হয়ত ব্যাপারটা আগাগোড়াই বাজে!

    তাপস॥ কি জানি ভাই! তোমরা হয়ত কেটে বেরিয়ে আসতে পারছ, — কিন্তু আমি তো পারছি না—আমিও না, মাও নয়।

    চন্দ্রমাধব॥ কেন নয়! তোদের মার সমিতিতে তো আকছার ফলস ইন্টারভিউ হচ্ছে। পুলিশের ব্যাপারটার মতো এটাও হয়ত আগাগোড়া সাজানো।

    তাপস॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) আশ্চর্য! একটা মেয়ে যে অ্যাসিড খেয়ে মারা গেছে, সেটাও কি সাজানো?

    অমিয়॥ কিন্তু কোন মেয়ে? মেয়ে তো দেখছি একটা নয়। ব্যাপার যা দাঁড়িয়েছে তাতে তো দেখছি বোধহয় জন-চার-পাঁচ হবে।

    তাপস॥ দশজন হলেই বা আমার কী? আমি যাকে জানতাম, সে তো মারা গেছে।

    চন্দ্রমাধব॥ তাই বা কি করে জানছি—

    অমিয়॥ ঠিক বলেছেন কাকাবাবু! আজ অটা-অল কোন মেয়ে সুইসাইড করেছে কিনা দেখ! তারও তো কোন প্রমাণ নেই।

    চন্দ্রমাধব॥ ঠিক, ঠিক অমিয়! (তাপসকে) কই—এবার উত্তর দে? আরে আমি তো গোড়া থেকেই বলছি, একটা লাইট মুডে ছিলাম, লোকটা ফস করে এসে একটা শকিং ব্যাপার বলতে আরম্ভ করলে! যেই না একটু-আধটু নার্ভাস হয়ে পড়া আর অমনি ব্লাফের পর ব্লাফ—একটা মেয়ে কার্বলিক অ্যাসিড—

    তাপস॥ থাক বাবা, বার বার আর নাই বললে!

    চন্দ্রমাধব॥ তবে? আরে ব্যাপারটাই তো এই রকম, একেবারের বেশি দু’বার বললেই কি রকম নার্ভাস মনে হয়! লোকটা করলেও তো তাই! গল্পটা শুনেই সব নার্ভাস—আর যায় কোথায়? লোকটাও একটার পর একটা জিজ্ঞেস করতে আরম্ভ করলে! ওঃ, খুব বোকা বানিয়ে দিয়ে গেল যা হোক!

    তাপস॥ ওঃ! ব্যাপারটা যদি সত্যিই মিথ্যে হত?

    চন্দ্রমাধব॥ মিথ্যে তো বটেই! কে বলেছে সত্যি! পুলিশের ব্যাপারটাও মিথ্যে আর মেয়েও একটা নয়, কাজেই নো স্ক্যান্ডাল!

    শীলা॥ কিন্তু বাবা, সুইসাইড—সেটাও কি মিথ্যে?

    অমিয়॥ সেটা তো এক্ষুনি জেনে নেওয়া যায়।

    শীলা॥ কী করে?

    অমিয়॥ কেন, হসপিটালে ফোন করে।

    চন্দ্রমাধব॥ (অস্বস্তির সহিত) কিন্তু কি রকম যেন শোনাবে না—এত রাতে?

    অমিয়॥ হোক রাত তবু ফোন করব, দেখি না ব্যাপারটা সত্যি কিনা? (টেলিফোনের নিকট গিয়া ফোন তুলিয়া নাম্বার বলিল) হ্যালো, পাণ্ডে হসপিটাল? দেখুন, খুব দরকারে পড়ে রাত্তিরে আপনাদের বিরক্ত করলাম, যদি একটু হেল্প করেন দয়া করে —মানে আজ দুপুর থেকে সন্ধ্যের মধ্যে সন্ধ্যা চক্রবর্তী—হ্যাঁ সন্ধ্যা চক্রবর্তী নামে কেউ ভর্তি হয়েছে? এমারজেন্সি, কার্বলিক অ্যাসিড কেস? আচ্ছা, আমি ধরে দাঁড়িয়ে আছি—(অল্পক্ষণ পরে) কি বললেন? আজ তিনদিন হল ওরকম কোন কেসই আসেনি? আচ্ছা, মেনি থ্যাঙ্কস কষ্ট দিলাম কিছু মনে করবেন না (ফোন নামাইয়া দিল। অমিয় যতক্ষণ ফোন করিতেছিল, ততক্ষণ সকলেরই ত্রস্ত অবস্থা। চন্দ্রমাধব কপাল মুছিতেছেন, শীলা তো মাঝে মাঝে আপনা-আপনি শিহরিয়া উঠিতেছে, ইত্যাদি। এদিকে আসিয়া) পাণ্ডেতে আজ তিনদিন হল কোন সুইসাইড কেসই আসেনি।

    চন্দ্রমাধব॥ (উল্লসিত হইয়া) কেমন, এবার হল তো — সুইসাইড কেসই আসেনি। ওঃ, কি ধাপ্পাই দিয়ে গেল লোকটা—(হাসিতে হাসিতে) ওঃ, আসল ব্যাপারটাই হয়নি, যাই বল—ও বোকা নয়, একেবারে গাধা বানিয়ে দিয়ে গেছে কিন্তু!

    রমা॥ ভাগ্যিস অমিয় কথাটা ঐভাবে তুললে। নাঃ তোমার বাহাদুরি আছে অমিয়।

    অমিয়॥ ঐ জন্যেই তো বাইরে চলে গেলাম কাকীমা—মনে হল, দেখি না একটু ঘুরে ফিরে আসি যদি কিছু মাথায় খেলে যায়।

    চন্দ্রমাধব॥ বুঝলে অমিয়, ভয় যে একটু আমারও হয়নি তা নয়, হয়েছিল—তবে ঐ স্ক্যাণ্ডালটার জন্যে, নইলে নয়। (শীলাকে উৎফুল্ল না দেখিয়ে) কিরে শেলী, আবার কি হল? সব তো মিটে গেছে।

    শীলা॥ কি করে তুমি বলছ বাবা? আমরা যে নিজের মুখে সব স্বীকার করেছি, কি করে তা না হয়ে যাবে! আমাদের বরাত খুব ভালো তাই শেষেরটা না হয় হয়নি, কিন্তু সেটা হলেও হতে পারত।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটাই যে এখন অন্য রকম দাঁড়িয়ে গেল। নে নে—আর মুখভার করে বসে থাকে না। (তিনকড়িবাবুর অনুকরণ করিয়া) ওঃ, সে আঙুল নেড়ে বলার ঘটা কি—(শীলার দিকে আঙুল দেখাইয়া হাসিতে হাসিতে) আপনারা কেউ তাকে সাক্ষৎভাবে খুন করেন নি ঠিক কথা—কিন্তু আপনারা প্রত্যেকেই তাকে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দিয়েছেন! ওঃ—তখন যদি দেখতে অমিয়, তার মুখ চোখের ভাবটা! (শীলাকে দরজার দিকে যাইতে দেখিয়া) কি রে, উঠছিস যে—

    শীলা॥ কি জানি বাবা—তোমরা কথা কইছ শুনে আমার কিন্তু কি রকম যেন ভয় করছে।

    চন্দ্রমাধব॥ দুর পাগলি, ওপরে গিয়ে ভালকরে ঘুমো দিকি—দেখবি সকালে সব পরিষ্কার হয়ে গেছে।

    শীলা॥ (ফিরিয়া উত্তেজিত কণ্ঠস্বরে) আচ্ছা বাবা—তুমি কি বলতে চাও, সব ঠিক আগের মত আছে?

    চন্দ্রমাধব॥ নিশ্চয়।

    শীলা॥ ও—তাহলে সত্যিই কিছু হয়নি? ভদ্রলোক যা বলে গেলেন তা থেকে তোমাদের তাহলে শেখবার কিছু নেই? তোমরা তাহলে ঠিক যেমন ছিলে, তেমনিই থাকলে?

    অমিয়॥ (ঠাট্টার সুরে) কেন? তুমি কিছু অন্য রকম হয়ে যাবে নাকি?

    শীলা॥ যাব নয় অমিয়, গেছি বলো। ভদ্রলোকের চেহারাটা আমার চোখের সামনে ভাসছে, তিনি আঙুল দেখিয়ে বলেছেন—সেদিন খুব বেশি দূর নয় যেদিন প্রত্যেকটা মানুষকে আমার এই কথাগুলো ভাবতে হবে! কিন্তু সেদিন হাজার মাথা খুঁড়েও আপনারা কোন পথ পাবেন না। তখন চারপাশে আপনাদের আগুন, আর চারধার আপনাদের রক্তে লাল!

    তাপস॥ তুই ঠিক বলেছিস শীলা। এদের কথাবার্তায় আমারও ভয় ভয় করছে। এরা কি!

    রমা॥ এই দেখ এরা আবার আরম্ভ করেছে।—এই! তোরা শুতে যা দেখি, যতসব মাথা খারাপের দল।

    চন্দ্রমাধব॥ আশ্চর্য, এমন একটা মজার ব্যাপার হল, অথচ এর মজাটা এরা কেউ বুঝলে না। আজকালকার ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারই এই, একেবারে না জেনে সবজান্তা হয়ে বসে আছে!

    (হঠাৎ টেলিফোনের ঘন্টা বাজিয়া উঠিল। এক মুহূর্তের জন্য সকলে চুপ। চন্দ্রমাধব উঠিয়া গিয়া ফোন ধরিলেন। শঙ্কিত কণ্ঠস্বরে) হ্যালো, হ্যাঁ আমিই চন্দ্রমাধব সেন। কি? এখানে মানে আমার এখানে— (চন্দ্রমাধবের কণ্ঠস্বর ভয়ে কম্পিত হইতেছে বলিলে কিছুই বলা হইবে না। ততক্ষণে ওদিকের ব্যক্তি ফোন ছাড়িয়া দিয়াছেন। চন্দ্রমাধব ফোন নামাইয়া এদিকে আসিলেন। তাঁহার মুখে চোখে দারুণ ভীতির আভাস। ধীর ও ভীতিপূর্ণ কণ্ঠস্বর) পুলিশ থেকে ফোন করছিল। একটু আগে একটি মেয়ে কার্বলিক অ্যাসিড খেয়ে আত্মহত্যা করেছে—একজন সাব-ইন্সপেক্টর এখানে আসছেন এনকোয়ারিতে। (হতভম্ব ও ভীত অবস্থায় আর সকলে চন্দ্রমাধবের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। পর্দাও এই সঙ্গে নামিয়া আসিল।)

  • মরিচঝাঁপি

    মরিচঝাঁপি

    মরিচঝাঁপি

    সবে ভোর হয়েছে। জানালায় পর্দা নেই, তাই নরম রোদে ধুয়ে যাচ্ছে ঘরটা। সাতসকালেই ঘুম ভেঙে গেল কানাইয়ের। মুখহাত ধুয়ে জামাকাপড় পালটে একটু বাদে নীচে নেমে এল ও। টোকা দিল নীলিমার দরজায়।

    “কে?” কেমন যেন কাঁপা কাঁপা শোনাল মাসির গলাটা।

    “আমি–কানাই।”

    “আয়। ভোলাই আছে দরজা।” ঘরে ঢুকে কানাই দেখল পিঠের কাছে কয়েকটা বালিশ জড়ো করে তাতে ঠেস দিয়ে বসে আছে নীলিমা। পায়ের ওপর বড় একটা লেপ ফেলা রয়েছে অগোছালো ভাবে। চোখদুটো কুঁচকে রয়েছে, যেন দেখতে পাচ্ছে না ভাল করে। বিছানার পাশের টেবিলে এক কাপ চা আর একটা প্লেটে মারি বিস্কুট চার-পাঁচটা। ঘরে জামাকাপড় বা নীলিমার নিজের ব্যবহার্য জিনিসপত্র বলতে কিছুই নেই; শুধু বই আর ফাইলপত্র ঠাসা বিছানায়, মেঝেতে, এমনকী মশারির পুঁটলির ওপরে পর্যন্ত। খুবই সাদামাটা কেজো চেহারার ঘর, আসবাব বলতে প্রধানত কয়েকটা বইয়ের আলমারি আর ফাইল ক্যাবিনেট। নীলিমার বড় খাটটা না থাকলে এটাকে ট্রাস্টের আর-একটা অফিসঘর বলে ভুল হতে পারত।

    “তোমাকে কিন্তু অসুস্থ দেখাচ্ছে মাসি, কানাই বলল। “ডাক্তারকে খবর দিয়েছ?” হাতের রুমালটায় একবার নাক ঝাড়ল নীলিমা। “ওই সর্দি লেগেছে একটু। সেটা বলে দিতে আবার ডাক্তার কেন লাগবে?”

    “যাই বল মাসি, তোমার কাল ক্যানিং-এ যাওয়াটা ঠিক হয়নি,” বলল কানাই। “ধকলটা একটু বেশি হয়ে গেছে। শরীরের দিকে আরেকটু নজর দিতে হবে তোমাকে।”

    হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর মতো ভঙ্গি করে কথাটা উড়িয়ে দিল নীলিমা। “ছাড় তো আমার কথা। তোর কথা বল। আয়, এখানে এসে বোস। ভাল ঘুম হয়েছিল তো রাত্তিরে?”

    “তোফা।”

    “আর প্যাকেটটা?” নীলিমার গলায় আগ্রহ ঝরে পড়ছে। “ওটা পেয়েছিস তো?”

    “হ্যাঁ। যেখানে বলেছিলে সেখানেই রাখা ছিল।”

    “বল না রে কী আছে ওটায়? গল্প না কবিতা?”

    মাসির গলায় প্রত্যাশার সুরটুকু কানাইয়ের কান এড়াল না। ও বুঝতে পারছিল নীলিমার বিশ্বাস এমন কিছু আছে ওই প্যাকেটটায় যাতে মৃত্যুর পরেও তার স্বামীর সাহিত্যিক খ্যাতি নতুন করে ছড়িয়ে পড়বে। মাসিকে নিরাশ করতে খারাপ লাগছিল কানাইয়ের। যতটা সম্ভব নরমভাবে ও বলল, “আসলে আমি যা ভেবেছিলাম সেরকম কিছু নেই ওটায়। আমার মনে হয়েছিল হয়তো গল্প কি কবিতা বা প্রবন্ধ-টবন্ধ থাকবে, কিন্তু যেটা আছে সেটা একটা ডায়ারি বা জার্নাল মতো। সাধারণ একটা খাতায় লেখা, স্কুলের বাচ্চারা যেমন খাতা ব্যবহার করে সেরকম।”

    “ও, তাই?” ম্লান হয়ে এল নীলিমার চোখ। একটা আশাভঙ্গের দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুক থেকে। “কোন সময়কার লেখা রে? তারিখ-টারিখ কিছু আছে?”

    “হ্যাঁ। ১৯৭৯-তে লেখা,” কানাই বলল।

    “১৯৭৯?” এক মুহূর্ত চুপ করে কী ভাবল নীলিমা। “কিন্তু সে বছরই তো ও মারা গেল। জুলাই মাসে। তুই ঠিক দেখেছিস? ওই বছরেই লেখা ওটা?”

    “হ্যাঁ,” বলল কানাই। “কেন আশ্চর্য হচ্ছ তুমি?”

    “বলছি,” নীলিমা বলল। “কারণ সে বছরটায় একেবারে লেখালিখির ধার দিয়েই যায়নি নির্মল। তার আগের বছরই ও রিটায়ার করল লুসিবাড়ি স্কুলের হেডমাস্টার হিসেবে। তার পর থেকেই ওর সময়টা ভাল যাচ্ছিল না। আমরা লুসিবাড়ি চলে আসার পর থেকেই, মানে প্রায় তিরিশ বছর ধরে ওই স্কুলটাই ছিল ওর প্রাণ। রিটায়ার করার পর থেকেই কেমন একটা যেন হয়ে গেল ও। আগেও ওর একটা মানসিক সমস্যা ছিল, সে তো জানিসই, তাই সব সময় খুব চিন্তায় থাকতাম আমি। দিনের পর দিন কোথায় উধাও হয়ে যেত, ফেরার পর আর মনেও করতে পারত না কোথায় গিয়েছিল। খুবই অস্থিরতার মধ্যে কেটেছিল সে বছরটা ওর। লেখার মতো অবস্থাতেই ছিল না।”

    “হয়তো খানিকটা সময়ের জন্য সুস্থিতি ফিরে এসেছিল কখনও একটা,” বলল কানাই। “আমার এক ঝলক দেখে যা মনে হল, গোটা খাতাটা একদিনে, বা খুব বেশি হলে দু’দিনে লেখা।”

    “তারিখটা লিখেছে কি?” খুঁটিয়ে কানাইকে নজর করতে করতে জিজ্ঞেস করল নীলিমা।

    “লিখেছে,” কানাই বলল। “মেসো ওটা লিখতে শুরু করেছিল ১৯৭৯ সালের ১৫ মে সকালবেলা। মরিচঝাঁপি বলে একটা জায়গায়।”

    “মরিচঝাঁপি!” শব্দটা বলতে গিয়ে হঠাৎ একটা শ্বাস টানল নীলিমা।

    “হ্যাঁ, কানাই বলল। “সেখানে কী হয়েছিল বলো তো আমায়।”

    নীলিমা বলতে শুরু করল। মরিচঝাঁপি এই ভাটির দেশেরই একটা দ্বীপ। লুসিবাড়ি থেকে নৌকোয় কয়েক ঘণ্টার পথ। সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের আওতায় ছিল দ্বীপটা, কিন্তু এ ধরনের অন্য দ্বীপগুলোর মতো দুর্গম ছিল না। ১৯৭৮ সালে একটা সময় হঠাৎ বহু মানুষ এসে হাজির হল মরিচঝাঁপিতে। যে দ্বীপে মানুষের কোনও বসতি ছিল না, প্রায় রাতারাতি হাজার হাজার লোক এসে থাকতে শুরু করল সেখানে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা বাদাবন সাফ করে, বাঁধ তৈরি করে, শত শত কুঁড়ে বানিয়ে ফেলল। এত তাড়াতাড়ি পুরো ব্যাপারটা ঘটল, শুরুতে তো কেউ জানতেই পারেনি এ লোকগুলো কারা, কোথা থেকে এসে উদয় হল এখানে। আস্তে আস্তে জানা গেল ওরা হল বাংলাদেশি রিফিউজি। অনেকে সেই পার্টিশনের সময় এসেছিল, অনেকে আবার পরে বিভিন্ন সময় বর্ডার পেরিয়ে এসে ঢুকেছে। একেবারে হতদরিদ্র সব মানুষ, বাংলাদেশে মুসলমানদের আর উঁচু জাতের হিন্দুদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে চলে এসেছে এপারে।

    “বেশিরভাগই ছিল আমরা এখন যাদের দলিত বলি সেরকম,” নীলিমা বলল। “তখন বলা হত হরিজন।”

    মরিচঝাঁপিতে আসার সময় কিন্তু এরা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসেনি; তখন ওরা পালাচ্ছিল মধ্য ভারতের একটা সরকারি পুনর্বাসন শিবির থেকে। এই শিবির ছিল মধ্যপ্রদেশের দণ্ডকারণ্যে, গভীর জঙ্গলের মধ্যে। পশ্চিমবাংলা থেকে বেশ কয়েকশো কিলোমিটার দূরে। পার্টিশনের পর পরই তখনকার ওই পূর্ব পাকিস্তানি উদ্বাস্তুদের অনেককে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেখানে।

    “সরকার তো ওগুলোকে বলত ‘পুনর্বাসন’ শিবির, কিন্তু লোকে বলত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, জেলখানা,” বলল নীলিমা। “ওই উদ্বাস্তুদের সব সময় পাহারা দিয়ে রাখত নিরাপত্তারক্ষীরা, ক্যাম্প ছেড়ে কোথাও যাওয়ার জো ছিল না। কেউ পালালে ঠিক খুঁজে বের করে ফিরিয়ে আনা হত তাকে।”

    ক্যাম্পগুলো যেখানে বানানো হয়েছিল সেখানকার মাটি ছিল পাথুরে, বাংলাদেশের মাটির সঙ্গে তার কোনও মিল ছিল না। উদ্বাস্তুরা ওখানকার ভাষা বলতে পারত না, আর স্থানীয় লোকেরাও মনে করত ওদের ওখানে থাকার কোনও অধিকার নেই, উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। মাঝে মাঝেই তারা তির ধনুক আর মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে উদ্বাস্তুদের ওপর হামলা চালাত। অনেক বছর ধৈর্য ধরে ওই ক্যাম্পে ছিল মানুষগুলো। অবশেষে ১৯৭৮-এ কিছু লোক জোট বেঁধে পালাল ওখান থেকে। ট্রেনে করে, পায়ে হেঁটে ওরা পুবদিকে চলতে শুরু করল। ভাবল সুন্দরবনে গিয়ে বসত করবে। মরিচঝাঁপিতে আসবে বলেই ঠিক করে রেখেছিল ওরা।

    তার কিছুদিন আগেই বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসেছে পশ্চিমবঙ্গে; রিফিউজিরা ভেবেছিল এই সরকার তাদের বিশেষ কিছু বলবে না। কিন্তু এইখানেই হিসেবে গণ্ডগোল হয়ে গিয়েছিল ওদের। সরকার বলল মরিচঝাঁপিকে সংরক্ষিত এলাকা বলে ঘোষণা করা হয়েছে, সেখান থেকে উঠে যেতেই হবে উদ্বাস্তুদের। প্রায় বছর খানেক ধরে বার বার রিফিউজিদের সংঘর্ষ হল সরকারি লোকেদের সঙ্গে।

    “আর শেষ ঝামেলাটা হয়েছিল,” বলল নীলিমা, “আমার যদূর মনে পড়ছে, ওই ১৯৭৯-র মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে।”

    “মানে তুমি বলছ ওই গণ্ডগোলটা যখন হয়েছিল মেসো তখন ওখানে ছিল?” এক মুহূর্ত থেমে গেল কানাই। আরেকটা সম্ভাবনার কথা মনে হল ওর। “নাকি পুরোটাই কল্পনা?”

    “জানি না রে কানাই,” অন্যমনস্ক ভাবে নিজের হাতের দিকে চেয়ে বলল নীলিমা। “সত্যি জানি না। সে বছরটায় যেন একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গিয়েছিল নির্মল। আমার সঙ্গে কথা বলত না, কথা লুকিয়ে রাখত। এমন ব্যবহার করত যেন আমি ওর শত্রুপক্ষের লোক।” কানাই দেখতে পাচ্ছিল আরেকটু হলেই কেঁদে ফেলবে নীলিমা। মাসির জন্য খুব খারাপ লাগছিল ওর। “খুব কষ্টে কেটেছে সে সময়টা তোমার,?”

    “খুব কষ্টে রে,” নীলিমা বলল। “মরিচঝাঁপি নিয়ে যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল মানুষটা। আমার ভাল লাগত না। বুঝতে পারছিলাম একটা ঝামেলা হতে যাচ্ছে ওখানে; নির্মলকে তার থেকে দূরে রাখতে চাইছিলাম আমি।”

    কানাই মাথা চুলকাল একবার। “একটা জিনিস আমি বুঝতে পারছি না। এই ব্যাপারটা নিয়ে এত কেন ভাবছিল মেসো?”

    একটু সময় নিয়ে জবাবটা দিল নীলিমা। “একটা জিনিস ভুলে যাস না কানাই, কম বয়সে বিপ্লবের কথা ভাবতে ভালবাসত নির্মল। পার্টি বা পুরনো কমরেডদের থেকে সরে এলেও এরকম লোকেরা জীবনে সেসব কথা ভুলতে পারে না। বুকের মধ্যে থেকে গোপন ঈশ্বরের মতো সে চিন্তা ওদের চালিয়ে নিয়ে বেড়ায়, ওদের প্রাণশক্তির কাজ করে। যন্ত্রণার মধ্যে, বিপদের মধ্যে ওরা আনন্দ পায়। মেয়েদের কাছে সন্তানের জন্ম দেওয়ার অনুভূতি যে রকম, ভাড়াটে যোদ্ধাদের কাছে যুদ্ধ যে রকম, বিপ্লবের চিন্তায়, আপদ বিপদের মধ্যে সেই রকম অনুভূতি হয় ওদের।”

    “কিন্তু মরিচঝাঁপিতে যারা এসেছিল তারা তো আর বিপ্লব করছিল না।”

    “না,” বলল নীলিমা। “একেবারেই না। ওদের উদ্দেশ্য ছিল একেবারে সোজাসাপটা। ওরা শুধু মাথা গোঁজার জন্য একটু জমি চেয়েছিল। কিন্তু তার জন্য সরকারের সঙ্গে লড়তে প্রস্তুত ছিল ওরা। একদম শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ের জন্য ওরা তৈরি ছিল। তাই যথেষ্ট। তার মধ্যেই বিপ্লবের কাছাকাছি পৌঁছনোর একটা রাস্তার ছায়া দেখতে পেয়েছিল নির্মল। ওদের লড়াইয়ে তাই অংশ নিতে চেয়েছিল ও। খানিকটা হয়তো নিজের বয়সটাকে ভুলে থাকার ইচ্ছেও কাজ করছিল এর পেছনে।”

    মেসোর চেহারাটা কানাইয়ের চোখে ভাসছিল। ওই ধুতি-পাঞ্জাবি পরা শান্ত নম্র মানুষটাকে ঠিক বিপ্লবী বলে কিছুতেই ভাবতে পারছিল না ও। “তুমি কখনও বোঝাতে চেষ্টা করেছিলে মেসোকে?”

    “করিনি আবার?” নীলিমা বলল। “কিন্তু শুনলে তো! আমাকে বলত, “তুমিও ওই সরকারি লোকেদের মতো হয়ে গেছ, ওদের মতো করে ভাবছ। এই যে সমাজসেবা করে যাচ্ছ এত বছর ধরে, সেজন্যেই তোমার দৃষ্টিভঙ্গি এরকম পালটে গেছে। সেইজন্যেই এরকম সব চিন্তা আসছে তোমার মাথায়। আসল ব্যাপারগুলোই আর চোখে পড়ছে না তোমার।” সারা জীবন ধরে একটু একটু করে গড়ে তোলা ওর কাজকে কেমন এককথায় উড়িয়ে দিয়েছিল নির্মল সে কথা মনে করে একবার চোখ বন্ধ করল নীলিমা। গড়িয়ে পড়া চোখের জল মুছে নিতে মাথাটা ঘুরিয়ে নিল ও। “আমরা দু’জন যেন দুটো ভূতের মতো বাস করছিলাম একটা বাড়িতে। শেষের দিকটায় আমাকে যেন শুধু কষ্ট দিতেই ভাল লাগত ওর। আচ্ছা ভাব, অন্য কী কারণ থাকতে পারে তা ছাড়া এই খাতাটা আমাকে না দিয়ে তোকে দিয়ে যেতে চাওয়ার?”

    “কী বলব বুঝতে পারছি না।” কানাই ভেবেছিল খাতাটা ওকে দিয়ে যাওয়ার কারণ হল ওর সঙ্গেই শুধু বাইরের বধির জগৎটার একটা যোগসূত্র আছে বলে মনে করেছিল মেসো। এক মুহূর্তের জন্যেও ওর মনে হয়নি যে নীলিমার মনে ব্যথা দিতে চেয়েছিল নির্মল। ব্যাপারটা ভেবেই একটু শিউরে উঠল কানাই। বরাবরই মেসোকে একটু খ্যাপাটে মানুষ বলে জানে ও, কিন্তু তার মধ্যে কোনও নিষ্ঠুরতা আছে বলে কখনওই মনে হয়নি। আর নীলিমার প্রতি নিষ্ঠুর হবে নির্মল সে তো ও স্বপ্নেও ভাবেনি কখনও। আর সকলের মতো কানাইও এতদিন জানত যে বেশ ভালই ছিল ওদের দুজনের জীবন; ঠিক রাজযোটক যাকে বলে তা না হলেও, সুখী দম্পতিই ছিল ওরা। এখন ও বুঝতে পারল নির্মল লুসিবাড়ি ছেড়ে বেরোত না বলেই এই ধারণাটা ওদের কোনওদিন বদলায়নি।

    কী কষ্টের মধ্যে মাসিকে এতগুলো বছর কাটাতে হয়েছে ভেবে কী যেন একটা দলা

    পাকিয়ে উঠছিল কানাইয়ের গলার ভেতরে। “শোনো,” দাঁড়িয়ে উঠল কানাই, “আমি এক্ষুনি তোমাকে খাতাটা এনে দিচ্ছি। তুমি রেখে দাও, ফেলে দাও–যা ইচ্ছে করো। ওটা আমার কোনও দরকার নেই।”

    “না, কানাই!” নীলিমা যেন চেঁচিয়ে উঠল। “বোস, বোস।” হাতটা ধরে টেনে ওকে। চেয়ারে বসাল নীলিমা। “কানাই, আমার কথাটা একবার শোন। আমি সব সময় নির্মলের প্রতি আমার কর্তব্য করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। ওর শেষ ইচ্ছের যাতে অসম্মান না হয় সেটা দেখাটাও খুব বড় ব্যাপার আমার কাছে। আমি জানি না কেন নির্মল ওটা তোকে দিয়ে যেতে চেয়েছিল, ওটায় কী আছে তাও জানি না আমি, কিন্তু ওর ইচ্ছাটা আমাকে রাখতেই হবে।”

    চেয়ার থেকে উঠে বিছানায় মাসির পাশে গিয়ে বসল কানাই। ওর একটু অস্বস্তি হচ্ছিল কুসুমের প্রসঙ্গটা তুলতে, কিন্তু আর কোনও উপায় দেখল না ও। “আচ্ছা,” খুব আস্তে বলল কানাই, “তোমার কি মনে হয় কুসুমের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ আছে ব্যাপারটার?”

    নামটা শুনেই যেন একটু কুঁকড়ে গেল নীলিমা। “হ্যাঁ কানাই, এরকম একটা গুজব সে সময় শোনা গিয়েছিল। সেটা অস্বীকার করব না।”

    “কিন্তু মরিচঝাঁপিতে কী করতে গিয়েছিল কুসুম?”

    “কী করে কী ঘটেছিল সে আমি জানি না, কিন্তু সে সময় কুসুম ছিল মরিচঝাঁপিতে।”

    “যে সময়টায় ও ওখানে ছিল তার মধ্যে কুসুমের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তোমার?” কানাই জিজ্ঞেস করল।

    ঘাড় নাড়ল নীলিমা। “হ্যাঁ, একবার মাত্র। দেখা করতে এসেছিল ও আমার সঙ্গে। এই ঘরেই।”

    একদিন সকালবেলা–১৯৭৮ সালে–এসেছিল ও। নীলিমা তখন নিজের টেবিলে বসে কাজ করছে। একজন নার্স এসে বলল কে যেন দেখা করতে এসেছে, বলছে নাকি নীলিমাকে চেনে। কী নাম জিজ্ঞেস করতে বলতে পারল না নার্সটি। “ঠিক আছে,” বলল নীলিমা, “নিয়ে এসো এখানে।” খানিক পরে দরজা খুলে ভেতরে এল একটি কমবয়সি মহিলা, সঙ্গে একটা বছর চার-পাঁচেকের বাচ্চা ছেলে। মহিলার বয়স মনে হল খুব বেশি হলে বছর কুড়ি-বাইশ হবে। কিন্তু সাদা শাড়ি পরা, শাঁখা-সিঁদুর কিছু নেই। অন্য কোথাও হলে দেখেই বোঝা যেত বিধবা, কিন্তু লুসিবাড়িতে সেটা বলা কঠিন।

    চেনা চেনা লাগছিল নীলিমার। মুখটা ততটা নয়, কিন্তু চোখদুটো আর তাকানোর ভঙ্গিটা খুব পরিচিত মনে হল। কিন্তু নামটা ও কিছুতেই মনে করতে পারল না। মেয়েটি এসে প্রণাম করল পা ছুঁয়ে। নীলিমা বলল, “তুমি কে বলো তো মা?”

    মেয়েটি বলল, “আমাকে চিনতে পারছেন না মাসিমা? আমি কুসুম।”

    “কুসুম!” প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ওকে বকতে শুরু করল নীলিমা। “কোথায় ছিলি বল তো এতদিন? কোনও খোঁজ নেই, খবর নেই। কত খুঁজেছি জানিস তোকে আমরা?”

    হেসে ফেলল কুসুম। “কত কী হয়ে গেছে মাসিমা এর মধ্যে। একটা-দুটো চিঠিতে অত কিছু ধরতই না।”

    ও উঠে দাঁড়াতে নীলিমা দেখল পুরোদস্তুর শক্ত সমর্থ ঝকঝকে চোখের মহিলা হয়ে উঠেছে কুসুম। “এই ছেলেটা কে রে, কুসুম?”

    “আমার ছেলে,” জবাব দিল কুসুম। “ওর নাম ফকির–ফকিরচাঁদ মণ্ডল।”

    “আর ওর বাবা?”

    “ওর বাবা মারা গেছে মাসিমা। আমিই এখন ওর সব।”

    নীলিমা দেখে খুশি হল এই অকালবৈধব্য কুসুমের মুখের হাসিটা কেড়ে নিতে পারেনি। “বল এবার, এখানে কেন এসেছিস?”

    তখন কুসুম বলল যে ও মরিচঝাঁপিতে থাকে। ও এসেছে নীলিমাকে বলতে যদি ওখানকার জন্য লুসিবাড়ি থেকে ডাক্তার, ওষুধ কিছু পাঠানো যায়।

    সঙ্গে সঙ্গে সাবধান হয়ে গেল নীলিমা। বলল মেডিকেল টিম পাঠাতে পারলে খুবই খুশি হত ও, কিন্তু সেটা অসম্ভব। সরকার পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে মরিচঝাঁপির জবরদখলিদের উচ্ছেদ করা হবেই। কাজেই ওদের কোনওরকম সাহায্য করতে গেলেই এখন সরকারের কোপে পড়তে হবে। এই হাসপাতাল আর মহিলা সমিতির কথা তো ভাবতে হবে নীলিমাকে। সরকারকে বাদ দিয়ে ও চালাতে পারবে না। বেশি লোকের যাতে মঙ্গল হয় সেভাবেই চলতে হবে নীলিমাকে।

    আধঘণ্টা খানেক পর চলে গেল কুসুম। আর কখনও ওকে দেখেনি নীলিমা।

    “তার পর তা হলে কী ঘটল?” জিজ্ঞেস করল কানাই। “কুসুম কোথায় গেল?”

    “কোথাও যায়নি রে কানাই, ও তো খুন হয়ে গেল তারপর।”

    “খুন?” কানাই জিজ্ঞেস করল। “সে কী? কী করে?”

    “ওই ম্যাসাকারের সময়ই মারা গিয়েছিল ও। মরিচঝাঁপি গণহত্যা।”

    দু’হাত দিয়ে মুখ ঢাকল নীলিমা। “ভীষণ ক্লান্ত লাগছে রে। খানিকটা বিশ্রাম নিলে মনে হয় ভাল লাগবে।”

  • হঠাৎ আলো

    হঠাৎ আলো

    হঠাৎ আলো

    দুপুরের দিকে জল যখন বাড়তে শুরু করল, পিয়া লক্ষ করল আগের মতো অত ঘন ঘন আর দেখা যাচ্ছে না ডলফিনগুলোকে। ডেটাশিটটা এক ঝলক দেখে নিঃসন্দেহ হল ও জোয়ার আসার সাথে সাথে মনে হচ্ছে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে ওরা।

    সকালের দিকটায় পিয়া কাজ করছিল ঝড়ের গতিতে। ওর ধারণা ছিল এটা একটা ভেসে বেড়ানো শুশুকের দল, আপাতত এখানে আছে, কিন্তু যে-কোনও সময়ে চলে যাবে নজরের বাইরে। কিন্তু এতক্ষণ ধরে প্রাণীগুলোর হাবভাব লক্ষ করে বিশেষ কোনও গন্তব্য ওদের আছে বলে তো মনে হচ্ছে না। বরঞ্চ বোধ হচ্ছে শুধু এই জায়গাটুকুতেই ঘোরাঘুরি করে ভাটার সময়টা কাটিয়ে দিতে চাইছিল ওরা। জল যেই বাড়তে শুরু করেছে, এখন আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে এখান থেকে। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না মাথামুণ্ডু, নিজের মনেই বলল পিয়া। এই ডলফিনদের সম্পর্কে ওর যেটুকু জানা আছে এদের ব্যবহার তো একেবারেই খাপ খাচ্ছে না তার সঙ্গে।

    সাধারণত দুটো উপজাতিতে ভাগ করা যায় এই ওর্কায়েলা ডলফিনদের। একটা জাত ভালবাসে সমুদ্র উপকূল অঞ্চলের লোনা জল, আর অন্যটা নদীনালা বা মিষ্টি জলে থাকতে পছন্দ করে। দু’দলের মধ্যে শারীরিক গঠনগত কোনও তফাত নেই, তফাত শুধু বাসস্থান নির্বাচনে। এই দু’জাতের মধ্যে সমুদ্র উপকূলবর্তী ডলফিনদেরই দেখা যায় বেশি। দক্ষিণ এশিয়া এবং উত্তর অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলে বেশ কয়েক হাজার এ ধরনের ডলফিন আছে বলে জানা গেছে। অন্য দিকে মিষ্টি জলের ওর্কায়েলারা সংখ্যায় অনেক কম–ক্রমশ আরও কমে আসছে। এশিয়ার কোনও কোনও অঞ্চলের নদীতে এদের আর কয়েকশো মাত্র অবশিষ্ট আছে। উপকূলীয় প্রজাতির ডলফিনরা সাধারণত বেশিক্ষণ এক জায়গায় থাকে না, সমুদ্রের তীর বরাবর ভেসে ভেসে বেড়ায়। কিন্তু মিঠে জলের প্রজাতির প্রাণীগুলি নিজেদের নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যেই থাকতে পছন্দ করে। খুব বৃষ্টির সময় নদীর জল বেড়ে গেলে মাঝে মাঝে শিকারের পেছন পেছন খানিকটা দূরে কোনও খাল বা নালা, এমনকী ধানক্ষেতের মধ্যে পর্যন্ত চলে আসতে দেখা গেছে এদের। কিন্তু শুখা মরশুমে জল কমে এলে ফের এরা ফিরে যায় সেই নিজেদের নির্দিষ্ট জায়গাতে। অনেক সময় ভূপ্রাকৃতিক কারণে বা নদীর স্রোতের হেরফেরে নদীর নীচে গভীর পুকুরের মতো খাতের সৃষ্টি হয়। সাধারণত ওই পুকুর’-গুলোতে থাকতে পছন্দ করে মিষ্টি জলের ডলফিনরা। কম্বোডিয়াতে কাজ করার সময় নম পেন থেকে লাওস সীমান্ত পর্যন্ত মেকং নদী বরাবর এরকম অনেকগুলি ‘পুকুর’-এর সন্ধান পেয়েছিল পিয়া। তখন দেখেছিল বছরের পর বছর ধরে একই ডলফিন একই নির্দিষ্ট ‘পুকুরে’ বার বার ফিরে আসছে। কিন্তু প্রতি বছরই ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শত শত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ভাটির দিকে চলে যেত ওরা। একবার তো লাওস সীমান্ত অঞ্চলের একটা ডলফিন নম পেনের কাছাকাছি গিয়ে একটা মাছ-ধরা জালে জড়িয়ে মারা পড়ল।

    সুন্দরবনে এসে পিয়া ভেবেছিল এখানে যদি কোনও ওর্কায়েলা দেখতে পায় সেটা নিশ্চয়ই উপকূলীয় প্রজাতির হবে। সেটাই স্বাভাবিক মনে হয়েছিল, কারণ এখানকার নদী-খাড়িগুলির জল যথেষ্ট লোনা। কিন্তু আজকে যে অভিজ্ঞতা হল তার পর তো মনে হচ্ছে ভুল ভেবেছিল ও। এগুলো যদি উপকূলীয় প্রজাতির ডলফিনই হয় তা হলে নদীর মধ্যের এই পুকুরে এরকম দল বেঁধে ঘোরাঘুরি করছে কেন। ওদের স্বভাব তো এরকম নয়–শুধু মিষ্টি জলের ডলফিনরাই এরকম করে। কিন্তু সে ডলফিন তো এখানে এত লোনা জলে থাকার কথা নয়। আর তা ছাড়া নদীর ডলফিনরা এরকম হঠাৎ করে দুপুরবেলা তাদের ‘পুকুর’ ছেড়ে উধাও হয়ে যায় না। পুরো একটা ঋতু তারা সেখানে কাটায়। তা হলে কী ধরনের প্রাণী এগুলো? আর এদের এরকম অদ্ভুত ব্যবহারের মানেটাই বা কী?

    ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা নতুন চিন্তা মাথায় এল পিয়ার। আচ্ছা, এরকম কি হতে পারে যে মেকং-এর ডলফিনরা যেটা বছরে একবার করে, এই সুন্দরবনের শুশুকেরা সেটাই করে প্রতিদিন দু’বার করে? হতেই পারে যে এই ভাটির দেশের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার জন্য এই নতুন উপায় বের করেছে এরা? মেকং ডলফিনদের বার্ষিক জীবনছন্দকে এখানকার প্রাত্যহিক জোয়ার-ভাটার চক্রের সঙ্গে মিলিয়ে এক এক দিনের হিসেবে সংক্ষিপ্ত করে নিয়েছে এই শুশুকগুলো?

    পিয়া বুঝতে পারছিল যদি কোনওভাবে বিষয়টা ও প্রমাণ করতে পারে, তা হলে একটা আশ্চর্য নিটোল নতুন তত্ত্ব খাড়া করা যাবে; স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিশৃঙ্খল অভ্যাসের জগতে সেটা হবে এক বিরল সৌন্দর্যের প্রতীক। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল এই লুপ্তপ্রায় প্রজাতির সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও সে তত্ত্বের বিশাল ভূমিকা থাকবে। এই বিশেষ দহগুলোকে এবং এই ডলফিনদের যাতায়াতের পথগুলোকে যদি চিহ্নিত করা যায় তা হলে সেই অঞ্চলগুলোর ওপর জোর দিয়ে পরবর্তী কালে সংরক্ষণের কাজ করা যাবে। অনেক বেশি কার্যকরী হবে সেই ব্যবস্থা। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সামান্য দু-একটা সূত্র শুধু পাওয়া গেছে। তত্ত্ব দাঁড় করাতে গেলে আরও বহু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে পিয়াকে। যেমন, কী ধরনের শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের ফলে এখানকার জোয়ার-ভাটার চক্রের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পেরেছে এই শুশুকরা? এদের দৈনিক জীবনছন্দটাই সেভাবে বদলে গেছে তাও ঠিক বলা যায় না, কারণ জোয়ার-ভাটার সময় এখানে প্রতিদিনই পালটে যায়। বর্ষার সময় যখন নদীতে মিষ্টি জলের পরিমাণ বেড়ে যায়, তখনই বা কী হয়? সে সময় তো জলে নুনের মাত্রা অন্য সময়ের মতো থাকে না। এই দৈনিক পরিযাণ চক্র কি তা হলে দীর্ঘতর কোনও ঋতুছন্দের মাত্রার ওপর নতুন খোদকারি?

    অনেক দিন আগে পড়া একটা স্টাডির কথা মনে পড়ল পিয়ার। তাতে দেখা গিয়েছিল গোটা ইয়োরোপ মহাদেশে যত প্রজাতির মাছ আছে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রজাতির মাছ দেখতে পাওয়া যায় এই সুন্দরবনে। সেখানে বলা হয়েছিল এত বিচিত্র জাতের জলজ প্রাণী এখানে পাওয়া যাওয়ার কারণ হল এখানকার জলের প্রকৃতির বিভিন্নতা। গাঙ্গেয় বদ্বীপের এই বিশেষ অঞ্চলটিতে নদী এবং সাগরের জল সর্বত্র সমান ভাবে এসে মেশে না। বরং বলা যায় সুন্দরবনের নদী-খাড়িতে এই দুই জলস্রোত পরস্পরের মধ্যে ঢুকে আসে–কোনও কোনও জায়গায় মিষ্টি জলের স্রোত নদী বা খাঁড়ির একেবারে নীচের মাটি বরাবর বয়ে চলে; ফলে হাজারো বৈচিত্র্যের সৃষ্টি হয় তোনাভাব এবং পলির মাত্রায়, তৈরি হয় শত শত বিভিন্ন জৈবক্ষেত্র। এই অণুজীবমণ্ডলগুলি তাদের নিজের নিজের গতিতে কতকটা বেলুনের মতো ভেসে বেড়ায় জলের মধ্যে। অবিরাম তারা জায়গা বদলায়, কখনও চলে যায় মাঝনদীতে, আবার ফিরে আসে তীরের কাছাকাছি। কোনও কোনও সময় সমুদ্রের মধ্যেও অনেকদূর পর্যন্ত এগুলো ভেসে চলে যায়, আবার কখনও নদী-খাঁড়ি বেয়ে উজান ঠেলে চলে আসে অনেক ভেতরে। এই প্রতিটি বেলুন হল একেকটি ভাসমান জীবগোলক, তাতে ঠাসা থাকে তার নিজস্ব প্রাণী ও উদ্ভিদজগৎ। আর জলের মধ্যে দিয়ে যখন এরা ভেসে চলে, পেছন পেছন সারে সারে চলতে থাকে শিকারি প্রাণীর দল। এই বিভিন্ন পরিবেশমণ্ডলের অস্তিত্বের জন্যই বিশালকায় কুমির থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মাছ পর্যন্ত বিভিন্ন মাপের জলজ প্রাণীদের নিয়ে বৈচিত্র্যময় এক বিশাল জীবজগতের সৃষ্টি হয়েছে এই সুন্দরবনে।

    এখন এই নৌকোর ওপর বসে এই সমস্ত কিছুর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ আর সম্পর্কের কথা ভাবতে ভাবতে মনের মধ্যে একের পর এক এত সব সম্ভাবনার দরজা খুলে যেতে লাগল যে মাথা ধাঁধিয়ে গেল পিয়ার; চোখ বন্ধ করে ফেলল ও হাতের সামনে অজস্র সূত্র, কত কিছু করতে হবে এখন, বহু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে; কাজ চালানোর মতো শিখে নিতে হবে অনেকগুলি বিষয়–হাইড্রলিক্স, সেডিমেন্টেশন জিওলজি, ওয়াটার কেমিস্ট্রি, ক্লাইমেটোলজি; একটা ঋতু-ভিত্তিক গণনা করতে হবে এখানকার ডলফিনদের, ওদের যাতায়াতের পথের ম্যাপ তৈরি করতে হবে, গ্রান্টের জন্য কাঠখড় পোড়াতে হবে, নানা রকম পারমিট আর পারমিশনের জন্য দরখাস্ত করতে হবে; কোনও কূল কিনারা নেই কাজের। ওকে সুন্দরবনে পাঠানো হয়েছে মাত্র দু’সপ্তাহ সময় দিয়ে, ছোট একটা সার্ভে করার জন্য। বাজেটও খুবই কম। কিন্তু যেসব প্রশ্ন এখন মাথায় ঘুরছে তার উত্তর খুঁজে বের করা তো এক দু’সপ্তাহের কাজ নয়, বছরের পর বছর সময় দিতে হবে, কয়েক দশক লাগলেও আশ্চর্য হবে না পিয়া। নদীনালায় ঘুরে ঘুরে ফিল্ড রিসার্চই করতে হতে পারে পনেরো-কুড়ি বছর ধরে। এই প্রজেক্ট শেষ করতে গেলে সে সময়টা অন্তত দিতে হবে ওকে। এমনকী, বলা যায় না, হয়তো সারা জীবন ধরেও কাজ করে যেতে হতে পারে।

    যে সমস্ত ফিল্ড বায়োলজিস্টরা স্মরণীয় কাজ করার মতো বিষয় খুঁজে পেয়েছেন যেমন কিনিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে কাজ করেছেন জেন গুডল, কুইন্সল্যান্ডের জলাভূমিতে কাজ করেছেন হেলেন মার্শ–কত সময় তাদের ঈর্ষা করেছে পিয়া। কিন্তু খুব একটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই বলে ওর নিজের কপালেও একদিন এরকম কিছু জুটে যেতে পারে বলে কখনও ভাবেনি। তা সত্ত্বেও এই সুযোগ এসে গেল হাতের সামনে। এবং এরকম অকল্পনীয়ভাবে–যখন মনে হচ্ছিল কিছুই ঠিকমতো হচ্ছে না, কেবলই একের পর এক বাধা আসছে কাজে। ছোটবেলায় যেসব আশ্চর্য আবিষ্কারের গল্প পড়ে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল, সেই গল্পগুলি মনে পড়ল পিয়ার। কেমন অদ্ভুত, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই কিন্তু অনুপ্রেরণা এসেছিল সাধারণ সব দৈনন্দিন ঘটনা থেকে যেমন আর্কিমিডিস আর তার বাথটাব, নিউটন আর সেই আপেলগাছ। অবশ্য সেসব আবিষ্কারের সাথে ওর এই কাজকে কোনওভাবেই তুলনা করা যায় না, কোনওরকম কোনও মিলও নেই কিন্তু অন্তত ও এখন বুঝতে পারছে কীভাবে হয় ব্যাপারটা, কেমন করে একটা আশ্চর্য ভাবনার ঝলক হঠাৎ মাথায় এসে যায়, আর এক মুহূর্তে ঠিক হয়ে যায় এই কাজটাই তাকে করে যেতে হবে বাকি জীবন ধরে।

    বড় বৈজ্ঞানিক হবে এরকম উচ্চাশা পিয়ার কোনওদিনই ছিল না। যদিও জলচর প্রাণীদের ও ভালবাসে এবং তাদের বিষয়ে জানার আগ্রহও আছে, কিন্তু মনে মনে পিয়া ভাল করেই জানে যে শুধু সেইজন্যই ও এ কাজ করতে এসেছে তা ঠিক নয়। বাকি অনেকের মতোই ওইসব প্রাণীদের প্রতি ভালবাসা ছাড়াও ফিল্ড বায়োলজিতে ওর আকর্ষণের আরেকটা কারণ এই কাজের ইন্টেলেকচুয়াল দিক–এখানে ও নিজের মতো করে কাজ করতে পারবে, রোজ কোনও নির্দিষ্ট অফিসে হাজিরা দিতে হবে না, চেনাজানা জগতের পরিধির বাইরে বাইরে কাজ করা যাবে, এবং পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধ অথচ আলগা সম্পর্কের একটা নিজস্ব সমাজও থাকবে। এখন এই বিশাল কাজ যদি ও হাতে নেয়, সেই ব্যাপারগুলি হয়তো খুব একটা কিছু পালটাবে না, কারণ আপাতত বেশিরভাগ সময়টাই কাটবে সেই দরখাস্ত লেখা, গ্রান্ট জোগাড়ের চেষ্টা আর ওই রকম সব গতানুগতিক কাজে। আর শেষ পর্যন্ত যাই হোক না কেন এই গবেষণার ফলে বিজ্ঞান জগতে যে মারাত্মক কিছু তোলপাড় হয়ে যাবে তা তো নয়। কিন্তু এসব কিছু সত্ত্বেও, এভাবে নিজের ভবিষ্যৎ ঠিক করে নেওয়া বা আগামী বছরগুলিতে কী করবে সে চিন্তার দায় থেকে মুক্তি পাওয়ার মধ্যে যে কী তৃপ্তি তা কি পিয়া আগে কখনও ভাবতে পেরেছিল? আর বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন কিছু না ঘটাতে পারলেও, এটা তো ঠিক যে শেষ পর্যন্ত সফল যদি হয় পিয়া–এমনকী আংশিক ভাবেও যদি হয় তা হলেও বর্ণনামূলক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক চমৎকার অবদান হিসেবে থেকে যাবে ওর কাজ। তাই যথেষ্ট; বেঁচে থাকার কৈফিয়ত হিসেবে অন্য কিছুর আর দরকার নেই পিয়ার। অন্তত এই পৃথিবীতে থাকার সময়টুকু ও বাজে খরচ করেছে সে অপবাদ তো কেউ দিতে পারবে না।

  • ময়না

    ময়না

    ময়না

    কানাই নীলিমার দরজায় গিয়ে আবার যখন কড়া নাড়ল তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে বিছানা থেকে উঠে মাসি জামাকাপড় পালটে নিয়েছে দেখে ভাল লাগল ওর।

    “আরে কানাই,” নীলিমা ডাকল হাসিমুখে, “আয় আয়, ভেতরে আয়।”

    সকালের মন খারাপের এতটুকুও চিহ্ন নেই আর মাসির মুখে। কানাই আন্দাজ করল নিশ্চয়ই এতক্ষণ অফিসে কাজকর্ম করে মুড ভাল হয়ে গেছে। মেসো মারা যাওয়ার ধাক্কা, এতগুলো বছরের একাকিত্ব তা হলে এভাবেই ভুলে থেকেছে মাসি–কাজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রেখে।

    “ময়নাকে খবর দিয়েছি, এক্ষুনি এসে যাবে ও,” বলল নীলিমা, “তোকে নিয়ে একবার হাসপাতালটা ঘুরিয়ে দেখাতে বলেছি ওকে।”

    “ময়না করেটা কী এখানে?” কানাই জিজ্ঞেস করল।

    “ও এখানকার ট্রেনি,” নীলিমা জবাব দিল। “অনেক বছর ধরে এই ট্রাস্টে কাজ করছে, সেই আমরা যখন ‘বেয়ারফুট নার্স প্রোগ্রাম’ চালু করেছিলাম তখন থেকে। ওই প্রোজেক্টটা নেওয়া হয়েছিল এখানকার সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনোর জন্য, দূরদূরান্তের গ্রামের লোকেরাও যাতে কিছু অন্তত চিকিৎসার সুবিধা পায় সেই জন্য। কয়েকজন নার্সকে আমরা সাধারণ কিছু ট্রেনিং দিয়ে দিয়েছিলাম–সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি, নিউট্রিশন, কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা, প্রসবের কাজ, আরও টুকিটাকি দু-একটা–যেমন কেউ জলে ডুবলে কী করতে হবে, এইসব। জলে ডোবার ঘটনা তো আকছার লেগেই আছে এখানে। তারপর ওই নার্সরা যার যার গ্রামে ফিরে গিয়ে নিজেরা ট্রেনিং ক্লাস চালায়।”

    “কিন্তু তারপর তো ময়নার পদোন্নতি হয়েছে মনে হয়?”

    “তা হয়েছে,” নীলিমা বলল। “এখন ও আর বেয়ারফুট নার্স নয়। হাসপাতালে পুরোদস্তুর নার্স হওয়ার জন্য ট্রেনিং নিচ্ছে। বছর কয়েক আগেই দরখাস্ত করেছিল, আর ওর রেকর্ডও বেশ ভাল ছিল, তাই হাসপাতালে নিয়ে নেওয়া হল ওকে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল এতদিন ও কাজ করছে আমাদের সঙ্গে, কিন্তু ও যে কে সেটাই জানতাম না আমরা মানে ও যে আমাদের কুসুমের ছেলের বউ সেটাই জানা যায়নি। একদিন ঘটনাচক্রে আমি জানতে পারলাম ব্যাপারটা।”

    “কী করে?”

    “আমি একদিন বাজারে গেছি, বুঝলি তো,” নীলিমা বলল, “হঠাৎ দেখি সেখানে ময়না, একটা ছোকরার সঙ্গে কথা বলছে; সঙ্গে একটা বাচ্চা। এখন, ফকিরকে এর আগে আমি যখন দেখেছি তখন তো ও বছর পাঁচেকের একটা বাচ্চা ছেলে। কাজেই বাজারে দেখে ওকে আমি চিনতে পারিনি। তো, আমি ময়নাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই ছোঁড়াটা তোর বর নাকি রে? ও বলে, ‘হা মাসিমা, আমার বর। জিজ্ঞেস করেছি, নাম কী রে ওর?’ বলে, ফকির মণ্ডল। এমনিতে নামটা খুবই কমন, কিন্তু আমি ঠিক বুঝতে পেরে গেছি। বললাম, এ কী রে? তুই কে বল তো? আমাদের কুসুমের ছেলে ফকির নাকি তুই?’ তো সে বলে ‘া।”

    “যাক, তবু ভাল, কানাই বলল। “ফকির অন্তত নিরাপদে লুসিবাড়িতেই আছে।”

    “ভাল হলে তো ভালই ছিল,” বলল নীলিমা, “কিন্তু খুব একটা ভাল নেই রে ওরা।”

    “তাই? কেন?”

    নীলিমা বলল, “ময়না মেয়েটা বেশ বুদ্ধিমতী, উচ্চাশাও আছে। বাড়ির দিক থেকে কোনও উৎসাহ ছাড়াই নিজের চেষ্টায় খানিকটা লেখাপড়া শিখেছে। ওদের গ্রামে কোনও স্কুল ছিল না, বেশ কয়েক কিলোমিটার হেঁটে আরেকটা গ্রামে গিয়ে রোজ স্কুল করত। ফাইনাল পরীক্ষাতেও ভালই করেছিল। তারপর ঠিক করল কলেজে ভর্তি হবে–ক্যানিং কি অন্য কোথাও। নিজে নিজেই সব ব্যবস্থা করে ফেলেছিল, এমনকী শিডিউলড কাস্ট সার্টিফিকেটও জোগাড় করেছিল, কিন্তু বাড়ির লোকেরা কিছুতেই যেতে দেবে না। ওকে আটকানোর জন্য বিয়ের ব্যবস্থা করে ফেলল। পাত্র ঠিক করল ফকিরকে। ছেলে হিসেবে ফকির এমনিতে সব দিক থেকেই ভাল, কিন্তু লেখাপড়া কিচ্ছু জানে না, নদী থেকে কাঁকড়া ধরে সংসার চালায়।

    “তবে একটা ভাল ব্যাপার হল ময়না কিন্তু হাল ছাড়েনি,” বলল নীলিমা। “নার্স হবে বলে এমনই মনস্থির করে ফেলেছে ও, যে ট্রেনিং-এর সময়টা লুসিবাড়িতে থাকলে সুবিধে হবে বলে ফকিরকে পর্যন্ত নিয়ে চলে এসেছে এখানে।”

    “ফকির খুশি তাতে?”

    “মনে তো হয় না,” নীলিমা বলল। “মাঝে মাঝেই তো শুনি গণ্ডগোল হচ্ছে সেই জন্যই বোধহয় থেকে থেকেই ও নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। খুঁটিনাটি সব কিছু জানি না, মেয়েগুলো তো সব বলেও না আমায়। কিন্তু এটা জানি খুব ঝামেলার মধ্যে কাটছে ময়নার। আজকেই তো সকালে ভীষণ মনমরা দেখলাম ওকে।”

    “তার মানে আজকে এসেছে ও কাজে?”

    “হ্যাঁ, এসেছে তো,” নীলিমা বলল। “যে-কোনও সময় এসে যাবে এখানে। আমিই ওকে পাঠিয়েছি একবার হাসপাতালে, কয়েকটা ওষুধ এনে দেওয়ার জন্যে।

    “কিন্তু ফকির কি আজকেও বাড়ি ফেরেনি?”

    “না,” বলল নীলিমা, “আর চিন্তায় চিন্তায় বেচারি ময়নার মাথা খারাপ। সেজন্যেই ওকে বলেছি তোকে নিয়ে হাসপাতালটা দেখাতে, খানিকক্ষণ অন্তত যাতে অন্য কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকে।”

    দরজায় খটখট করে আওয়াজ হল একটা। গলাটা একটু তুলে সাড়া দিল নীলিমা, “ময়না নাকি রে?”

    “হ্যাঁ মাসিমা।”

    “ভেতরে আয়।”

    কানাই ফিরে দেখল মাথায় ঘোমটা দেওয়া অল্পবয়সি একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। খোলা দরজা দিয়ে বাইরের উজ্জ্বল আলো উপছে ঢুকে আসছে ঘরে, কিন্তু সেদিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে বলে ছায়া পড়েছে মেয়েটির মুখে, কানের দুলদুটো আর নথটা শুধু ঝিকমিক করছে; ওর ছায়া ছায়া ডিমাকৃতি মুখে নক্ষত্রপুঞ্জের তিনটে তারার মতো জ্বলজ্বল করছে সেগুলো।

    “ময়না, এ হল কানাইবাবু,” আলাপ করিয়ে দিল নীলিমা, “আমার বোনপো।” ঘরের ভেতর ঢুকে এল মেয়েটি। বলল, “নমস্কার।”

    “নমস্কার।” এখন আলো পড়েছে ময়নার মুখে, কাছে থেকে দেখেই কানাই লক্ষ করল একটু ধেবড়ে গেছে ওর চোখের কাজল। গায়ের রং মসৃণ কালো, কুচকুচে কালো চুল তেলে

    মা টানা ভুরু, ‘পষ্ট চোয়াল; এক নজর দেখেই কানাই বলতে পারে সারা দুনিয়া ওর বিরুদ্ধে গেলেও নিজের জেদ রাখতে এ মেয়ে পিছপা হবে না। তবুও চোখের লালচে ভাব দেখে বোঝা গেল একটু আগেও কাঁদছিল ময়না।

    “শোন কানাই,” ইংরেজিতে বলল নীলিমা, যাতে ময়না বুঝতে না পারে, “একটু সাবধান। মেয়েটার মন মেজাজ কিন্তু মনে হয় ভাল নেই।”

    “ঠিক আছে মাসি,” বলল কানাই।

    “রাইটি-ও, দেন,”নীলিমা বলল, “আই সাপোজ ইউ হ্যাড বেটার বি গোয়িং।”

    “রাইটি-ও!” মাসিকে ইংরেজি বলতে এর আগে বিশেষ শোনেনি কানাই; এরকম স্পষ্ট সুন্দর উচ্চারণ শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল ও। এত বছর এই ভাটির দেশে থেকে নীলিমার বাংলাটার থেকে শহুরে ছাপ মুছে এসেছে, প্রায় এখানকার লোকেদের ভাষার মতোই হয়ে গেছে সেটা। কিন্তু ইংরেজিটা বোধহয় বিশেষ ব্যবহার হয় না বলেই রজনের স্ফটিকের মধ্যে ফার্নের পাতার মতো অক্ষত রয়ে গেছে। সময়ের স্পর্শ তাতে পড়েনি, রোজকার ব্যবহারের মলিনতা ছুঁতে পারেনি ব্রিটিশ আমলের স্কুলে শেখা সে ইংরেজিকে। কানাইয়ের মনে হল যেন হারিয়ে যাওয়া কোনও ভাষা শুনছে ও, ফুরিয়ে যাওয়া সেই ঔপনিবেশিক যুগের উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজের মুখের ভাষা, যে ভাষা বলা হত সেকালের ইলোকিউশন স্কুল আর ডিবেটিং সোসাইটিতে শেখা স্পষ্ট দ্বিধাহীন উচ্চারণে।

    হাসপাতালের রাস্তায় যেতে যেতে কানাই ময়নাকে জিজ্ঞেস করল, “মাসিমা কি আপনাকে বলেছেন যে আমি আপনার শাশুড়িকে চিনতাম?”

    “না তো!” অবাক হয়ে কানাইয়ের দিকে তাকাল ময়না। “কিচ্ছু বলেননি তো মাসিমা। সত্যি চিনতেন?”

    “হ্যাঁ,” কানাই বলল। “চিনতাম। অনেককাল আগে যদিও। ওর বয়েস তখন খুব বেশি হলে পনেরো-টনেরো হবে, আর আমি আরও ছোট।”

    “কেমন ছিলেন উনি?”

    “আমার যেটা মনে আছে সেটা হল ওর তেজ,” বলল কানাই। “ওইটুকু বয়েসেই খুব তেজি ছিল ও।”

    মাথা নাড়ল ময়না। “লোকে বলে নাকি একটা ঝড়ের মতো ছিলেন উনি।”

    “হ্যাঁ,” বলল কানাই। “সেরকমও বলা যেতে পারে। অবশ্য আপনি তো বোধহয় দেখেননি ওকে, তাই না?”

    “না,” বলল ময়না। “উনি যখন মারা যান তখন তো আমি ছোট বাচ্চা। কিন্তু অনেক গল্প শুনেছি ওনার সম্পর্কে।”

    “আপনার স্বামী কিছু বলেন না ওর কথা?”

    কুসুমের কথা বলতে বলতে মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল ময়নার, কিন্তু ফকিরের প্রসঙ্গ উঠতেই আবার যেন মেঘ জমল সেখানে। “না,” ও বলল। “ও তো কখনও বলেই না ওনার কথা। আমার মনে হয় খুব একটা মনেও নেই ওর। উনি মারা যাওয়ার সময় তো ও খুবই ছোট ছিল–” কাধটা একটু ঝাঁকিয়ে কথাটা শেষ করে দিল ময়না। এ প্রসঙ্গটা আর না-টানাই ভাল মনে হল কানাইয়ের।

    হাসপাতালের কাছাকাছি চলে এসেছিল ওরা। বাড়িটা কাছ থেকে দেখে নতুন করে বুঝতে পারল কানাই কী বিশাল কর্মযজ্ঞের পৌরোহিত্য করছে এখানে নীলিমা। এমনিতে যে বাড়িটা বিরাট বড় বা দেখতে খুব চমৎকার তা নয়–সাধারণ একটা দোতলা বাড়ি, চৌকো টাইপের জুতোর বাক্সর মতো দেখতে। ছাই-রঙা বাইরের দেওয়াল, আর সাদা বর্ডার টানা রয়েছে জানালা এবং লম্বা বারান্দার রেলিংগুলো বরাবর। সামনে একটা বাগান, তাতে বেশিরভাগই গাঁদাফুলের গাছ। কিন্তু সাধারণ হলেও, এই ভাটির দেশের কাদা আর ছাতলার মধ্যে ঝকঝকে তকতকে এই বাড়িটাকেই আকাশছোঁয়া বহুতলের মতো বলে মনে হচ্ছে। কানাইয়ের মনে হল শুধু এই বাড়িটা দেখেই অনেকটা ভরসা পাবে রোগীরা।

    বাড়িটার বহিরঙ্গের সে প্রভাব ময়নার ওপরেও পড়েছে দেখা গেল। কানাইকে নিয়ে হাসপাতালে ঢুকতে ঢুকতেই একটা স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ করা গেল ওর হাবেভাবে। প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হল আরও ঋজু, আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে ওর চলাফেরার ভঙ্গি যেন বাড়িটার সংস্পর্শে আসতে-না-আসতেই সংসারভারগ্রস্ত এক স্ত্রী ও মায়ের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসছে চটপটে পেশাদার একটা নতুন মানুষ।

    হাসপাতালের গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে একটা দরজার সামনে কানাইকে নিয়ে এল ময়না। “এটা আমাদের মেটারনিটি ওয়ার্ড,” কথাটা বলার সময় গর্বে গলাটা যেন বুজে এল ওর।

    এমনিতে হাসপাতাল-টাসপাতালের ব্যাপারে আদৌ কোনও আগ্রহ নেই কানাইয়ের। কিন্তু এই জায়গাটা ব্যতিক্রম: প্রতিটি ওয়ার্ড এত টিপটপ, দেখে অবাক না হয়ে পারল না ও। পুরো হাসপাতালটা তকতকে পরিষ্কার, আর যদিও মোটে চল্লিশটা বেড, কিন্তু হাসপাতালের আয়তনের তুলনায় ব্যবস্থাদির কোনও খামতি নেই। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সব পৃষ্ঠপোষকদের পয়সায় কেনা, বলল ময়না। তাদের মধ্যে দেশের লোকও আছে কিছু, আবার বিদেশিও অনেকে আছে। প্যাথোলজি ল্যাব আছে, একটা এক্স-রে রুম আছে, এমনকী একটা ডায়ালিসিস মেশিন পর্যন্ত আছে। হাসপাতালের ওপরের তলায় দু’জন। রেসিডেন্ট ডাক্তার থাকেন। তাদের মধ্যে একজন তো প্রায় দশ বছর আছেন এই লুসিবাড়িতে। অন্যজন ডাক্তারি পাশ করার পর ভেলোরের নামকরা হাসপাতালে প্রশিক্ষণ শেষ করে নতুন এসেছেন এখানে। ময়না বলল দু’জনকেই আশেপাশের সমস্ত দ্বীপের লোকজন খুব শ্রদ্ধা করে আর ভালবাসে। যে পেশেন্টই আসে হাসপাতালে, ডাক্তারবাবুদের জন্য হাতে করে কিছু না কিছু একটা নিয়ে আসে–কখনও একটা নারকেল, বা কিছু কেওড়া ফল, না হলে পাতায় মুড়ে একটা মাছ, কখনও বা দু-একটা মুরগি।

    ময়না বলল এত নামডাক হয়ে গেছে এখন হাসপাতালটার যে দূরদূরান্ত থেকে রোগীরা এখানে দেখাতে আসে। এমনও অনেকে আসে এই লুসিবাড়ি হাসপাতালে যাদের পক্ষে ক্যানিং, এমন কী কলকাতা পর্যন্ত চলে যাওয়া এর তুলনায় সহজ হত। কারণ এখানকার সবাই জানে যে এ হাসপাতালে সামান্য খরচে যে যত্ন পাওয়া যায় সেরকম যত্ন অনেক জায়গায় অনেক পয়সা দিয়েও পাওয়া যায় না। আবার এত মানুষ এখানে যাতায়াত করে বলে এলাকার বেশ কিছু লোকের কিছু জীবিকার সংস্থান হয়েছে। গত কয়েক বছরে কতগুলো সাইকেল ভ্যানের স্ট্যান্ড হয়েছে। নতুন চায়ের দোকান আর গেস্ট হাউসগুলো তো রমরম করে চলছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখন লুসিবাড়ির বেশিরভাগ লোকেরই জীবিকার উৎস এই হাসপাতাল।

    দোতলায় উঠে ময়না দেখাল এ হাসপাতালে নির্মলের একমাত্র অবদান বিশাল একটা ওয়ার্ড, সাইক্লোন ঠেকানোর জন্য বিশেষভাবে বানানো। জানালাগুলিতে মোটা কাঠের পাল্লা দেওয়া, আর দরজাগুলো সব লোহার ফ্রেমে বাঁধানেনা। এমনিতে ট্রাস্টের কাজে কর্মে বিশেষ নাক গলাত না নির্মল, কিন্তু এই হাসপাতাল যখন তৈরি হয় তখন দেখতে এসেছিল যে সাইক্লোন ঠেকানোর ব্যবস্থা সব ঠিকমতো নেওয়া হয়েছে কিনা। সেরকম কিছু করা হয়নি শুনেই একেবারে আঁতকে উঠল–ভাটির দেশের বিধ্বংসী সব সাইক্লোনের ইতিহাস সবাই ভুলে গেছে নাকি? সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি লুসিবাড়িতে কখনও হবে না নাকি? নির্মলের নিবন্ধাতিশয্যেই শেষে তৈরি হল এই ওয়ার্ড।

    দোতলার বারান্দা থেকে হাসপাতালের চারদিকের দোকানঘর আর ছোট ছোট কুঁড়েগুলো কানাইকে দেখাল ময়না। “ওদিকে দেখুন কানাইবাবু, দোকানগুলো দেখুন হাসপাতালের আশেপাশে। কত্তগুলো হয়েছে দেখেছেন?”

    হাসপাতালটা নিয়ে ময়নার গর্ব দেখে বেশ ভাল লাগল কানাইয়ের, প্রায় অভিভূত হয়ে গেল ও। জিজ্ঞেস করল, “আপনি ফকিরকে কখনও নিয়ে এসেছেন এখানে?”

    ছোট্ট করে একবার মাথা নাড়ল ময়না। “না।”

    “কেন?”

    মুখটা একটু বাঁকিয়ে বলল, “ও আসতে চায় না–বলে কেমন যেন লাগে ওর এখানে।”

    “এখানে মানে–এই হাসপাতালে, না লুসিবাড়িতে?”

    “দুটোই,” বলল ময়না। “এখানে ওর ভাল লাগে না।”

    “কেন বলুন তো?”

    “গাঁয়ে যেমন ছিল তার থেকে সব আলাদারকম এখানে।”

    “কী রকম আলাদা?”

    কাঁধ ঝাঁকাল ময়না। “ওখানে ও সব সময় টুটুলকে নিয়ে থাকত–টুটুল আমাদের ছেলে,” বলল ও। “ট্রাস্টের কাজের জন্যে আমাকে অনেকটা সময় বাইরে বাইরে থাকতে হত তো, আর ও সারাদিন টুটুলকে নিয়ে নদীতে নদীতে ঘুরত। কিন্তু এখানে আসার পর আমাকে সেটা বন্ধ করে দিতে হল।”

    “তাই? কেন বন্ধ করতে হল?”

    “কারণ টুটুলকে তো স্কুলে যেতে হবে, না কি?” একটু যেন ঝঝ ময়নার গলায়। “ও-ও বাপের মতো কঁকড়া ধরে বেড়াবে সেটা আমি চাই না। ওতে কোনও ভবিষ্যৎ আছে নাকি?”

    “কিন্তু ফকির তো তাই করে।”

    “করে তো, কিন্তু কতদিন আর করবে বলুন?” বলল ময়না। “মাসিমা তো বলেন নতুন যেসব জাল-টাল লোকে ব্যবহার করছে তাতে পনেরো বছরের মধ্যে নদীতে মাছ আর কিছু থাকবে না।”

    “কী নতুন জাল?”

    “ওই যে সব নাইলন জাল চালু হয়েছে এখন। চিংড়ির মীন–মানে বাগদা চিংড়ির পোনা–ধরে ওতে করে। জালের ফুটোগুলো এত ছোট যে তাতে মীনের সঙ্গে অন্য সব মাছের ডিমও উঠে আসে। মাসিমা একবার চেষ্টা করেছিলেন নাইলন জাল বন্ধ করতে, কিন্তু কিচ্ছু করা গেল না।”

    “কেন?”

    “কেন আবার? চিংড়ির ব্যবসায় তো প্রচুর লাভ। আর সব নেতাদের ওরা পয়সা খাইয়ে রাখে। ওদের আর কী? নেতাদেরও কিছু যায় আসে না। মরবে তো আমাদের মতো লোকেরাই। আমাদেরই তাই ভাবতে হবে কী করা যায়। সেইজন্যেই তো আমি চাই টুটুলটা যাতে ভালভাবে লেখাপড়া শেখে। নইলে কী হবে ওর বলুন তো?” এক নিশ্বাসে এতগুলো কথা বলে গেল ময়না।

    “আপনি যদি ভাল করে ফকিরকে বোঝান ও নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে,” কানাই বলল।

    “সে চেষ্টা কি করিনি ভেবেছেন?” গলার আওয়াজ চড়ে গেল ময়নার। “কতবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু কী বুঝবে ও বলুন? লেখাপড়া জানে না তো এসব জিনিস ওকে বোঝানো অসম্ভব।”

    ওর কথা শুনতে শুনতে কানাইয়ের মনে হচ্ছিল এই পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও নিজের জগটুকু সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা আছে ময়নার। আর কী করে সেখানে চলতে হবে সেটাও ও ভাল করেই জানে। অবাক লাগছিল কানাইয়ের, শেষবার যখন ও এই ভাটির দেশে এসেছিল তারপর থেকে কত পালটে গেছে সবকিছু। বাইরের পরিবর্তনই শুধু নয়, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সবকিছুই অনেক বদলে গেছে। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই হাসপাতালটা তার সুযোগ সুবিধা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সবকিছুই। এইসব পরিবর্তনের মধ্যে ময়নার মতো প্রতিভাময়ী একটা মেয়ের স্বপ্ন ওরকম একজন স্বামীর জন্য অপূর্ণ থেকে যাবে ভাবতেও খারাপ লাগল কানাইয়ের।

    “দেখুন।”

    একটা অপারেটিং থিয়েটারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ওরা। হঠাৎ ময়না গিয়ে দরজার কাঁচ লাগানো গোল ফুটোটার মধ্যে উঁকি দিয়ে ভেতরে দেখতে লাগল। দেখছে তো দেখছেই। কানাই ভাবল ভেতরে নিশ্চয়ই কোনও অপারেশন চলছে। কিন্তু অবশেষে ময়না সরে এসে ওকে যখন দেখতে দিল, কানাই দেখল ঘরটা খালি, শুধু যন্ত্রপাতিগুলো রয়েছে।

    “কী দেখছিলেন এতক্ষণ?” ও জিজ্ঞেস করল ময়নাকে।

    “এই নতুন যন্ত্রগুলো। আমার খুব ভাল লাগে ওগুলো দেখতে,” একটু হেসে বলল ময়না। “আমার কোর্সটা শেষ হয়ে গেলে আমিও হয়তো একদিন কাজ করব ওখানে।”

    “নিশ্চয়ই করবেন।”

    ঠোঁটদুটো একটু কোঁচকাল ময়না। “ভগবান জানে।”

    ওর গলা শুনে স্পষ্ট বুঝতে পারল কানাই, যে এই নার্স হওয়ার স্বপ্ন ওর কোনও সাধারণ শখের ব্যাপার নয়–এ স্বপ্নের উৎস যে আকাঙ্ক্ষায়, সম্পূর্ণতায় বা ঋদ্ধিতে মনের মধ্যে লালিত তার রূপ কোনও কবিতা বা উপন্যাসের তুলনায় কোনও অংশে কম নয়। নিজেকে আরও পরিশীলিত করে সামনের বিরাট পৃথিবীর দিকে হাত বাড়ানোর দুর্দম ইচ্ছার চেহারাটা আজ ফের ধরা দিল কানাইয়ের কাছে। ময়নার কথা শুনতে শুনতে ও যেন হারিয়ে যাওয়া নিজের ছবি নতুন করে খুঁজে পেল।

    দরজার গায়ের গোল কাঁচটার মধ্যে নিজের মুখের ছায়ার পাশে ময়নার মুখটা দেখতে পেল কানাই। কাঁচের গায়ে টোকা দিয়ে অন্ধকার অপারেটিং থিয়েটারটার দিকে দেখাল ময়না। “এই ঘরটাতেই আমার টুটুল হয়েছিল,” ও বলল। “মাসিমাই আমার ভর্তির সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। জানেন, আমার আগে আমাদের বাড়ির কোনও মেয়ে বাচ্চা হওয়ার সময় হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। টুটুল যখন হয়, তখন তিনজন নার্স ছিল এখানে। আমাকে দেওয়ার আগে ওরা সবাই একবার করে কোলে নিল ওকে। আমার শুধু মনে হচ্ছিল ওদের কী ভাগ্য; খুব ইচ্ছে করছিল তখন ওদের মতো হতে।”

    স্পষ্ট পড়া যাচ্ছিল ময়নার মুখে আঁকা উচ্চাশার ছবি। সেদিকে তাকিয়ে অদ্ভুত একটা মমতায় ভরে গেল কানাইয়ের মন: আমাদের একান্ত নিজস্ব সব আকাঙ্ক্ষা–যেগুলো হয়তো সারাজীবন ধরে শুধু আড়াল করার চেষ্টা করে যাই আমরা–হঠাৎ তার ছায়া যদি ছেলেবেলার পুরনো কোনও ছবিতে চোখে পড়ে তা হলে যেমন মনে হয়, খানিকটা সেইরকম একটা কোমল অনুভূতিতে মনটা ছেয়ে গেল ওর।

    “চিন্তা কোরো না ময়না,” বলল কানাই। “খুব শিগগিরই এখানে কাজ করবে তুমি।” কথাটা বলেই খেয়াল হল জিজ্ঞেস না করেই ও ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করেছে ময়নাকে। ব্যাপারটা ইচ্ছাকৃত নয়, কিন্তু সেটা নিয়ে কিছু বলার দরকার আছে বলে মনে হল না কানাইয়ের। মনে হল এই তো ভাল। আলাদা করে বলার কী-ই বা প্রয়োজন?

  • কাঁকড়া

    কাঁকড়া

    কাঁকড়া

    ঠিক দুপুর নাগাদ, জল বেশ খানিকটা বেড়ে ওঠার পর পরিষ্কারই বোঝা গেল আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে শুশুকগুলো। শেষের কয়েকবার মা আর ছানার জুড়িটাকেই শুধু দেখতে পেল পিয়া। জলের ওপর নানারকম সব কসরত দেখাল তারা। সেরকম আগে কখনও বিশেষ দেখেনি পিয়া। প্রথমে পরপর কয়েকবার এমনভাবে ভেসে উঠল যে দুটো ডলফিনেরই পুরো শরীর দেখতে পাওয়া গেল জলের ওপর। ছানাটা দেখা গেল মিটার খানেকের মতো লম্বা আর মা-টা তার দেড়গুণ মতো। একটু পরে ফের দেখা গেল বার দুয়েক। চমৎকার লাগছিল দেখতে। মা আর ছানা মুখ দিয়ে ফোয়ারার মতো জল ছুঁড়ে দিচ্ছে শূন্যে। এই ‘থুতু ছেটানোর’ অভ্যেসটা এ জাতীয় ডলফিনদের একটা বৈশিষ্ট্য–পিয়ার নিজের ধারণা এটা ওরা করে শিকারকে বিভ্রান্ত করার জন্য। এত সুন্দর লাগছিল দেখতে যে ডেটাশিট রেখে ক্যামেরা বের করল পিয়া। মিনিট কয়েক পরেই আশ্চর্য এক কাণ্ড করল ছানা ডলফিনটা একটা মাছকে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে আবার লুফে নিল মুখে। শিকার নিয়ে খেলা করাটা এদের বংশের ধারা–এই ওর্কায়েলা-দের জ্ঞাতি খুনে তিমিরও এ স্বভাব আছে। কিন্তু এত বছর নদী-নালায় ঘুরে ঘুরে কাজ করলেও, সব মিলিয়ে মাত্র বার ছয়েক এরকম দৃশ্য চোখে পড়েছে পিয়ার। আর এই প্রথম তার একটা স্পষ্ট ছবি তুলতে পারল ও।

    খানিক বাদেই এ দুটো ডলফিনও বেপাত্তা হয়ে গেল। এখন দেখতে হবে সন্ধেবেলা জল নামলে আবার এখানে ফিরে আসে কিনা আঁকটা।

    পিয়া যখন নৌকোর আগায় বসে জলের দিকে নজর রাখছিল, ফকির আর টুটুল তখন ডিঙির পেছন দিকটায় বসে খুব ধৈর্য ধরে একগোছা মাছ ধরার সুতোর পরিচর্যা করছিল। সুতোগুলো দেখে প্রথমটায় একটু চিন্তিত হয়েছিল পিয়া, কারণ কিছু কিছু মাছ ধরার সরঞ্জামে ডলফিনদেরও অনেক সময় আটকে পড়তে দেখা গেছে। কিন্তু ভাল করে দেখে বুঝতে পারল ফকিরের সুতোগুলো এতই পলকা, ডলফিনের মতো অত বড় প্রাণীকে তাতে আটকাতে পারবে না। এই নিয়ে তাই আর কোনও উচ্চবাচ্য করেনি ও। এই সামান্য সুতোগুলোতে কিছুই আসে যায় না। মাছেরাও মনে হল একইরকম ভাবছে; সারা সকাল চেষ্টা করে বাপ ব্যাটা কেউই একটা চুনোপুঁটিও ধরে উঠতে পারল না। কিন্তু ওদের দুজনের তাতে দেখা গেল কোনও হেলদোল নেই মনে হল, যা করছে তাই নিয়েই বেশ আছে, অন্তত আপাতত।

    কিন্তু ফকির আর টুটুল কখন ফিরতে চাইবে কে জানে। রাত্রে পিয়া আশা করেছিল সূর্য উঠলেই বোধহয় রওয়ানা হবে ওরা। কিন্তু এই ডলফিনগুলো এসেই সব পালটে দিল। এখন তো মনে হচ্ছে অন্তত কাল সকাল পর্যন্ত থাকতে হবে এখানে। সুন্দরবনের এই ডলফিনেরা এখানকার জোয়ার-ভাটার চক্রের সঙ্গে নিজেদের মতো করে খাপ খাইয়ে নিয়েছে কিনা তা বোঝার এটাই একমাত্র উপায় এখন দেখা যাচ্ছে আরও একটা ভাটা আর জোয়ার এখানে অপেক্ষা করে যাওয়া। অবশ্য এরকম হতেই পারে যে এ সমস্তই নিছক ওর কল্পনা, আর সে কল্পনা যদিও বা সত্যি হয় তা হলেও তার সমর্থনে উপযুক্ত তথ্য জোগাড় করে উঠতে বছরের পর বছর কেটে যাবে। এখনকার মতো অন্তত আরও একটু কিছু প্রমাণ চাই পিয়ার, সামান্য কিছু ইঙ্গিত, যাতে অন্তত বোঝা যায় যে ওর চিন্তাটা ঠিক দিকেই এগোচ্ছে। পরের সূর্যোদয়টা পর্যন্ত যদি কোনওভাবে থাকতে পারে এই জায়গাটায়, তা হলেই ওর চলবে।

    সময় যত কাটতে লাগল ডলফিনদের ছেড়ে ফকির আর তার ছেলেকে নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকল পিয়ার। আর কতক্ষণ ওরা ধৈর্য ধরে থাকতে চাইবে এখানে কে জানে? কী করলে আটকে রাখা যাবে ওদের? পিয়া লক্ষ করছে ওদের ওই মাটির স্টোভটা একবারও জ্বালানো হয়নি আজকে। বাপ ব্যাটা শুধু কয়েকটা শুকনো রুটি খেয়ে আছে সকাল থেকে। ভাল লক্ষণ নয়। তার মানে রসদ ফুরিয়ে আসছে ওদের। অন্য কোনও পরিস্থিতি হলে ও আরও কিছু টাকা অফার করতে পারত ফকিরকে; কিন্তু এক্ষেত্রে সে প্রসঙ্গ তোলা যায় না কারণ সঙ্গে টুটুল আছে। বাবার কিছু বাড়তি পয়সা রোজগার হবে বলে ওইটুকু ছেলে খিদে সহ্য করে বসে থাকবে সেটা আশা করা যায় না। ‘: পিয়ার নিজেরই মিনারেল ওয়াটার কমে এসেছে, কিন্তু ও জানে যেটুকু আছে তা দিয়েই ও চালিয়ে নিতে পারবে। ওদের দুজনের জন্যেই ওর চিন্তা। শেষ পর্যন্ত থাকতে না-পেরে কোনওদিন ও যা করেনি তাই করল: ওর সাবধানে জমিয়ে রাখা নিউট্রিশন বারের প্যাকেট থেকে কয়েকটা বের করে দিতে চাইল ওদের। ফকির নিল না, কিন্তু টুটুল একটা নিয়ে বেশ তারিয়ে তারিয়েই খেল। একটু নিশ্চিন্ত হল পিয়া। সেরকম দরকার হলে আরও কয়েকটা বার দিয়ে দেবে ও তাতে যদি থেকে যায় ওরা তা হলেই পুষিয়ে যাবে ওর। কিন্তু তবুও মনটাকে শান্ত করতে পারছিল না পিয়া। ডেটাশিট ভরতে ভরতে বারবার আড়চোখে চাইছিল ওদের দুজনের দিকে। ওদের প্রতিটি ওঠাবসায় চমকে চমকে উঠছিল ও এই রে! এই বোধহয় ওরা ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করছে।

    কিন্তু কেন কে জানে, সেরকম কিছুই হল না শেষ পর্যন্ত। রওয়ানা হওয়ার ব্যাপারে ওদের দু’জনের কারওরই কোনও আগ্রহ দেখা গেল না। দুপুরে সামান্য কিছু শুকনো রুটি মধু দিয়ে খেয়ে বাপ ব্যাটা গিয়ে ছইয়ের ভেতর ঢুকে শুয়ে পড়ল।

    আশা-নিরাশার দোলায় পিয়ার টেনশন এদিকে বেড়েই চলেছে। ভাটা পড়া পর্যন্ত এই কয়েকটা ঘণ্টা চুপ করে এক জায়গায় বসে থাকতেই পারছে না ও। শেষে ঠিক করল এই সময়টা নদীর নীচের এই জায়গাটার ম্যাপ তৈরি করবে। সত্যিই ওই ওর্কায়েলা-দের জড়ো হওয়ার মতো কোনও দহ এখানটায় আছে নাকি দেখা যাবে। এ ধরনের ম্যাপ তৈরির কিছু অভিজ্ঞতা ওর আছে, এটুকু জানে যে খুব একটা কঠিনও নয় কাজটা, তবে বেশ ঝামেলার: ডেপ্‌থ সাউন্ডিং করে নদীর নীচ থেকে ফিরে আসা প্রতিধ্বনি মেপে মেপে গভীরতার মাপ কাগজে তুলতে হবে, তারপর সেগুলো জুড়ে জুড়ে নদীগর্ভের ঢালের একটা রেখাচিত্র বানাতে হবে। গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের সুবিধা থাকায় অবশ্য প্রত্যেকবার শব্দ ক্ষেপণের জায়গার নিখুঁত অবস্থানটা ঠিক করে নেওয়া সহজ, ফলে নিয়মিত জ্যামিতিক বৃত্তচাপ বরাবর ঠিকমতো রিডিংগুলো নেওয়াও খুব একটা কঠিন হবে না।

    কিন্তু সমস্যা হল ফকিরকে সেটা বোঝানো যাবে কী করে?

    আস্তে আস্তে ছইয়ের সামনে গেল পিয়া, দেখল বেঘোরে ঘুমোচ্ছে ফকির আর তার ছেলে। দু’জনেই পাশ ফিরে শুয়ে আছে, বাবার শরীরের বাঁকের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে টুটুলের ছোট্ট চেহারাটা দেখা যাচ্ছে। ছেলেটা একটু নাদুস-নুদুস, বাপের প্রায় কঙ্কালসার কাঠখোট্টা ভাবের একেবারে উলটো। ফকিরের গায়ে তো খালি হাড়-পাঁজরা আর পাকানো পেশি কয়েকটা। পুরুষের গঠনতন্ত্রের শুধু সারটুকু দিয়ে যেন তৈরি ওর শরীরটা। আচ্ছা, ছেলেটা কি তা হলে বাবার থেকে ভাল খেতে পায়? এর মধ্যে নিশ্চয়ই কোনও গল্প আছে, সেটা জানতে পারলে বেশ হত। ছেলেটার দেখাশোনা কে করে? কেউ কি নিজে না-খেয়ে রেখে দেয় খাবারটা, যাতে ঠিক মতো খেতে পায় টুটুল?

    ঘুমের মধ্যে একসঙ্গে ওঠানামা করছিল দু’জনের বুক। ওদের শ্বাসের ছন্দটা দেখে মা ডলফিন আর ছানাটার কথা মনে পড়ে গেল। এত নিশ্চিন্তে ওদের ঘুমোতে দেখে নিজের মনটাও একটু শান্ত হল পিয়ার–ওর মনের ভেতরের উথাল পাথালের সঙ্গে ওদের এই শান্তির ঘুমের আকাশ পাতাল ফারাক। ফকিরকে জাগানোর জন্য হাতটা বাড়াতে একটু দ্বিধা হচ্ছিল পিয়ার: এই ভরদুপুরের কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলে কি ও বিরক্ত হবে? তারপর যদি বাড়ি ফিরে যেতে চায় তক্ষুনি? পিয়া দেখল ফকিরের কপালের পাশ দিয়ে একটা ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে নামছে চোখের কোণের দিকে। কিছু না-ভেবেই একটা আঙুল বাড়িয়ে ঘামটা মুছে দিল ও।

    সঙ্গে সঙ্গে জেগে গেল ফকির। উঠে বসল ধড়মড় করে। পিয়ার আঙুলের ডগাটা ওর চামড়ার যে জায়গায় ছুঁয়েছিল সেখানটা ঘষতে লাগল হাত দিয়ে। অপ্রস্তুত হয়ে একটু পিছিয়ে গেল পিয়া। মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “আই অ্যাম সরি। আই ডিডন্ট মিন…” নির্লিপ্তভাবে মাথাটা একবার ঝাঁকাল ফকির, তারপর হাত মুঠো করে চোখ কচলাতে লাগল, যেন বাকি ঘুমটুকু ঘষে ঘষে চোখ থেকে মুছে দিতে চাইছে।

    “লুক!” পজিশনিং মনিটরটা ফকিরের মুখের সামনে ধরে স্ক্রিনের দিকে ইশারা করল পিয়া। “ওভার হিয়ার।” আশ্চর্য হয়ে দেখল ফকির বুঝতে পারছে ওর বক্তব্য। তারপর পিয়া যখন ওই বিন্দু আর রেখাগুলোর মানে বোঝাতে শুরু করল, মনিটরটার দিকে ঝুঁকে পড়ে মন দিয়ে দেখতে লাগল ফকির।

    সবচেয়ে কঠিন সমস্যাটা হল মনিটরের পর্দায় যে ওদের এখনকার অবস্থানটা দেখা যাচ্ছে সেটা কী করে ওকে বোঝাবে পিয়া। বিভিন্ন কিছুর দিকে ইশারা করে বোঝানোর চেষ্টা করল–একবার স্ক্রিনের দিকে, একবার নিজের দিকে, একবার ফকিরের দিকে, একবার ছেলেটার দিকে, কিন্তু কোনও লাভ হল না। পিয়া দেখল ঘাবড়ে যাচ্ছে ফকির, ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে। মনে হল ইশারাগুলিতে ও ভেবেছে ওকে কাছে সরে আসতে বলছে পিয়া। পাগল পাগল লাগছিল পিয়ার। কী করে বোঝানো যায় একে! শেষে ঠিক করল অন্য কায়দা করে দেখবে একবার। একটা কাগজ নিয়ে এল পিয়া। ব্যাপারটাকে দ্বিমাত্রিক ক্ষেত্রে নিয়ে এলে হয়তো বোঝানো একটু সহজ হবে। সরল একটা ছবি দিয়ে, বাচ্চারা যেমন কাঠি কাঠি হাত-পাওয়ালা মানুষ আঁকে সেরকম এঁকে ফকিরকে জিনিসটা বোঝানোর চেষ্টা করবে ও। কিন্তু মুশকিল হল, ছবি আঁকাটা পিয়ার কখনওই ঠিক আসে না। অর্ধেকটা এঁকেও হঠাৎ থেমে গেল ও। নতুন একটা সমস্যার কথা মাথায় এল এবার। আগে যখনই এরকম মানুষের ছবি ও এঁকেছে, মহিলা বোঝানোর জন্যে সবসময় কাঠিটার মধ্যে একটা তিনকোণা স্কার্ট এঁকে দিয়েছে। কিন্তু এখানে তো তা করলে চলবে না–এখানে তো পুরুষের পরনে লুঙ্গি আর মহিলার পরনে প্যান্ট। কাগজটাকে দলা পাকিয়ে ফেলল পিয়া। ফেলেই দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু ওর হাত থেকে সেটা প্রায় ছিনিয়ে নিল ফকির, গুছিয়ে রেখে দিল জ্বালানি করবে বলে।

    পরের ছবিটা ও শুরু করল জায়গাটার মোটামুটি একটা নকশা দিয়ে। নিজেদের অবস্থানটা দেখানোর আগে প্রথমে নদীর পাড়ের বাকটা এঁকে নিল। দেখা গেল ঠিকই আন্দাজ করেছিল ও, ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্র ছেড়ে দুই মাত্রায় আসতেই ফল পাওয়া গেল: ওর নকশাটার সঙ্গে মনিটরের পর্দার লাইনগুলো কীভাবে মিলে যাচ্ছে একবার দেখিয়ে দিতেই জলের মতো সোজা হয়ে গেল বাকিটা। পেনসিলের কয়েকটা আঁচড়েই তারপর ও ফকিরকে বুঝিয়ে দিল কীভাবে মোটামুটি ত্রিভুজাকার একটা বৃত্তচাপের মধ্যে পরপর সমান্তরাল পথে নৌকোটা বেয়ে নিয়ে যেতে হবে ওকে। চাপের শীর্ষবিন্দুটা প্রায় ছুঁয়ে থাকবে নদীর অন্য পাড়টাকে।

    পিয়া ভেবেছিল বোধহয় গাঁইগুঁই করবে ফকির, এমনকী হয়তো নাও রাজি হতে পারে। কিন্তু আদৌ সেরকম কিছু ঘটল না। বরং মনে হল বেশ খুশিই হয়েছে ও, এমনকী উৎসাহের চোটে চেঁচিয়ে-মেচিয়ে টুটুলকে পর্যন্ত ঘুম থেকে তুলে দিল। ওই সরলরেখা বরাবর পারাপারের ব্যাপারটাতেই মনে হল ওর বেশি উৎসাহ। কেন, সেটা একটু পরেই বুঝতে পারল পিয়া–যখন তক্তার নীচ থেকে একগোছা মাছ ধরার সুতো বের করে আনল ফকির। বোঝাই যাচ্ছে এই সুযোগে ও কিছু মাছ ধরে নিতে চায়।

    কিন্তু মাছ ধরার সুতোটা দেখে একটু ধাঁধা লাগল পিয়ার। এশিয়ার বিভিন্ন নদীতে জেলেদের সঙ্গে ও কাজ করেছে, এরকম কিছু তো কোথাও আগে দেখেনি। একটু মোটা নাইলনের শক্ত সুতো, আর পুরো দৈর্ঘ্য বরাবর মিটার খানেক পরপর একটা করে ওজন বাঁধা ছোট ছোট টুকরো করা টালি কতগুলো। আরও অদ্ভুত যেটা, বঁড়শি-টরশির কোথাও কোনও বালাই নেই। তার বদলে ওজনগুলোর মাঝে মাঝে মাছের শুকনো হাড়কাটা কয়েকটা বাঁধা রয়েছে। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না কী করে কাজ করে জিনিসটা। দেখে তো মনে হচ্ছে যেন ওরা আশা করছে যে মাছেরা নিজের থেকেই এসে আটকে যাবে সুতোটার মধ্যে, আর ওরা শুধু সেটা গুটিয়ে তুলবে। কিন্তু সেরকম কি আদৌ সম্ভব? তা হলে কী ধরবে ওটা দিয়ে? কোনওরকম কোনও ব্যাখ্যাই খুঁজে পেল না পিয়া। তবে একটা ব্যাপার অন্তত পরিষ্কার, ওই সুতোতে ডলফিনদের কোনও ক্ষতি হবার সম্ভাবনা নেই। তাই নৌকো যদি ঠিকঠাক পথে চলে তা হলে ওতে আপত্তি করারও কোনও কারণ দেখল না পিয়া।

    আবার নৌকোর আগার দিকটায় ফিরে গেল ও, ম্যাপ বানানোর সব প্রস্তুতি করতে শুরু করল। মনিটরটা হাতে নিয়ে ফকিরকে ইশারা করে দেখাল ঠিক কোন জায়গাটা থেকে শুরু করতে হবে। তারপর, টুটুলও মাছ-ধরা সুতোর প্রথম ওজনটা জলে ফেলল, আর তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ইকো সাউন্ডারটাও ডুবিয়ে দিয়ে বোতাম টিপল পিয়া।

    প্রথম দফায় প্রায় কিলোমিটার খানেক যেতে হল ওদের। সবটা সুতোই এর মধ্যে জলে ফেলা হয়ে গেছে টুটুলের। পুরোটা যাওয়ার পর আবার যখন নৌকোর মুখ ফিরিয়ে উলটোদিকে চলতে শুরু করল ওরা, তখন পিয়া আবিষ্কার করল কী করে ওরা ওই সুতোটা দিয়ে। সুতোটা টেনে তোলার সময় দেখা গেল সাত-আটটা টোপ পরপরই একটা করে কাঁকড়া ঝুলছে। শক্ত করে পঁাড়া দিয়ে চেপে ধরে আছে সুতোয় বাঁধা মাছের কাঁটাগুলো। ফকির আর টুটুল একটা জাল দিয়ে কাঁকড়াগুলোকে ছাড়িয়ে আনল, তারপর পাতা দিয়ে ভর্তি একটা পাত্রের মধ্যে রেখে দিল সেগুলোকে। দেখতে দেখতে হাসি পেয়ে গেল পিয়ার। এর থেকেই তা হলে ‘ক্র্যাবি’ কথাটা এসেছে ইংরেজিতে? এত একগুঁয়ে প্রাণীগুলো, ধরা পড়বে তবু খাবার ছাড়বে না।

    বার কয়েক যাতায়াতের পরই বোঝা গেল ঠিকই ভেবেছিল পিয়া, নদীর নীচে একটা ঢালু জায়গাতেই এসে জমা হয় ডলফিনগুলো। সাউন্ডিং করে দেখা গেল নদীর খাতটা এই জায়গায় এসে পাঁচ থেকে আট মিটার পর্যন্ত গম্ভীর হয়ে গেছে; ফলে ভাটায় জল নেমে গেলেও ডলফিনরা এখানে এসে স্বচ্ছন্দে কাটাতে পারে সেই সময়টা।

    নদীর নীচের এই দহ শুধু যে ডলফিনদের জন্যই উপযুক্ত তা নয়–কঁকড়াদেরও মনে হয় খুবই বাড়বাড়ন্ত এখানে। প্রতিবার যাতায়াতের সময়ই রাশি রাশি কঁকড়া উঠে আসছে ফকিরের সুতোয়। শুরুতে পিয়া ভেবেছিল ওদের দুজনের কাজের বোধহয় ব্যাঘাত ঘটবে–ওর ডেথ সাউন্ডিং-এর ফলে ফকিরের মাছেরা পালিয়ে যাবে অথবা উলটোটা হবে। কিন্তু ও সবিস্ময়ে লক্ষ করল আদৌ সেরকম কিছু ঘটল না। সুতোটা জলে ফেলার জন্য প্রত্যেকবারই একেবারে ঠিক সময়ে নৌকো থামিয়েছে ফকির। ঠিক ওই সময়গুলোতেই পিয়ারও থামার দরকার ছিল সাউন্ডিং নেওয়ার জন্য। তা ছাড়া ফকিরের সুতোটা ঠিকমতো পথপ্রদর্শনের কাজেও সাহায্য করছিল–সুতো বরাবর একেবারে সোজা পথে চলছিল নৌকোটা। আর ফেরার সময়ও প্রতিবারই ঠিক যে জায়গাটা থেকে রওয়ানা হয়েছিল নিঃসন্দিগ্ধভাবে সেখানটাতেই এসে পৌঁছনো যাচ্ছিল আবার। অন্য সময় হলে প্রতিবারই পথ ঠিক রাখার জন্য ওর গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমটা ব্যবহার করতে হত পিয়াকে। কিন্তু এখানে ওই সুতোটা দিয়েই সে কাজ হয়ে যাচ্ছিল। শুধু প্রত্যেকবার পারাপারের সময় বৃত্তচাপ বরাবর আগেরবারের থেকে যাতে ঠিক পাঁচ মিটার দুরে যাত্রা শুরু হয় সেটা ঠিক করার জন্য মনিটরটা কাজে লাগাতে হচ্ছিল। এতে কিন্তু ফকিরেরও লাভ হচ্ছিল, কারণ কখনওই এক জায়গায় দু’বার পড়ছিল না ওর কাঁকড়া-ধরা সুতোটা।

    খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে এতটুকুও বিরোধ হচ্ছিল না ওদের দুজনের কাজের। আশ্চর্যের এইজন্য যে একজন কাজ করছে ভূসমলয় কক্ষের কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে, আর অন্যজনের কাজের সরঞ্জাম হল কয়েকটা মাছের কাটা আর ভাঙা টালির টুকরো। কিন্তু দু’জন একেবারে দু’রকমের মানুষ, যারা পরস্পরের সঙ্গে একটা বাক্যও বিনিময় করতে পারে না, একজন কী ভাবছে অন্যজনের সেটা জানা বা বোঝার কোনও উপায়ই নেই, তারা যে একই সঙ্গে নির্বিবাদে নিজের নিজের কাজ করে যাচ্ছে, সেটা মনে হল আরও বিস্ময়কর–যেন প্রায় দৈবঘটিত। ব্যাপারটাতে শুধু যে পিয়াই আশ্চর্য হয়েছে তা নয়, একবার হঠাৎ করে ফকিরের চোখে চোখ পড়ায় ওর মুখের ভাবেও বোঝা গেল বেশ অদ্ভুত লাগছে ওর। দু’জনের উদ্দেশ্য এবং তৃপ্তির এরকম স্বচ্ছন্দ মিশ্রণ কী করে সম্ভব হল সেটা ও যেন বুঝে উঠতে পারছে না।

    কঁকড়ার পাত্রটা ভর্তি হয়ে যাওয়ার পর সেটার মুখটা একটা অ্যালুমিনিয়ামের প্লেট দিয়ে ঢেকে কাঁকড়াগুলোকে নৌকোর খোলের মধ্যে ঢেলে দেওয়ার জন্য পিয়ার হাতে দিল ফকির। ঢাকনা ফাঁক করে পিয়া দেখল ভেতর থেকে গোটা পনেরো কঁকড়া কটমট করে ওর দিকে চেয়ে দাঁড়া শানাচ্ছে। ডিঙির খোলের মধ্যে পাত্রটা উলটে দিতে হুড়মুড় করে একটা লম্বা শেকলের মতো বেরিয়ে এল কাঁকড়াগুলো, প্রচণ্ড রেগে খটখট আওয়াজ করতে করতে ঢুকে গেল তক্তার নীচে। কাঁকড়াদের এই অভাবনীয় মুখরতায় হাসি পেয়ে গেল পিয়ার। ওর জন্ম হয়েছিল জুলাই মাসে। মাঝে মাঝেই ওর তাই মনে হয়েছে এত প্রাণী থাকতে প্রাচীনকালের লোকেরা কাঁকড়াকে কেন রাশিচক্রের মধ্যে ঢুকিয়েছিল। কিন্তু এখন এই কঁকড়াগুলোকে তড়বড় করে নৌকোর খোলের মধ্যে ঢুকে যেতে দেখতে দেখতে পিয়ার মনে হল প্রাণীগুলোর বিষয়ে আরও কিছু জানা থাকলে বেশ হত। মনে পড়ল একবার একটা ক্লাসে ওদের এক অধ্যাপক দেখিয়েছিলেন কিছু প্রজাতির কাঁকড়া কীভাবে তাদের বাসার কাদাটা সত্যি সত্যি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে কাদার প্রতিটা দানা ওরা সাফ করে ঘষে ঘষে। ওই কঁকড়াদের পায়ে এবং শরীরের ধার বরাবর সূক্ষ্ম লোমের আবরণ থাকে। সেই লোমগুলোই আণুবীক্ষণিক বুরুশ আর চামচের মতো কাজ করে। ওগুলো দিয়েই কাদার সূক্ষ্ম কণার গায়ে লেগে থাকা ক্ষুদে শ্যাওলা আর অন্যান্য সব খাদ্যবস্তু চেঁছে তোলে ওরা। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিভাগ এবং পরিচ্ছন্নতা দপ্তরের কাজ করে এই কাঁকড়ারা–বাদাবনের পচা পাতা, জঞ্জাল সাফ করে ওরাই বাঁচিয়ে রাখে বনকে। ওরা না-থাকলে তো নিজেদের আবর্জনার চাপেই দমবন্ধ হয়ে মারা পড়ত জঙ্গলের সব গাছ। বাদাবনের জৈবতন্ত্রের একটা বিরাট অংশই যে এই কঁকড়ারা, সেটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে? ডালপাতা সমেত সমস্ত গাছের তুলনায়ও যে একটা বাদাবনে কাঁকড়াদের গুরুত্ব বেশি সেটা তো সত্যি? কেউ একজন তো বলেইছিলেন যে ম্যানগ্রোভের বদলে এই ধরনের নদীমুখের জঙ্গলগুলির নাম কঁকড়াদের নামেই হওয়া উচিত। কারণ বাঘ বা কুমির বা ডলফিন নয়, এই কঁকড়ারাই হল গোটা বাদাবনের জৈবতন্ত্রের মূল ধারক।

    এতদিন পর্যন্ত এই সমস্ত বিষয়ে যখনই ভেবেছে পিয়া–এই জৈবতন্ত্র, মূল প্রজাতি এইসব–সবসময়েই নিজেকে তার বাইরে রেখে, অন্যান্য সমস্ত কিছুর পরিপ্রেক্ষিতে ভেবেছে। সংক্ষেপে, প্রকৃতির পরিপ্রেক্ষিতে ভেবেছে–কারণ কে বলেছে যে মনুষ্যসৃষ্ট সমস্ত কিছুকে বাদ দিয়ে যা বাকি থাকে তাই হল ‘প্রকৃতি’? কিন্তু আজকে যে ও এখানে এসেছে সে তো নিজের ইচ্ছায় আসেনি; এই কঁকড়াদের জন্যই এসেছে। কারণ এরাই হল ফকিরের জীবিকা, আর এরা–থাকলে ফকির জানতেও পারত না কোথায় কোন নদীর দহে এই ওর্কায়েলাশুশুকেরা আসে। হয়তো ঠিকই করেছিল সেই প্রাচীনকালের লোকেরা। হয়তো আসলে পিয়ার নিয়তির জোয়ার ভাটার দিক নির্দেশ করছে এই কাঁকড়ারাই। কে বলতে পারে!

  • ভ্রমণকাহিনি

    ভ্রমণকাহিনি

    ভ্রমণকাহিনি

    গেস্ট হাউসে ফিরে কানাই দেখল টিফিন ক্যারিয়ারে করে দুপুরের খাবার রেখে গেছে। ময়না। সাদামাটা খাবার ভাত, মুসুরির ডাল, একটা চচ্চড়ি আলু, মাছের কাটা আর কী একটা শাক দিয়ে। শাকটা ঠিক চিনতে পারল না কানাই। আর ছিল কুচো মৌরলা মাছের পাতলা ঝোল। ঠান্ডা হয়ে গেলেও খাবারটা অমৃতের মতো লাগল কানাইয়ের। দিল্লিতে ওর যে রাঁধুনি আছে সে লক্ষৌর লোক। নানারকম মোগলাই খাবারই সে বেশি বানায়। ফলে বহুদিন এরকম সাধারণ বাঙালি খাবার কপালে জোটেনি কানাইয়ের। প্রতিটা খাবারের স্বাদ যেন ওর মাথার মধ্যে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটাতে লাগল। শেষ পর্যন্ত এত খেয়ে ফেলল যে পেটটা আইঢাই করতে লাগল একেবারে।

    খাওয়ার পর বাসনপত্র সরিয়ে রেখে ওপরে নির্মলের পড়ার ঘরে গেল কানাই। দরজাটা বন্ধ করে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল ডেস্কটার সামনে। তারপর নোটবইটা খুলল।

    কানাই, সেই ১৯৭০-এ শেষ যারা কুসুমকে দেখেছিল লুসিবাড়িতে, তাদের মধ্যে তুমি ছিলে একজন। সে বছর বনবিবি জহুরানামা পালা চলার সময় হঠাৎই নিখোঁজ হয়ে যায় ও। যেন একটা ঝড় ওকে তুলে নিয়ে চলে গিয়েছিল কোথাও, এতটুকু চিহ্নও রেখে যায়নি। কেউ জানত না কোথায় গেল কুসুম। সেই শেষ। তারপরে আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি ওর। সত্যি বলতে কী, ওর কী যে হল তা নিয়ে আমরা কেউ মাথাও ঘামাইনি। খুবই দুঃখের বিষয় হলেও সত্যি, এই ভাটির দেশের অনেক ছেলেমেয়েই এভাবে হারিয়ে যায় শহরের ভিড়ে। এরকম ঘটনা এত ঘটে যে খেই রাখা মুশকিল।

    তারপর বহু বছর কেটে গেল, আমারও অবসরের সময় চলে এল। অস্বীকার করলে.মিথ্যে বলা হবে, আমার বুকটা একটু দুরুদুরু করছিল বইকী। প্রায় তিরিশ বছর হেডমাস্টারি করেছি। এই স্কুল, এই ছাত্ররা, তাদের পড়ানো–এসবই জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছিল আমার। ক্লাসরুম আর রুটিনের নিয়মের বাইরে বেরিয়ে আমি বাঁচব কী নিয়ে? বহু বছর আগের সেই অসম্বন্ধ দিনগুলির কথা মনে পড়ে গেল আমার, যখন পৃথিবীটাকে এত নৈরাশ্যময় আর জটিল মনে হত যে সবসময় খালি শুয়ে থাকতেই ইচ্ছে করত। আবার যদি সেরকম হয়? সে সময় আমার মনের অবস্থাটা নিশ্চয়ই তুমি কল্পনা করতে পারছ।

    ছকে-বাঁধা জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হল তার অর্থহীনতাটা বোঝা যায় বড় দেরিতে। কত বছর ধরে আমি নীলিমাকে বলেছি যে আমি ওপরে আমার স্টাডিতে বসে লেখার কাজ করছি। শুনে খুব খুশি হত নীলিমা। এই যে চারিদিকে ওর এত খ্যাতি, প্রতিপত্তি, আর আমার কিছুই নেই, সেটা ওর ভাল লাগত না। ওর বিশ্বাস ছিল আমি একজন লেখক, কবি। ও চাইত কবি হিসেবে, লেখক হিসেবে আমাকেও সবাই চিনুক, জানুক। কিন্তু সত্যি কথা হল লুসিবাড়িতে এতগুলো বছরে একটা শব্দও লিখিনি আমি। শুধু তাই নয়, আমার আরেকটা ভালবাসার জিনিস বই পড়া, সে অভ্যাসটাকেও বিসর্জন দিয়েছিলাম একেবারে। অবসরের সময় যত এগিয়ে আসতে লাগল, এই সবকিছুর জন্য ভীষণ অনুশোচনা হতে লাগল আমার। একদিন কলকাতায় গিয়ে আমার এক সময়কার প্রিয় দোকানগুলোতে বইপত্র ঘেঁটে অনেকটা সময় কাটালাম, দেখলাম বই কেনার সামর্থ্য আমার আর নেই। একটা মাত্র নতুন বই নিয়ে ফিরে এলাম লুসিবাড়িতে। বার্নিয়ের ভ্রমণকাহিনি। তুমিই কিনে দিয়েছিলে সেটা আমাকে।

    আমার স্কুল থেকে বিদায়ের দিন যত এগিয়ে আসতে লাগল, পরিষ্কার বোঝা গেল অন্য মাস্টারমশাইরা সাগ্রহে অপেক্ষা করে আছেন আমার যাওয়ার জন্য। আমার মনে হয় না তার মধ্যে বিদ্বেষের ভাব খুব একটা ছিল। আসলে অনাগত ভবিষ্যতের গর্ভে কী লুকোনো আছে সেটা দেখার জন্যই ওরকম উদগ্রীব হয়েছিলেন ওঁরা। কেউ যদি কোনও জায়গায় একটানা তিরিশ বছর কাজ করে, সেখানকার দেওয়ালের গায়ে শ্যাওলার মতো হয়ে যায় সে। নতুন দিনের আলোয় কেমন করে তা শুকিয়ে ঝরে যায় সেটা সকলেই দেখতে চায়।

    আমার অবসরের খবর যত ছড়াতে থাকল, বহু নিমন্ত্রণ পেতে থাকলাম আমি আশেপাশের অন্য সব দ্বীপের স্কুলগুলো থেকে, সেসব জায়গায় একবার ঘুরে আসার জন্য। আগে হলে হয়তো রাজি হতাম না, কিন্তু এখন কবির সেই সতর্কবাণী মনে পড়ল আমার–”থেমে যাওয়ার অর্থ অস্তিত্বহীনতা”। কাজেই খুশি হয়েই সে সব নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতে লাগলাম। একদিন এরকমই এক নিমন্ত্রণ এল কুমিরমারি দ্বীপ থেকে। আমার পরিচিত একজন সেখানে থাকতেন। লুসিবাড়ি থেকে কুমিরমারির দূরত্ব খুব একটা কম নয়, বেশ কয়েকবার ফেরি পার হয়ে যেতে হয়। স্থির করলাম যাব।

    যেদিন সকালে আমার যাওয়ার কথা, ঘটনাচক্রে নীলিমা সেদিন বাড়ি ছিল না, ট্রাস্টের কাজে কোথাও গিয়েছিল। আমিও খালি বাড়িতে মনের আনন্দে অনেকক্ষণ ধরে আমার ঝোলা গোছালাম। একটা বই ঢোকালাম, তারপর মনে হল আরও একটা নিই–এত দূরের পাড়ি, অনেক পড়ার জিনিস লাগবে। এই করতে করতে সময়ের হিসাব ভুলে গেলাম আমি–ক’টার সময় নৌকো আছে, জেটি পর্যন্ত হেঁটে যেতে কতক্ষণ লাগবে–সব গোলমাল করে ফেললাম। তারপর কী হল সে আর বিশদ বলার কিছু নেই। এইটুকু বললেই চলবে যে প্রথম নৌকোটা ধরতে পারলাম না আমি। অর্থাৎ পরের কোনও ঘাটেও আর ফেরি ধরতে পারব না।

    হতাশ হয়ে বাঁধের ওপর বসেছিলাম, হঠাৎ দেখি একটা চেনা চেহারা–নৌকো নিয়ে যাচ্ছে সামনে দিয়ে। হরেন নস্করকে বহু বছর দেখিনি, কিন্তু ওই তাগড়াই চেহারা আর সরু চোখ দেখে সঙ্গে সঙ্গেই চিনতে পারলাম ওকে। কিশোর বয়সি একটি ছেলে ছিল সঙ্গে, নিশ্চয়ই ওর বড় ছেলে।

    তড়িঘড়ি বাঁধ বেয়ে নেমে গিয়ে ডাকলাম ওকে–”হরেন! হরেন! একটু দাঁড়াও!”

    কাছাকাছি আসতে অবাক হয়ে হরেন বলল, “সার? আপনি এখানে? আমি তো ছেলেকে নিয়ে আপনার কাছেই যাচ্ছিলাম। ও আপনার স্কুলে ভর্তি হতে চায়।”

    ছেলেটার কাঁধে হাত রাখলাম আমি। “অবশ্যই ওর ভর্তির ব্যবস্থা করে দেব। কিন্তু আমারও যে একটা উপকার করে দিতে হবে হরেন।”

    “নিশ্চয়ই সার। কী করতে হবে বলুন।”

    “হরেন, আমাকে এখন একবার কুমিরমারি যেতেই হবে। তুমি নিয়ে যাবে?”

    “কেন নিয়ে যাব না সার? এটুকু করতে পারব না আপনার জন্য? উঠে আসুন, উঠে আসুন।” ছেলের পিঠে একটা চাপড় মেরে ওকে বলল একাই বাড়ি ফিরে যেতে। তারপর একবারও পেছনে না তাকিয়ে আমরা রওয়ানা হলাম কুমিরমারির উদ্দেশ্যে।

    চলতে শুরু করেই আমার মনে হল বহু বছর পরে হরেনের নৌকোর মতো এরকম নৌকোয় চড়লাম। গত কয়েক বছরে যখনই লুসিবাড়ির বাইরে যাওয়ার দরকার হয়েছে–খুব একটা বেশি হয়নি অবশ্য–সাধারণত লঞ্চ বা ভটভটিতেই যাতায়াত করেছি। এখন এই নৌকোয় বসে চারপাশের চেনা দৃশ্যগুলোই কেমন অন্যরকম মনে হতে লাগল–যেন নতুন দৃষ্টিতে দেখছি আমি। ছাতা দিয়ে রোদ আড়াল করে বসে একটা বই বের করলাম–সেই বার্নিয়ের ভ্রমণকাহিনি–আর যেন কোনও জাদুমন্ত্রে বইয়ের যে পাতাগুলো খুলল ঠিক সেই জায়গাটাতেই সাহেব ভাটির দেশে তার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন।

    হরেন বলল, “কী পড়ছেন সার? গল্পের বই? আমাকেও একটা গল্প বলুন না ওটা থেকে। অনেক দূরের পথ তো, শুনতে শুনতে যাওয়া যাবে বেশ।”

    “ঠিক আছে, আমি বললাম, “শোনো তা হলে।

    “এই বইটা লিখেছিলেন একজন খ্রিস্টান পাদরি। ফরাসি দেশ থেকে ১৬৬৫ সালে এসেছিলেন ভারত ভ্রমণ করতে। তখনও চৈতন্য মহাপ্রভুর কথা আমাদের গ্রামগঞ্জের মানুষের বেশ মনে আছে। আর দিল্লির মসনদে তখন ছিলেন মুঘল বাদশা আওরঙ্গজেব। তো, আমাদের পাদরিসাহেব ছিলেন জেসুইট সম্প্রদায়ের মানুষ। নাম ছিল সোয়া বার্নিয়ে। সাহেবের সঙ্গে ছিল দু’জন পর্তুগিজ পথপ্রদর্শক আর বেশ কিছু চাকর-বাকর। সকলে মিলে তো এসেছেন এই বাদাবনে। কিন্তু প্রথম দিনেই সাহেবরা খিদের জ্বালায় অস্থির। সঙ্গে খাবার ছিল, কিন্তু ডাঙায় নেমে রান্না করার সাহস আর হয় না। এখানকার বাঘের হিংস্রতার বহু গল্প তারা শুনে এসেছেন, সবাই। তাই খুব সাবধান। অবশেষে নদীর মাঝে একটা সুবিধাজনক চড়া পাওয়া গেল। সেখানে নেমে রান্না করা হল–দুটো মুরগি আর একটা মাছ। খাওয়া-দাওয়ার পরে তো আবার রওয়ানা হল নৌকো। একেবারে অন্ধকার নামা পর্যন্ত তারা চললেন। সন্ধের মুখে মুখে নিরাপদ একটা খাঁড়িতে ঢুকে দু’দিকের তীরের থেকে বেশ খানিকটা দূরে এসে নোঙর ফেলা হল। সাহেবদের মনে হল জন্তুজানোয়ারের আক্রমণের সম্ভাবনা অনেক কম হবে এই মাঝখাঁড়িতে। তবুও, বাড়তি সাবধানতা হিসেবে ঠিক হল পালা করে রাত জেগে পাহারা দেওয়া হবে। পাদরি সাহেব লিখেছেন কী ভাগ্যিস তাকেও রাত জাগতে হয়েছিল সেখানে, সেইজন্যেই অপূর্ব এক দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হল তার–চাঁদের আলোয় রামধনু।”

    “ও!” হরেন বলে উঠল, “আমি জানি কোন জায়গায় হয়েছিল এটা। নিশ্চয়ই গেরাফিতলার কাছটায় হবে।”

    “রাবিশ,” আমি বললাম, “কী করে জানবে তুমি হরেন? তিনশো বছরেরও আগেকার ঘটনা, সেটা তুমি কী করে জানবে?”

    “আমিও দেখেছি তো, “ হরেন প্রতিবাদ করল, “ঠিক যেমন আপনি বলছেন–একটা বড় নদী দিয়ে গিয়ে একটা খাঁড়ি, সেরকম। শুধু সে জায়গাটায় দেখা যায় ওই চাঁদের রামধনু। পূর্ণিমার রাতে কুয়াশা থাকলে রামধনু হয় ওখানটায়। সে যাকগে, আপনি গল্পটা বলুন সার।”

    “বাদাবনে আসার তৃতীয় দিনে বার্নিয়ে আর তার দলবল আবিষ্কার করলেন যে তাঁরা পথ হারিয়ে ফেলেছেন। একবার এ নদী দিয়ে যান, একবার সে খাঁড়িতে ঢোকেন–আর যত এরকম ঘুরতে থাকেন, আরও গুলিয়ে যায় পথ। ভয়ে সবার প্রাণ শুকিয়ে গেছে, ভাবছেন বুঝি এই গোলোকধাঁধা থেকে বেরোনোই যাবে না কোনওদিন, এখানেই বোধ হয় ঘুরে মরতে হবে। এইরকম সময়, আবার এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। নৌকো থেকে দেখা গেল দূরে একটা বালির চরের ওপর কিছু লোক কী যেন করছে। নৌকোর মুখ ঘোরানো হল সেদিকে। সাহেবরা ভেবেছিলেন নিশ্চয়ই স্থানীয় জেলে-টেলে হবে, ওদের কাছ থেকে বেরোনোর পথ জেনে নেওয়া যাবে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা গেল লোকগুলি পর্তুগিজ। নুন তৈরি করছে ওই বালির চরে।”

    “ওহ!” লম্বা একটা শ্বাস ছেড়ে বলল হরেন। “ও জায়গাটা তো আমি চিনি। কেঁদোখালি যাওয়ার পথে পড়ে। ওদিকে একটা জায়গা আছে যেখানে এখনও গ্রামের কিছু লোক নুন তৈরি করে। আমার ছোটকাকা একবার এক রাত্তির ছিল ওই চরে। সারারাত কাদের সব গলা শুনেছে। অদ্ভুত ভাষায় কী সব কথা বলছে। নিশ্চয়ই

    ওই ভূতগুলোই হবে। সে যাকগে সার, আপনি বলুন গল্পটা।”

    “চারদিনের দিন, তখনও এই ভাটির দেশ থেকে বেরোতে পারেননি পাদরিসাহেব আর তার দলবল। সন্ধে হয়ে এসেছে, তখন আবার একটা খাঁড়ির মাঝে গিয়ে নোঙর ফেলা হল। সে রাত এক অসাধারণ রাত। প্রথমে তো হাওয়া বন্ধ হয়ে গেল; সারা জঙ্গলে একটা গাছের পাতা নড়ছে না। তারপর, নৌকোর চারপাশের বাতাস আস্তে আস্তে গরম হয়ে উঠতে লাগল। ক্রমে এত গরম হয়ে গেল যে পাদরি আর তার দলবলের প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসার মতো অবস্থা হল। তারপর হঠাৎ মনে হল নৌকোর চারপাশের জঙ্গলে যেন আগুন লেগেছে; গাছে গাছে থিকথিক করছে অজস্র জোনাকি। এমনভাবে উড়ছিল জোনাকিগুলো, মনে হচ্ছিল যেন গাছের ডাল আর শেকড়গুলোর ওপর দিয়ে আগুন নেচে বেড়াচ্ছে। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেল মাঝিরা। পাদরি লিখেছেন, “উহাদের মনে হইতেছিল ওইগুলি সব ভূতপ্রেত।”

    “কিন্তু সার,” অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে হরেন জিজ্ঞেস করল, “মনে হচ্ছিল কেন লিখেছে সার? ওগুলো তো ভূতই। তা ছাড়া আবার কী?”

    “আমি জানি না, হরেন। পাদরি যা লিখেছেন সেটাই আমি বলছি।”

    “ঠিক আছে সার, ঠিক আছে। বলুন, আপনি বলুন।”

    “পরের রাতটা আরও সাংঘাতিক সম্পূর্ণরূপে ভয়াবহ এবং বিধ্বংসী’, লিখেছেন সাহেব। কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ প্রচণ্ড এক ঝড় উঠল। ওদের নৌকোটাকে ঠেলে নিয়ে ঢোকাল এক খাঁড়ির মধ্যে। কোনওরকমে সেটাকে পাড়ের কাছে নিয়ে গিয়ে যত দড়িদড়া ছিল সব দিয়ে কষে বাঁধা হল একটা গাছের সঙ্গে। কিন্তু ভয়ানক সে ঝড়ের দাপট; হাওয়ার মুখে দড়ি বেশিক্ষণ টিকল না। খানিক পরেই টুকরো টুকরো হয়ে গেল সব বাঁধন, মনে হল ঝড়ের তোড়ে এক্ষুনি নৌকো খাঁড়ির নিরাপদ আশ্রয় থেকে ভেসে যাবে মোহনায়, উথাল পাথাল ঢেউয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে একেবারে। আর সমস্তক্ষণ অঝোরে বৃষ্টি, মনে হইতেছিল যেন কেউ বৃহৎ বারিভাণ্ড লইয়া নৌকার উপর জল নিক্ষেপ করিতেছে, আর মস্তকের সম্মুখে অনবরত এমন উজ্জ্বল বিদ্যুৎচমক আর কর্ণবিদারক বজ্রপাত হইতে লাগিল যে সে রাত্রে আমাদিগের প্রাণ বাঁচানোর আশা আর রহিল না।”

    “এইরকম সময়ে ‘এক আকস্মিক এবং স্বতস্ফূর্ত চেষ্টায়’ পাদরিসাহেব আর তার দুই পর্তুগিজ পথপ্রদর্শক জঙ্গলের গাছের পাচালো শেকড়গুলি দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। তাদের হাতগুলোও যেন জীবন্ত শেকড়ের মতো হয়ে লেগে রইল গাছের সঙ্গে। প্রায় দুই ঘটিকা কাল, যতক্ষণ সে ঝঞ্ঝা তীব্র গতিতে বহিয়া চলিল’, ততক্ষণ ওঁরা সেইভাবে রইলেন।”

    “এই রে!” বলে উঠল হরেন। “নিশ্চয়ই সে গণ্ডীটা পেরিয়ে গিয়েছিল।”

    “কোন গণ্ডী হরেন?”

    “বললেন না সার, যে ওরা হারিয়ে গেছিল?”

    “হ্যাঁ, বললাম তো।”

    “আর দেখতে হবে না! তা হলে তাই হয়েছিল। নিশ্চয়ই ভুল করে গণ্ডীটা পেরিয়ে গিয়েছিল, আর একেবারে দক্ষিণরায়ের এলাকায় কোনও দ্বীপে গিয়ে পড়েছিল। ওরকম কোথাও কিছু নেই হঠাৎ ঝড় শুরু হয়ে গেল–ওরকম হলেই বুঝতে হবে ও দক্ষিণরায় আর তার দানোগুলোর কারসাজি।”

    আর ধৈর্য রাখতে পারলাম না আমি। বললাম, “হরেন, ঝড়ঝঞ্ঝা হল প্রাকৃতিক ব্যাপার, কারও ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর সেটা নির্ভর করে না।”

    এত রূঢ়ভাবে কথাটা বলেছিলাম আমি যে হরেন আর প্রতিবাদ করল না, কিন্তু একমতওঁ হল না আমার সঙ্গে। “ঠিক আছে সার,” ও বলল, “আমার বিশ্বাস আমার কাছে, আপনার বিশ্বাস আপনার কাছে। তারপর গল্পটা কী হল বলুন।”

    আমার মনে হল একমাত্র কবিই ওর মতো এইরকম মানুষদের চিনতে পেরেছিলেন–‘পেশি আর সারল্যে ভরপুর।’

    অনেকক্ষণ একটানা লেখা হয়ে গেল কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে বোধহয়। আমার ডটপেনের কালিও ফুরিয়ে এসেছে। এত বছর না লিখলে এরকমই হয় প্রতিটা মুহূর্ত যেন স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ হয়ে ফিরে আসে, ছোট ছোট ঘটনাকে মনে হয় যেন বিশ্বদর্শন।

    আমাকে এখানে ফকিরের কাছে রেখে কুসুম আর হরেন বেরিয়েছে। ওরা দেখতে গেছে যে গুজবটা সত্যি কিনা মরিচঝাঁপিতে হামলা হতে পারে সেই গুজব; যদি সেটা সত্যি হয় তা হলে কখন হতে পারে সে হামলা?

    আপশোস হচ্ছে। এতগুলো বছর কত সময় ছিল আমার হাতে, কিন্তু একটা শব্দও লিখিনি আমি। আর এখন আমার নিজেকে আরব্যোপন্যাসের সেই শাহজাদির মতো মনে হচ্ছে–ভ্রান্তস্থিতি, ভ্রান্তলিঙ্গ–ছুটন্ত কলম হাতে কোনওরকমে রাতটা পার করে দেওয়ার চেষ্টা করছি…

  • গর্জনতলা

    গর্জনতলা

    গর্জনতলা

    শেষবার নদী পেরোনোর পর ফকিরের নৌকো এসে থামল অগভীর জলে, পাড় থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে। পিয়ার আন্দাজ একেবারে ঠিক প্রমাণিত হয়েছে, সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই আর–সাউন্ডিং-এর ফলাফল অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে বাঁকের মুখে, নদীর কনুইয়ের ঠিক ভেতরের দিকটায় কিলোমিটার খানেক জায়গা জুড়ে বেশ খানিকটা গম্ভীর হয়ে গেছে খাতটা। চারপাশ থেকে আস্তে আস্তে ঢালু হয়ে এসে কিডনি আকৃতির একটা বেসিন সৃষ্টি হয়েছে সেখানে। কোথাও কোথাও সেটা নদীর খাতের থেকে আট মিটারের মতো বেশি গম্ভীর হলেও, গড়ে সে গভীরতা মিটার পাঁচেকের বেশি নয়। সংক্ষেপে, শুখা মরশুমে জল কমে এলে মেকং নদীর নীচের যে ‘পুকুর’গুলিতে ওর্কায়েলারা এসে জমা হয়, প্রায় সবদিক থেকেই সুন্দরবনের এই নদীখাতের দহের সঙ্গে তার ভীষণ মিল।

    জল এখন অনেকটাই ওপর দিয়ে বইছে। হাত কয়েকের বেশি আর দেখা যাচ্ছে না। পাড়ের কাদা। বনের গাছগুলোও ঠিক চোখের সমান উচ্চতায়–নৌকোর থেকে উঁচুতেও নয়, নিচুতেও নয়। পাড়ের কাছে এ জায়গাটা এতই অগভীর যে এখানে আর সাউন্ডিং-এর কোনও মানেই হয় না। বেশ কয়েকঘণ্টা পর এতক্ষণে একটু গা ঢিলে দিল পিয়া। দূরবিনটা নামিয়ে চোখ রাখল পাড়ের সবুজের দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ কাদার মধ্যে ইটের টুকরোর মতো কী যেন একটা নজরে এল। দূরবিন দিয়ে ভাল করে একবার দেখল পিয়া। হ্যাঁ, ঠিকই মনে হয়েছিল, ইটের টুকরোই বটে। একটা টুকরো শুধু নয়, পাড় জুড়ে রাশি রাশি পড়ে রয়েছে ওরকম ভাঙা ইট। ওপরের ঘন জঙ্গলের দিকে নজর করে দেখা গেল গায়ে গায়ে লেগে থাকা গাছগুলোর মধ্যে কয়েকটা গজিয়ে উঠেছে পুরনো মাটির দেওয়ালের ওপর, আর কয়েকটার শেকড়-বাকড়ের মধ্যে জড়িয়ে রয়েছে থাক থাক ইট।

    ফকিরকে ডাকল পিয়া, “লুক–দেয়ার।” পাড়ের দিকে একবার ফিরে দেখে মাথা নাড়ল ফকির। হাত দিয়ে সেদিকে দেখিয়ে বলল, “গর্জনতলা”। পিয়া আন্দাজ করল হয়তো কোনও একদিন এই নামে কোনও বসতি ছিল এখানে। “গর্জনতলা?” মাথা নেড়ে সায় দিল ফকির। নামটা জেনে খুশি হল পিয়া, চটপট টুকে নিল নোটবইয়ে। ঠিক করল এই পরিত্যক্ত গ্রামের নামেই ভাটার সময় ডলফিনদের জড়ো হওয়ার জায়গাটার নামকরণ করা হবে–‘গর্জনতলা, দহ’।

    হঠাৎ লাফিয়ে উঠল টুটুল। অল্প দুলে উঠল নৌকোটা। নোটবই থেকে চোখ তুলে পিয়া দেখল খানিক দূরে পাড়ের একটা গাছের দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে ও। আশপাশের অন্য গাছের তুলনায় সেটা বেশি লম্বা, এই বাদাবনের গাছের মতো নয় ঠিক, খানিকটা যেন বার্চের মতো দেখতে–পাতলা ডালপালা, হালকা রঙের বাকল, বনের অন্যসব গাছের ঘন সবুজের সামনে এর পাতাগুলোকে মনে হচ্ছিল প্রায় রুপোলি।

    পিয়ার নদী পারাপারের কাজ হয়ে যাওয়ার পর হঠাই নৌকোর মুখ এদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল ফকির। একটু আশ্চর্য হয়েছিল পিয়া। এর আগে জঙ্গলের এতটা কাছে ও কখনও আসেনি, মনে হচ্ছিল যেন এই প্রথম এল বনের মুখোমুখি। আগে জঙ্গল যেটুকু দেখেছে সে হয় অর্ধেক জলে ডোবা, নয়তো দূরের উঁচু পাড় থেকে জলের ওপর ঝুঁকে থাকা কালো ছায়ার মতো। সামনাসামনি দেখে অবাক হয়ে গেল ও। চোখে যেন ধাঁধা লাগিয়ে দেয় এই গাছগাছালির সারি। পর্দা বা দেওয়ালের মতো যে জঙ্গলটা চোখের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তা শুধু নয়, যেন ধন্দে ফেলে দিচ্ছে মানুষের দৃষ্টিকে, যেন খুব ভেবেচিন্তে বানানো প্রহেলিকা। আকার, ঢং, বর্ণ আর বিন্যাসের এত বৈচিত্র্য এখানে যে চোখের সামনে থাকা জিনিসও হঠাৎ করে নজরে আসে না, লুকিয়ে থাকে অসংখ্য রেখার জটের মধ্যে–বাচ্চাদের হেঁয়ালি ছবির মতো।

    শেষ একবার জোরালো বৈঠা মেরে ফকির দাঁড় তুলে নিল। পাড়ের কাদায় আস্তে একবার ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল ডিঙিটা। ফকির উঠে দাঁড়িয়ে ম্যাজিকের মতো কবজির ছোট্ট একটা মোচড়ে পরনের লুঙ্গিটাকে ল্যাঙ্গোটের মতো বানিয়ে ফেলল। তারপর নৌকোর পাশের দিকে পা ঝুলিয়ে বসে ঝুপ করে নেমে পড়ল জলে, আর নৌকোটাকে আরও একটু ঠেলে দিল পাড়ের দিকে। ডিঙির একেবারে সামনে বসে পিয়া দেখল পাড়ের অনেকটা ওপরের দিকে বসে আছে ও, সামনের ঢাল জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে জটপাকানো ম্যানগ্রোভের দেওয়াল।

    টুটুলকে কোলে তুলে নিয়ে হাত দিয়ে পিয়াকে ইশারায় ডাকল ফকির। পিয়া বুঝতে পারল নৌকো থেকে নেমে ওর পেছন পেছন যেতে বলছে। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে ও? পিয়ার ইশারায় প্রশ্নের জবাবে শুধু হাত তুলে সামনের জঙ্গলের পেছনে দ্বীপের ভেতরের দিকটা দেখাল ফকির।

    “ইন দেয়ার?”

    আবার হাত নেড়ে ডাকল ওকে ফকির। ইশারা করল তাড়াতাড়ি যেতে। এক মুহূর্ত দ্বিধা করল পিয়া; কাদা, পোকামাকড়, ঘন বন–এসব ওর একটুও পছন্দ নয়। কিন্তু এ সবগুলিই প্রচুর পরিমাণে রয়েছে পাড়ের ওপর। অন্য যে-কোনও অবস্থাতেই কিছুতেই এরকম জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে ঢুকত না পিয়া, কিন্তু ফকিরের সঙ্গে ও যেতে পারে। কেন যেন মনে হয় ওর সঙ্গে থাকলে বিপদের কোনও ভয় নেই।

    “ওকে। আই অ্যাম কামিং,” হাঁটু অব্দি প্যান্টটা গুটিয়ে নিয়ে নৌকোর পাশের দিক দিয়ে পা বাড়িয়ে দিল পিয়া। পায়ের তলা থেকে কাদা সরে গেল ওর ভারে। একটা ভেজা ভেজা খপাৎ শব্দ করে মাটির ভেতরে যেন টেনে নিল পা-টা। পিয়া একটুও প্রস্তুত ছিল না এর জন্যে, কারণ ফকির যখন নেমে দৌড়ে পাড়ে উঠে গেল তখন একবারও মনে হয়নি কাদা এত গভীর এখানে। সামান্য যেটুকু সামনে ঝোঁক দিয়ে নামতে হল নৌকো থেকে, এ কাদায় ব্যালান্স হারানোর জন্য সেটুকুই যথেষ্ট। কাদা যেন গোড়ালিটা কামড়ে ধরে টানছে পেছনের দিকে, শরীরটাকে সরিয়ে দিচ্ছে ভরকেন্দ্র থেকে। হঠাৎ পিয়া দেখল মুখ থুবড়ে উলটে পড়ে যাচ্ছে ও, হাতদুটো সামনে বাড়ানো–কাদা থেকে বাঁচার জন্য। কিন্তু ঠিক সময়ে ওর একেবারে সামনে এসে গেল ফকির। নিজের শরীর দিয়ে পিয়াকে ঠেকানোর জন্য দাঁড়িয়ে পড়ল ওর মুখোমুখি। ধপাস করে ফকিরের কাঁধের ওপর এসে পড়ল পিয়া, ওর গায়ের সেই নোনা গন্ধ আবার এসে লাগল নাকে। হাতের সামনে কোনও থাম কি গাছ পেলে পড়ন্ত মানুষ যেমন তাকে জড়িয়ে ধরে নিজেকে সামলায়, ফকিরকে সেরকম দু হাতে জড়িয়ে ধরল পিয়া। একটা হাতে আঁকড়ে ধরল ফকিরের স্কন্ধার হাড়। অন্য হাতটা পিছলে গেল ওর খালি গায়ের চামড়ার ওপর দিয়ে, একেবারে পিঠের শেষটায় এসে থামল। মুহূর্তের জন্য সংকোচে অবশ হয়ে গেল পিয়া। ঠিক সেইসময়ে টুটুলের গলা শুনতে পেল ও। পিয়ার দুরবস্থা দেখে মজা পেয়ে হাসছে–শিশুসুলভ আনন্দে। আস্তে আস্তে আঙুল সরিয়ে নিয়ে ফকিরের গা ছেড়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল পিয়া। ওকে সোজা করে দাঁড় করাতে ফকির যখন কনুইয়ের তলা দিয়ে এক হাত গলিয়ে দিল, পিয়া দেখল ও-ও হাসছে। সে হাসিতে নিষ্ঠুরতা নেই। পিয়ার পড়ে যাওয়ার চেয়ে আচমকা গভীর কাদায় নামার পর ওর ভ্যাবাচ্যাকা ভাবটাতেই যেন বেশি মজা পেয়েছে ফকির।

    পিয়া নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর ছোট্ট একটু মূকাভিনয় করে দেখিয়ে দিল ফকির, কেমন করে হাঁটতে হবে এই কাদার মধ্যে। প্রথমে একটা পা তুলে বুড়ো আঙুলটা কঁকড়ার পঁাড়ার মতো কুঁকড়ে ধরল, তারপর কাদার মধ্যে যেন পুঁতে দিল পা-টাকে। পিয়া নিজে চেষ্টা করল এবার, কয়েক পা এগোল ঠিক মতো, তারপর পিছলে গেল আবার। সৌভাগ্যবশত ফকির পাশেই ছিল। ওর হাতটা ধরে কোনওরকমে টাল সামলে নিল। কাদা পার হয়ে পাড় বরাবর টানা দুর্ভেদ্য জঙ্গলে ঢুকে পড়া পর্যন্ত হাতটা ধরে রইল পিয়া।

    ফকিরের সঙ্গে দেখা গেল একটা ধারালো দা আছে। পিয়াকে ছেড়ে এগিয়ে গেল ও, ডাইনে বাঁয়ে দা চালিয়ে ডালপাতা কেটে কেটে ঢুকতে লাগল ঘন বনের ভেতরে। সামান্য পরেই জঙ্গলের দেওয়াল ভেদ করে একটা খোলা জায়গায় এসে পড়ল ওরা। বনের মধ্যে একচিলতে ফাঁকা ঘাসজমি, কয়েকটা বেঁটে খেজুরগাছ ছাড়া আর কোনও গাছ নেই সেখানে।

    ফাঁকা জায়গাটার শেষে ছোট একটা গুমটি মতো ঘর–কয়েকটা খুঁটির ওপর দাঁড় করানো। একদৌড়ে টুটুল সেটার সামনে চলে গেল। কাছে গিয়ে পিয়া দেখল গুমটি নয়, পাতা দিয়ে তৈরি একটা ছোট মন্দিরের মতো–ওটা দেখে ওর মায়ের পুজোর টেবিলের একটা সুদূর স্মৃতি ভেসে এল পিয়ার মনে। তফাত শুধু এ মন্দিরের মূর্তিগুলির সাথে পিয়ার চেনা হিন্দু ঠাকুর দেবতাদের কোনও মিল নেই। সবচেয়ে বড়টি স্ত্রী মূর্তি টানা টানা চোখ, শাড়ি পরা; তার পাশে আকারে একটু ছোট একটি পুরুষের মূর্তি। দু’জনের মাঝখানে নিচু হয়ে বসে আছে একটা বাঘ–গায়ের ডোরাকাটা দাগ দেখে বাঘ বলে আন্দাজ করা গেল সেটাকে।

    পিয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল ফকির আর টুটুল মিলে একটু পুজো মতো করল সেখানে। প্রথমে কিছু ফুল পাতা নিয়ে এসে মূর্তিগুলির সামনে রাখল। তারপর মন্দিরের সামনে মাথা হেঁট করে জোড়হাতে দাঁড়িয়ে ফকির মন্ত্রের মতো কিছু একটা আওড়াতে লাগল। কয়েক মিনিট শোনার পর পিয়া ধরতে পারল মন্ত্রটার মধ্যে একটা লাইন ধুয়ার মতো ঘুরে ঘুরে আসছে। তার মধ্যে একটা শব্দ মনে হল ‘আল্লা’। এতক্ষণফকিরের ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামায়নি পিয়া, কিন্তু এখন মনে হল ও হয়তো মুসলমান। কিন্তু সেটা ভাবার পরেই খেয়াল হল মুসলমান হলে তো এরকম মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করবে না। ফকির যেটা করছে তার সাথে ওর মা যেরকম পুজো করত তার বেশ মিল রয়েছে। কিন্তু মন্ত্রের শব্দগুলো শুনে আবার অন্যরকম মনে হচ্ছে।

    তবে যাই হোক না কেন তাতে কীই বা আসে যায়? এখানে দাঁড়িয়ে এরকম একটা অদ্ভুত পুজো দেখার সুযোগ পেয়েই ও খুশি।

    মিনিট কয় পরে আবার ফিরতি পথ ধরল ওরা। জঙ্গল ভেদ করে নদীর কাছে পৌঁছে পিয়া দেখল সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে, এদিকে নদীর জলও নামতে শুরু করেছে। এবার খুব সাবধানে পা টিপে টিপে কাদার মধ্যে দিয়ে হেঁটে ডিঙিটার কাছে গিয়ে পৌঁছল পিয়া। নৌকোয় উঠতে যাবে, এমন সময় হাত নাড়ল ফকির। কিছু একটা দেখাতে চাইছে কাদার মধ্যে। মিটার বিশেক দূরে হাঁটু গেড়ে বসে আছে ও মাটির দিকে ইশারা করছে হাত দিয়ে। পিয়া একটু এগিয়ে গেল। দেখল কাদার মধ্যে একটা গর্তের মতো কিছু দেখাচ্ছে ফকির। কাঁকড়া বিজবিজ করছে সেটার মধ্যে। ভুরুদুটো একটু তুলে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাল পিয়া। ফকির একটা হাত তুলে দেখাল, যেন ওকে বলতে চাইছে গর্তটা কীসের একটা হাতের ছাপ। ব্যাপারটা ঠিক মাথায় ঢুকল না পিয়ার। ভুরু কুঁচকে ভাবতে লাগল ফকির ছাড়া আর কে হাত দিতে যাবে ওই কাদার মধ্যে? হঠাৎ খেয়াল হল হাত’ নয়, ও বোধহয় ‘পা’ বোঝাতে চাইছে–মানে ‘থাবা”। “টাইগার?” শব্দটা উচ্চারণ করতে যেতেই আঙুল তুলে বারণ করল ফকির। পিয়া আন্দাজ করল নিশ্চয়ই কোনও কুসংস্কার আছে–নাম উচ্চারণ করা বা ইঙ্গিতেও প্রসঙ্গটার উল্লেখ করা চলবে না।

    ছাপটার দিকে আবার তাকাল পিয়া। দেখে কিন্তু ফকির যা বলছে সেরকম কিছু বুঝল না ও। দাগটা যেখানে আছে তাতেই ওর বেশি সন্দেহ হচ্ছিল–ওই জায়গায় আসতে গেলে তো জঙ্গল থেকে পুরো বেরিয়ে আসতে হবে জন্তুটাকে। তা হলে তো জল থেকে ওর চোখে পড়ত। আর একটা বাঘ যদি কাছাকাছি থাকে তা হলে ফকিরই বা এরকম নিশ্চিন্তে থাকে কী করে? কিছুই ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

    ঠিক তখনই একটা শ্বাস ফেলার মতো শব্দ শুনতে পেল পিয়া। সঙ্গে সঙ্গে বাঘ-টাঘের সমস্ত চিন্তা উবে গেল ওর মাথা থেকে। দূরবিন তুলে দেখল কুঁজের মতো দুটো জিনিস জল কেটে ভেসে যাচ্ছে। সেই মা ডলফিন, ছানাটার সঙ্গে সাঁতরাচ্ছে। জল নামার সাথে সাথে আবার ফিরে এসেছে ডলফিনগুলো। যেরকম আন্দাজ করেছিল পিয়া, তার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে ওদের গতিবিধির ধরন।

  • আলোড়ন

    আলোড়ন

    আলোড়ন

    হঠাৎ দপদপ করতে করতে নিভে গেল টেবিলের ওপরের আলোটা। তখনও মেসোর ঘরে বসে একমনে লেখাটা পড়ছিল কানাই। একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে খানিকক্ষণ বসে রইল চুপ করে। বাইরে জেনারেটারের ধকধক শব্দটা কমতে কমতে মিলিয়ে গেল। একটা নিঝুম ভাব মেঘের মতো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে গেল গোটা দ্বীপটার ওপর। কানাই যেন শুনতে পাচ্ছিল তার এগিয়ে আসা, ভাবছিল নিস্তব্ধতার প্রসঙ্গে ইংরেজিতে কেন যে ‘ফল’ বা ‘ডিসেন্ড’ শব্দগুলো ব্যবহার করা হয় কে জানে–শুনতে লাগে যেন ওপর থেকে নেমে আসা পর্দা কি ছুরি। জেনারেটার বন্ধ হওয়ার পর যে নৈঃশব্দ্য এখন অনুভব করছে কানাই, তার মধ্যে পড়ে যাওয়া কি থিতিয়ে পড়ার ভাব তো নেই। বরং কুয়াশা কি মেঘের সঙ্গেই তার মিল বেশি–যেন দূর থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল গুঁড়ি মেরে, কিছু শব্দকে ঢেকে দিল তার চাদরে, কিছু শব্দকে আবার স্পষ্ট করে তুলল–ঝিঁঝিপোকার ডাক, দূরের কোনও রেডিয়ো থেকে ভেসে আসা একটা গানের টুকরো, হঠাৎ একটা পাচার কর্কশ চিৎকার। প্রত্যেকটা শব্দই শোনা গেল সামান্য দু-এক মুহূর্তের জন্য, তারপরেই যেন আবার ঝাপসা হয়ে ঢাকা, পড়ে গেল কুয়াশায়। এরকমভাবেই হঠাৎ একটা অচেনা শব্দ কানে এল কানাইয়ের, খুব সামান্য সময়ের জন্য, তারপরেই মিলিয়ে গেল শব্দটা। প্রতিধ্বনির মতো বহু দূর থেকে জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা সে আওয়াজ হয়তো শোনাই যেত না জেনারেটার চালু থাকলে। তা সত্ত্বেও সে শব্দের মধ্যে নগ্ন দাপট, শক্তি এবং হিংস্রতার ভয়ংকর প্রকাশ বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হল না। ছোট্ট একটু আওয়াজ, কিন্তু তাতেই যেন মুহূর্তের জন্য নিথর হয়ে গেল সমস্ত দ্বীপ, অন্যসব শব্দ যেন থেমে গেল হঠাৎ। আর তারপরেই শুরু হয়ে গেল কানে তালা-ধরানো শোরগোল–সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছিল কুকুরগুলোর পাগলের মতো চিৎকার।

    দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে ছাদে বেরিয়ে এল কানাই। আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করল কখন ফের বদলে গেছে চারপাশের রূপ। যেন কোনও মহাকাব্য লেখকের কলমের আঁচড়ে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। দিনের বেলা যে ছবি দেখেছিল, জ্যোৎস্নায় ধুয়ে গিয়ে এখন যেন তার রুপোলি নেগেটিভটুকু রয়ে গেছে চোখের সামনে। আবছা আঁধারে ঢাকা দ্বীপগুলোকেই এখন মনে হচ্ছে টলটলে দিঘি, আর গোটা নদীর বিস্তার জুড়ে যেন পড়ে রয়েছে বিশাল এক চকচকে ধাতুর পাত।

    “কানাইবাবু?”

    ঘুরে তাকিয়ে কানাই দেখল মাথায় ঘোমটা দেওয়া এক ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে দরজায়।

    “ময়না?”

    “হ্যাঁ।”

    “শুনতে পেয়েছ?” বলতে-না-বলতেই আবার সেই আওয়াজ–একইরকম অস্পষ্ট প্রতিধ্বনি, খানিকটা যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসা কোনও রেলগাড়ির শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে সারা দ্বীপ জুড়ে ফের শুরু হয়ে গেল কুকুরদের কোরাস, যেন শব্দটা আবার হবে বলে এতক্ষণ অপেক্ষা করে ছিল ওরা।

    “এটা কি…” বলতে শুরু করেই কানাই দেখল কেমন যেন কুঁকড়ে গেল ময়না। থেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “নামটা বলতে নেই, না?”

    “না,” ময়না বলল। “জোরে বলতে নেই এ নাম।”

    “কোথা থেকে আসছে মনে হয় শব্দটা?”

    “যে-কোনও জায়গা থেকে হতে পারে,” বলল ময়না। “আমি ঘরে বসেছিলাম, বসে বসে অপেক্ষা করছি, তখন ওটা শুনতে পেলাম। স্থির হয়ে আর বসে থাকতে পারলাম না।”

    “ফকির তা হলে এখনও ফেরেনি?”

    “না।”

    এবার কানাই বুঝল জন্তুটার গর্জনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে ময়নার উদ্বেগের। “চিন্তা কোরো না,” ওকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য বলল কানাই। “নিশ্চয়ই সাবধানেই আছে ফকির। কী করতে হয় না হয় সে তো ও জানে।”

    “ও?” রাগ যেন ঝরে পড়ছে ময়নার গলায়। “ওকে জানলে আর এ কথা বলতেন না আপনি। সব লোকে যা করে, ও ঠিক তার উলটোটা করবে। অন্য যারা মাছ ধরতে যায়, আমার বাবা, আমার ভাইরা, প্রত্যেকে ডিঙিতে রাত কাটালে সবার নৌকো একসঙ্গে বেঁধে মাঝনদীতে গিয়ে থাকে, যাতে কিছু হলে সবাই মিলে সামাল দিতে পারে। কিন্তু ফকির তা করবে না। ও নিজের মতো কোথাও একটা গিয়ে থাকবে; চারদিকে হয়তো সেখানে একটা জনপ্রাণীও নেই।”

    “কেন?”

    “ও ওইরকমই, কানাইবাবু,” ময়না বলল। “নিজের বোঝ নিজে বোঝে না। একেবারে বাচ্চাদের মতো করে।”

    চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে ময়নার মুখের সোনার বিন্দু তিনটে। আবার নক্ষত্রপুঞ্জের তিনটে তারার কথা মনে হল কানাইয়ের। যদিও যত্ন করে আঁচলটা টানা মাথার ওপর, কিন্তু ময়নার একদিকে একটু হেলানো মুখের অস্থির ভাবটুকু ওর মার্জিত শাড়ি পরার ঢংয়ের সঙ্গে ঠিক যাচ্ছে না, মনে হল কানাইয়ের।

    “একটা কথা বলো তো ময়না,” খানিকটা যেন মজা করে ওকে খেপানোর সুরে বলল কানাই, “বিয়ের আগে তুমি চিনতে না ফকিরকে? মানে, ও কীরকম মানুষ সেটা জানতে না?”

    “হ্যাঁ,” ময়না বলল। “আমি ওকে জানতাম, কানাইবাবু। ওর মা মারা যাওয়ার পর তো হরেন নস্করই ওকে মানুষ করেছে। ওদের গ্রাম আর আমাদের গ্রাম তো একেবারে পাশাপাশি।”

    “আচ্ছা, তুমি তো বুদ্ধিমতী মেয়ে, ময়না,” কানাই বলল। “যদি জানতেই ও কীরকম লোক, তা হলে ওকে বিয়ে করলে কেন?”

    মনে হল যেন নিজের মনেই একটু হাসল ময়না। “সে আপনি বুঝবেন না।”

    ময়নার প্রত্যয়ী ভঙ্গিটা যেন বিছুটির মতো এসে লাগল কানাইয়ের গায়ে। “আমি বুঝব না?” কর্কশ শোনাল ওর গলার স্বর। “তুমি জান আমি ছয়-ছয়টা ভাষা জানি? সারা পৃথিবী ঘুরেছি আমি? আমি কেন বুঝব না?”

    ঘোমটা খসে গেল ময়নার, মিষ্টি করে একটু হাসল ও কানাইয়ের দিকে তাকিয়ে। “আপনি ক’টা ভাষা জানেন তাতে কিছু আসে যায় না কানাইবাবু। আপনি তো মেয়েমানুষ নন, আর আপনি ওকে চেনেনও না। আপনি বুঝবেন না।”

    হঠাৎ ফিরে চলে গেল ময়না। কানাই দাঁড়িয়ে রইল, একা।

  • শোনা

    শোনা

    শোনা

    ডলফিনগুলোর ধীর নিয়মিত শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দে একটু ঝিমুনি মতো এসে গিয়েছিল পিয়ার। হঠাৎ যেন স্বপ্নের মধ্যে থেকে ভেসে আসা প্রচণ্ড একটা গুমগুম আওয়াজে চটকাটা ভেঙে গেল। চোখ খুলে উঠে বসতে বসতেই আবার চারদিক চুপচাপ। প্রতিধ্বনির রেশটুকুও নেই আর। ডিঙির গায়ে জলের ধাক্কায় মৃদু একটা ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শুধু কানে আসছে। ফটফটে জ্যোৎস্নায় তারাগুলোকে দূরে ক্ষুদে ক্ষুদে আলোর বিন্দুর মতো মনে হচ্ছে।

    নৌকোটা দুলতে শুরু করল হঠাৎ। তার মানে ফকিরও জেগে আছে। মাথাটা একটু তুলে পিয়া দেখল ডিঙির ঠিক মাঝখানটায় আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে ফকির। উঠে পড়ে কাঁকড়ার মতো হামা দিয়ে গিয়ে ওর পাশে বসল পিয়া। “কীসের আওয়াজ ওটা?” ভুরুদুটো একটু তুলে মাথা ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল ইশারায়। একটু হাসল ফকির, কিন্তু সোজাসুজি কোনও জবাব দিল না। হাতটা তুলে অস্পষ্টভাবে পাড়ের দিকে ইশারা করল একবার। তারপর থুতনিটা হাঁটুর ওপর রেখে বিকেলে ওরা যে দ্বীপটায় গিয়েছিল সেটার দিকে চেয়ে রইল একদৃষ্টে। এতদূর থেকে জলের ওপর হালকা জরির নকশার মতো লাগছে এখন দ্বীপটাকে।

    শুশুকগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে নৌকোটার চারপাশে। দু’জনে বসে চুপচাপ সেই শব্দ শুনল খানিকক্ষণ। একটু পরে পিয়া শুনতে পেল খুব আস্তে আস্তে গুনগুন করছে ফকির। একটু হেসে ও বলল, “সিং। লাউডার। সিং।” আরও বার দুই বলার পর নিচু গলায় গাইতে শুরু করল ফকির। আগের দিন যে গানটা গাইছিল তার থেকে এ সুরটা একেবারে অন্যরকম–মাঝে মাঝে প্রাণোচ্ছল, কয়েকটা কলি আবার ধীর, শান্ত। পিয়ার মনে হল যেন নিজের মনের ভাবের ছায়া দেখতে পাচ্ছে ওই সুরে। ফকিরের গান আর তার ফাঁকে ফাঁকে ডলফিনদের শ্বাসের শব্দ শুনতে শুনতে কেমন একটা তৃপ্তিতে ভরে উঠল ওর মনটা। এই মায়াময় পরিবেশে নৌকোর ওপর একজন বিশ্বাসী মানুষের পাশে বসে ওই শুশুকদের চলাফেরার শান্ত শব্দ শোনা–এর চেয়ে সুখ আর কী আছে?

    কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল ওরা দু’জন। পিয়ার মনে হল ফকির যদিও চেয়ে আছে সামনের তীরের দিকে, কিন্তু আসলে কিছুই দেখছে না ও। ঘুম এসে গেছে নাকি? যেমন অনেক সময় মানুষ আধো-ঘুমে থাকলেও দেখে মনে হয় জেগে আছে। নাকি নিজের ভাবনাতেই ডুবে আছে ও? হারিয়ে যাওয়া কোনও স্মৃতির ছেঁড়া সুতো জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে মনে মনে?

    কী দেখবে ফকির ফিরে তাকালে? একটা কুঁড়েঘরের ছবি মনে এল পিয়ার ক্যানিং-এর আশেপাশে যেরকম দেখেছে–মাটির দেওয়াল, খড়ের চাল, হেঁচা বাঁশের। দরজা। ফকিরের বাবাও হয়তো একজন জেলে পাকানো দড়ির মতো হাত পা, বহু বছরের রোদে জলে পোড়খাওয়া মুখ; ওর মা-র চেহারা শক্ত সমর্থ, কিন্তু ক্লান্তির ছাপ তাতে–দিনের পর দিন ঝুড়ি ঝুড়ি মাছ আর কঁকড়া বাজারে বয়ে নিয়ে যাওয়ার হাড়ভাঙা খাটুনি স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে চেহারায়। ছোট্ট ফকিরের খেলার সাথীর কোনও অভাব নেই, চারদিকে একগাদা বাচ্চা-কাচ্চা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। সংসারে স্বাচ্ছল্য নেই, কিন্তু পরিবারের মধ্যে উষ্ণতার কোনও অভাব নেই। এরকম পরিবারের কথা বাবার মুখে শুনেছে পিয়া: অভাব আর দারিদ্রই সেখানে একসাথে বেঁধে রাখে সকলকে।

    বিয়ের আগে কি কখনও ওর বউয়ের মুখ দেখেছে ফকির? ওর নিজের বাবা মা-র কথা শুনেছে পিয়া, তারা নাকি বিয়ের আগে দেখেছিল পরস্পরকে, এমনকী কথাও বলেছিল। অন্য সব আত্মীয়স্বজনদের সামনে অবশ্য। কিন্তু ওরা তো শহরের লোক, মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত। ফকিরদের গ্রামে নিশ্চয়ই বিয়ের আগে বর-কনেকে ওরকম দেখা করতে দেয় না। হয়তো বিয়ের যজ্ঞের সময়ই প্রথম ওরা দেখেছে দুজন দুজনকে। হয়তো তার পরেও চোখ তুলে তাকায়নি ওর বউ, যতক্ষণ না রাতে ওদের কুঁড়ের মাটির দেয়াল দেওয়া ঘরে গিয়ে শুয়েছে পাশাপাশি। তখনই হয়তো প্রথম ভাল করে চেয়ে দেখেছে বরের দিকে, মনে মনে ধন্যবাদ দিয়েছে ভাগ্যকে, এরকম জোয়ান, টানা টানা চোখের সুন্দর বর জুটিয়ে দেওয়ার জন্য। হয়তো এরকম বরেরই স্বপ্ন দেখে এসেছে ও বরাবর, এর জন্যেই এতদিন প্রার্থনা করেছে ভগবানের কাছে।

    উঠে পড়ল পিয়া, আবার গিয়ে শোবে। ডিঙির সামনের দিকে পেতে রাখা বিছানায় গিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে মনোযোগ দিল ডলফিনগুলোর দিকে। ভরা জোয়ার এসে গেছে, কিন্তু এখনও দহটা ছেড়ে যায়নি ওরা। তার মানে রাতে ওরা শিকারে বেরোয় না। কাল তা হলে ভাটা শেষ হলে দেখতে হবে তখন ওরা কী করে।

    শুয়ে শুয়ে কল্পনা করতে লাগল পিয়া আধোঘুমে দহটার মধ্যে পাক খেয়ে যাচ্ছে ডলফিনগুলো, জলের মধ্যে ভেসে আসা প্রতিধ্বনি শুনছে কান পেতে, ছবি আঁকছে–ত্রিমাত্রিক সব ছবি, যার অর্থ একমাত্র ওরাই উদ্ধার করতে পারে। খুব ভাল লাগে পিয়ার ওদের জগৎটার কথা ভাবতে: যেখানে ‘দেখা’ আর ‘শোনা’য় কোনও ফারাক নেই, যেখানে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগই অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র উপায়।

    সে তুলনায় নিজের জগতে—এখানে–কত লক্ষ যোজন দূরত্ব ওর আর ফকিরের মধ্যে। ওই জ্যোৎস্নার নদীর দিকে চেয়ে কী ভাবছে ফকির? জঙ্গলের কথা? কঁকড়ার কথা? কোনওদিনই জানতে পারবে না পিয়া। শুধু যে ভাষার ব্যবধানের জন্য তা নয়, জানতে পারবে না কারণ মানুষদের জগৎটাই এরকম। একমাত্র মানুষই পৃথিবীতে আসে অন্যের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখার ক্ষমতা নিয়ে। ফকির আর ও, ওরা দু’জন দু’জনকে যতটা জানে, তাতে ওরা যদি দুটো গাছ কি পাথরও হত তফাত বিশেষ কিছু হত না। সেভাবে ভাবলে একদিক থেকে এটাই তো ভাল, এই কথা না বলতে পারাটা–অন্তত এটুকু তো বলা যাবে যে নিজেদের কাছে সৎ আছে ওরা। কারণ ডলফিনরা যেমন তাদের প্রতিধ্বনির আয়নাতেই পৃথিবীটাকে দেখে, তার সঙ্গে তুলনা করলে মানুষের ভাষা তো শুধু কিছু কৌশল, চোখের দিকে তাকিয়েই মনের কথা পড়ে নেওয়া সম্ভব–এই ভুল ধারণার বাহন মাত্র।

  • তীরে ভেড়া

    তীরে ভেড়া

    তীরে ভেড়া

    অবশেষে কুমিরমারি। সেখানেই সেদিন মরিচঝাঁপির কথা প্রথম শুনলাম আমি। দুটো দ্বীপের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। যে স্কুলটায় গিয়েছিলাম সেখানকার মাস্টারমশাইদের মধ্যেও অনেকেই দেখেছেন যখন রিফিউজিরা আসে। হাজারে হাজারে লোক নাকি এসেছে–বড় নৌকোয়, ছোট নৌকোয়–যে যা পেয়েছে। তাতে করেই গিয়ে উঠেছে মরিচঝাঁপিতে। মাস্টারমশাইদের আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেও নাকি কেউ কেউ ভিড়ে গেছে ওদের সঙ্গে, বিনে পয়সায় জমি পাওয়া যাবে সেই আশায়। সবাই আশ্চর্য হয়েছে উদ্বাস্তুদের বুকের পাটা দেখে। কেউ কেউ আবার বলেছে এই নিয়ে পরে গন্ডগোল বাঁধতে পারে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের জায়গা, সরকার কি আর এমনি ছেড়ে দেবে? তাড়িয়ে ছাড়বে ওদের ওই দ্বীপ থেকে।

    আমি আর এই নিয়ে মাথা ঘামাইনি তখন। আমার কী যায় আসে?

    দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে হরেন আর আমি ধীরে সুস্থে রওয়ানা হলাম লুসিবাড়ির উদ্দেশে। নৌকো করে যাচ্ছি বাড়ির পথে, এমন সময় হঠাৎ ঝড় উঠল। দেখতে না দেখতে তুমুল হাওয়ার তোড় হুড়মুড় করে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের ওপর–অদ্ভুত রণমূর্তিতে ক্ষ্যাপা মোষের মত আক্রমণ করল আমাদের। এজন্যই এখানকার লোকে মনে করে যে অলৌকিক কিছু একটা আছে এই ঝড়গুলোর পেছনে। কয়েক মিনিট আগে পর্যন্ত যে নদী একেবারে শান্ত ছিল সেখানে এখন উথাল পাথাল ঢেউ, মোচার খোলার মতো নৌকোটাকে তুলে আছড়াচ্ছে। খানিক আগেও যে নৌকোকে নাড়াতে দম বেরিয়ে যাচ্ছিল হরেনের, সে এখন হু হু করে ছুটে চলেছে আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে।

    “এবার কি তা হলে শেষ, হরেন?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।

    “না সার,” ও বলল, “এর থেকেও কত বড় ঝড় পার করে দিয়েছি–”

    “কবে?”

    “সত্তর সালে। আগুনমুখা ঝড়ে পড়েছিলাম। সে যদি আপনি দেখতেন তা হলে তো এটাকে কোনও ঝড়ই মনে হত না আপনার। কিন্তু সে অনেক লম্বা গল্প সার। এখন আগে কোনওরকমে পাড়ে নিয়ে গিয়ে তুলি নৌকোটাকে।” ডান হাত তুলে একটা দ্বীপের দিকে দেখাল হরেন।

    “মরিচঝাঁপি, সার। ঝড় থামা পর্যন্ত ওখানেই গিয়ে অপেক্ষা করতে হবে আমাদের।”

    আমি আর কী বলব? পেছন থেকে হাওয়ার চাপ থাকায় একটু পরেই গিয়ে পাড়ে ঠেকল নৌকো। সেটাকে ঠেলে ডাঙায় তুলতে হরেনের সঙ্গে হাত লাগালাম আমিও। তারপর ও বলল, “সার, কোথাও একটা গিয়ে উঠতে হবে আমাদের। কোনও চালা-টালার নীচে।”

    “এখানে কোথায় গিয়ে উঠব হরেন?”

    “ওইখানটায় সার। একটা ঘর দেখা যাচ্ছে।”

    আর কথা না বাড়িয়ে ওর পেছন পেছন দৌড়োলাম। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে, আমার চশমার কাঁচ বেয়ে ধারা নামছে জলের, কোনওরকমে শুধু হরেনের পিঠটার দিকে নজর রেখে দৌড়ে চলেছি সামনের দিকে।

    একটা চালাঘরের সামনে গিয়ে পৌঁছলাম আমরা। দরমার বেড়া আর গোলপাতার ছাউনি দেওয়া ঘর। দরজার কাছে এসে হরেন একটা হাঁক ছাড়ল, “ঘরে কেউ আছ নাকি গো?

    খুলে গেল দরজাটা। আমি গিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। চোখ পিটপিট করতে করতে চশমা খুলে কাঁচটা মুছছি, এমন সময় শুনতে পেলাম কে যেন বলছে, “সার? আপনি!”

    নীচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একজন অল্পবয়সি মহিলা হাঁটু গেড়ে বসে প্রণাম করছে আমাকে। আমি চিনি না ওকে, কিন্তু ও আমাকে চেনে। তাতে অবশ্য আমি বিশেষ আশ্চর্য হইনি। বহু বছর এক জায়গায় শিক্ষকতা করলে পথেঘাটে যার সঙ্গেই দেখা হয় এই একই ব্যাপার ঘটে। ছাত্রছাত্রীরা বড় হয়ে যায়, স্মৃতিশক্তি তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে পারে না। নতুন নতুন মুখগুলিকে তাদের পুরনো চেহারার সঙ্গে মেলাতে পারি না।

    “সার, আমি কুসুম,” মেয়েটি বলল।

    এত দূরে এই মরিচঝাঁপিতে ঝড় বাদলের মধ্যে আশ্রয় খুঁজতে এসে শেষে কুসুমের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে এ আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। “অসম্ভব!”

    চশমাটা শুকিয়ে গেছে ততক্ষণে। নজর করে দেখলাম একটা বাচ্চা ছেলে উঁকি মারছে মেয়েটির পেছন থেকে। “ওটা আবার কে?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।

    “ও আমার ছেলে, ফকির।”

    একটু ঝুঁকে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে গেলাম, কিন্তু ছুট্টে পালাল ছেলেটা। মায়ের আঁচলের তলা থেকে উঁকি দিয়ে দেখতে লাগল।

    “খুব লাজুক, সার,” হেসে বলল কুসুম।

    হঠাৎ আমার খেয়াল হল হরেন তখনও বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝলাম আমাকে সম্মান দেখানোর জন্য ভেতরে ঢোকেনি ও। মনে মনে একটু খুশিও হলাম, আবার বিরক্তিও লাগল। খুশি হলাম, কারণ মানুষের শ্রদ্ধার মূল্য বুঝবে না দুনিয়ায় এরকম সাম্যবাদী কেউ কি আছে? কিন্তু রাগ হল এই কথা ভেবে যে, ও কি জানে না এইরকম হাত-জোড় করা ভাব আমি পছন্দ করি না?

    দরজা দিয়ে মাথা বের করে দেখলাম ওই অঝোর বৃষ্টির মধ্যে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে ও। “কী ব্যাপার কী হরেন?” আমি বললাম। “ভেতরে এসো, ভেতরে এসো। এখন কি এইসব আদিখ্যেতার সময় নাকি?”

    ভেতরে এল হরেন। খানিকক্ষণ কারও মুখে কোনও কথা নেই–বহুদিন পর চেনা মানুষদের সঙ্গে দেখা হলে অনেক সময় যেমন হয়। কুসুমই মুখ খুলল প্রথম, “তুমি?” হরেন তার স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে বিড়বিড় করে কী যে জবাব দিল কিছুই বোঝা গেল না। তারপর বাচ্চাটাকে ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে কুসুম বলল, “এই যে ফকির, আমার ছেলে।” ছেলেটার চুলে হাত বুলিয়ে হরেন বলল, “বেশ বেশ!”

    “আর তোমার বাড়ির কী খবর?” জিজ্ঞেস করল কুসুম। “ছেলেপুলেরা নিশ্চয়ই সব বড় বড় হয়ে গেছে?”

    “ছোটটার পাঁচ বছর হল, “হরেন বলল। “আর বড়টার এই চোদ্দো চলছে।” হাসল কুসুম। তারপর ঠাট্টার সুরে বলল: “বল কী গো? তা হলে তো প্রায় বিয়ের বয়স হয়ে গেল বলতে গেলে।”

    “না,” হঠাৎ একটু জোরেই বলে উঠল হরেন। “যে ক্ষতি আমার হয়েছিল ওর বেলায় সেটা হতে দেব না আমি।”

    কথাটা লিখলাম একটা উদাহরণ হিসেবে, অনেক অস্বাভাবিক সময়েও মানুষ কেমন তুচ্ছ সব বিষয়ে কথা বলে সেটা বোঝানোর জন্য।

    “কাণ্ডটা দেখো একবার,” আমি বললাম। “এতদিন পরে খোঁজ পাওয়া গেল কুসুমের, আর আমরা কিনা হরেন আর তার ছেলেমেয়েদের নিয়েই কথা বলে যাচ্ছি তখন থেকে।”

    একটা মাদুর পাতা ছিল মাটিতে, তার ওপরে বসে পড়লাম আমি। কুসুমকে জিজ্ঞেস করলাম কোথায় ছিল ও এতদিন, আর কী করেই বা এই মরিচঝাঁপিতে এসে পৌঁছল।

    “কী বলব সার,” বলল কুসুম। “সে অনেক বৃত্তান্ত।”

    বাইরে থেকে বাতাসের গর্জন কানে আসছে, বৃষ্টিরও থামার কোনও লক্ষণ নেই। “এমনিতেও তো কিছুই করার নেই এখন,” আমি বললাম। “তার থেকে তোর গল্পটাই বল, শুনি।”

    হাসল কুসুম। “ঠিক আছে সার। আপনাকে আর না বলি কী করে? যা যা ঘটেছিল সবই বলছি।”

    মনে আছে, সে কাহিনি বলতে গিয়ে গলার স্বর বদলে গেল কুসুমের, কথা বলার ঢঙে ছন্দ যোগ হল–স্পষ্ট তার লয় আর মাত্রা। নাকি সে আমারই স্মৃতির ছলনা? কে জানে। সে যাই হোক, ওর সেই কথাগুলি এখন বন্যার স্রোতের মতো নেমে আসছে আমার মনে। তার সঙ্গে তাল রেখে পক্ষীরাজের মতো উড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে আমার কলমকে। মূর্তিমতী বাগদেবী সেদিনের সেই কুসুম; আমি তার লিপিকর মাত্র।

    “মা কোথায়, খোঁজ কেউ পারে কি বলতে? আঁধারে হাতড়ে মরি, পথ জেনে নিতে অনেককে শুধোলাম। কেউ বলে শুনি, ধানবাদ নামে কোনও শহরেতে কোথা মাকে ওরা নিয়ে গেছে। সেখানে কী করে যেতে হবে জানি না তো। জিজ্ঞাসা করি, অচেনা বা চেনা লোক যাকে পাই পথে। এই গাড়ি সেই গাড়ি রেলগাড়ি ধরে, অবশেষে পৌঁছই ধানবাদে গিয়ে।

    “স্টেশনে নামার পর অন্ধকার দেখি, কী করে এখানে আমি খুঁজে পাব মাকে? খনির শহরে সেই সেখানে বাতাসে ধোঁয়া ধুলো লোহাগন্ধ চারিদিকে ভাসে। লোকজন পথেঘাটে আদতে আলাদা, তেমন মানুষ আগে দেখিনি কখনও। লোহা দিয়ে গড়া যেন মুখের জবান। কথা বলে, শব্দ যেন বেজে বেজে ওঠে। চোখের চাহনি যেন জ্বলন্ত কয়লা, তাকালেই মনে হয় হ্যাঁকা লাগে গায়ে। একে সেখানে আমি ছেঁড়া ফ্রক পরা, ছোট মেয়ে, ভয়ে বুক দুরু দুরু করে।

    “অদৃষ্ট কিন্তু ছিল সহায় আমার। অজানিতে ভগবান বাতলে দিল পথ। ঘুগনির ফেরিওয়ালা স্টেশনে সেখানে সওদা সাজিয়ে বসে খদ্দেরের আশে। কাছে গিয়ে তার সাথে কথা বলে আমি দেখি যে ভাটির দেশ তারও জন্মভূমি! নাম তার রাজেন, ছিল বাসন্তীতে বাড়ি। গরিব ঘরের ছেলে, খুবই ছেলেবেলা দেশ ছেড়ে চলে আসে পেটের ধান্দায়। একদিন কলকাতা শহরে হঠাৎই চলন্ত বাসের নীচে চাপা পড়ে সে যে এক পা খোয়াল তার। তারপর থেকে এটা ওটা ফেরি করে ট্রেনে ও স্টেশনে। ভাগ্যচক্র অবশেষে নিয়ে এল তাকে, ধানবাদ শহরে এই। এখানে কপালে জুটে গেল ঝুপড়ি এক, সেখানেই থাকে। রেললাইনের পাশে, বেশি দূরে নয়। যখন শুনল রাজেন বৃত্তান্ত আমার, বলল সাহায্য নিশ্চয় করবে আমাকে। কিন্তু ততদিন আমি থাকব কোনখানে? চলে এসো ঝুপড়িতে আমার সঙ্গেই থেকে যাবে, অসুবিধা কিছুই হবে না। তুমি তো একাই, আমি একলাই থাকি। দু’জনের জন্যে ঘরে যথেষ্ট জায়গা,বলল রাজেন। আমি ধীর পায়ে পায়ে ওর পিছু পিছু যাই রেললাইন ধরে। সেখানে গিয়ে তো ডরে বুক কেঁপে ওঠে। কে জানে কেমন ঠাঁই, নিরাপদ কিনা। সারারাত জেগে থাকি। ঝম ঝম করে ট্রেন যায়, সেই শব্দ শুনি শুয়ে শুয়ে।

    “বহুদিন কেটে গেল রাজেনের ঘরে। লজ্জায় পড়িনি এক মুহূর্ত কখনও। মানুষ সে ভাল ছিল, দয়ার হৃদয়। এরকম কটা লোক খুঁজে পাওয়া যায়? ঠিক বটে, সেখানেও কানাঘুষো ছিল–”দেখ রে, ল্যাংড়া রাজু কাকে নিয়ে থাকে। সেসব কখনও আমি গায়েতে মাখিনি। বলুক যা মন চায়। কী বা যায় আসে?

    “অবশেষে একদিন রাজেনই মায়ের খোঁজ নিয়ে এল। নাকি এক জায়গায় ট্রাক-ড্রাইভাররা সব আসে প্রতিদিন, খাঁটিয়ায় বিশ্রাম করে সেথা, আর ভাড়া করে মেয়েদের। সেখানেই নাকি মা আমার কাজ করে। রাজেনের সাথে একদিন গোপনেতে গিয়ে দেখা করি। মাকে তো দেখেই বুকে ঝাপাই তখনি। কিন্তু মুখে কথা নেই–বাক্যহারা আমি; এ কী দেখি, মা তো নয়, মায়ের কঙ্কাল: কুঁকড়ে গেছে শুকনো মুখ, রোগা জীর্ণ দেহ। সে চেহারা দেখে কষ্টে ভেঙে গেল বুক। ফিসফিসে গলা মার, অস্ফুটে বলল, “দেখিস না, কুসুম, চোখ বন্ধ করে ফেল। এ চেহারা মুছে ফেল মন থেকে তোর। আগেকার আমাকেই মনে রেখে দিস, সেই যবে তোর বাবা বেঁচে ছিল আর, কষ্ট ছিল, তবু ছিল ভরা সংসার। সবই সেই দিলীপের দোষ। সে রাক্ষস, মিথ্যেবাদী, বলেছিল খুঁজে দেবে কাজ ভাল কোনও জায়গায়। শেষে এইখানে নিয়ে এসে ঠেকিয়েছে। এর চেয়ে ভাল ছিল দেশে পড়ে থেকে শাকপাতা খেয়ে কোনও মতে বেঁচে থাকা, সে তবু মানের। দিলীপ দানব সেই আনল আমাকে, বেচে দিল অন্য সব পশুদের কাছে। তুই হেথা থাকিস না, ফিরে যা, ফিরে যা। কিন্তু মন তবু চায় একবার আরও দেখে নিই তোর মুখ জনমের মতো। যাওয়ার আগেতে শুধু আর একটি বার দেখা করে যাস এই অভাগীর সাথে।

    “সে রাতের মতো আমি ফিরি ঝুপড়িতে। হপ্তা এক-দেড় পরে রাজেন আবার নিয়ে গেল আমাকে সে মায়ের ডেরায়। তখনই রাজেন দিল বিয়ের প্রস্তাব। বলে মাকে, অনুমতি দাও যদি তুমি, কুসুমকে বউ করে রেখে দিই কাছে। নতুন জীবন হবে ওর, আর আমি দুঃখ সুখ ভাগ করে নেব ওর সাথে।অবশেষে দেখি মা-র মুখে হাসি ফোটে: এর চেয়ে সুসংবাদ কী বা হতে পারে? কী ভাগ্য কুসুম! বনবিবির দয়ায় বর পাবি, ঘর পাবি এর চেয়ে সুখ কিছু যে কপালে আছে ভাবিনি কখনও।রাজেন বলল, ‘মা গো, তোমাকেও সাথে নিয়ে যাব চুরি করে। এখানে কিছুতে আমরা তোমাকে আর দেব না থাকিতে। এ তোমার জায়গা নয়। কিছুদিন আরও থাক যদি প্রাণে তুমি বাঁচবে না আর। মা-কে সাথে করে নিয়ে ফিরি সেইদিনই রাজেনের ঝুপড়িতে। সে যে কত সুখ! তার পর বিয়ে হল রাজেন ও আমার। মা দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিল আমাদের। তখন কি জানতাম এ মা-র মুকতি? তিন মাসও তারপর কাটল না আর: আমাদের সুখী দেখে মা নিল বিদায়। সে মা-র নিয়তি ছিল–কী বা করা যাবে? আরও দু’বছর যদি বাঁচত পরাণে, দেখে যেত ফকিরকে ছেলেকে আমার।

    “কত মাস কেটে গেল সেই ধানবাদে। মাঝে মাঝে দু’জনেই ভাবি ফিরে যাই, এ খনির দেশ ছেড়ে। এ তো নয় ঘর। এখানের সব কিছু বড় ভিনদেশি। লোহার ওপরে হুঁটি, মনে পড়ে খালি, ভাটির দেশের কাদা জন্ম থেকে জানা। এখানে রেলের লাইন চারিদিক বেড়ে, দেখি আর ভাবি সেই রায়মঙ্গল, কতদূরে চেনা সেই বানভাসা নদী। স্বপ্নে দেখি ঝড় আসে উথাল পাথাল, বাদাবন থরথর হাওয়ার বেগেতে। ছোট ছোট দ্বীপ কত নদী দিয়ে ঘেরা, সোনালি শেকলে যেন বাঁধা পড়ে থাকে। জোয়ারের কথা ভেবে দু’চোখে জোয়ার, মনে পড়ে মোহনার থইথই জলে ভেসে যায় নিচু দ্বীপ, মনে হয় যেন জলের নীচেতে কত মেঘ জমে আছে। রাত্রে দেশের কথা মনে করি আর গল্প করি, স্বপ্ন দেখি। সকালে আবার ফিরে আসি ফের সেই লোহা কয়লার জগতে। মনের দুখ মনে রাখি চেপে।

    “এভাবেই চলে গেল চারটি বছর। তারপর সে জীবনও শেষ হয়ে গেল: চলতে শুরু করল ট্রেন, রাজেন তখনও পায়নি পয়সা তার যাত্রীদের থেকে। ইঞ্জিনের তেজ বাড়ে, রাজেনও দৌড়ায়। হঠাৎ মোচড় লাগে খোঁড়া পায়ে তার, হোঁচটে ছিটকে পড়ে চাকার নীচেতে। কী আর বলার আছে? সময়ের আগে চলে গেল। কখনও তো

    ভাবিইনি আমি এভাবে হঠাৎ করে ছেড়ে চলে যাবে। সান্ত্বনা, ফকির আছে দান রাজেনের। তাকে বুকে নিয়ে ফের ভাবি চলে যাব চেনা দেশে, চেনা ঘরে ফিরব আবার। কিন্তু ভয় লাগে প্রাণে, বাচ্চা কোলে নিয়ে কার কাছে হাত পেতে দাঁড়াব সেখানে? যদি কিছু নাই জোটে কী করে সংসার চালাব? আবার যদি দিলীপের পায়ে গিয়ে পড়তে হয় তা’লে কী হবে আমার?

    “মনে হয় বনবিবি দেখেছিল সবই, নিজের আসন থেকে। কারণ একদিন হঠাৎ খবর পাই বিরাট মিছিল যাবে এ শহর দিয়ে, পুবদেশ পানে। পরদিনই এল তারা, মানুষের ঢল নেমে এল ধানবাদে। রেললাইন ধরে দেখি ক্লান্ত মুখ সব ধুলোয় ধূসর পা টেনে টেনে চলে। কাঁধে ছানাপোনা, বোঁচকা কুঁচকি যত, সারা সংসার টেনে নিয়ে হেঁটে চলে ভূতের মতন। কোথায় চলল এরা? কোথা থেকে আসে? সবাই অচেনা মুখ, এ শহরে আগে এদের কাউকে আমি দেখিনি কখনও। দাঁড়িয়ে দেখছি আমি সেই জনস্রোত, হঠাৎ পড়ল চোখে বয়স্কা মহিলা আমার মায়ের মতো–পা হড়কিয়ে পড়ে। তাকে নিয়ে আসি। ওদের দলের আরও কেউ কেউ আসে মহিলার সাথে। জল আর খাবার দিই, দেখি কী ভীষণ ক্লান্ত সব। বিশ্রামের খুবই দরকার। রহো, ব্যয়ঠো, বলি আমি হিন্দি ভাষায়, বিশ্রাম নিতে বলি ওদের সেখানে। জবাব আসে বাংলায়, আমি তো অবাক। চেনা শব্দ, চেনা ভাষা–কানে মধু ঢালে। কে তোমরা? কোথা থেকে আসছ এভাবে? কোথায়ই বা যেতে চাও? শুধোলাম আমি। “তুমি আমাদের বোন। বলি শোনো তবে, দীর্ঘ কাহিনি সেই,’ বলে শুরু করে।

    “আমরা বাংলারই লোক, খুলনা জেলার। ভাটি দেশে ঘর ছিল, জঙ্গলের কাছে। সে ঘর জ্বালিয়ে দিল যুদ্ধের সময়। আমরা পালিয়ে আসি, বর্ডার পেরিয়ে। এদেশে ঢুকতেই পাকড়াও করল পুলিশ, বাস ভরে নিয়ে গেল উদ্বাস্তু শিবিরে। সে এক অচেনা ঠাই, এরকম আগে জীবনে দেখিনি। বড় ভয়ংকর লাগে। ধূ ধূ করে মাঠ; মাটি টকটকে লাল, রক্তে ধোয়া যেন। যারা সে দেশের লোক তাদের কাছেতে সেই একই লাল মাটি সোনার সমান, তারা তাই ভালবাসে। যেভাবে আমরা ভালবাসি কাদামাটি, বাদাবন, নোনা জল–ঠিক সেরকমই। কিন্তু আমাদের সেথা বসে না তো মন। চেষ্টা প্রাণপণ করি, তবু কীরকম মাথার ভেতরে সেই নদী ডাক দেয়, জোয়ারের টান লাগে শিরায় শিরায়। আমাদেরই বাপ কাকা বহুদিন আগে হ্যামিলটনের ডাকে সাড়া দিয়েছিল, নদীর টানের সাথে কী লড়াই লড়ে বাদাবন সাফ করে গড়েছিল গ্রাম। একই ভাবে এখনও তো গড়ে নিতে পারি নতুন বসতি আরও, ভাবি মনে মনে। ভাটির দেশেতে আরও কত খালি দ্বীপ এখনও তো পড়ে আছে–মানুষ থাকে না। আমাদেরই এক দল গিয়ে দেখে এল বড় খালি চর এক, মরিচঝাঁপিতে। তারপর বহু মাস প্রস্তুতি নিতে চলে গেল। অবশেষে বেচেবুচে সব রওয়ানা হলাম। কিন্তু সাথে সাথে দেখি, পেয়াদা পুলিশ সব লেগেছে পেছনে। ট্রেনে থিকথিক করে পুলিশের লোক, রাস্তা বন্ধ করে রাখে, আটকে দেবে বলে। তবু পিছু হটব না কিছুতে আমরা–হাঁটতে শুরু করে দিই রেললাইন ধরে।

    “শুনি বসে বসে আর বুকে আশা জমে; এরা তো নিজেরই লোক, আত্মীয় আমার–একই ভাষা, রক্তে একই জোয়ারের টান, একই স্বপ্ন দেখি, মনে একই সুর বাজে। এরাও মাখতে চায় সেই কাদামাটি হাতে-পায়ে, দেখতে চায় জোয়ারের নদী। আমি কেন তবে আর দূরে সরে থাকি? কী লাভ এখানে থেকে, এই ধানবাদে? জং-ধরা শহরে এই মুখে রক্ত তুলে পরিশ্রম করে যাব আমরণ কাল? পুঁটুলি গুছিয়ে নিই, কাপড় কখানা গাঁঠরি বেঁধে তুলে দিই ফকিরের কাঁধে। রাজেনের স্মৃতি বুকে নেমে আসি পথে। অনেক দূরের পাড়ি সে মরিচঝাঁপি।

    “এই হল কাহিনি, সার। এই আমার কথা। এভাবেই পৌঁছলাম এইখানে এসে।”

    খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম আমরা, যে যার নিজের ভাবনা নিয়ে কুসুম আর ফকির, হরেন আর আমি। মনে মনে যেন দেখতে পাচ্ছিলাম ওরা হেঁটে আসছে, ওই হাজার হাজার মানুষ, শুধু ভাটির দেশের কাদায় আরেকবার পা রাখার জন্য। দেখতে পাচ্ছিলাম ওরা আসছে, দলে দলে ছেলেমেয়ে বাচ্চা বুড়ো সারাজীবনের সমস্ত সঞ্চয় পুঁটুলিতে করে মাথায় নিয়ে হেঁটে আসছে এই মরিচঝাঁপির দিকে। মনে হল এদের কথাই তো কবি বলতে চেয়েছিলেন, যখন লিখেছিলেন:

    “পৃথিবীর প্রতিটি ধীর মন্থর ঘূর্ণন এখন কিছু উত্তরাধিকারহীন সন্তানের জনক,

    যার কাছে ভূত কিছুর অর্থ নেই, আসন্নেরও মান নেই কোনও।”

  • ধাওয়া

    ধাওয়া

    ধাওয়া

    সকালেও দেখা গেল বাড়ি যাওয়ার কোনও উদ্যোগ করছে না ফকির। পিয়াও তাড়া দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল নাঃ যতক্ষণ এই ডলফিনগুলোর সঙ্গে কাটাতে পারে ততই ওর ভাল।

    খানিকটা বেলায় জল ফের বাড়তে শুরু করা পর্যন্ত দহটার মধ্যেই রয়ে গেল প্রাণীগুলো। তারপর আবার আধঘণ্টা যেতে না যেতেই উধাও হয়ে গেল–ঠিক আগের দিনের মতো। তফাত শুধু জোয়ার আসার সময়ের।

    তা হলে, এখন যেটা জানা বাকি রয়ে গেল তা হল এখান থেকে বেরিয়ে এরা যায় কোথায়। ফকির হয়তো জানলেও জানতে পারে। নানারকম ইশারা আর অঙ্গভঙ্গি করে অবশেষে ফকিরকে ওর প্রশ্নটা বোঝাতে পারল পিয়া: এই নৌকো করে কি ডলফিনগুলোর পেছন পেছন যাওয়া যাবে? সাগ্রহে মাথা নাড়ল ফকির, সঙ্গে সঙ্গে নোঙর তুলে ফেলল।

    দহটা ছেড়ে যখন বেরোল ওরা, তখনও জোয়ারের জল ঢুকছে। ফলে স্রোতের টানে নৌকোর গতিও বাড়ল খানিকটা। গর্জনতলা পেছনে ফেলে একটা মোহনায় এসে পৌঁছল ওরা। নৌকোর গলুইয়ে দাঁড়িয়ে পিয়া লক্ষ করল থইথই জোয়ারে ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে চারপাশের দ্বীপগুলো।

    দূরবিনে চোখ রেখে সামনে অনেকটা দূরে একবার জলের ওপর এক জোড়া পাখনা দেখতে পেল পিয়া। কিন্তু মোহনা পেরিয়ে যেতে যেতেই সেগুলির আর কোনও চিহ্ন দেখা গেল না। তবে ফকিরকে দেখে মনে হল ও ঠিক জানে কোথায় যেতে হবে। নির্দ্বিধায় ডিঙির মুখ ঘুরিয়ে প্রথমে একটা বড় খাঁড়িতে পড়ল, সেখান থেকে আবার ঢুকল সরু একটা খালে। খানিক যাওয়ার পর হঠাৎ দাঁড় নামিয়ে ইশারা করল পাড়ের দিকে। দূরবিন সমেত মুখ ফিরিয়ে পিয়া দেখল তিনটে কুমির শুয়ে আছে কাদার ওপর। আগে চোখে পড়েনি কারণ এতক্ষণ ও শুধু জলের দিকেই মনোযোগ দিয়েছিল। ও আন্দাজ করল এদেরও হয়তো ফকির আগে এই জায়গায় দেখেছে। চোখের সামনেই শুয়ে ছিল তিনটে কুমির, কিন্তু কাদামাখা শরীরগুলো এমনভাবে চারপাশের সঙ্গে মিশেছিল যে প্রাণীগুলো কত বড় সেটাও ঠিক ভাল করে বোঝা যাচ্ছিল না। একটা কুমির আবার হাঁ করে ছিল। এত বড় রাক্ষুসে হাঁ, যে পিয়ার মনে হল দাঁড়ানো অবস্থায় গোটা একটা মানুষ তার মধ্যে ঢুকে যাবে–অন্তত ওর নিজের মাপের একটা লোক তো বটেই।

    এই খালটা তুলনায় একটু সরু, ফলে এখন যদি ভাটার সময় হত, ওই কুমিরগুলোর খুব কাছ দিয়ে যেতে হত ওদের। কিন্তু জোয়ার থাকার ফলে অনেকটা দূরে আছে এখন প্রাণীগুলো পাড়ের বেশ খানিকটা ওপরের দিকে। নৌকোটা ওদের নজরে পড়েছে বলে মনে হল না, কিন্তু খানিক পরে দূরবিন ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে পিয়া লক্ষ করল মাত্র দুটো কুমির শুয়ে আছে এখন সেখানে। তিন নম্বরটা কখন পিছলে নেমে গেছে জলে। কাদার ওপর দিয়ে তার হেঁচড়ে নামার ফলে যে লম্বাটে গর্তটা তৈরি হয়েছে সেটা এর মধ্যেই ভরাট হয়ে যেতেও শুরু করেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আর কোনও চিহ্ন রইল না দাগটার; পাড়ের পলি ফের যেমন কে তেমন–আগের মতোই মসৃণ, চকচকে।

    হঠাৎ টুটুল একটা চিৎকার করে হাত তুলে কী একটা দেখাল সামনের দিকে। চট করে দূরবিন ঘুরিয়ে পিয়া একটা ডলফিনের লেজ এক ঝলক দেখতে পেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মিলিয়ে গেল সেটা জলের তলায়। কুমির দেখতে গিয়ে খামখা সময় নষ্ট করেছে বলে পিয়ার একটু রাগ হল নিজের ওপর। কিন্তু মিনিট খানেক পরেই আবার দেখা গেল একটা লেজ–জলের ওপরে একেবারে খাড়া যেন মাথার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ডলফিনটা। তার পরেই আরও এক জোড়া লেজ দেখা গেল সেটার পাশে, একইরকম খাড়া হয়ে আছে জলের ওপরে। পিয়া চিনতে পারল, সেই মা আর ছানা ডলফিনটা–ওই দহের মধ্যে যাদের দেখেছিল। জল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাজারো ছোট ছোট খাঁড়ির সৃষ্টি হয়েছে। চারপাশে, আশেপাশের দ্বীপগুলোতে ডাঙার মধ্যে বেশ খানিকটা করে ঢুকে গেছে সেগুলো। সেরকমই একটা খাঁড়িতে ঢুকে খাবার খুঁজছে ডলফিনগুলো। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে খুবই কম গভীরতা খাড়িটার, এমনকী ফকিরের নৌকোও ঢুকবে না সেখানে।

    তবে ডলফিনগুলো ওখানে কী করছে চোখ বুজে সেটা বলে দিতে পারে পিয়া: এক দল মাছকে তাড়া করে নিয়ে ঢুকেছে ওরা ওই অগভীর জলে, আর মাছগুলো ওদের হাত থেকে পালাবার ব্যর্থ চেষ্টায় গিয়ে লুকিয়েছে কাদার মধ্যে। তারপর খরগোশ যেমন করে ক্ষেতের থেকে গাজর তুলে খায়, অনেকটা সেই ভাবে জলের নীচে কাদা থেকে মাছ তুলে তুলে খাচ্ছে ডলফিনগুলো।

    ওর এত দিনের অভিজ্ঞতায় একবারই মাত্র এই দৃশ্যের ব্যতিক্রম দেখেছে পিয়া। ইরাবডিড নদীতে। সেখানে তখন একটা সার্ভের কাজ চলছিল। তারই মধ্যে খানিকটা সময় বের করে নিয়ে মান্দালয়ের উত্তরের এক গ্রামে দুই জেলের কাছে গিয়েছিল ওরা। ওরই চেনা আরেকজন সিটোলজিস্ট বলে দিয়েছিল এই জেলেদের কথা। বলেছিল, ওদের সঙ্গে গেলে এমন এক অভিজ্ঞতা হবে পিয়ার, নিজের চোখে দেখেও যা বিশ্বাস করা কঠিন।

    সেই দুই জেলের সঙ্গে আলাপ করে দেখা গেল তারা আসলে বাবা আর ছেলে। বাবা মাঝবয়সি, আর ছেলের বয়স বড়জোর চোদ্দো কি পনেরো। দুপুর এগারোটা নাগাদ তাদের মাছধরা ডিঙিতে চড়ে বসল পিয়া আর ওর দোভাষী। মাপে সে ডিঙিটা মোটামুটি এই ফকিরের নৌকোরই সমান, কিন্তু কোনও ছই ছিল না সেটাতে। সেই এগারোটার সময়ই এত গরম সেখানে যে নদীর জল পর্যন্ত মনে হচ্ছিল ঝিম ধরে আছে, বিশেষ কোনও নড়াচড়া নজরে আসছে না। পিয়া আশ্বস্ত হল দেখে যে খুব একটা দুরে ওদের যেতে হবে না। পাড় থেকে নদীর ভেতরে মিটার বিশেক যাওয়ার পরেই বয়স্ক লোকটি একটা লাঠি বের করে সেটা দিয়ে নৌকোর গায়ে বাড়ি মারতে লাগল। মিনিট কয়েকের মধ্যে একটা মসৃণ চকচকে পাখনা দেখা গেল জলের ওপরে। একটু পরে আরও কয়েকটা পাখনা ভেসে উঠল আশেপাশে। কমবয়সি জেলেটি তখন মাছ ধরার জালটা নিয়ে সেটার ধারে ধারে বাঁধা ধাতুর টুকরোগুলোতে ঝম ঝম করে আওয়াজ করতে শুরু করল। সেই শব্দ শুনে দল ছেড়ে বেরিয়ে এল দুটো ডলফিন। বাকিরা যে জায়গায় ছিল সেখানেই রয়ে গেল, আর এই জোড়াটা এগিয়ে এল নৌকোর খুব কাছে। ডিঙির মুখের কয়েক মিটার দূরে এসে হঠাৎ গোল হয়ে ঘুরতে শুরু করল ডলফিন দুটো, যেন একটা আরেকটার লেজ ধরার চেষ্টা করছে। দোভাষীর মাধ্যমে জেলেরা বোঝাল যে এক দল মাছকে ঘিরে ধরে নৌকোর দিকে নিয়ে আসছে ডলফিন দুটো।

    বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে দেখতে লাগল জেলে দু’জন। একটু পরে কমবয়সি জেলেটি উঠে দাঁড়াল। মুখ দিয়ে গুবগুব একটা আওয়াজ করে মাথার ওপর দু’-এক পাক ঘুরিয়ে নিয়ে জালটা ছুঁড়ে দিল জলে। ডলফিন দুটো যেখানে বৃত্তাকারে পাক খাচ্ছিল, ঠিক তার কেন্দ্রে গিয়ে পড়ল জালটা। জাল ডুবতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে বুজকুড়ি উঠতে লাগল জলে। দু-একটা ছোট ছোট রুপোলি মাছ লাফিয়ে উঠল, আর ডলফিনগুলো আরও দ্রুত সাঁতরাতে লাগল, ক্রমশ ছোট করে আনতে লাগল পাক খাওয়ার বৃত্তটা। দলের বাকি ডলফিনগুলোও এবার যোগ দিল ওই দুটোর সঙ্গে, তিরবেগে ঘুরতে থাকল জালের চারদিকে, লেজের বাড়ি মারতে লাগল জলে ছড়িয়ে পড়া মাছগুলোকে জালের কাছাকাছি তাড়িয়ে আনার জন্য।

    দুই জেলে এবার টেনে তুলল জালটা, সঙ্গে সঙ্গে খাবি খাওয়া কিলবিলে একটা রুপোলি পিণ্ড যেন ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল নৌকোর ওপর। মনে হচ্ছিল যেন একটা পিনাটা ফাটানো হয়েছে, আর প্রচুর ঝিলমিলে কাগজ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। ডলফিনগুলোও এর মধ্যে তাদের ভোজ শুরু করে দিয়েছে। জালটা যখন জলে ডুবছিল তার চাপে বহু মাছ গিয়ে গেঁথে গিয়েছিল নদীর নীচের নরম মাটিতে। সেই জলের তলার ফসল তুলে এখন খাচ্ছে ওরা। মহা উৎসাহে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেই মাছগুলির ওপর, মাথা নিচু করে লেজ শূন্যে তুলে শিকার ধরছে; আর জলের ওপরে মনে হচ্ছে তাদের কিলবিলে লেজের একটা ছোট জঙ্গল তৈরি হয়েছে।

    একেবারে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল পিয়া এই দৃশ্য দেখে। মানুষ এবং বন্যপ্রাণীদের পরস্পরনির্ভরশীলতার এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কিছু আছে? ভেবে পেল না ও। কত যে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে এই জলজীবনে তার কোনও সীমা পরিসীমা নেই।

  • স্বপ্ন

    স্বপ্ন

    স্বপ্ন

    বাইরে ঝড়ের গর্জন থামার কোনও লক্ষণ নেই। বোঝা গেল সে রাতে আর লুসিবাড়ি ফেরা সম্ভব নয়।

    “সার,” একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অবশেষে বলল হরেন, “মনে হচ্ছে কুসুমের ঘরের মেঝেতেই আজকের রাতটা কাটাতে হবে আমাদের।”

    “যা ভাল বোঝ,” বললাম আমি। “তুমি যা ঠিক করবে তাই হবে।”

    খানিক পরে ভাত চাপাল কুসুম। ফকির ক’টা ট্যাংরা মাছ ধরে এনেছিল, তাই দিয়ে ঝোল রাঁধল। খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে ঘরের একপাশে হরেন আর আমার জন্য মাদুর পেতে দিল, আর নিজে ফকিরকে নিয়ে শুল আরেক কোনায়। অনেক রাতে, ঝড় তখন থেমে গেছে, একবার দরজা খোলার আওয়াজ কানে এল। বুঝলাম হরেন বেরোল, নৌকোটা ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে আসতে। তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়লাম, বিকারগ্রস্ত জ্বরো রোগীর মতো সে ঘুম, একটা ঘোরের মধ্যে যেন ছটফট করতে লাগলাম।

    “সার”–কুসুমের গলা শুনতে পেলাম। অন্ধকারে মুখ দেখা যাচ্ছে না। “শরীর খারাপ লাগছে?”

    “না তো। কিছু তো হয়নি। কেন রে?”

    “না, আপনি ঘুমের মধ্যে চেঁচিয়ে উঠলেন একবার, তাই ভাবলাম।”

    কুসুম আস্তে আস্তে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে টের পেলাম। চোখে জল এল আমার। “ওসব বুড়ো মানুষের রাতের বেলার ভয়,” অবশেষে বললাম আমি। “এখন ঠিক আছি রে। যা, ছেলের কাছে যা। ঘুমো গিয়ে।”

    সকালবেলা উঠে দেখি আকাশে এক ছিটে মেঘ নেই কোথাও। এরকম একটা ঝড়ের পরে তাই হয় সাধারণত। ঝকঝকে রোদে ধুয়ে যাচ্ছে গোটা দ্বীপ আর নদী। কুসুমের ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি কাছাকাছি আরও কয়েকটা এরকম কুঁড়ে রয়েছে। হেঁটে হেঁটে খানিকটা দূর পর্যন্ত গেলাম, দেখলাম বনবাদাড় সাফ করা মাঠের ওপর আরও অনেক ঘর কয়েকটা কুঁড়ে, কিছু গুমটি, বস্তি মতো কয়েকটা। যেরকম হয় এ ধরনের ঘর এই ভাটির দেশে বাঁশ, দরমা আর মাটি দিয়ে তৈরি। কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করলাম: ঘরগুলো কিন্তু যেখানে সেখানে ইচ্ছে মতো বানানো হয়নি।

    কী আশা করেছিলাম আমি? নোংরার মধ্যে এলোমেলো ভাবে কিছু মানুষ কোনওরকমে একসঙ্গে গাদাগাদি করে বাস করছে? ‘রিফিউজি’ শব্দটার অর্থ তো সেরকমই হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু যা দেখলাম তার সঙ্গে আমার কল্পনার কোনও মিলই নেই। রাস্তাঘাট এর মধ্যেই বানানো হয়ে গেছে; বাঁধ–দ্বীপজীবনের নিরাপত্তায় যার প্রধান ভূমিকা–তাও তৈরি হয়েছে; জমি ভাগ ভাগ করে বেড়া দিয়ে ঘেরা হয়ে গেছে; বেড়ার ওপর শুকোচ্ছে মাছধরা জাল। মহিলা পুরুষ সবাই যার যার ঘরের সামনে বসে বসে জাল সারাই করছে অথবা টোপ গাঁথছে কঁকড়া ধরার সুতোয়।

    কী শৃঙ্খলা! কী পরিশ্রম! তাও মাত্রই কয়েক সপ্তাহ হল এরা এখানে এসেছে। দৃশ্যগুলি মনে গেঁথে নিতে নিতে একটা অদ্ভুত, মাতাল-করা উত্তেজনা এল আমার মধ্যে: হঠাৎ আবিষ্কার করলাম নতুন একটা কিছু জন্ম নিচ্ছে আমার চোখের সামনে, যা আগে কেউ কখনও দেখেনি। মনে হল নিশ্চয়ই ঠিক একই অনুভূতি হয়েছিল হ্যামিলটনের লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে বাদাবন সাফ করা দেখতে দেখতে। কিন্তু এই মরিচঝাঁপিতে যা হচ্ছে তার সঙ্গে হ্যামিলটনের কাজের একটা মূলগত ফারাক আছে; এটা কোনও একজন মানুষের ভাবনা নয়। যারা এখানে বসত করতে এসেছে এ তাদেরই নিজেদের স্বপ্ন, সেই স্বপ্নকেই বাস্তব করে তুলছে তারা।

    আমার চলা থেমে গেল। বৃষ্টিভেজা রাস্তার ওপর এক জায়গায় ছাতায় ভর দিয়ে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি, আমার কোঁচকানো ধুতি অল্প অল্প উড়তে লাগল সকালের ফুরফুরে বাতাসে। মনে হল আমার ভেতরে যেন একটা পরিবর্তন আসছে। কী বিস্ময়কর, আমি–বই মুখে করে সারা জীবন কাটানো একজন ইস্কুল মাস্টার আমার জীবদ্দশায় এরকম একটা ঘটনা দেখে যাচ্ছি যা কোনও শিক্ষিত বা ক্ষমতাবান মানুষের কল্পনাপ্রসূত নয়, শিক্ষা আর ক্ষমতা যাদের নেই তাদেরই নিজস্ব স্বপ্নের বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করছি আমি!

    মনে হল আমার শিরায় শিরায় যেন নতুন প্রাণ ফিরে আসছে। ছাতা ফেলে দিলাম হাত থেকে, বুক চিতিয়ে দাঁড়ালাম রোদ আর হাওয়ার মুখোমুখি। মনে হল যে শূন্যতাকে এত দিন দু’হাতে আঁকড়ে ছিলাম আমি, এক রাত্রে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি দূরে।

    ভীষণ উত্তেজিত অবস্থায় আবার ফিরে গেলাম কুসুমের ঘরে। আমার চেহারা দেখে ঘাবড়ে গেল ও। বলল, “কী হয়েছে সার? আপনার জামা কাপড়ে কাদা লাগা, মুখটা লাল হয়ে গেছে… আপনার ছাতাটা কোথায় গেল?”

    “সেসব কথা ছাড় এখন,” অধৈর্য লাগছিল আমার, “আগে বল, কে আছে এ সবের দায়িত্বে? কোনও কমিটি তৈরি হয়েছে? নেতা-টেতা কেউ আছে?”

    “সে তো আছেই। কেন বলুন তো?”

    “তাদের সঙ্গে আমি দেখা করব।”

    “কেন সার?”

    “কারণ, এখানে যা হচ্ছে তাতে আমিও কিছু করতে চাই, সাহায্য করতে চাই যে রকম পারি।”

    “সে আপনি চাইলে করবেন। আমি না বলার কে?”

    কুসুম আমাকে জানাল যে গোটা দ্বীপটাকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রত্যেকটা ভাগের দায়িত্বে আছে কিছু লোক, তারাই সমস্ত ঠিক করছে কী করা হবে না হবে, জরুরি যা যা দরকার তারাই তার ব্যবস্থা করছে।

    “তোদের ভাগটার মূল দায়িত্বে যে আছে তার কাছে নিয়ে চল আমাকে,” বললাম আমি। কুসুম পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল আমাকে, খানিক দূরে একটা কুঁড়ের দরজায়।

    নেতাটি দেখলাম বেশ বুদ্ধিমান, কর্মঠ লোক, আদৌ কোনও স্বপ্নের জগতের বাসিন্দা নয়। কেউ এসে খামখা সময় নষ্ট করলে তাকে পাত্তা দেওয়ার মানুষ সে নয়। স্বল্পবাক, কিন্তু হাবেভাবে এমন একটা আত্মবিশ্বাসের ছাপ, যেন ও জানে যে সাফল্য হাতের নাগালের মধ্যে প্রায়। খুবই ব্যস্ত ছিল সে, কিন্তু যখন শুনল আমি একটা স্কুলের হেডমাস্টার–যদিও অবসর নেওয়ার সময় এসে গেছে প্রায় আমাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে সব দেখাল। নতুন বানানো রাস্তা ধরে হেঁটে গেলাম আমরা, আমাকে দেখাতে দেখাতে নিয়ে গেল কী কী কাজ ওরা করেছে আসার পর থেকে এই কয় সপ্তাহে। মুগ্ধ হয়ে গেলাম আমি, কাজের বহর দেখে শুধু নয়, তার পেছনে যে সংগঠন, যে প্রতিষ্ঠান–কত যত্ন নিয়ে তা গড়ে তোলা হয়েছে, তাই দেখেও। দ্বীপে নিজেদের একটা সরকার তৈরি করে ফেলেছে এরা, জনগণনাও হয়েছে–এর মধ্যেই মরিচঝাঁপির লোকসংখ্যা ত্রিশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, আরও অনেক মানুষের জন্য এখনও জায়গা রয়ে গেছে। গোটা দ্বীপটাকে পাঁচটা ভাগে ভাগ করা হয়েছে, প্রতিটি পরিবারের জন্য বরাদ্দ হয়েছে পাঁচ একর করে জমি। আরও একটা ব্যাপারে ওদের বিচক্ষণতার পরিচয় পেলাম–ওরা বুঝেছে যে আশেপাশের প্রতিবেশী দ্বীপগুলির সহায়তা না পেলে এই বিশাল পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করা সম্ভব নয়। দ্বীপের চারভাগের এক ভাগ তাই রেখে দেওয়া হয়েছে ভাটির দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের জন্য। এর মধ্যেই বেশ কয়েকশো পরিবার চলে এসেছে। সেখানেও।

    দ্বীপ পরিক্রমার শেষে আমার গাইডের দু’হাত জড়িয়ে ধরলাম আমি: “ভবিষ্যৎ আপনাদেরই পক্ষে, কমরেড।”

    একটু হাসল লোকটি। বলল, “আপনাদের সকলের সাহায্য ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়।”

    বোঝা গেল ও মনে মনে চিন্তা করছে কীভাবে কাজে লাগানো যায় আমাকে। বেশ ভাল লাগল আমার ব্যাপারটা। মনে হল ভাল লক্ষণ এটা–বাস্তববাদী চিন্তা।

    “আমি সাহায্য করতে প্রস্তুত,” বললাম আমি। “বলুন, কীভাবে কাজে লাগতে পারি আপনাদের।”

    “সেটা কয়েকটা জিনিসের ওপর নির্ভর করছে,” ও বলল। “যেমন ধরুন, এখন আমাদের কাছে সবচেয়ে জরুরি হল জনমত তৈরি করা, সরকারের ওপর কোনও ভাবে চাপ সৃষ্টি করা, যাতে আমাদের নিজেদের মতো থাকতে দেওয়া হয় এখানে। এমনভাবে ওরা প্রচার করছে যেন এ জায়গাটাকে ধ্বংস করে ফেলছি আমরা; যাতে লোকে ভাবে যে আমরা কিছু গুণ্ডা, জোর করে জমি দখল করেছি এখানে এসে। কিন্তু আমরা যে ঠিক কী করছি, কেন এসেছি এখানে, সেটা আমরা মানুষকে জানাতে চাই। আমরা চাই সত্যিটা সবাই জানুক–কী কী করেছি আমরা এখানে এই ক’দিনে, কতটা সফল হয়েছে আমাদের উদ্দেশ্য। এই ব্যাপারে কোনও সাহায্য করতে পারেন আপনি? কলকাতায় খবরের কাগজে চেনাশোনা আছে আপনার?”

    খারাপ লাগল না আমার লোকটির মনোভাব; ঠিকই তো, এই পথেই তো এগোনো উচিত এখন। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে জানাতে হল, “কাগজের লোকেদের সঙ্গে চেনাশোনা ছিল এক সময়, কিন্তু এখন তো আর নেই।”

    “তা হলে হোমরা-চোমরা আর কাউকে চেনেন? পুলিশের লোক, কি ফরেস্ট রেঞ্জার, বা পার্টির নেতা-টেতা কাউকে?”

    “না,” বললাম আমি। “সে রকম কাউকে তো আমি চিনি না।”

    একটু বিরক্ত হল লোকটি। বলল, “তা হলে আর কী করবেন আপনি আমাদের জন্য বলুন তো? কী কাজ হবে আপনাকে দিয়ে?”

    সত্যিই তো। কী কাজ হবে আমাকে দিয়ে? এ জগতে কত মানুষ আছে যারা সত্যিকারের কাজের লোক, যাদের সত্যিকারের কিছু উপযোগিতা আছে। যেমন ধর নীলিমা। কিন্তু আমার মতো একজন স্কুল মাস্টার?

    “একটা কাজ করতে পারি,” আমি বললাম, “আমি পড়াতে পারি।”

    “পড়বেন?” মনে হল প্রাণপণে হাসি চাপার চেষ্টা করছে লোকটি। “কী পড়াবেন আপনি এখানে?”

    “এই, যেখানে আপনারা এসেছেন সেই ভাটির দেশের কথা শেখাতে পারি বাচ্চাদের। আমার হাতে এখন অনেক সময় আর কিছুদিনের মধ্যেই রিটায়ার করব আমি।”

    আমার বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলল লোকটি। “আমাদের বাচ্চাদের এখানে নষ্ট করার মতো সময় নেই,” ও বলল। “খাবার জোগাড়ের জন্য বাড়ির বড়দের সাহায্য করতে হয় ওদের।”

    তারপর একটু ভেবে আবার বলল, “অবশ্য পড়াশোনা করতে চায় এরকম ছাত্র যদি আপনি জোগাড় করতে পারেন তা হলে আমি কেন বাধা দেব? সে আপনার ব্যাপার; পড়ান, প্রাণে চায়।”

    বিজয়গর্বে ফিরে এলাম আমি কুসুমের ঘরে। কী কী কথাবার্তা হয়েছে সব বললাম ওকে। “কিন্তু এখানে কাদের পড়াবেন সার আপনি?” স্পষ্ট আশঙ্কা ওর গলায়।

    “কেন?” আমি বললাম। “তোর ছেলে ফকির আছে, এরকম আরও কয়েকজনকে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। যাবে না?” একটা অনিচ্ছার ছায়া যেন দেখতে পেলাম কুসুমের মুখে। প্রায় অনুরোধের সুরে তাই বললাম, “প্রতিদিন নয় রে। সপ্তাহে হয়তো একদিন, অল্প একটু সময়ের জন্য। আমি চলে আসব লুসিবাড়ি থেকে।”

    “কিন্তু সার,” বলল কুসুম, “ফকির তো লিখতে পড়তে পারে না। এখানকার বেশিরভাগ বাচ্চারই সেই একই অবস্থা। ওদের কী শেখাবেন আপনি?”

    সেটা ভাবিনি আমি আগে, কিন্তু যেন ঠোঁটের ডগায় কে জুগিয়ে দিল জবাবটা। বললাম, “কুসুম, ওদের আমি স্বপ্ন দেখতে শেখাব।”

  • অনুসরণ

    অনুসরণ

    অনুসরণ

    খাঁড়ির মধ্যে মা ডলফিন আর তার ছানা যখন মাছ ধরতে ব্যস্ত, তখন পাশের খালে ডিঙিটাকে স্থির রাখতে দম বেরিয়ে যাচ্ছিল ফকিরের। স্রোত খুব বেশি এখানে, তার মধ্যেই কোনওরকমে একই জায়গায় চক্কর কেটে যাচ্ছিল ফকির, যাতে ডলফিনগুলো পিয়ার নজরের মধ্যে থাকে। যদিও হাওয়া নেই এক বিন্দু, তাও নদীতে এত ছোট ছোট ঢেউ আর ঘূর্ণি যে মনে হচ্ছে জল যেন ফুটছে।

    ছ’খানা ডেটাশিট ভর্তি করার পর পিয়া ঠিক করল জল কতটা গভীর এখানে সেটা একবার মেপে দেখবে। নৌকোর সামনের দিকটাতেই বসেছিল ও, যেমন বসে সাধারণত, আর ফকির ছিল মাঝামাঝি জায়গায়, ঝপাঝপ দাঁড় ফেলছিল একবার ডাইনে, একবার বাঁয়ে। পিয়া ওর ডেস্থ সাউন্ডারটা জলে মাত্র ডুবিয়েছে, ঠিক সেই সময় হঠাৎই ফকিরের নজর গেল ওর দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ফকিরের চোখ গোল গোল হয়ে গেল, এমন এক চিৎকার করল যে পিয়া যে অবস্থায় ছিল সে ভাবেই থমকে থেমে গেল, ওর কবজি পর্যন্ত তখনও জলে ডোবানো। দাঁড়-টাঁড় নৌকোর ওপর ফেলে ঝাঁপিয়ে পড়ল ফকির পিয়ার দিকে, হুমড়ি খেয়ে সামনে পড়ে অন্ধের মতো টান মারল ওর কবজি ধরে। উলটে পড়ে গেল পিয়া, জল থেকে ছিটকে উঠে এল ওর হাত, আর ডেপ্‌থ সাউন্ডারটা উড়ে গিয়ে পড়ল নৌকোর মাঝখানে।

    ঠিক তখনই আচমকা জল তোলপাড় করে বিশাল একটা হাঁ-করা মুখ তিরবেগে উঠে এল নদী থেকে, এক মুহূর্ত আগেও পিয়ার কবজিটা যেখানে ছিল ঠিক সেই জায়গাটায়। চোখের কোনা দিয়ে পিয়া দেখল ঝকঝকে একজোড়া ধারালো দাঁতের সারি পাক মেরে ছিটকে উঠল তখনও ঝুলে থাকা হাতটার দিকে: এত কাছ ঘেঁষে গেল যে শক্ত খসখসে নাকের ডগাটা ঘষে গেল ওর কনুইয়ে, আর নিশ্বাসের সঙ্গে আসা জলের ছিটেয় ভিজে গেল হাতের সামনেটা। এক সেকেন্ড পরেই জলের তলা থেকে আসা প্রচণ্ড এক ধাক্কায় টলমল করে উঠল ডিঙিটা। এত জোরালো সে ধাক্কা, যে নৌকোর খোলের মধ্যে জমে থাকা জল ছিটকে উঠে এল, মড়মড় করে আওয়াজ হল একটা, আর ডিঙিটা এমনভাবে কাত হয়ে গেল, মনে হল নির্ঘাত উলটে যাবে। পিয়ার পায়ের কাছে রাখা ক্লিপবোর্ডটা পিছলে গিয়ে পড়ল জলে, নৌকোর পাটাতনের কাঠগুলো উলটে চলে এল হুড়মুড় করে।

    টুটুল বসেছিল ছইটার ভেতরে। একটা বলের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ব্যালান্স ঠিক রাখতে গিয়ে ডিগবাজি খেতে খেতে চলে এল সামনের দিকে। ঝপাস করে একটা আওয়াজ করে ফের সোজা হল নৌকোটা। একটা জলের পর্দা ছিটকে উঠল নদী থেকে। এক মুহূর্ত পরেই আরেকবার প্রচণ্ড ধাক্কা এল নীচ থেকে। এবার ডিঙির পেছনের দিকটায়। ভয়ানক দুলুনির মধ্যেই কোনও রকমে হাঁটু গেড়ে উঠে বসে একটা বৈঠা তুলে নিল ফকির। মাথার ওপরে সেটাকে এমন ভাবে তুলে ধরল, যাতে বৈঠার ডগাটা একটা ফলার মতো কাজ করে, তারপর প্রচণ্ড জোরে সেটা চালিয়ে দিল জলের ভেতরে। ঠিক সেই মুহূর্তেই আরেকবার ধাক্কা দিতে যাচ্ছিল কুমিরটা। বৈঠাটা গিয়ে পড়ল একেবারে ওর মাথার ওপর। ঘা-টা এত জোরে গিয়ে লাগল যে তার চোটে ঝপাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল কুমিরের হাঁ করা মুখটা। বৈঠাটাও টুকরো টুকরো হয়ে গেল সে আঘাতে, ফলাটা হাতলের থেকে ভেঙে চারকির মতো পাক খেতে খেতে ছিটকে গেল জলের ওপর দিয়ে। আর, বুজকুড়ি তুলতে তুলতে দৃষ্টির আড়ালে তলিয়ে গেল কুমিরটা। ডুব মারার পর এক মুহূর্তের জন্য জলের মধ্যে ভুতুড়ে একটা ছায়ার মতো ওটার আকৃতি নজরে এল পিয়ার। দেখল প্রায় এই ডিঙির সমান বড় ছিল সরীসৃপটা।

    ইতোমধ্যে ফকির ঠিক হয়ে বসে একজোড়া বৈঠা তুলে নিয়েছে হাতে। ডলফিনগুলো যে খাঁড়িটার মধ্যে শিকার ধরছিল, স্রোতের টানে তার থেকে বেশ কয়েকশো মিটার সরে এসেছে নৌকোটা। এবার ফকির প্রাণপণে বৈঠা চালিয়ে এ খাঁড়ি সে খাঁড়ি দিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আরও দূরে সরে যেতে লাগল জায়গাটা থেকে।

    প্রায় মিনিট বিশেক ওইভাবে একটানা দাঁড় টেনে একটা সরু খালে এসে ঢুকল ওরা। এঁকেবেঁকে ঘন জঙ্গলে ভরা একটা দ্বীপের মধ্যে ঢুকে গেছে খালটা। তার মধ্যে দিয়ে নৌকোটাকে নিয়ে গিয়ে এমন একটা জায়গায় দাঁড় করাল ফকির যেখানে জোয়ারের টান আর বোঝা যায় না। নোঙর নামিয়ে চুপচুপে ভেজা গেঞ্জিটা গা থেকে টেনে খুলে ফেলল। তারপর গামছা নিয়ে বুক বেয়ে গড়িয়ে নামা ঘাম মুছতে লাগল।

    দম ফিরে পেয়ে পিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “লুসিবাড়ি?”

    সাগ্রহে রাজি হয়ে গেল পিয়া। বলল, “ইয়েস। লেটস হেড ফর লুসিবাড়ি। ইটস টাইম।”

  • পুনরাগমনায় চ

    পুনরাগমনায় চ

    পুনরাগমনায় চ

    ভেবেছিলাম মরিচঝাঁপির সাময়িক উত্তেজনা আমার চেহারায় যে ছাপ ফেলেছে, লুসিবাড়িতে ফিরতে ফিরতে তা মিলিয়ে যাবে : নদীর হাওয়ায় শরীরও স্নিগ্ধ হবে, আর হরেনের নৌকোর দুলুনিতে ধীর হয়ে আসবে আমার উত্তেজিত হৃৎস্পন্দন। কিন্তু কই? দেখা গেল ঠিক তার উলটোটাই ঘটছে : প্রতিটি বাঁক ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখের সামনে যেন একে একে নতুন সব সম্ভাবনার দরজা খুলে যাচ্ছে। স্থির হয়ে আর বসে থাকতে পারলাম না। ছাতাটা এক ধারে সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালাম, দু’হাত ছড়িয়ে দিলাম দু’দিকে, যেন আলিঙ্গন করতে চলেছি বাতাসকে। হাওয়ার টানে পালের মতো ফুলে উঠল আমার ধুতি, আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম সটান মাস্তুলের মতো–যেন ডিঙিটাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাব দিগন্তের দিকে।

    “সার,” চেঁচিয়ে উঠল হরেন, “বসে পড়ুন, বসে পড়ুন। নৌকো কাত হয়ে যাবে যে! একেবারে উলটে পড়বেন জলে।”

    “তোমার মতো মাঝি থাকতে নৌকো কখনও উলটোতে পারে হরেন? তুমি ঠিক ভাসিয়ে রাখবে আমাদের।”

    “সার, আজ আপনার কী হয়েছে বলুন তো?” হরেন জিজ্ঞেস করল। “আপনাকে আগের মতো তো আর লাগছে না–যেন অন্য মানুষ হয়ে গেছেন একেবারে।”

    “ঠিক বলেছ হরেন। আমি আর সে আমি নেই। একেবারে পালটে গেছি। আর তোমার জন্যই সম্ভব হয়েছে সেটা।”

    “কী করে সার?”

    “তুমিই তো আমাকে মরিচঝাঁপিতে নিয়ে গেলে, না কি?”

    “না সার, ঝড়ে নিয়ে গেল।”

    এই রকম বিনয়ী, আমাদের এই হরেন। “ঠিক আছে, ঝড়েই না হয় নিয়ে গেল,” হাসলাম আমি। “এই ঝড়ই তা হলে আমাকে বুঝিয়ে দিল যে রিটায়ার করার পরেও একটা লোকের জীবনে পরিবর্তন আসতে পারে, তার পরেও নতুন করে আবার সব কিছু শুরু করা যায়।”

    “কী শুরু করা যায় সার?”

    “নতুন জীবন শুরু করা যায় হরেন, নতুন জীবন। এর পর যখন মরিচঝাঁপি যাব আমি, আমার ছাত্ররা সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। জীবনে কখনও যে ভাবে পড়ানোর সুযোগ পাইনি, সেইভাবে ওদের পড়াব আমি।”

    “কী পড়াবেন সার ওদের? কী শেখাবেন?”

    “কেন, আমি ওদের বলব—”

    সত্যিই তো, কী বলব আমি ওদের? পাকা মাঝি বটে হরেন, ঠিক হাওয়া কেড়ে নিয়েছে আমার পাল থেকে।

    বসে পড়লাম আমি। ভাল করে চিন্তা করা দরকার বিষয়টা নিয়ে।

    ঠিক আছে, এই সব ছেলেমেয়েরা যে ধরনের কাল্পনিক কাহিনি-টাহিনির সঙ্গে পরিচিত সেইখান থেকেই শুরু করব আমি। “বল দেখি তোমরা, আমাদের পৌরাণিক গল্পগুলির সাথে ভূগোলের মিল কোথায়?” এরকম ভাবে আরম্ভ করা

    যেতে পারে। প্রশ্নটা শুনে নিশ্চয়ই আগ্রহ জাগবে ওদের মনে। চোখ কুঁচকে মিনিট দুয়েক ভাববে, তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করবে–

    “কোথায় মিল সার?”

    “কেন? দেবদেবীদের কথা ভুলে গেলে?” বিজয়গর্বে পালটা প্রশ্ন করব আমি। “দেবদেবীদের বিষয়টাতেই তো মিল ভুগোল আর পুরাণের।”

    ওরা একে অপরের দিকে তাকাবে, ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করবে, “সার কি ঠাট্টা করছেন আমাদের সঙ্গে? মজার কথা বলছেন কিছু?” অবশেষে মিনমিনে দ্বিধাগ্রস্ত গলায় কেউ একজন বলে উঠবে : “কিছু বুঝতে পারছি না তো সার।”

    “ভাবো, ভাবো,” বলব আমি। “ভাল করে ভেবে দেখলেই ঠিক বুঝতে পারবে। তখন দেখবে শুধু দেবদেবী কেন, অনেক বিষয়েই মিল আছে পুরাণ আর ভূগোলের মধ্যে। একেকটা পৌরাণিক কাহিনির নায়কদের কথা ভাবো, কী বিশাল তাদের চেহারা–এক দিকে এই সব স্বর্গের দেবদেবীরা, আরেক দিকে এই মাটির পৃথিবীর বিপুল প্রাণস্পন্দন–দুটোই আমাদের কাছে যেন অচেনা, অনেক দূরের কোনও জগৎ। আবার, পুরাণেই বলো কি ভূগোলেই বলো, দেখবে কাহিনিগুলো বা ঘটনাগুলো একের পর এক সব এমনভাবে চলতে থাকে যে প্রতিটা ঘটনারই একটা শুরু আর শেষ থাকে, কিন্তু একটা ঘটনার সঙ্গে পরেরটার একটা যোগ থেকে যায়। একটা কাহিনির শেষ থেকেই গজিয়ে ওঠে আরেকটা কাহিনি। তার পরে ধরো, সময়ের হিসেব–ওদিকে যেমন কলিযুগ, এদিকে তেমনি ভূগঠনের চতুর্থ যুগ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা খেয়াল করো–এই দুই ক্ষেত্রেই কিন্তু ঘটনাগুলো ঘটছে বিশাল সময় জুড়ে, কিন্তু এমন ভাবে সব কিছু হচ্ছে যে খুব ছোট করেও সেই গল্পগুলি বলে দেওয়া যায়।”

    “কী করে, সার, কী করে? এরকম একটা গল্প বলুন না, সার।”

    তখন আমি শুরু করব।

    বিষ্ণুর উপাখ্যান দিয়েই শুরু করতে পারি। বামনাবতার রূপে কীভাবে মাত্র তিনটি বিশাল পদক্ষেপে গোটা পৃথিবীকে মেপে ফেলেছিলেন বিষ্ণু, সেই কাহিনি শোনাতে পারি। আমি ওদের বলব কেমন ভাবে ভগবানের সেই চলার পথে একবার একটুখানি ভুল পা ফেলার জন্য তাঁর পায়ের একটা লম্বা নখের ছোট্ট একটু আঁচড় লেগে গেল পৃথিবীর গায়ে। সেই আঁচড়ের দাগ থেকেই সৃষ্টি হল আমাদের এই চিরকালের চেনা নদী–যুগ যুগান্ত ধরে যে জগতের সমস্ত পাপ ধুয়ে নিয়ে চলেছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নদী–আমাদের এই গঙ্গা।

    “গঙ্গা? পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নদী?” আমার কথার মারপ্যাঁচে এত উত্তেজিত হয়ে যাবে ওরা যে আর বসে থাকতে পারবে না। উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে বলবে, “কিন্তু সার, গঙ্গার থেকে লম্বা তো অনেক নদীই আছে : নীলনদ আছে, আমাজন আছে, মিসিসিপি আছে, ইয়াংসিকিয়াং আছে।” তখন আমি বের করব আমার গুপ্তধন, আমার এক ছাত্রের পাঠানো উপহার–সেটা হল ভূতাত্ত্বিকদের বানানো সাগরতলের একটা ম্যাপ। উলটো রিলিফ ম্যাপের মতো সে মানচিত্রে নিজের চোখেই দেখতে পাবে ওরা যে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছেই গঙ্গার যাত্রা শেষ হয়ে যায়নি–ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিশে সমুদ্রের নীচে স্পষ্ট এক খাত ধরে আরও বহু দূর বয়ে চলে গেছে। এমনিতে যা জলের তলায় ঢাকা পড়ে থাকে, এই ম্যাপে ওরা তা দেখতে পাবে : দেখতে পাবে মাটির ওপর দিয়ে যতটা পথ গেছে গঙ্গা, তার চেয়ে অনেক দীর্ঘ পথ বয়ে গেছে সমুদ্রের তলার খাত ধরে।

    “দেখো, বন্ধুগণ, নিজের চোখেই দেখে নাও,” বলব আমি। “এই ম্যাপে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে যে পুরাণে যেমন বলা আছে ঠিক তেমনই একটা দৃশ্য গঙ্গা আর একটা লুপ্ত গঙ্গা সত্যি সত্যিই রয়েছে; একটা বয়ে চলেছে মাটির ওপর দিয়ে, আরেকটা বইছে জলের তলা দিয়ে। এবার দুটোকে জুড়ে নাও, তারপর দেখো গঙ্গা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নদী কি না।”

    আর তার পরে, আমি ঠিক করলাম, ওদের সেই গ্রিক দেবীর গল্প শোনাব যিনি আমাদের এই গঙ্গার আসল মা। ভূগোলের পথ ধরে বহু বহু যুগ পিছিয়ে নিয়ে যাব ওদের, দেখাব এখন যেখান দিয়ে গঙ্গার ধারা বয়ে চলেছে সেই রেখা এক সময় ছিল উপকূল রেখা–এশীয় ভূখণ্ডের সর্বদক্ষিণ তটভূমি। এই ভারতবর্ষ তখন অনেক অনেক দুরে, অন্য গোলার্ধে। অস্ট্রেলিয়া আর অ্যান্টার্কটিকার সঙ্গে জোড়া ছিল এই দেশ তখন। আমি ওদের দেখাব এশিয়ার দক্ষিণের সেই সমুদ্র, যার নাম ছিল টেথিস। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী টেথিস হলেন ওশেনাসের পত্নী। হিমালয় তখন ছিল না, আর এই সব পুণ্যতোয়া নদী–গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, ব্রহ্মপুত্র তারা তখন কোথায়? আর নদী যেহেতু ছিল না, তাই কোনও ব-দ্বীপও ছিল না। এই বন্যাবিধৌত সমভূমিই বলো, কি পলল মৃত্তিকাই বলো, বা এই বাদাবনই বলো–এসবেরও কোনও চিহ্ন ছিল না। এক কথায়, আমাদের এই বাংলারই কোনও অস্তিত্ব ছিল না তখন। তামিলনাড়ু আর অন্ধ্রপ্রদেশের এই সবুজ তীরভূমি তখন জমাট বরফে ঢাকা, কোনও কোনও জায়গায় সে বরফ পঞ্চাশ থেকে ষাট মিটার পর্যন্ত গভীর। এখন যেটা গঙ্গার দক্ষিণ কূল, সে জায়গা তখন বরফ-জমা এক সাগরতীর–ক্রমশ ঢালু হয়ে নেমে গেছে টেথিস সমুদ্রে, যে সমুদ্রের এখন আর কোনও অস্তিত্ব নেই।

    আমি ওদের বলব কেমন করে আজ থেকে চোদ্দো কোটি বছর আগে অস্ট্রেলিয়া আর অ্যান্টার্কটিকা থেকে হঠাৎ ভেঙে বেরিয়ে এসে ভারতবর্ষ শুরু করল তার উত্তরমুখী যাত্রা। ওরা দেখবে কী বেগে ওদের এই উপমহাদেশ এগিয়ে চলেছে, পৃথিবীর অন্য কোনও ভূখণ্ডই কখনও সেই বেগ, অর্জন করতে পারেনি। ওরা দেখবে কীভাবে বিশাল এই ভূভাগের ওজনের চাপে ধীরে ধীরে গজিয়ে উঠছে হিমালয় পর্বত; দেখবে সেই বেড়ে ওঠা পর্বতমালার গায়ে কেমন করে জন্ম নিচ্ছে তিরতিরে একটা ছোট্ট নদী–আমাদের এই গঙ্গা। চোখের সামনে ওরা দেখতে পাবে ভারত যত উত্তরে এগোচ্ছে তত ছোট হয়ে আসছে টেথিস, ক্রমশ সরু হয়ে আসছে মাঝের ফাঁকটুকু। ওরা দেখবে কীভাবে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল সে সমুদ্র কেমন করে দুই ভূখণ্ড মিলে এক হয়ে গেল তাদের সাগর-মায়ের অস্তিত্বের মূল্যে। কিন্তু চোখের সামনে টেথিসের মৃত্যু দেখেও এতটুকু অশ্রুপাত করবে না ওরা, কারণ সঙ্গে সঙ্গে ওদের সামনেই তো জন্ম নেবে দুই নদী, যাদের মধ্যে ধরা থাকবে তার স্মৃতি, জন্ম নেবে টেথিসের দুই যমজ সন্তান–সিন্ধু আর গঙ্গা।

    “বলতে পার, কেমন করে বলা যায় যে এক সময় সিন্ধু আর গঙ্গা নদী পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল?”

    “কী করে বলা যায় সার?”

    “এই শুশুকদের দেখে। এক সময়কার সাগরবাসী এই প্রাণীই হল দুই যমজ নদীর জন্য রেখে যাওয়া টেথিস সমুদ্রের উত্তরাধিকার। সে উত্তরাধিকারকে সযত্নে লালন করেছে এই দুই নদী, আস্তে আস্তে আপন করে নিয়েছে তাকে। সিন্ধু আর গঙ্গা ছাড়া পৃথিবীর আর কোনও নদীতেই এই জাতের শুশুক দেখতে পাওয়া যায় না।”

    শুনতে শুনতে যদি দেখি অধৈর্য হয়ে পড়ছে ওরা, তখন এক প্রেমের গল্প বলে আমি শেষ করব আমার কথা। শান্তনু নামের সেই রাজার কথা বলব আমি ওদের, কেমন করে নদীর পাশ দিয়ে যেতে যেতে রাজা একদিন পরমাসুন্দরী একটি মেয়েকে দেখলেন সেই কাহিনি শোনাব আমি। সেই সুন্দরী আর কেউ নন, স্বয়ং গঙ্গা। কিন্তু রাজা সে কথা জানেন না। নদীর পাড়ে এলে যে কোনও স্থিতধী মানুষেরই মাথা ঘুরে যেতে পারে। তো, এই সুন্দরীকে দেখে শান্তনুর খুবই ভাল লেগে গেল, পাগলের মতো তার প্রেমে পড়ে গেলেন তিনি; রাজা প্রতিজ্ঞা করলেন রূপবতী যা চাইবেন তাই তাঁকে দেবেন তিনি, এমনকী তিনি যদি নিজের সন্তানদের জলে ভাসিয়ে দিতে চান তাতেও বাধা দেবেন না।

    নদীর তীরে এক রাজার এই মুহূর্তের হৃদয়দৌর্বল্যের কাহিনি থেকে শুরু করেই লেখা হয়ে গেল মহাভারতের গোটা একখানা পর্ব।

    সেকালের পুরাণকাররাও যে সত্যকে মেনে নিয়েছিলেন সামান্য এক স্কুলমাস্টার কী করে তাকে অস্বীকার করবে? যে-কোনও নদীতেই আসলে বয়ে চলে ভালবাসার স্রোত। “ছেলেমেয়েরা, এই তা হলে আজকের পড়া। এবার শোনো কবি কী বলেছেন :

    “এক কথা, প্রেয়সীকে গান গাওয়া। আর, হায়, অন্য এক কথা

    সেই গুপ্ত, অপরাধী শোণিতের দেবতুল্য নদ।”

  • বন্দরের কাল

    বন্দরের কাল

    বন্দরের কাল

    শুরুতে জলের স্রোত ছিল উলটোদিকে, আর দাঁড় টানছিল ফকির একা, ফলে খুবই ধীরে এগোচ্ছিল নৌকো। প্রায় ঘণ্টাখানেক চলার পর জিপিএস-এ নৌকোর অবস্থান মেপে পিয়া দেখল এতটা সময়ে মাত্র তিন কিলোমিটার এসেছে ওরা। এতক্ষণে হঠাৎ ওর খেয়াল হল ফকিরের কাছে হয়তো বাড়তি এক জোড়া দাঁড় থাকতেও পারে। ইশারায় প্রশ্ন করে বুঝল সত্যিই আছে আর একজোড়া দাঁড়। তক্তার নীচে নৌকোর খোলের মধ্যে রাখা আছে। দাঁড়দুটো। খুশি হয়ে উঠল পিয়া।

    দাঁড়গুলোর হালও দেখা গেল ডিঙিটারই মতো, কোনও রকমে জোড়াতালি দিয়ে বানানো। ডালপালা ছাঁটা একজোড়া গাছের ডালের আগার দিকে বেঢপ ভাবে পেরেক দিয়ে আঁটা দুটো কাঠের টুকরো শুধু। ডিঙির কিনারায় পঁড় টানার জন্য কোনও আংটার বালাই নেই, শুধু দুটো খুঁটির ওপর ঠেকা দিয়ে বাইতে হবে। জলের মধ্যে বৈঠা নামাতেই স্রোতের টানে মোচড় খেয়ে গেল সেগুলো। আরেকটু হলেই ভেসে যাচ্ছিল পিয়ার হাত থেকে। হাতের আন্দাজটুকু আসতে খানিকটা সময় লাগল, তবে দু’জনে মিলে দাঁড় টানার ফলে নৌকোর গতি খানিকটা বাড়ল।

    কিন্তু যত সময় যেতে লাগল পিয়া দেখল উত্তরোত্তর কঠিন হয়ে উঠছে কাজটা : দুই হাতের তালুতেই বেশ কয়েকটা ফোঁসকা গজিয়ে উঠেছে, মুখে আর ঘাড়ে নুনের আস্তরণ পড়ে গেছে। প্রায় সন্ধে নাগাদ–সূর্য তখন ডুবুডুবু দাঁড় তুলে ফেলল পিয়া। গন্তব্য আর কত দূর সেটা জিজ্ঞেস করার ইচ্ছেটা আর দমন করে রাখতে পারল না। “লুসিবাড়ি?”

    সেই সকাল থেকে প্রায় একটানা নৌকো বেয়ে চলেছে ফকির, কিন্তু এখনও ওর চেহারায় কোনও ক্লান্তির ছাপ পড়েনি। পিয়ার প্রশ্ন শুনে মুহূর্তের জন্য থেমে ঘাড় ফিরিয়ে দূরে জলের মধ্যে ঢুকে আসা জিভের মতো একটা চড়ার দিকে ইশারা করল ও। আশেপাশের দ্বীপগুলোর মধ্যে পরিষ্কার, বন জঙ্গলহীন জায়গাটা সহজেই নজরে পড়ছিল। শেষ পর্যন্ত চোখে দেখা যাচ্ছে দ্বীপটা সেটা যথেষ্টই স্বস্তির কথা, কিন্তু বেশ বুঝতে পারছিল পিয়া, ডাঙায় পৌঁছতে আরও অনেকক্ষণ লাগবে ওদের। ঠিকই বুঝেছিল।

    নৌকো পাড়ে ভেড়ার পর অবশেষে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে যখন নেমে এল ওরা, ততক্ষণে সূর্য অস্ত গেছে। প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে চারদিক। ফকির একটা পিঠব্যাগ তুলে নিল, অন্যটা পিয়া নিজের কাঁধে ঝুলিয়ে নিল, তারপর টুটুলকে সামনে রেখে লাইন করে এগোতে লাগল আস্তে আস্তে। পিয়া শুধু ওদের দুজনের দিকে চোখ রেখে হেঁটে যাচ্ছিল, ফলে আশেপাশের দিকে খুব একটা নজর দিতে পারছিল না। চলতে চলতে হঠাৎ এক সময় থেমে গেল ফকির। বলল, “মাসিমা।” পিয়া তাকিয়ে দেখল একটা সিঁড়ির দিকে ইশারা করছে ও। একটা বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে শেষ হয়েছে সিঁড়িটা।

    এই সেই জায়গা? ফকির কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে পিয়ার হাতে তুলে দিল। কী করা উচিত এখন? ওরা দুজনে একটু পিছিয়ে গেল। ফকিরের হাতে জালের মধ্যে কঁকড়ার পুঁটলি, আর কাপড়জামাগুলো বান্ডিল বেঁধে মাথায় তুলে নিয়েছে টুটুল। আবার হাত তুলে বন্ধ দরজাটার দিকে ইশারা করল ফকির। ওদের দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে বুঝতে পারল পিয়া, ওকে ওখানেই রেখে এখন ফিরে চলে যাবে ওরা। হঠাৎ কেমন যেন ভয় ভয় লাগল ওর। চেঁচিয়ে বলল, “ওয়েট। হোয়্যার আর ইউ গোয়িং?”

    নানা রকম অদ্ভুত সব সম্ভাবনার কথা আগে থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছিল পিয়ার মাথার ভেতরে, কিন্তু এরকম ভাবে ওকে একা দাঁড় করিয়ে রেখে একটা কথাও না বলে ওরা চলে যাবে, সেরকম যে কিছু হতে পারে তা কখনও ভাবেনি। এও মনে হয়নি যে ওদের চলে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা ভাবতেই এরকম একটা শীতল একাকিত্বের অনুভূতি এসে পেয়ে। বসবে ওকে।

    “ওয়েট। জাস্ট আ মিনিট।”

    দূরে কোথাও একটা জেনারেটর চালু হল, আর পাশের একটা জানালা দিয়ে ঝকঝকে আলো এসে পড়ল ভেতর থেকে। এই ক’দিনে প্রাকৃতিক আলো-অন্ধকারেই সয়ে গিয়েছিল চোখ, হঠাৎ এই ফ্যাটফ্যাটে উজ্জ্বল ইলেকট্রিকের আলোয় মুহূর্তের জন্য যেন ধাঁধা লেগে গেল পিয়ার। দুয়েকবার পিটপিট করে দু’হাতের মুঠি দিয়ে চোখ কচলে নিল। নজর ফিরে পেতে তাকিয়ে দেখল চলে গেছে ওরা। দু’জনেই। ফকির আর টুটুল।

    মনে পড়ল এখানে নিয়ে আসার জন্য ফকিরকে কোনও পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি। কী করে আবার খুঁজে পাওয়া যাবে ওকে? কোথায় থাকে ফকির সে তো জানে না পিয়া। ওর পুরো নামটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করে রাখা হয়নি। মুখের সামনে দু’হাত নিয়ে অন্ধকারের দিকে ফিরে চিৎকার করে একবার ডাকল, “ফকির!”

    “কে?” জবাবটা এল একজন মহিলার গলায়, সামনে থেকে নয়, পেছন দিক থেকে। হঠাৎ খুলে গেল বন্ধ দরজাটা। পিয়া দেখল ছোট্টখাট্ট চেহারার বয়স্কা একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন ওর সামনে। মাথার চুলগুলো খড়ের আঁটির মতো, চোখে সোনালি ফ্রেমের একটা চশমা। “কে?”

    দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল পিয়া। “কিছু মনে করবেন না, ঠিক জায়গাতে এসেছি কিনা জানি না, আসলে আমি মাসিমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছি।” মহিলা বুঝবেন কি বুঝবেন না সেসব না ভেবেই এক নিশ্বাসে হড়বড় করে ইংরেজিতে কথাগুলো বলে গেল পিয়া।

    একটা অস্বস্তিকর মুহূর্ত। পিয়া টের পাচ্ছিল একজোড়া তীক্ষ্ণ সন্ধানী চোখ খুব ভাল করে জরিপ করে নিচ্ছে ওকে। নজর করল ওর নুনের দাগ-লাগা মুখ আর কাদামাখা সুতির প্যান্ট দেখতে দেখতে সোনালি ফ্রেম একবার ওপরে উঠছে, ফের নীচে নামছে। তারপর ওকে আশ্বস্ত করে বাঁশির মতো মিষ্টি সুরেলা ইংরেজিতে মহিলা বললেন, “একদম ঠিক জায়গাতেই এসেছ। কিন্তু তুমি কে বলো তো? আমি কি তোমাকে চিনি?”

    “না,” পিয়া বলল, “আপনি আমাকে চিনবেন না। আমার নাম পিয়ালি রয়। আপনার ভাগ্নের সঙ্গে ট্রেনে আমার আলাপ হয়েছিল।”

    “কানাই?”

    “হ্যাঁ। উনিই আমাকে এখানে আসতে বলেছিলেন।”

    “বেশ বেশ। ভেতরে এসো। কানাই এক্ষুনি নীচে নেমে আসবে।” একপাশে সরে গিয়ে পিয়াকে ভেতরে ঢোকার জায়গা করে দিলেন মহিলা। “কিন্তু তুমি চিনে চিনে এখানে এলে কী করে বলো তো? একা তো নিশ্চয়ই আসনি?”

    “না, না। একা আমি জীবনে খুঁজে বের করতে পারতাম না।”

    “তা হলে কার সঙ্গে এলে? বাইরে তো কাউকে দেখলাম না।”

    “আপনি দরজা খুলতে খুলতেই চলে গেল ওরা–” কথাটা শেষ করার আগেই দড়াম করে খুলে গেল দরজাটা। কানাই ভেতরে এল। বিস্ময়ে চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “আরে, পিয়া না?”

    “হ্যাঁ।”

    “আসতে পারলেন তা হলে?”

    “চলে এলাম।”

    “গুড, কানাই একগাল হাসল। এত তাড়াতাড়ি পিয়ার সঙ্গে আবার দেখা হয়ে যাবে ভাবেনি ও। মনে মনে একটু খুশি হল কানাই, শ্লাঘাও বোধ করল একটু। লক্ষণটা মনে হল ভালই। “বেশ একটা ইভেন্টফুল ট্রিপ হয়েছে মনে হচ্ছে?” ভাল করে একবার পিয়ার কাদামাখা জামাকাপড়গুলো দেখল কানাই। “তা, কী করে এলেন এখানে?”

    “একটা দাঁড়-টানা নৌকোয়।”

    “দাঁড়-টানা নৌকোয়?”

    “হ্যাঁ। আসলে আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর একটা অ্যাক্সিডেন্টে পড়েছিলাম।” লঞ্চ থেকে জলে পড়ে যাওয়া পর্যন্ত কী কী ঘটেছিল সংক্ষেপে বলল পিয়া। “আর তারপর সেই জেলেটি আমার পেছন পেছন জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল না হলে কী যে হত কে জানে। একগাদা জল খেয়ে ফেলেছিলাম আমি, কিন্তু ও ঠিক টেনেটুনে আমাকে নৌকোয় তুলে ফেলল। আমার তখন মনে হল ওই গার্ডদের লঞ্চে আবার গিয়ে ওঠাটা ঠিক নিরাপদ হবে না। ভাবলাম একটা আন্দাজে ঢিল মেরে দেখি, জেলেটিকে একবার জিজ্ঞেস করি ও মাসিমাকে চেনে কিনা। দেখলাম চেনে। তো, তখন বললাম ও যদি আমাকে লুসিবাড়িতে পৌঁছে দেয় তা হলে কিছু টাকা দেব। অনেক আগেই আমরা পৌঁছে যেতাম এখানে, কিন্তু মাঝরাস্তায় আবার কয়েকটা ঘটনা ঘটল।”

    “কী ঘটল আবার?”

    “প্রথমে তো দেখা হল এক দল ডলফিনের সঙ্গে। তারপর, আজ সকালে একটা কুমিরের খপ্পরে পড়েছিলাম।”

    “আরে সর্বনাশ!” নীলিমা বলল, “কারও কিছু হয়নি তো??

    “না। কিন্তু হতেই পারত। একটা দাঁড় দিয়ে তারপর ওটাকে মেরে তাড়াল জেলেটি। একেবারে অবিশ্বাস্য ব্যাপার,” বলল পিয়া।

    “কী ভয়ংকর! কে ছিল জেলেটি? নাম বলেছে তোমাকে?” নীলিমা জিজ্ঞেস করল।

    “হ্যাঁ, বলেছে। ওর নাম ফকির।”

    “ফকির?” নীলিমা প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। “ফকির মণ্ডল ছিল কি?”

    “পদবি তো বলেনি।”

    “একটা ছোট ছেলে ছিল কি সঙ্গে?”

    “হ্যাঁ, ছিল,” পিয়া বলল। “টুটুল।”

    “ও-ই,” কানাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল নীলিমা, “এতক্ষণে বোঝা গেল কোথায় ছিল ও।”

    “ওর খোঁজ করা হচ্ছিল নাকি?”

    “হ্যাঁ, কানাই বলল, “ফকিরের বউ ময়না এখানকার হাসপাতালে কাজ করে। সে বেচারির তত চিন্তায় চিন্তায় প্রায় পাগল হবার দশা।” :

    “তাই নাকি? ছি ছি, মনে হয় আমারই জন্য এতটা দেরি হয়েছে। আমিই ওদের আটকে রেখেছিলাম এতক্ষণ, তা না হলে হয়তো আরও অনেক আগেই ফিরে আসত,” বলল পিয়া।

    “যাক গে,” নীলিমা বলল ঠোঁট চেপে, “ভালয় ভালয় ফিরে যখন এসেছে আর চিন্তার কোনও কারণ নেই।”

    “আশা করি নেই,” পিয়া বলল। “আমার জন্য ওকে কোনও রকম ঝামেলায় পড়তে হলে খুব খারাপ লাগবে আমার। দু-দু’বার ও আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে। আর ও-ই তো সোজা ওই ডলফিনের ঝকটার কাছে নিয়ে গেল আমাকে।”

    “তাই নাকি? কিন্তু আপনি যে ডলফিনের খোঁজ করছেন সেটা ও বুঝল কী করে?” জিজ্ঞেস করল কানাই।

    “আমি ওকে ছবি দেখালাম, একটা ফ্ল্যাশকার্ড,” বলল পিয়া। “আর কিচ্ছু বলতে হয়নি ওকে। ও সোজা আমাকে ডলফিনগুলোর কাছে নিয়ে গেল। এক হিসেবে দেখতে গেলে ওই লঞ্চ থেকে পড়ে যাওয়াটা ভালই হয়েছিল আমার পক্ষে একা একা কিছুতেই আমি ওই ডলফিনগুলোকে খুঁজে পেতাম না। একবার দেখা করতেই হবে ওর সঙ্গে। অন্তত পয়সাটা তো ওকে দিতে হবে।”

    “সে নিয়ে চিন্তা কোরো না,” নীলিমা বলল। “ওরা এই কাছেই থাকে, এই ট্রাস্টের কোয়ার্টারে। সকালে কানাই নিয়ে যাবে তোমাকে।”

    কানাইয়ের দিকে মুখ ফেরাল পিয়া। “খুব ভাল হয় যদি পারেন।”

    “হ্যাঁ হ্যাঁ, কেন পারব না?” বলল কানাই। “কিন্তু সে তো কাল সকালে। এখন আপাতত আপনার থাকা-টাকার একটা ব্যবস্থা করা যাক। জামাকাপড় পালটে রেস্ট নিন আপনি।”

    এর পরে কী হবে তাই নিয়ে এতক্ষণ মাথাই ঘামায়নি পিয়া। এবার এখানে এসে পৌঁছনোর প্রাথমিক উত্তেজনাটুকু থিতিয়ে যেতে হঠাৎ এই ক’দিনের ক্লান্তির সমস্ত ভার যেন চেপে বসল ওর ওপর। “থাকার ব্যবস্থা?” ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল পিয়া। “কোথায়?”

    “এখানেই। মানে, দোতলায়,” বলল কানাই।

    একটু অস্বস্তি লাগছিল পিয়ার। কানাই কি মনে করেছে পিয়া এখানে কানাইয়ের সঙ্গে থাকবে?

    “কাছাকাছি কোনও হোটেল-টোটেল নেই?”

    “হোটেল এখানে নেই,” নীলিমা বলল। “তবে ওপরে একটা গেস্ট হাউস আছে, সেখানে তিনটে খালি ঘর আছে। তুমি স্বচ্ছন্দে থাকতে পার। আর কেউ নেইও ওপরে, কানাই ছাড়া। ও যদি তোমায় বিরক্ত করে, তুমি সোজা নীচে নেমে এসে আমাকে একবার খালি খবরটা দেবে।”

    হেসে ফেলল পিয়া। “না না, সে ঠিক আছে। আর নিজের দেখভাল করার উপায় আমার জানা আছে। তবে মাসিমার কাছ থেকে আমন্ত্রণটা আসায় একটু খুশি হল পিয়া: রাজি হওয়াটা যেন সহজ হয়ে গেল এর ফলে। বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ। সত্যি, একটা রাত একটু ভাল করে বিশ্রাম নেওয়া দরকার। আমি দিন কয়েক এখানে থাকলে সত্যি কোনও অসুবিধা হবে না তো আপনাদের?”

    “তোমার যত দিন ইচ্ছে থাকো,” বলল নীলিমা। “কানাই তোমাকে ঘুরে ঘুরে সব দেখিয়ে দেবে।”

    “চলে আসুন,” একটা পিঠব্যাগ হাতে তুলে নিয়ে বলল কানাই। “এই দিকে।” সিঁড়ি দিয়ে কানাই দোতলায় নিয়ে গেল ওকে। রান্নাঘর আর বাথরুমটা দেখিয়ে দিয়ে তালা খুলে দিল একটা ঘরের। সুইচ টিপে টিউব লাইটটা জ্বালিয়ে কানাই দেখল ওর নিজের শোয়ার ঘরটার সঙ্গে এটার তফাত কিছু নেই। এখানেও সেই দুটো সরু সরু তক্তপোশ, প্রত্যেকটার সঙ্গে একটা করে মশারি লাগানো। দেয়ালে কোথাও কোথাও নতুন প্লাস্টার, অনেক জায়গায় গত বর্ষার সময়কার ড্যাম্পের ছোপ, ফাটল ধরেছে কিছু কিছু জায়গায়। উলটোদিকে গরাদ দেওয়া একটা জানালা। ট্রাস্টের কম্পাউন্ডের লাগোয়া ধানজমিগুলি দেখা যাচ্ছে জানালা দিয়ে।

    “চলবে এতে?” একটা তক্তপোশের ওপরে পিয়ার পিঠব্যাগটা রেখে জিজ্ঞেস করল কানাই।

    ঘরের ভেতরে ঢুকে চারদিকটা একবার দেখল পিয়া। এমনিতে যদিও খালি খালি, কিন্তু যথেষ্টই আরামদায়ক ঘরখানা : চাদরগুলি পরিষ্কার, এমনকী বিছানার পায়ের কাছে একটা কাঁচা তোয়ালেও ভাঁজ করে রাখা আছে। জানালার পাশে একটা টেবিল আর খাড়া-পিঠ চেয়ার। দরজাটা শক্তপোক্ত দেখে খুশি হল পিয়া। ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগানোর ব্যবস্থাও আছে।

    “এত কিছু সত্যি আমি আশা করিনি,” পিয়া বলল। “অনেক ধন্যবাদ।”

    মাথা নাড়ল কানাই, “ধন্যবাদ জানানোর কোনও প্রয়োজন নেই। আপনি আসাতে ভালই হয়েছে। একা একা একটু একঘেয়ে লাগছিল আমার।”

    কী জবাব দেওয়া উচিত এ কথার বুঝতে না পেরে নিরপেক্ষ একটা হাসি হাসল পিয়া। “ঠিক আছে, নিজের মতো করে দেখেশুনে নিন,” বলল কানাই, “আমি ওপরের তলায় আছি, আমার মেসোর পড়ার ঘরে। কিছু দরকার লাগলে বলবেন।”

  • ভোজ

    ভোজ

    ভোজ

    যে-কোনও একটা ছুতো পেলেই আবার মরিচঝাঁপি যাওয়ার জন্য মনে মনে তৈরিই। ছিলাম আমি, কিন্তু হরেন যে সুযোগ করে দিল তার চেয়ে ভাল অজুহাত আর কিছু হতে পারত না। ইতোমধ্যে ওর ছেলের ভর্তির ব্যবস্থাও করে দিয়েছি, ফলে স্কুলের আশেপাশে প্রায়ই দেখা হয়ে যেত আমার ওর সঙ্গে।

    একদিন হরেন বলল, “সার, মরিচঝাঁপি থেকে খবর আছে। ওরা একদিন একটা ফিস্টির ব্যবস্থা করেছে ওখানে, কুসুম বার বার করে আপনাকে যেতে বলে দিয়েছে।”

    আশ্চর্য হয়ে গেলাম আমি। “ফিস্টি? কীসের ফিস্টি?”

    “কলকাতা থেকে অনেক সব লোককে ওরা নেমন্তন্ন করেছে–কবি, লেখক, খবরের কাগজের লোকজন সব আসবে। ওদেরকে ওরা দ্বীপটার কথা বলবে, কী কী করেছে ওখানে সব দেখাবে।”

    এতক্ষণে পরিষ্কার হল পুরো ব্যাপারটা : ওই উদ্বাস্তু নেতাদের বিচারবুদ্ধি দেখে নতুন করে আবার মুগ্ধ হলাম আমি। দেখা যাচ্ছে, ওরা বুঝতে পেরেছে যে এখানে টিকে থাকতে গেলে নিজেদের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে হবে। আর এ হল তারই প্রথম পদক্ষেপ। যেতে তো আমাকে হবেই। হরেন বলল ভোর থাকতেই বেরিয়ে পড়তে হবে। বললাম, আমি তৈরি হয়ে থাকব।

    বাড়ি ফিরলাম যখন, নীলিমা এক পলক আমার মুখের দিকে তাকিয়েই বলল, “কী ব্যাপার? এরকম দেখাচ্ছে কেন তোমাকে আজকে?”

    কেন এর আগে মরিচঝাঁপি নিয়ে নীলিমার সঙ্গে কোনও কথা বলিনি আমি? বোধ হয় মনে মনে আমি জানতাম নীলিমা কিছুতেই আমার এই উৎসাহের শরিক হবে না; হয়তো আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে ওদের নিয়ে আমার এই উত্তেজনাকে লুসিবাড়িতে ওর এতদিনের কাজের প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসভঙ্গ বলে মনে করবে। যাই হোক না কেন, আমার এই ভয় অচিরেই সত্যি বলে প্রমাণিত হল। এই উদ্বাস্তুদের মরিচঝাঁপিতে এসে ওঠার ঘটনাটার মধ্যে যে নাটকীয়তা আছে, আমার পক্ষে যতটা সম্ভব তা বর্ণনা করলাম; কীসের টানে মধ্য ভারতের নির্বাসন থেকে এই ভাটির দেশে এসে উপস্থিত হয়েছে ওরা সেটা ব্যাখ্যা করলাম; ওদের সব পরিকল্পনা, নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন, নতুন বাসভূমি গড়ে তোলার জন্য অটল সংকল্প–সব বুঝিয়ে বললাম ওকে।

    আমাকে অবাক করে দিয়ে নীলিমা বলল মরিচঝাঁপিতে উদ্বাস্তুদের আসার কথা ও জানে : এ খবর ও পেয়েছে কলকাতায়, বিভিন্ন আমলা আর নেতাদের কাছ থেকে। ও বলল সরকারি লোকেদের চোখে ওই উদ্বাস্তুরা স্রেফ বেআইনি দখলদার; ওদের ওখানে থাকতে দেবে না সরকার; গণ্ডগোল একটা হবেই।

    আমাকে বলল, “নির্মল, আমি চাই না যে তুমি ওখানে যাও। ওই রিফিউজিদের সঙ্গে আমার কোনও বিরোধ নেই, কিন্তু তুমি এসব ঝুটঝামেলার মধ্যে যাও সেটা আমি চাই না।”

    সেই মুহূর্তেই খুব দুঃখের সঙ্গে আমি বুঝতে পারলাম, এখন থেকে আমাকে গোপনেই যোগাযোগ রাখতে হবে মরিচঝাঁপির সঙ্গে। আমার ইচ্ছে ছিল পরের দিনের ফিস্টের কথাটা ওকে বলব, কিন্তু এরপর সে কথা আর তুললাম না। নীলিমাকে যদ্র চিনি, ও ঠিক কোনও না কোনও উপায়ে আমার যাওয়াটা আটকে দেবে।

    তা সত্ত্বেও ও চাপাচাপি না করলে মিথ্যে বলার কোনও বাসনা আমার ছিল না। আমাকে ঝোলা গোছাতে দেখে জিজ্ঞেস করল আমি কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করছি কিনা।

    “হ্যাঁ, কাল সকালেই বেরোতে হবে আমাকে।” বানিয়ে বানিয়ে বললাম মোল্লাখালিতে একটা স্কুলে নিমন্ত্রণ আছে।

    স্পষ্ট বুঝতে পারলাম আমার কথা বিশ্বাস করল না নীলিমা। খুব ভাল করে আমাকে একবার দেখে নিয়ে বলল, “তাই? তো, কার সঙ্গে যাবে শুনি?”

    “হরেনের সঙ্গে,” বললাম আমি।

    “তাই নাকি? হরেনের সঙ্গে?” ওর গলার বাঁকা সুরটা শুনেই ভয় হল আমার । মনে হল শেষ পর্যন্ত বোধহয় ফাস হয়ে যাবে আমার গোপন কথাটা।

    এই ভাবেই আমাদের দু’জনের সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাসের জন্ম হল সেদিন।

    কিন্তু ফিস্টটাতে আমি গেলাম। আমার সারা জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিনগুলির অন্যতম হয়ে থাকবে সেই দিনটা। আমি যদি কলকাতাতেই থেকে যেতাম তা হলে আমার জীবন কী রকম হত সেটা যেন সেদিন, অবসরের ঠিক আগের মুহূর্তে, এক ঝলক দেখতে পেলাম আমি। শহর থেকে অতিথি যারা এসেছিলেন সে রকম সব মানুষদের সঙ্গেই তো ওঠাবসা হত আমার : সাংবাদিক, আলোকচিত্রী, বিখ্যাত লেখক; তাদের মধ্যে ছিলেন সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সাংবাদিক জ্যোতির্ময় দত্ত। এমনকী আমার চেনাশোনা লোকও ছিল কয়েকজন, ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় যোগাযোগ ছিল ওদের সঙ্গে। একজন ছিল আমার এক সময়কার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং কমরেড–আমরা তখন খোকন বলে ডাকতাম তাকে। দূর থেকে ওকে সেদিন দেখলাম আমি। কী সুন্দর চেহারা হয়েছে ওর : কুচকুচে কালো চুল, মুখ থেকে যেন জ্যোতি ফুটে বেরোচ্ছে। যদি সাহিত্যচর্চা ছেড়ে না দিতাম, আমিও কি তা হলে আজকে এরকম জায়গায় পৌঁছতাম?

    সারা জীবনের না করা কাজগুলোর জন্য সেদিন যেমন অনুতাপ হল সেরকম আমার আগে আর কখনও হয়নি।

    উদ্বাস্তু নেতারা যখন অতিথিদের নিয়ে দ্বীপটা ঘুরে দেখাতে বেরোল, একটু দূর থেকে আমিও চললাম ওদের পেছন পেছন। কত কিছু যে দেখানোর আছে এমনকী আমি আগেরবার যখন এসেছিলাম তারপর থেকে এই ক’দিনে আরও কত কী করেছে ওরা। অনেক কাজ করে ফেলেছে এর মধ্যে। নুনের ভাটি তৈরি হয়েছে, টিউবওয়েল বসানো হয়েছে, আল দিয়ে জল আটকে মাছ চাষের ব্যবস্থা হয়েছে, একটা রুটি কারখানা চালু হয়েছে, নৌকোর মিস্ত্রিদের কাজের জায়গা তৈরি হয়েছে, মাটির জিনিস গড়ার জায়গা করা হয়েছে, কামারশালা খুলেছে, আরও কত কী। কিছু লোক নৌকো তৈরি করছে, কয়েকজন বসে জাল বুনছে, কাঁকড়া ধরার দোন বানাচ্ছে; ছোট ছোট বাজার মতো বসেছে কয়েকটা জায়গায়, সেখানে জিনিসপত্র কেনাবেচা হচ্ছে। এই সব কিছু হয়েছে মাত্র এই কয়েক মাসে! এ এক আশ্চর্য দৃশ্য–যেন এই কাদামাটির ওপর হঠাৎ করে একটা নতুন সভ্যতা গজিয়ে উঠেছে।

    তারপরে ফিস্ট। সাবেকি ধরনে সুন্দর করে গুছিয়ে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, মাটিতে কলাপাতা পেতে গাছের ছায়ায় আসন দেওয়া হয়েছে অতিথিদের। যারা পরিবেশন করছিল তাদের মধ্যে কুসুমকে দেখতে পেলাম আমি। ও আমাকে। দেখাল কী বিশাল বিশাল সব ডেকচি আনা হয়েছে রান্নার জন্য। কত রকমের যে মাছ রাঁধা হয়েছে বড় বড় চিংড়ি, গলদা বাগদা দু’রকমেরই, তা ছাড়াও ট্যাংরা, ইলিশ, পার্শে, পুঁটি, ভেটকি, রুই আর চিতল।

    একেবারে হতবাক হয়ে গেলাম আমি। অধিকাংশ লোকেরই এখানে দু’বেলা ভাত জোটে না, সে তো আমি ভাল করেই জানি। বুঝতে পারলাম না কী করে এই বিশাল ব্যবস্থা করল এরা।

    কোথা থেকে এল এত সব? জিজ্ঞেস করলাম কুসুমকে।

    যে যতটুকু পেরেছে দিয়েছে, ও বলল। বিশেষ কিছু তো কিনতে হয়নি–শুধু চালটা। বাকি সব তো নদী থেকেই এসেছে। কালকে পর্যন্ত আমরা সবাই জাল নিয়ে, ছিপ নিয়ে মাছ ধরেছি। বাচ্চারাও পর্যন্ত। পার্শে মাছগুলো দেখিয়ে খানিকটা গর্বের সঙ্গে বলল, “আজকে সকালে ছ’টা এই মাছ ধরেছে ফকির।”

    আমি বিস্ময়বিমুগ্ধ। শহুরে মানুষদের হৃদয় জয় করার জন্য টাটকা মাছের চেয়ে ভাল আর কি হতে পারে? অতিথিদের ঠিক বুঝেছে তো এরা!

    কুসুম আমাকে বার বার বলল বসে পড়তে, কিন্তু আমি ঠিক পারলাম না। এই অতিথিদের সঙ্গে এক পঙক্তিতে আমি কী করে বসব? “না রে কুসুম,” বললাম। আমি। “যাদের খাইয়ে কাজ হবে তাদের খাওয়া। এত দামি খাবার আমাকে খাইয়ে কেন নষ্ট করবি খামখা?” একটা গাছের ছায়ায় বসে বসে দেখতে লাগলাম আমি। মাঝে মাঝে কুসুম কি ফকির এসে কলাপাতায় মুড়ে অল্প কিছু কিছু খাবার দিয়ে যেতে লাগল আমাকে।

    একটু পরেই বোঝা গেল যে ওষুধে কাজ দিয়েছে : অতিথিরা একেবারে মুগ্ধ। উদ্বাস্তুদের কাজকর্মের গুণগান করে অনেক সব বক্তৃতা দেওয়া হল। সবাই এক বাক্যে স্বীকার করল যে মরিচঝাঁপিতে যা ঘটছে তার গুরুত্ব শুধু এই দ্বীপটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আজকে মরিচঝাঁপিতে যে বীজ বোনা হয়েছে, কে বলতে পারে তার থেকেই একদিন দলিতদের জন্য নতুন রাষ্ট্র না হলেও, অন্তত দেশের সমস্ত নিপীড়িত মানুষের জন্য নিশ্চিন্ত কোনও এক আশ্রয়স্থল গড়ে উঠবে না?

    বেলা যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, তখন আস্তে আস্তে খোকনের কাছে গিয়ে ওর চোখের সামনে দাঁড়ালাম আমি। ও এক পলক দেখল আমাকে, কিন্তু চিনতে পারল না। অন্যদের সঙ্গে যেমন কথা বলছিল, বলতেই থাকল। খানিক পরে গিয়ে ওর কনুইয়ে আলতো করে টোকা দিলাম একটা। বললাম, “এই যে, খোকন!”

    অচেনা একজন লোকের কাছ থেকে এরকম অতি পরিচিতের মতো সম্বোধন শুনে ও বিরক্ত হল একটু। বলল, “কে মশাই আপনি?”

    যখন বললাম আমি কে, ওর মুখটা হাঁ হয়ে ঝুলে গেল, আর সেই হা-এর ভেতরে জিভটা জালে পড়া মাছের মতো লটপট করতে লাগল। “তুই?” অবশেষে বাক্‌স্ফুর্তি হল ওর। “তুই?”

    “হ্যাঁ, আমি।”

    “এত বছর কোনও খবর নেই তোর, আমরা তো সবাই ভেবেছিলাম–”

    “কী? মরে গেছি? দেখতেই পাচ্ছিস দিব্যি জলজ্যান্ত দাঁড়িয়ে আছি তোর সামনে।”

    মনে হল ও প্রায় বলে ফেলতে যাচ্ছিল, “মরলেই ভাল হত,” কিন্তু বলল না শেষ পর্যন্ত।

    “কিন্তু এত বছর ধরে কী করছিলি তুই? কোথায় ছিলি?”

    মনে হল আমার গোটা অস্তিত্বটার জন্যই যেন কৈফিয়ত চাওয়া হচ্ছে, যেন লুসিবাড়িতে এতগুলো বছর কী করে কাটিয়েছি তার হিসেব দিতে বলা হচ্ছে আমাকে।

    কিন্তু ভদ্রতা রেখেই জবাবটা দিতে হল : “ইস্কুল মাস্টারি করছিলাম। এই কাছেই একটা জায়গায়।”

    “আর লেখালিখি?”

    কাঁধ ঝাঁকালাম আমি। কী আর বলব? “ভালই করেছি ছেড়ে দিয়ে,” বললাম অবশেষে।

    “তোরা যা লিখছিস তার কাছে দাঁড়াতে পারত না আমার ওই সব লেখা।”

    হায় লেখককুল! সামান্য তোষামোদেই কেমন গলে জল হয়ে যায়। আমার কাঁধে হাত দিয়ে ওখান থেকে একটু সরে এল ও। তারপর খানিকটা প্রশ্রয় দেওয়ার ভঙ্গিতে গলাটা একটু নামিয়ে–যেন বড়ভাই কথা বলছে ছোটভাইয়ের সঙ্গে, সেইভাবে–জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা নির্মল, এইসব রিফিউজিদের সঙ্গে তোর কী করে যোগাযোগ হল?”

    বললাম, “আসলে এদের দু’-এক জনকে আমি চিনি। আর, রিটায়ার করারও সময় এসে গেছে, ভাবছিলাম এইখানে এসে এবার একটু আধটু মাস্টারি করব।”

    “এইখানে?” খোকনের গলায় একটু দ্বিধার সুর। “কিন্তু সমস্যা হল, ওদের তো বোধহয় থাকতে দেওয়া হবে না এ জায়গায়।”

    “ওরা তো আছেই এখানে,” আমি বললাম। “এখন কি আর সরানো সম্ভব নাকি ওদের? রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে তো তা হলে।”

    হাসল খোকন। “ভুলে গেছ বন্ধু, সে সময়ে কী বলতাম আমরা?”

    “কী বলতাম?”

    “ডিম না ভেঙে ওমলেট বানানো যায় না।”

    বাঁকা হাসি হাসল খোকন। এরকম হাসি একমাত্র তারাই হাসতে পারে যারা এক সময়ে আদর্শের কথা বলেছে কিন্তু কখনও সেই আদর্শে বিশ্বাস করেনি, আর ভেবেছে অন্য সকলেও তাদেরই মতো বিশ্বাসহীন আদর্শের কথা প্রচার করে চলেছে। একবার ভাবলাম যা তা বলে দিই মুখের ওপর, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই কেউ যেন প্রচণ্ড একটা ধাক্কা দিয়ে আমাকে মনে করিয়ে দিল যে অতখানি গর্বিত হওয়ার অধিকার আমার নেই। নীলিমা যেমন বিশাল কাজ করেছে এই কয় বছরে। কিন্তু আমি কী করেছি? সারা জীবনে কী কাজটা করেছি আমি? উত্তর খোঁজার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুই মনে এল না।

    বিকেল হয়ে গেছে। হরেন আর কুসুম বেরিয়েছে দেখতে যদি কিছু মাছ পাওয়া যায়। ফকির বসে আছে একটা কাঁকড়া ধরার সুতো নিয়ে। ভাটির দেশে এই সুতোগুলোকে বলে দোন। সুতোটা নিয়ে ওর খেলা করা দেখতে দেখতে আমার বুকের ভেতরটা যেন উথলে উঠল। কত কী বলার আছে, কত কথা ঘুরপাক খাচ্ছে আমার মাথার মধ্যে, সেগুলি কি সব না বলাই রয়ে যাবে? ওঃ, কতগুলো বছর অকারণে নষ্ট হয়েছে, জীবনের কতটা সময় অকারণে জলাঞ্জলি দিয়েছি। রিলকের কথা মনে পড়ল আমার, বছরের পর বছর কেটে গেছে একটা শব্দও লিখতে পারেননি, তারপর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সমুদ্রের তীরে এক দুর্গে বসে লিখে ফেললেন দুইনো এলিজির কতগুলো কবিতা। নিস্তব্ধতাও আসলে প্রস্তুতির একটা অঙ্গ। একেকটা মিনিট কাটছে, আর আমার মনে হচ্ছে ভাটির দেশের প্রতিটি খুঁটিনাটি যেন চোখ-ধাঁধানো উজ্জ্বলতায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে আমার সামনে। মনে হল ফকিরকে বলি, “জানিস কি তুই, প্রতিটা দোনে হাজারটা করে টোপ থাকে? তিন হাত ছাড়া ছাড়া বাঁধা হয় একেকটা টোপ? প্রত্যেকটা দোন তাই তিন হাজার হাত লম্বা?”

    কবি যে পথ দেখিয়ে দিয়েছেন তা ছাড়া আর কীভাবে এই জগৎটার যশোকীর্তন করি বলো? সেই পথে চলতে গেলে আমাদের কুমোর আর মজুরের কথা বলতে হবে, বলতে হবে

    ‘বরং এমন-কিছু তুলে ধরো,

    যা সহজ, আর বংশপরম্পর স্বচ্ছন্দে নূতন রূপ নিতে-নিতে

    এখন যা আমাদেরই অংশ হয়ে আমাদের হাতে, চোখে প্রাণবন্ত।’