Author: তাহের আলমাহদী

  • জাকির নায়িক বক্তৃতামালা

    জাকির নায়িক বক্তৃতামালা

    [book]

    মূল: ডা. জাকির নায়িক

    অনুবাদ: তাহের আলমাহদী

    ভূমিকা

    ‘জাকির আবদুল করিম নায়িক’ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ইসলামী চিন্তাবিদ, ধর্মপ্রচারক, বক্তা ও লেখক; তিনি ‘ডাক্তার জাকির নায়িক’ নামেই সমধিক বিখ্যাত। তিনি ইসলাম ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে কাজ করেন, তিনি তাঁর কাজের সুবিধার্থে ‘ইসলামিক রিসার্চ ফাউণ্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন, অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিভিন্ন ভাষায় ‘পিস টিভি নেটওয়ার্ক’ পরিচালিত হয়ে থাকে।

    জাকির আবদুল করিম নায়েক ১৮ অক্টোবর ১৯৬৫ সালে ভারতের মহারাষ্ট্রের মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মুম্বাইয়ের সেন্ট পিটার্স হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। এরপর তিনি কিশিনচাঁদ চেল্লারাম কলেজে ভর্তি হন। তিনি মেডিসিনের ওপর টোপিওয়ালা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড নাইর হসপিটালে ভর্তি হন। অতঃপর, তিনি ইউনিভার্সিটি অফ মুম্বাই থেকে ব্যাচেলর অব মেডিসিন সার্জারি বা এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।

    ১৯৮৭ সালে বিখ্যাত ইসলাম প্রচারক ‘আহমদ দিদাতে’র সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেন, তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৯১ সালে তিনি ইসলাম প্রচার শুরু করেন এবং আইআরএফ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর স্ত্রী ফারহাত নায়েক, ইসলামিক রিসার্চ ফাউণ্ডেশনের (IRF) নারী শাখায় কাজ করেন। এই কারণে তাঁকে ‘আহমদ প্লাস’ বলা হয়ে থাকে।

    এছাড়াও তিনি মুম্বাইয়ের ইসলামিক ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এবং ইউনাইটেড ইসলামিক এইডের প্রতিষ্ঠাতা, যা দরিদ্র ও অসহায় মুসলিম তরুণ-তরুণীদের বৃত্তি প্রদান করে থাকে।

    ‘ইসলামিক রিসার্চ ফাউণ্ডেশনে’র ওয়েবসাইটে তাকে “পিস টিভি নেটওয়ার্কের পৃষ্ঠপোষক ও আদর্শিক চালিকাশক্তি” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই চ্যানেলটি ‘সমগ্র মানবতার জন্য সত্য, ন্যায়বিচার, নৈতিকতা, সৌহার্দ্য ও জ্ঞানের’ প্রচারের লক্ষ্যে কাজ করে বলে এর ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।

    ২০১৬ সালে, একটি প্রেস কনফারেন্সে, জাকির নিজেকে নন-রেজিস্ট্যান্ট ইন্ডিয়ান (এনআরআই) বা বছরের অর্ধেকের বেশি সময় প্রবাসে বসবাসকারী ভারতীয় হিসেবে দাবি করেন।

    নায়েক বর্তমানে মালেশিয়ায় স্থায়ী নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাস করছেন।

    ‘পিস টিভি’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাঁর বক্তৃতা প্রায় দশ কোটি দর্শকের নিকট পৌঁছে যায়। তাকে ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের একজন বিশেষজ্ঞ’, ‘অনুমেয়ভাবে ভারতের সালাফি মতাদর্শের অনুসারী সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি’, ‘টেলিভিশনভিত্তিক-ধর্মপ্রচারণার রকস্টার এবং আধুনিক ইসলামের একজন পৃষ্ঠপোষক’ এবং ‘পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় ইসলাম ধর্মপ্রচারক’ বলা হয়ে থাকে। বহু ইসলামি ধর্মপ্রচারকদের সাথে তার ভিন্নতা হল, তার বক্তৃতাগুলো পারস্পারিক আলাপচারিতা ও প্রশ্নোত্তরভিত্তিক, যা তিনি আরবি কিংবা উর্দুতে নয় বরং ইংরেজি ভাষায় প্রদান করেন, এবং অধিকাংশ সময়েই তিনি ঐতিহ্যগত আলখাল্লার পরিবর্তে স্যুট-টাই পরিধান করে থাকেন।

    পেশাগত জীবনে তিনি একজন চিকিৎসক হলেও ১৯৯১ সাল থেকে তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। ইসলাম এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের উপর তার বক্তৃতাসমূহ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং সেগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

    তিনি প্রকাশ্যে ইসলামে শ্রেণীবিভাজনকে অস্বীকার করে থাকেন, তবুও অনেকে তাকে সালাফি মতাদর্শের সমর্থক বলে মনে করেন এবং অনেকে তাঁকে ‘ওয়াহাবি মতবাদ প্রচারকারী’ একজন ‘আমূল-সংস্কারবাদী’ ইসলামিক ‘টেলিভেগানিস্ট’ বা ‘তহবিল সংগ্রহকারী টেলিভিশন ধর্মপ্রচারক’ বলে সমালোচনা করে থাকেন। বর্তমানে ভারত, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে তাঁর ধর্মপ্রচার নিষিদ্ধ। বলা হয়ে থাকে যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের বাইরের তুলনায় এর ভেতরেই তাঁর সমালোচকের সংখ্যা বেশি।

    ‘ডা. জাকির নায়িক’ শাইখ মোহাম্মাদ রাশিদ আল মাখতুম এ্যাওয়ার্ড ফর ওয়ার্ল্ড পিস কর্তৃক  ‘ইসলামিক পারসোনালিটি অব ২০১৩’, মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান টুয়ানকু আব্দুল হালিম মুয়াদজাম শাহ ‘ডিস্টিংগুইশড ইন্টারন্যাশনাল পারসোনালিটি এওয়ার্ড’, শারজাহ শাসক সুলতান বিন মোহাম্মেদ আল কাশিমি কর্তৃক ‘শারজাহ এওয়ার্ড ফর ভলান্টারি ওয়ার্ক, ২০১৪’, গাম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া জাম্মেহ কর্তৃক ‘ইন্সাইনিয়া অব দ্য কমান্ডার অব দ্য ন্যাশনাল অর্ডার অব দ্য রিপাবলিক অব দ্য গাম্বিয়া’, গাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘অনারারি ডক্টরেট (ডক্টর অব হিউম্যান লেটারস)’, রাজকীয় সাউদী আরব কর্তৃক ‘বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার’ লাভ করেন।

    মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও জাকির নায়েক তার বক্তব্য ও মতের জন্য বিভিন্ন স্থানে সমালোচিত হয়েছেন। এমনকি মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশ তাঁর প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন।

    ২০১৬ সালে ‘হুসনি টাইগার’ নামক স্বঘোষিত শিয়া দল কর্তৃক জাকির নায়েকের মাথার বিনিময়ে ১৫ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। একই সালের ১৩ জুলাই, ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেত্রী’ ‘সাধ্বী প্রাচী’ জাকির নায়েকের শিরশ্ছেদকারীকে ৫০ লক্ষ রুপি পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করেন।

    জাকির নায়েকের বিভিন্ন সময়ের প্রদত্ত বক্তৃতায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আমন্ত্রিত ও অনামন্ত্রিত শ্রোতৃগণ অংশগ্রহণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য বক্তৃতা পরবর্তীতে মূল ইংরেজিসহ একাধিক ভাষায় বই হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে। জাকির নায়িকের প্রকাশিত বক্তৃতামালা বাংলায় অনূদিত হয়েছে, এর মধ্যে বাছাই করা গ্রন্থগুলোর সমন্বয়ে ‘জাকির নায়িক বক্তৃতামালা’ বা ‘জাকির নায়িক লেকচার সমগ্র’ বা ‘জাকির নায়িক উপদেশ সমগ্র’ নামে গ্রন্থ সঙ্কলিত হয়েছে।

  • অমুসলিমদের সচরাচর জিজ্ঞাসার জবাব

    অমুসলিমদের সচরাচর জিজ্ঞাসার জবাব

    [book]

    অমুসলিমদের সচরাচর জিজ্ঞাসার জবাব

    [REPLIES TO THE MOST COMMON QUESTIONS ASKED BY NON-MUSLIMS]

    ডঃ জাকির নায়েক কর্তৃক আন্তর্জাতিক দা’ওয়াহ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ধারণা, বিকাশ ও পরিচালনা

    ভূমিকা

    দাওয়াহ একটি কর্তব্য

    আরবী ‘দাওয়াহ’ শব্দের অর্থ ‘আহ্বান’ বা ‘আমন্ত্রণ’। ইসলামী প্রেক্ষাপটে এর অর্থ  অমুসলিমদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া বা ইসলাম প্রচার করা।

    ইসলাম একটি সার্বজনীন ধর্ম, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) হলেন সমগ্র মহাবিশ্বের প্রভু, এবং মুসলমানদেরকে সমস্ত মানবজাতির কাছে তাঁর বাণী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।

    মহিমান্বিত কুরআন বলে:

    ٱدْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِٱلْحِكْمَةِ وَٱلْمَوْعِظَةِ ٱلْحَسَنَةِ ۖ وَجَـٰدِلْهُم بِٱلَّتِى هِىَ أَحْسَنُ ۚ … ١٢٥

    আপনি মানুষকে আপনার রবের পথে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা (হিকমাহ) ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা করুন উত্তমপন্থায়।

    — আলকুরআন, সূরা নাহল, আয়াত ১২৫।

    দাওয়াতের কৌশল

    অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়ার বিভিন্ন কৌশল রয়েছে। এমনকি যদি একজন মুসলিম ইসলাম সম্পর্কে হাজারটা ভাল কথা বলে, তবুও অধিকাংশ অমুসলিম ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে না কারণ তাদের মনের পেছনে ইসলাম সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন আছে যেগুলোর উত্তর পাওয়া যায় না।

    তারা ইসলামের ইতিবাচক প্রকৃতির সাথে একমত হতে পারে। কিন্তু, তাৎক্ষণিক তারা বলবে— “আহ! অথচ আপনারা সেই মুসলিম যারা মৌলবাদী, যারা সন্ত্রাসী। আপনি সেই মুসলিম যারা একাধিক নারীকে বিয়ে করেন। আপনারা সেই একই মানুষ যারা নারীদেরকে পর্দার আড়ালে রেখে অবরোধবাসিনী করে রাখেন, ইত্যাদি।”

    আমি ব্যক্তিগতভাবে অমুসলিমকে জিজ্ঞাসা করতে পছন্দ করি, তিনি ইসলামের ভুল কী বলে মনে করেন। তাদের সীমিত জ্ঞান দ্বারা, সঠিক বা ভুল, যেকোন উৎস থেকেই হোক না কেন, আমি সরাসরি জিজ্ঞাসা করতে পছন্দ করি, তারা ইসলামে কী ভুল বলে মনে করেন। আমি তাদের খুব অকপট এবং খোলামেলা হতে উত্সাহিত করি এবং তাদের বোঝাই যে আমি ইসলাম সম্পর্কে সমালোচনা সহ্য করতে পারি।

    কুড়িটি অতি সাধারণ প্রশ্ন

    আমার বিগত কয়েক বছরের দাওয়াতের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পেরেছি যে, ইসলাম সম্পর্কে একজন সাধারণ অমুসলিমের বিশটি সাধারণ প্রশ্নও নেই। যখনই আপনি একজন অমুসলিমকে জিজ্ঞেস করেন, “ইসলামে আপনার কি ভুল মনে হয়?” তিনি পাঁচ বা ছয়টি প্রশ্ন করেন এবং এই প্রশ্নগুলি সর্বদাই বিশটি সাধারণ প্রশ্নের মধ্যে পড়ে।

    যৌক্তিক জবাব সংখ্যাগরিষ্ঠকে বোঝাতে সক্ষম

    ইসলাম সম্পর্কে বিশটি অতি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর প্রজ্ঞা ও যুক্তি দিয়ে দেওয়া যেতে পারে। অধিকাংশ অমুসলিম এইসকল উত্তর দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন। একজন মুসলমান যদি এই উত্তরগুলো মুখস্থ করেন বা সহজভাবে মনে রাখেন, ইনশাআল্লাহ তিনি সফল হবেন; যদি অমুসলিমদের ইসলামের সম্পূর্ণ সত্য সম্পর্কে বোঝাতে না পারেন, তবে অন্তত ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের ভুল ধারণা দূর করতে এবং ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তাভাবনা বিরত রাখতে পারবেন। খুব অল্প সংখ্যক অমুসলিম এই উত্তরগুলির পাল্টা জবাব দিতে পারেন, যার জন্য আরও তথ্যের প্রয়োজন হতে পারে।

    সময়ের ব্যবধানে ভুল ধারণা পরিবর্তন হয়

    ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নগুলো বিভিন্ন সময় ও যুগে পরিবর্তিত হয়েছে। সঙ্কলিত এই বিশটি সর্বাধিক সাধারণ প্রশ্ন বর্তমান সময়ের উপর ভিত্তি করে। কয়েক দশক আগে, প্রশ্নগুলি ভিন্ন ছিল এবং কয়েক দশক পরেও এই প্রশ্নগুলি পরিবর্তন হতে পারে মিডিয়া ইসলামকে কিভাবে প্রক্ষেপণ করে তার উপর ভিত্তি করে।

    বিশ্বেজুড়ে অভিন্ন ভুল ধারণা

    আমি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছি এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সাথে আলোচনা করেছি। সারা বিশ্বের সাধারণ অমুসলিমদের দ্বারা জিজ্ঞাসা করা ইসলাম সম্পর্কে এই বিশটি সর্বাধিক সাধারণ প্রশ্ন একই।

    অঞ্চলভেদে সম্পূরক প্রশ্ন হতে পারে

    স্থানভেদে কয়েকটি সম্পূরক প্রশ্ন থাকতে পারে, উদাহরণ স্বরূপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, অতিরিক্ত প্রশ্ন ছিল; ইসলাম কেন সুদের লেনদেন হারাম করেছে?

    কিছু সাধারণ প্রশ্ন ভারতীয় অমুসলিমদের মধ্যে নির্দিষ্ট

    আমি সর্বাধিক জিজ্ঞাসিত বিশটি সাধারণ প্রশ্নের মধ্যে ভারতীয় অমুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত কিছু প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করেছি। যেমন, মুসলমানেরা আমিষ খায় কেন? কারণ এই যে, ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকেদের পরিমাণ প্রায় বিশ শতাংশ অর্থাৎ বিশ্বের জনসংখ্যার এক পঞ্চমাংশ এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকেরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে, এইভাবে সারা বিশ্বে অমুসলিমদের মধ্যেও এই প্রশ্নগুলি সাধারণ হয়ে উঠেছে।

    মিডিয়ার কারণে ভুল ধারণা

    অধিকাংশ অমুসলিমের মনে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা উদিত হয় মিডিয়ার কারণে, কেননা, মিডিয়া তাদের উপর ক্রমাগত ইসলাম সম্পর্কে ভুল তথ্যের বোমাবর্ষণ করতে থাকে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রধানত পশ্চিমা বিশ্বের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তা আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট চ্যানেল, রেডিও স্টেশন, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন বা বইই হোক না কেন। সম্প্রতি ইন্টারনেট তথ্যের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠেছে। যদিও এটি ব্যক্তিবিশেষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়, তবুও ইন্টারনেটে ইসলাম সম্পর্কে একটি বিশাল পরিমাণ ভয়ানক প্রচারণা পাওয়া যায়। অবশ্য মুসলমানেরাও ইসলাম ও মুসলমানদের সঠিক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে এই হাতিয়ার ব্যবহার করছেন, কিন্তু ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের তুলনায় তারা অনেক পিছিয়ে রয়েছেন। আমি আশা করি মুসলমানদের প্রচেষ্টা আরও বাড়বে এবং অব্যাহত থাকবে।

  • আশ্চর্য পুকুর

    আশ্চর্য পুকুর

    আমাদের স্কুলে যিনি বাংলা ব্যাকরণ পড়াতেন তিনি ছিলেন চিমটি স্পেশালিস্ট। বিভিন্ন ধরনের চিমটি আবিষ্কার করে তিনি ছাত্র মহলে খুবই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। খ্যাতির কারণ চিমটি নয়, চিমটির নাম। চিমটির তিনি চমৎকার চমৎকার সব নাম দিতেন। সমাস-চিমটি, সন্ধি-চিমটি, এককথায় চিমটি, বিপরীত শব্দে চিমটি…। চিমটি অ্যাপ্লাই করার আগে স্যার ক্লাসে উচ্চ-গলায় চিমটির নাম ঘোষণা করতেন। তারপর মিটমিটি হেসে বলতেন, ‘এই নাম কি তোমাদের পছন্দ হয়েছে?’ আমরা সমস্বরে বলতাম, ‘খুবই হয়েছে স্যার। তবে খেয়াল রাখবেন যেন বেশি না লাগে।’ স্যার মাথা নাড়তেন কিন্তু খেয়াল রাখতেন না। চিমটিতে যথেষ্টই লাগত। গোটা পিরিয়ডটা জ্বালা জ্বালা করত। তবে চোখ দিয়ে জল বের হওয়ার মতো লাগত না।

    ব্যাকরণ স্যার যেদিন অবসর নিলেন সেদিন একটা কাণ্ড হল। হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে স্যার ধরা গলায় বললেন, ‘ছেলেরা, তোমাদের অনেক ব্যথা দিয়েছি। আজ যদি ইচ্ছে হয় তোমরা এসে আমাকে একটা করে চিমটি কেটে যেতে পারো। আমি কিছু মনে করব না। তবে দেখবে, জীবনে ব্যাকরণ যেন ভুল না হয়।’

    চিমটিতে যা হয়নি, স্যারের কথা শুনে আমাদের তাই হল। সবার চোখে জল এসে গেল।

    স্কুল জীবন এরকমই হয়। এই জীবনে হাসিতেও আনন্দ, চোখের জলেও আনন্দ থাকে। অন্য কোন জীবনে এই জিনিস পাওয়া যায়?

    নানা ধরনের গল্পের সঙ্গে স্কুল জীবন অনেকগুলো গল্প লিখলাম এই বইতে। শুধু আমার স্কুল জীবন নয়, তোমাদের সকলের স্কুল জীবন। লেখার পর দেখলাম, সব গল্প সত্যি হল না, অথচ কোনও গল্পই যেন মিথ্যে নয়!

    তোমাদের দিনগুলো এমনই আনন্দময় হোক।

  • হারলেও হাসে

    হারলেও হাসে

    টিফিনের সময় মিটিং বসল।

    এ ধরনের গোপন এবং জরুরি মিটিং আমরা সাধারণত করি স্কুলের পেছন দিকটায়। ঝাঁকড়া জামরুল গাছটার নীচে। সকলে গাছের তলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসি। পল্টু শুধু বসে গাছের ওপরে, ডালে পা ঝুলিয়ে। এই কারণে ওকে আমরা মাঝে মধ্যেই ‘হনুমান পল্টু’ বলে ডাকি। তাতে তার কিছু আসে যায় না। জরুরী সময়ে সে গাছের ডালে বসতেই পছন্দ করে।

    আজ বসেছে। বলল, ‘বন্ধুগণ, সব জিনিস মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু এই জিনিস মেনে নেওয়া যায় না। অনেক হয়েছে আর নয়।’

    তপন গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসেছে। দাঁত দিয়ে ঘাস কাটছে। সবসময়ই সে এরকম করে। মনে হয়, সুযোগ পেলে লুকিয়ে ঘাস খায়ও। বলল, ‘আমি পল্টুর কথা সমর্থন করি। শুধু সমর্থন করি না। একশো ভাগ সমর্থন করি। হার-জিতের থেকে অনেক বড়ো হল সম্মান। আমাদের সম্মান। ক্লাস সেভেনের সম্মান। সেই সম্মান রক্ষা করতে না পারলে ট্রফি, মেডেল জিতে লাভ কী?’

    ফুচাইয়ের নামের মধ্যে একটা ফাজিল ফাজিল ব্যাপার আছে। কিন্তু সে যথেষ্ট গম্ভীর প্রকৃতির ছেলে। আজ আরও গম্ভীর হয়ে গেছে। বলল, ‘প্রসূন, তোমাকে যে রিপোর্ট তৈরি করতে বলা হয়েছিল সেটার কী হল?’

    প্রসূন মন দিয়ে কেক খাচ্ছিল। সেই অবস্থাতেই বলল, ‘আমার রিপোর্ট রেডি।’

    তমাল ওর হাত থেকে কেকের বাকি অংশটা কেড়ে টুক করে নিজের মুখে পুরে ফেলল। তারপর বলল, ‘আগে রিপোর্ট বল। তারপর খাবি।’

    প্রসূন বেজার মুখে বলল, রিপোর্ট খুবই ভয়ঙ্কর এবং দুঃখজনক। শেষ এগারোটা ম্যাচে একই কাণ্ড হয়েছে। হেরে যাওয়ার পর বিশু হেসেছে। দুটো ম্যাচের ঘটনা তো মারাত্মক। সে যতবার গোল খেয়েছে, ততবার মুখে হাত চাপা দিয়ে ফিক ফিক করে হেসেছে। আশ্চর্যের কথা হল, ওই দুটো ম্যাচে আমাদের ফল, বাড়াবাড়ি রকমের খারাপ হয়েছিল। এত খারাপ যে, খেলা শেষে আমাদের টিমের দুএকজনের চোখে জল পর্যন্ত এসে গিয়েছিল। নাম বলে আমি আর তাদের লজ্জায় ফেলতে চাইছি না। তাছাড়া এই রিপোর্ট কান্না নিয়ে নয়, হাসি নিয়ে। যাই হোক, হারবার পর বিশুর হাসবার রহস্য আমি বুঝতে পারছি না।”

    মল্লিব্রত লাফিয়ে উঠে বলল, “আমি তোদের বলেছিলাম না? এবার বিশ্বাস হল তো?”

    অজয় চোখ সরু করে বলল, “আচ্ছা প্রসূন, তোর কী মনে হয়? এসব সময় বিশু কি চাইছিল, আমরা হেরে যাই?”

    প্রসূন জিভ কেটে বলল, “ছি, ছি এ কী কথা বলছিস! একথা আমাদের মনে আনাও অন্যায়। বিশু না খেললে আমাদের হাঁড়ির হাল হত। তাছাড়া ও তো শুধু দল হারলে হাসে না, নিজে গোল খেলে, আউট হয়ে গেলেও হাসে। স্পোর্টসের সময় যখন দু-একটা ইভেন্টে জিততে পারেনি তখনও খুব হাসাহাসি করেছে বলে খবর পেয়েছি। সুশান্ত বলছিল, হান্ড্রেড মিটারস্ আর হার্ডল রেসে পিছিয়ে পড়ে ও নাকি সব থেকে মজা পেয়েছিল।’

    সুশান্ত চিন্তিত গলায় বলল, “এটাই তো মুশকিল হয়েছে। হাসির মানে বোঝা যাচ্ছে না।”

    সুকল্যাণ চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখছিল। শেষ দুটো ম্যাচে ক্লাস সেভেনের ভয়ঙ্কর পরাজয়ের পেছনে সুকল্যাণের অবদান খুবই বড়ো। সে দুটো সেমসাইড করেছে। একটা আবার হাতে লেগে। সুকল্যাণ উদাসীন গলায় বলল “তোরা কিন্তু একটু ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিস। দুম করে কিছু করে বসিস না।”

    অরূপ দুঃখী মুখ করে বলল, “কোন ভাবনা চিন্তার আর সুযোগ নেই। আমরা যা ঠিক করেছি সেটাই আমাদের করতে হবে। কাজটা খুবই দুঃখের। আমাদের অসুবিধেও হবে খুব। কিন্তু উপায় নেই।”

    তাপস ক্লাসের ফার্স্ট বয়। যে কোনও বিষয়ে মত দেওয়াটা তার স্বভাব। তার বেশিরভাগ মতই অবশ্য শোনা হয় না। সে বলল, ‘বিশুকে ডেকে একবার জিগ্যেস করলে হত না? ওরাও তো একটা বক্তব্য থাকতে পারে।”

    অরূপ বলল, “থাকতে পারে। কিন্তু যে এরকম উদ্ভট আচরণ করছে তার মতামত জেনে কী হবে? তাছাড়া বিশুর জ্বর হয়েছে। আজ আসেনি। এটাই সুযোগ। বেচারি এখানে থাকলে আমরা এই কষ্টদায়ক সিদ্ধান্তটা কিছুতেই ওর সামনে নিতে পারতাম না। সুতরাং আর দেরি করাটা ঠিক হবে না।”

    গাছের ওপর থেকে পল্টু বলল, অরূপ ঠিকই বলেছে। খুবই দুঃখের সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত আমাদের নিতে হচ্ছে। কারোর আপত্তি থাকলে হাত তোল।”

    সকলে মাথা নামিয়ে বসে রইল। কেউ হাত তুলল না। এর মানে হচ্ছে, সিদ্ধান্তে সকলেই একমত।

    খেলায় হারবার পরও হাসবার অপরাধে ক্লাস সেভেনের বিশ্বনাথ পাল ওরফে বিশুকে যাবতীয় টিম থেকে বাদ দেওয়া হল।

    বিশুর মধ্যে একটা পাগল পাগল ব্যাপার আছে। চেহারায় কোন ছিরিছাঁদ নেই। চুলগুলো খোঁচা খোঁচা। হাঁটাচলাটা ল্যাগব্যাগে ধরনের। প্যান্টে ঠিকমত গুঁজতে জানে না। জুতোর ফিতে সবসময়ই খোলা। পাগলাটে ধরনের মানুষের মজা হল, সাধারণ ক্ষমতা না থাকলেও তাদের কিছু না কিছু অ-সাধারণ ক্ষমতা থাকে। বিশুরও সেরকম রয়েছে। তার অসাধারণ ক্ষমতা খেলাধুলোতে। সবধরনের খেলাতেই এই ছেলে দারুণ ওস্তাদ। ক্রিকেটে ওর ফিল্ডিং দেখলে চমকে উঠতে হয়। ঝপাং ঝপাং করে শুয়ে পড়ে এমন সব ক্যাচ ধরে যে নিজের দলের বোলার পর্যন্ত ঘাবড়ে যায়। এত ঘাবড়ে যায় যে আউট করার আনন্দে লাফাতে পর্যন্ত ভুলে যায়।

    ফুটবলের সময় বিশু গোলকিপার। গোলপোস্টের দিকে আসা বল যখন সে ধরে তখন মনে হয় সে বুঝি কোনও মানুষ নয়। একটা পাখি। তার হাত দুটো আসলে দুটো ডানা। গোলপোস্টের দিকে আসা বল পাখির মতো উড়ে উড়ে সে ধরতে পারে।

    একবার আমাদের গেম টিচার বিজয়বাবুর মাথায় ভূত চাপল।

    তিনি বললেন, ফুটবল, ক্রিকেট একঘেয়ে হয়ে গেছে। এবার অন্যকিছু করতে হবে। তিনি হকি খেলার ব্যবস্থা করলেন। আমরা সবাই ভেবেছিলাম এ খেলায় বিশু তেমন কেরামতি দেখাতে পারবে না। পারবেই বা কী করে? হকি তো আর সে কখনও খেলেনি। ওরে বাবা! দশমিনিট পরে দেখা গেল সেখানেও বিশু মারাত্মক। হকি স্টিকে যেন আঠা লাগিয়ে মাঠে নেমেছে। বল তাকে ছেড়ে অন্যদিকে যেতেই চায় না যে়!

    এখানেই বিশুর খেলা-প্রতিভার শেষ নয়। ক্রিকেট, ফুটবল, হকির মতো বড়ো বড়ো খেলার পাশাপাশি কবাডি, পিট্টু, বল চোরের মতো, ছোটখাটো খেলাতেও বিশুর পারদর্শিতা দেখবার মতো। স্পোর্টসের সময় দৌড়, লং জাম্প, হাই-জাম্পে তার ধারে কাছে কারোর আসা শক্ত। অত প্ৰাইজ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য বেচারিকে রিকশা ডাকতে হয়।

    বিশু অবশ্য লেখাপড়াতেও ভয়ঙ্কর। যে কোনও পরীক্ষায় দুটো তিনটে বিষয়ে ফেল করা তার কাছে কোন ঘটনা নয়। তবে তাকে কখনও ক্লাসে রেখে দেওয়া হয় না। কারণ, তাহলে আমাদের ক্লাস টিমের কেলেঙ্কারি হত। বিশুর মতো তুখোড় খেলোয়াড় আমাদের ক্লাসে থাকলে কী হবে, দল হিসেবে ক্লাস সেভেন খুবই দুর্বল। এতই দুর্বল যে প্রায় সব খেলাতেই আমরা হেরে যাই। বিশু চেষ্টা করে খুব। যেখানে বারো গোলের হার অবশ্যম্ভাবী সেখানে বিশুর জন্য আমরা সাত গোলে হেরে ফিরি। যেখানে পঞ্চাশ রান আমাদের হার কেউ আটকাতে পারবে না, সেখানে কুড়ি রানে বিপক্ষ দল জিতে যায়। বিশু এর থেকে বেশি আর কী করতে পারে? ম্যাচ শেষ হলে অন্য ক্লাসের ছেলেরা ঠাট্টা করে বলে, ‘এবার থেকে অতজনে মাঠে না নেমে তোরা বরং বিশুকে একা মাঠে নামা। দেখবি রেজাল্ট ভালো হবে।”

    এই তো গত বছর আন্তক্লাস ফুটবল টুর্নামেন্টে সব মিলিয়ে বাহান্নটা গোল খেয়ে ক্লাস সেভেন রেকর্ড করল। তবে সেরা খেলোয়াড়ের ট্রফিটা কিন্তু পেয়েছিল বিশুই। সে ট্রফি পেল আটচল্লিশটা গোল বাঁচানোর জন্য। বিশু না থাকলে আমরা বাহান্নর বদলে ঠিক একশোটা গোল খেতাম।

    অ্যানুয়াল পরীক্ষার সময় মাস্টারমশাইরা এই জিনিসটা মাথায় রাখেন। বিশুকে ক্লাসে উঠতে না দিলে আমাদের অবস্থা যে ভয়াবহ হবে সেটা ওঁরা বুঝতে পারেন। হেডস্যারের সঙ্গে অনেক আলোচনা-টালোচনা করে শেষপর্যন্ত স্পোর্টস গ্রাউন্ডে বিশুকে ক্লাসে তুলে দেওয়া হয়।

    তবে গত ফুটবল টুর্নামেন্টের পর থেকে গেম টিচার বিজয়বাবু খুব রেগে আছেন। বলছেন, ‘এতদিন জানতাম, চাঁদের মধ্যে কলঙ্ক থাকে। কিন্তু তোদের ক্লাসে দেখছি, একগাদা কলঙ্কের মধ্যে একটা চাঁদ পড়ে রয়েছে। এ আর মেনে নেওয়া হবে না। বিশুকে হয় ফেল করিয়ে আটকে দেব, নয়তো ডবল প্রমোশন দিয়ে উঁচু ক্লাসে তুলে নেব। না তোদের সঙ্গে আর ওকে রাখা যাবে না।”

    বিজয়বাবুর এই হুমকি শুনে আমাদের মুখ শুকিয়ে গেল। হারবারও একটা প্রেস্টিজ থাকবে না। এখনই তো আমাদের ক্লাসের নাম হয়ে গেছে, “হেরো ক্লাস সেভেন’, এরপরে হয়তো হবে সুপার হেরো ক্লাস সেভেন।’ সে বড়ো লজ্জার হবে।

    এতকিছুর পরও আমাদের কঠিন সিদ্ধান্তটা নিতে হল। ক্লাস টিম থেকে বিশুকে বাদ দিতে হল।

    খবরের নিয়ম হল যে খবর যত বেশি গোপন রাখার চেষ্টা হবে সে খবর তত তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়বে। এটার ক্ষেত্রেও তাই হল। টিফিনে আমরা যে সিদ্ধান্ত নিলাম, ছুটির আগে সবাই সেটা জেনে গেল। অন্য ক্লাসের ছেলেরা এসে আমাদের ধরে ধরে জানতে চাইল, এরকম ভয়ঙ্কর ঘটনা আমরা কোন সাহসে ঘটালাম? আমরা চুপ করে থাকলাম। বেশি চাপাচাপি করলে বললাম, “এটা ক্লাস সেভেনের নিজস্ব ব্যাপার। বলা যাবে না।”

    আমাদের মন খুব খারাপ। খেলায় ক্লাস সেভেনের ভবিষ্যতের কথা ভেবেও খুব দুশ্চিন্তা হতে লাগল।

    পরদিন স্কুলে যেতেই পল্টু, প্রসূন, সুকল্যাণকে বিজয় স্যার ডেকে পাঠালেন। চোখে মুখে টেনশন। টিচারস রুমের এক কোণে ডেকে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, যা শুনছি সেটা সত্যি নাকি?”

    সুকল্যাণ মাথা নামিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার সত্যি।’

    স্যার আঁতকে উঠে বললেন, ‘বলিস কী! সত্যি! ক্লাস শুদ্ধ তোদের সকলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে?”

    প্রসূন বলল, “কিছু করার নেই স্যার। আপনি আমাদের ক্ষমা করবেন।”

    স্যার চাপা ধমকের গলায় বললেন, “ক্ষমা করব মানে? বিশু না খেললে কী অবস্থাটা হবে একবার বুঝতে পেরেছিস? হেডমাস্টারমশাইকে আমি কী কৈফিয়ত দেব? না কিছুতেই তোমাদের একথা শোনা যাবে না। বিশুকে তোমরা আজই দলে ফিরিয়ে নাও। পরশু ক্লাস এইটের সঙ্গে তোমাদের ম্যাচ। আমি দেখতে চাই তখন বিশুও খেলছে।”

    পল্টু মাথা নামিয়ে বলল, “সেটা হয় না স্যার। বিশু খেললে আমরা কেউ খেলব না।”

    স্যার রেগে গিয়ে চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘খেলবে না মানে। তোমাদের তো খুব সাহস বেড়েছে দেখছি।” কিছুক্ষণের মধ্যে গলা নামিয়ে বললেন, কী হয়েছে রে তোদের? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। বিশুর সঙ্গে সকলের ঝগড়া হয়েছে নাকি? খুলে বল তো।”

    স্যারকে সব বলা হল। কীভাবে বিশু খেলায় হেরে যাওয়ার পরও হাসে, কীভাবে ক্লাস হারলে হাসে, হাসতে হাসতে বাড়ি যায়, কীভাবে নিজে গোল খেয়ে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, কীভাবে আউট হয়ে যাওয়ার পর দাঁত বের করে মাঠের বাইরে ফিরে আসে, কীভাবে দৌড়ে পিছিয়ে পড়লে মজা পায়-সবই।

    সব শুনে বিজয়স্যার অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। পকেট থেকে নস্যির কৌটো বের করে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। মনে মনে কিছুক্ষণ বিড়বিড় করলেন। ছাদের দিকে পিটপিট করে তাকালেন। তারপর ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “না, বিষয়টা সত্যি খুব জটিল। জিতলে হাসে আমি জানি, কিন্তু হারলে কেন হাসবে? হারার মধ্যে হাসির কোন এলিমেন্ট আছে? হারলে তো কাঁদার কথা? এতদিন ধরে গেম টিচারের কাজ করছি। কত খেলা করলাম, কত খেলা দেখলাম। এরকম তো শুনিনি কখনও! বিশু ছেলেটার মাথায় একটু গোলমাল আছে সেটা আমরা সব মাস্টারমশাই জানি। কিন্তু এখন দেখছি গোলমাল একটু নয়, গোলমাল খুব বেশি।”

    সুকল্যাণ বলল, “তাহলেই বলুন স্যার, এরপর ওকে দল থেকে বাদ দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় ছিল? কাজটা করে আমাদের খুবই দুঃখ হয়েছে। আমরা ওকে প্রত্যেকে খুব ভালবাসি। খেলাধুলোয় ও আমাদের ক্লাসের গর্ব, স্কুলের গর্ব। কিন্তু এই ঘটনার পর ওকে বাদ না দিয়ে আমাদের কী উপায় ছিল?”

    প্রসূন বলল, ‘ক্লাস সেভেন সব খেলায় হারতে পারে স্যার, কিন্তু প্রেস্টিজ বলে তো একটা জিনিস থাকবে। সেটায় তো হার মেনে নেওয়া যায় না।’

    বিজয়স্যার বললেন, “কখনই নয়। তোদের মুখে যা শুনলাম তাতে মনে হচ্ছে বিশু হার জিতের ব্যাপারটাতেই একটা গোলমাল পাকিয়ে দিচ্ছে। এই পাগলামি যদি সংক্রামিত হয় তাহলে কেলেঙ্কারি। এবার থেকে হেরে গিয়েও সবাই ধেই ধেই করে নাচবে। নিজে গেম টিচার হয়ে আমি এই বেনিয়ম কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। না, নো নেভার।” এতদূর বলে বিজয়স্যার হাঁপ নিলেন। নস্যি নিলেন। তারপর বললেন, “কিন্তু পরশুদিনের খেলাটার কী হবে? এরকম সময় যদি তোরা দু-তিন ডজন গোলে হারিস আমি তো মুখ দেখাতে পারব না। আচ্ছা, এবারটা কী বিশুকে দলে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না? বিশুকে নিলেও তোরা যে হারবি তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু বিচ্ছিরি ভাবে হারাটা তো ঠেকানো যেত আর এবারকার মত আমার মুখ কিছুটা রক্ষা পেত।’

    সুকল্যাণ, প্রসূন, পল্টু মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। এর জন্য ওরা তৈরি ছিল না। স্যারের বকাঝকা ঠিক আছে, কিন্তু তা’বলে এভাবে অনুরোধ? তিনজনই খুব লজ্জা পেয়ে গেল। পল্টু আমতা আমতা করে বলল, ‘পরশুর খেলাতেও আমরা যে হারব…। আর তারপর যদি বিশু আবার হাসে?”

    বিজয়স্যার এবার রেগে গেলেন। গলা তুলে বললেন, “গাধাটার হাসি আমি বের করছি। ফের যদি হেরে গিয়ে হাসে তাহলে ওকে স্কুল থেকে দূর করে দেব। তাছাড়া এটাই তো ওর শেষ ম্যাচ।”

    টিফিনের সময় গাছতলায় আবার জরুরি মিটিং। বিশু স্কুলে এসেছে, কিন্তু মিটিঙে ডাকা হয়নি। গাছের ডালে বসে পল্টু বিজয় স্যারের কথা সবাইকে বিস্তারিত জানাল। তারপর ভাষণ দেওয়ার ভঙ্গিতে হাত তুলে বলল, “বন্ধুগণ, কোন উপায় নেই। স্যারের মুখরক্ষার জন্যই আমরা এবারের মতো বিশুকে ফিরিয়ে নিচ্ছি। আবার আমরা হারব এবং বিশু আবার হাসবে। কিন্তু সেটাই ওর শেষ হাসি হবে।”

    কার শেষ হাসি, কে হাসে?

    সেদিন খেলায় যা ঘটল তা আমরা কল্পনা করতেও পারিনি। গোটা স্কুলের কেউ-ই পারেনি। বাবা, মায়েদের পাশে চেয়ার নিয়ে বসে থাকা মাস্টার মশাইরা চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে রইলেন। বিজয় স্যার ঘন ঘন নস্যি নিয়ে হেডমাস্টার মশাইয়ের ঘাড়ের কাছে গিয়ে হাঁচতে লাগলেন। এতে হেডমাস্টার মশাইয়ের খুব রেগে যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি রেগে না গিয়ে হাত বাড়িয়ে বললেন, “বিজয় তোমার নস্যির কৌটোটা একটু দাও তো। এক টিপ নিয়ে ফেলি। এই সময় মাথা পরিষ্কার রাখাটা জরুরি।”

    আজকের খেলায় আমরা তিন-এক গোলে ক্লাস এইটকে হারিয়ে দিলাম!

    সবাই চলে গেছে। আমরা ক্লাস সেভেনের ছেলেরা মাঠের এককোনায় গোল হয়ে বসে আছি চুপ করে। জিতে এত ঘাবড়ে গেছি যে কথা বলতে পর্যন্ত ভুলে গেছি। সন্ধে হতে আর দেরি নেই। অল্প অল্প ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে।

    জেতার বিকেল বুঝি এত সুন্দর হয়! হঠাৎ শুনি ফোঁপানির আওয়াজ। মুখ ফিরিয়ে দেখি, একটু দূরে বিশু হাঁটুর ওপর মাথা রেখে বসে আছে। কাঁদছে নাকি! হ্যাঁ, কাঁদছেই তো! আরে, কাঁদছে কেন? জেতার পর কেউ কাঁদে নাকি! ছেলেটা সত্যি পাগল। হাফটাইমের পরে ও চার চারটি গোল না বাঁচালে আমরা আজ আবার হারতাম।

    পল্টু উঠে গিয়ে বিশুর পিঠে হাত রাখল। বলল, “অ্যাই বিশু, কাঁদছিস কেন? অ্যাই মুখ তোল। মুখ তোল বলছি। কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন?”

    বিশু মুখ তুলল। চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, “কাঁদছি তো তোদের কী? আনন্দ হচ্ছে তাই কাঁদছি। প্লিজ, তোরা আমাকে কাঁদতে দে।”

    আমরা ওকে কাঁদতে দিলাম।

    এরপর বহু খেলায় আমরা জিতেছি, তেমনি অনেক খেলায় হেরেছিও। বিশু কিন্তু তার স্বভাব বদলায়নি। হেরে গেলে সে একইরকম ভাবে হাসে। তবে আমরা আর রাগ করি না। কারণ, আমরা বুঝতে পেরেছি, হারবার পর হাসা খুব কঠিন কাজ। এই কাজ সবাই পারে না। বিশুর মতো পাগলাটে ধরনের ছেলেরাই কেবল পারে। হারবার পর তারা মোটেও ভেঙে পড়ে না। বরং হাসতে হাসতে তারা নিজের জেদটাকে বাড়িয়ে নেয়। যাতে কোনও না কোনদিন জিতে খুব আনন্দ হয়। এত আনন্দ যে কান্না পেয়ে যায়।

  • আগুন লাফ

    আগুন লাফ

    ‘তোমরা সবাই’ ক্লাবঘরে আজ সকাল থেকে ভিড়।

    বেলা যত বাড়ছে ভিড়ও তত বাড়ছে। দশটা নাগাদ বাইরে লম্বা লাইন পড়ে গেল। সেই লাইনে যেমন বড়োরা আছে, তেমন হাফপ্যান্ট, ফ্রক পরা ছোটোরাও আছে। তাদের সংখ্যাই বেশি। ক্লাবের পক্ষ থেকে খানিক আগে সেইসব ছোটো ছেলেমেয়েদের হাতে দুটো করে বিস্কুট দিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সময় যদি বেশি লাগে তা হলে আবার বিস্কুট আসবে। ছোটোরা চাইছে, সময় বেশি লাগুক এবং আবার বিস্কুট আসুক।

    ভিড়ের কারণ যারা জানে না তারা অবাক হয়ে ভাবছে, ব্যাপারটা কী? এত মানুষ কেন? ‘তোমরা সবাই’ ক্লাব তো আর কোনও স্কুল নয় যে ছেলেমেয়ে ভর্তি নেবে, বাচ্চারা সেখানে ইন্টারভিউ দিতে এসেছে। তবে? ভেতরে কোনও প্রদর্শনী হচ্ছে না তো? তাক লাগানো ছবি বা কথা-বলা পুতুলের প্রদর্শনী? হতে পারে। একবার কারা যেন বাঘের ছবি, পোস্টার নিয়ে প্রদর্শনী করেছিল। তখনও খুব ভিড় হয়েছিল। ঘরের ভিতর ঢুকলেই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ডাক! ছবি, পোস্টার দেখার জন্য যত না ভিড় হয়েছিল, বাঘের ডাক শোনার জন্য ভিড় হয়েছিল তার থেকে অনেক বেশি। এবারও সেরকম কিছু হচ্ছে নাকি? হতে পারে। কিন্তু তা বলে এই সাতসকালে প্ৰদৰ্শনী! আচ্ছা, টিকা বা রক্ত পরীক্ষার ব্যাপার নেই তো? আজকাল ক্লাবগুলোতে নানা ধরনের স্বাস্থ্যশিবিরের আয়োজন হয়। আগের দিন রিকশাতে মাইক লাগিয়ে ক্লাবের ছেলেরা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘোষণা করে যায়। সেইরকম কিছু?

    যারা ভিড়ের কারণ জানে তারা অবশ্য অবাক হচ্ছে না। বছরের একটা দিন ‘তোমরা সবাই’ ক্লাবের সামনে এই কাণ্ড হয়। এবার থেকে ছোটোরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। যারা পারে বাবা-মাকে নিয়ে আসে, যারা পারে না একাই চলে আসে। তবে এবারের ঝাঁপানোটা বেশি। তারও কারণ আছে।

    আজ ‘তোমরা সবাই’ ক্লাবে স্পোর্টসের জন্য নাম লেখানোর দিন। সামনের রবিবার এই এলাকার সব থেকে বড়ো বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হবে। স্কুল মাঠে সারাদিন তুমুল হইচই। এলাহি ব্যাপার। কত রকমের যে প্রতিযোগিতা হবে তার ইয়ত্তা নেই। শুধু দৌড়ই আছে সাত রকমের। একশো মিটার, দুশো মিটার, চারশো মিটার ছাড়াও হবে রিলে দৌড়, বস্তা দৌড়, চামচ দৌড়, ক্যাঙ্গারু দৌড়, অঙ্ক দৌড়। আছে লাফালাফি। হাই জাম্প, লং জাম্প, ফ্রগ জাম্প, জিলিপি জাম্প। তা ছাড়া বল ছোড়া, হাঁড়ি ভাঙা, যেমন খুশি সাজো তো আছেই। সকালবেলা শুরু করে শেষ হতে সন্ধে গড়িয়ে যায়। সব থেকে বড়ো কথা হল, প্ৰাইজগুলো সব লোভনীয়। ‘তোমরা সবাই’ ক্লাব স্পোর্টসের সময় দামি প্রাইজ দিয়ে এলাকায় বিরাট নাম করেছে। প্ৰাইজের ব্যাপারে কেউ তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারে না। এ বছর তো আরও পারবে না। কারণ, এবার খুব বড়ো একটা কম্পিউটার কোম্পানিকে ধরা হয়েছিল। ক্লাবের প্রেসিডেন্ট নিজে এ ব্যাপারে খাটাখাটনি করেছেন। দিনের পর দিন কম্পিউটার কোম্পানির অফিসে গেছেন। ওরা প্ৰথমে রাজি হচ্ছিল না, পরে রাজি হয়েছে। বলেছে সবকটা ফার্স্ট প্রাইজ তারাই দেবে একটা করে কম্পিউটার।

    কাল সন্ধেবোলা এই খবর ছড়িয়ে পড়েছে। সেই কারণেই এবার ভিড় বেশি।

    ঘরের ভেতরে ক্লাবের সবাই আছে। পটল, গুঞ্জন, বিধানদা, অশোক, ঋদ্ধি মাইতি, সন্তোষদা, আনিসুর। এমনকি ক্লাব প্রেসিডেন্ট পরিতোষবাবুও এসেছেন। চেয়ার টেনে বসে নজর রাখছেন। মোট ছটা টেবিলে নাম লেখার কাজ চলছে। বিধানের টেবিলে ঝগড়া হচ্ছে। বাবা-মায়েরা চাইছে, তাদের ছেলেমেয়েরা সব ইভেন্টেই নাম দিক। একটা যদি লেগে যায়। কম্পিউটার পাওয়া চাট্টিখানি কথা। বিধান তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে। যে ছেলে দৌড়ে ভালো সে ছেলে হাঁড়ি ভাঙাতে যে ভালো করবে তার কী মানে আছে? অথবা যে মেয়ে জিলিপি রেসে অংশ নিচ্ছে, তার বস্তা দৌড়ে ঢুকে লাভ কী? বড়োরা শুনছে না।

    যেমন মালিনীদেবী। তিনি ঝগড়া শুরু করেছেন।

    “আপনি জানেন, আমার ছেলে হাঁড়ি ভাঙায় “কত বড়ো চৌখস? জানেন আপনি!”

    বিধান অবাক হয়ে বলল, “হাঁড়ি ভাঙায় আবার চৌখস হওয়ার কী আছে! আন্দাজ মিললে জিতবে, নইলে হবে না।”

    মালিনীদেবী বললেন, “কে বলেছে আন্দাজ? হাঁড়ি ভাঙার জন্য বিল্টু কতদিন বাড়িতে প্র্যাকটিশ করছে আপনি খবর রাখেন?”

    বিধানের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। “হাঁড়ি ভাঙার জন্য প্র্যাকটিস! বাড়িতে কী সে হাঁড়ি ভাঙছে?”

    “বাড়িতে হাঁড়ি ভাঙবে কেন? চোখ বেঁধে হাঁটাহাঁটি করছে।”

    বিধান আর্তনাদ করে উঠল, “সর্বনাশ! বলেন কী! চোখ বেঁধে হাঁটাহাঁটি তো ভয়ংকর। টেবিল, চেয়ারে ধাক্কা খাবে।”

    “খেলে খাবে। জিততে গেলে অমন একটু-আধটু ধাক্কা খেতেই হয়। আমরা ফ্ল্যাটের একটা ঘর ছেলের প্র্যাকটিসের জন্য ফাঁকা করে দিয়েছি। নিন, আপনি বিল্টুর নাম লিখুন।”

    ঝগড়া শুনে পরিতোষবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে এসেছেন। তিনি মুচকি হেসে বললেন, “বিধান, তুমি নামটা লিখে নাও। উনি যখন এত করে বলছেন।”

    বিরক্ত বিধান গজগজ করতে করতে হাঁড়ি ভাঙার খাতা খুলে বলল, “নিন, নাম ঠিকানা বলুন।”

    বিধানের রাগটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। খানিক আগে অধ্যাপক সৃঞ্জয় দেবনাথও একই কাজ করে গেছেন। তিনি তার সাত বছরের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। ফুটফুটে সেই মেয়ের নাম রঞ্জাবতী। রঞ্জাবতী কিছুতেই অঙ্ক দৌড়ে নাম দেবে না। সে কাঁদো কঁদো গলায় বলল, “বাবা, আমি শুধু জিলিপি রেসে যাব। আমি অঙ্ক পারি না।”

    সঞ্জয়বাবু সবার সামনেই মেয়েকে ধমক দিলেন, “চুপ কর। তোর মা যদি শোনে অঙ্কতে নাম দিসনি তোর পিঠ ভেঙে দেবে।”

    ছোটোরা যারা একা এসেছে তাদের নিয়ে সমস্যা নেই। তারা নিজের পছন্দমতো প্ৰতিযোগিতাতেই নাম লেখাচ্ছে।

    গুঞ্জন কাজ করছিল মাথা নামিয়ে। সে ‘তোমরা সবাই’ ক্লাবের ক্যাশিয়ার। চমৎকার ছেলে। তার কাজকর্মও খুবই গোছানো। আজও খাতায় পরপর লাইন টেনে নিয়েছে। প্রথমে প্রতিযোগিতার বিষয়, তারপর নাম, ঠিকানা, বয়স। সে বলে রেখেছে, “আমি বাবা-মায়েদের সামলাতে পারব না। যে সব ছেলেমেয়ে একা এসেছে, তাদের এই টেবিলে পাঠিয়ে দাও। আমি নাম লিখে নিচ্ছি।”

    খাতার ওপর ছায়া দেখেই গুঞ্জন বুঝতে পারল, সামনে একটা ছোটো ছেলে এসে দাঁড়িয়েছে।

    মুখ না তুলেই গুঞ্জন বলল, “কীসে নাম দিবি?”

    “লাফ।”

    “কোন লাফ।”

    “লম্বা লাফ।”

    “লম্বা লাফ!”

    লঙ জাম্পকে যে বাংলায় লম্বা লাফ বলা যেতে পারে এমনটা জানা ছিল না গুঞ্জনের। সে মুখ তুলল। তুলে অবাক হল। এগারো-বারো বছরের যে ছেলেটি টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তার সাজপোশাকের অবস্থা একটু খারাপ বললে কম বলা হবে। খুবই খারাপ। এই শীতে গায়ে সোয়েটার নেই। রঙ-চটা জামার কলার ফাটা। নীচের দিকে দুটো বোতাম উধাও। ডান কাঁধের পাশটা ছেঁড়া। টেবিলের কারণে হাফ প্যান্টটা পুরো দেখা যাচ্ছে না, তবে কোমরের কাছে বেল্টের বদলে যে দড়ি বাঁধা সেটা বোঝা যাচ্ছে। মাথা ভর্তি এলোমেলো চুলে জট পাকিয়ে আছে। এই সকলেও গায়ে ধুলো-বালি। সুন্দর বলতে শুধু টানা টানা চোখদুটো আর মুখের হাসিটুকু। ঠোঁটের ফাঁকে বিস্কুটের গুড়ো লেগে থাকায় সেই হাসি আরও ঝলমল করছে।

    গুঞ্জন ধাঁধায় পড়ল। ছেলেটা কে? যে-ই হোক ‘তোমরা সবাই’ ক্লাবের বার্ষিক ক্রীড়া প্ৰতিযোগিতায় যারা নাম দেয় তাদের সঙ্গে এই ছেলে মোটেই খাপ খায় না। এই এলাকায় সব ধোপদূরস্ত মানুষের বসবাস। সবাই যে বিরাট বড়োলোক এমন নয়, তবে একেবারে ফালতু নয়। ছেলেমেয়েদের বাবা-মায়েরা কেউ স্কুল কলেজের মাস্টারমশাই, কেউ সরকারি চাকুরে। বড়ো অফিসার, ইঞ্জিনিয়ারও আছে। দুজন নাম করা লেখক, একজন চিত্রকরও এখানে থাকেন। ক্লাবের নানা অনুষ্ঠানে তারা বিশেষ অতিথি হন। এই ছেলে কোথা থেকে এল! শুধু এলও না, একে ক্লাবের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় কীভাবে নেওয়া যাবে?

    “নাম কী তোর?”

    টানা টানা চোখের ছলে তার হাসি চওড়া করে বলল, ‘ঘুলঘুলি।’

    বলে কী ছেলেটা! ঠাট্টা করছে নাকি? গুঞ্জন ভুরু কুঁচকে বলল, “কী নাম বললি?”

    “ঘুলঘুলি। মায়ে বলেছে, আমি যে ঘরে জন্মেছি, সেখানে নাকি জানলা-টানলা কিছু ছিল না। শুধু একটা ঘুলঘুলি ছিল। সেই জন্য আমার নাম ঘুলঘুলি। হিহি।”

    কথা শেষ করে ছেলেটা এমন বুক টান করে দাঁড়াল যেন নামের ব্যাখ্যা করতে পেরে খুবই খুশি! গুঞ্জনের মজা লাগল, আবার চিন্তাতেও পড়ল। ঘুলঘুলি নামের কোনও বালককে কি ক্লাবের স্পোর্টসে নামানো উচিত হবে? ‘তোমরা সবাই’ ক্লাবের একটা মানমর্যাদা বলে ব্যাপার আছে। মাইকে কী ঘোষণা করা হবে?

    “শ্রীমান ঘুলঘুলি তুমি যেখানেই থাক মাঠের ভেতর চলে এসো, তোমার ইভেন্ট এখনই শুরু হবে।”

    মাঠ জুড়ে তো হাসির তুফান উঠবে। তার ওপর এই ছেলের পোশাকের অবস্থা শোচনীয়অ এর নাম লেখাটা কি ঠিক হবে?

    গুঞ্জন বলল, “ঘুলঘুলি, তুই থাকিস কোথায়?”

    ছেলেটা হাত তুলে বলল, “উই যে ব্রিজ হচ্ছে, ওর নীচে।”

    গুঞ্জনের দুশ্চিন্তা আরও বাড়ল। ঠিকই আন্দাজ করেছে সে। একেবারেই রাস্তার ছেলে।

    “বাবা-মা’র সঙ্গে থাকিস?”

    “বাবা থাকে না, মায়ে থাকে।”

    গুঞ্জন পথ খুঁজছে। যা কিছু করতে হবে ভেবেচিন্তে করতে হবে।

    “মা কী করে তোর?”

    “তিন মাস হল এয়েচি। এর আগে ছিলাম ডানকুনি। ডানকুনিতে তখন রাস্তায় পিচ হচ্ছিল।”

    “রাস্তায় পিচ হচ্ছিল তো তোর কী?”

    ঘুলঘুলি ফিক করে হাসল।

    “ওমা! আমার কী মানে! মায়ে রাস্তা তৈরির সময় পিচ ঢালে না? সারাদিন আগুন আগুন পিচ ঢালে আর আমি লম্বা লম্বা লাফ মেরে পার হই। হিহি। একটু ভুল হলেই! ঝপাস-একেবারে আগুনের মধ্যি পড়বে। আমি পড়ি না। হিহি। সেই কারণেই তো তোমাদের লম্বা লাফে নাম দিব।”

    গুঞ্জন এবার নড়েচড়ে বসল। ভয়ংকর! এই ছেলে বলে কী! আগুন গরম পিচ টপকাতে টপকাতে লঙ জাম্পে এক্সপার্ট হয়ে গেছে। কেমন এক্সপার্ট? কতটা লাফাতে পারে? ছেলেটাকে একবার চান্স দিলে কেমন হয়? ঝকঝকেদের মাঝখানে একটা ভিখিরি ধরনের ছেলে ঢুকে পড়লে কে বুঝতে পারবে? কেউ পারবে না। খেলার মাঠে ধুলোকাদা তো সবার গায়েই থাকবে। একটা নতুন প্যান্ট আর সাদা গেঞ্জি দরকার। ব্যবস্থা হয়ে যাবে। সে নিজে যখন ক্যাশিয়ার, ক্লাবের ফাণ্ড থেকে ওই কটা টাকা বের করে নেওয়া কোনও ব্যাপারই নয়। সব মিলিয়ে ঘটনাটা কিন্তু খুব ইন্টারেস্টিং হত। তবে এত বড়ো ঝুঁকি নিজে নেওয়া যাবে না। কথা বলে নিতে হবে। ক্লাব তার একার নয়। ক্লাবের মানমর্যাদাও তার একার নয়। তবে এইটুকু সে এক-একাই বুঝতে পারছে, এই ছেলেকে নেওয়া উচিত। গরম পিচ টপকে যে ছেলে লাফাতে শেখে সে চাট্টিখানি ছেলে নয়।

    গুঞ্জন হেসে বলল, “একটু দাঁড়া ঘুলঘুলি। ভেবেছিলাম ছোটোদের নাম লেখায় ঝামেলা হবে না। কিন্তু তুই আমাকে ঝামেলায় ফেললি।”

    এরপর গুঞ্জন ক্লাব প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়ে ঘটনা জানাল। মুচকি হেসে গলা নামিয়ে বলল, “কী করব দাদা? নিয়ে নেব? থাকুক না, অসুবিধে কী?”

    পরিতোষবাবু চমকে উঠলেন। চোখ কপালে তুলে বলল “খেপেছ নাকি? ক্লাবের একটা প্রেস্টিজ আছে-না? রাস্তার ছেলেরাও ‘তোমরা সবাই ক্লাবের স্পোর্টসে যোগ দিচ্ছে শুনলে কী হবে বুঝতে পারছ না? ভদ্রলোকের ছেলেরা সব থাকবে. তার ওপর অত বড় একটা কম্পিউটার কোম্পানি এবার আমাদের প্রাইজ স্পনসর করছে। তারা কী মনে করবে? ওরা আর কোনওদিন আমাদের কোনও অনুষ্ঠানে টাকা দেবে ভেবেছ?”

    গুঞ্জন অবাক হয়ে বলল, “কেন? দেবে না কেন? প্ৰাইজের সঙ্গে ভদ্রলোক, গরিবলোকের কী আছে? যে জিতবে সে-ই পাবে।”

    পরিতোষবাবু চোখ পাকিয়ে বললেন, “আঃ আস্তে বলো, গুঞ্জন। সবাই শুনতে পাবে। তোমার ওই ঘুলঘুলি না দরজার খিল যদি ফাস্ট প্রাইজ পেয়ে যায়?”

    গুঞ্জন হেসে ফেলল। বলল, “পেলে পাবে।”

    প্রেসিডেন্ট ধুতির কোঁচা ঠিক করতে করতে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, “পাবে! তারপর? তারপর কী হবে? কম্পিউটার কোম্পানির মালিক ওর হাতে একটা লাল ফিতে বাঁধা বাক্স তুলে দেবে? বলবে, যাও বাছা, ওটা ব্রিজের তলায় রেখে এস? অসম্ভব। ইমপসিবল।”

    গুঞ্জন এবার মনে মনে রেগে গেল। এ কেমন যুক্তি!

    “আর একবার ভেবে দেখুন দাদা। একটা ছোটো ছেলেকে ছেঁড়া জামার জন্য স্পোর্টস থেকে বাদ দিয়ে দেওয়াটা কি ঠিক হবে?”

    পরিতোষবাবু স্থির চোখে তাকিয়ে বললেন, “দরদ দেখাচ্ছ?”

    গুঞ্জন দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে বলল, “দরদ দেখাচ্ছি না, একজনকে বাকিদের মতো সুযোগ দিতে চাইছি।”

    “সেটা সম্ভব নয়। এটা আমার ডিসিশন।” রোখ চেপে গেল গুঞ্জনের। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “শুধু আপনার ডিসিশনে হবে না। আজ সন্ধেতে মিটিং ডাকুন। ক্লাবের মেম্বাররা কী বলছে সেটাও শুনুন।”

    রাগে কাঁপতে কাঁপতে পরিতোষবাবু বললেন, “তাই হোক।”

    গুঞ্জন ফিরে এসে ঘুলঘুলিকে বলল, “আজ পালা। কাল সকালে একবার আসিস। তোর নাম লিখে নেব।”

    ধুলো মাখা মুখ আর টানা টানা চোখে হেসে ঘুলঘুলি পালাল।

    নাম কিন্তু লিখতে পারল না গুঞ্জন। এমন হবে সে ভাবতেও পারেনি। বিকেলের মিটিং-এ সকলেই আপত্তি করল। কেউ বলল, ব্রিজের তলায়-থাকা ছেলেকে সঙ্গে নিলে অন্য বাবা-মায়েরা রেগে যাবে। কেউ বলল, রেগে না গেলেও ক্লাবের দুর্নাম। কেউ বলল, দুর্নাম ছড়ালে পরের বার থেকে আর কম্পিউটার, পোটাটো চিপস, কোল্ড ড্রিংক্স, টাকা দেবে না। স্পোর্টস বন্ধ করে দিতে হবে। সেটা একরকম আত্মহত্যা। সামান্য একটা দশ-বারোর বছরের ছেলের জন্য ক্লাবের এত উৎসব বন্ধ করে দেওয়া যায় না। গুঞ্জন অবাক হয়ে বলল, “তাহলে ক্লাবের নাম আর মিছিমিছি, ‘তোমরা সবাই’ রাখা কেন? এই নাম বদলে করে দেওয়া হোক ‘তোমরা ক’জন’।”

    প্রেসিডেন্ট হাসি মুখে সবটা শুনলেন। তারপর ধুতির কোঁচা ঠিক করতে করতে বললেন, “আহ্, রাগ করো কেন, গুঞ্জন? এরপরে না হয় আমরা আলাদা করে পথশিশুদের জন্য একটা কিছু করব। এই ধরো, বসে আঁকো বা ফুটবল ধরনের কিছু একটা।”

    পরদিন আবার ঘুলঘুলি এল। ফাঁকা ক্লাবঘরের এক কোনায় বসে কী যেন লিখছিল গুঞ্জন।

    “কী হল কাকু? আমার নাম লিখবে না?” গুঞ্জন শুকনো হেসে ঘুলঘুলির এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে বলল, “লেখা হয়ে গেছে রে ঘুলঘুলি। তবে খাতায় নয়, আমি তোর নাম লিখেছি অন্য জায়গায়।”

    ঘুলঘুলি হেসে ঘাড় কাত করল। বলল, “তা হলেই হবে।”

    ঘুলঘুলি চলে যাওয়ার পর দ্রুত হাতে ক্লাবের সদস্যপদ ছেড়ে দেওয়ার চিঠিটা শেষ করল গুঞ্জন।

    ‘পরিতোষদা, আমাকে ক্ষমা করবেন। সকলের যেমন আপত্তি আছে, তেমন আমারও একটা প্ৰতিবাদ আছে…।”

    রবিবার সকাল থেকেই স্কুলমাঠ জমজমাট। গোটা এলাকার মানুষ ভেঙে পড়েছে ‘তোমরা সবাই’ ক্লাবের স্পোর্টস দেখতে। রঙিন পতাকা, কাগজের চেন, সাদা চুনের দাগে মাঠ সেজেছে। সুন্দর সুন্দর ছেলেমেয়েরা সাদা জামা, প্যান্ট, ফ্রকে ফুরফুর করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বুকে পিঠে নম্বর লেখা কাগজ। একদিকে সামিয়ানা। লম্বা টেবিলে থরেথরে সাজানো প্ৰাইজ। পাশেই ঝকঝকে কম্পিউটারের বাক্স। মাইকে একটার পর একটা ঘোষণা চলেছে। সেই অনুযায়ী চলছে প্রতিযোগিতা। মাঠের পাশেই চেয়ারে বসেছে বাবা-মায়েরা। তাদের টেনশন দেখার মতো। কেউ ঘাম মুছছে, কেউ ঘনঘন জল খাচ্ছে। এই টেনশন চলবে সারাদিন।

    খানিকটা দূরে ব্রিজের ওপর আজও নতুন রাস্তা তৈরির কাজ চলছে। বিছানো হচ্ছে পাথরকুচি। বড়ো বড়ো কালো ড্রামে আগুন জ্বেলে গলানো হচ্ছে পিচ। পুরুষ মহিলারা দল বেঁধে সেই পিচ ঢেলে দিচ্ছে পথে। গরগর আওয়াজ তুলে দৈত্যের মতো চলে যাচ্ছে রোলার। জমাট লাল গলন্ত পিচ যেন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো!

    বড় ভয়ঙ্কর কাজ করছে একটা ছোটো ছেলে। সেই আগুন লাফ দিয়ে দিয়ে টপকে যাচ্ছে। উড়ে যাচ্ছে! এগিয়ে যাচ্ছে! সবাই বারণ করছে, বকছে। মলিন পোশাকের ছেলেটা কিন্তু শুনছে না। হাসছে খিলখিল করে।

    হাসবে না? তার আগুনলাফের খেলা দেখতে আজ কে এসেছে দেখতে হবে তো।

    মুগ্ধ গুঞ্জন দাঁড়িয়ে আছে একপাশে। ঘুলঘুলির প্রতিটা লাফের সঙ্গে সঙ্গে হাততালি দিচ্ছে। ফিসফিস করে বলছে, “আরও জোরে, আরও জোরে লাফ দে বেটা।”

    বড়ো কিছু নয়, এই ছেলের জন্য ছোট্ট একটা প্রাইজ এনেছে গুঞ্জন।

  • একমত

    একমত

    এই অঞ্চলে একটাই বড় স্কুল। এই পবনপুরে। এদিকে দু’স্টেশনের মধ্যে এত বড় স্কুল আর নেই। এ হল যাকে বলে সেই হাই স্কুল। একেবারে ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত। আমরা যারা পবনপুরে থাকি তারা তো এই স্কুলে পড়িই, এমনকি আশপাশে অনেক দূর দূর জায়গা থেকেও ছেলেরা সব আসে। স্কুল নিয়ে আমাদের খুবই গর্ব। আমাদের যখন কেউ জিজ্ঞেস করে, “কি খোকা, কোন স্কুলে পড়?” তখন আমরা যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, হাতদুটো পেছনে নিয়ে, বুক টান টান করে বলি, “পবনপুর স্বাধীনতাসংগ্রামী শহিদ শ্ৰীমতী চারুবালা দাসী স্মৃতি বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় ব্র্যাকেটে সরকার অনুমোদিত।” অনেকেই বলেছেন, ‘স্কুলের নাম বলছি তো ওরকম অঙ্গভঙ্গি করছ কেন? আমাদের তাতে কিছু এসে যায় না। আমাদের ড্রিল স্যার এ রকমই শিখিয়ে দিয়েছেন।”

    স্কুল আমাদের একেবারে নতুন। বছর তিনেক আর এমন কী? তবু এর মধ্যেই একদম জমজমাট। কোন ক্লাসে আর একটি সিটও ফাঁকা নেই। তাও রোজ যে কত ছেলে ভর্তির জন্য আসে তার কোন ঠিক নেই। বড় পরীক্ষায় স্কুলের রেজাল্টও খুব ভাল হয়। এই তো এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় আটানব্বইজন ছাত্রের মধ্যে দশজন ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছে, দুজন পেয়েছে স্টার নম্বর। এইজন্য স্কুল একদিন টুনিবাল্ব দিয়ে সাজানো পর্যন্ত হয়েছিল। আমাদের স্কুলে খেলাধুলো হয়, অ্যানুয়াল ফাংশন হয়, হাতে লেখা ম্যাগাজিন বের হয়। এইরকম স্কুল নিয়ে পবনপুরের মানুষ গর্ব করবে না তো কী করবে? অথচ স্কুলটা হবে কি না তা নিয়ে কতই না সংশয় ছিল। চিস্তায় কত রাত আমাদের ঘুম হয়নি। আজ যারা এই স্কুল নিয়ে গর্ব করে তাদের কতজনই না সেদিন চেষ্টা করেছিল স্কুলটা যাতে না হয়। আমরা ছোটরা, মানে পিন্টু, সুমন, শুভাশিস, মানস, রথীন, পার্থ, দেবু, কৃষ্ণেন্দু, প্রতীম, অর্ণব, পিনাকী, অনুপমরা যদি তখন একজোট না হতাম তাহলে কি পবনপুরে এতবড় স্কুলটা হত? মোটেই না।

    তাহলে বলি—।

    শিবপদ ভট্টাচার্য যখন পবনপুর কেন্দ্র থেকে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন তখনই বলেছিলেন, “হবে, একটা কিছু হবেই। জিতে নিই। পবনপুরের জন্য ঠিক কিছু একটা করে দেব।” ভোটে জিতে এম এল এ হয়ে শিবপদবাবু সে কথা মনে রেখেছেন দেখে দাদা, বাবা, কাকারা অবাক হল। পাড়ার বড়রা বলাবলি করতে লাগল, “অবাক কাণ্ড! শিবুটার হল কী? জিতে গেছে। তাই কিনা বলছে কথা রাখব? প্রতিশ্রুতি রাখব? মাথা খারাপ হল নাকি? যে যাই বলুক না কেন, এক রোববার সন্ধেবেলা বাজারের মোড়ে এম এল এ সাহেব মিটিং ডাকলেন। বড়রা গেল, আমরাও পেছন পেছন গেলাম। মাইকে ধরা ধরা গলায় শিবপদবাবু বললেন, “পবনপুর কথা রেখেছে। আমাকে জিতিয়েছে। আমিও কথা রাখব। এবার আপনারা বলুন, পবনপুরের জন্য কী চান? একটা সিনেমাহল না একটা বিরাট ক্লাবঘর, না একটা সুইমিং পুল? আপনারা নিজেরা ঠিক করে সাতদিনের মধ্যে জানান।”

    ব্যস, এরপর যা হওয়ার তাই হল। ঘরে ঘরে ঝগড়া লেগে গেল। মা, মাসি, পিসি, জেঠি, দিদিরা বলতে লাগল সিনেমাহলই চাই। কাছাকাছি ভাল কোন হল নেই। বাবা কাকারা চায় ক্লাবঘরটাই হোক। সন্ধের পর তাস, দাবা খেলা যাবে। দাদার বয়সী যারা তারা ঝুঁকছে সুইমিং পুলের দিকে। এই নিয়ে আলোচনা ঝগড়া এমনকি ছোটখাট মারপিট পর্যন্ত হল। সাতদিন কেটে গেল, দশদিন কেটে গেল কোন সিদ্ধান্তই হল না। এইরকম সময় একদিন বিকেলে ফুটবল খেলার মাঠে পিন্টু বলল, “দেখ, ব্যাপারটা আমার মোটেই পছন্দ হচ্ছে না। আমরা কি পবনপুরের কেউ নই?” দেবু বলল, “ঠিকই। পবনপুরে আমাদের জন্য কি কিছু হতে নেই? বড়রাই কি সব?”

    কৃষ্ণেন্দু বলল, “চল আমরাও এম এল এ-র কাছে যাই। কিন্তু কী চাইবি?’

    মানস বলল, “সবথেকে ভাল হয় আমরা যদি একটা স্কুল চাই। তাহলে আর আমাদের কষ্ট করে দূরে যেতে হবে না।”

    অনুপম বলল, “সেটাই ভাল। এক স্কুলে আমরা বেশ সবাই মিলে পড়তে পারব। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যেতে হবে না।”

    ‘হুররে’ বলে। লাফিয়ে উঠলাম সকলে। পরদিন ভোর না হতেই আমরা একেবারে শিবপদ ভট্টাচার্যের বাড়ির দরজায়। আমরা সবাই চাই একটা স্কুল। আমরা, ছোটরা সবাই একমত। এরপর সত্যি সত্যিই একদিন পবনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হল। সেদিনের সেই অনুষ্ঠানে বড় মন নিয়ে দলে দলে ছোটরা এসেছিল। আর অনেক ছোট মনের বড়রা সিনেমা হল, ক্লাব আর সুইমিং পুল হল না বলে রাগ করে এলই না।

  • ঢাকের বাদ্যি

    ঢাকের বাদ্যি

    আমাদের ক্লাবের দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে প্রতিবারই যে লোকটা ঢাক বাজাতে আসত তার নাম নটুরাম নট্ট। বড়রা নটু বলে ডাকত। আমরা বলতুম নটুদা। নটুদা প্রথম কবে আমাদের ক্লাবে ঢাক বাজাতে এসেছিল আমাদের তা মনে নেই। সত্যি কথা বলতে কী সেকথা কেউই জানে না। সবাই শুধু জানে যে আমাদের পুজোতে নটুদাই ঢাক বাজাবে।

    নাটুদাকে কিছু বলতে হয় না। ষষ্ঠী পুজোর দিন সেই কাকভোরে সে চলে আসত। আমরা বাড়ি থেকেই শুনতে পেতাম ঢাক বাজাচ্ছে।

    কাইনাড়া কাইনাড়া গিজগিনতা গিজগিনতা।

    ব্যস, আমরা ধড়মড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়তাম। হুররে। পুজো এসে গেছে! যেন নটুদাই এসে ঠিক ভোরবেলা আমাদের জানিয়ে দিত, দুর্গাপুজো শুরু হয়ে গেছে! তাই নটুদা ছাড়া আমরা পুজোর কথা ভাবতেই পারতাম না।

    কিন্তু নটুদার একটা বিচ্ছিরি স্বভাব ছিল। প্রতিবারই সে নিজের গ্রামে ফিরে যাওয়ার সময় আমাদের এখানে কিছু না কিছু ফেলে যেত। এই যেমন গামছাটা, জামাটা, ঢাক পেটাবার কাঠি দুটো। কখনও আবার যে টাকাটা ওকে দেওয়া হত সে টাকাটাই হয়তো পড়ে থাকতো। একেক বছর একেকটা জিনিস। আমরা ক্লাবের ছেলেরা জানতাম, নটুদা কিছু না কিছু ফেলে যাবেই। দশমীর দিন গঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে এসে আমরা নটুদার ফেলে রাখা জিনিস যত্ন করে ক্লাবঘরে তুলে রাখতাম। আবার পরের বছর পুজোর সময় নটুদার হাতে তুলে দিতাম। এরকমই চলছিল। নটুদাকে যখন বলতাম, তখন সে হাসতে হাসতে বলত, ‘ওটা তো তোমাদের জন্য রেখে গিয়েছিলাম’।

    বছরের পর বছর এরকম চলতে লাগল। আমরা বড় হয়ে গেলাম। বড়রা আরও বড় হয়ে গেল। অনেকে দূরে দূরে চলে গেল। তবে আমাদের ক্লাবের পুজোটাও রইল, আর রইল ঢাকী নটুদা। অনেক কিছু বদলালো কিন্তু নটুদার জিনিস ফেলে দেওয়ার স্বভাব বদলালো না। একবছর তো ঢাকটাই নটুদা নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিল। আমরা ওকে জিগ্যেস করেছিলাম, কি নটুদা ঢাকটাও কি আমাদের জন্য রেখে গিয়েছিলে’?

    গত দু’বছর হল নটুদা আর আমাদের ক্লাবের পুজোতে আসছে না। শুনেছি, নটুরাম নট্ট নাকি মারা গেছে। সে আর আশ্চর্যের কথা কী? বয়স তো হয়েছিল। আমরা খবরটা শুনে দুঃখ পেয়েছিলাম। তবে নটুদার একটা রাখা জিনিস এখনও আমাদের পুজো প্যান্ডেলে রয়ে গেছে। কী সেটা? ঢাকের বাজনাটা। ওটা নটুদা সত্যি আমাদের জন্য রেখে গেল।

  • এরোপ্লেন

    এরোপ্লেন

    ক্লাস এইটের পটল প্রামাণিক এবার পুজোর ছুটিতে দিল্লি বেড়াতে গিয়েছিল।

    সেটা আসল কথা নয়, আসল কথা হল, সে গিয়েছিল এরোপ্লেনে চেপে। বেড়াতে যাওয়ার থেকে এরোপ্লেনে চাপাই পটলের কাছে অনেক বড় ব্যাপার। আর সত্যি কথা বলতে কি আমাদের এই পবনপুর উচ্চবিদ্যালয়ে কেউ কখনও এরোপ্লেনে চেপেছে এমনটা শোনা যায়নি। পটল সেই সুযোগ ছাড়ে?

    কিন্তু ব্যাপারটা একটু অন্য দিকে মোড় নিল। এরোপ্লেনে একবার চেপেই পটলের যেন সত্যি সত্যি পা মাটিতে পড়ছে না। সে বাড়াবাড়ি শুরু করল। পুজোর ছুটি একমাস বাদে ফুরলো। আমরা সবাই হইহই করে স্কুলে এলাম। পটলও এল। স্কুলে ঢোকার পর থেকে সে এমন একটা ভান করতে লাগল যেন এইমাত্র এরোপ্লেন থেকে নেমেছে। বাচ্চু গিয়ে জিগ্যেস করল, “কী রে পটল কেমন বেড়ালি?” পটল আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলল, ‘দাঁড়া, দাঁড়া হাত-পাগুলো একটু ছাড়িয়ে নেই। অতক্ষণ এরোপ্লেনে থাকলে হাতে পায়ে সব খিল ধরে যায়।” বাচ্চু তো অবাক। সে বলল, “সে কি রে! তুই তো পনেরো দিন হল ফিরেছিস। এখনও হাত পা ছাড়েনি?” পটল খেঁকিয়ে উঠল, “মেলা বকিস না তো। এরোপ্লেনে চড়িসনি তো কখনও। তুই পা খিল ধরার কী বুঝবি?”

    বাচ্চু এতে যথেষ্ট অপমানিত হয় এবং চলে আসে। অপমানিত হওয়ার যথেষ্ট কারণও আছে। অনেকক্ষণ একটানা বসে থাকবার পর বাচ্চুরও অনেকবার হাত পায়ে খিল ধরেছে। হতে পারে সে খিল হয় এরোপ্লেনের নয়, তবু খিল তো।

    বাচ্চু গজ গজ করতে করতে এসে পিন্টুকে বলল, পটলার বড্ড বাড় বেড়েছে।”

    এর কয়েকদিন বাদেই পটলদের ক্লাসের ফার্স্ট বয় সুশান্তর জন্মদিন ছিল। সে একবাক্স টফি নিয়ে এসে সবাইকে দিচ্ছিল। প্রত্যেকেই হাসিমুখে সেই টফি খেয়ে টফি এবং সুশান্তর ভূয়সী প্রশংসা করছিল। শুধু পটল টফিটা মুখে দিয়ে এমন একটা মুখ করল যেন সে উচ্ছে সেদ্ধ খাচ্ছে। সুশাস্ত ব্যতিব্যস্ত হল, “কী হল পটল?” পটল মুখটা আরও বিকৃত করল, “না হয়নি কিছু। আসলে এরোপ্লেনের চমৎকার টফি খাওয়ার পর, এসব আর মুখে রোচে না।”

    সুশান্তর কান লাল হয়ে গেল। একদিন টিফিনের সময় হঠাৎ দেখা গেল পটল দুকানে তুলো গুঁজে বসে আছে। অনুপম সরল মনে গিয়ে বলল, “কী ব্যাপার, কানে ব্যথা হয়েছে নাকি? তুলো গুঁজেছিস কেন?” গম্ভীর মুখে পটল বলল, “বোকার মত কথা বলিস না তো। এরোপ্লেনে চড়বার অভিজ্ঞতা থাকলে এমন কথা বলতিস না। শব্দ আটকাতে এরোপ্লেনের ভেতর আমরা কানে তুলো দিয়ে বসে থাকতাম। টিফিনের সময় এখানে এত হট্টগোল হয় যে ঠিক করেছি এখন থেকে এখানেও কানে তুলো দেব। এরোপ্লেনের শব্দ তাও সহ্য হয়। তোদের চিৎকার চেঁচামেচি তো একেবারে জংলির মত।”

    অনুপমের মাথাটা রাগে গরম হয়ে যায়। এইসব পর্যন্ত তাও চলছিল। বন্ধুদের সঙ্গে এসব কথাবার্তায় পটলের কোন বিপদ ছিল না। কিন্তু হায়রে! পটল যে আরও বাড়ল!

    ইংরেজিতে পটল বরাবরই দুর্বল। কিন্তু সম্প্রতি এরোপ্লেনে ভ্রমণের পর সম্ভবত সে সেকথা ভুলতে বসেছে। নিজের মধ্যে সে একটা ‘ইংরিজি ইংরিজি’ ভাব আনতে চেষ্টা করছে। যেমন মাঝে মধ্যেই সে কারণে অকারণে ‘নো থ্যাঙ্কস’ বা ‘ওকে ফাইন’ এর মত দুএকটা কথা বলছে। কেলেঙ্কারিটা হল সেদিন ফোর্থ পিরিয়ডে। মানে ইংরিজি ক্লাসে।

    নিকুঞ্জবাবু এসে বললেন, ‘সবাই দশ লাইনে পুজোর অভিজ্ঞতা লিখে দেখা দিখিনি।’

    আশ্চৰ্য; সবার আগে খাতা জমা পড়ল পটল প্রামাণিকের! এই প্রথম। শুধু তাই নয়, সেই খাতার ওপর চোখ বুলিয়ে নিকুঞ্জবাবু চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠলেন। হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ‘সবাই শোন, পটল লিখেছে, চেক ইন। টেক অফ। ককপিট। এয়ার হস্টেস। রান ওয়ে। ল্যান্ডিং। লাগেজ। ব্যস। রচনার নাম দিয়েছে এরোপ্লেন। আর ‘চেক ইন’-এর ইন’ ছাড়া সব বানান ভুল। ‘হুম’, বলে বসে পড়লেন নিকুঞ্জবাবু। রাগ তার চোখে নাকে। ‘এদিকে আয় পটল।’ পটল হাসি হাসি মুখে উঠে গেল।

    এরপর পটলের খাতায় নিকুঞ্জবাবু বড় বড় করে লিখে দিলেন, ‘এ ই আর ও পি এল এ এন ই’। বললেন, ‘যা এক হাজার বার লিখে নিয়ে আয়।’

    এই ঘটনার পর পটল আমাদের কুতুবমিনার, লালকেল্লা নিয়ে অনেক গল্প বলেছে, কিন্তু এরোপ্লেন নিয়ে কখনও একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি।

  • ডাকনাম

    ডাকনাম

    সাতদিনে পাঁচটা ঘটনা। তিনটে মারাত্মক, দুটো ভয়াবহ। এরপরই হেডস্যার নোটিশ দিলেন। নতুন নিয়মের নোটিশ। আমাদের স্কুলের নোটিশ বোর্ডে একটা মুশকিল আছে। বোর্ডটা একটা বাক্সের মতো। সামনে কাঁচের ঢাকনা। বোর্ডে নোটিশ লাগিয়ে সেই ঢাকনা আটকে দিতে হয়। তারপর টিপ তালা সিস্টেম। মাস তিনেক হল ঢাকনার কাঁচের নিচে লম্বা একটা দাগ পড়েছে। আঁচড়ের মতো দাগ। পিওন দিবাকরদা অনেক ঘষেও সেই দাগ তুলতে পারেনি। ফলে নোটিশের কোনও কোনও লেখা অনেক সময় সেই দাগের আড়ালে পড়ে যায়। আর তখনই মুশকিলটা হয়। আড়ালের লেখা পড়া যায় না। কোন লেখাটা দাগের আড়ালে পড়বে আগে থেকে বোঝা কঠিন। বড় বড় পিন দিয়ে নোটিশ আটকে, কাঁচের দরজা বন্ধ করার পর বোঝা যায়। যেমন হেডস্যারের এই নোটিশে ঢাকা পড়েছে শেষ লাইনটা। বেশিরভাগ সময়ই শেষ লাইনে গুরুত্বপূর্ণ কথা থাকে না। এবারে কিন্তু আছে। নতুন নিয়ম লেখার পর, শেষ লাইনে হেডস্যার লিখেছেন, নিয়ম না মানলে কী শাস্তি হবে। আমরা, স্কুলের ছেলেরা, নিয়ম জানলাম, নিয়ম ভাঙার শাস্তি জানতে পারলাম না।

    সে যাই হোক, হঠাৎ করে স্কুলে একটা নতুন নিয়ম কোন চালু করতে হল? সবকটা ঘটনা না বলে শুধু মারাত্মক তিনটে বললেই এর কারণ বোঝা যাবে।

    প্ৰথম ঘটনা অপলককে নিয়ে। অপলক বিশ্বাস।

    ক্লাস এইটের এই ছেলে শুধু নামে সুন্দর নয়, স্বভাবেও সুন্দর। সুন্দর আর শান্ত। নামের সঙ্গে মিলিয়ে চোখদুটো বড় বড়, চুল কোঁকড়ানো। মারপিট দুরের কথা, কারও সঙ্গে তার ঝগড়া পর্যন্ত নেই। যদি বা ছোটখাটো রাগারাগি হয়, নিজেই মিটিয়ে ফেলে। যার সঙ্গে গোলমাল, টিফিনের সময় তার কাঁধেই হাত দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ছুটির পর পোটাটো চিপস কিনে বলে, “এই নে, তুই আগে প্যাকেট খোল।”

    সোমবার সেই ছেলেই মারাত্মক একটা কাণ্ড করে বসল!

    থার্ড আর ফোর্থ পিরিয়ডের মাঝখানের সময়ে পিছনে বসা তূর্যকে লক্ষ্য করে ঘুসি ছুঁড়ল। একটা ঘুষি নয়, পরপর তিনটে ঘুষি! তবে একটাও তূর্যর গায়ে লাগেনি। লাগার কথাও নয়। অপলক ভূগোল, অঙ্ক, ইংরেজিতে যেমন পাকা, কিল চড় ঘুষিতে ঠিক ততটাই কাঁচা। ফলে ঘুষিগুলো খুব সহজে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে এদিক ওদিক হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে গায়ে না লাগলেও অপলকের এই রণমূর্তি দেখে তূর্যর মুখ গেল শুকিয়ে। অপলকের সম্পর্কে অনেক কিছু ভাবা যায়, ঘুষি ভাবা যায় না। শুধু তূৰ্য নয়, গোটা ক্লাস হতবাক।

    আমাদের স্কুলে যে কোনও খবরই খুব সহজে ছড়িয়ে পড়ে। প্ৰথমে করিডোর, বাথরুম এবং লাইব্রেরিতে ছাত্রদের মধ্যে কানাকানি হয়। তারপর সেই খবর একতলা, দোতলা, তিনতলা টপকে, অফিস হয়ে, টিচার্স রুম ছুঁয়ে একেবারে হেডস্যারের ঘরে গিয়ে পৌছোয়। সমস্যা একটাই। এতটা পথ পেরোতে গিয়ে ‘সত্যি খবর’ এর গায়ে অনেক ‘মিথ্যে খবর’ও লেগে যায়। এবারও তাই হল। টিফিনের আগেই গোটা স্কুল ঘুষির খবর জেনে ফেলল। শেষপর্যন্ত হেডস্যারের ঘরে খবর যখন পৌঁছোল তখন সেই খবরের অবস্থা ভয়ংকর!

    দিবাকর প্রায় ছুটতে ছুটতে হেডস্যারের ঘরে ঢুকল। সে হাঁপাচ্ছে। উত্তেজনায় গলা কাঁপছে তার।

    “স্যার, কেলেঙ্কারি কাণ্ড। ভয়ংকর ব্যাপার। অপলক মেরেছে।”

    “মেরেছে! কাকে মেরেছে?”

    হেডস্যার তখন মন দিয়ে স্যারেদের রুটিন তৈরি করছিলেন। রুটিন তৈরি একটা জটিল কাজ। এই কাজে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ সবরকম অঙ্ক লাগে। টেবিল জুড়ে একটা সাদা কাগজ পাতা। এত বড় কাগজ পাওয়া যায় না। বেশ কয়েকটা কাগজ আঠা দিয়ে জুড়ে জুড়ে তৈরি করতে হয়েছে। দিবাকরদাই তৈরি করে দিয়েছে। হেডস্যার একটা স্কেল দিয়ে সেই কাগজে রুল টানছেন। কাগজ বড় হওয়ার কারণে একেবারে রুল শেষ হচ্ছে না। টেবিলের চারপাশে ঘুরে ঘুরে টানতে হচ্ছে। তিনি ঘোরা বন্ধ করে মুখ তুলে দিবাকরের দিকে তাকালেন। দিবাকরদা বলল, “স্যার অপলক মেরেছে তূর্যকে। তূর্য ঠিক ওর পিছনেই বসে।”

    হেডস্যার ভুরু কেঁচকালেন। বললেন, “তুমি কোন অপলকের কথা বলছে। ক্লাস এইটের অপলক?”

    “হ্যাঁ, স্যার। স্কুলে তো ওই একটিই অপলক। অমন ভাল নাম আর কটা আছে?”

    হেডস্যার একটু হাসলেন। বললেন, “তুমি নিশ্চয় ভুল করছো দিবাকর। শুধু নাম নয়, ওই অপলক নিজেও অতি চমৎকার ছেলে। তুমি বোধহয় জানো না এবছর সে গুড কন্ডাক্টের জন্য প্রাইজ পাচ্ছে। তার জন্য দুটো বই পর্যন্ত কিনে রাখা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের শিশু এবং মার্ক টয়েনের হাকলবেরি ফিন।”

    দিবাকর জোর গলায় বলল, “স্যার, খবর পেলাম অপলকের ঘুষিতে তূর্যর নাক ফেটেছে। রক্তপাত হচ্ছে। রক্ত দেখে ইতিমধ্যে ক্লাসের আর দুটি ছেলে জ্ঞান পর্যন্ত হারিয়েছে স্যার।”

    এরপর আর দেরি করা যায় না। হাতে স্কেল নিয়েই তিনতলায় দৌড়োলেন হেডস্যার। চাপা না দেওয়ার কারণে স্যারেদের রুটিন পাখার হাওয়ায় ঘরময় উড়তে লাগল মহানন্দে।

    দ্বিতীয় মারাত্মক ঘটনা একটু অন্যরকম। তাতে ঝগড়া বা মারপিট নেই। ফুটবল আছে।

    সেদিন ছিল ক্লাস সেভেন আর এইটের ফুটবল ম্যাচ। এমনি ম্যাচ নয়, প্রেস্টিজ ম্যাচ। এর আগে দুটো ম্যাচেই হার হয়েছে সেভেনের। এটাতে জিততেই হবে। গেম টিচার ক্লাস সেভেনের জন্য নতুন গোলকিপার ঠিক করছেন। ঋষভ। ঋষভকে নেওয়ার পরামর্শটা প্রান্তিকের। প্রান্তিক সেভেনের ফুটবল টিমের ক্যাপটেন। ঋষভ শুধু প্রান্তিকের ক্লাসের বন্ধু নয়, পাড়ারও বন্ধু। পাশাপাশি বাড়ি। পাড়ার মাঠে এক সঙ্গে খেলাধুলোও হয়। গেম টিচার ক্যাপটেনের কথায় রাজি হয়ে গেলেন। রাজি হয়ে ঠিকই করেছেন। নতুন গোলকিপারের পারফরমেনস হাফ টাইম পর্যন্ত দুৰ্দান্ত। তিনটে অবধারিত গোল বাঁচিয়ে দিল। সেভেন এক গোলে এগিয়ে। জিতব জিতব করছে। গোটা টিম উত্তেজনায় ফুটছে টগবগ করে। আর এমন সময়ই মারাত্মক ঘটনা!

    খেলা শেষের বাঁশি বাজার মিনিট দুয়েক আগে সেভেন একটা গোল খেয়ে বসল। তুখোড় গোলকিপার ঋষভ লাফিয়ে ঝাঁপিয়েও বল আটকাতে পারেনি। পারবে কী করে? গোল যে সেমসাইড। বল এসেছে নিজের দলেরই খেলোয়াড়ের পা থেকে। সেই খেলোয়াড়ের নাম প্রান্তিক। দলের ক্যাপটেন। ক্লাসের সহপাঠী। পাড়ার বন্ধু!

    ম্যাচ শেষ হওয়া মাত্র কাদামাখা অবস্থাতেই ঋষভ ছুটল গেম টিচারের কাছে। নালিশ জানাতে। গেম টিচার প্রান্তিককেও ডেকে পাঠালেন। বিচার তো আর এক তরফা হয় না। তবে বিচার কিছু করা গেল না। দু’পক্ষের কথা শুনে গেম টিচার গম্ভীর হয়ে গেলেন।

    তিন নম্বর মারাত্মক ঘটনা মারাত্মকের থেকেও বেশি। ডবল মারাত্মক।

    অন্যদুটো তো তাও স্কুলের মধ্যে আটকে ছিল। এই ঘটনা স্কুলের গণ্ডি টপকে গেল। টপকে চলে গেল বাড়ি পর্যন্ত। আর যাবে নাই বা কেন? এতদিন ছিল দুজনে দুজনে। এবার হল সিঞ্জন বনাম গোটা ক্লাস টেন। দুদিন সহ্য করার পর সিঞ্জন সেদিন পেট ব্যথা বলে স্কুল থেকে হাফ ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে গেল। পরদিন ফিরে এল বটে, তবে একা নয়, বাবা, মা দুজনকেই সঙ্গে নিয়ে এল। তিনজনেরই মুখ থমথমে। কোনদিকে না তাকিয়ে তারা সোজা ক্লাস টিচারের সঙ্গে দেখা করল।

    এরপরই নোটিশ বোর্ডে নিষেধের নোটিশ পড়ল—এখন থেকে স্কুলে ডাকনাম নিষিদ্ধ!

    এই নোটিশ ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। কারণ ভয়ংকর সবকটা ঘটনার পিছনের কারণ একটাই। ডাকনাম।

    শান্তশিষ্ট অপলক। সেদিন অশান্ত হয়েছিল এই ডাকনামের জন্যই। সুন্দর নামের এই ছেলেকে বাড়িতে নাকি সবাই ডাকে ‘পেঁপে’ বলে। এই নামের পিছনে ইতিহাসও আছে। ছেলেবেলায় কেউ সন্দেশ, রসগোল্লার ভক্ত হয়, কারও নজর থাকে চকোলেট, ক্যাডবেরিতে। কেউ পছন্দ করে কেক, পেস্ট্রি, পিৎসা। ফুচকা, বাদাম, চিপসের জন্য পাগল তো সকলে। কিন্তু কোনও রহস্যময় কারণে অপলক ছেলেবেলায় ছিল পেঁপের ভক্ত। এমনি ভক্ত নয় বাড়াবাড়ি রকমের ভক্ত। পেঁপের ডালনা থেকে পাকা পেঁপে কিছুই খেতে বাদ দিত না। সেই থেকে বাড়িতে সবাই তাকে ‘পেঁপে’ বলে ডাকতে শুরু করে। একটু বড় হতেই অপলক বুঝতে পারে, এই নাম আগে ঝেড়ে ফেলতে হবে। সে পেঁপে ত্যাগ করল। কিন্তু নাম ত্যাগ করতে পারল না। ডাকনামের এই সমস্যা। ভাল নাম তাও বদলানো যায়। কিন্তু ডাকনাম বদলানো যায় না। মেনে নিতে হয়। অপলকও মেনে নিল। তবে একটা কাজ করল। নামটাকে গোপন করে রাখল। কিছুতেই বাড়ির চার দেয়ালের বাইরে বেরোতে দিল না।

    আর সেটাই সেদিন ফাঁস করেছে তূর্য কোনভাবে সে অপলকের এই ‘অতি চমৎকার’ ডাকনামটি জানতে পারে এবং পিছনে বসে ফিসফিস করে ডাকতে থাকে।

    “পেঁপে, অ্যাই পেঁপে। কী শুনতে পাচ্ছিস না? এবার দেখবি মজা? পেঁপে বলে ক্লাসের মধ্যে চেঁচাব নাকি?”

    এরপরেও কী অপলক ঘুষি ছুঁড়বে না? ফুটবল ম্যাচে সেমসাইডের ঘটনার পিছনেও সেই ডাকনাম। প্ৰান্তিকের ডাকনাম। এমন মনকাড়া নামের একটা ছেলের ডাকনাম যে কেন ‘গোল’ হয়েছিল কে বলতে পারে? প্ৰান্তিক মোটেও গোলগাল দেখতে নয়। ড্রইং ক্লাসে যে ভাল সার্কেল আঁকে তাও নয়। তবে? তবে আর কী। ডাকনাম যে কোনটা হবে কে বলতে পারে। বেচারি প্রান্তিকের কপালেও তাই ঘটেছে। আর সেটাই গোলমাল পাকালো ম্যাচের সময়।

    মুহূর্তটা ছিল চরম টেনশনের। হঠাৎ একটা ঝটিকা দিয়ে ক্লাস এইটের সৌর্য বল নিয়ে ক্লাস সেভেনের গোল পোস্টে পৌঁছে যায়। গোল কী হবে? গোটা মাঠ তাকিয়ে আছে। প্রান্তিক ছুটে আসে। লাফিয়ে বল কেড়ে নেয় সৌর্যর পা থেকে। ছোট দুটো ট্যাকেলে টপকে যায় এইটের অধিরাজ আর স্পন্দনকে। হাততালি আর চিৎকারে ফেটে পড়ে মাঠের পাশে দাঁড়ানো ছেলেরা। প্রান্তিক এগিয়ে আসে নিজেদের গোলপোস্টের দিকে। গোলপোস্টে দাঁড়ানো ঋষভ হাত পেতে চিৎকার করে ওঠে—

    “গোল দে। গোল দে। তাড়াতাড়ি দে। দেরি করিস না। গোল, গোল….”

    আর এখানেই হয় ভুল। যে ভুল হওয়ার নয়। যে ভুল কখনও হয় না। চরম উত্তেজনায় সেই ভুলটাই করে বসে প্রাত্তিক। ‘গোল” যে তার ডাকনাম এটাই ভুলে গেল সেই মুহূর্তের জন্য! পাড়ার বন্ধু ঋষভ তাকে সেই নামে ডেকে নিজের হাতে বল চাইছে সেইটাই মাথা থেকে উবে যায় যেন! অবধারিত গোল বাঁচানোর আনন্দে সব গোলমাল হয়ে যায়। প্ৰান্তিক শরীরের সব শক্তি দিয়ে বলে শট মারে। ওস্তাদ গোলকিপার ঋষভকে খুব সহজেই পরাস্ত করে নিজেদের গোলে বল ঢুকে যায় হাসতে হাসতে। বন্ধুর ‘গোল দে’ শুনে সে ‘গোল দিয়ে’ বসে!

    তারপর? তারপর আর কী? দুজনেই নালিশ জানাতে ছোটে গেম টিচারের কাছে।

    পেঁপে, গোল তাও মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু ‘চুপ’? ‘চুপ’ কখনও কারও ডাকনাম হতে পারে? হলে যা ঘটতে পারে সেটাই ঘটল ক্লাস টেনের সিঞ্চনের। আর সেটাই তিন নম্বর মারাত্মক ঘটনা।

    সিঞ্চন তার ‘সিঞ্চন’ নাম নিয়ে খুবই গর্বিত। কেনই বা হবে না? সত্যি তো এমন সুন্দর নাম হয় কজনের? সে ‘চুপ’ এর কথা ঘূণাক্ষরেও বলে না কাউকে। অপলকের মতোই ডাকনাম লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু সেদিন হল দুর্ঘটনা। সেই দুর্ঘটনা নিজেই ঘটাল সিঞ্চন। এটাও অনেকটা ফুটবল ম্যাচের সেমসাইডের মতো।

    সোমবার অঙ্কের স্যার ভূপতিবাবু বোর্ডে অঙ্ক কসছিলেন। ক্লাসে চলছিল চাপা গুঞ্জন। স্যার পিছনে ফিরে ধমক দিলেন–

    ‘চুপ!’

    সিঞ্চন ছিল অন্যমনস্ক। নিজের ‘নাম’ শুনে উঠে দাঁড়িয়ে বলল “কী স্যার?”

    “কী স্যার মানে?” ভূপতি স্যারের ভুরু গেল কুঁচকে। বললেন, “তুমি উঠে দাঁড়িয়েছে কেন সিঞ্চন?”

    “ওই যে আমায় ডাকলেন।”

    “ডাকলাম মানে। ফাজলামি হচ্ছে ছেলে? চুপ তোমার নাম নাকি?”

    নার্ভাস সিঞ্চন নিজেকে সামলাতে পারল না। বলে ফেলল, “হাঁ, স্যার। চুপ আমার ডাকনাম। তবে বাড়ির নয়, শুধু মামাবাড়ির।”

    ব্যস। হাত থেকে তীর বেরিয়ে গেল। পরের কটা দিন ছেলেরা সিঞ্চনকে ‘চুপ’ নামে ডেকে ডেকে কান একেবারে ঝালাপালা করে দিল। তিনদিনের মাথায় অতিষ্ঠ সিঞ্চন “পেট ব্যথা’ বলে পালালো। ফিরল একেবারে বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে নালিশ জানাতে।

    এরপরই বোর্ডে হেডস্যারের নোটিশ। তাতে তিনি যা লিখেছেন তার মোদ্দা কথা হল-আমাদের স্কুলে ছেলেদের নাম অতি চমৎকার। সেই নাম উচ্চারণে আনন্দ, শুনতে আরাম, বলতে গর্ব। সুতরাং সেইসব নাম বাদ দিয়ে বিচ্ছিরি ডাকনামে ডাকাডাকি আর চলবে না। এতে আইন শৃঙ্খলার অবনতি হচ্ছে। তাই এখন থেকে স্কুলের ভেতর ডাকনাম নিষিদ্ধ। যদি কেউ এই নিষেধ না মানে… (শেষ লাইন পড়া যাচ্ছে না। কাঁচের দাগে ঢাকা পড়েছে।

    কথাটা ভুল নয়। আমাদের স্কুলের ছেলেদের নাম সত্যি ভাল। অপলক, ঋষভ, সিঞ্চন, তুর্য, প্রান্তিক, সৌর্য, স্পন্দন। কী নেই? এসব বাদ দিয়ে পেঁপে, গোল, চুপ! ছিঃ। স্কুলের সব ছাত্রই হেডস্যারের নোটিশের সঙ্গে একমত। নিষেধাজ্ঞা জারি করে উনি ঠিক কাজই করেছেন।

    কিন্তু নোটিশ লাগানোর দুদিন পর থেকেই উল্টো কাণ্ড শুরু হয়ে গেল!

    নিষেধের একটা মজা আছে। যেটা নিষেধ করা হয় সেটাই যেন বেশি বেশি করে টানে। বিশেষ করে অল্প বয়সে তো বটেই। আমাদের স্কুলের ছেলেদেরও সেটাই হয়েছে। তারা মহা উৎসাহে ডাকনাম সংগ্রহে নেমে পড়েছে! সংগ্রহের কাজ চলছে খুব গোপনে। ক্লাসে ক্লাসে ডাকটিকিটের খাতার মতো ডাকনামের খাতা তৈরি হয়েছে। আশ্চর্যের কথা হল, অনেকে নিজে এসে সেই খাতায় নিজের ডাকনাম জমা করে যাচ্ছে! সেই সব খাতা অদল বদলও চলে। ক্লাস সিক্সের খাতা আসে সেভেনে। সেভেনের খাতা চলে যায় নাইনে। এতদিন যা লুকোনোর জন্য সবাই চেষ্টা করত, নিষেধের পর এখন সেটাই সবাইকে জানাতে চাইছে!

    বাপরে, ডাকনাম যে এতরকম হতে পারে কে জানত? আপেল, টুথপেস্ট, পাটিগণিত তো আছেই। এমনকি মাউস, ফ্লপি, সিডি, রিংটোন পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে! ক্লাস সিক্সের সবথেকে হাসিখুশি শাকম্ভরের ডাকনাম যে ‘কাঁদুনে’ সেটা যদি সে নিজে এসে না বলত, কে বিশ্বাস করত? কে জানে হয়তো এই কারণেই ডাকনাম এত মজার। নোটিশের পর আরও কাণ্ড হয়েছে। ডাকনাম নিয়ে কেউ আর রাগারাগি করছে না! বরং বিচ্ছিরি নামটা হেডস্যারের নিষেধে সত্যি সত্যি মুছে না গিয়ে খাতায় লেখা হয়ে থাকছে তাতে তারা বেজায় খুশি।

    কেন এরকম হল কে জানে? ডাকনামের পিছন কি ভালবাসা বেশি থাকে?

    হেডস্যার জানলে শাস্তি যে মারাত্মক কোন সন্দেহ নেই। তবে শোনা যাচ্ছে, স্যারেরাও নাকি ডাকনাম সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছেন! তবে সেটা খাতা নয়, ছোট্ট নোটবুক। টিচার রুমে সেই নোটবুক লুকোনো আছে। খবর ঠিক কিনা বলতে পারব না। স্যারেদের একথা জিগ্যেস করার সাহস কারও নেই।

  • প্রেয়ার

    প্রেয়ার

    আমাদের ক্লাস, অর্থাৎ ক্লাস সেভেনের ঘরটাই স্কুলের সব থেকে বড় ঘর। পবনপুর শ্ৰীমতী কালিদাসী স্মৃতি উচ্চবিদ্যালয়ে এত বড় ক্লাসঘর আর একটাও নেই। আমাদের স্কুল শুরু হয় বেলা এগারোটায়। শুরু হয় বলা ঠিক হবে না, বরং বলা ভাল প্রথম ঘণ্টা পড়ে। আমরা তখন যে যেখানে থাকি হুড়োহুড়ি করে ক্লাসঘরে চলে যাই। অন্যসব ক্লাসের ছেলেরাও তখন আমাদের ঘরে চলে আসে। ঘরের চারপাশে সবাই লাইন করে দাঁড়িয়ে পড়ে। এগারোটা বেজে পাঁচ মিনিটে দু নম্বর ঘণ্টাটা বাজে। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রেয়ার শুরু হয়ে যায়।

    আমাদের প্রেয়ার হল “বন্দেমাতরম সুজলাং সুফলাং…”। বেশি নয়। প্রথম প্যারাগ্রাফটুকু। এরকমই চলছিল। এমন সময় হঠাৎ একদিন কী জানি কী হল, আমাদের ইতিহাসের স্যার কুঞ্জবিহারী গাঙ্গুলি ঘোষণা করলেন, না। আর নয়। রোজ রোজ একই গান কেন? এবার থেকে ছেলেরা প্ৰেয়ারের সময় একেকদিন একেকটা গান গাইবে। কিন্তু মুশকিল হল, ছেলেরা তো গান জানে না। কুঞ্জবিহারী স্যার বললেন, ‘কই বাৎ নেহি। ডরো মৎ। আমি গান শেখাব। দু-একদিন রপ্ত করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আসছে সোমবার থেকে শুরু হবে।’ আমাদের তো খুব উৎসাহ। বেশ নতুন একটা কিছু হবে।

    সোমবার আমরা সব তাড়াতাড়ি স্কুলে চলে এলাম। অনেকেই অবশ্য ভাল করে বুঝতে পারিনি ব্যাপারটা কী। ফাংশন টাংশন কিছু একটা হতে চলেছে ভেবে কেউ কেউ ইস্তিরি করা জামা-প্যান্ট পরে এল। হয়ত অনেকক্ষণ থাকতে হবে ভেবে কারও বাড়ি থেকে বেশি করে টিফিন দিয়ে দিল। সব থেকে ভয়ঙ্কর ঘটনা হল, ক্লাস নাইনের নেপু বগলদাবা করে বাঁয়া তবলা নিয়ে এসে হাজির হল হাসি হাসি মুখে। কুঞ্জবিহারী স্যার যথাসময়ে আমাদের ঘরে এলেন। পেছনে পেছনে অখিল বেয়ারা বয়ে নিয়ে এল একটা হারমোনিয়াম। টেবিলে হারমোনিয়াম, তবলা। একদিকে আমরা অন্যদিকে কুঞ্জবিহারী স্যার আর নেপু। ঘরে টুঁ শব্দ নেই। থম থম করছে। কী হয়, কী হয় ভাব। স্যার বললেন, “শোন আমি প্রথমে এক লাইন গাইব। শুনে শুনে তোমরা গাইবে।” একথা বলে তিনি হারমোনিয়াম টেনে টুনে দেখে নিলেন। নেপুর কানে কানে কী বললেন। নেপু খুব ঘাড় নাড়ল। এমন সময় দু-নম্বর ঘণ্টা বাজল।

    স্যার শুরু করলেন, “আমাদের যাত্রা হল শুরু, এখন ওগো কর্ণধার–।”

    বেজে উঠল হারমোনিয়াম। শুরু হল তবলার বোল। আমরা হতবাক। কোথায় গান? কোথায় হারমোনিয়াম? কোথায় তবলা? তিনটে যেন তিনদিকে ছুটছে! মনে হচ্ছে যেন একশো লোক মিলে ছাদ পেটাচ্ছে। ওরকম রোগা রোগা ইতিহাস স্যারের গলা যে এমন আশ্চর্য রকম হাঁড়ির মত হতে পারে কে ভেবেছিল? চোখ বুজে, আবেগ নিয়ে তিনি গেয়ে চলেছেন, “এখন বাতাস ছুটুক তুফান উঠুক, ফিরব না গো আর—।” তারপর হঠাৎ চোখ খুলে খেঁকিয়ে উঠলেন, “কিরে তোরা গা।’

    নেপুও টেরি নাড়িয়ে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ গা গা।”

    অগত্যা আর উপায় কী? আমরা প্রায় শ-দুয়েক ছেলে মিলে উচ্চৈস্বরে শুরু করলাম। দুশো জন মিলে ভুল সুরে, গলা ফাটিয়ে যদি “আমাদের যাত্রা হল শুরু-” গাইতে থাকে তাহলে যে কী ঘটতে পারে তা এক মিনিটের মধ্যে বোঝা গেল। গাইতে গাইতে শুনতে পেলাম হারমোনিয়াম আর তবলাকে ছাপিয়ে একটা গোঁ গোঁ শব্দ হচ্ছে। গান থামিয়ে সকলে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের ক্লাসের মুকুন্দরাম ঘটকের মুখ দিয়ে গ্যাজলা বের হচ্ছে। আর সে মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ করছে। ওই দৃশ্য দেখে ক্লাস ফাইভের একটা ছেলে ‘ওরে বাবা রে, আমি আর গাইব না রে’ বলে কাঁদতে শুরু করল। হেডসার ছুটে এলেন।

    তারপর? তারপর আর কী। আমরা আবার প্ৰেয়ারের সময় ‘বন্দেমাতরম’ গাই। তবে মুকুন্দ নাকি এখনও রাতে ঘুমের ঘোরে মাঝে মাঝে গোঁ-গোঁ শব্দ করে!

  • টিফিন কমপিটিশন

    টিফিন কমপিটিশন

    আমাদের এই পবনপুর উচ্চবিদ্যালয়ের নানারকম মজার কম্পিটিশন হয়। আমাদের বাংলার মাস্টারমশাই বিমানবাবু এসব ব্যবস্থা করেন। ওঁর মাথা থেকে অদ্ভুত অদ্ভুত সব আইডিয়া বের হয়। এসব কম্পিটিশনে আমাদের খুব উৎসাহ। পড়াশুনোর সঙ্গে বেশ একটা অন্যরকম দিন কাটাই। এরকম একটা কম্পিটিশনের গল্প বলি।

    বিমান স্যার একদিন বললেন, “আগামীকাল তোমাদের একটা কম্পিটিশন হবে।” আমরা তো হৈ হৈ করে উঠলাম, কিসের কম্পিটিশন?”

    স্যার বললেন, টিফিন কম্পিটিশন। টিফিনের সময় আমি ঘুরে ঘুরে দেখব কে কে টিফিন খাও। যার টিফিন আমার সব থেকে ভাল লাগবে সে ফার্স্ট হবে। মনে রাখবে বিচার কিন্তু সবদিক থেকে হবে। যে টিফিন আনবে সেটা খেতে ভাল কিনা, কুড়ি মিনিট টিফিন টাইমের মধ্যে সেই টিফিন তোমরা শেষ করতে পারছ কি না, টিফিন খেয়ে স্কুল নোংরা কর কিনা—এইরকম সবদিক দেখব কিন্তু। ক্লাস সেভেনের সবাই তো দারুণ খুশি। এমন প্রতিযোগিতার কথা আগে কেউ কখনও শোনেনি।

    পরদিন আমাদের ক্লাসে সে একটা দেখবার মত দৃশ্য। পিন্টু এসেছে ইয়া বড় চারটে বাটিওলা একটা টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে, সোমনাথ এল কাঁধে একটা ফ্লাস্ক ঝুলিয়ে, সুমনের হাতে একটা ঠোঙা, মানসের সঙ্গে ওয়াটার বটল, দেবুর সঙ্গে ওদের বাড়ির কাজের ছেলে নিমাই এল। নিমাইয়ের হাতে একটা ডাব। প্রণব নিয়ে এসেছে মিষ্টির বাক্স আর হাঁড়ি, কৃষ্ণেন্দুর জামার পকেট থেকে কাঁটাচামচ উকি মারছে। আরও সবাই কত কি যে নিয়ে এসেছে তার ঠিক ঠিকানা নেই। তবে কেউ কিন্তু বলছে না যে কী টিফিন এনেছে। সবার মুখেই মিটমিটি হাসি। ‘আজ দেখে নেব’, এমন একটা ভাব সকলেরই।

    টিফিনের ঘণ্টা পড়তেই শুরু হল সে এক দারুণ কাণ্ড! পিন্টু টিফিন ক্যারিয়ার খুলে সাজিয়ে বসল। নুন, লেবু, ভাত, ডাল, মাছের ঝোল, চাটনি। সোমনাথ ফ্লাস্ক থেকে গরম দুধ ঢালতে লাগল। সুমনের ঠোঙা থেকে বের হল ফুলুরি, বেগুনি, মোচার চাপ। মানসের ওয়াটার বটলে লেবুর সরবত। দেবু পেনসিল কাটার ছুরি দিয়ে ডাবের মুখ কাটতে শুরু করল। প্রণব সন্দেশ আর রাজভোগ এনেছে। কৃষ্ণেন্দু গলায় রুমাল বেঁধে কাটা চামচ দিয়ে চাউমিন খেতে শুরু করল। এছাড়া কেউ এনেছে, প্যাকেট ভর্তি বিস্কুট। এমনকি ক্যাডবেরি পর্যন্ত।

    এদিকে স্কুলে তো কম্পিটিশনের কথা ছড়িয়ে পড়েছে। অন্য ক্লাসের ছাত্ররা সব দরজা-জানলায় ভিড় করেছে। খুব হাসাহাসি করছে সবাই। আমাদের ক্লাস সেভেনের ঘরটা যেন নেমস্তন্ন বাড়ি! বিমান স্যার ঢুকলেন। তাঁর মুখেও হাসি। তিনি এক একটা বেঞ্চে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন আর কাগজের টুকরোতে কিসব লিখতে লাগলেন। এদিকে আমরা তো খুব জোর খাওয়া-দাওয়া সারছি। এমন সময় বিমান স্যার ঘুরতে ঘুরতে হাজির হলেন আমাদের নিমাই সামন্তর সামনে। সে টিফিন খাচ্ছে না, কাঁদো কাঁদো মুখে বসে আছে। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, “কিরে তোর টিফিন খাওয়া হয়ে গেছে?” নিমাই প্রায় কেঁদে ফেলে আর কি। সে বলল, “স্যার টিফিন কিনব বলে বাবার কাছ থেকে দুটো টাকা নিয়ে বেরিয়েছিলাম। সত্যি বলছি স্যার। একটা ভাল কেক কিনেছিলাম স্যার। বিশ্বাস করুন স্যার। কিন্তু স্কুলে ঢোকবার সময় বাহাদুরের (স্কুলের দারোয়ান) ছোট ছেলেটা এমন জুল জুল করে তাকাচ্ছিল-কেকটা স্যার ওকে দিয়ে দিলাম। আপনি স্যার বাহাদুরকে ডেকে জিজ্ঞেস করুন—”

    স্যার খুব বিরক্ত মুখে নিমাইকে বললেন, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। দুঃখ কর না। পরেরবার আবার যোগ দিও কম্পিটিশনে।’ তিনি আবার ঘুরতে লাগলেন। প্রণব একবার স্যারকে বলল, “একটা রাজভোগ খাবেন স্যার?” স্যার কঠিন চোখে প্ৰণবের দিকে তাকালেন। ঘণ্টা পড়তে কম্পিটিশন শেষ হল। পরের দিন ফলাফল জানানো হবে।

    এরপর সারাটা দিন ধরে আমাদের খুব আলোচনা চলল। তপন বলল, “মনে হচ্ছে পিন্টুই ফার্স্ট হবে।” অজয়ের মতে ফার্স্ট হওয়া উচিত বাবলুর। কেননা ও হজমি আর আচার এনেছিল। অলক কিন্তু বলল, “ফার্স্ট প্রণবই হচ্ছে। ও কেমন স্যারকে রাজভোগ খাওয়াতে গেল।” তবে একটা বিষয়ে আমরা সবাই একমত হলাম যে নিমাইটা খুব বোকামি করেছে। বিমানস্যার ওর ওপর খুবই বিরক্ত হয়েছেন।

    পরদিন স্কুলে গিয়েই আমরা নোটিস বোর্ডের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। যা দেখলাম তাতে কৃষ্ণেন্দুর মুখ চামচের মত, প্ৰণবের মুখ রাজভোগের মত, দেবুর মুখ ডাবের মত হয়ে গেল।

    বিমান স্যার নোটিস বুলিয়েছেন: ক্লাস সেভেনের টিফিন কম্পিটিশনে ফাস্ট হয়েছে নিমাই সামন্ত।

  • মামা বাড়ির খাওয়া

    মামা বাড়ির খাওয়া

    আমাদের ক্লাসের মনোজের মামার একটা অদ্ভুত নেশা আছে। এমন নেশার কথা কেউ কখনও শোনেনি। নেশাটা হল, লোককে বেজায় খাওয়ানো। দিনে অন্তত একজনকে মনের মত খাওয়াতে না পারলে ওঁর রাতে ঘুম হয় না। বিছানায় শুয়ে ছটফট করেন। সারারাত ছাদে পায়চারি করতে হয়। ভোররাতে মাথায় জল ঢালতে হয়। সে এক বিচ্ছিরি কাণ্ড ঘটে।

    আর খাওয়ানো মানে, যেরকম সেরকম ভাবে নাম নাম করে খাওয়ানো নয় মোটেই। রীতিমত খাওয়ানো। গলা পর্যন্ত খাওয়ানো, জোর করে খাওয়ানো, দম বন্ধ করে খাওয়ানো। মোট কথা হল, খাওয়াতে খাওয়াতে যতক্ষণ না মামার তৃপ্তি হচ্ছে, যতক্ষণ না মনে হচ্ছে যে যাকে তিনি খাওয়াচ্ছেন, তার খাওয়ার মত খাওয়া হচ্ছে ততক্ষণ তিনি থামতে চান না মোটেও।

    খাওয়াতে অনেকেই ভালবাসে। আমার কাঁকুড়গাছির মাসি, প্ৰণবের উল্টোডাঙার কাকা, দেবুর বারুইপুরের পিসিও কি কম কিছু খাওয়াতে ভালবাসে? মোটেই না। আমাদের একবার হাতে পেলেই হল। পেট পুরে খাইয়ে তবে ছাড়বে। এদের কাছে খাওয়ার পর মনটা কেমন ফুরফুর করে। মনে হয়, আহা দিনটা কত ভাল। কিন্তু মনোজের মামার খাওয়ানো তো একপেশে খাওয়ানো! আর সে কথাটা বেশ ভালভাবেই জানাজানি হয়ে গেছে। খেতে কে না ভালবাসে? ভালমন্দ খাবার দাবার পেলে কার না ভাল লাগে? আর যদি কেউ নিজে থেকে ডেকে, আদর যত্ন করে খাওয়ায় তাহলে তো সোনায় সোহাগা। কিন্তু মনোজের মামার এই ঠেসেঠুসে, পারলে গলায় বাঁশ ঢুকিয়ে, চেপেচুপে খাওয়ানোকে সবাই ভয় পায়।

    আর ভয় পাবেই না বা কেন? একবার মনোজকেই তো উনি পঁয়তাল্লিশটা রসগোল্লা খাইয়ে প্রায় মেরে ফেলেছিলেন আর কী! সেবার মনোজের কোন দূর সম্পর্কের দাদাকে এক হাঁড়ি রাবড়ি খাইয়ে দিয়েছিলেন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। মামার নজরে একবার পড়ে গেলেই হল। না খেয়ে পালাবার কোনও পথ নেই। ষণ্ডামার্কা ছটা দারোয়ান মামার হুকুম ছাড়া দরজা খুলবে না মোটেও। সুতরাং নিজের ইচ্ছেমত খেয়ে নিয়ে যে কেউ চম্পট দেবে সে গুড়ে বালি!

    প্রথম প্রথম যখন মামার এই ভয়ঙ্কর নেশার কথা তেমন করে ছড়ায়নি, তখন অনেকেই ভাল ভাল খাওয়ার লোভে ওখানে যেত। এখন আর তা হয় না। বেশিরভাগ লোকই জানে, মনোজের মামার বাড়ির খাওয়া মানে ফাঁসির খাওয়া। খেতে বসে যতই কেউ বলুক, ঠিক আছে মামা, আর নয়। পেট একেবারে আইঢাই হয়ে গেছে। ততই মামা বলবেন, দূর! এ আবার খাওয়া নাকি? মামার বাড়ির খাওয়া কী একে বলে? এ তো সবে শুরু।

    আজকাল তাই মামার খাওয়ার লোক পেতে ভারি মুশকিল। হচ্ছে। বড় বড় খাইয়েরাও ওঁর বাড়ির ধারে কাছে যাচ্ছে না।

    একদিন মনোজ স্কুলে এল। কাঁচুমাচু মুখে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “কী হল?”

    মনোজ বলল, “মামী গতকাল আমাদের বাড়িতে এসে খুব কান্নাকাটি করছেন। মামার এই নেশা যেমন করে হোক কাটাতে হবে। মামার সর্বনেশে খাওয়ানোর দুর্নাম এত হয়েছে যে ফেরিওয়ালারা পর্যন্ত মামার বাড়ি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আর মামার জমানো টাকাও সব ফতুর হয়ে যেতে বসেছে। তোরা কোনও একটা উপায় কর ভাই। নাহলে আর রক্ষে নেই।” এই কথা বলে মনোজ আমাদের হাত জড়িয়ে ধরল।

    আমরা ভাবতে বসলাম। টিফিন টাইমে খুব আলোচনা হল। এক একজন এক-একটা প্ল্যান দিতে থাকল। একজন বলল, মামী যদি সিন্দুকের চাবি লুকিয়ে রাখেন? একজন বলল, আমরা যদি মিষ্টির দোকানগুলোকে বলে দিই মামাকে মিষ্টি বিক্রি না করতে। একজন বলল, মামাকে যদি একদিন জোর করে একশোটা রাজভোগ খাইয়ে দিই। এমন সময় আমাদের মধ্যে সবথেকে চালাক মানস বলল, “না, এভাবে হবে না। মামার নেশা কাটাতে হবে অন্যভাবে। আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। তবে তার জন্য মামীমাকে কয়েকদিন মনোজের বাড়ি এসে থাকতে হবে।”

    মনোজ বলল, “সে আর এমন কী? কাল থেকেই হবে।”

    মানস তখন মনোজকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, তোর মামা রাতের খাবার কখন খেয়ে নেন?”

    মনোজ বলল, “লোককে ওরকম খাওয়ালে কী হবে, মামা নিজে তো সামান্য খান। উনি ঠিক রাত দশটায় খেতে বসেন।”

    মানস বলল, “ঠিক আছে। এখানে রাত দশটার আগেই দোকান বাজার সব বন্ধ হয়ে যায়।” সুতরাং মামা যে তখন দোকান থেকে খাবার কিনবে তারও উপায় নেই। তাই তো? কিছুই বুঝতে পারলাম না। মানস বলল, “দেখ না মজা। মামার খাওয়ানোর নেশা কেমন দৌড়ে পালায়। আমি যা বলব, তাই তোদের করতে হবে।”

    পরদিন ঠিক রাত দশটার সময় আমরা পাঁচজন ছেলে মনোজের মামার বাড়ি হাজির হলাম। দরজা খুলে মামা আমাদের দেখে তো অবাক। মানস বলল, “মামা, অনেকদিন আপনার বাড়িতে আসা হয়নি। তাই এলাম। বড় খিদেও পেয়েছিল। যদি-”

    খাওয়ার কথা শুনে প্রথমে মামার মুখ জ্বলজ্বল করে উঠল।

    পরের মুহূর্তেই কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, “কিন্তু এত রাতে তোদের কী খাওয়াব? ইস, তোরা যদি একটু খবর দিয়ে আসতিস। আমার যে হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছে।”

    আমরা বললাম, “কোনও চিন্তা নেই মামা। আপনার বাড়িতে এখন যা আছে, তাই খাব। মামা বললেন, “এখন রুটি, এক বাটি আলু-কুমড়োর তরকারি আছে।”

    আমরা সমস্বরে বললাম, “ওতেই হবে।” এরপর আমরা পাঁচজন একটুও দেরি না করে রান্নাঘরে ঢুকে মামার রাতের খাবারটা নিমেষে সাবাড় করে দিলাম। বিস্কুটের কৌটো, চানাচুরের শিশি ফাঁকা করে ফেললাম। তারপর ভালমানুষের মত বাড়ি চলে এলাম। মামা ফ্যালফ্যাল করে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

    পরদিন আবার একই ঘটনা। মামা তো তখন রাতের খাবার খেতে শুরু করে ফেলেছিলেন আর কী! তারপরের দিনও এক কাজ। তারপরের দিনও, তারপরের দিনও। এরকম টানা সাতদিন আমরা বলতে গেলে লুটেপুটে মামার রাতের খাবার খেয়ে এলাম।

    আটদিনের দিনও যখন পাঁচজনে মিলে মামার বাড়ির সামনে হাজির হলাম, আমরা দেখলাম দরজায় ইয়া বড় একটা তালা ঝুলছে।

    জুলজুল করে বসে থাকা দারোয়ান দুটো বলল,”বাবু মনোজদার বাড়ি চলে গেছেন।”

    আমরা লাফিয়ে উঠলাম, “হুররে!”

    সাতরাত উপবাসে কাটিয়ে মামার নেশা ছুটে গেল। খেতে না পাওয়ার কষ্ট থেকে তিনি বুঝলেন, বেশি খাওয়ালে কষ্ট কত হয়।

  • ইউনিফর্ম

    ইউনিফর্ম

    আমাদের স্কুলের ইউনিফর্ম নিয়ে অনেক জলঘোলা হয়েছে, অনেক গোলমাল হয়েছে। প্রথমে আমরা যে ইউনিফর্ম পরতাম, এখন আর সেটা পরি না। বদলে দেওয়া হয়েছে। এখন যেটা পরছি সেটাও আর কতদিন চলবে, কে জানে? সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের এই পবনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইউনিফর্ম একটা সমস্যার ব্যাপার।

    স্কুল চালু হওয়ার মুখে মুখে শুরু হল ইউনিফর্ম নিয়ে মিটিং। সেইসব মিটিংয়ে পবনপুরের মান্যিগণ্য ব্যক্তিরাও উপস্থিত থাকতেন। তবে হল কী, আমাদের পবনপুরের বড়রা তো কোন ব্যাপারেই কিছুতে একমত হন না। একজন একরকম বলেন তো আর একজন উল্টো বলবেন। ইউনিফর্ম নিয়ে মিটিংগুলোতেও সেরকম হচ্ছিল। কিছুতেই কোন ফয়সালা হচ্ছিল না। শেষপর্যন্ত স্কুল কমিটির সদস্যরা ঠিক করলেন, এবার মিটিংয়ে নিয়ে আসা হবে শিবপদ ভট্টাচার্যকে। অর্থাৎ আমাদের পবনপুরের এম এল এ-কে। তিনি একদিকে যেমন এম এল এ, অন্যদিকে তখন আবার তিনি না বললে এই স্কুলই হত না। সুতরাং তাঁর কথার যথেষ্ট দাম আছে। তিনি যা বলবেন তাই হবে শেষ কথা।

    সামান্য ইউনিফর্ম নিয়ে ডাকা মিটিংয়ে সভাপতি হতে হবে শুনে প্রথমে শিবপদবাবু রাজি হননি। পরে কী যেন হল, তিনি খবর পাঠালেন, “আমি যাচ্ছি।”

    এম এল এ মশাই মিটিংয়ে বেশি কিছু বলেননি। সামান্য দু’চার কথা। তিনি বললেন, “প্ৰথমে ভেবেছিলাম, এই সভায় আসব না। পরে ভুল ভাঙল। বিষয় যখন ইউনিফর্ম তখন তো আমাকে আসতেই হবে। ইউনিফর্ম মানে হল গিয়ে ইউনিটি, মানে হল গিয়ে সংহতি, সবাই মিলে মিশে থাকার শপথ। এটাই এখন সব থেকে বড় কথা। আসল কথা। মহান কথা। আর তাছাড়া পবনপুর উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্ররা যে ইউনিফর্ম পারবে তা বাইরে থেকে কেন আসবে? ছিছি। সে হবে। আমাদের লজ্জার। তাই অনেক ভেবে আমি সিদ্ধান্তু নিয়েছি, এই স্কুলের ছাত্ররা যে ইউনিফর্ম পরবে তা তৈরি হবে মাধব সাঁতরার দোকান থেকেই। আপনারা মাধবকেই দায়িত্ব দিন।” অনেক হাততালি, আর জলভরা সন্দেশ দিয়ে সেই মিটিং শেষ হয়েছিল।

    মাধব সাঁতরা এম এল এ মশাইয়ের দূর সম্পর্কের ভাগনে। পবনপুরের রেল স্টেশনের পাশে তার জামা-কাপড়ের দোকান ‘লজ্জা নিবারণ’। এক সপ্তাহের মধ্যেই স্কুলের তিনশো ছাত্রের ইউনিফর্মের অর্ডার সেখানে জমা হল। মাধববাবুই ঠিক করলেন, জামার রং হবে নীল, প্যান্ট হবে সাদা। হলও তাই।

    তবে এখানেই ইউনিফর্ম নিয়ে গণ্ডগোল থেমে গেল না।

    গত বর্ষাতে ছেলেদের সেই নীল জামা থেকে রং উঠতে শুরু করল। নীল রং গড়িয়ে গড়িয়ে সাদা প্যান্টের ওপর পড়তে লাগল। প্রথমে একজন দুজনের তারপর দশজন বিশজনের, শেষপর্যন্ত একশজন দেড়শজনের দল বেঁধে ছাত্ররা যখন স্কুলে আসত বা যেত তখন সে এক কিম্ভূতকিমাকার দৃশ্য। অভিভাবকরা প্ৰথমে মাধব সাঁতরার কাছে গিয়ে বলল, তারপর স্কুলের মাস্টারমশাইদের কাছে গিয়ে বলল, কিন্তু উপায় নেই। মাধব সাঁতরার ‘লজ্জা নিবারণ’ দোকান থেকেই ইউনিফর্ম তৈরি করতে হবে। এম এল এ মশাই যে সেরকমই বলে দিয়েছেন। তাই হেডমাস্টারমশাই মাধববাবুকে একদিন ডেকে পাঠিয়ে বললেন, “এ তো আর চোখে দেখা যায় না। একটা কিছু করুন।”

    তারপরই মাধববাবু ইউনিফর্মের রং বদলে দিয়েছেন। নীল জামার বদলে সাদা জামা। আর সাদা প্যান্টের বদলে নীল প্যান্ট। মাধববাবু বলেন, আবার যে রং উঠবে না এমন কথা বলতে পারি না। তবে সাদা জামা থেকে রং উঠলেও সাদা জামা সাদাই থাকবে।’

  • ক্লাস নাইনের ভূত

    ক্লাস নাইনের ভূত

    আমাদের স্পোর্টসে এক একজন ছেলে এক একটা ইভেন্টে দুর্দান্ত। তাদের পারফরমেন্স নিয়ে আমরা সারা বছর আলোচনা, ঝগড়া এমনকি মারামারি পর্যন্ত করি।

    কয়েকটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে।

    ক্লাস নাইনে ছিপছিপে বাসুদেব একশো মিটার দৌড়ে একেবারে মারাত্মক। চোখের পলক পড়বার আগেই দৌড় শেষ। কালো হাফ প্যান্ট আর সাদা গেঞ্জি না পরে, ও যদি দৌড়ানোর সময় কালো হলুদ ডোরাকাটা কোনও পোশাক পরত তা হলে ঠিক মনে হত বাসুদেব নয়, একটা চিতাবাঘ ছুটছে। বাসুদেবের দৌড়ের কায়দা আমরা অনেকেই নকল করতে চেষ্টা করি। কিন্তু কখনই ঠিকমতো হয় না। ওর স্টার্ট আর ফিনিশিং নিয়ে একবার ক্লাস সেভেনের সঞ্জয় আর ক্লাস এইটের অমৃতর মধ্যে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়েছিল।

    বাসুদেবের দৌড় যদি চিতাবাঘের মতো হয়, তা হলে রাজার হাই জাম্প পাখির মতো। ক্লাস সিক্সের রাজাকে শুধু তার ক্লাসের ছেলেরা হিংসে করে বললে ভুল হবে। গোটা স্কুলের ছাত্ররাই হিংসে করে। হিংসে করে আবার ওকে নিয়ে গর্বও করে। আশেপাশে চার-পাঁচটা স্কুলে খবর নিয়ে দেখা গেছে, এমন হাই জাম্প দিতে কেউ পারে না। লাফাচ্ছে তো না, যেন ডানা মেলে উড়ছে!

    অঙ্ক স্যার সুশীলবাবু হােমটাস্ক না করলে পরদিন ডবল হােমটাস্ক দেন। সেই সুশীলবাবু পর্যন্ত রাজাকে বলেন, “তোকে শুধু ছাড়। তুই বাড়িতে অঙ্ক প্র্যাকটিস না করে হাই জাম্প প্র্যাকটিস করবি। এতদিন জানতাম লাফিয়ে লাফিয়ে জীবনে উন্নতির ব্যাপারটা শুধুমাত্র কথার কথা। তোকে দেখে বুঝতে পারছি না, কথার কথা নয়। তুই সত্যি লাফিয়ে উন্নতি করবি। তুই বাবা মন দিয়ে লাফা, আরও বেশি বেশি লাফা।”

    রাজা মন দিয়েই লাফায়। নইলে প্রতি বছর স্পোর্টসে কেউ নিজের রেকর্ড ভাঙতে পারে?

    অনীশের হার্ডল রেস আমরা কখনও বসে দেখতে পারি না। উত্তেজনায় উঠে দাঁড়াতেই হবে। গত বছর শেষ দুটো বেড়া সে যেভাবে পা তুলে টপকে গেল যে আমরা ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছিলাম। এই বুঝি বেড়া ভেঙে মুখ থুবড়ে পড়বে। তবে ওর একটাই দুঃখ। স্পোর্টসের হার্ডল টপকালেও পরীক্ষার হার্ডল কিছুতেই টপকাতে পারে না। এই নিয়ে এইটে তার দু’বছর হয়ে গেল। ভূগোল আর ইতিহাসের বেড়ায় সে হােঁচট খেয়েছে। ইংরেজিতে তো একেবারে মুখ তোবড়ানো অবস্থা। তবে পরীক্ষায় ফেল করলেও হার্ডল রেসের জন্য স্কুলে অনীশের খুবই খাতির। সেও একটা ‘অহঙ্কারী অহঙ্কারী’ হাবভাব নিয়ে চলাফেরা করে। আমরা অবশ্য এই হাবভাবের জন্য কিছু মনে করি না। স্পোর্টসে যে এতগুলো কাপ আর মেডেল পেয়েছে, তার তো একটু অহঙ্কার হবেই। আমরা ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য ঘুরঘুর করি।

    গত দু’বছর ধরে শ্ৰীধরের নাম হয়েছে ‘ক্যাঙারু’। প্রথম প্রথম শুধু ক্লাস সেভেনের ছেলেরাই ওকে এই নামে ডাকত। এখন স্কুলের সব ছেলেরাই ‘ক্যাঙারু’, ‘ক্যাঙারু’ করে। শুধু ছেলেরা নয়, মাস্টারমশাইদের কেউ কেউ ক্লাসে ঢুকে বলেন, “ক্যাঙারু, যাও তো লাফাতে লাফাতে টিচার্স রুমে গিয়ে চট করে চক আর ডাস্টারটা নিয়ে এসো তো। আনতে ভুলে গেছি।”

    নিজের নাম বদলে দিলে সবাই রেগে যায়। শ্ৰীধর কিন্তু রাগে না। বরং তার বেশ আনন্দই হয়। সুকৃত সেদিন বলল, “আর কটা দিন যাক, দেখবি স্কুলের খাতাতেও শ্ৰীধরের নাম পাল্টে গেছে। লেখা হয়েছে ক্যাঙারু মজুমদার। হিহি।”

    পরে স্কুলের খাতায় কী হবে সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না, তবে শ্ৰীধরের নাম এমনি এমনি ‘ক্যাঙারু’ হয়নি। সে স্পোর্টসের বস্তা দৌড়ে প্রতিবার এক নম্বর। মেডেল বাঁধা। দৌড় শুরুর বাঁশি একবার বাজলেই হল। দুহাতে বস্তা তুলে তার লাফ তখন দেখার মতো। ক্যাঙারুর পেটে থলি থাকে। আর শ্ৰীধর হল থলির ভেতর ক্যাঙারু! আমাদের গেম টিচার অলকনন্দনবাবু ওকে দুঃখ করে বলেন, “ইস, অলিম্পিকে স্যাক রেস ইভেন্টটা নেই রে শ্ৰীধর। থাকলে একদিন ঠিক তোর চান্স হত। তুই সোনা জিতে আসতিস। আমরা তোকে সংবর্ধনা দিতাম। বস্তা দিয়ে স্টেজ সাজানো হত।”

    সে কী আর করা যাবে? শুধু বস্তা দৌড় কেন, জিলিপি দৌড় আর হাঁড়ি ভাঙাও তো অলিম্পিকেও নেই। কিন্তু ক্লাস ফাইভের জয় আর ক্লাস টেনের বিক্রম এই দুই খেলায় যে কত বড় ওস্তাদ সে কথা আর বাইরের কটা লোক জানতে পারল? জিলিপি দৌড় দিয়ে যে কেউ নাম করতে পারে, এমন কথা কেউ কখনও ভাবতে পেরেছে? জয় পেরেছে। শুধু পেরেছে নয়, একেবারে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। পিছনে হাত বাঁধা অবস্থায় সে যখন সবার আগে দৌড় শেষ করে তখন তার মুখে ঠিক আধখানা জিলিপির প্যাঁচ ধরা। সেই প্যাঁচ থেকে টপ টপ করে রস পড়ছে! বাকিদের অনেকে তখনও সুতো থেকে ঝোলানো সারি সারি জিলিপির সামনে নাচছে। মাঠের পাশে রাখা বক্সে চলছে বাজনা। মনে হচ্ছে, প্ৰতিযোগীরা যেন বাজনার তালে তালে নাচছে! সেই জিলিপি নাচ দেখে সকলে হাসতে হাসতে একেবারে গড়িয়ে পড়ে।

    সেবার অবশ্য কেলেঙ্কারি হল। জিলিপির ইভেন্ট দেখে আমরা হাসছি, হঠাৎ ভেউ ভেউ করে কান্নার আওয়াজ। চমকে উঠলাম। স্পোর্টসের মাঠে কে কাঁদে? তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখি, ক্লাস সিক্সের তমাল কাঁদছে। বেচারির হাত পিছনে বাঁধা বলে চোখের জল মুছতে পারছে না। মাঠের ধারে নিয়ে গিয়ে শান্ত করার পর চোখের জল মুছে সে জানাল, সেও এই দৌড়ে ছিল। সুতো থেকে জিলিপি ছিড়ে সবার আগে দৌড় শেষও করেছে। কিন্তু এসে দেখে মুখে ধরা জিলিপি নেই! দৌড়তে দৌড়তে ভুল করে খেয়ে ফেলেছে।

    এরপর না কেঁদে আর উপায় কী? অধীরের হাঁড়ি ভাঙা নিয়ে গত বছর স্পোর্টসে খুব গোলমাল হয়েছিল। ক্লাস নাইনের ছেলেরা গেম টিচারের কাছে গিয়ে আপত্তি জানাল–

    ‘স্যার এ কখনও হতে পারে না। অধীরের রুমালে নিশ্চয় ফুটো আছে। সেবারও অধীর চোখে রুমাল বাঁধা অবস্থায় হাঁড়ি ফাটিয়েছিল, এবারও ফাটিয়ে দিল। পরপর দু’বার একই ঘটনা কী করে ঘটে স্যার? তাও কোনওরকমে হাঁড়ির গায়ে লাঠিটা লাগালে একটা কথা ছিল। একেবারে এক চান্সেই ফটাস! আপনি স্যার ওই রুমাল পরীক্ষার ব্যবস্থা করুন।” ক্লাস টেনের ছেলেরা এ কথা শুনে রে রে করে উঠল। উঠবেই তো। অধীর তাদের ক্লাসের ছেলে। হাঁড়ি ভাঙা ইভেন্টের চ্যাম্পিয়ন। রুমালে ফুটো থাকার অভিযোগ তারা মানবে কেন? বলল—

    “স্যার, ওদের কথা একদম শুনবেন না। হিংসেতে এই সব বলছে। আমরা সবাই দেখলাম, প্রতিটা রুমাল খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে চোখ বাঁধা হয়েছে। অধীর এমনি এমনি চোখ বাঁধা অবস্থায় হাঁড়ি ভাঙেনি। ও তিন সপ্তাহ ধরে প্র্যাকটিস করেছে। প্র্যাকটিসের কোনও দাম নেই?”

    ক্লাস নাইনের ছেলেরা বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল, “হাঁড়ি ভাঙা প্র্যাকটিস করছে মানে! হাঁড়ি ভাঙা কি থ্রি হানড্রেড মিটার রেস? নাকি লং জাম্প যে প্র্যাকটিস করলে হয়। স্যার, এদের কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছে, ঘটনার পিছনে কোনও রহস্য আছে।”

    অলকনন্দনবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন,”কীরকম রহস্য বলে তোমরা মনে করছ?”

    ক্লাস নাইনের ছেলেরা হইহই করে বলল, “রুমালের রহস্য স্যার। ওই রুমাল পরীক্ষা করলেই সব ধরা পড়বে।”

    অলকনন্দনবাবু অধীরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “রুমালটা কী রকম ছিল অধীর?”

    অধীর মিটিমিটি হেসে বলল, “নতুন রুমাল স্যার। সাদার পাশে নীল বর্ডার।”

    ক্লাস টেনের ছেলেরা বলল, “অধীর ঘাবড়াসনি। তুই পকেট থেকে রুমালটা বের করে দেখিয়ে দে। আমরা তোর পাশে আছি।”

    অধীর এখনও মিটিমিটি হাসছে। বলল, “আমার কাছে রুমাল নেই।”

    ক্লাস নাইনের ছেলেরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। বলল, “দেখলেন তো স্যার? ফুটো রুমাল চোখে বেঁধে হাঁড়ি ভেঙেছে, তারপর সেই রুমাল কোথায় সরিয়ে ফেলে এখন বলছে রুমাল নেই। স্যার অধীরের গতবারের হাঁড়ি ভাঙার মেডেলও কেড়ে নেওয়া হোক।”

    এ বার ‘হো হো’ করে হেসে উঠলেন অলকনন্দনবাবু। হাসতে হাসতেই ক্লাস নাইনের ছেলেদের দিলেন জোর ধমক । বললেন, “অ্যাই চোপ। একদম চুপ করো তোমরা। আজ যারা হাঁড়ি ভাঙা ইভেন্টে অংশ নিয়েছে তাদের সবার চোখ বাঁধা হয়েছিল স্কুলের মাস্টারমশাইদের রুমাল দিয়ে। এক একজন প্রতিযোগীর জন্য এক একজন মাস্টারমশাইয়ের রুমাল। আর অধীরের রুমালটা ছিল আমার। এই দেখ।”

    কথা শেষ করে অলকনন্দনবাবু পকেট থেকে একটা নীল বর্ডার দেওয়া নতুন সাদা রুমাল বের করলেন।

    ক্লাস টেনের ছেলেরা চিৎকার করে উঠল, “হাঁড়ি ভাঙার হিরো অধীর হিপ হিপ হুররে…।”

    তবে আমাদের স্পোর্টসের আসল হিরোর নাম বাদল। ক্লাস নাইনের রোগাভোগা, খোঁচা খোঁচা চুলের বাদল। তাকে নিয়ে আমাদের সারা বছর ধরে কৌতুহল। স্পোর্টসের দিন যত এগিয়ে আসে সেই কৌতুহল বাড়তে থাকে। ক্লাসে ক্লাসে জল্পনাকল্পনা শুরু হয়। এমনকি মাস্টারমশাইরা পর্যন্ত আমাদের জিজ্ঞেস করেন, “কীরে, এ বছর বাদলের প্ল্যান কী?” বাদলের প্ল্যানের খবর আমরা বলতে পারি না। কারণ, এই সময়টা সে একেবারে তালা বন্ধ করে ফেলে। এমনি তালা নয়। ডবল তালা। তারপর যেন দুটো চাবিই ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এ বিষয়ে কোনও প্রশ্ন করলে গম্ভীর মুখে বলে, “এখনও কিছু ঠিক করিনি। দেখি এখনও তো সময় আছে।”

    অথচ প্রতি বছর সে এমন এক একটা কাণ্ড করে যে স্পোর্টসের শেষ ইভেন্ট ‘যেমন খুশি সাজো’ সবথেকে মজার হয়ে যায়। বাদলকে কেউ হারাতে পারে না। তার সাজ দেখে চমকে উঠতে হয়। শুধু সাজপোশাকে নয়, ভাবনাতেও সে হয় এক নম্বর। একবার গুপি গাইনের বাঘা সেজে এমন ঢোল বাজাল যে মাঠে হাততালি আর থামতেই চাইছিল না। দু’বছর আগে সেজেছিল ফেলুদা। হাতে খেলনা রিভলভার নিয়ে স্কুলের পাঁচিল টপকে এল! সবথেকে মজা হয়েছিল যেবার হেডস্যারের সাজে ধুতি-পাঞ্জাবি আর কালো পাম্পসু পরে মস মস আওয়াজ তুলে হাঁটতে হাঁটতে ঘুরপাক খেল। হাসিতে আমাদের পেট ফেটে যাওয়ার অবস্থা। কিন্তু হাসতে পারছি না। হাসব কী করে? একটু দূরেই চাঁদোয়ার নিচে খোদ হেডস্যার নিজে বসে আছেন। শুধু বসে আছেন না, তিনি তো বিচারকদের একজন। আমাদের মনে হল, বাদলের কপালে দুঃখ আছে। আশ্চর্যের বিষয়, সেবার হেডস্যার বাদলকে সবথেকে বেশি নম্বর দিয়েছিলেন!

    তবে এবারের ঘটনা আগের সব ঘটনাকে ছাড়িয়ে গেল।

    আমি, তন্ময়, অৰ্চি আর ঋজু ঠিক করলাম, এ বছর বাদল কী সাজবে আগে থেকে জানতেই হবে। যে করেই হোক জানতে হবে। তন্ময় বলল, “দাঁড়া, আগে খোঁজ নিয়ে দেখি বাদল কী খেতে ভালবাসে।”

    অৰ্চি অবাক হয়ে বলল, “খাওয়ার সঙ্গে সাজের কী সম্পর্ক?”

    তন্ময় মুচকি হেসে বলল, “আরে বাবা, আছে। ফেবারিট জিনিস খাবার সময় সকলের মনই একটু দুর্বল হয়। বাদলেরও হবে। আর তখনই গল্প করতে করতে ওর সাজের পরিকল্পনা জেনে নেব।”

    সত্যি সত্যি তন্ময় খোঁজ নিয়ে এসে জানাল, বাদলের দারুণ ফেবারিট হল এগ রোল। তন্ময় বলল, “দে, সবাই চাঁদা দে। বেশি করে দিস। দুটো রোলের দাম লাগবে। এর নাম হল এগ রোল অপারেশন।”

    ঋজু বলল, “এগ রোল অপারেশনে দুটো রোল লাগবে কেন? বাদলকে কি তুই রোল খাওয়াবি।”

    তন্ময় রেগে গিয়ে বলল, “বোকার মতো কথা বলিস না ঋজু। বাদল দুটো খাবে কেন? আমাকে একটা খেতে হবে না? দুজনে রোল খেতে খেতে গল্প করব। নইলে ও সন্দেহ করে সতর্ক হয়ে যাবে।”

    দুটো রোলের চাঁদা তোলা হল এবং শনিবার স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে তন্ময় সত্যি সত্যি বাদলকে রোল কিনে দিল। মন দিয়ে খাওয়া শেষ করে বাদল বলল, “খুব ঝাল লেগেছে রে, উপস। মনে হচ্ছে লঙ্কায় কামড় দিয়েছি, উপস। একটা আইসক্রিম খাওয়া রে, উপস।”

    তন্ময়ের খুব রাগ হল। কিন্তু কিছু করার নেই। আইসক্রিম না দিলে বাদল রেগে চলে যাবে। কিছুই বলবে না। তখন এগ রোলের টাকাটাও জলে যাবে। বাধ্য হয়ে নিজের পকেট থেকেই টাকা বের করে আইসক্রিম কিনল। তন্ময়। সস্তার আইসক্রিম নয়, একেবারে দামি চকোবার। বাদল আইসক্রিমে আলতো কামড় দিয়ে বলল, “নে এবার বল।”

    তন্ময় ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “কী বলব?”

    বাদল অবাক হয়ে বলল, “বাঃ, বলবি না? কেন এগ রোল খাওয়ালি সেটা বল।”

    তন্ময় লজ্জা পেয়ে বলল, “বাঃ, বন্ধুকে একটা রোল খাওয়াতে পারি না?”

    বাদল নির্লিপ্ত মুখে বলল, “পারবি না কেন? তবে স্পোর্টস এসে গেছে তো, তাই সন্দেহ সন্দেহ হচ্ছে।”

    তন্ময় দেখল বাদল ধরে ফেলেছে। আর ধরেই যখন ফেলেছে। তখন সরাসরি কথাটা বলে ফেলাই বুদ্ধিমানের। সে আমতা আমতা করে বলল, “আসলে কী জানিস, ‘যেমন খুশি সাজো’তে তুই যা করিস না..একেবারে ফাটাফাটি। হ্যাঁরে বাদল, এবার কী সাজবি? ভেবেছিস কিছু?”

    বাদল আইসক্রিমের তলায় একটা হাত রেখে বলল, “দেখ, তন্ময়, সাজের কথা আমি আগাম বলি না। কিন্তু এবার তুই এগ রোল খাইয়ে আমার মনটা দুর্বল করে দিয়েছিস। শুধু এগ রোল নয়, সঙ্গে আবার আইসক্রিমও। তোর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করাটা ঠিক হবে না। তাই ভাবছি, তোকে বলেই ফেলব।”

    তন্ময় রাস্তার মধ্যেই দাঁড়িয়ে পড়ল। বাদলের হাত ধরে বলল, “বলবি, বল তাহলে।”

    বাদল আইসক্রিম শেষ করে কাঠিটা ছুঁড়ে ফেলল। তারপর সে বলল, “ভূত। এবার আমি ভূত সাজছি। যা, এবার বাড়ি যা।”

    পরের দিন তন্ময় স্কুলে এল মুখ কালো করে। আমরা ঘিরে ধরলাম। আমরা বললাম, “কীরে, তোর এগ রোল অপারেশন কী হল? কিছু জানতে পারলি?”

    তন্ময় মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “অপারেশন ফেল করেছে। বাদল কিছুই বলল না। উল্টে এগ রোলের সঙ্গে একটা আইসক্রিমও খেল। শেষে রসিকতা করে চলে গেল।”

    ঋজু বলল, “রসিকতা! কী রসিকতা?” তন্ময় গজগজ করতে করতে বলল, “কী আবার বলবে? বলল, এবার নাকি ও ভূত সাজছে!”

    আমরা হাল ছেড়ে দিলাম। না, এবারও জানা হল না।

    স্পোর্টসের দিন ‘যেমন খুশি সাজো’ ইভেন্ট শুরু হতে সবাই নড়েচড়ে বসল। এক এক করে প্রতিযোগীদের নাম ডাকা হচ্ছে। হাততালি, হাসি আর চিৎকারের মধ্যে দিয়ে তারা মাঠে ঢুকছে। কেউ সেজেছে বাউল। কারও সাজ প্রফেসর শঙ্কুর মতো। কেউ আবার কোট-প্যান্ট আর টাই পরে হাতে বাবার ল্যাপটপ নিয়ে এসেছে! ক্লাস টেনের অনির্বাণ মাথায় গামছা বেঁধে ফুচকাওলা হয়েছে। ফুচকা ভর্তি একটা ঝুড়িও সঙ্গে এনেছে! তিনজন সেজেছে হ্যারি পটার। গোল গোল চশমা। এলোমেলো চুল। তিন সাইজের হ্যারি পটার দেখে সবাই হইহই করে উঠল। কিন্তু বাদল কোথায়? প্রথমে দু-একজনের মধ্যে ফিসফাস শুরু হল। সেই ফিসফাস খুব দ্রুত গোটা মাঠে ছড়িয়ে পড়ল। এমনকি মাস্টারমশাইরা পর্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। আমাদের ডেকে মুকুন্দবাবু বললেন, “কী হল রে? তোদের বাদল কোথায়? এতবার নাম ডাকা হল…।”

    অৰ্চি কাঁচুমাচু গলায় বলল, “বুঝতে পারছি না স্যার। খানিকক্ষণ আগেই দেখলাম মাঠ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।” আমি বললাম, “কোথায় চললি? বলল, সাজতে যাচ্ছি।”

    মুকুন্দবাবু বললেন, “তা হলে তো ব্যাপারটা সিরিয়াস মনে হচ্ছে। হঠাৎ কিছু হয়ে গেল নাকি? একবার খোঁজ নিতে হয়। তোরা কেউ চট করে বাড়ি থেকে ঘুরে আয়।”

    তন্ময় একটা সাইকেল জোগাড় করে রওনা দিল। বাদলের বাড়ি দূরে নয়। সাইকেলে যেতে-আসতে মিনিট পনেরো। তন্ময় ফিরে এল তেরো মিনিটের মাথায়। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “না, বাড়িতেও নেই।”

    মুকুন্দস্যার গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন, “স্পোর্টস শেষ হয়ে গেল। কিছু একটা করতে হবে। সেরকম হলে থানায় খবর দেব। আমি হেডস্যারকে জানাচ্ছি। তোরা এখন চুপচাপ থাক।”

    আমরা চুপচাপ থাকলাম। কিন্তু তাতে লাভ হল না। খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। বাদল ভ্যানিস! এর সঙ্গে আবার নানারকম গল্পও জুড়ল। কেউ বলছে, অপহরণ। কেউ বলছে, মনে হয় ডাকাত সেজে আসছিল। সত্যি ডাকাত ভেবে রাস্তাতেই পুলিস অ্যারেস্ট করেছে।

    স্পোর্টস শেষ হলে চাপা টেনশনের মধ্যেই শুরু হল পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। ‘যেমন খুশি সাজো’ ইভেন্টের পুরস্কারের সময় হেডস্যার উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, “প্রতিবার যে ছেলেটি এতে প্রথম হয় সেই বাদল এবার আসেনি। অথচ আমরা জানতে পেরেছি সে ‘আসছি’ বলে খানিক আগে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, তার কোনও সমস্যা হয়েছে। স্পোর্টস শেষ হয়ে গেলেই আমরা তার খোঁজখবর শুরু করব। যাই হোক, এবার ‘যেমন খুশি সাজো’-তে ফার্স্ট হয়েছে… ”

    ঠিক এমন সময় বাদলের গলা! “এই তো আমি স্যার। এই তো আমি এসে গেছি।” সবাই চমকে উঠল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, মাঠের একপাশ থেকে ছুটতে ছুটতে আসছে সে! কোনও সাজগোজ নেই। একেবারে সাদামাঠা স্কুলের পোশাক। এমনকি পায়ে কালো বুটটা পর্যন্ত রয়েছে!

    ছেলেদের ভিড় ঠেলে চাঁদোয়ার তলায় এসে দাঁড়াল বাদল। সে একই সঙ্গে হাঁপাচ্ছে এবং হাসছে!

    মুকুন্দবাবু চোখ পাকিয়ে বললেন, “কোথায় ছিলি তুই? অ্যা, ছিলি কোথায়?

    বাদল হাসিমুখে বলল, “স্কুলে ঢুকে ফাঁকা ক্লাসরুমে লুকিয়ে বসে ছিলাম।”

    মুকুন্দবাবু ধমকে উঠলেন, “ফাঁকা ক্লাসরুমে লুকিয়ে ছিলি মানে! রসিকতা হচ্ছে? কান টেনে ছিঁড়ে দেব। এতবার নাম ডাকা হল, শুনতে পাসনি?”

    বাদল কাঁচুমাচু মুখে বলল, “হ্যাঁ শুনতে পাব না কেন স্যার? খুব শুনতে পেয়েছি।”

    এবার হেডস্যার কটমট করে তাকিয়ে বললেন, “শুনতে পেয়েছ তো আসনি কেন?”

    বাদল মাথা নামিয়ে বলল, “কী করে আসব স্যার? এবার যে আমি ভূত সেজেছি। ভূত কি দেখা যায়? ভূত তো অদৃশ্য। সেই জন্যই তো লুকিয়ে ছিলাম।”

    “যেমন খুশি সাজো’ এখন খেলাধুলোর মধ্যে পড়ে না, কিন্তু তখন পড়ত। খুব বেশি মাত্রাতেই পড়ত। আর সেবারও এই খেলায় প্রথম হল ক্লাস নাইনের বাদল।

  • পড়তে বসা

    পড়তে বসা

    মাস্টার মশাইরা বলেন, “অঞ্জনকে দ্যাখ। দেখে শেখ।” সত্যিই শুধু আমরা ক্লাস সেভেনের ছেলেরা শুধু নই, অঞ্জনকে দেখে আমাদের এই পবনপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সব ক্লাসের ছেলেরাই। তাকিয়ে দেখার মতই ছেলে বটে সে। ক্লাস সেভেনের একটা ছেলে যে এত পড়াশুনো করতে পারে তা কেউ দেখা তো দূরের কথা, কানেও কখন শোনেনি।

    আমরা দু-একবার তমালকে জিগ্যেস করেছিলাম, ‘হ্যাঁরে তমাল তুই কখন পড়বি? তমাল বলেছে, “খেপেছিস। এত কাজ, পড়ার সময় কই।” সেই তমালই অঞ্জনের পড়ার যা হিসেব আমাদের দিয়েছে তা এইরকম—

    ভোর সাড়ে চারটের সময় ঘুম থেকে ওঠা। সময় যাতে নষ্ট না হয় তার জন্য বালিশের পাশেই বই থাকে। সঙ্গে সঙ্গে পড়তে বসে যাওয়া। দাঁত মাজতে মাজতে সেই পড়া মনে মনে আওড়ানো। ছাদে মর্নিং ওয়াক করতে করতে পড়া। জলখাবার খেতে খেতে পড়া। সাড়ে ছটার সময় ভূগোলের মাস্টারমশাই চলে আসবেন। সাড়ে সাতটায় ইতিহাসের, সাড়ে আটটায় ইংরেজির, সাড়ে নটায় অঙ্কের। মাস্টার মশাইরা চলে গেলে স্নান, খাওয়া। তখনই সকালের পড়াগুলো সব পরপর মুখস্থ বলে যাওয়া। এরপর চারটে পর্যন্ত স্কুল। তখনও টিফিনে পড়া। ছুটি হলেই দৌড়ে বাড়ি। সাড়ে চারটেয় বাংলার মাস্টারমশাই, পৌনে ছটায় বিজ্ঞানের, আটটা বেজে দশ মিনিটে কর্মশিক্ষার, সাড়ে ন’টার সময় সংস্কৃতর। এবং সবথেকে আশ্চর্যের বিষয়, তমাল আমাদের জানিয়েছে, অঞ্জনের জন্য একজন ড্রিলের মাস্টারমশাইও বাড়িতে আসেন। রাত সোয়া দশটা নাগাদ নাকি দেখা গেছে তিনি ছাদে অঞ্জনকে এক দুই, এক-দুই-তিন করে ড্রিল শেখাচ্ছেন!! এরকম ছেলেকে বাবা, মা, দাদা এবং মাস্টারমশাইরা যে “আদৰ্শ” হিসেবে বার বার আমাদের সামনে আনবেন এ আর আশ্চৰ্য্য কী?

    এদিকে বাড়িতে স্কুলে শুধু ‘অঞ্জন-অঞ্জন’ শুনে আমরা তো একেবারে তিতিবিরক্ত। এ কেমন পড়ার ছিরি? আমরা অনেক ভেবেচিন্তে একটা ফন্দি করলাম। ঠিক হল এবার আমরা সরস্বতী পুজোটা করব একেবারে অঞ্জনদের বাড়ির উল্টোদিকের মাঠে। সেই মত সব ব্যবস্থা হল। রাত জেগে প্যান্ডেল বাঁধলাম। মনোজ খুব ভাল বাজনা বাজাতে পারে। সে কোথা থেকে জানি একটা ঢাক যোগাড় করে আনল। এবার হতে না হতেই সেই ঢাক বাজতে শুরু করল, ধাঁই না না, ধাঁই না না গিজ গিনিতা গিজ গিনিতা। সঙ্গে তাপসের কাঁসরঘণ্টা। আমরা বললাম, “দেখি ব্যাটা অঞ্জন এমন দিনেও কত পড়ে!” সরেজমিনে দেখে আসতে তমাল পিছনের দরজা দিয়ে সুড়ুৎ করে অঞ্জনদের বাড়িতে ঢুকে পড়ল। মিনিট তিনেকের মধ্যেই তমাল ফিরে এসে জানাল, ঘরের সবকটা জানলায় দরজায় মোটা মোটা পর্দা টাঙিয়েছে অঞ্জন। ভেন্টিলেটারে সোয়েটার। এমনকি নিজের দুকানে তুলো পর্যন্ত গুঁজেছে! এত করেও ঘরে যেটুকু ঢাকের শব্দ ভেসে আসছে তা চাপা দিতে অঞ্জন ইতিহাস বই খুলে বাবর, আকবর, শেরশাহ, লৰ্ডকার্জন, বলে পরিত্ৰাহি চেঁচাচ্ছে!

    “যা বাবাঃ” বলে আমরা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। পরীক্ষার রেজাল্ট যেদিন বের হল, সেদিন দেখা গেল অঞ্জন ভূগোলে সাত, ইতিহাসে তের, অঙ্কে সতের, বিজ্ঞানে নয় পেয়েছে। অঞ্জনের এই রেজাল্ট দেখে আমরা সত্যিই একটু দুঃখ পেয়েছিলাম। বেচারি এত খাটাখাটনি করল! সব একেবারে জলে গেল। অঞ্জন কিন্তু একটুও মুষড়ে পড়ল না। বলল, “বাড়ি যাই। পড়তে বসতে হবে।”

  • হিংসুটে

    হিংসুটে

    রঘুনাথের মত হিংসুটে ক্লাস সেভেনে কেন, গোটা ইস্কুলেই আর কেউ নেই। বন্ধুরা তার নাম রেখেছে হিংসুটে নাথ।

    সব কিছু নিয়ে রঘুনাথ হিংসে করে। পিন্টু কেন ক্লাসে ফার্স্ট হয়, আমি কেন হই না? তপন কেন ফুটবল টিমে চান্স পেল, আমি কেন পেলাম না? বিশ্বরূপ কেন ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ নাটকে লক্ষ্মণের পার্ট পেল, আমি কেন পেলাম না? অমিয় কেন ভূগোলে বিরাশি পেল, আমি কেন পেলাম না? অজয় কেন গান গাইতে পারে, আমি কেন পারি না? এইরকম সব।

    হিংসে করতে করতে রঘুনাথের এমন অভ্যেস হয়ে গেছে যে ক্লাসে কেউ মাস্টারমশাইয়ের কাছে মার খেলে পর্যন্ত সে হিংসে করে বসে। আসলে হিংসে করতে গিয়ে যেসব গুলিয়ে ফেলে। এরকম ছেলেকে কেইবা পছন্দ করবে? তাই রঘুনাথকেও তার বন্ধুরা এড়িয়ে চলে। নইলে ছোটখাটো সব ব্যাপার নিয়েই তো তার সঙ্গে ঝগড়া নয়, হাতাহাতি পর্যন্ত হয়। এই তো সেদিন বিদ্যুৎ ওর স্ট্যাম্পের অ্যালবাম নিয়ে এসেছিল। ক্লাসে একেবারে হৈ হৈ পড়ে গেল। টিফিনের সময় সবাই হুমড়ি খেয়ে সেই অ্যালবাম দেখছিল আর পঞ্চমুখে বিদ্যুতের প্রশংসা করছিল। বিদ্যুৎ নেতার মত মুখ করে গর্বের হাসি হাসছিল।

    রঘুনাথের তো এই কাণ্ড দেখে গা জ্বলে যাচ্ছে। সে আর সহ্য করতে না পেরে দুম করে বলে বসল, “ওসব জাল স্ট্যাম্প।” ব্যস, যা হবার তাই হল। বিদ্যুৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। কুস্তি, বক্সিং, ক্যারাটে কিছুই বাকি রইল না। অন্যরা কোনক্রমে দুজনকে সরিয়ে দেয়।

    আর একদিন মধু এসে বলল, “আমার সেজমামা আফ্রিকা ঘুরে আজ ফিরলেন।”

    অমনি সবাই মধুকে ঘিরে বসল। মধু তখন তার মামার গা ছমছমে আফ্রিকা ভ্রমণের গল্প বলতে শুরু করল বন্ধুদের। পরদিন রঘুনাথ ক্লাসে এসেই ঘোষণা করল, “আফ্রিকা না ছাই, মধুর সেজমামা সুন্দরবনের গোসাবা থেকে বদলি হয়ে কলকাতায় এসেছেন। আমার ছোট কাকার এক বন্ধু তো ওই অপিসেই কাজ করেন।” এরপর কি আর মধুর পক্ষে চুপ করে বসে থাকা সম্ভব? তবে সেদিন শুধু চুলের ওপর দিয়ে মারপিট শেষ হয়েছিল। এই হল রঘুনাথ। রঘুনাথকে তার বন্ধুরা হাড়ে হাড়ে চিনে ফেলেছে। কিন্তু পরশু দিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল।

    সেদিন রঘুনাথ ছুটির পর লাইব্রেরিতে বসে টিনটিনের নতুন বইটা পড়ছিল। নতুন বই অন্য কেউ আগে পড়ে নেবে একথা সে কল্পনাও করতে পারে না। যখন সে ইস্কুল ছেড়ে বের হচ্ছে, তখন সব ফাঁকা। সন্ধে হয় হয়। ঠাণ্ডা বাড়ছে। হনহনিয়ে ইস্কুল গেটের মুখে এসে দেখে দারোয়ানের বেঞ্চিতে জবুথবু হয়ে বসে আছে তাদেরই ক্লাসের কল্যাণ। আরে, এখনও কল্যাণ কেন? থমকে দাঁড়ায় রঘুনাথ। তার হিংসুটে মন খচখচ করে ওঠে। ব্যাপারটা কী? “কি রে কল্যাণ? কী হয়েছে?” জিগ্যেস করে সে।

    কল্যাণ প্ৰায় কাঁপতে কাঁপতেই বলে “জ্বর এসেছে রে। উঠতে পারছি না।” হিংসে করবার মত কিছু ঘটেনি দেখে যেন নিশ্চিন্ত হল রঘুনাথ। বলল, “তা বসে আছিস কেন? গায়ে তো দেখছি সোয়েটারও নেই। একটা রিকশা ডেকে বাড়ি চলে যা।”

    কল্যাণ কাঁচুমাচু মুখে জানাল, “রিকশ ভাড়া নেই।” কথা শেষ হলে রঘুনাথ চলেই যাচ্ছিল। হঠাৎ কী ভেবে ফিরে এল সে। নিজের পকেট থেকে বের করল দুটো টাকা। চারপাশ ভাল করে দেখে জোর করে সেগুলো ধরিয়ে দিল কল্যাণের হাতে। তারপর ফিসফিস করে বলল, “কাউকে বলিস না যেন। সব যা হিংসুটে। তোকে সাহায্য করে বাহাদুরিটা নিতে পারল না বলে হিংসে করবে।” কল্যাণ অবাক।

  • লজ্জা

    লজ্জা

    আমাদের ক্লাস সেভেনে নতুন ক্লাস টিচার এলেন অনিল মহান্তি। চুলগুলো খাড়াখাড়া, এক গাল খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। চোখ দুটো লাল আর বন-বন করে ঘুরছে। ভয়ঙ্কর রাগী। প্রথমদিন ক্লাসে ঢুকেই বললেন, “কোনওরকম বেয়াদপি করেছিস তো পিঠের ছাল তুলে দেব”

    শুধু এই হুঙ্কারেই তিনি থামলেন না। প্রথমদিনই তিনি প্রত্যেককে এক ঘা, দু’ঘা করে দিয়ে জানালেন, “প্রথম রাতেই বেড়াল মেরে রাখলাম। আশা করি তোরা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারলি তোদের নতুন ক্লাস টিচার কেমন।”

    বুঝব আর কী? আমরা তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে রইলাম আর ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলাম। মহান্তিবাবুর রাগের খবর দাবানলের মত স্কুলে ছড়িয়ে পড়ল। শুরু হয়ে গেল ফিসফিস করে আলোচনা, পবনপুর উচ্চবিদ্যালয়ে এমন রাগী মাস্টারমশাই আগে কখনও আসেননি।

    সেই থেকে প্রথম পিরিয়ডটা আমাদের কাটতে লাগল ভয়, উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তায়। কারণে, অকারণে, যখন-তখন, যে কোনও সময়, যে কারোর ওপর মহান্তিবাবু রেগে যেতেন। আর তার কপালে জুটত অশেষ লাঞ্ছনা। তিনি স্কুলের একেবারে কাছেই বাড়ি ভাড়া নিলেন। একা মানুষ। সকাল সকাল চলে আসেন স্কুলে। বাড়ি ফেরেন সবার শেষে। কামাই বলে কোনও ব্যাপারই নেই। ঝড়-বৃষ্টিতে তাঁর কোনও অসুবিধাই হয় না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে দু’পা হাঁটলেই তো স্কুল। সবকিছুই যেন আমাদের বিরুদ্ধে গেছে।

    এরকমভাবেই চলছিল। হঠাৎ মহান্তিবাবু একটা কাণ্ড করলেন। একদিন ক্লাসে এসে বললেন, “দ্যাখ, বেশ কয়েকদিন তোদের সঙ্গে থাকলাম। দেখলাম তোরা সবাই বদ আর পাজি। তবে তোদের মধ্যে কয়েকজন আছে যারা বেশি পাজি। আমি অনেক ভেবেচিন্তে এরকম পাঁচজনের একটা লিস্টি তৈরি করেছি। এরা হল বাবলু, রাতুল, অঞ্জন, কৌশিক আর সুব্রত। হাফ ইয়ারলি পরীক্ষায় এরা সবার থেকে কম নম্বর পেয়েছে। এদের দ্বারা কিস্যুু হবে না। ছাত্র তো নয়, এক একটা গাধা। শুধু তাই নয়, এরা হল পচা ফলের মত। ঝুড়িতে থাকলে অন্যগুলোও পচে যাবে। তাই আমি ঠিক করেছি, এই পাঁচজন পাজির সঙ্গে কেউ মিশবি না। ওদের একঘরে করা হল। যদি দেখি ওদের কারোর সঙ্গে কেউ কথা বলেছিস, তাহলে কপালে খুব দুঃখ আছে।”

    মহান্তিবাবুর কথার প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা, তার মুখের ওপর কথা বলার সাহসই আমাদের কারোর নেই। হতে পারে বাবলুরা পড়াশোনাতে তেমন ভাল নয়, হতে পারে মাথায় নানারকম দুষ্টুবুদ্ধি খেলে, তা বলে ওদের বয়কট করতে হবে? এ যে লঘু পাপে গুরু দণ্ড। ক্লাস সেভেনের কেউ এতে খুশি নই। কিন্তু উপায় কী?

    অল্প কিছুদিনের মধ্যেই গণ্ডগোল শুরু হল। মহান্তিবাবু তো হুকুম দিয়েই খালাস। কিন্তু ঝামেলা পোয়াতে হচ্ছে আমাদের। কৌশিককে বাদ দিয়ে টিম করতে হল। ক্লাস নাইনের কাছে চারটে গোল খেতে হল। সুব্রত ছাড়া ক্যারাম কম্পিটিশনে নামলে যা হওয়ার তাই হল। ক্লাস সেভেন ফার্স্ট রাউন্ডেই বাতিল। রাতুল পরপর দু’বার আন্তঃজেলা আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় মেডেল এনেছিল। এবার রাতুল বাদ, মেডেলও বাদ গেল। অঞ্জন ছিল বলে এঁকে দেয়—, আমরা দেওয়াল পত্রিকায় ফার্স্ট হয়ে আসছিলাম এতদিন। এবছর অঞ্জনকে দিয়ে আঁকানো গেল না, দেওয়াল পত্রিকায় আমরা লাস্ট হলাম। বাবলু আমাদের ক্লাসে সবথেকে ভাল অভিনয় করে। স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশনে সেই আমাদের ক্লাস থেকে প্রতিনিধিত্ব করে। এবার আর কেউ চান্স পেল না।

    পরপর এইসব ঘটনায় আমাদের ক্লাস সেভেনের মনোবল একেবারে ভেঙে পড়ল। যে ‘পাজি ছেলে’দের জন্য আমরা গর্ব অনুভব করতাম, তাদের একঘরে করে দিয়ে আমরাই সবকিছুতে পিছিয়ে যেতে থাকলাম। তবু আমাদের কিছু করার নেই। ক্লাস টিচারের হুকুমে আমরা ঐ পাঁচবন্ধুর সঙ্গে কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি।

    এরকম সময় একটা ঘটনা ঘটল। টানা তিনদিন মহান্তিবাবু এলেন না। আমরা খুশি। চারদিন হল, পাঁচদিন হল, ছ’দিন হল। মহান্তিবাবু এলেন না। আমরা দারুণ খুশি। সাতদিন হল, আটদিন হল তাও মহান্তিবাবুর দেখা নেই। আমাদের মধ্যে খুশির একেবারে বাঁধ ভেঙে পড়ল। আমরা ঠিক করলাম আরও দুদিন যদি উনি না আসেন তাহলে আমরা পিকনিক করতে যাব।

    পরদিন আমরা যখন ক্লাসে জটলা করে পিকনিকের মেনু তৈরি করছি তখন বাবলু হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল, “মহান্তিবাবুর খুব অসুখ করেছে। প্রচণ্ড জ্বর। বিছানায় শুয়ে ছটফট করছেন।”

    বলা বাহুল্য মহান্তিবাবুর অসুখ নিয়ে আমাদের কারোরই কোনও মাথাব্যথা নেই। পিন্টু বলল, “এ তো ভাল খবর। ভাল করে খোঁজ নিয়ে এসে বল তো দিন পনের আমরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারব কিনা?” তাপস বলল, “রোজ থাপ্পড় খেয়ে খেয়ে আমার ফোলা গালদুটো কেমন বসে গেছে। বয়ে গেছে আমার ওকে দেখতে যেতে।”

    বাকিরাও একমত হয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে পিকনিকের আলোচনায় মন দিল। আমরা ঠিক করলাম, বাবলু, কৌশিক, অঞ্জন, রাতুল, সুব্রতদেরও সঙ্গে নেব।

    পিকনিক খুব ভাল হল। খুব হৈচৈ হল। আলুর দমটা পুড়ে যাওয়াতে সবাই চেয়ে চেয়ে ওটাই খেতে লাগল। সবাই এসেছিল, আসেনি শুধু ঐ পাঁচজন। আমরা ভাবলাম, ওদের অভিমান হয়েছে।

    আরও সাতদিন বাদে মহান্তিবাবু এলেন। চুলগুলো আর খাড়া খাড়া নেই। তেল দিয়ে পাট করে আঁচড়ানো। খোঁচা খোঁচা দাড়ি নেই। পরিষ্কার করে কামানো। এমনকি চোখ দুটোও আর অত লাল নয়। ক্লাসে ঢুকে তিনি শান্তভাবে একগাল হেসে বললেন, “তোদের পিকনিকের খবরটা আমি জেনে ফেলেছি। কিন্তু তোরা তো জানতে পারিসনি, তোদের ক্লাসের ঐ পাঁচজন পাজি সাতদিন ধরে আমার সেবা করে আমাকে ভাল করে তুলেছে। মাস্টারমশাইয়ের অসুখ করেছে বলে পিকনিক করে তোরা নিজেদেরই লজ্জায় ফেলেছিস। আর ঐ পাঁচ পাজি লজ্জায় ফেলেছে আমাকে। তোদের লজ্জাটা দুঃখের। আমারটা আনন্দের।”

  • ফুলডুংরি

    ফুলডুংরি

    সেবার ঠিক হল, আমরা দেবুর ছোট পিসির বাড়িতে বেড়াতে যাব। বেশি দিনের জন্যে নয়, মাত্র দু’দিনের জন্যে। দুদিন ধরে খুব মজা হবে।

    দেবুর ছোটপিসি থাকেন ফুলডুংরিতে। দেবু বলেছে, “ওরকম সুন্দর জায়গা খুব কমই আছে।” ওখানে একটা চমৎকার পাহাড় আছে। ছোটখাটো পাহাড়। ইচ্ছে করলেই সেই পাহাড়টা বেয়ে একদম ওপরে উঠে যাওয়া যায়। আর ওই পাহাড় থেকে নেমে আসছে ফুটফুটে সাদা একটা ঝরনা। খুব গরমের সময়েও নাকি সেই ঝরনার জল একটুও শুকোয় না। সব থেকে বড় কথা হল, ওই ঝরনার দু’পাশে রয়েছে গাছের ঠান্ডা ঠাণ্ডা জঙ্গল। ওখানে পিকনিক করাটা নাকি একটা দারুণ ব্যাপার!

    এসব কথা অবশ্য আমরা দেবুর মুখেই শুনেছি, আমরা যারা পবনপুর উচ্চবিদ্যালয়ে ক্লাস সেভেনে পড়ি তারা তো কেউ কখনও ফুলডুংরিতে যাইনি। আমরা তাই জানিও না যে ফুলডুংরি সত্যি কেমন দেখতে। তবে দেবুর মুখ থেকে আমরা মাঝে মাঝেই ফুলডুংরির লোভনীয় গল্প শুনি। তাই এবার আমরা ক্লাসের কয়েকজন ঠিক করেছি ফুলডুংরিতে যাবই যাব।

    কিন্তু কে কে যাবে? এটা নিয়ে খুব গণ্ডগোল শুরু হল। আমরা তো এই ক্লাসে চল্লিশজন পড়ি, তার মধ্যে আটতিরিশজনই বলল, ‘আমি যাব।’

    দেবু এই শুনে একেবারে বেঁকে বসল। “না ভাই, এভাবে তো যেতে পারব না। আমার পিসিমার বাড়িতে দুটো ঘর, একটা বারান্দা, একটা ছাদ। আটতিরিশ জন কোথায় থাকবে!”

    মানস বলল, “তাহলে আমরা ছাদেই থাকব। বেশ মজা হবে।”

    দেবু বলল, “ছাদে লাফালাফি করলে তোমাদের মজা হতে পারে, কিন্তু আমার পিসিমা তাে ছাদের তলায় থাকবেন, তাঁর মােটেই মজা হবে না। খুব বেশি হলে চারজন যেতে পারে।”

    দেবুর এই কথা শুনে আমরা আঁতকে উঠলাম।

    মোটে চারজন!

    দেবু বলল, “হ্যাঁ, মোটে চারজনই। আমাকে নিয়ে পাঁচজন। এবার তোমরা নিজেরা ঠিক কর কে কে যাবে।”

    এই কথা ঘোষণা করে দেবু গম্ভীর মুখে পাটিগণিতের বই খুলে বিড় বিড় করে কী সব পড়তে লাগল।

    এবার যে ঘটনা ঘটবার সেটাই ঘটল। পবনপুর উচ্চবিদ্যালয়ের ক্লাস সেভেনের ছেলেদের মধ্যে ভীষণ রকম হট্টগোল বেধে গেল। সকলেই ফুলডুংরি যেতে চাইল। এমনকি প্রথমে যে দু’জন ‘যাব না’ বলেছিল তারাও বলল, “যাব’!

    সত্যি কথা বলতে কী অমন সুন্দর জায়গায় বেড়াতে গেলে কাকে বাদ দিয়ে কাকে নেওয়া হবে? পাহাড়, ঝরনা, জঙ্গলে যেতে তো সবাই চাইবেই, সে আর আশ্চর্যের কী! তার ওপর আবার নাকি দুপুরবেলা ওই ঝরনা থেকে জলের কণা চারিদিকে উড়ে বেড়ায়। কেউ ওখানে গেলে তার চোখেমুখে এসে লাগে। এই গল্প দেবু আমাদের সকলকে করেছে। ওই তো যত নষ্টের গোড়া। ও আরও বলেছে যে, ওই সময়টা নাকি পাহাড়ের সারা গা কৃষ্ণচুড়া ফুলে লাল হয়ে থাকে। বিকেলের ঝোড়ো হাওয়ায় সেই ফুল উড়ে এসে ঝরনার জলে পড়ে। তখন মনে হয় ঐ ঝরনাটা জলের নয়, ফুলের ঝরণা। ঝরনাটার এমনি নাম তো ডুংরি, আর ওইরকম ফুল পড়ে বলে নাম হয়েছে ফুলডুংরি। আর এসব তো আমরা কোন বইতে পড়িনি, আমাদের দেবুই বলেছে। সেই কারণেই তো সবাই ওখানে যেতে চাইছে।

    রবীন বলল, “তাহলে আমরা হেডস্যারকে বলি যে আপনি বেছে দিন কোন চারজন দেবুর সঙ্গে যাবে।”

    বিষ্ণু বলল, “তার থেকে আমাদের ক্লাসটিচার বিমানবাবুকে বলি।”

    শুভাশিসের মত হল, “দেবুই ঠিক করুক কাকে ও সঙ্গে নেবে।”

    শেষ পর্যন্ত কিন্তু কোন কথাই শোনা হল না।

    দুদিন কেটে গেল। তার মধ্যে দেবু আমাদের ক্লাসের অনেকের কাছে অনেকরকম উপহার পেল। এই যেমন ভুটানের তিনকোনা স্ট্যাম্প, এক বছরের বাঁধানো অরণ্যদেব, শচীন তেণ্ডুলকরের ছবি—এইসব।

    দেবু এই দুদিন ফুলডুংরি সম্পর্কে আরও দুটো তথ্য ক্লাসের সবাইকে জানিয়েছে। এক নম্বর হল, ফুলডুংরি ঝরনার ভেতর এমন চমৎকার করে পাথর সাজানো আছে যে, যেখানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্নান করা যায়। আর, দু নম্বর তথ্যটা হল, ওর ছোটপিসির বাড়িতে একটা নীল রঙের দুর্দান্ত তাঁবু আছে, ইচ্ছে করলে সেটাকে জঙ্গলের মধ্যে টাঙিয়ে সারা দিন থাকা যায়।

    এই তথ্য দুটো জানানোর পর দেবুকে কেউ হজমির প্যাকেট দিল, কেউ ওর অ্যাকোরিয়ামের জন্য রঙিন মাছ এনে দিল শিশি করে, কেউ ঘুড়ি এনে দিল।

    সবই দেবু গম্ভীর মুখে নিল। কিন্তু চারজনের বেশিতে কিছুতেই রাজি হল না। শুধু বলল, “তোমরা এবার ঠিক করে নাও কে কে যাবে। আমরা রবিবার ভোরে রওনা হচ্ছি। ছোট পিসিকে সেইমত চিঠি লিখে দিয়েছি।”

    একথা শুনে তো ক্লাসে লাফালাফি শুরু হয়ে গেল। হাতে মাত্র কটা দিন। এর মধ্যে পঁয়ত্ৰিশ জনকে বাদ দিতে হবে!

    ফুলডুংরি যাওয়া নিয়ে ক্লাস সেভেনের ছেলেদের মধ্যে যে খুব ঝগড়া লেগেছে সে কথা পবনপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সকলে জেনে ফেলল। কোন কোন ক্লাসের ছেলেরা ঠাট্টা করতেও শুরু করল।

    এই নিয়ে আমাদের অনুপমের সঙ্গে এইটের সুপ্রিয়র একদিন হাতাহাতি পর্যন্ত হয়ে গেল। শুক্রবার দেবু স্কুলে এসে বলল, “কাল আমি স্কুলে আসব না। গোছগাছ করতে হবে। তোমরা যে চারজন আমার সঙ্গে যাবে রবিবার ভোরে স্টেশন চলে যাবে। ট্রেনে করে আমরা চলে যাব রসুইনগর, সেখান থেকে বাসে পটাসের হাট, পটাসের হাট থেকে ভ্যানরিকশায় আধঘণ্টা ফুলডুংরি। বিকেলের আগেই পৌঁছে যাব। সেদিন কেউ যেন দেরি কোরো না। চারজনই ঠিক সময়ে চলে এসো। ছটা পঞ্চান্নর ট্রেন ধরতে না পারলে দেরি হয়ে যাবে। পিসিমা আবার লুচি-আলুর দম তৈরি করে বসে থাকবেন কিনা।”

    দেবুর এই কথাগুলো আমাদের কানে যেন বিষ ঢেলে দিল, গায়ে যেন কাঁটা বিঁধিয়ে দিল। শনিবার দিন হাফ ছুটির পর আমরা ক্লাসের উনচল্লিশ জন মিটিঙে বসলাম।

    প্রণব বলল, “কোন চারজন যাবে ঠিক করতে হবে এখনই। আর সময় নেই।”

    পিন্টু বলল, “তা হবে না। গেলে আমরা সবাই যাব।”

    অশোক বলল, “ঠিক কথা। কেউ বাদ যাবে না। ফুলডুংরির মত সুন্দর জায়গায় আমরা সবাই বেড়াতে যেতে চাই।”

    বিষ্ণু বলল, “একশো ভাগ ঠিক। হয় সবাই যাবে, নয় কেউ যাবে না।”

    মানস বলল, “সবাইকে তো দেবু নিয়ে যাবে না।”

    রথীন বলল, “ফুলডুংরি কি দেবুর জায়গা যে ও ঠিক করবে ক’জন যাবে?”

    শুভাশিস বলল, “আমরা তো ফুলডুংরি চিনি না। আর চিনে যদিবা পৌঁছেই, সেখানে গিয়ে এতজন থাকবে কোথায়? এতজন মিলে তো আর গাছতলায় থাকা যায় না? তাছাড়া বাড়ি থেকে ওরকমভাবে ছাড়বেই বা কেন?”

    এমন সময় সোমনাথের মাথায় কী যেন পরিকল্পনা এল। সে লাফিয়ে উঠল। বলল, “হুররে! আইডিয়া পাওয়া গেছে। আমরা সবাই যাব। সক্কলে কাল চলে আয় স্টেশনে। দেবুর আগেই আমরা ট্রেন ধরব।”

    সোমনাথের কথা শুনে আমরা জোর ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। কিন্তু ও আর একটা কথাও না বলে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল।

    এরপরের ঘটনাটা একেবারে রোমাঞ্চকর। সেটা এরকম–

    রবিবার সকালে সোমনাথের নেতৃত্বে একদল ছেলে ঝপাং করে ট্রেনে উঠে পড়লাম। এক একটা করে স্টেশন আসে আর সোমনাথ জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে এদিক ওদিক তাকায়। এরকম করে ঘণ্টা দুই পরে হঠাৎ সোমনাথ একটা স্টেশনে বলল, “এই নেমে আয়, নেমে আয়, এসে গেছি।”

    আমরা তো অবাক! এত তাড়াতাড়ি এসে গেল! তবু নেমে পড়লাম হই হই করে।

    স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। দুএকটা দোকান-বাজার। পেরিয়ে গেলাম তাও। তার পরই মাটির রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে আমরা বেসুরো গলায় গান গাইতে গাইতে গেলাম। কিছুটা দূরে যেতেই একেবারে খোলা একটা ধু-ধু মাঠ। উঁচু একটা টিবি। যতদূর চোখ যায় বাড়ি-ঘর কিছু নেই। শুধু এখানে ওখানে বড় বড় কতকগুলো গাছ, ঝাঁকড়া মাথা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা একছুটে ঐ টিবির ওপরে উঠলাম। ওমা! টিবির পিছনে একটা পুকুর লুকিয়ে আছে! আর সেটার টলমলে জলে একদল হাঁস এমনভাবে সাঁতার কাটছে যেন ওরা সবাই ওই পুকুরটার রাজা!

    প্ৰণব ‘ফ্যানটাসটিক!’ বলে ওই পুকুর পাড়েই একটা ডিগবাজি খেল। রথীন ‘দুর্দান্ত!’ বলে এক চক্কর দৌড় দিয়ে এল মাঠে। মানস “বাঃ! বাঃ! বলে তরতরিয়ে উঠে গেল গাছ বেয়ে।”

    সোমনাথ টিবির মাথায় উঠে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেওয়ার কায়দায় বলল, “বন্ধুগণ, এই হল আমাদের ফুলডুংরি। দেবুর একার ফুলডুংড়িতে ঝরনা পাহাড়, জঙ্গল আছে, আর আমাদের সকলের ফুলডুংরিতে মাঠ, পুকুর গাছ আর আকাশ আছে। এই ফুলডুংরিটা কম কিসের?”

    আমরা সবাই মিলে বলে উঠলাম ‘একটুও না।’

    এরপর সারাদিন আমরা ফুলডুংরির মাঠে খেললাম, পুকুরে সাঁতার কাটলাম, গাছে চড়লাম, চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশ দেখলাম, পাখির ডাক শুনলাম, টিফিনবক্স খুলে ভাল করে খেলাম। তারপর সন্ধেবেলায় ট্রেন ধরে পবনপুর ফিরে এলাম।

    আমরা ট্রেনে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ঠিক করেছি যে পরেরবার আমরা অন্য আর একটা ফুলডুংরিতে যাব। আর দেবুকে জোর করে নিয়ে যাব।

  • প্রধান অতিথি

    প্রধান অতিথি

    এই বছর থেকে আর আমাদের পবনপুর উচ্চবিদ্যালয়ের বার্ষিক অনুষ্ঠানে কোনও ‘প্রধান অতিথি’ থাকবে না। একথা শুনে অনেকেরই হয়ত মন খারাপ হয়ে যাবে, বিশেষ করে আমাদের এই এলাকায় যেসব মান্যিগণ্যি ব্যক্তিরা আছেন, আগামী দিনে ‘প্রধান অতিথি’ হওয়ার সুযোগ যাঁদের ছিল তারা যে যথেষ্ট কষ্ট পাবেন তা আমরা জানি। তবু এই সিদ্ধান্তের জন্য আমরা, পবনপুর উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র এবং মাস্টারমশাইরা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি। সত্যি কথা বলতে কী, অনেক দুঃখ কষ্ট, অনেক মাথার ঘাম পায়ে ঝরানোর পর আমাদের স্কুল এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হল। আমরা বিশ্বাস করি, দুএকটা ঘটনার কথা খুলে বললেই পবনপুরের বেশিরভাগ মানুষই আমাদের স্কুলের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবেন।

    আর পাঁচটা স্কুলের মত, আমাদের স্কুলেও প্রতিবছর ‘বার্ষিক অনুষ্ঠান’ হয়। বেশ ধুমধাম করেই হয়। স্কুলের পিছনের দিকে প্যান্ডেল খাটানো হয়। স্টেজ তৈরি হয়। সারি দিয়ে চেয়ার পাতা হয়। বিকেল চারটে বাজতে না বাজতে ভূগোল স্যার আদিত্যবাবু গলা কাঁপিয়ে মাইকে বলতে থাকেন, নমস্কার, অদ্য বৈকাল পাঁচ ঘটিকায়–।

    পরীক্ষায় যেসব ছাত্র ফার্স্ট, সেকেণ্ড হয় তাদের প্রাইজ দেওয়াই এই অনুষ্ঠানের মুখ্য উদ্দেশ্য। এছাড়া নাটক, গান, আবৃত্তি, হাস্যকৌতুক, ম্যাজিক—এইসব হয়। সব মিলিয়ে আমাদের দারুণ মজা। সব ছাত্রই কম বেশি জড়িয়ে পড়ি। যারা প্রাইজ পাই না, নাটক, গানেও চান্স পাই না তারা সব ভলান্টিয়ার হই। বুকে নীল ব্যাজ আটকাই। অনুষ্ঠান শেষে ব্রাউন পেপারের ঠোঙায় একটা নিমকি, একটা অমৃতি, একটা করে দানাদার পাই। প্রতি বছরই এইসব ঠিক থাকে। শুধু গণ্ডগোল হত ‘প্রধান অতিথি’ নিয়ে। আসলে ‘প্রধান অতিথি’ করে কাকে আনা হবে, তার জন্য স্কুলে একটা কমিটি ছিল। ‘প্রধান অতিথি’ কমিটি। এই কমিটিতে পবনপুরের কয়েকজন বড় বড় লোক আর কয়েকজন মাস্টারমশাই ছিলেন। অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে এই কমিটির মিটিং হত। সেখানে প্ৰচণ্ড ঝগড়া হওয়ার পর প্রধান অতিথির নাম ঠিক হত। সেই কমিটিতে একবার এমন ঝগড়া হয়েছিল যে, দু’জনকে প্রধান অতিথি করতে হয়েছিল। সেবার অনুষ্ঠানের কয়েকদিন পরেই পবনপুর মিউনিসিপ্যালিটির ভোট ছিল। মাধব গড়গড়ি, বলাই পাল দুজনে সেই ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। আমাদের কমিটিতে দুই দলেরই সমর্থক ছিলেন। একদল বললেন, “মাধববাবুকে চাই।” একদল বললেন, “বলাইবাবুকে আনতে হবে।”

    অগত্যা দু’জনেই এলেন। অনুষ্ঠান শুরুতে মাধববাবু বললেন, “আমি যদি ভোটে জিতি তাহলে এই স্কুলের প্রতি ক্লাসে যাতে ২০ জন ২৫ জন করে ফার্স্ট হয় তার ব্যবস্থা করব।” অনুষ্ঠানের শেষে বলাইবাবু বললেন, “আমি যদি একবার ভোটে জিতে পারি তাহলে শুধু ফার্স্ট সেকেণ্ড হওয়া ছাত্র নয়, ফেল করা ছাত্ররাও যাতে প্রাইজ পায় তার ব্যবস্থা করে ছাড়ব।” এক বছর ‘প্রধান অতিথি’ করে নিয়ে আসা হল ব্যায়ামবীর তপেশরঞ্জন মল্লিককে। তিনি ভাষণ দেওয়ার বদলে মঞ্চে উঠে বাইসেপ আর ট্রাইসেপের খেলা দেখালেন। পাটভাঙা ধুতি-পাঞ্জবি পরা, গলায় মালা ঝোলানো প্রধান অতিথি ব্যায়াম দেখাচ্ছেন-একটা দৃশ্য হয়েছিল বটে। গেলবারের আগেরবার কমিটির মিটিংয়ে জগদীশ নস্কর খুব কান্নাকাটি করে বললেন, “আমার মামাতো ভাই ভুটু মল্লিককে আপনারা এবার চান্স দিন। সে বেচারি কখনও ‘প্রধান অতিথি’ হয়নি।” জগদীশবাবু এ অঞ্চলে বিশেষ নামকরা মানুষ। তার দুটো পুকুর, তিনটে লরি আছে। সুতরাং তঁর কথা ফেলা যায় না। কমিটির অন্যরা বললেন, “আপনার মামাতো ভাইয়ের বায়োডাটা কী? আমন্ত্রণপত্রে কী লেখা হবে?” জগদীশবাবু চোখের জল মুছে একগাল হেসে বললেন, “ভুটু রেডিওতে হারমোনিয়াম বাজায়।”

    তাই হল। আর আমরা সেবছর নিমকি, দানাদারের সঙ্গে ঠোঙায় একটা করে সন্দেশ পেলাম জগদীশবাবুর আয়োজনে। তবে ব্যায়ামবীরের মত ইনিও যদি ভাষণের বদলে হারমোনিয়াম বাজিয়ে শোনান এই ভয়ে স্টেজের ধারে কাছে সেবার কোনও হারমোনিয়াম রাখা হয়নি।

    বিচ্ছিরি কাণ্ড হল গতবছর। ‘প্রধান অতিথি’ কমিটির সকলে একমত হলেন, এবার আনা হবে কবি নিমাইচাঁদ গুপ্তকে। দুজনে কলকাতায় ছুটে গিয়ে অনেক কষ্টে কবিকে রাজি করালেন। অনুষ্ঠানের দিন সকালে খুব বিরক্ত মুখে তিনি পবনপুরে এসে হাজির হলেন। অত বড় কবি বলে কথা! আমাদের সামান্য স্কুলের অনুষ্ঠানে তাঁকে ডেকে আনাটা যে খুব অন্যায় হয়েছে, সেকথা তিনি বারবার হাবেভাবে বোঝাতে লাগলেন। বিমান স্যারের বাড়িতে তাঁকে রাখা হল। সবাই তো খুব ভয়ে ভয়ে আছে। পাছে যত্নে কোনও ত্রুটি হয়। স্কুলের নাম ডুববে তাহলে। দুপুরে কবি মাছের মাথা দিয়ে ডাল, মাংস, চাটনি খেয়ে বললেন, “এবার আমি একটু চোখ বুজে কবিতা ভাবব। সেই ব্যবস্থাই হল।”

    সন্ধেবেলা প্ৰধান অতিথিকে দেখবার জন্য আমাদের প্যান্ডেল একেবারে উপচে পড়ল। গিলে করা পাঞ্জাবি আর কোঁচানো ধুতি পরে কবি বসে আছেন মঞ্চে। ভুরভুর করছে সেন্টের গন্ধ। এত নামকরা কাউকে পবনপুরের লোক আগে কখনও দেখেনি। সবাই কান পেতে আছে। উনি কী বলেন তা শোনার জন্য। ভাষণ দিতে উঠে কবি বললেন, “আমি আপনাদের সামনে কী বলব? আমার কথা আপনারা বুঝতে পারবেন না। তার থেকে আমার লেখা একটা কবিতা বলছি।

    শুনুন। দেখুন যদি বুঝতে পারেন।”

    চোখ বুজে তিনি আবৃত্তি শুরু করলেন, “আজি এ প্ৰভাতে রবির কর, কেমন পশিল প্ৰাণের পর—”

    ক্লাস সিক্সের নন্টে বসেছিল স্টেজের সামনে মাটিতে। সে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে চেঁচাতে লাগল, “এ মা, স্যার, টুকলিফাই, টুকলিফাই। রবি ঠাকুরের কবিতা টুকলিফাই করেছে স্যার।” সেবছরই ছিল আমাদের শেষ “প্রধান অতিথি” আনা।

  • রিহার্সাল ছাড়া

    রিহার্সাল ছাড়া

    সে বছর আমাদের বার্ষিক অনুষ্ঠানে এক বিপত্তি ঘটেছিল। ঘটনাটা বলি–

    অন্য বছরের মত সেবারও ঠিক হল যে, বাৎসরিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের সঙ্গে আবৃত্তি, গান, হাস্যকৌতুক আর নাটক হবে। একমাস আগে নোটিস বোর্ডে ভুগোলের স্যার বিকাশবাবু আর ইংরেজির স্যার শম্ভুবাবুর সই করা নোটিস লাগিয়ে দেওয়া হল–’যারা যারা বার্ষিক অনুষ্ঠানে নাটক, গান, আবৃত্তি ইত্যাদি করতে চাও তারা আমাদের কাছে নাম জমা দাও।”

    প্রতি বছরের মত এবারও নাম জমা দেওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। এক একটা ক্লাস থেকে যে কত নাম জমা পড়ল তার কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই।

    বিকাশবাবু আর শম্ভুবাবু বললেন, যত নাম জমা পড়েছে সবাইকে যদি অনুষ্ঠানে নিতে হয়, তাহলে সেদিন আমাদের নাকি পাঁচশো সাতান্নটা গান, সাতশো দশটা আবৃত্তি, বিয়াল্লিশটা নাটকের ব্যবস্থা করতে হবে। আর সে তো একদিন হবে না, টানা পনেরো দিন ধরে করতে হবে। কিন্তু সে তো আর সম্ভব নয়। তাই ঠিক হল পরীক্ষা হবে। সেখানে গোনাগুনতি যে ক’জন পাস করবে তারাই অনুষ্ঠানে অংশ নেবে।

    সেই পরীক্ষার দিনও এক এলাহি কাণ্ড হল। টিফিনের পর স্কুল ছুটি হয়ে গেল। অনেকের বাবা-মা পর্যন্ত চলে এলেন। স্কুলের সামনে ডাব বিক্রি হতে লাগল। স্কুলের বাইরে গাছের ছায়ায় মাঠের এক কোণে দেখা গেল কেউ হাত-পা নেড়ে ‘সোনার তরী” আওড়াচ্ছে, কেউ বা ‘অবাক জলপান’-এর পার্ট মুখস্থ করছে। ক্লাস সিক্সের প্রতুল তো। কপালে দইয়ের ফোঁটা লাগিয়ে চলে এসেছে!

    যাই হোক, উৎকণ্ঠা একসময় শেষ হল। পরীক্ষা হয়ে গেল। অত আবৃত্তি, গান আর নাটকের পার্ট শুনে বিকাশবাবু অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে দুদিন ছুটি পর্যন্ত নিতে হল। তবে দুদিন পরেই নোটিস বোর্ডে ফাইনাল তালিকা ঝুলিয়ে দেওয়া হল। সেই ভাগ্যবানদের নিয়ে বিকাশবাবু আর শম্ভুবাবু জোরকদমে রিহার্সাল শুরু করে দিলেন। আর যারা চান্স পেল না তাদের সব ভলেন্টিয়ার করে দেওয়া হল। বলা হল, অনুষ্ঠানের দিন তোমরা তাড়াতাড়ি এসে বুকে ব্যাজ আটকে তৈরি থাকবে।

    দেখতে দেখতে দিন চলে এল। আগের দিন, সব কিছু রেডি। সন্ধেবেলা স্টেজ রিহার্সাল হল। সেই সঙ্গে সঙ্গে হল প্রচুর খাওয়া-দাওয়া।

    এই খাওয়াই যে ভয়ানক বিপদ ডেকে আনবে কে বুঝেছিল?

    অনুষ্ঠান শুরুর দশ মিনিট বাকি। বিকাশবাবু আর শম্ভুবাবু ছুটোছুটি করছেন। কী ব্যাপার? কেউ আসেনি। উদ্বোধনী সঙ্গীতের বিকাশ, বাবলু, অজয় আসেনি। আসেনি আবৃত্তির মলয় হলধর, সুব্রত। গানের দ্বিজু, ব্ৰতীশ, অমিয় নেই। নেই নাটকের তাপস, বিনয়, দেবু, সুপ্রিয়রা। কী হল! কারোর পেট ব্যথা, কারোর হজমের গণ্ডগোল, কারোর বমি, কারোর চোঁয়া ঢেকুর, কারোর মাথা ঝিমঝিম।

    মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন বিকাশবাবু। শম্ভুবাবু কিন্তু ঘুরে ঘুরে ছাত্রদের ডেকেডেকে সব কী জানি বলতে লাগলেন। ছাত্ররা জটলা করে তাঁর কথা শুনতে লাগল আর খুব মাথা নাড়তে লাগল।

    আশ্চর্য ঘটনা হল ঠিক সময়তে স্টেজের পর্দা সরে গোল শম্ভুবাবুর নির্দেশে!

    শুধু হল অনুষ্ঠান! কথা ছিল উদ্বোধনী সঙ্গীত হবে কোরাসে। গাইবে ক্লাস এইটের ছেলেরা। বদলে ক্লাস সিক্সের তপন একাই গাইল, “এই লভিনু সঙ্গ তব।’ তালে একটু গণ্ডগোল হল বটে। কিন্তু সে কিছু নয়। এরপর আবৃত্তি। ক্লাস সেভেনের হলধর গলা কাঁপিয়ে ‘আফ্রিকা’ করবে বলে ঠিক ছিল। বদলে ক্লাস সেভেনেরই তমাল বলল, “শুনতে পেলুম পোস্তা গিয়ে।” একটু ভুলে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু শেষে হাততালি পেল অনেক। ঠিক এরকমভাবেই আরও বেশ কয়েকটা আবৃত্তি, গান হল। দুজন তো দু লাইন করে গান গেয়ে বাকিটা ভুলেই গেল। তাতে অনুষ্ঠান আরও জমে উঠল। সবথেকে বড় আশ্চর্যের ঘটনা ঘটাল ক্লাস এইটের ছেলেরা। তারা ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল” নাটকটাও করে ফেলল। মেকআপ ছাড়াই। বিকাশবাবু আর শম্ভুবাবু আড়াল থেকে প্রম্পট করলেন আর ওরা তা শুনে শুনে দুর্দান্ত অভিনয় করল। কখনও হয়ত জাম্বুবানের পার্ট হনুমান বলে ফেলল, কখনও হয়ত রাম পার্ট ভুলে জিভ কাটল। কিন্তু এতে মজা একটুও কমল না, উল্টে বাড়ল।

    সেদিন রিহার্সাল ছাড়া অনুষ্ঠান এত হাততালি পেয়েছিল যে সেই আওয়াজ অনেক দূর পর্যন্ত শোনা গিয়েছিল।