Author: তাহের আলমাহদী

  • ভূমিকা

    ভূমিকা

    উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্দ্ধে বঙ্গভারতীর একজন কৃতী অথচ অলস ও অসাবধান সাধক বঙ্কিমাগ্রজ সঞ্জীবচন্দ্রের অন্যতম সার্থক এবং সুসমঞ্জস রচনা “পালামৌ”—বস্তুতঃ আধুনিক কাল পর্য্যন্ত তাঁহার সাহিত্যকীর্ত্তি এই “পালামৌ”কে কেন্দ্র করিয়াই প্রতিষ্ঠিত আছে। এই কারণে সঞ্জীবচন্দ্রের এই রচনাটিই আমরা পুনঃপ্রকাশিত করিলাম।

    “পালামৌ” সঞ্জীবচন্দ্র-সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শনে’ সর্ব্বপ্রথম ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। লেখকের আসল নাম ছিল না; “প্র. না. ব.” এই ছদ্ম নাম ব্যবহৃত হইয়াছিল। ১২৮৭ বঙ্গাব্দের পৌষ-সংখ্যায় আরম্ভ, ১২৮৯ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে ‘বঙ্গদর্শনে’ ইহা সমাপ্ত হয়। প্রকাশের ক্রম এইরূপঃ ১২৮৭, পৌষ, পৃ. ৪১২-১৯; ফাল্গুন, পৃ. ৫১৩-১৯; ১২৮৮ আষাঢ়, পৃ. ১৩৫-৩৯; শ্রাবণ, পৃ. ১৬৫-৭১; আশ্বিন, পৃ. ২৮১-৮৬; ১২৮৯, ফাল্গুন, পৃ. ৫১৪-১৭। “পালামৌ” সঞ্জীবচন্দ্রের জীবৎ-কালে স্বতন্ত্র পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় নাই। তাঁহার মৃত্যুর পর বঙ্কিমচন্দ্র ‘সঞ্জীবনী সুধা’ নাম দিয়ে সঞ্জীবচন্দ্রের রচনার যে সঙ্কলন প্রকাশ করেন, তাহাতেই “পালামৌ” সর্ব্বপ্রথম পুস্তকাকারে মুদ্রণগৌরব লাভ করে। দুঃখের বিষয়, অনবধানবশতঃ ‘সঞ্জীবনী সুধা’তে অনেক মুদ্রাকর-প্রমাদ ঘটিয়া স্থানে স্থানে অর্থ বোইকল্য ঘটিয়াছে এবং যে-কোন কারণেই হোক ‘বঙ্গদর্শনে’ প্রকাশিত সর্ব্বশেষ অংশ স্থান পায় নাই। বসুমতি-সংস্করণ সঞ্জীব-গ্রন্থাবলিতে ‘সঞ্জীবনী সুধা’র পাঠই অনুসৃত হইয়াছে। সুতরাং আমরাই সর্ব্বপ্রথম সম্পূর্ণ “পালামৌ” পুস্তকাকারে প্রকাশ করিলাম, ইহা বলা চলে। আমরা ‘বঙ্গদর্শনে’র পাঠ গ্রহণ করিয়াছি।

    সঞ্জীবচন্দ্রের জীবনী বঙ্কিমচন্দ্র লিখিয়াছেন, বঙ্কিম-রচনাবলীর “বিবিধ” খণ্ডে তাহা প্রকাশিত হইয়াছে। সঞ্জীবচন্দ্রের প্রচলিত গ্রন্থাবলীর সঙ্গেও তাহা সচরাচর যুক্ত দেখা যায়। বঙ্কিমচন্দ্রের পরও আরও উপকরণ সঞ্জীবচন্দ্রের জীবনী সম্পর্কে যাহা পাওয়া গিয়াছে, বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ কর্তৃক প্রকাশিত “সাহিত্য-সাধক-চরিতমালা”র ‘সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ পুস্তকে তাহা সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। সঞ্জীবচন্দ্রের গ্রন্থপঞ্জীও উহাতে দেওয়া হইয়াছে।

    বঙ্কিমচন্দ্রের মত আমরাও মনে করি, “তিনি যে এ পর্য্যন্ত বাঙ্গালা সাহিত্যে আপনার উপযুক্ত আসন প্রাপ্ত হয়েন নাই, তাহা যিনি তাঁহার গ্রন্থগুলি যত্নপূর্ব্বক পাঠ করিবেন, তিনিই স্বীকার করিবেন। কালে সে আসন প্রাপ্ত হইবেন”। এই ভরসা লইয়াই আমরা তাঁহার একটি শ্রেষ্ঠ রচনা পুনঃপ্রকাশ করিলাম। এ যুগের পাঠকেরা এই রচনা হইতেই সঞ্জীবচন্দ্রের সাহিত্যকীর্ত্তি সম্বন্ধে সচেতন হইবেন বলিয়া আমাদের বিশ্বাস।

    চন্দ্রনাথ বসু “পালামৌ” সম্বন্ধে লিখিয়াছেন:

    …উপন্যাস না হইয়াও পালামৌ উৎকৃষ্ট উপন্যাসের ন্যায় মিষ্ট বোধ হয়। পালামৌর ন্যায় ভ্রমণকাহিনী বাঙ্গালা সাহিত্যে আর নাই। আমি জানি উহার সকল কথাই প্রকৃত, কোন কথাই কল্পিত নয়। কিন্তু মিষ্টতা মনোহারিত্বে উহা সুরচিত উপন্যাসের লক্ষণাক্রান্ত ও সমতুল্য।

    রবীন্দ্রনাথ তাঁহার ‘আধুনিক সাহিত্যে’ সঞ্জীবচন্দ্রের “পালামৌ” সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করিয়াছেন। এই আলোচনা সকলের পাঠ্য। আমরা নিম্নে সেই আলোচনা হইতে কিয়দংশ উদ্ধৃত করিয়া এই ভূমিকা সমাপ্ত করিতেছি। রবীন্দ্রনাথ লিখিয়াছেন:

    পালামৌ ভ্রমণবৃত্তান্তের মধ্যে সৌন্দর্য্যের প্রতি সঞ্জীবচন্দ্রের যে একটি অকৃত্রিম সজাগ অনুরাগ প্রকাশ পাইয়াছে এমন সচরাচর বাংলা লেখকদের মধ্যে দেখা যায় না। সাধারণত আমাদের জাতির মধ্যে একটি বিজ্ঞবার্দ্ধক্যের লক্ষণ আছে—আমাদের চক্ষে সমস্ত জগৎ যেন জরাজীর্ণ হইয়া গিয়াছে। সৌন্দর্য্যের মায়া-আবরণ যেন বিস্রস্ত হইয়াছে—এবং বিশ্বসংসারের অনাদি প্রাচীনতা পৃথিবীর মধ্যে কেবল আমাদের নিকটই ধরা পড়িয়াছে। সেই জন্য অশন বসন ছন্দ ভাষা আচার ব্যবহার বাসস্থান সর্ব্বত্রই সৌন্দর্য্যের প্রতি আমাদের এমন সুগভীর অবহেলা। কিন্তু সঞ্জীবের অন্তরে সেই জরার রাজত্ব ছিল না। তিনি যেন একটি নূতনসৃষ্ট জগতের মধ্যে একজোড়া নূতন চক্ষু লইয়া ভ্রমণ করিতেছেন। “পালামৌ”তে সঞ্জীবচন্দ্র যে, বিশেষ কোনো কৌতূহলজনক নূতন কিছু দেখিয়াছেন, অথবা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে কিছু বর্ণনা করিয়াছেন তাহা নহে, কিন্তু সর্ব্বত্রই ভালবাসিবার ও ভালো লাগিবার একটা ক্ষমতা দেখাইয়াছেন। “পালামৌ” দেশটা সুসংলগ্ন সুস্পষ্ট জাজ্বল্যমান চিত্রের মতো প্রকাশ পায় নাই, কিন্তু যে সহৃদয়তা ও রসবোধ থাকিলে জগতের সর্ব্বত্রই অক্ষয় সৌন্দর্য্যের সুধাভাণ্ডার উদ্ঘাটিত হইয়া যায় সেই দুর্লভ জিনিসটি তিনি রাখিয়া গিয়াছেন, এবং তাঁহার হৃদয়ের সেই অনুরাগপূর্ণ মমত্ববৃত্তির কল্যাণকিরণ যাহাকেই স্পর্শ করিয়াছে—কৃষ্ণবর্ণ কোলরমণীই হৌক্‌, বনসমাকীর্ণ পর্ব্বতভূমিই হৌক্‌, জড় হৌক্‌, চেতন হৌক্‌, ছোট হৌক্‌, বড় হৌক্‌ সকলকেই একটি সুকোমল সৌন্দর্য্য এবং গৌরব অর্পণ করিয়াছে।
    লেখক যখন যাত্রা আরম্ভকালে গাড়ি করিয়া বরাকর নদী পার হইতেছেন এমন সময় কুলীদের বালকবালিকারা তাঁহার গাড়ি ঘিরিয়া “সাহেব একটি পয়সা” “সাহেব একটি পয়সা” করিয়া চীৎকার করিতে লাগিল—লেখক বলিতেছেন “এই সময় একটি দুই বৎসর বয়স্ক শিশু আসিয়া আকাশের দিকে মুখ তুলিয়া হাত পাতিয়া দাঁড়াইল। কেন হাত পাতিল তাহা সে জানে না, —সকলে হাত পাতিয়াছে দেখিয়া সেও হাত পাতিল। আমি তাহার হস্তে একটি পয়সা দিলাম, শিশু তাহা ফেলিয়া দিয়া আবার হাত পাতিল; অন্য বালক সে পয়সা কুড়াইয়া লইলে শিশুর ভগিনীর সহিত তাহার তুমুল কলহ বাধিল।”

    সামান্য শিশুর এই শিশুত্বটুকু, তাহার উদ্দেশ্যবোধহীন অনুকরণবৃত্তির এই ক্ষুদ্র উদাহরণটুকুর উপর সঞ্জীবের যে-একটি সকৌতুক স্নেহহাস্য নিপতিত রহিয়াছে সেইটি পাঠকের নিকট রমণীয়;—সেই একটি উল্টা-হাতপাতা ঊর্দ্ধমুখ অজ্ঞান লোভহীন শিশু ভিক্ষুকের চিত্রটি সমস্ত শিশুজাতির প্রতি আমাদের মনের একটি মধুররস আকর্ষণ করিয়া আনে।

    দৃশ্যটি নূতন এবং অসামান্য বলিয়া নহে পরন্তু পুরাতন এবং সামান্য বলিয়াই আমাদের হৃদয়কে এরূপ বিচলিত করে। শিশুদের মধ্যে আমরা মাঝে মাঝে ইহারই অনুরূপ অনেক ঘটনা দেখিয়া আসিয়াছি, সেইগুলি বিস্মৃতভাবে আমাদের মনের মধ্যে সঞ্চিত ছিল;—সঞ্জীবের রচিত চিত্রটি আমাদের সম্মুখে খাড়া হইবামাত্র সেই সকল অপরিস্ফুট স্মৃতি পরিস্ফুট হইয়া উঠিল এবং তৎসহকারে শিশুদের প্রতি আমাদের স্নেহরাশি ঘনীভূত হইয়া আনন্দরসে পরিণত হইল।…

    সঞ্জীব বালকের ন্যায় সকল জিনিস সজীব কৌতুহলের সহিত দেখিতেন এবং প্রবীণ চিত্রকরের ন্যায় তাহার প্রধান অংশগুলি নির্ব্বাচন করিয়া লইয়া তাঁহার চিত্রকে পরিস্ফুট করিয়া তুলিতেন এবং ভাবুকের ন্যায় সকলের মধ্যেই তাঁহার নিজের একটি হৃদয়াংশ যোগ করিয়া দিতেন।

  • প্রথম প্রবন্ধ

    প্রথম প্রবন্ধ

    বহুকাল হইল আমি একবার পালামৌ প্রদেশে গিয়াছিলাম, প্রত্যাগমন করিলে পর সেই অঞ্চলের বৃত্তান্ত লিখিবার নিমিত্ত দুই এক জন বন্ধুবান্ধব আমাকে পুনঃ পুনঃ অনুরোধ করিতেন, আমি তখন তাঁহাদের উপহাস করিতাম। এক্ষণে আমায় কেহ অনুরোধ করে না, অথচ আমি সেই বৃত্তান্ত লিখিতে বসিয়াছি। তাৎপর্য্য বয়স। গল্প করা এ বয়সের রোগ, কেহ শুনুন বা না শুনুন, বৃদ্ধ গল্প করে।

    অনেক দিনের কথা লিখিতে বসিয়াছি, সকল স্মরণ হয় না। পূর্ব্বে লিখিলে যাহা লিখিতাম, এক্ষণে যে তাহাই লিখিতেছি এমত নহে। পূর্ব্বে সেই সকল নির্জ্জন পর্ব্বত, কুসুমিত কানন প্রভৃতি যে চক্ষে দেখিয়াছিলাম, সে চক্ষু আর নাই। এখন পর্ব্বত কেবল প্রস্তরময়, বন কেবল কণ্টকাকীর্ণ, অধিবাসীরা কেবল কদাচারী বলিয়া স্মরণ হয়। অতএব যাঁহারা বয়োগুণে কেবল শোভা সৌন্দর্য্য প্রভৃতি ভাল বাসেন, বৃদ্ধের লেখায় তাঁহাদের কোনো প্রবৃত্তি পরিতৃপ্ত হইবে না।

    যখন পালামৌ যাওয়া আমার একান্ত স্থির হইল, তখন জানি না যে সে স্থান কোন্‌ দিকে, কত দূরে। অতএব ম্যাপ দেখিয়া পথ স্থির করিলাম। হাজারিবাগ হইয়া যাইতে হবে এই বিবেচনায় ইন্‌ল্যাণ্ড ট্রাঞ্জিট কোম্পানীর (Inland Transit Company) ডাকগাড়ী ভাড়া করিয়া রাত্রি দেড় প্রহরের সময় রাণীগঞ্জ হইতে যাত্রা করিলাম। প্রাতে বরাকর নদীর পূর্ব্বপারে গাড়ি থামিল। নদী অতি ক্ষুদ্র, তৎকালে অল্পমাত্র জল ছিল, সকলেই হাঁটিয়া পার হইতেছে, গাড়ী ঠেলিয়া পার করিতে হইবে, অতএব গাড়ওয়ান কুলি ডাকিতে গেল।

    পূর্ব্বপার হইতে দেখিলাম যে, অপর পারে ঘাটের উপরেই একজন সাহেব বাঙ্গালায় বসিয়া পাইপ টানিতেছেন, সম্মুখে একজন চাপরাসী একরূপ গৈরিক মৃত্তিকা হস্তে দাঁড়াইয়া আছে। যে ব্যক্তি পারার্থ সেই ঘাটে আসিতেছে, চাপরাশি তাহার বাহুতে সেই মৃত্তিকাদ্বারা কী অঙ্কপাত করিতেছে। পারার্থীর মধ্যে বন্য লোকই অধিক, তাহাদের যুবতীরা মৃত্তিকারঞ্জিত আপন আপন বাহুর প্রতি আড়নয়নে চাহিতেছে আর হাসিতেছে, আবার অন্যের অঙ্গে সেই অঙ্কপাত কিরূপ দেখাইতেছে তাহাও এক একবার দেখিতেছে। শেষে যুবতীরা হাসিতে হাসিতে দৌড়িয়া নদীতে নামিতেছে। তাহাদের ছুটাছুটিতে নদীর জল উচ্ছ্বসিত হইয়া কূলের উপর উঠিতেছে।

    আমি অন্যমনস্কে এই রঙ্গ দেখিতেছি এমত সময়ে কুলিদের কতকগুলি বালক বালিকা আসিয়া আমার গাড়ী ঘেরিল। “সাহেব একটি পয়সা” “সাহেব একটি পয়সা” এই বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। ধুতি চাদর পরিয়া আমি নিরীহ বাঙালী বসিয়া আছি, আমায় কেন সাহেব বলিতেছে তাহা জানিবার নিমিত্ত বলিলাম, “আমি সাহেব নহি।” একটি বালিকা আপন ক্ষুদ্র নাসিকাস্থ অঙ্গুরীবৎ অলঙ্কারের মধ্যে নখ নিমজ্জন করিয়া বলিল, “হাঁ, তুমি সাহেব।” আর একজন জিজ্ঞাসা করিল, “তবে তুমি কি?” আমি বলিলাম, “আমি বাঙ্গালী।” সে বিশ্বাস করিল না, বলিল, “না, তুমি সাহেব।” তাহারা মনে করিয়া থাকিবে যে, যে গাড়ি চড়ে, সে অবশ্য সাহেব।

    এই সময় একটি দুইবৎসরবয়স্ক শিশু আসিয়া আকাশের দিকে মুখ তুলিয়া হাত পাতিয়া দাঁড়াইল। কেন হাত পাতিল তাহা সে জানে না, সকলে হাত পাতিয়াছে দেখিয়া সেও হাত পাতিল। আমি তাহার হস্তে একটি পয়সা দিলাম, শিশু তাহা ফেলিয়া দিয়া আবার হাত পাতিল, অন্য বালক সে পয়সা কুড়াইয়া লইলে শিশুর ভগিনীর সাথে তাহার তুমুল কলহ বাধিল। এই সময় আমার গাড়ী অপর পাড়ে গিয়া উঠিল।

    বরাকর হইতে দুই একটি ক্ষুদ্র পাহাড় দেখা যায়। বঙ্গবাসীদের কেবল মাঠ দেখা অভ্যাস, মৃত্তিকার সামান্য স্তূপ দেখিলেই তাহাদের আনন্দ হয়। অতএব সেই ক্ষুদ্র পাহাড়গুলি দেখিয়া যে তৎকালে আমার যথেষ্ট আনন্দ হইবে ইহা আর আশ্চর্য্য কি? বাল্যকালে পাহাড় পর্ব্বতের পরিচয় অনেক শুনা ছিল, বিশেষতঃ একবার এক বৈরাগী আখড়ায় চুণকাম-করা এক গিরিগোবর্দ্ধন দেখিয়া পাহাড়ের আকার অনুভব করিয়া লইয়াছিলাম। কৃষক-কন্যারা শুষ্ক গোময় সংগ্রহ করিয়া যে স্তূপ করে, বৈরাগীর গোবর্দ্ধন তাহা অপেক্ষা কিছু বড়। তাহার স্থানে স্থানে চারি পাঁচখানি ইষ্টক গাঁথিয়া এক একটি চূড়া করা হইয়াছে। আবার সর্বোচ্চ চূড়ার পার্শ্বে এক সর্পফণা নির্ম্মাণ করিয়া তাহা হরিত, পীত, নানা বর্ণে চিত্রিত করা হইয়াছে, পাছে সর্পের প্রতি লোকের দৃষ্টি না পড়ে এইজন্য ফণাটি কিছু বড় করিতে হইয়াছে। কাজেই পর্ব্বতের চূড়া অপেক্ষা ফণাটি বড় হইয়া পড়িয়াছে, তাহা মিস্ত্রির গুণ নহে, বৈরাগীরও দোষ নহে। সর্পটি কালীয়দমনের কালীয়, কাজেই যে পর্ব্বতের উপর কালীয় উঠিয়াছে, সে পর্ব্বতের চূড়া অপেক্ষা তাহার ফণা যে কিছু বৃহৎ হইবে ইহার আর আশ্চর্য্য কী? বৈরাগীর এই গিরিগোবর্দ্ধন দেখিয়া বাল্যকালেই পর্ব্বতের অনুভব হইয়াছিল। বরাকরের নিকট পাহাড়গুলি দেখিয়া আমার সেই বাল্যসংস্কারের কিঞ্চিৎ পরিবর্ত্তন হইতে আরম্ভ হইল।

    অপরাহ্ণে দেখিলাম একটি সুন্দর পর্ব্বতের নিকট দিয়া গাড়ী যাইতেছে। এত নিকট দিয়া যাইতেছে যে, পর্ব্বতস্থ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তরের ছায়া পর্য্যন্ত দেখা যাইতেছে। গাড়ওয়ানকে গাড়ী থামাইতে বলিয়া আমি নামিলাম। গাড়ওয়ান জিজ্ঞাসা করিল, “কোথা যাইবেন?” আমি বলিলাম, “একবার এই পর্ব্বতে যাইব।” সে হাসিয়া বলিল, “পাহাড় এখান হইতে অধিক দূর, আপনি সন্ধ্যার মধ্যে তথায় পৌঁছিতে পারিবেন না।” আমি এ কথা কোনরূপে বিশ্বাস করিলাম না। আমি স্পষ্ট দেখিতেছিলাম, পাহাড় অতি নিকট, তথা যাইতে আমার পাঁচ মিনিটও লাগিবে না, অতএব গাড়ওয়ানের নিষেধ না শুনিয়া আমি পর্ব্বতাভিমুখে চলিলাম। পাঁচ মিনিটের স্থলে ১৫ মিনিট কাল দ্রুতপাদবিক্ষেপে গেলাম, তথাপি পর্ব্বত পূর্বমতো সেই পাঁচ মিনিটের পথ বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। তখন আমার ভ্রম বুঝিতে পারিয়া গাড়ীতে ফিরিয়া আসিলাম। পর্ব্বতসম্বন্ধে দূরতা স্থির করা বাঙ্গালীর পক্ষে বড় কঠিন, ইহার প্রমাণ পালামৌ গিয়া আমি পুনঃ পুনঃ পাইয়াছিলাম।

    পরদিবস প্রায় দুই প্রহরের সময় হাজারিবাগ পৌঁছিলাম। তথায় গিয়া শুনিলাম, কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির বাটীতে আমার আহারের আয়োজন হইতেছে। প্রায় দুই দিবস আহার হয় নাই, অতএব আহার সম্বন্ধীয় কথা শুনিবামাত্র ক্ষুধা অধিকতর প্রদীপ্ত হইল। যিনি আমার নিমিত্ত উদ্যোগ করিতেছেন, তিনি আমার আগমনবার্ত্তা কিরূপে জানিলেন, তাহা অনুসন্ধান করিবার আর সাবকাশ হইল না, আমি তৎক্ষনাৎ তাঁহার বাটীতে গাড়ী লইয়া যাইতে অনুমতি করিলাম। যাঁহার বাটীতে যাইতেছি, তাঁহার সহিত আমার কখনও চাক্ষুষ হয় নাই। তাঁহার নাম শুনিয়াছি, সুখ্যাতিও যথেষ্ট শুনিয়াছি; সজ্জন বলিয়া তাঁহার প্রশংসা সকলেই করে। কিন্তু সে প্রশংসায় কর্ণপাত বড় করি নাই, কেন না বঙ্গবাসীমাত্রই সজ্জন; বঙ্গে কেবল প্রতিবাসীরাই দুরাত্মা, যাহা নিন্দা শুনা যায় তাহা কেবল প্রতিবাসীর। প্রতিবাসীরা পরশ্রীকাতর, দাম্ভিক, কলহপ্রিয়, লোভী, কৃপণ, বঞ্চক। তাহারা আপনাদের সন্তানকে ভাল কাপড়, ভাল জুতা পড়ায়; কেবল আমাদের সন্তানকে কাঁদাইবার জন্য। তাহারা আপনার পুত্রবধূকে উত্তম বস্ত্রালঙ্কার দেয়, কেবল আমাদের পুত্রবধূর মুখ ভার করাইবার নিমিত্ত। পাপিষ্ঠ, প্রতিবাসীরা! যাহাদের প্রতিবাসী নাই, তাহাদের ক্রোধ নাই। তাহাদেরই নাম ঋষি। ঋষি কেবল প্রতিবাসী-পরিত্যাগী গৃহী। ঋষির আশ্রমপ্বার্শে প্রতিবাসী বসাও, তিন দিনের মধ্যে ঋষির ঋষিত্ব যাইবে। প্রথম দিন প্রতিবাসীর ছাগলে পুষ্পবৃক্ষ নিষ্পত্র করিবে। দ্বিতীয় দিনে প্রতিবাসীর গোরু আসিয়া কমণ্ডলু ভাঙ্গিবে, তৃতীয় দিনে প্রতিবাসীর গৃহিণী আসিয়া ঋষি-পত্নীকে অলঙ্কার দেখাইবে। তাহার পরই ঋষিকে ওকালতির পরীক্ষা দিতে হইবে, নতুবা ডেপুটি মেজিষ্ট্রেটীর দরখাস্ত করিতে হইবে।

    এক্ষণে সে সকল কথা যাক্‌। যে বঙ্গবাসীর গৃহে আতিথ্য স্বীকার করিতে যাইতেছিলাম, তাঁহার উদ্যানে গাড়ী প্রবেশ করিলে তাহা কোনো ধনবান ইংরেজের হইবে বলিয়া আমার প্রথমে ভ্রম হইল। পরক্ষণেই সে ভ্রম গেল। বারাণ্ডায় গুটিকত বাঙ্গালী বসিয়া আমার গাড়ী নিরীক্ষণ করিতেছিলেন, তাঁহাদের নিকটে গিয়া গাড়ি থামিলে আমি গাড়ী হইতে অবতরণ করিলাম। আমাকে দেখিয়া তাঁহারা সকলেই সাদরে অগ্রসর হইলেন। না চিনিয়া যাঁহার অভিবাদন সর্ব্বাগ্রে গ্রহণ করিয়াছিলাম, তিনিই বাটীর কর্ত্তা। তিনি শত লোক সমভিব্যাহারে থাকিলেও আমার দৃষ্টি বোধ হয় প্রথমেই তাঁহার মুখের প্রতি পড়িত। সেরূপ প্রসন্নতাব্যঞ্জক ওষ্ঠ আমি অতি অল্প দেখিয়াছি। তখন তাঁহার বয়ঃক্রম বোধহয় পঞ্চাশ অতীত হইয়াছিল, বৃদ্ধের তালিকায় তাঁহার নাম উঠিয়াছিল, তথাপি তাঁহাকে বড় সুন্দর দেখিয়াছিলাম। বোধহয় সেই প্রথম আমি বৃদ্ধকে সুন্দর দেখি।

    যে সময়ের কথা বলিতেছি, আমি তখন নিজে যুবা; অতএব সে বয়সে বৃদ্ধকে সুন্দর দেখা ধর্ম্মসঙ্গত নহে। কিন্তু সে দিবস এরূপ ধর্ম্মবিরুদ্ধ কার্য্য ঘটিয়াছিল। এক্ষণে আমি নিজে বৃদ্ধ, কাজেই প্রায় বৃদ্ধকে সুন্দর দেখি। একজন মহানুভব বলিয়াছিলেন যে, মনুষ্য বৃদ্ধ না হইলে সুন্দর হয় না, এক্ষণে আমি তাঁহার ভূয়সী প্রশংসা করি।

    প্রথম সম্ভাষণ সমাপন হইলে পর স্নানাদি করিতে যাওয়া গেল। স্নান গোছলখানায় ইংরেজী মতেই হইল, কিন্তু আহার ঠিক হিন্দুমতে হয় নাই, কেন না, তাহাতে পলাণ্ডুর আধিক্য ছিল। পলাণ্ডু হিন্দুধর্ম্মের বড় বিরোধী। তদ্ভিন্ন আহারের আর কোনো দোষ ছিল না, সঘৃত আতপান্ন, আর দেবীদুর্লভ ছাগমাংস, এই দুই-ই নির্দোষী।

    পাক সম্বন্ধে পলাণ্ডুর উল্লেখ করিয়াছি, কিন্তু পিঁয়াজ উল্লেখ করাই আমার ইচ্ছা ছিল। পিঁয়াজ যাবনিক শব্দ, এই ভয়ে পলাণ্ডুর উল্লেখ করিয়া সাধুগণের মুখ পবিত্র রাখিয়াছি, কিন্তু পিঁয়াজ পলাণ্ডু এক দ্রব্য কি না, এ বিষয়ে আমার বহুকালাবধি সংশয় আছে। একবার পাঞ্জাব অঞ্চলের এক জন বৃদ্ধ রাজা জগন্নাথ দর্শন করিতে যাইবার সময় মেদিনীপুরে দুই এক দিন অবস্থিতি করেন। নগরের ভদ্রলোকেরা তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার প্রার্থনা করিলে, তিনি কি প্রধান, কি সামান্য, সকলের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া নানাপ্রকার আলাপ করিতেছিলেন, এমত সময় তাঁহাদের মধ্যে একজন যোড়হস্তে বলিলেন, “আমরা শুনিয়াছিলাম যে, মহারাজ হিন্দুচূড়ামণি, কিন্তু আসিবার সময় আপনার পাকশালার সম্মুখে পলাণ্ডু দেখিয়া আসিয়াছি।” বিস্ময়াপন্ন রাজা “পলাণ্ডু!” এই শব্দ বার বার উচ্চারণ করিয়া তৎক্ষণাৎ তদারকের নিমিত্ত স্বয়ং উঠিলেন, নগরস্থ ভদ্রলোকেরাও তাঁহার পশ্চাদ্বর্ত্তী হইলেন। রাজা পাকশালার সম্মুখে দাঁড়াইলে, একজন বাঙ্গালী পিঁয়াজের স্তূপ দেখাইয়া দিল। রাজা তখন হাসিয়া বলিলেন, “ইহা পলাণ্ডু নহে; ইহাকে পিঁয়াজ বলে। পলাণ্ডু অতি বিষাক্ত সামগ্রী, তাহা কেবল ঔষধে ব্যবহার হয়। সকল দেশে তাহা জন্মে না; যে মাঠে জন্মে, মাঠের বায়ু দূষিত হইয়া যায়, এই ভয়ে সে মাঠ দিয়া কেহ যাতায়াত করে না। সে মাঠে আর কোনো ফসল হয় না।”

    রাজার এই কথা যদি সত্যি হয়, তাহা হইলে অনেকে নিশ্চিন্ত হইতে পারেন। পলাণ্ডু আর পিঁয়াজ এক সামগ্রী কি না, তাহা পশ্চিম প্রদেশে অনুসন্ধান হইতে পারে, বিশেষতঃ যে সকল বঙ্গবাসীরা সিন্ধুদেশ অঞ্চলে আছেন, বোধ হয় তাঁহারা অনায়াসেই এই কথার মীমাংসা করিয়া লইতে পারেন।

    আহারান্তে বিশ্রামগৃহে বসিয়া বালকদিগের সহিত গল্প করিতে করিতে বালকদের শয়নঘর দেখিতে উঠিয়া গেলাম। ঘরটি বিলক্ষণ পরিসর, তাহার চারি কোণে চারিখানি খাট পাতা, মধ্যস্থলে আর একখানি খাট রহিয়াছে। জিজ্ঞাসা করায় বালকেরা বলিল, “চারি কোণে আমরা চারিজন শয়ন করি, আর মধ্যস্থলে মাষ্টার মহাশয় থাকেন।” এই বন্দোবস্ত দেখিয়া বড় পরিতৃপ্ত হইলাম। দিবারাত্র বালকদের কাছে শিক্ষক থাকার আবশ্যকতা অনেকে বুঝেন না।

    বালকদের শয়নঘর হইতে বহির্গত হইয়া আর এক ঘরে দেখি, এক কাঁদি সুপক্ক মর্ত্তমান রম্ভা দোদুল্যমান রহিয়াছে, তাহাতে একখানি কাগজ ঝুলিতেছে, পড়িয়া দেখিলাম, নিত্য যত কদলী কাঁদি হইতে ব্যয় হয়, তাহাই তাহাতে লিখিত হইয়া থাকে। লোকে সচরাচর ইহাকে ক্ষুদ্র দৃষ্টি, ছোট নজর ইত্যাদি বলে; কিন্তু আমি তাহা কোনরূপে ভাবিতে পারিলাম না। যেরূপ অন্যান্য বিষয়ের বন্দোবস্ত দেখিলাম, তাহাতে “কলাকাঁদির হিসাব” দেখিয়া বরং আরও চমৎকৃত হইলাম। যাহাদের দৃষ্টি ক্ষুদ্র, তাহারা কেবল সামান্য বিষয়ের প্রতিই দৃষ্টি রাখে, অন্য বিষয় দেখিতে পায় না। তাহারা যথার্থই নীচ। কিন্তু আমি যাঁহার কথা বলিতেছি, দেখিলাম তাঁহার নিকট বৃহৎ সূক্ষ্ম সকলই সমভাবে পরিলক্ষিত হইয়া থাকে। অনেকে আছেন, বড় বড় বিষয় মোটামুটি দেখিতে পারেন, কিন্তু সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি তাহাদের দৃষ্টি একেবারে পড়ে না। তাঁহাদের প্রশংসা করি না। যাঁহারা বৃহৎ সূক্ষ্ম একত্র দেখিয়া কার্য্য করেন, তাঁহাদেরই প্রশংসা করি। কিন্তু এরূপ লোক অতি অল্প।

    “কলাকাঁদির ফর্দ’” সম্বন্ধে বালকদিগের সহিত কথা কহিতে কহিতে জানিলাম যে, একদিন এক চাকর লোভ সম্বরণ করিতে না পারিয়া দুইটি সুপক্ক রম্ভা উদরস্থ করিয়াছিল, গৃহস্থের সকল বিষয়েই দৃষ্টি আছে, সকল বিষয়েরই হিসাব থাকে, কাজেই চুরি ধরা পড়িল। তখন তিনি চাকরকে ডাকিয়া চুরির জন্য জরিমানা করিলেন। পরে তাহার লোভ পরিতৃপ্ত করিবার নিমিত্ত যত ইচ্ছা কাঁদি হইতে রম্ভা খাইতে অনুমতি করিলেন। চাকর উদর ভরিয়া রম্ভা খাইল।

    অপরাহ্ণে আমি উদ্যানে পদচারণ করিতেছি, এমত সময় গৃহস্থ “কাছারি” হইতে প্রত্যাগত হইলেন। পরে আমাকে সমভিব্যাহারে লইয়া বাগান, পুষ্করিণী, সমুদয় দেখাইতে লাগিলেন। যে স্থান হইতে যে বৃক্ষটি আনাইয়াছেন, তাহারও পরিচয় দিতে লাগিলেন। মধ্যাহ্নকালে “কলাকাঁদি” সম্বন্ধে যাহা দেখিয়াছি এবং শুনিয়াছি, তাহা তখনও আমার মনে পুনঃ পুনঃ আলোচিত হইতেছিল; কাজেই আমি কদলীবৃক্ষের প্রসঙ্গ না করিয়া থাকিতে পারিলাম না। বলিলাম, “আমার ধারণা ছিল এ অঞ্চলে রম্ভা জন্মে না; কিন্তু আপনার বাগানে যথেষ্ট দেখিতেছি।” তিনি উত্তর করিলেন, “এখানে বাজারে কলা পাওয়া যায় না। পূর্ব্বে কাহার বাটীতেও পাওয়া যাইত না। লোকের সংস্কার ছিল যে, এই প্রস্তরময় মৃত্তিকায় কলার গাছ রস পায় না, শুকাইয়া যায়। আমি তাহা বিশ্বাস না করিয়া, দেশ হইতে ‘তেড়’ আনিয়া পরীক্ষা করিলাম। এক্ষণে আমার নিকট হইতে ‘তেড়’ লইয়া সকল সাহেবই বাগানে লাগাইয়াছেন। এখন আর এখানে কদলীর অভাব নাই।”

    এইরূপ কথাবার্ত্তা কহিতে কহিতে আমরা উদ্যানের এক প্রান্তভাগে আসিয়া উপস্থিত হইলাম, তথায় দুইটি স্বতন্ত্র ঘর দেখিয়া আমি জিজ্ঞাসা করায় গৃহস্থ বলিলেন, “উহার একটিতে আমার নাপিত থাকে, অপরটিতে আমার ধোপা থাকে। উহারা সম্পূর্ণ আমার বেতনভোগী চাকর নহে, তবে উভয়কে আমার বাটীতে স্থান দিয়া এক প্রকারে আবদ্ধ করিয়াছি। এখন যখনই আবশ্যক হয়, তখনই তাহাদের পাই। ধোপা, নাপিতের কষ্ট পূর্ব্বে আর কোন উপায়ে নিবারণ করিতে পারি নাই।”

    সন্ধ্যার পর দেখিলাম, শিক্ষক-সম্মুখে বালকেরা যে টেবিলে বসিয়া অধ্যয়ন করিতেছে, তথায় একত্র একস্থানে তিনটি সেজ জ্বলিতেছে। অন্য লোক যাঁহারা কদলীর হিসাব রাখেন না, তাঁহারা বালকদের নিমিত্ত একটি সেজ দিয়া নিশ্চিন্ত হন, আর যিনি কদলীর হিসাব রাখেন, তিনি এই অতিরিক্ত ব্যয় কেন স্বীকার করিতেছেন জানিবার নিমিত্ত আমার কৌতূহল জন্মিল। শেষে আমি জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন, “ইহা অপব্যয় নহে, অল্প আলোকে অধ্যয়ন করিলে বালকের চক্ষু দুর্ব্বল হইবার সম্ভাবনা; যথেষ্ট আলোকে অধ্যয়ন করিলে চল্লিশের বহু পরে ‘চালশা’ ধরে।”

    উচ্চপদস্থ সাহেবরা সর্ব্বদাই তাঁহার বাটীতে আসিতেন, এবং তাঁহার সহিত কথাবার্ত্তায় পরমাপ্যায়িত হইতেন। বাঙ্গালীরা ছোট বড় সকলেই তাঁহার সৌজন্যে বাধ্য ছিলেন, যে কুঠীতে তিনি বাস করিতেন, সেরূপ কুঠী সাহেবদেরও সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায় না; কুঠীটি যেরূপ পরিষ্কৃত ও সুসজ্জীভূত ছিল, তাহা দেখিলে যথার্থই সুখ হয়, মনও পবিত্র হয়। মনের উপর বাসস্থানের আধিপত্য বিলক্ষণ আছে। যাহারা অপরিষ্কৃত ক্ষুদ্র ঘরে বাস করে, প্রায় দেখা যায়, তাহাদের মন সেইরূপ অপরিষ্কৃত ও ক্ষুদ্র। যিনি বিশ্বাস না করেন, তিনি বলিতে পারেন যে, যদি এ কথা সত্য হয়, তাহা হইলে প্রায় অধিকাংশ বাঙ্গালীর মন ক্ষুদ্র ও অপরিষ্কৃত হইত। আমরা এ কথা লইয়া কোন তর্ক করিব না, আমরা যেমন দেখিতে পাই, সেই মত শিখিয়াছি। যাঁহাকে উপলক্ষ করিয়া এই কথা বলিয়াছি, তাঁহার মন, “কুঠী”র উপযোগী ছিল। সেরূপ কুঠীর ভাড়ায় যে ব্যক্তি বহু অর্থ ব্যয় করে, সে ব্যক্তি যদি কদলীর হিসাব রাখে, তাহা হইলে কী বুঝা কর্ত্তব্য?

    রাত্রি দেড় প্রহরের সময় বাহকস্কন্ধে আমি ছোটনাগপুর যাত্রা করিলাম। তথা হইতে পালামৌ দুই চারিদিনের মধ্যে পৌঁছিলাম। পথের পরিচয় আর দিব না, এই কয়েক ছত্র লিখিয়া অনেককে জ্বালাতন করিয়াছি, আর বিরক্ত করিব না, এবার ইচ্ছা রহিল, মূল বিবরণ ভিন্ন অন্য কথা বলিব না, তবে যদি দুই একটি অতিরিক্ত কথা বলিয়া ফেলি, তাহা হইলে বয়সের দোষ বুঝিতে হইবে।

  • দ্বিতীয় প্রবন্ধ

    দ্বিতীয় প্রবন্ধ

    সেকালের হরকরা নামক ইংরেজী পত্রিকায় দেখিতাম, কোন একজন মিলিটারি সাহেব “পেরেড” বৃত্তান্ত, “ব্যাণ্ডের” বাদ্যচর্চ্চা প্রভৃতি নানা কথা পালামৌ হইতে লিখিতেন। আমি তখন ভাবিতাম, পালামৌ প্রবল সহর, সাহেবসমাকীর্ণ সুখের স্থান। তখন জানিতাম না যে, পালামৌ শহর নহে, একটি প্রকাণ্ড পরগণামাত্র। শহর সে অঞ্চলেই নাই, নগর দূরে থাকুক, তথায় একখানি গণ্ডগ্রামও নাই, কেবল পাহাড় ও জঙ্গলে পরিপূর্ণ।

    পাহাড় আর জঙ্গল বলিলে কে কী অনুভব করেন বলিতে পারি না। যাঁহারা “কৃষ্ণচন্দ্র কর্ম্মকার কৃত” পাহাড় দেখিয়াছেন, আর যাঁহাদের গৃহপার্শ্বে শৃগালশ্রান্তিসংবাহক ভাটভেরাণ্ডার জঙ্গল আছে, তাঁহারা যে এ কথা সমগ্র অনুভব করিয়া লইবেন, ইহার আর সন্দেহ নাই। কিন্তু অন্য পাঠকের জন্য সেই পাহাড় জঙ্গলের কথা কিঞ্চিৎ উত্থাপন করা আবশ্যক হইয়াছে। সকলের অনুভবশক্তি তো সমান নহে।

    রাঁচি হইতে পালামৌ যাইতে যাইতে যখন যখন বাহকগণের নির্দ্দেশমত দূর হইতে পালামৌ দেখিতে পাইলাম, তখন আমার বোধ হইল যেন মর্ত্ত্যে মেঘ করিয়াছে। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া সেই মনোহর দৃশ্য দেখিতে লাগিলাম। ঐ অন্ধকার মেঘমধ্যে এখনই যাইব, এই মনে করিয়া আমার কতই আহ্লাদ হইতে লাগিল। কতক্ষণে পৌঁছিব মনে করিয়া আবার কতই ব্যস্ত হইলাম।

    পরে চারি পাঁচ ক্রোশ অগ্রসর হইয়া আবার পালামৌ দেখিবার নিমিত্ত পাল্কী হইতে অবতরণ করিলাম। তখন আর মেঘভ্রম হইল না, পাহাড়গুলি স্পষ্ট চেনা যাইতে লাগিল; কিন্তু জঙ্গল ভাল চেনা গেল না। তাহার পরে আরও দুই এক ক্রোশ অগ্রসর হইলে, তাম্রাভ অরণ্য চারি দিকে দেখা যাইতে লাগিল; কি পাহাড়, কি তলস্থ স্থান সমুদয় যেন মেঘদেহের ন্যায় কুঞ্চিত লোমরাজিদ্বারা সর্ব্বত্র সমাচ্ছাদিত বোধ হইতে লাগিল। শেষ আরও কতদূর গেলে বন স্পষ্ট দেখা গেল। পাহাড়ের গায়ে, নিম্নে সর্ব্বত্র জঙ্গল, কোথাও আর ছেদ নাই। কোথাও কর্ষিত ক্ষেত্র নাই, গ্রাম নাই, নদী নাই, পথ নাই, কেবল বন—ঘন নিবিড় বন।

    পরে পালামৌ প্রবেশ করিয়া দেখিলাম, নদী, গ্রাম, সকলই আছে, দূর হইতে তাহা কিছুই দেখা যায় নাই। পালামৌ পরগণায় পাহাড় অসংখ্য, পাহাড়ের পর পাহাড়, তাহার পর পাহাড়, আবার পাহাড়; যেন বিচলিত নদীর সংখ্যাতীত তরঙ্গ। আবার বোধহয় যেন অবনীর অন্তরাগ্নি একদিনেই সেই তরঙ্গ তুলিয়াছিল। এখন আমার ঠিক স্মরণ হয় না, কিন্তু বোধ হয় যেন দেখিয়াছিলাম, সকল তরঙ্গগুলি পূর্ব্ব দিক হইতে উঠিয়াছিল, কোন কোনটি পূর্ব্ব দিক্‌ হইতে উঠিয়া পশ্চিম দিকে নামে নাই। এইরূপ অর্দ্ধপাহাড় লাতেহারগ্রামপার্শ্বে একটি আছে, আমি প্রায় নিত্য তথায় গিয়া বসিয়া থাকিতাম। এই পাহাড়ের পশ্চিমভাগে মৃত্তিকা নাই, সুতরাং তাহার অন্তরস্থ সকল স্তর দেখা যায়; এক স্তরে নুড়ি, আর এক স্তরে কাল পাথর, ইত্যাদি। কিন্তু কোন স্তরই সমসূত্র নহে, প্রত্যেকটি কোথাও উঠিয়াছে, কোথাও নামিয়াছে। আমি তাহা পূর্ব্বে লক্ষ্য করি নাই, লক্ষ্য করিবার কারণ পরে ঘটিয়াছিল। এক দিন অপরাহ্ণে এই পাহাড়ের মূলে দাঁড়াইয়া আছি, এমত সময় আমার একটা নেমকহারাম ফরাসিস কুক্কুর (poodle) আপন ইচ্ছামতো তাঁবুতে চলিয়া গেল, আমি রাগত হইয়া চীৎকার করিয়া তাহাকে ডাকিলাম। আমার পশ্চাতে সেই চীৎকার অত্যাশ্চর্য্যরূপে প্রতিধ্বনিত হইল। পশ্চাৎ ফিরিয়া পাহাড়ের প্রতি চাহিয়া আবার চীৎকার করিলাম, প্রতিধ্বনি আবার পূর্ব্বমত হ্রস্ব দীর্ঘ হইতে হইতে পাহাড়ের অপর প্রান্তে চলিয়া গেল। আবার চীৎকার করিলাম, শব্দ পূর্ব্ববৎ পাহাড়ের গায়ে লাগিয়া উচ্চ নীচ হইতে লাগিল। এইবার বুঝিলাম, শব্দ কোন একটি বিশেষ স্তর অবলম্বন করিয়া যায়; সেই স্তর যেখানে উঠিয়াছে বা নামিয়াছে, শব্দও সেইখানে উঠিতে নামিতে থাকে। কিন্তু শব্দ দীর্ঘকাল কেন স্থায়ী হয়, যত দূর পর্য্যন্ত সেই স্তরটি আছে, ততদূর পর্য্যন্ত কেন যায়, তাহা কিছুই বুঝিতে পারিলাম না; ঠিক যেন সেই স্তরটি শব্দ কন্‌ডক্‌টার (conductor); যে পর্য্যন্ত ননকন্‌ডক্টরের সঙ্গে সংস্পর্শ না হয়, সে পর্য্যন্ত শব্দ ছুটিতে থাকে।

    আর একটি পাহাড় দেখিয়া চমৎকৃত হইয়াছিলাম। সেটি একশিলা, সমুদয়ে একখানি প্রস্তর। তাহাতে একেবারে কোথাও কণামাত্র মৃত্তিকা নাই, সমুদয় পরিষ্কার ঝর্‌ঝর্‌ করিতেছে। তাহার এক স্থান অনেক দূর পর্য্যন্ত ফাটিয়া গিয়াছে, সেই ফাটার উপর বৃহৎ এক অশ্বত্থগাছ জন্মিয়াছে। তখন মনে হইয়াছিল, অশ্বত্থবৃক্ষ বড় রসিক, এই নীরস পাষাণ হইতেও রস গ্রহণ করিতেছে। কিছু কাল পরে আর একদিন এই অশ্বত্থগাছ আমার মনে পড়িয়াছিল, তখন ভাবিয়াছিলাম বৃক্ষটি বড় শোষক, ইহার নিকট নীরস পাষাণেরও নিস্তার নাই। এখন বোধহয় অশ্বত্থগাছটি আপন অবস্থানুরূপ কার্য্য করিতেছে; সকল বৃক্ষই যে বাঙ্গালার রসপূর্ণ কোমল ভূমিতে জন্মগ্রহণ করিয়া বিনা কষ্টে কাল যাপন করিবে, এমত সম্ভব নহে। যাহার ভাগ্যে কঠিন পাষাণ, পাষাণই তাহার অবলম্বন। এখন আমি অশ্বত্থটির প্রশংসা করি।

    এক্ষণে সে সকল কথা যাউক, প্রথম দিনের কথা দুই একটি বলি। অপরাহ্ণে পালামৌয়ে প্রবেশ করিয়া উভয়পার্শ্বস্থ পর্ব্বতশ্রেণী দেখিতে দেখিতে বনমধ্য দিয়া যাইতে লাগিলাম। বাঁধা পথ নাই, কেবল এক সংকীর্ণ গো-পথ দিয়া আমার পাল্কী চলিতে লাগিল, অনেক স্থলে উভয়প্বার্শস্থ লতা পল্লব পাল্কী স্পর্শ করিতে লাগিল। বনবর্ণনায় যেরূপ “শাল তাল তমাল, হিন্তাল” শুনিয়াছিলাম, সেরূপ কিছুই দেখিতে পাইলাম না। তাল, হিন্তাল একেবারেই নাই; কেবল শালবন, অন্য বন্য গাছও আছে। শালের মধ্যে প্রকাণ্ড গাছ একটিও নাই, সকলগুলিই আমাদের দেশীয় কদম্ববৃক্ষের মতো, না হয় কিছু বড়; কিন্তু তাহা হইলেও জঙ্গল অতি দুর্গম, কোথাও তাহার ছেদ নাই, এই জন্য ভয়ানক। মধ্যে মধ্যে যে ছেদ আছে, তাহা অতি সামান্য। এইরূপ বন দিয়া যাইতে যাইতে এক স্থানে হঠাৎ কাষ্ঠঘণ্টার বিষণ্ণকর শব্দ কর্ণগোচর হইল, কাষ্ঠঘণ্টা পূর্ব্বে মেদিনীপুর অঞ্চলে দেখিয়াছিলাম। গৃহপালিত পশু বনে পথ হারাইলে, শব্দানুসরণ করিয়া তাহাদের অনুসন্ধান করিতে হয়; এইজন্য গলঘণ্টার উৎপত্তি। কাষ্ঠঘণ্টার শব্দ শুনিলে প্রাণের ভিতর কেমন করে। পাহাড় জঙ্গলের মধ্যে সে শব্দে আরও যেন অবসন্ন করে; কিন্তু সকলকে করে কি না তাহা বলিতে পারি না।

    পরে দেখিলাম, একটি মহিষ সভয়ে মুখ তুলিয়া আমার পাল্কীর প্রতি একদৃষ্টিতে চাহিয়া আছে, তাহার গলায় কাষ্ঠঘণ্টা ঝুলিতেছে। আমি ভাবিলাম, পালিত মহিষ যখন নিকটে, তখন গ্রাম আর দূরে নহে। অল্প বিলম্বেই অর্ধশুষ্ক তৃণাবৃত একটি ক্ষুদ্র প্রান্তর দেখা গেল, এখানে সেখানে দুই একটি মধু বা মৌয়াবৃক্ষ ভিন্ন সে প্রান্তরে গুল্ম কি লতা কিছুই নাই, সর্ব্বত্র অতি পরিষ্কার। পর্ব্বতছায়ায় সে প্রান্তর আরও রম্য হইয়াছে; তথায় কতকগুলি কোলবালক একত্র মহিষ চরাইতেছিল, সেরূপ কৃষ্ণবর্ণ কান্তি আর কখন দেখি নাই; সকলের গলায় পুতির সাতনরী, ধুক্‌ধুকীর পরিবর্ত্তে এক একখানি গোল আরসী; পরিধানে ধড়া, কর্ণে বনফুল; কেহ মহিষপৃষ্ঠে শয়ন করিয়া আছে, কেহ বা মহিষপৃষ্ঠে বসিয়া আছে, কেহ কেহ নৃত্য করিতেছে। সকলগুলিই যেন কৃষ্ণঠাকুর বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। যেরূপ স্থান, তাহাতে এই পাথুরে ছেলেগুলি উপযোগী বলিয়া বিশেষ সুন্দর দেখাইতেছিল; চারিদিকে কাল পাথর, পশুও পাথুরে; তাহাদের রাখালও সেইরূপ। এই স্থলে বলা আবশ্যক এ অঞ্চলে মহিষ ভিন্ন গোরু নাই। আর বালকগুলি কোলের সন্তান।

    এই অঞ্চলে প্রধানতঃ কোলের বাস। কোলেরা বন্য জাতি, খর্ব্বাকৃতি, কৃষ্ণবর্ণ; দেখিতে কুৎসিত কি রূপবান্‌, তাহা আমি মীমাংসা করিতে পারি না! যে সকল কোল কলিকাতা আইসে বা চা-বাগানে যায়, তাহাদের মধ্যে আমি কাহাকেও রূপবান্‌ দেখি নাই; বরং অতি কুৎসিত বলিয়া বোধ করিয়াছি। কিন্তু স্বদেশে কোল মাত্রেই রূপবান্‌, অন্তত আমার চক্ষে। বন্যেরা বনে সুন্দর; শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।

    প্রান্তরের পর এক ক্ষুদ্র গ্রাম, তাহার নাম স্মরণ নাই; তথায় ত্রিশ বত্রিশটি গৃহস্থ বাস করে। সকলেরই পর্ণকুটির। আমার পাল্কী দেখিতে যাবতীয় স্ত্রীলোক ছুটিয়া আসিল। সকলেই আবলুসের মতো কাল, সকলেই যুবতী, সকলেরই কটিদেশে একখানি করিয়া ক্ষুদ্র কাপড় জড়ান; সকলেরই কক্ষ, বক্ষ আবরণশূন্য। সেই নিরাবৃত বক্ষে পুতির সাতনরী, তাহাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আরসী ঝুলিতেছে, কর্ণে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বনফুল, মাথায় বড় বড় বনফুল। যুবতীরা পরস্পর কাঁধ ধরাধরি করিয়া দেখিতে লাগিল, কিন্তু দেখিল কেবল পাল্কী আর বেহারা। পাল্কীর ভিতরে কে বা কি, তাহা কেহই দেখিল না। আমাদের বাঙ্গালায়ও দেখিয়াছি, পল্লিগ্রামে বালক বালিকারা প্রায় পাল্কী আর বেহারা দেখিয়া ক্ষান্ত হয়। তবে যদি সঙ্গে বাদ্য থাকে, তাহা হইলে “বর-কনে” দেখিবার নিমিত্ত পাল্কীর ভিতর দৃষ্টিপাত করে। যিনি পাল্কী চড়েন, সুতরাং তিনি দুর্ভাগ্য, কিন্তু গ্রাম্য বালক বালিকারাও অতি নিষ্ঠুর, অতি নির্দ্দয়।

    তাহার পর আবার কতকদূর গিয়া দেখিলাম, পথশ্রান্তা যুবতীরা মদের ভাঁটিতে বসিয়া মদ্য পান করিতেছে। গ্রামমধ্যে যে যুবতীদের দেখিয়া আসিয়াছি, ইহারাও আকারে অলঙ্কারে অবিকল সেইরূপ, যেন তাহারাই আসিয়া বসিয়াছে। যুবতীরা উভয় জানুদ্বারা ভূমি স্পর্শ করিয়া দুই হস্তে শালপত্রের পাত্র ধরিয়া মদ্য পান করিতেছে, আর ঈষৎ হাস্যবদনে সঙ্গীদের দেখিতেছে। জানু স্পর্শ করিয়া উপবেশন করা কোলজাতির স্ত্রীলোকদিগের রীতি; বোধ হয় যেন সাঁওতালদিগেরও এই রীতি দেখিয়াছি। বনের মধ্যে যেখানে সেখানে মদের ভাঁটি দেখিলাম, কিন্তু বাঙ্গালায় ভাঁটিখানায় যেরূপ মাতাল দেখা যায়, পালামৌ পরগণায় কোন ভাঁটিখানায় তাহা দেখিলাম না। আমি পরে তাহাদের আহার ব্যবহার সকলই দেখিতাম, কিছুই তাহারা আমার নিকট গোপন করিত না, কিন্তু কখন স্ত্রীলোকদের মাতাল হইতে দেখি নাই, অথচ তাহারা পানকুণ্ঠ নহে। তাহাদের মদের মাদকতা নাই, এ কথাও বলিতে পারি না। সেই মদ পুরুষেরা খাইয়া সর্ব্বদা মাতাল হইয়া থাকে।

    পূর্ব্বে কয়েক বার কেবল যুবতীর কথাই বলিয়াছি, ইচ্ছাপূর্ব্বক বলিয়াছি এমন নহে। বাঙ্গালার পথে, ঘাটে, বৃদ্ধাই অধিক দেখা যায়, কিন্তু পালামৌ অঞ্চলে যুবতীই অধিক দেখা যায়। কোলের মধ্যে বৃদ্ধা অতি অল্প, তাহারা অধিকবয়ঃ হইলেও যুবতীই থাকে, অশীতিপরায়ণা না হইলে তাহারা লোলচর্ম্মা হয় না। অতিশয় পরিশ্রমী বলিয়া গৃহকার্য্য কৃষিকার্য্য সকল কার্য্যই তাহারা করে, পুরুষেরা স্ত্রীলোকের ন্যায় কেবল বসিয়া সন্তান রক্ষা করে, কখন কখন চাটাই বুনে। আলস্য জন্য পুরুষেরা বঙ্গমহিলাদের ন্যায় শীঘ্র বৃদ্ধ হইয়া যায়; স্ত্রীলোকেরা শ্রমহেতু চিরযৌবনা থাকে।

    লোকে বলে পশুপক্ষীর মধ্যে পুরুষজাতিই বলিষ্ঠ ও সুন্দর; মনুষ্যমধ্যেও সেই নিয়ম। কিন্তু কোলদের দেখিলে তাহা বোধ হয় না, তাহাদের স্ত্রীজাতিরাই বলিষ্ঠা ও আশ্চর্য্য কান্তিবিশিষ্টা। কিন্তু তাহাদের বয়ঃপ্রাপ্ত পুরুষদের গায়ে খড়ি উঠিতেছে, চক্ষে মাছি উড়িতেছে, মুখে হাসি নাই, যেন সকলেরই জীবনীশক্তি কমিয়া আসিয়াছে। আমার বোধ হয় কোলজাতির ক্ষয় ধরিয়াছে। ব্যক্তিবিশেষের জীবনীশক্তি যেরূপ কমিয়া যায়, জাতিবিশেষেরও জীবনীশক্তি সেইরূপ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, ক্রমে ক্রমে লোপ পায়। মনুষ্যের মৃত্যু আছে, জাতিরও লোপ আছে।

    এই পরগণায় পর্ব্বতে স্থানে স্থানে অসুরেরা বাস করে, আমি তাহাদের দেখি নাই, তাহারা কোলদের সহিত বা অন্য কোন বন্য জাতির সহিত বাস করে না। শুনিয়াছি, অন্যজাতীয় মনুষ্য দেখিলে তাহারা পলায়; পর্ব্বতের অতি নিভৃত স্থানে থাকে বলিয়া তাহাদের অনুসন্ধান করা কঠিন। তাহাদের সংখ্যা নিতান্ত অল্প হইয়া পড়িয়াছে। পূর্ব্বকালে যখন আর্য্যেরা প্রথমে ভারতবর্ষে আসেন, তখন অসুরগণ অতি প্রবল ও তাহাদের সংখ্যা অসীম ছিল। অসুরেরা আসিয়া আর্য্যগণের গোরু কাড়িয়া লইয়া যাইত, ঘৃত খাইয়া পলাইত, আর্য্যেরা নিরুপায় হইয়া কেবল ইন্দ্রকে ডাকিতেন, কখন কখন দলবল জুটাইয়া লাঠালাঠিও করিতেন। শেষে বহু কাল পরে যখন আর্য্যগণ উন্নত ও শক্তিসম্পন্ন হইলেন, তখন অসুরগণকে তাড়াইয়াছিলেন। পরাজিত অসুরগণ ভাল ভাল স্থান আর্য্যদের ছাড়িয়া দিয়া আপনারা দুর্গম পাহাড় পর্ব্বতে গিয়া বাস স্থাপন করে। অদ্যাবধি সেই পাহাড়পর্ব্বতে তাহারা আছে, কিন্তু আর তাহাদের বল বীর্য্য নাই; আর সে অসীম সংখ্যাও তাহাদের নাই। এক্ষণে যেরূপ অবস্থা, তাহাতে অসুরকুল ধ্বংস হইয়াছে বলিলেও অন্যায় হয় না; যে দশ পাঁচ জন এখানে সেখানে বাস করে, আর কিছু দিনের পর তাহারাও থাকিবে না।

    জাতিলোপ মধ্যে মধ্যে হইয়া থাকে; অনেক আদিম জাতির লোপ হইয়া গিয়াছে, অদ্যাপি হইতেছে। জাতিলোপের হেতু দর্শনবিদ্‌গণের মধ্যে কেহ কেহ বলেন যে, পরাজিত জাতিরা বিজয়ী কর্ত্তৃক বিতাড়িত হইয়া অতি অযোগ্য স্থানে গিয়া বাস করিলে, পূর্ব্বস্থানে যে সকল সুবিধা ছিল, তাহার অভাবে ক্রমে তাহারা অবনত ও অবসন্ন হইয়া পড়ে। এ কথা অনেক স্থলে সত্য সন্দেহ নাই; অসুরগণের পক্ষে তাহাই খাটিয়াছিল বোধহয়। কিন্তু সাঁওতালেরাও এক সময় আর্য্যগণ কর্ত্তৃক বিতাড়িত হইয়া দামিনীকোতে পলায়ন করিয়াছিল। সেই অবধি অনেক কাল তথায় বাস করে, অদ্যপিও তথায় খাস সাঁওতালেরা বাস করিতেছে, পূর্ব্বাপেক্ষা তাহাদের যে কুলক্ষয় হইয়াছে, এমত শুনা যায় না।

    মারকিন ও অন্যান্য দেশে যেখানে সাহেবেরা গিয়া রাজ্য স্থাপন করিয়াছেন, সেখানকার আদিমবাসীরা ক্রমে ক্রমে লোপ পাইতেছে, তাহার কারণ কিছুই অনুভব হয় না। রেড ইণ্ডিয়ান, নাটিক ইণ্ডিয়ান, নিউ জিলাণ্ডার, তাস্মানীয় প্রভৃতি কত জাতি লোপ পাইতেছে। মৌরিনামক আদিম জাতি বলিষ্ঠ, বুদ্ধিমান্‌, কর্ম্মঠ বলিয়া পরিচিত, তাহারাও সাহেবদের অধিকারে ক্রমে লোপ পাইতেছে। ১৮৪৮ সালে তাহাদের সংখ্যা এক লক্ষ ছিল, বিশ বৎসর পরে ৩৮ হাজার হইয়া গিয়াছিল, এক্ষণে সে জাতির অবস্থা কি, তাহা জানি না। বোধ হয় এতদিনে লোপ পাইয়া থাকিবে, অথবা যদি এত দিন থাকে, তবে অতি সামান্য অবস্থায় আছে। মৌরি দুর্ব্বল নহে, তৎসম্বন্ধে একজন সাহেব লিখিয়াছেন: “He is the noblest of savages, not equalled by the best of Red Indians.” তথাপি এ জাতি লোপ পায় কেন? তুমি বলিবে সাহেবদের অত্যাচারে? তাহা কদাচ নহে, ক্যানেডার অধিবাসী সম্বন্ধে সাহেবরা কতই যত্ন করিয়াছিলেন, কিছুতেই তাহাদের কুলক্ষয় রক্ষা করিতে পারেন নাই। ডাক্তার গিকি লিখিয়াছেন যে, “In Canada for the last fifty years the Indians have been treated with paternal kindness but the wasting never stops * * * * The Government has built them houses, furnished them with ploughs, supplied them constantly with rifles, ammunition, and clothes, paid their medical attendants * * * but the result is merely this that their extinction goes on more slowly than it otherwise would.” সমাজোপযোগী ভাল স্থান ত্যাগ করিয়া বিপরীত স্থানে ত এই জাতিদের যাইতে হয় নাই, তবে তাহাদের কুললোপ হইল কেন?

    কেহ কেহ বলেন যে, সাহেবদের সংস্পর্শে দোষ আছে। প্রধান জাতির সংস্পর্শে আসিলে সামান্য জাতিরা কতকটা উদ্যমভঙ্গ ও অবসন্ন হইয়া পড়ে। এ কথার প্রত্যুত্তরে এক জন সাহেব লিখিয়াছেন যে, ভারতবর্ষে কতই সামান্য জাতি বাস করে, কিন্তু শ্বেতকায় জাতির সংস্পর্শে তাহাদের ত কুলবৃদ্ধির ব্যাঘাত হয় না।

    আমরা এ কথা সম্বন্ধে এইমাত্র বলিতে পারি যে, ভারতবর্ষে আদিম জাতিদের কুলক্ষয় অনেক দিন আরম্ভ হইয়াছে, কিন্তু ইংরেজদের সমাগমের পর কোন জাতির ক্ষয় ধরিয়াছে, এমত নিশ্চয় বলিতে পারি না। তবে কোলদের সম্বন্ধে কিছু সন্দেহ করা যাইতে পারে, তাহার কারণ, আর এক সময় সমালোচনা করা যাইবে। এক্ষণে এ সকল কথা যাউক, অনেকের নিকট ইহা শিবের গীত বোধ হইবে। কিন্তু এ বয়সে যখন যাহা মনে হয়, তখনই তাহা বলিতে ইচ্ছা যায়; লোকের ভাল লাগিবে না, এ কথা মনে তখন থাকে না। যাহাই হউক, আগামী বারে সতর্ক হইব। কিন্তু যে কথার আলোচনা আরম্ভ করা গিয়াছিল, তাহা শেষ হয় নাই। ইচ্ছা ছিল, এই উপলক্ষে বাঙ্গালীর কথা কিছু বলি। কিন্তু চারি দিকে বাঙ্গালীর উন্নতি লইয়া বাহবা পড়িয়া গিয়াছে; বাঙ্গালী ইংরেজী শিখিতেছে, উপাধি পাইতেছে, বিলাত যাইতেছে, বাঙ্গালী সভ্যতার সোপানে উঠিতেছে, বাঙ্গালীর আর ভাবনা কী? এ সকল তো বাহ্যিক ব্যাপার। বঙ্গসমাজের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার কি একবার অনুসন্ধান করিলে ভাল হয় না? শুনিতেছি, গণনায় বঙ্গবাসীদের সংখ্যা বাড়িতেছে। বড়ই ভাল!

  • তৃতীয় প্রবন্ধ

    তৃতীয় প্রবন্ধ

    পূর্ব্বে একবার “লাতেহার” নামক পাহাড়ের উল্লেখ করিয়াছিলাম। সেই পাহাড়ের কথা আবার লিখিতে বসিয়াছি বলিয়া আমার আহ্লাদ হইতেছে। পুরাতন কথা বলিতে বড় সুখ, আবার বিশেষ সুখ এই যে, আমি শ্রোতা পাইয়াছি। তিন চারিটি নিরীহ ভদ্রলোক, বোধ হয় তাঁহাদের বয়স হইয়া আসিতেছে, পুরাতন কথা বলিতে শীঘ্র আরম্ভ করিবেন এমন উমেদ রাখেন, বঙ্গদর্শনে আমার লিখিত পালামৌ-পর্য্যটন পড়িয়াছেন; আবার ভাল বলিয়াছেন। প্রশংসা অতিরিক্ত; তুমি প্রশংসা কর আর না কর, বৃদ্ধ বসিয়া তোমায় পুরাতন কথা শুনাবে; তুমি শুন বা না শুন সে তোমায় শুনাবে, পুরাতন কথা এইরূপে থেকে যায়, সমাজের পুঁজি বাড়ে। আমার গল্পে কাহার পুঁজি বাড়িবে না, কেন না আমার নিজের পুঁজি নাই। তথাপি গল্প করি, তোমরা শুনিয়া আমায় চিরবাধিত কর।

    নিত্য অপরাহ্ণে আমি লাতেহার পাহাড়ের ক্রোড়ে গিয়া বসিতাম, তাঁবুতে শত কার্য্য থাকিলেও আমি তাহা ফেলিয়া যাইতাম; চারিটা বাজিলে আমি অস্থির হইতাম; কেন তাহা কখনও ভাবিতাম না; পাহাড়ে কিছুই নূতন নাই, কাহার সহিত সাক্ষাৎ হইবে না, কোন গল্প হইবে না, তথাপি কেন আমায় সেখানে যাইতে হইত জানি না। এখন দেখি এ বেগ আমার একার নহে। যে সময়ে উঠানে ছায়া পড়ে, নিত্য সে সময় কুলবধূর মন মাতিয়া উঠে, জল আনিতে যাইবে; জল আছে বলিলেও তাহারা জল ফেলিয়া জল আনিতে যাইবে; জলে যে যাইতে পাইল না, সে অভাগিনী। সে গৃহে বসিয়া দেখে উঠানে ছায়া পড়িতেছে, আকাশে ছায়া পড়িতেছে, পৃথিবীর রং ফিরিতেছে, বাহির হইয়া সে তাহা দেখিতে পাইল না, তাহার কত দুঃখ। বোধ হয়, আমিও পৃথিবীর রং ফেরা দেখিতে যাইতাম। কিন্তু আর একটু আছে, সেই নির্জ্জন স্থানে মনকে একা পাইতাম, বালকের ন্যায় মনের সহিত ক্রীড়া করিতাম।

    এই পাহাড়ের ক্রোড় অতি নির্জ্জন, কোথাও ছোট জঙ্গল নাই, সর্ব্বত্র ঘাস। অতি পরিষ্কার, তাহাও বাতাস আসিয়া নিত্য ঝাড়িয়া দেয়। মৌয়া গাছ তথায় বিস্তর। কতকগুলি একত্রে গলাগলি করে বাস করে, আর কতকগুলি বিধবার ন্যায় এখানে সেখানে একাকী থাকে। তাহারই মধ্যে একটিকে আমি বড় ভাল বাসিতাম, তাহার নাম “কুমারী” রাখিয়াছিলাম। কখন তাহার ফল কি ফুল হয় নাই; কিন্তু তাহার ছায়া বড় শীতল ছিল। আমি সেই ছায়ায় বসিয়া “দুনিয়া” দেখিতাম। এই উচ্চ স্থানে বসিলে পাঁচ সাত ক্রোশ পর্য্যন্ত দেখা যাইত। দূরে চারি দিকে পাহাড়ের পরিখা, যেন সেইখানে পৃথিবীর শেষ হইয়া গিয়াছে। সেই পরিখার নিম্নে গাঢ় ছায়া, অল্প অন্ধকার বলিলেও বলা যায়। তাহার পর জঙ্গল। জঙ্গল নামিয়া ক্রমে স্পষ্ট হইয়াছে। জঙ্গলের মধ্যে দুই একটি গ্রাম হইতে ধীরে ধীরে ধূম উঠিতেছে, কোন গ্রাম হইতে হয়ত বিষণ্ণ ভাবে মাদল বাজিতেছে, তাহার পরে আমার তাঁবু, যেন একটি শ্বেত কপোতী জঙ্গলের মধ্যে একাকী বসিয়া কী ভাবিতেছে। আমি অন্যমনস্কে এই সকল দেখিতাম; আর ভাবিতাম এই আমার “দুনিয়া।”

    একদিন এই স্থানে সুখে বসিয়া চারি দিক্‌ দেখিতেছি, হঠাৎ একটি লতার প্রতি দৃষ্টি পড়িল; তাহার একটি ডালে অনেক দিনের পর চারি পাঁচটি ফুল ফুটিয়াছিল। লতা আহ্লাদে তাহা গোপন করিতে পারে নাই, যেন কাহারে দেখাইবার জন্য ডালটি বাড়াইয়া দিয়াছিল; একটি কালোকালো বড় গোচের ভ্রমর তাহার চারি দিকে ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল; আর এক একবার সেই লতায় বসিতেছিল। লতা তাহাকে নারাজ, ভ্রমর বসিলেই অস্থির হইয়া মাথা নাড়িয়া উঠে। লতাকে এইরূপ সচেতনের ন্যায় রঙ্গ করিতে দেখিয়া আমি হাসিতেছিলাম, এমত সময়ে আমার পশ্চাতে উচ্চারিত হইল:

    “রাধে মন্যুং পরিহর হরিঃ পাদমূলে তবায়ং।”

    আমি পশ্চাৎ ফিরিলাম, দেখিলাম কেহই নাই, চারি দিক্‌ চাহিলাম, কোথায়ও কেহ নাই। আমি আশ্চর্য্য হইয়া ভাবিতেছি, এমত সময়ে আবার আর এক দিকে শব্দিত হইল,

    “রাধে মন্যুং” ইত্যাদি।

    আমার শরীর রোমাঞ্চ হইল, আমি সেই দিকে কতক সভয়ে, কতক কৌতূহলপরবশে গেলাম। সে দিকে গিয়া আর কিছুই শুনিতে পাইলাম না। কিয়ৎ পরেই “কুমারীর” ডাল হইতে সেই শ্লোক আবার উচ্চারিত হইল, কিন্তু তখন শ্লোকের স্পষ্টতা আর পূর্ব্বমত বোধ হইল না, কেবল সুর আর ছন্দ শুনা গেল। “কুমারীর” মূলে আসিয়া দেখি, হরিয়াল ঘুঘুর ন্যায় একটি পক্ষী আর একটির নিকট মাথা নাড়িয়া এই ছন্দে আস্ফালন করিতে করিতে অগ্রসর হইতেছে, পক্ষিণী তাহাকে ডানা মারিয়া সরিয়া যাইতেছে, কখন কখন অন্য ডালে গিয়া বসিতেছে। এবার আমার ভ্রান্তি দূর হইল, আমি মন্দাক্রান্তাচ্ছন্দের একটিমাত্র শ্লোক জানিতাম; ছন্দটি উচ্চারণ মাত্রেই শ্লোকটি আমার মনে আসিয়াছিল, সঙ্গে সঙ্গে কর্ণেও তাহার কার্য্য হইয়াছিল; আমি তাহাই শুনিয়াছিলাম “রাধে মন্যুং।” কিন্তু পক্ষী বর্ণ উচ্চারণ করে নাই, কেবল ছন্দ উচ্চারণ করিয়াছিল। তাহা যাহাই হউক, আমি অবাক্‌ হইয়া পক্ষীর মুখে সংস্কৃত ছন্দ শুনিতে লাগিলাম। প্রথমে মনে হইল, যিনি ‘উদ্ধবদূত’ লিখিয়াছেন, তিনি হয়ত এই জাতি পক্ষীর নিকট ছন্দদ পাইয়াছিলেন। শ্লোকটির সঙ্গে এই “কুঞ্জকীরানুবাদের” বড় সুসঙ্গতি হইয়াছে। শ্লোকটি এই—

    রাধে মন্যুং পরিহর হরিঃ পাদমূলে তবায়ং।
    জাতং দৈবাদসমৃশমিদং বারমেকং ক্ষমস্ব॥
    এতানাকর্ণয়সি নয়বন্ কুঞ্জকীরানুবাদান।
    এভিঃ ক্রুরৈর্বয়মবিরতং বঞ্চিতাঃ বঞ্চিতাঃ স্মঃ॥

    উদ্ধব মথুরা হইতে বৃন্দাবনে আসিয়া রাধার কুঞ্জে উপস্থিত হইলে গোপীগণ আপনাদের দুঃখের কথা তাঁহার নিকট বলিতেছেন, এমত সময়ে কুঞ্জের একটা পক্ষী বৃক্ষশাখা হইতে বলিয়া উঠিল, “রাধে আর রাগ করিও না। চেয়ে দেখ, স্বয়ং হরি তোমার পদতলে। দৈবাৎ যাহা হইয়া গিয়াছে, একবার তাহা ক্ষমা কর।” গোপীরা এত বার এই কথা রাধিকাকে বলিয়াছে যে, কুঞ্জ-পক্ষীরা তাহা শিখিয়াছিল। যাহা শিখিয়াছিল, অর্থ না বুঝিয়া পক্ষীরা তাহা সর্ব্বদাই বলিত। গোপীরা উদ্ধবকে বলিলেন, “শুন্‌লে—কুঞ্জের ঐ পাখী কী বলিল—শুন্‌লে? একে বিধাতা আমাদের বঞ্চনা করেছেন, আবার দেখ, পোড়া পক্ষীও কত দগ্ধাচ্ছে।”

    পক্ষী আবার বলিল, “রাধে মন্যুং পরিহর হরিঃ পাদমূলে তবায়ং”। তাহাই বলিতেছিলাম বিহঙ্গচ্ছন্দে বিহঙ্গের উক্তি বড় সুন্দর হইয়াছিল।

    ছন্দ কি গীত শিখাইলে অনেক পক্ষী তাহা শিখিতে পারে; কিন্তু ছন্দ যে কোন পক্ষীর স্বরে স্বাভাবিক আছে, তাহা আমি জানিতাম না। সুতরাং বন্য পক্ষীর মুখে ছন্দ শুনিয়া বড় চমৎকৃত হইয়াছিলাম। পক্ষীটির সঙ্গে কতই বেড়াইলাম, কত বার এই ছন্দ শনিলাম, শেষ সন্ধ্যা হইলে তাঁবুতে ফিরিয়া আসিলাম। পথে আসিতে আসিতে মনে হইল, যদি এখানে কেহ ডারউইন সাহেবের ছাত্র থাকিতেন, তিনি ভাবিতেন নিশ্চয়ই এ পক্ষীটি রাধাকুঞ্জের শিক্ষিত পক্ষীর বংশ, বৈজিক কারণে পূর্ব্বপুরুষের অভ্যস্ত শ্লোক ইহার কণ্ঠে আপনি আসিয়াছে। বৈষ্ণবদের উচিত, এ বংশকে আপন আপন কুঞ্জে স্থান দেন। রাধাকুঞ্জের সকল গিয়াছে, সকল ফুরাইয়াছে, কেবল এই বংশ আছে। আমার ইচ্ছা আছে, একটি হরিয়াল পালন করি, দেখি সে “রাধে মন্যুং পরিহর” বলে কি না বলে।

    আর এক দিনের কথা বলি; তাহা হইলেই লাতেহার পাহাড়ের কথা আমার শেষ হয়। যেরূপ নিত্য অপরাহ্ণে এই পাহাড়ে যাইতাম, সেইরূপ আর এক দিন যাইতেছিলাম, পথে দেখি একটি যুবা বীরদর্পে পাহাড়ের দিকে যাইতেছে, পশ্চাতে কতকগুলি স্ত্রীলোক তাহাকে সাধিতে সাধিতে সঙ্গে যাইতেছে। আমি ভাবিলাম, যখন স্ত্রীলোক সাধিতেছে, তখন যুবার রাগ নিশ্চয় ভাতের উপর হইয়াছে; আমি বাঙ্গালী, সুতরাং এ ভিন্ন আর কি অনুভব করিব? এক কালে এরূপ রাগ নিজেও কত বার করিয়াছি, তাহাই অন্যের বীরদর্প বুঝিতে পারি।

    যখন আমি নিকটবর্ত্তী হইলাম, তখন স্ত্রীলোকেরা নিরস্ত হইয়া এক পার্শ্বে দাঁড়াইল। বৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করায় যুবা সদর্পে বলিল, “আমি বাঘ মারিতে যাইতেছি, এইমাত্র আমার গোরুকে বাঘে মারিয়াছে। আমি ব্রাহ্মণ-সন্তান; সে বাঘ না মারিয়া কোন্ মুখে আর জল গ্রহণ করিব?” আমি কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ হইয়া বলিলাম “চল, আমি তোমার সঙ্গে যাইতেছি।” আমার অদৃষ্টদোষে বগলে বন্দুক, পায়ে বুট, পরিধানে কোট পেণ্টুলন, বাস তাঁবুতে; সুতরাং এ কথা না বলিলে ভাল দেখায় না, বিশেষতঃ অনেকে আমায় সাহেব বলিয়া জানে, অতএব সাহেবি ধরণে চলিলাম, কিন্তু নিঃসঙ্কোচচিত্তে। আমি স্বভাবতঃ বড় ভীত, তাহা বলিয়া ব্যাঘ্র ভুল্লুক সম্বন্ধে আমার কখন ভয় হয় নাই। বৃদ্ধ শিকারীরা কত দিন পাহাড়ে একাকী যাইতে আমায় নিষেধ করিয়াছে, কিন্তু আমি তাহা কখনও গ্রাহ্য করি নাই, নিত্য একাকী যাইতাম; বাঘ আসিবে, আমায় ধরিবে, আমায় খাইবে, এ সকল কথা কখনও আমার মনে আসিত না। কেন আসিত না, তাহা আমি এখনও বুঝিতে পারি না। সৈনিক পুরুষদের মধ্যে অনেকে আপনার ছায়া দেখিয়া ভয় পায়, অথচ অম্লান বদনে রণ-ক্ষেত্রে গিয়া রণ করে। গুলি কি তরবার তাহার অঙ্গে প্রবিষ্ট হইবে, এ-কথা তাহাদের মনে আইসে না। যত দিন তাহাদের মনে এ কথা না আইসে, তত দিন লোকের নিকট তাহারা সাহসী; যে বিপদ্‌ না বুঝে, সেই সাহসিক। আদিম অবস্থায় সকল পুরুষই সাহসী ছিল, তাহাদের তখন ফলাফলজ্ঞান হয় নাই। জঙ্গলীদের মধ্যে অদ্যাপি দেখা যায়, সকলেই সাহসী, ইউরোপীয় সভ্যদের অপেক্ষাও অনেক অংশে সাহসী; হেতু ফলাফলবোধ নাই। আমি তাহাই আমার সাহসের বিশেষ গৌরব করি না। সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে সাহসের ভাগ কমিয়া আইসে; পেনাল কোড যত ভালো হয় সাহস তত অন্তর্হিত হয়। এখন এ সকল কচকচি যাক।

    যুবার সঙ্গে কতক দূর গেলে সে আমায় বলিল, “বাঘটি আমি স্বহস্তে মারিব।” আমি হাসিয়া সম্মত হইলাম। যুবা আর কোন কথা না বলিয়া চলিল। তখন হইতে নিজের প্রতি আমার কিঞ্চিৎ ভাল বাসার সঞ্চার হইল। “হস্তে মারিব” এই কথায় বুঝাইয়াছিল, যে পরহস্তে বাঘ মারা সম্ভব; আমি সাহেববেশধারী, অবশ্য বাঘ মারিলে মারিতে পারি, যুবা এ কথা নিশ্চয় ভাবিয়াছিল, তাহাতেই কৃতার্থ হইয়াছিলাম। তাহার পর কতক দূর গিয়া উভয়ে পাহাড়ে উঠিতে লাগিলাম। যুবা অগ্রে, আমি পশ্চাতে। যুবার স্কন্ধে টাঙ্গী, সে একবার তাহা স্কন্ধ হইতে নামাইয়া তীক্ষ্ণতা পরীক্ষা করিয়া দেখিল, তাহার পর কতক দূর গিয়া মৃদুস্বরে আমাকে বলিল, আপনি জুতা খুলুন, শব্দ হইতেছে। আমি জুতা খুলিয়া খালি পায় চলিতে লাগিলাম, আবার কতক দূর গিয়া বলিল, “আপনি এইখানে দাঁড়ান, আমি একবার অনুসন্ধান করিয়া আসি।” আমি দাঁড়াইয়া থাকিলাম, যুবা চলিয়া গেল। প্রায় দণ্ডেক পরে যুবা আসিয়া অতি প্রফুল্লবদনে বলিল, “হইয়াছে, সন্ধান পাইয়াছি, শীঘ্র আসুন, বাঘ নিদ্রা যাইতেছে।” আমি সঙ্গে গিয়া দেখি, পাহাড়ের একস্থানে প্রকাণ্ড দীর্ঘিকার ন্যায় একটি গর্ত্ত বা গুহা আছে, তাহার মধ্যস্থানে প্রস্তরনির্ম্মিত একটি কুটীর, চতুঃপার্শ্বস্থ স্থান তাহার প্রাঙ্গণস্বরূপ। যুবা সেই গর্ত্তের নিকটে এক স্থানে দাঁড়াইয়া অতি সাবধানে ব্যাঘ্র দেখাইল। প্রাঙ্গণের এক পার্শ্বে ব্যাঘ্র নিরীহ ভাল মানুষের ন্যায় চোখ বুজিয়া আছে, মুখের নিকট সুন্দর নখরসংযুক্ত একটি থাবা দর্পণের ন্যায় ধরিয়া নিদ্রা যাইতেছে। বোধ হয় নিদ্রার পূর্ব্বে থাবাটি একবার চাটিয়াছিল। যে দিকে ব্যাঘ্র নিদ্রিত ছিল, যুবা সেই দিকে চলিল। আমায় বলিল, “মাথা নত করিয়া আসুন, নতুবা প্রাঙ্গণে ছায়া পড়িবে।” তদনুসারে আমি নতশিরে চলিলাম; শেষ প্রাঙ্গণে একখানি বৃহৎ প্রস্তরে হাত দিয়া বলিল, “আসুন, এইখানি ঠেলিয়া তুলি।” উভয়ে প্রস্তরখানিকে স্থানচ্যুত করিলাম। তাহার পর যুবা একা তাহা ঠেলিয়া গর্ত্তের প্রান্তে নিঃশব্দে লইয়া গেল, একবার ব্যাঘ্রের প্রতি চাহিল, তাহার পর প্রস্তর ঘোর রবে প্রাঙ্গণে পড়িল। শব্দে কি আঘাতে তাহা ঠিক জানি না, ব্যাঘ্র উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিল; তাহার পর পড়িয়া গেল। এ নিদ্রা আর ভাঙিল না। পর-দিবস বাহকস্কন্ধে ব্যাঘ্রটি আমার তাঁবু পর্য্যন্ত আসিয়াছিলেন; কিন্তু তখন তিনি মহানিদ্রাচ্ছন্ন বলিয়া বিশেষ কোন প্রকার আলাপ হইল না।

  • চতুর্থ প্রবন্ধ

    চতুর্থ প্রবন্ধ

    আবার পালামৌর কথা লিখিতে বসিয়াছি; কিন্তু ভাবিতেছি এবার কী লিখি? লিখিবার বিষয় এখন ত কিছুই মনে হয় না, অথচ কিছু না কিছু লিখিতে হইতেছে। বাঘের পরিচয় ত আর ভাল লাগে না; পাহাড় জঙ্গলের কথাও হইয়া গিয়াছে, তবে আর লিখিবার আছে কী? পাহাড়, জঙ্গল, বাঘ, এই লইয়াই পালামৌ। যে সকল ব্যক্তিরা তথায় বাস করে, তাহারা জঙ্গলী, কুৎসিত, কদাকার জানওয়ার, তাহাদের পরিচয় লেখা বৃথা।

    কিন্তু আবার মনে হয়, পালামৌ জঙ্গলে কিছুই সুন্দর নাই, এ কথা বলিলে লোকে আমায় কী বিবেচনা করিবে? সুতরাং পালামৌ সম্বন্ধে দুটা কথা বলা আবশ্যক।

    এক দিন সন্ধ্যার পর চিকপর্দ্দা ফেলিয়া তাঁবুতে একা বসিয়া সাহেবী ঢঙ্গে কুক্কুরী লইয়া ক্রীড়া করিতেছি, এমত সময় এক জন কে আসিয়া বাহির হইতে আমাকে ডাকিল, “খাঁ সাহেব!” আমার সর্ব্বশরীর জ্বলিয়া উঠিল। এখন হাসি পায়, কিন্তু তখন বড়ই রাগ হইয়াছিল। রাগ হইবার অনেক কারণও ছিল; কারণ নং এক এই যে, আমি মান্য ব্যক্তি; আমাকে ডাকিবার সাধ্য কাহার? আমি যাঁহার অধীন, অথবা যিনি আমা অপেক্ষা অতি প্রধান, কিম্বা যিনি আমার বিশেষ আত্মীয়, কেবল তিনিই আমাকে ডাকিতে পারেন। অন্য লোকে “শুনুন” বলিলে সহ্য হয় না।

    কারণ নং দুই যে, আমাকে “খাঁ সাহেব” বলিয়াছে, বরং “খাঁ বাহাদুর” বলিলে কতক সহ্য করিতে পারিতাম, ভাবিতাম, হয়তো লোকটা আমাকে মুছলমান বিবেচনা করিয়াছে, কিন্তু পদের অগৌরব করে নাই। “খাঁ সাহেব” অর্থে যাহাই হউক, ব্যবহারে তাহা আমাদের “বোস মশায়” বা “দাস মশায়” অপেক্ষা অধিক মান্যের উপাধি নহে। হারম্যান কোম্পানি যাহার কাপড় সেলাই করে, ফরাসী দেশে যাহার জুতা সেলাই হয়, তাহাকে “বোস মহাশয়” বা “দাস মহাশয়” বলিলে সহ্য হইবে কেন? বাবু মহাশয় বলিলেও মন উঠে না। অতএব স্থির করিলাম, এ ব্যক্তি যেই হউক, আমাকে তুচ্ছ করিয়াছে, আমাকে অপমান করিয়াছে।

    সেই মুহূর্ত্তে তাহাকে ইহার বিশেষ প্রতিফল পাইতে হইত, কিন্তু “হারামজাদ্‌” “বদ্‌জাত” প্রভৃতি সাহেবস্বভাবসুলভ গালি ব্যতীত আর তাহাকে কিছুই দিই নাই, এই আমার বাহাদুরি। বোধ হয়, সে রাত্রে বড় শীত পড়িয়াছিল, তাহাই তাঁবুর বাহিরে যাইতে সাহস করি নাই। আগন্তুক গালি খাইয়া আর কোন উত্তর করিল না; বোধ হয় চলিয়া গেল। আমি চিরকাল জানি, যে গালি খায়, সে হয় ভয়ে মিনতি করে, নতুবা গালি অকারণ দেওয়া হইয়াছে প্রতিপন্ন করিবার নিমিত্ত তর্ক করে; তাহা কিছুই না করায়, আমি ভাবিলাম, এ ব্যক্তি চমৎকার লোক। সেও হয়তো আমাকে ভাবিল, “চমৎকার লোক”। নাম জানে না, পদ জানে না, কী বলিয়া ডাকিবে তাহা জানে না; সুতরাং দেশীয় প্রথা অনুসারে সম্ভ্রম করিয়া ‘খাঁ সাহেব’ ডাকিয়াছে, তাহার উত্তরে যে ‘হারামজাদ’ বলিয়া গালি দেয়, তাহাকে “চমৎকার লোক” ব্যতীত আর কী মনে করিবে?

    দণ্ডেক পরে আমার “খানশামা বাবু” তাঁবুর দ্বারে আসিয়া ঈষৎ কণ্ঠকণ্ডুয়নশব্দ দ্বারা আপনার আগমনবার্ত্তা জানাইল। আমার তখনও রাগ আছে, “খানশামা বাবু”ও তাহা জানিত, এইজন্য কলিকা-হস্তে তাঁবুতে প্রবেশ করিল, কিন্তু অগ্রসর হইল না, দ্বারের নিকট দাঁড়াইয়া অতি গম্ভীরভাবে কলিকায় ফুঁ দিতে লাগিল। আমি তাহার মুখের প্রতি চাহিয়া ভাবিতেছি, কতক্ষণে কলিকা আলবোলায় বসাইয়া দিবে, এমন সময়ে দ্বারের পার্শ্বে কী নড়িল, চাহিয়া দেখিলাম সে দিকে কিছুই নাই, কেবল নীল আকাশে নক্ষত্র জ্বলিতেছে; তাহার পরেই দেখি দুইটি অস্পষ্ট মনুষ্যমূর্তি দাঁড়াইয়া আছে। টেবিলের বাতি সরাইলাম, আলোক তাহাদের অঙ্গে পড়িল। দেখিলাম, একটি বৃদ্ধ আবক্ষ শ্বেত শ্মশ্রুতে পরিপ্লুত, মাথায় প্রকাণ্ড পাগড়ি, তাহার পার্শ্বে একটি স্ত্রীলোক বোধ হয় যেন যুবতী। আমি তাহাদের প্রতি চাহিবামাত্র উভয়ে দ্বারের নিকট অগ্রসর হইয়া যোড়হস্তে নতশিরে আমায় সেলাম করিয়া দাঁড়াইল। যুবতীর মুখ দেখিয়া বোধ হইল যেন বড় ভয় পাইয়াছে, অথচ ওষ্ঠে ঈষৎ হাসি আছে। তাহার যুগ্ম ভ্রূ দেখিয়া আমার মনে হইল যেন অতি ঊর্দ্ধে নীল আকাশে কোনো বৃহৎ পক্ষী পক্ষ বিস্তার করিয়া ভাসিতেছে। আমি অনিমিষ লোচনে সুন্দরী দেখিতে লাগিলাম; কেন আসিয়াছে, কোথায় বাড়ী, এ কথা তখন মনে আসিল না। আমি কেবল তাহার রূপ দেখিতে লাগিলাম, তাহাকে দেখিয়াই প্রথমে একটি রূপবতী পক্ষিণী মনে পড়িল; গেঙ্গোখালি “মোহনায়” যেখানে ইংরেজেরা প্রথম উপনিবাস স্থাপন করেন, সেইখানে একদিন অপরাহ্ণে বন্দুক স্কন্ধে পক্ষী শিকার করিতে গিয়াছিলাম, তথায় কোন বৃক্ষের শুষ্ক ডালে একটি ক্ষুদ্র পক্ষী অতি বিষণ্নভাবে বসিয়াছিল, আমি তাহার সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইলাম, আমায় দেখিয়া পক্ষী উড়িল না, মাথা হেলাইয়া আমায় দেখিতে লাগিল। ভাবিলাম “জঙ্গলী পাখি হয়ত কখন মানুষ দেখে নাই, দেখিলে বিশ্বাসঘাতককে চিনিত।” চিনাইবার নিমিত্ত আমি হাসিয়া বন্দুক তুলিলাম; তবু পক্ষী উড়িল না, বুক পাতিয়া আমার মুখপ্রতি চাহিয়া রহিল। আমি অপ্রতিভ হইলাম, তখন ধীরে ধীরে বন্দুক নামাইয়া অনিমিষলোচনে পক্ষীকে দেখিতে লাগিলাম; তাহার কি আশ্চর্য্য রূপ! সেই পক্ষিণীতে যে রূপরাশি দেখিয়াছিলাম, এই যুবতীতে ঠিক্‌ তাহাই দেখিলাম। আমি কখন কবির চক্ষে রূপ দেখি নাই, চিরকাল বালকের মত রূপ দেখিয়া থাকি, এই জন্য আমি যাহা দেখি, তাহা অন্যকে বুঝাইতে পারি না। রূপ যে কি জিনিস, রূপের আকার কি, শরীরের কোন্ কোন্ স্থানে তাহার বাসা, এ সকল বার্ত্তা আমাদের বঙ্গকবিরা বিশেষ জানেন, এইজন্য তাঁহারা অঙ্গ বাছিয়া বাছিয়া বর্ণনা করিতে পারেন, দুর্ভাগ্যবশতঃ আমি তাহা পারি না। তাহার কারণ, আমি কখন অঙ্গ বাছিয়া রূপ তল্লাস করি নাই। আমি যে প্রকারে রূপ দেখি, নির্লজ্জ হইয়া তাহা বলিতে পারি। একবার আমি দুই বৎসরের একটি শিশু গৃহে রাখিয়া বিদেশে গিয়াছিলাম। শিশুকে সর্ব্বদাই মনে হইত, তাহার ন্যায় রূপ আর কাহারও দেখিতে পাইতাম না। অনেক দিনের পর একটি ছাগশিশুতে সেই রূপরাশি দেখিয়া আহ্লাদে তাহাকে বুকে করিয়াছিলাম। আমার সেই চক্ষু! আমি রূপরাশি কী বুঝিব? তথাপি যুবতীকে দেখিতে লাগিলাম।

    বাল্যকালে আমার মনে হইত যে, ভূত প্রেত যে প্রকার নিজে দেহহীন, অন্যের দেহে আবির্ভাবে বিকাশ পায়, রূপও সেইপ্রকার অন্যদেহ অবলম্বন করিয়া প্রকাশ পায়, কিন্তু প্রভেদ এই যে, ভূতের আশ্রয় কেবল মনুষ্য, বিশেষতঃ মানবী। কিন্তু বৃক্ষ, পল্লব, নদ ও নদী প্রভৃতি সকলেই রূপ আশ্রয় করে। যুবতীতে যে রূপ, লতায় সেই রূপ, নদীতেও সেই রূপ, পক্ষীতেও সেই রূপ, ছাগেও সেই রূপ; সুতরাং রূপ এক, তবে পাত্র-ভেদ। আমি পাত্র দেখিয়া ভুলি না; দেহ দেখিয়া ভুলি না; ভুলি কেবল রূপে। সে রূপ, লতায় থাক অথবা যুবতীতে থাক, আমার মনের চক্ষে তাহার কোন প্রভেদ দেখি না। অনেকের এই প্রকার রুচিবিকার আছে। যাঁহারা বলেন যুবতীর দেহ দেখিয়া ভুলিয়াছেন, তাঁহাদের মিথ্যা কথা।

    আমি যুবতীকে দেখিতেছি, এমত সময় আমার খানসামা বাবু বলিল, “এরা বাই, এরাই তখন খাঁ সাহেব বলিয়া ডাকিয়াছিল।” শুনিবামাত্র আবার রাগ পূর্ব্বমত গর্জ্জিয়া উঠিল, চীৎকার করিয়া আমি তাহাদের তাড়াইয়া দিলাম। সেই অবধি আর তাহাদের কথা কেহ আমায় বলে নাই। পর-দিবস অপরাহ্ণে দেখি, এক বটতলায় ছোট বড় কতকগুলা স্ত্রীলোক বসিয়া আছে, নিকটে দুই একটা “বেতো” ঘোড়া চরিতেছে জিজ্ঞাসা করায় জানিলাম, তাহারাও “বাই”; ব্যয় লাঘব করিবার নিমিত্ত তাহারা পালামৌ দিয়া যাইতেছে, এই সময় পূর্ব্বরাত্রের বাইকে আমার স্মরণ হইল, তাহার গীত শুনিব মনে করিয়া তাহাকে ডাকিতে পাঠাইলাম। কিন্তু লোক ফিরিয়া আসিয়া বলিল, অতি প্রত্যুষে সে চলিয়া গিয়াছে, আমি আর কোন কথা কহিলাম না দেখিয়া এক জন রাজপুত প্রতিবাসী বলিল, “সে কাঁদিয়া গিয়াছে।”

    আ। কেন?

    প্র। এই জঙ্গল দিয়া আসিতে তাহার সঙ্গীরা সকলে মরিয়াছে, মাত্র এক জন বৃদ্ধ সঙ্গে ছিল, “খরচা”ও ফুরাইয়াছে। দুই দিন উপবাস করিয়াছে, আরও কতদিন উপবাস করিতে হয় বলা যায় না। এ জঙ্গল পাহাড় মধ্যে কোথা ভিক্ষা পাইবে? আপনার নিকট ভিক্ষার নিমিত্ত আসিয়াছিল, আপনিও ভিক্ষা দেন নাই।

    এ কথা শুনিয়া আমার কষ্ট হইল, তাহার বিপদ্‌ কতক অনুভব করিতে পারিলাম, নিজে সেই অবস্থায় পড়িলে কী যন্ত্রণা পাইতাম, তাহা কল্পনা করিতে লাগিলাম। জঙ্গলে অন্নাভাব, আর অপার নদীতে নৌকাডুবি একই প্রকার। আমি তাহাকে অনায়াসে দুই পাঁচ টাকা দিতে পারিতাম, তাহাতে নিজের কোন ক্ষতি হইত না; অথচ সে রক্ষা পাইত। আমি তাহাকে উদ্ধার করিলাম না, তাড়াইয়া দিলাম; এ নিষ্ঠুরতার ফল এক দিন আমায় অবশ্য পাইতে হইবে, এরূপ কথা আমার সর্ব্বদা মনে হইত। দুই চারি দিনের পর একটি সাহেবের সহিত আমার দেখা হইল, তিনি দশ ক্রোশ দূরে একা থাকিতেন, গল্প করিবার নিমিত্ত মধ্যে মধ্যে আমার তাঁবুতে আসিতেন। গল্প করিতে করিতে আমি তাঁহাকে যুবতীর কথা বলিলাম। তিনি কিয়ৎক্ষণ রহস্য করিলেন, তাহার পর বলিলেন, আমি স্ত্রীলোকটির কথা শুনিয়াছি; সে এ জঙ্গল অতিক্রম করিতে পারে নাই, পথে মরিয়াছে। এ কথা সত্যই হউক বা মিথ্যাই হউক, আমার বড়ই কষ্ট হইল; আমি কেবল অহঙ্কারের চাতুরীতে পড়িয়া “খাঁ সাহেব” কথায় চটিয়াছিলাম। তখন জানিতাম না যে, এক দিন আপনার অহঙ্কারে আপনি হাসিব।

    সাহেবকে বিদায় দিয়া অপরাহ্ণে যুবতীর কথা ভাবিতে ভাবিতে পাহাড়ের দিকে যাইতেছিলাম, পথিমধ্যে কতকগুলি কোলকন্যার সহিত সাক্ষাৎ হইল, তাহারা “দাড়ি” হইতে জল তুলিতেছিল। এই অঞ্চলে জলাশয় একেবারে নাই, নদী শীতকালে একেবারে শুষ্কপ্রায় হইয়া যায়, সুতরাং গ্রাম্য লোকেরা এক এক স্থানে পাতকুয়ার আকারে ক্ষুদ্র খাদ খনন করে—তাহা দুই হাতের অধিক গভীর করিতে হয় না—সেই খাদে জল ক্রমে ক্রমে চুঁইয়া জমে। আট দশ কলস তুলিলে আর কিছু থাকে না, আবার জল ক্রমে আসিয়া জমে। এই ক্ষুদ্র খাদগুলিকে দাড়ি বলে।

    কোলকন্যারা আমাকে দেখিয়া দাঁড়াইল। তাহাদের মধ্যে একটি লম্বোদরী—সর্ব্বাপেক্ষ বয়োজ্যেষ্ঠা—মাথায় পূর্ণ কলস দুই হস্তে ধরিয়া হাস্যমুখে আমায় বলিল, রাত্রে নাচ দেখিতে আসিবেন? আমি মাথা হেলাইয়া স্বীকার করিলাম, অমনি সকলে হাসিয়া উঠিল। কোলের যুবতীরা যত হাসে, যত নাচে, বোধহয় পৃথিবীর আর কোন জাতির কন্যারা তত হাসিতে নাচিতে পারে না; আমাদের দুরন্ত ছেলেরা তাহার শতাংশ পারে না।

    সন্ধ্যার পর আমি নৃত্য দেখিতে গেলাম; গ্রামের প্রান্তভাগে এক বটবৃক্ষতলে গ্রামস্থ যুবারা সমুদয়ই আসিয়া একত্র হইয়াছে। তাহারা “খোপা” বাঁধিয়াছে, তাহাতে দুই তিনখানি কাঠের “চিরুণী” সাজাইয়াছে। কেহ মাদল আনিয়াছে, কেহ বা লম্বা লাঠি আনিয়াছে, রিক্তহস্তে কেহই আসে নাই, বয়সের দোষে সকলেরই দেহ চঞ্চল, সকলেই নানা ভঙ্গীতে আপন আপন বলবীর্য্য দেখাইতেছে। বৃদ্ধেরা বৃক্ষমূলে উচ্চ মৃন্ময় মঞ্চের উপর জড়বৎ বসিয়া আছে, তাহাদের জানু প্রায় স্কন্ধ ছাড়াইয়াছে, তাহারা বসিয়া নানাভঙ্গিতে কেবল ওষ্ঠক্রীড়া করিতেছে, আমি গিয়া তাহাদের পার্শ্বে বসিলাম।

    এই সময় দলে দলে গ্রামস্থ যুবতীরা আসিয়া জমিতে লাগিল; তাহারা আসিয়াই যুবাদিগের প্রতি উপহাস আরম্ভ করিল, সঙ্গে সঙ্গে বড় হাসির ঘটা পড়িয়া গেল। উপহাস আমি কিছুই বুঝিতে পারিলাম না; কেবল অনুভবে স্থির করিলাম যে, যুবারা ঠকিয়া গেল। ঠকিবার কথা, যুবা দশ বারটি, কিন্তু যুবতীরা প্রায় চল্লিশ জন, সেই চল্লিশ জনে হাসিলে হাইলণ্ডের পল্টন ঠকে।

    হাস্য উপহাস্য শেষ হইলে, নৃত্যের উদ্যোগ আরম্ভ হইল। যুবতী সকলে হাত ধরাধরি করিয়া অর্দ্ধচন্দ্রাকৃতি রেখা বিন্যাস করিয়া দাঁড়াইল। দেখিতে বড় চমৎকার হইল। সকলগুলিই সম উচ্চ, সকলগুলিই পাথুরে কাল; সকলেরই অনাবৃত দেহ, সকলের সেই অনাবৃত বক্ষে আরশির ধুকধুকি চন্দ্রকিরণে এক একবার জ্বলিয়া উঠিতেছে। আবার সকলের মাথায় বনপুষ্প, কর্ণে বনপুষ্প, ওষ্ঠে হাসি। সকলেই আহ্লাদে পরিপূর্ণ, আহ্লাদে চঞ্চল, যেন তেজঃপুঞ্জ অশ্বের ন্যায় সকলেই দেহবেগ সংযম করিতেছে।

    সম্মুখে যুবারা দাঁড়াইয়া, যুবাদের পশ্চাতে মৃন্ময়মঞ্চোপরি বৃদ্ধেরা এবং তৎসঙ্গে এই নরাধম। বৃদ্ধেরা ইঙ্গিত করিলে যুবাদের দলে মাদল বাজিল, অমনি যুবতীদের দেহ যেন শিহরিয়া উঠিল; যদি দেহের কোলাহল থাকে, তবে যুবতীদের দেহে সেই কোলাহল পড়িয়া গেল, পরেই তাহারা নৃত্য আরম্ভ করিল। তাহাদের নৃত্য আমাদের চক্ষে নূতন; তাহারা তালে তালে পা ফেলিতেছে, অথচ কেহ চলে না; দোলে না, টলে না। যে যেখানে দাঁড়াইয়াছিল, সে সেইখানেই দাঁড়াইয়া তালে তালে পা ফেলিতে লাগিল, তাহাদের মাথার ফুলগুলি নাচিতে লাগিল, বুকের ধুক্‌ধুকি দুলিতে লাগিল।

    নৃত্য আরম্ভ হইলে পর একজন বৃদ্ধ মঞ্চ হইতে কম্পিতকণ্ঠে একটি গীতের “মহড়া” আরম্ভ করিল, অমনি যুবারা সেই গীত উচ্চেঃস্বরে গাইয়া উঠিল, সঙ্গে সঙ্গে যুবতীরা তীব্র তানে “ধুয়া” ধরিল। যুবতীদের সুরের ঢেউ নিকটের পাহাড়ে গিয়া লাগিতে লাগিল। আমার তখন স্পষ্ট বোধ হইতে লাগিল, যেন সুর কখন পাহাড়ের মূল পর্য্যন্ত, কখন বা পাহাড়ের বক্ষ পর্য্যন্ত গিয়া ঠেকিতেছে; তাল পাহাড়ে ঠেকা অনেকের নিকট রহস্যের কথা, কিন্তু আমার নিকট তাহা নহে, আমার লেখা পড়িতে গেলে এরূপ প্রলাপবাক্য মধ্যে মধ্যে সহ্য করিতে হইবে।

    যুবতীরা তালে তালে নাচিতেছে, তাহাদের মাথার বনফুল সেই সঙ্গে উঠিতেছে নামিতেছে, আবার সেই ফুলের দুটি একটি ঝরিয়া তাহাদের স্কন্ধে পড়িতেছে। শীতকাল, নিকটে, দুই তিন স্থানে হু হু করিয়া অগ্নি জ্বলিতেছে, অগ্নির আলোকে নর্ত্তকীদের বর্ণ আরও কাল দেখাইতেছে; তাহারা তালে তালে নাচিতেছে, নাচিতে নাচিতে ফুলের পাপড়ির ন্যায় সকলে একবার “চিতিয়া” পড়িতেছে; আকাশ হইতে চন্দ্র তাহা দেখিয়া হাসিতেছে, আর বটমূলের অন্ধকারে বসিয়া আমি হাসিতেছি।

    নৃত্যের শেষ পর্য্যন্ত থাকিতে পারিলাম না; বড় শীত; অধিক ক্ষণ থাকা গেল না।

  • পঞ্চম প্রবন্ধ

    পঞ্চম প্রবন্ধ

    কোলের নৃত্য সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিৎ বলা হইয়াছে, এবার তাহাদের বিবাহের পরিচয় দিতে ইচ্ছা হইতেছে। কোলের অনেক শাখা আছে। আমার স্মরণ নাই, বোধ হয় যেন উরাঙ, মুণ্ডা, খেরওয়ার এবং দোসাদ এই চারি জাতি তাহার মধ্যে প্রধান। ইহার এক জাতির বিবাহে আমি বরযাত্রী হইয়া কতক দূর গিয়াছিলাম। বরকর্ত্তা আমার পাল্‌কী লইয়া গেল, কিন্তু আমায় নিমন্ত্রণ করিল না; ভাবিলাম—না করুক, আমি রবাহূত যাইব। সেই অভিপ্রায়ে অপরাহ্ণে পথে দাঁড়াইয়া থাকিলাম। কিছুক্ষণ পরে দেখি, পাল্‌কীতে বর আসিতেছে। সঙ্গে দশ বার জন পুরুষ আর পাঁচ ছয় জন যুবতী, যুবতীরাও বরযাত্রী। পুরুষেরা আমায় কেহই ডাকিল না, স্ত্রীলোকের চক্ষুলজ্জা আছে, তাহারা হাসিয়া আমায় ডাকিল, আমিও হাসিয়া তাহাদের সঙ্গে চলিলাম; কিন্তু অধিক দূর যাইতে পারিলাম না; তাহারা যেরূপ বুক ফুলাইয়া, মুখ তুলিয়া, বায়ু ঠেলিয়া মহাদম্ভে চলিতেছিল, আমি দুর্ব্বল বাঙ্গালী, আমার সে দম্ভ, সে শক্তি কোথায়? সুতরাং কতক দূর গিয়া পিছাইলাম; তাহারা তাহা লক্ষ করিল না; হয়ত দেখিয়াও দেখিল না; আমি বাঁচিলাম। তখন পথপ্রান্তে এক প্রস্তরস্তূপে বসিয়া ঘর্ম্ম মুছিতে লাগিলাম, আর রাগভরে পাথুরে মেয়েগুলাকে গালি দিতে লাগিলাম। তাহাদিগকে সেপাই বলিলাম, সিদ্ধেশ্বরীর পাল বলিলাম, আর কত কি বলিলাম। আর একবার বহু পূর্ব্বে এইরূপ গালি দিয়াছিলাম। একদিন বেলা দুই প্রহরের সময় টিটাগড়ের বাগানে “লসিংটন লজ” হইতে গজেন্দ্রগমনে আমি আসিতেছিলাম—তখন রেলওয়ে ছিল না, সুতরাং এখনকার মত বেগে পথ চলা বাঙ্গালীর মধ্যে বড় ফেসন হয় নাই—আসিতে আসিতে পশ্চাতে একটা অল্প টক টক শব্দ শুনিতে পাইলাম। ফিরিয়া দেখি, গবর্ণর জেনেরল কাউন্‌সলের অমুক মেম্বারের কুলকন্যা একা আসিতেছেন। আমি তখন বালক, ষোড়শ বৎসরের অধিক আমার বয়স নহে, সুতরাং বয়সের মত স্থির করিলাম, স্ত্রীলোকের নিকট পিছাইয়া পড়া হইবে না, অতএব যথাসাধ্য চলিতে লাগিলাম। হয়ত যুবতীও তাহা বুঝিলেন। আর একটু অধিক বয়স হইলে এদিকে তাঁহার মন যাইত না। তিনি নিজে অল্পবয়স্কা; আমার অপেক্ষা কিঞ্চিৎমাত্র বয়োজ্যেষ্ঠা, সুতরাং এই উপলক্ষে বাইচ খেলার আমোদ তাঁহার মনে আসা সম্ভব। সেই জন্য একটু যেন তিনি জোরে বাহিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে পশ্চিমে মেঘের মতো আমাকে ছাড়াইয়া গেলেন, যেন সেইসঙ্গে একটু “দুয়ো” দিয়া গেলেন,—অবশ্য তাহা মনে মনে, তাঁহার ওষ্ঠপ্রান্তে একটু হাসি ছিল, তাহাই বলিতেছি। আমি লজ্জিত হইয়া নিকটস্থ বটমূলে বসিয়া সুন্দরীদের উপর রাগ করিয়া নানা কথা বলিতে লাগিলাম। যাহারা এত জোরে পথ চলে, তাহারা আবার কোমলাঙ্গী? খোশামুদেরা বলে, তাহাদের অলকদাম সরাইবার নিমিত্ত বায়ু ধীরে ধীরে বহে। কলাগাছে ঝড়, আর শিমূল গাছে সমীরণ?

    সে সকল রাগের কথা এখন যাক; যে হারে, সেই রাগে। কোলের কথা হইতেছিল। তাহাদের সকল জাতির মধ্যে একরূপ বিবাহ নহে। এক জাতি কোল আছে, তাহারা উরাঙ কি, কি তাহা স্মরণ নাই, তাহাদের বিবাহপ্রথা অতি পুরাতন। তাহাদের প্রত্যেক গ্রামের প্রান্তে একখানি করিয়া বড় ঘর থাকে। সেই ঘরে সন্ধ্যার পর একে একে গ্রামের সমুদয় কুমারীরা আসিয়া উপস্থিত হয়, সেই ঘর তাহাদের ডিপো। বিবাহযোগ্য হইলে আর তাহারা পিতৃগৃহে রাত্রি যাপন করিতে পায় না। সকলে উপস্থিত হইয়া শয়ন করিলে গ্রামের অবিবাহিত যুবারা ক্রমে ক্রমে সকলে সেই ঘরের নিকটে আসিয়া রসিকতা আরম্ভ করে, কেহ গীত গায়, কেহ নৃত্য করে, কেহ বা রহস্য করে। যে কুমারীর বিবাহের সময় হয় নাই, সে অবাধে নিদ্রা যায়। কিন্তু যাহাদের সময় উপস্থিত, তাহারা বসন্তকালের পক্ষিণীর ন্যায় অনিমেষলোচনে সেই নৃত্য দেখিতে থাকে, একাগ্রচিত্তে সেই গীত শুনিতে থাকে। হয়ত থাকিতে না পারিয়া শেষে ঠাট্টার উত্তর দেয়, কেহ বা গালি পর্য্যন্তও দেয়। গালি আর ঠাট্টা উভয়ে প্রভেদ অল্প, বিশেষ যুবতীর মুখবিনির্গত হইলে যুবার কর্ণে উভয়ই সুধাবর্ষণ। কুমারীরা গালি আরম্ভ করিলে কুমারেরা আনন্দে মাতিয়া উঠে।

    এইরূপে প্রতি রাত্রে কুমার কুমারীর বাক্‌চাতুরী হইতে থাকে, শেষ তাহাদের মধ্যে প্রণয় উপস্থিত হয়। প্রণয় কথাটি ঠিক নহে। কোলেরা প্রেম প্রীতের বড় সম্বন্ধ রাখে না। মনোনীত কথাটি ঠিক। নৃত্য হাস্য উপহাস্যের পর পরস্পর মনোনীত হইলে সঙ্গী, সঙ্গিনীরা তাহা কাণাকাণি করিতে থাকে। ক্রমে গ্রামে রাষ্ট্র হইয়া পড়ে। রাষ্ট্র কথা শুনিয়া উভয় পক্ষের পিতৃকুল সাবধান হইতে থাকে। সাবধানতা অন্য বিষয়ে নহে। কুমারীর আত্মীয় বন্ধুরা বড় বড় বাঁশ কাটে, তীর ধনুক সংগ্রহ করে, অস্ত্রশস্ত্রে শান দেয়। আর অনবরত কুমারের আত্মীয় বন্ধুকে গালি দিতে থাকে। চীৎকার আর আস্ফালনের সীমা থাকে না। আবার এদিকে উভয় পক্ষে গোপনে গোপনে বিবাহের আয়োজনও আরম্ভ করে।

    শেষ একদিন অপরাহ্ণে কুমারী হাসি হাসি মুখে বেশ বিন্যাস করিতে বসে। সকলে বুঝিয়া চারি পার্শ্বে দাঁড়ায়, হয়তো ছোট ভগিনী বন হইতে নূতন ফুল আনিয়া মাথায় পরাইয়া দেয়, বেশ বিন্যাস হইলে কুমারী উঠিয়া গাগরি লইয়া একা জল আনিতে যায়। অন্য দিনের মত নহে, এ দিনে ধীরে ধীরে যায়, তবু মাথায় গাগরি টলে। বনের ধারে জল, যেন কতই দূর! কুমারী যাইতেছে আর অনিমেষলোচনে বনের দিকে চাহিতেছে। চাহিতে চাহিতে বনের দুই একটি ডাল দুলিয়া উঠিল। তাহার পর এক নবযুবা, সখা সুবলের মত লাফাইতে লাফাইতে সেই বন হইতে বহির্গত হইল, সঙ্গে সঙ্গে হয়তো দুটা চারিটা ভ্রমরও ছুটিয়া আসিল। কোল-কুমারীর মাথা হইতে গাগরি পড়িয়া গেল। কুমারীকে বুকে করিয়া যুবা অমনি ছুটিল। কুমারী সুতরাং এ অবস্থায় চীৎকার করিতে বাধ্য, চীৎকারও সে করিতে লাগিল। হাত পাও আছড়াইল। এবং চড়টা চাপড়টা যুবাকেও মারিল; নতুবা ভাল দেখায় না! কুমারীর চীৎকারে তাহার আত্মীয়েরা “মার মার” রবে আসিয়া পড়িল। যুবার আত্মীয়েরাও নিকটে এখানে সেখানে লুকাইয়া ছিল, তাহারাও বাহির হইয়া পথরোধ করিল। শেষে যুদ্ধ আরম্ভ হইল। যুদ্ধ রুক্মিণীহরণের যাত্রার মতো, সকলের তীর আকাশমুখী। কিন্তু শুনিয়াছি, দুই একবার নাকি সত্য সত্যই মাথা ফাটাফাটিও হইয়া গিয়াছে। যাহাই হউক, শেষ যুদ্ধের পর আপোষ হইয়া যায় এবং তৎক্ষণাৎ উভয় পক্ষ একত্র আহার করিতে বসে।

    এইরূপ কন্যা হরণ করাই তাহাদের বিবাহ। আর স্বতন্ত্র কোনো মন্ত্র তন্ত্র নাই। আমাদের শাস্ত্রে এই বিবাহকে আসুরিক বিবাহ বলে। এক সময় পৃথিবীর সর্ব্বত্র এই বিবাহ প্রচলিত ছিল। আমাদের দেশে স্ত্রী-আচারের সময় বরের পৃষ্ঠে বাউটি-বেষ্টিত নানা ওজনের করকমল যে সংস্পর্শ হয়, তাহাও এই মারপিট প্রথার অবশেষ। হিন্দুস্থান অঞ্চলের বরকন্যার মাসী পিসী একত্র জুটিয়া নানা ভঙ্গীতে, নানা ছন্দে, মেছুয়াবাজারের ভাষায় পরস্পরকে যে গালি দিবার রীতি আছে, তাহাও এই মারপিট প্রথার নূতন সংস্কার। ইংরেজদের বরকন্যা গির্জ্জা হইতে গাড়ীতে উঠিবার সময় পুষ্পবৃষ্টির ন্যায় তাহাদের অঙ্গে যে জুতাবৃষ্টি হয়, তাহাও এই পূর্ব্বপ্রথার অন্তর্গত।1

    কোলদের উৎসব সর্ব্বাপেক্ষা বিবাহে। তদুপলক্ষে ব্যয়ও বিস্তর। আট টাকা, দশ টাকা, কখন কখন পনর টাকা পর্য্যন্ত ব্যয় হয়। বাঙ্গালীর পক্ষে ইহা অতি সামান্য, কিন্তু বন্যের পক্ষে অতিরিক্ত। এত টাকা তাহারা কোথা পাইবে? তাহাদের এক পয়সা সঞ্চয় নাই, কোন উপার্জ্জনও নাই, সুতরাং ব্যয় নির্ব্বাহ করিবার নিমিত্ত কর্জ্জ করিতে হয়। দুই চারি গ্রাম অন্তর এক জন করিয়া হিন্দুস্থানী মহাজন বাস করে, তাহারাই কর্জ্জ দেয়। এই হিন্দুস্থানীরা মহাজন কি মহাপিশাচ, সে বিষয়ে আমার বিশেষ সন্দেহ আছে। তাহাদের নিকট একবার কর্জ্জ করিলে আর উদ্ধার নাই। যে একবার পাঁচ টাকা মাত্র কর্জ্জ করিল সে সেই দিন হইতে আপন গৃহে আর কিছুই লইয়া যাইতে পাইবে না, যাহা উপার্জ্জন করিবে, তাহা মহাজনকে আনিয়া দিতে হইবে। খাতকের ভূমিতে দুই মণ কার্পাস, কি চারি মণ যব জন্মিয়াছে, মহাজনের গৃহে তাহা আনিতে হইবে; তিনি তাহা ওজন করিবেন, পরীক্ষা করিবেন, কত কি করিবেন, শেষ হিসাব করিয়া বলিবেন যে, আসল পাঁচ টাকার মধ্যে এই কার্পাসে কেবল এক টাকা শোধ গেল, আর চারি টাকা বাকি থাকিল। খাতক যে আজ্ঞা বলিয়া চলিয়া যায়। কিন্তু তাহার পরিবার খায় কি? চাষে যাহা জন্মিয়াছিল, মহাজন তাহা সমুদয় লইল। খাতক হিসাব জানে না, এক হইতে দশ গণনা করিতে পারে না, সকলের উপর তাহার সম্পূর্ণ বিশ্বাস। মহাজন যে অন্যায় করিবে, ইহা তাহার বুদ্ধিতে আইসে না। সুতরাং মহাজনের জালে বদ্ধ হইল। তাহার পর পরিবার আহার পায় না, আবার মহাজনের নিকট খোরাকী কর্জ্জ করা আবশ্যক, সুতরাং খাতক জন্মের মত মহাজনের নিকট বিক্রীত হইল। যাহা সে উপার্জ্জন করিবে, তাহা মহাজনের। মহাজন তাহাকে কেবল যৎসামান্য খোরাকি দিবে। এই তাহার এ জন্মের বন্দোবস্ত।

    কেহ কেহ এই উপলক্ষে “সামকনামা” লিখিয়া দেয়। সামকনামা অর্থাৎ দাসখত। যে ইহা লিখিয়া দিল, সে রীতিমত গোলাম হইল। মহাজন গোলামকে কেবল আহার দেন, গোলাম বিনা বেতনে তাঁহার সমুদয় কর্ম্ম করে; চাষ করে, মোট বহে, সর্ব্বত্র সঙ্গে যায়। আপনার সংসারের সঙ্গে আর তাহার কোন সম্বন্ধ থাকে না। সংসারও তাহাদের অন্নাভাবে শীঘ্রই লোপ পায়।

    কোলদের এই দুর্দ্দশা অতি সাধারণ। তাহাদের কেবল এক উপায় আছে—পলায়ন। অনেকেই পলাইয়া রক্ষা পায়। যে না পলাইল, সে জন্মের মত মহাজনের নিকট বিক্রীত থাকিল।

    পুত্রের বিবাহ দিতে গিয়া যে কেবল কোলের জীবনযাত্রা বৃথা হয় এমত নহে, আমাদের বাঙ্গালীর মধ্যে অনেকের দুর্দ্দশা পুত্রের বিবাহ উপলক্ষে অথবা পিতৃমাতৃশ্রাদ্ধ উপলক্ষে। সকলেই মনে মনে জানেন, আমি বড় লোক, আমি “ধুমধাম” না করিলে লোকে আমার নিন্দা করিবে। সুতরাং কর্জ্জ করিয়া সেই বড়লোকত্ব রক্ষা করেন, তাহার পর যথাসর্ব্বস্ব বিক্রয় করিয়া সে কর্জ্জ হইতে উদ্ধার হওয়া ভার হয়। প্রায় দেখা যায়, “আমি ধনবান্” বলিয়া প্রথমে অভিমান জন্মিলে শেষ দারিদ্র্যদশায় জীবন শেষ করিতে হয়।

    কোলেরা সকলেই বিবাহ করে। বাঙ্গালা শস্যশালিনী, এখানে অল্পেই গুজরান চলে, তাই বাঙ্গালায় বিবাহ এত সাধারণ। কিন্তু পালামৌ অঞ্চলে সম্পূর্ণ অন্নাভাব, সেখানে বিবাহ এরূপ সাধারণ কেন, তদ্বিষয়ে সমাজতত্ত্ববিদেরা কি বলেন জানি না। কিন্তু বোধ হয় হিন্দুস্থানী মজাজনেরা তথায় বাস করিবার পূর্ব্বে কোলদের এত অন্নাভাব ছিল না। তাহাই বিবাহ সাধারণ হইয়াছিল। এক্ষণে মহাজনেরা তাহাদের সর্ব্বস্ব লয়। তাহাদের অন্নাভাব হইয়াছে, সুতরাং বিবাহ আর পূর্ব্বমত সাধারণ থাকিবে না বলিয়া বোধ হয়।

    কোলের সমাজ এক্ষণে যে অবস্থায় আছে দেখা যায়, তাহাতে সেখানে মহাজনের আবশ্যক নাই, যদি হিন্দুস্থানী সভ্যতা তথায় প্রবিষ্ট না হইত, তাহা হইলে অদ্যাপি কোলের মধ্যে ঋণের প্রথা উৎপত্তি হইত না। ঋণের সময় হয় নাই। ঋণ উন্নত সমাজের সৃষ্টি। কোলদিগের মধ্যে সে উন্নতির বিলম্ব আছে। সমাজের স্বভাবতঃ যে অবস্থা হয় নাই, কৃত্রিম উপায়ে সে অবস্থা ঘটাইতে গেলে, অথবা সভ্য দেশের নিমাদি অসময়ে অসভ্য দেশে প্রবিষ্ট করাইতে গেলে, ফল ভাল হয় না। আমাদের বাঙ্গালায় এ কথার অনেক পরিচয় পাওয়া যাইতেছে। এক সময় ইহুদি মহাজনেরা ঋণ দানের সভ্য নিয়ম অসভ্য বিলাতে প্রবেশ করাইয়া অনেক অনিষ্ট ঘটাইয়াছিল। এক্ষণে হিন্দুস্থানী মহাজনেরা কোলদের সেইরূপ অনিষ্ট ঘটাইতেছে।

    কোলের নববধূ আমি কখন দেখি নাই। কুমারী এক রাত্রের মধ্যে নববধূ! দেখিতে আশ্চর্য্য! বাঙ্গালায় দুরন্ত ছুঁড়ীরা ধূলাখেলা করিয়া বেড়াইতেছে, ভাইকে পিটাইতেছে, পরের গোরুকে গাল দিতেছে, পাড়ার ভালখাকীদের সঙ্গে কোঁদল করিতেছে, বিবাহের কথা উঠিলে ছুঁড়ী গালি দিয়া পলাইতেছে। তাহার পর এক রাত্রে ভাবান্তর। বিবাহের পরদিন প্রাতে আর সে পূর্ব্বমতো দুরন্ত ছুঁড়ী নাই। এক রাত্রে তার আশ্চর্য্য পরিবর্ত্তন হইয়া গিয়াছে। আমি একটি এইরূপ নববধূ দেখিয়াছি। তাহার পরিচয় দিতে ইচ্ছা হয়।

    বিবাহের রাত্রি আমোদে গেল। পরদিন প্রাতে উঠিয়া নববধূ ছোট ভাইকে আদর করিল, নিকটে মা ছিলেন, নববধূ মার মুখ প্রতি এক বার চাহিল, মার চক্ষে জল আসিল, নববধূ মুখাবনত করিল, কাঁদিল না। তাহার পর ধীরে ঘীরে এক নির্জ্জন স্থানে গিয়া দ্বারে মাথা রাখিয়া অন্যমনস্কে দাঁড়াইয়া শিশিরসিক্ত সামিয়ানার প্রতি চাহিয়া রহিল। সামিয়ানা হইতে টোপে টোপে উঠানে শিশির পড়িতেছে। সামিয়ানা হইতে উঠানের দিকে তাহার দৃষ্টি গেল, উঠানের এখানে সেখানে পূর্ব্বরাত্রের উচ্ছিষ্টপত্র পড়িয়া রহিয়াছে, রাত্রের কথা নববধূর মনে হইল, কত আলো! কত বাদ্য! কত লোক! কত কলবর! যেন স্বপ্ন! এখন সেখানে ভাঙা ভাঁড়, ছেঁড়া পাতা! নববধুর সেই দিকে দৃষ্টি গেল। একটি দুর্ব্বলা কুক্কুরী—নবপ্রসূতি—পেটের জ্বালায় শুষ্ক পত্রে ভগ্ন ভাণ্ডে আহার খুঁজিতেছে, নববধূর চোখে জল আসিল। জল মুছিয়া নববধূ ধীরে ধীরে মাতৃকক্ষে গিয়া লুচি আনিয়া কুক্কুরীকে দিল। এই সময় নববধূর পিতা অন্দরে আসিতেছিলেন, কুক্কুরীভোজন দেখিয়া একটু হাসিলেন, নববধূ আর পূর্ব্ববমত দৌড়িয়া পিতার কাছে গেল না, অধোমুখে দাঁড়াইয়া রহিল। পিতা বলিলেন, ব্রাহ্মণভোজনের পর কুক্কুর ভোজনই হইয়া থাকে, রাত্রে তাহা হইয়া গিয়াছে, অদ্য আবার এ কেন মা? নববধূ কথা কহিল না! কহিলে হয়ত বলিত, এই কুক্কুরী সংসারী।

    পূর্ব্বে বলিয়াছি, নববধূ লুচি আনিতে যাইবার সময় ধীরে ধীরে গিয়াছিল, আর দুই দিন পূর্ব্বে হইলে দৌড়িয়া যাইত। যখন সেই ঘরে গেল, তখন দেখিল, মাতার সম্মুখে কতকগুলি লুচি সন্দেশ রহিয়াছে। নববধূ জিজ্ঞাসা করিল, “মা! লুচি নেব?” মাতা লুচিগুলি হাতে তুলিয়া দিয়া বলিলেন, “কেন মা আজ চাহিয়া নিলে? যাহা তোমার ইচ্ছা তুমি আপনি লও, ছড়াও, ফেলিয়া দাও, নষ্ট কর; কখন কাহাকেও ত জিজ্ঞাসা করে লও না? আজ কেন মা চাহিয়া নিলে? তবে সত্যই আজ থেকে কি তুমি পর হ’লে, আমায় পর ভাবিলে?” এই বলিয়া মা কাঁদিতে লাগিলেন। নববধূ বলিল, “না মা! আমি বলি বুঝি কার জন্য রেখেছ?” নববধূ হয়ত মনে করিল, পূর্ব্বে আমায় “ওই” বলিতে আজ কেন তবে আমায় “তুমি” বলিয়া কথা কহিতেছ?

    নববধূর পরিবর্ত্তন সকলের নিকট স্পষ্ট নহে সত্য, কিন্তু যিনি অনুধাবন করিয়াছেন, তিনিই বুঝিতে পারিয়াছেন যে, পরিবর্ত্তন অতি আশ্চর্য্য! এক রাত্রের পরিবর্ত্তন বলিয়া আশ্চর্য্য! নববধূর মুখশ্রী এক রাত্রে একটু গম্ভীর হয়, অথচ তাহাতে একটু আহ্লাদের আভাসও থাকে। তদ্ব্যতীত যেন একটু সাবধান, একটু নম্র, একটু সঙ্কুচিত বলিয়া বোধ হয়। ঠিক যেন শেষ রাত্রের পদ্ম। বালিকা কী বুঝিল যে, মনের এই পরিবর্ত্তন হঠাৎ এক রাত্রের মধ্যে হইল!

  • ষষ্ঠ প্রবন্ধ

    ষষ্ঠ প্রবন্ধ

    বহু কালের পর পালামৌ সম্বন্ধে দুইটা কথা লিখিতে বসিয়াছি। লিখিবার একটা ওজর আছে। এক সময়ে একজন বধির ব্রাহ্মণ আমাদের প্রতিবাসী ছিলেন, অনবরত গল্প করা তাঁহার রোগ ছিল। যেখানে কেহ একা আছে দেখিতেন, সেইখানে গিয়া গল্প আরম্ভ করিতেন; কেহ তাঁহার গল্প শুনিত না, শুনিবারও কিছু তাহাতে থাকিত না। অথচ তাঁহার স্থির বিশ্বাস ছিল যে, সকলেই তাঁহার গল্প শুনিতে আগ্রহ করে। একবার একজন শ্রোতা রাগ করিয়া বলিয়াছিলেন, “আর তোমার গল্প ভাল লাগে না, তুমি চুপ কর।” কালা ঠাকুর উত্তর করিয়াছিলেন, “তা কেমন করিয়া হবে, এখনও যে এ গল্পের অনেক বাকি।” আমারও সেই ওজর। যদি কেহ পালামৌ পড়িতে অনিচ্ছুক হন, আমি বলিব যে, “তা কেমন করে হবে, এখনও যে পালামৌর অনেক কথা বাকি।”

    পালামৌর প্রধান আওলাত মৌয়া গাছ। সাধু ভাষায় বুঝি ইহাকে মধুদ্রুম বলিতে হয়। সাধুদের তৃপ্তির নিমিত্ত সকল কথাই সাধু ভাষায় লেখা উচিত। আমারও তাহা একান্ত যত্ন। কিন্তু মধ্যে মধ্যে বড় গোলে পড়িতে হয়, অন্যকেও গোলে ফেলিতে হয়, এই জন্য এক এক বার ইতস্তত করি। সাধুসঙ্গ আমার অল্প, এই জন্য তাঁহাদের ভাষায় আমার সম্পূর্ণ অধিকার জন্মে নাই। যাঁহাদের সাধুসঙ্গ যথেষ্ট অথবা যাঁহারা অভিধান পড়িয়া নিজে সাধু হইয়াছেন, তাঁহারাও একটু একটু গোলে পড়েন। এই যে এইমাত্র মধুদ্রুম লিখিত হইল, অনেক সাধু ইহার অর্থে আশোকবৃক্ষ বুঝিবেন। অনেক সাধু জীবন্তীবৃক্ষ বুঝিবেন। আবার যে সকল সাধুর গৃহে অভিধান নাই, তাঁহারা হয়ত কিছুই বুঝিবেন না; সাধুদের গৃহিণীরা নাকি সাধুভাষা ব্যবহার করেন না। তাঁহারা বলেন, সাধুভাষা অতি অসম্পন্ন; এই ভাষায় গালি চলে না, ঝগড়া চলে না, মনের অনেক কথা বলা হয় না। যদি এ কথা সত্য হয়, তবে তাঁহারা স্বচ্ছন্দে বলুন, সাধুভাষা গোল্লায় যাক।

    মৌয়ার ফুল পালামৌ অঞ্চলে উপাদেয় খাদ্য বলিয়া ব্যবহৃত হইয়া থাকে। হিন্দুস্থানীয়েরা কেহ কেহ সক করিয়া চালভাজার সঙ্গে এই ফুল খাইয়া থাকেন। শুকাইয়া রাখিলে এই ফুল অনেক দিন পর্য্যন্ত থাকে। বর্ষাকালে কোলেরা কেবল এই ফুল খাইয়া দুই তিন মাস কাটায়। পয়সার পরিবর্ত্তে এই ফুল পাইলেই তাহাদের মজুরি শোধ হয়। মৌয়ার এত আদর, অথচ তথায় ইহার বাগান নাই।

    মৌয়ার ফুল শেফালিকার মত ঝরিয়া পড়ে, প্রাতে, বৃক্ষতল একেবারে বিছাইয়া থাকে। সেখানে সহস্র সহস্র মাছি, মৌমাছি, ঘুরিয়া ফিরিয়া উড়িয়া বেড়ায়, তাহাদের কোলাহলে বন পূরিয়া যায়। বোধ হয় দূরে কোথায় একটা হাট বসিয়াছে। একদিন ভোরে নিদ্রাভঙ্গে সেই শব্দে যেন স্বপ্নবৎ কি একটা অষ্পষ্ট সুখ আমার স্মরণ হইতে হইতে আর হইল না। কোন্ বয়সের কোন্ সুখের স্মৃতি, তাহা প্রথমে কিছুই অনুভব হয় নাই, সে দিকে মনও যায় নাই। পরে তাহা স্পষ্ট স্মরণ হইয়াছিল। অনেকের এইরূপ স্মৃতিবৈকল্য ঘটিয়া থাকে। কোন একটি দ্রব্য দেখিয়া বা কোন একটি সুর শুনিয়া অনেকের মনে হঠাৎ একটা সুখের আলোক আসিয়া উপস্থিত হয়; তখন মন যেন আহ্লাদে কাঁপিয়া উঠে—অথচ কি জন্য এই আহ্লাদ, তাহা বুঝা যায় না। বৃদ্ধেরা বলেন, ইহা জন্মান্তরীণ সুখস্মৃতি। তাহা হইলে হইতে পারে, যাঁহাদের পূর্ব্বজন্ম ছিল, তাঁহাদের সকলই সম্ভব। কিন্তু আমার নিজ সম্বন্ধে যাহা বলিতেছিলাম, তাহা ইহজন্মের স্মৃতি। বাল্যকাল আমি যে পল্লীগ্রামে অতিবাহিত করিয়াছি, তথায় নিত্য প্রাতে বিস্তর ফুল ফুটিত, সুতরাং নিত্য প্রাতে বিস্তর মৌমাছি আসিয়া গোল বাধাইত। সেই সঙ্গে ঘরে বাহিরে, ঘাটে পথে হরিনাম—অস্ফূট স্বরে, নানা বয়সের নানা কণ্ঠে, গুন্‌ গুন্‌ শব্দে হরিনাম মিশিয়া কেমন একটা গম্ভীর সুর নিত্য প্রাতে জমিত, তাহা তখন ভাল লাগিত কি না স্মরণ নাই, এখনও ভালো লাগে কিনা বলিতে পারি না, কিন্তু সেই সুর আমার অন্তরের অন্তরে কোথায় লুকান ছিল, তাহা যেন হঠাৎ বাজিয়া উঠিল। কেবল সুর নহে, লতা-পল্লব-শোভিত সেই পল্লীগ্রাম, নিজের সেই অল্প বয়স, সেই সময়ের সঙ্গিগণ, সেই প্রাতঃকাল, কুসুমবাসিত সেই প্রাতর্বায়ু, তাহার সেই ধীর সঞ্চরণ সকলগুলি একত্রে উপস্থিত হইল। সকলগুলি একত্র বলিয়া এই সুখ, নতুবা কেবল মৌমাছির শব্দে সুখ নহে।

    অদ্য যাহা ভাল লাগিতেছে না, দশ বৎসর পরে তাহার স্মৃতি ভাল লাগিবে। অদ্য যাহা সুখ বলিয়া স্বীকার করিলাম না, কল্য আর তাহা জুটিবে না। যুবার যাহা অগ্রাহ্য, বৃদ্ধের তাহা দুষ্প্রাপ্য। দশ বৎসর পূর্ব্বে যাহা আপনিই আসিয়া জুটিয়াছিল, তখন হয়তো আদর পায় নাই, এখন আর তাহা জুটে না, সেই জন্য তাহার স্মৃতিই সুখদ।

    নিত্য মুহূর্ত্তে এক একখানি নূতন পট আমাদের অন্তরে ফোটোগ্রাফ হইতেছে এবং তথায় তাহা থাকিয়া যাইতেছে। আমাদের চতুষ্পার্শ্বে যাহা কিছু আছে, যাহা কিছু আমরা ভালোবাসি, তাহা সমুদয় অবিকল সেই পটে থাকিতেছে। সচরাচর পটে কেবল রূপ অঙ্কিত হয়; কিন্তু যে পটের কথা বলিতেছি, তাহাতে গন্ধ স্পর্শ সকলই থাকে, ইহা বুঝাইবার নহে, সুতরাং সে কথা থাক।

    প্রত্যেক পটের এক একটা করিয়া বন্ধনী থাকে, সেই বন্ধনী স্পর্শ মাত্রেই পটখানি এলাইয়া পড়ে, বহু কালের বিস্মৃত বিলুপ্ত সুখ যেন নূতন হইয়া দেখা দেয়। যে পটখানি আমার স্মৃতিপথে আসিয়াছিল বলিতেছিলাম, বোধহয় মৌমাছির সুর তাহার পটবন্ধনী।

    কোন পটের বন্ধনী কী, তাহা নির্ণয় করা অতি কঠিন; যিনি তাহা করিতে পারেন, তিনিই কবি। তিনিই কেবল একটি কথা বলিয়া পটের সকল অংশ দেখাইতে পারেন, রূপ গন্ধ স্পর্শ সকল অনুভব করাইতে পারেন। অন্য সকলে অক্ষম, তাহারা শত কথা বলিয়াও পটের শতাংশ দেখাইতে পারে না।

    মৌয়া ফুলে মদ্য প্রস্তুত হয়, সেই মদ্যই এই অঞ্চলে সচরাচর ব্যবহার। ইহার মাদকতাশক্তি কত দূর জানি না, কিন্তু বোধ হয়, সে বিষয়ে ইহার বড় নিন্দা নাই, কেন না আমার একজন পরিচারক এক দিন এই মদ্য পান করিয়া বিস্তর কান্না কাঁদিয়াছিল, বিস্তর বমি করিয়াছিল। তাহার প্রাণও যথেষ্ট খুলিয়াছিল, যেরূপে আমার যত টাকা সে চুরি করিয়াছিল, সেই দিন তাহা সমুদয় বলিয়াছিল। বিলাতী মদের সহিত তুলনায় এ মদের দোষ কি, তাহা স্থির করা কঠিন। বিলাতী মদে নেশা আর লিবর দুই থাকে। মৌয়ার মদে কেবল একটী থাকে, নেশা-লিবর থাকে না; তাহাই এ মদের এত নিন্দা, এ মদ এত সস্তা। আমাদের ধেনোরও সেই দোষ।

    দেশী মদের আর একটা দোষ, ইহার নেশায় হাত পা দুইয়ের একটিও ভাল চলে না। কিন্তু বিলাতী মদে পা চলুক বা না চলুক, হাত বিলক্ষণ চলে, বিবিরা তাহার প্রমাণ দিতে পারেন। বুঝি আজ কাল আমাদের দেশেরও দুই চারি ঘরের গৃহিণীরা ইহার স্বপক্ষ কথা বলিলেও বলিতে পারেন।

    বিলাতী পদ্ধতি অনুসারে প্রস্তুত করিতে পারিলে মৌয়ার ব্রাণ্ডি হইতে পারে, কিন্তু অর্থসাপেক্ষ। একজন পাদরি আমাদের দেশী জাম হইতে শ্যামপেন প্রস্তুত করিয়াছিলেন, অর্থাভাবে তিনি তাহা প্রচলিত করিতে পারেন নাই। আমাদের দেশী মদ একবার বিলাতে পাঠাইতে পারিলে জন্ম সার্থক হয়, অনেক অন্তরজ্বালা নিবারণ হয়।

  • নব্য জাপান ও রুষ জাপান যুদ্ধের ইতিহাস

    নব্য জাপান ও রুষ জাপান যুদ্ধের ইতিহাস

    নব্য জাপান

    রুষ জাপান যুদ্ধের ইতিহাস।

    শ্রীউমাকান্ত হাজারী

    প্রণীত

    দ্বিতীয় সংস্করণ।

    “Japan is indeed the object-lesson of national

    efficiency, and happy is the nation

    that learns it.”

    LORD ROSEBERY

    সামটা স্বদেশী সমিতি হইতে (সামটা পােষ্ট বি, সি, আর)

    প্রকাশিত।

    Printed by Sarat Chandra Mallick,

    The DIVINE PRESS

    5, Lal Ostagur’s Lane, Calcutta.

    মাঘ, ১৩১৩

  • প্রথম সংস্করণের ভূমিকা।

    প্রথম সংস্করণের ভূমিকা।

    আজ এক বৎসর হইল, এসিয়ার পূর্ব্ব প্রান্তে যে ভীষণ সমরানল প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিয়াছে, তাহার বিস্তৃত বৃত্তান্ত পাঠক মাত্রেই অবগত আছেন। এই লোকভয়ঙ্কর মহাযুদ্ধ কতদিনে সমাপ্ত হইবে, সৌভাগ্যলক্ষ্মী কাহার প্রতি কিরূপে প্রসন্ন হইবেন, তাহা এক্ষণে নিশ্চয়রূপে প্রকাশ করিতে পারা যায় না। আমেরিকা ও ইয়ুরােপীয় শক্তিপুঞ্জ প্রাচ্য রণরঙ্গভূমে তাণ্ডবনৃত্যে প্রবৃত্ত হইবেন কিনা, তাহাও অধুনা ভবিষ্যৎ গর্ভে নিহিত।

    ইহা সত্য যে, কি জলে, কি স্থলে, এ পর্যন্ত যতগুলি ক্ষুদ্র বা বৃহৎ যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে, তাহার প্রত্যেকটিতে জয়লক্ষ্মী জাপানের প্রতি অনুকম্পা প্রকাশ করিয়াছেন। জাপান সৈনিকের অদ্ভুত কর্ম্মকুশলতা, অসাধারণ কষ্টসহিষ্ণুতা, অপূর্ব্ব স্বদেশহিতৈষীতা দর্শন করিয়া ইউরােপ স্তম্ভিত ও আমেরিকা বিস্মিত হইয়াছে। জাপানী সেনাপতিগণের সৈন্যসঞ্চালন, বৃহৎ কামান পরিচালন ও টর্পেডো ক্ষেপণ প্রভৃতি অবলােকন করিয়া পৃথিবীর সর্ব্বশ্রেষ্ঠ সেনাপতিরাও বিস্মিত ও মােহিত হইয়াছেন।

    লেখক শ্রীউমাকান্ত হাজারী

    সকলই সত্য; কিন্তু তথাপিও আশঙ্কা হয়। যে রুষ পৃথিবীর মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ শক্তি বলিয়া পরিগণিত, ব্রিটিশকেশরী যাহার জন্য ভারতসীমান্তে ব্যতিব্যস্ত, ফরাসিশার্দ্দূল যাহার সহিত মিত্রতা করিয়া গৌরবান্বিত, জর্ম্মণঅহি বর্ত্তমান মুহূর্ত্তে যাহাকে বন্ধু বলিয়া আলিঙ্গন করিতে উদ্যত, মার্কিণনক্র দূরে অবস্থান করিয়াও যাহার নামে কম্পিত, মুসলমান জগতের একছত্রী সম্রাট তুরষ্ক সােলতান যাহার পদানত, সেই মহাকায় ভীম-পরাক্রমশালী রুষঋক্ষের সহিত ক্ষুদ্র দ্বীপবাসী জাপান তরক্ষুর যুদ্ধ! আশঙ্কার কারণ নাই কি?

    আমরা জাপানকে প্রাণের অধিক ভালবাসি। জাপানবাসী নরনারিগণকে অতি নিকট আত্মীয় বলিয়া মনে করি। যাঁহারা বলেন, জাপান একদিন নিজ বাহুবলে ইংলণ্ডকে পর্য্যুদস্ত করিয়া সমগ্র ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা প্রদান করিবে, জাপানের কৃপায় বােম্বাই নগরী একদিন বােষ্টন বন্দরে পরিণত হইবে, তাঁহারা হয় ভ্রান্ত, না হয় উন্মাদগ্রস্ত। বাতুলালয়ই তাঁহাদের উপযুক্ত বাসস্থান। জাপানের প্রতি আমাদের ভালবাসা ও সহানুভূতির কারণ অন্যবিধ। জাপান এসিয়াবাসী বলিয়া আমাদের ধর্ম্মভ্রাতা, জাপানবাসীরা ভগবান বুদ্ধদেবের উপাসক বিধায় আমাদের ধর্ম্ম শিষ্য। আমাদের সর্ব্বপ্রধান তীর্থ গয়াধাম, জাপানিগণের অতি প্রিয় ও পরম তীর্থ। জাপানে বিধিমতে সংস্কৃত চর্চ্চা হইয়া থাকে, এক্ষণে বহুতর জাপানী যুবক ভারতে আসিয়া সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করিতেছেন। ইউরােপ বা আমেরিকায় আমাদের স্থান নাই, তথায় আমরা বিতাড়িত, ঘৃণিত ও অপমানিত। অষ্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকায় ভারতবাসী মাত্রেই কুলি বলিয়া অভিহিত। পক্ষান্তরে জাপানের প্রতি গৃহদ্বার আমাদের জন্য উন্মুক্ত, তথায় আমরা ভারতবাসী বলিয়া পূর্ব্বগৌরবে সম্মানিত। মিঃ ওয়াগেল ইংলণ্ডে কাচনির্ম্মাণ কৌশল শিক্ষা করিতে গিয়া যে বিপদে পড়িয়াছিলেন, তাহা আমরা ভুলি নাই; আর আজি ভারতবাসী দলে দলে জাপানে গমন করিয়া নিরুপদ্রপে নানাবিধ শিল্পকলা শিক্ষা করিয়া আসিতেছেন, তাহাও স্বচক্ষে দেখিতেছি। ইহাতেও যদি আমরা জাপানকে ভাল না বাসি, জাপানিগণের প্রতি অকৃত্রিম অনুরাগ পােষণ না করি, জাপানবাসীর মঙ্গলের জন্য সর্ব্বমঙ্গলার চরণে প্রার্থনা না করি, তাহা হইলে আমাদের মত কৃতঘ্ন ও নরাধম ধরাতলে আর কোথায় পাওয়া যাইবে?

    জাপানবাসিগণের নিকটে আমরা প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে যে সমস্ত উপকার পাইতেছি, একবার তাহারও আলােচনা ও চিন্তা করা কর্ত্তব্য। ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, একটী আমাদের মত ক্ষুদ্রকায় অন্নমৎস্যভুক আসিয়িক জাতি গত ৩০ বৎসরের চেষ্টায় যে অনন্যসাধারণ উন্নতিলাভ করিয়াছে, তাহা দিনান্তে চিন্তা করিয়াও আমাদের আশা ও আকাঙ্ক্ষা একটু ঊর্দ্ধে উঠিয়াছে। আমার নিত্যউপবাস-রুগ্ন প্রতিবাসীর পর্ণকুটীর সহসা প্রাসাদে পরিণত ও অতিথি অভ্যাগতের আনন্দ কোলাহলে মুখরিত হইয়া উঠিলে, আমরা যেরূপ যত্ন ও পরিশ্রম সহকারে তাহার কারণ নির্দ্দেশে চেষ্টা করিয়া থাকি, আজ শিক্ষিত ভারতবাসী মাত্রেই সেইরূপ আগ্রহ সহকারে জাপানের অসাধারণ অভ্যুদয়ের কারণ নির্দ্দেশে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। তাহারই ফলে “স্বদেশী সমাজ” প্রভৃতি বিবিধ সাময়িক প্রবন্ধের উদ্ভব হইয়াছে, বিভিন্নমতাবলম্বিগণের মধ্যে সৌভ্রাত্রভাব ও একতার পথ উন্মুক্ত হইয়াছে। আজ ভারতবর্ষের নগরে নগরে, গ্রামে গ্রামে, পল্লীতে পল্লীতে সাধারণ শিক্ষার উপযােগিতা ও বিজ্ঞান শিক্ষার আবশ্যকতা বজ্রনির্ঘোষে ঘােষিত হইতেছে। রাজানুগ্রহের উপর নির্ভর না করিয়া, রাজনৈতিক আন্দোলনে সমস্ত শক্তি অপব্যয় না করিয়া, যাহাতে সমাজের চেষ্টায় দেশের অন্নকষ্ট বিদূরিত হয়, শ্রম ও অধ্যবসায়ের ফল সহজে হস্তগত হয়, স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়, নৈতিক ও দৈহিক বল পরিবর্দ্ধিত হয়, আজ সর্ব্বত্রই তাহার জন্য চেষ্টা হইতেছে। ইহা উন্নতির চিহ্ন, মঙ্গলের লক্ষণ।2

    কিন্তু হায়! আমাদের অদৃষ্ট ও এসিয়ার বর্তমানাবস্থা স্মরণ করিলে মনে বড় আশঙ্কা হয়। মনে হয়, বুঝি প্রাচ্য গগনের প্রভাত-মার্ত্তণ্ড মধ্যাহ্নের পূর্ব্বেই অস্তমিত হইবে, অষ্টমীর অর্দ্ধ-শশধর অকালেই করাল রাহুর কবলগ্রস্ত হইবে। এসিয়ার, ভারতের, বৌদ্ধধর্ম্মের, আশাভরসা প্রশান্ত মহাসাগরের অতল জলে নিমর্জ্জিত হইবে।

    জননী! ইহাই কি সত্য? যে জাপান আত্ম অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, ন্যায্য স্বত্ব রক্ষার জন্য ধর্ম্মযুদ্ধে অগ্রসর হইয়াছে, তাহাকে কি রক্ষা করিবে না?

    যেন কোন দেবতা আবির্ভূত হইয়া এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদিগকে বলিতেছেন;—“ভয় নাই। পঞ্চকোটী নরনারী যখন একতা-বন্ধনে আবদ্ধ হইয়া আত্মত্যাগ-ব্রত অবলম্বন করিয়াছে, তখন আর কিসের ভয়? যখন প্রত্যেক জাপানীর হৃদয় স্বদেশানুরাগে পরিপূর্ণ রহিয়াছে, তখন আর কাহাকে ভয়? যাহাদের ধর্ম্মকর্ম্ম, যাগযজ্ঞ, কামমােক্ষ, সমস্তই সম্রাট ও স্বদেশানুরাগের অন্তর্ভূত, পৃথিবীতে তাহাদের পরাজয় নাই। যে জাতির বালক হইতে বৃদ্ধ পর্য্যন্ত, পর্ণকুটীরবাসী কৃষক হইতে প্রাসাদবাসী সম্রাট পর্য্যন্ত, বালিকা হইতে বৃদ্ধা পর্য্যন্ত সকলেই একস্বরে “স্বদেশ” “স্বদেশ” বলিয়া চীৎকার করিতেছে, সে জাতির জন্য আশঙ্কা নাই।”

    আমরা বঙ্গদেশবাসী ভীরুঅপবাদগ্রস্থ বাঙ্গালী; একতা, আত্মত্যাগ, স্বদেশানুরাগ প্রভৃতি শব্দের প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারি না। আমাদের প্রধান ভরসা ইংলণ্ড ও আমেরিকা। পঞ্চবার্ষিক সন্ধি অনুসারে ইংলণ্ড কিছুতেই রুষকে ম্যানচুরিয়া গ্রাস করিতে দিবেন না। আমেরিকা কোন ক্রমেই প্রশান্ত মহাসাগরে রুষাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হইতে দিবেন না। পৃথিবীর এই দুই মহাশক্তির স্বার্থের সহিত জাপানের স্বার্থ অভিন্ন, ইহাই আমাদের প্রধান ভরসা। কিন্তু যদি রাজনৈতিক কারণে ব্রিটিশ মন্ত্রীরা জাপানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন পূর্ব্বক গম্ভীর হইয়া বসেন, মার্কিণ বন্ধুরা বেদান্তের উপদেশ প্রদান করিতে করিতে প্রশান্ত মহাসাগরে পাড়ি মারিবার সংকল্প করেন, তাহা হইলে জাপান কি করিবে?

    পূর্ব্বে বলিয়াছি, আমরা জাপানকে ভালবাসি, জাপানের নরনারিগণকে অতি নিকট আত্মীয় বলিয়া মনে করি। বলা বাহুল্য, এই জন্য বহু অর্থ ব্যয় ও শ্রমস্বীকার পূর্ব্বক এই ক্ষুদ্র ইতিবৃত্ত সঙ্কলন করিয়াছি। ইহাতে জাপানের ভৌগােলিক ও ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত, জাপানিগণের রীতিনীতি, আচার ব্যবহার, ধর্মবিশ্বাস, শিক্ষাপ্রণালী, শাসনপদ্ধতি প্রভৃতি বিবিধ বিষয় সংক্ষেপে বিবৃত হইয়াছে। বঙ্গের অমর কবি তাঁহার সর্ব্বশ্রেষ্ঠ গীতিকবিতায় যাহাকে “অসভ্য জাপান” বলিয়া উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন, সেই জাপান কি কৌশলে পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ, পরাক্রমশালী ও সুসভ্য রাজ্য বলিয়া পরিগণিত হইল, তাহাও এই পুস্তকে লিখিত হইয়াছে।

    এই পুস্তকের পরিশেষে রুষ-জাপান যুদ্ধের কারণ ও বর্তমান সময় পর্যন্ত যতগুলি উল্লেখযােগ্য যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে, তাহারও বিবরণ সংক্ষেপে বিবৃত হইয়াছে।

    সামটা,

    শ্রীউমাকান্ত হাজারী।

    ৮ই ফ্রেব্রুয়ারী, ১৯০৫।

  • দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপন।

    দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপন।

    প্রথম সংস্করণ দুই হাজার খণ্ড নিঃশেষিত হওয়ায় “নব্য জাপান ও রুষ জাপান যুদ্ধের” দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হইল। প্রথম সংস্করণের যে যে স্থানে ত্রুটী ছিল, এই সংস্করণে তাহা সংস্করণে তাহা সংশােধন করিয়াছি। পণ্ডিতপ্রবর বীরেশ্বর পাঁড়ে, কবিবর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিজ্ঞানাচার্য্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, স্বদেশানুরাগী অশ্বিনীকুমার দত্ত প্রভৃতি সুধিগণের নির্দেশানুসারে কয়েকটি প্রস্তাব নূতন করিয়া সন্নিবিষ্ট করিয়াছি। এতদ্ভিন্ন গত মহাযুদ্ধের শেষফল, ইংরেজ-জাপান সন্ধি, রুষ জাপান সন্ধি প্রভৃতির সারমর্ম্ম বিবৃত করিয়াছি। তজ্জন্য পুস্তকের আয়তন প্রায় দ্বিগুণ বর্দ্ধিত হইয়াছে। গ্রাহকগণের অনুরােধ নিবন্ধন মূল্য প্রথম সংস্করণের ন্যায় চারি আনাই রাখিয়াছি।

    শ্রীউমাকান্ত হাজারী।

    সামটা পােষ্ট,

    বি, সি, আর।

  • ভৌগলিক বৃত্তান্ত।

    ভৌগলিক বৃত্তান্ত।

    অবস্থান ও বিভাগ।

    এসিয়ার পূর্ব্বপ্রান্তে প্রশান্ত মহাসাগরবক্ষে কতকগুলি বৃহৎ ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ লইয়া জাপান সাম্রাজ্য সংগঠিত হইয়াছে। তন্মধ্যে নীপন, কিউসিউ, সিকক্, যেশাে, ফরমােসা এই পাঁচটী দ্বীপ সর্ব্বাপেক্ষা প্রধান। এতদ্ভিন্ন কিউরাইল, লুচু, বােনিন প্রভৃতি বহুসংখ্যক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ ইহার অন্তর্গত।

    জাপান সাগর ও কোরিয়া প্রণালী পশ্চিমে থাকিয়া জাপান সাম্রাজ্যকে এসিয়াটিক রুষিয়া ও কোরিয়া উপদ্বীপ হইতে বিচ্ছিন্ন করিতেছে।

    ১২৯° হইতে ১৫০° অক্ষাংশের মধ্যে এই রাজ্য অবস্থিত।

    জাপান সাম্রাজ্যের পরিমাণফল প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার বর্গ মাইল। তুলনায় ইংলণ্ড, ওয়েলস্‌, স্কটলণ্ড ও আয়র্লণ্ডের দ্বিগুণ, এবং জর্ম্মণ সাম্রাজ্যের ও ফ্রান্সের সমতুল্য হইবে। লােকসংখ্যা ৪ কোটী ৭০ লক্ষর উপর।

    জাপান সাম্রাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত। জাপান ও অধীন দ্বীপপুঞ্জ।

    জাপান বলিতে নীপন, কিউসিউ, সিকক্ ও কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ বুঝায়। ইহার মধ্যে নীপনের দৈর্ঘ্য ৯০০ মাইল ও প্রস্থ ১০০ মাইল। কিউসিউ দৈর্ঘ্যে ২০০ মাইল ও প্রস্থে ৮০ মাইল। সিককের দৈর্ঘ্য ১৫০ মাইল ও প্রস্থ ৮০ মাইল হইবে।

    অধীন দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে যেশাে ও ফরমোসা সর্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ। যেশো দৈর্ঘ্যে ৩০০ মাইল ও প্রস্থ ১০০ মাইল। ফরমােসা দৈর্ঘ্যে ২০০ ও বিস্তারে ৭০ হইবে।3

    রাজধানী ও প্রধান নগর।

    জাপানী ভাষায় নীপন শব্দের অর্থ সূর্যোদয়ের স্থান। এই দ্বীপ চীনবাসিগণের নিকট য়ংহু বা জিয়নউ নামে পরিচিত। প্রাচীন ভারতবর্ষের সুবর্ণযুগে এই দ্বীপের নাম সুদর্শন ছিল।4

    জাপান সাম্রাজ্যের রাজধানী টোকিও নীপন দ্বীপে অবস্থিত। “টো” শব্দে প্রাচ্য ও “কিও” শব্দে রাজধানী বুঝায়। সুতরাং জাপানী ভাষায় টোকিও অর্থে প্রাচ্য রাজধানী বুঝিতে হইবে। এই নগরী কলিকাতা হইতে ৩২০০ মাইল উত্তর-পূর্ব্বে অবস্থিত। লােকসংখ্যা ১৪ লক্ষ হইবে।

    এই নগর এসিয়া মহাদেশের মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা উন্নত ও বাণিজ্য-প্রধান স্থান। যে সমস্ত সাগরশাখা সহরের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে, তাহার উভয়পার্শ্বে নানাবিধ সুন্দর সুন্দর বৃক্ষশ্রেণী রােপিত আছে। এখানে অনেকগুলি সেতু আছে। প্রধান সেতুর নাম নিপবস্‌। রাজপ্রাসাদ নগরের মধ্যভাগে অবস্থিত। সম্রাটের ব্যবহারের জন্য নানাস্থানে অনেকগুলি অট্টালিকা আছে। জাপানের অনেক প্রধান লােক এইখানে অতি মনােহর গৃহসকল নির্ম্মাণ করিয়াছেন। সাধারণ গৃহগুলি কাষ্ঠ নির্ম্মিত। এইখানে জাপানের পার্লামেণ্ট সভা, ইউনিভার্সিটী, ব্যাঙ্ক, নেভাল কলেজ, টর্পেডো স্কুল প্রভৃতি অবস্থিত। এখানকার বাজার, চক, উপবন ও ডক প্রভৃতি অতি সুন্দর। ১৮৮৯ খ্রীষ্টাব্দে এই সহরের লোক সংখ্যা ১৩৭৮১৩২ জন ছিল।

    ওসাকা জাপানের দ্বিতীয় সহর। এই নগর সমুদ্রতীরে অবস্থিত অতি সুরক্ষিত বন্দর। ইহার লােকসংখ্যা ৫ লক্ষ হইবে। এইখানে যুদ্ধোপযােগী বিবিধ অস্ত্র, গােলা, বারুদ প্রভৃতি প্রস্তুত হয়। অনেকে ইহাকে জাপানের উলউইচ্ বলিয়া থাকেন। এই নগরের অধিবাসিগণ ধনাঢ্য ও বিলাস পরায়ণ। জাপানীরা এই সহরকে প্রমােদ ভবন বলিয়া থাকে।

    মিয়াকো বা কিয়াটো । বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রসিদ্ধ। জাপানের প্রধান ধর্ম্মযাজক এইখানে বাস করিয়া থাকেন। সকলে তাঁহাকে দৈরি বলিয়া থাকে। এই নগরে জাপানের প্রাচীন যুগের অনেক নিদর্শন পাওয়া যায়। কিয়াটো পূর্ব্বে সমগ্র রাজ্যের রাজধানী ছিল।

    ইয়াকোহামা । জাপানের সর্ব্ব প্রধান সামুদ্রিক বন্দর। এই স্থানে ইংরাজ, ফরাসী প্রভৃতি বৈদেশিকগণের বাণিজ্যপােতসকল নঙ্গর করিয়া থাকে।

    হিওগো। অন্তর্বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থান।

    সিমনসেকি। সাগরতীরবর্ত্তী সুরক্ষিত বন্দর। এই নগরে চীন জাপান যুদ্ধের সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হয়।

    মেজারু। এখানে একটী গবর্ণমেণ্টের ডক আছে। এই নগরে জলযুদ্ধের উপযোগী অস্ত্রাদি নির্ম্মিত হইয়া থাকে।

    নাগাসাকি। অতি সুরক্ষিত বন্দর, কিউসিউ দ্বীপে অবস্থিত। এখানকার ডকগুলি অতি উৎকৃষ্ট। নাগাসাকিতে প্রচুর পরিমাণে কয়লা রক্ষিত হইয়া থাকে। ইংরাজ, মার্কিণ, প্রভৃতি জাতিরা এইখানে বাণিজ্য করিয়া থাকে। এই স্থানের গৃহসকল অতি সুন্দররূপে নির্ম্মিত, প্রতি গৃহেই বারাণ্ডা আছে। এই নগরের মধ্যে ও বাহিরে অনেক বৌদ্ধমঠ দৃষ্টিগােচর হয়।

    সেসাবাে। জাপান সাগরীয় রণতরী শ্রেণীর প্রধান আশ্রয় স্থান। এইখানে গবর্ণমেণ্টের ডক আছে। এই বন্দরে বড় বড় জাহাজ, লাইনার, টর্পেডো বােট প্রভৃতি গঠিত হয়।

    এতদ্ভিন্ন সঙ্গ, কোকুরা, কতসীমা, হামাতা প্রভৃতি উন্নতিশীল নগর আছে।

    হাকোডোট। সুগারু প্রণালীর উত্তরতীরস্থিত অতি সুরক্ষিত বন্দর। এখানে জাহাজ গঠনোপযােগী কতকগুলি উৎকৃষ্ট ডক আছে।

    মাটসমৈ। জেসো দ্বীপের শাসনকর্ত্তা এইখানে অবস্থিতি করেন। জাপান সম্রাট সময়ে সময়ে এই নগরে বাস করিয়া থাকেন। সহরটী ক্রমনিম্ন ও চারিদিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড় দ্বারা পরিবেষ্টিত। দেখিতে অতি সুন্দর।

    মারোয়ান। অতি সুরক্ষিত সামুদ্রিক বন্দর।

    এতদ্ভিন্ন জেসােদ্বীপে ফুকুসমা, ওসিমা, অকেশী প্রভৃতি প্রধান প্রধান নগর আছে।

    তৈবান। চীনের দক্ষিণ পূর্ব্ব উপকূলে অবস্থিত ফরমোসা দ্বীপের প্রধান নগর। এইখানে জাপানের রাজপ্রতিনিধি অবস্থান করেন। পূর্ব্বে চীনের উৎকট অপরাধীরা এইখানে নির্ব্বাসিত হইত। ফরমোসার অন্য আর একটী সমৃদ্ধিশালী নগর তাকাও।

    উপরােক্ত নগরগুলি ভিন্ন জাপান সাম্রাজ্যে কোব, হিরোসিমা, কুরি, নিগাটা প্রভৃতি কয়েকটী উল্লেখযােগ্য নগর আছে।

    জলবায়ু।

    জাপানের প্রায় সমগ্র ভাগই শীতমণ্ডলের অন্তর্গত। উত্তরাংশে ইয়ুরােপের ন্যায় অতি তীব্র শীত অনুভূত হয়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে তাপমান যন্ত্রের পারদ ২৮° ডিক্রির নিম্নে পতিত হয়। দক্ষিণাংশে বায়ুর তাপ অতি গ্রীষ্মের সময় ৯৮° হইয়া থাকে। কিন্তু দিবাভাগে দক্ষিণদিক হইতে এবং রজনীতে পূর্ব্বদিক হইতে সমুদ্র বায়ু প্রবাহিত হওয়ায় গ্রীষ্মের তাপ অনুভূত হয় না। এ দেশের ঋতু অত্যন্ত পরিবর্তনশীল হইলেও জলবায়ু সাধারণতঃ স্বাস্থ্যকর। পূর্ব্ববায়ু অপেক্ষা, দক্ষিণবায়ু সমধিক সুখস্পর্শ। বর্ষাকালে জাপানে প্রচুর বারিবর্ষণ হইয়া থাকে। এখানে ঝড়ের বেগ অতি প্রচণ্ড।

    জাপানে ঝটিকা, বজ্রপাত, সমুদ্রপ্লাবন ও ভূমিকম্প সর্ব্বদাই হইয়া থাকে।

    ভূমি ও উৎপন্ন ।

    জাপানের ভূমি সাধারণতঃ উর্ব্বরা। সর্ব্বত্রই কৃষিকার্য্য অতি সুন্দররূপে সম্পন্ন হয়। জাপানীদিগের ন্যায় কৃষিকুশল জাতি পৃথিবীতে দৃষ্ট হয় না। ইহারা একখণ্ড ভূমিও বৃথা ফেলিয়া রাখে না। সুবিধা হইলে পাহাড়ের অতি উচ্চস্থান পর্য্যন্তও কর্ষণ করিয়া থাকে। জাপানে পূর্ব্বে ব্যবস্থা ছিল, যে ব্যক্তি পতিত জমি আবাদ করিবে, তাহাকে দুই বৎসরের মধ্যে কোনরূপ কর প্রদান করিতে হইবে না; আর যে অলস ব্যক্তি এক বৎসর নিজ জমি চাষ করিবে না, সে তাহার জমির যাবতীয় অধিকার হইতে বঞ্চিত হইবে।

    জাপানে ধান্য, যব, গম, চা, তুলা, রেশম, পাট, তামাক প্রচুর পরিমাণে জন্মিয়া থাকে। ধান্যের চাষই অধিক পরিমাণ ভূমিতে হইয়া থাকে। এখানে এক প্রকার অতি উৎকৃষ্ট তণ্ডুল আছে, তাহা কিয়ৎক্ষণ শীতল জলে রক্ষা করিলে অন্ন প্রস্তুত হয়। যে যে স্থানে তামাক উৎপন্ন হয়, তন্মধ্যে নাগাসাকি ও সাস্‌মার তামাকই উৎকৃষ্ট ও সুগন্ধযুক্ত। জাপানীরা অতি উত্তমরূপে, তামাকের চাষ করিয়া থাকে। যাহারা কোন তামাক ব্যবহার করিতে পারে না, তাহারাও এদেশের তামাক ব্যবহার করিতে পারে। জাপানে মূলা, শশা, ফুটী, তরমুজ, আলু, কাফি, চা প্রভৃতি যথেষ্ট জন্মিয়া থাকে। নানাপ্রকার বাঁশ, কর্পূর ও বার্ণিষ উৎপাদক বৃক্ষ প্রভৃতি নানাবিধ আশ্চর্য্য উদ্ভিদ এখানে পাওয়া যায়। এক প্রকার বৃক্ষ হইতে দুগ্ধের ন্যায় শ্বেতবর্ণ রস নিঃসৃত হয়। সুখাদ্য ফলের মধ্যে কমলা, লিচু, আঙ্গুর, কুল, চেরি, আখরােট, পেয়ারা, পিচ প্রভৃতি উৎপন্ন হয়। বৃহৎ বৃক্ষের মধ্যে ওক, পাইন, দেবদারু, মেহগ্নি প্রভৃতি দৃষ্ট হয়। জাপানে নানাশ্রেণীর অতি মনোহর পুষ্প উৎপন্ন হইয়া থাকে। এখানে পশমের অভাব নাই। এখানকার তুতজাত রেশম সর্ব্বত্র প্রসিদ্ধ।

    আকরিক।

    আকরিকের মধ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, টিন, পাথুরিয়া কয়লা প্রচুর পাওয়া যায়। লৌহ অধিক পাওয়া যায় না। লৌহের অনেক কার্য্য তাম্র দ্বারা সম্পন্ন হইয়া থাকে। এখানকার তাম্রের ন্যায় উৎকৃষ্ট তাম্র পৃথিবীর কুত্রাপি পাওয়া যায় না। জাপানীরা ইহা এক ইঞ্চ মােটা ও এক ফুট লম্বা পাত করিয়া বিক্রয় করে। অপকৃষ্ট তাম্র ইষ্টকাকারে বিক্রীত হয়। জাপানে তামার খনিতে সময়ে সময়ে স্বর্ণ পাওয়া যায়। সম্রাটের অনুমতি ব্যতীত কেহই স্বর্ণখনির কার্য্য করিতে পারে না। এখানকার টিন রৌপ্যের ন্যায় শুভ্র ও উজ্জ্বল। জাপানের নানাস্থানে একরূপ মৃত্তিকা পাওয়া যায়, তাহা হইতে মনােহর বাসন প্রস্তুত হয়। চীনাবাসন বলিয়া ইহা পৃথিবীর নানাদেশে বিক্রয় হইয়া থাকে।

    জীবজন্তু।

    জাপানে অশ্ব, মহিষ, গবাদি গ্রাম্য জন্তু দৃষ্ট হয়। এখানকার অশ্ব সকল বলিষ্ঠ, কিন্তু বৃহৎ নহে। মৃত্তিকাকর্ষণ ও শকটচালন জন্য গরু ও মহিষ ব্যবহৃত হয়। ছাগ, মেষ, হরিণ, শূকর, ভল্লুক প্রভৃতি নানাস্থানে দেখা যায়। জাপানে পক্ষী অতি বিরল, এই পার্থিব অমরাবতীতে হংস, কুক্কুট ও ভরত পক্ষী ভিন্ন উজ্জ্বল বর্ণবিশিষ্ট বিহঙ্গ দেখিতে পাওয়া যায় না। এখানে সর্প অতি অল্পই দেখিতে পাওয়া যায়। ফিনাকারী ও তিতাকাজি নামে দুই শ্রেণীর সর্প আছে, উহারা এদেশীয় গােখুরা ও কেউটে সাপ অপেক্ষাও ভীষণ। ইহারা কাহাকেও দংশন করিলে দষ্ট ব্যক্তির নিশ্চয়ই মৃত্যু হয়। এই দুই শ্রেণী ভিন্ন জাপানে আর দুই তিন প্রকার সর্প আছে, তাহারা বিষাক্ত নহে। এই দ্বীপে উঁই বড়ই প্রবল। ইহার অত্যাচারে জাপানীরা ব্যতিব্যস্ত হইয়া থাকে। ইহারা বলে, গৃহের চারি পাশে লবণ ছড়াইয়া দিলে কিয়দ্দিবসের জন্য উঁইয়ের দৌরাত্ম নিবারিত হয়।

    জাপানের সমুদ্র, নদী ও বিল প্রভৃতিতে প্রচুর মৎস্য পাওয়া যায়। জাপান সমুদ্রে ঠিক মানুষের ন্যায় এক রূপ মৎস্য আছে। ইহার মস্তক বৃহৎ, বক্ষদেশে ও মুখমণ্ডলে আঁইস নাই। ইহার পায়ে বালকের ন্যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঙ্গুলি আছে। টোকিও উপসাগরে ইহা অধিক পাওয়া যায়। এখানকার জলাশয়ে কুম্ভীর ও কচ্ছপাদির অভাব নাই। জাপান সমুদ্রে শুক্তি, নানাবর্ণের প্রস্তর ও প্রবালাদি পাওয়া যায়।

  • ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত: প্রাচীনযুগ।

    ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত: প্রাচীনযুগ।

    ভারতীয় আর্য্যজাতিগণ যে অতি প্রাচীন কাল হইতে ভারতবর্ষ ব্যতীত পৃথিবীর অন্যান্য দেশ ও দ্বীপপুঞ্জাদির কথা সম্যক্‌রূপে অবগত ছিলেন, আর্যজাতি, আর্য্যধর্ম্ম ও আর্য্যাচার যে এক সময়ে পৃথিবী ব্যাপিয়া বিদ্যমান ছিল, তাহার ভূরি ভূরি প্রমাণ অদ্যাপি দেদীপ্যমান রহিয়াছে। “ফেলিক ওয়ারসিপ” নামক ইংরাজী গ্রন্থে লিখিত আছে, এক সময়ে তান্ত্রিক আচার, শিবলিঙ্গপূজা এবং ভারতীয় ব্রতাচরণ, প্রাচীন আসিরিয়া, (অসুর দেশ) চালিডিয়া, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা প্রভৃতি নানা দেশে অনুষ্ঠিত হইত। আমাদের পুরাণ গ্রন্থে বলিরাজা ও সূর্য্যবংশীয় জনৈক নৃপতির পাতালে গমন করার কথা লিখিত আছে। আমেরিকায় বলিভিয়া ও পুরুভিয়া নামে দুইটী দেশ আছে। পুরুভিয়ার প্রধান নগর কুজনাে নগরীতে অদ্যাপি কয়েকটি দেবালয়, দেব বিগ্রহ ও একটী সূর্য্য মন্দিরের ভগ্নাবশেষ বিদ্যমান আছে। কেহ কেহ বলেন, প্রাচীন বলিভূমিও পুরুভূমি হইতে আধুনিক বলিভিয়া ও পুরুভিয়া নামের উৎপত্তি হইয়াছে। জনৈক সংস্কৃতজ্ঞ সুপণ্ডিত বহু প্রাচীন গ্রন্থ আলোচনা করিয়া লিখিয়াছেন;—ইংরেজেরা যাহাকে আমেরিকা বলিয়া বর্ণনা করিয়া থাকেন, শ্রীমদ্ভাগবতে তাহাকে আবর্ত্তন উপদ্বীপ নামে অভিহিত করা হইয়াছে। এই আবর্ত্তন উপদ্বীপের পশ্চিমখণ্ডে (আমেরিকার উত্তর প্রদেশে) সূর্য্যবংশীয় পুরুকুৎস রাজার রাজ্য পুরুভূমি অর্থাৎ পেরু প্রদেশ ও দক্ষিণ প্রদেশে বলি রাজার রাজ্য বলিভূমি অর্থাৎ বলিভিয়া দেশ বিদ্যমান আছে। এখানে অদ্যাপি “রামু-সীতোয়ো” অর্থাৎ রামসীতার উৎসব হইয়া থাকে।

    H. M. Westrap প্রণীত Ancient Archœology নামক গ্রন্থে প্রাচীন মিশরীয়, গ্রীক, রােমান প্রভৃতি জাতির শিল্পকলা ও ভাস্কর বিদ্যার বহু বিবরণ সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। এই পুস্তক যত্নসহকারে পাঠ করিয়া জনৈক বিশেষজ্ঞ ঐতিহাসিক লিখিয়াছেন;—

    এই গ্রন্থের ১৬৪ পৃষ্ঠায় গ্রীক দেবতা জুপিটারের প্রতিমূর্ত্তি অঙ্কিত আছে। এই মূর্ত্তি নিবিষ্টচিত্তে দেখিলেই মনে হয়, ইহা যেন ভারতীয় পৌরাণিক দেব মহাদেবেরই প্রতিমূর্ত্তি। বাম হস্তে পারাবত-শীর্ষ ত্রিশূল; দুই পার্শ্বে যেন জয়া-বিজয়া; পদতল সমীপে দুই দিকে ছিন্নমস্তার প্রতিরূপ; আর আমাদের দেশে দশভূজা প্রতিমার চালচিত্রে যেমন বহুবিধ দেব-দেবীর মূর্ত্তি অদ্যাপি অঙ্কিত হইয়া থাকে, এই জুপিটার-প্রতিমা-ফলকের ললাটদেশে যেন তেমনই চাল-চিত্র অঙ্কিত। এই পুস্তকের ১৭৪ পৃষ্ঠায় প্রাচীন এথেন্সে প্রচলিত মুদ্রা বিশেষের প্রতিমূর্ত্তি আছে; এই মুদ্রার একদিকে যেন লক্ষ্মী দেবীর মূর্ত্তি অঙ্কিত; অপর দিকে লক্ষ্মী-পেচক ও ধান্য পাত্র খুঁচির প্রতিরূপ বিন্যস্ত। এই পুস্তকের ১৮৮ পৃষ্ঠার চিত্র দেখিলেই মনে হয়, ইহা যেন আমাদের দেশের মহিষমর্দ্দিনীরূপের প্রতিরূপ; মহিষ কায়, হইতে অসুর বিনির্গত হইয়াছে; এই অসুর,—পার্শ্বোপবিষ্ট অপর অসুরের কেশাকর্ষণ করিতেছে। ১০১ পৃষ্ঠায় অঙ্কিত মূর্ত্তি সমূহ দেখিলেই মনে হয়, ঠিক যেন ভারতের বৃন্দাবনবিলাসিনী শ্রীরাধার প্রতিমা; পার্শ্বে বংশীবাদন তৎপর শ্রীকৃষ্ণ, কোন মূর্ত্তি বা বীণাধারিণী বীণাপাণির বিকৃতি। এই সকল মূর্ত্তির হাব-ভাব ও বেশ-ভূষা দেখিলে, নিশ্চয়ই ভারতীয় বলিয়া প্রতীত হইবে,—রাধা-কৃষ্ণপ্রতিমার পার্শ্বে হ্লাদিনী রসান্যাদিনী সখী-মণ্ডলী। পুস্তকের ১৭০ পৃষ্ঠায় রােমবিগ্রহ অঙ্কিত আছে, ইহা দেখিলেই মনে হইবে,—অবিকল যেন চতুর্ম্মুখ ব্রহ্মারই অনুকরণ! ২৩১ পৃষ্ঠায় যে রোমান-চিত্র বিশেষের প্রতিচিত্র অঙ্কিত আছে, তাহা দেখিলেই মনে হইবে, আমাদেরই শাস্ত্রবর্ণিত সমুদ্র-মন্থনের প্রতিমূর্ত্তি;—সমুদ্র-গর্ভ হইতে চন্দ্র ও উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব উঠিতেছে,—আবার চৈত্রেক-পার্শ্বে সমুদ্র সম্ভব সুধা লইয়া, দেবাসুরে মহাযুদ্ধ বাধিয়া গিয়াছে।

    কেবলমাত্র গ্রীক বা রােম দেশে নহে, প্রাচীন মিশর দেশের মূর্ত্তি-প্রসঙ্গেও ভারতীয় দেবদেবীর প্রতিমার লক্ষণ দিব্যরূপ প্রকটিত। উপরি-উক্ত পুস্তকের ১৫৫ পৃষ্ঠায় যে চিত্র অঙ্কিত রহিয়াছে, তাহা দেখিলেই মনে হইবে,—ইহা যেন অবিকল জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রারই প্রতিমূর্ত্তি; জগন্নাথ কৃষ্ণবর্ণ, বলরাম শুভবর্ণ এবং ইঁহাদের উভয়ের মধ্যস্থলে সুভদ্রাদেবী উপবিষ্ট। প্রতিমা-চিত্রে যেরূপ,—সৌধ-মন্দির চিত্রেও সেইরূপ ভারতীয় ভাবানুকরণই পুরা মাত্রায় প্রকটিত। মিশরীয় প্রাচীন মন্দির বিশেষের দৃশ্য যেন ভুবনেশ্বর মন্দির সদৃশ।

    এক সময়ে আর্য্যধর্ম্মই যে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে প্রচলিত ছিল, এই সকল রূপ-প্রতিমা কি তাহার অন্যরূপ পরিচায়ক নহে? সুদুর উত্তর কুরুবর্ষে,5 তির্ব্বতে, মানসসরােবরে, চীন-সাম্রাজ্যে, কৃষ্ণসাগরের উপকূলবর্ত্তী কলচিস প্রদেশে, তুরস্কের বসােৱা নগরে, পারস্যের অন্তর্গত নানা প্রদেশে, অদ্যাপিও হিন্দুদিগের প্রতিষ্ঠিত দেবমূর্ত্তি বিরাজমান আছে। এখনও অনেক হিন্দু সন্ন্যাসীরা এই সকল স্থানে গমন করিয়া থাকেন।

    কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পঞ্চশতবর্ষ পূর্ব্বেও আর্য্যজাতির ইয়ুরােপ6 গমনের কথা অবগত হওয়া যায়। ভূগর্ভোত্থিত যে শিলালিপি হইতে ইহা স্থির হইয়াছে, তাহা অদ্যাপিও ইংলণ্ডের রাজকীয় কৌতুকাগারে রক্ষিত আছে7

    এই সকল দৃষ্টান্ত হইতে নিসংশয়ে প্রতীত হইতেছে,ভারতীয়েরা এক সময়ে পৃথিবীর সর্ব্বস্থানেই আপনাদের অক্ষুন্ন প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন।

    প্রাচীনযুগে হিন্দু বণিকেরা পোতারোহণপূর্ব্বক বালি, যাবা, সুমাত্রা, বোর্ণিও প্রভৃতি প্রাচ্য দ্বীপপুঞ্জে গমনাগমন করিতেন। এই সমস্ত স্থানে অদ্যাপিও হিন্দু উপনিবেশের সুস্পষ্ট চিহ্ণ বর্ত্তমান রহিয়াছে। হিন্দুরা যে, জাপানের অস্তিত্ব সম্বন্ধে অজ্ঞ ছিলেন না, তাহারও কয়েকটী প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে। ইয়োকোহামার অনতিদূরে কামিকুরা নামক স্থানে ৩৩১/৩ হস্ত উচ্চ একটী বুদ্ধদেবের প্রতিমূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। আর একস্থানে ৪২ হস্ত উচ্চ একটি দেবমূর্ত্তি আবিষ্কৃত হইয়াছে। শেষোক্ত মূর্ত্তির গাত্রে সংস্কৃত ভাষায় কতকগুলি কথা খোদিত আছে। তাহাতে জানা যায়, খ্রীষ্ট জন্মিবার বহুশতবর্ষ পূর্ব্বে এই দেবমূর্ত্তি ভারতবর্ষ হইতে জাপানে আনীত হইয়াছিল।

    জাপানের প্রাচীন নাম সুদর্শন দ্বীপ। রামায়ণের অন্তর্গত কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ডের চত্বারিংশ সর্গে চারুদর্শন সুদর্শন দ্বীপ ও সূর্ম্যরাগ-রঞ্জিত মনোহর স্বর্ণ পর্ব্বতের উল্লেখ আছে। কালক্রমে সুদর্শন নামের অপভ্রংশে ‘নিপন’ নাম হইয়াছে। প্রাচীন সুবর্ণ পর্ব্বত হইতে আধুনিক ‘ফুজিসান’ পর্ব্বতের নাম উৎপন্ন হইয়া থাকিবে। মহর্ষি বাল্মীকি সুদর্শন দ্বীপকে সূর্যোদয়ের স্থান বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি, জাপানী ভাষায় নিপন শব্দের অর্থ সূর্য্যোদয়ের স্থান। আমাদের বৈবস্বত মনুর ন্যায়, জাপান রাজবংশের আদি পুরুষ সিণ্টো, সূর্য্য হইতে উৎপন্ন। জাপান রাজবংশধরেরা আপনাদিগকে অদ্যাপিও সূর্য্যবংশীয় বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকেন।

    অনেকে অনুমান করেন; যে সভ্যতারাগে জাজ্জ্বল্যমান হইয়া জাপান আজি উষার সুকুমার অরুণ প্রভার ন্যায় উত্তরােত্তর উন্নতির পথে অগ্রসর হইতেছে, সে সভ্যতা জাপানবাসিরা পাশ্চাত্য জাতির নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছে। এ অনুমান প্রকৃত নহে। পাশ্চাত্য সভ্যতার অভ্যঙ্গনে জাপানের বর-বপু কিঞ্চিন্মাত্রায় মসৃণ হইয়াছে সত্য, কিন্তু উহার জাতিকলেবর গঠনে যে ভারতবর্ষই মন্ত্রগুরু অদ্যাপিও তাহার দৃঢ় নিদর্শন বিদ্যমান আছে। এই বিবরণ আমরা ক্রমান্বয়ে লিপিবদ্ধ করিতে যত্ন করিব।

    জাপান দ্বীপের উৎপত্তি ও তথায় লােকের বসতি সম্বন্ধে অনেক অপূর্ব্ব উপাখ্যান প্রচলিত আছে। তাহার অধিকাংশই ভারতীয় পৌরাণিক আখ্যায়িকার ন্যায় অপূর্ব্ব রহস্যে বিজড়িত। জাপানীদিগের বিশ্বাস, অতি প্রাচীনকালে এই দ্বীপে দেবতারা রাজত্ব করিতেন। বহুযুগ পরে সেই দেববংশে মানব ও দেবধর্ম্মবিশিষ্ট এক সম্প্রদায় মনুষ্যের জন্ম হয়। ইহার বহুবর্ষ পরে তাঁহাদের সন্তানসন্ততি হইতে বর্ত্তমান জাপানিগণের উৎপত্তি হইয়াছে।

    ইয়ুরােপীয় পণ্ডিতগণের অনুমান যে, চীন হইতে জাপানীদিগের উৎপত্তি হইয়াছে। কিন্তু উভয় জাতির ধর্ম্ম ও ভাষার অসাদৃশ্য, রীতিনীতি ও আচার ব্যবহারের পার্থক্য, মানসিক গতি ও চরিত্রের ভিন্নতা দর্শনে, কিছুতেই উক্ত অনুমানের সারবত্ত্বা উপলব্ধি হয় না।

    পাশ্চাত্য মানবতত্ত্ববিদেরা মনুষ্যবর্গের বর্ণ, মুখশ্রী ও গঠনাদির বিভিন্নতা অনুসারে সমগ্র মানবজাতিকে, ককেশীয়, মােঙ্গলীয়, ইথিওপীয়, মালয় ও আমেরিক এই পঞ্চ শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছেন। তাঁহাদের মতে চীন, বর্মা, শ্যাম, জাপান, এসিয়াস্থ রুষিয়া, তিব্বত প্রভৃতি দেশের অধিবাসিগণ মােঙ্গলীয় শ্রেণীভুক্ত। ইহাদিগের বর্ণ পীত, কেশ স্থূল ও ঋজু, শ্মশ্রু বিরল, মুখ প্রশস্ত ও চেপ্টা, গণ্ডাস্থি উন্নত এবং চক্ষু বাদামাকৃতি।

    নিম্নশ্রেণীর জাপানিগণের গঠনাদি মােঙ্গলীয় ভাবাপন্ন হইলেও জাপানের শিক্ষিত ও উন্নতিবংশীয়দিগের বর্ণ ও শারীরিক গঠনাদি অনেকাংশে ভারতীয় শ্রেষ্ঠজাতিগণের অনুরূপ। তাঁহাদিগকে সহসা দর্শন করিলে, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ প্রভৃতি উচ্চশ্রেণীর বাঙ্গালী বলিয়া ভ্রম উপস্থিত হয়। তাঁহাদিগের বর্ণ গৌর, কেশ দীর্ঘ, নাসিকা উন্নত ও সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুগঠিত। যাঁহারা সংবাদপত্রে জাপান-সম্রাট, মার্কুইস আইটো, মন্ত্রী টেরাউচি, এডমিরাল টোগো, সেনাপতি অকু প্রভৃতি সুপ্রসিদ্ধ জাপানিগণের আলােকচিত্র দর্শন করিয়াছেন, তাঁহারা নিশ্চয়ই আমাদের একমতাবলম্বী হইবেন। কয়েক বৎসর পূর্ব্বে কলিকাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ অধিবেশনে একটী আশ্চর্য্য পরীক্ষা হইয়াছিল। তাহাতে দুই জন জাপানী ভদ্রলোক এদেশীয় পরিচ্ছদ পরিধান পূর্ব্বক সভায় উপস্থিত স্বত্বেও কেহই তাঁহাদিগকে বাঙ্গালী হইতে ভিন্ন বিবেচনা করিতে পারেন নাই।

    পৃথিবীর সর্ব্বত্রই দৃষ্ট হয় যে, অনেক প্রদেশ আদিম অধিবাসী শূন্য হইয়া নূতন জাতি কর্ত্তৃক উপনিবেশিত হইয়াছে। ইয়ুরােপ মহাদেশের ইতিবৃত্ত পাঠ করিলে, ইহার প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যাইবে। আরও দেখা যায়, আদিম জাতি ও নবাগত জাতির সংমিশ্রণে নানাস্থানে নূতন নূতন জাতিনিচয়ের উৎপত্তি হইয়াছে। উদাহরণ স্বরূপ মূলাটো ও জম্বো প্রভৃতি জাতির কথা উল্লেখ করা যাইতে পারে। এইরূপ উদাহরণ ভারতবর্ষেও বিরল নহে।

    আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, দুর অতীতের কোন এক সময়ে ভারতীয় আর্য্যজাতিগণের কোন এক শাখা সুদর্শন দ্বীপে উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছিলেন। এই মহাঘটনা, আর্য্যজাতির অতীত গৌরবের সুবর্ণযুগে, কি ইতিহাস-প্রসিদ্ধ বৌদ্ধযুগে ঘটিয়াছিল, তাহা নিঃসন্দেহে নির্ণয় করিবার অবসর উপস্থিত হয় নাই।

    কোজিকি নামক জাপানের পুরাণগ্রন্থে লিখিত আছে যে, অতি প্রাচীন কালে সিণ্টো নামক জনৈক মহাপুরুষ ভগবান সূর্য্য হইতে উৎপন্ন হইয়া মর্ত্তধামে অবতরণ করেন। তাঁহার সন্তানসন্ততিরা বহুযুগ ধরিয়া পৃথিবী সুশাসন পূর্ব্বক অন্তর্হিত হইলে, নিপন রাজ্যে অতি ভয়াবহ দেবাসুর সংগ্রাম আরম্ভ হয়।

    ভগবতী বসুমতী উকুনিনুনী নামক অজেয় অসুর কর্ত্তৃক পীড়িতা হইয়া, প্রভাকরপত্নী দেবী অমৃতরাশির আশ্রয় গ্রহণ করেন। মহাদেবী বসুন্ধরার কাতর-ক্রন্দনে বিগলিতা হইয়া মিকাডো নামক মহাবলশালী দেব সেনাপতিকে দৈত্য দলনার্থ ভূতলে প্রেরণ করেন। বহুযুগ ধরিয়া দেবদানবে ভীষণ যুদ্ধ হয়। অবশেষে মিকাডো ও তাঁহার মানসপুত্রগণের বাহুবলে দানবেরা পরাজিত হইয়া দেশত্যাগ পূর্ব্বক পাতাল প্রদেশে পলায়ন করে। যুদ্ধাবসানে মিকাডো নিপনের সম্রাট হন। ইহাই জাপানের পৌরাণিক ইতিহাস।

    মিকাডাে বংশে জীমূতমনু নামক জনৈক মহাপ্রতাপশালী নরপতি জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম নিনো অব্দে অর্থাৎ খৃষ্ট জন্মিবার ৬৬০ বৎসর পূর্ব্বে ইহাঁর আবির্ভাব হয়। এই সময় হইতে জাপানে কাল গণনার সূত্রপাত হয়। দেববংশসম্ভূত বলিয়া জীমূতমনু রাজ্যের সর্ব্বত্রই প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিলেন। সহস্র সহস্র ধর্ম্মমন্দিরে মহােৎসব সহকারে তাঁহার নিত্য পূজা হইত। প্রজাগণ সাক্ষাৎ ঈশ্বর বােধে তাঁহাকে ভয় ও ভক্তি করিত। এই সময়ে জাপানীরা সিণ্টো ধর্মাবলম্বী ছিল। সূর্য্যপূজা, রাজভক্তি ও স্বদেশপ্রীতি এই ধর্ম্মের মূলমন্ত্র ছিল। প্রজা মাত্রেই সম্রাট ও স্বদেশের জন্য সাগর সলিলের ন্যায় অকাতরে অর্থ ও শােণিত ব্যয় করিত।

    জীমূতমনু মিকাডাের পর হইতে জাপানে রাজ-সম্মান অত্যধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পাইতে থাকে। এই সময়ে জনসাধারণ সম্রাটকে দেবতা বােধে তাঁহার শরীর পরম পবিত্র বলিয়া বিশ্বাস করিত। রাজা কোন সময়ে মৃত্তিকা স্পর্শ করিতেন না। কোনস্থানে যাইতে হইলে বাহকের স্কন্ধে উঠিয়া গমন করিতেন। সম্রাটের নখর ও কেশ প্রভৃতি কেহই পাপভয়ে ছেদন করিতে সাহসী হইত না। সম্রাটের জন্য প্রত্যহ নূতনপাত্রে রন্ধন হইত, রন্ধনান্তে সেগুলি সমুদ্রগর্ভে পরিত্যাগ করা হইত। সম্রাট প্রত্যহ নূতন স্বর্ণপাত্রে ভােজন করিতেন। সে পাত্র পরিত্যাগ না করিয়া, তাহা অবসর মত দ্রব করিয়া নূতন পাত্র প্রস্তুত করা হইত। সম্রাটের পীড়া হইলে, সিণ্টো ধর্ম্মমন্দিরের পুরোহিতগণকে অনশনে থাকিয়া ত্রিসন্ধ্যা সূর্য্যোস্তোত্র পাঠ করিতে হইত। সম্রাট শাস্ত্রানুসারে দ্বাদশটি পত্নী গ্রহণ করিতে পারিতেন। পত্নীগর্ভজাত সন্তান মাত্রেই রাজ সম্মান প্রাপ্ত হইতেন। সর্ব্বাপেক্ষা জ্যেষ্ঠ পুত্রের গৌরব অধিক ছিল, তাঁহারই অদৃষ্টে সিংহাসনের উত্তরাধিকার ঘটিত। সম্রাটের মৃত্যু হইলে কনিষ্ঠ পত্নী মৃতপতির অনুগামিনী হইতেন। অন্যান্য পত্নীরা ইচ্ছা করিলে এই সতীধর্ম্ম পালন করিতে পারিতেন। বিধবা সম্রাট-মহিষীরা অন্য পতি গ্রহণ করিতে পারিতেন না।

    এই সময়ে জাপানিগণের মধ্যে বিবিধ সংস্কার বিদ্যমান ছিল। তাহারা শুনিয়াছিল, পৃথিবীর নিম্নে একটি বৃহদাকার তিমিঙ্গিল আছে, সেই মৎস্য মস্তক নাড়িলে ভূমিকম্প হয়। তাহারা বলিত দেবমন্দির গুলি সিণ্টোর পতাকার উপরে স্থাপিত বলিয়া তথায় ভূমিকম্পের উপদ্রব হয় না। তাহাদের বিশ্বাস ছিল, কুদিনে মরিলে মনুষ্য প্রেতযােনি প্রাপ্ত হয়, অধার্ম্মিকগণ মরণান্তে শৃগাল ও উল্কামুখী হয়।

    আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি, সে সময়ে ভারতবর্ষ চীন, গ্রীক ও মিশর প্রভৃতি কয়েকটি দেশ ভিন্ন সমগ্র পৃথিবী অজ্ঞানান্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল। আশ্চর্যের বিষয়, এই সময় হইতে (২৫৫০ খৃঃ পূঃ) জাপানের পুরাবৃত্ত অতি সুন্দরভাবে লিখিত হইতে আরম্ভ হইয়াছে।

    আমরা দেখিতে পাই, প্রাচীনযুগেও জাপানবাসীরা শিল্প ও বাণিজ্য কুশল জাতি বলিয়া প্রসিদ্ধ ছিল। খৃষ্ট জন্মিবার ৬৫০ বৎসর পূর্ব্বে জাপানীরা স্বদেশজাত দ্রব্যাদি লইয়া চীন ও কোরিয়ার সহিত সমুদ্রপথে বাণিজ্য করিত। বর্ত্তমান সময়ের দুই সহস্র বর্ষ পূর্ব্বে জাপানে জনসংখ্যা গ্রহণ করা হইয়াছিল। ১৭০০ বৎসর অতীত হইল, জাপানে ডাকঘর স্থাপিত হইয়াছে। সহস্রাধিক বর্ষ বিগত হইল, জাপানবাসীরা রেশম বয়ন ও চীনাবাসন প্রস্তুত প্রণালী অবগত হইয়াছে।

    খৃষ্ট জন্মিবার বহুবর্ষ পূর্ব্ব হইতেই জাপানীরা ভারতবর্ষের কথা অবগত হইয়াছে। এই সময়ে তাহারা ভারতবর্ষকে “তেনজিকু” ও ভারতবাসীকে “তেনজিকুজিন” নামে অভিহিত করিত। এই দুইটি শব্দের অর্থ যথাক্রমে স্বর্গ ও স্বর্গবাসী। এইরূপ প্রবাদ আছে, প্রাচীনযুগে জাপানীরা, ভারতবাসী কোন ব্যক্তিকে দর্শন করিলে বলিত;—“আজ আমাদের মানব জন্ম ধন্য হইল, আমাদের স্বর্গযাত্রার পথ উন্মুক্ত হইল। আমরা স্বচক্ষে স্বর্গবাসীকে দর্শন করিলাম।”

  • ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত: মধ্যযুগ।

    ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত: মধ্যযুগ।

    বৌদ্ধধর্ম্ম কোন সময়ে জাপানে প্রবেশ লাভ করিয়াছিল, কোন সময়ে জাপানিগণের রীতিনীতি, আচারব্যবহার বৌদ্ধ ভাবাপন্ন হইয়াছিল তাহা নিশ্চয়রূপে বলিতে পারা যায় না। খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দের পূর্ব্বে যে জাপানে বৌদ্ধসভ্যতা প্রচলিত ছিল, তাহার কোন নিদর্শন প্রাপ্ত হওয়া যায় না।7

    ইয়ুরােপীয় পণ্ডিতগণের অনুমান, চীনের বৌদ্ধ ভিক্ষুরাই সর্ব্বপ্রথমে জাপানে গমন করিয়া, তথায় বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচারের পথ উন্মুক্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু এক্ষণে নানাস্থান হইতে যেরূপ প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে, তাহাতে স্পষ্টই প্রতীত হয় যে, জাপানে বৌদ্ধধর্ম্ম প্রবেশের বহুপূর্ব্বে তথায় প্রাচীন আর্য্যসভ্যতা ও ভারতীয় তান্ত্রিক ধর্ম্মের বিস্তার হইয়াছিল।

    জাপানের প্রাচীন ইতিহাস পাঠে অবগত হওয়া যায় যে, খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দে যে সমস্ত ব্যক্তি জাপানে ভারতবাসী বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ তন্ত্রশাস্ত্রে সুনিপুণ ও কেহ কেহ ঐন্দ্রজালিক বিদ্যায় সুপণ্ডিত ছিলেন। কাই (Kii) প্রদেশীয় একটী উষ্ণ প্রস্রবণের নিকটে কয়েকজন হিন্দু সন্ন্যাসী বাস করিতেন। এইরূপ শুনা যায়, ইঁহাদিগের মধ্যে একজন নগ্ন ছিলেন এবং ইঁহার দৃষ্টি সর্ব্বদাই দক্ষিণদিকে থাকিত।

    জাপানের ইতিহাসে বােধিসেন ভারদ্বাজ নামক একজন ভরদ্বাজ বংশীয় ব্রাহ্মণের উল্লেখ আছে। ইনি ভারতবর্ষ হইতে সমুদ্রপথে কোচীন-চীনে আগমন করেন, তথায় কিছুকাল অতিবাহিত করিয়া “ফোচে” নামক চীন দেশীয় পণ্ডিতের সহিত জাপানের “ওসাকা” নগরে উপস্থিত হন। বােধিসেন প্রায় চতুর্বিংশতি বর্ষকাল জাপানে অতিবাহিত করেন। ইঁহার মৃত্যুর পর, স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ, তাঁহার সমাধিস্থানে একখণ্ড প্রস্তর প্রােথিত হয়। অদ্যাপিও জাপানের সুবিখ্যাত নারা প্রদেশে বােধিসেন ভারদ্বাজের প্রতিষ্ঠিত মঠ ও স্মৃতি প্রস্তরফলক বর্ত্তমান আছে। “মান্‌জো-শিউ” নামক জাপানের প্রচীন পদ্য সংগ্রহ পুস্তকে “ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মণ ও বায়সের উপাখ্যান” নামক একটী ক্ষুদ্র কবিতা লিখিত আছে।8

    চীন ত্রিপিটকান্তর্গত9 গ্রন্থাবলী পাঠে অবগত হওয়া যায় যে, চীন দেশীয় ধর্ম্মপ্রচারকগণ সপ্তম শতাব্দ হইতে দশম শতাব্দ পর্য্যন্ত জাপানবাসিগণের নিকট বৌদ্ধধর্ম্ম ও বৌদ্ধনীতির মহিমা কীর্ত্তন করিয়াছিলেন।

    সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে সাম্রাজ্ঞী সু-ইকো জাপানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিতা ছিলেন। তিনিই এ দেশের প্রথম স্ত্রী-শাসনকর্ত্রী। বৌদ্ধধর্ম্মে তাঁহার অচলাভক্তি ও দৃঢ় বিশ্বাস থাকায় এই সময় হইতে জাপানে বৌদ্ধধর্ম্ম বদ্ধমূল হয়। এই শতাব্দীতে সপ্তজন সম্রাট ও পঞ্চজন সাম্রাজ্ঞী জাপানে রাজত্ব করেন। ভারতের বৌদ্ধধর্ম্ম ইতিহাসে প্রিয়দর্শী অশোকের ন্যায়, সাম্রাজ্ঞী কৈমিও ও সাম্রাজ্ঞী কো-কেন জাপানে সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেন। কৈমিও রাজ্যের নানাস্থানে বৌদ্ধ মন্দির নির্ম্মাণ করিয়া, প্রত্যেক মন্দিরে ভগবান শাক্যমুণির মূর্ত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁহার সময়ে রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে পান্থ-নিবাস, অনাথ-আশ্রম ও চিকিৎসালয় স্থাপিত হয়। এই সকল কার্য্যের জন্য তিনি ব্যয় স্বীকারে অণুমাত্র কুণ্ঠানুভব করিতেন না।

    নবম শতাব্দীর মধ্য হইতে একাদশ শতাব্দী পর্য্যন্ত জাপানের সর্বত্র ফুজিয়ারা বংশের বিশেষ প্রতিপত্তি হয়। জাপানী ঐতিহাসিকেরা এই সময়কে “ফুজিয়ারা সময়” বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। এই সময়ে ফুজিয়ারা বংশীয় কতিপয় সম্রাট ও সাম্রাজ্ঞীর যত্নে জাপানে বৌদ্ধধর্ম্মের অসাধারণ উন্নতি সাধিত হইয়াছিল।

    খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দীর পর হইতে মিকাডোর ক্ষমতা হ্রাস হইয়া জাপানে তৈরা ও মাইনামটো নামক দুইটি সম্ভ্রান্ত বংশের ক্ষমতা অত্যধিক বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। ইঁহাদের ভয়ে ভীত হইয়া, সম্রাট ভেদনীতি অবলম্বন পূর্ব্বক উভয় বংশকে বলহীন করিয়া ফেলেন। দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে তৈরা বংশে কায়ামর নামে জনৈক প্রতাপশালী ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বুদ্ধিবলে সম্রাটকে হস্তগত করিয়া, স্ব-বংশীয় প্রধান ব্যক্তিগণের সাহায্যে মাইনামটো বংশীয় নেতৃগণকে সংগ্রামক্ষেত্রে নিহত করেন।

    কালক্রমে হতাবশিষ্ট মাইনামটো বংশে যােরিটোমো নামক জনৈক বীরযুবকের উৎপত্তি হয়। কথিত আছে, তাঁহার ন্যায় অসামান্য ধীশক্তিসম্পন্ন রাজনীতিজ্ঞ ব্যক্তি জাপানে জন্মগ্রহণ করেন নাই। তিনি ১১৮০ খৃষ্টাব্দে সম্রাট টাকাকুরার সহিত নিজ সুন্দরী ও সুলক্ষণা কন্যার উদ্বাহক্রিয়া সম্পন্ন করেন। যােরিটোমো ১১৮৪ খৃঃ অব্দে কৌশলে রাজশক্তি গ্রাস পূর্ব্বক জাপানের “দৈজো-দেজিন” অর্থাৎ প্রধান মন্ত্রীপদে সমারূঢ় হইয়া নিজেই সম্রাটের যাবতীয় কার্য্য পরিচালনা করিতে আরম্ভ করেন। কোন কোন জাপানী ঐতিহাসিকের নিকটে যোরিটোমো জাপান সাম্রাজ্যের “টাইকুন” অর্থাৎ সেনাপতি বলিয়া আখ্যাত হইয়াছেন।

    এই সময় জাপানে জায়গীর-প্রথার প্রবর্ত্তন হয়। জায়গীরদারগণ আপনাপন অধিকৃত স্থান রক্ষার ব্যয় ভিন্ন নিজেদের বেতন জন্য বৎসরে ১০ হাজার “কোকু” অর্থাৎ ত্রিশ হাজার মণ ধান্য পাইতেন। জায়গীরদারদিগকে জাপানীরা “দাইমিও” বলিত।

    ১১৮৬ অব্দে জাপানে “সোগান” অর্থাৎ রাজ্যরক্ষক নামক একটী প্রধান পদের সৃষ্টি হয়। মাইনামটো নামক প্রথম সােগানবংশ ১১৮৬ খৃঃ হইতে ১৩৩৬ খৃঃ পর্য্যন্ত রাজ্যশাসন করেন। কাকামুরা নগরে তাঁহাদের বাসভবনের ভগ্নাবশেষ অদ্যাপি দেখিতে পাওয়া যায়। আসিকাগা নামক দ্বিতীয় সোগানবংশ ২৩৭ বর্ষ পর্য্যন্ত কিয়াটো নগরে বাস করিয়া রাজ্যশাসন করেন। এই বংশে হিদো-ইযোসী নামক জনৈক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি সােগান উপাধি ধারণ ধরিয়া দুইবারে কোরিয়া রাজ্যের দ্বি-তৃতীয়াংশ অধিকার করেন।

    খৃষ্টীয় ত্রয়ােদশ শতাব্দীতে দিগ্বিজয়ী জঙ্গিস খাঁর পুত্র সুপ্রসিদ্ধ কুবলাই খাঁ অসংখ্য মােগল সৈন্য লইয়া পঙ্গপালের ন্যায় জাপান রাজ্য আচ্ছন্ন করেন। প্রায় চত্বারিংশ বর্ষব্যাপী ভীষণ যুদ্ধে তিন লক্ষ মােগল সৈন্যের মধ্যে কয়েকজন মাত্রকে লইয়া কুবলাই স্বদেশে উপস্থিত হন। এই মহাসমরে জাপানবাসিগণ যে অদ্ভুত বীরত্ব ও অপূর্ব্ব স্বদেশানুরাগ প্রদর্শন করিয়াছিল, তাহা বর্ণনা করিতেও হৃদয় কম্পিত ও শরীর লােমাঞ্চিত হইয়া উঠে।

    মহাবীর কুব্‌লাই জাতিনির্ব্বিশেষে প্রতিভার পূজা করিতেন। তিনি জাপানবাসী বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বিগণের হস্তে পরাজিত হইয়া, তাঁহার বিশাল রাজ্যে বৌদ্ধধর্ম্ম বিস্তারের জন্য চীন ও জাপানবাসী লামাগণকে আহ্বান করেন। বহু তর্কবিতর্ক ও আলােচনার পরে অবশেষে বৌদ্ধধর্ম্ম তাঁহার মনঃপুত হয়।

    ১৬০৩ খৃষ্টাব্দে টোকাগুয়া বংশের জনৈক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি সােগান উপাধি ধারণ করিয়া জাপানের রাজসিংহাসন অধিকার করিতে মনস্থ করেন। দীর্ঘকালব্যাপী ভীষণ গৃহযুদ্ধের পরে মিকাডােবংশ কিয়াটো নগরে (মিয়াকো) ও সোগানবংশ জেডো সহরে (টোকিও) আপনাপন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই দারুণ অন্তর্বিপ্লবের বিষময়ফলে জাপানের কি রাজনৈতিক, কি সামাজিক সমস্ত উন্নতিই বহুদিনের জন্য স্থগিত হইয়া যায়।

    এই সময়ের অবস্থা বর্ণনাবসরে ইয়ুরােপীয় ও আমেরিকার ইতিহাস লেখকেরা লিখিয়াছেন;—জাপানে দুইটি নরপতি রাজত্ব করিয়া থাকেন। জেডাের রাজা রাজ্য শাসন করেন এবং কিয়াটোর রাজা বৌদ্ধধর্ম্ম রক্ষা করেন। সুপ্রসিদ্ধ জাপানী ঐতিহাসিক মিঃ ওকাকুরা “Awakening of Japan” নামক গ্রন্থে এই সময়ের জাপানের অবস্থার সহিত বর্ত্তমান ভারতবর্ষ ও চীন সাম্রাজ্যের তুলনা করিয়াছেন।

    জাপানবাসিরা বৈদেশিক জাতিগণকে বিশেষতঃ ইয়ুরোপীয় খৃষ্টান সম্প্রদায়দিগকে, বহু কাল হইতে বিদ্বেষ ও অবিশ্বাসের চক্ষে দর্শন করিয়া আসিতেছে। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ইংরাজ, ফরাসী, ওলন্দাজ, পাের্টুগিস্, দিনেমার প্রভৃতি ইয়ুরােপীয় জাতিগণ বাণিজ্য ব্যপদেশে এসিয়ায় আগমন করিয়া, যেরূপ সামান্য সূত্র অবলম্বন পূর্ব্বক এই বিশাল মহাদেশ গ্রাস করিতে আরম্ভ করেন, তাহাতে জাপানীরা যে ইয়ুরােপীয়দিগকে আপনাদের ঘাের শত্রু বলিয়া মনে করিবে, তাহাতে আর আশ্চর্য্য হইবার কারণ কি? জনৈক প্রথিতনামা জাপানী ঐতিহাসিক লিখিয়াছেন,——যে দিন ইংরাজেরা বাণিজ্য উপলক্ষ করিয়া অন্যায়ভাবে রত্নগর্ভা বিশাল ভারতবর্ষ আত্মসাৎ করিল, সেইদিন হইতেই জাপানীরা ইয়ুরোপবাসিগণের চরিত্র অবগত হইয়াছে। ক্রমেই যখন খৃষ্টানেরা প্রাচ্যদেশবাসীদিগকে ভ্রষ্ট ও ধর্ম্মত্যাগী বলিয়া ঘোষণা করিতে আরম্ভ করিল, তখন হইতেই জাপানীরা ইয়ুরােপবাসীর প্রতি দারুণ বিদ্বেষভাব পােষণ করিয়া আসিতেছে।

    আমরা ইতিপূর্ব্বে যে গৃহযুদ্ধের কথা উল্লেখ করিয়াছি, তাহার বিষময়ফলে ক্রমেই জাপানের অবস্থা শােচনীয় হইতে আরম্ভ হইল। এই সময়ে—১৮৫৩ খৃষ্টাব্দে—কমােডাের পেরি নামক জনৈক মার্কিণ নৌ সেনাধ্যক্ষ ৪ খানি রণতরি লইয়া জাপানে আগমন করেন। জাপান রাজ্য ও মার্কিণ সাধারণতন্ত্রের মধ্যে একটী বাণিজ্য-সন্ধি স্থাপন করাই তাঁহার অভিলাষ ছিল। এই সময়ে টোকাগুয়াবংশীয় দ্বাদশ সােগান জাপানে রাজত্ব করিতেছিলেন। তিনি পেরির প্রস্তাবে কর্ণপাত না করায়, পেরি কূপিত হইয়া পােতস্থিত কামানের সাহায্যে টোকিও উপসাগরের উপকূলবর্ত্তী নগর সমূহের উপর গােলাবৃষ্টি করিতে আরম্ভ করেন। বিপদ দেখিয়া জাপানবাসী বৌদ্ধগণ যুদ্ধদেবতা কার্ত্তিকেয়ের ও সিণ্টোগণ অনশন ব্রতাবলম্বন করিয়া সমুদ্র ও ঝটিকার উপাসনা করিতে লাগিল। গত পূর্ব্ববর্ষে যে জাতির জলযুদ্ধ কৌশল দেখিয়া পৃথিবীর বীরমণ্ডলী ধন্য ধন্য করিয়াছিল, কিঞ্চিদধিক অর্দ্ধ শতবর্ষ পূর্ব্বে সেই জাতির পূর্ব্বপুরুষগণ নৌকা ও কাষ্ঠ উড়ুপে আরােহণ করিয়া পেরির সম্মুখীন হইল। এই অসম সমরের পরিণামফল বুঝিতে পারিয়া, সম্রাট ও সােগান উভয়েই পেরির প্রস্তাবিত সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করিতে বাধ্য হন।

    ইহার কতিপয় বর্ষ পরে, ইংরাজ, ফরাসী প্রভৃতি ইয়ুরােপীয় জাতিগণ আমেরিকাবাসীর ন্যায় জাপানের সহিত বাণিজ্য-সন্ধি সংস্থাপন করেন। কিন্তু খৃষ্টশিষ্যগণের অদম্য জঠরানল সহজে পরিতৃপ্ত না হওয়ায়, ১৮৬৩ খৃঃ ১১ই আগষ্ট তারিখে কোগিশামা নামক স্থানে তাহাদের সহিত জাপানিগণের একটী ক্ষুদ্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বলা বাহুল্য এই যুদ্ধেও জাপানীরা সম্পূর্ণ পরাস্থ হয়।

    উপরিউক্ত ঘটনানিচয় হইতেই নিপনের নবযুগ আরম্ভ হইল। বৈদেশিক জাতির হস্তে বার বার পরাজিত হইয়া জাপানবাসীর হৃদয়ে যে গভীর ক্ষত উৎপন্ন হইল, অদ্যাপিও তাহার রক্ত নির্গম রুদ্ধ হয় নাই। পেরির উৎপীড়নে অনেকেই ব্যথিত হইয়াছিলেন। এক্ষণে ইয়ুরােপীয় খৃষ্টান জাতির আচরণ দেখিয়া সকলেরই মােহনিদ্রা ভঙ্গ হইল। জাপানের সুসন্তান মাত্রেই বুঝিলেন, আর রক্ষা নাই; এখন হইতে সাবধান না হইলে, অনতিকাল মধ্যেই সমগ্র রাজ্য শত্রুর করাল-কবলে নিপতিত হইবে; নিপনের আজন্ম-স্বাধীনতা-সূর্য্য চিরদিনের জন্য অস্তমিত হইবে।

    বাগ্মিগণ হৃদয়বিলােড়নকারিণী বহ্নিতাপােচ্ছাসিনী বক্তৃতা দ্বারা, সুলেখকগণ অন্তর প্রজ্জ্বালনকারিণী রণােন্মাদিনী রচনা দ্বারা, স্বদেশীয় শ্রোতৃবর্গের ও পাঠকবৃন্দের চিত্ত উন্মত্ত করিয়া তুলিলেন। পরিশেষে,—অতি অল্প দিবস মধ্যে—সমগ্র জাপানবাসী একবাক্যে স্থির করিলেন যে, স্বদেশহিত-যজ্ঞে স্বার্থপশু উৎসর্গ না করিলে কোন উপায়েই জননী জন্মভূমির স্বাধীনতা রক্ষা হইবে না।

    ইহা স্থির করিয়াই সর্ব্বপ্রথমে জাপানের অদ্বিতীয় শক্তিধর প্রধান সেনাপতি কিকি স্বদেশহিতব্রতে আত্মস্বার্থ বিসর্জ্জন দিলেন। তিনি বিশাল রাজ্য, সােগানের স্বর্ণসিংহাসন, অতুল্য সম্মান, সমস্তই সম্রাটচরণে উৎসর্গ করিয়া কেবলমাত্র একখানি সুশাণিত তরবারি গ্রহণ করিলেন। দেখিতে দেখিতে দাইমিও আখ্যাধারী জায়গীরদারগণ, কুগেবংশীয় ভূম্যাধিকারিগণ, আইচু ও টোকাগুয়া বংশীয় সামুরাইগণ ও অন্যান্য সম্মানিত বংশের রাজকর্ম্মচারিগণ একে একে কিকি সােগানের মহৎ দৃষ্টান্তের অনুসরণ করিলেন। লক্ষপতি স্বেচ্ছায় পথের ভিখারী হইলেন। এই দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হইয়া নিরক্ষর সৈনিকেরা পর্য্যন্ত আপনাপন নিস্করভূমি পরিত্যাগ পূর্ব্বক সম্রাট সমক্ষে দণ্ডায়মান হইল।

    সমগ্র দেশ ব্যাপিয়া স্বদেশানুরাগের প্রবল ঝটিকা বহিতে লাগিল। দেশে দেশে, নগরে নগরে, গ্রামে গ্রামে, স্বদেশ ও সম্রাটের মঙ্গল কামনায় ভগবান শাক্যমুণির আরাধনা হইতে লাগিল। বালক হইতে বৃদ্ধ পর্য্যন্ত, কৃষক হইতে জমিদার পর্য্যন্ত, মূর্খ হইতে পণ্ডিত পর্য্যন্ত, অধিক কি বালিকা হইতে বৃদ্ধা পর্য্যন্ত, সকলেই সম্রাট ও স্বদেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করিতে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হইল। ঝটিকা বহিতে লাগিল। স্বদেশানুরাগ ও স্বজাতিপ্রেমের প্রবলবহ্নিতে জাপান-ভূমি পূত ও পুণ্যময় হইল। সোগান পদ বিলুপ্ত হইয়া, জাপান সাম্রাজ্য একমাত্র সম্রাটের অধীন হইল।

    এইরূপে ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে প্রশান্ত মহাসাগরের সুনীলবক্ষে বালার্কদ্যূতিমণ্ডিত জাপান রাজ্যে নবযুগ আরম্ভ হইল।

  • ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত: নবযুগ।

    ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত: নবযুগ।

    বলিতে গেলে, সােগানাধিপত্য অবসানের পর বৎসরে—১৮৬৮ খৃঃ অব্দে—প্রাচীন জাপান নবজীবন প্রাপ্ত হয়। এই বৎসরে “মেইজি” অব্দের প্রবর্ত্তন হয়। এই বৎসরে রাজধানী কিয়াটো নগর হইতে জেডো নগরে স্থানান্তরিত হয়। এই বৎসরেই জেডো নাম পরিবর্ত্তিত হইয়া উহা টোকিয়ো অর্থাৎ প্রাচ্য রাজধানী নামে অভিহিত হয়।

    প্রথম মেইজি অব্দে মিকাডো মেঘমুক্ত প্রভাকরের ন্যায় সিংহাসনে প্রতিভাত হইয়া, একখানি ঘোষণা পত্র প্রচার করেন। এই পত্রে নিম্নলিখিত পাঁচটী বিষয় লিখিত হইয়াছিল। যথা,— (১) রাজ্যের যাবতীয় কার্য্য দেশের বিদ্বান সম্প্রদায় কর্ত্তৃক পরিচালিত হইবে। (২) প্রাসাদবাসী সম্রাট হইতে পর্ণকুটীরবাসী কৃষক পর্য্যন্ত সকল ব্যক্তিকেই জাতীয় উন্নতির জন্য আত্মােৎসর্গ করিতে হইবে। (৩) দেশের অধিবাসী মাত্রেই দেশীয় শিল্পের সহায়তা করিবেন। (৪) প্রাচীন রাজনীতির সংস্কার হইবে। (৫) জাতীয় সঞ্জীবন শক্তির অনুকূল শিক্ষাপ্রণালী প্রবর্ত্তিত হইবে।

    এই ঘােষণা প্রচারের কতিপয় বৎসর পরে, ১৮৮৯ খৃঃ ১১ই ফেব্রুয়ারী তারিখে সম্রাট আর একটী ঘােষণা প্রচার দ্বারা জাতীয় মহা সমিতি গঠন করেন। সভ্যতাভিমানী ইয়ুরােপীয় রাজন্যবর্গ নররুধিরে বসুন্ধরা সিক্ত হইতে দেখিয়াও প্রজা সাধারণকে যে অধিকার প্রদান করিতে সঙ্কোচ বােধ করেন, জাপান সম্রাট স্বয়ং উদ্যোগী হইয়া প্রজাগণকে সেই অধিকার প্রদান করিলেন।

    এসিয়া খণ্ডে জাপানেই সর্ব্বপ্রথমে রাজার শাসনদণ্ড প্রজার হস্তগত হয়। এই প্রাচ্য মহাসাগরের ক্ষুদ্রদ্বীপের অধীশ্বরকে যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া তাঁহার প্রজারা শাসনদণ্ড গ্রহণ করে নাই। রাজা স্বেচ্ছায়, উপযাচক হইয়া প্রজাদিগের হস্তে শাসন ক্ষমতা প্রদান করিয়াছিলেন। এরূপ মহানুভবতা জগতের ইতিহাসে অতি বিরল। যে শাসনক্ষমতা লাভ করিবার জন্য রুষিয়ার কোটী কোটী প্রজা বহু বৎসর হইতে প্রাণপণে চেষ্টা করিতেছে, নরশােণিত ধারায় পৃথিবী কর্দ্দমাক্ত করিতেছে, সেই শাসনদণ্ড জাপানীরা অযাচিত ভাবে প্রাপ্ত হইয়াছে। জাপান সম্রাট মৎসুহিতো দেখাইয়াছেন যে, এক কালে যে বৌদ্ধ নরপতিগণ পরের সেবার জন্য আপনার যথাসর্ব্বস্ব দান করিয়া ভিক্ষুক হইতেও কুণ্ঠিত হইতেন না, তিনি সেই শ্রেণীর বৌদ্ধ নৃপতিগণেরই অন্যতম। তিনি পরের কল্যাণ কামনায় সুদুর্লভ রাজশক্তি পরিত্যাগ করিতে মুহূর্ত্ত মাত্র ইতস্ততঃ করিলেন না। জাপান সম্রাট এখন প্রজাবৃন্দের হস্তে রাজদণ্ড সমর্পণ পূর্ব্বক তদ্বিনিময়ে প্রজার নিকট হইতে অনন্যসুলভ শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রাপ্ত হইয়াছেন। প্রজার শ্রদ্ধাভাজন হইয়া তিনি কেবল রাজমুকুট ও রাজ সিংহাসন লইয়াই সন্তুষ্ট আছেন।

    অদ্য উনচত্বারিংশৎবর্ষ মাত্র হইল, মেইজি অব্দ প্রবর্ত্তিত হইয়াছে। এই অনতিদীর্ঘসময়মধ্যে নব্য জাপান যে অনন্যসাধারণ উন্নতিলাভ করিয়াছে, তাহা পৃথিবীর ইতিহাসে অপূর্ব্ব। এই স্বল্পসময় মধ্যে পৃথিবীর কোনও জাতি এতাদৃশ উন্নতিলাভে সমর্থ হয় নাই। এই উন্নতির গুঢ়তত্ত্ব সম্বন্ধীয় সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমরা যথাক্রমে লিপিবদ্ধ করিতেছি।

    জাপানের প্রসিদ্ধ ব্যক্তিগণ।

    রাজ পরিবার ।

    জাপানের বর্ত্তমান সম্রাট মৎসুহিতো ১৮৫২ খৃষ্টাব্দের ৩রা নবেম্বর তারিখে কিয়াটো নগরে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি নিপণের সর্ব্বপ্রথম সম্রাট জীমূতমনু হইতে ১২০ পুরুষ অধস্তন। ইঁহার পিতার নাম কেমিয়ামনু ও মাতার নাম অশােকা। ইনি ১৮৬৬ খৃঃ অব্দের ১৩ই ফেব্রুয়ারি তারিখে মিকাডো অর্থাৎ দেবতার প্রতিনিধি উপাধি ধারণ করিয়া জাপানের রাজসিংহাসনে আরােহণ করেন। এই অব্দের ১২ই অক্টোবর তারিখে মহাআড়ম্বর সহকারে সম্রাটের মুকুটোৎসব সম্পন্ন হয়।

    মৎসুহিতো মিকাডোর ন্যায় বুদ্ধিমান, কার্য্যতৎপর, শান্তিপ্রিয়, অশেষগুণসম্পন্ন, প্রজারঞ্জক নরপতি পৃথিবীতে অধিক দৃষ্ট হয় না। মিকাডো রাজকোষ হইতে প্রতিবর্ষে ৪৫ লক্ষ মুদ্রা পাইয়া থাকেন। ইহা ভিন্ন পূর্ব্বপুরুষ-সঞ্চিত প্রচুর স্বর্ণমুদ্রায় ও মণি মাণিক্যে তাঁহার ভাণ্ডার পরিপূর্ণ। জনৈক ইয়ুরােপীয় পরিব্রাজক বলেন, এই সঞ্চিত ধনের মুল্য দুই শত কোটী টাকার ন্যূন হইবে না। সম্রাট অশ্বারােহণে ভ্রমণ করিতে বড় ভাল বাসেন। তাঁহার মন্দুরায় নানাদেশীয় অতি উৎকৃষ্ট অশ্ব আছে। সদগ্রন্থ ও সংবাদপত্র পাঠে সম্রাটের সমধিক অনুরাগ দৃষ্ট হয়। তিনি মধ্যে মধ্যে কবিতা রচনা করিয়া সময়ের সদ্ব্যবহার করিয়া থাকেন। সম্রাট প্রজামাত্রকেই সন্তানের ন্যায় দর্শন করিয়া থাকেন।10

    সম্রাটমহিষী হারুকো ১৮৫০ খৃঃ ২৪শে মে তারিখে ভূমিষ্ঠ হয়েন। ১৮৬৯ অব্দের ৯ই ফেব্রুয়ারি তারিখে মিকাডোর সহিত ইহাঁর উদ্বাহক্রিয়া সম্পন্ন হয়। মিকাডো মহিষী পতিব্রতা, বিদুষী ও কার্য্যপ্রিয়া বলিয়া বিখ্যাত। অসংখ্য দাসদাসীতে রাজপ্রাসাদ পরিপূর্ণ থাকিলেও, ইনি স্বহস্তে সংসারের বিবিধকার্য্য সম্পাদন করিয়া থাকেন। সাম্রাজ্যের হিতকর যে কোন কার্য্যেই সম্রাটমহিষীর সহানুভূতি দৃষ্ট হয়। রাজ্যের কত দীন, পীড়িত ও নিরন্ন পরিবার যে সাম্রাজ্ঞীর অর্থসাহায্যে রক্ষা পাইতেছে, কেহ তাহার সংখ্যা করিতে পারে না। সম্রাটের ন্যায় ইনিও সুকবি বলিয়া প্রসিদ্ধ।

    বহু সন্ততির জনক জননী হইলেও সম্রাটদম্পতির সন্তান ভাগ্য প্রসন্ন নহে। তাঁহাদের প্রথম পুত্র ও প্রথমা কন্যা ভূমিষ্ঠ দিবসেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ২য়, ৪র্থ ও ৫ম পুত্র এবং ২য়, ৩য়, ৪র্থ, ৫ম ও ১০ম কন্যা ভূমিষ্ঠের অল্পদিবস মধ্যেই ইহলােক হইতে অপসারিত হয়। এক্ষণে তৃতীয় পুত্র এবং ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী কন্যা জীবিত আছেন। মাসাকো, ফুসাকো, নবুকো ও একিকো নাম্নী রাজকন্যা চতুষ্টয় জননীর ন্যায় বিদ্যাবতী ও গুণবতী বলিয়া পরিচিতা।

    সম্রাটের তৃতীয় পুত্র যশােহিত হারুনোমিয়া বহু পরিমাণে পিতৃগুণসম্পন্ন। ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দের ৩১শে আগষ্ট তারিখে ইহাঁর জন্ম হয়। ১৮৮৮ খৃঃ ৩রা নবেম্বর তারিখে ইহাঁকে “কৌতেসী” অর্থাৎ জাপানের যুবরাজ বলিয়া ঘােষিত করা হয়। ১৯০০ অব্দের ১০ই মে তারিখে সাদাকো নাম্নী জনৈকা গুণবতী আভিজাতকুমারীর সহিত যুবরাজের বিবাহ হয়। পর বৎসর ২৯শে এপ্রেল তারিখে যুবরাজদম্পতির প্রথম পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। তাহার নাম হিরােহিত। যুবরাজের দ্বিতীয় পুত্র বাশুহিত ১৯০২ খৃঃ ২৫শে জুন তারিখে ভূমিষ্ঠ হয়েন। তৃতীয় পুত্র নবুহিত, গত ১৯০৫ অব্দের ৩রা জানুয়ারি তারিখে জন্মগ্রহণ করেন।


    মার্কুইস হিরােবুমি আইটো।——ইনি জাপানের চাণক্য বলিয়া পরিচিত। ইহাঁর ন্যায় মন্ত্রণানিপুণ ও রাজনীতিবিশারদ ব্যক্তি সমগ্র জাপান-মধ্যে দৃষ্টিগােচর হয় না। ইনি ১৮৬৩ খৃঃ গোপনে জন্মভূমি পরিত্যাগ পূর্ব্বক সর্ব্বপ্রথমে ইংলণ্ডে গমন করেন। আইটো এই সময় “ন্যাভিগেশন” “ষ্টীমার” প্রভৃতি দুই চারিটী শব্দ ব্যতীত ইংরেজী ভাষার কিছুই জানিতেন না। ইনি স্বদেশে প্রত্যাগত হইয়া সর্ব্বপ্রথমে ইয়ুরােপের অনুকরণে জাপানে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন করেন। এই বিদ্যালয় এক্ষণে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিত সংযুক্ত হইয়াছে। ইহাঁরই অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রাচীন জাপান জীর্ণবাস পরিত্যাগ করতঃ নূতন বস্ত্র পরিধান করিয়াছে।

    আইটো রাজনীতি ও শিক্ষাপ্রণালীর সংস্কার সাধনে উদ্যোগী হইলে জাপানের রক্ষণশীলদল তাঁহার ভীষণ শত্রু হইয়া উঠে। পরিশেষে এই শত্রুতা এত প্রবল হইয়াছিল যে একদিন অপরাহ্নে চা-গৃহে গমনকালে ইনি পথিমধ্যে শত্রুগণের হস্তে আক্রান্ত হন। একটী জাপানীবালিকা নিজ কুটীরে আশ্রয় দিয়া সে যাত্রা তাঁহার জীবন রক্ষা করে। আশ্চর্য্যের বিষয় আইটো কিছুদিন পরে এই দয়াবতী রমণীকে পত্নীরূপে প্রাপ্ত হয়েন।

    মার্কুইস মহােদয় এক্ষণে প্রাচীন হইয়াছেন। জাপানবাসিরা ইহাঁকে দেবতার ন্যায় ভক্তি ও শ্রদ্ধা করিয়া থাকে। ইনি এক্ষণে সম্রাটের বিশেষ অনুরােধে কোরিয়া রাজ্যে জাপান রাজপ্রতিনিধির কার্য্য করিতেছেন।

    মার্কুইস আরিযোশী ইয়ামাগাটা।——জাপানের সর্ব্বপ্রথম সেনাপতি। ইহাঁর বিদ্যা, বুদ্ধি ও বিক্রম অসাধারণ। বয়ষ ৭২ বৎসর হইলেও মার্কুইসের দেহের ও মনের তেজ অদ্যাপিও হ্রাস হয় নাই। ইনি এক্ষণে ফিল্ডমার্শাল উপাধি ধারণ করিয়া স্বদেশের সৈন্যগঠন কার্য্যে নিযুক্ত আছেন।

    কাউণ্ট কাটসুরা।——গত রুষ জাপান যুদ্ধের সময়ে ইনি জাপানের “দৈজো-দেজিন”, অর্থাৎ প্রধান মন্ত্রিপদে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। যুদ্ধবিদ্যায় ইনি ইয়ামাগাটার প্রিয়শিষ্য এবং কুটমন্ত্রণায় আইটোর সমকক্ষ। ইহাঁর কৌশল ও সুমন্ত্রণায় জাপান সাম্রাজ্য অল্প দিবসেই সভ্যজগতের মধ্যে পরিগণিত হইয়াছে।

    মার্কুইস সৈয়নজি কিনমৎসু,—— বর্ত্তমান বৎসরে (১৯০৬ খৃ) ইনি জাপানের প্রধান মন্ত্রীপদে অধিষ্ঠিত হইয়াছেন। এই অল্প সময়ের মধ্যে ইনি জাপানের অন্তর্বাণিজ্য ও বহির্বাণিজ্য সম্বন্ধে যেরূপ অসাধারণ উন্নতি সাধন করিয়াছেন, তাহাতে ইহাঁর বুদ্ধিমত্বা ও কার্য্যতৎপরতার সম্যক পরিচয় পাওয়া গিয়াছে।

    ব্যারণ কমুরা,——গত মহাযুদ্ধের সময়ে ইনি জাপানের পররাষ্ট্রসচিব ছিলেন। জাপান সাম্রাজ্যের মধ্যে ইনি একজন বিচক্ষণ রাজনীতিক বলিয়া পরিচিত। ইনি আমেরিকার পাের্টস্‌মাউথ নগরে উপস্থিত থাকিয়া রুষ-জাপান যুদ্ধের সন্ধিপত্রে জাপান সম্রাটের পক্ষে নাম স্বাক্ষর করেন। ব্যারণ মহােদয় এক্ষণে জাপানের রাজদূত স্বরূপে ইংলণ্ডে অবস্থান করিতেছেন।

    কাউণ্ট কাটোটাকাকী,——বর্ত্তমান বৎসরে ইনি জাপানের বৈদেশিক মন্ত্রীপদে অধিষ্ঠিত হইয়াছেন।

    কাউণ্ট অকুমা,——ইতিপূর্ব্বে জাপানের রাজস্ব সচিব ছিলেন। ইনি সর্ব্বদাই অকপট চিত্তে দেশের উপকার করিয়া থাকেন। সমগ্র রাজ্যমধ্যে ইহাঁর শত্রু নাই। ইহাঁর ন্যায় সরলভাষী, সুবক্তা ও লেখক জাপান রাজ্যে অধিক দৃষ্ট হয় না।

    ব্যারণ সাকাটানি যশিরো,——জাপানের বর্ত্তমান রাজস্ব-মন্ত্রী। ইনি অল্পদিবস মধ্যে জাপানের রাজস্ববিষয়ক বিবিধ উন্নতি সাধন করিয়াছেন। সাম্রাজ্যের আয়ব্যয় সম্বন্ধীয় প্রত্যেক বিভাগেই ইহাঁর প্রখর দৃষ্টি দেখিতে পাওয়া যায়।

    লেপ্টনাণ্ট জেনারল টেরাউচি,——ইনি এক্ষণে জাপানের যুদ্ধমন্ত্রীর পদে নিযুক্ত রহিয়াছেন। ইহাঁর ন্যায় সুকৌশলী কূটমন্ত্রণানিপুণ সেনাপতি পৃথিবীতে বিরল। ইহাঁর কার্য্য সকল বিদ্যুতের ন্যায় মহাদ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয়।

    মার্কুইস ওয়ামা,——বয়ষ ৬২ বৎসর। গত মহাযুদ্ধে ইহাঁর অদ্ভুত রণপাণ্ডিত্য ও অসাধারণ সৈন্য পরিচালনাশক্তি দর্শন করিয়া সভ্যজগৎ স্তম্ভিত হইয়াছিল। গৃহে পরিজনগণের নিকটে ইনি ভদ্র, শান্ত ও হাস্যবদন; কিন্তু রণক্ষেত্রে, শক্রসমক্ষে কালান্তক শমন। ইনি ১৮৯৪ খৃঃ চীনজাপান যুদ্ধে অশীতি সহস্র সৈন্য লইয়া যুদ্ধে জয়লাভ করেন। গত রুষজাপান যুদ্ধে ইনি প্রধান সেনাপতি রূপে অসংখ্য জাপানবাহিনী পরিচালিত করিয়াছিলেন। ইহাঁর দেহের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬ ফুট হইবে। মার্কইসের পত্নী জাপান সাম্রাজ্যমধ্যে বিদুষী বলিয়া পরিচিতা। ইহাঁর দুইটী পুত্র ও একটী কন্যা আছে।

    কাউণ্ট নডজু,——বয়স ৬১ বৎসর। সকলের বিশ্বাস ইহাঁর ন্যায় রণনিপুণ সেনাপতি জাপানে আর নাই। কাউণ্ট মহাশয় মহাযুদ্ধ ভিন্ন আনন্দানুভব করেন না। সৈন্যগণ মধ্যে ইহাঁর বিশেষ প্রতিপত্তি আছে। ইনি জাপানিগণ মধ্যে মহাবলশালী ও কুস্তিকুশল ব্যক্তি বলিয়া বিখ্যাত। গত মহাযুদ্ধে ইনি জাপান অনীকিনীর মধ্যভাগ পরিচালন করিয়া অদ্ভুত সমরনৈপুণ্যের পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন।

    ব্যারণ কুরোকী,——বয়ষ ৬১ বৎসর। এইরূপ শুনা যায়, ইহাঁর পিতা রুষাধিকৃত পােলণ্ডদেশ হইতে জাপানে আগমন করিয়াছিলেন। কামানের গভীর গর্জ্জন, আহতের হৃদয়বিদারী আর্তনাদ, মুমূর্ষুর কাতরতা, কিছুতেই ইহাঁর ভ্রুক্ষেপ নাই। ব্যারণ মহােদয় মৃত্যুকে অতি তুচ্ছ বলিয়া মনে করেন। রণক্ষেত্র তাঁহার নিকট ক্রীড়াক্ষেত্র স্বরূপ প্রতীয়মান হয়। গত মহাযুদ্ধে ইনি জাপান চমূর দক্ষিণপার্শ্ব পরিচালনা করিয়াছিলেন।

    কাউণ্ট ওকু,——বয়ষ ৬৫ বৎসর। ইহার মুখশ্রী সুন্দর ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সুগঠিত। কাউণ্টের বেগ প্রতি প্রচণ্ড। ইনি যুদ্ধক্ষেত্রে কোনও বিঘ্ন অনতিক্রম্য বলিয়া বিশ্বাস করেন না। কাউণ্ট মহােদয় জীবনের কোন সময়েই শত্রুগণকে হাস্য করিবার অবসর প্রদান করেন নাই। মহামহিম ভারত সম্রাটের মকুটোৎসব সময়ে ইনি দিল্লী নগরীতে শুভাগমন করিয়াছিলেন। গত মহাযুদ্ধে ইনি জাপান সৈন্যের বামপার্শ্ব রক্ষা করিয়াছিলেন।

    কাউণ্ট নগী,——ইহার ন্যায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও কঠোর অন্তঃকরণবিশিষ্ট সেনাপতি জাপান সাম্রাজ্যে দেখিতে পাওয়া যায় না। এ পর্যন্ত কেহই ইহাঁর নয়নে শােকাশ্রু বহির্গত হইতে দেখে নাই। কাউণ্ট লক্ষপতি হইয়াও অতি দীনপ্রজার ন্যায় জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ করিয়া থাকেন। সম্রাট ও স্বদেশ ভিন্ন কাহারও উপরে তাঁহার মায়া মমতা নাই। গত মহাযুদ্ধে ইনি আর্থার বন্দর অধিকার করিয়া সমগ্র পৃথিবীবাসীর বিস্ময় উৎপন্ন করিয়াছিলেন। এই কালসমরে তাঁহার দুইটী পুত্রেরই মৃত্যু হয়।

    ভাইস এডমিরাল সেটো মিনরু,——বর্ত্তমান বৎসরে ইনি জাপানের জলযুদ্ধ বিভাগের মন্ত্রীপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছেন। ইনি পৃথিবীর নানারাজ্য পরিভ্রমণ করিয়া প্রচুর অভিজ্ঞতা অর্জ্জন করিয়াছেন।

    এডমিরাল টোগো,——ইংরাজেরা ইহাঁকে জাপানের নেলসন বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকে। গত মহাযুদ্ধে ইহাঁর জলযুদ্ধকৌশল দর্শন করিয়া সমগ্র সভ্যজগৎ বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইয়াছে। ইহাঁর সংকল্প স্থির ও অধ্যবসায় অসাধারণ। মন্ত্রগুপ্তিতে পৃথিবীর কোন সেনাপতিই ইহাঁর সমকক্ষ নহেন। এডমিরাল মহোদয় কোন সময়েই অধিক কথা কহিতে ভাল বাসেন না। ইহাঁর গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলে, তাহা নিতান্ত দীনব্যক্তির কুটীর বলিয়া অনুভব হয়। সম্প্রতি রাজ-চিত্রকর মরূকী জাপানের নানাস্থানে ইহাঁর ছায়াচিত্র বিক্রয় করিতে আরম্ভ করায়, ইনি নিতান্ত দুঃখিত হইয়াছিলেন। ইহাঁর পুত্র ও কন্যাগণও সর্ব্বাংশে পিতৃগুণবিশিষ্ট। এডমিরাল মহোদয় অল্পকাল মধ্যেই ইংলণ্ডে গমন করিবেন বলিয়া সমগ্র ইয়ুরােপ ব্যাপিয়া হুলস্থুল পড়িয়া গিয়াছে। ইনি এক্ষণে জাপানের প্রধান নৌসেনাপতিপদে অবস্থিত রহিয়াছেন।

    এডমিরাল ক্যামিমুরা,——জাপানের দ্বিতীয় নৌসেনাপতি। গত মহাযুদ্ধে ইনি ভ্যালাডিবােষ্টক বন্দর অবরূদ্ধ করিয়া ছিলেন।

    ভাইস এডমিরাল কটাক্ষ,——জাপানের নৌসেনাপতি। ইহাঁরই বুদ্ধিকৌশলে অতি অল্প সময় মধ্যে রুষাধিকৃত সাগালিয়ন জাপান সৈন্যের হস্তগত হয়।

    ব্যারণ শিবসহা,——ইনি জাপান সাম্রাজ্যের কুবের বলিয়া পরিচিত। ইহাঁর মূলধন শতকোটী মুদ্রার অধিক হইবে। ইনি বুদ্ধিমান, সুলেখক ও প্রাচীন বলিয়া সর্ব্বত্র সম্মানিত। অর্থনীতি ও বার্ত্তাশাস্ত্রে ইহাঁর প্রচুর অভিজ্ঞতা আছে। গত মহাযুদ্ধে ব্যারণ মহােদয় সমস্ত সম্পত্তিই সম্রাটচরণে উৎসর্গ করিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে যাইবার অভিপ্রায় প্রকাশ করিলে, সম্রাট তাঁহাকে ধন্যবাদ দিয়া নিবৃত্ত করেন।

    ইহা ব্যতীত জাপানে আরও বহুসংখ্যক কৃতবিদ্য ও কার্য্যকুশল ব্যক্তি অবস্থিতি করিতেছেন। যাঁহারা পৃথিবীর নানাস্থানে দৌত্যকার্য্যে নিযুক্ত রহিয়াছেন, তাঁহারা সকলেই সুপণ্ডিত ও রাজনীতি বিশারদ। এক্ষণে জাপানে প্রিন্স ১২ জন, মার্কুইস ৩৪ জন, কাউণ্ট ৯০ জন, ভাইকাউণ্ট ৩৬২ জন ও ব্যারণ উপাধিধারী ২৮৭ জন সুশিক্ষিত ও বহুশাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি বিদ্যমান আছেন।

  • ধর্ম্মপ্রণালী।

    ধর্ম্মপ্রণালী।

    আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি, শিণ্টোধর্ম্ম জাপানের প্রাচীন ধর্ম্ম। এক্ষণে এই ধর্ম্মাবলম্বী লােকদিগকে সিন্‌জু বলে। সূর্য্যসহধর্ম্মিনী অমতেরাশু বা উষাদেবী সিনজুগণের আরাধ্যা দেবী। দেশের নানাস্থানে মিয়াসিয়া নামে সিনজুদিগের ধর্ম্মমন্দির আছে। মন্দিরের পুরােহিতগণ নেগি ও কানিগি নামে অভিহিত হইয়া থাকে। সিন্‌জুগণ মস্তক মুণ্ডন করে না। ইহারা বিবাহ গৌরবের বিষয় বলিয়া মনে করে। সিন্‌জুদিগের একটী বিশেষত্ব এই যে, ইহারা গাত্রবস্ত্রে ও শিরস্ত্রাণে স্বীয় নাম ও বাসস্থান প্রভৃতি আবশ্যকীয় পরিচয় লিখিয়া রাখে। ইহারা মাসের প্রথম, পঞ্চদশ ও অষ্টাবিংশতি দিবসে উপাসনা ভিন্ন অন্য কোন গৃহকার্য্য করে না। সিনজুগণ রাজাজ্ঞাপালন, তীর্থ ভ্রমণ, ভিখারীভোজন, পুণ্যদিনে দান করণ ইত্যাদি কার্য্য ইহলোক ও পরলোকের কল্যাণপ্রদ বলিয়া বিশ্বাস করে।

    খৃষ্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে চীনদেশীয় প্রচারকগণ জাপানে বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচার করিতে আরম্ভ করেন। এই সময়ে জাপানে শিণ্টোধর্ম্ম, ভারতীয় তান্ত্রিকধর্ম্ম ও চীনদার্শনিক কনফিউসিয়াস্ প্রবর্ত্তিত একটী প্রাচীন ধর্ম্ম বিদ্যমান ছিল।

    এক্ষণে জাপানের অধিকাংশ ব্যক্তিই বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বী। প্রায় প্রতি পল্লীতেই বৌদ্ধধর্ম্মমন্দির ও যাজক দেখিতে পাওয়া যায়।

    জাপানে প্রত্যেক গৃহস্থের বাটীতে তিনটী পবিত্র স্থান আছে। প্রথম, কামিদানা অর্থাৎ সৃষ্টিকর্ত্তা ভগবানের পূজাস্থান; দ্বিতীয়, বুদসুদান অর্থাৎ বুদ্ধবেদী; তৃতীয়, ইউজি-গেমি অর্থাৎ কুলদেবতা-গৃহ। এই সকল স্থানে প্রত্যহ যথারীতি পূজা হইয়া থাকে। সিনজুগণ দেবতার সম্মুখে দর্পন, শুভ্রবস্ত্র ও পানপাত্র স্থাপন করিয়া চাউল, সাকি ও বিবিধ মৎস্যসহযোগে উপাসনায় প্রবৃত্ত হইয়া থাকে। বৌদ্ধগণ দেবপূজায় মৎস্য ব্যবহার করে না। টৌরীশাখা, কদলীপত্র ও বিচালিনির্ম্মিত রজ্জু দেবকার্য্যে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। পূজাগৃহে প্রত্যহ দীপদান করা হয়।

    রাজ প্রাসাদে তিনটী পবিত্র মন্দির আছে। ১ম,—কাশিকোদোকোরো; এইখানে প্রত্যহ অমতেরাশু অর্থাৎ উষাদেবীর অর্চ্চনা হইয়া থাকে। ২য়,—কোরাইদেন; এই মন্দিরে সম্রাটের পূর্ব্বপুরুষগণের উদ্দেশে প্রত্যহ পূজা হইয়া থাকে। ৩য়,—শিনদেন; এইখানে বহুসংখ্যক দেবদেবীসহ ভগবান অমিতাভ অর্থাৎ বুদ্ধদেবের পূজা হইয়া থাকে।

    জাপানবাসী সিনজু ও বৌদ্ধদিগের মধ্যে কাহারও মৃত্যু হইলে আত্মীয় স্বজনেরা মৃতের ঔর্দ্ধদৈহিক ক্রিয়াদি সম্পন্ন করিয়া থাকে। বৌদ্ধেরা ৭ দিনে প্রথম শ্রাদ্ধ, ১৪ দিনে দ্বিতীয় শ্রাদ্ধ এইরূপে ৪৯ দিনে ৭টী শ্রাদ্ধ করিয়া শুদ্ধ হইয়া থাকে। সিনজুগণের মধ্যে কি-নিচি (দিন-শ্রাদ্ধ) সাে-সুকি (মাসিক-শ্রাদ্ধ) ও লেন-কি অর্থাৎ বার্ষিক শ্রাদ্ধের প্রথা প্রচলিত আছে। বার্ষিক শ্রাদ্ধ সিনজুগণের মধ্যে ১, ৫, ১০, ২০, ৩০, ৪০ ও ৫০ বৎসরে এবং বৌদ্ধগণের মধ্যে ১, ৩, ৭, ১৩, ১৭, ২৩, ২৭, ৩৩, ৩৭, ৪৩, ৪৭, ৫০ ও ১০০ বৎসরে হইয়া থাকে। শ্রাদ্ধকার্য্য নিজগৃহে, কোন তীর্থস্থানে বা দেবমন্দিরে পুরােহিত কর্ত্তৃক সম্পাদিত হইয়া থাকে।

    বর্ত্তমানে জাপানে একাদশটী মহােৎসব হইয়া থাকে। যথা, সেনসাই, (নববর্ষ) এইদিনে সম্রাট স্বয়ং জীমুতমনু ও নিজপিতা কেমিয়ামনুর পূজা করিয়া থাকেন। ২য় জেনসাই, (শীতোৎসব) ৩য় সিনেন-ক্বোয়াই, (বর্ষপূজা) ৪র্থ কেমিয়াসাই, এই দিনে সম্রাটের পিতার মৃত্যুতিথি পূজা হইয়া থাকে। ৫ম কিজেন সেটসু, জাপানের সর্ব্বপ্রথম সম্রাটের সিংহাসনারােহণ উপলক্ষে প্রতিবর্ষের ১১ই ফেব্রুয়ারি তারিখে এই উৎসব হইয়া থাকে। ৬ষ্ঠ সিউনকি-কোরি, (বসন্তোৎসব) প্রতিবর্ষের ২০ মার্চ্চ তারিখে হইয়া থাকে। ৭ম জীমুতমনু সাই, প্রতিবর্ষের ৩ এপ্রিল তারিখে হইয়া থাকে। ৮ম জিউকি-কোরি-সাই (শরতােৎসব) প্রতিবর্ষের ২৩শে সেপ্টেম্বর তারিখে এই পর্ব্ব উপলক্ষে সকলেই পূর্ব্বপুরুষগণের পূজা করিয়া থাকে। ৯ম কালেম-মাৎসুরি বা সিনশো সাই (নবান্ন) ১০ম তেনচো-সেটসু (বর্ত্তমান সম্রাটের জন্মদিন) ১১শ নমনো মাৎসুরি, ২৩শে নবেম্বর তারিখে নূতনধান্য ছেদন উপলক্ষে এই উৎসব হইয়া থাকে।

    এতদ্ভিন্ন জাপানে আরও কয়েকটী জাতীয়-উৎসব প্রচলিত আছে।

    ভগবান গৌতম বুদ্ধ স্বীয় শিষ্যবর্গের মধ্যে যে কয়টী নিষেধাজ্ঞা প্রচার করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে সেসিত (অহিংসা) ফুলতা (চুরি না করা) সিজেন (সৎশীলতা) সেগো (সত্যবাদিতা) প্রভৃতি কয়েকটী অনুশাসন জাপানবাসী বৌদ্ধগণের মধ্যে প্রবল দেখা যায়।

    ১৫৪৯ খৃষ্টাব্দের ১৫ই আগষ্ট তারিখে ফ্রান্সিস জেভিয়ার জাপানে আগমন পূর্ব্বক খৃষ্টধর্ম্ম প্রচার করিতে আরম্ভ করেন। এইরূপ শুনা যায়, তিনি নিংসিট নামক জনৈক অশীতিবর্ষীয় বৌদ্ধ যাজককে তর্কযুদ্ধে পরাস্থ এবং একটী মৃতাবালিকাকে মন্ত্রবলে পুনর্জীবিত করিয়া জাপানে অপূর্ব্ব প্রতিপত্তি লাভ করেন। ফলতঃ জেভিয়ারের যত্নেই জাপানে খৃষ্ট মাহাত্ম্য প্রথম প্রচারিত হয়, তাঁহারই চেষ্টায় আমকুশা দ্বীপস্থ সমগ্র নরনারী খৃষ্টধর্ম্মে দীক্ষিত হয়।

    ১৫৮৭ খৃঃ সেনাপতি টয়োটমার আদেশানুসারে খৃষ্টধর্ম্ম প্রচারকেরা জাপান পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হন। তদবধি বহু বৎসরমধ্যে খৃষ্টধর্ম্ম জাপানে মস্তকোত্তোলন করিতে সাহসী হয় নাই। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে জেসুইট প্রচারকদিগের যত্নে জাপানে পুনরায় খৃষ্টধর্ম্মের প্রচার আরম্ভ হয়। ইহাতে কুপিত হইয়া জাপানের ১১৪শ সম্রাট মিকাডো সাকুরামাচি ১৭৩৮খৃঃ ১২ই এপ্রেল তারিখে রাজ্যের নানাস্থানে ৩৭ হাজার খৃষ্টান প্রজাকে নিহত করিয়া ফেলেন।

    অধুনা জাপানে খৃষ্টশিষ্যগণের সঙ্খ্যা সামান্য নহে।

    আজিকালি জেনারল বুথের মুক্তিফৌজ, কর্ণেল অলকটের থিয়সফি, আনি বেসন্তের বৈজ্ঞানিক ধর্ম্ম প্রভৃতি বিবিধ ধর্ম্মমত জাপানের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান আছে।

  • সামাজিক রীতিনীতি।

    সামাজিক রীতিনীতি।

    আচারব্যবহার, বেশভূষা, খাদ্য, কুসংস্কার ও ক্রীড়াকৌতুক প্রভৃতি।

    সাধারণতঃ জাপানের অধিবাসিগণকে নিম্নলিখিত সাত ভাগে বিভাগ করা যাইতে পারে। ১ম সম্ভ্রান্তবংশ, ২য় যাজক, ৩য় রাজকর্ম্মচারী, ৪র্থ বণিক, ৫ম সৈনিক, ৬ষ্ঠ শিল্পী ও ৭ম শ্রমজীবিগণ।11

    সন্ত্রান্তবংশীয় ব্যক্তিগণ, যাজক-সমাজ, রাজকর্ম্মচারিগণ ও বাণিজ্যজীবি সম্প্রদায় লইয়া উচ্চশ্রেণী গঠিত হইয়াছে। এই শ্রেণীর পুরুষদিগের বর্ণ গৌর, শরীর দীর্ঘ ও মুখমণ্ডল শ্মশ্রুল। তাঁহাদের আকৃতি ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গাদির গঠন প্রণালী অনেকাংশে ভারতীয় শ্রেষ্ঠজাতিগণের অনুরূপ। তাঁহাদিগকে সহসা দর্শন করিলে, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ প্রভৃতি উচ্চশ্রেণীর বাঙ্গালী বলিয়া ভ্রম উপস্থিত হয়।

    সৈনিক, শিল্পিগণ ও শ্রমজীবি সম্প্রদায় লইয়া নিম্নশ্রেণী গঠিত হইয়াছে। এই শ্রেণীর লোকদিগের বর্ণ পীত, আকৃতি খর্ব্ব, শ্মশ্রু বিরল, অধরোষ্ঠ স্থূল ও নাসিকা চেপ্টা। ইহারা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও কষ্টসহিষ্ণু।

    জাপানী কুল-লক্ষ্মিগণের গঠন অতি সুন্দর। বর্ণ উজ্জ্বল গৌর, নয়নদ্বয় ভাসমান ও স্থির-কটাক্ষবিশিষ্ট। ভ্রমরকৃষ্ণ কেশরাশি অপূর্ব্ব কৌশলে পৃষ্ঠোপরি বিন্যস্ত। পাশ্চাত্য যুবতীসুলভ বিলাস বিভ্রম নাই, কিন্তু তথাপিও প্রথম দর্শনে দর্শক মাত্রেরই চিত্ত আকৃষ্ট হয়। বস্তুতঃই জাপানী স্ত্রী সুশীলা, একান্ত পতিপরায়ণা, সর্ব্বথা সংসার শুভকারিণী।

    জাপানে রমণীগণের নাম রাখায় একটু বিশেষত্ব আছে। প্রায়ই নামের পূর্ব্বে ‘ও’ এবং পরে ‘সান’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। যাঁহার নাম তারা, তাঁহাকে সম্বোধন করিবার সময়ে “ও তারা সান” অর্থাৎ হে তারাসুন্দরী বলিয়া সম্বােধন করাই জাপানী সভ্যতা। “সান” শব্দ পুরুষের নামের পরে ব্যবহৃত হইলে মহাশয় অর্থ বুঝায়।

    “কাইমনো” জাপানবাসী পুরুষ ও রমণীগণের জাতীয় পরিচ্ছদ। ইহা দেখিতে অনেকাংশে বিলাতী অলষ্টার বা এদেশীয় আলখেল্লার অনুরূপ। কাইমনো স্কন্ধদেশ হইতে পাদমূল পর্যন্ত লম্বিত, ইহার ভিতরভাগ অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পকেটে পরিপূর্ণ। “ওবি” নামক নাতিপ্রসস্ত ৭।৮ হস্ত দীর্ঘ বস্ত্রখণ্ড দ্বারা কটিবন্ধের কার্য্য হইয়া থাকে। কাইমনো ও ওবি সাধারণতঃ কার্পাস সূত্রে নির্ম্মিত হয়। অবস্থাবানেরা রেশম নির্ম্মিত পরিচ্ছদাদি ব্যবহার করিয়া থাকেন। জাপানে অলঙ্কার পরিধানের প্রথা দেখিতে পাওয়া যায় না।

    জাপানের বালক বালিকারা বাল্যকাল হইতে পিতা, মাতা, জ্যেষ্ঠভ্রাতা প্রভৃতি গুরুজনের আদেশ প্রতিপালনে অভ্যস্থ হয়। ইহার ফলে জাপানিগণের পারিবারিক জীবনে কোন অশান্তি পরিলক্ষিত হয় না। জাপানী বালিকারা শৈশব হইতেই রন্ধন, গৃহমার্জ্জন, শয্যারচন, নিমন্ত্রিতগণের ভােজ্যাহরণ প্রভৃতি আবশ্যকীয় গৃহকার্য্য সমূহ অতি যত্নপূর্ব্বক সম্পন্ন করিয়া থাকে। জাপান কুমারী অতি অল্প বয়স হইতেই পতিব্রত্যধর্ম্মের শিক্ষা পাইয়া থাকে। ঘুড়িউড়ান, নদীরজলে কাগজের নৌকাচালান, কৃত্রিম যুদ্ধ, বিবাহাভিনয়, পুতুলের তীর্থযাত্রা, ধুলাখেলা প্রভৃতি এদেশীয় বালক বালিকাগণের প্রধান ক্রীড়া।

    জাপানে প্রত্যেক বালিকার যােগ্য বয়সেই বিবাহ হইয়া থাকে। উচ্চশ্রেণীরমধ্যে বিবাহের গড় বয়স পাত্রপক্ষে বাইশ ও পাত্রিপক্ষে ষোল বৎসর দৃষ্ট হয়। পিতা মাতা প্রভৃতি প্রকৃত অভিভাবকেরাই বিবাহসম্বন্ধ স্থির করিয়া থাকেন। ইহাতে কোন পক্ষ বিরাগ প্রদর্শন করে না।12 নিজ পরিবার বা আত্মীয় স্বজনের-মধ্যে কন্যার বিবাহসম্বন্ধ স্থির হইতে পারে না। কোনও জাপানী কুমারী স্বেচ্ছায় স্বয়ংবরা হইতে পারে না। সম্প্রদায় বিশেষে কন্যাপণ ও বরপণ প্রচলিত আছে। বিবাহ রজনীতে পানভােজন ব্যতীত অন্য কোন বিশেষ ধর্ম্মানুষ্ঠানের সংস্রব নাই। স্ত্রী-আচার প্রচলিত আছে। বিবাহ সমাপ্ত হইলে বর-বধূ তুষার-শুভ্র-পরিচ্ছদ পরিধান পূর্ব্বক গুরুজনের নিকট সৌন্দর্য্যবর্দ্ধন ও দীর্ঘজীবন কামনা করিয়া আশীর্ব্বাদ গ্রহণ করিয়া থাকে। বিবাহের একটী নিষ্ঠুর প্রথা এই যে, দম্পতি যুগলের একের বা উভয়ের মৃত্যু হইলে শবদেহ আবৃত করা হইবে বলিয়া, পরিণয়ের নবীন পরিচ্ছদ অতি যত্নপূর্ব্বক রক্ষা করা হইয়া থাকে।

    বালিকাবধূ বিবাহের অল্পদিবস পরেই পতিগৃহে গমন করিয়া থাকে। তথায় তাহাকে শ্বশ্রূঠাকুরাণীর সম্পূর্ণ শাসনাধীনে বাস করিতে হয়। তাহাকে প্রত্যুষে সকলের অগ্রে শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়া সংসারের যাবতীয় কর্ম্ম সম্পন্ন করিতে হয়। জাপানী যুবতীরা আপনাদিগকে পতির সমকক্ষ বলিয়া ধারণা করে না। তাহারা স্বামীকে দেবতার ন্যায় ভক্তি করিয়া থাকে। স্বামী অসচ্চরিত্র হইলেও তাহারা অসূয়া-পরবশ হয় না। তাহাদের বিশ্বাস, প্রবৃত্তি শান্ত হইলেই, স্বামীর চরিত্র আপনিই শােধিত হইয়া যাইবে। জাপানীবধূর ভালবাসা অপরিসীম হইলেও তাহা ইয়ুরােপীয় ললনাগণের ভালবাসার ন্যায় উদ্দাম ও চাঞ্চল্যপরিপূর্ণ নহে। ফলতঃ জাপানী স্ত্রীই পতি হৃদয়ের চির প্রহ্লাদিনী; সংসার সরােবরের প্রফুল্ল কমলিনী; সংসার তরুর বিনােদ বল্লরী; শান্তিকুঞ্জের সুরভি মল্লিকা।13

    প্রাচীন ও মধ্যযুগে জাপানে বহু বিবাহ প্রচলিত ছিল। তৈহো সংহিতা নামক জাপানের প্রাচীন ধর্ম্মশাস্ত্রের ব্যবস্থানুসারে ভার্য্যা ব্যাভিচারিণী, মিথ্যাভাষিনী, শ্বশ্রূজনবিদ্বেষিনী, কন্যাপ্রসবিনী, চৌর্যাদি দোষাক্রান্তা ও পীড়িতা হইলে স্বামী অধিবেদন করিতে পারিত।14 এক্ষণে স্ত্রী ব্যাভিচারিণী, অভিভাবকের অসম্মতিতে গৃহত্যাগিনী ও চৌর্য্যাদি দোষাক্রান্তা হইলে, রাজবিধানের সাহায্য লইয়া পত্নীত্যাগ করিতে হয়। যাহারা লেখ্য-সাহায্যে চুক্তিবদ্ধ হইয়া বিবাহ করে, তাহারা রাজসাক্ষিক লেখ্যের চুক্তি অনুসারে বিবাহসম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করিতে পারে।

    জাপানে নিম্নশ্রেণীর অশিক্ষিত সম্প্রদায়েরমধ্যে বিধবা বিবাহ প্রচলিত আছে। উচ্চ ও সম্ভ্রান্ত পরিবারমধ্যে এই প্রথা নিন্দনীয় বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে। অতি পূর্ব্বে সন্ত্রান্তবংশে সহমরণ প্রথা প্রচলিত ছিল, এক্ষণে রাজব্যবস্থা দ্বারা তিরােহিত হইয়াছে।

    জাপানে ভিন্ন ভিন্ন আখ্যাধারী বহুসংখ্যক বংশের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রত্যেক বংশেই একজন করিয়া “ইউজি-নো- কামি” অর্থাৎ প্রধান আছে। পূর্ব্বে জাপানে প্রত্যেক বংশ রেজেষ্ট্রী হইত এবং রেজেষ্ট্রী পুস্তকে বংশের প্রধান ব্যক্তির নাম ও বাসস্থান লিখিত থাকিত। শেষ পুস্তকে ১১৮২টী বংশের উল্লেখ আছে।

    জাপানের প্রাচীন ধর্ম্মপুস্তকে ত্যজ্যপুত্রের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। পুত্র বংশের প্রধান ব্যক্তিকে অপমান করিলে, বংশগৌরবের হানিকর কোন কার্য্য করিলে, পুত্র উন্মত্ত বা ক্লীব হইলে ও চৌর্য্যাদি দোষাক্রান্ত হইলে পিতা কর্ত্তৃক পরিত্যজ্য হইত। এক্ষণে রাজবিধানের সাহায্য ব্যতীত ত্যজ্যপুত্র সিদ্ধ হয় না। জাপানে “কিউযোশী” অর্থাৎ পােষ্যপুত্র গ্রহণ প্রথা প্রচলিত আছে। চারি পুরুষের মধ্যস্থিত জ্ঞাতি হইতে ১০ বৎসরের ন্যূনবয়স্ক বালক দেখিয়া পােষ্যপুত্র লইতে হয়। জামাতাকে পােষ্যপুত্ররূপে গ্রহণ করা যায় না। তবে কোন বালককে গৃহে আনিয়া পােষ্যপুত্র করিয়া কন্যার সহিত বিবাহ দেওয়া যাইতে পারে। ইহাকে “মুকোযোশী কহে।” সম্প্রতি এই প্রথা জাপানে অত্যধিক বৃদ্ধি প্রাপ্ত হওয়ায় নুতন দেওয়ানী আইনের ৮৩৯ ধারায় ও রেজেষ্ট্রী আইনের ১০২ ধারায় মুকো-যােশী সম্বন্ধে কয়েকটী অভিনব নিয়ম সন্নিবেশিত হইয়াছে।

    জাপানে জ্যেষ্ঠপুত্রই পিতার সন্মান (বােটোকো-সােজোকু) ও সম্পত্তি (আইসান-সােজোকু) লাভ করিয়া থাকে। পুত্রাভাবে মৃত ব্যক্তির পিতা, পিতার অভাবে মাতা, তদাভাবে প্রথমা পত্নী, তদাভাবে মৃতের সহােদর, সহােদরাভাবে সহােদরা, তদাভাবে অন্য পত্নীগণ, তদাভাবে মৃতের জ্ঞাতি ভ্রাতাগণ সম্পত্তির উত্তরাধিকার করিয়া থাকে।

    অন্ন, মৎস্য ও শাকসব্জি জাপানিদিগের প্রধান খাদ্য। অতি সন্ত্রান্ত ব্যক্তি হইতে দীন পর্য্যন্ত সকলেই ভাত, মাছ, শাক আহার করিয়া থাকে। নিম্নে কয়টী উৎকৃষ্ট জাপানি ব্যঞ্জনের নাম লিখিত হইল।

    জাপানী নাম বঙ্গীয় নাম জাপানী নাম বঙ্গীয় নাম
    মিয়া সিম সুক্ত মাছিটোরি শাকের ঘণ্ট
    লুইমনো মাছের ঝোল উমেনী শাক, মাছ ও লেবুর রস সহযোগে অম্ল
    নিজাকানা আলু ও মাছের কালিয়া সুকিমনো আচার
    টেরায়াকি মাছের চড়চড়ি গােসেন পায়ষ
    সাসিমা চিংড়িমাছ ভাজা সিওয়াকি মাছের কাবাব

    মধ্যশ্রেণীর পরিবারে ভাত, চিংড়িসিদ্ধ, কাঁকড়ার কাবাব, কেবাকী (বাইন) ও জেটাচাকা (চাঁদা) মৎস্যের অম্ল নিত্যই রন্ধন হইয়া থাকে। নিম্নশ্রেণীর জাপানীরা অন্ন অপেক্ষা মৎস্য অধিক পরিমাণে ভোজন করিয়া থাকে।

    জাপানীরা পৃথিবীর অন্যান্য জাতির ন্যায় উচ্চাসনে উপবেশন করিয়া ভােজন করে না। তাহারা বঙ্গবাসীর ন্যায় পিঁড়ি ও পত্রের উপর উপবিষ্ট হইয়া হস্তসাহায্যে ভোজন করিয়া থাকে।

    জাপানে শূকর ও গো-মাংস ভক্ষণ চলিত নাই। এখানে কেহই গাে হত্যা করিতে পারে না। খৃষ্টধর্ম্মাবলম্বী ও ইয়ুরােপ প্রত্যাগতদিগের মধ্যে কেহ কেহ বিদেশাগত শুষ্ক গো-মাংস ও টেবিনেব (মুরগী) ভক্ষণ করিয়া থাকেন। জাপানিরা পরমান্ন ও পিষ্ঠকাদি ব্যতীত কেবলমাত্র দুগ্ধপান করে না। তরকারী বিশেষে দুগ্ধ, ঘৃত, নবনীত, তৈল ও চর্ব্বি ব্যবহৃত হইয়া থাকে।

    জাপানের অধিকাংশ নরনারী প্রত্যহ চা-পান করিয়া থাকে। সাকি ও সয় জাপানের জাতীয় সুরা, প্রায় সকলেই পান করিয়া থাকে। সাকি চাউল হইতে প্রস্তুত হয়। ইহা প্রথমে ওসাকা নগরে প্রস্তুত হইয়াছিল বলিয়া ইহার নাম “সাকি” হইয়াছে। চিকিৎসকের অনুমতি ভিন্ন জাপানে কেহই অহিফেন সেবন করিতে পারে না। এখানে সিগারেট ও বিবিধ প্রকারে তাম্রকূট সেবনের প্রথা আছে।

    জাপানবাসিদিগের মধ্যে অনেকগুলি কুসংস্কার বর্ত্তমান আছে। এখানে রাত্রে লবণ ধার করিতে নাই। মাসের শেষ শনিবারে বস্ত্র ধৌত করিতে নাই। বিবাহের দিনে বরকন্যার পরিচ্ছদ লাল বা বেগুনি বর্ণের হইলে উভয়ের মধ্যে দাম্পত্যবন্ধন স্থায়ী হইবে না। কোন বালক দর্পণে মুখ দেখিলে, তাহাকে যৌবনে যমজ সন্তানের জনক হইতে হয়। গ্রহণের সময়ে জলপান করিলে শরীরমধ্যে বিষ প্রবিষ্ট হয়। কুকুর কাঁদিলে গৃহস্থের অকল্যাণ হয়; মোরগ চালে উঠিলে গৃহদাহের আশঙ্কা আছে। মৎস্য ধরিবার মানসে যাত্রা করিয়া পুরোহিতের সহিত সাক্ষাৎ হইলে, বাটীতে ফিরিয়া আসাই মঙ্গল। গ্রামে বসন্ত ও কলেরা প্রভৃতি সংক্রামক পীড়ার প্রাদুর্ভাব হইলে, গৃহস্থেরা দ্বারদেশে লিখিয়া দেয় যে, এবাটীতে বালক বালিকা একটীও নাই। জাপানীরা যাত্রা কালে বক ও সুকি নামে কচ্ছপ দেখিলে বড়ই আনন্দানুভব করিয়া থাকে।

    জাপানবাসিরা সর্ব্বদাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকিতে ভালবাসে। অনেকে প্রত্যহ তিনবার স্নান করিয়া থাকে। এখানে প্রতি গৃহস্থের বাটীতে কয়েকটী ফুলের গাছ, একখণ্ড ক্রীড়াভূমি ও একটী কূপ দেখিতে পাওয়া যায়। জাপানীরা প্রাণ ভরিয়া মুক্তবায়ু সেবন করিতে পারিলে বড়ই প্রফুল্ল হয়।

  • জাপানের শিক্ষা-প্রণালী।

    জাপানের শিক্ষা-প্রণালী।

    সুশিক্ষাই সর্ব্ববিধ উন্নতির মূল। কি সাম্রাজ্যের পরিপুষ্টি, কি বাণিজ্যের বিপুলবিস্তার, কি স্বদেশের শ্রীবৃদ্ধিসাধন, কি জ্ঞানের পরিধি প্রসারণ, ইহার কোন একটিও শিক্ষা নিরপেক্ষ নহে। জাপানবাসীরা গত ত্রিংশতি বৎসর মধ্যে শিক্ষাবিষয়ে যে উন্নতিলাভ করিয়াছে, তাহা পৃথিবীর ইতিহাসে অতি অপূর্ব্ব ও সর্ব্বাপেক্ষা বিস্ময় জনক।

    জাপানের শিক্ষার ইতিহাস ১৮৬৮ খৃঃ হইতে আরম্ভ হইয়াছে। ইহার তিন বৎসর পরে গবর্ণমেণ্টের তত্ত্বাবধানে জাপানে “মম্বাসাে” অর্থাৎ শিক্ষাবিভাগ স্থাপিত হয়। ১৮৭২ খৃঃ শিক্ষাসংক্রান্ত কতকগুলি ব্যবস্থা প্রণীত হইয়া শিক্ষাবিভাগে নবযুগের আবির্ভাব হয়।

    এক্ষণে জাপানে চারিশ্রেণীর বিদ্যালয় দৃষ্ট হয়। যথা,— প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য-বিদ্যালয়, উচ্চ-বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়।

    প্রাথমিক বিদ্যালয় জাপানের প্রতি “সান” অর্থাৎ পল্লীগ্রামে দৃষ্ট হয়। ইহাতে ষষ্ঠ বৎসর হইতে চতুর্দ্দশ বর্ষীয় বালক বালিকাগণকে জাপানী ভাষায় শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য, গণিত ও স্বাস্থ্যরক্ষা বিষয়ক সাধারণ সূত্রগুলি শিক্ষা দেওয়া হয়। পীড়িত ও অতি দরিদ্র ব্যতীত গ্রামের সকল বালক বালিকাই এই বিদ্যালয়ে আসিতে বাধ্য হইয়া থাকে। এই সমস্ত বিদ্যালয়গুলি গবর্ণমেণ্ট ও গ্রামবাসীর অর্থ সাহায্যে রক্ষিত হইয়া থাকে। ১৯০২ খৃঃ এই শ্রেণীর বিদ্যালয়-সংখ্যা ২৮,৩৮১, ছাত্র ও ছাত্রী সংখ্যা ৪৯,৮০,৬০৪ ও শিক্ষক এবং শিক্ষয়ত্রী সংখ্যা ১,০৩৭৮০ জন ছিল।

    জাপানের প্রতি জেলাতেই এক বা ততােধিক মধ্য-বিদ্যালয় অবস্থিত আছে। এই সমস্ত বিদ্যালয়ে চৌদ্দ হইতে অষ্টাদশ বর্ষ বয়স্ক বালক বালিকাদিগকে জাপানী, চীনা ও ইংরাজী ভাষায় সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগােল, গণিত, জ্যামিতি, বিজ্ঞান, রসায়ন, জ্যোতিষ প্রভৃতি বিবিধ বিষয় শিক্ষা দেওয়া হয়। যাহাতে ছাত্র ও ছাত্রীগণের ধর্ম্মজ্ঞান, নীতি ও শারীরিক শক্তি সম্যক পরিপুষ্ট হয়, তাহার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা হয়। ১৯০২ সালে এই শ্রেণীর বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৯২, ছাত্র ও ছাত্রী সংখ্যা ১,০২,৩০৪ এবং শিক্ষক ও শিক্ষায়ত্রী সংখ্যা ৪২৩৩ জন ছিল।

    উচ্চ বিদ্যালয় গুলি রাজধানী ও প্রধান নগরে অবস্থিত। ইহাতে জাপানী, ইংরাজী ও জর্ম্মান ভাষায় গণিত, দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান, আইন, চিকিৎসা-শাস্ত্র, কৃষি, বাণিজ্য, ভূতত্ব প্রভৃতি বিবিধ বিষয়ের শিক্ষা দেওয়া হইয়া থাকে। এই বিদ্যালয়ে সপ্তদশ বৎসরের ন্যূন বয়স্ক কোন ছাত্র প্রবিষ্ট হইতে পারে না। ১৯০৩ খৃঃ জাপানের উচ্চ-বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮টী ও ছাত্র সংখ্যা ৪৬৮১ জন ছিল।

    জাপানে ৭০টী উচ্চ বালিকাবিদ্যালয় ও ৫৪টি নর্ম্মাল বিদ্যালয় আছে। নর্ম্মাল বিদ্যালয়ে ছাত্রগণকে চারি বৎসর ও ছাত্রীগণকে তিন বৎসর অধ্যয়ন করিতে হয়। নর্ম্মাল বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষয়িত্রী প্রস্তুত করিবার জন্য আবার দুইটী উচ্চ নর্ম্মাল বিদ্যালয় আছে। ইহার একটী টোকিয়ে রাজধানীতে ও অন্যটী হিরােসিমা নগরে অবস্থিত। গত পূর্ব্ব বর্ষে ইহার ছাত্র সংখ্যা ৮০৩ জন ও ছাত্রী সংখ্যা ৩৬১ জন ছিল।

    জাপানে দুইটী “দৈগাকু” অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ইহার একটী রাজধানীতে ও অন্যটী মিয়াকো নগরে অবস্থিত। উচ্চবিদ্যালয়ের উত্তীর্ণ ছাত্র ভিন্ন কেহই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইতে পারে না।

    টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়,—এখানে আইন, চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং সাহিত্য, বিজ্ঞান ও কৃষিবিদ্যা বিষয়ক ৬টী কলেজ আছে। আইন বিভাগের মধ্যে চিকিৎসা সম্বন্ধে একটী নির্দ্দিষ্ট পাঠ্য আছে। ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মধ্যে গৃহনির্ম্মাণ, রসায়ন, বারুদ, খনি ও ধাতু সম্বন্ধে নয়প্রকার পাঠ্য আছে। সাহিত্য কলেজে দর্শন, জাপানী-সাহিত্য, চীন-সাহিত্য, ইতিহাস ও বিবিধ বৈদেশিক সাহিত্য প্রভৃতি নয়প্রকার পাঠ্য আছে। বিজ্ঞান কলেজে গণিত, জ্যোতিষ, পদার্থবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা প্রভৃতি সাতপ্রকার পাঠ্য আছে। কৃষি কলেজে কৃষিবিদ্যা, বনবিদ্যা প্রভৃতি চারি প্রকার পাঠ্য আছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিত একটা বৃহৎ পুস্তকাগার ও হাঁসপাতাল আছে। আইন কলেজে কতদিন পাঠ করিতে হইবে তাহার নিশ্চয়তা নাই। অন্যান্য কলেজে তিন বৎসর অধ্যয়ন করিতে হয়। কোন ছাত্রকেই সাত বৎসরের অধিক কাল পড়িতে দেওয়া হয় না।

    টোকিয়ো বিশ্ব-বিদ্যালয়ে বর্ত্তমান বৎসরে আইনবিভাগে ২৫, চিকিৎসাবিভাগে ২৩, ইঞ্জিনিয়ারিংবিভাগে ২৫, সাহিত্যবিভাগে ২০, বিজ্ঞানবিভাগে ২১, ও কৃষিবিভাগে ১৭ জন অধ্যাপক আছেন।

    এই বিশ্ব-বিদ্যালয় হইতে চিকিৎসাশাস্ত্রে উত্তীর্ণ হইলে ইগাকুশী, ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় উত্তীর্ণ হইলে কোগাকুশী, সাহিত্যে উত্তীর্ণ হইলে বানগাকুশী, বিজ্ঞানশাস্ত্রে উত্তীর্ণ হইলে রিগাকুশী ও কৃষিবিদ্যায় উত্তীর্ণ হইলে নােগাকুশী উপাধি পাওয়া যায়।

    জাপান গবর্ণমেণ্ট টোকিও বিশ্ব-বিদ্যালয়ের জন্য প্রতিবর্ষে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়া থাকেন।

    এই বিশ্ব-বিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা বর্ষে বর্ষে কি পরিমাণে বর্দ্ধিত হইতেছে, তাহা নিম্নলিখিত তালিকা হইতে বুঝিতে পারা যায়।

    ১৮৯০ ১৮৯৫ ১৯০০ ১৯০৩
    আইন ৩০১ ৪৭২ ৮২০ ১২০৮
    চিকিৎসা ১৮৮ ১৭৮ ৪০২ ৭১৭
    ইঞ্জিনিয়ারিং ১০৬ ২৯৫ ৪০৭ ৯০১
    সাহিত্য ৮৮ ২১৯ ৩১২ ৮৩৩
    বিজ্ঞান ৭৭ ১০২ ১০৫ ২১৩
    কৃষি ৪৮৫ ২৪৯ ২৬২ ৪৯৪
    বিবিধ ৪৮ ১০৫ ১৯২ ২৫০
    ১,২৯৩ ১,৬২০ ২,৫০০ ৪,৬১৬

    কিয়াটো বিশ্ব-বিদ্যালয়ে আইন, চিকিৎসা, বিজ্ঞান এবং ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতির চারিটী কলেজ আছে। এখানে কোন ছাত্রকে তিন বৎসরের অধিক কাল এক প্রকার পাঠ্য পাঠ করিতে দেওয়া হয় না। চিকিৎসা কলেজে চারি বৎসর অধ্যয়ন করিতে হয়। অন্যান্য নিয়মাদি টোকিও বিশ্ব-বিদ্যালয়ের অনুরূপ।
    বিশ্ব-বিদ্যালয়ের বাৎসরিক ফিজ ৩৭॥৹ টাকা। ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্রগণকে আরও ১৫৲ টাকা অতিরিক্ত প্রদান করিতে হয়।

    এই দুইটী বিশ্ববিদ্যালয় হইতে গত ২৫ বৎসরে প্রায় ৫০০০ ছাত্র উত্তীর্ণ হইয়াছে।

    টোকিও ও কিয়াটো বিশ্ব-বিদ্যালয় ভিন্ন জাপানে শিল্প, কৃষি ও স্ত্রীশিক্ষাসংক্রান্ত আরও কয়েকটী বিশ্ব-বিদ্যালয় আছে।

    উপরােক্ত বিদ্যালয়সমূহ ভিন্ন জাপানে উচ্চ ও নিম্নশ্রেণীর ১৪৭৪টী বিদ্যালয় বর্ত্তমান আছে। তন্মধ্যে ৪৭টী কৃষি, ২০০টী শিল্প, ৩৬টী বাণিজ্যবিষয়ক বিদ্যালয় উল্লেখ যােগ্য। শিল্প বিদ্যালয়ের মধ্যে টোকিও উচ্চ শিল্প বিদ্যালয়, ওসাকা শিল্প বিদ্যালয় ও কিয়াটো উচ্চ শিল্প বিদ্যালয় সমধিক প্রসিদ্ধ। এই সমস্ত বিদ্যালয়ে রসায়ণ, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাদি গঠন, রং করণ, বস্ত্র বয়ন, চীনাবাসন গঠন, মদ্য প্রস্তুত করণ, ধাতুবিদ্যা, মানচিত্র অঙ্কিত করণ, চিত্রবিদ্যা প্রভৃতি বিবিধ বিষয় হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়।

    এক্ষণে জাপানে ১৬টী মূকবধির বিদ্যালয় ও ২৫৪টী কিণ্ডারগার্টেন বিদ্যালয় বিদ্যমান আছে।

    জাপান গবর্ণমেণ্ট ১৮৭০ খৃষ্টাব্দ হইতে শিল্প ও বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য বিদেশে ছাত্র প্রেরণ আরম্ভ করেন। ১৮৭২ অব্দে প্রায় ২৫০ ছাত্র প্রেরিত হইয়াছিল। ১৮৯৫ অব্দে কেবল মাত্র ১১ জন প্রেরিত হয়। পূর্ব্বে জাপানী বিদ্যালয়ের জন্য ইউরােপ ও আমেরিকা হইতে অধ্যাপক আনিতে হইত, এক্ষণে তাহার প্রয়ােজন হয় না।

    সমগ্র জাপান রাজ্যে বর্ত্তমান সময়ে প্রায় ৫৪ লক্ষ ছাত্র বিবিধ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিতেছে। এখানে বিদ্যালয় গমনযােগ্য বালক ও যুবকবর্গের মধ্যে শতকরা ৮৫ জন বিদ্যালয়ে গমন করিয়া থাকে। আমেরিকার যুক্তরাজ্য (ইউনাইটেডষ্টেটস্) পৃথিবীর মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা সুসভ্য রাজ্য বলিয়া পরিগণিত। প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে সেই শক্তিশালী রাজ্যের সহিতও জাপানের তুলনা হয় না। হতভাগ্য ভারতের সহিত আর কি তুলনা করিব?

    জাপানীরা ইংলণ্ডের নিকট হইতে নৌবিদ্যা, ফ্রান্সের নিকটে যুদ্ধবিদ্যা, জার্ম্মানির নিকট হইতে চিকিৎসাশাস্ত্র এবং আমেরিকার নিকট হইতে শিক্ষাপ্রণালী গ্রহণ করিয়া সকলগুলিই স্বদেশের উপযোগী করিয়া লইয়াছে। কোন বিষয়েই আমাদের ন্যায় অবিকল অনুকরণ করে নাই।

    জাপান সম্রাট বলিয়াছিলেন,—“It is designed, henceforth, education shall be so diffused that there may not be a village with an ignorant family, nor a family with an ignorant member.” সম্রাটের এই উক্তি সার্থক হইয়াছে।

  • জাপানের সাহিত্য ও সংবাদপত্র।

    জাপানের সাহিত্য ও সংবাদপত্র।

    জাপানের সাহিত্যভাণ্ডার পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যজাতির সাহিত্যের ন্যায় ঐশ্বর্য্য সম্পদে পরিপুষ্ট নহে। জাপানী সাহিত্যে কালিদাস বা সেক্সপিয়ার দূরের কথা, মিল্টন বা মধুসূদনের ন্যায় কবির পরিচয় পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন যে, প্রাচীন জাপান যুদ্ধবিগ্রহ ও ব্যবসাবাণিজ্যে ব্যাপৃত থাকায় সাহিত্য সম্বন্ধে কোনরূপ চিন্তা করিবার অবসর পায় নাই।

    “কোজিকী” জাপানের সর্ব্বাপেক্ষা প্রাচীন গ্রন্থ। ইহা ভারতীয় পৌরাণিক গ্রন্থাবলীর ন্যায় বিবিধ অতিপ্রকৃত উপাখ্যানে পরিপূর্ণ। কোজিকীর কোন কোন আখ্যায়িকার সহিত অস্মদ দেশীয় পুরাণ বিশেষের ঐক্যতা পরিলক্ষিত হয়। ইহা গদ্যে রচিত।

    জাপানীদিগের প্রধান নীতিশাস্ত্রের নাম ‘বুসিডাে’। হিন্দুর নিকটে বেদ, মুসলমান সমীপে কোরান ও খ্রীষ্টানের কাছে বাইবেল যদ্রুপ, প্রাচীন ‘বুসিডাে’ জাপানিগণের নিকটে তদ্রুপ। জাপানীরা এই গ্রন্থকে ভগবান ভাস্করের মুখ-নিঃসৃত বলিয়া বিশ্বাস করিয়া থাকে। ইহাতে পরমাত্মা, জীবাত্মা, পুনজন্ম, পরজন্ম, পাপপুণ্য, স্বাস্থ্য, পীড়া, রাজভক্তি, পিতৃমাতৃভক্তি, স্বদেশপ্রীতি প্রভৃতি বহু বিষয় ধারাবাহিকরূপে লিখিত আছে।

    অতি পূর্ব্বকালে “বুসি” অর্থাৎ সম্ভ্রান্ত ক্ষত্রিয় জাতি ভিন্ন অন্য কেহ এই গ্রন্থ পাঠ করিতে অধিকারী ছিল না। এক্ষণে—জাপানের উন্নতির যুগে—ইহা সাধারণসম্পত্তিরূপে পরিগণিত হইয়াছে। “বুসিডাের” কয়েকটী উপদেশ এইরূপ;—“আড়ম্বর পরিত্যাগ পূর্ব্বক দীনভাবে জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ কর।” “আত্ম অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকিয়া স্বধর্ম্ম প্রতিপালন কর।” “হিংসা, দ্বেষ, মিথ্যা, চাতুর্য্য পরিহার করিয়া সত্য ও সরলতার আশ্রয় গ্রহণ কর।” “পরলােকে বিশ্বাস স্থাপন করিয়া ধর্ম্মাচরণ কর।” “বিবেকের সাহায্যে পাপপুণ্য নির্ণয় কর।” ইত্যাদি

    “কোজিকী”, “বুসিডাে” প্রভৃতি গ্রন্থ পাঠ করিলে স্পষ্টই বুঝা যায় যে, প্রাচীনযুগে জাপানী সাহিত্যে প্রভূত পরিমাণে সংস্কৃত ভাষার রীতি প্রবেশলাভ করিয়াছিল। সংস্কৃতের ন্যায় জাপানী কবিতায় এখনও দ্ব্যর্থ দেখা যায়। অনেকগুলি জাপানী শব্দের সহিত সংস্কৃত শব্দের সাদৃশ্য লক্ষিত হয়। যথা,—“শামন” (শ্রমণ) “সর” (স্বর্গ) “সামুরে” (সমর) “যিযুৎসু” (যুযুৎসু) “সেন্‌দন্” (চন্দন) ইত্যাদি।

    খৃষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দে জাপানী সাহিত্য বৌদ্ধধর্ম্মের নবীন উপাদানে নবীকৃত হইয়া উঠে। এই সময়ে চীন ভাষা হইতে কয়েকখানি গ্রন্থ জাপানী ভাষায় অনুদিত হয়। এই সমস্ত গ্রন্থাবলীর মধ্যে প্রজ্ঞা পারমিতা, মহাপ্রজ্ঞা পারমিতা অমিতাভ সূত্র, রত্নজাল সূত্র, মহা পরিনির্ব্বান সূত্র, (এইখানি এক্ষণে সংস্কৃত ভাষায় পাওয়া যায় না) ললিত বিস্তর, ধর্ম্মপদ, সাংখ্য দর্শন, চন্দ্রগর্ভ ও সূর্য্যগর্ভ মহায়ণ সূত্র প্রভৃতি ধর্ম্মগ্রন্থ সমধিক প্রসিদ্ধ। সপ্তম শতাব্দে সাহিত্য প্রাচীন ভারতের ন্যায় কবিতাবহুল হইয়া উঠে। এই সময়ে চীন দার্শনিক কনফিউসিয়াসের নীতিশিক্ষায় লােকের হৃদয় কর্ম্মপ্রবণ ও ধর্ম্মানুরক্ত করিবার জন্য জাপানী কবিরা বিবিধ বিষয়ের কবিতা লিখিতে আরম্ভ করেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে পুস্তক সকল ইতিহাসের ন্যায় লিখিত হইতে আরম্ভ হয়। এই সময়ে মুরাসাকিসিকিবু নাম্নী জনৈক জাপানী মহিলা “গেঞ্জিমােণো-গাতারি” নামে একথানি ধর্ম্মগ্রন্থ প্রণয়ন করেন। সুপ্রসিদ্ধ “মন-যো-শিও” অর্থাৎ লক্ষপত্র নামক কবিতা পুস্তক এই সময়ে সঙ্কলিত হয়। ত্রয়ােদশ শতাব্দীতে জাপানে “নো” নামে এক শ্রেণীর সাহিত্যের উৎপত্তি হইয়াছিল। ইহা অনেকাংশে আধুনিক গীতি কবিতার ন্যায় ছিল। এই সময়ে জাপানে “কাইও-জেন” অর্থাৎ প্রহসনের সৃষ্টি হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে জাপানী সাহিত্যে বিবিধ উপন্যাস (নিনজিও বন) ও নাটকের (জোরুরি-বন) উৎপত্তি হয়।

    এক্ষণে জাপানে যে কয়টী ছন্দ প্রচলিত আছে, তন্মধ্যে তৌকা সর্ব্বপ্রধান। প্রায় শতকরা ৮০টী কবিতা এই ছন্দে রচিত হইয়া থাকে। ইহা ৩১টী অক্ষর সম্বলিত পঞ্চপদে বিভক্ত। পদপঞ্চে যথাক্রমে ৫, ৭, ৫, ৭ ও ৭টি অক্ষর থাকে। নিমে সম্রাট রচিত কয়েকটী কবিতা ও তাহার অনুবাদ প্রদত্ত হইল।

    কোরে ওয়া মিনা
    ইকুছা নো নিওয়ানি
    ইদোহাতেতে
    ও কিনা ইয়া হিতােরি
    ইয়ামাদা মরুবাণ

    মায়ের সন্তান, সকলে গিয়াছে,
    কর্ত্তব্য পালিতে,—
    উন্মুক্ত কৃপাণ লইয়া করে;
    তাহাদের বৃদ্ধ জনক জননী,
    শূন্য গেহে ভাবে,
    গিয়াছে তনয় ঘাের সমরে।

    চিবাইয়া কুরু
    কামি নো কোকোরোনি
    কানো ওরাণ
    ওয়াগা কুনি-তামি নাে
    ছুকুছু মাকোতে ওয়া

    শ্রীবিন্দুমাধব দেব পরাৎপর
    স্নেহ বরিষণ,—
    করুন তা’দের পুণ্যমস্তকে,
    মধুরিমাময় সারল্য তা’দের
    হৃদে একাগ্রতা,
    অতি তুচ্ছ করে মনুজান্তকে।

    কুণি ও ওমােও
    মিচি নি ফুতাৎছুওয়া
    নিকারি কিরি
    ইকুছা লো নিওয়া নি
    তাৎছু মো তাতামো মাে

    সমর প্রাঙ্গনে, সুখ জন্মস্থানে,
    যে থাকে যেখানে,
    সকলেরই হৃদে জনমভূমি;
    তাহারা সকলে মায়ের সন্তান
    স্বজাতির তরে,
    এক মনঃপ্রাণ দৃঢ়সংযমী।

    হৃদে আশা বাঁধি, অতি সন্তর্পণে,
    যবে জাতিধ্বজা
    সঁপিয়া দিলাম তা’দের কাছে;
    মহতী আশাতে, হৃদয় স্পন্দিল
    বিবেক বলিল,
    নবোদিত ভানু কীর্ত্তি আনিছে।

    পুরাতন গ্রন্থে যবে দৃষ্টি করি
    একটী ভাবনা,
    জাগে সদা মম হৃদিকন্দরে;
    প্রজারঞ্জন, প্রজার পালন
    প্রজা সুশাসন
    কিরূপ হ’তেছে রাজ্য ভিতরে।

    আজ কাল জাপানী সাহিত্যে বহুসংখ্যক লেখক-লেখিকার আবির্ভাব হইয়াছে।

    গত ত্রিশ বৎসরের মধ্যে যে সমস্ত বিদেশী গ্রন্থ জাপানী ভাষায় অনুদিত হইয়াছে, তন্মধ্যে স্মাইল, মিল, স্পেনসার ও কাণ্টের গ্রন্থাবলী প্রসিদ্ধ। উপন্যাসের মধ্যে “আর্ণেষ্ট মলট্রাভার” সর্ব্বপ্রথমে অনুবাদিত হয়। “টেলিমেক্‌স” ও “রবিন্‌সনক্রসোর” পাঠক সংখ্যা সর্ব্বাপেক্ষা অধিক। এতদ্ব্যতীত ডুমা’ ভার্ণ, কারভেণ্ট, হ্যাগার্ড প্রভৃতি সুপ্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিকগণের গ্রন্থরাজি জাপানী সাহিত্যের অধিকাংশ স্থান অধিকার করিয়াছে।

    অনুবাদিত কবিতা পুস্তকের মধ্যে গ্রের “এলিজি”, গােল্ডস্মিথ কৃত “ডেজার্টেড ভিলেজ” ও টেনিসনের “এনক-আর্ডেন” উল্লেখ যােগ্য।

    ঔপন্যাসিকগণের মধ্যে বেকিন, টেনিহিকো সানসুই, ইক্কু ও ন্যানুসী প্রভৃতি গ্রন্থকার বিখ্যাত। জাপানী সমালােচকেরা ইহাঁদের সহিত যথাক্রমে লিটন, স্কট, হিউগো, ডিকেন্স ও কলিন্সের তুলনা করিয়া থাকেন। মানবচরিত্রাঙ্কণে বেকিনের সহিত সেকস্‌পিয়ারের সাদৃশ্য লক্ষিত হয়।

    জাপানের সর্ব্বপ্রথম সংবাদপত্রের নাম “যােমি-উরি” ইহা ১৬০৩ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ইহার পরের উল্লেখ যােগ্য পত্রের নাম “কেইগােয়া-সিম্বু”। ১৮৭১ খৃঃ “জিম্বু-জিজি” নামে আর একখানি পত্র জন্মগ্রহণ করে। ১৮৭২ অব্দে জন ব্লাকি নামক জনৈক ইংরেজ কর্ত্তৃক “জাপান হেরাল্ড” নামে একখানি প্রথম শ্রেণীর দৈনিক পত্র বাহির হয়। এই সময় হইতে জাপানে সংবাদপত্রের সংখ্যা অতি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাইতে থাকে। ১৮৭৮ খৃঃ সংবাদপত্রের সংখ্যা ২০০, ও পাঠক সংখ্যা ৩ কোটী ছিল। ১৮৯৪ অব্দে পত্রের সংখ্যা ৮১৪ খানিতে পরিণত হয়, ইহার ৫ বৎসর পরে ৯৭৮ খানি হয়। এক্ষণে ১৩৫০ খানি হইয়াছে। দশ সহস্র লােকের বাসস্থান এমন নগর নাই, যেখান হইতে দুই বা তিনখানি সংবাদপত্র বাহির হয় না। টোকিও হইতে প্রত্যহ ৪০ খানি সংবাদপত্র বাহির হইয়া থাকে, তন্মধ্যে “জিজি” “নিচিনিচি” “ককুমিন” “নিপন” “জিজিসিম্পো” “য়্যাসাই” “হােচি” “মাইয়াকি” প্রভৃতি দৈনিকগুলি সমধিক প্রসিদ্ধ। ওসাকা,কোব, ইয়াকোহামা ও নাগােয়া হইতে অনেকগুলি দৈনিক পত্র বাহির হইয়া থাকে। ইংরেজী পত্রের মধ্যে জাপান গেজেট, জাপান টাইমস, জাপান মেল, হেরাল্ড, কোব হেরাল্ড প্রভৃতি পত্রগুলি উল্লেখযােগ্য। এই সকল পত্রের প্রত্যেকটীর গ্রাহকসংখ্যা এক লক্ষের অধিক হইবে।

    জাপানের মুদ্রাযন্ত্রবিধি অতীব কঠোর। রাজ্য সম্পর্কীয় কোন গুপ্তকথা প্রকাশ করিলেই সম্পাদক মহাশয়কে কারাদণ্ড ভােগ করিতে হয়। এইজন্য সংবাদপত্র মাত্রেরই একজন করিয়া “কারা-সম্পাদক” থাকে। তিনি প্রকৃত সম্পাদকের ভৃত্যরূপে অবস্থিতি করেন এবং প্রয়ােজন হইলে অম্লানবদনে কারাগৃহে গমন করিয়া থাকেন।

  • জাপান সাম্রাজ্যের গঠনপ্রণালী ও রাজনীতি।

    জাপান সাম্রাজ্যের গঠনপ্রণালী ও রাজনীতি।

    সমগ্র জাপান সাম্রাজ্য ৪৫টী “কেন” অর্থাৎ প্রদেশে বিভক্ত। প্রতি প্রদেশে একজন করিয়া “চো” অর্থাৎ শাসনকর্ত্তা অবস্থিতি করেন। প্রতি গ্রামেই গ্রামবাসিগণ কর্ত্তৃক নির্ব্বাচিত ১২ জন প্রধান ব্যক্তি লইয়া এক একটী গ্রাম্যসমিতি আছে। প্রতি গ্রামেই এক জন করিয়া পােলিস অবস্থান করে।

    সম্রাটই রাজ্যের সর্ব্বপ্রধান কর্ত্তা; তিনি “নেকয়্যাকু” অর্থাৎ মন্ত্রিসভার সাহায্যে রাজ্যের প্রকৃত শাসন সংরক্ষণ করিয়া থাকেন। কার্যের শৃঙ্খলাসাধন জন্য মন্ত্রিসভা রাজস্ব, শিক্ষা, সামরিক, বৈদেশিক, অভ্যন্তরীণ, ঔপনিবেশিক প্রভৃতি নানা বিভাগে বিভক্ত আছে। প্রত্যেক বিভাগে একজন করিয়া মন্ত্রী (দৈজিন) আছেন।

    ১৮৯০ খৃষ্টাব্দে ইংলণ্ডের অনুকরণে জাপানে পালামেণ্ট অর্থাৎ প্রতিনিধি সভা স্থাপিত হয়। এই সভা আভিজাত ও সাধারণসভা নামে দুই ভাগে বিভক্ত। সাধারণ সভার সভ্যদিগের ক্ষমতা অধিক; কারণ সাম্রাজ্যের যাবতীয় আয় ও ব্যয়ের উপরে ইহাঁদের সম্পূর্ণ কর্ত্তৃত্ব আছে। যাহাঁদের বয়ঃক্রম ২৫ বৎসর এবং বৎসরে ১৫৲ টাকা বা তদূর্দ্ধ কর দিয়া থাকেন, সাধারণ সভার সভ্য মনােনীত করিবার জন্য তাঁহাদের একটী “ভােট” দিবার অধিকার আছে। বর্ত্তমান বৎসরে ৪৫টী “কেন” (জেলা) হইতে ২৯৬টী, ৫৩টী “সাই” (সহর) হইতে ৭৩টী, ৪টী “চো” (দ্বীপ) হইতে ৪টী, যেশোদ্বীপ হইতে ৬টী ও ওকিনাওয়া (লিচুপুঞ্জ) হইতে ২টী সভ্য সাধারণ সভায় প্রবিষ্ট হইয়াছেন। আভিজাত সভার সভ্যের সংখ্যা ৩৫৭ জন, ইহাঁরা সাত বৎসরের জন্য ও সাধারণ সভার সভ্যেরা চারি বৎসরের জন্য মনােনীত হইয়া থাকেন। জাপানবাসির পােষ্যপুত্র অথবা জাপান রমণীর স্বামী ভিন্ন কোন বৈদেশিক মতদাতা বা সভ্য হইতে পারেন না। সম্রাট কর্ত্তৃক উভয় সভার সভাপতি ও সহকারী সভাপতি মনোনীত হইয়া থাকে। তাঁহারা প্রত্যেকে বৎসরে ৬০০০৲ টাকা ভাতা পাইয়া থাকেন। অন্যান্য সভ্যরা প্রত্যেকে ১২০০৲ টাকা পাইয়া থাকেন। যে সমস্ত সভ্যেরা রাজকর্ম্মচারী, তাঁহারা কেবলমাত্র পাথেয় পাইয়া থাকেন। প্রতি বৎসরে তিনমাস কাল পার্লামেণ্ট বসিয়া থাকে। এক তৃতীয়াংশ সভ্য উপস্থিত না হইলে কোন বিষয় আলােচিত হইতে পারে না। এক সভার প্রস্তাবিত বিষয় অন্য সভা ও সম্রাট কর্ত্তৃক অনুমােদিত হইলে তাহা আইনরূপে গৃহীত হইয়া থাকে। কোন বিশেষ রাজনৈতিক আন্দোলন ব্যতীত অন্য কোন সময়ে যে কোন ব্যক্তি সভামধ্যে প্রবেশ লাভ করিতে পারেন।15

    বর্ত্তমান সময়ে জাপানে একটী সুপ্রিমকোর্ট, সাতটী “কোশােইন” (আপিলকোর্ট) ৪৮টী “চিহো-সেবানসাে” (জেলাকোর্ট) ও ৩১০টী নিম্ন আদালত আছে। এই চারি শ্রেণীর আদালতের বিচারক সংখ্যা যথাক্রমে ২৫, ১২১, ৩৯৯ ও ৫৫৭ জন হইবে। এই সমস্ত বিচারালয়ে গত পূর্ব্ববর্ষে ১,৬১, ৮৫৪টী দেওয়ানী মােকর্দ্দমা ও ১, ৮৩, ৫৬২টী ফৌজদারী মােকর্দ্দমা হইয়াছিল।

    জাপানের পােলিশ প্রথা সর্ব্বোৎকৃষ্ট। এখানে গ্রামে গ্রামে একজন করিয়া পােলিশ আছে। তাহাদের নিকটে এলাকাধীন স্থানের মানচিত্র ও অধিবাসিগণের তালিকা আছে।

    প্রতি অফিসেই টেলিফোঁ সংযােগ রহিয়াছে। যে কোন ব্যক্তি তথায় পাঁচটী মাত্র পয়সা দিলে অন্যত্র সংবাদে পাঠাইতে পারে। এখানে উৎকোচের ব্যবস্থা আদৌ নাই। দেশবাসীর অর্থ ও শােণিত শোষণ করিবার জন্য জাপানী পােলিশের সৃষ্টি হয় নাই।

    এক্ষণে জাপানে ১৩৯টী কারাগার আছে। প্রতি কারাগারেই একজন করিয়া জেল গভর্ণর আছেন। তাঁহার বার্ষিক বেতন নয় শত হইতে পঁচিশ শত টাকা। গত পূর্ব্ব বৎসরে জেলসমূহের কর্ম্মচারী সংখ্যা ১১,৯৯৫ জন ছিল। এক্ষণে সমগ্র কারাগারের কয়েদীগণের দৈনিক উপস্থিত সংখ্যার গড় ৬০ হাজার হইবে। কয়েদীগণের স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা হয়, তাহাদিগকে গ্রীষ্মকালে প্রতি পাঁচ দিবসে ও শীতকালে প্রতি দশ দিবসে স্নান করিতে দেওয়া হয়। প্রত্যহ তিনবার করিয়া খাদ্য প্রদান করা হয়। কয়েদীরা মুক্ত হইয়া যাহাতে সদুপায়ে জীবিকার্জ্জন করিতে পারে, তাহার জন্য কারাগারের ভিতরে ও বাহিরে তাহাদিগকে বস্ত্রবয়ণ, সূচীকর্ম্ম, ইষ্টকনির্ম্মাণ প্রভৃতি, বিবিধ বিষয় শিক্ষা দেওয়া হয়। কয়েদীরা বাহিরে কর্ম্ম করিয়া যাহা উপার্জ্জন করে, মুক্তিদানকালে তাহা তাহাদিগকে প্রদান করা হয়।

    জাপান গভর্ণমেণ্টের মােট আয় ৫০ কোটী টাকা হইবে। জমির মূল্যের শতকরা ২॥৹ হিসাবে প্রায় ১৮ কোটী টাকা ভূমির রাজত্ব সংগৃহীত হইয়া থাকে। বার্ষিক ৪৫০৲ টাকা আয় হইলে ইনকম্ ট্যাক্স দিতে হয়। গত বৎসরে ইহা হইতে প্রায় ৬ কোটী টাকা সংগৃহীত হইয়াছিল। অবশিষ্ট টাকা দেশীয় ও বিদেশীয় মদিরা,16 তামাক,17 বাণিজ্য শুল্ক, রেলওয়ে, পােষ্টাফিস, মিণ্ট, বনবিভাগ, খনিকর, কষ্টম, ষ্ট্যাম্প প্রভৃতি হইতে গৃহীত হয়। পূর্ব্বে প্রতি জাপানীকে ৮৩ পেন্স বা ৫৷৹ করিয়া কর প্রদান করিতে হইত। গত মহাযুদ্ধের পর হইতে আর ৩৭ পেন্স করিয়া অধিক দিতে হইতেছে।

    জাপান গভর্ণমেণ্ট সৈন্যপালনার্থ প্রতি বর্ষে প্রায় ছয় কোটী টাকা ব্যয় করিয়া থাকেন। সাধারণ শিক্ষার জন্য সমগ্র আয়ের শতকরা ২॥৹ টাকা অর্থাৎ প্রায় এক কোটী টাকা ব্যয় হইয়া থাকে। বাণিজ্য ও কৃষির উন্নতির জন্য প্রায় ৮৭ লক্ষ টাকা ব্যায়িত হয়। জাপান গভর্ণমেণ্ট যেস্থলে শিক্ষাব্যয় নির্ব্বাহার্থ ব্যক্তি প্রতি।৴৫ পয়সা করিয়া ব্যয় করেন, ভারত গভর্ণমেণ্ট সেই স্থলে আড়াই পয়সার অধিক ব্যয় করিতে অসমর্থ হইয়া থাকেন।

    জাপানবাসিদিগের আর্থিক অবস্থা, ভারতসন্তানগণের ন্যায় শোচনীয় নহে। জাপানে প্রত্যেক ব্যক্তির গড় আয় বৎসরে ৮০৲ টাকা হইবে, তাহাদিগকে সর্ব্বপ্রকারে ৮৲ টাকার অধিক কর প্রদান করিতে হয় না।

  • জাপানের বাণিজ্য।

    জাপানের বাণিজ্য।

    আর্জেণ্টাইন, অস্ত্রিয়া, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, ডেন্মার্ক, ফ্রান্স, জারমানি, গ্রেটব্রিটেন, ইটালী, মেক্সিকো, নেদারল্যাণ্ড, পেরু, রুসিয়া, শ্যাম, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যাণ্ড, ইউনাইটেডষ্টেটস প্রভৃতি বৈদেশিক গভর্ণমেণ্টের সহিত জাপানের বাণিজ্য সন্ধি আছে। জাপান হইতে যে সমস্ত দ্রব্যসম্ভার বিদেশ প্রেরিত হইয়া থাকে, তন্মধ্যে চা, চাউল, কর্পূর, কর্পূরতৈল, তামাক, মৎস্য, দিয়াশলাই বিছানা, মােম, রেশম, রেশমীবস্ত্র, পশম, তুলা, বার্নিস, তাম্র, টীন, কয়লা সর্ব্বপ্রধান। চাউল প্রধান উৎপন্ন দ্রব্য হইলেও সম্রাটের অনুমতি ব্যতীত বিদেশে প্রেরিত হইতে পারে না; এইজন্য জাপানে দুর্ভিক্ষ নাই। গত ১৯০৩ অব্দে সাড়ে চল্লিশ কোটী টাকার দ্রব্য বিদেশ প্রেরিত হইয়া ছিল। ইহার পূর্ব্ববর্ষে রপ্তানির পরিমাণ ৪০ কোটী টাকা ছিল।

    সূত্র ও রেশমীবস্ত্রাদিবয়নে জাপানীরা পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠস্থান অধিকার করিয়াছে। ‘ওসাকা’ বন্দর প্রশান্ত মহাসাগরের ম্যানচেষ্টার রূপে পরিগণিত হইয়াছে। হােয়াইট দ্বীপে কয়লা, কেরাসিন, স্বর্ণ ও রৌপ্যের আকর আছে। জাপানের তাম্রখনি পৃথিবীমধ্যে বিখ্যাত। এক্ষণে সমগ্র জাপান সাম্রাজ্যে ৫৭টী রৌপ্য ১৩৬টী তাম্র-রৌপ্য এবং ৭২টী মিশ্রধাতুর খনি আছে। এই সমস্ত খনি হইতে গত পূর্ব্ব বর্ষে ৯ লক্ষ মণ তাম্র ৬২ হাজার মণ স্বর্ণ, দেড় লক্ষ মণ রৌপ্য, ২৫ কোটী মণ কয়লা উত্তোলিত হইয়াছিল। গতবর্ষে জাপানে যে সুবর্ণখনি আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহার মূল্য আনুমানিক হিসাবে ৪০০ কোটী স্থির হইয়াছে।

    জাপান সভ্যতার উচ্চতর সােপানে আরােহণ করিয়াও দেশীয় বাণিজ্যের উন্নতি সম্বন্ধে অণুমাত্র উদাসীন হয় নাই। বাষ্পীয় যন্ত্রের প্রবল প্রতিযােগিতা সত্বেও জাপানের প্রতি পল্লীতেই চরকা হইতে সূত্র নির্ম্মাণ ও তাঁতসাহায্যে বস্ত্র বয়ন হইয়া থাকে। জাপানের গৃহে গৃহে হস্তজাত ছুরি, কাঁচি, মৃত্তিকানির্ম্মিত বাসন ও বংশনির্ম্মিত নানাবিধ গৃহসামগ্রী দেখিতে পাওয়া যায়। জাপানী শিল্পীরা কাগজের দ্বার, জানালা, বাঁশের বিছানা, বাক্স, ব্যাগ প্রভৃতি প্রস্তুত বিষয়ে অসামান্য নৈপুণ্য প্রদর্শন করিয়া থাকে।

    জাপানবাসিরা যে কেবলমাত্র সমরশাস্ত্রে পারদর্শী হইয়াই ইউরােপীয় জাতিগণের সমকক্ষ হইয়াছে, এরূপ নহে। তাহারা কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যাদি বিষয়েও অসাধারণ উন্নতিলাভ করিয়াছে। মহাযুদ্ধে ব্যাপৃত থাকিয়াও, জাপানী কৃষকেরা গত পূর্ব্ববর্ষে ভূমি হইতে ১৪ কোটী মণ চাউল, ৬ কোটী মণ যব, ৪ কোটী মণ বিবিধ তরকারী উৎপন্ন করিয়াছে। সরকারী গণনানুসারে উক্ত বর্ষে ১৩ লক্ষ মণ নীলপত্র, ৮ লক্ষ মণ তামাক ও পৌণে সাতলক্ষ মণ চা উৎপন্ন হইয়াছে।

    টোকিও নগরে কাগজের প্রকাণ্ড কারখানা আছে। তথায় মিৎসুমাতো, কোজো ও গাম্পি নামক বৃক্ষ হইতে কাগজ প্রস্তুত হইয়া থাকে। কাঠে কাগজ হয়, কাগজে গৃহ নির্ম্মিত হয়, কড়ি, বরগা প্রস্তুত হয়, রেল প্রস্তুত হয়, জলের নৌকা হয় এবং চা তৈয়ারির কেটলি প্রস্তুত হয়।

    জাপানের মৎস্যের ব্যবসা অতি বিস্তৃত। এখানে ৯ লক্ষ ঘর জালিক আছে, তাহাদের জনসংখ্যা ৩০ লক্ষ হইবে। ইহারা ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জাল, বড়সি এবং বংশনির্ম্মিত যন্ত্রাদির সাহায্যে জাপান, কোরিয়া ও সাইবেরিয়ার উপকূলে বিবিধ প্রকার মৎস্য ধরিয়া থাকে। গত পাঁচ বৎসর পূর্ব্বে সমগ্র জাপানে সাড়ে চারি লক্ষ নৌকা ও এগার লক্ষ নানাশ্রেণীর জাল ছিল। সর্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ নৌকার নাম “সাউনসি”, ইহা দৈর্ঘ্যে ৫০ ফিট ও প্রস্থে ১৮ ফিট হইবে।

    গম, চিনি, গজদন্ত, স্বর্ণ, লৌহ, কাচ, চামড়া, ঔষধ, পুস্তক, মানচিত্র, রং, বিবিধ প্রকার তৈল বিদেশ হইতে আমদানি হইয়া থাকে। এই সকল ঐব্যের মধ্যে চীনের গম ও কোরিয়ার সুবর্ণ সমধিক প্রসিদ্ধ। গত পূর্ব্ববর্ষে আমদানীর মূল্য ৩১ কোটী টাকা স্থির হইয়াছিল। জাপানের ডাক, রেল, টেলিগ্রাফ, কাপড়ের কল, সূতার কল, মুদ্রাযন্ত্র প্রভৃতি সমস্ত কল কারখানা দেশের মুলধনে দেশীয় লােক কর্ত্তৃক পরিচালিত হইতেছে। সামান্য সূচ হইতে আরম্ভ করিয়া বিশাল যুদ্ধ-জাহাজ পর্য্যন্ত সমস্তই জাপানে প্রস্তুত হইতেছে। এক্ষণে জাপানে বিবিধ শ্রেণীর ৭৮২৯টী কল কারখানা বিদ্যমান আছে, এই সকলের মধ্যে প্রায় ৩০০০টী বিদ্যুৎ ও বাষ্প বলে ও অবশিষ্টগুলি হস্তকৌশলে পরিচালিত হইতেছে। ইহাদের মূলধন ৬৮, ৮২, ৮৭,০০০ টাকার উপর হইবে। এক্ষণে জাপানে ৬০টী সূতার কলে ২০ লক্ষ টাকু চলিতেছে, কলের তাঁত ৯০০০ হাজার চলিতেছে। সমগ্র কল কারখানায় ৪ লক্ষ মজুরের কার্য্য হইতেছে।

    বাণিজ্যের ক্রমােন্নতি সহকারে একদিকে যেমন দেশের ধনবৃদ্ধি হইতেছে, অন্যদিকে সেইরূপ জীবন-সংগ্রামের কঠোরতা বৃদ্ধি হইয়াছে। আজ কাল দৈনিক মজুরির হার অত্যধিক পরিমাণে বাড়িয়া উঠিয়াছে।

    যে সমস্ত জাপানী সদাগরেরা পৃথিবীর নানাস্থানে ব্যবসা বাণিজ্য করিতেছেন, তন্মধ্যে ফুকিসামা, আমাজেসাকি, লিটসু, নিফন, গােডো, কানাকিম ও ওসাকা কোম্পানি সর্ব্বপ্রধান। ইহাঁদের প্রত্যেকের বার্ষিক আয় এক কোটী টাকার ন্যূন হইবে না।

    বাণিজ্যাদির সুবিধার জন্য জাপান সাম্রাজ্যে ২৩১৭টী “জিনকো” অর্থাৎ ব্যাঙ্ক আছে। এই সকলের মধ্যে জাপান ব্যাঙ্ক সমধিক প্রসিদ্ধ। ইহার বর্ত্তমান মূলধন মুদ্রা ও নােটসহ ২৫ কোটী টাকা হইবে। এতদ্ব্যতীত ১৮০ টী সাধারণ, ৫০টী কৃষি ও ৪৬৭টী সেভিং ব্যাঙ্ক আছে।