Author: তাহের আলমাহদী

  • জাপানের সমর বল।

    জাপানের সমর বল।

    স্থলবল।

    ১৮৮৩ অব্দে জাপানের সৈন্যসংখ্যা সর্ব্বপ্রকারে এক লক্ষের ন্যূন ছিল। গত চীন-জাপান যুদ্ধের পর হইতে সৈন্যসংখ্যা অধিক পরিমাণে বর্দ্ধিত হইয়াছে। এক্ষণে জাপানে যুদ্ধের জন্য সর্ব্বদাই ৬ লক্ষ সৈন্য প্রস্তুত থাকে। তন্মধ্যে কর্ম্মচারীর সংখ্যা ২০০০০ হাজার, পদাতিক ৫ লক্ষ এবং অশ্বারোহী ও গােলন্দাজ সৈন্যের সংখ্যা এক লক্ষ হইবে। ইঞ্জিনিয়ারিং, টেলিগ্রাফ, বেলুন, রসদ ও গুপ্তচর বিভাগের লােক সংখ্যাও এক লক্ষের অধিক হইবে। এতদ্ভিন্ন ক্ষুদ্র বৃহৎ ২৫০০ কামান আছে।

    সম্রাটই জাপানের সর্ব্বপ্রধান সেনাপতি। তাঁহার আদেশ ব্যতীত কোন সৈন্যদল পরিচালিত হইতে পারে না।

    সম্রাটের নিম্নেই যুদ্ধমন্ত্রীর পদ নির্দ্দিষ্ট আছে। তিনি তাঁহার অধীন কর্ম্মচারিগণের সহিত পরামর্শ করিয়া যুদ্ধবিভাগের যাবতীয় কার্য্য নির্ব্বাহ করিয়া থাকেন।

    এক্ষণে সমগ্র জাপান সাম্রাজ্য তিন প্রেসিডেন্সিতে বিভক্ত। প্রতি প্রেসিডেন্সিতে চারিটী করিয়া ডিভিসন আছে। ৮টী রেজিমেণ্ট লইয়া প্রতি ডিভিসন গঠিত হইয়াছে।

    সৈনিকগণের শিক্ষারজন্য জাপানে ১৪টী কলেজ ও স্কুল আছে। অশ্ববিভাগের কার্য্য পরিচালনার্থ টোকিও নগরে একটী কার্য্যালয় আছে। দেশের নানাস্থানে তাহার সাতটী শাখা আছে। অশ্বসমূহের জন্য রাজ্যমধ্যে সাড়ে চারি লক্ষ বিঘা জমি পতিত আছে। টোকিও ও ওসাকা নগরে কামান, গােলাগুলি ও অস্ত্রাদির কারখানা আছে। মেজারু, ইটাবাস ও আইওনা নগরে বারুদের গুদাম আছে।

    জাপানের পদাতিক সৈন্য জর্ম্মন আদর্শে গঠিত। এই বিভাগে কোন বিদেশীয় জাতির প্রবেশাধিকার নাই।

    জাতীয় বিপত্তি উপস্থিত হইলে, জাপানের সৈন্য-সংখ্যা আরও বর্দ্ধিত হইতে পারে। রাজাজ্ঞানুসারে জাপানবাসী সমর্থ পুরুষ মাত্রেই অস্ত্রধারণ করিতে বাধ্য। সমগ্র জাপান-সাম্রাজ্যে এক্ষণে উক্তরূপ যুবকের সংখ্যা ৮০ লক্ষের অধিক হইবে। তন্মধ্যে ২০ লক্ষ যুবক যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করিয়া অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছেন। প্রয়ােজন হইলে স্বদেশের গৌরব রক্ষার জন্য তাঁহারা এই মুহুর্ত্তেই সমরাঙ্গনে অবতীর্ণ হইতে পারেন।

    জাপান গবর্ণমেণ্ট এক্ষণে সেনা-বিভাগ সম্বন্ধে যে ব্যবস্থা করিয়াছেন, তাহার ফলে তাঁহারা ভবিষ্যতে সমরক্ষেত্রে সাড়ে সাত লক্ষ সৈন্য প্রেরণ করিতে সমর্থ হইবেন। জাপানী গবর্ণমেণ্ট মাঞ্চুরিয়া ও কোরিয়ার সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করিতেছেন। যেরূপ ব্যবস্থা হইয়াছে, তাহাতে জাপানস্থিত সৈন্যের সংখ্যা শতকরা ৫০ জন হিসাবে বৃদ্ধি হইবে। জাপানের মন্ত্রিসভায় সে দিন জাপানী সমরসচিব স্পষ্টই বলিয়াছেন, জাপানী বাহিনীকে তাঁহারা এমন দুর্দ্ধর্ষ করিয়া তুলিবেন যে, কোন শক্তিই তাঁহাদিগের সহিত সহসা শক্তি পরীক্ষায় সাহসী হইবেন না। জাপানীরা অচিরেই পৃথিবীতে অজেয় শক্তিরূপে পরিণত হইবে প্রাচ্য দেশসমূহের পক্ষে ইহা সুসংবাদ, সন্দেহ নাই।

    জাপান গভর্ণমেণ্টকে প্রচুর সৈন্য পরিপােষণ করিতে হইলেও বৎসরে ছয় কোটী টাকার অধিক ব্যয় করিতে হয় না। জাপানে প্রতি পদাতিক সৈন্য ও অশ্বারােহী সৈন্যের বার্ষিক বেতন যথাক্রমে ৪৫৲ ও ৬০৲ টাকা মাত্র। কর্ণেল, কাপ্তেন প্রভৃতি সেনানায়কেরা বৎসরে দেড় শত হইতে দুই শত টাকা বেতন পাইয়া থাকেন। প্রধান সেনাপতিগণের বার্ষিক বেতন ৫০০৲ হইতে ৭৫০৲ টাকার অধিক নহে। সৈন্যবিভাগীয় কুলিগণের প্রত্যেক ব্যক্তি খাদ্য ও দৈনিক ৴১০ হিসাবে মাহিনা পাইয়া থাকে। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদিগকে প্রত্যহ তিনবার করিয়া খাদ্য প্রদান করা হইয়া থাকে। প্রত্যুষে চা, বিষ্কুট, মাছভাজা ও শুষ্কান্ন; মধ্যাহ্নে ভাত, শুস্কমৎস্য ও মাংস, এবং সায়াহ্ণে চা, বার্লি, পাঁওরুটী ও পায়ষ ব্যবস্থা। চিকিৎসকের আদেশানুসারে এই ব্যবস্থা পরিবর্ত্তিত হইয়া থাকে।

    নৌবল।

    জাপানবাসীরা গত ত্রিশ বৎসরের মধ্যে জলযুদ্ধ বিষয়েও অসামান্য উন্নতি লাভ করিয়াছে। জাপানীরা বুঝিয়াছে, দ্বীপবাসীর পক্ষে প্রবল নৌ-বল ভিন্ন আত্মরক্ষার সুবিধা হইতে পারে না। ইংরেজ নৌ-সেনাপতি ফিট্জিরাল্ড স্পষ্টাক্ষরে বলিয়াছেন;—In some matters they appears to have improved upon the methods of their instructor.

    অর্থাৎ জাপানীরা স্বীয় প্রতিভাবলে, কোন কোন বিষয়ে ইংরেজাপেক্ষাও নৌ-যুদ্ধের অধিকতর উন্নতি সাধন করিরাছে। পরপৃষ্ঠায় জাপানের বর্ত্তমান নৌ-বলের তালিকা প্রকাশ করা যাইতেছে।

    যুদ্ধজাহাজ (Battle Ship)।

    নাম। যতটন। অশ্ব-শক্তি। বেগ। কামান। মন্তব্য।
    ১। মিকাণা ১৫৩৫০ ১৬২০৩ ১৮ মাইল ৫০ অগ্নি লাগিয়া নষ্ট হওয়ায় মেরামত হইয়াছে।
    ২। সিকিসামা ১৫০৮৮ ১৪৭০০ ১৮ ,, ৫০
    ৩। য়্যাসাহী ১৫৪৪৫ ১৫৪৪৫ ১৮ ,, ৫০
    ৪। ফুজি ১২৩২০ ১৪০০০ ১৮১/২ ,, ৩৮
    ৫। হিজেন ১২০০০ ১৬০০০ ১৭ ,, রুষিয়ার “রেটভিসান”
    ৬। ইকি ৯৬৭২ ৮০০০ ১৬ ,,    ,,      “নিকোলাস”
    ৭। একাই নির্ম্মিত হইতেছে।
    ৮। সাতজুমা ১৯০২০ পৃথিবীমধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, সম্প্রতি নির্ম্মিত হইয়াছে।
    ৯। ইয়াসিমা ৯৮৫৫ ১৮২৮৪ ১৮১/২ ,, ৩৮ রুষিয়ার “ওরেল”
    ১০। আইয়োয়ামি ১৩৬০০ ১৬০০০ চীন হইতে প্রাপ্ত
    ১১। চীনইয়েন ৭৭৩৫ ৬২০০ ১৪১/২ ,, ১৮
    ১২। টোগো ১০৩৪০ ১১২৫৫ রুষিয়ার “পোলটাভা”
    ১৩। কাটোরি ১৫৯৪০ ১৬০০০ ১৮ ,, ৫০
    ১৪। সুও ১২৬৭৪ ১৪৫০০ রুষিয়ার “পোভিডা”

    রুষিয়ার “পােভিডা” লৌহমণ্ডিত প্রথম শ্রেণীর রণতরি।
    ( Cruiser ) ।

    নাম। টন। শক্তি। মন্তব্য।
    ১। টোকিওয়া ৯৮৫৫ ১৮২৪৮
    ২। আডজুমা ৩৪৬৫ ১৬০০০
    ৩। আসো ৭৭৩৬ ২৭৪০০ “রুষিয়ার বেয়ান”
    ৪। ক্যাসুগা ৭৬২৮ ১৩৫০০ } দুইখানি ইংলণ্ডে প্রস্তুত, এবং চিলি হইতে ক্রীত।
    ৫। নিশিন ৭৬২৮ ৯৪০০
    ৬। ইকোমা ১৩৫৭০ সম্প্রতি নির্ম্মিত হইয়াছে।
    ৭। ইয়াকুমা ৯০০০ ১৫৫০০
    ৮। আইওয়েট ৯৯০৬ ১৪৭০০

    এতদ্ভিন্ন “কুরুমা” “সুকুকু” নাম্নী দুইখানি তরণী প্রস্তুত হইতেছে।

    লৌহমণ্ডিত রক্ষিত রণতরি।

    ১। একাগী ২। একাসি ৩। একি সুসীমা
    ৪। চিতোজ ৫। হাসিডেট ৬। আজুমা
    ৭। একিনো সীমা (রুষিয়া হইতে প্রাপ্ত) ৮। নানিওয়া ৯। টেকাসেগো
    ১০। কাসাগী ১১। মাৎসুসিমা ১২। সুগারু (রুষিয়ার “পালাভা”)
    ১৩। সুম। ১৪। ইন সুসীমা ১৫। টেকিচিও
    ১৬। নিটাকা ১৭। ইডজুমা ১৮। অকোশী
    ১৯। টেকিওয়া ২০। ইয়েয়ামা ২১। সয় (রূষিয়ার ভেরাগ
    ২২। ওটেয়া

    এতদ্ব্যতীত কামানবাহক তরি ও উপকূল রক্ষক পােতের সংখ্যা ৩০ খানি হইবে।

    জাপানের টর্পেডো তরি ৭৮ খানি ও টর্পেডো নাশক তরণীর সংখ্যা ৫১ খানি হইবে।

    উপরােক্ত প্রভূত শক্তিশালী রণতরি ভিন্ন জাপান সাম্রাজ্যে ৫৫০০ খানি বাণিজ্যপােত আছে। তাহার মধ্যে ১৪০০ খানি কলে ও ৪০০ খানি পাইলে চলিয়া থাকে।

    অধিকাংশ পােতের তলদেশ ও মর্মস্থান লৌহ বা তাম্রমণ্ডিত থাকায় যুদ্ধকার্য্যে ব্যবহৃত হইতে পারে।

    ১৮৬৭ অব্দে জাপানের ৯ খানি মাত্র রণতরি ছিল। ১৮৭২ খৃঃ ২০ খানি হয়। ১৮৯৩ খৃঃ এই সংখ্যা বর্দ্ধিত হইয়া ৩২ খানিতে পরিণত হয়। গত পাঁচ বৎসর পূর্ব্বে সমগ্র রণতরির সমষ্টি ৫৯ খানি ও কামান সংখ্যা ১১৫৬টী গণিত হইয়াছিল। এই পুস্তকে বর্ত্তমান বৎসরের (১৯০৬ খৃঃ) সংখ্যা প্রদত্ত হইয়াছে।

    জাপানী নৌ-বিভাগে এডমিরাল, ভাইস এডমিরাল, রিয়ার এডমিরাল, কাপ্তেন, কমাণ্ডার, লেপ্টনেণ্ট, চিফগনার ও বােটস্ওয়েন উপাধিধারী কর্ম্মচারী আছেন। প্রথম তিন শ্রেণীর নৌ-সেনাপতিরা বৎসরে যথাক্রমে নয় হাজার, ছয় হাজার ও পাঁচ হাজার টাকা বেতন পাইয়া থাকেন। পরবর্ত্তী তিন শ্রেণীর বার্ষিক বেতন যথাক্রমে ২৫৯০৲ ১৮০০৲ ও ১৫০০৲ টাকা নির্দ্দিষ্ট আছে।

  • জাপানের নানাকথা।

    জাপানের নানাকথা।

    মুদ্রা বিভাগ।

    ১০ রিন—১ ছেন, ১০০ ছেন—১ ইয়েন। “ইয়েন” রৌপ্য মুদ্রা, ইহা ইংরেজী ২ শিলিং ·৫৮২০৭৫ পেন্সের সমান, আমাদের প্রায় ১॥৹ টাকা হইবে। “ছেন” তাম্রমুদ্রা, আমাদের এক পয়সার সমান। “রিন” দুই কড়ার তুল্য হইবে।

    ওজন প্রণালী।

    ৬ কিন—১ কোয়ান, ১৭ কোয়ান—১ পাইকল। ৪ পাইকল—১ কোকু (তরল), ১ কোকু—৪০ গ্যালন। ১ কিন ইংরেজী ·১০৩২ পাইণ্ট, আমাদের প্রায় অর্ধসের হইবে।

    জমি মাপিবার প্রণালী।

    ৬ সাকু—১ কেন, ৬০ কেন—১ চো, ৩৬ চো—১ রাই।

    ইংরেজী ·৯৯৪ ফিটে ১ মাকু হইয়া থাকে। ১ চো প্রায় ২৩৫ হস্তের সমান। এক রাই ইংরেজী দুই মাইলের উপর। অর্থাৎ আমাদের এক ক্রোশের কিছু কম হইবে।

    ডাক বিভাগ।

    ১৮৭১ খৃঃ মার্চ্চমাসে জাপানে ইয়ুরােপীয় প্রথায় ডাকঘর স্থাপিত হয়। এই বৎসরেই ডাক-আইন ও টিকিট প্রকাশিত হয়। ১৮৭৫ খৃঃ সেভিং ব্যাঙ্কের প্রথা প্রবর্ত্তিত হয়। ১৮৮৫ অব্দে রিপ্লাই কার্ডের প্রচলন হয়। এক্ষণে জাপানে একটী জেনারেল পােষ্টাফিস ৫০০০টী ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর পােষ্টাফিস ও ১৮০০টী টেলিগ্রাফ আফিস আছে। গত পূর্ব্ববর্ষে ডাক বিভাগীয় উচ্চ কর্ম্মচারির সংখ্যা ৩০০ শত, মধ্য কর্ম্মচারির সংখ্যা ১৮০০০ হাজার ও অধস্তন কর্ম্মচারির সংখ্যা ৬৬০০০ হাজার ছিল। এই বৎসরে সমগ্র রাজ্যে ৩৫ কোটী পোষ্টকার্ড ও ১৫ কোটী পত্র ব্যবহৃত হইয়াছিল। ডাক বিভাগে যত টাকা আয় হইয়া থাকে, তাহার শতকরা ৬৮ ভাগ এই বিভাগে ব্যয় নির্দ্দিষ্ট আছে। জাপানে॥৹ আউন্স ওজনের পত্রে ও ২॥ আউন্স ওজনের সংবাদ পত্রে, যথাক্রমে ৩ ছেন ও॥৹ ছেন মাশুল লাগিয়া থাকে। পােষ্টকার্ড ও রিপ্লাই কার্ডের মূল্য যথাক্রমে ১॥ ছেন ও ৩ ছেন মাত্র। বুক প্যাকেট ও নমুনা ডাকের প্রতি ৩৸ আউন্সে ২ ছেন মাশুল দিতে হয়। রেজিষ্ট্রীর জন্য ৭ ছেন ব্যয় হইয়া থাকে। পত্রাদি ব্যারিং হইলে ডবল মাশুল দিতে হয়। জাপানে ১০ ইয়েন মণিঅর্ডার করিতে হইলে ৬ ছেন কমিশন দিতে হয়। টেলিগ্রাফে প্রতি ১৫ কথায় ২০ ছেন ব্যয় হয়।

    জাপানের রেলপথ।

    জাপানের সর্ব্বপ্রথম রেলপথ ১৮৭২ খৃঃ ১২ই এপ্রেল তারিখে উদ্ঘাটিত হয়। ১৮৭৭ খৃঃ ৬৫ মাইল পথ প্রস্তুত হয়। জাপানের উন্নতিসহকারে রেলপথ ক্রমেই বৃদ্ধি হইয়া বর্ত্তমান সময়ে ৫০০০ মাইলে পরিণত হইয়াছে। পূর্ব্বে গভর্ণমেণ্টের খাসে দুইটী ও ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানীর হস্তে ৪১টি রেলপথ ছিল। সম্প্রতি সমস্তই গভর্ণমেণ্টের অধীনে আসিয়াছে। জাপানে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর গাড়ী আছে। ভাড়ার অনুপাত যথাক্রমে ৩ঃ ১′৭৫ঃ ও ১ঃ। দ্বাদশ বর্ষের ন্যূনবয়স্কদিগকে অর্দ্ধ ভাড়া দিতে হয়। চারি বৎসরের কম হইলে কিছুই দিতে হয় না। রিটর্ণ টিকিটে পূর্ণ ভাড়ার শতকরা ২% বাদ পাওয়া যায়। প্রথম শ্রেণীর টিকিটে ১০০ কিন, দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকিটে ৬০ কিন ও তৃতীয় শ্রেণীর টিকিটে ৩০ কিন ওজনের ভাড়া লাগে না। যাত্রীদিগকে নিজের সাইকেলের জন্য ভাড়া দিতে হয় না। জাপানি ট্রেণের ১ম ও ২য় শ্রেণীতে একজন করিয়া ভৃত্য অবস্থিতি করে।

    জাপান পৃথিবীর নন্দনকানন বলিয়া প্রসিদ্ধ। এইজন্য প্রাচীন ভারতীয়েরা এই দ্বীপের নাম সুদর্শন রাখিয়াছিলেন। জীবন সার্থক ও নয়ন পরিতৃপ্ত করিবার অনেক দৃশ্য এখানে দেখিতে পাওয়া যায়। ইয়াকোহামা বন্দর, হাকোন পর্ব্বতের আশাহৃদ, ফুজিসামা শৃঙ্গ, সীতা পর্ব্বতের রেলপথ, তেনারুনদীর লৌহসেতু, হামানা হৃদ, নাগােয়ার স্বর্ণভবন, ইয়ােরো জলপ্রপাত ইরামানাকা উষ্ণপ্রস্রবণ, কেনরোকু পার্ক, কিয়াটোর বংশকুঞ্জ, মিনাটোগোয়ার তীর্থ প্রভৃতি ভ্রমণকারীমাত্রেরই দ্রষ্টব্য।

    ****

    কলিকাতা হইতে প্রতি সপ্তাহেই আপকার কোম্পানীর অথবা ইন্দোচায়না কোম্পানির ডাক জাহাজ হংকং দ্বীপে গমন করিয়া থাকে। হংকং হইতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ডাক জাহাজে জাপানে গমন করা যায়। কলিকাতা হইতে হংকং, প্রথম শ্রেণীর ভাড়া ২৫০৲, দ্বিতীয় শ্রেণীর ভাড়া ২০০৲, ডেকের ভাড়া ৪৫৲ টাকা। হংকং হইতে ইয়াকোহামা, ১ম শ্রেণী ২২৭ ৷৹, জাহাজের সম্মুখবর্ত্তী কামরা ৯৮৲ এবং ডেকের ভাড়া ৩৫৲ টাকা মাত্র। ইহা ভিন্ন প্রায় এক মাসের আহারাদি আছে। কলিকাতা, ৯ নং ওলড কোর্ট হাউস স্ট্রীটে টমাস কুক এণ্ড সনের কার্য্যালয়ে টিকিট প্রভৃতি পাওয়া যায়। বােম্বাই বন্দর হইতে ও হংকং হইয়া “প্যাসিফিক মেলে” জাপানে গমন করিতে পারা যায়।1

    জাপানীরা যে প্রণালী অবলম্বন করিয়া দৈহিক বলবীর্য্য বৃদ্ধি করে, তাহার নাম “জিউ জুৎসু”। জাপানিভাষায় ইহার অর্থ পেশী বিনষ্টকরা, কিন্তু ইহার দ্বারা পেশী সমূহের পুষ্টিসাধন হয়। অতি দুর্ব্বল ও ক্ষীণকায় ব্যক্তিও ইহার অনুশীলন করিয়া বিপুল বলশালী হইতে পারে। জাপানের সৈনিক ও নাবিকদিগকে এই বিদ্যা শিক্ষা করিতে হয়। ইহাতে সর্ব্বপ্রথমে আহারের প্রতি দৃষ্টি রাখিতে হয়, পরে ফুস্‌ফুস্ ও হৃৎপিণ্ডের উন্নতিসাধন করিতে হয়। শিক্ষার্থীদিগকে অস্থিবিদ্যা ও প্রাণীবিদ্যা আলােচনা করিতে হয় এবং যােগীর ন্যায় সংযত ও শুদ্ধাচারী হইয়া বাস করিতে হয়। চারি বৎসর বিশেষ ধৈর্য্য সহকারে শিক্ষা না করিলে, এই বিদ্যায় সিদ্ধ হওয়া যায় না।2

    ****

    জাপানে “হারা-কিরি” অর্থাৎ আত্মহত্যা অত্যন্ত প্রবল। জাপানীরা অতি সামান্য কারণেই নিজের জীবন বিনষ্ট করিয়া ফেলে। তাহাদের বিশ্বাস আত্মহত্যায় ইহকালে যশঃ ও পরকালে স্বর্গলাভ হইয়া থাকে। জাপানের প্রাচীন ধর্ম্মশাস্ত্রে লিখিত আছে যে, মানবমাত্রেরই আত্মজীবন রক্ষা ও বিনষ্ট করিবার অধিকার আছে। বর্ত্তমান রাজবিধানে “হারা-কিরি” গুরুতর অপরাধ বলিয়া উক্ত হইয়াছে।

    জাপানের শিমোজ বারুদ পৃথিবীমধ্যে বিখ্যাত। জাপানী অধ্যাপক শিমোজ দীর্ঘকালব্যাপী পরিশ্রম ও পরীক্ষার পরে ইহা প্রস্তুত করেন। তাঁহারই নামানুসারে ইহার নাম শিমােজ বারুদ হইয়াছে। এরূপ অসাধারণ বিস্ফোটন-শক্তিসম্পন্ন বারুদ পৃথিবীর কোন বৈজ্ঞানিক এ পর্য্যন্ত আবিষ্কার করিতে পারেন নাই।

    জাপানী অধ্যাপক ওমােরি ভূমিকম্পের গতি ও স্থিতি পরিমাপক যে যন্ত্র প্রস্তুত করিয়াছেন, তাহা পাশ্চাত্য পণ্ডিত মিল্নির যন্ত্রাপেক্ষা বহুপরিমাণে কার্য্যকরী হইয়াছে। সম্প্রতি এই যন্ত্রের সাহায্যে সিমলাশৈল হইতে ২০০০ মাইল দূরবর্ত্তী স্থানের ভূমিকম্প অবগত হওয়া গিয়াছে।

    ১৮৯৪ অব্দের ২৯শে জুন তারিখে জাপানী অধ্যাপক কিটা সাটো হংকং দ্বীপে উপস্থিত থাকিয়া প্লেগের বীজাণু আবিষ্কার করেন। এক্ষণে পৃথিবীর সর্ব্বস্থানে কিটাসাটোর মতানুসারেই এই ভয়াবহ ব্যাধির নিদানতত্ব স্থিরীকৃত হইতেছে।

    চিকিৎসাশাস্ত্রে জাপান অনেক উন্নতি সাধন করিয়াছে। সংপ্রতি জাপানের সুবিখ্যাত চিকিৎসক ডাক্তার শিগা আমাশয় রােগের জীবাণু আবিষ্কার করিয়া পাশ্চাত্য জগতের চিকিৎসকগণকে চমৎকৃত করিয়াছেন। ডাক্তার শিগা আমাশয়গ্রস্ত রােগীর শােণিতে ঐ জীবাণু দেখিতে পাইয়াছেন। আর একজন জাপানী চিকিৎসক পশু পক্ষী প্রভৃতি জীবের অন্ত্র হইতে এক প্রকার রস প্রস্তুত করিয়াছেন, ঐ রস মুমূর্ষু রােগীর শরীরে প্রবেশ করাইয়া দিলে সেই মুমূর্ষুর জীবনীশক্তি কিয়ৎকালের জন্য সতেজ হইয়া উঠে।

    “গেইসা” জাপানের নৃত্যকারিণী রমণী। এই অপ্সরানিন্দিত সুন্দরী সঙ্গীতবালিকাগণের নৃত্য দর্শন ও গীত শ্রবণ জন্য জাপানীরা বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করিয়া থাকে। ইহাদিগের কমনীয় মুখশ্রী, বিচিত্র বেশবিন্যাস ও অঙ্গভঙ্গিমা প্রভৃতি দর্শন করিলে বোধ হয়, যেন জগতের চক্ষু পরিতৃপ্ত করিবার জন্য গেইসা সুন্দরীর সৃষ্টি হইয়াছে। গেইসাদিগের চরিত্র দূষিত নহে। ইহারা পিতা, মাতা, ভ্রাতা প্রভৃতি অভিভাবকগণের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে থাকিয়া নৃত্যগীতাদি করিয়া থাকে। উপযুক্ত সময়ে বিবাহ হইলে আর কখনও সাধারণ সমক্ষে বহির্গত হইতে বা গীতাভিনয় করিতে পারে না।

    জাপানিদিগের ভদ্রতা ও নম্রতা শিক্ষা করিবার বিষয়। তাহারা কথায় কথায় ধন্যবাদ ও নমস্কার করিয়া থাকে। গুরুজনকে আমাদের মত জানু অবনত করিয়া প্রণাম করিয়া থাকে। জাপানে মারামারি অথবা ঝগড়া বিবােধ প্রায় দেখা যায় না। জাপানী ভাষায় কুৎসিত গালাগালির প্রতিশব্দ নাই। বিশেষ রাগের কারণ হইলে লােকে “বাকা” অর্থাৎ বােকা বলিয়া গালি দিয়া থাকে। এখানে গৃহাভ্যন্তরে চর্ম্মপাদুকা লইয়া যাওয়া বিশেষ নিষিদ্ধ, এইজন্য অনেকেই বস্ত্রপাদুকা ব্যবহার করে।

    জাপানে “সাতজুমা” অর্থাৎ মল্ল উপাধিধারী একটী প্রসিদ্ধ বংশ আছে। ইহারা কুস্তিগীর পালােয়ান ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তিকে কন্যাদান করা ঘৃণার বিষয় মনে করে। ইহারা পুত্র কন্যার জন্মদিনে একটী বৃক্ষ রােপণ করিয়া থাকে, পরে সন্তানের বিবাহের সময়ে সেই বৃক্ষের কিয়দংশ ছেদন করিয়া কোন একটী গৃহসরঞ্জাম প্রস্তুত করে।

    জাপানের ন্যায় বৈদ্যবহুল দেশ সমগ্র পৃথিবীমধ্যে কুত্রাপি দৃষ্ট হয় না। জাপানি-ভাযায় হাতুড়িয়া বৈদ্যের নাম “কুইসা”; ইহাদের প্রস্তুত গণ্ডার বটিকা, মহিষমিশ্রণ, ছাগারিষ্ট, হংসরস প্রভৃতি ঔষধ, সর্দ্দিজ্বর ও বিবিধ জটিল রোগে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। জাপানী ভৈষজ্যশাস্ত্রে মৃগনাভিকেই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ঔষধ বলা হইয়াছে।

    জাপানে যে সমস্ত গল্প ও উপকথা প্রচলিত আছে, সেই সকলের মধ্যে দুই চারিটী গল্পের সহিত এ দেশীয় কোন কোন উপকথার অপূর্ব্ব ঐক্যতা পরিলক্ষিত হইয়া থাকে। উদাহরণ স্বরূপ বিহগবিহগীর (ব্যাগমাবেগমী) উপাখ্যান ও সাতভাই চম্পার কথা বলা যাইতে পারে। জাপানী উপকথায় দেব দানবের সহিত মানুষের বিবাহ, ব্যাঘ্র শৃগালাদির মানুষের রূপ ধারণ, শিয়ালভূত, মন্ত্রবলে মৃতদেহে জীবনসঞ্চারণ প্রভৃতি বহু অনৈসর্গিক কথা শ্রুত হওয়া যায়।

    ১৮৯৬ খৃঃ ১লা জুন তারিখে জাপান গভর্ণমেণ্ট যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ চীনের নিকট হইতে ফরমােসা (তৈবান) ও তৎসন্নিহিত ৭৬টী ক্ষুদ্র দ্বীপ গ্রহণ করেন। সেই সময়ে এই দ্বীপের অবস্থা যারপরনাই শােচনীয় ছিল। জাপানের সুশাসনে ফরমোসা এক্ষণে দ্বিতীয় জাপানে পরিণত হইয়াছে। বর্ত্তমান সময়ে এই দ্বীপের লােক সংখ্যা ৩০ লক্ষ ৪০ হাজার হইবে। টেহােকু, ফেলাং, কাগী, হামা প্রভৃতি প্রধান নগরে বহুসংখ্যক বিদ্যালয়, ডাক্তারখানা ও ব্যাঙ্ক প্রভৃতি স্থাপিত আছে। এই দ্বীপে ৫টি রেলপথ আছে, তাহার পরিমাণ ১৫৮ মাইল হইবে। সম্প্রতি ৮২ মাইল প্রস্তুত হইতেছে। এতদ্ভিন্ন ২০০ মাইল পথে ট্রামগাড়ী চলিতেছে। টেলিগ্রাফের দৈর্ঘ্য ২০০০ মাইল হইবে। সমগ্র দ্বীপে ১০৯টী ডাকঘর আছে। এখান হইতে প্রচুর পরিমাণে আফিং, লবণ, কর্পূর, চিনি, চাউল, কাচ, কাগজ ও কয়লা পৃথিবীর নানাস্থানে রপ্তানি হইয়া থাকে। ইহার মধ্যে প্রথম দ্রব্য তিনটীতে গভর্ণমেণ্টের একচেটিয়া আছে। এখানেও জাপানের ন্যায় ডাক্তারের বিনানুমতিতে অহিফেন সেবন করিলে দণ্ডনীয় হইতে হয়।

    বর্ত্তমান বর্ষে জাপান গভর্ণমেণ্ট ফরাষীর নিকট হইতে আলাস্কার নিকটবর্তী সেণ্ট পিরি ও অপর একটি ক্ষুদ্রদ্বীপ ক্রয় করিয়া লইয়াছেন। ইহাতে আমেরিকায় জাপানের প্রথম অধিকার স্থাপিত হইল। এইরূপ জনরব যে, ফিলিপাইন ক্রয় সম্বন্ধে মার্কিন রাজ্যের সহিত জাপানীদিগের কথাবার্ত্তা হইতেছিল, কিন্তু উভয় রাজ্যের সহিত গুরুতর মনোমালিন্য ঘটায় সে প্রস্তাব স্থগিত রহিয়াছে।

  • রুষ ও জাপান যুদ্ধের ইতিহাস।

    রুষ ও জাপান যুদ্ধের ইতিহাস।

    চীনের বক্সার বিদ্রোহ প্রশমিত হইলে, মার্কিন, জাপান ও ইয়ুরােপীয় শক্তিগণ সকলে সমবেত হইয়া অঙ্গীকার করেন যে; — আমরা বিবিধ ক্ষতিপূরণের জন্য চীন গভর্ণমেণ্টের নিকট হইতে এক শতকোটী টাকা গ্রহণ করিব; কিন্তু চীন-সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণ রাখিব। সম্মিলিত সৈন্যগণ চীনের যে সমস্ত দুর্গ ও নগরাদি অধিকার করিয়াছে, তথা হইতে ক্রমে ক্রমে সৈন্য সামন্ত উঠাইয়া লইব।

    অন্যান্য শক্তিপুঞ্জ স্ব স্ব প্রতিজ্ঞানুসারে চীনরাজ্য পরিত্যাগপূর্ব্বক স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন, কিন্তু রুষ মাঞ্চুরিয়া পরিত্যাগ করিলেন না। শক্তিনিচয়ের পুনঃ পুনঃ অনুরােধ ও ভয় প্রদর্শন স্বত্তেও তিনি আজি নয় কালি, এমাসে নয় পরমাসে ইত্যাদি বিবিধ রাজনৈতিক ছল আরম্ভ করিয়া কালবিলম্ব করিতে আরম্ভ করিলেন। কিছুদিন পরে মাঞ্চুরিয়া পরিত্যাগ করা দূরে থাকুক, রুষ গভর্ণমেণ্ট কোরিয়া রাজ্যের উপরে স্বীয় লােলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন। দেখিতে দেখিতে আলু নদীর তীরবর্ত্তী অরণ্যে কাষ্ঠছেদনের অধিকারপত্র সংগৃহীত হইল, কোরিয়ার উইজু বন্দর রুষ বন্দরে পরিণত হইল।

    রুষের এই সকল দুরভিসন্ধি দর্শনে জাপান গভর্ণমেণ্ট স্বভাবতঃই উত্তেজিত হইয়া উঠিলেন। জাপান মনে করিলেন, রুষ ত মাঞ্চুরিয়া পরিত্যাগ করিবেই না; তাহার উপরে যদি কোরিয়া রাজ্য গ্রাস করিয়া বসে, তাহা হইলে কয়েক বৎসরের মধ্যে আমারও স্বাধীনতা-গৌরব বিলুপ্ত হইয়া যাইবে। অদ্য ১৮০০ শত বৎসর ধরিয়া যে কোরিয়ার উপরে আমার অখণ্ড আধিপত্য বিদ্যমান রহিয়াছে, যাহার উপরে জাপানবাসীর জীবন মরণ নির্ভর করিতেছে, সেই কোরিয়া রাজ্য কখনও রুষিয়ার করালগ্রাসে পতিত হইতে দিব না। তাঁহারা স্থির করিলেন, যদি দুরাকাঙ্খ রুষ, ন্যায়, ধর্ম্ম ও যুক্তির মস্তকে পদাঘাত পূর্ব্বক পররাজ্য গ্রাস করিতে প্রবৃত্ত হয়, তাহা হইলে আমরা “নিপনের” আজন্মস্বাধীনতাগৌরব রক্ষার জন্য ঈশ্বরের মহামহিমামণ্ডিত নাম স্মরণ করিয়া ধর্ম্মযুদ্ধে অগ্রসর হইব।

    গত ১৯০৩ অব্দের ২৩শে জুন তারিখে টোকিওর মন্ত্রণামন্দিরে রুষদুত ব্যারণ রােসেনের সহিত জাপানের পররাষ্ট্র সচিব ব্যারণ কমুরা মহাশয়ের প্রবল বাক্‌যুদ্ধ উপস্থিত হয়। সপ্তমাস ব্যাপী তর্ক বিতর্কের পর খ্রীষ্টধর্ম্মপরায়ণ জার মহােদয় প্রকাশ করিলেন যে;—মানচুরিয়া সম্বন্ধে আমি জাপানের কোন কথা শুনিব না। কোরিয়ার ১/৩ অংশ নিরপেক্ষ থাকিবে, অবশিষ্টাংশে রুষাধিকার বিস্তৃত হইবে। ২২শে ডিসেম্বর তারিখে জাপান উত্তর দিলেন:— না, তাহা হইবে না। রুষকে কোন নির্দ্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানচুরিয়া পরিত্যাগ করিতে হইবে। কোরিয়ায় জাপানের ক্ষমতা অক্ষুন্ন থাকিবে। ৬ই জানুয়ারি তারিখে রুষ রাজনৈতিক ভাষায় মানচুরিয়ায় জাপানের স্বত্ব স্বীকার করিলেন, কিন্তু কোরিয়া সম্বন্ধে নিজাভিপ্রায় পূর্ব্বমত বলবৎ রাখিলেন। ১৩ই জানুয়ারি তারিখে জাপান আপনার শেষ অভিপ্রায় ব্যক্ত করিয়া কহিলেন, মানচুরিয়ায় যাহাতে সমস্ত জাতিই স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করিতে পারে তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে; কোরিয়ায় জাপানের প্রভুত্ব ও বাণিজ্যাধিকার অব্যাহত থাকিবে। ইহার পরে দ্বাবিংশতি দিবস অতিবাহিত হইল, তথাপিও রুষ গভর্ণমেণ্ট কোন উত্তর প্রদান করিলেন না। এই ঘটনায় জাপানের মনে রুষের দুরভিসন্ধি সম্বন্ধে গভীর সন্দেহের উদয় হইল। অতঃপর তাঁহারা আর কালবিলম্ব অনুচিত মনে করিয়া, ৬ই ফেব্রুয়ারি তারিখে রুষিয়ার সহিত সমস্ত রাজনৈতিক সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিলেন।

    এইরূপে রুষের চাতুর্য্য, স্বার্থপরতা, দুরাকাঙ্ক্ষা ও পররাজ্যগ্রাসস্পৃহার বিষময়ফলে সুদূর প্রাচ্য ভূখণ্ডে লোক-ভয়ঙ্কর ভীষণ সমরানল প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল।

    জলযুদ্ধ।

    গত ১৯০৪ অব্দের ৮ই ফেব্রুয়ারি তারিখে রাত্রি দ্বিপ্রহরের সময়ে রুষ জাপানে প্রকৃত যুদ্ধারম্ভ হয়। তদবধি সন্ধিপত্র স্বাক্ষর পর্য্যন্ত সমুদ্রবক্ষে যতগুলি ভীষণ যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে, তাহার প্রত্যেকটীতেই জয়লক্ষ্মী জাপানের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন করিয়াছেন। এই কালসমরে রুষিয়ার জলবল সম্পূর্ণ নির্ম্মূল হইয়া গিয়াছে। রুষের কি সর্ব্বনাশ হইয়াছে, তাহা নিম্ন প্রদর্শিত তালিকা পাঠ করিলে সহজেই হৃদয়গম্য হইবে।

    যুদ্ধের পূর্ব্ব দিবস পর্যন্ত সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরে রুষিয়ার এই কয়েকখানি রণতরি বিদ্যমান ছিল,—

    আর্থার বন্দরে (যুদ্ধজাহাজ) জারউইচ্ B, রেট্ভিসান C, সিবাষ্টপোল G, পোলটাবা G, পারচ্ভিট G, পোবিডা, G, পেট্র পেবলস্কি A।

    (লৌহমণ্ডিত রণতরি) বেয়ান E।

    (রক্ষিত রণতরি) আস্কল্ড C, নভিক E, ডিয়ানা D, পালাডা G, বেরিন E।

    কোরিয়ার উপকূলে;—(রক্ষিত রণতরি) ভেরিয়াগ E, কোরিজ E।

    ভ্যালাডিভােষ্টক বন্দরে (লৌহমণ্ডিত রণতরি) গ্রোমোবিয়া রসিয়া F, রুরিক E, বগাটির F।

    উপরােক্ত প্রথমশ্রেণীর রণতরিসমষ্টির মধ্যে A চিহুিত জাহাজ খানি জাপানের আগ্নেয়যন্ত্রে পড়িয়া ৭০০ সৈন্য ও প্রচুর যুদ্ধোপকরণসহ সাগরগর্ভে প্রবিষ্ট হইয়াছে। এই জাহাজে সুপ্রসিদ্ধ নৌ-সেনাপতি ম্যাকারফ্ ও জগদ্বিখ্যাত চিত্রকর ভেরেটসাগীন অবস্থিত ছিলেন।

    B চিহ্নিত জাহাজখানি চীনের কিয়াচিউ বন্দরের সন্নিকটে জলমগ্ন হয়। ইহাতে সেনাপতি উইটগার্ট, দুইশতাধিক সৈন্যসহ মৃত্যু মুখে পতিত হইয়াছিলেন।

    C চিহ্নিত অস্কল্ড চীনের উসাং বন্দরে ভগ্নাবস্থায় বন্দী হয়।

    D চিহ্নিতখানি ফরাসী অধিকৃত সৈগন বন্দরে বন্দী হয়।

    E চিহ্নিত রণতরি ছয়খানি জাপানের গােলা ও টর্পেডোর আঘাতে প্রচুর সৈন্য ও যুদ্ধোপকরণ সহ সাগরসলিলে নিমগ্ন হয়।

    F চিহ্নিত তরণীদ্বয় দ্রুত পলায়নকালে সমুদ্রমধ্যস্থ পর্ব্বত চুড়ায় আহত হইয়া জলমগ্ন হয়।

    G চিহ্নিত প্রথম শ্রেণীর রণতরি ছয়খানি আর্থার বন্দরে জলমগ্ন হইয়া জাপানিদিগের হস্তে পতিত হয়।

    এতদ্ভিন্ন এনিসি, ষ্টিরিগাছি, বুনি, রেষ্ট্রফনি প্রভৃতি অনেকগুলি কামানবাহী ও টর্পেডো ধবংসিণীতরণী বিনষ্ট ও নিরপেক্ষ বন্দরে বন্দী হয়। রেসিটেলনী, মঙ্গোলিয়া প্রভৃতি কয়েকখানি জাপানীরা কাড়িয়া লয়।

    উপরােক্ত রণতরি সকলের মূল্য ত্রিংশতি কোটী টাকার ন্যূন হইবে না।

    এই যুদ্ধে জাপানের হ্যাট্‌সুজ নাম্নী যুদ্ধজাহাজ, যশিনো নাম্নী রক্ষিত রণতরি ও কয়েকখানি টর্পেডো বােট জলমগ্ন হইয়াছিল।

    স্থলযুদ্ধ।

    রুষজাপান সমরে যতগুলি উল্লেখযােগ্য যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে, তাহার সকলগুলিতেই জয়লক্ষ্মী রুযিয়ার প্রতি কার্পণ্য প্রকাশ করিয়াছেন। কি আলুতীরে, কি দুরারােহ ন্যান্সান পর্ব্বতে, কি ওয়েফ্যানকু প্রান্তরে, কি সুরক্ষিত কেইপিং নগরে, কি দুর্গম মটিয়েন গিরিপ্রদেশে, কি ট্যাসিচিও ক্ষেত্রে, সর্ব্বস্থানেই রুষ সৈন্য পরাজিত ও বিতাড়িত হইয়াছে। দ্রুত পলায়ন ব্যপদেশে রুষ সেনাপতিরা প্রতিযুদ্ধেই বহু সংখ্যক কামান, বহু সহস্র বন্দুক, প্রচুর যুদ্ধোপকরণ ও বহু পরিমাণ খাদ্যাদি পরিত্যাগ পূর্ব্বক ও সগৌরবে পলায়ন করিতে বাধ্য হইয়াছেন। রুষ সেনানী ও সৈনিকগণ প্রকৃত বীরের ন্যায় প্রাণপণে যুদ্ধ করিয়াও এই ছয়টী যুদ্ধ ক্ষেত্রের কোন স্থলেই সফলকাম হইতে পারেন নাই। তাঁহারা প্রতি যুদ্ধেই জীবনে উপেক্ষা, অপূর্ব্ব বুদ্ধিমত্তা ও বীরত্বের পরকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াও নিষ্ঠুর অদৃষ্ট দেবীর চিত্ত বিনােদনে সমর্থ হয়েন নাই।

    সপ্তম যুদ্ধ পৃথিবীর সমরেতিহাসে লেয়ং যুদ্ধ নামে অভিহিত হইয়াছে। ইহাই বিংশ শতাব্দীর সর্ব্বপ্রথম প্রধান যুদ্ধ। রুষ সেনাপতি কুরােপাট্‌কিন, সার্দ্ধ দ্বিলক্ষ প্রথম শ্রেণীর সৈন্য ও ষষ্ঠ শতাধিক কামান লইয়া লেয়ং নগরে অবস্থিতি করিতে ছিলেন। নদী, পর্ব্বত, প্রাচীর ও পরিখা প্রভৃতিতে এই নগরী স্বভাবতঃই দুর্ভেদ্য ও দুরাক্রম্য ছিল, তাহার উপরে রুষদিগের ষষ্ঠ মাসব্যাপী বিপুল অধ্যবসায় ও অসামান্য চেষ্টায় লেয়ং নগরী একটী অজেয় দুর্গে পরিণত হইয়াছিল। ফলতঃ মহাযুদ্ধ হইবার আশঙ্কায় কুরোপাট্‌কিন তাঁহার অবস্থান সুরক্ষিত করা সম্বন্ধে কোন অংশই অসম্পূর্ণ রাখেন নাই।

    হায়! তথাপিও তাঁহাকে ভীষণ পরাজয় সহ্য করিতে হইয়াছিল; তথাপিও তাঁহাকে লজ্জারক্ত বদনে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিয়া আত্মরক্ষা করিতে হইয়াছিল। আমেরিকা, জাপান ও বিলাতী পত্র সম্পাদকেরা কুরােপাটকিনের এই অদ্ভুত পলায়ন বর্ণনায় সহস্রমুখ হইলেও, ফরাসী, জার্ম্মাণ ও রুষ পত্র-সম্পাদকেরা অণুমাত্র আনন্দ প্রকাশ করেন নাই। এই পৃষ্ঠপ্রদর্শন ব্যাপারে রুষ জনসাধারণ কোনরূপ আনন্দ করিবার অবসর পায় নাই; জার মহোদয় ও মন্ত্রিগণের পরাজয়মলিনবদনমণ্ডলে কোনরূপ আনন্দ চিহ্ন প্রকটিত হয় নাই। যে দাম্ভিক সেনাপতি তিনলক্ষ মাত্র সৈন্য লইয়া যুদ্ধারম্ভের ছয় মাস মধ্যেই টোকিওর নন্দন কাননে প্রবেশ করিতে বাসনা করিয়াছিলেন, তাঁহার অপূর্ব্ব বীরত্ব পুনঃ পুনঃ পলায়ন কৌশলে পর্য্যবসিত হইতে দেখিয়া আমরাও আনন্দ লাভ করিতে পারি নাই। এই যুদ্ধের ভয়াবহ ফলে বিচলিত হইয়া, কুরোপাট্‌কিনকে পরােক্ষে তিরস্কার করিবার ব্যপদেশে জার মহােদয় সেনাপতি গ্রিপেনবার্গকে স্বাধীন ক্ষমতা প্রদান করিয়া মাঞ্চুরিয়ার দ্বিতীয় সেনাপতি পদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন।

    রুষ পক্ষের হিসাবে লেয়ং যুদ্ধে প্রায় ৩০ হাজার রুষ সৈন্য হতাহত হয়। জাপানের হতাহতের সংখ্যা চল্লিশ সহস্রের ন্যূন হইবে না। এই যুদ্ধে ১৩ জন রুষ সৈন্য ও ৩০ টী যুদ্ধাশ্ব জাপানের বন্দী হয়। এতদ্ব্যতীত ৪০০০ বন্দুক, ১৬ লক্ষ টোটা, ১০ হাজার শেলগােলা, ১২ শত শকট, ১৬ হাজার খনন যন্ত্র, ৫৬০ লাঙ্গল, ২৫০০ কুঠার, ৬৪০০ জামা, ১৯ হাজার টিন মাংস ও প্রচুর রেলসরঞ্জাম জাপানের হস্তগত হয়।

    অষ্টম যুদ্ধ “সা” নদীর তীরদেশে সংঘটিত হওয়ায় সা-হো-যুদ্ধ নামে প্রসিদ্ধ হইয়াছে। এই যুদ্ধে সেনাপতি কুরোপাট্‌কিন তিন লক্ষ সৈন্য লইয়া বিপুল বিক্রমে জাপানবাহিনীকে আক্রমণ করিয়া ভীষণ পরাজয় সহ্য করেন। ইতিপূর্ব্বে কোন যুদ্ধেও রুষের এরূপ পরাজয় হয় নাই। ইয়ুরােপের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ সেনাপতি সাহো যুদ্ধের ভীষণ পরিণাম দৃষ্টি করিয়া পূর্ব্ব্যভ্যস্থ কৌশল অবলম্বন পূর্ব্বক নিজ গৌরব রক্ষা করেন। এই যুদ্ধে ৭০৯ জন রুষ সৈন্য জাপানের বন্দী হয়। সমরক্ষেত্রে জাপানী শববাহকেরা পঞ্চদশ সহস্র মৃত রুষসৈন্যের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করে। এতদ্ব্যতীত ৪৫টী কামান, ৫৪০০ বন্দুক, ৭৮ হাজার টোটা ও ৭ হাজার বড় গােলা বিজয়ী জাপানিগণের হস্তগত হয়। অনেকের অনুমান এই যুদ্ধে এক লক্ষ রুষ সৈন্য হতাহত হইয়াছিল।

    সাহো যুদ্ধে জাপানী সৈন্যেরও সামান্য ক্ষতি হয় নাই। এই যুদ্ধে ৩০ হাজার জাপানী সৈন্য হতাহত ও ১২টী কামান রুষের অধিকৃত হইয়াছিল।

    নবম যুদ্ধ ২য় সাহােযুদ্ধ বা হিকণ্টাইয়ের যুদ্ধ নামে অভিহিত হইয়াছে। গত পূর্ব্ব ২৫শে জানুয়ারি দ্বিতীয় রুষ সেনাপতি গ্রিপেনবার্গ বিপুল সৈন্য লইয়া অতর্কিতভাবে জাপানবাহিনীর বামভাগ আক্রমণ করেন। প্রথম চারি দিবসের যুদ্ধ দর্শনে অনেকেরই ধারণা হইয়াছিল যে, বুঝি এতদিনে জয়লক্ষ্মী রুষের প্রতি অনুকূলা হইলেন। কিন্তু তাহা হইল না, রুযিয়ার দগ্ধ অদৃষ্টে সে শুভ মুহূর্ত্ত আসিয়াও আসিল না। সেনাপতি ওয়ামার অপূর্ব্ব নেতৃত্ব কৌশলে চতুর্থ রজনীতে যুদ্ধের গতি সম্পূর্ণ নূতনাকার ধারণ করিল, তাহার ফলে প্রভাতের পূর্ব্বেই রুষের পূর্ণ পরাজয় হইল।

    এইরূপ প্রকাশ, এই যুদ্ধে ৩৬ সহস্র রুষসৈন্য ও সাত সহস্র জাপানী সৈন্য হতাহত হইয়াছিল।

    পরাজয়ের হেতু নির্দ্দেশ করিতে যাইয়া গ্রিপেনবার্গ বলিয়াছেন;—কুরোপাট্‌কিন যথা সময়ে সৈন্য সাহায্য করিলে, তাঁহাকে এরূপ পরাজয় সহ্য করিতে হইত না। কুরােপাট্‌কিন বলেন, গ্রিপেনবার্গ তাঁহার সহিত কোনরূপ পরামর্শ না করিয়া মহাযুদ্ধ সংঘটনপূর্ব্বক ভীষণ পরাজয় সহ্য করিয়াছিলেন।

    আর্থার বন্দর অধিকার পৃথিবীর সমর ইতিহাসে এক অপূর্ব্ব কীর্ত্তি। জাপানীরা ২৩৩ দিনব্যাপী অবরোধ করিয়া, বহু সৈন্য উৎসর্গ করিয়া ১৯০৫ খৃঃ ১লা জানুয়ারি তারিখে অজেয় আর্থার দুর্গে মিকাভাের সূর্য্যাঙ্কিত বিজয় বৈজয়ন্তী উড্ডীন করিতে সমর্থ হয়। এই বন্দর অধিকার করিতে জাপানীরা যে অসাধারণ সহিষ্ণুতা, বিপুল অধ্যবসায় ও অদ্ভুত শৌর্য্য প্রদর্শন করিয়াছে, জগতের ইতিহাসে তাহার তুলনা নাই।

    রুষ সেনাপতি মহাবীর ষ্টোসেল প্রতিজ্ঞাপূর্ব্বক বলিয়াছিলেন, একজন মাত্র রুষসৈন্য জীবিত থাকিতে, রুষের ধমনীতে বিন্দুমাত্র শােণিত থাকিতে আমি আত্মসমর্পণ করিব না।” অবশেষে সেই কঠোর কর্ম্মা সেনাপতি নিরুপায় হইয়া, দুঃখে, ক্ষোভে, অভিমানে জাপান সেনাপতিকে বলিয়াছিলেন,—”নগী! আর নয়, আমরা আত্মসমর্পণ করিতেছি।”

    ১৯০৫ খৃঃ ১লা জানুয়ারি তারিখে আর্থার বন্দরস্থিত কি সেনা, কি সামরিক কর্ম্মচারী সকলেই জাপানের নিকটে আত্মসমর্পণ করেন। ইহাতে বন্দরের সমস্ত দুর্গ, গােলাগুলি, বারুদ, বন্দুক, কামান, রণতরি ও বিবিধ বাণিজ্যজাহাজনিচয় জাপান গভর্ণমেণ্টের হস্তগত হয়। দশ বৎসর পূর্ব্বে রুষ যে সম্পত্তি অম্লানবদনে জাপানের নিকট হইতে কাড়িয়া লইয়াছিল, জাপান সেনাপতি নগী কেবলমাত্র জাপানী সেনার সাহায্যে সেই সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করিয়াছেন। কেন জাপানের যশােনিনাদে দিঙ্মণ্ডল প্রতিধ্বনিত হইবে না?

    রুষ কর্ম্মচারিগণ দুর্গরক্ষায় বিশেষ বীরত্ব প্রকাশ করায়, জাপান সেনাপতি প্রস্তাব করেন, যে সমস্ত রুষ কর্ম্মচারী শপথ করিয়া বলিবেন, “আর কখনও জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিব না” তাঁহারা রুষিয়ায় প্রত্যাবর্ত্তন করিতে অধিকার পাইবেন। এই রূপ শপথ করিয়া মহাবীর ষ্টোশেল, ৪৪১ জন কর্ম্মচারী ও ২২৯ আরদালীসহ মুক্তিলাভ করিয়াছিলেন। অবশিষ্ট ৪৩ জন কর্ম্মচারী ও ২৩৪৯১ জন সৈনিক বন্দী হইয়া জাপানে প্রেরিত হয়।

    সৈন্য ও কর্ম্মচারী ব্যতীত, বিজয়ী জাপান সেনাপতি আর্থার বন্দরে ৫৯টী স্থায়ী দুর্গ, ৫৪৬টী কামান, ৩৫ হাজার বন্দুক, ৮২ হাজার শেলগােলা, ১৯ লক্ষ মণ কয়লা, ৪ খানি যুদ্ধ জাহাজ, ২খানি লৌহমণ্ডিত রণতরি, ১৪ খানি টর্পেডো তরণী, ১০ খানি বাণিজ্য জাহাজ, ৩৫ খানি কলের জাহাজ ও প্রচুর রেল সরঞ্জাম প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।

    দশম যুদ্ধ মুকদেন যুদ্ধ নামে প্রসিদ্ধ হইয়াছে। এই মহাযুদ্ধে জাপানের সুসন্তান মার্শাল ওয়ামা যে অপূর্ব্ব কৃতিত্ব ও অসাধারণ রণচাতুর্য্যের পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন, পৃথিবীর সমরেতিহাসে তাহার তুলনা নাই। আজি জাপান সৈনিকের অনন্যসাধারণ শৌর্য-বীর্য্য দর্শন করিয়া, আমেরিকা স্তম্ভিত, ইউরােপ ভীত, এসিয়া পরমানন্দে বিমােহিত। প্রশান্ত মহাসাগরে রুষের জলবল পূর্ব্বেই নির্ম্মূল হইয়া যায়, তাহার পরে মানচুরিয়ার বিস্তৃত সমরপ্রাঙ্গনে স্থলবলও এক রূপ ধ্বংশ হইয়া গেল। বহুবর্ষ ধরিয়া, বহু কোটী মুদ্রা ব্যয় করিয়া, রুষ সমগ্র এসিয়ায় একাধিপত্য বিস্তারের যে কল্পনা করিতেছিলেন, আজি জাপানের প্রচণ্ড বিক্রমে সে কল্পনাজাল সহসা ছিন্ন হইয়া গিয়াছে। হায়! অদৃষ্টের কি কঠোর উপহাস!

    আর ইউরােপের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ সেনাপতি মহাবীর কুরােপাট্‌কিন! যিনি একদা টোকিওর নন্দন কাননে দৈত্যপতির ন্যায় বিচরণ করিতে বাসনা করিয়াছিলেন, মুকদেন যুদ্ধে তাঁহার সমস্ত আশাভরসা, তেজ, গর্ব্ব বিনষ্ট হইয়া গেল। এই মহাযুদ্ধের ভয়াবহ ফলে বিচলিত হইয়া, জার মহােদয়, সেনাপতি লিনিভিচকে মানচুরিয়ার প্রধান সেনাপতিপদে নিযুক্ত করেন। হায়! নিষ্ঠুর অদৃষ্ট।

    রুষপক্ষ হইতে প্রকাশ, সাহাে মুকদেন যুদ্ধে প্রায় দুই লক্ষ রুষ সৈন্য হত, আহত ও বন্দী হইয়াছে এবং প্রায় ৫০০ শত কামান জাপানের হস্তগত হইয়াছে।

    এইরূপ প্রকাশ, এই যুদ্ধে যে সমস্ত সমরোপকরণ ও রসদাদি জাপানের হস্তগত হইয়াছে, তাহার কিয়দ্দংশ শকটপূর্ণ হইয়া স্থানান্তরে প্রেরণ কালে ১২ মাইল পথ আচ্ছন্ন হইয়াছিল।

    মার্শাল ওয়ামার রিপোর্টে প্রকাশ, এই মহাসমরে জাপানের হতাহতের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার হইয়াছিল।

    মুকদেন যুদ্ধের পরে, টিলিং, সিংহিং প্রভৃতি স্থানে যে সকল যুদ্ধ হইয়াছিল তাহার সকল গুলিতেই রুষিয়ার শােচনীয় পরাজয় হয়। পৃথিবীর সমরেতিহাসে এরূপ ধারাবাহিক পরাজয়ের কথা শ্রুত হওয়া যায় নাই।

    বাল্টিক নৌ-বাহিনীর পরিণাম।

    জাপানিদিগকে উপর্য্যুপরি জয়লাভ করিতে দেখিয়া রুষ সম্রাট এডমিরাল রোজ্ডেজ্ভেনস্কির অধীনে বাল্টিক সাগরস্থিত নৌ-বাহিনীকে সুসজ্জিত করিয়া জাপানযুদ্ধে প্রেরণ করেন। এই বিপুল-বাহিনী যখন ইংরেজের কয়েকখানি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অর্ণবপােত বিনষ্ট করিয়া আটলাণ্টিকবক্ষঃ আলােড়িত করিতে করিতে প্রাচ্য সমুদ্রাভিমুখে ধাবিত হইল,তখন অনেকেই জাপানের পরিণাম ভাবিয়া আকুল হইয়াছিলেন। এই সময়ে জার্ম্মানি, ফরাসী প্রভৃতি নিরপেক্ষ শক্তিপুঞ্জেরা বিবিধ উপায়ে রুষিয়ার সাহায্য করিয়াছিলেন। অধিক কি, ইংরেজ বণিকেরা পর্য্যন্ত প্রকারান্তরে এই বিরাটবাহিনীর আবশ্যকীয় ইন্ধনাদি সংগ্রহে সহায়তা করিয়াছিলেন। এই সমস্ত ঘটনায়, বিশেষতঃ যখন রুষবাহিনী চীনসাগর অতিক্রম করিয়া জাপানের নিকট দিয়া উত্তরাভিমুখে অগ্রসর হইল, অথচ জাপানী নৌ-সেনাপতি টেগো শত্রুর গতিরোধ জন্য কোনপ্রকার চেষ্টা করিলেন না, তখন জাপানের জয় সম্বন্ধে সকলেরই অন্তঃকরণে দারুণ সন্দেহ উপস্থিত হইল। কিন্তু হায়! এত চেষ্টা ও আড়ম্বর স্বত্ত্বেও রুষিয়ার দগ্ধাদৃষ্টে পুনরায় দারুণ পরাজয় ঘটিল, জগতে পুনরায় অধর্ম্মের পরাজয় ও ধর্ম্মের জয় বিঘােষিত হইল।

    জাপান ও কোরিয়া প্রায়দ্বীপের মধ্যে কোরিয়া প্রণালী অবস্থিত। গত ১৯০৫ অব্দের ২৭ মে শনিবার তারিখে রুষ নৌ-বাহিনী চারিভাগে বিভক্ত হইয়া এই প্রণালীতে প্রবিষ্ট হইবামাত্র জাপানী নৌ-বাহিনী কর্ত্তৃক আক্রান্ত হয়। শনিবার প্রাতঃকাল হইতে আরম্ভ হইয়া সােমবার প্রাতঃকাল পর্যন্ত যুদ্ধ হইয়াছিল। প্রথম দ্বাদশ ঘণ্টার মধ্যেই রুষবাহিনী বিধ্বস্ত হইয়া ইতস্ততঃ পলায়ন করিতে আরম্ভ করে। পরে নৈশযুদ্ধে জাপানের টর্পেডাের আঘাতে তাহাদের শােচনীয় সর্ব্বনাশ সাধিত হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত শত্রুপক্ষ সম্পূর্ণ পরাস্থ না হইয়াছিল, ততক্ষণ জাপানী সৈন্যেরা বিন্দুমাত্র শৈথিল্য প্রকাশ করে নাই।

    এই কালসমরে রূষপক্ষের রিয়াজসুভায়ফ, আলেকজেণ্ডার, বেরিডিনো, ডিমিট্রি, নাচিমহফ্, ভ্যালাডিমির, মনােমাক, জামযুগ, উষাহফ্,অসলিয়া, নাভারিণ, আলমাজ প্রভৃতি রণপােতগুলি কোরিয়া প্রণালীস্থিত সুসীমা দ্বীপের নিকটে জলমগ্ন হয়। নিকোলাস, ওরেল, আপ্রাকসিন, সেনিয়াভিন ও চিভােডি এই পাঁচখানি রণতরি বিজয়ী জাপানিদিগের হস্তগত হয়।

    এই সমস্ত রণতরিগুলির মূল্য বিংশতি কোটী টাকার ন্যূন হইবে না।

    এই মহাযুদ্ধে জাপানীপক্ষের তিনখানি টর্পেডো তরণী বিনষ্ট ও ৪০০ লােক হতাহত হয়। এইরূপ প্রকাশ যে যুদ্ধ পরিচালন কালে সেনাপতি টেগো ও এডমিরাল যিশু সামান্য আঘাত প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।

    এই যুদ্ধে ৫৫০০ শত রুষসেনার সহিত প্রধান সেনাপতি রােজডেজভেনস্কি, নেবােগেটফ্, ফোকর্সাম ও বোট্রোভােস্কি জাপানের বন্দী হন।

    অতিদর্পে লঙ্কেশ্বর রাবণ বিনষ্ট হইয়াছিলেন, অতিশয় অভিমানে কুরুপতি দুর্য্যোধনের সর্ব্বনাশ হইয়াছিল, আর অতিলােভে রুষ সম্রাট নিকোলাস হতমান, নষ্টগৌরব ও ভগ্নমনোরথ হইলেন। অর্দ্ধ ইউরােপ ও অর্দ্ধ এসিয়া যাঁহার পদানত এই যুদ্ধ ফলে সেই রুষসম্রাটকে জাপানের ইচ্ছানুসারে সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করিতে হইল। ধনবল, বাহুবল, লােকবলের অপেক্ষা যে ধর্ম্মবল কত শ্রেষ্ঠ তাহা তিনি জানিতেন না। অর্দ্ধ পৃথিবীর অপ্রিয় অধীশ্বরের অপেক্ষা ক্ষুদ্রদ্বীপের প্রিয় সম্রাট যে কত শক্তিশালী, জার মহােদয় এই যুদ্ধে তাহা সম্যক্‌ হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইয়াছেন।

    জাপানের এই অশ্রুতপূর্ব্ব জয়লাভে আজ আমরা আনন্দিত; কোন্ প্রাচ্যজাতি প্রাচ্যজাতির জয়লাভে আনন্দ ও গর্ব্ব অনুভব না করিবে? জাপান গত মহাযুদ্ধে পাশ্চাত্য মােহ-জাল ছিন্ন করিয়া প্রাচ্যজগতের মুখােজ্জ্বল করিয়াছে। সেই জন্যই আমাদের আনন্দ। কিন্তু প্রবল প্রতাপ রুষ সম্রাটের অবস্থা স্মৃতিপথে উদিত হইলে আমরা দুঃখে ম্রিয়মাণ হই। ভারতবর্ষের ভীষণ দুর্ভিক্ষের সময়ে রুষিয়া নানাপ্রকারে আমাদিগকে সাহায্য করিয়াছিল, সুতরাং আমরা রুষিয়ার নিকটও কৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ। রুষ সম্রাট নিকোলাস আমাদের ভারত সম্রাট সপ্তম এডোয়ার্ডের নিকট আত্মীয়, সেজন্যও আমরা তাঁহার বিপদে দুঃখিত। কিন্তু তিনি যদি আমাদিগকে বিপদকালে সাহায্য না করিতেন, অথবা তিনি আমাদের রাজরাজেশ্বরের আত্মীয় না হইতেন, তথাপি আমরা তাঁহার এই দুর্দ্দশায় দুঃখিত হইতাম। প্রবল পরাক্রান্ত সম্রাটকে, ধুল্যবলুণ্ঠিত দেখিলে কাহার হৃদয়ে বিষাদের ছায়া পতিত না হয়? প্রবল ভূমিকম্পে গগণস্পর্শী অট্টালিকা ভূমিশায়ী হইলে কে তাহা অবিচলিত চিত্তে দর্শন করিতে পারে?

    ****

    গত রুষজাপান যুদ্ধে যে সমস্ত খ্যাতনামা রুষ সেনাপতিগণের দারুণ ভাগ্যবিপর্যয় ঘটিয়াছিল, নিম্নে তাঁহাদের একটী তালিকা প্রদান করা হইল।

    স্থল সেনাপতি।

    (জেনারল উপাধিধারী যে ২৮ জন যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন)

    1. ষ্টোশেল … বন্দী
    2. গ্রিপেনবার্গ অপমানিত হইয়া প্রত্যাবর্ত্তন।
    3. আরলফ্‌ ঐ
    4. ট্রুসক্‌ ঐ
    5. কেলার যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত।
    6. কোণ্ড্রোচেনকো ঐ
    7. জারপিটসি ঐ
    8. রিয়ালিনকিন ঐ
    9. স্নোলেনস্কি ঐ
    10. রটকোভোস্কি নিহত
    11. স্মারনফ্ বন্দী
    12. রেচ টালিনিষ্কি ঐ
    13. প্লাগ ঐ
    14. বিলি ঐ
    15. গোরবাটকোভোস্কি ঐ
    16. নিকিটিন ঐ
    17. ফক বন্দী
    18. ক্রোণ্ডাভিচ সাংঘাতিক আহত।
    19. কাসাটালিনিস্কী আহত।
    20. সাসুলিচ পদানত।
    21. স্কাকেলবার্গ আহত।
    22. রেনেন ক্যাম্প ঐ
    23. মিচচেন্‌কো ঐ
    24. কুরোপাটকিন্‌ পদাবনত।
    25. বিলডারিং ঐ
    26. লিনিভিচ্ উন্নতিলাভ করিয়া যুদ্ধ শেষ পর্য্যন্ত ছিলেন।
    27. কাবলারস্ যুদ্ধ শেষ পর্য্যন্ত স্বপদে ছিলেন।
    28. সাকারফ্ ঐ

    জল সেনাপতি

    (এডমিরাল উপাধিধারী যে ১৬ জন যুদ্ধে নিযুক্ত হন)

    1. এলেকসিফ অপমানিত হইয়া প্রত্যাবর্ত্তন।
    2. ষ্টার্ক ঐ
    3. স্ক্রাইডলফ্ ঐ
    4. বেজোব্রাজফ ঐ
    5. উখ্‌টোমস্কি বন্দী
    6. উইরেণ ঐ
    7. লচচিনিস্কি ঐ
    8. গ্রিগোরিভিচ ঐ
    9. রোজডেজভেস্কি বন্দী
    10. ফোকেরশাম ঐ
    11. বোট্রোভোস্কি ঐ
    12. ম্যাকারফ্‌ নিহত।
    13. নেবোগেটফ্ ঐ
    14. মোলাস্ ঐ
    15. উইটগেট্ ঐ
    16. জেসুরু যুদ্ধ শেষ পর্য্যন্ত ভ্যালিডিভোষ্টকে ছিলেন।

    রুষ জাপান সন্ধি।

    বাল্টিক নৌ-বাহিনীর শােচনীয় পরিণাম সন্দর্শন করিয়া আমেরিকার যুক্তরাজ্যের প্রেসিডেণ্ট রুজভেল্ট মহােদয় ১৯০৫ অব্দের ৯ই জুন তারিখে যুযুৎসু জাতিদ্বয়ের নিকটে সন্ধির প্রস্তাব করেন। তদনুসারে রুষপক্ষে কাউণ্ট ডি-উইটী ও জাপান পক্ষে ব্যারণ কমুরা সন্ধিদূত নিযুক্ত হইয়া, আমেরিকার পাের্টসমাউথ নগরে গমন করেন। ১০ই আগষ্ট তারিখে সন্ধির প্রথম অধিবেশন হয়। প্রায় এক মাসকালব্যাপী প্রবল তর্ক বিতর্কের পরে ৫ই সেপ্টেম্বর তারিখে উভয় পক্ষ সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করিয়া, বিংশশতাব্দীর প্রথম যুদ্ধের অবসান করেন।

    নিম্নে সন্ধির যাবতীয় স্বত্ত্বগুলি ধারাবাহিকরূপে সঙ্কলিত হইল।

    1. যুদ্ধের ক্ষতিপূরণজন্য জাপান গভর্ণমেণ্ট রুষিয়ার নিকটে অর্থরূপে কিছু গ্রহণ করিবেন না। যে সমস্ত রুষ সৈন্য বন্দী হইয়া জাপানে অবস্থিতি করিতেছে, তাহাদের জন্য যে টাকা ব্যয় হইয়াছে, জাপান তাহা প্রাপ্ত হইবেন।
    2. রুষাধিকৃত সাগেলিয়ন দ্বীপ সমান দুই অংশে বিভক্ত করিয়া, তাহার দক্ষিণার্দ্ধ জাপান গ্রহণ করিবেন। এই অর্দ্ধাংশে জাপান গভর্ণমেণ্ট স্থায়ীভাবে কোন দুর্গাদি নির্ম্মাণ করিবেন না। যেশাে ও সাগেলিয়ান দ্বীপের মধ্যবর্তী লাপিরুজ প্রণালী জাপানের অধিকার ভুক্ত হইবে।
    3. লিয়াওটাং উপদ্বীপ, দুর্গাদিসহ আর্থার বন্দর ও ইলিয়ট দ্বীপপুঞ্জ জাপান গভর্ণমেণ্ট প্রাপ্ত হইবেন।
    4. যুযুৎসু জাতিদ্বয় নির্দ্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানচুরিয়া পরিত্যাগ করিবেন।
    5. স্বরাজ্যে চীন গভর্ণমেণ্টের একাধিপত্য স্থাপিত হইবে।
    6. চীনরাজ্যে সমস্ত বৈদেশিক শক্তির সমান বাণিজ্যাধিকার থাকিবে।
    7. হার্ব্বিন হইতে আর্থার বন্দর পর্যন্ত রুষিয়ার রেলপথ জাপান গভর্ণমেণ্ট প্রাপ্ত হইবেন। ভ্যালাডিভােষ্টক রেলপথ রুষিয়ার অধিকারে থাকিবে।
    8. কোরিয়া রাজ্যের সমস্ত বিভাগে জাপানের অক্ষুণ্ণ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হইবে।
    9. রুষাধিকৃত ভ্যালাডিভােষ্টক হইতে বেরিং প্রণালী পর্য্যন্ত সাইবেরিয়া প্রদেশের উপকূলে জাপানীরা মৎস্য ধরিবার অধিকার প্রাপ্ত হইবে।
    10. রুষিয়ার যে সমস্ত যুদ্ধ ও বাণিজ্য জাহাজ জাপান গভর্ণমেণ্ট ধৃত করিয়াছেন এবং যাহা সমুদ্রে নিমগ্ন রহিয়াছে, সে সমস্ত জাপান প্রাপ্ত হইবেন।
    11. রুষিয়ার যে সমস্ত যুদ্ধ ও বাণিজ্য জাহাজ নিরপেক্ষ বন্দরে আত্মসমর্পণ করিয়াছে, সে সমস্ত রুষ গভর্ণমেণ্ট প্রাপ্ত হইবেন।

    উপরােক্ত সন্ধিপত্রের স্থূলমর্ম্ম প্রকাশ হইবার অব্যবহিত পরেই সমগ্র সভ্যজগৎব্যাপিয়া মহা হুলস্থূল পড়িয়া গিয়াছিল। “টাইমস” বলিয়াছিলেন, “জাপানীরা এই সন্ধিতে স্বীকৃত হইয়া যে ঔদার্য্য, মহানুভবতা ও আত্মসংযমতার পরিচয় প্রদান করিয়াছে, তাহা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখন পরিদৃষ্ট হয় নাই।” “মণিং পােষ্টের” মতে “এই মহা ত্যাগস্বীকারে জাপানের বিজয়গৌরব শতগুণে বর্দ্ধিত হইয়াছে।” “গ্রাফিক” বলিয়াছিলেন, “খৃষ্টীয় রাজন্যবর্গের কেহই এরূপ মহত্ব ও উদারতা দেখাইতে পারেন না।” “ডেলীমেল” লিখিয়াছিলেন, “যুদ্ধকৌশলে জাপানীরা শ্রেষ্ঠ হইলেও কুটরাজনীতিতে রুষিয়ার সমকক্ষ নহে।” “ষ্টাণ্ডার্ডে” প্রকাশ, রুষ গভর্ণমেণ্ট গােপনে জাপানের ক্ষতিপুরণ করিয়াছেন, কেবল জারের বিশেষ অনুরােধে সন্ধিপত্রে ইহা পরিত্যক্ত হইয়াছে।

    জাপানী পত্র সম্পাদকেরা বলিয়াছিলেন, জাপানের জয়ের তুলনায় বর্ত্তমান সন্ধি কিছুই নহে।

    আমেরিকা, জারমানি ও প্যারিসের পত্র সম্পাদকেরা একবাক্যে জাপানের মহানুভবতা ও রুষ মন্ত্রিগণের কূটরাজনীতিজ্ঞতার ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন।

    রুষপত্র “নভােভ্রিমিয়া” বলিয়াছিলেন, “বর্ত্তমান সন্ধি রুষিয়ার অদৃষ্টে দারুণ বিপদ আনয়ন করিবে।” রুষিয়ার “সুয়েট” লিখিয়াছিলেন, “সাগেলিয়ান দ্বীপের অর্দ্ধাংশ পরিত্যাগের তুলনায় জাপানের ত্যাগস্বীকার কোনক্রমেই গণনীয় হইতে পারে না।” “রাস্” পত্রে প্রকাশ “বর্ত্তমান সন্ধিতে শত্রুপক্ষেরই স্বার্থ অধিক পরিমাণে সংরক্ষিত হইয়াছে।” “নভােস্তীতে” প্রকাশ “এই সন্ধিতে রুষিয়ার পূর্ব্বগৌরব সম্পূর্ণ বিনষ্ট হইয়াছে।”

    রুষ জাপান যুদ্ধের সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হইবার অল্পদিবস পূর্ব্বে (১৯০৫, ১২ই আগষ্ট) ইংরেজ ও জাপানের সহিত একটী চুক্তি হইয়া গিয়াছে। তাহাতে উভয়শক্তি উভয়েরই বিপদে সাহায্য করিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছেন। চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হইবার তারিখ হইতে দশ বৎসরের জন্য এই চুক্তি বলবৎ থাকিবে।

    সম্পূর্ণ।

  • কৃত্তিবাস স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন

    কৃত্তিবাস স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন

    কৃত্তিবাস

    স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন।

     

    ২৭শে চৈত্র ১৩২২

     

    সভাপতির অভিভাষণ

     

    PRINTED BY N. CHATTERJEE
    AT THE ART PRINTERS,
    14, College Square, Calcutta.

    শ্রী আশুতোষ মুখোপাধ্যায়।


    কৃত্তিবাস।

    “ওরে বাছা মাতৃকোষে রতনের রাজি।
    এ ভিখারী দশা। তবে তোর কেন আজি?”

    মাইকেল মধুসুদন।

    ব্যাস, বাল্মীকি ও কৃত্তিবাস। সামান্য প্রণিধান সহকারে দৃষ্টি করিলেই যেমন উপলব্ধি হয় যে, সংস্কৃত অনার্য্য কাব্যাবলীর অধিকাংশের উপরেই ব্যাস বা বাল্মীকির প্রভাব সুপরিস্ফুট, কেহ মহর্ষি ব্যাস-বিরচিত কবিতা-কুঞ্জের পথিক, কেহ বা রত্নাকরের নানরত্নসমুদ্ভাসিত কবিতা-মন্দিরের যাত্রী; এক-ভাবে না একভাবে যেমন ব্যাস-বাল্মীকি এই উভয়ের একতরের কাব্যের আদর্শ, পরবর্তী অনার্য্যকবিকুলের কাব্যাবলীর উপজীব্য, তদ্রূপ, বাঙ্গালার মহাকবি কৃত্তিবাসের প্রভাব,—তাঁহার ভাষার প্রভাব, ভাবের প্রভাব, রচনাভঙ্গির প্রভাব তৎপরবর্ত্তী বঙ্গীয় কবিকুলের উপর সম্যক্‌রূপে সুপরিস্ফুট। কৃত্তিবাসের পরবর্ত্তী কবিবৃন্দ, যে সমুদয় সুরভিকুসুমে বীণাপাণির পাদপূজা করিয়াছেন, তাহার অধিকাংশই তদীয় কবিতারূপী কল্পনাকানন হইতে সংগৃহীত। এই হিসাবে, সংস্কৃত কাব্যাবলীর সহিত ব্যাস-বাল্মীকির যে সম্বন্ধ, বঙ্গভাষার কাব্যাবলীর সহিত কৃত্তিবাসেরও সেই-ই সম্বন্ধ।

    কালিদাস ও কৃত্তিবাস।—আদিকবি বাল্মীকির রামায়ণের পর কালিদাস আবার সেই রামচরিতেরই পুনর্বর্ণন করিলেন। রামায়ণ শ্লোকবদ্ধ মহাকাব্য, কালিদাসের রঘুবংশও শ্লোকবদ্ধ মহাকাব্য। কালিদাসের আবির্ভাবের বহুপূর্ব্ব হইতে রামায়ণ ভারতের সকল সমাজে কীর্ত্তিত, গীত, অধীত ও ভক্তিপূর্ব্বক শ্রুত হইত। তথাপি কালিদাসের রঘুবংশ ভারতের বিদ্বদ্বৃন্দ সাদরে গ্রহণ করিলেন। ইহার হেতু কি? একান্ত সুপরিচিত ও সর্ব্বদা শ্রুত বৃত্তান্তের পুনঃ পঠন-পাঠনে এই যে আগ্রহ, এত যে আদর, তাহার একমাত্র কারণ কালিদাসের প্রাঞ্জল ভাষা ও ভাবের সুস্পষ্টতা। যদি ভাষা এত সুন্দরী এবং সম্পত্তি-শালিনী না হইত, তাহা হইলে, কেবল ভাবের তরঙ্গলীলায় বা কল্পনার ক্রীড়ায় কালিদাসের কাব্য সুধী-সমাজের চিত্তাকর্ষণ করিতে পারিত না। কল্পনা বিষয়ে বাল্মীকির সহিত কালিদাসের তুলনা করিতে প্রয়াস পাওয়া বৃথা। তবুও যে, কালিদাস এত প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন, তাহার প্রধান কারণ তাঁহার সুমধুর ভাষা। কালিদাস ব্যতীত আরও অনেকে রামায়ণ উপজীব্য করিয়া কাব্যাদি বিরচন করিয়াছেন, কিন্তু তাঁহাদের গ্রন্থ জন-সমাজে রঘুবংশাদির ন্যায় আদৃত হয় নাই। এই আদর-অনাদরের একমাত্র নিদান, ভাষাগত প্রাঞ্জলতার উৎকর্ষাপকর্ষ এবং ভাবের সুস্পষ্টতা। কালিদাস এমন মনোহারিণী ভাষায় তদীয় কাব্যাবলী নির্ম্মাণ করিয়াছেন, যে, যে কোন সময়ে, যে কোন সমাজের লোকেই তাহা পাঠ করুক না কেন, বিমুগ্ধ হইবে। সংস্কৃত সাহিত্যে এই ভাষাগত উৎকর্ষের জন্য যেমন কালিদাসের শ্রেষ্ঠতা, বঙ্গীয় সাহিত্যেও তেমনই ভাষাগত উৎকর্ষের নিমিত্ত কৃত্তিবাসের শ্রেষ্ঠতা। যে ভাষা সম্প্রদায়বিশেষের জন্য উপনিবদ্ধ, অর্থাৎ কেবল শিক্ষিত বা কেবল অশিক্ষিতদিগের জন্য যে ভাষা ব্যবহৃত, ধনী নির্ধন, পণ্ডিত মূর্খ, ইহার একতরের উদ্দেশ্যে যে ভাষা গ্রথিত, তাহা কদাচ স্থায়ী বা সকলজনসম্মত উৎকৃষ্ট ভাষা হইতে পারে না। তাদৃশী ভাষায় নিবদ্ধ গ্রন্থাদি কখনও কালজয়ী হইতে পারে না। তাহাকে প্রকৃত ভাষা বলা যায় না। তাদৃশী ভাষায় বিরচিত গ্রন্থাদি কালের তরঙ্গে দেখিতে দেখিতে ভাসিয়া যায়। অল্পকাল মধ্যেই তাহার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়।

    যে ভাষা কোনও সম্প্রদায় বিশেষে সীমাবদ্ধ নহে, সকল সম্প্রদায়নির্ব্বিশেষে, সমাজ-দেহের প্রত্যেক শিরা ধমনী কৈশিকায় যে ভাষা প্রবেশ করিতে পারে, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোকে যে ভাষাকে “আমার” বলিয়া গ্রহণ করিয়া পরিতৃপ্তি লাভ করেন, শিক্ষিত অশিক্ষিত, ধনী নির্ধন, পণ্ডিত অপণ্ডিত, সকলে সমানভাবে যে ভাষাকে আদর করিয়া লয়েন, তাহাই যথার্থ ভাষা। কালিদাস যেমন তাদৃশী সর্ব্বতোগামিনী ও সর্ব্বতোব্যাপিনী ভাষায় গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন বলিয়াই তদীয় কাব্য সকল সম্প্রদায়ে সকল সময়ে সকলের প্রিয় পদার্থ, মহাকবি কৃত্তিবাসও তদীয় অনবদ্য রামায়ণ কাব্য সেইরূপ সর্ব্বকালানুযায়িনী সর্ব্বতোগামিনী ও সর্ব্বতোব্যাপিনী ভাষায় রচনা করিয়াছেন বলিয়া, তদীয় রামায়ণ, এত প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। যে সমুদয় কাব্যের ভাষা প্রাঞ্জল নহে, বা ভাবও সুস্পষ্ট নহে, সেই কাব্যাদির প্রভাব সমাজে স্থায়িত্ব লাভ করিতে পারে না। ভাষা ও ভাব উভয় সম্পদে সম্পন্ন বলিয়াই কৃত্তিবাসের রামায়ণ কালজয়ী হইয়া রহিয়াছে। সংস্কৃতে কালিদাস এবং বঙ্গভাষায় কৃত্তিবাস,—এই দুই জন একই কারণে অমরত্ব লাভ করিয়াছেন।

    কৃত্তিবাস ও অন্যান্য রামায়ণকারগণ।—কৃত্তিবাসের পর আরও অনেক কবিযশঃপ্রার্থী ব্যক্তি রামায়ণ রচনাপূর্ব্বক বঙ্গসাহিত্যের অঙ্গ পরিপুষ্ট করিয়াছেন, কিন্তু তাঁহাদের সকলের দ্বারাই যে ভাষার শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হইয়াছে একথা নিঃসঙ্কোচে বলা কঠিন।

    এপর্য্যন্ত যত দূর জানা গিয়াছে, তাহাতে কৃত্তিবাসই সর্ব্বপ্রথম বঙ্গভাষায় রাম-চরিত নিবদ্ধ করেন। তাহার পরে আরও চতুর্দ্দশ ব্যক্তি রামায়ণী কথায় পুস্তক রচনা করিয়াছেন বলিয়া নির্দ্দেশ পাওয়া যায়। কালে হয়ত, আরও অনেক নাম পাওয়া যাইবে। এই প্রসঙ্গে বঙ্গীয় সাহিত্যপরিষদ্‌ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। আর সেই সঙ্গে বঙ্গভাষার ইতিহাস-লেখক অক্লান্তকর্ম্মা শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ও সর্ব্বথা প্রশংসনীয়। এতদুভয়ের সমবেত চেষ্টার ফলেই আমরা আজ কৃত্তিবাসকে প্রকৃত ভাবে চিনিবার অবসর পাইয়াছি। কৃত্তিবাসের রামায়ণে যে প্রকার পাঠ-বৈষম্য ঘটিয়াছে, তাহাতে প্রকৃত কৃত্তিবাসের সম্পূর্ণ পরিচয় এখনও দুর্লভ। তবুও যতটা পাওয়া যাইতেছে, তজ্জন্য, সাহিত্যপরিষদ্‌ এবং দীনেশ বাবু বঙ্গবাসীর কৃতজ্ঞতাভাজন হইয়াছেন।

    কৃত্তিবাস এবং তৎপরবর্ত্তী অনেকে একই রামায়ণ অবলম্বনে কাব্য নির্ম্মাণ করিলেন, কিন্তু কৃত্তিবাসের কাব্য আবাল বৃদ্ধ বনিতার প্রিয়, সকল সমাজের আদরণীয় হইল, ইহার প্রকৃত কারণ কি?

    কৃত্তিবাস মহর্ষি বাল্মীকির রামায়ণ মাত্র অবলম্বন করিয়াই কাব্য লিখেন নাই। আমাদের দেশে কথকতায়, যাত্রায়, গোষ্ঠীবন্ধনে, সর্ব্বত্রই নানা ভাবে ও, নানা আকারে রামবিষয়ক বৃত্তান্ত বহুকাল হইতে, কৃত্তিবাসের বহু পূর্ব্ব হইতে চলিয়া আসিতেছিল। ফলতঃ লোকমুখে স্ত্রী-পুরুষ-সমাজে রাম-সীতার কথা কীর্ত্তিত হইত, এখনও হইতেছে। কৃত্তিবাস তদীয় গ্রন্থরচনায় এই লোকপরম্পরাগত গাথার অনেকটা অনুসরণ করিয়াছিলেন। কেবল অনুবাদে বা মহর্ষি-চিত্রিত আলেখ্যাবলীর পুনশ্চিত্রণেই যদি কৃত্তিবাস রত থাকিতেন, তাহা হইলে, তদীয় কাব্য এত প্রসিদ্ধি লাভ করিতে পারিত না। তাঁহার পরবর্ত্তী রামায়ণ-লেখকগণের অনেকের গ্রন্থে কৃত্তিবাসোচিত মৌলিকতা নাই। অধিকাংশ স্থানই অনুবাদ মাত্রে পর্য্যবসিত। কোনও রামায়ণকার স্বকীয় কল্পনার চঞ্চল বৈদ্যুতী প্রভায় গ্রন্থের ক্বচিৎ ভাস্বর করিয়াছেন, সত্য, কিন্তু পরক্ষণেই আবার কল্পনামান্দ্য-দোষে গ্রন্থের শ্রীহানি ঘটিয়াছে। এই স্থলে কবিচন্দ্রের নাম উল্লেখ্য। কবিচন্দ্র স্বীয় রামায়ণে অঙ্গ-রায়বার নামে যে অধ্যায় লিখিয়াছিলেন, যাহা আজ কৃত্তিবাসের বলিয়া বঙ্গের অধিকাংশ গৃহে আদৃত, সেই অধ্যায়টি বাস্তবিকই অনেকটা কবিত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই অনুপাতে কবিচন্দ্রের গ্রন্থের অপরাংশসমূহ গ্রহণ করা যায় না। সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত অনেকে যেমন দু’একটি মনোহারিণী কবিতা রচনা করিয়া থাকেন, প্রাচীন কালেও করিতেন; যে কবিতাগুলি “উদ্ভট” আখ্যায় জন-সমাজে প্রচারিত, কিন্তু ঐ উদ্ভট-কর্ত্তাদের কোনও বিশিষ্ট এবং উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থ পাওয়া যায় না, চঞ্চল কল্পনার ক্ষণিক অনুগ্রহে মাত্র দু’চারিটি হৃদয়াকর্ষিণী কবিতাতেই তাঁঁহাদের কবিত্ব পরিসমাপ্ত, তদ্রূপ অন্যান্য রামায়ণকারগণের অনেকেরই দুই একটি, বা কাহারও দু’চারিটি রসভাবপূর্ণ অধ্যায় রচনার পরই কবিত্বের পর্য্যবসান ঘটিয়াছে। সমগ্র গ্রন্থে কবিতার উচ্ছলিত তরঙ্গলীলা একমাত্র কৃত্তিবাসেই পরিদৃষ্ট হয়।

    কৃত্তিবাস জানিতেন যে, যাঁহাদের জন্য তিনি কাব্য লিখিয়াছেন, তাঁহারা কি চান্‌, কতটুকু বা কতটা তাঁহাদের অভিলষিত? কিরূপ আলেখ্যে তাঁহাদের নয়ন রঞ্জন হইবে? কবিত্বের সার্থকতার এই মূলমন্ত্রে তিনি দীক্ষিত হইয়া তবে কাব্য লিখিতে বসিয়াছিলেন, সর্ব্বদা এই মন্ত্রের স্মরণপূর্ব্বক কাব্য লিখিয়াছেন, তাই তাঁঁহার কাব্য এত জমিয়াছে। এই জন্যই কেবল বাল্মীকির আদর্শ তাঁঁহার উপজীব্য ছিল না, তিনি প্রয়োজনমত, অন্যান্য পুরাণ, উপপুরাণ প্রভৃতিরও সাহায্য গ্রহণ করিয়াছেন। কালিকাপুরাণ, অধ্যাত্মরামায়ণ, অদ্ভুতরামায়ণ প্রভৃতি হইতেও তিনি আদর্শ সঙ্কলন করিয়াছেন।

    অনেক কাব্য কবির সমসাময়িক সমাজের রুচি এবং ছায়ার অনুসরণে নির্ম্মিত হওয়ায়, সেই নিয়মিত সমাজে এবং নির্দ্দিষ্ট সময়ে সেই কাব্য আদৃত হইয়া থাকে, কিন্তু পরবর্ত্তী ও পরিবর্ত্তিত সমাজে তাহার আদর ক্রমেই কমিয়া যায়। যে কবির কাব্য, যত অধিক পরিমাণে এইরূপ সাময়িক ভাবে পরিপূর্ণ, সে কবির কাব্য, ততই অল্পকালস্থায়ী। অন্যান্য অনুবাদকগণের রামায়ণগ্রন্থের অপ্রসিদ্ধির ইহাও অন্যতম কারণ। তাঁহাদের রামায়ণের যে যে অধ্যায়গুলি এই প্রকার কোন বিশেষভাবে লিখিত নহে, অর্থাৎ সাধারণ ভাবে, সকল সময়ের অনুগত করিয়া লিখিত, সেই সেই অধ্যায়গুলির মর্য্যাদা এখনও একেবারে লুপ্ত হয় নাই। দৃষ্টান্তরূপে কবিচন্দ্রের “অঙ্গদরায়বার” ও রঘুনন্দন গোস্বামীর “রামরসায়নের” অশোকবনবর্ণন প্রভৃতির উল্লেখ করা যাইতে পারে। বস্তুতঃ সরল ভাষা এবং সুস্পষ্ট ভাব,—এই দুই দুর্লভ সম্পদে কৃত্তিবাসের কাব্য বঙ্গসাহিত্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অতি সরল কথায়, সকলের বোধগম্য ভাষায়, তিনি তাঁঁহার হৃদয়ের ভাব অতি স্পষ্টরূপে সাধারণের সম্মুখে প্রকাশ করিতে পারিতেন। ভাষার দীনতায় বা ভাবের জড়তায় তাঁঁহার কাব্য কুত্রাপি দুষ্ট হয় নাই। তিনি যখন যে চিত্র অঙ্কন করিয়াছেন, তাহার কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে কোনরূপ অসম্পূর্ণতা রাখেন নাই। যে কবি, যত অধিক পরিমাণে প্রাঞ্জলভাষায় মনের ভাবরাশি, তদীয় সমাজের সমক্ষে অতি সুস্পষ্টরূপে তুলিয়া ধরিতে পারিবেন, সেই কবি তত অধিক আদৃত হইবেন। কৃত্তিবাস সেইটি অতি উত্তমরূপে পারিতেন বলিয়াই, তাঁঁহার “রামায়ণ” অপরাপর “রামায়ণ” অপেক্ষা ভাবুকসমাজে, অথবা, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকল সমাজেই এত প্রিয় হইয়াছে।

    দয়া, দাাক্ষিণ্য, সমবেদনা, স্নেহ, প্রেম, ভক্তি প্রভৃতি স্বর্গীয় সম্পদে মানব দেবতা হয়, আবার এইগুলির অভাবে মানব দানব হইয়া থাকে। কৃত্তিবাস এই মহনীয় গুণাবলীর এমন সুস্পষ্টভাবে বর্ণন করিয়াছেন, যে, পাঠকালে, হৃদয় অনির্ব্বচনীয় আনন্দরসে আপ্লুত হয়। মহাকবি ভবভূতি যেমন তাঁঁহার উত্তরচরিতের নিরবদ্য ও নয়নরঞ্জন চিত্রগুলির আদর্শ কালিদাসের কাব্যাবলী হইতে গ্রহণ করিয়া, পরে, সেই আদর্শের উপর নৈপুণ্য সহকারে বর্ণসংযোগ করিয়া আনন্দময়ী মূর্ত্তি নির্ম্মাণ করিয়াছেন, যে মূর্ত্তির গরিমায় সংস্কৃত সাহিত্য গৌরবিত হইয়াছে, কৃত্তিবাসও সেইরূপ মহর্ষিকৃত আদর্শের উপর সতর্ক হস্তে বর্ণসংযোগপূর্ব্বক, তৎ তৎ চিত্রাবলী বঙ্গীয় সমাজের অনুগত ভাবে উপস্থাপিত করিয়াছেন, অলঙ্কারের গুরু ভারে, বা ভাষার আড়ম্বরে তদীয় কবিতাসুন্দরী ক্লিষ্ট হন নাই। তাঁঁহার কবিতা সর্ব্বত্র একভাবে, ভাগীরথীর প্রবাহের ন্যায় তর তর করিয়া চলিয়া গিয়াছে, আবিলতায় সে কবিতার প্রবাহ দুষ্ট হয় নাই, বা ভাবের জড়তায় সে কবিতার অমর্য্যাদা ঘটে নাই। অন্যান্য কবি অপেক্ষা তদীয় প্রাধান্যের এইটিই মুখ্য কারণ। ভাষার প্রাঞ্জলতা এবং ভাবের সুস্পষ্টতার সহিত তাঁহার আশ্চর্য্যচিত্রনৈপুণ্যের সম্মিলনে তদীয় কাব্য ত্রিবেণীসঙ্গমের ন্যায় পবিত্র ও সর্ব্বজনসেব্য হইয়াছে।

    কৃত্তিবাসের রামায়ণে প্রক্ষেপ—কৃত্তিবাসের রামায়ণ রচনার প্রায় এক শত বৎসর পরে নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যদেব আবিভূর্ত হন। চৈতন্যের আবির্ভাবের এবং তদীয় প্রেম-বন্যায় বঙ্গদেশ প্লাবিত হইবার পূর্ব্ববর্ত্তী কালের হস্তলিখিত কোন কৃত্তিবাসী রামায়ণের পুস্তক এপর্য্যন্ত পাওয়া যায় নাই। যদি কখনও পাওয়া যায়, তবে তখন কৃত্তিবাসের প্রক্ষিপ্ত অংশগুলির সমাধানের উপায় অনেকটা সহজ হইবে। চৈতন্যের আবির্ভাবের পর বঙ্গদেশে যে ভক্তির স্রোত, প্রেমের “বাণ” বহিয়াছিল, পরবর্ত্তী কালের রামায়ণ-সমূহে তাহার প্রভাব সম্পূর্ণরূপে বিদ্যমান। যে সময়ে যে ভাব দেশের মধ্যে মাথা তুলিয়া দেশটাকে বিভোর করিয়া ফেলে, সেই সময়ের জাতীয় সাহিত্যাদিতেও সেই ভাবের প্রভাব প্রবিষ্ট হইয়া, তাবৎ সাহিত্যকে ‘তদ্ভাবভাবিত’ করিয়া তোলে। তাই পরবর্ত্তী কালের কৃত্তিবাসে আমরা কি বীর কি করুণ, সকল রসেই নদিয়ার ভক্তির তরঙ্গের উচ্ছ্বাস দেখিতে পাই। লিপিকারগণ, সুবিধা পাইলেই রামের স্থলে শ্যাম করিয়াছেন। পরিবর্ত্তিত কৃত্তিবাসের অনেক অনাবশ্যক স্থলে অতর্কিত বৈষ্ণবী দীনতার পরাকাষ্ঠা দেখিতে পাই। কৃত্তিবাসের স্বকপোলকল্পিত বীরবাহু, পরবর্ত্তী কালের বৈষ্ণব লিপিকারগণের কৃপায়, দীনাতিদীন বৈষ্ণবসেবক-গণের ন্যায়, করযুগল জুড়িয়া ধরণীতে লুটায়। তুলসীতলার মৃত্তিকায় অঙ্গরাগ করিয়া বৈষ্ণব যেমন “শ্রীবাসের আঙ্গিনায়” মহাপ্রভুর ভক্তগণকে প্রণাম করেন, সেইরূপ রাক্ষসগণও কপিগণকে গল-লগ্নবাসে প্রণাম করে। এইরূপ অনেক স্থলেই বৈষ্ণবীয় কোমলতার ও দীনতার চরম দেখিতে পাই। এ সমস্তই চৈতন্যের পূর্ণ প্রকটের পর কৃত্তিবাসে প্রক্ষিপ্ত হইয়াছে। এইরূপ সংক্রামক রোগের পরিচয় আমরা অন্যত্রও দেখিতে পাই। অনেক বৌদ্ধ গ্রন্থের দুই একটি স্থলের ঈষৎ পরিবর্ত্তনপূর্ব্বক, কোথাও বা প্রমাণসূত্রটিকে বদলাইয়া, সমগ্র গ্রন্থখানিকে “হিন্দু” করিয়া তোলা হইয়াছে। কৃত্তিবাসে পাঠবৈষম্যের ইহাই একমাত্র কারণ নহে। বহুকাল পূর্ব্বের হস্তলিখিত যে সকল পুঁথি পাওয়া গিয়াছে, তাহার সহিত বর্ত্তমান কৃত্তিবাসের ত মিল নাই-ই, এমনকি ১৮০৩ খৃঃ অব্দে শ্রীরামপুরের মিশনারিগণের দ্বারা প্রথম যে “কৃত্তিবাস” মুদ্রিত হয়, তাহার সহিতও বর্ত্তমান কৃত্তিবাসের অনেক স্থলে আদৌ মিল নাই। মিশনারিদের পুস্তকে যেখানে আছে,—

    “পাকল চক্ষে রামের পানে চাহিলেক বালি।
    দন্ত কড়মড়ায় বীর রামেরে পাড়ে গালি॥”

    সেই স্থানে—পরবর্ত্তী কালের সংশোধিত বটতলার সংস্করণে আছে,—

    “রক্তনেত্রে শ্রীরামের পানে চাহে বালি।
    দন্ত কড়মড় করে, দেয় গালাগালি॥”

    পরবর্ত্তী কালে ভাষার পরিমার্জ্জনের সঙ্গে সঙ্গে বাঙ্গালার আদিকবি কৃত্তিবাসও “পরিমার্জ্জিত” হইয়াছেন!! কবির কাব্য পরিষ্কৃত করিতে যাইয়া, সংশোধকগণ আবর্জ্জনারাশির দ্বারা কৃত্তিবাসকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছেন। এই ব্যাপারের মূলে আর একটি সত্য নিহিত আছে। আমাদের দেশে, যখন যে কোনও নূতন জিনিষের আবির্ভাব হইয়াছে, আমরা তাহাকে, ধীরে ধীরে পুরাতনের সহিত মিশাইয়া নিজেদের ছাঁঁচে ঢালাই করিয়া “আপন” করিয়া লইয়াছি। আমাদের এই adaptability আছে বলিয়াই আমাদের ধর্ম্ম, আমাদের সাহিত্য এখনও টিকিয়া আছে। নবীন নানাবিধ ভঙ্গিরাগবিভূষিতা, শ্রুতিমোহিনী বঙ্গভাষার যেমন আবির্ভাব হইল, অমনি আমরা আমাদের প্রাচীন, দুর্ব্বোধ শব্দসঙ্কুল ভাষাকে তাহার অনুগত করিয়া লইলাম, তাই আমার প্রাচীন—“অমিয় সায়ারে নিশান করিতে সকলি গরল ভেল” ইহার স্থলে “অমিয় সাগরে সিনান করিতে সকলি গরল হলো” করিয়া ফেলিলাম। প্রতিমার মূল পঞ্জরের কোন বিশেষ পরিবর্ত্তন করিলাম না বটে, কিন্তু একটু নূতন ভঙ্গিতে বর্ণযোজনা করিয়া, প্রাচীনাকে নবীন করিয়া তুলিলাম। ইহাতে প্রাচীনার অঙ্গহানি ঘটিল। এইরূপে মূল কৃত্তিবাসের অর্দ্ধসংস্কৃত, অর্দ্ধ-হিন্দি অনেক শব্দ পরিবর্ত্তিত হইতে হইতে ক্রমে বর্ত্তমান বাঙ্গালায় আসিয়া দাঁঁড়াইল। তাই প্রাচীন কৃত্তিবাসের

    “মুঞি” “ভিলন্ত” “কর‍্যা” “থুয়্যা” “পাকল” প্রভৃতি অধুনা অপ্রচলিত শত শত শব্দের পরিত্যাগ সাধিত হইল। ইহা কালের নিরঙ্কুশ বিধান। ইহার উপর মানুষের কর্ত্তৃত্ব তত অধিক নাই। যাহা গ্রাহ্য, কাল তাহার গ্রহণ করিবে। যাহা বর্জ্জনীয়, কাল তাহার বর্জ্জন করিবে।

    শাক্ত এবং বৈষ্ণব—এই দুই সম্প্রদায়ের লিপিকারগণের কল্যাণে কৃত্তিবাসের অনেক স্থলে যেমন শাক্তপ্রভাব পরিদৃষ্ট হয়, তেমনই বৈষ্ণবপ্রভাবও পরিদৃষ্ট হয়। ইহা ছাড়া, অন্যান্য পুরাণ উপপুরাণ প্রভৃতি হইতে অনেক মনোরম অংশও লিপিকারগণ বাছিয়া আনিয়া কৃত্তিবাসে জুড়িয়া দিয়াছেন। অনেকে অনেক নূতন কবিতার প্রণয়ন করিয়া কৃত্তিবাসের গ্রন্থে পূরিয়া দিয়া, স্ব স্ব আত্মাভিমানের পূজা করিয়াছেন। দৃষ্টান্ত স্বরূপ কৃত্তিবাস হইতে শত শত স্থল উদ্ধৃত করা যাইতে পারে, ঐতিহাসিকের সে কার্য্য হইতে আমি বিরত হওয়াই সঙ্গত মনে করি।

    কৃত্তিবাসের কল্পনা তাহার গন্তব্য পথ—রামায়ণী কথার আশ্রয়ে কালিদাস ভবভূতি রঘুবংশ উত্তরচরিত প্রভৃতির রচনা করিয়াছেন বটে, কিন্তু যেস্থানে যেরূপ প্রয়োজন, তাঁহারা নূতন মূর্ত্তিও গঠন করিয়াছেন। কবির কল্পনার বৈদ্যুতিক শক্তিতে শক্তিমান্‌। সেই সতত চঞ্চলা শক্তি কদাচ কোন নির্দ্দিষ্ট পথে, কোন পূর্ব্ব-নির্দ্দিষ্ট রেখা বাহিয়া চলিতে পারে না, জানেও না। তাই কবিকৃত সৃষ্টিতে, অনেক স্থলে মূল আদর্শেরও পরিবর্ত্তন দেখিতে পাই। কালিদাস ভবভূতি প্রভৃতি মহাকবিগণ তাই মহর্ষিক্ষুন্নপথ কল্পনার দৌত্যে অল্পবিস্তর ছাড়িয়া, অন্য পথেও গিয়াছেন। কৃত্তিবাসও সেইরূপ অনেক স্বকল্পিত আলেখ্যের অঙ্কনপূর্ব্বক, তদীয় গ্রন্থ সুচারুতর করিয়াছেন। সর্ব্বত্রই বাল্মীকির অনুসরণ করেন নাই। বীরবাহু তরণীসেন প্রভৃতির সৃষ্টি তাঁহার আত্মকল্পনার চরম উৎকর্ষ খ্যাপন করিতেছে। কবিগণ কাহারও অঙ্গুলিসঙ্কেতে চলেন না। কল্পনা কাহারও দাসীত্ব করিতে জানে না। কল্পনা কখনও কবিকে মেঘের উপর লইয়া গিয়া সৌদামিনীর বিলাসচঞ্চলা মূর্ত্তি প্রদর্শন করে, কখনও আবার তুষারমণ্ডিত কমলের কেশরের মধ্যে লুকাইয়া রাখিয়া কবিকে কত নিভৃত সৌন্দর্য্য দেখায়। উন্মাদিনী চঞ্চলার ন্যায় কবির উন্মাদিনী কল্পনা কাহারও অঙ্গুলিসঙ্কেতে পরিচালিত বা ভ্রূকম্পনে বিকম্পিত হয় না। সে আপনার ভাবেই আপনি বিভোর হইয়া ছুটে, পরের ভাবে ভুলে না। কৃত্তিবাসের স্বৈরচারিণী কল্পনা কোনও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ হইয়া রহে নাই। কোথাও প্রাচীন পথে, কোথাও বা নূতন পথে যেখানে যেমন ইচ্ছা, সে কল্পনা চলিয়া গিয়াছে। তরণীসেন বীরবাহু প্রভৃতির সৃষ্টি এই নূতন পথে যাত্রারই ফল।

    কবির পরিচয়।—আনুমানিক ১৩০৬শক ১৩৮৫ খৃঃ অব্দের মাঘ মাসের শ্রীপঞ্চমী তিথিতে কৃত্তিবাস জন্ম গ্রহণ করেন। বঙ্গের প্রতিগৃহে যে দিন বীণাপাণির চরণকমল অর্চ্চিত হইতেছিল, “সকলবিভবসিদ্ধ্যৈ পাতু বাগ্‌দেবতা নঃ” বলিয়া যেদিন ভক্তি-গদগদকণ্ঠে স্তব করিতে করিতে হিন্দু তাহার চিরপ্রার্থিত দেবতার চরণে মস্তক স্থাপন করিতেছিল, সেই শুভ ক্ষণেই যাঁঁহার জন্ম, তাঁঁহার জীবন যে সেই বাগ্‌দেবতার অনুগ্রহে ধন্য ও কৃতকৃতার্থ হইবে তাহাতে আর কথা কি?

    ৭৩২ খৃঃ অব্দে আদিশূর কনোজ হইতে যে পাঁচ জন ব্রাহ্মণকে এ দেশে আনয়ন করেন, তাঁহাদের অন্যতম ভরদ্বাজ-গোত্রীয় শ্রীহর্ষ হইতে সপ্তদশ পুরুষ অধস্তন নরসিংহ ওঝা বেদানুজ রাজার প্রধান মন্ত্রী ছিলেন। এই বেদানুজ সম্ভবতঃ পূর্ববঙ্গের স্বর্ণগ্রামের রাজা ছিলেন। আন্দাজ ১২৪৮ অব্দে এই নরসিংহ অরাজক স্বর্ণগ্রাম পরিত্যাগপূর্ব্বক গঙ্গাতীরে বাস করিবার সঙ্কল্পে ফুলিয়ায় আসিয়া বসতি স্থাপন করেন। ফুলিয়ার তখন বড় স্পর্দ্ধার দিন। কৃত্তিবাস নিজেই স্বীয় বংশ-পরিচয়ের সময়ে বলিয়াছেন যে, পূর্ব্বে এখানে “মালঞ্চ” ছিল, নানাবিধ ফুলের বাগান ছিল, তাই ইহার নাম হয়—“ফুলিয়া”। এই ফুলিয়ার দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে বীচিমালিনী ভাগীরথী রজতধারায় প্রবাহিত ছিলেন। প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য্যের ইহা লীলানিকেতন ছিল। মন্ত্রিশ্রেষ্ঠ নরসিংহ তাঁঁহার তদানীন্তন পদোচিত বিভবাদির সহিত এই মনোহর স্থানে আসিয়া একেবারে জুড়িয়া বসিলেন। কৃত্তিবাসের ভাষায়

    “ফুলিয়া চাপিয়া হইল তাঁঁহার বসতি।
    ধন ধান্যে পুত্র পৌত্রে বাড়য়ে সন্ততি॥”

    ফুলিয়া “চাপিয়া” তাঁঁহার বসতি হইল। এই নরসিংহের পরমদয়ালু পুত্র গর্ভেশ্বর কৃত্তিবাসের প্রপিতামহ। গর্ভেশ্বরের পুত্র মুরারি ওঝা, কৃত্তিবাসের পিতামহ এক অতি প্রধান কবি ছিলেন। তাঁহার কোন গ্রন্থাদির পরিচয় পাই না সত্য, কিন্তু কবি কৃত্তিবাস স্বয়ং তাহাকে ব্যাস মার্কণ্ডেয়াদির সহিত তুলনা করিয়াছেন।

    এই মুরারি ওঝার পৌত্র কৃত্তিবাসের নিজের উক্তিতেই দেখিতে পাই, বাল্যে তিনি প্রথমতঃ চতুষ্পাঠীতে বিদ্যাভ্যাস করেন। এই চতুষ্পাঠীর শিক্ষাই তদীয় সংস্কৃত রামায়ণ পাঠের সোপান। পাঠ সমাপ্তির পর, তদানীন্তন প্রথা অনুসারে তিনি গৌড়েশ্বরের সভায় আত্ম-পরিচয়ার্থ উপস্থিত হন। রাজা তাঁহার গুণগ্রামের পরিচয় পাইয়া তাঁহাকে রামায়ণ রচনা করিতে আদেশ করেন। “তথাস্তু” বলিয়া কৃত্তিবাস যখন সগর্ব্বে বাহির হইলেন, তখন সকলে “ধন্য ধন্য” বলিয়া কবির অভ্যর্থনা করিলেন।

    “সবে বলে ধন্য ধন্য ফুলিয়া পণ্ডিত।
    মুনিমধ্যে বাখানি’ বাল্মীকি মহামুনি।
    পণ্ডিতের মধ্যে তথা কৃত্তিবাস গুণী॥”

    বলিয়া সহস্র মুখে কৃত্তিবাসের প্রশস্তি সঙ্গীত উচ্চারিত হইল। কৃত্তিবাস স্বয়ং এই প্রসঙ্গে অনেক কথা বলিয়াছেন, আত্মবংশের বিশিষ্ট পরিচয় প্রদান করিয়াছেন। তিনি যে কত বড় বংশে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহার পরিচয় আমি আর বিশেষ কি বলিব! এখনও “ফুলিয়ার মুখটী” বলিয়া আমরা তাঁহারই বংশের স্পৰ্দ্ধা করি। রাঢ়ীয় শ্রেণীর প্রধান এবং মুখ্য বংশ “ফুলিয়ার মুখটি”—কৃত্তিবাসেরই অনুস্মৃতি মাত্র।

    মাহেন্দ্রক্ষণে রাজা কৃত্তিবাসকে রামায়ণ রচনার আদেশ করিয়াছিলেন। বঙ্গভাষার অরুণ-রাগরঞ্জিতা উষার প্রথম আলোকচ্ছটা কৃত্তিবাসের মস্তকে প্রথম স্বর্ণকিরীট পরাইয়া দিয়াছিল,—বঙ্গভূমি, বঙ্গভাষা ও সেই সঙ্গে বাঙ্গালী জাতি ধন্য হইয়াছে। পল্লী-প্রান্তরের স্নিগ্ধ বটচ্ছায়ায়, জন-পদবধূর গোষ্ঠীবন্ধনে, বর্ষীয়সী ললনাদিগের বিশ্রামকক্ষে, কৃত্তিবাসের বিরচিত গাথা গীত ও ভক্তিপূর্ব্বক শ্রুত হইতেছে। ভাষায় যাহার সম্যক্‌ অধিকার নাই, সেই প্রাকৃত ব্যক্তিও প্রেম ভরে রামায়ণ গান করিয়া আত্মহারা হইতেছে, আর সেই সঙ্গে, নিরক্ষর সরল কৃষক সাশ্রুনয়নে ও তন্ময়হৃদয়ে সে গান শুনিয়া আপনাকে ভুলিয়া যাইতেছে। এখনও একাদশীর অপরাহ্ণে ধূসরবসনা বিধবারা সমবেত হইয়া, কোন ললিতকণ্ঠ বালকের দ্বারা রামায়ণ পড়াইয়া শুনিতেছেন, তাঁহাদের উপবাস-ক্লিষ্ট হৃদয়ের ভক্তির রস উচ্ছলিত হইয়া উঠিতেছে। মনোহর কল্পনা, মধুরভাব, অমুপম সৃষ্টিকৌশলে, কৃত্তিবাসের রামায়ণ, বঙ্গ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ্‌রূপে পরিগণিত। কৃত্তিবাসের পর, আজ পর্য্যন্ত যত ব্যক্তি বঙ্গবাণীর পাদ পূজা করিয়াছেন, তাঁহাদের প্রত্যেকেরই পূজার উপকরণ—ফুল, ফল, পল্লব,—কৃত্তিবাসের ঐ রামায়ণরূপী কল্পকানন হইতে চয়িত ও সংগৃহীত। কৃত্তিবাস ধরাধামে অবতীর্ণ হইবার পর পাঁচশত বৎসরেরও অধিক কাল অতীত হইয়াছে বটে, কিন্তু আজও প্রতিক্ষণে তাঁহার নাম বঙ্গের গৃহে গৃহে, বিপণির পণ্যকুটীরে, চাষার আশার কৃষিক্ষেত্রে—সর্ব্বত্র কীর্ত্তিত হইতেছে। আজ আর

    “দক্ষিণে পশ্চিমে যা’র গঙ্গা তরঙ্গিণী”

    সে “ফুলিয়া” নাই, সে “ফুলিয়ায়” কৃত্তিবাসের সেই “চাপিয়া বসতি”র চিহ্নও নাই, কিন্তু সেই “ফুলিয়া পণ্ডিতের” মোহন বাঁশরীর ঝঙ্কার এখনও বাঙ্গালীর “কাণের ভিতর দিয়া মরমে” প্রবেশ করিতেছে, বাঙ্গালীকে উন্মত্ত করিয়া, বিভোর করিয়া রাখিয়াছে।

    কৃত্তিবাসের এই সার্ব্বভৌম প্রসিদ্ধির অপর কতিপয় কারণও পরিদৃষ্ট হয়। ভারতবর্ষের মৃত্তিকা বড়ই কোমল, বড়ই উর্ব্বর। রামচন্দ্র, যুধিষ্ঠির, কর্ণ, ভীষ্ম, দধীচি, শিবি, সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তী, অরুন্ধতী, লোপামুদ্রা, ঔশীনরী প্রভৃতি এই ভারতবর্ষেরই চিত্র। যাহার প্রাণে প্রেম, নয়নে ভক্তির অশ্রু, ভারতবাসীরা তাহাকে হৃদয় পাতিয়া গ্রহণ করে, প্রাণ দিয়া পূজা করে। কৃত্তিবাস এ রহস্য বুঝিতেন। তিনি আরও বুঝিতেন যে, নিশীথে নিস্তব্ধ রজনীর সৌম্যমূর্ত্তি যাহার চিত্তকে অভিভূত, বা অনুভূতির বিমল কর-ধৌত করিতে না পারে, সে কদাচ ঐ নৈশ নীরবতার মাধুর্য্য অপরকে বুঝাইতে পারে না; সায়ংকালের শ্যামায়মানা বনভূমির প্রাঞ্জল মূর্ত্তি যাহার প্রাণে আকুলতা জন্মাইতে অসমর্থ, সে কখনও সান্ধ্য-সুষমার পবিত্র আলেখ্য অঙ্কন করিতে পারে না। সকল পদার্থেরই অনুভূতি চাই। সমস্ত বিষয়েই মগ্ন হওয়া চাই, প্রাণ অকৃপণভাবে ঢালিয়া দেওয়া চাই, অন্যথা সিদ্ধিলাভ সুদূরপরাহত। কৃত্তিবাস অকৃপণভাবে, আত্মপ্রাণ কবিতাদেবীর পাদপদ্মে ঢালিয়া দিয়াছিলেন, তাঁহার হাতে আর কিছুই ছিল না, সমস্তই ঐ চরণে অঞ্জলি দিয়াছিলেন, তাই তদীয় কবিতার কুত্রাপি কোনরূপ বাধা দোখতে পাই না। সর্ব্বত্রই সমান এবং অপ্রতিহত গতি। অসম্ভব হইলেও মনে হয়, যেন, এক সময়ে, এক স্থানে বসিয়া, অন্য-চিন্তা-বিযুক্ত হইয়া, মহাকবি, তাঁহার সাধের রামায়ণ গান গাহিয়াছেন। তিনি নিজে সে গানে মজিতে পারিয়াছিলেন, তাই তাঁহার শ্রোতৃবর্গও মজিয়াছে, আত্মবিস্মৃত হইয়া, তাঁহার সেবা করিয়াছে, আচন্দ্র-দিবাকর করিবেও।

    তুমি যখন অভ্রভেদী, শুভ্রতুষারশীর্ষ, হিমাচলের পাদদেশে বসিবে, বিধাতার কৃপায়, তখন যদি তোমার হৃদয়ে, কোন প্রশান্ত ছবির ছায়াপাত হয়, কোন বিরাট্‌ শক্তির স্পন্দন অনুভূত হয়, তবেই তুমি ঐ বিরাট্‌ হিমাচলের প্রশান্ত ভাবের, প্রশান্ত মূর্ত্তির কিয়দংশ হয়ত, তোমার কল্পনা-দর্পণের সাহায্যে অন্যকে প্রদর্শন করিতে পার। অন্যথা, তোমার সাধ্য কি যে তুমি হিমাচলের ঐ গম্ভীর-মাধুর্য্যের বর্ণন করিবে। তুমি যে স্থানে, যে সময়ে, যে অবস্থায় বর্ত্তমান, যদি সেই স্থানের, সেই সময়ের, সেই অবস্থার সহিত, নিজেকে মিশাইতে না পার, “তদ্ভাব ভাবিত” করিতে না পার, তবে কদাচ, তদ্দেশীয় ও তৎকালীন ভাবের স্ফুরণ তোমার দ্বারা সম্ভব হইবে না। তোমার দ্বারা তদ্দেশবাসিগণের হৃদয় কদাচ বিমোহিত হইতে পারে না। দীপকরাগের সময়ে, তুমি বেহাগ পূরবীতে আলাপ করিলে, তাহা কখনও জমিতে পারে না। সে আলাপে শ্রুতির সুখ হয় না, বরং পীড়াই জন্মে। ভারতবর্ষের বিশেষতঃ বঙ্গদেশের ধর্ম্মপ্রাণ অধিবাসীরা কি চায়, কি ভালবাসে, এ তত্ত্ব মহাকবি কৃত্তিবাস বুঝিতেন। এদেশের লোকের হৃদয় কি উপাদানে গঠিত, কোন্‌ উপকরণ তাহাতে অধিক, তাহা কৃত্তিবাস জানিতেন, তাই তাঁঁহার দেশবাসিগণের হৃদয়ের ভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া, তিনি তদীয় কল্পনার মোহন বীণায় ঝঙ্কার করিয়াছিলেন। তাই সে ঝঙ্কার বসন্তের পিকঝঙ্কারের ন্যায়, বঙ্গবাসীদিগকে বিমুগ্ধ, একেবারে আকুল করিয়া তুলিয়াছিল। এই হিসাবেও সংস্কৃতে কালিদাস ও বাঙ্গালায় কৃত্তিবাস একই মন্ত্রে দীক্ষিত, একই পথের যাত্রী। তোমার পাঠকগণ কি চান্, কতটুকু চান্, তোমার বীণার কোন্ তার স্পর্শ করিলে, তাহার ধ্বনি তোমার পাঠকের হৃদয়ে অনুরণিত হইবে, তাহার “কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিবে,”—এজ্ঞান যদি তোমার না থাকে, তবে তুমি যত বড় শক্তিশালী লেখকই হও না কেন, যত বড় কলাবিদ্যাবিশারদই হও না কেন, তোমার লেখায় বা তোমার অঙ্কিত আলেখ্যে, তোমার সামাজিক বর্ণের বা তোমার দর্শকবৃন্দের পরিতৃপ্তি হইবে না। তোমার সে লেখায় বা সে চিত্রে, তদীয় দেশবাসী সহৃদয়বর্গের হৃদয় আকৃষ্ট ও বিমোহিত হইবে না। যে সমুদয় লেখকের এই জ্ঞান আছে, তাঁহাদের লেখাই কালজয়ী হয়, থাকিয়া যায়; আর যাঁহাদের এই জ্ঞান নাই, তাঁহাদের লেখা ছিন্ন তুষারের ন্যায় অতি অল্পকাল মধ্যেই কোথায় মিলাইয়া যায়। আর্য্য রামায়ণ অবলম্বনপূর্ব্বক অন্য অনেক কবি বঙ্গভাষায় রামায়ণ রচনা করিয়াছেন, কিন্তু কৃত্তিবাসের রামায়ণ তন্মধ্যে যে এত প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে, প্রায় পাঁচ শত বৎসরেরও অধিক কাল সমানভাবে বা উত্তরোত্তর ক্রমেই অধিকতরভাবে, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, স্ত্রীপুরুষ, ইতর ভদ্র সকল সমাজেই পূজিত হইতেছে, ইহার কারণ হইল, পূর্ব্বোক্ত জ্ঞান। কৃত্তিবাসের ঐ জ্ঞান প্রচুর পরিমাণে ছিল। যে দেশে তিনি অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, সেই দেশের অধিবাসীরা কি ভালবাসে, কি চায়, তাহা তিনি জানিতেন এবং তিনিও তাহাই চাহিতেন ও ভালবাসিতেন। তাই, তিনি যদি কখনও সামান্য একটু গুণ্‌গুণ্‌, করিয়া স্বরবিলাস করিয়াছেন, অমনি সেই গুণ্‌গুণ্‌, ধ্বনি শতগুণে বর্দ্ধিত হইয়াই যেন, তদীয় দেশবাসীদিগের হৃদয় বিমোহিত করিয়া তুলিয়াছে। দিবাবসানে সাগরগামিনী তটিনীর প্রাণের আকুল গীতিকা, কুলকুল ধ্বনিতে যেমন শ্রান্ত পথিকের চিত্তে একটা জড়তা, একটা তন্দ্রা আনিয়া দেয়, পথিক একপদে তাঁহার কর্ম্মময় দীর্ঘ দিবসের সমস্ত ক্লেশ ভুলিয়া যান, কেমন একটা ঘুমের ঘোরে তাঁহার নয়ন নিমীলিত হইয়া আসে, সেইরূপ, প্রেমিক কবি কৃত্তিবাসের মোহিনী বীণার ঝঙ্কারেও বঙ্গবাসীর হৃদয় বিমোহিত, আনন্দালস হইয়া রহিয়াছে। কবে কোন্‌ দিন্‌, কত শত সহস্র বৎসর পূর্ব্বে, তমসার তীরে “মা নিষাদ” বলিয়া বাল্মীকি গান ধরিয়াছিলেন, আর আজও যেন সেই গানের ধ্বনির বিরাম হয় নাই। সে স্বরলহরী যেন বাতাসে এখনও ভাসিয়া বেড়াইয়া, ভারতবাসীদের প্রাণে কেমন একটা তন্দ্রা জন্মাইয়া দিতেছে, সেইরূপ কবে কোন্‌ দিন্‌, কোন্‌ শুভমুহূর্ত্তে পতিতোদ্ধারিণীর তীরে বসিয়া, তাঁঁহারই কুলকুল গীতির সুরে সুর মিশাইয়া ফুলিয়ার পণ্ডিত তান ধরিয়াছিলেন, আজ সে ফুলিয়া নাই, সে ভাগীরথীও দূরে সরিয়া গিয়াছেন,—কিন্তু সেই স্বপ্নময়, আবেশময় তানের এখনও যেন শেষ লয় হয় নাই। সে রাম, সে অযোধ্যা, কিছুই নাই, তবুও সেই রামের কথা, রামের স্মৃতি যেমন ভারতের নরনারীর প্রাণে প্রাণে গাঁঁথা রহিয়াছে, আজীবন থাকিবেও, তদ্রূপ আজ সে ফুলিয়া নাই, সে জাহ্নবী নাই, সে কৃত্তিবাস নাই, কিন্তু কৃত্তিবাসের কথা, কৃত্তিবাসের স্মৃতি বঙ্গবাসী কদাচ বিস্মৃত হইবে না। রাম-সীতার পাদস্পর্শে অযোধ্যা চিরকালের মত তীর্থ হইয়া রহিয়াছে, কৃত্তিবাসের পাদস্পর্শে ফুলিয়া বঙ্গের সাহিত্যসাম্রাজ্যের প্রধান তীর্থ হইয়াছে। ফুলিয়ার মুখটী, শুধু ফুলিয়ার নহে, বাঙ্গালার গৌরব স্থান, পরমস্পর্দ্ধার ভাজন হইয়াছেন। জন্ম জন্মান্তরে কৃত্তিবাস কত তপস্যা করিয়াছিলেন, তাঁঁহার সে তপস্যার ফলে তিনি ত অমর হইয়াছেনই, তাঁঁহার মাতৃভাষাকেও অমরী করিয়া গিয়াছেন। বাঙ্গালীর জাতীয় সাহিত্যের স্বর্ণমন্দিরের তিনিই ভিত্তিস্থাপন করিয়াছেন। যে দেশে এবং যে জাতিতে কৃত্তিবাসের ন্যায় কবি আবির্ভূত হন, সে দেশ ধন্য, সে জাতি বরেণ্য। কৃত্তিবাস বাঙ্গালী জাতিকে বড় করিয়া দিয়াছেন; তিনি যে সঙ্গীত ধরিয়াছিলেন, আজ এই পাঁচ শত বৎসর ধরিয়া যিনি যতটুকু পারেন, সেই সঙ্গীতেরই “তান প্রদান” করিতেছেন। তাঁঁহার সাধনার ফলে, তাঁঁহার স্বজাতির জাতীয় সাহিত্য ধীরে ধীরে পরিপুষ্টি লাভ করিতেছে। বাঙ্গালীর যতই চক্ষু ফুটিতেছে, ততই তাহারা তাঁঁহার আদর করিতে শিখিতেছে।

    সমবেত ভদ্রমণ্ডলী এবং বন্ধুবর সতীশচন্দ্র, আপনারা মহাকবি কৃত্তিবাসের জন্মস্থানে অদ্য এই যে মহোৎসবের আয়োজন করিয়াছেন,—পূজ্য মহাপুরুষের পূজার অনুষ্ঠান করিয়াছেন, এজন্য সমগ্র বাঙ্গালী জাতির কৃতজ্ঞতাভাজন হইয়াছেন। যে সমুন্নতবংশের কৃত্তিবাস অলঙ্কার ছিলেন, সেই ফুলিয়ার মুখটীর একজন কবিতারসবঞ্চিত অভাজনকে আপনাদের অদ্যকার উৎসবে আহ্বান করিয়াছেন বলিয়া আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি। যে কুলে আমার জন্ম, সেই কুলের একজন প্রধান পুরুষের এবং বঙ্গের সর্ব্বপ্রধান মহাকবির স্মৃতিবাসরে আমি উপস্থিত হইবার সুযোগ পাইয়াছি বলিয়া নিজেকেও ধন্য ও কৃতকৃতার্থ মনে করিতেছি।

    এস কৃত্তিবাস, তোমার বড় সাধের ফুলিয়ায় একবার ফিরিয়া এস, এই দেখ, তোমার উদ্দেশে, কত শত ভক্ত আজ সজলনেত্রে ফুলিয়ায় উপস্থিত, তুমি তাহাদিগের সারস্বতভাণ্ডারে যে অমূল্য রত্ন দিয়া গিয়াছ, সেই রত্নের গৌরবে তাহারা আজ গৌরবিত, কৃত্তিবাসের স্বজাতি বলিয়া আদৃত। এস কবি, আবার আসিয়া—

    “পবন নন্দন হনূ, লঙ্ঘি ভীমবলে
    সাগর, ঢালিলা যথা রাঘবের কাণে
    সীতার বারতা-রূপ সঙ্গীত লহরী;
    তেমতি, যশস্বি, তুমি সুবঙ্গ মণ্ডলে
    গাও গো রামের নাম সুমধুর তানে,
    কবি-পিতা বাল্মিকীকে তপে তুষ্ট করি।”

    শ্রীআশুতোষ মুখোপাধ্যায়।

  • ইস্তাহার

    ইস্তাহার

    ইস্তাহার বইটির লেখকের নাম জানা যায়নি, তাই অজ্ঞাতনামা লেখকের তালিকায় বইটি প্রকাশিত হলো। ইস্তাহার প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে (১৯৫১ খৃষ্টাব্দে)। প্রকাশক দেবকুমার বসু, ৯/৩ টেমার লেন। কলিকাতা ৯-এর বিশ্বজ্ঞান থেকে। বইটির মুদ্রাকর ছিলেন শ্রীপ্রভাতচন্দ্র রায়
    শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেস প্রাঃ লিঃ। ৫ চিন্তামশি দাস লেন। কলিকাতা ৯। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন গণেশ বসু।

  • মুখবন্ধ

    মুখবন্ধ

    আমার কবিতাগুচ্ছ মুঠো মুঠো জ্বলস্ত অঙ্গার,
    সৈনিকের অস্ত্রাগারে ইম্পাতের উজ্জ্বল তলোয়ার
    ছত্রে ছত্রে স্বীকৃত জীবনের সত্য অঙ্গীকার,
    দুর্বলের দরিদ্রের নিজস্ব কঠিন হাতিয়ার।

     

    আমার কবিতা বিংশ শতাব্দীর প্রত্যক্ষ দর্পণ,
    আধ্যাত্মিক জীবনের বেদান্তের সহজ দর্শন।
    কোমল কুসুম সুষমায় মাখা চন্দ্রমহিমা,
    পাশাপাশি কামানের রকেটের শৌর্য গরিমা।

     

    তোমাদের দ্বারে দ্বারে আমি কবি নিত্য অতিথি,
    তোমাদের সুখ দুঃখ পরিণয় জন্ম মৃত্যু তিথি
    আমার কবিতা রাখে সযতনে মালিকায় গেঁথে;
    আমি থাকি তোমাদের আঁতুড়ে বাসরে শ্মশানেতে।

     

    আমি কবি তোমাদের একান্ত আপনার জন,
    আমার কবিতা চার বিশ্বজনে করিতে আপন।

  • ইস্তাহার

    ইস্তাহার

    পৃথিবীর নানা প্রান্তে শোষণের ভয়ঙ্কর ছবি
    দেখে, আজ আমি এক বিদ্রোহী বিপ্লবী কবি,
    আমার বুকের রক্তে লিখি লাল লাল ইস্তাহার।
    দুর্ভিক্ষে যুদ্ধে রোগে অনশনে মানি নি তো হার,
    মিছিলের পুরোভাগে করি আজ জেহাদ ঘোষণা,
    আমি তো জানি না, বন্ধু, নত শির কাতর প্রার্থনা৷

    যে সকল বজ্র মুঠি কেড়ে নিয়ে অন্ন বারবার
    দুর্বলের ভগ্ন প্রাণে জাগায় ক্ষুধার হাহাকার,
    আমার এ মেরুদণ্ডে উষ্ণ রক্তে অশান্ত প্রবাহ
    সেই লোভী জিহ্বাকে জিঘাংসায় করবেই দাহ।

    দেয়ালে দেয়ালে লেখা আমার জ্বলন্ত ইস্তাহার।
    সাক্ষ্য দেবে অন্যায়ের ইতিহাসে। ঘৃণ্য অত্যাচার,
    অবিচার অনশনে নিঃস্ব পঙ্গু দুঃস্থ দিশহারা
    নিত্য বঞ্চিতের প্রতি সাত্বনার ধূর্ত ইসারা
    তাহাদের প্রলুব্ধ করে, যারা ক্লীব মুর্খ পদানত।
    যুগে যুগে অপদস্থ, অপমানে অতি মর্মাহত;
    আমি কভু সেই দলে লিখি না তো পাগলের নাম,
    তাদের বেদনা দুঃখ বঞ্চনা, আমি জানতাম!

    আমি লিখি ইস্তাহারে শুধু তাহাদেরই সব কথা,
    যাদের চায় না কেউ, যাদের জীবনে ব্যর্থতা;
    সেই সব প্রতিহিংসাপরায়ণ ক্ষুব্ধ কঙ্কাল
    আপন অস্থি দিয়ে ভাবীকালে জ্বালবে মশাল।

  • মশাল

    মশাল

    মশাল জ্বলছে পৃথিবীর মুখে। রক্তমশাল।
    আগ্নেয়গিরি ফুটন্ত লাভা ঢালে লাল লাল।
    পাহাড় ফেটেছে চৌচির উত্তপ্ত রোদে,
    জঠর জ্বলছে কঠোর ক্ষুধায়, দারুণ ক্রোধে।

    সংজ্ঞা খুঁজছো কঙ্কালটার অভিধান জুড়ে?
    দেখাব বুকের ঝাঁজরা পাঁজরা নখাগ্রে খুঁড়ে?

    ভয় কি মানুষ, মানুষের এই হাড় মাস দেখে,
    লোনা রক্ত ও স্বাদহীন মেদ দেখ না চেখে!
    লকলকে লোভী জিভ খাঁক হবে মশালে জ্বলে,
    লক্ষ মশাল জ্বলছে, জানো কি, বক্ষতলে!

  • জনতা

    জনতা

    জনতার দেহে আজ প্রাণের সঞ্চার দেখি গ্রামে শহরে
    অফিসে কাছারিতে কলে কারখানায় স্কুলে কলেজে রাজপথে;
    গণতন্ত্রের সংজ্ঞা সাম্যবাদ আজ দেয়ালের পরিচিত লিপি,
    তাই সমাজ ব্যবস্থার চাই আশু পরিবর্তন।

    এই উপমহাদেশে আজ এত দিনে রীতিমত কায়েম হল জনতার রাজ।
    ছোট বড় উচু নীচু রোড রোলারের তলে পিষ্ট দলিত একাকার।
    ফানুষের মতো ফাঁকা ঠুনকো বুলির ধাপ্পাবাজি ধরা পড়ে,
    সখের নেতাদের স্বার্থপর পুরনো কারসাজির দিন খতম হয়েছে।

    এবার বন্ধু, শ্রমের কড়ি দিয়ে কেনো তোমাদের অন্ন বস্ত্র,
    যথারীতি বংশানুক্রমিক শোষণের মহার্য রক্তের দামে নয়।
    ব্যাঙ্কের লেজারে কাগজে কালিতে তোমাদের কোটি টাকার হিসেব
    কোন আগন্তুক সকালে বাজেয়াপ্ত হলে বিস্মিত হয়ো না, বন্ধু!
    অনেক দিনের জমানো দুধ ক্ষীর মাখন এত কাল খেয়েছ,
    এবার জনতার মাঝে সকলের পাশে বসে ডাল রুটি খাও।
    মনে রেখ বন্ধু, বাড়তি বিত্ত আনে বাড়তি রক্তচাপের রোগ;
    বিত্তহীনের অকালমৃত্যু বিরল, যেমন মাথাহীনের থাকে না মাথাব্যথা।

    দিন আনা দিন খাওয়ার বাঁধাধরা সরল কাঠামোয়
    ভেদাভেদের বিরাট ফাঁক ক্রমে ক্রমে ভরাট হয়ে আসে।
    আজকের জনতার মুক্ত আদালতে সাম্যের আইনে বাঁধা
    এই উপমহাদেশে এক জাতি। একতা।

    আজকের জাতীয় জীবনে ভাঙাগড়ার নিত্য খেলায়
    পরম শত্রু সংক্রামক ব্যাধির মতো ঘৃণ্য মারাত্মক আক্রমণে
    দূষিত বন্যার মতো সমাজের স্তরে স্তরে ক্ষয়িষ্ণু আস্তানা পাতে
    নিদারুণ দারিদ্র্যের পচনশীল ক্ষতগ্রস্ত নিঠুর অভিশাপ।

    তাই বৈশাখের খরতর রুদ্র রৌদ্র দহনে ভস্মীভূত হয়ে যায়
    গণজীবনের মূল মর্মকথা; প্রতিভার যোগ্যতার সাফল্যের উজ্জ্বল মানদণ্ড
    বেসামাল দারিদ্র্যের দমকা ঝড়ে কালে কালে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়।
    কত মূল্যবান প্রাণ নিঃশেষিত, কত মহান আত্মা লাঞ্ছিত লুণ্ঠিত হয়,
    সাধু আর শয়তানের ঐতিহাসিক উপাধিতে স্বচ্ছ তুলনা আনে
    নিশি শেষের চরম ব্যর্থতা হতাশা অথবা বিকৃত মনোবৃত্তির বিকাশ।

    দুর্বাসার কঠিন অভিশাপ যেন দারিদ্র্যের প্রত্যক্ষ বিদ্রোহের ভাষা,
    ভিক্ষা প্রতারণা আত্মদহন অথবা আত্মহত্যা কখনও পথের সম্বল;
    কারণ দিনরাত মাটি কেটে পাথর ভেঙ্গে বোঝা বয়ে, তবু মেলে না
    পেট ভরার মতো দু মুঠো ভাত, দুখানা রুটি কিংবা তৃষ্ণার জল।
    স্নেহপুত্তলিকা রুগ্ন উলঙ্গ শিশুর ভাগ্যে বার্লি জোটে না,
    পরম আদরের সোমত্ত বৌয়ের নেই পরনের এক টুকরো শাড়ী,
    বেড়া ভাঙ্গা মাটির ঘরের জীর্ণ চালে নেই ছাউনির পাতা,
    দারুণ খরায় মাঠের ফাটল বাড়ে, গোয়ালের বলদ মরে অনাহারে,
    বাকি খাজনার দায়ে ঘরবাড়ী ঘটি বাটি মান ইজ্জত প্রাণটুকু পর্যন্ত
    প্রতি বছরই মহাজনের হাতের মুঠোর মধ্যে অনায়াসে বাঁধা পড়ে।

    জনজীবনের এই সব মামুলি কথা কে কবে শুনতে চায়?
    কোন হৃদয়বান বোঝে সর্বহারাদের এই চিরাচরিত দুঃখ?
    তথাকথিত ভদ্র সভ্য সমাজের চোখে অনীপ্সিত নোংরা জঞ্জাল
    এই উপমহাদেশের উপেক্ষিত জনগণের যে বিরাট অংশ,
    তারাই কোটি কোটি দরিদ্র নিম্ন মধ্যবিত্ত অবহেলিত নগণ্য মানুষ;
    তবু দেশ সংগঠনে তাদের সস্তা জলবৎ রক্তের বিশেষ প্রয়োজন।

    জনতার কণ্ঠে সংস্কারের সংগ্রামের উদার ডাক শোনা যায়,
    সিভিল সাইরেণে দীর্ঘ দিনের ভয়াবহ কঠিন যুদ্ধের ঘোষণা,
    জনগণের আশু পরম বৈরী দারিদ্র্যকে নিঃশেষিত করে মুছে দাও!

    এবার তাই ধনী বন্ধুদের সন্ধির হাত উদারতায় প্রসারিত হোক!
    যা কিছু সঞ্চিত রয়েছে তাদের গোপন ভারী ভাণ্ডে সমানভাগে

    পুরনো দিনের পাওনার খতিয়ানে নির্ভুল গাণিতিক হিসেবে
    আসরের সকলের মাঝে এনে সমানভাবে দিতে হবে বেঁটে,
    সেই হবে দারিদ্র্যের সংগ্রামের স্বয়ংক্রিয় চরম সংহার হাতিয়ার।

    এ কথা তো মানো, এই উপমহাদেশ তোমার আমার এবং তাহাদের;
    এখানের গণ আদালতে এক জাতি সমতায় চাই একতা।

    আজ সেই পরম লগ্ন এসেছে, বন্ধু। আর বৃথা দেরী নয়,
    তোমাদের বৃহৎ প্রাসাদের অব্যবহৃত অখ্যাত কোন অন্ধকার কোণে
    শত শত পথবাসী গৃহহীনের জন্যে সামান্যতম ঠাঁই চাই,
    তোমাদের ভাঁড়ারের বাড়তি বাসি খাবারের অকৃপণ দানের দ্বারা
    তাদের জ্বলন্ত জঠরের ক্ষুধার দাবানলের নিবৃত্তি অবশ্যই হবে!
    শুধু মনে রেখ, বন্ধু, এক জাতি। একতা।

  • আদিম ও আগামী

    আদিম ও আগামী

    আদিম, তুমি চলে গেছ বহু দূরেই আজ,
    নাগাল তোমার পাবে না তো আর উড়োজাহাজ!

    লাঙল তোমার মরচে ধরেছে,

    বলদ তোমার, তাও তো মরেছে,

    ট্রাকটার আনে ফসল দিন,

    প্রবীণ গিয়েছে, প্রাক্তন নেই, এল নবীন।

     

    আকাশ নীলিমা ভরে গেছে আজ কলের ধোঁয়ায়,
    মাটি পুড়ে পুড়ে রূপ পেল আজ ইট খোয়ায়।
    মানচিত্রের সীমারেখা আজ হল বদল,
    চলমান এই পৃথিবীতে কিছু নহে অটল।
    যুগের চাকায় মানুষেরা চলে,

    জীবন চিনেছে ক্ষেত আর কলে,

    তবুও ছেঁড়েনি মহামারী আর মৃত্যু ফাঁস,

    জোড়াতালি দেওয়া এ জীবন যেন শুধু পরিহাস।

     

    বহু দধীচির আত্মায় গড়া এই সমাজ

    আশা উদ্যোগ সংগ্রাম নিয়ে জীবিত আজ।

    অঙ্কুর কেউ বুনে গেছে এই মাটিরই বুকে

    আজ তারই গাছ ধীরে ধীরে বাড়ে দুঃখে সুখে;

    আগামী পৃথিবী পাবেই তাহার সোনার ফসল,

    কেমন করে আদিম তাকে বাঁধবে, বল!

  • চোখ

    চোখ

    মানুষের মুখে দেখেছি চোখ। অদ্ভুত চোখ।
    ক্ষুব্ধ আত্মা খর দৃষ্টিতে খোলে নির্মোক,
    কোটরগত ফারনেস থেকে আগুন ঝরায়,
    শান্ত সবুজ পৃথিবীর শোভা জ্বলে পুড়ে যায়।

    অবুঝ শিশুর ক্ষুধার্ত চোখে অশ্রু ঝরে,
    যুবকের চোখে হতাশাবহ্নি গরগরে।

    উপোস ক্লিষ্ট প্রৌঢ়ের চোখ পেচকের মতো,
    বৃদ্ধের চোখে তন্দ্রা নেমেছে, যেন সে মৃত।

    প্রেয়সীর সেই মদনমুগ্ধ চোখের চাহনি গেল কোথায়?
    আমার চোখের দৃষ্টিও দেখি জ্বলছে, হায়!

  • জেহাদ

    জেহাদ

    দিকে দিকে ওরা আঘাতে আঘাতে তোলে জেহাদ,
    ভেঙ্গে পড়ে বুঝি শাসনের পুরাতন বনিয়াদ।
    নিশানে নিশানে আন্দোলন তোলে মাথা,
    বিক্ষুব্ধ হল গ্রাম শহর কলকাতা।

    এক সাথে আজ মজুর কেরানী কৃষাণ ভাই
    কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলছে, ‘বাঁচতে চাই’!
    দিকে দিকে জাগে মিছিলে মিছিলে জিন্দাবাদ;
    ওরা যে আজি ঘোষণা করেছে দারুণ জেহাদ!

    পুরনো দিনের রঙটি বদল হয়েছে আজি,
    বিদ্রোহী মনে বিপ্লব বীজ করছে কাজ,
    জনতার দাবী, তার দাম দাও সবার আগে,
    পাওনাগণ্ডা বুঝে নিতে দাও ভাগে ভাগে।

    মালিক, দালাল, কালোবাজারীর গুপ্ত দল,
    এবার করবে সব একে একে পালা বদল,
    পুরনো দিনের বিদূষকের রঙিন বেশ
    দিনের আলোয় আদালতে করবে পেশ।

  • রাজনীতি

    রাজনীতি

    এতদিন জানতাম, রাজনীতি শুধুমাত্র সংসদ ভবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ;
    কিন্তু আজ দেখি, রাজনীতির নামে মূর্তিরা নেমেছে রাজপথে ফুটপাথে,
    রাজনীতির ছবি আঁকতে বোমা পিস্তল পাইপগান ছুরির ফলাকায়,
    দেশের মানুষের তাজা রক্তে। ছন্নছাড়া পাটি প্রীতির অদম্য মোহে
    দিক্‌বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অন্ধ অঙ্গীকারে বিপুল আক্রোশে
    নিতান্ত জুলুমের বশে ফয়সালা হয় অসঙ্গত রাজনৈতিক মতবাদ।

    তারপর একদিন জনতা জাগে। সত্যের নির্ভীক আলোক বর্তিকা
    যদিও কেউ আসে না দেখাতে; বরং দালালের কুর পরিহাস
    তোমাকে আমাকে এবং সকলকে
    ছেলেখেলার তামাসার মঞ্চে বোকা পুতুলের ছায়া বানাতে নিয়ত প্রয়াসী।
    এই মর্মান্তিক প্রহসনের অর্থ, আপন মুণ্ড আপন হাতে কেটে
    আপনার পায়েই নৈবেদ্যের ডালির মতো সমর্পণ করতে হয়।

    জনতার জমজমাট আসরে মহামান্য সম্রাটসম যাদুকর নেতাদের
    সচরাচর দর্শন মেলে না। প্রহরারত রুদ্ধ কক্ষে নিরাপদে বসে
    পত্র-পত্রিকায় মাঝে মাঝে বিভ্রান্তিময় ছলাকলার অমূলক বিবৃতিতে
    তাদের অস্তিত্বের দুর্বল প্রমাণ। দেশকে, অথবা দেশের মানুষকে
    তারা কোনদিন কি ভালবেসেছে? আপন গদি অথবা দলমত
    সর্বোপরি স্বীয় উদরপূর্তি, ক্ষমতার প্রতিযোগিতামূলক মারাত্মক লড়াইয়ে
    ছলে বলে কৌশলে ব্যালট বাক্সে বিজয়গৌরব অর্জনের বাহাদুরি
    আপন বিশ্বের আধুনিকতম অভিধানে রাজনীতির অভিনব ব্যাখ্যা।

    কিন্তু এই প্রহসনের শহীদ হতে আমরা কখনও চাই নি।
    তোমাদের আমাদের এবং তাহাদের নিম্নতম চাহিদা ছিল:
    শুধুমাত্র পেট ভরে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত, পরনের সামান্য আবরণ,
    হতভাগ্য বংশধরদের জন্যে শিক্ষা স্বাস্থ্য এবং সুস্থ জীবন;
    মানুষের উপযোগী মাথা গোঁজবার মতো এতটুকু স্থান,
    আর প্রকৃত অর্থে আমাদের আপন দেশের সর্বাঙ্গীন সমৃদ্ধি।

  • সঙ্কট

    সঙ্কট

    আমি জানতাম, বঞ্চনা ক্ষোভে ব্যাপক ধর্মঘট,
    বেকারত্বের গণসমস্যা, খাদ্যের সঙ্কট,
    নব বিপ্লবে আগ্নেয়গিরি ধূমায়িত ষড়যন্ত্রে,
    কেমন করে তা রুখবে বন্ধু, কোন মহা যাদুমন্ত্রে?

    এই মহাদেশে কোটি মানুষের কোটি অনটন, দায়,
    কোন কৌশলে নিমেষে তাদের সমাধান করা যায়?
    নীচের তলার অন্ধকারের দুঃসহ হাহাকারে
    উপর তলার ঘুম ভেঙে যাবে, করাঘাত দ্বারে দ্বারে।
    গৃহযুদ্ধের প্রয়োজন নেই; বাঁচার চাহিদা পণ,
    সদ্ধিপত্রে স্বাক্ষর পড়ে, সেটুকু হলে পূরণ।

    আমি জানতাম, লোক গণনার হিসেবে রয়েছে ভুল,
    প্রতি মুহূর্তে জন্মের হার ছাপিয়ে সীমানা কুল
    আরও কোটি ছায়া কিলবিল করে, নাহি লেখাজোখা মাপ,
    তারাই আবার আনবে যুদ্ধ দুর্ভিক্ষের অভিশাপ।

  • বন্যা

    বন্যা

    বন্যার জলে ভেসে গেছে সব ধানের চারারা;
    অনেক শ্রমের মূল্যে বোনে মাঠে রক্তের ধারা
    দরিদ্র কৃষক তার সামান্য সম্পদ বেচে কিনে,
    এখন মরতে হবে দুর্ভিক্ষের দুরন্ত দুদিনে।

    জল নেমে গেলে, মাঠে জেগে ওঠে শুকনো ফাটল,
    বুভুক্ষু গহবরে ওঠে ক্ষুধার উত্তাপে কোলাহল,
    ধ্বংসের তাণ্ডবে চুর্ণ চৌচির বিচিত্র রুক্ষ্ম রুপ
    দেখে দেখে আতঙ্কে অন্তরাত্মা হয়ে আসে চুপ।

    উপোসী বৌয়ের নেই, এমন কি, পরনের শাড়ী,
    রুগ্ন শিশুর দুধ বার্লি নিয়ে তুচ্ছ কাড়াকাড়ি,
    অন্ন নেই ঘরে, কানা কড়ি নেই কৃষকের হাতে,
    দুঃখী কৃষক জানে, মৃত্যু আছে তাদের বরাতে।

    মহাজন দুর্ভিক্ষে কখনও করে না তো ক্ষমা!
    তার ঘরে চড়া দামে কৃষকের মাথা পড়ে জমা।
    ভাগ্যের পরিহাসে খাদ্যের দারুণ অভাব,
    মজুতদারের দ্বারের কঙ্কালের দ্রুত আবির্ভাব।

    বন্যা কেন নিয়ে গেল শুধুই মাঠের যত ধান,
    কেন সে নিল না এই কটিমাত্র হতভাগ্য প্রাণ!

  • জবানবন্দী

    জবানবন্দী

    আমরা অগ্রগামী। অগ্রদূতের সারথি।
    উর্বর জীবনের স্বপ্নে কাটে আমাদের দিন।
    এটুকু যেন আজন্ম কুড়িয়ে পাওয়া আশীর্বাদ;
    ভাঙ্গা বাসরের জোড়াতালি দেওয়া
    বেসুরো বাঁশীর বিমুনি আজ আমাদের ইঞ্জিনের স্টীম।
    শিল্পের সংজ্ঞা আমরা জানি না, ইস্পাতের যুগে
    হায়, খলিফাকে প্রতিবেশী করেছি।
    আগুনে মেঘ ওড়ে যদি আকাশে আকাশে,
    নেহাত উদাসী বাউলের মতোই একতারার চুম্বকে
    চাতক পাখীর ঠোঁটে তাকে গ্রাস করি।
    চাঁদের আলো ফুলের হাসির দিন ফুরিয়েছে। পুরোনো রঙে
    তুলি আর ভেজে না; ধানের চাষে এবার
    বিদ্যুৎ চাই, ট্রাকটার চাই।
    স্রোতস্বিনী ক্ষীণতর হয়ে আসে প্রতিদিন। আজ
    ওপারের হাটের কৃত্রিম কোলাহল এপারে পৌছেচে,
    কাঁপন লেগেছে দুরঙা নদীর বুকে। অবাক কাণ্ড!
    আর্শিতে নিজেদের বিসদৃশ চেহারা চেনা যায় না;
    রঙ মাখা সঙের মতোই আমরা কিম্ভূতকিমাকার!
    দুনিয়ার প্রগতির তরী আমাদের ঘাটের পাশে এলে;
    বোকা ছেলের হাতের মোয়ার মতো
    আমরা বিমুগ্ধ চোখে তা দেখি, মাটির গন্ধ ভুলে।
    তাই আমরা আজ দুর্বল বেকুব বিমূঢ়!
    বিকৃত সূর্যের ছায়াই মাটিতে, শ্যামল বনানীতে;
    আজ আমরা কোন সার্কাসের পংগু ‘ক্লাউন’,
    সুরার প্রলাপ বা রোমাঞ্চ কাহিনীর ভূমিকা ভুলে
    শুনি কোন দুরন্ত আসামীর কয়েদ জীবনের ব্যর্থ জবানবন্দী।

  • নেতা

    নেতা

    জনতার স্রোতস্বিনী উত্তাল জোয়ারের টানে

    ভাসমান রাজনীতির পালে লাগে নতুন হাওয়া;

    উজান স্রোতের মুখে তাই দিক্‌হারা নেতা

    সাফল্যের পথ খোঁজে নতুন ধারায়, নতুন ভাবনায়।

    জীর্ণ অট্টালিকার প্রাচীন বনিয়াদে যেমন করে জন্ম নেয়

    ভাঙনের কুটিল কুচক্রী দুঃস্বপ্নের দল,

    জনতার মনের রন্ধ্রে নব আবিষ্কারে তেমনি দ্রুত মগ্ন হয়

    বল্লাহীন অশ্বের মতো নতুন কোন নেতা।

    ঊর্ধ্বমুখী পতঙ্গের অবশ্যম্ভাবী দুঃসহ পতন রীতিমত অভ্যস্ত

    দুর্বোধ্য অসংলগ্ন অঙ্গীকারের বুকে মূর্তিমান যাদুকর

    সনাতন নেতার কাঠামো ভাঙে। আবার নতুন নেতা গড়ে।

     

    দিকভ্রান্ত বিভ্রান্ত জনতার আশা আকাঙ্ক্ষার নগ্ন ইতিহাস

    অসঙ্গত অন্যায় মুমুর্ষু জীবনের পাতায় পাতায়

    যে মেঘলা প্রভাতে গোপনে গোপনে জলের রেখায় লেখা হয়,

    অমৃতের বরপুত্রের মতো চমকপ্রদ পোষাকে ঠিক তখনই

    আবার আকস্মিকভাবে নব জন্ম লাভ করে কোন নেতা।

    পলায়নের খতিয়ানের ধূসর ছিন্নপত্রগুলো

    ঘূর্ণি হাওয়ার মাঝে আবার সহসা কখনও উধাও হলে,

    এবং জ্বলন্ত বক্তৃতার মালা কখনও অর্থহীন প্রমাণিত হলে,

    সেই বিশেষ নেতার অপমৃত্যু ঘটে অনিবার্য গন্তব্যের মতোই।

     

    যশ অপযশের নিরপেক্ষ চিরন্তন মানদণ্ডে জনতার ময়দানে

    নিতুল সংকেতের স্পষ্ট ছায়াছবি নিয়তির পরিহাসে প্রতিফলিত;

    শরৎকালের প্রতি প্রত্যুষের জীবন্ত নিষ্পাপ শিউলির মতোই

    উচ্চাভিলাসী নেতারা ফোটে করে আবার মাটিতেই বিলীন হয়;

    দেশে দেশে প্রতি মরশুমেই তারা আসে, আসবে এবং যাবে।

  • শকুনির পাশা

    শকুনির পাশা

    শকুনির পাশার যাদু কুরুক্ষেত্রের দামামা বাজাল
    পূবে আর পশ্চিমে। পাণ্ডবে কৌরবে।
    মরা হাড়ে ভেন্ধি দিয়ে গড়া শক্তিমত্ত বহুরূপী পাশা।
    নগ্ন অট্টহাসিতে উৎকট বীভৎস,
    মৈত্রী বর্মে জুয়াড়ীর গোলক ধাঁধার ফাঁদ।
    তাই শকুনির অবশ্যম্ভাবী জয়ের পৈশাচিক উল্লাসে
    উগ্র উৎকণ্ঠায় যুগে যুগে কত কঙ্কাল হয়েছে ফসিল;
    দ্বন্দ্বে সংঘাতে বিচ্ছেদে সংগ্রামে ইতিহাসের পাতা ভরা।
    সুপ্রাচীন অট্টালিকার কক্ষে কক্ষে রন্ধ্রে রন্ধ্রে
    কালো হয়ে উঠেছে কত বিষাক্ত অজগরী নিঃশ্বাস।

    তবু যুগে যুগে মীরজাফর ফিরে আসে,
    খাল কেটে আরো কুমীর আনা হয়,
    নেকড়েকে আনা হয় লোকালয়ে।
    আহা, ভাঙ্গনের সাধনায় মরে বেঁচে থাকা,
    আর কুচক্রী শকুনি তার ক্রূর হাসি ছড়ায় বাতাসে

  • মহাজীবন

    মহাজীবন

    এ মহাজীবন হয়েছে রুক্ষ্ম,
    বসন্ত বায়ু হয়েছে তপ্ত,
    হারাল কাব্য এ শতাব্দী,
    আজ এ পৃথিবী কি অভিশপ্ত?

    এস, আজ মোরা নাটক লিথি,
    তোমার আমার জীবনের ছবি
    নগ্ন কাহিনী গদ্যেই গাঁথ,
    তৃষ্ণা ব্যাকুল ক্ষুধার্ত কবি।

    এ মহাজীবন হয়েছে রুক্ষ্ম,
    এ পৃথিবী আজ হয়েছে সাহারা,
    পথে পথে দেখ ভুখা মিছিলেতে
    সবহারা ওই চলেছে কাহারা!

    শিল্পী তোমার নরম তুলিতে
    আঁকিতে পার এ রিক্ত ধরা?
    ভাঙনের কুলে কুলে বুঝি আজ
    ভাসে যাযাবর সারি সারি মরা।

    তোমরা কি কেউ বলতে পার,
    কি নাম ওদের, কোন জাতি ওরা?
    কণ্ঠে কণ্ঠে একই জবাব,
    নাম জাত নেই, ওরা শুধু ‘মরা’।

  • যৌথ

    যৌথ

    সবল পেশীর মুষ্টিতে ঘোরে যন্ত্রের চাকা,
    প্রসূত সৃষ্টি মুনাফা আনে সহস্র টাকা।

    মজদুর আমি যন্ত্রের মতো দৃঢ় কঠোর,
    আমার দেহের বয়লারটার নাম জঠর,
    সেখানেও চাই কয়লার মতো কিছু রুটি।
    ধর্মঘটের কৌশল আনে গণছুটি,
    লক আউট সভা ঘেরাও মিছিল সন্ত্রাসে
    দুঃখ ঘুচবে, এ কথা শুলে কে না হাসে?

    মজদুর আমি যান্ত্রিক আমি, এ দেশ আমার,
    দেশের ফসল উৎপাদনের দায়িত্বভার
    আমার মতন মজুর ভাইয়েরা নেয় যখন,
    মালিক, বৃথা না-ই বা করলে আস্ফালন!
    নির্ধারিত নিয়মে তব বখরার হার;
    মজদুর মেরে উদরপূর্তি হবে না আর।

    এস আজ মোরা মালিক মজুর একই সাথে
    যন্ত্রের চাকা ঘোরাই সহজে যৌথ হাতে।