Author: তাহের আলমাহদী

  • বি-এন-ডব্লুর ব্র্যাঞ্চ লাইনে

    বি-এন-ডব্লুর ব্র্যাঞ্চ লাইনে

    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    বি-এন-ডব্লুর ব্র্যাঞ্চ লাইনে

    সে মূর্ত্তি লাখের মধ্যেও দৃষ্টি আকর্ষণ করিত; সুতরাং গাড়ির মধ্যে যখন তৃতীয় ব্যক্তি আর ছিলই না, তখন মৃঢ়ভাবে একদৃষ্টে চাহিয়া থাকা ভিন্ন আর উপায়ই ছিল না।

    কালো — সে যেমন তেমন কালো নয়; তাহার উপর বেঁটে এবং মোটা। মাথার ব্রহ্মতলে একটা আব, তাহার উপর একটা সুপুষ্ট চৈতন — যেন গোড়াটি সযত্নে বাঁধানো হইয়াছে। এক কানে একটা কলম, অপর কানে পেন্সিল। রগের পাশ দুইটা হালফ্যাশানে চামড়া ঘেঁষিয়া ছাঁটা। রেল-কম্পানির মার্কামারা কালো কোট এবং সেই মেলের পেণ্টালুন পরিয়া গাড়িতে প্রবেশ করিলেন এবং বসিয়াই চটের ব্যাগটা খুলিয়া ফেলিলেন।

    তাঁহাকে যে লোকে বিস্ময়নেত্রে দেখেই — এ জ্ঞানটুকু বোধ হয় স্বভাবসিদ্ধ হইয়া গিয়াছে। আমার দিকে এক রকম না চাহিয়াই বলিলেন, এই যে দাঁড়ান একটু, বলি সব —

    কোট এবং প্যাণ্ট খুলিলেন। কালো পাঁঠার যেন ছালটা ছাড়াইয়া ফেলা হইল। কোটের নীচে শ্রীশ্রীকালী ছাপ দেওয়া লাল নামাবলি ও প্যাণ্টের নীচে রক্তচেলি বাহির হইয়া পড়িল। পেণ্টালুন এবং কোর্ট তাল পাকাইয়া এক পাশে রাখিলেন। ব্যাগ হইতে একটা টকটকে জবাফুল বাহির করিয়া টিকিতে বাঁধিলেন; কপালে একটা জ্বলজ্বলে সিন্দুরবিন্দু পরিলেন, তাহার পর ব্যাগটার মধ্যে কোট আর জামাটা ঠাসিতে ঠাসিতে দাঁত মুখ খিঁচাইয়া ব্যাগটাকে সম্বোধন করিয়া বলিতে লাগিলেন, বটে! নেবে না ভেতরে? ভটচাজ্জির চটের ব্যাগ আবার ইংরিজী কায়দামত মিতাহারী হয়েছেন — তোর ব্যাগের নিকুচি করেছে।

    ভয়েই হউক আর যে জন্যই হউক, স্ফীতোদের ব্যাগটি কোট ও প্যাণ্টটিকে আশ্রয় দিল। এ অঘটন-ঘটনে আমায় বিস্ময়নেত্রে চাহিয়া থাকিতে দেখিয়া বলিলেন, খুব সোজা কথা — এ দেশেরই কারিগরেরা মসলিন তৈয়ের করে গেছে, যার একটা থানকে থান একটা ঝিনুকের খোলে লুকিয়ে রাখা যেত! যাক সে দুঃখের কথা। চাবিটা কষে দিই এই, তারপর দিচ্ছি সব পরিচয়। কত দূরের পাল্লা?

    উত্তর দিতে যাইতেছিলাম, এমন সময় দরজার কাছে শব্দ হইল — দণ্ডবৎ বড়হমচারী বাবা, সাহেবকে কেমোন দেখলেন? বোড্ডো গোস্মায়ে ছিলো। সোব জবাবদেহি আপনারই কন্ধা পর —

    আরে হীরে সিং যে! হ্যাঁঃ, একটা ইঞ্জিন একটু ডিরেল হয়ে গেছে, তার আবার জবাবদিহি! জল করে দিয়ে এসেছি। এই দেখ, এ কানে কলম, এ কানে পেন্সিল; — দেখেই বেটা হেসে জিজ্ঞাসা করলে, এ কি বাবু? যেন আকাশ থেকে পড়লাম, দেখেছ, কাজের ভিড়ে কলম পেন্সিল কানে যেন কায়েমি বাসা বেঁধেছে একেবারে; আর হুজুরের তলব শুনে কি আর জ্ঞানগম্যি কিছু ছিল? লোকে বলে, সিংহের ডাক! এই তাতটুকু দিতেই মন গলতে আরম্ভ হ’ল বেটার। বললে, না, কাজ কর আর না কর, অমন বেতর মাতাল হয়ে ইষ্টিশনে ঢুকো না বাবু, অনেক গুলো দোষ জমে উঠেছে তোমার, এই ফাইল দেখ।

    ব্যাগের মধ্যে ছ বোতল সেরা বিলিতী মাল নিয়ে গিয়েছিলাম, একেবারে আনকোরা; টেবিলের ওপর সারবন্দী করে বললাম, ও পাটই উঠিয়ে দিয়েছি হুজুর, ওই ছটি বোতল ছিল, হুজুরের কাছে জরিমানা দিয়ে যাচ্ছি — এই নাকে হাত দিলাম, এই কানে দিলাম।

    একেবারে জল, বললে, এখনও রিপোর্টটা পাঠাই নি, দেখি ভেবে তা হলে; কিন্তু দেখে, সাবধান।

    ছ আষ্টে আটচল্লিশটি টাকা লম্বা হয়ে গেল — তা আর কি করব? বেটা একটু টানেটোনে বলেই এই করে চালিয়ে যাচ্ছি; না হলে চাকরি কি আর থাকত হীরে সিং? ব্যাগের দিকে চাইছিস? তিনটে বোতল কিনে নিলাম তাড়াতাড়ি — আজ আবার দাসু খুড়োর ওখানে মায়ের পূজো — তুই বেটা যাবি নি?

    হীরা সিং দুঃখের হাসি হাসিয়া বলিল, মাকে পরনাম হোই দেওতা; আজ ডিউটি পড়িয়ে গেসে; নইলে আমার তো ষোড়্‌হো আনা খাঁইস ছিল।

    এই দেখ বেটার মতিচ্ছন্ন; নাম শুনেও ডিউটির খেয়ালে গরহাজির হয়ে একটা কাণ্ড বাধাবে দেখছি! নে, উঠে আয়। না না, আর না অমত করিস নি হীরে সিং, ওইটুকু বলেই মাকে ঢের চটিয়েছিস — তোর আমার আবার ডিউটি কি র‍্যা? এই আমিই কার ওপর সব ছেড়ে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছি? তার ডিউটি তিনি বুঝে নেবেন, তুই উঠে আয়।

    হীরা সিং ইতস্তত করিতেছিল, এমন সময় গার্ড হুইস্‌ল দিল। বড়হমচারী আমার দিকে না দেখিয়াই বলিলেন, রগের চুলছাঁটা দেখছেন? ওটা সবারই চোখে ঠেকে। দাঁড়ান, ও বেটাকে তুলি আগে, তারপর সব বলছি। ওটা সেজো আবাগীর আবদার; কিন্তু সব; কথা না বললে বুঝতে পারবেন না। হীরে সিং, উঠে আয় বাপধন, দাসু খুড়ো আজ মার রাজসূয় যজ্ঞ করাচ্ছে; ‘কারণে’ আজ ডুবসাঁতার কাটতে হবে — নে, উঠে আয়।

    গাড়ি ছাড়িয়া দিল।

    ডিউটি ছিল, কাল সাহেব গর্দ্দানা লিবে। — বলিতে বলিতে হীরা সিং গাড়িতে উঠিয়া পড়িল। দেওতার পায়ে হাত দিয়া, হাতটা কপালে ঠেকাইয়া সামনে বসিয়া পড়িল।

    জিতা রও বেটা, সুবুদ্ধি হোক। — বলিয়া দেওতা ব্যাগ খুলিয়া একটি সক্রীত বোতল ও একটা গেলাস বাহির করিয়া তাহার হাতে দিলেন — নে, সিলটা খুলে ফেল দিকিন, একটু পেসাদ করে দিই, তারপরে সাধ থাকে ডিউটির কথা ভাবিস, বেটা কুসন্তান কোথাকার! এরই নাম জমাদার হীরা সিং। এই তিনটি বোতল তিন চুমুকে সাবড়ে ওই ভৈরবী নদীর নেড়া পুলের ওপর দিয়ে গটগট করে পার হয়ে যেতে পারে। জংশন ইষ্টিশনের হেড পয়েণ্টম্যান, এক কথায় ডিউটি ফেলে মার টানে উঠে এল। — শেষের কথাগুলি আমায় বলিলেন। হীরা সিং সম্বন্ধে পূৰ্ব্বে কৌতুহলের তেমন বিশেষ কারণ না থাকলেও পরিচয়ে উদ্রেক হইল বটে; এবং হীরা সিঙের মহত্ত্ব ও জংশন স্টেশনের আসন্ন বিপদের কথা ভাবিয়া মনে মনে শিহরিয়া উঠিলাম।

    দেওতার পীতাবশিষ্ট পেসাদটুকু নিঃশেষ করিয়া হীরা সিং গোঁফজোড়া মুছিয়া একটু পাকাইয়া লইল; মনে হইল, সে এইবার গাড়ি হইতে লাফ দেওয়া কিংবা নেড়া পুল পার হওয়ার অনুরূপ একটা দুরূহ কার্যের জন্য তৈয়ার হইতেছে; কিন্তু সেসব কিছুই না করিয়া হীরা সিং আস্তে আস্তে টলিতে টলিতে আসিয়া আমার পায়ের উপর তাহার মাথাটা চাপিয়া ধরিল এবং একটু পরে হাউহাউ করিয়া ক্রন্দন শুরু করিয়া দিল।

    ভাবিলাম, এ তো ভ্যালা বিপদ, বেটা আধ ছটাক খাইয়াছে কি না! ঠিক নাই! একেবারে ভূত!

    বড়হমচারী ওর দুনো টানিয়াও নির্বিকার; বুঝিলাম, হাঁ, বড়র মুখেই ক্ষুদ্রের প্রশংসা মানায় বটে। বলিলেন, ওর অনেক দুঃখু, সব বলব ’খন, আর একটু সবুর করুন না। আজ গার্ড ড্রাইভার কে র‍্যা বেটা? নে, উঠে আয়।

    হীরা সিং আমার পা আরও জোর করিয়া ধরিল; জড়িত অনিরুদ্ধ কণ্ঠ বলিল, গরিব হীরা সিং ছ্যুমা মাঙছে।

    রাগে একটা হেঁচকানি দিয়া পা ছাড়াইয়া লইলাম; বলিলাম, আচ্ছা মাতালদের পাল্লায় পড়া গেল তো!

    দেওতা হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন; বলিলেন, আরে না না, ও চুমো চাইছে না, ওকে ক্ষমা করতে হবে; বেটারা ‘ক্ষ’ — কে ‘ছ্য’ বলে সব মাটি করে যে — ভয় নেই — হাঃ হাঃ হাঃ। আয় বেটা, উঠে আয়, জিবের আড়টা ভেঙে নে দিকিন — একটু হলে কেলেঙ্কারি বাধাতিস আর কি! ভাব্‌ দিকিন্‌ যদি উনি কোন বড়ঘরের লেডি হতেন! আচ্ছা, আমিই ওর হয়ে অ্যাপলজি চাইছি। — বলিয়া উঠিয়া আসিয়া করুণভাবে আমার হাতটা চাপিয়া ধরিয়া আবার স্বস্থানে গিয়া বসিলেন। দেখিলাম, ক্রমে ক্রমে তাহারও অবস্থা সঙিন হইয়া আসিতেছে।

    হীরা সিং আবার বজ্রমুষ্টিতে আমার পা ধরিয়াছিল। আমি নিরুপায় হইয়া তাহাকে ভাল কথায় বলিলাম, নে, তোকে করলাম ছ্যমা — আর যেন টানিস-টুনিস নি — যা, গিয়ে ব’স দিকিন এখন।

    এ জিন্দগিমে আবার শরাব? এই গুরুর শপথ খাচ্ছি, হীরা সিঙের শপথকে ওই দেওতা চিনেন, দেওয়ার জন্যে আমার ধন-মান-কুল। আবার গলা ভারী হইয়া আসিল।

    দেওতা ডাক পাড়িতেছিলেন, হীরা সিং আস্তে আস্তে গিয়া পায়ের কাছে বসিল, গেলাসটি হাতে লইল, তাহার পর আমার দিকে বাঁ হাতটা আড়াল করিয়া চুমুক লাগাইল।

    বড় পাজি জিনিস। অ্যাজ এ ফ্রেণ্ড অ্যাড্‌ভাইস দিচ্ছি, কেউ মাথার দিব্যি দিলেও ধরবেন না। আমার কথা? একটু মেডিসিনডোজে চালাই কখনও কখনও, তাও কেন যে ধরেছি সব কথা বললেই বুঝতে পারবেন, একটু সবুর করুন না, সব বলছি।

    একটু সবুর করিবার পর গাড়ি আসিয়া পরের স্টেশনে থামিল। দেওতা বলিলেন, যা বেটা, দেখ, দিকিন — গার্ড আর ড্রাইভার কে? হঠাৎ চোখ রাঙাইয়া উগ্রভাবে বলিলেন, যেই হোক, টিকি ধরে টেনে নিয়ে আসবি, বলবি, বড়হমচারী বাবার হুকুম, ইয়ারকি না, যা। — বলিয়া পৃথিবীতে তাঁহার হুকুমগুলা ঠিকমত তামিল হইতেছে না, বোধ হয় এই রকম একটা ধারণা করিয়া লইয়া রাগতভাবে মুখটা গোঁজ করিয়া বসিয়া রহিলেন।

    হীর সিং ভক্তিভরে তাহার পায়ের ধূল লইয়া টলিতে টলিতে নামিয়া গেল; প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াইয়া শেষ বিদায়ের মত হাতজোড় করিয়া বলিল, গরিবকে অসমরণ রাখবেন বাবা।

    দেওতা অবিচলিতভাবে বসিয়া রহিলেন, হীরা সিং চলিয়া গেলে আবার সহজ ভাব ধারণ করিয়া আমাকে বলিলেন, সার্থক নাম বেটার, একখানি হীরের টুকরো। তাহার পর যুক্তকর কপালে ঠেকাইয়া বলিলেন, জংশনের পয়েণ্টগুলো সামলে দিস মা, দশমহাবিদ্যারূপিণী; নয়তো দুর্নাম নিবি বেটী —

    চুপ করিয়া হীরার হীরাত্ব এবং মা আজ দশমহাবিদ্যার কোন্ রূপটি লইয়া পয়েণ্টগুলির নিকট আবির্ভাব হইবেন ভাবিতেছিলাম, এমন সময় হীরা সিং একটা মুসলমান ড্রাইভার ও একজন ফিরিঙ্গী গার্ডকে সঙ্গে করিয়া হাজির হইল। তাহার আসিয়া হীরা সিঙেরই মত বলিল, দণ্ডবৎ বড়হমচারী বাবা।

    বাবা রক্ত চক্ষু এবং কম্পিত হস্ত তুলিয়া নীরবে আশীর্বাদ করিলেন, তাহার পর বোতলটা এবং গেলাসটা বাড়াইয়া দিয়া বললেন, তোর ইঞ্জিন চলছে না যে আলিজান, নে, একটু স্টীম ক’রে নে! —  কে, পিটার গার্ড সাহেব? নাও, একটু চড়িয়ে নাও, ঘাট স্টেশন পৌঁছুতে যার নাম রাত দুটো; আজ দাসু খুড়ো মার পূজো করছে —  নেমন্তন্ন রইল। ঘণ্টা দুত্তিন লাগবে; ফাস্ট সেকেণ্ড ক্লাসে কোন প্যাসেঞ্জার আছে নাকি?

    পিটার সাহেব গেলাস হাতে করিয়া তাচ্ছিল্য ভরে ওষ্ঠাধর কুঞ্চিত করিয়া বলিল, ইয়েস, কোঠিয়াল বিলিয়াস সাহেব সিকিন কিলাসমে হ্যায়। আরে হ্যায় তো হ্যায়; ওয়েসা সাহেবকো পিটার গার্ড ‘সাহেব’ নেহি কইতা — কভি ওসব ওলায়েৎ দেখা হ্যায়? হামারা গ্র্যাণ্ডফাদার —

    বড়হমচারী পিটারের মুখের কথা কাড়িয়া লইয়া জড়িত কণ্ঠে বলিলেন, ওর গ্রাফাদার প্রকাণ্ড জাহাজের ফায়ারম্যান ছিল — কতবার যে বিলেতে যাওয়া-আসা করেছিল, তার হিসেব নেই; পিটার তো এদেশী সাহেবগুলোকে সাহেবই বলে না। তারপর একটু হাসিলেন — বোধ হয় এহেন কুলীন পিটারের সাহচর্য্যগৌরবে।

    পিটার সাহেব গেলাসে ধীরে ধীরে চুমুক দিতে দিতে এদেশী সমস্ত সাহেবদিগের উপর অবজ্ঞা ও ক্রোধের নিদর্শনস্বরূপ গেলাসের আড়াল হইতে আমার পানে ঘন ঘন উগ্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগিল।

    আলিজানের মুখ চোখে রঙ ধরিয়া আসিতেছিল, দৃপ্তভাবে বলিল, কেয়া, হাম্‌ভি সাদা চামড়াসে থোড়াই ডর করি। হাম দো ঘণ্টা, চার ঘণ্টা, দশ ঘণ্টা দেরি করেগা, খুশি হামারা। বোলাও সিকিন কিলাসকা সাহেবকো কালীমাইকা সামনে আঙ্গরেজ?

    বড়হমচারী বাবা আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন, করিম বক্স ডাকাত ওরই ঠাকুরদাদার বাবা ছিল কিনা; — ভয়ানক কালীভক্ত, পূজো করে বেরুলে তাকে রোখে কে? কত কুঠিয়ালের মাথা নিয়েছিল, তার কি ঠিকানা আছে? সব একে একে বলছি, একটু সবুর করুন না, অত উতলা হলে চলবে কেন মশাই?

    আলিজান হঠাৎ বিরক্তভাবে পিটারের হাত হইতে গেলাসটি ছিনাইয়া লইয়া বোতল হইতে ছাপাছাপি এক গেলাস ঢালিয়া লইল, তাহার পর এক নিশ্বাসে সেটা শেষ করিয়া বিনা বাক্যব্যয়ে গটগট করিয়া নামিয়া গেল। পিটার অবিচলিতভাবে শূন্য গেলাসটা পূর্ণ করিতে লাগিল। আলিজানের ভাব দেখিয়া বোধ হইল, তাহার ঘাড়ে হঠাৎ তাহার কুঠিয়াল-বিধ্বংসী পূর্ব্বপুরুষের ভূত চাপিয়াছে। জানালা দিয়া মুখ বাড়াইয়া শঙ্কিতভাবে সেকেণ্ড ক্লাসে একটা হৈ-চৈয়ের প্রতীক্ষা করিতেছি, এমন সময় একটা প্রচণ্ড রকম ঝাঁকানি দিয়া গাড়িটা একেবারে ভৈরববেগে ছুটিতে আরম্ভ করিয়া দিল। মনে হইল, ড্রাইভারের ছোঁয়াচ লাগিয়া এঞ্জিনটাও যেন এক মুহূর্ত্তে মাতাল হইয়া উঠিয়াছে।

    পিটার সাহেব পকেট হইতে হুইস্‌লটা বাহির করিল; সেইখানে বসিয়াই খুব জোরে ফুঁ দিয়া পকেটে রাখিয়া দিয়া বলিল, হম আঙ্গরেজকা বাচ্চা, ডিউটি নেহি ভুল সাকতা।

    বড়হমচারী বাবা আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন, আলিজান একবার রাগলে কারও রক্ষে নেই।

    আমি গাড়ির মত্ত বেগ লক্ষ্য করিয়া বলিলাম, রক্ষের তো উপায় দেখছি না ঠিক; তবে হঠাৎ রাগল কেন, তা তো বুঝতে পারি না। আপনারা মশায়, এত গুলো লোকের প্রাণ নেবেন নাকি? আমি তে পরের স্টেশনে গিয়েই ডি. টি. এস.কে তার করছি।

    দেওতা ঈষৎ হাস্য করিয়া জড়িত কণ্ঠে বলিলেন, অনেক সময় পাবেন; আমাদের এখানে দু-চার ঘণ্টার বেশি লাগবে না; তারবাবুর বাড়িতেই আজ মা অবতীণ হবেন কিনা?

    হতাশ হইয়া চুপ করিয়া রহিলাম।

    হীরা সিং নেশায় আচ্ছন্ন হইয়া অসাড়ভাবে পড়িয়া ছিল।

    বড়হমচারী বাবা বোতলটা উপুড় করিয়া গলায় ঢালিয়া দিয়া বিষণ্ণ বদনে পিটারের দিকে চাহিয়া বলিলেন, পিটার গার্ড, কক্‌খনও তিনটে শাদি করিস নি বাপ, ধনে প্রাণে মারা যাবি — চারটে কর্, আটটা কর্, তারা জোড়া বেঁধে নিজেদের মধ্যে ঝোঁটাঝুঁটি ক’রে মরবে। তুই দিব্যি ‘জিতু জিতু মোর মামা’ করবি; কিন্তু যদি একটি বেজোড় ছেড়ে রাখ, সেটি তোমার ঘাড়ে চাপবে। আমার সেজো আবাগীর কথাই ধর না ভাই; বড়য় মেজোয় হরদম মাথা-ফাটাফাটি করছে — বেশ শান্তিতে থাকতাম; কিন্তু সেজো আবাগীকে এনেই —

    গার্ড সাহেব আমার দিকে দেখাইয়া বলিল, ই বাবু পিতে নেহি হায়? দেওতা, দিয়া ইনকো?

    নাঃ, উনি এদিকে নেই। কেত্তা কিসিমকা আজব আদমি জগদম্বা বানিয়েছে রে দাদা; দুনিয়াটা চিড়িয়াখানা। কি যে বলছিলাম, হ্যাঁ, তিনটে শাদি ক’রো না পিটার সাহেব — জেরবার হবে। দশটা কর, বারোটা কর, ষোলটা কর, বাধা দোব না; বেজোড়ের দিকে যেও না, পাঁচটা নয়, সাতটা নয়, একুশটা নয় — নাও, বোতলটা খোল।

    পিটার সাহেব বোতলটা হাতে লইয়া বিমর্ষ ভাবে বলিল, হামারি আওরাৎ আকেলেহি একেইশ হ্যাঁয়। কাল দোঠো ওসাজিব বাত বোলনে গিয়া। ইয়ে দেখো নতিজা। — দেখাইয়া দিল।

    ও ব্বাবা, তোকেই উল্টে মার দেয়। মেয়েমানুষের দাঁত-নড়ানো ঘুষি!

    আওর কোই আধা সের লেহু নাকসে নিকলা।

    ইংরেজ বউকে ক্ষুরে ক্ষুরে নমস্কার বাবা, বেশ আছি; আমার কোনও আবাগী গায়ে হাত তোলে নি কখনও। ডাইভোর্স করে দিস না কেন মাগীকে? তোদের জাত বুঝে যীশু তো সে ব্যবস্থা করে গেছে।

    বোলতি হায়, ডাইভোর্স করনেসে খুন করেগি।

    না করলেও বা কোন্ বাকি রাখছিস বাপু? এক কাজ কর, আমি হদিস বাতলে দিচ্ছি — দেখবি, অমন দজ্জাল মাগ তো একেবারে কেঁচো হয়ে গেছে। তিন-তিনটে বাঘিনী নিয়ে ঘর করছি রে দাদা, ‘ওসব ঢের দেখা আছে। সেজো আবাগী অভিমান করে বললে, একটু ভাল করে ফিটফাট হয়ে থাকতে পার না? বুঝলাম, কথাটা যৌবনের রস; তার পরদিনই নাপতে ডাকিয়ে দুই কানের ওপটার চামড়া বের করে ছোকরা বাবু হয়ে পড়া গেল। আর কিছু আবদার নেই, সব মিটে গেছে — এখন দেখলে নাক সিঁটকোয়। যে যেমন, তার সঙ্গে সেই রকম চালাও। বড় আবাগী বললে, তোমার হাতে পড়ে পাপে তাপে তো জীবনটা দগ্ধে গেল, আর কেন? একটু তীর্থ-টীৰ্থ করিয়ে আন না, এটুকুও হবে না? বললাম, সে কি কথা! হবে বইকি। এলাহাবাদ ত্রিবেণীর ঘাটে — ও-ও ডুব দিতে নামল, আমিও বগলে বোতল বাগিয়ে উঠলাম, সাত দিন দুজনের দেখা নেই — দু মাস কথা কয় নি — আজ পর্য্যন্ত তীর্থের নাম করে না। একটু সবুর কর না, তোকে আমি এসা এক মতলব বাতলে দিচ্ছি —

    আচ্ছা, একঠো খাস্‌সি চড়হানেসে তুমলোগোকী কালীজী কুছ বন্দোবস্ত কর্‌ সকতী?

    খুব খুব; আরে, কালী আর তোদের যীশুর মা মেরী তো খুড়তুতো জাঠতুতো বোন ছিল — যার নাম ‘চাচেরা বহিন’ — বুঝা? তোরা কি আর মার পর?

    এমন সম! দুই-তিনবার ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং শব্দ করিয়া গাড়িটা হঠাৎ থামিয়া গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে —  ‘বড়হমচারী বাবা, ও বড়হমচারী বাবা’ ‘দাদা, দাদা’ ‘ও খুড়ো, কোন গাড়িতে হে?’ ইত্যাকার কতকগুলো অসংলগ্ন আওয়াজে স্টেশন-প্ল্যাটফর্ম্মটা সরগরম হইয়া উঠিল। বি-এন-ডব্লুর ব্রাঞ্চ ট্রেন — বলাই বাহুল্য যে, কোনও গাড়িতেই আলো ছিল না। শেষ পর্য্যন্ত দেওয়ার আওয়াজ ও পিটার গার্ডের হুইস্‌ল লক্ষ্য করিয়া যখন উভয় পক্ষের মিলন হইল, তখনকার সেই পৈশাচিক উল্লাস ও চীৎকার মসীজীবী নিরীহ কলমের মুখে প্রকাশ করা যায় না।

    দাসু খুড়োকে দেখিলাম। রাজসূয় যজ্ঞ করিবার মত লোক বটে; লিকলিকে, খৰ্ব্ব; মদে যদি ভারী হইয়া অমন গড়াইয়া গড়াইয়া না পড়িত তো হাওয়ায় উড়িবারই কথা। যতক্ষণ দেখিলাম, ডান হাতে ঘুষি বাগানোই ছিল; বলিল, দাদা, বেটা বলিল, দাদা, বেটা কন্‌ফোর্ড তোমায় ডেকে পাঠিয়েছিল সামান্য একটু ডিরেলের জন্য? আমি দেখে নোব সম্বন্ধীকে — এই একটি ঘুষি! অলিজান, পিটার গার্ড, ব্যাক কর গাড়ি — চল জংশনে — দেখেগা ক্যায়সা সাহেব হ্যায় — দেসো শালা বেঁচে, আর তোমার কাছে এক্সপ্ল্যানেশন চাইলে দাদা? আমাদের লর্ড বিশপের অপমান!

    আলিজানের নেশাটা একটু ফুরাইয়া আসিয়াছিল। সেই জন্যই হোক আর যে কারণেই হোক, সে ব্যাক করতে নারাজ হইল; তখন দাসু খুড়া নিজের শক্তি ও শৌয্যের অভিব্যক্তি সম্বন্ধে এদিকে নিরাশ হইয়া, মৃত প্রায় হীরা সিঙের শরীরটা কাঁধে ফেলিয়া এক বাসায় লইয়া যাইবার জন্য জিদ ধরিয়া বসিল। এ ব্যাপারে কি মীমাংসা হইত বলা যায় না, তবে এই নারকীয় গোলমালে এবং তাহার শরীরটা লইয়া টানাটানি করাতে হীরা সিঙের তন্দ্রা একটু ভাঙিয়া যাওয়ায় সে ‘ছ্যুমা’র জন্য আমার পা জড়াইয়া ধরিয়া হতাশ ভাবে কাঁদিতে লাগিল। এই সঙ্ক জানাই যে, আমি ছ্যুমা না করিলে বাঙ্গালী তো কোন্ ছার, স্বয়ং হুন্‌মানজী আসিলেও তাহাকে নড়াইতে পারবে না।

    আমি প্রায় বিশ — পঁচিশ বার এর ক, খহার আর মোট সন্দেহ রহিল না, সে সবাইকে ঠেলিয়া — লি আপনিই দালত নিতে নামিয়া গেল।

    বড়হমচারী বাবা, হীরা সিং, আলিজান আর ও পক্ষের সবাই হৈ-হৈ করিতে করিতে, টলিতে টলিতে, পড়তে পড়িতে দাসু খুড়োর বাসার দিকে চলিল। বলিলাম, গার্ড সাহেব, মিঞা সাহেব, আমার কাল সকালের মধ্যে ঘাট স্টেশনে পৌঁছানো চাই — গবমেণ্টের জরুরি কাজ —

    দাসু খুড়া টলিতে টলিতে ঠেলিয়া আসিয়া তাহার হাড্ডিসার ঘুষি আমার নাকের সামনে বাঁকাইয়া ধরিয়া বলিল, একটি ঘুষিতে গবর্মেণ্টের বত্রিশ পাটি দাঁত বসিয়ে দোব। তাদের জরুরি কাজ তারা বুঝবে — আমার রিলিজিয়াস টলারেশনে হাত দেবার কে হ্যাঁ?

    বড়হমচারী বাবা ঘুরিয়া দাঁড়াইয়া — স্রোতের ধারের বেতগাছের মত দুলিতে দুলিতে বলিলেন, আমারও তো ভোরের স্টীমারে ওপারের স্টেশন-মাস্টার রামদয়ালের বাড়িতে যেতে হবে — বড় ঘটা করে রাধামাধবজীর পিতিষ্ঠে করবে কিনা; আপনার এই দাসানুদাসের ওপর সব ভার। ওপার থেকে আর ইস্তক জংশন পর্য্যন্ত সব ব্যাপারে বাবা এই কালী বেহ্মচারী। ডালে আছি, ঝোলে আছি, অম্বলে আছি, ঘাবড়ান কেন? এক সবুর করে বসে থাকুন — দেখবেন, আপনার এ গোলামের গোলামকে না হলে কারুর এক পা এগুবার জো নেই — শাক্ত হোক, বোষ্টম হোক, শৈব হোক, কেরেস্তান হোক —

    পিটার হঠাৎ তাহার হাতটা ধরিয়া একটা টান দিল, ঘৃণার সহিত বলিল, আরে চলো, কভি শরাব নেহি পিতা, ওই তুমহারা কদর কেয়া বুঝেগা?

    বড়হমচারী তাহার অর্দ্ধনিমীলিত চক্ষুপল্লব যেন হঠাৎ চাড়া দিয়া তুলিয়া আমার দিকে কটমট করিয়া চাহিয়া শাপ দেওয়ার ভঙ্গীতে বলিয়া উঠিলেন, আমার ‘কারণ’কে অপমান করেছিস — মনে থাকে যেন।

    র‍্যাপারটা টানিয়া লইলাম। মুড়িসুড়ি দিয়া রাত্রের মত বেঞ্চের উপর শুইয়া বি-এন-ডব্লুর মহিমার এই নূতন স্বরূপটির কথা ভাবিতে লাগিলাম।

    .

  • ষষ্ঠ কল্প : আমি নাগরদোলায়

    ষষ্ঠ কল্প : আমি নাগরদোলায়

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    ষষ্ঠ কল্প : আমি নাগরদোলায়

    আবার আমরা ঢাকায়। বোম্বেটেরা ফৌজদারী আদালতে চালান হয়ে গেল, জখমী লোকেরা হাসপাতালে প্রেরিত হলো, আমরা ডেপুটিবাবুর বাড়ীতে আশ্রয় পেলেম। হরিহরবাবুর আটজন পাইকের মধ্যে জলযুদ্ধের সময় দুজন নিহত হয়েছিল, বাকী ছিল ছয়জন, তাদের ইচ্ছা ছিল, মাণিকগঞ্জে ফিরে যায়, কিন্তু ডেপুটিবাবু যেতে দিলেন না। ইংরেজ আইন, প্রমাণের উপরেই অধিক পরাক্রম প্রকাশ করে; বোম্বেটে ধরা পড়াতে আবার এক নূতন মোকদ্দমা।

    রক্তপাত হয়ে গেল, মানুষ মারা গেল, ভগবানের কৃপায়, ডেপুটিবাবুর অনুগ্রহে, আমরা কজন প্রাণে প্রাণে রক্ষা পেলেম; এই মোকদ্দমায় প্রমাণ আবশ্যক। বেঁচেছিলেম বোলে আমরাই সাক্ষী, পাইকেরাও সাক্ষী। আমাদের বজরার সারেং আর তার অধীনস্থ দাঁড়ী-মাঝীরা সাক্ষীশ্রেণীতে গণ্য। তারাও উপস্থিত থাকলো। বোম্বেটেদের বৃহৎ ছীপখানা ২০ জন লোকের দ্বারা চালিত হয়েছিল, তারাও বোম্বেটে। ডাকাতের সঙ্গের দলবল সকলেই ডাকাত, আসামীর দলে সেই ২০ জনও বন্দী হয়ে এসেছে; মোকদ্দমা গুরতর। বিচারের দিন ধার্য হয় নাই; অবসরপ্রতীক্ষায় পাঁচদিন আমরা ঢাকায় থাকলেম।

    ডেপুটিবার বাসাবাড়ীর অন্দরমহলে অমরকুমারী। হরিহরবাবু যে দুটি স্ত্রীলোককে অমরকুমারীর সঙ্গে দিয়েছিলেন, তারা ঠিকাচাকরানী, যারা ঠিকালোক, তাদের উপর অধিক প্রভুত্ব চলে না; যাতে চলে, আমি তার উপযুক্ত উপায় অবলম্বন কোল্লেম। মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত সঙ্গে যেতে হবে, অমরকুমারীর কাছে কাছেই থাকতে হবে, এই কড়ারে সম্মত কোরে তাদের আমি মাসিক পাঁচ পাঁচ টাকা বেতন ধার্য কোরে দিলেম; খোরাক-পোষাক স্বতন্ত্র। অমরকুমারীর মধুর ব্যবহারে, মধুর বচনে তারা তুষ্ট হয়েছিল, তার উপর অধিক বেতনের আশা পেলে, আর তাদের কোন আপত্তি থাকলো না। পাঁচ দিন আমরা নির্বিঘ্নে ঢাকায় বাস কোল্লেম।

    পুলিশের সাহায্য-প্রার্থনায় আদালতে দরখাস্ত দাখিল উপলক্ষে ইতিপূৰ্বে একবার ঢাকায় আমি এসেছিলেম; লোকের মুখে শুনা ছিল, পূৰ্ববঙ্গের মধ্যে ঢাকা খুব ভাল সহর; মুর্শিদাবাদে বাঙলার রাজধানী হবার অগ্রে ঢাকাতেই রাজধানী ছিল। ঢাকা সহর আমার দর্শন করা হয় নাই; দর্শনের অভিলাষ প্রবল; পূৰ্বযাত্রায় সময় ছিল না, অভিলাষ পূর্ণ হয় নাই। এই যাত্রায় যদি ঘটে, বঙ্গের এই প্রাচীন সহরটি আমি ভালরূপে দর্শন কোরবো, এই সঙ্কল্প আমার মনে ছিল।

    পাঁচ দিন অতিবাহিত। ইতিমধ্যে একদিন মোকদ্দমা ডাক হয়েছিল, আমাদের তলব হয় নাই। আসামীদের হাজতবাসের হুকুম। এই পর্যন্তই সে দিনের কার্য। আবার কবে দিন ধার্য হবে, আর কত দিন আমাদের ঢাকায় অবস্থান কোত্তে হবে, জানতে পারা গেল না। মনে উদ্বেগ থাকলো; কিন্তু সঙ্কল্পসিদ্ধির সময় পেলেম। সহরমাত্রই জনাকীর্ণ। বহুদিকে বহু গলীপথ; বহু দিকেই দোকান-পসার। অজানা লোকের পক্ষে শীঘ্র শীঘ্র সহরের সৰ্বস্থান চিনে লওয়া সহজ হয় না। ঢাকা আমার পক্ষে নূতন সহর। কোন দিকে কি, কোন দিকে কোন রাস্তা, কোন দিক দিয়ে কোন রাস্তায় যেতে হয়, কোন দিকে গৃহস্থলোকের বাস, কোন কোন দিকে কোন কোন দর্শনীয় পদার্থ, একাকী বাহির হয়ে ঠিক ঠিক সে সব নির্ণয় করা কঠিন; অতএব পল্লীর একটি বালককে আমি পথ-প্রদর্শক-রূপে মনোনীত কোল্লেম। বালকটি আমার সমবয়স্ক, বেশ চালাক-চতুর, কিছু কিছু লেখাপড়াও জানে, নাম অবলাকান্ত। প্রতিদিন অপরাহ্ণে, অবলাকান্তকে সঙ্গে নিয়ে আমি নগরদর্শনে বাহির হই। মণিভূষণ বাহির হন না, স্থানাদি-সন্দর্শনে তাঁর আগ্রহ অল্প, বাসাতেই তিনি থাকেন, সঙ্গে আসবার জন্য আমি তাঁরে অনুরোধও করি না, বরং অমরকুমারীর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আমার কোন উদ্বেগ থাকে না, সে জন্য আনন্দ জন্মে; নিত্য নিত্য নিরুদ্বেগে নগরদর্শনে আমি প্রীতি অনুভব করি। মণিভূষণের বাসায় থাকা ভালই হয়।

    অবলাকান্ত আমার মনের মত সহচর। যেটি যেটি আমি দর্শন কোত্তে চাই, অবলাকান্ত সেইগুলি আমারে দেখায়, যে যে রাস্তার যে যে নাম, যে যে পদার্থের যে যে প্রকার বর্ণনা, যে যে মহাপুরুষের নামের যে সকল কীর্তি একে একে তন্ন তন্ন কোরে আমারে বোলে বোলে দেয়। বুড়ীগঙ্গার ধারে কোথায় কোথায় জলদস্যুর ভয়, তাও আমারে দেখিয়ে দেখিয়ে চিনিয়ে চিনিয়ে রাখে; যে দিকে ইংরেজটোলা, যে দিকে কোম্পানির বিদ্যালয়, চিকিৎসালয়, বিচারালয়, সাধারণ কার্যালয়, কারাগার, সে সকল দিকেও এক একদিন বেড়িয়ে বেড়িয়ে আসি। অষ্টাহকাল এইরূপে আমি অবলাকান্তের সঙ্গে ঢাকা সহরের বহুস্থান সন্দর্শন কোল্লেম। ঢাকার বাঙালীটোলার রাস্তাগুলি, বাজারের গলীগুলি অপ্রশস্ত; কাশীর বাঙালীটোলার ছোট ছোট গলী যত অপ্রশস্ত, তত অপ্রশস্ত নয়, কিন্তু যানবাহনের চলাচলে সঙ্কীর্ণ। ঢাকার বাজারে অনেক প্রকার জিনিষপত্র অতি সুন্দর। ঢাকাই কাপড়, ঢাকাই স্বর্ণালকার, ঢাকাই রজতালঙ্কার, ঢাকাই শঙ্খ অতি পরিপাটী। বঙ্গের সকলেই বলেন ঢাকার স্বর্ণকারেরা সোণারূপার উপর যেরুপ সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিচিত্র কাজ কোত্তে পারে, অন্য স্থানের স্বর্ণকারেরা সেরুপ পারে না। বিদেশী লোকের কাছেও ঢাকাই তাঁতি আর ঢাকাই সোণার বিশেষ প্রসিদ্ধ।

    নিত্য নিত্য নূতন স্থান দর্শনে নিত্যই আমার নূতন নূতন কৌতূহল। একদিন অপরাহ্ণে, সহর ছাড়িয়ে অনেক দূরে গিয়ে পোড়লেম।—একটা মেলা উপলক্ষে সেইস্থানে অধিক জনতা। সেই জনতা ভেদ কোরে আমরা নানা প্রকার তামাসা দেখে দেখে বেড়াচ্ছি, মেলা স্থলে নানা প্রকার জিনিষপত্র বিক্রীত হোচ্ছে, এক একপ্রকার জিনিসের এক একটা পটি বোসে গিয়েছে; তরুণবয়স্ক ভিক্ষুক বালকেরা বহুরূপী সেজে পটিতে পটিতে ভিক্ষা কোরে বেড়াচ্ছে, ছদ্মবেশী জুয়াচোর ও গাঁটকাটারা উত্তম কৌশলে আপনাদের গুপ্ত মতলব হাসিল কোচ্ছে, বদমাসলোকেরা রকমারী যুবতী স্ত্রীলোকের অন্বেষণে ভিড়ের ভিতর লুকাচুরি খেলাচ্ছে, স্থানে স্থানে গীতবাদ্য হচ্ছে, একধারে হরিসংকীৰ্ত্তন বেরিয়েছে, যাত্রাওয়ালা ছেলেরা দিল্লীকা বাইজী সেজে ঘাঘরা ঘুরিয়ে ঘুরে ঘুরে নেচে নেচে দর্শকের কাছে পয়সা আদায় কোচ্ছে; এই সকল দেখতে দেখতে আমরা সেই ভিড়ের ভিতর পথহারা হোলেম, অবলাকান্তকে হারিয়ে ফেল্লেম। যেখানে মেলা হয়েছিল, সে দিকে আর কোনদিন আমি যাই নাই, সঙ্গীহারা হয়ে ফাঁপরে পোড়লেম। দেখতে দেখতে সুর্য অস্ত, দেখতে দেখতে সন্ধ্যা সমাগত, চতুর্দিক অন্ধকার। আকাশে নক্ষত্রোদয়।

    সন্ধ্যাকালে যেমন অন্ধকার হয়, সেই রকম অন্ধকার, কিন্তু আমার চক্ষে তখন অনেক বেশী। কি কারণে আমি বেশী অন্ধকার দেখলেম, বোধ হয় তার পরিচয় দিতে হবে না। বিপদ আমার সঙ্গে সঙ্গে, শত্রু আমার সঙ্গে সঙ্গে, তার উপর সন্ধ্যাকালে অজানা জায়গায় সঙ্গীহারা। একবার তো বরদা-রাজ্যে সন্ধ্যাকালে পথ ভুলে বনমধ্যে প্রবেশ কোরে মহা বিপদে পতিত হয়েছিলেম, সেই কথাই মনে হোতে লাগলো। ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পায়, এ কথা নিস্ফল নহে। আমি ভয় পেলেম। সহরের ভিতর যদি থাকতেম, সহরের ভিতর যদি পথ হারাতেম, তা হোলে হয় তো ভয় পেতেম না। যেখানে এসেছি, সে স্থানটা সহরের বাহির; সেই জন্যই ভয়।

    সহরের বাহিরেই মেলা। মেলাস্থল থেকে প্রায় আধ ক্রোশ পথ আমি চোলে এসেছি। কোন দিকে এসেছি, কোন দিকে যাচ্ছি, কোন দিকে সহর, কোন দিকে বড়ীগঙ্গা, কোন দিকে ডেপুটিবাবুর বাসা, কিছুই জানতে পাচ্ছি না। আকাশে সূর্য থাকলে বরং দিকনির্ণয় করা যেতো, সন্ধ্যার অন্ধকারে, সে পক্ষেও বাধা। কি করি?

    দাঁড়ালেম। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিষন্ননয়নে আমি চতুর্দিক নিরীক্ষণ কোল্লেম। দেখলেম কেবল অন্ধকার। আকাশপানে চাইলেম, আকাশে মেঘ ছিল না, উজ্জ্বল অনুজ্জ্বল নক্ষত্রমালা নয়নগোচর কোল্লেম; নীল চন্দ্রাতপে যেন মণি-মুক্তাখচিত, এইরুপ শোভা; প্রকৃতির সে শোভা তখন আমার ভাল লাগলো না; অন্য ভাবনায় প্রাণ আকুল। কত ভাবনাই ভাবছি, সকল ভাবনার উপরে অমরকুমারীর ভাবনা প্রবল হয়ে উঠছে। কোন দিকেই আর পদচারণ কোচ্ছি না, পথের একধারে একটি স্থানেই চুপ কোরে দাঁড়িয়ে আছি। আমি একাকী। কোন দিকে যাই, আপন মনে আপনা আপনি এই প্রশ্ন। নক্ষত্রেরা আকাশে জলে, আকাশে আলো হয়; সে আলো ধরাতলে আসে না; নক্ষত্রেরা যদি ধরাতলে পথ দেখিয়ে দিতে পাত্তো, তা হোলেও বরং অনুমানে অনুমানে গঙ্গা-তীরের রাস্তাটা আমি ধোরে নিতে পাত্তেম, প্রকৃতির খেলাঘরে নক্ষত্রপুঞ্জ যে দীপ্তি বিকাশ করে, সে দীপ্তিতে পার্থিব পথিকের বিশেষ উপকার কিছুই হয় না; নক্ষত্ৰ-দীপ্তি সে সময় আমার কোন উপকারেই এলো না।

    পথের মাঝখানে আমি অচল। সাধ্য-সমীরণ বক্ষ-পল্লবের সঙ্গে খেলা কোচ্ছে, তরুবাসী বিহঙ্গেরা মিশ্রকণ্ঠে মিশ্র-রাগিণীতে গান কোচ্ছে, বাতাসের শব্দ আর সেই সঙ্গীত ধনি আমার শ্রবণকুহরে প্রবেশ কোচ্ছে, তমোময়ী নিশামূর্তি আমার সম্মুখে তিমির-বসন পরিধান কোরে কেমন এক রকম ভয় দেখাচ্ছে, কিছুই যেন আমি দেখছি না, কিছুই যেন আমি শুনছি না, নেত্র কর্ণ উভয়েই যেন নিশ্চেষ্ট। আমি অন্যমনস্ক।

    রাত্রি প্রায় চারিদণ্ড। স্থাণুর ন্যায় এক স্থানেই আমি নিবদ্ধ; কে যেন সেই স্থানেই আমার পায়ে প্রেক মেরে আটক কোরে রেখেছে, এই প্রকার ভাব। এই ভাবে আমি আছি, এমন সময় দেখলেম, যে দিক থেকে আমি এসেছি, সেই দিকে একটু দূরে তিনটি শুভ্র পদার্থ;—পদার্থ তিনটি সচল;—আমার দিকেই যেন চোলে চোলে আসছে। ক্ষণকাল অনিমেষে সেই দিকে আমি চেয়ে থাকলেম। সেই তিন পদার্থের সমান গতি। ক্রমশঃ নিকটবর্তী।

    যদিও অন্ধকার, তথাপি ক্ৰমশঃ নিকটবর্তী হওয়াতে আমি জানতে পাল্লেম, অন্য পদার্থ নহে, তিনটি মনুষ্য;—শুভ্রবসনাবৃত তিনজন পুরুষ। সমভাবে এক স্থানে আমি দাঁড়িয়ে ছিলেম, সেই তিনজন মনুষ্য সম্মুখরাস্তা দিয়ে চোলে যাবার সময় আমারে দেখতে পেলে। রাস্তার উপরেই আমি ছিলেম না, বামদিকের একটা বৃক্ষতলে নিঃশব্দে নীরবে দুর্ভাবনায় আমি নিমগ্ন, মুখে ফিরিয়ে আমার দিকে চেয়ে, সেই তিনজনের মধ্যে একজন একটু যেন চমকিতভাবে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “কে আপনি? এখানে এই অন্ধকারে একাকী এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “পথিক আমি সম্প্রতি ঢাকা নগরে এসেছিলেম, আজ বৈকালে মেলা দেখতে বেরিয়েছিলেম, সঙ্গে আমার একটি বন্ধু ছিল, ভিড়ের ভিতর সেটিকে আমি হারিয়ে ফেলেছি; পথ ভুলে গিয়েছি; এদিকে আমার নূতন আসা, কোন দিক দিয়ে কোথায় যেতে হয়, জানি না, এজন্যই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি।”

    লোকটি যেন একটু সদয়ভাবে পুনরায় আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “কোথায় আপনি যেতে চান? কোন দিকে আপনার বাসা?”—আমি বোল্লেম, বাসা আমার এখানকার আদালতের দিকে; ডেপুটিম্যাজিষ্ট্রেট সদানন্দবাবু তাঁরই বাসাতে আমি থাকি; কোন দিকে বুড়ীগঙ্গা, অনুগ্রহ প্রকাশ কোরে সেইটি যদি আপনি দেখিয়ে দেন, তা হোলেই আমি চিনে নিতে পারবো।

    আকাশের দিকে মুখ তুলে লোকটি একটু উচ্চকণ্ঠে বোলে উঠলো, “বুড়ীগঙ্গা?—বুড়ীগঙ্গা এখান থেকে অনেক দূরে। সে দিকের রাস্তা ছেড়ে আপনি অনেক দূর এসে পোড়েছেন। আমরাও মেলা দেখতে গিয়েছিলেম, এই দিকেই আমাদের বাড়ী, বুড়ীগঙ্গার ধার দিয়ে গেলেও আমরা বাড়ীতে পৌঁছিতে পারি, কিন্তু অনেকটা ঘুর হয়। কি করা যায়, আপনি দেখছি নূতন, রাত্রিও অন্ধকার, একাকী কোন দিকেই আপনি যেতে পারবেন না, নূতন লোকের পক্ষে রাত্রিকালে এ পথে যাওয়াও নিরাপদ নয়, কাজেই বুড়ীগঙ্গার তীর পর্যন্ত আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসা আমরা উচিত বিবেচনা কোচ্ছি। এ পথে ডাকাতের ভয় আছে; আপনি দেখছি নিতান্ত ভালমানুষ, আপনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় না থাকলেও সময় এ পথে আপনাকে একা ছেড়ে যেতে আমার মন সরছে না; চলুন, গঙ্গাতীর পর্যন্ত আমরাও আপনার সঙ্গে যাই।”

    কথাগুলি শুনে লোকটির প্রতি আমার শ্রদ্ধা জন্মিল। কোথাকার কে আমি, অকস্মাৎ আমার প্রতি দয়া, এলোক অবশ্যই শ্রদ্ধার পাত্র। যথার্থ ভদ্রলোক। তাঁর অঙ্গীকারে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ধন্যবাদ দিব দিব মনে কোচ্ছি, এমন সময় হঠাৎ তিনি আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “আপনি ঘোড়া চোড়তে জানেন? বুড়ীগঙ্গা এখান থেকে অনেকটা দূর, পদব্রজে যেতে হোলে দেরী হবে, অনেক রাত্রি হয়ে যাবে; ঘোড়ায় চেপে যাওয়াই সুবিধা; আপনি ঘোড়ায় চোড়তে জানেন?”

    কেন, বোলতে পারি না, সহসা ঐ প্রশ্ন শ্রবণ কোরে আমার মনে একটু সন্দেহ এলো। এই তিনটি লোক পদব্রজে যাচ্ছিল সঙ্গে ঘোড়া ছিল না, হঠাৎ ঘোড়ায় চড়ার কথা কেন বলে? সন্দেহটুকু মনের ভিতর চেপে রেখে সেই প্রশ্নে আমি উত্তর দিলেম, “ঘোড়া যদি এখানে সুলভ হয়, আমি সওয়ার হোতে জানি; মধ্যে মধ্যে সওয়ার হওয়া আমার অভ্যাস আছে।”

    যিনি আমার সঙ্গে কথা কোচ্ছিলেন, আমারে কিছু না বোলে তিনি তাঁর সঙ্গীদের দিকে একবার কটাক্ষপাত কোল্লেন, একজন তৎক্ষণাৎ ভোঁ ভোঁ কোরে একদিকে দৌড় ছিল। কেন দৌড়িল, কোথায় গেল, তা আমি বুঝলেম না, যারা সেখানে থাকলো তাদের কিছু জিজ্ঞাসাও কোল্লেম না। তিনজনেই আমরা নিস্তব্ধ।

    দশ মিনিট পরে একজন ঘোড়-সওয়ার আমাদের সম্মুখে উপস্থিত। সহচরের ইঙ্গিতে যে লোকটি ইতিপূৰ্বে দ্রুতগতি ছুটে গিয়েছিল, সেই লোকটিই সওয়ার; তৎপশ্চাতে অপর তিনটি শুন্যপষ্ঠ অশ্ব; সে তিনটি অশ্বের লাগামও একগাছি রঞ্জ, বন্ধ কোরে সেই সওয়ার আপনার কটিদেশে নিবদ্ধ রেখেছে। ঘোড়ারা কদমে কদমে চোলে এসেছে। পশ্চাতের তিনটি অশ্ব শূন্যপৃষ্ঠ এ কথা বলবার তাৎপর্য এই যে, সেই তিন অশ্বপৃষ্ঠে সওয়ার ছিল না; —পৃষ্ঠদেশ শূন্য ছিল, এ কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়; কেন না, চর্ম নির্মিত সুন্দর সুন্দর জীন সেই তিন অশ্ব-পৃষ্ঠে সজ্জিত ছিল।

    প্রথমে যে লোকটি আমার সঙ্গে কথা কোয়েছিলেন, এই সময়ে তিনি আমারে একটি অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করবার জন্য অনুরোধ কোল্লেন; কোনটিতে আমি আরোহণ কোরবো, অঙ্গুলিসঙ্কেতে সেটিও তিনি আমারে দেখিয়ে দিলেন, এক লম্ফে সেই সুন্দর জীনসজ্জিত তুরঙ্গ-পৃষ্ঠে আমি আরোহণ কোল্লেম। লোকেরা তিনজন. আমি একজন, চারিজন, একজন সওয়ার ছিল, দ্বিতীয় অশ্বে আমি আরোহণ করবার পর অবশিষ্ট দুজন অবশিষ্ট দুটি অশ্ব-পৃষ্ঠে আরোহণ কোল্লে, অশ্বেরা তখন দ্রুতগতিতে ধাবিত হোতে লাগলো। যে অশ্বে আমি আরোহণ কোল্লেম, সেই অশ্বের সম্মুখ দুজন, আর পশ্চাতে একজন সওয়ার অরূঢ় থাকলো।

    ঘোড়ারা ছুটেছে। কোন দিকে চোলেছে, আমি সেটা নিরূপণ কোত্তে পাচ্ছি না; দিগভ্রম হয়েছিল, রাত্রিও অন্ধকার, নিরূপণ করাও কঠিন। মানুষের অনুমানটা সঙ্গে সঙ্গেই থাকে। যেখানে আমি ছিলেম, দিগভুল হোলেও ক্ষণে ক্ষণে মনে মনে আমি অনুমান কোচ্ছিলেম, মুখ যেন আমার দক্ষিণদিকে আছে; দক্ষিণদিকে মুখ থাকলে বামদিকে পূৰ্বদিক, পশ্চাতে উত্তরদিক, দক্ষিণ হস্তের দিকে পশ্চিমদিক থাকে। এ হিসাবে দক্ষিণদিকেই বুড়ীগঙ্গা; কিন্তু ঘোড়ারা যে দিকে দৌড়িল, ঐ হিসাবে আমার অনুমান সেটা পূৰ্বদিক। কোথায় যাচ্ছি, লোকেরা আমারে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সভয় সংশয় মনে আমার এইরুপ বিতর্ক।

    অশ্বগতি অবিরাম। কতদূর আমরা গিয়ে পোড়লম, ঠিক অনুমান কোত্তে পাল্লেম না, কিন্তু ভয় হলো। পথ ভুলেছিলেম, সেটা বরং এক রকম ছিল ভাল; নূতন লোকের কথায় ভুলে, ভুলের কান্তারে এসে পোড়লেম। বুড়ীগঙ্গা এ দিকে নয়; লোকেরা আমারে পথ ভুলিয়ে অন্যদিকে এনে ফেলেছে, ইচ্ছা কোরেই এনেছে, তাদের ভুল নয়, আমারই ভুল, তাদের হয় তো দুষ্ট মতলব, আমার সরল প্রাণে আশুপ্রত্যয়, উপকারী ভদ্রলোক বিবেচনা কোরেই তাদের প্রস্তাবে আমি সম্মত হয়েছিলেম, তাদের ঘোড়াতে আরোহণ কোরেছিলেম. সেইটিই আমার ভুল; সেই ভুল এখন আমার আতঙ্কের কারণ।

    একবার উচ্চকণ্ঠে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “তোমরা আমারে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? কেহই উত্তর দিল না; সম্মুখে সওয়ারও নিরুত্তর, পশ্চাতের সওয়ারেরাও উদাসীন। ভগবানের মনে কি আছে, ভগবান জানেন, অজ্ঞাত লোকের ঘোড়ার উপর অজ্ঞাত ভয়ে আমি অর্ধকম্পিত; সংশয় ক্রমশই প্রবল।

    আশুগতি অশ্বেরা কতক্ষণে কত পথ অতিক্রম কোত্তে পারে, অবধারণে শিক্ষা হওয়া অবধি সেটি আমি জেনেছিলেম, এই চারিটি অশ্ব এক ঘণ্টায় প্রায় তিন ক্রোশ অতিক্রম কোরেছে, এইরুপ আমি সিদ্ধান্ত কোল্লেম। যেখানে আমি বিফল প্রশ্ন কোরে হতাশ্বাস হয়েছিলেম, সে স্থান থেকে প্রায় অর্ধক্রোশ অগ্রসর হয়ে সম্মুখের ঘোড়াটা হঠাৎ থেমে গেল। আমি মনে কোল্লেম, এই বুঝি তবে ঠিকানায় এসে পৌঁছিলেম।

    সব ভুল। মেলাস্থলে সঙ্গীহারা হয়ে এত রাত্রি পর্যন্ত যা যা আমি ভাবছি, যা যা আমি কোচ্ছি, সব ভুল। সম্মুখের ঘোড়াটা থেমে গেল। সওয়ার লোকটা এক-বেষ্টন প্রায় বিশ হাত পশ্চাতে হোটে গিয়ে ঘোড়ার পৃষ্ঠে এক কশাঘাত কোল্লে, ঘোড়া তৎক্ষণাৎ পুনরায় তীরবেগে অগ্রসর হয়ে তুড়িলাফ কেটে অনেক দূরে গিয়ে যেন ঠিকরে পোড়লো, আমি অবাক হয়ে সন্দেহে সন্দেহে কারণ চিন্তা কোত্তে লাগলেম। চিন্তার অবসর হলো না। পশ্চাতে যে দুজন সওয়ার ছিল, তাদের মধ্যে একজন বেশ মিষ্টবচনে উৎসাহ দিয়ে আমারে বোল্লে, “আপনিও ঐ রকম করুন, ঐ লোকটি যেমন বিশ হাত পেছিয়ে গিয়ে অধিক বেগে ঘোড়া ছুট করালে, আপনিও তাই করুন। সম্মুখে একটা নালা আছে, ওসার প্রায় চার হাত, কানায় কানায় জল, ঘোড়া যদি কিনারায় দাঁড়িয়ে লাফ দেয়, একলাফে পার হহতে পারবে না, জলে পড়া সম্ভব; দূর থেকে ছুট কোরিয়ে লক্ষের অবসর দিলে নির্বিঘ্নে পার হওয়া যায়, আপনি তাই করুন।”

    তাই আমি কোল্লেম। সুশিক্ষিত অশ্ব একলম্ফে নালা পার হয়ে গেল। আমার পশ্চাতে যে দুজন সওয়ার ছিল, ঐ রকমে তারাও পার হয়ে এলো;— এলো, কিন্তু কেহই দাঁড়ালো না। যেমন সারিবন্দী হয়ে আমরা আসছিলেম, সেই রকম সারিবন্দী হয়েই যেতে লাগলেম। অগ্রপশ্চাতে ঘোড়াসওয়ার, মধ্যস্থলে আমি; এত পথ এলেম, কাহারও মুখে কোন কথা শুনলেম না। নালা পার হবার উপদেশটি মাত্র একজনের মুখে শুনা হয়েছিল, তার পর আবার সকলেই নিস্তব্ধ।

    আমিও নিস্তব্ধ। মহা বিপাকে ঠেকলেম। নালা পার হবার পর অবধি আমার অশ্বপৃষ্ঠের জীনটা অল্প অল্প কম্পিত হোচ্ছিল, অশ্বের গতিবেগে সেই কম্পন ক্রমশই বেড়ে বেড়ে উঠতে লাগলো, অশ্বপৃষ্ঠে ক্ষণে ক্ষণে আমি যেন টোলে টোলে পোড়তে লাগলেম। আশ্চর্য ব্যাপার! যারা ভেল্কীবাজী দেখায়, তাদের কত কৌশল সকলেই দেখেন, কিন্তু ঘোড়ার পিঠের জীন, আপনা আপনি কাঁপে, আপনা আপনি টলে, এটা কি প্রকার ভেঙ্কী, সহজে অনুধাবন করা যায় না। দুই দিকের দুই রেকাবে দুই পা; জীন-কম্পনে পা আমি ঠিক রাখতে পাচ্ছি না, জীনের ভিতর কি রকম কল আছে, তাই যেন মনে হোতে লাগলো। জীন ঘোরে, জীনের সঙ্গে আমিও ঘুরি; একবার কাৎ হোলেম; ঘুরে ঘুরে ঘোড়ার পেটের নীচে আমার মাথা এলো, রেকাবশুদ্ধ পা-দুটি ঘোড়ার পিঠের উপর উঠলো, আবার আর এক চক্র ঘুরে জীনশুদ্ধ অশ্বপৃষ্ঠে আমি সওয়ার হয়ে বোসলেম, আবার ঘুরে পোড়লেম, আবার উঠলেম, দুই হস্তে অশ্বের কেশর আকর্ষণ কোরে অশ্বপৃষ্ঠে শুয়ে পোড়লেম; তবুও স্থির থাকতে পাল্লেম না, আবার ঘুরে ঘুরে ঝুলে পোড়লেম, ঝুলে ঝুলে আবার উপরদিকে ঠেলে উঠলেম, ভোঁ ভোঁ কোরে মাথা ঘুরতে লাগলো, অশ্বের বেগ সংযত করবার চেষ্টা পেলেম, বিফল চেষ্টা, কিছুতেই থামাতে পাল্লেম না। বায়ুবেগের ন্যায় অশ্বগতি, আমি কেবল ঝুলছি আর উঠছি, অশ্বারোহণে সুশিক্ষা না থাকলে কখনই আমি সেই ভাবে অধিকক্ষণ ঝুলতে পাত্তেম না, উঠছি, নামছি, ঝুলছি, ছেলেরা যেমন নাগরদোলায় দোলে, সেই রকমই দুলছি, সত্যই যেন আমি নাগরদোলায়।

    বিধাতার নাগরদোলায় দোল খাওয়া আমার একপ্রকার অভ্যাস হয়ে এসেছে। গুরুপত্নী যখন আমারে বিদায় কোরে দেন, তখন আমি এক প্রকার অধঃপতিত, সর্বানন্দবাবু যখন আমারে দয়া কোরে আশ্রয় দেন, তখন আমি একপ্রকার উচ্চে উত্থিত, তার পর আবার রক্তদন্তের তাড়নে পুনঃ পুনঃ বিঘূর্ণিত; সংসারের নাগরদোলা উপর্যুপরি কতবার কত স্থানে অধঃপতিত হোচ্ছি, মাঝে মাঝে এক এক ঘটনায় একটু একটু সামলে উঠছি, পাঠকমহাশয় পদে পদে আমার এই নাগরদোলায় ঘূর্ণনের বিশেষ বিশেষ পরিচয় প্রাপ্ত হোচ্ছেন, আবার এই এক অশ্বপৃষ্ঠে নাগরদোলা! বিধাতা আমারে নাগরদোলায় ঘুরাচ্ছেন, মানুষেরাও ঘুরাচ্ছে, আবার এই চতুষ্পদ অশ্ব আমারে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চমৎকার খেলা খেলাচ্ছে। অশ্বারোহণে সুশিক্ষা না থাকলে হয় তো মাটিতে পোড়ে অশ্বপদাঘাতে চূর্ণ হয়ে যেতেম, পৃথিবী থেকে হরিদাসের নাম পর্যন্তও বিলুপ্ত হয়ে যেতো, কেবল ভগবানের কৃপায় রক্ষা পাচ্ছি। যে সওয়ার আমার অগ্রগামী, সে একবারও মুখ ফিরিয়ে আমার দিকে চেয়ে দেখছে না; যারা পশ্চাতে, তারা অবশ্য দেখছে; এক একবার আমিও তাদের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছি; তারা গম্ভীর। লোকে যেমন গম্ভীরবদনে কোন আশ্চর্য ক্রীড়া দর্শন করে, তারাও সেই রকমে আমার তখনকার সেই দুর্দশা দর্শন কোচ্ছে। উদরের দায়ে যারা পশুপক্ষী বলিদান করে, রাজ-সরকারের যারা জল্লাদের কাজ করে, জীবের জীবনান্তসময়ে আনন্দ প্রকাশ কোরে তারা হাস্য কোরে থাকে। অশ্বপৃষ্ঠে আমি নাগরদোলায় দলছি, সেই দশা দর্শন কোরে আমার পশ্চাদ্বর্তী সেই দুজন ঘোড়সওয়ারও অবশ্য মনে মনে হাস্য কোচ্ছিল, সে অংশে সন্দেহ বিরহ।

    নাগরদোলায় দুলতে দুলতে কতদূর আমি গিয়েছিলেম, মনে হয় না, প্রাণ হাঁই ফাঁই কোচ্ছিল, থেকে থেকে দম বন্ধ হয়ে আসছিল, আর খানিকক্ষণ সেই ভাবে থাকলে নিশ্চয়ই আমার প্রাণবায়ু বহির্গত হোত। কোথাকার লোক এরা? আমার সঙ্গে এদের কি এত শত্রুতা? আমারে প্রাণে মারবার জন্য কেন এই চক্র বিস্তার? মনে মনে আমি এই সকল আন্দোলন কোচ্ছি, ঘোড়ার উপরে ক্রমাগত ঝুলছি আর উঠছি, তার পর আমি অজ্ঞান হয়ে পোড়েছিলেম। কতকক্ষণ অজ্ঞান ছিলেম, মনে নাই।

  • সপ্তম কল্প : এ আবার কে?

    সপ্তম কল্প : এ আবার কে?

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    সপ্তম কল্প : এ আবার কে?

    যখন চৈতন্যোদয় হলো, তখন আমি দেখলেম, বনমধ্যে একখানি কুটির, সেই কুটিরে পর্ণশয্যায় আমি শুয়ে আছি, আমার মাথার কাছে একটি স্ত্রীলোক উপবিষ্ট। কে এই স্ত্রীলোক? মানুষ যখন স্বপ্ন দেখে, তখন মনে করে, সব যেন ঠিক, স্বপ্নভঙ্গ হবার পর সকলের সকল কথা মনে থাকে না, স্বপ্নবৃত্তান্ত কেহ কেহ স্মরণ রাখতে পারে, কেহ কেহ পারে না, কিন্তু মূর্চ্ছার অগ্রে যা যা ঘটে, মূর্চ্ছাভঙ্গের পর সব কথাই মনে হয়। স্মৃতি আমারে পরিত্যাগ কোরে যায় নাই! তিনজন লোক আমার হিতৈষী হয়ে পথপ্রদর্শক হবার অঙ্গীকার কোরেছিল, পদব্রজে কষ্ট হবে বোলে অশ্ব সংগ্রহ কোরে দিয়েছিল, তাদের চক্রে আমার এই দশা। কারা তারা? কেন আমারে এই বিজনস্থানে এনে ফেলেছে, কেনই বা অজ্ঞান অবস্থায় বনমধ্যে পরিত্যাগ কোরে পালিয়েছে, বুঝে উঠতে পাল্লেম না; পালিয়েছে কি লুকিয়ে আছে তাও তখন জানতে পারা গেল না। এই স্ত্রীলোকটি কে?—তাদেরই কেহ হবে কিম্বা বনবাসিনী অন্য কোন কামিনী করুণাবশবর্তিনী হয়ে আমারে রক্ষা কোত্তে এসেছে, বিনা জিজ্ঞাসায় সেটিও আমি অবধারণ কোত্তে অক্ষম হোলেম।

    সূৰ্য-দর্শনে অনুমান হোল বেলা এক প্রহর অতীত। বনমধ্যে কুটীর। কুটীরের চতুর্দিকে দৃষ্টিসঞ্চালন কোরে আমি অনুভব কোল্লেম, কেহই এখানে বাস করে না। বাসের যোগ্য যে সকল স্থান, সে সকল স্থানে মানুষের ব্যবহারের সামগ্রী থাকে; এ কুটীরে কিছুই নাই। পত্রশয্যায় আমি শয়ন কোরে আছি, মাথার কাছে সেই স্ত্রীলোকটি পত্ৰাসনে বসে আছে।

    কিছুই যেন আমি দেখছি না, বাস্তবিক কিন্তু সেই স্ত্রীলোকের মুখের দিকে আমার নজর আছে। তার দিকে আমি চেয়ে দেখছি, তারে কিন্তু সেটি আমি জানতে দিচ্ছি না। আমার চক্ষে যখন তার চক্ষু পড়ে, তখন আমি অন্যদিকে চক্ষু ফিরাই।

    কিঞ্চিৎ অগ্রে আমি ভাবছিলেম, কে এই স্ত্রীলোক? এই সময় অনেক পরিমাণে সে ভাবনা দূরে গেল। একরকমে সেই স্ত্রীলোকটি আমি চিনলেম। সে আমারে চিনতে পেরেছিল কি না, তা আমি বলতে পারি না। বাঙালীর ঘরের কন্যা, মুখশ্রীতে সে লক্ষণ বেশ জানা যাচ্ছে; কিন্তু বাঙালীর মেয়ে আপনাদের ঘরে যেমন থাকে, যেমন অলঙ্কারবস্ত্র পরিধান করে, যে ভাবে মস্তকে কেশবিন্যাস করে, এ মূর্তিতে সে ভাবের অভাব। বাজীকরী ভানুমতীরা যে রকমে কাপড় পরে, সেই ভাবে মালকোঁচ্চা কোরে কাপড় পরা, বক্ষে রক্তবর্ণ কাঁচলি, সেই কাঁচলির উপর বসনাঞ্চল খুব চোস্ত কোরে বাঁধা; গলায় একছড়া তবলকীর মালা, দুই কানে দুটি রূপার মাকড়ী, তাতেও তবলকী গাঁথা; মাথার চুল কিছু খাটো খাটো, সে চলগুলি কপালের দিকে টেনে বামদিকে নাড়ুগোপালের চূড়ার মত চূড়াকরা। একরকম ছদ্মবেশ বোল্লেও বলা যায়। তথাপি মুখ দেখে তারে আমি চিনলেম।

    অনেকক্ষণ আমার দিকে চেয়ে চেয়ে সেই স্ত্রীলোক আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “তোমার কি ক্ষুধা হয়েছে? তুমি কি এখন স্নান কোরবে?” প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমি তারে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “কোথায় আমি এসেছি? যারা এনেছে, তারা কোথায় গেল?”

    আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্ত্রীলোকটি সেখান থেকে উঠে গেল; একটু পরে এক কলসী জল আর একখানি ক্ষুদ্র বস্ত্র এনে সে আমারে স্নান কোত্তে বোল্লে। আমি কথা কোইলেম না। স্ত্রীলোক হড় হড় কোরে আমার মাথায় এক কলসী জল ঢেলে দিলে, মার্জনী অভাবে আমার মস্তক গাত্র জলসিক্ত থাকলো; শুষ্ক বস্ত্রখানি পরিধান কোরে সিক্ত বস্ত্রখানি আমি পরিত্যাগ কোল্লেম। স্ত্রীলোকটি আবার চোলে গেল; আবার একটু পরে গুটিকতক ফল আর এক ভাঁড় জল এনে আমারে খেতে দিলে। দুটি ফল ভক্ষণ কোরে আমি জল খেলেম। কিছুই ভাললাগে না। যে অবস্থায় আমি পতিত, সে অবস্থায় কিছু ভাল লাগাও সম্ভব নয়।

    বেলা যখন প্রায় দুই প্রহর, সেই সময় সেই স্ত্রীলোক কিঞ্চিৎ ইতস্ততঃ কোরে আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “যদি তোমার বিশ্বাস হয়, বিশ্বাস কর, আমি গৃহস্থকন্যা, আমার হস্তে অন্ন গ্রহণ কোত্তে তোমার কোন বাধা আছে কি না?”—অন্নগ্রহণে আমার ইচ্ছা ছিল না, গৃহস্থকন্যা সামান্য কথা, ব্রাহ্মণের কন্যা বোলে পরিচয় দিলেও অন্নগ্রহণে আমার রুচি হোতো না। আমি নিরুত্তর থাকলেম। অনেকক্ষণের পর সেই স্ত্রীলোককে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “এ জায়গায় তুমি কেন থাক? আর কে কে এখানে থাকে?”

    স্ত্রীলোক উত্তর কোল্লে, “কেহই থাকে না, আমিও থাকি না, নূতন এসেছি। যারা তোমারে এনেছে, তারাও নূতন, আমিও নূতন। যখন যেখানে তারা যায়, আমারেও সঙ্গে নিয়ে যায়, যেখানে তারা আড্ডা করে, আমারেও সেইখানে থাকতে হয়।”

    আমি মনে কোল্লেম, যখন যেখানে যায়, তখন সেইখানে আড্ডা করে, বেদেদের টোলফেলা; সেই জন্যই এই স্ত্রীলোককে ভানুমতীর সাজে সাজিয়ে রেখেছে। তারা বাজীকর, এখন আমি বেশ বুঝলেম। ঘোড়ার পিঠের জীনটা ঘুরে ঘুরে আমারে নাগরদোলায় দুলিয়েছিল, সেটা বাজীকরের কৌশল, এখন ঠিক বুঝলেম; কিন্তু এই স্ত্রীলোক কি কোরে বাজীকরের দলে মিশে আছে, সেটি আমি ভাল কোরে বুঝতে পাল্লেম না। রাত্রিকালে তাদের মুখে যদি ভাল কোরে আমি দেখতে পেতেম, তা হোলেও এক রকমে কিছু অবধারণ কোত্তে পাত্তেম, কিন্তু ঘোর অন্ধকারে সে তিনটে লোকের মুখ-দর্শনে আমার সুবিধা হয় নাই; অজ্ঞানাবস্থায় আমারে এইখানে ফেলে রেখে তারা গা-ঢাকা হয়েছে, আমি এখন এই স্ত্রীলোকটির জিম্মায়।

    বেলা ক্রমশই অধিক হোতে লাগলো। স্ত্রীলোকটিকে আমি বোল্লেম, “আমার ক্ষুধা নাই, আহারে আমার রুচি নাই, আমার জন্য তুমি কেন আর কষ্ট পাও? তুমি গিয়ে আহার কর, তোমার লোকেরা যদি এসে থাকে, তাদের আহার করাওগে, আর একবার আমারে দেখা দিও।”

    স্ত্রীলোক বোল্লে, “পালিও না, পালাবার চেষ্টা কোরো না, পালাতে পারবে না, এ স্থানটা অরণ্যময়, চারিধারে গড়খাই খালের ভিতর অগাধ জল, পালাবার উপায় নাই, পালাবার চেষ্টা কোল্লেই বিপদে পোড়বে।”

    আমি ঈষৎ হাস্য কোল্লেম, কিঞ্চিৎ উত্তেজিতম্বরে বোল্লেম, “যারা আমারে এখানে এনেছে, তাদের সঙ্গে একবার দেখা না কোরে কোথাও আমি যাব না, তুমি স্বচ্ছন্দে আপনার গৃহকর্মে মনোযোগী থাক। আর দেখ, তোমারে যেন কোথায় আমি দেখেছি, এই রকম মনে হোচ্ছে, তোমার শরীরে দয়া আছে, তাও আমি বুঝতে পাচ্ছি; আমার প্রতি দয়া রেখো; কাজকর্ম সারা হোলে আর একবার তুমি আমার কাছে এসো; তোমার সঙ্গে আমার কতকগুলি কথা আছে।”

    এইবার সটান আমার মুখের দিকে চেয়ে, মুখখানি একটু ভারী কোরে, স্ত্রীলোকটি কুটির থেকে বেরিয়ে গেল। আমি একাকী হোলেম। সূর্য কাহারও অনুরোধ উপরোধ রক্ষা করেন না। আমি বিপদে পোড়েছি, দিনমানে একটু নির্ভয় থাকি রাত্রিকালে বড় যন্ত্রণা, তুমি একটু থেকে যাও; আমার উপকারের জন্য তুমি একটু অপেক্ষা কর। যোড়হাতে মিনতি কোরে এরূপ প্রার্থনা কোল্লেও সূর্যদেব সে প্রার্থনা শ্রবণ করেন না। সেই অবস্থায় আমারে রেখে দিবাকর পশ্চিমাচলে অস্ত গেলেন। অন্ধকারে সেই কুটিরমধ্যে আমি থাকলেম। একাকী। সে স্ত্রীলোক আর ফিরে এলো না।

    স্ত্রীলোকের মুখে আমি শুনেছি, এখানে তারা নূতন। ভালমানুষ নয়; ভালমানুষ হোলে অবশ্য লোকালয়ে থাকতো, বনের ভিতর থাকতো না, বনের ভিতর লুকিয়ে আছে, নিশ্চয়ই দুষ্ট মতলব। যে প্রকারে ঘোড়ায় তুলে এই বনের ভিতরে তারা আমারে এনেছে, তাতে আর নিশ্চয়তার বাকী কিছুই নাই। ঐ স্ত্রীলোকটি আমার চেনা; যা বোলে আমি চিনেছি, তাই ঠিক; বসন-ভূষণের পরিবর্তন হয়েছে, মুখের গঠনের পরিবর্তন হয় নাই, আমার চক্ষেরও ভুল হয় না; যা ভেবে চিনেছি, তাই ঠিক।

    মহা বন, চারিদিকে গড়খাই, এই গড়বন্দী অরণ্যমধ্যে সেই তিনটি লোক আছে আর ঐ স্ত্রীলোকটি আছে, আরও কেহ কেহ থাকলেও থাকতে পারে। কুটির কেবল এই একখানি নয়, আরও কুটির আছে, সেই কুটিরে সেই স্ত্রীলোকটি গিয়েছে। ফিরে আসবার কথা আছে, আমিও ফিরে আসবার আমন্ত্রণ কোরেছি; কিন্তু এলো না। কতক্ষণ আমি এই অন্ধকারে একাকী অবস্থান কোরবো, তাই ভাবতে লাগলেম।

    সে ভাবনা বড় নয়, তদপেক্ষা বড় ভাবনায় আমার হৃদয় ব্যাকুল। আবার আমি অমরকুমারীকে হারালেম! এত কষ্টে উদ্ধার কোরে আনলেম, এনেও নিরুদ্বেগ হোতে পাল্লেম না। হাকিমের বাসায় অমরকুমারী আছেন, মণিভূষণ রক্ষক আছেন, দুষ্টলোকেরা সেখান থেকে অমরকুমারীকে হরণ কোত্তে পারবে না, সেটি আমি বুঝতে পাচ্ছি, কিন্তু অমরকুমারীকে আমি দেখতে পাচ্ছি না; এই বড় আক্ষেপ।

    কোথায় আমি এলেম? সেই তিনজন লোক কোথাকার? কেন তারা তেমন কোরে আমারে এই বনের ভিতর ধোরে নিয়ে এলো? আমি তাদের কাছে কি অপরাধ কোরেছিলেম? কি অপরাধে তারা আমার শত্রু? তারাও কি রক্তদন্তের দলের লোক? তাই হবে। রক্তদন্তের লোক সর্বঠাঁই! যেখানে আমি সেইখানেই রক্তদন্তের চর! প্রতাপ সামান্য নয়! আচ্ছা, রক্তদন্তের লোক তারা, এই যদি ঠিক হয়, তবে তারা একটি মেয়েমানুষের কাছে আমারে রেখে সোরে গেল কেন? সম্মুখে আর এলো না কেন? বেঁধে রাখলে না, প্রহার কোল্পে না, ভয় দেখালে না, অমনি অমনি সোরে গেল; মানে কি? শীঘ্র যদি আমি এখান থেকে মুক্ত না হোতে পারি, অবশ্যই আমার অনুমান একজন হাকিমের বাসাতে আমি থাকি, পূর্বদিন বৈকালে আমি বেরিয়ে এসেছিলেম, সমস্ত রাত্রির মধ্যে ফিরে যাই নাই, আজও সমস্ত দিন গেলেম না, অবশ্যই অনুসন্ধান হবে; হয় তো অনুসন্ধান আরম্ভ হয়েছে, কিন্তু এই নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে আমি আবদ্ধ, নগরে আমারে পাওয়া যাবে না; বনে আমি আছি, এ সংবাদও প্রচার হবে না, অন্বেষণকারীরা কোথায় আমার দর্শন পাবে?

    কপট-চাতুরীতে যারা আমারে এই বনের ভিতর এনেছে, তারা আর এখন দেখা দিচ্ছে না। কি মতলবে এনেছে, তাও আমি জানতে পাচ্ছি না। প্রাণে মারবে কি বাঁচিয়ে রাখবে, তারাই জানে। আমি মরি আর বাঁচি, তাতে আর আমার ক্ষোভ থাকছে না। কেন যে আমি পৃথিবীতে এসেছিলেম, পাঠাবার অগ্রে বিধাতার মনে যে কি ছিল, সে তত্ত্ব বিধাতারই সুগোচর; আমার ভাবনা বৃথা। জন্ম হয়েছে, বেঁচে আছি, এইমাত্র। এই বয়স পর্যন্ত জীয়ন্তে আমি মৃতবৎ; মরণেও আমার ক্ষোভ নাই। যদি মরি, অমরকুমারী নিরাপদ, এটি আমি জেনে যাব। আপাততঃ রক্ষক একজন হাকিম, অভিভাবক মণিভূষণ দত্ত। এখানকার কার্য সমাধা হবার পর অমরকুমারীকে সঙ্গে কোরে মণিভূষণ দেশে যাবেন, বৃদ্ধ শান্তিরাম দত্ত অমরকুমারীরে সযত্নে পালন কোরবেন, দীনবন্ধুবাবু পশুপতিবাবু তত্ত্বাবধান কোরবেন। অমরকুমারীর বিবাহ হবে।

    অহো! অকস্মাৎ আমার প্রাণ কেন এমন করে? বড় গরম! প্রাণ আই ঢাই কোচ্ছে! এতক্ষণ তো এ রকম ছিল না, হঠাৎ কেন এমন হয়? অমরকুমারীর বিবাহ হবে, আমি দেখতে পাব না, সেই জন্যই কি প্রাণ আমার এত অস্থির?

    ছুঁড়িটা কোথায় গেল? আমারে চৌকি দিবার জন্য নষ্টলোকেরা তারে এখানে বোসিয়ে রেখেছিল, আমি পালাতে পারবো না; ছুঁড়ী আমারে এই কথা বোলে ভয় দেখিয়ে গেল, আর এলো না। পিপাসায় যদি আমার ছাতি ফাটে, এক বিন্দু জল পাবো না। ছুঁড়িটা গেল কোথায়? কেন এলো না? বোধ হয়, আমারে চিনতে পেরেছে। যখন আমার জ্ঞান ছিল না, তখন সে ছিল; যখন আমি চৈতন্য পাই, তখনও সে ছিল, কথাও কোয়েছিল, চিনেছে, তেমন ভাব কিছুই জানায় নাই। আমি চিনেছি, সে ভাবটি আমিও তারে জানাই নাই। এখন আমি কি করি?

    ভাবছি, এমন সময় একটা জলন্ত মশাল হাতে কোরে একটা লোক সেই কুটিরের মধ্যে প্রবেশ কোল্লে, একবার তার মুখের দিকে চেয়ে আমি মাথা হেঁট কোল্লেম। সে লোককে পূর্বে আমি কখন দেখি নাই, রাত্রে যারা আমাকে ঘোড়ায় তুলে বনে এনেছে, সেই লোকটা তাদের মধ্যে একজন, তাতে আমি কোন সন্দেহ রাখলেম না, কিন্তু তারে দেখে আমার কোন প্রকার ভয় হলো না। প্রাণে যার মায়া নাই, শত্রু-দর্শনে তার কোন প্রকার ভয় হোতেও পারে না। আমি ভয় পেলেম না। পূর্বরাত্রে পথের ধারে যখন তারা আমাকে দেখে, আমি যখন তাদের দেখি, রাত্রের অন্ধকারে তখন আমি তাদের মুখ ভাল কোরে দেখতে পাই নাই; তথাপি আমি স্থির কোল্লেম, সেই তিনজনের মধ্যেই এই একজন।

    মশাল হাতে কোরে লোকটা খানিকক্ষণ নীরবে আমার সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকলো। তার পর ভাঙা কাঁসি যেমন খন খন শব্দে বাজে, সেইরূপ আওয়াজে সগর্জনে আমারে জিজ্ঞাসা কোল্পে, “কি রে ছোকরা! তোর নাম হরিদাস? এই বয়সে ততটা ধূৰ্ততা তুই কোথায় শিখেছিস? আমাদের হাতে এইবার সেই ধূর্তটা ভাঙবে।”

    প্রথমে তার মুখ দেখে আমি মাথা হেঁট কোরেছিলেম, এই সময় মাথা তুলে তার মুখে পানে চেয়ে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, তোমরা কে?

    হি হি শব্দে হাস্য কোরেই সেই লোক উত্তর কোলে, “আমরা কে? কোন আমরা? আমাদের পরিচয় অনেক। সে সকল পরিচয়ে তোর কি দরকার?”

    ধীরস্বরে আমি বোল্লেম, দরকার আমার কিছুই নাই, তবে কি না, বিনা দোষে আমারে বনবাসে এই কারাযন্ত্রণা ভোগ কোত্তে হোচ্ছে, অকারণে তোমরাই আমার এই যন্ত্রণার হেতু, সেই জন্যই আমি জানতে চাই, তোমরা কে? কেন আমারে ধোরেছ? একবার আমি ভেবেছিলেম, অদ্য কোন লোককে ধরবার তোমাদের মতলব ছিল, অন্ধকারে ঠিক কোত্তে না পেরে আমারেই ধোরে ফেলেছ, এখন দেখছি, তুমি আমার নাম পর্যন্ত জানো, কেন আমারে ধোরেছ, সেইটি জানতে পারলে,—

    মশালটা একধারে নামিয়ে রেখে উগ্রমূর্তি ধারণ কোরে, উগ্রস্বরে সেই লোক বোলে উঠলো, “জানতে পারলে তুই কি কোরবি? ভারী চালাক! এবারে আর চালাকী খাটছে না যাদু! গুজরাটের বরদা রাজ্য নয়! এ রাজ্য প্রবল প্রতাপ ইংরেজের, এখানে লোকের চক্ষে ধূলা দেওয়া বড় শক্ত কথা! একজন বিশ্বাসঘাতক রাজকুমার, কে জানে রাজকুমার কি প্রেতকুমার, সে ব্যক্তি ছদ্মবেশে বীর মল্লের আশ্রয়ে থেকে, বীরমল্লকে ধোরিয়ে দিয়েছে। হস্তী-পদতলে নিক্ষেপ কোরে সেই বীর-পুরুষের বীরদেহ ধূলিসাৎ কোরেছে, তুই তার সহায় হয়েছিলি, সেই নিমখারাম তোর মুরব্বি হয়েছে, এইবার দেখা যাবে, কে তোরে রক্ষা করে! তুই হয় তো মনে করেছিস, আমরা নিকটে থাকি না, তোরে আমরা বেঁধে রাখি নাই মনে কোল্লেই তুই পালাতে পারিস, সেই সাহসেই তোর বুকে ভয় নাই। হাঁ, আমরা নিকটে থাকি না, সম্মুখে আসি না, এ কথা সত্য, কিন্তু দূরে দূরে আমরা বিচরণ করি। দূরে থেকে তোকে পরীক্ষা করি। আমরা কেবল তিনজন নহি। তুই যা মনে ভাবিস, তা নয়, আমরা অনেক, আমাদের তাঁবেদার বন্দুকধারী লোকেরা গড়ের ধারে ধারে দিবারাত্রি পাহারা দেয়। পালাবার চেষ্টা কোল্লেই তুই মারা যাবি।

    লোকটা নিস্তব্ধ হলো। মশাল জ্বোলছিল, লোকের মুখের দিকে চেয়ে আমি বুঝলেম, তার কথাগুলো আমার উপর কতদূর কাজ কোরেছে, রক্ত বর্ণ বক্রনয়নে আমার মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে সেই লোকটা তাই পরীক্ষা কোচ্ছে। বাস্তবিক ঔষধ ধরে নাই, কথাগুলো আমার উপর কিছুই কাজ করে নাই;—

    কাজ করা মানে আমার ভয় পাওয়া। আমি কিছু মাত্র ভয় পাই নাই, আমি তখন ভাবছিলেম, লোকটা মিথ্যাবাদী; দুষ্টলোকে সত্যবাদী হয় না। ধূর্তলোকে সত্যকথা বলে না। জানি, তথাপি আমি মনে কোল্লেম, এ লোকটার আগাগোড়া সমস্তই মিথ্যাকথা। যে স্ত্রীলোকটা আমার কাছে ছিল, আমি তারে চিনেছি, সে এখনও এ সব লোকের দলে দস্তুরমত অভিষিক্ত হয় নাই। অকপটে সে আমারে বোলেছে এ বনে তারা নূতন; এ লোকটা বোলছে, তাঁবেদার লোকেরা দিবারাত্রি গড়ের ধারে পাহারা দেয়। গড় যেন এই সব লোকের ইন্তমুবারী ভোগ-দখলী মৌরাশী পাট্টাই। পুরষানুক্রমে এরা যেন এই গড়বন্দী অরণ্যের অবিরোধ অধিকারী! কাণ্ডই মিথ্যা।

    নানা কথায় আমারে ভয় দেখিয়ে, লোকটা সেখান থেকে চলে গেল। মশালটা নিয়ে যেতে ভুলে গেল না। কুটির অন্ধকার। আবার আমি ঘোর অন্ধকারে একাকী স্ত্রীলোকটা এলো না। গত রাত্রে আমি উপবাস কোরেছি, আজি দিবাভাগে গোটা দুই ফল খেয়েছি; ক্ষুধার উদ্রেক নাই, কিন্তু পিপাসা ধারণ করা যায় না। পিপাসা হোচ্ছে; স্ত্রীলোকটা যদি আসে, একটু জল পাবার আশা হয়। জল পিপাসা অপেক্ষা সে সময় আমার আর একটা পিপাসা ছিল। যা আমি ভেবেছি, যা আমি স্থির করেছি, যা বলে চিনেছি, বাস্তবিক সেই স্ত্রীলোকটি, সেই স্ত্রীলোক কি না, সেই তত্ত্বটি পরিজ্ঞাত হবার পিপাসা।

    অন্ধকারে আমি বসে আছি, প্রায় অর্ধদণ্ড অতীত। বাহির দিকে একটু দূরে অল্প অল্প আলো দেখা গেল। যে লোকটা মশাল হাতে কোরে বেরিয়েছে, সেই লোক হয় তো আবার ফিরে আসছে, এইরূপ আমি মনে কোল্লেম। তা নয়, সে নয়; আলো যখন ক্রমশঃ নিকটবর্তী হলো, তখন দেখলেম, সেই পূর্বে কথিত স্ত্রীলোক। কুটিরদ্বারে ক্ষুদ্র এক লণ্ঠন হস্তে সেই স্ত্রীলোক।

    স্ত্রীলোক কুটিরমধ্যে প্রবেশ কোল্লে, লণ্ঠনটি পাশে রেখে আমার নিকটে এসে বোসলো, অতি নিকটে। আমি তার মুখ দেখলেম। মুখে ম্লানও নয়, মাঝে হাসিও নাই; অথচ ভাবে যেন একটু হাসি হাসি বুঝা গেল। সেইভাবে সেই মুখখানি ঘুরিয়ে সে আমারে বোল্লে, “কেমন শুনলে? যা আমি বোলেছিলেম, তাই ঠিক কি না? পালাবার উপায় নাই।”

    সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমি অনাবশ্যক বিবেচনা কোল্লেম। পূর্বাবধি যে কথাটি আমার মনে মনে জাগছিল, সেই কথাই অগ্রে উত্থাপন করি এই আমার অভিলাষ; কিন্তু হলো না, স্ত্রীলোক পুনরায় আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “যে লোকটি এসেছিল, তোমারে আর কি কি কথা বোলে গেল? আমি তোমার কাছে অনেকক্ষণ ছিলেম, তার পর অনেকক্ষণ অনুপস্থিত ছিলেম, তাতে কি তার রাগ রাগ ভাব দেখলে?”

    আর আমি ধৈর্য রাখতে পাল্লেম না, ক্ষুধা আমার পূর্বেই দূর হয়েছিল, একটু পূর্বে একটু পিপাসা এসেছিল, ছুঁড়িটার বাচালতা দেখে, সে পিপাসাও দূর হয়ে গেল। এক নিশ্বাসে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “নবীন! এ বনে কি তুমি নবীন তপস্বিনী?”

    প্রশ্ন শ্রবণ মাত্র, স্ত্রীলোকটা চমকে গেল। আঁতে ঘা লাগলো। তার চক্ষু তখন আমার চক্ষের দিকে ছিল না। সহসা সমসূত্রে আমার চক্ষের দিকে চক্ষু উত্তোলন কোরে ছুঁড়ী খানিকক্ষণ হাঁ কোরে থাকলো; যতক্ষণে অন্ততঃ দশবার চক্ষের পলক পড়া সম্ভব, ততক্ষণের মধ্যে একটিবারও পলক ফেলে না। ভাব আমি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পাল্লেম তার নাম আমি জানতে পেরেছি, নাম ধোরেই সম্বোধন কোরেছি, তার পরিচয় আমি জানি, সে জন্যই তার বিস্ময়।

    বিস্ময়ে জড়ীভূতা সেই নবীন বন-বাসিনী চমকিতনয়নে চেয়ে অবাক হয়ে আছে, সেই ভাব দর্শন কোরে পুনরায় আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “নবীন! তোমার এ দশা কতদিন? কতদিন তুমি এই দস্যুদলের সহচারিণী? আমি এখান থেকে পালাতে পারবো না, সেই কথা তুমি বোলেছিলে, এবার তুমি আসবার কিছু পূর্বে যে লোক এখানে এসেছিল, সেই লোকটিও সেই কথা বোলে গেল। তার সঙ্গে তোমার কি সম্বন্ধ? আমার সঙ্গে তোমার কি শত্রুতা? আমারে তুমি চিনতে পেরেছ? তোমার চাউনি দেখেই তা আমি বুঝতে পেরেছি। তোমার ভাগ্যে এই ছিল, স্মরণ কোরে আমার প্রাণে কষ্ট হোচ্ছে; কিন্তু এ কি বিপরীত! আমি বিপদে পড়েছি, তাতে তুমি আহ্লাদিনী! ধর্ম ভাবটা তুমি একেবারেই ভুলে গিয়েছ। যে পথে তুমি এখন দাঁড়িয়েছ, যারা যারা সে পথে আসে, তারা সকলেই ধর্মভাব ভুলে যায়। দেখ নবীনকালি! দুই একদিন নয়, অনেকদিন তোমাদের বাড়ীতে আমি ছিলেম, তোমাদের সংসারে যাতে মঙ্গল হয়, তোমরা যাতে সুখে থাক, সাধ্যমত সেই চেষ্টাই আমি কোরেছি, তাও তুমি জানো; কি অবস্থায় কি প্রকারে এই বিজন বনমধ্যে আমি এসে পড়েছি, তাও তুমি জেনেছ; এ অবস্থায় তোমার কি করা কর্তব্য, সেটা তুমি ভাবলে না; যাতে আমি এখানে থেকে পালাতে না পারি, তাই তুমি ইচ্ছা কোচ্ছো! চিরদিন আমি সত্যধর্মের সেবা করি, তুমি নিশ্চয় জেনো, তোমার ইচ্ছা কখনই ফলবতী হবে না। মানুষ পৃথিবীতে আসে, চিরকাল পৃথিবীতে থাকে না। মানুষ কখনও অমর হয় না। কিছুদিন ইহসংসারে সুখভোগ অথবা দুঃখভোগের পর, মানুষকে এক অজ্ঞাত দেশে চলে যেতে হয়; সে দেশের নাম পরলোক। সে লোকের অবস্থার নাম পরকাল। সে লোকে সে কালেও সুখ-দুঃখের ভোগ আছে। তুমি অভাগিনী, পাপবুদ্ধির বশবর্তিনী, পাপীলোকের সঙ্গিনী, এ সব ঠিক; কিন্তু অবকাশ কালে নির্জনে এক একবার পরকালের কথাটা মনে কোরো।”

    এইবার নবীনকালীর ঘন ঘন চক্ষের পলক পড়তে লাগলো। তার সর্বশরীর সিউরে উঠলো; কি যেন আমারে বোলবে বোলবে। মনে কোল্পে, দুই তিনবার একটু একটু হাঁ কোল্লে, কথা ফুটলো না, বোলতে পাল্লে না।

    পাঠক মহাশয় হয় তো এই স্ত্রীলোকটির পরিচয় জানবার নিমিত্ত উৎসুক হয়ে থাকবেন। এই স্ত্রীলোক বঙ্গবাসিনী। শেষকালে কাশীবাসিনী হয়েছিল। কাশী রমণবাবুর বাড়ীতে যখন আমি আশ্রয় পাই, তখন তাঁর পরিবারবর্গের সঙ্গে আমার জানাশুনা হয়। রমণবাবুরা তিন সহোদর। তিনি জ্যেষ্ঠ, রামশঙ্কর মধ্যম, মতিলাল কনিষ্ঠ। তাঁদের পিসীমার দুটি কন্যা, সেই দুটি কন্যার মধ্যে একটি কন্যা এই নবীনকালী। রামশঙ্কর একরাতে পিসীমার হাতের অঙ্গুলিগুলি ছেদন কোরে, মেজ বৌমার গায়ের অলঙ্কারগুলি কেড়ে নিয়ে, বাড়ী থেকে পলায়ন করে। সেই রাত্রেই এই নবীনকালী নিরুদ্দেশ! এতদিন কোথায় ছিল, প্রকাশ ছিল না; এতদিনের পর পড়বি তো পড়, আমারই নজরের উপর! দর্শনমাত্রেই আমি চিনেছি; অংশ চিনতে কিছু, বাকী আছে। সঙ্গে সঙ্গে রামশঙ্কর আছে কি না, সেইটি এখন অনিশ্চিত।

    পরকালের নামে নবীনকালী সিউরে উঠছে, চমকে উঠেছে; এতক্ষণ ডেকে ডেকে কথা কোচ্ছিল, এই সময় কিছু, নরমসুর ধোল্পে; বিষাদে ম্লানমুখী হয়ে নরমসুরে আমারে বোল্লে “না হরিদাস! অমন কোরে তুমি আমারে ভয় দেখিও না! কাশীবাস আমার ভাগ্যে নাই; বিশ্বেশ্বর আমারে কাশীতে রাখলেন না, তাড়িয়ে দিলেন, সেই জন্যই আমার নরকভোগ!”

    এই দেখ! পাপিয়সী! কেমন কোরে আপনার মুখে আপনি আগুন দেয় দেখ! হতভাগিনী স্বৈরিনী। বিশ্বেশ্বর তোমারে তাড়িয়েছেন, পাপমুখে এমন কথা বোলো না। বিশ্বেশ্বরপুরী তোমারে ভাল লাগলো না, রামশঙ্করের প্রেমে মন মজে গেল, মুক্তিক্ষেত্র পরিত্যাগ কোরে রাতারাতি রামশঙ্করের সঙ্গে তুমি পালিয়ে এলে! বিশ্বেশ্বরের নিন্দা করবার সময় তোমার পাপ-রসনা অবসন্ন হয় না, এই বড় আশ্চর্য।

    নবীনকালী আরও জড়সড়; আরও নরম হয়ে আরও অনুতাপ কোরে বোল্লে, “না হরিদাস! আর তুমি আমারে ওরকম তিরস্কার কোরো না; বিশ্বেশ্বর আমারে তাড়ান নাই; পাপে আমার মতি ছিল, কালভৈরব আমারে তাড়া কোরেছিল! তাও না! পাপে আমার মতি হয় নাই, একজন আমারে কুমতি দিয়ে ছিল! সেই রামশঙ্কর আমার পরকালের পথ বিষময় কোরে দিয়েছে, নরকের অগ্নি নরকের বিষ অহরহ আমারে দগ্ধ কোচ্ছে, জর্জরীভূত কোচ্ছে; ভুলিয়ে দাও, ভুলিয়ে দাও; নরকের মূর্তি আর আমারে তুমি দেখিও না! আচ্ছা হরিদাস! আমি যে সেই কুলকলঙ্কিনী নবীনকালী, এখানে এ বনে, তা তুমি কেমন কোরে চিনেছ?”

    মৃদুহাস্য কোরে আমি বোল্লেম, ভানুমতী সেজে যে হরিদাসের চক্ষে ধাঁধা লাগান বড় শক্ত কথা! তোমার মত শত শত নবীনকালীও আমার চক্ষে ধাঁধা দিতে পারে না। একবারমাত্র তোমার মুখখানি দর্শন কোরেই আমি ছদ্মবেশের ছদ্ম-আবরণ ভেদ কোরে ফেলেছি। ধরা তুমি দাও কি না দাও, তোমার নিজমুখে নিজ পরিচয় প্রকাশ হয় কি না হয়, সেই প্রতীক্ষায় আমি চুপ কোরেছিলেম। বোধ হয়, তোমার ইচ্ছাও ছিল না, পরিচয় দেওয়া; বিশ্বেশ্বর দেওয়াইলেন। তুমি এখন বুঝতে পেরেছ, নরকভোগ। নিজ মুখে স্বীকার। দয়াময় বিশ্বেশ্বর তোমার প্রতি দয়া প্রকাশ কোরেছেন। আচ্ছা, নবীন! রামশঙ্কর কি তোমার সঙ্গে আছে?

    এ প্রশ্ন আমি জিজ্ঞাসা কোরবো, কলঙ্কিনী সেটা ভাবে নাই; প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল না। প্রশ্নটা ঘুরিয়ে দ্বিতীয়বার আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, তুমি কি রামশঙ্করের সঙ্গে আছ? সে প্রশ্নেও নবীনকালী কোন উত্তর দিল না। কাশী থেকে ঢাকা! পলায়নের দৌড় কম নয়! সরাসর এক যাত্রায় ঢাকা, এমনও সম্ভব নয়। এরূপ পাপ কার্যের রীতিপদ্ধতি যে প্রকার, সেই প্রকার পদ্ধতিতেই নানা স্থানে এরা পরিভ্রমণ কোরেছে, সেটি আমি অনুভবে বুঝে রাখলেম। আর এক তত্ত্ব আমার মনে এলো। মশালহাতে কোরে যে লোকটা আমার কাছে এসেছিল, সে লোক রামশঙ্কর নয়; কিন্তু সে বোলে গিয়েছে, তারা অনেক লোক; দিবারাত্রি গড়ের ধারে ধারে বন্দুকধারী পাহারা। কথাটা সত্য কি না? নবীনকালীকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, সমান প্রকৃতির কত লোক এই বনে বাস করে? পথে আমার দেখা পেয়ে তিনজনে আমারে এখানে এনেছে। সত্য কি কেবল তিনটি লোক তোমার রক্ষাকর্তা?

    নির্বাকে অল্পক্ষণ আমার নয়ন নিরীক্ষণ কোরে নবীনকালী আমারে এক প্রশ্ন দিলে। সে প্রশ্ন আমার অভাবনীয়। নবীনকালী জিজ্ঞাসা কোল্পে, কথা তুমি কেন জিজ্ঞাসা কর? কম লোক যদি হয়, তা হলে কি তুমি পালাবে? পালাবার উপায় থাকলে আমি পালাবো, এই ভাব আমার মনে ছিল। কাপুরুষের মত পলায়ন কোত্তে আমার ইচ্ছা ছিল না; যদি পালাতে হয়, বীরত্ব দেখিয়ে জয়ী হয়ে পালাবো, এই আমার মতলব। প্রশ্নের উত্তরে আমি বোল্লেম, আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমারে তুমি নূতন প্রশ্ন দিচ্ছ, এটা ঠিক হোচ্ছে না; আগে আমার প্রশ্নের উত্তর কর, তার পর আমার মনের কথা শুনতে পাবে।

    নবীনকালী বোল্লে, “অল্প দিন হলো, আমরা এখানে এসেছি। যে তিনজনকে তুমি দেখেছ, তারাই এখানে থাকে। রাত দিন এক জায়গায় বোসে থাকে না, ঠাঁই ঠাঁই ঘুরে ঘুরে বেড়ায়; তাদের ভিতর রামশঙ্কর আছে কি না, সে কথা তুমি আমারে জিজ্ঞাসা কোরো না, সে প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারবো না। এখন তোমার কথা হোচ্ছে, কেবল সেই তিনজন মাত্র এ বনের অধিকারী কি না। হাঁ, আপাততঃ অধিবাসী তিনজন, কিন্তু এই কদিনের মধ্যে আমি দেখেছি, আরও দুটি লোক একদিন এখানে এসে ঐ তিনজনের সঙ্গে ফুসফুস কোরে কি পরামর্শ কোরে গিয়েছে; পরামর্শ সব আমি শুনতে পাই নাই। একজন কেবল দুই একবার একটু বড় বড় কোরে তোমার নাম কোরেছিল, তাই আমি শুনেছি; তাই শুনেই আমি বুঝেছিলেম, তুমি ঢাকায় এসেছ; তার পর আর কোন উচ্চবাচ্য ছিল না; আজ সকালবেলা তোমারে আমি এখানে দেখলেম।”

    আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “দেখে তোমার মনে কিরূপ ভাবের উদয় হয়েছিল? আপন ইচ্ছায় আমি এসেছি, কিংবা আর কেহ আমারে এনেছে, কি তুমি ভেবেছিলে?”

    নবীনকালী উত্তর কোল্লে, “নিবিড় বন, হিংস্র জন্তুর বাসভূমি, বিরামকানন অথবা ক্রীড়াকানন নয়, ইচ্ছাপূর্বক রাত্রিকালে তুমি এখানে আসবে এমন আমি ভাবি নাই; কারা তোমারে ধোরে এনেছে, সেই কথাই আমি ভেবেছিলেম।

    আমি।—ভেবে তোমার আনন্দ হয়েছিল, কিংবা আমার এই অবস্থা দেখে আমার কষ্টে তুমি কষ্ট অনুভব কোরেছিলে?

    নবীন।—আমি তোমারে চিনেছিলেম। কাদের হাতে তুমি ধরা পড়েছ, সেইটি মনে কোরে আমি কষ্ট অনুভব কোরেছিলেম।

    আমি।—হাঁ হাঁ, তা হোতে পারে! তোমার মনটি বড় ভাল! কারা আমারে ধোরেছ তা তুমি জানতে না, এখনো বোধ হয় জান না, প্রাতঃকালে আমারে এখানে দেখেই তোমার কষ্ট হয়েছিল, আনন্দ হয় নাই, এই তো তোমার কথা? আচ্ছা, এখন জানতে পেরেছ, কাদের হাতে আমি ধরা পোড়েছি?

    নবীন।—(নিরুত্তর)।

    আমি।—চুপ কোরে থাকলে হবে না, মিথ্যাকথাও খাটবে না, আমার সরল প্রশ্নের সরল উত্তর দাও।

    নবীন।—উত্তর আমি দিতে পাচ্ছি না, গুর গুর কোরে বুক কাঁপছে! যারা তোমারে ধোরেছে, এখন তারা আমার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।

    আমি।— দেখ নবীনকালী, পূর্বাবস্থা মনে কর। এখন তুমি কাশীবাসিনী নও; কাশীতে তুমি যেমন ছিলে, তোমার মন সেখানে যেমন ছিল, এখানে এখন তার সম্পূর্ণ বিপরীত; নষ্ট সংসর্গে স্বভাব নষ্ট হয়, মনও নষ্ট হয়; তাই তোমার ঘোটেছে। কাশীতে আমি তোমারে দেখেছি, তোমার কার্যকলাপ পরীক্ষা কোরেছি, আমার প্রতি তোমার স্নেহ-যত্ন ছিল, সদয় ব্যবহার ছিল, তাও আমি অনুভব কোরেছি; এখন সম্পূর্ণ ভাবান্তর; যাদের কাছে এখন তুমি আছ, তাদের প্রকৃতি প্রাপ্ত হয়েছ; পাকা পাকা মিথ্যাকথাও শিখেছ; জটিলতা কুটিলতা অভ্যাস কোরেছ; রামশঙ্কর এ বনে আছে কি না, সে কথাটাও তুমি আমার কাছে বোলছ না; সকালে তুমি আমারে চিনেছিলে, সঙ্কেতেও সে ভাবটি আমার কাছে প্রকাশ কর নাই; বনবাসী দস্যুরা আমারে নিয়ে কি কোরবে, তাও তুমি আমারে বোলছো না; সব একযোগ! কাশীতে তোমারে দেখে আমার আনন্দ হতো, এখানে তোমারে দেখে ভয় হয়! কাশীতে তুমি এক প্রকার দেবী ছিলে, এখানে এখন তুমি ভয়ঙ্করী পিশাচী হয়েছ।

    নবীন।—আর আমারে লাঞ্ছনা দিও না হরিদাস, আর লাঞ্ছনা দিও না! তোমার কথা শুনে আমার প্রাণের ভিতর যেন আগুন জ্বোলে উঠছে! আগুন নির্বাণ করবার ঔষধ নাই! হাঁ, ভাল কথা! তুমি কি এখানে উপবাস কোরেই থাকবে? দিনমানে তো কিছুই আহার কোল্লে না, রাত্রেও কি কিছু খাবে না? অনাহারে বাঁচবে কিরূপে? সেই কথা জিজ্ঞাসা কোত্তেই আমি এসেচি।

    আমি।— বাঃ! সব দয়া-মায়া তবে তুমি হারাও নাই! আমার আহারের কথা জিজ্ঞাসা কোত্তে এসেছ! তারা বুঝি এই কথা তোমারে শিখিয়ে দিয়েছে? দেখ নবীন, আহারে আমার রুচি নাই, একটু পূর্বে পিপাসা হয়েছিল, তখনি তখনি তা আবার মিলিয়ে গিয়েছিল, এখন আবার একটু একটু পিপাসা আসছে। মনে দুশ্চিন্তা থাকলে কিছুই ভাল লাগে না, এক দণ্ডও আর এখানে থাকতে আমার ইচ্ছা নাই।

    নবীন।—তবে কি তুমি পালাবে?

    আমি।—বিদ্রূপ কর কেন? নিজেই তুমি বোলছ, পালাবার উপায় নাই, তুমি আসবার আগে তোমাদের একটা লোক এখানে এসেছিল, সে লোকটাও বোলে গিয়েছে, পালাবার চেষ্টা কোল্লেই মারা যাবে। তোমাদের দুজনের মুখেই এক রকম কথা। এখন আবার এ কিসের ছলনা? ছলনা কোরে তুমি বুঝি আমার মন জানতে এসেছ?

    নবীন।—না হরিদাস, ছলনা আমি শিখি নাই; আমার মনের কথা শুন। যে অবস্থায় পোড়ে কুল হারিয়ে আমি বেরিয়েছি, কতক কতক তুমি জান, কিন্তু গোড়ার কথা জান না; তুমি হয় তো মনে কোচ্ছো, আমি এখানে সুখে আছি। হায় হায়! যে সুখে আমি আছি, জগতের সৃষ্টিকর্তা যিনি, তিনিই তা জানছেন। এখানে আমি এক রকম পিঞ্জরবদ্ধ বিহঙ্গিনী। গাছতলায় বোসে বোসে পালাই পালাই ডাক ছাড়ি! পালাতে পারি না; তুমি কি পালাবে? তুমি যদি পালাও, সত্য বোলছি হরিদাস, তুমি যদি পালাও, আমিও তোমার সঙ্গে পালাবো। হাঁ, কি কথা বোলছিলে? পিপাসা হয়েছে? রোসো একটু শীঘ্রই আমি আসছি।

    নবীনকালী উঠে দাঁড়ালো; আলো এনেছিল, সে আলোটি হাতে কোরে আমার মুখের দিকে চাইতে চাইতে কুটির থেকে বেরিয়ে গেল; একটু পরেই ফিরে এলো; হস্তে একটা মাটির ভাঁড়; এসেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ত্বরিতম্বরে বোলে, “এ বনে এক রকম ফল হয়, সে ফলের রস অতি সুসম্বাদু; পান কোল্লে তৎক্ষণাৎ পিপাসাশান্তি হয়, অনেকক্ষণ আর পিপাসা আসে না; সেই ফলের সরবত কোরে এনেচি, খাও, এক চুমকে সবটুকু খেয়ে ফেলো, শরীর জুড়িয়ে যাবে।”

    ফলের গুণ ব্যাখ্যা কোরে, ঐ সব কথা বোলে, নবীনকালী সেই মৃৎপাত্রটি আমার হাতে দিলে, যথার্থই আমার পিপাসা হয়েছিল, যথার্থই এক চুমুকে সেই সরবতটকু আমি পান কোল্লেম। কতক্ষণ নবীনকালী আমার কাছে বোসে ছিল, কতক্ষণ আমার সঙ্গে কথা কোয়েছিল, মনে হয় না, কেবল এইটুকুমাত্র মনে হয়, আমার চক্ষের সম্মুখে যেন ঝাঁক ঝাঁক জোনাকী পোকা উড়ে বেড়াতে লাগলো, একপাল কালো কালো কুকুর আমার সম্মুখ দিয়ে ছুটে গেল, ঘুমের ঘোরে অবশাঙ্গ হয়ে আমি যেন সেইখানে তৃণাসনের উপর ঢোলে পোড়লেম।

  • মায়াবিনী

    মায়াবিনী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    বিজ্ঞাপন

    প্রথম বার।

    গতবর্ষে “গোয়েন্দার গ্রেপ্তার” নমাক সাময়িক পত্রিকায় “জুমেলিয়া” নামে এই পুস্তকের ৩ ফর্ম্মা বাহির হইয়াছে। এক্ষণে অবশিষ্ট ফৰ্ম্মাগুলি মুদ্রাঙ্কিত করিয়া পুস্তক সম্পূর্ণ করা গেল। “জুমেলিয়া” নামের পরিবর্ত্তে “মায়াবিনী” নামে সম্পূর্ণ পুস্তক স্বতন্ত্র আকারে বাহির হইল।

    দ্বিতীয় বার।

    এক্ষণে ইহার অনেকাংশ পরিবর্তিত হইয়াছে, অনেকাংশ পরিত্যাগ করা গিয়াছে, এবং কোন কোন স্থানে পুনর্ব্বার লিখিত হইয়াছে। মুদ্রাঙ্কণকার্য্যেও পূৰ্ব্বাপেক্ষা সুসম্পাদিত করা গেল এবং তিনখানি ছবি দেওয়া হইল।

    গ্রন্থকার