Author: তাহের আলমাহদী

  • পঞ্চম কল্প : পদ্মায় প্রাণ যায়

    পঞ্চম কল্প : পদ্মায় প্রাণ যায়

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    পঞ্চম কল্প : পদ্মায় প্রাণ যায়

    যে বজরায় ঢাকায় আসা হয়েছিল, সেই বজরায় আরোহণ কোরে আমরা মাণিকগঞ্জে চোল্লেম। আমরা ছয় জন;—আমি, মণিভূষণ, অমরকুমারী, হরিহরবাবুর সরকার, হরিহরবাবুর চাপরাসী আর ঢাকার পুলিশ-প্রহরী।

    মনে আনন্দ আছে, অথচ আসামীরা ধরা পোড়ছে না, গুপ্তভাবে কোথায় কি প্রকারে ওৎ কোরে থাকে, কোথায় কি প্রকারে কখন কি বিপদ ঘটায়, সেই বিষয়ে কিছু কিছু, আশঙ্কাও আছে। আমার জীবনের কেমন এক গ্রহফল, চিন্তাশূন্য আমি থাকতে পারি না। নিশ্চিন্ত থাকায় যে সুখ, সে সুখ যেন আমার ভাগ্যে নাই, তাই আমি সৰ্বদা ভাবি। বজরায় বোসে বোসে অমরকুমারীর সঙ্গে কথা কোচ্ছি, মণিভূষণের সঙ্গে কথা কোচ্ছি, চিন্তারাক্ষসী বুকের ভিতর খেলা কোচ্ছে! রাশিচক্রের গতির ন্যায় কত পরিবর্তনে কত প্রকার চিন্তা আমার মনের ভিতর উদয় হচ্ছে, ঠিক রাখতে পাচ্ছি না। বর্ধমানে সর্বানন্দবাবুর খুনের পর রক্তদন্ত আমারে ধোরে এনেছে, সর্বানন্দবাবু পরিবারেরা কে কেমন আছেন, কোন সংবাদ পাই না, মোহনবাবুর সঙ্গে মধ্যে মধ্যে দেখা হয়েছিল, শ্বশুরবাড়ীর সংবাদ তিনি কিছুই বলেন নাই। আশালতা; স্নেহময়ী বালিকা আশালতা; রক্তদন্ত যে দিন আমারে ধোত্তে যায়, সেই দিন বালিকা আমার অনুকলে পিতার কাছে কত কথাই বোলেছিল। হায় হায়! আশালতার বিবাহের আয়োজনের সময়েই সর্বানন্দবাবুর প্রাণ গেল! কারা যে তাঁরে কেটে গেল, পুলিশ তার কিছুই কিনারা কোতে পাল্লে না; আজ পর্যন্ত খুনী আসামীর সন্ধান হলো কি না, তাও কিছ, জানা গেল না। জানা যাবেই বা কিরূপে? মোহনবাবুর মোহন চক্রে তদবধি আমি নানাস্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছি; কোথাও স্থির হয়ে থাকতে পাচ্ছি। বর্ধমানের সংবাদ আমারে কে এনে দিবে?

    রক্তদন্ত আমার শত্রু; জাতশত্রু; প্রাণসংহার কোত্তে চায়! তেমন শত্রুতা তার সঙ্গে আমার কি আছে, কিছুই আমি জানি না। কাশীতে জেনেছি, মোহনলালবাবুর গুপ্ত উপদেশে রক্তদন্ত আমার উপরে দৌরাত্ম্য করে। সে কথাটাই বা কি? মোহনবাবুর কাছে আমি কি অপরাধে অপরাধী, মোহনবাবু কেন আমার শত্রু, তাও আমার অজ্ঞাত। তাঁর শ্বশুরবাড়ীতে আমি ছিলেম, মহাবিপদসময়ে সেইখানে আশ্রয় পেয়েছিলেম, এই আমার অপরাধ, মোহনবাবু আমারে সে আশ্রয় ছাড়িয়ে নিজ বাড়ীতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, যেতে আমি সম্মত হই নাই, এই আমার অপরাধ। সে অপরাধে প্রাণে মারবার সংকল্প হয়, এটা আমার স্বপ্নের অগোচর ছিল।

    চিন্তার স্রোত একটানা বহে না, জোয়ার-ভাঁটার ন্যায় গতির তারতম্য অনুভূত হয়, নানা দিকে শাখা-প্রশাখা প্রবাহিত হয়ে থাকে। মোহনলালবাবু একবার আমার প্রতি প্রসন্ন হয়েছিলেন, সে প্রসন্নতা দীর্ঘকালস্থায়ী হয় নাই। বারাণসীধামে রমেন্দ্রবাবুর নিকটে একদিন আমি মোহনলালের চরিত্রের একটু একটু ছায়া-চিত্র অঙ্কিত কোচ্ছিলেম, গুপ্তভাবে শ্রবণ কোরে মোহনবাবু আবার আমার উপর খড়াহস্ত; অল্পদিনের সেই প্রসন্নতা অল্পদিনেই উড়ে যায়; তদবধি চক্ষে চক্ষে তার সঙ্গে আর আমার দেখা-সাক্ষাৎ হোচ্ছে না, কিন্তু গোপনে গোপনে তাঁর দুষ্টচক্র সমভাবেই ঘূর্ণিত হোচ্ছে। অমরকুমারী-হরণের এই যে ভয়ানক চক্র, আমি বেশ বুঝতে পাচ্ছি, এ চক্রের মূলেও মোহনবাবু দণ্ডধর! অমরকুমারীকে উদ্ধার কোরে আমি নিশ্চিন্ত হোতে পাচ্ছি না। চক্রের নায়কেরা-উপনায়কেরা নিরাপদে মুক্ত আছে। আমার শান্তিপথে তারা বিষম কণ্টক; তবে আমি নিশ্চিত থাকি কিরূপে?

    নিশ্চিত সুখ আমার ভাগ্যে নাই। আমার সম্মুখে অমরকুমারী; অমরকুমারীর চন্দ্রমুখ আমি দর্শন কোচ্ছি, অমরকুমারীর অমৃতময়ী বাণী আমি শ্রবণ কোচ্ছি, তথাপি যেন চিত্তে সুখ নাই; চিতার অনলে আমার হৃদয় দগ্ধ হোচ্ছে। কবির বাণী অখণ্ডনীয়। কবি বলেন, চিতা আর চিন্তা এই উভয়ের মধ্যে চিন্তাই গরীয়সী, কেন না, চিতা কেবল মৃতদেহ দাহ করে, চিতা সৰ্বদা সজীব প্রাণীকে দাহ করে! সেই চিন্তার প্রখর অনলে আমি দগ্ধীভূত। এক এক সময় এক একটি আনন্দের হেতু উপস্থিত হয়, চিন্তার অনল সেই হেতুগুলিকে তখনি দগ্ধ কোরে ফেলে। এখন আমার সেইরূপ অবস্থা।

    মাণিকগঞ্জে তরণী পৌঁছিল। হরিহরবাবুর বাসায় আমরা উত্তীর্ণ হোলেম। বাসায় পরিবার থাকেন না, কিন্তু বাসাবাড়ী দু-মহল। ভিতরমহলে অমরকুমারীকে রাখা হলো, বাসায় দাসী আর পাচিকা অমরকুমারীর সঙ্গিনী হয়ে থাকলো। হরিহরবাবু অমরকুমারীর রূপ দর্শন কোল্লেন; যত কষ্টে, যত কৌশলে, যত ব্যয়ে, যত শ্রমে অমরকুমারীকে আমি উদ্ধার কোরেছি, আমার মুখে সেই সব কথা শ্রবণ কোল্লেন; তত অল্প বয়সে তত সৃষ্টি আমি কোরেছি, স্নেহবশে প্রশংসা কোরে আমারে সাধুবাদ দিলেন; ভক্তিভাবে আমি তাঁরে অভিবাদন কোল্লেম।

    মাণিকগঞ্জে তিন দিন। দীনবন্ধুবাবু আমার কোন সমাচার প্রাপ্ত হোচ্ছেন না। চিঠি লিখে সংবাদ দেওয়া, তাও ঘোটে উঠছে না, সমস্তই অনিশ্চিত ছিল, অনিশ্চিত সংবাদে বন্ধুলোকের উদ্বেগ বৃদ্ধি করা হয় মাত্র; সেই কারণেই মুর্শিদাবাদে আমি চিঠি লিখি নাই। তৃতীয় দিবসের রজনীযোগে হরিহরবাবুকে সেই সব কথা আমি বোল্লেম; আর কালবিলম্ব না কোরে মুর্শিদাবাদে ফিরে যাওয়া আমার ইচ্ছা; এই নিবন্ধ জানালেম। একটু চিন্তা কোরে তিনি বল্লেন, “আর একটি দিন অপেক্ষা কর। মণিভূষণ আর তুমি, দুজনেই ছেলেমানুষ, অমরকুমারী বালিকা; যেতে হবে অনেকদূর, ভয়ঙ্করী পদ্মানদী, পদ্মার তরঙ্গে বড় বড় সাহসী পুরুষেরও হৃদয় কম্পিত হয়; উপযুক্ত বন্দোবস্ত কোরে, উপযুক্ত লোকজন সঙ্গে দিয়ে, একদিন পরে আমি তোমাকে পাঠাব; আর একটি দিন মাত্র অপেক্ষা কর।”

    একটি দিন আমি অপেক্ষা কোল্লেম। সেই দিন দীনবন্ধুবাবুর নামে আর শান্তিরাম দত্তের নামে দুইখানি চিঠি লিখে, আমি স্বহস্তে ডাকঘরে দিয়ে এলেম। সে দিন আমার আর অন্য কার্য ছিল না, দিনমানে হরিহরবাবুও বাড়ীতে ছিলেন না, মণিভূষণের সঙ্গে আনুসঙ্গিক নানাপ্রকার গল্পে দিনমান আমি অতিবাহিত কোল্লেম। সন্ধ্যার পর হরিহরবাবুর বাসায় এলেম। আমাদের মুর্শিদাবাদে যাত্রার সমস্ত বন্দোবস্ত ঠিক হলো। অমরকুমারীর সঙ্গে দুজন দাসী থাকবে আর নৌকার হেপাজাতের জন্য পাঁচজন পাইক থাকবে, রন্ধনকার্যের জন্য একটি ব্রাহ্মণবালকও সঙ্গে যাবে, এইরূপ বন্দোবস্ত। সঙ্গে আমার যে টাকাগুলি ছিল, সমস্তই নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছে, অতি অল্পমাত্র অবশিষ্ট, হরিহরবাবু আর একশত টাকা আমারে ঋণস্বরূপ প্রদান কোল্লেন, মুর্শিদাবাদে পৌঁছে সেই টাকা আমি পাঠাব, এইরূপ অঙ্গীকার কোল্লেম।

    পরদিন মধ্যাহ্নের পূর্বে আহারাদি কোরে আমরা নৌকাররাহণ কোল্লেম, আমাদের জন্য বড় একখানি বজরা, আর রন্ধনের জন্য আর একখানি নৌকা ভাড়া করা হলো, বজরা আমাদের পদ্মানদীতে প্রবেশ কোল্লে, আমরা পদ্মাগর্ভে ভাসলেম। পূর্ণ বর্ষাকাল নয় তথাপি পদ্মার এ কূল ও কূলে দেখা যায় অল্পবাতাসেও পদ্মানদীতে তুফান হয় তরঙ্গে তরণীগুলি যেন নৃত্য কোত্তে থাকে। আমরা যে দিন পদ্মায়, সে দিন অল্প অল্প হাওয়া ছিল, তরঙ্গ প্রবল ছিল, বাতাসের গতি উত্তরদিকে, পদ্মা একটানা, দক্ষিণবাহিনী, উজানে তরণী চোলেছে, যে দিকে স্রোত, বায়ু সে দিকে অনুকূল ছিল না, কাজে কাজে দ্রূতগমনে বাধা হোচ্ছিল, এক ঘণ্টার পথে দুই ঘণ্টা অতীত। বজরার সারেং পাকালোক, নদীর যেখানে যেখানে চড়া, যেখানে যেখানে গভীরতা, সারেঙের সে সব জায়গা ঠিক ঠিক জানা ছিল; বেলা যখন প্রায় অবসান, সারেং সেই সময় মধ্যস্রোত পরিত্যাগ কোরে কিনারা ধোল্লে, কিনারায় কিনারায় মৃদুগতিতে তরণী চোল্লো, দশ হাত দূরেই তীরভূমি। মধ্যস্থল দিয়া গেলে কোন তীরের কোন বস্তু স্পষ্ট নজর হয় না, কিনারা থেকে একপারের সকল বস্তুই দেখা যায়। এক এক বার আমি তীরের দিকে চেয়ে দেখছি, লোকজন চলাচল কোচ্ছে, গরু-বাছুর চোরে বেড়াচ্ছে, এক একটা জঙ্গলের উপর বড় বড় কাক বোসে আছে, দূর থেকে দেখলে বোধ হয়, যেন এক একটা কৃষ্ণবর্ণ খাসী; এ অঞ্চলের লোকের মুখে কাকের নাম ‘কৌয়ো।’ ঠাঁই ঠাঁই অনেক গাছপালাও দেখা গেল, দূরে দূরে এক একখানা বাড়ীও দেখতে পেলেম, কিন্তু ক্রমশই লোকালয় অদৃশ্য, যে স্থানে আমরা এসে পোড়লেম, সে দিকে মানুষের গতিবিধিও বড় কম। পশ্চাতে আমি চেয়ে দেখলেম, একখানিও নৌকা দেখা গেল না, দূরে দূরে ক্ষুদ্রাবয়ব এক একখানি নৌকার পালদণ্ড দেখা গেল, কিন্তু সে সকল নৌকারও গতি অন্যদিকে। এক এক জায়গায় ইলিশমাছ ধরার ডিঙ্গী; জেলেরা স্ফূর্তিতে গান কোত্তে কোত্তে মাছ ধোরে বেড়াচ্ছে, এক এক ক্ষেপে বহু মৎস্য আটক পোড়ছে, দেখতেই এক তামাসা।

    আমাদের তরণী ক্রমশই অগ্রসর; সূর্যও ক্রমশঃ পশ্চিমাভিমুখে অগ্রসর; মাছধরা নৌকাও ক্রমশঃ বিরল; তীরভূমি জনশূন্য, আমার বোধ হলো যেন, কোন একটা প্রশস্ত প্রান্তরের উপর দিয়ে আমরা ভেসে ভেসে যাচ্ছি, সম্মুখে পশ্চাতে বামে দক্ষিণে আর একখানিও নৌকা নাই। পদ্মাবক্ষে নৌকাযোগে যাঁরা নূতন যাত্রী, বিস্তার দর্শনে, তরঙ্গ দর্শনে তাঁদের ভয় হয়, যখন আবার অন্য নৌকা দৃষ্টিগোচর হয় না তখন আরো সেই ভয়ের বৃদ্ধি হয়। সূর্যদেব ডুবে যাচ্ছেন, ডুবুডুবু মূর্তিতে পদ্মার জলতলে তরঙ্গে তরঙ্গে কম্পিত হোচ্ছেন, বোধ হোচ্ছে যেন, সমস্ত দিন পরিশ্রমের পর দিনপতি ঠাকুর পদ্মাজলে স্নান কোত্তে নেমেছেন। ধরাতল অন্ধকার হয়ে আসছে; যে সময়ের নাম গোধুলি, সেই সময় অতি নিকট; আমার অন্তরে অল্প অল্প আশঙ্কার উদয়, অকারণে কেন তখন আশঙ্কা, নিজের মন নিজে জানতে পাল্লেও সে আশঙ্কার হেতুনির্দেশ করা দুরহ। এক একবার তীরের দিকে আমি চেয়ে চেয়ে দেখছি, একটিও লোক নাই, সে জায়গাটায় চলাচলের রাস্তা আছে কি না, তাও ঠিক জানা গেল না, অনাবশ্যক বিবেচনায় সারেঙকেও কিছু জিজ্ঞাসা কোল্লেম না।

    তরণী চোলেছে, তীরের বৃক্ষশাখাও যেন চোলেছে। হঠাৎ দেখি, এক জায়গায় প্রকাণ্ড একটা বৃক্ষতলে একজন লোক। মাথায় প্রকাণ্ড একটা পাগড়ী; গায়ে বোধ হলে তুলাভরা চাপকান, হাতে একগাছা মানুষপ্রমাণ যষ্টি। লোকটা সেইখানে দাঁড়িয়ে ছিল, কোন দিকে তার দৃষ্টি, অনেকক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখেও আমি সেটা ঠিক কোত্তে পাল্লেম না, অনুভবে বুঝলেম যেন, পদতলের মৃর্তিকার দিকেই চেয়ে আছে, অন্যদিকে দৃষ্টি নাই। গোধূলির অল্প অল্প অন্ধকার, লোকটার মুখখানা কি রকম, স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হলো না; মুখে দৃষ্টিগোচর হলো না বটে, কিন্তু মনের ভিতর কেমন একরকম সন্দেহ দাঁড়ালো, কারণ উপস্থিত নাই, তথাপি আমি একটু একটু ভয় পেলেম।

    ভয়ের সময় আপন মনে সাহস আনয়ন করা ভাল, ভয়কে অতিক্রম করা যাক না যাক, সাহসের প্রবোধে কতকটা আশ্বস্ত হওয়া যায়। মনে কোল্লেম, হয় তো পথিক লোক, কিম্বা হয় তো, কোন আদালতের পেয়াদা, কি হয় তো কোন জমীদারের পাইক। এই একপ্রকার প্রবোধ। ভয়ের সময় সাধ্যানুসারে অন্যমনস্ক হবার চেষ্টা করাও ভাল। লোকটার দিকে আর চাইলেম না, তরণীও ক্রমে ক্রমে সে জায়গা ছাড়িয়া গেল। যে বস্তু দেখবো না, যে দিকে চাইবো না মনে করা যায়, সেই বস্তু দেখতে সেই দিকে চাইতে আগেই যেন প্রবৃত্তি আসে, সেইরকম উপদেশ দেয়, মানুষের প্রবৃত্তির এই একটা ধর্ম যেন সাধারণ। পশ্চাতে ফিরে ফিরে দুই তিনবার সেই বৃক্ষের দিকে আমি চাইলেম, যতক্ষণ দেখা গেল, ততক্ষণ চাইলেম, শেষে চেয়ে চেয়ে দেখি, সে লোক সেখানে আর নাই। আতঙ্ক, উপেক্ষা, তাচ্ছল্য, এই তিনের পরপর মল্লযুদ্ধ। সে যুদ্ধ দেখবার লোক নাই, আমার চক্ষ কি দেখেছে, আমার মন কি ভেবেছে, চক্ষুই জানলে, মনই জানলে, কাহাকেও আমি কিছু বোল্লেম না; লোকটার কথা যেন ভুলেই গেলেম। অন্য বিষয়ে একটু চিন্তা কোরে, অমরকুমারীকে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আচ্ছা অমর ডেপুটিবাবুকে তুমি বোলেছিলে, একটা লোকের নাম চণ্ডেশ্বর। আচ্ছা, চেহারা তুমি জান, পাপিষ্ঠ জটাধর ওখানে চণ্ডেশ্বর নাম ধোরেছিল, যেটা ঠিক হোতে পারে, কিন্তু আর একটা লোকের নাম তুমি বোলেছ, গণেশ্বর। আচ্ছা, শোনবার ত তোমার ভুল হয় নাই? ঠিক মনে কর দেখি, গণেশ্বর কি ঘনশ্যাম?”

    অমরকুমারী বোল্লেন, “শোনবার ভুল হয় নাই। ঠিক শুনেছি, তার নাম গণেশ্বর; কিন্তু ভাই! চণ্ডেশ্বর এক একবার সেই লোকটাকে ঘনশ্যাম বোলে ডাকতে ডাকতে বড় বড় দাঁত দিয়ে জিব কামড়ে ফেলেছিল, তাও আমি দেখেছি। বোধ করি, সেই লোকটার দুটো নাম; এক নাম গণেশ্বর, এক নাম ঘনশ্যাম।”

    আপন মনেই আমি বোলে উঠলেম, “ওঃ! ঘনশ্যামটাও তবে নাম ভাঁড়িয়েছে! যে সব কাজ তারা করে, সে সব কাজে নামভাঁড়ান, বেশ লুকান, বড়ই দরকার। ঘনশ্যামটা গণেশ্বর হয়েছে, জটাধরটা চণ্ডেশ্বর সেজেছে, তবে সেই যার নাম মিয়াজান, সে লোকটাও হয় তো ঠিক নামে পরিচয় দেয় নাই; সে লোকটাও হয় তো আর কিছু হবে। যাই হোক, জটাধরের নাম ভাঁড়ান ফস্কা গেরো;—বিধাতার গঠনের উপর কারিকুরি খাটে না; বানরের মত মুখ ভালকের মত লোম, উটের মত কুব্জ, সে লোক সামান্য একটা নাম ভাঁড়িয়ে কত দিন লুকিয়ে থাকতে পারে? চেনালোকের চক্ষে পোড়লেই সব বুজরুকী ভেঙে যাবে। থাক তারা। ইংরেজী পুলিশের দক্ষতা যদি পরীক্ষামূখে খাঁটি দাঁড়ায়, পুলিশ যদি কর্তব্যজ্ঞানটা করে, তা হোলৈ ভণ্ডলোকেরা কদাচ নামের আবরণে অব্যাহতি লাভ কোতে পারবে না।”

    আমার মুখপানে চেয়ে অমরকুমারী বল্লেন, ‘আমিও তাই মনে করি। তিনটে লোকেই জালমানুষ সেজেছে, তিনটে লোকেই নাম ভাঁড়িয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়াচ্ছে, মিয়াজানটার কথা ঠিক আমি বোলতে পাচ্ছি না, কেন না, সে চেহারার লোক পূৰ্বে আর কোথাও আমি দেখি নাই; কিন্তু যে লোকটার নাম গণেশ্বর, তারে আমি দেখেছি। বীরভূমে যে রাত্রে জটাধর তোমার প্রাণবিনাশের মন্ত্রণা কোরেছিল, সেই রাত্রে সেই চেহারার একটা লোক জটাধরের কাছে বোসে ছিল, তারে আমি দেখেছি।”

    পূর্বকথা স্মরণ কোরে সবিস্ময়ে আমিও বোল্লেম, “আমিও তাই বুঝেছি। গণেশ্বরটাই ঘনশ্যাম। জটাধরের কাছে বোসে ছিল, তুমি গিয়ে আমারে খবর দিলে, মেয়েমানুষ সাজিয়ে দিলে, খিড়কী দিয়ে যখন আমি পালাই, আড়ে আড়ে সদরের দিকে চেয়ে দেখেছিলেম, জ্যোৎস্না ছিল কি না,—ঠিক তাই! জটাধর আর ঘনশ্যাম। মিয়াজানটাকে এখনো ঠিক জানা যাচ্ছে না; ধরা পোড়লেই ধরা যাবে।”

    এই সব কথা আমাদের হচ্ছে, নদীতীরে বৃক্ষতলে কিছু পূৰ্বে যে লোকটাকে আমি দেখেছিলেম, সে লোকটার কথা আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছি, অমরকুমারী তারে দেখেন নাই, মণিভূষণও দেখেন নাই, অমরকুমারী যদি দেখতেন, মিয়াজানের আকারের সঙ্গে সেই লোকের আকারের সাদৃশ্য আছে কি না, বোধ হয় ধোত্তে পাত্তেন। আমার বোধ হোচ্ছে, সেই লোকটাই মিয়াজান, তিনজনেই তারা এই অঞ্চলে আছে। মাণিকগঞ্জে আমি এসেছিলেম, ঢাকায় আমি গিয়েছিলেম, অমরকুমারীকে আমি উদ্ধার কোরেছি গোপনে গোপনে এ সব সন্ধান তারা রেখেছে, কোন দিকে আমরা যাই, সঙ্গে আমাদের কত লোক, সেই সন্ধান জানবার জন্যই সেই লোক সেইখানে দাঁড়িয়ে ছিল, এই আমার অনুমান।

    অমরকুমারী ভয় পাবেন, এই ভেবে সে অনুমানের কথা অমরকুমারীকে আমি বোল্লেম না; মনের অনুমান আমার মনের ভিতরেই চাপা থাকলো। সন্ধ্যা তখন উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে, আকাশে চাঁদ উঠেছে, নক্ষত্র উঠেছে, দিনমান অপেক্ষা একটু জোরে জোরে বাতাস উঠেছে, আকাশপানে আমি চেয়ে আছি। চন্দ্রমণ্ডল প্রায় ষোলকলা পূর্ণ রূপখানি কিন্তু সৰ্বক্ষণ আমার নয়নগোচর হোচ্ছে না, এক একদিক থেকে এক একখানি তরল মেঘ এসে চাঁদের ছবিখানি ঢাকা দিয়ে ফেলছে, মেঘেরা চোলে যাচ্ছে, চাঁদ আবার একটু একটু হাসি-মুখে প্রকাশ হোচ্ছেন। আবার মেঘ আসছে, আবার চাঁদ ঢাকছে, চোলতী মেঘের অবিরণে চন্দ্রমা অধিকক্ষণ লুক্কায়িত থাকছেন না। তরল শুভ মেঘ যখন চন্দ্রগাত্র আচ্ছাদন করে, চন্দ্রমণ্ডল তখন পাণ্ডুবর্ণ দেখায়। আমাদের তরণী চোলেছে; আমি দেখছি, পাণ্ডুচন্দ্র আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চোলেছেন।

    একটা জায়গায় এসে বজরাখানি থামলো; পশ্চাতের নৌকাখানিও সেই খানে নোগর করা হলো, রন্ধনাদির আয়োজন।

    শশধর মেঘমুক্ত। পদ্মার বক্ষে কৌমুদীহার শোভমান; আকাশ নীল চন্দ্র-নক্ষত্র সেই নীলাকাশে মণি-মরকত; পদ্মা-সলিলের গর্ভেও মণি-মরকত-খচিত নীলাকাশের নির্মল ছায়া, তরণীর গবাক্ষপথে মুখ বাহির কোরে সেই শোভা আমি দর্শন কোত্তে লাগলেম; শশিবিভূষিণী রজনীতে প্রকৃতির শোভা যেমন সুন্দর দেখায়, ভাবুকের মন সে সৌন্দর্যে অপরিচিত নয়, ভাবুকের ভাবে চিরবঞ্চিত থাকলেও সেই নৈশ শোভা সন্দর্শনে আমার নয়ন-মন পুলকিত হোতে লাগলো। সেইখানে আমি দেখলেম, প্রবল পদ্মার আর একটি স্রোত চন্দ্রকিরণে রজতবর্ণ ধারণ কোরে সমানবেগে দক্ষিণদিকে চোলে যাচ্ছে। ভূগোলে লেখা আছে, সে রকম নদীর নাম শাখানদী। আমাদের সারেং অবশ্য ভূগোলবিদ্যায় অপণ্ডিত, বাংলা স্কুলের ছাত্রও নয়, তথাপি তারে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “এ নদীটির নাম কি?”

    সারেং একটি গল্প বোল্লে। যে ভাষায় তার বর্ণনা, আমাদের পাঠকমহাশয়েরা সে ভাষায় রসাস্বাদনে তৃপ্তিলাভ না কোত্তে পারেন, এই বিবেচনায় আমি আমার নিজের ভাষায় সারেঙের কথাগুলি এইখানে সুপ্রণালীক্রমে লিপিবন্ধ কোল্লেম।

    এইখানে পদ্মাতীরে একটি লোকালয় ছিল; অনেকগুলি লোকের বাস। এক বৎসর বৈশাখমাসে কি একটা যোগ হয়, সেই যোগে গঙ্গাস্নানে মহা ফল। অগ্রে যারা সে সংবাদ পেয়েছিল, যে দেশে গঙ্গা আছেন, সেই দেশে তারা গঙ্গাস্নানে গিয়েছিল; পূৰ্বে যারা সংবাদ পায় নাই, পদ্মাকে গঙ্গার ভগ্নীবিশ্বাসে পদ্মাস্নানেই তারা যোগফল লাভ করবার আশা করে। গ্রামে একঘর ব্রাহ্মণ ছিলেন, তাঁর ধর্মপত্নী সেই যোগে পদ্মাস্নানে অভিলাষিণী হন। বাড়ীতে একজন দাসী ছিল, তার নাম গৌরী। প্রভাতের গৃহকার্যে গৌরীকে নিযুক্ত রেখে ব্রাহ্মণী শীঘ্র শীঘ্র পদ্মাস্নানে আসেন। বেলা চারি দণ্ডের মধ্যে যোগ ছিল, গৌরীও স্নানার্থিনী, গৃহকর্মে তার বেলা হোতে লাগলো, গৌরী বড় ব্যাকুলা, এক হস্তে গৃহমার্জনী-ঝাঁটা, অপর হস্তে গোময়ের হাঁড়ী, সেই অবস্থাতেই গৌরী পদ্মাস্নানে ছুটলো; পথে একটি ফলগাছে অনেকগুলি ফুল ফুটেছিল, একটা কচুপাতা ছিড়ে নিয়ে গৌরী গুটিকতক ফল তুলে নিলে। আবার ছুট! সকলেই জানেন, পদ্মায় মধ্যে মধ্যে মহা ভাঙ্গন হয়; গৌরী আসছে;—আসতে আসতে দেখলে, পথের মাঝখানে শক্ত ভূমিতে একটা চিড়;—প্রখর সূর্যাতপে মাটি যেন ফেটে গিয়েছে, সেই রকমের একটা চিড়;—সেই ফাটোলে অল্প অল্প জল। ওদিকে সূর্যদেব অনেক দূরে উঠে এসেছেন, বেলা চারি দণ্ড হবার দেরী নাই, ততক্ষণের মধ্যে পদ্মার স্রোত প্রাপ্ত হওয়া অসম্ভব, গৌরী এইরূপে বিবেচনা কোল্লে। যোগ ফুরায়, কি হয়, সাত পাঁচ ভেবে গৌরী সেই ফাটোলের ধারেই বোসে গেল; ঝাড়, হাঁড়ি সেইখানে রেখে, কচুপাতার ফুলগুলিতে অঞ্জলি পূর্ণ কোরে সেই ফাটোলের জলেই পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ কোল্লে। অপর্ণমাত্রেই ফাটোলের বিস্তার; জলস্রোত দক্ষিণদিকে ছুটলো; গৌরী কেঁদে উঠলো; “নিলে না মা! আমার পুজো নিলে না মা! দাসী বোলে অবহেলা কোরে চোলে যাচ্চো? আমি তোমায় ছাড়বো না, দাঁড়াও, দাঁড়াও, তোমার সঙ্গে আমিও যাবো।” স্রোত ক্রমশই দক্ষিণদিকে প্রবাহিত; ঝাড়ু, হাঁড়ি তুলে নিয়ে গৌরীও সেই স্রোতের ধারে ধারে প্রধাবিতা; স্রোত ক্রমশই বিস্তৃত, ক্রমশই বেগবান যেখানে ফাটোল ধোরেছিল, তার আধ ক্রোশ পর্যন্ত জলশায়ী হয়ে গেল। ধারে ধারে গৌরী ছুটেছে; নূতন জলস্রোত যতই ছোটে, গৌরীও ততই ছোটে; জল দাঁড়ায় না; হুঁ হুঁ শব্দে দক্ষিণদিকে গতি দেখতে দেখতে সেই স্রোত মহা বেগবতী নদী। গৌরীর হাতে ঝাঁটা ছিল, স্রোতের জলে নিক্ষেপ কোল্লে, পদ্মা পদ্মা বোলে ডাকতে লাগলো, উভরায় চীৎকার; পদ্মা উত্তর দিলেন না, গতিও থামলো না, সমানবেগে ছুট; গৌরীরও সমানবেগে ছুট। পূৰ্বদেশের লোকেরা আমাদের হাঁড়িকে পাতিল বলে; খানিক দূর গিয়ে গৌরী তার হাতের সেই গোলা-হাঁড়িটা সেই জলে ফেলে দিলে; স্রোত ছুটেছে, গৌরীও ছুটেছে; গৌরী আর পারে না;—পাল্লেনা; কেবল মা মা, পদ্মা পদ্মা, বোলে উচ্চরবে ডাক দিতে লাগলো;—ডাকেও কিছু হলো না;—গৌরী শেষকালে মা মা বোলতে বোলতে সেই স্রোতের জলে ঝাঁপ দিলে;—গৌরীকে কোলে কোরে পদ্মাবতী সমুদ্রের দিকে ছুটলেন। গৌরীর নামে পদ্মার সেই শাখানদীর নাম গৌরী-নদী; তীরবর্তী গ্রামবাসীরা এই গৌরী-নদীর নাম দিয়েছে, গড়ুই নদী;—ইংরেজরা নাম দিয়েছেন গোরাই। গৌরী যেখানে ঝাঁটা ফেলে দিয়েছিল, সে স্থানের নাম ঝাঁটাদহ, যে স্থানে পাতিল (হাঁড়ি) ফেলে দিয়েছিল, সে স্থানের নাম পাতিলদহ, যে স্থানে মা মা বোলে ডাক দিয়েছিল, সে স্থানের নাম ডাকদহ। সেই ডাকদহের বর্তমান নাম কুষ্টিয়া। পদ্মানদীতে যাঁদের গতিবিধি আছে, তাঁরা সকলেই জানেন, কুষ্টিয়া, কুমারখালি, পাংসা প্রভৃতি স্থানের নীচে দিয়ে যে নিশ্চলসলিলা নবনদী প্রবাহিতা, সেই নদীর নাম গড়াই নদী;—গৌরী নামের অপভ্রংশে গড়ুই নামের উৎপত্তি।

    পদ্মার এক শাখানদী গৌরী। সারেঙের মুখে গৌরী নদীর উৎপত্তিবিবরণ শ্রবণ কোরে আমরা চমৎকৃত হোলেম। ওদিকে আমাদের রন্ধনকার্য সমাপ্ত হলো, আমরা আহার কোল্লেম। রাত্রি প্রায় দেড় প্রহর অতীত। আমার ইচ্ছা ছিল, সেইখানেই সে রাত্রে নঙ্গর ফেলে প্রভাত পর্যন্ত অপেক্ষা করা, কিন্তু সারেঙ আমার সে অনুরোধ রক্ষা কোল্লে না। সারেঙ বেল্লে, “দিব্য চাঁদনী রাত্রি, ঠাণ্ডায় ঠাণ্ডায় বেশ যাওয়া যাবে; এই বোলেই তরণী খুলে দিলো। তখনো জোর হাওয়া, তখনো পদ্মায় তরঙ্গ, তখনো আকাশে অল্প অল্প মেঘ, তখনো এক একবার চন্দ্রচ্ছতি মেঘাবৃত। তরণী চোল্লো, কতদূর চোলে গেল, কেবল আমাদের তরণীই চোলেছে, যতদূর চেয়ে দেখি, অগ্রে পশ্চাতে আর একখানি তরণীও দেখতে পাই না। সারেং আমাদের তরণীখানি ধারে ধারেই নিয়ে যাচ্ছে অল্প দূরেই ডাঙ্গা।

    সময় প্রায় নিশীথ। সেই সময় পশ্চাদ্দিকে আমি চেয়ে দেখি, দূরে একখানা নৌকা আসছে, যাত্রীনৌকা। অন্য নৌকা, নির্ণয় কোত্তে পাল্লেম না, খানিকক্ষণ সেই দিকে চেয়ে থাকলেম, ক্রমশই সেই নৌকা আমাদের নৌকার দিকে অগ্রসর। আমাদের নৌকা অপেক্ষা সে নৌকার গতি দ্রুত, দেখতে দেখতে নিকটর্তী তখন আমি দেখলেম, সে নৌকায় অনেক দাঁড়; ঝুপ ঝুপ শব্দে দাঁড় পোড়ছে, নৌকাখানা যেন তীরবেগে ছুটেছে। সে ধরনের নৌকা পূৰ্বে আর কখন আমি দেখি নাই; কিসের নৌকা, দেখবার জন্য কৌতূহল জন্মিল। সারেঙকে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, সারেঙ উত্তর কোলে, “ছীপ নৌকা; শিকারী লোকেরা ঐ রকম নৌকায় বড় বড় নদীতে বেড়ায়।”

    কেবল ঐ পর্যন্তই আমি জানতে পাল্লেম। বড় বড় নদীতে শিকারী নৌকা, বিচরণ করে। নদীতে কি রকম শিকার পায়, সেটা আমি হৃদয়ঙ্গম কোত্তে পাল্লেম না। ছীপনৌকা অল্পক্ষণের মধ্যেই আমাদের নৌকার নিকটবর্তী হলো, দেখলেম, সেই ছীপের একজন লোক ক্ষুদ্র একটা লণ্ঠন হাতে কোরে ইতস্ততঃ একবার সঞ্চালন কোল্লে, পরক্ষণেই গড়ুম গড়ুম শব্দে নৌকার ভিতর থেকে বন্দুকের আওয়াজ হলো, শব্দে আমার বুক কেঁপে উঠলো। জলের উপর বন্দুকের আওয়াজ হোলে শব্দ আরো বেশী হয়, অনেকক্ষণ পর্যন্ত প্রতিধ্বনি থাকে; জলে স্থলে, উভয় স্থানে প্রতিধ্বনি হয়। অজ্ঞাত কারণে আমার অন্তরে ভয়ের সঞ্চার হলো। না জানি, রাত্রিকালে কি বিপদ ঘটে, ওখানা যদি ডাকাতের নৌকা হয়, ডাকাতেরা যদি আমাদের নৌকায় প্রবেশ করে, কি উপায়ে অমরকুমারীকে রক্ষা কোরবো, সেই ভাবনাতেই আমার ভয়। ছীপ-নৌকা তীরবেগে ছুটে আসছে; আর বিশ হাত অগ্রসর হোলেই আমাদের নৌকার উপরে পোড়বে। তখন আমাদের কি উপায় হবে? আমাদের বিপদ ঘটবার কোন হেতু আছে, সারেঙ সেটা জানতো না, দাঁড়ীমাঝীরাও জানতো না, সুতরাং তারা ভয় পেলো না; পূৰ্বাপর ঘটনা স্মরণ কোরে আমার কিন্তু ভয় হলো। পুনৰ্বার সেই শিকারী নৌকায় বন্দুকের আওয়াজ। আমি নিরস্ত্র ছিলেম না, আমার সঙ্গে পিস্তল ছিল, ছীপের দিকে চেয়ে পিস্তল বাগিয়ে আমি সতর্ক থাকলেম।

    ছীপখানা প্রায় ৮০ হাত দীর্ঘ। বহর কম। কত লোক সেই ছীপে ছিল, দেখা গেল না, কোন দেশের লোক, তাও জানা গেল না, ছীপের দুই মুখে দুগাছা দীর্ঘ দীর্ঘ লাঠি, লাঠির মাথায় নিশান উড্ডীয়মান, সম্মুখের নিশান রক্তবর্ণ, পশ্চাতের নিশান কৃষ্ণবর্ণ। ছীপ আমাদের নিকটবর্তী হোলে সারেঙকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “এই কি শিকারী নৌকা?” সারেঙ তখন একটু ইতস্ততঃ কোরে যেন একটু কুণ্ঠিতভাবে উত্তর কোল্লে, “ওদিকে আপনারা চাইবেন না, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথাও কবেন না, রাত্রিকালে এ রকম ছীপ-নৌকায় কত লোক কত রকম মতলবে ফেরে, বুঝে উঠা যায় না।”

    সারেঙের কথায় আমার আশংকা হলো। নিশান দর্শন কোরে আমি মনে কোচ্ছিলেম, হয় তো পুলিশের নৌকা হবে; সারেঙ বোল্পে, মতলবের কথা। কারা কি মতলবে রাত্রিকালে জলে জলে বেড়ায়, সে অঞ্চলের লোকেরা সে তত্ত্ব জানতে পারে, আমাদের জানা অসম্ভব। ছীপের দিকে আমি চেয়ে থাকলেম। বায়ুবেগে অতিক্রম কোরে নক্ষত্ৰবেগে ছীপখানা ছুটে আসছে, দেখতে দেখতে আমাদের তরণীর কাছে এসে পোড়লো, গায়ে গায়ে ঠেকাঠেকি হয় হয় এইরূপ গতিক; একজৃষ্টে সেই দিকে আমি চেয়ে আছি; ঠেকাঠেকি হলো না। সাঁ সাঁ কোরে ছীপখানা আমাদের বজরা ছাড়িয়ে প্রায় দশ হাত দূরে বেরিয়ে গেল। যে প্রকার দ্রুতগতি, তাতে আমি মনে কোল্লেম, অল্পক্ষণের মধ্যেই আমাদের চক্ষের অন্তর হয়ে যাবে, ভয়ের কারণ থাকবে না।

    হরিহরবাবুর প্রেরিত পাইকেরা আমাদের পশ্চাতের নৌকায় ছিল। ছীপখানা বেরিয়ে যাবার পর তারা পরস্পর চুপি চুপি কি বলাবলি কোরে আমাদের বজরায় এসে উঠলো। তাদের মুখের ভাব দেখে আমি বুঝলেম, তারা যেন কোন রকম অমঙ্গলের আশঙ্কা কোচ্ছিল। অমরকুমারীকে সাবধানে রাখবার জন্য দাসী-দুজনকে আর মণিভূষণকে আমি সতর্ক কোরে দিলেম। আমি যে দিকে লক্ষ্য রাখছিলেম, মণিভূষণ তা দেখতে পান নাই; অমরকুমারীও কিছু জানতে পারেন নাই। বজরার কামরা মধ্যে তাঁরা নিয়ে নিশ্চিন্ত। ছীপের দিকে আমি চেয়ে আছি, অল্প অল্প দেখা যাচ্ছে, নদীর স্রোত অপেক্ষাও অধিকবেগে ছীপখানা চোলেছে। পুনৰ্বার গড়ুম গড়ুম শব্দে সেই ছীপ নৌকায় বন্দুকের আওয়াজ।

    মণিভূষণ ইতিপূৰ্বে সারেঙের কথা শুনেছিলেন; অমরকুমারীও শুনেছিলেন, সেই কথাই তাঁদের মনে ছিল; শিকারী নৌকা, শিকারীরা বন্দুকের আওয়াজ করে, তাই তাঁরা কোন রকম আতঙ্ক অনুভব কোল্লেন না। না করাই আমার ইচ্ছা। বন্দুকধ্বনি শ্রবণ কোরে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে আমি সেই অল্প-দৃষ্ট ছীপের দিকে চেয়ে থাকলেম, গতির ভাবে বুঝলেম, ফিরেছে, যে দিকে যাচ্ছিল, সে দিকে আর গেল না, আমাদের নৌকার দিকেই আসতে লাগলো। এবার কিন্তু গতি তত দ্রুত নয়, কিঞ্চিৎ শ্লথগতি, কিঞ্চিৎ ধীরে ধীরে গতি। যদিও ছীপখানা তখন অনেক দুরে, তথাপি শঙ্কাসূচক মৃদুস্বরে আমাদের লক্ষ্য কোরে সারেঙ বোল্লে, “সাবধান!” আমিও প্রতিধনি কোল্লেম, “সাবধান!” পাইকেরা পূর্বেই হয় তো জানতে পেরেছিল: গতিক বড় ভাল নয়; তাদের মধ্যে যে লোকটি সর্দার, সারেঙকে সম্বোধন কোরে যথাসম্ভব অনুচ্চস্বরে সেই লোকটি বোল্লে, “কিনারায় ধর, নোঙ্গর কর।”

    সর্দারের কথায় সারেঙের নিভীর্কতায় যেন আঘাত পেলে। কিনারায় ধরা অথবা নঙ্গর করা তার মত হলো না; বজরা এতক্ষণ যে ভাবে চোলছিল, তদপেক্ষা কিছু মৃন্দবেগে চালনের নিমিত্ত চালকগণকে অনুমতি দিল। পাইকেরা ব্যতিব্যস্ত। তাদের চাঞ্চল্য দর্শনে আমিও ক্ষেত্ৰকর্ম-বিধানের অবসর প্রতীক্ষায় প্রস্তুত হয়ে থাকলেম। যে দিকে স্ত্রীলোকেরা, সেই দিকে মণিভূষণকে রেখে আমি সম্মুখভাগে দরজা বন্ধ কোরে বহির্দিকে দাঁড়ালেম।

    আর সময় নাই। ছীপখানা একবার মৃদুগতি ধারণ কোরেছিল, পুনৰ্বার দ্রূতগতি। আমাদের বজরা চোলেছে, ছীপখানাও চোলেছে, অবিলম্বেই কাছাকাছি। আমরা আছি দশ হাত দূরে পশ্চাতে, ছীপ আছে দশ হাত দূরে অগ্রে এই সময় এক ঘূর্ণন। সচরাচর সোজা পথে যেতে যেতে পাড়ি দিবার সময় নৌকা যেমন আড়ে আড়ে খেয়া দিবার জন্য ঘুরে যায়, ছীপখানা সেই রকমে এক ঘূর্ণনে ঘুরে এসে আড়ে আড়ে দাঁড়ালো। বলা হয়েছে, ছীপখানা প্রায় ৮০ হাত লম্বা, নদীর এক কিনারা থেকে জলভাগের ৮০ হাত পর্যন্ত আটক পোড়ে গেল। বোধ হলো যেন, অর্ধপদ্মায় সেতুবন্ধ। আমাদের বজরা আর অগ্রসর হবার পথ পেলো না, ৮০ হাত ঘুরে আবার স্রোতোপথে উপস্থিত হবার অগ্রেই ছীপের লোকের আক্রমণে কোথায় আমরা তলিয়ে যাব, ঠাঁইকিনারা থাকবে না। বিপদ আসন্ন। ছীপের লোকেরা আমাদের উপরেই লক্ষ্য কোরে আসছে। সারেং বোলেছিল, শিকারী নৌকা; আমাদের দুর্ভাগ্যক্রমে একপ্রকার সেই কথাই ঠিক হয়। শিকারী নৌকাই বটে। আমরাই সেই শিকারীদের শিকার।

    চিন্তার অবসর নাই, বাক্যের অবসর নাই; ছীপখানা সেই ভাবে সোরে সোরে এসে আমাদের বজরার মুখের কাছে লাগলো। গোলন্দাজী জাহাজের ছিদ্রপথে যেমন বিভীষণ তোপধ্বনি হয়, জলদগর্জনের ন্যায় সেই ছীপে ঘন ঘন সেই প্রকার বন্দুকধ্বনি! রণতরীর সঙ্গে রণতরীর যুদ্ধ; সমুদ্রপথে সে যুদ্ধ যাঁরা দর্শন কোরেছেন, তুলনাকে একটু ছোট কোরে ভেবে তাঁরা এখন মনে করুন, পদ্মাবক্ষে সেইরুপ জলযুদ্ধের উপক্ৰম! আমাদের তরণীখানি রণতরণী নয়, তাদৃশ যোদ্ধাপতিও উপস্থিত নাই, মহাসঙ্কট উপস্থিত। ত্রাহি মধুসদন!

    ঝপ ঝপ কোরে ৮/১০ জন অস্ত্রধারী লোক ছীপের উপর থেকে আমাদের বজরার উপর লাফিয়ে পোড়লো। ডাকাতী করবার অগ্রে মফস্বলের ডাকাতেরা বিকট চীৎকারে যে প্রকার কুকী দেয়, সেই সকল লোক সেই প্রকারে বিকট চীৎকার আরম্ভ কোল্পে, সঙ্গে সঙ্গে বন্দুকধ্বনি, সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ারবিঘূর্ণন। ছীপে কত লোক ছিল, অনুমান কোত্তে না পেরেও আমাদের পাইকেরা মালসাট মেরে দাঁড়ালো; আক্রমণকারীরা দশজন, পাইকেরা আটজন। রাত্রিকালে পদ্মাবক্ষে বিপদ হয়, পাইকেরা সেটা জানতো; তারা প্রস্তুত ছিল, কেবল লাঠিমাত্র ভরসা নয়, ছোট ছোট তলোয়ার, ভুজালি, ছোট ছোট বন্দুক তারা সঙ্গে এনেছিল; মহা বিপদের সম্ভাবনা বুঝে, আমাদের দাঁড়ী-মাঝীরাও তরণীচালন পরিত্যাগ কোরে পাইকের দলে যোগ দিলে; আমি তখন কি করি; পকেটে পিস্তল ছিল, পিস্তল বাগিয়ে যোদ্ধাদলের পশ্চাতে দাঁড়ালেম। ঘোরতর যুদ্ধ। ছীপখানা ক্ৰমশঃ ঘুরে ঘুরে আমাদের বজরাকে প্রদক্ষিণ কোত্তে লাগলো। দুর্গানাম স্মরণ কোরে, সাহসে ভর কোরে, দুই তিন বার আমি পিস্তলের আওয়াজ কোল্লেম। কোন দিকেই লক্ষ্য ছিল না, সুতরাং সে আওয়াজে কিছুই ফল হলো না। তরণীমধ্যে স্ত্রীলোক তিনটার অস্ফুট আর্তনাদ! মণিভূষণ তাঁদের সান্ত্বনা কোত্তে লাগলেন; “ভয় নাই, ভয় নাই” বোলে আমিও বাহির থেকে সাধ্যমত অভয় দিতে লাগলেম; কে কার কথা শুনে, কে কারে অভয় দেয়, কে কারে সান্ত্বনা করে, মহা কলরবে প্রকৃতি প্রতিধ্বনিত! তলোয়ারে তলোয়রে যুদ্ধ, বন্দুকে বন্দকে যুদ্ধ! দুই পক্ষে পাঁচ সাত জন অস্ত্রাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত! পদ্মার জল অনেক দূর পর্যন্ত রক্তিম! এই অবসরে ছীপারোহী আরো জনকতক লোক আমাদের বজরায় এসে উঠলো বহুলোকের পদভরে বজরাখানি যেন ডুবুডুবু হয়ে দোল খেতে লাগলো। আমার পিস্তলের গুলীবারুদ নিঃশেষিত! একজনের হস্তের একখানা তলোয়ার ছিনিয়ে নিয়ে আমি বৈরীদলের সম্মুখীন হোলেম; খেলাঘরের ছেলেরা যেমন ছোট ছোট ছুরী দিয়ে কলাগাছ কাটে বলবান দস্যুর সম্মুখে আমার অস্ত্রধারণও সেইরুপ কলাগাছ-কাটার প্রয়াসের ন্যায় ব্যর্থ হয়ে গেল; তবু, আমি ইতস্ততঃ তলোয়ার ঘুরিয়ে দুই একজন বিপক্ষের ঊরুতে বাহুতে রক্তপাত কোরে দিলেম। পাইকেরা সুশিক্ষিত মল্ল; তলোয়ার-খেলাতেও বিলক্ষণ নিপুণ, তারা আমার অঙ্গরক্ষক, তারা আমারে পশ্চাদিকে সোরিয়ে সোরিয়ে আপনারাই রণক্ষেত্রে বীরত্ব প্রকাশ কোত্তে লাগলো; তাদের আবরণে আমার গাত্রে কোন রকম আঘাত লাগলো না, কিন্তু রণরক্তে আমার অঙ্গ ভিজে গেল।

    যথভঙ্গ! পাইকপক্ষেও বন্দুক ছিল; কিন্তু তলোয়ারের যুদ্ধেই তারা বৈরী-দলকে বিপর্যস্ত কোরে তুল্লে। গোলন্দাজেরা যখন বন্দুক লক্ষ্য করে, তখন তারা নীচু হয়ে গুড়ি মেরে বসে, মাথার উপর দিয়ে গুলী চোলে যায়। বন্দুকধারীরা যখন নীচদিকে গুলী করে, তখন তারা লম্ফ দিয়ে কুলালচক্রের ন্যায় ঘুরে ঘুরে ঠিক যেন শূন্যপথে ক্রীড়া করে; পায়ের নীচে দিয়ে গুলী চোলে যায়। চমৎকার শিক্ষা। আমাদের দাঁড়ী-মাঝীরাও সে বিপদে অল্প সাহস প্রকাশ কোল্লে না। আমারে আক্রমণ করা, তরণী মধ্যে প্রবেশ কোরে অমরকুমারীকে হরণ করা দস্যুদলের আসল মতলব; অর্থলোভেই এই নৈশযুদ্ধে তারা প্রবৃত্ত হয় নাই; সেটি আমি বেশ বুঝলেম। প্রতিপক্ষকে ঠেলে ঠেলে তারা কেবল আমার দিকেই রুকে রুকে আসে, তরণীর খড়খড়ী ভেঙে ভিতরে প্রবেশ কোত্তে চায়; আমার পক্ষের লোকেরা বিশেষ বীরত্ব দেখিয়ে পদে পদেই তাদের গতি অবরোধ করে; বিপক্ষেরা কিছুতেই অভিসন্ধি সিদ্ধ কোত্তে সমর্থ হয় না। আমাদের পাইকেরা একপ্রকার ব্যূহ-রচনা জানে; অল্পলোক হলেও দিব্য একটি অর্ধচন্দ্রাকার ব্যূহ-রচনা কোরেছিল; বোম্বেটেরা বহু চেষ্টা কোরেও সে ব্যূহভেদ কোত্তে পাল্লে না।

    আমি স্থির কোল্লেম, বোম্বেটে। জলপথে যারা ডাকাতী করে, জলপথে যারা মানুষ মারে, তারাই সব বোম্বেটে। আমার লোকেরা আমারে ঢেকে ঢেকে রাখছে। আকাশের তরল মেঘমালা তখন অন্তর হয়ে গিয়েছে, সুধাকর তখন মেঘমুক্ত হয়ে সমুজ্জ্বল সুধাকর পরিবর্ষণ কোচ্ছেন, রক্ষক লোকগুলির বাহু পার্শ্ব দিয়ে বোম্বটে লোকের চেহারাগুলো আমি উঁকি মেরে মেরে দেখছি; ভয়ঙ্কর চেহারা! কতক লোকের ফিরিঙ্গী সজ্জা, মুখে ফিরিঙ্গী দাড়ী, গলায় ফিরিঙ্গী বগলোস, মাথায় ফিরিঙ্গী টোপ; কতক লোকের মাথায় বড় বড় পাগড়ী, গালে গাল-পাট্টা, গায়ে বুকবন্দ চাপকান, চাপকানের উপর লাল কাপড়ের কোমরবন্ধ; কতক লোকের মাথা নেড়া, মুখে কালী, কালীর উপর চুনের গোঁফ, চুণের ভ্রূ, গা আদুড়, হিন্দুস্থানী ধরনের মালকোঁচার উপর সবুজ কাপড়ের কোমরবন্ধ, কতক লোক কাফ্রিদের মতন কৃষ্ণবর্ণ, মাথায় সেই রকম কোকড়া কোঁকড়া চুল, নীলবর্ণ ইজেরপরা; বুঝা গেল ছদ্মবেশ; যেহেতু, ঠোঁটে আর নাকে কাফ্রি লক্ষণের অভাব।

    নদীতীরে বৃক্ষতলে যে লোকটাকে আমি দেখেছিলেম, সেই দীর্ঘকার লোকটা সেই দলের মধ্যে ছিল, তুলাভরা চাপকানে আর প্রকাণ্ড পাগড়ীতে আমি তারে সনাক্ত কোত্তে পাল্লেম, কে যে কি, কারা যে তারা, কেন যে আমাদের উপর তাদের আক্রোশ, তা আমি অনুভব কোত্তে পাল্লেম না। একবার মনে কোরেছিলেম, চণ্ডেশ্বরের চক্র; অমরকুমারীকে আমি উদ্ধার কোরেছি, গোপনে গোপনে জানতে পেরে, সেই রাগে চণ্ডেশ্বর এই বোম্বেটোর দল ভাড়া কোরে এনেছে, কিন্তু ফিরিঙ্গী, কাফ্রী, পেশোয়ারী, এ সব লোক কোথাকার? সব লোক চণ্ডেশ্বরের আয়ত্তাধীন হবে, এমন তো আমি বিশ্বাস কোত্তে পাল্লেম না। তুলাভরা চাপকানধারী বৃহৎ পাগড়ীওয়ালা বৃহদাকার লোকটাই এই দস্যুদলের দলপতি, সে লোকটা কে? আকারে বুঝেছিলেম পঞ্জাবী, কিন্তু নিকটে মুখের চেহারা দেখে, পূৰ্বদেশবাসী বাঙালী বোলেই বোধ হলো; চাপকান-পাগড়ীতে বিদেশী সেজে এই বোম্বেটে-দলের মুরব্বী হয়েছে। এই লোকটাই হয় তো এখানে চণ্ডেশ্বরের পৃষ্ঠপোষক, শেষকালে এই সিদ্ধান্তই মনে এলো।

    আমার তখন সিদ্ধান্ত করবার সময় নয়; তরণীর উপর উভয় দলে মল্লযুদ্ধ বেধে গিয়েছে। অস্ত্রশস্ত্র ত্যাগ কোরে উভয় দলের হাতা-হাতি, মুষ্টামুষ্টি, লাথা-লাথি, হুড়া-হুড়ি, জড়াজড়ি, মাথা-ঠোকাঠুকি আরম্ভ হয়েছে। জনকতক লোক রক্তবমি কোত্তে কোত্তে গড়াগড়ি খাচ্ছে। দুই একটা লোকের চক্ষু ফেটে রক্ত গড়াচ্ছে। একটা লোক দাঁতকপাটি লেগে মজ্জিত হয়ে পোড়েছে। তখনো যুদ্ধের বিরাম হোচ্ছে না, ছীপের উপর থেকে তখনো মাঝে মাঝে বন্দুকের আওয়াজ হোচ্ছে, সে সব কেবল ফাঁকা আওয়াজ, এইরুপ আমি স্থির কোল্লেম, কেন না, এক জায়গায় ঘরদল পরদল উভয়দল জমা, বন্দুকের গুলীতে কোন দলের কোন লোকের প্রাণ যাবে, বন্দুকওয়ালারা তা জানে না; শুধু কেবল আমাদের ভয় দেখাবার জন্যই ফাঁকা আওয়াজ কোচ্ছিল, বন্দুকে গোলাগুলী ছিল না। থাকুক আর নাই থাকুক, অমরকুমারীর ক্রন্দনে আমার প্রাণ ছটফট কোচ্ছিল। বন্দুকের ধ্বনিতে আমার কিছুই ভয় ছিল না।

    ছীপের ভিতর ভীষণ চীৎকারধনি। ভীষণগর্জনে চার পাঁচজনে একসঙ্গেই চীৎকার কোরে বোলে উঠলো, “ডুবিয়ে দে! ডুবিয়ে দে!”

    এতক্ষণ বরং একটু ভরসা ছিল, ঐরূপ গর্জনধ্বনি শ্রবণ কোরে আমার প্রাণ উড়ে গেল! ক্ষণেকের মধ্যে আশা-ভরসা ফুরালো! বোম্বেটেরা দলে পুরু, অবহেলেই আমাদের বজরাখানি ডুবিয়ে দিতে পারে। এইবারেই প্রাণ গেল! অনেক বিপদেই অনেকবার পোড়েছি, ভগবান রক্ষা কোরেছেন, এবার এই পদ্মাবক্ষে বোম্বেটের হাতেই প্রাণ গেল! পদ্মার কাছে আমরা কোন অপরাধ করি নাই, পদ্মার জলে প্রাণ যায়! পদ্মাগর্ভে আজ আমাদের জীবতেই সমাধি হয়! মা পদ্মা! এই কি তোমার মনে ছিল? বিদেশী নিরপরাধী বালক আমি, বিদেশিনী নিরপরাধিনী বালিকা অমরকুমারী; মা পদ্ম! তুমি কি এই রাত্রে বিষম বদন-ব্যাদান কোরে আমাদের দুটিকে গ্রাস কোরে ফেলবে? এতগুলি প্রাণী তোমার গর্ভে জীবন বিসর্জন দিবে, নরনারী-ভক্ষণে তোমার অভ্যাস আছে, জীবনগ্রহণে তুমি মায়া-দয়া রাখ না, কিন্তু মা! তুমি আমাদের মা গঙ্গার সহোদরা; গঙ্গা আমাদের পতিতপাবনী দয়াময়ী, তুমিও দয়াময়ী, তুমি আমাদের প্রতি দয়া কর!”

    মনে মনে এই মন্ত্রে আমি পদ্মাবতীর স্তব কোল্লেম; পদ্মার প্রবল স্রোত আমার স্তবে কর্ণপাত না কোরে সাগরসঙ্গমে সমভাবে ছুটে চোল্লো; ছীপের লোকেরা আবার পূর্বরূপ উৎকট-স্বরে সঙ্গীলোকগুলোকে হুকুম দিতে লাগলো, “ডুবিয়ে দে! ডুবিয়ে দে! ডুবিয়ে দে!”

    ভয় দেখাবার হকুম নয়। সত্যই তারা মোরিয়া হয়েছে; সত্যই বজরাখানি ডুবিয়ে দিবে। আর আমাদের অব্যাহতি নাই! যারা সন্তরণ জানে, তারা পরিত্রাণ পেতে পারে। আমি সন্তরণ জানি, পদ্মাস্রোতে সন্তরণে প্রাণরক্ষা যদি সম্ভব হয়, আমি পরিত্রাণ পেলেও পেতে পারি, কিন্তু স্বর্ণপ্রতিমা অমরকুমারীকে পদ্মার জলে বিসর্জন দিয়ে সংসারে আমি বেঁচে থাকবো, তাও কি কখনো হয়? আর দুটি স্ত্রীলোক অমরকুমারীর সহচরী হয়ে এসেছে, তাদের কি অপরাধ? বোলতে গেলে আমিই তাদের রক্ষক, দৈববিপাকে নয়, আমারই কারণে দস্যুপরাক্রমে তরণী ডুবছে, সেই দুটি স্ত্রীলোক জলে ডুবে প্রাণ হারাবে, আমি স্ত্রীহত্যার পাতকী হব, এ প্রাণে আমার কাজ কি? ত্রাহি মধুসদন! ত্রাহি মা দুর্গা! ত্রাহি সৰ্বমঙ্গলে! দীনের প্রতি সদয় হয়ে এই বিপদে রক্ষা কর?”

    ঘোর বিপদে কাতর হয়ে আবার আমি বিপদ-বারণ মধুসূদনের স্তব কোল্লেম, বিপদ-বারিণী ব্ৰহ্মময়ীকে ডাকলেন; আবার আমার কর্ণে সেই ভীমগর্জন প্রবেশ কোল্লে,—“ডুবিয়ে দে। ডুবিয়ে দে! ডুবিয়ে দে!”

    বার বার তিনবার! আর বিলম্ব নাই। মণিভূষণের উদ্দেশে উচ্চকণ্ঠে আমি বোলে উঠলেম, “ভাই মণিভূষণ! ভাই! অমরকুমারী থাকলেন, অমরকুমারীকে রক্ষা কোরো! বহরমপুরের মোকদ্দমা আমি দেখতে পেলেম না; দীনবন্ধু বাবুকে আমার এই শেষবার্তা জানিও; প্রাণ যায়! আমার জন্য এতগুলি লোকের প্রাণ যায়! ভাই! আমি যদি আগে মরি, তোমরা নিরাপদে থাকবে; মঙ্গলময় মহেশ্বর তোমাদের নিরাপদে রাখবেন। আমি কাহারো শত্রু নই, আমার শত্রু এতো! আমার জন্য বোম্বেটেরা পদ্মার অগাধজলে এ তরণী ডুবাবে! না ভাই! তা আমি দেখবো না! পৃথিবীতে আমি থাকবো না! অমরকুমারীকে তুমি দেখো! অমরকুমারীকে তুমি রক্ষা কোরো! জন্মের মত আমি বিদায় হোলেম!”

    কথাগুলি আমি বোল্লম, কিন্তু চক্ষে আমার এক বিন্দুও জল এলো না। লম্ফ দিয়ে বজরার ছাদের উপর আমি উঠলেম। যে দিকে বেশী জল, সেই দিকে ঝাঁপ দিয়ে পোড়বো, পদ্মার সঙ্গে মহাসাগরে ভেসে যাব, দুই হস্ত উর্ধ্বে তুলে, সেই সঙ্কল্প সিদ্ধ করবার উদযোগ কোচ্ছি, আমার লোকেরা আমারে নিবারণ করবার নিমিত্ত কাতরে টানাটানি কোচ্ছে, এমন সময় এক দৈব অনুগ্রহ।

    যে দিক থেকে আমরা আসছি, সেই দিকে অকস্মাৎ ঘন ঘন গোটাকতক বন্দুকের ধ্বনি শুনতে পাওয়া গেল। সকলের কর্ণ সেই দিকে স্থির, সকলের চক্ষু সেই দিকে চকিত। আমি তখন একপ্রকার মোরিয়া, জলে ঝাঁপ দিতে উদ্যত, আমার আর তখন ভাল-মন্দ ভাবনা করবার আবশ্যক ছিল না, তথাপি আমি সেই দিকে একবার চাইলেম। চক্ষু তখন সে কার্যে আমার কোন উপকারে এলো না, কিছুই দেখা গেল না; পদ্মার জলরাশি চন্দ্রালোকে যেমন জলময় প্রান্তরের ন্যায় ধূ ধূ কোচ্ছিল, চক্ষু আমার সেই রূপ অবলোকন কোল্লে। বন্দুকধ্বনি আমার কর্ণে এসেছিল, শরতের জলদ-গর্জনের ন্যায় গড় গড় নাদে পুনৰ্বার সেই প্রকার আগ্নেয়াস্ত্রের গম্ভীরধনি; জলে স্থলে প্রতি ধ্বনি। শব্দ কেবল কর্ণে প্রবেশ কোচ্ছে, কোথা থেকে শব্দ আসছে, তা কিছু, দেখা যাচ্ছে না। চেয়ে আছি, খানিক পরে দেখলেম, সাধারণ খেয়া-নৌকার ন্যায় একখানি তরণী বায়ুভরে ছুটে আসছে, সেই তরণী থেকেই বন্দুকের আওয়াজ আসছে। দেখতে দেখতে সেই নৌকা নিকটবর্তী, আর একখানা বৃহৎ ছীপ। দুর থেকে ক্ষুদ্র নৌকা মনে হয়েছিল, তা নয়, বৃহৎ ছীপ। যে ছীপের উপর বোম্বটেরা আমাদের প্রাণের উপর আক্রমণ কোচ্ছিল, সেই ছীপের পূৰ্বগতি অপেক্ষা আগন্তুক ছীপের গতিবেগ আরো অধিক দ্রুত; সে ছীপেরও দুইদিকে দুই নিশান; সে দুই নিশান ঘোর রক্তবর্ণে রঞ্জিত।

    আমি মনে কোল্লেম, আর একদল ডাকাত! একদলের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়াই দুর্ঘট হয়েছিল, তার উপর আর এক দল; গ্রহদেবতারা নিতান্তই বাম! পদ্মাগর্ভে শয়ন করাই আমাদের নিয়তি! ঝাঁপ দিয়ে পড়ি, আমার লোকেরা আমার হাত ধরে টানাটানি কোচ্ছে, ছাড়াবার জন্য আমি ধস্তাধস্তি কোচ্ছি, ইতিমধ্যেই নূতন ছীপখানা বিদ্যুতবেগে পশ্চিমদিকে খানিকদর ভেসে গেল। কেন গেল, তাও আমি বুঝতে পাল্লেম; পূর্বাগত বোম্বেটে নৌকা আড়ভাবে পদ্মাপ্রসারের অনেকদূর পর্যন্ত জুড়ে ছিল, আধখানা পদ্মায় যেন নৌ-সেতু হয়েছিল, সে স্থান দিয়ে অন্য নৌকার চলাচলের পথ ছিল না, কাজেই নূতন ছীপখানা তফাৎ দিয়ে ঘুরে গেল। গেল কি এলো, একটু পরেই চিনতে পাল্লেম।

    ঘন ঘন বন্দুকের আওয়াজ। আওয়াজে আওয়াজে দুই ছীপে শব্দযুদ্ধ। তখন আমার মনে হলো, নূতন নৌকাখানা ডাকাতের নৌকা নয়; বিপন্ন লোকের কোন রক্ষাকর্তা ঐ নৌকার অধিকারী। আমাদের বজরার মাঝীমাল্লারা আকাশে হাত তুলে আনন্দধ্বনি কোরে উঠলো। বোম্বেটে ছীপ আর এই নূতন ছীপ পাশা-পাশি; ছীপে ছীপে তুমুল যুদ্ধ। প্রথমতঃ বন্দুকে বন্দুকে যুদ্ধ।

    আমি কিঞ্চিৎ প্রকৃতিস্থ হোলেম। সারেং এসে আমার কানে কানে বেল্লে, সিপাহী-ছীপ;—সেনাদলের সিপাহী আর রণবেশধারী পুলিশ-প্রহরী একত্র সমবেত। ভগবান আমাদের রক্ষার জন্য এই অভয়া তরণী প্রেরণ কোরেছেন।”

    একবার পদ্মার দিকে আর একবার সেই দুই রণতরীর দিকে আমি নয়ন ফিরালেম। যুদ্ধাস্ত্রের গর্জনশব্দে পদ্মা যেন নৃত্য আরম্ভ কোরেছিল; পদ্মার সেই ভয়ঙ্করী মূর্তি দেখতে দেখতে বজরার ছাদের উপর থেকে আমি নামলেন। হতাশে জলে ঝাঁপ দিবার শেষ সঙ্কল্পটা তখন একরকম ভুলেই গেলেম। যুদ্ধদর্শনের কৌতূহলে মন যখন একপ্রকার উন্মত্ত হয়ে উঠলো। ভয় নাই, ভয় নাই, আশ্বাসবাক্যে ভীরুলোকগুলিকে নিজেই আমি অভয় দিতে লাগলেম।

    ছীপে ছীপে যুদ্ধ। এক ছীপে বোম্বেটেদল, এক ছীপে সিপাহীদল। প্রায় ২৫ জন সিপাহী আপনাদের ছীপ থেকে সুশোণিত অসি হস্তে বেম্বেটে ছীপে লাফিয়ে এলো; একটু পরে আরো ২৫ জন। উভয় দলে তলোয়ারযুদ্ধ। কাটা-কাটি, রক্তারক্তি, লোমহর্ষণ কাণ্ড! আমরা তখন নিশ্চেষ্ট। রক্ষাকর্তা পরমেশ্বর, কিন্তু পরমেশ্বর স্বয়ং বাহুবিস্তার কোরে কোন বিপদক্ষেত্রেই বিপদগ্রস্ত প্রাণী-পুঞ্জকে রক্ষা কোত্তে আসেন না, এক একটা উপলক্ষ্য হয়; এখানে আমাদের রক্ষার উপলক্ষ্য ঐ নবাগত সিপাহী-ছীপ। পর পর যুদ্ধে কত লোক নিহত, কত লোক আহত, গণনা করা গেল না, কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই আমি দেখতে পেলেম, বোম্বেটেরা সকলেই পুলিশ-প্রদত্ত অলঙ্কার পরিধান কোরে, ঘন ঘন বেত্রাঘাতে ছীপের উপর যেন নৃত্য কোত্তে লাগলো। দুঃসাহসিক দুরন্ত লোকেরা নির্ঘাত প্রহারেও, নিদারুণ যন্ত্রণাতেও ক্রন্দন করে না, তপ্তলৌহে অঙ্গদাহ কল্লেও শীঘ্র তাদের চক্ষে জল আসে না; যে সকল লোক পুলিশের হাতে বাঁধা পড়লো, রোদন দূরে থাক, চক্ষে জল আসা দূরে থাক, তাদের কাহারো মুখে একটি ক্ষুদ্রবাক্যমাত্রও উচ্চারিত হলো না।

    যুদ্ধের অবসান। প্রকৃতি একপ্রকার স্থির। পদ্মা একপ্রকার শান্ত। আমরা একপ্রকার নির্ভয়। এই সময় সিপাহী-ছীপের একটি ভদ্রলোক আমাদের বজরায় এলেন। দর্শনমাত্রেই আমি চিনলেম, অমরকুমারী-উদ্ধারের যিনি আমাদের প্রধান উত্তরসাধক হয়েছিলেন, তিনিই সেই উদারাশয় ডেপুটিবাবু। সাদরে আমার মস্তকে হস্তাপর্ণ কোরে মধুরবচনে তিনি বোল্লেন, “হরিদাস! তোমরা তো সকলে অক্ষত শরীরে আছ? দুরাত্মারা কেহই তো বালিকা অমরকুমারীর অঙ্গস্পর্শ কোত্তে পারে নাই?”

    বাবুকে অভিবাদন কোরে আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞে না, বোম্বেটেরা কেহই আমাদের অঙ্গে আঘাত কোত্তে পারে নাই; আমার সঙ্গের পাইকেরা, আর বজরার মাঝী-মাল্লারা বিশেষ বীরত্ব প্রদর্শন কোরেছে। বজরার মধ্যে অমরকুমারী কুশলে আছেন। আপনি আমাদের এ বিপদের সংবাদ কি প্রকারে প্রাপ্ত হেলেন?”

    ঈষৎ হাস্য কোরে ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “সে সব কথা পরে বোলছি। এখন দেখ দেখি, তোমার সঙ্গী লোকেদের মধ্যে অক্ষতশরীরে ক-জন জীবিত আছে?” ডেপুটিবাবু ঐ কথা বল্লেন, সেই জন্যই আমার সেই কথাটা তখন মনে হলো। অত লোকের সঙ্গে অল্পলোকে অতক্ষণ যুঝেছে, আমাদের বাঁচিয়েছে, এই তো তাদের মহাপরাক্রমের পরিচয়; তার উপর আরো বেশী;— সাতটি লোক আমাদের জন্য প্রাণবিসর্জন কোরেছে;—দাঁড়ী-মাঝী এগারজন, সারেং একজন, পাইক আটজন, এই কুড়িজনের মধ্যে তেরজন জীবিত। পাইকেরা সুশিক্ষিত খেলোয়াড়, তথাপি তাদের মধ্যেও দুটি লোক বোম্বেটের গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে মারা গিয়েছে। আমাদের প্রাণের জন্য অপর লোকে প্রাণ দিলে, বড়ই পরিতাপের কথা! ডেপুটিবাবুও তজ্জন্য আক্ষেপ প্রকাশ কোল্লেন। উপায় নাই, এইমাত্র প্রবোধ।

    আমার পক্ষে এই কথা; অপরপক্ষে ডেপুটিবাবুকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, বোম্বেটে-দলে কতগুলা লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে?” বাবু উত্তর কোল্লেন, “পূর্ণসংখ্যা জানা যায় নাই। আমাদের উপস্থিতির অগ্রে কজন ঘাল হয়েছে, সিপাহী-যুদ্ধে কজন কাটা পোড়েছে, ঠিক জানা গেল না। কতক মৃতদেহ নদীর জলে ডুবেছে, কতক দেহ ভেসে গিয়েছে, যুদ্ধের সময় জনকতক ঝাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে জলে পোড়ে সাঁতার দিয়ে পালিয়েছে। এগারোটা মৃতদেহ ছীপের উপর পোড়ে আছে, একুশটা জখম, তাদের বন্ধন করা হয় নাই, অবশিষ্ট ৩৫ জনকে হাতকড়ী-বাঁধা গিয়েছে। আমি একটি নিশ্বাস ফেলে বোল্লম, “তবেই তো বড় গোলমাল। যে সকল দেহ ডুবে গিয়েছে, ভেসে গিয়েছে, যে সকল লোক সাঁতার দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে, তাদের মধ্যে মুখচেনা লোক যদি আমি দুটো-একটা ধোত্তে পাত্তেম, তা হোলে অনেকটা সংশয়ভঞ্জন হতো, সে উপায় থাকলো না। পূৰ্বে আমি আপনাকে বোলেছি, অকারণে আমার শত্রু অনেক। বিশেষতঃ অমরকুমারীকে যারা মাণিকগঞ্জে এনেছিল, তারা দূরদেশে যায় নাই। আমাদের মারবার জন্য কিম্বা ফাঁদ পেতে ধরবার জন্য বোম্বেটে দলের নিয়োগ-কর্তা তারাই; সে বিষয়ে আর সন্দেহ থাকছে না। প্রকাশ্যে তারা তিনজন;—সেই তিনজনের মধ্যে বোম্বেটে-দলে কেহ উপস্থিত ছিল কি না, নির্ণয় করা কঠিন হবে। তবু আচ্ছা, বন্দীদলে, জখমীদলে, ছীপে পতিত মৃতদলে, তাদের মধ্যে কাহাকেও চেনা যায় কি না, চেনালোক তাদের ভিতর আছে কি না, একবার আমি দেখবো।”

    ডেপুটিবাবু আমারে বোম্বেটে-নৌকায় নিয়ে গেলেন। মরা ১১ জন সকলের স্কন্ধে মুণ্ড ছিল, একে একে আমি দেখলেম, চেনা গেল না; জখমী ২১ জন—তাদেরে সকলের মুখ দেখলেম, চেনা গেল না;—বন্দী ৩৫ জন;—হাতে হাতকড়ী, পায়ে বেড়ী, গলায় শিকল;—গুড়ের নাগরীর মত সারি সারি বোসে আছে; বিকট-শিকট-মুখে মিটমিট কোরে চেয়ে চেয়ে দেখছে, একখানা মুখও চেনা গেল না। চিনলেম কেবল একটা লোককে। পাঞ্জাবীধরনের পাগড়ী মাথায় দিয়ে যে দীর্ঘাকার লোকটা নদীর ধারে বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে ছিল, গায়ে তুলাভরা চাপকান, বন্দীদলে সেই লোক বিদ্যমান। তারে চিনেই বা আমার কি ফল? সে লোককে পূৰ্বে আমি দেখি নাই, দেখা দিয়ে পূৰ্বে যে আমার কোনপ্রকার শত্রুতাচরণ করে নাই, তারে চিনে মোকদ্দমাপ্রমাণের কোন সূত্ৰই আমি পাব না, সে লোকটা হয় তো বোম্বেটেদলের গুপ্ত গোয়েন্দা—গুপ্তচর! বিচারের সময় বোম্বেটেদের সঙ্গেই তার দণ্ড হবে, আমাদের মূল মোকদ্দমার সঙ্গে সে লোকের কোন সংস্রব নাই।

    তবে হাঁ, একটা কথা, সেই সময় আমার মনে পোড়ল। অমরকুমারী বোলেছিলেন, তিনটে লোকের মধ্যে একটা লোকের নাম মিয়াজান। এই লোকটা যদি সেই মিয়াজান হয়, জিজ্ঞাসা কোল্লে এ যদি সত্যকথা বলে, তা হোলে বোধ হয়, চণ্ডেশ্বর নামধারী রক্তদন্তের সন্ধানটা পাওয়া গেলেও যেতে পারে। ডেপুটিবাবুর অনুমতি গ্রহণ কোরে সেই লোকের নাম আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম। লোক তো প্রথমে কথাই কোইলে না, শেষকালে সিপাহীলোকের ধমকে, পায়ের জুতার ঠোক্করে, বন্দুকের কু’দোর গুতোতে হাউ হাউ কোরে বোল্লে, “মাদু।”

    এক কথায় সব ফর্শা। মুখের চেহারা দেখেও জানতে পারা গেল, নামটা সত্য হোক না হোক, লোকটা বাস্তবিক হিন্দু। মুসলমানের মুখে আর হিন্দুর মুখে অনেক প্রভেদ দৃষ্ট হয়। একটু চিন্তা কোরে দ্বিতীয়বার ডেপুটিবাবুর অনুমতি নিয়ে পুনরায় সেই লোককে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আচ্ছা মাধু, তুমি কি কখনো কোন জায়গায় কোন লোকের সঙ্গে উপস্থিত হয়ে মিয়াজান নামে পরিচয় দিয়াছিলে?”

    লোক তখন দুই চক্ষু রক্তবর্ণ কোরে, সক্রোধে বারকতক অধরোষ্ঠ দংশন কোরে সগর্জনে বোল্লৈ, “হুঁ—উ—উ—উ—উম!”—জনান্তিকে ডেপুটিবাবু তখন আমারে বোল্লেন, ‘বজ্জাৎ বদমাসলোকের মুখে সত্যকথা বাহির করা এক প্রকার অসাধ্য! এখানে ও প্রকার প্রশ্ন করা নিষ্ফল। বিচারের সময় কোন সূত্রে যদি কিছু প্রকাশ হয়, অবশ্যই তুমি সে সব কথা জানতে পারবে।”

    আর আমরা ছীপ-নৌকায় থাকলেম না, বজরায় উঠে এলেম। এগারটা মৃতদেহ পদ্মার জলে নিক্ষেপ করবার হকুম হলো। আমাদের পক্ষে যে সাতজন মারা গিয়েছিল, তাদের দেহ পাওয়া গেল না; পদ্মার স্রোতে অন্বেষণ করাও বিফল, সুতরাং পদ্মাগর্ভেই তাদের চিরবিশ্রাম।

    আমরা বজরায় এলেম। যুদ্ধের সময় কামরায় প্রবেশের দ্বার আমি বন্ধ কোরে রেখেছিলেম, উন্মুক্ত কোরে কামরার মধ্যে প্রবেশ কোল্লেম; আমি আর ডেপুটিবাবু। কপাল পর্যন্ত ঘোমটা ঢেকে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে অমরকুমারী একধারে বোসে থাকলেন, অঞ্চলসঞ্চালনে দাসীরা তাঁরে বাতাস কোত্তে লাগলো, মণিভূষণও আমাদের দিকে সোরে এলেন। অমরকুমারীর দিকে চেয়ে প্রসন্নবদনে ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “ভয় নাই মা! শত্রুনিপাত হয়েছে! তোমরা নিরাপদ হয়েছ!”—হুলস্থূলের সময় অমরকুমারী একবার মূর্চ্ছা গিয়েছিলেন, অনেক কষ্টে মূর্চ্ছাভঙ্গ করা হয়েছে, মণিভূষণের মুখে এই কথা শুনে, আমি একবার অমরকুমারীর সম্মুখে গেলেম, শত্রুনিপাত হয়েছে, তোমরা নিরাপদ হয়েছ, এই বোলে ডেপুটিবাবুর বাক্যের প্রতিধ্বনি কোল্লেম। অমরকুমারী একবার উজ্জ্বলনয়নে আমার দিকে চেয়ে বক্রনয়নে ডেপুটিবাবুর দিকে কটাক্ষ কোরে নীরবে নতমুখী হোলেন। আমি অতঃপর ডেপুটিবাবুর নিকটে এসে, আমার সেই প্রশ্ন পুনরুত্থাপন কোল্লেম, “পদ্মার উপর বোম্বেটের হাতে আমরা বিপদে পোড়েছি, এ সংবাদ আপনি কি প্রকারে প্রাপ্ত হোলেন?”

    পকেটে কি একখানি কাগজ ছিল সেইখানি বাহির কোরে একবার দেখে, আবার সেখানি পকেটে রেখে, শান্তস্বরে ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “তোমরা বিপদে পোড়েছ, সংবাদ পেয়ে তরণীসজ্জা কোরে এত শীঘ্র ঢাকা থেকে আমরা এখানে উপস্থিত হয়েছি, এমন অসম্ভব কথা তুমি মনে কোত্তে পার না। মাণিকগঞ্জের ওভারসীয়ার হরিহরবাবু তোমার আপনার লোক;—হাঁ, অবশ্যই আপনার লোক, উপকারী বন্ধু;—বজরা ছেড়ে তোমরা রওনা হবামাত্র, তিনি একজন বিশ্বাসী ভদ্রলোককে শীঘ্র শীঘ্র ঢাকায় প্রেরণ করেন। ষোলদাঁড়ী পানসীতে সেই লোকটি অবিলম্বে আমার কাছে উপস্থিত হয়, একখানি পত্র আমাকে দেয়। আমার সঙ্গে হরিহরবাবুর আলাপ আছে, পত্রপাঠমাত্র পত্রের কথাগুলি আমি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের গোচর করি; তুমি শত্ৰুবেষ্টিত, পদ্মায় বোম্বেটের ভয়, এই সব অবস্থা জানিয়ে তোমার রক্ষাবিধানের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে আমি বিশেষরূপ অনুরোধ করি; যেরূপ সজ্জায় আমি এসেছি, সেইরূপ সজ্জা প্রয়োজন, আমিই সেই প্রস্তাব করি। বর্তমান ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবটি অতিশয় সদাশয়; অবিলম্বে তিনি আমার প্রার্থনা পূর্ণ করেন। আমি বোধ করি, তোমরা এদিকে অধিক দূর আসতে না আসতেই আমরা অধিক দাঁড়ী-নিযুক্ত কোরে ঢাকায় গঞ্জঘাট থেকে ছীপখানা খুলে দিই, শীঘ্র রওনা হয়েছিলেম বোলেই এখানে আমরা উপস্থিত হোতে পেরেছি।”

    উদ্দেশেই হরিহরবাবুকে প্রণাম কোরে, ঢাকার প্রধান ম্যাজিস্ট্রেটকে ধন্যবাদ দিয়ে, সমীপোবিষ্ট ডেপুটিবাবুকে আমি অভিবাদন কোল্লেম। উপরে বোলেছি, দৈব অনুগ্রহ; বিপদে বিপদভঞ্জন মধুসদনকে আমি ডেকেছি, বিপদনাশিনী মা দুর্গাকে আমি ডেকেছি, ডাকবার অগ্রেই তাঁরা হরিহরবাবুকে, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে আর এই ডেপুটিবাবুটিকে সদয়ভাবে ভবিষ্যজ্ঞান বিতরণ কোরেছিলেন, তাতেই আমাদের রক্ষা হলো, সে বিষয়ে আর কিছুমাত্র সন্দেহ থাকলো না; এই জন্যই আমি বোলেছি, দেব অনুগ্রহ। বিপত্তিকাণ্ডারী হরি শ্রীমধুসদন! বিপত্তিনাশিনী দুর্গা ভবনিস্তারিণী। এই দুটি বাক্য সার্থক। মধুসূদনে যাঁদের বিশ্বাস নাই, দুর্গা-নামে যাঁদের ভক্তি নাই, তাঁরা আমারে যদি উপহাস করেন সে উপহাস আমি পরমাদরে মাথা পেতে গ্রহণ কোরবো।

    আমরা পরিত্রাণ পেলেম। বিপদের রজনী দীর্ঘ হয়; দীর্ঘ রজনীর অবসান। ডেপুটিবাবুর সঙ্গে যখন আমি কথা কোচ্ছি, তখন ঊষাকাল; ব্রাহ্মমুহূর্ত সমাগত; অল্পে অল্প সূর্যমণ্ডলের আরক্ত ছবি পূৰ্বগগনে সমূদিত। তিথি ছিল কৃষ্ণপ্রতিপদ, প্রতিপদের চন্দ্র পশ্চিমগগনে অস্ত যাচ্ছেন, নূতন প্রভাকর পূৰ্বগগনে উদয় হোচ্ছেন। সুপ্রশস্ত নদীবক্ষে তরণীর উপর থেকে প্রকৃতির সেই শোভা কি চমৎকার দেখায়, যাঁরা দেখেছেন, তাঁরাই সেটি অনুভব কোত্তে পারবেন। সমুদ্রযাত্রী লোকের মুখে আমি শুনেছি, মধ্যসমুদ্র থেকে সেই দৃশ্য আরো সুন্দর দেখায়, আরো চমৎকার! নয়ন মন উভয়ই বিমুগ্ধ হয়।

    ধূসরবসনা ঊষা তুষারসিক্ত হয়ে লজ্জাবনতবদনে প্রস্থান কোল্লেন, দিনমণি সপ্রকাশ। আমি তখন ডেপুটিবাবুকে বোল্লেম, “এখন আমরা তবে বিদায় হোতে পারি? দিনের বেলা নদীতে আর বোম্বেটের ভয় থাকবে না, দিনের বেলা নূতন বোম্বেটেরা আর আমাদের ধোত্তে আসবে না, আপনার অনুগ্রহে পরম উপকৃত হোলেম; মহা বিপদে জীবনরক্ষা হলো। আপনার মহত্ত্বের নিকটে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকলেম। এখন অনুমতি হয়, বজরা খুলে দিই।”

    মৃদু হাস্য কোরে ডেপুটিবাবু বোল্লেন, “তাই বুঝি তুমি মনে কোরেছ? এত বড় কাণ্ডটা কেবল জলের উপরেই শেষ হয়ে গেল, এই বুঝি তোমার বিশ্বাস? তা নয় হরিহরিদাস, তা নয়। অল্পবয়সে সাহসে তুমি ধন্য, কিন্তু সংসারের বিষয়জ্ঞানে এখনো তুমি অপরিপক্ক। ব্যাপার ছোট নয়। ছীপনৌকায় আমোদ কোরে পদ্মানদীতে আমরা মাছ ধোত্তে এসেছিলেম, শীকার ধোরে আমোদ কোরে ফিরে চোল্লেম, তাও নয়। বিচার আছে। তোমারেও আর একবার ঢাকায় যেতে হবে। এই ভীষণ ব্যাপারের মূল উপলক্ষ্য তুমি। তোমার তরণী আক্রমণের উদ্দেশেই বোম্বেটেদল জমায়েত, তোমার লোকের সঙ্গেই বোম্বেটেদের প্রথম যুদ্ধ। উভয় পক্ষেই খুন-জখম; এ অবস্থায় বিচারস্থলে তোমার সাক্ষ্যই অগ্রগণ্য। তোমারে আর একবার ঢাকায় যেতে হবে। বোম্বেটে নৌকা নদী বেয়ে যাচ্ছিল, আমরা ছুটে এসে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কোরেছি; কত নৌকা অমন যায়, কোন একটা অকু ঘটনা না হলে পুলিশ তাদের ধরে না, বিনা প্রমাণে নৌকার লোককে বোম্বেটে বোলে ধরাও যায় না, প্রমাণ আবশ্যক; প্রমাণের জন্যই অগ্রে তোমারে দরকার হবে। তুমি আমাদের সঙ্গে ঢাকায় চল।”

    আর আমার কোন ওজর-আপত্তি খাটলো না। আবার আমারে ঢাকায় ফিরে যেতে হলো। আমাদের বজরায় ডেপুটিবাবু থাকলেন। ডেপুটিবাবুর ছীপে সিপাহী শান্ত থাকলো, বোম্বেটেদের ছীপে পুলিশ-পাহারায় জখমী লোকেরা আর বন্দীলোকেরা থাকলো। আমরা ঢাকায় চোল্লেম। বজরার গতি মৃদু ছীপের গতি দ্রুত। একসঙ্গে কি প্রকারে যাওয়া যায়, সেই তত্ত্ব একবার আমার মনে উঠেছিল, কিন্তু ডেপুটিবাবুর বন্দোবস্তে তিন তরণীর গতি সমান কোরে দেওয়া হলো। সৰ্বপ্ৰথমে গ্রেপ্তারী আসামী নৌকা, মধ্যস্থলে আমার বজরা, পশ্চাতে সিপাহী। তিন তরণীর সমান গতি।

  • নিশীথিনী

    নিশীথিনী

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book-name]

    নিশীথিনী

    মিসির আলির ধারণা ছিল, তিনি সহজে বিরক্ত হন না। এই ধারণাটা আজ ভেঙে যেতে শুরু করেছে। ঠিক এই মুহূর্তে তিনি অসম্ভব বিরক্ত। যে-রিকশায় তিনি উঠেছেন, তার সীটটা ঢালু। বসে থাকা কষ্টের ব্যাপার। তার চেয়েও বড় কথা, দু’ মিনিট পরপর রিকশার চেইন পড়ে যাচ্ছে।

    এখন বাজছে দশটা তেইশ। সাড়ে দশটায় থার্ড ইয়ার অনার্সের সঙ্গে তাঁর একটা টিউটরিআল আছে। এটা কোনোক্রমেই ধরা যাবে না। যে হারে রিকশা এগুচ্ছে, তাতে ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছতে তাঁর আরো পনের মিনিট লাগবে। এ-কালের ছাত্ররা এতক্ষণ তাদের টীচারদের জন্যে  অপেক্ষা করে না।

    মিসির আলি তাঁর বিরক্তি ঢাকবার জন্যে একটা সিগারেট ধরালেন। ঠিক তখন পঞ্চম বারের মতো রিকশার চেইন পড়ে গেল। রিকশাওয়ালার ভাব-ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে চেইন পড়ার ব্যাপারটায় সে আনন্দিত। গদাইলশকরী চালে সে নামল এবং সামনের চাকাটা তুলে ঝাঁকাঝাঁকি করতে লাগল!

    চেইন পড়ে গেলে কেউ চাকা তুলে ঝাঁকাঝাঁকি করে বলে তাঁর জানা ছিল না। রুক্ষ গলায় বললেন, ‘এ রকম করছ কেন?’

    রিকশাওয়ালা জবাব দিল না। গরম চোখে তাকাল এবং মিসির আলিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে একটা বিড়ি ধরাল। মিসির আলি রাগ সামলাবার চেষ্টা করতে লাগলেন। কুড়ি থেকে এক পর্যন্ত উল্টো দিকে গুনলেন। জীবনানন্দ দাশের ‘মনে হয় একদিন’ কবিতার প্রথম চার লাইন মৃদু স্বরে আওড়ালেন। মিসির আলির ধারণা, কিছু-কিছু কবিতা মানুষের অস্থিরতা কমিয়ে দেয়। ‘মনে হয় একদিন’ এমন একটি কবিতা।

    কিন্তু আজ তাঁর রাগ কমছে না। রিকশাওয়ালা কঠিন মুখ করে নির্বিকার ভঙ্গিতে বিড়ি টানছে। মিসির আলির দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।

    মিসির আলি নিজেকে সামলাবার জন্যেই ভাবতে লাগলেন—তিনি নিজে যদি সিগারেট ধরাতে পারেন, তাহলে এই লোকটি পারবে না কেন? জুন মাসের প্রচণ্ড গরমে বেচারা ক্লান্ত ও বিরক্ত। এক জন ক্লান্ত ও বিরক্ত মানুষের নিশ্চয়ই বিশ্রাম করার অধিকার আছে। তিনি হালকা গলায় বললেন, ‘নাম কি তোমার?’

    ‘সামসু।’

    ‘বাড়ি কোথায় তোমার সামসু?’

    ‘বাড়ি-ঘর নাই।’

    ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার। সামসু, রিকশা চালাও। ক্লাস মিস হবে।’

    সামসু কোনো পাত্তাই দিল না। রাস্তার পাশে পেচ্ছাব করতে বসে গেল। তার বসার ভঙ্গি থেকেই বোঝা যাচ্ছে সে সহজে উঠবে না, বসেই থাকবে। এই লোকটি কি কোনো-একটি অজ্ঞাত কারণে তাঁর সঙ্গে ঝগড়া বাধাবার চেষ্টা করছে?

    মিসির আলি রিকশা থেকে নেমে পড়লেন। পাঁচ টাকা ভাড়া ঠিক করা ছিল, তিনি ছ’টাকা দিলেন। সহজ স্বরে বললেন, ‘নাও, ভাড়া নাও। আমি হেঁটে চলে যাব।’

    সাধারণত রিকশাওয়ালাদের সবচেয়ে ময়লা ন্যাতন্যাতে নোটগুলো দেয়া হয়। মিসির আলি তাকে দিয়েছেন কচকচে নতুন নোট। এটা তিনি করলেন এই আশায়, যাতে সামসু নামের এই উদ্ধত যুবকটি তাঁর আচরণের জন্যে লজ্জিত বোধ করে।

    এ-রকম কাণ্ডকারখানা মিসির আলি সাহেব করে থাকেন। একবার বাসে তাঁর পাশে সুখী-সুখী চেহারার এক বুড়ো বসল। দু’ জনের সীট। কিন্তু বুড়ো অকারণে পা ফাঁক করে তাঁকে চাপ দিতে লাগল। বিশ্রী কাণ্ড! মিসির আলি খানিকক্ষণ চাপ সহ্য করলেন, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘আপনার বোধহয় অল্প জায়গায় বসার অভ্যেস নেই, আপনি বরং একাই এখানে আরাম করে বসুন।’

    মিসির আলি ভেবেছিলেন, লোকটি এতে লজ্জিত ও বিব্রত হবে। সে-রকম কিছু হল না। লোকটি নির্বিকার ভঙ্গিতে দু’ জনের জায়গা দখল করে পা দোলাতে লাগল। এরা অসুখী মানুষ। নিজেদের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা এরা—অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করে। ঢাকা শহরে অসুখী মানুষের সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ছে কেন ভাবতে ভাবতে মিসির আলি দ্রুত হাঁটতে লাগলেন। মাথার ওপর জুন মাসের গনগনে আকাশ। রাস্তাঘাট তেতে উঠেছে। বাতাসের লেশমাত্রও নেই। এ-বছর অসম্ভব গরম পড়েছে। এই অসহ্য গরমে রিকশাওয়ালারা মানুষ টানে কীভাবে কে জানে! মিসির আলি সামসু নামের উদ্ধত যুবকটির জন্যে এক ধরনের মায়া অনুভব করলেন।

    ক্লাস ফাঁকা। আসমানী রঙের জামদানি শাড়ি পরা একটি মেয়ে শুধু সেকেন্ড বেঞ্চে বসে আছে। মেয়েটির মাথায় ঘোমটা। এটা একটা নতুন ব্যাপার। ইউনিভার্সিটির মেয়েরা মাথায় ঘোমটা দেয় শুধু আজানের সময়।

    মিসির আলি ঢুকতেই মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। তিনি অপ্রস্তুত স্বরে বললেন, ‘দেরি করে ফেললাম। সবাই চলে গেছে নাকি?’

    ‘জ্বি স্যার।’

    ‘তুমি বসে আছ কেন? তুমি কেন ওদের সঙ্গে গেলে না?’

    মেয়েটি মৃদু স্বরে বলল, ‘স্যার, আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন না?’

    ‘হ্যাঁ, চিনতে পারছি। তোমার নাম নীলু।’

    ‘জ্বি।’

    ‘তুমি তো এই ক্লাসের নও।’

    ‘জ্বি-না।’

    ‘তাহলে?’

    ‘আমি স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে বসে আছি। আমি রুটিনে দেখেছি, আজ আপনার এখানে ক্লাস।’

    মিসির আলি ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘তোমার কি বিয়ে হয়েছে? মাথায় ঘোমটা, তাই বললাম। নতুন বিয়ে-হওয়া মেয়েরা প্রথম দিকে ঘোমটা পরে।’

    ‘আমার বিয়ে হয় নি।

    ‘ও, আচ্ছা।’

    ‘আপনার সঙ্গে আমার খুব একটা জরুরি কথা আছে স্যার।’

    ‘বল।’

    ‘আমি স্যার অনেকটা সময় নিয়ে কথাটা আপনাকে বলতে চাই। আমি কি স্যার আপনার বাসায় যেতে পারি?’

    ‘বাসায় আমার কিছু ঝামেলা আছে।’

    ‘তাহলে স্যার, আপনি কি আমাদের বাসায় একটু আসবেন? আমার খুব দরকার।’

    ‘ঠিক আছে, যাব।’

    ‘আমাদের বাসার ঠিকানা কি আপনার মনে আছে? এক বার গিয়েছিলেন আমাদের বাসায়। আমাদের বাসার দোতলায় আপনার এক জন পরিচিত মহিলা থাকতেন। রানু নাম।’

    ‘আমার মনে আছে।’

    ‘স্যার, আপনি কি আজই আসবেন? আমার খুব দরকার।’

    মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন মেয়েটার দিকে। এই মেয়ের নাম নীলু, কিন্তু কোনো-এক বিচিত্র কারণে তাকে অবিকল রানুর মতো দেখাচ্ছে।

    ‘স্যার, আপনি কি আজই যাবেন?’

    ‘ঠিক আছে রানু।’

    ‘আমার নাম কিন্তু স্যার নীলু।’

    মিসির আলি লক্ষ করলেন, মেয়েটা হাসছে। যেন তাকে রানু বলায় সে খুশি। এটাই যেন আশা করছিল।

    ‘আমাদের বাসার ঠিকানা কি লিখে দেব?’

    ‘লিখে দিতে হবে না। আমার মনে আছে।’

    ‘আসবেন কিন্তু স্যার।’

    ‘আসব। আমি আসব।’

    ‘যাই স্যার, স্লামালিকুম।’

    নীলু উঠে দাঁড়াল। এত সুন্দর মেয়েটি। শ্যামলা গায়ের রঙ। চোখে-মুখে তেমন কোনো বিশেষত্ব নেই। কিন্তু তবু এমন মায়া জাগিয়ে তুলছে কেন? মিসির আলি লজ্জিত বোধ করলেন। তাঁর বয়স একচল্লিশ। এই বয়সের এক জন মানুষের মনে এ-জাতীয় তরল ভাব থাকা উচিত নয়। তা ছাড়া এই মেয়েটি তাঁর ছাত্রী।

    মিসির আলি শূন্য ক্লাসে দীর্ঘ সময় বসে রইলেন। একসঙ্গে বেশ কয়েকটা জিনিস নিয়ে তিনি ভাবছেন। মেয়েটির মাথায় ঘোমটা কেন? এই মেয়েটি দীর্ঘদিন ধরেই ক্লাসে আসছে না কেন? মেয়েটি চলে যাবার সময়ও একটা অস্বাভাবিক আচরণ করেছে। সোজাসুজি হেঁটে গেছে, এক বারও পেছনে ফিরে তাকায় নি। মেয়েরা সাধারণত পেছন ফিরে তাকায়।

    সবচেয়ে রহস্যময় ব্যাপারটি হচ্ছে, একটি মৃতা মেয়ের ছাপ আছে নীলুর মধ্যে। যেভাবেই হোক আছে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। প্রকৃতি রহস্য পছন্দ করে না।

    তিনি সিগারেট ধরালেন।

    প্রকৃতি রহস্য পছন্দ করে না—কথাটা কি সত্যি? তাঁর মনে হল, সত্যি নয়। প্রকৃতির কাজই হচ্ছে নানান রকম রহস্য সৃষ্টি করা—মানুষের কাজ হচ্ছে সেই রহস্যের কুয়াশা সরিয়ে দেয়া। এমন একদিন কি আসবে, যখন কেউ বলবে না—দেয়ার আর মেনি থিংকস ইন হেভেন্‌ অ্যাণ্ড আর্থ…।

    ‘আরে, মিসির আলি সাহেব না? এখানে কী করছেন? একা-একা ক্লাসে বসে আছেন কেন?’

    তিনি দাড়িওয়ালা এই লোকটাকে চিনতে পারলেন না। হাতে রেজিস্ট্রি খাতা, কাজেই অধ্যাপক হবেন! মুখখানা হাসি-হাসি। পান খেয়ে দাঁত লাল করে ফেলেছেন। পান-খাওয়া লোকজন কি কিছুটা নম্র স্বভাবের হয়? মিসির আলির মনে হল, পান এবং স্বভাবের ভেতর কোনো-একটা সম্পর্ক আছে। তিনি যে ক’ জন পানবিলাসী লোককে চেনেন, তাদের সবাই সদালাপী।

    ‘কি, কথা বলছেন না কেন? কিছু ভাবছেন নাকি?’

    মিসির আলি উঠে দাঁড়ালেন। শান্ত ও নরম স্বরে বললেন, ‘জ্বি-না, কিছু ভাবছি না।’

    ‘আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন না?’

    ‘জ্বি-না।’

    দাড়িওয়ালা অধ্যাপক অত্যন্ত বিস্মিত হলেন। মিসির আলি বিব্রত বোধ করলেন। কাউকে চিনতে পারছি না বলা—তাকে প্রায় অপমান করার শামিল। বিশেষ করে অধ্যাপক শ্রেণীর মানুষরা এ ব্যাপারে খুব স্পর্শকাতর।

    ‘সত্যি চিনতে পারছেন না?’

    ‘জ্বি না। আমার একটা প্রবলেম আছে, কিছুই মনে থাকে না।’

    ‘মাসখানেক আগে আমি আপনার কাছে এক জন রোগী নিয়ে গিয়েছিলাম—ফিরোজ নাম। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র।’

    ‘ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আপনি ফিরোজের দুলাভাই।’

    ‘হ্যাঁ দুলাভাই।’

    ‘এবং আপনার নাম হচ্ছে নাজিমুদ্দিন। হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট।’

    ‘এই তো চিনতে পারছেন।’

    ‘চিনতে পারছি এসোসিয়েশন থেকে। একটা মনে পড়লে, অন্যগুলো মনে পড়তে থাকে। এসোসিয়েশন অব আইডিয়াস।’

    ‘ফিরোজ তো অনেকখানি ইমপ্রুভ করেছে। এত অল্প সময়ে যে আপনি এতটা করবেন, আমরা কেউ কল্পনাও করি নি। দারুণ ব্যাপার।’

    মিসির আলি কিছু বললেন না। ফিরোজ আজ বিকেলে তাঁর কাছে আসবে। প্রতি সোমবার ফিরোজের সঙ্গে তাঁর একটি সেশন হয়। অথচ নীলুকে বলে রেখেছেন, আজ যাবেন তাদের বাসায়। তাঁর কাজকর্ম ইদানীং এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কেন? বয়স বাড়ছে।

    ‘মিসির আলি সাহেব।’

    ‘জ্বি?’

    ‘চলুন, লাউঞ্জে বসে চা খাওয়া যাক।’

    ‘চলুন।’

    ‘আপনি এত গম্ভীর হয়ে আছেন কেন? কী ভাবছেন এত?’

    ‘কিছু ভাবছি না।’

    তিনি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। দীর্ঘনিঃশ্বাসটি কেন ফেললেন, এই নিয়ে ভাবতে চেষ্টা করলেন। অকারণে তো কেউ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে না। সবকিছুর পেছনেই কারণ থাকে। এই জগতে কার্যকারণ ছাড়া কিছুই হয় না, সবই লজিক। জটিল লজিক। জটিল কিন্তু অভ্রান্ত। লজিকের বাইরে এক চুলও কারোর যাবার ক্ষমতা নেই।

  • নিষাদ

    নিষাদ

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    মিসির আলি আগ্রহ নিয়ে তাকে দেখছেন। রোগা লম্বা এক জন মানুষ। মুখ দেখা যাচ্ছে না, কারণ লোকটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই গরমেও ফুল হাতা ফ্লানেলের শার্ট, ফুলপ্যান্টটি চকচকে কাপড়ের তৈরী। ছাঁটের ধরন দেখে মনে হয় সেকেণ্ডহ্যাণ্ড মার্কেট থেকে কেনা। এ ধরনের ছাঁটের প্যান্ট ঢাকায় এখন চালু নেই। পায়ের জুতা জোড়া ঝকঝক করছে। মনে হচ্ছে এখানে আসবার আগে জুতা পালিশ করেছে। মিসির আলি লোকটির বয়স আন্দাজ করবার চেষ্টা করলেন। কুড়ি থেকে পঁচিশের মধ্যে হবার কথা। এই বয়সের যুবকদের চেহারায় এক ধরনের আভা থাকে। যৌবনের আভা। এর তা নেই। অল্প বয়সে চুলও পেকেছে বলে মনে হচ্ছে। কানের পাশে রুপোলি ছোঁয়া। মিসির আলি বললেন, ‘আপনি কি আমার কাছে এসেছেন?’

    সে জবাব দিতে দেরি করছে। যেন এই প্রশ্নের জবাব তার জানা নেই। মিসির আলি আবার বললেন, ‘আপনি কি আমার কাছে এসেছেন?’

    ‘জ্বি।’

    ‘আপনি মনে হয় আগেও কয়েক বার এসেছিলেন?’

    ‘জ্বি।’

    ‘এক বার একটি চিঠি লিখে গিয়েছিলেন, তাই না? লিখেছিলেন——সোমবার সন্ধ্যায় আসব।’

    ‘জ্বি স্যার।’

    ‘আমি কিন্তু সোমবার সন্ধ্যায় আপনার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। আপনি আসেন নি।’

    ‘একটা কাজ পড়ে গিয়েছিল স্যার।’

    লোকটি খুব সহজেই স্যার বলছে। তার মানে ছোট কোনো চাকরি করে। অফিসের প্রায় সবাইকে বোধহয় স্যার বলতে হয়, যে-কারণে এটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। খারাপ অভ্যাস। মিসির আলি বললেন, ‘আপনি কী করেন?’

    ‘সামান্য একটা কাজ করি। বলার মতো কিছু না।’

    ‘আসুন। ভেতরে আসুন।’

    ‘আজ যাই স্যার। আরেক দিন আসব।’

    মিসির আলি অত্যন্ত অবাক হলেন। এই লোকটি বারবার তাঁর খোঁজে আসছে, চিঠি লিখে যাচ্ছে। আজ দেখা হল, কিন্তু সে থাকতে চাচ্ছে না। মনের ভেতর বড় রকমের কোনো দ্বিধার ভাব আছে, যা সে কাটাতে পারছে না। মিসির আলি বললেন, ‘আপনি চলে যেতে চাচ্ছেন, চলে যাবেন। কিছুক্ষণ বসে যান। আমার কাছে কেন এসেছেন, সেটা বলুন।’

    ‘অন্য আরেক দিন আসব।’

    ‘সেদিন হয়তো আমাকে পাবেন না। আমি বাসায় খুব কম থাকি। আমার অনেক ঝামেলা।’

    লোকটি খুবই অস্বস্তি নিয়ে ভেতরে ঢুকল। জুতা জোড়া নিয়ে একটু চিন্তা করছে। খুলে ফেলবে কি ফেলবে না। মিসির আলি লক্ষ করলেন, লোকটি নিজেই বসার ঘরের দরজা বন্ধ করছে। ছিটকিনি লাগানোর চেষ্টা করছে। এটাও হয়তো তার অভ্যাস। সে খুব সম্ভব তার ঘরে ঢুকেই ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। তাই যদি হয়, তাহলে লোকটি থাকে একা। যে বাড়িতে অনেকগুলি মানুষ থাকে, সে-বাড়ির কেউ ঘরে ঢুকেই ছিটকিনি লাগানোর অভ্যাস করবে না।

    মিসির আলি বললেন, ‘এ-বাড়ির ছিটকিনি লাগানোর একটা বিশেষ কায়দা আছে। আপনি পারবেন না। আপনি বসুন, আমি লাগাচ্ছি।’

    লোকটি বসল। বসার ভঙ্গি বিনীত। হাত মুঠি করে কোলের উপর রাখা। ঈষৎ কুঁজো হয়ে বসেছে। গায়ের রঙ বেশ ফর্সা। অতিরিক্ত ফর্সা হবার কারণেই বোধহয় চেহারায় খানিকটা মেয়েলি ভাব চলে এসেছে। অবশ্যি এটা জোড়া ভুরু ও পাতলা ঠোঁটের কারণেও হতে পারে। এই ধরনের ছেলেদেরকেই স্কুলে সবাই ‘মেয়ে’ বলে খেপায়। এবং উঁচু ক্লাসের কিছু বখা ছেলে বিশেষ কারণে এদের বন্ধুত্ব কামনা করে।

    মিসির আলি বললেন, ‘আপনার নাম কি?’ লোকটি জবাব দিল না। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। এখন সে তাকাচ্ছে জানালা দিয়ে। মিসির আলি অবাক হয়ে বললেন, ‘নাম বলতে কি আপনার আপত্তি আছে?’

    ‘জ্বি-না।’

    ‘তাহলে নাম বলুন। নাম দিয়েই শুরু করা যাক।’

    ‘আমার নাম রইসুদ্দিন।’

    ‘শুধু রইসুদ্দিন! নাকি রইসুদ্দিনের সঙ্গে অন্য কিছু আছে?’

    ‘মোঃ রইসুদ্দিন।’

    দেখুন ভাই, আপনি কিন্তু ঠিক নামটা বলছেন না। মিথ্যা কথা বলায় যারা অভ্যস্ত নয়, তারা যখন মিথ্যা বলে, তখন তাদের গলা কেঁপে যায়। খুব দ্রুত চোখের পাতা পড়ে এবং খানিকটা ব্লাশ করে। আপনার বেলায় এর সব ক’টি হয়েছে।’

    ‘আমার ভালো নাম মুনির। ডাক নাম টুনু।’

    ‘চা খাবেন?’

    ‘জ্বি স্যার, খাব।’

    ‘আপনি আরাম করে বসুন, আমি চা বানিয়ে আনছি। ঘরে কাজের কোনো লোক নেই। সব আমাকেই করতে হবে। আপনি আমার কাছে কি জন্যে এসেছেন তা এখন বলবেন? না চা খেয়ে বলবেন?’

    ‘স্যার আমি খুব বিপদে পড়েছি।’

    ‘বিপদে পড়লে লোকজন যায় পুলিশের কাছে। আমার কাছে কেন? আমি তো পুলিশ নই।’

    ‘অন্য রকম বিপদ। আপনি না শুনলে বুঝবেন না। আগে শুনতে হবে।’

    ‘বেশ শুনছি, তাতে লাভ হবে কি?’

    ‘আপনি অনেকের অনেক সমস্যার সমাধান করেছেন—আমি অনেক কিছু আপনার সম্পর্কে শুনেছি।’

    ‘শুনেছেন, খুব ভালো কথা। কী শুনেছেন, জানি না। তবে আপনাকে আগেভাগেই বলে রাখি, আমার দৌড় খুব সামান্য। আমি অ্যাবনরমেল সাইকোলজি নিয়ে কিছু পড়াশোনা করেছি—এই পর্যন্তই।’

    মুনির মাথা নিচু করে বসে আছে। কোনো কথা সে শুনছে বলে মনে হচ্ছে না। মিসির আলি বললেন, ‘আপনার বাসা কোথায়?’

    মুনির তার জবাব দিল না। মাথা নিচু করে ফেলল। অর্থাৎ সে তার ঠিকানা জানাতে ইচ্ছুক নয়। মিসির আলি চা বানাতে গেলেন। ঘরে কোনো খাবার নেই। বিস্কিট-টিস্কিটজাতীয় কিছু দিতে পারলে ভালো হত। লোকটি ক্ষুধার্ত। হয়তো অফিস শেষ করে সরাসরি চলে এসেছে। কিছু খাওয়া হয় নি। কিংবা বিকেলে কিছু খাবার মতো সামর্থ্য নেই। এটি হওয়াই স্বাভাবিক। নিম্ন আয়ের মানুষরা এ-দেশে পশুর জীবন-যাপন করে।

    মিসির আলি চা নিয়ে বসার ঘরে ঢুকে চমকে উঠলেন। কেউ নেই। দরজা ভেজানো। লোকটি এক ফাঁকে উঠে চলে গিয়েছে। নিঃশব্দ প্রস্থান যাকে বলে। মিসির আলি হেসে ফেললেন। এ-জীবনে তিনি অনেক বিচিত্র মানুষ দেখেছেন। তাদের অদ্ভুত আচার-আচরণের সঙ্গে তিনি পরিচিত। এই লোকটির প্রস্থান ঘটনা হিসেবে তেমন অদ্ভুত নয়, তবু বেশ মজার। তবে নিঃশব্দ প্রস্থানের এই ঘটনার ব্যাখ্যা বেশ সরল। লোকটি যে-বিপদের কথা বলতে এসেছিল, শেষ মুহূর্তে ঠিক করেছে তা সে বলবে না। এ-রকম মনে করারও অনেকগুলি কারণ হতে পারে। প্রথম কারণ—সম্ভবত মিসির আলিকে দেখে তার আশাভঙ্গ হয়েছে। মনে হয়েছে, এই লোকটিকে দিয়ে কাজ হবে না। দ্বিতীয় কারণ—বিপদটা এমন শ্রেণীর যা বলার মতো মনের জোর তার নেই।

    ‘স্যার, আসব?’

    মিসির আলি চমকে উঠলেন। লোকটি ফিরে এসেছে। তার চোখে-মুখে অপ্রস্তুত ভঙ্গি। যেন সে বড় ধরনের অপরাধ করে এসেছে। এই অপরাধের জন্যে সে লজ্জিত, অনুতপ্ত।

    ‘কোথায় গিয়েছিলেন?’

    ‘আপনার জন্যে এক প্যাকেট সিগারেট আনতে গিয়েছিলাম। বেশি কিছু দেবার সামর্থ্য স্যার আমার নেই। আমি দরিদ্র মানুষ।’

    তিনি হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেট নিলেন। বেনসন এণ্ড হেজেস, নির্ঘাৎ পঞ্চাশ টাকার মতো খরচ হয়েছে। লোকটি আগের মতো মাথা নিচু করে বসে আছে। চোখের পাতা পর্যন্ত ফেলছে না।

    ‘আমাকে কী বলতে এসেছেন, বলুন।’

    লোকটি কিছু বলল না। মিসির আলি সিগারেট ধরিয়ে হালকা স্বরে বললেন, ‘যদি বলতে না-চান বলার দরকার নেই। আসুন অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ করি। গরম কেমন পড়েছে বলুন।’

    ‘খুব গরম পড়েছে স্যার।’

    ‘এই প্রচণ্ড গরমে ফ্লানেলের শার্ট গায়ে দিয়েছেন কেন? আপনার গরম লাগছে না?’

    ‘আমার আর কোনো ভালো শার্ট নেই। আমি দরিদ্র।’

    ‘দরিদ্র হওয়াতে লজ্জাবোধ করার কিছু নেই। ধনী ব্যক্তিদের বরং লজ্জিত হওয়া উচিত। আপনার চা-টা মনে হচ্ছে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। গরম করে আনব?’

    ‘জ্বি না।’

    লোকটি ঠাণ্ডা চায়ের কাপে চুমুক দিতে লাগল। যেন সে একটি অপ্রিয় দায়িত্ব পালন করছে।

    ‘আপনি কি আমাকে সত্যি সত্যি কিছু বলবেন?

    ‘জ্বি স্যার, বলব।’

    ‘বলুন।’

    মুনির চুপ করে আছে। ইনহিবিশন বলে একটা ব্যাপার আছে। এটা হচ্ছে তাই। প্রথম বাধাটি সে কাটিয়ে উঠতে পারছে না। মিসির আলির মনে হল, লোকটি নিঃসঙ্গ প্রকৃতির। একা-একা থাকে। মানুষের সঙ্গে কথা বলার অভ্যেস নেই। যা সে বলতে চায়, তা বলার জন্যে তাকে প্রচুর সাহস সঞ্চয় করতে হবে। মিসির আলি তাকে সময় দিলেন।

    বাইরে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। আকাশ থমথমে। দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড় আসবে সম্ভবত। আসুক। এই গরম আর সহ্য করা যাচ্ছে না। ইচ্ছা করছে কোনো একটা পুকুরে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকতে।

    ঘর অন্ধকার। বাতি জ্বালান দরকার। মিসির আলি বাতি জ্বালালেন না। ইনহিবিশন কাটানোর জন্যে অন্ধকার একটা চমৎকার জিনিস।

    মুনির মূর্তির মতো বসে আছে। সে এবার ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে কথা বলা শুরু করল। তার গলার স্বর মিষ্টি। শুনতে ভালো লাগে। গলার স্বরে কোথাও যেন একটি ধাতব চরিত্র আছে। মেয়েদের গলার স্বরে তা মানিয়ে যায়। পুরুষদের সঙ্গে ঠিক মানায় না।

  • অন্যভুবন

    অন্যভুবন

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    দুপুরবেলা কাজের মেয়েটি মিসির আলিকে ডেকে তুলল। কে নাকি দেখা করতে এসেছে। খুব জরুরি দরকার।

    মিসির আলির রাগে গা কাঁপতে লাগল। কাজের মেয়েটিকে বলে দেয়া ছিল কিছুতেই যেন তাঁকে তিনটার আগে ডেকে তোলা না হয়। এখন ঘড়িতে বাজছে দু’টা দশ। যত জরুরি কাজই থাকুক, এই সময় তাঁকে ডেকে তোলার কথা নয়। মিসির আলি রাগ কমাবার জন্যে উল্টো দিকে দশ থেকে এক পর্যন্ত গুনলেন। গুন-গুন করে মনে-মনে গাইলেন—আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে এত পাখি গায়—। এই গানটি গাইলে তাঁর রাগ আপনাতেই কিছুটা নেমে যায়। কিন্তু আজ নামছে না। কাজের মেয়েটির ভাবলেশহীন মুখ দেখে তা আরো বেড়ে যাচ্ছে। তিনি গম্ভীর গলায় ডাকলেন, ‘রেবা।’

    ‘জ্বি।’

    ‘আর কোনো দিন তুমি আমাকে তিনটার আগে ডেকে তুলবে না।’

    ‘জ্বি আইচ্ছা।’

    ‘দুটো থেকে তিনটা এই এক ঘণ্টা আমি প্রতিদিন দুপুরে ঘুমিয়ে থাকি। এর নাম হচ্ছে সিয়াস্তা। বুঝলে?’

    ‘জ্বি।’

    ‘ঘড়ি দেখতে জান?’

    ‘জ্বি-না।’

    মিসির আলির রাগ দপ করে নিভে গেল। যে-মেয়ে ঘড়ি দেখতে জানে না, সে তাকে তিনটার সময় ডেকে তুলবে কীভাবে? রেবা মেয়েটি নতুন কাজে এসেছে। তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে।

    ‘রেবা।’

    ‘জ্বি?’

    ‘আজ সন্ধার পর তোমাকে ঘড়ি দেখা শেখাব। এক থেকে বার পর্যন্ত সংখ্যা প্রথম শিখতে হবে। ঠিক আছে?’

    ‘জ্বি, ঠিক আছে।’

    ‘এখন বল, যে-লোকটি দেখা করতে এসেছে, সে কেমন?’

    রেবা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মানুষ মানুষের মতোই, আবার কেমন হবে! তার এই সাহেব কী-সব অদ্ভুত কথাবার্তা যে বলে! পাগলা ধরনের কথাবার্তা!

    ‘বল বল, চুপ করে আছ কেন?’

    মিসির আলি বিরক্ত হলেন। এই মেয়েকে কাজ শেখাতে সময় লাগবে। তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘মানুষকে দেখতে হবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, বুঝতে পারছ?’

    মেয়েটি মাথা নাড়ল। মাথা নাড়ার ভঙ্গি থেকেই বলে দেয়া যায়, সে কিছুই বোঝে নি। বোঝার চেষ্টাও করে নি। সে শুধু ভাবছে, এই লোকটির মাথায় দোষ আছে। তবে দোষ থাকলেও লোকটা ভালো। বেশ ভালো। রেবা এ-পর্যন্ত দু’টি গ্লাস, একটা পিরিচ এবং একটা প্লেট ভেঙেছে। একটা কাপের বোঁটা আলগা করে ফেলেছে। সে তাকে কিছুই বলে নি। একটা ধমক পর্যন্ত দেয় নি। ভালো মানুষগুলি একটু পাগল-পাগলই হয়ে থাকে।

    মিসির আলি হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেট নিলেন। একটি সিগারেট বের করে হাত দিয়ে গুঁড়ো করে ফেললেন। তিনি সিগারেট ছাড়বার চেষ্টা করছেন। যখনই খুব খেতে ইচ্ছা করে, তিনি একটি সিগারেট বের করে গুঁড়ো করে ফেলেন, এবং ভাবতে চেষ্টা করেন একটি সিগারেট টানা হল। এতে কোনো লাভ হচ্ছে না, শুধু মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যাচ্ছে।

    ‘রেবা।’

    ‘জ্বি?’

    ‘এখন আমি তোমাকে কিছু প্রশ্ন করব, তুমি উত্তর দেবে। তোমার উত্তর থেকে আমি ধারণা করতে পারব, যে-লোকটি এসেছে সে কী রকম।’

    রেবা হাসল। তার বেশ মজা লাগছে।

    ‘প্রথম প্রশ্ন, যে লোকটি এসেছে সে গ্রামে থাকে না শহরে?’

    ‘গেরামে।’

    ‘লোকটি বুড়ো না জোয়ান?’

    ‘জোয়ান।’

    ‘রোগা না মোটা?’

    ‘রোগা।’

    ‘কী কাপড় পরে এসেছে?’

    ‘মনে নাই।’

    ‘কাপড় পরিষ্কার না ময়লা?’

    ‘ময়লা।’

    ‘হাতে কী আছে? ব্যাগ বা ছাতা, এ-সব কিছু আছে?’

    ‘না।’

    ‘চোখে চশমা আছে?’

    ‘না।’

    মিসির আলি থেমে-থেমে বললেন, ‘তোমাকে যে-প্রশ্নগুলি করলাম, সেগুলি মনে রাখবে। কেউ আমার কাছে এলে, আমি এইগুলি জানতে চাই। বুঝতে পারছ?’

    ‘জ্বি।’

    ‘এখন যাও, আমার জন্যে এক কাপ চমৎকার চা বানাও। দুধ-চিনি কিচ্ছু দেবে না। শুধু লিকার। বানানো হয়ে গেলে চায়ের কাপে এক দানা লবণ ফেলে দেবে।’

    ‘লবণ?’

    ‘হ্যাঁ, লবণ!’

    মিসির আলি উঠে দাঁড়ালেন। বসার ঘরে যে-লোকটি এসেছে তাকে দেখা দরকার। রেবার কথামতো লোকটি হবে গ্রামের, ময়লা কাপড় পরে এসেছে। জোয়ান বয়স। হাতে কিছুই নেই। এই ধরনের এক জন লোকের তাঁর কাছে কী প্রয়োজন থাকতে পারে?

    বসার ঘরে যে লোকটি বসে ছিল, সে রোগা নয়। পরনে গ্যাভার্ডিনের স্যুট। হাতে চামড়ার একটি ব্যাগ। বয়স পঞ্চাশের উপরে। চোখে চশমা। মিসির আলি মনে-মনে একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। রেবা মেয়েটির পর্যবেক্ষণশক্তি মোটেই নেই। একে বেশি দিন রাখা যাবে না। মিসির আলি বসে-থাকা লোকটিকে তীক্ষ্ণ চোখে দেখতে লাগলেন।

    তিনি ঘরে ঢোকার সময় লোকটি উঠে দাঁড়ায় নি। দাঁড়াবার মতো ভঙ্গি করেছে। বসে থাকার মধ্যেও একটা স্পর্ধার ভাব আছে। লোকটি তাকিয়ে আছে সরু চোখে। যেন সে কিছু একটা যাচাই করে নিচ্ছে। মিসির আলি বললেন, ‘ভাই, আপনার নাম?’

    ‘আমার নাম বরকতউল্লাহ্। আমি ময়মনসিংহ থেকে এসেছি।’

    ‘কোনো কাজে এসেছেন কি?’

    ‘হ্যাঁ, কাজেই এসেছি। আমি অকাজে ঘোরাঘুরি করি না।’

    ‘আমার কাছে এসেছেন?’

    ‘আপনার কাছে না-এলে, আপনার ঘরে বসে আছি কেন?’

    ‘ভালোই বলেছেন। এখন বলুন, কী ব্যাপার। অল্প কথায় বলুন।’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব থমথমে গলায় বললেন, ‘আমি কথা কম বলি। আপনাকে বেশিক্ষণ বিরক্ত করব না।’

    তিনি লক্ষ করলেন, লোকটি আহত হয়েছে। তার চোখ-মুখ লাল। মিসির আলি খুশি হলেন। লোকটি বড় বেশি স্পর্ধা দেখাচ্ছে।

    ‘বরকতউল্লাহ্ সাহেব, চা খাবেন?’

    ‘জ্বি না, আমি চা খাই না। আমার যা বলার তা আমি খুব অল্প কথায় বলে চলে যাব।’

    মিসির আলি হাসতে-হাসতে বললেন, ‘অল্প কথায় কিছু বলতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আপনার অভ্যাস হচ্ছে বেশি কথা বলা। আপনি চা খাবেন কি না, তার জবাব দিতে গিয়ে একটি দীর্ঘ বাক্য বলেছেন। আপনি বলেছেন—জ্বি না, আমি চা খাই না। আমার যা বলার তা আমি খুব অল্প কথায় বলে চলে যাব। এই বাক্যটিতে সতেরটি শব্দ আছে।’

    বরকতউল্লাহ সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন। তাঁর ভ্রু কুঞ্চিত হল। মিসির আলি মনে-মনে হাসলেন। কাউকে বুদ্ধির খেলায় হারাতে পারলে তাঁর খুব আনন্দ হয়।

    ‘বরকতউল্লাহ্ সাহেব, আপনি কী চান?’

    ‘আপনার সাহায্য চাই। তার জন্যে আমি আপনাকে যথাযথ সম্মানী দেব। আমি ধনাঢ্য ব্যাক্তি না-হলেও দরিদ্র নই! আমি চেকবই নিয়ে এসেছি।’

    ভদ্রলোক কোটের পকেটে হাত দিলেন। মিসির আলির খানিকটা মন-খারাপ হয়ে গেল। ধনবান ব্যক্তিরা দরিদ্রের কাছে প্রথমেই নিজেদের অর্থের কথা বলে কেন ভাবতে লাগলেন।

    বরকতউল্লাহ্ বললেন, ‘আমি কি আমার সমস্যাটার কথা আপনাকে বলব?’

    মিসির আলি বললেন, ‘তার আগে জানতে চাই, আপনি আমার নাম জানলেন কী করে? আমি এমন কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নই যে, ময়মনসিংহের এক জন লোক আমার নাম জানবে।’

    বরকতউল্লাহ্ নিচু স্বরে বললেন, ‘আমি খুঁজছি এক জন ভালো সাইকিয়াটিস্ট, যাঁর কাছে আমি অকপটে আমার কথা বলতে পারব। যে আমার কথায় লাফিয়ে উঠবে না, আবার অবিশ্বাসের হাসিও হাসবে না। আমি জানি, আপনি সে-রকম এক জন মানুষ। কী করে জানি, তা তেমন জরুরি নয়।’

    মিসির আলির মনে হল লোকটা বেশ বুদ্ধিমান, গুছিয়ে কথা বলতে জানে। যার মানে হচ্ছে, গুছিয়ে কথা বলার অভ্যেস তার আছে। লোকটি সম্ভবত এক জন ব্যবসায়ী। সফল ব্যবসায়ীদের নানান ধরনের লোকজনের সঙ্গে খুব গুছিয়ে কথা বলতে হয়।

    ‘বরকতউল্লহ্ সাহেব, আপনি কি এক জন ব্যবসায়ী?’

    ‘হ্যাঁ, আমি এক জন ব্যবসায়ী।’

    ‘কত দিন ধরে ব্যবসা করছেন?’

    ‘প্রায় দশ বছর। এখন করছি না।’

    ‘কিসের ব্যবসা?’

    ‘আপনি আমাকে জেরা করছেন কেন বুঝতে পারছি না।’

    ‘আপনার সমস্যা নিয়ে আমি মাথা ঘামাব কি না, তা জানার জন্যে জেরা করছি। যদি আপনাকে আমার পছন্দ হয়, তবেই আপনার কথা শুনব। সবার সমস্যা নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না।’

    ‘যথেষ্ট পরিমাণ টাকা পেলেও না?’

    ‘না। আমার সম্পর্কে ভালোরকম খোঁজখবর আপনি নেন নি। যদি নিতেন, তাহলে জানতেন যে, আমি টাকা নিই না।’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব দীর্ঘ সময় চুপ করে রইলেন। তিনি তাঁর সামনে বসে থাকা রোগাটে লোকটিকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। কথাবার্তা বলছে অহঙ্কারী মানুষের মতো, কিন্তু বলার ভঙ্গিটি সহজ ও স্বাভাবিক।

    ‘আপনি টাকা নেন না কেন, জানতে পারি কি?’

    ‘নিশ্চয়ই পারেন। টাকা নিলেই এক ধরনের বাধ্যবাধকতা এসে পড়ে। আমি তার মধ্যে যেতে চাই না। অন্যের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা আমার পেশা নয়, শখ। শখের ব্যাপারে কোনোরকম বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়। কি বলেন?’

    ‘ঠিকই বলছেন। আমি আপনার সব প্রশ্নের জবাব দেব। কী জানতে চান বলুন?’

    ‘আপনার পড়াশোনা কতদূর?’

    ‘এম এ পাশ করেছি। পলিটিক্যাল সায়েন্স।’

    ‘আপনি বলছেন ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন, কেন?’

    ‘এই প্রশ্নের জবাব আপনাকে পরে দেব। অন্য প্রশ্ন করুন।’

    ‘আপনি বিবাহিত?’

    ‘হ্যাঁ। আমার ন’ বছর বয়েসী একটি মেয়ে আছে।’

    ‘আপনার সমস্যা এই মেয়েকে নিয়েই, নয় কি?’

    ‘জ্বি হাঁ। কী করে বুঝলেন?’

    মেয়ের কথা বলার সময় আপনার গলার স্বর পাল্টে গেল, তা থেকেই আন্দাজ করছি। আপনার স্ত্রী মারা গেছেন কত দিন হল?

    ‘প্রায় নয় বছর হল। স্ত্রী মারা গেছেন, সেটা কী করে বলতে পারলেন?’

    ‘বাচ্চাদের কোনো সমস্যা হলে মা নিজে আসেন। এ ক্ষেত্রে আসেন নি দেখে সন্দেহ হয়েছিল। তা ছাড়া বিপত্নীক মানুষদের দেখলেই চেনা যায়।’

    ‘আমি কি এবার আমার ব্যাপারটা বলব?’

    ‘বলুন।’

    ‘সংক্ষেপে বলতে হবে?’

    ‘না, সংক্ষেপে বলার দরকার নেই। চা দিতে বলি?’

    ‘জ্বি-না, আমি চা খাই না। এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি দিতে বলুন, খুব ঠাণ্ডা। তৃষ্ণা হচ্ছে।’

    ‘আমার ঘরে ফ্রীজ নেই। পানি খুব ঠাণ্ডা হবে না।’

    ভদ্রলোক তৃষ্ণার্তের মতোই পানির গ্লাস শেষ করে দ্বিতীয় গ্লাস চাইলেন। মিসির আলি বললেন, ‘আরেক গ্লাস দেব?’

    ‘আর লাগবে না।’

    ‘আপনি তাহলে শুরু করুন। আপনার মেয়ের নাম কি?’

    ‘তিন্নি।’

    ‘বলুন তিন্নির কথা।’

    ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। সম্ভবত মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছেন। কিংবা বুঝে উঠতে পারছেন না, ঠিক কোন জায়গা থেকে শুরু করবেন। মিসির আলি লক্ষ করলেন, ভদ্রলোকের কপালে সূক্ষ্ম ঘামের কণা জমতে শুরু করেছে। মিসির আলি ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, ন’ বছর বয়েসী একটি মেয়ের এমন কী সমস্যা থাকতে পারে যা বলতে গিয়ে এমন অস্বস্তির মধ্যে পড়তে হয়।

    ‘বলুন, আপনার মেয়ের কথা বলুন।’ ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন।

    ‘আমার মেয়ের নাম তিন্নি।…

    ওর বয়স ন’ বছর। মেয়ের জন্মের সময় ওর মা মারা যায়। মেয়েটিকে আমি নিজেই মানুষ করি। আমি মোটামুটিভাবে এক জন স্বচ্ছল মানুষ। কাজেই আমার পক্ষে বেশ কিছু কাজের লোকজন রাখা কোনো সমস্যা ছিল না। তিন্নিকে দেখাশোনার জন্যে অনেকেই ছিল। কিন্তু তবু মেয়েটির বেশির ভাগ দায়িত্ব আমিই পালন করেছি। দুধ বানানো, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো—সবই আমি করতাম। বুঝতেই পারছেন, মেয়েটি আমার খুবই আদরের। সব বাবার কাছেই তাদের ছেলেমেয়ের আদর থাকে, কিন্তু আমার মধ্যে বাড়াবাড়ি রকমের ছিল।’

    মিসির আলি বললেন, ‘আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, এখন নেই?’

    ভদ্রলোক এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। তাঁর মেয়ের কথা বলে যেতে লাগলেন। তিনি এমন একটি ভঙ্গি করলেন, যেন প্রশ্নটি শুনতে পান নি।

    ‘তিন্নির বয়স যখন এক বৎসর, তখন লক্ষ করলাম, ও অন্যান্য শিশুদের মতো নয়। সাধারণত এক বৎসর বয়সেই শিশুরা কথা বলতে শুরু করে। তিন্নির বেলা তা হল না। সে কথা বলা শিখল না। বড়-বড় ডাক্তাররা সবাই দেখলেন। তাঁরাও কোনো কারণ বের করতে পারলেন না। মেয়েটি কানে শুনতে পায়। তার ভোকাল কর্ড ঠিক আছে। কিন্তু কথা বলে না! কেউ কিছু বললে মন দিয়ে শোনে–এই পর্যন্তই।

    ‘ই এন টি স্পেশালিস্ট প্রফেসর আলম বললেন, অনেক বাচ্চাই দেরিতে কথা শেখে। এর বেলাও তাই হচ্ছে। দেরি হচ্ছে। আপনি আপনার মেয়ের সঙ্গে দিন-রাত কথা বলবেন। ও শুনে-শুনে শিখবে।…

    ‘আমি প্রফেসর আলমের পরামর্শমতো প্রচুর কথা বলতাম। গল্প পড়ে শোনাতাম। সিনেমায় নিয়ে যেতাম। কিন্তু কোনো লাভ হল না। মেয়েটি একটি কথাও বলল না।…

    ‘ওর যখন ছ’ বছর বয়স তখন একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল। দিনটি আমার পরিষ্কার মনে আছে–জুলাই মাসের তিন তারিখ, শুক্রবার। আমি দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর ঘুমুচ্ছি। শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। জ্বরজ্বর ভাব। হঠাৎ তিন্নি আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে জাগাল, এবং পরিষ্কার গলায় বলল, “বাবা, অসময়ে ঘুমুচ্ছ কেন?”…

    ‘আপনি বুঝতেই পারছেন আমি স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম। প্রথমে ভাবলাম স্বপ্ন দেখছি। তিন্নি কথা বলেছে। একটি দু’টি শব্দ নয়, পুরো বাক্য বলেছে। অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেছে। কোনো রকম জড়তা নয়, অস্পষ্টতা নয়। বিস্ময় সামলাতে আমার দীর্ঘ সময় লাগল। আমি এক সময় বললাম, ‘তুই কথা বলা জানিস?’

    ‘তিন্নি হাসি মুখে বলল, “হ্যাঁ। কেন জানব না?”…

    “এত দিন কথা বলিস নি কেন?”…

    ‘তিন্নি তার জবাব দিল না। ঠোঁট টিপে হাসতে লাগল, যেন সে খুব মজা পাচ্ছে। এটা যেন চমৎকার একটা রসিকতা, কথা না-বলে বাবাকে বোকা বানানো।…

    ‘মিসির আলি সাহেব, আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, নতুন এই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে উঠতে আমার সময় লাগল। তবে আমি ঠাণ্ডা ধরনের মানুষ। আমি কোনো কিছু নিয়েই হৈচৈ শুরু করি না। প্রথমে নিজে বুঝতে চেষ্টা করি। কিন্তু তিন্নির ব্যাপারটা আমি কিছুই বুঝলাম না। হঠাৎ করে কথা বলা শুরু করা ছাড়াও তার মধ্যে অনেক বড় ধরনের অস্বাভাবিকতা ছিল।’

    এই পর্যন্ত বলেই বরকতউল্লাহ্ সাহেব থামলেন। পানি খেতে চাইলেন। মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। বরকতউল্লাহ্ সাহেব নিচু গলায় আবার কথা শুরু করলেন।

    ‘আমি লক্ষ করলাম, তিন্নি সব প্রশ্নের জবাব জানে।’

    মিসির আলি বললেন, ‘আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না। সব প্রশ্নের জবাব জানে মানে?’

    ‘আপনাকে উদাহরণ দিলে ভালো বুঝবেন। ধরুন, আমি তিন্নিকে জিজ্ঞেস করলাম, ষোলর বর্গমূল কত? সে এক মুহূর্ত ইতস্তত না-করে বলবে ‘চার’ – যদিও সে অঙ্কের কিছুই জানে না। যে-মেয়ে কথা বলতে পারে না, তাকে অঙ্ক শেখানোর প্রশ্নই ওঠে না।

    ‘আপনাকে আরেকটি উদাহরণ দিই। এক দিন বাসায় ফিরে তিন্নিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বল তো মা আজ নয়াবাজারে কার সঙ্গে দেখা হয়েছে?’ সে সঙ্গে-সঙ্গে বলল, ‘হালিম সাহেবের সঙ্গে।’

    ‘হালিম আমার বাল্যবন্ধু। তিন্নি তাকে চেনে না। তার সঙ্গে আমার মেয়ের কোনো দিন দেখা হয় নি। হালিমের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, এটা তিন্নির জানার কোনো কারণ নেই। মিসির আলি সাহেব, বুঝতেই পারছেন, আমি খুব চিন্তিত হয়ে পড়লাম। তার কিছুদিন পর আরেকটি অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।…

    ‘রাতের বেলা তিন্নিকে নিয়ে খেতে বসেছি। হঠাৎ ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। আমি হারিকেন জ্বালানোর জন্যে বললাম। কেউ হারিকেন খুঁজে পেল না। প্রয়োজনের সময় কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। টর্চ আনতে বললাম–তাও কেউ পাচ্ছে না। আমি বিরক্ত হয়ে ধমকাধমকি করছি। তখন তিন্নি বলল, ‘বাতি চলে গেলে সবাই এত হৈচৈ করে কেন?’…

    আমি বললাম, “অন্ধকার হয়ে যায়, তাই।”…

    “অন্ধকার হলে কী অসুবিধা?”

    “অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না, সেটাই অসুবিধা।”

    “তুমি দেখতে পাও না?” …

    “শুধু আমি কেন, কেউই পায় না। আলো ছাড়া কিছুই দেখা যায় না মা।”

    ‘তিন্নি খুবই অবাক হল, বিস্মিত গলায় বলল, “কিন্তু আমি তো অন্ধকারেও দেখতে পাই। আমি তো সব কিছু দেখছি।”

    ‘প্রথম ভাবলাম, সে ঠাট্টা করেছে। কিন্তু না, ঠাট্টা নয়। সে সত্যি কথাই বলছিল। সে অন্ধকারে দেখে। খুব পরিষ্কার দেখে।’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব থামলেন। রুমাল বের করে চশমার কাঁচ পরিষ্কার করতে লাগলেন। মিসির আলি বললেন, ‘আপনার মেয়ের প্রসঙ্গে আরো কিছু কি বলবেন?’ তিনি না-সূচক মাথা নাড়লেন।

    ‘আর কিছুই বলার নেই?’

    ‘আছে। কিন্তু এখন আপনাকে বলতে চাই না।’

    ‘কখন বলবেন?’

    ‘প্রথম আপনি আমার মেয়েকে দেখবেন। ওর সঙ্গে কথা বলবেন। তারপর আপনাকে বলব।’

    ‘ঠিক আছে। আপনার মেয়ের এখন বয়স হচ্ছে নয়। মেয়ের অস্বাভাবিকতাগুলি তো আপনার অনেক আগেই চোখে পড়েছে। কোনো ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছেন?’

    ‘না। ডাক্তার এর কী করবে?’

    ‘কোনো সাইকিয়াট্রিস্ট?’

    ‘না। আপনিই প্রথম ব্যক্তি, যাঁর কাছে আমি এসেছি।’

    ‘মেয়ের এই ব্যাপারগুলি আপনি মনে হচ্ছে লুকিয়ে রাখতে চান।’

    ‘হ্যাঁ, চাই। কেন চাই, তা আপনি আমার মেয়ের সঙ্গে কথা বললেই বুঝবেন।’

    ‘আপনি মেয়ের মা সম্পর্কে কিছু বলুন।’

    ‘কী জানতে চান?’

    ‘জানতে চাই তিনি কেমন মহিলা ছিলেন। তাঁর মধ্যে কোনো রকম অস্বাভাবিকতা ছিল কি না।’

    ‘না, ছিল না। তিনি খুবই স্বাভাবিক মহিলা ছিলেন।’

    ‘আপনি ভালোমতো জানেন?’

    ‘হ্যাঁ, ভালোমতোই জানি। আমি এগার বছর আমার স্ত্রীর সঙ্গে কাটিয়েছি। তিন্নি আমাদের শেষ বয়সের সন্তান। এগার বছরে এক জন মানুষকে ভালোমতো জানা যায়।’

    ‘তা জানা যায়। আচ্ছা, আপনার মেয়ের এই ব্যাপারগুলি কি বাইরের অন্য কাউকে বলেছেন?’

    ‘না, কাউকেই বলি নি। আপনি বুঝতেই পারছেন, এটা জানাজানি হওয়ামাত্রই একটা হৈচৈ শুরু হবে। পত্রিকার লোক আসবে, টিভির লোক আসবে। আমি ভাবলাম, কিছুতেই এটা করতে দেওয়া উচিত হবে না। এখন মিসির আলি সাহেব, দয়া করে বলুন—আপনি কি আমার মেয়েটাকে দেখবেন?’

    ‘হ্যাঁ, দেখব।’

    ‘কবে যাবেন ময়মনসিংহ?’

    ‘আপনি কবে যাবেন?’

    ‘আমি আগামীকাল রাতে যাব। রাত দশটায় একটা ট্রেন আছে—নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেস।’

    মিসির আলি সহজ স্বরে বললেন, ‘আমি আপনার সঙ্গেই যাব।’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব অবাক হয়ে বললেন, ‘আমার সঙ্গে যাবেন!’

    ‘হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে যাব। কোনো অসুবিধে হবে?’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব মাথা নাড়লেন। কোনো অসুবিধা হবে না। এই লোকটিকে তিনি ঠিক বুঝতে পারছেন না। যে প্রথমে তাঁর কথাই শুনতে চায় নি, সে এখন…। কত বিচিত্র স্বভাবের মানুষ আছে এই পৃথিবীতে!

  • বৃহন্নলা

    বৃহন্নলা

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    অতিপ্রাকৃত গল্পে গল্পের চেয়ে ভূমিকা বড় হয়ে থাকে।

    গাছ যত-না বড়, তার ডালপালা তার চেয়েও বড়। এই গল্পেও তাই হবে। একটা দীর্ঘ ভূমিকা দিয়ে শুরু করব। পাঠকদের অনুরোধ করছি তাঁরা যেন ভূমিকাটা পড়েন। এর প্রয়োজন আছে।

    আমার মামাতো ভাইয়ের বিয়ে।

    বাবা-মা’র একমাত্র ছেলে, দেখতে রাজপুত্র না হলেও বেশ সুপুরুষ। এম. এ পাস করেছে। বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করা এবং গ্রুপ থিয়েটার করা—এই দুইয়ে তার কর্মকাণ্ড সীমিত।

    বাবা-মা’র একমাত্র ছেলে হলে যা হয়—বিয়ের জন্যে অসংখ্য মেয়ে দেখা হতে লাগল। কাউকেই পছন্দ হয় না। কেউ বেশি লম্বা, কেউ বেশি বেঁটে, কেউ বেশি ফর্সা, কেউ বেশি কথা বলে, আবার কেউ-কেউ দেখা গেল কম কথা বলে। নানান ফ্যাঁকড়া।

    শেষ পর্যন্ত যাকে পছন্দ হল, সে-মেয়ে ঢাকা ইডেন কলেজে বিএ পড়ে— ইতিহাসে অনার্স। মেয়ের বাবা নেই। মা’র অন্য কোথায় বিয়ে হয়েছে। মেয়ে তার বড়চাচার বাড়িতে মানুষ। তিনিই তাকে খরচপত্র দিয়ে বিয়ে দিচ্ছেন।

    আমার মামা এবং মামী দু’ জনের কেউই এই বিয়ে সহজভাবে নিতে পারলেন না। যে-মেয়ের বাবা নেই, মা আবার বিয়ে করেছে—পাত্রী হিসেবে সে তেমন কিছু না। তা ছাড়া সে খুব সুন্দরীও না। মোটামুটি ধরনের চেহারা। আমার মামাতো ভাই তবু কেন জানি একবারমাত্র এই মেয়েকে দেখেই বলে দিয়েছে—এই মেয়ে ছাড়া আর কাউকে সে বিয়ে করবে না। মেয়ের বাবা নেই তো কী হয়েছে? সবার বাবা চিরকাল থাকে নাকি? মেয়ের মা’র বিয়ে হয়েছে, তাতে অসুবিধাটা কী? অল্প বয়সে বিধবা হয়েছেন, তাঁর তো বিয়ে করাই উচিত। এমন তো না যে, দেশে বিধবাবিবাহ নিষিদ্ধ।

    মামা-মামীকে শেষ পর্যন্ত মত দিতে হল, তবে খুব খুশিমনে মত দিলেন না, কারণ মেয়ের বড়চাচাকেও তাঁদের খুবই অপছন্দ হয়েছে। লোকটা নাকি অভদ্রের চূড়ান্ত। ধরাকে সরা জ্ঞান করে। চামার টাইপ।

    বিয়ের দিন তারিখ হল।

    এক মঙ্গলবার কাকডাকা ভোরে আমরা একটা মাইক্রোবাস এবং সাদা রঙের টয়োটায় করে রওনা হলাম। গন্তব্য ঢাকা থেকে নব্বই মাইল দূরের এক মফস্বল শহর। মফস্বল শহরের নামটা আমি বলতে চাচ্ছি না। গল্পের জন্যে সেই নাম জানার প্রয়োজনও নেই।

    তেত্রিশ জন বরযাত্রী। অধিকাংশই ছেলেছোকরা। হৈচৈয়ের চূড়ান্ত হচ্ছে। এই মাইক বাজছে, এই মাইক্রোবাসের ভেতর ব্রেক ডান্স হচ্ছে, এই পটকা ফুটছে। ফাঁকা রাস্তায় এসে মাইক্রোবাসের গিয়ারবক্সে কী যেন হল। একটু পরপর বাস থেমে যায়। সবাইকে নেমে ঠেলতে হয়। বরযাত্রীদের উৎসাহ তাতে যেন আরো বাড়ল। শুধু আমার মামা অসম্ভব গম্ভীর হয়ে পড়লেন। আমাকে ফিসফিস করে বললেন, ‘এটা হচ্ছে অলক্ষণ। খুবই অলক্ষণ। রওনা হবার সময় একটা খালি জগ দেখেছি, তখনি মনে হয়েছে একটা কিছু হবে। গিয়ারবক্স গেছে, এখন দেখবি চাকা পাংচার হবে। না হয়েই পারে না।’

    হলও তাই। একটা কালভার্ট পার হবার সময় চাকার হাওয়া চলে গেল। মামা বললেন, ‘কি, দেখলি? বিশ্বাস হল আমার কথা? এখন বসে বসে আঙুল চোষ।’

    স্পেয়ার চাকা লাগাতেও অনেক সময় লাগল। মামা ছাড়া অন্য কাউকে বিচলিত হতে দেখলাম না।

    বরযাত্রীদের উৎসাহ মনে হল আরো বেড়েছে। চিৎকার হৈচৈ হচ্ছে। একজন গান গাওয়ার চেষ্টা করছে। শুধুমাত্র বিয়েবাড়িতে পৌঁছানোর পরই সবার উৎসাহে খানিকটা ভাটা পড়ল।

    মফস্বল শহরের বড় বাড়িগুলি সাধারণত যে-রকম হয়, সে-রকম একটা পুরনো ধরনের বাড়ি। এইসব বাড়িগুলি এমনিতেই খানিকটা বিষণ্ণ প্রকৃতির হয়। এই বাড়ি দেখে মনে হল বিরাট একটা শোকের বাড়ি। খাঁ-খাঁ করছে চারদিক। লোকজন নেই। কলাগাছ দিয়ে একটা গেটের মতো করা হয়েছে, সেটাকে গেট না-বলে গেটের প্রহসন বলাই ভালো। একদিকে রঙিন কাগজের চেইন, অন্য দিকে খালি। হয় রঙিন কাগজ কম পড়েছে, কিংবা লোকজনের গেট প্রসঙ্গে উৎসাহ শেষ হয়ে গেছে। আমার মামা হতভম্ব। বরযাত্রীরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। ব্যাপারটা কি?

    হাফশার্ট-পরা এক চ্যাংড়া ছেলে এসে বলল, ‘আপনারা বসেন। বিশ্রাম করেন।’

    আমি বললাম, ‘আর লোকজন কোথায়? মেয়ের বড়চাচা কোথায়?’

    সেই ছেলে শুকনো গলায় বলল, ‘আছে, সবাই আছে। আপনারা বিশ্রাম করেন।’

    আমি বললাম, ‘কোনো সমস্যা হয়েছে?’

    সেই ছেলে ফ্যাকাসে হাসি হেসে বলল, ‘জ্বি-না, সমস্যা কিসের?’ এই বলেই সে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল। আর বেরুল না!

    বসার ঘরে চাদর পেতে বরযাত্রীদের বিশ্রামের ব্যবস্থা। বারান্দায় গোটা দশেক ফোল্ডিং চেয়ার। বিয়েবাড়ির সজ্জা বলতে এইটুকুই।

    মামা বললেন, ‘বলেছিলাম না অলক্ষণ? এখন বিশ্বাস হল? কী কাণ্ড হয়েছে কে জানে! আমার তো মনে হয় বাড়িতে মেয়েই নেই। কারোর সঙ্গে পালিয়েটালিয়ে গেছে। মুখে জুতোর বাড়ি পড়ল, স্রেফ জুতোর বাড়ি।’

    মামা অল্পতেই উত্তেজিত হন। গত বছর তাঁর ছোটখাটো স্ট্রোক হয়ে গেছে। উত্তেজনার ব্যাপারগুলি তাঁর জন্যে ক্ষতির কারণ হতে পারে। আমি মামাকে সামলাতে চেষ্টা করলাম। হাসিমুখে বললাম, ‘হাত-মুখ ধুয়ে একটু শুয়ে থাকুন তো মামা। আমি খোঁজ নিচ্ছি কী ব্যাপার।’

    মামা তীব্র গলায় বললেন, ‘হাত-মুখটা ধোব কী দিয়ে, শুনি? হাত-মুখ ধোবার পানি কেউ দিয়েছে? বুঝতে পারছিস না? এরা বেইজ্জতির চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে।’

    ‘কী যে বলেন মামা!’

    ‘কথা যখন অক্ষরে-অক্ষরে ফলবে, তখন বুঝবি কী বলছি। কাপড়চোপড় খুলে ন্যাংটো করে সবাইকে ছেড়ে দেবে। পাড়ার লোক এনে ধোলাই দেবে। আমার কথা বিশ্বাস না-হয়, লিখে রাখ।’

    মামার কথা শেষ হবার সঙ্গে-সঙ্গেই খালিগায়ে নীল লুঙ্গি-পরা এক লোক প্লাস্টিকের বালতিতে করে এক বালতি পানি এবং একটা মগ নিয়ে ঢুকল। পাথরের মতো মুখ করে বলল, ‘হাত-মুখ ধোন। চা আইতাছে।’

    মামা বললেন, ‘খবরদার কেউ চা মুখে দেবে না, খবরদার! দেখি ব্যাপার কী।’

    ভেতরবাড়ি থেকে কান্নার শব্দ আসছে। বিয়েবাড়িতে কান্না কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু এই কান্না অস্বাভাবিক লাগছে। মধ্যবয়স্ক এক লোক এক বিশাল কেটলিতে করে চা নিয়ে ঢুকল।! আমি তাঁকে বললাম, ‘ব্যাপার কী বলেন তো ভাই?’ সেই লোক বলল, ‘কিছু না।’

    ভেতরবাড়ির কান্না এই সময় তীব্র হল। কান্না এবং মেয়েলি গলায় বিলাপ। কান্না যেমন হঠাৎ তুঙ্গে উঠেছিল, তেমনি হঠাৎই নেমে গেল। তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই মেয়ের বড়োচাচা ঢুকলেন। ভদ্রলোককে দেখেই মনে হল তাঁর ওপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে। তিনি নিচু গলায় যা বললেন, তা শুনে আমরা স্তম্ভিত। কী সর্বনাশের কথা! জানলাম যে কিছুক্ষণ আগেই তাঁর বড়ছেলে মারা গেছে। অনেক দিন থেকেই অসুখে ভুগছিল। আজ সকাল থেকে খুব বাড়াবাড়ি হল। সব এলোমেলো হয়ে গেছে এই কারণেই। তিনি তার জন্যে লজ্জিত, দুঃখিত ও অনুতপ্ত। তবে যত অসুবিধাই হোক— বিয়ে হবে। আজ রাতে সম্ভব হবে না, পরদিন।

    এই কথা বলতে-বলতে তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।

    আমার মামা খুবই আবেগপ্রবণ মানুষ। অল্পতে রাগতেও পারেন, আবার সেই রাগ হিমশীতল পানিতে রূপান্তরিত হতেও সময় লাগে না। তিনি মেয়ের বড়চাচাকে জড়িয়ে ধরে নিজেও কেঁদে ফেললেন। কাতর গলায় বললেন, ‘আপনি আমাদের নিয়ে মোটেও চিন্তা করবেন না। আমাদের কিচ্ছু লাগবে না, আপনি বাড়ির ভেতরে যান বেয়াই সাহেব।’

    অদ্ভুত একটা অবস্থা! এর চেয়ে যদি শুনতাম মেয়ে পালিয়ে গেছে, তাও ভালো ছিল। কারো ওপর রাগ ঢেলে ফেলা যেত।

    আমরা বরযাত্রীরা খুবই বিব্রত বোধ করছি। স্থানীয় লোকজন এখন দেখতে পাচ্ছি।

    তারা বোধহয় এতক্ষণ ভেতরের বাড়িতে ছিলেন। আমরা বসার ঘরেই আছি। খিদেয় একেক জন প্রায় মরতে বসেছি। খাবার কোনো ব্যবস্থা হচ্ছে কি না বুঝতে পারছি না। এই পরিস্থিতিতে খাবারের কথা জিজ্ঞেসও করা যায় না। একজন মামাকে কানে-কানে এই ব্যাপারে বলতেই তিনি রাগী গলায় বললেন, ‘তোমাদের কি মাথাটাথা খারাপ হয়েছে—এত বড় একটা শোকের ব্যাপার, আর তোমরা খাওয়ার চিন্তায় অস্থির! ছিঃ ছিঃ ছিঃ। এক রাত না খেলে হয় কী? খবরদার, আমার সামনে কেউ খাবারের কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করবে না।’

    আমরা চুপ করে গেলাম। বার-তের বছরের ফুটফুটে একটি মেয়ে এসে পানভর্তি একটা পানদান রেখে গেল। কাঁদতে-কাঁদতে মেয়েটি চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। এখনও কাঁদছে।

    মামা মেয়েটিকে বললেন, ‘লক্ষ্মী সোনা, তোমাদের মোটেই ব্যস্ত হতে হবে না। আমাদের কিছুই লাগবে না।’

    রাত আটটার দিকে থাকা এবং খাওয়ার সমস্যার একটা সমাধান হল। স্থানীয় লোকজন ঠিক করলেন, প্রত্যেকেই তাঁদের বাড়িতে একজন-দু’জন করে গেস্ট নিয়ে যাবেন। বিয়ে হবে পরদিন বিকেলে।

    আমাকে যিনি নিয়ে চললেন, তাঁর নাম সুধাকান্ত ভৌমিক। ভদ্রলোকের বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে। বেঁটেখাটো মানুষ। শক্তসমর্থ চেহারা। এই বয়সেও দ্রুত হাঁটতে পারেন। ভদ্রলোক মৃদুভাষী। মাথার চুল ধবধবে সাদা। গেরুয়া রঙের একটা চাদর দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন বলেই কেমন যেন ঋষি-ঋষি লাগছে।

    আমি বললাম, ‘সুধাকান্তবাবু, আপনার বাসা কত দূর?’

    উনি বললেন, ‘কাছেই।’

    গ্রাম এবং মফস্বলের লোকদের দূরত্ব সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তাদের ‘কাছেই’ আসলে দিল্লি হনুজ দূর অস্তের মতো। আমি হাঁটছি তো হাঁটছিই।

    অগ্রহায়ণ মাস। গ্রামে এই সময়ে ভালো শীত থাকে। আমার গায়ে পাতলা একটা পাঞ্জাবি। শীত ভালোই লাগছে।

    আমি আবার বললাম, ‘ভাই, কত দূর?’

    ‘কাছেই।’

    আমরা একটা নদীর কাছাকাছি এসে পড়লাম। আঁতকে উঠে বললাম, ‘নদী পার হতে হবে নাকি?’

    ‘পানি নেই, জুতো খুলে হাতে নিয়ে নিন।’

    রাগে আমার গা জ্বলে গেল। এই লোকের সঙ্গে আসাই উচিত হয় নি। আমি জুতো খুলে পায়জামা গুটিয়ে নিলাম। হেঁটে নদী পার হওয়ার কোনো আনন্দ থাকলেও থাকতে পারে। আমি কোনো আনন্দ পেলাম না, শুধু ভয় হচ্ছে কোনো গভীর খানাখন্দে পড়ে যাই কি না। তবে নদীর পানি বেশ গরম।

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আপনাকে কষ্ট দিলাম।’

    ভদ্রতা করে হলেও আমার বলা উচিত, ‘না, কষ্ট কিসের!’ তা বললাম না। নদী পার হয়ে পায়জামা নামাচ্ছি, সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আপনি ছেলের কে হন?’

    ‘ফুপাতো ভাই।’

    ‘বিয়েটা না-হলে ভালো হয়। সকালে সবাইকে বুঝিয়ে বলবেন।’

    ‘সে কী!’

    ‘মেয়েটার কারণে ছেলেটা মরল। এখন চট করে বিয়ে হওয়া ঠিক না। কিছুদিন যাওয়া উচিত।’

    ‘কী বলছেন এ-সব!’

    ‘ছেলেটা সকালবেলা বিষ খেয়েছে। ধুতরা বীজ। এই অঞ্চলে ধুতরা খুব হয়।’

    ‘আপনি বলছেন কী ভাই?’

    ‘ছেলের বাবা রাজি হলেই পারত। ছেলেটা বাঁচত। গোঁয়ারগোবিন্দ মানুষ। তার “না” মানেই না।’

    ‘ছেলে-মেয়ের এই প্রেমের ব্যাপারটা সবাই জানে নাকি?’

    ‘জানবে না কেন? মফস্বল শহরে এইসব চাপা থাকে না। আপনাদের শহরে অন্য কথা। আকছার হচ্ছে।’

    আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। এ কী সমস্যা! বাকি পথ দু’ জন নীরবে পার হলাম।

    পুরোপুরি নীরব বলাটা বোধহয় ঠিক হল না। ভদ্রলোক নিজের মনেই মাঝে-মাঝে বিড়বিড় করছিলেন। মন্ত্রটন্ত্র পড়ছেন বোধহয়।

    ভদ্রলোকের বাড়ি একেবারে জঙ্গলের মধ্যে। একতলা পাকা দালান। প্রশস্ত উঠোন। উঠোনের মাঝখানে তুলসী মঞ্চ। বাড়ির লাগোয়া দু’টি প্রকাণ্ড কামিনী গাছ। একপাশে কুয়া আছে। হিন্দু বাড়িগুলো যেমন থাকে, ছবির মতো পরিচ্ছন্ন। উঠোনে দাঁড়াতেই মনে শান্তি-শান্তি একটা ভাব হল। আমি বললাম, ‘এত চুপচাপ কেন? বাড়িতে লোকজন নেই?’

    ‘না।’

    ‘আপনি একা নাকি?’

    ‘হুঁ।’

    ‘বলেন কী! একা-একা এত বড় বাড়িতে থাকেন!’

    ‘আগে অনেক লোকজন ছিল। কিছু মরে গেছে। কিছু চলে গেছে ইণ্ডিয়াতে। এখন আমি একাই আছি। আপনি স্নান করে ফেলুন।’

    ‘স্নান—ফান লাগবে না। আপনি কিছু খাবারের ব্যবস্থা করুন, তাহলেই হবে।’

    ‘একটু সময় লাগবে, রান্নার জোগাড় করতে হবে।’

    ‘আপনি কি এখন রান্না করবেন?’

    ‘রান্না না করলে খাবেন কী? বেশিক্ষণ লাগবে না।’

    ভদ্রলোক গামছা, সাবান এবং একটা জলচৌকি এনে কুয়ার পাশে রাখলেন।

    ‘স্নান করে ফেলুন। সারা দিন জার্নি করে এসেছেন, স্নান করলে ভালো লাগবে। কুয়ার জল খুব ভালো। দিন, আমি জল তুলে দিচ্ছি।’

    ‘আপনাকে তুলতে হবে না। আপনি বরং রান্না শুরু করুন। খিদেয় চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে।’

    ‘এই লুঙ্গিটা পরুন। ধোয়া আছে। আজ সকালেই সোডা দিয়ে ধুয়েছি। আমার আবার পরিষ্কার থাকার বাতিক আছে, নোংরা সহ্য করতে পারি না।’

    ভদ্রলোক যে নোংরা সহ্য করতে পারেন না, তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। তিনি রান্না করতে বসেছেন উঠোনে। উঠোনেই পরিষ্কার ঝকঝকে দুটো মাটির চুলা। সুধাকান্তবাবু চুলার সামনে জলচৌকিতে বসেছেন। থালা, বাটি, হাঁড়ি সবই দেখি দু’ বার তিন বার করে ধুচ্ছেন।

    ‘সুধাকান্তবাবু?’

    ‘বলুন।’

    ‘আপনি বিয়ে করেন নি?’

    ‘না।’

    ‘চিরকুমার?’

    ‘ঐ আর কি।’

    ‘আপনি করেন কী?’

    ‘শিক্ষকতা করি। হাই স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক। মনোহরদি হাই স্কুল।’

    ‘রান্নাবান্না আপনি নিজেই করেন?’

    ‘হ্যাঁ, নিজেই করি। এক বেলা রান্না করি। এক বেলা ভাত খাই, আর সকালে চিঁড়া, ফলমূল—এ-সব খাই।’

    ‘কাজের লোক রাখেন না কেন?’

    ‘দরকার পড়ে না।’

    ‘খালি বাড়ি পড়ে থাকে, চুরি হয় না?’

    ‘না। চোর নেবে কী? আমি এক জন দরিদ্র মানুষ। আপনি স্নান করে নিন। স্নান করলে ভালো লাগবে।’

    অপরিচিত জায়গায় ঠাণ্ডার মধ্যে গায়ে পানি ঢালার আমার কোনোই ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু সুধাকান্তবাবু মনে হচ্ছে আমাকে না ভিজিয়ে ছাড়বেন না। লোকটি সম্ভবত শুচিবাইগ্রস্ত।

    কুয়ার পানি নদীর পানির মতো গরম নয়, খুব ঠাণ্ডা। পানি গায়ে দিতেই গা জুড়িয়ে গেল। সারা দিনের ক্লান্তি, বিয়েবাড়ির উদ্বেগ, মৃত্যুসংক্রান্ত জটিলতা—সব ধুয়ে-মুছে গেল। চমৎকার লাগতে লাগল। তা ছাড়া পরিবেশটাও বেশ অদ্ভুত। পুরনো ধরনের একটা বাড়ি। ঝকঝকে উঠোনের শেষ প্রান্তে শ্যাওলা ধরা প্রাচীন কুয়া। আকাশে পরিষ্কার চাঁদ। কামিনী ফুলের গাছ থেকে ভেসে আসছে মিষ্টি গন্ধ। এক ঋষির মতো চেহারার চিরকুমার বৃদ্ধ রান্না বসিয়েছেন। যেন বিভূতিভূষণের উপন্যাসের কোনো দৃশ্য।

    ‘সুধাকান্তবাবু?’

    ‘বলুন।’

    ‘রান্নার কত দূর?’

    ‘দেরি হবে না।’

    ‘একা-একা থাকতে আপনার খারাপ লাগে না?’

    ‘না, অভ্যেস হয়ে গেছে।’

    ‘বাসায় ফিরে আপনি করেন কী?’

    ‘তেমন কিছু করি না। চুপচাপ বসে থাকি।’

    ‘ভয় লাগে না?’

    সুধাকান্তবাবু এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না।

    খাবার আয়োজন সামান্য, তবে এত চমৎকার রান্না আমি দীর্ঘদিন খাই নি। একটা কিসের যেন ভাজি, তাতে পাঁচফোড়নের গন্ধ—খেতে একটু টক-টক। বেগুন দিয়ে ডিমের তরকারি, তাতে ডালের বড়ি দেওয়া। ডালের বড়ি এর আগে আমি খাই নি। এমন একটা সুখাদ্য দেশে প্রচলিত আছে তা-ই আমার জানা ছিল না। মুগের ডাল। ডালে ঘি দেওয়াতে অপূর্ব গন্ধ।

    আমি বললাম, ‘সুধাকান্তবাবু, এত চমৎকার খাবার আমি আমার জীবনে খাই নি। দীর্ঘদিন মনে থাকবে।’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আপনি ক্ষুধার্ত ছিলেন, তাই এত ভালো লেগেছে। রুচির রহস্য ক্ষুধায়। যেখানে ক্ষুধা নেই, সেখানে রুচিও নেই।’

    আমি চমৎকৃত হলাম।

    লোকটির চেহারাই শুধু দার্শনিকের মতো না, কথাবার্তাও দর্শনঘেঁষা।

    সুধাকান্তবাবু উঠোনে পাটি পেতে দিলেন। খাওয়াদাওয়ার পর সিগারেট হাতে সেখানে বসলাম। কিছুক্ষণ গল্পগুজব করা যেতে পারে। সুধাকান্তবাবুকে অবশ্যি খুব আলাপী লোক বলে মনে হচ্ছে না। এই যে দীর্ঘ সময় তাঁর সঙ্গে আছি, তিনি এর মধ্যে আমার নাম জানতে চান নি। আমি কী করি তাও জানতে চান নি। আমি এই মানুষটির প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ বোধ করছি, কিন্তু এই লোকটা আমার প্রতি কোনো আগ্রহ বোধ করছে না। অথচ আমি আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, যারা মাস্টারি করে, তারা কথা বলতে খুব পছন্দ করে। অকারণেই কথা বলে।

    প্রায় মিনিট পনের আমরা চুপচাপ বসে থাকার পর সুধাকান্তবাবু আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘আপনি জিজ্ঞেস করছিলেন একা-একা আমি এই বাড়িতে থাকতে ভয় পাই কি না, তাই না?’

    আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, তাই।’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘ভয় পাই। প্রায় রাতেই ঘুমুতে পারি না, জেগে থাকি। ঘরের ভেতর আগুন করে রাখি। হারিকেন জ্বালান থাকে। ওরা আগুন ভয় পায়। আগুন থাকলে কাছে আসে না।’

    আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কারা?’

    তিনি জবাব দিলেন না।

    আমি বললাম, ‘আপনি কি ভূতপ্রেতের কথা বলছেন?’

    ‘হ্যাঁ।’

    আমি মনে-মনে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললাম। পৃথিবী কোথায় চলে গিয়েছে এই বৃদ্ধ তা বোধহয় জানে না। চাঁদের পিঠে মানুষের জুতোর ছাপ পড়েছে, ভাইকিং উপগ্রহ নেমেছে মঙ্গলের মরুভূমিতে, ভয়েজার ওয়ান এবং টু উড়ে গেছে বৃহস্পতির কিনারা ঘেঁষে, আর এই অঙ্কের শিক্ষক ভূতের ভয়ে ঘরে আগুন জ্বালিয়ে রাখছে। কারণ, অশরীরীরা আগুন ভয় পায়।

    আমি বললাম, ‘আপনি কি ওদের দেখেছেন কখনো?’

    ‘না।’

    ‘ওদের পায়ের শব্দ পান?’

    ‘তাও না।’

    ‘তাহলে?’

    ‘বুঝতে পারি।’

    ‘বুঝতে পারেন?’

    ‘জ্বি। আপনি যখন আছেন, আপনিও বুঝবেন।’

    ‘ওদের কাণ্ডকারখানা দেখতে পাব, তাই বলছেন?’

    ‘হুঁ, তবে ওদের না, এক জন শুধু আসে।’

    ‘তাও ভালো যে এক জন আসে। আমি ভেবেছিলাম দলবল নিয়ে বোধহয় চলে আসে। নাচ গান হৈ-হল্লা করে।’

    ‘আপনি আমার কথা একেবারেই বিশ্বাস করছেন না?’

    ‘ঠিকই ধরেছেন, বিশ্বাস করছি না। অবশ্যি এই মুহূর্তে আমার গা ছমছম করছে। কারণ, আপনার পরিবেশটা ভৌতিক।’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘ওরা কিন্তু আছে।’

    আমি চুপ করে রইলাম। এই বৃদ্ধের সঙ্গে ভূত আছে কি নেই, তা নিয়ে তর্ক করার কোনো অর্থ হয় না। থাকলে থাকুক।

    ‘আমার কাছে যে আসে, সে একটা মেয়ে।’

    ‘তাই নাকি?’

    ‘জ্বি, এগার-বার বছর বয়স।’

    ‘বুঝলেন কী করে তার বয়স এগার-বার? আপনাকে বলেছে?’

    ‘জ্বি-না। অনুমান করে বলছি।’

    ‘তার নাম কি? নাম জানেন?’

    ‘জ্বি না।’

    ‘সে এসে কী করে?’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘মেয়েটি যে আসছে এই কি যথেষ্ট নয়? তার কি আর কিছু করার প্রয়োজন আছে?’

    আমি চুপ করে গেলাম। আসলেই তো, অশরীরী এক বালিকার উপস্থিতিই তো যথেষ্ট। সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আপনি নিজেও হয়তো দেখতে পারবেন।’ আমি চমকে উঠলাম। ভদ্রলোক সহজ স্বরে বললেন, ‘আমি ছাড়াও অনেকে দেখেছে।’

    সুধাকান্তবাবু ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেললেন এবং তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে বিকট একটা হাসি শুনলাম। উঠোন কাঁপিয়ে গাছপালা কাঁপিয়ে হো-হো করে কে যেন হেসে উঠল। সুধাকান্তবাবু পাশে না থাকলে অজ্ঞানই হয়ে যেতাম। আমি তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘কে, কে?’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘ওটা কিছু না।’

    আমি ভয়-জড়ানো গলায় বললাম, ‘কিছু না মানে?’

    ‘ওটা খাটাশ। মানুষের মতো শব্দ করে হাসে।’

    ‘বলেন কী। খাটাশের নাম তো এই প্রথম শুনলাম। এ তো ভূতের বাবা বলে মনে হচ্ছে। এখনো আমার গা কাঁপছে।’

    ‘জল খান। জল খেলে ভয়টা কমবে।’

    সুধাকান্তবাবু কাঁসার গ্লাসে করে পানি নিয়ে এলেন। খাটাশ নামক জন্তুটি আরেক বার রক্ত হিম করা হাসি হাসল। সুধাকান্তবাবু যদি কিছু না বলতেন তাহলে ভূতের হাসি শুনেছি, এই ধারণা সারা জীবন আমার মনের মধ্যে থাকত।

    লোকটার প্রতি এই প্রথম আমার খানিকটা আস্থা হল। আজগুবি গল্প বলে ভয় দেখান এই লোকের ইচ্ছা নয় বলেই মনে হল। এ-রকম ইচ্ছা থাকলে, এই ভয়ংকর হাসির কারণ সম্পর্কে সে চুপ করে থাকত।

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘ঐ মেয়েটার কথা শুনবেন?’

    ‘হ্যাঁ, শোনা যেতে পারে। তবে আমি নিজে অবিশ্বাসী ধরনের মানুষ, কাজেই গল্পের মাঝখানে যদি হেসে ফেলি কিছু মনে করবেন না।’

    ‘এই গল্পটা কাউকে বলতে ভালো লাগে না। অবশ্যি অনেককে বলেছি। এখানকার সবাই জানে।’

    ‘আপনার গল্প এখানকার সবাই বিশ্বাস করেছে?’

    সুধাকান্তবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আমি যদি এখানকার কাউকে একটা মিথ্যা কথাও বলি, এরা বিশ্বাস করবে। এরা আমাকে সাধুবাবা বলে ডাকে। আমি আমার এই দীর্ঘ জীবনে কোনো মিথ্যা কথা বলেছি বলে মনে পড়ে না। আমি থাকি একা-একা। আমার প্রয়োজনও সামান্য। মানুষ মিথ্যা কথা বলে প্রয়োজন এবং স্বার্থের কারণে। আমার সেই সমস্যা নেই। এইসব থাক, আমি বরং গল্পটা বলি।’

    ‘বলুন।’

    ‘ভেতরে গিয়ে বসবেন? এখানে মনে হচ্ছে একটু ঠাণ্ডা লাগছে। অগ্রহায়ণ মাসে হিম পড়ে।’

    ‘আমার অসুবিধা হচ্ছে না, এখানেই বরং ভালো লাগছে। গ্রামে তেমন আসা হয় না। আপনি শুরু করুন।’

    সুধাকান্তবাবু গল্প শুরু করতে গিয়েও শুরু করলেন না। হঠাৎ যেন একটু অন্য রকম হয়ে গেলেন। যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছু দেখতে চেষ্টা করছেন। খসখস শব্দ হল। নতুন কাপড় পরে হাঁটলে যেমন শব্দ হয়, সে-রকম। তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই কাঁচের চুড়ির টুং-টুং শব্দের মতো শব্দ। আমি বললাম, ‘কী ব্যাপার বলুন তো?’

    সুধাকান্তবাবু ফ্যাকাসে মুখে হাসলেন। আমি বললাম, ‘কিসের শব্দ হল?’

    তিনি নিচু গলায় বললেন, ‘ও কিছু না, আপনি গল্প শুনুন। আজ ঘুমিয়ে কাজ নেই, আসুন গল্প করে রাত পার করে দিই।’

    গা-ছমছমে পরিবেশ। বাড়ির লাগোয়া ঝাঁকড়া কামিনী গাছ থেকে কামিনী ফুলের নেশা-ধরান গন্ধ আসছে। কুয়ার আশেপাশে অসংখ্য জোনাকি জ্বলছে নিভছে। উঠোনের চুলা থেকে ভেসে আসছে পোড়া কাঠের গন্ধ। আকাশ-ভরা নক্ষত্রবীথি।

    সুধাকান্তবাবু গল্প শুরু করলেন।

  • ভয়

    ভয়

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book-name]
    [book]

    একটা মজার ঘটনার কথা বলি।

    ক্লাস নিচ্ছি, পড়াচ্ছি থার্মোডিনামিক্স। একটি ছেলেকে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম সে উত্তর দিতে পারল না। বিরক্ত হয়ে বললাম, নাম কি তোমার? সে উঠে দাঁড়াল কিন্তু নাম বলল না। ক্লাসের সব ছেলেমেয়েরা হাসতে শুরু করল। আমি বিস্মিত। তাদের হাসির কারণ ধরতে পারছি না। আবার বললাম, নাম কি তোমার? ছাত্র-ছাত্রীরা আবারও হেসে উঠল। ছেলেটির পাশে বসা একজন বলল, স্যার সে নাম বলবে না। কারণ তার নাম— মিসির আলি।

    ঘটনাটা ক্ষুদ্র। কিন্তু এই ক্ষুদ্র ঘটনা আমার মন আনন্দে পূর্ণ করল। মিসির আলি নামের চরিত্রটি আমি তাহলে অনেকের কাছেই পৌঁছে দিতে পেরেছি। একজন লেখকের কাছে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে?

    আমি বিব্রত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে বললাম, তুমি অস্বস্তি বোধ করছ কেন? মিসির আলি চরিত্রটি কি তুমি পছন্দ কর না?

    সে মাথা নীচু করে রইল, অন্য একজন পেছন থেকে বলল, স্যার ওর নামটাই মিসির আলি, বুদ্ধি শুদ্ধি খুব কম।

    আবার সবাই হেসে উঠল।

    ঐ দিনের ক্লাসের ঘটনাটি আমার জীবনের আনন্দময় ঘটনার একটি।

    মিসির আলিকে নিয়ে আরো তিনটি গল্প লেখা হল। এই আনন্দময় ঘটনার উল্লেখ সেই কারণেই করলাম। হয়ত এতে খুব সূক্ষ্ম ভাবে হলেও সামান্য অহংকার প্রকাশ করা হয়েছে। পাঠক-পাঠিকা আমার এই মানবিক ত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন এই বিনীত কামনা।

    হুমায়ূন আহমেদ

    শহীদুল্লাহ হল

  • বিপদ

    বিপদ

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    ভূমিকা

    মিসির আলির আরো একটি গল্প। আমার ধারণা, অদ্ভুত এই গল্প পাঠক-পাঠিকারা এক কথায় উড়িয়ে দেবেন। তাতে ক্ষতি নেই, তবু আমি অনুরোধ করব উড়িয়ে না দিতে। এ জগৎ বড়ই রহস্যময়। প্রকৃতি মাঝে মাঝে কিছু রহস্য ভাঙ্গতে চেষ্টা করে, আবার পরমুহূর্তেই সচেতন হয়ে আরো কঠিন রহস্যে নিজেকে ঢেকে ফেলে। সেই রহস্যের জট ছড়ানো মিসির আলির ক্ষমতার বাইরে।

    হুমায়ূন আহমেদ

    শহীদুল্লাহ হল

    ১৬ই নভেম্বর ১৯৯১

  • অনীশ

    অনীশ

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    হাসপাতালের কেবিন ধরাধরি ছাড়া পাওয়া যায় না, এই প্রচলিত ধারণা সম্ভবত পুরোপুরি সত্যি নয়। মিসির আলি পেয়েছেন, ধরাধরি ছাড়াই পেয়েছেন। অবশ্যি জেনারেল ওয়ার্ডে থাকার সময় একজন ডাক্তারকে বিনীতভাবে বলেছিলেন, ‘ভাই একটু দেখবেন—একটা কেবিন পেলে বড় ভালো হয়।’ এই সামান্য কথাতেই কাজ হবে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। আজকাল কথাতে কিছু হয় না। যে-ডাক্তারকে অনুরোধ করা হয়েছিল, তিনি বুড়ো। মুখের ভঙ্গি দেখে মনে হয় সমগ্র মানবজাতির ওপরই তিনি বিরক্ত। কোনো ভয়ংকর দুর্ঘটনায় মানবজাতি নিঃশেষ হয়ে আবার যদি এককোষী এ্যামিবা থেকে জীবনের শুরু করে তাহলে তিনি খানিকটা আরাম পান। তাঁকে দেখে মনে হয় নি তিনি মিসির আলির অনুরোধ মনে রাখবেন। কিন্তু ভদ্রলোক মনে রেখেছেন। কেবিন জোগাড় হয়েছে পাঁচতলায়। রুম নাম্বার চার শ নয়।

    সব জায়গায় বাংলা প্রচলন হলেও হাসপাতালের সাইনবোর্ডগুলি এখনো বদলায় নি। ওয়ার্ড, কেবিন, পেডিয়াট্রিকস—এ-সব ইংরেজিতেই লেখা। শুধু রোমান হরফের জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে বাংলা হরফ। হয়তো এগুলির সুন্দর বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া যায় নি। কেবিনের বাংলা কী হবে? কুটির? জেনারেল ওয়ার্ডের বাংলা কি ‘সাধারণ কক্ষ’?

    যতটা উৎসাহ নিয়ে মিসির আলি চার শ’ ন’ নম্বর কেবিনে এলেন ততটা উৎসাহ থাকল না। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তিনি আবিষ্কার করলেন—বাথরুমের ট্যাপ বন্ধ হয় না। যত কষেই প্যাচ আটকানো যাক, ক্ষীণ জলধারা ঝরনার মতো পড়তেই থাকে। কমোডের ফ্ল্যাশও কাজ করে না। ফ্ল্যাশ টানলে ঘড়ঘড় শব্দ হয় এবং কমোডের পানিতে সামান্য আলোড়ন দেখা যায়। এই পর্যন্তই। তার চেয়েও ভয়াবহ আবিষ্কারটা করলেন রাতে ঘুমোতে যাবার সময়। দেখলেন বেডের পাশে সাদা দেয়ালে সবুজ রঙের মার্কার দিয়ে লেখা—

    “এই ঘরে যে থাকবে

    সে মারা যাবে।

    ইহা সত্য। মিথ্যা নয়॥’

    মিসির আলির চরিত্র এমন নয় যে এই লেখা দেখে তিনি আঁৎকে উঠবেন এবং জেনারেল ওয়ার্ডে ফেরত যাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। তবে বড় রকমের অসুখবিসুখের সময় মানুষের মন দুর্বল থাকে। মিসির আলির মনে হল তিনি মারাই যাবেন। সবুজ রঙের এই ছেলেমানুষি লেখার কারণে নয়, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক নিয়মে। তাঁর লিভার কাজ করছে না বললেই হয়! মনে হচ্ছে লিভারটির আর কাজ করার ইচ্ছেও নেই। শরীরের একটি অঙ্গ নষ্ট হয়ে গেলে অন্য অঙ্গগুলিও তাকে অনুসরণ করে। একে বলে সিমপ্যাথেটিক রিঅ্যাকশন। কারো একটা চোখ নষ্ট হলে অন্য চোখের দৃষ্টি কমতে থাকে। তাঁর নিজের বেলাতেও মনে হচ্ছে তাই হচ্ছে। লিভারের শোকে শরীরের অন্যসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলিও কাতর। একসময় ফট করে কাজ বন্ধ করে দেবে। হৃৎপিণ্ড বলবে—কী দরকার গ্যালন গ্যালন রক্ত পাম্প করে? অনেক তো করলাম। শুরু হবে অনির্দিষ্টের পথে যাত্রা। সেই যাত্রা কেমন হবে তিনি জানেন না। কেউই জানে না। প্রাণের জন্ম-রহস্য যেমন অজানা, প্রাণের বিনাশ-রহস্যও তেমনি অজানা।

    তিনি শুয়ে পড়লেন। প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। বেল টিপে নার্সকে ডাকলেই সে কড়া কোনো ঘুমের অষুধ খাইয়ে দেবে। মিসির আলির ধারণা, এরা ঘুমের ট্যাবলেট এ্যাপ্রনের পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। রুগীর সামান্য কাতরানির শব্দ কানে যাওয়ামাত্র ঘুমের ট্যাবলেট গিলিয়ে দেয়। কাজেই ওদের না-ডেকে মাথার যন্ত্রণা নিয়ে শুয়ে থাকাই ভালো। শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর পরের জগৎ নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে।

    ধরা যাক মৃত্যুর পরে একটি জগৎ আছে। পার্টিকেলের যদি অ্যান্টি-পার্টিকেল থাকতে পারে, ইউনিভার্সের যদি অ্যান্টি-ইউনিভার্স হয়, তাহলে শরীরের এ্যান্টি-শরীর থাকতে সমস্যা কী? যদি মৃত্যুর পর কোনো জগৎ থাকে কী হবে সেই জগতের নিয়ম-কানুন? এ-জগতের প্রাকৃতিক নিয়ম-কানুন কি সেই জগতেও সত্যি? এখানে আলোর গতি সেকেণ্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল, সেখানেও কি তাই? নিউটনের গতিসূত্র কি সেই জগতের জন্যেও সত্যি? হাইজেনবার্গের আনসার্টিনিটি প্রিন্সিপ্‌ল? একই সময়ে বস্তুর গতি এবং অবস্থান নির্ণয় করা অসম্ভব। পরকালেও কি তাই? নাকি সেখানে এটি খুবই সম্ভব?

    মিসির আলি কলিং বেলের সুইচ টিপলেন। প্রচণ্ড বমি ভাব হচ্ছে। বমি করে বিছানা ভাসিয়ে দিতে চাচ্ছেন না, আবার একা-একা বাথরুম পর্যন্ত যাবার সাহস ও পাচ্ছেন না। মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে বাথরুমের দরজায় পড়ে যাবেন।

    অল্পবয়েসী একজন নার্স ঢুকল। তার গায়ের রঙ কালো, মুখে বসন্তের দাগ, তার পরেও চেহারায় কোথায় যেন একধরনের স্নিগ্ধতা লুকিয়ে আছে। মিসির আলি বললেন, এত রাতে আপনাকে ডাকার জন্যে আমি খুব লজ্জিত। আপনি কি আমাকে বাথরুম পর্যন্ত নিয়ে যাবেন? আমি বমি করব।

    ‘বাথরুমে যেতে হবে না। বিছানায় বসে-বসেই বমি করুন—আপনার খাটের নিচে গামলা আছে।’

    সিস্টার মিসির আলিকে ধরে-ধরে বসালেন। আশ্চর্যের ব্যাপার, বমি ভাব সঙ্গে-সঙ্গে কমে গেল। মিসির আলি বললেন, ‘সিস্টার, আপনার নাম জানতে পারি?’

    ‘আমার নাম সুস্মিতা। আপনি কি এখন একটু ভালো বোধ করছেন?’

    ‘বমি গলা পর্যন্ত এসে থেমে আছে। এটাকে যদি ভালো বলেন তাহলে ভালো।’

    ‘আপনার কি মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে?’

    ‘হচ্ছে।’

    ‘খুব বেশি?’

    ‘হ্যাঁ, খুব বেশি।’

    ‘আপনি শুয়ে থাকুন। আমি রেসিডেন্ট ফিজিসিয়ানকে ডেকে নিয়ে আসছি। তিনি হয়তো আপনাকে ঘুমের কোনো অষুধ দেবেন। তা ছাড়া আপনার গা বেশ গরম। মনে হচ্ছে টেম্পারেচার দুই-এর উপরে।’

    সুস্মিতা জ্বর দেখল। এক শ’ দুই পয়েন্ট পাঁচ। সে ঘরের বাতি নিভিয়ে ডাক্তারকে খবর দিতে গেল।

    মিসির আলি লক্ষ করছেন, তাঁর মাথার যন্ত্রণা ক্রমেই বাড়ছে। ঘর অন্ধকার, তবু চোখ বন্ধ করলেই হলুদ আলো দেখা যায়। চোখের রেটিনা সম্ভবত কোনো কারণে উত্তেজিত। ব্যথার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি? আচ্ছা—জ্বর মাপার যন্ত্র আছে থার্মোমিটার! ব্যথা মাপার যন্ত্র এখনো বের হল না কেন? মানুষের ব্যথা-বোধের মূল কেন্দ্র—মস্তিষ্ক। স্নায়ু ব্যথার খবর মস্তিষ্কে পৌছে দেয়। যে-ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল ব্যথার পরিমাপক, সেই সিগন্যাল মাপা কি অসম্ভব?

    ব্যথা মাপার একটা যন্ত্র থাকলে ভালো হত। প্রসববেদনার তীব্রতা নাকি সবচেয়ে বেশি। তার পরেই থার্ড ডিগ্রী বার্ন। তবে ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতাও একেক মানুষের একেক রকম। কেউ-কেউ অতি তীব্র ব্যথাও শান্তমুখে সহ্য করতে পারে। মিসির আলি পারেন না। তাঁর ইচ্ছা করছে দেয়ালে মাথা ঠুকতে। ব্যথা ভোলবার জন্যে কী করা যায়? মস্তিষ্ককে কি কোনো জটিল প্রক্রিয়ায় ফেলে দেওয়া যায় না? উল্টো করে নিজের সঙ্গে কথা বললে কেমন হয়? কিংবা একই বাক্য চক্রাকারে বলা যায় না?

    শিবে বখু কি থাব্য?

    শিবে বখু কি থাব্য?

    শিবে বখু কি থাব্য?

    নার্স ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকল। বাতি জ্বালাল। ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘কী ব্যাপার?’

    মিসির আলি বললেন, ‘আমার ডেলিরিয়াম হচ্ছে। একটি বাক্য বারবার উল্টো করে বলছি। “ব্যথা কি খুব বেশি’’—এই বাক্যটিকে আমি উল্টো করে বলছি, ‘শিবে বখু কি থাব্য?’

    ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘কোনো রুগীর যখন ডেলিরিয়াম হয়, সে বুঝতে পারে না যে ডেলিরিয়াম হচ্ছে।’

    ‘আমি বুঝতে পারি। কারণ আমার কাজই হচ্ছে মানুষের মনোজগৎ নিয়ে। ডাক্তার সাহেব, আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিন। সম্ভব হলে খানিকটা অক্সিজেন দেবারও ব্যবস্থা করুন। আমার মস্তিষ্কে অক্সিজেন ডিপ্রাইভেশন হচ্ছে। আমার হেলুসিনেশন হচ্ছে।’

    ‘কি হেলুসিনেশন?’

    ‘আমি দেখছি আমার হাত দুটো অনেক লম্বা হয়ে গেছে। এখনো লম্বা হচ্ছে।’

    মিসির আলি গানের সুরে বলতে লাগলেন—

    “ম্বাল তক তহা রমাআ।

    ম্বাল তক তহা রমাআ।

    ম্বাল তক তহা রমাআ।”

    ডাক্তার সাহেব নার্সকে প্যাথিড্রিন ইনজেকশান দিতে বললেন।

    মিসির আলির ঘুম ভাঙল সকাল ন’টার দিকে।

    ট্রে-তে করে হাসপাতালের নাশতা নিয়ে এসেছে। দু’ স্লাইস রুটি, একটা ডিম সেদ্ধ, একটা কলা এবং আধ গ্লাস দুধ। বিশ্বের দরিদ্রতম দেশের একটির জন্যে বেশ ভালো খাবার—স্বীকার করতেই হবে। তবু বেশির ভাগ রুগী এই খাবার খায় না। তাদের জন্যে টিফিন ক্যারিয়ারে ঘরের খাবার আসে। ফ্লাস্কে আসে দুধ।

    জেনারেল ওয়ার্ডের অবস্থা অবশ্য ভিন্ন। সেখানকার রুগীরা হাসপাতালের খাবার খুব আগ্রহ করে খায়। যারা খেতে পারে না, তারা জমা করে রাখে। বিকেলে তাদের আত্মীয়স্বজনরা আসে। মাথা নিচু করে লজ্জিত মুখে এই খাবারগুলি তারা খেয়ে ফেলে। সামান্য খাবার, অথচ কী আগ্রহ করেই-না খায়! বড়ো মায়া লাগে মিসির আলির। কতবার নিজের খাবার ওদের দিয়ে দিয়েছেন। ওরা কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়েছে।

    আজকের নাশতা মিসির আলি মুখে দিতে পারলেন না। পাউরুটিতে কামড় দিতেই বমি ভাব হল। এক চুমুক দুধ খেলেন। কলার খোসা ছাড়ালেন, কিন্তু মুখে দিতে পারলেন না। শরীর সত্যি-সত্যি বিদ্রোহ করেছে।

    খাবার নিয়ে যে এসেছে, সে তাকিয়ে আছে তীক্ষ্ণ চোখে। রুগী খাবার খেতে পারছে না, এই দৃশ্য নিশ্চয়ই তার কাছে নতুন নয়। তবু তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে দুঃখিত। লোকটি স্নেহময় গলায় বলল, ‘কষ্ট কইরা খান। না-খাইলে শরীরে বল পাইবেন না।’

    মিসির আলি শুধুমাত্র লোকটিকে খুশি করবার জন্যে পাউরুটি দুধে ভিজিয়ে মুখে দিলেন। খেতে কেমন যেন ঘাসের মতো লাগছে।

    আজ শুক্রবার।

    শুক্রবারে রুটিন ভিজিটে ডাক্তাররা আসেন না। সেটাই স্বাভাবিক। তাঁদের ঘর-সংসার আছে, পুত্র-কন্যা আছে। জন্মদিন, বিয়ে, বিবাহবার্ষিকী আছে। একটা দিন কি তাঁরা ছুটি নেবেন না? অবশ্যই নেবেন। মিসির আলি ধরেই নিয়েছিলেন তাঁর কাছে কেউ আসবে না। কিন্তু তাঁকে অবাক করে দিয়ে এ্যাপ্রন গায়ে মাঝবয়েসী এক ডাক্তার এসে উপস্থিত। ডাক্তার আসার এটা সময় নয়। প্রথমত শুক্রবার, দ্বিতীয়ত দেড়টা বাজে, লাঞ্চ ব্রেক। ডিউটির ডাক্তাররাও এই সময় ক্যান্টিনে খেতে যান।

    ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘কেমন আছেন?’

    মিসির আলি হেসে ফেলে বললেন, ‘ভালো থাকলে কি হাসপাতালে পড়ে থাকি?’

    ‘আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে ভালো আছেন। কাল রাতে খুব খারাপ অবস্থায় ছিলেন। প্রবল ডেলিরিয়াম।’

    ‘আপনি রাতে এসেছিলেন?’

    ‘জ্বি।’

    ‘চিনতে পারছি না। মাথা এলোমেলো হয়ে আছে। গত রাতে কী ঘটেছে কিচ্ছু মনে নেই।’

    ডাক্তার সাহেব চেয়ারে বসলেন। তাঁর শরীর বেশ ভারি। শরীরের সঙ্গে মিল রেখে গলার স্বর ভারি। চশমার কাঁচ ভারি। সবই ভারি ভারি, তবুও মানুষটির কথা বলার মধ্যে সহজ হালকা ভঙ্গি আছে। এ-জাতীয় মানুষ গল্প করতে এবং গল্প শুনতে ভালবাসে। মিসির আলি বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব, আমি আপনার জন্যে কী করতে পারি বলুন।’

    ‘একটা সমস্যার সমাধান করতে পারেন। এই কেবিনটা ছেড়ে অন্য একটা কেবিনে চলে যেতে পারেন। একজন মহিলা এই কেবিনে আসতে চাচ্ছেন।’

    মিসির আলি হাসতে-হাসতে বললেন, ‘আমি এই মুহূর্তে কেবিন ছেড়ে দিচ্ছি।’

    ‘এই মুহূর্তে ছাড়তে হবে না। কাল ছাড়লেও হবে।’

    ডাক্তার সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। মিসির আলি বললেন, ‘ভদ্রমহিলা বিশেষ করে এই কেবিনে আসতে চাচ্ছেন কেন?’

    ‘তাঁর ধারণা, এই কেবিন খুব লাকি। কেবিনের নম্বর চার শ’ নয়। যোগ করলে হয় তের। তের নম্বরটি নাকি তাঁর জন্যে খুব লাকি। সৌভাগ্য-সংখ্যা। নিউমোরলজি’-র হিসাব।’

    ‘কী অদ্ভুত কথা!’

    ডাক্তার সাহেব হালকা স্বরে বললেন, ‘অসুস্থ অবস্থায় মন দুর্বল থাকে। দুর্বল মনে তের নম্বরটি ঢুকে গেলে সমস্যা।’

    ‘মনের মধ্যে যা ঢুকেছে তা বের করে দিন।’

    ডাক্তার সাহেব হেসে ফেলে বললেন, ‘এটা তো কোনো কাঁটা না রে ভাই, যে, চিমটা দিয়ে বের করে নিয়ে আসব। এর নাম কুসংস্কার। কুসংস্কার মনের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে শিকড় ছড়িয়ে দেয়। কুসংস্কারকে তুলে ফেলা আমার মতো সাধারণ মানুষের কর্ম নয়। যাই ভাই। আপনি তাহলে কাল ভোরে কেবিন নম্বর চার শ’ পাঁচে চলে যাবেন। কেবিনটা সিঁড়ির কাছে না, কাজেই হৈ-চৈ হবে না। তা ছাড়া জানালার ভিউ ভালো। গাছপালা দেখতে পারবেন।’

    মিসির আলি গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না। আমি এই রুম ছাড়ব না। এখানেই থাকব।’

    ডাক্তার সাহেব বিস্মিত হয়ে তাকালেন। কি একটা বলতে গিয়েও বললেন না। মিসির আলি বললেন, ‘রুম ছাড়ব না, কারণ ছাড়লে কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। আমি এই জীবনে কুসংস্কার প্রশ্রয় দেবার মতো কোনো কাজ করি নি। ভবিষ্যতেও করব না।’

    ‘ও, আচ্ছা।’

    ‘আপনি যদি অন্য কোনো কারণ বলতেন, রুম ছেড়ে দিতাম। আমার কাছে চার শ’ নয় নম্বর যা, চার শ’ পাঁচ-ও তা। তফাত মাত্র চারটা ডিজিটের।’

    ডাক্তার সাহেব বিব্রত গলায় বললেন, ‘আপনি কি ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলবেন? অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ভদ্রমহিলা এ-ঘরে না-আসা পর্যন্ত অপারেশন করাবেন না। অপেক্ষা করবেন। অথচ অপারেশনটা জরুরি।’

    ‘ওঁর অসুবিধা কী?’

    ‘কিডনির কাছাকাছি একটা সিস্টের মতো হয়েছে। আপনি যদি তাঁর সঙ্গে কথা বলেন তাহলে ভালো হয়। ভদ্রমহিলাকে আপনি চেনেন।’

    ‘তাই নাকি?’

    ‘হ্যাঁ। ভালো করেই চেনেন। উনি অনুরোধ করলে না বলতে পারবেন না।’

    ‘নাম কি তাঁর?’

    ‘আমি ওঁকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি কথা বলুন।’

    মিসির আলি তাকিয়ে আছেন।

    দরজা ধরে যে-মহিলা দাঁড়িয়ে, তাঁর বয়স ত্রিশের কাছাকাছি হলেও তাঁকে দেখাচ্ছে বালিকার মতো। লম্বাটে মুখ, কাটা-কাটা চেহারা। অসম্ভব রূপবতী। সাধারণত রূপবতীরা মানুষকে আকর্ষণ করে না—একটু দূরে সরিয়ে রাখে। এই মেয়েটির মধ্যে আকর্ষণী ক্ষমতা প্রবল। মিসির আলি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন। মেয়েটি বলল, ‘আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন?’

    ‘না।’

    ‘সে কী, চেনা উচিত ছিল তো! আপনি সিনেমা দেখেন না নিশ্চয়ই?’

    ‘না।’

    ‘টিভি? টিভিও দেখেন না? টিভি দেখলেও তো আমাকে চেনার কথা!’

    ‘আমার টিভি নেই। বাড়িওয়ালার বাসায় গিয়ে অবশ্যি মাঝে-মাঝে দেখি। আপনি কি কোনো অভিনেত্রী?’

    ‘হ্যাঁ। এলেবেলে টাইপ অভিনেত্রী নই। খুব নামকরা। রাস্তায় বের হলে ‘ট্রাফিক জ্যাম’ হয়ে যাবে।’

    মেয়েটির কথা বলার ভঙ্গিতে মিসির আলি হেসে ফেললেন। মেয়েটিও হাসল। অভিনেত্রীর মাপা হাসি নয়, অন্তরঙ্গ হাসি। সহজ-সরল হাসি।

    ‘আপনি কিন্তু এখনো আমার নাম জিজ্ঞেস করেননি।’

    ‘কী নাম?’

    ‘আসমানী। এটা আমার আসল নাম। সিনেমার জন্যে আমার ভিন্ন নাম আছে। সেই নাম আপনার জানার দরকার নেই। ভেতরে আসব?’

    ‘আসুন।’

    মেয়েটি ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসল। গলার স্বর খানিকটা গম্ভীর করে বলল, ‘শুনলাম আপনি নাকি কুসংস্কার সহ্য করতে পারেন না।’

    ‘ঠিকই শুনেছেন। সহ্য করি না এবং প্রশ্রয় দিই না।’

    ‘কুসংস্কার-টুসংস্কার কিছু না। আপনি আপনার ঘরটা আমাকে ছেড়ে দিন। আমার এই কেবিনটা খুব পছন্দ। আমি আপনার কাছে হাতজোড় করছি। প্লীজ।’

    মেয়েটি সত্যি-সত্যি হাতজোড় করল। মিসির আলি লজ্জায় পড়ে গেলেন। এ কী কাণ্ড!

    ‘আমি এক্ষুণি ছেড়ে দিচ্ছি। হাতজোড় করতে হবে না।’

    ‘থ্যাংকস!’

    ‘থ্যাংকস বলারও প্রয়োজন নেই, তবে আমার ধারণা, এই কেবিনটিতেও শেষ পর্যন্ত আপনি থাকতে রাজি হবেন না।’

    ‘এ-রকম মনে হবার কারণ কী?’

    ‘আপনি রাতে যখন ঘুমুতে যাবেন তখন হঠাৎ করে দেয়ালের একটা লেখা আপনার চোখে পড়বে—সবুজ মার্কারে কাঁচা-কাঁচা হাতে লেখা—

    “এই ঘরে যে থাকবে

    সে মারা যাবে।

    ইহা সত্য, মিথ্যা নয়।”

    লেখা পড়েই আপনি আঁৎকে উঠবেন। যেহেতু আপনার মন খুব দুর্বল, সেহেতু আপনি আর এখানে থাকবেন না।’

    আসমানী বলল, ‘কোথায় লেখাটা—দেখি।’

    তিনি লেখাটা দেখালেন। আসমানী বলল, ‘কে লিখেছে?’

    মিসির আলি থেমে-থেমে বললেন, ‘যে লিখেছে তার সঙ্গে আমার দেখা হয় নি, তবে আমি অনুমান করতে পারি, একটি বাচ্চা মেয়ের লেখা। মেয়েটির উচ্চতা চার ফুট দু’ ইঞ্চি। এবং মেয়েটি এই ঘরেই মারা গেছে।’

    আসমানী ভুরু কুঁচকে বলল, ‘এ-সব আপনার অনুমান?’

    ‘জ্বি, অনুমান। তবে যুক্তিনির্ভর অনুমান।’

    ‘যুক্তিনির্ভর অনুমান মানে?’

    ‘এক-এক করে বলি। এটা একটা মেয়ের লেখা তা অনুমান করছি দেয়ালে আঁকা কিছু ছবি দেখে। সবুজ মার্কারে আঁকা বেশ কিছু ছবি আছে, সবই বেণী-বাঁধা বালিকাদের ছবি। মেয়েরা একটা বয়স পর্যন্ত শুধু মেয়েদের ছবি আঁকে।’

    ‘তাই বুঝি?’

    ‘হ্যাঁ, তাই।’

    ‘আর মেয়েটির উচ্চতা কীভাবে আঁচ করলেন?’

    ‘মেয়েটির উচ্চতা আঁচ করেছি আরো সহজে। আমরা যখন দেয়ালে কিছু লিখি, তখন লিখি চোখ বরাবর। মেয়েটি বিছানায় বসে-বসে লিখেছে। সেখান থেকে তার উচ্চতা আঁচ করলাম।’

    ‘দাঁড়িয়েও তো লিখতে পারে। হয়তো মেঝেতে দাঁড়িয়ে লিখেছে।’

    ‘তা পারে। তবে মেয়েটি অসুস্থ। বিছানায় বসে-বসে লেখাই তার জন্যে যুক্তি-সঙ্গত।’

    আসমানী গম্ভীর গলায় বলল, ‘মেয়েটি যে বেঁচে নেই তা কী করে অনুমান করলেন? কাউকে জিজ্ঞেস করেছেন?’

    ‘না, কাউকে জিজ্ঞেস করি নি। এটাও অনুমান। বাচ্চারা দেয়ালে লেখার ব্যাপারে খুবই পার্টিকুলার। যা বিশ্বাস করে তা-ই সে দেয়ালে লেখে। যদি বাচ্চাটি সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে যেত তাহলে অবধারিতভাবে এই লেখার জন্যে সে লজ্জিত বোধ করত এবং হাসপাতাল ছেড়ে যাবার আগে লেখাটি নষ্ট করে যেত।’

    ‘আপনি কী করেন জানতে পারি?’

    ‘মাস্টারি করতাম, এখন করি না। পার্ট টাইম টীচার ছিলাম। অস্থায়ী পোস্ট। চাকরি চলে গেছে।’

    ‘আপনি আমাকে দেখে কি আমার সম্পর্কে কিছু বলতে পারেন?’

    ‘একটা সামান্য কথা বলতে পারি—আপনার আসল নাম আসমানী নয়। অন্য কিছু।’

    ‘এ-রকম মনে হবার কারণ কী?’

    ‘আসমানী নামটি আপনি এমনভাবে বললেন যাতে আমার কাছে মনে হল অচেনা একটি শব্দ বলছেন। তার চেয়েও বড় কথা আপনার পরনে আসমানী রঙের একটি শাড়ি। শাড়িটি পরার পর থেকেই হয়তো আসমানী নামটা আপনার মাথায় ঘুরছে। প্রথম সুযোগে এই নামটি বললেন।’

    ‘আমার ডাক নাম “বুড়ি”।’

    মিসির আলি কিছু বললেন না। তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। বুড়ি বলল, ‘আপনি অনুমানগুলি কীভাবে করেন?’

    ‘লজিক ব্যবহার করে করি। সামান্য লজিক। লজিক ব্যবহার করার ক্ষমতা সবার মধ্যেই আছে। বেশির ভাগ মানুষই তা ব্যবহার করে না। যেমন আপনি ব্যবহার করছেন না। ভেবে বসে আছেন চার শ’ নয় নম্বর ঘরটি আপনার জন্যে লাকি। এ-রকম ভাবার পিছনে কোনো লজিক নেই।’

    ‘লজিকই কি এই পৃথিবীর শেষ কথা?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘আপনি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে লজিকই হচ্ছে পৃথিবীর শেষ কথা—। লজিকের বাইরে কিছু নেই? পৃথিবীর সমস্ত রহস্যের সমাধান আছে লজিকে, পারবেন বলতে?’

    ‘পারব।’

    ‘ভালো কথা। শুনে খুশি হলাম। আমি কি আপনার নাম জানতে পারি?’

    ‘আমার নাম মিসির আলি। আপনি কি কাল ভোরে এই কেবিনে আসতে চান? না মত বদলেছেন?’

    ‘আমি কাল ভোরে চলে আসব। যাই মিসির আলি সাহেব। স্লামালিকুম।’

    মেয়েটি নিজের কেবিনে ফিরে গেল। রাত দশটার ভেতর সে চার শ’ নয় নম্বর কেবিনে আগের রুগীর যাবতীয় তথ্য জোগাড় করল। এই কেবিনে ‘লাবণ্য’ নামের দশ বছর বয়সী একটি মেয়ে থাকত। হার্টের ভাল্বের কী একটি জটিল সমস্যায় সে দীর্ঘদিন এই ঘরটিতে ছিল। মারা গেছে মাত্র দশ দিন আগে। তার ওজন তেষট্টি পাউণ্ড। উচ্চতা চার ফুট এক ইঞ্চি।

    মিসির আলি সাহেব সামান্য ভুল করেছেন। তিনি বলেছেন চার ফুট দু’ ইঞ্চি। এইটুকু ভুল বোধহয় ক্ষমা করা যায়।

  • মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য

    মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    ‘আপনি কি ভূত দেখেছেন স্যার? ইংরেজিতে যাকে বলে spirit, ghost, astral body মানে প্রেতাত্মার কথা বলছি, অশরীরী……’

    মিসির আলি প্রশ্নটির জবাব দেবেন কি না বুঝতে পারছেন না। কিছু মানুষ আছে যারা প্রশ্ন করে, কিন্তু জবাব শুনতে চায় না। প্রশ্ন করেই হড়বড় করে কথা বলতে থাকে। কথার ফাঁকে-ফাঁকে আবার প্রশ্ন করে, আবার নিজেই জবাব দেয়। মিসির আলির কাছে মনে হচ্ছে তাঁর সামনের চেয়ারে বসে থাকা এই মানুষটি সেই প্রকৃতির। ভদ্রলোক মধ্যবয়স্ক। গোলাকার মুখে পুরুষ্ট গোঁফ। কুস্তিগির-কুস্তিগির চেহারা। কথার মাঝখানে হাসার অভ্যাস আছে। হাসার সময় কোনো শব্দ হয় না, কিন্তু সারা শরীর দুলতে থাকে। ওসমান গনি নামের এই মানুষটির প্রধান বৈশিষ্ট্য অবশ্য নিঃশব্দে হাসার ক্ষমতা নয়; প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাঁর নিচের পাটির একটি এবং ওপরের পাটির দু’টি দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো। যে-যুগে রুট ক্যানালিং-এর মতো আধুনিক দন্ত চিকিৎসা শুরু হয়েছে, সে-যুগে কেউ সোনা দিয়ে দাঁত বাঁধায় না। এই ভদ্রলোক বাঁধিয়েছেন। ধবধবে সাদা দাঁতের মাঝে ঝকঝকে তিনটি সোনালি দাঁত।

    ‘কথা বলছেন না কেন স্যার, ভূত কি কখনো দেখেছেন?’

    ‘জ্বি না।’

    ‘না-দেখাই ভালো। আমি একবার দেখেছিলাম, এতেই অবস্থা কাহিল। ঘাম দিয়ে জ্বর এসে গিয়েছিল। এক সপ্তাহের উপর ছিল জ্বর। পায়ের পাতা চুলকাত। ডাক্তার পরীক্ষা করে বলল—অ্যালার্জি। ডাক্তারদের কারবার দেখুন, আমি বললাম, ভূত দেখে জ্বর এসে গেছে। তার পরেও ডাক্তার বলে অ্যালার্জি। অ্যান্টি হিস্টামিন দিয়েছিল। অ্যান্টি হিস্টামিন কি ভূতের অষুধ, আপনি বলুন?’

    মিসির আলি বললেন, ‘আজ আমার একটু কাজ ছিল। বাইরে যাব। আপনি বরং অন্য একদিন আসুন, আপনার গল্প শুনব।’

    ‘দশ মিনিট লাগবে স্যার। ভূতের গল্পটা বলেই চলে যাব। আমার সঙ্গে একটা মাইক্রোবাস আছে, আপনি যেখানে যেতে চান আপনাকে নামিয়ে দিয়ে যাব। রিকন্ডিশান্ড মাইক্রোবাস। গত আগস্ট মাসে কিনেছি। দু’ লাখ পঁচিশ নিয়েছে।’

    মিসির আলি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আপনি কি খুব অল্পকথায় আপনার ভূত দেখার গল্প বলতে পারবেন? যদি পারেন তাহলে বলুন, গল্প শুনব। খুব যে আগ্রহ নিয়ে শুনব তা না। অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়েরা ভূতের গল্প খুব আগ্রহ করে শোনে। আমার বয়স একান্ন। তার চেয়েও বড় কথা ভূত-প্রেতের ব্যাপারে আমার উৎসাহ কম।’

    ‘আমারো কম। খুবই কম। গল্পটা বলে চলে যাই স্যার।’

    ‘আচ্ছা বলুন। আপনি কি এই গল্প শোনাতেই এসেছেন?’

    ‘দ্যাটস কারেক্ট স্যার। আপনার ঠিকানা পেয়েছি আমার ভাগ্নির কাছ থেকে। সে বইটই পড়ে। বই পড়ে তার ধারণা হয়েছে আপনি দারুণ বুদ্ধিমান। অনেক বড় বড় সমস্যা নাকি সমাধান করেছেন। তখন ভাবলাম, যাই, ভদ্রলোককে দেখে আসি বুদ্ধিমান লোকের সঙ্গে কথা বলেও আনন্দ। গাধা টাইপের লোকের সঙ্গেও অবশ্যি কথা বলে আনন্দ পাওয়া যায়। যাদের বুদ্ধি মাঝামাঝি, এদের সঙ্গে কথা বলে কোনো আনন্দ নেই। আমি আসায় বিরক্ত হন নি তো?’

    ‘না, বিরক্ত হই নি। আপনার কি কোনো সমস্যা আছে?’

    ‘না, কোনো সমস্যা নেই। প্রথম দিন ভূত দু’টাকে দেখে ভয় পেয়ে জ্বর হয়েছিল। এখন আর হয় না।’

    ‘প্রায়ই দেখেন?’

    ‘জ্বি-না। প্রায়ই দেখি না। ধরেন মাসে, দু’মাসে একবার।’

    ‘এরা আপনাকে ভয় দেখায়?’

    ‘না, ভয় দেখায় না। গল্পটা তাহলে বলি—’

    ‘সংক্ষেপ করে বলুন, আমার এক জায়গায় যেতে হবে।’

    ‘আপনি স্যার কোনো চিন্তা করবেন না। আমার মাইক্রোবাস আছে। গত আগস্ট মাসে কিনেছি। নাইনটিন এইটি মডেল……’

    ‘মাইক্রোবাসের কথা আগে একবার শুনেছি। ভূতের কথা কি বলতে চাচ্ছিলেন বলুন।’

    ‘ও হ্যাঁ—আমার হচ্ছে স্যার বিরাট ফ্যামিলি। পাঁচ মেয়ে। সব ক’টার চেহারা খারাপ। মা’র মতো মোটা, কালো, দাঁত উঁচু। একটারও বিয়ে হয় নি। এদিকে আবার আমার ছোট বোনটি মারা গেছে—তার তিন মেয়ে এক ছেলে উঠে এসেছে আমার বাড়িতে। গোদের উপর বিষফোঁড়া। আমার মা, এক খালাও সঙ্গে থাকেন। বাড়িভর্তি মেয়ে। একগাদা মেয়ে থাকলে যা হয়, দিন-রাত ক্যাঁচ-ক্যাঁচ—ক্যাঁচ-ক্যাঁচ। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় ভিসিআর। রোজ রাতে এরা দু’টা করে ছবি দেখে। আমার মা চোখে কিছুই দেখেন না, তিনিও ভিসিআর-এর সামনে বসে থাকেন। শব্দ শোনেন। শব্দ শুনেই হাসেন—কাঁদেন। গলার আওয়াজ শুনে বলতে পারেন কে শ্রীদেবী, কে রেখা। এই হল স্যার বাড়ির অবস্থা।’

    মিসির আলি হতাশ গলায় বলেন, ‘আপনি মূল গল্পটা বলুন। আপনি অপ্রয়োজনীয় কথা বেশি বলছেন।’

    ‘মূল গল্পটা তাহলে বলি। বাড়ির মেয়েগুলির যন্ত্রণায় আমি রাতে ঘুমাই ছাদের চিলেকোঠায়। ছোট্ট ঘর। খাট আছে, ড্রেসিং টেবিল আছে, শুধু বাথরুম নেই—এই একটা অসুবিধা। আমার আবার ডায়াবেটিস আছে, কয়েকবার প্রস্রাব করতে হয়। ছাদে প্রস্রাব করি। কাজের ছেলেটা সকালে এক বালতি পানি দিয়ে ধুয়ে দেয়। কাজের ছেলেটার নাম হল ইয়াসিন।’

    ‘প্লীজ, গল্পটা তাড়াতাড়ি শেষ করুন।’

    ‘জ্বি স্যার, শেষ করছি। গত বৎসর চৈত্র মাসের ছয় তারিখের কথা। রাতে ঘুমাচ্ছি, প্রস্রাবের বেগ হওয়ায় ঘুম ভেঙে গেল। মাথার কাছে টেবিল ল্যাম্প ছিল। টেবিল ল্যাম্প জ্বালালাম। তখনি দেখি ঘরের কোণায় দু’টা ভূত। খুব ছোট সাইজ, লম্বায় এই ধরেন এক ফুটের মতো হবে। গজ-ফিতা দিয়ে মাপি নি। চোখের আন্দাজ। দু’-এক ইঞ্চি এদিক-ওদিক হতে পারে।’

    ‘তারা করছে কী?’

    ‘বই নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। একজনের হাতে সবুজ মলাটের ময়লা একটা বই, অন্যজন সেই বই কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। খিচ-খিচ, খিচ-খিচ করে কথা বলছে। আমি ওদের দিকে তাকাতেই কথা বন্ধ করে ফেলল। আমি তখনো ভয় পাই নি। কারণ হঠাৎ ঘুম ভেঙেছে তো, এরা যে ভূত এইটাই বুঝি নি। কাজেই ধমকের মতো বললাম, ‘এ্যাই, এ্যাই।’

    ‘তখন কী হল?’

    ‘ধমক শুনে হাত থেকে বই ফেলে দিল। তারপর মিলিয়ে গেল। তখন বুঝলাম, এরা ভূত। ছোট সাইজের ভূত। তখন ভয় লাগল। জ্বর এসে গেল।’

    ‘এই আপনার গল্প?’

    ‘জ্বি।’

    ‘আচ্ছা ঠিক আছে। চলুন এখন উঠি।’

    ‘ইন্টারেস্টিং লাগছে না স্যার?’

    ‘জ্বি, ইন্টারেস্টিং।’

    ‘ভূত এত ছোট সাইজের হয়, তা-ই জানতাম না। একটার আবার থুতনিতে অল্প দাড়ি, ছাগলা দাড়ি।’

    ‘আসুন, আমরা উঠি।’

    ওসমান গনি উঠলেন। মনে হল খুব অনিচ্ছায় উঠলেন। তাঁর আরো কিছুক্ষণ বসার ইচ্ছা ছিল। মিসির আলি ঘরে তালা দিতে-দিতে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। ওসমান গনির কথাবার্তা থেকে পরিষ্কার হয়ে গেছে—এই লোক তার ‘ছোট ভূতের’ গল্প বলার জন্য বারবার আসবে। নানানভাবে তাঁকে বিরক্ত করবে। একদল মানুষ আছে, যারা অন্যদের বিরক্ত করে আনন্দ পায়। ইনিও মনে হচ্ছে সেই দলের।

    ‘স্যার।’

    ‘বলুন।’

    ‘ভূতদের ঐ বইটা ড্রয়ারে তালাবন্ধ করে রেখে দিয়েছি।’

    ‘খুব ভালো করেছেন। এই বই তালাবন্ধ থাকাই ভালো।’

    ‘একদিন আপনাকে দেখাতে নিয়ে আসব।’

    ‘কোনো প্রয়োজন নেই। মানুষের বইয়ে আমার আগ্রহ আছে। ভূতের বইয়ের প্রতি আমার আগ্রহ নেই।’

    ‘আমারও নেই। এই জন্যে ড্রয়ারে তালাবন্ধ করে রেখে দিয়েছি। উল্টেও দেখি নি। তার উপর স্যার বইটা থেকে দুর্গন্ধ আসে। গো-মূত্রের গন্ধের মতো গন্ধ।’

    ভদ্রলোক আনন্দিত ভঙ্গিতে হাসলেন। মনে হচ্ছে বইটি থেকে গো-মূত্রের গন্ধ আসায় তিনি আনন্দিত। মিসির আলি মনে বিরক্তি চেপে রাখতে পারলেন না। কঠিন গলায় বললেন, ‘চলুন রওনা হওয়া যাক। আমার জরুরি কাজ আছে।’

    ‘জ্বি আচ্ছা। কাজের সঙ্গে আপোস নাই। আগে কাজ, তারপর অন্য কথা। আমি তাহলে কাল আসি?’

    ‘কাল আসার কি দরকার আছে?’

    ‘দরকার আছে স্যার। ভূতের গল্পটা ভালোমতো বলা হয় নাই। ওরা আমার সঙ্গে কী-সব কথাবার্তা বলে—একটা আছে ফাজিল ধরনের, আমাকে ডাকে ছোট মামা।’

    ‘ভাই শুনুন, আমার কাছে আসার আর দরকার নেই। আমি নিজে অসুস্থ। বিশ্রাম করছি।’

    ‘আপনি তো স্যার বিশ্রামই করবেন। বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে থাকবেন। আমি পাশে বসে গল্প বলব—’

    ‘আপনি দয়া করে আর আসবেন না। আমি একা-একা বিশ্রাম করতে পছন্দ করি।’

    ‘জ্বি আচ্ছা, আসব না। শুধু যদি স্যার আমাকে একটা উপদেশ দেন। কাগজে লিখে দেন, তাহলে খুব ভালো। উপদেশটা মানিব্যাগে রেখে দেব।’

    মিসির আলি হতভম্ব গলায় বললেন, ‘কী উপদেশ?

    ‘লিখবেন— “ওসমান গনি, আপনার মৃত্যু হবে পানিতে ডুবে। খুব সাবধান। খুব সাবধান।” এই লিখে আপনার নামটা সই করবেন।’

    ‘আমি আপনার কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারছি না। এ-সব কথা আমি কেন লিখব?’

    ‘অকারণে লিখতে বলছি না স্যার। কারণ আছে। যে-ভূতটা আমাকে ছোট মামা ডাকে, সে আমাকে বলেছে—আমার মৃত্যু হবে পানিতে ডুবে। আমাকে সাবধান করে দিয়েছে। ভূতের কথা কে বিশ্বাস করে বলেন? কেউ বিশ্বাস করে না। আমিও করি না। এখন যদি আপনি দয়াপরবশ হয়ে লিখে দেন—’

    ‘দেখুন ওসমান গনি সাহেব—এ-জাতীয় কথা আমি কখনো লিখব না। চলুন, আমরা ঘর থেকে বের হই। আকাশের অবস্থা ভালো না—ঝড়-বৃষ্টি হবে।’

    ‘লেখাটা না দিলে আমি স্যার যাব না। লিখে দিলে আর কোনোদিন এসে বিরক্ত করব না। আমি স্যার এককথার মানুষ। মানিব্যাগটা খুললেই আপনার লেখাটা চোখে পড়বে। তখন সাবধান হয়ে যাব। পানির ধারেকাছে যাব না।’

    ‘এটা লিখে দিলে আপনি চলে যাবেন?’

    ‘জ্বি।’

    ‘আর কোনোদিন আসবেন না?’

    ‘বললাম তো স্যার, আমি এককথার মানুষ।’

    ‘বেশ, বসুন। লিখে দিচ্ছি।’

    ‘চা খেতে ইচ্ছা করছে। চিনি ছাড়া এক কাপ চা কি হবে?’

    ‘চা হবে না।’

    ‘আপনার কি প্যাড আছে স্যার? প্যাডে লিখে দিলে ভালো হয়।’

    ‘না, আমার প্যাড নেই।’

    ‘তাহলে নাম সই করে ঠিকানা লিখে দেবেন। আর টেলিফোন নাম্বার, যদি টেলিফোন থাকে।’

    ‘ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। টেলিফোন নেই।’

    ‘টেলিফোন না-থাকাই ভালো। বড়ই যন্ত্রণা। এমন সব আজেবাজে টেলিফোন আসে! এই পর্যন্ত আছাড় দিয়ে আমি ক’টা টেলিফোন ভেঙেছি বলুন তো স্যার?’

    মিসির আলি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘এই নিন আপনার কাগজ। এখন চলুন, যাওয়া যাক। দয়া করে আবার এসে আমাকে বিরক্ত করবেন না।’

    ‘স্যার থ্যাংকস। খুব উপকার করেছেন।’

    ওসমান গনি রাস্তায় নেমে বিস্মিত হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন। কোনো মাইক্রোবাস দেখা যাচ্ছে না। মিসির আলি বললেন, ‘আপনার মাইক্রোবাস কোথায়?’ ওসমান গনি খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘নতুন ড্রাইভার। বাস নিয়ে পালিয়ে গেছে বোধহয়। আপনি কী বলেন স্যার?’

    মিসির আলি কী বলবেন ভেবে পেলেন না। যে-চায়ের দোকানের সামনে মাইক্রোবাসটি দাঁড়িয়ে ছিল, সেই চায়ের দোকানিকে জিজ্ঞেস করা হল। সে বলল, তার দোকানের সামনে কখনোই কোনো মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে ছিল না।

    ওসমান গনি চিন্তিত গলায় বললেন, ‘বিরাট সমস্যা হয়ে গেল। আমি এখন বাসায় যাব কী করে? আমার তো বাসার ঠিকানা মনে নেই।’

    ‘আমি আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। বাসার ঠিকানা মনে নেই মানে?’

    ‘আমার কিছু মনে থাকে না। ও, আচ্ছা আচ্ছা, নোটবুকে ঠিকানা লেখা আছে। স্যার, আপনি আমাকে একটা রিকশা ঠিক করে দিন। আর নোটবই দেখে ঠিকানাটা রিকশাওয়ালাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিন। কী যন্ত্রণার মধ্যে পড়লাম দেখুন তো!’

    মিসির আলি নোটবই খুললেন। সেখানে প্রথমে বাংলা এবং পরে ইংরেজিতে লেখা—

    “ইনি মানসিকভাবে অসুস্থ।

    দয়া করে তাঁকে সাহায্য করুন। তাঁর বাসার ঠিকানা………….”

    ‘স্যার, ঠিকানাটা লেখা আছে না?’

    ‘আছে।’

    ‘পরের পৃষ্ঠায় ডায়াগ্রাম আছে। ডায়াগ্রাম দেখে রিকশাওয়ালাকে বুঝিয়ে দিন, ও নিয়ে যাবে।’

    মিসির আলি নোটবই হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন। এ-জাতীয় ঝামেলায় তিনি আগে পড়েন নি। ওসমাস গনি নিজেই রিকশা ডেকে আনলেন। তাঁকে বেশ উৎফুল্ল মনে হল। মিসির আলি রিকশাওয়ালাকে বুঝিয়ে দিলেন কীভাবে যেতে হবে। ওসমান গনি বললেন, ‘স্যার, তাহলে যাই। আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল। কারো সঙ্গে কথা বলে আজকাল আরাম পাই না। এই জন্যেই ছাদের ঘরে একা-একা থাকি। বড় ভালো লাগল স্যার। তবে সব ভালো দিকের যেমন মন্দ দিক আছে—এটারও আছে। মাইক্রোবাসটা চুরি হয়ে গেল। বাসায় ফিরেও শান্তি নেই। থানা-পুলিশ করতে হবে।’

    মিসির আলি বললেন, ‘আমি কি আসব আপনার সঙ্গে?’

    ওসমান গনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘না না না। কোনো প্রয়োজন নেই। এ-রকম আগেও হয়েছে, রিকশা করে চলে গেছি। আচ্ছা স্যার, যাই। আপনিও বাসায় চলে যান। রাত অনেক হয়ে গেছে। এত রাতে কোথাও যাওয়া ঠিক না। তা ছাড়া আমার মনে হয় আপনার আসলে কোথাও যাবারও কথা না। আমার হাত থেকে বাঁচার জন্য বলেছেন— ‘কাজ আছে।’ বুদ্ধিমান লোকেরা এ-রকম করে। আপনি স্যার আসলেই বুদ্ধিমান।’ ওসমান গনি নিঃশব্দে গা দুলিয়ে হাসতে লাগলেন।

    মিসির আলি ঘরে ফিরলেন খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে। বিভ্রান্তির অনেকগুলি কারণ। প্ৰথম কারণ—ওসমান গনিকে মানসিক রুগী বলে মনে হচ্ছে না। যে-মানুষ খুঁজে খুঁজে তার ঠিকানা বের করতে পারে, সে নোট বইয়ে লেখা পড়ে বাসায় ফিরে যেতে পারে না, তা হয় না।

    লোকটি যে পাগল সাজার ভান করছে তাও না। যে ভান করবে, সে সারাক্ষণই করবে। আসল পাগলের চেয়ে নকল পাগল অনেক বেশি পাগলামি করে। মিসির আলি যে তাকে বিদেয় করবার জন্যে বলছেন—‘তাঁর কাজ আছে’, এই ব্যাপারটি ওসমান গনির কাছে ধরা পড়েছে। নকল পাগল হলে তা সে কখনো স্বীকার করত না। চেপে যেত। তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? রাতে ঘুমুতে যাবার সময় মিসির আলি বালিশের কাছে রাখা খাতায় পেনসিলে অস্পষ্টভাবে লিখলেন—

    নাম : ওসমান গনি।

    বয়স : পঞ্চাশের কাছাকাছি।

    বিশেষত্ব : তিনটি সোনাবাঁধানো দাঁত। হাসেন কোনো রকম শব্দ না করে।

    (১) কেন এসেছিলেন? বুঝতে পারা যাচ্ছে না।

    (২) অন্যরা দাবি করছে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ। তিনি নিজে দাবি করছেন না।

    (৩) তবে তিনি যে ভৌতিক গল্পের কথা বলছেন, তা মানসিক অসুস্থতার দিকেই ইঙ্গিত করে।

    (৪) লোকটি বিত্তবান বলেই মনে হল। কারণ তিনি যে-তেতলা বাড়ির কথা বললেন, সেই বাড়িটি তাঁর হওয়ারই সম্ভাবনা। নোটবইয়ের ঠিকানায় গুলশানের কথা লেখা। গুলশান বিত্তবানদের এলাকা।

    (৫) ভদ্রলোকের হাতে পাথর-বসানো তিনটি আঙটি, ব্যবসায়ীরা সাধারণত পাথর-টাথরে বিশ্বাসী হয়। তিনি সম্ভবত একজন ব্যবসায়ী।

    রাত এগারটা পাঁচ মিনিটে মিসির আলি বাতি নিভিয়ে ঘুমুতে গেলেন। কঠিন নিয়মে তিনি এখন নিজেকে বাঁধার চেষ্টা করছেন। ঘুম আসুক না-আসুক, রাত এগারটা বাজতেই বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়বেন। ঘুম আনানোর যে-সব প্রক্রিয়া আছে সেগুলি প্রয়োগ করবেন। তার পরেও যদি ঘুম না আসে কোনো ক্ষতি নেই। বিছানায় গড়াগড়ি করবেন। উঠবেন ভোর পাঁচটায়। ঘুম পাড়িয়ে দেবার কোনো যন্ত্র আবিষ্কৃত হয় নি, কিন্তু ঘুম ভাঙানোর যন্ত্র আছে। তিনি দু’ শ’ ত্রিশ টাকা দিয়ে একটি অ্যালার্ম-ঘড়ি কিনেছেন। এই ঘড়ি ভোর পাঁচটায় এমন হৈচৈ শুরু করে যে, কার সাধ্য বিছানায় শুয়ে থাকে! বিজ্ঞানের এই সাফল্যের দিনে ঘুম আনার যন্ত্র বের হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। অ্যালার্ম-ঘড়ি যে-হারে বিক্রি হয়, ঘুম-ঘড়িও সেই হারে বিক্রি হবে।

    ঘুম আনানোর প্রক্রিয়াগুলি কাজ করছে না। মিসির আলি সাত শ’ ভেড়া গুনলেন। এই গুণন প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের ক্লান্ত হয়ে যাবার কথা। ক্লান্ত হবার পরিবর্তে মস্তিষ্ক আরো উত্তেজিত হল। মনে-মনে গল্প বললেও নাকি ঘুম আসে। গল্প বলার সময় ভাবতে হয়, এক দল ঘুম-ঘুম চোখের শিশুরা গল্প শুনছে। মিসির আলি গল্প শুরু করলেন। সব গল্প শুরু হয় এইভাবে—এক দেশে ছিল এক রাজা। তাঁর গল্পটা একটু অন্য রকম হল—এক দেশে ছিল এক রানী। রানীর দুই রাজা। সুয়োরাজা এবং দুয়োরাজা। সুয়োরাজাটা বড়ই ভালো………।

    কল্পনার শিশুদের একজন প্রশ্ন করল, ‘সুয়োরাজার নাম কি?’

    ‘সুয়োরাজার নাম হচ্ছে ওসমান গনি। মোটাসোটা একজন মানুষ, পঞ্চাশের মতো বয়স। হাতে তিনটা আঙটি। এর মধ্যে একটা আঙটি হচ্ছে নীলার। সুয়োরাজার তিনটা দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো……’

    কল্পনার শিশুটি বলল, ‘এ আবার কেমন রাজা?’

    মিসির আলি বিছানা থেকে উঠে পড়লেন। বাতি জ্বালালেন না, অন্ধকারেই বাথরুমে ঢুকে চোখে-মুখে পানি ঢাললেন। বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে সিগারেট ধরালেন, যদিও তাঁর বর্তমান নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন পদ্ধতিতে রাত এগারটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত কোনো সিগারেট খাবার ব্যবস্থা নেই। তিনি একধরনের অস্বস্তি বোধ করছেন, একধরনের বিভ্রান্তি—যা ওসমান গনি নামের মানুষটি তৈরি করে গেছেন। মাথা থেকে বিভ্রান্তি তাড়াতে পারছেন না। স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে আছে। বারান্দায় প্রচুর হাওয়া, আকাশ মেঘলা। শ্রাবণের ধারাবর্ষণ সম্ভবত শুরু হবে। তাঁর শীত-শীত লাগছে। জ্বলন্ত সিগারেট হাতে নিয়েই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। সিগারেট পুড়তে পুড়তে একসময় তাঁর হাতেই নিভে গেল। তাঁর ঘুম ভাঙল ভোর পাঁচটায়। দু’ শ’ ত্ৰিশ টাকায় কেনা অ্যালার্ম-ঘড়ি তাঁকে যথাসময়ে ডেকে তুলল।

    তিনি হাতমুখ ধুলেন। কেরোসিন কুকারে চা বানিয়ে খেলেন। খানিকক্ষণ ফ্রী-হ্যান্ড একসারসাইজ করলেন। এও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন পদ্ধতির অংশ। ডাক্তার বিশেষভাবে বলে দিয়েছেন। পাথরের মতো মুখ করে বলেছেন, ‘মিসির আলি সাহেব, আপনার শরীরের কলকব্জা সবই নষ্ট হয়ে গেছে। এটা কি আপনি জানেন?’

    মিসির আলি হাসতে-হাসতে বললেন, ‘জানি।’

    ‘আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে চান, না এখনি মরে যেতে চান?’

    ‘অল্প কিছুদিন বাঁচতে চাই।’

    ‘কতদিন?’

    ‘এই ধরুন এক বৎসর।’

    মিসির আলি ভেবেছিলেন ডাক্তার বলবেন, এক বৎসর কেন? ডাক্তার সে-প্রশ্ন করলেন না, খসখস করে প্রেসক্রিপশনে একগাদা কথা লিখতে লাগলেন।

    ভোরবেলা খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে পনের মিনিট ফ্রী-হ্যান্ড একসারসাইজ হচ্ছে তার একটি। একসারসাইজের পর এক ঘণ্টা প্রাতঃভ্রমণের ব্যাপার আছে। ডাক্তার সাহেব লিখে দিয়েছেন—ঝড় হোক, টাইফুন হোক, ভূমিকম্প হোক—এক ঘণ্টা হাঁটতেই হবে।

    এখন ঝড়, টাইফুন বা ভূমিকম্প কোনোটাই হচ্ছে না। টিপটিপ করে বৃষ্টি অবশ্যি পড়ছে। সেই বৃষ্টি অগ্রাহ্য করে বের হওয়া যায়। ছাতা মাথায় প্রাতঃভ্রমণ মন্দ নয়। সকালবেলা এই বেড়ানোটা তাঁর খারাপ লাগে না। বিচিত্র সব চরিত্র দেখা যায়। একদল মানুষ প্রাতঃভ্রমণকে প্রায় উপাসনার পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। উপাসনার যেমন কিছু নিয়ম আছে, এদেরও আছে। আরেক দল আছে ‘খাদক’ জাতীয়। ভ্রমণের এক পর্যায়ে বিশাল টিফিন-ক্যারিয়ার খুলে হাউহাউ করে পরোটা-গোস্ত যেভাবে গিলতে থাকেন, তাতে মনে হয় তাঁদের সৃষ্টি করা হয়েছে খোলা মাঠে বসে গোস্ত-পরোটা খাবার জন্যে।

    মিসির আলি বেরুবার মুখে বাধা পেলেন। গেটের কাছে আসতেই ত্ৰিশ পঁয়ত্রিশ বছর বয়েসী এক ভদ্রলোক এসে শীতল গলায় বললেন, ‘আপনি কি বেরুচ্ছেন?’

    মিসির আলি বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ।’

    ‘কাল রাতে ওসমান গনি নামের কেউ কি আপনার কাছে এসেছিলেন?’

    ‘এসেছিলেন।’

    ‘ঐ বিষয়ে আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলব। আমি পুলিশের লোক। ইন্সপেক্টর অব পুলিশ। আমার নাম রকিবউদ্দিন।’

    মিসির আলি সহজ গলায় বললেন, ‘ওসমান গনি কি মারা গেছেন?’

    ‘হ্যাঁ, মারা গেছেন। আপনি কী করে জানলেন?’

    ‘অনুমান করেছি। আমার অনুমানশক্তি ভালো।’

    ‘অনুমানশক্তি ভালো থাকাই ভালো। আসুন, কথা বলি। বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হোম মিনিস্টার নিজেই ইন্টারেস্ট দেখিয়েছেন। বেশিক্ষণ আমি আপনাকে বিরক্ত করব না। প্রাথমিকভাবে আধ ঘণ্টার মতো কথা বলব। পরে আবার আসব।’

    ‘রকিবউদ্দিন সাহেব, এখন তো আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারব না। এখন মর্নিং-ওয়াকে যাচ্ছি। এক ঘণ্টা মর্নিং-ওয়াক করব। আপনাকে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে।’

    ‘এক ঘণ্টা অপেক্ষা করা সম্ভব নয়, আপনাকে এক্ষুণি কথা বলতে হবে।’

    ‘এমন কোনো আইন কি আপনাদের আছে যে পুলিশ যখন কথা বলতে চাইবে তখনি কথা বলতে হবে?’

    ‘আইনের বিষয় নয়, হোম মিনিস্টার নিজে বলেছেন। তিনি বিষয়টায় খুব আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’

    ‘আমি এই মুহূর্তে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছি না। কাজেই আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। আমি আমার ঘরের চাবি দিয়ে দিচ্ছি, আপনি আমার ঘরে অপেক্ষা করতে পারেন। তবে আপনার যদি ধারণা হয় আমি পালিয়ে যেতে পারি, তাহলে আপনি আমার সঙ্গেও আসতে পারেন।’

    ‘ঠিক আছে, আমি অপেক্ষা করব। আপনি দেরি করবেন না। দিন, ঘরের চাবি দিন।’

    মিসির আলি চাবি দিয়ে গেট খুলে রওনা হলেন। রাস্তার মোড় পর্যন্ত গিয়ে একবার পিছনে ফিরলেন। ইন্সপেক্টর সাহেব আগের জায়গায় চাবি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। ভদ্রলোকের মুখ শ্রাবণ মাসের আকাশের চেয়েও মেঘলা।

    বৃষ্টি জোরেসোরে পড়া শুরু করেছে। রাস্তায় নোংরা পানি। পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ময়লা পানিতে ডুবিয়ে প্রাতঃভ্রমণে যাবার কোনো মানে হয় না—তবু মিসির আলি যাচ্ছেন। ঝড় হোক, টাইফুন হোক, ভূমিকম্প হোক—তাঁকে এক ঘণ্টা হাঁটতে হবে। সকালের খোলা হাওয়া গায়ে লাগাতে হবে। এক বৎসর তাঁকে বেঁচে থাকতে হবে। দেখা যাক, ডাক্তারের উপদেশ মেনে কতদূর কি হয়।

    আজ শরীর অন্যদিনের চেয়েও বেশি খারাপ লাগছে। চোখ জ্বালা করছে, কোনো কিছুর দিকেই বেশি সময় তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না। শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নষ্ট হতে শুরু করেছে। শুধু শরীর নয়—মনও নষ্ট হতে শুরু করেছে। ওসমান গনির মৃত্যুসংবাদ তাঁকে বিচলিত করে নি। করা উচিত ছিল। খ্রিস্টানরা মৃত্যুসংবাদে গির্জায় ঢং-ঢং করে ঘণ্টা বাজায়। নিয়মটা সুন্দর। সবাইকে জানিয়ে দেয়া—শোন, তোমরা শোন।! তোমাদের একজন চলে গিয়েছে—ঢং ঢং ঢং……

    ‘কেমন আছেন মিসির আলি সাহেব?’

    মিসির আলি তাকালেন—অপরিচিত একজন মানুষ। অপরিচিত মানুষদের প্রশ্নের জবাব খুব অল্প কথায় দিতে হয়, কিন্তু মিসির আলি একটি দীর্ঘ বাক্য বললেন, ‘আমি ভালো না। শরীর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—মনও নষ্ট হচ্ছে। অপেক্ষা করছি ঘণ্টার জন্যে, ঢং ঢং ঢং। ভাই যাই।’

    অপরিচিত ভদ্রলোক অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। তিনি এতটা অবাক হচ্ছেন কেন তাও মিসির আলি ধরতে পারলেন না।

  • দ্বিতীয় খণ্ড

    দ্বিতীয় খণ্ড

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    দ্বিতীয় খণ্ড

    ‘মিসির আলি অমনিবাস’ দ্বিতীয় খণ্ড; প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ২০০৬; প্রচ্ছদ : প্রতীক ডট ডিজাইন। প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা ৪৬/২ হেমেন্দ্র দাস রোড, সূত্রাপুর, ঢাকা-১১০০-‘র পক্ষে এফ. রহমান কর্তৃক প্রকাশিত এবং নিউ পূবালি মুদ্রায়ণ, ৪৬/১ হেমেন্দ্র দাস রোড সূত্রাপুর, ঢাকা-১১০০ কর্তৃক মুদ্রিত। একমাত্র পরিবেশক : অবসর প্রকাশনা সংস্থা; বিক্রিয় কেন্দ্র : ৩৮/২ক বাংলাবাজার (দোতলা), ঢাকা-১১০০। ‘মিসির আলি অমনিবাস’ দ্বিতীয় খণ্ডে যে সকল উপন্যাস আছে—

      উৎসর্গ

      জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

      প্রিয় মানুষ ও প্রিয় অভিনেতা

      মিসির আলির কথা

      আমি একবার এক বিয়ের দাওয়াতে গেছি। বিয়ের দাওয়াত মানে খাসির রেজালা, রোস্ট-পোলাও নিয়ে হৈচৈ। এতবড় একটা অনুষ্ঠান কী করে শুধুমাত্র খাওয়া-নির্ভর হয় আমি জানি না। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। যাই হোক আমি বসে আছি এক কোনায়; নিমন্ত্রিত অতিথিরা আসছেন, দ্রুত টেবিলের দিকে ছুটে যাচ্ছেন। সে এক দৃশ্য। এক পর্যায়ে আমিও ছুটে গেলাম। ‘যস্মিন দেশে যদাচার’। খেতে বসে মেজাজ খুব খারাপ হল। পোলাও ঠাণ্ডা, রোস্ট ঠাণ্ডা, খাসির রেজালায় সরের মতো চর্বি জমে আছে। ঠাণ্ডা খাবার দেখে নিমন্ত্রিতরা কেউ বিচলিত হলেন না। প্লেটের পর প্লেট নেমে যেতে লাগল। এর মধ্যে শুরু হল আরেক ঝামেলা; নিমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে দু’জন মিসির আলিকে নিয়ে বিরাট তর্কযুদ্ধে নেমে গেলেন। (তাদের উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই আমাকে শুনানো তবে তারা কেউই আমাকে চিনেছেন এমন ভাব দেখালেন না)। একজন বলছেন মিসির আলিকে যতটা বুদ্ধিমান মনে হয় ততটা বুদ্ধিমান তিনি না। অন্য জন বলছেন তিনি যথেষ্টই বুদ্ধিমান তবে তিনি আবেগ-নির্ভর মানুষ বলেই বুদ্ধিটা স্পষ্ট হয় না। আমি অপেক্ষা করছি কখন তাঁরা আমাকে সালিশ মানবেন তার জন্যে। উত্তরে কী বলব ভেবে রাখা দরকার। মাথায় কিছু আসছে না। তখন একটা ঘটনা ঘটল, নতুন রেজালার বাটি নিয়ে উর্দি পরা বয় এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ আলোচনা শুনল এবং আমাকে বিস্মিত করে ঘোষণা করল, মিসির আলি সাহেবের বুদ্ধির কোনো তুলনা নাই।

      মুহূর্তের মধ্যে আমার মন ভালো হয়ে গেল। বিয়ে বাড়ির কোলাহল সংগীতের মতো মনে হল। ঠাণ্ডা খাবার যথেষ্ট আনন্দ নিয়ে খেলাম। মিসির আলি নামের মানুষটার প্রতি খানিকটা ঈর্ষাও বোধ করলাম।

      মিসির আলি অমনিবাসের দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হচ্ছে। অভিনন্দন মিসির আলিকে, অভিনন্দন প্রতীক প্রকাশনীকে।

      হুমায়ূন আহমেদ

      দখিন হাওয়া, ধানমণ্ডি

      ১৮-১২-২০০৫

    • আমি এবং আমরা

      আমি এবং আমরা

      হুমায়ূন আহমেদ

      [book]

      মিসির আলি দু শ গ্রাম পাইজং চাল কিনে এনেছেন। চাল রাখা হয়েছে একটা হরলিক্সের কৌটায়। গত চারদিন ধরে তিনি একটা এক্সপেরিমেন্ট করছেন। চায়ের চামচে তিন চামচ চাল তিনি জানালার পাশে ছড়িয়ে দেন। তারপর একটু আড়াল থেকে লক্ষ করেন—কী ঘটে। যা ঘটে তা বিচিত্র। অন্তত তাঁর কাছে বিচিত্র বলেই মনে হয়। দুটা চড়ুই পাখি চাল খেতে আসে। একটি খায়, অন্যটি জানালার রেলিঙে গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে থাকে। ব্যাপারটা রোজই ঘটছে। পক্ষী সমাজে পুরুষ স্ত্রী পাখির চেয়ে সুন্দর হয়, কাজেই ধরে নেওয়া যায় যে পাখিটি চাল খাচ্ছে সেটা পুরুষ পাখি। গম্ভীর ভঙ্গিতে যে বসে আছে, সে তার স্ত্রী কিংবা বান্ধবী। পক্ষী সমাজে বিবাহ প্রথা চালু আছে কিনা মিসির আলি জানেন না। একটি পুরুষ পাখি একজন সঙ্গিনী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে, না সঙ্গিনী বদল করে—এই ব্যাপারটা মিসির আলির জানতে ইচ্ছা করছে। জানেন না। পক্ষী বিষয়ক প্রচুর বই তিনি যোগাড় করেছেন। বইগুলোতে অনেক কিছুই আছে, কিন্তু এই জরুরি বিষয়টা নেই।

      পাবলিক লাইব্রেরিতে পুরোনো একটি বই পাওয়া গেল—ইরভিং ল্যাংস্টোনের ‘The Realm of Birds’. সেখানে পাখিদের বিচিত্র স্বভাবের অনেক কিছুই লেখা, কিন্তু কোথাও নেই একটি পাখি খাবে, অন্যটি দূরে দাঁড়িয়ে দেখবে। রহস্যটা কী? এই পাখিটির কি খিদে নেই? নাকি সে এক ধরনের উপবাসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে? পক্ষী বিশারদরা কী বলেন? বিশারদদের ব্যাপারে মিসির আলির এক ধরনের এ্যালার্জি আছে। বিশেষজ্ঞদের কিছু জিজ্ঞেস করলেই তাঁরা এমন ভঙ্গিতে তাকান যেন প্রশ্নকর্তার অজ্ঞতায় খুব বিরক্ত হচ্ছেন। প্রশ্ন পুরোপুরি না শুনেই জবাব দিতে শুরু করেন। সেই জবাব বেদবাক্যের মতো গ্রহণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের জবাবের ওপর প্রশ্ন করা যাবে না। বিনয় নামক সদ্গুণটি বিশেষজ্ঞদের নেই। দীর্ঘদিন পড়াশোনা করে তাঁরা যা শেখেন তার চেয়ে অনেক বেশি শেখেন—অহংকার প্রকাশের কায়দাকানুন। পাখির ব্যাপারটাই ধরা যাক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একজন অধ্যাপকের কাছে গিয়েছিলেন। সেই ভদ্রলোক সমস্যা পুরোপুরি না শুনেই বললেন, এটা কোনো ব্যাপার না। খিদে নেই তাই খাচ্ছে না, পশু ও প্রাণিজগতের নিয়ম হল খিদেয় খাদ্য গ্রহণ করা একমাত্র মানুষই খিদে না থাকলেও লোভে পড়ে খায়।

      মিসির আলি বললেন, প্রতিদিন একটা পাখির খিদে থাকবে না, অন্য একটার থাকবে—এটা কি যুক্তিযুক্ত?

      ‘একটা বিশেষ পাখিই যে খাচ্ছে না তাইবা আপনি ধরে নিচ্ছেন কেন? সব পাখি দেখতে এক রকম। একদিন একটা খাচ্ছে, অন্যদিন আরেকটা খাচ্ছে।’

      ‘আমি পাখি দুটাকে চিনি। খুব ভালো করে চিনি। অসংখ্য চড়ুই পাখির মধ্যেও আমি এদের আলাদা করতে পারব।’

      অধ্যাপক ভদ্রলোক অনেকক্ষণ গা দুলিয়ে হাসলেন। তারপর ছোট শিশুকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন—একটা মশা আপনার গায়ে কামড় দিল, তারপর সেটা উড়ে গিয়ে অন্য মশাদের সঙ্গে মিশল। আপনি কি সেই মশাটা আলাদা করতে পারবেন?

      ‘না।’

      ‘যদি না পারেন তা হলে চড়ুই পাখিও আলাদা করতে পারবেন না। পুরুষ চড়ুই এবং মেয়ে চড়ুই দেখতে এক রকম। ভাই, এখন আপনি যান। এগারোটার সময় আমার ক্লাস, আমি কিছুক্ষণ পড়াশোনা করব।’

      ভদ্রলোক মিসির আলিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ডিকশনারি সাইজের এক বই খুলে পড়তে শুরু করলেন। ভাবটা এরকম যে আজেবাজে লোকের সঙ্গে কথা বলে নষ্ট করার মতো সময় তাঁর নেই। দেখা যাচ্ছে, সবাই ব্যস্ত। সবারই সময়ের টানাটানি। একমাত্র তাঁরই অফুরন্ত সময়। সময় কাটানোই তার সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুই করার নেই। মিসির আলির ডাক্তার তাঁকে বলেছেন—একজন মানুষের শরীরে যত ধরনের সমস্যা থাকা সম্ভব তার সবই আপনার আছে। লিভারের প্রায় পুরোটাই নষ্ট করে ফেলেছেন। অগ্ন্যাশয় থেকে সিক্রেশন হচ্ছে না। রক্তে ডাবলিউ বিসি-র পরিমাণ খুব বেশি। আপনার হার্টেরও সমস্যা আছে, ড্রপ বিট হচ্ছে। আপনাকে যা করতে হবে তা হল—দিনের পর দিন বিছানায় শুয়ে থাকা। বুঝতে পারছেন?

      ‘পারছি।’

      ‘সিগারেট ছেড়েছেন?’

      ‘এখনো ছাড়ি নি তবে শিগগিরই ছাড়ব।’

      ‘উপদেশ দিতে হয় বলে দিচ্ছি। মনে হয় না আপনি আমার উপদেশের প্রতি কোনো রকম গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারপরেও বলি—মন থেকে সমস্ত সমস্যা ঝেঁটিয়ে দূর করুন। যা করবেন তা হল বিশ্রাম। গান শুনবেন, পার্কে বেড়াবেন, হালকা বইপত্র পড়তে পারেন। রাত জাগা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মনে থাকবে?’

      ‘জি থাকবে।’

      ‘আমি জানি আপনি এর কোনোটাই করবেন না।’

      মিসির আলি হেসে ফেললেন। হাসতে হাসতে বললেন, আমি আপনার উপদেশ মেনে চলব। দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার জন্যে যে উপদেশ মানব তা না। শরীরটা সত্যি সত্যি সারাতে চাচ্ছি। অসুস্থতা অসহ্য বোধ হচ্ছে।

      ডাক্তার সাহেব বললেন, আপনি মুখে বলছেন কিন্তু আসলে কিছুই করবেন না। কিছু কিছু মানুষ আছে অন্যের উপদেশ সহ্য করতে পারে না। আপনি সেই দলের।

      ডাক্তারের কথা ভুল প্রমাণিত করে মিসির আলি ডাক্তারের উপদেশ মতোই চলছেন। রাত নটার মধ্যেই ভাত খান, দশটা বাজতেই শুয়ে পড়েন। সমস্যা হল—ঘুম আসে না। মানুষ কম্পিউটার না। নির্দিষ্ট সময়ে তাকে ঘুম পাড়ানো সম্ভব না। মিসির আলি গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন। এক এক রাতে এক এক ধরনের বিষয় নিয়ে ভাবেন। ইচ্ছে করে যে ভাবেন তা না। ভাবনাগুলোর যেন প্রাণ আছে, তারা নিজেরাই আসে। মিসির আলিকে বিরক্ত করে তারা যেন এক ধরনের আনন্দ পায়। ইদানীং তিনি চড়ুই পাখি নিয়ে ভাবেন। পাখি মানুষ চিনতে পারে কি পারে না এই তাঁর রাতের চিন্তার বিষয়। কোনো মানুষ যদি রোজ রোজ পাখিকে খাবার দেয় তা হলে সেই পাখিগুলো কি ঐ মানুষটিকে চিনে রাখবে?

      রাতে ঘুমের ঠিক না থাকলেও তাঁর ঘুম ভাঙে খুব ভোরে। ঘুম ভেঙে পার্কে বেড়াতে যান। দুপুরে খাওয়ার পর দরজা-জানালা বন্ধ করে শুয়ে পড়েন। বিকেলে পার্কে গিয়ে বসেন। তার বসার নির্দিষ্ট বেঞ্চ আছে। পা তুলে বেঞ্চিতে বসে তিনি গাছপালার সৌন্দর্য দেখতে চেষ্টা করেন, যদিও গাছপালা তাকে কখনোই আকৃষ্ট করে না। ডাক্তার হালকা বই পড়তে বলেছে। তিনি ‘হাসি হাসি হাসি’ এই নামে একটা তিন শ পৃষ্ঠার বই কিনে এনেছেন। বইটিতে দু হাজার একটি ‘জোক’ আছে। তিনি প্রথম পৃষ্ঠা থেকে পড়ে পড়ে এখন তেত্রিশ পৃষ্ঠায় এসেছেন—এখনো তাঁর হাসি আসে নি। এই বইটির দাম পড়েছে এক শ টাকা। মনে হচ্ছে এক শ টাকাই পানিতে গেছে।

      আরেকটি বই ফুটপাত থেকে কিনেছেন দু টাকা দিয়ে। বইটির নাম বেহুলার বাসরঘরের ইতিহাস। এই বইটি বরং ভালো। অনেক চিন্তাভাবনা করার ব্যাপার আছে। যেমন লখিন্দরের বাবার নাম চাঁদ সদাগর। চাঁদ সদাগর সম্পর্কে বলা হচ্ছে—

      কালীদহে পড়ে চাঁদ পান করে জল

      ক্ষণকাল যায় ভেসে ক্ষণে হয় তল।

      সপ্তদিন নবম রাত্রি ভাসিল সাগরে

      ইচামাছ বাসা বাঁধে দাড়ির ভিতরে…।

      অর্থাৎ চাঁদ সদাগরের দাড়িতে ইচামাছ বাসা বেঁধেছে। সাগরের ইচামাছ হচ্ছে গলদা চিংড়ি। এরা কী করে দাড়ির ভেতর বাসা বাঁধবে? রূপক অর্থে বলা হচ্ছে? রূপকের চিত্রকল্প তো বাস্তব হওয়া উচিত। অবাস্তব চিত্রকল্প দিয়ে রূপক তৈরি করার মানে কী? তা ছাড়া ‘সপ্তদিন নবম রাত্রি ভাসিল সাগরে’ বাক্যটির মানেই বা কী? সপ্তদিন সাগরে ভাসলে সপ্তরাতও ভাসতে হবে। অবিশ্যি শুরুতে এক রাত ভেসেছে এবং শেষে এক রাত ভেসেছে এই ভাবে ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। তাতেও শেষ রক্ষা হয় না, কারণ চাঁদ সদাগরের নৌকাডুবি রাতে হয় নি। হয়েছে দিনে।

      মিসির আলি পার্কে তাঁর নির্দিষ্ট বেঞ্চিতে বসে আছেন। তাঁর পাশে দুটি বই। একটি হল বেহুলার বাসরঘরের ইতিহাস, অন্যটি— The Birds, Their habits. তিনি বই পড়ছেন না। বেশ আগ্রহ নিয়ে খেলা দেখছেন। বাচ্চারা ফুটবল খেলছে। ফুটবল খেলার মতো ফাঁকা জায়গা এই পার্কে নেই। চারদিকে গাছগাছালি। এর মধ্যেই বাচ্চারা খেলছে। কে কোন দলে খেলছে এটা বের করাই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছেলেরাও যার যেদিকে ইচ্ছা বলে কিক বসাচ্ছে। নির্ধারিত কোনো গোলপোস্ট আছে বলেও মনে হচ্ছে না। গোলকিপার যে দুটি গোলপোস্টের মাঝখানে দাঁড়াচ্ছে সেটাই গোলপোস্ট। বলের সঙ্গে সঙ্গে গোলপোস্টের স্থান বদল হচ্ছে।

      ‘স্লামালিকুম স্যার।’

      মিসির আলি না তাকিয়েই বললেন, ‘ওয়ালাইকুম সালাম।’

      ‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারি স্যার?’

      ‘এখন বলতে পারেন না। এখন আমি খেলা দেখছি।’

      ‘স্যার, আমি বসি না হয়।’

      ‘বসুন।’

      অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত খেলা চলল। কে জিতল কে হারল কিছু বোঝা গেল না। মনে হচ্ছে দু’ দলই জিতেছে। এও এক অসাধারণ ঘটনা। একসঙ্গে দুটি দলকে জিততে প্রায় কখনোই দেখা যায় না।

      ‘স্যার, আমি অনেকক্ষণ বসে আছি।’

      মিসির আলি তাকালেন। তাঁর ভুরু কুঞ্চিত হল। মানুষের সঙ্গ তাঁর কাছে কখনোই বিরক্তিকর ছিল না। অতি সাধারণ যে মানুষ তার চরিত্রেও অবাক হয়ে লক্ষ করার মতো কিছু ব্যাপার থাকে। কিন্তু ইদানীং মানুষ তাঁর কাছে অসহ্য বোধ হচ্ছে। বরং চড়ুই পাখির ব্যাপার তাকে অনেক বেশি আকৃষ্ট করছে। তাঁর পাশে বসে থাকা চশমা পরা মানুষটি মাঝে মাঝেই তাঁকে বিরক্ত করছে। তাকে এই পার্কেই দেখা যায়। সবদিন না, কয়েকদিন পরপর। এই লোক তাঁকে একটা গল্প বলতে চায়। তাও প্রেমের গল্প। পার্কে বসে প্রেমের গল্প শোনার মতো ধৈর্য এবং ইচ্ছা কোনোটাই তাঁর নেই। এ লোককে সে কথা অনেকবারই বলা হয়েছে। মিসির আলি ঠিক করলেন, আজ আরেক বার বলবেন। প্রথমে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করবেন—তারপর কঠিন এবং রূঢ়ভাবে বলবেন।

      মিসির আলি বললেন, ‘হ্যাঁ, এখন বলুন কেমন আছেন?’

      কঠিন কথা বলার আগে সহজভাবে শুরু করা। বুদ্ধিমান লোক হলে বুঝে ফেলা উচিত যে প্রস্তাবনা মূল বইয়ের মতো নয়।

      ‘জি স্যার, ভালো আছি।’

      ‘গল্প শোনাতে চাচ্ছেন তো? কিছু মনে করবেন না। গল্প শুনতে ইচ্ছে করছে না।’

      ‘আপনার চড়ুই পাখি দুটি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলাম।’

      ‘চড়ুই পাখি?’

      ‘জি স্যার, পরশুদিন আপনার কাছে এসেছিলাম। আপনি বলেছিলেন, আপনি আমার কোনো কথা শুনতে পারবেন না। চড়ুই পাখি নিয়ে ব্যস্ত। পাখি দুটি কি ভালো আছে?’

      ‘হ্যাঁ, ভালো আছে।’

      ‘এখনো কি পুরুষ পাখিটা খাচ্ছে এবং মেয়ে পাখি দূরে বসে দেখছে?’

      ‘হ্যাঁ।’

      ‘স্যার, আমি ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করেছি। আমার মনে হয় পাখি দুটাকে যদি আমরা খাঁচায় আটকে ফেলতে পারি তা হলে বোঝা যাবে ব্যাপারটা কী? খাঁচায় চাল দেওয়া থাকবে—ক্রমাগত চব্বিশ ঘণ্টা মনিটর করা হবে। যদি দেখা যায় খাঁচার ভেতর ও মেয়ে পাখিটা কিছুই খাচ্ছে না—তখন বুঝতে হবে…’

      মিসির আলি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘খাঁচায় এদের ঢোকাব কী করে?’

      ‘খাঁচায় ঢোকানো সমস্যা হবে না, স্যার। চাল খাইয়ে খাইয়ে আপনি এদের অভ্যস্ত করে রেখেছেন— খাঁচার দরজা খুলে আপনি যদি এর ভেতর চাল দিয়ে দেন—পাখি দুটা খাঁচায় ঢুকবে।’

      মিসির আলি আগ্রহ নিয়ে বললেন, ‘খাঁচা কোথায় পাওয়া যায়?’

      ‘নীলক্ষেতে ইউনিভার্সিটি মার্কেট নামে একটা নতুন মার্কেট হয়েছে। রঙিন মাছ, পাখি, পাখির খাঁচার অসংখ্য দোকান।’

      ‘খাঁচার কী রকম দাম?’

      ‘আপনি যদি বেয়াদবি না নেন—আমি আপনার জন্যে বড় একটা খাঁচা কিনেছি। আপনার বাসায় যে কাজের ছেলেটি আছে তাকে দিয়ে এসেছি।’

      ‘কেন করলেন?’

      ‘আপনার ভেতর কৌতূহল জাগানোর জন্যে করেছি। আমি বেশ কিছুদিন ধরে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি। আপনি কোনোরকম আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এমনকি আমার নাম পর্যন্ত জানতে চাচ্ছেন না। আমার ধারণা হয়েছে খাঁচাটা পেলে হয়তোবা আপনি কৌতূহলী হবেন। আমার নাম জানতে চাইবেন।’

      ‘আপনার নাম কী?’

      ‘আমার ডাকনাম তন্ময়। ভালো নাম মুশফেকুর রহমান।’

      ‘আপনি আমার কাছে কী চান?’

      ‘আমি আপনাকে একটা গল্প বলতে চাই।’

      ‘প্রেমের গল্প?’

      ‘প্রেমের গল্প বলা যেতে পারে।’

      মিসির আলি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমাকে দেখে কি আপনার মনে হয়— আমি প্রেমের গল্প শোনার ব্যাপারে খুব আগ্রহী?’

      ‘হ্যাঁ, মনে হয়। আমার মনে হয় গল্প শুরু করলে আপনি খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতে শুরু করবেন। আমার দরকার অসম্ভব মনোযোগী একজন শ্রোতা। যে গল্প শুনে যাবে। একটি প্রশ্নও করবে না। গল্প শুনে হাসবে না, ব্যথিত হবে না।’

      ‘এমন শ্রোতা তো প্রচুর আছে। এই পার্কেই আছে।’

      ‘আপনি কী বলতে চাচ্ছেন আমি বুঝতে পারছি। আপনি বলতে চাচ্ছেন—এই পার্কে প্রচুর গাছ আছে। গাছগুলো আমার গল্পের মনোযোগী শ্রোতা হতে পারে। আপনি কি তাই বোঝাতে চাচ্ছেন না?’

      ‘হ্যাঁ।’

      ‘গাছকে আমি আমার গল্প শুনিয়েছি। গাছরা আমার গল্প মন দিয়ে শুনেছে এবং গল্পের মাঝখানে প্রশ্ন করে আমাকে বিরক্ত করে নি। কিন্তু ওরা আমার গল্প বুঝতে পেরেছে কি না তা আমি জানতে পারছি না।’

      ‘আপনার গল্প বোঝা কি গাছদের জন্যে জরুরি?’

      ‘গাছের জন্যে জরুরি নয়। আমার জন্যে জরুরি। খুবই জরুরি।’

      ‘প্রেমের গল্পটি কি দীৰ্ঘ?’

      ‘গল্প বেশ দীর্ঘ। তবে গল্পের মূল লাইনটি যাকে বটম লাইন বলা হয় তা ছোট। স্যার, বটম লাইনটি বলব?’

      ‘বলুন।’

      ‘আমি আপনাদের মনোবিদ্যার ভাষায় একজন সাইকোপ্যাথ। আমি এ পর্যন্ত দুটি খুন করেছি। খুব ঠাণ্ডা মাথায় করেছি। খুব ভেবেচিন্তে করা। এই খুন দুটি করার জন্যে আমার মনে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। আমি তৃতীয় খুনটির প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছি। প্রস্তুতিপর্ব আপনাকে বলতে চাচ্ছি। প্রস্তুতিপর্বে প্রেমের ব্যাপার আছে। এই জন্যেই বলছি প্রেমের গল্প।’

      ‘দুটি খুন করেছেন। তৃতীয়টি করবেন। করে ফেলুন। আমাকে বলার দরকার কী? আমার অনুমতি নেওয়ার ব্যাপার তো নেই।’

      ‘স্যার, আপনি কি আমার গল্প বিশ্বাস করেছেন?’

      ‘হ্যাঁ করেছি।

      ‘আমি তো আপনাকে একটা ভয়াবহ কথা বললাম। আপনি সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করলেন?’

      ‘হ্যাঁ করলাম।’

      ‘কেন করেছেন?’

      ‘আমি মানুষকে কখনোই অবিশ্বাস করি না। তা ছাড়া একজন মানুষ অকারণে কেন আমাকে এসে বলবে আমি দুটা খুন করেছি, তৃতীয়টি করব? এখন বলুন কেমন লাগে মানুষ খুন করতে?’

      ‘ভালো লাগে স্যার।’

      লোকটি হেসে ফেলল। সুন্দর হাসি। কিন্তু মিসির আলি শিউরে উঠলেন। লোকটির জিহ্বা কুচকুচে কালো। সে যখন হেসে উঠল মিসির আলি ব্যাপারটা তখনই লক্ষ্য করলেন।

      লোকটি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আমি আপনার ভেতর কৌতূহল জাগ্রত করতে পেরেছি। কাজেই আমি জানি আপনি এখন আমার কথা শুনবেন। আর স্যার, আপনি আমার জিহ্বা দেখে যেভাবে চমকে উঠেছেন সেভাবে চমকে ওঠার কিছু নেই। খুব ছোটবেলায় আমার অসুখ হয়েছিল। কালাজ্বর। ব্রহ্মচারী ইনজেকশন নিতে হয়েছে। সেইসঙ্গে আয়ুর্বেদি এক ওষুধ খেয়ে জিহ্বা পুড়িয়ে ফেলেছিলাম। স্যার যাই। খুব শিগগিরই আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে। ও ভালো কথা, স্যার এই বইটিও আমি আপনার জন্যে এনেছি। অস্ট্রেলিয়ান পাখিদের ওপর একটা বই। পাখিদের সম্পর্কে কিছু তথ্য এই বইটিতে পেতে পারেন।

      ‘আপনার ভালো নাম কী যেন বললেন? মুশফেকুর রহমান?’

      ‘জি।’

      ‘আপনার সঙ্গে আমার কোথায় দেখা হবে? আপনার ঠিকানা কী?’

      ‘আমাকে আপনার খুঁজে বের করতে হবে না, স্যার। আমিই আপনাকে খুঁজে বের করব।’

    • তন্দ্রাবিলাস

      তন্দ্রাবিলাস

      হুমায়ূন আহমেদ

      [book]

      ভোরবেলায় মানুষের মেজাজ মোটামুটি ভালো থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খারাপ হতে থাকে, বিকালবেলায় মেজাজ সবচে বেশি খারাপ হয়, সন্ধ্যার পর আবার ভালো হতে থাকে। এটাই সাধারণ নিয়ম।

      এখন সকাল এগারটা, মেজাজের সাধারণ সূত্র মতে মিসির আলির মেজাজ ভালো থাকার কথা। কিন্তু মিসির আলির মন এই মুহূর্তে যথেষ্টই খারাপ। তিনি বসার ঘরে বেতের চেয়ারে পা তুলে বসে আছেন। তাঁর ভুরু কুঁচকে আছে। তাঁর মেজাজ খারাপের দুটি কারণের প্রথমটা হল—একটা মাছি। অনেকক্ষণ থেকেই মাছিটা তাঁর গায়ে বসার চেষ্টা করছে। সাধারণ মাছি না—নীল রঙের স্বাস্থ্যবান ডুমো মাছি। আম-কাঁঠালের সময় এই মাছিগুলিকে দেখা যায়। এখন শীতকাল—এই মাছি এল কোত্থেকে? মাছিটা তার গায়েই বারবার বসতে চাচ্ছে কেন? তাঁর সামনে বসে থাকা মেয়েটির গায়ে কেন বসছে না?

      মিসির আলির মেজাজ খারাপের দ্বিতীয় কারণ এই মেয়েটি। তাঁর ইচ্ছা করছে মেয়েটিকে একটা ধমক দেন। যদিও ধমক দেবার মতো কোনো কারণ ঘটে নি। মেয়েটি তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। দেখা করতে আসার অপরাধে কাউকে ধমক দেয়া যায় না। ধমক দেয়ার বদলে মিসির আলি শব্দ করে কাশলেন। প্রচণ্ড শব্দে কাশলে, কিংবা কুৎসিত শব্দে নাক ঝাড়লে মনের রাগ অনেকখানি কমে। মিসির আলির কমল না বরং আরো যেন বাড়ল। মাছিটাও মনে হচ্ছে এই শব্দে উৎসাহ পেয়েছে। এতক্ষণ গায়ে বসতে চাচ্ছিল এখন উড়ে ঠোঁটে বসতে চাচ্ছে। কী যন্ত্রণা!

      স্যার, আমার নাম সায়রা বানু। সায়রা বানু নামটা কি আপনার মনে থাকবে?

      মিসির আলি বললেন, মনে থাকার প্রয়োজন কি আছে?

      অবশ্যই আছে। আমি এত আগ্রহ করে আমার নামটা আপনাকে কেন বলছি, যাতে মনে থাকে সেই জন্যেই তো বলছি।

      মিসির আলি রোবটের গলায় বললেন, মানুষের নাম আমার মনে থাকে না।

      মেয়েটি তাঁর রোবট গলা অগ্রাহ্য করে হাসিমুখে বলল, আমারটা মনে থাকবে। কারণ একজন বিখ্যাত সিনেমা অভিনেত্রীর নাম সায়রা বানু।

      মিসির আলি ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। এখন তাঁর মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। অর্থহীন কথা শুনতে ভালো লাগছে না। তা ছাড়া শীতও লাগছে। চেয়ারটা টেনে রোদে নিয়ে গেলে হয়। তাতে কিছুক্ষণ আরাম লাগবে তারপর আবার রোদে গা চিড়বিড় করতে থাকবে। শীতকালের এই এক যন্ত্রণা। ছায়া বা রোদ কোনোটাই ভালো লাগে না। মিসির আলি মাছিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মাছিটার কারণে নিজেকে এখন কাঁঠাল মনে হচ্ছে।

      মেয়েটি খানিকটা মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, আপনি দিলীপ কুমার, সায়রা বানু এদের নাম শোনেন নি?

      দিলীপ কুমারের নাম শুনেছি।

      সায়রা বানু হচ্ছে দিলীপ কুমারের বউ। আমার বন্ধুরা অবিশ্যি আমাকে সায়রা বানু ডাকে না, তারা ডাকে এস বি। সায়রার এস, বানুর বি―এস বি। এস বি-তে আর কী হয় বলুন তো?

      বলতে পারছি না।

      এস বি হচ্ছে স্পেশাল ব্রাঞ্চ। আমার বন্ধুদের ধারণা আমার চেহারায় একটা স্পাই স্পাই ভাব আছে। এই জন্যেই তারা আমাকে এস বি ডাকে। আচ্ছা আপনারও কি ধারণা আমার চেহারায় স্পাই স্পাই ভাব? ভালো করে একটু আমার দিকে তাকান না। আপনি সারাক্ষণ এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন কেন?

      মিসির আলি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন না। মাছিটার দিকে তাকিয়ে আছেন। মাছিটা এদিক-ওদিক করছে বলেই এদিক-ওদিক তাকাতে হচ্ছে। আচ্ছা পৃথিবীতে মোট কত প্রজাতির মাছি আছে?

      এই যে শুনুন। তাকান আমার দিকে।

      মিসির আলি মেয়েটির দিকে তাকালেন। অতিরিক্ত ফর্সা একটি মেয়ে। বাঙালি মেয়েদের গায়ের রঙের একটা মাত্রা আছে। কোনো মেয়ে যদি সেই মাত্রা অতিক্রম করে যায় তখন আর ভালো লাগে না। তার মধ্যে বিদেশী বিদেশী ভাব চলে আসে। তাকে তখন আর আপন মনে হয় না। সায়রা বানুর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাকে পর পর লাগছে। মেয়েটির মাথা ভরতি চুল। সেই চুলেও লালচে ভাব আছে। অতিরিক্ত ফর্সা মেয়েদের ক্ষেত্রে তাই হয়। তাদের গায়ের রঙের খানিকটা এসে চুলে লেগে যায়। চুল লালচে দেখায়—খানিকটা এসে লাগে চোখে। চোখ তখন আর কালো মনে হয় না। মেয়েটির মুখ লম্বাটে। একটু বোঁচা ধরনের নাক। বোঁচা নাক থাকায় রক্ষা—বোঁচা নাকের কারণেই মেয়েটিকে বাঙালি মনে হচ্ছে। খাড়া নাক হলে মেডিটেরিনিয়ান সমুদ্রের পাশের গ্রিককন্যা বলে মনে হত। বয়স কত হবে? উনিশ থেকে পঁচিশের ভেতর। মানুষের বয়স চট করে ধরতে পারার কোনো পদ্ধতি থাকলে ভালো হত। গাছের রিং গুনে বয়স বলা যায়। মানুষের তেমন কিছু নেই। মানুষের বয়স তার মনে বলেই বোধ হয়। আচ্ছা, একটা মাছি কতদিন বাঁচে?

      স্যার কথা বলছেন না কেন? আমাকে কি স্পাই মেয়ে বলে মনে হচ্ছে?

      স্পাই মেয়েদের চেহারা আলাদা হয় বলে আমি জানি না।

      একটু আলাদা হয়। স্পাই মেয়েদের মুখ দেখে এদের মনের ভাব বোঝা যায় না।

      এদের মুখে এক রকম ভাব মনের ভেতর আরেক রকম।

      তোমারও কি তাই?

      জি। ও আপনাকে বলতে ভুলে গেছি এস বি ছাড়াও আমার আরেকটা নাম আছে। নাম ঠিক না খেতাব। নববর্ষে পাওয়া খেতাব। আমাদের কলেজে পহেলা বৈশাখে খেতাব দেয়া হয়। আমার খেতাবটা হচ্ছে সাদা বাঘিনী। এস বি-তে সাদা বাঘিনীও হয়। সাদা বাঘিনী টাইটেল কেন পেয়েছিলাম শুনতে চান? খুবই মজার গল্প।

      মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন। তাঁর কিছুই শুনতে ইচ্ছা করছে না। মাথার যন্ত্রণা এবং শীত ভাব দুইই বাড়ছে। গায়ে পাতলা একটা চাদর দিয়ে শীত ভাবটা কমানো যেত। চাদরটা ধুপিখানায় দিয়েছেন। ধোয়া নিশ্চয়ই হয়ে গেছে, স্লিপের অভাবে আনতে পারছেন না। স্লিপটা কোথাও খুঁজে পাচ্ছেন না। কড়া এক কাপ চা খেলেও শীতটা কমত। ঘরে চায়ের পাতা আছে, চিনি, দুধও আছে। গতকালই কিনে এনেছেন। কিন্তু গ্যাসের চুলায় কী একটা সমস্যা হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগুন জ্বলেই হুস করে নিভে যায়। মিস্ত্রি ডাকিয়ে চুলা ঠিক করা দরকার। গ্যাস মিস্ত্রিরা কোথায় থাকে কে জানে?

      সায়রা বানু মেয়েটি হড়বড় করে কথা বলে যাচ্ছে, তার কথা তিনি মন দিয়ে শুনছেন না। মাথায় দুশ্চিন্তা নিয়ে অন্য কিছুতে মন বসানো বেশ কঠিন। তবে মাছিটা এখন শান্ত হয়েছে। টেবিলের উপর চুপ করে বসে আছে। ডিম পাড়ছে না তো?

      ‘আমার সাদা বাঘিনী টাইটেল পাওয়ার ঘটনাটা খুব ইন্টারেস্টিং। শুনলে আপনি খুব মজা পাবেন। বলব?’

      মিসির আলি কিছুই বললেন না। তিনি খুব ভালো করেই জানেন মেয়েটি তার গল্প বলবেই। তিনি বলতে বললেও বলবে, বলতে না বললেও বলবে।

      ‘হয়েছে কী শুনুন—সায়েন্স ল্যাবরেটরির সামনে দিয়ে আমি যাচ্ছি। আমার সঙ্গে আমার এক বন্ধু, রাকা। রাকা হচ্ছে বোরকাওয়ালী। বোরকা পরে। সউদি বোরকা। বেশ কয়েক টাইপ বোরকা পাওয়া যায় তা কি আপনি জানেন? সউদি বোরকা, পাকিস্তানি বোরকা। সউদি বোরকা ভয়াবহ, শুধু চোখ দুটো বের হয়ে থাকে। এমনিতে সে অবিশ্যি খুব স্টাইলিস্ট। বোরকার নিচে স্লিভলেস ব্লাউজ পরে। যাই হোক বোরকাওয়ালী রাকা হঠাৎ বলল, সে একটা পেনসিল কিনবে। আমি তাকে নিয়ে একটা দোকানে ঢুকলাম পেনসিল কিনতে। স্টেশনারির দোকান তবে তার সঙ্গে কনফেকশনারিও আছে। চা বিক্রি হচ্ছে। কেক বিক্রি হচ্ছে। দোকানটায় বেশ ভিড়। ভিড়ের সুযোগ নিয়ে এক লোক করল কী বোরকাওয়ালীর গায়ে হাত দিল। গায়ে মানে কোথায় তা আপনাকে বলতে পারব না। আমার লজ্জা লাগবে। বোরকাওয়ালী এমন ভয় পেল যে প্রায় অচেতন হয়ে পড়ে যাচ্ছিল। আমি বোরকাওয়ালীকে ধরে ফেললাম। তারপর বদমাশ লোকটার দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনি ওর গায়ে হাত দিলেন কেন? ষণ্ডাগণ্ডা টাইপের লোক। লাল চোখ। গরিলাদের মতো লোম ভরতি হাত। সে এমন ভাব করল যে আমার কথাই শুনতে পায় নি। দোকানদারের দিকে তাকিয়ে হাই তুলতে তুলতে বলল—দেখি একটা লেবু চা। তখন আমি খপ করে তার হাত ধরে ফেললাম। সে ঝটকা দিয়ে তার হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করল কিন্তু তার আগেই আমি তার হাত কামড়ে ধরলাম। যাকে বলে কচ্ছপের কামড়। কচ্ছপের কামড় কী তা নিশ্চয়ই আপনি জানেন। কচ্ছপ একবার কামড়ে ধরলে আর ছাড়ে না, আমিও ছাড়লাম না। আমার মুখ রক্তে ভরে গেল। লোকটা বিকট চিৎকার শুরু করল। ব্যাপারস্যাপার দেখে বোরকাওয়ালী অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এর পর থেকে আমার টাইটেল হয়েছে সাদা বাঘিনী।’

      গল্প শেষ করে সায়রা বানু খিলখিল করে হাসছে। মিসির আলি মেয়েটির হাসির মাঝখানেই বললেন, তুমি আমার কাছে কেন এসেছ?

      ‘গল্প করার জন্যে এসেছি। বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে গল্প করতে আমার খুব ভালো লাগে।’

      ‘আমি বিখ্যাত মানুষ?’

      ‘অবশ্যই বিখ্যাত। আপনাকে নিয়ে কত বই লেখা হয়েছে। আমি অবিশ্যি একটা মাত্র বই পড়েছি। ওই যে সুধাকান্ত বাবুর গল্প। একটা মেয়ে খুন হল আর আপনি কেমন শার্লক হোমসের মতো বের করে ফেললেন—সুধাকান্ত বাবুই খুনটা করেছেন। বই পড়ে মনে হচ্ছিল আপনার খুব বুদ্ধি কিন্তু আপনাকে দেখে সেরকম মনে হচ্ছে না।’

      ‘আমাকে দেখে কেমন মনে হচ্ছে?’

      ‘খুব সাধারণ মনে হচ্ছে। আপনার মধ্যে একটা গৃহশিক্ষক গৃহশিক্ষক ব্যাপার আছে। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি নিয়মিত বেতন পান না এমন একজন অংকের স্যার। আপনি রোজ ভাবেন আজ বেতনের কথাটা বলবেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহস করে বলতে পারেন না। আচ্ছা আপনি এমন গম্ভীর মুখে বসে আছেন কেন? মনে হচ্ছে আপনি আমার কথা শুনে মজা তো পাচ্ছেনই না উল্টো বিরক্ত হচ্ছেন। সত্যি করে বলুন আপনি কি বিরক্ত হচ্ছেন?’

      ‘কিছুটা হচ্ছি।’

      ‘মাছিটা তো এখন আর বিরক্ত করছে না। কেমন শান্ত হয়ে টেবিলে বসে আছে। তারপরেও আপনি এত বিরক্ত কেন বলুন তো?’

      ‘তুমি অকারণে কথা বলছ এই জন্যে বিরক্ত হচ্ছি। অকারণ কথা আমি নিজেও বলতে পারি না অন্যের অকারণ কথা শুনতেও ভালো লাগে না।’

      ‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে হলে সব সময় একটা কারণ লাগবে? তা হলে তো আপনি খুবই বোরিং একটা মানুষ। এত কারণ আমি পাব কোথায় যে আমি রোজ রোজ আপনার সঙ্গে কথা বলব?’

      মিসির আলি বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘তুমি রোজ রোজ আমার সঙ্গে কথা বলবে?’

      ‘হুঁ।’

      ‘সে কী, কেন?’

      সায়রা বানু খুব সহজ ভঙ্গিতে হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘এক বাড়িতে থাকতে হলে কথা বলতে হবে না?’

      ‘এক বাড়িতে থাকবে মানে? আমি বুঝতে পারছি না।’

      ‘আমি আপনার সঙ্গে কয়েকটা দিন থাকব। কদিন এখনো বলতে পারছি না। দু দিনও হতে পারে আবার দু মাসও হতে পারে। আবার দু বছরও হতে পারে। সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আপনার উপর।’

      মিসির আলি চেয়ার থেকে পা নামিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকালেন। হচ্ছেটা কী? এই যুগের টিনএজার মেয়েদের ভাবভঙ্গি, কাণ্ডকারখানা বোঝা মুশকিল। তারা যে কোনো উদ্ভট কিছু হাসিমুখে করে ফেলতে পারে। মেয়েটি হয়তো অতি তুচ্ছ কারণে রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে। কিংবা তাকে ভড়কে দেবার জন্যে গল্প ফেঁদেছে। পরে কলেজে বন্ধুদের কাছে এই গল্প করবে। বন্ধুরা মজা পেয়ে একে অন্যের গায়ে হেসে গড়িয়ে পড়বে। —ও মাগো বুড়োটাকে কী বোকা বানিয়েছি! সে বিশ্বাস করে ফেলেছিল যে আমি থাকতে এসেছি।

      মিসির আলি নিজের বিস্ময় গোপন করে সহজভাবে বললেন, ‘তুমি এ বাড়িতে থাকবে?’

      ‘জি।’

      ‘বিছানা বালিশ নিয়ে এসেছ?’

      ‘বিছানা বালিশ আনি নি। আজকাল তো আর বিছানা বালিশ নিয়ে কেউ অন্যের বাড়িতে থাকতে যায় না। শুধু একটা স্যুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগ এনেছি। আর একটা পানির বোতল।’

      ‘স্যুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগ কোথায়?’

      ‘বারান্দায় রেখে এসেছি। শুরুতেই আপনি আমার স্যুটকেস দেখে ফেললে ঢুকতে দিতেন না। যাই হোক আমি এখন আমার স্যুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে আসছি। আচ্ছা আপনি এমন ভাব করছেন যেন আকাশ থেকে পড়েছেন। আকাশ থেকে পড়ার মতো কিছু হয় নি। বিপদগ্রস্ত একজন তরুণীকে কয়েকদিনের জন্যে আশ্রয় দেয়া এমন কোনো বড় অন্যায় না। আমি নিশ্চিত এরচে অনেক বড় বড় অন্যায় আপনি করেছেন।’

      ‘তুমি সত্যি সত্যি আমার এখানে থাকার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছ?’

      ‘জি।’

      মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন। এই মুহূর্তে তাঁর ঠিক কী করা উচিত তা মাথায় আসছে না। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে মেয়েটির কাণ্ডকারখানা দেখাই মনে হয় সবচে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মেয়েটি বুদ্ধিমতী। এই পরিস্থিতিতে তিনি কী করবেন বা করতে পারেন সেই সম্পর্কে চিন্তাভাবনা সে নিশ্চয়ই করেছে। নিজেকে সম্ভাব্য সব রকম পরিস্থিতির জন্যে সে প্রস্তুত করে রেখেছে। মিসির আলির এমন কিছু করতে হবে যার সম্পর্কে মেয়েটির প্রস্তুতি নেই। সে কেন বাড়ি ছেড়ে এসেছে এই মুহূর্তে তা তাকে জিজ্ঞেস করা যাবে না। কারণ এই প্রশ্নটি স্বাভাবিক এবং সঙ্গত প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর মেয়েটি তৈরি করে রেখেছে। তাঁর বিস্মিত হওয়াও ঠিক হবে না। তাঁকে খুব সহজ এবং স্বাভাবিক থাকতে হবে। যেন এমন ঘটনা প্রতি সপ্তাহেই দুটা-একটা করে ঘটছে।

      সায়রা বানু স্যুটকেস, হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে ঘরে ঢুকল। মিসির আলি বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন সে গুনগুন করে কী একটা গানের সুরও যেন ভাজছে। কত সহজ স্বাভাবিক তার আচরণ।

      ‘কেক খাবেন?’

      ‘কেক?’

      ‘হুঁ। আমার নিজের বেক করা, ডিমের পরিমাণ বেশি হয়েছে বলে একটু ডিম ডিম গন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে ডিমের গন্ধ একেবারে সহ্য করতে পারে না। আমার কাছে অবিশ্যি খারাপ লাগে না। দেব আপনাকে এক পিস কেক?’

      ‘না।’

      ‘আপনাকে একটু বাজারে যেতে হবে, কয়েকটা জিনিস কিনতে হবে। আমি অতি দ্রুত চলে এসেছি তো কাজেই অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস আনা হয় নি। টুথপেস্ট এনেছি, টুথব্রাশ আনি নি। আমার অভ্যাস হচ্ছে রাতে শোবার সময় কুটকুট করে কয়েকটা লবঙ্গ খাওয়া। লবঙ্গ খেলে শরীরের রক্ত পরিষ্কার থাকে, কখনো হার্টের অসুখ হয় না। সেই লবঙ্গ আনা হয় নি। আপনাকে লবঙ্গ আনতে হবে। পারবেন? আমি আপনাকে টাকা দিয়ে দেব। আমি সঙ্গে করে অনেক টাকা নিয়ে এসেছি। বলুন তো কত এনেছি?’

      ‘বলতে পারছি না।’

      ‘অনুমান করুন। আপনি হচ্ছেন বিখ্যাত মিসির আলি। আপনার অনুমান হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনুমান। বলুন আমার সঙ্গে কত টাকা আছে।’

      ‘পাঁচ হাজার টাকা।’

      ‘হয় নি। আমার সঙ্গে আছে মোট একান্ন হাজার টাকা। পাঁচ শ টাকার একটা বান্ডিল এনেছি আর এনেছি দশ টাকার একটা বান্ডিল। সেখান থেকে কিছু খরচ করেছি। বেবিট্যাক্সি ভাড়া দিয়েছি তিরিশ টাকা। ঠিক এই মুহূর্তে আমার কাছে আছে পঞ্চাশ হাজার নয় শ সত্তর টাকা। আপনাকে টুকটাক বাজারের জন্যে পাঁচ শ টাকা দিচ্ছি, যা লাগে খরচ করবেন বাকিটা ফেরত দেবেন। এই নিন।’

      সায়রা বানু তার কাঁধে ঝুলানো কালো ব্যাগ খুলে টাকা বের করল। মিসির আলি টাকাটা নিলেন। মেয়েটি এক ধরনের খেলা শুরু করেছে। মিসির আলির মনে হল মেয়েটিকে সেই খেলা তার মতোই খেলতে দেয়া উচিত। এই মুহূর্তে এমন কিছু করা ঠিক হবে না যাতে খেলা বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি মেয়েটিকে আগ্রহ নিয়ে দেখতে শুরু করেছেন—তার তাকানোর ভঙ্গি, হাঁটার ভঙ্গি, বসার ভঙ্গি। আপাতদৃষ্টিতে এইসব খুবই ছোটখাটো ব্যাপার থেকে অনেক কিছু জানা যায়।

      সায়রা বানু চেয়ারে বসতে বসতে বলল, আমার খাওয়া নিয়ে আপনি মোটেই চিন্তা করবেন না। যা খাওয়াবেন আমি তাই খাব। শুধু মাছ ছাড়া। মাছ আমি খেতে পারি না—গন্ধ লাগে। অবিশ্যি চিংড়ি মাছ খাই। চিংড়ি মাছ কেন খাই বলুন তো?

      ‘বলতে পারছি না।’

      ‘চিংড়ি মাছ খাই কারণ চিংড়ি মাছ হচ্ছে আসলে এক ধরনের পোকা। পোকা বলেই চিংড়ি মাছে আঁশটে গন্ধ নেই। ও আচ্ছা বলতে ভুলে গেছি। আরেকটা জিনিস খুব পছন্দ করে খাই। ইলিশ মাছের ডিম।’

      ‘মাছের ডিমেরও তো আঁশটে গন্ধ থাকে।’

      ‘ইলিশ মাছের ডিমে থাকে না। আপনি কেভিয়ার খেয়েছেন?’

      ‘না।’

      ‘কেভিয়ার হচ্ছে পৃথিবীর সবচে দামি খাবার। কালো রঙের মাছের ডিম। স্বাদ কী রকম জানেন?’

      ‘যেহেতু খাই নি স্বাদ কেমন তা তো জানার কথা না।’

      ‘স্বাদ কেমন আপনি জানেন। অনেকটা আমাদের শিং মাছের ডিমের মতো। তবে আঁশটে গন্ধ অনেক বেশি। নাক চেপে ধরে আমি একবার খানিকটা খেয়েছিলাম তারপর বমিটমি করে একাকার।’

      মিসির আলি পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেট বের করলেন। সঙ্গে দেয়াশলাই নেই। দেয়াশলাইয়ের খোঁজে রান্নাঘরে যেতে হবে। চেয়ার ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না। মেয়েটাকে কি বলবেন দেয়াশলাই এনে দিতে? মিসির আলিকে কিছু বলতে হল না। তার আগেই সায়রা বানু বলল, ‘আপনার লাইটার লাগবে?’

      ‘আছে তোমার কাছে?’

      ‘আছে। আপনি সিগারেট মুখে দিন আমি ধরিয়ে দিচ্ছি।’

      মেয়েটা যে ভঙ্গিতে লাইটার ধরাল তাতে মনে হল সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে তার অভ্যাস আছে। সে নিজে সিগারেট খায় না তো? না খায় না, সিগারেটের ধোঁয়ায় সে নাক কুঁচকাচ্ছে।

      ‘এই লাইটারটা আপনি রেখে দিন। লাইটারটা আমি আপনার জন্যে এনেছি।’

      ‘থ্যাংক য়্যু।’

      ‘আর এক প্যাকেট সিগারেটও এনেছি। আপনার একটা বইয়ে পড়েছিলাম একজন কে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসত। যেদিনই আসত আপনার জন্যে এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আসত।’

      মিসির আলি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন, ‘একটু আগে বলেছিলে তুমি আমার একটা বইই পড়েছ।’

      ‘মিথ্যা কথা বলেছিলাম। অনেকগুলি বই পড়েছি। সুধাকান্ত বাবুর উপর লেখা বইটা সবচে ভালো লেগেছে। ওইটা আমি পড়েছি তিনবার। না তিনবার না। আড়াইবার পড়েছি। দুবার পড়েছি পুরোটা। শেষ বার পড়েছি শুধু শেষের কুড়ি পাতা।’

      ‘ভালো।’

      ‘মিথ্যা কথা বললে কি আপনি রেগে যান?’

      ‘না।’

      ‘আমাকে কেউ মিথ্যা কথা বললে আমি অবিশ্যি খুব রেগে যাই। আর আমার এমনই কপাল যে সবাই শুধু আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলে। তবে আপনি বলবেন না সেটা আমি জানি। আপনার চেহারা দেখেই বোঝা যায় আপনি মিথ্যা কথা বলতে পারেন না। আপনি কি জানেন যারা সব সময় মিথ্যা কথা বলে তাদের চেহারায় একটা মাইডিয়ার ভাব থাকে।’

      ‘তাই নাকি?’

      ‘জি।’

      ‘যেসব মেয়েকে দেখবেন খুব মায়া মায়া চেহারা, আপনি ধরেই নিতে পারেন তারা প্রচুর মিথ্যা কথা বলে।’

      ‘এই তথ্য জানতাম না।’

      ‘আপনি মিসির আলি আর আপনি এই সাধারণ তথ্য জানেন না? অথচ বইয়ে কত আশ্চর্য আশ্চর্য কথা যে আপনার সম্পর্কে লেখা হয়। যেমন কাউকে এক পলক দেখেই আপনি তার সম্পর্কে হড়বড় অনেক কথা বলে দিতে পারেন। আসলেই কি পারেন?’

      ‘না। পারি না।’

      ‘আচ্ছা চেষ্টা করে দেখুন না। আমার সম্পর্কে বলুন।’

      ‘কী বলব?’

      ‘আমাকে দেখে কী মনে হচ্ছে। এইসব। দেখি আপনার পাওয়ার অব অবজারভেশন।’

      ‘দেখ সায়রা বানু, আমি পরীক্ষা দেই না।’

      ‘পরীক্ষা ভাবছেন কেন? ভাবেন একটা খেলা। বলুন আমার সম্পর্কে বলুন।’

      মিসির আলি হাতের সিগারেট ফেলে দিলেন। আরেকটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছা করছে। তিনি নিজের ওপর একটু বিরক্ত হচ্ছেন কারণ তাঁর টেনশান হচ্ছে। টেনশান হলেই একটা সিগারেট শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছা করে। তাঁর শরীর ভালো না। এখন কিছুদিন টেনশান ফ্রি জীবন যাপন করতে চান। অজানা-অচেনা একটা মেয়ে হুট করে উপস্থিত হয়ে তাতে বাধা দিচ্ছে।

      মেয়েটি আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘কী হল কিছু বলছেন না কেন?’

      মিসির আলি খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘তোমার সম্পর্কে আমার প্রথম অবজারভেশন হচ্ছে তোমার নাম সায়রা বানু নয়।’

      ‘এরকম মনে হবার কারণ কী?’

      ‘মনে হবার কারণ হচ্ছে—সায়রা বানু যদি তোমার নাম হত তা হলে সায়রা বানু ডাকলে তুমি সহজ ভাবে রেসপন্স করতে। একটু আগে আমি বললাম, দেখ সায়রা বানু পরীক্ষা আমি দেই না। বাক্যটা আমি একবারে বলি নি। দেখ সায়রা বানু, বলে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করেছি। যখন দেখলাম তুমি হঠাৎ চমকে উঠলে তখনই আমি বাক্যটা শেষ করলাম। তোমার চমকে ওঠার কারণ হচ্ছে সায়রা বানু বলে যে তোমাকে সম্বোধন করা হচ্ছে তা তুমি শুরুতে বুঝতে পার নি। যখন বুঝতে পেরেছ তখনই চমকে উঠেছ। তোমার নাম কী?’

      ‘আমার নাম চিত্রা।’

      ‘তোমার সম্পর্কে আমার দ্বিতীয় অবজারভেশন হচ্ছে তোমাকে দীর্ঘদিন একটা ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেই ঘরের জানালা পর্যন্ত বন্ধ ছিল। আলোহীন একটা ঘরে দীর্ঘদিন থাকলে গায়ের চামড়া ফ্যাকাসে হয়ে যায়। তোমার তাই হয়েছে। তুমি আলোর দিকে ঠিকমতো তাকাতেও পারছ না। যতবার তাকাচ্ছ ততবার চোখের মণি ছোট হয়ে আসছে। ভুরু কুঁচকে যাচ্ছে। আবার জানালা থেকে তুমি চোখ ফিরিয়েও নিতে পারছ না। বারবার বিস্মিত চোখে জানালা দিয়ে তাকাচ্ছ। কারণ অনেকদিন পরে তুমি জানালায় খোলা আকাশ দেখছ।’

      ‘আরো কিছু বলবেন?’

      ‘দীর্ঘদিন ধরে তুমি ক্রমাগত মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছ। যে কোনো কারণেই হোক তোমাকে মিথ্যা কথা বলতে হচ্ছে। স্টোরি তৈরি করতে হচ্ছে। মিথ্যা বলাটা তোমার অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি কি ঠিক বলেছি?’

      ‘হ্যাঁ।’

      ‘তোমার হাত বাঁধা ছিল। মণিবন্ধে কালো দাগ পড়ে গেছে।’

      ‘হুঁ।’

      ‘তোমার ঘ্রাণশক্তি অতি প্রবল। তুমি কিছুক্ষণ পরপরই নাক কুঁচকাচ্ছ। এবং তাকাচ্ছ ঘরের দক্ষিণ দিকে। দক্ষিণ দিক থেকে নর্দমার দুর্গন্ধ আসছে। সেটা এত প্রবল না যে এমনভাবে নাক কুঁচকাতে হবে। এর থেকে মনে হয়–হয় তোমার ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত প্রবল আর নয়তো তোমাকে অনেক উঁচু কোনো ঘরে আটকে রাখা হয়েছে, ছ তলা-সাত তলায় যেখানে রাস্তার নর্দমার গন্ধ পৌঁছে না।’

      চিত্রা চুপ করে রইল। সে খুব একটা বিস্মিত হল বলে মনে হল না। মিসির আলি বললেন, ‘এখন বল, তোমার ব্যাপারটা কী?’

      ‘আপনি তো কিছু না জেনেই অনেক কিছু বলতে পারেন। আপনি নিজেই বলুন।’

      ‘না আমি বলতে পারছি না।’

      ‘অনুমান করুন। দেখি আপনার অনুমানশক্তি আমার ঘ্রাণশক্তির মতো কি না।’

      ‘আমার ধারণা তুমি অসুস্থ। অসুস্থতাটা এমন যে রোগীকে ঘরে আটকে রাখতে হয়। তুমি কোনোক্রমে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে এসেছ।’

      ‘আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে আমি পাগল তাই আমাকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল? না আমি পাগল না। সুস্থ। ছিটেফোঁটা পাগলামি যা অন্যদের মধ্যে থাকে আমার তাও নেই। তবে আমাকে ঘরে আটকে রাখা হচ্ছিল তা ঠিক। ছাব্বিশ দিন হল ঘরে তালাবন্ধ। আমাকে সবাই মিলে ঘরে তালাবন্ধ করে রেখেছে। কারণটাও খুব সাধারণ এবং আপনার মতো বুড়োর কাছে হয়তো বা হাস্যকর। কারণটা বলব?’

      মিসির আলি হ্যাঁ-না কিছুই বললেন না। মেয়েটির স্বভাব যা তাতে তিনি যদি বলেন হ্যাঁ বল—তা হলে সে নিশ্চিতভাবেই বলবে—না বলব না। তারচে চুপ করে থাকাই ভালো।

      ‘ব্যাপারটা প্রেমঘটিত। আমি একটা ছেলেকে বিয়ে করতে চাই। দরিদ্র ফালতু টাইপ ছেলে। কিছুই করে না। তার প্রেমে পড়ার কারণ নেই। তারপরেও আমি পড়ে গেছি এবং এবং…’

      ‘এবং কী?’

      ‘গোপনে বিয়ে করার জন্যে তার সঙ্গে পালিয়েও গিয়েছিলাম। আমাকে ধরে আনা হয়। আমি তো খুব জেদি মেয়ে, কাজেই আমি সবাইকে বলি—আমি আবারো পালিয়ে যাব। তোমাদের কোনো সাধ্য নেই আমাকে ধরে রাখার।’

      ‘ছেলেটার নাম কী?’

      ‘ছেলেটার নাম দিয়ে আপনার দরকার কী?’

      ‘কোনো দরকার নেই। কৌতূহল বলতে পার।’

      ‘উনার নাম ফরহাদ।’

      ‘শুধুই ফরহাদ?’

      ‘ফরহাদ খান।’

      ‘তারপর?’

      ‘তারপর আবার কী?’

      ‘তোমার কাছ থেকে এই কথা শোনার পর তারা তোমাকে তালাবন্ধ করে রাখল?’

      ‘তাই তো রাখবে। যে মেয়ে এ জাতীয় কথা বলে তাকে নিশ্চয়ই কেউ কোলে করে ঘুরে বেড়াবে না। ঘুমপাড়ানি গান গাইয়ে ঘুম পাড়াবে না।’

      ‘আজ তুমি ছাড়া পেয়েছ, আমার কাছে না এসে ওই ছেলেটির কাছে চলে যাচ্ছ না কেন?’

      ‘যাব তো বটেই। আপনার কি ধারণা আমি চিরকালের জন্যে আপনার সঙ্গে থাকব?’

      ‘মিসির আলি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, চিত্রা তুমি আবারো মিথ্যা কথা বলছ।’

      ‘বুঝলেন কী করে?’

      ‘ছেলেটার নাম কী বল জিজ্ঞেস করার পর—থতমত খেয়ে গেলে। চট করে বলতে পারলে না। একটা কোনো নাম ভাবার জন্যে সময় নিলে। তারপর বললে উনার নাম ফরহাদ। উনি বললে—যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছ তার প্রসঙ্গে উনি বলবে কেন? বলবে ওর নাম ফরহাদ।’

      ‘তা হলে কি সত্যি কথা শুনতে চান?’

      ‘আমি এখন সত্যি-মিথ্যা কোনো কথাই শুনতে চাই না। তুমি আমার সাহায্য চাচ্ছ। যদি সত্যি চাও আমি তোমাকে সাহায্য করি, তা হলে তোমাকে সত্যি কথা বলতে হবে। তা তুমি পারবে না। মিথ্যা বলাটা তোমার রক্তের মধ্যে ঢুকে গেছে। কিছুক্ষণ সত্যি বলার পর আবার মিথ্যা শুরু করবে।’

      ‘তাতে অসুবিধা কী? যেই মুহূর্তে আমি মিথ্যা বলব আপনি ধরে ফেলবেন। আপনার তো সেই ক্ষমতা আছে।’

      মিসির আলি আরেকটি সিগারেট ধরিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন—‘চিত্রা শোন আমার পক্ষে তোমাকে এ বাড়িতে রাখা সম্ভব না। তোমাকে চলে যেতে হবে। এবং কিছুক্ষণের মধ্যে চলে যেতে হবে।’

      ‘আমার সমস্যা আপনি সমাধান করবেন না?’

      ‘মানুষের বেশিরভাগ সমস্যাই এরকম যে তা তারা নিজেরাই সমাধান করতে পারে। আমার ধারণা তোমার সমস্যার সমাধান তুমিই করতে পারবে।’

      ‘আমি আপনার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলেছি বলে কি আপনি রাগ করেছেন?’

      ‘রাগ করার প্রশ্ন আসছে না। মিথ্যা কথা বলাটাকে সবাই যতবড় অন্যায় মনে করে আমি তা করি না। আমার কাছে মনে হয় মানুষের অনেক অদ্ভুত ক্ষমতার একটি হচ্ছে মিথ্যা বলার ক্ষমতা। কল্পনাশক্তি আছে বলেই সে মিথ্যা বলতে পারে। যে মানুষ মিথ্যা বলতে পারে না সে সৃষ্টিশীল মানুষ না—রোবট টাইপ মানুষ।’

      ‘আপনি কি মিথ্যা বলেন?’

      ‘না বলি না। মানুষ হিসেবে আমি রোবট টাইপের। শোন চিত্রা, তুমি এখন চলে যাও।’ চিত্রা বিস্মিত গলায় বলল, ‘চলে যাব?’

      ‘হ্যাঁ চলে যাবে।’

      ‘আপনি আমাকে খুব অপছন্দ করেছেন তাই না?’

      ‘আমি তোমাকে অপছন্দও করি নি আবার পছন্দও করি নি।’

      ‘আমার বিষয়ে আপনার কোনো কৌতূহলও হচ্ছে না?’

      ‘লোকজনের ধারণা আমার কৌতূহল খুব বেশি, আসলে তা না। আমার কৌতূহল কম। অনেক কম।’

      ‘নীল রঙের মাছিটার দিকে আপনি যতটা কৌতূহল নিয়ে তাকিয়েছেন আমার দিকে তাও তাকান নি। আমি কি মাছির চেয়েও তুচ্ছ?’

      মিসির আলি চুপ করে রইলেন।

      চিত্রা ক্লান্ত গলায় বলল, আচ্ছা আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু আপনি দয়া করে গম্ভীর হয়ে থাকবেন না। যাবার আগে হাসিমুখে থাকুন। আপনার হাসিমুখ দেখে যাই।

      মিসির আলি হাসলেন। চিত্রা বলল, বাহ আপনার হাসি তো সুন্দর। যারা গম্ভীর ধরনের মানুষ তাদের হাসি খুব সুন্দর হয়। এরা হঠাৎ হঠাৎ হাসে তো এই জন্যে। আর যারা সব সময় হাসিমুখে থাকে তাদের হাসি হয় খুব বিরক্তিকর। তাদের কান্না হয় সুন্দর। আচ্ছা আমি তা হলে এখন উঠি।

      চিত্রা উঠে দাঁড়াল। মেয়েটা এত সহজে চলে যেতে রাজি হবে তা মিসির আলি ভাবেন নি। তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।

      ‘আচ্ছা শুনুন, আমি আমার ব্যাগগুলি রেখে যাই। ব্যাগ হাতে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আশ্রয় খোঁজার তো কোনো মানে হয় না, তাই না?’

      ‘বিছানা বালিশ নিয়ে যাওয়াই তো ভালো, সবাই ভাববে এই মেয়ের আসলেই আশ্রয় প্রয়োজন।’

      ‘আপনি কিন্তু সেরকম ভাবেন নি। আপনি আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন। যাই হোক আমি জিনিসপত্র রেখে যাচ্ছি। একসময় এসে নিয়ে যাব।’

      ‘আচ্ছা।’

      ‘আপনি আসলেই রোবট টাইপ মানুষ। যাই কেমন?’

      ‘তুমি কি তোমার বাড়ির টেলিফোন নাম্বারটি দিয়ে যাবে?’

      ‘কেন? আচ্ছা দিচ্ছি। কাগজে লিখে দিচ্ছি। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে টেলিফোন করবেন না। আর যদি করেন আপনি ভয়াবহ বিপদে পড়ে যাবেন। এইবার কিন্তু আমি সত্যি কথা বলছি—কি বলছি না?’

      ‘মনে হচ্ছে বলছ।’

      চিত্রা তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে কাগজ নিয়ে টেলিফোন নাম্বার লিখল। ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলল, এই নিন নাম্বার। আবারো বলছি নিতান্ত প্রয়োজন না হলে টেলিফোন করবেন না।

      ‘নিতান্ত প্রয়োজন বলতে তুমি কী বুঝাচ্ছ?’

      ‘ধরুন আমি আপনার ঘর থেকে বের হলাম। আর হঠাৎ একটা ট্রাক এসে আমার গায়ের উপর দিয়ে চলে গেল তখন আপনি বাসায় টেলিফোন করে বলবেন—–চিত্রা মারা গেছে।’

      ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’

      চিত্রা বেশ সহজ ভঙ্গিতেই বের হল। মিসির আলি উঠে দরজা বন্ধ করে দিলেন। তিনি আজ আর ঘর থেকে বের হবেন না। তিনি জানেন ঘণ্টা দু-একের ভেতর চিত্রা ফিরে আসবে, তার জিনিসপত্র নিয়ে যাবে। মেয়েরা তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কোথাও রেখে স্বস্তি পায় না। কাজেই অপেক্ষা করাই ভালো।

      খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার মেয়েটি চলে যাবার পর মিসির আলির একটু মন খারাপ হয়ে গেল। পাখি উড়ে যাবার পর পাখির পালক পড়ে থাকে। মেয়েটা চলে গেছে তার পরেও কিছু যেন রেখে গেছে। স্যুটকেস এবং হ্যান্ডব্যাগ নয়, অন্য কিছু।

      মেয়েটির রেখে যাওয়া ৫০০ টাকার নোটটা পকেটে। টাকাটা ফেরত দিতে ভুলে গেছেন। আশ্চর্য কাণ্ড—মেয়েটি তার কালো ব্যাগও ফেলে গেছে। তার সব টাকা তো ওই ব্যাগে। বেবিট্যাক্সি নিয়ে যদি কোথাও যায় ভাড়া দিতে পারবে না।

      মিসির আলি অস্বস্তি বোধ করছেন। মেয়েটাকে মাথা থেকে তাড়াতে পারছেন না। মাছিটা এখনো টেবিলে বসে আছে। মারা গেছে নাকি? না মারা যায় নি। কীট এবং পতঙ্গ জগতের নিয়ম হল মৃত্যুর পর উল্টো হয়ে থাকা। পিঠ থাকবে মাটিতে পা থাকবে শূন্যে। মাছির বেলাতেও নিশ্চয়ই সেই নিয়ম। মিসির আলি তার লাইব্রেরির দিকে এগুলেন—মাছি সম্পর্কে জানার জন্যে কোনো বই কি আছে লাইব্রেরিতে? থাকার তো কথা।

      মাছি সম্পর্কে মিসির আলি তেমন কোনো তথ্য যোগাড় করতে পারলেন না। শুধু জানলেন পৃথিবীতে মোট ৮৫,০০০ প্রজাতির মাছি আছে। মৌমাছি যেমন মাছি, ড্রাগন ফ্লাইও মাছি। সবচে ছোট মাছি প্রায় অদৃশ্য আর সবচে বড় মাছি চড়ুই পাখি সাইজের। এদের সবারই দু জোড়া পাখা থাকে। এক জোড়া তারা ওড়ার কাজে ব্যবহার করে অন্য জোড়া ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যবহার করে। বেশিরভাগ প্রজাতির মাছিই মানুষের পরম বন্ধু—শুধু হাউস ফ্লাই নয়। এদের প্রধান কাজ অসুখ ছড়ানো।

    • রাণু সমগ্র

      রাণু সমগ্র

      বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

      [book]

      গ্রন্থকথা

      রাণুর প্রথম ভাগ, রাণুর দ্বিতীয় ভাগ, রাণুর তৃতীয় ভাগ ও রাণুর কথামালা—বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের এই গ্রন্থচতুষ্টয় বাংলা সাহিত্যের একটি সার্থক সৃষ্টি। হাসি, অশ্রু ও অন্তর্দৃষ্টির আশ্চর্য সংমিশ্রণ, কৌতুক রস ও করুণ রসের সঙ্গে সুগভীর জীবনবোধ—এর যে পরিচয় গল্পগুলিতে প্রকাশ পেয়েছে, বাংলা সাহিত্যে তা আর কোথাও পাওয়া যায় বলে মনে পড়ে না। বহু দিন ধরেই এই গ্রন্থগুলির একটি সংকলনের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিল। “রাণু” অভিধায় গ্রন্থ চারটির একত্র সংকলন সেই প্ৰয়োজন পূর্ণ করারই প্রচেষ্টা। গ্রন্থ চারটি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে উৎসর্গীকৃত হয়, যেমন প্রথম খণ্ড লেখকের ‘পিতা-মাতাকে, দ্বিতীয় খণ্ড ‘অগ্রজকে’, তৃতীয় খণ্ড ‘বঙ্গসাহিত্যসেবক ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে’ ও রাণুর কথামালা লেখকের ‘মেজমামাকে’। সঙ্গত কারণে, এই সংকলনেও প্রতিটি গ্রন্থের প্রারম্ভে উৎসর্গপত্র দেওয়া হল। গ্রন্থকার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ডে বিভিন্ন ভূমিকা সংযোজিত করেছিলেন। সেগুলিও এই সংকলনে স্ব-স্ব স্থানে সন্নিবেশিত হয়েছে এবং প্রতিটি খণ্ডের প্রকাশনা বিষয়ক তথ্যাদিও যথাস্থানে সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রায় অর্ধশতাব্দী কাল রাণু ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গল্পের চরিত্রগুলি বাংলা সাহিত্যে বহুল আলোচিত হতে হতে আজ প্রায় পূর্ণ অবয়ব ধারণ করেছে। সুতরাং তার কোনো নূতন পরিচয় অনাবশ্যক।

      সূচিপত্র

    • রাণুর প্রথম ভাগ

      রাণুর প্রথম ভাগ

      বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

      [book]

      শ্রীবিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় বিরচিত ‘রাণুর প্রথম ভাগ’ প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় বৈশাখ ১৩৪৪ বঙ্গাব্দে। রঞ্জন পাব্‌লিশিং হাউস, ২৫২ মোহনবাগান রো কলিকাতা-র পক্ষে শনিরঞ্জন প্রেস, ২৫/২ মোহনবাগান রো, কলিকাতা হইতে শ্রীসৌরীন্দ্রনাথ দাস কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। একই প্রকাশনালয় হতে অগ্রহায়ণ ১৩৪৭, আশ্বিন ১৩৫০ ও বৈশাখ ১৩৫২-তে গ্রন্থটি পুনর্মুদ্রিত হয়।

      উৎসর্গ

      পূজ্যপাদ পিতৃদেব

      এবং

      পূজনীয়া মাতৃদেবীর

      করপদ্মে

      এই বইখানি

      বিপুল সার্থকতার আনন্দের সহিত

      সমর্পিত হইল।

      দ্বারবঙ্গ
      বৈশাখী-পূর্ণিমা, বঙ্গাব্দ ১৩৪৪
      —গ্রন্থকার

      প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

      মাটি এবং মন লইয়া দেশ। বাংলা দেশের মাটি বড় ভিজা এবং মন বড় অশ্রুসিক্ত। আশার কথা, মাটি আর বেশি দিন ভিজা থাকিবে না;—নদী, খাল, বিল সব জাহান্নমে চলিয়াছে।

      মনের দিকটা।—যদি একদণ্ডও অশ্রুর ধারা একটু বন্ধ করা যায়, সেই জন্যই এই আয়োজনটুকু। আশা, এই আয়োজনটুকু। আশা, না দুরাশা বুঝিতে না পারিতেছি না।

      বইখানির সমস্ত ইতিহাসের সঙ্গে দুইজনের নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত,–এক ‘প্রবাসী’র সহকারী সম্পাদক সোদরোপম শ্ৰীযুক্ত ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি আমার বইয়ের কথা আমার চেয়ে ঢের বেশি ভাবিয়া আসিয়াছেন, আর দ্বিতীয় সুহৃদ্বর শ্রীযুক্ত সজনীকান্ত দাস, যাহার আগ্রহ ব্যতীত বইখানির প্রকাশ সম্ভব ছিল না। দুইজনের নিকটেই গভীর কৃতজ্ঞতা জানানো রহিল।

      গ্রন্থকার

    • বিয়ের ফুল

      বিয়ের ফুল

      বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

      [book]

      বিয়ের ফুল

      রামতনু সাত-সাত জায়গায় মেয়ে দেখিয়া ফিরিল; কিন্তু পছন্দ আর হইল না। সব গুলিই জবুথবু হইয়া সামনে আসিয়া বসে; হাজার চেষ্টা করিলেও ভাল করিয়া দেখা হয় না, সেইজন্য হাজার সুন্দর হইলেও মনে কেমন একটু খুঁত থাকিয়া যায়। সন্দেহ হয়, আচ্ছা, এ যে চোখটা কোনমতেই বড় করিয়া চাহিল না, নিশ্চয়ই কোনও দোষ আছে; ওঁর যে খোঁপার এত ধুম, ওইখানেই গলদ নাই তো? ইত্যাদি।

      নাহক এই সাত ঘাটের জল খাইয়া রামতনু বুঝিল, কন্যামননের এ প্রশস্ত উপায় নহে। একটা প্রশস্ত উপায় মনে মনে ঠাওরাইবার চেষ্টা করিতেছিল, এমন সময় বউদিদির মুখে একদিন শুনিল, তাঁহার সম্পর্কে এক পিসীর কন্যা সম্প্রতি প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সহিত পাস দিয়া জলপানি পাইয়াছে। রামতনু বেচারা এতদিন বেশির ভাগ পাড়াগেঁয়ে ‘পুঁটী-খেঁদী’দেরই সন্ধান করিয়া ফিরিতেছিল, সুতরাং এখন খবর পাইয়া এই সুশিক্ষিত যুবতীরত্নটির জন্য তাহার হৃদয় একেবারে পিপাসিত হইয়া উঠিল।

      ‘দেখা নাই, বুঝ নাই, এইরূপ হইল কি করিয়া’–ইত্যাকার সন্দেহ যদি কাহারও মনে উদয় হয় তো কৈফিয়ৎ এই মাত্র দেওয়া যায় যে, প্রেম সব সময় চোখে দেখার তোয়াক্কা রাখে না–‘হৃদয়-মরুভূমে’ আপনার খেয়ালমতই গজাইয়া উঠে। তাই, বউদি সংবাদটি দিতে, একটু অশোভন হইলেও রামতনু প্রথমেই জিজ্ঞাসা করিয়া বসিল, কত বয়স তাঁর, দেখতে কেমন?

      বউদিদি ইহাতে তাচ্ছিল্যের সহিত মুখটা ঘুরাইয়া বলিলেন, পোড়া কপাল, তোমার বুঝি অমনই নোলায় জল এল? পুরুষের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে পাস করে, সে মেয়ের আবার বিয়ে! গলায় দড়ি জোটে না? কোন্ দিন বা কাছা-কোঁচা এঁটে পুরুষের সঙ্গে আপিসে বেরুবে!

      রামতনু বেজায় অপ্রতিভ হইয়া পড়িল। বুঝিল, কথাগুলা বড় অসাময়িক হইয়া পড়িয়াছে। বয়স এবং চেহারার সহিত পাস দিবার বিশেষ সম্বন্ধ সে নিজেই তেমন খুঁজিয়া পাইল না। কথাগুলা তাহার মনের আকস্মিক উন্মাদনার খবরই বাহিরে প্রকাশ করিয়া দিয়াছে। সামলাইবার চেষ্টা করিয়া বলিল, না গো না, সে কথা নয়; কত বয়সে পাস দিয়েছে — তোমার গিয়ে, ষোল বছরের কমে — অর্থাৎ কিনা —

      বউদিদি হাসিয়া ফেলিলেন।

      রামতনু মুখ-চোখ রাঙা করিয়া আরও দুই-তিন বার ‘অর্থাৎ কিনা’ ‘অর্থাৎ কিনা’ করিয়া, তখনও বউদিদিকে হাসিতে দেখিয়া হঠাৎ চটিয় উঠিল; বলিল, না বউদি, সব সময় ইয়ারকি ভাল লাগে না।

      পূর্ব্বের মতই সুতীক্ষ্ণ হাস্যসহকারে বউদিদি উত্তর করিলেন, বিশেষ ক’রে মনের অবস্থা যে সময় খারাপ, না? আহা, শুধু পাস-করা শুনেই বেচারীর এই দশা, যখন শুনবে চোদ্দ বছর বয়স, দেখতে পটের ছবিটির মতন, তার ওপর আবার পদ্য লিখতে পারে, তখন বোধ হয় মুচ্ছে যাবে।

      মূর্চ্ছা যাইবার লক্ষণ রামতনুর তখনই প্রকাশ পাইতেছিল — রাগের চোটে; কোন রকমে আত্মসংবরণ করিয়া ঘর হইতে সক্রোধে বাহির হইয়া গেল।

      এই ঘটনাটির পর ছোকরা হঠাৎ বড় নির্জ্জনতাপ্রিয় হইয়া উঠিল। বৈকালে দেখা গেল, সে মাঠে একলা ঘুরিয়া বেড়াইতেছে এবং সন্ধ্যা সময় তাহাকে বড় একটা দেখাই গেল না। রাত্রে ডালের সহিত দুধ মাখিয়া এবং মাঝে মাঝে আলুর শাঁস বাদ দিয়া খোসা খাইয়া সে আহার শেষ করিল এবং তাহার পর বিছানার আশ্রয় লইল। একটার সময়ও সে জাগিয়া মশারির চালে কল্পনার রঙিন ছবি আঁকিতেছে।

      তাহার পরদিন কিন্তু মেঘ কাটিয়া গেল এবং রামতনুকে বেশ প্রফুল্ল দেখা গেল। স্পষ্টই বুঝিতে পারা গেল যে, সে রাতারাতি একটা মতলব আঁটিয়া ফেলিয়াছে। সে স্থির করিল, প্রজাপতির সহিত এ পর্য্যন্ত সাত-সাতটা বাজি হারিলেও আর এক হাত খেলিয়া দেখিবে। এবার আর পরের কথায় নাচিয়া চট করিয়া কন্যা দেখিতে ছুটিয়া তিক্ত মুখে ফিরিয়া আসা নয়। পূর্ব্বরাগের পালাটা দস্তুরমত শেষ করিয়া অন্য কথা। তবে দেরি আর কোনমতেই করা চলে না। সে মনশ্চক্ষে দেখিতে পাইল, এই বিদুষী তরুণীটির জন্য যুবকমহলে একটা চাঞ্চল্য পড়িয়া গিয়াছে; এবং স্বয়ম্বর-সভার প্রত্যেক প্রার্থীর মতন যদিও সে নিজেকেই সর্ব্বাপেক্ষা বাঞ্ছনীয় মনে করিল, তথাপি ভাবিল, না, দেরি করাটা নিরাপদ নয়। অভাবের মাথায় চাই কি এক অবাঞ্ছনীয়ের গলায়ই বরমাল্য পড়িয়া যাইতে পারে।

      সকালবেলা একটু এদিক ওদিক করিয়া কাটাইল; তারপর হঠাৎ বউদিদির নিকট একটা পুরানো টেলিগ্রাম লইয়া গিয়া বিরক্তভাবে বলিল, এই নাও, যা মনে করেছিলুম তাই; আমায় আর থাকতে দিলে না।

      টেলিগ্রাম দেখিয়া বউদিদির মুখটা শুকাইয়া গিয়াছিল। তিনি জিজ্ঞাসু নেত্রে চাহিয়া রহিলেন।

      রামতনু বলিল, ভয় পাবার কিছুই নেই; তবে আমায় কালই যেতে হবে।

      কাল? এই বললে, বারো দিন দেরি আছে!

      আমি বললেই তো আর হচ্ছে না, বিশ্বাস না হয় টেলিগ্রামটা পড়িয়ে নাও কাউকে দিয়ে। — বলিয়া, পাছে সত্যই কাহাকেও নিয়া পড়াইয়া লওয়া হয়, এই ভয়ে সেটা সঙ্গে সঙ্গে পকেটে পুরিল এবং হঠাৎ অধিকতর বিরক্তভাবে সেটাকে বাহির করিয়া টুকরা টুকরা করিয়া ছিড়িয়া বলিল, আরে রামঃ, এমন কলেজেও মানুষে পড়ে।

      এসব ব্যাপারে অনভিজ্ঞ বউদিদি সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, তা ভাই, কি করবে বল; কামাই করাটা কি ভাল হবে? তোমার দাদা শুনে আবার চটবেন। কিন্তু এমন কেন হ’ল বল তো?

      রামতনু পূর্ব্বের মতই রাগতভাবে বলিল, কে জানে? শুনেছিলাম, লাটসাহেব নাকি কলেজ দেখতে আসবে, তাই হবে বা।

      বউদিদি রাগিয়া বলিলেন, মুয়ে আগুন লাটসাহেবের, সে আর মরবার সময় পেলে না! ঘরের ছেলে দুদিন ঘরে এসে বসবে, তাতেও সোয়াস্তি নেই!

      যেন অকস্মাৎ মনে পড়িয়া গেল — এই ভাবে রামতনু বলিল, চুলোয় যাক; হ্যাঁ, তোমার কোনও কাজ-টাজ আছে নাকি? তা হলে বল। তাই বলে আমি কিন্তু তোমার সেই পিসের বাড়িতে যেতে পারব না, সে আগে থাকতেই বলে রাখছি।

      এই সরলহৃদয় রমণী ভাবিলেন, কালকের ঠাট্টায় দেবর তাহার রাগ করিয়াছে। সেইজন্য সেইখানেই যাওয়াইবার জন্য বেশি জিদ করিয়া বসিলেন। ঠিকানা দিলেন, মাথার দিব্য দিলেন, এবং যাহাতে হাঁটিয়া যাইতে না হয় তাহার জন্য ভাড়াও কবুল করিলেন। রামতনুর ঠিকানাটা লওয়াই উদ্দেশ্য ছিল; সেটি মনে মনে মুখস্থ করিয়া লইল। বাহিরে কিন্তু খুব মাথা নাড়িয়া বউদিদিকে বলিল, সে হতেই পারে না, আমি সেখানে যেতেই পারব না; তুমি আমায় তা হলে চেন নি।

      পরদিবসই যাওয়া ঠিক হইল। দাদা তাহার বাড়িতে ছিলেন না; রামতনু ভাবিল, স্ত্রীর মুখে তিনি যখন এই উদ্ভট কথাটা শুনিবেন, তখন নিশ্চয়ই ভাবিবেন, রামতনু ভ্রাতৃজায়ার সহিত খুব একচোট ঠাট্টা করিয়া গিয়াছে; ততদিনে সে একটা সুসঙ্গত কারণ খুঁজিয়া বাহির করিয়া ফেলিবে।

      মা বধূমাতার মুখে শুনিলেন। অঞ্চলে চোখ মুছিয়া বলিলেন, রামুর আমার পড়াশোনার ঝোঁকটা চিরকালই এই রকম। আহা, ও কি বাঁচবে আমাদের পোড়া অদৃষ্টে? সবই ভাল বাছার, তবে ওই কেমন বিয়ের ফুল আর ফুটছে না!

    • অকাল-বোধন

      অকাল-বোধন

      বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

      [book]

      অকাল-বোধন

      বিবাহের পরে ননদ প্রথম বার শ্বশুরবাড়ি যাইবে, নন্দাই লইতে আসিয়াছে; পঙ্কজিনীকে তাহার নিজের ঘরটি কিছুদিনের জন্য এই নবদম্পতিকে ছাড়িয়া দিতে হইল, কারণ বাড়িতে ঘরের অভাব। কর্ত্তার বন্দোবস্ত হইল সদর-ঘরে। ছোট যে ভাঁড়ারঘরটি ছিল, তাহারই জিনিসপত্র সরাইয়া পঙ্কজিনী নিজের, পুত্রকন্যাদের এবং দেবরটির সংস্থান করিয়া লইল।

      কোলের ছেলেটি এই পরিবর্ত্তনের কারণ বুঝিতে না পারিয়া মার গলা জড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল, আমাদেল ঘলে ছুলে না কেন মা?

      তোর পিসী তাড়িয়ে দিয়েছে।

      বাবাকেও তালিয়ে দিয়েতে?

      হ্যাঁ, দিয়েছে বইকি।

      কেন?

      আড়ি পাতিবার সময় উতরাইয়া যাইতেছিল। ছেলের কানের উপর ঘুমপাড়ানির লঘু আঘাত করিয়া জননী বলিল, নে, ঘুমো দিকিন তুই এখন, বকর-বকর করতে হবে না, — ওই, আয় তো রে হুমো —

      সমস্ত দিনের দৌরাত্ম্য-ক্লান্ত শিশু অমন পিসীমার স্বভাবের এই আকস্মিক পরিবর্ত্তনের কথা, হুমোর অলৌকিক চেহারা এবং কীর্ত্তিকলাপের কথা এবং দিবসের হাসিকান্নার দুই-একটা আধবিস্মৃত কথা ভাবিতে ভাবিতে মায়ের কোলে নিদ্রায় এলাইয়া পড়িল। একটু পরেই পাড়ার কয়েকজন যুবতীর চুড়ির ঠুনঠুন, কাপড়ের খসখসানি এবং চাপা গলার ফিসফিসানিতে ঘরের পাশের হাওয়াটা কৌতুকচঞ্চলতায় জীবন্ত হইয়া উঠিল। পঙ্কজিনী কোলের ছেলেটিকে আরও দুই-একটা নরম আঘাত দিয়া শোয়াইয়া দিল; ঘরের অন্যান্য ঘুমন্ত মুখগুলির উপর চক্ষু বুলাইয়া লইল; তাহার পর চাপা স্বরে অনিচ্ছার আভাস মিশাইয়া বলিল, জুটেছিস পোড়রমুখীরা? বলিহারি শখ তোদের, কোথায় একটু চোখ বুজব, না — । বলিতে বলিতে খিড়কির দরজাটার অর্গল খুলিয়া দিল।

      একজন ভিতরে আসিতে আসিতে নথের ঝাঁকি দিয়া বলিল, নাঃ, শখে আর কাজ কি? তোমার কত্তার কাছে গিয়ে ভাগবতে দীক্ষা নিগে যাই। বলি, হ্যাঁ, তাকে বাড়ির বাইরে করেছ তো? নইলে আমাদের মতলব টের পেলে এই রাত-দুপুরে ডাকাত-পড়া কাণ্ড করে তুলবেন ’খন।

      এই সম্মিলনীটিতে বয়সে বোধ হয় পঙ্কজিনীই সবচেয়ে বড়, তাই সে সলজ্জ গাম্ভীর্যের সহিত বলিল, দেখিস, বেশি বাড়াবাড়ি করিস নি কিন্তু সব। এই দেড় দিন গাড়িতে এসে হাক্লান্ত হয়ে আছে বেচারা, একটু ঘুমুনো দরকার।

      এই সহানুভূতিতে একটি তরুণী নবম পর্দ্দাতেই খিলখিল করিয়া হাসিয়া ফেলিল, অপরের গা ঠেলিয়া বলিল, দিদি ভুলে গেছে সব; ঘুমের জন্যেই ওদের মাথা-ব্যথা বটে। ইহাতে দলটির একপাশে কয়েকজনার মধ্যে একটু টেপা হাসি, অর্থপূর্ণ চাহনি এবং দুই-একটা অন্যবিধ বয়সসুলভ ইশারার বিনিময় হইয়া গেল। যাহারা এই চপলতাটুকুর মূল কোথায় বুঝিল না, তাহারা কপট বিরক্তির সহিত মত দিল, এসব ছ্যাবলাদের সঙ্গে কোথাও যাইতে নাই।

      অমনই ছ্যাবলাদের দলের একজন হঠাৎ ভারিক্কি হইয়া বলিল, তাই না তাই, দু চক্ষের বালাই সব —

      এই ছলাটুকুতে সকলে হাসিয়া উঠিল। পঙ্কজ ঠোঁটে হাসির একটু রেশ নিয়া রাখিয়া বলিল, পোড়ার মু — খ, রঙ্গ নিয়েই আছেন।

      ইহারা যতই আনন্দমুখর হইয়া উঠিতেছিল, পঙ্কজিনীর উৎসাহটা যেন ততই শিথিল হইয়া আসিতেছিল। ইহারা সকলে মিলিয়া হঠাৎ ঘরটার মধ্যে পূর্ণযৌবনের এমন একটা রসহিল্লোল তুলিল যে, যৌবনসীমাগতা এই নারীর ইহাদের মধ্যে নিজেকে নিতান্ত খাপছাড়া বলিয়া বোধ হইল। যদি চিন্তার ক্ষমতা থাকিত, তাহা হইলে ফুটমান কলিটির পাশে যে ফুলটি ফোটা শেষ করিয়া দুই-একটি দল হারাইয়া বৃন্তসংলগ্ন রহিয়াছে, সেও বোধ করি এক রকমই ভাবিত। একেবারে তাহার সমবয়সীগোছের কেহই ছিল না সেখানে, তাহার পাতানো ‘গোলাপ’ পর্য্যন্ত নয়। কেন যে ছিল না, পঙ্কজ তাহার কারণ নিজের মনকে নিজেই দিল — তাহারা সব নিজেদের সাত আট দশ বৎসরের পুত্রকন্যা লইয়াই ব্যস্ত, এই সব লঘুতার কি আর অবসর আছে? একজনকে প্রশ্ন করিল, কই, গোলাপ এল না রে ছোট বউ? উত্তর পাইল, তাঁর শরীরটা তেমন ভাল নয়।

      সেই মুখরা মেয়েটা একটু পিছনে সরিয়া গিয়া একজনের ঘাড়ে মুখ গুঁজিয়া বলিল, মোটে দুদিনের ছুটিতে গোলাপের ‘ভোমরা’ বাড়ি এসেছে।

      কে তাহার গাল দুইটা টিপিয়া ধরিল, বলিল, মুয়ে আগুন, রস যে ধরে না আর! তোমার ভোমরারও শিগগির আসা দরকার হয়ে পড়েছে।

      পঙ্কজিনী হঠাৎ বলিল, তা সব দাঁড়িয়ে রইলি যে? যা করতে এসেছিস কর্‌গে।

      একজন বলিল, বাঃ, আর তুমি?

      নাঃ, আমি আর না; তোদের সব দোর খুলে দিতে উঠেছিলুম।

      সে গেলই না। বিছানায় গিয়া শুইল এবং উঠানের ওপার হইতে যখন মাঝে মাঝে ত্রস্ত মলের শিঞ্জিনী এবং রুদ্ধ হাসির তরল ঝঙ্কার ভাসিয়া আসিতে লাগিল, সে খোকার মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে কি ভাবিয়া শরমে সঙ্কুচিত হইয়া উঠিতে লাগিল।

    • হিমু সমগ্র

      হিমু সমগ্র

      হুমায়ূন আহমেদ

      [book]

      ‘হিমু’ নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ সৃষ্ট একটি জনপ্রিয় চরিত্র। হিমু মূলত একজন বেকার যুবক; যার আচরণে বেখেয়ালী, জীবনযাপনে ছন্নছাড়া ও বৈষয়িক ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন ভাব প্রকাশ পায়। চাকরির সুযোগ থাকলেও সে চাকরি কখনো করে না বলেই সে বেকার। তার অস্বাভাবিক চরিত্রের মধ্যে সে হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে রাস্তাঘাটে দিন-রাত ঘুরে বেড়ায় এবং মাঝে মাঝে ভবিষ্যদ্বাণী করে মানুষকে চমকে দেয়।

      ‘হিমু’ ধারাবাহিকের প্রথম উপন্যাস ‘ময়ূরাক্ষী’ প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে ঢাকার অন্যন্যা পাবলিকেশন থেকে। প্রাথমিক সাফল্যের পর হিমু চরিত্র বিচ্ছিন্নভাবে হুমায়ুন আহমেদের বিভিন্ন উপন্যাসে প্রকাশিত হতে থাকে। হিমু ও মিসির আলি হুমায়ুন আহমেদ সৃষ্ট সর্বাধিক জনপ্রিয় দু’টি চরিত্র। উদাসীন হিমু একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের বাঙালি তরুণদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

      হিমুর প্রকৃত নাম হিমালয়। এ নামটি রেখেছিলেন তার বাবা যেন তার পুত্র হিমালয় পর্বতের ন্যায় মহত্ব প্রকাশ করে। হিমুর বাবা তাকে একজন মহাপুরুষ হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি তার ছেলের এমন নাম রেখেছিলেন। পরবর্তীতে ছাত্রজীবনে এই নাম নিয়ে হিমুকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তার পিতামহ তার অন্য নাম রাখতে চেয়েছিলেন— চৌধুরী ইমতিয়াজ টুটুল। কিন্তু হিমু তার বাবার দেয়া নামই গ্রহণ করে। লেখক হিমুর বাবাকে বর্ণনা করেছেন একজন বিকারগ্রস্ত মানুষ হিসেবে; যার বিশ্বাস ছিল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যদি প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা যায় তবে একইভাবে মহাপুরুষও তৈরি করা সম্ভব। তিনি মহাপুরুষ তৈরির জন্য একটি বিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন যার একমাত্র ছাত্র ছিল তার সন্তান হিমু। হিমুর পোশাক হল পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবী। হলুদ বৈরাগের রঙ বলেই পোশাকের রং হলুদ নির্বাচিত করা হয়েছিল। ঢাকা শহরের পথে-পথে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো তার কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম। উপন্যাসে প্রায়ই তার মধ্যে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার প্রকাশ দেখা যায়। যদিও হিমু নিজে তার কোন আধ্যাত্মিক ক্ষমতার কথা স্বীকার করে না। হিমুর আচার-আচরণ বিভ্রান্তিকর। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার প্রতিক্রিয়া অন্যদেরকে বিভ্রান্ত করে, এবং এই বিভ্রান্ত সৃষ্টি করা হিমুর অত্যন্ত প্রিয় একটি কাজ। প্রেম ভালবাসা উপেক্ষা করা হিমুর ধর্মের মধ্যে পড়ে। কোন উপন্যাসেই কোন মায়া তাকে কাবু করতে পারে নি। মায়াজালে আটকা পড়তে গেলেই সে উধাও হয়ে যায়।

      হিমু উপন্যাসে সাধারণত হিমুর কিছু ভক্তশ্রেণীর মানুষ থাকে যারা হিমুকে মহাপুরুষ মনে করে। এদের মধ্যে হিমুর ফুপাতো ভাই বাদল অন্যতম। মেস ম্যানেজার বা হোটেল মালিক- এরকম আরও কিছু ভক্ত চরিত্র প্রায় সব উপন্যাসেই দেখা যায়। এছাড়াও কিছু বইয়ে বিভিন্ন সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী ও খুনি ব্যক্তিদের সাথেও তার সু-সম্পর্ক ঘটতে দেখা যায়। হিমুর একজন বান্ধবী রয়েছে, যার নাম রূপা; যাকে ঘিরে হিমুর প্রায় উপন্যাসে রহস্য আবর্তিত হয়। নিরপরাধী হওয়া সত্ত্বেও সন্দেহভাজন হওয়ায় হিমু অনেকবার হাজতবাস করেছে এবং বিভিন্ন থানার ওসি ও সেকেন্ড অফিসারের সাথে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে।

      হিমু ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষানবিশ— উপন্যাসে এমনটিই বলা হয়েছে; পাশ করেছে কিনা তা উল্লেখ করা হয়নি। তবে তার সাধারণ জ্ঞান ভালো।

      হিমুর বয়স ২৫-২৮ বছরের মধ্যে। তার পোশাক ও চাল-চলন কিছু কিছু মানুষের কাছে বিরক্তিকর। সে খুব একটা সুদর্শন না হলেও তার চোখ ও হাসি খুব সুন্দর বলা হয়েছে। সে সবসময় হলুদ রঙের পাঞ্জাবি (অধিকাংশ সময়ে যেটার পকেট থাকে না) পরে। বেশিরভাগ সময় সে খালিপায়ে চলাফেরা করে। শীতকালে সে রুপার দেওয়া কাশ্মীরি শাল ব্যবহার করে। তার চুল ও দাড়ি সবসময় বড়বড় রাখে। রাতের বেলায় রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে। তার খালাতো ভাই বাদল তার অন্ধভক্ত। যে তার আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতি নিঃসন্দিহান এবং তাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করে। হিমু মাঝে মাঝে ভবিষ্যতবাণী করে যা প্রায় সময়েই মিলে যায়। সে তার যুক্তি-বিরোধী মতানুসারে কাজ করে, এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করে দেয়। প্রায় সময়ই হিমুকে পরোপকার করতে দেখা যায় (যদিও তাতেও কিছু বিভ্রান্তি মিশ্রিত থাকে)।

      হিমুর জীবন যাপন অদ্ভুত। তার জীবন বাউন্ডুলে ছন্নছাড়া ধরনের। সে মেসে থাকে। মাঝে মাঝে রাস্তায় ও পার্কেও রাত কাটায়। তার প্রধান কাজ হেঁটে, খালি পায়ে রাস্তায় ঘুরে বেরানো। তার কোনো পেশা নেই। হিমুর বেশকিছু বিত্তবান আত্মীয় রয়েছে। হিমু প্রায়ই তার বিত্তবান আত্মীয়দের কাছ থেকে উপহার এবং অর্থসাহায্য পায়। তবে সে মানুষের কল্যাণের জন্য অনেক কাজ করেছে । তার জীবন যাপনে তাকে প্রায়ই আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে দেখা যায়।

      হিমু স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সে প্রায়ই যুক্তি-বিরোধী মতানুসারে আচরণ করে এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং তার এরকম অযৌক্তিক ব্যক্তিত্বের কারণে সে অনেক সম্ভাব্য বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে যায়। তার লোভ, লালসা, ঈর্ষা, ভয় নেই। তার এরূপ আচরণ অনেক মানুষকে তাকে মহাপুরুষ ভাবতে প্রভাবিত করে। হিমু যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও রসবোধসম্পন্ন ব্যক্তি।

      ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে ‘হিমু সমগ্র’ প্রকাশিত হয়; প্রকাশক মনিরুল হক, অনন্যা, ৩৮/২ বাংলাবাজার ঢাকা। গ্রন্থস্বত্ব লেখকের। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছিলেন ধ্রুব এষ। ‘হিমু সমগ্রে’ সঙ্কলিত গ্রন্থসমূহের নাম হচ্ছে—

      ‘হিমু সমগ্রে’র উৎসর্গ পাতায় লেখা ছিল—

      উৎসর্গ

      এ-দেশের

      হিমুদের জন্য

      উপনার নগণ্য।

      হুমায়ূন আহমেদ ‘হিমু সমগ্রে’র একটি সংক্ষিপ্ত ভূমিকাও লিখেছিলেন—

      ভূমিকা

      হিমুকে নিয়ে কতগুলি বই লিখেছি নিজেও জানি না। মন মেজাজ খারাপ থাকলেই হিমু লিখতে বসি। মন ঠিক হয়ে যায়। বেশি লেখার ফল সব সময় শুভ হয় না। আমার ক্ষেত্রেও হয় নি। অনেক জায়গাতেই ল্যাজে গোবরে করে ফেলেছি। হিমুর পাঞ্জাবির পকেট থাকে না অথচ একটা বই-এ লিখেছি সে পকেট থেকে টাকা বের করল। হিমুর মাজেদা খালা এক বই-এ হয়ে গেল মাজেদা ফুপু। তবে হিমু যে ঠিক আছে তাতেই আমি খুশি। হিমু ঠিক আছে, হিমুর জগৎ ঠিক আছে। তার বয়স বাড়ছে না। সে বদলাচ্ছে না। এই আনন্দ সংবাদ দিয়ে ভূমিকা শেষ করছি।

      সব হিমুকে বন্দি করে যে প্রকাশক বিশাল হিমু সমগ্র বের করলেন তাঁকে (মনিরুল হক, অনন্যা) ধন্যবাদ।

      হুমায়ূন আহমেদ

      ১৩.১১.২০০৬

    • ময়ূরাক্ষী

      ময়ূরাক্ষী

      হুমায়ূন আহমেদ

      [book]

      ‘ময়ূরাক্ষী’ হুমায়ূন আহমেদের লেখা হিমু ধারাবাহিকের প্রথম উপন্যাস। বইটি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসের চরিত্র সমূহ হচ্ছে— চৌধুরী খালেকুজ্জামান টুটুল/চৌধুরী ইমতিয়াজ টুটুল – হিমু; মীরা – জাস্টিস এম. সোবাহানের মেয়ে; বাদল – হিমুর ফুফাত ভাই; রিনকি – বাদলের বোন; রূপা – হিমুর বান্ধবী; মজিদ – হিমুর বন্ধু প্রমুখ।

      হিমুর বাবা ছিলেন একজন বিকারগ্রস্ত মানুষ তিনি বিশ্বাস করতেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যদি প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা যায় তবে একইভাবে মহাপুরুষও তৈরি করা সম্ভব। তিনি মহাপুরুষ তৈরির জন্য একটি বিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন যার একমাত্র ছাত্র ছিল তার সন্তান হিমু। এই মহাপুরুষ তৈরির জন্যই সে তার স্ত্রীকে হত্যা করে। একসময় হিমুর বাবা অসুস্থ হয়ে মারা যান। মারা যাওয়ার আগে তিনি হিমুকে বলে যান সে যেন ১৬ বছর পর্যন্ত তার মাতৃকুল অর্থাৎ তার মামাদের কাছে থাকে। সাথে এও সতর্ক করে দিয়ে যান তার মামারা পিশাচ প্রকৃতির। পিশাচ শ্রেণির মানুষের সংস্পর্শে না এলে মানুষের সৎ গুণ সম্পর্কে ধারণা হবে না।

      একসময় হিমু বড় হয়। মেট্রিক পাসের পর তার ফুফুর বাড়িতে আসে। সেখানেও এক সমস্যা হয়। তার ফুফাতো ভাই তার সংস্পর্শে এসে তার ভক্ত হয় এবং ৩ বার ইণ্টারমিডিয়েটে ফেল করে। বাদল হিমুকে মহাপুরুষ মনে করে। হিমুর প্রতি রয়েছে তার অগাধ বিশ্বাস।

      ইউনিভার্সিটিতে পড়ার ২ বছর পর প্রথম কথা হয় রূপার সাথে। একসময় সে ভালোবেসে ফেলে হিমুকে কিন্তু হিমু তাকে ধরা দেয় না ঠিক তেমনিই চলেও যায় না সে। সে যে মহাপুরুষ হওয়ার সাধনা করছে সে কেমন করে স্বাভাবিক হয়ে রূপার কাছে যাবে।

    • পৃথ্বীরাজ

      পৃথ্বীরাজ

      বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

      [book]

      পৃথ্বীরাজ

      পৃথ্বীরাজ, টিপু সুলতান আর পিণ্ডারী-দস্যুদলের মধ্যে ঘোরতর যুদ্ধ বাধিয়া গিয়াছে। পিণ্ডারীদের দুই-তিনজন আহত হইয়া ধরাশয্যা লইয়াছে, তবু দুর্দ্ধর্ষ দলটা হটিতে চাহে না। টিপু সুলতানের কানের কাছ দিয়া একটি আঁকাবাঁকা আমের ডাল বোঁ করিয়া বাহির হইয়া গেল; সেটা কুড়াইয়া লইয়া দস্যুদের আক্রমণ করিতে যাইবে, এমন সময় পৃথ্বীরাজের করচ্যুত একটা মাটির চাংড়া পিণ্ডারী-সর্দ্দারের নাকের উপর পড়িয়া তাহার নাকের নীচেটা রক্তে এবং মুখের বাকিটা ধূলায় ধূসরিত করিয়া দিল।

      এই সময় স্কুলের টিফিন পিরিয়ড শেষ হওয়ার ঘণ্টা পড়িল। টিপু সুলতান এবং অক্ষত পিণ্ডারী কয়জন ছুটিয়া গিয়া ক্লাসে বসিয়া অত্যন্ত মনোযোগের সহিত যে যাহার পড়া শুরু করিয়া দিল। তিনটি পিণ্ডারী আহত হইয়াছিল, তাহারা নিজের নিজের জখমে হাত দিয়া মন্থরগতিতে স্কুলের দিকে আসিতে লাগিল। রণক্ষেত্রে রহিল মাত্র পৃথ্বীরাজ এবং পিণ্ডারী-সর্দ্দার। বিজেতা গিয়া আহত শত্রুকে সমবেদনার কোমল স্বরে প্রশ্ন করিল, বড় লেগে গেছে, না ভাই?

      পিণ্ডারী বলিল, বেশি নয়। ইস, তোর পাটা —

      ও কিছু নয়; দাঁড়া, কাপড়ের খুঁটটা একটু ভিজিয়ে নিয়ে আসি। — বলিয়া পৃথ্বীরাজ একটু খোঁড়াইতে খোঁড়াইতে জলের ঘরের দিকে ছুটিল। জল আনিয়া নাকটা মুছাইয়া দিতেছিল, পিণ্ডারী বলিল, এর পরেই নবীন মাস্টারের ক্লাস, আজ আবার নতুন বেত কেড়েছে।

      এমন সময় স্কুলের বারান্দা হইতে টিপু সুলতান হাঁক দিল, তোমরা সব এস শিগগির, স্যার ডাকছেন; খেলা যে তোমাদের শেষ হতে চায় না!

      পিণ্ডারী বলিল, নিশ্চয় সব বলে দিয়েছে।

      পৃথ্বীরাজ বলিল, তা’লে আজ এসপার কি ওসপার যা হয় একটা করব, ওকে আস্ত রাখব না।

      বারান্দা হইতে তাগাদা আসিল, চলে এস, স্যার কতক্ষণ বসে থাকবেন?

      দুইজনে উগ্রভাবে চাহিয়া দেখিল; পৃথ্বীরাজের চেহারাটা অত্যন্ত কালো এবং চোখ দুইটা অত্যন্ত সাদা বলিয়া করুণার চক্ষে চাহিলেও উগ্র দেখায়। আহত পিণ্ডারী-দস্যু কয়টি থামের আড়ালে ইহাদের অপেক্ষায় ছিল; সকলে একসঙ্গে প্রবেশ করিল। টিপু নিজের আসনে বসিয়া একটা বই খুলিয়া বলিল, স্যার, আমরা ততক্ষণ সময় নষ্ট না করে পুরনো পড়া করি। — বলিয়া একবার অপরাধীদের পানে চাহিল।

      নবীন মাস্টার প্রশ্ন করিলেন, রস্‌কে, পৃথ্বীরাজের তারিখ কত?

      রসিক অর্থাৎ বর্ত্তমান ঘটনার পৃথ্বীরাজ চুপ করিয়া রহিল।

      নবীন মাস্টার আবার প্রশ্ন করিলেন, মাখনা, টিপু সুলতান কোন্ সালে জন্মেছিল?

      মাখনলাল অর্থাৎ এই আখ্যায়িকার পিণ্ডারী-সর্দ্দার যেন তারিখটা ‘পেটে আসছে মুখে আসছে না’ ভাব দেখাইয়া কড়িকাঠের দিকে চাহিয়া রহিল।

      নবীন মাষ্টার বলিলেন, হুঁ। আর আপনারা দয়া করে বলতে পারেন, পিণ্ডারীর আকবরের কে হত?

      যে তিনটিকে আহত পিণ্ডারী-দস্যু বলিয়া পরিচিত করিয়াছি, তাহাদের দুইজনে, যেন ভয়ানক মুখস্থ আছে এই ভাবে মনে করিবার ভঙ্গিমায় দ্রুত ঠোঁট নাড়িতে লাগিল। তৃতীয়টি অত্যন্ত ঘাবড়াইয়া গিয়াছিল। নবীন মাস্টারের রসিকতা ধরিতে না পারিয়া বৈরাম খাঁর সহিত গোলমাল করিয়া বলিয়া ফেলিল, আকবরের পিসেমশাই হত স্যার।

      সপাৎ করিয়া বেত নামিল। — আকবরের পিসেমশায় হত; — ভিন্সেণ্ট স্মিথের ঠাকুরদাদা রায় দিলেন। অন্য পিঠগুলাতেও সপাসপ সপাসপ আওয়াজ হইতে লাগিল। নবীন মাস্টার গর্জ্জাইতে লাগিলেন, লক্ষ্মীছাড়া সব, পেটে বোমা মারলে হিস্ট্রির একটা অক্ষর বেরোয় না — পৃথ্বীরাজ, টিপু সুলতান আর পিণ্ডারীদের একসঙ্গে লড়াই হচ্ছে। হিস্ট্রির পিণ্ডি চটকানো হচ্ছে! এই রস্‌কে লক্ষ্মীছাড়া হচ্ছে হারামজাদার জড়!

      আবার সপাৎ সপাৎ করিয়া বেতের ঘা পড়িতে লাগিল।

      রসিকের কালো মুখ রাগে, অপমানের যন্ত্রণায় তামাটে হইয়া উঠিয়াছিল। উস উস করিয়া চোখ-মুখ কুঁচকাইয়া মার খাইল। শেষ হইলে প্রচণ্ডভাবে এক বার টিপুর দিকে চাহিয়া লইয়া দাঁতে দাঁত পিষিয়া বলিল, আমরা একটুও মারামারি করি নি; কে বলেছে?

      নবীন মাস্টার হঠাৎ বেত বন্ধ করিয়া দিলেন, ডাকিলেন, অন্তা!

      অনন্তকুমার অর্থাৎ আজিকার টিপু সুলতান মাস্টারকে শুনাইয়া, আমায় এখানটা একটু বুঝিয়ে দাও তো ভাই। — বলিয়া সবে পাশের ছেলের নিকট জিওমেট্রির একটা পাতা মেলিয়া ধরিয়াছিল; আহ্বান-মাত্রেই উঠিয়া দাঁড়াইয়া উত্তর দিল, আজ্ঞে স্যা — র।

      এরা আজ মোটেই লড়াই করে নি?

      করেছিল বইকি স্যার; আমি স্যার, কত করে বুঝিয়ে বললাম স্যার, টিপিন-পিরিয়ডটা কি ভাই হুড়োহুড়ি দাপাদাপি করবার জন্যে স্যার দিয়েছেন? তা আমার কথা স্যার —

      আর শেষ করিতে হইল না, রসিক বাঘের মত একটা লাফ দিয়া অস্তার ঘাড়ে পড়িল এবং তাহার মাথাটা নিজের বুকের মধ্যে টানিয়া লইয়া চাপা কান্নার একটা ‘গি-গি’ শব্দ করিতে করিতে কিল চড় আঁচড়ানি কামড়ানি যাহা সুবিধা পাইল, তাহাই দিয়া নিজের আশ মিটাইয়া মাথাটা ঝাঁকানি দিয়া পিছনে ঠেলিয়া দিল এবং পলকের মধ্যে নবীন মাস্টারের লাঠিটা টেবিল হইতে তুলিয়া লইয়া এক দৌড়ে সদর-রাস্তার উপর আসিয়া দাঁড়াইল। সেখানে দাঁড়াইয়া লাঠিট। খেলাইয়া চীৎকার করিতে লাগিল, আজ সমস্ত ইস্কুল এক ধারে, আর রসিক এক ধারে। একটা এসপার কি ওসপার যা হয় কিছু করব; চলে আয় অন্তা, মরদকা বাচ্চা হ’স তো।

      সমস্ত স্কুলটা বারান্দায় আসিয়া জড় হইল। শিক্ষকেরা ‘ধরে আন ছোড়াকে, ধরে আন’ বলিয়া অনিশ্চিতভাবে হুকুম করিতে লাগিল। কিন্তু কেহই আর বারান্দা হইতে নামিতে সাহস করিল না। দারোয়ান রামভজ্জু, ‘হামি যাবে, হালমানজীকে কিরপাসে’ বলিয়া নামিয়া গটগট করিয়া কয়েক পা অগ্রসর হইল। রাস্তায় বিছাইবার জন্য এক জায়গায় পাথর-ভাঙা জড় করা ছিল। চলে আয়, এই তো মাংতা হ্যায়। — বলিয়া রসিক সেইখানে গিয়া দাঁড়াইল। রামভজ্জু পিছনে ফিরিয়া দেখিতে দেখিতে তাড়াতাড়ি বারান্দায় ফিরিয়া আসিল। বলিল, ডাকু আছে; ইস্কুলের গাছের আমগুলো কে ঢিল মেরে লুকসা করিয়েসে বাবু? ওহি তো।

    • রাণুর প্রথম ভাগ

      রাণুর প্রথম ভাগ

      বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

      [book]

      রাণুর প্রথম ভাগ

      আমার ভাইঝি রাণুর প্রথম ভাগের গণ্ডি পার হওয়া আর হইয়া উঠিল না।

      তাহার সহস্রবিধ অন্তরায়ের মধ্যে দুইটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য, এক, তাহার প্রকৃতিগত অকালপক্ক গিন্নীপনা, আর অন্যটি, তাহার আকাশচুম্বী উচ্চাকাঙ্ক্ষা। তাহার দৈনিক জীবনপ্রণালী লক্ষ্য করিলে মনে হয়, বিধাতা যদি তাহাকে একেবারে তাহার ঠাকুরমার মত প্রবীণ গৃহিণী এবং কাকার মত এম. এ., বি. এল. করিয়া পাঠাইতেন, তাহা হইলে তাহাকে মানাইতও ভাল এবং সেও সন্তুষ্ট থাকিত। তাহার ত্রিশ-চল্লিশ বৎসর পরবর্ত্তী ভাবী নারীত্ব হঠাৎ কেমন করিয়া যেন ত্রিশ-চল্লিশ বৎসর পূর্ব্বে আসিয়া পড়িয়া তাহার ক্ষুদ্র শরীর-মনটিতে আর আঁটিয়া উঠিতেছে না — রাণুর কার্য্যকলাপ দেখিলে এই রকমই একটা ধারণা মনে উপস্থিত হয়। প্রথমত, শিশুসুলভ সমস্ত ব্যাপারেই তাহার ক্ষুদ্র নাসিকাটি তাচ্ছিল্যে কুঞ্চিত হইয়া উঠে — খেলাঘর সে মোটেই বরদাস্ত করিতে পারে না, ফ্রক জামাও না, এমন কি নোলক পরাও নয়। মুখটা গম্ভীর করিয়া বলে, আমার কি আর ও সবের বয়েস আছে মেজকা?

      বলিতে হয়, না মা, আর কি — তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকল।

      রাণু চতুর্থ কালের কাল্পনিক দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনায় মুখটা অন্ধকার করিয়া বসিয়া থাকে।

      আর দ্বিতীয়ত — কতকটা বোধ হয় শৈশবের সহিত সম্পর্কিত বলিয়াই — তাহার ঘোরতর বিতৃষ্ণা প্রথম ভাগে। দ্বিতীয় ভাগ হইতে আরম্ভ করিয়া তাহার কাকার আইন-পুস্তক পর্য্যন্ত আর সবগুলির সহিতই তাহার বেশ সৌহার্দ্দ্য আছে, এবং তাহাদের সহিতই তাহার দৈনিক জীবনের অর্দ্ধেকটা সময় কাটিয়া যায় বটে, কিন্তু প্রথম ভাগের নামেই সমস্ত উৎসাহ একেবারে শিথিল হইয়া আসে। বেচারীর মলিন মুখখানি ভাবিয়া আমি মাঝে মাঝে এলাকাড়ি দিই — মনে করি, যাকগে বাপু, মেয়ে — নাই বা এখন থেকে বই স্লেট নিয়ে মুখ গুঁজড়ে রইল, ছেলে হওয়ার পাপটা তো করে নি; নেহাতই দরকার বোধ করা যায়, আর একটু বড় হোক, তখন দেখা যাবে ’খন।

      এই রকমে দিনগুলা রাণুর বেশ যায়; তাহার গিন্নীপনা সতেজে চলিতে থাকে এবং পড়াশুনারও বিষম ধুম পড়িয়া যায়। বাড়ির নানা স্থানের অনেক-সব বই হঠাৎ স্থানভ্রষ্ট হইয়া কোথায় যে অদৃশ্য হয়, তাহার খোঁজ দুরূহ হইয়া উঠে এবং উপরের ঘর নীচের ঘর হইতে সময়-অসময়ে রাণুর উচুঁ গলায় পড়ার আওয়াজ আসিতে থাকে — ঐ ক-য়ে য-ফলা ঐক্য, ম-য়ে আকার ণ-য়ে হস্বই ক-য়ে য-ফলা মাণিক্য, বা পাখী সব করে রব রাতি পোহাইল, অথবা তাহার রাঙা কাকার আইন মুখস্থ করার ঢঙে — হোয়ার অ্যাজ ইট ইজ, ইত্যাদি।

      আমার লাগে ভাল, কিন্তু রাণুর স্বাভাবিক স্ফূর্ত্তির এই রকম দিনগুলা বেশিদিন স্থায়ী হইতে পারে না। ভাল লাগে বলিয়াই আমার মতির হঠাৎ পরিবর্ত্তন হইয়া যায় এবং কর্ত্তব্যজ্ঞানটা সমস্ত লঘুতাকে ভ্রূভঙ্গী করিয়া প্রবীণ গুরুমহাশয়ের বেশে আমার মধ্যে জাঁকিয়া আসিয়া বসে। সনাতন যুক্তির সাহায্যে হৃদয়ের সমস্ত দুর্ব্বলতা নিরাকরণ করিয়া গুরুগম্ভীর স্বরে ডাক দিই, রাণু!

      রাণু এ স্বরটি বিলক্ষণ চেনে; উত্তর দেয় না। মুখটি কাঁদ-কাঁদ করিয়া নিতান্ত অসহায় ভালমানুষের মত ধীরে ধীরে আসিয়া মাথা নীচু করিয়া দাঁড়ায়, আমার আওয়াজটা তাহার গলায় যেন একটা ফাঁস পরাইয়া টানিয়া আনিয়াছে। আমি কর্ত্তব্যবোধে আরও কড়া হইয়া উঠি, সংক্ষেপে বলি, প্রথম ভাগ। যাও।

      ইহার পরে প্রতি বারই যদি নির্ব্বিবাদে প্রথম ভাগটি আসিয়া পড়িত এবং যেন তেন প্রকারেণ দুইটা শব্দও গিলাইয়া দেওয়া যাইত তো হাতেখড়ি হওয়া ইস্তক এই যে আড়াইটা বৎসর গেল, ইহার মধ্যে মেয়েটাও যে প্রথম ভাগের ও-কয়টা পাতা শেষ করিতে পারিত না, এমন নয়। কিন্তু আমার হুকুমটা ঠিকমত তামিল না হইয়া কতক গুলা জটিল ব্যাপারের সৃষ্টি করে মাত্র — যেমন, এরূপ ক্ষেত্রে কোন কোন বার দুই-তিন দিন পর্য্যন্ত রাণুর টিকিটি আর দেখা যায় না। সে যে কোথায় গেল, কখন আহার করিল, কোথায় শয়ন করিল, তাহার একটা সঠিক খবর পাওয়া যায় না। দুই-তিন দিন পরে হঠাৎ যখন নজরে পড়িল, তখন হয়তো সে তাহার ঠাকুরদাদার সঙ্গে চায়ের আয়োজনে মাতিয়া গিয়াছে, কিংবা তাহার সামনে প্রথম ভাগটাই খুলিয়া রাখিয়া তাহার কাকাদের পড়ার খরচ পাঠানো কিংবা আহার্য্য দ্রব্যের বর্ত্তমান দুর্ম্মূল্যতা প্রভৃতি সংসারের কোন একটা দুরূহ বিষয় লইয়া প্রবল বেগে জ্যাঠামি করিয়া যাইতেছে, অথবা তাঁহার বাগানের যোগাড়যন্ত্রের দক্ষিণহস্তস্বরূপ হইয়া সব বিষয়ে নিজের মন্তব্য দিতে দিতে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। আমার দিকে হয়তো একটু আড়চোখে চাহিল, বিশেষ কোন ভয় উদ্বেগ নাই — জানে, এমন দুর্ভেদ্য দুর্গের মধ্যে আশ্রয় লইয়াছে, যেখানে সে কিছুকাল সম্পূর্ণ নির্ব্বিঘ্ন।

      আমি হয়তো বলিলাম, কই রাণু, তোমায় না তিন দিন হ’ল বই আনতে বলা হয়েছিল?

      সে আমার দিকে না চাহিয়া বাবার দিকে চায়, এবং তিনিই উত্তর দেন, ওহে, সে এক মহা মুশকিল ব্যাপার হয়েছে, ও বইটা যে কোথায় ফেলেছে —

      রাণু চাপা স্বরে শুধরাইয়া দেয়, ফেলি নি — বল, কে যে চুরি ক’রে নিয়েছে —

      হ্যাঁ, কে যে চুরি করে নিয়েছে, বেচারী অনেকক্ষণ খুঁজেও —

      রাণু যোগাইয়া দেয়, তিন দিন খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়েও —

      হ্যাঁ, তোমার গিয়ে, তিন দিন হয়রান হয়ে ও — শেষে না পেয়ে হাল ছেড়ে —

      রাণু ফিসফিস করিয়া বলিয়া দেয়, হাল ছাড়ি নি এখনও।

      হ্যাঁ, ওর নাম কি হাল না ছেড়ে ক্রমাগত খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছে। যা হোক, একখানা বই আজ এনে দিও, কতই বা দাম!

      রাগ ধরে, তুই বুঝি এই কাটারি হাতে করে বাগানে বাগানে বই খুঁজে বেড়াচ্ছিস? লক্ষ্মীছাড়া মেয়ে।

      কাতরভাবে বাবা বলেন, আহা, ওকে আর এ সামান্য ব্যাপারের জন্যে গালমন্দ করা কেন? এবার থেকে ঠিক করে রাখবে তো গিন্নী?

      রাণু খুব ঝুঁকাইয়া ঘাড় নাড়ে। আমি ফিরিয়া আসিতে আসিতে শুনিতে পাই, তোমায় অত করে শেখাই, তবু একটুও মনে থাকে না দাদু। কি যেন হচ্ছ দিন দিন!

      কখনও কখনও হুকুম করিবার খানিক পরেই বইটার আধখান আনিয়া হাজির করিয়া সে খোকার উপর প্রবল তম্বি আরম্ভ করিয় দেয়। তম্বিটা আসলে আরম্ভ হয় আমাকেই ঠেস দিয়া, তোমার আদুরে ভাইপোর কাজ দেখ মেজকা। লোকে আর পড়াশুনা করবে কোথা থেকে?

      আমি বুঝি, কাহার কাজ। কটমট করিয়া চাহিয়া থাকি।

      দুষ্টু ছুটিয়া গিয়া বামালসুদ্ধ খোকাকে হাজির করে — সে বোধ হয় তখন একখানা পাতা মুখে পুরিয়াছে এবং বাকিগুলার কি করিলে সবচেয়ে সদ্গতি হয়, সেই সম্বন্ধে গবেষণা করিতেছে। তাহাকে আমার সামনে ধপ করিয়া বসাইয়া রাণু রাগ দেখাইয়া বলে, পেত্যয় না যাও, দেখ। আচ্ছা, এ ছেলের কখনও বিদ্যে হবে মেজকা?

      আমি তখন হয়তো বলি, ওর কাজ, না তুমি নিজে ছিঁড়েছ রাণু? ঠিক আগেকার পাঁচখানি পাতা ছেঁড়া — যত বলি, তোমায় কিছু বলব না — খান তিরিশেক বই তো শেষ হল!

      ধরা পড়িয়া লজ্জা, ভয়, অপমানে নিশ্চল নির্বাক হইয়া এমন ভাবে দাঁড়াইয়া থাকে যে, নেহাত নৃশংস না হইলে ইহার উপর আর কিছু তাহাকে বলা যায় না। তখনকার মত শাস্তির কথা ভুলিয়া তাহার মনের গ্লানিটুকু মুছাইয়া দিবার জন্য আমায় বলিতেই হয়, হারে দুষ্টু, দিদির বই ছিড়ে দিয়েছিস? আর তুমিও তো ওকে একটু-আধটু শাসন করবে না রাণু। ওর আর কতটুকু বুদ্ধি, বল?

      চাঁদমুখখানি হইতে মেঘটা সরিয়া গিয়া হাসি ফোটে। তখন আমাদের দুইজনের মধ্য হইতে প্রথম ভাগের ব্যবধানটা একেবারে বিলুপ্ত হইয়া যায় এবং রাণু দিব্য সহজভাবে তাহার গিন্নীপনার ভূমিকা আরম্ভ করিয়া দেয়। এই সময়টা সে হঠাৎ এত বড় হইয়া যায় যে, ছোট ভাইটি হইতে আরম্ভ করিয়া বাপ, খুড়া, ঠাকুরমা, এমন কি ঠাকুরদাদা পর্য্যন্ত সবাই তাহার কাছে নিতান্ত ক্ষুদ্র এবং স্নেহ ও করুণার পাত্র হইয়া পড়ে। এই রকম একটি প্রথম ভাগ ছেঁড়ার দিনে কথাটা এই ভাবে আরম্ভ হইল — কি করে শাসন করব বল মেজকা? আমার কি নিশ্বেস ফেলবার সময় আছে, খালি কাজ — কাজ — আর কাজ।

      হাসি পাইলেও গম্ভীর হইয়া বলিলাম, তা বটে, কত দিক আর দেখবে?

      যে দিকটা না দেখেছি, সেই দিকেই গোল — এই তো খোকার কাণ্ড চোখেই দেখলে। কেন রে বাপু, রাণু ছাড়া আর বাড়িতে কেউ নেই? খাবার বেলা তো অনেকগুলি মুখ; বল মেজকা! আচ্ছা, কাল তোমার ঝাল-তরকারিতে নুন ছিল?

      বলিলাম, না, একেবারে মুখে দিতে পারি নি।

      তার হেতু হচ্ছে, রাণু কাল রান্নাঘরে যেতে পারে নি। — ফুরসৎ ছিল না। এই তো সবার রান্নার ছিরি! আজ আর সে রকম কম হবে না, আমি নিজের হাতে দিয়ে এসেছি নুন।

      আমার শখের ঝাল-তরকারি খাওয়া সম্বন্ধে নিরাশ হইয়া মনের দুঃখ মনে চাপিয়া বলিলাম, তুমি যদি রোজ এক বার করে দেখ মা।

      গাল দুইটি অভিমানে ভারী হইয়া উঠিল, হবার জো নেই মেজকা, রাণু হয়েছে বাড়ির আতঙ্ক। ‘ওরে, ওই বুঝি রাণু ভাড়ার-ঘরে ঢুকেছে — রাণু বুঝি মেয়েটাকে টেনে দুধ খাওয়াতে বসেছে, দেখ্ দেখ্ — তোকে কে এত গিন্নীত্ব করতে বললে বাপু?’ হ্যাঁ, মেজকা, এত বড়টা হলুম, দেখেছ কখনও আমায় গিন্নীত্ব করতে — কখনও — একরত্তিও?

      বলিলাম, বলে দিলেই হ’ল একটা কথা, ওদের আর কি!

      মুখটি বুজে শুনে যাই। একজন হয়তো বললেন, ‘ওই বুঝি রাণু রান্নাঘরে সেঁধোল!’ রাঙী বেড়ালটা বলে, আমি পদে আছি। কেউ চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ওরে, রাণু বুঝি ওর বাপের — ।’ আচ্ছা মেজকা, বাবার ফুলদানিটা আমি ভেঙেছি বলে তোমার একটুও বিশ্বাস হয়?

      এ ঘটনাটি সবচেয়ে নূতন; গিন্নীপনা করিয়া জল বদলাইতে গিয়া রাণুই ফুলদানিটা চুরমার করিয়া দিয়াছে, ঘরে আর দ্বিতীয় কেহ ছিল না। আমি বলিলাম, কই, আমি তো মরে গেলেও এ কথা বিশ্বাস করতে পারি না।

      ঠোঁট ফুলাইয়া রাণু বলিল, যার ঘটে একটুও বুদ্ধি আছে, সে করবে না। আমার কি দরকার মেজকা, ফুলদানিতে হাত দেবার? কেন, আমার নিজের পেরথোম ভাগ কি ছিল না যে বাবার ফুলদানি ঘাঁটতে যাব?

      প্রথম ভাগের উপর দরদ দেখিয়া ভয়ানক হাসি পাইল, চাপিয়া রাখিয়া বলিলাম, মিছিমিছি দোষ দেওয়া ওদের কেমন একটা রোগ হয়ে পড়েছে।

      দুষ্টু একটু মুখ নীচু করিয়া চুপ করিয়া রহিল; তাহার পর সুবিধা পাইয়া তাহার সদ্য দোষটুকু সম্পূর্ণরূপে স্খলন করিয়া লইবার জন্য আমার কোলে মুখ গুঁজিয়া আরও অভিমানের সুরে আস্তে আস্তে বলিল, তোমারও এ রোগটা একটু একটু আছে মেজকা; — এক্ষুনি বলছিলে, আমি পেরথোম ভাগটা ছিঁড়ে এনেছি।

      মেয়ের কাছে হারিয়া গিয়া হাসিতে হাসিতে তাহার কেশের মধ্যে অঙ্গুলি-সঞ্চালন করিতে লাগিলাম।