Author: তাহের আলমাহদী

  • একষট্টি থেকে সত্তর পরিচ্ছেদ

    একষট্টি থেকে সত্তর পরিচ্ছেদ

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    একষট্টি থেকে সত্তর পরিচ্ছেদ

    “ভাই হেমকান্ত, তোমার পত্রখানি ঠিক তিন দিন আগে পাইয়াছি। তাহার পর হইতে কেবলই ভাবিতেছি, তোমাকে কী লিখিব। ভাবিয়া দেখিলাম, দুইটি পন্থা আছে। তোমার মানসিক বৈকল্যে এলেপ দিতে দু-একটা সান্ত্বনার কথা, স্তোকবাক্য অথবা এই বৈকল্যকে তোমার দার্শনিক চেতনা বলিয়া বর্ণনা করিয়া লেখা যায়। তাহাতে তোমার মানসিক বৈকল্যের কতদূর কী প্রশমন ঘটিবে জানি না, কিন্তু তোমার দুর্বলতাকে প্রকারান্তরে প্রশ্রয় দেওয়া হইবে। দ্বিতীয় পন্থা মোহমুদগর। অথাৎ তোমার মতো কূপমণ্ডুককে দেশকাল ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে সচেতন করিয়া তুলিয়া তুমি যে কত বড় অপদার্থ তাহাই তোমার চক্ষুর সম্মুখে তুলিয়া ধরা। আমি দ্বিতীয় পন্থাটিই গ্রহণ করিলাম।

    “তোমার পুত্র হইতে যতদূর উদ্ধার করিতে পারিলাম তাহার মোদ্দা কথা হইল, তোমার নবনীনিন্দিত কোমল কর হইতে কুয়ার বালতি স্খলিত হইয়া জলে পড়িয়াছে! ঘটনা তো তবে সাঙ্ঘাতিক। সারা বিশ্বে তো সাম্প্রতিককালে এরূপ বিশাল বিপর্যয় আর ঘটে নাই। ফলে তোমার মনে হইল, তুমি বুড়া হইতেছ, জীবনদীপের শিখা নিস্তেজ হইতেছে ইত্যাদি। ভাল কথা। কিন্তু এই অবিমিশ্র জলীয় মানসিকতার উৎসটি কোথায় তাহা কোনোদিন স্থিরচিত্তে ভাবিয়া দেখিবার অবকাশ পাইয়াছ কি? তোমার হস্তাক্ষর মুক্তার ন্যায় সুন্দর, ভাষাও প্রাঞ্জল। তথাপি বলি, তোমাকে বাল্যকালাবধি গভীরভাবে জানি বলিয়া পত্রটির অন্তর্নিহিত অর্থটি খানিকটা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিয়াছি। সাধারণ মানুষ এই পত্র পড়িয়া মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝিবে না। বড় জোর ভাবিবে, ইহা বোধ করি কৃপিত বায়ুর প্রভাব।

    “তোমার মনে আছে কিনা জানি না, বাল্যকালে আমরা উভয়ে পাঠশালায় যাইতাম। একদা ব্রহ্মপুত্রের তীরে এক বুড়া পাগল আমাদের তাড়া করিয়াছিল। দোষটা আমারই। সে নিরিবিলিতে বসিয়া বিষ্ঠা ত্যাগ করিতেছিল। আমি তাহাকে একটি ঢিল মারি। খানুপাগলা তাহাতে ক্ষেপিয়া গিয়া অঙ্গের একটিমাত্র আবরণ ছেড়া গামছাখানি পরিত্যাগ করিয়া ভীম হহুংকারে আমাদের ধাওয়া করিল। প্রকৃতপক্ষে কে ঢিল মারিয়াছিল তাহা সে জানিত না। প্রভাতসমীরে ব্রহ্মপুত্রের পারে বসিয়া নিবিষ্টমনে সে প্রাকৃতিক ক্রিয়া সারিতেছিল। ঢিল খাইয়া সে চমকিত হইয়া আমাদের দেখি এবং তৎক্ষণাৎ তাড়া করিল। কে অপরাধী তাহা সে জানিত না, তবে তোমার রাঙামূলার মতো চেহারাটিই তাহার পছন্দ হইয়া থাকিবে। সুতরাং আমাকে ছাড়িয়া সে তোমার পিছু লইল। সেই বয়েসের পক্ষে যথেষ্ট নাদুসনুদুস শরীর লইয়া তুমি প্রাণভয়ে বইখাতা ফেলিয়া দৌড়াইতেছ আর দিগম্বর খানুপাগলা তোমাকে তাড়া করিয়া লইয়া যাইতেছে, দৃশ্যটা যথেষ্ট হাস্যোদ্রেককারী। কিন্তু মুস্কিল হইল সেই সময়ে তুমি দৌড়ঝাঁপ ভাল জানিতে না। এমন কি আমাদের মতো হাঁটিয়া পাঠশালায় যাওয়ার অভ্যাসও তোমার ছিল না। তোমার দৌড় দেখিয়া মনে হইতেছিল যেন স্বয়ং জরদ্গব দৌড়াইবার চেষ্টা করিতেছে। কালীবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাইতেই তোমার দম বাহির হইবার জোগার, আতঙ্কে চোখ ডিম্বাকৃতি ধারণ করিয়াছে, কেমন যেন দিগবিদিগজ্ঞানশূন্য দিশাহারা অবস্থা। জমিদার-নন্দনের সেই দুরবস্থা দেখিয়া পথচারীরা অবশ্য হস্তক্ষেপ করিল এবং খানুপাগলাও নিরস্ত হইল। কিন্তু বহুক্ষণ তোমার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়া আসে নাই। তোমার বাক্য সরিতে ছিল না, আর বারবার শিহরিয়া উঠিতেছিলে, চোখে এক অস্বাভাবিক দৃষ্টি। তোমার অবস্থা দেখিয়া আমি ভয় পাইয়া গিয়াছিলাম, পাগলের তাড়া, কুকুরের কামড়,বা অন্যতর নানাবিধ উৎপাত বাল্যকালের নিত্যসঙ্গী। ইহাতে অতটা আতঙ্কিত হওয়ার কী আছে তাহা আমার শিশু মস্তিষ্কে ঢোকে নাই! তবে বুঝিয়াছিলাম, তোমার মন তেমন শক্তপোক্ত নহে। অথচ তোমারই অগ্রজ বরদাকান্ত অসম সাহসী বালক ছিল। তোমার সহোদর নলিনীর সাহসিকতার খ্যাতি তো ব্যাপক।

    “তুমি যুবা বয়সে ফুটবল খেলিয়াছ এবং তেমন মন্দ খেল নাই, তোমার জীবনে একমাত্র ওইটিই যা পুরুষোচিত। সেও খেলিয়াছ আমারই তাড়নায়। নহিলে বাল্যকালে বিদ্যালয়ে তুমি ছিলে বালকদের উপহাস ও লঘুক্রিয়ার উপকরণ। কিন্তু তোমার মধ্যে যে সৎ ও মহৎ একটি মানুষের বাস তাহা অনুভব করিয়া আমি তোমাকে প্রচণ্ড ভালবাসিতাম। তাই তোমাকে লইয়া বিদ্যালয়ে যে লঘু হাস্য-পরিহাস চলিত তাহা আমি পছন্দ করিতাম না। তাই সর্বদা তোমাকে রক্ষা করিয়া চলিতাম। একদিন মনে হইল, তুমি যদি নিজেই নিজেকে রক্ষা করিতে শিক্ষা না কর তবে আমার সাধ্য নাই বহির্বিশ্বের নানাবিধ আক্রমণ হইতে তোমাকে সর্বদা রক্ষা করিতে পারি। ফুটবল একটি উপলক্ষ মাত্র। তবে তাহার বিশেষ উপযোগ শরীর ও মনকে একযোগে গড়িয়া তোলে। বলিতে কী, ফুটবল তোমাকে জীবনের অনেক বাহুল্য বর্জন করিয়া একমুখীন হইতে শিখাইয়াছিল। বিপক্ষের গোলপোস্ট যখন আমাদের লক্ষ্যস্থল তখন ক্রীড়াটিও অর্থপূর্ণ ও লক্ষ্যাভিমুখী সংবেগ লাভ করে। ওই গোলপোস্টটি যদি না থাকে তবে ক্রীড়া অর্থহীন হইয়া যায়। ক্লান্তি আসে ও সমগ্র পরিশ্রমটাই পণ্ডশ্রম হইয়া পড়ে। ভাই হেম, জীবনটাও কি তাহাই নহে?

    “তোমার জীবনটা এইরূপ লক্ষ্যহীন হইয়া ওঠার অবশ্য কারণ আছে। বরদাকান্ত সন্ন্যাসী ও নলিনী স্বদেশী হইয়া যাওয়ায় তোমার পিতামাতা তোমার সম্পর্কে বিশেষ সাবধানী হইয়া পড়েন। অত আদর সতর্কতা তোমাকে ঘিরিয়া থাকায় তুমি ছায়াবৃত্ত বৃক্ষের মতো তেমন বাড়িয়া ওঠ নাই। মা-বাবার মুখ চাহিয়া তোমাকে অনেক অনভিপ্রেত গ্রহণ বর্জন করিতে হইয়াছে। ফলে তোমার চরিত্রের স্বাভাবিক বিকাশ ঘটে নাই। উপরন্তু জমিদার-নন্দন হইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছ বলিয়া তোমাকে খাওয়াপরার ভাবনাও ভাবিতে হয় নাই। কল্পনাবিলাসী হওয়া তোমার পক্ষে স্বাভাবিক। কিন্তু ভাই হেম, কল্পনাবিলাসী হওয়া কি আমাদের সাজে?

    “দেশ তথা বিশ্বের পরিস্থিতি যদি কিছুটা অনুধাবন করার চেষ্টা কর তাহা হইলে দেখিবে আমরা কি রকম সংকটের ভিতর দিয়া চলিয়াছি। একটা বিশ্বযুদ্ধ শেষ হইয়াছে তো আফগানিস্তান লইয়া আর এক বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে। আমানুল্লাকে সিংহাসন ছাড়িতে হইয়াছে। রুশীরা ফৌজ পাঠাইয়াছে। এদিকে সাইমন কমিশনরূপ এক দুষ্টচক্র এদেশে ব্রিটিশ শাসন কায়েম করিবার ফন্দি আঁটিতেছে। সংবাদপত্রটিও কি পড়িবার মতো আগ্রহ বোধ কর না? এদেশে প্রতি বৎসর ইংরাজ ১১১ কোটি টাকার পণ্য বিক্রয় করে। ভারতবাসীকে লইয়া যে ছেলেখেলা ও দুষ্ট ব্যবসা চলিতেছে সে সম্পর্কে সচেতন হও। কল্পনার ভূমি হইতে দেশ কাল পরিস্থিতির মধ্যে অবতীর্ণ হও। মৃত্যুচিন্তা কর্পূরের মতো উড়িয়া যাইবে।

    “তুমি বুড়া হইয়াছ ভাবিলেও হাসি পায়। কে, আমি তো তোমার বয়স্য হইয়াও বুড়া হই নাই! তবে তোমার বার্ধক্যের বোধ কোথা হইতে আসিতেছে? বলিলে হয়তো রাগ করিবে, তবু বলি, তোমার আসল খাঁকতি অন্য জায়গায়। তোমার সেই স্পর্শকাতর ও সযত্নগোপন স্থানটির সন্ধান আমি কতকটা জানি। বলি কি, লোকলজ্জা পরিত্যাগ করিয়া বরং রঙ্গময়ীকে বিবাহ কর। আর কতকাল একতরফা, প্রকাশবিমুখ, গোপন ও মূক প্রণয়ের জ্বালায় পুড়িয়া খাক হইবে? রঙ্গময়ী বাস্তববোধসম্পন্না, বুদ্ধিমতী ও সাহসী। সে সম্পূর্ণভাবে তোমার ভার লইলে এখনো জীবনে অনেক কিছু করার পথ খুলিয়া যাইবে। তোমার দেহ বৃদ্ধ হয় নাই, হইয়াছে তোমার মন। সুনয়নী আজ বাঁচিয়া থাকিলে আমি একথা উচ্চারণ করিবার সাহস পাইতাম না। যদিও জানি সুনয়নীর প্রতি তোমার প্রেম তেমন গভীর ছিল না। কেন ছিল না সে প্রশ্ন করিব না। হৃদয়ের আচরণ চিরকালই বিচিত্র। সুনয়নীর তো সৌন্দর্যের কোনো অভাব ছিল না। তবু সে তোমার মন পায় নাই। তোমার যখন বিবাহ হয় তখন রঙ্গময়ী নিতান্তই শিশু। তবু তাহার সঙ্গে তোমার বিবাহের একটা প্রস্তাব আসিয়াছিল। দরিদ্র পুরোহিত-কন্যাকে শেষ অবধি অবশ্য তোমরা গ্রহণ কর নাই। কিন্তু বর্জনই কি করিতে পারিলে!

    “রঙ্গময়ী তোমাদের বিশাল বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরিয়া এবং তোমাদেরই ভুক্তাবশেষ খাইয়া বড় হইয়াছে। তাহাকে লইয়া রটনাও বড় কম হয় নাই। কিন্তু যখন কৈশোর উত্তীর্ণ হইয়া সে যৌবনে পা দিয়াছে তখনই তাহাকে দেখিয়া বুঝিতাম, তাহার আলাদা একটা সত্তা ও ব্যক্তিত্ব দেখা দিতেছে। সে সুনয়নীর মতো সুন্দরী নহে বটে তবে আমাদের বাড়ির মেয়েদের মতো জলভাতও সে নহে। তুমিও রঙ্গময়ীর প্রসঙ্গ উঠিলে লজ্জা পাইতে শুরু করিলে। রোগটা আমি তখনই ধরিয়াছিলাম। কিন্তু তখনো সুনয়নী তোমার ঘর আলো করিয়া বিরাজ করিতেছে। কাজেই বিষয়টি বেশী তলাইয়া দেখি নাই। আমার বিশ্বাস, পুরুষমানুষ একটিমাত্র নারীর দ্বারা সম্পূর্ণ পোষণ পাইতে পারে না। বহু নারীর প্রতি তাহার আকর্ষণ স্বাভাবিক ও প্রকৃতি-অনুমোদিত। কিন্তু বহুবিবাহের হ্যাপাও বড় কম নহে। তাই রঙ্গময়ীর প্রতি তোমার দুর্বলতা আন্দাজ করিয়াও চুপ করিয়া ছিলাম। উপরন্তু এই যুগে ও পরিবেশে স্বাভাবিক বিবেকসম্পন্ন কোনো পুরুষের নারীপ্রেম লইয়া মাথা ঘামানোটা পাপ বলিয়াই মনে করি। প্রেম যদি কোথাও নিবেদন করিতে হয় তবে তাহা দেশমাতৃকার পায়ে। কিন্তু সেই বীরত্ব তোমার নাই। তবে তোমার সংযম আছে, কুণ্ঠা ও সৌজন্যবোধ আছে। প্রেম থাকিলেও তাহা তোমাকে প্রগলভ করিয়া তুলিবে না ইহাও জানিতাম। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ওই প্রেমই তোমাকে খাইবে।

    “ভাই হেম, আজ তোমার যে সব মৃত্যুচিন্তা ও অনিত্যের ভাবনা দেখা দিয়াছে, আজ যে তুমি নিবিষ্টমনে জগতে কে আত্মজন ও কে পর তাহা বিচার কবিতে শুরু করিয়াছ তাহা কিন্তু বাস্তবিক কোনো দার্শনিকতা নহে, বোধিও নহে। প্রবৃত্তির ক্ষুধা একটি ক্ষেত্রে নিবৃত্ত না হইলে অন্য দিক দিয়া ফুটিয়া বাহির হয়। জানিও, দুনিয়ার অধিকাংশ সন্ন্যাসী বৈরাগীই নানা অচরিতার্থ প্রবৃত্তির শিকার। তোমার ক্ষেত্রেও মনে হয়, প্রকৃতি প্রতিশোধ লইতেছে মাত্র। ওই বৈরাগ্যের মূলে আছে সেই নারীপ্রেম যাহা চরিতার্থ হয় নাই। গ্রাসটি সম্মুখে লইয়া ক্ষুধার্ত বাঘটি বসিয়া আছে। সংকোচবশে ভোজন করিতেছে না। প্রবৃত্তি চাহিতেছে, কিন্তু সৌজন্য ও সংকোচ বাধা দিতেছে। বিশেষ করিয়া, তোমার কনিষ্ঠ সহোদবকে জড়াইয়া এই রঙ্গময়ীর নামে কলঙ্ক রটিয়াছিল। তদুপরি সে পুরোহিতকন্যা। এর উপর আবার তোমার পুত্রকন্যারা সাবালক হইয়াছে, তোমার নাতি নাতনীও জন্মগ্রহণ করিয়াছে। সংকোচ স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষুধা ছাড়িবে কেন? সে তাই অন্য পন্থা লইয়াছে। তোমার মনের বৈক্লব্য ঘটাইয়া এখন সে তোমাকে লইয়া ছিনিমিনি খেলিবেই।

    কুয়ার বালতি লইয়া আর গভীর চিন্তা করিও না। বাইরের ঘটনাগুলি ঘটনাই নয়। আসলে যাহা ঘটে তাহার গভীরে আছে আমাদের মন। সেই মনের সম্মুখীন হও। অকপটে নিজের কাছে নিজেকে প্রকাশ কর। ভাবের ঘরে আর চুরি করিও না।

    “প্রিয় হেমকান্ত, তোমাকে এইসব কথা লিখিয়া কিছু ক্লেশও বোধ করিতেছি। হয়তো এতটা কঠোর সমালোচনা না করিলেও পারিতাম। কিন্তু শল্য চিকিৎসারই যদি প্রয়োজন দেখা দেয় তবে সংকটাপন্ন রোগীকে বাঁচাইতে অস্ত্র ধরিতেই হয়।

    “শীঘ্র দেশে যাওয়া হইবে না। কলিকাতায় কংগ্রেসের সভায় যোগ দিতে আসিয়াছি। যে বিপুল সমারোহ, উৎসব ও উদ্দীপনা এই সম্মেলনকে উপলক্ষ করিয়া দেখা দিয়াছে তাহা অভাবনীয়। মানুষ যদি এইভাবে জাগিয়া ও জাগরণটুকু ধরিয়া রাখিতে পারে তবে স্বরাজ আসিতে কতদিন লাগিবে?…”

    হেমকান্ত সচ্চিদানন্দের দীর্ঘ চিঠিটা বার দুই পড়লেন। তাঁর গা একটু জ্বালা করছিল। রাগ ক্ষোভ তাঁর সহজে হয় না। তবু সচ্চিদানন্দের চিঠি পড়ে হল।

    বিশাল ডেকচেয়ারে আধশোয়া হেমকান্ত কাশ্মীরি কারুকাজওলা ছোট্ট ত্রিপয়ের ওপর চিঠিটা রেখে জানালা দিয়ে চেয়ে রইলেন। দক্ষিণের এই জানালা দিয়ে বাড়ির ভিতর দিককার বাগান চোখে পড়ে। দুপুরের কবোষ্ণ রোদ এসে পড়ে গায়ে।

    অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ভিতরের অঙ্গন। কুকুর আছে, গাছপালা আছে, লন আছে। নীল উজ্জ্বল আকাশের গায়ে স্পর্ধিত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে পাম গাছের সারি। সেদিকে চেয়ে রইলেন হেমকান্ত।

    সচ্চিদানন্দ দেশকাল পরিস্থিতির মধ্যে নেমে আসার পরামর্শ দিয়েছে। চিরকালই সে এইরকম। তার মাথায় ছেলেবেলা থেকেই দেশ কাল পরিস্থিতির চিন্তা। তা বলে সব ছেড়েছুড়ে স্বদেশী করতে সে নেমে পড়েনি। আইন পাশ করে প্রবল প্রতাপে ওকালতি করছে। কংগ্রেসের সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীর বার দুই সে ধরা পড়েছে আবার ছাড়াও পেয়েছে। সচ্চিদানন্দের সবই ভাল, কিন্তু বড় বেশী বাস্তুবাদী এবং ঠোঁটকাটা। সেই কারণেই হেমকান্তর তাকে ভাল লাগে, আবার খারাপও লাগে।

    সচ্চিদানন্দের নগ্ন আক্রমণাত্মক চিঠিটার ঝাঁঝ হেমকান্তকে প্রায় ছেয়ে ফেলেছে। বুকে একটা যন্ত্রণার সূত্রপাত হয়েছিল কয়েকদিন আগে। এখন আবার সেরকম যন্ত্রণা হচ্ছে। শ্বাসকষ্টের মতোও লাগছে যেন একটু। মনটা অস্থির।

    হেমকান্ত উঠে ভিতর দিককার দরদালানে এসে পায়চারি করতে লাগলেন। দোতলার এই দরদালানটি বিশেষ রকমের নির্জন। হেমকান্ত পায়চারি করতে করতে ভাবতে লাগলেন। কুয়ার দড়ি, রঙ্গময়ী, শৈশবকাল, সচ্চিদানন্দ। ভাবনার কি শেষ আছে! ভাবতে বড় ভাল লাগে তাঁর। কিন্তু তিনি কিছুতেই বুঝতে পারছেন না, সচ্চিদানন্দের এই বিশ্লেষণ কতদূর সত্য এবং কতটাই বা ভ্রান্ত। কিন্তু তাঁর একটু লজ্জাবোধ হচ্ছে। আপনমনে হাসছেনও। মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছেন।

    ইদানীং এই রোগটা দেখা দিয়েছে তাঁর। একা হলেই আপনমনে ভাবতে ভাবতে কখনো হাসেন, মাথা নাড়েন, একটু-আধটু বিড়বিড় করেন। সচ্চিদানন্দটা পাগল। রঙ্গময়ীকে বিয়ে করতে উপদেশ দিয়েছে। হেমকান্ত রাগ করতে গিয়ে হেসেই ফেললেন হঠাৎ। কেমন দেখাবে? মাথায় টেপিব পরে ছাঁদনাতলায় যেতে? সিঁথিমৌরে রঙ্গময়ীর রূপই বা কেমন খুলবে? পাগল! সচ্চিদানন্দ একটা পাগল!

    “মা গো!” বলে কে চেঁচালো না পুকুরের ধারে?

    হেমকান্ত দরদালানের জানালায় গিয়ে নীচের দিকে চেয়ে দেখলেন,পুকুরের ঘাটে বিশাখা আর চুনী। দুজনেই পিছনের দেয়ালের দিকে চেয়ে আছে। চোখে রোদ পড়েছিল বলে হেমকান্ত। প্রথমটায় ভাল দেখতে পেলেন না। তারপর লক্ষ্য করলেন, পাঁচিলের ওপর একটা কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। জেলখানার মতো উঁচু পাঁচিল। ওঠা খুব সহজ নয়। কে ওটা? বাইরের লোক? না, বাড়িরই কেউ?

    বিরক্ত হেমকান্ত অনুচ্চ স্বরে ডাকলেন, হরি।

    তাঁর খাস চাকর দৌড়ে এল।

    হেমকান্ত ভ্রূ কুঁচকে বললেন, দেখ তো কে একটা লোক পিছনের দেয়ালে উঠেছে। ধরে নিয়ে আয়। পালাতে যেন না পারে দেখিস।

    হরি চলে গেল।

    হেমকান্ত আবার জানালায় এসে দাঁড়ানোর আগে ঘরে গিয়ে কাঠের আলমারি থেকে দূরবীনটা নিয়ে এলেন। বিদেশে তৈরি শক্তিশালী দূরবীন। চোখে তুলে তিনি দেয়ালের ওপরে দাঁড়ানো লোকটাকে দেখলেন।

    লোক নয়, নিতান্তই অল্পবয়সী ছেলে একটা। সতেরো আঠারোর বেশী বয়স হবে না। পরনে মালকোঁচা মারা ধুতি, গায়ে হাফ শার্ট। রং বেশ ফর্সা। সদ্য দাড়ি গোঁফ গজিয়েছে। ছেলেটা পিছনের মস্ত আমবাগানের দিক থেকেই দেয়ালে উঠেছে বলে আন্দাজ করলেন হেমকান্ত। তবে ছেলেটার হাবভাব একটু কেমনতরো। মুখটা শুকননা। চুল এলোমেলো। চোখের চাউনিটা যেন লক্ষ্যহীন। চারদিকে টালমালু করে চেয়ে দেখছে।

    হেমকান্ত দূরবীনটা নামিয়ে রাখলেন। বরকন্দাজরা দেয়ালের নীচে পৌঁছে গেছে। ছেলেটার পালানোর পথ নেই।

    হেমকান্ত সিঁড়ি বেয়ে আস্তে ধীরে নেমে এলেন নীচে। সামনের বৈঠকখানায় বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

    কয়েক মিনিটের মধ্যেই পিছমোড়ায় ধরে বরকন্দাজরা নিয়ে এল ছেলেটিকে। হেমকান্ত লক্ষ্য করলেন, ছেলেটা ল্যাংচাচ্ছে।

    হেমকান্ত নিষ্ঠুরতা পছন্দ করেন না। কিন্তু এই ছেলেটার বেয়াদবিও সহ্য করার মতো নয়। অন্দরমহলের দেয়ালে উঠবে বাইরের লোক, এ কেমন কথা? ওখানে মেয়েরা স্নান করে, বেড়ায়।

    হেমকান্ত গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে?

    ছেলেটা খুবই ঘাবড়ে গেছে। শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে চেটে বলল, আমার অন্যায় হয়ে গেছে। ওটা যে ভিতরের মহল তা বুঝতে পারিনি।

    কথাটা সত্যি হতেও পারে। হেমকান্ত বললেন, তোমার নাম কি? কোথা থেকে আসছো?

    আমার নাম শশীভূষণ গঙ্গোপাধ্যায়। বাড়ি বরিশাল জেলা।।

    এখানে কী করতে এসেছো?

    চাকরি খুঁজতে।

    দেয়ালে উঠে কী করছিলে?

    ছেলেটা ঠোঁট কামড়ে একটু যেন ভেবে নিয়ে বলল, আমি গত দুদিন ওই আমবাগানটায় আছি।

    হেমকান্ত অবাক হয়ে বলেন, আমবাগানে আছো মানে?

    কোথাও থাকার জায়গা পাচ্ছিলাম না, তাই আমবাগানে ছিলাম।

    এই শীতে?

    আজ্ঞে হ্যাঁ। খুব কষ্ট হচ্ছিল।

    তাহলে সরাসরি এসে কাছারিবাড়িতে বলোনি কেন? এ বাড়িতে বা যে কোন বাড়িতে গেলে এক আশ্রয় জুটে যেত।

    আমার উপায় ছিল না।

    কেন?

    শশীভূষণ ঘাবড়ে গেছে বটে, কিন্তু ভেঙে পড়েনি। হেমকান্তর চোখের দিকে চেয়ে বলল, সেটা খুব নিরাপদ হত না। আপনার লোকেরা একটু তফাৎ হলে সব কথা বলতে পারি।

    হেমকান্ত বিরক্ত হলেন। তবু চোখের ইশারায় সবাইকে সরে যেতে বললে সবাই সরে গেল।

    এবার বলো।

    আমি দুদিন ধরে কিছু খাইনি। পুলিশের তাড়া খেয়ে এখানে এসে পড়েছি।

    কেন, পুলিশ তোমাকে তাড়া করেছে কেন?

    তাদের সন্দেহ আমি স্বদেশী করি।

    কুঞ্চিত ভ্রূ সটান হল হেমকান্তর। একটু হাসলেন। আগেই তাঁর অনুমান করা উচিত ছিল ব্যাপারটা।

    হেমকান্ত বললেন, তাই বলো।

    শশীভূষণ ক্ষীণ একটু হেসে বলল, আমবাগানে বড় মশা। আমি ওখানে আর থাকতে পারছি না।

    হেমকান্তর হঠাৎ সচ্চিদানন্দের চিঠিটার কথা মনে হল। দেশ কাল পরিস্থিতি নিয়ে ভাবিত হতে তাঁকে বলেছে সচ্চিদানন্দ। তা দেশকালের তো এই অবস্থা। এইটুকু ছেলে লেখাপড়া ছেড়ে, বাড়িঘর ফেলে স্বদেশী করে বেড়াচ্ছে। হয় গুলিটুলি খেয়ে মরবে, নয় তো জেলে পচবে।

    হেমকান্ত বললেন, দেয়ালে উঠে কী দেখছিলে?

    দেখছিলাম এদিকে কোনো পোডো ঘরটর আছে কিনা।

    অন্য কোনো মতলব ছিল না তো?

    শশীভূষণ মাথা নেড়ে বলল, না। অন্য মতলব কী থাকবে? চরি?

    ধরো তাই।

    খাবার পেলে চুরি করতাম। তাছাড়া আর কিছু চুরির মতলব ছিল না।

    তোমার বাবা কী করেন?

    মাস্টারী। সামান্য মাইনে।

    সে জানি। মাস্টারির মাইনে আর আমাকে শেখাতে হবে না। তুমি কতদূর লেখাপড়া করেছে?

    বি এ পড়ছিলাম।

    এখন পড়ছো না?

    না। কলেজ ছেড়ে দিয়েছি।

    মা-বাপের প্রতি কর্তব্য নেই?

    আছে।

    সেটা আগে না করেই দেশসেবায় বেরিয়ে পড়েছো?

    দেশসেবা তো নয়। পুলিশের সন্দেহ যে, আমি স্বদেশী। বরিশালে একজন পাদ্রী খুন নিয়ে আমাদের বাড়িতে সার্চ হয়। বাবাই আমাকে পালিয়ে যেতে বলেন।

    পাদ্রীকে কারা খুন করেছে?

    জানি না। তবে লোকটা পাদ্রী নয়। পুলিশের স্পাই।

    সে যাই হোক, তোমাকে আশ্রয় দেওয়া বিপজ্জনক।

    তা আমি জানি। আমি দুদিন কিছুই খাইনি।

    দুদিন? বলে হেমকান্ত অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন।

    খাওয়ার পয়সাও নেই! বেরোতেও ভয় করছিল। আমাকে যদি কিছু খাবার দেন তাহলে আবার রওনা হয়ে যেতে পারি।

    কোথায় যাবে?

    ঢাকা। সেখানে আমার পিসির বাড়ি।

    গাড়িভাড়া আছে?

    না। তবে এতটা আসতে পেরেছি, বাকিটাও চলে যেতে পারব।

    আর যদি ধরা পড়ো?

    পড়ব না।

    সচ্চিদানন্দের দেশ কাল পরিস্থিতিই কি শশীভূষণের রূপ ধরে এসে হাজির হল?

    হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হরিকে ডেকে বললেন, একে কিছু খেতে দে। তারপর বারবাড়ির নলিনীর ঘরটায় নিয়ে যা।

    শশীভূষণ হঠাৎ আতঙ্কিত হয়ে বলে, আমি ঘরেটরে যাবো না।

    হেমকান্ত মৃদুস্বরে বললেন, ভয় নেই, ধরিয়ে দেবো না। একটু বিশ্রাম নাও। তারপর চলে যেয়ো।

  • সোনার ডমরু

    সোনার ডমরু

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book-name]

    সোনার ডমরু

    এক

    ডমরুনাথ নেপাল সীমান্তে একটি প্রাচীন তীর্থক্ষেত্র। কিন্তু জনসমাগম বছরে সেই একবার-বৈশাখ মাসে বাবা ডমরুনাথের পুজো উপলক্ষে। বাকি এগারো মাস খাঁ খাঁ নিঃঝুম অবস্থা। আড়াইহাজার ফুট পাহাড়ের মাথায় বাবার মন্দির। ঘোরালো একফালি রাস্তা পাহাড় ঘুরে ঘুরে এগিয়ে গেছে ওপরে। মোটরগাড়ি নিয়েও অনায়াসে ওঠা যায়।

    ছোট্ট একটা বাজার এবং বস্তী রয়েছে ডমরু পাহাড়ের পাদদেশে। সেখান দিয়েই গেছে নেপালগামী একটা পিচের সড়ক।

    অক্টোবরের এক বৃষ্টিঝরা সন্ধ্যায় আমি আমার বৃদ্ধ বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার ভাড়া করা জিপ থেকে নামলুম। যে বাংলোয় আমরা উঠব, সেটা খুব কাছেই একটা টিলার ওপর। জিপের ড্রাইভার বুষ্টু সিং এবং তার ছোকরা অ্যাসিস্টান্ট হরিয়া তাদের প্রতিশ্রুতি মতো আমাদের অল্পস্বল্প মালপত্তর সেখানে পৌঁছে দিল। ওরা যত ভিজল, আমরা তত ভিজলুম না। কারণ আমাদের গায়ে বর্ষাতি চাপানো। কিন্তু বাংলোর বারান্দায় উঠেই আমার বন্ধুটি ভীষণ কাশতে শুরু করলেন।

    চৌকিদার বদ্রীনাথ বয়সে প্রৌঢ়। পেটাই শরীর। বেঁটে, এবং মুখের গড়ন কিঞ্চিৎ বর্তুলাকার। তাকে অমায়িক ও আমুদে লোক বলে মনে হলো। সে আমার সঙ্গী ভদ্রলোকের কাশি দেখে কেন কে জানে হাসি চাপছিল। একটু পরে অনুমান করলুম সম্ভবত কাশির শব্দটাই তার হাসির কারণ।

    হাসি আমারও পাচ্ছিল। কারণ, এযাবৎকাল এই খ্যাতনামা গোয়েন্দা এবং প্রকৃতিবিদ বৃদ্ধলোকটির এমন দুরবস্থা কখনও প্রত্যক্ষ করিনি। কাশতে কাশতে উনি যেভাবে ঝুঁকে পড়ছিলেন ভয় হচ্ছিল, দম আটকে বেঘোরে মারা না পড়েন। কিন্তু কাশি থামার সঙ্গে সঙ্গে ওঁর দুচোখে সেই সুপরিচিত উজ্জ্বল হাসি ছলছল করে উঠছিল। এ হাসি প্রতিফলনের দরুণ দ্বিগুণ উজ্জ্বল-জলে  আলোর ছটা পড়লে যা হয়। ওঁর চোখে কাশি জনিত  জল ছিল।

    অক্টোবরেই উচ্চতার দরুন এ তল্লাটে আবহাওয়া বেশ ঠাণ্ডা। তার ওপর এই বৃষ্টি। শূন্য ফায়ারপ্লেসের দিকে চেয়ে আমি একটা মতলব ভঁজছি টের পেয়ে উনি বললেন, দরকার হবে না ডার্লিং! বরং তুমি বদ্রীকে বলল, ঝটপট কফিটা নিয়ে আসুক। আর শোনো, আমার কিটব্যাগ খুলে ডানদিকে খোপ থেকে ক্ষুদে শিশিটা বের করো।

    বদ্রীর উদ্দেশ্যে হাঁক মেরে জলদি কফি করতে বলার পর কিটব্যাগ খুলে। শিশিটা এনে দিলুম। টেবিলের পাশে পা ছড়িয়ে আরাম কেদারায় বসে উনি শিশি থেকে লালরঙের কয়েকটা গুলি বের করলেন। মুখে ফেলে চুষতে থাকলেন।

    জিজ্ঞেস করলুম, হাই ওল্ড ম্যান! বস্তুটি কি তানসেন গুলি?

    টাকওলা প্রকাণ্ড মাথাটি দোলালেন মাত্র। তারপর অভ্যাসমতো সাদা দাড়িগুলোতে আঙুল বোলাতে থাকলেন। আমি বারান্দায় গিয়ে বৃষ্টি দেখতে থাকলুম।

    বৃষ্টিঝরা অন্ধকার রাতে ডমরুনাথকে রহস্যময় দেখাচ্ছিল। একটু নীচে ওই বস্তী ও বাজারে সামান্য কয়েকটা আলো আবছা ঝিকমিক করছে। শুনেছি, তিনমাইল দূরের হাইড্রো-ইলেকট্রিক সেন্টার থেকে এখানে বিদ্যুৎ আসে। আসার কারণ বাবা ডমরু ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। সেই সুবাদে এই বাংলোও বিদ্যুৎ লাভে বঞ্চিত হয়নি।

    এই সময় হঠাৎ কানে এল পাশের বদ্ধ ঘর থেকে কাদের কথাবার্তা চলেছে। আড়িপাতা স্বভাব আমার নয়। কিন্তু ওই কথাবার্তা স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না। তার চেয়ে বড় কথা, একটি কণ্ঠ মহিলার।

    অনেক সময় অনিচ্ছাসত্ত্বেও অন্যদের আলোচ্য কানে এসে ঢোকে এবং কিছু করার থাকে না–নেহাত শুনে যাওয়া ছাড়া। বদ্রীর কফি করতে মিনিট সাতেক লাগল। তার মধ্যে আমি অনেকগুলো কথা শুনে ফেললুম।

    কিছুক্ষণ পরে কফি খাচ্ছি, গোয়েন্দাপ্রবর মাঝেমাঝে অদ্ভুত শব্দে কেশে উঠছেন–বদ্রী এসে জিজ্ঞেস করল, সায়েবরা সঙ্গে রাতের খাবারদাবার এনেছেন, নাকি তাকে খানার বন্দোবস্ত করতে হবে?

    আমরা কিছু আনিনি এবং তাকেই সব ব্যবস্থা করতে হবে, শুনে সে চলে যাচ্ছিল। আমি ডাকলুম, বদ্রী, শোনো।

    বদ্রী জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।

    বললুম– পাশের ঘরে কারা এসেছেন মনে হলো?

    হ্যাঁ স্যার। ওনারাভি বাঙালী আছেন। কলকাতা থেকে আজ সকালে এসেছেন।

    স্বামী স্ত্রী?

    বদ্রী কেমন হাসল শুধু।

    স্বামী-স্ত্রী নয়?

    বদ্রী ফের হেসে বলল, নয়–তা তো বলিনি স্যার!

    বেড়াতে এসেছেন বুঝি?

    তাছাড়া আর কেন এখন ডমরুনাথে লোকে আসবে? আপনারাও তো এসেছেন। বলে বদ্রী রহস্যময় হেসে চলে গেল।

    বৃদ্ধ গোয়েন্দা এবার আরেক দফা কেসে আস্তে বললেন, তোমায় রীতিমতো উত্তেজিত মনে হচ্ছে ডার্লিং। তবে একটা কথা বলি শোনো। নরনারীর ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানো অভদ্রতা। সুতরাং আশা করি আজ রাতে যদি তেমন কিছু ঘটেও–তুমি যেন ব্যস্ত হয়ো না!

    আমি একটু অবাক হয়ে বললুম– এর অর্থ?

    অতি সরল। বলে উনি কফির সঙ্গে সেই লাল গুলিও ফের মুখে চালান করলেন।

    সিগারেট ধরিয়ে হাসতে হাসতে বললুম– আপনি কি গণক, না অন্তর্যামী? কারা ও-ঘরে এসেছে, আমরা এখনও তাদের চাক্ষুষ পর্যন্ত করিনি। অথচ আপনি দৈববাণী করছেন যে, আজ রাতে কিছু ঘটতে পারে।

    বৃদ্ধ চোখ বুজে গুলি চুষতে থাকলেন। হাঁটুর ওপর কফির পেয়ালা। পেয়ালার ভাপ নিচ্ছেন হাতে এবং সেই হাত মাঝে মাঝে গালে ও কম্ফোর্টার সরিয়ে গলায় বুলোচ্ছেন।

    ডাকলুম, কর্নেল!

     বলো জয়ন্ত! ঐ দৈববাণীর কারণ কী?

    কর্নেল চোখ খুলে একটু হাসলেন। বললেন, তোমার উত্তেজিত চেহারা দেখে যা মনে এল, বলেছি ডার্লিং!

    ভ্যাট! আমার চেহারায় কিছু নেই।

    গোয়েন্দাপ্রবর কর্নেল নীলাদ্রি সরকার তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বললেন, যখন তুমি বারান্দায় গেলে, তখন তোমার চেহারায় প্রশান্তি ছিল। যখন তুমি ঘরে ঢুকলে, তখন তোমার চেহারায় রীতিমতো উত্তেজনা ছিল। তারপর তুমি বদ্রীকে জেরা করতে শুরু করলে। সব মিলিয়ে আমার মনে হলো, বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুমি ও-ঘরে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আড়ি পেতেছিলে! নিশ্চয় তেমন কিছু কানে এসেছিল তোমার–যাতে…

    বাধা দিয়ে হাসতে হাসতে বললুম– হার মানছি। কিন্তু হে বৃদ্ধ ঘুঘুমশাই। ব্যাপারটা কিন্তু সত্যি বড্ড গোলমেলে। আমি অকারণে উত্তেজিত হইনি!

    কর্নেল চোখ বুজে বললনে, বলে যাও ডার্লিং! আমি সবকিছুতেই আগ্রহী।

    চাপা গলায় বললুম– ওঁরা ভীষণ ঝগড়াঝাটি করছিলেন। কারণটা বোঝা গেল না। ভদ্রলোক বলছিলেন, তুমি নিজেই এ জন্যে দায়ী, এ সব কথা আগে জানলে কিছুতেই আমি আসতুম না এখানে। ভদ্রমহিলা বলছিলেন, ন্যাকামি কোরো না! তুমি জেনেশুনেই এসেছ। তুমি কী তা এতদিনে হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছি। তারপর শুনি, ভদ্রলোক ক্ষেপে গেছেন যেন। বললেন এখনই আমি চলে যাচ্ছি। থাকো তুমি একা! বিশ্বাসঘাতিনী মেয়ে কোথাকার! তারপর ভদ্রমহিলা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।

    হুঁ। ইন্টারেস্টিং। তারপর?

     তারপর আর কোনও সাড়াশব্দ ছিল না। চলে এলুম।

    কর্নেল কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, বদ্রীও কী যেন আঁচ করেছে মনে হলো। কেমন হাসছিল।

    এই সময় কড় কড় কড়াৎ করে মেঘ ডাকল। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে বাতাসের শোঁ শোঁ শোনা গেল। জানলাগুলো বন্ধই ছিল। দরজার  পর্দা দুলে উঠল। তখন দরজা বন্ধ করে দিলুম।

    কর্নেল বললেন, সন্ধ্যা থেকে টিপটিপ করে ঝরছিল। তখনই বুঝেছিলুম, রাতের দিকে অবস্থা যোরালো হবে। জয়ন্ত তরাই অঞ্চলের পাহাড়ে ঝড়বৃষ্টির রাত বড় রোমাঞ্চকর। ওই শোনন, বাবা ডমরুনাথ ডমরু বাজিয়ে এবার বেজায় রকমের একটা নাচ জুড়বেন। খাসা!

    বাইরে বাতাসটা বাড়তে থাকল। তার সঙ্গে মুহুর্মুহু বজ্রপাত এবং মেঘের গর্জন শুরু হলে বাংলো কাঁপতে থাকল। বললুম– সর্বনাশ! সেবার এ তল্লাটে এসে সাতদিন আটকে গিয়েছিলুম মনে পড়ছে কর্নেল? ধস ছেড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এবারও তাই হবে নাকি?

    হলেও অবাক হব না। কর্নেল নিরাসক্তভাবে বললেন।

    তবে স্বস্তির কারণ, ওঁর কাশিটা কমেছে। আমি পা ছড়িয়ে আরাম পাওয়ার চেষ্টায় সিগারেট ধরালুম। কিন্তু মনের ভেতর পাশের ঘরের সেই তর্কাতর্কি সারাক্ষণ প্রতিধ্বনি করে চলেছে। একটা যুক্তিসঙ্গত ঘটনা দাঁড় করার চেষ্টা করছি। কিন্তু দাঁড়াচ্ছে না। ভদ্রলোক ভদ্রমহিলাকে কিসের জন্য দায়ী করেছে? কী জানতে পারলে এখানে আসতেন না? আর ভদ্রমহিলাই বা কেন বলছেন,  জেনেশুনেই এসেছ তুমি! ব্যাপারটা কী হতে পারে?

    এতকাল ধরে গোয়েন্দার সঙ্গগুণে সবতাতে কৌতূহলী হওয়ার স্বভাব আমাকে পেয়ে বসেছে। ঝোঁকের মাথায় উঠে দাঁড়ালুম। কর্নেল চোখ বুজে শরীর এলিয়ে বসে আছেন। বর্ষাতিটা গায়ে চড়িয়ে দরজার দিকে এগোলে বললেন, বেরিয়ো না জয়ন্ত। ঝড়ে উড়ে যাবে। তাছাড়া কৌতূহল জিনিসটা অনেক সময় অকারণ বিপদে ফেলে। চুপ করে বসো।

    কথা কানে নিলুম না। দরজা খুলতেই ভেজা পর্দা গায়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেল। কর্নেল বিরক্ত হয়ে ফের বললেন, তুমি দেখছি কেলেংকারি না বাধিয়ে ছাড়বে না জয়ন্ত! লক্ষ্য করেছ কি, আমার স্বরভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ? যে ঠাণ্ডা বাতাসটা এইমাত্র ঘরে ঢুকতে শুরু করেছে, আজ রাতে সে আমার গলার বারোটা বাজাবে। দরজা বন্ধ করো শীগগির!

    দরজা বন্ধ করার মুখে আবছা একটা চিৎকার কানে এল যেন। ভুল হতেও পারে। কিন্তু গা শিউরে উঠেছিল। দরজা বন্ধ করে বললুম– কে চেঁচাল, শুনতে পেলেন?

    কর্নেল ওভারকোটের কলার আরও তুলে মাথার দুপাশটা ঢেকে বললেন, না।

     আমার ধারণা পাশের ঘরে একটা কিছু..।

    কথা কেড়ে বৃদ্ধ গোয়েন্দা বললেন, শুনেছি ডমরু পাহাড়ে ঝড়ের রাতে অনেক বিদঘুটে চিৎকার শোনা যায়। ভূতপ্রেত থাকা অস্বাভাবিক নয়। বাবা। ডমরুনাথ স্বয়ং মহাদেব কি না!

    ক্ষুব্ধমুখে চুপচাপ বসে রইলুম। বাইরে ঝড়বৃষ্টি তুমুল চলতে থাকল। বজ্রপাত এবং মেঘের গর্জনে পৃথিবী কাঁপতে থাকল।

    কতক্ষণ পরে বদ্রীর সাড়া এল দরজার বাইরে। দরজা খুললে সে ট্রে ভর্তি চাপাটি আর আলুর দম নিয়ে ঘরে ঢুকল। ঝড়টা কমেছে। কিন্তু ছিটেফোঁটা বৃষ্টি সমানে ঝরছে। বদ্রী বলল, তাহলে আপনারা খেয়ে নিন স্যার। দরকার হলে ঘণ্টার বোতাম টিপবেন।

    বললুম– পাশের ঘরের ওঁদের খাওয়া-দাওয়ার কী হচ্ছে বদ্রী?

    বদ্রী চোখ নাচিয়ে বলল, ক্যা মালুম! ওনারা রাতে কিছু খাবেন না বলেছেন।

    দরজা বন্ধ আছে দেখলে?

    জী হাঁ।

    বদ্রী চলে যাচ্ছিল, ডাকলুম–শোনো।

     বলুন স্যার!

    কিছুক্ষণ আগে কে চেঁচিয়ে উঠল মনে হলো। শুনছ?

    বদ্রী হাসল।…..ও কিছু না স্যার। ঝড়ের রাতে এমন আজব শব্দ হয়। শুনতে নেই।

    সে চলে গেলে কর্নেল উঠলেন। বললেন, জয়ন্ত! তুমি কি ভাবছ, ডমরুনাথে এসে তোমার দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার জন্য কিছু লোভনীয় রসদ সংগ্রহ করে নিয়ে যাবে?

    হাসতে হাসতে বললুম– আপনার গলা বেশ ভেঙে গেছে কর্নেল!

    আরও ভাঙবে। সকালে হয়তো আর কথাও বলতে পারব না। কর্নেল টেবিলে ট্রের দিকে ক্ষুধার্ত চোখে তাকিয়ে বললেন। হুম! তাই আগে থেকে বলে রাখি, অকারণ পাশের ঘরে নাক গলিও না। বিপদে পড়বে। এবং সে বিপদে বৃদ্ধের সাহায্য পাবার আশা বৃথা। কারণ তার প্রচণ্ড কাশিজনিত স্বরভঙ্গ আসন্ন। গলার স্বর না। থাকলে গোয়েন্দাগিরিতে কোনও সুফল ফলে না।

    কোনও কথা বললুম– না। কিন্তু বিপদে পড়ার কথা কেন বলছে কর্নেল, একথা ভেবেই কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল। তাছাড়া স্বরভঙ্গের সঙ্গে গোয়েন্দাগিরির বৈরীভাবের কারণ কী, তাও বুঝলুম না।

  • শুধু গল্প নয়

    শুধু গল্প নয়

    লীলা মজুমদার

    [book-name]

    গ্রন্থপরিচয়

    প্রথম সংস্করণ সেপ্টেম্বর ১৯৮৫

    প্রকাশক

    পি. রায়

    রে অ্যাণ্ড অ্যাসোসিয়েটস্ (পাবলিশিং) এর পক্ষে

    ২ গুরু প্রসাদ চৌধুরী লেন

    কলকাতা-৭০০০০৬

    মুদ্রক

    পুলিনচন্দ্র বেরা

    দি স্বরস্বতী প্রিণ্টিং ওয়ার্কস

    ২ গুরু প্রসাদ চৌধুরী লেন

    কলকাতা-৭০০০০৬

    প্রচ্ছদ

    স্বপন রায়চৌধুরী

    অলংকলণ

    ইন্দ্রনীল ঘোষ

    ওসিআর, শুদ্ধিপাঠ

    তাহের আলমাহদী

  • অভিযান

    অভিযান

    লীলা মজুমদার

    [book-name]

    অভিযান

    আমি অত ছোটদের গল্প বড়দের গল্পের তফাৎ বুঝি না। চারদিকে যেমন দেখি তেমন লিখি। তার চেয়েও বেশি শিখি। যে-সব কথা সন্দেহ করি, কিংবা আঁচ করি, তাও লিখি। সম্ভাব্য সব কথাই লিখি। সম্ভাব্য বলতেও শুধু যে-সব ব্যাপার হয়ে ঘটে চুকেবুকে গেছে, সেটুকুমাত্র বুঝি না। আমার কাছে যা হয়নি, অন্তত হয়েছে বলে শুনিনি, কিন্তু যে-কোনো সময়ে হলেও হতে পারে, তাও সম্ভব, তাও সত্যি।

    ব্যাপারটা আগাগোড়া আমাদের পাড়ার নালুঠাকুরঝির মুখে শোনা, তবে ছেলেগুলোকে আমিও দেখেছি। বল খেলে আমাদের জানলা-টানলা ভাঙে। তা ছ-বছর আগে পুজোর ছুটিতে ওদের মধ্যে সবচেয়ে জবরদস্ত গোটা পাঁচেক ছেলে ঠিক করল সাইকেল চেপে গিরিডি যাবে। বয়স সব ১৬-১৭-১৮, কেউ দশের পরীক্ষা দেবে, কেউ বারোর, কেউ সবে পাশ করেছে। তাদের মধ্যে নালু- ঠাকুরঝির নাতি গনাও ছিল। সে আবার মাধ্যমিকে ফেল করেছিল। তবে তাতে নাকি হিংসুটে পরীক্ষকদের হাত ছিল, ঠাকুরঝি বললেন।

    গেরস্তবাড়ির ছেলে সবাই। রেল ভাড়া হোটেল খরচা দিয়ে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়, এতে খালি পথের খাওয়া-দাওয়া বাবদ সামান্য হাতখরচা ছাড়া কোনো বালাই নেই। কাজেই কারো বাড়ি থেকে কোনো আপত্তি হল না। গনাটার উৎসাহ দেখে কে। কার কাছ থেকে একটা রোড-ম্যাপও জোগাড় করে ফেলল। বর্ধমান অবধি গ্র্যাণ্ড ট্রাংক রোড ধরে সোজা পথ। বর্ধমানে পুলুর দাদার শ্বশুরবাড়ি, সেখানে রাত কাটানো। বর্ধমানের পর একটু ঘুরো পথ। মধ্যিখানে মস্ত বন। স্থানীয় লোকেরা তার একটা বিশ্রী নাম দিয়েছে—রক্তখাগীর বন। তাই শুনে ওদের উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। বিপদ না থাকলে আবার অ্যাডভেঞ্চার কিসের? নালুঠাকুরঝি বললেন, ‘তা ভয়টা কিসের? গনার কোমরে লোহার ঘুনসি আছে। গুরুদেব দিয়েছেন।’

    পাঁচজনের পাঁচটি পুরনো সাইকেল। নিজেরাই মেরামত করে চৌকোস করে রেখেছে। ঘটুর কাকার সাইকেল মেরামতের দোকান আছে পদ্মপুকুরে। শনি-রবি খুড়ো ছুটি নেন, ঘটু চার্জে থাকে। সাইকেল সারানোর কিছু জানতে ওদের বাকি নেই। পথের যাবতীয় সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মোকাবিলা করবার জন্য নানা রকম যন্ত্রপাতি, আঠা, তেল ইত্যাদিকে একটা খোপকাটা খাকি ন্যাকড়ার থলিতে পরিপাটি করে জড়িয়ে বেঁধে ঘটু ক্যারিয়ারে আটকে নিয়েছিল। বলা বাহুল্য কাকা পরেও এ বিষয়ে ঘুণাক্ষরে টের পাননি। একটা বাড়তি শার্ট পেণ্টেলুন, একটা করে তুলোর কম্বল, পায়ে ক্যাম্বিসের জুতো। আবার কি চাই?

    এই সমস্ত কথাই নালুঠাকরুণ সন্ধ্যেবেলা আমাদের বাড়িতে এসে বলে গেলেন। শেষের রাতটা থাকা হবে রক্তখাগীর বনে ঢুকবার আধ কিলোমিটার আগে গনার বড়মামার খামারবাড়িতে। তিনি পেনশন নিয়ে ওখানে সস্তায় জমি কিনে মস্ত গোয়াল আর আখের খামার করেছেন ৷ নাকি চমৎকার দোতলা মাটির বাংলো করেছেন। সেখানে ছেলেরা নিশ্চয় আদর-যত্ন পাবে গনার মামার কাছ থেকে। তা বেয়াইমশাই যতই বজ্জাত হোন না কেন, সত্যি কথা আমি বলবই।

    এটা কিছু ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়, তবে পটভূমিকাটা তো দেওয়া দরকার, তাই এত কথা। এদিকে সব তো হল। মায় প্রত্যেকের পিঠের ব্যাগে বিস্কুট, চিঁড়ে-মুড়ি-নাডু ইত্যাদি। হেনকালে যাকে সাহেবরা বলে—একাদশ ঘণ্টায় বাধা পড়ল। গনার দাদামশাই এসে ওর ঠাকুরদাকে বললেন—’ফেল করে আবার নাকি হতভাগা আমোদ করতে যাচ্ছেন! তুমি কি বলে মত দিলে বুঝলাম না। ও সব হবেটবে না, জগা, তোমার এ জন্মে বুদ্ধিশুদ্ধি হবে না দেখছি।’ ব্যাস হয়ে গেল! বুড়োও অমনি বেঁকে বসল। নালুঠাকুরঝির কি রাগ! ‘বলিনি বজ্জাৎ বুড়ো! ওষুধ না খেলে ঘুম হয় না, ইয়ে হয় না, ও মত দিতে আসবার কে! আর ইনিও তেমনি, বেয়াইয়ের কথায় ওঠেন বসেন। কারণ এক সময় বেয়াই ওনাদের টিমে স্কুল-ক্যাপ্টেন ছিলেন!’

    দাদুকে যখন কিছুতেই মত করানো গেল না, তখন গনা অগত্যা কালো মুখ এবং অতি বিচ্ছিরি বানানের একটা চিঠি নিয়ে ওদের হাতে দিল, যাতে বড়মামার বাড়িতে অসুবিধা না হয়। নালুঠাকুরঝিও সেই রাতের ট্রেনেই কাশীতে বোনের বাড়ি গেলেন। সংসারে তাঁর ঘেন্না ধরে গেছিল। বাকি ঘটনা খবরের কাগজেই বেরিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু নানা কারণে চেপে যাওয়া হয়েছিল।

    নির্ধারিত দিনের ভোরবেলায় বাকি চারজন রওনা হয়ে গেল। পুলু, ঘটু, বেচু আর কানাই। এত চমৎকার ভ্রমণ যে একটু পরেই ওরা গনার কথা বেমালুম ভুলেই গেল। মাঝে মাঝে দোকানে থামা, বোয়েমের বিস্কুট আর ভাঁড়ের চা খাওয়া। যথাসময়ে বর্ধমানে পুলুর দাদার শ্বশুরবাড়িতে চিঠি ও কড়াপাকের সন্দেশ পৌঁছে দিয়ে রাজোচিত আদর-যত্ন লাভ। বেশি বর্ণনা দিতে পারলাম না, কারণ নালুঠাকুরঝি তেমন কিছু বলতে পারলেন না ৷ তাছাড়া গল্পের এ জায়গাটার তেমন গুরুত্ব নেই।

    পরদিনের যাত্রাপথ আরেকটু কষ্টকর। উঁচুনিচু এবড়ো-খেবড়ো। দু-একবার বাড়তি থামা। একটু-আধটু মেরামতি। পুলুর চেন ছিড়ল, ভাগ্যিস ঘটুর থলিতে বাড়তি একটা ছিল। শেষ পর্যন্ত পা যখন আর চলে না, পথের ধারে ঠিক গনা যেমন বলেছিল, চমৎকার এক খামারবাড়ি। নিজেদের ডাইনামোর বিজলী বাতি, পেছনদিকে খামারবাড়ি।

    সকলে যেন হাতে চাঁদ পেল। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। হাঁকডাক করে যদি বা গেট খোলানো গেল, সাইকেল ঠেলে ভেতরে পা দেবার আগেই গেঞ্জি পরা বিকট বেঘো-চেহারার এক আধাবয়সী ভদ্রলোক দোতলার ঝোলা বারান্দায় বেরিয়ে এসে দাঁত খিঁচিয়ে বললেন— ‘বলি, লজ্জা নেই তোদের? গনাটাকে ভালোমানুষ পেয়ে, তার মাথা তো চিবিয়েছিসই, আবার এখানে এসে হানা দিয়েছিস! বেরো বলছি! ন্যাপা, ওদের গেটের বার করে দিয়ে আয়! এক্ষুনি!’ তাঁর বেঘো হালচাল দেখে এবারে কারো মুখে কথাই সরল না, ঐ হরিব্‌ল্ বানানের চিঠি বের করা দূরের কথা।

    সঙ্গে সঙ্গে তেলচিটে চেহারার রোগা কালো এক যুবক একতলার দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ওদের বলল— ‘একটু এদিকে এসে শোন, ভাই।’ লোকটা ওদের অচেনা হলেও গনার সঙ্গে চেহারার মিল দেখে বোঝা গেল এ-ই হল গনার কুখ্যাত ছোটমামা। লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে, কাজকম্ম করে না। তা হতে পারে, কিন্তু মনটা যে ভালো তাতে সন্দেহ নেই। আড়ালে নিয়ে গিয়ে সে বলল, ‘দাদা আমাকে দিয়েই খবরটা পাঠিয়েছে বলে আমি দুঃখিত, লজ্জিত।’ তারপর বলল—’তা রাতে কোথায় থাকা হবে?’

    বাকিটা সত্যি আরব্য উপন্যাসের মতো। ওরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে দেখে সে বলল– ‘বেশ তো গায়েপায়ে আছ। মনেও যদি তেমনি সাহস থাকে, তাহলে আমার সঙ্গে রক্তখাগীর বনে চল। সেখানে নাকি আস্তানা পাওয়া যেতে পারে। আমার বন্ধু বটু বলেছিল ওখানে কেউ থাকে না, এ ধারণা ভুল। যাবে তো চল। আমাকে রডে বসিয়ে নাও। বেশি দূর নয়। আমার অনেক দিনের শখ। হাঁটতে-টাটতে পারব না।’

    ওকে নিয়ে ওরা বিনা বাক্যব্যয়ে বনের পথ ধরল। তখনো অন্ধকার হয়নি, যদিও বিকেল শেষ হয়ে এসেছে। ভালো পথ ছিল, এখন লতাপাতায় ঢেকে গেছে। এ পথে কেউ হাঁটা-চলা অন্তত এদানীং যে করেছে, তা মনে হল না। মনে একটু খটকা লাগলেও, ন্যাপামামার উৎসাহ দেখে ওরা ঘাবড়াল না। ওদের মধ্যে পুলুই বড়। সে একবার বলেছিল বটে—’ঠিক পথে যাচ্ছি তো মামা? এদিকে সাত বছরে কেউ হাঁটেনি মনে হচ্ছে যে।’ ন্যাপা হাসল— ‘পাগল! না জেনে কি আর ভরসন্ধ্যেয় তোমাদের এই আঘাটায় এনে ফেলি। এ বনটা এতকাল প্রাইভেট প্রপার্টি ছিল, এখন সরকার অধিগ্রহণ করে নিচ্ছে। আসল মালিক সাব্যস্ত হলে ক্ষতিপূরণ দিয়ে তবে দখল নিতে হবে। নইলে মহা ঝামেলা হতে পারে। এটা বন-সংরক্ষণের আওতায় পড়বে। ভালো ভালো গাছ আছে।’

    কানাই পড়াশুনোয় ভালো ছিল। সে অবাক হয়ে বলল,— ‘মামা, এত কথা জানলেন কি করে?’ ন্যাপা হাসল—’আমি জানব না? বলে বটু এক দিক থেকে দেখতে গেলে আমার উড্-বি শালা। মানে ওর বোনের সঙ্গে ইয়ে—’ বলে ন্যাপা একটু সলজ্জ হেসে চুপ করল। পুলু ঘটু কানাই বেচু সকলে উদ্‌গ্রীব— ‘থামলেন কেন, মামা? বোনের সঙ্গে— তারপর?’ ন্যাপা গম্ভার হয়ে গেল— ‘সে বড় দুঃখের কথা রে ভাই। মাসে দুশো টাকা আয় দেখাতে না পারলে ওর বাবার মত নেই।’ বেচুর রডেই বসেছিল ন্যাপা। তবে বনে ঢুকে ইস্তক সাইকেল ঠেলে হাঁটতে হচ্ছিল। বলা বাহুল্য বেচুর সাইকেলটা ন্যাপাই ঠেলছিল। বেচু তার পিঠ চাপড়ে সাহস দিয়ে বলল— ‘চিয়ার আপ মামা, দুশো টাকা আমরা আপনাকে সহজেই পাইয়ে দেব।’

    সহানুভূতির চোটে আসল কথাটা আরেকটু হলে চাপাই পড়ে যাচ্ছিল। পুলু বলল— ‘বটু মামা কি বলেছেন? তিনি এর মধ্যে এলেন কি করে?’ ন্যাপা অবাক হল ‘—আরে সে জানবে না? সে তো ঐ বন বিভাগেই চাকরি করে। বনের অবস্থা দেখতে এসে ঝড়ের মধ্যে পড়ে গেছিল। বজ্রবিদ্যুৎ হলে গাছতলায় কি বিপজ্জনক অবস্থা জানোই বোধ হয়। এদিকে অন্ধকার নেমে গেল, পথ হারিয়ে গেল। হয়তো ভয়েই মরে যেত। হঠাৎ আবছা দেখল ছোট একটা টিলার ওপর একটা লম্ফ জ্বলছে! উঠিপড়ি করে দেখে একটা চমৎকার কাঠের বাড়ি। দরজায় ঘা দিতেই পাল্লা খুলে গেল। দেখা গেল পরমা সুন্দরী এক ফিরিঙ্গি মেয়ে। খুব ফরসা না হলেও যেমন রূপ, তেমনি দয়া! সেই মেয়ে ওদের ডেকে নিয়ে গা মুছবার তোয়ালে, শুকনো জামা, গরম চা, সব দিল। ওরা তিনজন গায়ে নতুন প্রাণ পেল।

    তারপর বৃষ্টি থেমে গেল, মেঘ সরে গেল, দেখা গেল তখনো দিন আছে। সেই মেয়েকে কি বলে ধন্যবাদ দেবে ভেবে পাচ্ছিল না। মেয়েটিই বলল—’কিছু বলতে হবে না মাই ডিয়ারস্, খালি আমার এই চিঠিটি শহরের ডাকে দিয়ে দিও। আমার বাড়ির লোকেরা বড় নিষ্ঠুর, জোর করে অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান বড়লোকের সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে। তাই আমি যাকে বিয়ে করতে চাই সে আমাকে এখানে লুকিয়ে রেখেছে। একটু মাইনে বাড়লেই নিয়ে যাবে। কাঠুরেরা খাবার-দাবার বিক্রি করে যায়। আমি বাইরে বেরোই না। পাছে বাড়ির লোকেরা ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু সে কেন আসে না?’ বলে কেঁদে ফেলল। বটুরা আর ওদিকে যায়নি, তবে চিঠিটা ডাকে ফেলে দিয়েছিল। কে এক কিরীটীনারায়ণ বসুকে লেখা। এতদিনে তাদের নিশ্চয় বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু বাড়িটা নিশ্চয় আছে। বাড়ি থাকলে আশ্রয়ও আছে।’

    পুলু একটু হৃদয়হীন প্যাটার্নের। সে বলল— ‘বা বা মামা, বেড়ে গল্প ফেঁদে ফেললেন তো মুখে মুখে। ঐরকম মাসে গোটা দুত্তিন ছেপে বেরুলেই তো দুশো টাকা এবং বটুকে শ্যালকরূপে পেয়ে যাবেন।’ কি বিশ্রী কথা পুলুর যে বলা যায় না। কিন্তু ঠিক সেই সময়, ওর মুখে ছাই দিয়ে অনতিদূরে টিলার ওপর লম্ফর আলো দেখা গেল। দরজার কড়াও নাড়তে হল না। সবাই দেখল দরজা খুলে লম্ফ হাতে পরমাসুন্দরী সেই ফিরিঙ্গি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিরীটীনারায়ণ তাহলে এখনো তাকে নিয়ে যায়নি!

    বনের মধ্যে এমন সুন্দর বাড়ি কেউ ভাবতেও পারে না। টিলার ওপর গাছপালা কম; তারার আলোয় মরশুমী ফুলে ঘেরা বাড়িটাকে অপরূপ দেখাচ্ছে। আগাগোড়া কাঠের তৈরি, চারদিকে কাচের জানলা, বিলিতী বইতে যেমন থাকে। এরা চারজন কস্মিনকালেও এমন দেখেনি। এ বাড়িতে রাতে ওরা থাকবে কি করে ঐ ধুলোয় ধূসর চেহারা নিয়ে। চৌকাঠ ডিঙোতেই লজ্জা করছিল। কিন্তু মেয়েটি ভাঙা ভাঙা গলায় ইংরিজিতে বলল – ‘এসো, তোমরা ভিতরে এসো। হাত পা ধোও, বিছানা পাতাই আছে। কি খেতে দেব তোমাদের? বাড়িতে যে কিছু নেই। আমি ছাড়া কেউ নেই। কাল আমিও থাকব না।’

    ওরা চমকে উঠল। কত দুঃখে কথাগুলো বলা হল তা বোঝা গেল। ছিমছাম বিলিতী কায়দায় সাজানো বসবার ঘর। ন্যাপা সকলের হয়ে বলল— ‘তাতে কি হয়েছে, ম্যাডাম? আমরা খেয়ে এসেছি।’ আসলে আসেনি খেয়ে, মেয়েটিকে সান্ত্বনা দেবার জন্য ও-কথা বলল। এরাও সায় দিল— ‘হ্যাঁ, পরটা, কাবাব, দই। এইসব খেয়েছি। একটু শোবার জায়গা পেলেই আমরা খুশি। কাল সকালে চলে যাব।’

    মেয়েটির মুখের দিকে চেয়ে ওদের বুক ধড়াস্ করে উঠল। অনেক দুঃখে অনেক কাঁদলে তবে কারো ও-রকম মুখের চেহারা হয়। একটা ফুলের যেন জলে ধুয়ে ধুয়ে সব রং উঠে গেছে।

    ন্যাপার বেশ বয়স, তা চব্বিশ-টব্বিশ তো হবেই। সে বলল— ‘আপনি কেন চলে যাবেন এমন সুন্দর বাড়ি ছেড়ে?’ তার চোখ দিয়ে আরো খানিকটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে বলল— ‘মালিক বাড়ি বেচে দিয়েছেন। কাল তারা দখল নেবে।’

    ‘আর—আর কিরীটীনারায়ণ?’

    ‘তার সঙ্গে নতুন মালিকের মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। চল, ঘর দেখিয়ে দিই। সাইকেল বারান্দায় থাক। কেউ নেবে না।’

    এমনিতে ওরা এত কথা বলে, এখন কারো মুখে একটা শব্দ জোগাল না। ওরা মেয়েটির পিছন পিছন সুন্দর একটা শোবার ঘরে ঢুকল। পাশেই স্নানের ঘর দেখিয়ে দিয়ে সে চলে গেল।

    শেষ রাতে পুলুর ঘুম ভেঙে গেল। কিসের কটু গন্ধ? কিসের ঝিলিক দিচ্ছে, অদ্ভুত একটা চাপা গন্‌গন্ শব্দ। পুলু লাফিয়ে উঠল—’আগুন! আগুন!’ কেমন যেন নিশ্বাস ফেলার কষ্ট হচ্ছিল। ওর চেঁচামেচিতে সবাই জেগে উঠল। জিনিসপত্র, জুতো, সাইকেল সব পড়ে রইল, ওরা দরজা খুলে বেরিয়ে এসে— ‘ও ম্যাডাম্! ও, মিস্!’— করে পাগলের মতো এ-ঘর ও-ঘর করবার চেষ্টা করল। কিন্তু কোথাও তাকে পেল না। সব জায়গায় যেতেও পারল না। দেখতে দেখতে সব ঘরে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। সোলার টুকরোর মতো শুকনো কাঠের পুরনো বাড়িটা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। ও বাড়িতে সে সুন্দর মেয়ে আর নেই। হয় চলে গেছে, নয় তো— মোট কথা এখন আর কারো বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

    আরো ঘণ্টা দুই পরে যখন পাঁচটি দিগ্‌ভ্রান্ত মানুষ রক্তখাগীর বনের বাইরে ন্যাপার বড়দাদার খামারবাড়ির দরজার ওপর আছড়ে পড়ল, তাদের দেখে বড়মামার চক্ষু চড়কগাছ। ন্যাপা তক্ষুণি মুচ্ছো গেল। বাকিদের ভাঙা ভাঙা কথা জুড়ে একটা অস্পষ্ট মানে করে বড়মামাও পড়ে যান আর কি। ‘বনের মধ্যে টিলার ওপর কাঠের বাড়িতে অগ্নিকাণ্ড! তোরা বলিস কি রে! এমন তো কখনো শুনিনি। আচ্ছা, এবেলা খেয়েদেয়ে জিরিয়ে নে তো। গনাও কান্নাকাটি করে এসে গেছে কাল রাতের গাড়িতে। আমি না-হয় বনে একটু পরেই লোক পাঠাচ্ছি। অত ব্যস্ত হোস্ নে, বাপ।’

    কালকের সে বেঘো চেহারার চিহ্নমাত্র নেই! সঙ্গে সঙ্গে চোখ মুছতে মুছতে গনাও এসে হাজির হল। চা-জলখাবারের পর ওরা কারো কথা শুনল না। ন্যাপা, গনা, বড়মামা, জনাচারেক খামারের লোক মিলে মস্ত এক দল করে ওদের সঙ্গে খামারের ছোট ট্রাকে বনের সীমানা পর্যন্ত গিয়ে, পায়ে হেঁটে দু-ঘণ্টা ধরে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সে বাড়ির কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না। তবে আগাছায় ঢাকা একটা টিলার ওপর চড়ে অবাক হয়ে দেখল সেখানে ওদের সাইকেল, থলি, কম্বল, জুতো ধুলোর উপর পড়ে আছে। ধুলোটার রং কেমন কালচে, যেন বহুদিন আগেকার পোড়া ছাই মেশানো।

  • স্কূপ

    স্কূপ

    লীলা মজুমদার

    [book-name]

    স্কূপ

    একটা সাক্ষাৎকারের কথা বলি শোন। আমি তো আর সত্যিকার সাংবাদিক নই, কাজেই এটা যে ঠিক এই ভাবেই ঘটেছিল, তা বলতে পারছি না। তবে না ঘটবার কোনো কারণও নেই। শোন তবে। কিন্তু তার আগে জেনে রাখো, সাংবাদিকদের ছাড়া ডিটেকটিভদের চলে না। ডিটেকটিভদের ছাড়া সাংবাদিকদেরও চলে না।

    সাংবাদিকরা সর্বদা চমকপ্রদ চাঞ্চল্যকর অবিশ্বাস্য সব সত্যিকার ঘটনা খুঁজে বেড়ায়। তাকে বলে স্কূপ। সাধারণত চোর, ধাপ্পাবাজ, খুনেগুণ্ডা, ব্যাংকডাকাত, চোরাচালানকারী বিষয়ক সত্যি ঘটনার ওপর একটু রংচং চড়ালে দোষ হয় না। কিন্তু আগাগোড়া বানিয়ে লিখলে মেলা ঝামেলা হতে পারে। আমার তো আর সে-সব বালাই নেই। বানিয়ে লিখলেও দোষ নেই। দুঃখের বিষয়, সব চেয়ে অস্বস্তিকর স্কূপগুলো সব সময় ছাপা হয় না।

    শিবশংকর একজন উঠতি সাংবাদিক। তার ওপর যাকে বলা যায় টিকটিকিশাস্ত্র, তাই নিয়ে পাগল। ওর কাছে আমার সব জ্ঞাতব্য প্রশ্নের উত্তর পাই। যে বিষয়ে ও কিছুই জানে না, তার পর্যন্ত জবাব পাই। তাতে আমার ভারি সুবিধা হয়। এদিকে সাংবাদিকদের মধ্যে ভারি রেষারেষি; যে যত বড় বড় স্কূপ সবার আগে নিজের কাগজে পৌঁছে দিতে পারে, তার সাফল্য তত বেশি। অথচ পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা না থাকলেও মুশকিল। প্রত্যেককে যদি প্রত্যেক জায়গায় সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করতে যেতে হত, তাহলে কেউই কিছু করে উঠতে পারত না। তাই ওরা একটা অলিখিত খবর —সমবায় মতো তৈরি করে। সেখানে যে যা তথ্য পায় সব জমা দেয়, এবং সেখান থেকেই সব খবর সরবরাহ হয়। তবে যে যার পেটোয়া খবরের সবচেয়ে সঙ্গীন জায়গাটা সম্ভবত চেপে যায়, নিজেদের কাগজের এক-তরফা ব্যবহারের জন্য। ঐটুকু ওদের কর্তব্য। এটা আমিও মানি।

    এইখানে ডিটেকটিভ এবং দুষ্কৃতকারীদের প্রবেশ। চাঞ্চল্যকর খবরের তারাই হল ১ নং কাঁচা মাল। বলেছি তো এ সমস্ত তথ্য আমি শিবশংকরের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছি। তার মতো দক্ষ সংবাদ-সরবরাহকারী আর আমার জানা নেই। তাছাড়া সে মালপো খেতে ভালোবাসে। খেতে খেতে সে একদিন বলে বসল— ‘আপনারা জগৎকে ভুল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন বলে দুষ্কৃতকারীদের সামাজিক উপকারিতার দিকটা বুঝতে পারেন না। ওদের পক্ষটা তো আর শুনতে পান না।’ মহা রেগে, মালপোর বাটি সরিয়ে রেখে বললাম— ‘কিসের উপকারিতা?’

    শিবশংকর হাত বাড়িয়ে বাটি থেকে বড় বড় চার-পাঁচটা মালপো তুলে নিয়ে বলল— ‘আমিই কি আর আগে অত জানতাম। ঘটুর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে আমার চোখ খুলে গেছে। ঘটু হল গিয়ে যাকে মনস্তত্ত্ববিদ্‌রা হয়তো বলবেন আবশ্যিক দুষ্কৃতকারী। অর্থাৎ চুরিচামারি জুয়োচুরি ইত্যাদি অহিংস, কিন্তু লাভজনক দুষ্কর্ম না করে ও থাকতে পারে না। ওর নিজের কোনো দোষ নেই, ওর মনের মধ্যে একটা কিছু রোগ আছে যা ওকে ঐ সব করতে বাধ্য করে। যেমন কারো কারো ফিটের ব্যামো থাকে ৷ তাদের কি জেলে দেওয়া হয়?

    সে যাই হোক গে, জামাইবাবুর বড় ভগ্নীপতি হলেন বড় জেলের সুপারিনটেণ্ডেণ্ট, সে তো জানেনই। তাঁকে বলেকয়ে ঘটুর সাক্ষাৎকার নিলাম। প্রাইভেটলি। অর্থাৎ ভিজিটিং আওয়ারে নয়। অন্য সময়ে। ওর নিজের ঘরে। জেলের ডাক্তারবাবুর সামনে এবং ঘরের অন্য দুজন বাসিন্দাকে সরিয়ে! তাদের কি রাগ! ‘এ রকম পক্ষপাতিত্বের কি মানে হতে পারে? আমরা বিক্ষোভ করব।’ করলও খানিকটা— চলবে না, চলবে না! তারপর লপসির সময় হয়ে যাওয়াতে, বলে গেল——এখানেই এর শেষ নয়, এটা শুধু টিফিনের ছুটি। ঘটুও চঞ্চল হয়ে উঠল— ‘হিংসে করে আমার ভাগটাও খেয়ে নেবে না তো স্যার?’ ডাক্তারবাবু বললেন— ‘আহা, বলেছি তো, তোমার জন্য আমার বাড়িতে বাড়তি রান্না হচ্ছে। তুমি এখন শিবশংকরের প্রশ্নের জবাব দাও তো ভাই।’ ঘটু আঁৎকে উঠল— ‘এঁরা! প্রশ্ন নাকি? অংকটংক নয় তো?”

    শিবশংকর : আরে না, না। নিজে ও-সব জানলে তো প্রশ্ন করব।

    ঘটু : (নিশ্চিন্ত হয়ে ) ঠিক আছে, ঠিক আছে। বলুন কি জানতে চান।

    শিব : (খুদে রেকর্ডার খুলে) আচ্ছা বলদিকিনি, তুমি ৫-৬ মাস অন্তর একবার করে এখানে মাস দুই কাটিয়ে যাও কেন?

    ঘটু : ছুটি করি, স্যার। ডাক্তারবাবু থেকে থেকে যে জন্যে শান্তিনিকেতনে যান। হাওয়া বদল না করলে মানুষ বাঁচে? শরীর মনের একটু যত্ন না নিলে চলে?

    শিব : তাই বলে পাঁচিল ঘেরা হয়ে, লপসি খেয়ে?

    ঘটু : (চটে) কেন, লপসিটা খুব খারাপ হল কিসে? একটু কাঁচা লংকা আর সরষের তেলের ব্যবস্থা করলে আমার বৌয়ের রান্নার চেয়ে ঢের ভালো।

    শিব : কিন্তু বন্ধ থাকতে হয় যে?

    ঘটু : আহা, ঘুরে ঘুরে পালিয়ে দৌড়ে লুকিয়ে ছিপিয়ে পয়সা কামানো বুঝি খুব আরামের?

    শিব : তবে ওসব কর কেন?

    ঘটু : কি মুশকিল, ঐ তো আমার কাজ। অন্য কাজ আমার ধাতে সয় না। দেশের কত উপকার করি বলুন। আমি তো দেশপ্রেমিক।

    শিব : এ্যা, বল কি!

    ঘটু : তা নয় তো কি? আমাদের জন্য কত হাজার হাজার লোক করে খাচ্ছে, তা কখনো ভেবেছেন? বেশি ঝামেলা করেন যদি তাহলে আমরা দলেদলে চুরি কম্ম ছেড়ে দেব, হ্যাঁ। আমাদের ইউনিয়ন আছে জানেন? খবরের কাগজ থেকে মাইনে পান, কি-ই বা বোঝেন। আমরা সবাই কাগজে চাকরি নিলে এই ধরুন ডাক্তারবাবুর চাকরিটা ফাল্‌তু ডিক্লেয়ার হয়ে যাবে না? টিকটিকিরা সক্কলে, পাহারাদার, ওয়ার্ডার, জেলার, উকিল, মোক্তার, আদালত, পুলিশ, সব ফালতু হয়ে যাবে। লক্ষ লক্ষ লোক না খেতে পেয়ে মরবে। তাই চান?

    শিব : (এতক্ষণে একটু সুযোগ পেয়ে) না, না, তা মোটেই বলছি না। চুরি করবে বই কি। যার যা কাজ।

    ঘটু : ‘হ্যাঁ, পথে আসুন বাছাধন। স্রেফ পরের উপকারের জন্য আমরা কুকর্ম করি এটা কাগজে ফলাও করে লিখতে ভুলবেন না। অকৃতজ্ঞতা বড় খারাপ। আর কি জানতে চান, একটা ছাঁচি পান পেলে বলতে পারি।’

    (ডাক্তারবাবুর কৌটো থেকে ছাঁচি পান প্রদান)

    শিব : ইয়ে—মানে শরীরটরীর ভালো থাকে তো?

    ঘটু : থাকবে না-ই বা কেন? সুপারিনটেণ্ডেণ্টের ফুল বাগানে কাজ করি। ছোটবেলার শখ। বাবা ছিল মালী। তা বৌ লাউ-কুমড়ো ছাড়া কিছু ফলাতে দেবে না। এখানে আমার গোলাপ বাগিচাটে দেখে আসুন। চক্ষু সাৰ্থক হবে। মাইনে পাই। একমাত্র দুঃখ আর ১৫ দিন বাদে কুঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করবে, ঠিক তখনি আমার মেয়াদ ফুরিয়ে যাবে।—আচ্ছা, ডাক্তারবাবু, আমি যদি এনার হাতঘড়িটে ছিনিয়ে নিই, তাহলে মেয়াদ বাড়বে না?

    ডাক্তার : না, না, ও কি কথা! আমি বরং তোমাকে ওঁর প্রাইভেট মালীর কাজ পাইয়ে দেব। কিন্তু ও কি সব উটকো কথা বলছো বাপ? বয়স হচ্ছে, ঘটু, দুষ্কম্মের পথ ছাড়ো। আজকাল ওষুধ বেরিয়েছে। তাই খেলে কুকর্মের ইচ্ছাই চলে যায়।

    ঘটু : ও, খবরের কাগজ-মশাই, দেখছেন তো কি নির্বান্ধব পুরীতে থাকি, কারো ওপর ভরসা করতে পারি না। লিখবেন আমাদের দুঃখের কথা। আপনিও আমাকে দুষ্কৃতকারী বলে ঘেন্না করছেন নাকি?

    শিব : না, না, ছি, কি যে বল। আমি বরং এবার উঠি। আমারো নীতিজ্ঞানটুকু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। কাসুন্দি দিলে লপসি আরো ভালো লাগতে পারে মনে হয়।

    এই বলে কাসুন্দির নতুন শিশিটা ঘটুকে দিয়ে শিবশংকর ভারি চিন্তাগ্রস্ত হয়ে আপিসে ফিরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে খাসা একটা স্কূপ লিখেও ফেলল। তার টাইটেল দিল ‘দুর্নীতির উল্টো পিঠ। দুঃখের বিষয়, সম্পাদক মশাই মন দিয়ে সবটা পড়ে বললেন—’ এ সব সত্যি কথা কখনো ছাপানো যায়? তুমি কি আমার চাকরি খেয়ে নিতে চাও নাকি, এ্যাঁ? না না, ঐ বইমেলাটেলাই তো বেশ ছিল। এ-সব দুর্বুদ্ধি ছাড়ো!’ যাচ্চলে।

  • অশরীরী

    অশরীরী

    লীলা মজুমদার

    [book-name]

    অশরীরী

    এখন আমি একটা সাধারণ খবরের কাগজের আপিসে কাজ করলেও, এক বছর আগেও একটা সাংঘাতিক গোপনীয় কাজ করতাম। সে কাউকে বলা বারণ। বললে আর দেখতে হত না, প্রাণটা তো বাঁচতই না, তার ওপর সব চাইতে খারাপ কথা হল যে, চাকরিটাও চলে যেত। তবে এটুকু বলতে দোষ নেই যে, কাজটা ছিল খবর সংগ্রহ করা। কোথায়, কেন, কার জন্য সে-সব তোমরাই ভেবে নিও।

    আমার বয়স তখন ২২; নামটা আর বললাম না। আমাদের পাড়ার হরিশ খুড়ো চাকরিটা করিয়ে দিয়েছিলেন। প্রথম দিনেই আমার বড়-সায়েব—সায়েব হলেও তিনি কুচকুচে কালো — আমাকে বলেছিলেন, “দেখ, সর্বদা ‘নেই’ হয়ে থাকবে। তুমি আদৌ আছ সে-কথা টের পাওয়া গেলে চলবে না। তোমার আলাদা একটা চেহারা, কিম্বা চলা-ফেরা, কিম্বা কথা-বলার ধরন গজালেই চাকরিটে যাবে। পানা-পুকুরে এক ফোঁটা ময়লা জল হয়ে থাকবে; সমুদ্রের ধারে এক কণা বালি হবে; এক কথায় স্রেফ অশরীরী হয়ে যাবে। কথা বললে কী বলছ বোঝা যাবে; কিন্তু আলাদা করে গলার আওয়াজ মালুম দেবে না। আর সব চাইতে বড় কথা হল যে, নিজের চেহারা বলে কিচ্ছু রাখতে পাবে না, যাতে তুমি মরে গেলেও তোমাকে সনাক্ত করা না যায়। ও-রকম করে তাকাচ্ছ কেন, এ কিচ্ছু শক্ত কাজ নয়, কিছু করতে হবে না, স্রেফ নেই হয়ে থাকতে হবে। বেশি লেখা-পড়া জানারও দরকার নেই। বলো, পারবে তো?”

    আমি বললাম, “আজ্ঞে হ্যাঁ, স্যার।”

    বড়-সায়েব বেজায় রেগে গেলেন, “ফের কথার ওপর কথা! চুপ করে থাকতেও কি শেখাতে হবে নাকি? কী নাম তোমার?”

    আমি কোনো উত্তর দিলাম না ৷

    বড়-সায়েব খুব খুশি হয়ে বললেন, “খুব ভাল। মাইনে নেবার সময় নাম লিখবে না, টিপ-সই দেবে না। নাম ভাঁড়ানো যায়, কিন্তু টিপসই দিয়ে সবাইকে চেনা যায়। দুনিয়ার কোনো দুজন লোকের এক রকম আঙ্গুলের ছাপ হয় না। ১লা তারিখে আমার কাছ থেকে মাইনে নিয়ে যাবে, খাতায় লেখা হবে ‘নষ্টামি বাবদ দুই শো টাকা’। আচ্ছা, যেতে পারো।”

    আমি হাতে রুমাল জড়িয়ে তিনটে আঙুল দেখালাম। বড়-সায়েব হেসে বললেন, “আচ্ছা, তিনশো টাকাই। কিন্তু মনে থাকে যেন, বিপদে পড়লে আমরা বলব তোমাকে চিনি না।”

    ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। শুনলাম আমার নতুন নাম ইংরিজি হরপের ‘কিউ’। যেখানে যত সন্দেহজনক খবর শোনা যেত, নিজে দেখে এসে আপিসের পাশের গলিতে ভাঙা টাইপ-রাইটার ভাড়া খাটত, তাতে টাইপ করে জমা দিতে হত। তারপরের ছয় মাসে কোথায় যে না গেলাম, কী যে না দেখলাম, তার ঠিক নেই ৷ অথচ আমাকে কেউ দেখতে পেত না। রাস্তার ভিড়ের মধ্যে এক্কেবারে মিলিয়ে যেতাম। যেখানে ভিড় নেই, শুধু ভাঙা দেয়াল, সেই দেয়ালে একটা দাগ হয়ে মিশে থাকতাম। একবার একটা চোরাই গুদোমে সারাদিন শ্রমিকদের একজন হয়ে গিয়ে রাশি রাশি গোপন খবর এনে দিয়েছিলাম। বড়-সায়েব খুশি হওয়ায় মাইনে বেড়ে গেছিল। আরেকবার একটা বিদেশী মাল জাহাজে সারাদিন একটা পিপে হয়ে লক্ষ লক্ষ টাকার সোনা খুঁজিয়ে পাইয়ে দিলাম। সেইজন্য খবরের কাগজে বড়-সায়েবের সে কী প্রশংসা!

    সে যাই হক, শেষবারের কাজটার কাছে ও-সব কিছু না। নাকি গড়িয়ার দিকে এতকাল কোনো বে-আইনী কাজ হয়নি, তাইতে সকলের সন্দেহ হল, নিশ্চয় কোনো গোপন ষড়যন্ত্র চলছে। তার ওপর সব বাংলা কাগজে যখন ছোট্ট একটা নোটিস বেরুল— টিপ বোতাম পরিষদের প্রথম সভা গ-শু-৭, তখন আমার বুঝতে বাকি রইল না যে গড়িয়াতে, শুক্রবার সাতটায় গোপন সভা বসবে।

    বড়-সায়েবের ঘর থেকে প্রায় অদৃশ্যভাবে বেরিয়ে যাচ্ছি, তাঁর পেয়ারের বেয়ারা বলল, “টিকিট ছাড়া ঢুকতে দেবে না।”

    রুমাল জড়িয়ে হাত পাতলাম। সে এক কুচি লাল কাগজ বের করে বলল, “দু টাকা।” একটা আঙুল দেখালাম। তাকে টাকা দিয়ে টিকিট পকেটে ফেলে চলে এলাম।

    শুক্রবার পাঁচটায় যখন বাসে সব চাইতে ভিড় হয়, তখন, বেছে বেছে সব চাইতে ভিড়ের বাসে উঠলাম। উঠে চারটে লোকের মধ্যিখানে এমন ‘নেই’ হয়ে রইলাম যে, কণ্ডাক্টর টিকিট চাইল না। চাইবে কেন, আমার তো আর শরীর-টরীর নেই যে বাসের জায়গা জুড়ে থাকব।

    গড়িয়াতে নেমেই একটা চায়ের দোকানে ভিড় দেখে, সটান সেখানে গেলাম ৷ এক ভাঁড় বেজায় হালকা, বেজায় গুড়ের চা নিয়ে, তক্তার ওপর দশ পয়সা ফেলে দিলাম। সস্তা তো হবেই, শুকনো শালপাতা দিয়ে এ-সব চা বানাতে হয়, চা-পাতা দিলে আর ঐ দামে দিতে হত না।

    ভাঁড় নিয়ে এটা বাঁশের খুঁটির পিছনে গুম্ হয়ে গেলাম। ভিড়ের মধ্যে হাসাহাসি হচ্ছিল, ঐ শুক্রবার নিয়ে নাকি চারদিন পকেট-মার হয়নি। চট্‌ করে বুঝে নিলাম সভা তাহলে পকেট-মারদের। একটা চিমড়ে লোক চায়ের ভাঁড় শেষ করে, সামনের বাঁশ বাগানের দিকে পা বাড়াতেই, বাকি সব হাঁ-হাঁ করে ছুটে এল — “ও মশাই অমন কাজও করবেন না। ঐ বাঁশ বাগানের পথ দিয়ে একটি মাত্র জায়গায় যাওয়া যায়, সেটি হল গোরে-বাড়ির ভাঙা কেল্লা, ভূতদের থান! দিনের বেলাতেও ও-পথে কেউ যায় না। কাগ-চিল, কুকুর-বেড়াল-ও না।”

    লোকটা ভয়ে-ভয়ে ইদিক-উদিক তাকিয়ে উল্টো দিকে মাঠের পথ ধরল ৷ সকলে হাঁফ ছেড়ে যে যার জায়গায় ফিরে গেল। আমিও সেই সুযোগে ঐ লোকটির পিছন-পিছন চললাম। যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। মাঠ ভেঙে ঘুরে সে আবার বাঁশ বাগানের ওপারে, সেই রাস্তাটাই ধরল। আমি তার পিছনে ‘নেই’ হয়ে চললাম। শুকনো পাতার ওপর এতটুকু পায়ের শব্দ হল না, নইলে এতদিন কী শিখলাম।

    তার পরেই বুকটা ধড়াস্ করে উঠল। সামনেই একটা প্রকাণ্ড ভাঙা কেল্লা। সেখানে পৌঁছে পথটাও শেষ হয়ে গেছে। কেল্লার চুড়োটা শুধু দেখা যাচ্ছে, চারদিকে এমনি ঘন বন হয়ে গেছে যে তার বেশি কিছু ঠাওর হল না। লোকটা একটুও দাঁড়াল না, সটান বনের মধ্যে দিয়ে সেঁধিয়ে গিয়ে, কেল্লার লোহা-বাঁধানো প্রকাণ্ড সদর দরজায় দাঁড়িয়ে, পাশে ঝোলানো একটা দড়ি ধরে টানতেই দরজা খুলে গেল। আমিও তার সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে সেঁধিয়ে গেলাম, সে কিছু টেরই পেল না।

    ঢুকেই একটা প্যাসেজ, তার ও-ধারেই মস্ত ঘরে সভা বসেছে। সে কী ভিড় আর কী ভয়ঙ্কর তর্কাতর্কি! ঘরে একটা জানালা নেই, উঁচু ছাদে কয়েকটা ঘুলঘুলি দিয়ে বাতাস আসে, তাও এমন আড়াল করা যে, বাইরে এক বিন্দু আলো যাচ্ছে না। যদিও ঘরে কয়েকটা ডে-লাইট বাতি জ্বলছে, তাতে ঘরের অন্ধকার কাটছে না, ঘুপচি-ঘুপচি ভাব, একটা সোঁদা গন্ধ, পায়রার নাকি বাদুড়ের বা অন্য বিকট কিছুর, কে বলতে পারে। সেই অন্ধকারের সঙ্গে আমি মিশে যেতে-যেতে বুঝলাম যে, কেউই আলো চায় না, কারো মুখ চেনা যাচ্ছে না; সকলের একরকম কাপড় চোপড়, চেহারা, ঘাড় গুঁজে বসার আর আড়চোখে চাওয়ার অভ্যাস। এদের সঙ্গে আমার এতটুকু তফাত নেই দেখে, নিশ্চিন্তে অদৃশ্যভাবে একটা থামে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালাম। দরজার কাছে। বেরুবার পথ ঐ একটি, আর সব বন্ধ, হয়তো একশো বছর খোলা হয়নি, খোলা যায়ও না।

    ফ্যাশফেঁশে বেড়ালে গলায় যা বলা হচ্ছিল তার কতক কতক বুঝতে পারলাম। এরা ইউনিয়ন করতে চায়, কিন্তু শত্রুরদের জ্বালায় কিছু হয়ে উঠছে না। আজকের ঐ কুখ্যাত নির্জন জায়গায় কারো অনধিকার প্রবেশের কোনো সম্ভাবনাই নেই— হঠাৎ চমকে উঠলাম। একটা থামের পাশের সব চাইতে অন্ধকার কোণ দিয়ে সর সর করে কেউ ছাদের অস্পষ্টতা থেকে নেমে এসে, আমার থামের ও-পাশে দাঁড়াল। আমার গা শিউরে উঠল।

    বক্তা তাঁর সরু-সরু হাত-পা নেড়ে বলে চললেন, “সাধারণ নাগরিকদের অধিকার থেকে কেন আমাদের বঞ্চিত করা হবে? জনতা থেকে আমরা অভিন্ন। আলাদা করে চিনুক তো কেউ! বলুক দেখি আমরা কেমন দেখতে, কেমন গলার আওয়াজ! আমাদের—”

    আমার গা শিউরে উঠল! আরো গোটা দশেক ছায়া ছায়া মতো একোণ থেকে ও-কোণ থেকে বেরিয়ে এসে, আবছায়াতে মিশে রইল।

    বক্তা একটু ইতস্তত করে বললেন, “আমাদের একটা আস্তানার দরকার ছিল, এর চাইতে ভাল আস্তানা কোথায় পাওয়া যাবে? আমরাই তো আসল অশরীরী, সকলের চোখের সামনে কাজ করি, কেউ আমাদের দেখতে পায় না। এই ছোট ইটের টুকরো ফেলে আজ এখানে আমাদের ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা—”

    এই অবধি বলে ইটটা হাতে করে তুলেছে, অমনি ঘরে একটা সোরগোল উঠল, “না, না, না, না—”, তারপরেই মনে হল ঘরের আনাচ-কানাচ থেকে পঁচিশ-ত্রিশটা ছায়া-মূর্তি বক্তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি অদৃশ্যভাবে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। বক্তা একটা কোঁক শব্দ করে বসে পড়ল।

    হঠাৎ বক্তার পাশে বসা ছুঁচোমুখো একটা লোক গর্জন করে উঠল, “নটে! ভজা! কার্তিক! কী, কচ্ছিস্‌টা কী? কই সম্‌ঝা!”

    সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য ভাব ছেড়ে দিয়ে গোটা পঞ্চাশেক ছোকরা খালি হাতেই মঞ্চের ওপর উঠে পড়ে, ওরে বাবারে, সেই ছায়া-মূর্তিগুলোকে পেল্লায় পেটাতে লাগল! সেই ফাঁকে বক্তা উঠে পড়ে দে দৌড়।

    আমি এমন পেট্‌নাই জন্মে দেখিনি। আগন্তুকদের আগা-পাশ-তলা ধাই-ধড়াক্কা মার! তার মধ্যে কে রব তুলল, “ব্যাটারা সব পুলিশের চর, অশরীরী সেজে এয়েচেন! লাগা! লাগা! ভজা দেখছিস্ কী?”

    ভজা বলল, “পেছলে যাচ্ছেন যে!”

    শেষটা তাদের পৃষ্ঠভঙ্গ দিতেই হল। সুড়ৎ সুড়ৎ করে মঞ্চ থেকে নেমে, স্রেফ জলের স্রোতের মতো ভিড়ের মধ্যে দিয়ে গলে, ঘরের একটি মাত্র দরজা দিয়ে, সব নিমেষের মধ্যে বেরিয়ে পড়ল। ধন্যি পুলিসের ট্রেনিং!

    হয়তো একটু অসাবধান হয়ে পড়েছিলাম। ঐ অদ্ভুত ব্যাপার দেখবার জন্য বোধহয় ভিড় থেকে কিঞ্চিং আলাদা হয়ে পড়েছিলাম। কারণ পালাতে-পালাতে শেষের লোকটা আমাকে দেখতে পেয়ে একরকম কোল-পাঁজা করে তুলে ধরে বাইরের জঙ্গলের মধ্যে এনে ফেলে বলল, “চঁলে চঁল্! চঁলে চঁল্! দেঁখ্‌ ছিস্ কীঁ!”

    বলে একটা শ্যাওড়া গাছের ডাল বেয়ে উঠে পড়ল। ততক্ষণে ডে-লাইট হাতে নিয়ে নটে ভজারাও দোরগোড়ায় দেখা দিয়েছে। সেই আলোতে দেখলাম, যে লোকটা গাছে চড়ছে, তার গোড়ালি দুটো সামনের দিকে! তক্ষুণি গাছ-গাছড়ার সঙ্গে মিশে গিয়ে মুচ্ছো গেলাম। ওরা বোধহয় আমাকে খুঁজে পায়নি। অবিশ্যি আমি যে আছি, তাও ওরা জানত না। খুঁজবে কাকে?

    বড়-সায়েবের কাছে আর যাইনি। আজকাল খবরের কাগজের জন্য সংবাদ সংগ্রহ করি। অবিশ্যি একেবারে ‘নেই’ হয়ে।

  • একাত্তর থেকে আশি পরিচ্ছেদ

    একাত্তর থেকে আশি পরিচ্ছেদ

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    একাত্তর থেকে আশি পরিচ্ছেদ

    ফার্স্ট ক্লাস কুপে কামরায় হানিমুনটা শুরু থেকেই জমে যাওয়ার কথা। একদিকে তরতাজা একটা ছেলে, অন্যদিকে টগবগে একটা মেয়ে। কিন্তু জমল না। গাড়ি শেয়ালদা ছাড়তে না ছাড়তেই ধ্রুব তার সুটকেসে জামাকাপড়ের তলায় সযত্নে শোয়ানো বোতলটি বের করে বসে গেল এবং খুব নিবিষ্টমনে প্রায় একনাগাড়ে মদ খেয়ে যেতে লাগল। ফলে খাওয়ার জলের বোতলটা বর্ধমান যেতে যেতেই শেষ।

    রেমি ধ্রুবর দিকে তাকাচ্ছিল না। জানালার ধারে আড়ষ্টভাবে বসে বাইরের চলন্ত প্রকৃতি দেখার চেষ্টা করছিল। এ কার সঙ্গে বিয়ে হল তার? একজন নেতা এবং বড়লোকের ছেলে, এই পরিচয় দেখেই কি বাবা ধ্রুবর সঙ্গে বিয়ে দিল তার? আর কোনো খোঁজখবর করল না? ধ্রুব সুপুরুষ সন্দেহ নেই। রেমি এও জানে, খাওয়া-পরা বা বিলাস-ব্যসনের কোনো অভাব তার হবে না। কিন্তু সেইটেই তো সব নয়। এ লোকটা বিয়ের দিন থেকেই গণ্ডগোল করে যাচ্ছে যে! বিয়ের দিন যখন সাজগোজ করানো হচ্ছে রেমিকে, সেই সময় একবার খবর এল ধ্রুবকে বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছে না। দুটো মিনিবাস ভর্তি রক্ষ ও উগ্র চেহারার বরযাত্রীরা এসে বাড়ি গরম করে ফেলেছে তখন। তাদের অনেকেই ভারী ভারী সোনার গয়না দিয়ে আশীর্বাদও করে গেল তাকে। অন্তত বিশ-ত্রিশ ভরি সোনা রোজগার করে ফেলল রেমি। কিন্তু বরের গাড়ি আসেনি, বর আনতে গিয়েছিল দাদা। সেই টেলিফোন করে জানাল, ধ্রুব বাড়িতে নেই। কৃষ্ণকান্তবাবু খুব রাগারাগি করছেন। এমন কি পুলিশকে পর্যন্ত কাজে লাগানো হয়েছে।

    রেমির কানে খবরটা হয়তো এসে পৌঁছতো না। কিন্তু সন্ধের লগ্ন পেরিয়ে যাওয়ায় ফিসফাস গুজগুজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। বাঙালরা একটু উচ্চস্বর হয়েই থাকে, বড় একটা ঢাকঢাক গুড় গুড় নেই। তাদের মধ্যে একজন বেশ চেচিয়েই বলছিল, দেখ কোথায় গিয়ে মাল খেয়ে গড়াগড়ি যাচ্ছে। ওর কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান আছে! কৃষ্ণদা যে কেন এটার বিয়ে দিচ্ছেন তাই বোঝা যাচ্ছে না।

    বাঙাল বাড়িতে বিয়ে নিয়ে রেমির আত্মীয়স্বজনের মধ্যে দ্বিধা এবং ভয় ছিলই। বাঙালদের রীতিনীতি আলাদা, আচার-ব্যবহার আলাদা, রেমিদের বাড়িতে আর কেউ বাঙাল বিয়ে করেও নি। তাই বাঙাল ছেলের সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারে অনেকে আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু বাবার উপায় ছিল না। কৃষ্ণকান্তবাবুর কাছে অনেক ব্যাপারেই তাৰ টিকি বাঁধা। তিনি নিজের ছেলের জন্য রেমিকে পছন্দ করায় বাবা আর আপত্তি করতে পারেনি। কিন্তু বর বেপাত্তা হওয়ায় সকলেই ঘাবড়ে গেছে বরযাত্রীদের মন্তব্য বর সম্পর্কে তাদের আরো ভীত করে তুলল।

    তবে কৃষ্ণকান্ত অতি ক্ষমতাবান লোক। সারা কলকাতা এবং গোটা রাজ্য জুড়ে তাঁর অজস্র কর্ষিকা। বাড়িতে বসে শুধু টেলিফোন করে কৃষ্ণকান্ত তার কর্ষিকাগুলিকে সক্রিয় করে তুললেন দলীয় কর্মী, পুলিশ, চামচা, ভক্ত, আত্মীয়স্বজন, আড়কাঠি, বন্ধুবান্ধব সকলেই সজাগ হয়ে উঠল।

    পরের লগ্ন রাত এগারোটার কাছাকাছি। তার অন্তত আড়াই ঘণ্টা আগে নৈহাটি স্টেশনের কাছে রুটি এবং মাংস ভক্ষণরত ধ্রুবকে প্রায় এঁটো হাতেই তুলে আনা হল। শোনা যায় সেই শুভদিনে ছেলেকে ধরে আনার পর কৃষ্ণকান্ত নিজের হাতে তাকে চটিপেটা করেন। তবে তাঁর প্রধান অভিযোগ ছিল, উপোস ভেঙে সে বিয়ের দিন রুটি মাংস খেয়েছিল কেন।

    ধ্রুব যখন বিয়ের পিঁড়িতে এসে বসল তখন তার মুখ গম্ভীর এবং থমথমে। একটা মন্ত্রও সে উচ্চারণ করেনি বিয়ের সময়। শুভদৃষ্টির সময় কনের মুখের দিকে তাকায়নি। শুধু পাথরের মতো চুপচাপ বসে ছিল। রেমি তখনই জানত বাবা তাকে হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দিয়েছে। এটা বিয়েই নয়। এই লোকটা হয় পাগল, নয় বদমাশ। সারা জীবন একে স্বামী হিসেবে কল্পনা করাও তার পক্ষে কষ্টকর হবে।

    ফুলশয্যার রাত্রে ঘরে এসেই একটা আলমারি খুলে মদের সরঞ্জাম বের করে বসে গেল ধ্রুব। তাকে বলল, খাওয়ার ঘরের ফ্রিজ থেকে বরফের ট্রেটা নিয়ে এসে তো।

    অবাক রেমি বলল, তুমি আজ মদ খাবে?

    খেলে কী? রোজ তো খাই, আজ নয় কেন?

    আজকের দিনেও খায় কেউ?

    মুখটায় রাজ্যের বিরক্তি ফুটিয়ে ধ্রুব বলল, প্যান প্যান কোরো না। নিজে না পারো তো একটা চাকরবাকর কাউকে বলো। এনে দেবে।

    আমি পারব না।

    ধ্রুব একটু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রেমির দিকে। তবে বাড়াবাড়ি করল না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল, তুমি বেশ সুন্দরী। তবে তোমাকে কিন্তু আমি নিজে পছন্দ করে আনিনি। সুতরাং আমার বেশী দায়দায়িত্বও নেই।

    রেমি একটু দাপটের সঙ্গেই বলল, তোমার দায়দায়িত্বের বোধ কেমন তা আমি জানি। আমাকে আর বোঝাতে হবে না।

    ধ্রুব এই কথায় অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। বেল আর জুঁই ফুলে সাজানো ঘর মাতাল হয়ে উঠছিল গন্ধে। দামী সেন্ট ছড়ানো বিছানা অপেক্ষা করছিল তাদের জন্য। চালু ছিল শব্দহীন এয়ারকুলার। সেই অদ্ভুত মাদকতাময় ঘরে একা খাটের ওপর পা তুলে শিকারী বেড়ালের মতো তীব্র চোখে রেমি লক্ষ করছিল ধ্রুবকে। এই লোকটা কোনোদিন তাকে ছোঁবে বা আদর সোহাগ করবে ভাবতেও গা ঘিনঘিন করছিল তার।

    অনেকক্ষণ চুপ করে অনড় হয়ে বসে রইল ধ্রুব। তারপর একসময়ে চেয়ারটা রেমির দিকে ঘুরিয়ে বসল।

    রেমি দেখল ধ্রুবর মুখে রাগ নেই, বিদ্বেষ বা ঘৃণাও নেই। এক ধরনের তীব্র ও গভীর বিষন্নতা আছে।

    ধ্রুব ধীর স্বরে বলল, তোমার নাম তো রেমি!

    রেমি সামান্য বিদ্রুপ করে বলল, না, আমার নাম বঙ্গবাসিনী।

    ধ্রুব তার দিকে চেয়ে একটু হাসল। বলল, নামটা আমার জানা উচিত, তাই না?

    তুমি কি উচিত অনুচিত মানো?

    ধ্রুব রাগল না। ধীর স্বরে বলল, ঠিক আমার মতো অবস্থায় না পড়লে তুমি কখনোই আমার সমস্যার কথা বুঝতে পারবে না রেমি। আমাকে ঘেন্না করা খুব সোজা। এই বাড়ির সকলেই আমাকে ঘেন্না করে। কারণ তাদের সেটা শেখানো হয়েছে।

    কথাটা রেমি ভাল বুঝল না। তবে চুপ করে রইল।

    ধ্রুব নিজেই খানিকক্ষণ বিরতি দিয়ে বলে, আমার মা নেই, জানো?

    রেমি, বলল, তোমার মা নেই তাতে কী হল? অনেকেরই থাকে না।

    ঠিক কথা। কিন্তু আমার মায়ের এখনো বেঁচে থাকার কথা ছিল। মা গায়ে আগুন লাগিয়ে মারা যায়। আমি তখন ছোটো, বছর দশেক বয়স হবে হয়তো। পদ্মপুকুরের বাড়িতে থাকতাম তখন। বাথরুমে ঢুকে মা গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়। গোটাটা পুড়ে গেল, অথচ মা একটাও শব্দ করেনি। হান্ড্রেড পারসেন্ট বাবনিং, হাসপাতালে তিন দিন বেঁচে থেকে মারা যায়। সেই মৃত্যুটা যতদিন মনে থাকবে ততদিন তোমার শ্বশুরের সঙ্গে আমার লড়াই শেষ হবে না।

    রেমি বুঝতে পারছিল না। বলল, কিসের লড়াই?

    লড়াইটা বহুমুখী, কারণ বহু কিছুর জন্যই এই লোকটা দায়ী। লোকটা বর্বর, নির্বোধ, ক্ষমতালোভী, নিষ্ঠুর, অহংকারী। জানো এসব?

    না। মাথা নাড়ল রেমি।

    ধীরে ধীরে জানবে। তবে লোকটার গুণও অনেক। সমস্তরকমের বিরুদ্ধতাকেই জয় করতে পারে, সমস্ত প্রতিকূলতাকেই নিজের অনুকূলে ঘুরিয়ে নিতে পারে। ব্রিটিশ আমলে এ লোকটা বিস্তর সাফার করেছে, লাঠি গুলি ফাঁসির দড়িকে ভয় খায়নি। তাই লোকটাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সবচেয়ে বড় কথা কী জানো? সবচেয়ে বিস্ময়কর কথা? এই লোকটা নিজের দেশ এবং দেশের মানুষকে বাস্তবিকই ভালবাসে।

    রেমি এই শ্বশুরপ্রসঙ্গ খুব উপভোগ করছিল না। ছেলের মুখে বাপের নিন্দে এমনিতেও সুস্বাদু নয়। সে বলল, আমার মাথা ধরেছে। আমি একটু শুচ্ছি।

    ধ্রুব উদাস স্বরে বলল, এ বাড়িতে যে ঘেন্নার বীজাণু ঘুরে বেড়াচ্ছে তোমাকেও তা অ্যাটাক করেছে, বুঝলে? সেটাই অবশ্য স্বাভাবিক। এনি ওয়ে, তুমি শুয়ে পড়ো। আমার বোধহয় আজ রাতে আর ঘুম আসবে না।

    রেমি শুয়ে পড়ল এবং একসময়ে ঘুমও এল। খুব সকালবেলা তুমুল চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল তার। বাইরের প্যাসেজে ধ্রুব চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলছিল, কোনো শালার রাইট নেই আমাকে আটকে রাখাব। ছাড়ো আমাকে, ছাড়ো! নইলে আমি গুলি করে উড়িয়ে দেবো সবাইকে, সুইসাইড করব⋯

    রেমি বুকে ধড়ফড়ানি নিয়ে দৌড়ে দরজায় গিয়ে দেখল, চার পাঁচজন ষণ্ডামার্কা লোক চেপে ধরে, আছে ধ্রুবকে। ধ্রুব রক্তচক্ষুতে চেয়ে চেঁচাচ্ছে। কিন্তু নড়তে পারছে না।

    কৃষ্ণকান্ত সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন। টকটকে গৌরবর্ণ সুপুরুষ। দীর্ঘকায় এবং মজবুত গড়ন। এসে ছেলের সামনে দাঁড়ালেন। মুখে কথা নেই।

    কিন্তু জোঁকের মুখে যেন নুন পড়ল। সপ্তম স্বর চিচি করতে লাগল ধুবর। সে বলল, দেখুন, আপনার লোকেরা আমাকে ধরে রেখেছে।

    কৃষ্ণকান্ত গমগমে গলায় বললেন, ওদের ওপর সেরকমই হুকুম আছে।

    কেন, আমি কী করেছি?

    কৃষ্ণকান্ত বললেন, ওদের ওপর হুকুম আছে, তুমি বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করলে থেকে যেন ধরে আনা হয়।

    আমি পালানোর চেষ্টা করিনি।

    তবে কী করেছিলে?

    মাথা ধরেছে বলে একটু বাইরে যাচ্ছিলাম। হাওয়ায়।

    কৃষ্ণকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, আজকের দিনটা শুধু বেরিও না। চেষ্টা করলেও বেরোতে পারবে না। তবে কাল যেখানে খুশি যেও। কেউ বাধা দেবে না।

    এই বলে কৃষ্ণকান্ত আবার ওপরে চলে গেলেন।

    রেমির বুকের ধড়ফড় অনেকক্ষণ ছিল। লোকগুলো ধ্রুবকে আবার ঠেলে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে গেল।

    রেমি জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছিলে?

    ধ্রুবর মুখচোখ রাগে লাল। ঘনঘন শ্বাস ফেলছিল। চাপা গর্জন করে বলল, যেখানে খুশি যাচ্ছিলাম, তাতে তোমার বাবার কী?

    রেমি দাঁতে দাঁত পিষে বলল, আমার বাবার কিছু নয়, তবে তোমার বাবার তো দেখলাম বেশ মাথাব্যথা।

    ধ্রুব চেয়ারে বসে বোতল তুলে নিল। রেমি অবাক হয়ে দেখল, বোতলটা সারা রাত খোলেনি ধ্রুব। অর্থাৎ ফুলশয্যার রাতটা ধ্রুব বাস্তবিকই মদ খায়নি। তবে ভোরবেলা সেই অপমানের পর খেল।

    পরদিনই পাহারা তুলে নিলেন কৃষ্ণকান্ত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ধ্রুব আর পালানোর চেষ্টা, করল না। খুব শান্ত হয়ে রইল ক’দিন। বেশী বেরোতও না বাড়ি থেকে।

    রেমির সঙ্গে অবশ্য ধুবর দেখা হত খুবই কম। পারিবারিক নিয়ম অনুযায়ী দিনের বেলা স্বামীর সঙ্গে দেখা করার উপায় ছিল না। দেখা হত রাত্রিবেলা। সেই কয়েকদিন ধ্রুব খুব শান্ত রইল বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে কেমন একরকম উদাসীন দূরত্ব বজায় রাখত। কথা বলত না একদম। দাড়ি কামাত না বলে গালে কোমল দাড়ি গজিয়ে ভারী সুন্দর দেখাত ওকে। আলাদা একটা ছোটো খাটে শুয়ে থাকত।ফ্যামিলি ট্যুর প্যাকেজ

    খুবই কচি এবং কাঁচা বয়স ছিল তাদের। সেই সময়ে তো দুজনের ভিতরেই তীব্র চৌম্বক তা কর্ষণ থাকার কথা। ধুর প্রতি বিদ্বেষ ও ক্ষোভ রেমিকে প্রথম ক’দিন উদভ্রান্ত রাখলেও একদিন অন্যরকম ঘটল।

    সেদিন একটু রাত করেই ঘরে এসেছিল রেমি। ধ্রুব একটু কাৎ হয়ে শুয়ে আছে। ঘুমন্ত। লম্বা চুলওলা মাথাটা একটু গড়িয়ে গেছে বালিশ থেকে। লাল টুকটুক করছে ঠোঁট। বিশাল চোখের নীচে ক্লান্তির কালো ছোপ। গায়ে একটা ফর্সা পাঞ্জাবি, সোনার বোতামগুলো ঝকঝক করছে। ফর্সা বুকে কিছু রোম দেখা যাচ্ছিল। একটা তাবিজ ঝুলে আছে গলা থেকে।

    বড় মায়া হল রেমির। মাথাটা তুলে দিল বালিশে। এ লোকটাকে তার ভালবাসতে ইচ্ছে করে। কিন্তু লোকটা যেন কেমনধারা। কিছুতেই কারো ভালবাসা নিতে হাত বাড়ায় না। বিদ্রোহী? কিন্তু সেই বিদ্রোহের রকমটা এরকম বিদঘুটে কেন?

    কয়েক মুহূর্তের বিভ্রম। রেমি ধ্রুবর মাথার চুলে একটু হাত বুলিয়ে দিল। তারপর তার পাশেই একটু জায়গা করে নিয়ে শুয়ে পড়ল। ডাকল, এই, ঘুমোলে? শোনো, আমার একা শুতে বুঝি ভয় করে না?

    ধ্রুব বাস্তবিকই ঘুমিয়ে পড়েছিল। চোখ খুলে তাকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হল। তবে রাগ করল না। বিরক্তও হল না। বরং ঠাট্টা করে বলল, তুমি কোন শিবিরের লোক তা জানো তো?

    জানি।

    তোমাকে আমি তাই বিশ্বাস করি না।

    নাই বা করলে।

    আমাকে শোধরানোর জন্যই বাবা তোমাকে বউ করে এনেছে। কিন্তু আমি এত সহজে শোধরাবো না রেমি।

    তুমি কি খুব খারাপ?

    আমি খুব খারাপ হতে চাই।

    এখন একটু খারাপ হও না ব্রহ্মচারী, দেখি।

    খুব কাছ থেকে ধ্রুবর মুখখানা দেখে সম্মোহিত হয়ে গেল রেমি, কী সুন্দর! তার মেয়েলী অহংকার ভেসে গেল, উবে গেল অভিমান রাগ বা ঘৃণা। শরীর ও হৃদয় জুড়ে বেজে যাচ্ছিল এক দামামা। এই সেই রণবাদ্য যা অবশ্যম্ভাবী করে তোলে দুই বিপরীত শরীরের সংঘর্ষ ও সংঘাত।

    একটি দুটি রাত্রি কাটল শরীরের উন্মত্ততায়।

    কিন্তু এই বাড়ির ভিতরে ভিতরে যে বিভেদ, বিদ্বেষ ও অবিশ্বাস জমেছে বহুদিন ধরে, তা ছাড়বে। কেন তাদের?

    বিয়ের একমাস পরেই ইলেকশন। কৃষ্ণকান্ত বিধানসভার নমিনেশন পেয়েছেন, বাড়িতে প্রচুর লোকের আনাগোনা এবং ভীষণ ব্যস্ততা দেখা দিল। রান্নাঘরে বিশাল উনুন জ্বলে সারাদিন। দলের কর্মীরা অনেকেই এসে খায়। তা হচ্ছে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা। বাড়িটা প্রায় বারোয়ারি বাড়ি হয়ে উঠল।

    একদিন সন্ধেবেলা ধ্রুব একটা লোককে কলার ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে ভিতরে নিয়ে এল। চেঁচিয়ে কৃষ্ণকান্তের উদ্দেশে বলতে লাগল, দেখুন, আপনার লোকজনকে একটু দেখে যান।

    কৃষ্ণকান্ত দলের লোকজনকে নিয়ে ওপরতলায় জরুরী মিটিং করছিলেন। মিটিং অবশ্য সারাদিন লেগেই থাকত। বিরক্ত মুখে কৃষ্ণকান্ত গাড়িবারান্দার ছাদে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, কী হয়েছে? চেঁচাচ্ছো কেন?

    ধ্রুব বলল, এই লোকটাকে চেনেন তো! এ হচ্ছে আপনার একজন ক্যামপেনার। রঘুবীর দাশশর্মা।

    চিনব না কেন? ও কী করেছে?

    একটু আগে হাজরা পার্কের উল্টোদিকে গলিতে এ দুটো ছেলেকে মেরেছে। তারা দেয়ালে লিখছিল। সেই দেয়াল নাকি আপনার। শুধু এই কারণে দলবল নিয়ে এ গিয়ে ওদের তাড়া করে। গলিতে নিয়ে গিয়ে পেটে ছোরা মেরেছে। তারপর এসে ফুটপাথে বেঞ্চ পেতে বসে বিড়ি ফুঁকছে।

    কৃষ্ণকান্ত গমগমে গলায় বললেন, চেঁচিও না, ছেড়ে দাও ওকে, আমি দেখছি।

    কী দেখবেন?

    সে আমি বুঝব।

    আপনি বুঝবেন কেন? এ লোকটাকে পুলিশের হাতে দেওয়া উচিত।

    কৃষ্ণকান্ত ধমক দিয়ে বললেন, ধ্রুব! ওকে ছেড়ে দাও। পুলিশে দেওয়ার দরকার হলে আমিই দেবো। তুমি তোমার কাজে যাও।

    সেটা তো আইন নয়।

    আইন তোমার চেয়ে আমি ভাল জানি।

    জানেন, কিন্তু মানেন না।

    কৃষ্ণকান্ত একটু বিপদে পড়লেন। কারণ দলের লোকজন সব উঠে গাড়িবারান্দার ওপরে ভীড় করে পিতা-পুত্রের নাটক দেখছে। নীচে এবং ফটকের বাইরেও লোক জমা হচ্ছে।

    কৃষ্ণকান্ত মরীয়া হয়েই বললেন, ও যে মেরেছে তার কোনো সাক্ষী আছে?

    আমিই সাক্ষী।

    তুমি একা?

    তাছাড়া আর কে সাক্ষী দেবে?

    তুমি ঠিক দেখেছো?

    নিশ্চয়ই। আপনি থানায় টেলিফোন করুন। আমি সাক্ষী দেব।

    রঘুবীর দাশশর্মা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। একটু হাসছিলও মাঝে মাঝে। সে জানে ধ্রুব একটু পাগলা গোছের। সে এও জানে কৃষ্ণকান্ত চৌধুরী যে কোনো বিপদ থেকে তাকে উদ্ধার করাবেনই।

    কৃষ্ণকান্ত বললেন, আমি থানায় ফোন করছি। রঘুবীরকে ওপরে আসতে বলো।

    ব্যাপারটা এইখানেই মিটে গেল অবশ্য। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পুলিশ এসে রঘুবীরকে ধরে নিয়ে যায় এবং তার পরদিনই রঘুবীর ছাড়া পেয়ে অন্য এলাকায় কৃষ্ণকান্তর হয়ে খাটতে থাকে।

    কৃষ্ণকান্ত তখন একদিন রেমিকে ডেকে বললেন, বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে নিয়ে দামড়াটাকে সঙ্গে করে ক’দিন দার্জিলিং বেরিয়ে এসো তো মা। রিজার্ভেশন হয়ে গেছে।

    সেই তারা হানিমুনে চলল। রক্ষণশীল পরিবারের পক্ষে দারুণ আধুনিক ব্যাপার।

    মধুচন্দ্রিমা না নিমচন্দ্রিমা তা কে বলবে? ধ্রুব সেই আগের মতোই অস্বাভাবিক। কিছুতেই রেমিকে চিনতে চায় না। তাকায় না, কথা বলে না। দিনরাত একনাগাড়ে মদ খেয়ে যাচ্ছে।

    ইলেকশনের সময়ে তাকে কেন সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে তা কি বোঝেনি ধ্রুব? ঠিকই বুঝেছিল। আর রেমি বুঝতে পারছিল মাত্র কয়েকদিনের শারীরিক প্রেম ধ্রুবর ফুরিয়ে গেছে। শরীর আর কতদিন শরীরের বাঁধনে বাঁধা থাকতে পারে। যেখানে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে যৌনতাই প্রধান সেখানে সম্পর্ক বাতাসের ভর সয় না।

    বর্ধমানে ধ্রুব রেমিকে বলল, যাও না, প্ল্যাটফর্মের কল থেকে জলের বোতলটা ভরে আনো।

    আমি? রেমি অবাক হয়ে বলল, আমাকে জল আনতে বলছো?

    কেন, তুমি আনলে কী হয়?

    মেয়েরা কখনো এসব করে? যদি গাড়ি ছেড়ে দেয় আমি তো দৌড়ে এসে চলন্ত ট্রেনে উঠতেও পারব না।

    চেষ্টা করলে সব পারা যায়। পারবে।

    তুমি পারো গিয়ে। আমি তোমার মদ খাওয়ার জন্য জল আনতে পারব না।

    তাহলে আমি বাথরুমের জলই মিশিয়ে খাবো।

    তা খেতে পারো।

    খাবো? তুমি আমাকে খেতে দেবে? জানো, গাড়ির জলে এক লক্ষ রকমের জীবাণু আছে?

    তা আমি কী করব? তোমাকে তো আমি মদ খেতে বলিনি।

    মাইরি, যাও না।

    বলেছি তো পারব না।

    ঠিক আছে, তাহলে আমিই নামছি। যদি গাড়িতে উঠতে না পারি তাহলে তুমি একাই দার্জিলিং যেও।

    এই বলে ধ্রুব নিজেই উঠল এবং জলের বোতল নিয়ে নেমে গেল। সেটা গ্রীষ্মকাল। প্ল্যাটফর্মের কলে দারুণ ভীড়। রেমি দেখল, ধ্রুব সেই ভীড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে ঢুকে পড়ল। কিন্তু তারপর আর তাকে দেখা যাচ্ছিল না।

    জল নিয়ে যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে ফিরে আসছে। কল প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল। কিন্ত ধ্রুবকে আর দেখতে পেল না রেমি। গার্ডের হুইশিল বাজল। একসময়ে গাড়ি নড়েও উঠল।

    কিন্তু ধ্রুব?

    আতঙ্কে জানালা দিয়ে রেমি তারস্বরে চেঁচাতে লাগল, এই তুমি কোথায়? ওগো, তুমি এসো। শীগগির। গাড়ি ছেড়ে দিল যে!

    কিন্তু কোথায় ধ্রুব? বর্ধমান প্ল্যাটফর্ম ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে পিছন দিকে।

    মরীয়া রেমি গাড়ির অ্যালার্ম চেন ধরে ঝুলে পড়ল। গাড়ি থামতেই সে নেমে পড়ল আগুন-গরম প্ল্যাটফর্মে। তারপব ছুটতে লাগল পিছন দিকে।

    ধ্রুবকে অবশ্য পাওয়া গেল সহজেই। খুব নিবিষ্টমনে হুইলারের দোকানে দাঁড়িয়ে একটা ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছিল। রেমি গিয়ে তার হাত ধরতেই সে একটুও লজ্জিত না হয়ে একটা হাই তুলে বলল, প্রেমের চেয়ে তাহলে সিকিউরিটিই বড়! কী বলো

  • একাশি থেকে নব্বই পরিচ্ছেদ

    একাশি থেকে নব্বই পরিচ্ছেদ

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    একাশি থেকে নব্বই পরিচ্ছেদ

    তখন সন্ধের কুয়াশামাখা অন্ধকার ধীরে ধীরে গড়িয়ে আসছে চারদিক থেকে। জল-স্থল-অন্তরীক্ষের সব বাস্তবতা হারিয়ে যাচ্ছে এক রহস্যময় কুহেলিকায়। ব্রহ্মপুত্রের বুক থেকে আঁশটে গন্ধ বয়ে নিয়ে হু-হু করে উত্তুরে হাওয়া এল। কাছেপিঠে ডেকে উঠল একশ শেয়াল।

    বিকেল থেকেই শশিভূষণ টের পাচ্ছিল, জ্বর আসবে। কিন্তু পরের বাড়িতে অচেনা লোকজনের কাছে সে কথাটা বলতে পারেনি। একটা ঘর আর একটা বিছানা পেয়ে সে বর্তে গিয়েছিল। শেষ বেলায় এক পেট খেয়ে অঘোরে লেপমুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছিল। ঘুম ভাঙল মাথার ব্যথা আর শরীরের কম্পে। কাউকে ডাকবে কিনা বুঝতে পারছিল না সে। এরা রাজা জমিদার মানুষ। এসব লোক কেমন হয় তা তার ভাল জানা নেই। আশ্রয়টুকু দিয়েছে সেই ঢের। এরপর আবার অসুখ-বিসুখের কথা শুনলে হয়তো বিরক্ত হবে। শশিভূষণের অবশ্য জ্বরের সঙ্গে চেনাজানা বহু দিনের। এ হল ম্যালেরিয়া। খুব বেশীক্ষণ থাকে না। কিন্তু যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। ঘরে কেউ আলো জ্বেলে দিয়ে যায়নি। অবশ্য আলোর বাবস্থা আছে। জ্বেলে নিলেই হয়। কিন্তু শশিভূষণ ভয়ে আলো জ্বালল না। ঘরে যে লোক আছে সেটা পাঁচজনকে জানান দেওয়ার কী দরকার?

    লেপমুড়ি দিয়ে শশিভূষণ ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। তারপর ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যেতে লাগল চেতনা। চোখের তারা উল্টে গেল। কিছুক্ষণ ঘোরের মধ্যে সে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা আর শেকসপীয়রের নাটক থেকে মুখস্থ বলতে লাগল। মাঝে মাঝে “ভূত! ভূত!” বলে চেঁচিয়ে উঠতে লাগল।

    ঘরেব দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছিল সে। উঠে সেটা আর খুলে দিতে পারেনি। জানালার একটা পাল্লা ভাঙা। তা দিয়ে ভয়ংকর ঠাণ্ডা হাওয়া আসছিল ঘরে। অন্ধকারে একটা দুটো জোনাকি পোকা ঘুরে ঘুরে ওড়ে। গাছের ডালে রহস্যময় সব শব্দ হয়। শেয়াল ডাকে। জ্বরের ঘোরে এই সব আবহ এক বিচিত্র পরপারের ছবি রচনা করে শশিভূষণের চারপাশে!

    বিকেল পেরিয়ে সন্ধে নামার পরও কৃষ্ণকান্ত বারবাড়ির মাঠে একটা টাট্টু ঘোড়া চালাচ্ছিল। ঘোড়া চালাতে সে সদ্যই শিখেছে। রোমাঞ্চকর এই অভিজ্ঞতার প্রথম স্বাদ সে যতক্ষণ পারে উপভোগ করে নেয়। সারা বিকেল ঘোড়া চালিয়েও সে ক্লান্ত হয়নি। আর অনেকক্ষণ চালাতে পারে। কিন্তু উপায় নেই। একটু বাদেই প্রতুল মাস্টারমশাই আসবেন। হরি এসে তাকে ডেকে নিয়ে যাবে।

    তার এই ঘোড়া দাবড়ানোর দৃশ্যটা দেখছিল মাত্র একজন। সে হল হর কমপাউণ্ডার। এই বিশ্ব-সংসারে তার আপনজন আর কেউ অবশিষ্ট নেই। বছর দুই আগে কৃমি বিকারে তার মেয়েটা মরার পরই সব মায়ামোহের বাঁধন একদম কেটে গেল তার। কিন্তু সেই সঙ্গেই দেখা দিল মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণ। পাঁচ টাকা বেতনে সে জ্ঞানদা দাতব্য চিকিৎসালয়ে চাকরি করত। কৃষ্ণকান্ত তখন প্রায়ই গিয়ে ডাক্তারখানার পেছন দিককার ওষুধের ঘরে বসে থাকত। অবাক হয়ে দেখত হব কমপাউণ্ডার কেমন ওষুধের সঙ্গে ওষুধ মেশায়, শিশির গায়ে নকশাকাটা কাগজের দাগ সাঁটে আঠা দিয়ে। মাঝে মাঝে মেজার গ্লাসে কৃষ্ণকান্তকে মিষ্টি ও সুগন্ধী সিরাপ খাওয়াত সে। বিস্তর ভূত-প্রেতের গল্প শোনাত।

    মাথা খারাপের লক্ষণ দেখা দেওয়ায় হর কমপাউণ্ডারের চাকরিটি গেছে। কিন্তু হেমকান্ত তাকে তাড়িয়ে দেননি। হর কমপাউণ্ডারকে চাকরি দিয়েছিলেন তাঁর বাবা শ্যামকান্ত। বাপের আমলের পুরোনো ও বিশ্বাসী লোকটিকে তাই এখনও নিজের আশ্রয়ে রেখেছেন।

    মায়ামোহ মানুষের জন্মগত অভিশাপ। সহজে কাটে না। আপন না পেলে পরকে আঁকড়ে ধরে। এমন কি বেড়ালটা, কুকুরটা, গাছটা পর্যন্ত মায়াবশে মানুষের আপন হয়। হর কমপাউণ্ডারেরও হয়েছে তাই। এ বাড়ির চৌহদ্দিতে তার একটা অদৃশ্য খোঁটা পোঁতা আছে। সেই খোঁটায় বাঁধা মায়ার দড়ি। কে যেন টানে। হর কমপাউণ্ডার তাই আর কোথাও যেতে পারেনি শেষ পর্যন্ত।

    এই যে কৃষ্ণকান্ত, দশ-এগারো বছরের তেজী সুন্দর ছেলেটা, এ হল মনিবের ছেলে। আত্মীয়তা নেই, অবস্থা বয়স ইত্যাদির ফারাকও যথেষ্ট। তবু এ ছেলেটাকে দেখলেই বুকটার মধ্যে কেমন উথলে-ওঠা ভাব হয় তার। ছেলেটার যা দেখে তাই তার ভাল লাগে। এই যে আবছায়া মতো আলোয় সাদা টাট্টু ঘোড়ায় চেপে চারদিকে ঢেউ তুলে দাবড়ে বেড়াচ্ছে কৃষ্ণকান্ত, এই দৃশটাকে তার পার্থিব কিছু বলে মনে হয় না। এ যেন এক স্বপ্ন-দৃশ্য। বিলিতি ছবির বইতে এরকম সব ছবি আছে। তা থেকেই যেন বেরিয়ে এসেছে ছেলেটা, আবার ছবির মধ্যে ফিরে যাবে।

    কাছারির মাঠের চারধারে ঋজু পাম গাছের মিছিল। তারই ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে কৃষ্ণকান্ত। ঘোড়ার খুরের শব্দ ধরিত্রীর হৃদস্পন্দনের মতো ধুকপুক ধুকপুক করে বেজে যাচ্ছে অবিরল।

    মস্ত একটা চক্কর দিয়ে কৃষ্ণকান্ত ঘোড়া ছুটিয়ে কাছে আসে। আবার দূরে চলে যায়। হর কমপাউণ্ডার কাছারির সিঁড়ির শেষ ধাপটায় বসে একটা নস্যি রঙের আলোয়ানে সারা গা ঢেকে চুপচাপ দেখতে থাকে। তার মুখে একটু হাসি লেগে আছে সেই কখন থেকে।

    পৃথিবী জায়গাটা ভাল না খারাপ তা আজকাল আর বুঝতে পারে না হরনাথ। তবে সে বোঝে যে, এখানে তার আর কোনো কাজ নেই। কাজ শুধু চেয়ে থাকা, শুধু বসে থাকা, শুধু বেঁচে থাকা। আর কিছু নয়।

    কৃষ্ণকান্ত গল্প শুনতে বড় ভালবাসে। আগে তাকে অনেক গল্প শোনাত হরনাথ। আজকাল আর গল্প মনে পড়ে না। একটা গল্প শুরু করে অন্য গল্পে চলে যায়। মাথাটা ঠিক নেই কিনা। আজ তার বদরুদ্দিনের গল্পটা মনে পড়েছে। সবটা নয়, তবে কিছুটা। কৃষ্ণকান্ত ঘোড়া চালানো শেষ করে তার লাশটিতে এসে বসবে। তখন গল্পটা শোনাবে হরনাথ। তাই প্রাণপণে সে গল্পটা মাথার মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা করছে। আজকাল বেশীক্ষণ কিছুই নে মাথায় রাখতে পারে না।

    বদরুদ্দিনের ঘোড়াটার বয়স হয়েছিল। তার ওপর চোখে ছানি পড়তে লাগল। বদরুদ্দিনও বুড়ো মানুষ। চোখের নজর তারও তখন কমে এসেছে। তবু সওয়ারির জন্য কানা ঘোড়ায় ছ্যাকরা গাড়ি তে বদরুদ্দিন রোজ বেরোতো। তবে গণ্ডগোল হত খুব। প্রথম প্রথম আন্দাজে রাস্তা ঠাহর করত। পরে ভুল রাস্তায় নিয়ে গিয়ে সওয়ারির ধমক খেত। বদরুদ্দিন রেগে গিয়ে চাবুক চালাত শপাশপ। কিন্তু ঘোড়াটাই বা কী করে! মার খেয়ে বেচারা চিহিঁহিঁ করে কেঁদে উঠত শুধু। তারপর একদিন গাঙ্গিনার পাড়ে রাস্তা ছেড়ে ঘোড়াটা গিয়ে পড়ল একটা মাদার গাছের ওপর। গলায় ফাঁস লেগে ঘোড়াটা আর ঘাড় ভেঙে বদরুদ্দিন নিজেও সেইখানেই মরে গেল। তা বলে গল্পটা শেষ হল না কিন্তু। শরীর ছেড়ে উঠে দাঁড়াল বদরুদ্দিন। গা ঝাড়া দিয়ে উঠল তার ঘোড়াও। দুজনেই তখন চোখে বেশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। ভাঙা গাড়িটায় আবার ঘোড়া যুতে নিল বদরুদ্দিন। তারপর পংক্ষিরাজের মতো উড়ে বেড়াতে লাগল শহরময়। মাঝরাতে না জেনে কেউ কেউ এখনো বদরুদ্দিনের ছ্যাকরা গাড়ির সওয়ার হয়। আর রাস্তা ভুল হয় না।

    বুড়ো সহিস লণ্ঠন হাতে এসে দাঁড়িয়ে আছে মাঠের মধ্যিখানে। ঘোড়ার পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে।

    ও ছোটোকর্তা, এবার নামো। ঘোড়ার মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছে। আর না।

    কৃষ্ণকান্ত ঘোড়া থামায়। হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বসে হরনাথের পাশে। বলে, ওফ, দারুণ চালিয়েছি আজ। না, হরদা?

    খুব।

    দুজনেই চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকে। কুয়াশা এবং অন্ধকার ঘনিয়ে ওঠে। মন্দির থেকে শঙ্খধ্বনি আসে।

    কৃষ্ণকান্তর সত্যিকারের কোনো অভিভাবক নেই। হেমকান্ত তার প্রতি নজর দেন না। কেউই দেয় না। মাঝে মাঝে রঙ্গময়ী একটু-আধটু ডাক খোঁজ করে মাত্র। কৃষ্ণকান্ত বেড়ে উঠছে নিজের মতো করেই। সময় মতো লেখাপড়া করা আর ইসকুলে যাওয়া ছাড়া বাদবাকি সময়টা সে কী করে বেড়ায় তার খোঁজ কেউ নেয় না। সুতরাং নানা সৃষ্টিছাড়া কাণ্ড করে সে। তিনতলার চোর কুঠুরিতে পুরোনো আমলের কিছু অস্ত্রশস্ত্র আছে। সেই ঘর থেকে একদিন একটা তরোয়াল বের করে এনেছিল কৃষ্ণকান্ত। সারাদিন খোলা তরোয়াল হাতে করে ঘুরে বেড়াল। কযেকজন অবশ্য বারণ করেছিল, সে শানেনি। বস্তুত হেমকান্ত ছাড়া আর কারও কথা শোনে না সে। ফয়জলের গোটা দুই ছাগল আর ছানাপোনারা রোজই ঘাস খেতে আসে বারবাড়ির পশ্চিম দিককার গোচর ভূমিটায়। কখন যে কৃষ্ণকান্ত সেখানে হাজির হয়েছে তা কেউ জানে না। হঠাৎ তার আর্তনাদ শুনে লোকজন ছুটে গিয়ে দেখল ধারি ছাগলটার মুণ্ডু খসে পড়ে আছে মাটিতে, ধরটা ছটফট করছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে জায়গাটা। কৃষ্ণকান্ত রক্তমাখা তরোয়াল হাতে দৃশ্যটার দিকে সম্মোহিতের মতো চেয়ে হরহর করে কাঁপছে।

    কৃষ্ণকান্ত চমৎকার সাঁতার কাটতে পারে। বিশেষ করে ডুবসাঁতার। একদিন তার ইচ্ছে হল, অন্দরমহলের দিকে যে অথৈ পুকুরটা আছে তার তলা থেকে মাটি খামচে আনবে। যেই কথা, সেই কাজ। একদিন ডুব দিল তো দিলই। আর ওঠে না। হরি বিপদ বুঝে লোকজন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল জলে। যখন কৃষ্ণকান্তকে তোলা হল তখন মৃত্যুর ঘণ্টা প্রায় বেজে গেছে।

    হেমকান্ত অন্যান্য ছেলেরা যেমন শান্ত ও সুশীল কৃষ্ণকান্ত তেমন নয়। ঘরের চেয়ে বাইরের আকর্ষণ তার ঢের বেশী। বাড়ির পিছন দিকে পগারের ওপারে হেমকান্তর কিছু প্রজা বাস করে। তারা গরীব ও অসংস্কৃত। কৃষ্ণকান্ত নিয়মিত সেই পাড়ায় যায়। সেখানে তার একদঙ্গল অনুচরও জুট গেছে। কৃষ্ণকান্ত তাদের সঙ্গী করে মাঝে মাঝে মারপিট লাগায় অন্য পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে। এর ওর তার বাড়ি থেকে ফুল বা ফল চুরি করে। তাদের সঙ্গে ফুটবলও খেলে।

    ব্রহ্মপুত্রের ধারে যেসব ডিঙ্গি নৌকো থাকে সুযোগ পেলেই কৃষ্ণকান্ত দড়ি খুলে সেগুলো স্রোতের মুখে ঠেলে দিয়ে আসে। বুড়ো রামভজুয়া দারোয়ানের কানে সে একবার গোকুলপিঠের গরম রস ঢেলে দিয়েছিল। রামভজুয়ার সেই কান একদম গেছে।

    হেমকান্তর কাছে অবশ্য এসব খবর বড় একটা পোঁছায় না। প্রথম কথা, কৃষ্ণকান্ত যে হেমকান্তর আদরের ছেলে এটা সবাই জানে। দ্বিতীয় কথা, মা-মরা ছেলে বলে সকলেরই একটু মায়া আছে। তাই কেউ নালিশ করতে যায় না। হেমকান্তর বড় ছেলে কণককান্তি কলকাতায় তাঁদের কালীঘাটের বাড়িতে থাকে। শ্বশুরের সঙ্গে সে একটা ব্যবসায় নেমেছে। ব্যবসা কিসের তা খোঁজ করেননি হেমকান্ত । তবে আয় বোধহয় ভালই হচ্ছে। কণককান্তি টাকার জনা বাপকে চিঠি লেখে না। সম্প্রতি সে একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সে কৃষ্ণকান্তকে নিজের কাছে রেখে মানুষ করতে চায়। হেমকান্ত না বা হ্যাঁ কোনোটাই জানাননি। কৃষ্ণকান্তকে ছেড়ে থাকতে তাঁর কষ্ট হবে। তবু তাকে যে কলকাতায় পাঠানোই উচিত তাও তাঁর মনে হয়। এখানে কৃষ্ণকে দেখার কেউ তেমন নেই। কণককান্তিও আগ্রহের সঙ্গেই চাইছে।

    কিন্তু কলকাতায় যাওয়ার প্রস্তাবে কৃষ্ণকান্ত কেঁদে ভাসিয়েছে। বাবা তাকে এখনো কিছু বলেনি ঠিকই, কিন্তু যদি বলে? বাবার কথার ওপর তো আর কথা চলে না। মনু পিসি বা রঙ্গময়ীই হচ্ছে তার একমাত্র ভরসা। বড়দা তাকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চায় শুনে সে গিয়ে মনু পিসির ওপর হামলে পড়ল, আমি কিন্তু কিছুতেই যাবো না, বলে দিচ্ছি। তুমি বাবাকে রাজি করাও।

    কৃষ্ণ কোথাও চলে যাবে এটা রঙ্গময়ীও ভাবতে পারে না। সুনয়নী চলে যাওয়ার পর এই দুধের বাচ্চাটিকে সে বুকে আগলে এত বড়টি করেছে। তবু সে বলল, যাবি না তো কী করবি? এখানে কে তোকে অত চোখে চোখে রাখবে? কখন পুকুরে ডুবে মরিস, কার সঙ্গে মারামারি করে মাথা ফাটিয়ে আসিস তার তো ঠিক নেই। কলকাতায় ধরাবাঁধা জীবন, সেখানেই গিয়ে থাকা ভাল।

    এরপর কৃষ্ণকান্ত রেগে রঙ্গময়ীকে আঁচড়ে কামড়ে চুল ছিঁড়ে একাকার কাণ্ড করল। রঙ্গময়ী ভরসা দিল, আচ্ছা যা, তোর বাবাকে রাজি করানোর চেষ্টা করব।

    কৃষ্ণকান্ত ভরসা পেল বটে, কিন্তু ভয়টা আজও কাটেনি। কণককান্তি সামনের মাসে আসছে। সেই সময়, আবার তাকে কলকাতা নিয়ে যাওয়ার কথা উঠবে। সেখানে এমন অবারিত মাঠঘাট নেই. ঘোড়া নেই, বন্ধু নেই, ধারেকাছে নেই নদী বা পুকুর। বড়দা লোকটা ভারী গোমরামুখো। বউদিও ভীষণ রাগী।

    কৃষ্ণকান্ত হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, হরদা, কখনো কলকাতায় গেছ?

    গেছি। অনেকদিন আগে।

    তোমার ভাল লাগে?

    না।

    তোমার এ জায়গাটিই বেশী ভাল লাগে, না হরদা?

    হ্যাঁ।

    আমারও। তবু বড়দা আমাকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চাইছে।

    হরনাথ উদ্বিগ্ন হয়ে বলে, সে কী? তুমি যেও না।

    কিন্তু জোর করে নিয়ে গেলে কী করব?

    তুমি জোর করেই এখানে থেকে যাবে।

    কৃষ্ণকান্ত এ কথায় হেসে উঠে বলল, হরদা, তুমি সত্যিই পাগলা। বাবা যদি বলে, ওরে কৃষ্ণ, কণকের সঙ্গে কলকাতায় যা তা হলে কী হবে?

    তুমি লুকিয়ে থেকো। আমি তোমাকে একটা জায়গা দেখিয়ে দেবো। কেউ খুঁজে পাবে না তোমাকে।

    কৃষ্ণকান্ত সঙ্গে সঙ্গে কৌতূহলী হয়ে বলে, আছে সেরকম জায়গা?

    অনেক আছে। কেউ খুঁজে পাবে না।

    জায়গাটা দেখাবে আমাকে?

    হরনাথ মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখছিল কৃষ্ণকান্তকে। এ ছেলে ভবিষ্যতে খুব বড় কেউ একজন হবে। চোখের দৃষ্টি এই বয়সেই কী গভীর! কেমন ধারালো চেহারা। সে বলল, দেখাতে পারি। তবে একটু ভয়ের জায়গা।

    ভয়! কিসের ভয়?

    ওখানে আরও একজন থাকে কিনা।

    সে কে?

    তোমার কাকা। নলিনীকান্ত।

    কী যে বলো! কাকা তো বেঁচে নেই।

    তা না থাক, মরে তো আছে।

    তার মানে?

    হরনাথ নির্বিকার গলায় বলে, নলিনীবাবুর ঘরে এখনো নলিনীবাবু থাকেন।

    কৃষ্ণকান্তর গায়ে একটু কাঁটা দিল। হরনাথের কাছ ঘেঁষে বসে সে বলল, সত্যি বলছ?

    তিন সত্যি। মাঝরাতে সাইকেল চালিয়ে আসেন। ঘরে ঢোকেন। সব টের পাই।

    কখনো দেখেছো?

    দু-একবার। আমি তাঁর সাড়া পেলেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। রোজ দেখতে পাই না অবশ্য। তবে দু’বার দেখেছি। একবার আমাকে ইশারায় কাছেও ডাকেন।

    তুমি কাছে গেলে?

    গিয়েছিলাম। কিন্তু তারপর আর কিছু দেখতে পেলাম না।

    ও বাবা! ও ঘরে আমাকে লুকিয়ে থাকতে বলছ?

    ভয় পেও না। উনি তোমার কাকা হতেন। তোমার কোনো ক্ষতি করবেন না। বরং, ভালই করবেন। ওদের ভয় পেতে নেই। আমাদের যেমন একটা জগৎ আছে, ওদেরও তেমনি একটা আলাদা জগৎ আছে।

    তুমি ভূত দেখতে পাও?

    খুব দেখতে পাই। তোমার মাকে মাঝে মাঝে দেখি, ভিতরের দরদালানের জানালায় দাঁড়িয়ে দুপুরবেলা চুল শুকোচ্ছেন। কাল যখন বিকেলে তুমি ঘোড়া চালাচ্ছিলে তখন উনি এসে সামনের গাড়িবারান্দার ছাদে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে দেখছিলেন তোমাকে।

    কৃষ্ণকান্ত খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল হরনাথের সঙ্গে। বলল, মা আমাকে কেন দেখছিল?

    দেখবে না? ছেলে বলে কথা! তোমাকে একটুখানি দেখে চলে গেছেন, এখন তুমি কত বড়টি হয়েছো! ঘোড়া চালাও, ইসকুলে যাও, ফুটবল খেল। মা তাই দেখতে আসেন।

    ভয় ভয় করলেও কৃষ্ণকান্ত ঘটনাটা খারাপ লাগল না। মার কথা তার মনেই নেই। তবু মা যে চাখের আড়ালে এখনো আছে সেটা ভাবতে ভালই লাগে।

    হরনাথ অস্ফুট গলায় বলে, দুলিকেও দেখি। জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে শাক তোলে। আঁচলে মাছ ধরে। কখন ঘরেও আসে। আমার মাথার কাছটিতে চুপ করে বসে থেকে আবার চলে যায়।

    তবে যে প্রতুল মাস্টারমশাই বলে, ভূত বলে কিছু নেই।

    কী জানি। আমি তো সব স্পষ্ট দেখি। এই যেমন তোমাকে দেখছি। তবে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা হয় না।

    আমার মাকে দেখাবে। আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করে।

    দেখা কি আর না যায়? চেষ্টা থাকলে, ইচ্ছে থাকলে দেখা যায়ই। দুলি মরার পর আমি কেবল দিনরাত তাকে ভাবতাম আর কাঁদতাম। ভাবতে ভাবতে আর কাঁদতে কাঁদতে মাথাটা কেমন গণ্ডগোল হয়ে গেল। তারপর থেকে সব দেখতে পাই। কোকাবাবু যেদিন মারা গেলেন—

    সেদিন কী?

    সেদিন তাঁকেও দেখেছি। সন্ধেবেলা ব্রহ্মপুত্রের জলে নেমে স্নান করলেন। সুন্দর একটা পিনিশ এল। তাইতে উঠে কোথায় চলে গেলেন।

    কুষ্ণকান্ত একটু কাঠ কাঠ হয়ে গেল ভয়ে।

    চারদিকে অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে। শেয়াল ডেকে উঠল। উত্তরের হাওয়া এল অদ্ভুত এক হাহাকারের শব্দ নিয়ে।

    হরনাথ উঠে বলল, চলো, লুকিয়ে থাকার জায়গাটা তোমাকে দেখিয়ে দিই।

    কৃষ্ণকান্ত ভয় পায় বটে, কিন্তু ভয়ে কুঁকড়ে যায় না, ভেঙেও পড়ে না। তার ভিতরে এক অফুরন্তু কৌতুহলই তাকে ভয়ের মুখেও এক ধরনের সাহস দেয়। সে উঠে বলল, কোথায় যাবে? কাকার ঘরে?

    কাকার ঘরেই। তবে তার মধ্যেও একটু ব্যাপার আছে। চলো দেখাচ্ছি।

    দুজনে আবছা অন্ধকার টানা বারান্দা ধরে কাছারিঘর ছাড়িয়ে ভিতর দিকে হাঁটতে থাকে।

    সারি সারি ঘর। এত ঘর কোনো কাজে লাগে না। এক সময়ে এই কাছারি বাড়িতে বিস্তর লোক কাজ করত। আজকাল জমিদারির আয় কমেছে। লোকজনও কমে গেছে। গোটা চারেক বড় বড় মোকদ্দমায় হেরে গেছেন হেমকান্ত, কেবল তদবিরের অভাবে। এখন শোনা যাচ্ছে, বড় ভাই বরদাকান্তর স্ত্রীও সম্পত্তির অংশ চেয়ে মামলা করবে। হেমকান্ত এসব বৈষয়িক ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামান না। তাঁর কর্মচারীরাও তাঁর কানে সব কথা তোলে না। কিন্তু এই মন্ত্র জমিদারিতে যে অলক্ষ্মীর সঞ্চার ঘটেছে তাতে সন্দেহ নেই। এই শূন্য ঘরগুলো তারই আগাম ইঙ্গিত বহন করছে।

    নলিনীর বন্ধ দরজার সামনে এসে হরনাথ দাঁড়ায়। দরজায় কান পেতে কী একটু শোনে। তারপর ফিসফিস করে বলে, ওই শোনো। নলিনীবাবুর গলা!

    আচমকা কৃষ্ণকান্তও শুনতে পেল, ঘরের মধ্যে একটা গলা বিকট স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, ভূত! ভূত।

    কুয়াশামাখা অন্ধকারে ভূতুড়ে ছায়া ধীরে ধীরে গড়িয়ে আসছে চারদিক থেকে। বাস্তব হারিয়ে যাচ্ছে এক রহস্যময় কুহেলিকায়। ব্রহ্মপুত্রের বুক থেকে আঁশটে গন্ধ বয়ে নিয়ে হু হু করে উত্তুরে হাওয়া এল। কাছেপিঠে ডেকে উঠল একশ শেয়াল।

    ভয় পাওয়ারই কথা। শশিভূষণকে যখন ধরে আনা হয় তখন কৃষ্ণকান্ত ইসকুলে। তাই ঘটনাটার কথা সে জানে না। কৃষ্ণকান্ত একবার ভাবল, দৌড় দেবে। কিন্তু জানার কৌতূহলও তার অসীম। সে দরজায় দমাদম ঘা দিয়ে বলল, কে? কে ভিতরে?

    তোমার কাকা। ফিসফিস করে হরনাথ বলে।

    কিন্তু কৃষ্ণকান্ত লক্ষ্য করেছে, দরজাটায় তালা দেওয়া নেই। এ ঘরটায় সর্বদাই তালা দেওয়া থাকে। ভিতরের কণ্ঠস্বর যদি নলিনীকান্তর প্রেতাত্মারই হয় তবে দরজার তালাটা খোলার দরকারই হত না। নিশ্চয়ই কেউ আছে।

    আবার সে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল।

    সেই শব্দে লোক জড়ো হতে দেরী হল না। গগন মুহুরি বলল, ও ঘরে একজন অতিথি আজ দুপুর থেকে আছে। কর্তাবাবু তার ওপর নজর রাখতে বলেছেন।

    কৃষ্ণকান্ত একটু রাগের গলায় বলল, লোকটা দরজা খুলছে না কেন? কে লোকটা?

    গগন মাথা চুলকে বলল, আমরা চিনি না। তবে পাগলের মতো চেহারা।

    কৃষ্ণকান্ত আরো কয়েকবার দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল, লোকটার বোধহয় অসুখ করছে। দরজাটা ভাঙতে হবে।

    খবর পেয়ে হেমকান্তও দরজা ভাঙার হুকুম দিলেন। ভিতরে ঢুকে দেখা গেল, শশিভূষণের জ্ঞান নেই। গায়ে প্রবল জ্বর।

    রঙ্গময়ীকে কিছু বলতে হয় না। সে চট করে পুকুর থেকে এক বালতি জল নিয়ে এসে সযত্নে মাথা ধুইয়ে দিয়ে জলপটি দিতে লাগল কপালে। কুমুদ ডাক্তার এসে ওষুধ দিয়ে বলে গেল, খারাপ ধরনের ম্যালেরিয়া। মাথায় রক্তের চাপ প্রবল।

    কৃষ্ণকান্ত জনে জনে জিজ্ঞেস করেও লোকটার নাম ছাড়া আর কিছুই জানতে পারল না। শশিভূষণের বয়স প্রতুল মাস্টারমশাইয়ের সমান। কিন্তু চেহারাটা একদম মড়ার মতো শুঁটকো, সাদা। গালে দাড়ি। লম্বা লম্বা চুল।

    মনু পিসি, লোকটা কি পাগল? সে রঙ্গময়ীকে জিজ্ঞেস করল।

    না রে, দু দিন আমবাগানে লুকিয়ে ছিল। খায়দায়নি। তাই ওরকম দেখাচ্ছে।

    লুকিয়ে ছিল কেন?

    শুনছি তো, পুলিসে নাকি তাড়া করেছিল।

    কেন তাড়া করেছিল?

    স্বদেশী করত যে!

    এটা আর বুঝিয়ে বলার দরকার হয় না কৃষ্ণকান্তকে। স্বদেশীদের সে খানিকটা চেনে। তবে ভাল চোখে দেখে না। সে বলল, তা হলে পুলিশে খবর দিচ্ছো না কেন?

    ওরে চুপ, চুপ! পুলিস এলে তোর বাপেরও রেহাই নেই। ওসব বলিস না। তোকে বলাই ভুল হয়েছে দেখছি।

    কৃষ্ণকান্ত জিজ্ঞেস করল, কোন আমবাগানে? বাড়ির পিছনেরটা?

    তাই তো শুনছি।

    ওখানে ছিল লোকটা? দু দিন?

    হ্যাঁ।

    মশা কামড়ায়নি?

    তা আর কামড়ায়নি! সারা গায়ে তো দেখছি দানা দানা হয়ে আছে।

    কিছু খায়ওনি?

    কী খাবে? শীতকালে কি আর আমবাগানে আম পাওয়া যায়?

    লোকটার দিকে আর একবার ভাল করে চেয়ে দেখল কৃষ্ণকান্ত। চেহারাটা তার পছন্দ হল না ঠিকই। তবে যে-লোক দুদিন না খেয়ে আমবাগানে লুকিয়ে থাকতে পারে তাকে একটু শ্ৰদ্ধা না করে উপায় কী?

  • একানব্বই থেকে একশ পরিচ্ছেদ

    একানব্বই থেকে একশ পরিচ্ছেদ

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    একানব্বই থেকে একশ পরিচ্ছেদ

    দিশাহারা রেমি অবিশ্বাসের চোখে ধ্রুবর দিকে চেয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তার সন্দেহ, ধ্রুব স্বাভাবিক মানুষ নয়! হয় পাগল, না হয় পয়লা নম্বরের বদমাশ। তবু মাঝরাস্তায় এই লোকটির সঙ্গে গোলমাল বাঁধিয়ে লাভ নেই। রেমির চোখে তখন জল এসে গেছে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে সে বলল, চলো শীগগির। তোমার পায়ে পড়ি। ট্রেন ছেড়ে দেবে।

    ধ্রুব ম্যাগাজিনটা বগলদাবা করে ধীরে সুস্থে দাম মেটাল। তারপর বলল, চলো। কিন্তু একটা কথা বলে দিচ্ছি। অবাধ্যতা কোরো না। আমার কিন্তু কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই।

    তারা কামরায় ফেরার পর গার্ড সাহেব একবার হানা দিয়েছিলেন। কিন্তু কৃষ্ণকান্তর ছেলে বলে পরিচয় পাওয়ায় জল আর বেশীদূর গড়ায়নি। এমন কি জরিমানা পর্যন্ত দিতে হয়নি তাদের।

    শিলিগুড়ি পর্যন্ত বাকি রাস্তাটা ধ্রুব আর গোলমাল করেনি। কারণ প্রচুর মদ খেয়ে সে একদম অচেতন অবস্থায় গাড়ির মেঝেয় পড়ে থেকেছে। একবার টেনে হিঁচড়ে তাকে সীটে তুলে শুইয়েছিল রেমি। দশ মিনিটের মাথায় আবার সে দড়াম করে মেঝেয় পড়ে যায় এবং পড়েই থাকে। রেমি আর তাকে তোলার সাহস পায়নি। পড়ে গিয়ে যদি ঘাড় বা হাত পা ভাঙে?

    কৃষ্ণকান্তর বন্ধু সুদর্শন রায় শিলিগুড়ির মস্ত ধনী লোক। তাঁর চা বাগান কাঠের ব্যবসা, নিউ মারকেটে বাহারী দোকান, কী নেই? দার্জিলিঙে তাঁর একটা ভাল হোটেলেও আছে। সেই সুদর্শনবাবু গাড়ি নিয়ে স্টেশনে হাজির ছিলেন। সোজা তাদের নিয়ে তুললেন হাকিমপাড়ায় নিজের প্রকাণ্ড বাড়িতে। বললেন, দার্জিলিং তো যাবেই। একদিন এখানে রেস্ট নিয়ে যাও।

    ধ্রুব একটু গাঁইগুঁই করেছিল বটে, কিন্তু থেকেও গেল।

    ওই একটি দিন রেমির বড় চমৎকার কেটেছিল। সুদর্শনবাবুর দুটি যুবতী মেয়ের সঙ্গে তার ভীষণ ভাব হয়ে গেল। বড়লোকের মেয়ে বলে কোনো দেমাক-টেমাক নেই, কিংবা থাকলেও তা রেমিকে দেখায়নি। সেই সঙ্গে জুটে গেল সুদর্শনবাবুর ভাইপো সমীর। যেমন ঝকঝকে চেহারা তেমনি বুদ্ধিদীপ্ত তার চালচলন আর কথাবার্তা। তারা চারজনে মিলে চমৎকার একটা টিম হয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি যে কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে পারে তা রেমির অভিজ্ঞতায় ছিল না। সম্ভবত দায়িত্ব ও কাণ্ডজ্ঞানহীন ধ্রুবর কাছ থেকে ধাক্কা খেয়েই রেমির মধ্যে একটা ভয় ও নিঃসঙ্গতার বোধ জন্ম নেয়। তাই এই তিনটি স্বাভাবিক, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা যুবক যুবতীকে পেয়ে সে আঁকড়ে ধরল। সেই টিমে ধ্রুব ছিল না। কারণ আগের দিনের অঢেল মদ তখন তার ওপর শোধ নিচ্ছে, দারুণ মাথাধরা, বমির ভাব ও দুর্বলতায় আচ্ছন্ন হ্যাংওভার কাটাতে সে সারাদিনটাই প্রায় বিছানা আলিঙ্গন করে রইল।

    নন্দা, ছন্দা আর সমীরের সঙ্গে রেমি বেরোলো শহর দেখতে। কী সুন্দর শহরটি। খানিকটা কলকাতার সঙ্গে খানিকটা গ্রাম মেশালে যেমন হয় আর কী। শহর ঘেঁষে একটি পাহাড়ী নদী বয়ে যাচ্ছে। মহানন্দা। উত্তরে মহান হিমালয়।

    সমীর বলল, শিলিগুড়ি এখন ওয়েস্ট বেঙ্গলের সেকেণ্ড সিটি। কলকাতার পরই শিলিগুড়ি কলকাতা-গরবিনী রেমি বলল, আহা রে, কলকাতার সঙ্গে টক্কর দেওয়া অত সস্তা নয় মশাই। শিলিণ্ডড়িকে সাত জন্ম তপস্যা করতে হবে।

    সমীর ছ্যাবলা নয়। এ কথার জবাবে মৃদু একটু হাসল মাত্র। হুড খোলা জীপগাড়িটা চালাচ্ছিল সে-ই! চোখে গগলস। কিছুক্ষণ বাদে সেই গগলসের ভিতর দিয়ে রেমির দিকে চেয়ে বলল, কলকাতা শুধু আপনারই নয় কিন্তু, আমাদেরও।

    তাই নাকি?

    যে কোনো বাঙালীকেই জিজ্ঞেস করুন। নোংরা হোক, ঘিঞ্জি হোক, কলকাতার নিন্দে করলে যে কোনো বাঙালী চটে যায়। আমি আরো বেশী চটি। কারণ কলকাতাকে আমার মতো করে কেউ আবিষ্কার করেনি। আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে কলকাতা।

    রেমি বলল, তবু ভাল। আমি ভাবলাম আপনি বুঝি শিলিগুড়িকে তোল্লাই দিতে গিয়ে কলকাতাকে ছোটো করছেন।

    মোটেই নয়।

    নন্দা বলল, সমীরদা অসম্ভব কলকাত্তাই। ছুটি পেলেই পালাবে। আমাদের তো বাবা সল্ট লেকে অত বড় বাড়ি পড়ে আছে। কিন্তু আমার গিয়ে বেশীদিন থাকতে ইচ্ছে করে না।

    ছন্দার অবশ্য অন্য মত। সে বলে, না বাবা, আমার কলকাতাই ভাল লাগে।

    সেদিন তারা রেস্টুরেন্টে খেল, চোরাই হংকং মারকেটে ঘুরে ঘুরে বিদেশী শাড়ি আর কসমেটিকস কিনল, সেভক রোড ধরে চলে গেল কালিঝোড়া পর্যন্ত। আর তারই ফাঁকে চারজনের টিমটা আরও আঠালো হয়ে উঠল।

    পরদিন সেই চারজন এবং ধ্রুব একটা জোঙ্গা জীপগাড়িতে গেল দার্জিলিং। সমীর পাহাড়ী রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছিল বলে বেশী কথা বলছিল না। তার পাশে বসা ধ্রুবও চুপচাপ। কলকল করছিল শুধু তিন যুবতী পিছনের দিকে বসে। একান্ন মাইল রাস্তা টেরই পাওয়া গেল না।

    কিন্তু মুশকিল হল বিকেলবেলা, যখন রেমি আর ধ্রুবকে দার্জিলিং-এ রেখে ওরা ফিরে আসবে। কারণ ধ্রুব হোটেলে ঢুকেই বার-এ সেঁটে বসে গিয়েছিল। বিকেল নাগাত সে চুরচুর মাতাল। সুতরাং নন্দা ছন্দা আর সমীর যদি শিলিগুড়ি ফিরে আসে তাহলে রেমি একা পড়ে যায়। এই অনাত্মীয় শহরে একা একটি যুবতী মেয়ের কেমন কাটবে?।

    ধ্রুবকে সুদর্শনবাবুর হোটেলে রেখে তারা চারজন একটু বেড়াতে বেরিয়েছিল। ধ্রুব যেতে চায়নি বলেই তাকে নেওয়া হয়নি। বেড়িয়ে ফেরার পর ধ্রুবর অবস্থা দেখে সমীর মুখে আফশোশের চুকচুক শব্দ করে বলল, ম্যাডাম, তো খুব অসুবিধেয় পড়বেন দেখছি। ধ্রুববাবু তো আউট।

    ভয়ে বুক ঢিবঢিব করছিল রেমির। শুষ্ক গলায় সে বলল, আপনারা প্লিজ যাবেন না। ওর যদি কিছু হয় তাহলে কে দেখবে?

    সমীর তার দিকে চেয়ে একটু হেসে বলে, ওর কিছু হবে না। বিছানায় নিয়ে শুইয়ে দিলেই রাত কেটে যাবে। ভয় আপনাকে নিয়ে। আপনার রক্ষক তো কেউ থাকছে না।

    নন্দা আর ছন্দাও অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। তারা বুঝতে পারছিল রেমিকে এই অবস্থায় ফেলে যাওয়াটা ঠিক নয়। কিন্তু তাদেরও ফেরা দরকার। ছন্দার কলেজ আছে। নন্দারও কী সব এনগেজমেন্ট।

    খানিকক্ষণ শলা পরামর্শের পর ঠিক হল, সমীর থেকে যাবে। দুই বোন ফিরে যাবে শিলিগুড়ি। তাদের ফিরতে কোনো অসুবিধে নেই। সুদর্শনবাবুর হোটেলেরই নিজস্ব গাড়ি তাদের পৌঁছে দিয়ে আসবে।

    কিন্তু রেমি আজ জানে, সমীরেরও থেকে যাওয়ার কোনো দরকার ছিল না। সেই সুন্দর ছিমছাম হোটেলটির মালিক স্বয়ং সুদর্শনবাবু। হোটেলের বশংবদ কর্মচারীরা তাদের ভালই দেখাশোনা করতে পারত। সুতরাং সমীরের ওই কথাটা “আপনার রক্ষক তো কেউ থাকছে না” ঠিক নয়।

    কিন্তু বলতে নেই, সমীর থাকায় রেমির বুকের মধ্যে এক আনন্দের খামচাখামচি শুরু হয়েছিল। সেই অবোধ রহস্যময় অনুভূতির কোনো মানে হয় না। এত বেহায়া বেহেড রেমি বিয়ের আগেও ছিল না কোনোদিন। কিন্তু মাতাল ধ্রুবই কি তাকে ঠেলে দিয়েছিল ওই অসামাজিক এক সম্পর্ক শুরু করার রাস্তায়?

    নন্দা আর ছন্দা চলে যাওয়ার পর ধ্রুবকে বিছানায় পৌঁছে দেওয়া হল। একজন বেয়ারা মজুত থাকল ঘরে। নিঃসাড়ে ঘুমোতে লাগল ধ্ৰুব।

    সমীর বলল, চলুন সেকেণ্ড রাউণ্ড বেড়িয়ে আসি। ভাল করে ঢাকাঢুকি দিয়ে নিন। দারুণ শীত।

    জোঙ্গা গাড়িটায় আবার দুজনে বেরোলো। তখন সন্ধের পর রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা, ম্যাল প্রায় জনশূন্য, মেঘ করে হঠাৎ একটু বৃষ্টিও পড়ছে। রেমির তবু খারাপ লাগছিল না। বুকটা একটু কেমন করছিল। বারবার মনে হচ্ছিল এবার একটা কিছু হবে, কিছু ঘটবে, জীবনে একটা মোড় ফিরবে।

    আস্তে আস্তে গাড়িটা বিভিন্ন চড়াই উতরাই ভেঙে চালাচ্ছিল সমীর। কোথাও যাচ্ছিল না। উদ্দেশ্যহীন চলা।

    জিজ্ঞেস করল, ধ্রুববাবু সম্পর্কে আমি খুব বেশী কিছু জানি না। কিন্তু শুনেছি এক সময়ে উনি খুব ব্রাইট বয় ছিলেন। এরকম কবে থেকে হল? ইজ হি ফ্রাস্ট্রেটেড?

    রেমি তার কী জানে? সে মৃদুস্বরে বলল, আমি তো বিয়ের পর থেকেই এরকম দেখছি। আগে কীরকম ছিল জানি না।

    আপনি নিশ্চয়ই খুব লোনলি ফিল করেন!

    সেটা কি আর বলতে হবে!

    উনি খুবই ইয়ং। বয়সে বোধহয় আমার চেয়েও ছোটো। এই বয়সে এত ডীপ ফ্রাটস্ট্রেশন আমি দেখিনি কারও। এঁর সঙ্গে আপনি ঘর করবেন কী করে?

    সেটাই তো ভাবছি।

    ভাবছেন? যাক বাঁচালেন। প্রশ্নটা করেই আমি মনে মনে জিব কাটছিলাম, অনধিকার চর্চা হয়ে গেল ভেবে।

    রেমি ম্লান একটু হেসে বলল, অত ফরমাল হওয়ার দরকার নেই। আমি ভীষণ প্রবলেমের মধ্যে আছি। এই সময়ে আমার একজন বন্ধু দরকার যে গাইডেনস দিতে পারবে। আমি আপনার পরামর্শ চাই। ওকে নিয়ে কী করব বলুন তো।

    সমীর একটু ভেবে বলল, আপনি যদি অনুমতি দেন তবে কাল সকালে আমি ওঁর সঙ্গে একটু কথা বলে দেখতে পারি। তবে উনি খুব গম্ভীর। কাল থেকে বহুবার কথা বলার চেষ্টা করেছি। উনি তেমন ইন্টারেস্ট্ দেখাচ্ছেন না।

    তবু আপনি একটু কথা বলে দেখবেন। তবে দয়া করে আমার রেফারেন্স দেবেন না। তাহলে চটে যাবে।

    আরে না না, আমি অত বোকা নই। আপনাকে আড়াল করাই তো আমার উদ্দেশ্য।

    রেমি মৃদুস্বরে বলল, আমার খুব ভয় করছে দার্জিলিং বেড়াতে এসে।

    কিসের ভয়?

    আমার মনে হচ্ছে কর্তাটি অ্যাবনরম্যাল। যে কোনও সময়ে আমার কথা ভুলে গিয়ে হয়তো আমাকে ছেড়েই কোথাও চলে যাবে।

    ধ্রুববাবু কি এতই ইরেসপনসিবল?

    হ্যাঁ। আপনি ধারণা করতে পারবেন না। আসার সময় বর্ধমান স্টেশনে এমন একটা কাণ্ড করেছিল যে আমার ভিতরে একটা ভয় ঢুকে গেছে। আমি ওকে বিশ্বাস করি না।

    সমীর খুব হাল্কা গলায় বলল, আপনার মতো মেয়েকে ভুলে গিয়ে বা ফেলে রেখে কি যাওয়া যায়?

    সমীরের এই স্তুতিটুকু তার ভালই লাগল। সে বলল, আমি এমন কিছু না।

    সে আপনি জানেন না। আমরা জানি। কিন্তু ধ্রুববাবু অ্যাবনরম্যাল এটা কি ঠিক জানেন?

    জানি। ওর সবচেয়ে বেশী রাগ ওর বাবার ওপর।

    কেন বলুন তো! কৃষ্ণকান্তবাবুকে আমি চিনি। দারুণ লোক।

    শ্বশুরমশাইয়ের তুলনা হয় না। তবু ও ওর বাবাকে দেখতে পারে না। সেটাই অস্বাভাবিক।

    জেলাসি নয় তো!

    কে জানে কী। এ প্রসঙ্গটা বাদ দিন।

    সরি। দার্জিলিং আপনার কেমন লাগছে?

    ভাল।

    ধ্রুববাবু নরম্যাল থাকলে আরো ভাল লাগত।

    সেটা ঠিক। তবে যতটা খারাপ লাগার কথা ছিল এখন ততটা খারাপ লাগছে না।

    এ হচ্ছে কথার পিঠে কথার খেলা। কিন্তু রেমি বাস্তবিক কথার খেলা জানে না। সে যা বলেছিল তা অকপট মন থেকে উঠে আসা কথা। সত্যিই তো তার খারাপ লাগছিল না।

    তারা যখন হোটেলে ফিরল তখন দার্জিলিং-এর নিয়ম অনুযায়ী অনেক রাত। রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ জনশূন্য। হোটেলেও দু-চারজন মদ্যপায়ী ছাড়া বাকি সবাই ঘরে দোর দিয়েছে।

    ফাঁকা ডাইনিং হল-এ বসে রেমি আর সমীর রাতের খাবার খেল। খেতে খেতে রাত গড়িয়ে দিল অনেকটা। কথা আর শেষ হতে চায় না। ধ্রুবর সঙ্গে সাতদিনে যত কথা না হয় তার চেয়ে ঢের বেশী সেই কয়েকঘণ্টায় হল সমীরের সঙ্গে রেমির। খাওয়ার পর লাউনজে ইলেকট্রিক হিটারের সামনে নরম সোফায় কম্বলমুড়ি দিয়ে বসেও অনেকক্ষণ সময় কাটাল তারা।

    তারপর একসময়ে রেমির মনে হল, এবার ঘরে যাওয়া দরকার। হোটেলে কেউ আর জেগে নেই। ধ্রুবকেও অনেকক্ষণ একা রাখা হয়েছে।

    সে অনিচ্ছার সঙ্গে বলল, এবার যাই।

    আরে বসুন বসুন, সবে তো সন্ধে।

    এইভাবে যাই-যাই করে কাটল আরো কিছু সময়। যখন বাস্তবিকই ঘরে এল রেমি তখন রাত পৌনে একটা।

    ধ্রুব তখনো অচেতন। রেমির অনেকক্ষণ ঘুম এল না। কেমন একটা উদভ্রান্ত উত্তেজনায় বুক কাঁপছে। বারবার শিহরিত হচ্ছে সর্বাঙ্গ। এরকম তার আগে কখনও হয়নি। এমন কি ফুলশয্যার রাতেও নয়। নিজেকে বহুবার ধিক্কার দিল সে। তারপর ঠাকুর দেবতার পায়ে মাথা কুটতে লাগল মনে মনে, আমাকে রক্ষা কর। এ আমার কী হল? কেন হল? ছিঃ ছিঃ।

    পরদিন ধ্রুবর ঘুম ভাঙল বেলায়। গভীর হ্যাংওভার। ভাল করে তাকাতে পারছে না। মাথা ধরা বমি বমি ভাব।

    রেমি তীব্র বিরাগের সঙ্গে বলল, এটা কী ধরনের হানিমুন হচ্ছে আমাদের?

    ধ্রুব মাথা চেপে ধরে আধশোয়া অবস্থায় তার দিকে চেয়ে বলল, কে বলেছে হানিমুন? এটা হল এক্‌স্যাইল। কৃষ্ণকান্ত চৌধুরির পলিটিক্যাল ফিলড থেকে ধ্রুব চৌধুরিকে সরিয়ে দেওয়া। শুধু দেখাশোনা করার জন্য সঙ্গে তুমি।

    তাই নাকি?

    একজ্যাকটলি তাই। যাও একটা হেভি ব্রেকফাস্ট অরডার দিয়ে এসো। আর আমাকে ধরে একটু বাথরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে যাও।

    স্নান এবং ছোটো হাজরির পর কিন্তু ছিপছিপে তেজী চেহারার ধ্রুবকে আবার বেশ তরতাজা দেখাচ্ছিল। নিজেই পোশাক-টোশাক করল। বলল, চলো, একটু ঘুরে আসি।

    হঠাৎ ভূতের মুখে যে বড় রাম নাম।

    ধ্রুব একটু হেসে বলে, চলো, দেখা যাক একসাইলটাকে হানিমুন করে তোলা যায় কিনা।

    সত্যি নাকি?

    একটা দীর্ঘশ্বাসকে চাপা দিল রেমি। ভিতরকার উত্তেজনায় সারা রাত সে এপাশ ওপাশ করেছে। পাপবোধ তাকে ছিঁড়ে খেয়েছে। সকালে সে তখন বড় অবসন্ন। ধ্রুবর সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার শারীরিক বা মানসিক শক্তিতে তখন টান ধরেছে।

    সে বলল, আমি হাঁটতে পারব না।

    হাঁটতে হবে না। হোটেল থেকে একটা গাড়ি ম্যানেজ করা যাবে।

    রেমি একটু তটস্থ হয়ে বলে, হোটেলের গাড়ি দরকার নেই। কালকের সেই জীপগাড়িটাই তো আছে।

    কোন জীপগাড়িটা?

    যেটায় আমরা এলাম। সমীরবাবুও আছেন।

    কে সমীরবাবু? সুদর্শনকাকার ভাইপো?

    অকারণে লাল হয়ে এবং মুখ নামিয়ে রেমি বলল, হ্যাঁ। তোমার ওই অবস্থা দেখে উনি আর কাল ফিরে যাননি।

    ধ্রুব ভ্র্রূ কুঁচকে বোধহয় সেকেণ্ড দুই রেমির দিকে চেয়ে রইল। আর রেমির তখন মনে হল, ধ্রুব তার ভিতরকার সব দৃশ্য দেখে ফেলছে। কী যে অস্বস্তি! সে তাড়াতাড়ি উঠে সাজপোশাকে একটু সংশোধন শুরু করে দিল।

    ধ্রুব বলল, সুদর্শনকাকার মেজো মেয়েটার নাম যেন কী!

    ছন্দা, কেন বলো তো!

    ওই ছন্দার সঙ্গে বোধহয় সমীরের একটা আনহেলদি রিলেশন আছে।

    রেমি ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো চমকে উঠে বলে, যাঃ কী যে বলো না!

    ধ্রুব একটু অপ্রতিভ হয়ে বলে, অবশ্য আমার ভুলও হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল।

    ওরা আপন খুড়তুতো জ্যাঠতুতো ভাইবোন, সেকথাটা ভুলে যেও না।

    তা বটে। তাহলে লেট আস গো। সমীরকে রেডি হতে বলো।

    বলাই আছে। উনি তৈরি। আমরা নামলেই হয়।

    যখন দুজনে নীচে নেমে এল তখন ধ্রুবর ফিটফাট চেহারা দেখে সমীর কিছুটা অবাক। বলল, আপনি হানড্রেড পারসেন্ট ফিট দেখছি।

    ধ্রুব খুব লাজুক মুখে হেসে বলল, কাল একটু বেসামাল হয়েছিলাম। কিছু মনে করবেন না। শুনলাম, আমার জন্যই আপনি আটকে গেলেন।

    ও কিছু নয়।

    ধ্রুব খুব ভদ্র গলায় বলল, কাল আপনি প্রায় সারাদিন গাড়ি চালিয়েছেন। আজ পাশে বসে রেস্ট নিন। আমি চালাবো।

    পারবেন? পাহাড়ী রাস্তা কিন্তু।

    পারব।

    আশ্চর্য এই, ধ্রুব চমৎকার পারল। গাড়ি টাল খেল না, ঝাঁকুনি লাগল না, এতটুকু বেসামাল হল না কোথাও। অত্যন্ত দক্ষ পাহাড়ী ড্রাইভারের মতোই সে ঘুম মনাস্টারি, সিনন্চল লেক হয়ে কারশিয়ং পর্যন্ত নেমে এল। তারপর নিরাপদে আবার গাড়ি ফিরিয়ে আনল হোটেলে। পিছনে বসে মুগ্ধ বিস্ময়ে দৃশ্যটা দেখছিল রেমি। বুকের মধ্যে যেন দুটো হৃৎপিণ্ড ধুক ধুক করছিল তার। ধ্রুব! ধ্রুব যদি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে তবে রেমি ধ্রুব ছাড়া আর কাউকে পাত্তা দেবে কি?

    দুপুরে ভাত খাওয়া অবধি তিনজনে চমৎকার সময় কাটিয়ে দিল।

    সমীর বলল, আজ আমার ফিরে যাওয়ার কথা। যদি অনুমতি দেন তাহলে যাই।

    ধ্রুব মৃদু হেসে বলল, আমাকে বিশ্বাস করবেন না। দার্জিলিঙের ওয়েদারের মতোই আমার মেজাজ। এই ভাল আছি, চার ঘণ্টা পরে হয়তো দেখবেন মেঝেয় গড়াগড়ি খাচ্ছি। তার চেয়ে বরং সুদর্শনকাককে একটা ফোন করে দিই, আপনি কয়েকটা দিন আমাদের সঙ্গেই থাকুন। রেমিরও একটা কমপ্যানি হবে।

    সমীর হঠাং সেই সময়ে বলল, আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে ধ্রুববাবু। আজ আপনার মেজাজটা ভাল আছে বলেই বলতে চাইছি।

    আরে বলুন না! কী কথা! রেমি বরং ঘরে গিয়ে রেস্ট নিক। আমরা দুটো বীয়ার নিয়ে লাউনজে বসি।

    সেই ভাল।

    রেমি কাঁপা কাঁপা বুক নিয়ে ঘরে এল। সমীর কী বলবে সে জানে না। কিন্তু হে ঠাকুর, এমন কিছু যেন না হয় যাতে ও চটে যায় কিংবা রেমিকে সন্দেহ করে।

    অস্থির রেমি বিছানায় শুয়ে বই পড়ার চেষ্টা করল অনেকক্ষণ। মন দিতে পারল না। ঘণ্টা তিনেক কেটে যাওয়ার পর সে ক্লান্ত হয়ে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। যখন ঘুম ভাঙল তখন সন্ধে হয়ে গেছে। ঘর ফাঁকা।

    তাড়াতাড়ি উঠে নীচে নেমে এসে দেখল সমীর গম্ভীরভাবে লন-এ পায়চারি করছে একা।

    সে কী? আপনি একা! ও কোথায়?

    সমীর একবার কপালে হাত দিয়ে হতাশার ভঙ্গি করে বলল, হি ইজ বিয়ণ্ড এভরিথিং।

    তার মানে?

    কিছু করা গেল না রেমি। আমি ভাল করে কথা বলা শুরু করার আগেই উনি আসছি বলে কেটে পড়লেন। কোথায় গেলেন কে জানে। ঘণ্টা দুই বাদে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে শুরু করলাম। খবর পেলাম, বাজারের কাছে একটা বার-এ মদ খেয়ে প্রচণ্ড হাঙ্গামা বাঁধিয়েছেন।

    সে কী! রেমির চোখ কপালে উঠল।

    ব্যাপারটা স্যাড। কয়েকটা নেপালী ছোকারার সঙ্গে মারপিট হয়েছে। খুব বেশীদূর গড়ায়নি অবশ্য। তাহলে পেটে কুকরি ঢুকে যেত। তবে একটু চোট হয়েছে।

    রেমি আর্তনাদ করে উঠল, ও কোথায় বলুন।

    ডাক্তারখানায়। এখুনি আসবেন। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

    নিশ্চয়ই আছে। ও কি উণ্ডেড?

    না না, সেরকম কিছু নয়। বরং দুটো ছোকরা ওর হাতেই বেশী ঠ্যাঙানি খেয়েছে। উনি ঠিক আছেন। কপালটা একটু কেটেছে। আপনি অস্থির হবেন না। আমাদের হোটেলের ম্যানেজার নিজে গেছেন স্পটে।

    রেমি অবশ হয়ে লনের একটা বেনচে বসে পড়ল। অত্যন্ত সেকেলে ভঙ্গিতে বলল, কী হবে?

    হয়তো কিছু হবে না। কিন্তু লোক্যাল ছেলেদের সঙ্গে গণ্ডগোল করায় এখানে আপনাদের থাকাটা আর সেফ নয়। আপনি বরং ঘরে গিয়ে এসেনশিয়াল কিছু গুছিয়ে নিন। স্যুটকেশ ট্যুটকেসগুলো থাক, পরে পাঠিয়ে দেবে। ধ্রুববাবু এলেই আমি আপনাদের নিয়ে শিলিগুড়ি নেমে যাবো।

    রেমি ভয় পেয়ে বলল, কেন? লোকাল ছেলেরা কি গণ্ডগোল করবে?

    করতে পারে। সেটাই স্বাভাবিক।

    রেমির হাত পা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। কোনোরকমে ঘরে এসে সে পাগলের মতো ভুলভাল জিনিস ভরে একটা কিট ব্যাগ গোছাচ্ছিল। মাথায় ব্যণ্ডেজ বাঁধা ধ্রুব ঘরে ঢুকে বিরক্ত গলায় বলল, কী করছো? আমরা শিলিগুড়ি যাচ্ছি না।

    রেমি দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল ধ্রুবর বুকে, কী করেছো তুমি? কী সর্বনেশে কাণ্ড করেছে? জানো না, এখানে মারপিট করতে যাওয়া কী ভীষণ রিস্কি? কেন মারপিট করেছো?

    ধ্রুব তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আরে, অত তাড়াতাড়ি সব কথার জবাব কি করে দেবো? মারপিট করিনি, নিজেকে বাঁচাতে মেরেছি। তা বলে পালাবো কেন?

    কিন্তু সমীর যে বলল—

    হ্যাং সমীর। আমার গায়ে হাত পড়লে জল অনেকদূর গড়াবে রেমি। তুমি শ্বশুরের কথা ভুলে যাচ্ছো!

    তখন স্থির হল রেমি। সত্যিই তো। ঘটনার আকস্মিকতায় সে বিস্মৃত হয়েছিল যে তার শ্বশুর কৃষ্ণকান্ত চৌধুরি। শুধু দার্জিলিং কেন, সারা দেশের সর্বত্রই তাঁর প্রভাব ছড়ানো। তবু সে বলল, কিছু হবে না তো?

    কী হবে? বলে ব্যঙ্গের হাসি হেসে ধ্রুব বলে, বাবার কাছে অলরেডি ট্রাংক কল-এ খবর চলে গেছে। পুলিশ হেভি অ্যাকশন নিচ্ছে। কিছু ভেবো না রেমি, লিডারের ছেলে হতে কপাল লাগে।

    সকালটা সুন্দর কেটেছিল রেমির। কিন্তু সেই সন্ধেবেলাই আবার ধ্রুবর মেজাজ পাল্টাল।

  • প্রেম, হত্যা এবং কর্নেল

    প্রেম, হত্যা এবং কর্নেল

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book-name]

    প্রেম, হত্যা এবং কর্নেল

    বারান্দা থেকে কয়েক একর পাথুরে জমির ওধারে কয়েকটা শালগাছ আছে। দুটো কুকুর ভোরবেলা থেকে শালগাছ ঘিরে খুব খেলা জমিয়েছিল। তারপর একটা মাটি শুঁকতে শুঁকতে স্টেশনের দিকে চলে গেছে। অন্যটা মদ্দা, একটা কিছু আঁচ করে দাঁড়িয়ে থেকেছে মুখ তুলে–যেন গন্ধ শুঁকেছে কিছু। তারপর দু-পা সামনে ছড়িয়ে থাবায় চিবুক রেখে টানটান বসে আছে। ওর গায়ে আস্তে আস্তে একটা ছায়া সেঁটে যায়। সাদা কুকুরটা ধূসর হয়ে বস্তুজগতের সঙ্গে ওতোগোতভাবে সংলগ্ন হয় এবং স্তব্ধতায় গুপ্ত থাকে।

    মেঘেন–বরমডিহি স্টেশনের রেলবাবু মেঘে লাল বোস, তার লাল কোয়ার্টার থেকে সকালের অবসরে সবুজ বনের খেলা দেখছিল। সাদা কুকুরটা শুলে সে বারান্দা থেকে নামল। খানিক দূরে গিয়ে একটুকরো পাথর ছুঁড়ল। কুকুরটা মুখ ঘুরিয়ে দাঁত বের করল। দ্বিতীয়বার মেঘেন পাথর তুললে সে গরগর করে তেড়ে এল। মেঘেন পিছিয়ে আসে।

    বারান্দা থেকে মন্দিরা চেঁচায় কী হচ্ছে ওখানে? ওর পিছনে লাগলে কেন?

    মেঘেনও ঘুরে দাঁত বের করে–অর্থাৎ হাসে।

    –পাগলা কুকুর ওটা। শীগগির চলে এস।

    স্ত্রীলোকের ইনটুইশান। মেঘেন ভাবে। কিন্তু পাগলা কুকুর কি সঙ্গিনী নিয়ে। খেলে? কে জানে! পৃথিবীর অনেক ব্যাপারের অনেকটাই মানুষের জানা হয় না। জানা যায় না। প্রাণীজগতটা তো মনে হয় একেকটি দুরুহ কোডে ভরা জিনপুঞ্জসমন্বিত দুয়ে ক্রোমোসোম নিয়ে তৈরি। তার মধ্যে মানুষ বিশেষত স্ত্রীলোক, যাদের রামকৃষ্ণদেব বলতেন, প্রকৃতির অংশ। অংশ কেন–হাতের পুতুল। কী করে কী বলে নিজেরাও বোঝে না। যেমন মন্দিরা। কেন সে সারারাত মেঘেনের পিঠ আঁকড়ে শুয়ে থেকেছে, কে বলবে? পিঠটা আয়নায় দেখেছে সে, নখের চেরা লাল দাগ পড়ে গেছে। কারও কারও নখে নাকি বিষ থাকে। মন্দিরার নেই তো?

    জামার ভেতর হাত চালিয়ে পিঠের দাগটা ছুঁতে-ছুঁতে মেঘেন বারান্দার সামনে রোদ্দুরেই দাঁড়িয়ে যায়। চৈত্রের আকাশ এই এলাকায় এত নীল কখনও সে দেখেনি। ঈশানকোণে কয়েকটা পাখি বিন্দুর মতো নড়ছে। শকুন নাকি? মেঘেনের চোখ নিস্পলক হয়ে ওঠে।

    মন্দিরা সকালের স্নান সেরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। কী ভাবছে সে হয়তো নিজেও জানে না। খুব পবিত্রতা দিয়ে নিজেকে ঢেকে রেখেছে, এমনি শান্ত অবস্থিতি। মেঘেনের মনে মন্দিরা, চোখে দূরের কয়েকটা সাংঘাতিক বিন্দু অবশেষে সে বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

    –রোদ্দুরে কী করছ? চলে এস।

    মন্দিরার গলাটাও এখন পবিত্র, স্নেহে ভিজে, শান্ত। মেঘেনের ভাল লাগে ডাকটা। অনেকদিন এমন করে সে যেন ডাকেইনি।

    একটু পরে মেঘেন বারান্দায় বসে যখন চা খাচ্ছে, ফাদার খ্রিস্টমাস চেহারার বৃদ্ধ এক ভদ্রলোক এলেন। বয়স মেঘেনের বাবার সমান মনে হয়। কিন্তু টাক পড়েছে মাথায়। খাড়া নাক, চাপ চাপ সাদা দাড়ি, বড় বড় কান, চওড়া কপালে তিনটে ভঁজ! মেঘেন ফ্যালফ্যাল করে তাকায়।

    কোয়ার্টারের পিছনদিক এটা। বেড়ায় ঘেরা একটুকরো সবজিক্ষেত বা বাগিচার জন্য জমি আছে। এদিকে কারও আসার কথা নয়।

    -নমস্কার। আপনি কি মেঘেনবাবু?

    মেঘেন পাল্টা নমস্কার করে বাঁ হাতে, কারণ ডানহাতে চায়ের পেয়ালা।

    –আমি মোহনপুর জংশন থেকে আসছি।

    বলুন?

    বৃদ্ধ কপালের ঘাম মুছতে মুছতে হাসেন।বসব। না বসে তো বলা যায় না।

    মেঘেন হন্তদন্ত হয়ে ওঠে। আসুন, আসুন! খালি মোড়াটার দিকে আঙুল বাড়ায় সে। বেড়ার গেট দিয়ে লোকটা ঢোকে। মোড়ায় বসে পড়ে। হাসিমুখে তাকিয়ে বলে–কাল ইভনিং-এ কখন থেকে কখন অব্দি ডিউটি ছিল আপনার?

    -কেন বলুন তো? বিকেল পাঁচ থেকে রাত বারোটা।

    বরমডিহি তো খুব বড় স্টেশন নয়।

    নয়। কেন বলুন তো?

    –আপনার দেশ কোথায়?

    পশ্চিমবঙ্গ। বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ। কেন ব…..

    এখানে ছমাস এসেছেন?

    –হ্যাঁ কিন্তু কেন……..

    এর আগে মোহনপুরে ছিলেন?

    –ছিলুম। কে…….

    –মোহনপুরের ডিভিসনাল সুপারিন্টেন্টে রথীনবাবুও তো বহরমপুরের লোক?

    –আজ্ঞে হ্যাঁ। কিন্তু…..

    রথীনবাবুর মেয়ে তিথিকে তো চেনেন?

    –চিনি। কী ব্যা…….

    –গতকাল সন্ধ্যা সাতটা ত্রিশের ডাউন ঠিক ক’টায় ইন্ করেছিল মেঘেনবাবু?

    -সাতটা সাঁইত্রিশে। আগের স্টেশনে মেল পাস ক…

    –তিথি নেমেছিল স্টেশনে?

    এ্যাঁ? তি… … …।

    দরজায় মন্দিরা এসে দাঁড়িয়েছিল। প্রথমে চোখ দুটো বড় ছিল। তারপর ছোট হয়েছে, ভুরু কুঁচকে গেছে, ঠোঁটের নিচে ভাজ ফুটেছে–যা তাকে সুন্দর করে। সে মুখ খোলে।

    আপনি কে?

    বৃদ্ধ অমনি নমস্কার করেন তাকে। আপনি মিসেস মন্দিরা বোস?

    –হ্যাঁ! আপনি কে?

    –আপনি ভাগলপুরের মেয়ে?

    –সবই তো জানেন দেখছি? আমার বলা কেন? কে আপনি শুনি?

    –গত মাসের এগারো তারিখে আপনি নারায়ণগড় মন্দিরে যাচ্ছি বলে মোহনপুরে গিয়েছিলেন?

    মন্দিরা লাল মুখে প্রায় গর্জায়। হ্যাঁ, গিছলুম। কিন্তু তাতে আপনার এত মাথাব্যথার কী আছে? আগে বলুন তো, কে আপনি–নয়তো…রাগে সে কথা হারিয়ে ফেলে।

    বৃদ্ধ মিটিমিটি হাসেনা হাত তুলে বলেন–প্লীজ! প্লীজ! আচ্ছা, মন্দিরাদেবী, আপনি সেদিন তিথিকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন? হ্যাঁ কিংবা না বলুন, প্লীজ!

    বলব না।

    –প্লীজ!

    না! চলে, যান আপনি! এখুনি চলে যান। নয়তো লোক ডাকব!..মন্দিরা হাঁফাতে হাঁফাতে কথা বলে। তারপর মেঘেনের দিকে ঘোরে। তুমি চুপচাপ এই অপমান হজম করছ? একটা কোথাকার কে এসে যা খুশি জিগ্যেস করবে বাড়ি চড়াও হয়ে, তার জবাব দিতে হবে? কী–ভেবেছে কী? মগের মুলুক?

    মেঘেন গম্ভীর ও অপ্রস্তুত হয়ে থাকে। বৃদ্ধ হাসতে হাসতে বলেন–ভীষণ রেগে গেলেন দেখছি! প্লীজ, শান্ত হোন। আচ্ছা মেঘেনবাবু!

    –উ?

    –আপনার স্ত্রী গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে বাসায় ছিলেন? নাকি বেরিয়েছিলেন–আপনার কী ধারণা?

    –ওকে জিগ্যেস করুন!

    –আপনার ধারণাটাই আমি জানতে চাই।

    হয়তো….

    বলুন! বলুন!

    –হয়তো ছিল, হয়তো বেরিয়েছিল। জানি না।

    –তিথির সঙ্গে কথা বলতে বলতে আপনি মাঠের দিকে গিয়েছিলেন তাই না?

    মন্দিরা চেঁচাল। –কোনও কথা না! চুপ করে থাকো!

    –মেঘেনবাবু!

    –উ? হুঁ। তিথি আমাকে জরুরি কিছু কথা আছে বলে ডেকে নিয়ে গেল।

    তারপর?

    –কিন্তু তেমন কিছু বলল না। শুধু…

    –! বলুন!

    রাতকাটানোর আশ্রয় চাইল। বলল বাড়ি থেকে চলে এসেছে! আর ফিরবে না।

    –আপনি কী করলেন তখন?

    –আমি বললুম– আমার বাসায় তো অসম্ভব! তবে রামু সিগন্যালম্যানের কোয়ার্টার এখন খালি আছে। তিথি আপত্তি করল। তখন আমি ওই যে দেখছেন জঙ্গলের ওপাশে লাইনের ওপর খালি একটা ওয়াগনের সঙ্গে গার্ডের কামরা রয়েছে–ওইযে!

    –হ্যাঁ। দেখতে পাচ্ছি।

    ওটাই সিলেক্ট করলুম। রামুকে কিছু খাবার তৈরি করে দিতে বলেছিলুম। তিথি তা খায়নি। বিছানার তেমন ব্যবস্থা হলো না। একটা মাত্র শতরঞ্জি দিল রামু। একটা বাড়তি লণ্ঠন দিল।…মেঘেন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

    বাসায় ফিরেছিলেন ঠিক কটায়?

    –একটা প্রায়।

    –তখন আপনার স্ত্রী ছিলেন?

    মেঘেন মন্দিরার দিকে তাকাল। মন্দিরা মুখ ঘুরিয়ে মাঠ দেখছে। নাকের ফুটো কাঁপছে। চোখ দুটো লাল। চাপা শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলছে।

    মেঘেন বলেনা। তারপরই মাথাটা কয়েকবার দোলায়।

    আপনার নিশ্চয়ই বাকি রাত ঘুম হয়নি?

    হয়নি। জেগেই ছিলুম। কারণ রাত তিনটে চল্লিশের ডাউনে…

    –থামবেন না, প্লীজ।

    রাত ৩:৪০-এর ডাউনে কলকাতা যাবার কথা ছিল! তিথির সঙ্গে।

    মন্দিরা চকিতে মেঘেনকে দেখে নিয়ে আবার মাঠের দিকে ঘুরল। বিশাল ঢেউ খেলানো মাঠ–শস্যহীন, বেশির ভাগই অনুর্বর রুক্ষ মাটি, দুরে টিলার সার এবং খড়কুটো উড়িয়ে ছোটখাট ঘূর্ণি হাওয়া চলেছে কোনাকুনি। কাছাকাছি ফণিমনসার ঝোপের গায়ে একটা সাপের খোলস উড়ছে, এক ফালি পতাকা যেন।

    –কিন্তু শেষঅব্দি যাওয়া হলো না?

    না। হলো না। মন্দিরা–আমার স্ত্রী আমাকে আঁকড়ে ধরে ঘুমোচ্ছিল।

    একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরা সাঁৎ করে ভেতরে চলে গেল। তারপর কয়েকটা সেকেণ্ড বারান্দায় স্তব্ধতা। পাখির ডাকও স্তব্ধতা বলে ভুল হয়। তারপর মাঠ থেকে ঘূর্ণি নিয়ে একটা বাতাস এসে বারান্দায় উঠল। দরজার পর্দা দুলিয়ে ঢুকে গেল ঘরে।

    কখন উঠলেন মেঘেনবাবু?

    –সাতটার কাছাকাছি।

    –সেই গার্ডের কামরায় গেলেন না?

    না।

    –কোথাও গেলেন না?

    গেলুম। ওই শালবনটায়। রোজ ভোরে ওখানে বেড়ানো অভ্যাস আছে। এক মিনিট স্তব্ধতা। তারপর…–তিথি কোথায় মেঘেনবাবু?

    জানি না। মেঘেন মাথা দোলায়।

    –গার্ডের কামরার মেঝেতে রক্ত পাওয়া গেছে মেঘেনবাবু।

    মেঘেন সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড চেঁচিয়ে ওঠেনা না না! তিথি… না না!

    –প্লীজ, আস্তে।

    –গেট আউট! গেট আউট! চলে যান আপনি বেরিয়ে যান!….মেঘেন হাত মুঠো করে উঠে দাঁড়ায়! গলা আরও চড়িয়ে চেঁচায়–গেট আউট!

    -আমার আরও প্রশ্ন আছে মেঘেনবাবু!

    শাট আপ। আপনাকে আমি খুন করে ফেলব। গেট আউট ইউ ওল্ড ফুল!

    বৃদ্ধ হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ান। তারপর অমায়িকভাবে নমস্কার করে চলে যান।

    তিনি বাঁদিকে স্টেশনের রাস্তায় ওঠেন। থমকে দাঁড়ান হঠাৎ। তারপর ফিরে আসেন বাঁজা জমিটার ওপর এবং মেঘেনের কোয়ার্টারের সামনে দিয়ে পশ্চিমের সেই শালবনে এগিয়ে যান।

    বনের ভেতরে ঢুকে ছায়ায় সেই বৃদ্ধ দু’পকেটে হাত ভরে দাঁড়িয়ে আছেন। কুকুরটা তেমনি চুপচাপ শুয়ে আছে একই জায়গায়। মেঘেন তাকিয়ে দেখে। মাথার ভিতরটা খালি, দৃষ্টিতে ক্রমশ একটা নীল চওড়া কিছু এসে আটকে থাকে। একটু পরে তিনি নেমে আসেন। তারপর বাঁদিকে ঘুরে স্টেশনে চলে যান। মেঘেন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

    পরদিন মেঘেন স্টেশনে সকালের ডিউটিতে আছে, সেই বৃদ্ধ এলেন। স্টেশনের ভেতরে আর কেউ নেই। পশ্চিমের জানলার বাইরে কুয়োয় পুরুষ ও স্ত্রীলোকেরা জল তুলছে, কাপড় কাঁচছে, স্নান করছে। তার ওপাশে বেড়া, বেড়ার ওধারে কয়লার স্তূপ, দুটো কাক বসে আছে।

    নমস্কার মেঘেনবাবু!

    –আবার কী চান?

    —অনেক কিছু।

    কিছু বলার নেই আর।

    –আছে। এক মিনিট। ..বলে তিনি পকেট থেকে একটা নোটবই বের করে পাতা ওল্টান। তারপর একটা খালি চেয়ারে বসে পড়েন। মেঘেন টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

    –মেঘেনবাবু, আপনি-সরি, আপনার সঙ্গে তিথি যতক্ষণ ছিল, এমন কোনও কথা বলেছিল কি যাতে আপনার স্ত্রীর উল্লেখ ছিল?

    মেঘেন তেতো মুখে বলে খুবই থাকা উচিত।

    –আমি পজিটিভ উত্তর চাই, মেঘেনবাবু।

    –তাহলে ছিল।

    –তিথি কি মন্দিরাদেবীর দ্বারা কোনও বিপদের আশঙ্কা করেছিল?

    –তাই স্বাভাবিক।

    –ঠিক কী ধরনের আশঙ্কা?

    –আমি অন্তর্যামী নই।

    –আপনি তিথিকে নিয়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন বলেছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে কী কিছু স্পষ্ট নির্দেশ ছিল?

    তার মানে?

    তার মানে-ধরুন, আপনি গিয়ে গার্ডের কামরার দরজায় নক করবেন, অথবা ডাকবেন–এমন কিছু?

    –ডাকা নিরাপদ মনে করিনি! তিনবার নক করার কথা ছিল।

    –দেখুন তিথির লাশ আমরা পেয়েছি।

    –পেয়েছেন? মেঘেন প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে।

    –হাওড়া এক্সপ্রেসের কামরায়। কিন্তু মাথাটা পাইনি।

    –আমি লুকিয়ে রাখিনি। না, না!

    বলছি না। মেঘেনবাবু, আপনার স্ত্রী তিথিকে খুন করেছে বলে মনে করেন?

    –আমি কিছুই মনে করি না।

    –কিন্তু আপনি সিওর যে আপনি নিজে তিথিকে খুন করেননি। কেমন?

    না। সিওর নই। মেঘেন দৃঢ়কণ্ঠস্বরে জবাব দেয়!

    –সিওর নন?

    না।

    বৃদ্ধ হাসেন। কয়েক সেকেণ্ড পরে বলেনতিথির পেটে বাচ্চা ছিল।

    মেঘেন তাকায়। ঠোঁটে ফাঁক করে কিছু বলার জন্যে কিন্তু বলে না।

    –ফোরেনসিক এক্সপার্টদের মতে তিথির মৃত্যু হয়েছে সে রাতে ঠিক বারোটা থেকে ভোর পাঁচটার মধ্যে কোনও একসময়ে। আর…আর তার দেহে সেক্সয়াল ইন্টারকোর্সের লক্ষণ স্পষ্ট পাওয়া গেছে। সেও ওইসময়ের মধ্যে ঘটেছে। মনে হয়, তিথি বাধা দিয়েছিল–পারেনি। এইতে সিদ্ধান্ত দাঁড়ায় যে কোনও পুরুষমানুষই খুনী। কিন্তু রেপ–হ্যাঁ, রেপই বলছি আপাতত-রেপ এবং খুন দুটো আলাদা ঘটনা হওয়া সম্ভব, অর্থাৎ যে খুন করেছে–সেই রেপ করেছে–এটা ঠিক হতেও পারে।

    মেঘেন আবার ঠোঁট ফাঁক করে। কিন্তু কিছু বলে না।

    গতকাল অন্তত দুপুরের মধ্যে এসব জানা গেলে আপনাকে আমরা নিয়ে যেতুম এবং মেডিক্যাল একজামিন করা হতো। কিন্তু টু লেট!

    –আমি তিথির সঙ্গে শুইনি। সে প্রশ্নই ওঠে না। কারণ আমরা চলে যেতে চেয়েছিলুম। তারও কারণ তিথি রথীনবাবুর নির্বাচিত বিগ অফিসারকে ফেলে সামান্য একজন এ. এস. এমের ঘর করবে–যার একটি বিবাহিতা স্ত্রীও রয়েছে, এটা রথীনবাবু বরদাস্ত করতেন না। আর মন্দিরা……

    বলুন। মন্দিরা….

    –মন্দিরাও তা বরদাস্ত করত না। তাছাড়া আইনও সইত না।

    –তাই নিরুদ্দিষ্ট হতে চেয়েছিলেন দুজনে?

    হুঁ।

    –মেঘেনবাবু, আমাদের ধারণা, তিথির মুণ্ডুটা সম্ভবত বাক্সে ধরাতে পারেনি খুনী। তিথির মাথায় নাকি প্রচুর চুল ছিল। ওঁর মা বলছিলেন-বংশের ধারা।

    -হ্যাঁ। খুব ঘন আর সুন্দর চুল ছিল ওর। ওতেই ওকে সুন্দর লাগত। নয়তো স্বাস্থ্য বা দেহের দিক থেকে মন্দিরার চেয়ে অনেক কুৎসিত ছিল তিথি।

    –আপনি স্বাভাবিক হয়েছেন দেখে খুশি হলুম।

    –তিথির আর এক সৌন্দর্য ছিল ওর অস্ফুট কণ্ঠস্বর। অর্ধেক বলা অর্ধেক না বলা কথা ওকে রহস্যময়ী করে রাখত। ওর শরীরে শরীর রাখলে ও ছটফট করতবারবার না না না বলত, কিন্তু ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিত না, বারবার বলত– এ তুমি কী করছকী করছ তুমি–কেন এমন করছ….

    –মেঘেনবাবু, আবার ধন্যবাদ যে আপনি এখন এত স্বাভাবিক।

    হঠাৎ মেঘেন পকেটে হাত ভরে একটা মোড়ক বের করে। ব্যগ্রস্বরে বলে– খুলে দেখুন। এর মধ্যে তিথির কয়েক গোছা চুল আছে।

    সে ব্যস্ত হয়ে মোড়ক খোলে। বৃদ্ধ শান্ত মুখে বলেন আই সি! কোথায় এ চুল পেলেন মেঘেনবাবু?

    কাল ভোরে ওই শালবনের তলায়। শুকনো ঘাসে। তারপর….

    –হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন।

    –আমি একখানে মাটির চাবড়া দেখলুম। কী খেয়াল হলো, সরালুম–দেখি তিথির মাথা! মাথাটা তুলে নিয়ে একদৌড়ে জঙ্গলে ঢুকলুম। ওদিকে একটা জলনিকাশী ন্যাচারাল ড্রেন আছে–রেল ব্রিজ আছে না? তার ষাট-সত্তর মিটার পুব-দক্ষিণে শুকনো বালির তলায় পুঁতে ছিলুম। তারপর ফিরে এসে শালবনের সেই গর্তটা বুজিয়ে দিলুম। কাঠকুটো কুড়িয়ে ছড়ালুম। খুব স্বাভাবিক দেখাল জায়গাটা।

    বলে যান, প্লীজ।

    কাল বিকেলে গিয়ে দেখি, তিথির মাথাটা জন্তুজানোয়ারে তুলে কোথায় নিয়ে গেছে। কিছু চিহ্ন পড়ে ছিল। আবার বালিতে ঢেলে দিলুম।

    –কেন এমন করলেন?

    মন্দিরার স্বার্থে।

    –তাহলে মন্দিরাদেবীই খুন করেছেন–আপনার মতে?

    কী? ও-হ্যাঁ। তাই মনে হয়।

    –আপনার স্টেটমেন্ট অনুসারে মন্দিরাদেবীকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে।

    –ও! তাই বুঝি? কিন্তু…..আপনি কে? কে আপনি?

    –মেঘেনবাবু, মন্দিরাদেবীকে এইমাত্র বিরক্ত করে এসেছি। তিনি অনেক কিছু বলেছেন।

    -অ্যাঁ?

    হ্যাঁ। উনি সব জানতে পেরেছিলেন। আপনাদের ফলো করে সেই গার্ডের কামরায় গিয়েছিলেন। রাত বারোটার পর আপনি কোয়ার্টারে আসার একটু আগেও উনি ওখানে লুকিয়ে ছিলেন। আপনি চলে এলে কিছুক্ষণ পরে উনি তিথির দরজায় তিনবার নক করেন। দরজা খোলে তিথি। পরস্পর তীব্র বচসা হয়। কিন্তু মন্দিরার কথামতো–সেটা কান্নায় শেষ হয়। শেষে নাকি মন্দিরা আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে চলে আসেন। আসার পথে রামুর সঙ্গে ওঁর দেখা হয়। রামু ওখানে নাকি পায়খানায় গিয়েছিল। রামুকে ডাকুন না, প্লীজ।

    রামু কাল বিকেলে ছুটি নিয়ে জংশনে গেছে। এখনও ফেরেনি। অথচ গতরাতেই ফেরার কথা ছিল। মোহনপুর বলছে, রামুকে কেউ দেখেনি সেখানে।

    রামুর কথা আপাতত তাহলে থাক। আপনি নিজের কথা বলুন।

    সবই তো বললুম—

    –একটা ভাইটাল কথা এখনও বলেননি।

    কী?

    -রাত এগারোটা পাঁচের ডাউনে মোহনপুর জংশন থেকে একজন নামেন সে রাতে। তার কথা এড়িয়ে গেছেন।

    অ্যাঁ! হ্যাঁ–তিথির বাবা নেমেছিলেন।

    –আপনি তখন…..

    –আমি তখন তিথির শতরঞ্জি বিছানা হাতে রামুর কোয়ার্টার থেকে বেরচ্ছি সবে–পিছনে তিথি আছে, প্ল্যাটফর্মে দেখতে পেলুম রথীনবাবুকে; তক্ষুনি আমরা চলে গেলুম মাঠের দিকে। ফিরে আসার পর রথীনবাবুকে আর দেখতে পাইনি।

    –মিথ্যা বলছেন মেঘেনবাবু! গিরিধারী খালাসি আপনাকে ও রথীনবাবুকে কথা বলতে দেখেছিল।

    –ও, হ্যাঁ। মনে পড়ছে।

    -রাত একটায় রথীনবাবু আপ-সিগনালের দিকে যান। হাতে টর্চ ছিল! গিরিধারী যেতে চেয়েছিল সঙ্গে। ধমক দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর গিরিধারী দেখেছে, রামু হাঁফাতে হাঁফাতে দৌড়ে এসে তার কোয়ার্টারে ঢুকল। তার আগে গিরিধারী মেয়েলি গলায় একটা চিৎকার শুনেছিল দূরে।

    রামু কি…..

    আমার সিদ্ধান্ত, রামুই রেপ করে তিথিকে।

    –স্কাউড্রেল!

    -চুপ! আস্তে। গিরিধারী তার একঘণ্টা পরে রথীনবাবুকে ফিরতে দেখে। রথীনবাবু তাকে একটা জিনিস আনতে বলেন।

    -ওঃ! একটা বাক্স।

    –গিরিধারী সব কবুল করেছে, মেঘেনবাবু।

    –কে খুন করেছে তিথিকে?

    –ওর বাবা।

    –ওঃ তিথি!

    –আমার কাজ আপাতত শেষ! শুধু ভয় হচ্ছে, হয়তো রামুকেও…।

    –ঠিক এসময় দুজন পুলিশ অফিসার হন্তদন্ত ঢোকেনকর্নেল! লাশটা পাওয়া গেছে। ওই মাঠের নালায় পোঁতা ছিল। স্ট্যাবড বডি। ধস্তাধস্তি হয়েছিল সম্ভবত।

    মেঘেন ভারি গলায় বলে রামুর লাশ!

    দাড়িওলা বৃদ্ধ একটু হাসেন।-হ্যাঁ, রামুর। রথীনবাবু মেয়েকে খুন করলেন। আর আপনি–মেঘেনবাবু, আপনি করলেন রামুকে। মিঃ ভদ্র, হেয়ার ইজ দা সেকেণ্ড মার্ডারার।

    মেঘেনের সামনে পুলিশ অফিসার এসে দাঁড়ায়।

  • খোকন গেছে মাছ ধরতে

    খোকন গেছে মাছ ধরতে

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book-name]

    খোকন গেছে মাছ ধরতে

    সেদিন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার আমাকে দেখেই বলে উঠলেন–জয়ন্ত কখনওকি ছিপে মাছ ধরেছ?

    সবে ওঁর ইলিয়ট রোডের তিনতলার অ্যাপার্টমেন্টের ড্রয়িংরুমের ভেতর পা বাড়িয়েছি, বেমক্কা এই প্রশ্ন। অবশ্য ওঁর নানারকম অদ্ভুত-অদ্ভুত বাতিক আছে জানি, কিন্তু ওঁর মতো ছটফটে মানুষ ছিপ হাতে ফাতনার দিকে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে বসে থাকবেন–এটা বিশ্বাস করা কঠিন। যাই হোক্ ধীরে সুস্থে বসার পর বললুম–আজ কি তাহলে কোথাও ছিপ ফেলার আয়োজন করেছেন কর্নেল?

    কর্নেল হাসতে হাসতে ছড়া বলে উঠলেন :

    খোকন গেছে মাছ ধরতে

    ক্ষীর নদীর কূলে,

    ছিপ নিয়ে গেছে কোলাব্যাং

    মাছ নিয়ে গেছে চিলে।…

    অবাক হয়ে বললুম–আপনি এ ছড়া কোথায় শিখলেন? আপনি তো বাংলা পাঠশালায় পড়েননি।

    কর্নেল এ প্রশ্নের জবাব দিলেন না। বললেন–ছড়াটা কিন্তু ব্রিলিয়ান্ট! অপূর্ব! ভাবা যায় না! বেচারা খোকন বড় সাধে মাছ ধরতে বসেছে। এদিকে কি না দুষ্ট কোলাব্যাংটা তার ছিপখানাই নিয়ে পালাল? ওদিকে কোত্থেকে এক ব্যাটা চিল এসে…ভাবা যায় না! ভাবা যায় না!

    কর্নেল ছড়ায় বর্ণিত দৃশ্য যেন চোখ বুজে দেখতে দেখতে খুব মুগ্ধ হয়ে তারিফ করতে থাকলেন এবং সেই সঙ্গে ওঁর প্রাণখোলা হাসি। ওঁর পরিচারক ষষ্ঠীচরণ পর্দার ফাঁকে মুখ বাড়িয়ে থ।

    কর্নেলের মধ্যে খোকাটেভাব আছে, বরাবর দেখেছি। কিন্তু আজ সকালে আমাকে জরুরি তলব দিয়ে ডেকে এনে নিতান্ত মাছ ধরার প্রোগ্রাম শোনাবেন ভাবিনি। আমি খবরের কাগজের রিপোর্টার এবং কর্নেল এক ধুরন্ধর প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার-সোজা কথায় গোয়েন্দাও। আশা ছিল, গুরুতর একটা ক্রাইম স্টোরি পেয়ে যাব। দৈনিক সত্যসেবকের আগামীদিনের প্রথম পাতাটা পাঠকদের মাত করে ফেলবে! কিন্তু এ যে দেখছি, নিতান্ত মাছধরার বদখেয়াল নিয়ে উনি বসে আছেন! আমার মতো ব্যস্ত রিপোর্টারের একটা দিনের দাম খুব চড়া। আমি হতাশ হয়ে ওঁর দিকে তাকিয়ে রইলুম।

    হঠাৎ কর্নেল কোণের দিকে ঘুরে বললেন–মিঃ রায়, আলাপ করিয়ে দিই। এই আমার সেই প্রিয়তম তরুণ বন্ধু জয়ন্তার কথা আপনাকে বলছিলুম।

    এতক্ষণ কোণের দিকে তাকাইনি। এবার দেখি, খবরের কাগজের আড়ালে এক সুদর্শন প্রৌঢ় ভদ্রলোক উজ্জ্বল ফর্সা রঙ, পরনে নেভিরু আঁটো পাতলুন এবং গায়ে টকটকে লাল স্পোর্টিং গেঞ্জি, ঠোঁটে আটকানো পাইপ, মুখ বের করলেন। ভদ্রলোকের কাঁচাপাকা গোঁফে কর্নেলের মতো একটা সামরিক জীবনের গন্ধ মেলে। উনি কাগজ ভাঁজ করে রেখে তখুনি আমাকে নমস্কার করলেন। আমিও।

    কর্নেল বললেন–জয়ন্ত, উনি মেজর ইন্দ্রনাথ রায়। আমার সামরিক জীবনের বিশেষ স্নেহভাজন বন্ধু। সম্প্রতি রিটায়ার করছেন। এঁর জীবন খুব রোমাঞ্চকর, জয়ন্ত। সিক্সটি-টুতে চীনারা নেফাবর্ডারে এঁকে ধরে নিয়ে যায়। জঘন্য অত্যাচার করে। তারপর…

    ইন্দ্রনাথ হাত তুলে হাসতে হাসতে বললেন–এনা কর্নেল! আমি আপনার মতো যোদ্ধা ছিলুম নাসুযোগও পাইনি। তাই অত কিছু বলারও নেই।

    কর্নেল আপত্তি গ্রাহ্য না করে বললেন–তাছাড়াও এঁর একটা অভিজাত সামাজিক পরিচয় আছে, জয়ন্ত। ইনি মহিমানগরের প্রখ্যাত রাজপরিবারের সন্তান। মধ্যপ্রদেশের নানা জায়গায় এঁদের অনেকগুলো খনি ছিল। একটা বাদে সবই এখন রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়েছে।

    ইন্দ্রনাথ বললেন– ও একটা ডেড মাইন বলতে পারেন অবশ্য। ছেড়ে দিয়েছি আমরা।

    কর্নেল প্রশ্ন করলেন–কিসের খনি যেন?

    –সীসের। সাত বছর আগে ওটা পোড়া হয়ে গেছে। আর কিছু মেলেনি।

    –খনিমুখগুলো তাহলে নিশ্চয় সিল করে দিয়েছেন?

    না কর্নেল। সিল করার সুযোগ পাইনি। মানে….একটু ইতস্তত করে ইন্দ্রনাথ মৃদু হেসে ফের বললেন–আমার অবশ্য কোনওরকম কুসংস্কার নেই। আপনি তা ভালই জানেন। কিন্তু আমার কাকা জগদীপ রায় হঠাৎ রহস্যজনকভাবে মারা পড়েন–ওঁর ডেড বডি খনির একটা সুড়ঙ্গে পড়ে ছিল–তারপর কাকিমা জেদ ধরলেন, খনিমুখ যেমন আছে তেমনি পড়ে থাক–তোমরা কেউ ওখানে যাবে না। কারণ কাকা নাকি খনিমুখগুলো কীভাবে বন্ধ করা যায়, তা ঠিক করতেই গিয়েছিলেন ওখানে। আর, আপনি তো জানেন, কাকিমাই আমাদের ফ্যামিলির একমাত্র গার্জেন– কাকার অবর্তমানে। আমাদের ছেলেবেলা থেকে উনিই মানুষ করেছেন। ওঁর কথা আমাদের দু-ভাইয়ের কাছে ঈশ্বরের আদেশ। তাই আমরা আর ওদিকে মাড়াইনি।

    কর্নেল বললেন–আপনার কাকিমার কী ধারণা হয়েছিল বলতে পারেন?

    ইন্দ্রনাথকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। বললেন–একটু খুলে না বললে ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন না। কাকা ছিলেন খেয়ালি মানুষ। মাছ ধরার বাতিক ছিল প্রচণ্ড। সীসের খনিটা রয়েছে তিনদিকে তিনটে পাহাড়ের মধ্যিখানে, একটি উপত্যকায়। খনির পেছনে আছে একটা হ্রদ। আসলে ওটা একটা নদীর বাঁকের মুখে, ন্যাচারাল ওয়াটার ড্যাম। পরে মুখটা চড়া পড়ে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু হ্রদটা খুব গম্ভীর হওয়ার জন্য জল কখনও মরে না। আমরা খনিটা ছেড়ে আসার পর নদীতে একবার প্রচণ্ড বন্যা হয়। তখন হ্রদেও জল ঢুকে পড়ে এবং সেই জল খনির মধ্যেও ঢুকে যায়। কিছু কিছু খনিমুখ এর ফলেই আপনা-আপনি ধস নেমে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাকি ছিল তিনটে খনিমুখ, একটু উঁচু জায়গায়। কাকা প্রতিবার অক্টোবরে ওখানে গিয়ে তার বাংলোয় কাটাতেন। বরাবরকার অভ্যাস। জায়গাটার সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। যাই হোক, হ্রদে মাছ ধরার নেশা ছিল ওঁর। পাঁচবছর আগের অক্টোবরে কাকিমাকে নিয়ে উনি ওখানে যান। সেবারই খনিমুখ তিনটে বন্ধ করে আসার উদ্দেশ্য ছিল। সঙ্গে একজন ইঞ্জিনিয়ারও নিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর কী হলো, ফোরটিনথ অক্টোবর সারা বিকেল মাছ ধরার পর ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোককে বলেন–আপনি বাংলোয় চলুন, আমি একটু পরে যাচ্ছি। তারপর অনেক রাত হলো, কিন্তু ফিরলেন না। তখন খোঁজাখুজি পড়ে গেল। হ্রদে স্থানীয় কয়েকজন আদিবাসী জেলে রাতে মাছ ধরতে এসেছিল। তাদের সঙ্গে দেখা হলে জানাল সায়েবকে তারা খোলা খনিমুখের কাছে দাঁড়িয়ে টর্চ জ্বালাতে দেখেছে। রাত তখন একটা। জেলেদের কথা শুনে…

    কর্নেল বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-জেলেরা তো লেকে ছিল। কীভাবে জানল, উনিই আপনার কাকা?

    ইন্দ্রনাথ বললেন নির্জন জায়গা। তাছাড়া ওখানে ভূত আছে বলে স্থানীয় লোকেদের বিশ্বাস। সব পোডড়া খনি কেন্দ্র করেই ভুতুড়ে গালগল্প গড়ে ওঠে। এখানেও তাই হয়েছিল। যাইহোক, এই জেলে তিনজন ছিল খুব সাহসী। বয়সে যুবক। টর্চের আলো দেখে ওরা পরস্পর তর্ক জুড়ে দেয় যে ওটা ভূত কিংবা ভূত নয়। তাছাড়া হ্রদটায় প্রচুর মাছ–অথচ ভূতের ভয়ে গরীব জেলেরা মাছ ধরতে ভয় পায়–পাছে ভূতের অভিশাপ লাগে। কিন্তু এই তিনটি সাহসী তরুণ আদিবাসী সে রাতে জেদ করেই এসেছিল। হারাতেই এসে এবং মাছ ধরে ওরা প্রমাণ করে দেবে যে ওখানে ভূতপ্রেত কিংবা অভিশাপ ব্যাপারটা মিথ্যে।

    কর্নেল বললেন-তারপর?

    –ওরা আলো লক্ষ্য করে ওখানে যায়। দূর থেকেই চেঁচিয়ে বলে–কে ওখানে? তখন কাকার সাড়া পায়। কাকা ওদের সুপরিচিত। ফলে, ওরা কাছে না গিয়ে হ্রদে নিজের কাজে ফিরে যায়। যাই হোক, এই সূত্র ধরে সেই খনিমুখ তিনটের কাছে যাওয়া হলো। তারপর একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে কাকার লাশ পাওয়া গেল। কোনও ক্ষতচিহ্ন নেই শ্বাসরোধ করেও মারা হয়নি। পোস্টমর্টেমের রিপোর্টে বলা হলো–হার্টফেল করে মারা পড়েছেন। অথচ কাকার স্বাস্থ্য ছিল খুবই ভাল।

    কিছুক্ষণ স্তব্ধতা। তারপর কর্নেল বললেন–কিন্তু আপনার কাকিমা খনিমুখ বন্ধ করতে নিষেধ করেন বলছিলেন। কেন–সেটা স্পষ্ট বুঝলুম না মিঃ রায়!

    ইন্দ্রনাথ আনমনে মাথা নেড়ে বললেন কাকিমাও স্পষ্ট কিছু বলেননি। শুধু বলেছিলেন–ওগুলো যেমন আছে, তেমনি থাক। আমার ছোট ভাই সৌমেন্দু ডাক্তার। ও এখন জব্বলপুরে সরকারী হাসপাতালের চার্জে আছে। কোনও কুসংস্কার নেই। ও জেদ ধরেছিল কাকিমার কাছে। কিন্তু কাকিমা শুধু বলেছিলেন–খনিতে এক সাধু আছেন তিনি নাকি অদৃশ্যও হতে পারেন। সেই সাধু নির্জনে তপস্যা করার জন্য খনির ভেতরে ঢুকে পড়েছেন কবে। জবরদখল–যাকে বলে! …কথাটা বলে ইন্দ্রনাথ হো হো করে হেসে উঠলেন।

    আমরাও হাসলুম। কর্নেল বললেন–সাধুকে কেউ দেখেছে কখনও?

    ইন্দ্রনাথ বললেন–না। আমার ধারণা, কাকিমার নিছক বিশ্বাস। তবে কেন এমন আজগুবি ধারণা হলো, তাও উনি বলেননি। বলবেনও না। খনিমুখ বন্ধ করলে সাধু নাকি রেগে যাবেন।

    ষষ্ঠীচরণ ট্রেতে কফি নিয়ে এল। আমরা কিছুক্ষণ কফি খেলুম চুপচাপ। তারপর কর্নেল চুরুট জ্বেলে বললেন–খুব ইন্টারেস্টিং!

    ইন্দ্রনাথ বললেন–তবে কর্নেল, ওই ভূতুড়ে রহস্য ফাঁস করার জন্যে আমি নিশ্চয় আপনার কাছে আসিনি। আমি এসেছি, স্রেফ মাছ ধরার প্রস্তাব নিয়ে। অবশ্য, আপনারই কাছে প্রস্তাব আনার কারণ যদি জানতে চান, তাহলে বলবকাকার মৃত্যুর পর থেকে প্রতিবছরই এই সময় আমার চিরিমিরি এলাকার ওই হ্রদে যেতে ইচ্ছে করে–অন্তত স্রেফ ছিপে মাছ ধরার জন্যে। অথচ বুঝতেই পারছেন, ওই ট্র্যাজিক ঘটনার ফলে একটা অস্বস্তি জেগে ওঠে। দ্বিধা এসে সামনে দাঁড়ায়। একা যেতে শেষ অব্দি সাহস পাইনে। ওদিকে কাকিমা জানতে পারলেও বাধা দেবেন। তাই অবশেষে আপনাকে নিয়ে যাবার প্ল্যান মাথায় এসে গেল। আপনারও মাছ। ধরার হবি ছিল এক সময়–দেখেছি।

    কর্নেল মাথা দুলিয়ে বললেন–ছিল! এখন সেটা আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। মিঃ রায়। কিন্তু একটা কথা–আপনার কাকিমা আপনাকে বাধা দেবেন না?

    ইন্দ্রনাথ বললেন–নিশ্চয় দেবেন। কিন্তু আমি এবার যেভাবে হোক, যাবই কর্নেল। জায়গাটা এত সুন্দর, এত নির্জন, ভাবা যায় না। আমার স্মৃতি আমাকে উত্যক্ত করে মারছে। কাকিমাকে গোপন করেই যাব।

    কর্নেল আমার দিকে ঘুরে বললেন–জয়ন্ত! আশা করি, ইতিমধ্যে তুমি ঞ্চল হয়ে উঠেছ! মনশ্চক্ষে চিরিমিরি হ্রদের অপূর্ব সৌন্দর্য এবং রুপোলি মৎস্য অবলোকন করছ!

    ইন্দ্রনাথ বললেন–তাহলে দুজন নয় কর্নেল, তিনজন মিলে যাব। জয়ম্বাবুকেও আমি আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

    কর্নেল হেসে বললেন রাইট, রাইট। তারপর অস্ফুটস্বরে বাচ্চা ছেলের মতো সেই ছড়াটা আওড়াতে থাকলেন :

    খোকন গেছে মাছ ধরতে

    ক্ষীর নদীর কূলে,…

    চিরিমিরি পাহাড়ের বাংলোটির নাম ‘দা সোয়ান’। দূর থেকে ধূসর এই পুরনো বাংলোটিকে সত্যি একটা রাজহাঁসের মতো দেখায়–যেন মাঝে মাঝে রাজহাঁসটা জ্যোৎস্নারাতে হ্রদে সাঁতার কেটেও যায়। বাংলোর গেট থেকে একফালি সরু পথ ঘুরে ঘুরে হ্রদে নেমেছে। যেখানে নেমেছে, সেখানে কয়েক ধাপ পাথর বাঁধানো আছে ঘাটের মতো। পথের দুধারে গাছপালা ঝোপঝাড় আছে। পথটাও এবড়োখেবড়ো অব্যবহৃত হয়ে রয়েছে অনেক বছর। ফাটলে ঘাস বা আগাছা গজিয়েছে। আমরা দুপুর নাগাদ তিনজনে পৌঁছুলে কেয়ারটেকার রঘুবীর সিং তক্ষুনি কয়েকজন আদিবাসী লাগিয়ে সব সাফ করার ব্যবস্থা করল। ঘাটের পাথরগুলোয় শ্যাওলা জমে ছিল। তাও সাফ করা হলো। লাঞ্চের আগে কর্নেল স্বভাবমতো চারপাশটা দেখতে বেরিয়ে গেলেন–সঙ্গে বাইনোকুলার আর ক্যামেরা নিতেও ভুললেন না। আমাকে ডাকলেন না দেখে অভিমান হলো–অবশ্য ডাকলেও যেতুম না, সারাদিন সারারাত ট্রেনজার্নির পর তখন খুব ক্লান্ত আমি। বিছানায় গড়াচ্ছি। কর্নেলকে ইন্দ্রনাথ সাবধান করে দিলেন এলাকার জঙ্গলে বুনো হাতি আছে অজস্র। বাঘ ভালুকও কম নেই। কর্নেল ঘাড় নাড়লেন মাত্র।

    বাংলোর ঘরগুলো এসেই দেখা হয়েছে। পাঁচঘানা ঘর আছে। একটা কিচেন কাম-ডাইনিং-প্লাস ড্রয়িং রুম, একটা বাথরুম-প্রিভি, বাকি তিনটে শোবার ঘর। থাকার ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি নেই। ইন্দ্রনাথ খবর পাঠিয়ে সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন। দান সিং নামে ওঁদের পুরনো রাঁধুনিও অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। এবার সে কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে কাজে লেগে গেল। আমাদের সঙ্গে তিনখানা হাল্কা মজবুত বিলিতি ছিপ, চার এবং আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র রয়েছে। ইন্দ্রনাথ আমাকে ছিপ ফেলার ঘাট দেখতে ডাকলেন একবার। কিন্তু আমার ক্লান্তি লক্ষ্য করে শেষে একজন লোক সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন।

    একটু পরে বারান্দায় গিয়ে চারপাশের সৌন্দর্য দেখতে থাকলুম। হ্রদটা বিশাল। সামনে উত্তরে রয়েছে সেটা। পশ্চিমে মোটামুটি সমতল জায়গায় ওঁদের পোড়ো খনি–এখন জঙ্গল গজিয়ে গেছে। পুবে এবং উত্তরে যতদূর চোখ যায়, শুধু জল। দিগন্তরেখায় কিছু নীল পাহাড়। উত্তরেও পাহাড়–সেগুলো কাছে বলে মনে হলো। বাংলোটা রয়েছে পাহাড়ের গায়ে–এটা হ্রদের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ-ঘেঁষা। রঘুবীর এসে সব দেখাল। বাংলোর পিছনে আরেকটা রাস্তা আছে–সেটা চলে গেছে খনিতে। বাংলা থেকে সিকি কিলোমিটার দূরে রাস্তাটা দুভাগ হয়েছে ডাইনে চলে গেছে খনির দিকে। বাঁয়ে গিয়ে মিলেছে একটা ঢালু বড় সড়কে মাইল পাঁচেক দূরে। ওই পথেই আমরা টাঙ্গায় চেপে এসেছি। সড়কটা নদী পেরিয়ে পুবে বরটুঙ্গা স্টেশন হয়ে জব্বলপুরের দিকে চলে গেছে।

    রঘুবীর বলল কী ছিল জায়গাটা, কী হয়ে গেল! কত লোকজন– কত আওয়াজ–সবসময় গমগম করত। আমি স্যার, সেই এসেছিলুম রায়সায়েবের সঙ্গে পাঁচ সাল আগে। উনি তো মারা গেলেন। তারপর আমিও চলে গেলুম। আমার মনে বড় কষ্ট হত স্যার। কিন্তু ওনারা ছাড়বেন না। বাংলোর জিম্মাদারি করতে হবে। তো আমার ছেলেই এখানে এসে মাঝে মাঝে দেখাশোনা করে যেত। খুব সাসহী ছেলে স্যার! আমার তো এ বয়সে এই ভূতের আড্ডায় থাকার সাহসই ছিল না। লেকিন দেখুন, আমার ছেলের একচুল ক্ষতি হয়নি। ভূতও নাকি দেখা দেয়নি। তবে…

    ও থামলে জিগ্যেস করলুম–তবে?

    –ছেলে বলত, খনির ওদিকে আলো জ্বলতে দেখেছে। ওর ধারণা ওসব আলো জেলেদের। রাতে মাছ ধরতে আসে জেলেরা।

    –আচ্ছা রঘুবীর, রায়সাহেব মারা যাবার সময় তো তুমি এখানে ছিলে?

    জী হুজুর।

    –তুমি কি মনে করো উনি হার্টফেল করেই মারা যান?

    রঘু গম্ভীর হয়ে বলল–জী হাঁ। আচানক কিছু আজগুবি দেখলে তো হার্টফেল করবেই! আমার মালুম, রায়সাহেব সেই সাধুকে দেখতে পেয়েছিলেন। সাধুর রাগ হয়েছিল। কেন? না–খনির গর্ত বন্ধ করে দেবেন রায়সাহেব। সাধুর ভয়ঙ্কর চেহারা দেখেই মারা যান উনি।

    –তাহলে বলছ, খনির মধ্যে কৈানও সাধু ছিলেন? তাকে কেউ দেখেছিল নাকি?

    –জী হ্যাঁ। মাইজি দেখেছিলেন।

    –তুমি?

    রঘুবীর একটু চুপ করে থেকে বলল–স্যার, বিশ্বাস করেন তো বলি। আমি একদিন সন্ধ্যাবেলায় এক পলকের জন্যে দেখেছিলুম। আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন। তারপর–আর নেই! বিলকুল হাওয়া।

    বল কী রঘুবীর!

    হ্যাঁ স্যার। দেখামাত্র গর্তে সেঁধিয়ে গেলেন। মনে মনে হেসে সিগারেট ধরালুম। রঘুবীর হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে চলে গেল। একটু পরে শুনি বাংলোর পিছন দিকে গাড়ির আওয়াজ হচ্ছে। ব্যাপারটা দেখার জন্য লন ঘুরে পিছনে যেতেই দেখলুম, একটা জিপ থেকে আমার বয়সী একজন যুবক নামল–চোখে সানগ্লাস, পিঠে বন্দুক। তারপর নামলেন এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক। কর্নেলের বয়সী। তবে কর্নেলের মতো টাক বা দাড়ি নেই। শেষে নামলেন এক বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা। পোশাক দেখেই চমকে উঠলুম। বাঙালী বিধবা। তাহলে কি হঠাৎ ইন্দ্রনাথের সেই কাকিমা এসে পড়লেন? সর্বনাশ!

    কিন্তু এই অভিশপ্ত মাটিতে হঠাৎ উনি নিজেই এসে পড়লেন এবং সদলবলে– কেন?

    ততক্ষণে রঘুবীর দৌড়ে হাজির হয়েছে। তার হাবভাব দেখে স্পষ্ট জানা গেল, যা ভেবেছি, তাই। বৃদ্ধা বেশ শক্ত সমর্থ মনে হলো। আমাকে দেখে ভুরু কুঁচকে তাকালেন। তারপর প্রশ্ন করলেন–আপনাকে তো চিনলুম না বাবা?

    রঘুবীর বলল-মাইজী, ওনারা এসেছেন কলকাতা থেকে। ইন্দর সাহেবের সঙ্গে। লেকে মাছ ধরবেন।

    ইন্দ্র! ইন্দ্র এসেছে? বৃদ্ধার মুখে খুবই বিস্ময় ফুটে উঠল।

    –জী হাঁ। এই তো দো-তিনঘণ্টা আগে এসেছেন। ঔর এক কর্নেল সাহেব এসেছেন।

    বৃদ্ধা গম্ভীর মুখে দলবল সহ বাংলোয় উঠলেন। ব্যাপারটা আমার খারাপ লাগল। ভুতুড়ে বাংলোর সব রোমান্স মাঠে মারা যাবে। বেশি হইচই করা যাবে না। মেপে জুপে চলাফেরা করতে হবে। ইন্দ্রনাথের মুখে ওঁদের গার্জেন এই ভদ্রমহিলার যে ব্যক্তিত্বের আঁচ পেয়েছিলুম, বাস্তবে মনে হচ্ছে তার চেয়েও কড়া কিছু। আশঙ্কাও হলো, ইন্দ্রনাথ ওঁর বিনা অনুমতিতে এবং অজ্ঞাতসারে আমাদের নিয়ে এখানে এসেছেন–এই নিয়ে কোনও মনান্তর দেখা দেবে না তো?

    অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে হাঁটতে গেট পেরিয়ে রাস্তায় গেলুম। তারপর আরও কিছু এগিয়ে যেতেই আচমকা পাশের একটা ঝোপ ঠেলে বেরিয়ে এলেন কর্নেল। টুপিতে মাকড়সার জাল, জামায় কাঁটা আটকে আছে এবং শুকনো পাতা লেগে রয়েছে। আমাকে দেখে যেন একটু অপ্রস্তুত হলেন। বললেন–এই যে জয়ন্ত!

    বললুম–বন্য জন্তুর মতো ঝোপ জঙ্গলে ঢুঁ মেরে বেড়াচ্ছেন। ওদিকে দেখুন গে, ধুন্ধুমার শুরু হয়েছে এতক্ষণ। ইন্দ্রনাথের সেই কাকিমা ভদ্রমহিলা দলবল নিয়ে। এসে পড়েছেন!

    কর্নেল হাত তুলে বললেন–দেখেছি। এত নার্ভাস হয়ে পড়ার কিছু নেই। এবার চুপচাপ একটা জমাট নাটক দেখতে থাকো। আনন্দ পাবে–আই অ্যাসিওর ইউ, ডার্লিং!

    নাটক মানে?

    কর্নেল টুপি খুলে টাক চুলকে বললেন–হ্যাঁ জয়ন্ত। সম্ভবত একটা রোমাঞ্চকর নাটকের শেষ অঙ্কের পর্দা উঠল এবং আমরা কিছু না জেনে তার মধ্যে এসে। পড়েছি।

    বিস্মিত হয়ে বললুম–কর্নেল! প্লীজ-অন্ধকারে রাখবেন না!

    কর্নেল সস্নেহে আমার একটা হাত ধরে বললেন–ধৈর্য ধরো, জয়ন্ত। সম্ভবত আমাদের দুজনেই এখন একটা সুবিশাল ধৈর্যের মধ্যে সময় কাটাতে হবে। আই জাস্ট স্মেল ইট।

    লাঞ্চ খেতে তিনটে বেজে গেল। আশ্বস্ত হয়ে দেখলুম, ইন্দ্রনাথের ঠাণ্ডা ধরনের নির্লিপ্ত আচরণ সত্ত্বেও তার কাকিমা সর্বেশ্বরীদেবী আমাদের বিশেষ করে কর্নেলের প্রতি খুব ভদ্রতা দেখালেন। কিন্তু একটু বিসদৃশ মনে হলো দুই ভায়ের পরস্পর আচরণ। ইন্দ্রনাথ ও সৌমেন্দু পরস্পর বাক্যালাপ পর্যন্ত করলেন না। সর্বেশ্বরীর সঙ্গের ভদ্রলোক সেই ইঞ্জিনিয়ার এবং খনি-বিশারদ, যিনি জগদীপের মৃত্যুর সময় এখানে ছিলেন এবং খনিমুখ বন্ধ করার উপায় বাতলাতে এসেছিলেন। সেই বৃদ্ধের নাম অনন্তরাম শর্মা। মহীশূরের লোক। জগদীপের ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন।

    কর্নেলের যা স্বভাব, এই তিনজন নবাগতের সঙ্গে ভাব জমিয়ে তুলতে দেরি হলো না। লাঞ্চের টেবিলে কর্নেলের অনুরোধে সর্বেশ্বরীও বসলেন। কিন্তু তিনি নিরামিষ খান। আলাদা ব্যবস্থাও ছিল। নিঃসঙ্কোচে খেলেন এবং তাঁর স্বামীর কার্যকলাপ সম্পর্কে গল্পও করলেন। মনে হলো, ভদ্রমহিলার প্রভুত্ব করার ক্ষমতা অসাধারণ এবং রীতিমতো শিক্ষাদীক্ষা আছে।

    খাওয়াদাওয়া শেষ হলে ইন্দ্রনাথ তিনটে ছিপ নিয়ে চলে গেলেন হ্রদের দিকে। আমাদের দুজনকে ডেকেও গেলেন। কর্নেল বললেন–খাওয়ার পর আধঘণ্টা জিরিয়ে নেওয়া আমার অভ্যাস, মিস্টার রায়। আপনি চলুন। আমরা দুজনে যাচ্ছি।

    বুঝলাম, আমাকেও কর্নেলের সঙ্গে জিরিয়ে নিতে হবে।

    সৌমেন্দুকে দেখলুম লনে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন। বারান্দার চেয়ারে আমরা চারজন বসে আছি-কর্নেল, সর্বেশ্বরী, মিঃ শর্মা আর আমি। সর্বেশ্বরী বলছিলেন–তা বুঝলেন কর্নেল? স্বপ্ন দেখার পর তো আমি অস্থির হয়ে উঠলুম। তখনই টেলি করে দিলুম মিঃ শর্মাকে। সৌমেন্দুকেও খবর দিলুম মিঃ শর্মাকে নিয়ে সে যেন অপেক্ষা করে। তারপর…

    কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন–একটা ছোট্ট প্রশ্ন মিসেস রায়। জাস্ট একটা কৌতূহল। ইন্দ্রনাথকে আপনি কথাটা নিশ্চয় জানাননি?

    সর্বেশ্বরী গম্ভীর হয়ে জবাব দিলেন–দেখুন কর্নেল সরকার, ব্যাপারটা অবশ্য পারিবারিক এবং প্রাইভেট অ্যাফেয়ার। কিন্তু আপনাকে বলতে সংকোচের কারণ দেখি না। ইন্দ্রনাথকেই প্রথমে কথাটা বললুম–। কিন্তু ও বরাবর অবিশ্বাসী-নাস্তিক। ও উড়িয়ে দিল। বলল–একটা পোডড়া খনির গর্ত বুজিয়ে ফেলতে একগাদা টাকা খরচা হবে। এর কোনও জাস্টিফিকেশন নেই। ইন্দ্রনাথ গোঁ ধরে বসে রইল। তখন আর কী করি বলুন! প্রত্যক্ষ স্বপ্নে দেখলুম, উনি বলছেন পিট তিনটে শীগগির বন্ধ করে দাও। সাধুবাবা চলে গেছেন!

    কর্নেল মাথা দুলিয়ে সায় দিলেন-রাইট, রাইট মিসেস রায়। মিঃ শর্মাকে জিজ্ঞেস করছি। মিঃ শর্মা কীভবে পিট বন্ধ করবেন, নিশ্চয় প্ল্যান করেই এসেছেন?

    শর্মা বললেন–অবশ্যই। সঙ্গে ডিনামাইট নিয়ে এসেছি। কোনও অসুবিধে হবে না। এখন আগে একবার গিয়ে জায়গাটা দেখতে হবে কী অবস্থায় আছে। পাঁচ বছর আগে যেমন দেখেছি, তেমন না থাকতেও পারে। কারণ, বুঝতেই পারছেন–প্রকৃতি সবসময় নিজের কাজ করে যাচ্ছে। ওলট-পালট ঘটাচ্ছে।…বলে শর্মা হাসতে থাকলেন।

    কর্নেল ফের মাথা দুলিয়ে বললেন রাইট, রাইট!

    শর্মা একটু ঝুঁকে বললেন–কিছু যদি মনে করেন কর্নেল, তাহলে আপনিও আমার সঙ্গে যেতে পারেন। সার্ভে এবং ডিনামাইট রাখার ব্যাপারে আপনার মতো অভিজ্ঞ একজন সমরকুশলী থাকা খুবই সঙ্গত। এ ধরনের কাজকর্ম সমর বিভাগের লোকেরা নিশ্চয় করে থাকেন।

    কর্নেল তক্ষুণি আমন্ত্রণটা নিলেন। আমার দিকে ঘুরে বললেন জয়ন্ত, তাহলে তুমি ছিপ ফেলতে যাও। আমি মিঃ শর্মার সঙ্গে যাই।…

    সর্বেশ্বরী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–আপনারা ঘুরে আসুন। ততক্ষণ আমি বিশ্রাম করে নিই।

    সবেশ্বরী ঘরে ঢুকলেন। কর্নেল ও মিঃ শর্মা বেরিয়ে গেলেন। আমি লেকের দিকে পা বাড়ালুম। লন পেরিয়ে যাবার সময় সৌম্যেন্দু হঠাৎ আমাকে ডাকলেন– জয়ন্তবাবু, শুনুন!

    কাছে গেলুম। বললুম–আপনি গেলেন না যে?

    সৌম্যেন্দু সে কথার জবাব না দিয়ে বললেন–আপনারা কি সত্যি নিছক মাছ ধরতেই এসেছেন?

    চমকে উঠে বললুম–নিশ্চয়ই। আপনার অবিশ্বাসের কারণ বুঝলুম না সৌমেন্দুবাবু। দুঃখিত।

    সৌম্যেন্দু আমার অনুযোগ গ্রাহ্য না করে প্রশ্ন করলেন–আপনি কি সত্যি রিপোর্টার?

    অপমানিত বোধ করলুম। পকেট থেকে আমার আইডেন্টিটি কার্ড (ফটো সমেত) বের করে ওঁর সামনে ধরে বললুম–আপনার কি এটা জাল মনে হচ্ছে?

    সৌম্যেন্দু, আশ্চর্য, আইডেন্টিটি কার্ডটা আমার হাত থেকে নিলেন এবং তীক্ষ্ণদৃষ্টে পরীক্ষা করার পর ফিরিয়ে দিয়ে একটু হাসলেন–জয়ন্তবাবু, আমার এই সংশয়কে ক্ষমা করবেন। আপনাকে খোলাখুলিই বলছি, দাদার প্রতি আমার এতটুকু বিশ্বাস নেই।

    –কেন সৌমেন্দুবাবু?

    ওঁর এখানে আসার মধ্যে অবশ্যই কোনও মতলব আছে। কিন্তু শুধু বুঝতে পারছি না–আপনাদের কেন উনি আনলেন? বিশেষ করে ওই কর্নেল ভদ্রলোকের নাম আমার শোনা আছে–উনি একজন শখের গোয়েন্দা–তাই না?

    –ঠিক তা নয়। তবে ওঁর রহস্যসম্পর্কে আগ্রহ আছে। তবে একটা পোড়ো খনির মুখ বন্ধ করার মধ্যে কী রহস্য থাকতে পারে, সত্যি আমি বুঝতে পারছি না সৌম্যেন্দুবাবু।

    –পারে বইকি।…বলে সৌম্যেন্দু কেমন হাসলেন। তারপর চাপা গলায় ফের বললেন–আমার বরাবর ধারণা, ওই খনির সুড়ঙ্গে কোথাও গুপ্তধন লুকোনো আছে।

    বলেন কী মশাই!

    -হ্যাঁ জয়ন্তবাবু। এই আমার বরাবরকার অনুমান। কিন্তু কিছুতেই মাথায় ঢোকে না, ওখানে কে গুপ্তধন পুঁতে রাখতে গেল? কখন পুঁতল?

    আমি হতভম্ভ হয়ে গেছি কথাটা শুনে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ সৌম্যেন্দু বললেন–চলুন, আপনার ওই কর্নেল সায়েব তো ছিপ নিয়ে বসবেন না। অতএব আমি ওঁর ছিপটা নিয়ে মাছ ধরতে বসব। কিন্তু একটা কথা–আমি ছিপটা দাদার কাছে গিয়ে আনতে পারব না। আমি দূরে দাঁড়াব। আপনি এনে দেবেন। দাদার কাছে জেনে নেবেন কিন্তু, কোন ঘাটে কর্নেলের বসার কথা ছিল। সে ঘটেই আমি বসব।…

    লেকের এই দক্ষিণ ধারটা পাহাড় থেকে ঢালু বা গড়ানে অবস্থায় জলে নেমে গেছে। অজস্র ঝোপঝাড় ও পাথর আছে এখানে। বাঁদিকে অর্থাৎ পশ্চিমে সেই পাথর বাঁধানো ঘাটে কর্নেলের বসার কথা। সেখানেই সৌম্যেন্দু বসলেন। আমি বসলুম তার আন্দাজ তিরিশ গজ দূরে ঝোপের মধ্যে থেকে একটা পাথর জলঅব্দি নেমে গেছে, তার ওপর। আমি সৌম্যেন্দুর ছিপের ডগাটা শুধু দেখতে পাচ্ছিলুম। আর, ইন্দ্রনাথ বসেছেন আমার ডাইনে আন্দাজ চল্লিশ-পঞ্চাশ গজ দূরে। সেখানেও এমনি পাথর আছে। কিন্তু আমি ইন্দ্রনাথের ছিপটা দেখতে পাচ্ছিলুম না। ওই ঘাটটা সম্পূর্ণ আড়ালে পড়ে গেছে।…

    হ্রদের জল এখন মোটামুটি শান্ত। আমার পিছন থেকে বাতাস বইছে বলে আমার ঘাটের জলটা কাচের মতো নিভাজ আর স্বচ্ছ দেখাচ্ছিল। পশ্চিমের উপত্যকায় সেই ভুতুড়ে খনি অঞ্চল–বেশ কঁকা খানিকটা জায়গা। ঝোপঝাড় অবশ্য আছে। কিন্তু কোনও পাহাড় না থাকায় সূর্যের আলো এসে হ্রদের জলকে গোলাপি আলোয় রাঙিয়ে তুলছিল। ছিপে বসতে যে একাগ্রতার দরকার, এখন তা আর আমার নেই। মাথায় সৌম্যেন্দুর গুপ্তধন কথাটা ভেসে আসছে। বারবার পশ্চিমের ওই উপত্যকার দিকেই তাকাচ্ছি। ফাতনা স্থির হয়ে ভেসে আছে। হ্রদে প্রচুর মাছ আছে শুনেছিলাম, কিন্তু একবারও ফানা নড়তে দেখলুম না। চারে মাছ এলে বুজকুড়ি ফুটবে জলে। তারও কোনও লক্ষণ নেই। বসে থেকে বিরক্তি ধরে গেল। অনেকগুলো সিগারেট খেয়ে ফেললুম। বারকতক ছিপ তুলে টোপও দেখলুম। মাছে ঠোকর দেয়নি। ঘড়িতে তখন পাঁচটা বাজতে কয়েক মিনিট বাকি। হ্রদের জলের গোলাপি রঙ ঘিরে ধূসর কুয়াশা জেগে উঠছে। দূরের পাহাড়গুলো কালো হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। যে সব পাখি হ্রদের আকাশে ওড়াউড়ি করছিল, এতক্ষণে তারা পাহাড়-জঙ্গল লক্ষ্য করে ডানা মেলছে। হঠাৎ আমার ছিপের সুতোয় টান পড়ল এবং হুইলের ঘরঘর শব্দ শোনা গেল। ছিপটা চেপে ধরে, দেখি সুতো প্রচণ্ড বেগে জলের তলায় ছুটছে। নির্ঘাৎ কোনও প্রকাণ্ড মাছ বঁড়শি গিলেই গেঁথে গেছে, আমাকে খ্যাচ মারার সুযোগও দেয়নি।

    ছিপের ডগা বেঁকে যাচ্ছিল। সামলাতে না পেরে উঠে দাঁড়ালুম। একটু পরেই মাছটা স্থির হলো। তখন সুতো গুটোতে শুরু করলুম। মাছটা অন্তত কিলো দশকের কম হবে না। কাছাকাছি আসার পর মাছটা এক লাফ দিয়ে ডাইনে ঘুরল। তারপর পাড়ের সমান্তরালে জল ভেঙে দৌড় দিল। পাড়ের কাছাকাছি বলে এসব জায়গায় অজস্র পাথর জলের ভিতরে এবং উপরে ঘাপটি পেতে রয়েছে। ভয় হলো, নির্ঘাৎ এবার মাছটা কোনও পাথরের খাঁজে ঢুকে যাবে এবং আমার সুতোটা ছিঁড়ে ফেলবে।

    ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ইন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠলুম ইন্দ্রনাথবাবু! ইন্দ্রনাথবাবু!

    চেঁচানোর উদ্দেশ্য, মাছটা ওঁর ঘাটের দিকেই যাচ্ছে। উনি যদি এখন কোনওভাবে ওঁর বঁড়শিতে বা সুতোয় ওটাকে আটকাতে পারেন, মাছটা হাতছাড়া হবার সুযোগ পাবে না।

    আমার ডাকের পর মনে হলো উনি সাড়া দিলেন–সেটা আমার শোনারও ভুল হতে পারে। কারণ, ঠিক তখনই যা ভয় করেছিলুম–তাই হলো। সুতোটা ঢিলে হয়ে নেতিয়ে গেল। গুটিয়ে আনার পর দেখি, ফাতনাসুদ্ধ ছিঁড়ে মাছটা সম্ভবত পাথরের তলায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। ফাতনাটা খুঁজলুম। আলো কমে গেছে। এখান থেকে দেখা গেল না। তখন আরও ভাল করে দেখার জন্য ইন্দ্রনাথের ঘাটের। কাছে গেলুম।

    ঝোপ ঠেলে গিয়ে দেখি, ইন্দ্রনাথ পাথরে পা ঝুলিয়ে বসে দোলাচ্ছেন। ছিপটা তুলে পাশে রেখেছেন। জলের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। ব্যাপার কী?

    আমার পায়ের শব্দে ঘুরে তাকালেন। তারপর হো হো করে হেসে উঠলেন। আসুন, আসুন জয়ন্তবাবু। আপনারও দেখছি আমার অবস্থা হয়েছে। লেকের মাছগুলো খুব শক্তিমান। বরাবর এই কাণ্ডটি ঘটে বলে এবার বিলিতি কোম্পানির সুতো আনলুমতাও টিকল না।

    বললুম–ডাকছিলুম, শোনেননি?

    ইন্দ্রনাথ বললেন—হুঁ শুনেছি। কিন্তু তখন সাড়া দেবার ফুরসত কোথায়? চলুন–আলো কমে গেছে। আজ আর আশা নেই। কাল সকাল থেকে ফের বসা যাবে।

    দুজনে পাশাপাশি ঢালু বেয়ে ওঠা শুরু করলুম। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ইন্দ্রনাথ বললেন-সৌম্য অবশ্য আমাদের মতো আনাড়ি নয়। আমি জানি জব্বলপুর থেকে গাড়ি করে এসে ও মাছ ধরে। বিলক্ষণ অভ্যাস আছে। এজন্যেই সম্ভবত জব্বলপুর ছেড়ে যেতে চায় না।

    বললুম–দেখে আসব নাকি?

    –থাক। ও একটু গোঁয়ার প্রকৃতির ছেলে। ডিসটার্ব করলে খুশি হবে না। আসুন, আমরা বাংলোয় গিয়ে আরামে কফি খাব।…..

    বাংলোয় গিয়ে দেখি, সর্বেশ্বরী বারান্দায় বসে রয়েছেন। রঘুবীরের সঙ্গে কথা বলছেন। ভাসুরপোকে একবার দেখে বললেন–মাছ হলো না? ইন্দ্রনাথ জবাবে একটু হাসলেন মাত্র। তারপর আমরা বারান্দার উত্তরদিকে একটু তফাতে বসলুম। ইন্দ্রনাথ রঘুবীরকে বলে দিলেনকফি খাব।

    একটু পরে কফি খেতে খেতে কর্নেল ও শর্মার গলার আওয়াজ পেলুম। তখনও অন্ধকার ঘন হয়নি। গোধূলিকাল বলা যায়। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলুম কর্নেল ও শর্মা ঘাটের দিক থেকেই আসছেন। কিন্তু তাঁদের আসার মধ্যে কেমন ব্যস্ততা ছিল। খোলা বারান্দায় আমাদের দেখতে পেয়েই কর্নেল চেঁচিয়ে বললেন ইন্দ্রনাথবাবু! সৌমেন্দুবাবু ফিরেছেন?

    ইন্দ্ৰনাথ উঠে দাঁড়িয়ে বললেনা। ও এখনও ঘাটে আছে।

    কর্নেল অমনি ঘুরলেন এবং হাস্যকর ভঙ্গিতে দৌড়ে, যেদিক থেকে আসছিলেন–অর্থাৎ সেই পাথরের ধাপবন্দী ঘাটটার দিকেই চলে গেলেন। শর্মা দাঁড়িয়ে ওঁর চলে যাওয়া দেখছিলেন। ইন্দ্রনাথ ও আমি বারান্দা থেকে তক্ষুনি ওঁর কাছে চলে গেলুম।

    ইন্দ্রনাথ বললেন ব্যাপার কি মিঃ শর্মা?

    শর্মার যেন এতক্ষণে সংবিত ফিরল। ইন্দ্রনাথ! ঘাটে সৌমেন্দু নেই– ছিপটা জলে পড়ে আছে। আর…আশ্চর্য ঘাটের পাথরে একটুখানি রক্ত। আমরা ভাবলুম, মাছের রক্ত। কিন্তু… ।

    কথা শেষ করার আগেই কর্নেলের ডাক এল ইন্দ্রনাথ! মিঃ শর্মা! চলে আসুন।

    সবাই দৌড়ে গিয়ে দেখি ঘাটের ওপর দিকে ঝোপে কর্নেল দাঁড়িয়ে আছেন। ঝোপে ঢুকে আমার মাথা ঘুরে গেল। শরীর অবশ হয়ে উঠল। ইন্দ্রনাথ ভাঙা গলায় আর্তনাদ করে উঠলেন-সৌম্য!

    সৌমেনের বুকে একটা ছোরা বিধে রয়েছে। বিঁধে আছে বলেই বিশেষ রক্ত পড়েনি। চিত হয়ে ঘাসের ওপর পড়ে আছেন উনি। চোখদুটো খোলা। মুখে বিকৃত ভাব। মুহূর্তে আমার মনে পড়ে গেল, কর্নেলের মুখে শোনা সেই ছড়াটা :

    খোকন গেছে মাছ ধরতে

    ক্ষীর নদীর কূলে,

    ছিপ নিয়ে গেছে কোলাব্যাং

    মাছ নিয়ে গেছে চিলে।…

    বিন্দিয়া নামে পাঁচ মাইল দূরে একটা ছোট শহর আছে। সেখানেই থানা। ইন্দ্রনাথ সেই গাড়িটা চালিয়ে থানায় গিয়েছিলেন। ফিরলেন সাতটা নাগাদ। সঙ্গে একদল পুলিশ। অফিসার-ইন-চার্জের নাম মিঃ লাল। ভদ্রলোক খুব রাগী মানুষ। এসেই প্রথমে চোখ পড়ল রঘুবীর আর রাঁধুনী বেচারার দিকে। ধমক দিয়ে বললেন এই ব্যাটারাই খুন করেছে! শুনে ওরা ঠকঠক করে কাঁপতে ঈশ্বর-রামজী-হনুমান গণেশ তাবত দেব-দেবতার কিরিয়া খেতে থাকল। বেগতিক দেখে কর্নেল তার পরিচয়পত্রটি বের করলেন। সম্প্রতি এটি তিনি ভারত সরকারের কাছে লাভ করেছেন। এটি এতদিন ছিল না বলে তাকে নানান অসুবিধায় পড়তে হচ্ছিল। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমার পরামর্শে যোগাড় করতে হয়েছে।

    পরিচয়পত্র দেখে মিঃ লাল একটু সংযত হলেন। কিন্তু ঠোঁটে বাঁকা হাসিটা থেকে গেল। বললেন–আপনার সাহায্য পেলে খুশি হব নিশ্চয়। কিন্তু কর্নেল সরকার এ হলো মধ্যপ্রদেশের জঙ্গল। যত সব খুনে ডাকাতের আড্ডা। কথায় কথায় ওরা খুন খারাবি করে। আশা করি, খবরের কাগজ পড়ে তা আপনি বিলক্ষণ অবগত আছে। এই লোকদুটোর চেহারা দেখেই বুঝেছি এরা ঘোড়েল ক্রিমিনাল। রেকর্ড খুঁজলে নিশ্চয় সব বেরোবে। যাক্ গে, এখন আমাদের রুটিনওয়ার্কে নামতে হবে।

    টর্চের আলোয় সরজমিন তদন্ত শুরু হলো। লাশটা সেখানেই পড়ে ছিল। লাশের কাছে একটা হেরিকেন রেখে সর্বেশ্বরী, মিঃ শৰ্মা, এবং আমি এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলুম। কর্নেল বাংলোয় (লাশটা থেকে পঞ্চাশ গজ ওপরে) রঘুবীর ও রাঁধুনীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। তারপর লাশের কাছে এলেন।

    মিঃ লাল টর্চের আলো পেলে লাশ পরীক্ষা করতে করতে বললেন–মনে হচ্ছে ঘাটে মাছ ধরার সময় খুনী ছুরি মেরেছে। তারপর লাশটা টেনে এখানে এনেছে। আপনি কী বলেন কর্নেল সরকার?

    কর্নেল একটু কেসে বললেন–ঠিক তাই বটে। কিছু রক্ত পড়ে আছে।

    অমনি মিঃ লাল ও দুজন কনস্টেবল রক্ত খুঁজতে ব্যস্ত হলেন। কর্নেল আমার দিকে তাকিয়ে বললেন-জয়ন্ত, যদি অসুস্থ বোধ করো, বাংলোয় গিয়ে বিশ্রাম করো।

    অসুস্থ বোধ করা স্বাভাবিক। কিন্তু মনে হলো, কর্নেল আমাকে কোনও গূঢ় আদেশ দিচ্ছেন। অতএব ভালছেলের মতো আমি বাংলোয় চলে গেলুম।

    বাংলোর বারান্দায় একটা কাঁচটকা ল্যাম্প রয়েছে। ঘরের দরজা বন্ধ। বারান্দায় দুজন রাইফেলধারী সেপাই বসে রয়েছে। তারা আমার দিকে তাকাল মাত্র। তারপর চাপা গলায় নিজেদের মধ্যে কথা বলতে থাকল। আমি ঘরে ঢুকলাম। মোমবাতি দেখেছিলুম দিনে। দেশলাই জ্বেলে একটা ধরালাম। তারপর খাটে বসে পড়লুম।

    এ ঘরে একটা বড় বিলাতি খাট আছে তাতে কর্নেল ও আমার শোবার ব্যবস্থা হয়েছে। অন্যপাশে একটা ক্যাম্পখাট পাতা হয়েছে ইন্দ্রনাথের জন্যে। হঠাৎ চোখে পড়ল ওই খাটটার তলায় দলাপাকানো একটা কাগজ পড়ে রয়েছে। অন্যসময় হলে কিছুই ভাবতুম না। কিন্তু সদ্য খুন হয়েছে এবং কর্নেলের মতো রহস্যভেদী আছেন। সঙ্গগুণে এসব ক্ষেত্রে আমার মধ্যে গোয়েন্দা পোকা অর্থাৎ টিকটিকিটা খুব ব্যস্ত হয়ে ওঠে। অতএব তক্ষুনি কাগজটা কুড়িয়ে এনে খুলে ফেললুম। খুব পুরনো কাগজ। কোণায় ছাপানো সনতারিখ দেখেই বুঝলুম, এটা কারো ডায়েরির ছেঁড়া পাতা। তারিখটা হচ্ছে ১৭ আগস্ট ১৯৬৮ রবিবার। পাতার নিচের দিকটা ছেঁড়া। তাতে শুধু লেখা রয়েছে ইংরেজিতে: ‘C2’। খুব বড় হরফে কালো কালিতে কেউ লিখেছে। কালি পরীক্ষা করে মনে হলো খুব পুরনো।

    ধুরন্ধর গোয়েন্দার শিষ্য আমি। তাই কাগজটা পকেটে রেখে দিলুম। গুরুদেবকে দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেব। এবং এরপর স্বভাবত আমার মাথায় তদন্তের পোকাটা আরও চঞ্চল হয়ে উঠল। তখন ইন্দ্রনাথের বিছানা হাতড়াতে ব্যস্ত হলুম। আমার তদন্ত ব্যর্থ হলো। তেমন সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ল না। তলায় ওঁর একটা স্যুটকেস রয়েছে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলুম, সেটা ভোলা। তখন সাবধানে খুলে ফেললুম। কয়েকটা প্যান্টশার্ট আর দুটো হুইস্কির বোতল ছাড়া আর কিছু নেই। এই সময় বাইরে পায়ের শব্দ হতেই ঝটপট সরে এলুম।

    দরজায় দেখা দিলেন সর্বেশ্বরী। ব্যস্ত হয়ে বললুম–আসুন, আসুন মা।

    সর্বেশ্বরী ঢুকে ইন্দ্রনাথের খাটে বসে পড়লেন। সন্ধ্যা থেকেই দেখছি, উনি স্তব্ধ এবং যেন নির্বিকার কিংবা যেন ভীষণ-বিমূঢ়। ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছেন শুধু, এক ফোঁটা চোখের জল পড়তে দেখিনি। এখন চুপচাপ বসে সেই শক খাওয়া নির্বিকার চাহনিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। ভয় হলো, উনি পাগল হয়ে। যাননি তো এই আকস্মিক আঘাতে? একটু অস্বস্তি হলো। বললুম–কী সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে গেল বলুন তো! কী বলে যে আপনাকে সান্ত্বনা দেব, ভেবে পাচ্ছি না! সৌমেন্দুবাবু…

    বাধা দিয়ে সর্বেশ্বরী মুখ খুললেন এবার।–এ আমি জানতুম, বাবা জয়ন্ত।

    অবাক হয়ে বললুম–জানতেন?

    –হ্যাঁ। ওই অভিশপ্ত খনি কাকেও রেহাই দেবে না। কোনও-না-কোনও ভাবে রায়বংশের সবাইকে শেষ করবে। বলবে, কেউ ছুরি মেরেছে সৌমেন্দুকে। হ্যাঁ– মেরেছে। কিন্তু যে মেরেছে, সে নিজেও জানে না কেন ওকে ছুরি মারল।…দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের শোকমবেগ যেন:দমন করলেন সর্বেশ্বরী। ফের বললেন–আমি যা জানি তোমরা কেউ তো, তা জানো না, বাবা জয়ন্ত। বললে বিশ্বাস করবে না।:ওই অভিশপ্ত জায়গাটা কেনার কথাবার্তা চলতে চলতেই আমার ভাসুর আর বড় জা হঠাৎ মারা গেলেন–একমাস আগে-পরে। আমি বাধা দিলুম। তাই কেনা হয়নি। কিন্তু আমার স্বামী না জানিয়ে উনিশ বছর পরে কখন কিনে বসলেন। শর্মা ওর বন্ধু। শর্মাই নাকি কবে সার্ভে করে দেখেছিলেন, ওখানে মাটির তলায় অনেক সীসে আছে। তারপর তো খনির কাজ শুরু হলো। আমার কপাল ভাঙল।…

    উনি চুপ করলে বললুম–আপনারা খনি শুরু করার আগে জায়গাটা তাহলে এমনি পড়ে ছিল?

    মাথা দোলালেন সর্বেশ্বরী। তারপর বললেন–পড়ে ছিল ঠিকই। কিন্তু ব্রিটিশ আমল থেকেই গুজব রটেছিল যে ওখানে সীসের খনি আছে।

    কিন্তু তাহলে ওই উনিশ বছর ধরে কেউ খনির কাজ করেনি কেন?

    –ওখানে এক সাধু থাকতেন। তিনিই বরাবর ভূপালের নবাবকে ধরে কাকেও ইজারা নিতে দিতেন না। উনিশ বছর পরে হঠাৎ সাধু অদৃশ্য হলেন। তখন আর আমার স্বামীর পক্ষে কেনার বাধা রইল না। নবাবের এক উত্তরাধিকারীর কাছে সস্তায় কিনে ফেললেন। তখন দেশীয় রাজাদের সম্পত্তি সরকার দখল করতে শুরু করেছেন। তাই বেগতিক দেখে ওরা বেচে দিলেন। কিন্তু বাবা, তোমরা তো একালের ছেলে কিছু বিশ্বাস করো না। সাধু কিন্তু বরাবর অদৃশ্য হয়ে ওখানে বাস করতেন। এতদিনও করেছিলেন। কদিন আগে এক রাতে আমাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন–বেটি, চলে যাচ্ছি। খনির মুখ বন্ধ করে দে এবার।

    –সাধুকে আপনি কি দেখেছেন কখনও? মানে–স্বপ্নের কথা বলছি না।

    –হ্যাঁ। একবার প্রত্যক্ষ দেখেছিলুম। খানিকটা দূর থেকে। টকটকে ফর্সা রঙ-লাল জটা, দাড়ি গোঁফও লাল। একেবারে উলঙ্গ বলা যায়। চোখ দুটো নীল–হৃঙ্খল্ করছে। আমার চোখে চোখ পড়ামাত্র একটু হেসে অদৃশ্য হলেন।

    লাল জটা, দাড়ি, গোঁফ। চোখ নীল। টকটকে ফর্সা রং। মনে মনে হাসলুম। অলৌকিক পুরুষ যখন, তখন ভারতবাসীর আদর্শ চেহারা যা, অর্থাৎ একেবারে সায়েবদের মতোই হবেন বই কি। প্রায় দুশো বছর ব্রিটিশ শাসনে থেকে আমাদের চোখে যা কিছু শ্রেষ্ঠ, তা সায়েবদের ওপর আরোপ করার অভ্যাস হয়েছে।

    দুজনেই চুপ করে আছি। এক সময় সর্বেশ্বরী হঠাৎ নড়ে উঠলেন। চাপা গলায় বললেন ইন্দ্র আমার কথা শুনছে না। তুমি দেখে নিও, ওরও কী ঘটে। আমার কী?

    বলে উনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর যেমন এসেছিলেন, বেরিয়ে গেলেন। ওপাশে ঘরের দরজা খোলার শব্দ হলো। হয়তো অন্ধকারেই শুয়ে পড়লেন বিছানায়। আমি ওঁর কথাগুলো ভাবতে থাকলুম। তারপর মনে পড়ল কাগজটার কথা। C লেখা আছে। কোনও সংকেত বাক্য কি? কাগজটা কার? কে অমন করে ফেলে দিয়েছে?

    এই সময় কর্নেলদের সাড়া পাওয়া গেল। ওঁরা সবাই বারান্দায় এলে বেরিয়ে গেলুম। মিঃ লাল চেয়ারে বসে বললেন–লাশটা আর ওভাবে ফেলে রাখার মানে হয় না। কী বলেন কর্নেল সরকার? আমাদের যা দেখাশোনার ছিল, হয়ে গেছে। এবার একটা খাটিয়া নিয়ে গিয়ে ওটা আনা যাক্।

    কর্নেল বললেন–হ্যাঁ। ঠিকই বলেছেন মিঃ লাল।

    –তাহলে ইন্দ্রনাথবাবু, আপনি প্লীজ সেই ব্যবস্থাই করুন। কাল সকালের আগে অ্যাম্বুলেন্স আসার কোনও চান্স নেই। তারপর বডি মর্গে যাক্। এবার আমরা আরও কিছু জরুরী কাজকর্ম সেরে নিই।

    ইন্দ্রনাথ রঘুবীর ও রাঁধুনীকে ডেকে বাংলো থেকে একটা ক্যাম্প খাট বের করলেন। লাশের কাছে দুজন সেপাই রেখে এসেছেন মিঃ লাল। বয়ে আনতে কোনও অসুবিধা হবে না। দারোগাবাবু একটা ফাইল খুলে পেন্সিল চালনা শুরু করলেন। কর্নেল আমার হাত ধরে বললেন–চলো জয়ন্ত, আমরা একটু জিরিয়ে নিই। আজ আর ডিনার খাবার বিন্দুমাত্র আশা রেখ না। কেমন?

    ঘরে ঢুকে আমাদের খাটে বসলুম দুজনে। তারপর সেই কাগজ দিলুম ওঁকে এবং সংক্ষেপে সর্বেশ্বরীর কথাগুলোও জানালুম। কাগজটা পরীক্ষা করার পর কর্নেল পকেটে ঢোকালেন। চাপা গলায় বললেন–জয়ন্ত, আমি যা অনুমান করেছিলুম, তা যে ভুল নয়–তার প্রমাণ পেলুম।

    বললুম–কী অনুমান করেছিলেন, কর্নেল?

    কর্নেল আমার কথার জবাব না দিয়ে হাতের টর্চটা জ্বেলে মেঝেয় আলো ফেললেন। তারপর ইন্দ্রনাথের খাটের কাছে গিয়ে হাঁটু দুমড়ে বসলেন। বললেন জয়ন্ত, দেখে যাও।

    কাছে গিয়ে উঁকি মেরে দেখি, পাথরের মেঝেয় কয়েকটা দুইঞ্চি-দেড়ইঞ্চি এবং একইঞ্চি দাগ। দাগটা কালো। বললুম–ও কিসের দাগ?

    মনে হচ্ছে জুতোর গোড়ালির, কিম্বা ডগার। দেখ জয়ন্ত, আমরা বিকেলে বেরিয়ে যাওয়ার পর কেউ এ ঘরে ঢুকেছিল। সে বাইরে থেকেই এসেছিল।…বলেই কর্নেল আরেক জায়গায় আলো ফেলে অস্ফুট স্বরে বললেন–মাই গুডনেস!

    দেখি ওখানেও একই রকম দাগ। কিন্তু এই দাগগুলো সবুজ রঙের। বললুম– কর্নেল, নিশ্চয় তাহলে এসব জুতোর দাগ নয়। অন্য কিছু।

    না জয়ন্ত! এবার বুঝলুম, দুজন এসেছিল এই ঘরে। একজন এসেছিল ঘাট থেকে। ঘাটের ধাপে শ্যাওলা আছে। সবুজ দাগ তারই। কিন্তু কালো দাগ কার জুতোর? এখানে কালো মাটি আছে একমাত্র খনির ওখানে। খনিতে তো আমি আর মিঃ শর্মা এই দুজনে গিয়েছিলুম। কিন্তু, আমরা কেউ এ ঘরে আসিনি। অতএব অন্য কেউ এসেছিল। সে কে?

    কর্নেল, তখন বাংলোয় রঘুবীর, রাঁধুনী আর সর্বেশ্বরী ছিলেন। তাদের জিগ্যেস করা যায়।

    করব। তবে এটা ঠিক, ওরা কেউ এ ঘরে এলেও এই দাগগুলোর জন্য ওরা দায়ী নয়। কারণ, দাগগুলো পুরুষ মানুষের জুতোর। এবং ওই তিনজনের মধ্যে রঘুবীর আর রাঁধুনী জুতো পরে না। সর্বেশ্বরী স্লিপার পরেন। এ দাগ স্লিপারেরও নয়। স্লিপারের দাগ আরও ছোট হওয়া উচিত।

    –তাই মনে হচ্ছে।

    কর্নেল চিন্তিতমুখে উঠে এসে ফের খাটে বসলেন। তারপর বললেন– ইন্দ্রনাথবাবুকে বলেছিলুম-জব্বলপুরে একটা টেলি পাঠাতে। ওখানে সি. আই. ডি. ইন্সপেক্টরকে আমার নামে টেলি করা হয়েছে। সম্ভবত ওঁরা কেউ এসে পড়বেন আজ রাত্রে, অথবা সকালে। বলাবাহুল্য মিঃ লাল চটে যাবেন। কিন্তু উপায় কী? এই হত্যাকাণ্ড খুব সহজ ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না জয়ন্ত। এর পিছনে একটা জটিল রহস্য আছে যেন।

    হঠাৎ সৌমেন্দুর কথাটা মনে পড়ে গেল। কর্নেলকে সেটা জানালুম। শুনে উনি ঘন ঘন মাথা নাড়তে থাকলেন। তারপর বললেন–গুপ্তধন সত্যি করে থাক, বা নাই থাক–একটা গুজবের ব্যাপার নিশ্চয় আছে, তা প্রথমেই অনুমান করেছিলুম। জয়ন্ত, গুপ্তধনের গুজবের মতো ভয়ঙ্কর সর্বনেশে আর কিছু নেই।

    কর্নেল! কাগজের ওই সংকেতটা গুপ্তধনের ঠিকানা নয় তো?

    কর্নেল হেসে ফেললেন।–তোমার অনুমানে যুক্তি থাকতেও পারে। কিন্তু ডার্লিং, তাহলে ওটা অমন তাচ্ছিল্য করে কেউ ফেলে দেবে কেন?

    ফেলে দিয়েছে। কারণ, সে ভেবেছে একটা বাজে কাগজ।

    কর্নেল আমার দিকে তাকিয়ে বললেন–তোমার যুক্তিতে সারবত্তা উঁকি দিচ্ছে। খুব খুশি হলুম, জয়ন্ত।

    উনি চুরুট ধরিয়ে কী ভাবতে থাকলেন। একটু পরে বললুম–থাগে। আপনি আর ডঃ শর্মা খনিতে কী করছিলেন অতক্ষণ? হঠাৎ ঘাটের দিকেই বা গেলেন কেন? কোন পথে গেলেন?

    কর্নেল একটু হেসে বললেন–খনিটা দেখে মনে হলো, সত্যি ভূতের আড্ডা। খানাখন্দ প্রচুর। তত ঝোপঝাড়। বারোটা পিট ছিল। তিনটে বাদে সব বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনটের মধ্যে একটা ধস নেমে প্রায় বুজে গেছে। দুটো পিট এখনও খোলা। কিন্তু জঙ্গল গজিয়েছে। ভেতরে ঢোকার কথা ভাবা যায় না। শর্মা তো ভেবেই পেলেন না কোথায় ডিনামাইট বসাবেন। ও দুটোর কাছে কোনও পাথর নেই–তাছাড়া মুখগুলোর চারপাশে গভীর খাদ, জলে ভর্তি। মুখের কাছে যথেষ্ট মাটিও নেই যে ডিনামাইট চার্জ করলে ধস ছাড়বে। এক হতে পারে, সুড়ঙ্গের ওপর গর্ত খুঁড়ে ডিনামাইট বসানো। কিন্তু সুড়ঙ্গ কোন পথে কী ভাবে মাটির তলায় গেছে, না জানলে তো কিছুই করা সম্ভব নয়। ওপর থেকে বুঝবে কী করে?

    সুড়ঙ্গে ঢোকা যায় না?

    –যায়। কিন্তু তখন যথেষ্ট আলো নেই। তাছাড়া ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস থাকতে পারে। না পরীক্ষা করে ঢোকা যায় না। অবশ্য, আমরা দুজনে সুড়ঙ্গের অন্য মুখ আছে কি না খুব তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। পাইনি। শর্মার তো পরিচিত জায়গা। উনি কোনও মুখ দেখেননি। এবারও দেখতে পাননি।

    অন্যমুখ ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না কর্নেল।

    কর্নেল ব্যাখ্যা করে বললেন–পোড়ো খনির সুড়ঙ্গে জীবজন্তুরা বাসা বাঁধে। তাছাড়া প্রাকৃতিক কারণেও কোনও জায়গায় ফাটল দেখা যায়। জীবজন্তুদের স্বভাব হচ্ছে, ঢোকার মুখ পেলেই সহজাত প্রবৃত্তি অনুসারে বেরিয়ে যাবার একটা মুখ খোঁজে। না থাকলে নখের আঁচড়ে গর্ত করে সেটা বানিয়ে নেয়। সজারু ইত্যাদি কয়েক রকম গর্তবাসী প্রাণীর এ অভ্যেস আছে। আমরা ওখানে অজস্র সজারুর কাটা পড়ে থাকতে দেখেছি বলেই অন্যমুখ খুঁজছিলুম। কিন্তু তেমন কিছু দেখলুম না। হয়তো ছোট্ট ফোকর থাকতে পারে–তা দিয়ে মানুষ ঢোকা বা বেরুনো অসম্ভব।

    বাইরে লাশটা এসেছে। আমরা বেরিয়ে গেলুম। চাদরে ঢাকা লাশটা বারান্দায় খাটিয়াতে রাখা হচ্ছিল। সর্বেশ্বরী তখনও ঘরের ভেতরে আছেন। ভেতরে অন্ধকার। শর্মা দারোগাবাবুর সামনে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। সম্ভবত প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন এতক্ষণ।

    কর্নেল গিয়ে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। ইন্দ্রনাথ এদিকের ঘরে এসে ঢুকলেন। আমি একটু দাঁড়িয়ে থাকার পর ইন্দ্রনাথের সঙ্গে কথা বলতে ফিরে এলুম। ঘরে ঢুকে দেখি, ইন্দ্রনাথ ব্যস্তভাবে বিছানা হাতড়াচ্ছেন। বললুম–কী খুঁজছেন?

    ইন্দ্রনাথ কোনও জবাব না দিয়ে স্যুটকেসটা টানলেন। তারপর বলে উঠলেন—হুঁ। যা ভেবেছিলুম, তাই!

    কী মিঃ রায়?

    ইন্দ্রনাথ গম্ভীর মুখে উঠে তার খাটে বসলেন। বললেন–নিশ্চয় সৌম্যের কাজ। আমি যখন ঘাটে ছিলুম, ও এসে স্যুটকেসের তলা ভেঙেছিল। এ ছাড়া আর কে ভাঙবে?

    -কেন বলুন তো ইন্দ্রনাথবাবু!

    ইন্দ্রনাথের মুখটা লাল হয়ে উঠল। নিজেকে সংযত করে আস্তে আস্তে বললেন–ওর মাথায় একটা অদ্ভুত বোকামি ঢুকে পড়েছিল। ও ভাবত, খনিতে কোনও গুপ্তধন আছে এবং তার সন্ধান আমার হাতে আছে। বরাবর সুযোগ পেলেই আমার জিনিসপত্র হাতড়ানো অভ্যাস ছিল ওর।

    ওঁকে সেই কাগজের কথাটা বলার জন্যে খুব ইচ্ছে সত্ত্বেও চেপে গেলুম। কিন্তু আমার মাথায় টিকটিকির উৎপাত। তাই কৌশলে প্রশ্ন করলুম-কিছু খোওয়া গেছে দেখলেন, মিঃ রায়?

    ইন্দ্রনাথ গম্ভীর হয়েই জবাব দিলেন–হ্যাঁ। কলকাতায় বড়শি কেনার সময় দোকানদার আমাকে একটুকরো কাগজের মোড়কে সেটা জড়িয়ে দিয়েছিল। এখানে এসে মোড়কটা খুলে দেখি, ওটা একটা ডাইরি বইয়ের ছেঁড়াপাতা। লেখা ছিল C? ইংরেজি হরফে। কিন্তু তারিখটা দেখে অবাক হয়েছিলুম। ১৯৬৮ সালের ১৭ আগস্ট, রবিবার। ওইদিনই কাকা মারা যান। এটা নিছক দৈবাৎ যোগাযোগ ছাড়া কিছু নয়। তবু মনটা একটু দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ওটা বালিশের তলায় এমনি-এমনি রেখে দিয়েছিলুম। সেটা এখন আর পাচ্ছি না।

    এবার আর না বলে পারলুম না যে ওটা দলাপাকানো অবস্থায় আমিই পেয়েছি এবং কর্নেলকে দিয়েছি। শুনে ইন্দ্রনাথ হতাশভাবে মাথাটা দোলালেন। বললেন– বেশ বুঝতে পারছি। সৌম্যই ওটা হাতড়ে বের করেছিল। তারপর মাথামুণ্ডু বুঝতে পেরে ফেলে দিয়েছিল দলা পাকিয়ে। হয়তো ভেবেছিল, Cকথাটা মুখস্থ রাখা যখন সোজা, তখন কেন চুরি করি দাদার কাছ থেকে?

    কিন্তু যেভাবে ছিল, সেভাবেই রাখতে পারত?

    সৌম্যের স্বভাব এই। সহজে রেগে যেত। অদ্ভুত অদ্ভুত ভাবনা নিয়ে থাকত। খুব খেয়ালী ছেলে ও। ভেবে কোনও কাজ করা ওর স্বভাবে ছিল না।

    হঠাৎ কর্নেল ঢুকে বললেন ইন্দ্রনাথবাবু, রঘুবীর আর রাঁধুনী লোকটাকেই মিঃ লাল আসামী হিসেবে চালান দিচ্ছেন। আমার কোনও কথা কানে তুললেন না।

    ইন্দ্রনাথ উত্তেজিতভাবে বললেন–সে কী! কেন?

    রাঁধুনীই বিপদটা ডেকে আনল। সৌম্যেন্দুকে যে ছুরিটা মারা হয়েছে, সেটা নাকি কিচেনেরই ছুরি। বিকেল থেকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাছাড়া একবার নাকি রঘুবীর বিকেলে কিচেনে ঢুকে ছুরিটার খোঁজ করেছিল।

    ইন্দ্রনাথ বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল আমার পাশে বসে বললেন–তোমাদের আলোচনার শেষাংশ আমি শুনে নিয়েছি, জয়ন্ত। না–এ জন্যে লজ্জা পাবার কিছু নেই। তুমি মুখটা অমন হাঁড়ি করো না। এবার একটা অদ্ভুত ব্যাপার শোনো। বঁড়শি একটা মোড়কে ছিল, তা সত্যি। কিন্তু সেই ওরিজিন্যাল মোড়ক বদলে এখানে আসার পর কেউ দ্বিতীয় মোড়কটা পাচার করে। ওরিজিন্যালটা আমি এইমাত্র কুড়িয়ে পেয়েছি বারান্দার নিচে। এই দেখ।

    মোড়কটা দাদহাজার বিজ্ঞাপনের কাগজ। দেখে নিয়ে বললুম–মোড়ক বদলানোর উদ্দেশ্য কী?

    ইন্দ্রনাথকে সম্ভবত উত্যক্ত করা।

    বুঝলুম না।

    –সি স্কোয়ার কথাটা এবং ওই তারিখ সম্ভবত ইন্দ্রনাথের ওপর কেমন প্রভাব সৃষ্টি করে কেউ দেখতে চেয়েছিল। বলা বাহুল্য, ইন্দ্রনাথ কিছুটা প্রভাবিত হয়েছিলেন বই কি।

    -কিন্তু কে সে?

    –যে ছুরি চুরি করেছে এবং সৌম্যেন্দুকে হত্যা করেছে। সে ছাড়া নিশ্চয় আর কউ নয়। এবং যে দু-ধরনের দাগ মেঝেয় আছে, তার মধ্যে সবুজ দাগ যদি ৗম্যেন্দুর জুতোর হয়, কালো দাগ নিশ্চয় সেই অজ্ঞাত ব্যক্তির জুতো থেকে য়েছে।

    কর্নেলের এই কথায় রহস্যের জট আরও পাকিয়ে গেল। আমি গুম হয়ে রইলুম। এমন অদ্ভুত হত্যাকাণ্ডের পাল্লায় কখনও পড়িনি।..

    ডিনার খাওয়া হবে না জানতুন। বিস্কুট আপেল আর কফি খেয়ে শুয়ে পরলুম। আমরা। মিঃ লালের সবুর সইছিল না। আসামী দুজনকে নিজের জীপে তিনজন কনস্টেবলের সঙ্গে চালান দিলেন সেই রাত্রেই। দুজন কনস্টেবল লাশের কাছে। পাহারায় রাখলেন এবং ডাইনিং টেবিলে বিছানা করে আরামে নাক ডাকাতে থাকলেন। ডাইনিংয়ের ওপাশে দুটো রুমের একটায় সর্বেশ্বরী, অন্যটায় শর্মা শুতে গেলেন। এ পাশের রুমে আমি, কর্নেল ও ইন্দ্ৰনাথ শুয়ে পড়লুম। বারান্দায় সেই ল্যাম্পটা জ্বলতে থাকল। বেচারা কনস্টেবল দুজনের জন্য আমার দুঃখ হচ্ছিল। কিন্তু মিঃ লালের কাছে ডিউটি ইজ ডিউটি।

    শুয়ে জঙ্গলে রাতচরা জানোয়ারের ডাক শুনতে পাচ্ছিলুম মাঝে মাঝে। ঘুম আসছিল না। পাশে কর্নেলের কিন্তু দিব্যি নাক ডাকছে। জানালার পর্দার ফাঁকে তারা দেখা যাচ্ছে। তারপর একসময় হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে গেছি, কে জানে!

    হঠাৎ এক সময় ঘুম ভেঙে গেল। জেগে ওঠার পর টের পেলুম বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু গাছপালা থেকে জলের ফোঁটা ঝরে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে আমার সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস আছে। সিগারেট ধরিয়ে দেশলাইয়ের আলোয় কোণার দিকে ইন্দ্রনাথকে দেখার চেষ্টা করলুম। দেখতে পেলুম না। ওঁর বিছানা খালি। তখন মাথার কাছ থেকে টর্চটা নিয়ে সাবধানে জ্বাললুম। ইন্দ্রনাথ নেই। বাথরুমে ঢুকেছে কি? কিন্তু বাথরুমের দরজা বাইরে থেকেই বন্ধ। তখন ঘরের দরজায় আলো ফেললুম। দরজার ছিটকিনি খোলা কপাট দুটো ঠেস দেওয়া রয়েছে। তার মানে ইন্দ্রনাথ বেরিয়েছেন।

    আলো নিভিয়ে কর্নেলের গায়ে হাত রাখলুম। অমনি আমার হাতটা চেপে ধরে ফিসফিস করে বললেন–চুপচাপ শুয়ে থাকো।

    তাহলে কর্নেল জেগে আছেন! নিশ্চয় সব লক্ষ্য করছেন কখন থেকে। উত্তেজনায় অধীর হয়ে শুয়ে রইলুম।

    প্রায় দুঘণ্টা কেটে গেল। সময় যে আসলে এত দীর্ঘ, তা এই প্রথম জানলুম। তারপর দরজাটা নিঃশব্দে ফাঁক হলো, বাইরের আলো এল একটুখানি। দেখলুম ইন্দ্রনাথ ঢুকছে। খালি গা, পরনে শুধু আণ্ডারওয়্যার, পায়ে কেডস। ওঁর হাতে যা দেখলুম, তাতে গা শিউরে উঠল। একটা রিভলভার।

    ইন্দ্রনাথ নিঃশব্দে দরজাটা এঁটে দিলেন। তারপর অন্ধকারে কীভাবে জুতো খুলে শুলেন, টের পেলুম না। একটু পরেই শুনি ওঁর নাক ডাকছে। তখন খুব হাসি পেল। কর্নেলকে খুঁচিয়ে দিলুম। কর্নেলও শুনি এবার নাক ডাকাচ্ছেন। অদ্ভুত লোক তো!

    এইসময় আবার বৃষ্টি এল। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে আমার ঘুমের সম্পর্ক নিশ্চয় নিবিড়। ফলে আবার চোখের পাতা খুঁজে এল।

    কী একটা স্বপ্ন দেখছিলুম, হঠাৎ স্বপ্নটা ছিঁড়ে এবং ঘুমটাকে বরবাদ করে কোথাও কোনও জন্তু গর্জে উঠল যেন। জাগার সঙ্গে সঙ্গে টের পেলুম ইন্দ্রনাথ উঠে দাঁড়িয়েছেন এবং আলো জ্বেলেছেন। আমাকে জাগতে দেখে বললেন–আসুন তো জয়ন্তবাবু, পাশের ঘরে কী গণ্ডগোল হচ্ছে মনে হলো।

    কিছু একটা হচ্ছে তা ঠিকই। ধস্তাধস্তির এবং চাপা গর্জনের আওয়াজ। ঘুরে দেখি কর্নেল নেই বিছানায়। বেরিয়ে গেছেন। আমিও বেরোলুম। বারান্দায় যেতেই ডাইনিং থেকে মিঃ লালের চিৎকার শুনলুম–হ্যাণ্ডস আপ!

    বারান্দায় যে সেপাই লাশের পাশে ঘাড় গুঁজে একটা কম্বলে পড়ে ছিল, তারা আচমকা জেগে রাইফেল বাগিয়ে ধরল। মিঃ লাল ফের চেঁচালেন বুধন সিং! সূরযলাল! মেরা টারচ খো গ্যয়া। জলদি বাত্তি লে আও!

    কয়েক সেকেণ্ডে এসব ঘটে গেল। বারান্দা থেকে ল্যাম্পটা নিয়ে সেপাইরা ডাইনিংয়ে ঢুকল। আমরাও ঢুকলুম। ঢুকে হাঁ করে তাকালুম। এ এক অদ্ভুত দৃশ্য।

    কর্নেল দেয়ালে পিঠ রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন–দুহাত মাথার ওপরে তোলা। রাতের জামা ছিঁড়ে ফর্দাফাই। ঝুলছে কোমরের নিচে অব্দি। মুখে অপ্রস্তুত হাসি।

    তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে মিঃ লাল রিভলভার তুলে শাসাচ্ছেন। আর কোনও কথা শুনব না। দেখেই আঁচ করেছিলুম, এ ব্যাটা নিশ্চয় একজন এক নম্বর চারশো বিশ। আমার চোখ এড়িয়ে যাবে? কত খুনী জোচ্চোর দেখলুম অ্যাদ্দিন!

    খুব রাগ হলো আমার। বললুম–দেখুন মিঃ লাল, আপনি ভুল করছেন। উনি বিখ্যাত প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। ওঁর পরিচয়পত্র আপনি দেখেছেন। ওঁকে এভাবে অপমান করাটা আপনার মোটেও উচিত হচ্ছে না। এর জন্য আপনাকে জবাবদিহি করতে হবে কিন্তু!

    মিঃ লাল তুমুল গর্জন করে বললেন–ইউ শাট আপ! আপনাকেও আমি ও ব্যাটার সহযোগী বলে গ্রেপ্তার করব।

    ইতিমধ্যে দুপাশের দুটো দরজা খুলে সর্বেশ্বরী এবং মিঃ শর্মা বেরিয়ে হতভম্ব হয়ে তাকাচ্ছেন। ইন্দ্রনাথ বললেন মিঃ লাল, ব্যাপারটা কী হয়েছে বলুন তো?

    মিঃ লাল হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন–মশাই, আমার এক চোখ ঘুমোয়, অন্য চোখ জাগে। কপাট ফাঁক করে ও ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে টের পেয়েছি কী মাল! : ভাবলুম কী করে দেখা যাক। ও করল কী, একটা ক্ষুদে টর্চের সাহায্যে দেয়াল হাতড়ানো শুরু করল। তারপর দেখি, ওই দেয়াল আলমারিটার একটা ড্রয়ার টানাটানি করছে। তারপর ড্রয়ার খুলে ফেলল দেখলুম। কী একটা বের করল। তখন আমি নেমে পা টিপে টিপে টেবিলের পিছনে গেলুম। যেই বাছাধন আসা, অমনি জাপটে ধরলুম। ভুল করে টর্চটা হাতে নিইনি। যাই হোক, ব্যাটার গায়ে অসুরের বল। জুডোর প্যাঁচে আমাকে ছিটকে ফেলে দিলে। আমি ওর জামা খামচে ধরেছিলুম। ওই দেখুন না। তারপর উঠে এক লাফে বিছানায় গিয়ে রিভলভার হাতে নিলুম।….

    কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন–আপনি ভুল করছেন মিঃ লাল। আমি আপনাকে ফেলে দিইনি। বরং আপনিই আমাকে….

    শাট আপ! গর্জালেন মিঃ লাল।

    সর্বেশ্বরীকে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে দেখলুম। মিঃ শর্মা এগিয়ে এসে বললেন–ড্রয়ার থেকে উনি কী বের করেছেন, সেটা এবার সার্চ করা উচিত মিঃ লাল। জয়দীপ আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তার ড্রয়ারে উনি কেন রাতদুপুরে হাত ভরতে গেলেন জানা দরকার।

    মিঃ লাল এগিয়ে কর্নেলের রাতের পাজামার পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা কালো বাঁধানো নোটবই কিংবা ডায়রি বের করে নিলেন। মিঃ শর্মা এবং ইন্দ্রনাথ দুজনে একই সঙ্গে হাত বাড়িয়ে বললেন–দেখি, দেখি ওটা কী?

    মিঃ লাল হয়তো ওঁদের একজনের হাতে দিয়েই ফেলতেন বইটা। কিন্তু : কর্নেল এক লাফে সরে এসে বাধা দিলেন।খবরদার মিঃ লাল! এই ডায়রি ওঁদের হাতে দেবেন না। এটা একটা ভেরি ইমপরট্যান্ট ডকুমেন্ট!

    মিঃ লাল রিভলভার তুলে বললেন হ্যাঁণ্ডস্ আপ। নয়তো গুলি ছুঁড়ব!

    অমনি কর্নেল দুহাত তুলে দাঁড়ালেন। আমি হাসব না কাদব ভেবে পেলুম না। ওই অবস্থায় দাঁড়িয়ে কর্নেল ফের বললেন–মিঃ লাল, প্লীজ! ওই ডায়রি সরকারের সম্পত্তি। কারো হাতে দিলে আপনিই বিপদে পড়বেন। আর দু-এক ঘণ্টার মধ্যে ডিটেকটিভ ডিপার্টের অফিসাররা এসে পড়বেন জব্বলপুর থেকে। ততক্ষণ আপনার অপেক্ষা করা কর্তব্য।

    মিঃ লাল অমনি ভড়কে গিয়ে বললেন–ডিটেকটিভ ডিপার্টের লোক আসবে? তার মানে?

    ইন্দ্রনাথ বললেন–হ্যাঁ। আমি টেলিফোন করে এসেছি কর্নেলের কথায়।

    মুখ বিকৃত করে মিঃ লাল বললেন–ভাল করেছেন! এবার দেখুন মশা মারতে কামান দেগে কী অবস্থা হয়। সব জড়িয়ে পড়বেন মাইণ্ড দ্যাট! একজন জোচ্চোরের কথায় আপনি……

    বাধা দিয়ে বললুম–মিঃ লাল, আবার আপনি অন্যায় করছেন। ওঁকে এসব কদর্য কথা বলার জন্যে আপনাকে জবাবদিহি করতে হবে।

    এবার মিঃ লাল আর গর্জালেন না। গম্ভীর মুখে বললেন–আপনিও ভাববেন যে জার্নালিস্ট বলে আপনি বেঁচে যাবেন। ইয়েস–লেট দেম কাম। কিন্তু ততক্ষণ এই লোকটা আর আপনি দুজনেই এই ঘরে বসে থাকুন। ইউ আর আণ্ডার অ্যারেস্ট।

    কর্নেল আমাকে চোখ টিপলেন। হাসি টিপে বললুম–বেশ। কিন্তু দেখতেই তো পাচ্ছেন, উনি বুড়োমানুষ ওভাবে হাত তুলে কতক্ষণ থাকবেন?

    মিঃ লাল ধমক দিয়ে বললেন–হ্যাণ্ডস ডাউন।

    ঘরের ভেতর বসে নিঃশব্দে আমরা ভোরের প্রতীক্ষা করতে থাকলুম। তখন রাত চারটে বেয়াল্লিশ। বৃষ্টি সমানে পড়ছে।……

    ভোরেই আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। মিঃ লাল টেবিলের বাতির সামনে সেই কালো নোটবই পড়ছিলেন আর মাঝে মাঝে আমাদের দিকে ঘুরে তাকাচ্ছিলেন। দুজন সেপাই দরজায় বন্দুক বাগিয়ে পাহারা দিচ্ছিল। কিন্তু অবাক লাগল, শর্মা এবং ইন্দ্রনাথ ও ঘর ছেড়ে শুতে যাননি। দুটি লুব্ধ জন্তুর মতো মিঃ লালের নোটবইটার দিকে তাকিয়ে ঠায় বসে থাকলেন। আমরা দুজন তো মিঃ লালের বন্দী, তাই ঘর ছাড়ার প্রশ্ন ওঠে না। বেচারা কর্নেলের জন্য দুঃখ হচ্ছিল। ওঁর হাতির বরাত, এমন মশা বনে যেতে কখনও দেখিনি! চালে ভুল করেই এই দুর্দশায় পড়েছেন। দোর্দণ্ডপ্রতাপ মিঃ লালের খপ্পরে এভাবে পড়ে যাবেন, ভাবেননি। ভাবছিলুম, কর্নেলকে যথেষ্ট বকে দেব। নির্ঘাৎ এবার ওঁকে বাহাওরে ভীমরতি ধরেছে! এভাবে সেখানে যা খুশি করে ফেলে নিজেও বিপদে পড়বেন– আমাকেও ফেলবেন। কোনও মানে হয় না!

    কিন্তু ওঁর মুখটা নির্বিকার। মিটিমিটি হাসছেন আর হাসছেন। কী লোক রে বাবা!

    সবে পুবের আকাশ লাল হয়ে উঠেছে, মিঃ লালের পড়া শেষ হলো। নোট বইটা বুজিয়ে কর্নেলের দিকে ঘুরলেন। বললেন, বোঝা গেল শ্রীমান চারশো বিশের আগমনের উদ্দেশ্য। ইন্দ্রনাথবাবু, মিঃ শর্মা! আপনাদের সাক্ষ্যের ওপর সব নির্ভর করছে–মাইণ্ড দ্যাট।

    ইন্দ্রনাথ বললেন–মিঃ লাল, কী লেখা আছে ওতে বলবেন কি?

    মিঃ লাল কী বলতে যাচ্ছিলেন, কর্নেল বাধা দিলেন। মিঃ লাল, আবার। আপনাকে, আমি সতর্ক করে দিচ্ছি। ওই ডায়রি বইটা সৌম্যেন্দুর হত্যকাণ্ডের ব্যাপারে একটা মূল্যবান দলিল।

    মিঃ লালের ঠোঁট ফাঁক হলো, কিন্তু কথা বেরুবার আগেই দরজা খুলে ফের সর্বেশ্বরী বেরুলেন। মনে হলো, বৃদ্ধা এতক্ষণ ঘুমোননি। জেগেই ছিলেন। বললেন– মিঃ লাল, ওই ডায়রিটার কথা আমি জানতুম। ওটা আমার স্বামীর ডায়রি। ওতে কী আছে, তা আমার স্বামী অবশ্য কখনও জানাননি–জানতেও চাইনি। এখন মনে হচ্ছে, ওর মধ্যে এমন কিছু আছে–যার জন্য সৌম্যেন্দুর প্রাণ দিতে হলো। ওটা কি আমাকে একবার দেখতে দেবেন?

    মিঃ লাল কর্নেলের মুখের দিকে তাকিয়ে দ্বিধাজড়িত স্বরে বললেন কিন্তু এটা এখন আদালতের একজিবিট হবার যোগ্য। তাই আপনাকে দেখানো যাবে কি?

    কর্নেল বললেন–ওঁকে একবার পড়তে দিতে আমার আপত্তি নেই। কারণ উনিই এই হত্যাকাণ্ডের মামলার প্রধান সাক্ষী হবেন।

    –আপনি থামুন! বলে মিঃ লাল সর্বেশ্বরীর দিকে ঘুরলেন। মিসেস রায়, এটা আমার হাতেই থাকবে। আপনি এখানে এসে পড়ে দেখুন।

    সর্বেশ্বরী এগিয়ে গিয়ে টেবিলের পাশে দাঁড়ালেন। মিঃ লাল ডায়রিটা খুলে ধরলেন। কয়েক পাতা পড়ার পর সর্বেশ্বরীর মুখে অদ্ভুত ভাবান্তর লক্ষ্য করলুম। মনে হলো, উনি খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন। ঠোঁট কামড়ে ধরেছেন। আমরা সবাই চুপচাপ ওর দিকে তাকিয়ে আছি।

    পড়া শেষ হলে সর্বেশ্বরী কর্নেলের দিকে ঘুরে বললেন-কর্নেল সরকার! আপনি কীভাবে এটার খোঁজ পেলেন বলবেন কি?

    কর্নেল বললেন-বলতে আপত্তি নেই। কিন্তু তার আগে দয়া করে আমার প্রশ্নের জবাব দিন। এই সংকেতটি কি আপনার পরিচিত?

    সর্বেশ্বরী ভুরু কুঁচকে বললেন—হ্যাঁ। কেন?

    –এর অর্থ কি আপনি জানতেন?

    না। কারণ, আমার স্বামী এর অর্থ আমাকে জানাননি। তিনি বেশ কয়েকদিন আমাকে বলেছিলেন–যদি আমি হঠাৎ মারা পড়ি, তুমি C? এই কথাটা মনে রাখবে এবং সৌম্যেন্দুকে জানাবে। ওর সব কথাই ওই রকম হেঁয়ালিতে ভরা থাকত। ভাবতুম ড্রিঙ্কস-এর ঘোরে আবোল তাবোল বকছেন।

    –সৌম্যেন্দুকে আপনি জানিয়েছিলেন?

    -হ্যাঁ। ওর মৃত্যুর পর জানিয়েছিলুম। সৌম্যেন্দু হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। বলেছিল-কাকামশাইয়ের পাগলামি!

    কর্নেল ইন্দ্রনাথকে জিগ্যেস করলেন–আপনি এর আগে C? কথাটা শুনেছিলেন?

    ইন্দ্রনাথ গম্ভীরমুখে বললেন না। এখানে আসার পর বঁড়শির মোড়কে লেখা দেখেছিলুম।

    কর্নেল সর্বেশ্বরীকে বললেন–মিসেস রায়, লুকোবার কারণ নেই। এবার বলুন তো, আপনিই ইন্দ্রনাথ বাবুর বড়শির মোড়ক বদলে C? লেখা ডায়রির একটা পাতা ও ঘরে রেখেছিলেন কি না?

    সর্বেশ্বরী মুখ নামিয়ে জবাব দিলেন–হ্যাঁ। আমার স্বামী যেদিন মারা যান, সেদিনই আনমনে কথাটা অন্য একটা ডায়রির পাতায় আমি লিখেছিলুম। ইন্দ্রনাথ এবার এখানে আসার পর আমার সন্দেহ হলো যে নিশ্চয় একটা কিছু ঘটতে চলেছে–যার কোনও কিছু আমি জানি না। তাই ওই পাতাটা ওর নজরে এনে দেখতে চেয়েছিলুম, ও কী করে।

    ইন্দ্ৰনাথ শুকনো হেসে বললেন–অবাক হয়েছিলুম তারিখটা দেখে। কিন্তু ওই কথাটার মানে কী, আমি তো জানতুম না। এখনও জানি না।

    কর্নেল মিঃ শর্মার দিকে ঘুরে বললেন–আপনি কিছু জানতেন?

    শর্মা অন্যমনস্ক ছিলেন যেন। চমকে উঠে মাথা দোলালেন। ওদিকে মিঃ লাল এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিলেন। এবার হাত নেড়ে বললেন–খুব হয়েছে। এটা আদালত নয় এবং ওই লোকটা সরকারী কৌসুলী নয়। সে অধিকার আমি ওকে দিইনি।

    সেই সময় বাইরে জিপের গর্জন শোনা গেল। তখন সূর্যের হাল্কা আলো এসে লন পেরিয়ে বারান্দা ছুঁয়ে ঘরে ঢুকছে। দুটো জিপ দেখা গেল লনে। তারপর ক’জন পুলিশ অফিসার এবং দুজন সিভিলিয়ানের পোশাক পরা ভদ্রলোক জিপ থেকে নেমে বারান্দায় উঠলেন। একজন ঢুকতে ঢুকতে বললেন কই? কোথায় আমাদের মাননীয় কর্নেল সাহেব?…ও হ্যাল্লো! হ্যাল্লো! হ্যাল্লো!

    আমি অবাক হলুম না। মিঃ লাল ভীষণ অবাক হলেন নিশ্চয়। কর্নেলের হাত ধরে সেই ভদ্রলোক চেঁচিয়ে উঠলেন–একি কর্নেল সরকার! আপনার এ অবস্থা কেন?

    কর্নেল স্মিত হেসে বললেন–ও কিছু না মিঃ আচারিয়া! ও কিছু না! আপনি কেমন আছেন? ইস! দীর্ঘ ছ-সাত মাস পরে দেখা। তাই না?

    মিঃ আচারিয়া তখনও অবাক। আমি এবার মিঃ লালের কীর্তি ফাঁস করতে যাচ্ছি, টের পেয়েই কর্নেল আমার হাত ধরে বললেন–মিঃ আচারিয়া, আগে আলাপ করিয়ে দিই আমার এই তরুণ বন্ধুর সঙ্গে। জয়ন্ত চৌধুরী কলকাতার প্রখ্যাত সংবাদপত্র দৈনিক সত্যসেবকের রিপোর্টার। জয়ন্ত, ইনি আমার এক বন্ধু ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ চন্দ্রমোহন আচারিয়া।

    আড়চোখে তাকিয়ে দেখি মিঃ লাল ফোঁস ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলছেন এবং সূর্যোদয়ই দেখছেন হয়তো।

    হঠাৎ সর্বেশ্বরী বলে উঠলেন–আপনারা বসুন, প্লীজ। আমি আপনাদের কফির ব্যবস্থা করি। কেউ কিছু বলার আগেই বৃদ্ধা কিচেনের দিকে চলে গেলেন।…

    ডায়রিতে কী লেখা ছিল, পরে জেনেছিলুম। কিন্তু ঘটনা আগাগোড়া সাজানোর খাতিরে সেটা এখানেই দেওয়া হলো। সংক্ষিপ্তভাবেই বলছি :

    জগদীপ রায় একবার বোম্বাইয়ের এক পানশালায় হিগিনস নামে একজন প্রাক্তন ব্রিটিশ যোদ্ধার সঙ্গে পরিচিত হন। হিগিনস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লেফটন্যান্ট মেজর ছিলেন। ভারতের স্বাধীনতার পরও তিনি এদেশে থেকে যান। এবং অবসর নেন। হিগিনস বেজায় মদ খেতেন। সেই পানশালায় জগদীপের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সময় তখন ওঁর প্রচণ্ড মাতাল অবস্থা। তখন জগদীপ ওঁকে ওঁর বাসায় পৌঁছে দিতে যান। হিগিনস ব্যাচেলার ছিলেন। যাইহোক, গাড়িতে নিয়ে যাবার সময় এবং বাসায় গিয়ে নেশার ঘোরে এমন কিছু কথা বলেন, জগদীপের তাক লেগে যায়।

    হিগিনস যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রদেশের এই এলাকার এক রাজপ্রাসাদে ছিলেন। বলাবাহুল্য বাড়িটি এক দেশীয় রাজার এবং তা ব্রিটিশ সরকার সেনানিবাস হিসেবে ব্যবহার করার জন্য দখল করে নেন। সেই বাড়িতে যেভাবেই হোক, হিগিনস এবং তিনজন সহযোদ্ধা মিলে একটি বাক্স পেয়ে যান। বাক্সে সোনাদানা হীরে জহরত ছিল বোঝাই হয়ে। এই গুপ্তধন পাওয়ার পর সমস্যা দেখা দেয়। সবার চোখ এড়িয়ে এগুলো ভাগাভাগি করা কঠিন। কারণ সেনানিবাসে সব সময় ভিড়। তাছাড়া কাকে কোন মুহূর্তে কোথায় পাঠানো হবে, ঠিক নেই। ধনসম্পদের ভাগ নিয়ে রাখবেন কোথায়? চার বন্ধু মিলে এই চিরিমিরি জঙ্গলে এসে লেকের পশ্চিম উপত্যকায়–যেখানে পরে সীসের খনি খোঁড়া হয়, সেখানে। পুঁতে রাখেন। কথা রইল–যুদ্ধ শেষ হলে ওটা ভাগাভাগি করে নেওয়া হবে। ঘটনাচক্রে বর্মা ফ্রন্টে হিগিনস বাদে সবাই মারা পড়েন। হিগিনস ফিরে এসে গুপ্তধনের খোঁজ করেন। কিন্তু তিনবছরের মধ্যে এক ভূমিকম্পে উপত্যকার মাটি ওলটপালট হয়ে গেছে। ফলে হিগিনস খুঁজে বাক্সটা বের করতে পারেননি। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসকরা চলে গেলেন। কিন্তু বাধ্য হয়ে হিগিনসকে থাকতে হলো। এখন তাঁর একমাত্র কাজ, বারবার চিরিমিরি উপত্যকায় যাওয়া এবং অনুসন্ধান।

    গুপ্তধনের প্রতি মানুষের প্রচণ্ড নেশাধরানো লোভ আছে। জগদীপ সেই লোভে পড়ে গেলেন এবং গোপনে একা তল্লাস শুরু করলেন। কিন্তু বারবার ওখানে শিকার কিংবা ছিপে মাছধরার অজুহাত কাঁহাতক দেখানো যায়। বিশেষ করে ক্রমাগত সপ্তাহ কিংবা মাসও লেগে যেতে পারে। অতএব উনি ফন্দি আঁটলেন। অনন্তরাম শর্মা ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং খনি ইঞ্জিনিয়ার। ওই উপত্যকায় কোনও খনিজ সম্পদ থাকা সম্ভব বলে মনে হয়েছিল জগদীপের। ওঁর ভাগ্য ভাল শর্মা মাটি পরীক্ষা করে জানালেন, তলায় সীসের খনি আছে। জগদীপ ভূপালের নবাবের কাছে বন্দোবস্ত নিলেন জায়গাটার। খনির কাজ শুরু হলো। কিন্তু সেই গুপ্তধনের কোনও সন্ধান পাওয়া গেল না।…….

    এরপর জগদীপের নিজের ভাষায় ডায়রির শেষাংশ তুলে দিচ্ছি। তারিখ ১৬ আগস্ট। অর্থাৎ ওঁর মৃত্যুর আগের দিন।

    ..আজ আমি জীবনের এক ভয়ঙ্করতম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলুম। শেষ তিনটি পিট সাবধানতার জন্য বুজিয়ে দেওয়া দরকার। তাই শর্মাকে নিয়ে বেরিয়েছিলুম। শর্মা কিছুক্ষণ পরীক্ষার পর মাছ ধরতে গেল লেকে। আমি বিষণ্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এতগুলো বছর আমার বৃথা চলে গেল। এবার ব্যর্থতার বোঝা মাথায় নিয়ে এই উপত্যকা ছেড়ে চলে যেতে হবে।

    ….আনমনে বড় সুড়ঙ্গের কাছে যেই গেছি, হঠাৎ দেখি এক আজব মূর্তি। প্রথমে চিনতে পারিনি–পরক্ষণে চিনলুম। হিগিনস! কিন্তু এ কী মূর্তি তার! মাথায় একরাশ চুল, মুখে দাড়ি গোঁফের জঙ্গল, পরনে মাত্র একটা ঘেঁড়া হাফপ্যান্ট হাতে বড়বড় নখ, সারা গা নোংরা–খালি পা–সে আমাকে দেখামাত্র অমানুষিকভাবে হেসে উঠল। ও নিশ্চয় পাগল হয়ে গেছে! শিউরে উঠলুম ওর পরিণতি দেখে। তাহলে কি একদিন আমারও ওই পরিণতি ঘটবে?

    ….হঠাৎ হিগিনস জন্তুর মতো গর্জন করে আমাকে তেড়ে এল। পকেট থেকে। পিস্তল বের করে ছুঁড়লুম। গুলি লক্ষ্য ভ্রষ্ট হলো। হিগিনস অমনি ঘুরে সুড়ঙ্গে গিয়ে ঢুকল। আমার মধ্যে তখন খুনের নেশা জেগেছে। সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়লুম। আন্দাজে গুলি ছুঁড়লুম পাগলের মতো। মনে হলো হিগিনস হাসছে কোথায়। কানের ভুল হতেও পারে।…

    ….ঠিক করেছি, হিগিনসকে শেষ করতেই হবে। আগামীকাল টর্চ নিয়ে ওই সুড়ঙ্গে ঢুকব। ওকে খুঁজে বের করে হত্যা করব। ও আমার লোভের জন্য দায়ী। ও আমার জীবনের সুখশান্তি নষ্ট করার মূলে। আজ আমার চোখে শুধু হীরেপান্না জহরতের ঝলমলানি। এ কী অদ্ভুত অভিশাপ! খেতে ঘুমোতে সবসময় ওই গুপ্তধন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ঘুমোতে পারিনে–খাওয়া ফেলে উঠে পড়ি। আমার জীবনীশক্তি দিনে দিনে শেষ হয়ে যাচ্ছে। শয়তান হিগিনসই এর জন্যে দায়ী….

    বেশ বোঝা যায়, ১৭ আগস্ট হিগনসকে হত্যার উদ্দেশ্যে জগদীপ সুড়ঙ্গে ঢোকেন এবং সম্ভবত হার্টফেল করে মারা পড়েন। ওই মানসিক অবস্থায় এটা স্বাভাবিক ছিল।

    সেই সঙ্গে বোঝা গেল সর্বেশ্বরী যে সাধুর কথা বলেন, সে কে। কিন্তু হিগিনস কি এখনও বেঁচে আছেন এবং সুড়ঙ্গে থেকে অভিশপ্ত গুপ্তধন খুঁজে বেড়াচ্ছেন?

    আর C2 কথার অর্থ কি, কর্নেল আমাকে জানিয়েছে। ওটা দুর্বোধ্য কিছু নয়। ক্যাবিনেট নম্বর টু। ডাইনিংয়ের দেয়াল আলমারির দুনম্বর খোপ। কর্নেল নিছক অনুমানের ভিত্তিতে কাজে নেমেছিলেন এবং অনুমানটা মিথ্যে হয়নি।

    আচারিয়া কর্নেলের দুর্দশার কথা শুনে হেসে খুন। ততক্ষণে মিঃ লাল পুরোপুরি বদলে গেছে এবং কর্নেলের উদ্দেশ্যে বারবার বলছেন–খুব দুঃখিত। কিন্তু স্যার, আমার কর্তব্যজ্ঞানই এ জন্যে দায়ী। কর্নেল মিঃ লালের একটা হাত সস্নেহে টেনে নিয়ে তার উপস্থিত বুদ্ধি, সাহস এবং দক্ষতার প্রশংসা করার পর দেখা গেল, দুজনে পাশাপাশি হাঁটছেন, বসছেন। কর্নেলের এ সব ব্যাপারে জুড়ি নেই। সব অপ্রীতিকর স্মৃতি ঘুচিয়ে দিতে তিনি পটু। অতএব, আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বেঁচেছি।

    কর্নেল এবং পুলিশ অফিসাররা সবাই ঘাট ঘুরে খনি উপত্যকায় চলে গেলেন। রাতে ভাল ঘুম হয়নি–তাই আমার ক্লান্তি লাগছিল। ভাবলুম ওঁরা তদন্ত করুন– আমি একটু গড়িয়ে নিই।

    গড়াচ্ছি, হঠাৎ কানে এল সর্বেশ্বরী ও ইন্দ্রনাথ পাশের ডাইনিংয়ে উত্তেজিতভাবে কথা বলছেন। উঠে বারান্দায় গেলুম। তখন অ্যাম্বুলেন্স এসে গেছে। একটু পরে লাশ নিয়ে যাওয়া হবে। সেপাইরা এবং অ্যাম্বুলেন্সকর্মীরা দাঁড়িয়ে রয়েছে। মিঃ শর্মাকে দেখতে পেলুম না কোথাও। অথচ উনি কর্নেলদের সঙ্গেও যাননি। শরীর খারাপ বলে নিজের ঘরে ঢুকেছিলেন। সেই ঘরের দরজা খোলা এবং বিছানা শূন্য দেখা যাচ্ছে। বারান্দা থেকে ডাইনিংয়ের দরজা দিয়ে সেটা আমার চোখে পড়ছিল।

    সর্বেশ্বরী তার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। ইন্দ্রনাথ একটু তফাতে। আমি একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনতে থাকলুম।

    সর্বেশ্বরী। তুমি দেব-দেবতা ভগবান–যার নামই নাও, আমি ও কথা বিশ্বাস করি না।

    ইন্দ্রনাথ। আপনার বিশ্বাস করা না করায় আমার কিছু যায় আসে না।

    সর্বেশ্বরী। হ্যাঁ, তা তো বটেই। এখন ওকথা বলবে বইকি! মানুষ হয়ে গেছ এখন তো আর আমার কোনও প্রয়োজন নেই। কিন্তু জেনে রেখো, আমার একটি পয়সাও তুমি আশা কোরো না।

    ইন্দ্র। নিশ্চয় করি না। আপনার সম্পত্তি যা খুশি করুন, আমি কিছু বলতে চাইনে। কিন্তু দোহাই আপনার, ওই মিথ্যে বদনাম দেবেন না।

    সর্বেশ্বরী। একশো বার দেব। সাধুবাবা স্বয়ং আমাকে বলে গেলেন। ফাইলটা তুমিই হাতিয়েছ।

    ইন্দ্র। (বিকৃত হেসে) সাধুবাবা! আপনার ওসব গাঁজাখুরি ব্যাপারে আমার কোনওদিন বিশ্বাস ছিল না–এখনও নেই।

    সর্বেশ্বরী। (ক্ষেপে গিয়ে) আমি এ ঘর থেকে তোমার পায়ের শব্দ পেয়েছিলুম কাল বিকেলে। উঠে এসে দেখি, তুমি ঝোপের মধ্যে চলে যাচ্ছ।

    ইন্দ্র। আপনি পায়ের শব্দ বুঝতে পারেন?

    সর্বেশ্বরী। নিশ্চয় পারি!

    ইন্দ্র। তাহলে শুনুন, যাকে দেখেছিলেন সে সৌম্য। আমি তাকে ফলো করে এসেছিলুম। ঝোপের আড়াল থেকে দেখলুম–সে এঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে তার হাতে কী একটা ছিল দূর থেকে বুঝতে পারলুম না।

    সর্বেশ্বরী। আমি বিশ্বাস করি না।

    ইন্দ্র। আপনার পা ছুঁয়ে বলব?

    সর্বেশ্বরী। না–আমার পায়ে হাত দেবে না। নিজের ছোট ভাইকে খুন করেছে যে, তাকে ……. ।

    ইন্দ্র। (আর্তস্বরে) কাকিমা! ওকে আমি খুন করিনি।

    সর্বেশ্বরী। নিশ্চয় করেছ! যদি তোমার ওই কথাটা সত্যি হয় যে ফাইলটা সৌম্য নিয়ে যাচ্ছিল, তাহলে ওটা হাতাতে তুমিই খুন করেছ।

    ইন্দ্র। (ভাঙা স্বরে) না না! ফাইলে কী ছিল আমি এখনও জানি না!

    সর্বেশ্বরী। তুমি ন্যাকা!

    এইসময় দূরে কোথাও গুলির শব্দ শোনা গেল। চমকে উঠলাম। ফের। কয়েকবার শব্দ হতেই একটা হুলুস্থুল পড়ে গেল। সিপাইরা দৌড়ে ঘাটের দিকে গেল। ইন্দ্রনাথও বেরিয়ে এলেন। আমাকে দেখেই জিগ্যেস করলেন কী হলো জয়ন্তবাবু?

    মাথা নেড়ে দৌড়ে গেলুম ঘাটের দিকে। গিয়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলুম। লেকের জলে অনন্তরাম শর্মা গলাঅব্দি ডুবে রয়েছেন-দুহাত ওপরে তোলা। সবাই হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মিঃ আচারিয়া চিৎকার করছেন–উঠে আসুন। বলছি। এক মিনিটের মধ্যে উঠে না এলে আবার গুলি ছুঁড়ব।

    শর্মা আর্তনাদ করে বললেন–উঠছি। দোহাই! গুলি ছুড়বেন না। উনি এবার দুহাত তুলে ঘাটের দিকে আসতে থাকলেন। কর্নেল একটু দূরে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছিলেন। কাছে গিয়ে বললুম–এই নাটকের অর্থ কী কর্নেল?

    কর্নেল বললেন–তুমি এখনও নাবালক, জয়ন্ত! বুঝতে পারছ না কিছু?

    কী সর্বনাশ! শৰ্মাই কি সৌম্যেন্দুকে খুন করেছেন?

    –হ্যাঁ।

    –সে কী! কেন?

    –হিগিনসের একটা ফাইল হাতাতে। চলো, বাংলোয় গিয়ে সব বলছি।

    তবে শেষপর্যন্ত লেকের জলে সত্যিই মাছ ধরা হলো। তাই না? বলে কর্নেল সহাস্যে সেই ছড়াটা আওড়ালেন; ‘খোকন গেছে মাছ ধরতে…..’

    ফাইলটার কথা একটু আগে সর্বেশ্বরী ও ইন্দ্রনাথের ঝগড়ার মধ্যে শুনেছি। বাংলোয় ফিরে বাকিটা শুনলুম বিশদ ব্যাখ্যা সহ। সর্বেশ্বরীও সব ফাঁস করে দিলেন।

    হিগিনসই সর্বেশ্বরীর সাধুবাবা। কদিন আগে কলকাতা গিয়ে সর্বেশ্বরীকে একটা ছোট ফাইল দিয়ে আসেন। ইন্দ্রনাথ ব্যাপারটা টের পান। কিন্তু এর রহস্যটা কী জানতেন না। তাই কর্নেলের শরণাপন্ন হন। আশ্চর্য, কর্নেল আমাকেও কিছু খুলে বলেননি। যাই হোক, হিগিনস দেশে ফিরে গেছেন। গুপ্তধনের মায়া ত্যাগ করেই গেছেন। ওঁর ফাইলে উপত্যকার একটা ম্যাপ ছিল–১৯৪৩ সালের ম্যাপ। ম্যাপে গুপ্তধনের অবস্থান চিহ্নিত ছিল। কিন্তু ১৯৪৬-এর ভূমিকম্পে সব ওলটপালট হয়ে যায়। তাই হিগিনস বছরের পর বছরখোঁজাখুঁজি করেও পাত্তা পাননি। তাছাড়া বোঝাই যায়, ওঁর ক্রমশ মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছিল। তা না হলে হয়তো বের করা। অসম্ভবও হত না। জগদীপ তখন ফাইলটা পেলে নিশ্চয় হদিশ করতে পারতেন। এখন সর্বেশ্বরীর ভুল হলো–ফাইলের কথাটা শর্মাকে জানানো। শর্মা তক্কেতক্কে ছিলেন। সর্বেশ্বরী এখানে আসার পর ফাইলটা সতর্কতা হিসাবে সৌম্যেন্দুর বিছানার তলায় রেখে দেন। কারণ, শর্মার মতিগতির ওপর ক্রমশ তার সন্দেহ জাগছিল।

    কর্নেল ও শর্মা চলে যাবার পর সর্বেশ্বরী রঘুবীরকে দিয়ে সৌম্যেন্দুকে ডাকতে পাঠান। সৌম্যেন্দু আসতে দেরি করে। সম্ভবত মাছে টোপ খাচ্ছিল তখন। সে একটু পরে এলে সর্বেশ্বরী তাকে বলেন, বিছানার তলায় যেটা আছে–সেটা সে যেন সাবধানে লুকিয়ে রাখে। কারণ, ওটা একটা দামী দলিল।

    সৌম্যেন্দু দলিলের ফাইলটা নিয়ে চলে যায়, সে ঘাটে বসে পড়ে দেখার কথা ভেবেছিল। ওদিকে কর্নেল ও শর্মা গর্তগুলোর অন্যমুখ খুঁজছেন। ওই সময় এক ফকে কর্নেলের অজানতে শর্মা ফাইল চুরি করতে চলে আসেন। অভাবিত সুযোগ। সর্বেশ্বরী তখন একা আছেন। দরকার হলে তাকেও খুন করে ওটা হাতাবে। কিন্তু সৌম্যেন্দুর দুর্ভাগ্য, ঘাটে তখন ফাইলটা পড়ছে। শর্মা আগেই কিচেনের ছুরিটা হাতিয়েছিলেন। তাই দিয়ে সৌম্যেন্দুকে খুন করেন। ফাইলটা কেড়ে নেন। জঙ্গলে পাথর চাপা দিয়ে রেখে ভালমানুষের মতো কর্নেলের সামনে আবির্ভূত হন।

    ইন্দ্রনাথ তার একটু আগে সৌম্যেন্দুকে বাংলোয় যেতে দেখে অনুসরণ করেছিলেন। কিন্তু ফাইলটা যে সৌম্যেন্দু নিয়ে আসছে, বুঝতে পারেননি। নিজের ঘরে ঢুকে দেখে আসেন সৌম্যেন্দু বরাবরকার মতো তার জিনিসপত্র হাতড়াচ্ছে কি না। তার শ্যাওলাভরা জুতোর দাগ আমরা ঘরের মেঝেয় দেখেছি। কালো দাগগুলো শর্মার। শৰ্মা সৌম্যেন্দুকে খুন করার পর ওঘরে একবার ঢোকেন। কারণ, সর্বেশ্বরীর মোড়ক বদলানোটা তারই পরামর্শে। ইন্দ্রনাথের রি-অ্যাকশন জানা। যখন দেখলেন, ইন্দ্রনাথের নজরে মোড়কটা এসেছে এবং সযত্নে রাখা আছে উনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ওটা দলা পাকিয়ে ফেলে দেন। তখন খুন করার পর ওঁর বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছে। ফাইলটাও লুকোতে হবে। কিন্তু নিজের ঘরে গেলে সর্বেশ্বরীর চোখে পড়বে। তাই তক্ষুনি বেরিয়ে উপত্যকার দিকে চলে যান। ওদিকে কর্নেলও তার দেরিতে সন্দিগ্ধ হতে পারেন।

    ইন্দ্রনাথ কিন্তু বারবার ঘাট থেকে উঠে বাংলোর দিকটা দেখছিলেন। অর্থাৎ লক্ষ্য রেখেছিলেন। হঠাৎ তার চোখে পড়ে, শৰ্মা চলে যাচ্ছেন। যদি ইন্দ্রনাথ সৌম্যেন্দুর ঘাট হয়ে যেতেন, তাহলে হয়তো পাশের ঝোপে লাশ পড়ত। কিন্তু সৌম্যেন্দুর চোখে পড়ার ভয়ে তিনি আরও ওপর দিয়ে শর্মাকে অনুসরণ করেন। উঁচু থেকে দেখতে পান, শর্মা কী একটা পাথরের তলায় পুঁতে রাখছেন। গতরাতে সেটা খুঁজতেই গিয়েছিলেন। পান নি।

    আজ সকালে অবশ্য ফাইলটা কর্নেলরা উদ্ধার করেছেন। কিন্তু ম্যাপটা নেই। ওটা শর্মার পকেটস্থ হয়েছিল। কাজেই লেকের জলে ভিজে দুমড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। কালি ধেবড়ে গেছে। অতএব গুপ্তধন মানুষের চোখের আড়ালেই থেকে গেল।…..

  • জানালার নীচে একটা লোক

    জানালার নীচে একটা লোক

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book-name]

    জানালার নীচে একটা লোক

    এক

    ধীরে বও, ধীরে

    সুবচনী হে বাতাস, এ সন্ধ্যায় আজ

    বিষাদের সুর বাজে, মৃত্যু অনুগামী।

    উজ্জ্বলতাগুলি নিল কঠিন শামুক

    গোরস্থানে সংহত কফিনে…

    শ্রীদিগন্ত সেন থামল। এবং তখন সন্ধ্যা ও সবরকম শব্দ খুব বিষাদগ্রস্ত নরমতায় গলে পড়ছে, এমনকি আকাশে কিছু জলহাঁসকেও ‘আঁক আঁক’ ধ্বনিপুঞ্জ নখের আঁচড় দিয়ে ঝেড়ে ফেলতে দেখছি আমরা–ঠিক ওইভাবেই গাছের পাতা থেকে শিশির ঝরে যায়, হয়তো চারজনের মধ্যে আমিই একা বুকে ও মস্তিষ্কে হিমবাহ চলনশীল টের পাচ্ছি, এ একটা অদ্ভুত সন্ধ্যা চিকনডিহির বাংলোয়।

    শুধু শ্ৰীঅমর্ত্য (৩৪), আমাদের দ্বান্দ্বিক তত্ত্ববাদী বন্ধু এবং হার্বার্ট মারকুইসের ভক্ত অমর্ত্য রায় বলে উঠল, বড় সেকেলে–কিন্তু আমরা কেউ-ই বাক্যটা নিলুম না।

    কবি দিগন্তের (৩৬) খুনীদের মতো চৌকো চোয়াল, একরাশ চুল পেঁয়াজের শেকড়ের মতো, তামাটে রঙ, ক্ষুদে কুতকুতে চোখে পুরু কাচের চশমা। টকটকে লাল শার্টের নিচে ডোরাকাটা ঢিলে পাতলুন, পায়ে বেঢপ পেতলের বকলেসলাগা চটি। সেই পেতলটা থেকে আলো, চিকনডিহির মাঠে বালির পাহাড়ের চূড়া থেকে যে আলো আসছিল, মুছে যেতে দেখলুম। এবং আমার মনে হল, সত্যি কি ও ত্রিশদশকী বিষাদবায়ুগ্রস্ত প্রেমিক? রাত্রি আমাদের হোস্টও মাননীয় বন্ধু জেলাশাসক শ্রীবিহ্বল মজুমদারের (৪২) বউ শ্ৰীমতী রাত্রি (২৬) দরজার ধারে দাঁড়িয়ে কী দেখতে দেখতে হঠাৎ ঘুম পাচ্ছে বলে চলে গেলেন পর্দার আড়ালে।

    মনে হল, কারো কথা বলতে ইচ্ছে করছে না কিছুক্ষণ। এটা কি দিগুর ওই ত্রিশদশকী কবিতা আবৃত্তির দরুণ, নাকি নির্জন চিকনডিহির মাঠের এই প্রাকৃতিক ঘটনাবলী? ঠিক বোঝা গেল না।

    এই সময় চাপা স্বরে অমু বলল বিহ্বলকে (ডি এমকে বিহুটিহু বলতে পারা যায় না), লুম্বিনীতে কিছু হল না তো এক কাজ করলে পারতেন–ডক্টর বাগচীর কাছে, মানে এস কে বাগচী, নার্ভ স্পেশালিস্ট যিনি… ।

    বিহ্বল একটু হেসে বললেন, সেও হয়ে গেছে। ও কিছু হবার নয়।

    আমরা ফের দুতিন মিনিট চুপ করে থাকলুম। হুঁ, কবিতায় কিংবা চিকনডিহির মাঠে কিংবা সন্ধ্যাবেলায় কী ছিল বা কী থাকে, সব সুবচনীকে ধীরে বইতে হয়। আর কী হিম মস্তিষ্কে! কিছু ভাবতে ভালো লাগে না, কিছু ভালো লাগে না! ঘুলিয়ে যায় যুক্তি ও বিবেক, মরিয়া হতে ইচ্ছা করে অনিবার্যের বিরুদ্ধে। আমি হতভাগিনী রাত্রির কথা ভাবতে চেষ্টা করলুম। রাত্রি আমার নতুনতম আবিষ্কার–এখানে চিকনডিহির বাংলোয় জেলা শাসকের ঘরণী! মুখ তুলে ঘাড় উঁচু করে কষ্টে তাকাতে হচ্ছে তার দিকে। আর ওই রাত্রিকে একদা মাথা নিচু করলেই দেখতে পেতুম–এবং বুকের নিচে। হায়, সে এখন মাথার ওপর কতদূরে! চেনা যায় না, চেনা যায় না!

    সেই রহস্যময় রুদ্ধবাক যেন জড়ভরত, ভারত বেয়ারা (আমার নাম-অ ভারত অ-অছি) দুটো সাদা জীনের বোতল রেখে গেল আর পাঁচটা গ্লাস। তিনজনে তাকাতাকি করলুম। রাত্রিও বসবে নাকি? কিন্তু লনে চেয়ার রয়েছে ছটা–একটায় রাত্রি এসে একবার বসেছিল তিন-চার মিনিট। তারপর জানালার ধারে যাই বাবা, এসব পোষায় না, বলে উঠে গিয়েছিল। ডি এম বেচারা সত্যি বড্ড বিব্রত বোধ করছেন স্ত্রীকে নিয়ে। পাগল হলে বেঁধে রাখা যায়, কিংবা রাঁচিটাচিতে রাত্রির অসুখ দুর্বোধ্য। কতকটা হ্যালুসিনেশান আর সিজোফ্রেনিয়ার মাঝামাঝি। তা এতক্ষণে আমাদের যেন চমক লাগল। চেয়ার ছ’টা কেন? গ্লাসই বা পাঁচটা কেন?

    বিহ্বল মৃদু উচ্চারণ করলেন, ভারত, বরফ। ভারত-অ চলে গেল শূন্য ট্রে নিয়ে। তখন উনি ঘড়ি দেখলেন কবজির, তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে সম্ভবত চাঁদ উঠছে– কি না দেখলেন, তারপর রাস্তার দিকে তাকিয়ে বললেন, কেউ গাড়ির শব্দ পাচ্ছেন?

    আমরা ব্যস্ত হয়ে কানগুলোতে মন রাখলুম এবং চোখগুলো দিলুম ঢালু হয়ে যাওয়া ধূসর রহস্যময় রাস্তায়। চারদিকে শুধু বালি আর বালি। হরেক জাতের ক্যাকটাস আর কেয়াঝাড়। আর সরকারী প্রযত্নে খচিত ঝাউবন। বিশ সাল আগে দশ মাইল দূরের সমুদ্রে এসে এতখানি ভূগোল বদলে দিয়েছিল নাকি। সব মাটি ঢেকে বালিয়াড়ি আর টিলা গড়ে উঠেছিল। সরকারী যোজনা তাদের আরও শোভন করেছে। কখনও কখনোও রাষ্ট্রীয় এবং প্রাকৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সৌন্দর্য প্রয়োজনকে খুন করে। কারণ আমরা তিনজন আসবার সময় পথের গ্রামে প্রচুর পাঁজরের হাড় গুণে এসেছি মানুষ ও জন্তুদের!

    কিন্তু তেমন কোনও শব্দ কি শুনলুম? শুধু মৃদুগামী সান্ধ্য বাতাস, দূরের ঝাউবনে, অস্পষ্ট কী স্বর, উড়ন্ত জলহাঁস, ধূসরতা, বালিয়াড়ি জুড়ে বিষাদের নরম শিশির–সেই কবিতাটি ফিরে এল।

    ধীরে বও, ধীরে

    সুবচনী হে বাতাস, এ সন্ধ্যায় আজ

    বিষাদের সুর বাজে–মৃত্যু অনুগামী….

    শিউরে উঠলুম। এই কি মৃত্যুর স্বাদ? অনুগামী মৃত্যু কি পা টিপে টিপে সত্যি সত্যি আসছে–ধীর অনুসরণে, বালিয়াড়িতে দীর্ঘ ছায়া ফেলে, তার পায়ের শব্দ ফুটে উঠছে ক্রমশঃ, এই নির্জন সন্ধ্যার বাংলোয়? অথচ মস্তিষ্কে এ কীরকম হিমবাহ স্বপ্নের মধ্যে বিপদ আসার মতো অসহয়তা, এবং যখন শরীর জড়বস্তু ছাড়া কিছু নয়।

    কিছুতেই এই ভাবটা ঘুচল না। জিনের গ্লাসটা হোস্টের আগেই তুলে নিলুম অভদ্রতা নিশ্চয় হল কিন্তু যুদ্ধের গোলাগুলির মধ্যেও আত্মরক্ষার উপায় বালায় যে সনাতন বোধ, সে যেন খুঁচিয়ে দিল–তৈরি থাকো, তৈরি হয়ে পড়ো, ঝটপট! আসন্ন যা-যা অনিবার্য, তার জন্যে।

    আর কেউ আসবেন নাকি? অমু প্রশ্ন করল।

    হোস্ট জেলাশাসকটি বললেন, হু। কর্নেল।

    দিগন্ত চেয়ার ছেড়ে সোজা হল।…..কর্নেল! কে তিনি?

    কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। এলে দেখবেন, এক অসাধারণ পারসোনালিটি! যে কোনও বয়সের লেডি অর জেন্টলম্যান হোক না, অ্যাটওয়ান্স সে টের পাবে, কর্নেল ইজ এ ভেরি ভেরি গুড কমপানিয়ান! সো চারমিং, সো ইনটেলিজেন্ট, সো মাইটি সেন্স অফ ডিডাকশান ফ্রম দা ফ্যাকটস, সো এলাবোরেট নলেজ অফ ডিটেকশন…..,

    মলোচ্ছাই! বাংরেজি ঝাড়ছে দেখি! এ যে মাল না টানতেই গন্ধে বেহেড হয়ে গেল! বিকেলে লোকটা তার মানসিক রুগী বউ (আহা, আমার রাত্রি! আমার রহস্যময়ী রাত্রি!) আর তার এই চাকরি প্রসঙ্গে একটা শব্দ বারবার ব্যবহার করছিল : হামড্রাম একজিস্টেন্স। লালচে চুলওয়ালা লম্বা নাকবিশিষ্ট এই লম্বু ফর্সাগুলো বরাবর ব… নির্বোধ হয় দেখেছি। রাত্রি, হায়, রাত্রির মতো আত্মসচেতন সহস্রচক্ষু সেনসেটিভ মেয়ে তো কম দুঃখে পাগল হয়নি!

    কিসের ডিডাকশন-ডিটেকশন বুঝলুম না। অমু স্পষ্টভাষী স্বভাবে আস্তে বলল।

    হি ইজ অ্যাকচুয়ালি এ প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর।

    অফ?

    ক্রাইম। বলে খুক খুক করে হেসে বিহ্বল গেলাস তুলে বললেন–চিয়ার্স!

    আবার আমার মাথার ভিতর একটুকরো বরফ ধসল। ক্রাইম! স্বপ্নের মতো চেঁচানোর চেষ্টা করে বললুম–কী ক্রাইম?

    জেলাশাসক ঠোঁটে হাসি রেখে জবাব দিলেন–মার্ডার! অমনি আরর এই দন্ত জিহ্বা কম্পনকারী ধ্বনিটি বিস্তৃত হতে হতে কোথাও দূরে আরও ভয়ঙ্কর হতে থাকল এবং বালিয়াড়ির মাথায় ঝাউবনে যেন আগুন লাগল। তখন বিহ্বল মজুমদার খিকখিক করে হেসে বললেন, আসছেন। কর্নেল ইজ কামিং!

    যেন মহানন্দে পরপর দুটানে গেলাস শেষ করে এবং ফের ভরে ও শেষ করে জ্বলজ্বলে চোখে সেইদিকে তাকালেন। চাউনি দেখে ভয় লাগল। কী নীল, কী জাম্ব!

    মার্ডার! বাবার শিউরে উঠলুম। অথচ সবই স্বপ্নের মধ্যে এত অসহায়, কিছু করা যায় না, কারণ উজ্জ্বলতাগুলি বুকে নিল কঠিন শামুক গোরস্থানে সংহত কফিনে।…..

    এবং ঠিক সেই সময় ঘর থেকে রাত্রির আর্ত চিৎকার শোনা গেল–তোমরা এস, তোমরা এস! জানালার নিচে সেই লোকটা এসেছে। জানালার নিচে সেই লোকটা?

    মুহূর্তে একটা হতচকিত হুলুস্থুল ঘটে গেল এবং তাই স্বাভাবিক ছিল।

    আমার ডাইনে, যেখানে দিগু ছিল–তার মাথার ওপর দিয়ে ঝাউবনের কালো বাসায় তখন লাল চাঁদটা পাখির ডিম ভেঙে যাওয়া ব্যাপার, হলফ করে বলছি ঠিক তাই এবং না হলে সেই লাল থলথলে গোটাটার মধ্যে প্রথমে আমার চোখদুটো তারপর মগজসমেত আমি নিজে আঠালো চ্যাটচ্যাটে বস্তুতে আটকে পড়তুম না অন্তত আধমিনিটের জন্যে! দুদ্দাড় ধুপধাপ অস্পষ্ট শব্দগুলো পরিস্থিতিকে মুচড়ে ভয়ের বস্তায় ভরে ফেলছিল। দিগুর চেয়ারটা পড়ে যেতে দেখলুম, কিংবা আমারটাই–(পরে দেখেছিলুম সবকটা চেয়ারই পড়ে গিয়েছিল টেবিলটা বাদে) অমুর কথা শুনলুম–কী ব্যাপার এবং লম্বা নির্বোধ ভদ্রলোকটি, আমাদের মাননীয় বন্ধু ও হোস্ট, কুসুমগলা লালচে, ব্যাপারটার মধ্যে অদ্ভুত ভঙ্গিতে পিছলে যেতে যেতে চেঁচিয়ে উঠলেন–রাত্রি! রাত্রি! ভয় নেই–ভয় নেই! আর আমার তখনও স্বপ্নের মধ্যে আটকে পড়া মাকড়সার মতো হয়েছে। কিন্তু তাহলে তো চলবে না। আমাকে শক্ত হতে হবে। রাত্রি–আমার রাত্রির ডাক! দ্বিতীয়বার রাত্রি বুক ফেটে চেঁচাল–সেই লোকটা এসেছে। জানালার নিচে সেই লোকটা! বাঁচাও, বাঁচাও! একটু পরে দেখলুম, আমি দিগু আর অমুকে ঠেলে বারান্দা থেকে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করতে গিয়ে ভারি পর্দাটা ফরফর করে ছিঁড়ে ফেলেছি। কখন লনের ছইঞ্চি খাপি দলদলে ঘাসে সেই আঠালো রঙীন ব্যাপারটা মুছে ফেলে এসেছি, হুঁশ নেই। মুছে ফেলেছি বলার কারণ, এখন আমার শরীর ভীষণ খসখসে শুকনো লাগছিল। আর ডাইনে দুতিন মিটার দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছিলুম ব্যাটাছেলে ভারত-অমুকে-খাকি হাফপ্যান্ট হাফশার্ট থাকায় দুর থেকে বিষাদময় আজকের সন্ধ্যা ও লাল আঠাটার মধ্যে তাকে সনাক্ত করা। কঠিন যে সে একটি সজীব পদার্থ।

    ভিতরে কিছু ঘটছিল। নির্বোধ ভদ্রলোকের রাত্রি রাত্রি চিৎকার, দুমদাম শব্দ, রাত্রির চেরাগলায়–বাঁচাও বাঁচাওকরুণ কান্না। দিগু বিকট গৰ্জাল–অ্যাই ভারত, জানালার নিচেটা দেখে এস শীগগির!

    অমু বলল, টর্চ! টর্চ নিয়ে যাও!

    আমি বললুম– লাঠি! লাঠি!

    ভারত করুণ কেঁদে বলল, মুই একা পারিবু না সার! আপুনি আসুন।

    তখন অমু, দ্বান্দ্বিক জড়বাদী ও অমর্তে অবিশ্বাসী অমর্ত্য তার বলিষ্ঠ বেঁটে দেহ নিয়ে তার হাত ধরে বারান্দা থেকে ঝাঁপ দিল পূর্বদিক। ঘুরে পেছনে চলে গেল বাংলোটার। তার যাওয়ার মধ্যে খুনে স্বভাবের লক্ষণ ছিল। যেন বিপ্লব এলে এরকম মরণাপ সে দেবে পরিখায় এবং জানালার নীচের লোকটার মতো শ্রেণীশত্রুর চুল খামচে ধরবে। ফের শিউরে উঠলুম।

    ঢুকে দেখি সুদৃশ্য হারিকেন ল্যাম্প জ্বলছে এবং এটা বসার ঘর। আমরা দুজনে দুদিকে দৌড়ে গেলুম। সৌভাগ্যবশত, আমি আরেকটা পর্দা ছিঁড়ে (পরে দেখেছি এত ভয় পেয়েছিলুম, কিংবা রাত্রির অসুখের বিরুদ্ধে এত বেশি অবচেতন হিংসা ছিল যে দুটো পর্দা ফেড়ে ফেলেছি) আরেক ঘরে ঢুকে আরেকটা ছোট্ট আলোর গম্বুজ হাতে নিয়ে জেলাশাসককে দেখলুম, অচেতন স্ত্রীর মুখের দিকে ঝুঁকে রয়েছেন। আমার শব্দ পেয়ে বললেন, অজ্ঞান হয়ে গেছে!

    সামনে বিছানার ওধারে খোলা পর্দা ওঠানো জানালা। তার নিচে অমু ভারতকে দেখতে পেলুম। অমু বলল, কই, কেউ তো নেই! এখানটায় ঘাস বড্ড, বালি থাকলে পায়ের দাগ পাওয়া যেত!

    বিহ্বল বললেন, ও কিছু না চলে আসুন! ওর হ্যাঁলুসিনেশা!

    অমু জানালায় নাক ঠেকিয়ে বাইরে থেকে নিস্তব্ধ রাত্রিকে দেখছিল। চমকে উঠলুম ওর চোখ দেখে। কী নীল, কী জান্তব! অমু বলেছিল, রাত্রি তার চেনা মেয়ে। আমি কাকেও বলিনি কিছু। তবে দিগুও ইশারা দিয়েছিল, রাত্রিকে সে চিনত। এই চেনাচেনির ব্যাপারটা এইসময় মাথায় এসে মনে হল, আমরা সবাই আজ এক ভয়ঙ্কর নাটকের পাত্রপাত্রী যেন।

    হ্যালুসিনেশান! ভুল ঘরে ধাক্কা খেয়ে দিও চলে এসেছিল। এখন সবিস্ময়ে বলল।

    হ্যাঁ আজ দুপুর থেকেই এই হচ্ছে। এ নিয়ে চারবার হল। জেলাশাসক বললেন।

    আমি বললুম– সেন্ট্রি গার্ড রাখলে ভাল হতো মিঃ মজুমদার।

    জেলাশাসক হাসলেন। নাঃ। স্রেফ হ্যালুসিনেশান! এক্ষুণি ঠিক হয়ে যাবে। তারপর সম্ভবত স্মেলিং সল্টের শিশি নিয়ে এলেন হোয়াটনটের মাথা থেকে।…

  • দুই নারী

    দুই নারী

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book-name]

    দুই নারী

    সব লেখকই পাঠকপাঠিকাদের চিঠি পান। কোনও লেখা ভাল লাগলে লেখককে তা না জানাতে পারলে স্বস্তি পান না অনেকে। তবে অনেক চিঠিতে কড়া সমালোচনাও থাকে। কেউ কেউ নিখাদ গালিগালাজও খামে পুরে পাঠিয়ে দেন। এ ধরনের চিঠি আমি অনেক পেয়েছি। আবার কোনও কোনও পাঠিকা এমন চিঠি লিখেছেন, যা বটতলার সচিত্র প্রেমপত্র থেকে নিখুঁত কপি করা। এমন কি অপটু হাতে আঁকা ফুল ও ভোমরা ইত্যাদি সমেত।

    কিন্তু রাখী মিত্র নামে মফস্বলের এক পাঠিকার চিঠি পেয়ে সত্যি অভিভূত হয়েছিলুম। এই বুদ্ধিমতী পাঠিকা সরাসরি প্রেম নিবেদন করেননি বটে; কিন্তু যা লিখেছিলেন, তাতে আমার কোনও নিজ্ঞান ইচ্ছার ওপর মিষ্টি একটা ছোঁওয়া লেগেছিল এবং তার জবাবও দিয়েছিলুম পুরো চার স্লিপ!

    এমনি করে রাখীর সঙ্গে আমার দূর থেকে প্রেম হয়ে যায় এবং পরস্পরকে না পেলে জীবন ব্যর্থ হবে, এই ধারণা গড়ে ওঠে। অথচ তখনও আমরা কেউ কাউকে চোখের দেখাও দেখিনি অর্থাৎ রক্তমাংসের শরীর নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়াইনি। অবশ্য দুজনেই নিজের নিজের ফোটো পাঠিয়েছিলুম। বলাই বাহুল্য, একটু আগের ভরাট চেহারার ফোটোই পাঠিয়েছিলুম। রাখীও তাই করেছিল, পরে তা বুঝলুম।

    ফোটোর রাখীকে দেখেই আমার মাথা ঘুরে গিয়েছিল। তারপর যখন হাওড়া স্টেশনে কথামতো সে এল, তখন ঘুরে যাওয়া মাথার ঘিলু গলে গেল। ফোটোর। কথা ভুলেই গেলুম। এত আশ্চর্য সুন্দর আর সেক্সি চেহারা সচরাচর দেখা যায় না। হাল্কা হলুদ রঙের শাড়ি পরেছিল সে, হাতাকাটা ব্লাউজ ছিল গায়ে, বেণী বাঁধা ঘন কালো চুল ঝুলছিল কোমর অব্দি–এবং তার উদ্ধত বুকের ওপর একটা শঙ্খের মালা ঝুলছিল। আমি মনে মনে পাগল হয়ে গেলুম। বললুম–একটা কবিতা মনে পড়ছে। জীবনানন্দ দাশের শঙ্খমালা নামে এক নারীর কথা আছে তাতে।

    কথা ছিল আমরা ওখান থেকেই সোজা বাইরে এক জায়গায় চলে যায়। সেই জায়গাটা পছন্দ করেছিল রাখীই। আমার অমত করার কী আছে? চন্দনপুর অন-সীর মতোন সুন্দর সমুদ্রতীর সারা ভারতে আর একটিও নেই। হিলক শ্রেণীর পাহাড়, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, তার নিচে সমুদ্র–মাত্র একবার গিয়েছিলুম কবছর আগে। খুবই ভাল লেগেছিল।

    ট্রেনে আমরা কোনও প্রেমাত্মক কথাবার্তা বললুম– না। খুব স্বাভাবিক ব্যবহার করলুম। শুধু একবার আস্তে বলেছিলুম-আমাকে দেখে তোমার ইমেজ নিশ্চয় নষ্ট হয়ে গেছে, রাখী!

    রাখীও আস্তে জবাব দিয়েছিল–পাগল! কী যে ভাল লাগছে!

    চন্দনপুর অন-সী পৌঁছতে সন্ধ্যা সাতটা বেজে গিয়েছিল। সময়টা বর্ষার। ভাগ্যিস আমরা পৌঁছানোর সময় বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। ভাল হোটেল কয়েকটা। আছে ওখানে। কিন্তু রাখীর পছন্দ মিসেস জেভিয়ারের হোটেল। লোকে বলে মিসেস জেভিয়ারস্ লজ। প্রাইভেট বাড়ির মতো ব্যবস্থা। সমুদ্রের এক খাড়ির কাছে পাথুরে জমির ওপর বাড়িটা বানিয়েছিলেন ব্রিটিশ আর্মির লেফটন্যান্ট কর্নেল রিচার্ড জেভিয়ার–সে ১৯৩০ সালের কথা। মিসেস আর দেশে ফিরে যাননি। একা এখানেই থেকে গেলেন। বয়স প্রায় সত্তর। কিন্তু শক্ত সমর্থ মহিলা। আমাদের দেখেই সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। কারণ, এখন অফ সিজন। খুব কম লোকই এই বর্ষায় এখানে বেড়াতে আসে। একটা ডাবল বেড ঘর খালি ছিল দোতালার পুবদক্ষিণ কোণে। পুবে সমুদ্র, দক্ষিণে কিছু ছোটো পাহাড় আর বাংলো বাড়ি। বসতি এলাকা গোটা পশ্চিম-উত্তর জুড়ে।

    ঘরটা খুবই ভাল লাগল। সব রকম আধুনিক ব্যবস্থা আছে। রাখীর প্রতি সপ্রশংস তাকিয়ে বললুম– নিশ্চয় তুমি এখানে কখনও এসেছিলে?

    রাখী জবাব দিল–মোটেও না। এই প্রথম।

    –তবে মিসেস জেভিয়ারের লজে আসতে বললে যে?

    আমার বিস্ময় কাটিয়ে দিল রাখী। বলল–আমার এক আত্মীয় এখানে আসেন। তাঁর কাছেই শুনেছিলুম।

    ইচ্ছে ছিল, ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে সব কিছুর আগে ওকে বুকে চেপে ধরব। ওকে দুহাতে তুলে নিয়ে তুমুল চিৎকার করে বলব-রাখী, তুমি আমার! কিন্তু কে জানে কেন, সেসব কিছু করলুম না। খুব শান্ত ও ভদ্র হয়ে গেলুম। সেও যেন বিশেষ উৎসাহ দেখাল না। সোজা বাথরুমে চলে গেল আগে।

    মিসেসের লোক এসে সব দেখিয়ে শুনিয়ে চলে গিয়েছিল। একটু পরে উনি নিজে এলেন। বিরক্ত করার জন্য বারবার ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বললেন–কোনও অসুবিধে হলে যেন তক্ষুনি জানাই। এ বাড়িতে যাঁরাই আসেন, তারাই ওর কাছে পুত্রকন্যাবৎ। নো কোয়েশ্চেন অফ মানি। প্রবাসের আনন্দটুকু, পুরোপুরি সবাই যাতে উপভোগ করতে পারে, সেটা দেখা ওঁর কর্তব্য।

    রাখী কিন্তু খুব ভাব জমাবার চেষ্টা করল। যত শীগগির উনি চলে যান, তাই ভাল কারণ, আমি একা হতে চাই রাখীর কাছে। অথচ রাখী এটা ওটা নানা প্রশ্ন করল। অবশেষে আন্টি পাতিয়ে বসল। মিসেস জেভিয়ারও দেখলুম রাখীকে পছন্দ করেছেন। এমন কি, যাবার সময় ওর গালে সস্নেহ চুমুও দিয়ে বসলেন।

    চলে গেলে দরজা বন্ধ করে রাখী বলল–কেমন ম্যানেজ করলুম দেখলে? বুড়িটা অবশ্য খুব ভাল মানুষ। দেখবে, একটুও অসুবিধে ঘটতে দেবেন না।

    রাখী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে মাঝে মাঝে পাশের খোলা জানলায় উঁকি দিয়ে সমুদ্র দেখছিল। দেখা যায় না–সব অন্ধকার। শুধু নিচের দিকে অবিশ্রান্ত গর্জন শোনা যায়। বর্ষার সমুদ্র এমনিতেই উত্তাল থাকে। তাতে এ বাড়ির নিচে খাড়ি আছে। পাথরের ওপর ঠেউ এসে দারুণ গর্জনে ভেঙে যাচ্ছে। মিসেস বলছিলেন–ঝোড়ো হাওয়া বইলে জানলা খোলা যেন না থাকে। লোনা জল এত উঁচুতে ছিটকে এসে ঘর ভিজিয়ে দেবে।

    আমি বিছানার দিকে তাকিয়ে একটা কিছু ভাবছিলুম। পাশাপাশি দুট নিচু খাট আছে। ডানলোপিলো গদি আছে। মধ্যে একহাত ব্যবধান ওই ব্যবধান রেখেই কি শুতে হবে?

    আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমার মুখের সেই লোভ, অসহায়তা ও কাকুতির দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করল রাখী–প্রতিবিম্বে। সে ঘুরে একটু হেসে বলল–যে মেয়ে সোজা এভাবে চলে আসতে পেরেছে সে তোমার কোনও সমস্যাই সৃষ্টি করবে না। সাহিত্যিক হয়ে এটুকুও তুমি বুঝতে পারছ না গৌতম?

    অপ্রস্তুত হয়ে বললুম–কী বলছ! যাঃ!

    রাখী তার খোলাচুলের ঝাপি নিয়ে আমার পাশে এসে বসে পড়ল হঠাৎ! তারপর আমার চিবুক ধরে সোজা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল বলো তো, আমাকে তুমি বাজারের মেয়ের মতো ভেবেছ কি না?

    আবেগ সংযত করে বললুম–তুমি এসব কেন ভাবছ রাখী? বাজারের মেয়ে আমি জানি না। জানলেও তোমাকে তা ভাবব কেন? আমি তো তোমাকে দেখে তোমার প্রেমে পড়িনি! সে প্রশ্নও ওঠে না।…

    রাখী আমার মুখে হাত চাপা দিল। ওর চিরোল সাদা আঙুলগুলো আমার ঠোঁটের খিদে জাগিয় তুলল। কিন্তু এখনই হুট করে কিছু করে বসলে রাখীর মনে আমার সাহিত্যিক ইমেজে আঘাত লাগতে পারে। তাই সংযমী হলুম।

    রাখী বলল–চলো না গো, ওই ব্যালকনিতে গিয়ে বসে সমুদ্র দেখি!

    এই ডাকে সহজ সম্পর্কের তীব্র মাধুর্য ছিল। তখুনি ব্যালকনিতে গিয়ে বসলুম আমরা। তারপর রাখী কেমন চুপ করে গেল। তার মৌন নষ্ট করতে ইচ্ছে হলো না। অথচ আমার চুপচাপ থাকতে ভাল লাগছিল না। এই অসাধারণ সৌন্দর্য পাশে নিয়ে কেউ চুপ থাকতে পারে না।

    একটু পরেই আবার বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির ছাঁটে পুবের ব্যালকনি ভিজতে থাকল। সেইসঙ্গে সমুদ্রের দিক থেকে জোর একটা বাতাস এল! তখন আমরা উঠে এসে দরজা বন্ধ করলুম। শুধু জানালা খোলা রইল। সমুদ্রের গর্জন বেড়ে গেল। অস্বস্তি জাগছিল যদি সমুদ্রের ঝাপটায় নিচের পাথর ধসে যায়। এই বাড়িটাও তো তখুনি সমুদ্রের তলায় চলে যাবে।

    সেই সময় রাখী বলে উঠল–ভীষণ খিদে পেয়েছে। তোমার পায়নি?

    নিশ্চয় পেয়েছে। কিন্তু ওদের যে খাবার এখানে আনতে বলা হয়নি।

    চলো না, নিচে ডাইনিং হলে গিয়ে খেয়ে আসি।

    একটু হেসে বসলুম–চেনাজানা কারো চোখে পড়লে কী বলবে বলোত? তুমিই বা কী বলবে–যদি তোমার চেনা কেউ থাকেন?

    রাখী তাচ্ছিল্য করে জবাব দিল–আমি বলব, বন্ধুর সঙ্গে বেড়াতে এসেছি। তুমি বলতে পারবে না?

    খুব পারব। ওর সাহস আমার সাহস বাড়াল। উঠে দাঁড়ালুম।

    রাখী বলল–এক মিনিট। তুমি নিচে গিয়ে বসো। আমি যাচ্ছি। কাপড়টা বদলে নিতে যেটুকু সময় লাগবে!

    ওর কথা মেনে নিয়ে সুড়সুড় করে নিচে চলে এলুম। ডাইনিং হলটা মোটামুটি প্রশস্ত। মৃদু আলো জ্বলছে সেখানে। বেশ রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। লক্ষ্য করলুম কোণার দিকে একজন বুড়ো কাপ্তেন গোছের ভদ্রলোক একা বসে রয়েছেন। মাথায় টাক, মুখে সাদা গোঁফ আর দাড়ি, কিন্তু বেশ শক্তসমর্থ চেহারা। ওঁর কোলে একটা বর্ষাতি রয়েছে। মনে হলো, এইমাত্র বাইরে থেকে এসেছেন। ভদ্রলোকের উদ্দেশে কাউন্টার থেকে মিসেস জেভিয়ার চাপা গলায় কিছু বললেন। উনি অমায়িক হেসে মাথা নেড়ে পাল্টা কিছু বললেন। কথাগুলো শোনা গেল না।

    অন্যদিকের কোণে এক দম্পতি বসে রয়েছেন। অবাঙালী মনে হলো। চল্লিশ বেয়াল্লিশ বয়স পুরুষটির, মহিলাটির পঁয়ত্রিশ-সাঁইত্রিশের কম নয়। আলো কম থাকলেও এটা আঁচ করা গেল। আমার ডাইনে দুটো টেবিল পরে বসে আছে একটি মেয়ে। হাল্কা ছিপছিপে গড়ন। ডিমালো মুখ। বেণীবাঁধা চুল। পরনে ফিকে নীল রঙের শাড়ি আর গায়ে সাদা লম্বাহাতা ব্লাউস। স্কুলমিসট্রেসের আদল যেন।

    টেবিলে একটা কালো ব্যাগ রয়েছে। আমি নেমে আসার সময় মুখটা একবার। ঘুরিয়েছিল মেয়েটি, কেমন চোখে তাকিয়েছিল যেন। যতক্ষণ আমি এই টেবিলে না এলুম, সে তাকিয়েই ছিল। তারপর মুখটা ঘুরিয়ে নিলো, তারপর আর তাকায়নি। কেন যেন মনে হলো, তার দুই চোখে ঘৃণা বা ব্যঙ্গ ছিল।

    কিন্তু ও যে বাঙালী মেয়ে, তা চিনতে আমার অসুবিধে হয়নি। শুধু ভাবছিলুম, আজকাল বাঙালী যুবতীরাও একা এতদূর সমুদ্রতীরে বেড়াতে আসার সাহস রাখে! ওকে সাহসী মেয়ে বলেই মনে হলো। চেহারা খুব সুশ্রী বলব না। কিন্তু মুখে ব্যক্তিত্ব কিংবা এমন একটা কিছু আছে–যা ওকে আর পাঁচজন থেকে আলাদা করে দেখাতে বাধ্য। কিন্তু একটু পরে হঠাৎ মনে হলো ওকে কোথায় যেন দেখেছি।

    আমার ডাইনের দিকের একটা টেবিল বাদে বসেছেন একজন রুক্ষ কঠোর চেহারার ভদ্রলোক–একা। গোঁফ আর বড়বড় চুল আছে মাথায়। বয়স পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। হাতে একটা বালা রয়েছে। খাড়া নাক, চোখদুটো কেমন হিংস্র যেন। এইসব চেহারায় হানাদারের আদল থাকে এবং অকারণে অস্বস্তি জাগায়।

    বসে থাকতে থাকতে উনি হঠাৎ উঠে গেলেনে। সিঁড়িতে ওঁর পা দুটো মিলিয়ে গেল। মিসেস জেভিয়ার ওঁকে কী যেন বলতে ঠোঁট ফাঁক করেছিলেন, কিন্তু বললেন না। ঘরে প্রায় স্তব্ধতা। শুধু অবাঙালী দম্পতি চাপা গলায় কথা বলছেন। বাইরে চাপা বৃষ্টি ও সমুদ্রের গর্জন কানে আসছে। ওপরে সম্ভবত কেউ ঘরের জানালায় হুক লাগায়নি–মাঝে মাঝে জানালার কপাটই হয়তো শব্দ করছে। ঘড়ি দেখলুম, আটটা বারো। এখনও ডিনার সার্ভ করছেন না কেন মিসেস জেভিয়ার? কিচেনের কাউন্টারের পাশে তিনজন উর্দিপরা বয় পুতুলের মতন দাঁড়িয়ে রয়েছে। হঠাৎ আমার কেমন অস্বস্তি জাগল। ওই বেয়াড়া রুক্ষ চেহারার লোকটা ওপরে গেল। ওপরে রাখী একা আছে।

    কিন্তু রাখীই বা এত দেরি করছে কেন? সিঁড়ির দিকে বারবার ঘুরে তার আশা করতে থাকলুম। এসময় মিসেস জেভিয়ার কাউন্টার থেকে এগিয়ে এলেন আমার কাছে। এসে সস্নেহে চাপা স্বরে বললেন মাফ করবেন। আর আট মিনিট পরে ডিনার সার্ভ করা হবে, মাই ডিয়ার ইয়াং ম্যান। একটা মিসহ্যাপ হয়েছে। গ্যাস ফুরিয়ে গেছে কিচেনে। তাই ইলেকট্রিক চুলোয় সব রান্না হচ্ছে। একটা হিটার জ্বলে গিয়ে এই সামান্য দেরি। খুব কষ্ট হচ্ছে না তো?

    শশব্যস্ত বললুম–না, না!

    মিসেস জেভিয়ার বললেন–যা অবস্থা হচ্ছে দিনে দিনে বলার নয়। জিনিসপত্র আগুনের দর। মিলছে না সবকিছু। গ্যাস প্রায় মেলে না। ইলেকট্রিসিটি–তাও প্রায় লোডশেডিং হচ্ছে ঘন ঘন। তোমাদের ভাগ্য ভাল যে আজ প্রায় সারাটা দিনই ভাল। গেছে। এখন অব্দিও ভাল যাচ্ছে। পরে কী হয় বলা যায় না। তোমাদের টেবিলের ওপর মোম রাখা আছে। আশা করি লক্ষ্য করেছ?

    দেখিনি–তবু মাথা দোলালুম। ভদ্রমহিলার আচরণ মায়ের মতো। সহজে হৃদয় গলে যায়।

    আরও কিছু কথা বলে উনি চলে গেলেন। তখন লক্ষ্য করলুম, সেই একলা বাঙালী মেয়েটি নেই। কখন হয়তো ওপরে উঠে গেছে।

    কিন্তু আট মিনিটের জায়গায় দশ মিনিট হলো, তখনও ডিনার এল না, রাখীও না, অধৈর্য হয়ে উঠে দাঁড়ালুম। মিসেস জেভিয়ার কিছু বলার জন্যে ঠোঁট ফাঁক করলেন আবার–কিন্তু বললেন না। আমি সিঁড়িতে কয়েক ধাপ সবে উঠেছি, হঠাৎ রাখীর চিৎকার শুনলুম যেন চিৎকারটা হঠাৎ বেখাপ্পাভাবে থেমে গেল, এবং সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটা অন্ধকার হয়ে গেল। তারপর কার সঙ্গে ধাক্কা লাগল আমার। উঠেই চেঁচিয়ে ডাকলুম রাখী! রাখী!

    মাত্র কয়েকটি সেকেণ্ডের মধ্যে এসব ঘটল। আমার সঙ্গে যার ধাক্কা লেগেছিল, সে যেন নীচে নেমে গেল। নীচে মিসেস জেভিয়ারের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শুনলুম হীরা সিং! মোম জ্বালাও। জলদি মোম জ্বালাও।

    ওপরের করিডোরে ঘন অন্ধকার। আবার ডাকলুম রাখী! রাখী! আমার গলা শুকিয়ে গেছে–অজানা ভয়ে প্রচণ্ড কাঁপছি। দেশলাই আছে, তাও ভুলে বসেছি। কেবল বেমক্কা ঘড়ঘড়ে গলায় ডাকছি রাখীকে। নিজেদের ঘরও চিনতে পারছিনে।

    সেইসময় করিডরের শেষদিকে দরজা খুলে কে বেরোল। তার হাতে টর্চ জ্বলে উঠল। সেই আলোয় দেখলুম, আমার ঘরের দরজার সামনে রাখী অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে। লাফিয়ে গিয়ে রাখীর মাথাটা তুলে বোকার মতো চেঁচালুম-ডাক্তার! ডাক্তার!

    টর্চের আলোটা কাছে এসে গেল। কে বলে উঠল–ও কী! হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছে নাকি? কী ব্যাপার?

    মনে হলো, সেই রুক্ষ চেহারার ফো লোকটিই। রুদ্ধশ্বাসে বললুম–প্লীজ একটু জল আনুন না দাদা! আমাদের রুমেই পেয়ে যাবেন।

    ততক্ষণে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ তুলে কারা সব উঠে আসছে। তারপর মোমের আলো হাতে বেয়ারা, মিসেস জেভিয়ার আর কারা এসে পড়লেন। ভিড় জমে গেল। রাখীকে আমি আর কে যেন ধরল। তুলে নিয়ে ঘরে ঢোকালুম। ঘরে ঢুকে দেখি, সেই ফো ভদ্রলোক দেশলাই জ্বেলে টেবিলের মোমটা ধরাচ্ছেন।

    ঘরে স্বভাবত ভিড় হলো। রাখীর মুখে জল ছিটিয়ে দিতেই সে জ্ঞান ফিরে পেল। চোখ খুলে শশব্যস্তে উঠে বসতে চেষ্টা করল সে। কিন্তু মিসেস জেভিয়ার… বাধা দিলেন–চুপ করে শুয়ে থাকো ডার্লিং। প্লীজ। অন্তত মিনিট দশেক। তারপর কোনও কথা।

    এবার দেখলুম, টেকো মাথা দাড়িওলা বুড়ো ভদ্রলোকটিও আমাদের রুমে এসেছেন। ভুরু কুঁচকে রাখীর দিকে তাকিয়ে আছেন। মিসেস জেভিয়ার ওঁর দিকে তাকিয়ে বললেন–চলুন কর্নেল, আমরা একে সুস্থ হতে সময় দিই। তারপর আমার দিকে ঘুরে বললেন–থাক বাছা, তোমাদের আর কষ্ট করে নীচে যেতে হবে না। এখানেই ডিনার খাবে। আর, দেখো–একে বেশি নাড়াচাড়া করতে দিও না। মনে হচ্ছে, হঠাৎ লোডশেডিং হওয়ায় ভয় পেয়েছিল। এ খুবই স্বাভাবিক। কর্নেল, আপনার মনে পড়ছে, সেবার এক ভদ্রমহিলা তো প্রতিরাত্রে সমুদ্রে ভূত দেখে চেঁচামেচি করতেন!

    বুড়ো লোকটি তাহলে কোনও কর্নেল–তবে পোশাক ও বয়স দেখে মনে হচ্ছে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল। উনি চাপা হাসলেন। হাসিটা খুবই ভদ্র আর অমায়িক। মুহূর্তে ভালো লেগে গেল আমার।

    মিসেস জেভিয়ার ফের হেসে বললেন–ও নো নো! অফ কোর্স এটা কোনও ভূতের বাড়ি নয়। সবাই তা জানে। তোমরা মিছিমিছি ভয় পেয়ো না–আসলে অনেকের নার্ভের অসুখ থাকে-হ্যালুসিনেশা দেখে তারা।

    উনি বেরোলেন প্রথমে। তারপর গুফো লোকটি গেল। তার পেছনে অবাঙালী দম্পতি। বেয়ারা পিছনে মোমের আলো হাতে এগোল।

    কর্নেল ভদ্রলোক তখনও দাঁড়িয়ে আছে দেখে বললুম–বসুন স্যার!

    কর্নেল হাত তুলে মিঠে গলায় বললেন–ধন্যবাদ ইয়ংম্যান। আমার নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। থাকি কলকাতায়। আর ইয়ে…

    চমকে উঠে বললুম–কী কাণ্ড! আপনি কি সেই প্রখ্যাত কর্নেল সরকার প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার? এই তো সেদিন খবরের কাগজে আপনার আরেক কীর্তির কথা পড়লুম! কী সর্বনাশ! রাখী, আমাদের কী সৌভাগ্য। পরিচয় করিয়ে দিই।

    রাখী ক্লান্তভাবে চোখ বুজল! তখন নিজের পরিচয় দিলুম–আমি গৌতম চৌধুরী। সামান্য সাহিত্যচর্চা করে থাকি।

    কর্নেল ব্যস্ত হয়ে বললেন-সামান্য কী অসামান্য আমি জানি। গৌতম চৌধুরী! মাই গুডনেস! আপনি তো আমার প্রিয় লেখক গৌতমবাবু। আপনার লেখায় প্রকৃতি থাকে অনেকটা জায়গা নিয়ে। আর আমি সত্যি বলতে কী– একজন প্রকৃতি-প্রেমিক। এই দেখুন না, এখনও গলায় বাইনোকুলার আর ক্যামেরা ঝুলছে। দিনমান টোটো করে ঘুরি। বিরলজাতের পাখি প্রজাপতি পোকামাকড় আর অর্কিড দেখার বাতিক আছে প্রচণ্ড। আপনার সঙ্গে আলাপ করে খুব প্রীত হলুম।

    রাখী চোখ খুলছে না দেখে অস্বস্তি জাগল। আস্তে বললুম– রাখী তোমার কি কষ্ট হচ্ছে এখনও?

    চোখ বুজে ও জবাব দিল-হ্যাঁ।

    তখন কর্নেল একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন–এখন তাহলে আসি গৌতমবাবু। পরে আলাপ করা যাবে। ওঁকে একটু সাবধানে রাখবেন। আর নার্ভ ঠাণ্ডা রাখার জন্যে আমার কাছে একরকম ট্যাবলেট আছে। পাঠিয়ে দিচ্ছি। দুটো খাইয়ে দেবেন নির্ভয়ে। দেখবেন, সকালে ফ্রেশ হয়ে উঠেছেন আবার!

    কর্নেল চলে গেলেন। এমন একজন প্রখ্যাত ধুরন্ধর গোয়েন্দার সঙ্গে আলাপ : হওয়া এখন আমার পক্ষে যতটা খুশির–ততটা অস্বস্তিরও। কারণ, রাখীর ব্যাপারে আমি নার্ভাস বোধ করছিলুম। নিশ্চয় ওই ঘুঘু ভদ্রলোক আঁচ করে নিয়েছেন ইতিমধ্যে যে এই মেয়েটিকে নিয়ে আমি বেড়াতে অর্থাৎ ফুর্তি করতেই এসেছি। আবার মনে হলো, ভদ্রলোক নিশ্চয় আধুনিক মনের মানুষ। যুগোপযোগী উদারতা। কি ওঁর থাকতে নেই? আজকাল বান্ধবী নিয়ে ছেলেদের বেড়াতে যাওয়ার মধ্যে তেমন খারাপ কী থাকতে পারে?

    দরজায় কেউ নক করল। অমনি রাখী চোখ খুলে উঠে বসল। ব্যস্তভাবে বললনা, না। দরজা খুলল না। আমার ভয় করছে!

    বাইরে থেকে সাড় এল–খানা সাব!

    তখন দরজা খুলে দিলুম। বেয়ারা ট্রেতে রাতের খাবার রেখে গেল। কোণের টুলে জলের কুঁজো আর গ্লাস দেখিয়ে দিয়েও গেল।

    এবার রাখীকে প্রশ্ন করলুমকী হয়েছিল বলো তো? হঠাৎ কী দেখে ভয় পেয়েছিলে?

    রাখী আমার কাছ ঘেঁষে এসে চাপা গলায় বলল–তুমি যাবার পর শাড়ি বদলে নিয়ে বেরোতে যাচ্ছি, হঠাৎ দরজায় কে নক করল! বললুম– কে? সাড়া নেই। একটু ভয় পেলুম! কিন্তু ভাবলুম হয়তো তুমিই দুষ্টুমি করছ। দ্বিতীয়বার নক করার সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুললুম। কিন্তু করিডোর ফাঁকা। কেউ কোথাও নেই। অমনি ভীষণ ভয় হলো। কিছুতেই একা ওই পথটুকু পেরিয়ে সিঁড়ির কাছে যাবার সাহস হলো না। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ভাবলুম–চুপচাপ বসে থাকি। দেরি দেখলে তুমি নিশ্চয় আসবে। তখন দুজনে একসঙ্গে বেরোব। কিছুক্ষণ পরে আবার দরজায় কে নক করল। এবার ভাবলুম, নিশ্চয় তুমি আমার দেরি দেখে চলে এসেছ। তবু জিজ্ঞেস করলুম-কে? যে নক করছিল, সে বলল–আমি!

    কী আশ্চর্য!

    হ্যাঁ! শুধু আমি বলল। মনে হলো তোমার গলা। তখন গিয়ে দরজা খুলে দিলুম। কিন্তু দরজা খুলেই আমি আবার অবাক। কেউ কোথাও নেই। আর সঙ্গে সঙ্গে আলো নিভে গেল। তখন….

    রাখী প্রচণ্ড ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আমার হাত চেপে ধরল। ফিসফিস করে। ফের বলল–তখন, বিশ্বাস করো–মনে হলো, কী একটা ঠাণ্ডা শরীর তামাকে চেপে ধরেছে হঠাৎ। অমনি চেঁচিয়ে উঠলুম। তারপর কী হলো কিছু মনে নেই!

    ওর কথার মধ্যে সরলতা এত বেশি যে অবিশ্বাস করার কিছু নেই। ভয়ে। আড়ষ্ট হলুম। তাহলে কি সত্যি ভূতপ্রেত বলতে কিছু আছে? পরক্ষণে মনে। হলো-রাখীর মনের ভুলও হতে পারে।

    হাসতে হাসতে বললুম–তুমি বড্ড অনুভূতিপ্রবণ মেয়ে তো! তাই বৃষ্টির রাতে সমুদ্র তীরের বাড়িতে এটা ঘটেছে। আসলে বাতাস বইছে জোরে। তাই দরজায় শব্দ হয়েছে। আর বৃষ্টির বাতাস তো বেশ ঠাণ্ডাই। আচমকা একটা ঝাপটানি এসে গায়ে লাগতেই ভেবেছ, কেউ চেপে ধরল।

    রাখী বলল–তা নয়। আমি স্পষ্ট নক করতে শুনেছি। আর ওই আমি বলাটা? নিশ্চয় কেউ বদমাইশির তালে ছিল। সাহস পায়নি। পাশের ঘরে ঢুকে পড়েছিল।

    তাও আশ্বস্ত হওয়া গেল, রাখীর ভয়টা ভূতের নয় তাহলে কোনও লম্পট বদমাইশের। বললুম–আমার সামনে শাড়ি বদলালে এসব হতো না!

    রাখীর মুখ লজ্জায় রাঙা হলো–যাঃ! আমি তা পারি না।

    ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে এবার চুমু খেলুম। ও ছাড়িয়ে নিয়ে বলল–এস, খাওয়াটা সেরে নিই আগে….

    সে রাতে যখন শুতে যাচ্ছি, তখন ঘড়িতে নটা তিরিশ। এত সকালে ঘুমানো সম্ভব নয়। তাই দাখীর সঙ্গে প্রেমিকসুলভ কথা বলছি আর সিগারেটের পর সিগারেট খাচ্ছি। এই সময় মনে হলো, বাইরে কারা সব ব্যস্তভাবে চলাফেরা করছে! তখন বৃষ্টি অনেকটা কমেছে, কিন্তু লোডশেডিং চলছে। আমাদের টেবিলে মোমের আলো জ্বলছে। বাইরের চাপা শব্দে কৌতূহলী হলুম। উঠে দরজা খুলতে যাচ্ছি, রাখী বাধা দিয়ে বলল–যে যা করছে করুক। দরজা খুলল না।

    সরে এসে আবার বসলুম। কিন্তু নাবাইরের চলাফেরা ও কথা বলার চাপা আওয়াজ থামল না। নিশ্চয় কিছু একটা ঘটেছে।

    কয়েকমিনিট পরে রাখীর নিষেধ না মেমে দরজা খুললুম। উঁকি মারতেই দেখি, করিডরে মিসেস জেভিয়ার শশব্যস্তে ওদিকে কোথায় চলেছেন। তার সঙ্গে আলো হাতে দুজন বেয়ারা দৌড়ে চলেছে। তারপর সিঁড়ির মুখ থেকে কর্নেলের ভারি গলার আওয়াজ পেলুম–আপনি তাহলে ওকে করিডোরে দেখেছিলেন মিঃ সেন?

    ঠাহর করে দেখি সেই গুফো লোকটি টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে কর্নেলের সামনে। কী ব্যাপার? দরজা খুলে বেরিয়ে গেলুম ওঁদের দিকে।

    আমাকে দেখে কর্নেল বললেন-এই যে গৌতমবাবু। আসুন, আসুন। আপনাকে ডিসটার্ব করতে চাইনি। ইয়ে–একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে।

    চমকে উঠলাম। অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠল মাথার চুল। ব্যস্তভাবে বললুম– কী হয়েছে কর্নেল?

    কর্নেল গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন মিস রমা রায় নামে একটি মেয়ে আজ সন্ধ্যায় এই লজে আসে। রাত আটটা দশ অব্দি মেয়েটিকে ডাইনিং হলে দেখেছি আমরা। তার রুম নাম্বার আঠারো। কিন্তু আশ্চর্য, তার পাত্তা নেই। আর…

    বাধা দিয়ে বললুম–হা, হ্যাঁ। আমার ডাইনের দুটো টেবিলের ওদিকে একা বসেছিল–সেই তো! রোগা ছিপছিপে চেহারা ফিকে নীল শাড়ি?

    কর্নেল বললেন–হ্যাঁ। সেই। তবে তার চেয়ে সাংঘাতিক ঘটনা হচ্ছে তিন তলায় মিসেস জেভিয়ারের ঘর থেকে একটা দামী জিনিস হারিয়েছে। যার দাম অন্তত লাখ তিনেক হবে।

    –সে কী! সর্বনাশ!

    -হ্যাঁ, একটা জুয়েল নেকসেল। ওপরের ঘরে মিসেস জেভিয়ার আজকাল থাকেন না। ওঁর জিনিসপত্র থাকে। উনি ভেবেছিলেন, যেহেতু অত দামী জিনিস, তাই ওঘরে আর সব অকেজো জিনিসের মধ্যে এটা রাখলে চোরডাকাতের পক্ষে অনুমান করা সম্ভব হবে না। সচরাচর দামী জিনিস লোকে নিজের শোবার ঘরেই রাখে। অথচ, কী আশ্চর্য ব্যাপার–চোর কীভাবে তা টের পেয়েছিল এবং সুযোগমতো হাতিয়েছে!

    গুঁফো লোকটি বলল–এবং হাতিয়ে কেটেও পড়েছে।

    আমি বললুম–এর সঙ্গে মিস রমা রায়ের বেপাত্তা হওয়াটা খুব অদ্ভুত লাগছে কিন্তু!

    কর্নেল বললেন–ঠিকই বলেছেন গৌতমবাবু। হঠাৎ সে বেপাত্তা হলো কেন? যাক গে–এসব পুলিসের ব্যাপার। পুলিশ এসে যা হয় করুক।

    বললুম–মিসেস জেভিয়ার হঠাৎ কীভাবে টের পেলেন যে ওঁর নেকলেস খোয়া গেছে?

    –ভদ্রমহিলা যেমন কর্মঠ, তেমনি অভিজ্ঞ। বুদ্ধি ওঁর প্রখর। ডিনার টেবিলে রমা নেই–অথচ আপনার ঘরের দরজায় ওই কাণ্ড হলো, তবু ওকে দেখা যায়নি। তাছাড়া বোর্ডারদের সম্পর্কে খোঁজখবর তো মিসেস জেভিয়ারকে রাখতেই হয়। বেয়ারা দিয়ে খাবার পাঠালেন ঘরে। বেয়ারা ফিরে এসে জানাল–দরজা খোলা কিন্তু ঘরে কেউ নেই। এমনকি কোনও জিনিসপত্রও নেই ওর। অমনি স্বভাবত মিসেস জেভিয়ারের মনে সন্দেহ হলো। তারপর…

    -কিন্তু আশ্চর্য! রমা পালাল কোন পথে?

    –সেটাই বুঝতে পারছি না। যেতে হলে এই সিঁড়ি দিয়েই ওঁকে যেতে হবে।

    গুঁফো লোকটি বলল–তখন আমরা সবাই এই ভদ্রলোকের স্ত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত। এঁর ঘরে ঢুকে গেছি। তখন সে কেটে পড়েছে।

    কর্নেল বললেন–এও একটা পয়েন্ট বটে। কিন্তু নীচে নামলে বেয়ারা আর দারোয়ানের চোখে না পড়েই পারে না। তারা বলছে, কেউ বেরিয়ে যায়নি।

    দারোয়ানদের কথা ছাড়ুন স্যার! ব্যাটারা গাঁজাখোর। তখন তো লোডশেডিং –অন্ধকার। ওরা কি টের পাবে নাকি? তার ওপর বৃষ্টি। ঘরে ঢুকে বসেছিল সব।

    হাতে টর্চ ছিল। হেরিকেনও জ্বেলে নিয়েছিল লোডশেডিং শুরু হতেই। অবশ্য, তাতেও রমার পালাবার সন্স থাকে। রাউট রাইট মিঃ সেন। আপনার যুক্তি অগ্রাহ্য করা কঠিন। কিন্তু..

    –কোনও কিন্তুর ব্যাপার নেই। পুলিসে খবর গেছে। দেখবেন, স্টেশনেই ধরা পড়ে যাবে!

    আরও একটা আলোচনার পর আমি নিজের ঘরে ফিরে এলুম। রাখী আমার প্রতীক্ষায় উত্তেজিত মুখে বসেছিল। বলল–কী ব্যাপার? কী হয়েছে?

    সব বললুম–! শুনে রাখী আরও ভয় পেয়ে গেল। রুদ্ধশ্বাসে বলল–আমার ইনটুইশান বলছিল কিছু সাংঘাতিক ব্যাপার ঘটছে। ওগো, তুমি খাটটা সরিয়ে নিয়ে এস। আমরা পাশাপাশি শোব…

    বেড-টি দিয়ে গেল ভোর সাড়ে ছটায়। রাখী তখনও ঘুমোচ্ছে। ওকে জাগালুম না। কর্নেল দুট ট্যাবলেট দিয়েছিলেন খেতে। তাই অত ঘুম। আমি ব্যালকনিতে গিয়ে বসলুম।আমার চোখ জ্বালা করছিল। একটুও ঘুম হয়নি। রাখী জেগে থাকলে নিশ্চয়ই ওর শরীরের সঙ্গে কিছু একটা শারীরিক ব্যাপার ঘটে যেত কিন্তু বিবেক আর শালীনতা অথবা চিরকালের ভীরুতা আমাকে সংযত রেখেছিল। রাখীকে মনে হচ্ছিল, ঝড়ে ক্লান্ত এক ছোট্ট সুন্দর পাখি। সে আকাতরে ঘুমোচ্ছে যখন–ঘুমোক। ওকে বিরক্ত করব না। বিরক্ত করিনি। বরং সাবধানে দূরত্ব নিয়ে শুয়েছিলুম–যাতে আমার মনের অন্ধ কামনা বাসনা ওই অবস্থাতেই হঠকারী কোনও ঘটনা না। ঘটিয়ে ফেলে।

    আকাশ আজ পরিষ্কার। সূর্যোদয় দেখলুম। রেলিং-এ ভর দিয়ে দাঁড়াতেই নিচে বাঁদিকে চোখ পড়ল। চমকে উঠলুম। দেখি, খাকি উর্দি পরা পুলিসদল, আর কর্নেল দাঁড়িয়ে আছেন একটা পাথরের ওপর। পিছনে আরও একটা ভিড় রয়েছে। এবং কজন জেলে ধরনের আধন্যাংটা লোক জাল দিয়ে নীচে থেকে কী যেন টেনে ওপরে তোলার চেষ্টা করছে।

    তক্ষুনি ভেতরে এসে দরজা আস্তে খুলে বেরিয়ে গেলুম।

    ডাইনিং হলে দুজন কনস্টেবল বসে রয়েছে। মিসেস জেভিয়ারকে দেখতে পেলুম না।

    বাইরে রাস্তায় গিয়ে একজনকে পেলুম। তাকে জিগ্যেস করলুম–ওদিকে পুলিশ কেন অত?

    লোকটা নিরাসক্ত গলায় জবাব দিল–যাকে দেখিয়ে না। কুছ অ্যাকসিডেন হুয়া জুরুর। যাইয়ে–দেখিয়ে! কই বড়া মছলি পাকড়া, মালুম।

    বাড়ির উত্তর ঘুরে পাথুরে সরু পথ ধরে কিছুটা যেতেই চোখে পড়ল, জালটা টেনে ওপরে ভোলা হয়েছে। ভিড় ঘিরে ধরেছে।

    কাছে গিয়ে আমার চোখ দুট নিষ্পলক হয়ে উঠল। জালে যা তুলেছে, তা একটি বডি। এবং ডেডবডিলাশ!!

    সেই লাশটার মুখের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট চিৎকার করে উঠলুম–কে ও?

    কর্নেল চাপাস্বরে বললেন রমা রায়। দ্য পুওর গার্ল!

    রমা! সেই মেয়েটি! কীভাবে সমুদ্রে পড়ল?

    কর্নেল জবাব দিলেন–ওর ঘরের ব্যালকনি থেকে।

    –অ্যাকসিডেন্ট?

    –কে জানে! কেউ ধাক্কা মেরে ফেলে দিতেও পারে।

    আঁতকে উঠলুম। ফিকে নীল শাড়িটা জড়িয়ে আছে গায়ে-রমার মুখে আতঙ্কের চিহ্ন নোনা জলেও মুছে যায়নি। প্রায় হাঁফাতে হাঁফাতে পালিয়ে এলুম।…

    সিঁড়িতে ওঠার সময় অন্যমনস্ক হয়ে ছিলুম। শেষ ধাপে উঠলে আমাদের ঘরটা ডাইনে সামনে পড়ে এবং কোনও বাধা না থাকায় দরজাটা স্পষ্ট দেখা যায়। আমার অন্যমনস্কতা কেটে গেল। সেই গ্রুফো ভদ্রলোক যেন এইমাত্র আমাদের দরজা থেকে সরে আসছে, এমন কি পর্দাটাও স্পষ্ট নড়ে ওঠা দেখেছি। প্রথম মুহূর্তের চমক কাটলে ব্যাপারটা চোরে ভুল বলে সন্দেহ করলুম।

    এই লোকটাকে কর্নেল সাহেব মিঃ সেন বলে সম্বোধন করছিলেন। আমার সামনে এসে সে একটু হাসল। হাসিটা অপ্রস্তুত ও হতচকিত মানুষের যেন।–এই যে মিঃ চৌধুরী। দেখে এলেন নাকি?

    গম্ভীর হয়ে পড়েছিলুম নিজের অজান্তে। বললুম–হ্যাঁ।

    সে অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করল যেন। বলল–কিন্তু কী মারাত্মক ঘটনা বলুন তো! আমি তো গত পাঁচ-ছ বছর ধরে জেভিয়াস লজে আছি। এমন বীভৎস কাণ্ড কখনও ঘটতে দেখিনি! আচ্ছা, আপনারা সাহিত্যিকরা তো খুব পাওয়ার অব অবজার্ভেশনের অধিকারী। দেখে কী মনে হলো বলুন তো?

    উত্তেজনা দমন করে বললুম–কী মনে হবে? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

    সেন চাপা গলায় বলল, বোঝার সমস্যা নিশ্চয়। প্রথম ধরুন, এটা স্বাভাবিক দুর্ঘটনা বলেও মনে হতে পারে। রমার ব্যালকনির নিচেই খাড়ি এবং গভীর জল। আনমনে রেলিং-এ পা ঝুলিয়ে বসলে পড়ে যাবার চান্স আছে! সম্প্রতি বোম্বেতে ফিল্ম প্রডিউসার ভদ্রলোকের বাড়ি থেকে এভাবেই তো এক অভিনেত্রী শাবানা সমুদ্রে পড়ে গেছেন। খবরের কাগজে দেখেননি?

    –দেখেছি। কিন্তু রমা হঠাৎ ডাইনিং থেকে উঠে এসে ওভাবে বসতে যাবে কেন রেলিং-এ?…অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই প্রশ্নটা তুললুম। কারণ, আমি ঘটনাটায় গুরুত্ব চাপিয়ে ওকে আঁচ করাতে চাইছিলুম যে যত সহজে ভাবছ উড়িয়ে দেওয়া যাবে, তত সহজ এটা নয়। অবশ্য ওকেই আমি অপরাধী ভেবেছি, তাও নিঃসংশয় নই। শুধু কেমন-কেমন লাগছে মাত্র।

    আমার প্রশ্ন শুনে গুঁফো সেন সায় দিয়ে বলল–ঠিক, ঠিক। ওটাই ভাইটাল কথা! তবে এমনও হতে পারে, খাবার দেরি দেখে বিরক্ত হয়ে চলে গিয়েছিল রমা এবং রেলিং-এ বসেছিল!

    সবই সম্ভব! তবে খুব জোরাল যুক্তি এতে নেই!

    –তা তো নেই-ই। কিন্তু ওকে কেউ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে কেন?

    আমরা তো পিছনের ঘটনা কিছু জানি না। ওর শত্রু থাকতে পারে।

    নিশ্চয় পারে। কিন্তু যার শত্রু আছে, সে দরজা খোলা রেখে একা এইভাবে অন্ধকারে ব্যালকনিতে গিয়ে শত্রুকে সুযোগ দিল?

    লোকটি যে ধুরন্ধর, তাতে সন্দেহ রইল না! ওর প্রশ্নে যুক্তি আছে। বললুম– হ্যাঁ, সেও একটা পয়েন্ট। দ্বিতীয়ত মিসেস্ জেভিয়ারের হার চুরির ঘটনা।….

    কথা কেড়ে সেন বলল–হ্যাঁ, হার চুরি। দুটো প্রায় একই সময়ে ঘটেছে। আপনি কি মনে করেন দুটোর মধ্যে কোনও লিঙ্ক আছে?

    থাকতে পারে। হয়তো রমা চোরকে মুখোমুখি দেখেছিল এবং তার ফলে তাকে মরতে হয়েছে।

    সেন সোসাহে বলল–চমৎকার যুক্তি! জানেন, ওই কর্নেল ভদ্রলোকও তাই মনে করেন। পুলিসও তাই ধরে নিয়েছে। হাজার হলেও আপনারা সাহিত্যিকরা অর্ডিনারি ব্রেন তো নন!

    সে সপ্রশংস তাকাল আমার দিকে। কিন্তু ওর চাউনিটা পছন্দ করছিলুম না। গায়ে পড়ে এমন ভাব করতে চায় কেন সে? তাছাড়া আমাদের ঘরের দরজায় ওকে দেখলুম, যদি চোখের ভুল না হয় তার কারণটাই বা কী? সেই সময় চকিতে মনে পড়ল, গতরাতে রাখীর মুছা যাবার সময় সে আমাদের ঘরে ঢুকেছিল–মোম জ্বেলে দিয়েছিল। তখন আবছা ভাবে মনে হয়েছিল, নোকটা যেন আমাদের ঘরের প্রতি কোনও অজানা কারণে আগ্রহী। কেন এই ধারণা মাথায় এসেছিল তখন? এটা ইনটুইশানের মতো।

    সেন আরও দু-একটা কথা বলে চলে গেল। আমি ঘরের দরজা ঠেললুম। যেমন ভেজিয়ে রেখে বেরিয়েছিলুম, তেমনি রয়েছে। কিন্তু খাটে রাখী নেই। বাথরুমে জলের সব্দে তার সাড়া পেলুম। কী বোকা মেয়ে! দরজাটা বন্ধ আছে কী নেই দেখেনি! এবার আমাদেরই কিছু চুরি গেল না তো? প্রেমিকারা এমনি সরল গোবেচারা হয়!

    প্রথমে চোখ পড়ল রাখীর ভ্যানিটি ব্যাগটার দিকে। সেটা গতরাত থেকে ওর বালিশের পাশে রয়েছে। সেই মুহূর্তে চমকে উঠলুম। ব্যাগের মুখটা খোলা একটা ভাঁজকরা কাগজ উঁকি মেরে রয়েছে। ব্যস্ত হয়ে ব্যাগটা ফাঁক করলুম। সর্বনাশ! নির্ঘাৎ কিছু, চুরি গেছে। রাখী শোবার সময় হাতের সোনার কাকন দুটো খুলে ওতে ঢুকিয়ে রেখেছিল মনে পড়ছে।

    কাগজটা কিন্তু আমারই লেখা চিঠি। রাখী সঙ্গে এনেছে তাহলে! ওর কাকন খুঁজতে–যদিও ওর ব্যাগে হাত ভরা উচিত নয়–এই অনধিকার চর্চা করতে হলো, কারণ আমিই তো এখন ওর গার্জেন।

    টুকিটাকি কাগজপত্র, প্রসাধনী, রুমাল কিন্তু কাকন জোড়া কই? রুমালটা তুলতেই বুকে জোর এল। এই যে রয়েছে।

    কিন্তু পরমুহূর্তেই আমার চোখ ঝলসে গেল। মাথা ঘুরে উঠল। কয়েকটা সেকেণ্ড ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম। রুমালের তলা থেকে একটা নেকলেস যন্ত্রের মতো টেনে তুললুম। হা-হীরেরই নেকলেস।তা না হলে এত উজ্জ্বল সাদা হতে পারে না। সাদাসিদে নেকলেস নয় রীতিমতো জড়োয়া হার!

    কোথায় পেল এ হার রাখী? এটাই সেই চুরি যাওয়া নেকলেস ম্যাডাম জেভিয়ারের? থরথর করে কাঁপতে থাকলুম। রাখীই কি….কিন্তু না–তা তো অসম্ভব। রাখীর মতো একজন সাদাসিধে নিরীহ মেয়ে সুশিক্ষিতা, সংস্কৃতিমতী, মার্জিত রুচির মেয়ে–যে শুধু ভালবাসা ছাড়া, সৌন্দর্য ও শিল্প ছাড়া জীবনে কিছু শ্রেয় ও প্রেয় মনে করে না–সে হার চুরি করবে কেন? গতকাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত এই তেইশটি ঘন্টায় ওর যা পরিচয় পেয়েছি, তাতে ওকে কিছুতেই ক্রিমিনাল চরিত্রের মেয়ে বলে ভাবা যায় না। তাহলে যা চোখের ভুল ভেবেছি, তাই ঠিক। ওই সেন ব্যাটাই খুনে ডাকাত। সে রাখীর ব্যাগে হারটা পাচার করে গেল এইমাত্র। হয়তো হজম করতে পারল না–তাই।আপনার প্রিয়জনের জন্য সেরা উপহার

    হারটা হাতে নিয়ে অবশ হয়ে বসে আছি, এমন সময় রাখী বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল হাসিমুখে ক্ষণে সে আমার হাতের দিকে তাকিয়ে প্রায় আর্তনাদ করে উঠল–ও কী? ওটা কী?

    আড়ষ্টস্বরে বললুম–হীরের নেকলেস।

    রাখী আমার পাশে লাফিয়ে এসে বসল। রুদ্ধশ্বাসে ভয়ার্ত গলায় বলল হীরের নেকলেস! এ কোথায় পেলে তুমি? কার নেকলেস?

    –সম্ভবত মিসেস জেভিয়ারের সেই চুরি যাওয়া নেকলেস। তোমার ব্যাগের মুখ ভোলা দেখে সন্দেহ হয়েছিল, তারপর দেখি ওতে ভরা আছে।

    রাখী কেঁদে ফেলল তখুনি। সে কী! কে রাখল ওখানে? হা গো, আমার গায়ে হাত দিয়ে তুমি বলোতুমি বলো আমার গা ছুঁয়ে–তুমি…

    অবাক হয়ে বললুম–রাখী! কী বলতে চাও তুমি? আমি হার চুরি করেছি?

    রাখী আমার বুকে ভেঙে পড়ল! না, না, না। তুমি সাহিত্যিক, তুমি শিল্পী তুমি কেন তা করবে? ছি ছি ছি! আমার মনে এখনও পাপ আছে গো? আমায় ক্ষমা করো, ক্ষমা করো তুমি। বলল, ক্ষমা করেছ? বলো!

    তার মাথাটা এবার আমার পায়ে পড়ার উপক্রম হলো। ব্যস্ত হয়ে ওকে দুহাতে চেপে ধরে সামলে নিলুম। বললুম–না, রাখী। তোমার স্বাভাবিক সংশয় তুমি প্রকাশ করেছ মাত্র। কিন্তু আমি ভাবছি, অন্য একটা কথা। দরজাটা ভেতর থেকে লক না করে তুমি বোকার মতো বাথরুমে ঢুকেছিলে, আর চোর সেই সুযোগে ঘরে ঢুকে এটা পাচার করে গেছে।

    রাখী চমকে উঠে বলল–সে কী! দরজা ভেজানো ছিল?

    -হ্যাঁ।

    রাখী ভুরু কুঁচকে কিছু ভেবে বলল–আমারই ভুল। ট্যাবলেট দুটোর ঘোর এখনও চোখ থেকে যায়নি। টলতে টলতে সোজা বাথরুমে ঢুকেছি। ভেবেছিলুম তুমি হয়তো ব্যালকনিতে বসে আছ।

    কিন্তু যা হবার হয়েছে। এখন এটা নিয়ে কী করা যায়, দেখি। বরং কর্নেলের সঙ্গে পরামর্শ করে… ।

    বাধা দিল রাখী!–উঁহু। ঠাণ্ডা মাথায় এটা ভাবা দরকার। আমার মনে হচ্ছে, এখন কেউ আমাদের কথা বিশ্বাস করবে না। পুলিস জানলেই আমাদের জড়াবে। তার ফলে একটা ভীষণ ক্ষতি হবে অন্তত আমার। কারণ, আমি মেয়ে–এবং একটা স্কুলের শিক্ষিকা। আমার চাকরি যাবে। কেলেঙ্কারি রটবে–এমনি করে, তোমার সঙ্গে বাইরে এসেছি বলে! রাখী বুদ্ধিমতী। ঠিকই তো। আমরা দুজনে গোপনে বেড়াতে এসেছি স্বামী স্ত্রী সেজে। রটলে রাখীর শুধু নয়, আমারও কি কম বদনাম হবে? তার ওপর সবচেয়ে সর্বনাশ হবে আমার বাড়িতে। সত্যিকার স্ত্রী ভদ্রমহিলা হিস্টেরিক মেয়ে। নির্ঘাৎ আত্মহত্যা করে বসবে। এ ব্যাপার ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করেও কতটুকু কাজ হবে? কারণ, সাহিত্যিক হিসাবে আমার খ্যাতি আছে। খ্যাতিমান লোকেদের কোন কিছু চাপা থাকে না। এক সময় ফঁস হয়ে যায়। খবরের কাগজের রিপোর্টাররা এ নিয়ে যা শুরু করবে, তা ভাবতেই আমার গা হিম হয়ে গেল।

    বললুম–হা, ঠিকই বলেছ রাখী। আমরা এখন অজ্ঞাতবাসে এসেছি। কর্নেলকে জানানো মানেই পুলিসকে জানানো। ব্যাপারটা সহজে হয়তো মেটার বা চেপে দেওয়ার একটা চান্স ছিল কিন্তু তা আর নেই। কারণ সেই বেপাত্তা রমা রায়ের লাশ পুলিস খুঁজে পেয়েছে!

    অমনি রাখীর মুখটা আবার আতঙ্কে ছাই হয়ে গেল। সে রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল–সে কী! সেই মেয়েটি খুন হয়েছে?

    –হ্যাঁ। ব্যালকনিতে গেলেই দেখতে পাবে। ওর ঘরের নীচের খাড়ি থেকে লাশটা তোলা হয়েছে।

    রাখী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কোনও কথা বলতে পারল না।

    বললুম–কাজেই এই হারটা খুব সহজ হার নয়। খুনের সঙ্গে তার বাস্তব যোগাযোগ থাক বা নাই থাক, এখন আপাতত দুটো একসুত্রে জড়িয়ে গেছে। তুমি ঠিকই বলেছ, হারটা আমরা দিতে গেলেই জড়িয়ে যাব!

    রাখী অস্ফুটস্বরে বলল–এ কী বিপদে পড়লুম আমরা।

    ওকে আশ্বস্ত করার ক্ষমতা নেই। তবু বললুম–আমাদের ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে। তাহলে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব হবে। তুমিও ভাব, কী করলে ভাল হয়।

    একটু পরে রাখী বলে উঠল–এক কাজ করা যেতে পারে। হারটা যে কোনও ভাবে পাচার করা। বরং ওটা ব্যালকনি থেকে এক্ষুণি সমুদ্রের জলে ফেলে দাও।

    -এখন চারদিকে পুলিসের চোখ, রাখী!

    রাখী ঠোঁট কামড়ে একটু ভেবে বলল–তাহলে…তাহলে ওটা এবাড়ির মধ্যে কোথাও ফেলে রেখে এস।

    –তা সম্ভব। কিন্তু কয়েক লাখ টাকা দামের জিনিস এটা। যদি অন্য কেউ হজম করে দেয়? আমাদের বিবেক তত আছে, রাখী! মিসেস জেভিয়ারের এই সম্পদ তো শুধু টাকার জিনিষ নয়!

    –হ্যাঁ। ঠিকই বলেছ! আহা বেচারা!

    –একটা কাজ করা যেতে পারে। কিন্তু সেটায় রিস্ক আছে।

    কী, কী?

    –হারটা ম্যাডামের হাতের নাগালে রেখে দেওয়া।

    –কোথায় রাখবে?

    –ভাবছি।

    -শোনো, এক কাজ করা কিন্তু অনেকটা সহজ। ওপরে ওঁর যে ঘর থেকে এটা চুরি গিয়েছিল, সেখানেই রেখে আসা।

    –কিন্তু সেখানে তো তালা আটকানো।

    কপাট বা অন্য কোথাও ফোকর থাকা সম্ভব। গলিয়ে দিলেই তো ঝামেলা চুকে গেল। তাই না? ম্যাডাম ভাববেন, চোর ভয়ে ফেরত দিয়েছে। হজম করতে পারেনি।

    ঘামতে ঘামতে বললুম–তাহলে তা এখনই করতে হয়। তুমি সিঁড়ির মুখে দাঁড়াও। ম্যাডাম এখন নীচে আছেন! আমি কোনও কায়দায় তিনতলায় ঝটপট গিয়ে এটা পাচার করে আসি।

    রাখী হঠাৎ একটু হাসল–হাসিটা অবশ্য খুবই করুণ। বলল–হ্যায় সাহিত্যিক। তোমার প্রেমের মূল্য হয়তো এভাবে শোধ দিতে হচ্ছে!

    ওর একথায় আপ্লুত হলুম। উঠে দাঁড়ালুম। আমার পা থরথর করে অবশ্য কাঁপছে। মাথা টলমল করছে।

    পা বাড়াতেই রাখী উঠে দাঁড়াল। ওর মুখে একটা দৃঢ়তার ছাপ ফুটে উঠল। ফিসফিস করে বলে উঠল সেনা, না! তোমাকে অমন ভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া যায় না। আমি তা প্রাণ থাকতে হতে দিতে পারব না। তুমি দেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। তোমার মর্যাদার দাম কে দিতে পারে! ওগো, তুমি যেওনা। জীবনে তোমার এখনও কত কী দেবার আছে মানুষকে? তার চেয়ে আমি তো সামান্য অজ্ঞাতকুলশীল মেয়ে–আমার কিছু ঘটলেও কিছু যায় আসে না। শোনো, আমার কথা শোনো তুমি!

    রাখীকে আবেগে উচ্ছসিতা দেখলুম। এই সেই সত্যিকার রাখী, ঠিক কণ্ঠস্বর তার চিঠিতে পেয়ে এসেছি বরাবর। আবেগময়ী প্রেমিকা মেয়ে সে। আমি ওর চিবুক ধরে চুমু খেলুম। বললুম–না। তুমি অসামান্যা, রাখী। তুমি মেয়ে বলেই তোমার মর্যাদা আমার চেয়ে বেশি।

    না, না! ওগো, তা নয়। তোমার পায়ে পড়ি, তুমি যেও না!

    তবে কে যাবে?

    রাখীর নাসারন্ধ্র কাঁপছিল। তার মুখে ফুটে উঠেছে এক দৃপ্ত দৃঢ়তা। এদেশের মেয়েরা হয়তো এমনি করেই প্রেমিকের সম্মানে আত্মদান করতে যায়। সে বলল আমি যাব। আমিই রেখে আসব। ভেবো না–মেয়েরা এমন অনেক কিছু পারে, যা পুরুষেরা কল্পনাও করতে পারে না। তুমিই তো একথা কত উপন্যাসে লিখেছ?

    তুমি যাবে?

    হ্যাঁ। তার আগে তুমি বাইরেটা ভাল করে দেখে এস। তারপর তুমি কাশলে আমি বেরোব। তুমি বাঁদিকে নীচে যাবার সিঁড়ির মুখে দাঁড়াবে। কেউ এলে খুব জোরে কাশবে। আমি করিডরে ডাইনে তেতলার সিঁড়িতে উঠব। তোমার দ্বিতীয়বার কাশি শুনলে নেমে আসব। কেমন? আর কেউ না এলে তুমি চুপচাপ থাকবে। মনে রেখ।

    বেরিয়ে এলুম অগত্যা। ওর দৃঢ়তার কাছে নতি স্বীকার করা ছাড়া উপায় নেই। করিডর ফাঁকা। সব দেখে শুনে বাঁদিকে এগিয়ে নিচে যাবার সিঁড়ির মুখে কথামতো দাঁড়ালুম এবং কাশলুম অর্থাৎ পথ পরিষ্কার।

    আমাদের ঘর থেকে রাখী বেরোল। অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় চলে গেল সে করিডর পেরিয়ে তেতলার সিঁড়ির দিকে। অবশ গায়ে ও দুরুদুরু বুকে আমি দাঁড়িয়ে আছি। এতদিন পরে দেবতাকে খুব ডাকাডাকি করছি মনে মনে। মানত মানছি। সেকেণ্ডগুলো কাটতেই চায় না।

    আর কাশবার দরকার হলো না। রাখীকে নেমে আসতে দেখলুম। সে চোখ নামিয়ে হাসিমুখে ঘরে ঢুকলে আমার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। প্রায় দৌড়ে ঘরে ঢুকে দরজা ভাল করে লক করলুম। তারপর রুদ্ধশ্বাসে বললুম–কোথায় রেখে এলে?

    রাখী জবাব দিল–ভেবো না। ঠিক জায়গায় রেখেছি।

    এই সময় বাইরে ভারী পায়ের শব্দ হলো। পুলিস নাকি? শব্দ অন্য দিকে সরে গেল। ইস্ আর একটু দেরি করলে কী যে ঘটত! …

    তারপর যা সব হলো, বিস্তারিত বলার দরকার নেই। পুলিস আমাদের নীচে ডাইনিং হলে ডেকেছিল। জিজ্ঞাসাবাদ যা হলো, তা চূড়ান্ত। এরপর সার্চের পালা পড়ল। প্রত্যেকটি ঘর এবং প্রত্যেককে সার্চ করা হবে। মেয়েদের বডিসার্চ করবে এক মহিলা পুলিস। সবাইকে নিয়ে ওপরে আসা হচ্ছে, এমন সময় দেখা গেল মিসেস জেভিয়ার তেতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে নামছেন। কর্নেল সাহেবই দৌড়ে গিয়ে বুড়িকে ধরলেন। বুড়ির হাতে সেই চোখ ধাঁধানো জড়োয়া নেকলেস! সবাই তাজ্জব।

    বুড়ি হেসে কেঁদে বাঁচেন না! তারপর সকলের কাছে ক্ষমা চাইতে শুরু করলেন। বোঝা গেল, হারটা মোটেও খোওয়া যায়নি। ওটা ওঁর স্মৃতির ভুল। লকারের অন্য তাকে রেখেছিলেন। এই স্মৃতিভ্রংশের জন্য উনি ভীষণ লজ্জিত।

    সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কর্নেল ওঁর হাত থেকে হারটা নিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বুড়ি তখন প্রায় পাগল-হারানিধি ফিরে পেয়েছেন। পাত্তাই দিলেন না।

    আমরা আবার ডাইনিং হল-এ নেমে এলুম। বেলা বারোটা তখন। লাঞ্চের এক ঘণ্টা দেরি। এখন মিসেস জেভিয়ারের আন্তরিক কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে কফি খেতে হবে বিনা দামে। বলা বাহুল্য, সবাই খুশি মনে কফি খেতে বসলেন।

    কিন্তু আমার মন খারাপ করছিল। বেচারা রমার কথা ভাবছিলুম। কীভাবে পড়ে গেল সে রেলিং থেকে? রাখী আমার মনমরা ভাবটা টের পেয়ে বলল তুমি কিন্তু এখনও নার্ভাস হয়ে রয়েছ গৌতম?

    -না, না। এমনি!

    –এমনি নয়। কী ভাবছ, বলব?

    বলো না?

    রমার কথা।

    হাসলুম। হয়তো ভাবছি। বেচারা ওভাবে মারা পড়ল!

    দুঃখ নিশ্চয় হওয়া স্বাভাবিক। হ্যাঁ গো, যদি রমা না পড়ে আমি ওভাবে পড়ে যেতুম…

    না, না! কী বলছ অলক্ষুণে কথা!

    –আচ্ছা, হ্যাঁ গো, যদি রমা হতে রাখী–তাহলে এমন করে ভালবাসতে নিশ্চয়? বলল না!

    -যাঃ! কী বলছ!

    –আহা, বলোই না বাবা! যদি আমি অন্য কোনও মেয়ে হতুম, আর রমা হতো তোমার ভক্ত সেবিকা এবং প্রেমিকা!

    যা হয়নি, তা নিয়ে ভাবি না, রাখী।

    ভাবতে দোষ কী? তুমি তো সাহিত্যিক মানুষ। কত সব কল্পনা করতে পারো। এটা কল্পনা করে দেখ না কেন একবারটি।

    –তুমি সামনে না থাকলে পারতুম রাখী।

    –তাহলে রমাকে আমার মতোই আদর করতে? কাছে নিয়ে শুতে– চুমু খেতে?

    যাঃ! শুনবে ওরা!

    আচমকা আমার বাঁ দিক থেকে কর্নেলের সাড়া পেলুম-হ্যালো গৌতমবাবু! এই যে মিসেস চৌধুরী! এতক্ষণ কথা বলার ফুরসতই পাইনি। ট্যাবলেট খেয়ে ভাল ঘুম হয়েছিল তো?

    বলতে বলতে কর্নেল এসে আমাদের পাশে বসে পড়লেন। রাখী সলজ্জ মুখে বলল–বসুন, বসুন কর্নেল। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। খুব ঘুমিয়েছি।

    কর্নেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন–সবই সুরাহা হলো। শুধু বেচারা রমা! ভেরি স্যাড রিয়্যালি!

    রাখী বলল-হা, বেচারার জন্য কষ্ট হচ্ছে। আচ্ছা কর্নেল, আপনার কি মনে হয় সত্যি ওটা অ্যাকসিডেন্ট?

    তাই বলছে পুলিস। রেলিং-এর ফাঁকে ওর শাড়ির একটা টুকরো আটকে রয়েছে। আর–ওর হাতের ব্যাগটাও ছিটকে পড়েছে-অবশ্য জলে পড়েনি, পাথরের ওপর পাওয়া গেছে ওটা। এসব দেখে পুলিস বলছে, অ্যাকসিডেন্ট। বৃষ্টিতে রেলিং ভীষণ পিছল ছিল। বসতে গিয়ে পিছলে পড়ে গেছে।

    আমি বললুম–আপনার ধারণা কী বলুন কর্নেল?

    কর্নেল হাসলেন। আমার আর কী আলাদা ধারণা থাকবে?

    -এটা খুন নয় তো?

    –তেমন ক্লু তো পাওয়া যায়নি এখনও। অবশ্য মেয়েটির সত্যিকার পরিচয়। পুলিস উদ্ধার করতে পারলে সব বোঝা যেত।

    রাখী ভুরু কুঁচকে বলল–সত্যিকার পরিচয়? তার মানে-ও কি রমা নয়, অন্য কেউ?

    কর্নেল জবাব দিলেন–আমি ডেফিনিট নই। কিন্তু…

    বললুম–কিন্তু?

    –কিন্তু ওর মধ্যে কেমন একটা অপ্রকৃতিস্থ ভাব লক্ষ করেছিলুম। আমার স্বভাব, মানুষকে লক্ষ করা। অবশ্য আমার চোখের ভুল হতেও পারে। তাছাড়া ও আসে গত রাত্রে সাতটা দশের ট্রেনে।

    –আমরাও তো ওই ট্রেনে এসেছি।

    -তাই বুঝি? তা ও যখন নাম রেজিস্ট্রি করাচ্ছিল মিসেস জেভিয়ারের খাতায়, আমি কাছাকাছি ছিলুম। লক্ষ করলুম, নাম লেখবার সময় একটু ইতস্তত করল। আমার ওই এক কুঅভ্যাস। একটু পরে পাশে গিয়ে একটা অজুহাতে দাঁড়ালুম। দেখলুম আর লিখে ও হরফটা দুবার বুলিয়েছে–যেন অন্য কী হরফ লিখতে যাচ্ছিল–হয়তো অভ্যাসে।…অবশ্য সবই আমার ভাসা ভাসা ধারণা। এর পিছনে কোনও বাস্তব তথ্য নাও থাকতে পারে।

    রাখী কৌতূহলী হয়ে বলল ঠিকানা কোথাকার?

    -বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ।

    –সে কী! আমিও তো…বলে চুপ করে গেল রাখী।

    –আপনি কি বহরমপুরের মেয়ে?

    রাখীর বিব্রত অবস্থা টের পেয়ে আমি বললুম–হা কর্নেল। আমার শ্বশুরালয় বহরমপুর। কিন্তু সবাইকে চেনা তো রাখীর পক্ষে সম্ভব নয়। কী বলল রাখী?

    রাখী বলল–নামটা…নামটা কেমন চেনা লাগল। বহরমপুরে রমা বলতে সে ভুরু কুঁচকে ভাবতে থাকল।

    কর্নেল তার দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকিয়ে আছে দেখে খারাপ লাগল। রাখীর সিঁথিতে অবশ্য সরু সিঁদুরের রেখা রয়েছে। হাতে শাঁখাটাখা নেই–আমরা তো মডার্ন দম্পতি! বললুম–একটা শহরে অনেক রমা থাকা সম্ভব!

    কর্নেল বললেন–রাইট, রাইট। সে তো সম্ভবই।

    রাখী হঠাৎ বলল–ও, মনে পড়েছে! রমা রায়! কিন্তু তাকে তো আমি চিনতুম!

    –কে সে?

    রাখী হেসে ফেলল।–এক দাগী ডাকাতের বউ। পরে ওর স্বামীর জেল হয়। জেল থেকে পালাতে গিয়ে গুলি খেয়ে মারা পড়ে। বউটি বহরমপুরে মার্কামারা মেয়ে ছিল। সবাই চিনত। পুলিসের সঙ্গে খাতির ছিল প্রচণ্ড। তারপর কোথায় যেন চাকরি-টাকরি নিয়েছিল। ও হ্যাঁ–স্কুলে।

    –স্কুলে ডাকাতের বউকে চাকরি দিল?

    বুঝতেই পারছেন, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে খাতির করে নিয়েছিল। ওর মতো মেয়ের পক্ষে অসম্ভব তো কিছু ছিল না!

    আমি রাখীকে সমর্থন করে বললুম–আজকাল তো সব জায়গায় এরকম হচ্ছে। মরালিটি নিয়ে কজনই বা মাথা ঘামায়? অবশ্য, সাহিত্যিক হিসেবে আমি বলব–এতে ইম্মরালও কিছু নেই। স্বামী দাগী ডাকাত হলেই যে বউ ভাল মেয়ে হবে না, তার মানে নেই। তাছাড়া স্বামীর মৃত্যুর পর তাকে বাঁচতে হবে তো!

    কর্নেল বললেন–সে রমা নিশ্চয় দেখতে খুব সুন্দরী ছিল?

    কর্নেলের বেমক্কা প্রশ্নে অবাক হলুম। রাখী কিন্তু হাসল।-কেমন করে বুঝলেন?

    হিউম্যান সাইকলজি এরকমই, মিসেস চৌধুরী। রূপের বেলা সাতখুন মাফ। অবশ্য এটা জেনারেল ল।

    রমা দেখতে খুব সুন্দরী ছিল। গরীব ঘরের মেয়ে তো? বি এ পাশ করার আগেই বাবা ওর বিয়ে দেন–অবশ্য রমা প্রেম করেই বিয়ে করে। আর করল করল, এক মাস্তানের সঙ্গে। তার ফলটা ভালই ভুগল।

    –তাহলে বলছেন, সে রমা এই রমা নয়?

    –মোটেও না।

    আমি হঠাৎ বলে উঠলুম কিন্তু তুমি তো এই রমাকে দেখইনি, রাখী?

    রাখী ভুরু কুঁচকে বলল–দেখিনি? পরক্ষণে হেসে ফেলল। কী কাণ্ড! সত্যি তো! আমি ওকে এখানে দেখিইনি। অথচ কেবলই মনে হচ্ছে–দেখেছি! আসলে ওই নামটার জন্যে এমন হচ্ছে!

    কর্নেল মাথা নেড়ে সায় দিলেন। রাইট, রাইট। যাকে বলে উইশফুল থিংকিং। তবে ও বডিটা আপনার একবার দেখা দরকার। অবশ্যই দরকার। আপনি সনাক্ত করলে পুলিসের খুবই সুবিধে হয়। দায়িত্ববান নাগরিকের পক্ষে এটা কর্তব্যও বটে।

    এই বলে কর্নেল খুব ব্যস্তভাবে উঠলেন এবং রাখী অসহায় মুখে আমার দিকে তাকাল। বিব্রত বোধ করছিলুম। রাখীকে এভাবে মড়ার সামনে নিয়ে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। তাই শেষ রক্ষার জন্যে, বললুম–ইয়ে দেখুন কর্নেল, ওর নার্ভ খুব শক্ত নয়। একসময় নার্ভের অসুখেও ভুগেছে। তার প্রমাণ তো গতরাতে পেয়েছেন। তাই বলছিলুম, মড়াটড়া দেখে ও হয়তো ভীষণ ভয় পাবে এবং হিতে বিপরীত ঘটে যাবে।

    কর্নেল মানুষটি দেখলুম খুবই সহানুভূতিশীল। ব্যাপারটা বুঝতে ওঁর দেরি হলো না। আবার বসে পড়লেন। বললেন–হ্যাঁ, সেও ঠিক। ওঁর নার্ভ তেমন শক্ত নয়। আচ্ছা মিসেস চৌধুরী, তাহলে যদি ওর ডেডবডির একটা ফোটো আপনাকে দেখানো হয়, কোনও আপত্তি হবে?

    রাখী নিশ্চয় মনে মনে বিরক্ত হলো। পুলিসে যা করবার করুক, তুমি কে বাপু যে এত উৎসাহ দেখাচ্ছ–এরকম ভাব রাখীর মুখে ফুটে উঠল। কিন্তু সে আস্তে ঘাড় নেড়ে ছোট্ট করে শুধু বললেউ।

    কর্নেল বললেন–ছবি তোলা হয়েছে। লাশও এতক্ষণ মর্গে চলে গেছে। ছবিটা পেতে ঘণ্টা চার-পাঁচ দেরি হবে। যাই হোক, অপেক্ষা করা যাক।

    রাখী বলল-চার-পাঁচ ঘণ্টা! আমরা যে এগারোটা ছত্রিশের ট্রেনে চলে যাব ঠিক করেছি কর্নেল!

    আমি অবাক হয়ে তাকালুম ওর দিকে। কখন ঠিক করলুম রে বাবা! চলে যাওয়া মানেই তো রাখীর সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া! আর এক্ষুণি চলে যাব বলে তো এতদূরে বেড়াতে আসিনি।

    রাখী আমার দিকে চোখের ইশারা করল। তখন বুঝলুম, আসলে ও ডেডবডির ছবিও দেখতে চায় না। এড়িয়ে যাবার মতলব এঁটেছে! অতএব ওকে সায় দিয়ে বললুম–হা কর্নেল। যে বীভৎস কাণ্ড হলো–এরপর এখানে ওকে নিয়ে থাকা খুব রিস্কি! আবার ভয়টয় পেয়ে সিন ক্রিয়েট করে বসবে। তাছাড়া রমা ঠিক পাশের ঘরেই উঠেছিল!

    হাসতে হাসতে বললুম– কথাটা। কর্নেল গম্ভীর হয়ে মাথাটা কয়েকবার দোলালেন মাত্র। কিছু বললেন না। অবশ্য এও জানি যে, পুলিস আইনত আমাদের আটকাতে পারে। বুক কেঁপে উঠল–আমাদের নিয়ে পুলিস টানাটানি করলেই বিপদ। রাখী ও আমার গোপন সম্পর্ক ফাঁস হয়ে যায় যদি! পুলিসের চোখে ফাঁকি দেওয়া কি সহজ হবে যে আমরা আসলে স্বামী-স্ত্রী নই?

    অবশ্য এটা পশ্চিমবঙ্গ হলে নিজের কিছু প্রভাব খাটাতে হয়তো পারতুম। কিন্তু এটা ওড়িশা। ভিন ভাষার রাজ্য। এখানে কারো কাছে গৌতম চৌধুরী সাহিত্যিক বলে কোনও আলাদা গুরুত্ব নেই।

    হঠাৎ কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন–এক্সকিউজ মি। আবার দেখা হবে। কেমন?

    উনি চলে গেলে রাখী ফিসফিস করে রাগ দেখিয়ে বলল–ভদ্রলোক বড্ড কুচুটে মানুষ! যেন সব দায় ওঁর! এই, আর এখানে থাকব না আমরা। বরং অন্য কোনও জায়গায় চলে যাই। এই বিশ্রী ঘটনার পর তোমার ইচ্ছে করবে ফ্রিলি চলাফেরা করতে?

    ঠিকই বলেছে রাখী। এই পরিবেশে প্রেমের বারোটা বেজে যাবে। মোটেও জমবে না। ওকে সায় দিলুম। বললুম–তাই হবে। লাঞ্চ খেয়ে আর দরকার নেই। চলল, গিয়ে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিই। মিসেস জেভিয়ারকে আমি বলে আসছি তুমি এগোও।

    রাখী তখুনি ওপরে চলে গেল। আমি মিসেস জেভিয়ারকে কথাটা বলতেই উনি দুঃখিত মুখে বারবার ক্ষমা চাইলেন। বললেন কী করব বাছা, আমারই দুর্ভাগ্য! আবার কিন্তু আসবে তোমরা।

    সিঁড়ির মুখে সেই গুঁফো সেনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল–হ্যাল্লো মিঃ চৌধুরী, আর কিছু শুনলেন?

    -কিসের বলুন তো?

    –আবার কিসের? যা ঘটে গেল!

    বিরক্ত হয়ে বললুম–কিচ্ছু শুনিনি। স্রেফ সুইসাইড। কেন? আর বেশি কী শোনার আছে?

    হঠাৎ লোকটা অভদ্রভাবে আমার কাঁধে একটা হাত রেখে মুচকি হেসে চাপা গলায় বলে উঠল–ওই ভদ্রমহিলা কি সত্যি আপনার স্ত্রী?

    রাগে সারা শরীর বি রি করে উঠল। হাতটা সরিয়ে দিয়ে বললুম–কী বলছেন মশাই যা-তা! একটু ভদ্রতাও শেখেননি!

    গুঁফো সেন হাসতে লাগল।

    আরও রেগে বললুম–আপনি অত্যন্ত অভদ্র! আপনি জানেন কার সঙ্গে ইতর রসিকতা করছেন? তেমন শিক্ষা-সংস্কৃতি থাকলে গৌতম চৌধুরীর সঙ্গে এরকম ব্যবহার করতে লজ্জা পেতেন!

    গুঁফো একটুও না দমে বলল–আমি মশাই এখানকার ভেটারেন ট্যুরিস্ট। আপনার সঙ্গিনীকে অনেকবার দেখেছি এখানে। এই লজেই–অন্য ভদ্রলোকের প্লঙ্গে। মিসেস জেভিয়ার বুড়ি মানুষ–চোখেও কম দেখেন। নয়তো চেনা মুখকে। অচেনা ভাবতেন না। এবেলার চেনা মানুষ উনি ওবেলায় চিনতে পারেন না। কিন্তু আমি পারি!…..

    বলেই গুঁফো সেন আচমকা চলে গেল। আর দুটো চড়া কথা বলার সুযোগ দিল না। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঘরের দিকে পা বাড়ালুম।

    রাখী তাহলে অন্য কারও সঙ্গে অনেকবার এখানে এসেছে? কার সঙ্গে এসেছে? অন্য প্রেমিক? নাকি ওই মাস্তান লোকটা আমাকে নিয়ে মজা করল? রাখীকে কথাটা বলার সাহস পেলুম না। ও দুঃখ পাবে। আমাদের সুন্দর সম্পর্কটা নড়ে ওঠারও আশঙ্কা আছে। বিশেষ করে রাখী যা ভাবপ্রবণ মেয়ে! অত আবেগ। যার মনে–তাকে এসব প্রশ্ন করা মানেই বারুদে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছুঁড়ে দেওয়া! আর এযুগে অত সংকীর্ণচেতা হওয়া সাজে না।

    মনের অস্থিরতা মনেই চেপে রাখলুম। কিন্তু গোছগাছ করতে করতে বুদ্ধিমতি রাখী তা যেন টের পেল। বলল–তোমাকে অমন দেখাচ্ছে কেন বল তো? মাথা ধরেনি তো?

    বললুম–হ্যাঁ?

    ট্যাবলেট আছে। খেয়ে নাও না! দেব?

    থাক। বেরুলে ছেড়ে যাবে।

    সব গোছানো হয়ে গেলে রাখী একবার ব্যালকনিতে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখতে দেখতে ডাকল–এই! শুনে যাও না!

    তার ডাকের কোনও তুলনা নেই। খুব ঝটপট যেটুকু সেজে নিয়েছে, তাতে, ওর চেহারা আশ্চর্য লাবণ্যময় হয়ে উঠেছে। ওর কোমর, নিতম্ব ও পেটের কিছু নগ্ন অংশ, এবং ওর ঠোঁট চিবুক গলা ঘাড় চুল–আমার চোখে অলৌকিক আর মায়াময় হয়ে উঠেছিল। প্রায় উদ্ভ্রান্ত হয়ে তার পাশে গেলুম। সে তার চাপা অভ্যস্ত আবেগময় স্বরে বলল–চলে যাবার আগে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সমুদ্রকে বলে যাবে না যে, আমরা এসেছিলুম–তুমি সাক্ষী রইলে?

    -হ্যাঁ। বলব। বলব যে আবার আসব, আমাদের মনে রেখ।

    –গৌতম!

    উঁ?

    –এখানে দাঁড়িয়ে সমুদ্রকে সাক্ষী রেখে আমাকে তুমি একটা চুমু দাও না লক্ষ্মীটি।

    বলার দরকার ছিল না। পাগলের মতো ওকে দুহাতে বুকে টেনে ওঁর ঠোঁটে ঠোঁট রাখলুম–দীর্ঘ একটা মিনিট। তারপর ও সরিয়ে দিল। ঠোঁট মুছল। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল–আরও কিছু তোমাকে দেবার ছিল এই সমুদ্রের সামনে। তুমি আরও কিছু চেয়েছিলে–তাই না গৌতম?

    –হ্যাঁ। আরও কিছু বাকি থেকে গেল, রাখী।

    রাখী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হঠাৎ ঘরে চলে এল। আমি ওর পিছন পিছন এসে ওকে গভীর আবেগে আকর্ষণ করে বললুম–রাখী! আমার আত্মা! আমার প্রাণ!

    রাখী মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল–এবার আমরা কোথায় যাব গৌতম? আমার ছুটি কিন্ত আরও তিনদিন আছে।

    –চলো তো, আগে স্টেশনে যাই। তারপর ঠিক করে নেব।

    কাছাকাছি আর কোথাও সি-বিচ নেই ভাল?

    –আছে। সে অনেক দূর। প্রায় ছ-সাত ঘণ্টার জার্নি। তার চেয়ে তিন ঘণ্টার ট্রেনে ও বাসে আমরা কোনারক পৌঁছাতে পারি।

    –কোনারক! রাখী নেচে উঠল। ওগো, তাহলে তাই চলো! …

    একটু পরে নির্বিবাদে আমরা বেরোলুম। ফো সেন বা কর্নেল কাউকেও দেখতে পেলুম না। অনেকটা স্বস্তি এল। রিকশায় আমরা স্টেশনের দিকেই চললুম। আকাশ মোটামুটি পরিষ্কার আজ। অবশ্য এখানে ওখানে কিছু সাদা মেঘ আছে। বাতাসও বইছে প্রচণ্ড জোরে। পিছন থেকে বইছে বলে রিকশা প্রায় পক্ষীরাজের মতো উড়ে চলল।

    চন্দনপুর অন-সী জংশন স্টেশন। খুব ভিড়ও ছিল। কোনারকের দিকে যাবার ট্রেন আসতে দেড় ঘণ্টা দেরি। ফার্স্ট ক্লাশ ওয়েটিং রুমে রাখীকে বসিয়ে রেখে এনকোয়ারিতে দাঁড়িয়ে ছিলুম। ভাবছিলুম, দুপুরের খাওয়াটা এখানেই সেরে নিই। কারণ ট্রেন থেকে নেমে কোনারকের পথে বাসে যেতে হবে। কখন পৌঁছব কিছু ঠিক নেই।

    হঠাৎ চমকে দেখি সেই গুফো সেন সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে নিবিষ্ট মনে খবরের কাগজ পড়ছে। আপদটা এখানে কেন? অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠলুম। ওর চোখ এড়িয়ে তক্ষুনি সরে গেলুম। ক্যান্টিনটা খুঁজে বের করতে হবে!

    ক্যান্টিন থেকে অবস্থা দেখে বেরিয়ে রাখীকে ডাকতে আসছি, চোখে পড়ল প্ল্যাটফর্মের ফাঁকা জায়গায় কিছুটা দূরে একটা পিপুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছেন সেই ধুরন্ধর গোয়েন্দা ঘুঘু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। আমার বুকে রক্ত ছলকে উঠল।

    দ্রুত ওয়েটিং রুমে গিয়ে ঢুকলুম। কিন্তু রাখী কোথায়? প্রায় দৌড়ে গিয়ে দেখি শুধু আমার সুটকেসটা পড়ে আছে–আমার মগজ খালি হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। মাথা ঘুরতে লাগল। পাশের টেবিল ধরে সামলে নিলুম। তারপর চারদিকে ঘুরে ঘটনাটা বাস্তব কি না টের পেতে চাইলুম।

    সেই সময় দরজায় দেখা গেল কর্নেলকে। মুখে স্বভাবসিদ্ধ হাসি বুডোর। গা জ্বলে যাচ্ছিল। কাছে এসে বাও করে বললেন–গুডমর্নিং মাই ডিয়ার চৌধুরী। তাহলে সত্যি সত্যি চন্দনপুর ছেড়ে চললেন? আপনার স্ত্রী কোথায়?

    হঠাৎ আমার সব উত্তেজনা ঝিমিয়ে গেল। বললুম– কর্নেল, আমি হয়তো ভুল করেছিলুম কোথাও কিছু সাংঘাতিক একটা ভুল ঘটেছে। আমার ইনটুইশন বলছে একথা! রিয়্যালি কর্নেল–আমি যেন বড্ড ঠকে গেছি।

    কর্নেল আমাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে হাত তুলে বললেন–নেভার মাইণ্ড গৌতমবাবু! আপনারা সাহিত্যিকরা বড্ড আবেগপ্রবণ এবং বেহিসেবী মানুষ। তাই এটা স্বাভাবিক। তবে দুশ্চিন্তা করে লাভ নেই–পস্তেও ফল হবে না। স্টেশনটা পুলিস ঘিরে ফেলেছে। আপনার জাল প্রেমিকা পালাতে পারবে না।

    চমকে উঠে বললুম–জাল প্রেমিকা মানে?

    -মানে রমা রায়!

    –কিন্তু রমা রায় তো মৃত!

    না গৌতমবাবু, যে সমুদ্রের জলে পড়ে মারা গেছে সেই হচ্ছে খাঁটি রাখী–আপনার সত্যিকার প্রেমিকা–মানে, সরি। পাঠিকা–গুণমুগ্ধা পাঠিকা।

    –আমি কিছু বুঝতে পারছি না কর্নেল।

    –খুবই সহজ। বহরমপুর গার্লস স্কুলের দুই শিক্ষিকা–একজন রমা রায়– কুখ্যাত ডাকাতের উইডো, অন্যজন রাখী মিত্র-সরলমনা কালচার্ড মেয়ে। কিন্তু যেভাবে হোক, দুজনের মধ্যে ভাব ছিল। এমন কি বিশ্বাস করে রাখী রমাকে আপনার সব চিঠিই দেখিয়ে থাকবে। এসব কিন্তু হাইপথিসিস। এখনও বাস্তবে প্রমাণিত হয়নি। তবে আমার সিদ্ধান্ত প্রায়ই ভুল হয় না। যাই হোক, রমার লক্ষ ছিল মিসেস জেভিয়ারের নেকলেসটার প্রতি। একদা এখানে এসে, হয়তো তার স্বামীও সঙ্গে ছিল-ওটার খবর পেয়ে যায়। কিন্তু কোনও সুযোগ পায়নি। অথচ ওটার কথা ভোলেনি রমা। এবার সে একটা চান্স নিল। রাখীকে সেই সম্ভবত প্ররোচনা দিল চন্দনপুরে বেড়াতে যেতে-সাজতে হবে গৌতম চৌধুরীর স্ত্রী। তাই পুলিস বা কেউ ভুলেও সন্দেহ করবে না। এবার একটা প্রশ্ন করি। আপনি রাখীকে বহরমপুরে কোন ট্রেন ধরতে বলেছিলেন?

    -পাঁচটা পাঁচের। ভোরে। পরের ট্রেন ছটা তেইশে। ওটাতেও হাওড়া এসে চন্দনপুরের ট্রেন ধরা যায়–তবে লেট করলে যায় না। তাই প্রথম ট্রেনেই আসতে বলেছিলুম।

    –হুঁম্! রেডিও মেসেজে বহরমপুর পুলিসের পাওয়া তথ্য শুনুন। স্কুলে দুজনেই ছুটি নেয়। ওইদিন সাড়ে পাঁচটায় হোস্টেলে রমাদের ঘরের দরজায় ধাক্কার শব্দ শুনে অন্য ঘরের একটি মেয়ে দেখে ভিতরে রাখী বন্দী। বাইরে কেউ শেকল তুলে দিয়েছে। ঘরে রমা ছিল না। রাখী তখন সেজেগুজে বেরিয়ে যায়। বলে– কলকাতা যাচ্ছে কথামতো। রাখী তাহলে বোধহয় ছটা তেইশের ট্রেন ধরেছিল। ট্রেনটা হয়তো লেট করেনি। ফলে আপনাদের দেখে থাকবে। অভিমান হওয়া স্বাভাবিক। সে চন্দনপুরের ট্রেনে চেপে বসেছিল। কোনও এক সুযোগে ব্যাপারটা ফাঁস করে দেবার ইচ্ছে নিশ্চয় ছিল–আপনার সঙ্গে গোপনে দেখা করত হয়ত। এবার বাকিটা সহজ। রমা এখানে এসে কোনও ভাবে ওকে আবিষ্কার করুক, কিংবা রাখী নিজেই রমাকে একা পেয়ে মুখোমুখি চার্জ করার সুযোগ নিক কিছু একটা ঘটেছিল।

    –ঠিক বলেছেন কর্নেল। আমার মনে পড়ছে যখন জাল রাখীকে ঘরে রেখে আমি নীচে এসেছি, হঠাৎ ওই মেয়েটি কখন ওপরে চলে গিয়েছিল।

    –তাহলে বোঝা যাচ্ছে, রাখীই গিয়েছিল রমার কাছে। রমা কোনও অজুহাতে তাকে তার নিজের ঘরে নিয়ে যায় এবং ব্যালকনিতে গিয়ে বোঝাপড়া করার অছিলায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় সমুদ্রে।

    ইস্! কী সাংঘাতিক মেয়ে।

    ব্যাপারটা প্রথমে টের পাই, রাখীর পড়ে যাওয়া ব্যাগে আপনার কিছু চিঠি দেখে। মুহূর্তে অনেকটা বুঝতে পারি কী ঘটেছে। দ্বিতীয় আবিষ্কার–মিসেস জেভিয়ারের ফিরে পাওয়া নেকলেস–যা নকল!

    নকল!

    –হ্যাঁ! ওটা নকলই। আসলটা রমা মেরে দিয়েছিল এবং নকলটা …

    বলছি। সে আমাকে ভুল বুঝিয়ে সিঁড়ির মুখে পাহারা দিতে বলল, এবং নেকলেসটা রাখতে গেল। আঃ, তখনই সন্দেহ করা আমার উচিত ছিল। কারণ। তেতলার ঘরের চাবি…

    –চাবি কোনও প্রশ্ন নয় ওর কাছে। দেখবেন, কবে ওই তালার ছাঁচ নিয়ে গিয়ে চাবি তৈরি করিয়ে নিয়েছিল। ধরা পড়ে যাবে। আর কয়েকটা মিনিট পর দেখতে পারবেন আপনার জাল প্রেমিকাকে!

    কর্নেল হাসতে লাগলেন। আমার মন দুঃখে ভেঙে পড়ছিল। হায় রাখী! চিঠিতে অত গভীর প্রেম আর সৌন্দর্যময় ব্যক্তিত্বের প্রমাণ দিয়েছিলে–বাস্তবে তুমি যাই হও, তোমাকে মনেপ্রাণে বরণ করে নিতে এতটুকু বাধত না!

    কর্নেল বললেন–দুঃখ হওয়া স্বাভাবিক গৌতমবাবু। আপনারা সাহিত্যিকরা অনুভূতিপ্রবণ মানুষ। কিন্তু তত চালাকচতুর নন। প্র্যাকটিকাল হওয়া আপনাদের ধাতে নেই।

    এমন সময় সেই গুঁফো সেন দৌড়ে এল–কর্নেল! আসামী ধরা পড়েছে। আসল নেকলেস আর একগোছ চাবি পাওয়া গেছে। পিস্তল ছোঁড়ার চেষ্টা করেছিল কী সাংঘাতিক মেয়ে!

    কর্নেল বললেন–এই যে আলাপ করিয়ে দিই–বহরমপুরের ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর রমেন সেন। ইনিই রমাকে সারা পথ ফলো করে এসেছিলেন!

    যন্ত্রের মতো গুঁফো সেনকে নমস্কারের জবাব দিলুম। সে বলল–আপনি হাওড়ায় আমাকে জিগ্যেস করলেন চন্দনপুর এক্সপ্রেস কোন প্লাটফর্মে? মনে পড়ছে?

    না তো।

    গুঁফো সেন হাসল–তখন অত লক্ষ করার মুড ছিল না আপনার।

    কর্নেল বললেন–তাহলে এগোনো যাক্। আসুন গৌতমবাবু, আপনার কিছুক্ষণের সঙ্গিনীকে এবার অন্যরূপে দেখবেন আসুন।

    আমি করজোড়ে বললুম–ক্ষমা করবেন কর্নেল।

    –কিন্তু আপনাকে এখন পুলিশের দরকার হবে স্যার। গুঁফো সবিনয়ে বলল।–এবার আপনাকে আগাগোড়া একটা স্টেটমেন্ট দিতে হবে যে।

    –ঠিক আছে, দেব। চলুন–। কিন্তু ওই শয়তানীর সামনে নয়–নেভার।

    ওঁরা দুজনে হেসে উঠলেন। সুটকেসটা তুলে নিয়ে ভারি পা দুটো কোনও ভাবে টেনে নিয়ে চললুম। যেতে যেতে গুঁফো সেন বলল–গত রাত্রে আর এক মিনিট আগে ওপরে গেলে হতভাগিনী রাখীকে বাঁচাতে পারতুম। আমি ব্যাপারটা এভাবে দেখিনিজানেন? অর্থাৎ রাখীই যে আপনার সত্যিকার প্রেমিকা এবং সে এতদূর চলে এসেছে, জানতুম না। কীভাবে জানব বলুন? শুধু নির্দেশ আছে রমা যেখানে যাচ্ছে ওকে ফলো করতে হবে। এটা কর্তাদের স্ট্যাণ্ডিং নির্দেশ। তাই বরাবর হোস্টেলের দিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হয়েছে চব্বিশ ঘণ্টা। হাওড়া স্টেশনে এসে আপনার সঙ্গে রমাকে দেখে ভাবলুম নিশ্চয় বড় শিকারে যাওয়া হচ্ছে। আপনাকেও ভাবলুম কোনও বড় মাল। সাহিত্যিক গৌতম চৌধুরী যে আপনি, কেমন করে জানব? পরে জেভিয়ার্স লজে এসে জানলুম। তখন আরও শিউরে উঠলুম। সর্বনাশ, নিরীহ শিল্পী ভদ্রলোককে শয়তানী ফাঁদে ফেলেছে যে। সাবধান করার স্কোপ পেলুম না।

    গুঁফো সেন অনর্গল বকবক করতে করতে একটা জিপের সামনে দাঁড়াল। দেখলুম পুলিশের জিপ। উঠে বসলুম তিনজনে। জিপটা স্টার্ট দিল।

    আমাদের আগে-আগে একটা কালো প্রিজনভ্যান যাচ্ছিল। জানি, ওর মধ্যে সেই রহস্যময়ী যুবতীটি খাঁচায় বন্দী বাঘিনীর মতো ছটফট করছে। এখন তো আমি ওর কেউ নই। সামনে গেলে মাংস ছিঁড়ে খাবে। এখন আমি ওর ঘোর শত্রু।

    বাঁকের মুখে সমুদ্র দেখা দিল। সেই সমুদ্রবর্ষার দুরন্ত উচ্ছ্বাসে বিক্ষুব্ধ। এখন তাকে মনে হলো না প্রেমের আবেগে চঞ্চল হয়েছে। মনে হলো প্রচণ্ড দুঃখে ক্রোধে কান্নায় ফেটে পড়ছে। চোখে জল এসে গেল। রুমাল চাপলুম।

  • হাঙর

    হাঙর

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book-name]

    এক

    দ্য শার্কে একটি হামলা

    বিকেলটা বেশ চমৎকার ছিল। সমুদ্রের লম্বা বিচে অজস্র লোক ভিড় করেছিল আজ। কদিন থেকে যা বৃষ্টি হচ্ছিল, তাতে কোনও ভ্রমণবিলাসী ঘর থেকে বেরোতে পারেনি। হঠাৎ আজ কিছুক্ষণের জন্য একটা বিকেল প্রচুল গোলাপি রোদ্দুর ছড়িয়ে খুশি করতে চাইল লোকগুলোকে। যারা বাইরে থেকে এসেছিল, প্রায় সকলেই চলে যাবার জন্যে তৈরি ছিল। কারণ বর্ষার মরসুম সত্যি সত্যি এসে গেছে এতদিনে। ভ্রমণ আর জমবার কথা নয়। কিন্তু যাবার আগের হঠাৎ পাওয়া এই সুন্দর উপহার–একটা শান্ত রোদ্দুরের বিকেল সবাই নিবিড়ভাবে ভোগ করতে চেয়েছিল। আর সমুদ্রকেও দেখাচ্ছিল প্রাচীন ব্রাহ্মণের মতো, ঢেউ-এর ফেনায় যার সাদা উত্তরীয় এবং উপবীত ঝকমক করে উঠছে ঐশ্বরিক পবিত্রতায়।

    ধর্মভীরু মানুষেরা রোদ মিলিয়ে যেতে যেতে শেষবার সমুদ্র-প্রণাম সেরে নিল। দুর্বলেরা ব্যস্ত সমস্ত হয়ে নুলিয়ার সাহায্যে স্নান থেকে স্বাস্থ্য নিয়ে এল। আর যারা চেয়েছিল শুধুমাত্র সৌন্দর্য, তারা বালির ওপর চেয়ারগুলোতে বসে সমুদ্রকে গিলে ফেলার ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর আস্তে আস্তে ফিরে গেল। কিছু লোক এসেছিল শিশুসুলভ বিস্ময় নিয়ে, তারাও ক্লান্ত হয়ে কেউ কেউ। ডেরায় ফিরল।

    সংখ্যায় ওইসব লোকই ছিল বেশি, কোনও উদ্দেশ্য ছাড়া যারা কোনওখানে পা বাড়াতে রাজি নয়। বাদবাকি সব নিষ্কমা ও বৈহিসেবীর দল–তাদের কাছে সমুদ্র বা পাহাড় অরণ্য, অথবা কোনও প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শনের বস্তুত আলাদা মূল্য নেই, আলাদা কোনও বৈশিষ্ট্য নেই। তারা উদ্দেশ্যহীন। তারা জানে, বছরের কোন কোন সময় কোথাও যেতে হয়। তাই তারা যায় এবং ঘুরে আসে। হয়তো ঘর তাদের সময় বিশেষে চার দেয়াল থেকে চারটে, সিলিং ও মেঝে থেকে দুটো–মোটা ছটা দাঁত বের করে বলেই দরজা গলিয়ে পালায় কোথাও। তারা এই সমুদ্রতীরে এসে ঘুরতে হয় বলেই ঘুরেছে। হল্লা করা উচিত বলেই হল্লা করেছে। এবং কেউ কেউ শুনেছিল, বিচে বসে প্রকাশ্যে মদ্যপান করায় প্রচুর স্যাডিজম আছে, তারা তাই করল বটে কিন্তু সুখ কী টের পেল, বলা কঠিন। যেমন, শেষ মরসুমের সেরা আকর্ষণ তিনটি মেয়ে আর দুটি ছেলের দলটা। তাদের কেউ কেউ তো হড়হড় করে বমি করেই ফেলল। তারপর তারা বিধ্বস্ত ফুসফুস আর অস্পষ্ট চোখে সমুদ্রকে দেখেছে প্রচণ্ড ক্লান্তির প্রতীক–একঘেয়েমির যান্ত্রিক বিক্ষোভ।

    দ্বিতীয় নমুনা, আর একটি পঞ্চরত্নের দল। তারা সঙ্গিনীছাড়া তরুণ। বেলেল্লামি করা তাদের পক্ষে অনিবার্য হয়ে পড়েছিল–যেহেতু তাদের সঙ্গে কোনও মেয়ে নেই। তারা সমুদ্রকে আলাদা করে দেখেনি, বিচের নরমতা থেকে হাঁটার আনন্দ পায়নি, হঠাৎ এই খোলা বিকেলটার ভালবাসা টের পায়নি তারা কেবল বিশাল জালার গায়ে কয়েকটি পিঁপড়ের মতো ঘুরঘুর করছে এবং কুট কুট করে কামড়াতে চেয়েছে। বিস্তর মানুষকে তারা বিরক্ত করেছে। তারপর তিনটি মেয়ে ও দুটি ছেলের দলটাকে দেখতে পেয়ে শেষঅব্দি খানিকটা ঘুমো-ঘুষিও করেছে। পুলিশ দৌড়ে না এলে সে একটা দৃশ্য হত বটে! যেন বর্তমান সভ্যতাজোড়া স্যাডিজমের ঢেউ বিকেলের সমুদ্রতীরে বারবার হানা দিচ্ছিল।

    তৃতীয় নমুনা, স্ন্যাকস-গারারা ইত্যাদি পোশাকপরা চারটি মেয়ে। সম্ভবত তারা এখানে এসেই প্রথম সিগারেট খেতে চেয়েছিল। চারজনের হালকা আঙুলে চারটে সিগারেট, বিচের চেয়ারে বসা সৌন্দর্যলিঙ্গু বুড়োমানুষটিকে বলেছে, দাদু, দেশলাই দিতে পারেন? বিস্ময়ের কথা, তিনি মৃদু হেসে এবং সপ্রতিভ আধুনিকতায় লাইটার এগিয়ে দিয়েছেন। তখন তারা দেখেছে, লোকটার হাতে জ্বলন্ত চুরুট রয়েছে এবং তাঁর পোশাক দস্তুরমতো বিলিতি। অমনি ধন্যবাদ বলে হাসতে হাসতে সরে গেছে তারা। কিন্তু দ্বিতীয় জায়গায় আরেক নিঃসঙ্গ বুড়োকে বেছে দেশলাই চাইলে তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলো। ভদ্রলোক মুখটা গম্ভীর করে ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, নেই।তারা হেসে উঠল। এ বুড়োকে শায়েস্তা করা হয়েছে ভেবে অনেক খুঁজে আরেক বুড়োকে বের করল। ইনি কিন্তু মুচকি হেসে বললেন–দেশলাই কী হবে লক্ষ্মীমায়েরা?

    সিগারেট খাবো।

    মেয়েরা সিগারেট খায় নাকি? বলে পরক্ষণে মাথা দুলিয়েছেন।…হা ভুল। হচ্ছে। খায় বটে। আমাদের শহরে মনিসিপ্যালিটির ঝাড়ুদারনীরা খায় বটে। তা লক্ষ্মীমায়েরা, তোমরা কোন মুনিসিপ্যালিটিতে কাজকম্মো করো, শুনি?

    পাল্টা চোট খেয়ে ওরা চটে গেল।..বুড়ো হয়েছে, ভদ্রতা করে কথা বলতে জানেন না? যত সব সেকেলে ভূত! গেঁয়ো রাবিশ! কবে যে এগুলো যাবে সব!

    এবং পরে কয়েক মিনিট শিক্ষাসভ্যতা নারীধর্ম ইত্যাদি নিয়ে একতরফা বিতর্ক–তারপর হঠাৎ চারটি ফ্যাশানভূতগ্রস্ত মেয়ের পক্ষে সেই পাঁচটি সঙ্গিনীলিঙ্গু ছেলের যোগদান, দেশলাই জ্বেলে প্রত্যেকের ঠোঁটের সিগারেট ধরিয়ে দেওয়া–তারপর বুড়ো অভিমানী কম্পিত চোখে দেখলেন, নজনের দলটা নটা সিগারেটের ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে চলতে শুরু করেছে। বুড়ো সখেদে বললেন, একেই কি বলে সভ্যতা? এবং বুড়ো শালিকের মতো ঘাড়ে রোঁ নিয়ে এক দত্তকুলোদ্ভব কবির কথা ভাবতে লাগলেন।

    হ্যাঁ, অভাবিত বিকেলের সমুদ্রতটে হয়তো এসব ঘটনা ও দৃশ্যও সমুদ্রচাঞ্চল্যের অন্তর্গত। তারপর কিন্তু প্রকৃতি তেমনি বিস্ময়কর তৎপরতার সঙ্গে গুটিয়ে ফেলল ঝিলমিল গোলাপি রঙের পটচিত্র! সূর্য ডুবে যেতে-না-যেতে হু হু করে সমুদ্র থেকে উঠে এল চমরী গাইয়ের মতো মেঘ। এবং তারপর আবার শুরু হলো তুলকালাম বৃষ্টি। দেখতে দেখতে ফাঁকা হয়ে গেল বিচ। নুলিয়ারা ডাঙ্গার নৌকোর তলায় গুটিসুটি ঢুকে গেল। ফেরিওয়ালারা জিনিসপত্র গুটিয়ে শস্যকণাবাহী পোকাদের মতো দৌড়ে পালাতে লাগল। বেলুনওয়ালাদের হলো সমস্যা। চারজন কাবুলিওয়ালাও গুলিখাওয়া বাঘের মতো সি-বিচের একটা হোটেলে ডিগবাজি খেয়ে ঢুকল। বুড়ো, কাচ্চাবাচ্চা আর মেয়েরা ভিজে জবুথবু হয়ে যে-যার আখড়ায় ঢুকতে বেশ দেরি করে ফেলল। কেবল মাস্তানটাইপ কিছু ছেলেমেয়েকে দফায় দফায় দেখা গেল কাকের মতো দিব্যি ভিজতে ভিজতে উদ্দেশ্যহীনভাবে এদিক-ওদিক চলেছে। নজনের দলটা একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে গেছে ইতিমধ্যে। পাঁচজনের দলটা হোটেলে ফিরেছে সবার আগে। বিলিতি পোশাকপরা বুড়ো রেনকোট চাপিয়ে দিব্যি ধীরে-সুস্থে সবার শেষে গেল। তারপর সমুদ্রের ধারে শুধু বৃষ্টি আর ধূসরতা ছাড়া কিছু নেই।

    একটু পরেই খুব তাড়াতাড়ি রাত এসে গেল। বৃষ্টির মধ্যে কুয়াশার মতো অপরিচ্ছন্নতায় বিচের বাতিগুলো জ্বলে উঠল। দ্য শার্ক বা হাঙর নামে একটেরে ঝাউবনের ধারে যে নির্জন ছোট্ট বার কাম-রেস্তোরাঁ রয়েছে, সেখানে ভিড় কম ছিল। মদ্যপিপাসুরা আজ বিকেলে সমুদ্রের ধারে বসে সুখ চেয়েছিল। তাছাড়া, কেন যেন আজ জমেইনি এখানকার আসর। কাউন্টারের ভদ্রলোক এক মাদ্রাজী। তিনিই মালিক। বিকেলে ভালো আবহাওয়া পেয়ে মোহনপুর চলে গেছেন– বউয়ের অসুখ নাকি। তিনজন ওয়েটার, কিচেনে দুজন রাঁধুনি, দুটো কিশোর বয় এবং কাউন্টারে রোগা হাড়জিরজিরে একজন বাঙালী কর্মচারী।

    এ রেস্তোরাঁয় যারা দৌড়ে ঢুকেছিল, সাতটা অব্দি কেউ কেউ বিয়ার খেয়ে ভিজতে ভিজতে কেটে পড়ল। একজন অবশ্য হুইস্কি খেয়েছে পেগ তিনেক। সেও দুলতে দুলতে চলে গেল। এক মধ্যবয়সী দম্পতি ছিলেন। তারা লাইম দিয়ে জিন খেলেন এক পেগ করে তারপর রেনকোট চড়িয়ে বেরোলেন। রাত আটটাতেও বৃষ্টি চলেছে সমানে। এবং ঘরে তখন কোণার টেবিলে কেবল দুটি মেয়ে বসে রয়েছে। একজন স্ন্যাকসপরা, অন্যজন বেলবটম। বাইশ থেকে চব্বিশের মধ্যে বয়স। একজন মোটাসোটা, একটু বেঁটে, খুব পাতলা ঠোঁট আর একবার ভাজা বেগনীর মতো সরু নাক, ছোট্ট কপাল–উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ বলা যায় এবং তার মাথায় ববছাঁট চুল–সে স্ন্যাকস পরেছে ক্রিমরঙা। গায়ে তাঁতের ফিকে হলুদ হাফ পাঞ্জাবি–তাতে বাটিকের কালো ছাপ, কবিজিতে চওড়া কালো বেল্টের মোটা ঘড়ি। তার পায়ে সরু দু ফিতের হালকা স্লিপার।

    বেলবটপরা মেয়েটির গায়ে শুধু ধবধবে সাদা গলা-আঁটো হাফ স্পোর্টিং গেঞ্জি, তার বুকে ব্রেসিয়ার নেই, তা স্পষ্ট। তার মুখটা একটু লম্বাটে–গালের দিকটা ডিমালো, চিবুক তিনকোণা কিন্তু প্রশস্ত, বেমক্কা পুরু ঠোঁট ঠোঁটের কোণায় উদ্দেশ্যহীন হাসির আভাস আছে। তার ভোলা বলিষ্ঠ বাহু দুটো টর্চের নতুন ব্যাটারি থেকে উৎসারিত জোরাল দুটি আলোর মতো। তারও কবজিতে মোটা ঘড়ি এবং একই ব্যাণ্ড। তার পায়ে পেতলের চওড়া বকলেস দেওয়া চটি। তার গায়ের রঙ বেশ ফরসা। হঠাৎ দেখলে অবাঙালী মনে হতে পারে। তার কপাল অশোভন ভাবে চওড়া এবং ঘন কালো ভুরু পাপড়ি, ডাগর চোখ, কালো একরাশ চুল কাঁধ থেকে কয়েক ইঞ্চি নেমে গেছে। কীরকম পুরুষালি চেহারা যেন। হঠাৎ দেখলে কিম্পুরুষ মনে হয়।

    হাফ-পেগ জিন নিয়ে তারা রাত আটটা অব্দি হাঙর-এর মধ্যে বসে রয়েছে। তার জন্য অবশ্য এই দুঃসময়ে হাঙরওয়ালাদের কোনও বিরক্তি নেই বরং উপভোগ্য দ্রব্য, এই ক্লান্তিকর বৃষ্টির রাতে দুটি উঁচুদরের যুবতী! তাদের শরীরে বিবিধ আয়োজন এবং ধনী গৃহস্থের বিয়েবাড়ির দরজার সামনে দিয়ে যাবার সময় নিম্নবিত্ত যেমন একবার তাকিয়ে দেখে যায়, তেমনি করে ঘুরঘুর করে যাচ্ছে। রাঁধুনি, ওয়েটারদ্বয়–এমন কি বয় দুজনও।

    মেয়ে দুটি কি বৃষ্টির দরুন উদ্বিগ্ন? তা কিন্তু কারো মনে হচ্ছিল না। ডেরায় ফিরে যাবার কোনও তাড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছিল না তাদের মধ্যে। বরং যেন কী নিশ্চিন্ত নির্ভরতায় সময় কাটানো আলস্যে বৃষ্টিকে উপভোগ করছিল। চাপা গলায় কথা বলছিল পরস্পর। এদিকে ক্রমশ রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাবার নির্দিষ্ট সময় এগিয়ে আসছিল। আজ মালিক নেই, তুমুল বৃষ্টি আর নির্জনতা, তাই কাউন্টারের রোগা কর্মচারীটি হাই তুলে বারবার ঘড়ি দেখছিল। তার ইচ্ছে, নটার বেশি অপেক্ষা করা আজ অসম্ভব। মালিক আসবেন না। তাঁর স্কুটার না থেকে পুরোপুরি গাড়ি থাকলে অবশ্য অন্য কথা ছিল। তাই হঠাৎ দেখা গেল সে চাপা গলায় ওয়েটারদের কী সব বলে সাড়ে আটটাতেই অধৈর্য হয়ে বেরিয়ে গেল–দরজার কাছে ছাতা খুলল, তারপর বৃষ্টি ও কালো রাতের মধ্যে ডুব দিল।

    তার পনের মিনিট পরে বেরোল দুজন ওয়েটার–আর তাদের ছাতার তলায় একজন করে ক্ষুদে বয়। আরও পাঁচটা মিনিট লম্বা পায়ে চলে গেল রাঁধুনি দুজনও একইভাবে বেরোল। তারা মেয়ে দুটোর দিকে একবার যথারীতি তাকিয়েও গেল।

    এখন রইল শুধু সবচেয়ে শক্তিমান, লম্বাচওড়া গড়নের লোক তার নাম নব। নব হাঙরে রাতে একমাত্র পাহারাদার। বোঝা যায়, সেই মালিকের একমাত্র বিশ্বস্ত ও প্রশ্রয় পাওয়া কর্মী। কারণ ক্যাশবাক্সটা সে লম্বা মোটা হাতে অবহেলায় তুলে লোহার আলমারিতে ঢোকাল। চাবির গোছাটা উর্দির তলায় গাপ করল। তারপর ক্যাশ কাউন্টারে বসে মেয়ে দুটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার তাকানোর মধ্যে বিস্ময় বিরক্তি কিংবা প্রশ্নবোধক চিহ্ন নেই। বোঝা যায়, এই ধরনের জীবনে সে কোনও আকস্মিকতা আশা করে নাবস্তুত সব আকস্মিকতাই তার কাছে নিয়ম। এবং সেজন্যেই সে ফাঁক পেলেই বলে, এই হচ্ছে হাঙরের কানুন।

    হ্যাঁ, যে-কোনও সময় কোনও আবেগবান, ভাবপ্রবণ কিংবা খামখেয়ালী খদ্দের এসে হানা দিতে পারে। দেয়ও। রাত বারোটা অব্দি তাই খুলে রাখার নিয়ম আছে দ্য শার্কের দরজা। অনেক সময় এসে পড়তে পারেন পুলিশ অফিসারদেরও কেউ। বঙ্গোপসাগরের উত্তর পশ্চিম তীরবর্তী এই উপনগরীটিতে প্রচুর রহস্যময় ঘটনা ঘটে থাকে। অনেকে জানে, নব পুলিশের একজন টাউট। এবং পুলিশ সচরাচর গভীর রাতেই আসে এখানে।

    রাত নটা বাজলে এতক্ষণে মেয়ে দুটি আরও দুট হাফ-জিনের অর্ডার দিল। নব অর্ডার সার্ভ করে ফের কাউন্টারে মাছের চোখ নিয়ে বসল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ তখনও শোনা যাচ্ছে। সমুদ্রের গর্জন কাঁপয়ে দিচ্ছে মানুষের সচেতন ইন্দ্রিয়গুলোকে। এই উপকুলে এমনিতেই সমুদ্র খুব রাফ যাকে বলে–তাতে এই দুর্যোগে তার ভয়ঙ্কর আওয়াজ অনভিজ্ঞদের অস্বস্তিতে অস্থির করে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, ঠিক দরজার সামনে ঢেউ এসে ভেঙে গেল। তিনজনের কেউ তাকিয়ে দেখে না।…

    একটু পরেই দরজার বাইরে একটা ভিজে মানুষের মূর্তি দেখা গেল। দরজায় এসে দুটো হাত দুদিকে রেখে মাথা গলিয়ে দিল সে। মেয়ে দুটি অমনি অস্ফুট চেঁচিয়ে উঠল। বড়বড় চোখে তাকাল তার দিকে। দুজোড়া চোখে প্রচণ্ড আতঙ্ক ম্লান আলোয় ঝলমল করে উঠল।

    নবও নড়ে উঠেছিল। সে সিংহের মতো গ্রীবা ঘুরিয়ে দেখছিল আগন্তুককে।

    কারণ, আগন্তুকের মুখে একটা কালো মুখোশ।..

    সে এক লাফে ভিতরে এসে গেল। পরক্ষণে তার হাতে ঝলসে উঠল একটা ছোরা। অমনি স্ন্যাকসপরা মেয়েটি জন্তুর মতো অব্যক্ত একটা আর্তনাদ করে কোণের দিকে ছিটকে গেল। অসমাপ্ত গ্লাসগুলো উল্টে ঝনঝন শব্দে নিচে পড়ে ভাঙল। বেলবটমপরা মেয়েটি যেন হতবুদ্ধি হয়ে বসেছিল। আততায়ী ছোরাটা নিয়ে এক পা এগোতেই সে মুখে আঙুল পুরে গোঁ গোঁ করে উঠলতারপর কাউন্টারের দিকে দৌড়ে যেতে চেষ্টা করল। কিন্তু তার সামনে আততায়ী-তাই কিচেনের দরজার দিকে এগোল।

    তাও পারল না। আততায়ী এক লাফে সেদিকে এগোলে মেয়েটি কোণে তার সঙ্গিনীর কাছে চলে গেল। দুজনেই ভীষণ কাঁপছিল।

    বড়জোর কয়েকটা সেকেণ্ডের মধ্যে এগুলো ঘটল।

    তখন দেখা গেল নব আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াচ্ছে। তার মুখে সংশয়। প্রস্তুতির অভাব তখনও স্পষ্ট। আগন্তুকের হাতে ছোরা রয়েছে।

    দ্য শার্কের সাত বছরের জীবনে এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি। মারামারি বিস্তর হয়েছে কিন্তু হঠাৎ এমন দুর্যোগের রাতে নির্জন পরিবেশে মুখোশপরা কোনও লোক ছোরা হাতে ঢোকেনি। নব তাই হয়তো হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল।

    আট-দশ সেকেণ্ডের মধ্যে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। আততায়ী ছোরাটা তুলে জড়সড় বোবায়ধরা মেয়ে দুটির দিকে এগোতেই বেলবটমপরা ফরসা মেয়েটি ছিটকে সদর দরজার কাছে চলে গেছে এবং তারপর তাকে বাইরে অদৃশ্য হতে দেখা গেল।

    তারপর ভয়ঙ্কর কানামাছি খেলা চলল স্ন্যাকসপরা বেঁটে মেয়েটি ও আততায়ীর মধ্যে। মেয়েটি বোবায়ধরা গলায় গোঁ গোঁ করতে করতে এদিক-ওদিক লাফ দিচ্ছে। টেবিল-চেয়ার ইত্যাদি লণ্ডভণ্ড হচ্ছে। নব সেইসময় একহাতে চেয়ার তুলে অন্যহাতে একটা বড় বোতল তাক করল। সে খুব অবহেলায় ব্যাপারটা দেখছিল।

    আর সেই মুহূর্তেই দ্বিতীয় মেয়েটিও ছিটকে সদর দরজা গলিয়ে বেরিয়ে পড়ল এবং অদৃশ্য হলো। নবর বোতলটা লাগল দরজার পাশে। প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে গেল। আততায়ী তখন দরজায়। পরক্ষণে নব দ্রুত একটা সোডার বোতল তুলে। মারল। বোতলটা বাইরে বৃষ্টির মধ্যে মোটাসোটা বাচ্চার মত ধপ্ করে পড়ল মাত্ৰ-ফাটল না। লন মতো আছে ওখানটায়-ঘাস আর ফুলের গাছ রয়েছে। ঘাস আর ফুলের গাছের মধ্যে বেহেড মাতালের মতো ঘাড় গুঁজে পড়ে রইল বোতলটা।

    তখন নব দুহাতে চোখ মুছল। মঞ্চে কেউ নেই।

    দুঃস্বপ্ন দেখছিল না তো?

    মোটেও না। রেস্তোরাঁর ভিতর জলজ্যান্ত ওল্টানো টেবিল-চেয়ার, ভাঙা কাচের গ্লাসগুলো, ছত্রাকার ছাইদানি ইত্যাদি-মেঝের কারপেট ভিজে গেছে ইতস্তত, একটা বোতল থেকে তখনও বগবগ করে জল পড়ছে। দরজার কাছে অজস্র কাচের .. টুকরো। একদিকের পর্দা ছিঁড়ে বেমক্কা ঝুলছে।

    নব প্রথমে এক লাফে দরজায় এসে বাইরে তাকাল। কেউ কোথাও নেই। বাতিগুলি বৃষ্টির ঝাপটায় ম্লান-বিচের দিকে যেন কুয়াশার পর্দা ঝুলছে। ডাইনে বাঁয়ে উপকূলের সমান্তরাল অপ্রশস্ত রাস্তা নির্জন। ফুলগাছ কিংবা অন্যান্য সব বড় গাছগুলো বৃষ্টির মধ্যে ছটফট করছে, যেন পায়ে বাঁধা সব জন্তু-জানোয়ার।

    সে দরজা ভাল করে এঁটে দিল। ডানপাশের কোনও বাড়ি বলতে বালিয়াড়িটার পিছনে কোস্টের সবচেয়ে কস্টলি হোটেল সী ভিউ। অন্তত চল্লিশ-পঞ্চাশ গজ হেঁটে যেতে হয় এখান থেকে। বাঁ পাশে একটা লম্বা ঝাউবন পেরিয়ে অন্তত একশো গজ দূরত্বে এক ধনী মানুষের বাংলোবাড়ি। পিছনে দেড়শো গজ পোভড়া জায়গায় কাটাতারের বেড়া এবং সরকারের লোহালক্কড়ের পাহাড়, তার পিছনে ত্রিশ গজ দূরে অবজারভেটরি। তারপর বড় রাস্তা এবং ছড়ানো-ছিটানো বসতি এলাকা, বাজার এবং সরকারী কোয়ার্টার। তারও পিছনে সরকার-লালিত অরণ্য অঞ্চল এবং কয়েকটি টিলা বা হিলক-শ্রেণীর ক্ষুদে পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় কোথাও বাংলো, কোথাও আশ্রম আর মন্দির রয়েছে।

    এই ভূগোল ও প্রকৃতি-পরিবেশ ঝটপট মনে ভাসল নবর। সে খুব ক্লান্ত বোধ করল। বৃষ্টি ছাড়বার কোনও লক্ষণ নেই। সমুদ্র গর্জাচ্ছে। কোনও পুলিশ অফিসারও তো আজ আসছে না এমন রাতে! হাঙরে কোনও ফোন নেই। বড়ো হোটেলগুলোয় আছে। কিন্তু বাইরে বেরোনো অসম্ভব।

    মেয়ে দুটি গতকাল সন্ধ্যায় এসেছিল হাঙরে। হাফ-পেগ জিন নিয়ে দুঘন্টা কাটিয়ে গিয়েছিল। কেমন গম্ভীর টাইপ মেয়ে যেন কম কথা বলে। কলকাতা থেকে এসেছে, সেটা বোঝাই যায়। কোথায় উঠেছে ওরা? আর, আচমকা ওই মূর্তির উদয় হলো, তাদের তাড়িয়ে নিয়ে গেল…কোনও মানে হয় না। এ একটা স্বপ্নই!

    একটু পরে সে সিগারেট ধরাল। তারপর ধীরে সুস্থে ঘরটা সামলাতে ব্যস্ত হলো। কাচের টুকরোগুলো কুড়িয়ে টেবিলে রাখল। তারপর মেয়ে দুটি যেখানে বসেছিল, সেখানে গেল। চেয়ারগুলো ঠিকঠাক করার সময় হঠাৎ তার চোখে পড়ল কিছু কাগজের টুকরো পড়ে রয়েছে কুচিকুচি এবং দলা পাকানো। দলা পাকানো কাগজটা সে অকারণ অন্যমনস্কতায় খুলল। একটা বড় কাগজের অংশ–কিন্তু ছাপানো নয়, হাতের লেখা। সে আদৌ লেখপড়া জানে না।

    নবর মনে পড়ল, এই কাগজটা বেঁটে মেয়েটির হাত থেকে নিয়ে ফরসা মেয়েটি পড়ছিল বটে। দ্বিতীয়বার সার্ভ করার সময় নব দেখেছিল, বেঁটে মেয়েটি কোলে হাত দুটো রেখেছে এবং আনমনে একটা কাগজ কুটিকুটি করেছে।

    কাগজগুলো সে ফেলল না। পকেটে রাখল। নব পুলিশের ইনফরমার। তার কী করা উচিত, সে জানে।…

  • কালো পাথর

    কালো পাথর

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book-name]

    কালো পাথর

    এক

    প্রেতাত্মা নিয়ে আসর বসানো অরুণেন্দুর হবি। এই আসরে মৃত মানুষের আত্মার আবির্ভাব হয় কোনো জীবিত মানুষের মাধ্যমে, যাকে বলা হয় মিডিয়াম। অরুণেন্দু নিজে কিন্তু মিডিয়াম নয়, নিছক উদ্যোক্তা। মিডিয়াম সবাই হতে পারে না। অরুণেন্দুর মতে সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়ের অধিকারী এবং খুব অনুভূতিপ্রবণ মানুষই মিডিয়াম হবার যোগ্য। পুরুষের তুলনায় এ ক্ষমতাটি মেয়েদের বেশি। তাই মেয়েদের মধ্যেই সে মিডিয়াম খোঁজে। পেয়েও যায়। অশরীরী আত্মা আনতে দেরি করে না। অরুণেন্দু দাবি করে, শতকরা নব্বইটি আসরে তার সাফল্যের অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই আসরকে ইংরেজীতে বলা হয় Seance-এর আসর। ..

    আসর যখন তখন যেখানে বসানো যায় না। পরিবেশ নির্জন এবং স্তব্ধ হওয়া চাই। আসরের লোকগুলোরও বিশ্বাস থাকা চাই দেহাতীত সত্তায়। তবে আত্মার আবির্ভাবের গ্যারান্টি দিতে অরুণেন্দু রাজি, যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের রাতে কোনো নিরিবিলি বাড়িতে আসর বসানো যায়।

    সেদিন এই রকম একটা অবস্থা দেখা দিয়েছিল চব্বিশে অক্টোবর রাত দশটায়, বঙ্গ-বিহার সীমান্তে খনি এলাকায় বারাহিয়া টাউনশিপে, ডঃ কুসুমবিহারী রায়ের বাড়িতে। ডঃ রায় খনি ও ধাতুবিশেষজ্ঞ সরকারি অফিসার। অরুণেন্দু সম্পর্কে তার ভাগ্নে। যখনই বেড়াতে আসে, প্রেততত্ব নিয়ে বকবক করে সারাক্ষণ।

    রাতের খাওয়ার পর বাইরের বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন ডঃ রায়, তার স্ত্রী মীনাক্ষী, একমাত্র সন্তান মঞ্জুশ্রী, তার হবু বর সুমন আর অরুণেন্দু। সেই সময় হঠাৎ বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়বৃষ্টি এসে গেল। তার মধ্যে লনের ওধারে গেট খুলে দৌড়ে এল দুটি মেয়ে, অনুরাধা আর ভাবনা দুই বন্ধু। মঞ্জুশ্রীরও বন্ধু। বেড়াতে বেরিয়ে আচমকা প্রকৃতির তাড়া খেয়ে আশ্রয় নিতে এল।

    ভাবনা গুজরাটি মেয়ে। তার বাবা কেশবলাল শান্তপ্রসাদ স্থানীয় ব্যবসায়ী। ভাবনার জন্ম বারাহিয়ায়। তাই সে বাংলাও বলে মাতৃভাষার মতো।

    বৃষ্টির ছাঁট এসে সবাইকে বিব্রত করছিল। তাই ডাইনিং-কাম-ড্রয়িংরুমে যাওয়া হল। অনুরাধা ও ভাবনা যে-যার বাড়িতে ফোনে জানিয়ে দিল মঞ্জুশ্রীদের বাড়িতে আটকে পড়েছে। চিন্তার কারণ নেই। ডঃ রায় গাড়ি করে পৌঁছে দেবেন তাদের।

    কফির আসর বসল এবার। অরুণেন্দু কিছুক্ষণ আগে সিয়াস (Seance) নিয়ে আলোচনা করছিল। ডঃ রায় ওসব বিশ্বাস করেন না। কিন্তু মা ও মেয়ে করে। তারা মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। সুমন হা বা না কিছুই বলছিল না। সে বরাবর মধ্যপন্থী সব ব্যাপারে। কফির আসরে আরও দুজনকে পেয়ে অরুণেন্দু আগের কথাটার জের টেনে আনল। অনুরাধা ও ভাবনার চোখে ফুটে উঠল চাপা ভয় ও বিস্ময়। বাইরে ঝড় বৃষ্টি, মেঘের গর্জন যেন অশরীরী আত্মারা আত্মপ্রকাশের জন্য অস্থির হয়ে, জীবিত মানুষের আনাচেকানাচে ছোঁক ছোঁক করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

    মঞ্জুশ্রী বলল, তাহলে অরুদা, এই তো তোমার মতে উপযুক্ত সময়।

    তার মা মীনাক্ষী হাসতে হাসতে বললেন, খুব হয়েছে, আত্মাটাত্মা ডেকে, এখন কাজ নেই। মুখেই বলল অরু, শুনতে বেশ লাগছে।

    ভাবনা একটু হাসল হঠাৎ। না মাসিমা। আমরা পরীক্ষা করে দেখি না, যদি সত্যি আত্মা আসে।

    ডঃ রায় হাই তুলে বললেন, ও কে! তোমরা আজ্ঞা দাও। আমি একটু পড়াশোনায় বসি এবার। অনু, ভাবনা-চিন্তা কোরো না। পৌঁছে দেবখন, যত রাতই হোক।

    তার পেছন-পেছন মীনাক্ষীও চলে গেলেন। ছেলেমেয়েদের মধ্যে আর আড্ডা দেওয়া শোভন নয়। ওরা হয়তো মন খুলে কথা বলতে পারছে না। বিশেষ করে। সুমন ও মঞ্জুশ্রীর কথা ভেবেই উঠে গেলেন মীনাক্ষী।

    সুমন চোখ নাচিয়ে বলল, কী অরুদা, হবে নাকি?

    অরুণেন্দু পা বাড়িয়েই ছিল। অনুরাধার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার আপত্তি নেই তো?

    অনুরাধা আস্তে মাথাটা দোলাল।

    অরুণেন্দু তার দিকে তাকিয়েই রইল মিনিট-খানেক। তারপর রহস্যময় হেসে বলল, আমার বিশ্বাস, মিডিয়াম, হবার যোগ্যতা এখানে একমাত্র আপনারই আছে।

    ভাবনা বলল, কি করে বুঝলেন বলুন তো?

    অরুণেন্দু বলল, ওটা আমার ইনটুইশান বলতে পারেন। দশবছর ধরে এসব নিয়ে আছি। দেখামাত্র বুঝতে পারি কে ভাল মিডিয়াম হতে পারে। অনুরাধা প্লিজ আপত্তি করবেন না কিন্তু।

    অনুরাধা মৃদুস্বরে বলল, আমাকে কী করতে হবে?

    অরুণেন্দু উঠে দাঁড়িয়ে বল্ল, ডাইনিং টেবিলে চলুন সবাই বলছি। আর মঞ্জু একটা হাল্কা পেন্সিল আর একটা কাগজ চাই। ঝটপট! সময় চলে যাচ্ছে। আর একটা মোম চাই।

    সঙ্গে সঙ্গে জোগাড় হয়ে গেল। কিচেন বন্ধ করে ফেলু ঠাকুর আর পরিচারিকা সুশীলাকে নিজেদের ঘরে পাঠানো হল। দরজা ও জানালাগুলো বন্ধ করে, অরুণেন্দু মোমবাতি জ্বেলে টেবিলে রাখল। বাইরের প্রাকৃতিক আলোড়ন খুব চাপা শোনাচ্ছিল এবার। ফ্যান বন্ধ করলে ঘরের ভেতরটা গুমোট হয়ে উঠল। কিন্তু উপায় নেই।

    সে অনুরাধাকে টেবিলের একদিকে একা বসাল। অন্যদিকে পাশাপাশি বসল সুমন, ভাবনা, মঞ্জুশ্রী আর সে। অনুরাধার হাতে পেন্সিল ও কাগজটা দিয়ে সে বলল, পেন্সিলটা কাগজের ওপর আলতো ভাবে রাখুন। তারপর কী করতে হবে বলছি।

    অরুণেন্দু খুব চাপা গলায় বলতে থাকল, এবার আমরা সবাই মিলে এমন একজন মৃত মানুষের কথা, চিন্তা করব, যাকে আমরা প্রত্যেকে চিনি। চিনি মানে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও পরোক্ষ ভাবে চিনি। অর্থাৎ জানি। যেমন রবীন্দ্রনাথ। আমি টেবিলে সংকেত করব। সঙ্গে সঙ্গে গভীর মনোযোগে রবীন্দ্রনাথের কথা চিন্তা করতে হবে। অনুরাধা আমাদের আসরের মিডিয়াম। রবীন্দ্রনাথের আত্মা তার মধ্যে আসবেন। অনুরাধা, প্লিজ বি ভেরি কেয়ারফুল। তিনি এলে আপনার পেন্সিল কেঁপে উঠবে কিংবা অন্য কোনো ভবে টের প্রানে সেটা। আপনার আঙুল যদি লিখতে চায় জোর করে বাধা দেবেন না কিন্তু। এটা একটা সিরিয়াস এবং কঠিন ব্যাপার-মানে, আপনার সচেতন মন অন্যের অনুভূতি-চিন্তা কাজকে বাধা দিতে চাইবে। আপনি নিষ্ক্রিয় থাকার চেষ্টা করবেন। মনে রাখবেন, আপনার এই মানসিক অবস্থার ওপর আসরের সাফল্য নির্ভর করছে। কেমন?

    অনুরাধা তাকিয়ে রইল নিষ্পলক চোখে। মোমের আলোয় তাকে যেন দূরের মানুষ মনে হচ্ছিল অন্যদের। সুমনের ঠোঁটের কোণায় সুক্ষ্ম হাসি ছিল এতক্ষণ। সেটা মিলিয়ে গেল। ভাবনাও গম্ভীর হয়ে পড়ল। মঞ্জুশ্রীর মুখে ভয় ও বিস্ময় ছিল। তাকেও এবার শান্ত দেখাল।

    — অরুণেন্দু বলল, রেডি। আমরা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের প্রতীক্ষা করছি। বলে সে টেবিলে আঙুলের শব্দ করল।

    বাইরে মেঘ ডাকল সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটা কেঁপে উঠল। মোমের শিখা স্থির জ্বলছে। ঘরে স্তব্ধতা ও ভ্যাপসা গরম। আবছা শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ ক্রমশ শোনা যেতে থাকল। দুমিনিট পরে দেখা গেল অনুরাধার হাতের পেন্সিল কঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে কাগজের ওপর কিছু লেখা হল।

    পেন্সিল থামলে অরুণেন্দু আস্তে কাগজ আর পেন্সিলটা অনুরাধাকে না ছুঁয়ে তুলে নিল। কিছু লেখা নেই। আঁকাবাঁকা একটা রেখা মাত্র।

    অরুণেন্দু লিখল : আপনি কে? তারপর কাগজটা আস্তে এগিয়ে পেন্সিলটা অনুরাধার হাতে গুঁজে দিল। অনুরাধার হাত তেমনি পেন্সিল ধরার ভঙ্গিতে টেবিলে রাখা আছে।

    আবার পেন্সিলটা কাঁপল। তারপর লেখা হতে থাকল। পেন্সিল থামলে অরুণেন্দু কাগজ ও পেন্সিলটা তেমনি আস্তে তুলে নিল। লেখা হয়েছে : আমি সুদীপ্ত।

    অরুণেন্দু লেখাটা নিঃশব্দে দেখাল অন্যদের। অনুরাধা ছাড়া সবারই মুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের কথা ভেবেছিল সবাই। সুদীপ্ত এসে গেল!

    এর পর অরুণেন্দুর প্রশ্ন এবং অনুরাধার জবাব লেখা হতে থাকল পালাক্রমে।

    তা হল এই :

    আপনাকে আমরা ডাকিনি।

    আমার কথা আছে।

    বলুন।

    থাক। আমি যাই।

    কেন?

    পিট নং ৩৪৭ ..

    তার মানে?

    কালো পাথর।

    কিছু বুঝলাম না।

    মোহান্তজী।

    এসব কী বলছেন?

    যাচ্ছি।

    অনুরাধার আঙুল থেকে কাগজ-কলম টেনে নিতে হাত বাড়াল অরুণেন্দু, সেই সময় হঠাৎ টেবিলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল অনুরাধা। ভাবনা আতঙ্কে অস্ফুট চীৎকার করে উঠল। অরুণেন্দু ডাকল, অনুরাধা! অনুরাধা!

    অনুরাধা অজ্ঞান হয়ে গেছে। সবাই উঠে দাঁড়াল। সুমন ঝটপট সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিল। মঞ্জুশ্রী কিচেন থেকে জল নিয়ে এল গ্লাসে। অরুণেন্দু অনুরাধার মুখে জল ছিটিয়ে দিল। ভাবনা তাকে ধরে সোজা করে বসিয়ে দিয়েছে ততক্ষণে।

    তারপর অনুরাধা চোখ খুলল। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

    গণ্ডগোল শুনে ডঃ রায় এবং মীনাক্ষীদেবী পাশের ঘর থেকে ছুটে এলেন। অরুণেন্দুকে একটু বকাবকি করলেন। ভাবনা বলল, অনু, তোমরা কি হয়েছিল?

    অনুরাধা আস্তে বলল, জানি না। হঠাৎ মাথা ঘুরে উঠল।

    সুমন জানালাগুলো খুলে দিলে ঘরের ভেতরকার গুমোটভাবটা চলে গেল। বাইরে ঝড়ের প্রকোপ লেগেছে। কিন্তু বৃষ্টি পড়ছে সমানে। অরুণেন্দু কাগজটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখে অদ্ভুত হাসি। সে বলল, সিয়াসের আসরে অনেক সময় এমন হয়েই থাকে অবশ্য। মিডিয়াম নিজেও ভয় পেয়ে যায়। তার একটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও আমি দিতে পারি। তবে

    ডঃ রায় কপট ধমক দিয়ে বললেন, থাক। তারপর হো হো করে হাসলেন। কবে অশরীরী এসে তোমারই ঘাড় মটকাবে দেখবে।

    মীনাক্ষী বললেন, মনু, সুস্থবোধ করছ তো?

    অনুরাধা একটু হাসল। আমি ঠিক আছি, মাসিমা।

    বাইরের বারান্দায় গিয়ে বৃষ্টি দেখে এসে ডঃ রায় বললেন, এখন বেরুনো যায়। অনু ভাবনা, এস–গ্যারাজ থেকে গাড়ি বের করি।

    ভাবনা বলল, এক মিনিট। মেসোমশাই, সিয়াসের আসরে কে এসেছিল জানেন? সুদীপ্ত।

    ডঃ রায় চমকে উঠলেন। সুদীপ্ত!

    ধাতু গবেষণা কেন্দ্রের অ্যাসিস্ট্যান্ট রিসার্চ অফিসার ছিল সুদীপ্ত। কিছুদিন আগে সে খুন হয়ে গেছে। তাই সকলের অবাক হবারই কথা।

    ডঃ রায় অরুণেন্দুর হাত থেকে কাগজটা নিলেন। অরুণেন্দু কাগজটার দিকে তাকিয়ে ছিল। কাগজটা নিয়ে চোখ বুলোতে ডঃ রায়ের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছিল। পড়া শেষ হলে গম্ভীর মুখে বললেন, এটা আমার কাছে থাক, অরু! ভাবনা এস। অনু তোমাদের পৌঁছে দিয়ে আসি।

    সুমন বলল, আমি ওদের পৌঁছে দিতে পারতাম। বৃষ্টির মধ্যে আপনি কষ্ট করে–

    ডঃ রায় বললেন, তুমি তো উল্টোদিকে যাবে। তাছাড়া রাত হয়ে গেছে। অতখানি পথ তোমাকে ফিরতে হবে।

    ডঃ রায় বেরিয়ে গেলেন। তাদের বিদায় দিতে গেল মঞ্জুশ্রী আর তার মা। মা ও মেয়ের মুখে আতঙ্ক ও উদ্বেগের ছাপ লেগে রয়েছে।

    অরুণেন্দু গুম হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সুমন একটু হেসে বলল, কী অরুদা? কী ভাবছ?

    অরুণেন্দু হাসল। চাপা গলায় বলল, ব্যাপারটা আমার নিজেরই খটকা লাগছে।

    কেন বলো তো?

    আমার অভিজ্ঞতায় কখনও সিয়াসের আসরে সদ্যমৃত কেউ আসেনি। তার চেয়ে বড় কথা অপঘাতে মৃত কোনো মানুষের আত্মা আসে বলেও জানি না। প্রেততত্ত্বের বহু বই পড়েছি। কোথাও পড়িনি, অপঘাতে মৃতরা আসে। কারণ কী জানো? অরুণেন্দু চাপা গলায় বলতে লাগল। তার মুখে উত্তেজনা থমথম করছে।..কারণ যারা অপঘাতে মারা পড়ে, তারা ভীষণ যন্ত্রণায় ভোগে অনন্ত কাল। মৃতদের জগতে কয়েকটা স্তর আছে। অপঘাতে মৃতরা সেই সব স্তরের বাইরে কোথাও স্থান পায়। সেখান থেকে যদি বা কেউ বস্তুজগতে এসে পড়ে, সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠে। তাই ভগবান বা প্রকৃতি, যিনিই হোন, তাদের স্বাভাবিক পারলৌকিক স্তরগুলোতে রাখার ব্যবস্থা করেননি। ..

    সুমন বলল, বাপস্। মাথাটা আর বিগড়ে দিও না অরুদা! তাছাড়া এসব শুনলে এ রাতে আর বাড়ি ফেরা কঠিন হবে। মাইণ্ড দ্যাট, পাঁচ কিলোমিটার দূরে থাকি।

    অরুণেন্দু বলল, সুদীপ্তকে তুমি চিনতে, সুমন?

    সুমন উঠে দাঁড়াল। অল্পস্বল্প। তবে ওর কথা আর নয়। দেখি বৃষ্টি কমল নাকি।…

  • ত্রিশূলে রক্তের দাগ

    ত্রিশূলে রক্তের দাগ

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book-name]

    ত্রিশূলে রক্তের দাগ

    এক

    সম্প্রতি চিৎপুর এলাকায় আন্তর্জাতিক চোরাচালানীচক্রের কার্যকলাপ ফাঁস হাওয়ার ঘটনা সব কাগজে বেরিয়েছিল। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার পক্ষ থেকে এর একটা ফলোআপ সংগ্রহের জন্যে বেরিয়ে ট্রাফিক জ্যামে আটকে গেলাম। ঘিঞ্জি রাস্তা। বেলাও পড়ে এসেছিল। তার ওপর ঠিক এই সময়টাতেই লোডশেডিং। বিরক্ত হয়ে গাড়িতে বসে সিগারেট টানতে টানতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখছিলাম, আর এই অব্যবস্থার জন্যে ট্রাফিক পুলিশদেরই দায়ী করছিলাম। লরি বা ট্রাকের প্রতি তাদের মাত্রাতিরিক্ত মনোযোগ যে অনেক সময় জ্যামবিভ্রাট বাধায়, তাতে কোনও ভুল নেই।

    বাঁ পাশে বসে থাকার ফলে পরপর কয়েকটা হার্ডওয়্যার স্টোর্স, যাত্রা, থিয়েটারের পোশাকের দোকান, এবং তার মাঝখানে একটা বইয়ের দোকান চোখে পড়ল। আনন্দময়ী পুস্তক ভাণ্ডার। নিশ্চয় সুখ্যাত বটতলা প্রকাশনের ঐতিহ্যসম্পন্ন দোকান। সামনের শোকেসে যাত্রানাটক, কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীদাসী মহাভারত, প্রভাস খণ্ড, বৃহৎ তন্ত্রসার ইত্যাদি টাইটেল সাজানো ছিল। আলো কম হলেও, আমার দৃষ্টিশক্তি মোটামুটি ভালই। তাছাড়া পঞ্জিকার পাতায় এমন বইয়ের বিজ্ঞাপন আমাকে আকৃষ্ট করে। এইসব দোকান যেন এক রহস্যময় পৃথিবীর তথ্যে ভরা। বশীকরণতন্ত্র ডাকিনীতন্ত্র, ভোজবিদ্যা কামাখ্যাতন্ত্র…এক আশ্চর্য অন্ধকার মায়ালোকের দিকে অঙ্গুলিসঙ্কেত করে যেন।

    হঠাৎ হকচকিয়ে গেলাম। এক সৌম্যকান্তি বৃদ্ধ আনন্দময়ী পুস্তক ভাণ্ডার থেকে বেরোলেন। তার হাতে লাল মলাটের একটা বই। তার মাথায় ধুসর টুপি, মুখের সাদা দাড়ি, এবং বাঁ হাতে একটা বিদঘুটে গড়নের যষ্ঠি। ফুটপাতে নেমেই তিনি কয়েক পা এগিয়ে অন্য একটা দোকানে ঢুকলেন। এ দোকানটার সাইন বোর্ডে লেখা আছে : আর দাশ অ্যাণ্ড কোং। যাত্রা-থিয়েটারের যাবতীয় পোশাক, স্টেজ, সিন সুলভে ভাড়া পাওয়া যায়। পরীক্ষা প্রার্থনীয়।

    হ্যাল্লো ওল্ড ডাভ বলে অভ্যাসমতো চেঁচিয়ে ডাকার কথা স্রেফ ভুলে গিয়েছিলাম, কারণ এই ধুরন্ধর বৃদ্ধকে এখানে দেখতে পাওয়ার কথা কল্পনাও করিনি। গতকাল উনি ফোনে জানিয়েছিলেন, এক জার্মান উদ্ভিদবিজ্ঞানীর সঙ্গে নেপাল রওনা হচ্ছেন–আমার সঙ্গদান সম্ভব কি না। বলা নিষ্প্রয়োজন, এ আমন্ত্রণ একটা ছুতোনাতা করে এড়িয়ে গিয়েছিলাম। নেপাল যত সুন্দর দেশ হোক দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির অর্কিডের তল্লাসে পাহাড়-জঙ্গলে টো টো করে ঘোরা আমার ধাতে সইবে না।

    তাহলে দেখা যাচ্ছে, যে কোনও কারণে হোক, ওঁর নেপাল যাওয়া হয় নি।

    হয়নি কিন্তু এই এবেলায় চিৎপুরে কী করছেন? বটতলার বই কেনারই বা উদ্দেশ্য কী? আর যাত্রা-থিয়েটারের পোশাকের দোকানেই বা কেন ঢুকলেন? রহস্যের গন্ধ পেলাম। ভাবলাম, নেমে গিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা করি। কিন্তু সেই মুহূর্তে ট্রাফিকজট কোনও যাদুবলে খুলে গেল। আমাদের গাড়ির বাঁ দিকে ইতিমধ্যে কয়েকটা রিকশো, ঠেলা, টেম্পো ঢুকে পড়েছিল। জট ছাড়লে স্বভাবত হল্লা আর যানবাহনের গর্জনও প্রচণ্ডভাবে বেড়ে যায়। আমার ডাক উনি শুনতে পেতেন না।

    অফিসে গিয়ে ব্যাপরটা ভাবছিলাম। আর দাশ অ্যাণ্ড কোম্পানির দোকানে ঢুকে , কি ছদ্মবেশ ধরার জিনিসপত্র কিনছিলেন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার? কিছু কি ঘটেছে, কোথাও? নাকি সম্প্রতি ফঁস-হয়ে-যাওয়া আন্তর্জাতিক চোরাচালানচক্রের সঙ্গে ওঁর এই কাজকর্মের কোনও সংস্রব আছে?

    রাত আটটায় অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা ইলিয়ট রোডে সানি লজ নামে বিশাল বাড়িটির তিনতলায় হানা দিলাম। দরজা খুলে ষষ্ঠীচরণ জনান্তিকে জানাল, বাবুমশাই আসনে বসে জপ করছেন। অবাক হয়ে ভেতরের ড্রইংরুমে ঢুকে দেখি, কতকটা তাই বটে। আমার বৃদ্ধ বন্ধু ডিভানে আসন করে বসে সেই বটতলার লাল মলাটের বইটি পড়ছেন। ঠোঁটদুটো কাঁপছে। তার মানে, উচ্চারণ করেই পড়ছেন। আমার সাড়া পেয়ে চোখ কটমটিয়ে হুংকৃত স্বরে বলে উঠলেন, ওঁং হ্রীং ক্রীং জয়ন্তং মারয়ঃ মারয়ঃ তাড়য়ঃ ফট ফট স্বাহা।

    একটু ভড়কে গিয়ে বললাম, সর্বনাশ! এ আবার কী?

    কর্নেল হো হো করে হেসে ডিভান থেকে নেমে আমার হাতে বইটা খুঁজে দিলেন। লাল মলাটের ওপর সোনালী হরফে লেখা আছে ডাকিনীতন্ত্র। শ্রী হরিশরণ শর্মা তন্ত্ৰার্ণব সিদ্ধাচার্য কতৃক সংগৃহীত। পাতা উল্টে দেখি, ভূমিকায় বলা হয়েছে, এই গুপ্ত তন্ত্র আসামের কামরূপ অঞ্চলের পর্বত-অরণ্যে বহু বৎসর ভ্রমণ করিয়া সিদ্ধাই ডাকিনীগণের নিকট হইতে সংগৃহীত। তন্ত্ৰাৰ্ণব শ্রীহরিশরণ শর্মা মহাশয় বহুবার একচুলের জন্য বাঁচিয়া গিয়াছে। সাধক পাঠকবর্গের জ্ঞাতার্থে উল্লেখ করি যে বাৎসরাধিক কাল তাহাকে ডাকিনীগণ মন্ত্রবলে মেষশাবকে রূপান্তরিত করিয়াছিল। দেবী কামাখ্যার করুণায় তিনি মনুষ্যদেহ পুনঃপ্রাপ্ত হন।…

    বললাম, এই গাঁজা কেনার জন্যে আজ বিকেলে চিৎপুরে আনন্দময়ী পুস্তক। ভাণ্ডারে ঢুকেছিলেন।

    হুঁ–তুমি তোমাদের প্রেসমার্কা কালো গাড়িতে বসে লোলুপ দৃষ্টে শো-কেসের বইগুলি দেখছিলে বটে!

    ঠিক ঠিক। তারপর আপনি আর দাশ অ্যাণ্ড কোংয়ের দোকানে ঢুকলেন ছদ্মবেশ কিনতে। কই, দেখি, কী কিনলেন?

    কর্নেল মাথা নেড়ে বললেন, আমি কি বুড়োবয়সে যাত্রাদলে নাম লেখাব ভাবছ?

    যাত্রাদলে ঢুকলে পোশাক নিজেকে কিনতে হয় না। নিশ্চয় ছদ্মবেশ ধরার দরকার হয়েছে আপনার। তা এক কাজ করলেই তো পারেন। গোঁফদাড়ি সাফ, করে ফেললেই হল। কেউ আর প্রখ্যাত কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে চিনতে পারবে না। অবশ্য মাথার টাকটি অতি প্রসিদ্ধ। কিন্তু তার জন্য টুপিই যথেষ্ট।

    ষষ্ঠীচরণ কফি রেখে গেল। কফি খেতে খেতে কর্নেল বললেন, তুমি তো এ যাবৎ দেখেছ ডার্লিং, আমি কদাচ ছদ্মবেশ ধরি না। ছদ্মবেশ ব্যাপারটা বড় বাজে। ওর ভেতর প্রচুর পোকা থাকে। আসলে মাথার ভেতরকার কোমল সারপদার্থকে ঠিক মত কাজে লাগাতে পারলেই হল। চাই শুধু কিছু তথ্য-সঠিক, অকপট তথ্য। সত্যকে আবিষ্কারের জন্য আমি তাই ডিডাকটিভ পদ্ধতির পক্ষপাতী। আগে সিদ্ধান্ত পরে তথ্য সংগ্রহ নয়, আগে তথ্য সংগ্রহ পরে সিদ্ধান্ত।

    বললাম, বেশ। আপনারই ডিডাকটিভ পদ্ধতি অনুসারে গতকাল থেকে এ পর্যন্ত আপনার ক্রিয়াকলাপের যে তথ্য পাচ্ছি, তা থেকে সিদ্ধান্ত করা যায় যে আপনার নেপালযাত্রা বরবাদ করার মতো একটি ঘটনা ঘটেছে এবং সেই ঘটনার সূত্রে আজ বিকেলে আপনাকে চিৎপুরে গিয়ে…।

    হাত তুলে বাধা দিয়ে সহাস্যে গোয়েন্দাপ্রবর বললেন, এনাফ জয়ন্ত, এনাফ। কিন্তু আমি অবাক হচ্ছিযে তুমি কাগজের লোক হয়েও কাগজ পড় না।

    ময়রার সন্দেশে রুচি থাকে না। কিন্তু কাগজে কী বেরিয়েছে? চিৎপুরের আন্তর্জাতিক চোরাচালানীচক্রের খবর তো? যতদূর জানি, লালবাজারের তরুণ গোয়েন্দাকর্তা আপনাকে এতে নাক গলাতে দেবেন না। কারণ, আপনি এসব ব্যাপারে যুক্ত হলে তার কৃতিত্ব প্রদর্শনের সুযোগ মিলবে না।

    কর্নেল কফির পেয়ালা রেখে চুরুট ধরালেন। তারপর মৃদু হেসে চোখ নাচিয়ে বললেন, চলো ডার্লিং, আগামীকাল একবার ভৈরবগড় ঘুরে আসি।

    ভৈরবগড়! নড়ে বসলাম। মাই গুডনেস! মনে পড়ে গেছে। আসলে এসব খবর চোখের কোণা দিয়ে ছুঁয়ে দেখার মত। তাছাড়া দেশজুড়ে প্রতিদিন অসংখ্য খুনোখুনি হচ্ছে। কিন্তু ভৈরবগড়..কর্নেল! ভৈরবগড়ে গোটা দুতিন খুন হয়েছে তার জন্য নেপাল-যাত্রা পণ্ড করে আপনার চিৎপুরে যাত্রার তাৎপর্য মাথায় ঢুকছে না? মফস্বলে দলাদলি আজকাল বেড়ে গেছে। দলে দলে সংঘর্ষ আকছার হচ্ছে। কাজেই এ খুনোখুনিতে রহস্য কিসের?

    কর্নেল বললেন, আছে। তুমি তৈরি থেক–আগামীকাল সকাল নটায় ট্রেন।

  • টয় পিস্তল

    টয় পিস্তল

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book-name]

    টয় পিস্তল

    হঠাৎ আজব দৃশ্য দেখে ঘরসুদ্ধ লোক প্রথমে হতভম্ব হলো, পরে প্রচণ্ড অট্টহাসির ধুম পড়ে গেল। আমি তো হাসতে হাসতে দুহাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজে প্রায় মরার দাখিল–ফুসফুস ফেটে যাবে মনে হচ্ছিল। তারপর কর্নেলের করুণ ও অস্ফুট স্বগতোক্তি শুনলুম-ওটা কেড়ে নিন ওর হাত থেকে। কেড়ে নিন!

    মুখ তুলে টেবিলের ওপর দুহাত ভোলা, অর্থাৎ হ্যাঁণ্ডস আপ ভঙ্গিতে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলুম এবং ফের দমফাটানো হাসির চাপ এল। মেঝেয় ছোট্ট মেয়ে নিন তখনও খেলনার পিস্তলটা তাক করে আছে।

    কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের বোধ থেকে জানলুম-কর্নেলের মুখে এবং ওই ভঙ্গিতে দেখেছি তা যেন একটি ছোট মেয়ের সঙ্গে কৌতুক নয়। তা যেন ভান নয় মোটেও। যেন কোনও হিংস্র আততায়ী সত্যি সত্যি একটা প্রকৃত মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র তার দিকে তাক করেছে।

    একি আমার নিছক দেখার ভুল? কর্নেল নীলাদ্রি সরকার স্বভাবত সিরিয়াস টাইপের মানুষ। তার মানমর্যাদাও সামান্য নয়। বিশেষত প্রতাপপুর অখনির মালিকের এই বাড়িতে তিনি এখন একজন বরেণ্য অতিথি।

    বিজয়েন্দু রায়ের সাত বছরের মেয়ে নিনা টয় পিস্তল হাতে ঘরে ঢুকেই তাকে তাক করে যেই বলেছে–হ্যাণ্ডস আপ, অমনি কি না ওই রাশভারী বৃদ্ধ কর্নেল আচমকা একলাফে কোণায় উঁচু টেবিলে উঠে দাঁড়ালেন–শুধু তাই নয়, দুহাত তুলে চেঁচিয়ে উঠলেন–নো নো নো! মিসেস রায়! মিসেস রায়! ওটা কেড়ে নিন।

    পরক্ষণে চন্দ্রকণা মেয়ের হাতের টয় পিস্তলটা কেড়ে নিয়েছেন বাবাঃ! খুব ভয় পেয়েছেন কর্নেলদাদু। দেখছ না–হ্যাণ্ডস আপ করেছেন? ব্যস! এবার তুমি অন্য খেলা খেল গে কেমন?

    ঘরে তখনও হাসির আবহাওয়া। কর্নেলকে নামতে দেখলুম! কিন্তু আশ্চর্য, মুখটা গম্ভীর। সোফার আগের জায়গায় বসে কঁচুমাচু হয়ে বললেন–আপনারা ক্ষমা করবেন আমায়। জাস্ট এ ফান। কিন্তু রিয়েলি–এত হঠাৎ ও অমনভাবে ঢুকল যে…মাই গড! হোয়াট এ ফান!

    ফের সবাই হাসল। নিনা ওর মায়ের হাত থেকে পিস্তলটা নেবার চেষ্টা করছে। আমি বললুম–দিয়ে দিন না! তখন চন্দ্রকণা সেটা ওকে ফেরত দিলেন। মুখে প্রচুর হাসি।

    নিনা পিস্তলটা নিয়ে ফের কর্নেলের দিকে তাক করতেই কর্নেল এবার সব গাম্ভীর্য এবং কঁচুমাচু ভাব ভেঙে হো হো করে হেসে ফেললেন এবং ডাকলেন– নিনি! চলে এস। দেখি তোমার পিস্তল! হুঁ–দেখি দেখি!

    খুব ভয় পেয়েছিলুম। দারুণ ভয়! বসে কর্নেল ওর পিস্তলটা নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন।বাঃ! চমৎকার পিস্তল কিন্তু! আজকাল আমাদের খেলনা তৈরিতে খুব উন্নতি করেছে। ইয়ে মিসেস রায়, এটা–এটা বুঝি সম্প্রতি কেনা হয়েছে?

    চন্দ্রকণা জবাব দিলেন—হ্যাঁ। পরশু উনি কলকাতা থেকে এনে দিয়েছেন। নিনা কদিন থেকে টয় পিস্তলের বায়না ধরেছিল, আজকাল বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ওয়েস্টার্ন ফিল্মের কায়দায় গানডুয়েল খেলতে ভালবাসে। নিশ্চয় লক্ষ্য করে থাকবেন কর্নেল?

    কর্নেল বললেন–তাই বটে! তবে আর একটা ব্যাপার নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন মিঃ রায়? আজকালকার খেলনা কিন্তু মোটেও খেলনার মতো দেখায় না। অবিকল আসলের ক্ষুদে সংস্করণ। তাই না? যেমন এই টয় পিস্তলটাই দেখুন। পরীক্ষা করার আগে কার সাধ্য এটা খেলনা ভাবতে পারে? তাছাড়া ওজনও দেখছি প্রকৃত পিস্তলের মতো।

    এবার সকৌতুকে বললুম–তাই বুঝি আপনি প্রাণভয়ে টেবিলে চড়েছিলেন? কিন্তু আপনার কিলার নিনাও যে একটা বাচ্চা মেয়ে সে কথাটা নিশ্চয় মাথায় ঢোকেনি?

    কর্নেল একটু হেসে রহস্যময় ভঙ্গিতে মাথা দোলালেন। বিজয়েন্দু হাসতে হাসতে বললেন–যদি সিরিয়াসলি ধরেন তাহলে বলব কর্নেলের গোয়েন্দা। মানসিকতারই এটা একটা প্রকাশ। অনবরত হত্যাকারীর মুখোশ ফাস করা যার নেশা ও পেশা, তার মনে এমন আতঙ্ক থাকা স্বাভাবিক।

    একটু পরে সুদৃশ্য ট্রে এবং পট-পেয়ালায় কফি তার সঙ্গে কিছু স্ন্যাকস এল। এখন সকাল সাতটা। যে ঘরে আমরা বসে আছি তা পাহাড়ের গায়ে একটা বাংলোবাড়ি। দক্ষিণ-পশ্চিমে বিস্তৃত সুন্দর উপত্যকা, পূর্বে ছোটোখাটো পাহাড় এবং উপত্যকা পেরিয়ে একটা নদী, পূর্বের পাহাড় ঘেঁসে দক্ষিণে চলে গেছে। সময়টা সেপ্টেম্বর। তাই প্রাকৃতিক দৃশ্য তুলনাহীন।

    খনি রয়েছে এই পাহাড়ের উত্তর দিকের অন্য একটা উপত্যকায়। এখান থেকে দুমাইল দূরে একটা সুন্দর পীচের রাস্তা বাংলোর পশ্চিম গেট থেকে শুরু হয়ে উত্তর ঘুরে উতরায়ে নেমেছে এবং বড় সরকারী সড়কে মিশেছে। ওই সড়ক ধরে এগোলে খনিতে পৌঁছানো যায়।

    আমরা, দৈনিক সত্যসেবকের রিপোর্টার শ্রীমান জয়ন্ত চোধুরী এবং তার বৃদ্ধ বন্ধু গোয়েন্দা ও প্রকৃতিবিদ কর্নেল নীলাদ্রি সরকার দৈবাৎ এসে পড়েছি এখানে। দক্ষিণ-পশ্চিমের উপত্যকার জঙ্গলে কর্নেল কিছু বিরল প্রজাতির প্রজাপতি সংগ্রহ করবেন এবং আমি তাকে নিছক সঙ্গ দেব। ফরেস্ট বাংলোয় ওঠার কথা ছিল। কিন্তু পথে হঠাৎ বিজয়েন্দুর সঙ্গে দেখা এবং কর্নেল তার পরিচিত–অতএব কিছুতেই জঙ্গলে কাটাতে দেবেন না। তার অতিথি হয়ে গতকাল সন্ধ্যায় এখানে আসতে হলো। এখন এ ঘরে রায়দম্পতি ও তাদের মেয়ে নীনা ছাড়া আরও তিনজন ভদ্রলোক আছেন। আলাপ হয়েছে পরস্পর। সতীনাথ চাকলাদার কলকাতা থেকে এসেছে নিছক শিকারে। তিনি নামকরা শিকারী। আমাদের যে ফরেস্ট বাংলোয় থাকার কথা তিনি সেখানেই একটা ঘরে আছেন। এসেছেন গত পরশু। বিজয়েন্দু ওঁর বন্ধু। নরেন্দ্র সিংহরায় পাঁচ মাইল দূরের প্রতাপগড় বাজারের একজন ব্যবসায়ী। আর আছেন শ্যামল মুখার্জি বিজয়েন্দুর খনির ম্যানেজার।

    বিজয়ের বয়স চল্লিশ-বেয়াল্লিশ। শক্ত সমর্থ বলিষ্ঠ গড়নের মানুষ, কেমন যেন বন্য চেহারা। গোঁরগোবিন্দ বলে মনে হয়েছে। শিকারী সতীনাথ কিন্তু উল্টো চেহারার ও স্বভাবের। ওঁর হাসিটি এত চমৎকার যে, ভাবাই যায় না এই মানুষ হিংস্র বন্য জন্তুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তেও ওস্তাদ। রোগা, ঢ্যাঙা, বয়সে বিজয়ের কাছাকাছি। নরেন্দ্রবাবু হোঁদলকুতকুতে গড়নের সুখীসুখী চেহারার মানুষ বয়স অনুমান পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ। সবসময় পান খান। কথা খুব কম বলেন। বেশি হাসেন। শ্যামলবাবু আমার বয়সী, অর্থাৎ বত্রিশ। সফিস্টিকেটেড বলা যায়, একটু গম্ভীর। তীক্ষ্ণ চোখজোড়ায় সর্বজ্ঞের হাবভাব। চন্দ্রকণা কিন্তু স্ত্রী হিসেবে বিজয়েন্দুর। বেমানানই বলব। অসাধারণ সুন্দরী তো বটেই বয়সেও মনে হলো অন্তত দশ বারো বছরের ছোট, স্বামীর চেয়ে।

    কফি খেতে খেতে এবার শিকারের গল্প শুরু হলো। আমারও শিকারে এক আধটু নেশা ও অভিজ্ঞতা আছে। সঙ্গে রাইফেলও এনেছি একথা শুনে সতীনাথ আমার দিকে ঝুঁকলেন। বেগতিক দেখে কর্নেল বলে উঠলেন–তবে সাবধান মিঃ চাকলাদার, জয়ন্ত মাঝেমাঝে ভুলে যায় যে ওর হাতে রাইফেল আছে। ও খাঁটি রিপোর্টারের মতো বধ্য জন্তুর দিকে তাকায় যেন সত্যসেবকে কীভাবে ফাস্ট লাইনটা শুরু করবে। সুতরাং সাবধান!

    সবাই হাসলেন। ওঁকে আশ্বস্ত করে বললুম–আমি এবার শিকার-টিকারে বেরুচ্ছিনে। এখানে বসে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখেই সময় কাটাব।

    সতীনাথ বললেন কর্নেলও তো শুনেছি পাকা শিকারী! সুতরাং বেরুতে হলে তিন জনেই বেরুব। কী বলেন কর্নেল?

    এইসব গপ্পসপ্প হতে হতে আটটা বেজে গেল। চন্দ্রকণা ততক্ষণে মেয়েকে নিয়ে অন্য ঘরে গেলেন। নিনা খুব চঞ্চল মেয়ে।

    তারপর সতীনাথ আমাদের দুজনকে ফরেস্ট বাংলোয় আমন্ত্রণ জানিয়ে চলে গেলেন। একটু পরে নরেন্দ্র বেরিয়ে গেলেন। তার কিছু পরে শ্যামলবাবু ও বিজয়েন্দু কাজকর্ম নিয়ে পাশের ঘরে কথা বলতে চলে গেলেন। ঘরে রইলুম কর্নেল ও আমি।

    কর্নেলের মুখটা আবার গম্ভীর দেখাচ্ছিল। বললুম–হ্যালো ওল্ড ম্যান! ব্যাপারটা কী, বলুন তো!

    কর্নেল তাকালেন–কিছু কি বলছ, ডার্লিং?

    উনি কি যেন ভাবছিলেন। বললুম–এনিথিং সিরিয়াস?

    কর্নেল ঘাড় নাড়লেন। তারপর ঠোঁট ফাঁক করলেন–কিন্তু কিছু বললেন না।

    মনে হচ্ছে একটা কিছু চক্রান্ত করছেন?

    কর্নেল হঠাৎ আমার হাতে হাত রেখে চাপা গলায় বললেন-জয়ন্ত! ওই টয় পিস্তলটা–

    উনি থামতেই চমকে উঠে বললুম–কেন? আপনার কি মনে হলো ওটা টয় পিস্তল না।

    -হ্যাঁ, ডার্লিং। ওটা একটা খেলনার পিস্তলই বটে!

    –তাহলে?

    –কিন্তু আশ্চর্য, জয়ন্ত, আশ্চর্য!

    এবার বিরক্ত হলুম। সব তাতেই ওঁর যেমন নাক গলানো অভ্যাস তেমনি যেন আজকাল সব কিছুতেই রহস্য টের পাবার বাতিক দাঁড়িয়েছে। বললুম–একটা টয় পিস্তলে কী আশ্চর্য থাকতে পারে বুঝলুম না! ছেড়ে দিন।

    কর্নেল আমার বিরক্তি অগ্রাহ্য করে ফের বললেন–ওটা অবিকল আসল পিস্তলের মতো দেখতে। এমন কি ওজনও একই। কেন জয়ন্ত, কেন?

    নির্ঘাৎ ওঁর এবার ভীমরতি ধরেছে। অগত্যা উঠে দাঁড়িয়ে বললুম–আপনার কিঞ্চিৎ ভোলা বাতাস সেবন করা দরকার। টুপি খুলে টাক বিকশিত করে, হে প্রাজ্ঞ ঘুঘুমশায়, নদীর ধারে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন। ঘিলুর ধুলোময়লা সাফ হয়ে। যাবে। আসুন।

    কর্নেলও উঠে দাঁড়ালেন, তখুনি সায় দিয়ে বললেন–ঠিকই বলেছ ডার্লিং। এর চেয়ে আপাতত আরামদায়ক কিছু নেই। ওঃ, এই ঘরে যেন আমার দম আটকে আসছে।

    .

    সেই যে বেরুলুম দুজনে, পুরো দুপুর কেটে গেল জঙ্গলে-জঙ্গলে। কর্নেলকে স্বাভাবিক দেখে আশ্বস্ত হয়েছিলুম। কাঁধে কিটব্যাগ নিয়েছিলেন। তার মধ্যেese প্রজাপতি ধরা জাল আর ভাজকরা খাঁচাও ছিল। আড়াইটে অব্দি সাতটা প্রজাপতি ধরলেন উনি। পাখির পিছনেও বাইনোকুলার চোখে নিয়ে ছোটাছুটি করলেন। আমার অবস্থা তখন শোচনীয়। অবশেষে কর্নেলের দৃষ্টি ঘড়ির কাঁটার দিকে আনা গেল এবং দুজনে গলদঘর্ম হয়ে ফেরার পথে পা বাড়ালুম। ..

    কিন্তু নদীর ধারে এসে হঠাৎ কর্নেল বললেন–জয়ন্ত, মনে হচ্ছে আমরা ফরেস্ট বাংলোর কাছে এসে পড়েছি। একবার অন্তত মিঃ চাকলাদারের সঙ্গে দেখা করা উচিত। কী বলে?

    বিরক্ত হয়ে বললুম–লাঞ্চের সময় চলে গেল যে। তাছাড়া উনি এখানে, আছেন, না জঙ্গলে ঘুরছেন–ঠিক নেই!

    কর্নেল আমার হাত ধরে সস্নেহে টানলেন। –ডার্লিং, এটা ভদ্রতা। জঙ্গলে আছি কিন্তু আমরা মানুষ।

    বলে উনি যেন বীরবিক্রমে হাঁটা শুরু করলেন। একটু পরেই টের পেলুম, এ যাওয়া স্বাভাবিক গতিতে নয়। তাড়া খাওয়া জন্তুর মতো ঝোপঝাড় ভেঙে আগাছা মাড়িয়ে যেন আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে যাওয়া। কয়েকবার ওঁর টুপি কাঁটায় আটকে গেল। দ্রুত ছড়িয়ে নিলেন। আমিও প্রায় ক্ষতবিক্ষত হলুম। তারপর হঠাৎ কর্নেল আমাকে টেনে ধরে বসিয়ে দিলেন এবং নিজেও বসলেন। ঝোপের আড়াল ছিল। তার ওধারে ফরেস্ট বাংলোটা দেখা যাচ্ছিল। নদীর এপারেই একটা টিলার গায়ে রয়েছে সেটা। তারপর দেখলুম, কর্নেল বাইনোকুলার দিয়ে বাংলোটা দেখছেন। আমি অবাক এবং অস্থির।

    একটু পরে ঘুরে কর্নেল চাপা গলায় বললেন–এক মিনিট, জয়ন্ত। তুমি এখানে অপেক্ষা করো, আমি এখুনি আসছি। সাবধানে, যেভাবে বসে আছ, তাই থাকবে। নড়ো না।

    কোনও প্রশ্নের সুযোগ না দিয়ে উনি গুঁড়ি মেরে এগোলেন। ওঁর ভঙ্গি দেখে, মনে হলো, একটা ক্ষুধার্ত সিংহ যেন চুপিসারে তার শিকারের দিকে এগিয়ে চলেছে। একটু পরেই ওঁকে গাছপালা ও ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হতে দেখলুম। এই অদ্ভুত কাণ্ডের মাথামুণ্ডু না খুঁজে পেয়ে অগত্যা হাল ছেড়ে দিতে হলো। ঝোপের ফাঁকে দুরের ওই বাংলোর দিকে চোখ রইল আমার।

    কিন্তু বাংলো যেমন নির্জন ছিল তেমনিই আছে। জনপ্রাণীটি নেই। পনের মিনিট কেটে গেল। তারপর সামনের দিকে শুকনো পাতা মচমচ করে উঠল। শব্দটা এগিয়ে আসতে থাকল। রাইফেলটা সঙ্গে নিয়ে বেরোয়নি। তাই অসহায় হয়ে আশা করতে থাকলুম যে, ওই শব্দ যেন কর্নেলেরই হয়। শেষ অব্দি আশা মিটল। আন্দাজ দশ গজ দূর থেকে কর্নেলের টুপি চোখে পড়ল। ওঁর মুখে অমায়িক হাসি। কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন–যে পথে এসেছি সেই পথে এই ভাবেই ফিরতে হবে, জয়ন্ত। সাবধান।

    অতএব ফের সেইসব কাঁটায় খোঁচা খেতে খেতে আগের জায়গায় পৌঁছানো গেল এবং এবার উনি চড়া গলায় জঙ্গলের সৌন্দর্যের প্রশংসা করতে করতে সুপথে পা বাড়ালেন।

    বিজয়ের বাংলোর কাছে পৌঁছে এতক্ষণে বললুম–এসবের মানে কী?

    কর্নেল আমার হাত টেনে নিয়ে বললেন-অধৈর্য হয়ো না। ঠিক মতো সব কিছু চললে তুমি এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারবে। জয়ন্ত, এটা আমার দূরদৃষ্টি বলতে পারো। যেখানে যাই, এক মারাত্মক আততায়ী আমার সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে এগিয়ে আসে। না, না, ডার্লিং। তুমি ভয় পেয়ো না। আশা করি, খুব বেশি কিছু ঘটবে না।

    অস্থিরতা চেপে রাখতে হলো। আর তখন খিদেয় নাড়িভুঁড়ি জ্বলছে।

    .

    সেদিন সন্ধ্যায় বিজয়ের সেই ঘরে আবার আজ্ঞা চলেছে। তবে এ-বেলা সেই ব্যবসায়ী ভদ্রলোক, অর্থাৎ নরেন্দ্র সিংহরায় আসেননি। শিকারী বা ম্যানেজারও না। আমি, কর্নেল ও রায়দম্পতি গল্প করছি। গল্প করার সময় কর্নেলের অন্যমনস্কতা লক্ষ করছিলুম। মাঝেমাঝে ঘড়ি দেখছেন আড়চোখে। কে যেন আসবে, প্রতীক্ষা করছেন। কে সে?

    পাশের ঘরে নিনা ইংরেজি ছড়া মুখস্থ করছে, শোনা যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে আবার কথাও বলছিল। বাইরে তখন ফুটফুটে শরঙ্কালীন জ্যোৎস্না।

    কর্নেলের চঞ্চলতা এবার বিজয়ের চোখে পড়ল। বললেন কর্নেলের কি। শরীর খারাপ করছে?

    কর্নেল ব্যস্তভাবে বললেন–ও নো নো! আমি–ইয়ে মিঃ রায়, ভাবছি যে আজ রাতটা বরং ফরেস্ট বাংলোয় গিয়ে কাটাব। ভারি চমৎকার জ্যোৎস্না ফুটেছে। তাছাড়া আজ দুপুরে জায়গাটা দেখে এসেছি–অপূর্ব। আপনি যদি কিছু না মনে করেন

    বিজয়েন্দু বললেন, না। মনে করার কি আছে?

    চন্দ্রকণা বললেন কিন্তু এক শর্তে। এখানে ডিনারে না খেয়ে নয়।

    কর্নেল বেজার মুখে বললেন–প্লিজ মিসেস রায়। আপনার রাঁধুনীকে কিন্তু আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছি। সে আপনাকে কিছু বলে নি?

    চন্দ্রকণা ক্ষুব্ধমুখে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন-কই না তো। তারপর ভেতরে চলে গেলেন। হয়তো রাঁধুনীকে ধমক দিতেই গেলেন।

    বিজয়েন্দু একটু হেসে বললেন–তাহলে যা ভেবেছি। শরীর খারাপ। মুশকিল– কী জানেন, এ জায়গাটা একটা বিউটি স্পষ্ট। কিন্তু জলবায়ুটা তেমন ভাল নয়। আমারও মাঝে মাঝে পেটের অসুখ হয়।

    কর্নেল এ সময় আমাকে গোপনে একটু খুঁচিয়ে দিলেন। তারপর বললেন-হ্যাঁ। জয়রেও সেই অবস্থা। তাই ওকেও বলেছি, রাত্তিরটা আমার সঙ্গে উপোস করতে।

    আমি হতভম্ব হয়ে বসে রইলুম। পাশের ঘরে চন্দ্রকণা শুনলুম মেয়েকে বকাবকি করছেন–এখন খেলে না। এখন কি খেলার সময়? নিনা অনুযোগ করছে, শোনা গেল।

    বাইরে কার সাড়া পাওয়া গেল রায়, আসতে পারি? বিজয়েন্দু উঠে গেলেন। তারপর দেখি, সতীনাথ ঢুকছেন ওঁর সঙ্গে। কর্নেলের মুখে উজ্জ্বল হাসি ফুটল। বললেন–আসুন, আসুন মিঃ চাকলাদার। আপনি না থাকায় মোটেও আচ্ছা জমছিল না। তারপর বলুন, আজ কী শিকার-টিকার করলেন।

    সতীনাথ হাসিমুখে বসে বললেন–একটা সাপ মেরেছি। হ্যামাড্রায়াড। অর্থাৎ শঙ্খচুড়।

    এরপর ফের গল্পের আবহাওয়া জমজমাট হয়ে উঠল। চন্দ্রকণা ফিরলে সতীনাথ। ফের গোড়া থেকে সাপ মারার ঘটনা শুরু করলেন। তারপর এক ফাঁকে হঠাৎ নিনা। সকালের মতো সেই টয় পিস্তল হাতে ঢুকে পড়ল। বিজয়েন্দু হেসে বললেন নিনি, এবার আর কর্নেলদাদুকে নয়–তোমার শিকারীকাকুকে অ্যাটাক করো! জোরে ট্রিগার টিপবে কেমন? তাহলেই কাকু ব্যস!

    অমনি নিনা পিস্তল তাক করল সতীনাথের দিকে। কিন্তু আশ্চর্য, সতীনাথ, ঠিক সকালে কর্নেল যা করেছিলেন, তার চেয়েও হাস্যকর কাণ্ড করে বসলেন। এক লাফে তিনি প্রায় চোখের পলকে ঘর তেকে বেরিয়ে গেলেন। তারপর বাইরে ওঁর। প্রচণ্ড গর্জন শোনা গেল–বিশ্বাসঘাতক। ব্রুট। এর শধ একদিন নেবই নেব।

    কর্নেল চেঁচিয়ে উঠলেন–মিঃ চাকলাদার। ফিরে আসুন। কোনও ভয় নেই।

    কিন্তু চেঁচিয়ে ওঠার মধ্যেই উনি একলাফে নিনার পিস্তলটাও ধরে ফেলেছেন। নিনা কেঁদে উঠেছে। চন্দ্রকণা স্তম্ভিত। বিজয়েন্দু হাঁ করে আছেন। সতীনাথের কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। ভদ্রলোক কি সত্যি চলে গেলেন?

    নিনার হাত থেকে পিস্তলটা কেড়ে নিয়ে কর্নেল হাসতে হাসতে জানালা দিয়ে তাক করলেন এবং আমাদের আরও হতবুদ্ধি ও আতঙ্কিত করে ট্রিগার টিপতেই সত্যিকার পিস্তলের আওয়াজ রাতের স্তব্ধতা খানখান করে দিল। আমার বুক চিব ঢিব করতে থাকল।

    বিজয়েন্দু লাফিয়ে উঠে বললেন–সর্বনাশ! নিনা করেছে কী!

    কর্নেল ভৎর্সনার ভঙ্গিতে বললেন–আপনার পিস্তলের সঙ্গে নিনার খেলনা পিস্তল বদল হয়ে গেছে, মিঃ রায়। আপনি এবার থেকে অস্ত্রের ব্যাপারে সতর্ক হবেন।

    বিজয়েন্দু বললেন–আমি খুব দুঃখিত, কর্নেল। আমার পিস্তলটা ড্রয়ারে থাকে। কিন্তু মনে হচ্ছে, চাবি দিতে ভুলে গিয়েছিলুম। কী সর্বনাশ ঘটে যেত এক্ষুণি! কর্নেল পিস্তলটা ওঁকে দিয়ে বললেন–এবার চলি। জয়ন্ত তুমি গুছিয়ে নাও আর মিঃ রায়, মানুষকে ক্ষমা করতে শিখুন।

    বিজয়েন্দু কোনও কথাও বললেন না। পিস্তলটা হাতে নিয়ে গম্ভীর মুখে বসে থাকলেন। নিজেদের ঘরে গিয়ে গোছগাছ করছি, সেই সময় চন্দ্রকণার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না শুনলুম। কর্নেল ফিসফিস করে বললেন-জয়ন্ত, ওই জটিল দাম্পত্য সমস্যা মেটাবার ক্ষমতা আমাদের নেই। অতএব দ্রুত বেরিয়ে পড়া যাক।

    রাস্তায় গিয়ে বললুম–কিন্তু ব্যাপারটা কী?

    কর্নেল বললেন–এখনও টের পাচ্ছ না? সতীনাথ চন্দ্রকণার পুরনো প্রেমিক। বিজয়েন্দু এবার ঠিক করেছিলেন সতীনাথ এলেই মেয়ের হাত দিয়ে ওঁকে খুন করাবেন। খুব সরল পন্থা। দৈবাৎ বাচ্চা মেয়ে তাঁর অটোমেটিক পিস্তলের সঙ্গে নিজের টয় পিস্তল বদল করে নিয়েছে। অতএব হত্যাকাণ্ডের দায়টা আইনের ফাঁকে উড়ে যাবে। আজ সকালে আমি যে আচরণ করেছিলুম, তা বিজয়েন্দুকেই সতর্ক করে দিতে। নির্বোধ বিজয়েন্দু তা আঁচ করেননি। আর, আজ দুপুরে আমার অত সতর্কতার কারণ আর কিছু নয়–বিজয়েন্দু খনিতে যাওয়ার পর চন্দ্রকণা প্রেমিকের কাছে আসবেন, এই ধারণা ছিল। তাই পাছে প্রেমিকদ্বয়ের চোখে পড়ি, একটু সতর্ক হয়েছিলুম।

    বললুম–এবং গোপনে গিয়ে সবটা প্রত্যক্ষও করে এসেছিলেন।

    কর্নেল বললেন–হ্যাঁ। কারণ আজ সকালেই চন্দ্রকণা ও সতীনাথের হাবভাবে আমার সন্দেহ জেগেছিল। যাকগে, এখন চলো বেচারা সতীনাথকে সান্ত্বনা ও উপদেশ দেওয়া যাক।…

  • অলীক মানুষ

    অলীক মানুষ

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book-name]

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘অলীক মানুষ’ উনিশ-বিশ শতকের মুসলিম অন্দর মহলের এক তথ্যপূর্ণ ডকুমেন্টশন। তিনি নিমোর্হভাবে তার সহজাত ভাষায় বুনেছেন অসংখ্য কাহিনী-উপকাহিনীর মধ্যে দিয়ে একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস। একশ বছরের এই লৌকিক-অলৌকিকের মন্ময় আখ্যানটি রচিত হয়েছে কোলাজ রীতিতে। কখনো সহজ বয়ানে, কখনো মিথ ও কিংবন্তী আবার কখনো ব্যক্তিগত ডায়েরী, সংবাদপত্রের কাটিং জুড়ে দিয়ে দূর সময় ও বিস্ময়কর মানুষের বৃত্তান্ত। বাঙালি হিন্দু মুসলমান জীবনে এক অনাবিষ্কৃত এক সত্যের উদ্ভাসন।

    এরকম উপন্যাস দুই বাংলায় বিরল। পাঠ অমৃতসমান। কেননা অমৃতপাঠ থেকেই জানতে পারি :

    …‘এখন ভাবি, পুরুষের জীবনে ওই যেন কঠিন নির্বাসনের কষ্ট-কাল! নারীর জরায়ু থেকে বেরিয়ে এসে নিরন্তর নারীর সঙ্গে স্পর্শে-সাহচর্যে বেড়ে উঠতে উঠতে তারপর সে ধীরে ধীরে দূরে যেতে থাকে অথবা তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় দূরে। নারীর শরীর, নারীর স্তন, নারীর ঠোঁট তাকে অচ্ছুৎ করে ফেলে। নিষিদ্ধ হয়ে ওঠে প্রিয় এক জগৎ, এবং নির্বাসিতের মতো, অচ্ছুতের মতো, তারপর দূরে সরে থাকা। আবার প্রতীক্ষায় থাকা, কবে ফিরবে প্রিয়তম ঘরে? কবে ফিরে পাবে সে নারীর শরীর, নারীর স্তন, নারীর ঠোঁট এবং নারীর জরায়ূ–শরীরের পারুষ্যের যৌবনের রক্তমূল্য দিয়ে সবল পেশীর শক্তি দিয়ে হবে তার প্রত্যাবর্তনজনিত পুনরাভিষেক? করে সে ফিরবে পুরনো কোমল ঘরে? কৈশোরের সেই প্রতীক্ষা আর নির্বাসনের কাল।’

    লেখকবৃত্তান্ত

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক। তিনি খোশবাসপুর গ্রামে ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম জীবনে বাড়ি থেকে পলাতক কিশোরের জীবন অতিবাহিত করেছেন। রাঢ় বাংলার লোকনাট্য “আলকাপের” সঙ্গে যুক্ত হয়ে নাচ-গান-অভিনয়ে নিমজ্জিত হয়ে জেলায় জেলায় ঘুরেছেন। আবার একদিন সহসা সব ছেড়ে তিনি শুনলেন নিজের নাড়ির আওয়াজ – তাঁর ভেতরে অন্তর্নিহিত লেখকসত্তার ধ্বনি। শুরু হলো সাহিত্যের সাধনা।

    তাঁর “ইন্তি, পিসি ও ঘাটবাবু”, “ভালোবাসা ও ডাউনট্রেন”, “তরঙ্গিনীর চোখ”, “জল সাপ ভালোবাসা”, “হিজলবিলের রাখালেরা”, “রণভূমি”, “উড়োপাখির ছায়া”, “রক্তের প্রত্যাশা”, “মৃত্যুর ঘোড়া”, “গোঘ্ন”, “রানীরঘাটের বৃত্তান্ত”, ইত্যাদি অসংখ্য ছোটগল্পের জন্য বিশ্বসাহিত্যের দরবারে স্থায়ী আসন পেয়েছেন।

    সিরাজের প্রথম মুদ্রিত উপন্যাস – “নীলঘরের নটী” প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকমহলে সাড়া পড়ে যায়। একের পর এক প্রকাশিত হয় “পিঞ্জর সোহাগিনী”, “কিংবদন্তীর নায়ক”, “হিজলকন্যা”, “আশমানতারা”, “উত্তর জাহ্নবী”, “তৃণভূমি”, “প্রেমের প্রথম পাঠ”, “বন্যা”, “নিশিমৃগয়া”, “কামনার সুখদুঃখ”, “নিশিলতা”, “এক বোন পারুল”, “কৃষ্ণা বাড়ি ফেরেনি”, “নৃশংস”, “রোডসাহেব”, “জানগুরু” ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁর গল্প ও একাধিক গ্রন্থ ভারতের সমস্ত স্বীকৃত ভাষায় অনূদিত হয়েছে, এমনকি ইংরেজি তো বটেই, বিশ্বের বহু ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।

    ক্ষুদে ও কিশোর পাঠকদের দাবি মেটাতে তিনি সৃষ্টি করলেন “গোয়েন্দা কর্নেল” নামে একজন রহস্যময় চরিত্র, যাঁর মাথা জোড়া টাক, ঠোঁটে চুরুট, অবসরপ্রাপ্ত মিলিটারি অফিসার, এখন প্রজাপতি ও পাখি দেখতে ভালোবাসেন। অথচ তিনি অনেক অপরাধ ও হত্যার কিনারা করে শখের গোয়েন্দাগিরি করেন। “গোয়েন্দা কর্নেল” পাঠকের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

    সিরাজ কলকাতায় পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন ষাটের দশকের শুরুতে। দীর্ঘদিন আনন্দবাজার পত্রিকায় সাংবাদিক হিসাবে চাকরি ও লেখালেখি সমানতালে চালিয়ে গেছেন। তাঁর জ্ঞান ও অধীত বিদ্যাসমূহ তাঁকে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী হিসাবে বিদ্বানসমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, পুরাতত্ত্ব, বিজ্ঞান, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব – সব বিষয়েই তাঁর বিস্ময়কর জ্ঞান ও বিদ্যার গভীরতা তাঁকে পণ্ডিত মহলে উচ্চ আসন এনে দিয়েছে।

    তিনি কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা প্রদত্ত আকাদেমি পুরস্কার, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা প্রদত্ত নরসিংদাস পুরস্কার, রাজ্য সরকার দ্বারা প্রদত্ত বঙ্কিম পুরস্কার, এছাড়া ভূয়ালকা পুরস্কার সহ আরও অনেক অনেক পুরস্কার, সম্মান, পদক প্রাপ্ত হয়েছেন। তাঁর অনেক কাহিনী চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। তাঁর “মানুষ ভূত” চলচ্চিত্র ছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে মঞ্চে ক্রমাগত অভিনীত হয়ে চলেছে…

    [book-name]

    প্রথম প্রকাশ : বৈশাখ, ১৩৫৫

    দে’জ পাবলিশিং ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০৭৩

    প্রচ্ছদ : গৌতম রায় প্রকাশক : সুভাষচন্দ্র দে।

    লেজার টাইপ সেটিং : পেজমেকার্স ২৩বি রাসবিহারী এভিনিউ, কলকাতা ৭০০০২৬

    মুদ্ৰক : স্বপনকুমার দে। দে’জ অফসেট ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০৭৩

    উৎসর্গ

    আব্দুর রউফ, প্রীতিভাজনেষু


    Hatred is one of the passions that can master a life, and there is a temperament very prone to it, ready to see life in terins of vindictive melodrarna, ready to fine stimulus and satisfaction in frightful dem onstrations of ‘justice’ and ‘revenge’.

    – H.G. wells

  • কালো জিন এবং শাদা জিন বৃত্তান্ত

    কালো জিন এবং শাদা জিন বৃত্তান্ত

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book-name]

    কালো জিন এবং শাদা জিন বৃত্তান্ত

    দায়রা জজ ফাঁসির হুকুম দিলে আসামি শফিউজ্জামানের একজন কালো আর একজন শাদা মানুষকে মনে পড়ে গিয়েছিল। এদেশের গ্রামাঞ্চলে শিশুরা চারদিকে অসংখ্য কালো মানুষ দেখতে-দেখতে বড় হয় এবং নিজেরাও কালো হতে থাকে। কিন্তু শাদা মানুষ, যার লোম ভুরু ও চুলও প্রচণ্ড শাদা, ভীষণ চমকে দেয়।

    এর আগে শফিউজ্জামান ‘বিপজ্জনক ব্যক্তি’ ঘোষিত হন। একবার তাঁকে সাত বছরের জন্য জেলা থেকে নির্বাসিত করা হয়। ইংরেজের আইন একেক সময়ে ভারি অদ্ভুত চেহারা নিত।

    কিন্তু শফিউজ্জামান ছিলেন আরও অদ্ভুত। কারণ তাঁর পিতা ছিলেন মুসলিমদের ধর্মগুরু। শিষ্যরা তাঁকে বুজুর্গপির বলে মনে করত, যদিও পিরতন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনিই জেহাদ করে বেড়াতেন মুলুকে-মুলুকে। তাঁর পুরো নামটি প্রকাণ্ড। সৈয়দ আবুল কাশেম মুহম্মদ বদি-উজ-জামান আল হুসায়নি আল-খুরাসানি।

    বদিউজ্জামান ছিলেন যেমন অমায়িক, মিষ্টভাষী আর ভাবপ্রবণ, তেমনি খামখেয়ালি, জেদি আর হঠকারী। বারবার ঠাঁইনাড়া হওয়া ছিল স্বভাব। শফিউজ্জামানের জন্ম কাঁটালিয়া নামক পদ্মাতীরবর্তী এক গ্রামে। যখন তাঁর তিন বছর বয়স, তখন বদিউজ্জামান গেরস্থালি তুলে নিয়ে পোখরায় যান। শফির পাঁচ বছর বয়সে পোখরা থেকে বিনুটি-গোবিন্দপুর, দশ বছর বয়সে নবাবগঞ্জ, বারো বছর বয়সে কুতুবপুর, ষোলতে খয়রাডাঙ্গা, আর পরের বছরই মৌলাহাট। শফির জন্মের আগেও এরকম ঘটেছে। তার মা সাইদ-উন-নিসা, সংক্ষেপে সাইদা, সেইসব ঘটনা শফিকে হয়তো অনেকটা রঙ চড়িয়েই শোনাতেন। প্রথম স্টিমার দেখা ও ইলিশ খাওয়া আর প্রথম জঙ্গলের বাঘের মুখোমুখি হওয়ার রোমহর্ষক গল্প। একবার গোরুর গাড়িতে টাপরের পেছনকার পরদা তুলে হাত বাড়াচ্ছেন আর হাতে কচি আম ঠেকছে, এত আমের গাছ রাস্তার দুদিক থেকে ঝুঁকে এসেছে টাপরের ওপর। সেই আম খেতে খেতে শেষে পেটে নাড়ি কচলানো ব্যথা। বুজুর্গ স্বামীর দোওয়া পড়ে ফুঁ দেওয়া জল খেয়েই শেষে সেরে গেল। সারবে না কেন? মৌলানার সঙ্গে আসমান থেকে জিনেরা নিশুতি রাতে দলিজঘরে দেখা করতে আসত। জানলা দিয়ে ঠিকরে পড়ত শাদা রোশনি। জিনেদের কণ্ঠস্বর ছিল গ্রামোফোন রেকর্ডের মতো অর্থাৎ ধাতব ও সঙ্গীতময়। তাদের ভাষা সাইদা বুঝতেন না। তাঁর শাশুড়ি মাঝরাত্তিরে বউবিবিকে জাগিয়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলতেন, জিনের সঙ্গে বদুর বাত করা শুনতে চেয়েছিলে। ওই শোনো! সাইদা তখনও নাকি বালিকা। তাঁর স্বামীর বয়স তাঁর বয়সের আড়াইগুণ প্রায়। সাইদা বলতেন, আমাকে একবার জিন দেখাবেন বলায় উনি রাগ করে এক হপ্তা ‘ইত্তেকাফ’ নিয়েছিলেন।

    ‘ইত্তেকাফ’ শফি দেখেছেন। ব্যাপারটা আসলে নির্জনে মৌনীভাবে ঈশ্বরচিন্তা। কিন্তু বদিউজ্জামান তো পাহাড় বা অরণ্য এলাকার বাসিন্দা ছিলেন না যে পাহাড়ের গুহায় বা জনহীন জঙ্গলের ভেতর কুটির করে এক সপ্তাহের খাদ্য ও পানীয় নিয়ে ঈশ্বরচিন্তায় বসবেন। তিনি যেতেন মসজিদে। সব মসজিদই এদেশে পূর্বদুয়ারি। দক্ষিণপূর্ব কোনায় মশারি খাঁটিয়ে ঢুকে পড়তেন। মুসল্লি শিষ্যরা ওই কয়েকটি দিন যতটা সম্ভব নিঃশব্দে নমাজ পড়ে যেত। নৈলে মসজিদ তো নমাজান্তে সামাজিক আলোচনার মজলিশ, কখনও বিচারসভাও। সেকারণে হই-হট্টগোলও চূড়ান্ত রকমের হয়ে থাকে। হুজুর ‘ইত্তেকাফ’-ব্রত নিলে তারা তাঁকে বরং সাহায্য করত। মসজিদ এলাকায় জোরে কথা বলতে দিত না কাউকে। লোকচক্ষুর অন্তরালে একটি কালো মশারির ভেতর আব্বা হারিয়ে গেলে বালক শফি খুব অবাক হয়ে যেত। তার বড়ভাই নুরুজ্জামান সুদূর দেওবন্দ মাদ্রাসায় তালেব-উল-আলিম – শিক্ষার্থী। মেজভাই মনিরুজ্জামান জন্ম-প্রতিবন্ধী। মুখ দিয়ে লালা বেরুত। নড়বড় করে পাছা ঘষটে উঠোন থেকে বারান্দা, বারান্দা থেকে ঘর, শেষে রান্নাশালে গিয়ে মায়ের পিঠে সেঁটে যেত। তাই শফিকেই আব্বার খাবার পৌঁছে দিতে হতো মসজিদে। একে তো মসজিদের ভেতর আবছায়া, তাতে ওই কালো মশারি। খাবার পাশে রেখে শফি চোখদুটো তীক্ষ্ণ করে ভেতরটা দেখতে চাইত। আব্বার সঙ্গে কথা বলা বারণ। বললেও তিনি জবাব দেবেন না। কিন্তু শফির ইচ্ছে করত, মশারিটা একবার খপ করে তুলে দেখেই পালিয়ে যায়।

    ভেতরে কী করছেন আব্বা? ওখানে কোনো জিনও ঢুকে পড়েনি তো? কিংবা ভেতরে আব্বা আছেন তো? মূহুর্মূহু এইসব প্রশ্ন জাগত মনে। কখনও অজানা ভয়ে তার গা ছমছম করে উঠত। সেইসব মুহূর্তে তার ইচ্ছে করত, প্রচণ্ড চেঁচামেচি করে উঠবে। অনেক কষ্টে এই ইচ্ছেকে দমন করত শফি। তারপর কোন মুসল্লি এসে পড়লে তাকে দেখে সে ভুরু কুঁচকে জিভ বের করে মাথা নাড়তে নাড়তে তার একটা হাত ভরে টানত এবং বাইরে নিয়ে যেত। ফিসফিসিয়ে তাকে ভর্ৎসনা করত। শফি বলত, এঁটো থালা নিয়ে যেতে হবে না? সেজন্যেই তো বসে আছি। মুসল্লি বলত, সে ভার আমার। যানদিকিনি আপনি। ঘর যানদিকিনি।

    ধর্মগুরুর বাড়ির ছেলে বলে কাচ্চাবাচ্চাদেরও লোকে আপনি-টাপনি করত। কিন্তু শুধুই মুখের ভক্তি নয়। বালক শফি দেখেছে, সারাবছরই কত জায়গার লোক দেখা করতে আসছে হজুরের সঙ্গে। টাকাকড়ি ভেট দিচ্ছে পায়ের কাছে। কেউ আসছে গোরুরগাড়ি বোঝাই খন্দ ফলমূল নিয়ে। দলিজঘরের বারান্দায় জমে উঠছে শস্যের বস্তা। শাক-সবজির স্তূপ। পুকুরের মাছ। মুরগি-মোরগ। আস্ত খাসি। আর কোরবানির পরবে তো দলিজঘরের একপাশে খেজুরতালাই বিছানো থাকত। আর তাতে জমে উঠত মাংসের পাহাড়। সত্যি পাহাড়। শফির চেয়ে উঁচু।

    দয়ালু মৌলানা কিন্তু অনেকটাই বিলি করে দিতেন গরিব-গুরবোদের। রোজই ভিখিরির ভিড়, ফকিরফাঁকরার ভিড়, মুসাফির লোকের ভিড় দলিজের সামনের চত্বরে। ওরা সবাই মুসলিম ছিল না। হিন্দুসমাজের নিচুতলার নিরন্নরাও এসে দাঁড়াত। কুনাইপাড়ার একচোখ কানা সরলাবুড়ি, যাকে মায়ের হুকুমে সল্লাপিসি বলতে বাধ্য হয়েছিল শফি, ইদ বা কোরবানির দিন সে খুব ভোরবেলাতেই এসে বসে থাকত ওই চত্বরে। একটা প্রকাণ্ড নিমগাছ ছিল সেখানে। তখনও পাখ-পাখালি ডেকে ওঠেনি। বদিউজ্জামান দলিজঘরেই রাত কাটাতেন। সবে উঠে চাপাগলায় ঈশ্বরের প্রশস্তি উচ্চারণ করছেন। তামাচিনির বৃহৎ বদনা আর ময়ুরমুখো ছড়িটি হাতে নিয়ে মসজিদে ফজরের নমাজে যাবেন বলে দরজা খুলতেই ‘আঁই বাবা!’

    ওই ছিল সল্লাকানির সাড়া দেওয়া। এসেছে জানাতে আচমকা বেড়ালের ম্যাও করে চেঁচিয়ে ওঠার মতো ওই দুটি শব্দ। নিঝুম দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর সাইদা মেঝেয় বসে সুরে ধরে বাংলা পুঁথি পড়ছেন। শাশুড়ি কামরুন্নিসা চোখ বুজে শুয়ে কান করে শুনছেন। চৌকাঠের কাছে একদঙ্গল পাড়ার মেয়ে জুটেছে। শুনতে শুনতে কেউ ঢুলছে। ভাদুর মা তো বারান্দায় গড়িয়েই পড়ত। ওদিকে ভাদু মাঠ থেকে ফিরে সারা পাড়া মা মা করে গর্জে বেড়াচ্ছে। এদিকে বাদশাহ নমরুদ খাঁটিয়ার শীর্ষে মাংসখণ্ড ঝুলিয়ে তিনটে শকুনকে লোভ দেখিয়ে আসমানে উঠেছেন, হাতে তীরধনুক, খোদার বুকে তীর মারবেন। আর খোদা মুচকি হেসে ফেরেশতাকে বলছেন, বেচারা নমরুদকে খুশি করো। ওর ছুঁড়ে মারা তীরের ডগায় রক্ত মাখিয়ে ফেরত পাঠাও। তখন ফেরেশতারা রক্ত চেয়ে বেড়াচ্ছেন হন্যে হয়ে। শেষে মাছ দিল রক্ত। আর খোদা বললেন, হে মাছ, এরপর থেকে মরা অবস্থাতেও তুমি হারাম বলে গণ্য হবে না। সেই সময় আচমকা ‘আঁই মা!’

    ভাদুর মা তড়াক করে উঠে বসে চুল বাঁধতে লাগল। সদুর বউয়ের দুলুনি কেটে লালা মুছতে থাকল। বাকি মেয়েরা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। কামরুন্নিসাও ফোকলা দাঁতে হাসতে মুখ তুলে বললেন, কৈ, সরো সরো। দেখি সল্লাকানিকে। সাইদা চাপাগলায় হুঁশিয়ারি দিলেন, চুপ চুপ। গলাবাজি কোরো না তো তোমরা। শুনতে পেয়ে নসিহত (ভর্ৎসনা) করবেন।

    বদিউজ্জামান দলিজে। তাই এই হুঁশিয়ারি । শফি মায়ের আঁচল টেনে বলে, আম্মা! বলুন না, তারপর কী হল? তীরে মাছের রক্ত মাখিয়ে কী করল?

    সাইদা চোখ পাকিয়ে বলেন, রক্ত না, খুন।

    কেন আম্মা?

    হিঁদুরা রক্ত বলে।

    এসব ঘটনা কুতুবপুরে থাকার সময়। গ্রামটা ছিল বড়ো। হিন্দু-মুসলমান প্রায় সমান-সমান। মাঝখানটাতে নোম্যানস ল্যান্ডের মতো একটা চটান। নিমগাছের জঙ্গল। কী খেয়ালে বদিউজ্জামান কনিষ্ঠ পুত্রকে সেখানে নিসিং পণ্ডিতের পাঠশালায় ভর্তি করিয়েছিলেন। নিমের জঙ্গলের ভেতরে পায়েচলা পথ। চৈত্র মাসে নিমফুল ফুটে মিষ্টি গন্ধে মউমউ করত। গন্ধটা যখনই কোথাও পেয়েছে, শফির নাকে এসে সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপটা মেরেছে নিসিং পণ্ডিতের তামাকের গন্ধ। এক গন্ধ আরেক গন্ধের পেছনে ওত পেতে আছে। একটা কালো মানুষের পেছনে যেমন একটা শাদা-মানুষ।

    চটানটাকে বলা হত মানকের চটান। মানিক নামে কোনো লোক ছিল হয়তো। মানকের চটান পেরুলেই ছোট্ট ঘরে পাঠশালা। তালপাতার ছোট-ছোট চাটাই যার যার তার-তারটা। সাইদা নিজের হাতে যত্ন করে শফির চাটাই বুনে দিয়েছিলেন। সফি সেই চাটাই ছিঁড়ে চিবুত। তার চেয়েও ধেড়ে পড়ুয়াদের ভিড়ে সে সবসময় সিঁটিয়ে থাকত।

    শফির বৃত্তি পরীক্ষার আগেই বদিজ্জামান তল্পি গুটোলেন কুতুবপুর থেকে খয়রাডাঙ্গার মুসলমান জমিদার ইটের বাড়ি দিচ্ছেন হুজুরকে। সেখানে মিনার আর গম্বুজওয়ালা বিশাল মসজিদ। পাশে মাদ্রাসা, সারবন্দি তালেবুল আলিমদের থাকার ঘর। চত্বরে ফোয়ারা। ফুলবাগিচা। দুনিয়ায় যেন বেহেশতের একচিলতে প্রতিবিম্ব।

    দেউড়িতে রোজ সন্ধ্যায় নমাজের পর নহবত বাজে। জমিদার আশরাফ খানচৌধুরি হুজুরের কথায় নহবত বন্ধ করে দিয়েছেন। ফরাজিমতে দীক্ষা নিয়েছেন। গান-বাজনা হারাম ঘোষিত হয়েছে। কড়া পরদার হুকুম জারি হয়েছে। খোঁড়াপিরের আস্তানায় হত্যে দেওয়া, মানত, আগরবাতি, পিদিম, কবরে মাথা ঠেকানো, জ্যৈষ্ঠের শেষ রবিবারে বৈকালিক মেলা–সবকিছু বন্ধ। পিরের খাদিম বা সেবক, যার মাথায় জটা ছিল, গেরুয়া কাপড় পরতেন, ঝাড়ফুঁক করতেন, মাদুলি দিতেন, বেগতিক দেখে সদর শহরে পালিয়ে গেছেন। গুজব রটেছিল, বদুমৌলানা একশো লোক নিয়ে থান ভাঙতে আসছেন। সদরে আবুতোরাব উকিলের মেয়ের কাঁধ থেকে হারামজাদা এক জিনকে ধরে জটাধারী খাদিম শিশিতে ভরেন এবং গঙ্গায় ফেলে দেন। কৃতজ্ঞ উকিল আদালতে তাঁর পক্ষ থেকে দরখাস্ত ঠুকেছেন নাকি। তা ঠুকুন। বদুমৌলনা গঙ্গা থেকে শিশিবন্দি জিনটাকে উদ্ধার করবেন। তারপর কী হবে বোঝাই যায়।

    এসব কথা শুনতেও পেতেন বদিউজ্জামান। কিন্তু এড়িয়ে থাকতেন। তিনি ফরাজি ধর্মগুরু। পূর্ববাংলার প্রখ্যাত ফরাজি আন্দোলনের প্রবক্তা হাজি শরিয়তুল্লার মুরিদ–শিষ্য। প্রচণ্ড পিউরিটান। হাত দুটো নাভির ওপরে রেখে নমাজ পড়েন। সুরা ফাতেহা আবৃত্তির পর উচ্চকণ্ঠে ‘আমিন’ বলেন। প্রার্থনারীতি ও ধর্মীয় আচরণে অসংখ্য এমন পার্থক্য মেনে চলেন অন্য তিনটি মজহাব বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে। তবে জিনে তাঁর আপত্তি থাকার কথা নয়। কারণ পবিত্র কোরানে স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন, আমি জিন ও ইনসান (মানুষ) সৃষ্টি করেছি। জিন বানানো হয়েছে আগুন থেকে, মানুষকে মাটি থেকে। জিনরা অগ্নিজাতক। তারা আলোর মানুষ। বাস করে সপ্তস্তবক আসমানের কোনও একটি স্তবকে। (আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় অন্য একটি গ্যালাক্সিতে) কাজেই জিন আছে। জিন থাকলে দুনিয়ায় তাদের আনাগোনা ঠেকাবে কে?

    নিসিং পণ্ডিতের পাঠশালা ছেড়ে বরং খুশিই হয়েছিল শফি। কথায়-কথায় বেত মারতেন পণ্ডিত। শফি ভীষণ অবাক হয়ে যেত। তাকে পাড়ার দাড়িচুল-পাকা বুড়োরাও আপনি বলে। এমন কি শফি বিশ্বাস করত, তাদের বাড়ির লোকেরা মরবে না। কুতুবপুরে থাকার সময় তার আর একটি ভাই হয়েছিল। একবছর পরে একদিন সে পাঠশালা থেকে ফেরার সময় তার মরে যাওয়া শুনে প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিল। এ তো অসম্ভব ব্যাপার। বাড়ি ফিরে কান্নাকাটি শুনে সে থ। তারপর প্রায়ই কবরখানায় গিয়ে ছোট্ট কাঁচা কবরটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঢিল ছুঁড়তে শুরু করত সামনের শ্যাওড়াগাছটার দিকে। শেষে রাগেদুঃখে ভ্যা করে কেঁদে ফেলত।

    পণ্ডিতের বেতের কথা শফি বাড়িতে চেপে যেত। ভাগ্যিস মুসলমানপাড়ার কোনও ছেলে পাঠশালায় পড়তে যেত না। কিন্তু মুসলমানদের ধর্মশিক্ষা আবশ্যিক। তাই ছোটরা মসজিদে একজন ওস্তাদজির কাছে আরবি পড়তে যেত! ওস্তাদদজিকে নিযুক্ত করা হয়েছিল হুজুরের সুপারিশে। তিনি একদা তাঁর তল্পিবাহক ‘তালেবুল আলিম’ ছিলেন। এদিকে মেয়েরা পড়তে আসত সাইদার কাছে। উঠোনে সারবেঁধে বসে দুলে দুলে তারা পড়ত; আলেফ জবর আ। বে জবর বা। তে জবর তা।

    কুতুবপুর থেকে চলে যাওয়ার কথা শুনে শিষ্যদের সে কী হাউহাউ করে কান্না!

    এসব সময় বদিউজ্জামানের চিরাচরিত একটি আনুষ্ঠানিক রীতি ছিল। একেবারে শেষ সময়ে মসজিদে নমাজের পর ভাষণ শুরু করতেন; বেরোদানে ইসলাম– ইসলামের ভ্রাতৃবৃন্দ! আল্লাহ পাক আমাকে জিন্দেগি-ভর রাহি মুসাফির করেছেন। যদি বলেন, আপনার দেশ কোথায়? আমার কোনো দেশ নেই ভাইসকল! আমার দেশ সারা দুনিয়া।

    এরপর হুজুর গ্রামবাসী মোমিনবৃন্দের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন আবেগ মাখা কণ্ঠস্বরে। প্রতিটি ছোটবড় ঘটনা উল্লেখ করে বুকে হাত রেখে বলতেন, সব আমার দেলে গাঁথা রইল। ভুলি নাই। ভুলব না। তবে আমার আবার সময় হয়েছে, ‘উঠো মুসাফির, কদম বাঢ়াও, আগেসে এক মঞ্জিল হ্যায়।’

    শিষ্যবৃন্দ (সমস্বরে) । হুজুর! হজুর! এ কী বলছেন! এ যে আসমান থেকে বাজ এসে পড়ল মাথায়।

    (প্রবল কান্নার ধ্বনি)

    হুজুর॥ ভ্রাতৃবৃন্দ! আল্লাহ বলেছেন, কিছু চিরস্থায়ী নয়। কেউ কাউকে বেঁধে রাখতে পারে না। তাই আল্লাহ বলেছেন, কোনোকিছুর জন্য শোক হারাম। মৃতের জন্য শোক হারাম। নষ্ট হওয়ার জন্য শোক হারাম। কিছু হারানোর জন্য শোক হারাম। যে তোমার কাছ থেকে চলে যাচ্ছে, তার জন্য শোক হারাম।

    (কান্নার ধ্বনির শ্বাসপ্রশ্বাসে রূপান্তর। চতুর্দিকে ফোঁসফোঁস নাক ঝাড়ার আওয়াজ।)

    সর্দারশিষ্য (কাঁধের ডোরাকাটা রুমালে চোখ মুছে)॥ হুজুর, এদফা আপনার মঞ্জিল কোথায়?

    হুজুর (বিষণ্ণ হেসে)॥ খয়রাডাঙ্গা।

    সর্দারশিষ্য (নাক মুছে)॥ জায়গা ভালো। জমিদার মোছলমান। কিন্তু আমরা যে এতিম হয়ে গেলাম হজুর!

    হুজুর (চোখ মুছে)॥ আল্লার হাতে আপনাদের রেখে যাচ্ছি। নজর রাখবেন, যেন আউরত লোকেরা বেপর্দা না হন। গানবাজনা যেন না শোনা যায়। মোহররমে আর যেন তাজিয়া জুলুস গ্রামে না ঢোকে। কেউ যেন পিরের থানে মানত দিতে না যায়। কেউ নমাজ কামাই করলে জরিমানা করবেন। দোসরা বার করলে সাত হাত নাক খবদা সাজা দেবেন। তেসরা বার করলে পঁচিশ কোড়া মারবেন। আর তারপর করলে গ্রাম থেকে নিকালে দেবেন শয়তানকে।…

    হজুর চলে গেলে সেসব অবশ্য কিছুই করা হত না। কারণ তাতে দলাদলি ও হাঙ্গামার আশঙ্কা ছিল। মেয়েরা আবার বেপরদা হয়ে মাঠে মরদ-ব্যাটাদের নাশতা দিয়ে আসত। শাদি লাগলে ঢোল বাজিয়ে গীত গাইত আগের মতোই। নাচত এবং সঙ দিত। পাশের গায়ের হানাফি মজহাবের জোয়ানরা মোহররমের মিছিল এনে খবর পাঠাত ঢুকবে নাকি এবং অনুমতিও পেত। তবে প্রধান ফরাজিরা দেখে না দেখা বা শুনেও না-শোনার ভান করে আড়ালে গিয়ে বসত। বাংলা পুঁথিগুলো বানান করে-করে সুর ধরে পড়তঃ ‘লাখে লাখে মরে লোক কাতারে কাতার/শুমার করিয়া দেখি পঞ্চাশ হাজার।…’ সেই কবে এসে ইরফান মৌলবি বাংলা মক্তব খুলেছিলেন। তখনই কিছু লোকের যা বাংলা হরফ শেখা, শ্লেটে দাগড়া দাগড়া ‘স্বরে অ, স্বরে আ।’ পাঁচন আর লাঙ্গলের মুঠিধরা হাতে দড়কচা পড়ে গেছে। ধান পুঁতে হাতে পায়ে হাজা।

    খয়রাডাঙ্গায় গিয়ে একটা বছর না কাটতেই আবার তল্পি গুটোলেন বদিউজ্জামান। জমিদার সাহেব হুজুরকে দেখে আসন ছেড়ে সালামের জবাব দেননি। সেদিনই সন্ধ্যায় কজন অনুগত শিষ্যকে ডেকে জানিয়ে দিলেন, এশার নমাজের পর রওনা হবেন সেকেচ্ছা। খানকতক গাড়ি এখনই দরকার।

    বদিউজ্জামানের সংসার সবসময় তৈরি থাকত, কখন হুকুম জারি হবে, উঠে পড়ো, গুটিয়ে নাও। কিন্তু খয়রাডাঙ্গা থেকে যেমন করে উঠে পড়তে হয়েছিল, সে যেন একটা শেকড় পড়ানোর ব্যাপার। সেই প্রথম ইটের ঘরে থাকা। প্রথম নিজস্ব একটি ইঁদারা। আর শফির বয়স তখন প্রায় সোল। পৃথিবীর কিছু কিছু কুয়াশা তার চারপাশ থেকে অপসৃত। সেই প্রথম সে বন্ধুতার স্বাদ পেয়েছে যৌনতা বুঝেছে। তার কষ্ট হচ্ছিল খয়রাডাঙ্গা ছেড়ে চলে যেত। এখানকার মেয়েরা তার চোখে পরি হয়ে উঠেছিল।

    মৃদু আপত্তি করেছিলেন সাইদা। কিন্তু বদিউজ্জামান অমনি অগ্নিমূর্তি হয়ে বললেন, খামোশ বুড়বক ঔরত!

    কামরুন্নিসা তখন চলচ্ছক্তিরহিত। ধরে ওঠাতে হয়। খাইয়ে দিতে হয়। অর্ধাঙ্গে পক্ষাঘাত। শুধু বললেন, কেন বেটা? বদিউজ্জামান জবাব দিলেন না। জোব্বার আস্তিন গুটিয়ে কেতাব গোছাতে থাকলেন। এইসব সময় তাঁবেদার জিনেরা এসে যেত মানুষের চেহারায়। সামান্য সময়ের মধ্যে লটবহর তারা ছাড়া কে গোছাতে পারবে?

    অনেক পরে শফি বুঝতে পেরেছিল আব্বার খয়রাডাঙ্গা ছাড়ার কারণ কী। খোঁড়া পিরের প্রতি নবদীক্ষিত ফরাজিদের গোপন ভক্তি থেকে গিয়েছিল। তারা বাইরে ফরাজি হলেও ভেতর-ভেতর হানাফি। তাছাড়া মাদ্রাসার আলেমরা বদিউজ্জামানের একাধিপত্য বরদাস্ত করতে পারছিলেন না। তার চেয়ে বড় কথা, তাঁরা ফরাজি মত মেনে নেননি। এমন কী ‘বাহাছ’ অর্থাৎ প্রকাশ্য তর্কযুদ্ধেরও ডাক দিয়েছিলেন। জমিদারসাহেব বিব্রত বোধ করছিলেন। বদিউজ্জামানের বহু ব্যাপারে বাড়াবাড়ি দেখে বিরক্ত হচ্ছিলেন। ভদ্রলোক ছিলেন সঙ্গীতের ভক্ত। বাংলা উপন্যাস ভালবাসতেন। বিকেলে আরামকেদারায় বসে থাকতেন এবং মাদ্রাসা থেকে পালা করে একজন পড়ুয়া এসে তাঁকে উপন্যাস পড়ে শোনাত। এমন কি আলবোলায় তামাক খাওয়া তাঁর আজীবন অভ্যাস, কিন্তু ফরাজি হওয়ার পর ধূমপান হারাম গণ্য। বদিউজ্জামান নাকি তাঁর কাছে গেলে তামাকের গন্ধ পেতেন এবং ধর্মগুরুসুলভ ভৎর্সনা, যাকে বলা হয় ‘নসিহত’, করতেন। লোকের সামনে শাস্ত্রীয় এই ভৎর্সনা সহজ মনে মেনে নিতে পারছিলেন না জমিদারসাহেব।

    মাসটা ছিল চৈত্র। আগের বর্ষায় ভাল বৃষ্টি হয়নি। রাস্তাঘাট শুকনো খটখটে। বারো ক্রোশ দূরে সেকেচ্ছা যেতে সিধে নাকবরাবর রাস্তাই বেছে নেওয়া হয়েছিল। শীতলগাঁয়ের কাছে মৌরালা নদী পেরুলে তিনক্রোশের একটি অনাবাদি মাঠ পড়ে। উলুশরার মাঠ। আসলে মাঠ নয়, উলুকাশের জঙ্গল। শীতের শেষে সেখানে গাড়ি চলার রাস্তা হয়ে যায়। রাস্তা বলতে শুধু কাশবন ভেঙে দুটি চাকার দীর্ঘ আঁকাবাঁকা দাগ। তারপর আবার উঁচু মাটির আবাদি মাঠ। সেখানে আবার স্থায়ী সড়ক। সেকেড্ডা পৌঁছুতে পরদিন বিকেল হয়ে যাবে।

    এবার তল্পি গুটোনোর সময় সেই আনুষ্ঠানিক রীতির ব্যতিক্রম ঘটালেন হুজুর। তবু খবর পেয়ে ছোটখাট একটা ভিড় হল। গম্ভীর হুজুর দুচার কথার কৈফিয়ত দিলেন। কিন্তু অন্ধকারে কোনো ক্রন্দন শোনা গেল না। না কোনো দীর্ঘশ্বাস। সাতখানা গোরুর গাড়ি, দুখানায় টাপর চাপানো। পেছনে পাঁচখানা গাড়িতে গেরস্থালির লটবহর। শেষে গাড়ির পেছনে বাঁজা গাইগোরু মুন্নি টানটান করে বাঁধা। নিঃসন্তান প্রাণীটি ছিল ভীষণ বৈরাগিনী। দড়ি ছেঁড়ার তাল করত। বারবার নিখোঁজ হয়ে বিস্তর ভোগাতও শফিকে।

    ধাড়ি ছাগল কুলসুম সওয়ার হয়েছিল দ্বিতীয় গাড়ির টাপরের পেছনে। তার দুদিনের ছানাদুটোকে এক প্রধান শিষ্য পেছনের খোলাগাড়িতে কোলে নিয়ে বসে ছিল। বেচারি সারারাত ঘুমোতে পারেনি। কিন্তু খয়রাডাঙ্গার শিষ্যদের মধ্যে সেই ছিল হুজুরের সবচেয়ে অনুগত মানুষ। পুণ্যের লোভ ছিল তার অসম্ভব বেশি। ভোরবেলা যখন এই অদ্ভুত কারাভাঁ শীতলগাঁয়ের নদীটির ধারে পৌঁছল, তখন তার মার্কিন থানের লুঙ্গি এবং ফতুয়া হলুদ হয়ে গেছে। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। প্রায় বুজে যাওয়া নদীর শুকনো বালিতে গাড়িগুলো দাঁড়ানোমাত্র সে ছানা দুটিকে নিয়ে লাফ দিল। সেখানেই তাদের ছেড়ে দিয়ে নদীর হাঁটুজলে উপুড় হয়ে পড়ল।

    ছানাদুটি লম্ফঝম্ফ করে মাকে ডাকছিল। কুলসুমকে নামিয়ে দেওয়া হল তাদের কাছে। তখন কুলসুম ঠ্যাং ফাঁক করে দাঁড়িয়ে তাদের দুধ খেতে দিল এবং খুদে লেজ দুটোকে দুধারে মুখ ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে পুঁকতে থাকল।

    বদিউজ্জামান ক্ষীণ নদীস্রোতের দিকে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চটি খুলে রেখে তামচিনির বদনাটিতে জল ভরলেন। কিনারায় বসে উপাসনার প্রক্ষালন ‘ওজু’ সেরে নিলেন। সাতখানা গাড়ির সাতজন গাড়োয়ান আর তিনজন শিষ্য নদীতেই ওজু করল। তারপর হুজুরের পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। পরিস্কার বালির ওপর ফজরের নমাজ শুরু হল। সামনে হুজুরের পরিচিত ময়ূরমুখো ছড়িটি পোঁতা।

    ঠিক এইসময় নদীর ওপারে পশ্চিমে ঈষৎ উঁচুপাড়ের ওপর ভোরের ধূসর আলোয় একটি ছায়ামূর্তি ফুটে উঠল।

    দ্বিতীয় টাপর চাপানো গাড়ির ভেতর ছিলেন সাইদা, তাঁর রুগ্ণা শাশুড়ি আর কিশোর শফি। সাইদা গাড়ির আড়ালে বদনা নিয়ে নেমেছিলেন। প্রার্থনাকারীরা অন্যদিকে রয়েছে দেখে আশ্বস্ত হলেন। তারপর বাকি দিকগুলিকে দেখে নিলেন। সেসব দিকে কোনো বেগানা মরদলোক আছে কি না এতে নিঃসশয় হওয়ার পর পা বাড়ালেন নদীর দিকে। এসব সময় তাঁকে খাঁচা থেকে বেরিয়ে পড়া পাখির মতো লাগে। নড়বড় করে পা ফেলেন। দুনিয়ার প্রকাশ্য মাটিতে হাঁটতে তাঁর যেন কষ্ট হয়। বহুকাল ধরে পাতার তলায় চাপাপড়া ঘাসের মতো বিবর্ণ তাঁর গায়ের রঙ। সামান্য দূরে একটি কাশঝোঁপ তাঁর লক্ষ্য ছিল। কিন্তু কিছুতেই যেন পৌঁছুতে পারছিলেন না সেখানে। সারারাত গাড়ির ঝাঁকুনিতে শরীর অবশ। গিঁটে গিঁটে ব্যথা হয়ে গেছে। আর এই নরম বালি। বিব্রত বোধ করছিলেন সাইদা। এখনই যে সুরুজ বেরিয়ে পড়বে পুবে! দাগকাটা দুধের সরের মতো সেখানে মেঘ জমে আছে আর ক্রমশ লাল আভা ফুটে উঠছে। সাইদা যেন পয়গম্বর এব্রাহিমের পরিত্যক্তা নির্বাসিতা স্ত্রী বিবি হাজেরার মতো বিশাল মরুভূমিতে জলের খোঁজে ছুটে চলেছেন।

    শফি সারারাত ঘুমোতে পারেনি। খয়রাডাঙ্গা তাকে পেয়ে বসেছিল। কতবার তার ইচ্ছে করছিল, চুপিচুপি গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যাবে। কিছুক্ষণ আগে একটা স্বপ্ন দেখেছিল সে। মাদ্রাসার পেছনে বটগাছটার তলায় মৌলবি নাসিরুদ্দিনের মেয়ে জহরা দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ তার স্বপ্নটা ভেঙে গেল। একটানা শো শো ঘস ঘস অদ্ভুত শব্দ শুনে সে উঠে বসল! পর্দা ফাঁক করে দেখল বালির চড়ার ওপর গাড়ি চলেছে।

    গাড়ি থামলে সে লাফ দিয়ে নেমেছিল। তারপর ঘুরে নদীর ক্ষীণ স্রোতটার দিকে তাকাতেই স্বপ্নের কষ্টটা চলে গেছে। সে দৌড়ে নদীর জল ছুঁয়েছিল। তারপর আব্বা তাকে ডাকলেন, শফিউজ্জমান!

    শফি সাড়া দিয়ে বলল, জি!

    ওজু করো বেটা! আমরা এখানেই ফজরের নমাজ পড়ব।

    নমাজে দাঁড়িয়ে সামনে নদীর ওপারে তাকিয়েই শফি চমকে উঠেছিল। ছাইমাখানো আলোয় কালো এক মূর্তি। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। শফির মনে হল, তার চোখদুটোকেও সে দেখতে পাচ্ছে। জন্তুর চোখের মতো কি? যেন নীল চকচকে দুটি চোখ এবং তা শুধু শফিকেই দেখছে। শিউরে উঠল শফি।

    করজোড়ে মোনাজাতের সময়ও আঙুলের ফাঁক দিয়ে শফি লক্ষ্য রেখেছিল কালো মূর্তিটার দিকে। সে তেমনি দাঁড়িয়ে।

    নমাজ শেষ হওয়ার পর একজন গাড়োয়ান তাকে চেঁচিয়ে জিগ্যেস করল, এ ভাই! উলুশরার মাঠে রাস্তা হয়েছে?

    লোকটার গলা শুনে আরও চমকে উঠল শফি। খ্যানখেনে এমন কণ্ঠস্বর কি মানুষের? সেও চেঁচিয়ে বলল, হয়েছে!

    গাড়োয়ান তবু জিগ্যেস করল, হয়েছে?

    হ্যাঁ, হ্যাঁ, হয়েছে। তবে কিনা—

    তবে কিনা?

    নদীটা ছোট। তত কিছু চওড়া নয়। হাওয়া বন্ধ ছিল। আস্তে কথা বললেও শোনা যেত। কিন্তু গ্রামের মানুষজনের চেঁচিয়ে কথা বলাই অভ্যাস। ততক্ষণে ওপারের উঁচুপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা স্পষ্ট হয়েছে। তার পরনে একফালি ন্যাতা। ঝাঁকড়া চুলেও একটা ন্যাতা জড়ানো। কিন্তু সে সাঁওতাল বা মুশহর নয়, সেটা তার কথাতেই বোঝা যাচ্ছিল। খুব স্পষ্ট আর জোরালো তার উচ্চারণ। আকাশের নিচে নদীর ওপর তার কণ্ঠস্বর গমগম করছিল, যেন ধ্বনি নয়, প্রতিধ্বনি।

    গাড়োয়ান আবার চিৎকার করল, তবে কিনা?

    সে একটু ঘুরে হাত তুলে বলল, পাকুড়গাছের কাছে যেয়ে ডাইনের লিকে গাড়ি ঘোরাতে হবে। নৈলে–

    নৈলে?

    বাঁয়ের লিকে গেলে গুপিডাঙ্গার নামুতে কেঁওলির বিল। তবে কিনা যাওয়া হবে কোথা?

    সেকেচ্ছা-মখদুমলগর।

    সে তো বিরভুঁই জেলায়।

    তাই বটে।

    হঠাৎ লোকটা হনহন করে চলে গেল। ঠিক অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মতো। শফির বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। চোখ বড়ো করে উঁচুতে নীলধূসর আকাশের বিশাল পটের দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা ভীষণ শূন্য করে দিয়েছে আকাশটাকে। কালো একটা রহস্যময় কে ও?

    শফি আড়চোখে আব্বাকে দেখে নিল। মা বলেছিলেন, দুরকম জিন আছে। ভাল জিন, মন্দ জিন। ভাল জিনের গায়ের রঙ ফিট শাদা, ধপধপে কাফনের থানের মতো। কালো জিনের গায়ের রঙ মাটির হাঁড়ির তলার মতো ভূসকালো। বদিউজ্জামান তাঁর কেতাববোঝাই টাপর দেওয়া গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে তখনও তসবিহ (জপমালা) জপছেন। ন্যালা মেজভাই মনিরুজ্জামান টাপরের ভেতরে থেকে মুখ বের করে হাত চুষছে আর খ্যা খ্যা করে হাসছে। সাইদা গাড়ির আড়াল দিয়ে এইমাত্র মেজছেলের খোঁজ নিতে এলেন। একটাই ভয় ছিল। বিছানায় পেচ্ছাপ করে দেয় আঠারো বছর বয়সের ছেলেটি। পবিত্র কেতাবগুলি যদিও চট আর কাপড়ে বাঁধা রয়েছে, কিছু বলা যায় না। সাইদা ফিসফিস করে বললেন, ইস্তেঞ্জা (মূত্রত্যাগ) করবি বেটা? কানে গেলে বদিউজ্জামান জপ থামিয়ে বললেন, খাওয়ার ইন্তেজাম করো। সাইদা, চলে গেলেন নিজের গাড়িতে। গাড়ির তলা দিয়ে তাঁর এলোমেলো পা ফেলা এবং লাল চটি দুটো দেখতে পেল শফি।

    আব্বার কোনো ভাবান্তর না দেখে অবাক হয়েছিল শফি। নিশ্চয় একটা কালো জিন এসেছিল। ও কখনও মানুষ হতে পারে না।

    কিছুক্ষণ পরে তুমুল চেঁচামেচি করে গাড়িগুলোকে নদীর চালু পাড় বেয়ে যখন ওপারে ওঠানো হল, আবার শফির গা শিউরে উঠল। এ কোথায় চলে এসেছে তারা? যতদূর চোখ যায়, ধূসর উলুকাশের বন। জনমানুষহীন খাঁ খাঁ নিঝুম এক দুনিয়া। এখানে এক কালো মানুষের কথা ভাবতেই বুক কেঁপে ওঠে। খুব আদিম এই ভূখণ্ডে মানুষের পায়ের ছাপ খুঁজে মিলবে না। সাতখানা গাড়ি সার বেঁধে চলেছে। সাতজোড়া চাকায় একটানা ঘস ঘস ক্যাচ ক্যাচ আওয়াজ। তার সঙ্গে উলুকাশের ঘষা-খাওয়া শোঁ শোঁ শনশন অদ্ভুত ধারাবাহিক শব্দ। অবাধ এই তৃণভূমিতে এতক্ষণে সূর্যের লালচে আভা ছড়িয়ে পড়েছে। সবার আগে এবার কুলসুমকে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে একজন প্রবীণ শিষ্য। ছানাদুটিকে অদ্ভুত দক্ষতায় বুকে চেপে রেখেছে সে। মুন্নি শেষ গাড়িটির পেছনে আগের মতোই বাঁধা। এতক্ষণে শফি গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামল। সাইদা পর্দা ফাঁক করে দেখেই প্রায় চেঁচাতে যাচ্ছিলেন। বলদের পিঠের ওপর এমনি করে ঝাঁপিয়ে পড়তে আছে? এক্ষুণি বুকের ওপর চাকা চলে গিয়ে কলজে ফেটে যেত না বাছার? গাড়োয়ান হ্যা হ্যা করে হাসতে লাগল।

    শফি একা হতে চাইছিল। চ্যালেঞ্জের একা ইচ্ছা তাকে পেয়ে বসেছিল। শেষ গাড়ির পেছনে চলে গিয়ে সে ঝোঁপ থেকে একটা ডাল ভেঙে নিল। ডালটা শক্ত করে ধরে সে তৃণভূমিতে চারদিকে তাকিয়ে কালো জিনটিকে খুঁজতে থাকল।

    ভয় পেয়ে শফি এরকম করত। একবার সন্ধ্যার পর গোরস্তানের পাশ দিয়ে আসতে আসতে হঠাৎ প্রচণ্ড ভয় পেয়ে তেমনি হঠাৎ রুখে দাঁড়িয়েছিল সে। চিড়খাওয়া গলায় চিৎকার করে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল, চলে আয়, দেখি। পরে খুব লজ্জা পেয়েছিল সে। যদি কেউ শুনে থাকে, তাকে মেজভাইয়ের মতো পাগলা ভাববে যে? কিন্তু মজার কথা, পরে তাকে মেহেদি নামে একজন লোক বলেছিল, হ্যাঁ গো, সেদিন গোরস্তানে কার সঙ্গে তকরার করছিলেন? শফি বলেছিল, ও কিছু না চাচা! কিছু না।

    উলুশরার মাঠে সকালের আলোয় তারপর সে ‘কালা জিনে’র কথা ভুলে গেল। ক্রমশ সে একটা নতুন আর অচেনা দুনিয়ার ঢুকে পড়েছিল। টের পাচ্ছিল, এ কোনো মানুষের দেশ নয়। ঘাসফড়িংগুলো কি কিড় করে ডাকছিল। ডাকছিল পাখপাখালি। কাঁটাগাছের ফুলন্ত ঝোঁপ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতি উড়ে যাচ্ছিল কাশের ডগা ছুঁয়ে। একখানে খরগোশ দেখে গাড়োয়ানরা হল্লা করতে লাগল। একজন হুজুরের কাছে জানতে চাইল, খরগোশ হালাল না হারাম। হুজুর ফতোয়া দিলেন, জরুর হালাল। কিন্তু তখন খরগোস উধাও। শফি-একটা শেয়াল দেখল। একটা খেঁকশিয়ালি তার পায়ের ফাঁক দিয়ে পালিয়ে গেল। একটা ঢ্যামনা সাপ ছুটে গিয়ে ব্যানাবনে ঢুপে পড়ে। শফি বুঝতে পারছিল এটা মানুষের দুনিয়া নয়। সে ছিপটিটাকে শক্ত করে ধরে সতর্কভাবে হাঁটছিল। মাঝেমাঝে মুন্নিকে ছিপটির ঘা মারছিল নেহাত অকারণে। পোকামাকড়ের ডাক, পাখপাখালির ডাক, সাতখানা গোরুর গাড়ির ঘসটানো ক্যাঁচ-কোঁচ শব্দ, উলুকাশের শোঁ শোঁ শনশন আওয়াজের মধ্যে দিয়ে শফি চলেছে তো চলেছে। কখন হাওয়া উঠেছে। কাশবন দুলতে লেগেছে। কত অদ্ভুত নতুন-নতুন শব্দ। রোদ পড়লে মাথার টুপিটা খুলে পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে রাখল শফি।

    তারপর হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে পর-পর সাতখানা গাড়ি থেমে গেল।

    শফি কী হয়েছে দেখার জন্য দৌড়ে সামনে চলে গেল। তারপর থমকে দাঁড়াল। সামনে জল।

    বদিউজ্জামান অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন। আগের লোকটিও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছে। কুলসুম এই সুযোগে দড়ি ঢিলে পেয়ে হাঁটু বাঁকা করে জল খেয়ে নিচ্ছে। গাড়োয়ান বোবাধরা গলায় বলে উঠল, হা আল্লা!

    একটু স্তব্ধতা হকচকানি। তারপর কথা ফুটল লোকগুলোর। একজন চিৎকার করে উঠল, হারামি! নাফরমান।

    সেই কালো লোকটি যে ভুলপথে পাঠিয়ে দিয়েছে, বুঝতে পারছিল সবাই। গাড়োয়ানরা তার উদ্দেশে ক্রোধ বর্ষণ করতে থাকল। তাদের মনে ভীষণ এবং জঘন্য গালাগালি। কিন্তু হুজুরের সামনে মুখখিস্তি করা চলে না। শফি তার আব্বাকে আবার লক্ষ্য করছিল। বদিউজ্জামানের নিষ্পলক দুটি চোখ জলের দিকে। ঈষৎ কুঞ্চিত। হাতের তসবিহদানা স্থির। ঠোঁট একটু ফাঁক হয়ে আছে। শফি মনে মনে বলল, আব্বা! আমি জানতাম।

    সে ঘুরে দ্বিতীয় গাড়ির দিকে তাকাল। টাপরের পরদার ফাঁকে মায়ের একটা চোখ দেখা যাচ্ছে। শফির ইচ্ছে করল, মায়ের কাছে গিয়ে কালা জিনের কথাটা তোলে। কিন্তু কারুর কাছে ব্যাপারটা ধরা পড়েনি দেখে সে একটু আড়ষ্ট হয়ে গেল। আর তার মনের ভেতর ঘুরে বেড়াতে থাকল ‘আমি জানতাম’ এই শব্দটা।

    একজন জলে একটু নেমেই ব্যস্তভাবে উঠে এল। বলল, সর্বনাশ হুজুর। অগাধ পানি।

    আরেকজন বলল, খাগড়ির সোঁতা না এটা?

    তাই বটে।

    কিন্তু এত পানি থাকার তো কথা না।

    সেটাই আশ্চর্য লাগছে।

    একজন ডাইনে-বাঁয়ে দূরে তাকিয়ে বলল, মনে হচ্ছে কোথায় লোকে বাঁধ দিয়ে পানি আটকেছে। বোরোধান পুঁতেছে।

    হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওই তো হারা রঙ ঝিকমিকোচ্ছে! তাকিয়ে দ্যাখো অসিমুদ্দিন।

    অসিমুদ্দিন তাকিয়ে দেখল। সে বয়সে সবচেয়ে প্রবীণ। তার কপালে নমাজপড়ার কালচে ছোপ। পরনে খাটো লুঙ্গি গায়ে কোরা থানের পাঞ্জাবি। মাথায় তালশির দিয়ে তৈরি টুপি। সে গম্ভীর কণ্ঠস্বর ডাকল, হুজুর পিরসাহেব!

    জি! বদিউজ্জামান আস্তে সাড়া দিলেন।

    শয়তান আমাদের মুসিবতে ফেলে দিয়েছে।

    জি।

    হুজুর! এ মুসিবত থেকে বাঁচার রাস্তা আপনার হাতে। আপনি একটা কিছু করুন।

    শফি বুঝতে পারছিল লোকটা কী বলতে চাইছে। উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে উঠল সে। কালো জিনের কারচুপি সম্ভবত ধরতে পারছে ওরা। কিন্তু আব্বা চুপ কেন? জিনেরা তো তাঁর কথা শোনে!

    এইসময় সাইদার চাপা ফুঁপিয়ে ওঠা শুনতে পেল শফি। তারপর আব্বার গর্জন শুনল। বেঅকুফ নাদান ঔরত! বেশরম কাঁহেকা!

    অসিমুদ্দিন ডাকল, হুজুর!

    গর্জন করার পর কান্নাটা থেমে গিয়েছিল। বদিউজ্জামান চোখ বন্ধ করেছেন। ঠোঁট কাঁপছে। নাসারন্ধ্র ফুলে উঠেছে। তারপর সুর ধরে উচ্চারণ করলেন, আউজুবিল্লাহে শয়তান-ইর রাজিম। বিসমিল্লাহে রহমান-ইর রহিম।

    বদিউজ্জামানের কণ্ঠস্বর ছিল জোরালো, উদাত্ত। জমিদারি মসজিদের মিনারে উঠে কোনো-কোনো ফজরে আজান দিতেন নিজেই। সারা খয়রাডাঙ্গার ঘুম ভেঙে যেত। মধুরস্বরে কোরান আবৃত্তিকারদের বলা হয় কারি এবং কোরান যাদের মুখস্থ তাঁরা হাফিজ। বদিউজ্জামান ছিলেন কারি এবং হাফিজ দুই-ই।

    কোরানের সুরা ইয়াসিন আবৃত্তি করছিলেন তিনি। বিপদে-আপদে এই সুরা আবৃত্তি করা হয়। নীলধূসর চৈত্রের আকাশের নিচে সেই গম্ভীর ও উদাত্ত ধ্বনি ছড়িয়ে যাচ্ছিল চারদিকে। বলদগুলোও যেন শ্বাস ফেলতে ভুলে গিয়েছিল। চারপাশে কাশবনে শনশন হাওয়ার শব্দ, বনচড়ুইয়ের ঝাঁকে অস্ফুট ডাকাডাকি, ঘাসফড়িঙদের প্রচ্ছন্ন চিৎকার, তার মধ্যে সঙ্গীতময় ওই পবিত্র ঐশী-ধ্বনিপুঞ্জ। খাগড়ির সোঁতার ওপারে দুটি শাদা সারস মর্মর পাথরের মূর্তি হয়ে গেল।

    কিছুক্ষণ পরে অলৌকিক ঘটনাটি ঘটল। একেই বলে বুজুর্গের মোজেজা–দিব্যশক্তির নিদর্শন। পরে চাপা গলায় লোকগুলিকে বলাবলি করতে শুনেছিল শফি, এ মোজেজাই বটে। হুজুরের অসাধ্য তো কিছু নাই।

    বহুবছর পরে শফি ইংরেজ সাহেব দেখেছিল। কিন্তু উলুশরার কাশবনে খাগড়ির সোঁতারও পারে যাকে দেখেছিল, তার সঙ্গে ইংরেজ সাহেবের কোনো তুলনাই হয় না। আরও পরে সে প্রথম ধুতরার ফুলের গড়ন প্রকাণ্ড চোঙবসানো গ্রামোফোন যন্ত্র দেখেছিল এবং রেকর্ডে ‘জন্মাষ্টমী’ নামে নাটক শুনেছিল। সেই ধাতব কণ্ঠস্বর শুনে হঠাৎ খুব চেনা মনে হয়েছিল– আগেও কোথায় যেন শুনেছে। কিন্তু মনে পড়েনি। তখন শফির মন ভারাক্রান্ত, মগজে অন্য দুনিয়ার ঝড়।

    ভরা সোঁতার ওপারের শাদা সারসগুলি হঠাৎ উড়ে যাওয়ায় সবার দৃষ্টি পড়েছিল সেদিকে। উঁচু কাশবনের ভেতরে থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এল অসম্ভব শাদা এক মানুষ। দিনের উজ্জ্বল আলোয় তার শাদা চুল, শাদা ভুরু, শাদা চোখের পাতা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তার মুখে গোঁফদাড়ি ছিল না। সে চিৎকার করে বলল, রাস্তা ভুল হয়েছে। তারপর হাত তুলে ইশারায় এপারে সোঁতার বাঁদিকটা দেখিয়ে বলল, কিনারা ধরে চলে যান।

    বদিউজ্জামান আবৃত্তি বন্ধ করেননি। কণ্ঠস্বর নামিয়ে এনেছিলেন মাত্র। অসিমুদ্দিন বলল, এদিকে তো লিক (চাকার দাগ) নাই ভাইজান!

    ওপারের শাদা লোকটি বলল, তাতে কী? গাড়ি ডাকান। আমি এপারে থেকে সঙ্গে যাচ্ছি।

    গাড়ির মুখ ঘোরানো হল। কাশের বন ভেঙে গাড়িগুলো সোঁতার সমান্তরালে চলতে থাকল। এবারে পায়ে হাঁটার সমস্যা। তাই সবাইকে গাড়িতে উঠতে হল। কুলসুমকে রাতের মতো চাপানো হ’ল সাইদার টাপরের পেছনে। শফি চাপল মায়ের গাড়িতে গাড়োয়ানের পেছনে। সাইদা পরদার ফাঁকে ডানদিকে তাঁকিয়ে ওপরের শাদা লোকটিকে দেখছিলেন। তাঁর চোখের চাউনিতে বিস্ময় ঝিলিক দিচ্ছে। শফি ফিসফিস করে ডাকল, আম্মা!

    কী বেটা?

    শফি চুপ করে গেল। সে জিনের কথা বলবে ভাবছিল। কিন্তু তার কথা শুনে যদি শাদা জিন অদৃশ্য হয়ে যায়, তাহলে আব্বা হয়তো তাকে ভীষণ বকবেন।

    শাদা মানুষটির পরনেও একফালি ন্যাতা। শাদা চুলগুলো খোঁচাখোঁচা। কিছু জড়ানো নেই। সে মাঝেমাঝে কাশের ভেতরে ঢাকা পড়ছিল। তখন অসিমুদ্দিন চেঁচিয়ে তাকে ডাকছিল, ভাইজান! ভাইজান!

    তখনই সে কাশের পরদা ফাঁক করে সাড়া দিচ্ছিল, আছি, আছি। চলেন, চলেন। তার শাদা দাঁতে রোদ্দুর ঝকমকিয়ে উঠছিল।

    পোয়াটাক চলার পর সত্যি একটা বাঁধ দেখা গেল। বাঁধের ওপাশে সোঁতার বুকে গাঢ় সোনালি বালির চড়া। শাদা লোকটি বলল, এইখানে পার হয়ে আসেন। আর ওই যে দেখছেন বাবলাবন, ওখানে গেলেই আবার লিক পাবেন। তা যাবেন কোথা আপনারা?

    সেকেড্ডো-মখদুমলগর।

    গাড়িতে উনি কে?

    হুজুর পিরসাহেব।

    লোকটা কপালে হাত ঠেকিয়ে বদিউজ্জামানের উদ্দেশে বলল, সালাম হুজুর! তারপর সে কাশবনের ভেতর ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ তার শাদা মাথাটা দেখা গেল। তারপর সে একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল।

    অসিমুদ্দিন মৃদু হেসে চাপাগলায় বলল, সবই হুজুরের কেরামতি। আমিন। রব্বুল আলামিন!

    উলুশরার মাঠে একজন কালোমানুষ বিপদে ফেলেছিল, একজন শাদা মানুষ এসে তাদের উদ্ধার করে গিয়েছিল। সদরে দায়রা আদালতে ফাঁসির হুকুম শোনার পরই শফিউজ্জামানের চোখে ভেসে উঠেছিল চৈত্রমাসের সেই আশ্চর্য দিনটি। সমস্ত খুঁটিনাটি নিয়ে একটি আশ্চর্য সময়। প্রাচীন একটি মোজজা। আব্বা যদি আজ বেঁচে থাকতেন।…