Author: তাহের আলমাহদী

  • প্রকাশকের নিবেদন

    প্রকাশকের নিবেদন

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    প্রকাশকের নিবেদন

    “……কিন্তু কাব্যের সঙ্গে দ্বিতীয়বার পরিচয় ঘটলো এবং বেশ মনে পড়ে এইবারে পেলাম তার প্রথম সত্য পরিচয়। এরপরে এ বাড়ির উকীল হবার কঠোর নিয়ম-সংযম আর ধাতে সইলো না; আবার ফিরতে হলো আমাদের সেই পুরোনো পল্লী-ভবনে। কিন্তু এবার বোধোদয় নয়, বাবার ভাঙ্গা দেরাজ থেকে খুঁজে বের করলাম ‘হরিদাসের গুপ্তকথা’। গুরুজনদের দোষ দিতে পারিনে, স্কুলের পাঠ্য ত নয়, ওগুলো বদ্-ছেলের অ-পাঠ্য পুস্তক। তাই পড়বার ঠাঁই কোরে নিতে হোলো আমার বাড়ির গোয়াল ঘরে। সেখানে আমি পড়ি, তারা শোনে। এখন আর পড়িনে, লিখি।……”

    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    (১৩৩৮)

    প্রকাশক হিসেবে ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের (১৮৪২-১৯১৬) এই গ্রন্থটি পড়বার পর ঠাকুমার যৌবনকালের আতর মেশানো পুরোনো বেনারসী শাড়ির গন্ধ পাই। অনেক দিন সেই আতরের গন্ধ আমার নাকে লেগেছিল। গন্ধটা ফিকে হয়ে যাবার মুখেই নতুন করে মনে করিয়ে দিল বিমল করের ‘বালিকা বধূ’-র ছায়াচিত্রের নায়ক-নায়িকারা। এরপর বইটি বহু খুঁজেছি। পরে সেই বইটি পড়ার সুযোগ করে দিলেন বঙ্গীয়-সাহিত্য পরিষৎ-এর কর্মী সাহিত্যিক-গবেষক শ্রীবিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়। বইটি পড়ে মনে হলো প্রায় পঞ্চাশখানি বইয়ের লেখক সেকালের স্বনামধন্য বহু বিতর্কিত সাহিত্যিক ভুবনচন্দ্রের এই গ্রন্থটি—আজ যাঁরা সাহিত্যচর্চায় ব্যাপৃত, আধুনিক পাঠক-পাঠিকা, আমাদের মতো প্রকাশক—সকলেরই বইটি পড়া উচিত। যাচাই করে দেখে নেওয়া উচিত ১৩০৪ বঙ্গাব্দে চলিত ভাষায় লেখা সমাজ-চিত্রের অপূর্ব ইতিহাস এই উপন্যাস থেকে আমরা কতটা এগোতে পেরেছি। প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সাংবাদিক পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় তাঁর ‘নায়ক’ পত্রিকায় ভুবনচন্দ্র সম্বন্ধে লিখেছিলেন : ‘আলালের সময় হইতে যিনি বাঙ্গালার গদ্য-পদ্য লেখক, মাইকেলের সহচর, যাঁহার লিখিত পুস্তকরাশির সংখ্যা করা যায় না, যাঁহার পাঠকগণেরও সংখ্যা হয় না—সেই সরল, সোজা দেশী বাঙ্গলা গদ্যের লেখক ভুবনচন্দ্রের মতন অনুবাদক আর বাঙ্গালায় ছিল না—বোধহয় আর হইবে না।’ পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যের সত্যতা প্রকৃতই ‘হরিদাসের গুপ্তকথা’ পাঠে উপলব্ধ হয়। পাঠকসমাজের হাতে তাই তুলে দিলাম বহু দুষ্প্রাপ্য এই গ্রন্থটি। সকলের ভালো লাগলে আমার এই পরিশ্রম সার্থক বলে মনে করবো।

  • প্রথম খণ্ড : অতি আশ্চর্য্য

    প্রথম খণ্ড : অতি আশ্চর্য্য

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    অতি আশ্চর্য্য

    ১৩১০ বঙ্গাব্দ।

    সূচনা : আমি কে?

    আমি হরিদাস। বত্রিশ বৎসর পূর্ব্বে আমি এই বাঙ্গালাদেশেই ছিলাম। সেই সময় আমার বাল্যজীবনের কতক কতক পরিচয় দিয়াছি। জন্মাবধি কতদিন পর্য্যন্ত মাতাপিতা জানিতাম না, আপন বলিয়া কাহাকেও চিনিতাম না, নানা স্থানে বিচরণ করিয়া কত কষ্টই ভোগ করিয়াছিলাম, কত বিপদেই পড়িয়াছিলাম, তাহা মনে হইলে এখনও আমার সর্ব্বেন্দ্রিয়ের সহিত জীবাত্মা শিহরিয়া উঠে। ভাগ্যক্রমে যদিও এখন আমি রাজা, তথাপি পূর্ব্বের অবস্থার সমস্ত কথাই আমার মনে আছে।

    জীবনকাহিনীগুলি প্রণালীপূর্ব্বক বর্ণনা করিতে হইলে এতদ্দেশের প্রচলিত কথোপকথনের সহজ ভাষাই ব্যবহার করা ভাল; কেন না, সেই ভাষায় গল্পচ্ছলে লিখিয়া দিলে আপামর সাধারণ সকলেরই হৃদয়গ্রাহিণী হয়। এই আখ্যায়িকাতে সেই ভাষাই আমি অবলম্বন করিব। পূর্ব্বে একবার কতক কতক পরিচয় দিয়াছিলাম, বয়স তখন অল্প ছিল, আমার অনেক গুহ্যকথা তখন আমি ব্যক্ত করিতে পারি নাই, এইবার শেষের কথাগুলির সঙ্গে সেইগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে খোলসা করিয়া বলিব। গোড়ার কথাগুলি না বলিলে আখ্যায়িকা অসম্পূর্ণ থাকে, অতএব প্রয়োজনীয় ঘটনাবলীও সংক্ষেপে সংক্ষেপে ইহাতে লিপিবদ্ধ থাকিল। পাঠকমহাশয়! অনুগ্রহপূর্ব্বক অবহিতচিত্তে শ্রবণ করান।

  • প্রথম কল্প : পাঠশালা

    প্রথম কল্প : পাঠশালা

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    প্রথম কল্প : পাঠশালা

    শিশুকাল থেকে চতুর্দ্দশ বর্ষ বয়সক্ৰম পৰ্য্যন্ত আমি গুরুগৃহে ছিলেম। আমার গুরুদেবের বাসস্থান কোথায় ছিল, শিশুকালে ঠিক জানতে না পেরে, পূর্ব্বে আমি বোলেছিলেম সুবর্ণগ্রাম। কথাটা ভুল ছিল; দেশের ভূগোলে তখন আমার জ্ঞান ছিল না, এখন বুঝ্‌তে পেরেছি, সুবর্ণগ্রাম নয়, সপ্তগ্রাম। সুবর্ণগ্রাম ঢাকাজেলায়, আমি ঢাকাজেলায় ছিলেন না, হুগলীজেলায় ছিলেম, সে কথা আমার মনে আছে; হুগলীজেলাতে সপ্তগ্রাম অবস্থিত, চলিতকথায় সাত গাঁ।

    গুরুগৃহে আমি ছিলেম। কে আমি কাহার পুত্র, কি জাতি, কোথায় নিবাস, কিছুই আমি জানতেম না; পৃথিবীতে আমার কেহ আপনার লোক ছিল কি না, সেটাও আমার জানা ছিল না; জানা ছিল কেবল নামটী আমার হরিদাস। এ নামটী কে দিয়েছিল, সে কথাও আমি অবগত ছিলেম না। সমস্তই আমার চক্ষে অন্ধকারময় ছিল; চক্ষেও অন্ধকার, মনেও অন্ধকার।

    একটী কথা স্মরণ হয়। মাসে মাসে এক একখানা রেজিষ্টারীকরা বেনামী চিঠিতে আমার শিক্ষাগুরুর নামে কিছু, কিছু টাকা আস্‌তো, কে পাঠাতো, আমি জানতেন না। গুরুদেবও কিছু আমাকে বোল্‌তেন না। শুনতে পেতেম, আমারই খরচপত্রের টাকা। এ তত্ত্বটাও ঘোর অন্ধকার।

    পাঠশালেই আমার থাকা, পাঠশালেই আমার পড়াশুনা, পাঠশালেই আমার স্নানাহার, পাঠশালেই আমার খেলাধূলা, পাঠশালেই আমার শয়ন, পাঠশালেই আমার নিদ্রা, পাঠশালেই আমার সব। পাঠশালা ছাড়া আর কোন স্থান আমি জানতেম না, চিনতেম না, দেখতেমও না, কোন স্থানে যেতেমও না।

    পাঠশালে অনেকগুলি ছেলে লেখাপড়া শিক্ষা কোত্তো। প্রাচীন অধ্যাপক মহাশয়দিগের চতুষ্পাঠীর নিয়মে অনেকগুলি ছেলে আমাদের গুরুগৃহেই আহারাদি পেতো, দিবারাত্রিই সেইখানে থাকতো। আমার সঙ্গে সব ছেলেগুলির বেশ সদ্ভাব হয়েছিল।

    আমরা সকলেই হিন্দু-সন্তান। পার্ব্বণে পার্ব্বণে বিদ্যালয়ের ছুটী হোতো, সকল ছেলে ঘরে যেতো, আমোদ কোরে তারা আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইতো, আমি যেতেম না। কোথায় যাব?—ঘর ছিল না, বাড়ী ছিল না, মাতাপিতা, ভ্রাতা-ভগিনী কেহই ছিল না। কোথায় যাব? কার কাছে যাব?— যেতেম না। মন যখন নিতান্ত উদাস হোতো, সেই সময় একাকী নির্জ্জনে বোসে নীরবে কেবল রোঁদন কোত্তেম আর নিশ্বাস ফেলতেম্। চক্ষের জলে অঙ্গবস্ত্র ভেসে যেতো। বাস্তবিক আমার ঘর-বাড়ী ছিল কিনা, বাস্তবিক আমার আপনার লোক ছিল কিনা, ভগবান জানতেন; মানুষের মধ্যে যদি কাহারো জানা সম্ভব থাকতো, সেই সকল মানুষই সে খবর রাখতো; আমি কিন্তু কোন খবর পেতেম না, কোন খবরই রাখতেম না; কোন দিন কেহ আমাকে দেখতেও আসতো না। নিত্য নিত্য আমি ভাবতেম, সৃষ্টিকৰ্ত্তার এত বড় সংসারে আমাকে আমার বলবার কেহ নাই, নিসম্পর্কে সুধুই আমি একাকী।

    আমার যখন চৌদ্দ বৎসর বয়স, সেই সময় আমাদের আচার্যের মত্যু হয় : পাঠশালাটী ভেঙে যায়। আমার গুরুপত্নী শোকে কাতরা, তাঁর একটি কন্যা ছিল, অবিবাহিতা কুমারী. পিতার বড় আদরিণী কন্যা, সেটী তো পিতার বিয়োগে প্রায় জ্ঞানহারা। আমিও শোকে আকুল।

    কেবল শোক প্রকাশ কোরেই গুরুপত্নী নিশ্চিন্ত থাকতে পাত্তেন, এমন কথা বলা যায় না। আচার্য্যঠাকুর বহুশ্রমে যা কিছু উপার্জ্জন কোত্তেন, তাতেই শিষ্যপোষণ ও সংসারপালন হতো; তিনি চোলে গিয়েছেন, উপার্জ্জন বন্ধ হয়েছে, সংসারে বড়ই কষ্ট। কিছুমাত্র সম্বল নাই। ডাকযোগে আমার খরচপত্রের টাকা আসবে, আশায় আশায় তবুও আমি সেই কষ্টের সংসারে আরো তিন মাস থাকলেম। রেজিষ্টারী চিঠি এক মাস এসেছিল, গৃহিণী ঠাকুরাণী স্বয়ং রসীদ দিয়ে সেই চিঠিখানি গ্রহণ কোরেছিলেন। তার পরেই বন্ধ; দুই মাস আর চিঠিও এলোনা, টাকাও পৌঁছিল না। নিরুপায়।

    আমি তখন কি করি? গুরুপত্নী আমাকে বড়ই ভালবাসতেন, এক একবার আমার মুখপানে চান, চক্ষে জল আসে, বসনাঞ্চলে চক্ষু ঢেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে সোরে যান। ক্রমাগতই এই ভাব। দিন দিন আরো কষ্টবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কাতরতার বৃদ্ধি।

  • দ্বিতীয় কল্প : উপায় কি?

    দ্বিতীয় কল্প : উপায় কি?

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    দ্বিতীয় কল্প : উপায় কি?

    আরো দুই মাস কেটে গেল। গুরুপত্নী মুখ ফুটে আমাকে কিছু বোলতে পারেন না, আমিও নিজের ভাগ্যফল নিজে কিছু জানতে পারি না, মন কিন্তু সৰ্ব্বদাই অস্থির। যাঁর আশ্রয়ে থাকা, তাঁর অবস্থা প্রতিকূল, তিনি তাঁর নিজের আর কন্যাটীর ভরণ-পোষণেই অক্ষম, তার উপর আমি যদি আর বেশীদিন গলগ্রহ হয়ে থাকি, যে-ই দিক, যে-ই পাঠাক, ডাকে আমার টাকা আসতো, সেটা বন্ধ হয়ে গেছে, এখন আমি এই বিধবার গলগ্রহ ভিন্ন আর কিছুই নহি। পাঁচ মাস। এই পাঁচ মাসের মধ্যে কেবল প্রথম মাসের চিঠিখানি এসেছিল, আর এলো না। কারণ কি?—যে পাঠাতো সে লোক হয় তো মোরে গেছে। কিম্বা হয় তো আমি মোরে গেছি, সেইটাই ভেবে নিয়েছে, কিম্বা হয় তো আমি এখন বড় হয়েছি, শরীর খাটিয়ে দিনগুজরাণ কোত্তে পারি, এখন আর কেন দিবে, তাই ভেবেই বন্ধ কোরেছে। যা-ই হোক, উপায় তো কিছুই দেখছি না।

    নিত্য নিত্য এই সব কথা আমি ভাবি, আরো কত কি ভাবি, ভেবে কিন্তু কূলকিনারা কিছুই পাই না। যেখানে আমাদের পাঠশালাটী ছিল, ঠিক তারই পশ্চিমদিকে একটী বৃদ্ধ বকুলফুলের গাছ। একদিন বৈকালে সেই বকুলতলায় বোসে আমি আপন অদৃষ্ট ভাবনা কোচ্ছি, দুই চক্ষু দিয়ে জলধারা গড়াচ্ছে, হৃদয়সাগরে চিন্তা-তরঙ্গ তোলপাড় কোচ্ছে, মাথাটী হেট কোরে আমি বোসে আছি, হঠাৎ একবার মুখ তুলে চেয়ে দেখি, সম্মুখে গুরুপত্নী।

    চঞ্চল হস্তে চক্ষের জল মার্জ্জন কোরে শশব্যস্তে আমি উঠে দাঁড়ালেম। মনের দুঃখে আমি কাঁদি। গুরুপত্নীকে সেটা জানতে দিব না, আমার চক্ষের জল তাঁকে দেখতে দিব না, তিনি আমার মা, তিনি আমাকে পুত্ৰতুল্য স্নেহ করেন, প্রাণের সঙ্গে ভালবাসেন, তাঁর প্রাণে আমি ব্যথা দিব না, ইহাই আমার সংকল্প। অসাবধানে আজ আমার চক্ষের জল তিনি দেখতে পেলেন, তাই ভেবে চিত্ত আমার অত্যন্ত কাতর হলো, আড়ে আড়ে চেয়ে চেয়ে দেখলেম, ঠাকুরাণীর চক্ষেও জলধারা। অঞ্চলে নেত্র মার্জ্জন কোরে স্তম্ভিতস্বরে তিনি আমাকে আদেশ কোল্লেন, “হরিদাস! বোসো।”

    আমি বোসলেম। ঠাকুরাণীও ধীরে ধীরে আমার সম্মুখভাগে উপবেশন কোল্লেন। তখনো তাঁর চক্ষু-দুটী সজল। আমি মনে কোল্লেম, স্নেহবশেই স্নেহবতী আমার দুঃখে অশ্রুবিসর্জ্জন কোচ্ছেন। বাস্তবিক কোন মেঘে কিরুপ বর্ষণ হয়, সেটা অনুমান করা সাধারণ মানুষের অসাধ্য, বিশেষতঃ আমার মত বালকের পক্ষে।

    নীরবে গুরুপত্নীর মুখপানে চেয়ে আমি বোসে আছি, তিনিও সজলনয়নে আমার মুখপানে চেয়ে আছেন, দেখতে দেখতে তাঁর চক্ষু-দুটী জলশুন্য হয়ে এলো, হস্ত দ্বারা শুষ্কনেত্র পরিমার্জ্জন কোরে রুদ্ধস্বরে থেমে থেমে তিনি আমাকে বোল্লেন, “হরিদাস বাছা! দেখতেই তো পাচ্চো, সংসার অচল। লোকজন সব জবাব দিয়েছি, আসবাবপত্র তৈজসপত্র সমস্তই বিক্রয় কোরেছি, খাজনার দায়ে টোলবাড়ীখানিও নীলাম হয়ে যায়, উপায় কি? তোমার কি হবে? আহা! অনেক দিন ছিলে, অনেক দিন আছ, সন্তানের মত মায়া বোসেছে, কি কোরে তোমাকে আমি—”

    এই পর্য্যন্ত বোলেই ঠাকুরাণী তাড়াতাড়ি দুই হস্তে চক্ষু-দুটী ঢাকা দিলেন, তাঁর নাসায় ঘন ঘন বড় বড় নিশ্বাস পোড়তে লাগলো। আমি দেখলেম, প্রবল ঝড়! এ ঝড়ের পরিণাম কি হবে, আমার ভাগ্যচক্র কোন পথে ঘুরে যাবে, ভেবে চিন্তে কিছুই ঠিক কোরে উঠতে পাল্লেম না।

    চক্ষু থেকে হাত নামিয়ে জড়িতস্বরে গুরুপত্নী আবার বোলতে লাগলেন, “হরিদাস! তাই তো! উপায় কি হয়? কি কোরে চালাব? তোমাকে বিদায় দিতে ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু কি করি! তোমার জন্যই আমার বেশী ভাবনা। তুমি কোথায় যাবে।

    আর আমি ধৈর্য্য রাখতে পাল্লেম না; ক্ষুদ্র বালকের মত উচ্চকণ্ঠে রোদন কোরে করুণস্বরে বোল্লেম, “যাব?— কোথায় যাব? কোন জায়গা আমি চিনি? কাহাকে আমি জানি? জন্মাবধি এই আশ্রমে প্রতিপালিত হয়েছি, এই আশ্রমটীই জানি। আপনি আমাকে পরিত্যাগ কোল্লে আমি কোথায় গিয়ে কার কাছে দাঁড়াব? কে আমাকে আশ্রয় দিবে? দোহাই আপনার পায়ে ধরি, আপনি আমাকে পরিত্যাগ কোরবেন না। আমি আর আপনার গলগ্রহ হব না, এই বয়সে যতদূর পারি, পরিশ্রম কোরে, কোন লোকের কাছে চাকরী কোরে আপনার সংসারে যথাশক্তি সাহায্য কোরবো, আপনি আমাকে বিদায় কোরে দিবেন।”

    গম্ভীরবদনে ঠাকুরাণী বোল্লেন, “উপায় নাই হরিদাস, উপায় নাই। আমার কাছে তোমার আর থাকা হোতে পারে না; কি কোরে হবে? আমি এখানকার সব বিলিব্যবস্থা কোরে মেয়েটী নিয়ে এক মাসের মধ্যেই কাশী চোলে যাব, তখন তুমি আর কার কাছে থাকবে? চাকরীর কথা বোলছিলে, আমিও সেই কথা বোলছি। তোমার জন্য আমি একটী বেশ চাকরী যোগাড় কোরেছি। বেশ লোক; যার কাছে তুমি থাকবে, তোমার সেই মনিবটী বেশ লোক। খাটনীও বেশী হবে না, আপনার পুথি পড়বার সময়ও পাবে, সেখানকার সকলেই তোমাকে ভালবাসবে, যত্ন কোরবে, আদর কোরবে, বেশ থাকবে; কোন কষ্ট হবে না। সেই লোকটীকে আমি—”

    আমার মাথায় যেন বজ্রাঘাত হলো! চক্ষে যেন ধাঁধাঁ লাগতে লাগলো; মাথা ঘুরে গেল। বিস্তর মিনতি কোরে, গুরুপত্নীর চরণে ধোরে কতবার দয়া ভিক্ষা কোল্লেম, কিছুই ফল হলো না। যতই আমি কাঁদি, ততই তিনি কঠিন হন! আমার প্রতি তার দয়া ছিল, স্নেহ ছিল, ইহাই আমি জানতেম; ছিলও সত্য, কিন্তু ক্ষণেকের মধ্যে সব যেন কর্পূর হয়ে উবে গেল! ক্রমাগত কেঁদে কেঁদে আমি নির্ব্বাক হয়ে পোড়লেম, গৃহিণীর বাকপটুতা চতুর্গুণ হয়ে বেড়ে উঠলো!

    আপন মনে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কত কথাই তিনি বোলতে লাগলেন, আমার কাণ আর সে দিকে থাকলো না। থাকলেই বা কি হোতো? একটপূর্ব্বে যে সব কথা আমি শুনেছি, তাতেই আমার ধড়ের মন যেন ঝড়ের সঙ্গে উড়ে গেছে, মন উড়ে গেলে কাণ তখন আর কোন কার্য্যেই লাগে না; আওয়াজগুলো কেবল কাণের ভিতর ভোঁ ভোঁ কোরে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। আমি নিৰ্ব্বাক।

    টোলবাড়ীর সম্মুখদরজাটা তখন খোলা ছিল। যে বকুলতলায় আমরা ছিলেম, সেখান থেকে সে বাড়ীর ভিতর পর্য্যন্ত বেশ দেখা যায়। সে দিকে গুরুপত্নীর চক্ষু ছিল না, চক্ষু ছিল আমার দিকে, দৈবাৎ একবার আমার চক্ষু, সেই দিকে ঘূর্ণিত হলো। দেখলেম, একটা লোক একখানা ঘর থেকে বেরিয়ে, উঠান পার হোয়ে, আমাদের দিকে চাইতে চাইতে আর একখানা ঘরে প্রবেশ কোল্লে। দেখেই আমার বুক কেঁপে উঠলো। এম্নি ভয়ানক চেহারা!

    লোকটা দীর্ঘাকার; মুখখানা গোল, মাথাটা ন্যাড়া, হাত-দুখানা ছোট ছোট, পা-দুখানা খুব লম্বা, বুকখানা সরু, পেটটা খুব মোটা, চলতী বয়ানে নাদাপেটা; বর্ণ ঘনশ্যাম, বয়স আন্দাজ ৪৫/৪৬ বৎসর। পরিধান চওড়া কস্তাপেড়ে ধোপদাস্ত ধূতী;—ধূতী বলাও চলে, শাড়ী বোল্লেও ভুল হয় না।—গা আদুড়।

    তাকে আমি দেখলেম। সে আমাদের দিকে চেয়ে চেয়ে গেল, আমি তাকে দেখতে পেলেম কি না, সেটা সে জানতে পাল্লে কি না, তা আমি জানি না, বোলতেও পারি না। অন্য ঘরে প্রবেশ কোরেই সে লোক অদেখা হলো। গুরুপত্নী অনেকক্ষণ আমাকে নিরুত্তর দেখে, আপন বক্তব্য সমাপ্ত কোরে, উঠে দাঁড়িয়ে, অল্প উচ্চস্বরে ধীরে ধীরে আমাকে বোল্লেন, “হরিদাস! বোসো। তোমার সঙ্গে আরো আমার অনেক কথা আছে; যাতে কোরে তোমার ভাল হয়, সে ব্যবস্থা আমি অবশ্যই করবো; অব্যবস্থায় তোমারে আমি অকালে ভাসিয়ে দিব না, সেটা তুমি বেশ জেনো।—বোসো, কোথাও যেয়ো না; এখান থেকে উঠো না; শীঘ্রই আমি ফিরে আসচি।”

    গুরুপত্নী বাড়ীর ভিতর প্রবেশ কোল্লেন, তাঁর আদেশমত আমি সেই বৃক্ষতলেই বোসে থাকলেম। অন্তরসাগরে কত তরঙ্গ প্রবাহিত হোতে লাগলো, আমার অন্তরাত্মাই তা অনুভব কোল্লে।

    আচার্যের বাড়ীখানি দুমহল। সদর-মহলে পাঠশালা ছিল, অন্দরমহলে তাঁরা বাস কোত্তেন। এখন আর পাঠশালা নাই, কিন্তু অন্দরের অবস্থা পূৰ্ব্ববৎ। সদরমহলের নাম টোলবাড়ী। সেই বাড়ীতেই আমি থাকতেম, অন্যান্য ছাত্রেরাও থাকতো, এখন তারা নাই, এখন আমি একাকীই সেই টোলমহলের অধিবাসী। গুরুপত্নী ঠাকুরাণী সেই মহলেই প্রবেশ কোল্লেন, দ্বার বন্ধ কোল্লেন না, ভেজিয়ে রেখে গেলেন।

    আকাশে তখনও সূৰ্য্য ছিলেন। অল্প অল্প বেলা ছিল। ঠাকুরাণী ঘরে গেলেন, আমি তরুতলে বোসে বোসে ভূতভবিষ্যতের দুঃখের ভাবনা ভাবতে লাগলেম। জন্মাবধি ঘর ছিল না, তবু একটু আশ্রয় ছিল;—এইবার তাও যায়! গুরুপত্নী দয়াবতী ছিলেন, এখন হোচ্ছেন মায়াবতী! আর আমি এ আশ্রমে আশ্রয় পাব না! কোথায় যাব? কার হব? কার কাছে গিয়ে দাঁড়াব? উপায় কি?

  • তৃতীয় কল্প : পরামর্শ

    তৃতীয় কল্প : পরামর্শ

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    তৃতীয় কল্প : পরামর্শ

    সন্ধ্যা হলো। পল্লীগ্রামের সন্ধ্যাকাল। সহরের সন্ধ্যাকালের ন্যায় রাজমার্গগুলি আলোর মণ্ডিত হয় না, জনকোলাহল বাড়ে না, ঢোলকতবলা বাজে না, স্বরলহরী উঠে না, পাহারার আঁটা-আঁটি হয় না, চোর-গাঁটকাটা ঘোরে না, গাড়ী-ঘোড়াও ছোটে না, এ প্রকার কিছুই হয় না,—পল্লীগ্রামের সন্ধ্যাকালে অন্ধকার হয়, নক্ষত্র উঠে, শেয়াল ডাকে, সকলে ঘরে যায়, ঘরে ঘরে সন্ধ্যা জ্বালে, ভক্তগৃহে শঙ্খধ্বনি হয়, দুই একটী দেবগৃহে আরতির সময় শঙ্খঘণ্টা বাজে, পল্লী নিস্তব্ধ হয়, প্রকৃতি নিদ্রা যান, পাখীরা আলয় অন্বেষণ করে, পশুরা খোয়াড়ে গহ্বরে আশ্রয় লয়, এই সকল লইয়াই পল্লীগ্রামের সন্ধ্যা। সেই সন্ধ্যাকালে আমি হুগলীজেলার সপ্তগ্রামের এক বকুলতলায়। আমার ভাগ্যক্রমে সে দিন শুক্লপক্ষের দশমী তিথি ছিল, আকাশে চন্দ্রোদয় হলো,—দিব্য জ্যোৎস্না। বকুলপল্লব ভেদ কোরে চন্দ্রদেব আমার অঙ্গে অল্প অল্প শীতল কিরণ বর্ষণ কোত্তে লাগলেন, আমি আকাশপানে চাইলেম; চন্দ্রদেবকে দর্শন কোলেম। আকাশ আমি দেখবো, চন্দ্রদেবকেও দেখবো, আবার সন্ধ্যাকাল আসবে, কিন্তু সপ্তগ্রামের এই আকাশ, এই চন্দ্র আর আমি দেখতে পাব না! গুরুঠাকুরাণীর যে প্রকার ভাব, তাতে কোরে এই রাত্রেই হয় তো আমাকে সপ্তগ্রাম-ছাড়া হোতে হবে! যে লোকটাকে বাড়ীর ভিতর দেখলেম, ঐ লোকটার হাতেই হয় তো আমার ভাগ্যচক্রের নতন ঘূর্ণন আরম্ভ হবে! আশাভরসার বিসর্জ্জন হয়ে যাবে। কি যে হবে, কিছুই তখন ঠিক কোত্তে পাল্লেম না। আগাগোড়া অনেক ভাবলেম, মীমাংসা পেলেম না।

    রাত্রি প্রায় চারি দণ্ড। গুরুপত্নী ফিরে এলেন না। একা আমি এতক্ষণ বৃক্ষতলে বোসে তাঁর আজ্ঞা পালন কোচ্চি, এটা হয় তো তিনি ভুলে গেছেন। রাত্রি অন্ধকার থাকলে আমার ভয় হোতো, জ্যোৎস্নাটুকু সহায় আছে বোলে ততটা ভয় আসছে না, এক-রকমে আছি ভাল। হঠাৎ একদিক থেকে তিনটা প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বন্য শৃগাল আমার সম্মুখ দিয়ে ভোঁ ভোঁ কোরে নক্ষত্ৰবেগে ছুটে গেল।

    এ সংসারে দুঃসময়ে আপন মুখে সুখের কথা বোলতে নাই। ভাল আছি বোলতে বোলতেই সম্মুখ দিয়ে শেয়াল ছুটে গেল! শেয়াল ছুটে গেল, পাছে আবার বাঘ ছুটে যায়, সেই ভয়ে আমি তাড়াতাড়ি উঠে, টোলমহলের দরজার কাছে ছুটে গেলেম। ঠাকুরাণীর নিদেশ-নিৰ্ব্বন্ধ বিস্মৃত হোলেম। আস্তে আস্তে দরজাটা একটু ফাঁক কোরে, বাড়ীর ভিতর এদিক ওদিক উঁকি মেরে দেখলেম, উত্তরদিকের ঘরে প্রদীপ জ্বোলছে; দ্বার আবত আছে; জানালার ফাঁক দিয়ে আলো আসছে; দুটী লোক বেশ ডেকে ডেকে কথা কোচ্ছেন।— কে সেই দুটী লোক, একবার দেখেই তৎক্ষণাৎ নিঃসন্দেহে আমি তা বুঝতে পাল্লেম।

    প্রাঙ্গণ পার হয়ে ইতিপূর্বে যে লোকটী উত্তরের ঘরে প্রবেশ কোরেছিল, সেই একটী আর দ্বিতীয়টা আমার স্নেহময়ী গুরুঠাকুরাণী। কি তাঁদের কথা, সেটুকু বুঝে নিতেও আমার বিলম্ব হলো না। আমারি অদৃষ্ট ফলকের অক্ষরগুলির রূপভাগ করাই তাঁদের কার্য্য;—তারি উপায় নির্দ্ধারণ করা তাঁদের পরামর্শ।

    ধীরে ধীরে পা টিপে টিপে বাড়ীর ভিতর আমি প্রবেশ কোল্লেম। যে ঘরে তাদের পরামর্শ হোচ্ছিল, সেই ঘরের পশ্চিম গায়ে একখানা পরচালা; তার ভিতর পাঁচ রকম বাজেজিনিস থাকতো,  এক এক সময় সে জায়গাটা খালী পোড়ে থাকতো। সেখানে দাঁড়ালে ঘরের ভিতরের কথাবার্ত্তা বেশ স্পষ্ট স্পষ্ট শুনা যেতো। আমার সেটা জানা ছিল, চুপি চুপি সেই পরচালা ঘরেই আমি প্রবেশ কোল্লেম; একটী কোণ ঘেঁষে প্রচ্ছন্নভাবে দাঁড়ালেম।

    ঘরে দর্ম্মার বেড়া। একদিকে আমি, একদিকে তাঁরা দুজন। ব্যবধান একখানি পাতলা দর্ম্মা মাত্র। কথাগুলি স্পষ্ট স্পষ্ট আমার কাণে আসতে লাগলো। গোপনে দাঁড়িয়ে অন্য লোকের কথোপকথন শ্রবণ করা সেই আমার নূতন;—সেই আমার প্রথম কেন তেমন গর্হিত কার্য্যে আমার মতি হয়েছিল, আবশ্যকবোধে তাও এইখানে বোলে রাখি। আমি নিশ্চয় জেনেছিলেন, তাঁরা বলাবলি কোচ্ছিলেন আমারি কথা। কোন অপরিচিত লোকের কাছে আমার উপকারিণী গুরুপত্নী আমার চরিত্রচর্য্যার পরিচয় দিচ্ছেন, এমনটী যদি বুঝতে পাত্তেম, তা হোলে ঐ ভাবে লুকিয়ে শুনবার প্রয়োজন হতো না। সে রকম প্রবৃত্তিও আসতো না; কিন্তু যখন জেনেছিলেম, আমাকে নিরাশ্রয় কোরে অকূলে ভাসিয়ে দেওয়াই গুরুপত্নীর ইচ্ছা,—সুদঢ় পণ, সেই ইচ্ছা ও সেই পণ পূর্ণ করবার উদ্দেশেই যখন ঐ লোকটীকে এনেছেন, তখন আর গুপ্তশ্রোতা হয়ে মনকে স্থির রাখতে পাল্লেম না; কাজেই ঐ ঘৃণিত কার্যে প্রবৃত্তি।

    কথা কইতে কইতে হঠাৎ দুজনেই একবার থেমে গেলেন। একটু পরেই আবার হাস্যের কলরব উঠলো। ভাল কোরে গলা শাণিয়ে লোকটা তখন নূতন রকম কথা তুল্লে। দর্ম্মার গায়ে নিঃশব্দে আমি কাণ পেতে থাকলেম। বলে “চেহারাটা আছে ভাল; চেহারার চটোকে বুঝা যায়, বুদ্ধিটাও ভাল, বেশ মোটাসোটাও আছে, কিন্তু খাটে না, খাটতে পারে না, তোমার মুখে এই কথাটা শুনে আমার কেমন কেমন বোধ হোচ্ছে; রোগমাখা মাংসপিণ্ড নিয়ে আমি কি কোরবো?”

    ঠাকুরাণী বোল্লেন, “খাটতে পারে না, এমন কথা আমি বলি নাই, তবে কি জান, কৰ্ত্তার আদর পেয়ে ও কেমন একরকম নাই পেয়ে গিয়েছে; কর্ত্তা আদরে আমারও আদর পেয়েছিল, কাজে কাজেই কুড়ে বোনে গেছে; খাটালেই খাটবে,—ঘাড়ের উপর চাপ পড়লে সকলকেই খাটুনী অভ্যাস কোত্তে হয়। তুমি এক কাজ কর। আজ আর নয়, কালকের দিনটেও থাক, পরশুদিন বিকেলবেলা তুমি এসো, আমি ওটাকে তোমার সঙ্গে বিদায় কোরে দিব।”

    লোক।—ছোঁড়াটা দেখতে দিবি ফুটফুটে, আদরে আদরে বোধ করি আয়েসী হয়ে পোড়েছে, সহজে বোধ হয় বাগে আনা যাবে না। একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, সেই কথাটাই আগে দরকার; জাতটা কি?

    ঠাকুরাণী।–জাতজন্ম আমি কিছুই জানি না। কার ছেলে, কোথাকার ছেলে, কোন দেশে ঘর, কিছুই জানা নাই; কৰ্ত্তা জানতেন কি না, সে কথাও আমি বোলতে পারি না, আমায় কিন্তু একদিনও কিছু বলেন নাই। আমি জানি, ছোঁড়াটা বেওয়ারীস। মাসে মাসে বেনামী রেজিষ্টারী চিঠিতে টাকা আসতো, তাই আমি জানতেম, কে পাঠাতো, কতবার জিজ্ঞাসা কোরেছিলেম, কিন্তু কিছুই বোলতেন না। ডাকের মোহরে অবশ্য ডাকঘরের ঠিকানা থাকতো, আমি মেয়েমানুষ কি জানবো, চিঠি খুলে নিয়েই কৰ্ত্তা সেই খামখানা ছিঁড়ে ফেলতেন। যাক সে কথা, জাতের কথা তুমি জিজ্ঞাসা কোচ্চো কেন? কাজ চোল্লেই হলো, জাতের খবরে কি দরকার?

    লোক।—জিজ্ঞাসা কোচ্চি এই জন্য, অন্য কাজ যদি না জানে, অন্য কাজ যদি না পারে, চাষের কাজে জুড়ে দিব। দশ জায়গায় দশজনের হাতে আমার কাজ, একটা কিছু সুবিধা পেলেই একরকমে লাগিয়ে দিব।

    ঠাকু।—যাতে দিবে, তাই পারবে। কেন পারবে না? পেটের দায় বড় দায়। পেটের জ্বালা ধোল্লে লোকে বাঘের মুখে সাপের মুখে যেতেও পেছপা হয় না। দোকানের কাজেই দাও, পেয়াদার কাজেই দাও কিম্বা চাষের কাজেই লাগাও, ক্রমে ক্রমে সব কাজেই পটু হয়ে উঠবে।

    আমার গা কেঁপে উঠলো। আমার গুরুপত্নী আমাকে এই লোকটার হাতেই সোঁপে দিবেন, এই লোক আমাকে চাষের কাজে নিযুক্ত করবে। কোথায় যে নিয়ে যাবে, কে বোলতে পারে? চাষের কাজে দুদিনেই আমি মারা যাব! হায় হায়! আমার ভাগ্যে যে কি আছে, ভাগ্যলিপির যিনি কর্ত্তা, সেই বিধাতাপুরষ ভিন্ন আর কেহই সে তত্ত্ব পরিজ্ঞাত নয়। ভাগ্য আমার বড়ই মন্দ। তা যদি না হবে, জন্মাবধি নিরাশ্রয় হয়েও একটা আশ্রয় পেয়ে ছিলেম, অকস্মাৎ সে আশ্রয়টীও হারাব কেন? আমার ভাগ্যের কথা নিয়ে এরা আমোদ কোরে হাসিখুসী কোচ্চে, এটাও আমার ভাগ্যের ফল! হায় হায়! মানুষের মন বুঝে উঠা মানুষের অসাধ্য! এই গুরুগৃহিণীকে আমি মায়ের সমান দেখতেম; এখন দেখতে পাচ্ছি, তা তো নয়, ইনি একটী মায়ারাক্ষসী। মনে এই সব আলোচনা কোরে সেইখানে দাঁড়িয়ে আমি তিনটী দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ কোল্লেম।

    খানিকক্ষণ চুপ কোরে থেকে লোকটা আবার আমার গুরুপত্নীকে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “লেখাপড়ায় কেমন?”

    বিকৃতকণ্ঠে গুরুপত্নী উত্তর কোল্লেন, লেখাপড়া মাথা আর মুণ্ডু! কেবল খানকতক পুথি, কে জানে কি, তাই নিয়ে বর্ষাকালের ব্যাঙের মতন কোঁ কোঁ কোত্তো, দশ জনে জড়ো হয়ে চীৎকারশব্দে আমার এই দর্ম্মার ঘরের চালের গোলপাতাগুলো পর্য্যন্ত কাঁপিয়ে দিতো, এই পর্য্যন্ত বিদ্যা! সে বিদ্যাতে তোমার কোন উপকার হবে না। তুমি ওটাকে তোমার মনের মতন কাজেই ভর্ত্তি কোরে দিও। না পারে ত সপাসপ চাবুক দিও, চাবুকের চোটে ভূত-প্রেত বশীভূত হয়, ওটা তো একটা সামান্য বেওয়ারীস ছোঁড়া!”

    আবার আমি কেঁপে উঠলেম। উঃ! এই রাক্ষসী আমাকে বাছা বোলে ডাকতো, কত রকম আদর কোত্তো, স্নেহ জানাতো, মায়ায় ভুলে—আমি ছেলেমানুষ, এত কি জানি, মায়ায় ভুলে এই রাক্ষসীকে আমি জননী তুল্য শ্রদ্ধাভক্তি কোত্তেম। পেটে পেটে এত ছিল, কেমন কোরেই বা জানবো! রাক্ষসী আমাকে চাবুক মারবার হকুম দিচ্ছে! উঃ! সংসারের মায়া-মমতা কত স্থানে কত আবরণে ঢাকা, নিরুপণ করা অসাধ্য। একবার ইচ্ছা হলো, সরাসর সম্মুখে গিয়ে চোটপাট জবাব করি, আশ্রয়ের ধূলায় দণ্ডবৎ কোরে জন্মের মত বিদায় চাই; ইচ্ছা হলো বটে, কিন্তু ভয় এসে অগ্রে অগ্রে সেই ইচ্ছার সম্মুখে দাঁড়ালো। যদি এখন গিয়ে দেখা দিই, লোকটা এখনি আমাকে ধোরে ফেলবে, দুদিন সময় দিবার পরামর্শ হোচ্ছিলো, সে অবসরও আর থাকবে না। ভয়ে ভয়ে মনে মনে এইরূপ চিন্তা কোরে সেইখানেই আমি নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেম।

    দুজনে আবার চুপি চুপি কি বলাবলি কোরে দু-একবার আমার নাম কোল্লে, আবার খানিকক্ষণ চুপ কোরে থাকলো। তার পর লোকটা ইতস্তত কোরে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “আচ্ছা, আজ নিয়ে যেতে তুমি বারণ কোচ্চো কেন?” ঠাকুরাণী বোল্লেন, “আজ আমি সব কথা ওকে খুলে বলেছি, এ দেশে আমি থাকবো না, এখানকার সব জিনিসপত্র বেচে কিনে মেয়েটী নিয়ে কাশী যাব, এই মিথ্যাকথাটাও বোলেছি, তাই শুনে ছোঁড়াটা হাপুসনয়নে কাঁদতে লেগেছে। খুব ছোটবেলা থেকে এখানে রয়েছে, মায়ার সংসারে বেরালকুকুরের উপরেও একটু একটু মায়া বসে, তার কান্না দেখে আমারও একটু, মায়া হয়েছিলো, সেইজন্য তাকে গাছতলায় বসিয়ে আমি এখানে চোলে এসেছি। আমার পায়ে ধোরে কতই কেঁদেছে, কতই সাধনা কোরেছে, আমার চক্ষেও জল এসেছিলো, তাই জন্যে বলা, এ দু-দিন থাক, পরশুদিন তুমি নিয়ে যেয়ো।” হো হো কোরে হেসে লোকটা বোল্লে, “ও হো হো! এই কথা তোমার! এত মায়া তোমার! ঐ রকম মায়াকান্নায় তুমি ভুলে যাও! ছোঁড়াটা তো ভারী ধড়ীবাজ! এই বয়সে এত ধড়ীবাজী বুদ্ধি ধরে! ও সব মায়াকান্না! মায়াতে তুমি ভুলতে পার, আমি ভুলি না। আজ রাত্রেই আমি নিয়ে যাব। রাত্রিকালে নিয়ে যাওয়াই ভাল। কোন দিক দিয়ে কোথায় নিয়ে ফেলবো, পথ চিনে আর ফিরে আসতে পারবে না। মল্লিকবাবুদের নদীয়াজেলার নীলকুঠীতে।”

    তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে ঠাকুরাণী বোলে উঠলেন, “না, না, এ রাত্রে নিয়ে যেয়ো না; আর একটা দিন থাক : দেখই না, কি তামাসা হয়, কি রঙ্গটা করে; আর একটা দিন থাক। ঘনশ্যাম, তুমি আমারে চেন না; যখন আমি যে সঙ্কল্পটা ধরি, সেটা আমি সিদ্ধ করিই করি; ব্রহ্মা বিষ্ণু, মহেশ্বর তিন জনে একত্র হোলেও আমারে নিবারণ কোতে পারে না। যখন আমি সঙ্কল্প কোরেছি তাড়াবো, তখন ওটাকে তাড়াবোই তাড়াবো! মায়া-দয়া আমার কিছুই নাই! কার প্রতি মায়া-দয়া?—কে ও? তোমাকে আমি দিয়েছি, ও এখন তোমারি; একটা দিন রেখে দাও। রাত্রি কত?—বোধ হয় বেশী। ছোঁড়াটা একাকী গাছতলায় বোসে আছে, আজ তুমি বিদায় হও, তারে বাড়ীর ভিতর এনে বুঝিয়ে পড়িয়ে আমি রাজী কোরে রাখবো। তার পর অন্যকথা।”

    আর আমার সেখানে লুকিয়ে থাকবার সাহস হলো না। গুরুঠাকুরাণী আগে গিয়ে যদি দেখেন, সেখানে আমি নাই, তা হলে বিপদ হবে! বাড়ীর ভিতর থেকে আমি বেরিয়ে যাচ্ছি, এটা যদি তিনি দেখতে পান, তবেই মনে কোরবেন, লুকিয়ে লুকিয়ে আমি তাঁদের গুপ্তপরামর্শ শ্রবণ কোরেছি। ভারী রাগ হবে : আজ রাত্রেই আমাকে মেরে ধোরে তাড়িয়ে দিবেন। সেটা ভাল নয়; একটা রাত্রি, একটা দিন, আবার একটা রাত্রি, তার পর এক বেলা, সময় নিতান্ত কম নয়; আজ রাত্রে যদি রক্ষা পাই, তা হোলে ঐ সময়ের মধ্যে অবসর বুঝে যে দিকে ইচ্ছা, সেই দিকেই আমি পালিয়ে যেতে পারবো, রাক্ষসীর কাছেও থাকতে হবে না, রাক্ষসের কবলেও পোড়তে হবে না। এই স্থির কোরে চুপি চুপি সেই গুপ্তস্থান থেকে বেরিয়ে অলক্ষিতে আমি সেই বকুলতলায় গিয়ে চুপটী কোরে বোসে থাকলেম। আকাশে উজ্জ্বল চন্দ্র, ধরাতলে দিব্য জ্যোৎস্না।

  • চতুর্থ কল্প : দালালের বাড়ী

    চতুর্থ কল্প : দালালের বাড়ী

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    চতুর্থ কল্প : দালালের বাড়ী

    আমি বকুলতলায়। বাড়ীর পশ্চিমদিকে বকুলগাছ। যাকে আমি বাড়ীর ভিতর দেখেছিলেম, তার চেহারা-বর্ণনে বোলে রেখেছি, বর্ণ-ঘনশ্যাম। ঠাকুরাণীর সহিত তার যখন কথোপকথন হয়, তখন শুনেছি, ঠাকুরাণী তাকে ঘনশ্যাম বোলে সম্বোধন কোরেছিলেন। আমার বর্ণনা নিরর্থক হয় নাই। লোকটার নাম ঘনশ্যাম। বর্ণের সঙ্গে নামের মিলটী বেশ আছে। যে দিকে আমি ছিলেম, সে দিক দিয়ে ঘনশ্যাম বাহির হয় নাই; বাড়ীর পূৰ্ব্বদিকে আর একটী দরজা ছিল, সেই দরজা দিয়েই বেরিয়ে গেল। ঠাকুরাণী আমার কাছে এলেন; এসেই বোল্লেন, “হরিদাস! রাত্রি অনেক হয়েছে, বাড়ীর ভিতর চল।” আমি যে এতক্ষণ কি কোরেছি, তা তিনি কিছুই জানতে পাল্লেন না।

    বাড়ীর ভিতর প্রবেশ কোল্লেম। মনে সুখ ছিল না, যৎসামান্য আহার কোল্লেম। গুরুঠাকুরাণী তাই দেখে কপট স্নেহে একবার জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কিছুই খেতে পাল্লে না, অসুখ হয়েছে কি?”—আমি উত্তর কোল্লেম, “তেমন অসুখ কিছুই না—অক্ষুধা।”

    কর্ত্তার মত্যুর পর অবধি রাত্রিকালে যে ঘরে আমি শয়ন করি, সেই ঘরেই শয়ন কোল্লেম। ঠাকুরাণী সে রাত্রে সেই ঘরের দরজায় চাবী দিয়ে রাখলেন। পাছে আমি পালাই, সেই জন্যই সাবধান। পালাতে আমি পারবো না, তা তিনি জানতেন। কেন না ঐ পাঠশালা ছাড়া আর কোথাও আমি যেতেম না, গ্রামের পথঘাট কিছুই চিনতেম না। রাত্রিকালে পালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল, সেটা তিনি ভালই জানতেন, তথাপি সন্দেহ; সেই সন্দেহেই চাবী দিলেন। আমি যেন নিরপরাধে সেই রাত্রে ঘরের ভিতর কয়েদী হয়ে থাকলেম।

    নিদ্রা হলো না। ভয়ে আর চিন্তায় সমস্ত রাত্রি জাগরণ কোল্লেম। ভয় কিসের? সেই বিকটাকার ঘনশ্যাম আমার মনিব হবে, বলদের মতন হাললাঙ্গলে জুড়ে দিয়ে, কোথায় যে নিয়ে যাবে, কতই যে যন্ত্রণা দিবে, সেই ভয়। চিন্তা কিসের?—কি প্রকারে পরিত্রাণ পাই, কি প্রকারে পলায়ন করি, কি প্রকারে সেই নরাকার রাক্ষসমূৰ্ত্তি আর দর্শন কোত্তে না হয়, সেই চিন্তা।

    চিন্তা আমাকে কোন উপায় বোলে দিতে পাল্লে না। দিনের বেলা পলায়ন করবো, এইরুপ সঙ্কল্প কোরেছিলেম, সে সম্বন্ধটাও সিদ্ধ হলো না। প্রভাতে গুরুপত্নী আমার ঘরের চাবী খুলে দিলেন, বিমর্ষবদনে আমি বাহির হোলেম, একটু সুবিধা দেখলেই ছুটে পালাবো, এইরূপে আশা কোত্তে লাগলেম, কিন্তু সুবিধা ঘোটে উঠলে না; ঠাকুরাণী সৰ্ব্বক্ষণ আমাকে চক্ষে চক্ষে আটক রাখতে লাগলেন : নিজে যখন কোন কার্য্যে ব্যস্ত থাকেন, তখন ছোট মেয়েটীকে আমার কাছে রেখে যান; মুহূর্ত্তের জন্যও আমি পালাবার সুবিধা পেলেম না।

    আমার গুরুকন্যার বয়স আট বৎসর, নাম অপরাজিতা। অপরাজিতা বেশ বুদ্ধিমতী; আমার প্রতি তার ভ্রাতৃতুল্য ভালবাসা হয়েছিল। আমিও সেটীকে ভগ্নীতুল্য ভালবাসতেম। সেই দিন মাতৃ-আদেশে অপরাজিতা যখন আমার কাছে এসে বোসলো, আমি তখন সভাবনায় অন্যমনস্ক ছিলেম, বদন বিষন্ন ছিল, তাই দেখে সে তখন আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “দাদা! আজ তুমি একটাও কথা কোচ্চো না, একটীবারও হাসচো না, মুখখানি ভারী কোরে রয়েচো, এমন হয়েছো কেন?”

    আমার চক্ষে জল এলো। মেয়েটার মুখের দিকে ভাল কোরে চাইতে না পেরে নতবদনে বোল্লেম, “রাত্রে একটা কুস্বপ্ন দেখেছি, তাতেই এমন বিমর্ষ দেখছো। আমার বড় দুভাবনা হয়েছে। স্বপ্ন দেখেছি, আমি যেন এ বাড়ীতে, আর জায়গা পাব না, কে যেন আমাকে ধোরে বেঁধে কোন দেশে নিয়ে যাবে, তোমারে আর দেখতে পাব না, তুমিও আমারে দেখতে পাবে না, সেই জন্যই দুর্ভাবনা।”

    অপরাজিতার দুটী চক্ষু, ছল ছল কোত্তে লাগলো। সত্য সত্য স্বপ্ন কি না, স্বপ্ন কখন সত্য হয় কি না, বালিকার সে জ্ঞান ছিল না, আমার দুখানি হাত ধোরে ভেউ ভেউ কোরে কাঁদতে লাগলো, চক্ষের জলে আমার হাতদুখানি ভাসিয়ে দিলে।

    গৃহিণী কোথায় ছিলেন, মেয়ের কান্না দেখে তাড়াতাড়ি ছুটে এসে, তার হাত ধোরে সেখান থেকে সোরিয়ে নিয়ে গেলেন, আমাকেও মিষ্ট মিষ্ট ভর্ৎসনা কোল্লেন। আমি চুপ কোরে থাকলেম। তদবধি তিনি আর আমাকে একবারও নজরছাড়া কোল্লেন না। দিনমান কেটে গেল, সূৰ্য্যদেব অস্ত গেলেন, সন্ধ্যার পর আহারাদি সমাপ্ত হলো, পূৰ্ব্ব-রাত্রের ন্যায় সে রাত্রেও তিনি আমাকে দ্বারে চাবী দিয়ে আটক রাখলেন। দ্বিতীয় প্রভাতে দ্বার মুক্ত হলো, আমি বাহির হোলেম। মন অত্যন্ত চঞ্চল। সেই দিন আমার সে আশ্রমবাসের শেষদিন আজ বৈকালে সেই লোক আসবে, এসেই আমাকে পোরে নিয়ে যাবে। ছোট ছোট ছেলেরা ছেলেধরার ভয়ে যেমন কাতর হয়, ঘনশ্যামের ভয়ে আমিও সেইরূপ কাতর হোলেম। সূৰ্য্য যতক্ষণ পূর্ব্বগগনে ছিলেন, ততক্ষণ পর্য্যন্ত একটু একটু আশা ছিল, সূর্য্য যখন মধ্যগগনে বিরাজ করেন, তখনও আমি নিতান্ত হতাশ হই নাই, সূৰ্য্য যখন অল্পে অল্পে পশ্চিমদিকে ঢোলতে লাগলেন, তখন আমার বক্ষঃস্থল গর গর কোরে কাঁপতে লাগলো। আর বিলম্ব নাই; অপরাহ্ন আগত এইবার আমাকে নিরাশা-সাগরে ডুবে যেতে হবে, সেই ভাবনাতেই আমি ম্রিয়মাণ হয়ে থাকলেম।

    বৈকালে মহাজনের মত পোষাক পোরে ঘনশ্যাম এসে দেখা দিলে। তাকে দেখেই আমার সমস্ত আশা-ভরসা উড়ে গেল! আমার গুরুপত্নী সেই লোকটাকে সঙ্গে কোরে আমার কাছে নিয়ে এলেন। আমি কাঁপতে লাগলেম। লোকটার চেহারা যে রকম, একবার চক্ষে দেখলেই ভয় হয়, পোষাক পোরে আরও ভয়ানক হয়েছে। দুর্জ্জনেরা দেখতেও যদি সুশ্রী হয়, তবু তাদের চক্ষু দেখলে নিরীহ লোকে অন্তরে অন্তরে ভয় পায়; আর এর সেই যমোপম মূর্ত্তি! ঘনশ্যামের চক্ষের দিকে আমি চক্ষু রাখতে পাল্লেম না, মাথা হেঁট কোরে থাকলেম।

    ঠাকুরাণী বল্লেন, “হরিদাস! এই ইনিই তোমার মনিব হোলেন। ইনি একজন বড়দরের মহাজন, ইনি তোমাকে বেশ যত্নে রাখবেন; সহজ সহজ কাজ দিবেন, যে কাজ তুমি জান, যে কাজ তুমি পারবে, সেই কাজেই ইনি তোমাকে নিযুক্ত রাখবেন। এর সঙ্গে তুমি যাও; কোন কষ্ট হবে না।”

    এই পর্য্যন্ত বোলে কপট স্নেহ জানিয়ে, বসনাঞ্চলে নয়নকোণ মার্জ্জন কোরে, ঠাকুরাণী আবার আমাকে বোল্লেন, “কি করি বাছা, সকল কথাই তো তোমাকে বোলেছি। এদেশে আমি থাকবো না, মেয়েটী নিয়ে কাশী যাব। তোমাকে বিদায় করবার ইচ্ছা ছিল না, নিতান্ত দায়ে পোড়েই বিদায় কোরে দিতে হলো। একটা কিছু কিনারা কোরে না দিলে অজানা জায়গায় কোথায় তুমি যাবে, তাই ভেবে এই ভদ্রলোকটীর হাতে সোঁপে দিলেম, যাতে তুমি ভাল থাক, যাতে তুমি সুখে থাক, তাই আমার ইচ্ছা; তাই তোমাকে ভাললোকের হাতেই সমর্পণ কোল্লেম। মধ্যে মধ্যে চিঠিপত্র লিখবো, তুমিও লিখবে, কোন প্রকার কষ্ট হোলে আমারে জানাবে, আমি তখন অন্য প্রকার বন্দোবস্ত কোরে দিব। এখন যাও। আহা! তোমাকে বিদায় দিতে আমার প্রাণ কেমন কোচ্চে!”

    ঘনশ্যামের স্বর অতি কর্কশ। সেই কর্কশ স্বরকে একটু মিষ্ট করবার চেষ্টা কোরে লম্বা লম্বা কথায় ঘনশ্যামও আমাকে অনেক রকম আশ্বাস দিলে। আমি কাঁদতে লাগলেম। গুরুপত্নী পুনঃপুনঃ ঘনশ্যামের মুখের দিকে চেয়ে মাথা নেড়ে নেড়ে ইসারা কোল্লেন, ঘনশ্যাম আমার একখানা হাত ধোল্লে। উঃ! ঠিক যেন বজ্ৰমষ্টি! বোধ হলো, আমার হাতখানি যেন ভেঙে গেল! এক হাতে গুরুপত্নীর চরণ ধারণ কোরে সেইখানে আমি শুয়ে পোড়লেম, কণ্ঠ শুষ্ক হয়ে এলো, শুষ্ককণ্ঠে রোদন কোত্তে লাগলেম। ঘনশ্যামের একবারও দয়া হলো না, গুরুপত্নীও দয়া কোল্লেন না। ঘনশ্যাম আমাকে টেনে হিঁচড়ে বাড়ী থেকে বাহির কোরে নিয়ে চোল্লো। আমার পরিত্রাহি চীৎকার, গুরুপত্নীর চক্ষে কপট অশ্রুবিন্দু অপরাজিতার বালিকাসুলভ কুন্দন, এই তিন একত্র, কিন্তু একত্র হলে কি হয়, ঠাকুরাণী আমাকে রাক্ষসের হস্তে সমর্পণ কোরেছেন, ইচ্ছাবশেই মায়া-দয়া বিসর্জ্জন দিয়েছেন, রাক্ষস আমাকে ছাড়বে কেন, হিড়হিড় কোরে টেনে নিয়ে চোল্লো।

    বাইরে একখানা গাড়ী ছিল, সেই গাড়ীতে ঘনশ্যাম আমাকে টেনে টেনে তুল্লে। বেলা তখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো, দিবাকর অস্তাচলে গমন করবার উপক্ৰম কোচ্ছিলেন, সেই সময় আমি আমার আশৈশব আশ্রয়স্থান থেকে জন্মশোধ বিদায় হোলেম; জন্মশোধ বিদায় কি না, ভগবান জানেন, আমি কিন্তু মনে কোল্লেম, জন্মশোধ! আমার নিজের কোন জিনিসপত্র ছিল না, জিনিসপত্রের মধ্যে আমি আর আমার পরিহিত বস্ত্রখানি। আমার দেহ আর আমার প্রাণকে লয়েই আমি। সম্বলের মধ্যে পুথি ক’খানি ছিল, গুরুপত্নী সেগুলি আমাকে দিলেন না। বেশী ভালবাসতেন কি না, বেশী স্নেহ কোত্তেন কি না, সেই জন্য সেইগুলি বিক্রয় কোরে স্নেহ ও ভালবাসার নিদর্শন দেখাবেন, সেইটীই তাঁর ইচ্ছা হয়েছিল।

    আমাকে গাড়ীতে তুলে যমোপম ঘনশ্যাম আমার বামদিকে এসে বোসলো। আমার আর নড়নচড়নের শক্তি থাকলো না। বড় বড় ঘোড়ারা আমাদের গাড়ীখানাকে পবনবেগে টেনে নিয়ে চোল্লো। খানিক দূরে গিয়েই সন্ধ্যা হলো। কোন দিকে যাচ্ছি, কতদুর যাচ্ছি, কিছুই আমি অনুভব কোত্তে পাল্লেম না। মন অত্যন্ত অস্থির হয়ে ছিল, কোন দিকেই ভ্রূক্ষেপ ছিল না। গাড়ী ক্রমাগতই চোলছে; কোথাও দাঁড়ায় না, কোথাও থামে না, ঘোড়াবদলও হয় না; পিপাসায় আমার ছাতি ফাটে, একবিন্দু জল কোথাও আশা কোত্তে পারি না, কণ্ঠ-তালু বিশুষ্ক। ভয়ের সময়, রোদনের সময়, নৈরাশ্যের সময় পিপাসা অধিক হয়, ক্ষুধা থাকে না, কিন্তু জলপিপাসায় দম বন্ধ হবার লক্ষণ দাঁড়ায়; গাড়ীর ভিতর আমারও সেই দশা।

    রাত্রি যখন প্রায় শেষ, গাছে গাছে পাখীরা কলরব কোচ্ছে, দূরে দূরে গঙ্গাস্নানের যাত্রীরা দুর্গা দুর্গা নাম স্মরণ কোচ্ছে, যবনপল্লীতে কুক্কুটধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তাতেই আমি অনুমান কোল্লেম, ঊষাকাল। মনে মনে আমিও দুর্গানাম স্মরণ কোল্লেম। বৃহৎ একখানা ভগ্নবাড়ীর সম্মুখে গিয়ে গাড়ীখানা দাঁড়ালো। ঘনশ্যাম আমাকে গাড়ী থেকে নামিয়ে সেই বাড়ীর ভিতর নিয়ে গেল। পথে পথেই রাত্রিকাল কেটে গিয়েছে, গাড়ীর-ঘোড়ারা কত স্থানে কত বেগে পথ অতিক্রম কোরেছে, কোন দিক দিয়ে এসেছি, কোথায় এসেছি, কিছুই ঠিক কোত্তে পাল্লেম না; যে বাড়ীতে প্রবেশ কোল্লেম, সে বাড়ীর কোন দিকে কি, ঊষার আঁধারে, চক্ষের আঁধারে তাও আমি দেখতে পেলেম না।

    একটু পরেই প্রভাত হলো। পূর্ব্বদিন বেলা এক প্রহরের সময় যৎকিঞ্চিৎ আহার কোরেছিলেম, তার পর সমস্ত দিন সমস্ত রাত্রি উপবাস, একবিন্দু জল পর্য্যন্ত না, তার উপর মনের চাঞ্চল্য, কাজে কাজে চক্ষে অন্ধকার দেখতে লাগলেম। ঘনশ্যাম একটা ঘরে আমাকে রেখে দরজায় শিকল দিয়ে বোধ হয় অন্য ঘরে চোলে গেল। ঘরে আমি একাকী থাকলেম। সূর্য্যোদয় হলো। যে ঘরে আমি ছিলেম, সে ঘরে পাঁচটা জানালা; একটা জানালাতেও কপাট ছিল না, ঘরের ভিতর রৌদ্র এলো। তখন আমি ঘরের আসবাবপত্রের প্রতি চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলেম। গৃহশয্যা দেখবার প্রবৃত্তি ছিল না, যা আমি দেখছিলেম, যা দেখবার ইচ্ছা হেচ্ছিলো, সে বস্তু সে ঘরে আছে কি না, সেই দিকেই আমার লক্ষ্য। ধন্য জগদীশ! ধন্য তাঁর দয়া! চারিদিকে চক্ষু ঘুরিয়ে শেষকালে দেখতে পেলেম, ঘরের এক কোণে একটা জলের কলসীর নিকটে একটা মাটীর ভাঁড়। জলের কলসীতে ঢাকা ছিল না, গিয়ে দেখলেম, তাতে প্রায় একসের আন্দাজ জল ছিল, সেই জলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মশক-মক্ষিকারা সাঁতার দিচ্ছিলো। জল অপেয়; তবু আমার আহ্লাদ হলো; মাটীর ভাঁড়ে সেই কীটপূর্ণ জল পরিপূর্ণ কোরে দুই নিশ্বাসে দুই চুমকে সবটুকু আমি পান কোল্লেম। বুক অনেকটা ঠাণ্ডা হলো; আমিও একটু ঠাণ্ডা হয়ে নিশ্বাস ফেল্লেম।

    এইবার দেখলেম, ঘরের খিলানে খিলানে বড় বড় মাকড়সার জাল, কোণে কোণে কালো কালো ঝুল, দেয়ালে দেয়ালে ভূষাকালি, ঘরের মধ্যস্থলে একখানা পায়াভাঙা তক্তপোষ, তার উপর একখানা খেজুরপাতার চেটাই, একধারে একটা শ্মশানের বালিশ, এক কোণে একটা প্রকাণ্ড ডাবা হুঁকা, তিন ধারে আমের আটার তালি দেওয়া, কোলকেট্টার তিন ধারে ফাটা, পার্শ্বে একটা কাণাভাঙা হাড়ী, তার গর্ভে আধ হাঁড়ি ছাই। এই পর্য্যন্ত আসবাব! আর কিছুই না!

    আমি বোল্লেম, সুপারিসটা খুব পাকা-রকম বটে! গুরুপত্নী বলেছেন, ঘনশ্যাম একজন মহাজন! খুব ভদ্রলোক! পোষাকেও দেখা গিয়াছে বড় মহাজন! ব্যবহারেও দেখা গিয়াছে খুব ভদ্রলোক! এখন আমার ভাগ্যে কি হয়, সেইটুকু জানতেই বাকী। বসে আছি, একবার একবার আসবাবপত্র নিরীক্ষণ কোচ্ছি, এমন সময় দরজার শিকল খুলে একটা বুড়ী সেই ঘরে প্রবেশ কোল্লে। ঘরের চারিদিকে চেয়ে আমাকে দেখতে পেয়েই বড় কম্পিত কণ্ঠে একটু থেমে থেমে বোল্লে, “হ্যাঁ গা ছেলেটী, তোমার নামটী কি ভাল, হাঁ, ঠিক ঠিক! হরি হরি;—হ্যাঁ গা হরি! তুমি কি আমাদের বাবুর বাড়ী ভাত খাও? বাবু আমাদের ব্রাহ্মণ। বাবু জিজ্ঞাসা কোরে পাঠালেন, ব্রাহ্মণের ভাত তুমি খাও কি না?”

    প্রশ্ন শুনেই আমি মনে কোল্লেম, অদ্ভুত সমস্যা। চেহারা যে রকম, ব্যবহার যে রকম, বাক্য যে রকম, তাতে কোরে বোধ হয়, আগাগোড়া সমস্তই কৃত্রিম। বুড়ী বল্লে, “বাবু আমাদের ব্রাহ্মণ।” বাবু যে দিন সপ্তগ্রামে গিয়েছিলেন, সে দিন খোলা গা আমার চক্ষে পোড়েছিল; ব্রাহ্মণের লক্ষণ ত কিছুই ছিল না, নিদর্শন একগাছি যজ্ঞসূত্র, তা পর্য্যন্ত ছিল না, এখন এখানে এসে ব্রাহ্মণ সেজেছে! ব্যাপার বড় শক্ত! ভেবে চিন্তে আমি উত্তর কোল্লেম, “আমার বড় অসুখ, কিছুই আহার করবার ইচ্ছা নাই, তবে যদি এখানকার কোন দোকানে কিছু মিষ্টান্ন পাওয়া যায়, তা হোলে—”

    আমার কথা সমাপ্ত হোতে না হোতেই বুড়ী বোলে উঠলো, “মিষ্টান্ন কি বাবা! মিষ্টান্নের মধ্যে মুড়ি পাওয়া যায়, চিঁড়ে পাওয়া যায়, ঘোল পাওয়া যায়, আর—আর—আর—”

    বোলেছি বটে বড় অসুখ, ক্ষুধায় কিন্তু পৃথিবী অন্ধকার দেখছি। কি করি, বুড়ীকে বোল্লেম, “ঐ রকম মিষ্টান্নই পেটের অসুখে বড় ভাল। চিঁড়ে আর ঘোল ভাল, ঐ দরকম মিষ্টান্ন হোলেই ঠিক হবে।”

    আমার উত্তর শ্রবণ কোরে বুড়ী আপনা আপনি কি বোকতে বোকতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। খানিক পরেই আমার ভাগ্যে ঘোল-চিঁড়ে হাজির।

    প্রাণধারণের অনুরোধে যৎসামান্য ঘোল-চিঁড়ে আমি ভক্ষণ কোল্লেম, কিন্তু চিঁড়েগুলি সহজে আমার উদরস্থ হলো কি না, বোলতে পারি না। কারণ, চিঁড়েগুলির আকার কিছু বৃহৎ, বর্ণও আরক, গন্ধও বিকৃত! তাদৃশ বস্তু মানুষে ভক্ষণ করে, এমন বিশ্বাস আমার ছিল না, তথাপি যথাশক্তি চর্ব্বণে এক ছটাক আন্দাজ রক্তচিপিটক আমি ভক্ষণ কোরেছিলেম। পেটে থাকলে না; বুড়ী বিদায় হবার পরেই বমি হয়ে গেল। কপাটশূন্য জানালায় মুখ বাড়িয়ে বমনকার্য্য সম্পাদন কোল্লেম, গৃহমধ্যে কোন চিহ্ন থাকলো না, আমার উদরেও থাকলো না; সুতরাং কেহই কিছু দেখতে পেলে না।

    বেলা প্রায় দেড় প্রহর। নূতন রকম পোষাক পোরে, মুখে একটা চুরুট লাগিয়ে, ঘনশ্যাম এসে দর্শন দিলে। আমার মুখের কাছে চুরুটের ধোঁয়া উড়িয়ে লোকটা গম্ভীর আওয়াজে বোল্লে, “কেমন, প্রস্তুত আছ? আহার হয়েছে? আপিস করবার সময় হয়েছে। এসো আমার সঙ্গে।”

    আফিস কি, জন্মাবধি আমি কখনো শুনি নাই। কি রকমে আফিস করে, তাও আমি জানতেম না। কিন্তু অপ্রস্তুত কেন হব, কৌতহলে কৌতুকী হয়ে তৎক্ষণাৎ আমি উঠে দাঁড়ালেম; অগ্রে অগ্রে ঘনশ্যাম, পশ্চাতে আমি, দুজনে একসঙ্গে সে ঘর থেকে বেরুলেম। চতুর্দ্দিকেই আমার চক্ষু বিঘুর্ণিত।

    তিনখানা ঘরের পরে আর একখানা ঘর। ঘনশ্যাম সেই ঘরে আমাকে নিয়ে গেল। ঘরটা কিছু জমকালো। মেজেতে ক্যাম্বিস মোড়া; মাঝখানে একটা বড় টেবিল; ধারে ধারে ৩/৪ খানা ছোট ছোট চৌকী। টেবিলের উপর রাশীকৃত চোতা কাগজ, ধারে ধারে সেই রকম কাগজে নানা বর্ণের নানা প্রকার জিনিস-ছোলা, মাষকলাই, প্রেক, তেঁতুলবীচি, সাগুদানা, কুল, সাবান, মসিনা, তেজপত্র, কাবাবচিনি ইত্যাদি।

    টেবিলের পার্শ্বে একখানা সাদা রঙের গড়াপাতা ক্ষুদ্র বিছানা। সেই বিছানার উপর মুন্সীধরণের একজন বৃদ্ধ খাতাপত্র কোলে কোরে চক্ষু বুজে বসে আছে, দুকাণে দুটো সরকাঠীর কলম গোঁজা। লোকটীর চেহারা মন্দ নয়। বর্ণ অন্ধ গৌর, গঠন দীর্ঘও নয়, খর্ব্বও নয়, মোটাও নয়, রোগাও নয়, দিব্য পাকাগোঁফ, মাথার চুলগুলিও শ্বেতবর্ণ, পশ্চাদ্দিকে ঘাড়ের নীচে খোঁপাবাঁধা, বয়স অনুমান ৬০/৬৫ বৎসর।

    আমি, ঘনশ্যাম আর সেই মুন্সী, এই তিনজন মাত্র তথায় উপস্থিত। ঘনশ্যাম আমাকে বোসতে বোল্লে, টেবিলের দক্ষিণ ধারে একখানি চৌকীর উপর আমি বোসলেম; আমার গা ঘেঁসে আর একখানা চৌকীতে ঘনশ্যাম নিজেও বোসলে।

    ঘনশ্যাম আমাকে জিজ্ঞাসা কোলে, “আপিসের কাজকর্ম্ম তুমি জানো?” —আমি উত্তর কোল্লেম, “আফিস কাকে বলে, তাই জানি না। আফিসের কাজকৰ্ম্ম কিরপে জানবো?” ঘনশ্যাম পুনরায় বোল্লে, “আপিস ইংরাজী কথা, যে বাড়ীতে অথবা যে ঘরে বিষয়কার্য্যের লেখাপড়া হয়, তারই নাম আপিস।”

    আমি কিছু, উত্তর দিব মনে কোচ্ছিলেম, এমন সময় সেই ঘরে ৫/৭ জন লোক প্রবেশ কোল্লে। সকলেরই চাপকান গায়, বড় বড় পাগড়ী মাথায়। তাদের মধ্যে দুজনের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ভুঁড়ী। সচরাচর সাধারণ লোকে যাকে ঢাকাই জ্বালা বলে, সেই রকমের ভুঁড়ী, মানুষের তত বড় ভুঁড়ী হয়, আমি আর কখনো দেখি নাই। ভুঁড়ীর ভারে কাতর, কাজেই আর তারা বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পাল্লে না, ধপ ধপ কোরে দুজনে দুখানা চৌকীর উপর বোসে পোড়লে। চৌকী দুখানা মড় মড় শব্দে কেঁপে উঠলো। বাকী লোকেরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘনশ্যামের টেবিলের উপর হাত দিয়ে দিয়ে এক এক রকম জিনিস পরীক্ষা কোত্তে আরম্ভ কোল্লে। ভাবে বুঝলেম সেখানে খরিদবিক্ৰী দুই-ই চলে। কেহ কেহ খরিদ করে, কেহ কেহ বিক্রয় করে। সকলেই ব্যাপারী। ভুঁড়ীওয়ালারা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে গায়ের চাদরের বাতাস খেতে খেতে বার দুই তিন বড় বড় হাই তুল্লে। ঘনশ্যামের দিকে চেয়ে একজন বোল্লে, “ভাই সায়েব, তুমি সেদিন আমার কাছে যে একখানা ইস্তাহার পাঠিয়েছিলে, সেখানা ভারী চমৎকার! তেমন ইস্তাহার ইতিপূর্ব্বে আমার নজরে আর একখানাও পড়ে নাই। সেই কারবারে আমার বড় ইচ্ছা।”—তিনবার মাথা নেড়ে নেড়ে হুঁ হুঁ দিয়ে ঘনশ্যাম একটু হাস্য কোল্লে। তার পর অনেক রকম কথা হলো, জিনিসপত্রের দর-দস্তুর ঠিক করা হলো, ভুঁড়ীওয়ালারা ছাড়া অন্য লোকেরা বিদায় হবার উপক্রম কোল্লে, এমন সময় আর একজন লোক এলো। সে লোকের চাপকান পাগড়ী ছিল না, বাঙ্গালীর মত সাদাসিদা কাপড় পরা, দেখতেও বেশ সুশ্রী। বয়স অনুমান ৫০/৫২ বৎসর। ঘনশ্যাম তাকে চিনতো না, তথাপি আদর কোরে বসালে। লোকটী বোল্লে, “যে কারবারে পাঁচবৎসরে লক্ষপতি হওয়া যায়, সেই কারবারে আমি অগ্রিম ৫০৲ টাকা জমা দিতে এসেছি, কারবারের নিয়মাবলী একবার দেখতে চাই।”

    মহাজনের পার্শ্বে বৃদ্ধ মুন্সীজী বোসে বোসে ঝিমুচ্ছিলেন, মহাজন তার দিকে ফিরে একবার একটা ঘণ্টা বাজালেন, মুন্সীর চমক ভাঙলো। কারবারের ভাষায় মহাজন ঘনশ্যাম সেই মুন্সীকে কি উপদেশ দিলে, মুন্সী তখন বড় একখানা খাতা হাতে কোরে সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন। দুই কাণে দুটী কলম। পঞ্চাশ টাকা জমা হবে, নিয়মাবলী জানাতে হবে, ঘনশ্যামের বড়ই আহ্লাদ, মুন্সীজী বড়ই ব্যস্ত। আগত ব্যাপারীরাও আহ্লাদে কৌতুকে একবার ঘনশ্যামের মুখের দিকে, একবার সেই নূতন লোকটীর মুখের দিকে সতৃষ্ণনয়নে চাইতে লাগলেন।

    এইবার নিয়মাবলীর ব্যাখ্যা। ঘনশ্যাম নিজেই ব্যাখ্যাকৰ্ত্তা। গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে তিনি বোল্লেন, “লক্ষপতি হওয়া ছোট কথা। দশ টাকা জমা দিলেই পাঁচ বৎসরে আপনি লক্ষপতি হোতে পারেন। আচ্ছা এনেছেন পঞ্চাশ টাকা, দিয়ে যান পাঁচগুণ; পাঁচ দশে পঞ্চাশ; পাঁচ বৎসরে আপনি পাঁচ লক্ষ টাকা পাবেন। যদি কিছু বেশী হয়, সেটা আমার এই মুন্সীজীকে দস্তুরী বোলে বকসীস দিয়ে যাবেন। জমা দিন। লেখ হে মুন্সী!”

    সকলেরই চক্ষু তখন মুন্সীজীর মুখের দিকে নিক্ষিপ্ত হলো। কাণের একটী কলম খুলে নিয়ে মুন্সীমহাশয় সেই আগন্তুক জমাদাতাকে নম্রস্বরে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “আপনার নাম কি মহাশয়?”—জমাদাতা বোল্লেন, “হরেরাম শুকুল, নিবাস পাটনা, খয়রাতগঞ্জ।”

    মুন্সী সেই নাম-ধাম লিখে নিলেন। টাকা হাতে না পেয়ে অঙ্কপাত করা হয় না, সুতরাং অঙ্কপাত কোল্লেন না, হাঁ কোরে সেই লোকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। লোক বোল্লেন, “নিয়মের কথাটা অগ্রে শোনা যাক, তার পর বন্দোবস্ত।”

    অট্টহাস্য কোরে ঘনশ্যাম বোল্লেন, “ও হো হো! ওটা আমার ভুল হোচ্ছিলো বটে। নিয়ম হোচ্ছে এই অগ্রিম দশ টাকা জমা দিলে পাঁচসের তেঁতুলবীচি প্রদান করা হয়। তেঁতুলবীচিকে বাঙলাদেশে কাঁইবীচি বলে, এ কথাও বোধহয় আপনি জানেন। সেই কাঁইবীচিগুলি বর্ষাকালে একটা জমীতে ছড়িয়ে দিতে হয়। সকল বীচিতেই গাছ হয়, একটা বীচিও নষ্ট হয় না। পাঁচ বৎসরে সেই সব গাছ বড় হয়, ফল ধরে। মনে করুন, পাঁচসের কাঁইবীচিতে দশ হাজার গাছের কম জমে না। এক একটা গাছে বৎসরে যদি এক টাকার তেঁতুল বিক্রী হয়, তা হোলে দশহাজার টাকা। আমি খুব কম কোরেই হিসাব ধোল্লেম; বাস্তবিক বিশ হাজার টাকা। আর সেই গাছগুলি যদি কেটে কেটে কয়লা করা হয়, তেঁতুলকাঠের কয়লার দাম খুব বেশী, দশ হাজার গাছের কয়লা আশী হাজার টাকায় বিক্রী হবে। তবেই ধরুন, লক্ষ টাকা।”

    নিয়মাবলী শ্রবণ কোরে হরেরাম শুকুলের চক্ষ স্থির! জমা দিবার জন্য টাকা বাহির কোচ্ছিলেন, সেগুলি সামলে রেখে, ঘনশ্যামকে সেলাম দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। একটীও বাক্যব্যয় না কোরে মস্ মস্ শব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। মুন্সীর হাতের কলমটা খোসে পোড়লো, সকলের মুখ শুকিয়ে গেল, দর্শক লোকেরা অবাক! আমি ত সৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক চমকিত হয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরালেম। ভয়ের সঙ্গে ঘৃণা এসে আমাকে নিতান্তই অবশ-অস্থির কোরে ফেল্লে।

    যারা এসেছিলো, কাজকর্ম্ম দেখে তারা চোলে গেল, জমা না পেয়ে হতাশ হয়ে শুষ্কবদনে মুন্সী গিয়ে আপন আসনে উপবেশন কোল্লেন, ঘনশ্যাম গম্ভীরবদনে বোসে রইলেন। আফিসের কাজকর্ম্ম তখনকার মত সমাধা হলো, আমি কেবল দেখলেম আর শুনলেম, আমাকে আর কোন কাজ স্বহস্তে কোত্তে হলো না।

    একটু পরে ঘনশ্যাম উঠে গেলেন। মুন্সীর কাছে বোসে বোসে খানিকক্ষণ আমি তাঁর ঘুমন্ত চক্ষু দর্শন কোল্লেম, তার পর আমিও সে ঘর থেকে বেরুলেম। বাড়ীখানা খুব বড়, কিন্তু অনেক দিনের জীর্ণ। বাহিরদিকে বারান্দা ছিল না, পূর্ব্বকালে বোধ হয়, সে প্রকার পদ্ধতিও ছিল না, ছোট ছোট জানালা রাখলেই বাড়ী মানাতো, সে রকমের বাড়ী। আমার মনের ভিতর যা হোচ্ছিলো, অট্টালিকা বর্ণনা করা তার কাছে ছোট কথা। বাড়ীতে অনেক ঘর : একতালা, দোতালা, তেতালা। সকল ঘরেই লোকজন আছে কি না, সেটা আমি প্রথমে জানতে পাল্লেম না, জানবার ইচ্ছাও হলো না। আমার ইচ্ছা কেবল পলায়ন। দোতালার একটা ঘরের জানালা দিয়ে দেখলেম, বাহিরে রাস্তার দিকে ফটক। সেই ফটকে একজন দরোয়ান বোসে দুই হাতে গাঁজা টিপছে আর হিন্দুস্থানী সুরে গান গাচ্ছে। ফটকে দুখানা বৃহৎ বৃহৎ কপাট, সেই কপাটে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড তিনটে তালায় চাবী বন্ধ। জানা হলো আফিসবাড়ী, কিন্তু আফিসবাড়ীর ফটকে দিনের বেলা চাবী বন্ধ থাকে কেন, সেটা আমি বুঝতে পাল্লেম না। ঘর অসংখ্য; কোন দিকের কোন ঘরে কি, দেখতে পেলেম না, ভাবতে ভাবতে উপর থেকে নীচে নেমে এলেম। সকল ঘরেই মানুষ আছে, গরু আছে, ছাগল আছে, ভেড়া আছে। অনেক ঘরে কাজকর্ম্মও হোচ্ছে; ঘর প্রায় খালি নাই। এক জায়গায় দেখি, কামারেরা বড় বড় জাঁতায় লৌহ দগ্ধ কোচ্ছে, বড় বড় হাতুড়ী দিয়ে লোহা পিটছে, অনেক দূর পর্য্যন্ত আগুন ঠিকরে ঠিকরে যাচ্ছে, মিস্ত্রীরা নানারকম গড়ন প্রস্তুত কোচ্ছে। সকলেই ঘর্ম্মাক্ত-কলেবর। আর এক জায়গায় দেখি, করাতী মিস্ত্রীরা বড় বড় বাহাদুরীকাঠ চিরে চিরে জমা কোরে রাখছে, র‍্যাঁদা-বাটালীর কাৰ্য্যও হোচ্ছে, করাতীরা এক মুহূর্ত্তও বিশ্রাম পাচ্ছে না। আর এক জায়গায় স্তুপাকার ধোঁয়া উঠছে, পাঁচ সাতজন লোক সেইখানে হৈ হাই কোরে গোলমাল কোচ্চে; বোধ হলো, কি যেন পোড়াচ্ছে। আর এক জায়গায় ভেড়া-ভেড়ী জবাই হোচ্ছে, রক্তের ঢেউ খেলাচ্ছে, বড় বড় ছোরা-হাতে দাড়ীওয়ালা লোকেরা চতুর্দ্দিকে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর খানিক এগিয়ে গিয়ে দেখলেম, উচ্চ উচ্চ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা মস্ত একটা পুষ্করিণী, জল সবজবৰ্ণ, ধারে ধারে তক্তার মাচান, ধোপারা সেই সকল তক্তার পাটে কাপড় কাচ্ছে। লোক অনেক! সকল লোকই নানা কাজে ব্যস্ত। কোন দিকেই আমি পালাবার পথ পেলেম না। অত বড় বাড়ীতে একটামাত্র ফটক, অন্য কোনদিকে আর দরজা নাই, এটাও আ-রোধ হলো। আবার উপরে উঠে গেলেম।

    যে ঘরে মুন্সীজী, যে ঘরটার নাম আফিসঘর, সেই ঘরে প্রবেশ কোল্লেম। মুন্সী তখন খাতাপত্র বন্ধ, কাণেও কলম নাই। তিনি তখন কাঁইবীচির ঝুড়ীগুলো সাজিয়ে সাজিয়ে একধার থেকে আর একধারে নিয়ে গিয়ে রাখছেন, আর অনবরত ঘামছেন। বৃদ্ধ লোকের উপর অত বড় শক্ত কাজের ভার, সেটাও আমি ভয়ানক নিষ্ঠুরতা মনে কোল্লেম। আমি প্রবেশ করবামাত্র মুন্সীজী আপন হাতের কাজ পরিত্যাগ কোরে হাঁপাতে হাঁপাতে একখানা চৌকীর উপর বোসে পোড়লেন। পূর্ব্বে আমি ঘরের উপরদিকে চেয়ে দেখি নাই, কড়িকাঠে খুব লম্বা একখানা টানাপাখা ঝুলছিলো, দেয়ালের গায়ে দড়ী বাঁধা ছিল। মুন্সী সেই দড়ীগাছটা খুলে নিয়ে আপন হতেই পাঙ্ক্ষাওয়ালার কাজ কোত্তে লাগলেন, আমাকে নিকটে বোসতে বোল্লেন। আমিও সেই পাখার নীচে বোসলেম। পাখার বাতাসে শরীর একটু জুড়ুলো। কথায় কথায় মুন্সীর সঙ্গে আমার বেশ আলাপ হলো। আমার জীবনকাহিনীর গোটাকতক কথা শুনেই তিনি এক দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ কোল্লেন। কি যে তিনি বুঝলেন, কি যে তাঁর মনে হলো, প্রথমে আমি সেটা অনুভব কোত্তে পাল্লেম না, তিনি কিন্তু আমার দিকে চেয়ে চেয়ে কাতরভাব জানাতে লাগলেন।

    কথায় কথা বাড়ে। ইচ্ছা কোরেই আমি কথা বাড়ালেম। ঘনশ্যামের পরিচয় জিজ্ঞাসা কোল্লেম। মুন্সীজী দিব্য সরলপ্রকৃতি, কোন বিষয়ে কোন কথায় তাঁর একটু কপটতা আমি ধোত্তে পাল্লেম না। পূর্ব্বে তিনি ঘনশ্যামের মুখে আমার একটু পরিচয় পেয়েছিলেন, নামটীও শুনেছিলেন, সেই সুত্রে আমার নাম ধোরেই সম্ভাষণ কোত্তে লাগলেন। দ্বিতীয়বার নিশ্বাসত্যাগ কোরে তিনি বোল্লেন, “হরিদাস! তুমি এখানে কেন এসেছ? এ জায়গা ভাল নয়, এখানকার বাতাস পর্য্যন্ত পাপরক্তে মাখা। আমি বন্ধ হয়েছি, আমার উপর ঘনশ্যামের অধিক প্রভুত্ব চলে। এখান থেকে যদি আমি চোলে যাই, যমের বাড়ী গেলে ঘনশ্যামের হাত থেকে পরিত্রাণ পাব না, ঘনশ্যামের সঙ্গে আমার জীবনান্ত সম্বন্ধ; সেই জন্যই আমি আছি। তুমি কেন এ নরককুণ্ডে প্রবেশ কোরেছ?”

    সত্য সত্য উত্তর দিয়ে পুনর্ব্বার আমি ঘনশ্যামের পরিচয় জিজ্ঞাসা কোল্লেম। শুনলেম, জাতিতে ঘনশ্যাম চাষা-গয়লা, ঘনশ্যাম বিশ্বাস নামে পরিচয়, পেশা দালালী। সকল কাজের দালালী করাই ঘনশ্যামের কার্য্য। বাড়ীতে তিনি সৰ্ব্বদা আসেন না, সকল দিন আসেনও না, সাত দিন অন্তর, দশ দিন অন্তর, কখনো বা একমাস অন্তর একবার আসেন, লোকজনের উপর জলুম করেন, মনের মতন ব্যাপারী পেলে দস্তুরমত ব্যাপারও করেন। কাঁইবীচির কারবারেই তাঁর বেশী ঝোঁক।

    আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, দিনের বেলা ফটকে চাবী দেওয়া কেন? মুন্সী বোল্লেন, “তিনি বেরিয়ে গিয়েছেন; বেরিয়ে গেলেই সদরফটকে চাবী পড়ে। এ বাড়ীতে যে সকল লোক থাকে, সকলকেই তিনি কেনা গোলাম মনে করেন। সকলের কাজের উপার্জ্জন তিনি নিজেই গ্রাস কোত্তে চান। তুমি এখানে এসেছ, বাহির হোতে না পার, দরোয়ানকে সেইরুপ হুকুম দিয়ে গিয়েছেন; আমাকেও বোলে গিয়েছেন, ‘ছেলেটাকে ছেড়ো না।’ ভাবভক্তি আমি কিছুই বুঝতে পারি নাই, তোমাকে গোলাম কোরে রাখাই বোধ হয় তাঁর মতলব। যা হোক, তুমি ভয় পেয়ো না। যাতে তুমি নিরাপদে এস্থান থেকে প্রস্থান কোত্তে পার, আমি তার উপায় কোরে দিব। আমি ব্রাহ্মণ, আপাততঃ পাঁচ সাত দিন তুমি এইখানে থাকো। আমি স্বয়ং রন্ধন কোরে ভোজন করি, আমার কাছেই তুমি আহার কোরবে, আমার ঘরেই শয়ন কোরবে। কষ্ট যাতে না হয়, সাধ্যমতে আমি সেই রকম ব্যবস্থা কোরবো। তোমাকে নূতন এনে রেখে গিয়েছেন, বোধ হয়, এবার আর তিনি বেশী দিন বাইরে বাইরে থাকবেন না, শীঘ্রই ফিরে আসবেন। তোমার কিরূপ ব্যবস্থা করেন, সেইটী জেনে শুনে যাহা কর্ত্তব্য আমি অবধারণ কোরবো।”

    আমি একটু আশ্বস্ত হোলেম। ব্রাহ্মণ আমার মুক্তির উপায় কোরে দিবেন, এইটকু মাত্র আশ্বাস। মনের ভয় মনেই থাকলো, মনের ঘৃণা মনেই চাপ দিয়ে রাখলেম, মুন্সীর কাছেও সে কথা প্রকাশ কোল্লেম না।

    সন্ধ্যা হয়ে গেল। যে যে ঘরে মানুষ থাকে, সেই সব ঘরে এক একটা প্রদীপ জ্বালা হলো। লোকেরা সব নানা প্রকার গোলমাল কোত্তে লাগলো। আমার মন সৰ্ব্বদাই চঞ্চল, কোন দিকে আমি মন দিতে পাল্লেম না। আফিসঘরের আশে পাশে যে সকল ঘর, একে একে সেই সব ঘরে আমি উঁকি মেরে দেখতে লাগলেম। যে ঘরে আলো, সে ঘরে দুই একজন মানুষ, যে ঘর অন্ধকার, সে ঘর খালি। আরশোলা, মাকড়সা, ছুঁচো আর ইঁদুরেরা সেই ঘরের বাসিন্দা; ঘরগুলিও দুর্গন্ধে পরিপূর্ণ, সমস্তই দুর্গন্ধ। পাপের পরাক্রম যেখানে অধিক, সেখানে শান্তির ছায়া পড়ে না, এই কারণেই আমার মনে তত ভয় ও তত ঘৃণা। রাত্রি চারি দণ্ডের পর মুন্সীর ঘরে ফিরে গেলেম, এক প্রহরের মধ্যেই তাঁর রন্ধনকার্য্য শেষ হলো। আমার জাতিজন্ম আমার জানা ছিল না, উভয়ে স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র বোসে আহার কোল্লেম। শেষকালে সেই বুড়ী এসে মুন্সীর পাতে প্রসাদ পেলে, উচ্ছিষ্ট স্থানগুলি পরিষ্কার কোরে দিয়ে গেল, স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র শয্যায় মুন্সীর ঘরেই আমরা শয়ন কোল্লেম।

    মনে আমার আর এক ভাবের উদয়। মনে মনে না রেখে চুপি চুপি মুন্সীজীকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আচ্ছা মহাশয়! আপনি যে বোল্লেন, ঘনশ্যামবাবু সৰ্ব্বদা এখানে থাকেন না, কত দিন অন্তর এক একবার আসেন? সে সব দিন তবে থাকেন কোথায়?”

    মুন্সী উত্তর কোল্লেন, “কিছুই ঠিক নাই, কোথায় যে কখন থাকেন, কোন কার্য্যে যে কখন ব্যস্ত, কেহই সে কথা বোলতে পারে না। তবে আমি কেবল এইটুকু জানি, হুগলীজেলার সপ্তগ্রামের কাছে কি একখানা ক্ষুদ্র গ্রাম আছে, সেইখানে একখানা আড়ত আছে, সেইখানেই মধ্যে মধ্যে আড্ডা হয়। কুলিধরা কাজ একটা ভাল ব্যবসা, যাদের কাজ, তারাই বলে ভাল। এই ঘনশ্যামবাবু সেইখান থেকেই ছেলেধরা ব্যবসাটা চালান; ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে ধোরে নদীয়াজেলায় আর অন্য অন্য জায়গায়, যেখানে নীলকুঠী আছে, সেই সব জায়গায় চালান দেন। পাপের কৰ্ম্ম কি না, এক এক সময় এমনি ঘটে, ঘনশ্যামের আহার পর্য্যন্ত জোটে না; সে সময় তিনি বড় বড় কুঠীয়াল লোকের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করেন; মুষ্টিভিক্ষা নয়, মোটা মোটা সাহায্য ভিক্ষা। কোথাও ফল ফলে, কোথাও অর্দ্ধ ফলন; কেবল কুঠীয়ালের কথাই বা কেন বলি, রকমারী দাতালোকের শরণাপন্ন হওয়াও ঘনশ্যামের অভ্যাস। সেই প্রকারের দিন নিকটবর্ত্তী হয়ে এসেছে, আমি তার সন্ধান জানতে পেরেছি। আর সেই যে হরেরাম শুকুলটী এসেছিলেন, সত্য তিনি হরেরাম শুকুল নন; আমি তাঁকে চিনি। এখন সে কথা আমি তোমাকে বোলবো না; এখন তোমাকে এখান থেকে মুক্ত করাই আমার কাজ। এর পর যদি কখনো তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়, তখন তুমি আমার মুখে ঘনশ্যামচরিত সবিশেষ শুনতে পাবে। আমার নাম গয়ারাম মিশ্র, আমার পিতামহ নবাব-সরকারে চাকরী কোত্তেন, তাঁর পদবী ছিল মুন্সী। সেই জন্য এখনও আমরা পুরুষানুক্রমে মুন্সী। আমার নিবাস নবদ্বীপ। আর দেখ হরিদাস! আমি যে এখানে থাকি, ঘনশ্যামের চাকরী করি না, কাজকর্ম্ম করি, বেতন গ্রহণ করি না, বরং ঘনশ্যাম আমার কাছে মধ্যে মধ্যে বিশ পঞ্চাশ টাকা হাতকর্জ্জ বোলে গ্রহণ করেন, শেষে উবুড়হস্ত হন না, তবু আমি দিই। কেন দিই, সে কথাও এখন ভাঙবো না। আমার পিতার কাছে ঘনশ্যামের দস্তখতী পঞ্চাশখানা খত ছিল, পিতার মৃত্যুর পর সেই সকল খত আমার হাতে এসেছে। আমি যদি পীড়াপীড়ি করি, সেই ভয়ে আমার নাম জাল দস্তখত কোরে ঘনশ্যাম অনেক টাকার জালখত আপন হস্তে রেখেছে। আমি যদি এখানকার কাজকর্ম্ম ছেড়ে অন্যস্থানে চোলে যাই, সেই সময় আমাকে জব্দ কোরবে, এইটীই তার মতলব। সেই জন্যই আমি বোলছি, আমার উপর ঘনশ্যামের অধিক প্রভুত্ব। আমার খাতক আমার হাতে থাকলো না, কালের গতিকে আমিই এখন তার হাতের ভিতর। সেই দিন একবার—”

    ঘরের দরজা খোলা ছিল, ঘরে প্রদীপ জ্বোলছিলো, মুখে ঐ কথাটী নির্গত হতে না হতেই কে একজন হঠাৎ ঘরের ভিতর এসে ধমক দিয়ে বোল্লে, “এত রাত পর্য্যন্ত ঘুম নাই? কোথাকার একটা পলাতক ছোকরাকে ধোরে এনেছে, তার কাছে ঐ সকল ঘরের কথা? এবার তিনি এলেই এই সব কথা আমি বোলে দিব, দুজনে তোরা ইংরেজের জেলখানায় পোচে মোরবি!”

    আমি চোমকে উঠলেম। মুন্সীজীও ভয় পেলেন। তিনি বোল্লেন, “করো! এত রাত্রে তুই এখানে কি কোত্তে এলি? ঘরে যা!—শু গে যা! বোলে দিয়ে যা কোত্তে পারিস, চেষ্টা করিস, তোকেও আমি ভয় করি না, তাকেও আমি ভয় করি না।”

    যার সঙ্গে মুন্সীজীর ঐ রকম কথা-কাটাকাটি, কে সে? যে আমাকে ঘোল-চিঁড়ে এনে দিয়েছিল, সেই বুড়ী। মুন্সীজীর কথা শুনে খিলখিল কোরে হেসে বুড়ী তখন চুপি চুপি বোল্লে, “সেজন্য নয় গো, সেজন্য নয়, এই ছেলেটীকে দেখে আমার কেমন মায়া হয়েছে, কি কোচ্চে, তাই আমি দেখতে এসেছি। তুমি বোলেচ, ঠিক কথা! কৰ্ত্তা আমাদের দু-এক দিনের মধ্যেই ভিক্ষাযাত্রা কোরবেন, আমি তার আভাষ পেয়েছি, সেই সময় এই ছেলেটীকে তুমি এখান থেকে সোরিয়ে দিও, আমি তোমার সহায় হবো।

    এই কথা বোলেই বুড়ী চোলে গেল, সে প্রসঙ্গে আমরাও আর কিছু বলাবলি কোল্লেম না, ঘুমিয়ে পোড়লেম। নিরুদ্বেগে রজনী প্রভাত হলো। পাঁচ সাত দিন আমি মুন্সীজীর কাছেই থাকলেম, কাজকর্ম্ম কিছুই কোত্তে হলো না, রাশীকৃত কাঁইবীচি দেখে দেখেই কেবল হাসলেম আর ভগবানকে ডাকলেম।

    অষ্টম রজনীতে ঘনশ্যাম দর্শন দিলেন। বাড়ীর মধ্যে সোরগোল পোড়ে গেল। রাত্রি প্রায় এক প্রহরের কাছাকাছি। কৰ্ত্তা এসেই উপরে উঠে অগ্রে আমাকেই খোঁজ কোল্লেন। মুন্সীর ঘরে আমি শুয়েছিলেম, মুন্সী আমাকে ডেকে দিলেন, নিজেও আমার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এসে কৰ্ত্তার সম্মুখে দাঁড়ালেন। সকলকে বিদায় দিয়ে ঘনশ্যাম কেবল আমাকেই নিকটে রাখলেন। যেটার নাম আফিসঘর, সেই ঘরে তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন। ঘরে আলো ছিল না, ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকিতে ফটকের সেই দরোয়ান এসে একটা আলো জ্বেলে দিয়ে গেল। দুজনে আমরা দুখান চেয়ারে বোসলেম। চেয়ার, টেবিল, আফিস, এ সকল নাম আমি জানতেম না, ক্রমে ক্রমে শিক্ষা কোত্তে লাগলেম। এতদিন আচার্য্যগৃহে শিক্ষা পেয়েছি, সে শিক্ষা অন্যপ্রকার;—সে শিক্ষা কেবল পুথিগত; সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্যবশে এখন অবধিই আমার সংসার-শিক্ষা আরম্ভ।

  • পঞ্চম কল্প : দালালী ইস্তাহার

    পঞ্চম কল্প : দালালী ইস্তাহার

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    পঞ্চম কল্প : দালালী ইস্তাহার

    ঘনশ্যাম হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কেমন ছোকরা! এখানকার কাজকর্ম্মের ধরণ-ধারণ সব দেখলে শুনলে? অনেক লোক এখানে অনেক রকম কাজ করে, বেশ দশ টাকা রোজগার করে; কোন কাজে তোমার মন যায়, সেইটী জানবার জন্যই এই বাড়ীতে তোমায় আনা। সেদিন একটা বিশেষ জরুরী কাজের খাতিরে হঠাৎ তাড়াতাড়ি আমাকে স্থানান্তরে চোলে যেতে হয়েছিল, সকল কথা তোমাকে বোলে যেতে পারি নাই, মুন্সীর উপরেই ভার দিয়ে গিয়েছিলেম;—কেমন, কি রকম বুঝলে? কোন কাজে তোমার ইচ্ছা হয়?”

    আমি চুপ কোরে থাকলেম। কি উত্তর দিব?—কাঁইবীচির কারবার, নাম শুনেই অরুচি জন্মে,—ভয়ানক জুয়াচুরি ফন্দী বোলেই বিশ্বাস হয়। সে কারবারে আমার মত বালকের প্রবৃত্তি আসতেই পারে না, সকলেই এটা বুঝতে পাচ্ছেন। তা ছাড়া—লোহা পেটা, কাঠ কাটা, ভেড়া কাটা, তক্তা চেরা, কাপড় কাচা, এ সকল কার্য্য ভদ্রলোকের নয়; কাজেই আমি মাথা হেঁট কোরে নীরব হয়ে থাকলেম।

    ভাব দেখে গম্ভীর হয়ে, গম্ভীরবদনে একটু হেসে, গম্ভীরস্বরে ঘনশ্যাম বোল্লেন, ‘হাঁ হাঁ, বুঝা গেছে, ও সব কাজে তোমার মন যাবে না, লেখাপড়ার কাজটাই তুমি ভালবাস। আচ্ছা, লেখো দেখি, কেমন লিখতে পার দেখি।”

    কথা বোলতেও যতক্ষণ, কাজ কোত্তেও ততক্ষণ। দুইখানা বড় বড় সাদা কাগজ আর দোয়াত-কলম আমার সম্মুখে ধোরে দিয়ে, পুনৰ্ব্বার গম্ভীরস্বরে তিনি বোল্লেন, লেখো! যা যা আমি বলি, ঠিক ঠিক লিখো। সাবধান! খবরদার! ভুল কোরো না, ঠিক ঠিক লিখে যাও!

    উপদেশগুলি আমি মনেই রাখলেম; উত্তর কোল্লেম না। তিনি এক এক কোরে বোলতে লাগলেন, আমি সাবধান হয়েই লিখতে লাগলেম।

    “পরমার্থবিদ্যা”

    “পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জানিয়া, চন্দ্রসূর্য্যাদি নবগ্রহকে এবং ইন্দ্রাদি দশদিক্‌পালকে সাক্ষী রাখিয়া, এতৎ ইস্তাহারপত্র দ্বারা সৰ্ব্বসাধারণ জনগণকে আহ্বান করা যাইতেছে, সপ্তাহের মধ্যে জ্ঞানদর্পণে যাঁহারা বিষ্ণুমূর্ত্তিদর্শন করিতে বাসনা রাখেন, তাঁহারা প্রত্যেক মাসের প্রথম রবিবারে দামোদরে প্রাতঃস্নান করিয়া বর্দ্ধমানের পরমার্থ-কুটীরে শ্রীশ্রীসাধুসেবক ঘনশ্যাম সরস্বতীর নিকটে আগমন করিবেন। চিত্রকূটপৰ্ব্বতের সাধু মহাপুরুষের নিকট অনিৰ্ব্বচনীয় জ্ঞানদর্পণ লাভ করা হয়েছে। দর্পণের জ্যোতিতে দিনমানে সূর্য্যরশ্মি মলিন হয়। সেই দর্পণে ভক্তিপূর্ব্বক নয়ন অৰ্পণ করিলে চক্রগদাপদ্মধারী নবঘনশ্যাম চতুর্ভুজ বিষ্ণুমূর্ত্তি দর্শন করিতে পাইবেন। তেমন মূর্ত্তি কেহ কখনও আবিষ্কার করিতে পারে নাই, কস্মিনকালে পারিবেও না। আসুন—আসুন—আসুন! অদ্ভুত ব্যাপার! অদ্ভুত ব্যাপার! অদ্ভুত ব্যাপার! সে মূর্ত্তি দর্শন করিলে ভবধামে আর জন্ম লইতে হইবে না। দর্শনী কেবল এক টাকা পাঁচ আনা মাত্র। এই ইস্তাহার-প্রেরণের ডাকমাশুল অগ্রিম ছয় পয়সা। প্যাকিং খরচা আমার নিজের।”

    এই ইস্তাহার আমি লিখলেম। হাত কাঁপতে লাগলো; সর্ব্বশরীরে ঘাম হলো। তত বড় ভয়ানক দাগাবাজীর অক্ষরগুলো আমার হাত দিয়ে বেরুলো, তাই ভেবে মনে মনে বিস্তর অনুতাপ কোল্লেম। কাগজখানা আমার হাত থেকে টেনে নিয়ে, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দুই তিনবার দেখে দেখে, ইস্তাহারওয়ালা ঘনশ্যাম প্রফুল্লবদনে বোল্লেন, “বেশ হয়েছে। দিব্বি হয়েছে! অক্ষরগুলি যেন মণিমুক্তার হারের মতন শোভা পাচ্ছে! বেশ ছোকরা তুমি! আচ্ছা, ইস্তাহারের অক্ষর তো বেশ হলো, এখন একখানা দরখাস্ত লেখো দেখি। দরখাস্তের অক্ষর যদি এই রকম হয়, তা হোলে আমি তোমাকে খুব বড় একটা নীলকুঠীতে বড় একটা চাকরী কোরে দিব। আমার শ্বশুরের পিসতুতো ভগ্নীপতির মেজো কাকা সেই কুঠীর সৰ্ব্বেসর্ব্বা দেওয়ানজী।”

    ইচ্ছা হলো উঠে পালাই, কিন্তু কায়দায় পোড়ে গেছি, কোথায় যাব? গুরুঠাকুরাণী আমাকে অমনি অমনি বিদায় কোরে না দিয়ে এমন ভয়ঙ্কর লোকের হাতে গছিয়ে দিলেন কেন, কিছুতেই বুঝতে পাল্লেম না। ভাবছি, ঘনশ্যাম আবার আদর কোরে বোল্লেন, “কি হে! ভাবছ কি? ধর না! দরখাস্তখানা লিখে ফেলো!”

    কাজে কাজেই তাই। আর একখানি কাগজ আমার হাতে দিয়ে কর্ত্তা বোলতে লাগলেন, “লেখো—মহামহিম শ্রীল শ্রীযুক্ত দাতালোক মহাশয় বরাবরেষু।—বিধাতার নিগ্রহে দূরদৃষ্টক্ৰমে গত ১৭ই চৈত্র তারিখে নিশাকালে আমার গৃহে হঠাৎ অগ্নি লাগিয়া সৰ্ব্বনাশ হইয়া গিয়াছে। সাতখনি ঘর, পাঁচটী গাই গরু, মায় বাছুর, এক জোড়া বলদ, আটটী পরিবার, তিনটী বিড়াল, একটী প্রাচীন কুক্কর, আর ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র নিঃশেষে ভস্ম হইয়াছে। আমি এককালে নিঃসম্বল ও নিরাশ্রয় হইয়াছি। দেশের বড় বড় রাজা, মহারাজা দেওয়ান, নবাবু খাঁ সাহেব, রায় সাহেব, রায় বাহাদুর এবং মহামান্য জমিদার মহোদয়গণের নামে রেজিষ্টারী করিয়া এক একখানি দরখাস্ত পাঠাইয়াছি। এক্ষণে মহাশয়ের নামডাক শুনিয়া দ্বারস্থ হইয়াছি। মহাশয়ের তুল্য দাতা আমাদের এ অঞ্চলে নাই। অতএব প্রার্থনা এই যে, গরিবের প্রতি দয়া করিয়া আশ্রমনির্ম্মাণের ও ভরণপোষণের ও গোবধের প্রায়শ্চিত্তের খরচাগুলি দান করিলে চরিতার্থ হইব। এই পূণ্যফলে মহাশয় পুরুষানুক্রমে স্বর্গবাসী হইবেন। আমার দরখাস্তের মধ্যে যদি কোন মিথ্যাকথা লেখা থাকে, এমন সন্দেহ করেন, তাহা হইলে পাতিয়ালার মহারাজকে পত্র লিখিলে অনিৰ্ব্বচনীয়রূপে সে সন্দেহ ভঞ্জন হইয়া যাইবেক। কেননা, আমার পিতামহের এক শ্বশুরের কনিষ্ঠ ভ্রাতার ভ্রাতুষ্পুত্র পাতিয়ালার রাজসংসারে পূর্ব্বে মুহুরীগিরী চাকরী—”

    ঘৃণায় কলমটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আমি উঠে দাঁড়ালেম। ঘর থেকে বেরিয়ে যাই, এইরূপ লক্ষণ বুঝতে পেরে কৰ্ত্তা তখন একটু উগ্রস্বরে বোল্লেন, “কি হে ছোকরা! তুমি এমন বেয়াদব কেন? লিখতে বোল্লেম একখানা দরখাস্ত, লিখতে লিখতে অমন কোরে ক্ষেপে উঠলে কেন? ঘাড়ে ভূত চাপলো না কি?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা, আমাকে আপনি ক্ষমা করুন, ও রকম দরখাস্ত লেখা আমার কর্ম্ম নয়। ছেলেবেলা থেকে গুরুগৃহে আমি ধর্ম্মশাস্ত্র অধ্যয়ন কোরেছি, ধর্ম্মশাস্ত্রে যে সকল কার্য্য নিষিদ্ধ, তাহাই আপনি—”

    শেষ পর্য্যন্ত না শুনেই কর্ত্তা একটু হাস্য কোরে বেল্লেন, “আচ্ছা, আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি। ঘুম পেয়েছে। আচ্ছা, আজ ঐ পর্য্যন্তই থাক, কল্য আবার দেখা যাবে। যাও, শয়ন কর গে।”

    আমি যেন বাঁচলেম। মুন্সীর ঘরে শয়ন কোত্তে যাচ্ছি, পশ্চাতে ডেকে কৰ্ত্তা আবার বোল্লেন, “আর দেখ, খুব ভোরে উঠো; ভোরে তোমাকে আমার দরকার আছে; বিশেষ দরকার : ভুলো না।” :

    পশ্চাতে একবার চেয়ে দেখলেম, কিন্তু কথা কইলেম না, সরাসর মুন্সীর ঘরে চোলে গেলেম। কৰ্ত্তা তার পর কি কোল্লেন, কোথায় থাকলেন, কিছুই জানলেম না। আমি শয়ন কোল্লেম। শয়নের অগ্রেই দুর্ভাবনা জুটেছিল, শয্যা গ্রহণ করবামাত্র সেই ভাবনার পরিপাক। কি ভয়ানক লোক! বিষ্ণুদর্শনের ইস্তাহার! গৃহদাহের দরখাস্ত! সর্ব্বৈব মিথ্যা! এমন লোক সংসারে স্বচ্ছন্দে বিচরণ কোরে বেড়ায়, মহাজনের বেশ ধারণ কোরে স্থানে স্থানে কারবার করে, কেহই ধরে না, কেহই কিছু বলে না, স্বচ্ছন্দে ফাঁকে ফাঁকে এড়িয়ে যায়, এটাও তত বড় আশ্চর্য্য ব্যাপার! উঃ! উপাধি আবার সরস্বতী! হায় হায়! মা সরস্বতী আর আশ্রয় করবার স্থান পান নাই!

    ভাবতে ভাবতে নিদ্রা এলো, আমি ঘুমিয়ে পোড়লেম। খানিক পরে দরজা ঠেলে লোকেরা আমাকে ডাকাডাকি কোতে লাগলো, গোলমালে আমি জেগে উঠলেম, দরজা খুলে বেরুলেম। সম্মুখেই কর্ত্তা। তিনি আমার একখান হাত ধোরে উপর থেকে নামিয়ে নিয়ে এলেন, ফটক পার হয়ে যখন আমরা রাস্তায় এলেম, তখন ঘোর অন্ধকার। ভোর নয়, রাত্রি তখন অনেক ছিল। সেই অন্ধকারে কর্ত্তা আমাকে কত দূরে নিয়ে গেলেন, ঠিক অনুমান কোত্তে পাল্লেম না।

    যখন প্ৰভাত হলো, তখন দেখলেম, ঘনশ্যামের আর একরকম বেশ। মহাজনী পাগড়ী নাই, চাপকান নাই, বদনে সে গাম্ভীর্য্য নাই, নূতন ভেক!—সব নূতন! পরিধানে একখানা অল্প বহরের থানকাপড়, কাঁধে একখানা গামছা, মস্তকের কেশ রূক্ষ, বগলে এক তাড়া কাগজ; বদন বিষন্ন; চলনটাও একটু বাঁকা বাঁকা। লোকে দেখে মনে করে একটা পা খোঁড়া।

    ভঙ্গী দেখে আমার মনে আর একটা সন্দেহ দাঁড়ালো। নূতন কি একটা দাগাবাজ মতলবে এই লোক আজ বেরিয়েছে। কি ফ্যাসাতেই আমাকে ফেলবে, মনে বড় ভয় হলো, ভয়ে ভয়ে মুখটী বুজে কাঁপতে কাঁপতে তার সঙ্গে সঙ্গে আমি চোল্লেম। লোকটা আমার ডান হাতখানা খুব শক্ত কোরে ধোরে রইলো।

    হেঁটে হেঁটেই চোলেছি। কতদুর চোলেছি, একটুও বিরাম পাচ্ছি না। পথে পথে ঘনশ্যাম আমাকে কত রকমের কত কথাই শিখিয়ে দিতে লাগলো, শুনে শুনে কেবল আমার ভয়, সংশয় আর ঘৃণাই বেড়ে বেড়ে উঠলো। বেলা এক প্রহর হয়ে গেল। এই সময় আমরা একটা লোকাকীর্ণ গঞ্জের মধ্যে প্রবেশ কোল্লেম। বোধ হলো যেন সহর গঞ্জটা পার হয়ে গৃহস্থপল্লী পাওয়া গেল। সেইখানে ঘনশ্যাম আমাকে নানা প্রকার উপদেশ দিয়ে বার বার সাবধান হোতে বোল্লে। কিছুই আমার ধারণা হলো না।

  • ষষ্ঠ কল্প : নূতন আশ্রয়

    ষষ্ঠ কল্প : নূতন আশ্রয়

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    ষষ্ঠ কল্প : নূতন আশ্রয়

    রাস্তার ধারে ধারে অনেকগুলি বাড়ী। ঠাঁই ঠাঁই ভাল ভাল অট্টালিকা। কোন কোন বাড়ীতে কি কি রকমের লোক থাকেন, বোধ হয়, ঘনশ্যামের জানা ছিল, সে আমার হাত ধোরে ধীরে ধীরে এক একখানা বাড়ীর দেউড়ীতে গিয়ে দাঁড়ালো, নানা সুরে কাঁদনী গেয়ে, চক্ষে জল এনে, মুস্কিল আশানের ফকিরের মতন আশীর্ব্বাদ কোরে কোরে ভিক্ষা চাইলে, কিছুই ফল হলো না। অনেক জায়গাতেই তাড়া খেলে, দুই একখানা বাড়ীর চাকরেরা মুষ্টিভিক্ষা দিতে এলো, ঘনশ্যাম সে ভিক্ষা গ্রহণ কোল্লে না।

    এক বাড়ীর বাহিরের দরজায় একটী বাবু বোসে ছিলেন, তাঁর কাছে গিয়ে ঘনশ্যাম ফাঁদুনী কোরে কাঁদুনী ধোল্লে। “ঘর পুড়ে গেছে, গরু পুড়ে গেছে, ছেলেমেয়ে পুড়ে গেছে, এই দরখাস্ত দেখুন, দোহাই বাবা। এই ছোট ছেলেটী নিয়ে আমি পথে বেসেছি, দোহাই বাবা! দয়া কর! ভগবান নারায়ণ তোমাদের মঙ্গল কোরবেন।”—এই রকম অনেক আড়ম্বর কোরে ভিকারীটা হেঁট হয়ে, আমার মুখের দিকে চেয়ে, একখানা কাগজ বাহির কোরে বাবুটীকে দেখালে; ঝর্ঝর কোরে চক্ষের জল ফেলতে লাগলো।

    লোকটা মহাজনও নয়, দালালও নয়, কারবারীও নয়, কিছুই নয়; বহুরূপী ভিকারী, ভেকধারী বদমাস, সেটা আমি তখন বেশ বুঝতে পাল্লেম। গত রাত্রে আমাকে দিয়ে যে দরখাস্তখানা লিখিয়ে নিয়েছিল, সেইখানাই ঐ বাবুর হাতে দিতে গেল।

    মহা বিরক্ত হয়ে বাবু তৎক্ষণাৎ উগ্রস্বরে বোলে উঠলেন, “যাও যাও, ও রকম দরখাস্ত আমি অনেক দেখেছি, তোমার মতন ভিকারীও অনেক দেখেছি; ঘর পোড়া, গরু পোড়া, বাগান পোড়া, ব্যাগ চুরি, টাকা চুরি ইত্যাদি বাহানায় নিত্য নিত্য কত লোক এখানে ঘোরে, গৃহস্থ লোক তাদের জ্বালায় জর্জ্জর হয়ে আছেন; বর্দ্ধমান জায়গা, এখানে তোমার বুজরুকী খাটবে না; চোলে যাও!”

    সেখানেও তাড়া খেয়ে বুজরুকটা আমাকে অন্য দিকে নিয়ে চোল্লো। একবারও হাত ছাড়ে না। একবার একটু ফাঁক পেলেই আমি ছুটে পালাই, সে সুবিধা কিছুতেই ঘটলো না। হাতখানা ধোরেই আছে। এক একবার একটু আলগা দেয়, আবার জোর কোরে চেপে ধরে। বিষম বিভ্রাট! বেলা দুই প্রহর। প্রচণ্ড রৌদ্রে মাথা ফাটছে, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় আঁধার দেখছি, কোথাও একটু বসি, লোকটা একবারও সে অবসর দিচ্ছে না; ক্রমাগতই টেনে নিয়ে চোলেছে! পা আর চলে না। সৰ্ব্বশরীর অবশ হয়ে পোড়লো। ত্রাহি মধুসূদন!

    শেষবেলায় আমরা যে দিকে গিয়ে উপস্থিত হোলেম, সে দিকটা বোধ হলো, সহরের প্রান্তভাগ। লোকজনও বেশী চলে না, দোকানপাটও বেশী নাই, বড় বড় বাড়ীও খুব কম। একখানা ময়রার দোকানে প্রবেশ কোরে, এক পয়সার পাটালী গুড় কিনে ঘনশ্যাম দু-ঘটী জল খেলো। আমাকেও একবিন্দু পাটালী দিয়েছিল, সেই বিন্দুটুকু জিবে বুলিয়ে আমিও এক ঘটী জল খেলেম। সূর্য্যদেব আর আমার কষ্ট দেখতে পাল্লেন না, অগ্নিকিরণ, সংবরণ কোরে, একটু ঠাণ্ডা হয়ে, অস্তাচলে প্রস্থান করবার উপক্রম কোল্লেন। আর রৌদ্র নাই। দোকান থেকে বেরিয়ে ঘনশ্যাম আমাকে একখানি সুদশ্য অট্টালিকার সম্মুখে নিয়ে গেল। রাস্তার উপরেই ফটক; ফটকে একজন দীর্ঘাকার দারোয়ান ছিল, যেন কত কালের পরিচয়, সেই ভাব জানিয়ে ঘনশ্যাম তাকে “রাম রাম” দিয়ে বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করবার উপক্রম কোল্লে। দরোয়ানটী রুকে দাঁড়ালো।— “কাঁহাকা উল্লুক! কাহা যাও?—নিকালো!” এইরূপ মিষ্টবাক্য উপহার দিয়ে, দরোয়ান তারে ধাক্কা মেরে পাঁচহাত তফাতে সোরিয়ে দিলে। বেহায়া বদমাস বুজরুকটা তখনো আমার হাত ছেড়ে দিলে না; ধাক্কার সময় আমি তার হাতের সঙ্গে পাখীর মত ঝুলতে লাগলেম।

    তফাতে দাঁড়িয়ে মহাজন তখন অভাজনের ন্যায় ভিক্ষা চাইতে লাগলো। দরোয়ান বোল্লে, “নেই—নেই, এসমাফিক জোয়ান আদমীকো ভিচ্ছা দেনেকা হকুম হ্যায় নেই!” এই কথা উপলক্ষে দ্বারপালের সঙ্গে ভিকারীর বচসা আরম্ভ হলো;— কলহতুল্য বচসা! আর সূর্য্য দেখা গেল না; দেখা গেল কেবল অল্প অল্প আলো;— অট্টালিকার মাথায় চপলার ন্যায় ক্ষণস্থায়িনী বর্ণরেখা।

    অন্ধকার হবার অত্যল্প বিলম্ব। ভিক্ষুকে দোবারিকে বচসা চোলছে, ইত্যবসরে মুখ ফিরিয়ে আমি চেয়ে দেখি, রাস্তায় একটু দূরে একটী ভদ্রলোক। মৃদুপদসঞ্চারে প্রসন্নবদনে তিনি সেই বাড়ীর দিকেই এগিয়ে আসছেন। ঘনশ্যাম ইতিমধ্যে ফটকের দিকে দুই চারি পা অগ্রসর হয়েছিল, দরোয়ানজী তাই দেখে ফটক বন্ধ কোরে দিয়েছিল, ভদ্রলোকটী নিকটবর্ত্তী হবামাত্র দ্বার উন্মুক্ত কোরে দ্বারপাল ব্যস্তভাবে ঘনশ্যামকে বোল্লে, “যাও যাও, তফাৎ যাও, বাবা, আতা হ্যায়।”—ঘনশ্যাম একটু পেছিয়ে দাঁড়ালে বাবু এসে ফটকের সম্মুখে দাঁড়ালেন, দ্বারপাল দুই হস্তে সেলাম দিলে।

    বাবুর চেহারা অতি সুন্দর। দিব্য গৌরবর্ণ, গঠন মোলায়েম, বদন বাদামে, নয়ন দীর্ঘ, জোড়া ভ্ৰূ, সর্ব্বাংশেই নিখুঁত; মাথার চুলগুলি শ্বেতবর্ণ; গোঁফজোড়াটী দিব্য কালো; বয়স অনুমান ৬০/৬২ বৎসর।

    একটু তফাতে সোরে দাঁড়িয়ে, দরখাস্তখানি বাহির কোরে, চক্ষে জল এনে, ঘনশ্যাম কেঁদে বোলতে লাগলো, “দোহাই ধর্ম্মাবতার! আমি বড় গরিব, ঘরে আগুন লেগে সৰ্ব্বস্ব পুড়ে গিয়েছে, পরিবারলোক মারা গিয়েছে, গরুবাছর পুড়ে মরেছে, কেবল এই ছেলেটী আর আমি প্রাণে বেঁচে আছি; থাকবার স্থান নাই, আহারের সংস্থান নাই, একবারে নিরুপায়। এই ছেলেটীর জন্যেই আরো আমার বেশী ভাবনা।”

    এক কথাই বার বার। লোকটা কত বড় ধড়ীবাজ, তা আমি বেশ বুঝতে পেরেছিলেম, সে আমার হাতখানি খুব শক্ত কোরে ধোরেছিল, কিছুতেই আমি ছাড়াতে পাল্লেম না, দুই চক্ষু দিয়ে জল পোড়ছিলো, বাবু আমার মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে লোকটাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “এ ছেলেটী তোমার কে হয়?”—লোক উত্তর কোল্লে, “ছেলে হয়, আর কে হবে। এই ছেলেটী নিয়ে আমি পথে পথে কেঁদে বেড়াচ্ছি, তিনদিন উদরে অন্ন নাই, ছেলেটীকে বাঁচানো ভার!—হুজুর হোচ্ছেন কাঙ্গাল গরিবের মা-বাপ, হুজুর রক্ষা না কোল্লে ছেলেটী আমার না খেয়ে মারা যাবে।”

    এতক্ষণ আমি চুপ কোরে ছিলেম, লোকটার এই কথা শুনে কেঁদে কেঁদে বাবুকে আমি বোল্লেম, “আমি নিরাশ্রয়, আমার নিজের পরিচয় আমি নিজেই জানি না, এই লোক আমাকে আটদিন হলো, সপ্তগ্রামের গুরুবাড়ী থেকে আমাকে ধরে এনেছে। জন্মাবধি গুরুর বাড়ীতেই ছিলেম, সেইখানেই শাস্ত্র অধ্যয়ন কোত্তেম, সম্প্রতি অধ্যাপকের মত্যু হয়েছে, গুরুপত্নী আমাকে বিদায় কোরে দিয়েছেন, এই লোক আমাকে এনেছে। এ আমার কেহই নয়, একে আমি কখনো চক্ষেও দেখি নাই। সমস্তই মিথ্যাকথা বোলছে, এ লোকের জুয়াচুরীর কথা আমি সব শুনেছি। এ আমাকে কোথাকার নীলকুঠীতে চালান কোরে দিবে, কুলীর কাজ করাবে, এই মতলব।”

    আমার কথাগুলি শুনে, লোকটার আপাদ-মস্তক নিরীক্ষণ কোরে, বাবু তাকে বোল্লেন, “কেমন হে, বালক যে যে কথা বোলছে, এ সব সত্য কি না?” —ঘনশ্যাম উত্তর কোল্লে “একটাও সত্য নয়, সমস্তই মিথ্যাকথা, তবে এইটুকু সত্য হোতে পারে, ও আমার নিজের ছেলে নয়, পথে কুড়িয়ে পেয়ে আমি পুত্রবৎ মানুষ কোরেছি, কিছু কিছু, লেখাপড়া শিখিয়েছি, কলিকালের ছেলে কি না, এখন আর আমার কাছে থাকতে চায় না; খেতে পেতো না, জায়গা পেতো না, পথে পথেই পোড়ে থাকতো, কত উপকার কোরেছি, সব কথা এখন ভুলে গেছে।”

    খানিকক্ষণ চুপ কোরে থেকে গম্ভীরস্বরে বাবু তাকে বোল্লেন, “হাঁ, তুমি যা যা বোলছে সমস্তই সত্য, আর এই বালক যা যা বোলছে, সমস্তই মিথ্যা, কেমন, এই কথা তোমার নয়? সব আমি বুঝেছি; তোমার চেহারাতে সকল কথাই ব্যক্ত হোচ্ছে। তুমি ভিকারী হয়েছ, জুয়ান মরদ, খেটে খেতে পার না? তোমাকে ভিক্ষা দেওয়া গৃহস্থলোকের উচিত হয় না। তুমি জুয়াচরী অভ্যাস কোরেছ, তোমাকে আমি এখনি পুলিশে দিতেম কিন্তু ক্ষমা কোল্লেম, ছেলেটীর হাত ছেড়ে দাও; চেহারায় বুঝতে পাচ্ছি, ভদ্রলোকের ছেলে, এ ছেলে আমার কাছেই থাকবে। তুমি ভিক্ষা নিতে এসেছ, ভিক্ষা নিয়ে চোলে যাও। ফের যদি কথা কও, পুলিশের গারদে তোমার স্থান হবে; এ কথা নিশ্চয়!”

    পুলিশের কথা শুনে লোকটা কেঁপে কেঁপে আমার হাত ছেড়ে দিলে, আমি দৌড়ে গিয়ে বাবুর দুটী পায়ে জড়িয়ে ধোল্লেম, “রক্ষা করুন, রক্ষা করুন” বোলে অনবরত কাঁদতে লাগলেম। অভয় দিয়ে বাবু আমাকে বোল্লেন, “তুমি শান্ত হও, কোন ভয় নাই, সব আমি বুঝেছি। তুমি আমার কাছেই থাকবে, যাতে তোমার ভাল হয়, যাতে তুমি নিজের পরিচয় জানতে পার, যাতে তোমার আপনার লোকেরা সংবাদ পান, আমি তার চেষ্টাও কোরবো, কোন চিন্তা নাই।”

    লোকটার সম্মুখে একটা আধুলি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে উগ্রস্বরে বাবু বোল্লেন, “লও তোমার ভিক্ষা, চোলে যাও, তিলার্দ্ধ আর এখানে বিলম্ব কোরে না।”

    ঘনশ্যামকে এই কথা বোলে আমাকে সঙ্গে কোরে নিয়ে বাবু বাড়ীর মধে প্রবেশ কোল্লেন। লোকটা তখনও যায় না, ফটকের বাহিরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কটমটচক্ষে আমার দিকে চাইতে লাগলো, ইসারায় ইসারায় যেন শাসালে। তার ভঙ্গী দেখে বাবু তখন দরোয়ানকে হুকুম দিলেন, “গলাধাক্কা দিয়ে দূর কোরে দাও?”—দরোয়ান তৎক্ষণাৎ হুকুম তামিল কোল্লে। আড়ে আড়ে চাইতে চাইতে আপন মনে গর্জ্জন কোত্তে কোত্তে জুয়াচোর ঘনশ্যাম দক্ষিণদিকে ছুটে পালালো। আমারো ভয় ভাঙলো, আশ্রয়হারা হয়েছিলেম, মহৎ আশ্রয় প্রাপ্ত হোলেম। বাবুর বাড়ীতেই আমি থাকলেম।

  • সপ্তম কল্প : জামাইবাবু

    সপ্তম কল্প : জামাইবাবু

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    সপ্তম কল্প : জামাইবাবু

    বাবুর নাম সর্ব্বানন্দ মুস্তফী;—বসু মস্তফী। পুত্রসন্তান নাই, তিনটী কন্যা। জ্যেষ্ঠা কন্যার নাম শ্যামাসুন্দরী, মধ্যমা উমাকালী, কনিষ্ঠা আশালতা। বড়মেয়েটী বিধবা, মেজোটী সধবা, ছোটটী অবিবাহিতা, বয়ঃক্রম প্রায় দশ বৎসর। বাবুর বাড়ীতেই আমি থাকলেম। বাবু মহৎলোক, নামলব্ধ জমীদার, বৎসরে প্রায় আশী হাজার টাকা আয়, সংসারে বিলক্ষণ জলজলাট। আমার প্রতি বাবুর বেশ আদর-যত্ন। টোলে আমি সংস্কৃতভাষা শিক্ষা কোরেছিলেম, সংস্কৃতের প্রতি বাবুরও বিশেষ অনুরাগ, সেই কারণেই তিনি আমাকে বেশী ভালবাসলেন। মাসখানেক থাকতে থাকতে একদিন তিনি আমাকে বোল্লেন, “দেশে এখন ইংরেজের রাজত্ব, কিছু কিছু ইংরেজী শিক্ষা করা ভাল, তুমি ইংরেজী ভাষা শিক্ষা কর।”—তৎক্ষণাৎ আমি সম্মত হোলেম। আমি পর, কে আমি, তা তিনি কিছুই জানতেন না, জাতি কি, তাও আমি বোলতে পাত্তেম না, বাড়ীতে রসুই-ব্রাহ্মণ ছিল, ব্রাহ্মণের পাককরা অন্ন সকলেই খায়, তাই আমি আহার কোত্তেম। আহারে কিছুই কষ্ট ছিল না, বাবু আমাকে ভিন্ন ভাবতেন না, উপাদেয় সামগ্রী আহার কোত্তেম, উত্তম গৃহে উত্তম শয্যায় শয়ন কোত্তেম, নুতন লোকেরা আমাকে বাবুর বাড়ীর ছেলে বোলেই মনে কোত্তো, দিব্য সুখস্বচ্ছন্দেই সে বাড়ীতে আমি থাকলেম। বাবু আমার জন্য একজন শিক্ষক রেখে দিলেন, স্কুলে দিলেন না, সেই শিক্ষকের নিকটেই আমি ইংরাজী ভাষা শিক্ষা কোত্তে লাগলেম।

    বাড়ীখানি বৃহৎ; তিন মহল। সদরমহলে পুজার দালান, তিনদিকে বারান্দাযুক্ত বৈঠকখানা, নীচের একদিকের বৈঠকখানায় জমিদারী সেরেস্তা। অন্দরমহলে মন্ত্রীলোকেরা থাকেন, তৃতীয় মহলে একটী সরোবর, চারিধারে উচ্চ প্রাচীর, প্রাচীরের কোলে কোলে নানাজাতি ফলফলের গাছ; একধারে খুব লম্বা একখানা চালাঘর, সেই ঘরে অনেকগুলি গরু থাকে, রাখালেরাও একপাশে শয়ন করে। সুন্দর বন্দোবস্ত।

    একমাস আমি থাকলেম। আমার রীতিব্যবহার দেখে বাবু আমাকে অন্দরমহলেও প্রবেশ করবার অনুমতি দিলেন। রাত্রিকালে সদরমহলের উপরের একটী বৈঠকখানায় আমি শয়ন কোত্তেম। অন্দরে বাবুর ধর্ম্মপত্নী আর ছোট-মেয়েটী। তারা ছাড়া সম্পর্কীয় পাঁচ-সাতটী স্ত্রীলোক নিয়তই সেই বাড়ীতে বাস কোত্তেন। কর্ত্তার বড়মেয়েটী বিধবা বটেন, কিন্তু পিত্রালয়ে থাকতেন না, শ্বশুরালয়েই থাকতেন; মধ্যমাটীও শ্বশুরালয়বাসিনী। পূৰ্ব্বে বোলেছি, ছোটমেয়েটীর নাম আশালতা। থাকতে থাকতে আশালতার সঙ্গে আমার বেশ ভাব হলো। আশালতা লেখাপড়া করেন, রামায়ণ-মহাভারত বেশ শুদ্ধ শুদ্ধ উচ্চারণে পাঠ কোত্তে পারেন, আমার সঙ্গে আশালতার লেখাপড়ার চর্চা হতো, আরও অনেক রকম ভাল ভাল কথাবার্ত্তা চোলতে, গৃহিণী আমাকে সন্তানের মতন আদর কোত্তেন, অপরা স্ত্রীলোকেরাও আমাকে আপন ভেবে স্নেহ-যত্ন কোত্তেন, কোন সুখের আমার অভাব ছিল না। অবকাশকালে সর্ব্বানন্দবাবু আমাকে নিকটে বোসিয়ে লেখাপড়ার কথা জিজ্ঞাসা কোত্তেন, যেমন জানি, যতদূর শিখেছিলেম, সেই রকম উত্তর কোত্তেম, শুনে তিনি খুসী হতেন।

    বাড়ীতে তিনজন চাকর, পাঁচজন দাসী, একজন মালী, তিনজন রাখাল আর আট দশ জন সেরেস্তার আমলা। ইহা ছাড়া দুইজন রসই ব্রাহ্মণ আর একজন ব্রাহ্মণী ছিল। চাকরেরা সকলেই আমাকে বাবুর ছেলের মতন মান্য কোত্তো আর ভালবাসতো।

    একটা কথা এইখানে বোলে রাখি। আমার পূৰ্ব্বকাহিনীতে যেখানে যেখানে যে সকল লোকের যে যে নাম বর্ণিত আছে, সেই নামগুলি কাল্পনিক, এ কাহিনীর নামগুলিও অকাল্পনিক নহে; তথাপি পাঠক-মহাশয় এই সকল নামের সঙ্গে আসল আসল নামের অনেকটা সাদৃশ্য দেখতে পাবেন।

    ছয় মাস আমি সর্ব্বানন্দবাবুর বাড়ীতে নির্বিঘ্নে পরমসুখেই থাকলেম। এক রাত্রে বাবু আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, ‘হরিদাস! তুমি কি নিজের পরিচয় কিছুই জান না? কোথায় তোমার নিবাস, কে তোমার মাতা-পিতা, কিছুই কি তোমার জানা নাই?”—আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞে না, কিছুই আমি জানি না। জানি শুধু আমার নাম হরিদাস। নিতান্ত শিশুকাল থেকে হুগলীজেলার সপ্তগ্রামে অধ্যাপকের গৃহে আমি প্রতিপালিত হয়েছি, অধ্যাপকের মত্যুর পরে সেই ভিকারী বেশধারী লোকটা আমাকে একখানা অজানা বাড়ীতে নিয়ে আসে, তার পর বর্দ্ধমানে এনেছিল, তার পর যা হয়েছে, আপনি জ্ঞাত আছেন। বাসস্থান জানি না, জাতি জানি না, আপনার লোক কে কোথায় আছে, আছে কিনা তা পর্য্যন্ত আমি জানি না।”

    আমার উক্তিগুলি শ্রবণ কোরে, একদৃষ্টে আমার মুখপানে চেয়ে, বাবু অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন, তার পর মৃদুস্বরে বোল্লেন, ‘আশ্চর্য্য বটে! আচ্ছা, যাতে সন্ধান হয়, আমি তার উপায় করবার জন্য সবিশেষ যত্ন কোরবো। ভদ্রলোকের ছেলে, হীনবংশে তোমার জন্ম নয়, চেহারাই সে কথা বেলে দিচ্ছে। আমি তোমাকে পুত্রতুল্য ভালবেসেছি, চিরদিন ভালবাসবো, যাতে তোমার মঙ্গল হয়, অবশ্য সেই চেষ্টা আমি কোরবো। তুমি কিছু ভেবো না, মন দিয়ে লেখাপড়া শিক্ষা কর।”

    আমি মাথা হেঁট কোরে চুপ কোরে থাকলেম। বাবু আমাকে যথার্থই পত্ৰতুল্য স্নেহ করেন, সেইটী স্মরণ কোরে পরমেশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেম।

    আর একমাস অতীত। একদিন বৈকালে আমি বৈঠকখানার বারান্দায় বোসে আছি, নিকটে কেহই নাই, এমন সময় গাড়ীবারান্দার নীচে একখানা গাড়ী এসে দাঁড়ালো। চমৎকার গাড়ী। দামী দামী সাজপরা বড় বড় দুটী কৃষ্ণবর্ণ অশ্ব সেই গাড়ীতে সংযোজিত। গাড়ীর পশ্চাতে উর্দ্দীতকমাধারী দুজন আরদালী, কোচবাক্সেও সারথির বামদিকে সেই রকমের আর একজন আরদালী। গাড়ীতে কে এলেন, অগ্রে আমি জানতে পাল্লেম না, গাড়ীখানি ভাল কোরে দেখবার জন্য আগ্রহে আগ্রহে উপর থেকে নেমে এলেম। বাবু তখন বাড়ীতে ছিলেন না, সেরেস্তার দুজন আমলা আর বাড়ীর দুজন চাকর সেই গাড়ীর সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে, পরস্পর মুখচাহাচাহি কোচ্চে। মূল্যবান পরিচ্ছদ-পরিহিত একটী বাবু গাড়ী থেকে নামলেন। সম্মুখে যারা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা সকলেই করপুটে সেই বাবুটীকে নমস্কার কোল্লে, দেখাদেখি আমিও নমকার কোল্লেম। কারো পানে না চেয়েই, কোন কথা না বোলেই, বাবু সরাসর উপরে গিয়ে উঠলেন। আমরাও সঙ্গে সঙ্গে গেলেম। চুপি চুপি একজনকে জিজ্ঞাসা কোরে জানলেম, জামাইবাবু।

    দিব্য চেহারা। আকার দীর্ঘ, অঙ্গ স্থূল, বদন গম্ভীর, বর্ণ গৌর, দিব্য মুখ, দিব্য গোঁফ, মাথার চুলগলি খাটো খাটো, মাঝখানে সিঁতিকাটা আর গোঁফের দুই চারিগাছ চুল পাকা; বয়স অনুমান ৪৫/৪৬ বৎসর। পরিধানে শান্তিপুরে কালাপেড়ে মিহি ধুতী, অঙ্গে চাপ্‌কানের উপর সবুজ শাটিনের চোকা, পায়ে পঞ্চবর্ণের মোজা, মোজার উপর ফুলদার জরীর জুতা, বুকপকেটে সোণার চেইনঝুলানো ঘড়ী, দশ অঙ্গুলীতে দশ অঙ্গুরী; হস্তে একগাছি গজদন্তমণ্ডিত সূক্ষ্ম যষ্টি।

    জামাইবাবু উপরে উঠেই, ভিতরদিকের বারান্দার একখানি চেয়ারের উপর উপবেশন কোল্লেন, দুই পাশে দুজন চাকর বড় বড় পাখা হাতে কোরে বাতাস কোত্তে আরম্ভ কোল্লে, একজন চাকর সোণার অলিবোলাতে তামাক সেজে এনে দিলে। জামাইবাব, আপন মনে সালমোড়া বৃহৎ নলে ওষ্ঠাপর্ণ কোরে উদাসভাবে ধূম নির্গত কোত্তে লাগলেন; মুখে বাক্য নাই। চেয়ারের একটু তফাতে আমি চুপ কোরে দাঁড়িয়ে ছিলেম, জামাইবাবুর মন কিছু চঞ্চল, চঞ্চলনয়নে তিন দিকে চাইতে চাইতে হঠাৎ একবার আমার দিকে নজর পোড়লো। ভাবে বুঝলেম, আমার দিকে চেয়েই তিনি যেন একটু চোমকে উঠলেন। ভাব গোপনের ক্ষমতা বেশ, এমনি সাবধানে তৎক্ষণাৎ সামলে নিলেন যে, কেহই কিছু অনুভব কোত্তে পাল্লে না। সকলের অলক্ষিতে চকিতমাত্রেই কাটা হয়ে গেল; আমার নাকি কিছু কূটদৃষ্টি, সেই চমকিত ভাবটা কেবল আমিই জানতে পাল্লেম।

    অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে অন্যমনস্কভাবে একজন আমলাকে সম্বোধন কোরে জামাইবাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কৰ্ত্তা কোথায়?”—উত্তর পেলেন, “আহরান্তে বাগানে গিয়েছেন, এখনি আসবেন। আজ আপনার আসবার কথা ছিল, সেটা তিনি জানেন, অধিক বিলম্ব হবে না।”

    বাস্তবিক দশ মিনিট পরেই কৰ্ত্তা বাড়ী এলেন, দস্তুরমত আদর-অভ্যর্থনা কোরে জামাইয়ের কুশলবার্ত্তা জিজ্ঞাসা কোল্লেন। দুই এক কথায় উত্তর দিয়ে জামাইবাবু পুনৰ্ব্বার গম্ভীরভাব ধারণ কোল্লেন; আসন থেকে উঠলেন না, শ্বশুরকে একটী প্রণামও কোল্লেন না; আদরের মধ্যে আলবোলার নলটীকে ক্ষণেকের জন্য ঊরদেশের উপর বিশ্রাম দিলেন।

    কৰ্ত্তা একবার অন্দরমহলে গেলেন, একটু পরে জামাইবাবুকে ডেকে পাঠালেন। জামাইবাবু একজন চাকরের সঙ্গে অন্দরে প্রবেশ কোল্লেন, কৌতূহলবশে আমিও পশ্চাৎ পশ্চাৎ চোল্লেম। জলযোগের আয়োজন হলো, জামাইবাবু জল খেলেন, আমি একটু তফাতে তফাতে ঘুরতে লাগলেম, কিন্তু জামাইবাবুর দিকে একটু একটু কটাক্ষ থাকলো। কটাক্ষভঙ্গীতে বুঝতে পাল্লেম, আমার দিকেও জামাইবাবুর কটাক্ষ। সে কটাক্ষের প্রত্যক্ষ ফলও তৎক্ষণাৎ জানা গেল। কৰ্ত্তার দিকে চেয়ে, আমাকে লক্ষ্য কোরে, জামাইবাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “আপনি যে দেখছি, মাঝে মাঝে নূতন নূতন লোকজন আমদানী কোচ্ছেন। ঐ ছোকরাটীকে আপনি কোথায় পেলেন?”

    প্রশ্ন শুনেই আমি অমনি ধাঁ কোরে সেখান থেকে সোরে গেলেম; সে প্রশ্নে কৰ্ত্তা কি উত্তর দিলেন, শুনতে পেলেম না; শোনবার তত আবশ্যকও ছিল না। একটু পরে জামাইকে সঙ্গে নিয়ে কর্ত্তাবাবু বাহিরের বৈঠকখানায় এসে বোসলেন, আমিও অন্যদিক দিয়ে বৈঠকখানার বারান্দার ধারে গিয়ে দাঁড়ালেম। সন্ধ্যা হবার অধিক বিলম্ব ছিল না, একটু পরেই সন্ধ্যা হলো; বৈঠকখানার ঘরে ঘরে বাতী জ্বোল্লো; কৰ্ত্তাবাবুর খাসকামরায় বসা-সেজে ডবল বাতী। ঘরে কেবল কৰ্ত্তা আর জামাইবাবু।

    যেটী কৰ্ত্তাবাবুর খাসকামরা, সেই ঘরের পার্শ্বে ক্ষুদ্র একটী পুস্তকাগার। আমি একাকী সেই পুস্তকাগারে বোসে একখানি ইংরাজী পুস্তক পাঠ কোচ্ছি, কর্ত্তার গৃহে কিছু বড় বড় কথা শুনতে পেলেম। শ্বশুর-জামাই নির্জ্জনে কথোপকথন কোচ্ছেন, সে কথায় কাণ দিবার আমার কোন দরকার ছিল না, কিন্তু চুপি চুপি কথা নয়, নিতান্ত গোপনীয় কথাও হতে পারে না, বিশেষতঃ শোনবার ইচ্ছা না থাকলেও কথাগুলি আমার কর্ণে প্রবেশ কোত্তে লাগলো। দুটী ঘরের মধ্যস্থলে একটী দরজা, সে দরজা তখন বন্ধ ছিল না। আমি পুস্তকাগারে আছি, কত্তা সেটা হয় তো জানতেন না। তিনি একটু জোর গলায় কথা কোচ্ছিলেন, তাই শুনে কেমন একটা আগ্রহ হলো। দরজা ভেজানো ছিল। বইখানি বন্ধ কোরে রেখে, সেই দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেম। গুরগৃহে ঘনশ্যামের সঙ্গে গুরুপত্নীর যখন কথা হয়, তখন যে রকমে লুকিয়ে লুকিয়ে আমি শুনেছিলেম, এখন সে লুকোচরিভাব ছিল না, অথচ দাঁড়ালো যেন সেই ভাব।

    কর্ত্তা বোল্লেন, “দেখ মোহনলাল! দিন দিন তুমি বেজায় বাজেখরচ আরম্ভ কোরেছ। যা যখন চাও, তাই তখন আমি দিই, তাতেও তোমার না, প্রায় প্রতি মাসেই রাশি রাশি দেনা হয়; আজ আবার দশ হাজার টাকা চাচ্ছো;—দিব আমি, তোমরা ভিন্ন আর আমার কে আছে? থাকলে তোমরাই পাবে, না থাকলে তোমরাই বঞ্চিত হবে। আমি মনে কোরেছি, এখন অবধি আর আমি তোমার বেহিসাবী খরচে প্রশ্রয় দিব না। আমার তিনটী মাত্র কন্যা, তিন নামেই আমি সমান সমান অংশে উইল কোরে রেখেছি। তুমি যদি বার বার এই রকম অপব্যয় কর, বার বার বেহিসাবী টাকা লও, তা হোলে উইলের ক্রোড়পত্রে তোমার অংশে সেই সব টাকা আমি বাদ দিয়ে নতুন ব্যবস্থা কোরে যাব, তখন তুমি আমাকে দোষ দিতে পারবে না।”

    এই পর্য্যন্ত বোলে, অঙ্গুলিসঙ্কেতে একটী সিন্দুক দেখিয়ে দিয়ে, কর্ত্তা আবার বোল্লেন, ঐ সিন্দুকেই উইল আছে, যদি দেখতে চাও, দেখতে পার।” একটু যেন লজ্জা পেয়ে জামাইবাবু বল্লেন, “না, আপনার সিন্দুক আপনার উইল, এখন আমার দেখবার অধিকার নাই। আপনি অনুমতি কোচ্ছেন, এখন অবধি আমি সাবধান হয়েই চোলবো, এইবার একটা দায় পোড়েছে, দশ হাজার টাকা হোলেই সেই দায় থেকে আমি মুক্ত হোতে পারি।”

    খানিকক্ষণ আর কোন কথাবার্ত্তা আমি শুনতে পেলেম না, তার পর একটী বাক্স খুলে কর্ত্তাবাবু জামাইবাবুর হস্তে খানকতক নোট দিলেন। বুঝতে পাল্লেম, দশ হাজার টাকা।

    রাত্রি এক প্রহর অতীত। একজন দাসী এসে সংবাদ দিলে, শ্বশুর-জামাই উভয়েই অন্দরে প্রবেশ করবার জন্য সে ঘর থেকে বেরুলেন। আমি তখন অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলেম, কৰ্ত্তা আমায় দেখেই একটু দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি হরিদাস! চুপটী কোরে এইখানেই দাঁড়িয়ে আছ? পড়াশনা সাঙ্গ হয়েছে?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞে হাঁ, নূতন বইখানির দশ পাতা পড়েছি, ঘরে বড় গ্রীষ্ম বোধ হোচ্ছিলো, সেই জন্য একটু বাতাসে এসে দাঁড়িয়েছি।”

    কৰ্ত্তাবাবু জামাইবাবু আর আমি, তিনজনে একসঙ্গে অন্দরমহলে প্রবেশ কোল্লেম। একসঙ্গেই আহারাদি হলো। আহারের সময় জামাইবাবু বক্রনয়নে দুই তিনবার আমার দিকে চাইলেন, দেখেও যেন দেখলেম না, মাথা হেঁট কোরে শান্ত হয়ে থাকলেম।

    আহারাতে বাড়ীর ভিতরের একটী ঘরে জামাইবাবুর শয্যা প্রস্তুত হলো; জামাইবাবু শয়ন কোল্লেন, কর্ত্তাবাবু আপন শয়নগৃহে গেলেন, আমি নিত্য রাত্রে যেখানে থাকি, সেইখানেই এসে শয়ন কোল্লেম।

    প্রভাতে জামাইবাবু বিদায় হোলেন। আমার একটা ভয় ঘুচে গেল। আমাকে দেখেই প্রথমে তিনি চোমকেছিলেন, কে আমি, কোথা থেকে এসেছি, কৰ্ত্তাকে সে কথা জিজ্ঞাসা করে জানেন, বার বার কেমন একরকম ভঙ্গীতে আমার দিকে কটাক্ষপাত কোরেছিলেন, আমি যেন কিছুই বুঝতে পারি নাই। তিনি বিদায় হবার পর কর্ত্তা আমাকে ডেকে খুব হাসতে হাসতে বোল্লেন, “হরিদাস! তোমার উপর জামাইবাবুর নজর পোড়েছে। আমার কাছে তুমি থাক, সেটা যেন তাঁর ইচ্ছা নয়; তিনি তোমাকে তাঁর নিজ বাড়ীতে নিয়ে যেতে চান; আমাকেও সে কথা জানিয়েছিলেন, আমি রাজী হই নাই। তোমার অভিপ্রায় কি? যাবে?”

    জলে আমার চক্ষ, ছলছল কোরে এলো। সজলনয়নে কর্ত্তার মুখপানে চেয়ে কম্পিত কণ্ঠে আমি বোল্লেম, “আজ্ঞে না, তাঁর বাড়ীতে আমি যাব না,—আপনার আশ্রয় ছেড়ে কোথাও আমি যাব না। আমার অদৃষ্ট বড় মন্দ। পাঠশালা পরিত্যাগ কোরে একটা দুষ্ট লোকের হাতে আমি পোড়েছিলেম, আপনি রক্ষা না কোল্লে আমার কপালে কতই না বিপদ ঘোটতো, তাই ভেবে সৰ্ব্বদাই আমার গা কাঁপে। সংসার আমি চিনি না, সংসারের লোকের রীত-ব্যবহার কিছুই আমি জানি না, মাতৃগর্ভে যেমন থাকা, চতুর্দশ বর্ষকাল পাঠশালার গর্ভেই আমি সেইরূপ ছিলেম; আমার অধ্যাপক-মহাশয় পাঠশালার বাহিরে কোথাও আমাকে যেতে দিতেন না। তিনিও সংসারলীলা সাঙ্গ কোল্লেন, তাঁর পত্নীর নিষ্ঠুরতায় আমিও নিরাশ্রয় হয়ে একটা ভয়ানক জুয়াচোরের সঙ্গে পথে বেরুলেম। আর দুর্দ্দশাই যে আমার হোতো, অদৃষ্ট কোন পথেই যে আমাকে নিয়ে যেতো, কিছুই আমি বোলতে পারি না। বিপদকালে বিপত্তির মধুসূদন আমার প্রতি সদয় হোলেন, জুয়াচোরীর ঘটনাবশে আপনার দ্বারেই আমায় নিয়ে এলো, আপনার কাছে আমি আশ্রয় পেলেম, আপনার দয়ার ক্রোড়েই আমি প্রতিপালিত হোচ্ছি, এ আশ্রয় ত্যাগ কোরে কোথাও আমি যাব না। দোহাই আপনার! আপনি আমাকে পরিত্যাগ কোরবেন না।”

    সন্তুষ্ট হয়ে কর্ত্তা বোল্লেন, “না হরিদাস। তোমাকে আমি পরিত্যাগ কোরবো না, তোমার স্বভাব-চরিত্র খুব ভাল, নির্ভাবনায় এই বাড়ীতেই তুমি থাকো, মন দিয়ে লেখাপড়া শিক্ষা কর, অবশ্যই তোমার ভাল হবে।”

    এইরূপ কথাবার্ত্তার পর আমি আপন পাঠাগারে প্রবিষ্ট হয়ে নিবিষ্টচিত্তে নূতন পাঠের অভ্যাস কোত্তে লাগলেম। দুর্ভাবনা দূরে গেল, নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ীর পরিবারবর্গের সঙ্গে পরমসুখে আরো একমাস সেই মহৎ আশ্রমে আমি থাকলেম।

  • অষ্টম কল্প : সব নূতন

    অষ্টম কল্প : সব নূতন

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    অষ্টম কল্প : সব নূতন

    >ভূমিষ্ঠ হবার পর ক্রমশঃ জ্ঞানোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শিশু যেমন জগৎসংসারের সমস্ত পদার্থই নূতন দেখে, বর্দ্ধমানে সর্ব্বানন্দবাবুর পবিত্র আশ্রমে আশ্রয় পেয়ে আমিও সেইরূপ সমস্ত পদাথই নূতন দেখতে লাগলেম। যা দেখি, সমস্তই নূতন; যা যা শুনি, আমার কর্ণে সমস্তই নূতন। এক বর্দ্ধমানেই নূতন জগৎ। সব নূতন। কর্ত্তার অনুমতি নিয়ে মধ্যে মধ্যে আমি নগরদর্শনে বাহির হই। এক একদিন এক একজন লোক সঙ্গে থাকে, এক একদিন আমি একা। নগরের পথ, ঘাট, দোকান, পসার, বাজার, লোকালয়, আদালত, একে একে দর্শন করি, সব যেন চমৎকার বোধ হয়। বর্দ্ধমানে এক মহারাজা থাকেন, মহারাজের সম্পদসমৃদ্ধি দেশবিখ্যাত। মহারাজের আসবাবপত্র সমস্তই সুন্দর সুন্দর। একে একে অনেকগুলি আমার দেখা হলো। রাজবাড়ী, রাজগাড়ী, রাজঠাকুর, রাজবাগিচা, রাজবানর, রাজতুরঙ্গ, রাজমাতঙ্গ, রাজমৎস্য, রাজবাদ্য, রাজসিপাহী, রাজসাগর, রাজ-পশুশালা, কৌতুকে কৌতুকে আমি সব দর্শন কোল্লেম। সকলগুলিই আশ্চর্য্য! মহারাজের চেহারা কেমন, অনেক দিন আমি দেখতে পাই নাই; একদিন অপরাহ্ণে জনাকীর্ণ রাজপথে রাজমূর্ত্তি আমি দর্শন কোরেছিলেম। বর্দ্ধমানের মহারাজ। শুনতেও যেমন নামটী জমকালো, চেহারাও তদ্রপ মনোহর; যেমন রূপ, তদুপযুক্ত বেশভূষা, তদপযুক্ত গাড়ী-ঘোড়া, তদপযুক্ত অনুচর-রেসালা। মহারাজকে যুগলহস্তে নমস্কার কোরে সেইদিন আমি আমাকে চরিতার্থ মনে কোরেছিলেম। কমলার কৃপায় মহারাজের সমস্তই পরম সুন্দর।

    রাজপথে আমি বেড়াই, দিন দিন কত কি দেখি, সকলগুলির নাম জানি না, কিন্তু দেখে দেখে বড় আমোদ হয়।—না না, বোলতে আমার ভুল হচ্ছে; সকলগুলি দেখে আমোদ হয় না। যেখানে জনতা অধিক, সেখানে ভাল-মন্দ সব রকম দেখা যায়, সুদৃশ্য-কুদৃশ্য, উৎকট বিকট, নানা প্রকার জীবপ্রবাহ নয়নগোচর হয়। মানুষের ভিতর বিকটমূর্ত্তি দর্শন কোরে ভয় হয়। মানুষেরা সৎকার্য্যে যেমন প্রতিষ্ঠাভাজন হয়ে থাকে, দুষ্কার্য্যেরত দুরাচার মনুষ্য তদ্রূপ নিন্দাভাজন হয়।

    কেবল এই পর্য্যন্ত ভেদ, এ কথাও বলা যায় না। সৎ-পুরষ দর্শনে মনে যেমন প্রীতি ও সন্তোষের আবির্ভাব হয়, দুষ্টলোক দর্শনে স্বভাবতঃ মনে সেইরপ ঘৃণার উদয় হয়ে থাকে। একটা দৃষ্টান্ত এইখানে আমি পাঠক-মহাশয়কে শুনাই।

    একদিন বৈকালে বাজারের কিঞ্চিৎ দূরে একাকী আমি ভ্রমণ কোচ্ছি, এমন সময় দেখি, একটা জায়গায় অনেক লোকের ভিড়। আমি একাকী, এ কথার অর্থ কি? যেখানে অনেক লোক, সেখানে কেন আমি একাকী বলি, এটাও একটা ক্ষুদ্র সমস্যা। গঠনে, চলনে, বর্ণে, কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ পার্থক্য থাকলেও সকল মনুষ্যই একাকার। দুই হস্ত, দুই পদ, এক মস্তক, এক বক্ষ, এক উদর সবাকার, তথাপি সকল মনুষ্যই ভিন্ন ভিন্ন কার্য্যে ভিন্ন ভিন্ন খ্যাতি লাভ করে। আমার যেমন আকার, ভিড়ের ভিতর সকল লোকের প্রায় সেই রকম। তবে কেন আমি একা?—আমি অপরিচিত, ভিড়ের ভিতর আমার চেনা লোক একজনও ছিল না; পূর্বে কোথাও দেখেছি, এমন একটীও লোক সেই জনতার মধ্যে দেখলেম না; সেই জন্যই আমি একাকী।

    কিসের ভিড়? সেই সময় কেহ আমাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা কোল্লে নিশ্চয়ই আমি বোলতেম, “কি জানি।”—এখন ঠিক উত্তর প্রদান কোত্তে পারি। খোলা জায়গা, ছোট মাঠ, চতুর্দ্দিকে ঘাসবন, একধারে একটা পুকুর; মাঠের ঘাসের উপর মস্ত একটা মশারি ফেলা; মশারির বাহিরে একটা লোক বোসে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মন্ত্র পোড়ে পোড়ে মস্ত একটা ঘণ্টা বাজাচ্ছে। আমি একটু দূরে ছিলেম, মন্ত্রগুলো কি, স্পষ্ট স্পষ্ট শুনতে পেলেম না, ভিড়ের সমারোহে কৌতুকী হয়ে পায়ে পায়ে নিকটবর্ত্তী হোলেম। তখন সেই মন্ত্রগুলা ঠিক ঠিক আমার কাণে এলো। লোক বোলছে :—

    “একখানা গরু।—সাতখানা পা!—তিনখানা পুশ্চ!—দুইখানা মুখ!—এক মুখে খায়, এক মুখে প্রস্রাব করে!—ভগবতীর স্বপ্ন!—দর্শনে সশরীরে স্বর্গবাস!—দর্শনী এক পয়সা।”

    মন্ত্র শুনেই আমার চক্ষু স্থির! বিধাতার সৃষ্টির বিষম বিপর্য্যয়। যে লোকটা ঘণ্টা বাজিয়ে ঐরূপ মন্ত্র পাঠ কোচ্ছিলো, সে লোকটার চেহারাও বিষম উৎকট! রং কালো, জোঁদা কালো; গঠন কতকটা দীর্ঘ, নীচের দিকটা হ্রস্ব; হাত-দুখানা মোটা মোটা পা-দুখানা সরু সরু; বুকখানা খুব খোলা; দু-ধারে উঁচু উঁচু দুটো ঢিবি; পেটের মাংস উপরদিকে উঠে সেদিকেও একটা ঢিবি বানিয়ে রেখেছে; মাথা হেঁট কোল্লে বুকের খালায় দাড়ী ঠেকে; দাড়ীতে চুল নাই, অথচ ত্রিকোণ আকারে অনেকটা লম্বা; নাকটা চ্যাপটা; চক্ষদুটো কোটরে বসা, সেই চক্ষু রক্তবর্ণ; ভাল কোরে দেখলে মনে হয় যেন দুটো গর্তের ভিতর দুটো জবাফুল ঘুরছে; কপালখানা প্রায় আধ হাত চওড়া; কাণের দিকে কিছুই নাই; মাথাটা নেড়া, কিন্তু খুব ডাগর : ঘাড় আছে কিনা অনুভব করা যায় না; বয়স আন্দাজ ৪০/৪২ বৎসর।

    লোকটার চেহারাও আমি নূতন দেখলেম, মন্ত্রগুলো নূতন শুনলেম। ভিড়ের লোকেরা এক এক পয়সা দর্শনী দিয়ে সশরীরে স্বর্গলাভের আশায় একে একে মশারির ভিতর ঢুকে সেই অদ্ভুত গরু দর্শন কোরে এলো। আমার প্রবৃত্তি হলো না, স্বর্গবাসের বাসনাও ছিল না, আমি গেলেম না : খানিকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফিরে এলেম। লোকটাকে চিনে রাখলেম। কে যেন আমাকে বোলে দিলে, এ লোকের অসাধ্য দুষ্কার্য্য কিছুই নাই।

    মন কেমন অস্থির হলো। সে দিন আর অন্য কিছু দর্শন করবার ইচ্ছা থাকলো না। আশ্রমে ফিরে যাবার জন্য পশ্চিমদিকের রাস্তা ধোল্লেম। রাস্তাটায় জোয়ার-ভাঁটার জলস্রোতের ন্যায় অনবরত নরনারীর স্রোত প্রবাহিত। পথে যেতে যেতে আমি মনে মা জগদম্বার সৃষ্টিতে কত রকম জীবজন্তুর খেলা হয়, জগদম্বাই জানেন। মানুষের জ্ঞান-গোচর হওয়া অসম্ভব। ভাবতে ভাবতে আশ্রমে ফিরে এলেম।

  • নবম কল্প : খুন!!!

    নবম কল্প : খুন!!!

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    নবম কল্প : খুন!!!

    চৈত্রমাস অতিক্রান্ত। বৈশাখ মাস আগত। বৈশাখে গ্রীষ্মাতিশয্য অনুভব হয়, প্রায় প্রত্যহ অপরাহ্ণে, আকাশে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের মেঘোদয় হয়, এক একদিন বাতাসে উড়ায়, এক একদিন বৃষ্টি পড়ে; ছোট ঝটিকা প্রায় প্রতিদিন; তথাপি এ দেশে বৈশাখমাসে বসন্ত-ঋতুর পরিশিষ্ট শোভা নয়নগোচর হয়ে থাকে। পল্লীগ্রামের প্রতি প্রকৃতিদেবীর কিছু বেশী অনুগ্রহ। তথায় নানাজাতি তরুলতা পল্লবিত—কুসুমিত হয়ে প্রকৃতির শোভাবর্দ্ধন করে, প্রস্ফুটিত পুষ্পগুলি সুসজ্জিত হয়ে চতুর্দ্দিকে সুগন্ধ বিতরণ করে, দক্ষিণদিক থেকে সুখস্পর্শ মলয়ানিল প্রবাহিত হয়, দিবসের শেষভাগ অতি রমণীয় বোধ হয়, এই সকল লক্ষণেই আমাদের বৎসরের প্রথম মাসকে বসন্তকাল বোলতে অনেক লোক ইচ্ছা করে। বর্দ্ধমান সহরের পশ্চিমপ্রান্ত-পল্লীতে বৈশাখমাসের সেইরূপ ক্রীড়াই আমি দর্শন করি; প্রমোদানন্দে চিত্ত পুলকিত হয়ে উঠে।

    মাসের দশম দিবসের সন্ধ্যার পর সর্ব্বানন্দবাবু আপন উপবেশনকক্ষে অনেকগুলি লোকের সঙ্গে সদালাপ কোচ্ছেন, নানা প্রকার জিনিসের মহাজন সেইখানে উপস্থিত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন দ্রব্যের বায়নাপত্র গ্রহণ কোচ্ছে, সর্ব্বানন্দবাবু, সকলের সঙ্গেই মিষ্টবাক্যে সম্ভাষণ কোচ্ছেন, বৈঠকখানা গুলজার!

    লোকেরা বিদায় হবার পর কর্ত্তা আমাকে ডেকে খানকতক পত্র লিখতে বোল্লেন। একখানিপত্র তিনি স্বহস্তে লিখে রেখেছিলেন, সেইখানি দেখে দেখে আমি প্রায় বিশ পঁচিশখানি নকল কোল্লেম। আশালতার বিবাহ। একমাস পূর্ব্ব থেকেই বিবাহের কথা আমি শুনে আসছিলেম, ঘটকেরা যাতায়াত কোচ্ছিলো, সম্প্রতি বিবাহসম্বন্ধ স্থির হয়েছে, এই মাসের পঞ্চবিংশ দিবসে শুভবিবাহ অবধারিত। পত্র-কখানি আমি লিখলেম, কর্ত্তা সেইগুলি একবার একবার দেখে আমার প্রতি সন্তুষ্ট হোলেন। কল্য শিরোনাম লেখা হবে, আমাকে এই কথা বোলে তিনি বাড়ীর ভিতর যাবার উপক্রম কোচ্ছেন, এমন সময় সেই খানে একজন লোক এলো। লোক এলো কি জানোয়ার এলো, চেহারা দেখে অগ্রে আমি সেটা ঠাওরাতে পাল্লেম না।

    লোকটা বেঁটে, কৃষ্ণবর্ণ, গঠন গাঁট গাঁট, একখানা হাত বড়, একখানা হাত ছোট; পা-দুখানা বাঁকা; বুক পেট সমান; মুখখানা গোল; ঠিক মানুষের মতন মুখ নয়, পুতুলে আর ছবিতে বাদরের মুখ যেমন দেখা যায়, চক্ষু কর্ণ নাসিকা ওষ্ঠ সর্ব্বাবয়বে ঠিক সেই রকমের মুখ; ওষ্ঠের দুই পার্শ্বে বরাহ অথবা হস্তীদন্তের ন্যায় বড় বড় দুটো দাঁত, দেখলেই ভয় হয়; মাথায় ঝুমরো ঝুমরো কোঁকড়া কোঁকড়া, লম্বা লম্বা অনেক চুল; কপালের চুলে চক্ষু পর্য্যন্ত ঢাকা পোড়েছে; মাথার মাঝখানে টাক; সৰ্ব্বাঙ্গে ভল্লকের ন্যায় লম্বা লম্বা লোম; কণ্ঠে একটী বৃহৎ কুঁজ; লোকটা একে বেঁটে, তার উপর কুঁজের ভার, দাঁড়ালে আরও বেঁটে দেখায়। কুঁজের মাপে জামা তৈয়ারী হয় না, সুতরাং গাত্রের লোমাবলী শীতকালে জামার কাজ করে। গ্রীষ্মকালে ঘামে ভিজে কিম্ভুতকিমাকার দেখায়।

    আমি সেই অবস্থায় সত্য সত্যই কিম্ভুতকিমাকার দেখলেম। ঘাড়ে গর্দ্দানে এক। গোঁফ-দাড়ী ছিল, কিন্তু যে লোকের সর্ব্বাঙ্গে গোঁফ-দাড়ী সে লোকের মুখের গোঁফ-দাড়ীর পরিচয় দেওয়া অনাবশ্যক; বাহুল্যপাঠ মাত্র।

    লোকটা এসেই চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে কর্ত্তাকেই জিজ্ঞাসা কোল্লে, “হরিদাস নামে কোন ছোকরা এই বাড়ীতে থাকে?”

    প্রশ্ন শুনেই আমি কেঁপে উঠলেম। চেহারাটা এতক্ষণ আমি ভয়ানক বোলেই জানছিলেম, এক একবার মানুষ বোলেও মনে হচ্ছিলো, কিন্তু এবার আর সে বিশ্বাস থাকলো না; মনে কোল্লেম, হয় হনুমান, না হয় রাক্ষস! মনে কোরেই সুট কোরে কর্ত্তার পশ্চাতে গিয়ে লুকালেম; থর থর কোরে কাঁপতে লাগলেম! আমার ভয় দেখে কৰ্ত্তা সেই লোকটাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “তুমি কে? তোমার নাম কি? হরিদাসের কথা তুমি কেন জিজ্ঞাসা কর?”

    মর্কটমুখো লোকটার চেহারা যেমন কদাকার, কণ্ঠস্বরও সেইরুপ বিকট কর্কশ। ভাঙা ভাঙা কাঁসী যেমন ঝন ঝন শব্দে বাজে, সেই রকম ভাঙা ভাঙা ঝনঝনে আওয়াজ। সেই আওয়াজে সেই কুঞ্জ রাক্ষসটা গর্জ্জন কোরে উত্তর কোল্লে, “কেন? ও কথা তুমি জিজ্ঞাসা কর কেন : আমি যা জিজ্ঞাসা কোল্লেম, সেই কথার উত্তর দাও। হরিদাস নামে কোন বালক এ বাড়ীতে আছে কি না?”

    লোকটার অভদ্রতার পরিচয় পেয়ে উত্তেজিতস্বরে কর্ত্তামহাশয় বোলেন, “আছে। কি তা? আমার কাছেই হরিদাস আছে; এই ছেলেটীর নাম হরিদাস।”

    আমার দিকে অঙ্গুলিসঙ্কেতে কৰ্ত্তামহাশয়ের এই উত্তর। কুঁজোটা আরো কর্কশ কণ্ঠে বোলতে লাগলো, “হরিদাস আমার ভাগ্নে হয়, আমি হরিদাসের মামা হই, আমার নাম জটাধর তরফদার। কাজকর্ম্ম শিক্ষার উদ্দেশে একটী ভদ্রলোকের কাছে ওকে আমি রেখেছিলেম, পালিয়ে এসেছে। ভারী দুষ্ট, ভারী অবাধ্য; কাজকর্ম্ম কিছুই কোরবে না, বেয়াড়া ছোঁড়াদের সঙ্গে কেবল মাঠে মাঠে ছুটে বেড়াবে, গাছে গাছে উঠে উঠে বনের পাখী ধোরে ধোরে মারবে, লোকজনের সঙ্গে দাঙ্গা-হাঙ্গামা কোরবে, এই ওটার মতলব। আমি ওটাকে নিতে এসেছি, ছেড়ে দাও, নিয়ে যাই।”

    বাতাসে যেমন কলাগাছ কাঁপে, রাক্ষসটার কথা শুনে সেই রকমে আমি কাঁপতে লাগলেম : দরদরধারে সৰ্ব্বশরীরে ঘাম ঝরতে লাগলো, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল; কৰ্ত্তার পশ্চাৎ থেকে একটুখানি মুখ বাড়িয়ে কুঁজোটার দিকে আর একবার চাইলেম! পান খেয়ে এসেছিল, যে সকল রাক্ষস কাঁচা কাঁচা গরু-মানুষ ধোরে ধোরে খায়, তাদের কস বেয়ে যেমন রক্তধারা গড়ায়, সেই মর্কটমুখোর দুই কস দিয়ে সেই রকম পানের পিক গড়াচ্ছিল, সেই পানের পিকে তার বড় বড় দুটো গজ-দাঁত লাল হয়ে গিয়েছিল; ঠিক যেন রক্তমাখা! সব দাঁতগুলোই বড় বড়, গজদাঁত-দুটো আরো বড়; সব দাঁত রক্তবর্ণ!

    মামা হয়ে আমাকে নিতে এসেছে, এই কথা শুনে কিছু কুপিতঘরে কর্ত্তা তাকে বোল্লেন, “তুমি হরিদাসের মামা, বিশেষ প্রমাণ না পেলে ও কথায় আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। হরিদাসের আপনার লোক কে কোথায় আছে, হরিদাস তা জানে না; জানবার জন্য খবরের কাগজে আমি বিজ্ঞাপন দিয়েছি, সে সকল বিজ্ঞাপনের ফলাফল না জেনে হরিদাসকে আমি কোথাও যেতে দিব না। তোমার কথা শুনে কেবল আমার সন্দেহ কিছুতেই বিশ্বাস হোচ্ছে না।”

    “বিশ্বাস হোচ্ছে না?”—দাঁত খিঁচিয়ে, ঘাড় বেঁকিয়ে, ব্যঙ্গচ্ছলে জটাধর বোল্লে, “বিশ্বাস হোচ্ছে না? আচ্ছা, আচ্ছা, দেখা যাবে। যে ভদ্রলোকের কাছে ওটাকে আমি রেখে দিয়েছিলেম, সেই ভদ্রলোককে তোমার কাছে আমি আনবো, তিনি মিথ্যাকথা জানেন না, তাঁরি মুখে সব কথা তুমি জানতে পারবে।”

    একটু নরম কথায় কৰ্ত্তা বোল্লেন, “হাঁ, হাঁ, সেই কথাই ভাল। ভদ্রলোক! সেই ভদ্রলোককেও আমি চাই! তোমার কথায় বিশ্বাস করা যেমন উচিত, তোমার সেই ভদ্রলোককেও এখানে হাজির করা সেইরূপ উচিত। বোধ হয়, সেই ভদ্রলোকের হাত থেকেই হরিদাসকে আমি উদ্ধার কোরেছি, তাকেও আমি চিনে রেখেছি, আজ তুমি চোলে যাও, কাল সেই লোককে নিয়ে এসো।”

    আমি একটীও কথা কইলেম না, কথা কইতে পাল্লেমই না। বোসে বোসে কাঁপছি আর ঘামছি, মকটমুখো আরো গর্জ্জন কোরে কর্ত্তার সঙ্গে কলহ বাধাবার উদ্‌যোগ কোল্লে। রাত্রিকালে অকস্মাৎ বৈঠকখানায় কিসের গোলমাল, জানবার অভিপ্রায়ে বাড়ীর তিন চারিজন আমলা আর চাকর তাড়াতাড়ি সেইখানে উপস্থিত হলো। সকলেই ঐ সব কথা শুনলে। লোকটাকে দেখে সকলেরি আতঙ্ক হলো; সকলেই দেখে বদমাস বিবেচনা কোরে তাড়িয়ে দিবার চেষ্টা কোত্তে লাগলো। ক্রমশঃ বাগবিতণ্ডায় গোলমাল আরও বেড়ে উঠলো।

    কৰ্ত্তা একা ছিলেন, কুঁজো পাছে জোর কোরে আমাকে কেড়ে নিয়ে যায়, এতক্ষণ আমার সেই ভয় হোচ্ছিলো, আমলারা সহায় হোলেন দেখে, একটু ভরসা পেলেম। কৰ্ত্তাকে কিছু বলি বলি মনে কোচ্ছি, এমন সময় বৈঠকখানা ঘরের উত্তরদিকের একটা দরজা খুলে গেল। একটী নীলবসনা কুমারী ধীরে ধীরে সেই ঘরে প্রবেশ কোল্লেন। কে এই কুমারী?—আশালতা।

    আশালতা অল্পবয়স্কা, অবিবাহিতা বালিকা, কি দিবা, কি রাত্রি, মধ্যে মধ্যে বৈঠকখানায় এসে পিতার সঙ্গে কথা কন, বই পড়েন, ছবি দেখেন, পুতুল নিয়ে খেলা করেন; লজ্জা করবার বয়স হয় নাই, লজ্জা করেন না। ঘরে প্রবেশ কোরেই সেই কুজ্জাকার রাক্ষসমূর্ত্তি নিরীক্ষণ কোরে বালিকা অত্যন্ত ভয় পেলেন, স্বভাবসিদ্ধ কোমলকণ্ঠে পিতাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “বাবা! ওটা কে? ওটা এখানে কেন এসেছে? ওটা বলে কি? এখানে এত গোলমাল হোচ্চে কেন?”

    কর্ত্তা উত্তর কোল্লেন, “কে ও, আমি জানি না। ও বোলছে, হরিদাসের মামা হয়, হরিদাসকে নিয়ে যেতে এসেছে।”

    এক নিশ্বাস ফেলে, গালে হাত দিয়ে, আশালতা বোল্লেন, “ও বাবা! হরিদাসের মামা! না বাবা, ও কখনই হরিদাসের মামা নয়, ও কখনই মানুষ নয়! হরিদাস এমন সুন্দর, হরিদাসের মামা কি ঐরকম? না বাবা, ওর সঙ্গে তুমি হরিদাসকে ছেড়ে দিয়ো না।”

    কন্যার কথায় একটু হাস্য কোরে, কুঁজোটার দিকে চেয়ে কর্ত্তামহাশয় বোল্লেন, “দেখ দেখি, শোন দেখি, এই ক্ষুদ্র বালিকা কি বলে! তুমি হরিদাসের মামা, কেহই এ কথা বিশ্বাস কোরবে না। তবে যদি বিশেষ প্রমাণ দিতে পার, আর সেই—আর সেই যার কথা তুমি বোলছো, তোমার সেই ভদ্রলোককে যদি হাজির কোত্তে পার, তা হোলে বিবেচনা করা যাবে। আজ তুমি মানে মানে বিদায় হও।”

    প্রতিধ্বনি কোরে আশালতা বোল্লেন, “সেই ভাল, সেই ভাল, বিদায় কোরে দাও, হরিদাসকে তুমি কোথাও যেতে দিয়ো না, আমিও যেতে দিব না। কোথাকার মামা, কোথাকার ভদ্রলোক, কোথাকার কে, ওর সঙ্গে কি আমাদের হরিদাসকে যেতে দিতে আছে? দিয়ো না, দিয়ো না। যে-ই হোক, ওকে তুমি এখনি তাড়িয়ে দাও।”

    আশালতার মধুর বচনগুলি শ্রবণ কোরে, অভয় পেয়ে আমি তখন কর্ত্তার কাছ থেকে সোরে আশালতার কাছে গিয়েই দাঁড়ালেম, কুঁজোটার দিকে চাইলেম না; আশালতার মুখের দিকে মুখ রেখে, পশ্চাদ্দিকে অঙ্গুলি হেলিয়ে, সভয়বদনে আতঙ্কে আতঙ্কে কুঁজোটাকে দেখিয়ে দিতে লাগলেম।

    কুঁজোটাকে সম্বোধন কোরে কৰ্ত্তা পুনরায় বোল্লেন, “শুনলে জটাধর, শুনলে। মেয়েটী কি বোলছে, শুনতে পেলে। সকলেই ঐ কথা বোলবে : বিশেষ প্রমাণ না পেলে কেহই তোমার মুখের কথায় বিশ্বাস কোরবে না। তুমি চোলে যাও।”

    গম্ভীর কর্কশগর্জ্জনে কুঁজোটা বোলতে লাগলো, “এখনো ঐ কথা? এখনো বিশ্বাস হোচ্ছে না? বিশেষ প্রমাণ! আচ্ছা, আচ্ছা, আমার উকীলের মুখে তুমি বিশেষ প্রমাণ পাবে, বিশেষ প্রতিফল তোমাকে ভোগ কোত্তে হবে। পরের ছেলেকে—পরের ভাগ্নেকে গুম করার দাবীতে তোমার নামে আমি নালিশ আনবো। আমি তোমাকে—”

    কথা সমাপ্ত কোত্তে না দিয়ে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে, কর্ত্তা তখন বোলেন, “যাও যাও, চোলে যাও, তোমার শাসানীতে আমি ভয় করি না। তুমি যা কোত্তে পার কোরো, তোমার উকীল যা কোত্তে পারে, কোত্তে বোলো। বিনা প্রমাণে তোমার হাতে হরিদাসকে আমি কখনই দিব না।”

    কুঁজো দেখলে, জোরজবরদস্তী খাটবে না, বলপ্রকাশ কোত্তে গেলেই বিভ্রাট ঘোটবে, কাজে কাজে সে রাত্রে আর বাগবিতণ্ডা না কোরে, চক্ষু পাকিয়ে আড়ে আড়ে আমার দিকে চাইতে চাইতে রাগে ফুলতে ফুলতে, আপন মনে বিড় বিড় কোরে বোকতে বোকতে, এঁকেবেঁকে উপর থেকে নেমে গেল। চাকরের পশ্চাৎ পশ্চাৎ হাততালি দিতে দিতে, হো হো শব্দে গোল কোরে উঠলো। দেউড়ীতে একজোড়া কৃষ্ণবর্ণ প্রকাণ্ড কুক্কুর ছিল, তারাও ঘেউ ঘেউ রবে রাক্ষসটাকে ফটক পার কোরে দিয়ে এলো।

    আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেম, বোধ হলো যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে গেল; সে যাত্রা রক্ষা পেলেম। রাত্রি অনেক হয়েছিল, আহারাদি সমাপ্ত হোলো, রাক্ষসের কথা বলাবলি কোত্তে কোত্তে সকলে যথাস্থানে শয়ন কোল্লেন, আমিও প্রেতমূর্ত্তি ভাবতে ভাবতে অনেকক্ষণ জেগে জেগে শেষরাত্রে নিদ্রাভিভূত হোলেম।

    রজনী প্রভাত। আশালতার বিবাহের আয়োজনে লোকজন সকলেই ব্যস্ত। পাঁচদিন অতীত। ১৬ই বৈশাখ। বিবাহের আটদিন মাত্র বাকী। আটদিন থাকতেই বাড়ী-মেরামত আরম্ভ হলো, ঘর সাজাবার ব্যবস্থা হলো, জিনিসপত্র, আমদানী হোতে লাগলো, ফটকের দুধারে দুটী পাকা নবৎখানায় নবৎবাজা আরম্ভ হলো। ১৬ই বৈশাখের দিবা-রজনী আকাশমণ্ডল মেঘাচ্ছন্ন, দিবা-ভাগে একবারও সূর্য্যমূর্ত্তি দর্শন হলো না, রাত্রিকালেও নক্ষত্র উঠলো না। ১৭ই বৈশাখ প্রাতঃকালে গুড়ুনি গুড়ুনি বৃষ্টি আরম্ভ, আকাশের দৃশ্য ভয়কর, দিনমানেই অন্ধকার! বৈকালে অল্প অল্প হাওয়া উঠলো, বেলা যতই শেষ হয়ে এলো, ততই জোর হাওয়া। সন্ধ্যাকালে ঝড়; ঝড়ের সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি। মেঘে গর্জ্জন থাকলো না, কালো অন্ধকার মেঘ, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের চকমকি। রাত্রে কেহই আর বাড়ী থেকে কোথাও যেতে পাল্লে না, রাত্রের সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের বেগবৃদ্ধি, বৃষ্টির অবিরাম। সকলেই চিন্তাযুক্ত। নিয়মিত আহারাদির পর সকলে শয়ন কোল্লেন, অট্টালিকা নিরাপদ, ঝড়বৃষ্টিতে কোন হানি হবার ভয় ছিল না, জানালা-দরজা বন্ধ কোরে সকলেই সুখনিদ্রা সম্ভোগ কোত্তে লাগলেন। কত রাত্রি পর্য্যন্ত ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল, রাত্রের মধ্যে থেমেছিল কি না থেমেছিল, তা আমার মনে নাই; ভোরবেলা ভারী একটা গোলমালে আমি জেগে উঠলেম। কেন গোলমাল, কিসের গোলমাল, ব্যাপারখানা কি, জানবার জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে উপর থেকে আমি নেমে এলেম।

    বাড়ীর সকলেই তখন জেগেছে। সদরবাড়ীর উঠানে গোটাকত আধপোড়া মশাল, খানকত চূণমাখা বাখারি, আর পাঁচ-সাতটা জলের কলসী পোড়ে আছে। ডাকাত পোড়েছিলো, বাড়ীতে ডাকাতী হয়ে গেছে, ভোরের সময় ডাকাতেরা পালিয়েছে, এই রকম সোরগোল শুনে ভয়েই আমি আড়ষ্ট! অকস্মাৎ অন্দরমহলে রোদনের কোলাহল! স্ত্রীলোকগণের অত্যুচ্চ ক্রন্দনধ্বনিতে বাড়ীখানা যেন প্রতিধ্বনিত হোতে লাগলো। ব্যাপার কি? ব্যাপার কি?” এই কথা বোলতে বোলতে, চাকরেরা অদরমহলে ছুটে গেল! হাহাকার কোত্তে কোত্তে বাহিরে ছুটে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বোল্লে, “সৰ্ব্বনাশ হয়েছে! ডাকাতেরা কর্ত্তাবাবুকে বিছানার উপরে কেটে রেখে গিয়েছে! রক্তের ঢেউ খেলছে।”

    আমার মাথায় যেন বজ্রঘাত হলো! জ্ঞানশূন্য হয়ে উঠানের মাঝখানে আমি আছাড় খেয়ে পোড়লেম। লোকেরা অনেক যত্নে অনেক কষ্টে আমার চৈতন্যসম্পাদন কোরেছিল। না কোল্লেই ভাল হোতো, চেতন পেয়ে আমি দশদিক অন্ধকার দেখতে লাগলেম, বন বন শব্দে মাথা ঘুরতে লাগলো : চেতন পেলেম, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান থাকলো না; উন্মত্তের ন্যায় “হা কর্ত্তা! হা পিতা! হা আশ্রয়দাতা! হা রক্ষাকর্ত্তা! হা দয়ার সাগর! আমাদের সকলকে অতলে ভাসিয়ে আপনি কোথায় চোলে গেলেন? সংসারে কেহই আপনার শত্রু ছিল না, কে এমন শত্রুতাবাদ সাধলে? কোথা থেকে ডাকাত এলো? কেন এমন সৰ্ব্বনাশ কোরে গেল?”—বারংবার আর্ত্তস্বরে এইরূপ বিলাপ কোত্তে কোত্তে মস্তকে বক্ষে ঘন ঘন করাঘাত কোত্তে লাগলেম। বাড়ীময় ক্রন্দনের কোলাহল!

    গৃহিণী মূর্চ্ছিতা! পিতৃশোকে আশালতা মূর্চ্ছিতা! দাস-দাসী, আত্মীয়-কুটুম্ব-চাকর-লোকজন, সকলেই শোকাকুল! রাত্রের মহা ঝটিকা অপেক্ষা এখন যেন এ বাড়ীতে প্রবল-ঝটিকার প্রাদুর্ভাব। আর একটা আশ্চর্য্য ব্যাপার! সদর দরজা বন্ধ ছিল। যেমন বন্ধ, ঠিক সেইরূপ বন্ধই আছে, ডাকাতেরা তবে কোন পথে এসেছিল, কোন পথ দিয়ে পালিয়েছে, সকলেই বিস্ময়ে বিস্ময়ে সেই কথা বলাবলি কোত্তে লাগলো।

    মহা ঝটিকার পর প্রকৃতি প্রশান্ত হয়, এ বাড়ীতে প্রকৃতি নিতাই অশান্ত! কেবল ক্রন্দনধ্বনি ব্যতীত আর কিছুই শ্রুতিগোচর হয় না। আকাশ পরিষ্কার; উজ্জ্বল প্রভাত; আকাশে উজ্জ্বল সূৰ্য্য সমুদিত; গত দিবসের মেঘাবৃত গগনে আর এক বিন্দুও মেঘ নাই। সেরেস্তার সর্দ্দার আমলা স্বয়ং পুলিশের থানায় গিয়ে ডাকাতীর সমাচার এজাহার কোল্লেন। থানার দারোগা প্রায় এক কুড়ি বরকন্দাজ সঙ্গে নিয়ে তদারকে এলেন। জমাদারের বগলে এক দিস্তা কাগজ, মুন্সীর কর্ণে ময়ূরপুচ্ছের কলম; ভারী ঘটা!

    তদারক আরম্ভ হলো। পোড়া মশাল, সাদা বাঁখারি, জলের কলসী, এই তিনটী ঐ ডাকাতীর সাক্ষী। দারোগা-মহাশয় ঘরে ঘরে তদন্ত কোরে জানতে পাল্লেন, জিনিসপত্র কিছুই যায় নাই, স্ত্রীলোকের অলঙ্কার সমস্তই আছে, জানালা-দরজা যেমন তেমনি আছে, ডাকাতেরা সিন্দুক-বাক্স কিছুই ভাঙে নাই। যে ঘরে কৰ্ত্তা থাকেন, সেই ঘরখানি ছাড়া অন্য ঘরে ডাকাত প্রবেশ কোরেছিল কি না, তারও কোন চিহ্ন নাই। কর্ত্তা একাকী আপন শয়নকক্ষে খট্টার উপর নিদ্রিত ছিলেন, গৃহিণী সে রাত্রে সে ঘরে ছিলেন না, আশালতাকে নিয়ে অন্যঘরে শুয়েছিলেন। সে ঘরের দরজা বন্ধ ছিল, সে ঘরে ডাকাত প্রবেশ করে নাই। অন্যান্য ঘরের দরজা খোলা ছিল না, সেই সকল ঘরে যাঁরা যাঁরা ছিলেন, প্রভাতে তাঁরাই ভিতরদিক থেকে দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়েছেন। সকলের জবানবন্দীতে এইরুপ প্রমাণ হলো। দারোগা-মহাশয় সকল কথাই রিপোর্টে লিখে নিলেন। কর্ত্তার ঘরের দরজা প্রতি রাত্রেই খোলা থাকে, সে রাত্রেও খোলা ছিল, সেই ঘরেই খুন। বিছানায় রক্ত ছড়াছড়ি, বালিসের কাছে বৃহৎ একখানা রক্তমাখা ছোরা, কৰ্ত্তার কণ্ঠদেশ মাঝামাঝি কাটা।

    আরো এক আশ্চর্য্য এই যে, ডাকাতেরা সে ঘরেরও কোন জিনিসপত্রে হাত দেয় নাই, সিন্দুক-বাক্সও ভাঙে নাই, সিন্দুক-বাক্সের চাবী কৰ্ত্তা নিজেই রাখতেন, রাত্রিকালে বালিসের নীচেই রিঙে গাঁথা চাবীর গোছা থাকতো, ঠিক আছে, কেহই সরায় নাই। বেশ জানা গেল, জিনিসপত্রের লোভে এ ডাকাতী নয়।

    তবে এ ডাকাতীর অর্থ কি?—বাড়ীতে ডাকাত পোড়লো, জিনিসপত্র নিলে না, অলঙ্কারপত্র ছুঁলে না, কেবল গৃহস্বামীকেই প্রাণে মেরে রেখে গেল, ব্যাপার অবশ্যই অদ্ভুত। এমন শত্রুতা কার সঙ্গে ছিল?

    পুলিশের লোকেরা একটা না একটা অছিলা পেলেই আপনাদের স্বার্থের দিকে বেশী ঝোঁক রাখেন। যে সময়ের কথা আমি বলছি, সে সময়ে সে ঝোঁকটা আরও কিছু বেশী ছিল। যাদের বিপদ, তাদের উপরেই বেশী জুলুম করা সে কালের দারোগাদের বিলক্ষণ অভ্যাস ছিল, এখনও আছে, কিন্তু সৰ্ব্বত্র তত নাই। চুরি, ডাকাতী, খুন, অপঘাতমত্যু ইত্যাদি বড় বড় অভিযোগে গৃহস্থের উপর দৌরাত্ম্য অতি প্রবল হয়। এদেশের প্রভুরা এক এক জায়গায় ঠিক সেই ভাব দেখান।

    পাইক বরকন্দাজ প্রভৃতি ছোট বড় শান্তিরক্ষকগণের সে সময়ের সদরবাড়িতে সাধুলোকের হৃদয়ে বিষম ভয়ের সঞ্চার হয়।

    তদারকের অনেক দূর সমাপ্ত কোরে দারোগা-মহাশয় দলবল সহ সদরবাড়িতে গেলেন। সেই সময় আর এক গুরতর সমস্যা উপস্থিত হলো। সমস্ত রাত্রি সদর দরজা বন্ধ, খিড়কীদরজা বন্ধ, খিড়কীর প্রাচীরগুলাও উচ্চ উচ্চ, ডাকাত তবে কোন পথে এসেছিল? কোন পথ দিয়েই বা বাহির হয়ে গেল? দারোগা-মহাশয় এই প্রশ্ন উত্থাপন কোরে মুখের কথায় রায় দিলেন, “ডাকাতীর সংবাদ মিথ্যা, বাড়ীর লোকেরাই শত্রুতা কোরে কর্ত্তাটীকে কেটে ফেলেছে, মিছামিছি গোটাকতক পোড়া মশাল আর খানকতক চূণমাখা বাঁখারি উঠানের মাঝখানে ফেলে রেখেছে। সর্বৈব মিথ্যা।” মুল কথা, কিছু, মোটা ধরণের দক্ষিণলাভ হোলে এ সকল কথা বোধ হয়, উত্থাপিত হোতো না। জমীদারের বাড়ীতে জমীদার খুন, সে ক্ষেত্রে বেশী দক্ষিণার আশা করা পুলিশের লোকের স্বভাবসিদ্ধই হওয়া উচিত, কিন্তু কে টাকা দিবে, কেন দিবে, সে কথার মীমাংসা না হওয়াতে পুলিশ কিছু ক্ষুন্ন হোলেন, তাঁদের মনে মনে রাগও হলো। হলো হলোই, সে রাগের উপশম করা বাড়ীর লোকের সাধ্য নয়, কাজে কাজে দারোগা তখন ডাক্তার ডাকবার হুকুম দিলেন।

    একজন ডাক্তার এলেন, মৃতদেহ পরীক্ষা কোল্লেন, যেমন দস্তুর, সেই রকম আপন মন্তব্য লিখে দারোগার হাতে দিলেন;— “ছোরা দিয়ে কাটা, বেশী রাত্রে কাটা, যারা অস্ত্ৰচালনে শিক্ষিত ও সুপটু তাদের মধ্যেই একজন কর্ত্তাকে খুন কোরেছে, ইহাতে সন্দেহমাত্র নাই।” ডাক্তারের সাটিফিকেটখানি পুলিশের রিপোর্টের সঙ্গে চালান হবে, সুতরাং সেখানি দারোগার হাতেই থাকলো।

    এই সকল কাণ্ড হোচ্ছে, এমন সময় বাড়ীর দুজন চাকর তাড়াতাড়ি সেইখানে ছুটে এসে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বোল্লে, “ভারা বেয়ে লোক উঠেছিল, আশালতার বিবাহের জন্য বাড়ী মেরামত হোচ্ছিল, বাইরে ভারা বাঁধা ছিল, সেই ভারার বাঁশের উপর কাদামাখা মানুষের পায়ের দাগ। গোটাকতক দাগের সঙ্গে রক্ত দেখা যাচ্ছে, দু-পাঁচটা বাঁশের বাঁধনদড়ীও আলগা হয়ে গিয়েছে, কজন লোক এসেছিল, ঠিক জানা গেল না, কিন্তু ভারা বেয়ে মানুষ উঠা, সে স্পষ্টই জানা গেল।”

    দারোগা-মহাশয় এই প্রমাণে গভীরবদনে খানিকক্ষণ মাথা হেঁট কোরে রইলেন, শেষকালে মৌনভঙ্গ কোরে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “পুরুষ ওয়ারীস কে আছে?” সেরেস্তার দেওয়ানজী অগ্রবর্ত্তী হয়ে উত্তর কোল্লেন, “আপনি তো সকলি জানেন, পুরুষ ওয়ারীস কেহই নাই, তবে জামাইবাবু, কন্যাদের পক্ষে অভিভাবক হবেন। তাঁকে সংবাদ দেওয়া হয়েছে, তিনি এলেই লাস জ্বালাবার ব্যবস্থা হবে। কৰ্ত্তার বড়মেয়েটীকে, মেজোমেয়েটীকে আর জামাইবাবুকে সংবাদ দেওয়া হয়েছিলো, কে কতক্ষণে পৌঁছিবেন, সেই অপেক্ষায় দারোগা মহাশয় সেই বাড়ীতেই থাকলেন। জামাইবাবুর বাড়ী অধিক দূর ছিল না, খুব শীঘ্রই তাঁর পত্নীকে সঙ্গে কোরে তিনি এসে উপস্থিত হলেন; সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে নিজেকে সামাল দিয়ে দু-এক ফোঁটা অশ্রুপাত কোল্লেন। কন্যা উমাকালী পিতার নিকটে গিয়ে হাহাকার কোত্তে লাগলেন, তাঁর সঙ্গে বাড়ীর লোকগুলির ক্রন্দন এমন উচ্চে পৌঁছল যেন বাতাস পর্য্যন্ত কাঁপাতে লাগলো।

    এদিকে অন্য বন্দোবস্ত। মৃতদেহ হাসপাতালে চালান না দিয়ে সহজে যাহাতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাধা হয়, জামাইবাবু দারোগাকে সেইরূপ অনুরোধ কোল্লেন। খানিক্ষণ ইতস্ততঃ কোরে দারোগা মহাশয় দুই একটা কূটতর্ক উত্থাপন কোল্লেন, শেষকালে গোপনে আশামত সেলামী পেয়ে জল হয়ে গেলেন; গৃহস্থের তত বিপদেও তাঁর গম্ভীরবদনে মৃদু হাস্য দেখা দিল, লাস জ্বালাবার হুকুম দিয়ে জামাইবাবুর সঙ্গে আত্মীয়তা কোরে তিনি তখন বিদায় হোলেন।

    শ্মশানে সর্ব্বানন্দবাবুর মৃতদেহের সৎকার হলো। শোকের বেগ কতকটা থামলো। সন্ধ্যার কিছু পূর্ব্বে জ্যেষ্ঠা কন্যা শ্যামাসুন্দরী রোদন কোত্তে কোত্তে বাড়ীতে এসে উপস্থিত হোলেন। গোলমাল, ক্রন্দন, হাহাকার, নানাকথা ইত্যাদি এ সকল কার্য্যের অঙ্গ। জামাইবাবু সকলকে প্রবোধ দিয়ে ঠাণ্ডা করবার চেষ্টা কোল্লেন, কতক পরিমাণে কৃতকার্য্যও হোলেন। চতুর্থ দিবসে কন্যারা নিয়মিত কাৰ্য্য সমাধা কোরে শুদ্ধ হোলেন। নির্দ্ধারিত সময়ে গৃহিণী ঠাকুরাণী পতির ঔদ্ধদৈহিক কার্য্য সম্পন্ন কোল্লেন। গোলমাল অনেকটা থেমে গেল।

  • দশম কল্প : উইলপাঠ

    দশম কল্প : উইলপাঠ

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    দশম কল্প : উইলপাঠ

    মোহনলালবাবু সৰ্ব্বদাই ব্যস্ত, সৰ্ব্বক্ষণ চঞ্চল। কি জন্য যে তত ব্যস্ততা, সকল লোকে সেটা অনুভব কোত্তে পাল্লে না। মোহনলালের শোক অপেক্ষা উদ্বেগ অধিক, সেটা আমি বেশ বুঝতে পাল্লেম। সংসারের প্রকৃতি এই যে, যাদের সঙ্গে শোণিত-সম্পর্ক, যাদের সঙ্গে নিকট-সম্পর্ক, কারো বিয়োগে তাদেরি শোক অধিক হয়, অপর লোকের ততটা হয় না। আমি একজন অপর লোক, সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্ক, তথাপি আমি যেন বুঝলেম, সৰ্ব্বাপেক্ষা আমারি অধীরতা অধিক হয়ে দাঁড়ালো। কেন এমন বিপর্য্যয়?—জন্মাবধি আমি নিরাশ্রয়, এই মহৎলোকের আশ্রয় পেয়েছিলেম, তিনি আমাকে ফাঁকী দিয়ে চোলে গেলেন, দুষ্টলোকে অন্ধকারে তাঁকে খুন কোরে গেল, আবার আমি নিরাশ্রয় হয়ে পোড়লেম। কে আর আমাকে আশ্রয় দিবে? সংসারে আমার আপনার লোক কেহই নাই, লোকের বরং মাথা রেখে থাকবার এক-আধখানা পর্ণকুটীর থাকে, আমার ভাগ্যে তা পর্য্যন্ত নাই। গৃহিণী যদি দয়া না করেন, তবে আমি যাব কোথা, খাব কি, সৰ্ব্বক্ষণ সেই ভাবনা; সেই ভাবনাতেই; আমার অধিক শোক।

    একমাস অতীত হয়ে গিয়েছে। বাবু মোহনলাল একদিন বৈকালে পাড়ার দশজন ভদ্রলোককে ডেকে প্রস্তাব কোল্লেন, “বিষয়াদি-বণ্টনের কিরূপ ব্যবস্থা হবে, সেইটীই এই সময় নির্ধারণ করা হোক। যা হবার, তা তো হয়ে গেল, তিনি তো আর ফিরে আসবেন না, এখন যারা থাকলে, তাদের একটা ব্যবস্থা করা ধর্ম্মসঙ্গত কাৰ্য্য। কৰ্ত্তা আমাকে বোলেছিলেন, উইল করা হয়েছে, সিন্দুকে উইল আছে। আপনারা চলন, আপনাদের সকলের সাক্ষাতে সিন্ধুকটী খুলে উইলখানি দর্শন করা যাক।”

    একটী ভদ্রলোক বল্লেন, “অবশ্য কর্তব্য। আমরা তো থাকবোই, কিন্তু একজন সরকারী লোক উপস্থিত থাকা আবশ্যক; সেইটাই বিধিসিদ্ধ কার্য্য। পুলিশের দারোগাকেই মাঝখানে দাঁড় করানো ভাল।”

    তাই-ই মঞ্জুর। মোহনবাবু নিজেই পুলিশে গেলেন, দারোগার সঙ্গে তাঁর সদ্ভাব ছিল, বিশেষতঃ তদন্তের দিন সেলামী দান করা হয়েছে, তিনি তুষ্টও ছিলেন, আহ্বানমাত্রই মোহনবাবুর সঙ্গে তিনি আগমন কোল্লেন। কৰ্ত্তার শয়নগহে সকলেই উপস্থিত। কর্ত্তার চাবীগুলি দারোগা পেয়েছিলেন, কিন্তু নিজে রাখেন নাই, সাক্ষাৎ উত্তরাধিকারিণী গৃহিণী, তাঁর কাছেই চাবীগুলি ছিল। চাবীর তাড়াটী চেয়ে নিয়ে বাবু মোহনলাল একটু সন্দিগ্ধবদনে বোল্লেন, “কোন সিন্দুকে উইল, তা তো ঠিক জানা নাই, এক এক কোরে সব সিন্দুকগুলি খুলে দেখতে হবে।” সকলে সেই কথাতেই সায় দিলেন, সৰ্ব্বসম্মতিতে সেইরূপ কাৰ্য্যই আরম্ভ হলো।

    ঘরে পাঁচটী সিন্দুক! একে একে পাঁচটী সিন্দুক খোলা হলো। অন্য জিনিস পাওয়া গেল, উইল পাওয়া গেল না।

    বলা উচিত, ভদ্রলোকগুলির সঙ্গে সেই দিন সেই সময় আমিও সেই ঘরে উপস্থিত হয়েছিলেম। মোহনবাবু রঙ্গ দেখে আমার বড় বিস্ময়বোধ হলো। পাঠক-মহাশয়ের স্মরণ থাকতে পারে, যে রাত্রে শ্বশুর-জামাই দুজনে নির্জ্জনে বৈঠকখানায় বোসে কথোপকথন করেন, পুস্তকাগারের দ্বারের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে আমি শুনেছিলেম, কর্ত্তাবাবু জামাইবাবুকে ভর্ৎসনা কোরে শাসিয়ে বোলেছিলেন, “ঐ সিন্দুকে উইল আছে।” সে সিন্দুক বৈঠকখানায়। অন্দরের শয়নকক্ষে পাঁচটী সিন্দুক খোলা হলো, সে সকল সিন্দুকে উইল ছিল না, মোহনবাবু অবশ্যই তা জানতেন, জেনেও যেন ন্যাকা সেজে লোকগুলির কাছে সাঁচ্চা হবার ভূমিকা কোল্লেন। পাঁচটী সিন্দুকে উইল পাওয়া গেল না, বৈঠকখানায় লৌহসিন্দুকে আছে, সেইখানে যাওয়াই স্থির হলো। সকলে চোল্লেন, আমিও সঙ্গে সঙ্গে চোল্লেম। মনে আমার দারুণ সন্দেহ।

    মোহনবাবু কেমন প্রকৃতির লোক, সেটা আমার ভাল জানা ছিল না। আমাকে প্রথম দেখে তিনি চোমকেছিলেন, আমাকে নিজবাড়ীতে নিয়ে যাবার জন্য কর্ত্তার কাছে অভিপ্রায় জানিয়েছিলেন, সে কথা আমার মনে আছে। তাঁকে দেখে আমার ভয় হয়। সেবারে কেবল এক রাত্রিমাত্র এ বাড়ীতে ছিলেন, আমার সঙ্গে বেশীক্ষণ দেখাশুনা হয় নাই, একটী কথাও হয় নাই। কর্ত্তার কথা শুনে জামাইবাবুর চরিত্র সম্বন্ধে কিছু জেনেছিলেম, স্বভাব ভাল নয়, এইটুকু মাত্র আমার ধারণা হয়েছিল। এখন একমাসের অধিক দিন আমার সঙ্গে দেখাশুনা, দুই একটী কথাও হয়, কিন্তু আমি বেশীক্ষণ তাঁর সম্মুখে থাকি না, আশেপাশে ঘুরে ঘুরে বেড়াই। এক একবার মনে কোন সন্দেহ আসে, তাঁর সঙ্গে দেখা হবামাত্রই কিম্বা তিনি আমার দিকে আসবেন, বুঝতে পাল্লেই ধাঁ কোরে সেখান থেকে আমি সোরে যাই। কেন এমন ভয়, কেন এমন সন্দেহ তখনো পর্য্যন্ত সেটা আমি ভাল কোরে বুঝতে পারি নাই। আজ আবার উইলের প্রসঙ্গে নূতন সন্দেহ। কোথায় উইল, জেনেও জানেন না। সিন্দুকটী দেখিয়ে দিয়ে কর্ত্তা তাঁকে স্পষ্টাক্ষরে বোলেছিলেন, ঐ সিন্দুকে উইল আছে। এখন তিনি যেন ন্যাকা লোক, সে কথা যেন ভুলেই গিয়েছেন।

    যা-ই হোক, বৈঠকখানায় আসা হলো, লৌহসিন্দুক খোলা হলো, উইলখানা পাওয়া গেল। সিন্দুকে আরও পাঁচরকম অল্পমূল্যের জিনিসপত্র ছিল, টাকাকড়ি ছিল না, খান দুই তিন সাদা ষ্ট্যাম্পকাগজ আর সেই উইলখানি।

    উইলখানি হাতে নিয়ে, সকলের দিকে চেয়ে, মোহনবাবু বোল্লেন, “আপনাদের মধ্যে একজন এইখানি পাঠ করুন।” সমবেতবাক্যে সকলে সমস্বরে বোল্লেন, আমাদের কেন, সরকারের লোক দারোগা-মহাশয়, ইনিই পাঠ করুন। সৰ্ব্বসম্মতিতে দারোগামহাশয় উইল পাঠ কোল্লেন। উইলে লেখা ছিল:—

    “আমার তিনটী কন্যা। প্রথমা শ্যামাসুন্দরী, দ্বিতীয়া উমাকালী, তৃতীয়া আশালতা। শ্যামাসুন্দরী বিধবা, আশালতা অবিবাহিতা। আমার। * * * নম্বরের জমীদারী এবং ৭৫ হাজার টাকার কোম্পানীর কাগজ এবং ভদ্রাসনবাটী ও বাগানবাটী ইত্যাদি যাহা কিছু আছে, আমার সম্ভাবিত পুত্রিকা মধ্যমা কন্যা শ্রীমতী উমাকালী দাসী প্রাপ্ত হইবেন। আমার জামাতা উক্ত উমাকালী দাসীর স্বামী শ্ৰীযুক্ত মোহনলাল ঘোষ তাহার অছি ও অভিভাবক থাকিবেন। আমার জ্যেষ্ঠা কন্যা শ্যামাসুন্দরী দাসী মাসে মাসে একশত টাকা মাসহারা পাইবেন, কনিষ্ঠা কুমারী কন্যা শ্রীমতী আশালতা দাসীর শুভবিবাহ যদি আমি জীবদ্দশায় সম্পাদন করিয়া না যাইতে পারি, তাহা হইলে আমার জীবনান্তে উক্ত মোহনলালবাবু দুই সহস্র মুদ্রা ব্যয় করিয়া উপযুক্ত পাত্রে আশালতাকে সম্প্রদান করিবেন। আশালতার গর্ভে পুত্রসন্তান জন্মিলে আমার মধ্যমা কন্যা উল্লিখিত উমাকালী দাসী আপন প্রাপ্ত সম্পত্তির তৃতীয়াংশ সেই পুত্রকে অথবা পুত্রগণকে প্রদান করিবেন, আশালতার পুত্র না জমিলে আশালতা মাসিক একশত টাকা মাসহারা পাইবেন।’ যদবধি আমার পত্নী শ্ৰীমতী মহালক্ষ্মী দাসী জীবিত থাকিবেন, তদবধি কেহই আমার বিষয়টি বণ্টন করিয়া লইতে পারিবেন না, তাঁহার মতানুসারে ও তাঁহার ইচ্ছানুসারে সমস্ত বিষয়কার্য্য নির্ব্বাহ হইবেক, কিন্তু উক্ত মহালক্ষ্মী দাসীও কোন বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত বিষয়ের কোন অংশ কোন প্রকারে হস্তান্তর করিতে পারিবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি।

    উইলের পাঠ শ্রবণ কোরে আমি এককালে হতবুদ্ধি হোলেম। কৰ্ত্তার মুখে কি শুনেছিলেম, এখনি বা কি শুনলেম। সমস্তই বিপরীত! এ বৈপরীত্যের হেতু কি, কিছু, অনুমান কোত্তে পাল্লেম না; মনে মনে যতই আলোচনা করি, ততই সন্দেহবৃদ্ধি এবং মনের কথা প্রকাশ কোরে বলি, এখন একটী লোক নাই। মনের সংশয় মনে চেপে রাখলেম। উইল যখন পড়া হয়, তখন আমি দারোগার পাশে দাঁড়িয়ে একবার দেখেছিলেম, উইলে তিনজন সাক্ষীর নাম লেখা। শ্রীকুঞ্জবিহারী সান্যাল নবীদার, সাং বর্দ্ধমান; শ্রীনফরচন্দ্র ঘোষাল, সাং রায়না; শ্ৰীজনার্দ্দন মজুমদার, সাং বর্দ্ধমান। এই তিনজনের কোন পরিচয় আমি জানি না। কেমন কোরেই জানবো? আমি আসবার অগ্রে উইল লেখা হয়েছিল কিংবা পরে হয়েছিল, আমার অজ্ঞাত; অধিকন্তু আমি বর্দ্ধমানে আসবার পর ঐ তিনজনের একজনও বাড়ীতে আসে নাই, কারো মুখে তাদের নামও আমি শুনি নাই, আমার সম্বন্ধে ওরা তিনজনেই নূতন লোক। মনে মনে অনেক আন্দোলন কোল্লেম, কিছুই মীমাংসা খুঁজে পেলেম না, সন্দেহটাও গেল না। বাড়ীতে ডাকাত পোড়েছিল, লুটপাট কোল্লে না, অন্যঘরেও গেল না, কেবল কর্ত্তাটীকে কেটে গেল, ইহাও বড় আশ্চর্য্য ব্যাপার! এ সমস্যা বড়ই বিষম সমস্যা!

    যে সকল ভদ্রলোক মধ্যস্থ হোতে এসেছিলেন, তাঁরা বিদায় হোলেন, দারোগামহাশয় থানায় গেলেন, গোলমাল চুকে গেল। লোকগুলি যখন বিদায় হন, তখন আমি দেখেছিলেম, কারো কারো মুখে বিষন্ন হলো, কারো কারো মুখে প্রসন্নভাব ধারণ কোল্লে; দারোগার মুখে প্রসন্ন অপ্রসন্ন কোন ভাবই লক্ষিত হলো না।

    হায় হায়! শুভকার্য্যের সূচনায় কি ভয়ঙ্কর অশুভসংঘটন! এক একখানা উপন্যাসে আমি পাঠ কোরেছি, বিবাহরজনীতে অকস্মাৎ কন্যার মৃত্যু, বাসরঘরে বরের মৃত্যু, অন্নপ্রাশনের পূর্ব্বদিন দুগ্ধপোষ্য শিশুর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি। এখানেও প্রায় সেইরূপে শোচনীয় ঘটনা। আশালতার বিবাহ। সমস্ত আয়োজন ঠিকঠাক, আত্মীয়-কুটুম্ব স্থলে নিমন্ত্রণপত্র পর্য্যন্ত প্রেরিত হয়েছিল, অকস্মাৎ বজ্রাঘাত! বিবাহের কথা আর কারো মুখে উচ্চারিত হলো না, সকলেরি মুখে কেবল শোকের কথা! মাসাধিক যে বাড়ীতে হর্ষধ্বনি সমুখিত হোচ্ছিল, সে বাড়ী এখন বিষাদপর্ণ!!

  • একাদশ কল্প : মামা!

    একাদশ কল্প : মামা!

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    একাদশ কল্প : মামা!

    পাঁচদিন গেল। সেই পাঁচদিন আমি জামাইবাবুর কাছে কাছে থাকতে শিখলেম, ঘনিষ্ঠতা করবার ইচ্ছা হলো। কেন হলো, পাঠক-মহাশয় বোধ হয়, সেটা অনুভবে বুঝেতে পেরে থাকবেন। নিরাশ্রয় আমি, উত্তম আশ্রয় পেয়েছিলেম, কৰ্ত্তা আমাকে ভালবেসেছিলেন, বাড়ীর পরিবারেরাও আদর কোচ্ছিলেন, সুখেই ছিলেম, এ আশ্রয় যদি যায়, তবে আমি পথের ভিকারী হব! জামাইবাবু যদি দয়া কোরে এই বাড়ীতে আমাকে থাকতে দেন, সেই আশাতেই তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করবার ইচ্ছা। যখন যা তিনি বলেন, তখনি তাই আমি করি, কোন কথাতেই আর অবাধ্যতা দেখাই না, সৰ্ব্বদাই তাঁর অনুগত হয়ে থাকি। তিনি যে সকল কথা কন, তা শুনে আমার প্রতি তার আদেশ আছে, এমন কিছুই বুঝা যায় না। কোন কার্য্যের আদেশ পেয়ে যখন আমি শীঘ্র ছুটে যাই, তখন তিনি মৃদু মৃদু হাস্য করেন, আড়ে আড়ে তাও আমি দেখতে পাই। আমার প্রতি তার একটু সদয়ভাব, ঐ হাস্য দেখে সেটাও আমি যেন বুঝতে পারি। মনে একটু ভরসা হয়।

    বাড়ীর স্ত্রীলোকেরা কর্ত্তা বিদ্যমানে আমার প্রতি যে ভাব দেখাতেন, এখনও তাঁদের সেই ভাব। আশালতার সুন্দর মুখখানি সৰ্ব্বদা বিষন্ন, মুখখানি দেখে আমার বড় কষ্ট হয়, তথাপি আমার প্রতি তাঁর সমান ভালবাসা।

    কর্ত্তার জ্যেষ্ঠা কন্যা শ্যামাসুন্দরী পূর্ব্বে আমাকে দেখেন নাই, এই বিপদের সময় প্রথম দেখা, তথাপি তিনি আমাকে বেশ আদর-যত্ন করেন। আমি যখন তার মুখের দিকে চাই, তিনি তখন একদৃষ্টে খানিকক্ষণ আমার মুখপানে চেয়ে হঠাৎ অন্যদিকে মুখ ফিরান; বোধ হয়, যেন চক্ষে একটু জল আসে। কেন যে তেমন ভাব, তা আমি বুঝতে পারি না। আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে চোলে গেলেও তিনি আমার দিকে চেয়ে থাকেন। মধ্যমা উমাকালীর সে ভাব নয়, তিনি আমাকে আদর করেন বটে, কিন্তু ততটা স্নেহমমতা প্রকাশ পায় না।

    গৃহিণী ঠাকুরাণী একদিন আমাকে কাছে বোসিয়ে এ কথা সে কথার পর সস্নেহবচনে বোল্লেন, “হরিদাস! ঘরসংসার তো অন্ধকার হয়ে গেল। সাধে বিধাতা বাদসাধলেন! বিধাতার মনে যা থাকে, তাই হয়; আমাদের ভাগ্যে যা ছিল তাই হলো; তুমি কিন্তু এখান থেকে কোথাও যেয়ো না; আমি তোমাকে কোথাও যেতে দিব না; কৰ্ত্তার কাছে যেমন ছিলে, আমাদের কাছেও তেমনি থাকো। আমি তোমাকে ঠিক যেন পেটের ছেলের মতন দেখি, কোথাও তুমি যেয়োনা, মোহনলাল তোমাকে আপন বাড়ীতে নিয়ে যেতে চান, কৰ্ত্তাকেও বোলেছিলেন, আমাকেও বোলেছিলেন, আমি অস্বীকার কোরেছি; তোমাকে যদি বলেন, তুমিও অস্বীকার কোরো। মোহনলালের—”

    কথাটী সমাপ্ত হোতে পেলে না, গৃহিণীর অর্দ্ধোক্তির সময়েই শ্যামাসুন্দরী সেইখানে এলেন; কথাটী চাপা পোড়ে গেল। শ্যামাসুন্দরী বোধ হয়, আড়ালে দাঁড়িয়ে জননীর কথাগুলি শুনেছিলেন, তিনিও ঠিক সেই রকমে স্নেহ জানিয়ে অতি কোমলস্বরে বোল্লেন “হরিদাস! মা যে কথা তোমাকে বোলছেন, তুমি তাই কোরো, এইখানেই থেকো, কোথাও যেয়ো না; তোমাকে দেখলে আমরা সকলেই—”

    বোলতে বোলতে বসনাঞ্চলে চক্ষু ঢেকে দয়াবতী নীরবে অশ্রুপাত কোল্লেন। কেন, কে জানে, তাঁর চক্ষের জল আমি দেখতে পাল্লেম না;—কি জানি কেন, ভারী কষ্ট হোতে লাগলো, চক্ষু মুছতে মুছতে আমি তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে উঠে গেলেম।

    আরো পাঁচদিন গেল। সন্ধ্যার সময় আমি আর জামাইবাবু বৈঠকখানায় নির্জ্জনে। স্থান প্রকার ভূমিকা না কোরেই জামাইবাবু আমাকে বোল্লেন, “হরিদাস! তুমি আমার বাড়ীতেই চলো। কর্ত্তার কাছে যেমন ছিলে, আমিও সেইরূপ যত্নে রাখবো। তুমি লেখাপড়া শিখেছ, আমার কাজকর্ম্ম কোরবে, মাসে মাসে কিছু কিছু, জলপানীও পাবে, কোন কষ্ট হবে না। থাকতে থাকতে আমি তোমাকে একটা ভাল কাজে নিযুক্ত কোরে দিব, বেশ সুখেই থাকবে। এখানে তো কিছু পেতে না, কৰ্ত্তা কেবল ভালকথা বোলে তোমাকে ভুলিয়ে রাখতেন, আমার কাছে সে রকম অবিবেচনার কাৰ্য্য হবে না; আমার সঙ্গেই তুমি চল। দুই এক হপ্তার মধ্যেই আমি যাব, সেই সঙ্গেই তোমাকে নিয়ে যাব, এইরূপ ইচ্ছা কোরেছি। কেমন, কি বল?”

    নতবদনে আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞে না, তা আমি যেতে পারবো না, কর্ত্তা আমাকে নিরাশ্রয় দেখে আশ্রয় দিয়েছিলেন, চিরজীবন আমি এইখানেই থাকবো, এইরুপ আজ্ঞা কোরেছিলেন, সে মহাপুরুষের সে আজ্ঞা আমি লঙ্ঘন কোত্তে পারবো না। বিশেষতঃ গৃহিণী ঠাকুরাণী আমাকে ছেড়ে দিবেন না, সেদিন তিনি আমাকে বোলেছেন, এ সংসার ছেড়ে কোথাও তুমি যেয়ো না।” তাঁর কথা অমান্য কোল্লে আমার ধর্ম্ম থাকবে না। জন্মাবধি আমি জননী জানি না, তারে আমি জননী তুল্য দেখি, তিনিও আমাকে পত্ৰতুল্য স্নেহ করেন। আমি যাব না।”

    উত্তর শুনে, মুখ ভারী কোরে, সক্রোধে জামাইবাবু বোল্লেন, “আচ্ছা, তবে থাকো! এই অবাধ্যতাই তোমার অধঃপাতের কারণ হবে! অবোধ বালক! আপনার ভাল আপনি বুঝতে পারে না! আমি তোমার ভাল করবার জন্য চেষ্টা কোরছিলেম, সেটা তোমাকে ভাল লাগলো না, গৃহিণী পত্ৰতুল্য স্নেহ করেন, সেই কথাটাই বড় হলো! ধৰ্ম্ম থাকবে না! উঃ! কত বড় ধর্ম্মজ্ঞান। আচ্ছা, ধর্ম্ম তোমার কত উপকার করে, দেখা যাবে! থাকো তুমি!”

    আমি আর একটীও কথা কইলেম না, নতশিরে অল্পক্ষণ সেইখানে বোসে থাকলেম। একখানা কাগজ হাতে কোরে জামাইবাবু সেখান থেকে উঠে গেলেন, একটু পরে আমিও বাড়ীর ভিতর চোলে গেলেম।

    আরো পাঁচদিন অতীত। উইলপাঠের পর এক পক্ষ অতিক্রান্ত। পক্ষান্তরজনী প্ৰভাত হলো। প্রভাতসূৰ্য্য পৰ্ব্বগগনে হাসতে হাসতে দেখা দিলেন। বড় বড় গাছেরা আর বড় বড় অট্টালিকার সকিরণ মাথায় কোরে রজতবর্ণ দীপ্তি ধারণ কোল্লে। আমাদের বৈঠকখানার সংলগ্ন মনোহর পুষ্পোদ্যানে প্রস্ফুটিত কুসুমেরা বাতাসে বাতাসে হেলে দুলে সুগন্ধ বিতরণ কোরে, আমার সন্তপ্তচিত্তকে সুশীতল কোত্তে লাগলো, ফুলে ফুলে উড়ে উড়ে গুন গুন স্বরে গান কোত্তে কোত্তে মধুভক্ত মধুমক্ষিকারা প্রভাতকুসুমের মধুপানে প্রবৃত্ত হলো, একাকী বারান্দায় বসে বোসে প্রকৃতির সেই নয়নমোহিনী শোভা আমি দর্শন কোত্তে লাগলেম।

    বেলা অনুমান চারিদণ্ড। জামাইবাবু বাড়ীর ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে বৈঠকখানায় বোসলেন। একজন চাকর তামাক দিয়ে গেল, তিনি আপন মনে তামাক খেতে লাগলেন। বৈঠকখানাঘর থেকে বারান্দা বেশ দেখা যায়, যেখানে আমি বোসে ছিলেম সেদিকের দরজার সঙ্গে বৈঠকখানার দরজা ঠিক রুজু রুজু; জামাইবাবু আমাকে দেখতে পেলেন, কিন্তু ডাকলেন না। আমি একবার তার দিকে চেয়ে দেখলেম, বুঝলেম, রাগ রাগ ভাব।

    গাছের মাথায় ছাদের মাথায় রৌদ্র দেখেছিলেম, সে রৌদ্র সে দিন মাটীতে নামলো না, সূৰ্য্যও আর দেখা গেল না। মেঘ উঠলো; মেঘের সঙ্গে অল্প অল্প হাওয়া; প্রভাতের মেঘে বৃষ্টি হয় না এই আমার সংস্কার, সুতরাং বারান্দা থেকে উঠলেম না, মেঘ ক্রমশই গাঢ় হয়ে এলো। ঊষাকালে কাক ডাকে; বেলা চারি দণ্ডের সময়, ঝাঁক ঝাঁক কাক কা কা রবে ডেকে ডেকে ঝটাপট শব্দে উড়ে উড়ে আমাদের বাড়ীর দিকে আসতে লাগলো; বাড়ীর নিকটস্থ জঙ্গলে শেয়ালেরা হুয়া হুয়া রবে চীৎকার কোরে উঠলো। মেঘাগমে দিনমানকে উষা অনুমান কোরে কাক-শৃগাল কলরব কোচ্ছে। এরপ সিদ্ধান্ত করা ভুল; অল্পজ্ঞানে আমার মনে যেন কোন অমঙ্গল আশঙ্কার আবির্ভাব হলো। দিবাভাগে শিবার ডাক অমঙ্গল, এ দেশের স্ত্রীলোকেরাও ইহ জানেন; অমঙ্গল আশঙ্কায় অকস্মাৎ আমার বুক কেঁপে উঠলো। কর্ত্তার অপমৃত্যুতে মহা অমঙ্গল ঘোটেছে, আজ আবার আরো বা কি ঘটে, সেই আশঙ্কাই প্রবল। বারান্দা থেকে উঠে আমি বৈঠকখানায় প্রবেশ কোল্লেম। যে ঘরে জামাইবাবু ছিলেন সে ঘরে গেলেম না, সেই ঘরের পাশের ঘরে অদেখা হয়ে একটা গবাক্ষের কাছে দাঁড়িয়ে থাকলেম; ঘরে যখন প্রবেশ করি, তখন দেখলেম, জামাইবাবুর কাছে আরো তিন চারিটী ভদ্রলোক বোসে আছেন। পোষাকে ভদ্র কি ব্যবহারে ভদ্র, তা আমি বুঝলেম না; কেন না, তাঁদের আমি আর কোন দিন দেখি নাই; সব মুখ অচেনা; কখন তাঁরা এসেছেন, কুসম দর্শনে অন্যমনস্ক ছিলেম, তা আমি দেখতে পাই নাই। জামাইবাবুর সঙ্গে তাদের হাসি-ঠাট্টা চোলছে, গল্প-গুজব হোচ্ছে, শব্দ আমার কাণে এলো। কিসের হাসি, কিসের গল্প, তা আমি জানতে পাল্লেম না; জানবার দরকার ছিল না, সেদিকে মনোযোগ রাখলেম না; ভ্রূক্ষেপই কোল্লেম না।

    জামাইবাবু আমাকে ডাকলেন না, আমি ইচ্ছাবশে সে ঘরে গেলেম না; অন্যলোকের সঙ্গে যদি কোন গোপনীয় কথাই থাকে, আমার সেখানে যাওয়া অনধিকারপ্রবেশ, তাই ভেবেই গেলেম না; ঘর থেকে বেরিয়ে তাঁদের অলক্ষিতে উপর থেকে নেমে এলেম; সদরদরজায় দাঁড়িয়ে আকাশপানে চেয়ে দেখি, ঘোর অন্ধকার! সেই সময় যদি আমার নিদ্রাভঙ্গ হোতো, তা হোলে মনে কোত্তেম, তখনো রাত্রি আছে; এত অন্ধকার।

    বাড়ীর সম্মুখের রাস্তা দিয়ে দুই একজন লোক যাওয়া-আসা কোচ্ছে, এখনি হয় তো বৃষ্টি আসবে, এই ভেবে তারা খুব তাড়াতাড়ি চোলছে, আর এক একবার উর্দ্ধদৃষ্টিতে আকাশপানে চেয়ে চেয়ে দেখছে;—দেখছে আর চোলেছে। হাওয়া; ক্রমশই জোর হাওয়া! আকাশের পশ্চিমকোণে ঘন ঘন চপলার হাসি; চপলার হাসি আমি অনেকবার দেখেছি, কিন্তু সে দিনের হাসি যেন কেমন একপ্রকার অভূতপূৰ্ব্ব, অভাবনীয়পূর্ব্ব, অননুভূতপূর্ব্ব বিকট ভয় দেখাচ্ছে! একবার গড়গড়শব্দে মেঘ ডেকে উঠলো। সেই অসাময়িক জলদগর্জ্জনও কেমন এক একার ভয়প্রদ! অল্প অল্প বৃষ্টি এলো। তখন আর আমি সদরদরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে পাল্লেম না, দেউড়ী পার হয়ে উপরে উঠবার সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়ালেম।

    উপরে উঠি উঠি মনে কোচ্ছি, সিঁড়ির দিকেই মুখ রয়েছে, হঠাৎ পশ্চাদ্দিক থেকে কে একজন এসে আমার একখানা হাত ধরে ফেলে। মুখে ফিরিয়ে চেয়ে দেখি, সেই বিকটাকার রক্তদন্ত! বিকটমূর্ত্তি দেখেই আমার হৃৎকম্প! জোর কোরে হাতখানা ছাড়িয়ে নিয়েই ছুট! এক ছুটে গুম গুম শব্দে উপরে উঠে, চীৎকার কোরে কেঁদে জামাইবাবুর দুই পায়ে জড়িয়ে ধোল্লেম; কুঁজোটাও আমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ সটান ছুটে এসে বৈঠকখানার চৌকাঠের উপর দাঁড়ালো। আমি কেঁদে কেঁদে জামাইবাবুকে বোলতে লাগলেম, রক্ষা করুন। রাক্ষস! রাক্ষস! আমাকে ধরেছিল! ঐ এসেছে! ঐ এসেছে। রক্ষা করন!”

    বাবুর পাশের লোকগুলো যেন কি একটা অপরুপ রঙ্গ মনে কোরে খিলখিল শব্দে হেসে উঠলো। কতই যেন বিরক্ত হয়ে পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে আমাকে ঠেলে ঠেলে দিয়ে, জামাইবাবু গম্ভীরগর্জ্জনে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি?” রাক্ষসটা সেই সময় সুযোগ বুঝে ভয়ানক ঝনঝনে আওয়াজে বোলতে আরম্ভ কোল্লে, “ঐ ছোঁড়া আমার ভাগ্নে, আমি ঐ ছোঁড়ার মামা, আমি ওটাকে নিয়ে যাবো। কেবল পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়, কিছুতেই বাগে আনা যায় না। একবার আমি এইখানে নিতে এসেছিলেম, এই বাড়ীর কর্ত্তা আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলো, এবার আমি কিছুতেই ছাড়বো না।”

    কাতর হয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমি বোল্লেম, “না গো না, ও আমার মামা নয়! ও আমার কেহই নয়! ও কখনই মানুষ নয়! আপনি আমাকে রক্ষা করুন! ওর সঙ্গে আমি কখনই যাব না! ওটা রাক্ষস! আমারে ধোরে নিয়ে গিয়েই খেয়ে ফেলবে! দয়া করে আপনি আমাকে রক্ষা করুন!”

    করণস্বরে এই সব কথা বোলতে বোলতে একবার আমি বাবুর মুখের দিকে আর একবার কুঁজোটার মুখের দিকে ভয়ে ভয়ে দেখলেম। বোধ হলো যেন, সেই সময় তাঁদের পরস্পর কি এক রকম চোক-টেপাটিপি হয়ে গেল। জামাইবাবু আরো বিরক্ত হয়ে উচ্চকণ্ঠে বোলে উঠলেন, “আমি তার কি জানি? কে কার মামা, কে কার ভাগ্নে, আমি তার কি জানি? যে যা ভাল বুঝবে, সে-ই তাই কোরবে, আমি তাতে কি কোরবো? এ ফ্যাঁসাতে আমি কেন মাথা দিব? আমি কেমন কোরে রক্ষা কোরবো নানা কাজে নানা দিকে আমার মাথা ঘুরছে, তার উপর এ কি উৎপাত! যাও,—যাও,— চোলে যাও! যে যার মামা, সে তারে নিয়ে যাবে, আমি তাতে বাধা দিবার কে?”

    বাবু যেন তখন সেই বাড়ীর সর্বেসৰ্ব্বা কৰ্ত্তা, পাশে যারা বোসেছিল, তারা যেন তাঁর মোসাহেব, তারা সকলেই বাবুর কথায় প্রতিধনি কোরে বোলতে লাগলো, “তা বটেই তো তা বটেই তো? বাবু কেন কথা কবেন? কে কার মামা, কে কার ভাগ্নে, বাবু তার কি জানেন? কাজের সময় কোথাকার মামা ভাগ্নের ঝগড়া এসে উপস্থিত হলো! কোথাকার পাপ! বিষম উৎপাত!”

    মোসাহেবের কলরবে ভ্রূক্ষেপ না কোরে জামাইবাবুকে আমি বিস্তর মিনতি কোল্লেম, চক্ষের জলে তাঁর পা-দুখানি ভিজালেম, কিছুতেই তাঁর দয়া হলো না! উৎসাহ পেয়ে, সাহস পেয়ে, বিকট মর্কট মুখখানা আরো বিকট কোরে, বিকট বিকট দাঁতগুলা আগাগোড়া বিকাশ কোরে, সেই বিকটাকার রাক্ষসটা পায়ে পায়ে এগিয়ে এগিয়ে জাজিমের উপর এসে উঠলো। আমি ক্রমাগত কাঁদতে লাগলেম, বাবু তাতে কর্ণপাতও কোল্লেন না, মোসাহেবদের সঙ্গে আবার হেসে হেসে নূতন গল্প জুড়ে দিলেন! কুঁজোটা আমার দুখানি হাত ধোরে হিড়হিড় কোরে টেনে নিয়ে চোল্লো, দরজার বাহিরে এনে ফেল্লে টেনে হিঁচড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে সদরদরজায় নিয়ে এলো। চীৎকার শব্দে আমি বাড়ীখানা কাঁপিয়ে তুল্লেম; বলিদানের অগ্রে ভিজে পাঁঠা যেমন কাঁপে, সেইরকম কাঁপতে লাগলেম, দুঃখ প্রকাশ কোরে কেহই একটী কথাও কইলে না! দেউড়ীতে দরোয়ান ছিল, বাবুর কাছ থেকে একটা রাক্ষস আমাকে ধারে এনেছে, বাবু তাতে বাধা দেন নাই, সুতরাং দরোয়ানেরাও সাহস কোরে কিছু বোলতে পাল্লে না, কিন্তু তাদের মুখের ভাব দেখে আমি বুঝলেম, তাদের যেন মনে মনে কষ্ট হোতে লাগলো।

    রাস্তায় বাহির কোরে কুঁজোটা আমাকে জলের উপর দিয়ে টেনে নিয়ে চোল্লো। অবিশ্রান্ত বৃষ্টি; বৃষ্টির জলে রাস্তা প্লাবিত, সেই জলের উপর আমি গড়গড়িয়ে যাচ্ছি, এক আধ জায়গায় আধখানা শরীর ডুবে ডুবে যাচ্ছে, তখনও আমি কেবল চেঁচাচ্ছি আর হাঁপাচ্ছি। বৃষ্টির জলে আমাদের দুজনের অষ্টাঙ্গ অভিষিক্ত। খানিক দূরে একটা উঁচু রাস্তা। সে রাস্তায় কেবল বালী আর কাদা; জল দাঁড়ায় নাই; কাদার উপর দিয়ে লোকটা আমাকে টানছে। সৰ্ব্বশরীর কাদামাখা হয়ে যাচ্ছে; ইট-পাথরের রাস্তা হোলে কেটে ছিঁড়ে আমার সৰ্ব্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যেতো, পথেই হয় তো প্রাণ যেতো, প্রাণ গেলেই ভাল হোতো; তত যন্ত্রণা সহ্য কোত্তে হোতো না।

    কোথায় আমি চোল্লেম? রাক্ষসটা আমাকে কোথায় নিয়ে চোল্লো? হায় হায়! কারো সঙ্গে দেখা হলো না! আশালতাকে দেখতে পেলেম না। আমার কি দশা হলো, বাড়ীর পরিবারের কেহই কিছু জানতে পাল্লেন না! নিষ্ঠুর মোহনলাল হাসতে হাসতে আমাকে রাক্ষসের হাতে সমর্পণ কোরে দিলেন! আমার ভাগ্যবিধাতা আমার ভাগ্যে কত কষ্টই লিখে রেখেছেন, সেই বিধাতাই তা জানেন!

    লোকটার আকর্ষণে ক্রমাগতই আমি গোড়িয়ে গোড়িয়ে চোলেছি। লোকটার শরীরে অনেক বল। মুখে বানর, দন্তে রাক্ষস, লোমে ভল্লুক, কুঁজে উষ্ট্র, হস্তপদে মনুষ্য, এই পশুজীবের সমষ্টিতে এ লোকটার পঞ্চভূতের গঠন সমাপ্ত! বৃষ্টির জলে ভিজে ভিজে তার গায়ের লোমগুলো আর মাথার ঝুমরো ঝুমরো চলগুলো গায়ের সঙ্গে লেপে গেছে, মূর্ত্তিটা আরো ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। একবার একবার আমি তার দিকে চেয়ে দেখছি, জলে শীতে সৰ্ব্বশরীর কাঁপছে, উচ্চৈঃস্বরে রোদন কোচ্ছি, রক্তদন্ত আমার রোদনে কর্ণপাত কোচ্ছে না। রাস্তায় লোক নাই। সে দুযোগে কে-ই বা বাহির হবে? কেহই নাই। রাস্তার ধারে ধারে তফাতে তফাতে লোকালয় আছে, সে সকল বাড়ীর লোকেরাও আমার দুর্দশা দেখে রক্ষা করবার চেষ্টা কোচ্ছে না; বরং কেহ কেহ গবাক্ষ পথে দাঁড়িয়ে যেন তামাসা দেখছে, কেহ কেহ করতালি দিয়ে হাস্য কোচ্ছে। আমি চীৎকার কোচ্ছি, তাদের হাস্যকোলাহলে সে চীৎকার ডুবে ডুবে যাচ্ছে। কুঁজোটা দুই হাতে ধোরে ক্রমাগতই আমাকে টানছে; কাঁচপোকা যেমন আর্শলা টানে, সেই রকমে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এক জায়গায় গিয়ে থামলো। বোধ হয় আর টানতে পাল্লে না, সেইজন্য সেইখানে একখানা গরুর গাড়ী ভাড়া কোল্লে। এ অঞ্চলের গরুর গাড়ীর উপর ছত্রী থাকে, রাক্ষসটা আমাকে টেনে ছত্রীওয়ালা গাড়ীর উপর তুল্লে; আপনিও আমার গা ঘেঁষে ঠেসে বোসলো। তার গায়ের দুর্গন্ধে আমার তখন বমী আসতে লাগলো।

    গরুরগাড়ী চোলেছে, কাদার উপর দিয়ে হেলে হেলে চোলেছে। গতি অত্যন্ত মৃদু। আমার সৰ্ব্বাঙ্গ কর্দমাক্ত। লোকটার আকর্ষণে সৰ্ব্বাঙ্গে বেদনা; বোসে থাকতে পাল্লেম না, গাড়ীর ভিতর খড়ের বিছানায় শুয়ে পোড়লেম।

    বেলা প্রায় এক প্রহরের সময় পাষণ্ড আমাকে পোরেছিল, সমস্ত দিন গেল, সমস্ত রাত্রি গেল, উদরে একবিন্দু জলও গেল না, অত্যন্ত কাতর হোলেম।

    আবার প্রভাত হলো। গাড়োয়ান দুজন। তারা আপনাদের আহারের সম্বল সঙ্গে রেখেছিল, ক্ষুধার সময় আহার কোল্লে, গাড়ী থামিয়ে নিকটের পুকুর থেকে জল খেয়ে এলো। আমার উপবাস! আমাকে জব্দ করবার জন্য রাক্ষসটাও উপবাসী।

    আকাশ পরিষ্কার। পূৰ্ব্বদিনের ন্যায় ঘনঘটা ছিল না, জলঝড় ছিল না, প্রকৃতির হাসিমুখ দেখলে ছেলেবেলা থেকে আমার আনন্দ হোতো, সেদিন আর আমার হৃদয়ে সে আনন্দের স্থান হলো না, ছত্রীর ভিতর থেকে মুখ বাড়িয়ে সূৰ্য্য দর্শন কোরে জগচ্ছক্ষু দেব দিবাকরকে প্রণিপাত কোল্লেম; মনে মনে মধুসূদনের নাম স্মরণ কোরে শরীর যেন একট, শীতল বোধ হলো।

    গাড়ী চোলেছে। বেলা প্রায় দুই প্রহরের কাছাকাছি। সম্মুখে একটা বাগান। রক্তদন্ত সেই বাগানের কাছে একবার নামলো আমাকেও নামতে বোল্লে, আমি নামলেম। নিকটে একটা পুষ্কর্ণী ছিল, যথারীতি নিত্যকর্ম্ম সমাধা কোরে সেই পুষ্কর্ণীতে আমরা সান কোল্লেম। সঙ্গে আর বেশী বস্তু ছিল না, উভয়কেই সিক্তবস্ত্রে থাকতে হলো। বাগানের ধারে একখানা মুদীর দোকান। রক্তদন্ত সেই দোকানে চিড়ে-মুড়কি কিনে জল খেলে; আমার সম্মুখেও কিছু ধোরে দিলে; রক্তদন্তের বৃহৎ দন্ত, সে সকল দন্তের শক্তিও বেশী, আমি নিস্তেজ বালক, তার মত জোরে জোরে চিপিটক চর্ব্বণে অশক্ত, সুতরাং একমুষ্টি মুড়কি মুখে দিয়ে এক ঘটী জল খেলেম।

    বেলা আড়াই প্রহর। আবার আমরা গাড়ীতে উঠলেম, গাড়োয়ানেরাও জলযোগ কোরে গাড়ী চালাতে আরম্ভ কোল্লে। শেষবেলায় একখানি গ্রামে গিয়ে পৌঁছলেম। কি গ্রাম কোথাকার গ্রাম, বিনা জিজ্ঞাসায় আমার জানবার উপায় ছিল না, কেবল গৃহস্থলোকের বাড়ী আর দোকানপাট দেখে স্থির কোল্লেম, একখানি পল্লীগ্রাম। সেই গ্রামের প্রায় অর্দ্ধক্রোশ গিয়ে একখানা একতালা বাড়ীর সম্মুখে গাড়ীখানা দাঁড়ালো। ভাড়া চুকিয়ে দিয়ে, আমাকে হাত ধরে নামিয়ে নিয়ে, রক্তদন্ত সেই বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ কোল্লে; আমাকে শিখিয়ে দিলে, “বেশ শিষ্ট-শান্ত হয়ে থাকবে, কোন কথার অবাধ্য হবে না, আমাকে মামা বোলে ডাকবে, কোথা থেকে কি রকমে আমি তোমাকে এনেছি, কারো কাছে সে সকল কথা গল্প কোরবে না! সাবধান! সাবধান!”—দায়ে পোড়ে আমি সম্মত হোলেম। তদবধি রক্তদন্ত আমার মামা!

  • দ্বাদশ কল্প : অমরকুমারী

    দ্বাদশ কল্প : অমরকুমারী

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    দ্বাদশ কল্প : অমরকুমারী

    বাড়ীখানা অনেকদিনের পুরাতন। দেয়ালে দেয়ালে নোণা ধোরেছে, ঠাঁই ঠাঁই চূণবালী খোসে পোড়েছে, ছাদের মাথায় ছোট ছোট গাছ বোসেছে, এক এক জায়গায় ফাট ধরেছে। একতালা বাড়ী বটে, কিন্তু দুমহল। সদরমহলে একখানি ঘর, সেই ঘরের সম্মুখে একটা রক, রকের ধারে ধারে গরানকাষ্ঠের খুটী, খুঁটীদের মাথায় উলুখড়ের চাল। অন্দরমহলে সারি সারি তিনখানি ঘর, সেই ঘরগুলির সম্মুখেও ছোট ছোট থাম দেওয়া দর-দালান, মাথায় খড়ের চাল নয়, বরোগা দেওয়া ঢালু ছাদ। দরদালানের ধারে রন্ধনগৃহ। রক্তদন্ত আমাকে সঙ্গে কোরে ঐ তিনখানি ঘরের মাঝের ঘরে নিয়ে বসালে। সেই ঘরে একটী স্ত্রীলোক একখানি মাদুরের উপর শুয়ে ছিলেন, রক্তদন্ত তাঁকে সম্বোধন কোরে বোলে, “এই হরিদাস এসেছে, আদর-যত্ন কোরো, নজরে নজরে রেখো, কোথাও যেন পালায় না; ছেলেটা ভারী ছটফটে।”

    স্বভাব কোথাও যায় না, কর্কশভাষীর কর্কশকণ্ঠ লুকায় না, প্রকৃতিসিদ্ধ কর্কশ আওয়াজে ঐ কথাগুলি বোলেই রক্তদন্ত সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। স্ত্রীলোকটী বিছানার উপর উঠে বোসলেন। কোমলদৃষ্টিতে অল্পক্ষণ আমার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ কোরে অতি কোমলঘরে তিনি বোল্লেন, “হরিদাস! তোমারে আমি আর কখনো দেখি নাই, কার মুখে তোমার নাম শুনেছিলেম, তুমি এসেছ, বড় তুষ্ট হোলেম।”

    কথা বোলতে বোলতে আমার কাপড়ের দিকে তাঁর নজর পোড়লো। ভিজে কাপড় দেখে তৎক্ষণাৎ একখানি শুল্ক বস্ত্র এনে আমাকে পরিধান কোত্তে দিলেন। আমি কাপড় ছেড়ে একটু সুস্থ হয়ে বোসলেম। মনে দুর্ভাবনা অনন্ত, ম্লানবদনে চুপটী কোরে বোসে থাকলেম। স্ত্রীলোকটী তখন আবার বোল্লেন, “হরিদাস! তোমার মুখখানি এমন বিরস বিরস দেখছি কেন: পথে কি বড় কষ্ট পেয়েছ?”

    রক্তদন্তের সাবধানতা স্মরণ কোরে ধীরে ধীরে মৃদস্বরে আমি উত্তর কোল্লেম, “কষ্ট এমন কিছুই নয়, দুদিন আহার হয় নাই।”

    আমার উত্তরবাক্য শ্রবণ কোরেই স্ত্রীলোকটী তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে উঠে পাশের ঘরে প্রবেশ কোল্লেন, একখানি রেকাবে চারিখানি বড় বড় বাতাসা আর এক গেলাস জল এনে আমাকে খেতে দিলেন; বোল্লেন, “আহা! ছেলেমানুষ, দুদিন আহার নাই, কিছু জল খাও।” আমি জল খেলেম। একবার ইচ্ছা হলো, আমার জীবনকাহিনীর কতকগুলি কথা তাঁকে আমি শুনাই, কিন্তু চেপে গেলেম। কিসে কি হবে, কি জানি কি বিপদ ঘোটবে, রক্তদন্ত যদি শুনে, যে রকম স্বভাব, হয় তো আমাকে কত লাঞ্ছনা কোরবে, তাই ভেবে সে সম্বন্ধে কোন কথাই প্রকাশ কোল্লেম না; অপর কথা উত্থাপন কোরে স্নেহ জানিয়ে স্ত্রীলোকটী আমাকে যে সব কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেন, সংক্ষেপে সংক্ষেপে সেই সব কথারই উত্তর দিলেম। প্রথমে তিনি যেমন আমার পানে একদৃষ্টে চেয়েছিলেন, আমিও সেই রকমে তাঁর সৰ্ব্বাবয়ব নিরীক্ষণ কোল্লেম। স্ত্রীলোকটী সুন্দরী, চক্ষু দুটী বড় বড়, কপালখানি ছোট, মস্তকে কৃষ্ণবর্ণ দীর্ঘকেশ, কিন্তু বর্ণটী কিছু ফিকে ফিকে। বোধ হলো যেন কোন প্রকার পীড়া আছে; শরীরে রক্তের কিছু অভাব : শরীর কাহিল, মুখখানি ম্লান; বয়স অনুমান ৩৫/৩৬ বৎসর।

    আমাকে সেই ঘরে বোসিয়ে সেই কৃপাময়ী রমণী অন্যঘরে উঠে গেলেন; বোলে গেলেন, “এইখানে একটু থাকো। আহা! দুদিন আহার হয় নাই, আমি তোমার আহারের আয়োজনে যাই।”

    তিনি গেলেন, আমি একাকী বোসে বোসে আপন অদৃষ্টের ভাবনাই ভাবতে লাগলেম। ভাবছি, এমন সময় একটী বালিকা ধীরে ধীরে সেই ঘরে এসে আমার সম্মুখে দাঁড়ালেন। বালিকাটীও দিব্য সুন্দরী। ফুট গৌরবর্ণ, কিঞ্চিৎ দীর্ঘাকার, মুখখানি নিখুঁত সুন্দর, খগচঞ্চু নাসিকা, চক্ষু আকর্ণ বিশ্রান্ত, কপাল চৌরস, দাঁতগুলি ছোট ছোট, অধরোষ্ঠ লাল টকটকে, কেশ পরিপাটী, সর্ব্বাঙ্গই সুন্দর কিন্তু কিছু কাহিল; বয়স অনুমান একাদশ কি দ্বাদশ বৎসর। ফল কথা, আমার অপেক্ষা কিছু কম বয়স দেহের উচ্চতায় উভয়েই আমরা সমান। মেয়েটীকে দেখে দেখে আমার তখন কেমন এক প্রকার মতন আহ্লাদ হলো : আহ্লাদের সঙ্গে কিছু কিছু সংশয়। এ মেয়েটী কে? আর সেই রমণীই বা কে?

    মনের সংশয় মনে চেপে রেখে মেয়েটীকে আমি বোসতে বোল্লেম। মেয়েটী বোসলেন না, যে ভাবে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই ভাবেই দাঁড়িয়ে রইলেন। ইতিমধ্যে পূর্বোক্ত রমণী পুনৰ্ব্বার সেই ঘরে এসে পূৰ্ব্ববৎ কোমলস্বরে আমারে বোল্লেন, “হরিদাস! এটা তোমার ভগিনী হয়, এটী আমারি কন্যা, এর নাম অমরকুমারী। তোমরা দুটী ভাই-ভগিনীতে এইখানে বোসে গল্প কর, একটু পরেই আবার আমি আসছি।”

    আমাকে ঐ কথা বোলে কন্যাটীকে সম্বোধন কোরে তিনি বোল্লেন, “অমর। এই সেই হরিদাস; কর্ত্তার মুখে যার কথা শুনেছিলে, এই সেই হরিদাস। তোমার পিসীমার ছেলে, হরিদাসের কাছে লজ্জা কোত্তে নাই; ভাই হয়, ভাইকে দেখে কেহ কি লজ্জা করে, বোসো; বোসে দুজনে কথাবার্ত্তা কও, লেখাপড়ার পরিচয় দাও, লজ্জা কি? আমি শুনেছি, হরিদাস বেশ লেখাপড়া জানে, হরিদাসের কাছে তোমার অনেক শিক্ষা হবে; দুটীতে বেশ আমোদে থাকবে; বোসো।”

    অমরকুমারী বোসলেন, কুমারীর জননী অন্য কার্য্যে চোলে গেলেন। অমরকুমারীর সঙ্গে আমি কথা কইতে আরম্ভ কোল্লেম। আমার মুখে অনেক কথা, অমরের মুখে দুটী একটী মাত্র। অমরকুমারী লেখাপড়া করেন, আমি দুটী একটী লেখাপড়ার কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেম, অমরকুমারী সুন্দর মুখখানি একটু নীচু কোরে মৃদু মৃদু হাস্য কোল্লেন। অতি মধুর মৃদু হাস্য। বর্দ্ধমানে আশালতাকে দেখেছি, আশালতাও সুন্দরী, এই অমরকুমারীও সুন্দরী। আশালতার মুখে মৃদু হাস্য দেখেছি, সেই হাস্য যেমন সুমধুর, অমরকুমারীর হাস্যও তদ্রূপ সমধুর। আহা! অভাগিনী আশালতা! অকালে অকস্মাৎ পিতৃহীনা! বিবাহের সূচনায় নিদারুণ বিঘ্ন! আহা! এ জন্মে হয় তো আশালতাকে আর আমি দেখতে পাব না!

    দুঃখের কথা যতই ভাবি, ততই বাড়ে! অদৃষ্ট আমার! যতটা ভুলে থাকা যায়, ততই মঙ্গল। যেখানে এখন এসেছি, সেইখানকার কথাই বলি। লেখাপড়ার কথায় অমরকুমারী হাসলেন কেন?—কারণ আছে। আজকাল আমাদের দেশে আমাদের বালিকাগণের বিদ্যাশিক্ষার যে প্রকার রীতি আরম্ভ হয়েছে, তখন এপ্রকার ইংরাজীধরণের বালিকা বিদ্যালয় ছিল না। অমরকুমারী কোন বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন নাই; এখনকার বালিকাবিদ্যালয়সমূহে যে সকল পাঠ্যপুস্তক প্রচলিত, তখন সে সকল পুস্তকের জন্মও হয় নাই। অমরকুমারী আপন জননীর নিকটে রামায়ণ মহাভারত পাঠ করেন, অপরাপর ধর্ম্মশাস্ত্রের আলোচনা করেন, বিষ্ণুশর্ম্মার হিতোপদেশের শ্লোকগুলি মুখস্থ করেন, এই রকম শিক্ষা। চন্দ্র কত বড়, পথিবী কত বড়, পৃথিবী থেকে সূৰ্য্য কত দূর, নবাব সিরাজোদ্দৌলা কেমন লোক, এই ভাবের গোটাকতক প্রশ্ন আমি জিজ্ঞাসা কোরেছিলেম, সেই জন্যই অমরকুমারী হেসেছিলেন। ধর্ম্মশাস্ত্রের সহজ সহজ কথায় অমরকুমারী বেশ নীতিশিক্ষার পরিচয় দিলেন, সেই সঙ্গে মুখখানি একটু কাচুমাচু কোরে বোল্লেন, “শিক্ষার আমি সময় পাই না : মেয়েমানুষের লেখাপড়ার উপর বাবা বড় চটা। বাবা যখন ঘরে না থাকেন, সেই সময় গোপনে একটু একটু পড়াশুনা করি; তিনি দেখতে পেলে কিম্বা জানতে পাল্লে আমাকে শুদ্ধ, মাকে শুদ্ধ মেরে গুড়ো কোরে দিবেন, পুঁথিগুলি পর্য্যন্ত আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে দিবেন; এত বড় রাগ!”

    মনে আমার বিস্ময়ের উদয় হলো। সবিস্ময়ে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “তোমার বাবা কোথায় থাকেন?” যেন চোমকে উঠে মৃদস্বরে কুমারী বল্লেন, “এ কি গো! কেমন কথা জিজ্ঞাসা কর? যিনি তোমারে নিয়ে এলেন, যাঁর বাড়ীতে তুমি এসেছ, তিনিই আমার বাবা। তা কি তুমি জান না? তিনি বলেন, তোমার মামা তিনি; মামাকে তুমি জানো না?”

    বিস্ময়ভাব গোপন কোরে অম্লানবদনে আমি বোল্লম, “না, তা আমি কেমন কোরে জানবো? তিনি তোমার বাবা, সে পরিচয় আমি কার কাছে পাবো? এ সব কথা তিনি আমাকে কিছুই বলেন নাই।

    কুমারীকে এই কথা বোল্লেম বটে, কিন্তু মনটা বিষম চঞ্চল হলো : সর্ব্বশরীর শিউরে উঠলো; প্রাণে কেমন ব্যথা লাগলো। কি ভয়ানক কথা! সেই রুগ্ণশরীরা সুন্দরী কি না রক্তদন্তের পত্নী! এই কুসমকোমলা সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী অমরকুমারী কি না রক্তদন্তের কন্যা! কি সৰ্ব্বনাশ! বিধাতার এ কি অদ্ভুত সংঘটন! রাক্ষসের গৃহে সুরসুন্দরী! রাক্ষসের সঙ্গে সুরসুন্দরীর বিবাহ! প্রজাপতির এ কি অদ্ভুত নিৰ্ব্বন্ধ! অমরকুমারী যেন যথার্থই অমরকুমারী! এই দেবকন্যার পিতা কি সেই রাক্ষস রক্তদন্ত?

    মনে অনেক প্রকার তোলপাড় কোল্লেম, ক্রমশই সংশয় বিস্ময় বেড়ে উঠতে লাগলো। কথাটা চাপা দিয়ে অমরকুমারীকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “কোথায় আমি এসেছি? এটা কোন স্থান? এ গ্রামের নাম কি?”

    অমরকুমারী বোল্লেন, “গ্রামের নাম নন্দীগ্রাম, বীরভূম জেলা, অতি নিকটেই সিউড়ি সহর। এ জেলার নাম তুমি কি কখনো শুন নাই? এত দিন তুমি কোথায় ছিলে?

    এই আবার সেই বিভ্রাট! এ প্রশ্নের কি উত্তর দিই? এত দিন আমি কোথায় ছিলেম, সে কথা বোলতে গেলেই গোড়ার কথা এসে পড়ে। সে সব কথা প্রকাশ করা রক্তদন্তের বারণ। রক্তদন্তের বারণ না থাকলেও এই সুশীলা কুমারীর কাছে সে সব কথা আমি বোলতে পাত্তেম না; সে ভাবের কোন কথাই বোল্লেম না; ভাবলেম কেবল বলি কি? যদি বলি বর্দ্ধমানে ছিলেম, সে কথাতে সঙ্গতি রাখা যাবে না। কেন না, বর্দ্ধমানের নিকটেই বীরভূম। যারা বর্দ্ধমানে থাকে, তারা বীরভূমের নাম জানে না, এ কথা হাস্যকর; অমরকুমারীর বয়স অল্প, তথাপি এই হাস্যকর কথায় অমরকুমারীরও বিশ্বাস হবে না। তবে বলি কি?—অনেক ভেবে চিন্তে শেষকালে বোল্লেম, যেখানে যখন থাকা আবশ্যক হয়েছিল, সেইখানেই তখন ছিলেম; বীরভূমে কখনো আসি নাই; নূতন জায়গায় এলেই স্থানের নামটা জিজ্ঞাসা কোত্তে হয়, সেই জন্যই জিজ্ঞাসা কোরেছিলেম। আচ্ছা অমর, তোমার জননীকে ওরকম কাহিল কাহিল শুষ্ক শুষ্ক বিবর্ণা দেখায় কেন? রুপের সঙ্গে লাবণ্য ছিল, চেহারা দেখে সেটী বেশ বুঝা যায়, বাঙ্গালী সুন্দরী-সমাজে তিনি গণনীয়া, ওরকম সুন্দরী আমি কম দেখেছি, এ কথাও বেশ বলা যায়, তবে তাঁর দেহখানি কেন ও রকম পাণ্ডুবর্ণ?”

    কুমারী উত্তর কোল্লেন, “আগে ও রকম ছিল না, আজ প্রায় দুবছর হবে, পেটের ভিতর কি একটা রোগ হয়েছে, তাতেই মা আমার দিন দিন কাহিল হয়ে যাচ্চেন, গায়ের রক্ত জল হয়ে যাচ্চে, সেই জন্যই রংটা অমন ফ্যাঁসাটে দেখাচ্চে। আহা! মায়ের আমার কি চমৎকার বর্ণই ছিল! ঠিক যেন মা ভগবতীর বর্ণ!”

    পূর্ব্বেই আমি অনুমান কোরেছিলেম, কোন প্রকার পীড়া আছে, কুমারীর মুখে শুনে জানতে পাল্লেম, সত্যই তাই। একটু চিন্তা কোরে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, চিকিৎসা করান হয় না? কি রোগ? কবিরাজেরা কিছু বলেন না?”

    চঞ্চলনয়নে ঘরের বাহিরের দিকে চেয়ে কুমারী উত্তর কোল্লেন, “কবিরাজ কোথায় পাবো? চিকিৎসা করাবে কে? বাবা ও সকল দিকে আসলেই মন দেন না। একটী কথা বোলতে গেলেই রেগে উঠেন। কথায় কথায় রাগ! কেবল রাগ! মা আমার ঐ রোগা শরীরে সংসারের সব কাজ করেন, আমারে কিছুই কোত্তে দেন না, তবু আমি যতদূর পারি, সাহায্য করি; তাতেও তিনি বারণ করেন; হাজার কষ্ট হলেও উঠে হেঁটে বেড়ান, কাজকর্ম্ম করেন, সাধ্যমতো বাবার সেবা করেন, একটু ত্রুটি হোলেই বাবা বেজার হন, দাঁত-মুখ খিচিয়ে গালাগালি দেন, মারতে আসেন। এক একদিন ঐ রোগা মানুষকে মেরেও বসেন! মেরে মেরে আধমরা করেন! তিনি আবার চিকিৎসা করাবেন? ও হরি! আমাদের কপাল যেমন!”

    সজললোচনে চুপি চুপি ঐ কটী কথা বোলে কুমারী যেন কতই ভয়ে ঘন ঘন বাহিরের দিকে চাইতে লাগলেন। পাছে সেই নৃশংস রাক্ষসটা হঠাৎ এসে পড়ে, সেই ভয়। ভাবটা বুঝতে পেরেও কাতরে মৃদস্বরে আবার আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “তোমার বাবার যদি অতই রাগ, অতই অযত্ন, তবে ঘরসংসার চলে কিরূপে?”

    চক্ষের জল মার্জ্জন কোরে, পুনৰ্ব্বার বাহিরের দিকে চেয়ে চেয়ে, দীর্ঘ একটী নিশ্বাস ফেলে, ভয়াকুলা সুশীলা পূর্ব্ববৎ মৃদস্বরে বোল্লেন, “আর আমাদের ঘরসংসার। সংসারে আমাদের ভারী কষ্ট! এক বিন্দুও সুখ নাই! বাবা আমার খামখেয়ালী! যেমন রাগী, তেমনি অস্থির! রাগের কথা কি আর বলবো, শুনলে তুমিও মনে কষ্ট পাবে। আমার একটী দিদি ছিল, আমার চেয়ে দু-বছরের বড়। বাবা যখন আমার উপর রাগ করেন, বিনা দোষে আমাকে ধরে ধরে মারেন, আমি তখন মুখটী বুঁজে চুপটী কোরে থাকি, কাঁদতেও পারি না; কাঁদলে পর আরো মারেন! দিদি সে সব দৌরাত্ম সইতে পাত্তো না, মুখের উপর চোটপাট জবাব কোতো। একদিন বাবা তাকে সপাসপ ঝাঁটার বাড়ি মারেন, বিনা দোষে ঝাঁটা; বুক বেয়ে, পিঠ বেয়ে রক্ত পড়ে, ঠাঁই ঠাই ঝ্যাঁটার কাঠী ফুটে থাকে; জালায় ছটফট কোত্তে কোত্তে দিদি সেই দিন আমার একটা খেলানাপতুল ছুড়ে মেরেছিলো, গায়ে লাগে নাই, তবুও রক্ষে থাকলে না; বাবা একেবারে রেগে অগ্নিশর্ম্মা হয়ে, দিদির গলা টিপে ধোরে, মাটীতে ফেলে, দমদম কোরে লাথি মাত্তে লাগলেন। মা ছুটে গিয়ে বাবার একখানা হাত ধোল্লেন, আমিও কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গিয়ে দিদির গায়ের উপর শুয়ে পোডুলেম। আমাদেরও নিস্তার থাকলো না! মায়ের তখন পীড়া হয় নাই, শরীরে বল ছিল, বাবাকে ধোরে টানাটানি কোল্লেন, তবুও পেরে উঠলেন না; পুরুষের জোরে পারবেন কেন? জোর কোরে হাতখানা ছাড়িয়ে নিয়ে, মাকে দুই লাথি মেরে পাঁচ হাত তফাতে ঠেলে দিলেন; আমাকেও এক লাথি মেরে তফাৎ কোরে দিয়ে দিদিকে আবার ধোল্লেন, গুমগম কোরে কীল মাত্তে মাত্তে হাত ধোরে টেনে টেনে দাঁড় করালেন; দিদির নাক দিয়ে মুখ দিয়ে রক্ত পোড়তে লাগলো! তবুও ক্ষতি নাই! শেষকালে একখানা ন্যাকড়া পোড়িয়ে গলাধাক্কা দিয়ে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিলেন! বাড়ীর কাছেও থাকতে দিলেন না, ধাক্কা দিতে দিতে কত দূর নিয়ে নদী-পারে ফেলে দিয়ে এলেন। সেই অবধি আমার দিদির আর উদ্দেশ নাই! আছে কি মোরে গেছে, তাও আমরা জানি না!”

    থেমে থেমে নিশ্বাস ফেলে ফেলে এই দুঃখের কথাগুলি বোলে, অমরকুমারী দুই হতে চক্ষু ঢেকে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। হৃদয়ে বেদনা পেয়ে অনেক প্রবোধবাক্যে আমি তাঁকে সান্ত্বনা কোত্তে লাগলেম। রাত্রি প্রায় এগারটা। জননী মেয়েটীকে ডাকলেন, সাবধানে রোদন সংবরণ কোরে, জননীর সঙ্গে স্নেহময়ী কন্যাটী রন্ধনগৃহে গেলেন। একটু পরেই আহারের আয়োজন হলো, আমি আহার কোল্লেম। আহার হলো রুটী, নিরামিষ তরকারী আর দুগ্ধ-সন্দেশ। বীরভূমজেলায় ময়রার দোকানের চিড়ে-মুড়ী ছাড়া সমস্ত খাবার জিনিসকেই সন্দেশ বলে। মুড়কীও সন্দেশ, পাটালীও সন্দেশ, বাতাসাও সন্দেশ, গুড়ও সন্দেশ। লোকবিশেষের নিকটে কচুরিজিলাপীও সন্দেশ নামে বাচ্য। রুটীর সঙ্গে আমি দুধ-সন্দেশ খেলেম, এই কথা বলেছি, এখানে সন্দেশ মানে গুড়।

    রক্তদন্ত তখনও ফেরে নাই। কন্যার মুখে শুনলেম, লোকটা খামখেয়ালী। যখন ইচ্ছা হয়, তখন আসে, কোন কোন দিন আসেও না। আমি আহার কোল্লেম, অমরকুমারী খেলেন না, গৃহিণীও খেলেন না; কার অপেক্ষায় দুজনেই বোসে থাকলেন। তিনটী ঘরের একটী ঘরে আমার শয়নের স্থান হলো। রক্তদন্তের মুখের সম্পর্কে অমরের জননী আমার মামী;—রক্তদন্তকে মামা বলতে আমার মনে বিজাতীয় ঘৃণার উদয় হয়, অমরের জননীকে মামী বোলতে আহ্লাদ জন্মে।

    মামী আমাকে শয়ন কোত্তে বোল্লেন। পথে অনেক কষ্ট পেয়েছিলেম, শরীর বড় ক্লান্ত ছিল, সুতরাং তাদের আহারের অগ্রেই আমি শয়ন কোল্লেম।

    ক্লান্তশরীরে শয়নমাত্রেই নিদ্রা হয়, সে রাত্রে আমার তা হলো না। মনে মনে অনেকক্ষণ অমরকুমারীর কথাগুলি আলোচনা কোত্তে লাগলেম। কবিরা বলেন, আকারের সঙ্গে চরিত্রচর্যার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ। কথা ঠিক। রক্তদন্তের আকার যেমন ভয়ঙ্কর, স্বভাবও ঠিক তাহার অনুরুপ। পরিবারের প্রতি সেই লোকের যে প্রকার নিষ্ঠুর ব্যবহার, সত্য সত্য নরখাদক রাক্ষসদেরও সেরূপ ব্যবহার হয় না। সামান্য অপরাধে বড়মেয়েটীকে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, দেশছাড়া কোরে দিয়েছে, আছে কি নাই, সংবাদ পর্য্যন্ত অজ্ঞাত! বড়ই ভয়ঙ্কর!—ভয়ঙ্কর রাক্ষস অপেক্ষাও ভয়ঙ্কর! এই লোক যে অবাধে মানুষগরু হত্যা কোত্তে পারে না, কাঁচা কাঁচা মানুষ-গরু ধোরে ধোরে খেতে পারে না, কিছুতেই তো আমার মনে এমন ধারণা আসে না; এমন ধারণা এলোও না।

    এই সব আলোচনা কোত্তে কোত্তে নিদ্রা এলো, আমি অকাতরে ঘুমালেম। প্রভাতে জাগরিত হয়ে দরজা খুলতে যাই, খোলা যায় না;—দরজা বন্ধ; বাহিরদিকে বন্ধ; বোধ হলো, চাবী দেওয়া। বেলা যখন আটটা কি নটা, সেই সময় কটকট শব্দে চাবী খুলে কে যেন একটু বাহিরদিকে পাশ কাটিয়ে দাঁড়ালো। বেরিয়েই দেখি, রক্তদন্ত।

    রক্তদন্তের মুখখানা তখন রক্তবর্ণ, চক্ষু দুটোও রক্তবর্ণ। মুখের গন্ধে নিকটে দাঁড়াতে পাল্লেম না, একটু তফাতে গিয়ে দাঁড়ালেম। কিসের দুর্গন্ধ? “তফাৎ থেকেও সেই দুর্গন্ধটা আমার নাকে আসতে লাগলো, বোধ হলো, মদ খেয়েছে। লোকের মুখে শুনেছি, পচা গন্ধ অপেক্ষা মদের গন্ধের ঝাঁজ বেশী। রক্তদন্তটা নিশ্চয়ই মদ খেয়েছে।

    আপন মনে এইরূপ অবধারণ কোচ্ছি, কর্কশকণ্ঠে জড়িয়ে জড়িয়ে রক্তদন্ত জিজ্ঞাসা কোল্লে, “কি রে ছোকরা! বাবার বাড়ীতে তুই যে বড় বোলেছিলি, আমি তোর মামা নই! এখন কেমন? মামার বাড়ীতে তোর আদরযত্ন কেমন? খাসা রুটী, খাসা দুধে, খাসা সন্দেশ, খাসা বিছানা, জন্মে কখন কি এত সুখের মুখ দেখতে পেয়েছিস? মনে রাখিস, মামা না হোলে এত সুখে রাখতে কেহই পারে না! কেমন, এখন আমাকে মামা বোলতো।”

    অমরকুমারী ব্যস্তভাবে এসে তাড়াতাড়ি বোল্লেন, “বাবা! সদরে কে একজন লোক এসেছে, তোমাকে ডাকছে।”

    রাক্ষস শেষকালে আমাকে যে কথা বোলছিল, তা আর বলা হলো না, রক্তচক্ষে আমার দিকে চাইতে চাইতে সদরবাড়ীতে চোলে গেল। একটু পরে কুমারীর মুখে শুনলেম, নূতনলোকের সঙ্গে বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেল। একটা ঝড়ের মুখ থেকে আমি যেন পরিত্রাণ পেলেম।

    প্রভাতের নিয়মিত কাৰ্য্য সমাধা কোরে নিকটের এক সরোবরে আমি স্নান কোল্লেম, কেহই আমার সঙ্গে থাকলো না। সেই সময়ে একবার মনে হয়েছিল, এই বেলা ছুটে পালাই, কিন্তু সেই সংসারের মাতা পুত্রীর সদব্যবহার স্মরণ কোরে সে ইচ্ছাটা পরিত্যাগ কোল্লেম। তাঁরা আমাকে কখন দেখেন নাই, এক রাত্রির মধ্যে ততটা দয়া জানালেন, ততটা ভালবাসলেন, তাঁদের প্রতি আমার স্নেহ-ভক্তির সঞ্চার হলো।

    স্নান কোরে বাড়ীর ভিতর আমি ফিরে গেলেম, কাপড় ছাড়লেম, সন্দেশনামক ফেনীবাতাসা জল খেলেম, রাত্রে যে ঘরে শয়ন কোরেছিলেম, সেই ঘরে গিয়ে বোসলেম, অমরকুমারী তখন গৃহকাৰ্য্যে জননীর সাহায্যে ব্যস্ত ছিলেন, আমার কাছে বসবার অবসর পেলেন না। নিরবলম্বনে একাকী বোসে বোসে আমি কি করি? পাঠশালা থেকে দূরীভূত হবার পর অবকাশকালে নিত্য নিত্য যা আমি কোরে থাকি তাই করি;—ভাবি।—ভাবনা আমার নিত্য-সহচর। নির্জ্জনে ভাবনা ভিন্ন আর কিছুই আমার সঙ্গে থাকে না। আজ এখন একটা নূতন ভাবনা। আহারের ব্যবস্থা কিরূপ হয়? আমার জাতি আমি জানি না, সে কথা সত্য, কিন্তু তা বলে যার তার অন্ন গ্রহণ করা কর্তব্য হয় না। ব্রাহ্মণের অন্নে বাধা নাই, কিন্তু এটা ব্রাহ্মণের বাড়ী নয়, কি জাতির বাড়ী, সেটাও আমার জানা হয় নাই। আমি কি জাতি, রক্তদন্ত হয় তো জানে না। জানলে মামা বোলে আমার সঙ্গে সম্পর্ক পাতাতে যাবে কেন? আচ্ছা তাই যদি ঠিক হয়, আমি যে জাতি, রক্তদন্ত সেই জাতি, তাই যদি ঠিক হয়, তা হোলেই বা রক্তদন্তের অন্নভক্ষণে আমার রুচি হবে কিরূপে? একটী কথা আছে। রক্তদন্তের স্ত্রী-কন্যার যে প্রকার রূপলাবণ্য, যে প্রকার মুখশ্রী, তাতে কোরে রক্তদন্তের পত্নীকে ইতরজাতীয় বোলে কিছুতেই প্রত্যয় হয় না; ব্যবহারেও এই রমণীটী রমণী-রত্ন; ইতরজাতি হোলে এ রকম হতো না। পরিচয়টা মিথ্যা হোলেই ভাল হয় —এ রমণী রক্তদন্তের স্ত্রী, মিথ্যা হলেই ভাল হয়। রক্তদন্তের উপর আমার ঘৃণা, রক্তদন্তকে দেখলেই আমার ভয় হয়, অমরকুমারীকে দেখলে, অমরকুমারীর জননীকে দেখলে উল্লাসে যেন হৃদয় নৃত্য করে; অমরের জননীর হস্তে পাক করা অন্নভক্ষণে কোন দোষ হবে না, কাজে কাজে অনেক ভাবনার পর শেষে এই সিদ্ধান্তটা দাঁড়ালো। না দাঁড়ালেই বা কি হতো? পশ্চিমের হিন্দুস্থানী লোকের মতন দু-বেলা রুটী খাওয়া বঙ্গদেশের পদ্ধতি নয়, তোমাদের ভাত আমি খাব না, এ কথা বলাও ভাল নয়, সুতরাং সেই সিদ্ধান্তের উপদেশেই আমি কাজ কোল্লেম; বেলা দুই প্রহরের পূর্বে স্নেহময়ী মাতুলানীর হস্তে পাক করা অব্যঞ্জন পরিতোষরূপে ভোজন কোল্লেম।

    রক্তদন্ত এলো না; বেলা আড়াই প্রহর অতীত হয়ে গেল, তিন প্রহর হোতে যায়, এখনো এলো না। তবে আর আসবে না, স্থির কোরে, নিতান্ত শেষবেলায় মাতাপুত্রী উভয়ে আহার কোল্লেন।

    একটু পরেই সন্ধ্যা হলো। সন্ধ্যাকালের কাজকর্ম্ম সমাপন কোরে অমরকুমারী আমার কাছে এসে বোসলেন। প্রথমেই আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “সমস্ত দিন গেল, তোমার বাবা তো এলেন না, আহারও কোল্লেন না, কি কাজে তিনি ব্যস্ত আছেন?”

    কুমারী বোলেন, “তাঁর স্বভাবই ঐ রকম। কাজকর্ম্ম থাক, না থাক, বাইরে বাইরে দিন কাটাতেই তিনি ভালবাসেন; মাঝে মাঝে একেবারে ডুব মারেন। কখনো পাঁচ দিন অন্তর, দশ দিন অন্তর, বিশ দিন অন্তর, কখনো বা মাসান্তরে দেখা দেন। এবারে হয় তো সে রকম কোরবেন না। তোমারে এনেছেন, তুমি নূতন এসেছ, তোমার খবরদারী লওয়া দরকার; কি প্রকার ব্যবস্থা করা হবে, দিনে দিনে তিনি সেটা স্থির কোরবেন বোলেছেন, এখন আর বাইরে বাইরে রাত কাটাবেন না। কাল অনেক রাত্রে এসেছিলেন। বেশী রাত্রে বাড়ীতে এলে তিনি বিষম গণ্ডগোল করেন, মিছামিছি চীৎকার শব্দে বাড়ী ফাটান; চিরদিন ঐ রকম অভ্যাস। কাল রাত্রে সেই রকম চীৎকারে তিনি যখন গোলমাল করেন, সেই গোলমালে আমি তখন জেগে উঠি। মা ঘুমচ্ছিলেন, ঘরের ভিতর এসেই বাবা তাঁকে এক ধাক্কা মেরে জিজ্ঞাসা করেন, হরিদাস কোন ঘরে? যে ঘরে তুমি শুয়েছিলে, মা সেই ঘরটী দেখিয়ে দিলেন, বাবা তাড়াতাড়ি একটা চাবীতালা খুঁজে নিয়ে ঘরের দরজার চাবী দিলেন : চাবীটা আমাদের কাছে রাখলেন না, নিজেই রাখলেন। রাত্রি তখন বেশী ছিল না, বাবা কিছুই আহার কোল্লেন না, আমরাও উপবাস কোরে থাকলেম। কেন যে তিনি তোমার ঘরে চাবী দিয়েছিলেন, আমরা তার ভাব বুঝতে পাল্লেম না। আজও হয় তো সেই রকম কোরবেন। সমস্ত দিন তো এলেন না, আজো হয় তো অনেক রাত্রে আসবেন।”

    অমরের জননী অন্যঘরে অন্য কার্যে ব্যাপৃতা। রন্ধনাদি কার্য্য ছাড়া তাকে অনেক কাজ কোত্তে হয়। কাপড় ছিঁড়ে গেলে, বিছানা-বালিশ ছিঁড়ে গেলে, স্বহস্তে সেলাই কোত্তে হয়, নিকটের বাগান থেকে কাঠ কুড়িয়ে আনতে হয়, মাঠের গোবর কুড়িয়ে ঘুটে দিতে হয়, সাজিমাটী দিয়ে ময়লাকাপড় কেচে নিতে হয়, আরো কত কি রকমারী কাজ, একে একে অমরকুমারী অনেক পরিচয় দিলেন। সকল কাজ রাত্রে হয় না, রাত্রে তিনি একখানি ছেঁড়া কাপড় সেলাই কোত্তে বোসেছিলেন, অমরকুমারীও বোসেছিলেন। অমরকুমারীও সেলাই জানেন, কিন্তু আমি একাকী থাকবো, সেটা ভাল দেখায় না, সেই জন্য আমার কাছেই তারে বোসতে হয়েছিল। আমরা দুজনে নির্জ্জনে ঘরে বোসে গল্প কোচ্ছিলেম। কথা কইতে কইতে বার বার আমার মুখের দিকে চেয়ে বুদ্ধিমতী বালিকা হঠাৎ জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “হরিদাস! তুমি যেন সৰ্ব্বক্ষণ অন্যমনস্ক, সদাই যেন বিমর্ষ, এসে অবধি একবারও তুমি ভাল কোরে হেসে কথা কইলে না, একবারও আমি তোমাকে প্রফুল্ল দেখলেম না, মনের ভিতর কি যেন দুর্ভাবনা আছে এই রকম বোধ হয়। আমার মনে হয়, কি যেন তুমি ভাবো। রাতদিন এত কি তুমি ভাবো?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “ভাবনা আমার অনেক। আমার ভাবনার পার নাই, পথ নাই, সীমা নাই। কত কি যে ভাবি, মুখে আমি তা বোলতে পারি না। তোমার বাবা আমাকে আমার দুঃখের কথা তোমাদের কাছে বোলতে বারণ কোরেছেন, কি কারণে বারণ, তা আমি জানি না, সে সব কথা আমি বোলতে পারবো। যেটা আমার এখন বেশী ভাবনা, সেটা কেবল মনের উদ্বেগ; বিষম একটা সন্দেহ। তোমারে দেখা অবধি আমি একটু ভাল আছি, তুমি আমারে বিশ্বাস কোরেছ, আমিও তোমারে বিরক্তি কোরেছি; তোমার কাছে যদি বলি, কারো কাছে প্রকাশ হবে না, সেটাও আমি বুঝতে পাচ্ছি। তুমি যখন জিজ্ঞাসা কোল্লে, তখন আর গোপন রাখতে পারি না; আপনার লোকের কাছে মনের বেদনা প্রকাশ কোল্লে হৃদয়ের ভার অনেকটা লাঘব হয়, এটা সাধুবাক্য; সাবধান, যা তোমাকে আমি বোলবো, কারো কাছে গল্প কোরো না, মায়ের কাছেও না। বর্দ্ধমানে এক বাবুর বাড়ীতে আমি ছিলেম, বাবু, আমাকে যথেষ্ট ভাল বাসতেন, ভবিষ্যতে আমার ভাল কোরবেন অঙ্গীকার কোরেছিলেন, বাড়ীর মেয়েদের কাছেও আমার আদর ছিল। হঠাৎ একরাত্রে সেই দয়াময় বাবুটীকে কোন দুষ্টলোকে খুন কোরে গেছে! বাড়ীতে ডাকাত পোড়েছিল, এই কথা প্রকাশ, পুলিশের তদারকে কিন্তু কোন বিষয়ের কিছুই কিনারা হলো না। ডাকাতে কেটে গেছে, ডাকাতের সন্ধান করা হলো, পুলিশের রিপোর্টে এই পর্য্যন্ত কথা। ডাকাত পোড়েছিল, জিনিসপত্র লয় নাই, কেবল কর্ত্তাকেই খুন কোরেছে, এটা বড় আশ্চর্য্য ব্যাপার! পুলিশের তদন্ত, পুলিশের অনুসন্ধান, এই দুটী বাক্য অথবা এই দুটী কাৰ্য্য অনেক জায়গায় ছেলে ভুলানো প্রবোধের মধ্যেই দাঁড়ায়। প্রথম প্রথম দিনকতক একটু হৈ চৈ পড়ে, তার পর প্রায়ই চাপা পোড়ে যায়। আহা বাবুটীকে কোন দুরাত্মা খুন কোরে গেল, কেনই বা খুন কোল্লে, তাই আমি সৰ্ব্বক্ষণ ভাবি, সেই বাড়ীতে থেকে আমি বেশ জানতে পেরেছিলেম, বাবুর কেহ শত্রু ছিল না, বাবুর স্বভাব অমায়িক ছিল, সকল লোকের উপকারে তিনি অগ্রে দাঁড়াতেন, মিষ্ট সম্ভাষণে সদয় ব্যবহারে সকলকেই তিনি তুষ্ট রাখতেন। আহা! তেমন সদাশয় মহৎলোকের ভাগ্যে এমন বিপরীত ঘটনা কেন হলো?

    রাত্রি অনুমান আটটা। ঘরের দরজাটা ভেজানো ছিল, সজোরে ঝনঝন শব্দে দরজাটা খুলে ফেলে একটা লোক সেই ঘরের মধ্যে প্রবেশ কোরেই দুই হাতে আমার গলা টিপে ধোল্লে! উর্দ্ধদৃষ্টিতে আমি চেয়ে দেখলেম, সেই দুরন্ত দুরাচার রক্তদন্ত! ভীষণগর্জ্জনে সে আমাকে বিস্তর গালাগালি দিয়ে, খোমকে ধামকে বোল্লে, “পাজি! শূয়ার! কুকুর! ইঁদুর! ছুঁচো। এত বড় আস্পর্ধা তোর! পরের বাড়ীর খুন-ডাকাতীর কথা নিয়ে ঘরের ভিতর তোলাপাড়া! কচি-মেয়ের কাছে খুন-ডাকাতীর গল্প? আমি তোকে বারণ কোরেছিলেম, সে কথা ভুলে গেছিস? আচ্ছা, থাক তুই, হাতে হাতে প্রতিফল পাবি।”

    আমাকে ঐ রকমে গালাগালি দিয়ে শাসিয়ে, শেষকালে মেয়েটীর উপরে হুহুঙ্কার! “ও সব কথা তুই কেন শুনতে আসিস? তুই কেন ওর কাছে বোসে থাকিস? এক লাথিতে তোকে আমি যমের বাড়ী পাঠাবো! একটাকে বিদায় কোরেছি, তোকেও সেই পথে বিদায় কোরবো! আয় আয় বেটী আয়, এ ঘর থেকে বেরিয়ে আয় আজ তোকে আমি আর আস্ত রাখবো না, গুঁড়ো কোরে ফেলবো।”

    এইরুপ গর্জ্জন কোত্তে কোত্তে মেয়েটীকে টেনে নিয়ে সেই রাক্ষসটা তখন ঘর থেকে বেরুলো, ঘরের দরজার শিকল টেনে দিলে, ঘরের ভিতর আমি একাকী কয়েদ থাকলেম। রক্তদন্ত গমগম শব্দে ভূতলে পদাঘাত কোত্তে কোত্তে কতরকম চীৎকার কোল্লে, ঘরের হাড়ি-কলসী ঘটী-বাটী ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতে লাগলো, তার পর আমার ঘরের দ্বারে চাবী বন্ধ কোরে বোকতে বোকতে বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেল। বাড়ীখানা যেন একটু জুড়ুলো।

    ঠিক আমি কয়েদী। মনে আবার নূতন ভয়ের আবির্ভাব। সর্ব্বশরীরে নূতন কম্প। অমরকুমারীর সঙ্গে এক ঘরে আমি বেসেছিলেম, অমরকুমারীকে যে সব কথা বোলেছিলেম, রাক্ষসটা হয় তো আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই সব কথা শুনেছিল, তা না হলে, অত রাগ কেন হবে? বর্দ্ধমানের বাবুর বাড়ীর ডাকাতীর কথায় এ লোকটারই বা সে রকম অগ্নিমূর্ত্তি কেন হলো? এর ভিতরেও বোধ হয়, কোন ভয়ঙ্কর গুপ্তব্যাপার আছে। যাই হোক, আমার নিজের এখন উপায় কি?

    উপায় তো কিছুই স্থির কোত্তে পাল্লেম না। লোকটা আমাকে কয়েদ কোরে রেখে গেল, রাত্ৰিমধ্যে আর ফিরে আসবে কি না, সে-ই জানে। যদি আসে, এসেই হয় তো আমাকে কেটে ফেলবে! শাসিয়ে গেল, হাতে হাতে প্রতিফল! আমার আর প্রতিফলের বাকী কি? এই বয়সে, অল্প দিনে কত বিপদের মুখে পতিত হয়েছি, কত কষ্টই সহ্য কোরেছি, আমি জানি, আর যিনি সেই সৰ্ব্বসাক্ষী ভগবান, তিনিই জানেন। হাতে হাতে প্রতিফল!—এটাই বা কি কথা? প্রতিফল কিসের?—কুকার্য্য কোল্লে তো পাপীলোকে প্রতিফল পায়; আমি জন্মাবধি জ্ঞানগোচরে কোন কুকাৰ্য্য করি নাই, যে কার্য্যে পাপ হয়, সে কার্য্য কখনো আমি স্বপ্নেও কল্পনা করি নাই, তবে আমি প্রতিফল কেন পাব? নিরাশ্রয় নিঃসহায় আমি, দয়াময় ভগবান আমাকে রক্ষা কোরবেন, সেই ভরসায় অন্ধকার ঘরের মধ্যে করযোড়ে আমি সেই মঙ্গলময় পরমেশ্বরের শ্রীপাদপদ্ম উদ্দেশে শত শত প্রণিপাত কোল্লেম।

    রাত্রে আর রক্তদন্ত ফিরে এলো না। তার স্ত্রী-কন্যা উপবাসিনী থাকলেন, আমিও উপবাস কোল্লেম। পরদিন বেলা দুই প্রহরের সময় রক্তদন্ত এলো, স্ত্রী-কন্যার উপর পর্ব্ববৎ গর্জ্জন কোল্লে, আমার ঘরের চাবী খুলে আমাকে ধাক্কা দিয়ে বাইরের ঘরে নিয়ে গেল। প্রহরীরা যেমন জেলখানায় কয়েদীগণকে পাহারা দিয়ে স্নান করায়, রক্তদন্ত আমাকে সেই রকমে পাহারা দিয়ে স্নান করিয়ে আনলে। আমি মনে কোল্লেম, বলিদানের অগ্রে বলীকে, যেমন ছাগশিশুকে স্নান করিয়ে শেষকালে গলা কাটে, এ লোকটাও আমাকে সেই রকমে কাটবে, স্নান করানোটা তারি পৰ্ব্বলক্ষণ।

    কুঁজোটা আমাকে কাটলে না, বরং দুটো ভালকথা বোলে মন ভিজিয়ে আবার অন্দরমহলে নিয়ে গেল। অমরের জননী সেই সংসারের লক্ষ্মীস্বরূপিণী, রাক্ষসের তাদশৃ দুর্ব্যবহার সহ্য কোরেও রন্ধন কোরে রেখেছিলেন, সকলের যথাসম্ভব আহার হলো, সেদিনের আহারে আমার একটুও তৃপ্তিবোধ হলো না, আতঙ্ক আমাকে হতাশ কোরে দিয়েছিল।

    অপরাহ্ণে আবার আমাকে দুটী পাঁচটী মিষ্টকথা বলে, সাবধান কোরে, রক্তদন্তটা ঘর থেকে বেরুলো, চাবী দিয়ে রেখে গেল না, আমি খোলসা থাকলেম। সন্ধ্যাকালে অমরকুমারী বাড়ীর মাঝদরজা বন্ধ কোরে আমার কাছে এসে বোসলেন, গত রজনীর হাঙ্গামা শেষ কোরে অন্যকথা কিছুই উত্থাপন কোল্লেন না, আমিও আমার ভাগ্যের কোন কথাই উত্থাপন কোল্লেম না। অশোকবনে সীতাদেবীর যন্ত্রণার কথা রামায়ণে যেরূপ লেখা আছে, অমরকুমারী সেইভাবের গুটীকতক কথা বিরসবদনে আমার কাছে বোল্লেন।

    ভাব বুঝতে পাল্লেম না। পূর্ব্বে কিছু সূচনা ছিল না, হঠাৎ কেন সে কথা মনে কোল্লেম, এটা হয় তো অভাগিনীর অন্তরের উচ্ছ্বাস। এই দুরন্ত লোকের সংসারে কন্যা-জননীর যেরূপে যন্ত্রণাভোগ হয়, বালিকা সেই সব যন্ত্রণা মনে কোরে রাখে। সীতাদেবীর যন্ত্রণার উদাহরণটী বোধ হয় সেই স্মৃতির উচ্ছাস।

    রামায়ণের কথা উত্থাপন না কোরে সহসা আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “তোমার সেই দিদিটীর কি বিবাহ হয়েছিল?” কুমারী ম্লানবদনে উত্তর কোল্লেন, “বিবাহ হয় নাই। তখন তার বিবাহের সময়ও হয় নাই। দিনকতক এক একটা সম্বন্ধ এসেছিল, বাবা তাতে কিছুই মনোযোগ করেন নাই। দিদির নাম সমরকুমারী। নামটা খুব নূতন, ছোটবেলা থেকে দিদি বড় চঞ্চলা ছিল, মুখরা ছিল, গায়ে অনেক জোর ছিল, ছেলেবেলা ছোট ছোট মেয়েদের সঙ্গে খেলা করবার সময় প্রায়ই ঝগড়া কোত্তো; বাখারি, তীর-ধনুক নিয়ে যুদ্ধ কোত্তো; তার চেয়ে বড় বড় মেয়েদের কিল চড় মেরে মেরে ফেলে ফেলে দিতো; এক একজনকে কামড়ে কামড়ে রক্তপাত কোত্তো; মায়ের মুখে শুনেছি, সেই সব দেখে শুনে পাড়ার সম্পর্কের একজন ঠাকুরদাদা আমার দিদির নাম দিয়েছিলো সমরকুমারী। দুঃখের সময় একটা হাসির কথা মনে পোড়লো। একটী লোক তাঁর ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিবার জন্য দিদিকে দেখতে এসেছিল, সমরকুমারী নাম শুনে ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল;—বলে গেল, বাবা! বাঙ্গালীর মেয়ের এমন নাম! ও বাবা? এ মেয়ে নিশ্চয়ই রাক্ষসী হবে! আমার ছেলেটী রোগা, টপ কোরে খেয়ে ফেলে দেবে।

    আমার মুখে হাসি আসে না, কত দিন হাসি ছিল না, তব অমরকুমারীর ঐ কথাগুলো শুনে আমি হাস্য সম্বরণ কোত্তে পাল্লেম না; মৃদু মৃদু হাস্য কোল্লেম। অমরকুমারী আমার হাসি দেখে বড় খুসী হেলেন। মধুর স্বর সুমধুর কোরে প্রফুল্লবদনে ফুল্লমুখে বোল্লেন, “হরিদাস! তিন দিনের মধ্যে একবারও তোমার মুখে আমি হাসি দেখি নাই। আজ তোমারে হাসিয়েছি! বাঃ! তোমার মুখে হাসিটুকু বেশ মানায়!”

    আমোদে আমি হাসি নাই, কৌতুকেও হাসি নাই, বালিকার কথার ভঙ্গীতে হাসি এসেছিল, সেই হাসির জন্য বালিকার মুখে আমি খোসনামী পেলেম;—খোসনামীতে আমি তুষ্ট থাকি না; দৈবাৎ যেখানে যে কেহ আমাকে বেশ ছোকরা বোলে তারিফ কোরেছে, সেইখানেই আমি অন্যমনস্ক হয়েছি। অমরকুমারীর খোসনামীতেও তাদৃশ মনঃসংযোগ কোল্লেম না। তখন আমি মনে মনে আর একটা কথা ভাবছিলেম; কেমন একটা কৌতুহলের উদয় হয়ে ছিল, খানিকক্ষণ চুপ কোরে থেকে, সমসূত্রে কুমারীর মুখপানে চেয়ে, মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “অমর! তোমার বিবাহ হয়েছে?”

    মেঘের কোলে চপলা একবারমাত্র খেলা কোরেই অমনি মেঘ-সাগরে ডুবে গেল। নম্রমুখখানি অবনত কোরে দীর্ঘ দীর্ঘ নেত্রপল্লবে পদ্মমুখী তখনি তখনি দুটী পদ্মনেত্র ঢাকা দিয়ে ফেল্লেন; সুন্দর কপোলযুগল আরক্তবর্ণ ধারণ কোলে; একটু পূর্ব্বে যে মুখে কত কথাই শ্রবণ কোচ্ছিলেম, সে মুখে আর তখন একটী বাক্যও নিঃসত হলো না; লজ্জাবনতমুখী বালিকা ধীরে ধীরে উঠে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

    কথায় কথায় আমরা অন্যমনস্ক ছিলেম, সূর্য্যদেব অস্ত গিয়েছিলেন, অন্ধকার হয়েছিল, জানতে পারি নাই। গৃহিণীঠাকুরাণী সেই ঘরে একটী প্রদীপ জেলে দিয়ে গেলেন, যাবার সময় এদিক ওদিক চেয়ে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “অমর কোথায়?”—তাঁর মুখের দিকে চেয়ে আমি উত্তর কোল্লেম, “ছিলেন এইখানে, এইমাত্র উঠে গেছেন।”

    গৃহিণী রন্ধনগৃহে প্রবেশ কোল্লেন। আমি একাকী যথাস্থানেই বোসে থাকলেম। অনেকক্ষণ অমরকুমারী দেখা দিলেন না। বাড়ী থেকে তিনি কোথাও যান না, বাড়ীতেই আছেন, সেইটী স্থির জেনে জননী উদ্বিগ্ন হোলেন না। বৈকালে বাড়ীর মাঝ-দরজা বন্ধ হয়েছিল, সে দরজা তখন খোলা; তাই দেখে, আমি মনে কোল্লেম, অমরকুমারী সদরবাড়ীতেই গিয়েছেন। একাকী বোসে থাকলেম, একাকী থাকলে চিন্তা-তপ্ত অন্তরে নানা চিন্তার উদয় হয়, নানা চিন্তায় আমার চিত্ত ক্ষণে ক্ষণে অস্থির হোতে লাগলো, আমি যেন তখন চিন্তা-সাগরে ডুবে রইলেম।

    অমরকুমারী সদরমহলেই গিয়েছিলেন, গবাক্ষ দিয়ে দেখলেম, ফিরে এসে রন্ধনগৃহে জননীর কাছে গেলেন। কতক্ষণ তাঁরা সেইখানে ছিলেন, তার পর রন্ধনকার্য্য সমাপ্ত কোরে, দুজনেই একসঙ্গে শয়নগৃহে প্রবেশ কোল্লেন; সে রাত্রে জননীর কিছু বেশী অসুখ বোধ হয়েছিল, অসুখেও তাঁরে সংসারের সমস্ত কাজ-কর্ম্ম কোত্তে হয়, কাজগুলি একরকম সারা হয়েছিল, ঘরে এসে তিনি শয়ন কোল্লেন। মেয়েটা খানিকক্ষণ তাঁর কাছে বোসে থাকলেন, তার পর বাইরে এলেন; এসেই আবার সদরবাড়ীর দিকে চোলে গেলেন। রাত্রি অনুমান এক প্রহর।

    কত কি যে আমি ভাবছি, স্থিরতা রাখতে পাচ্ছি না। চিন্তার সাগর, সে সাগরে আমি থই পাচ্ছি না। একবার মনে হোচ্ছে, এখানে যেন কোন প্রকার বিপদ ঘোটবে, সে বিপদ থেকে নিস্তার পাবার উপায় কি হবে? একবার মনে কোচ্ছি, সত্যই কি রক্তদন্ত আমার মামা? সত্য সত্যই কি অমরকুমারী রক্তদন্তের কন্যা? মীমাংসা কোত্তে বড়ই সন্দেহ উপস্থিত হয়; যতই মনে করা যায়, ততই সন্দেহ বাড়ে। রক্তদন্ত এখানে কেন আমাকে এনেছে? ভাল মতলবে কখনই না; তবে তার মতলব কি? একবার দুটো ভালকথা কয়, একবার বিষবর্ষণ করে, একবার কপটমায়ায় বিড়াল সাজে, একবার ব্যাঘ্ৰমূর্ত্তি পরিগ্রহ করে! লোকটী বড়ই ভয়ঙ্কর! বিকট চেহারাটাই তার উজ্জল প্রমাণ। এই লোকের হাতে আমার যে কি দশা হবে, ভাগ্যে আমার যে কি ফল ফোলবে, কিছুই তো স্থির কোত্তে পাচ্ছি না। তার মেয়ের কাছে আমি বর্দ্ধমানের ডাকাতীর গল্প কোচ্ছিলেম, গোপনে দাঁড়িয়ে সেই কথা শুনে আমাদের উভয়কে যেন খেতে এসেছিল! আজ দুই একটা ভালকথা বোলে বেরিয়ে গেছে, আমাকে চাবী দিয়ে রেখে যায় নাই, একটু সদয়, কিন্তু দুর্জ্জনের প্রসন্নতা, দুর্জ্জনের সদয় ব্যবহার বিষাক্ত ঘৃত দুগ্ধের মত অধিকতর ভয়!

    নানা কথা ভাবছি, রাত্রিও ক্রমশঃ বাড়ছে, ঘর থেকে বেরিয়ে একবার বারান্দায় এলেম, জ্যোৎস্না-রজনী; ফুট জ্যোৎস্না। আকাশে শুক্লপক্ষের দ্বাদশকলা চন্দ্রমার সমুদ্রহাস্য; পৃথিবীও হাস্যমুখী। এ শোভা দেখলে স্বভাবতই মানুষের মনে আনন্দ জন্মে, আমার মনে আনন্দ এলো না; প্রকৃতির শোভা সন্দর্শনে কি যেন এক প্রকার আতঙ্কে আমি কেপে উঠলেম। কি অমঙ্গল?-বারান্দায় আর দাঁড়ালেম না, আবার সেই নির্জ্জন ঘরের মধ্যে প্রবেশ কোল্লেম। কি জানি, কিরূপে ঘরের প্রদীপটী তখন নিবে গিয়েছিল; অন্ধকারে আমি বেসে থাকলেম। সহচর আতঙ্ক, সহচরী চিন্তা। অমরকুমারী এলেন না।

  • ত্রয়োদশ কল্প : নারীবেশ

    ত্রয়োদশ কল্প : নারীবেশ

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    ত্রয়োদশ কল্প : নারীবেশ

    ঘরের ভিতর অন্ধকারে আমি বোসে আছি, অন্যঘরে অমরের জননী শুয়ে আছেন। জাগরিতা কি নিদ্রিতা, জানি না, রাত্রি এক প্রহর অতীত হয়ে গেছে, কোন দিকে আর কোন সাড়াশব্দ পাচ্ছি না, জ্যোৎস্না রাত্রে ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ কিছু কম শুনা যায়, সেই দিকে মন রাখলে বেশীও শুনা যায়, আমি কেবল ঝিল্লীরব শ্রবণ কোচ্ছি; অমরকুমারী এলেন না। কোথায় অমরকুমারী? বিবাহের কথায় লজ্জাতে লজ্জাবতী বাইরে গিয়েছিলেন, আবার ফিরে এসেছিলেন, আমার কাছে আসেন নাই, জননীর কাছে এসেছিলেন, আবার সদরবাড়ীতে গিয়েছেন দেখেছি, ফিরে আসতে দেখি নাই। গেলেন কোথায়? —সদরবাড়ীতেই আছেন। সেখানে কেহ নাই, বালিকা একাকিনী সেখানে কি কচ্ছেন? ইচ্ছা হলো, একবার দেখে আসি।

    উঠি উঠি মনে কোচ্ছি, অকস্মাৎ ঘরের-বাহিরে চৌকাঠের ধারে কাহার পদশব্দ; কে যেন অতি সাবধানে টিপে টিপে আমার দিকে আসছে; কে আসছে? নিশ্বাস বন্ধ কোরে স্থির হয়ে আমি শুনলেম। পা টিপে টিপে কে যেন আমার কাছে এলো; অন্ধকারে আন্দাজে আন্দাজে আমার কাছে এসে বোসলো; অতি মৃদস্বরে আমার কাণের কাছে তাড়াতাড়ি বোল্লে, “চুপ! চুপ! চুপ! আমি অমরকুমারী। মহাবিপদ! বাবু এসেছেন; সঙ্গে দুটো লোক এনেছেন; পরামর্শ হোচ্ছে! সাঙ্ঘাতিক পরামর্শ! বাইরের ঘরের পশ্চিমদিকের লাগাও একটা ছোটঘর, সে ঘরটা তুমি দেখ নাই, ছেলেবেলা আমরা সেই ঘরে খেলা কোত্তেম, এখন আর সে ঘরে বড় একটা কেউ যায় না, বর্ষাকালে কাঠ-ঘুটে থাকে; আমি একাকিনী এত রাত্রে সদরবাড়ীতে আছি, বাবা দেখলেই রেগে উঠবেন, সেই ভয়ে সদরদরজার কাছে তাঁকে দেখেই সেই ছোটঘরে আমি লুকিয়েছিলেম, বাড়ীর ভিতর আসতে পারি নাই, চাঁদের আলোতে দেখতে পেতেন, সেই ভয়েই আসি নাই, সেইখানেই লুকিয়ে ছিলেম; লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁদের সেই ভয়ানক পরামর্শ আমি শুনেছি। রাত দুপুরের সময় তুমি যখন ঘুমিয়ে থাকবে, বাবার লোকেরা সেই সময় তোমারে হাত-পা বেঁধে ধোরে নিয়ে যাবে, কোথাকার একটা নীলকুঠীতে চালান কোরে দিবে। তা যদি না পারে, তবে হয় তো কেটে ফেলবে!”

    শুনে আমার আত্মাপুরুষ কেঁপে উঠলো। শুষ্ক-কম্পিত-মৃদুকণ্ঠে আমি বোলে উঠলেম, “তবে উপায়? এইখানে এইরুপ ডাকাতের হাতে বিঘোরে আমার প্রাণ যাবে, এই কি বিধাতার মনে ছিল? প্রাণে আমার সুখ নাই, এ কথা সত্য, কিন্তু বিঘোরে অপঘাতে প্রাণ হারাব, এ কথাটা ভেবে তো আমি যেন জগৎ অন্ধকার দেখছি!”

    পূৰ্ব্বাপেক্ষা আরো মৃদুস্বরে আশ্বাস দিয়ে আমার হিতৈষিণী ভগ্নী অভয়বচনে বোল্লেন, “ভয় নাই। আমি রক্ষা কোরবো! এখনো সময় আছে। তুমি এক কাজ কর। আমার একখানি শাড়ী পর, দুগাছি পিতলের বালা দিচ্ছি, হাতে দাও, মেয়েমানুষ হও; শীঘ্র!—শীঘ্র! রান্নাঘরের পাশেই খিড়কীদরজা; সে দরজা খোলা আছে, যেখানে তারা বোসে পরামর্শ কোচ্ছে, সেখান থেকে আমাদের রান্নাঘরখানি বেশ দেখা যায়, চাঁদের আলো, উঠানে নামলেই তারা দেখতে পাবে; পুরুষবেশে বাহির হোলে তুমি পালাতে পারবে না, ছুটে এসে তারা ধোরে ফেলবে! মেয়েমানুষ সেজে পালাও! ভগবান যদি দিন দেন, আবার দেখা হবে; তুমি আমারে ভুলে থেকো না, আমিও তোমাকে ভুলে যাব না; ভগবান তোমার মঙ্গল করুন; তুমি পালাও! শীঘ্র! শীঘ্র! —আর বিলম্ব কোরো না; বিলম্বেই বিপদ সম্ভাবনা?”

    প্রাণের মায়া বড় মায়া। প্রাণের মায়ায় আমি সেইখানেই নারীবেশ ধারণ কোল্লেম, দয়াময়ী স্নেহকুমারী একখণ্ড ছিন্নবস্ত্রে আমার মস্তক বেষ্টন কোরে ঠিক যেন একটী কবরী প্রস্তুত কোল্লেন, সেই কৃত্রিম কবরীর উপর একটু, ঘোমটা টেনে দিয়ে আস্তে আস্তে আমি উঠানে নামলেম। কুমারী চুপি চুপি আমার হাতে একটী টাকা দিলেন, কিছুতেই আমি গ্রহণ কোরবো না, দয়াবতী সে কথা শুনলেন না, “রাহাখরচ কোরো” বলে দিব্য দিয়ে গছিয়ে দিলেন, আবার পরমেশ্বরের নাম কোরে মঙ্গলকামনা কোল্লেন। আমি ধীরে ধীরে খিড়কীর দিকে চোল্লেম; আড়ে আড়ে চেয়ে দেখলেম, সদরের ঘরের রোয়াকে তিনজন লোক। নারীবেশে আমিই যেন তখন অমরকুমারী, লোকেরা যদি দেখে থাকে, নিশ্চয়ই আমাকে অমরকুমারী মনে কোরেছে, নতুবা সন্দেহ কোরে ছুটে আসতো, এলো না, আমি মনে মনে নিরাপদ ভাবলেম; তবু আমার বুক কাঁপলো; পরমেশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়ে, দয়াময়ী বালিকাটীকে আশীৰ্ব্বাদ দিয়ে, খিড়কীদরজা পার হয়ে আমি রাস্তায় পোড়লেম! এতক্ষণ প্রায় নিশ্বাস বন্ধ ছিল, রাস্তায় এসে নিশ্বাস ফেল্লেম।

    দু-দিকে দুটো রাস্তা। বামদিকের রাস্তা ধোল্লে রক্তদন্তের বাড়ীর সম্মুখ দিয়েই ঘুরে যেতে হয়, সে দিকে না গিয়ে দক্ষিণের রাস্তা দিয়েই দৌড়!—ভোঁ দৌড়! রাত্রি অন্ধকার হোলে অজানা পথে ছুটে যেতে পাত্তেম না, নিকটেই ধরা পোড়তেম, ভগবান সুধাকরের কৃপায় অনেক দূরে ছুটে গেলেম; ধোত্তে আসছে কি না, কেহ পিছ নিয়েছে কি না, সতর্ক হয়ে এক একবার পশ্চাদ্দিকে চেয়ে দেখি আর প্রাণপণে ছুট দিই!

    এই ভাবে ছুটে ছুটে প্রায় আধ ক্রোশ পথ গিয়েছি, সম্মুখে দেখি, রাস্তার মাঝখানে একখানা গাড়ী। কাদের গাড়ী, কিসের গাড়ী, মানুষ নাই, এত রাত্রে পথের মাঝখানে খালিগাড়ী কেন দাঁড়িয়ে আছে, মনে মনে এইরূপ ভাবছি, এমন সময় দু-দিক থেকে দুজন লোক ছুটে এসে আমার মুখে চোকে কাপড় বেঁধে সেই গাড়ীখানার ভিতর তুলে দিলে; তারাও গাড়ীর ভিতর উঠে বোসলো। একজন আমার সম্মুখে, একজন আমার পাশে। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ঘোড়ারা গাড়ীখানা নিয়ে নক্ষত্ৰবেগে দক্ষিণদিকে ছুটে চোল্লো। লোকেরা তখন আমার মুখের বাঁধন-চক্ষের ঢাকন খুলে দিলে। যে লোকটা সম্মুখে বোসেছিল, তার হাতে একখানা ছোটরকম তলোয়ার; আমার মুখের কাছে সেই তলোয়ারখানা নাচিয়ে নাচিয়ে লোকটা বলতে লাগলো, “খবরদার! চুপ কোরে থাক! যদি কথা কবি, যদি চেঁচাবি, এখনি দুটুকরো কোরে কেটে ফেলবো!”

    আমি আড়ষ্ট! বাকশক্তি তখন যেন আমাকে পরিত্যাগ কোরে গেল। লোক আমাকে ভয় দেখিয়ে কথা কইতে নিষেধ কোল্লে, নিষেধ না কোল্লেও সে সময় আমার রসনা থেকে একটী কথাও নির্গত হতো না। ভাবতে লাগলেম, কে এরা? কোথায়ই বা নিয়ে চোল্লো? কেনই বা মুখ-চোক বেঁধেছিল, কেনই বা খুলে দিলো? প্রাণের ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কতই যে ভাবলেম, এখন আর যে সব কথা মনে পড়ে না। রাত্রিকালে পথে আমাকে ধেরেছে; কেন ধরেছে? পরুষমানুষ রেতের বেলায় মেয়েমানুষ সেজে রাস্তায় বেরলে এখানকার লোকেরা বুঝি এম্নি কোরে ধরে। ধোরে নিয়ে কি করে? ভেবে চিন্তে কিছুই স্থির কোত্তে পাল্লেম না। লোকেরা গাড়ীর দরজা-খড়খড়ি বন্ধ কোরে দিয়েছিল, কোন দিকে যাচ্ছি, গাড়ীখানা কোন পথ দিয়ে চোলেছে, তাও কিছু স্থির কোত্তে পাল্লেম না। দরজা খোলা থাকলেই বা আমি ঠিক কি কোত্তেম? এ সব জায়গায় কখনো আসি নাই, পথ-ঘাট কিছুই জানি না, জ্যোৎস্নারাত্রেও আমার চক্ষে সমস্ত অন্ধকার বোধ হতো। কে এরা? কোথাকার লোক? আমাকে প্রাণে মারবার জন্য দুরাত্মা রক্তদন্ত যাদের ভাড়া কোরে এনেছিল, এরাই কি তারা? না, তারা নয়। আমি যখন অমরকুমারীর পরামর্শে উঠান পার হয়ে খিড়কীর দিকে আসি, তখন একবার সদরের দিকে চেয়ে দেখেছিলেম, তিনজন লোক। একজন রক্তদন্ত, আর দু-জন নূতন। সেই দুজনের মধ্যে জ্যোৎস্নার আলোতে একজনকে আমি একটু একটু চিনতে পেরেছিলেম; ঘনশ্যাম বিশ্বাস। যে লোকটা আমাকে গুরুপত্নীর উপদেশে কারখানাবাড়ীতে ধোরে এনেছিল, ভিকারী সেজে যে লোকটা আমাকে বর্দ্ধমানে নিয়ে গিয়েছিল, বিধাতার অনুগ্রহে যার হাত থেকে আমি অভাবনীয় উপায়ে রক্ষা পেয়েছিলেম, সেই লোকটা—সেই দালাল, মহাজন, ভিকারী ঘনশ্যাম বিশ্বাস। এখন যারা আমাকে ধোরেছে, এদের ভিতর সে লোক নাই। তবে এরা কে? কোথাকার লোক?

    গাড়ীর গতি অত্যন্ত দ্রুত; কিন্তু আমার ভাবনার স্রোত যত দ্রুত প্রবাহিত, গাড়ীর গতি তত দ্রুত নয়; হওয়াটা সম্ভবও নয়। কত দূর গেলেম। এক জায়গায় লোকেরা আমাকে গাড়ী থেকে নামতে বোল্লে, আমি নামলেম, তারাও নামলো। চন্দ্র তখন মধ্যগগন পার হয়ে পশ্চিমে খানিক দূর ঢোলেছিলেন, তখনও বেশ জ্যোৎস্না ছিল; দেখলেম, সম্মুখে একটা নদী; নদীর ধারে নৌকা ছিল, লোকেরা সেই নৌকাতে আমাকে তুল্লে; গাড়ীখানা সেই খান থেকে ফিরে গেল। নৌকাযোগে নদীপার হয়ে আমরাও পারে উঠলেম। একজন আমাকে চৌকী দিতে লাগলো, আর একজন কোথায় চোলে গেল। খানিক পরে আর একখানা গাড়ী আনলে, সেই গাড়ীতে উঠে আমরা প্রায় দুই ক্রোশ পথ অতিক্রম কোল্লেম।

    গাড়ীখানা যেখানে থামলো, তার বামদিকে একখানা দোতালা বাড়ী। সম্মুখে ফটক। ফটকে আলো ছিল না, আকাশেও চন্দ্র ছিল না, শুক্লদ্বাদশীর চন্দ্র, সমস্ত রাত্রি বিহার করেন না, রজনীকে একাকিনী রেখে রজনীকান্ত তখন অস্তাচলে চোলে গিয়েছিলেন, অন্ধকার হয়েছিল, লোকেরা আমাকে সেই অন্ধকারে বাড়ীর ভিতর নিয়ে গেল। সদরবাড়ী। একটা ঘরে আলো ছিল, লোকেরা সেই ঘরে আমাকে টেনে তুল্লে। ঘরে একটী বৃদ্ধলোক বোসে ছিলেন, তাঁর প্রকৃতি গম্ভীর, মাথায় শ্বেতবর্ণ ছোট ছোট চুল, শ্বেতবর্ণ গোঁফ, গলায় তুলসীর মালা, বাহুতে একখানা অর্দ্ধচন্দ্রাকার স্বর্ণকবচ। আমাকে দেখেই সেই বৃদ্ধটী চোমকে উঠলেন; যারা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল, চমকিতস্বরে তাদের জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কে এ?”—–লোকেরা অবাক।

    বৃদ্ধ তখন আমাকেই জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কে তুমি?”—কিছুমাত্র চিন্তা কোরেই আমি উত্তর কোল্লেম, “আমি হরিদাস।”

    আমার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ কোরে, বিস্ময়ে কিয়ৎক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে, বৃদ্ধ পুনরায় আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “এ রকম বেশ কেন তোমার?”

    কি উত্তর করি? সত্যকথা যদি বলি, নানা সন্দেহের কারণ উপস্থিত হবে, ঘটনাসূত্রে লোকের মুখে মুখে রক্তদন্তও হয় তো শুনতে পাবে, বিপদ আরো বেড়ে উঠবে। এক বিপদ থেকে রক্ষা পাবার আশায় নারীবেশে পথে বেরিয়েছিলেম, বেরিয়েই নূতন বিপদে পোড়েছি, তার উপর যদি আরো গোলযোগ হয়, তা হোলে আর রক্ষা পাবার কোন উপায়ই থাকবে না। ভরসা ভগবান; ভগবানের কৃপায় সেই সময় আমার একটা উপস্থিতবুদ্ধি যোগালো। একটা মিথ্যাকথা বোল্লেম। সপ্তগ্রামে পাঠদ্দশায় গুরুদেবের মুখে শুনেছিলেম, এমন এক একটা বিপদ ঘটে, মিথ্যাবাক্য প্রয়োগ না কোল্লে সে বিপদ থেকে উদ্ধার হবার উপায় থাকে না; তাদৃশ স্থলে মিথ্যাকথায় দোষ হয় না, শাস্ত্রেও এরূপ বিধান আছে। সেই কথাটীও তখন আমার স্মরণ হলো, ভেবে চিন্তে কাজে কাজে একটা মিথ্যাকথা বোল্লেম।

    বৃদ্ধের প্রশ্নের উত্তর দিলেম, “আমি বিদেশী বালক, নিরুপায়, নিরাশ্রয়, যাত্রার দলের একজন অধিকারী আমাকে আমার অনিচ্ছায় আপনাদের দলে ভর্তি কোরেছিল। আজ রাত্রে এক বাড়ীতে যাত্রা হয়, অধিকারী আমাকে সখী সাজিয়েছিল; তাদের দলে ভাল ভাল সাজপোষাক নাই, সেই কারণেই আমার এই রকম বেশ। যারা আমাকে এখানে ধোরে এনেছেন, তাঁরা যেখানে আমাকে দেখতে পান, তার আধ ক্রোশ তফাতে যাত্রা। যাত্রা করা আমার ইচ্ছা নয়, অভ্যাসও নয়; অতএব দলের ভিতর থেকে বেরিয়ে চুপি চুপি আমি পালিয়ে আসছিলেম, খুব ছুটে ছুটে আসছিলেম, আসতে আসতেই পথের মাঝখানে ধরা পোড়েছি।”

    এই পর্য্যন্ত বোলেই আমি চুপ কোল্লেম। বৃদ্ধটী হেসে উঠলেন, যারা আমাকে ধোরেছিল তারাও অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে হাসতে লাগলো। একটু পরেই পূর্ব্ববৎ গম্ভীরভাব। বৃদ্ধ আমাকে বোল্লেন, “কিছু মনে কোরো না তুমি, ভুলে তোমাকে ধরা হয়েছে, বৃথা বৃথা কষ্ট পেয়েছো, আচ্ছা থাকো,—রাত্রিও আর বেশী নাই, এই ঘরেই তুমি থাকো; যেখানে যেতে চাও, কাল সকালবেলা বিদায় কোরে দিব।”

    কথার ভাবে বুঝলেম, তিনিই সেই বাটীর কৰ্ত্তা। একজন চাকরকে ডেকে কৰ্ত্তা আমাকে একখানি কাপড় আনিয়ে দিলেন, সখীবেশ পরিত্যাগ কোরে আমি আবার হরিদাস হোলেম; কাপড় ছেড়ে, হাত-পা ধুয়ে ঠাণ্ডা হয়ে বোসলেম; ভয়টা ঘুচে গেল। বড়মানুষের বাড়ী, খাদ্যসামগ্রীর অভাব ছিল না, কৰ্ত্তার হুকুমে বাড়ীর ভিতর থেকে আমার জলখাবার এলো, পরিতোষে জলযোগ কোরে কর্ত্তার সঙ্গে নানা রকম কথা কইতে লাগলেম। আমার কথাবার্ত্তা শুনে কৰ্ত্তা তুষ্ট হোলেন। তার পর সেই ঘরে আমার শয়নের ব্যবস্থা কোরে দিয়ে কৰ্ত্তা বাড়ীর ভিতর উঠে গেলেন, নির্দ্দিষ্ট সুখশয্যায় আমি শয়ন কোল্লেম।

    যে ঘরে আমি, তারি পাশের ঘরে চাকরেরা থাকে। কৰ্ত্তা উঠে যাবার আধ ঘণ্টা পরে সেই ঘরে একটা হাসির গর্‌রা উঠলো। একজন বোল্লে, “সাবাস বাবা সাবাস! কি ধোত্তে কি ধোরেছে! ধোত্তে গেল মেয়েমানুষ, ধোরে আনলে হরিদাস! কানাইবাবু ভারী তুখোড়লোক! ধরেন মাছ, না ছোঁন পানী! এই বাড়ীতে মানুষ হয়ে মামার মেয়েটীকে বেমালুম সোরিয়ে দিয়েছেন, রকমারি আখড়ায় মজা করা হবে, এই মতলব! আর কি তাকে পাওয়া যায়! ধরবার জন্য চারিদিকে লোক ছুটেছে, কেহই ধোত্তে পারবে না; এরা তবু যা হোক একটা ধোরে এনেছিল, হয়ে গেল হরিদাস! এরা ভদ্রলোক, এদের ঘরে এই কাণ্ড! আমরা ছোটলোক, আমাদের ঘরে এমন কাণ্ড হয় না!”

    পাঁচজনে মিলে আবার হেসে উঠলো। আমি তখন একটু একটু বুঝতে পাল্লেম, ব্যাপারখানা কি। বাড়ীতে একজন কানাইবাবু আছেন, কর্ত্তাবাবুর ভাগ্নে তিনি, কর্ত্তার একটী মেয়েকে কুপথগামিনী করা তাঁর কার্য্য, অন্যলোকের দ্বারা সোরিয়ে ফেলেছেন, নিজে খাঁটি হবার চেষ্টা পাচ্ছেন, নিজেও খুঁজতে বেরিয়েছেন। যাঁদের হাতে আমি পোড়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে কানাইবাবু ছিলেন কি না, জানতে পাল্লেম না, কিন্তু বড় ঘৃণা হলো। যারা আমাকে ধোরেছিল, তারা কোন ঘরে শুতে গেল, তাও আমি জানি না। রাত্রি শেষ, নানা ভাবনায় একবারও আমি চক্ষের পাতা বুজতে পাল্লেম না, দুরে দুরে রামপাখী ডেকে উঠলো, গাছে গাছে গায়ক পক্ষীরা গান আরম্ভ কোল্লে, বনে বনে দলে দলে শেয়াল ডাকলো, কাকেরা কা কা রবে বাসা ছেড়ে উড়ে যেতে লাগলো, বুঝতে পাল্লেম, উষাকাল। একটু পরেই প্রভাত। একটী যুবাপুরুষকে সঙ্গে কোরে কর্ত্তাবাবু বৈঠকখানায় এলেন। আমি তখন বিছানার উপর উঠে বোসেছি, কিছুই যেন জানি না, সেইভাবে এদিক ওদিক চেয়ে দেখছি, কৰ্ত্তা এসেই প্রসন্নবদনে আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি হরিদাস! উঠেছ? রাত্রে কোন কষ্ট হয় নাই তো?”

    নম্রস্বরে আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞে না, কোন কষ্ট হয় নাই, বেশ আরামেই ছিলেম; এমন সুন্দর বিছানা আমার ভাগ্যে জুটে না।”

    কর্ত্তা একটু হেসে, যুবাটীর মুখের দিকে চেয়ে, আমার দিকে ফিরে একটু স্নেহ জানিয়ে বল্লেন, “রাত্রে কিছুই আহার হয় নাই, কষ্ট হয়েছে, এইখানে আহারাদি কোরে যেখানে যেতে চাও. সেইখানেই—”

    আর আমি বোলতে দিলেম না; শীঘ্র শীঘ্র বাধা দিয়ে শানুনয়ে বোল্লেম, “আজ্ঞে না, আহারের জন্য এখানে আর আমি বিলম্ব কোরবো না, এ অঞ্চলে থাকতে আমার ভয়; এখনি আমি যাবো।”

    কৰ্ত্তা জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কোথায় তুমি যাবে?”—সাত পাঁচ ভেবে আমি উত্তর কোল্লেম, “কোথায় যাব, ঠিক নাই; যাবার জায়গা আমার কোথাও নাই; আমি বড় গরিব; আমার আপনার লোক কেহই নাই, থাকবার স্থানও কোথাও নাই; যেখানে আশ্রয় পাব, যেখানে একটী চাকরী পাব, যেখানে দশজনের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হবে, ভবিষ্যতে ভাল হবার আশা থাকবে, সেই রকম জায়গাই আমি অন্বেষণ কোচ্ছি।”

    একটু চিন্তা কোরে কর্ত্তা বল্লেন, “সে রকম জায়গা পাড়াগাঁয়ে বড় কম; সহরেই সবরকম সুবিধা; আচ্ছা, বেশ কথা; সেই রকম জায়গাতেই তোমাকে আমি পাঠাব। আমার একটী ভাইপো আজ কলিকাতায় যাবেন, তারি সঙ্গে তুমি যাও, দেখে শুনে তিনি তোমার একটা বিলি-ব্যবস্থা কোরে দিবেন। সেই কথাই ভাল। থাকো, আহারাদি কর, আমরা ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণের বাড়ীতে সকলেই আহার কোত্তে পারে, এখানে আহার কোত্তে তোমার কোন বাধা নাই।”

    আর আমি আপত্তি কোত্তে পাল্লেম না, অস্বীকার করাও শিষ্টাচারবিরুদ্ধ; বিশেষতঃ কলিকাতায় যাবার সুবিধা হোচ্ছে; কলিকাতার নাম আমি শুনেছি, অনেক দিন অবধি কলিকাতা-দর্শনের ইচ্ছা রয়েছে, সুবিধা ঘটে নাই। পুস্তকে পাঠ কোরেছি, কলিকাতা সহর ভারতবর্ষের রাজধানী, সেখানে লক্ষ লক্ষ লোকের অন্ন হয়, লক্ষ লক্ষ লোকে কাজকর্ম্ম পায়, কেহই বেকার থাকে না; সেখানে অনেক রকম কারবার চলে, অনেক রকম চাকরী মেলে, অনেক দেশের লোক কলিকাতায় গিয়ে সুখে থাকে, আমি কলিকাতায় যাব। একজন ভদ্রলোক আমাকে সঙ্গে কোরে নিয়ে যাবেন, এটা আরও বিশেষ সুবিধা। কলিকাতা অনেক দূর; চিনে চিনে ততদূর হেঁটে যাওয়া আমার অসাধ্য; যানবাহনেরও খরচা নাই; অমরকুমারীর দত্ত একটী টাকামাত্র আমার সম্বল; অসুবিধা অনেক; এই সকল বিবেচনা কোরে কৰ্ত্তার প্রস্তাবেই আমি সম্মত হোলেম।

    কৰ্ত্তার নাম বাণেশ্বর চট্টোপাধ্যায়, তাঁর ভ্রাতুষ্পত্রের নাম নরহরি চট্টোপাধ্যায়। বাণেশ্বরবাবু একজন জমীদার। তাঁর জমীদারীতে নায়েবগোমস্তা অনেক আছে, কিন্তু ঐ নরহরিবাবুই সময়ে সময়ে সমস্ত জমীদারী পর্য্যবেক্ষণ করেন, মামলা-মোকদ্দমার তদ্বিরাদি করেন, তাঁর উপরেই সকল ভার। সম্প্রতি আলীপুরের দেওয়ানী আদালতে কি একটা বৃহৎ মোকন্দমা রজৃ আছে, সেই মোকদ্দমার তদ্বির করবার জন্যই নরহরিবাবু কলিকাতায় যাবেন, এইরূপ বন্দোবস্তই আমি জানতে পাল্লেম।

    বেলা এক প্রহরের পর আমরা আহার কোল্লেম। আহারান্তেই যাত্রা। কৰ্ত্তা আমার জন্য একজোড়া ধুতি-চাদর আর দুটী জামা আনিয়ে দিলেন, আর কি কি ব্যবস্থা কোত্তে হবে, ভ্রাতুষ্পত্রকে চুপি চুপি সে সব কথা বোলে দিলেন। নূতন কাপড় পোরে, নূতন জামা গায়ে দিয়ে, সেইখানে আমি এক রকম বাবু সাজলেম। অনন্তর কর্ত্তাকে প্রণাম কোরে নরহরিবাবুর সঙ্গে বাড়ী থেকে আমি বেরুলেম। ঘরের গাড়ী প্রস্তুত ছিল, সেই গাড়ীতে আরোহণ কোরে আমরা যাত্রা কোল্লেম; সঙ্গে একজন চাকর থাকলো। গাড়ীখানা সরাসরী উত্তরমুখে চোল্লো।

    লোকেরা রাত্রিকালে যখন আমাকে ঐ বাড়ীতে নিয়ে যায়, পথে তখন একটা নদী পার হোতে হয়েছিল, এবারে নদী দেখা গেল না, খানিক দূর কেবল একটা বালীর চড়ার উপর দিয়ে গাড়ী এলো। চড়া পার হয়ে নরহরিবাবুকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “রাত্রে এ পথে গাড়ী আসে নাই, নদী ছিল, এটা কি তবে সে পথ নয়?”

    বাবু উত্তর কোল্লেন, “সেই পথ। নদী আমরা পার হয়েছি। আশ্চর্য্য নদী। সৰ্ব্বদা জল থাকে না, অল্প অল্প বৃষ্টি হোলে কিম্বা আকাশে মেঘ দেখা দিলে নদীতে জল হয়, অতি বেগে স্রোত বয়, অন্য সময়ে কেবল বালী ধূ ধূ করে। কল্য দিবাভাগে মেঘ ছিল, এদিকে বৃষ্টিও হয়েছিল, সেইজন্য গাড়ী চলে নাই।”—জিজ্ঞাসা কোরে জানলেম, সেই নদীর নাম ময়ুরাক্ষী নদী। পূর্ব্বে বোলেছি, বীরভূমের প্রধান সহর সিউড়ী। গাড়ীখানা সিউড়ীতে একবার থামলো, সেইখানে ঘোড়া বদল কোরে আবার আমরা সদর-রাস্তায় যেতে লাগলেম। এখানকার রাস্তাগুলি বড় সুন্দর; মিউনিসিপালিটীর সাহায্য ব্যতিরেকে বালী-কাঁকরে নির্ম্মিত; বর্ষাকালেও কাদা হয় না, সৰ্ব্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। আমাদের গাড়ী সেই পথে বরাবর একটা জায়গায় এসে থামলো; সেই জায়গার নাম সাঁইথিয়া। যে সময়ের কথা আমি বোলছি, সে সময় এদেশে রেল পথ হয় নাই, এখন সাঁইথিয়াতে ইষ্টইণ্ডিয়া-রেলওয়ে কোম্পানীর একটী ষ্টেশন হয়েছে।

    সাঁইথিয়া থেকে ঘরের গাড়ীখানি বিদায় হয়ে গেল, আমরা একখানা ভাড়াটিয়া গাড়ীতে আরোহণ কোরে কলিকাতার দিকে আসতে লাগলেম। কোথাও ঘোড়ার গাড়ী, কোথাও গরুর গাড়ী, কোথাও নৌকা, এইরূপ বিবিধ যানে, মাঝে মাঝে বিশ্রাম কোরে, তিন দিনে আমরা কলিকাতায় পৌঁছিলেম।

  • চতুর্দ্দশ কল্প : রাজধানী

    চতুর্দ্দশ কল্প : রাজধানী

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    চতুর্দ্দশ কল্প : রাজধানী

    গঙ্গার পূর্ব্বতীরে কলিকাতা সহর। এই সহরটী এখন ভারতবর্ষের রাজধানী। ইংরেজেরা এখানে মা গঙ্গার নাম রেখেছেন হুগলী। ইংরেজী অক্ষরে গঙ্গানামটী লেখা যায় না, এমন কথা নয়; গঙ্গাকে আমরা দেবতা বলি, সেই কারণ গঙ্গানাম লিখনে বা উচ্চারণে হয়তো তাঁরা ঘৃণা বোধ করেন। গঙ্গাকে তাঁরা ইচ্ছামত ভিন্ন ভিন্ন নামে ভাগ কোরে নিয়েছেন। কোথাও গঙ্গা, কোথাও ভাগীরথী, কোথাও হুগলী; যে স্থানটুকু গঙ্গা, সে স্থানেও তাঁরা গঙ্গনামটী লেখেন না, কল্পনাবলে ভূগোলাদিতে লিখে দেন, “গ্যাঞ্জেস্।” ইংরেজ আমাদের রাজা, তাঁদের যে রকম ইচ্ছা, রাজক্ষমতায় অবশ্যই তাঁর মা গঙ্গার সেই রকম নাম দিতে পারেন, কিন্তু আমাদের ভাগীরথী গঙ্গা যত দিন ভারতভূমিতে প্রবাহিত থাকবেন, ততদিন পতিতপাবনী গঙ্গানাম কিছুতেই বিলুপ্ত হবে না; কালক্রমে গঙ্গা যদি সত্য সত্যই শুষ্কতোয়া হন, তথাপি চিরপ্রসিদ্ধ গঙ্গনামটী ভারতবাসী আর্য্য-সন্তানের চিরস্মরণীয় থাকবে।

    মা গঙ্গার পূৰ্ব্বতীরে কলিকাতা। নৌকাপথে আমাদের কলিকাতায় আসা হয়েছিল। যে ঘাটে আমরা অবরোহণ করি, সেই ঘাটটীর নাম জগন্নাথ-ঘাট। সে ঘাটে নৌকা লাগাবার কারণ এই ছিল যে, জোড়াসাঁকো অঞ্চলে বীরভূমের বাণেশ্বরবাবুদের একখানি বাড়ী ছিল, সেই বাড়ীখানি জগন্নাথঘাট থেকে অতি নিকট। নৌকা থেকে উঠে প্রথমেই আমরা জোড়াসাঁকোতে গেলেম। যতদূর গেলেম, ততদূর কেবল দু-ধারে সারি সারি ছোট বড় অট্টালিকা; মাঝে মাঝে দোকান। বাবুদের বাড়ীতে রাত্রিবাস করা হলো, কলিকাতায় গঙ্গার যেরূপ অপরুপ শোভা দর্শন কোরে এলেম, রাত্রে সেই শোভার সমালোচনা আমার হৃদয়ক্ষেত্রে সমূদিত হোতে লাগলো। অপরুপ শোভা! বহুদূর-ব্যাপ্ত অসংখ্য তরণী! কোনখানি হালভরে, কোনখানি পালভরে, উত্তরদক্ষিণে ভেসে ভেসে চোলেছে, বায়ু-হিল্লোলে হিল্লোলিত হয়ে গঙ্গা-তরঙ্গ যেন মধুময় প্রেমতরঙ্গে নেচে নেচে যাচ্ছে; বোধ হলো যেন জীবপূর্ণ, পণ্যপূর্ণ তরণীগুলি বক্ষে নিয়ে পলক-প্রমোদে মা গঙ্গা নিজেই তালে তালে নৃত্য কোচ্ছেন, তরণীগুলিও বায়ুপ্রভাবে তরঙ্গপ্রভাবে হেলে দুলে নৃত্য কোচ্ছে; সাহেবলোকের বড় বড় জাহাজ স্থানে স্থানে মাস্তুলাঙ্গ ধ্বজপতাকায় সুশোভিত হয়ে শৃঙ্গশোভিত অচল-পৰ্ব্বতের ন্যায় নঙ্গর করা রয়েছে; দৃশ্য অতি চমৎকার! যখন আমরা নেমেছিলেম, তখন বেলা প্রায় দশটা; নগরবাসী লোকের স্নানের সময়; গঙ্গার প্রতি যাঁদের অচলা ভক্তি, তাঁরা সকলেই প্রতিদিন গঙ্গাস্নান করেন; যাঁদের অল্প ভক্তি অথবা যাঁরা ভক্তিশূন্য, তাঁরাও গঙ্গাস্নানে আনন্দ অনুভব করেন; অসংখ্য স্ত্রী, পুরুষ, বালক, বালিকা একসঙ্গে এক এক ঘাটে পরমানন্দে স্নান কোচ্ছেন; বালক-বালিকারা অল্প জলে গঙ্গার সঙ্গে হেসে হেসে খেলা কোচ্ছে; একটু বেশী বয়সের বলবান ছেলেরা গঙ্গাবক্ষে সাঁতার দিয়ে দিয়ে ভেসে যাচ্ছে; গঙ্গা-ভক্তি স্ত্রীলোকের হৃদয়েই অধিক বিরাজ করে, স্ত্রীলোকেরা স্নানান্তে পুষ্প-চন্দনে শিবপূজার সঙ্গে গঙ্গা-পূজা কোচ্ছেন; ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতেরা অষ্টাঙ্গে গঙ্গা-মূর্ত্তিকা লেপন কোরে, ললাটে তিলক কেটে, চক্ষু বুজে ধ্যানযোগে বোসে আছেন; বহুলোকের সমাগমে গঙ্গার জল-স্থল পরম শোভা ধারণ কোরেছে; সেই শোভা আমি নূতন দর্শন কোরেছি, সেই জন্যই গঙ্গ-প্রসঙ্গে এত কথা বোল্লেম।

    প্রভাতে নগরদর্শন। নরহরিবাবুর মধ্যে মধ্যে কলিকাতায় আসা আছে, কলিকাতার অন্ধিসন্ধি তাঁর বেশ জানা ছিল, তিনি আমাকে সঙ্গে কোরে সহরটা দেখালেন। শকটারোহণে নগরদর্শন ভাল হয় না, অতএব প্রাতে ও অপরাহ্নে পদব্রজেই আমরা বেরতেম। পূর্ব্বে কখনো আমি কলিকাতা দেখি নাই, এই সবে নূতন দেখা; দু-এক দিনে সূক্ষ্মানুসূক্ষারূপে দর্শন করা অসম্ভব, ভ্রমণে ও দর্শনে আমাদের সাত দিন লাগলো। যা যা দেখলেম, সমস্তই আশ্চর্য্য।

    বাড়ী, গাড়ী, দোকান, এই তিনটী জিনিস অসংখ্য। যে দিকে যাই, সেই দিকেই বাড়ী, সেই দিকেই গাড়ী, সেই দিকেই দোকান। ঠাঁই ঠাঁই বৃহৎ বৃহৎ অট্টালিকা; ক্ষদ্র-বৃহৎ এত বাড়ী আমি দর্শন কোল্লেম, গণনা কোরে শেষ করা যায় না। এক জায়গায় এত অট্টালিকার সমাবেশ, সেই কারণেই বোধ হয়, কলিকাতার নাম প্রাসাদ-নগরী। কলিকাতায় বাজার অনেক, বাজারগুলি তন্ন তন্ন কোরে আমি দেখলেম; বাজারে বাজারে নানাদেশের নানাপ্রকার জিনিসপত্র বিক্রয় হয়। ইংরেজী-বাজার ধর্ম্মতলায়, বাঙালীবাজার বাঙালীটোলায়। বাজারগুলি দিব্য গুলজার। নিকটে নিকটে পুলিশের থানা, রাস্তায় রাস্তায় দিবারাত্রি প্রহরীদের ঘাঁটি। নরহরিবাবুর সঙ্গে থানাগুলি আমি দেখলেম, আদালতগুলি আমি দেখলেম, কেল্লা আর কেল্লার মাঠ একদিন দেখে এলেম। দক্ষিণে আলীপুর, ভবানীপুর, কালীঘাট। আলীপুরে নরহরিবাবুর মোকদ্দমা। একদিন তাঁর সঙ্গে আলীপুরে গিয়ে সেখানকার আদালতগুলিও দর্শন কোল্লেম। দেওয়ানী, ফৌজদারী এক জায়গায় নয়, ফৌজদারী কাছারীর অনেক দূর পশ্চিমে স্বতন্ত্র বাড়ীতে জজ-আদালত; সেই বাড়ীতে জজ, সদরআলা, সদর-আমীন আর মুন্সেফেরা এজলাস করেন। দেওয়ানী-ফৌজদারী উভয় বিভাগেই হাকিমের সংখ্যা বেশী। নরহরিবাবুর মুখে শুনলেম, এত বড় আদালত আর এতাধিক হাকিম বঙ্গদেশের আর কোন জেলাতেই নাই। এই জেলাটী সদরজেলা; এ জেলার নাম চব্বিশ পরগণা। রাজধানীর নিকট বোলেই এই জেলার প্রাধান্য। বঙ্গদেশের লেফটেনাণ্ট গবর্ণর এই আলীপুরের বেলভেডিয়ার উদ্যানে বাস করেন।

    কলিকাতা উত্তম সহর; লোকের মুখে শুনেলেম, পূর্ব্বে কলিকাতার এ অবস্থা ছিল না। স্থানে স্থানে জঙ্গল ছিল, বাগান ছিল, পচা পচা পূষ্কর্ণী ছিল, পশু-পক্ষী অনেক বাস কোত্তো, ভদ্রলোক অপেক্ষা ইতরলোক আর দুষ্টলোকই বেশী ছিল, ক্রমে ক্রমে সংস্কার হয়ে আসছে।

    ঐ সকল কথার সার্থকতাও আমি বেশ অনুভব কোল্লেম। অনেকগুলি রাস্তার নামে তদ্বিষয়ের প্রমাণ পাওয়া যায়। হাতীবাগান, বাদুড়বাগান, ভাল্লুকবাগান, ডালিমবাগান, পেয়ারাবাগান, গয়াবাগান, হরীতকীবাগান, চোরবাগান, জোড়াবাগান, ডিঙ্গীভাঙা, শানকীভাঙা, কসাইটোলাঁ, উলটাডিঙী, নারিকেলবাগান ইত্যাদি পরিচয়ে বেশ জানা যায়, পূর্ব্বে এ সহরের এরূপ শ্রী ছিল না; পূষ্কর্ণী-পরিচয়ে এক দৃষ্টান্ত হেদুয়াদিঘী। ইংরেজশ্রীবৃদ্ধিকারিদলের অনুগ্রহে কলিকাতা ক্রমে ক্রমে সুন্দর শ্রীধারণ কোচ্ছে, ক্ৰমশঃ আরও সুন্দর হবে, তারও আভাস পাওয়া গেল।

    নরহরিবাবু প্রায় কুড়ি দিন কলিকাতায় থাকলেন; সেই কুড়ি দিন আমি তাঁদের বাড়ীতেই থাকলেম। পাচক-ব্রাহ্মণ নিযুক্ত হয়েছিল, আহারাদির কোন কষ্টই ছিল না। থাকতে থাকতে পাড়ার পাঁচজন ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার জানাশুনা হলো; পরিচয় হলো না, পরিচয় আমার কি আছে, কাহার কাছে কি পরিচয় দিব, কিছুই পরিচয় হলো না; তথাপি বিনা পরিচয়ে ভদ্রলোকেরা আমাকে যেন ভালবাসলেন, লক্ষণে এইরূপ আমি বুঝলেম।

    একদিন একটী ভদ্রলোক আমাকে সাবধান কোরে বোল্লেন, “এ সহর বড় ভয়ঙ্কর স্থান; চোর, জয়াচোর, গাঁটকাটা, জুয়ারী, মাতাল, লম্পট এখানে অনেক; ভদ্রলোকের সঙ্গে তুলনায় বদমাসলোকের সংখ্যাই অধিক। সহরে যখন একাকী বাহির হবে, খুব সতর্ক হয়ে থেকো, অচেনা লোকের কথায় শীঘ্র বিশ্বাস কোরো না, দুষ্টলোকের মিষ্টকথায় ভুলো না, ছেলেমানুষ তুমি, খুব সাবধান হয়ে চোলো; অসাবধান হোলেই বিপাকে ঠেকবে। সাবধান! সাবধান। বিশেষতঃ রাত্রিকালে।”

    ভ্রমণকালে কতক কতক লক্ষণ দেখে দেখে ঐ রকম অনেকটা আমি বুঝেছিলেম, সাবধান হয়েই বেড়াতেম; ভদ্রলোকের মুখে স্পষ্ট স্পষ্ট ভয়ের কথা শুনে তদবধি আমি আরো অধিক সতর্ক হোলেম।

    নরহরিবাবুর দেশে যাবার দিন নিকট হয়ে এলো। আমাকে তিনি কোথায় কার কাছে রেখে যাবেন, বোধ হয়, আগে থেকেই ভেবেছিলেন। একদিন সন্ধ্যার পর পাড়ার একটী ভদ্রলোক তাঁর সঙ্গে দেখা কোত্তে আসেন, লোকটীর বয়স কিছু ভারী, দিব্য শান্তমূর্ত্তি, চেহারায় জানা যায়, বাবুলোক। আমাকে কাছে ডেকে, নরহরি সেই লোকের নিকটে সুপারিশ কোরে সংক্ষেপে সংক্ষেপে বোল্লেন, “এই ছোকরার কথাই আমি আপনাকে বোলেছিলেম; যেমন বয়স, সেই হিসাবে সম্ভবমত লেখাপড়া শিখেছে, চরিত্র খুব ভাল, অবাধ্যতা জানে না, অত্যন্ত গরিব, আপনি যদি দয়া কোরে এটীকে রাখেন, আমার যথেষ্ট উপকার করা হবে, গরিবকে আশ্রয় দিলে আপনারও পূণ্য হবে, ইহার দ্বারা আপনার ছোট ছোট কাজকর্ম্ম বেশ চোলবে, ছোকরা খুব বিশ্বাসী, সত্যবাদী, ধর্ম্মভীরু; অল্পদিনে অনেক পরিচয় আমি পেয়েছি।”

    তাঁকে আর বেশী কথা বোলতে হলো না, আমার মুখপানে চেয়ে, একটু হেসে ভদ্রলোকটী বোল্লেন, “কি বল হরিদাস! আমার বাড়ীতে তুমি থাকবে? কাজকর্ম্ম বেশী কিছু নয়, দপ্তরখানায় বোসে অল্প অল্প লেখাপড়া করা; আর বিশেষ প্রয়োজন উপস্থিত হোলে এক আধবার বাজারে যাওয়া, এই মাত্র কার্য্য। কেমন, রাজী আছ?”

    নমস্কার কোরে তৎক্ষণাৎ আমি সম্মত হোলেম। পূর্ব্বে দুই একদিন ঐখানে তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল, তাতেই তিনি জানতে পেরেছিলেন, আমার নাম হরিদাস। আমিও তাঁর সততা অনুভব কোরেছিলেন, তাঁর কাছে চাকরী কোত্তে আমার অনিচ্ছা হলো না, বরং আহ্লাদ হলো। খানিকক্ষণ থেকে সেই বাবুলোকটী আপন বাড়ীতে চোলে গেলেন, “কল্য আবার দেখা হবে,” এই কথা বোলে গেলেন।

    সেদিন রবিবার। আগামী বুধবার নরহরিবাবুর স্বদেশযাত্রা। সোমবার বৈকালে সেই বাবুটী আবার এলেন। আমাকে সঙ্গে কোরে নিয়ে যেতে চাইলেন, নরহরিবাবু বাধা দিয়ে বোল্লেন, “আজ নয়, এ দু-দিন এইখানেই থাকুক, যেদিন আমি যাব, সেই দিন আপনার কাছে রেখে যাব।” সেই কথাতেই বাবুটী রাজী হোলেন; নরহরিবাবুর বাড়ীতেই আমি থাকলেম।

    মঙ্গলবার বৈকালে আমাকে সঙ্গে নিয়ে নরহরিবাবু একবার বাজারে বেরুলেন; দেশের জন্য যা কিছু, খরিদ করা অবিশ্যক ছিল, খরিদ কোল্লেন আমার জন্য আর এক জোড়া ধুতী-চাদর, আর এক জোড়া জামা আর এক জোড়া বার্ণিসকরা বিলাতী জুতা কিনে দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে মুটে এলো, সন্ধ্যার পূর্ব্বেই আমরা বাড়ীতে ফিরে এলেম।

    রাত্রে নূতন অভিনয়। কল্য প্রাতে নরহরিবাবু দেশে যাবেন সন্ধ্যার সময় দুটী পাঁচটী বন্ধুবান্ধব দেখা কোত্তে এলেন, প্রসঙ্গাধীন পাঁচরকম গল্প হলো। তাঁরা উঠে যাবার পর নরহরিবাবু আমাকে ডাকলেন, ম্লানবদনে আমি তাঁর কাছে গিয়ে বোসলেম। দু-চারি কথার পর আমার হাতে ৫০০৲ টাকার পাঁচখানি ব্যাঙ্কনোট দিয়ে বাবু স্নেহবচনে বোল্লেন, “এই নোটকখানি রাখ। আমি দেশে চোল্লেম, মাসখানেক পরে আবার আসবো, তুমি কেমন থাকো, সাক্ষাৎ কোরে জেনে শুনে যাব, তুমি সাবধানে থেকো, সাবধান হয়ে কাজকর্ম্ম কোরো, বাবুটী লোক ভাল, আপাততঃ তোমাকে কিছু কিছু, জলপানী দিবেন, কাজকৰ্ম্ম শিখলে, থাকতে থাকতে তোমার ভাল হবে।”

    নোটকখানি ফিরিয়ে দিয়ে, কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমি বোল্লেম, “এ সব আমাকে কেন দিচ্ছেন? আমি আপনাদের কি উপকার কোরেছি? আমাকে টাকা দেওয়া কিসের জন্য? আপনাদের কাছেই বরং আমি উপকার পেয়েছি, তজ্জন্যই কৃতজ্ঞ আছি, চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকবো, টাকা আমি গ্রহণ কোরবো না; ও টাকা আপনিই রাখুন।”

    শান্তবদনে বাবু বোল্লেন, “সে জন্য নয়, তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছ, অকারণে আমাদের লোকেরা তোমাকে ধোরে কত কষ্ট দিয়েছে, তজ্জন্য আমরা বড় দুঃখিত আছি। জ্যাঠামহাশয় বলে দিয়েছেন, সে সব কথা তুমি কিছু মনে কোরো না, ভুলক্রমে লোকেরা তোমায় পোরেছিল, সে কথা কারো কাছে গল্প কোরো না, ভুলে যেয়ো। নোট-কখানি দিচ্ছি কেন, সে কথাও বোলছি; কর্ত্তার অনুমতি। বিশেষতঃ যেখানে তোমাকে আমি রেখে যাচ্ছি, সেখানে যদি তোমার কষ্ট হয়, সে বাড়ীতে যদি তুমি বেশী দিন থাকতে না পার, আশ্রয়হারা হয়ে ফাঁপরে পোড়বে :—সহর জায়গা, বিশেষ কলিকাতা, এখানে সহজে কেহ তোমাকে আশ্রয়ও দিবে না, কারো কাছে সাহায্য পাবে না; ছেলেমানুষ, অর্থাভাবে কোথায় যাবে, কি কোরবে, কোথায় থাকবে, বড়ই কষ্ট হবে; নোট-কখানি রাখ, আবশ্যকমত খরচপত্র কোরো; গ্রহণ না কোল্লে আমি বড়ই ক্ষুণ্ণ হব; কত্তাও ক্ষুণ্ণ হবেন।”

    আমিও গ্রহণ কোরবো না, তিনিও কিছুতে ছাড়বেন না, বার বার জেদ কোত্তে লাগলেন, কাজেই সেই পাঁচখানি নোট গ্রহণ কোত্তে হলো; অগত্যা স্বীকার।

    রাত্রি দশটার পূর্ব্বে আহারাদি কোরে আমরা যথাস্থানে শয়ন কোল্লেম। বাণেশ্বরবাবুর বদান্যতা, নরহরিবাবুর ভদ্রতা আর আমার অদৃষ্টের প্রসন্নতা চিন্তা কোত্তে কোত্তে নিদ্রিত হোলেম, ঊষাকালে নিদ্রাভঙ্গ হলো। প্রভাতে নরহরিবাবু গাত্রোত্থান কোরে, নিয়মিত কার্য্য সমাপন কোল্লেন, যে বাড়ীতে আমাকে রাখবার কথা, সঙ্গে কোরে সেই বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। বাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো, সময়োচিত কথাবার্ত্তার পর বাবুর হস্তে আমাকে সমর্পণ কোল্লে, বাবুর কাছে বিদায় নিয়ে, নরহরিবাবু আপন বাড়ীতে চোলে এলেন। কখন তিনি যাবেন, যাবার সময় দেখা কোরবো, সেই অভিলাষে আমার নূতন মনিবকে বোলে, আমিও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে এলেম। দূরপথে যাওয়া, কোথায় কখন আহার হবে, হবে কি না হবে, কিছুই নিশ্চয় ছিল না, অতএব সেইখানেই আহারাদি সমাপন কোরে, বাড়ীর দরজায় চাবী দিয়ে, তিনি গাড়ীতে উঠলেন। আমার চক্ষে জল এলো, আমার মুখপানে চেয়ে, তাঁর চক্ষু-দুটীও সজল; মিষ্টবাক্যে আমাকে সান্ত্বনা কোরে, নানাপ্রকার হিতোপদেশ দিয়ে, তিনি নেত্রমার্জ্জন কোল্লেন; আর আমার দিকে চাইতে পাল্লেন না। জিনিসগুলি গাড়ীর ভিতর তুলে দিয়ে চাকরটী কোচবাক্সে কোচমানের কাছে বোসল, গাড়ীখানা গড়গড় শব্দে গঙ্গার দিকে ছুটে চোল্লো।

    খানিকক্ষণ চেয়ে চেয়ে চক্ষু মুছতে মুছতে আমি মনিব-বাড়ী ফিরে এলেম।

  • পঞ্চদশ কল্প : এ আবার কি কাণ্ড?

    পঞ্চদশ কল্প : এ আবার কি কাণ্ড?

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    পঞ্চদশ কল্প : এ আবার কি কাণ্ড?

    যে বাড়ীতে আমার চাকরী হলো, সেই বাড়ীখানি দোতালা; সম্মুখে ঝিলিমিলি দেওয়া টানা বারান্দা; সদরবাড়ীতে অনেকগুলি ঘর। উপরের একটী ঘরে বাবু বসেন, আর সব ঘরগুলি প্রায় সৰ্ব্বদাই শূন্য থাকে, ক্রিয়াকর্মোপলক্ষে জনপূর্ণ হয়। সব ঘরগুলি কিন্তু সমভাবে সাজানো। নীচের দুটী ঘরে দপ্তরখানা, উত্তরদিকে পুজার দালান, বাড়ী চকবন্দী;—চকের অন্যান্য ঘরে সরকার, মুহুরী, গোমস্তা, খানসামা আর অন্যান্য চাকর থাকে। সদরে দেউড়ী আছে, দরোয়ান নাই।

    বাবুর নাম প্রতাপচাঁদ মৈত্র, বারেন্দ্ৰশ্রেণী ব্রাহ্মণ; বর্ণ উজ্জ্বল শ্যাম, গঠন নাতিদীর্ঘ, দোহারা, চক্ষুদুটী বড় বড়, মুখখানি সুন্দর, দীর্ঘ নাসিকার অগ্রভাগটী কিছু টেপা, মাথার চলগুলি কিছু লম্বা লম্বা, বয়স অনুমান পঞ্চাশ বৎসর। বাবুর দুটী পত্র, দুটী কন্যা। জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম হরিদয়াল, কনিষ্ঠের নাম শ্যামধন। বড়বাবু পিতার ন্যায় নাতিদীর্ঘ, বর্ণ গৌর, মুখ-চোখ দিব্য মানানসই, কেশ দীর্ঘ, মধ্যস্থলে সিঁতিকাটা; বয়স অনুমান পঁচিশ বৎসর। ছোটবাবুটী কিছু কালো, খৰ্ব্বাকার, একহারা, মুখেচক্ষে তীক্ষ্ণবুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়; বয়স অনুমান বাইশ বৎসর।

    অন্দরে বাবুর পত্নী, কন্যা দুটী, আর দুজন দাসী থাকে; আর কেহই না। আমি ছেলেমানুষ, অন্দরে প্রবেশ করবার অনুমতি ছিল, সময়ে সময়ে অন্দরে আমি যেতেম, মেয়েদের সঙ্গে কথাবার্ত্তা কইতেম, কেহই আমারে দেখে লজ্জা কোত্তেন না। গৃহিণী দিব্য সুন্দরী; মেয়ে-দুটীও সুন্দরী। বড় মেয়েটার নাম মৃণালিনী, বয়স অনুমান ১৮/১৯ বৎসর। ছোটমেয়েটীর নাম তরুবালা, বয়স অনুমান দশ বৎসর। মৃণালিনী সধবা, তরুবালা কুমারী।

    একমাস সেই বাড়ীতে আমি থাকলেম। দু-বেলা দপ্তরখানায় বোসে লেখাপড়া করি, সন্ধ্যার-সময় একজন সরকারকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় একটু একটু বেড়াই, অবকাশকালে দুই একখানি নূতন নূতন পুস্তক পাঠ করি; বেশ থাকি। বাবু বোলেছিলেন, মাঝে মাঝে এক একবার বাজারে যাওয়া আবশ্যক হবে; কিন্তু একমাসের মধ্যে সে রকম আবশ্যকতা একদিনও উপস্থিত হয় নাই; বাড়ীতেই আমি থাকি; বাহিরে অন্দরে সকলেই আমাকে ভালবাসেন। আমার ভাগ্যফলের মধ্যে সেইটকু একটী সুফল।

    ক্লমেই দিন গত হোতে লাগলো। হিসাব কোরে দেখলেম, একমাস আট দিন। মাসখানেকের মধ্যে আর একবার কলিকাতায় আসবেন নরহরিবাবু, এই কথা বোলে গিয়েছিলেন, কিন্তু এলেন না; চিঠিপত্রও লিখলেন না; বোধ হয়, আমাকে ভুলে গেলেন। ভুলে থাকেন ভুলেছেন, তবু আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। যে আশ্রয়ে তিনি আমারে রেখে গিয়েছেন, সে আশ্রয়টী খুব ভাল। আরো ভাল এই জন্য বলি, রক্তদন্তের ভয়টা ঘুচে গেছে। কোথায় বীরভূম, কোথায় কলিকাতা। এত বড় সহরের ভিতর কোথায় কোন গলীতে কোন বাড়ীতে আমি আছি, কলিকাতায় এলেও সে রাক্ষসটা কিছুই জানতে পারবে না; আমি কলিকাতায়, কে-ই বা তাকে এ সন্ধান বোলে দিবে? কেহই দিবে না। আমি নিরাপদ। এইরুপ আমি ভাবলেম; এইরুপ আমার মনের ধারণা। রক্তদন্ত এখানে আসতে পারবে না, এই ধারণায় এক প্রকার আমি নিশ্চিন্ত কিন্তু অমরকুমারী সৰ্ব্বক্ষণ আমার মনে জাগেন। সে রাত্রে আমি পালিয়ে এসেছি, সেটা জানতে পেরে রাক্ষসটা হয় তো সেই স্নেহময়ী কুমারীটীকে কতই লাঞ্ছনা কোরেছে। আহা! সেখানে একদিন আমি মনে মনে বলেছিলেম, অভাগিনী অমরকুমারী! ভাল করি নাই। অমরকুমারী অভাগিনী নহেন, অমরকুমারীর ভাগ্যে অবশ্যই সুখ আছে। অভাগিনী হোলে সেই ক্ষুদ্র হৃদয়ে ততটা দয়ার স্থান হতো না। অমরকুমারীর জন্য আমি ভাবি; অমরকুমারীর জননীর জন্যও ভাবনা হয়। বর্দ্ধমানের আশালতাকেও মাঝে মাঝে মনে পড়ে।

    এই রকমে আমার দিন যায়। দুই মাস পরিপূর্ণ। নরহরিবাবু এলেন। নরহরিবাবুর জন্য আমি কেন ভাবি? তিনি আমার উপকার কোরেছেন, আমি তাঁর কেহই নই, তবু তিনি আমারে আপন ভেবে ভালবেসেছেন, দয়া কোরে চাকরী কোরে দিয়েছেন, ৫০০৲ টাকার নোট দিয়ে গিয়েছেন, সেই জন্যই তাঁরে মনে করি। শেষকথাটা কিছু বেশী ভাবি। অত টাকা তিনি আমারে কেন দিলেন? বোলেছিলেন, কর্ত্তার অনুমতি। সেই অনুমতিরই বা কি কারণ? সেই রাত্রে চাকরেরা বলেছিল, তাঁদের বাড়ীর একটী মেয়ে হারিয়ে গিয়েছে, হারিয়ে গিয়েছে কি বেরিয়ে গিয়েছে, বাড়ীর লোকেই বাহির কোরেছে, কোন সূত্রে আমি যদি সেটা জানতে পেরে থাকি, অন্যলোকের কাছে প্রকাশ না করি, সেই জন্যই বোধ হয় টাকা দেওয়া। বোধ হয় কেন, সত্যই তাই। কৰ্ত্তাও বোলেছিলেন, নরহরিবাবুও বারংবার বলে গিয়েছেন, “সে রাত্রে কষ্টের কথা ভুলে যেয়ো, কোথাও গল্প কোরো না।” সত্যই তাই। কেন আমি গল্প কোরবো? পরের ঘরের কথা পরের কাছে বলা কখনই আমার অভ্যাস নয়; মনের কথা মনেই রয়ে গেছে; গল্পে আমার দরকার কি? গরিব আমি, গরিবের মত থাকাই আমার পক্ষে ভাল।

    বেলা আটটা কি নটা। বড়বাবু গঙ্গাস্নানে যাবেন, আমারেও সঙ্গে কোরে নিয়ে যেতে চাইলেন। আমি তাঁর সঙ্গে একটা বড় রাস্তায় উপস্থিত হোলেম। রাস্তার নাম চিৎপুর রোড। বড়বাবু বোল্লেন, “জগন্নাথ-ঘাটের চেয়ে আহীরিটোলার ঘাট ভাল, সে ঘাটে ভিড় কম, সেই ঘাটেই যাওয়া যাক।” সেই ঘাটেই আমরা চোল্লেম। রাস্তায় ভারী ভিড়। ঘোড়ার গাড়ীর ভিড়, গরুর গাড়ীর ভিড়, হাঁটা-লোকের ভিড়, রাস্তা প্রায় দুর্গেম। গাড়ীও অগন্তি, মানুষও অগন্তি। দুধারেই বাড়ী, দুধারেই দোকান। দেখতে দেখতে আমি চোল্লেম। এক জায়গায় খানকতক গাড়ী এদিক ওদিক ফিরি কোরে বেড়াচ্ছে, গাড়োয়ানেরা “কাশীপুর, বাবু কাশীপুর, চোলতি বল্লগর” বোলে চীৎকার কোরে হাঁকছে; কথা বুঝতে না পেরে বাবুকে জিজ্ঞাসা কোরে জানলেম, সহরের উত্তরে কাশীপর বরানগর নামে পল্লী আছে, ভাগাভাগি গাড়ী কোরে কাজের লোকেরা সেইদিকে যায়, সেই জন্য ঐ সকল গাড়ী ঐ রকমে ঐ জায়গায় বেড়ায়। সুবিধা বেশ।

    সে দিন কি একটা যোগ ছিল। গঙ্গার পথে, গঙ্গার ঘাটে স্ত্রী-পুরুষের বেশী জনতা। এক জায়গায় তত স্ত্রীলোক কখনো আমি দেখি নাই। ঘাটে ঘাটে দাঁড়া, বসা, শোয়া, চলা, গানকরা ভিকারীও বিস্তর। আরো শুনলেম, দিনের বেলা গঙ্গাস্নানের যোগে ঐ রকম ভিড়ের ভিতর অনেক গাঁটকটাও বেড়ায়। দুষ্টলোকে সকল কাজেই হুজুগ চায়। দুষ্কার্য্য বেশ চলে, পুলিশ প্রায় কিছুই কোত্তে পারে না।

    আহীরিটোলার ঘাটে স্নান কোরে আমরা বাড়ীতে ফিরে এলেম। নানা কাজে দিনমান কেটে গেল। সন্ধ্যার পর আমি কর্ত্তাবাবুর বৈঠকখানায় নিষ্কর্ম্মা হয়ে বোসে থাকলেম। কৰ্ত্তা তখন বেড়াতে বেরিয়েছিলেন, সে ঘরে আর কেহই ছিল না, আমি একাকী। এইখানে বাবুদের সংসারের কথা আর একটু বলি। প্রতাপবাবুর জমীদারী নাই; সহরে পাঁচ সাতখানি বাড়ী আছে, ভাড়া চলে; বাহির অঞ্চলে খণ্ড খণ্ড জমীজায়গা আছে, গোলপাতার ঘর বেঁধে ইতরজাতীয় প্রজালোক বাস করে, ভেড়া রাখে, মহিষ রাখে, দোকান করে; তাদের কাছেও বাবু অনেক টাকা খাজনা পান; তা ছাড়া কোম্পানীর কাগজ; ছমাস অন্তর সুদ আসে, বেশ সচ্ছলে সংসার চলে। বাড়ীতে দুর্গাপুজো হয়, অপরাপর ক্ৰিয়াকৰ্ম্মও প্রায় বাদ যায় না। সকল পাৰ্ব্বণে ঘটা হয় না, সকলে জানতেও পারে না, দুর্গোৎসবে কিছু ঘটা হয়।

    বড়বাবু আর ছোটবাবু উপরের বৈঠকখানায় বসেন না, তাঁদের জন্য নীচের তালায় দুটী স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র বৈঠকখানা আছে। ভাই-দুটীতে বেশ ভাব। স্বতন্ত্র বৈঠকখানা থাকলেও তাঁরা দুজনে প্রায়ই এক ঘরে বোসে থাকেন। খোসগল্প হয়, তাসখেলা হয়, বই পড়া হয়, বেশ আমোদ। দুজনেই তামাক খান না, কোন উৎপাত নাই। বোলেছি, ভালবাসা পাওয়া আমার অদৃষ্টের একটী সুফল; বাবুরা দুজনেই আমাকে ভালবাসেন; কথায় বার্ত্তায়, আদর-যত্নে, ঠিক যেন সহোদরের মতন ভাব; ভাবের বিনিময়ে আমিও তাঁদের আজ্ঞাকারী। বাবুরা যখন আমারে ডাকেন, আমি তখন তাঁদের বৈঠকখানায় গিয়ে বসি, তাঁরা আমারে কত কথাই জিজ্ঞাসা করেন, বেশী কথা আমি কি জানি, সকল কথার উত্তর দিতে পারি না, পরিচয়ের কথায় বোবা হই, তাঁরা পরস্পর মুখচাহাচাহি কোরে গম্ভীরভাব ধারণ করেন।

    বড়বাবুর নিজের একটী গাড়ীঘোড়ার কারবার আছে। নীলামে অল্পদরে সাহেববাড়ীর গাড়ী-ঘোড়া কিনে, সুবিধা বুঝে বেশী দামে বিক্রয় হয়, সে কারবারে বৎসর বৎসর বেশ দশ টাকা আয় হয়ে থাকে। বড়বাবুর হাত কিছু দরাজ, দশ টাকা খরচপত্র আছে, কিছু কিছু ব্যয় করাও আছে; আমোদগুলি কিন্তু নির্দোষ। ছোটবাবু কিছু, কৃপণ; নিজ খরচের জন্য পিতার কাছে মাসে মাসে তিনি ১০০ টাকা পান, অতি অল্পই খরচ হয়, বাকী টাকাগুলি তিনি তেজারতিতে খাটান; বয়স অল্প, কিন্তু বিষয়বুদ্ধি বেশ। যাতে কোরে টাকা জমে, সেই দিকেই তাঁর অধিক ঝোঁক।

    আরো একমাস গেল। শ্রাবণ মাস। বাবুর বাড়ীতে প্রতিমা গড়া আরম্ভ হলো। দুর্গাপ্রতিমা কখনো আমি দেখি নাই; পঞ্জিকায় ছবি দেখেছি, মাটীর গড়ন কেমন হয়, সেটী দর্শন করা আমার ভাগ্যে ঘটে নাই; এইবার বোধ হয় ঘোটবে, এইরুপ আশা জন্মিল। খড়বাঁধা থেকে মাটীর কাজ পর্য্যন্ত নিত্য নিত্য আমি দর্শন করি। দিন যেতে লাগলো, মাস যেতে লাগলো, শ্রাবণ ভাদ্র বিদায় হলো, আশ্বিনমাস আগত। শরৎকাল। সুখের শরৎ। বসন্ত-ঋতুর ন্যায় বৎসরের এই ঋতুটীও অতি সুন্দর। শীত-গ্রীষ্ম থাকে না, বৃষ্টিও, বেশী হয় না, পথে-ঘাটে বড় একটা কাদা থাকে না, সুখের শরৎকাল। পল্লীগ্রামে থাকলে এই ঋতুর বেশী মহিমা অনুভব করা যায়। উদ্যানে উদ্যানে শেফালিকা, কামিনী, মল্লিকা আর যুথি-যাঁতি প্রভৃতি সুগন্ধি পুষ্প প্রস্ফুটিত হয়, সরোবলে পদ্মফুল ফুটে, সূর্য্যের তেজ বেশী থাকে না, আকাশ নিৰ্ম্মল হয়, চন্দ্রের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি পায়, দেশেব কবিরা শরচ্চন্দ্রের উচ্চ প্রশংসা কীৰ্ত্তন করেন।

    প্রতিমায় রং করা, চিত্র করা আরম্ভ হলো। নিত্য নিত্য মা দুর্গার নূতন রূপ আমি দর্শন করি। কৃষ্ণনগরের কারিকর; প্রধান কারিকরের নাম রামচরণ পাল। মুখ কখানি গড়া, রং-ফলানো আর চিত্র করা ব্যতীত অপরাপর কাৰ্য্য রামচরণ স্বহস্তে কিছুই করে না, তাঁবেদারেরাই ওস্তাদের উপদেশমতে দস্তুরমত সে সকল কার্য্য নিৰ্ব্বাহ করে। রামচরণ পাল সৌখীন লোক; ফর্সা ফর্সা কোঁচানো কাপড় পরে, ভাল ভাল জামা গায়ে দেয়, দিল্লীর নাগোরা ব্যবহার করে, কোথাও যাবার সময় ছাতা-ছড়ি সঙ্গে রাখে; দক্ষিণ হস্তে একখানি ইষ্টকবচ, বামহস্তের বাহুমূলে চারি-পাঁচটী ঠাকুরের মাদুলী, গলায় ছোট ছোট মাদুলী-গাঁথা রুদ্রাক্ষের মালা; বেশ মানায়। চেহারাও মন্দ নয়, অল্প শ্যামবর্ণ, মুখেরও চটক বেশ, বয়স আন্দাজ ৫৫ বৎসর। বাবুসজ্জার প্রায় সকল অঙ্গই আছে, রামচরণ কিন্তু চল ফিরায় না; পাকা গোঁফ, চুলগুলিও অনেক পাকা, কাঁচা-পাকায় মিশানো, দেখায় বেশ। সতরঞ্চখেলায় রামচরণের বিশেষ নৈপুণ্য, বাড়ীর কর্ত্তাবাবুও সতরঞ্চখেলা ভালবাসেন; রামচরণের সঙ্গেই প্রতিদিন বৈকালে সতরঞ্চখেলা হয়। প্রায় সকল বাজীতেই বাবু হারেন, রামচরণের জিত। বাবু কিন্তু হেরে হেরেও অট্ট অট্ট হাস্য করেন, রাগ করেন না, বরং আরো খেলার উপর বেশী ঝোঁক হয়।

    প্রতিমা চিত্র করা হয়ে গেল। মহালয়া অমাবস্যার দিন দুজন মালী এসে সপরিবার মা দুর্গাকে নানা অলঙ্কারে সাজিয়ে দিলে, কেবল কার্তিকের গোঁফচুল আর অসুরের গোঁফ-চুল-ভ্রূ বাকী থাকলো, সে কাজগুলি রামচরণের। ষষ্ঠীর পূর্ব্বদিন রামচরণ কার্ত্তিক-অসুরকে পূর্ণাঙ্গ কোরে দিল, ষষ্ঠীর রাত্রে অধিবাস হয়ে গেল, তার পর সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, তিনদিন মহাপজা। দুর্গাপূজা কখনো দেখি নাই, নূতন দেখলেম; হৃদয়ে ভক্তির উদয় হলো, তিনদিন তিন তিনবার সাষ্টাঙ্গে ভক্তিভাবে প্রতিমাসমীপে প্ৰণিপাত কোল্লেম। অনেক লোকের নিমন্ত্রণ হয়েছিল, নিমন্ত্রিত লোকেরা ঘটের কাছে প্রণামী দিয়ে, প্রতিমাকে প্রণাম কোরে, কৰ্ত্তাবাবুর সঙ্গে যথাযোগ্য প্রিয়সম্ভাষণ কোল্লেন, অনন্তর যাঁর যেরুপ ইচ্ছা, তিনি সেইরুপ আহারাদি কোরে বিদায় হোলেন। ব্রাহ্মণের বাড়ী, ছোট খাট অন্নক্ষেত্র হয়েছিল, কতক লোক অন্ন-প্রসাদ পেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে গেল।

    দশমীতে নিরঞ্জন। কলিকাতায় দুর্গা-প্রতিমা অনেক হয়। বৈকালে নূতন কাপড় পোরে, বাবুদের সঙ্গে আমি বিসর্জ্জন দেখতে বেরুলেম। কলিকাতায় প্রতিমা-বিসর্জ্জনে যেরূপ সমারোহ, দেখে আমার তাক লেগে গেল! চক্ষে না দেখলে সে সমারোহ ব্যাপার অক্ষরে লিখে অথবা মুখের কথায় বোলে অপরলোককে বুঝিয়ে দেওয়া যায় না, সে বর্ণনায় আমি অক্ষম, সুতরাং ক্ষান্ত থাকতে হলো। গঙ্গাজলে দুর্গা-বিসর্জ্জন। অনেক ঘাটেই বিসর্জ্জন হয়, তন্মধ্যে নিমতলাঘাটেই বেশী।

    বিসর্জ্জনের পর বাড়ীতে ফিরে এসে বিল্বপত্রে দুর্গানাম লেখা, প্রসাদীসিদ্ধি পান করা এবং পরস্পর প্রণাম, আশীৰ্ব্বাদ ও মঙ্গলালিঙ্গন সমাপ্ত করা হলো। এই প্রথাটীও আমার নূতন দেখা, নূতন জানা।

    বঙ্গের প্রধান পৰ্ব্ব দুর্গাপূজা। বৎসরের মধ্যে হিন্দুজাতির এমন পৰ্ব্ব আর নাই। বৎসরের মত দুর্গাপূজা ফুরিয়ে গেল। আশ্বিনমাস প্রায় শেষ। ছয় মাস আমি কলিকাতায়। রাস্তাঘাট অনেক জানা হয়েছিল, বিসর্জ্জনের পাঁচদিন পরে, কোজাগর-পূর্ণিমার দিন বৈকালে আমি একাকী চিৎপুর রোডে বেড়াতে বেরিয়েছিলেম। বৈকালে এ রাস্তায় আমি একদিনও আসি নাই। অন্যদিন অন্য সময়ে এ রাস্তায় যে রকম ভিড় আর যে রকম শোভা দেখি, আজো সব সেই রকম, কেবল একটা শোভা আজ আমার চক্ষে নূতন। গরাণহাঁটা থেকে কলুটোলা-রাস্তা পর্য্যন্ত বেড়িয়ে বেড়িয়ে দেখলেম, দুধারি বারান্দায় বারান্দায় রকমারি মেয়েমানুষ। রকমারি বর্ণের কাপড়পরা, রকমারি ধাতুর গহনাপরা, রকমারি ধরণের খোঁপাবাঁধা, অনেক রকম মেয়েমানুষ। কেহ কেহ টুলের উপর বসে আছে, কেহ কেহ চেয়ারে বোসেছে, কেহ কেহ রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে রূপো-বাঁধা হুকায় তামাক খাচ্ছে, কেহ কেহ রেলিঙের উপর বুক রেখে ভানুমতী-ধরণের মুখ বাড়িয়ে রাস্তার দিকে ঝুলছে; কারো বুকে রংদার কাঁচলী, কারো কারো মুখে রংমাখা, কারো খোঁপা নাই, পৃষ্ঠদেশে দীর্ঘবেণী, কেহ কেহ এলোকেশী। কারা এরা? লোকমুখে শুনেছিলেম, কলিকাতা সহরে বেশ্যা অনেক; যে সকল পণ্ডিত সাধু ভাষায় কথা কন, তাঁরা বলেন, বেশ্যা মানে নগরবিলাসিনী বারাঙ্গনা; সুখবিলাসী মতিচ্ছন্ন যুবাদলের চিত্তমোহিনী-বিলাসিনী; এরা সব জঘন্য বিলাস-রসিক যুবাপুরষের ইহকাল পরকাল ভক্ষণ করে। চিৎপুর রোডে দাঁড়িয়ে পূর্ব্বের সেই শোনাকথাটা আমার মনে পোড়লো; স্থির কোল্লেম, এরাই তবে সেই সকল যুবকনাশিনী বিলাসিনী বারাঙ্গনা। দেখেই আমি চোমকে উঠলেম। সৰ্ব্বশরীরে কাঁটা দিলে। নগরের বিলাসিনীরা স্বী-জাতিসূলভ লজ্জাসরমের মস্তকে পদার্পণ কোরে, হেসে হেসে সদররাস্তার ধারে বাহার দিচ্ছে। আকার-অবয়বে ঠিক মানবী, কিন্তু ব্যবহারে এরা দানবী—পিশাচী! কলিকাতা সহর কলুষে পরিপূর্ণ! সিঁতিকাটা, গন্ধমাখা, সাজপরা ফলবাবুরা রাস্তা দিয়ে চোলে যাচ্ছেন, চক্ষু আছে উর্দ্ধ দিকে। বারান্দার চক্ষুরা তাঁদের দিকে ঘুরে ঘুরে ঘন ঘন কটাক্ষবাণ সন্ধান কোচ্ছে। সহরের একজন পক্ষীকবি এই সব কাণ্ড লক্ষ্য কোরে এক মজলীসে বোলেছিলেন, “বারান্দার ঐ চক্ষগুলি পাখীধরা ফাঁদ; পুরুষের মন মাতাবার মোহনমন্ত্রের বাঁশী?” আমারো মনে হলো, যথার্থই তাই!

    চিৎপররোড এই সকল ফাঁদে আচ্ছন্ন। এ রাস্তাটায় গৃহস্থলোকের বাস একেবারে নাই বোল্লেই হয়। থাকলেই বা কি হতো? কলিকাতার বেশ্যানিবাসের প্রণালীটী অতি জঘন্য। গৃহস্থের বাড়ীর কাছে বেশ্যা, ছেলেদের পাঠশালার পাশে বেশ্যা, ডাক্তার-কবিরাজের আবাসের পাশে বেশ্যা, কোথাও বা ভালমানুষের মাথার উপর বেশ্যা; অধিক কথা কি, ব্রাহ্মসমাজ-মন্দিরের আষ্টেপৃষ্ঠে বেশ্যা। যে সহরের এমন দশা, সে সহরের পরিণাম কি হবে, সহরবাসী ভদ্রলোকেরা সেটা কি একবারও চিন্তা করেন না? ইংরেজীতে যাঁরা যাঁরা পণ্ডিত হয়েছেন, সগৌরবে তাঁরা মুক্তকণ্ঠে বলেন, “যেখানে সহর, সেই খানেই পাপ। সহরমাত্রেই বেশ্যা বেশী, মদ বেশী, বদমাস বেশী, রাজধানীতে আরো বেশী। রাজধানীতেই পাপের রাজত্ব। এ সকল পাপের নাম উপকারী পাপ; প্রয়োজনীয় পাপ। এ সকল পাপ না থাকলে কোন দেশেই সহর চলে না।”

    চলাই ভাল। সৰ্ব্বনাশকর পাপের অভাবে সহর যদি না চলে, তবে সহরে আমাদের কাজ কি? সহরের উপর আমার ঘৃণা হলো। কলিকাতায় আর বেশী দিন থাকবো না, মনে মনে এইরুপ প্রতিজ্ঞা কোল্লেম। পথিক পুরষেরা রাস্তা দিয়ে চোলে যায়, বারান্দার দিকে চক্ষু থাকে, উপরে নীচে রসিকতা বর্ষে, গাড়ী-ঘোড়ার ধাক্কায় আছাড় খেয়ে হাত-পা ভাঙতে পারে, তেমন তেমন হোলে, প্রাণ যেতেও পারে, সে দিকে ভ্রূক্ষেপও থাকে না। এমন সহরে কি থাকতে আছে? কখনই থাকবো না। মনের ঘৃণায় এইরুপ সঙ্কল্প কোরে বাড়ীর দিকে আমি ফিরে চোল্লেম।

    বীরভূমের নরহরিবাবু যে বাড়ীতে ছিলেন, সেই বাড়ীর সম্মুখ দিয়ে আমার মনিববাড়ী যেতে হয়। সেই পথ দিয়ে আমি যাচ্ছি, দেখলেম, সেই বাড়ীর দরজা খোলা। মনে কোল্লেম, নরহরিবাবু এসেছেন। সূৰ্য্য তখনও অন্ত যান নাই, অল্প অল্প বেলা ছিল, আশায় আশায় সেই বাড়ীর ভিতর আমি প্রবেশ কোল্লেম; উপরে গিয়ে উঠলেম; দুই-একজন চাকর আমার সম্মুখ দিয়ে চোলে গেল, আমাকে দেখে কিছুই বোল্লে না, আমিও কিছু জিজ্ঞাসা কোল্লেম না; সরাসর একটা ঘরের ভিতর প্রবেশ কোল্লেম। ঘরে একখানি চেয়ারের উপর একটী বাবু। বেশ বাবুটী। দিব্য সপুরষ। বাবরী চল, দিব্য গোঁফ, দিব্য চক্ষু, দিব্য বুকের ছাতি, বয়স অনুমান ত্রিশ বৎসর। আমারে দেখেই বাবু চকিতস্বরে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কে তুমি? কি চাও?”

    বাটীর ভাবভঙ্গী আর কণ্ঠস্বর যে প্রকার, দেখলে শুনলে উত্তর কোত্তে ইচ্ছা হয় না, তথাপি আমি ধীরে ধীরে উত্তর কোল্লেম, “চাই না কিছু,, আমি হরিদাস; নরহরিবাবু এসেছেন কি না, জানতে এসেছি।”

    পূৰ্ব্ববৎ তীব্রস্বরে বাবু বোল্লেন, “কেন? তার কাছে তোমার কি দরকার? তিনি এখন আসবেন না, পৌষমাসের শেষে আসবেন।”

    আর আমি কথা কইলেম না, সেখানে আর দাঁড়ালেমও না, তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে এলেম। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছি, একজন চাকর উপরে উঠছিল, তারে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, বাবুটীর নাম কি? চাকর বোল্লে, কানাইবাবু, বীরভূমের বানেশ্বরবাবুর ভাগ্নে।

    শিউরে উঠে অবাক হয়ে আমি নেমে এলেম। তখন আমার মনে যে কি ভাবের উদয় হলো, অন্তর্যামীই জানতে পাল্লেন। সূর্য্যাস্তের পূর্ব্বেই আমি মনিববাড়ীতে এসে পৌঁছিলেম। কোজাগরপূর্ণিমা। পাড়ার একজন আত্মীয়ের বাড়ীতে মা লক্ষ্মীর প্রতিমা হয়, নিমন্ত্রণ আছে, প্রদোষেই পূজা, বাবুরা সেই বাড়ীতে গিয়েছেন, আমি এসে বড়বাবুর বৈঠকখানায় বোসলেম। ভাবনা আমাকে পরিত্যাগ কোরে যেতে চায় না। অন্যমনস্ক হবার জন্য যতই চেষ্টা করি, ততই নূতন নূতন ভাবনা এসে জোটে। মিছামিছি পরের জন্য কেন ভাবনা, তাও আমি বুঝতে পারি না। নরহরিবাবুর তত্ত্ব নিতে গিয়ে শুনে এলেম, কানাইবাবু। মনটা ঝাঁৎ কোরে উঠলো। যে রাত্রে আমি মেয়েমানুষ সেজে পালাই, নূতন লোকের হাতে ধরা পড়ি, সেই রাত্রে বাণেশ্বরবাবুর চাকরেরা হাসির তুফান তুলে যে কানাইবাবুর নাম কোরেছিল, এই সেই কানাইবাবু! ইনি বাণেশ্বরবাবুর ভাগ্নে হন, ইনি আপন মাতুলকন্যাকে কুলকলঙ্কিনী কোরেছেন, অন্যলোকের দ্বারা কৌশলে সেই কন্যাটিকে ঘরের বাহির কোরেছেন! সে রাত্রে সেখানে কানাইবাবুকে আমি দেখি নাই, কলিকাতায় দেখলেম। মুখের ভাব আর কথার ভাব যে রকম, তাতে কোরে বিশ্বাস হলো, সত্যই তিনি সেই পাপকার্য্যের নায়ক। বাহাদুর পুরুষ বটে! নায়িকাটীকে কলিকাতায় এনেছেন কি না, বলা যায় না; অনুমানে বোধ হয়, এনে থাকবেন। কলিকাতা সহর যে রকম জায়গা, ঐ প্রকার কার্য্যের সুবিধাই এখানে বিস্তর। কে কোথায় কি ভাবে আছে, কি ভাবে থাকে, অন্যলোকে কিছুই জানতে পারে না; পোষাক-পরিচ্ছদে, কথার আলাপে, বাহিরে বেশ ভদ্রলোক, ভিতরে ভিতরে নরককুণ্ড!

    এই সব আমি ভাবছি, বড়বাবু এলেন; এসেই আমারে সঙ্গে কোরে নিয়ে পূজাবাড়ীতে গেলেন। লক্ষ্মীপূজা দেখা হলো, সেইখানে মা লক্ষ্মীর প্রসাদ পাওয়া হলো, বাড়ী আসা হলো না। রাত্রে সেই বাড়ীতে লক্ষ্মী-মঙ্গল যাত্রা ছিল, সমস্ত রাত্রি আমরা সেই যাত্রা শুনলেম। কোজাগরের নিশা-জাগরণে লক্ষ্মীবৃদ্ধি হয়, যাত্রার কল্যাণে আমাদের বেশ আমোদ-আহ্লাদে পুর্ণিমার যামিনী পরিযাপিত হলো।

    প্রভাতে বাবুদের সঙ্গে আমি বাড়ী এলেম। স্নানাহারাতে রাত্রিজাগরণের ক্লান্তিরকরণার্থ বাবুরা নিদ্রা গেলেন, আমার নিদ্রা নাই। দিবানিদ্রায় দোষ আছে, সেইজন্য আমি দিনমানে নিদ্রা যাই না, পাঠকমহাশয় এমন কথা মনে কোরবেন না শরীর রক্ষার শাস্ত্রসম্মত নিয়মগুলি পালন আমার মত পরিব্রাজকের পক্ষে অসম্ভব; সকল দিন রাত্রিকালেই বেশীক্ষণ নিদ্রা হয় না, দিনমানে নিদ্রা তো বহু দুরের কথা। কেন এমন হয়? যার হৃদয়ে অহরহঃ চিন্তা-রাক্ষসী খেলা করে, যার মনে অজ্ঞাতকারণে সদাসৰ্ব্বদা নানা আশঙ্কা, একটা আশ্রয়হারা হোলে রজনীপ্রভাতে কোথায় যাব, কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো, যার মনে প্রতি রজনীতে এই দুঃসহ অনিশ্চিত ভাবনা, তার প্রতি কি বিরামদায়িনী নিদ্রাদেবীর অনুগ্রহ হয়? আমার অবস্থাও সেইরুপ। আমার প্রতি নিদ্রাদেবীর কৃপা হয় না, সেই জন্য আমার নিদ্রা নাই।

    আমি জেগে আছি। বড়বাবুর বৈঠকখানার সম্মুখদিকের একটী দরজা খোলা আছে, তক্তপোষের বিছানার ধারে সেই দরজার কাছে আমি বসে আছি। বেলা প্রায় পাঁচটা। আশ্বিনমাসে বেলা যখন পাঁচটা বাজে, তখন ঠিক এক ঘণ্টা বেলা থাকে। সেই ঘরেই বড়বাবু নিদ্রিত; তখনো নিদ্রাভঙ্গ হয় নাই। সহসা “বৃন্দাবন গোবর্দ্ধন-কুঞ্জকানন বিহারী। বংশীবদন রাধিকারমণ শ্রীমকুন্দ মুরারি॥” উচ্চকণ্ঠে এইরূপ গান কোত্তে কোত্তে পাঁচজন সন্ন্যাসী সেইখানে এসে দাঁড়ালো। সন্ন্যাসিদের চীৎকারধ্বনিতে বড়বাবুর নিদ্রাভঙ্গ হয়ে গেল; তাড়াতাড়ি চক্ষু মুছতে মুছতে তিনি বিছানার উপর উঠে বোসলেন। বাবুকে দেখে সন্ন্যাসীরা কত রকম ভঙ্গীতে কত কথাই বোলতে লাগলো, কত রকম সুরে শ্রীরাধাবল্লভের কত রকম ভজন-গীত গাইতে লাগলো, সব কথা আমি মনে কোরে রাখতে পাল্লেম না; একদৃষ্টে কেবল সন্ন্যাসিদের আকার-অবয়ব আর চমৎকার ভাবভঙ্গী দর্শন কোত্তে লাগলেম।

    পঞ্চ সন্ন্যাসী। পাঁচজনেই প্রায় সমবয়স্ক; কারো বয়ঃক্রম ত্রিশ বৎসরের অধিক বোধ হলো না। দুজন গৌরবর্ণ, দুজন শ্যামবর্ণ, একজন কৃষ্ণবর্ণ। লক্ষণে বুঝলেম, তারা পাঁচজনেই কৃষ্ণ-সন্ন্যাসী। সচরাচর সন্ন্যাসিদের দুই শ্রেণী;—শিব-সন্ন্যাসী আর কৃষ্ণ-সন্ন্যাসী। পথে পথে যারা বেড়ায়, তাদের মধ্যে শিব-সন্ন্যাসীই অধিক, কৃষ্ণ-সন্ন্যাসী অল্প; লক্ষণও ভিন্ন ভিন্ন। শিব-সন্ন্যাসীরা শিব সাজবার ভাব দেখায়; সৰ্ব্বাঙ্গে ভস্ম মাখে, মস্তকে জটা রাখে, রঙ দিয়ে মুখ-চক্ষু চিত্র করে, বাঘছাল পরে, বাঘছালের বদলে কেহ কেহ কৌপীন ধারণ করে, কেহ কেহ উলঙ্গ। শিব ত্রিশূলধারী, ত্রিশূলের বদলে সন্ন্যাসীর দক্ষিণ হস্তে দণ্ড ধরে, ডমরুর বদলে বামহন্তে কমণ্ডলু; এক একজনের হাতে গলায় রুদ্রাক্ষমালা, এক একজনের মালাভরণ থাকে না। মুখে থাকে হর্ হর্ বম্ বম্। ভেকধারিদের অনেক রকম ভেক থাকতে পারে, তিনটী মাত্র অভাব থাকে। মহাদেবও ত্রিনয়ন, চন্দ্ৰ সূৰ্য্য হুতাশন, মহাদেবের কণ্ঠে হলাহল, মহাদেবের অঙ্গে মস্তকে বিষধর সর্প। সন্ন্যাসীরা কপালের উপর চক্ষু ফুটাতে অক্ষম, বিষ খেয়েও নীলকণ্ঠ হোতে অক্ষম, ফণী ধারণ কোরে ফণিভূষণ হোতেও অক্ষম। রোগা রোগা সন্ন্যাসী ছাড়া মোটা মোটা সন্ন্যাসীরা ভোলানাথের মত ভুড়ি বাড়াবারও চেষ্টা করে।

    কৃষ্ণ-সন্ন্যাসী সে রকম নয়। শ্রীকৃষ্ণের অনুকরণে কেহ কেহ ইচ্ছা রাখে, সর্ব্বাংশে কৃতকার্য্য হয় না। কৃষ্ণ-সন্ন্যাসী জটা রাখে না, ভস্ম মাখে না, বাঘছাল পরে না, রুদ্রাক্ষ ধরে না, সে ভাবের কিছুই করে না। জটার বদলে স্ত্রীলোকের মত দীর্ঘ দীর্ঘ কেশ কপালের উপর খোঁপার আকারে চড়া কোরে বাঁধা (অভাব ময়রপুচ্ছের), ভস্মবিভূতির বদলে সৰ্ব্বাঙ্গে হরিমৃর্ত্তিকার ছাপকাটা, বাঘছালের বদলে গেরুয়া, বহির্বাসের বদলে গৈরিক নামাবলী, কেহ কেহ কৌপীনধারী, বাঁশরীর বদলে গোপীযন্ত্র, কেহ কেহ শূন্যহস্ত, রুদ্রাক্ষের বদলে তুলসীমাল্য, কেহ কেহ শূন্যকন্ঠ। শিব-সন্ন্যাসীরা গাঁজা খায়, কৃষ্ণ-সন্ন্যাসীরা প্রায়ই গাঁজা খায় না। দুই দলে এই সকল প্রভেদ। দুই দলের মধ্যে ভণ্ডসন্ন্যাসী অনেক, আমি ছেলেমানুষ, আমি সে পরিচয় না দিলেও বহুদর্শী বিজ্ঞ পাঠকমহাশয়েরা মনে অবশ্যই সে বিষয়ের নিগুঢ় তত্ত্ব বুঝতে পারবেন। মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের প্রসাদে যাঁরা কৌপীনধারী বৈষ্ণব, তাঁরা এই কৃষ্ণ-সন্ন্যাসিগণের অন্তর্গত কি না, সে বিচারেও আমি অসমর্থ।

    আমাদের সম্মুখে পঞ্চ সন্ন্যাসী। বাহ্যলক্ষণে পাঁচজনেই কৃষ্ণ-সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসীগুলির রূপ ভাল। যে দুটী গৌরবর্ণ, তাদের চেহারা আরো বেশী সুন্দর। আমাদের বড়বাবু শক্তিভক্তির সঙ্গে সনাতনী বিষ্ণুভক্তি হৃদয়ে ধারণ করেন, বাড়ীতে সাধু-সন্ন্যাসী দর্শন দিলে আদরযত্নে তিনি তাঁদের সেবা করেন, কৰ্ত্তাও তাতে উৎসাহ দেন। সন্ন্যাসিদের উপর ছোটবাবু বড় চটা। ছোটবাবু সেদিন তখন সেখানে ছিলেন না, বড়বাবু আমোদ কোরে সন্ন্যাসিদের গান শুনেলেন, শ্লোক শুনলেন, বৃন্দাবন-মথুরার গল্প শুনলেন, শুনে শুনে খুসী হয়ে পাঁচজনের হাতে পাঁচটী টাকা দিলেন; সন্ন্যাসীরা মিলিতকণ্ঠে আশীৰ্ব্বাদ বর্ষণ কোল্লে।

    টাকা বড় চমৎকার জিনিস। “লোভের নিকটে যদি ফাঁদ পাতা যায়, পশু পক্ষী সাপ মাছ কে কোথায় এড়ায়?” কবিবর ভারতচন্দ্রের এই কটী কথা অখণ্ডনীয়। পাঁচ টাকা হাতে পেয়ে সন্ন্যাসিদের লোভ বেড়ে উঠলো; তখন আপনাদের বেশী বেশী গুণপনা জাহির কোত্তে আরম্ভ কোল্লে। এ ধরণের সন্ন্যাসিদের যেমন যেমন দস্তুর সেই রকমে একজন সন্ন্যাসী বোলতে লাগলো, “হরেক রকম ঔষধ রাখি। বন্ধ্যা নারীর সন্তান হয়, তামা ছুঁলে সোণা হয়, সোণা ছুঁলে হীরা হয়, বেদামী জিনিস যা কিছু দিবে, তার বদলে বহুতর মহামূল্য জিনিস পাবে, বড় বড় চিকিৎসকেরা মানুষের যে সকল ব্যাধি অসাধ্য বলে, একদিনের মধ্যে সে সকল ব্যাধি আমরা নির্ম্মূল কোরে দিতে পারি। আমাদের ঔষধের গুণে হারানিধি পাওয়া যায়, নিরুদ্দেশ প্রবাসী ঘরে আসে, অপ্রিয়জন প্রিয় হয়, অবাধ্যের বশীভূত হয়, রাগী লোক ঠাণ্ডা হয়, ব্যবসাবাণিজ্যে প্রচুর লাভ হয়, ঘরে লক্ষ্মী বাঁধা থাকেন।” ইত্যাদি ইত্যাদি।

    কলিকাতা সহরে এ সকল বুজরুকী বড় একটা খাটে না, তথাপি মেয়েমহলে খুব খাটে। সন্ন্যাসীর কথা শুনে বড়বাবুর মুখের ভাব আর এক প্রকার হয়ে এলো; মনে যেন ঘৃণা জন্মিল; তাচ্ছল্যভাবে তিনি বোল্লেন, “হাঁ, হাঁ, দ্রব্যগুণে সব হয়, দেবতাদের কৃপায় সব সিদ্ধ হয়, ভগবানের সৃষ্টিতে কিছুই অসম্ভব নয়। আর একদিন আসবেন, একটা একটা পরীক্ষা কোরে দেখা যাবে।”

    ফুল্লমুখে জয় উচ্চারণ কোরে সন্ন্যাসীরা বিদায় হলো, সে দিন আর অন্য ঘটনা কিছুই হলো না। বাবুরাও কোথাও গেলেন না, আমিও কোথাও বেরুলেম না। লক্ষ্মীবিসর্জ্জনে ঘটা হয় না, দূরে দূরে দুই একটা বিসর্জ্জনের বাদ্যধনি শুনা গেল, তার পর সমস্তই চুপচাপ। নিয়মিত কাৰ্য্যান্তে নিদ্রা, নির্ব্বিঘ্নে রজনীপ্রভাত।

    সন্ন্যাসীরা নিত্য নিত্য দেখা দেয়, নাচে, গায়, শ্লোক পড়ে, কেচ্ছা ঝাড়ে, নিত্যই নূতন রঙ্গ। এক বাড়ীতে নয়, পাড়ায় পাড়ায় দশবাড়ীতে বেড়ায়, যেখানে সুবিধা পায়, সেইখানে বুজরুকী জানায়, শক্তলোকের কাছে জায়গা পায় না। লক্ষ্মীপূজার পর এই রকমে একমাস কেটে গেল। স্মরণ কোত্তে পারা যায়, এই একমাসের মধ্যে তেমন বিশেষ ঘটনা কিছুই হলো না। আমি শীঘ্র শীঘ্ৰ কলিকাতা-পরিত্যাগের সঙ্কল্প কোরেছিলেম, বাড়ীর পরিবারদের অনুরোধে ক্রমশই বিলম্ব হোতে লাগলো। একদিন সকালবেলা বাড়ীর সম্মুখের রাস্তায় সবে মাত্র আমি বেরিয়েছি, খানিক দূরে ভারী একটা গোল মাল উঠলো। কিসের গোলমাল, কিছুই ঠিক কোত্তে পাল্লেম না। রাস্তা দিয়ে অনেক লোক ছুটে ছুটে যাচ্ছে, “কোথায় খুন?—কোথায় খুন?—কোন বাড়ীতে খুন?” এই সব কথা বলছে আর ছুটছে। খুনের কথায় ভয় পেয়ে ছুটে আমি বাড়ীর ভিতর চোলে গেলেম, বাবুদের কাছে সেই সব কথা বোল্লম। লোকের বিপদে সম্পদে অগ্রসর হওয়া বড়বাবুর চিরদিন অভ্যাস, শশব্যস্তে তিনি একটা জামা গায়ে দিয়ে উদ্বিগ্নচিত্তে বাড়ী থেকে বেরুলেন; জামার বোতাম দিবার অবসর হলো না, যেদিকে গোলমাল হোচ্ছিল, রাস্তার লোকেরা যেদিকে ছুটছিল, অত্যন্ত দ্রুতপদে তিনি সেই দিকে যেতে লাগলেন। তখন একটু সাহস পেয়ে আমিও তাঁর পশ্চাৎ পশ্চাৎ চোল্লেম।

    ভয়ঙ্কর ব্যাপার! যে বাড়ীতে লক্ষ্মীপূজা হয়েছিল, সেই বাড়ীর দরজার সম্মুখেই ভয়ঙ্কর গোলমাল। বহুলোক একত্র জমায়েত, পুলিশ জমায়েত, রৈ রৈ কাণ্ড! সেই বাড়ীতেই খুন! অন্দরমহলে কর্ত্তার একটী কন্যার ঘরে রেতের বেলা খুন হয়েছে! কি রকমে কি হলো, কিছুই ঠিকানা হোচ্ছে না।

    অগ্রে একটু পরিচয় আবশ্যক, তার পর খুনের বৃত্তান্তটা আলোচনা করা যাবে। বাবুর নাম বিশ্বেশ্বর চক্রবর্ত্তী। বিশ্বেশ্বরবাবুর এক পুত্র, তিন কন্যা। পুত্রের নাম হরিবিলাস, কন্যাদের নাম নিতম্বিনী, কাদম্বিনী, সৌদামিনী। তিনটী কন্যাই বিবাহিতা, তিনটীই সধবা। সৌদামিনী সৰ্ব্বকনিষ্ঠা। সৌদামিনী পর্ণযুবতী, দিব্য সুন্দরী, বয়স ১৮/১৯ বৎসর। বিবাহ হয়ে অবধি সৌদামিনী কখনো শ্বশুরবাড়ী যায় নাই। পূৰ্ব্বদেশে শ্বশুরবাড়ী; শ্বশুর গরিব, স্বামী মুর্খ, তাতে দূরদেশ, এই কারণেই সৌদামিনী চিরদিন বাপের বাড়ীতেই থাকে। বৎসরে দুই একবার স্বামী আসে, মান পায় না, আদর পায় না, দু-পাঁচদিন থেকেই চোলে যায়। সৌদামিনীর সন্তান হয় নাই, কিন্তু সন্তানকামনায় সৌদামিনী অনেক রকম ব্রত করে, ঠাকুরদেবতাদের কাছে মানতি করে, নানা রকম ঔষধ খায়, সন্তান হয় না। সেই সৌদামিনীর ঘরেই খুন হয়েছে!

    কর্ত্তার জ্যেষ্ঠ পুত্র হরিবিলাসবাবু বেহার অঞ্চলের একজন মুন্সেফ, দুর্গাপূজার ছুটীতে বাড়ী এসেছিলেন, শ্যামাপূজার পরেই চোলে গিয়েছেন। বাড়ীতে কোজাগর-লক্ষ্মীপূজা হয়, সেই উপলক্ষে নিতম্বিনী আর কাদম্বিনী আশ্বিনমাসে পিত্রালয়ে এসেছিলেন, লক্ষ্মীপূজার পরেই চোলে গিয়েছেন। বিশ্বেশ্বরবাবুর স্ত্রী নাই, সুতরাং সৌদামিনীই এখন এই বাড়ীর গৃহিণী। সঙ্গিনী কেবল একজন দাসী আর একজন পাচিকা ব্রাহ্মণী। বিশ্বেশ্বরবাবু তাদৃশ বড়মানুষ নন, মধ্যবিত্ত ও গৃহস্থ মাত্র, পুত্রের উপার্জ্জনেই সংসার চলে, সম্ভবমত ক্রিয়াকর্ম্ম হয়। রাত্রিকালে মেয়েমানুষের ঘরে খুন, ভয়ানক ব্যাপার!

    পুলিশের তদন্ত আরম্ভ হয়েছে। পুলিশের লোকেরা বাজে দর্শকগণকে তাড়াহুড়া দিয়ে তফাত কোরে দিচ্ছে, সেই সময় আমরা গিয়ে উপস্থিত হোলেম। আমাদের বড়বাবুটী পুলিশের লোকের চেনা, বাড়ীর ভিতর যেতে তারা তাঁকে বারণ কোল্লে না, আমি বড়বাবুর সঙ্গেই গিয়েছিলেম, বাবুর খাতিরে অবাধে আমিও যেতে পেলেম; গিয়ে শুনলেম, সৌদামিনীর ঘরে একজন সন্ন্যাসী খুন হয়েছে।

    যে পাঁচটা সন্ন্যাসী মাসাবধি নেচে গেল, বজুরুকী জানিয়ে জোড়াসাঁকো পল্লীতে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, যাদের আমি ইতিপর্বে কৃষ্ণ-সন্ন্যাসী বোলে বর্ণনা কোরেছি, কাটা পোড়েছে, তাদের মধ্যে একজন। সন্ন্যাসীদের নাম সৰ্ব্বদা প্রকাশ হয় না, কিন্তু এ সন্ন্যাসীর নাম পাওয়া গিয়েছে, সৌদামিনীই নাম বোলেছে। সৌদামিনী গৃহস্থকন্যা, সন্ন্যাসীর সঙ্গে তার কিসের আলাপ, সৌদামিনী কি প্রকারে সন্ন্যাসীর নাম জানতে পাল্লে, সে কথাও একটু বলা দরকার। সৌদামিনী পুত্রকামনা করে, মহাপুরুষ সন্ন্যাসী এসেছে, বন্ধ্যানারীকে ছেলে দেয়, বোবালোকের কথা ফুটায়, অসাধ্য ব্যাধি আরাম করে, কাঁসাপিতলকে সোণা করে, এই সকল গুণের পরিচয় শুনে পিতাকে বোলে কোয়ে সন্ন্যাসীকে অন্দরমহলে নিয়ে গিয়েছিল, সৌদামিনীর রূপ দেখে সন্ন্যাসী মোহিত হয়, হাত দেখে মুখ দেখে, কপালের রেখা দেখে সন্ন্যাসী বলে, তোমার ভাগ্য ভাল, তুমি তিন পুত্রের জননী হবে। তোমার জন্য আমি একটী যজ্ঞ কোরবো, সে যজ্ঞ সাতদিনে পূর্ণ হয়, যজ্ঞস্থলে তোমাকে উপস্থিত থাকতে হবে, তোমাদের বাড়ীর ভিতরেই যজ্ঞকুণ্ডু প্রতিষ্ঠা কোরবো। সৌদামিনী সেই কথা পিতাকে বলে, বিশ্বেশ্বরবাবু বৃদ্ধ, বুদ্ধির ভিতর কোন রকম মার-পেঁচ খেলে না, সাধু-সন্ন্যাসীর উপর ভক্তিও আছে, মনে কোন প্রকার দ্বিধা না কোরে তিনি সম্মত হয়েছিলেন, যজ্ঞ আরম্ভ হয়েছিল। নিশাকালেই যজ্ঞ! হোমকুণ্ড-সমীপে চন্দনচর্চ্চিত হয়ে, তুলসীমাল্য ধারণ কোরে, কপালের উপর চুড়াবাঁধা খোঁপাটা এলিয়ে পৃষ্ঠের দিকে ফেলে, সেই কৃষ্ণ-সন্ন্যাসী যজ্ঞ কোত্তে বোসতো, পাশে থাকতো সৌদামিনী। প্রথম রাত্রে যখন সঙ্কল্প হয়, তখন উভয়ের নামে মন্ত্রপাঠ করা হয়েছিল, তাতেই সৌদামিনী শুনেছিল;—শুনেছিল আর জেনেছিল, সন্ন্যাসীর নাম রমাই সন্ন্যাসী। পুলিশের লোক সেই নামটা লিখে নিয়েছে। যজ্ঞ কিন্তু পূর্ণ হয় নাই, দুদিন বাকী ছিল, পঞ্চম রজনীতেই কৰ্ম্ম ফর্সা! বৃহৎ একখানা বটীর আঘাতে রমাই সন্ন্যাসীর প্রাণপক্ষী ছট ফট কোরে বেরিয়ে গিয়েছে; ভেঙে দুখানা হয়ে হোমকুণ্ডের ধারে দেহপিঞ্জরটা পোড়ে আছে। রক্তমাখা বটীখানাও কুণ্ডের কাছে পাওয়া গিয়েছে। একঠাঁই সন্ন্যাসীর মুণ্ড, একঠাঁই ধড়। এক কোপে গলাকাটা।

    শুনলেম, এই খুনের ব্যাপারে পুলিশের লোক হতবুদ্ধি। এরকমে খুন কোল্লে কে, কিছুই তারা অনুমান কত্তে পারে না। বাড়ীতে অন্যলোক থাকে না, পুরুষের মধ্যে বৃদ্ধ কৰ্ত্তা বিশ্বেশ্বর, তিনি হরিনামের মালা ঘুরিয়ে পরমার্থ চিন্তা করেন, মালাজপের সময়েও তাঁর হাত কাঁপে, তিনি সন্ন্যাসী খুন কোরবেন, অসম্ভব কথা। তবে কে? সৌদামিনী ব্রতবতী, সৌদামিনীর মঙ্গলের জন্যই আগমন, সন্ন্যাসীর প্রতি সৌদামিনীর অচলা ভক্তি, সৌদামিনী খুন কোরেছে, এরূপ অনুমান করা নিতান্ত অৰ্ব্বাচীনের কার্য্য। তবে কে? দাসী আর পাচিকা। যে রকমে এক চোটে গলাকাটা, সে রকমে খুন করা স্ত্রীলোকের অসাধ্য; বিশেষতঃ স্ত্রীলোকে সন্ন্যাসী কাটে, সচরাচর এ কথা শুনা যায় না। বাকী কেবল একজন। কৰ্ত্তার একজন পুরাতন চাকর। সে চাকর প্রায় পঞ্চাশ বৎসর এই বাড়ীতে আছে, সে লোকটাও কৰ্ত্তার সমবয়স্ক তার নাম গঙ্গারাম। তার প্রতি সন্দেহ করাও নিতান্ত ভুল; এই জন্যই পুলিশ হতবুদ্ধি। শেষে তারা স্থির কোরেছে, বাহিরের লোকেই কেটে গিয়েছে। যে লোকটা কেটেছে, সে বড় চতুর। সে জানে, বাড়ীতে কেবল স্ত্রীলোক, দুজন পুরুষ আছে, তারা অথৰ্ব্ব বৃদ্ধ সতরাং স্ত্রীলোকের দ্বারা খুন হওয়াই সকল লোকের সিদ্ধান্ত দাঁড়াবে, এইরুপ বিবেচনা কোরেই ছোরা না চালিয়ে, তলোয়ার না চালিয়ে, বটী দিয়ে কেটেছে। পুলিশের এই আনুমানিক মীমাংসা অনেক লোকের যুক্তিসিদ্ধ বোলে মনে হলো, কিন্তু কে সেই বাহিরের লোক, রাত্রিকালে কোন পথ দিয়ে বাটীর ভিতর এসেছিল, সেটা কিছু ঠিক হলো না। পুলিশের লম্পঝম্প জারিজুরী সচরাচর যেমন হয়ে থাকে, সে সব ঠিক হলো, ঠিক থাকলো, কিন্তু পৰ্ব্বতের প্রসববেদনার ন্যায় শেষ দাঁড়ালো একটা ইঁদুর; আসলকাজ কিছুই হলো না। বড় বড় তদারকে এক একজন পুলিশপুরুষ মনে যেরূপ আশা রাখেন, সে আশাও বিফল হয়ে গেল। রিপোর্ট লেখা হলো, হাসপাতালে লাস চালান হয়ে গেল, সৌদামিনী কাঁদতে লাগলো, বৃদ্ধ কৰ্ত্তা গ্রহশান্তির নিমিত্ত হরিনাম জপ কোত্তে লাগলেন।

    কিছুই কিনারা হলো না। দর্শকলোকেরা একে একে ঘরে ফিরে চোল্লো, কেহ কেহ বলাবলি কোত্তে কোত্তে গেল, “হয়েছে ভাল। এই রকম হওয়াই ঠিক। যেই কাটুক, যেই আসুক, ফলাফল এই রকম হওয়াই সংসারের মঙ্গল। সোণাকরা সন্ন্যাসী, ছেলেকরা সন্ন্যাসী, অনেক লোকের সৰ্ব্বনাশ করে, সে দলের সন্ন্যাসীকে বঁটীকাটা করাই সর্ব্বাংশে উত্তম, উপযুক্ত প্রতিফল।” আমিও মনে মনে প্রতিধ্বনি কোল্লেম, উপযুক্ত প্রতিফল। রমাই সন্ন্যাসীর পরিণাম দর্শন কোরে, বড়বাবুর সঙ্গে আমি বাড়ী ফিরে এলেম। সেই অবধি রমাই সন্ন্যাসীর সঙ্গী আর চারিজন সন্ন্যাসীকে একদিনও কোথাও দেখতে পাওয়া গেল না; বোধ হলো, তাদেরও পাছে ঐ রকম বিপদ ঘটে, তারাও ঐ কাজের কাজী, তাদেরও পাছে প্রাণ যায়, সেই ভয়েই তারা সহর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে। যেদিনের কথা আমি বোলছি, সেই দিন বৈকালে বিশ্বেশ্বরবাবুদের বাড়ীর দাসী কামিনীর মা আমাদের বাড়ীতে বেড়াতে এসেছিল, কামিনীর মা হাবাগোবা মেয়েমানুষ, বয়সটাও কিছু ভারী, সে এসে আমাদের বাড়ীর কর্ত্তাঠাকুরাণীর কাছে চুপি চুপি কত কথা বলছিল, আমি সেই সময় একটা কাজের জন্য হঠাৎ বাড়ীর ভিতর গিয়েছিলেম। যেখানে তাদের কথা হোচ্ছিল, সেখান পর্য্যন্ত যেতে না যেতেই আমার কাণে এলো, খুনের কথা, আমি একটুকু গা-ঢাকা হয়ে দাঁড়ালেম। আগেকার কথা শুনি নাই, শেষের কথা কেবল এইটুকু শুনতে পেলেম, সৌদামিনীর ঘরে তক্তপোষের নীচে তিনটে মদের বোতল বেরিয়েছে, একটা কাণাভাঙা মাটীর গেলাস আর কতকগুলো ছোট ছোট হাড়; পাঁটার কি মুরগীর কি আর কোন পাখীর হাড়, কে জানে, কিন্তু বেরিয়েছে, একটা বোতলে খানিকটা মদ ছিল। সন্ন্যাসীটা মদ খেতে। বোধ হয়, সৌদামিনীও খেয়েছে!

    শুনেই আমি সেখান থেকে ধাঁ কোরে সোরে এলেম, যে কাজের জন্য গিয়েছিলেম, সে কাজটা তখন আর সারা হলো না; কেন না, গৃহিণীর কাছেই দরকার, তাঁদের তখন যে প্রকার গুপ্তকথা হোচ্ছিল, তখন সেখানে দেখা দেওয়াটা দোষ, তাই ভেবেই সোরে পোড়লেম; বড়বাবুর বৈঠকখানায় এসে বোসে পূৰ্ব্বাপর সেই কথাই মনে মনে তোলাপাড়া কোত্তে লাগলেম। কিছুই বিচিত্র নয়। সন্ন্যাসীর দলে ভণ্ডসন্ন্যাসীই বিস্তর দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে, কিন্তু কোন প্রকার কুকাৰ্য্য তাদের বাকী নাই। কথার ছলনে মেয়েমানুষ ভুলায়, মেয়েমানুষের সঙ্গে নির্জ্জনে কথা কয়, একসঙ্গে নির্জ্জনে থাকে, ছেলে হবার ঔষধ দেয়, এ সব কাজ যারা কোত্তে পারে, তারা কি একটু মদ খেতে পারে না? কি তারা পারে না? সন্ন্যাসীরা গৃহস্থের ঘটী-বাটী চুরি করে, সোণা করার লোভ দেখিয়ে কৌশলে সৰ্ব্বস্ব চুরি করে, ভদ্রলোকের জাতিকুল নষ্ট করে, কি তারা করে না? ছেলেমানুষ আমি, কিন্তু একবার আমি শুনেছিলেম, ভস্মমাখা একটা শিব-সন্ন্যাসী কোথাকার এক বড়মানুষের সাত দেউড়ীর ভিতর থেকে একটী টকটকে বউ বাহির কোরে নিয়ে কোন দেশে পালিয়ে গিয়েছিল।

    সন্ন্যাসিদের উপর আমার ঘৃণা ছিল, সে ঘৃণাটা আরো বেড়ে উঠলো। কেবল সন্ন্যাসীর উপরে কেন, সহরের উপরেই ঘৃণা বাড়লো। কলিকাতায় আর থাকা হবে না, এ অঞ্চলে আর থাকবো না, পশ্চিমদেশে চোলে যাই; সে দেশে অনেক তীর্থস্থান আছে, সম্পর্কশূন্য উদাসীন নিরাশ্রয় আমি, তীথে তীর্থে দেবদর্শন কোরে, যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াবো। সহরেই পাপ, সহরেই দুষ্ক্ৰিয়া, সহরেই মানুষ খুন, সহরেই ব্যভিচার, সহরে থাকা আমার পক্ষে ভাল নয়। আমার মত অবস্থায় সহরে যারা থাকে, মনে হয় কখনই তারা চরিত্র রাখতে পারে না। সব আমি হারিয়েছি, অনেক কষ্টই পেয়েছি, ভগবান রক্ষা করেন, দোহাই ভগবানের চরিত্রটী আমি হারাব না, হারাতে পারবোই না।

    অষ্টাহ অতীত হয়ে গেল। কার্ত্তিকমাস শেষ হয়ে গিয়েছে, অগ্রহায়ণমাসের দশবারোদিন অতিক্রান্ত, শীতকাল উপস্থিত। আমার গায়ের কাপড় কিনে দিবার জন্য বড়বাবু আমাকে একদিন চাঁদনীর বাজারে নিয়ে গিয়েছিলেন, একজন দরজীর কাছে আমার গায়ের মাপ দিয়ে জামা তৈয়ারী করবার ফরমাস দিলেন, গায়ের একখানি কাপড় কিনে দিলেন, পাঁচদিন পরে জামা হবে, এইরূপ স্থির হয়ে থাকলো। পাঁচদিন পরে আমি একাকী চাঁদনীর চকবাজারে জামা আনতে যাই, জামা নিয়ে ফিরে আসছি, একটা রাস্তার মোড়ে দেখতে পেলেম, দু-জন লোক হন হন কোরে দক্ষিণদিকে চোলে যাচ্ছে। যেদিকে আমি ছিলেম, সেদিকে তারা চাইলে না, আপনা আপনি গল্প কোত্তে কোত্তে আমার পাঁচ হাত তফাৎ দিয়েই চোলে গেল। সৰ্ব্বদাই আমার মনে কেমন একপ্রকার আতঙ্ক; সেই দুটো লোককে দেখে আতঙ্কে আমার বুক কেঁপে উঠলো। দুজনের মধ্যে একজন সেই কালান্তক কুব্জ রাক্ষস রক্তদন্ত!

    ও বাবা! রক্তদন্তটা এখানে পর্য্যন্ত এসেছে। তবে তো আমার আর নিস্তার নাই! কার-মুখে হয় তো শুনেছে, আমি কলিকাতায় আছি, তাই শুনেই হয় তো আমাকেই খুঁজতে বেরিয়েছে; বীরভূমের লোক কি না, বীরভূমে আমাকে নিয়ে একটা মস্ত কাণ্ড হয়ে গিয়েছে, মুখে মুখে কাণে কাণে সেই কাণ্ডটা হয় তো প্রকাশ হয়ে পোড়েছে, সেই সূত্রেই রক্তদন্ত কলিকাতায় আমাকে ধোরতে এসেছে! এই ভাবনায়, এই ভয়ে, এই সন্দেহে, আমার সৰ্ব্বশরীর কেঁপে উঠলো; এক মুহূর্ত্তও সেখানে আর দাঁড়ালেম না, হেঁটে আসবে মনে কোরেছিলেম, সে সঙ্কল্প পরিত্যাগ কোল্লেম; সঙ্গে টাকা ছিল, একখানা ঠিকাগাড়ী ভাড়া কোরে শীঘ্র শীঘ্র মনিববাড়ীতে এসে পৌঁছিলেম। সারাটা পথ গাড়ীর ভিতর কেবল ভাবনা। ঐ লোক আমার মামা সেজেছিল, ঐ লোক আমাকে বীরভূমে নিয়ে গিয়েছিল, ঐ লোক আমাকে নীলকুঠীতে চালান দিবার পরামর্শ কোরেছিল, ঐ লোক আমাকে প্রাণে মারবার মন্ত্রণা এঁটেছিল, সেই লোক আবার কলিকাতায়। আর আমি কলিকাতায় থাকবো না। আজিই আমি পালাবো। বেলা তখন অতি অল্প ছিল, স্থির কোল্লেম, যোগেযাগে রাত্রিটা কাটিয়ে, ভোরেই আমি পালাবো।

    এই সঙ্কল্প স্থির।—একটী কথা পর্বে বলা হয় নাই। যখন আমি প্রতাপবাবুর বাড়ীতে ভর্তি হই, তখন আমার সঙ্গে সম্বল ছিল ৫০১৲ টাকা; —অমরকুমারীর দত্ত এক টাকা, আর নরহরিবাবর দত্ত পাঁচখানি নোটে ৫০০৲ টাকা। প্রতাপবাবুর বাড়ীতে আশ্রয় পেয়ে মাসে মাসে পাঁচটাকা কোরে জলপানী পেয়েছি। সব টাকাগুলি আমি বড়বাবুর কাছে গচ্ছিত রেখেছিলেম। সেই রাত্রে বড়বাবুকে আমি বোল্লেম, বিশেষ প্রয়োজনে কিছুদিনের জন্য আমাকে স্থানান্তরে যেতে হোচ্ছে, গচ্ছিত টাকাগুলি আমায় প্রদান করুন।” বড়বাবু প্রথমে আমাকে স্থানান্তরগমনে নিষেধ কোরেছিলেন, সে নিষেধ আমি মানলেম না;— না গেলেই নয়, বার বার এই কথা বোলে দৃঢ়সঙ্কল্প হোলেম। শেষকালে তিনি আর বাধা দিলেন না, কোন আপত্তিও কোল্লেন না, টাকাগুলি আর নোট-কখানি এনে আমার হাতে দিলেন, আমি নমস্কার কোল্লেম।

    রাত্রিকালে নিদ্রা। নামমাত্র নিদ্রায় খানিক রাত্রি অতিবাহিত কোরে, চঞ্চলমনে বিছানার উপর বোসে থাকলেম। রাত্রি কত আছে, জানবার জন্য একএকবার গবাক্ষের কাছে গিয়ে দাঁড়াই, ঠিক কোত্তে পারি না, চঞ্চলপদে ঘরের ভিতর পাইচারী করি, বারম্বার জানালার কাছে যাই, আকাশপানে উঁকি মেরে দেখি, কিছুই ঠিক হয় না। রাত্রে যে ঘরে আমি শুই, সে ঘরে ঘড়ী ছিল না, অন্য ঘরের ঘড়ীর আওয়াজ শুনতে পেলেম না, ক্রমশই চাঞ্চল্যবৃদ্ধি হলো। বেশী রাত থাকতে গৃহস্থবাড়ীর সদরদরজা খুলে রেখে বেরিয়ে যাওয়া দোষের কথা, কৰ্ম্মটা ভাল হয় না; করি কি? বেরুতেও পাচ্ছি না, থাকতেও ভয় হোচ্ছে। প্রভাত হোলে কোনরকম বাধা পোড়তে পারে, খুঁজে খুঁজে সন্ধান নিয়ে রক্তদন্তটাও হয় তো এখানে এসে পোড়তে পারে, করি কি?

    রাস্তার দিকে জানালার গরাদে ধোরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি, পল্লী নিস্তব্ধ, এমন সময় দরবর্ত্তী গির্জার ঘড়ীতে ঢং ঢং শব্দে ছয়টা বাজলো;—স্থির হয়ে, কাণ পেতে, এক এক কোরে আমি গণনা কোল্লেম, ছয়টা। অগ্রহায়ণমাসের রাত্রে ছয়টা বাজবার পরেই ঊষার আগমন;—ঠিক বুঝলেম, ঊষাকাল। দুর্গা দুর্গা বোলে যাত্রা কোল্লেম। কৰ্ত্তার কাছে বিদায় লওয়া হলো না, বাড়ীর মেয়েদেরও কিছু বলা হলো না, ছোটবাবুও কিছু জানতে পাল্লেন না, আমি বিদায় হোলেম, সংক্ষেপে কেবল এইটুকু জানলেন বড়বাবু। জানলেন বটে, কিন্তু কোথায় যে আমি যাব, তা তিনি কিছুই জানতে পাল্লেন না। আমি বিদায় হলেম। দুর্গা—শ্রীহরি! দুর্গা—শ্রীহরি!

  • ষোড়শ কল্প : কাশীধাম

    ষোড়শ কল্প : কাশীধাম

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    ষোড়শ কল্প : কাশীধাম

    কোথায় আমি যাব, অপরে কি জানবে, নিজেই আমি জানি না। কিছুই ঠিক নাই। ঠিক নাই, অথচ আমি কলিকাতার নূতন আশ্রয়টী পরিত্যাগ কোল্লেম! মনে বড় ভয়, কখন কোথায় কি বিপদ ঘটে, কখন দুৰ্বিপাকে বৈরিহস্তে ধরা পড়ি, সেই ভয়ে প্রতিজ্ঞা কোল্লেম, স্থলপথে যাব না, জলপথেই বরাবর দূরদেশে চোলে যাব। জানা ছিল, বড়বাজারের ঘাটে সৰ্ব্বক্ষণ নৌকা পাওয়া যায়; ভোরে ভোরে ভোঁ ভোঁ কোরে ছুটে ছুটে বড়বাজারের ঘাটে পৌঁছিলেম। যে সকল নৌকা পশ্চিম অঞ্চলে যায়, তারি একখানা ভাড়া কোরে আমি পশ্চিমদেশে চোল্লেম। দাঁড়ী-মাঝীরা বদর বদর মন্ত্রে নৌকা ছেড়ে দিলে। আট দাঁড়ে অতি দ্রুত তরণীখানি গঙ্গা-তরঙ্গে ছুটে ছুটে চোল্লো। বাগবাজারের সীমা যখন ছাড়িয়ে গেল, পূৰ্ব্বগগনে সূৰ্য্যদেব তখন অল্পে অল্পে উঁকি মাত্তে লাগলেন।

    গঙ্গার দুধারে যে সকল স্থান, মাঝীকে জিজ্ঞাসা কোরে সেই সকল স্থানের নাম জেনে নিতে লাগলেম। যে স্থানগুলি প্রসিদ্ধ, সেইগুলির নাম মনে থাকলো, ছোট ছোট গ্রামের নাম মনে কোরে রাখতে পাল্লেম না। বালী, শ্রীরামপুর, বৈদ্যবাটী, চন্দননগর ছাড়িয়ে হুগলীতে নৌকা পৌঁছিল। বেলা এগারটা। চন্দননগরে একবার নেমেছিলেম, ছোট সদর, কিন্তু মন্দ নয়। চন্দননগরের নাম ফরাসডাঙ্গা; এই স্থানটী ফরাসীদের অধিকারে; এখানে ইংরেজের আইন-কানুন চলে না, লোকের মুখে শুনলেম, ইংরেজের অধিকারে নরনারীহত্যা, চুরি-ডাকাতী, জালিয়াতী ইত্যাদি বড় বড় অপরাধ কোরে যারা ফরাসডাগায় আশ্রয় লয়, ফরাসী গবর্ণরের অনুমতি ব্যতিরেকে ইংরেজী পুলিশ সে সকল অপরাধীকে গ্রেপ্তার কোত্তে পারে না। আরও শুনলেম, ফরাসী অধিকারে বাঙ্গালী গৃহস্থ প্রজারা অনেক প্রকার সুখে আছে।

    হুগলীতে উত্তীর্ণ হয়ে স্নানাহার সমাপন কোল্লেম, দাঁড়ী-মাঝীরাও স্নানাহার কোরে নিলে; গঙ্গায় তখন ভাটা; জোয়ার আরম্ভ হোলে নৌকা-ছাড়া হবে, মাঝীরা আমাকে এই কথা জানালে; জোয়ার আসবার বিলম্ব আছে। এক প্রকার হলো ভাল। হুগলীটী প্রাচীন কুঠী, প্রাচীন সহর, বেড়িয়ে বেড়িয়ে সেখানকার বাজার হাট আমি দেখলেম। বেশী বিলম্ব হবে বোলে আদালতগুলি দেখা হলো না। সুখের আসা নয়, সখের যাত্রা নয়, দুরন্ত রাক্ষসের ভয়ে কলিকাতা পরিত্যাগ। পরিহিত বস্ত্র শীতকালের গাত্রবসু আর টাকাগুলি ব্যতীত দূরপথে ভ্রমণের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিছুই সঙ্গে ছিল না, হুগলীর বাজারে লেপ, তোষক, বালিশ আর কয়েকখানি তৈজসপত্র কিনে নিলেম; বেলা যখন আড়াইটে, সেই সময় নৌকাছাড়া হলো।

    দিবারাত্রি নৌকা চোলতে লাগলো; অষ্ট প্রহরের মধ্যে অল্পক্ষণ মাত্র বিরাম ক্রমশঃ শান্তিপুর, কালনা, কাটোয়া ইত্যাদি স্থান অতিক্রম কোরে অনেক দূরে গিয়ে পোড়লেম। শান্তিপুরে নেমেছিলেম; শান্তিপুর একটী সুবিখ্যাত গণ্ডগ্রাম; সহর বোল্লেও সাজে। শান্তিপুরে বহুলোকের বাস; হাটবাজারও বেশ গুলজার; সেখানে দেখবার জিনিস অনেক আছে। শুনলেম, কার্ত্তিকমাসে রাসের সময় শান্তিপুরে মহাসমারোহ হয়। কালনাতেও নেমেছিলেম; সেখানে বর্দ্ধমানের মহারাজের অনেকগুলি দেবালয় আছে; সারি সারি অনেক মন্দির; এখানকার প্রধান বিগ্রহ লালজী। অতি সুন্দর নবরত্নমন্দির লালজী বিরাজমান। লালজীর সেবা ও লালজীর বাড়ীর অতিথিসেবার বন্দোবস্ত অতি উত্তম।

    ক্রমে ক্রমে অনেক স্থান ছাড়িয়ে গেলেম। দূরে যেন কৃষ্ণবর্ণ মেঘমালা নয়নগোচর হলো। নৌকা যতই অগ্রসর হয়, ততই দেখি, সেই মেঘমালা যেন অনেক দুরে। মেঘের গায়ে গায়ে যেন কত রকম পাখী বোসেছে, ছোট ছোট গাছপালা রয়েছে, এই রকম অনুমান কোল্লেম। মেঘের গায়ে পাখী, মেঘের গায়ে গাছ, তবে তো মেঘ নয়; তবে ওটা কি? ক্রমশই নিকটবর্তী। তখন দেখলেম, সত্যই মেঘ নয়, উচ্চ উচ্চ ভূমিস্তূপ, প্রস্তরস্তূপ; যেগুলিকে ছোট ছোট গাছপালা মনে কোরেছিলেম, সত্যই সেগুলি বড় বড় বৃক্ষলতা; কতকগুলি পুষ্পবৃক্ষে নানাবর্ণের পুষ্প প্রস্ফুটিত হয়ে রয়েছে যেগুলিকে পাখী মনে কোরেছিলেম, সেগুলি গরু, বাছুর, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি গৃহপালিত পশু; তারা সেইখানে নির্বিঘ্নে চরা কোরে বেড়াচ্ছে। মাঝীকে জিজ্ঞাসা কোরে জানলেম, রাজমহলের পাহাড়। গরু-বাছুরেরা পাহাড়ে উঠে চোরে চোরে বেড়ায় সেটা আমার জানা ছিল না, আমার চক্ষে আশ্চর্য্য বোধ হলো, কিন্তু শুনলেম, পাহাড় অঞ্চলের পশুজাতির ঐরূপ শিক্ষা, ঐরূপ অভ্যাস।

    কলিকাতার বড়বাজারের ঘাট থেকে কদিনে রাজমহলে নৌকা পৌঁছেছিল, সেটা আমার ঠিক মনে নাই; শীঘ্র শীঘ্র কাশী যাব, ইহাই আমার আকিঞ্চন; রাজমহলে নেমে পাহাড়গুলি ভাল কোরে দেখা হলো না। নৌকা চোল্লো। সাহেবগঞ্জ, ভাগলপুর, মুঙ্গের, পাটনা ছাড়িয়ে পোড়লেম। ভাগলপুর ছাড়িয়ে একটা পাহাড় দেখা গিয়েছিল, সে পাহাড়টার নাম জাংরের পাহাড়; —জলের মাঝখানে যেমন দ্বীপ থাকে, এটাও প্রায় সেইরূপ; বোধ হয় যেন, জলের ভিতর থেকেই পাহাড় উঠেছে। প্রবাদ এইরুপ যে, জহ্নুমুনি এইখানে গঙ্গা পান কোরেছিলেন। তদবধি গঙ্গার একটী নাম জাহ্নবী।

    পাটনা সহরটী অতি সুন্দর। পাটনার প্রাচীন নাম পাটলীপুত্র। এই স্থান থেকে গণ্ডকী নদীর মোহানা দেখা যায়। পাটনার পর দানাপুরে, আরা, বক্সার, তার পর গাজীপুর। গাজীপুরের গোলাপ অতি প্রসিদ্ধ। কৌতুকে কৌতুকে কত স্থান দেখতে দেখতে চোল্লেম : আটদিন পরে কাশীর ঘাটে নৌকা পৌঁছিল।

    পথের একটী ঘটনার কথা এইখানে বোলে রাখা অতি আবশ্যক। কলের গাড়ী যখন ছিল না, অনেক যাত্রী তখন হাঁটাপথে যেতো; সঙ্গতিমান লোকেরা নৌকাযোগে যেতেন। পথের স্থানে স্থানে এক একটা চটী ছিল। চটী মানে ছোট ছোট পান্থনিবাস। তিনদিকে বেড়া, একদিক খোলা, মাথার উপর চাল। খোপে খোপে চৌকা। যাত্রীরা দলে দলে সেই সকল চটীতে আশ্রয় নিতো, রন্ধনাদি কোত্তো, অনেকে রাত্রিকালেও চটীর ভিতর শুয়ে থাকতো। তখনকার তীর্থযাত্রিগণের পথে অনেক ভয় ছিল; চোরের উপদ্রবে সকলেই সদাসৰ্ব্বদা শঙ্কিত হয়ে থাকতো; খুব সাবধানে থাকলেও অনেকে চোরের দৌরাত্ম থেকে পরিত্রাণ পেতো না। সেই কারণেই একসঙ্গে দল বেঁধে থাকা, রাত্রিজাগরণ করা নিতান্ত আবশ্যক হতো। তাতেও নিস্তার ছিল না। ঘুমিয়ে পোড়তো, চোরেরা চুপি চুপি তাদের ঘটী, বাটী, কাপড়, তল্পী, বাক্স ইত্যাদি চুরি কোরে নিয়ে পালাতো। মানুষ-চোর ব্যতীত ঠাঁই ঠাঁই কুকুরচোর ছিল। আট দশজন যাত্রী গায়ে গায়ে রাত্রিকালে নিদ্রাগত, মাথার নীচে তল্পী, তাদৃশ স্থলেও কুকুরেরা নিঃশব্দে চুপি চুপি গিয়ে ঘুমন্ত লোকের মাথার তল্পী চুরি কোরে নিয়ে যেতো; কেহই কিছু জানতে পাত্তো না, কারো অঙ্গে কুকুরের হাত-পা ঠেকতো না; কুকুরেরা এত সাবধান। মানুষ-চোরেরা সেই সকল কুকুরকে ঐ রকমের চুরি করা শিক্ষা দিত। কুকুরের বুদ্ধি ভাল, যা শিখাও, তাই শিখে; চোরেরা মনিব, সৰ্ব্বদাই সেই বিদ্যা শিক্ষা দেয়, চুরি শিখে সুশিক্ষিত হয়ে কুকুরেরাও বিলক্ষণ চোর হয়ে উঠতো।

    তীর্থপথের চোর সাধারণ ডাকাত অপেক্ষাও অধিক সাহসী। দিনমানেও যাত্রিদের সঙ্গে সরপট কথা কোয়ে জিনিস চুরি কোত্তো। পিতলের তসলায় যাত্রীরা রন্ধন কোচ্ছে, চোর গিয়ে লাঠী হাতে কোরে সম্মুখে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা কোত্তো, “তসলা তেরা কি মেরা?” যারা জানতো, তারা উত্তর দিতো, “তেরা।” —চোর তখন সেখান থেকে চোলে যেতো; নূতন যাত্রী তাদের কাণ্ডকারখানা জেনে যদি উত্তর কোত্তো, “এ তসলা মেরা,” তা হোলে চোর তৎক্ষণাৎ লাঠী মেরে আগুনের উপর থেকে তসলাটা ফেলে দিয়ে, হাতে কোরে নিয়ে গজেন্দ্রগমনে চোলে যেতো, দেখলে বোধ হতো, যেন একজন রাজা কি নবাব। কারো কথায় কর্ণপাত কোত্তো না, বুকে একটুভয়ও রাখতো না।

    সেই রকমের একটা চটীতে আমি একদিন উত্তীর্ণ হয়েছিলেম। সেই চটীর নাম ভেলুয়া চটী। রন্ধনাদি কোরে সেইখানে আমি আহার করি, অন্যান্য যাত্রীরাও ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন ঘরে আহারাদি করে। যাত্রী সে দিন বড় কম ছিল না। ঘর একখানা নয়, তফাৎ তফাৎ বিশ পঁচিশখানা ঘর। চটীর বন্দোবস্ত দেখবার জন্য অনেকক্ষণ আমি সেইখানে ছিলেম; বেড়াতে বেড়াতে সন্ধ্যা হয়ে যায়; সন্ধ্যাকালে নৌকার দিকে ফিরে আসছি, সাত আটখানা নৌকা সেইখানে নঙ্গর করা ছিল, ভয় ছিল না, নির্ভয়ে আপন মনে আমি চোলে আসছি, হঠাৎ দেখি, চটীর উত্তরদিকের একখানা কুটীরে দাউ দাউ কোরে আগুন জ্বোলছে, কে একজন সেই আগুনের ভিতর থেকে পরিত্রাহি চীৎকার কোচ্ছে। “কে আছ গো! বাঁচাও গো! প্রাণ যায় গো! পুড়ে মোলেম গো! রক্ষা কর গো!” এই রকম চীৎকার—এই রকম আর্ত্তনাদ! কণ্ঠস্বরে বুঝলেম, বামাকন্ঠ! কোন স্ত্রীলোক সেই ঘরে আছে, ঘরে আগুন লেগেছে, বাহির হোতে পাচ্ছে না, আশে পাশে জনকতক লোক হৈ হাই শব্দে ছুটাছটি কোচ্ছে, আগুনের কাছে কেহই এগুতে পাচ্ছে না। স্ত্রীলোকের ক্রন্দন, স্ত্রীলোকের প্রাণ যায়, আমার প্রাণ কেমন অস্থির হয়ে উঠলো; গঙ্গার দিকে যাচ্ছিলেম, ফিরে দাঁড়ালেম; যে দিকে আগুন, উর্দ্ধশ্বাসে সেইদিকে ছুটলেম। সম্মুখদিকে বেশী আগুন, সেই ভয়ে লোকেরা অগ্রসর হোতে পাচ্ছিল না; আগুনের ভেল্কীতে লোকেরা কেবল জল জল কোরে চেঁচাচ্ছিল। আমার তখন একটা উপস্থিতবুদ্ধি যোগালো, লোকেরা যে দিকে গোলমাল কোচ্ছিল, সে দিকে না গিয়ে তফাৎ দিয়ে ঘুরে ঘরের পশ্চাদ্দিকে উপস্থিত হলেম। সম্মুখদিকে আগুন লেগেছিল, পশ্চাতে তখনও আগুন ধরে নাই, তাই দেখে আমার একটু সাহস হলো। পরমেশ্বরের কৃপা! পলক ফেলবার অবসর রাখলেম না, নাসিকাতে নিশ্বাস ফেলবার অবকাশ দিলেম না, গাত্রবস্ত্রগুলি খুলে তফাতে টেনে ফেলে, এককাপড়ে কোমর বেঁধে, এক লাথিতে ঘরের বেড়া ভেঙে ঘরের মধ্যে প্রবেশ কোল্লেম; কোন দিকেই না চেয়ে স্ত্রীলোকটীকে কোলে কোরে নিয়ে ভোঁ কোরে বেরিয়ে পোড়লেম, স্ত্রীলোকটীর মুখের দিকে চাইলেম না, লম্ফে লম্ফে দশ হাত তফাতে এসে দম রাখলেম।

    আমিও বেরিয়েছি, ওদিকে উত্তরে হাওয়ায় ঘরখানা সমস্ত জ্বোলে উঠে হু হু শব্দে; চতুর্দ্দিকে আগুনের হল্কা ছড়াতে লাগলো। পাছে অন্যান্য ঘরে লেগে যায়, সেই আশঙ্কায় চটীর লোকেরা কলসী কলসী জল এনে তফাৎ থেকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ছড়াতে আরম্ভ কোল্লে; ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে আমিও একটু ঠাণ্ডা হোলেম। যেটীকে উদ্ধার কোরে আনলেম, সেটীকে ঘাসের উপর শুইয়ে রেখে দুই হাতে সৰ্ব্বাঙ্গের ঘাম মুছতে লাগলেম।

    অগ্রহায়ণমাস শেষ হয়ে গিয়েছে, বিলক্ষণ শীত, সে অঞ্চলে আরো বেশী, তথাপি আমার সৰ্ব্বশরীরে ঘর্ম্মধারা। কারে আমি বাঁচিয়েছি, কিছুই জানি না, তখনো তাঁর মুখের দিকে আমি চেয়ে দেখি নাই; অন্ধকার রাত্রি, ঘুট ঘুটে অন্ধকার; ঘরজ্বলা আগুনের আলোতে এতক্ষণের পর সেই স্ত্রীলোকটীর মুখপানে আমি চাইলেম। চেয়েই অমনি অকস্মাৎ চোমকে উঠে মনের আবেগে অস্ফুট চীৎকার কোরে উঠলেম। স্ত্রীলোকটী অজ্ঞান;—অঙ্গের কোন স্থানে অগ্নিস্পর্শ হয় নাই, কাপড়েও আগুন ধরে নাই, কিন্তু চৈতন্যশূন্য! চক্ষু-দুটী বিমুদিত!

    কি আশ্চর্য্য ব্যাপার! বিধাতা আমাকে এই সময় এখানে এনে পরম উপকারসাধন কোরেছে, এই কথা স্মরণ কোরে, উদ্দেশে বিধাতাকে নমস্কার কোল্লেম। ঘন ঘন বক্ষঃস্থল কম্পিত হোতে লাগলো। সন্দেহে সন্দেহে স্ত্রীলোকটীর নাসিকায় হস্ত দিয়ে বুঝলেম, নিশ্বাস আছে, মরে নাই, মূর্চ্ছা। পুনরায় এক নিশ্বাস ফেলে জগদীশ্বরকে প্রণিপাত কোল্লেম। তখন আমার অমঙ্গল-আশঙ্কা দূর হলো। স্ত্রীলোকটীর মুখে, কপালে, মস্তকে বারবার হস্ত স্পর্শ কোরে, হেঁট হয়ে ভাল কোরে, সেই মুখখানি আবার দেখলেম। প্রাণে আমার তখন কতই উৎসাহ, কতই আনন্দ, কতই উচ্ছ্বাস, সে কথা আমি বোলতে পারি না। একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে কিন্তু বিপুলে সন্দেহ।

    লোকেরা কলসী কলসী জল ঢেলে ঘরের অগ্নিনিৰ্ব্বাণের চেষ্টা কোচ্ছিল, জলাহুতি পেয়ে অগ্নি ক্রমশই প্রবল হোচ্ছিল, ডেকে ডেকে চীৎকার কোরে আমি লোকগুলিকে বোলতে লাগলেম, “ওগো, এইখানে একটু জল আন, আমাকে একটু জল দাও, স্ত্রীলোকটী অচেতন, বাঁচাও, বাঁচাও, শীঘ্র বাঁচাও!”— আমার কথাগুলি যেন বাতাসে উড়ে গেল, কেহই শুনতে পেলে না; কিম্বা হয় তো শুনতে পেয়েও গ্রাহ্য কোল্লে না। তখন আমি কি করি, যত্নের দেহ অযত্নে ফেলে রেখে গঙ্গা পর্য্যন্তও যেতে পারি না, কি করি, নিজের কোমরের কাপড় খুলে ধীরে ধীরে সেই চন্দ্রমুখে বাতাস কোত্তে লাগলেম। একটু পরে দুটী পদ্মচক্ষু যেন অল্প অল্প নিমীলিত হলো; আনন্দে আমার অন্তরাত্মা যেন নেচে উঠলো; আদরে তারস্বরে ডাকলেম, “অমরকুমারী!”

    অমরকুমারী অল্প অল্প চেয়েছিলেন, আমার কথা শুনে, একটীবার আমার দিকে চেয়েই তখনি আবার চক্ষু বুঝলেন; দীর্ঘ দীর্ঘ নেত্রপল্লবে পদ্মফুলদুটী ঢাকা পোড়ে গেল। আমি শুশ্রূষা কোচ্ছি, চৈতন্য প্রাপ্ত হয়েও অমরকুমারী কেন এমন হলেন, এইরূপ ভাবছি, এমন সময় দেখি, সেই জলন্ত ঘরের কাছে একটী ভদ্রলোক ছুটে এলেন; তাঁর মুখে হাহাকার ধ্বনি, অঙ্গবস্ত্র শিথিল। আমার দিকে অঙ্গুলিসঙ্কেতে একজন লোক সেই ভদ্রলোকটীকে কি কথা বোল্লে, তিনি তৎক্ষণাৎ দ্রুতপদসঞ্চারে আমাদের কাছে এসে উপস্থিত হোলেন। তফাৎ থেকে একটু একটু আমি চিনতে পেরেছিলেম, নিকটে এলে স্পষ্টই চিনলেম, মোহনলালবাবু। ঘটনার কথা একনিশ্বাসে তাঁর কাছে আমি বর্ণনা কোল্লেম, সাদরে আমার মস্তক স্পর্শ কোরে, আরক্তবদনে মিষ্টবচনে তিনি বোল্লেন, “খুব বাহাদর! খুব বাহাদুর! তুমি আমার পরম উপকার কোরেছ! এখানে তুমি কেমন কোরে এলে?”

    যেমন কোরে এসেছিলেম, সংক্ষেপে সংক্ষেপে পরিচয় দিলেম, শুনে তিনি ম্লানবদনে একটু হাস্য কোল্লেন। ঘরখানা ওদিকে ভস্মসাৎ হয়ে গেল, এদিকে অমরকুমারীর মূর্চ্ছাভঙ্গ হলো, আমার দিকে পৃষ্ঠ রেখে, মোহনবাবুর দিকে মুখ ফিরিয়ে, অমরকুমারী উঠে বোসলেন। মোহনবাবুকে সম্বোধন কোরে আমি বোল্লেম, “এখনো ভয়ের ঘোর আছে : অমরকুমারী আমারে চিনতে পাচ্ছেন না।”

    বিস্ফারিতনেত্রে একদৃষ্টে আমার মুখপানে চেয়ে সবিস্ময়ে মোহনবাবু বোল্লেন, “এ কি হরিদাস? ইহারে কি তুমি চেনো? ইহারে কি তুমি আর কোথাও দেখেছ?”

    আমার মনের ভিতর তখন যেন চপলার খেলা হয়ে গেল। যেমন আলো এলো, সঙ্গে সঙ্গে তখনি তেমনি অন্ধকার। অমরকুমারী আমারে চিনতে পাচ্ছেন না, আমি যদি বলি চিনি, সেটা তো ভাল কথা হবে না। যে জায়গায় দেখাশুনা, সেটা আমার পক্ষে অনুকূল স্থান নয়, সে সব কথা যদি প্রকাশ করি, কিসে কি হবে, চেপে যাওয়াই ভাল; তাই ভেবেই চেপে গেলেম; মোহনবাবুর প্রশ্নে কেবল এইটকুমাত্র উত্তর দিলেম, “আজ্ঞা হাঁ, এই রকমের একটী বালিকাকে আমি দেখেছি, তাঁর নাম অমরকুমারী।”

    হাস্য কোরে মোহনবাবু বোল্লেন, “তোমার ভুল হোচ্ছে। এর নাম অমরকুমারী নয়। এটী আমার নূতন পরিবার। সন্তান হলো না বোলে দ্বিতীয়বার আমি এটীকে বিবাহ কোরেছি। আগুনের মুখ থেকে তুমি এটীকে রক্ষা কোরেছ, আমি তোমার কাছে উপকৃত হয়েছি, এখন তুমি যাবে কোথায়?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “কাশী যাব। আমি কারো শত্রু নই, জন্মাবধি কখনো কারো কোন অনিষ্ট করি নাই, অকারণে দেশে আমার অনেক শত্রু হয়েছে, দেশে আর থাকবো না, কাশীবাসী হয়ে অন্নপূর্ণা-বিশ্বেশ্বর দর্শন কোরবো, কাশীর ঘাটে নিত্য গঙ্গাস্নান কোরবো, অন্নপূর্ণা-বিশ্বেশ্বরের পবিত্র নাম কীর্ত্তন কোরবো, এই আমার বাসনা। কাশীনাথ যদি কাশীতে আমাকে জায়গা না দেন, তা হোলে গঙ্গা পার হয়ে সন্ন্যাসীর মত তীর্থে তীথে পর্য্যটন কোরে বেড়াবো।”

    পুনৰ্ব্বার হাস্য কোরে মোহনবাবু বোল্লেন, “ছেলেমানুষ! ও রকম কাজ কি কোত্তে আছে? শিশুকালে সন্ন্যাস! বোকা ছেলে। চল আমার সঙ্গে, আমি প্রয়াগে যাচ্ছি, আগে প্রয়াগে চল, তার পর আমিই তোমাকে সঙ্গে কোরে কাশীতে নিয়ে যাব। দেশে তোমার কে এমন শত্রু হয়েছে? কেনই বা শত্রু হবে? কেহই শত্রু হয় নাই। ওটা তোমার মনের স্বপ্ন; ও সকল মিথ্যা স্বপ্ন মন থেকে দূর কোরে দাও; চল আমার সঙ্গে; আমার নৌকা আছে, একসঙ্গে সেই নৌকাতেই বেশ যাওয়া যাবে।”

    পূর্ব্বাপর চিন্তা না কোরেই আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা না, আমার নৌকা আছে, ভগবান বিশ্বেশ্বর আমার চিত্তকে আকর্ষণ কোরেছেন, অগ্রেই আমি কাশী যাব। আপনি যদি একান্তই আমারে প্রয়াগে নিয়ে যেতে চান, সেটা আপনার অনুগ্রহ কিন্তু বিশ্বেশ্বর-দর্শনের অগ্রে কিছুতেই আমি যেতে পারবো না, দয়া কোরে ক্ষমা কোরবেন।”

    মোহনবাবু বিস্তর জেদাজেদি কোল্লেন, ভাল করবার আশ্বাস দিয়ে বিস্তর অনুরোধ কোল্লেন, তথাপি আমি সম্মত হোলেম না। শেষকালে তিনি আমাকে সঙ্গে কোরে আপনার নৌকায় নিয়ে গেলেন, নাক পর্য্যন্ত ঘোমটা দিয়ে অমরকুমারীও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চোল্লেন। দুই একবার আমি মোহনবাবুর অলক্ষিতে অমরকুমারীর দিকে কটাক্ষপাত কোরেছিলেম, অমরকুমারী কিন্তু একবারও আমার পানে ফিরে চাইলেন না। আমার আশ্চর্য্য বোধ হলো। এত অল্পদিনে অমরকুমারী আমাকে ভুলে গেলেন, এককালে চিনতেই পাল্লেন না, ব্যাপারখানা কি?

    নৌকায় আমরা আরোহণ কোল্লেম, প্রাসঙ্গিক অপ্রাসঙ্গিক দুটী পাঁচটী কথার পর মোহনলালবাবু একটী বাক্স খুলে আমার হাতে খানকতক ব্যাঙ্কনোট দিলেন; বোল্লেন, “হরিদাস! আজ তুমি আমার যে উপকার কোরেছ, তার যোগ্য পুরস্কার আমি দিতে পাল্লেম না, এই নোট-কখানি গ্রহণ কর, যৎকিঞ্চিৎ নিদর্শন, আমাকে তুমি মনে রেখো, তোমার ঠিকানা লিখে নিচ্ছি, যখন কিছু অভাব হবে, চিঠি লিখে আমাকে জানিও, তৎক্ষণাৎ আমি সাহায্য কোরবো।”

    নোট-কখানি ফিরিয়ে দিবার উপক্রম কোরে, ম্লানবদনে আমি বোল্লেম, “উপকার আমি বিক্রয় করি না; অগ্নিকুণ্ডে স্ত্রীহত্যা হোচ্ছিল, আমি রক্ষা কোরেছি, সেটা আমার কর্তব্যপালন; কর্তব্যপালনের পুরস্কার আমি চাই না। আপনার নোট আপনিই রাখুন, আমার প্রয়োজন নাই।”

    একদৃষ্টে আমার মুখপানে চেয়ে, যেন একটু বিস্ময় বোধ কোরে, মোহনবাবু বোল্লেন, “না না, সে জন্য বোলছি না, উপকার-বিক্রয়ের কথা নয়। তবে কি না, তুমি ছেলেমানুষ, বিদেশে এসেছ, তীর্থস্থানে যাচ্ছ, তীর্থে অনেক প্রকার খরচপত্র আছে, টাকাগুলি সঙ্গে রাখ, সময়ে উপকারে আসবে।”

    বার বার অস্বীকার কোল্লেম, বিশেষ আগ্রহ জানিয়ে বার বার তিনি অনুরোধ কোল্লেন, আমি গ্রহণ কোরবো না, জোর কোরে তিনি গোছিয়ে দিবেনই দিবেন, দৃঢ়সঙ্কল্প, কাজেই আমারে গ্রহণ কোত্তে হলো। আবার মোহনবাবু আমাকে প্রয়াগে নিয়ে যাবার জন্য আকিঞ্চন পেলেন, অনেক রকম হেতুবাদ দিয়ে, অসম্মতি জানিয়ে, আড়ে আড়ে অমরকুমারীর দিকে চাইতে চাইতে নৌকা থেকে আমি নেমে এলেম, অনতিদূরেই আমার নিজের নৌকা নোঙ্গরকরা ছিল, সেই নৌকায় আরোহণ কোল্লেম। রাত্রি তখন নয়টা কি দশটা। রাত্রেও নৌকা চলে; দাঁড়ী-মাঝীরা নোঙ্গর তুলে ভগবানের নাম কোরে, নৌকা খুলে দিলে, গঙ্গাবক্ষে নাচতে নাচতে নৌকাখানি দ্রুতবেগে ছুটে চোল্লো।

    এটা কাশীতে পৌঁছিবার পূর্বের ঘটনা। নৌকায় বোসে বোসে আমি চিন্তা কোত্তে লাগলেম, এটা হলো কি! অমরকুমারী আমাকে চিনতে পাল্লেন না। অমরকুমারীই নিশ্চয়। সেই মুখ, সেই চক্ষু, সেই চুল, সেই বর্ণ, সেই গঠন, সব ঠিক; সাত আটমাসে আমার এতই কি দৃষ্টিভ্রম হওয়া সম্ভব? কখনই না। অমরকুমারী নিশ্চয়। মোহনবাবু বোল্লেন, অমরকুমারী নয় আর একজন; ঐ কন্যাটীকে তিনি বিবাহ কোরেছেন। বিবাহটা সম্ভব হোলেও হাতে পারে, কেন না, অমরকুমারীকে আমি অবিবাহিতা দেখে এসেছি, বিবাহ হওয়া বিচিত্র নয়; কিন্তু অমরকুমারী ভিন্ন ঐ কন্যা আর একজন, ইহা তো কোন ক্রমেই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। অবিকল একরূপ চেহারা, একরুপ ভঙ্গী, একরূপ বয়স, ইহা কিরূপে সম্ভবে? সংসারে আকার-অবয়বে এমন চমৎকার মিলন নিতান্তই বিরল। আচ্ছা, অমরকুমারী আমাকে চিনতে পাল্লেন না কেন? মোহনবাবু কাছে ছিলেন, সেই জন্যই কি গোপন করা? সেই জন্যই কি উদাসীনভাব?

    এই চিন্তার পর আর এক চিন্তা। রক্তদন্তের কথা যদি সত্য হয়, সত্য যদি রক্তদন্ত আমার মামা হয়, সত্য যদি অমরকুমারী সেই রক্তদন্তের কন্যা হন, তবে তো অমরকুমারী আমার মাতুলকন্যা। বাবু মোহনলাল সেই অমরকুমারীকে বিবাহ কোরেছেন, তাঁর নিজের মুখের পরিচয় এইরুপ; আচ্ছা, এ যোগাযোগ কি প্রকারে ঘোটলো? রক্তদন্তের সঙ্গে কি মোহনবাবুর পূর্বে জানাশোনা ছিল? তা যদি হয়, তবে বর্দ্ধমানে রক্তদন্ত যখন আমাকে ধোত্তে গিয়েছিল, সেটাও তো বেশী দিনের কথা নয়, তখন কেন মোহনবাবু সেই রক্তদন্তকে চিনতে পারেন নাই? একটা কদাকার কুব্জাঙ্গ অপরিচিত লোকের হাতে কেনই বা আমাকে তখন ছেড়ে দিয়েছিলেন? অনেক ভাবলেম, কিছুই মীমাংসায় আনতে পাল্লেম না। অন্য মীমাংসা এলো না, কিন্তু যাঁরে আমি আগুনের মুখ থেকে উদ্ধার কোরেছি, সেই বালিকাটী যে নিশ্চয়ই সেই সরলা, সুশীলা, স্নেহময়ী অমরকুমারী সে পক্ষে কিছুমাত্র সংশয় থাকলো না।

    কাশীর ঘাটে নৌকা পৌঁছিল। গঙ্গা থেকে কাশীধামের দৃশ্য অতি চমৎকার। অর্ধচন্দ্রাকার বিশ্বেশ্বরক্ষেত্র অগণিত সৌধ-মন্দিরে আলো কোরে রয়েছে। নৌকায় বোসে বোসে সেই দৃশ্য আমি দর্শন কোল্লেম, ভক্তিভাবে করপুটে কাশীপুরীকে নমস্কার কোল্লেম, উদ্দেশে কাশীশ্বর-কাশীশ্বরীকে প্রণিপাত কোল্লেম, শরীর রোমাঞ্চিত হলো।

    নৌকার জিনিসপত্ৰগুলি তীরে উত্তোলন কোরে নৌকার ভাড়া চুকিয়ে দিলেম। কোথায় তখন যাব, অন্তরে সেই ভাবনার আবির্ভাব। জনকতক পাণ্ডা এসে আমাকে ছেঁকে ধোল্লে। সকলেই বলে, আমার সঙ্গে এসো; হাত ধোরে টানাটানি। একজন উত্তরসাধক আমার দরকার, আমি একজন পাণ্ডাকেই বরণ কোল্লেম। সে একখানি গাড়ী ভাড়া কোরে আমার জিনিসগুলি একটা ঠিকানায় পৌঁছে দিবার বন্দোবস্ত কোত্তে লাগলো। আমি সেই অবসরে গঙ্গাতীরে দাঁড়িয়ে মা গঙ্গার শোভা দর্শন কোত্তে লাগলেম। গঙ্গা এখানে উত্তরবাহিনী। জোয়ার-ভাটা আছে কি না, বুঝা গেল না, কিন্তু তরঙ্গ-বেগ অত্যন্ত প্রবল; অল্পজলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অতি বলবান পুরুষেরও অসাধ্য। একদিকেই স্রোতের টান। নৌকা থেকে যখন আমি উত্তীর্ণ হোলেম, তখন প্রাতঃকাল, শত শত নরনারী মনের আনন্দে ভাগীরথী-সলিলে স্নান-আহ্নিক কোচ্ছেন, ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতেরা উচ্চকণ্ঠে ভাগীরথীর স্তবপাঠ কোচ্ছেন, ছোট ছোট বালকেরা অভ্যাসবশে সেই স্রোতে সাঁতার দিতে দিতে এক একটা চাতালের উপর লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে; চারিদিকে চক্ষু ঘুরিয়ে সেই সকল আমি দেখতে লাগলেম। সারি সারি অনেক ঘাট। সকল ঘাটেই উচ্চ উচ্চ সিঁড়ি। ঘাট যেমন অসংখ্য, সিঁড়িও তদ্রূপ অসংখ্য। সচরাচর ঘাটের সিঁড়ি যেমন ক্রমান্বয়ে ঢালুভাবে নীচে নামে, কাশীর গঙ্গার ঘাটের সিঁড়ি সে রকম নয়; উপর থেকে ঠিক নিম্নদিকে ঋজুভাবে ধাপ গাঁথা; সে সকল সিঁড়ি দিয়ে নামা-উঠা নূতনলোকের পক্ষে নিতান্তই দুঃসাধ্য; ধাপে ধাপে পা কাঁপে নীচের দিকে চাইতে ভয় হয়। স্নানের ঘাটের দুই ধারে রুলীওয়ালা পাণ্ডা। বাঁশের ছাতা মাথায় দেওয়া, নাকে তিলক কাটা, বুকে কপালে চন্দনমাখা, লম্বা লম্বা মালা গলায় দীর্ঘ দীর্ঘ পাণ্ডাদের মূর্ত্তি-দর্শনে ভক্তির উদ্রেক হয়; পাণ্ডাদের ভিতর হিন্দুস্থানীও আছে, উৎকলবাসীও আছে। উৎকলবাসীরা গঙ্গাস্নান কোরে, লম্বা চুলে খোঁপা বেঁধে, বড় বড় পান খেয়ে, গাল ভারী কোরে বোসেছে, পানের পিক গালের দু-ধারে যেন রক্তধারা গড়াচ্ছে, সে মূর্ত্তি-দর্শনে হৃদয়ে ভক্তি আনয়ন করা কিছু জোরের কাজ, অতি ভক্তি ব্যতিরেকে তাদৃশ পাণ্ডাগণকে প্রণামী দিতে ইচ্ছা হয় না। কি করা যায়, একজন পাণ্ডা আমার কপালে রুলী পরালে, তারে আমি কিঞ্চিৎ প্রণামী দিলেম, সে আমার মাথায় একটা ফল ছুইয়ে, অস্ফুট মন্ত্রোচ্চারণে আশীর্ব্বাদ কোল্লে, আমি চুপটী কোরে দাঁড়িয়ে রইলেম। সাধারণ পাণ্ডা ছাড়া কাশীতে আর দুই শ্রেণীর পাণ্ডা আছে, তাদের উপাধি যাত্রাওয়ালা আর গঙ্গাপুত্র। তারা যাত্রীগণকে তীর্থ দর্শন করায়, দর্শনী আদায় কোরে, বাসাবাড়ী ঠিক কোরে দেয়, দাসী-চাকর নিযুক্ত করবার বন্দোবস্ত করে, যাত্রীদের কাছে বকসীস পায়। একজন পাণ্ডা আমার জন্য একখানি বাসাবাড়ী ঠিক কোরে দিলে, জিনিসপত্রগুলি সেই বাড়ীতে তুলিয়ে দিলে, আর আর যা কিছু আমার প্রয়োজন, সমস্তই সেই পাণ্ডার দ্বারা সংগৃহীত হলো।

    দশাশ্বমেধঘাটে আমি স্নান কোল্লেম। স্নানের পর পাণ্ডাদের যেরুপ দস্তুর আছে, সেই রকমে আমাকে সাজিয়ে দিয়ে তীর্থদর্শনে নিয়ে চোল্লো। প্রথমেই বিশ্বেশ্বরের মন্দির : দ্বারে ঢুণ্ঢিগণেশ। অগ্রে ঢুণ্ডিগণেশকে প্রণাম কোরে বিশ্বেবরের মন্দিরে প্রবেশ কোল্লেম। মন্দিরে লিঙ্গরূপী বিশ্বেশ্বর বিরাজমান; লিঙ্গটী একটু পশ্চিমে হেলা। প্রবাদ এইরুপ যে, কালাপাহাড়ের ভয়ে আসল বিশ্বেশ্বর জ্ঞানবাপীতে ডুবে লুকিয়ে আছেন, নকল বিশ্বেশ্বর মন্দিরমধ্যে বিরাজ কোচ্ছেন। শিবলিঙ্গের মস্তকে গঙ্গাজল-বিল্বদল অর্পণ কোরে আমি সাষ্টাগে প্রণাম কোল্লেম। তার পর জ্ঞানবাপী। একটা চতুষ্কোণ কুণ্ড; কুণ্ডের জল বেলপাতায় ঢাকা; যাত্রীরা সেই জলে আতপচাল আর বিল্বপত্র নিক্ষেপ করে; পচাপাতায় কুণ্ডের জল দুর্গন্ধ। যাত্রিগণকে ভক্তিভাবে সেই জল পান কোত্তে হয়। একজন পাণ্ডা বৃহৎ একগাছা লাঠী দিয়ে বিল্বপত্র সরাচ্ছে, পাড়ের উপর তুলে ফেলছে, ষাঁড়েরা মনের আহ্লাদে সেই সকল বিল্বপত্র ভক্ষণ কোচ্ছে। আমি জ্ঞানবাপীর জল এক গণ্ডূষে পান কোরে মাথায় হাত মুছলেম, অন্তরে ভক্তি না এলেও বাহ্যভক্তিভাবে করযোড়ে বাপীকে নমস্কার কোল্লেম।

    তার পর অন্নপূর্ণার মন্দির। পাণ্ডা আমাকে সেই মন্দিরে নিয়ে গেল। অসম্ভব লোকের ভিড়। “হর হর বিশ্বেশ্বর! জয় মা অন্নপূর্ণা!” এককালে বহু রসনায় ইত্যাকার ধ্বনিতে মন্দির প্রতিধ্বনিত। মানুষের ভিড়ের সঙ্গে বহুসংখ্যক ষাঁড়ের ভিড়; দীর্ঘ দীর্ঘ শৃঙ্গবিশিষ্ট স্থূলাঙ্গ প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ষাঁড়, দেখলেই ভয় হয়, ষাঁড়েরা কিন্তু কাহাকেও কিছু বলে না। পাণ্ডার সঙ্গে আমি মন্দিরে প্রবেশ কোরে অন্নপূর্ণা দর্শন কোল্লেম। দুই প্রকার প্রণামী; আসলমূর্ত্তি যারা দর্শন কোত্তে যায়, পুজকেরা দরজা বন্ধ কোরে স্বতন্ত্র প্রণামী নিয়ে সেই মুক্তি দেখায়। শুনেছিলেম, অন্নপূর্ণা স্বর্ণ-প্রতিমা, বাস্তবিক তা নয়, পাথরের প্রতিমা, এক হস্তে থালি, এক হস্তে হাতা; সম্মূখে করযোড়ে সদাশিব। মুখটী অতি সুন্দর, দর্শনমাত্র ভক্তির উদয় হয়; মূর্ত্তি দর্শন কোরে রোমাঞ্চিতকলেবরে ভক্তিভাবে সাষ্টাঙ্গে আমি প্রণিপাত কোল্লেম।

    মন্দির-দুটী সুনিপুণ স্থপতি-হস্তে বিনির্ম্মিত। বিশ্বেশ্বরের মন্দিরটীর অর্দ্ধাংশ স্বর্ণময়। পাণ্ডার মুখে শুনলেম, পঞ্জাবের মহারাজ রণজিৎ সিংহ ঐ মন্দিরটী আদ্যোপান্ত স্বর্ণমণ্ডিত করবার ইচ্ছা কোরেছিলেন, অর্ধাংশ মণ্ডিত হবার পর মহারাজ রণজিৎ পরলোকযাত্রা করেন, সুতরাং তদবধি ঐরূপ অর্দ্ধসমাপ্ত অবস্থাতেই রয়ে গিয়েছে। অন্নপূর্ণার মন্দিরের তিন রকম রং : কতক শ্বেতবর্ণ, কতক রক্তবর্ণ, কতক কৃষ্ণবর্ণ। শোভা রমণীয়।

    পূৰ্ব্বে এমন শুনা ছিল, কাশীপরী স্বর্ণময়ী পঞ্চক্রোশী। এটী কিন্তু কবি-কল্পনা। কাশীপুরী স্বর্ণপুরী নহে, প্রস্তরপরী; এখানকার সমস্ত গৃহই প্রস্তরনির্মিত। মন্দিরদর্শন কোরে বেরিয়ে আমি চতুর্দ্দিকেই শিবলিঙ্গ দর্শন কোত্তে লাগলেম। কোথাও মন্দিরের ভিতর প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গ, কোথাও প্রাচীরের ধারে অনাবৃত স্থানে বিল্বপত্রে ঢাকা শিবলিঙ্গ, কোথাও বা এক জায়গায় রাশীকৃত শিবলিঙ্গ। এত শিব কোথাও নাই; গণনা কোরে সংখ্যা করা যায় না; সকল শিবের পূজাও হয় না। শিবলিঙ্গ ব্যতিরেকে স্থানে স্থানে আরও অনেক দেব-দেবীর প্রতিমূর্তি আছে, একে একে সেগুলিও আমি দর্শন কোল্লেম। বেলা দুই প্রহরের পূর্বে পাণ্ডা আমারে নির্দ্দিষ্ট বাসাবাড়ীতে নিয়ে গেল, যথাসময়ে একজন ব্রাহ্মণ অন্নপূর্ণার ভোগের প্রসাদ আমার বাসায় এনে দিলেন, ব্রাহ্মণকে যথাসম্ভব অর্থ দান কোরে আমি প্রসাদ পেলেম। সে দিন আর কোথাও বেরুলেম না; সন্ধ্যার পর অন্নপূর্ণা-বিশ্বেশ্বরের আরতি দেখে অন্তঃকরণ পুলকিত হলো।

    বাঙ্গালীটোলায় আমার বাসা হয়েছে। যখন আমি গিয়েছিলেম, তখন কাশীতে অনেক বাঙ্গালীর বাস হয়েছে; বাঙ্গালীটোলা প্রায় বাঙ্গালীতেই পরিপূর্ণ; দোতালা, তেতালা, চৌতালা, অনেক বাড়ী; একতালা বাড়ী প্রায়ই দেখা গেল না : সকল বাড়ীই পাথরে গাঁথা; গায়ে গায়ে বাড়ী; কলিকাতা সহরে অসংখ্য বাড়ী আমি দেখেছি, তুলনায় বোধ হয়, সেখানকার অপেক্ষাও কাশীর বাড়ীগুলি বেশী গিঞ্জি গিঞ্জি। কাশীধামের—বিশেষতঃ বাঙ্গালীটোলার রাস্তাগুলি অতি সঙ্কীর্ণ; গঙ্গাতীরের রাস্তা ব্যতীত অন্য কোন গলীতে প্রায়ই গাড়ী যায় না; অতি কষ্টে পাল্কী যায়, এক একটা গলীতে পাল্কীও যেতে পারে না। এত সঙ্কীর্ণ যে, দুইজন মানুষ পাশাপাশি চোলে যেতেও কষ্ট হয়; অন্যদিক থেকে একটা ষাঁড় চোলে এলে সে গলীর গন্তব্য পথ বন্ধ হয়ে যায়। এই কারণেই বাঙ্গালীটোলা সৰ্ব্বদা অপরিষ্কার দেখায়। আমি শীতকালে গিয়েছিলেম, গলী-রাস্তাগুলি তত দুর্গম বোধ হলো না, কিন্তু লোকের মুখে শুনলেম, বর্ষাকালে অত্যন্ত কাদা হয়, অনেক লোক গলীতে গলীতে আছাড় খেয়ে কর্দ্দমাক্ত-শরীরে ঘরে ফিরে আসে।

    আমার বাসাটী মন্দ হয় নাই। দোতালা বাড়ী, উপর-নীচে অনেকগুলি ঘর, দু-দিকে দুটী সিঁড়ি; উপরের ঘরগুলি দিব্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। সকল ঘরেই লোক আছে; আমার জন্য দুটী ঘর নির্দ্দিষ্ট ছিল;—একটী ঘরে শয়ন, একটী ঘরে রন্ধন। বেশ আরামেই ছিলেম। অন্যান্য ঘরে যারা যারা ছিল, তাদের দু-একজনের সঙ্গে সেইখানে আমার আলাপ হয়, তারাও বাঙ্গালী, কিন্তু বহুদিন পশ্চিমে থাকাতে তারা হিন্দীকথা বেশ শিখেছিল, অবকাশকালে আমিও তাদের কাছে হিন্দীভাষা শিক্ষা কোত্তে আরম্ভ কোল্লেম।

    একমাস আমার কাশীবাস হলো। কাশীর মহিমা বিচিত্র। এখানে ভাল মন্দ উভয় শ্রেণীর লোক আছে। ভক্তিযোগে তীর্থবাসী, তেমন লোক অতি কম, নানা লোক নানা ব্যপদেশে কাশীবাস কোচ্ছে; নূতন-পরিচিত লোকগুলির নিকটে যে রকম শুনলেম, তাতে আমার কতক কতক আতঙ্কও হলো, কতক কতক ঘৃণাও জন্মিল।

    গৃহস্থলোক ছাড়া উদাসীনলোকের ভক্তি বেশী, এই কথাই লোকে বলে; কিন্তু একমাস কাশীবাস কোরে যত দূর আমি জানলেম, তাতে কোরে সেই সাধারণ উক্তির সার্থকতা আমি স্বীকার কোত্তে পাল্লেম না। দণ্ডী, সন্ন্যাসী, ভৈরবী, ভৈরব, পাণ্ডা প্রভৃতি তীর্থবাসী লোকেরা বাহিরে যে প্রকার ভাব দেখায়, অন্তরের ভাব সে ভাবের সঙ্গে মিলে না, বিপরীতভাবের সুক্ষ্ম পরিচয় বিলক্ষণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। রক্তবস্ত্রের পাগড়ী বাঁধা, রক্তবস্ত্র ঢাকা, বাঁশের কঞ্চীর দণ্ড হাতে যে সকল লোক ধ্যানযোগে চক্ষু বুঁজে বিশ্বেশ্বরের মন্দিরে, অন্নপূর্ণার মন্দিরে ধারে ধারে বসে থাকে, এক একবার “বোম কেদার, বোম বিশ্বেশ্বর!” বোলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে উঠে, পূণ্যসঞ্চয় করবার জন্য যাত্রীলোকেরা নিমন্ত্রণ কোরে, ভক্তিভাবে যাদের ভোজন কোরিয়ে দক্ষিণা দেন, সেই সকল লোকের তীর্থোপাধি দণ্ডী। বিশেষ বিশেষ প্রমাণে আমি জানতে পেরেছি, সেই সকল দণ্ডীর ভিতর দুজন পাঁচজন ছদ্মবেশী গুণ্ডা থাকে। কাশীর গুণ্ডা সৰ্ব্বত্র বিখ্যাত, গুণ্ডার হাতে অসাবধান নূতন যাত্রিদের প্রাণ পর্য্যন্ত সঙ্কটাপন্ন হয়। টাকার লোভে ডাকাতেরা মানুষ মারে, কিন্তু আমি শুনলেম, কাশীর গণ্ডারা একখানি লাল গামছার লোভও সংবরণ কোত্তে পারে না; ‘মারি তো হাতী লুটি তো ভাণ্ডার,’ এই উপদেশ গুণ্ডাদের কাছে অমান্য, অগ্রাহ্য। পথিক যাত্রীলোকের কাছে ধন-দৌলত আছে কি নাই, গুণ্ডারা সেটা আদৌ বিবেচনা করে না, তাগে বাগে পতনে পেলেই রুল কসায়! কেবল মানুষ মারা আর মানুষের অর্থ অপহরণ করা গুণ্ডাদের কার্য্য নয়; দুরন্তলোকেরা বৈরনির্য্যাতনের বাসনায় সঙ্গোপনে গণ্ডা ভাড়া করে, গুণ্ডারা সেই অর্থলোভে নির্দোষ নিরীহ লোকের সৰ্ব্বনাশ কোরে থাকে; জাতিকুল পর্য্যন্ত স্বচ্ছন্দে নষ্ট করে!

    অনেক আমি দেখলেম; ভক্ত দেখলেম, দণ্ডী দেখলেম, সন্ন্যাসী দেখলেম, ভৈরবী দেখলেম, কুমারী দেখলেম, ভেকধারী শৈব দেখলেম, গৃহস্থ দেখলেম, তীর্থবাসী দেখলেম, নুতন নুতন যাত্রীও দেখলেম, কিছুই দেখতে বাকী রাখলেম না। পাণ্ডারা তো যাত্রীলোকের নিত্য-সহচর, পাণ্ডা দেখবার জন্য চেষ্টা কোত্তে হয় না, সময় খুঁজতে হয় না, সৰ্ব্বসময়েই পাণ্ডাদের গতিক্রিয়া বিলক্ষণ দেখা যায়। সমস্তই আমি দেখলেম। দিন দিন নূতন নূতন কাণ্ড দেখে, নূতন নূতন গল্প শুনে, শান্তির পরিবর্তে ক্রমশই আমার ঘৃণা ও শঙ্কার মাত্রা বেড়ে বেড়ে উঠলো।

    আরও একমাস। এই দুই মাসে এই পূণ্যক্ষেত্রের গূহ্যরহস্য আমি অনেক জানতে পাল্লেম। যে সকল বিদেশী লোক মুক্তিকামনায় কাশীধামে চিরদিন বাস করবার সঙ্কল্প কোরে কাশীবাসী হয়ে আছেন, কাশীতে জীবনান্ত হোলে মোক্ষ হয়, মোক্ষদাতা মহাদেব স্বয়ং মুমূর্ষুর কর্ণমূলে তারকব্রহ্মনাম শুনিয়ে দেন, মৃতজীব শিবত্ব প্রাপ্ত হয়; জীবের দক্ষিণকর্ণে মহেশ্বর তারকব্রহ্মমন্ত্র দেন, এই জন্য যাঁরা যাঁরা কাশীতে মরেন, বিশ্বেশ্বরের কৃপায় মরণকালে তাদের দক্ষিণকর্ণটী উপরদিকে থাকে; কেবল মানুষের নয়, গো, অশ্ব, কুকুর, বিড়াল, গর্দভ ইত্যাদি সমস্ত জীবজন্তুরও ঐ রকম। মরণের স্থানাস্থানও বিচার নাই, অস্তাকুড়ে মৃত্যু হোলেও শিবত্বপ্রাপ্তি নিঃসন্দেহ; এই বিশ্বাসে অনেক লোক কাশীবাসী, তন্মধ্যে বঙ্গবাসীর সংখ্যা কিছু অধিক।

    বাসাবাড়ীতে আমি থাকি; বাসার লোকের রীতিচর্য্যা যত দূর পারি, আলোচনা করি, একজনেরও চরিত্রের প্রতি শ্রদ্ধা জন্মে না। যাঁরা যাঁরা পুত্রপরিবার নিয়ে গৃহবাসী হয়ে আছেন, তাঁদের ব্যবহার বাস্তবিক কিরূপ, সেটা আমি ঠিক জানতে পারি না। কত দিন আমি কাশীতে থাকবো, সেটাও নিশ্চয় কোরে বোলতে পারি না। গৃহস্থ-ব্যবহার অবগত হবার নিমিত্ত বড়ই ইচ্ছা হলো; কি প্রকারে কৃতকার্য্য হওয়া যায় তারই উপায়, তারই সুবিধা অন্বেষণ কোত্তে লাগলেম; ঘরে বোসে সে কার্য্য সিদ্ধ হয় না, প্রত্যহ পল্লীতে পল্লীতে পরিভ্রমণ কোত্তে আরম্ভ কোল্লেম।

    এখানকার দোকানদারেরা সকলেই খোট্টা, বাঙ্গালী দোকানদার প্রায় একজনও দেখলেম না। খোট্টামহলে বড় বড় গদিয়ান মহাজনও আছে, তারা নানা রকম বড় বড় কারবার করে, কারবারে তাদের বিলক্ষণ লাভও হয়। এক এক দিন আমি এক একজন মহাজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ কোরে কারবারের কথা তুলেছিলেম, চাকরীতে আমার প্রবৃত্তি ছিল না, কারবার করবার ইচ্ছা ছিল, সেই জন্য কারবারী লোকের কাছে কারবারের কথা তুলেছিলেম। কত টাকা আমার আছে, একজন মহাজন সেই কথা আমাকে জিজ্ঞাসা কোরেছিলেন, যা আমার সম্বল, সেই কথা আমি বোলেছিলেম, শুনে তিনি হো হো শব্দে হাস্য কোরেছিলেন।

    পূর্ব্বে আমি বোলতে ভুলেছি, নৌকাতে মোহনলালবাবু আমাকে যে কখানি নোট দিয়েছিলেন, সে সময় গণনা করা হয় নাই, তার পর গণনা কোরে দেখি, দশখানি; প্রত্যেক নোট ১০০৲ টাকা, দশখানিতে হাজার টাকা। বীরভূমের নরহরিবাবু দিয়েছিলেন ৫০০৲ টাকা, এই হলো দেড় হাজার; তা ছাড়া কলিকাতায় প্রতাপবাবুর বাড়ীতে সাতমাসে জলপানী পেয়েছিলেম ৩৫৲ টাকা, বকসীস পেয়েছিলেম, ৬৫৲ টাকা। এই ষোল-শ টাকার মধ্যে নৌকাভাড়া আর খোরাকী ইত্যাদিতে ৫০৲ টাকা খরচ হয়েছিল, বাকী টাকায় বড় কারবার চলতে পারে না, মহাজনের মুখে শুনে দিনকতক আমি হতাশ হয়েছিলেম। তার পর যে ঘটনা হয়, একটু পরেই প্রকাশ পাবে। এখন নগরভ্রমণের কিঞ্চিৎ ফলাফল প্রকাশ করি।

    বাঙ্গালীটোলার প্রায় একক্রোশ দূরে সিক্রোল। সিক্রোলে ইংরেজলোক বাস করেন। কাশীর আদালতগুলি সিক্রোলে অবস্থিত। সেখানকার রাস্তাঘাট প্রশস্ত, দিব্য পরিষ্কার। বাঙ্গালীরা সাহেবলোককে ম্লেচ্ছ বলেন, কিন্তু সাহেবলোকের বাসস্থানগুলি, সাহেবপল্লীর রাস্তাগুলি নিরপেক্ষচক্ষে দর্শন কোল্লে বাঙ্গালীকেই সে অংশে বরং ম্লেচ্ছ বোলে মেনে নিতে হয়। ইংরেজটোলা দেখলেম, ময়দান দেখলেম, উদ্যান দেখলেম, আদালত দেখলেম, অন্তরে আনন্দোদয় হলো। একদিন দেখলেম বরুণা-অসিসঙ্গম। এই দুটী নদী ভাগীরথীর শাখা; এই দুই নদীর নামেই কাশীর দ্বিতীয় নাম বারাণসী।

    একদিন দুর্গাবাড়ী দর্শন কোল্লেম। দুর্গাবাড়ীতে দশভুজা দুর্গামূর্ত্তি প্রতিটি নিত্য পূজা হয়, বলিদান হয়, ভোগ হয়, অনেক লোক প্রসাদ পায়। অন্নপূর্ণা-বিশ্বেশ্বরের সন্নিধানে যেমন ষাঁড় অনেক, দুর্গাবাড়ীতে সেইরূপ বানর অনেক। যাত্রীরা দুর্গাবাড়ীতে প্রবেশ করবার সময় সেই সকল বানরকে দুটী দুটী ছোলা দেয়, বানরেরা তুষ্ট থাকে, যাত্রিগুলিকে কিছু বলে না; যারা কিছু খাদ্যসামগ্রী না দেয়, তাদের আঁচড়ায়, কামড়ায়, কাপড় ছিড়ে দেয়, উৎপাত করে। দুর্গাবাড়ীতেও অনেক প্রকার দেবদেবীর প্রতিমূর্ত্তি প্রতিষ্ঠিত আছে। কাশীর বাঙ্গালীটোলায় যাঁরা ছাগমাংসভক্ষণে ইচ্ছা করেন, তাঁরা দুর্গাবাড়ী থেকেই প্রসাদী মাংস আনিয়ে থাকেন।

  • সপ্তদশ কল্প : লালা বুকচাঁদ

    সপ্তদশ কল্প : লালা বুকচাঁদ

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    সপ্তদশ কল্প : লালা বুকচাঁদ

    দুর্গাবাড়ী-দর্শনের সাতদিন পরে আপনার বাসাঘরে আমি একাকী বোসে আছি, বেলা অপরাহ্ণ এমন সময় সেইখানে একটী লোক এলেন। দিব্য গৌরবর্ণ, বেশ মোটাসোটা, গায়ে চাপকান, চড়ীদার পায়জামা, কাণে বীরবৌলী, কপালে রক্তচন্দনের দীর্ঘ ফোঁটা, দিব্য কেয়ারীকরা গোঁফ, কাণের দুপাশে ছোট ছোট গালপাট্টা, মাথায় সবুজবৰ্ণ পাগড়ী, বয়স অনুমান ৪০/৪৫ বৎসর। লোকটী এসেই আমারে হিন্দীভাষায় জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “সিদ্ধেশ্বর বাবু, কাঁহা?”—আমিও তখন অল্প অল্প হিন্দী শিখেছিলেম, হিন্দীতেই উত্তর কোল্লেম, “আদালতে একটা মামলা আছে, সিক্রোলে গিয়েছেন, ফিরে আসতে সন্ধ্যা হবে; সন্ধ্যার আগেও আসতে পারেন।”

    আমার কথা শুনে সিদ্ধেশ্বরবাবুর অপেক্ষায় সেই লোকটী আমার ঘরে আমার কাছেই বোসলেন। কে আমি, কোথা থেকে এসেছি, কতদিন কাশীতে আছি, কাজকর্ম্ম কি করি, লোকটী আমাকে এই সব কথা জিজ্ঞাসা কোত্তে লাগলেন। যেমন যেমন প্রশ্ন, সংক্ষেপে সংক্ষেপে আমি সেই ভাবেই উত্তর দিলেম। কাজকর্ম্ম কিছুই করি না, এই কথা শুনে গম্ভীরভাব ধারণ কোরে লোকটী বোল্লেন, “নিষ্কর্ম্মা বোসে আছ? কাজকর্ম্ম কিছুই নয়? এ কেয়া তাজ্জব কী বাত!”

    একটু চুপ কোরে থেকে আমি আবার বোল্লম, “কাজকর্ম্ম কোথাও মিলছে না, নূতন এসেছি, সকলের সঙ্গে জানাশুনা হয় নাই, কোথায় কাজকৰ্ম্ম পাওয়া যায়, তাও ঠিক জানি না, কাজে কাজেই নিষ্কর্ম্মা থাকতে হয়েছে।”

    লোকটী আপশোষে করতালি দিয়ে বোল্লেন, “হায় হায় হায়! বাঙ্গালী কেবল চাকরী চাকরী কোরেই হায়রাণ হয়! চাকরী না পেলেই হাত-পা গুটিয়ে জড়ভরত হয়ে বোসে থাকে! এই জন্যই বাঙ্গালীর কপালে ভাল হয় না। কারবারে বাঙ্গালীর মতি নাই, উৎসাহ নাই, সাহস নাই, সেই জন্যই বাঙ্গালী কষ্ট পায়।”

    লোকটীর কথায় আমি বড় লজ্জা পেলেম; লজ্জার সঙ্গে একটু উৎসাহও অন্তরে অন্তরে উদয় হলো। যে লোকের সঙ্গে কথা, সে লোক অবশ্যই বাণিজ্যপ্রিয়, বাণিজ্যে লিপ্ত, লক্ষণেও বুঝলেম, কথার ভাবেও বুঝলেম। কারবারে আমারও বিশেষ অনুরাগ, নিরাশ্রয়, নিঃসম্বল, নিঃসহায়, সেই জন্যই সুবিধা ঘটে না। তখন আমার হাতে কিছু টাকা ছিল, উৎসাহে উৎসাহে নম্রস্বরে লোকটীকে আমি বোল্লেম, ‘আমি বাঙ্গালী, আমার সহায়-সম্পদ কিছুই নাই, জানাশুনা আপনার লোক কেহই নাই, তীর্থদর্শনের অভিলাষে কাশীধামে আমার আসা; দাসত্বের প্রতি আমার ঘৃণা আছে; কিন্তু অর্থাভাবে আর পৃষ্ঠপোষক সহায়ের অভাবে কোন কারবারে প্রবৃত্ত হোতে পারি না। কোন সদাশয় ব্যবসায়ী ভদ্রলোক যদি আমার প্রতি দয়া করেন, তা হোলে আমি—”

    আমার সকল কথা না শুনেই, একটু মুখ ভারী কোরে, লোকটী একটু থেমে থেমে বোল্লেন, “তাই তো! গোড়ায় কিছু টাকা না থাকলে, কোন কারবারেই সুবিধা ঘটে না, শুন্যভাগী থাকলে এক রকম চোলতে পারে বটে, কিন্তু সে কাজে পরিশ্রম বেশী, দায়িত্বও বেশী; তুমি বালক, ততটা ভারবহন কোত্তে পারবে না। কোন রকমে কিছু টাকা যদি যোগাড় কোতে পার, তা হোলে এক প্রকার উপায় হোতে পারে। আমি কারবারী লোক, কাশী, প্রয়াগ, পঞ্জাব এবং কলিকাতায় আমার নানা রকম কারবার চলে; আমি তোমাকে একজন অংশী কোরে নিতে পারি। এখানে আজ আমি যাঁর তত্ত্বে এসেছি, সেই সিদ্ধেশ্বরবাবু সম্প্রতি আমার একজন অংশী হয়েছেন, মাসে মাসে তাঁর বিলক্ষণ দশ টাকা আয় হোচ্ছে; তুমি যদি সেই রকমে আমার অংশী হোতে পার, তা হোলে তোমারও অল্পশ্রমে অধিক আয় হোতে পারে, সুখে-স্বচ্ছন্দে দিনগুজরাণের সুবিধা হয়।”

    একটু পূর্ব্বেই অন্তরে উৎসাহের উদয় হয়েছিল, আরও উৎসাহ পেলেম; আগ্রহে আগ্রহে লোকটীকে আমি বোল্লেম, “কিছু টাকা আমার কাছে আছে, তাতে যদি আপনার অভিপ্রায়মত কার্য্য চলে, তা হোলে—”

    এবারেও লোকটী ধৈর্য্য রাখতে পাল্লেন না, আমার অসমাপ্ত বাক্যে বাধা দিয়ে তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কত টাকা?”—আমি উত্তর কোল্লেম, “দেড় হাজার।”

    যেন তাচ্ছল্যভাবে একটু মুচকে হেসে লোকটী বোল্লেন, “ছেলেবুদ্ধিতে ছেলেখেলার কথাই আগে যোগায় : দেড় হাজার টাকাতে কি বড় কারবারের অংশী হওয়া যায়? আচ্ছা, বালক তুমি, তোমার কথা শুনে তোমার উপর আমার স্নেহ হোচ্ছে, সেই দেড় হাজার টাকাতেই আপাততঃ আমি তোমাকে কারবারে নামাব; আগামী শুক্রবার বেলা দশটার পর টাকাগুলি নিয়ে আমার কুঠীবাড়ীতে আমার সঙ্গে তুমি সাক্ষাৎ কোরো। সিদ্ধেশ্বরবাবু আমার কুঠীর ঠিকানা জানেন, তাঁকেও আমি বোলে যাব, তিনি তোমাকে সঙ্গে কোরে নিয়ে যাবেন।”

    এই সব কথা হোচ্ছে, সিদ্ধেশ্বরবাবু এলেন; মহাজনকে আমার ঘরে দেখে অগ্রে আমার ঘরেই প্রবেশ কোল্লেন। “রাম রাম” নমস্কার বিনিময়ের পর উভয়ে একসঙ্গে পাশের ঘরে চোলে গেলেন; আমার সাক্ষাতে তাঁদের তখন কিছু কথাবার্ত্তা হলো না।

    আমি একাকী হোলেম। একাকী হোলেই চিন্তার অবসর ভাল পাওয়া যায়, চিন্তা আমার নিত্য-সহচরী, চিন্তাকে আহ্বান কোল্লেম। চিন্তার সঙ্গেই আমার কথোপকথন। এক বাসায় থাকা, সিদ্ধেশ্বরবাবুর সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল। সিদ্ধেশ্বরবাবু বঙ্গদেশের পূৰ্ব্ব অঞ্চলের লোক, জাতিতে বঙ্গজ কায়স্থ, বয়স অনুমান ৩৫/৩৬ বৎসর; বেশ মিষ্টভাষী, সদালাপী, ব্যবহারে বোধ হয়, উদারপ্রকৃতি; চেহারাও বাবুর মত, পরিচ্ছদগুলিও বাবুর মত, খরচপত্রও বাবুর মত। এক একদিন তিনি আমাকে নিমন্ত্রণ করেন, আমিও মাঝে মাঝে তাঁদের নিমন্ত্রণ করি, অল্পদিনে দুজনে বেশ সদ্ভাব হয়েছিল। তিনি যদি মধ্যবর্ত্তী হয়ে ঐ মহাজনের সঙ্গে আমার মিশ খাইয়ে দেন, তা হোলে ভালই হবে, এইরুপ আশা জন্মিল।

    আধঘণ্টা পরে সেই হিন্দুস্থানী মহাজনটী সিদ্ধেশ্বরবাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, মুখখানি বেশ প্রফুল্ল প্রফুল্ল দেখলেম, আমার ঘরের চৌকাঠের বাহিরে দাঁড়িয়ে প্রসন্নবদনে বল্লেন, “ঠিকঠাক হয়ে গেল; বাবুকে আমি সব কথা বোলে গেলেম; যেয়ো, মনে রেখো শুক্রবার।”

    আমি নমস্কার কোল্লেম, তিনি একবার আপনার কপালের কাছে অঙ্গুলি তুলে চঞ্চলচরণে চোলে গেলেন। আমি উৎকণ্ঠিত হোলেম; কতক্ষণে কাজের কথা শুনবো, সেই উৎকণ্ঠায় ঘরের ভিতর পাইচারী কোত্তে লাগলেম। সিদ্ধেশ্বরবাবু আমার ঘরে আসবেন, সেই সব কথা বোলবেন, অপেক্ষা কোত্তে না পেরে আমি নিজেই তাঁর ঘরে চোলে গেলেম। আমারে দেখেই একটু হেসে মিহি আওয়াজে তিনি বোল্লেন, “কি হরিদাস! কারবার কোরবে? মহাজন হবে?—আচ্ছা, আচ্ছা, বহুৎ আচ্ছা! এই বয়সে তোমার এমন সৎপ্রবৃত্তি হয়েছে, শুনে আমি খুসী হোলেম। শুক্রবার আমি তোমাকে কুঠীতে নিয়ে যাব, যা যা কোত্তে হয়, বন্দোবস্ত কোরে দিব; লোকটী খুব ভাল, তার কারবারে আমিও একজন অংশী, আমাদের সঙ্গে যোগ দিলে তোমার ভালই হবে। মহাজন একটু ‘কিন্তু’ রেখে গিয়েছেন; কম টাকা তোমার, আপাততঃ বেশী লাভ পাবে না। তা হোক, ক্রমশই সুবিধা হয়ে আসবে। মহাপুরুষেরা বলেন, শনৈঃ পৰ্ব্বতলঙ্ঘনম্।”

    যে কথায় যে উত্তর দিতে হয়, সেইভাবে সকল কথার আমি উত্তর কোল্লেম; কথাপ্রসঙ্গে আরও পাঁচরকম কথা এসে পোড়লো, কথায় কথায় জানলেম, সেই মহাজনটীর নাম লালা বুলকচাঁদ।

    রাত্রি ছয় দণ্ডের সময় আমি আপনার ঘরে এলেম, আহারাদি কোরে যথাসময়ে শয়ন কোল্লেম, শীঘ্র নিদ্রা এলো না। ভাবনার সঙ্গে নিদ্রার বড় বিরোধ। সুভাবনাতেও শীঘ্র নিদ্রা আসে না, কুভাবনাতেও আসে না। দুর্ভাবনা আমি অনেক ভেবেছি, ভাবনার আগুনে চিত্ত আমার অহরহঃ পুড়ে পুড়ে গিয়েছে, আজ রাত্রের ভাবনাটী কিছু শুভ। বিদ্যাশিক্ষার অগ্রে এদেশের শিশুদের যেমন হাতে-খড়ি হয়, আমারও সেইরূপ কারবারে হাতেখড়ি; বাণিজ্য-লক্ষ্মীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে; অল্প টাকায় একটা বড় কারবারের অংশী হব; কাশীর একজন বড় মহাজনকে বন্ধু পাব; হৃদয়ে পরমানন্দ। সংসারে থাকতে গেলে টাকার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে হয়;—চিরদিন আমি গরিব, টাকার মুখ আমি কখনো দেখি নাই; আমার হাতে এখন দেড় হাজার টাকা। বড়লোকের হস্তে দানপ্রাপ্তি। দাতা হেলেন নরহরিবাবু আর মোহনলালবাবু। মনে মনে তাঁদের উভয়কে নমস্কার কোরে আপনাকে আপনি কৃতার্থ বোধ কোল্লেম। এই ভাবে থাকতে থাকতে নিদ্রা এলো, আমি ঘুমালেম। অনেক দিনের পর কাশীধামে এই রাত্রে আমার সুখের নিদ্রা। আজ আমার প্রতি নিদ্রাদেবীর বড়ই অনুগ্রহ।

    সুখের রজনী সুপ্রভাত। কাশীর প্রভাত আনন্দময়। ভক্তের মুখে ঘন ঘন অন্নপূর্ণা-বিশ্বেশ্বরের নাম, গঙ্গাস্নানের যাত্রীর মুখে গঙ্গাদেবীর স্তব, দণ্ডী-সন্ন্যাসীর মুখে বম বম বববম শ্রীমধুরধনি, ভক্তমাত্রেই পূজার আয়োজন ভক্তিমান। আমিও গঙ্গাস্নান কোল্লেম, আমিও দেবদেবী দর্শন কোল্লেম, আমিও জয় বিশ্বেশ্বর জয় অন্নপূর্ণা গান কোল্লেম; হৃদয়ে ভক্তি-সিন্ধু উথলিল। আমার ভক্তিদর্শনে আকাশে সূর্য্যদেব মৃদু মৃদু হাস্য কোল্লেন। শীতকালে সূর্যের হাস্য মৃদু হয়, বিশেষতঃ প্রভাতে; অতএব আমি সূৰ্য্যমণ্ডলে মৃদুহাস্য দর্শন কোল্লেম।

    আজ মঙ্গলবার। তিন দিন পরে বুলকচাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার দিনস্থির। বঙ্গদেশে শারদীয়া মহামায়ার আগমনে ভক্তজনের তিনটী দিন যেমন শীঘ্র শীঘ্র চোলে যায়, আমারও এই তিনটী দিন—মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, এই তিনটী দিন সেইরুপ শীঘ্র শীঘ্ন চোলে গেল। শুক্রবারের প্রভাত। সকাল সকাল স্নান-আহার সমাপন কোরে, সঞ্চিত ব্যাঙ্কনোটগুলি সঙ্গে নিয়ে একখানি এক্কাগাড়ী ভাড়া কোরে, সিদ্ধেশ্বরবাবুর সঙ্গে আমি বুলকচাঁদের কুঠীতে উপস্থিত হোলেম। মস্ত একখানা বাড়ী। লোকজন অনেক যাওয়া আসা কোচ্ছে, অনেক লোকের মুখে অনেক রকম কথা, সমস্ত লোক হিন্দুস্থানী, একখানি বাঙ্গালীর মুখও দেখতে পেলেম না। নীচের তালায় ছোট একটী ঘরে আমারে বোসিয়ে, সম্মুখে হস্তবিস্তার কোরে সিদ্ধেশ্বরবাবু বোল্লেন, “কৈ তোমার টাকা? দাও, টাকাগুলি আমার হাতে দাও, খাতায় জমা দিয়ে একটু পরেই রসীদ এনে দিচ্ছি। কোথাও তুমি যেয়ো না, কাকেও কিছু, বোলো না, চুপ কোরে বোসে থাকো, কেহ যদি জিজ্ঞাসা করে, আমার নাম কোরো না; শীঘ্রই আমি ফিরে আসছি।”

    বাবুর হস্তে ১৫ খানি নোট সমর্পণ কোরে, উপদেশমত চুপটী কোরে, সেই ঘরে আমি বোসে থাকলেম। বাবু অন্যদিকে চোলে গেলেন। যে ঘরে আমি বোসলেম, সে ঘরে তখন একটীমাত্র লোক ছিল, দেখতে দেখতে আরও পাঁচ সাতজন এসে সেইখানে গোলমাল কোত্তে লাগলো। সকলেই হিন্দুস্থানী; প্রায় সকলেই চাপকানপরা, পাগড়ী বাঁধা, দুই একজনের খালি গা। তাদের কথাবার্ত্তা শুনে লক্ষণটা বড় ভাল বোধ হলো না। তিন চারিজন ভুড়িওয়ালা লোক সেইখানে বোসে বাসে গাঁজা সেজে খেলে, রকমারিস্বরে উচ্চ উচ্চ আওয়াজে গান ধোল্লে, এক একবার বম মহেশ্বর বোলে হেসে উঠলো। আমি অবাক! প্রায় এক ঘণ্টা বোসে আছি, সিদ্ধেশ্বরবাবু ফেরেন না, দেড়ঘণ্টা হয়, তখনো আসেন না; দশটার সময় এসেছিলেম, দু-ঘণ্টা অতীত হলো, বারোটা বেজে গেল, তখনো পর্য্যন্ত দেখা নাই! বড়ই অস্থির হোলেম। একবার ভাবলেম, উঠে গিয়ে তত্ত্ব নিয়ে আসি, আবার ভাবলেম, উঠে যেতে বারণ, বিশেষতঃ কোন দিকের কোন ঘরে তাঁরা আছেন, উপরে কি নীচে, তাও ঠিক জানি না, কোথায় গিয়ে অন্বেষণ কোরবো, খুঁজেই হয় তো পাব না; এই সব আলোচনা কোরে সেখান থেকে উঠলেম না, সমভাবেই বোসে থাকলেম। মন কিন্তু ক্রমশই চঞ্চল।

    নীরবে একধারে আমি বেসে আছি, লোকেরা হয় তো এতক্ষণ আমাকে দেখতে পায় নাই, আপনাদের আমোদেই—আপনাদের কথাতেই আপনারা মত্ত ছিল, দেখেও হয় তো দেখে নাই, এই সময় হঠাৎ একজন ভুড়িওয়ালা লোক আমার দিকে এগিয়ে এসে, কটমটচক্ষে চেয়ে, গর্জ্জন কোরে বোল্লে, “তুই ছোঁড়া কে রে? এখানে বোসে বোসে তুই কি কোচ্ছিস? উঠে যা! দূর হয়ে যা! আমাদের ঘরে তোর কি দরকার? কোথাকার পাপ! দূর হয়ে যা!”

    লোকটার গভীরগর্জ্জনে আমার সৰ্ব্বাঙ্গ কেঁপে উঠলো; মনেও বড় ভয় হলো; ভয়ে ভয়ে বিনম্রস্বরে বোল্লেম, “আমি একটী বাবুর সঙ্গে এসেছি, বুলকচাঁদ মহাজনের কাছে আমাদের বিষয়কর্মের কথা আছে, বাবু আমাকে এইখানে রেখে তাঁর সঙ্গে দেখা কোত্তে গিয়েছেন, এখনি আসবেন, তিনি এলেই—”

    লোকটা অকস্মাৎ রেগে উঠে, এক হ্যাঁচকাটানে আমার হাত ধোরে তুলে, রক্তচক্ষু পাকল কোরে, ঘড়ি বেঁকিয়ে, আরও অধিকগর্জ্জনে বোলতে লাগলো, “দূর হয়ে যা! কোথাকার বাবু? কোথাকার বুলকচাঁদ? এখানে তারা থাকে না। এটা আমাদের বাড়ী, আমাদের ঘর, আমরাই এখানকার কর্ত্তা, বুলকচাঁদ ফুলকচাঁদকে আমরা চিনি না, কোথাকার কে তুই, এখনি বেরিয়ে যা! সহজে না গেলে ধাক্কা দিয়ে বাহির কোরবো, ঘুষী মেরে মুণ্ড ঘুরিয়ে দেবো!” এই সব কথা বোলতে বোলতে সেই লোক আমাকে জোরে জোরে ঠেলে ঠেলে দরজা পৰ্য্যত নিয়ে এলো; যে কথা আমি বোলছিলেম, তা আর বোলতে দিলে না; তার সঙ্গীলোকেরাও সেই রকম গর্জ্জন কোত্তে কোত্তে তার সঙ্গে এসে যোগ দিলে।

    আমি ঠক ঠক কোরে কাঁপতে লাগলেম। কোন কথাই তারা শুনে না, কোন কথাই বোলতে দেয় না, কেবল রেগে রেগে আমাকে গালাগালি দেয় আর জোরে জোরে ধাক্কা মারে! কিছুই শুনে না, তথাপি আমি বার বার মিনতি কোরে বোলতে লাগলেম, “কেন তোমরা আমাকে মারো? কেন আমাকে তাড়িয়ে দাও? কোন দোষ আমি করি নাই, বুলকচাঁদবাবুর কুঠী, সিদ্ধেশ্বরবাবু আমাকে এনেছেন, তোমরা দয়া কর, সিদ্ধেশ্বরবাবু এলেই আমি বেরিয়ে যাব, আর এক মুহূর্ত্তও এখানে থাকবো না।

    দলের ভিতর একজন কিছু ভালমানুষ ছিল, সেই লোকটী ঐ দুরন্ত লোকগুলাকে একটু থামিয়ে, আমার মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রবণ কোল্লে। শুনে তার যেন কিছু কষ্ট বোধ হলো; আমাকে একটু সোরিয়ে এনে দুঃখ প্রকাশ কোরে বোল্লে, “সব ফক্কিকার! সমস্তই মিথ্যা! এ বাড়ী বুলকচাঁদের নয়, কোন কারবারের কুঠী-বাড়ীও নয়, বুলকচাঁদ নামে কোন মহাজনও এ সহরে নাই, এ বাড়ীটা সৌখীনলোকের খেলাঘর; দিবারাত্রি এখানে জুয়াখেলা হয়; একটা লোক এখানে মাঝে মাঝে আসে বটে, তার নাম বুলকচাঁদ; সে লোকটা জুয়াড়িদলের একজন দালাল; নিজেও একজন জুয়াড়ী : তুখোড় জয়াড়ী; পাড়ায় পাড়ায় ঘরে ঘরে নূতন নূতন শীকার ধোরে আনে; তোমার মতন ছোকরা শীকার তার হাতে প্রায়ই পড়ে। কেন তুমি তার সঙ্গে মিশতে গিয়েছিলে? কেন তার সাক্ষাতে টাকার কথা বোলেছিলে? টাকার কথা বলাতেই তোমার এই দশা ঘেটেছে! টাকাগুলি তোমার গিয়েছে! ধড়ীবাজ বূলকের খর্পরে পোড়েছে, আর উদ্ধার হবে না! তুমি ঘরে যাও! ঘরে গিয়ে বোসে বোসে কাঁদো! একটা বাঙ্গালী সেই বুলকের সঙ্গে আসে বটে, সেটাও বুলকের পেটাও দালাল; তারা দুজনে মিলে তোমার টাকাগুলি ফাঁকী দিয়েছে। আর কেন এখানে বৃথা কষ্ট পাও? বিদায় হও! সন্ধ্যা হোলেই বিপদ ঘোটবে!”

    আমি কেঁদে ফেল্লেম। দারুণ শীতেও দরদরধারে আমার অঙ্গে ঘাম ঝরতে লাগলো, পিপাসায় কণ্ঠ শুষ্ক হয়ে এলো, লোকেরা আমার ধোরে রেখেছিল, ঘরের বাহির কোরে দিয়ে যখন হাত ছেড়ে দিলে, তখন আমি কাঁপতে কাঁপতে একখানা পাথরের উপর বোসে পোড়লেম। যে লোকটী মিষ্টকথা বোলেছিল, মিষ্টকথায় প্রবোধ দিয়ে হতাশ কোরে দিয়েছিল, কেঁদে সে লোকটীর পায়ে ধোরে কাতরবচনে বোল্লেম, “সিদ্ধেশ্বরবাবু গেল কোথা? টাকা পাই না পাই, একবার তার সঙ্গে দেখা কোরে যাওয়া আমার ইচ্ছা। বুলকচাঁদ কি এখন এ বাড়ীতে আছে? আপনি যদি দয়া কোরে একবার সংবাদ দেন কিম্বা আমারে সঙ্গে কোরে তাদের কাছে নিয়ে যান, তা হোলে চক্ষের জলে আমি তাদের পাষাণ-অঙ্গ অভিষিক্ত কোরে আসি!

    যখন ১২টা বেজেছিল, তখন আমার জ্ঞান ছিল, তার পর খোট্টাদের হুড়াহুড়িতে, চীৎকারধ্বনিতে, ধমকানীতে আমি এক প্রকার জ্ঞানশূন্য হয়েছিলেম; যখন শুনলেম, জুয়ার আড্ডা, যখন শুনলেম, আমার টাকাগুলি জুয়াচোরে ফাঁকী দিলে, তখন আমি পাগল হয়েছিলেম; বেলা শেষ হয়ে এসেছিল, সূৰ্য্যদেব অস্তে যাচ্ছিলেন, কিছুই জানতে পারি নাই; সন্ধ্যা হয়, সিদ্ধেশ্বর এলো না, তখন নিশ্চয় বুঝলেম, জুয়ারীই হোক, গাঁজাখোরই হোক, যে সব কথা এরা বোল্লে, সমস্তই সত্য। যে লোকটীকে শেষের কথাগুলি আমি বোল্লেম, বড় একটা হাই তুলে, সহানুভূতি জানিয়ে, সেই লোকটী বল্লে, “হায় হায়! ছেলেমানুষ, ছেলেবুদ্ধি, এখনও দেখা করবার ইচ্ছা! হায় হায়! এ বাড়ীটার চারিদিকে চারিটা দরজা। কে কখন কোন দিক দিয়ে আসে, কোন দিক দিয়ে যায়, কেহই জানতে পারে না। যার সঙ্গে তুমি এসেছ বোলছো, সে লোক কখন কোন দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে, কে তার সন্ধান কোরবে? বুলকচাঁদের কথা। বুলকচাঁদ দিনমানে আসে না, রাত্রে আসে; তাও আবার ঠিক নাই, সকল রাত্রে দেখা দেয় না। আজ একটা শীকার কোরেছে,—একটা কি কটা, তারাই জানে, কি কোরে বলা যাবে, শীকার যখন কোরেছে, তখন আজ আর এখানে তাদের পদাপর্ণ হবে কি না, সে পক্ষে সম্পূর্ণই সন্দেহ। তুমি ঘরে যাও। তাদের সঙ্গে আজ আর তোমার দেখাসাক্ষাৎ হবে না!”

    হতাশ হয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমি বাসাবাড়ীতে ফিরে চোল্লেম। আর তখন এক্কাগাড়ীর ভাড়া জুটলো না, সন্ধ্যাকালে পদব্রজেই চোল্লেম। তখনো আমার মনে মনে আশা, সিদ্ধেশ্বরকে পাওয়া যাবে। এক বাড়ীতেই থাকা হয়, বাসা ছেড়ে কোথায় পালাবে। সিদ্ধেশ্বরকে পাওয়া গেলেই টাকার কিনারা হোতে পারে। বুলকচাঁদকে দরকার নাই। সিদ্ধেশ্বরের হাতেই আমি টাকা দিয়েছি, সিদ্ধেশ্বরকে পেলেই হয় তো টাকা পাব। আকাশ-কুসুম আশা আমাকে তখন ঐ কথাই বোলে দিলে। হতাশ প্রাণের চমৎকার সান্ত্বনা! আশাকে লোকে নিন্দা করে, কিন্তু আমি তো বলি, আশাদেবী করুণাময়ী। আশা যাদের সফল হয় না, তারাই বলে, আশা পিশাচী। সফল বিফল উভয় অবস্থাতেই আশাকে আমি দেবী-কল্পনায় পূজা করি। আশাদেবী সংসারে কত শত লোককে নিতান্ত দুঃসময়েও প্রাণে বাঁচিয়ে রাখেন, মহাশোকেও প্রবোধ দান করেন; এমন উপকারিণী আশাকে পিশাচী বলা অধর্মের কথা।

    আশাকে সহচরী কোরে বাসায় এসে আমি পৌঁছিলেম। অগ্রেই সিদ্ধেশ্বরাবাবু ঘরে। ঘর পরিষ্কার। একগাছি ঝাঁটা পর্য্যন্তও ঘরে নাই। সমস্ত আসবাবপত্র তিরোহিত! এ কার্য্য কখন হলো? আমাকে সঙ্গে কোরে সিদ্বেশ্বর আজ সকালে যখন এক্কায় আরোহণ করে, তখন কি ঘরের জিনিস ঘরে ছিল না? না থাকাই সম্ভব? সোমবার রাত্রে বুলকচাঁদের আবির্ভাব হয়েছিল, আমার কাছে টাকা পাবার পরামর্শও সোমবারে, সুতরাং মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি তিন দিন সময় ছিল; সেই তিন দিনের ভিতরেই সিদ্ধেশ্বর আপন অভিসন্ধি সিদ্ধ কোরে নিয়েছে, বাসার সমস্ত জিনিসপত্র সোরিয়ে ফেলেছে, বাড়ীওয়ালাকে ফাঁকী দিয়েছে, আমার তো একেবারেই সৰ্ব্বনাশ! আমি এখন যে ফকির, সেই ফকির! আবার আমি পথে দাঁড়ালেম! ঐ দেড় হাজারের উপর যা কিছু ছিল, কলিকাতা থেকে কাশীতে পৌঁছিবার নৌকাভাড়া আর কাশীর খরচপত্র সমস্তই ফুরিয়ে গিয়েছে, দু-একটী টাকা সম্বল থাকা সম্ভব, কিন্তু তাতেই বা কি হবে? বাসার জিনিসপত্র বিক্রয় কোল্লে নগদ কিছু পাওয়া যায়, কিন্তু তা হোলেই বা থাকি কিরূপে? ঘর রাখতে পারবো না; কোথা থেকে ভাড়া দিব? ঘর না থাকলে জিনিসপত্রই বা থাকে কোথা? বিধাতা আমার ভাগ্যে এক আঁচোড়ে যা কিছু লিখে দিয়েছেন, শিশুকাল থেকেই সেই সকল ফল ফলে আসছে! চিরজীবন আমি নিরাশ্রয়—নিঃসম্বল! বিধাতার লিখন কখনো কি খণ্ডন হোতে পারে? দুটী দাতালোক দয়া কোরে এই অভাগারে দেড় সহস্র মুদ্রা প্রদান কোরেছিলেন, অভাগার কাছে সে দেড় সহস্র কত দিন থাকতে পারে?—ভোগেও এলো না, খরচও কোল্লেম না, কোন সংকার্য্যে এক পয়সা দানও কোল্লেম না; জুয়াচোরে ঠকিয়ে নিলে। এখন যাই কোথা? থাকি কোথা? খাই কি?

    লালা বুলকচাঁদ! উঃ! কি ভয়ঙ্কর লোক! মহাজন সেজে দেখা দিলে, সিদ্ধেশ্বরের সঙ্গে আলাপ, এই পরিচয় দিলে, সিদ্ধেশ্বর তার কারবারের একজন অংশী, আমিও একজন অংশী হব, কতই যেন ভালমানুষ হয়ে, কতই যেন উপকারী বন্ধু সেজে, আমারে এই রকম আশ্বাস দিলে, শেষকালে কি না, আমারে এক কালে পথের ভিকারী কোরে ছেড়ে দিলে! লালা বুলকচাঁদ! নামটাও শুনতে ভয়ঙ্কর! বোধ হয়, ওটা তার সত্যনাম নয়; যেরুপ স্বভাবের লোক, তাতে কোরে সে লোক যে সত্যনামে পরিচয় দেবে, এমন তো মনে লয় না, বুলকচাঁদ নামটা হয় তো জালনাম! লালা বুলকচাঁদ নানা স্থানের বড় বড় কুঠীর বড় মহাজন! উঃ! ভয়ানক বাটপাড়! কাশীর জুয়ার আড্ডার দালাল! আমার মত হতভাগা ভালমানুষ পেলেই দালাল-গিরীর চড়ান্ত পরিচয় দেয়। ভারী তুখোড় লোক! এত বড় সহরের ভিতর এত বড় জুয়ারী-ব্যবসা চালায়, অবাধে স্বচ্ছন্দে চালায়, কেহই ধরে না, কেহই কিছু বলে না, শান্তিরক্ষক নামে যাদের পরিচয়, তারাও এই রকম লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখে, অসাধারণ আশ্চর্য্য ব্যাপার!

    বড় বড় জুয়ারীতে—বড় বড় জুয়োচুরি-শীকারে এক একটা ঘাই থাকা দরকার! কাশীতে বুলকচাঁদের কারবারে ঘাই ছিল সিদ্ধেশ্বর। একটা সিদ্ধেশ্বর অথবা বেশী সিদ্ধেশ্বর, সে কথা প্রকাশ পেলে না, কিন্তু বেশী থাকাই সম্ভব। থাকে থাকুক, সে সকল গণনা করা আমার কাৰ্য্য নয়, কিন্তু সিদ্ধেশ্বরটা গেল কোথায়? কাশী ছেড়ে কোথাও যাবে না, এমন মজা কোথাও পাবে না, আমাকে ভিকারী কোরে, একটা আস্তানা ছেড়ে, আর একটা নতুন আস্তানায় ভর কোরেছে, ইহাই নিশ্চয়। যেখানে বুলকচাঁদ, সেইখানেই সিদ্ধেশ্বর, ইহাও নিশ্চয়। দুজনের চেহারা মনে রেখে, মনের কষ্টে অনাহারে সেই বাসাতেই আমি নিশাযাপন কোল্লেম। থেকে থেকে জুয়াচোরের কথাই মনে পড়ে, নিদ্রা আসে না, নিদ্রা এলো না, জাগরণেই রজনীপ্রভাত।

  • অষ্টাদশ কল্প : এরাই কি তীর্থবাসী?

    অষ্টাদশ কল্প : এরাই কি তীর্থবাসী?

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    অষ্টাদশ কল্প : এরাই কি তীর্থবাসী?

    আজ শনিবার। নিয়মমত গঙ্গাস্নান কোল্লেম, দেবদর্শন কোল্লেম, মনের দুঃখে আহার কোল্লেম না; অন্নপূর্ণা-পুরীতে আমি উপবাসী থাকলেম! বাসাঘরে চাবী দিয়ে, রাস্তায় বেরিয়ে, মন্দিরের দিকে চেয়ে, করযোড়ে জগন্মাতার উদ্দেশে সাশ্রু-লোচনে ডাকলেম, “মা অন্নপূর্ণে! শিব যখন ত্রিভুবনপরিভ্রমণ কোরে কোথাও কিছু ভিক্ষা পান নাই, এই কাশীধামে অন্নপূর্ণারূপিণী হয়ে, তুমি তখন ক্ষুধাতুর বিশ্বনাথকে অন্নদান কোরেছিলে মা! আজ আমি এই ক্ষুদ্র জীব, তোমার এই পূণ্যক্ষেত্রে উপবাসী রয়েছি, আমার প্রতি মা তোমার দয়া হলো না।”—তারস্বরে অন্নপূর্ণাকে ডাকলেম আর এই কথাগুলি বোল্লেম। মা অবশ্যই আমার কাতরোক্তি শুনলেন, কিন্তু উত্তর দিলেন না। আমার শুনা ছিল, কাশীতে কেহ উপবাসী থাকে না; পুরীমধ্যে অথবা অন্নছত্র অথবা গৃহস্থের দ্বারে উপস্থিত হোলেই উদর পূর্ণ হয়। শুনা ছিল বটে, কিন্তু সেরূপ চেষ্টা কিছুই কোল্লেম না; কিছুই ভাল লাগলো না; ভবিষ্যৎ-ভাবনায় ক্ষুধা-তৃষ্ণাও যেন উড়ে গেল; পথে পথেই বেড়াতে লাগলেম। অন্যমনস্ক, কোথায় কি হোচ্ছে, কোন দিক দিয়ে কারা সব চোলে চোলে যাচ্ছে, কোন দিকে কি কলরব হোচ্ছে, কোন দিকে চক্ষুও নাই, কোন দিকে কর্ণও নাই; বরাবর সিক্রোলের দিকে চোলে যাচ্ছি। এক একবার সূর্য্যপানে চেয়ে দেখছি, সূৰ্য্যও যেন আমার সঙ্গে সঙ্গে চোলেছেন, এইখানে বোধ হোচ্ছে। আমার কষ্ট দেখে দেখে দেব দিবাকর ক্রমশঃ রক্তবর্ণ ধারণ কোল্লেন, আর কষ্ট দেখতে পারেন না বোলেই যেন পশ্চিমাচলের অন্তরাল লুক্কায়িত হবার উপক্রম কোল্লেন। আমি তখন অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে একটা বৃক্ষতলে বোসে পোড়লেম। বেলা অবসান, সন্ধ্যা প্রায় সমাগত, দিনমানে বরং অধিক ভাবনা ছিল না, রাত্রিকালে কি হবে, কোথায় খাব, বাসাবাড়ী চাবী দেওয়া আছে, সেখানে ফিরে গিয়েই বা কি কোরবো, দ্বিতীয় প্রভাতেই বা কি উপায় হবে, বাসাঘরের ভাড়াই বা কোথা থেকে শোধ দিব, কি ভরসাতেই বা বাসা রাখবো, এই সকল ভাবনাতেই প্রাণ আকুল! ভাবনা-সাগরের পার নাই! অকুলপাথার ভাবনা!

    রাস্তার দিকে চেয়ে বেসে আছি, বাঙ্গালীটোলার যে সকল ভদ্রসন্তান সিক্রোলে চাকরী করেন, তাঁরা সব দলে দলে ঘরে ফিরে আসছেন, আমোদপ্রমোদে পরপর কত রকম গল্প কোচ্ছেন, কেহই আমার দিকে ফিরে চাইলেন না; অদৃষ্ট যার বিগুণ, তার প্রতি সকলেই বুঝি নিষ্ঠুর, এই ভাবনাই তখন আমার মনে উদয় হলো। ঠিক ভাবলেম, কি ভুল ভাবলেম, মনের আবেগে সেটা তখন বুঝতেই পাল্লেম না। ইচ্ছা ছিল না কাঁদবার, তবু কেন জানি না, আপনা হোতেই চক্ষু-দুটী অশ্রুপর্ণ হয়ে এলো, গণ্ডস্থল প্লাবিত কোরে অশ্রুধারা প্রবাহিত হলো; উদাস অন্তরে এক জায়গায় বোসে বোসেই আমি কাঁদলেম। আমার চক্ষের জল তখন কেহই দেখলে না।

    সম্মুখ দিয়ে অনেক লোক চোলে গেল, দুই একজন এক একবার আমার দিকে চেয়ে; চেয়ে দেখলেম, তামাসা মনে কোরে কেহ কেহ হাসলে, কেহ কেহ গম্ভীরভাব ধারণ কোরে মুখ ফিরালে। আমার দুঃখে কেহ দুঃখিত হলো কিম্বা কারো প্রাণে দয়া এলো, এমন লক্ষণ কিছুই বুঝা গেল না।

    সন্ধ্যা হয়। ক্রমশই লোকজনের চলাচল কম। আমি তখন সেখান থেকে উঠে আসি আসি মনে কোচ্ছি, এমন সময় একটী বাবু এসে আমার সম্মুখে দাঁড়ালেন। মুখ তুলে চেয়ে দেখি, দিব্য সুশ্ৰী পুরুষ, দিব্য পরিচ্ছদ পরিধান, মুখে যেন স্বাভাবিক দয়ামায়া সমঙ্কিত। কি জানি, কার উপদেশে দর্শনমাত্রই সেই বাবুটীর প্রতি আমার ভক্তির সঞ্চার হলো। বাবুর সঙ্গে কেহই ছিল না, তিনি একাকী। পথের ধারে একাকী বোসে আমি রোদন কোচ্ছি, তাই দেখে যেন কাতর হয়ে স্নিগ্ধস্বরে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “বালক! তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ? পথে বোসে এমন কোরে কাঁদছো কেন? তোমার হয়েছে কি?”

    দুই হস্তে নেত্রমার্জ্জন কোরে তৎক্ষণাৎ আমি উঠে দাঁড়ালেম। উত্তর আমার মুখস্থই ছিল, যত সংক্ষেপে পাল্লেম, আত্মপরিচয় নিবেদন কোল্লেম। পরিচয় কিছুই নয়, পরিচয় আমি জানিই বা কি, বাল্যজীবনের বড় বড় ঘটনাগুলি এক এক কোরে তাঁরে জানালেম; শেষের সম্বল গত কল্য জুয়াচোরে ঠকিয়ে নিয়েছে, সেই কথাটী বোলে তাঁর মুখপানে চেয়ে রইলেম; সেই সময় আমার চক্ষে পুনরায় দরবিগলিত অশ্রুধারা!

    শিবনেত্রে আমার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ কোরে মিষ্ট-মিষ্ট-বাক্যে বাবু বোল্লেন, “হায় হায়! এমন ঘটনা হয়েছে। কাশীর লোক যে কোন ভাবে চলে, সহজে বুঝে উঠা অত্যন্ত কঠিন। অচেনা লোককে ততটা বিশ্বাস করা তোমার ভাল হয় নাই। আচ্ছা, যা হবার, হয়ে গিয়েছে, জুয়াচোরে নিয়েছে, সে টাকা আর পাওয়া যাবে না। তুমি আমার সঙ্গে এসো, এখানে আমার বাড়ী আছে, পরিবারলোকজন সব এইখানে, আমার বাড়ীতেই তুমি থাকবে, কোন কষ্ট হবে না, যাতে তোমার ভাল হয়, আমি চেষ্টা পাব। বাসাটা ছেড়ে দাও, বৃথা কেন একটা ঝঞ্ঝাট বাড়ানো? খরচপত্রেরও অভাব। আপাততঃ আমি তোমাকে কিছু টাকা দিব, কল্য প্রাতঃকালেই বাড়ীভাড়া চুকিয়ে দিয়ে পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে এসো। এখন চল আমার সঙ্গে।”

    আমি যেন হাতে স্বর্গ পেলেম। তাদৃশ বিপদে যিনি অভয় দেন, যিনি আশ্রয় দেন, তিনি পিতৃতুল্য; পিতৃজ্ঞানে বাবুকে প্রণাম কোরে, আমি তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চোল্লেম।

    মহল্লা সোণাপুর, দিব্য একখানি বাড়ী; তেতালা চকবন্দী। পাথরের বাড়ী, এ কথা বলাই বাহুল্য। বাড়ী দু-মহল। বাবু আমাকে সদরবাড়ীর একটী ঘরে বসিয়ে, একজন চাকরকে যথাকৰ্ত্তব্য উপদেশ দিয়ে, বাড়ীর ভিতর চোলে গেলেন; আমাকে বোলে গেলেন, “বোস হরিদাস, শীঘ্রই আমি আসছি।”—আমি বোসে থাকলেম। একটু পরে সেই চাকর এক গাড়ু জল, একখানি গামছা, একখানি কাপড় আর কিছু জলখাবার এনে দিলে, হাত-পা ধুয়ে কাপড় ছেড়ে আমি জল খেলেম; শরীরটা অনেক সুস্থ বোধ হলো।

    প্রায় আধঘণ্টা পরে বাবু বৈঠকখানায় এসে বোসলেন, পাঁচ হাত তফাতে একটু জড়সড় হয়ে আমি বোসে থাকলেম। বাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “তোমার নামটী আমি শুনেছি, কিন্তু তোমার জাতি কি?”—এইবার বিষম বিভ্রাট! জাতি-জন্ম কিছুই আমি জানি না, বলি কি। একটা কথা স্মরণ হলো। মোহনলালবাবু বলেছে, অমরকুমারীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়েছে; অমরকুমারী রক্তদন্তের কন্যা; রক্তদন্ত বলে, সে আমার মামা হয়; মোহনলালবাবু কায়স্থ, তিনি অবশ্যই স্বজাতির কন্যাকেই বিবাহ কোরেছেন, তবেই বুঝে নিতে হলো, চেহারায় রাক্ষস-বানরের মত হোলেও জাতিতে রক্তদন্তটা কায়স্থ; মামা যদি কায়স্থ, তবে আমিও অবশ্য কায়স্থ; এই সিদ্ধান্তে উপস্থিত হয়ে সেই ভাবেই আমি উত্তর কোল্লেম। বাবুর মুখখানি বেশ প্রসন্ন হলো। রাত্রি প্রায় দশটা পর্য্যন্ত বাবুর সঙ্গে আমি অনেক রকম গল্প কোল্লেম; ভূতপ্রেতের গল্প নয়, রাক্ষসপিশাচের গল্প নয়, রাজপুত্র-কোটালের পত্রের রুপকথা নয়, আমিই আমার গল্প। পথে তাড়াতাড়ি গোটাকতক কথা বোলেছিলেম, এই সময় আমূল-বৃত্তান্ত দস্তুরমত বর্ণনা কোল্লেম। স্থির হয়ে শুনে শুনে বাবু মহা বিস্ময়াপন্ন হোলেন; পুনরায় আশ্বাস দিয়ে, অভয় দিয়ে, আমার ভাল করবার অঙ্গীকার কোল্লেন।

    অনিশ্চিত জাতির পরিচয় যা-ই হোক, বাড়ীতে পাঁচক ব্রাহ্মণ ছিল, আহারে দ্বিধা থাকলো না, একসঙ্গে আহারাদি কোল্লেম, পরিতোষরুপে ভোজন করা হলো। বৈঠকখানার একটী নির্দ্দিষ্ট কক্ষে আমি শয়ন কোল্লেম। কখনই আমি চিন্তাশূন্য থাকি না, বিশেষতঃ সেই দিন আমার টাকাগুলি জুয়াচোরে নিয়েছে, পূর্ব্বে অত টাকা দেখি নাই, দাতালোকে দিয়েছিলেন, সেইগুলি গেল, বড়ই কাতর হোলেম।

    নিরুপায়! এখন এই নূতন আশ্রয়ে যদি কিছু সুবিধা হয়, আবার আমি টাকার মুখ দেখবো, ভবিষ্যৎ আশায় আপনা আপনি এইরুপ সান্ত্বনা পেলেম; রাত্রি দুই প্রহরের পর নিদ্রা, ঊষাকালেই নিদ্রাভঙ্গ।

    প্রভাতে বাবুর প্রথম কাৰ্য্য আমার বাসা তোলা। ভাড়া কত বাকী ছিল, আমার মুখে শুনে, একজন লোক সঙ্গে দিয়ে, সেই বাসায় আমায় পাঠালেন, টাকাগুলিও আমার হাতে দিলেন। আমি সেখানে পৌঁছে, বাড়ীওয়ালার সঙ্গে সাক্ষাৎ কোরে ভাড়াগুলি চুকিয়ে দিলেম, দুঃখের কথা বোল্লেম। সিদ্ধেশ্বরের উদ্দেশে তিনি বিস্তর গালাগালি দিলেন; লোকটা সে বাড়ীতে ছয় মাস ছিল, একমাসেরও ভাড়া দেয় নাই, গোপনে গোপনে জিনিসপত্র সোরিয়ে গা-ঢাকা হয়েছে! জুয়াচোরলোকের ধর্ম্মই ঐরুপ!

    আমার জিনিসপত্রগুলি সঙ্গে নিয়ে বাবুর প্রেরিত লোকের সঙ্গে আবার আমি বাবুর বাড়ীতে এলেম। সে দিন রবিবার, বাবু আফিসে যাবেন না, অনেক বেলা পর্য্যন্ত বাবুর কাছে বোসে পূণ্যধাম বারাণসী-ক্ষেত্রের অনেক রকম ভয়ানক ভয়ানক গল্প শুনলেম। কথাপ্রসঙ্গে বাবু, একটী নিশ্বাস ফেলে বোল্লেন, “তুমি ত তুমি, কাশীর চোরেরা কত শত বড় বড় পাকা পাকা বিষয়ী লোককে অদ্ভুত কৌশলে ঠকায়, তার সংখ্যা হয় না; এখন অবধি তুমি খুব সাবধানে থেকো; অচেনা লোকের কোন ছলনায় ভুলো না।”—অদৃষ্টের উপর নিভর কোরে আমি নীরব থাকলেম।

    আহারান্তে বিশ্রামের পর বাবু আমাকে সঙ্গে কোরে দুই একজন বন্ধুর বাড়ীতে বেড়াতে গেলেন, বন্ধুদের কাছেও আমার পরিচয় দিলেন, তাঁরাও সকলে আমার দুঃখে দুঃখ প্রকাশ কোল্লেন। যাতে আমি একটা কাজকর্ম্ম পাই, যাতে আমি পরের গলগ্রহ না হয়ে একরকম সুখে থাকতে পারি, এই অল্পবয়সে যাতে আমি আলস্যে আলস্যে বৃথা সময় নষ্ট না করি, সকলেই এইরূপ অভিপ্রায় প্রকাশ কোল্লেন। আমাকে দেখে আমার অবস্থা শুনে, বাবুর বন্ধুরা আমাকে দয়ার পাত্র বিবেচনা কোরে স্নেহ প্রদর্শন কোল্লেন, কথাবাৰ্ত্তার ভাবে আমি সেটা বুঝতে পাল্লেম।

    সন্ধ্যার পর বাড়ীতে ফিরে এসে কিয়ৎক্ষণ বিশ্রামের পর বাবু আমায় জিজ্ঞাসা কোল্লে, “হরিদাস! তুমি ইংরেজী জান?”—চিন্তা কোরে আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞে, কিছু কিছু শিখেছি। কোন বিদ্যালয়ে পাঠ করা হয় নাই, একজন দয়াময় আশ্রয়দাতা বাড়ীতে শিক্ষক নিযুক্ত কোরে কিছু কিছু শিক্ষা দিয়েছিলেন; ভূগোল, ব্যাকরণ, গণিত, ইতিহাস, সরলপাঠ কিছু কিছু আমি শিক্ষা কোরেছি; তৎপূর্ব্বে হুগলি জেলার এক অধ্যাপকের টোলে সংস্কৃত অধ্যয়ন কোরেছি, অবস্থা প্রতিকূল, অধিক দূর অগ্রসর হোতে পারি নাই; ঐ পর্য্যন্তই আমার শিক্ষা।”

    পার্শ্বে কয়েকখানি ইংরেজী পুস্তক সাজানো ছিল, তন্মধ্যে একখানি হাতে কোরে নিয়ে বাবু আমাকে পাঠ কোত্তে দিলেন। দেখলেম, সেখানি রোমরাজ্যের ইতিহাস। রোমের ইতিহাস আমার পড়া ছিল না, তথাপি আমি আবৃত্তি কোল্লেম, এক একটী মানুষের নাম উচ্চারণে বেধে বেধে গেল, হাসতে হাসতে বাবু সেগুলি বোলে বোলে দিলেন, দ্বিতীয়বারে আমিও সুধরে নিতে পালেম। তার পর বাঙলা-ব্যাখ্যার আদেশ। ভাবলেম, এইবারেই ঠেকাঠেকি? একে তো অল্পবিদ্যা, তাতে আবার অপঠিত পুস্তক, অর্থ করা সহজ নয়। ছোট ছোট কথার অর্থ বুঝতে পাল্লেম, ইতিহাসের পাঠ, ভাবটাও অনেক দূর পরিগ্রহ হলো, বড় বড় কথার মানে জেনে নিয়ে, একরকমে খানিকদূর আমি ব্যাখ্যা কোল্লেম। আমার ব্যাখ্যা শুনে বাবু সন্তুষ্ট হোলেন; তাঁর মুখের ভাব দেখে আমি বুঝলেম, ব্যাখ্যাতে বড় একটা ভুল হলো না।

    অল্পক্ষণ চুপ কোরে থেকে গম্ভীরবদনে—গম্ভীর অথচ প্রসন্নবদনে বাবু আমাকে বোল্লেন, “তোমার হাতের ইংরেজী-লেখা কেমন, কল্য আমাকে দেখিও; দোয়াত, কলম, কাগজ এইখানেই থাকলো, রাত্রে যদি অবসর পাও, কষ্ট যদি না হয়, বেশ পরিষ্কার কোরে এক পাতা লিখে রেখো, কল্য যখন আমি আফিসে যাব, আমাকে দিয়ো।”

    যথাসময়ে নৈশ আহার সমাপ্ত হলো, বাবু বাড়ীর ভিতর শয়ন কোত্তে গেলেন, আমি আমার নির্দ্দিষ্ট শয়নকক্ষে কাগজ-কলম নিয়ে বোসে গেলেম। কি লিখি? সেই রোমের ইতিহাস। এক বাঘিণী দুটী শিশুকে স্তন দান কোরেছিল, এই কথা যেখানে লেখা, সেই পাতাটী আমি নকল কোল্লেম, প্রায় পঁচিশ ছত্র লিখলেম; চিহ্নগুলি যেখানে যেমন, অর্থ বোধ হয়েছিল কি না, ঠিক ঠিক দিয়ে দিলেম। কেতাবখানি এক কোণে চাপা দিয়ে, সেই কাগজখানি বাতাসের মুখে রেখে আমি শয়ন কোল্লেম। এক ঘুমেই রাত্রিপ্রভাত।

    সোমবার। বেলা দশটার পূর্ব্বে আফিসের কাপড় পোরে বাবু যখন উপর থেকে নেমে আসেন, রাত্রের লেখা সেই কাগজখানি হাতে কোরে আমি তখন তাঁর সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালেম, কাগজখানি সম্মুখে ধোল্লেম। পূর্ব্বকথা স্মরণ কোরে, একটু হেসে তিনি বোলে উঠলেন, “ওহো! লিখেছ? বেশ বেশ!”—একটু থোমকে দাঁড়িয়ে, অক্ষরগুলির প্রতি একটু দৃষ্টিপাত কোরে, আবার তিনি হাসতে হাসতে বোল্লেন, “আচ্ছা!”

    আচ্ছা বোলেই কাগজখানি পকেটে রেখে, বাবু সরাসর নেমে এলেন, চাকরদের যাকে যা বোলতে হয়, উপদেশ দিয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলেন। আহারান্তে আমি বাবুর বৈঠকখানায় বোসে একখানি ইংরেজী পুস্তক পাঠ কোত্তে লাগলেম। বেলা যখন তিনটে, সেই সময় একটী ভদ্রলোক সেই বৈঠকখানায় এসে দর্শন দিলেন। কল্য বৈকালে যে কয়েকটি বন্ধুর সঙ্গে বাবু সাক্ষাৎ কোরেছিলেন, এই ভদ্রলোকটী তাঁদেরই মধ্যে একজন। আমিও তাঁরে চিনলেম, তিনিও আমাকে চিনলেন। আমি ইংরেজী পুস্তক পাঠ কোচ্ছি দেখে, আমার কাছে বসে তিনি দুটী একটী কথা জিজ্ঞাসা কোত্তে লাগলেন, বিনম্রবচনে আমিও উত্তর দিতে লাগলেম। শেষকালে তিনি বোল্লেন, “তুমি বেশ বুদ্ধিমান, তোমার চেহারাও ভাল, রমণবাবুর কাছে কিছুদিন যদি তুমি থাকো, নিশ্চয়ই তোমার ভাল হবে।” পরিচয়ে জানলেম, সেই ভদ্রলোকটীর নাম রসিকলাল পিতুড়ী, বয়স প্রায় ২৭/২৮ বৎসর, একটী ইংরেজী স্কুলে শিক্ষকের কাৰ্য্য করেন, কোন কাৰ্য্য উপলক্ষে সাতদিনের ছুটী পেয়েছেন, বাহিরে কোথাও যান নাই, বাড়ীতেই আছেন, তিনি আমাদের বাবুর একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু।

    সেই রসিকবাবুর মুখেই শুনলোম, আমাদের বাবুর নাম রমেন্দ্রনাথ মিত্র, নিবাস বঙ্গদেশ। সাত বৎসর হলো কাশীতে এসেছেন, প্রথম প্রথম ভাড়াটে বাড়ীতে বাস কোত্তেন, এখন এই বাড়ীখানি কিনেছেন, সপরিবারে এই বাড়ীতেই থাকেন; বৎসরান্তে অল্পদিনের জন্য একবার দেশে যান, শীঘ্রই ফিরে আসেন। বাবুর আর দুটী সহোদর আছেন, তাঁরাও সঙ্গে এসেছেন, তাঁদেরও পরিবার আছে। বাবু এখানকার জজ-আদালতের সেরেস্তাদার, মাসিক বেতন ২০০৲ টাকা, সেরেস্তায় তাঁর বিলক্ষণ প্রতিপত্তি; বর্ত্তমান জজ-সাহেব তাঁরে খুব ভালবাসেন, শীঘ্রই বেতনবৃদ্ধি হবে, জজ-সাহেব এইরুপ আভাষ দিয়ে রেখেছেন।

    রমেন্দ্রবাবর দুই বিবাহ, দুটী পত্নীই এই বাড়ীতে আছেন; তাঁরা ব্যতীত দুটী ভ্রাতৃবধু, দুটী সহোদরা ভগিনী, একটী পিসীমা আর পিসীমার দুটী কন্যা; তাঁরা সকলেই এই বাড়ীতে আছেন। রমেন্দ্রবাবু সুশিক্ষিত, তাঁর দুই বিবাহের কারণ কি, রসিকবাবু আমার সে সন্দেহও মিটিয়ে দিলেন। প্রথম পত্নীর সন্তান হয় নাই, সেই জন্য দ্বিতীয়বার দার-পরিগ্রহ। প্রথমার বয়ঃক্রম প্রায় ৩০ বৎসর। দ্বিতীয়াটীর বয়ঃক্রম ১৭/১৮ বৎসর মাত্র; সেটী এ বাড়ীতে নূতন-বৌ নামে পরিচিত। বাবুর মা নাই, পিসীমাই এখানে গৃহিণীর কাৰ্য্য করেন। বৌগুলির ততটা স্বাধীনতা নাই, কিন্তু বড় বউটী যা যখন বলেন, পিসীমা তাতে অমত কোত্তে পারেন না। পিসীমার কন্যা-দুটীর বিবাহ হয়েছিল, দুটীই এখন বিধবা। বড়টীর বয়স ২৪/২৫ বৎসর, ছোটটী বিংশতিবর্ষের ন্যূনবয়স্কা। ভাই তিনটীর মধ্যে রমেন্দ্রবাবুই জ্যেষ্ঠ, মধ্যম রামশঙ্কর, কনিষ্ঠ মতিলাল। বাড়ীতে তিনজন চাকর, একজন পাচক ব্রাহ্মণ, দুজন দাসী আর একজন গঙ্গাজলতোলা ভারী। পোষ্য অনেকগুলি। মেজোবাবু আর ছোটবাবু রামনগরে চাকরী করেন, বড়বাবুই তাঁদের চাকরী কোরে দিয়েছেন।

    রসিকবাবুর মুখে এই সকল পরিচয় আমি অবগত হোলেম। বাবুর ভাইদুটী রামনগরে চাকরী করেন, রামনগর কোথায়, রামনগর কেমন জায়গা, রামনগরে কি কি আছে, উদ্দীপ্ত কৌতূহলে এই কথা আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম। রসিকবাবু বল্লেন, “কাশীর গঙ্গাপারেই রামনগর। রামনগরে একজন রাজা আছেন, তিনিই কাশীরাজনামে বিখ্যাত। রাজকার্য্য-নিৰ্ব্বাহের নিমিত্ত সেখানেও অনেক কার্য্যালয় আছে, দোকান আছে, বাজার আছে, বাড়ী আছে, অনেক লোক সেখানে চাকরী করে। গঙ্গাতীরে হাজার হাজার গাধা চরে, ধোপারা দলবদ্ধ হয়ে এক এক পাটা খাড়া কোরে সারি সারি গঙ্গাজলে কাপড় কাচে; গাধারা সেখানকার বোপাদেরই সম্পত্তি।”

    রামনগরের এইরূপ বর্ণনা কোরে রসিকলাল বাবু আরও বোল্লেন, “রামনগর-সম্বন্ধে একটা চমৎকার পৌরাণিক রহস্য আছে। বিশ্বেশ্বর একবার বেদব্যাসকে কাশী থেকে দূরে কোরে দিয়েছিলেন; শিবের উপর রাগ কোরে ব্যাসমুণি ঐ রামনগরে নূতনকাশী পত্তন করবার বাসনা কোরেছিলেন। কবিবর ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলগ্রন্থে ব্যাসের সঙ্কল্পের এইরূপ বর্ণনা আছে:—

    ‘আমাকে কাশীতে, না

    ভূতনাথ কাশীবাসী।

    সেই অভিমানে, আমি এইখানে,

    কবির দ্বিতীয় কাশী॥’

    ব্যাসদেব এই সঙ্কল্পে রামনগরে কাশী প্রতিষ্ঠার কল্পনায় যোগাসনে বসেন। কাশীতে তারকব্রহ্মনামে জীবকে শিব মুক্তি দেন, ব্যাসদেবের নূতন কাশীতে তারকব্রহ্মনামের প্রয়োজন থাকবে না, শিবের কৃপার অপেক্ষা থাকবে না, মরণমাত্রেই জীবগণ মোক্ষলাভ কোরবে। ব্যাসের বাসনা পূর্ণ হলে কাশীনাথের কাশীধামের মহিমা কম হবে কিম্বা আসলেই মাহাত্ম্য থাকবে না, এই বিঘ্ন সন্দেহ কোরে সৰ্ব্ববিঘ্ননাশিনী জগজ্জননী অন্নপূর্ণা জরাজীর্ণা ভিকারিণীবেশে ব্যাসদেবকে ছলনা করেন। দুইবার ভগবতী জিজ্ঞাসা করেন, ‘এখানে মরিলে কি হয়?’—দুইবার যোগাসনস্থ ব্যাসদেব উত্তর দেন, এখানে মরিলে সদ্য মোক্ষ হয়। তৃতীয়বার দেবী যখন ঐরুপ প্রশ্ন করেন, যোগভঙ্গের আশঙ্কায় ক্রোধান্ধ হয়ে ব্যাস তখন বোলে ফেলেন, ‘গর্দ্দভ হইবে বুড়ি এখানে মরিলে।’

    দেবী বোল্লেন, “তথাস্তু।” তদবধি রামনগরের নাম ব্যাসকাশী, সাধুভাষায় গর্দ্দভবারাণসী। প্রবাদ এইরুপ যে, যে সকল পাপীলোককে কাশীছাড়া করবার জন্য কালভৈরব তাড়া করেন, সেই সকল পাপীলোক গঙ্গা পার হয়ে ব্যাস-কাশীতে গিয়ে মরে, মরণমাত্রেই গাধা হয়; সেই কারণে এখনো রামনগরে গাধার সংখ্যা অত বেশী!”

    ব্যাসকাশীর বর্ণনা শুনে আমি হাস্য কোল্লেম। এদিকে সন্ধ্যাও হয়ে এলো, রসিকবাবু বাড়ী গেলেন, ঠিক সন্ধ্যার সময় আর দুটী নূতন বাবু বৈঠকখানায় এসে দাঁড়ালেন। বৈঠকখানায় বাবুর বিছানার ধারে আমাকে দেখেই খানিকক্ষণ তাঁরা অবাক হয়ে আমার পানে চেয়ে রইলেন, আমিও নিৰ্ব্বাকে একদৃষ্টে তাঁদের পানে চেয়ে থাকলেম। একটু পরেই একটী বাবু, কিছু রুক্ষ্মস্বরে আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কে তুমি? কোথা থেকে এসেছ?” অপ্রতিভ না হয়েই নির্ভয়ে আমি উত্তর কোল্লেম, “আমি হরিদাস, বড়বাবু আমাকে এনেছেন, এইখানেই আমি আছি, এইখানেই আমি থাকবো।”

    উভয়ে মুখ-চাহাচাহি কোরে দুই তিনবার বক্রনয়নে আমার দিকে কটাক্ষপাত কোল্লেন, বোধ হলো যেন বিরক্ত হোলেন। সেখানে আর তাঁরা বোসলেন না, বিড় বিড় কোরে বোকতে বোকতে মস মস শব্দে বাড়ীর ভিতরের দিকে চোলে গেলেন।

    ঘরের সেজে বাতী জ্বালবার জন্য সেই সময় একজন চাকর একটা লণ্ঠন হাতে কোরে সেইখানে এলো, বাতী জ্বেলে দিলে। সে যখন ফিরে যায়, তখন আমি তারে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “এইমাত্র যে দুটী বাবু এসেছিলেন, তাঁরা কে?” চাকর উত্তর কোল্লে, “বাবুর ভাই মেজোবাবু আর ছোটবাবু।”

    তখন আমি বুঝতে পাল্লেম; তথাপি পুনরায় জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “তিন দিন আমি রয়েছি, শনিবার রবিবার ঐ বাবু-দুটীকে দেখি নাই কেন?” চাকর বোল্লে, “সকল দিন আসেন না; রামনগরে কাজ করেন, সেইখানেই থাকেন। বড়বাবু বেজার হন; বাইরে বাইরে রাতকাটানো, বড়বাবু ভালবাসেন না, কতদিন বারণ কোরেছেন, বাবুরা শুনেন না, প্রায়ই মাঝে মাঝে দেখা দেন না, বিশেষত শনিবার রবিবার।”

    এই পর্য্যন্ত বোলেই, মুখ ফিরিয়ে একটু হেসে চাকরটী বেরিয়ে গেল। হাসি আমি দেখতে পেলেম, কিন্তু হাসির ভাব কিছু বুঝতে পাল্লেম না; বাতীর কাছে সোরে বোসে আবার আমি পুস্তকপাঠে মন দিলেম।

    রাত্রি যখন সাতটা, সেই সময় বড়বাবু বাড়ী এলেন; অগ্ৰেই বৈঠক খানায়। আমি পুস্তকপাঠে নিবিষ্টচিত্ত, তাই দেখে বাবুর মুখখানি সহসা প্রফুল্ল হলো, প্রফুল্লবদনে তিনি আমাকে বোল্লেন, “বড়ই তুষ্ট হোলেম। মিছে কাজে কালক্ষয় না কোরে তুমি যে একাকী বোসে বোসে পড়াশুনা কোচ্ছো, খুব ভাল; এই রকম আমি ভালবাসি। দেখ হরিদাস, কাল থেকে আমার সঙ্গে তোমায় বেরুতে হবে; তোমার চাকরী হয়েছে; তোমার সেই লেখাখানি দেখে সাহেবেরা পছন্দ কোরেছেন, আমার সেরেস্তাতেই তুমি বোসবে, আমিই তোমাকে কাজকর্ম্ম দেখিয়ে দিব, শিখিয়ে দিব, সহজ সহজ কাজ, তা তুমি বেশ পারবে, কিছুই কঠিন বোধ হবে না। এখন আপাততঃ মাসে মাসে কুড়ি টাকা পাবে, কাজকর্ম্মের দাঁড়া-দস্তুর শিক্ষা হোলে ক্রমশঃ বেতন বাড়বে।”

    পুস্তকখানি মুড়ে রেখে, দাঁড়িয়ে উঠে, বাবুকে আমি নমস্কার কোল্লেম। “আপনি মহৎলোক, আপনি সদাশয়, গরিবের প্রতি আপনার বিশেষ দয়া, বিশেষ অনুগ্রহ, আপনার অনুগ্রহে আমি সংসারের অকূল সাগরে পার পেলেম, চিরদিনের জন্য উপকারঋণে আমি ঋণী হয়ে থাকলেম, হৃদয়ের আনন্দবেগে এই সকল কথা বোলে তাঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞতা জানালেম। মৃদু হেসে, আমার মস্তকে হস্তার্পণ কোরে, হৃষ্টবচনে বাবু বোল্লেন, অত কথা আমাকে কিছুই বোলতে হবে না, আমি তোমাকে পুত্রের মত পালন কোরবো, দু-দিনেই আমি তোমার সদ্গুণের পরিচয় পেয়েছি। বেশ ছোকরা তুমি; বেশ বুদ্ধি তোমার; পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব দুর্ঘটনার কথা ভুলে গিয়ে, সুস্থির হয়ে আমার কাছে থাকো, মন দিয়ে কাজকর্ম্ম কর, লেখাপড়ার আলোচনা রাখ, ভবিষ্যতে ভাল হবে। এখানে তোমার কিছুমাত্র অযত্ন হবে না, ঘরের ছেলের মত থাকবে, স্বচ্ছন্দে বাড়ীর ভিতর যাবে আসবে, মেয়েদের সকলকেই আমি বোলে দিব, সকলেই তোমাকে আদর-যত্ন কোরবে; আদর করবার বস্তু তুমি, ভালবাসবার সামগ্রী তুমি, সকলেই তোমাকে ভালবাসবে, কারোর কাছে তোমার অনাদর হবে না।”

    উত্তম অবসর পেয়ে, কুণ্ঠিতভাবে মুখখানি নীচু কোরে, মৃদুস্বরে তৎক্ষণাৎ আমি বোল্লেম, “মেজোবাবু এসেছেন, ছোটবাবু এসেছেন, দুজনেই এই ঘরে আসছিলেন : আমি তাঁদেরে চিনতেম না, উঠে দাঁড়াই নাই, কর্কশস্বরে দুই একটা কথা আমাকে জিজ্ঞাসা কোরে আমার সামান্য উত্তর শুনেই তাঁরা বিরক্ত হয়ে চোলে গেলেন; ঘরে বোসলেনও না, আমার সঙ্গে আর কথাও কইলেন না।”

    গম্ভীরবদনে বাবু বোল্লেন, “তাদের ঐ রকম স্বভাব, তুমি কিছু মনে কোরো না। আমি তাদের বোলে দিব, চেনাশুনা হোলে আর সে রকম মেজাজ দেখাবে না। এখন তুমি পড়, আমি আসছি।”

    এই কথা বলে বাবু অন্দরমহলে প্রবেশ কোল্লেন, আমি আবার পুস্তকখানি খুলে আরব্ধ পাঠে মনোনিবেশ কোল্লেম।

    আধঘণ্টা পরে বাবু এলেন। আমার চাকরী-সম্বন্ধে কতকগুলি উপদেশ দিয়ে বাবু বোল্লেন, “দিন দিন এখানে বাঙ্গালীর সংখ্যা অধিক হোচ্ছে। যাদের মাথার উপর শাসনকৰ্ত্তা নাই, অভিভাবক নাই, তারা প্রায় সকলেই দুষ্কর্ম্মেরত। কেহ কেহ চাকরী করে, কেহ কেহ বেকার। অনেকে মনে করে, অল্প লেখাপড়া জানলেই পশ্চিমদেশে চাকরী হয়; কথাটা কতক পরিমাণে সত্য, কিন্তু কার্য্যে নিযুক্ত হয়ে যারা রীতিমত কাজকর্ম্ম শিক্ষা কোত্তে পারে, অল্প লেখাপড়ায় তাদের ততটা আটকায় না, যারা কর্ম্মস্থলে গিয়ে কেবল রোজসই কোরে আসে, বেশী দিন তাদের চাকরী থাকে না। যারা বেকার, তারা বাড়ী থেকে আসবার সময় মা-বাপের সিন্দুক-বাক্স ভেঙে যা কিছু আনে, তাতেই এখানে বাবুয়ানা কোরে দিন কাটায়; তাও দিনকতক মাত্র; শেষে অনন্ত দুর্গতি! একে কুক্রিয়াসক্ত, তার উপর নিঃসম্বল, কেশেল লোকের সঙ্গে মিশে অর্থ-লালসায় নানা কুক্রিয়ায় প্রবৃত্ত হয়; এক একদিন এক এক বাঙ্গালীর বাসায় বাসায় ভিক্ষা কোরে উদরপোষণ করে, এক একদিন উপবাসে কাটায়, তথাপি বদখেয়ালী বাবুগিরী ছাড়ে না। সাবধান, সে প্রকার লোকের সঙ্গে খবরদার তুমি মিশো না, মুখোমুখি দেখা হোলে বাক্যালাপও কোরো না; দুদিনে চরিত্র নষ্ট হয়ে যাবে, চাকরীটীও হারাবে, আমিও তোমাকে বিশ্বাস কোত্তে সন্দেহ কোরবো। তোমার স্বভাব ভাল, সেই জন্যই অগ্রে উপদেশ দিয়ে রাখলেম; ভুলো না, সাবধানে থেকো।”

    নতবদনে আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা, বদলোকের সঙ্গে সংস্রব রাখা কখনই আমার অভ্যাস নয়, কখনই আমি আপনার আজ্ঞার অবাধ্য হব না।” বাবু বোল্লন, “হাঁ, তা হোলেই ভাল হয়।”

    কথা হোচ্ছে, এমন সময় সেই দুটী বাবু এলেন। বাবুর সহোদর। বড়বাবু তাঁদের সম্বোধন কোরে, আমার দিকে অঙ্গুলিনির্দ্দেশে মিষ্টবাক্যে বোল্লেন, “দেখ, এই ছেলেটীর নাম হরিদাস, গরিব, চেহারা দেখেই বুঝতে পাচ্ছো, ভদ্রলোকের ছেলে, আমাদের স্বজাতি, চলনসই লেখাপড়া জানে, চরিত্র খুব ভাল, আমাদের আদালতে এই বালকের জন্য আমি একটী চাকরী স্থির কোরেছি, কাল থেকে সঙ্গে কোরে নিয়ে যাব। তোমরা হরিদাসকে অযত্ন কোরো না, কটুকথা বোলো না, ভয় দেখিও না, ঘরের ছেলের মতন সদয়চক্ষে দর্শন কোরো।”

    আমার দিকে চেয়ে চেয়ে বাবু-দুটী তখন বড়দাদার কথাতেই সম্মতি জানালেন; আমি সেই সময় তাঁদের উভয়ের মুখের দিকে চাইলেম; দেখলেম, ছোটবাবু একটু একটু হাসছেন, মেজোবাবুর মুখখানি ভারী ভারী; সেই ভারিত্বের সঙ্গে যেন কিছু বিরক্তিভাব অঙ্কিত বোধ হলো।

    বাবু-দুটীর সঙ্গে সে রাত্রে আমার কোন প্রকার কথাবার্ত্তা হলো না। ছোটবাবু একবার উঠে, একটা আলমারী থেকে লাল চামড়াবাঁধা একখানা কেতাব আর খানকতক কাগজ বাহির কোরে, বড়বাবুর বালিশের ধারে বোসলেন; একখানা কাগজ বড়বাবুকে দেখালেন। মস্তকসঞ্চালন কোরে বড়বাবু বোল্লেন, “হ, আচ্ছা, ঐ রকম হোলেই চোলবে।” ছোটবাবু তখন ঘাড় বেঁকিয়ে মেজোবাবুর দিকে চাইলেন; তার পর দুজনেই একসঙ্গে বাড়ীর ভিতর চোলে গেলেন; কাগজগুলি আর কেতাবখানি ছোটবাবুর হাতেই থাকলো। একটু পরে বড়বাবুর সঙ্গে আমিও অন্দরে প্রবেশ কোল্লেম। যথাসময়ে আহার করা হলো, নিদ্রায় রজনীপ্রভাত।

    নূতন চাকরী, সকাল সকাল আহার কোরে বড়বাবুর সঙ্গে আমি আদালতে গেলেম। কি আমার কাৰ্য্য, বড়বাবু দেখিয়ে দিলেন, হুঁসিয়ার হয়ে সমস্ত দিন আমি কাজ কোল্লেম। কাজ কেবল নকল করা আর মাঝে মাঝে লম্বা লম্বা ফর্দে অঙ্কমালা ঠিক দেওয়া। আফিস বন্ধ হবার অগ্রে বড়বাবু স্বয়ং আমার লেখাগুলি আর অঙ্কগুলি দর্শন কোল্লেন, প্রসন্নবদনে মন্তব্য দিলেন, “ঠিক।”

    সেই দিন থেকেই আমার চাকরী হলো। ছুটীর সময় বড়বাবু আমাকে সাহেবের কাছে নিয়ে গেলেন, সাহেবকে আমি সেলাম কোল্লেম, সাহেবের সঙ্গে বড়বাবুর কি কি কথা হলো, সব আমি বুঝতে পাল্লেম না, ভাবে বুঝে নিলেম, আমার পক্ষে অনুকূল।

    আমরা বাড়ী এলেম। সেদিন বড়বাবু আমার উপর বেশী সন্তুষ্ট। সেই দিন থেকে অন্দরে একটী ঘরে রাত্রে আমার শয়নের বন্দোবস্ত হলো। ভাগ্যদেবতাকে ধন্যবাদ দিয়ে সে রাত্রে আমি নিরুদ্বেগে নিদ্রাসুখ অনুভব কোল্লেম। বোধ হলো যেন, জন্মাবধি তেমন সুখে একদিনও আমি ঘুমাই নাই।

    ক্রমে ক্রমে বাড়ীর মেয়েদের সঙ্গে আমার বেশ জানাশুনা হলো, সকলেই আমাকে বেশ ভালবাসলেন। বড়বাবুর পূর্ব্ববাক্য সার্থক। বড়-বৌটীকে আমি মা বলি, নূতন-বৌটীকে ছোট মা, বাবুর ভগ্নী-দুটীকে পিসীমা, বাবুর পিসীমাকে দিদিমা, মেজো-বৌকে আর ছোট-বৌকে কাকীমা, বাবুর পিসীমার মেয়ে-দুটীকে বড়পিসী, ছোটপিসী, এই রকম সম্পর্ক ধোল্লেম; সম্পর্কানসারে তাঁরাও আমার প্রতি বেশ স্নেহ-যত্ন দেখাতে লাগলেন। দিন দিন সে সংসারে আমার বেশী বেশী আদর।

    একমাস আমার চাকরী করা হলো। কার্য্যালয়ে আমি খোসনামী পেলেম। সেখানে যাঁরা যাঁরা চাকরী করেন, তাঁদের সঙ্গেও বেশ আলাপ-পরিচয় হলো, মনের সুখেই আমি থাকলেম। সোণাপুরা মহল্লায় অনেকগুলি বাঙ্গালীর বাস; বড়বাবুর পরিচয়ে রবিবারে রবিবারে তাঁদের এক একজনের বাড়ীতে আমি যাই, বাড়ীর ছেলেদের সঙ্গে আলাপ হয়, কর্ত্তারাও আমার পরিচয় পান, সে সকল বাড়ীতেও আমার অনাদর হয় না। পূণ্যক্ষেত্র বারাণসীধাম আমার যেন চিরদিনের পরিচিত, জন্ম-কর্ম্ম সকলই যেন কাশীতে, দিন দিন আমার এই রকম জ্ঞান হোতে লাগলো।

    নূতন আশ্রয়ে দুই মাস অতীত, দুই মাস চাকরী। বড়বাবুর মধ্যম সহোদরের নাম রামশঙ্কর, কনিষ্ঠের নাম মতিলাল, এ কথা পূর্ব্বেই বলা হয়েছে; সকল দিন তাঁরা বাড়ীতে আসেন না, রামনগরে থাকেন, মাঝে মাঝে আসেন, তাঁদের সঙ্গে আমার বেশী ঘনিষ্ঠতার অবসর ঘটে না; যখন যখন দেখা হয়, আমি তাঁদের কাকাবাবু বোলে সম্মান জানাই। ছোটবাবু আমার সঙ্গে কথা কন, হাসির কথা হোলে হাসেন, কিন্তু মেজোবাবু যেন আর এক রকম। দৈবাৎ তিনি আমাকে এক একটা কাজের হুকুম করেন, হকুম আমি তামিল করি, তিনি কিন্তু তুষ্ট হন না; মুখ যেন সৰ্ব্বদাই ভার ভার। মুখ দেখে মনে হয়, এই বাবুটীর মনে মনে বেজায় অহঙ্কার।

    যে বাড়ীতে দশ দিন থাকতে হয়, কথায় কথায় সেই বাড়ীকে “আমাদের বাড়ী” বলাই প্রায় সকল লোকের অভ্যাস। আমাদের বাড়ীর উত্তরাংশে একটী ভদ্রলোকের একখানি বাড়ী। দুই বাড়ীর মধ্যস্থলে আড়াই হাত ওসারের একটী ক্ষুদ্র রাস্তামাত্র ব্যবধান। এক বাড়ীর ছাদে দাঁড়ালে দ্বিতীয় বাড়ীর ছাদের লোকের সঙ্গে বেশ কথাবার্ত্তা কওয়া যায়। চেঁচাতে হয় না; মৃদুকথোপকথনেও পরস্পরের বিলক্ষণ সুবিধা আছে। এ বাড়ীতে আমি দুমাস আছি, একদিনও ছাদে উঠি নাই। এক রবিবার অপরাহ্নসময়ে অজ্ঞাত কৌতূহলে একাকী আমি সদরবাড়ীর ছাদে উঠলেম। সদরেও সিঁড়ি আছে, অন্দরেও সিঁড়ি আছে, আমি কিন্তু সদরের সিঁড়ি দিয়ে উঠেছিলেম। দুই মহলে দুই সিঁড়ি বটে, কিন্তু সদর অন্দরের ছাদগুলি সব একটাল; মাঝে মাঝে আর ধারে ধারে ছোট ছোট আলসে। ছাদগুলি দিব্য পরিষ্কার।

    বসন্তকাল। বেলা প্রায় শেষ, রবিরশ্মি প্রায় নিষ্প্রভ, সুশীতল দক্ষিণানিল প্রবাহিত, সময় অতি সুখময়। গগনবিহারী বিহঙ্গকুল গগনাঙ্গনের নিম্নদেশে শ্রেণীবদ্ধ হয়ে বাতাসে উড়ে যাচ্ছে, মাথার উপর নির্ম্মল নীলবর্ণ আকাশমণ্ডল শোভা পাচ্ছে, ইতস্ততঃ উচ্চ নিম্ন শত শত অট্টালিকা নয়নগোচর হোচ্ছে, বড় বড় মন্দিরের চূড়া সৰ্ব্বসৌধ অতিক্রম কোরে যেন গিরিশৃঙ্গের ন্যায় বিরাজিত রয়েছে, দূরে তরলতরঙ্গ ভাগীরথী যেন অস্থিরগামিনী বৃহৎ ভুজঙ্গিনীর ন্যায় দেখা যাচ্ছেন, ছাদের উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই সকল শোভা আমি দেখছি, দেখছি আর পাইচারী কোরে বেড়াচ্ছি, এমন সময় হঠাৎ দেখতে পেলেম, দ্বিতীয়বাড়ীর ছাদের উপর একটী নারীমূর্ত্তি। সে মূর্ত্তি এতক্ষণ সেখানে ছিল না, অল্পক্ষণের মধ্যেই যেন শুক্লপক্ষের সন্ধ্যাকালের তরল মেঘঢাকা চন্দ্রের ন্যায় আশু এসে উদয় হয়েছে। পরমাসুন্দরী নারীমূর্ত্তি! পরিধান একখানি ময়ূরকণ্ঠী চেলী, বুকে সবুজবর্ণ কাঁচুলী, কাঁচুলীর উপর দুহালী সোণার হার, গলায় সোণার উপর ডায়মনকাটা চিক, দুহাতে দুগাছি সোণার বালা, দুকাণে দুটী নীলমণিদল, নাসিকায় একটী গজমুক্তার নোলক, এই পর্য্যন্ত অলঙ্কার; মস্তকে আবরণ নাই, কবরী নাই, পৃষ্ঠদেশে ভুজঙ্গাকার বিলম্বিতপৃষ্ঠ-বেণী। চমৎকার রূপ; সৌখীন বসনভূষণে সেই রূপের আরো চমৎকার খোলতা হয়েছে। নিখুঁত রূপ, উজ্জল শ্যামবর্ণ; দোষের মধ্যে একটু কোলকুঁজো। বয়স কত, ঠিক অনুমান কোত্তে পাল্লেম না, কিন্তু অঙ্গসৌষ্ঠবে পূর্ণযুবতী। হাতে একখানি গোলাপী ফলদার রেশমী রুমাল, সুন্দরী সেই রুমালখানি মুখের কাছে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাওয়া খাচ্ছেন। আমি যদি কবি হোতেম তা হোলে কল্পনাবলে বোলতে পাত্তেম, মুখখানি পদ্মফুল, চঞ্চলহস্তে পদ্মিনী সেই রুমাল দিয়ে ভ্রমর তাড়াচ্ছেন।

    কে এই সুন্দরী? পর্ব্বে কখনো দেখি নাই, ঐ বাড়ীতে কারা থাকে, ঠিক পাশের বাড়ী হোলেও তা আমার জানা ছিল না, রমণীকে দেখে আমার বিস্ময়বোধ হলো। রমণীর লজ্জা নাই। আমি যেন বালক, আমাকে দেখে লজ্জা না আসতে পারে, কিন্তু এ সময় অন্যান্য বাড়ীর অনেক পুরুষ ছাদে উঠেছে, তথাপি লজ্জা নাই! রমণী স্বচ্ছন্দে অনাবৃতবদনে রুমাল সঞ্চালন কোত্তে কোত্তে, থেকে থেকে নৃত্য-ভঙ্গীতে খোলাছাদে পরিক্রমণ কোচ্ছেন। আমিও পরিক্রমণ কোচ্ছিলেম, মূর্ত্তিদর্শনে নিস্পন্দ হয়ে এক জায়গায় থোমকে দাঁড়ালেম। কি জানি কেন, আমার দিকে দৃষ্টিপাত হবামাত্র রমণীও থোমকে দাঁড়ালেন। ক্ষণেকের জন্য উভয়ের চারি চক্ষু সমসূত্রে মিলিত হয়ে গেল। যে চক্ষু এতক্ষণ খঞ্জনপক্ষীর ন্যায় নেচে নেচে চতুর্দ্দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, আমাকে দেখে সেই উজ্জ্বল চক্ষু তখন চিত্রচক্ষুর ন্যায় অচঞ্চল; মূর্ত্তিও অচলা।

    আমার লজ্জা এলো। কি আমি দেখছি, কেনই বা দেখছি, কেনই বা দাঁড়িয়ে আছি, অন্তরে অকস্মাৎ এই ভাবের উদয়। মনে মনে আপনাকে আপনি ধিক্কার দিয়ে, চারিদিকে চেয়ে, উপর থেকে নেমে আসবার উপক্রম কোচ্ছি, বাধা পোড়ে গেল। যে ছাদে সেই রমণীমূর্ত্তি, সেই ছাদের সিঁড়ির দরজা উন্মুক্ত হলো, একটী প্রাচীন স্ত্রীলোক ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সেই অচলা মূর্ত্তির কাছে দাঁড়ালো। পরিচ্ছেদের অপারিপাট্য দেখে স্থির কোল্লেম, পরিচারিকা।

    কেবল কি তাই? অহো! এ কি আশ্চর্য্য! এ বৃদ্ধ এখানে কোথা থেকে এলো? এই মূর্ত্তি কোথায় আমি পূর্ব্বে দেখেছি; সত্যই কি এই সেই? দুই তিনবার আড়ে আড়ে চেয়ে চেয়ে দেখলেম, স্মৃতিকে আকর্ষণ কোরে উত্তমরুপে নিরীক্ষণ কোল্লেম. আকর্ষণে পূৰ্ব্বস্মৃতি জেগে উঠলো; সন্দেহ হোচ্ছিল, ঠিক মনে কোত্তে পাচ্ছিলেম না, সে সন্দেহ ঘুচে গেল; তখন আমি নিশ্চয় বুঝলেম, ঠিক সেই! নিশ্চয়ই এই বুড়ী সেই কামিনীর মা;—কলিকাতার বিশ্বেশ্বরবাবুর বাড়ীর চাকরাণী সেই কামিনীর মা।

    এ বুড়ী এখানে কেমন কোরে এলো? কামিনীর মা এখানে কি কোত্তে এসেছে? কার সঙ্গে এসেছে? বিশ্বেশ্বরবাবুর পরিবারেরা কেহ কী কাশীধামে এসেছেন? এই বাড়ীতেই কি তাঁরা বাসা কোরে রয়েছেন? এই সুন্দরী যুবতী তবে কে? এ যুবতী সেখানকার কি এখানকার? কামিনীর মা কলিকাতার চাকরী ত্যাগ কোরে একাকিনী কাশীবাসিনী হোতে এসেছে, এই বাড়ীতেই চাকরী পেয়েছে, এটাও একবার মনে ভাবলেম, কিছুই ঠিক কোত্তে পালেম না।

    আর সেখানে সে ভাবে অধিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা ভাল নয়, সন্ধ্যা হবারও বিলম্ব নাই, কটাক্ষে আর একবার মাত্র তাদের উভয়ের দিকে দৃষ্টিপাত কোরেই উপর থেকে আমি নেমে এলেম। বড়বাবু ইতিপূর্ব্বে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন, তিনি ফিরে এসেছেন; বৈঠকখানায় প্রবেশ কোরেই তাঁরে আমি দেখতে পেলেম। অন্তরে ভয়ের সঞ্চার হলো। আমি ঘরে ছিলেম না, না জানি, বাবু রাগ কোরে কি বলেন, সেই ভয়। বাবু তখন অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে কি একটা জিনিস অন্বেষণ কোচ্ছিলেন, সম্মুখে চেয়ে আমাকে দেখেই জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কোথা গিয়েছিলে হরিদাস?”

    সত্য আমি গোপন কোল্লেম না। অন্তরের ভয়কে অন্তরে রেখে স্পষ্টই আমি বোল্লম, “ছাদে উঠেছিলেম; ছাদের উপর থেকে নগরের শোভা বেশ দেখা যায়, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাই আমি দেখছিলেম। একদিনও আমি ছাদে উঠি নাই, মনের উল্লাসে আজ আমি দেখলেম, দৃশ্য বড় চমৎকার!”

    মৃদুহাস্য কোরে বড়বাবু বোল্লেন, “হাঁ হাঁ, উপর থেকে দূরের শোভা দেখায় ভাল : শেষবেলায় যেদিন যেদিন অবকাশ পাবে, এক একবার ছাদের উপর বেড়িয়ে এসো; তাতে উপকার আছে; কৃত্রিম শোভা অপেক্ষা প্রকৃত শোভা উপরে দাঁড়িয়ে অনেক দেখা যায়। বোসো; আজ একটা নূতন খবর আছে! আমার এক বন্ধুর বাড়ীতে একটী বাবু এসেছেন, তাঁর পরিবার সঙ্গে আছে, বাবুটী জমিদার। তিনি এখানে দশটাকা খরচপত্র কোরবেন। দণ্ডীভোজন, সন্ন্যাসীভোজন, সধবাভোজন, কুমারীভোজন, কাঙ্গালীভোজন, বৃষভোজন, এই রকম অনেক কাজ করা সেই বাবুটীর পরিবারের বাসনা। খুব সমারোহ হবে। অন্যদিন হোলে আমরা থাকতে পারবো না, এই জন্য আমি বোলে এলেম, আগামী রবিবার। তুমিও আমার সঙ্গে যেয়ো; ও সব কাণ্ড কখনো দেখ নাই, দেখে শুনে রাখবে। আরো এক কথা। প্রথমদিন তুমি আমার কাছে বীরভূমের নাম কোরেছিলে, যে বাবুটী এসেছেন, তাঁদেরো বাড়ী বীরভূম। বাবুকে দেখে যদি তুমি চিনতে পার—না, সে কথায় এখন কাজ নাই, রবিবার আসুক, যা হয়, সেইদিন দেখা যাবে।”

    সে দিনের কথোপকথন এই পর্য্যন্ত। বীরভূমের বাবু কাশীধামে এসেছেন, পুজো দিবেন, সৎকাজ কোরবেন, কথা ভাল, কিন্তু কোন বাবুটী? যিনি আমাকে সঙ্গে কোরে কলিকাতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি যদি হন, তবে তো ভালই হবে; যা আমার মনে আছে, জিজ্ঞাসা কোরে জেনে নিব, নূতন যা কিছু, আমি জানি, যা কিছু জানতে পেরেছি, তাও একটু একটু জানাবো। বীরভূম আমার পক্ষে দুই প্রকার;—শঙ্কাপ্রদ আর আনন্দাপ্রদ। যে কারণে শঙ্কা, যে কারণে আনন্দ, পাঠকমহাশয় তা অবগত আছেন, এখানে পুনরুক্তি নিষ্প্রয়োজন।

    সোমবার। নিয়মিত সময়ে আমরা কর্ম্মস্থলে গেলেম, নিয়মমত কাজকর্ম্ম কোল্লেম, বৈকালে একটা ঘর থেকে আমি বেরিয়ে আসছি, হঠাৎ দেখি, দুজন লোক আর একটা ঘর থেকে বেরিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে; ঘাড় নেড়ে নেড়ে কত রকম কথা কোচ্ছে, মাঝে মাঝে তুড়ি দিয়ে দিয়ে হাসছে, একজনের বগলে একতাড়া কাগজ। লোক-দুটীর কেবল পশ্চাদ্ভাগ আমি দেখতে পেলেম, মুখ দেখতে পেলেম না; দেখবার জন্য ততটা আগ্রহও জন্মিল না;—সরকারী আদালত, কত লোক আসছে, কত লোক যাচ্ছে, খোঁজ-খবরে আমার দরকার কি? আমি তো ভাবলেম, দরকার কি, কিন্তু যেদিন যেটী ঘোটবার, সেদিন সেটী ঘোটবেই ঘোটবে। সিঁড়িতে নামতে নামতে সেই দুজনের মধ্যে একজন মুখখানা ঘুরিয়ে একবার এদিক ওদিক চাইলে; মুখখানা দেখেই আমি শিউরে উঠলেম। সেদিকে আমার নজর পোড়েছিল, আমার দিকে তার নজর পোড়েছিল কি না, বোলতে পারি না, তবু আমি ভয়ে ভয়ে একটা কপাটের আড়ালে গা- ঢাকা হয়ে দাঁড়ালেম। লোকটার পৃষ্ঠদর্শনে অগ্রেই একটু সন্দেহ জন্মেছিল, কিন্তু কত লোকের পৃষ্ঠে কুব্জ থাকে, কুব্জলোক দেখে ততটা আমি ভ্রূক্ষেপ করি নাই; মুখ দেখে ভয় হলো। লোকটা সেই বীরভূমের বিকট বানরাকার রক্তদন্ত!

    লোকটা কি সৰ্ব্বব্যাপী? বর্দ্ধমানে আমি ছিলেম, আমার মামা সেজে ঐ লোকটা সেইখানে গেল, আবার দেখলেম, সেই লোক বীরভূমে; কলিকাতায় আমি পালিয়ে গেলেম, সেখানেও সেই লোক; আবার দেখছি, সেই লোক এই কাশীতে! কি ব্যাপার? আমার সঙ্গে ঐ লোকের কি লোহা-চুম্বকসম্বন্ধ? যেখানে আমি যাই, সেইখানেই রক্তদন্ত! এ কি আশ্চর্য্য ঘটনা! লোক যদি আমার ইষ্টানিষ্টের সংস্রবশূন্য থাকতো, তা হোলে তো কোন কথাই ছিল না, তা তো নয়, ভাড়াকরা গুণ্ডা এনে বীরভূমে আমার প্রাণবিনাশের চেষ্টা পেয়েছিল! ঐ লোকের সঙ্গে আমার কি যে শত্রুতা, আকাশ-পাতাল ভেবেও কিছু ঠিক কোত্তে পারি না।

    রক্তদন্ত কাশীতে? তবে তো আমার আর কাশীধামে থাকা হয় না! কি জানি, কখন কোথায় ঐ দুরন্তলোকের খর্পরে পোড়ে যাব, হয় তো গলা টিপে ধোরে নিয়ে যাবে, না হয় তো মেরেই ফেলবে! কাশীতে আর থাকা হলো না! বিশ্বেশ্বর কেন এমন কোল্লেন?

    ভাবছি, তারা দুজনে সেই রকম গল্প কোত্তে কোত্তে ক্রমে ক্রমে আমার চক্ষের অন্তর হয়ে গেল, আদালতের সীমার মধ্যেই আর থাকলো না। রক্তদন্তের বগলেই কাগজের তাড়া ছিল, শেষের সিঁড়ি থেকে সে যখন নামে, তখন সেই তাড়ার ভিতর থেকে খানকতক কাগজ সোরে পোড়লো; আমি দেখতে পেলেম, কিন্তু রক্তদন্ত সেটা জানতে পাল্লে না; পশ্চাতেও আর চাইলে না; অন্যমনস্কভাবে সটান বাহিরের দিকে চোলে গেল। তারা আমার চক্ষের অন্তর হবার পর আমি চুপি চুপি গিয়ে সেই কাগজ কখানা কুড়িয়ে নিলেম; কিসের কাগজ, সেখানে আর দেখলেম না, চারিদিক চেয়ে চেয়ে চাপকানের পকেটেই রেখে দিলেম। সবেমাত্র রেখেছি, সেরেস্তা বন্ধ কোরে বড়বাবু সেই সিঁড়ির ধারে এসেই আমাকে দেখতে পেলেন; দেখেই জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “এখানে তুমি? আমি তোমাকে অন্বেষণ কোচ্ছিলেম। চল, আফিস বন্ধ হয়েছে, চল, বাড়ী চল।”

    আমরা বাড়ী চোল্লেম। সারাপথ মনটা আমার ছমছমে; দৃষ্টি চঞ্চল। চলি চলি, চারিদিকে চাই; কোন দিকে সেই রাক্ষসটা দাঁড়িয়ে আছে কি না, চঞ্চলনয়নে বার বার চেয়ে চেয়ে ভয়ে ভয়ে তাই আমি দেখি। আমি পশ্চাতে ছিলেম, বড়বাবু আমার চঞ্চলভাব দেখতে পেলেন না, জানতেও পাল্লেন না। বাড়ীর নিকটে পৌঁছে বড়বাবু আমাকে বোল্লেন, “হরিদাস! তুমি বাড়ী যাও, যে বাড়ীতে সেই বীরভূমের বাবুটী এসেছেন, সেই বাড়ীতে আমি একবার যাব, যাবার কথা আছে, একবার দেখা কোরে শীঘ্রই চোলে আসবো; তুমি বাড়ী যাও।”

    বড়বাবু বন্ধুর বাড়ীতে গেলেন, আমি বাড়ী এলেম। ঠিক সন্ধ্যাকাল। বৈঠকখানায় বাতী জ্বোলেছে; আফিসের কাপড় ছেড়ে, পকেট থেকে সেই কাগজ-কখানি বাহির কোরে সেজের আলোর কাছে আমি বোসলেম। বড়বাবু উপস্থিত নাই, আমার পক্ষে সেটা তখন একরকম ভালই হলো; দুষ্টলোকের দলীলপত্র নির্জ্জনে দর্শন করাই ভাল। খুলে দেখলেম, খণ্ড খণ্ড ৮/১০ খানা কাগজ। কোন কাজের নয়। তিনখানা দরখাস্তের খসড়া, দুখানা চিঠির মুসাবিদা, চারিখানা দাগধরা ছেঁড়া ছেঁড়া দুর্গন্ধ সাদা কাগজ; কেবল একখানি রক্তদন্তের নামের ক্ষুদ্রচিঠি। কৌতূহলবশে মনোযোগ দিয়ে সেই চিঠিখানি আমি পাঠ কোল্লেম। চিঠিতে লেখা ছিল

    “জটাধর।

    অনেক দিন তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় নাই, এখন তুমি কোথায় আছ, কি করিতেছ, তোমার বেতনের টাকা কোন ঠিকানায় পাঠাইব, এই পত্রের উত্তরে তাহা লিখিও। হরিদাসকে কোথাও যদি দেখতে পাও, তাহা হইলে তাহার প্রতি আর তুমি কোন প্রকার দৌরাত্ম করিও না, ভয় দেখাইও না, মুখোমুখি সাক্ষাৎ হইলে মিষ্টকথা বলিয়া আদর করিও। তাহার পর যাহা যাহা করিতে হইবে, বিবেচনা করিয়া যথাসময়ে তাহা আমি তোমাকে জানাইব, ইতি।”

    ইতির পর যেখানে সন-তারিখ ছিল, পত্ৰলেখকের দস্তখৎ ছিল, সে জায়গাটা ছিঁড়ে গিয়েছে, লেখকের নাম আমি জানতে পাল্লেম না। না পাল্লেও সেই লোকটা যে আমার ভাল চেষ্টা করেন, পত্রের আভাষে তা কতকটা আমি বুঝতে পাল্লেম। ভাল চেষ্টা করেন, তাও কিন্তু ঠিক নয়। রক্তদন্তের নাম জটাধর, দাঁতের বিকৃতি দেখে আমি নাম রেখেছি রক্তদন্ত। রক্তদন্ত আমার উপর দৌরাত্ম করে, পত্ৰলেখক সেটা জানেন; না জানলে নিষেধ কোরবেন কেন? পত্রের আভাষে আরো বুঝা গেল, ঐ পত্ৰলেখকের হকুমমতই যেন রক্তদন্ত চলে, বলে, কাজ করে; হকুম তামিলের জন্যই রক্তদন্ত তাঁর কাছে বেতন পায়। সমস্যা বড় কঠিন। লোকটী তবে কে? দস্তখৎ ছেঁড়া, নির্ণয় করবার উপায় নাই। যা-ই হোক, আপাততঃ আমার পক্ষে মঙ্গল, রক্তদন্তকে দেখে আর আমাকে এখন ভয় পেতে হবে না। ধন্য বিশ্বেশ্বর! রক্তদন্তের ভয়ে বিশ্বেশ্বরপুরী পরিত্যাগ কোরে স্থানান্তরে পালিয়ে যাবার সঙ্কল্প কোচ্ছিলেম, রক্ষা পেলেম, এখন আমাকে কাশী ছেড়ে পালাতে হবে না।

    উল্লাসে উল্লাসে প্রস্থান-সঙ্কল্প পরিত্যাগ কোল্লেম, আসলে সন্দেহ থাকলেও মন অনেকটা প্রবুদ্ধ হলো। চোঁতা কাগজগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে দূরে কোরে টেনে ফেলে দিয়ে কেবল সেই ক্ষুদ্র চিঠিখানি আমি যত্ন কোরে তুলে রাখলেম।

    নির্জ্জনে আপন মনে এই কাজগুলি আমি সমাধা কোল্লেম। মনের চিন্তা মনেই থাকলো, অন্য কাজে তখন মনোনিবেশ কোত্তে পাল্লেম না; চুপ কোরে বেসে আছি, মিছামিছি একটা কাজের অছিলা কোরে বৈঠকখানার চাকরটী আমার কাছে এসে দাঁড়ালো। চাকরের নাম যজ্ঞেশ্বর; বয়স প্রায় ৫০/৫৫ বৎসর। বাবুরা যখন কাশীবাস করেন নাই, তার দশবৎসর পূর্ব্বাবধি যজ্ঞেশ্বর তাঁদের দেশের বাড়ীর পুরাতন চাকর। বড়বাবু তাকে সকল কার্য্যেই বিশ্বাস করেন, যথেষ্ট ভালও বাসেন। মেজোবাবুকে আর ছোটবাবুকে যজ্ঞেশ্বর “তুমি তুমি” বলে কথা কয়, বেচাল দেখলে ধমকও দেয়; ছোটবাবু চুপ কোরে থাকেন, মেজোবাবু চোটে চোটে উঠেন; যজ্ঞেশ্বর গ্রাহ্য করে না। আমার উপর যজ্ঞেশ্বরের স্নেহ বোসেছে; ঘনিষ্ঠভাবে আমাকেও “তুমি” বলে, আদরের “তুমি” সম্ভাষণ আমার কাণে বেশ মিষ্ট লাগে।

    বাবু বৈঠকখানায় থাকলেও কোন কাজের কথা বলবার আবশ্যক হোলে যজ্ঞেশ্বর বেপরোয়া জাজিমের উপর এসে বসে, বিশেষ কথা থাকলে বাবুর গা ঘেঁসেও বসে, বাবু তাকে কিছুই বলেন না। ঐ রাত্রে যজ্ঞেশ্বর আমার গা ঘেঁসে বোসে চুপি চুপি বোলতে লাগলো, দেখ হরিদাসবাবু! বাবু তোমাকে ভালবাসেন, তোমার অসাক্ষাতে লোকের কাছে কত প্রশংসা করেন, বাড়ীর মেয়েরাও তোমার গুণের কথা বাবুর কাছে বলেন, বাবু খুসী হন। ছোট বাবুও তোমার উপর তুষ্ট, কিন্তু মেজোবাবুর ভাবটা যেন কেমন কেমন। কোন মন্দকাজ তুমি কর না, কোন লোকের কথাতেও তুমি থাকো না; তবু যেন তোমার উপর মেজোবাবুর কেমন রাগ রাগ ভাব। আজ তিনি অনেক বেলা থাকতে বাড়ী এসেছেন, ছোটবাবু আসবেন না, সেখানকার এক বন্ধুর বাড়ীতে নাচ আছে, রাত্রে সেইখানে তাঁর নিমন্ত্রণ, তিনি আজ রাত্রে আসবেন না, মেজোবাবুরও নিমন্ত্রণ ছিল, কি একটা কথা নিয়ে ছোটবাবুর সঙ্গে বকাবকি কোরে তিনি চোলে এসেছেন; সেই রাগের ঝালটা বাড়ীর ভিতর মেয়েদের কাছে ঝাড়া হোচ্চে। স্পষ্ট কারো নাম কোচ্চেন না, আঁচে আঁচে ঠোকোর দিয়ে যাচ্চেন। দাদার উপরেই যেন বেশী ঝাল। মেয়েগুলি সকলেই এক জায়গায় জমা হয়েচেন, কথার উপর কথা কওয়া কারোর সাধ্য নয়। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মেজোবাবু বোলচেন, ‘সংসারটা একেবারে ছারেখারে দিলে! হিসেব নাই। ওজন নাই! নিকেশ নাই! কেবল বাজেখরচ, কেবল বাজেখরচ! একজন মনিষ রোজগার করে, দশজনে কেবল বেসে বোসে খায়! মামার শালা, খুড়শ্বশুরের সম্বন্ধী, ছোটখুড়ীর সম্পর্কের মাসী-পিসী, মামীশাশুড়ীর নাতনী, পাড়ার পুঁটীপিসীর দেওরপো, এই সকল পরগাছা জুটে অনেক লোকের সংসার মাটী করে। আমাদেরও প্রায় সেই দশা হয়ে এসেচে! দাদা আমার যেন দাতাকর্ণ! বিদেশে আসা গিয়েছে, এখানকার খরচপত্র অনেক, দশ টাকা হাতে থাকলে অসময়ে কাজে লাগে, সে দিকে ভ্রূক্ষেপ নাই! এখানেও পরগাছার বংশবৃদ্ধি! ভাবনা নাই, চিন্তা নাই, কিসে কি দাঁড়াবে, ভুলে একবার সেটা মনে করাও নাই। চাকরী—চাকরী—চাকরী! আরে, চাকরীর আবার বড়াই কি? চাকরী ত তালগাছের ছায়া, কখন আছে, কখন নাই, কে জানে? দাদা আমার চাকরীর গুমোরেই মত্ত। দেলদরিয়া! ছোট ভাইটীকেও সেই রকম বানিয়ে তুলচেন! আমি মাঝে মাঝে এক একটা কথা বলি, সেই জন্যই আমি অবাধ্য, সেই জন্যই আমি গোঁয়ার। আমার একটা কথাও ভাল লাগে না! খোসামুদে লোকগুলো হাত তুলে বলে, রমণবাবুটী আশুতোষ, ভোলা মহেশ্বর! সেই কথা শুনে দাদা আমার একেবারে ভোলানাথ হয়ে গঙ্গাজলে গোলে যান! লোকগুলোরই বা আক্কেল কি? একটা ঘর নষ্ট হয়ে যায়, একটা সংসারে আগুন জ্বলে, সেই আগুনে বাতাস দেয়! বলে কি না, দশজনের ভরণপোষণ করা বড় ভাগ্যের কথা! আরে, আমি যখন ফকির হয়ে বেড়াবো, তখন আমার ভাগ্যের কথা কোথায় থাকবে? পরিবারের পাঁচজনে খায় পরে, সুখে থাকে, এটা কার ইচ্ছা নয়? যার যেমন ক্ষমতা, সে সেই রকমে সংসার চালায়। এত উৎপাত কার ঘরে? এত পরগাছা কে পুষতে পারে? ধৰ্ম্মের ঘরে কুঠের অভাব নাই! আমাদের ঘরটা তাই হয়েছে। অমুক এলো, অমুক থাকলো, অমুকের শালীর মেয়ে, শালীর ছেলে, শালীর বৌমা এসে সংসার আলো কোরে তুল্লেন! থাকলে সব ভাল, না থাকলে দেয় কে? দাদা আমার সবার উপর ইস্কাবনের টেক্কা! কোথা থেকে একটা ছোঁড়া ধোরে নিয়ে এসেছেন, আমরা মায়ের পেটের ভাই, আমাদের চেয়ে সে ছোঁড়াটার বেশী আদর! ঘিয়ের বাটী, ক্ষীরের বাটী, রুইমাছের মুড়ো, নিত্য বরাদ্দ। উঃ! রাগে আমার সৰ্ব্বাঙ্গ জ্বোলে যায়! বাড়ীর ভিতর মেয়েমহলে সেই ছোঁড়াটার শোবার ঘর! উচক্কা উচক্কা বৌ-ঝি যাদের ঘরে, তারা কি পথের লোককে ধোরে এনে বাড়ীর ভিতর শুতে দেয়? যেদিন আমার খপ্পরে পোড়বে, সেই দিন দেখাবো, একবার মজাখানা!’—এই রকম কত কথাই যে ঠেস দিয়ে দিয়ে মেজোবাবু বোলচেন, মুখে আনতে ঘৃণা হয়। একটা দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে আমি সেই সব কথা শুনছিলেম, অনেকক্ষণ আমার দিকে চক্ষু পড়ে নাই, আমি যেমন সেখান থেকে বেরিয়ে সদরে আসবার জন্য মাঝের দরজা পর্য্যন্ত এসেছি, সেই সময়ে আমাকে দেখেই একেবারে আগুন-অবতার! ‘তুই বেটা এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে কি শুনছিলি? থাক, বেটা থাক! বড় বাড় বেড়েচে! জুতো মেরে তাড়াবো! সব আমি জানতে পেরেছি! তুই বেটাও সেই হতভাগা ছোঁড়া বেটার গোলাম হয়েচিস! আরো যে কত রকম গালাগালি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্থির হয়ে শুনতে পাল্লেম না, মনের ঘৃণায় গুম হয়ে বেরিয়ে এলেম। ঝড় এখনো থামে নাই, এখনো ভয়ানক গর্জ্জন হোচ্চে? বড়বাবু বাড়ী এলে সব কথা আমি বোলে দিব; মেয়েদের মুখেও শুনতে পাবেন, তবু যদি মেজোবাবু আমাকে সেই রকম গালাগালি পাড়ে, আমি না হয় চাকরী ছেড়ে দেশে চোলে যাবো, আর আমার কি হবে? দেখ হরিদাসবাবু, তুমি কিন্তু একটু সাবধানে থেকো; মেজোবাবুর সঙ্গে বেশী ঘনিষ্ঠতা কোত্তে যেয়ো না, তার কথায় বেশী উত্তর কোরো না, গোঁয়ার গোবিন্দি-লোক, কি কথায় কি হবে, কখন কি কোরে বোসবে, তোমার জন্য আমার বড় ভয় হয়। আর একদিন আমি—”

    যজ্ঞেশ্বরের কথা শেষ হতে না হতেই চৌকাঠের কাছে বড়বাবু। কোঁচার কাপড়ে চক্ষু মুছে, যজ্ঞেশ্বর তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো, অন্যদিকে চেয়ে, বাবুর পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। বাবু ঘরে এলেন; এসেই আমারে জিজ্ঞাসা কোলেন, “যজ্ঞেশ্বর এখানে বোসে বোসে কি কোচ্ছিল?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “মেজোবাবু বাড়ীর ভিতর কি বকাবকি কোচ্ছেন, অনেক রকম ঝঙ্কার, আমার উপরেও ঠেস ঠাস অনেক; আমি এ বাড়ীতে আছি, আপনি অনুগ্রহ করেন, সেটা তিনি সইতে পারেন না। যজ্ঞেশ্বর আড়ালে দাঁড়িয়ে সেই সব কথা শুনেছিল, সেই অপরাধে যজ্ঞেশ্বরকে তিনি যা ইচ্ছা তাই বোলে গালাগালি দিয়েছেন; যজ্ঞেশ্বর কাঁদতে কাঁদতে আমার কাছে সেই সব কথা বোলছিল।”

    বাবু আর তখন বৈঠকখানায় বোসলেন না, আমারেও আর কিছু জিজ্ঞাসা কোল্লেন না, আপন মনে দুই একটা অস্পষ্ট কথা বোলতে বোলতে বাড়ীর ভিতর চোলে গেলেন। যজ্ঞেশ্বর তখন অন্যঘরে প্রবেশ করে নাই, বারান্দাতেই দাঁড়িয়ে ছিল, তৎক্ষণাৎ আমার কাছে আবার এলো; দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বোলতে লাগলো, “বেশ কোরেচো, বোলে দিয়েছো; বাড়ীর ভিতর যে সব কাণ্ড হয়, সব কথা বাবুর কাণে উঠে না, পিসীমা এক একদিন এক একটা কথা বলেন, সে সব কথা ভেসে যায়, বাবু গুম হয়ে চুপ কোরে শুনেন, রা কাড়েন না।” বোলতে বোলতে যজ্ঞেশ্বর ধীরে ধীরে বোসলে; আবার চুপি চুপি বোলতে লাগলো, “বাবুর কিন্তু ধন্নি বরদাস্ত! ভাল-মন্দ কোন কথাতেই কথা নাই। ভাই-টাকে খুব ভালবাসেন, ছোট ভাইটী কথার বাধ্য, মেজোটী কিন্তু সৰ্ব্বক্ষণ তেরিয়া। যে দিক দিয়ে যা হোক, সব খরচ বড়বাবুর; ভায়েরা যা কিছু রোজগার করেন, আপনাদের সখের খরচেই তার অর্ধেক উড়ে যায়, বাকী অর্ধেক হয় তো জমা থাকে, সংসারে এক পয়সাও সাহায্য করেন না, বড়বাবুও সাহায্য চান না। ছোটবাবু বরং এক একটা ক্রিয়াকর্ম্মের সময় কিছু কিছু দেন, মেজোবাবু চক্ষু বুজে থাকেন। ঐ রকম গায়ের জ্বালা। কৰ্ত্তার আমোল থেকেই আমি আছি, এই সংসারের উপর আমার বড় মায়া, এই বাড়ীকে আমি আপনার বাড়ী মনে করি, ঘরের কথা প্রকাশ কোত্তে নেই, বড় দুঃখেই বোলতে হয়, মেজোবাবুর স্বভাব-চরিত্র একেবারে খারাপ হয়ে গিয়েছে। ছোটবাবুটীরও বদখেয়ালী আছে, কিন্তু সে সব বাহিরে বাহিরে; মেজোবাবুর কাণ্ড-কারখানা কথার কথা নয়; ঘরের ভিতর—না না, কি কেলেঙ্কার কি কেলেঙ্কার! সে সব কেলেঙ্কারের কথা মুখে আনলে প্রাচিত্তির কোত্তে হয়! বেশী দিন তুমি যদি এ বাড়ীতে থাকো, ক্রমে ক্রমে তুমিও অনেক জানতে পারবে। আমি সে দিন—”

    কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে শঙ্কিতচিত্তে আমি বোলে উঠলেম, “না বাপু, সে সব কথা আমি শুনতে চাই না, জানতেও চাই না; সে সব কথা তুমি আমার কাছে বোলো না। কে কোথা থেকে শুনবে, একে আর হয়ে যাবে! একে তো মেজোবাবু আমার উপর চটা, তাতে যদি আবার ঘরের কুচ্ছকথা আমি শুনতে চাই কি জানতে চাই, তা যদি তিনি জানতে পারেন, এই আশ্রয়টী আমি হারাবো; কাশীতে থাকবার আর স্থান পাব না; তুমি চুপ কর। যিনি যা ভাল বুঝেন, তিনি তাই করেন, ভালকাজে ভাল হবে, মন্দকাজে পাপের ফল ভোগ কোত্তে হবে, আমার মত গরিবের সে সব কথায় থাকবার দরকার কি? ওসব কথা ছেড়ে দাও; আমি একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞাসা করি, আমাদের পাশের বাড়ীতে কারা থাকে, তা কি তুমি জানো? ঐ উত্তরদিকের বাড়ীখানা, ছাদে উঠলে যে বাড়ীর ছাদের অন্ধিসন্ধি বেশ দেখা যায়, ছাদের লোকগুলিকেও স্পষ্ট স্পষ্ট দেখা যায়, সেই বাড়ীর কথাই আমি বোলছি। জানো কি?”

    যজ্ঞেশ্বর একটু হাসলে। প্রশ্নের উপর প্রশ্ন দিয়ে আমাকেই জিজ্ঞাসা কোলে, “কেন গো? সে বাড়ীর খোঁজ-খবরে তোমার কি দরকার?”

    অপ্রস্তুত না হয়েই আমি উত্তর কোল্লেম, “দরকার এমন কিছুই নয়, তবু বাড়ীর কাছে বাড়ী, ছাদে যদি কোন দিন উঠি, কিছু যদি দেখতে পাই বুঝে রাখবো, এইমাত্র কথা। একদিন আমি উঠেছিলেম, দুটী স্ত্রীলোককে আমি দেখেছি, একজনের বয়স কম, আর একজন বুড়ী। সেই বুড়ীকে যেন আমি কোথায় দেখেছি, তাকে যেন আমি চিনি, এই রকম বোধ হলো; সেই জন্যই জিজ্ঞাসা কোচ্ছি, ও বাড়ীতে কারা থাকে?”

    একটী নিশ্বাস ফেলে যজ্ঞেশ্বর বোল্লে, “দেখেছো? রোজ রোজ তাদের আমি দেখি। কত রকম ভাব-ভঙ্গী, কত রকম হাসি-তামাসা, কত রকম চক্ষের খেলা, দেখে দেখে আমি পালিয়ে পালিয়ে আসি; ভাব-ভঙ্গী কিছুই বুঝতে পারি না। বাড়ীখানি অনেক দিন খালি ছিল, তুমি এখানে আসবার মাসখানেক আগে কলিকাতার একটী বাবু ঐ বাড়ীতে এসে রয়েছেন, কুড়িটাকা ভাড়া দেন, পরিবার কজন, তা আমরা জানতে পারি না, বাবুটীর নামও জানি না, মাঝে মাঝে তিনি ছাদে উঠেন, তাতেই চেহারাখানা দেখতে পাই; চেহারাখানা বাবুলোকের মত, কিন্তু কে কি বৃত্তান্ত জানবার সুবিধা হয় না। অনুমানে লাগে, কেবল এক পরিবার ভিন্ন আর কেহ সঙ্গে নাই; সঙ্গিনী ঐ বুড়ী।”

    আর আমি কোন কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেম না, যতটুকু শুনলেম, তাতেও কিছু বুঝতে পাল্লেম না। বাড়ীর ভিতর ভারী একটা গোলমাল উঠলো, যজ্ঞেশ্বর ছুটে গেল, আর বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাণ পেতে শুনতে লাগলেম; দুই তিনজনের গলার আওয়াজ। তা উপলক্ষে গণ্ডগোল, স্পষ্ট বুঝা গেল না, আমিও বাড়ীর ভিতর যাই যাই মনে কোচ্ছি, দ্রূতপদে বড়বাবু উপরে এসে উঠলেন। তখনো কাপড় ছাড়া হয় নাই, সৰ্ব্বশরীরে ঘর্ম্ম,—ঘৰ্ম্মজলে গাত্রবস্ত্র পরিসিক্ত, বদন রক্তবর্ণ। ভাব দেখে আমি বুঝলেম, ব্যাপার গুরতর। বৈঠকখানাতেই কাপড় ছাড়া হলো, যজ্ঞেশ্বর একখানি শুল্ক তোয়ালে দিয়ে গাত্র মার্জ্জনা কোরে দিলে, বাবু অনেকক্ষণ নীরব হয়ে একটা তাকিয়ার কাছে বোসে রইলেন। এই সময় সদরবাড়ীতেও চীৎকারশব্দ। কে একজন চীৎকার কোত্রে কোত্তে বাড়ী থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল। পরে শুনলেম, মেজোবাবু। তিনি আর সে রাত্রে বাড়ীতে ফিরে এলেন না, বড়বাবুও তত্ত্ব নিলেন না, অসুখে অসুখেই রাত্রিটা কেটে গেল। কি সুত্রে কি প্রকার কলহ, আমি আর সেটা জানবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ কোল্লেম না। সূত্রের আভাষটা যজ্ঞেশ্বরের মুখে পূর্ব্বেই কতক কতক শনা হয়েছিল, অনুমানে সিদ্ধান্ত কোল্লেম, আমাকে উপলক্ষ কোরেই ভাই ভাই কলহ। কলহে বড়বাবু অনভ্যস্ত, মেজোবাবুই বেশী কথা বোলেছেন, বেশী গোল কোরেছেন, তাতে আর সন্দেহ থাকলো না।

    প্রভাতে বাড়ীর ভিতর মেয়েদের কাছে শুনলেম, মেজোবাবু এ সংসার থেকে পৃথক হবেন, পরিবার নিয়ে স্বতন্ত্র থাকবেন, বড়বাবুর টাকায় বাড়ী, তবুও অংশমত বাড়ীর তৃতীয়াংশের মূল্য আদায় কোরবেন, কারো সঙ্গে আর কোন সংস্রব রাখবেন না। লক্ষণও সেইপ্রকার। মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শনি এই পাঁচ দিনের মধ্যে মেজোবাবু আর একদিনও বাড়ী এলেন না, কোন সংবাদও পাঠালেন না।

    রবিবার। আজ সেই বীরভূমের বাবুর তীর্থোৎসব। কোন বাড়ীতে তিনি এসে উঠেছেন, ঠিক আমার জানা হয় নাই, শুনেছিলেম, কেবল বড়বাবুর এক বন্ধুর বাড়ীতেই সেই সমারোহ হবে। আহারাদির পর বড়বাবু আমাকে সঙ্গে কোরে সেই বন্ধুর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। দণ্ডীভোজন, কাঙ্গালীভোজন আর কুমারীভোজন। পাঠকমহাশয়ের স্মরণ থাকতে পারে, রসিকলাল পিতুড়ী নামে একটী বাবু, আমার কাছে একদিন আমাদের বড়বাবুর পরিবারবর্গের পরিচয় দিয়েছিলেন, এই বাড়ীখানি সেই রসিকবাবুর। বাড়ীতে একটা ক্রিয়াকাণ্ড উপস্থিত হোলে, বাড়ীর লোকেরা, বিশেষতঃ কর্ত্তাপক্ষের পুরুষেরা অত্যন্ত ব্যস্ত থাকেন, উপরে নীচে, ভিতরে বাহিরে, এ ঘর ও ঘর ছুটাছুটি করেন, নিমন্ত্রিত লোকের আদর-অভ্যর্থনা করেন, ছোট বড় কর্ম্মচারিলোকের উপর গলাবাজী করেন; রসিকবাবু আজ সেইরপ ব্যস্ত। বড়বাবু আমাকে একটী ঘরে পাঁচজনের কাছে বসিয়ে রেখে কাৰ্য্যান্তরে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, রসিকবাবুর সঙ্গে এক একটা কার্য্যের পরামর্শ কোচ্ছিলেন, ঘরের ভিতর থেকে এক একবার আমি তাঁদের উভয়কেই দেখতে পাচ্ছিলেম। যে ঘরে আমি, রসিকবাবু সেই ঘরের সম্মুখ দিয়ে দুই তিনবার হন হন কোরে চোলে গিয়েছেন, এক একবার ঘরের দিকেও চেয়েছেন, আমার প্রতি ততটা লক্ষ্য করেন নাই; বোধ হয় তখন তিনি আমাকে চিনতেই পারেন নাই।

    একদিনের দেখা, খানিকক্ষণের পরিচয়, চিনতে পারা ততটা সম্ভবও ছিল না, তিনি আমাকে চিনতে পারেন নাই। একঘণ্টা পরে, বোধ হয় বড়বাবুর মুখে শুনে, রসিকবাবু সেই ঘরে এসে আমাকে দেখলেন, তখন চিনতে পাল্লেন; প্রসন্নবদনে বোল্লেন, “হরিদাস! তুমি এসেছ, বড়ই সন্তুষ্ট হলেম, নানা কাৰ্য্যে আমি ব্যস্ত, এতক্ষণ তোমাকে দেখতে পাই নাই, এখানে তুমি কেন বোসেছ, তুমি ছেলেমানুষ, সদরবাড়ীর ভিড়ের ভিতর তুমি কেন? এসো, বাড়ীর ভিতর এসো, কুমারীভোজন আরম্ভ হয়েছে, দেখবে এসো।”

    আমার মন তখন অন্যদিকে ছিল। রসিকবাবুকে দেখবো, কুমারীভোজন দেখবো, আমি তখন আশা করি নাই; আমার প্রধান আশা কর্ম্মকর্ত্তাকে দেখা। বীরভূমের জমীদার, তিনি আমার পরিচিত কি অপরিচিত, তিনি আমার সেই অকারণ-বন্ধু, নরহরিবাবু কি না, সেইটী জানবার জন্যই আমার চিত্ত ব্যাকুল ছিল, তখন সুবিধা হলো না; রসিকবাবু ডাকলেন, তাঁর সঙ্গে অন্দরমহলে গেলেম। কেবল মেয়েমানুষের ভিড়। হরেক রকম কাপড়পরা, রকমারি গহনা গায়, রকমারি খোঁপাবাঁধা, শতাধিক মেয়েমানুষ। এ বাড়ীর ভিতরমহলটাও চকবন্দী; চারিদিকে টানা বারান্দা, প্রত্যেক বারান্দায় সারি সারি কার্পেটের আসন পাতা, প্রত্যেক আসনের কাছে কাছে পুষ্পচন্দনের রেকাব, আসনের সম্মুখে সম্মুখে পরিষ্কার ধাতুপাত্রে বিবিধ মিষ্টান্ন, দক্ষিণপার্শ্বে এক একটী জলপাত্র। দশজন স্ত্রীলোক একধারে কুমারীগণের পদপ্রক্ষালন কোরে দিচ্ছে, কুমারীরা বাতকম্পিত পদ্মফুলের মত হেলে দুলে এক একখানি আসনে গিয়ে বোসছে। কপাল পর্য্যন্ত ঘোমটা ঢাকা, অষ্টালঙ্কারে ভূষিতা, বারাণসী শাড়ীপরা, একটী শ্যামবর্ণা, সুন্দরী যুবতী গলবস্ত্র হয়ে প্রত্যেক কুমারীর পাদপদ্মে পুষ্পদান, গলদেশে মাল্যদান আর ললাটে রক্তচন্দনের তিলকদান কোরে করপুটে প্রণাম কোচ্ছে। অর্চ্চনাকাৰ্য্য সমাপ্ত হলো, কুমারীরা ভোজনকার্য্যে মনোযোগ দিল। চকের একটী ঘরের দরজার ধারে দাঁড়িয়ে আমি কুমারী ভোজন দেখতে লাগলেম।

    বড় বড় কুমারী। হিন্দুস্থানী কুমারীও আছে, বাঙ্গালী কুমারীও কতকগুলি আছে। বঙ্গদেশে যাজ্ঞবল্ক্য ঋষির বচনপ্রমাণে দশ বৎসরের অধিকবয়স্কা বালিকাগণকে কুমারী বলা হয় না, কাশীতে দেখলেম, বিংশতিবর্ষের ননবয়স্কা কুমারী একটীও নাই; হিন্দুস্থানী কুমারীদের দলে তদপেক্ষা আরো অধিকবয়স্কা রমণীও অনেক। আমার মনের কথার মিলনে সে সকল কুমারীর যদি পরিচয় হয়, তা হোলে আমার মনের অভিধান অনুসারে ব্যাখ্যা হওয়া উচিত, তারা সব প্রৌঢ়া কুমারী। অনুমানে আসে, কেহ কেহ একপুত্রবতী, কেহ কেহ দুই বা ততোধিক সন্তানের গর্ভধারিণী, সূক্ষ্মদর্শকের নয়নে বক্ষঃস্থলের নিম্নভাগের গঠনে কেহ কেহ গর্ভবতী!

    কুমারীদের কারো মুখে ঘোমটা নাই। না থাকার দুই কারণ। বিবাহের অগ্রে আমাদের দেশে ঘোমটা দিবার রীতি নাই, এই এক কারণ, দ্বিতীয় কারণ, সে মজলীসে যুবা অথবা প্রৌঢ়পুরুষ একজনও ছিল না। আমার মত বয়সের আট দশজন বালকের সঙ্গে কতকগুলি স্ত্রীলোক সেখানে পরিবেশনকার্য্যে নিযুক্ত; সুতরাং ঘোমটা নিষ্প্রয়োজন। বালিকারাও কুমারী, যুবতীরাও কুমারী, প্রৌঢ়ারাও কুমারী; অভাবের মধ্যে প্রবীণা প্রাচীন। সধবা কুমারী থাকা সম্ভব হয় না, নিতান্ত অসম্ভবও মনে করা যায় না। সধবার চিহ্ন সীমন্তে সিন্দুর; যে সকল সধবার কুমারীপূজাগ্রহণে আকাঙ্ক্ষা থাকে, তারা স্বচ্ছন্দে অল্পক্ষণের জন্য ললাটের সিন্দুরবিন্দুগুলিকে বিদায় কোরে দিতে পারে; এরূপ প্রক্রিয়ায় সধবাকুমারী জানা যায় না; বিধবা-কুমারী ধরবার তো কোন সম্ভাবনাই নাই; কেন না, বিধবারা সিঁদুরের ধার ধারে না, সিঁদুরের উৎপাতও রাখে না।

    সব মুখগুলি খোলা। একজায়গায় দাঁড়িয়ে যতগুলি মুখ দেখা যায়, কুভাবপরিশূন্য-নয়নে সবমুখগুলি আমি ভাল কোরে দেখলেম। সুন্দরী কুমারী, অসুন্দরী কুমারী, মনে মনে দুই শ্রেণীতে বিভক্ত কোল্লেম; কলসীর উপর কলসী, তার উপর কলসী, গঙ্গাজলপূর্ণ তিন তিন কলসী মাথায় নিয়ে, কাশীর ঘাটের অগন্তি সিঁড়ি ভেঙে, যে সকল গজেন্দ্রগামিনী খোট্টা-মহিলা অক্লেশে গৃহস্থলোকের বাড়ী বাড়ী গঙ্গাজল যোগান দেয়, তাদেরও কেহ কেহ এই কুমারীর দলে আছে, দুই একখানা মুখ দেখে তাও আমি চিনতে পাল্লেম। একে একে চেয়ে চেয়ে দেখতে দেখতে দুখানি মুখের দিকে আমার চঞ্চলনয়ন অকস্মাৎ সমধিক আকৃষ্ট হলো। আমি চোমকে উঠলেম!

    এরাও কি কাশীধামের কুমারী? কি আশ্চর্য্য! মোহনলালবাবু একজন মানীলোক, মান্যগণ্য ধনবান লোক, একজন উপরত প্রসিদ্ধ লোকের জামাতা, তিনি কিরুপে এই গহিত কাৰ্য্যে অনুমতি দিলেন? এ তো দেখছি অমরকুমারী! ভেলুয়া-চটীতে মোহনলালবাবু আমাকে বোলেছিলেন, অমরকুমারী নয়, সেই কন্যাটীকে সম্প্রতি তিনি বিবাহ কোরেছেন। বিবাহটা হয় তো সত্য হোতে পারে, কিন্তু অমরকুমারী নয়, এটা তো আমার কিছুতেই বিশ্বাস হয় না;—তখনও হয় নাই, এখনো হোচ্ছে না। অমরকুমারী নিশ্চয়। আমি যখন অমরকুমারীকে দেখি, তখন অমরকুমারী সত্যই কুমারী ছিলেন; পিতা গরিব, কোন গতিকে কাশীতে এসে, অমরকুমারী আপনাদের দেশস্থ লোকের কুমারী-পুজায় কুমারী হোতে এসেছেন, এটা তত দোষের কথা নয়; কিন্তু সত্য যদি বিবাহ হয়ে থাকে, তবে এটা নিতান্তই জঘন্য কাৰ্য্য। অমরকুমারীর মন আমি বুঝেছি, সরলতাও জেনেছি, সৎশিক্ষার পরিচয়ও পেয়েছি, এমন জঘন্য কার্য্যে সেই অমন সরলচরিত্রা অমরকুমারীর প্রবৃত্তি হবে, এমন তো কখনই বিশ্বাস হয় না। তবে কি মোহনলালবাবু আমার কাছে মিথ্যাকথা বোলেছেন? তাই হয় তো ঠিক হবে। মিথ্যাকথা; বিবাহের কথাটা একান্তই মিথ্যা!

    অমরকুমারীকে আমি দেখলেম, অমরকুমারী আমাকে না দেখেন, সেজন্য সাবধান হোলেম; কপাটের আড়ালে একটু সোরে দাঁড়ালেম। পূর্ব্বে বোলেছি, দুখানি মুখ। একখানি তো অমরকুমারীর, আর একখানি কার? তা আমি জানি না। কার মুখ, তা আমি জানি না বটে, কিন্তু যার মুখ, তারে আমি একদিন দেখেছি;—এই কাশীধামেই দেখেছি। সেই সুন্দরী কিসের লোভে এখানে কুমারী হোতে এসেছে? যখন আমি দেখেছিলেম, তখন দামী দামী অলঙ্কার-বস্তু অঙ্গে ছিল, এখনো দেখছি সেই রকম; তবে এ সুন্দরী এমন ভাবে দানবাড়ীতে কেন বেড়ায়? আরো এক কথা বাঙ্গালীর মেয়ে, এত বয়স পর্য্যন্ত কুমারী আছে, এটাই বা কি? এত কুমারী একত্র, এদের মধ্যে ঐ রকমের আরো কত আছে অথবা সকলেই ঐ রকম, তাই বা আমি কিরুপে জানবো? সকলে একরকম নয়, এমন কথাই বা কে বোলতে পারে? কাশী একেবারে মেয়েলোকের পুরী নয়, যে সকল মেয়েলোকের মাথার উপরে পুরুষ অভিভাবক আছে, সেই সকল পুরুষেরাই বা কোন লজ্জায় এমন সব সধবাবিধবা সুন্দরীগুলিকে ঠাঁটঠমোকে কুমারী সাজিয়ে পাঠায়? খোট্টামহলে কি রকম চলে না চলে তা আমার বিশেষ জানা নাই, কিন্তু বাঙ্গালীমহলে এ কি? একদিন একটী লোক আমাকে বলেছিল, “কাশীর বাঙ্গালীদলে অনেকগুলি বহুরুপী; দেশে যারা ছাগল ছিল, ধরা পড়াতে কিম্বা পড়বার আশঙ্কাতে সেই সকল ছাগল কাশীতে এসে বাবু হয়েছে!”

    সত্যই কি তাই? পূণ্যবানের ভান কোরে তারাই কি সব কাশীবাসী? দেশের ছাগল কাশীর বাবু; দেশের ছাগলী কাশীর কুমারী, কাশীর সধবা; কাশী-রঙ্গভূমির এ রঙ্গ লোমহর্ষণ! ধন্য কাশীরাম! ধন্য বিশ্বেশ্বর! ধন্য মহিমা! মরণেই মুক্তি! মরণের অগ্রে এই সব কাশীবাসী যেন সশরীরে শিবলোকে প্রস্থান কোচ্ছে, ভূতনাথের অনুচর সেজে তালে-বেতালে নৃত্য কোচ্ছে, রঙ্গভঙ্গ দেখে শুনে তাই যেন আমার মনে হয়! বোলেছি, একটী সুন্দরী কুমারীকে একদিন আমি কাশীতেই দেখেছি, সত্য সত্য কুমারী কি না, বিশ্বেশ্বর জানেন; কিন্তু আমি দেখেছি। কোথায় দেখেছি, সেই কথাটী আবার বলি। আমাদের বাড়ীর পাশের বাড়ীর ছাদের উপর। যৌবনভার- মন্থরা, পীনোন্নত-পয়োধরা, রেশমী-রুমালহস্তা, চঞ্চল-কুরঙ্গনেত্রা সুরঙ্গিণী। সেই সুরঙ্গিণীই এই কাৰ্য্য-বাড়ীর একটী পবিত্র কুমারী।

    বাহবা বাহবা বাহবা! বিশ্বেশ্বরের প্রসাদে এই পবিত্র মুক্তিক্ষেত্রে কত রকম তামাসাই যে হয়, কাশীবাসীরাই সেই সকল তামাসার নিত্য-দর্শক, নিত্য নিত্য নূতন নূতন রসভোগী! কাশী আমি ছাড়বো না। রক্তদন্ত কাশীতে এসেছে, রক্তদন্তকে দেখে আমার ভয় হয়েছিল, রক্তদন্তের ভয়ে কাশী ছাড়বার ইচ্ছা হয়েছিল, সে ভয়টা ঘুচে গিয়েছে;— সেই ছেঁড়া চিঠিখানা আমাকে সে ভয় থেকে আপাততঃ পরিত্রাণ কোরেছে। কাশী আমি ছাড়বো না, কতদূরে এই সকল রঙ্গের সমাপ্তি, সেটা আমি দেখবোই দেখবো।

    সে সব দেখা তো ভবিষ্যতের কথা, এখন—এই আজ আমার কি দেখবার সাধ? বীরভূমের জমীদার। যাঁর দৌলতে কুমারী-রঙ্গ দর্শন, তাঁরে আমি কখন দেখতে পাবো, সেই ব্যাকুলতা সৰ্ব্বক্ষণ আমার অন্তরে। কুমারীভোজন সমাপ্ত হলো, রসিকবাবু এসে আমাকে কিছু জল খেতে দিলেন, রসিকবাবুর স্ত্রীর সঙ্গে আমি দেখা কোল্লেম। স্ত্রীটী দিব্য প্রসন্নমুখী, সন্তান হয় নাই; কিন্তু দেখায় যেন দুই তিন পুত্রের জননী, রসিকবাবুর চেয়ে যেন আট দশ বৎসরের বড়। পিতুড়ীর ঘরে “বর বড় কি কোনে বড়,” এই মন্ত্রের যে তো সার্থকতা আছে, এই ভাবটা একবার মনে এলে;—যেমন এলো, তেমনি আবার ডুবে গেল। স্ত্রীটী কিছু স্থূলাঙ্গী, সেই জন্যই বোধ হয়, বড় দেখায়, সেই জন্যই হয় তো পুত্রবতী মনে হয়।

    রসিকবাবু আমাকে সদরবাড়ীতে নিয়ে এলেন, সদরবাড়ীর লোক তখন অনেক পাতলা হয়ে গিয়েছে, একটা ঘরের সম্মুখে আমাদের বড়বাবু একটী লোকের সঙ্গে হেসে হেসে কথা কোচ্ছিলেন, সেই লোকটা দীর্ঘাকার, স্থূলাঙ্গ, বুকে অনেক চুল, শ্যামবর্ণ, গলায় তুলসীমালার সঙ্গে ছোট ছোট মাদুলী, চোমরা গোঁফ, ক্ষুদ্র চক্ষু, টানা ভ্রূ, বাবরী চুল, মাঝখানে সিঁতিকাটা, কথা শুনে বুঝতে পাল্লেম, স্বর বড় কর্কশ। আমি তাঁদের নিকটে গিয়ে দাঁড়ালেম, একটু হেসে বড়বাবু আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি হরিদাস! কুমারীভোজন দেখা হলো?”

    আমার হাসি পেলে। মাথা হেঁট কোরে মৃদু হেসে উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞে হাঁ।” যে লোকটীর সঙ্গে বড়বাবুর কথা হোচ্ছিল, সেই লোকটী আমার দিকে একবার চাইলেন, আমিও তাঁর মুখের দিকে তাকালেম, বোধ হলো, যেন চিনেছি, চেনা মুখ, মনটা কেমন তর্কে উঠলো। সেই সময় বড়বাবু আমাকে বোল্লেন, “যাঁর কথা তোমাকে আমি বোলেছিলেম, ইনিই সেই বাবু, বীরভূমের জমীদার—নাম কানাইলাল বাবু।”

    তর্কের উপর তর্ক। চেহারা দেখে যা অনুমান কোরেছিলেম, নাম শুনে সেই অনুমানটা নিশ্চয়তায় পরিণত হলো। শিষ্টাচারের অনুরোধে হাত তুলে আমি কানাইবাবুকে নমস্কার কোল্লেম, অন্তরে কিন্তু বিজাতীয় ঘৃণা। কলিকাতার জোড়াসাঁকোর বাড়ীতে ঐ মূর্ত্তি আমার একবারমাত্র দেখা, ঐরূপ কর্কশস্বরে এই কানাই আমাকে বিদায় কোরে দিয়েছিলেন। কানাইবাবুর স্বভাবের পরিচয় বীরভূমের বাণেশ্বরবাবুর চাকরদের মুখে শুনা হয়েছিল, মাতুলকন্যার রসের নাগর! সেই কথা স্মরণ হওয়াতেই এই লোকের প্রতি অকস্মাৎ আমার ঘৃণা।

    আমার কাছে কানাইবাবুর পরিচয় দিয়ে, বড়বাবু সংক্ষেপে সংক্ষেপে কানাইবাবুর কাছেও আমার পরিচয় দিয়ে দিলেন। কানাইবাবু আর একবার আমার দিকে চাইলেন, কথাও কইলেন না, চিনতেও পাল্লেন না। তিনি বাবুলোক, আমি গরিব, একদিন একবার পলকমাত্র দেখা, আমি চিনে রেখেছিলেম, তিনি কেন আমার চেহারা মনে কোরে রাখবেন? বীরভূমে তাঁরে আমি দেখি নাই; নাম শুনেছিলেম, কার্য্য শুনেছিলেম, কলিকাতায় একবার দেখেছিলেম, এই পর্য্যন্ত কথা। তাঁর সম্বন্ধে কি কি আমি জানি, তিনি সে কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নাই।

    কানাইবাবু ব্যস্ত, বড়বাবুর কাছে বিদায় নিয়ে তিনি কাৰ্য্যান্তরে অন্যদিকে চোলে গেলেন। বড়বাবু আমারে আর একটা ঘরে নিয়ে বসালেন, তিনি নিজেও সেখানে বোসলেন। সে ঘরে তখন অন্য কেহ ছিল না। নির্জ্জন পেয়ে বড়বাবুকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “ঐ উনিই কি একা এসেছেন কিবা আর কোন জমীদার সঙ্গে আছেন?” বড়বাবু বোল্লেন, “পুরুষের মধ্যে উনি একাকী, পরিবার সঙ্গে আছেন।” আর কোন কথা আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম না। বেলা গেল, রসিকবাবুর সঙ্গে দেখা কোরে বড়বাবুর সঙ্গে আমি বাড়ী চোলে এলেম। সেই রাত্রে আমার অনেক ভাবনা। দুটী ভাবনা প্রধান। কানাইবাবু বীরভূমের জমীদার, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। যতদূর আমি জানি, তাতে কোরে বুঝা যায়, কাশীতে উনি পালিয়ে এসেছেন। সঙ্গে একটী স্ত্রীলোক আছে, তারেই পরিবার বোলে পরিচয় দিয়েছেন। যে স্ত্রীলোকটী বারাণসী শাড়ী পোরে কুমারীগুলিকে ফুল-চন্দন দিলেন, ফুলের মালা পরালেন, তিনিই বোধ হয় পরিবার। আমি যে রাত্রে রক্তদন্তের বাড়ী থেকে নারীবেশে পলায়ন করি, পথে বেরিয়েই ধরা পড়ি, সেই রাত্রে কানাইবাবুর মামার বাড়ীতে আমার বাস হয়; যারা আমাকে ধোরেছিল, তাদের ভুল। কানাইবাবু এখন যারে পরিবার সাজিয়ে কাশীতে এনেছেন, সেই মেয়েটী বাড়ী থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, নারীবেশে আমিই বুঝি সেই, তাই ভেবেই লোকেরা আমাকে ধরে। মেয়েটী কানাইবাবুর মাতুলকন্যা, সেই মাতুলকন্যার প্রেমাসক্ত কানাইবাবু; তিনিই তাকে কুপথগামিনী করেন; নিশ্চয় বুঝলেম, সেই মাতুলকন্যাই এই পরিবার! আর একটা কথা। কানাইবাবু বাল্যাবধি মামার বাড়ীর অন্নদাস; জমীদার অথবা জমীদারপুত্র হোলে কদাচ মাতুলের গলগ্রহ হয়ে থাকতেন না। কাশীতে কানাইবাবু একজন ছদ্মবেশী ভূমিশূন্য ভণ্ড ভূস্বামী, এই পরিচয় ঠিক। বীরভূমে গুপ্তভাবে মাতুলের ঘরজামাই হয়েছিলেন। বাড়ীর ভিতর বেশী দিন ঘরজামাই থাকা চোলবে না, প্রকাশের ভয়ে নায়ক-নায়িকা একে একে তফাৎ হয়ে পড়েন। প্রথমে হয় তো নায়িকাটীকে কলিকাতায় আনা হয়েছিল, তার পর নিরাপদ হবার জন্য পরিবার-পরিচয়ে কাশীতে আনা হয়েছে। ইহার মধ্যেও একটা প্রশ্ন আছে। কানাই যদি জমীদার নয়, তবে কাশীর উৎসবে এত সমারোহ করবার টাকা পেলে কোথা? এ প্রশ্নের উত্তরটা কিছু কঠিন হোলেও আমার অনুমানে অতি সহজ। যে লোক মামার ভাতে মানুষ হয়ে মামার মেয়েকে ঐ ভাবে দখল কোত্তে পারে, তার অসাধ্য কৰ্ম্ম কি আছে? নিশ্চয়ই মামার টাকা চুরি কোরে এনেছে; তীর্থস্থানে বাবুগিরীর টাকাগুলি নিশ্চয়ই চুরিকরা টাকা। এ রহস্য প্রকাশ হবে না, এমন কথাও নয়; পাপকর্ম্ম কত দিন চাপা থাকে? একদিন না একদিন অবশ্যই প্রকাশ হবে। আমি যদি মনে করি, নরহরিবাবুকে চিঠি লিখে অচিরেই ধোরিয়ে দিতে পারি। পারি বটে, কিন্তু কাজ কি? ধর্ম্ম আছেন, দশদিন পরে হোক, একমাস পরে হোক অথবা বর্ষ পরেই হোক, ধর্ম্মের ঢাক বাজবেই বাজবে।

    দ্বিতীয় ভাবনা অমরকুমারী। কাশীর কুমারীদলে অমরকুমারী। আমি কুমারীভোজের আসরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুখের দিকে চেয়ে থাকলেম, আমার দিকেও কতবার চক্ষু পোড়লো, তথাপি অমরকুমারী আমাকে চিনতে পাল্লেন না। ভেলুয়া-চটীতে জ্বলন্ত আগুনের মুখ থেকে যখন আমি উদ্ধার করি, তখনো অমরকুমারী আমাকে চিনতে পারেন নাই। ভাব কি? চেনালোকের সঙ্গে দেখা হোলে, মুখের কথায় না হোক, ভাবভঙ্গী দ্বারাও কিছু কিছু প্রকাশ পায়; কিন্তু কিছুই না। ভাব কি? সরলার ততটা হিতানুরাগ, ততটা দয়া, আত্মীয়তা কোথায় গেল? সত্য কি অমরকুমারী এত অল্পদিনে আমাকে একেবারে ভুলে গেলেন? মোহনলালবাবু, অমরকুমারীকে বিবাহ কোরেছেন, আমি কাশীতে আসবো, অমরকুমারীকে নিয়ে তিনি প্রয়াগে যাবেন, এইরূপ কথা ছিল, অমরকুমারী তবে কার সঙ্গে কাশীতে এসেছেন? বিবাহিতা বালিকা কার মন্ত্রণায় কুমারী সেজেছেন? ভাবলেম অনেক, কিছুই ঠিক কোত্তে পাল্লেম না। মোহনবাবুও হয় তো এখানে এসে থাকবেন, অনুমানে কেবল এইটুকু অবধারণ করা গেল।

    অপরাপর চিন্তা এ ক্ষেত্রে পাঠকমহাশয়ের প্রীতিকরী না হোতে পারে, তাই ভেবে এখন সে সব প্রকাশ কোল্লেম না। রজনী প্রভাত হলো, প্রভাতসূৰ্য্য দেখা দিলেন, যথাসময়ে অস্ত গেলেন, আবার রাত্রি এলো, আবার উষা দেখা দিল, আবার সূৰ্য্যোদয়, আবার অস্ত। এই প্রকারে সপ্তাহকাল সূর্য্যের উদয়াস্ত আমি দশন কোল্লেম। আবার রবিবার। এক রবিবার ছাদে উঠেছিলেম, নূতনমূর্ত্তি দর্শন কোরেছি, আর একবার দেখে আসি, এইরূপ মনে হলো, কিন্তু সাহস কোত্তে পাল্লেম না; কিসে কি হবে, কে কি বলবে, এই শঙ্কায় মনের ইচ্ছাকে মনে মনেই চেপে রাখলেম।