Author: তাহের আলমাহদী

  • চারফুট দূরত্বে একটি পাঁচিল

    চারফুট দূরত্বে একটি পাঁচিল

    বিনোদ ঘোষাল

    [book]

    চারফুট দূরত্বে একটি পাঁচিল

    খাবি খেতে থাকা শিউচরণের চল্লিশ বছরের আধমরা বডিটাকে মেঝেতে নামাল ভিখু আর হনুমান। কপালের ঘাম মুছল দুইজনে। শিউচরণ এমনভাবে শ্বাস নিচ্ছে যে দেখলে যে কেউ বুঝে যাবে যে কোনও শ্বাসই শেষ শ্বাস হবে। ঘরের মধ্যে একটা চাটাই পাতা আর পাশে একটা জলের লোটা। ব্যাস আর কিছু নেই। শিউচরণ মাঝেমাঝেই কেঁপে উঠছে। পৃথিবীর সব অক্সিজেন একবারে টেনে নেওয়ার জন্য সদ্য ডাঙায় তোলা কাতলামাছের মতো হাঁ করছে। কিন্তু অক্সিজেন পাচ্ছে না।

    শিউচরণ মরে যাবে। যাবেই। আজ না হোক কাল কিংবা পরশু। আর সেইজন্য ওকে আনা হয়েছে কলকাতার মেছুয়াপট্টি থেকে সুদূর বেনারসে। সারা রাত মেলট্রেনের মেঝেতে শুয়েই শিউচরণকে নিয়ে এসেছে ওর বহুকালের পুরনো দুই বন্ধু ভিখু আর হনুমান। কুড়ি বছরের পুরনো বন্ধু এই তিনজনে।

    ভিখু মুখ ঝুঁকিয়ে শিউচরণকে দেখল। ঘোলাটে চোখদুটোয় ফ্যালফেলে শূন্য দৃষ্টি। ফুটবলের মতো উঁচু পেট। বুকের খাঁচা উঠছে নামছে। ভিখু মুখ ফিরিয়ে তাকাল হনুমানের দিকে। তারপর দেহাতি হিন্দীতে হনুমানকে বলল একটু খাবার জল এনে দিতে। হনুমান কাঁসার লোটাটার ঢাকনা সরিয়ে দেখল ওতে জল ভরা। ঘোলাটে গঙ্গার জল। ওটা তুলে শিউচরণের মুখের সামনে ধরে ওকে হাঁ করাল। দুঢোঁক জলও ভাল করে খেতে পারল না। শেষ ঢোঁকের জল গালের কষ বেয়ে গড়িয়ে গেল। ভিখু হাতের চেটো দিয়ে সেই গড়িয়ে যাওয়া জলটুকু মুছে দিল। তারপর পুরনো বন্ধুর মাথায় একবার হাত রাখল।

    রামজীর নাম নেয় শিউ। তোর অনেক সৌভাগ্য যে বাবা বিশ্বনাথের দ্বারে এসেছিস মরতে। সোজা স্বর্গলাভ হবে তোর। চলি আমরা। বলে ভিখু হনুমানের সঙ্গে বেড়িয়ে এল ঘর ছেড়ে।

    শিউচরণ একা শুয়ে থাকল মোক্ষভবনের নয় নম্বর ঘরে।

    বেনারসের মোক্ষভবন বিশ্বনাথ মন্দিরের অদূরেই একটি দোতলা বাড়ি। আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর আগে এই বেনারসেরই এক পন্ডিত হরবিলাস শাস্ত্রী তাঁর জীবনের সমস্ত পুঁজি ঢেলে নির্মান করেছিলেন এই বাড়িটি একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। জীবনের অন্তিম শ্বাসটি বিশ্বনাথ ধামে ত্যাগ করে যিনি অক্ষয় মুক্তিলাভ করতে চান তাদের জন্যই গড়েছিলেন মোক্ষভবন। দুইতলা মিলিয়ে মোট বারোটি ঘর। বাড়িটি বয়স এবং পরিচর্যার অভাবে জীর্ন, বিবর্ণ। অনেক জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়েছে, নোনাধরা দেওয়ালে অচেনা সব দেশের বিচিত্র মানচিত্র। কিন্তু এসব নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। কারণ মোক্ষভবন তো হোটেল বা মেসবাড়ি নয়। এখানে যারা থাকতে আসেন তাদের সকলেরই থাকার দিন ফুরিয়েছে, আর কিছুক্ষণের অপেক্ষামাত্র। তখন তার জীবনের সকল লেনদেনের হিসাব শেষ। পৃথিবীর কোনও কিছুতেই তার আর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, একমাত্র পরপারের জন্য প্রতীক্ষা ছাড়া আর কিছু নেই।

    কেয়ারটেকার রামরতন তিওয়ারি এই মোক্ষভবন সামলাচ্ছেন গত চল্লিশ বছর ধরে। এই ভবনেরই একটি ঘরে তিনি থাকেন সপরিবার। জীবনে এত মৃত্যু দেখেছেন যে তার মন দীর্ঘকাল ধরেই জগতের সবকিছুর প্রতি নিরাসক্ত। জীবনধারণের জন্য ন্যুনতম যেটুকু প্রয়োজন সেইটুকুই তার চাহিদা। মোক্ষভবন ট্রাস্ট থেকে তাকে সামান্য কিছু মাসোহারা দেওয়া হয়, আর এই মোক্ষভবনে যারা মোক্ষলাভের আশায় আসেন তাদের পরিবার আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব যদি কিছু দেন, ব্যাস এতেই চলে যায়। সত্তর বছরে পা দেওয়া ‘তিওয়ারিজী’ ও তার পরিবার জগতের প্রতি উদাসীন। তাদের এই ঔদাসিন্য শ্মশানের চন্ডালের মতো নয়, বরং সন্ন্যাসীর মতো।

    তিওয়ারিজির অফিসঘরটা ভবনের মূল দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকেই ডানদিকের প্রথমে। বাড়িটা ফটোফ্রেমের মতো। মাঝখানে বাঁধানো উঠোনে ছোট একটি মন্দির, সেখানে রাম-সীতা-হনুমান, শিব এবং বিষ্ণু তিনজনেই রয়েছেন। তিনটে শিফটিং এ এখানে অষ্টপ্রহর ঠাকুরের নামগান চলে যাতে মুমূর্ষরা ঈশ্বরের নাম শুনতে শুনতে পরপারে যাত্রা করতে পারেন। উঠোনের চারদিকে বারান্দা এবং বারান্দার গায়ে সার সার ঘর। ওই ঘরগুলিতেই এক একজন শুয়ে রয়েছেন এবং সময় গুনছেন। কোনওঘরে কেউ একাই পড়ে রয়েছেন, হয়তো সাতকুলে তার কেউ নেই, পরিচিত বা অপরিচিত কেউ অবস্থা শেষ বুঝে নামিয়ে রেখে গেছেন তাকে অথবা কেউ এসেছেন সপরিবার। এখানে ঘর নিলে সপরিবার থাকারও ব্যবস্থা রয়েছে তবে ওই ঘরটুকুই পাওয়া যাবে। খাওয়াদাওয়া এবং বাকি ব্যবস্থা নিজেদের করে নিতে হবে। যারা একা পড়ে থাকেন তাদের দেখভাল করার জন্য তিওয়ারিজী তো রয়েছেনই আর রয়েছেন তার অ্যাসিসট্যান্ট বুধিয়া। মন্দিরের পুজারিজী লক্ষণপ্রসাদ শর্মাও সেবাতে হাত লাগান। তিওয়ারিজী বা বুধিয়া কিংবা লক্ষণপ্রসাদ যখন তাদের জীবনের প্রথমদিকে এই কাজের ভার নেন, তখন কোনও একাকী মুমূর্ষের মলমূত্র নিজের হাতে পরিস্কার অথবা তার পোশাক বদলানো, খাইয়ে দেওয়া ইত্যাদি নানা সেবার সময় ঘৃণায় কখনও নাক কুঁচকে আসত, বমি পেত, এইসব অপদার্থ মরনাপন্নগুলোর অসহায়তা দেখে মন খারাপের বদলে বিরক্তি লাগত, তারপর একসময়ে সয়ে যেতে যেতে অন্য এক ভাবনা এল তাদের মনে, তা হল পুন্য অর্জনের স্পৃহা। যত সেবা ততই তার নিজের পূণ্য সঞ্চয়ের ঝুলিটি ভরে উঠবে এই মোহ থেকে তারা কাজ করতেন। এই ইচ্ছেও একটা সময় রুগন হতে হতে মরে গেল। পড়ে রইল শুধু অভ্যাস আর নির্লিপ্তি এবং কর্তব্য। গোটা ভারতবর্ষর আনাচ কানাচ থেকে মৃতুপথযাত্রীরা এখানে আসেন জীবনের অন্তিম শ্বাস নিতে। তবে যারা আসেন তাদের মধ্যে শতকরা সত্তরভাগই হিন্দীভাষী এবং দেহাতি। অন্য ভাষার মানুষও আসেন কিন্তু সংখ্যায় খুব কম।

    ভিখু আর হনুমান ঢুকল তিওয়ারিজির অফিস ঘরে। অফিসঘরও ন্যাড়া। একটা টেবিল, চেয়ার আর একটা কাঠের বেঞ্চ। টেবিলের ওপর রাখা একটা রেজিস্টার খাতা, ওই খাতায় আগে মৃতপ্রায় ব্যক্তির নাম ধাম ইত্যাদি সব নোট করে রাখা হয়। আর এক দেওয়ালে একটি বহু পুরনো কাঠের আলমারি। আলমারির পাল্লা নেই। প্রতিটি রগ্ধ্যাকে থরে থরে বাঁধানো খাতা রাখা।

    অফিস ঘরে তিওয়ারিজ নির্লিপ্ত মুখে বসে রয়েছেন। সামনে কয়েকজন লোক। তারা কোনও একটি বিষয়ে হাতজোড় করে অনুনয় করছেন তিওয়ারিজী শান্ত মুখে হিন্দীতে বলছেন, মাপ করবেন আমার কিছু করার নেই। আমি নিয়ম ভাঙতে পারি না। গত চল্লিশ বছরে আমি নিয়ম ভাঙিনি, পনেরো দিনের বেশি একদিনও এখানে রাখার নিয়ম নেই। আমার মনে হয় আপনার বাবুজির এখনও ডাক আসেনি, ওকে বাড়ি নিয়ে যান, নয়তো কাছে অন্য কোনও হোটেলে রাখুন। ভগবানের ডাক না এলে মানুষ যাবে কী করে বলো?

    আর দুটো দিন দেখি মনে হচ্ছে বাবুজী চলে যাবেন।

    শুনে হাসলেন তিওয়ারিজি। শান্ত গলায় বললেন, বাবু এই চল্লিশ বছরে ষোল হাজার পাঁচশ তেষট্টিজন এই মোক্ষভবনে এসেছেন অনন্ত মুক্তি লাভের আশা নিয়ে। ওই যে দেওয়ালের আলমারিতে দেখছেন পুরনো খাতাগুলো, ওগুলো সব পুরনো রেজিস্ট্রার। প্রত্যেকটা এন্ট্রি আমার নিজের হাতে লেখা। এদের মধ্যে কম করে আটশ মানুষ পনেরোদিন থেকেও মুক্তিলাভ না করে ফিরে গিয়েছেন। ওপরওলার ডাক না পেলে, সঠিক সময় না এলে কারও কিছু করার নেই। বাবুজিকে নিয়ে যান। ওঁর আরও পরমায়ূ রয়েছে। দেখছেন তো মাত্র বারোটা ঘর। একটা ঘরে আমরা দুইজনের বেশি রাখতে পারি না। তাও তো এখন শীতকাল নয়, ওই সিজিনে আরও প্রেশার বেশি থাকে। বলে ভিখু আর হনুমানের দিকে তাকিয়ে তিওয়ারিজি বললেন, হ্যাঁ বাবু নমস্কার, বলুন কী সেবা করতে পারি?

    বসে থাকা লোকগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে করতে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেল। ভিখু আর হনুমান এসে বসল ওই বেঞ্চে। ভিখু বলল নয় নম্বর ঘরে আমাদের বন্ধুকে রেখেছি। শিউচরণ।

    আচ্ছা আচ্ছা বলুন।

    ব্যাপার হল যে আমরা কেউ থাকতে পারছি না। আজই চলে যেতে হবে। রুজিরুটির ব্যাপার। ওর কাছে থাকার…

    কোনও ব্যাপার না। মানুষ এসেছেও একা চলে যাবেও একা। আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব এসবই দুইদিনের মায়া। আমরাই দেখভাল করে নেব কোনও চিন্তা করবেন না। তবে অন্তেষ্টি যদি আপনারা করতে চান তাহলে এখানে কাউকে থাকতে হবে না হলে আমরা ব্যবস্থা করব।

    তাই করে দেবেন। কে আসবে কোনও ঠিক তো নেই। শিউচরণের খুব ইচ্ছে ছিল এখানে মরার, তাই আমরা নিয়ে এলাম।

    হ্যাঁ কাশীতে মৃতু মানে মোক্ষলাভ। মা গঙ্গা, বাবা বিশ্বনাথ সকলেই রয়েছেন এই বারানসীতে।

    হুঁ…বলে ভিখু জিজ্ঞাসা করল আচ্ছা টাকা পয়সা কী দিতে হবে?

    তিওয়ারিজী হাসলেন। বললেন মোক্ষভবনে টাকা পয়সা কিছু লাগে না বাবু। জীবনের শেষদিনে আর কোনও বিজনেস চলে না, শর্ত শুধু একটাই পনেরোদিন পেরিয়ে গেলে কিন্তু আর ঘরে রাখা যাবে না, ওকে ফেরত নিয়ে যেতে হবে। সেইজন্য আপনাদের কোনও ফোন নাম্বার থাকলে দিয়ে যান। আমরা যোগাযোগ করে নেব।

    তিওয়ারিজির কথা শুনে ভিখু আর হনুমান মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। হনুমান বলল আসলে আমাদের কারও ফোন নেই। আমাদের মালিকের দোকানের ফোন নাম্বার রয়েছে, সেটা দেব?

    তাই দিন। হনুমান ওর শর্টের বুক পকেট থেকে ছোট একটা নীল রঙের ডায়েরি বার করল। তারপর তিন নম্বর পৃষ্ঠা খুলে একটা নাম দেখিয়ে বলল এই যে এটা আমাদের মালিকের নাম আর নাম্বার।

    তিওয়ারিজি বুঝলেন এরা দুজনেই লেখাপড়া জানে না। তিনি খাতায় শিউচরণের এন্ট্রি যেখানে করেছেন তার পাশে নাম্বারটা লিখে নিলেন।

    বলছি কি…মানে আমাদের মালিক খুব সুবিধার লোক নয়, ওকে আপনি জানালেন কিন্তু ও আমাদের হয়তো কিছুই জানাল না, আর শিউচরণ পনেরোদিন বেঁচে রইল। তাহলে কী হবে?

    তিওয়ারিজি বললেন তাহলে ওকে ঘরে রাখা যাবে না ঠিকই, কারণ ওর পরে যারা আসবেন তাদেরও তো সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু রাস্তায় তো ফেলে আসতে পারি না আমরা। তাই মোক্ষভবনের পিছনে একটা টিনের শেড করা রয়েছে ওখানেই তাদের রাখা হয়। জল-খাবার ইত্যাদি সেবা তারা আগের মতোই পাবেন কিন্তু ঘর পাবেন না। আসলে এখানে যারা আসেন তাদের অনেকেই রয়েছেন যার চালচুলো আত্মীয়পরিজন কেউ নেই, হয়তো তিনি রাস্তার ভিখিরি বা ভবঘুরে তাকেও মোক্ষভবন জায়গা দেয়। এখানে সবাই সমান।

    আচ্ছা। শুনে একটু নিশিন্ত হল দুইজনে। কারণ এখান থেকে একবার চলে গেলে ওদের যে আর ফেরার উপায় নেই দুইজনেই জানে। আর মালিকও জানাবে না শিউচরণের কথা। হনুমান বলল, তাহলে আমাদের কি কিছু দান দিয়ে যেতে হবে?

    দিতেও পারেন, নাও পারেন।

    আচ্ছা, আমরা গরিব মানুষ সামান্য কিছু বলতে বলতে পকেট থেকে একটা একশোটাকার নোট বার করে হনুমান।

    তিওয়ারিজী বললেন আমাকে দিতে হবে না। উঠোনে মন্দির রয়েছে ওখানে প্রণামীবাক্সে দিয়ে দিন।

    আচ্ছা।

    কথার মাঝেই আবার একটা পার্টি ঢুকল। তাদের আত্মীয়কে নিয়ে আসা হয়েছে, শেষ অবস্থা। তিওয়ারিজি খাতা খুললেন। হনুমান আর ভিখু তাকে নমস্কার জানিয়ে বেড়িয়ে এল। মন্দিরের সামনে প্রনামীর বাক্সে একশোটাকার নোটটা গুঁজে মোক্ষভবন ছেড়ে বেড়িয়ে এল ওরা। এতদূর এসেছেই যখন গঙ্গাস্নান করে বিশ্বনাথ দর্শনের পূণ্য রাতে ট্রেনে চাপবে।

    মোক্ষভবনের নয় নম্বর ঘরের মেঝেতে চিত হয়ে শুয়েছিল শিউচরণ। গোটা শরীরে কোনও সাড় নেই। শরীর বলে যে একটা পদার্থ রয়েছে সেটাও টের পাচ্ছে না ও। কখনও চেতনা আসছে আবার কখনও ঘোরের মধ্যে চলে যাছে। দিন সাতেক আগেই ও টের পেয়েছিল দিন ঘনিয়ে এসেছে, তখনই ভিখু আর হনুমানকে জানিয়েছিল ওর শেষ ইচ্ছের কথা। ত্রিশ বছর আগে শিউচরণের দাদাজী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল এই মোক্ষভবনে। তখন শিউচরণের বয়স কত আর হবে এই দশ বারো। দাদাজীকে বড্ড ভালবাসত শিউচরণ। দাদাজী অনেক কাহিনি শোনাত, কাঁধে চাপিয়ে ঘুরতে নিয়ে যেত। তারপর একদিন বিছানা নিয়ে নিল। বাবা আর দাদিমা মিলে দাদাজীকে সেই বেগুসরাইয়ের গাধপুরা গ্রাম থেকে থেকে নিয়ে এসেছিল এই বেনারসের মোক্ষভবনে। বাবা আর দাদিমা ফিরেছিল অনেকদিন পর। বাবার মাথা ন্যাড়া ছিল আর দাদাজী ফেরেনি। শুধু এই ছেঁড়াছেঁড়া কিছু দৃশ্যের স্মৃতি। পরে বেশ কিছুটা বড় হওয়ার পর বাবার কাছে শুনেছিল দাদাজীর অনেককালের ইচ্ছে ছিল বেনারসে গঙ্গামায়ের ঘাটে শুয়ে শেষ নিঃশ্বাস তাগ করার। দাদাজীর ইচ্ছেপুরণ করার জন্য বাবা দাদাজীকে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু টানা তিনদিন গঙ্গার ঘাটে কাটানোর পরেও দাদাজীর মৃতু হল না। তখনই একজন সাধু তাদের সন্ধান দিয়েছিলেন মোক্ষভবনের। ওখানে গিয়ে আরও চারদিন থাকার পর দাদাজী প্রাণ ত্যাগ করে। তারপর একেবারে শ্রাদ্ধ সেরে বাবা গ্রামের বাড়িতে ফিরেছিল। মোক্ষভবন নামটা মনে গেঁথে গিয়েছিল সেই থেকে।

    গলা শুকিয়ে উঠেছে। ঘরের মধ্যে কাদের যেন কন্ঠস্বর। চোখ মেলে পাশ ফিরে দেখতে চেষ্টা করল শিউচরণ, পারল না। ভিখু আর হনুমান যে চলে গিয়েছে সেটা বুঝতে পেরেছে ও। আর কেউ নেই, একা। এবার চলে গেলেই হয়। জীবনে শুধু একটাই আফশোস থেকে গেল শিউচরণের। শুধু একটাই আফশোস। আর সেই আফশোস নিয়ে মরার জন্য যদি আবার ওকে জন্ম নিয়ে ফিরতে হয় সেই ভয় থেকেই ও মনেপ্রানে চেয়েছিল বেনারসে মরতে। কারণ বাবার কাছে শুনেছিল বাবা বিশ্বনাথের ধামে মরলে আর জন্ম হয় না। আর মানবজন্ম চাই না। বড় কষ্ট, বড় যন্ত্রণা। কথাগুলো মনে হতে আবার শরীরে মোচড় দিয়ে যন্ত্রণা এল শিউচরণের। অস্ফুটে আহ করে উঠল। চল্লিশ বছরের শিউচরণের চেহারা বলতে কয়েকটা হাড়কে কোঁচকানো চামড়ার চাদর দিয়ে ঢাকা। হাড় আর চামড়ার মাঝে মানুষের মাংস বলেও যে একটা পদার্থ থাকে সেটা প্রায় সাত আট বছর আগে থেকেই উধাও হতে শুরু করেছিল। অথচ আজ থেকে বছর বিশেক আগে বেগুসরাই থেকে যখন কলকাতা শহরের মেছুয়াপট্টিতে পা রেখেছিল তখন ওর চেহারা পরিণত শালগাছের মতো। হাট্টাখাট্টা জোয়ান। ঘরে অভাব। তাই কলকাতায় চলে এসেছিল কাজের সন্ধানে। মেছুয়া পট্টিতে ফলের বাজারে মুটেগিরি শুরু। তারপর গড়াতে থাকল সময়। তিরিশ বছর ছুঁই ছুঁই। বিয়ে শাদি করার কোনও আগ্রহ ছিল না শিউচরনের। মা চিঠিতে মাঝেমাঝেই লিখত, তোর জন্য মেয়ে দেখছি। শিউচরণ রাজি নয়। বছরে একবার দেশের বাড়ি যেত শিউচরণ। ছটপুজোর সময়। পুরো একমাস কাটিয়ে তারপর আবার কলকাতায় ফিরত। মেছুয়াপট্টিতেই একটা ঘর ভাড়া করে থাকত ছয়জন দেশয়ালি ভাই মিলে। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত ফলের ঝুড়ি, কার্টুন, লরি থেকে খালাস করা, গোডাউনে রাখা, আবার মাল নিয়ে অন্য লড়িতে তোলা। প্রচুর খাটনি। রোজগার মন্দ না। খৈনি ছাড়া আর কোনও নেশা ছিল না শিউচরণের। দুইবেলা কয়েকটা চাপাটি সবজি আর সন্ধেবেলায় পান্ডেজির দোকানের একলোটা গরম দুধ, ব্যাস ওতেই জীবন চলে যাচ্ছিল বেশ। কিন্তু জীবন আর কার চিরকাল একরকম চলে?

    ঘরের ভেতর লোকের কোলাহলটা অসহ্য লাগছে শিউচরণের। একটু একাকিত্ব চাই। একটু নৈঃশব্দ। আআহ… আবার যন্ত্রনাবোধ ফিরে আসছে। পেটে অসহ্য ব্যাথাটা ফিরে আসছে আবার। বার বার ফিরে আসছে একটা মুখ। কপালে দগদগে কমলা রঙের সিঁদূর, নাকে সোনার নথ ফর্সা গোল একটি মেয়ের মুখ, হে রামজি আমাকে এবার তুলে নাও…দয়া করো। মনে মনে কাতর প্রার্থণা করতে করতে ঘাড়টা ডানদিকে হেলে গেল শিউচরণের। ঘরের মধ্যে ওর থেকে ঠিক চারফুট দূরে আরেকজনকে চাটাইতে শুইয়ে রেখে গেল দুই তিনজন লোক। পেটের ব্যাথার চোটে শিউচরণের আবার যেন হুঁশ কিছুটা ফিরেছে। তার মৃতু সহযাত্রীটিকে একবার দেখার জন্য অতি কষ্টে চোখ মেলে ঘোলাটে দৃষ্টি মেলল শিউচরণ, আর সঙ্গে সংগে ওর ওই মৃতপ্রায় শরীরটায় যেন কেউ চারশ চল্লিশ ভোলটের কারেন্ট ছুঁইয়ে দিল। শিউরে উঠল ও। চিৎকার করে কিছু একটা বলে উঠতে গেল কিন্তু শ্লেষ্মা মেশানো খানিকটা ঘড়ঘড় ছাড়া কিছুই বেরলো না মুখ থেকে। নেতিয়ে পড়া হূদস্পন্দন আবার যেন ঘোড়ার মতো ছুটতে শুরু করেছে টের পেল শিউচরণ। ভাল করে আবার দেখল…লোকটাকে। হ্যাঁ ওই…হ্যাঁ হ্যাঁ ও! বাঁ গালের ওই আঁচিল ও কী করে ভুলবে? হ্যাঁ সেই আঁচিল, সেই খাঁড়া নাক। উত্তেজনায় উঠে বসতে গেল শিউচরন, পারল না। চিৎকার করে ডাকতে গেল চারফুট দূরে নির্জীব শুয়ে থাকা লোকটাকে। সেটাও পারল না। আহহহ বড় অস্থির… বড় অস্থির লাগছে। কতযুগ ধরে গালে আঁচিলওলা যে লোকটাকে পৃথিবীর আনাচে কানাচে শয়নে জাগরণে খুঁজেছে শিউচরণ সেই দুলারাম সাহারন এখন ওর থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরত্বে। বুকের ভেতর কে যেন ক্রমাগত একের পর এক ফসস শব্দ করে দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছুড়ে মারছে। জ্বলে জ্বলে উঠছে সেই জায়গাগুলো। নিঃশ্বাস দ্রুত পড়তে থাকল শিউচরণের। দুলারাম! শেষপর্যন্ত শেষমুহূর্তে হলেও দেখা হয়েই গেল! একই ঘরে মাত্র কয়েক ফুট দূরে শিউচরণের জীবনের এক এবং পরম শত্রু যাকে দেখতে পেলেই ও খুন করবে সেই জিঘাংসা নিয়ে বছরের পর বছর নিজের লুঙ্গির গেঁজে ফোল্ডিং ছুরি নিয়ে ঘুরেছে। যার জন্য ওর জীবনটা শেষ হয়ে গিয়েছে, যার জন্য শিউচরণ মাত্র চল্লিশ বছর বয়েসে একা এই মোক্ষভবনের মেঝেতে শুয়ে জীবনের অন্তিম শ্বাসটি নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে সে মাত্র চারফুট দূরে! এই অবিশ্বাস্য সত্যিটাকে প্রাণপনে চিবিয়ে গিলতে গিলতে হড়হড় করে শিউচরণ চলে গেল বেশ কিছু বছর আগে।

    সেবার দেশে ফেরামাত্রই মা বলেছিল এই শেষবার তোকে জিজ্ঞাসা করছি বিয়ে করবি?

    না।

    একটা মেয়ের ছবি দিয়ে গিয়েছে শাস্ত্রীজী। দেখ, যদি এটাও ভাল না লাগে তাহলে আর বলব না।

    মায়ের বাড়ানো ফটোটায় নেহাত অনিচ্ছায় চোখ রেখেছিল শিউচরণ তারপর সেই ছবিতে রাখা চোখ আর সরাতে পারেনি। সেবার আর এক মাস নয়, টানা দেড় মাস দেশের বাড়ি থেকেছিল শিউচরণ। মুঙ্গেরের সাজুয়া গ্রামের মুন্নালাল যাদবদের ছোট মেয়ে পিয়ারির সঙ্গে বিয়ে, ফুলশয্যা সেরে তবেই কলকাতায় ফিরেছিল ও। ফিরে মন টেঁকেনি কাজে। মাস খানেকের মধ্যে শরীর খারাপের অছিলায় আবার ফিরে গিয়েছিল দেশে তার পিয়ারির কাছে। পিয়ারি…আহা ভগবান যেন অনেক যত্ন করে বানিয়েছিলেন পিয়ারিকে। নইলে দেহাতে গরিবের মেয়ে হয়ে, খাটালে গু গোবর সাফ থেকে ঘরের-বাইরের সব কাজ করেও এত রূপ! যেন সিনেমার হিরোয়িন! রামজীর ভজন কীর্তন গাইতেও যেমন ভাল পারত তেমনই পারত সিনেমার গান গাইতে। ছবিতে পিয়ারিকে দেখেই মজে গিয়েছিল শিউচরণ। তার মনে হয়েছিল এতদিন অপেক্ষা করা সার্থক। আর এই মেয়ে যেন তারই জন্য বসেছিল। তারপর ঝট মাঙ্গনি পট শাদি। গরিব ঘরের মেয়ে কুড়ি বছর বয়েসি পিয়ারির সঙ্গে গরিব ঘরের ত্রিশ বছর বয়সের শিউচরণের বিয়ে হল এই বিশাল পৃথিবীর এককোনে। আকাশ থেকে কোনও পুষ্পবৃষ্টি হল না, আকাশে হাইউবাজিও জ্বলল না, কিন্তু শিউচরণের মনে শত শত ফুল ফুটল, চোখে জ্বলে উঠল হাজার হাজার রঙিন হাউই। এত রূপসী, গুণবতী বউকে নিয়ে সে কী করবে বুঝে পায় না। আর ছলাকলাতেও পিয়ারির দুরন্ত প্রতিভা। দ্বিতীয়বার দেশের বাড়ি যাওয়ার পর পিয়ারি বায়না ধরল কলকাতা শহর দেখব। শিউচরণও চাইছিল পিয়ারিকে নিজের কাছে রাখতে। নিয়ে এল কলকাতা। হাওড়াব্রিজ, ভিক্টোরিয়া, চিড়িয়াখানা তো দেখলই, আর দেখল সিনেমা হলে সিনেমা। শিউচরণ আর দেশের বাড়িতে পাঠাল না, বড়বাজার অঞ্চলেই বন্ধুবান্ধবদের চেনাশোনায় খুপরি ঘর ভাড়া নিল একটা। পিয়ারির শরীরের গন্ধে, স্বাদে ডুবে গেল ডুবে গেল শিউচরণ। পিয়ারির যেন ঠিক ততটা আগ্রহ নেই শিউচরণের শরীরে ডুবতে, বরং ওর বেশি প্রিয় জরিচুমকি দেওয়া শাড়ি, রঙিন চুড়ি, সুন্দর গন্ধওলা সাবান, শ্যাম্পু, আরও সব সাজগোজের জিনিস। এক বছর গড়াল, তারপর দুই…শিউচরণের মা তার বউমাকে জিজ্ঞাসা করল নাতির মুখ কবে দেখব? বউমার মুখ উত্তর নেই। শিউচরণেরও না। কী উত্তর দেবে? নাতি উৎপাদনের আয়োজনে ত্রুটি কিছুই নেই, শিউচরণের মতে জমি চষা ঠিকঠাকই হয়েছে কিন্তু ফসল যে সবসময় ভাল চষার ওপর নির্ভর করে না তা যে কোনও কিষানই জানে। তবে সন্তান না হওয়া নিয়ে শিউচরণের বাপ মা শ্বশুর শাশুড়ি যতটা চিন্তিত ছিল ওরা দুজনে কেউই অতটা অখুশি ছিল না। পিয়ারি তো বেশিই খুশি ছিল, কিন্তু কলকাতার জল যত শরীরে পড়ছিল যত শরীরের জেল্লা বাড়ছিল ওর চাহিদাও বাড়ছিল লাফিয়ে। শিউচরন উদয়অস্ত খাটত বউয়ের চাহিদার যোগান দিতে। কারণ ওর জীবন হয়ে উঠেছিল পিয়ারিময়। জগতে পিয়ারির হাসিমুখ ছাড়া ও আর কিছু দেখতে চাইত না। মেছুয়াপট্টির এক সামান্য মুটের পক্ষে যতটা রোজগার করা সম্ভব ততটা করতে করতে তার চেয়েও বেশি করতে গিয়ে ধুঁকতে শুরু করেছিল ও। কিন্তু পিয়ারির কোনও হুঁশ নেই। সে নিজেকে নিয়েই বুঁদ। ঘরে একটা বড় আয়না, সেখানে পারলে সারাদিন দেখে নিজেকে। বছর কয়েকের মধ্যেই শিউচরণ তার কাছে পুরনো আর একঘেয়ে হয়ে উঠল। শিউচরণের চোখের মুগ্ধতা আর ভাল লাগছিল না তার। সুন্দরী বউ বলে বন্ধুমহলে শিউচরণ যত না খাতির পেত বউয়ের আঁচলধরা ভেড়ুয়া এই কথা তাকে শুনতে হত অনেক বেশি। কিন্তু তাতে শিউচরণের পৌরুষে এতটুকু আঘাত লাগত না, বরং আরাম লাগত। পিয়ারিকে ও ভালবাসে এই অনুভূতিটাই ওকে তৃপ্তি দিত বেশি। কিন্তু পিয়ারির চাহিদা বাড়ছিল। সেই চাহিদার খোঁজ পেল ফলপট্টির দালাল দুলারাম সাহারন। বাঁ গালে আঁচিলওলা পয়লানম্বরের খচ্চর, শিউচরণের বউ সুন্দর দেখতে এইকথা শোনার পর ভাবীর হাতে এককাপ চা খাব এই আবদারে সে শিউচরণের সঙ্গে এসেছিল ওই ঘরে। সরল বিশ্বাসে সেই বেইমানকে ঘরে মেহমান করে নিয়ে এসেছিল শিউ। তারপর সেই চা খাওয়া তার বাড়তে থাকল। শিউচরণ ঘরে না থাকলেও চা খেতে চলে আসতে থাকল। পকেটে দালালির কাঁচা টাকা, রাজস্থানী সুঠাম ফর্সা চেহারা, মুখে বড় বড় বুকনি, পিয়ারি গলে গেল খুব দ্রুত। দুলারাম আসা মানেই ভাল ভাল উপহার, শিউচরণের থেকে অনেক সুন্দর আদর। আরও ভালভাবে থাকার স্বপ্ন। শিউচরণ একদিন সন্ধেবেলায় ঘরে এসে দেখল ঘরে বউ নেই। খবর পেল হাতে বাক্স আর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে সে দুলারামের সঙ্গে বেরিয়েছে। শিউচরণ অপেক্ষা করল। রাত পেরিয়ে গেল সেই অপেক্ষায়। আরও দুইদিন সে ঘর থেকে বেরোল না, কিছু খেল না। খবর ছড়িয়ে গেল শিউচরণের বউ দালাল দুলারামের সঙ্গে ভেগেছে। শালা বউয়ের ভেড়ুয়া যেমন…ঠিক হয়েছে। শিউচরণ স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি দুলারাম এমন করতে পারে। ঢের বিশ্বাস করেই পিয়ারির হাতের চা খাওয়ানোর জন্য নিজের ঘরে এনেছিল ওকে।

    তৃতীয় দিনে বড়বাজার থেকেই একটা ছয় ইঞ্চি ফলার ফোল্ডিং ছুরি কিনল শিউচরণ। কলকাতায় দুলারাম কোথায় থাকে সেই খোঁজ নিয়ে সেখানে হানা দিয়ে শুনল বেশ কিছুদিন আগেই সেখান ছেড়ে চম্পট দিয়েছে। কোথায় কোথায় যেতে পারে তার লিস্ট তৈরি করে ছোরা প্যান্টের গেঁজে ভরে মাসের পর মাস পাগলের মতো ঘুরল। রাজস্থানেও গিয়েছিল বাড়িটাও খুঁজে বার করেছিল কিন্তু ওদের পায়নি। তীব্র ক্রোধ, প্রতিহিংসায়, কষ্টে জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছিল শিউচরণ। যত দিন যাচ্ছিল দুলারামকে খুঁজে বের করে ওর বুকের ভেতর ছয় ইঞ্চির ফলাটাকে ঢুকিয়ে দেওয়ার ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে উঠছিল। কিন্তু এত বড় পৃথিবীর কোথায় কোথায় খুঁজবে? তবু যেখানে ও যেতে পারে বলে সামান্য ইশারাও পেয়েছে, ছুটে গেছে। পায়নি। বেমালুম উধাও হয়ে গিয়েছিল দুলারাম পিয়ারিকে নিয়ে। শিউচরণের ইচ্ছে করত গোঁটা পৃথিবীটাকে আঁচড়ে দেখতে কোথায় লুকিয়ে রয়েছে শয়তানটা। আর পিয়ারি? নাহ রাগ নয় বরং এর পরেও কষ্ট হত, চিন্তা হত মেয়েটার জন্য। তখনও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত দুলারাম পিয়ারিকে জোর করে কিংবা কিছু ভুল বুঝিয়ে নিয়ে গিয়েছে, হয়ত পিয়ারি ফিরতে চাইছে, পারছে না, কাঁদছে শিউচরণের জন্য…

    দুলারামকে খুঁজে পেল না শিউচরণ, কিন্তু তার বদলে যেটা পেল তা হল, নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ইচ্ছে। যে শিউচরণ খৈনি ছাড়া আর কোনকিছু নেশা করত না, সে ডুবে গেল মদের বোতলে। দিন রাত এক করে শুধু নেশা আর নেশা। বন্ধুবান্ধবরা বোঝাতে চেষ্টা করে বুঝল এই লোকটা আসলে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার খেলায় নেমেছে। একে আর আটকানোর সাধ্য নেই। হাল ছেড়ে দিল তার কুলি কামিন ঠেলাগাড়িওলা, খালাসি বন্ধুরা। কয়েকবছরের মধ্যেই শিউচরণের বলিষ্ঠ চেহারাটা শুকিয়ে পাকিয়ে নারকেল দড়ির মতো হয়ে গেল। ধুঁকতে শুরু করল ও, মোট বওয়ার মতো আর দম রইল না। ফলে রোজগার কমতে কমতে তলানিতে। আরও বছর দুয়েক পর লিভার পচতে শুরু করল। পেটে জল। সময় শেষ হয়ে এসেছে বুঝে ওর দুই পুরনো বন্ধু ভিখু আর হনুমান যারা সারাদিন খাটাখাটিনির পরেও যতটা সম্ভব শিউচরণের দেখভাল করত তাদের কাছে জানাল নিজের অন্তিম ইচ্ছের কথা। বন্ধুর শেষ ইছে ফেলতে পারেনি। অনেক ঝক্কি নিয়ে আজ রেখে গেল ওকে। পেটের টানে আজ ফিরেও গেল।

    গালের আঁচিলটা ধকধক করে জ্বলছে শুয়োরের বাচ্চাটার। হ্যাঁ ওই আঁচিলটাই ছিল দুলারামের চেহারার বৈশিষ্ট। ইসস ছোরাটা যদি এখন সঙ্গে থাকত…কিন্তু নিজে থেকে উঠে বসার ক্ষমতাও যে নেই শিউচরণের। তবু পারতে হবে, পারতেই হবে। রামজি নিজে ঠেলে পাঠিয়েছেন ওর শত্রুকে নিজে হাতে নিধন করার জন্য, এই সুযোগ ও ছাড়বে না কিছুতেই ছাড়বে না। ওই তো মুখ হাঁ করে নিঃশ্বাস টানছে দুলারাম, খাবি খাচ্ছে। এমনভাবে শ্বাস টানছে যে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে যে কোনও শ্বাসই শেষ শ্বাস হতে পারে। শিউচরণ মনে মনে রামজির কাছে প্রার্থনা করল যেন দুলারাম না মরে। যেন আজকের দিনটা আজকের রাত্তিরটা বেঁচে থাকে…

    প্রায় শেষ হয়ে আসা শরীরদুটো চারফুট দূরত্বে পড়ে রইল সারাদিন। তাদের মুখে গঙ্গাজল, মাথায় ঠাকুরের ফুল ছুঁইয়ে গেলেন পুজারীজি। সন্ধেবেলা গীতার কিছুটা অংশ পাঠ করে গেলেন তিনি। বুধিয়া এসে মাঝেমাঝে দেখে গেল ওদের, মুখে গঙ্গাজল, অল্প দুধ চামচে করে খাইয়ে গেল। বিকেল গড়িয়ে অন্ধকার নামল, ঘরে একটা টিমটিমে বাল্ব। দুলারাম মাঝে মাঝেই গোঙাচ্ছে। ওর বুকের ঘরঘর শব্দ শুনতে পাচ্ছে শিউচরণ। আজ সকাল পর্যন্তও ও নিজের মৃতুর জন্য অপেক্ষা করছিল কিন্তু এখন অপেক্ষা করছে আরেকটু রাত নামার। মাঝে মাঝে চোখ জুড়ে নামছে ঘুম, চেতনা চলে যাচ্ছে শিউচরণের। আবার ফিরে আসছে। ফুটবলের মতো উঁচু পেটের ভেতরে ভসভস করছে লিভার পচা হলদেটে জল। শিউচরণ চোখ বুজে অপেক্ষা করতে থাকল।

    রাত নামল। চারদিক চুপ। অতিকষ্টে চোখে মেলে তাকাল শিউচরণ। বারবার চোখ বুজে আসছে। তাকিয়ে থাকতে বড় কষ্ট। চারদিক ঘোলাটে অন্ধকার। আর সময় নষ্ট করা ঠিক না, দুই হাতে ভর দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করল। নড়তে পারল না। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হতে পিয়ারির মুখটা মনের ভেতর ঝলসে উঠল আর পরমুহূর্তেই ঠিক কী যে হয়ে গেল যেন শরীরে দশ বছর আগের শক্তি এসে গেল ওর। হামাগুড়ি দিয়ে গেল দুলারামের কাছে। দুলারাম খাবি খাচ্ছে। দুইদিকে পা ছড়িয়ে ওর বুকের ওপর চেপে বসল শিউচরণ। দুলারামও চোখে মেলে তাকিয়েছে। বিস্ফারিত দুইচোখে ভয়, তীব্র ভয়, হ্যাঁ চিনতে পেরেছে শিউচরণকে…গালের আঁচিলটা দগদগে ঘায়ের মতো জেগে উঠেছে। দুলারাম ভয়ে চিৎকার করে উঠতে গেল, সেই সুযোগ দিল না শিউচরন। শাঁড়াশির মতো শক্ত দুই হাতের আঙুল দিয়ে চেপে ধরল দুলারামের গলা। দুলারাম দুই হাত দিয়ে ওকে সরাতে গেল। কিন্তু শিউচরণের শরীরে যেন বহুদিন পর অসুরের শক্তি ভর করেছে। দুলারামের দুই চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে ভয়, যন্ত্রনা… আহা কী আরাম লাগছে দেখতে…কপালের রগ, নাকের পাটা ফুলে উঠছে শিউচরণের। নিঃশ্বাস ফেলছে দ্রুত। চোয়াল শক্ত। কপাল ঘেমে উঠছে উত্তেজনায়। দীর্ঘক্ষণ ধরে দুলারামের শ্বাসনালী চেপে রাখল প্রাণপনে। অনেকক্ষণ ধরে ছটফট করে তীব্র মৃতুযন্ত্রণা পেয়ে অবশেষে শিউচরণের হাতে মরল দুলারাম। ওর গালের কালো টপলা আঁচিলটা দপদপ করতে করতে থেমে গেল। দুলারামের বিস্ফারিত যন্ত্রণাক্লিষ্ট স্ট্যাচু হয়ে যাওয়া মুখটা কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করল শিউচরণ। আহহ কী আরাম কী আরাম…! খুনটা করতে করতে, করার পর ওই মরা মুখটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রায় রাত ভোর হয়ে গেল।

    তারপর বুকের ওপর থেকে নেমে আবার চুপিসারে হামাগুড়ি দিয়ে নিজের চাটাইয়ে গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়ল। এতকালের ভারি শরীরটা আজ পালকের মতো হালকা লাগছে। এতদিন ভাবত দুলারামকে মারার পরমুহূর্তে যদি মরে যাই তাহলেও আফশোস নেই কিন্তু আজ এখন মনে হচ্ছে নাহ শুধু আজকের রাতটা যেন মৃতু না আসে, বহুযুগ পর স্রেফ এই রাত্তিরটা একটু ভাল করে ঘুমোতে চাইল শিউচরণ।

    পরদিন সকালে মোক্ষভবনের বুধিয়া এসে দেখল পাশাপাশি মানুষদুটো একইভাবে শুয়ে। কারোরই হুশ নেই। প্রথমে শিউচরণের সামনে এসে নাকের সামনে আঙুল রাখল। খুব হালকা শ্বাস চলছে, আর হয়ত কয়েকঘন্টা। তারপর ওর পাশে গালে কালো আঁচিলওলা সাতজন্মের চালচুলোহীন ভিখিরিটা, যে গত তিরিশবছর ধরে এই দশাশ্বমেধ ঘাটে বসেই দুইবেলা ভিক্ষা করত, ঘাটের পাশে পড়ে খাবি খাচ্ছে দেখে কয়েকজন পরিচিত সাধু এসে গতকাল ওকে রেখে গেছিল মোক্ষভবনে, তাকে পরীক্ষা করে দেখল ওর শেষ দম বেরিয়ে গিয়েছে। বুধিয়া গেল তিওয়ারিজিকে খবর দিতে। মনিকর্ণিকার ঘাটে বাকি ব্যবস্থা। কাঠের আগুনে পুড়ে খাক হয়ে যাবে আরও একটা চির একলা মানুষ। আর গতকাল বিকেল থেকে সম্পূর্ণ চেতনা হারিয়ে ফেলা শিউচরণ এসব কিছুই জানল না।

  • গন্ধ

    গন্ধ

    বিনোদ ঘোষাল

    [book]

    গন্ধ

    চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখছিল কৌশিক। সত্যিই কোনও তুলনা নেই। ওর নিজের বাড়ি থেকে সাইকেলে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে যে এমন একটা বাড়ি যে এই দক্ষিণপাড়ায় থাকতে পারে তা ওর স্বপ্নের অতীত ছিল। দক্ষিণপাড়া হল হাওড়া মেন লাইনের একটি রেলস্টশনের নাম। হাওড়া স্টেশন থেকে মেনলাইনগামী লোকালে ঠিক আটটা স্টেশন পরেই দক্ষিণপাড়া। দক্ষিণপাড়ার পুবদিকে তিন কিলোমিটার দূরে জিটি রোড, গঙ্গা আর পশ্চিমদিকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে দিল্লিরোড। এই আট কিলোমিটার ব্যাস নিয়ে গোলাকার দক্ষিণপাড়া। বেশ পুরনো জায়গা, বিশেষ করে পুবদিকটায় এখনও বেশ কিছু প্রায় দুশো বছরের পুরনো বাড়ির সন্ধান মেলে। পশ্চিমদিক অবশ্য সেই তুলনায় নতুন। ষাট সত্তর বছর আগেও এইদিকটা ঘন জঙ্গলে ভরা ছিল। শিয়াল, বনবিড়াল, বিষাক্ত সাপ ইত্যাদির আখড়া। পরে ধীরে ধীরে জঙ্গল সাফ করে বসতি গড়ে ওঠে। কৌশিকের ঠাকুর্দা আজ থেকে প্রায় ষাঠট বছর আগে এখানে বাড়ি বানিয়েছিলেন তারপর থেকে পাকাপাকি এখানেই। কৌশিকের স্কুল জীবন এই দক্ষিণপাড়া বয়েজস্কুল তারপর কলকাতার কলেজে বাংলা অনার্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন। এখন কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করছে এবং সঙ্গে সরকারি চাকরির জন্য পড়াশোনা। তেইশ বছরের কৌশিকের শখ বলতে একটিই তা হ’ল গিটার। গানবাজনার প্রতি শখ ওর ছোটবেলা থেকেই ছিল, মাধ্যমিক পাশ করার পর খুব ইচ্ছে হল গিটার শেখার। ভর্তিও হল শিখতে। বছর দিয়েকের মধ্যে দিব্বি চলনসই শিখে নেওয়ার পর নিজের মনেই গান আর গিটার নিয়ে থাকে কৌশিক। লাজুক অন্তর্মুখী কৌশিক বরাবরই নিজের জগতে থাকতে ভালবাসে। ওদের বাড়ির পিছনে বেশ খানিকটা সাইকেল চালিয়ে গেলেই এখনও ধানক্ষেত, বাঁশবাগান, ঘন জঙ্গল পাওয়া যায়। যেদিন ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস থাকে না সেদিন বেলার দিকে অথবা দুপুর-বিকেলে কৌশিক সাইকেল চালিয়ে চলে যায় ওইসব জায়গায়। অনেকক্ষণ একা একা ঘোরে, বাঁশবনের ভিজে মাটি, ঠান্ডা পরিবেশ অথবা ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে বয়ে আসা মিষ্টি হাওয়া ওর বড় ভাল লাগে। মন ভাল হয়ে যায়।

    কৌশিকের আজ পর্যন্ত কোনও বান্ধবী হয়নি। দুই একজনকে কলেজে মনে ধরেছিল ঠিকই কিন্তু ওই পর্যন্তই। মনের বাইরে তার আর প্রকাশ ঘটেনি। এমনকি যাকে ওর পছন্দ হয় তাকে ওর ধারে কাছে আসতে দেখলেই ভয় পেয়ে যায় কৌশিক। সঙ্গে সঙ্গে দূরে, আড়ালে সরে যায়। এমন স্বভাব যার, তার প্রেমিকা জুটবে না সেটাই স্বাভাবিক।

    তা নিয়ে যে কৌশিকের খুব আফসোস রয়েছে তাও নয়। বরং এই একা একা থাকার যে একটা মজা সেটা ওর দিব্বি লাগে। কৌশিকের বাড়িটা যেখানে সেই জায়গাটা দিন পনেরো আগে পর্যন্তও খুব চুপচাপ ছিল। কিন্তু হপ্তা দুয়েক আগে থেকে সেই শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে। বাড়িতে কৌশিকের ঘরের বড় জানলা যেদিকে মুখ করে তার থেকে ঠিক কুড়ি ফুট দুরেই ধীরেনকাকাদের বাড়ি। ওদেরও অনেক পুরনো বাড়ি। সেই বাড়ি কিছুদিন আগে থেকে আগাপাশতলা সারাইয়ের কাজ চলছে। ধীরেনকাকুর ছেলে মলয়দা ভাল চাকরি করে। সেই বাড়ি রেনোভেনশনের কাজ শুরু করেছে ফলে রাজমিস্ত্রি, পাথর কাটার মিস্ত্রি, ঢালাই মেশিন, লেবারদের হৈ হৈ সবমিলিয়ে এক ভয়ংকর দুর্যোগ। এত হট্টগোলে জাস্ট পাগল পাগল লাগছিল কৌশিকের। কতদিনে এর থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে জানা নেই। যে আয়োজনে কাজ শুরু হয়েছে তাতে স্পষ্ট কম করে মাস দেড়েকের ধাক্কা। এমন হলে জীবন আর বেশিদিন নেই। কী করা যায় তাই ভাবতে ভাবতেই আজ সকালে কৌশিকের বন্ধু বুদ্ধদেব এসে হাজির। স্কুল বেলার বন্ধু। কয়েক কথার পরেই কৌশিক বলেছিল আর পারছি না ভাই, মনে হচ্ছে খুব শিগগিরিই পাগল হয়ে যাব। সারাক্ষণ মাথার ভেতরে যেন কেউ হাতুড়ি পিটছে।

    বুদ্ধদেব ওর বন্ধুকে চেনে। বলল কোথাও ঘুরতে চলে যা।

    কতদিন? সাতদিন দশ দিন পনেরো দিন? তারপর? এ তো মাস দুয়েকের আগে থামবে না।

    বুদ্ধ ঠোঁট কামড়ে বলেছিল একটা জায়গায় তোর থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারি, পুরো ফ্রিতে। যদি রাজি থাকিস তো কথা বলে দেখতে পারি।

    কোথায়?

    এই দক্ষিণপাড়াতেই। বিউটিফুল জায়গাটা। আমি শিওর দেখলে তোর ভাল লাগবে। আরামে যতদিন খুশি থাকতে পারবি। কেউ ডিস্টার্ব করার নেই।

    কী বলছিস রে!

    ঠিকই বলছি। যাবি দেখতে?

    এখনই চল।

    দুই বন্ধু মিলে তখনই রওনা দিয়েছিল সাইকেল চেপে।

    কৌশিকের বাড়ি থেকে সাইকেলে বেশ কিছুটা পথ, চার কিলোমিটার মতো। দক্ষিণপাড়ার পূর্বদিকে। গঙ্গার কাছাকাছি জিটি রোড থেকে একটু ভেতরের রাস্তার ওপরে একটা পুরনো ফটকের সামনে এসে দাঁড়াল বুদ্ধ। কৌশিককে বলল এই যে এসে গেছি। বিবর্ণ পলেস্তারা চটা দুটো প্রায় দশফুট উঁচু থামের মাঝে ব্ল্যাক জাপান রঙ করা লোহার পাতের গেট। বাইরে থেকে ভেতর দেখা যায় না। একটা থামের গায়ে পাথরের ফলকে লেখা রয়েছে মিত্র ভিলা। লেখাটাও কিছুটা ঝাপসা হয়ে গিয়েছে বয়সের ভারে।

    কৌশিক জিজ্ঞাসা করল, কী করে ঢুকব রে?

    আয় আমি জানি কী করে ঢুকতে হবে। বলে উবু হয়ে বসে ওই গেটের নিচের ফাঁকে হাত ঢুকিয়ে কী একটা টানল তারপর উঠে দাঁড়াল। চল গেট খুলে গেছে। নিচে একটা দড়ি রয়েছে ভেতরের শিকলের সঙ্গে সেট করা। দড়িটা টানলে ভেতরের শিকল খুলে যায়। এটা এই বাড়ির কেয়ারটেকার বাবলুদার টেকনিক, বলে বুদ্ধ বলল, চলে আয় ভেতরে। লোহার দরজাটা ঠেলে সরিয়ে দিল।  দরজা সরা মাত্র কৌশিক দেখল বাড়ির ভেতরটা যেন ওর জন্যই অপেক্ষা করছে। গেট থেকে সোজা চলে গিয়েছে ইট বিছনো লন। লনের দুই ধার ঘন সবুজ লম্বা ঘাসে ঢাকা। বুদ্ধ আর কৌশিক ভেতরে ঢুকল। দরজাটা ভেতর থেকে শিকল টেনে দিল বুদ্ধ। বলল চল এবার। সাইকেল এখানেই থাক।

    প্রায় আধঘন্টা ধরে পুরো বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখল কৌশিক। দক্ষিণপাড়াতে যে এমন বাড়ি থাকতে পারে তা ওর কল্পনার বাইরে ছিল। প্রায় কুড়ি কাঠা জমির ওপর বাড়ি। একতলা। আর বাকিটা জঙ্গল। জঙ্গলের গন্ধ যেন ছেয়ে রয়েছে বাড়িটাকে। কী অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ! পুরো বাড়িটাই উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। বাড়ির চৌহদ্দিতে একটা শানবাঁধানো পুকুরও রয়েছে। যদিও পুকুরের জল দেখেই বোঝা যায় সেটা দীর্ঘদিন অব্যবহূত।

    এই বাড়ির কেয়ারটেকার বছর পয়তাল্লিশের বাবলুদা তার স্ত্রী পুত্র নিয়ে অনেক বছরই রয়েছেন। তবে ওর ঘরটা পুকুরের অপর ঘাটের দিকে। মেন বিল্ডিংটা একতলা হলেও বেশ বড় এবং মেনটেইন্ড। পুকুরের গা দিয়ে সরু রস্তা রয়েছে বাবলুদার টিনে ছাওয়া ঘরের দিকে যাওয়ার জন্য। অনেক গাছ এই বাড়িতে। নারকেল, সুপুরি, আম, জাম, কাঠাল, আতা, জামরুল, কামরাঙা তো রয়েছেই ফুলের গাছও অনেক। জবা, টগর, কল্কের পাশাপাশি কামিনী, গুলঞ্চও রয়েছে। আর বাকিটা লম্বালম্বা ঘাস এবং আগাছার জঙ্গল।

    কেমন বুঝছিস? জিজ্ঞাসা করল বুদ্ধ।

    আমি ভাবতেই পারছি না। মনে হচ্ছে অনেক দূরে কোথাও এসেছি। সেখানে এমন জায়গা, এই হাভেলি…

    এখানে থাকবি? তাহলে বল ব্যবস্থা করে দেব। ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করল বুদ্ধ।

    সত্যি থাকতে দেবে আমাকে?

    বুদ্ধ বলল, একটা দিন সময় দে।

  • আয়না

    আয়না

    বিনোদ ঘোষাল

    [book]

    আয়না

    দুপুর দুটো নাগাদ অফিসে লাঞ্চ সারার পর রাস্তায় বেরিয়ে উল্টোদিকের ফুটেই একটা বাসস্ট্যান্ডে কয়েকজন কলিগের সঙ্গে মিনিট পনেরো কুড়ি আড্ডা দেয় সুব্রত। নয় ঘন্টার ডিউটি আওয়ারে এই আধঘন্টাই একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়। তারপর আবার নিজের ডেস্কে বসে রুদ্ধশ্বাসে এক নাগাড়ে কাজ করে যাওয়া। ওর অফিসটা বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ত্রিভোলি কোর্টে। ফিফথ ফ্লোরে অফিস। অটোমোবাইল স্পেয়ার পার্টস ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি। সুব্রত এ্যাকুন্টস এক্সিকিউটিভ। এইমাসে ছয় মাসের প্রোবেশন পিরিওড শেষ হয়েছে। এখন ও কোম্পানির পারমানেন্ট স্টাফ। ভাল স্যালারি। এই কারণে সুব্রতর খুব খুশি থাকার কথা। কিন্তু গত তিনবছর ধরে সুব্রত কোনও কিছুতেই খুশি হয় না। আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব-পরিচিত সকলেই ব্যাপারটা খেয়াল করেছে, ওকে বারবার জিজ্ঞাসাও করেছে কিন্তু উত্তরে যা সব বলেছে সুব্রত তা একটা বাচ্চা শুনেও বলে দেবে ডাঁহা মিহ্যে। চৌত্রিশ বছরের সুব্রত মজুমদারের এই খুশিহীন জীবনের মূল কারণ ওর স্ত্রী নন্দিনী। আজ থেকে প্রায় তিনবছর আগে খবরের কাগজে পাত্র-পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনসূত্রে শিবপুরের সুব্রতর সঙ্গে বেহালার নন্দিনীর বিয়ে হয়েছিল। ফুলশ্যার পরের দিন রাতে সুবরত তার নতুন বউ এর একটু ঘনিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করতেই তীক্ষ্ণ চিৎকার করে এক ধাক্কায় সুব্রতকে সরিয়ে দিয়েছিল নন্দিনী। প্রথমে বেজায় ঘাবড়ে গিয়েছিল সুব্রত। তারপর ভেবেছিল হয়তো প্রথমবারের ভয়। প্রথম প্রথম অনেক মেয়েরই এমনটা হয়ে থাকে শুনেছে। পরে ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু এইক্ষেত্রে হল না। সপ্তাহ-মাস পেরিয়ে গেল, কিন্তু তবু হল না। একটু ঘনিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করলেই প্রবলভাবে বাধা দিতে থাকে নন্দিনী। সুব্রত জোরাজুরি করলে হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। সুব্রতর মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ে। এসবের কারণ কী? কেন এমন করছে নন্দিনী? সুব্রত বহুবার জিজ্ঞাসা করেছিল ওকে। বুঝিয়েছিল, অভিমান দেখিয়েছিল, রাগ করেছিল, নন্দিনীর একই উত্তর ওইসব খারাপ লোকেরা করে।

    যাববাবা তাহলে তোমার বাবা-মাও খারাপ মানুষ?

    এর উত্তরে নন্দিনী বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিল সাতদিনের জন্য।

    আরেকবার অনেক ভুজুং ভাজাং দিয়ে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে কাউন্সেলিঙ্গের জন্য নিয়ে গিয়েছিল সুব্রত। ফার্সট সিটিং এর পরেই বাড়ি ফিরে নন্দিনীর প্রথম প্রশ্ন ছিল তুমি কি আমাকে পাগল ভাব?

    এ বাবা তা কেন ভাবব?

    তাহলে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে কেন নিয়ে গেছিলে?

    সে তো…মানে দেখো মনে হয় তোমার কিছু একটা প্রবলেম হচ্ছে। সেই জন্যই।

    তা বলে একটা বাইরের লোক আমাদের পারসোনাল লাইফে ইন্টারফেয়ার করবে? আর বিয়ে করা মানে তোমার কাছে শুধুই ওইসব?

    শুধু ওইসব হবে কেন? কিন্তু ম্যারিটাল লাইফে ওটা তো একটা পার্ট।

    ওসব নোংরামোতে যদি এতই সখ থাকে তাহলে বিজ্ঞাপনেও সেটা লিখে দিতে পারতে।

    এর উত্তর কী দেওয়া উচিত মাথায় আসেনি সুব্রতর। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একেবারে গুড়োগুড়ো হয়ে গিয়েছিল। ডিভোর্সের কথাও ভেবেছিল কয়েকবার কিন্তু তার কারণ হিসেবে সবাইকে যেটা বলতে হবে তা ভেবেই লজ্জায় গুটিয়ে গিয়েছিল। দুই একবার পরকিয়ার চেষ্টা করে দেখেছে ওই জিনিসের ধক ওর নেই। এগোতে আর সাহস পায়নি। অগত্যা গাছেদের মতো পুরোপুরি অযৌনজীবন। যৌনতা বলতে শুধু ইন্টারনেট আর টয়লেট। জীবনে অন্যান্য শখ বলতে তেমন কিছু নেই সুব্রত। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিশতে ইচ্ছে করে না আর। গল্প করতে গেলেই অনেক এমন প্রসঙ্গ এসে পড়ে যা ওর পক্ষে খুব অস্বস্তিকর। তাই অফিস থেকে অনেকটা দেরি করেই বেরোয়। কাজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রেখে শান্তি খোঁজে। এই তিনবছরে সুব্রত নন্দিনীর সঙ্গে কোথাও বেড়াতে যায়নি। নন্দিনীও আবদার করেনি। দুইজনে স্রেফ সামাজিকতা রক্ষার দায়ে একসঙ্গে থাকে। রাতে বিছানায় শোবার পর সুব্রতর মনে হয়, ও কোনো খাটে নয়, শ্মশানে শুয়ে রয়েছে।

    আজও দুপুরে লাঞ্চ সেরে বাসট্যান্ডে এসে বসল সুব্রত। বাসস্ট্যান্ডটা ফাঁকাই থাকে। এই রাস্তায় বাসচলাচল খুবই কম। তাই লোহার ছটা চেয়ারও ফাঁকা। আজ সুব্রতর সঙ্গে কৌশিক আর রাজদীপ ছিল। পাশাপাশি  চেয়ারে বসে বেশ আয়েস করে সিগারেট ধরাল তিনজনে। মিনিট কয়েক গল্পগুজবের পরে কৌশিক বলল, দেখেছিস মালটাকে?

    বাকি দুইজন ভাবল কোনও সুন্দরী মেয়েকে দেখার কথা বলছে বোধহয়।

    কৌশিক ফিক করে হেসে বলল তোরা যা ভাবছিস তা নয়, ওই দেখ বলে ও আঙুল তুলল বাসস্ট্যান্ডের ঠিক অপোজিট ফুটপাতে। ওখানে একটা পুরনো  ফার্নিচারের দোকান রয়েছে। সাইনবোর্ডে ইংরেজিতে লেখা হুসেনস ফার্নিচার। বায়ার এন্ড সেলার অফ ওল্ড ফার্নিচারস। ছোট দোকানটাকে রোজই আলোগোছে দেখে ওরা। অত খেয়াল করে না। দোকানটায় সব কর্মচারীই মুসলিম। ফুটপাতের ওপরেই ওধিকাংশ ফার্নিচার রেখে ওরা রিপেয়ার, পালিশ ইত্যাদির কাজ করে। ওই ফুটপাতের ওপরেই দোকানের দেওয়ালে আজ হেলান দিয়ে রাখা রয়েছে বিশাল আকারের একটা আয়না।

    রাজদীপ বলল ধুস শালা আয়না!

    হুঁ খানদানি আয়না। আহ এমন একটা জিনিস ঘরে থাকলে সারাদিন আয়নার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করবে। বলল কৌশিক।

    সুব্রত বেশ মনোযোগ দিয়ে আয়নাটাকে দেখছিল। প্রায় পাঁচফুট লম্বা হবে। আর দুই হাত চওড়া। আয়নাটা ওকে বেশ আকৃষ্ট করল।

    কৌশিক বলল, হেব্বি দেখতে কিন্তু মনে হয় কোনও রইস আদমীর ছিল।

    তাহলে বেচে দিল কেন? জিজ্ঞাসা করল রাজদীপ।

    এটা কে রে? বেচে দিল কেন আমি কী করে বলব? চল ওঠ আড়াইটা বাজল। বলে উঠে দাঁড়াল কৌশিক। ওদের লাঞ্চ আওয়ার শেষ। রাজিদীপও উঠে দাঁড়াল। কৌশিক বলল কী রে সুব্রত ওঠ।

    সুব্রত বলল তোরা যা, আমি একটা কাজ সেরে আসছি।

    ওক্কে বস। ওরা দু’জন চলে গেল। সুবরত সিগারেট ফেলে উঠে দাঁরাল। রাস্তা ক্রস করে দোকানের সামনে এল। আয়নাটার সামনে এসে দাঁড়াল। এত সুন্দর দেখতে সত্যিই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। দেখলেই বোঝা যায় অনেক পুরনো, কিন্তু এত এখনও এত ঝকঝকে যে পুরনো বলে দেগে দেওয়া যায় না। কাচ এখনও চকচকে। আয়নাটা এতই বড় সুব্রত নিজেকে আপাদমস্তক দেখতে পাচ্ছিল। কাঠের ফ্রেম পালিশ করা। ফ্রেমে অপূর্ব কাঠের কারুকাজ। সবথেকে নজর কাড়ে যেটা ফ্রেমের মাথায় এক স্বল্পবসনা নারীর রিলিফ, তার চোখের মনিদুটি লাল কাচের। এতই নিখুঁত যে একবার তাকালে চোখ সরানো যায় না। দেহের প্রতিটি খাঁজ যেন শিল্পী পরম যত্নে কুঁদে তৈরি করেছেন। মেয়েটির শরীরের কোমলতা যেন অনুভব করা যায়। সুব্রত নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। হাত বাড়িয়ে কিছুটা বেখেয়ালেই ছুঁয়ে ফেলল আয়নাটাকে। ফ্রেমে হাত বোলাল তারপর ধীরে ধীরে নিজের আঙুল সরিয়ে নিয়ে যেতে থাকল ওই কাঠের নারী শরীরটির দিকে। সুব্রতর অস্বস্তি হচ্ছিল কিন্তু কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছিল না।

    লে লিজিয়ে বাবু বড়িয়া চিজ।

    চমকে উঠে নিজের হাত সরিয়ে নিল সুব্রত। কথাটা দোকানের ভেতর থেকে এসেছে। সুব্রত তাকিয়ে দেখল দোকানের ভেতর বসে রয়েছে এক বয়স্ক সাদা দাড়িওলা মুসলমান। উনিই দোকানের মালিক।

    সুব্রত কিছু না বলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে।

    লে না হ্যায় তো লে লিজিয়ে। এ্যায়সা চিজ বার বার নেহি মিলেগা।

    না না এমনিই দেখছি। আময়া আমতা করে বলল সুব্রত।

    আরে বাবু দেখতা তো সবহি হ্যায়। লেকিন মিলতা হ্যায় নসিববালোকো। হ্যায় না?

    হুঁ তা ঠিক।

    লে না হ্যায় তো সোচিয়ে মত। ফট সে লে লিজিয়ে, কমতি করকে ছোড় দেঙ্গে।

    তা ভাল জিনিস কম দামে ছাড়বেন কেন? প্রশ্ন করল সুব্রত।

    দুকান ছোটা হ্যায় হামারা। আপ তো দেখহি রহে হো। কিতনা সামান রাখে গা। ঔর ইয়ে সিসাকা চিজ থোরি সি ভি আগর খরোচ লগ যায়ে তো কোই নেহি খড়িদে গা বাবু। ইসলিয়ে…

    হুম…তা দাম কত বলছেন। হঠাৎই প্রশ্নটা করে ফেলল সুব্রত।

    আজ লে না হ্যায়?

    আগে দাম তো শুনি।

    এক কিমত পাঁচ হাজার।

    পাঁ—চ! হাহাহা করে হেসে উঠল সুব্রত। তারপর ঘড়ি দেখে হাঁটা লাগাতে গেল।

    আরে রুকিয়ে বাবু। কেয়া হুয়া?

    আরে দাদা এত দাম! এত টাকা আমার স্যালারিও নয়। এসব বড়লোকেদের জিনিস।

    নেহি নেহি বড়লোক নেহি দিল বড়া হোনা চাহিয়ে বাস। আপ কিতনা দে সকতে হো বতাও?

    আরে আপনি এত দাম বললেন আমি এরপর আর কী বলব?

    ফির ভি কুছ তো বতাকে যাইয়ে বাবু।

    সুব্রত ভেবে পেল না কী বলবে? আর সবথেকে বড় কথা এতবড়  আয়না নিয়ে ও করবে টা কী? ঘরে রাখবে কোথায়? এসব আয়না রাখার জন্য তেমন বাড়ি হওয়া দরকার। তবু দড় করে ফেলেছে যখন কিছু একটা বলা দরকার। সুব্রত বলল, আমি মিডলক্লাস লোক। খুব বেশি হলে হাজারখানেক পারব।

    নেহি বাবু কুছ সোচকে তো বতাইয়ে। চিজ দেখিয়ে আপ? মার্কিটমে কম সে কম আট দশ হাজার তো মিল হি যায় গা। লেকিন ফুরসত কাঁহা।

    না চাচা আমি এর বেশি পারব না। বললাম তো আপনাকে। চললাম আমি। অফিসে ঢুকতে হবে।

    আরে রুকিয়ে জনাব।

    এগোতে গিয়েও আবার থামল সুব্রত।

    আভি লেনা হ্যায়?

    নাহ আজ কী করে নেব? অত টাকা নেই সঙ্গে। আর আমি ঢুকব অফিসে। সুব্রত মনে মনে প্রমাদ গুনল। জিনিসটা কেনার মোটেও ইচ্ছে নেই, দড় করাটাই ভুল হয়েছে।

    ঘর কাঁহা হ্যায় আপকা?

    বহোত দূর, শ্যামবাজার।

    উয়ো দূর কাঁহা। চলিয়ে আপকে লিয়ে দো হাজার মে ছোড় দেঙ্গে।

    সুব্রত কিছুটা একটা বলতে গেল সেই সুযোগ দিল না দোকানদার, তার আগেই বলে উঠল। অব ঔর কুছ মত বলিয়ে। হাথ জোড়তা হু। ইসসে কমমে নেহি দে সকতা। পুরা লস মে দে রহা হুঁ। খড়িদকে পুরা ফঁস গয়া ম্যায়নে।

    সুব্রত কী বলবে বুঝে পেল না। এ তো আচ্ছা ফাঁসা গেল।

    মাল হাম ঘরমে ভেজ দেঙ্গে। পেমেন্ট ঘর মে করেঙ্গে না ইঁহা?

    না না দুই হাজার টাকা সঙ্গে নেই।

    ঠিক হ্যায় কোই বাত নেহি কুছ এ্যাডভান্স দে দিজিয়ে।

    এই রে আমার কাছে আজ বলত বলতে মানিব্যাগ খুলে সুব্রত দেখল মাত্র চারতে একশোটাকার নোট রয়েছে। ও বলল আমি তিনশ টাকা এখন দিতে পারি।

    কোই বাত নেই। আপ তো জান পেহচানওয়ালা হো। এহি বগলকা অফিস মে কাম করতে হো হম জানতে হ্যায়। তিনশই দে দিজিয়ে।

    সুব্রত বুঝল দোকানদার মরিয়া। আর রেহাই নেই। এরপরে না নিলে কাল থেকে উলটো ফুটে বসে আর আড্ডা দেওয়া যাবে না। ব্যাগ থেকে তিনটে একশোর নোট বার করে লোকটির হাতে দিল ও। বাড়ির ঠিকানা জেনে নোট করে বিল বানিয়ে দিল লোকটা। বিল পকেটে নিয়ে অফিসে চলে এল সুব্রত। অনেক বেশি দেরি হয়ে গেল আজ।

    অফিসে ঢুকে নিজের ডেস্কে বসে কাজ মন বসছিল না সুব্রতর। বারবার মনে পড়ছিল আয়নাটার কথা।  আয়নার ফ্রেমে ওই অদ্ভুত সুন্দর কারুকাজ, নারী মুর্তিটির কথা। এত বড় একটা ধুমসো আয়না কিনে বাড়িতে ঢোকালে বাবা-মা নন্দিনীর কাছে অনেক কৈফিয়ত দিতে হবে ঠিকই কিন্তু এ্যান্টিক জিনিস বাড়িতে একটা থাকলে মন্দ হয় না। আর সুব্রত এবং নন্দিনীর বেডরুমটা একেবারে ছোট নয়, ঘরে মোটামুটি মানিয়েই যাবে। যদি নন্দিনী আপত্তি না তোলে তাহলে শোবার ঘরেই রাখা যাবে ওটাকে।

    বাবা-মা, নন্দিনী যথারীতি তিনজনেই বেশ অবাক হল এত ঢ্যাপ্পোস একটা আয়না আচমকা বাড়িতে নিয়ে আসার কারণে। নন্দিনী বলল তোমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে, মা জিজ্ঞাসা করল রাখবি কোথায়? বাবা বলল দেখতে মন্দ নয়, কিন্তু এসব এ্যান্টিকের জন্য ফ্ল্যাটবাড়ি মামানসই নয়।

    সুব্রত জানত এইসব প্রশ্নের উত্তর ওকে ফেস করতে হবে। তাই চুপ করে শুনে যাচ্ছিল কথাগুলো। শুধু হুঁ হাঁ করে সামান্য উত্তর। আজ সকালেই টেম্পো করে জিনিসটা হাজির হয়ে গিয়েছিল বাড়িতে। অফিসের জন্য যখন তৈরি হচ্ছিল তখনই জিনিসটা এসে হাজির হল। খালাসির সঙ্গে হাত লাগিয়ে আয়নাটা নিজের ঘরে এনে দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাখল সুব্রত। বাকি টাকা মিটিয়ে দিয়ে ওর মন খুঁতখুত করতে থাকল এইভাবে দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাখাটা কি ঠিক হবে? যদি হড়কে মেঝেতে পড়ে যায় তাহলে সব গেল। এই কাচ এখানে পাওয়া যাবে না। নাহ আজ আর অফিস যাবে না ঠিক করল। অফিস যাওয়ার থেকে ঢের বেশি ইমপরট্যান্ট আয়নাটার ব্যবস্থা করা। সুব্রত বেরিয়ে পড়ল  কাঠের মিস্তিরির খোঁজে। কাছেই একটি দোকান, সেখান থেকে একজন কাঠ মিস্তিরিকে ধরে বেঁধে নিয়ে এল। দেওয়ালে হুক লাগিয়ে আয়না ফিটিংপর্ব চলল বেশ কিছুক্ষণ। একটা দেওয়ালের অনেকটা জায়গা জুড়ে গেল আয়নার জন্য। কিন্তু বেশ লাগছে দেখতে। নন্দিনী প্রথম দিকে খুব আপত্তি জানিয়েছিল শোবার ঘরের মধ্যে এত বড় একটা আয়না ঢোকানোর জন্য। কিন্তু ওই আয়নাতেই বারবার নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল। মানুষের সহজাত স্বভাব সুযোগ পেলে নিজেকে একবার দেখে নেওয়া। এই স্বভাব মেয়েদের আরও অনেক বেশি। সুব্রত খেয়াল করল সকালে আয়নাটা ঘরে ঢোকানোর সময় নন্দিনী যতটা আপত্তি তুলেছিল বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ওর আপত্তিটা নরম হতে শুরু করল শুধু তাই নয় সুব্রতর অনুপস্থিতিতে আয়নাটার গায় বেশ কয়েকবা হাতও বুলিয়ে দেখল। নন্দিনী টের পাচ্ছিল ওটার সামনে ও যতবার যাচ্ছে শরীরের ভেতরে একটা অদ্ভূত অনুভূতি হচ্ছে, যেটা ওর আগে কখনই হয়নি। একেবারে অচেনা একটা অনুভূতি, গা সিরসিরে, গায়ে কাঁটা দেওয়া। সারাদিনে নন্দিনীর সঙ্গে সুব্রতর খুব বেশি কথা হয় না। দুইজনেই দুজনকে আসলে কিছুটা অ্যাভয়েড করে। দুজনের সেই অন্তরঙ্গ সম্পর্কটাই গড়ে ওঠেনি বলে কেউই খুব একটা কারও কাছে ঘেসে না। আজ ছুটি নেওয়ার কারনে সুব্রত সারাদিন অলসভাবেই ঘরে কাটাল। দুপুরে খেয়ে দেয়ে মোবাইলে নেটফ্লিক্সে সিনেমা দেখল। আর একটা বিষয় আরচোখে খেয়াল করছিল নন্দিনী বা বার কোনো অছিলায় ওই আয়নাটার সামনে যাচ্ছে আর নিজেকে দেখছে। বেশ মজা লাগছিল সুব্রতর। অবশ্য এতবড় খানদানি আয়নার সামনে নিজেকে দেখার লোভ ত্যাগ করা খুব কঠিন। কিন্তু ও জানত না আজ রাতে ওর জন্য কী অপেক্ষা করছে।

    রোজের মত রাতে খেয়ে খুব বেশিক্ষণ জাগে না সুব্রত। ও খেয়ে দেয়েই শুয়ে পড়ে। নন্দিনীর শুতে একটু দেরি হয়। সারা বছর ও শোবার আগে স্নান করে তারপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে নানা রকমের লোশন গায়ে মুখে মাখে। চুল আঁচড়ায় তারপর যখন শুতে আসে ততক্ষণে সুব্রত ঘুমিয়ে পড়ে। আজ সুব্রত বিছানায় এলিয়ে কিছুক্ষণ মোবাইলখুটখাট করতেই ঘুম দুইচোখে জড়িয়ে এল ওর। চোখ বুজতে ঘুমও চলে এল। ঘুম ভাঙল তখন ঘরে ড্রিমলাইট জ্বলছে। ওর কেমন যেন মনে হল ওর ওপরে কেউ চেপে বসেছে। প্রথমে মনে হল স্বপ্ন, তারপর মনে হল নাহ স্বপ্ন নয়, ভয় পেয়ে চোখ মেলতেই যা দেখল চমকে উঠ সুব্রত। নন্দিনী ওর গা ঘেসে শুয়ে ওর খোলা বুকে হাত বোলাচ্ছে। প্রথমে বিশ্বাস হল না সুব্রতর। ভাবল চোখের ভুল। কিন্তু তারপরে বুঝল নাহ এ সত্যি। স্লিভলেস সাদা নাইটি, মাখন ত্বক ছিপছিপে শরীর ড্রিমলাইটে কেমন অন্যরকম লাগছে নন্দিনীকে। সুব্রত বেশ সন্তর্পনেই প্রথমে হাত রাখল নন্দিনীর বাহুতে। উষ্ণ শরীর। নন্দিনী আরও ঘেঁসে এল কাছে। মুখ ঘসতে থাকল সুব্রতর বুকে। সুব্রত অবাক হয়ে তাকাল নন্দিনীর দিকে। এ যেন এক অচেনা নন্দিনী। ওর চোখদুটোর দিকে তাকাতেই গা ছমছম করে উঠল সুব্রতর। সরে আসতে চাইল। কিন্তু নন্দিনী আর সেই সুযোগ দিল না সুব্রতকে, নিপূনভাবে আদর করতে করতে জাগিয়ে তুলল ওকে। সুব্রতও মেতে উঠল খেলায়। আদিম লাগামছাড়া উদ্দাম খেলতে একটা সময়ের পর অনিবার্য ক্লান্ত ও তৃপ্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল দু’জনেই।

    পরদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গার পরেই গতরাতের কথা মনে পড়ে আনন্দ যেন চুঁইয়ে পড়ল সুব্রতর গোটা শরীর থেকে। এত খুশি এত ভাল লাগছে সবকিছু! আজও অফিস যেতে ইচ্ছে করছে না। এতদিন পর তাহলে অবশেষে…বিছানায় নন্দিনী নেই। আজও অফিস যেতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু কাল কামাই গিয়েছে আজ আর উপায় নেই। উঠল সুব্রত। ঘরে আয়নাটার দিকে দেখল। ওটার দিকে তাকালে কেমন যেন মনে হয় আয়নাটাই ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

    ঘর ছেড়ে টয়লেটের দিকে যেতে যাবে তখনই নন্দিনী ঘরে ঢুকল। ওকে জড়িয়ে ধরল সুব্রত।

    কী হল কী? ছাড়? সেই পুরনো স্টাইলেই বলল নন্দিনী।

    সে না হয় ছাড়ছি, কিন্তু কাল রাতে কী হয়েছিল তোমার? এতদিন পরে অবশেষে…বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলল সুব্রত।

    কী আবার হবে? বিরক্ত হয়ে জবাব দিল নন্দিনী।

    তাই নাকি? তাহলে এগুলো কী? বলে পিঠের, গলার পাশে নন্দিনীর আদরের দাগগুলো দেখাল সুব্রত।

    দেখে প্রথমেই ইস করে উঠল নন্দিনী। তারপর বলল এগুলো কী?

    কী মানে তোমারই তো করা। হেসে বলল সুব্রত।

    বাজে কথা বলবে না। কে না কে করেছে ছি ছি…বলতে বলতে অন্য ঘরে চলে গেল নন্দিনী।

    মানে! থম মেরে ঘরে দাঁড়িয়ে রইল সুব্রত।

    পরপর দুইরাত তিন রাত একই ঘটনা। রাতের নন্দিনী আর দিনের নন্দিনী কেউ কাউকে চেনে না। দিনের  আলোর নন্দিনী বড় চেনা, একঘেয়ে, খিটখিটে। রাতে বিছানায় সেই আবার অপূর্ব শিল্পী। সুব্রতর ভয় লাগে তখন কারণ আদরের সময় নন্দিনী যতই বন্য হয়ে ওঠে ওর চোখদুটোও ওই  আয়নার কাঠখোদাই নারী মুর্তির চোখের লাল মনিদুটোর মত জ্বলজ্বল করতে থাকে। কয়েকদিনের মধ্যে খুব অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল সুব্রত। কোনও কাজেই মন বসে না। সবসময়ে মনে কেমন যেন একটা অশান্তি। ইদানিং ওই আয়নাটার সামনে দাঁড়াতেও কেমন যেন গা ছমছম করে। আর নন্দিনী যেন পারলে সারাদিন আয়নার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকে। নড়তেই চায় না। নড়তে পারেও না। কী এক অমোঘ আকর্ষণ ওকে সারাদিন চুম্বকের মতো আটকে রাখে আয়নার ওই কাচের সামনে। নন্দিনী তাকিয়ে থাকে বিভোরভাবে।

    আজ অফিসে কাজ করতে বসে সুব্রত ঠিক করে ফেলল এইভাবে আর চলছে না। কিছু একটা রহস্য রয়েছে। আয়নাটা বাড়িতে আনার পরেই এমন অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। নন্দিনীর এমন আচরণ আগের থেকেও বেশি অস্বস্তিকর লাগে সুব্রতর। প্রতিদিন রাতে একই উদ্দামতা আর সকাল হলেই অন্যরকম। লাঞ্চ আওয়ারের একটু আগেই ও অফিস থেকে বেরিয়ে এল আজ। সোজা গেল ওই ফার্নিচারটার দোকানে। রহস্যের কিনারা করতে গেলে ওখানেই যেতে হবে।

    চাচা—

    হাঁ বোলিয়ে

    কিছুদিন আগে আপনার দোকান থেকে একটা আয়না কিনেছিলাম মনে রয়েছে?

    হাঁ ইয়াদ হ্যায়। কেয়া হুয়া?

    ওই আয়না আপনি যেখান থেকে কিনেছিলেন সেখানকার ঠিকানাটা দিতে পারবেন?

    শুনে বুড়ো মালিক ভুরু কুঁচকে তাকাল কিঁউ?

    খুব দরকার ঠিকানাটা।

    কেয়া জরুরত হামকো বোলিয়ে না? কুছ ডিফেক্ট নিকলা মালমে?

    না না সেসব কিছু না অন্য কারণে এ্যাড্রেসটা দরকার ছিল।

    নেহি মালুম। বলে লোকটা নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে গেল। সুব্রত বুঝল লোকটা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাচ্ছে। পকেট থেকে একটা একশোটাকার নোট বার করে লোকটার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এই নিন চাচা একটু চা মিষ্টি খাবেন।

    বুড়ো নোটটার দিকে তাকাল, তারপর নেহাত অনিচ্ছায় নোটটা হাতে নিয়ে পকেট ভরে বলল আপভি কেয়া জিদ করতে হ্যায় বাবু। ঠেহরিয়ে দেখতে হ্যায়। বলে টেবিলের সামনে রাখা ডায়রি খুলে পৃষ্ঠা ওল্টাতে থাকল। মিনিট পাঁচেক পৃষ্ঠা ওল্টানোর পর বলল হাঁ মিলা হ্যায়। নোট কর লিজিয়ে, বি কে মালহোত্রা, থারটি থ্রি বাই টু রিচি রোড।

    ঠিকানাটা মনে মনে একবার আওড়ে নিয়ে পিছন ফিরল সুব্রত। একটা ফাঁকা ট্যাক্সি যাচ্ছে। ট্যাক্সিইই…

    ড্রয়িংরুমে বসে রয়েছে সুব্রত। বি কে মালহোত্রার বাড়ি। বাড়িটা দেখলেই বোঝা যায় পুরনো দিনের। এই এলাকায় সব অভিজাতদের বাস। মেন গেট দিয়ে ঢুকে ফার্সট ফ্লোরে ওঠার সিড়িটা কাঠের। চকচকে পালিশ। ঘরের ফার্নিচার, ডেকরেশন দেখলে বোঝা যায় অনেক দিনের বাসিন্দাই শুধু নয় যথেষ্ট ধনী। চাকর দরজা খুলে ওকে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে রেখে গিয়েছে মিনিট দশেক হয়ে গিয়েছে। এবার ভেতরের ঘর থেকে একজন মহিলা এলেন ধীর পদক্ষেপে। সুব্রত দেখল মহিলার চেহারা স্থুল। পরনে নীল রঙের হাউজকোট, ধপধপে সাদা চুল কাঁধ পর্যন্ত সুন্দর করে কাটা। মহিলা সুব্রতর মুখোমুখি চেয়ারে বসে বললেন আমি মিসেস মালহোত্রা। কী ব্যাপার বলুন?

    আপনার সঙ্গে খুব জরুরি কিছু কথা ছিল। অনুগ্রহ করে যদি একটু শোনেন।

    বলুন কী বলতে চান।

    আসলে মানে ব্যাপার হল আমি কিছুদিন আগে…পুরো ঘটনাটাই বলল সুব্রত। শুধু লজ্জার খাতিরে নন্দিনীর পরিবর্তনতা ডিটেলে বলতে পারল না, বলল আমার স্ত্রীর আচরণে কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি যেটা আসলে স্বাভাবিক নয়। সামথিং আনন্যাচারাল। আয়নার গল্পটা বলতে বলতে সুব্রত খেয়াল করছিল মিসেস মালহোত্রার চোখ মুখের অভিব্যক্তি বদলে যাচ্ছে। বেশ আতঙ্কিত। উনি পুরো গল্পটা স্থির হয়ে শুনলেন, তারপর টেবিলের ওপর রাখা জলের জাগ থেকে কিছুটা জল খেয়ে বললেন, আপনি ওই  আয়না বাড়িতে রাখবেন না। ফেলে দিন, নষ্ট করে দিন, কাউকে দিয়ে দিন কিন্তু ঘরে রাখবেন না।

    কিন্তু কেন?

    সে আমি বলতে পারব না কিন্তু রাখবেন না। আমার মন বলছে ওই আয়না ঠিক নয়।

    কিন্তু ওই আয়না তো আপনারই ছিল তাই না? তাহলে বলতে কেন পারবেন না? কি কারণে বিক্রি করে দিয়েছিলেন আয়নাটা? প্লিজ ম্যাডাম আমার কাছে গোপন করবেন না দয়া করে বলুন।

    মহিলা একটু চুপ থাকলেন তারপর যা কাহিনি শোনালেন শুনে গা হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল সুব্রত। এই বাড়িরই গ্রাউন্ড ফ্লোরে ভাড়া থাকত একটি এ্যাংলো মেয়ে। রোজালিন্ড গর্ডন। একটা প্রাইভেট কোম্পনাইতে রিসেপশনে কাজ করত। নামেই চাকরি আসলে ওটা লোক দেখানো মেয়েটির আসল পেশা ছিল প্রসটিটিউশন। সেট মিসেস মালহোত্রা জানতে পেরেছিলেন অনেক পরে। কিন্তু মেয়েটিকে বাড়ি থেকে তোলা সহজ ছিল না। কারণ ওর অনেক প্রভাবশালী কাস্টমার ছিল। প্রতি রাতেই চলত নতুন নতুন পুরুষের সঙ্গে লীলাখেলা। মাস তিনেক আগে মেয়েটিকে হঠাৎই তার বিছানায় মৃত পাওয়া যায়। খুন। কিন্তু কে খুন করল তার কিনারা এখনও পুলিশ করে উঠতে পারেনি। নিচের ঘরটা পুলিশ সিল করে রেখেছিল বেশ কিছুকাল। এই কিছুদিন আগে সিল খুলে দেওয়ার পরেই মিসেস মালহোত্রা মেয়েটির ঘরে ঢোকেন এবং দেখেন ঘরে অনেক পুরনো আসবাব। মানে মেয়েটির শখ ছিল পুরনো ফার্নিচারের। ওর শোবার ঘরে একটি পুরনো দিনের পালঙ্ক আর পালংকের মুখোমুখি এই বিশাল আয়নাটি দেওয়ালে সেট করা ছিল। মেয়েটির রিলেটিভ বলতে কেউ ছিল না বলে কাউকে খবরও দেওয়া যায়নি। মিসেস মালহোত্রা তাই সব  ফার্নিচার কম দামে বিক্রি করে দেন। হ্যাঁ ওই হুসেনস ফার্নিচারেই।

    উঠে দাঁড়াল সুব্রত। মাথা টলছে। কোনওমতে বাইরে বেরিয়ে এল।

    অফিস থেকে আজ তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গিয়েছিল ও শরীর খারাপ করছে এই অজুহাতে। তারপর আগে সোজা পাড়ার সেই ফারনিচারের দোকানে গিয়ে মিস্তিরি নিয়ে এসে আগে আয়নাটাকে খোলাল। বাড়ির সকলে অবাক। নন্দিনীর তীব্র আপত্তিও শুনল না ও। আয়না খুলিয়ে একেবারে দোকানদারকে দিয়ে তাদের দোকানে পাঠিয়ে দিল। বলল যা দাম দেবে দিও। না দিলে রেখে দিও। দোকানদারও বেশ অবাক। এই দুদিন আগে লাগিয়ে এখন আবার খোলানোর তাড়া!

    আয়না বিদায় নেওয়ার পর নিশ্চিন্ত হল সুব্রত। আয়েস করে বিছানায় বসল। বিকেলে মিসেস মালহোত্রা ম্যাডামের কথাগুলো যতবার মনে পড়ছে, গা ছমছম করে উঠছে। নন্দিনী ঘরে ঢুকে আবার বেশ বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞাসা করল আয়নাটা সরিয়ে দিলে কেন?

    ওটা ভাল না।

    কেন শুনি।

    আমাদের অফিসে একজন বাস্তু বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। উনি বললেন ঘরে এতবড় আয়না রাখতে নেই, অকল্যান হয়। বেমালুম মিথ্যে বলে দিল সুব্রত।

    বাব্বা তুমি আবার কবে এই সবে বিশ্বাস করতে শুরু করলে? কাল আমার বলে আর কথা বাড়াল না নন্দিনী। নিজের ক্রিম লোশন ইত্যাদি মাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

    আয়নাটা সরিয়ে ফেলায় যেমন নিশ্চিন্তি লাগছে তেমন মনটা একটু খারাপও লাগছে সুব্রতর। শখ করে কেনা এমন রাজকীয় আয়না…জিনিসটাও গেল টাকাও গেল আর তার থেকেও বেশি যা গেল তা নন্দিনীর আদর, শরীরের স্পর্শ। হ্যাঁ হয়ত সেই স্পর্শ মনের থেকে নয়, ঘোর লাগা…তবু… আজ থেকে আবার সেই নিরুত্তাপ জীবন…নানা কথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়ল সুব্রত। আর আজও ঘুম ভাঙল বুকের ওপর চাপ অনুভব করায়। ভারি কিছু একটা চেপে বসেছে বুকের ওপর। অস্বস্তি হতে চোখ মেলতেই কেঁপে উঠল ও। নীল রঙের ড্রিমলাইটে দেখল নন্দিনী! হ্যাঁ নন্দিনী আজও আবার সেই দুইদিকে পা ছড়িয়ে সুব্রতর বুকের ওপর চেপে বসেছে। নিরাবরণ,

    খোলা চুল…আর চোখের মনিদুটো…সেই আয়নার নারীমুর্তিটির মতোই টকটকে লাল, জ্বলছে। আজ সেই চোখদুটোয় যেন তীব্র আগুন…সুব্রত ভয়ে চিৎকার করে উঠতে গেল, পারল না, নন্দিনীর মুখ এগিয়ে গেল সুব্রতর গলার কাছে।

    সমাপ্ত

  • নজরুল

    নজরুল

    জসীম উদ্‌দীন

    [book]

    নজরুল

    পদ্মানদীর তীরে আমাদের বাড়ি। সেই নদীর তীরে বসিয়া নানা রকমের কবিতা লিখিতাম, গান লিখিতাম, গল্প লিখিতাম। বন্ধুরা কেউ সে সব শুনিয়া হাসিয়া উড়াইয়া দিতেন, কেউ-বা সামান্য তারিফ করিতেন। মনে মনে ভাবিতাম, একবার কলিকাতায় যদি যাইতে পারি, সেখানকার রসিক-সমাজ আমার আদর করিবেনই। কতদিন রাত্রে স্বপ্নে দেখিয়াছি, কলিকাতার মোটা মোটা সাহিত্যিকদের সামনে আমি কবিতা পড়িতেছি। তাহারা খুশি হইয়া আমার গলায় ফুলের মালা পরাইয়া দিতেছেন। ঘুম হইতে জাগিয়া ভাবিতাম, একটিবার কলিকাতা যাইতে পারিলেই হয়। সেখানে গেলেই শত শত লোক আমার কবিতার তারিফ করিবে। কিন্তু কি করিয়া কলিকাতা যাই। আমার পিতা সারা জীবন ইস্কুলের মাস্টারী করিতেন। ছেলেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে এইরূপ আকাশকুসুম চিন্তা করে, তিনি জানিতেন। কিছুতেই তাহাকে বুঝানো গেল না, আমি কলিকাতা গিয়া একটা বিশেষ সাহিত্যিক খ্যাতি লাভ করিতে পারি। আর বলিতে গেলে প্রথম প্রথম তিনি আমার কবিতা লেখার উপরে চটা ছিলেন। কারণ পড়াশুনার দিকে আমি বিশেষ মনোযোগ দিতাম না, কবিতা লিখিয়াই সময় কাটাইতাম। তাতে পরীক্ষার ফল সব সময়ে ভাল হইত না।

    তখন আমি প্রবেশিকার নবম শ্রেণীতে কেবলমাত্র উঠিয়াছি। চারিদিকে অসহযোগ-আন্দলনের ধুম। ছেলেরা ইস্কুল-কলেজ ছাড়িয়া স্বাধীনতার আন্দোলনের নামিয়া পড়িতেছে। আমিও স্কুল ছাড়িয়া বহু কষ্ট করিয়া কলিকাতা উপস্থিত হইলাম।

    আমার দূর সম্পর্কের এক বোন কলিকাতায় থাকিতেন। তাঁর স্বামী কোন অফিসে দপ্তরীর চাকুরী করিয়া মাসে কুড়ি টাকা বেতন পাইতেন। সেই টাকা দিয়া অতি কষ্টে তিনি সংসার চালাইতেন। আমার এই বোনটিকে আমি কোনদিন দেখি নাই। কিন্তু অতি আদরের সঙ্গেই হাসিয়া তিনি আমাকে গ্রহণ করিলেন। দেখিয়াই মনে হইল, যেন কত কালের স্নেহ আদর জমা হইয়া আছে আমার জন্য তাঁহার হৃদয়ে। বৈঠকখানা রোডের বস্তিতে খোলার ঘরের সামান্য স্থান লইয়া তাঁহাদের বাসা। ঘরে সঙ্কীর্ণ জায়গা, তার মধ্যে তাদের দুইজনের মতন চৌকিখানারই শুধু স্থান হইয়াছে। বারান্দায় দুই হাত পরিমিত একটি স্থান, সেই দুই হাত জায়গা আমার বোনের রান্নাঘর। এমনি সারি সারি সাত-আট ঘর লোক পাশাপাশি থাকিত। সকাল-সন্ধ্যায় প্রত্যেক ঘরে কয়লার চুলা হইতে যে ধূম বাহির হইত, তাহাতে ওইসব ঘরের অধিবাসীরা যে দম আটকাইয়া মরিয়া যাইত না—এই বড় আশ্চর্য মনে হইত। পুরুষেরা অবশ্য তখন বাহিরে খোলা বাতাসে গিয়া দম লইত, কিন্তু মেয়েরা ও ছোট ছোট বাচ্চাশিশুরা ধুয়ার মধ্যেই থাকিত। সমস্তগুলি ঘর লইয়া একটি পানির কল। সেই কলের পানিও স্বল্প-পরিমিত ছিল। সময়মত কেহ স্নান না করিলে সেই গরমের দিনে তাহাকে অস্নাত থাকিতে হইত। রাত্রে এঘরে-ওঘরে কাহারও ঘুম হইত না। আলো-বাতাস বঞ্চিত ঘরগুলির মধ্যে যে বিছানা-বালিস থাকিত, তাহা রৌদ্রে দেওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। সেই অজুহাতে বিছানার আড়ালে রাজ্যের যত ছারপোকা অনায়াসে রাজত্ব করিত। রাত্রে একে তো গরম, তার উপর ছারপোকার উপদ্রব। কোন ঘরেই কেহ ঘুমাইতে পারি না। প্রত্যেক ঘর হইতে পাখার শব্দ আসিত, আর মাঝে মাঝে ছারপোকা মারার শব্দ শোনা যাইত। তা ছাড়া প্রত্যেক ঘরের মেয়েরা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবে পরদা মানিয়া চলিত, অর্থাৎ পুরুষেরাই যার যার ঘরে আসিয়া পর্দায় আবদ্ধ হইত। প্রত্যেক বারান্দায় একটি করিয়া চটের আবরণী। পুরুষলোক ঘরে আসিলেই সেই আবরণী টাঙাইয়া দেওয়া হইত। দুপুরবেলা যখন পুরুষেরা অফিসের কাজে যাইত, তখন এঘরের ওঘরের মেয়েরা একত্র হইয়া গাল-গল্প করিত, হাসি-তামাসা করিত, কেহ-বা সিকা বুনিত, কেহ কাঁথা সেলাই করিত। তাদের সকলের হাতে রঙবেরঙের সূতাগুলি ঘুরিয়া ঘুরিয়া নক্সায় পরিণত হইত। পাশের ঘরের সুন্দর বউটি হাসিয়া হাসিয়া কখন ও বিবাহের গান করিত, বিনাইয়া বিনাইয়া মধুমালার কাহিনী বলিত। মনে হইত, আল্লার আসমান হইতে বুঝি এক ঝলক কবিতা ভুল করিয়া এখানে ঝরিয়া পড়িয়াছে।

    এ হেন স্থানে আমি অতিথি হইয়া আসিয়া জুটিলাম। আমার ভগ্নীপতিটি ছিলেন খাঁটি খোন্দকার বংশের। পোলাও-কোর্মা না খাইলে তাহার চলিত না। সুতরাং মাসের কুড়ি টাকা বেতন পাইয়া তিনি পাঁচটাকা ঘরভাড়া দিতেন। তারপর তিন-চার দিন ভাল গোস্ত-ঘি কিনিয়া পোলাও-মাংস খাইতেন। মাসের অবশিষ্ট কোন কোন দিন খাইতেন, কোন দিন বা অনাহারে থাকিতেন।

  • দূরবীন

    দূরবীন

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    গ্রন্থকথা

    সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় দু-বছরেরও বেশি কাল ধরে ধারাবাহিকভাবে বেরিয়েছিল ‘দূরবীন’, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জোরালো, সংবেদনশীল কলমে অন্যতম মহৎ সৃষ্টি। চলমান শতাব্দীর দুইয়ের দশকের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে আটের দশক পর্যন্ত বিস্তৃত সময়ের প্ৰেক্ষাপটে সামাজিক জীবনের যাবতীয় পরিবর্তনকে এক আশ্চর্য কৌতুহলকর বিশাল কাহিনীর মধ্য দিয়ে ধরে রাখার প্রয়াসেরই অভিনন্দিত ফলশ্রুতি ‘দূরবীন’ উপন্যাস।

    তিন প্রজন্মের এই কাহিনীতে প্রথম প্রজন্মের প্রতিভূ জমিদার হেমকান্ত। এ-উপন্যাসের সূচনায় দেখা যায়, হেমকান্তের হাত থেকে কুয়োর বালতি জলে পড়ে গেছে, আর এই আপাততুচ্ছ ঘটনায় হেমকান্ত আক্রান্ত হচ্ছেন মৃত্যুচিন্তায়। বিপত্নীক হেমকান্ত ও রঙ্গময়ী নামের প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক পুরোহিত্যকন্যার, গোপন প্রণয়কাহিনী ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য পারিবারিক কাহিনী নিয়ে এ-উপন্যাসের প্রথম পর্যায়। দ্বিতীয় প্রজন্মের নায়ক কৃষ্ণকান্ত। দেবোপম রূপ ও কঠোর চরিত্রবল বালক কৃষ্ণকান্তকে দাঁড় করিয়েছে পিতা হেমকান্তের বিপরীত মেরুতে। স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ কৃষ্ণকান্তের ব্ৰহ্মচর্য-গ্রহণ ও দেশভাগের পর তাঁর আমূল পরিবর্তন—এই নিয়ে এ-উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাহিনী। তৃতীয় ও শেষ প্রজন্মের নায়ক ধ্রুব, বিশ শতকের উপান্তপর্বে এক দিগভ্ৰষ্ট, উদ্ধত বিদ্রোহী যুবা। ধ্রুবর স্ত্রী রেমি, যার সঙ্গে এক অদ্ভুত সম্পর্ক তার। কখনও ভালবাসা, কখনও উপেক্ষা, কখনও-বা প্রবল বিরাগ। অথচ রেমির ভালবাসা সাত-আঘাতেও অবিচল। একদিকে রেমির সঙ্গে সম্পর্ক অন্যদিকে পিতা কৃষ্ণকান্তের মধ্যে সেই ব্ৰহ্মচারী ও স্বদেশের জন্য উৎসর্গীকৃত প্রাণসত্তাটিকে খুঁজে না-পাওয়ার ব্যর্থতায় ক্ষতবিক্ষত ধ্রুবর আশ্চর্য কাহিনী নিয়েই শেষ পর্ব। শুধু তিন প্রজন্মের তিন নায়কের ব্যক্তিগত কাহিনীর জন্যই নয়, এ-উপন্যাসের বিশাল প্রেক্ষাপটে আরও বহু বিচিত্র ও কৌতুহলকর শাখা-কাহিনী, এবং এর চালচিত্রে স্বদেশী আন্দোলন, দেশভাগ ও স্বাধীনতা পরবর্তী উত্তাল দিনরাত্রির এক তাৎপর্যময় উপস্থাপনার জন্যও ‘দূরবীন’ চিহ্নিত হবে অবিস্মরণীয় সৃষ্টিরূপে।

    শুধুদূরকেই কাছে আনে না, উল্টো করে ধরলে কাছের জিনিসও দূরে দেখায় দূরবীন। ‘দূরবীন’ উপন্যাসের নামকরণে যেমন সূক্ষ্মতা, রচনারীতিতেও তেমনই অভিনবত্ব এনেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। দ্বিস্তর এই উপন্যাসে সেকাল ও একাল, অতীত ও বর্তমান এক অনন্য কৌশলে একাকার।

    শীর্ষেন্দুর লেখাতে সময় হচ্ছে মুখ্য বিষয়। তাঁর এই অসাধারণ কীর্তি ‘দূরবীন’ এ লেখক উনিশ শতকের ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রজন্মগত ব্যবধান (জেনারেশন গ্যাপ) খুব সাবলীল ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

    উপন্যাসটা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মূলত হেমকান্ত এবং ধ্রুবর জবানীর মাধ্যমে। কিন্তু আসলে এদের দুজনের কেউই এই উপন্যাসের মূল নায়ক নন। আসল নায়ক হচ্ছেন কৃষ্ণকান্ত। উপন্যাসটা দুইটা অংশে বিভক্ত, আর দুই অংশের বর্ণনাই লেখক চমৎকার ভাবে লিখে গিয়েছেন। শতাধিক পরিচ্ছেদের বিশাল উপন্যাস; কিন্তু কোথাও খারাপ লাগে নি। বিজোড় পরিচ্ছেদ গুলো (১, ৩, ৫…) প্রথম কাহিনীর অন্তর্গত এবং জোড় পরিচ্ছেদ গুলো (২, ৩, ৪…) দ্বিতীয় কাহিনীর অন্তর্গত। কেউ যদি প্রথম অংশ গুলো পড়ে শেষ করেন, তবে দ্বিতীয় অংশে তিনি প্রথম অংশের পর থেকে ধারাবাহিক বর্ণনা পাবেন! আর গল্পের প্রয়োজনেই এখানে রেমি এবং ধ্রুবর যে মধ্যে যে ভালোবাসার টানাপোড়েনের চিত্র আঁকা হয়েছে তার মধ্যেও অনেক সময় আবেগে ডুবে গিয়েছি। কখনো মনে হয়েছে যে রেমিই ঠিক আবার কখনও মনে হয়েছে যে ধ্রুবই ঠিক। গল্পের প্রয়োজনে অনেক চরিত্রেরই আগমন ঘটেছে যার প্রত্যেকটিই উপভোগ্য।

    এছাড়াও উপন্যাসটিতে ইংরেজদের হাত থেকে ভারতের স্বাধীনতার চিত্র খুব বড় ভাবে না হলেও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। স্বাধীন হওয়ার আগে ও পরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার একটা চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম অংশের ঘটনাস্থল আমাদের বাংলাদেশ এই এবং দ্বিতীয় অংশের ঘটনাস্থল পশ্চিমবঙ্গ। প্রথম অংশটুকুতে কৃষ্ণকান্তের সংগ্রাম এবং সাফল্য এবং দ্বিতীয় অংশে এর পরিণতি এবং কৃষ্ণকান্ত ও ধ্রুব এর মধ্যে ব্যবধান তুলে ধরা হয়েছে।

    ‘দূরবীন’ উপন্যাস প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালের বইমেলায়; মুদ্রণ সংখ্যা ৩৩০০। আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেডের পক্ষে ফণিভূষণ দেব কর্তৃক ৪৫ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা ৭০০ ০০৯ থেকে প্রকাশিত এবিং আনন্দ প্রেস অ্যাণ্ড পাবলিকেশনস প্রাইভেট লিমিটেডের পক্ষে দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু কর্তৃক পি ২৮৪ সি আই টি স্কিম নং ৬ এম কলকাতা ৭০০ ০৫৪ থেকে মুদ্রিত। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন অমিয় ভট্টাচার্য। উপন্যাসটির প্রথম বিশ্ববাণী সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৭২ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠে; প্রকাশক ব্রজকিশোর মণ্ডল, বিশ্ববাণী প্রকাশনী, ৯/১ বি মহাত্মা গান্ধী রোড, কলকাতা-৯। মুদ্রাকর পার্বতীচরণ রায়, দি গৌতম প্রিণ্টিং ওয়ার্কস প্রা. লি. ২০৯, এ বিধান সরণি, কলকাতা-৬।

    বর্তমান সংস্করণে অনুসৃত হয়েছে আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত প্রথম সংস্করণ জানুয়ারি ১৯৮৬, দ্বাবিংশ মুদ্রণ জানুয়ারি ২০২২। এই সংস্করণের প্রচ্ছদ এঁকেছেন সুব্রত চৌধুরী।

    “রা-সা”

    পূজনীয়

    শ্রীঅমরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (বড়দা)

    শ্রীচরণকমলেষু

  • এক থেকে দশ পরিচ্ছেদ

    এক থেকে দশ পরিচ্ছেদ

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    এক

    ১৯২৯ সালের শীতকালের এক ভোরে হেমকান্ত চৌধুরির হাত থেকে দড়ি সমেত কুয়োর বালতি জলে পড়ে গেল। অসহনীয় শীতের সেই নির্জন ব্রাহ্মমুহূর্তের অন্ধকারে হেমকান্ত অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে শুনলেন জলে দড়ি ও বালতির পড়া ও ডুবে যাওয়ার শব্দ। তাঁর জীবনে এরকম ঘটনা এই প্রথম।

    একটু দূরে উঁচু বারান্দার ধারে হ্যারিকেনটা রাখা। তার আলো কুয়োর পাড়ে খুব ক্ষীণ হয়ে আসছে। হেমকান্ত সেই একটুখানি আলোয় নিজের দুখানা হাতের পাতার দিকে চেয়ে দেখলেন। এই বিশ্বস্ত হাত থেকে গতকাল পর্যন্ত কখনো কুয়োর বালতি পড়ে যায়নি।

    হেমকান্ত বিস্ময় ও অবিশ্বাসভরে নিজের দুখানা হাতের দিকে চেয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর সিদ্ধান্তে এলেন, তিনি বুড়ো হয়েছেন। যথেষ্ট বুড়ো।

    বাড়িতে দড়ি আছে, বালতি তোলার কাঁটাও মজুত। ইচ্ছে করলে হেমকান্ত কেউ জানবার আগেই বালতিটা তুলে ফেলতে পারতেন। কিন্তু সে চেষ্টা আর করলেন না। কেনই বা করবেন? জীবনের অনেক কাজকেই আজকাল তাঁর তুচ্ছ বলে মনে হয়।

    ১৯২৯ বা তদানীন্তন কালে বয়স ত্রিশ পেরোলেই গড়পড়তা বাঙালী পুরুয় নিজেকে বুড়ো ভাবতেন। পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ বছর বয়সে অনেকেরই নাতি-নাতনি হতে শুরু করত। কাজেই নিজেকে বুড়ো ভাবার দোষ ছিল না। সেই হিসেবে হেমকান্তকেও বুড়োর দলে ফেলা যায়। ঘটনার সময় তাঁর বয়স কমবেশী পঁয়তাল্লিশ। উনিশ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় কিশোরগঞ্জের মোক্তার সুধীর চক্রবর্তীর মেজো মেয়ে সুনয়নীর সঙ্গে। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেই তিনি ছয় সন্তানের জনক হন। সাঁইত্রিশে বিপত্নীক। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র কনককান্তির বয়স চব্বিশ। বিবাহিত এবং দুই সন্তানের পিতা। মেজো সন্তান মেয়ে সবিতা। তার বরিশালে বিয়ে হয়েছে। তৃতীয় জন ছেলে জীমূতকান্তি। সেও বিবাহিত, তবে সন্তান হয়নি। চতুর্থ ও পঞ্চম পর পর দুই মেয়ে ললিতা ও বিশাখ। ললিতার বিয়ে দিয়েছেন কলকাতায়। ষষ্টটি পুত্র সন্তান। বয়স দশের বেশী নয়। তার নাম প্রথমে রাখা হয়েছিল কৃষ্ণকান্তি। হেমকান্ত পরে নিজের নামের আদলে কান্তির বদলে কান্ত যোগ করায় এখন সে কৃষ্ণকান্ত। বিশাখা ও কৃষ্ণকান্ত ছাড়া হেমকান্তর কাছে কেউই থাকে না। প্রকান্ড বাড়ি হা-হা করছে। আছে বিশ্বস্ত কয়েকজন দাস-দাসী, একটা বশংবদ দিশি হাউন্ড জাতীয় সড়লে কুকুর। একটা বুড়ো ময়ূর। কয়েকটা পোষা পাখি। গোটা দশেক গরু। কয়েকটা কাবলি বেড়াল।

    জমিদার সুলভ কোনও বদ অভ্যাস হেমকান্তর বংশে কারও নেই। হেমকান্তও সে-সবের ঊর্ধ্বে। মদ ছোন না, বাইজী নাচান না, ইয়ারবন্ধুও বিশেষ নেই। এমন কি পাশা তাস ইত্যাদিরও নেশা নেই তাঁর। বড় ভাই বরদাকান্তর বাল্যকাল থেকেই একটা উদাসী ভাব ছিল। যৌবনে ভাল করে পা দেওয়ার আগেই সে একদল সন্ন্যাসীর সঙ্গে ভিড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। বরদাকান্তর পরিত্যক্তা স্ত্রী প্রভা ঢাকায় তাঁর বাপের বাড়িতে আজও জীবন ধারণ করে আছেন। কেমন আছেন তা হেমকান্ত জানেন না। তাঁর ছোটো এক ভাই ছিল। নলিনীকান্ত। তার পরোপকারের নেশা ছিল। ব্রহ্মপুত্রে এক ঝড়ের রাত্রে তার নৌকাডুবি হয়। নৌকোর অন্যান্য যাত্রীরা বেঁচে গেলেও নলিনীকান্তর লাশ পাওয়া যায় ঘটনাস্থল থেকে তিন মাইল ভাঁটিতে। তিন ভাইয়ের স্বভাবেই মিল আছে। কেউই খুব বিষয়াসক্ত নন। এসরাজ বাজানো ছাড়া হেমকান্তর কোনো আমোদ-প্রমোদও নেই। একসময়ে ফুটবল খেলতেন। ব্যস আর কিছু নয়। তিনি স্বাবলম্বী, আত্মনির্ভরশীল, শান্ত ও হিসেবী মানুষ। কোনো ব্যাপারেই তিনি অসতর্ক নন। তাঁর জমিদারী খুব বড় নয়। অন্যান্য জমিদারের তুলনায় তিনি নিতান্তই চুনোপুঁটি। তবে হেমকান্ত কারো সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করেন না। তাঁর চাল-চলতিও জমিদারের মতো নয়। দাপট নেই, রাগ নেই, কর্তৃত্ব নেই। তাঁর কথা কম, হাসি কম, ভালবাসা বা আবেগও নগণ্য।

    হেমকান্ত হ্যারিকেনটা বাইরে রেখে ঘরে ঢুকলেন। অন্যান্য দিন এই সময়ে তিনি আহ্নিক করতে বসেন। আজ বসলেন না। তাঁর শান্ত ও ভাবলেশহীন মন আজ কিছু চঞ্চল। বিলিতি টেবিল ল্যাম্পের সলতে ধরিয়ে তিনি বসলেন বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে।

    “ইহাই কি বার্ধক্য নহে? পেশীর দৌর্বল্য দেখা দিয়াছে, স্নায়ু আর আগের মতো সতেজ নাই। ক্রমে ক্রমে স্থবিরতা আসিবে। আয়ু ফুরাইবে। যৌবনে প্রায় কেহই মৃত্যুকে ভয় করে না। কিন্তু রক্তের তেজ কমিয়া আসিলে দিনান্তে একা বসিয়া প্রিয় ও মৃতদের কথা ভাবিতে গিয়া কখন যেন পৃথিবীর সহিত আসন্ন বিরহের কথা মনে করিয়া হৃদয় ভারাক্রান্ত হইয়া উঠে। সেদিন কোকাবাবুকে দেখিতে গিয়াছিলাম। উদুরিতে পেটটা ফুলিয়া ঢাক হইয়াছে। পিঠভরা বেডসোর। হাঁ করিয়া কষ্টে শ্বাস লইতেছেন। একেবারে শেষ অবস্থায় তাঁহাকে বাড়ির পিছন দিকে একটি ঘরে স্থানান্তরিত করা হইয়াছে। ঘরে ঢুকলেই মনে হয় চারিদিক মৃত্যুর বীজাণুতে ভরা। ঘরের এক কোণে একটি ভাড়াটিয়া কীর্তনীয়া ছোট্ট করতাল লইয়া ক্লান্ত ও যান্ত্রিক স্বরে তারকব্রহ্ম নাম করিতেছিল। গুণ্ঠনবতী এক দাসী কেবল তাঁহার পরিচর্যা করিতেছে। বাহিরের ঘরে তাঁহার দুই পুত্র উদ্বিগ্ন মুখে বসা। মেয়েরাও আসিয়াছে। কান্নাকাটিও কিছু কিছু চলিতেছে। কোকাবাবুর স্ত্রী চিররুগ্না তাঁহাকে আমি বিশেষ হাঁটাচলা করিতে দেখি নাই। সেদিনও তিনি শয্যাশায়িনী ছিলেন। কোকাবাবুর জন্য যে বিশেষ শোক অনুভব করিতেছিলাম তাহা নহে। তাঁহার যথেষ্ট বয়েস হইয়াছে। কিন্তু সেই সময় একটি ঘটনায় সমস্ত চিত্রটিরই এক অন্যরূপ অর্থ প্রতিভাত হইল। কোকাবাবুর নাতি শরৎ অকস্মাৎ এক হাতে বন্দুক ও অন্য হাতে গোটাকয় মৃত বেলেহাঁস লইয়া ঘরে প্রবেশ করিল। বলিল ‘চর থেকে মেরে আনলাম বাবা, আজ আর খালিহাতে ফিরিনি’। তোমাকে কী বলিব। সেই ঘোষণায় এবং বেলেহাঁস দেখিয়া বাড়ির লোকজনের মধ্যে যেন একটা উত্তেজনা বহিয়া গেল। শরৎ কিশোর বয়স্ক। তাহার টিপ যে কি সাঙ্ঘাতিক হইয়াছে এবং তার সাহসও যে কত তাহাই তাহার বাবা গগন আমাকে বুঝাইতে লাগিল। শুনিতে শুনিতেই টের পাইলাম, ভিতর বাড়িতে বেলেহাঁস তরিবৎ করিয়া রাঁধিবার নানা তোড়জোড় চলিতেছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন কোকাবাবুকে সকলেই ভুলিয়া গেল। বার্ধক্যে ও মৃত্যুতে যে মানুষ কতটা একা ও নিঃসঙ্গ তাহা সেদিন বুঝিলাম। এও বুঝিলাম কোকাবাবুর আত্মীয়-পরিজনের মুখে যে উদ্বেগ ও আগাম শোকের ছাপ পড়িয়াছে তাহার সবটাই খাঁটি নয়, ছদ্মবেশও আছে। সেইদিনই মনে প্রশ্নের উদয় হইল, আমাদের প্রিয় পরিজনদের মধ্যে যে ভালবাসা সমবেদনা ও প্রেম দেখিতে পাই তাহার অনেকটাই বোধহয় আমাদের চোখের ভ্রম। সচ্চিদানন্দ, এবার একবার লম্বা ছুটি লইয়া আস। তোমারও আমার মতই বয়স হইয়াছে। জীবনের মেকী ও খাঁটিগুলিকে বাছাই করার জন্য তোমার সঙ্গে দীর্ঘ পরামর্শ আছে।….” পরদিন এই চিঠি হেমকান্ত তাঁর আবাল্য সুহৃদ সচ্চিদানন্দ বিশ্বাসকে।

    হেমকান্তর দেশভ্রমণের নেশা নেই। বস্তুত বাইরের জগৎ সম্পর্কে তাঁর ভীতি ও অজ্ঞতা সর্বজনবিদিত। নিজের জমিদারীরও সর্বত্র তিনি যাননি। অপরিচিত পরিবেশ ও অচেনা মানুষজনের মধ্যে তিনি বড় অস্বস্তি বোধ করেন। হেমকান্তর বন্ধু হোমিওপ্যাথ যোগেন্দ্র সিংহ প্রায়ই বলেন, তোমার বাপু এটি একটি মানসিক রোগ। পুরুষ মানুষের ঘরকুনো স্বভাব খুব স্বাভাবিক ব্যাপার নয়।

    কিন্তু হেমকান্ত ভাবেন, ঘরের বাইরে যে বিশাল পৃথিবী তার যত বৈচিত্র্যই থাকুক, নিজের গণ্ডীবদ্ধ জীবনেও যে তিনি বৈচিত্র্যের শেষ পান না। দুর্গাবাড়ির মণ্ডপের পিছনে একটি পোড়ো জমি আছে। এদিকটায় কেউই বড় একটা আসে না। এই ছাড়া-জমির একপাশে একটি শুকনো খাদে বাড়ির আবর্জনা ফেলা হয়। এই জমিটায় এক সময়ে হয়তো বাগান ছিল। এখন আগাছার নীচে মাটিতে মখমলের মতো শ্যাওলা পড়েছে। বাগানের শেষপ্রান্তে একটি ভাঙা ব্রুহাম গাড়ি পড়ে আছে কবে থেকে। তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে উঠেছে লতানো গাছ। হেমকান্ত মাঝে মাঝে কামলা ডেকে কিছুটা করে পরিষ্কার করান। তাই জঙ্গল খুব ঘন হতে পারেনি। কিন্তু এই জায়গাটার বন্য ও পরিত্যক্ত ভাবটিকে কখনো নষ্টও হতে দেন না হেমকান্ত।

    কেন এই জায়গাটা হেমকান্তর প্রিয় তার সুস্পষ্ট কোনো উত্তর তাঁর নিজেরও জানা নেই। তবে এই জায়গায় পা দিলেই তার ভিতরটায় একটা সুবাতাস বয়ে যায়। প্রায় আড়াই বিঘের এই ভূমিখণ্ডটি উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। পাঁচিলের গায়ে গায়ে চিরুনির দাঁড়ার মতো রুজু রুজু ঢ্যাঙা পাম গাছ। পৃথিবী থেকে আলাদা করে নেওয়া এই ভূমিখণ্ডে হেমকান্তর মন অবাধে বিস্তার লাভ করে। কত দার্শনিক চিন্তা আসে। ব্রুহাম গাড়িটার একটি পাদানী ঝেড়েঝুড়ে রোজ পরিষ্কার করে রেখে যায় চাকর রাখাল। হেমকান্ত বিকেলের দিকে প্রায়ই এসে সেই পাদানীতে বসেন। চারধারে কীট-পতঙ্গ পাখিদের শব্দ। বনজ একটা গন্ধ তাঁকে আচ্ছন্ন করে রাখে। কাশী বৃন্দাবন, হিমালয় বা সমুদ্র কোথাও যাওয়ার কোনো প্রয়োজন বা তাগিদ তিনি বোধ করেন না। তাঁর মনে হয়, এই তো বেশ আছি। মানুষের মন এক অদ্ভুত চিত্রকর। চেনা পরিচিত জায়গাতেও সে কত নিপুণ হাতে তুলির একটু-আধটু টানে কত অপরিচিত দৃশ্যই না ফুটিয়ে তোলে। ব্রুহাম গাড়ির পাদানীতে বসে হেমকান্ত তাঁর মনটিকে কাজ করে যেতে দেন! ধীরে ধীরে তাঁর সামনে ফুটে ওঠে অভ্রভেদী পাহাড়, তরঙ্গক্ষুব্ধ সমুদ্র, কনখলের রাস্তা বা ইংলণ্ডের মফঃস্বল।

    মনোরোগ? না, তাঁর কোনো মনোরোগ নেই তো! তবে একটা দুঃখ আছে। খুব গোপন দুঃখ। কিংবা হয়তো তা গোপন এক সুখই আসলে। সেই দুঃখ বা সুখের কথা তিনি বড় একটা কাউকে বলেননি কখনো। শুধু সচ্চিদানন্দ জানে।

    যেদিন কুয়োর বালতি হাত থেকে পড়ে গেল, সেদিন ভারী ও বিপুল বেলজিয়ামের কাচে তৈরি তিন খণ্ডের পূর্ণাবয়ব আয়নার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ালেন তিনি। স্ত্রী-বিয়োগের পর একবার মৃত্যু-চিন্তা এসেছিল তাঁর। সেটা স্থায়ী হয়নি। বিসর্জিত অশ্রুই সেই মৃত্যু-চিন্তা ও শ্মশানবৈরাগ্যকে ধুয়ে নিয়ে গিয়েছিল। হেলে পড়া গাছ যেমন ঠেকনায় ভর দিয়ে বেঁচে থাকে, তেমনি স্ত্রী-বিয়োগের সময় তাঁকে ঠেকা দিয়ে রেখেছিল রঙ্গময়ী। শুধু রঙ্গময়ী বলেই পেরেছিল। নইলে তখনই হেমকান্তর সংসার ছাড়ার কথা।

    বেলজিয়ামের খাঁটি ও মহান আয়না তাঁকে কিছুই বলল না। তিন খণ্ডে তাঁকে ভাগ করে বিশ্লেষণ করল, তাঁর তিনটি প্রতিবিম্বকে কোলে নিয়ে ভাবল অনেকক্ষণ কিন্তু কিছুই বলল না। সব কথা বলতে নেই। হেমকান্ত বিষন্নবদনে এসে বসলেন সেই ব্রুহাম গাড়ির পাদানীতে।

    বিকেল হয়েছে। ফার্ণ জাতীয় কিছু সুন্দর গাছ গজিয়েছে ব্রুহাম গাড়িটার আশেপাশে। ভারী সুন্দর গাছগুলি। হেমকান্তর পায়ে মোজা এবং তালতলার চটি। সেই চটির ডগা দিয়ে তিনি গাছগুলিকে একটু আদর করলেন।

    একটা আবছা ধোঁয়ার আস্তরণ হালকা মেঘের মতো ভেসে আছে সামনে। দুর্গাবাড়ির পিছনের অংশটা দেখা যাচ্ছে না। যে ঘাসে-ছাওয়া শ্যাওলায় পিছল আঁকা-বাঁকা পায়ে-চলা পথটি ধরে রোজ তিনি ব্রুহাম গাড়িটার কাছে আসেন সেটাও আজ ওই আবছায়ায় অর্ধেক আড়াল। সেদিকে চেয়ে তিনি ভোররাত্রির ঘটনাটা আবার তৈরি করতে লাগলেন মনে মনে। তুচ্ছ ও সামান্য একটা ঘটনা।

    ইঁদারার মধ্যে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছেন হেমকান্ত। বাঁ হাতে দড়ির লাছি সতর্ক মুঠোয় ধরা, ডান হাতের আলগা মুঠির ভিতর দিয়ে পিছল সাপের শরীরের মতো নেমে যাচ্ছে পাটের মজবুত দড়ি। শীতকালে জল নেমে যায়। বালতি সেই অনন্ত গহ্বরে নামছিল তো নামছিলই। কোথাও অন্যমনস্কতার কোনো কারণ ছিল না। আর কেউ খবর রাখে না, শুধু হেমকান্তই জানেন, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজেও তাঁর মতো সতর্ক লোক দ্বিতীয়টি নেই। এই গুণের জন্য গোপনে একটু গর্ববোধও আছে তাঁর। আচমকা দড়ির প্রান্তে বাঁধা বালতি জল স্পর্শ করল। শব্দ পেলেন হেমকান্ত। বহিরাগতের স্থূল স্পর্শে নিথর ঘুমন্ত জলে কুমারী-শরীরের মতো শিহরণ। বাঁ হাতের শক্ত মুঠিতে ছিল দড়ির লাছি এবং শেষ গিট। ডান হাতও সতর্ক ছিল। তবু কেন তাঁর দুটি হাতের কোনোটাই ধরে রাখল না দড়িটাকে? অসতর্কতা নয়, অন্যমনস্কতা নয়। হেমকান্তর মনে হয়, তাঁর দুটি হাত ছেড়ে দিতে চেয়েছিল দড়িটাকে, তাই দিল। হেমকান্তর কিছু করার ছিল না।

    সেই দু’টি হাতের দিকে শীত অপরাহ্ণের পড়ন্ত ম্লান আলোয় কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন হেমকান্ত। শ্রমের কাজ জীবনে কমই করেছেন। হাত দুটি কোমল ও লাবণ্যময় এখনো। হাতের চেটো এখনো তুলতুলে, এখনো রক্তাভাময় লম্বা ও পুরন্ত শিল্পের আঙুল। ময়লাহীন নরুণে সুন্দর করে কাটা নখ। এ দু’টি হাতের কোনো আলাদা সত্তা নেই, হেমকান্ত জানেন। তবু আজ ভাঙা ব্ৰুহাম গাড়ির পাদানীতে বসে তাঁর মনে হল, এ দুটি হাত তাঁকে কিছু ইঙ্গিত করছে। বলছে, ছেড়ে দাও, পার্থিব যা কিছু আছে ছেড়ে দাও। বাঁধনে থেকো না তুমি। চলো।

    কিন্তু চলো বললেই তো আর যাওয়া যায় না। কোথায় যাবেন বাইরের ধৃসর অচেনায়? এই তো তিনি বেশ আছেন। সংসারে কোনো বন্ধন তাঁর কখনো ছিল না, এখনো নেই। ছেলেমেয়েদের মধ্যে কাউকেই তাঁর কোলেপিঠে মানুষ করতে হয়নি। স্ত্রীর মৃত্যুর পর ছোটো দুটি ছেলেমেয়ের ভার নিয়েছিল পুরোনো ও বিশ্বাসী দাসীরা। আর দশভুজার মতো রঙ্গময়ী। এমন কি নিজের স্ত্রীর সঙ্গেও এক অপরিমেয় দূরত্ব ছিল তাঁর। অন্দরমহল ও সাংসারিক কাজেই ব্যস্ত থাকতে হত সুনয়নীকে। শেষ কয়েক বছর দুরারোগ্য ক্ষতে শয্যাশায়ী ছিলেন। সুতরাং হেমকান্তর বন্ধন বলতে কিছু নেই। কেউ তাঁকে ধরে রাখেনি। তবু হেমকান্তের কোথাও যাওয়ার নেই। এই পোড়ো জংলা ভূমিখণ্ডই তাঁকে অনন্তের আস্বাদন দেয়।

    কুয়াশার ভিতরে অস্পষ্ট এক ছায়ামূর্তিকে দেখে অন্যমনস্ক হেমকাত্ত একটু চমকে উঠলেন। উত্তরের পরিত্যক্ত দেউলের ভেঙে পড়া দেওয়ালের এক অংশ দিয়ে ছায়ামূর্তি ঢুকল। ওদিকে রাস্তা নেই। চারদিকে ইঁট ছড়িয়ে পড়ে আছে। লম্বা ঘাসের জঙ্গল। সাপের প্রিয় সে পথ ধরেই এগিয়ে আসছিল সে। চকিত পায়ে।

    হেমকান্তর হাতের লাঠিটায় থুঁতনির ভর রেখে সকৌতুকে চেয়ে রইলেন। রঙ্গময়ী এখনো চকিত-চরণা, চকিত-নয়না, চকিত-রসনা।

    বঙ্গময়ীর বয়স ত্রিশের আশেপাশে। তাকে হঠাৎ-সুন্দরী বলা যায় না। একপলক তাকিয়ে দেখলে তাম্রাভ গাত্রবর্ণের মেয়েটিকে তেমন নজরে পড়বে না। রঙ্গময়ীর শরীর কৃশ এবং কিছু দীর্ঘ। চোট দু’টি বড় এবং মাদকতাময়। সবচেয়ে সুন্দর তার ঝকঝকে দাঁত। লম্বাটে মুখখানায় একটু আপাত-কঠোরতা আছে বটে, কিন্তু বিন্দুমাত্র পুরুষালী ভাব নেই। গম্ভীর থাকলে রঙ্গময়ীকে ওরকম দেখায়। হাসলে মুখের আশ্চর্য রূপান্তর ঘটে। আশ্চর্য তার চোখ। একবার তাকালে আঠাকাঠির মতো চোখ লেগে থাকে। ফেরাতে ইচ্ছে করে না। কী গভীর মায়া, কত ছলছলে আর করুণ!

    শীতের পোশাক বলতে রঙ্গময়ীর অঙ্গে শুধু একটা মোটা সূতীর চাদর জড়ানো। পায়ে চটি নেই। এই শীতে রঙ্গময়ীর পায়ের চামড়া ফেটে একাকার কাণ্ড। ফিতে-পেড়ে সাদা খোলের একটা শাড়ি পরনে।

    হেমকান্তর স্নিগ্ধ মুখে ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটল। বললেন, বড় ঠাণ্ডা পড়েছে, খালি পায়ে ঘোরা ঠিক নয়।

    রঙ্গময়ী বলল, আহ্লাদের কথা পরে হবে। ও-সব তোমার মুখে মানায় না। শরৎ খবর দিয়ে গেল কোকাবাবুর শ্বাস উঠেছে। একবার যাও।

    হেমকান্ত নড়ে উঠলেন, খুব খারাপ অবস্থা নাকি?

    এখন আর খারাপ নয়, একেবারে শেষ অবস্থা। একবার যাও।

    হেমকান্ত গম্ভীর হলেন। বললেন, আমি গিয়ে কী করব? বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। গোটা কয়েক সান্ত্বনার বুলি আউড়ে যেতে হবে। এছাড়া আর কি?

    রঙ্গময়ী খুব শান্ত স্বরে বলল, সেটুকুও তো করা দরকার।

    আজ আমার শরীর ভাল নেই মনু। মনটাও খারাপ।

    তাহলে যাবে না?

    নাই গেলাম। এ-সব সামাজিকতা আমার ভাল লাগে না।

    নাকি চোখের সামনে কাউকে মরতে দেখতে চাও না!

    হেমকান্ত একটু হাসলেন। বললেন, তাও বটে।

    রঙ্গময়ী হেমকান্তর দু হাত দূরত্বে দাঁড়ানো। তার গা থেকে একটা আঁচ আসছে বলে মনে হল হেমকান্তর। রঙ্গময়ী বলল, তুমি আমি সবাই একদিন না একদিন তো মরবোই। মরতে দেখা ভয়ের কী?

    হেমকান্ত অন্য পন্থা ধরে বললেন, কোকাবাবু যদি মরেন তাহলে আমাকে তো আবার স্নান না করিয়ে ঘরে ঢুকতে দেবে না।

    স্নান করবে। তাতে কি? গরম জল করা থাকবে। আগুন আর লোহা ছুঁয়ে ঘরে ঢুকবে। আমি সব তৈরি রাখব।

    রাখবে জানি। কিন্তু আজ আমার অত হাঙ্গামা ভাল লাগছে না।

    রঙ্গময়ী একটু হতাশার গলায় বলে, কোনোকালেই তো কোনো হাঙ্গামা পোয়ালে না। এমন জড়ভরত হয়ে দিন কাটাতে ভাল লাগে তোমার?

    হেমকান্ত বিষন্ন গলায় বললেন, সংসার বাস্তবিকই বড় জটিল জায়গা মনু। সুনয়নী গেছে, ভেবেছিলাম এরপর আর লোক-লৌকিকতা, ভদ্রতা অভদ্রতার ধার ধারতে হবে না। আপনমনে থাকব। এখন দেখছি, নিজেরমতো করে থাকবার উপায় নেই।

    অত রেগে যাচ্ছো কেন? ব্যাপারটা খুব সামান্য। কোকাবাবু তোমাদেরই জ্ঞাতি। এক শহরে বাস। না গেলে কেমন দেখাবে? এ সময়ে শত্রুও তো যায়।

    মনু, তুমি কোনোদিন আমার কোনো অসুবিধে বুঝলে না। কোনটা আমি ভালবাসি, কোনটা বাসি না সেটা জেনেও তুমি সবসময়ে অপছন্দের কাজটাই আমাকে দিয়ে করাতে চাও। মরার সময় নাই বা গেলাম, কোকাবাবুর অসুখের সময় তো আমি প্রায়ই দেখতে গেছি।

    রঙ্গময়ী হাসল না বটে, কিন্তু তার মুখে কিছু কোমলতা ফুটল। যেমন শিশুর অসহায়তা দেখে মায়ের মুখে ফোটে। রঙ্গময়ী খুব মৃদু স্বরে বলল, সঙ্গে আমি গেলে?

    হেমকান্ত এ কথায় হঠাৎ মুখ তুলে রঙ্গময়ীর দিকে তাকান। বিভ্রান্তের মতো বলেন, তুমি গেলে—তুমি গেলে—

    সহিসকে গাড়ি যুততে বলো গে, আমি তৈরি হয়ে আসছি।

    হেমকান্ত হঠাৎ বললেন, খারাপ দেখাবে না মনু?

    রঙ্গময়ী যেতে যেতে মুখ ফেরাল। মুখে একটু হাসি। কী অপরূপ হয়ে গেল মুখটা! বিহ্বল হেমকান্ত চেয়ে রইলেন।

    রঙ্গময়ী বলল, দেখাবে। তবু তোমার জন্যেই যেতে হবে।

    বরং খবর পাঠিয়ে দাও, আমার শরীর খারাপ।

    সেটা অজুহাত হল, অজুহাত কি ভাল?

    মানুষের শরীর খারাপ হয় না?

    হয়। তোমার হয়নি।

    কে বললে হয়নি?

    রঙ্গময়ী একটু ভ্রূ কুঁচকে চিন্তান্বিত মুখে বলে, সত্যি বলছো নাকি? শরীর সত্যিই খারাপ?

    হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন, তোমরা তো কেউ আমার কোনো খবর রাখো না মনু। সে না হয় নাই রাখলে, কিন্তু মুখের কথাটুকু অন্তত বিশ্বাস কোরো।

    রঙ্গময়ী এই অভিমানের কথায় মুচকি হেসে বলল, শরীর খারাপ তা বুঝব কি করে? দিব্যি তো ফুল-ফুল সেজে কুঞ্জবনে এসে বসে আছো।

    হেমকান্ত ডাক-হাঁক বা প্রচণ্ড প্রতাপের মানুষ নন। তবে বন্ধ কপাটের মতো তার একটা নীরেট গাম্ভীর্য আছে। সেইজন্য সকলেই তাঁকে সমীহ করে। তাঁর মুখের দিকে চেয়ে তরল কথাবার্তা কেউই বলে না। অবশ্য রঙ্গময়ী তার ব্যতিক্রম। হেমকান্তও রঙ্গময়ীর কাছেই কিছু প্রগল্‌ভ হয়ে ওঠেন! রঙ্গময়ীর এ কথাটায় তিনি হাসলেন না। বোধহয় পুরোনো ক্ষতে ব্যথাতুর স্পর্শ পেলেন। বললেন, আজকের দিনটা আমার ভাল যাচ্ছে না মনু। মনটা মুষড়ে আছে। এর ওপর যদি কোকাবাবুর মৃত্যুটা চোখে দেখতে হয় তবে সারা রাত আর ঘুম হবে না।

    রঙ্গময়ী তার মায়াবী চোখ দিয়ে যতদূর সম্ভব খুঁটিয়ে লক্ষ্য করে হেমকান্তকে। তারপর বলে, মনের আর দোষ কি? পুরুষ মানুষরা হাঁটে, বেড়ায়, আড্ডা দেয়, তাস পাশা খেলে। তোমার তো সে-সব কিছু নেই। কেবল বসে বসে আকাশ পাতাল কী যে ভাবো।

    হেমকান্ত একটু ব্যঙ্গের হাসি হেসে বললেন, আমি কি কেবল বসেই থাকি? কিছু করি না?

    তা বলিনি। নিজের সব কাজ তুমি নিজেই করে নাও। কিন্তু সেটাও কি বাপু পুরুষ মানুষকে মানায়? নিজের ছাড়া কাপড় ধুচ্ছো, নিজের জল গড়িয়ে নিচ্ছো, নিজের মশারি টাঙাচ্ছো বা জুতো বুরুশ করছো, পুরুষ মানুষের এ কেমন ধারা? অত দাসদাসী তবে আছে কেন?

    তাহলে কিছু করি বলছো?

    করো, কিন্তু ওসব করো বলে আমি তোমার প্রশংসা করতে পারব না।

    তোমার প্রশংসা! ওরে বাবা! সে তো নোবেল প্রাইজ পাওয়ার শামিল।

    আমার প্রশংসা তো বড় কথা নয়। তোমার বউও দুঃখ করে বলত, উনি যে কেন সকলের এত ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলেন।

    বলত নাকি?

    বলবে নাই বা কেন? তাকে তো তুমি স্বামীসেবার সুযোগই দাওনি। জ্বর হলে মাথাটা পর্যন্ত টিপে দিতে ডাকতে না।

    সেটা ভাল হয়নি বুঝি?

    ভাল কি মন্দ সে জানি না। মেয়েমানুষের বুদ্ধি অল্প, তার ওপর আমি মুখ্যু মানুষ। আমাদের চোখে ভাল লাগে না বলেই বলি।

    রঙ্গময়ীর স্বরে একটু অভিমানের সুর ছিল কি? হেমকান্ত মনে মনে একটু উদ্বিগ্ন হলেন। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব যে মতগুলি আছে তা তিনি কদাচিৎ লোকের কাছে ব্যক্ত করেন। তর্ক করতে কেউ তাঁকে দেখেনি কখনো। হেমকান্ত মৃদু স্বরে বললেন, তোমার বুদ্ধি অল্প নয়। মূর্খও তোমাকে কেউ বলেনি। আমার সম্পর্কে তোমার সিদ্ধান্তও সঠিক। আমি নিজে আমার ত্রুটিগুলি খুব ভাল বুঝি। কিন্তু মনু, দোষ জেনেও কি সব সময়ে মানুষ সে দোষ ছাড়তে পারে?

    রঙ্গময়ী ভ্রূকুটি করে বলে, তোমার দোষ দেখে বেড়ানোই বুঝি আমার কাজ? সে সব নয়। কিছু মনে কোরো না আমার কথায়। শরীর খারাপের কথা বলছিলে, কী হয়েছে তা তো বললে না।

    এখনো তেমন কিছু হয়নি। হয়তো শরীর ততটা খারাপ নয়। মনটা খারাপ। আর মন খারাপ বলেই শরীরটাও ভাল লাগছে না।

    চুপচাপ বসে থাকলে কি মন ভাল হবে? একটু বেড়িয়ে এসে গিয়ে। কোকাবাবুর বাড়িতে না যাও, অন্য কোথাও তো যেতে পারো।

    হেমকান্ত হঠাৎ দাঁড়ান। বলেন, না তার দরকার নেই। চলো, বরং দুজনেই কোকাবাবুর বাড়িতে যাই।

    এ কথায় রঙ্গময়ী যেন একটু খুশি হয়। একটা দীপ্তি ক্ষণেক খেলা করে যায় মুখে। চোখের গভীর দৃষ্টি যেন বলে, এই তো চাই।

    রঙ্গময়ীর সঙ্গে হেমকান্তর বাইরের সম্পর্কটা খুবই পলকা। প্রায় কিছুই নয়। রঙ্গময়ী এ বাড়ির পুরুতের মেয়ে। পুরুত বিনোদচন্দ্র এখন খুবই বুড়ো হয়ে পড়েছেন। তাঁর ছেলে লক্ষ্মীকান্তই এখন পূজো-আর্চা করে। বিনোদচন্দ্রের অনেকগুলি ছেলেমেয়ে। তাদের অধিকাংশই লেখাপড়া শেখেনি। ভাল করে খাওয়াই জুটত না তাদের। রঙ্গময়ী বিনোদচন্দ্রের চতুর্থ কন্যা। তাঁর আশা ছিল জমিদার শ্যামকান্তর মধ্যমপুত্র হেমকান্তর সঙ্গে এই মেয়েটির বিয়ে হবে। শ্যামকান্তর স্ত্রী মেয়েটির সুলক্ষণ দেখে একবার এরকম অভিমত ব্যক্ত করেন। কষ্টেসৃষ্টে তিন মেয়ের বিয়ে দিলেও চতুর্থ রঙ্গময়ীর জন্য বিনোদচন্দ্র অন্যত্র বিয়ের চেষ্টা করেননি। বয়সে রঙ্গময়ীর চেয়ে হেমকান্ত প্রায় পনেরো বছরের বড়। কিন্তু রঙ্গময়ীর যখন বছর পাঁচেক বয়স তখন হেমকান্তর বিয়ে হয়ে যায়। এরপর বিনোদচন্দ্র, নলিনীকান্তর আশায় বসে রইলেন। কিন্তু শ্যামকান্ত বা তাঁর স্ত্রীর তরফ থেকে তেমন কোনো আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত পেলেন না। তাঁর বড় তিনটি মেয়েই গরীবের ঘরে পড়েছে। তাদের একজন আবার অকাল বৈধব্যের কবলে। ছেলেরা কেউই মানুষ হয়নি। বিনোদচন্দ্র তখন রঙ্গময়ীকে জমিদারের ঘরে বিয়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া। পুরোহিত হলেও তাঁর নীতিজ্ঞান প্রখর ছিল না। গলগ্রহ এক বালবিধবা বোন তাঁর সংসারে আছে। কনকপ্রভা। কনকের বুদ্ধি তীক্ষ্ণ, তবে বাঁকা। কনক একদিন বিনোদচন্দ্রকে বলল, সোনাভাই, যদি চৌধুরীবংশেই মনুকে দিতে চাও তো সোজা পথ ছাড়। বিনোদচন্দ্র সোজা পথ ছাড়তে রাজি, কিন্তু বাঁকা পথ পেলে তো!

    কনক সেই বাঁকা পথের সন্ধান দিল না। তবে নিজেই দায়িত্ব নিল।

    নলিনী বড় দালানে থাকত না। কাছারিঘরের পাশে খাজাঞ্চী মুহুরি বা ওই ধরনের কর্মচারীদের জন্য যে এক সারি ঘর ছিল তারই একটায় থাকত। বিলাসব্যসনের ধারেকাছেও ঘেঁষত না সে। ঘরে একটি তক্তপোশ, তাতে দীন বিছানা। কয়েকটা বইয়ের আলমারি আর লেখাপড়ার জন্য একটা টেবিল আর চেয়ার ছিল। অনেক রাত অবধি জেগে সে পড়াশুনো করত সেই ঘরে।

    সেই ঘরে মাঝে মাঝে কনক রঙ্গময়ীকে পাঠাত। রঙ্গময়ীর কাজ ছিল গিয়ে জিজ্ঞেস করা, আপনার কি কিছু লাগবে?

    এরকম নিরীহভাবে ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল। নলিনীর ঘরে মাঝে মাঝে খাওয়ার জল বা ঘোলের সরবৎ দিয়ে আসত রঙ্গময়ী। কাজটা তাকে দিয়ে কেন করানো হচ্ছে তা অবশ্য সে বুঝত না। নলিনীর প্রতি সে কোনো যুবতীসুলভ আকর্ষণও বোধ করত না।

    নলিনীও ছিল হৃদয়চর্চা থেকে বহুদূরের মানুষ।

    কিন্তু কনক ধৈর্য হারাচ্ছিল। মেয়েটা হাবা, ছেলেটা গবেট।

    সুতরাং আর একটু বাঁকা পথ নিতে হল কনককে। একদিন একটু বেশী রাত্রে সকলে ঘুমোনোর পর রঙ্গময়ীকে ঠেলে তুলে দিল কনক, যা তো, নলিনীর বোধহয় খুব জ্বর এসেছে। দেখে আয় তো।

    রঙ্গময়ী ঘুমচোখে একটু অবাক হলেও তড়িঘড়ি গিয়ে ঢুকেছিল নলিনীর ঘরে। নলিনী পড়তে পড়তে মুখ তুলে অবাক হয়ে চাইল। এত রাত্রে রঙ্গময়ী!

    কিছু বুঝবার আগেই বাইরে থেকে দরজা টেনে শিকল তুলে দিল কনক।

    নলিনী চমকে উঠল।

    আর থরথর করে কেঁপে উঠল রঙ্গময়ী!

  • এগার থেকে বিশ পরিচ্ছেদ

    এগার থেকে বিশ পরিচ্ছেদ

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    এগার

    পিতার বাৎসরিক কাজটি হেমকান্ত প্রতিবছর বেশ ঘটা করেই করেন। শ’খানেক ব্রাহ্মণকে ভোজন করানো হয় এবং ভালরকম দক্ষিণা ও অন্যান্য দানসামগ্রী দেওয়া হয়। ব্রাহ্মণ ছাড়াও আমন্ত্রিতের সংখ্যা বড় কম হয় না।

    এ বছর হেমকান্ত একটু দ্বিধায় পড়লেন। আয় ভাল নয়। হিসেবপত্র করে যা দেখছেন তাতে এসটেট চালানোই যথেষ্ট কষ্টকর। এর ওপর বাড়তি কোনো খরচের বোঝা বইতে গেলে উপরি আয় চাই। প্রচলিত ও প্রথাসিদ্ধ অনুষ্ঠানে কাটছাঁট করার ইচ্ছে হেমকান্তর নেই। বিশেষ করে বাবার বাৎসরিকের প্রশ্ন যেখানে। অগত্যা তিনি রঙ্গময়ীকে ডেকে পাঠালেন।

    শোনো মনু, সুনয়নীর বেশ কিছু গয়নাগাটি আছে। সেগুলো কোথায় আছে আমি সঠিক জানি না। মেয়েদের মহলে গিয়ে খোঁজ খবরও করা যাবে না। খবরটা আমাকে এনে দিতে পারবে? গোপনে?

    কেন, সুনয়নীর গয়নার খোঁজ করছ কেন?

    দরকারেই করছি।

    দরকারটা শুনি।

    আহা, অত দারোগাগিরির কী আছে। গয়নাগুলোয় তো আমারও খানিকটা অধিকার আছে, না কি?

    ওমা, তোমার নেই তো আছে কার? কিন্তু সুনয়নী এতকাল মরেছে, এ খোঁজটা এতদিন পরে করছো কেন?

    বললাম তো দরকার আছে।

    গয়না কোথায় আছে জানি। কিন্তু কী অবশিষ্ট আছে তা বলতে পারব না।

    তার মানে? অবশিষ্ট কথাটা বললে কেন? চুরি-টুরি গেছে নাকি?

    চুরি নয়। সুনয়নীই কিছু গয়না মেয়েদের আর বউদের ভাগ করে দিয়ে গিয়েছিল। আর যা ছিল তাও সব নেই। মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি থেকে আসে, এটা ওটা নিয়ে যায়। বউরাও নিয়েছে।

    হেমকান্ত বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকে বলেন, গয়নার একটা হিসেব থাকা উচিত ছিল।

    সুনয়নী অত হিসেবী মেয়ে ছিল না।

    তোমার তো নিশ্চয়ই মনে আছে।

    রঙ্গময়ী হেসে ফেলে বলে, গয়না তোমার বউয়ের আর তার হিসেব রাখতে হবে আমাকে?

    হিসেব কি সত্যিই নেই?

    রঙ্গময়ী মাথা নেড়ে বলে, না। তবে সুনয়নী আমাকে একজোড়া বালা আর একটা হার দিয়েছিল।

    তোমাকে দেওয়া গয়নার কথা আসছে কেন?

    আসছে তার কারণ আছে। সুনয়নী কাউকে সাক্ষী রেখে গয়না দুটো আমাকে দেয়নি। আমি পরিও না। পরলে চোর-দায়ে ধরা পড়তে পারি। সেগুলো পড়ে আছে বাক্সে। তোমার গয়নার দরকার থাকলে নিতে পারো।

    দূর, কী যে বলো।

    রঙ্গময়ী একটু হাসল। প্রশান্ত গলাতেই বলল, তোমার মতো মানুষ বউয়ের গয়নার খোঁজ করছে এটা ভাবাই যায় না। ইদানীং কি খুব হিসেবী হয়েছে?

    হলে দোষ কী?

    দোষ তো নয়ই। বরং তুমি হিসেবী হলে আমি বাঁচি। কী দরকার বলো তো? বেচবে নাকি?

    হেমকান্ত অস্বস্তি বোধ করেন। প্রসঙ্গটা খুবই লজ্জাজনক। হেমকান্ত ঘরের সোনা বেচতে চান এটা পাঁচকান হলে গোটা পরিবারটারই মর্যাদার হানি। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, আরে না। হঠাৎ মনে হল, গয়নাগুলো গেল কোথায়?

    সুনয়নীর ঘরে দেয়ালের সিন্দুকে সব পাবে। তার চাবি আছে তোমার পড়ার ডেসকের ড্রয়ারে।

    ঠিক আছে।

    এ কথাতে রঙ্গময়ী চলে গেল না। চুপ করে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গলাটা সামান্য নামিয়ে বলল, গয়না দিয়ে তুমি কী করবে জানি না। তবে আমি বলি, ও গয়না থেকে একটাও এদিক ওদিক করাই ভাল। তোমার হিসেব না থাক, তোমার মেয়ে আর বউদের আছে। কিছু সরালেই তারা টের পাবে।

    হেমকান্ত বিস্মিত হয়ে বলেন, তারা টের পাবে? তা পাক না।

    রঙ্গময়ী একটু বিব্রত হয়। একটু অপ্রতিভ হাসে। মৃদুস্বরে বলে, তুমি ভাবছো, তোমার বউয়ের গয়না, সুতরাং ওর ওপর তোমারই অধিকার।

    তাই তো হওয়া উচিত মনু।

    উচিত তো অনেক কিছুই। কিন্তু ও গয়নায় হাত পড়লেই কুরুক্ষেত্র লেগে যাবে। তোমার মেয়ে আর বউরা বনবেড়ালের মতো থাবা পেতে বসে আছে। পূজোর সময় কী কান্ড হয়েছিল তা তো জানো না।

    কী কান্ড?

    সে তোমার শুনে কাজ নেই। অন্দরমহলে অনেক কিছু হয়, সবটাই পুরুষের কানে না যাওয়া ভাল।

    নিশ্চয়ই ঝগড়া?

    হ্যাঁ, ভীষণ ঝগড়া। আর সেটা সুনয়নীর গয়না নিয়েই। তাই বলছিলাম হট করে গয়নায় হাত দিও না।

    হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মুখখানায় বিমর্ষতার ছায়াপাত ঘটল। হেমকান্ত বসেছিলেন নিজের শোওয়ার ঘরখানায় পূর্বাস্য হয়ে। মেঝের ওপর পুরু উলের গালিচা, তার ওপর একটা ছোট্টো ডেসকে প্যাড ও লেখার সরঞ্জাম সাজানো। সকালের রোদ এসে পড়েছে গালিচার ওপর। সেই আলোয় গালিচার অপরূপ রং ও নকশা ক্ষুরধার হয়ে উঠেছে।

    হেমকান্ত গালিচার নকশার দিকে চেয়ে থেকে বললেন, কত ভরি গয়না আছে জানো?

    না। তবে শুধু সুনয়নীরই বোধহয় হাজার ভরির মতো সোনা ছিল। এখন বোধহয় অত নেই।

    ওরা কতটা নিয়েছে তা বোধহয় জানো না?

    না। ওরা যখন সিন্দুক খোলে তখন আমি কাছে থাকি না।

    তবে জানলে কী করে যে, নিয়েছে?

    মেয়েমানুষ হচ্ছে হান জীব।

    হেমকান্ত হাঁ করে চেয়ে থেকে বললেন, এ কথাটার মানে বুঝলাম না।

    রঙ্গময়ী হেসে বলে, মানে কি ছাই আমিই জানি। মেয়েমানুষের লেখাপড়া নেই, চিন্তাভাবনা নেই, তাদের মন আর চোখ সবসময়েই সংসারের আস্তাকুঁড় খুঁটছে। তাই তারা খবর রাখে।

    তুমি কি সেইরকম মেয়েমানুষ?

    তবে আর কীরকম?

    হেমকান্তর একবার ইচ্ছে হল সচ্চিদানন্দর চিঠিটা রঙ্গময়ীকে দেখান। কিন্তু সেই চিঠিতে তো শুধু রঙ্গময়ীর প্রশংসাই নেই, তাঁকে এবং রঙ্গময়ীকে জড়িয়ে এমন সব ইঙ্গিত আছে যা পড়লে রঙ্গময়ী হয়তো বা গলায় দড়ি দেবে। হেমকান্ত রঙ্গময়ীর দিকে এই সকালের আলোয় চেয়ে দেখলেন ভাল করে।

    সচ্চিদানন্দ মিছে বলেনি। ধারালো এক ব্যক্তিত্ব রঙ্গময়ীকে এই ভরা যৌবনে ভারী বিশিষ্ট করে তুলেছে। ব্যক্তিত্বটা কী ধরনের তা অবশ্য জানেন না হেমকান্ত। কারণ রঙ্গময়ী তাঁর প্রতিদিনকার দেখা ও জানা একটি মানুষ। এত কাছের মানুষের মধ্যে ধরাছোঁয়ার বাইরের কোনো গুণ আছে কিনা তা টের পাওয়া কঠিন। তবু সচ্চিদানন্দর চিঠিটা পাওয়ায় পর থেকে রঙ্গময়ীকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করছেন হেমকান্ত। কিন্তু পুরোনো চোখ সব গন্ডগোল করে দিচ্ছে। হেমকান্ত বললেন, নিজের সম্পর্কে তুমি যাই বলল, লোকে কিন্তু অন্য কথা বলে।

    লোকে কী বলে?

    বলে, তুমি নাকি অসাধারণ।

    লোকের আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই। কে তোমাকে আবার এসব বলল?

    সচ্চিদানন্দকে তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই?

    থাকবে না কেন? পাজি লোকদের আমার মনে থাকে।

    পাজি লোক! হেমকান্ত চোখ বড় বড় করে বলেন, কে পাজি? আমার বন্ধু সচ্চিদানন্দ?

    তার কথাই তো হচ্ছে।

    সে পাজি হবে কেন?

    কেন হবে তা অত বলতে পারি না। তবে লোক চিনি।

    কীরকম চেনো?

    ভালই চিনি। ললিতার বিয়ের সময় যা একখানা কান্ড করেছিল।

    কী কান্ড?

    সবই কি তোমাকে শুনতে হবে?

    হবে।

    শুনে তোমার ভাল লাগবে না।

    তুমি সবসময়ে আমার মন রেখে কথা বলো?

    তা অবশ্য বলি না। কিন্তু শুনলে যদি তোমার বন্ধুপ্রীতি চটে যায়?

    হেমকান্ত মৃদু ও ম্লান একটু হেসে বললেন, তবু শোনা যাক। একটা মানুষকে নানাভাবেই জানতে হয়।

    স্নিগ্ধ ও স্মিত মুখে রঙ্গময়ী কিছুক্ষণ হেমকান্তর মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলে, ললিতার বিয়ের সময় সচ্চিদানন্দবাবু আমাকে ছাদে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেছিল, রঙ্গময়ী, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।

    বলো কী? হেমকান্ত ভারী বিব্রত বোধ করতে থাকেন।

    অবশ্য উনি আমার অবস্থা দেখে দুঃখিত হয়েই প্রস্তাবটা করেন। বলেছিলেন, তোমার তো গতি হচ্ছে না। ভবিষ্যৎ বলতে তো একটা কথা আছে।

    তুমি কী বললে?

    আমি কী বলতে পারি বলে তোমার মনে হয়?

    হেমকান্ত হাঁ করে চেয়ে থেকে বলেন, কী জানি।

    আমি বললাম, আপনার স্ত্রী তো একজন আছেন। উনি বললেন, থাক না। পুরুষমানুষের কি একজনকে নিয়ে থাকলে হয়?

    তুমি তখন কী করলে?

    একটা কথা বলেছিলাম। তাইতে উনি খুব ঘাবড়ে গিয়ে প্রস্তাবটা ফিরিয়ে নিলেন।

    কথাটা কী?

    সেটা বলতে পারব না।

    কিছুতেই না?

    কিছুতেই না।

    হেমকান্ত আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, থাকগে, শুনতে চাই না।

    রঙ্গময়ী কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে বলে, যে ছেলেটাকে কাছারি বাড়িতে থাকতে দিয়েছো তার খুব জ্বর। জানো?

    শুনেছিলাম।

    তার বাড়িতে একটা খবর দেওয়া দরকার।

    ঠিকানাটা জেনে নিয়ে একটা চিঠি দিয়ে দাও।

    রঙ্গময়ী মৃদু হেসে বলে, তোমার যা বুদ্ধি!

    কেন, বুদ্ধির আবার কী দোষ হল?

    ছেলেটা পুলিসের তাড়া খেয়ে পালিয়ে এসেছে তা তো জানো।

    হ্যাঁ, বলছিল বটে।

    তাহলে চিঠি লেখাটা কি ঠিক হবে? পুলিস হয়তো চিঠির খোঁজ করবে।

    হেমকান্ত একটু বিরক্ত হয়ে বলেন, তাহলে কী করব?

    বরিশালে কাউকে পাঠাও। সে গিয়ে ওর বাবাকে খবরটা গোপনে দিয়ে আসবে।

    ডাক্তার কী বলছে? অবস্থা খুব খারাপ?

    বেশ খারাপ। মাঝে মাঝে জ্ঞান ফিরছে, আবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। জ্বরটাও ছাড়ছে না।

    হাসপাতালে দিলে কেমন হয়?

    ভাল হয় না। সেখানে ওর কথা সবাই জানতে পারবে। পুলিসের খাতায় নাম থাকলে হাঙ্গামা হবে।

    সে তো এখানেও হতে পারে।

    পারেই তো। মুহুরি গোমস্তারা দেখছে। তারাও বাইরে বলাবলি করবে। স্বদেশী-করা ছেলেদের দেখলেই চেনা যায়।

    ছেলেটা কি স্বদেশী বলে তোমার মনে হয়?

    হয়। আমি লোক চিনি।

    তাহলে তো বিপদ হল মনু।

    একটু হল। কিন্তু তুমি ও নিয়ে ভেবো না। ছেলেটা যদি নাই বাঁচে তাহলে আর কী হবে?

    বাঁচবে না?

    বাঁচতে পারে যদি ভাগ্যে থাকে। তেমন সেবাযত্ন তো হচ্ছে না। দিনের মধ্যে পাঁচ সাতবার মাথায় জল দেবে কে? আইসব্যাগ ধরে থাকবে কে?

    কেন, তুমি!

    ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো।

    ছাইও তো কাউকে না কাউকে ফেলতে হবে মনু।

    রঙ্গময়ী একটা কপট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, আমি যেটুকু পারি করছি। কিন্তু তবু ওর বাড়ির লোককে খবর দেওয়া দরকার। যদি শেষ পর্যন্ত না বাঁচে তাহলে তাঁরা চোখের দেখাটাও দেখতে পাবেন না।

    ঠিক আছে। নগেন মুহুরীর বাড়ি বরিশালে। ওকে যেতে বলো।

    রঙ্গময়ী চলে গেলে হেমকান্ত অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন নিজের জায়গাটিতে। সচ্চিদানন্দর চিঠিটার জবাব দেওয়া দরকার। কিন্তু লিখতে ইচ্ছে করছে না। আর দিন দশেক বাদে তাঁর বাবার বাৎসরিক শ্রাদ্ধ। যথেষ্ট টাকার জোগাড় নেই। তার ওপর দুটি ঘটনা তার মনটাকে আরো খারাপ করে দিল। এক হল, রঙ্গময়ীকে সচ্চিদানন্দ বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। দুই, শশিভূষণ ছেলেটির অসুস্থতা।

    হেমকান্ত উঠে নিজের পড়ার ঘরে এসে ডেসকের দেরাজ থেকে চাবি বের করলেন।

    সুনয়নীর একটা আলাদা ঘর ছিল। সেটা এখন তালাবন্ধ থাকে। ঝাড়পোঁছও বড় একটা হয়। না

    তালা খুলে হেমকান্ত ভিতরে ঢুকলেন। জানালা দরজা বন্ধ থাকায় ভিতরটায় প্রদোষের আলো-আঁধারি আর ভ্যাপসা গন্ধ।

    ঘরের সোনা বিক্রি করার মতো দুরবস্থা হেমকান্তর নয়। ইচ্ছে করলেই তিনি ধার পেতে পারেন। কিন্তু ধার জিনিসটাকে বড়ই অপছন্দ তাঁর। বাজারে নগদ টাকার বেশ একটা অভাব চলছে। লোকের হাতে টাকা নেই। আদায় উশুলও কম।

    হেমকান্ত দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। তারপর গিয়ে সিন্দুকটায় চাবি ঢোকালেন।

    জীবনে এই কাজ এই প্রথম করছেন হেমকান্ত। সুনয়নীর গয়নার খোঁজ তিনি কোনোকালে করেননি। কত গয়না বা সোনা আছে তা জানার আগ্রহও তাঁর ছিল না। কাজেই বুকটা কেমন দুর-দুর করছিল। মনে হচ্ছিল যেন চুরি করছেন।

    এটা চুরিই কিনা তা নিয়ে মনে একটু দ্বন্দ্বও এল হেমকান্তর। গয়নাগুলির বেশীর ভাগই সুনয়নী পেয়েছিল উপহার হিসেবে। তার বাপের বাড়ির যৌতুক আছে, হেমকান্তর মায়ের দেওয়া গয়না। আর মোহর আছে, আত্মীয়-স্বজনরাও কিছু কম দেয়নি। হেমকান্তও দিয়েছেন। সুনয়নীর সেই সব সম্পদ হয়তো আইনের বলে তাঁতেই অর্শায়। তবু হেমকান্ত কিছুতেই সুনয়নীর সম্পদকে নিজের বলে মনে করতে পারছেন না।

    আচমকাই একটা অনুভূতি হল তাঁর। তিনি চকিতে ফিরে তাকালেন। খাটের ওই বিছানায় জীবনের শেষ কয়েকটা বছর দুরারোগ্য ব্যাধিতে শুয়ে কাটিয়েছে সুনয়নী। প্রচন্ড কষ্ট পেত। ওখানে শুয়ে আজও যেন সুনয়নী চেয়ে দেখছে। দেখছে তার আদরের সব গয়নাগাটি আর মোহর চুরি করতে ঢুকেছেন হেমকান্ত।

    হেমকান্তর সৌজন্যবোধ অসীম।

    তিনি সিন্দুকের চাবি ঘুরিয়ে ফেলেও পাল্লাটা খুললেন না। ধীরে ধীরে এসে ফাঁকা খাটটার কাছে দাঁড়ালেন। তাঁর মনে হল সুনয়নী এখন না থাকলেও এক সময়ে সে এই ঘরে বাস করেছে। তার সত্তার, তার অস্তিত্বের স্পন্দন বা স্মৃতি কিংবা রেশ কিছু এখনো রয়ে গেছে এইখানে। হয়তো সুনয়নী বাস্তবিকই তাঁকে দেখছে না, কিন্তু তিনি যে এ ঘরে ঢুকেছেন তার স্পন্দন সুনয়নীর সেই অদৃশ্য উপস্থিতিতে গিয়ে পৌছোচ্ছে।

    হেমকান্ত মৃদু স্বরে বললেন, তুমি কী রেখে গেছ তা তো জানি না। একটু দেখছি, যদি অনুমতি দাও।

    বলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন হেমকান্ত। কোনো জবাব আশা করেননি। পেলেনও না। তবু হেমকান্ত একবার বিছানাটা স্পর্শ করলেন। সুনয়নী যখন অসুস্থ তখন হেমকান্ত খুব একটা তার কাছে আসতেন না। অসুস্থতা বা রোগ ভোগ জিনিসটা তিনি সইতে পারেন না। সুনয়নীকে সেবা করার অবশ্য অনেক লোক ছিল, ফিরিঙ্গি একটি নার্স পর্যন্ত। অক্লেশে তার গু-মুত ঘাঁটত রঙ্গময়ী। হয়তো সেই সময়েই সুনয়নী রঙ্গময়ীকে গয়না দিয়েছিল।

    হেমকান্ত বিছানাটায় বসলেন। এখান থেকে দেয়ালে গাঁথা সিন্দুকটা মুখোমুখি দেখা যায়। সুনয়নী কি নিজের গয়নাগাটির ওপর নজর রাখত শুয়ে শুয়ে? নইলে দক্ষিণে পা করে শুতো কেন?

    ভেবে আবার চিন্তান্বিত হলেন হেমকান্ত। আস্তে আস্তে বিছানার জাজিমে হাতটা ঘষতে ঘষতে বললেন, কেন পার্থিব সম্পদের এত পিপাসা ছিল তোমার? কিছুই তো সঙ্গে যায় না। সব ফেলে যেতে হয়।

    সুনয়নীর স্তিমিত কণ্ঠ নিজের অন্তরে শুনতে পেলেন হেমকান্ত, সবই জানি। তবু বড় মায়া। তোমার মতো জাগ্রত বিবেক, কজনের থাকে? তার ওপর আমি মেয়েমানুষ।

    হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, সুনয়নী, তুমি মেয়েমানুষ ছিলে, কিন্তু আজ দেহ অবসানের পর আর তাও নও। আত্মা তো পুরুষ বা মেয়ে নয়। আজ বলো সুনয়নী, এই সম্পদ এই দেহ এই আত্মজন এ সবের দাম কী?

    দাম নেই? তাহলে সব সৃষ্টি হল কেন?

    দাম মানুষ দেয়, সৃষ্টিকর্তা তো দেন না। সোনাকে মহার্ঘ্য বানাল কে? দেহকে এত মূল্য দিল কে? আত্মজনকে পৃথিবীর মানুষের থেকে আলাদা করে চেনাল, কে? মানুষই তো? সভ্য মানুষ। নইলে সেই প্রাগৈতিহাসিক কালে মানুষ তো সোনার দাম কত তা জানত না। দেহের বিলাস সে শেখেনি তখননা। আত্মজন বলতে কেউ ছিল না তার। মানুষ তার পিতৃপরিচয় পর্যন্ত জানত না।

    সে সব জঙ্গলের কথা। মানুষ কি আর তখন মানুষ ছিল? জন্তুর মতোই তো ছিল।

    এখনো কি তাই নেই সুনয়নী? পৃথিবীকে তো আমার এখন আরো ভয়ংকর জঙ্গলের জায়গা বলে মনে হয়।

    তুমি চিরকালই একটু কেমন যেন! না বৈরাগী, না সংসারী। এরকম কেন বলো তো? তোমার কি বেঁচে থাকতে ভাল লাগে না? একটু পরমায়ুর জন্য আমি কত ছটফট করেছি।

    বেঁচেও তো থাকতে চাই সুনয়নী। জীবন্মৃত হয়ে থাকতে চাই না। জরা আসছে, মৃত্যু আসছে, সেই সঙ্গে আসছে নানা প্রশ্ন।

    কিসের প্রশ্ন?

    তুমি কি জাননা সুনয়নী, তুমি আর আমি মিলে যাদের জন্ম দিয়েছি, আমাদের সেইসব ছেলেমেয়েরা কেমন?

    ওরা খুব ভাল।

    ভাল? তবে কেন তোমার মৃত্যুর পরই মেয়েরা এসে গয়না চুরি করে নিয়ে যায়? কেন বউরা এসে তাতে ভাগ বসায়? যেন ওরা তোমার মৃত্যুর অপেক্ষাতেই ছিল।

    ওসব তো ওদেরই।

    ওদেরই? হেমকান্ত প্রেতের মতো একটু হাসলেন, মাথা নেড়ে বললেন, ওদের নয়, কারো নয়। পৃথিবীর ধ্বংসের দিনে পৃথিবী আবার সব ফিরিয়ে নেবে। সুনয়নী, এমন কি তোমার আমার ছেলেমেয়ে বলে যাদের জানি তারাও আমাদের নয়। আমরা নিমিত্তমাত্র। আমরা স্রষ্টা নই, জন্মের উপকরণ মাত্র। কাস্টোডিয়ান। কেন এত আমার-আমার বলে হয়রান হয় মানুষ?

    তোমার মতো জাগ্রত বিবেক তো সকলের নেই।

    হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, জাগ্রত বিবেক নয় সুনয়নী। যা জাগ্রত তা হল যন্ত্রণা। বড় যন্ত্রণা।

    তুমি মরতে ভয় পাও?

    না। মরতে ভয় পাই না। কিন্তু মৃত্যুর মধ্যে যে রহস্যময়তা আছে তা আমাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। তোমার মৃত্যুর কথা আমাকে বলবে?

    সুনয়নী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বলে, আমি কি অত সুন্দর করে বলতে পারবো? লেখাপড়া শিখিনি, ভাষার ব্যবহারও ভাল জানি না।

    বোবাও তো ভাব প্রকাশ করে। তুমি পারবে না?

    পারব কিনা কে জানে। তবে মনে হয়েছিল, গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছি। তারপর মনে হল, অনেক দূরে চলে এলাম। এত দূরে কখনো আসিনি। খুব কষ্ট হচ্ছিল।

    কিরকম কষ্ট?

    দোটানার কষ্ট। দুদিকেই টান। গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে নেওয়া হয় তখন ফুলের যেমন লাগে।

    বোঝা গেল না সুনয়নী।

    বোঝানো যায়ও না গো। অপেক্ষা করো, একদিন তোমারও তো ওরকম হবে।

    হ্যাঁ। তার বড় একটা দেরীও নেই।

    কেন ওকথা বলছ? সেই বালতিটা হাত থেকে পড়ে গেল বলে? ওটা কিছু নয়।

    কী করে বুঝলে কিছু নয়?

    কিছু নিশ্চয়ই। তবে ওটা বয়সের জন্য নয়।

    তবে কিসের জন্য?

    তোমার সব কাজই একটা নিয়ম শৃংখলায় বাঁধা। নিজেকে তুমি কতগুলি নিগড়ে বেঁধে রেখেছো। গভীর বাইরে কখনো যাও না। তুমি কখনো অস্বাভাবিক কোনো আচরণ করো না। কিন্তু তোমার ভিতরে, খুব গভীরে একটা নিয়ম ভাঙার ইচ্ছে জেগেছে।

    সেটা কীরকম?

    তুমি আর নিয়ম শৃংখলায় থাকতে চাইছে না। কিন্তু সেই পাগল ইচ্ছেকে জোর করে চাপা দিয়ে রেখেছে। তোমার হাত থেকে বালতি পড়ে যায়নি।

    তাহলে?

    তুমি ইচ্ছে করেই বালতিটাকে ছেড়ে দিয়েছিলে।

  • একুশ থেকে ত্রিশ পরিচ্ছেদ

    একুশ থেকে ত্রিশ পরিচ্ছেদ

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    একুশ

    রাজেন মোক্তারের ছেলে শচীন ল পাস করে ওকালতি শুরু করেছে সবে। শোনা যাচ্ছে কাছারিতে সে আরগুমেন্ট ভালই করে। হেমকান্তর পুরোনো উকিল গগন তালুকদার বড়ই বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন। কোর্ট কাছারি বড় একটা যান না। নতুন একজন উকিল নিয়োগের কথা বহুদিন ধরেই ভাবছেন হেমকান্ত। কিন্তু অলস লোকের যা স্বভাব। ভাবেন তো কাজে আর হয়ে ওঠে না। কাকে রাখবেন সেটাও ভেবে দেখা দরকার।

    শচীনের কথা তাঁকে বলল রঙ্গময়ী, এসব খবর রঙ্গময়ীর খুব ভাল রাখার কথা নয়। কিন্তু একদিন সে সকালে এসে সোজা বলল, গগন বাবুর তো নখদন্ত বলে আর কিছু নেই। কথা বলতে গেলে নালে-ঝোলে একাকার হয়। এই বুড়োকে দিয়ে তোমার মামলা টামলা চলবে?

    হেমকান্ত অবাক হয়ে বলে মামলা কিসের?

    মামলা লাগতে কতক্ষণ? রামকান্ত দারোগা যে তোমাকে কী একটা লিখে দিতে বলেছিল, লিখেছো?

    না, হয়ে ওঠেনি।

    তোমার তো আজকাল কিছুই হয়ে উঠছে না। শুধু ছেলে নিয়ে নৌকো চালালেই হবে? ওটাও তো গোল্লায় যাচ্ছে। বইপত্র ছোঁয় না।

    হেমকান্ত মৃদু হেসে বলেন, অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার দরকার কী? উকিলের কথাটা হঠাৎ তুললে কেন?

    রামকান্ত দারোগা রোজ লোক পাঠাচ্ছে তোমাকে কী সব লিখে দেওয়ার জন্য।

    কেন?

    বাঃ, পুলিস এখন শশিভূষণের নামে মামলা আনবে না? তুমি তাদের সাক্ষী যে!

    ওঃ, এই কথা! কিন্তু স্টেটমেন্ট লেখাও ঝকমারি, কাকে উকিল রাখা যায় বলো তোঁ!

    আমি তো শচীনের কথা বলি, অল্প বয়স, বুদ্ধি-সুদ্ধি খুব।

    শচীনকে ভালই চেনেন হেমকান্ত, রাজেনবাবুর বাড়ির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতাও অনেক দিনের। রাজেনবাবু ঢাকার লোক। ময়মনসিংহে আসেন ফৌজদারি মামলার ছড়াছড়ি দেখে। খুবই সামান্য আয়ে আইনের ব্যবসা শুরু করেন। মুক্তাগাছার এক জমিদার নলিনীরঞ্জন। তাঁর ছেলেকে পড়াতেন। সেই সূত্রে শহরে একটু বসতের জমি পান। আস্তে আস্তে অবস্থা ফিরিয়ে ফেলেছেন এখন। দুর্গাবাড়িতে একখানা বাড়ি করেছেন। সেখানে দুর্গোৎসব পর্যন্ত হয়। শচীন তাঁর ছোটো ছেলে। বেশ সুপুরুষ, লম্বা ছিপছিপে চেহারা, গানটানও গায়।

    শচীনের নিয়োগে আপত্তির কিছু নেই। হেমকান্ত বললেন, তাহলে ওকে একটু ডেকে পাঠাও।

    রঙ্গময়ী একটু কুটিল চোখে হেমকান্তর দিকে চেয়ে ছিল। তারপর বলল, একটু বুঝেসুঝে কথাবার্তা বোলো, আর ছেলেটিকে ভাল করে লক্ষও কোরো।

    হেমকান্ত অবাক হয়ে বলেন, শচীনকে আর লক্ষ করার কী আছে? ছোটো থেকে দেখছি।

    তোমার মতো ক্যাবলা দুটি নেই। শচীন শুধু উকিলই নয়, একজন সৎ পাত্রও বটে। তোমাদের পাল্টি ঘর।

    হেমকান্ত থতমত খেয়ে বলেন, ও বাবা, তুমি অনেকদূর ভেবে ফেলেছে দেখছি।

    ভাবতেই হয়। মেয়ে বড় হচ্ছে, কিন্তু বাপের কোনো দুশ্চিন্তা নেই, কাজেই পাড়া পড়শীকেই ভাবতে হয়।

    হেমকান্ত খুব হাসলেন, তারপর বললেন, আচ্ছা দেখা যাবে।

    আর একটা কথা।

    বলো।

    শশীর হয়ে মামলা লড়ার কেউ নেই।

    বরিশালে ওর বাবা আছে।

    তা আছে। কিন্তু ভদ্রলোক খুব গা করছেন না বলে শুনেছি।

    কেন, গা করছে না কেন?

    বাপ হচ্ছে সেই সৎ মায়ের পোষা ভেড়ার মতো। শশীকে নাকি ত্যাজ্য পুত্রও করেছে। আমার মনে হয় না, শশীর বাপ উকিল-টুকিল লাগাবে।

    হেমকান্ত গম্ভীর হয়ে বলেন, লোকটাকে তো চাবকাতে হয়।

    সে যখন হাতের কাছে পাবে তখন চাবকিও। কিন্তু এখন তো অবস্থাটা সামাল দেওয়া দরকার।

    আমার কী করার আছে?

    শচীনকে একটু বোললা।

    শচীন!

    ছেলেটা ভাল। বুদ্ধি রাখে। পয়সার পিশাচও নয়। তুমি বললে হয়তো শশীর পক্ষে দাঁড়িয়ে। লড়াই করবে। তোমাকে কোনো বিপদের ঝুঁকি নিতে হবে না। ভয় পেও না।

    হেমকান্ত রঙ্গময়ীর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মুখের হাসি ধীরে ধীরে মুছে গিয়ে একটা কঠোরতা ফুটল। ধীর স্বরে বললেন, মনু, তোমরা আমাকে সবাই একটু ভুল বুঝলে।

    রঙ্গময়ী বুঝি একটু লজ্জা পেল। বলল, আমাদের মেয়েমানুষে বুদ্ধি, ওগো রাগ কোরো না। তুমি গম্ভীর হলে আমার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়।

    হেমকান্ত খুব ম্লান একটু হেসে বললেন, থাক, আর মন রাখা কথা বলতে হবে না মনু। শচীনকে খবর পাঠাও। যা বলবার আমিই বলব।

    বিকেলে কাছারির কাজ শেষ করে শচীন এল। রুচিবান ছেলে। বাড়ি গিয়ে উকিলের পোশাক ছেড়ে ধুতি পানজাবি শাল চাপিয়ে এসেছে। ভারী সুন্দর চেহারাটি। কমনীয় মুখশ্রীতে বুদ্ধির দীপ্তি ঝলমল করছে। হেমকান্তকে প্রণাম করে সামনে বসল।

    রঙ্গময়ীর পরামর্শমতো ছেলেটিকে ভাল করেই লক্ষ করলেন হেমকান্ত। চমৎকার ছেলে, সন্দেহ নেই। এই ছেলে এ বাজারে এখনো পড়ে আছে সেটাই বিস্ময়ের।

    হেমকান্ত বললেন, ঘটনাটা কি শুনেছো? শশিভূষণ নামে একটি ছেলে যে আমার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল!

    আজ্ঞে হ্যাঁ।

    সেটা নিয়েই গোলমাল। দারোগা রামকান্তবাবু আমার একটা বিবৃতি চাইছেন। সেটা কি দেওয়া উচিত বলে মনে করো?

    শচীন বলল, স্টেটমেন্ট এখনই দেওয়ার দরকার নেই। মামলা উঠুক, তখন দিলেও চলবে।

    দারোগা আমার কাছে কিরকম স্টেটমেন্ট চাইছে তা আন্দাজ করতে পারো?

    শচীন মৃদু একটু হেসে বলল, তা বোধহয় পারি। উনি সম্ভবত আপনার কাছ থেকে একটা মুচলেকা আদায় করতে চাইছেন।

    উদ্দেশ্যটা কী?

    উদ্দেশ্য, শশিভূষণকে ফাঁসানো, তার বিনিময়ে আপনি আপনার নিরাপত্তা কিনে নিতে পারবেন।

    হেমকান্ত গম্ভীর হয়ে বলেন, আর যদি সেরকম মুচলেকা না দিই?

    তাহলে পুলিস আপনাকেও ফাঁসানোর চেষ্টা করবে।

    মামলাটা তুমি নেবে?

    শচীন বিনীতভাবে ঘাডহেঁট করে বলে, নিতে পারি।

    আমাদের পুরোনো উকিল গগনবাবু বুড়ো হয়েছেন। আমি সেই জায়গাতেও তোমাকে অ্যাপয়েন্ট করতে চাই।

    যে আজ্ঞে।

    তাহলে কাল থেকেই গগনবাবুর সঙ্গে বসে সব কাগজপত্র বুঝে নাও।

    যে আজ্ঞে।

    আমার এসটেটের অবস্থা বিশেষ ভাল নয়। খাজনা আসে খুব সামান্য আদায় উসুল করার লোক নেই। প্রজাদের হাতে নাকি নগদ টাকারও খুব অভাব।

    শচীন দু স্বরে বলে, একটা ডিপ্রেশন চলছে ঠিকই।

    ছেলেরা চায় জমিদারী বেচে দিই, তুমিও কি তাই বলো?

    শচীন একটু ভেবে নিয়ে বলল, দেখাশোনার লোক না থাকলে অবশ্য জমিদারীটা একটা লায়াবিলিটি হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু এখনই বেচার কথা ভাবছেন কেন? আমি আগে কাগজপত্র দেখি।

    তুমি তো দেখবে আইনের দিকটা, হিসেবপত্র দেখবে কে? আমি নতুন করে গোটা এসটেটের। একটা অ্যাসেসমেন্ট করতে চাই।

    শচীন বলে, সেটাও খুব শক্ত হবে না। দলিল-টলিলগুলো আমাকে দেবেন। দেখে দেবো। আপনার ম্যানেজার মশাইয়ের সঙ্গেও একটু বসা দরকার।

    বেশ, সে ব্যবস্থাও হবে। তাহলে আমি নিশ্চিন্ত?

    আগে সব দেখি।

    শশিভূষণের বিরুদ্ধে পুলিস মামলা সাজিয়েছে বলে কিছু জানো?

    শচীন মাথা নেড়ে বলে, এখনো দেয়নি। তবে হাসপাতাল থেকে আজই তাকে হাজতে নেওয়া হয়েছে।

    হেমকান্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, তাহলে ছেলেটা ফাঁসিতে মরার জন্যই বেঁচে উঠল!

    ফাঁসি যে হবেই তা বলা যায় না।

    শশীকে তুমি বাঁচাতে পারবে?

    শচীন চিন্তিত মুখে বলে, পুলিসের কাছে সে কী বলেছে তা তো জানি না। পুলিসই বাকী পয়েন্ট দিয়েছে তাও দেখা দরকার। আপনি বললে আমি শশীর সঙ্গে দেখা করতে পারি।

    করো।

    কিন্তু একটা কথা আছে।

    কী কথা?

    আমি একা গেলে সে হয়তো আমাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারবে না।

    আমি যদি তোমার সঙ্গে যাই?

    শচীন একটু দ্বিধা করল। কী যেন বলি বলি করেও সামলে নিয়ে বলল, তার হয়তো দরকার হবে না। শশীকে আমি কনভিনস করতে পারবো।

    আমি যাবো না বলছ?

    দরকার হলে বলবখন। তখন যাবেন।

    হেমকান্ত উদাস হয়ে গেলেন। বললেন, ছেলেটাকে আমার একটু দেখতেও ইচ্ছে করছে। আমার বাড়িতে কয়েকদিন ছিল, কিন্তু অসুস্থ অবস্থায়। ভাল করে কথাও হয়নি। না, চলো, কাল আমিও তোমার সঙ্গে যাবো।

    শচীনের মুখে আবার সেই দ্বিধার ভাবটা দেখা গেল। মৃদুস্বরে বলল, আপনার এখন না যাওয়াই বোধহয় ভাল।।

    কেন বলো তো?

    শচীন মৃদু একটু হেসে বলল, শহরে একটা গুজব রটেছে। লোকের ধারণা এ বাড়ি থেকে শশীকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

    হেমকান্ত চমকে উঠে বলেন, সে কী? কে রটাল?

    গুজব রটানোই তো কিছু লোকের কাজ। আমার মনে হয় শশীরও সেরকমই ধারণা।

    কেন, শশীর এরকম ধারণা হওয়ার কারণ কি?

    কোনো কারণ নেই। তবে শহরের গুজবটা তার কানে পৌঁছানোই সম্ভব।

    হেমকান্তকে ভারী ক্লান্ত দেখাল। বললেন, লোকে একথা বিশ্বাস করে?

    হয়তো সবাই করে না।

    তুমি করো?

    না। আপনাকে আমি শিশু বয়স থেকে দেখে আসছি। এই পরিবারের কোনো লোক কখনো ছোটো কাজ করেনি।

    হেমকান্ত একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললেন, না, আমরা ছোটো কাজ সহজে করি না। শশীকে ধরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

    আমি জানি। বরিশাল মারডার কেস নিয়ে খুব তোলপাড় হচ্ছে। শশীর পক্ষে দলছুট হয়ে লুকিয়ে থাকা এমনিতেই সম্ভব ছিল না।।

    তুমি অনেক জানো দেখছি।

    কিছু খবর রাখি। ওকে যারা প্রোটেকশন দিতে পারত তাদের সঙ্গে ও যোগাযোগ করতে পারেনি। তাছাড়া আর একটা নির্দেশ ছিল ওর ওপর। সেটাও ও মানেনি।

    কী সেটা?

    কথা ছিল, মারডারের পর সুইসাইড করবে।

    হেমকান্ত শিউরে ওঠেন, তাই নাকি?

    হ্যাঁ

    তুমি কী করে জানলে?

    মনুদিদির কাছে ও নিজেই বলেছে।

    কই, মনু তো আমাকে বলেনি।

    আপনাকে খামোখা বিরক্ত করতে চান নি।

    তোমাকে কবে বলল?

    পরশু মনুদিদি আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। তখনই বলেন।

    শশী সুইসাইড করল না কেন?

    সেটা বোঝা মুশকিল। হয়তো শেষ সময়ে দুর্বলতা এসে গিয়েছিল। পিস্তলের গুলিও ফুরিয়ে গিয়ে থাকতে পারে। বাচ্চা ছেলে তো।

    হেমকান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, কিন্তু আমার সম্পর্কে ওর ভুল ধারণাটা যে ভাঙা দরকার। কী করব বলতে পারো?

    এখন কিছু করার দরকার নেই। আগে আমি ওর সঙ্গে কথা বলে দেখি।

    মনু কি ছেলেটার সঙ্গে দেখা করেছে?

    না, উনি চেষ্টা করেছিলেন। পুলিস দেখা করতে দেয়নি।

    ঠিক আছে। আগে তুমিই দেখা করো।

    যে আজ্ঞে।

    মামলা কবে নাগাদ উঠবে?

    তা বলতে পারি না। তাছাড়া মামলা তো এখানে হবে না। শশীকে বরিশালে চালান দেওয়া হবে। মামলা উঠবে সেখানে।

    এখানে হয় না।

    সেটা নরমাল প্রসিডিওর নয়।

    তুমি কি বরিশালে গিয়ে মামলা লড়তে পারবে?

    তা পারা যাবে না কেন? ও নিয়ে আপনি ভাববেন না।

    আচ্ছা, তোমার ওপর অনেক দায় দায়িত্ব চাপিয়ে দিলাম।

    তাতে কি?

    পারবে তো সব সামলাতে?

    চেষ্টা করব।

    শচীন চলে যাওয়ার পর হেমকান্ত অনেকক্ষণ শচীনের কথাই ভাবলেন। ছেলেটি অতি চমৎকার। এই ছেলেটিকে যদি জামাই করেন তবে সব দিক দিয়েই তাঁর ভাল হয়। বিষয় আশয় এবং মামলা মোকদ্দমা নিয়ে ভাববার মতো একজন লোক পেলে জীবনটা তিনি নিশ্চিন্তে কাটাতে পারেন।

    হেমকান্তর ঘরের বাইরেই ওত পেতে ছিল কৃষ্ণকান্ত। শচীন বেরিয়ে আসতেই ধরল, শচীনদা, কী কথা হল?

    শচীন একটু হেসে বলে, তা দিয়ে তোর কী দরকার?

    আমার দরকার আছে। তুমি শশীদাকে বাঁচাবে?

    আমি বাঁচাতে যাবো কোন দুঃখে?

    বাবা তোমাকে শশীদার উকিল ঠিক করেনি?

    করলেই বা। উকিল কি ভগবান?

    সি আর দাশ কিরকম আরগুমেন্ট করেছিল জানো?

    খুব পেকেছিস দেখছি।

    শচীন নীচে এসে বারবাড়িতে রাখা তার সাইকেলটা টেনে নিয়ে বলে, শশীকে নিয়ে তোকে অত ভাবতে হবে না। লেখাপড়া কর।

    করছি। আমি উকিল হবো।

    তাই নাকি?

    উকিল হয়ে শুধু স্বদেশীদের হয়ে মামলা লড়ব।

    বলিস কি? শুধু স্বদেশীদের মামলা লড়লে যে পেট চলবে না।

    আমি তোমার সাইকেলের রডে একটু উঠি শচীনদা?

    ওঠ। কিন্তু তোর মতলবখানা কী?

    চললাই না, বলছি।

    শচীন সাইকেলের রড়ে কৃষ্ণকান্তকে নিয়ে বড় রাস্তায় উঠে এল। রাস্তা মোেটই ভাল নয়। ইটের রাস্তায় গর্ত, উচু নীচু।

    সাইকেল চালাতে চালাতে শচীন বলল, এবার বল।

    ছোড়দিকে তোমার পছন্দ হয়?

    শচীন একটু থতমত খেয়ে হেসে ওঠে। বলে, আমার পছন্দ হলে তোর কী লাভ?

    তোমার সঙ্গে ছোড়দির বিয়ের কথা চলছে, জানো?

    শচীন একটু গম্ভীর হয়ে বলে, না তো! তোকে কে বলল?

    মনুপিসি। বলেনি ঠিক। বাবাকে বলছিল, আমি শুনেছি।

    তাই নাকি?

    তুমি ছোড়দিকে বিয়ে করবে?

    দূর ফাজিল!

    ছোড়দি সুন্দর না?

    কে জানে!

    লোকে বলে, ছোড়দি নাকি খুব সুন্দর।

    তা হবে।

    কিন্তু ছোড়দির একটা দোষের কথা তোমাকে বলে দিই। রেগে গেলে কিন্তু ছোড়দির নাকের ডগা নড়ে।

    শচীন এত জোরে হেসে ফেলল যে, সাইকেল বেসামাল হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য। ফের সামলে নিয়ে সে বলল, আর কী দোষ আছে রে তোর ছোড়দির?

    ভীষণ হিংসুটে। খুব মিথ্যে কথা বলে।

    তাই নাকি? তাহলে ওকে তো বিয়ে করা উচিত নয়।

    না, না। করো। ছোড়দি এমনিতে ভালই। তোমার সঙ্গে বিয়ে হলে ছোড়দি তো কাছাকাছিই থাকবে, তাই না?

    ও, সেইজন্যই আমাকে বিয়ে করতে বলছিস?

    শচীন আবার হাসতে থাকে।

    রঙ্গময়ী বিশাখার চুল বেঁধে দিল সেদিন বিকেলে। তারপর বলল, বাপ তো বোম ভোলানাথ, মেয়ের বয়সের দিকে লক্ষ্যই নেই। কিন্তু এই বয়সে কি ঘরে রাখা যায়!

    কথাটা শুনল বিশাখা। কোনো মন্তব্য করল না।

    রঙ্গময়ী হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, রাজেন মোক্তারের ছেলে শচীনকে তো দেখেছিস!

    বিশাখা একটু বিস্ময়ভরে চেয়ে বলে, দেখব না কেন? সুফলার দাদা তো!

    তার কথাই বলছি।

    তার কথা কেন?

    তোর বাবার খুব ইচ্ছে, ওর সঙ্গে তোর সম্বন্ধ করে।

    ওর সঙ্গে? বলে বিশাখা যেন আকাশ থেকে পড়ে।

    কেন, ছেলেটা খারাপ নাকি? কী চমৎকার রাজপুত্রের মতো চেহারা!

    বিশাখা একটা ঝামটা মেরে বলে,হলেই বা! মোক্তারের ছেলেকে বিয়ে করতে যাবো কেন? আর পাত্র জুটল না?

    রঙ্গময়ী বলে, মোক্তারের ছেলে তো কী! ও নিজে তো উকিল।

    ওরকম উকিল গণ্ডায় গণ্ডায় আছে।

    তোর পছন্দ নয়?

    দূর! বলে প্রস্তাবটা একদম উড়িয়ে দিল বিশাখা।

    রঙ্গময়ী স্তব্ধ হয়ে গেল। অনেকক্ষণ বাদে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, এমন পাত্র তোর পছন্দ নয়! সত্যিই পছন্দ নয়?

    বিশাখা বিরক্ত হয়ে বলে, আমি কি তোমাদের পথের কাঁটা পিসি যে, ধরে বেঁধে জলে ফেলে দিতে চাও!

    জলে ফেলে দেওয়া কি একে বলে?

    তা ছাড়া আর কী? আমার কোনো দিদির কি এরকম ঘরে বিয়ে হয়েছে?

    রাজেন মোক্তারও তো গরীব নয়।

    একসময়ে তো ছিল। ওদের বাড়ি থেকে মার কাছে প্রায়ই লোক আসত চাল, টাকা, পুরোনো কাপড় চাইতে।

    সে তো কবেকার কথা!

    তা হোক। ওদের সংসারে বউ হয়ে আমি যেতে পারব না। বরং তোমাদের অসুবিধে হলে বোলো, পুকুরে ডুবে মরব।

    আমাদের অসুবিধে আবার কী? বারবার ওকথা বলছিস কেন?

    হচ্ছে বলেই বলছি।

    কিসের অসুবিধে? কার অসুবিধে?

    অত জানি না। মনে হল, তোমাদের দুজনের একটু অসুবিধে হচ্ছে আমি থাকাতে।

    বঙ্গময়ী নিঃশব্দে পালিয়ে গেল।

  • একত্রিশ থেকে চল্লিশ পরিচ্ছেদ

    একত্রিশ থেকে চল্লিশ পরিচ্ছেদ

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    একত্রিশ

    হেমকান্ত জীবনে অনেক সৌন্দর্য দেখেছেন, কিন্তু চৈত্রের শুরুতেই এক বিকেলে যে কালবৈশাখী এল তার মতো সম্মোহনকারক আর কিছুই হয় না।

    হেমকান্ত রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার বই পড়ছিলেন ছাদে বসে। রোদ পড়ে গেলে ছাদটি আজকাল মনোরম। একটু থম্‌ ধরা ভাব ছিল চারধারে। বাতাস ছিল না। ঠিক এই সময়ে আচমকা একটা কুচুটে বাতাস বইতে লাগল। সেই বাতাসে প্রেতের শ্বাসবায়ু মিশে আছে, টের পেলেন হেমকান্ত। বাল্যকাল থেকেই ঝড়ের অভিজ্ঞতা তাঁকে অনুভূতিশীল করেছে। ফরফর করে কোলে রাখা বইটির কয়েকটা পাতা উল্টে গেল। পাম গাছে হাহাকার বেজে উঠল। চোখ তুলে হেমকান্ত দূরে দিগন্তে এক অতিকায় কৃষ্ণবর্ণ মেঘস্তম্ভকে দেখতে পেলেন। ঘূর্ণমান এক কালান্তক চেহারা সেই স্তম্ভের। আকাশে রোদ ছিল তখনো। সেই আলোয় দেখা গেল, বহু ওপরে ঘুড়ির মতো কী যেন সব ঘুরপাক খাচ্ছে। ঘুড়ি নয়, হেমকান্ত ভাল করে দেখার জন্য হরিকে ডেকে দূরবীনটা আনতে বললেন।

    হরি দূরবীন নিয়ে এসে বলল, ঘরে যাবেন না কর্তামশাই? ভীষণ ঝড় আসছে।

    হেমকান্ত শুধু বললেন, হুঁ।

    দূরবীন লাগিয়ে দেখলেন, বহু দূরে আকাশের গায়ে টিনের চাল উড়ছে কয়েকটা। আরও কিছু জিনিসও আছে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অতিকায় সেই মেঘস্তম্ভেব মাথার দিকটা ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে। ডাইনীর চুলের মতো। বাতাসে একটা তীব্র চাপা গুমগুম শব্দ আসছে। কোথায় ঝলসাচ্ছে মেঘ! ব্রহ্মপুত্রের কালো জলে হঠাৎ তুমুল এক আলোড়ন ওঠে।

    বাতাস শরীরী নয়। কিন্তু হেমকান্ত হঠাৎ টের পেলেন, বাতাস তাঁকে ধাক্কা দিচ্ছে। এক অদৃশ্য পালোয়ানের মতো শক্তিমান বাতাসের ধাক্কায় কয়েক হাত পিছিয়ে গেলেন হেমকান্ত। হড়-হড় করে তীব্র বাতাস ঢুকে যাচ্ছে ফুসফুসে। দম নিতে পারছেন তো ছাড়তে পারছেন না। শ্বাসকষ্ট হতে থাকে তাঁর।

    হরি সিঁড়িঘরের কাছ থেকে দৌড়ে এসে তাঁকে ধরে।

    কতামশাই, ঘরে চলুন।

    এক ঝটকায় তার হাত ছাড়িয়ে দেন হেমকান্ত। ঘরে যাবেন কী? এই অপার্থিব দৃশ্য ছেড়ে কি কোথাও যাওয়ার উপায় আছে!

    চোখের সামনেই মাঝ দরিয়ায় একটা বেসামাল নৌকোকে নিশ্চিত ভরাডুবির সঙ্গে লড়াই করতে দেখতে পান তিনি। মস্ত এক ঢেউয়ের মাথায় চড়ে নৌকোটা এক ঘূর্ণী বাতাসের ঝাপটায় পাক খেয়ে ঘুরে পড়ে গেল নীচে। আবার উঠল।

    পগারের দিকে গোড়াশুদ্ধ পুরোনো কামরাঙা গাছটাকে উপড়ে ফেলল ঝড়। কলাঝাড়ের কয়েকটা গাছ শুয়ে পড়ল মাটিতে। হেমকান্ত তাঁর ইজিচেয়ারে বসে পড়লেন। চারদিক থেকে উন্মাদ বাতাস ছুটে আসছে। লয় করে দিচ্ছে সত্তা। হারিয়ে যাচ্ছে চিন্তাশক্তি। এমন কি অহং বোধ পর্যন্ত।

    হরি আবার দৌড়ে যায় সিঁড়িঘরের দিকে। তার নিসর্গপ্রীতি নেই। সে আত্মরক্ষা বোঝে।

    হেমকান্ত চোখ চেয়ে থাকতে পারলেন না। ধুলো আর কুটোকাঠি এসে এমন তীব্রভাবে ফুটছে গায়ে আর মুখে যে চোখ মেলে থাকা বিপজ্জনক। দু কান বধির করে ঝড়ের শব্দ বয়ে যাচ্ছে।

    চোখে কিছু দেখছেন না, কানে শুধু ঝড়ের উন্মাদ শব্দ। তবু তিনি তাঁর পিপাসিত অনুভূতির প্রতিটি রন্ধ্র দিয়ে গ্রহণ করছিলেন এই মহান ঝড়কে। সম্মোহিত, স্তব্ধ, বাক্যহারা। পৃথিবীর ক্ষীণপ্রাণ জীবজগৎ, তাদের খেলনার মতো ঘরবাড়ি ও পলকা অস্তিত্বকে নিয়ে কিছুক্ষণ ছেলেখেলা করে গেল ঝড়। তারপর একসময়ে থেমে গেল।

    শেষ দিকটা হেমকান্তর চৈতন্য ছিল না। যখন সম্বিৎ ফিরে পেলেন, তখন দেখেন, ইজিচেয়ারটা অনেকটা দূরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তিনি পড়ে আছেন শানের ওপর। রবীন্দ্রনাথের বইটি ধারে কাছে কোথাও নেই। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে। ঠিক অশ্বক্ষুরের শব্দ।

    হেমকান্ত ঘরে এলেন। অপ্রতিভ হরি জডোসড়ো হয়ে সঙ্গে সঙ্গে এল। তার তত দায়িত্ব ছিল না। কর্তামশাই ওরকম পাগল হলে সে কী করবে?

    হেমকান্ত তাকে হাতের ইশারায় বিদায় করে দিয়ে জানালার ধারে বসে বাইরে বৃষ্টি দেখতে লাগলেন। বড় একা লাগছিল তাঁর। এই বিপুল পৃথিবীতে একা। ঝড় তাঁর একাকিত্বের বোধটিকে আরো অসহনীয় করে দিয়ে গেল আজ।

    হরিকে ডেকে হেমকান্ত জিজ্ঞেস করলেন, কৃষ্ণ কোথায়?

    আজ্ঞে ঘরে।

    বিশাখা?

    ঘরেই আছেন।

    যাক, নিশ্চিন্ত। হেমকান্ত বললেন, খোঁজ নে তো, নদীতে একটা নৌকো বিপদে পড়েছিল। সেটা পৌঁছেছে কি না।

    যে আজ্ঞে। হরি চলে গেল।

    হেমকান্ত আবার বৃষ্টি দেখতে লাগলেন। চারদিকে অকালসন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। ঘরে বাতি জ্বেলে দিয়ে গেল চাকর।

    হেমকান্ত টেবিলের ধারে গিয়ে বসলেন। কারো সঙ্গে এখন কথা বলা দরকার। এমন কারও সঙ্গে, যে বোঝে, যে হৃদয়বান।

    ভাই সচ্চিদানন্দ, আজ কবির মতো বলিতে ইচ্ছা করিতেছে “হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে।” তবু তাহা বলিব না। কারণ বাস্তবিক হৃদয় নৃত্যপর নহে। নাচিতে গিয়া বারবার তাহার ঘুঙুর স্খলিত হয়, গাঁটে আমবাতের ব্যথা প্রকট হইয়া ওঠে, মাথা ঘুরিতে থাকে। আজ নাচিবার ইচ্ছাটুকুই সম্বল, শক্তি নিঃশেষিত।

    ভায়া হে, তুমি রবীন্দ্র ভক্ত নহ, তাহা আমি জানি। রবীন্দ্রনাথকে বুঝিবার মতো সময় ও চিন্তাশক্তি তোমার নাই। পলিটিকসের ঘষায় অনুভূতিগুলা ভোঁতা হইয়া গিয়াছে। বেনাবনে মুক্তা ছড়াইয়া লাভ নাই জানি। তথাপি আজ তোমাকে আমার সেই অনুভূতির কথা বলিতে বসিয়াছি যাহা অন্য কেহ বুঝিবে না, তুমিও বুঝিবে না। তবে তোমার ধৈর্য আছে, আমাকে এখনও অসহ্য মনে কর না। পলিটিকসের ইহাই সবচেয়ে বড় গুণ। মানুষকে সহনশীল করিয়া তোলে।

    একটু আগে এক রূপবান ঝড় আমার সমস্ত সত্তাকে আক্রমণ করিয়া ছিন্নভিন্ন করিয়া দিয়া গিয়াছে। মনে হইতেছে, আমি এখন দ্বিখণ্ডিত। এই ঝড়ের পূর্বে আমার যে জীবন ছিল তাহা প্রথম খণ্ড মাত্র। এই ঝড়ের পর আমি দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করিয়াছি। ইহা এক নূতন জীবনের সূচনা।

    কেমন হইবে এই দ্বিতীয় খণ্ডের জীবনযাপন?

    জানি না। কিন্তু বলিব, আজ ছাদের উপর যখন সর্বগ্রাসী ঝড়ের আঘাত আসিয়া আমাকে সমূলে উৎপাটিত করিল তখন মনে হইতেছিল আমরা কী ছাই ঘর সংসার সাজাইয়া ছেলেখেলা করিতে বসিয়াছি! একটি ফুৎকারেই যে সব উড়িয়া যায়! অনিত্য ভাবনা নূতন কিছু নহে। কিন্তু ঝটিকার মুখে যে বার্তা বহিয়া আসিল তাহা অনিত্য চিন্তা নহে, তাহা এক বৃহত্তর জীবনযাপনের আহ্বান। মনে হইতেছিল, আমি নিজেকে যাহা ভাবি আমি বুঝি মাত্র সেটুকুই নহি। আমার বিশ্বব্যাপী অস্তিত্ব আকাশ পাতাল জুড়িয়া মুখব্যাদান করিয়াছে।

    আবার বলি, ইহার সহিত বৈরাগ্য বা ব্রহ্মানুভূতিরও কোনো সম্পর্ক নাই। ইহা এক উপচানো আনন্দ, ইহা এক অসহনীয় সুখবোধ। তাহার সহিত এক নিঃসঙ্গতার বেদনাও মিশিয়া আছে।

    তোমার ধারণা, আমার জীবনে কোনো দুঃখ নাই। কোনো সমস্যা নাই। তাহাই হইবে। তবু বলি ভায়া, কাহারও জীবনই সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক নহে। যাহার বাহিরের সমস্যা নাই, তাহার মন নব নব সমস্যার জট পাকাইয়া তোলে। আমি বোধহয় সেইপ্রকারই একজন। নহিলে আমার অভ্যন্তরে সর্বদাই কেন এক প্রদোষের রহস্যময় আলো-আঁধারি? আজিকার ঝড়ে সেই রহস্যের আবরণ উড়িয়া গিয়া এক অদ্ভুত স্বর্গীয় আলো আসিয়া পড়িল, ক্ষণিকের জন্য এক বৃহৎ জগতের ছবি মেলিয়া ধরিল। মিলাইয়া গেল।

    কত লোকের সর্বনাশ হইয়াছে, কতগুলা নৌকো ডুবিয়াছে তাহা এখনো জানি না। কালবৈশাখীর দক্ষিণা তো কম নহে। কিন্তু আজ সে কথা ভাবিতেছি না। ঝড়ের একটু আগেই ছাদে বসিয়া নিবিষ্টমনে রবিবাবুর কবিতা পড়িতেছিলাম। মনটা সিক্ত ছিল। কিছু বিষণ্ণও। অকস্মাৎ ঝড় আসিয়া সেই কাব্য পাঠেরই একটি সুসংগত উপসংহার টানিয়া দিয়া গেল। কবিতা আমাদের ভিন্ন জগতে লইয়া যায়। ঝড়ও আজ সেই কাজটুকুই করিয়াছে।

    তুমি বাস্তববাদী। এইসব কথাকে বড় একটা মূল্য দাও না। তবু জানি, তুমি আমার কথাগুলিকে ওজন করিবে, সম্ভাব্যতা বিচার করিবে, তাহার পর হয়তো গালিই দিবে। তবু অস্বীকার করিবে না। তোমার এই বায়ুগ্রস্ত বয়স্যটির প্রতি তোমার যে এখনো একটু স্নেহ আছে তাহা কেন জানো? ওই বায়ুটুকুর জন্যই। বায়ুগ্রস্ত লোকদের তুমি উপেক্ষা করিতে চেষ্টা কর বটে, কিন্তু তোমার যাহা নাই তাহা তাহাদের আছে, তুমি যাহা অনুভব কর না তাহা তাহারা করে, এই সত্যও তুমি কোনোদিন অস্বীকার করিতে পারিবে না। তোমার এই গুণটুকুই আমাকে তোমার সঙ্গে আঠার মতো জুড়িয়া রাখিয়াছে।

    কৃষ্ণ আর বিশাখা ছাড়া আজ নিকটাত্মীয়েরা কেহই আমার নিকটে নাই। পুত্রেরা বিষয়কর্মে ব্যস্ত, কন্যারা ঘর-সংসারে ডুবিয়া আছে। আমি তাহাদের দোষ দিই না। মাঝে মধ্যে কর্তব্যবশে এক-আধখানা পত্র তাহারা লেখে, উহাই আমার কাছে যথেষ্ট। আমার এখনকার জীবনযাপনে এগুলি অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছে। তথাপি ঝড় থামিবার পর আজ যেন মনে হইল, আমি বড় একা। আজ স্ত্রী বাঁচিয়া থাকিলেও বোধহয় এরূপই মনে হইত।

    কেন বলো তো? এই রহস্যময় একাকিত্বের উৎস কী?

    ঝড় যখন আসিল তখন আমার ভৃত্য আমাকে গৃহাভ্যন্তরে লইয়া যাওয়ার চেষ্টা করিয়াছিল। আমি যাই নাই। সেই অপরূপ ঝড়ের সঙ্গে তখন শুভ্রদৃষ্টি হইতেছে, যাই কী করিয়া?

    যখন ঝড় থামিল তখন দেখি আমার আরাম কেদারা ছিটকাইয়া কোথায় সরিয়া গিয়াছে। রবিবাবুর গ্রন্থটির হদিশ নাই। আমি মুহ্যমান অবস্থায় পড়িয়া আছি। ভৃত্যটি সিঁড়িঘরের নিরাপত্তায় আশ্রয় লইয়াছে। ভাগ্য ভাল, পলাইয়া যায় নাই।

    অভিমান নহে। ঝড়ের নিসর্গদৃশ্য যত সুন্দরই হোক, তাহার ভয়াবহতাও কম নহে। একটা বিপদ ঘটিতে পারিত। তথাপি কেহ আমাকে জোর করিয়া ঘরে টানিয়া আনে নাই বা আমার বিপদের ভাগ লইবার জন্য আমার সহিত অবস্থান করে নাই।

    বোধহয় এই সামান্য ঘটনা হইতেই আজ বড় নিঃসঙ্গ অনুভব করিতেছি।

    এইবার কিছু কাজের কথা বলি। রাজেনবাবুর কথা নিশ্চয়ই ভুলিয়া যাও নাই। কর্মঠ, আত্মনির্ভরশীল মানুষ। ঢাকার বিক্রমপুরে ইঁহাদের বাড়ি। রাজেনবাবুর পুত্র শচীন ওকালতি পাস করিয়া আইন ব্যবসায় করিতেছে। তাহার সহিত বিশাখার বিবাহের একটি কথা চলিতেছে। সম্বন্ধটি কেমন হইল, তোমার মনোমত হইল কি না তাহা জানাইও।

    কিন্তু এই বিবাহের সম্বন্ধে অন্যরূপ একটা বিপদ দেখা দিয়াছে। লোক পরম্পরায় শুনিতেছি, আমার কন্যার না কি এই পাত্র বিশেষ পছন্দ নয়। বড়ই বিস্ময় বোধ করি সচ্চিদানন্দ। যুগের হাওয়া পাল্টাইতেছে বটে, তা বলিয়া পনেরো বৎসরের একটি মেয়ের নিজস্ব পছন্দ অপছন্দের সমস্যা দেখা দিবে তাহা ভাবি নাই। আমিই তাহার মত নিতে আগ্রহী ছিলাম। কিন্তু আশা ছিল, আমার মতের উপরে সে কথা কহিবে না। পনেরো বৎসর বয়সে কাহারও বিচারবুদ্ধি থাকে না। সুতরাং পিতামাতার বিচারবুদ্ধিই তাহাকে পথ নির্ধারণ করিতে সাহায্য করে। কিন্তু আমার হিসাব-নিকাশ কিছুই মিলিতেছে না।

    আমি কি তাহার উপর জোর খাটাইব? না কি তাহার মতই মানিয়া লইব? কিছু স্থির করিতে পারিতেছি না। তুমি কি এ বিষয়ে আমাকে সাহায্য করিতে পারো?

    এইসব সংকট সময়ে বড়ই মৃতা স্ত্রীর কথা মনে পড়ে।—তোমার হেম।

    সকালবেলায় রঙ্গময়ী একবার করে নিয়মিত এসে হেমকান্তর সঙ্গে দেখা করে যায়। কাজের কথা থাকলে তাও বলে। হেমকান্ত সকালের দিকটায় রঙ্গময়ীর জন্য নিজের অজান্তেই কিছুটা প্রতীক্ষা করে থাকেন। আজও করছিলেন।

    চৈত্রের শুরুতেই এবার কালবৈশাখীর দাপট দেখা দিয়েছে। কাল সন্ধেবেলায় তুমুল ঝড় বয়ে গেল। গোয়ালের চালের টিন উড়ে গেছে। বাগানে বহুকালের পুরোনো একটা কামরাঙা গাছ উপড়ে পড়েছে। ব্রহ্মপুত্রে দু’ চারটে নৌকো ডুবেছে নিশ্চয়ই। এখনো অবশ্য খবর আসেনি, তবে ফি বছরই ডোবে। এছাড়া গাঁ গঞ্জে, শহরতলীতে কী ঘটেছে তাও এখনো অনুমানের বিষয়। প্রজাদের অবস্থাই বা কী? অবস্থা যাই হোক, যে-কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়কেই তারা খাজনা না দেওয়ার অজুহাত হিসেবে দাঁড় করায়। হেমকান্ত বিষয়চিন্তা করতে চান না, কিন্তু বিষয়চিন্তা তাঁর ঘাড়ে চাপবেই। সরকারের খাজনা শোধ করতে তাঁর দম বেরিয়ে যাচ্ছে। পুরো জমিদারী না হোক এক-আধটা মহল বিক্রি করে দিলে কেমন হয়?

    এইসব সাত পাঁচ ভাবছিলেন, এমন সময় রঙ্গময়ী এল।

    কী খবর মনু? কালকের ঝড়ে কী হল খবর পেলে?

    আমি মেয়েমানুষ কী খবর পাবো? তুমি একটু ঘুরে সব দেখে এলেই তো পারো।

    যাবো-যাবো ভাবছিলাম।

    ভেবেই তোমার দিন যাবে।

    নৌকো-টৌকো ডুবেছে না কি?

    ডুবেছে। তবে ব্রহ্মপুত্রে নয়, তোমার সংসারে।

    এটা আবার কেমন হেঁয়ালী?

    হেঁয়ালী হবে কেন? তোমার আদরের মেয়ে বেঁকে বসেছে, শচীনকে বিয়ে করবে না। তার কী করছ?

    হেমকান্ত কারপেটের ওপর মেরুদণ্ড সোজা করেই বসেছিলেন, আরো টান হয়ে বললেন, কী করব বলো তো! ওর আপত্তি কিসের?

    শচীনরা না কি ভীষণ গরীব।

    গরীব! শচীন গরীব হতে যাবে কেন? জমাট প্র্যাকটিস।

    সে তোমার মেয়েকে বোঝাও গে।

    আমি যে ওদের সঙ্গে কথা পেড়ে ফেলেছি।

    রঙ্গময়ী বিরস মুখে বলে, বিয়ের কথা ওঠার পর থেকেই নানারকম আপত্তি তুলছিল। তোমাকে বলিনি, কারণ বললেই তুমি আকাশপাতাল ভাবতে শুরু করবে। কিন্তু এখন না বলেও তো উপায় নেই। মেয়েদের নিজস্ব মত থাকবে, তারা বিয়েতে আপত্তি তুলবে, এসব তো আমরা ভাবতেও পারি না।

    হেমকান্ত মাথা নেড়ে বলেন, সেটা কথা নয় মনু। আমি মেয়েদের মতামতকে গুরুত্ব দিই। কিন্তু আপত্তি যদি থাকেই সেটা প্রথমেই বলেনি কেন?

    তোমাকে বলতে হয়তো লজ্জা পেয়েছে।

    শুধু গরীব বলেই আপত্তি?

    ও তো তাই বলেছে। শচীনদের বাড়ি থেকে না কি চেয়েচিন্তে নিত এ বাড়ি থেকে। কথাটা মিথ্যেও নয়। কিন্তু তাতে বিয়ে আটকায় কেন তা বুঝছি না।

    আর কোনো কারণ নেই?

    রঙ্গময়ী একটু দ্বিধায় পড়ে দোনোমনো করে বলে, আছে বোধহয়। ওর মনে হয় কোকাবাবুর নাতি শরৎকে পছন্দ।

    শরৎ মানে যে পাখি মারে?

    হ্যাঁ। শরৎ তো একজনই।

    হেমকান্তর মুখ একটু বিবর্ণ দেখাতে লাগল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, কোকাবাবুর পরিবারের আভিজাত্য আছে। কিন্তু পরিবারটার মধ্যে কেমন যেন মায়াদয়া কম। কোকাবাবু যখন মারা যাচ্ছিলেন সেই সময় শরৎ পাখি মেরে বাড়ি ফিরল। সে কী উত্তেজনা!

    রঙ্গময়ী বলল, ওটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। খবর পেয়েছি, শরৎ বিলেত যাচ্ছে। বিয়ে- টিয়ে করবে না।

    কে বলল তোমাকে?

    কৃষ্ণ। শরতের সঙ্গে সেদিন পাখি শিকার করতে গিয়েছিল, মনে নেই? সেদিনই কথা হয়েছে।

    হেমকান্ত ভ্রূ কুঁচকে বললেন, কৃষ্ণের সঙ্গে শরতের এত ভাব কী করে হল বলো তো!

    বন্দুক! তোমার ছেলের দিনরাতের ধ্যান-জ্ঞান এখন বন্দুক।

    বন্দুক! ও বাবা!

    ও বাবা আবার কী? বন্দুক কি নতুন কিছু না কি?

    হেমকান্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন রঙ্গময়ীর দিকে। তারপর বলেন, বন্দুক ওকে ছুঁতে না দেওয়াই ভাল মনু। বাঘ যদি রক্তের স্বাদ পায়—

  • একচল্লিশ থেকে পঞ্চাশ পরিচ্ছেদ

    একচল্লিশ থেকে পঞ্চাশ পরিচ্ছেদ

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    একচল্লিশ

    বৈশাখ মাসে কোকাবাবুদের একটা মহাল কিনে নিলেন রাজেন মোক্তার। তাঁর বৈষয়িক অবস্থাটা বেশ ভালর দিকে। শচীন এখন বেশ পসার জমিয়ে ফেলেছে। সেজো ছেলে রথীন মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের খুবই মেধাবী ছাত্র। মাস্টারমশাইদের ধারণা সে ম্যাট্রিকে স্ট্যাণ্ড করবেই। মেজো ছেলে সতীন বা সতীন্দ্র লেখাপড়ায় সুবিধে করতে না পারলেও সে কাটা কাপড়ের একটা কারবার খুলেছে। দোকানটা বেশ চলছে এখন। রাজেনবাবু সুতরাং তাঁর দারিদ্র্যের গ্লানি সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠে এখন বিশিষ্ট একজন নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছেন। সুখের বিষয়, তাঁর নিজের পসারও এখন যথেষ্ট। তবু তিনি কানাঘুষো শুনেছেন যে, হেমবাবুর ছোটো মেয়েটি নাকি গরীব বলেই তাঁর পরিবারে বউ হয়ে আসতে স্বীকার হচ্ছে না।

    রাজেনবাবু জেদী লোক। বৈষয়িক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আত্মমর্যাদাবোধটিও বেড়েছে। এই জেলার কোন জমিদারের অবস্থা কেমন তা তিনি ভালই জানেন। হেমকান্ত চৌধুরির অবস্থাও তাঁর অজানা নয়। তবু এই পরিবারটির প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতাবোধ খুবই গভীর। এক সময়ে এঁরা তাঁর দুঃখের দিনে অযাচিত সাহায্য বড় কম করেননি। তাই হেমবাবুর মেয়েটিকে বউ করে আনতে তিনি এক কথাতেই রাজি হয়ে যান। মেয়েটিও সুন্দরী।

    কিন্তু তাঁর মেজো মেয়ে সুফলার কাছে তিনি বিশাখার স্বভাবের যে পরিচয় পেয়েছেন তা মোটেই ভাল নয়। তাঁর স্ত্রী স্বর্ণপ্রভাও এই বিয়েতে বেঁকে বসেছেন। তবু এখনো যে বিয়েটি ভেঙে যায়নি তার কারণ, রাজেনবাবু নিজে থেকে বিয়েটা ভাঙতে চান না। তাতে হেমবাবুকে অপমান করা হবে। তবে তিনি ছেলের জন্য ভাল পাত্রীর সন্ধানে আছেন। দু-একটা ভাল সম্বন্ধ এসেছেও। তার মধ্যে দুটি জমিদারকন্যা। শ্রীকান্ত রায়ের মেজো মেয়েটিকে তাঁরা একরকম পছন্দ কৱেই ফেলেছেন। বিশাখার মতো অতটা না হলেও মেয়েটি সুন্দরীই। উপরন্তু শ্রীকান্ত রায় মুখ ফুটে নিজেই বলেছেন, আমার ছেলে জ্যোতিপ্রকাশের সঙ্গে আপনার মেজো মেয়েটিরও বিয়ে হতে পারে।

    পাল্টি বিয়েতে একটু আপত্তি আছে স্বর্ণপ্রভার। তবে তিনি এখনো পরিষ্কার মতামত জানাননি। যদি আপত্তিটুকু শেষ অবধি না থাকে তবে আষাঢ়েই জোড়া বিয়ে লেগে যেতে পারে। শ্রীকান্ত রায় একটু কৃপণ মানুষ। তার ওপর নিজে ল পাশ। বিষয়বুদ্ধিও চমৎকার। তাই জমিদারদের মধ্যে তাঁর অবস্থাই সবচেয়ে স্থিতিশীল।

    সবদিক বিবেচনা করে দেখেছেন রাজেনবাবু। শ্রীকান্ত রায়ের প্রস্তাবটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। এখন অপেক্ষা শুধু হেমকান্তর দিক থেকে একটি অস্তিবাচক বা নেতিবাচক কথা শোনবার। যদি শেষ পর্যন্ত হেমবার মেয়েটি বিয়েতে রাজিও হয় তবে দেনা-পাওনার প্রশ্ন তুলে প্রস্তাবটি কাটিয়ে দেওয়া যাবে। হেমকান্তর সাধ্য নেই মেয়ের বিয়েতে খুব বেশী নগদ টাকা খরচ করার। শচীনের কাছ থেকে হেমবাবুর এসটেটের অবস্থা তিনি মোটামুটি জেনে নিয়েছেন।

    নতুন কেনা মহালটা দেখতে গিয়েছিলেন রাজেনবাবু। ফিরলেন দুপুরে। ঘেমেচুমে একশেষ। নৌকো থেকে নেমে একটা ছ্যাকরা গাড়িতে বাড়ি ফিরে স্নান করে যখন খেতে বসেছেন তখন স্বর্ণপ্রভা বললেন, হেমবাবু লোক পাঠিয়েছিলেন।

    ভ্রূ তুলে রাজেনবাবু একটু বিরক্তির সঙ্গেই বললেন, কেন?

    বিয়ের ব্যাপারে এগোতে আরো মাস দুই সময় চেয়েছেন।

    কে এসেছিল?

    মনু। আমার যেন কেমন-কেমন মনে হচ্ছে।

    কেমন-কেমন মানে?

    ওরা শচীনের মাথাটা খাওয়ার মতলব করছে। ভাল চাও তো শচীনকে বলো, যেন হেমবাবুর এসটেটের কাজ ছেড়ে দেয়।

    মাথাটা কী করে চিবিয়ে খাবে?

    মেয়েরা সব পারে।

    এই তো শুনি মেয়েটি নাকি এ বিয়েতে রাজি নয়। তারপর আবার মাথা চিবোনোর প্রশ্ন উঠছে কি করে?

    কী জানি। শচীনের জন্য আমরা অন্য পাত্রী দেখছি সেটা বোধহয় ওদের কানে গেছে। তাছাড়া আরো কথা আছে।

    আবার কী কথা?

    কোকাবাবুর নাতি শরৎ সেই যে ডাকাতিয়া ছেলেটা, বিশাখা নাকি তাকে বিয়ে করার জন্য পাগল।

    রাজেনবাবু এবার গম্ভীর হলেন। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, তাই নাকি? এতদূর!

    সেই জন্যই বলছি ছেলেকে এখন থেকেই একটু সাবধান করে দিও। যদি এ মেয়ের ফাঁদে পড়ে যায় তবে সারা জীবন নানা জ্বালা পোহাতে হবে।

    একটা অতৃপ্ত উদ্‌গার তুলে রাজেনবাবু উঠে পড়লেন।

    স্বর্ণপ্রভা পিছন থেকে বললেন, সময় চাইবেই বা কেন! ধিঙ্গি মেয়েকে ঘরে বসিয়ে রেখে নষ্ট করছে, তার জন্য আমরা কেন সময় দেবো? তুমি সোজা গিয়ে না করে দিয়ে এসো।

    রাজেনবাবু মাথা নেড়ে বলেন, কাজটা ওভাবে করতে চাই না। হেমবাবু লোক খারাপ নন।

    লোক ভালই বা কিসের? কানাঘুষো তো কিছু কম শুনিনি। মনু আজও বিয়ে বসেনি। লোকের কথা কি আর সব মিথ্যে হয়। এ বিয়ে ভেঙে দেওয়াই তো উচিত। আমি বলি দু-চারটে স্পষ্ট কথা মুখের ওপর বলে ভেঙে দেওয়াই ভাল। আমরা পাত্রপক্ষ, অত যো-হুজুর হয়ে থাকব কেন?

    রাজেনবাবু টের পান, স্বর্ণপ্রভা ঠিক আগের মতো নেই। এক সময়ে সংসার চালানোর জন্য কিশোরী বয়স থেকে এই স্বর্ণপ্রভা কাঁথা সেলাই ইত্যাদি কত কী করেছেন। হেমবাবুর স্ত্রীর আঁতুর ঘরে কাজ পর্যন্ত করেছেন। তার বদলে ধারকর্জ সাহায্য অনেক কিছু পাওয়া গেছে। সুনয়নীর সঙ্গে স্বর্ণপ্রভার একটা সখিত্বও গড়ে উঠেছিল। তবে সেটা সমানে সমানে নয়। বড়লোকের যেমন পারিষদ থাকে স্বর্ণপ্রভাও তাই ছিলেন সুনয়নীর। প্রায়ই এসে বলতেন, বাবা গো, একগলা মিথ্যে কথা বলে এলাম কত্রীর মন রাখতে।

    সে সব দুঃখের দিন গিয়ে আজ স্বর্ণপ্রভার জীবনে এক স্বর্ণযুগ এসেছে। স্বামী আর ছেলেরা দু হাতে রোজগার করছে। তিনি নিজে গোপনে বন্ধকী কারবার করছেন। তাঁর মনোভাব বুঝতে রাজেনবাবুর দেরী হয় না।

    কিন্তু রাজেনবাবু এখনো সুনয়নীর মানসিকতা অর্জন করতে পারেননি। অবস্থার পরিবর্তনে মানুষের মনের পরিবর্তন হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু তার মধ্যে একটা বিকৃতিও আছে। অতীতকে বিস্মৃত হওয়া বা ভবিষ্যতের চিন্তা না করাটাই মানুষের স্বভাব। তার চিন্তা শুধু বর্তমান নিয়ে। কিন্তু রাজেনবাবু সব সময়েই এরকম অবিমৃষ্যকারিতা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চান। অকৃতজ্ঞতা তাঁর স্বভাবে নেই। তিনি জেদী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ বলেই আজ ছুটকো বড়লোকের মতো ভাবভঙ্গি করতে লজ্জা পান।

    স্বর্ণপ্রভার প্রস্তাবে রাজেনবাবু সায় দিলেন না। গম্ভীর মুখ করে বললেন, যা স্থির করার আমিই করব। তোমার আর এ নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। সম্বন্ধটা ভেঙে যাচ্ছেই। কিন্তু সেটা আমাদের তরফ থেকে হওয়া উচিত নয়। কেন নয় সেটা তুমি বুঝবে না।

    ছেলেকে তো কিছু বলবে! সে ওবাড়িতে যায়-আসে এটা আমার পছন্দ নয়। আবার একটা কানাকানি শুরু হবে।

    আচ্ছা, সেটা ভেবে দেখছি।

    রাজেনবাবু তাঁর ঘরে এসে ইজিচেয়ারে বসে নিঃশব্দে তামাক খেতে লাগলেন। বাইরে গ্রীষ্মের খা খা দুপুরে একটা ঘুঘু ডাকছিল। চালের টিনে পাতা খসার শব্দ। পায়রার গাঢ় বকবকম স্বর এক-আধবার শোনা গেল। রাজেনবাবু নিজের বর্তমান বৈষয়িক সম্পন্নতাটা খুব টের পান। কিন্তু ভাবেন, আমার মনে কোনো হীনতা জন্ম নিচ্ছে না! কোনো দেমাকী ভাব! আমি মানুষকে যথাযথ মূল্য দিতে পারছি তো! যথেষ্ট বিনয়ী আছি কি এখনো?

    ভাবতে ভাবতে তিনি চোখ বুজলেন। একটু তন্দ্রা এল।

    কুঞ্জবনে আজ ধানীরঙের রোদ এক সুন্দর আবহ রচনা করেছে। ভারী নির্জন। ভারী। নিরিবিলি। রোদের আলপনা আর আঁকিবুকি ছড়িয়ে আছে সবুজ ঘাসে। গ্রীষ্মের প্রখরতায় বিবর্ণ গাছপালা কালবৈশাখীর ঝাপটায় আবার সতেজ।

    কাছারি ঘরের আড়াল থেকে লতানে গাছে আচ্ছন্ন একটি শুঁড়িপথ বেয়ে কুঞ্জবনে ঢুকল চপলা। তার হাতে ধরা বিশাখার লাজুক হাত।

    বিশাখা একটা ঝাপটা দিয়ে বলল, আঃ, ছাড়ো না।

    না, তুই পালাবি।

    পালাবো কেন? বাঘ না ভালুক?

    তার চেয়েও সাঙ্ঘাতিক। বিয়ে হলে বুঝবি বরের চেয়ে সাঙ্ঘাতিক জন্তু আর নেই।

    হলে তো!

    হওয়াচ্ছি, পালাবি কোথায়!

    ছাড়ো বউদি, পায়ে পড়ি। তেমন গরজ তো দেখছি না ছাড়া পাওয়ার। আয় বলছি।

    তোমার মাথায় কেন্নো আছে বউদি। আজ সন্ধেবেলায় তো জলসা হচ্ছেই।

    জলসায় কী কথা হয় রে বোকা! কথার জন্য জলসা নয়।

    দেখা করে লাভ কি?

    যদি এল ও ভি ই হয়ে যায়?

    যাঃ।

    দুজনে কুঞ্জবনে এসে চারদিকটা তাকিয়ে দেখল। চপলা একটা বেগুনী রঙের ছোটো ফুল ছিঁড়ে খোঁপায় গুজে ঘোমটাটা আবার তুলে দিয়ে বলল, এ জায়গাটা যে এত সুন্দর জানা ছিল না! কেন সুন্দর বল তো!

    এটা তো বাজে জায়গা। সুন্দর আবার কী? জঙ্গল, আগাছা, বিছুটিবন।

    তোর চোখ নেই।

    তা হয়তো নেই।

    ঠিকই নেই! তোর জন্য আমার ভাবনা হয়। এ জায়গাটা সুন্দর কেন জানিস! সাজানো নয় বলে।

    তুমি কলকাতায় থাকো বলে গাছপালা দেখলেই ভাল লাগে। আমাদের তো তা নয়। গাছপালা দেখতে দেখতে চোখ পড়ে গেছে।

    তোর চোখ পচে গেছে, মন পচে গেছে, হৃদয় বলে কিছু নেই।

    বেশ তো বেশ। পচে গেছে তো গেছে।

    আর এখানে বসি।

    ওমা! ওই ভাঙা গাড়ির পাদানীতে!

    তাতে কী! বেশ পরিষ্কার তো!

    বিশাখা একটু হাসল। ভারী সুন্দর দেখাল তাকে। আজ তাকে একটু সাজিয়েছে চপলা। চমৎকার একটা বুটিদার নলি বেনাবসা তার পরনে। বাজতে অনন্ত, কজিতে বালা আর চুড়ি, গলায় মোটা একটা মটরদান হার। চুল ফাঁপিয়ে আঁচড়ানো। কিন্তু সাজগোজ বড় কথা নয়। বিশাখা সাজগোজকে উপেক্ষা করেই তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য বিকিরণ করছে।

    দুজনে ভাঙা গাড়ির পাদানীতে বসে নিচুস্বরে কথা বলতে লাগল।

    চপলা জিজ্ঞেস করল ভয় করছে না তো রে?

    বিশাখা মাথা নেড়ে বলল, না। তবে তোমাৰ এতটা করার দরকার ছিল না। বাবা শুনলে তোমার ওপর চটে যাবে।

    সে আমি বুঝব। তোর কেমন লাগছে বল!

    কিছুই লাগছে না।

    বুক কাঁপছে না?

    না তো!

    ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছে না?

    একটুও না, এই দেখ না ঠোঁট।

    উঃ, তুই পাষাণী বটে। তোর কিছু হচ্ছে না, কিন্তু আমারই তো বুক কাঁপছে।

    দেখো আবার, তুমিই শচীনের প্রেমে মজে যেও না।

    দূর মুখপুড়ী, বলে একটা চিমটি কাটে চপলা।

    উঃ! ভীষণ লেগেছে কিন্তু।

    তোর কিছু হচ্ছে না কেন?

    হবেই বা কেন?

    পুরুষমানুষকে লজ্জা হয় না তোর?

    তা হয়। কিন্তু পুরুষমানুষকেই হয়। শচীনকে নয়।

    তার মানে কি শচীন পুরুষ নয়?

    তা বলিনি।

    তাই বলেছিস। কেন রে, সে কি মেয়েমানুষের মতো?

    বিশাখা মাথা নীচু করে একটু ভাবল। তারপর বলল, বড় হিসেবী, নরমসরম।

    সেটা কি খারাপ?

    পুরুষের স্বভাব হবে দামাল।

    তুই কাউকে দেখেছিস ওরকম? সত্যি কথা বল তো, কাউকে পছন্দ?

    না, তা নয়।

    আমার মনে হয়, তুই একটা গণ্ডগোল পাকিয়ে রেখেছিস মনে মনে। ভয়ে বা লজ্জায় বলছিস না।

    বিশাখা তার জেদী মুখ নত করে রইলো।

    চপলা নীচু হয়ে উঁকি মেরে মুখটা দেখার চেষ্টা করে বলল, লুকোচ্ছিস না তো!

    বিশাখা মাথা নেড়ে বলল, না।

    ঠিক সেই সময় গরম দু ফোঁটা জল পড়ল বিশাখার হাঁটুতে রাখা চপলার হাতে। চপলা চমকে উঠে বলল, কাঁদছিস? ওমা! কেন রে!

    বিশাখা জবাব দিল না। গোঁজ হয়ে রইল।

    চপলা বিশাখার কাঁধে হাত রেখে একটু কাছে টেনে নিয়ে বলল, চোখ মুছে নে। শচীন দেখলে কী ভাববে?

    আমি চলে যাই বউদি? বড় কাতর শোনাল বিশাখার গলার স্বর।

    চলে যাবি? আমি শচীনকে তাহলে কী বলব?

    যা হয় একটা কিছু বলো।

    তা হয় না। বোস। তুই তো বললি বাঘ ভালুক নয়, তবে যাবি কেন?

    সব কথা বোঝানো যায় না। আমি অত কথা জানি না।

    আচমকাই শচীনকে দেখতে পেল চপলা। মন্দিরের দিকটায় একটা ভাঙা বাড়ির স্তূপ আর আগাছার হাঁটুভর জঙ্গল পার হয়ে আসছে। পরনে কাঁচি ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি। ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে।

    আসুন। বলে চপলা উঠে দাঁড়ায়।

    শচীন এক ঝলক বিশাখার দিকে চেয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে থমথমে মুখে বলে, আপনি খুবই দুঃসাহসী।

    চপলা মৃদু স্বরে বলে, আপনিও কম নন।।

    শচীন মাথা নেড়ে বলে, এ জায়গায় ডেকে আপনি ঠিক কাজ করেননি। ঘটনাটা জানাজানি হয়ে যাবে।

    হোক না।

    না বউঠান, এটা কলকাতা নয়। জানাজানি হলে সকলেরই অসুবিধে, বিশেষ করে বিশাখার।

    নিজের নাম শচীনের মুখে শুনে বিশাখা একবার চোখ তুলেই নামিয়ে নিল।

    চপলা মুখ টিপে একটু হেসে বলল, কিন্তু আপনি তো এসেছেন। না এসে তো পারেননি।

    এলাম। বলে শচীন একটু উদাসভাবে ওপরের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর হতাশার ভঙ্গিতে মাথাটা একটু নেড়ে বলে, কয়েকটা কথা বলতে আসা।

    কী কথা?

    এ বিয়ে যে হবে না সেটা আপনি ধরে নিতে পারেন।

    হবে না?

    না। কিছুতেই না।

    আপনার বাড়ির কোনো অমত আছে?

    অমত ছিল না। কিন্তু বিশাখার মনোভাব জানাজানি হওয়ার পর অমত হয়েছে।

    চপলা হঠাৎ ভারী বিষণ্ণ হয়ে গেল। বলল, ইস? আমাদের দুভাগ্য।

    না। দুভাগ্য কেন! বিশাখা তো এই বিয়ে চায়নি।

    ও কী চায় তা ও নিজেই জানে না। বলে চপলা বিশাখার দিকে তাকাল।

    বিশাখা অনড় এক পুতুলের মতো যেমন বসে ছিল তেমনি বসে রইল।

    শচীন বলল, সেটা আপনি আর বিশাখা বুঝবেন।

    শুনুন শচীনবাবু, আপনি নিজে যদি বিশাখার সঙ্গে একটু কথা বলেন, তাহলে বোধহয় ওর একটা ভুল ধারণা কেটে যাবে।

    শচীন একটু হাসল। তারপর ধীর স্বরে বলল, ওকে তো আমি এইটুকু বেলা থেকে দেখছি। কথাও বলেছি অনেক। নতুন করে কী আর বলার আছে বলুন। ও বড় হওয়ার পর তো বলেননি।

    বলার দরকারও দেখছি না।

    চপলা হঠাৎ একটু ঝাঁঝের সঙ্গে বলল, আপনার কিন্তু বেশ অহংকার।

    শচীন বিষন্ন মুখে মাথা নেড়ে বলল, তা নয়। অহংকাব থাকলে একটি মেয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে জেনেও আজ এখানে আসতাম না। অহংকার নয় বউঠান। বরং আত্মগ্লানি।

    ওর বয়স কম। একটু তো বিবেচনা করবেন।

    আপনারা ধরে বেধে ওপর ওপর অযথা একটা অত্যাচার করে যাচ্ছেন বউঠান। হেমবাবু করেছেন, মনুদি করেছেন, এখন আপনিও করছেন। আমি বলি কি, বেচারাকে ছেড়ে দিন। বেচারা এত লোকের মতামতের চাপে পড়ে দিশাহারা হয়ে যাচ্ছে।

    চপলার মুখে কথা জোগাল না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, চলুন, তাহলে ঘরে গিয়ে বসি।

    চলুন। ঘর বরং ভাল। অনেক সেফ। এই সব বাগান-টাগানে দেখা সাক্ষাৎ করা ঠিক নয়।

    বিশাখা উঠল না। বসে রইল।

    চপলা বলল, আয়।

    তোমরা যাও। আমি একটু পরে আসছি।

    ওমা? জলসা আছে যে একটু পরেই।

    যাও না। বিশাখা বিরক্তির গলায় বলে, আমি ঠিক আসব।

    চপলা আর শচীন পাশাপাশি হেঁটে ভিতর বাড়ির দিকে চলে গেল। বিশাখা বিষাক্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তাদের গমনপথের দিকে।

    বিশাখার শ্বাস ক্রমশ প্রলয়ংকর এবং উষ্ণ হয়ে উঠল। ভিতরে এক তীব্র জ্বালা। সে টের পায়। সে অনেক কিছু টের পায়।

    দাঁতে দাঁত পিষে বিশাখা বলল, তলে তলে মকরধ্বজ! দাঁড়াও, দেখাচ্ছি মজা।

  • একান্ন থেকে ষাট পরিচ্ছেদ

    একান্ন থেকে ষাট পরিচ্ছেদ

    একান্ন

    কুঞ্জবনে আর এসো না, বুঝলে?

    কেন বলো তো!

    এটা তোমার জায়গা ছিল। একা একা বসে ভাবতে। আমি ঠাট্টা করে নাম দিয়েছিলাম কুঞ্জবন। কৃষ্ণ থাকত, কিন্তু রাধা আসত না। আজকাল রাধা আসে, কৃষ্ণও থাকে। তুমি পালাও।

    এসব কী হচ্ছে মনু? আমার যে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।

    সেইজনই তো তোমাকে সাবধান করছি। পৃথিবীর অনেক ঘটনা সম্পর্কেই তো তুমি চোখ বুঝে থেকেছো এতকাল। এটাও চোখ বুজে এড়িয়ে যাও।

    কিন্তু এ তো আমার পরিবারের কলঙ্ক মনু।

    তা জানি। কিন্তু তোমার বা আমার কিছু করার নেই।

    কেন নেই?

    যদি বাধা দাও তবে, মরীয়া হয়ে একটা কিছু করে ফেলবে।

    কী করতে পারে বলো তো!

    আত্মহত্যা করতে পারে। পালিয়ে যেতে পারে।

    তা বলে চুপ করে থাকতে হবে?

    অন্য কেউ হলে আমি চুপ করে থাকতে বলতাম না। তুমি বলেই বলছি। তুমি শান্ত, ভাবুক মানুষ। এসব সামাল দেওয়া তোমার কাজ নয়।

    তার মানে তুমি আমাকে অপদার্থ ভাবো।

    যা ভাবি তাই ভাবি। এখন তো নতুন করে ভাবতে পারব না।

    হেমকান্ত কিছুক্ষণ গম্ভীর বিষণ্ণ মুখে বসে থেকে বললেন, আমি সত্যিই অপদার্থ মনু।

    তুমি কী তা তো এ জন্মে সবটা জানা যাবে না। তবে যাই হও, তুমি যেমনটি, ঠিক তেমনটিই থেকো।

    তা না হয় থাকলাম, কিন্তু ওদের যে রোখা দরকার মনু। তুমি একটা কিছু করতে পারো না?

    রঙ্গময়ী মাথা নেড়ে বলে, না গো। তুমিও পারো না, আমিও পারি না। আমাদের সেই জোর নেই।

    কেন নেই?

    বোঝো না? একটু তলিয়ে দেখ, বুঝতে পারবে।

    হেমকান্ত যথাসাধ্য তলিয়ে দেখলেন, কিন্তু বুঝতে পারলেন না। বললেন, আমি বুঝতে পারছি না মনু

    সোজা তো।

    বুঝিয়ে দাও।

    তোমার আর আমার সম্পর্ক নিয়েও লোকের সন্দেহ আছে।

    হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, লোকের মন বড় নোংরা মনু।

    সে তুমি যাই বলো, কথাটা তো সত্যি। তাই তুমি বা আমি কারো নৈতিক চরিত্র নিয়ে কথা বলতে পারি না। যদি বলি তবে ওরাও আমাদের বিরুদ্ধে আঙুল তুলে বলবে, তোমরা কি সাধু?

    বলবে বলছো?

    নিশ্চয়ই বলবে। বিশাখা একদিন বুঝি শচীনকে আলতো করে কী একটু বলেছিল চপলাকে নিয়ে। শচীন উন্টে বিশাখাকে চোটপাট করেছে। বলেছে, চৌধুরি বাড়ির অনেক কেচ্ছাকাহিনী আছে।

    বিশাখা বলেছিল তাহলে?

    একটু বলেছিল। কিন্তু বেচারাকে অপমান হতে হয়েছে।

    ওরা কতদূর এগিয়েছে মনু?

    আমি কি আড়ি পাতি নাকি যে জানবো?

    তুমি জানো। বলছ না।

    খুব বেশী জানি না। তবে হাবভাব দেখে মনে হয় শচীন আর চপলা দুজনেই একটু বেশী বেপরোয়া। কাউকে গ্রাহ্য করছে না। করবেও না।

    কনককে একটা খবর পাঠাবো?

    তুমি বোকা।

    কেন?

    কনকের কিছুই করার সাধ্য নেই। তাকে আমি চিনি। চপলা ওকে যেমন ভেড়া বানিয়েছে ও তেমন ভেড়াটি হয়েই থাকবে। তুমি যদি ওর বউয়ের নামে ওকে কিছু বলো ও বিশ্বাস করবে না। উল্টে বরং তোমার ওপর রেগে যাবে।

    কিন্তু কলকাতা যাওয়ার আগে কনকের সঙ্গে নাকি বড় বউমার ঝগড়া হয়েছিল।

    হয়েছিল। তাতে কি প্রমাণ হয় যে, কনক পুরুষসিংহ? আর চপলা ওর কৃতদাসী?

    তা বলছি না। ঝগড়া হয়েছিল কেন জানো?

    তোমার মেনীমুখো ছেলে বউ ছাড়া থাকতে পারে না। তাই বউকে টানাটানি করেছিল যাওয়ার জন্য! চপলা যেতে চায়নি বলে ঝগড়া। কিন্তু সেই ঝগড়ায় কার হার হয়েছে তা তো দেখছই!

    বিষণ্ণ হেমকান্ত গম্ভীর মুখে বললেন, হুঁ।

    সংসারটা হল কাঁথার উল্টো পিঠের মতো। সামনেটা বেশ নকশাদার, সাজানো গোছানো সিজিল মিছিল। কিন্তু উল্টোপিঠে যত সূতোর গিঁট, উল্টোপাল্টা ফোঁড়। তোমার তো তলার দিকটা দেখবার দরকার নেই। যা হচ্ছে তোক।

    শচীনকে যদি বরখাস্ত করি?

    রঙ্গময়ী একটু হেসে বলে, তাতে তোমারই ক্ষতি। সে তোমার বিষয়-সম্পত্তি যক্ষের মতো আগলাচ্ছে। তাকে তাড়াতে আবার পাঁচ ভূতে লুটে খাবে। তাছাড়া লাভও নেই। বরখাস্ত করলে ওদের রোখ আরো বাড়বে। বেহেড হয়ে এমন কাণ্ড করে বসবে যে, তুমি মুখ দেখাতে পারবে না।

    খবরটা কতদূর রটেছে জানো?

    রটেছে। ভালই রটেছে। এসব কি চাপা থাকে?

    আমার ধারণা, তুমি ইচ্ছে করলে এর মীমাংসা করে দিতে পারো। তোমার তো অনেক বুদ্ধি।

    আমার ওপর তোমার অনেক বিশ্বাস। কিন্তু বললামই তো আমি সরাসরি কিছু করতে পারি না। আমার মনেও তো পাপ।

    হেমকান্ত সামান্য উষ্মার সঙ্গে বললেন, তোমার মনে পাপ থাকবে কেন মনু? তুমি এমন কী অন্যায় করেছো?

    অন্যায় নয়? ও বাবা, কত কলঙ্ক আমার!

    হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, আমাকে যা তা একটা কিছু বোঝালেই যে আমি বুঝব অত বোকা আমি নই মনু। আমি বিপত্নীক, তুমি এখনো কুমারী। যদি চাই তো আমরা বিয়ে করতে পারি। তাতে কোনো নৈতিক অপরাধ হয় না, বিশ্বাসঘাতকতা হয় না, পাপও হয় না। বরং অরক্ষণীয়া কন্যাকে উদ্ধার করার পুণ্যই হয়। আমাদের সঙ্গে ওদের তুলনা করছ কেন? চপলা ঘরের বউ, ছেলেমেয়ের মা, সে আর তুমি কি এক?

    রঙ্গময়ী হেমকান্তর কথায় মাথা নীচু করে লাজুক ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ মৃদু হেসে বলল, খুব বুদ্ধি হয়েছে আজকাল, না?

    বিপাকে পড়েছি মনু, এখন আমার মাথার ঠিক নেই। একটা কিছু পরামর্শ দাও। আমার তো তুমি ছাড়া কেউ নেই, জানোই।

    রঙ্গময়ী একটা বড় রকমের শ্বাস ফেলে বলে, সেটাই তো হয়েছে মুশকিল। তোমার আমি ছাড়া কেউ নেই। কিন্তু কপালগুণে আমি মেয়েমানুষ। তার ওপর আবার শিক্ষাদীক্ষা নেই। আমি তোমাকে কী পরামর্শ দেবো?

    তুমি মেয়েমানুষ হয়ে না জন্মালে আমার যে কী গতি হত!

    বলছ যখন ভেবে দেখব। তবে যেটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে বলতে পারি, এসব ক্ষেত্রে জোর করে কিছু করতে যাওয়া ঠিক নয়।

    জোর করতে পারি এমন জোরই যে আমার নেই।

    রঙ্গময়ীর। অসামান্য ধারাল মুখশ্রীতে লজ্জার লাবণ্য তেমন মানায় না। তবু লজ্জার রেশটুকু এখনো টলটল করছে মুখে। সলাজ দৃষ্টিক্ষেপ করে সে বলল, আজ কিছু একটা খুব জোরের কথা বলে ফেলেছে।

    কী বলো তো!

    ভেবে দেখ। এইমাত্রই তো বললে!

    কোন কথাটা?

    উঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারি না। সব কথাই ধরিয়ে না দিলে হয় না।

    বুঝেছি। হেমকান্তর ফর্সা রঙেও একটু লাল আভা মিশল।

    ছাই বুঝেছো।

    বুঝিনি?

    বলো তো কী?

    বিয়ের কথাটা তো?

    যাক। বলে রঙ্গময়ী পিছু ফিরল। হাঁটতে হাঁটতে বলল, কুঞ্জবনে থেকো না। ওরা আসবে।

    এটা আমার জায়গা মনু। আমি থাকব। ওরা অন্য জায়গায় যাক।

    রঙ্গময়ী যেতে যেতেও দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, শোনো বোকা মানুষটার কথা। কুঞ্জবন তবু খোলামেলা জায়গা। এখানে দুজন’ আর যাই করুক তেমন ঘনিষ্ঠ হতে পারবে না। তুমি কুঞ্জবন না ছাড়লে ওরা ঘরে গিয়ে দোর দেবে।

    হেমকান্ত রেগে গিয়ে বলেন, দিক। যা খুশি করুক।

    বঙ্গময়ী মাথা নেড়ে বলে, ওটা কাজের কথা নয়। রাগের কথা। ঘর কিন্তু ভাল জায়গা নয়। যত কাণ্ড সব নির্জন ঘরেই তো হয়। যা বলছি শোনো। মাথা ঠাণ্ডা রাখো।

    হেমকান্ত ঘরের ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময় নিলেন। কিন্তু যেই বুঝলেন অমনি ছ্যাঁকা খাওয়ার মতো চমকে উঠলেন।

    সন্ধেবেলা সেজবাতির আলোয় হেমকান্ত একখানা বাঁধানো খাতার প্রথম পাতায় লিখলেন; ইহা আমি কী বলিলাম! আমার মুখনিঃসৃত এই কথা যে আমাকে বিস্ময়ে আবিষ্ট করিতেছে, আনন্দে শিহরিত করিতেছে। তবে কি রবিবাবুর, সেই কবিতার মতো আমার অভ্যন্তবেও এক নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ ঘটিতেছে! বাঁধ ভাঙিয়া প্রলয়ংকর জলরাশি প্রমত্ত বেগে নামিয়া আসিবে? রবির কর কি কোনো উপায়ে গুহার সূচীভেদ্য অন্ধকার বিকীর্ণ কবিয়া আমার প্রাণে স্পর্শ রাখিয়াছে? আদি কবি বাল্মীকির মতো আমিও যে আজ স্বীয় মুখে উচ্চারিত একটি বাক্যকে সবিস্ময়ে পর্যালোচনা করিতেছি। কিমিদং? ইহা কী?

    ইহা যাহাই হউক, এই বাক্যের মধ্যে নিহিত রহিয়াছে সত্য। যাহা সত্য তাহাই আজ সবেগে বাহির হইয়া গেল। আমি নিমিত্ত মাত্র। অবচেতন মনের কথা শুনিয়াছি। চেতনার এমনই একটি স্তর যাহা ঘুমন্ত ও স্বপ্নময়। এইসব জীবনসত্য সেখানেই আত্মগোপন করিয়া থাকে। উপলক্ষ পাইলে সবেগে বাহির হইয়া আসে।

    যে মানবীকে উপলক্ষ করিয়া আজ এই সত্য প্রকটিত হইল তাহাকে আমি বাল্যকালাবধি জানি। বয়সে সে আমার অপেক্ষা প্রায় বিশ বৎসর ছোটো। তাহাকে শিশু অবস্থায় আমি এক আধবার ক্রোড়েও ধারণ করিয়া থাকিব। ঠিক স্মরণ নাই। তবে সেই শিশুকে আমি বড় হইতে দেখিয়াছি। আমার যখন বিবাহ হয় তখন সে নিতান্তই বালিকা। আমার বাসরঘরে সে তাহার পিসির সহিত রাত জাগিতে গিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। গাছ বাহিতে, সাঁতার দিতে পারিত চমৎকার। রুক্ষ চুলে তেল জুটিত কি জুটিত না। পূজার দানের সস্তা ও মোটা শাড়ি পরিয়া সে ঘুরঘুর করিত। মুখখানায় বুদ্ধির দীপ্তি ছিল।

    তাহাকে প্রথম ভাল করিয়া লক্ষ্য করি কিশোরী বয়সে। আমরা স্বামী-স্ত্রী দোতলার ঘরে থাকিতাম। আমাদের জানালার পাশেই একটি কাঠচাঁপা গাছের পুষ্পিত শাখা ছিল। পুষ্পের সুগন্ধ ঘরেও পাওয়া যাইত।

    একদিন ভোর রাত্রে জানালার বাহিরে কাঠচাঁপা গাছের নরম ডাল ভাঙ্গিয়া পড়িয়া শব্দ হইল, সেই সঙ্গে একটি শিহরিত মৃদু কাতরতার ধ্বনি। তাহা আর্তনাদ নহে। যেন একটা কোকিলের শ্বাসরোধ হইয়াছে। বা গলা ভাঙিয়াছে। উপমাটা বোধহয় ভাল হইল না। যাহাই হউক, আর্তনাদটি ঠিক আর্তনাদ নহে, কেহ যেন আর্তনাদ করিতে গিয়াও অমানুষিক প্রয়াসে সেটি রুদ্ধ করিল।

    সেই শব্দ এমনই মৃদু যে আমার স্ত্রীর ঘুম ভাঙিল না। আমি উঠিয়া প্রথমে জানালা দিয়া দেখিলাম। তেমন কিছু দৃষ্টিগোচর হইল না। দ্রুত নীচে নামিয়া কাঠচাঁপা গাছের তলায় ঘাসের উপর অধশায়িত যাহাকে আবিষ্কার করিলাম সে সেই কিশোরী। কোমরে ও হাতে সাঙ্ঘাতিক চোট লাগিয়াছে। তবু সে কাতর কোনো শব্দ করিতেছে না। শুধু মুখটি বিকৃত করিতেছে অবরুদ্ধ যন্ত্রণায়।

    তাহাকে ধরিয়া তুলিয়া প্রশ্ন করিলাম, গাছে উঠেছিলে কেন?

    ফুল তুলতে।

    কাঠচাঁপা গাছে কেউ ওঠে? ওর ডাল নরম হয় জানো না?

    জানি।

    তবে উঠেছিলে কেন?

    তোমাদের দেখতে।

    আমাদের দেখতে? আমাদের দেখার কী আছে?

    তোমরা ওরকমভাবে শুয়ে থাকো কেন?

    আমি স্তম্ভিত হইয়া বলিলাম, কীভাবে শুয়ে থাকি?

    বিশ্রীভাবে।

    আমার ইচ্ছা হইয়াছিল অসভ্য মেয়েটার গালে বিরাশি সিক্কা ওজনের একটি চড় কষাইয়া দিই। কিন্তু নিজেকে সংবরণ করাই আমার চিরকালের অভ্যাস।

    বলিলাম, তোমার লজ্জা হয় না?

    কেন হবে?

    আমরা স্বামী-স্ত্রী যে ঘরে বাস করি সেখানে অসময়ে উঁকি দাও, এটা কেমন কথা?

    বেশ করব উঁকি দেবো।

    কেন উঁকি দেবে?

    আমার ইচ্ছে।

    বাঃ বেশ তো! আমার এর বেশী কথা মুখে আসিল না।

    সে বলিল, বেশই তো! কী করবে, মারবে? মারো না।

    মারাই উচিত।

    বলছি তো মারো। মারো না!

    আমি হঠাৎ হাসিয়া ফেলিয়া বলিলাম, মার খাওয়ার অত শখ কেন?

    তুমি আমাকে মারলে আমি খুশি হই। মেরে ফেললে আরো খুশি।

    এ কাজ আর কোরো না। বাড়ি যাও।

    কিশোরী সপাটে আমার মুখের উপর বলিল, রোজ করব। রোজ আসব। রোজ দেখা

    আমার বিস্ময়ের ঘোর আর কাটিতে চায় না। এই মেয়েটি কি উন্মাদ হইয়া গিয়াছে? সামান্য গরীব ঘরের মেয়ে, ইহার তো অত তেজ থাকিবার কথা নহে।

    মনুষ্যচরিত্র আমি কোনোকালেই তেমন অনুধাবন করি নাই। আমার কাজে বেশীর ভাগ মানুষের অস্তিত্বই গৌণ। তাহারা কখন, কেন কিরূপ আচরণ করে তাহা লইয়া আমি বিশেষ মাথা ঘামাই না। কিন্তু এই কিশোরী আমাকে ভাবাইয়া তুলিল। আমি ইহার মধ্যে স্বাভাবিকতার অভাব লক্ষ করিতেছিলাম, কিন্তু কারণটি অনুমান করিবার সাধ্য ছিল না।

    তবে তাহার বাবাকে আমি পরদিন জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনার কন্যাটির মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক মানসিকতা আছে কি?

    আজ্ঞা না তো!

    সে কি খুব তেজী স্বভাবের মেয়ে?

    তাও নয়। বরং স্বভাব নম্রই। কেন বলুন তো?

    আমি তাকে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম। সে একটু অদ্ভুত আচরণ করছে। তার প্রতি একটু লক্ষ রাখবেন।

    বিবাহযোগ্যা কন্যার দায়গ্রস্ত পিতা ভয় পাইয়া বলিলেন, আজ্ঞে নিশ্চয়ই রাখব। তবে আমি দুবেলা গায়ত্রী জপ করি, অখাদ্য কুখাদ্য খাই না, নিত্য পূজা-পাঠ আমার বৃত্তি। আমার বংশে কেউ পাগল হবে এটা অস্বাভাবিক ব্যাপার।

    আমি একটু হাসিলাম। বলিলাম, তবু লক্ষ রাখবেন।

    আচ্ছা। বলিয়া তিনি চলিয়া গেলেন।

    কয়েকদিন পর আমার ভাই আসিয়া আমাকে এক অদ্ভুত ঘটনার কথা বলিল।

    তাহা সবিস্তারে লিখিতে চাই না। এইসব পারিবারিক ঘটনার লিখিত বিবৃতি থাকা ভাল নয়।

    তবে নলিনী যাহা বলিল তাহা আমাকে চমকাইয়া দিল।

    আমি বলিলাম, এই মেয়েটির একটি স্বাভাবিক আচরণ আমিও লক্ষ করেছি।

    কী রকম?

    মেয়েটি সেদিন আমাদের শোওয়ার ঘরে উকি মারতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে যায়।

    তারপর?

    আমি তাকে শাসন করতে গিয়ে ফ্যাসাদে পড়ে যাই। সে উল্টে আমাকে শাসন করে দিল।

    নলিনী সবিস্তারে কাহিনীটি আমার কাছে শুনিল। সে স্বদেশী করা মানুষ, প্রায় সাধু বৈরাগী। সংসারের কোনো মোহ তার নাই। কিন্তু তাই বলিয়া সে বাস্তব বোধ বর্জিত নয়। ধৈর্য ধরিয়া আমার অভিজ্ঞতার কথা শোনার পর সে বলিল, রোগটি আমি অনেক আগেই ধরেছিলাম।

    কিসের রোগ?

    দাদা, এ দেহের রোগ নয়। রোগটা মনের।

    আমি সরল বিশ্বাসে বলিলাম, আমারও তাই বিশ্বাস। মেয়েটা পাগল।

    নলিনী হাসিল। বলিল, পাগল বটে। তবে সে পাগলামি অন্যরকম।

    কি রকম?

    চিত্তদৌর্বল্যের পাগলামি।

    সে আবার কি?

    দাদা, এ মেয়েটিকে তুমি কখনো আঘাত কোরো না। এর মনে ব্যথা বা দাগা দিও না।

    ওসব বলছিস কেন?

    এ মেয়েটি তোমাকে তার জীবনের মধ্যে একটা অত্যন্ত বড় জায়গা দিয়েছে।

    আমাকে! আমাকে!

    নিজেকে তুমি যত তুচ্ছই ভাবো, কারো কারো কাছে তুমিই হয়তো দেবতার মতো মহান।

    বায়ান্ন

     

    তিপ্পান্ন

    চুয়ান্ন

    পঞ্চান্ন

    ছাপ্পান্ন

    সাতান্ন

    আটান্ন

    ঊনষাট

    ষাট

  • গোঁসাইবাগানের ভূত

    গোঁসাইবাগানের ভূত

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [bname]

    গোঁসাইবাগানের ভূত


    কিছু ভুতুড়ে কথা

    এই উপন্যাসটি শারদীয় ‘আনন্দমেলা’-য় প্রথম বেরোনোর পরই অনেকে প্রশ্ন তুলেছিল, রামনামকে ভূতের যদি এতই ভয় তবে ভূতের নিজের নাম কেন নিধিরাম? ভারি শক্ত প্রশ্ন। মাথাটাকে চুলকে আমি তখন বোঝালাম, নামের ‘রাম’ আর ‘রামনাম’ তো এক নয়! নিধিরামের যে রাম, তার সঙ্গে দশরথের বড় ছেলের সম্পর্ক নেই কোনো। তাছাড়া সাপের বিষ কি সাপকে লাগে? তারপর ফের প্রশ্ন উঠল, তাই যদি হবে তবে রাম কবিরাজের নাম শুনে ভূত পালায় কেন? সেও তো নাম। আমি কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, তা বটে। তবে কিনা কবিরাজ মশাইয়ের নামটা একেবারে সোজাসুজি রাম, তার আগে বা পরে কিছু যুক্ত নেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হল, ভূতের মনস্তত্ত্বও বোঝা ভার। কখনো তারা রামনাম শুনে আঁতকে ওঠে, কখনো কোনো কোনো রামকে তারা কেয়ারই করে না। আবার ধরো না কেন, কোনো ভূত যদি ভুল করে বে-খেয়ালে রাম কবিরাজের নাম করেই বসে, তাহলে আমাদের কী করার আছে? ভূতেরও তো ভুল হয়! পুরো ব্যাপারটাই ভারি গণ্ডগোলের। আমি তাই লেখাটা শোধরালাম না। রামনাম আর রামের নাম নিয়ে গণ্ডগোল সহ-ই বইটা ছাপা হল। তোমরা বরং কোনো ভাল ভূত পেলে তার কাছ থেকে সত্যি কথাটা জেনে নিও।

  • আট

    আট

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    আট

    “কল্লোল”কে নিয়ে যে প্রবল প্রাণোচ্ছাস এসেছিল তা শুধু ভাবের দেউলে নয়, ভাষারও নাটমন্দিরে। অর্থাৎ “কল্লোলে”র বিরুদ্ধতা শুধু বিষয়ের ক্ষেত্রেই ছিল না, ছিল বর্ণনার ক্ষেত্রে। ভঙ্গি ও আঙ্গিকের চেহারায়। রীতি ও পদ্ধতির প্রকৃতিতে। ভাষাকে গতি ও ভাবকে দ্যুতি দেবার জন্যে ছিল শব্দসৃজনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। রচনাশৈলীর বিচিত্রতা। এমন কি, বানানের সংস্করণ। যারা ক্ষুদ্বপ্ৰাণ, মূঢ়মতি, তারাই শুধু মামুলি হবার পথ দেখে—আরামরমণীয় পথ–যে পথে সহজ খ্যাতি বা কোমল সমর্থন মেলে, যেখানে সমালোচনার কাঁটা-খোঁচা নেই, নেই বা নিন্দার অভিনন্দন। কিন্তু “কল্লোলে”র পথ সহজের পথ নয়, স্বকীয়তার পথ।

    কেননা তার সাধনাই ছিল নবীনতার, অনন্যতার সাধনা। যেমনটি আছে তেমনটিই ঠিক আছে এর প্রচণ্ড অস্বীকৃতি। আছে তার ছেয়েও আরো কিছু আছে, বা যা হয়েছে তা এখনো পুরোপুরি হয়নি তারই নিশ্চিত আবিষ্কার।

    এই আবিষ্কারের প্রথম সহায় হলেন প্রমথ চৌধুরী। সমস্ত কিছু সবুজ ও সজীবের যিনি উৎসাহস্থল। মাঝে-মাঝে সকালবেলা কেউ কেউ যেতাম আমরা তার বাড়িতে, মে-ফেয়ারে। “কল্লোলে”র প্রতি অত্যন্ত প্রসন্নপ্রশ্রয় ছিলেন বলেই যখনই যেতাম, সম্বর্ধিত হতাম। প্রতিভাভাসিত মুখ মেহে সুকোমল হয়ে উঠত। বলতেন, প্রবাহই হচ্ছে পবিত্রতা—স্রোত মানেই শক্তি। গোড়ায় আবিলতা তো থাকবেই, স্রোত যদি থাকে তবে নিশ্চয়ই একদিন খুঁজে পাবে নিজের গভীরতাকে।

    মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করতাম, লিখে যাব আমরণ। অমন বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে বসে অমন প্রতিজ্ঞা করার সাহস আসত।

    বলতেন, ‘এমন ভাবে লিখে যাবে যেন তোমার সামনে আর কেউ দ্বিতীয় লেখক নেই। কেউ তোমার পথ বন্ধ করে বসে থাকেনি। লেখকের সংসারে তুমি একা, তুমি অভিনব।’

    ‘আমার সামনে আর কেউ বসে নেই?’ চমকে উঠতাম।

    ‘না।’

    ‘রবীন্দ্রনাথ?’

    ‘রবীন্দ্রনাথও না! তোমার পথের তুমিই একমাত্র পথকার। সে তোমারই একলার পথ। যতই দল বাঁধো প্রত্যেকে তোমরা একা।’

    মনে বোমাঞ্চ হত। কথাটার মাঝে একটা আশীর্বাদের স্বাদ পেতাম।

    বলেই ফের জের টানতেন : ‘নিত্য তুমি খেল যাহা, নিত্য ভাল নহে তাহা, আমি যা খেলিতে বলি সে খেলা খেলাও হে।’ এ কথা ভারতচন্দ্র লিখেছিল। চাই সেই শক্তিমান সৃষ্টিকর্তার কর্তৃত্ব, সেই অনন্যপূর্বতা। যদি সর্বক্ষণ মনে কর, সামনে রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন, তবে নিজের  কথা আর বলবে কি করে? তবে তো শুধু রবীন্দ্রনাথেরই ছায়ানুসরণ করবে। তুমি ভাববে তোমার পথ মুক্ত, মন মুক্ত, তোমার লেখনী তোমার নিজের আজ্ঞাবহ।

    রবীন্দ্রনাথ থেকে সরে এসেছিল “কল্লোল”। সরে এসেছিল অপজাত ও অবজ্ঞাত মনুষ্যত্বের জনতায়। নিম্নগত মধ্যবিত্তদের সংসারে। কয়লাকুঠিতে, খোলার বস্তিতে, ফুটপাতে। প্রতারিত ও পরিত্যক্তের এলেকায়।

    প্রমথ চৌধুরী প্রথম এই সরে-আসা মানুষ। বিষয়ের দিক থেকে না হোক, মনোভঙ্গি ও প্রকাশভঙ্গির দিক থেকে। আর দ্বিতীয় মানুষ নজরুল।

    যেমন লেখায় তেমনি পোশাকে-আশাকেও ছিল একটা রঙিন উচ্ছৃঙ্খলতা। মনে আছে, অভিনবত্বের অঙ্গীকারে আমাদের কেউ-কেউ তখন কোঁচা না ঝুলিয়ে কোমরে বাঁধ দিয়ে কাপড় পরতাম—পাড়-হীন খান ধুতি—আর পোশাকের পুরাতন দারিদ্র্য প্রকট হয়ে থাকলেও বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হতাম না। নৃপেন তো মাঝে মাঝে আলোয়ান পরেই চলে আসত। বস্তুত পোশাকের দীনতাটা উদ্ধতিরই উদাহরণ বলে ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু নজরুলের ঔদ্ধত্যের মাঝে একটা কবিতার সমারোহ ছিল, যেন বিহ্বল, বর্ণাঢ্য কবিতা। গায়ে হলদে পাঞ্জাবি, কাঁধে গেরুয়া উড়ুনি। কিংবা পাঞ্জাবি গেরুয়া, উড়ুনি হলদে। বলত, আমার সম্ভ্রান্ত হবার দরকার নেই, আমার বিভ্রান্ত করবার কথা। জমকালো পোশাক না পরলে ভিড়ের মধ্যে লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করব কি করে?

    মিথ্যে কথা। পোশাকের প্রগলভতার দরকার ছিল না নজরুলের। বিস্তীর্ণ জনতার মাঝেও সহজে চিহ্নিত হত সে, এত প্রচুর তার প্রাণ, এত রোধবন্ধহীন তার চাঞ্চল্য। সব সময়ে উচ্চরোলে হাসছে, ফেটে পড়ছে উৎসাহের উচ্ছৃঙ্খলতায়। বড়-বড় টানা চোখ, মুখে সবল পৌঁরুষের সঙ্গে শীতল কমনীয়তা। দূরে থাকলেও মনে করিয়ে দেবে অন্তরের চিরন্তন মানুষ বলে। রঙ শুধু পোশাকে কি, রঙ তার কথায় তার হাসিতে তার গানের অজস্রতায়।

    হরিহর চন্দ্র তখন ‘বিশ্বভারতী’র সহ-সম্পাদক, কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে তার আপিসের দোতালায় ফোর আর্টস ক্লাবের বার্ষিক উৎসব হচ্ছে। হরিহর আর “কল্লোল” প্রায় হরিহর আত্মার মত। সুগৌর সুন্দর চেহারা–পরিহাসচ্ছলে কেউ-কেউ বা ডাকত তাকে রাঙাদিদি বলে। তার শ্ৰী অশ্রু দেবী আসলে কিন্তু আনন্দ দেবী। স্বামী-স্ত্রীতে মিলে ‘আনন্দ মেলা’ নিয়ে মেতে থাকত। ছোট বড় ছেলেমেয়েদের নিয়ে খেলাধুলা ও নাচগানের আসরই নামান্তরে ‘আনন্দ মেলা’। ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে, রামমোহন লাইব্রেরিতে বা মার্কাস স্কোয়ারে এই মেলা বসত, কল্লোলের দল নিমন্ত্রিতদের প্রথম বেঞ্চিতে। কেননা হরিহর “কল্লোল”-দলের প্রথমাগতদের একজন, তাই “কল্লোল” প্রথমাত্মীয় নামধেয়। গ্রাহক ও বিজ্ঞাপন জোগাড় করে, প্রুফ দেখে দিয়ে কত ভাবে যে দীনেশ-গোকুলকে সাহায্য করত ঠিক-ঠিকানা নেই। ব্যবহারে প্রীতির প্রলেপ, সৌজন্যের স্নিগ্ধতা—একটি শান্ত, দৃঢ়, সুস্থ মনের সৌরভ ছড়াত চারদিকে।

    সেই হরিহরের ঘরে সভা বসেছে। দীর্ঘদীপিতদেহা কয়েকজন সুন্দরী মহিলা আছেন। গান হচ্ছে মধুকণ্ঠে। এমন সময় আবির্ভাব হল নজরুলের। পরনে সেই রঙের ঝড়ের পোশাক। আর কথা কি, হার্মোনিয়ম এবার নজরুলের একচেটে। নজরুল টেনে নিল হার্মোনিয়ম, মহিলাদের উদ্দেশ করে বললে, ‘ক্ষমা করবেন, আপনারা সুর, আমি অসুর।’

    হেসে উঠল সবাই। অসুরের সুরে ঘর ভরে উঠল।

    যতদূর মনে পড়ে সেই সভায় উমা গুপ্ত ছিলেন। যেমন মিঠে চেহারা তেমনি মিঠে হাতে কবিতা লিখতেন তিনি। তিনি আর নেই এই পৃথিবীতে। জানি না তার কবিতা ক’টিও বা কোনখানে পড়ে আছে।

    এই অস্থির এলোমেলেমি নজরুলের শুধু পোশাকে-আশাকে নয়, তার লেখায়, তার সমস্ত জীবনযাপনে ছড়িয়ে ছিল। বন্যার তোড়ের মত সে লিখত, চেয়েও দেখত না সেই বেগ-প্রাবল্যে কোথায় সে ভেসে চলেছে। যা মুখে আসত তাই যেমন বলা তেমনি যা কলমে আসত তাই সে নির্বিরোধে লিখে যেত। স্বাভাবিক অসহিষ্ণুতার জন্যে বিচার করে দেখত না বর্জন-মার্জনের দরকার আছে কি না। পুনর্বিবেচনায় সে অভ্যস্ত নয়। যা বেরিয়ে এসেছে তাই নজরুল, ‘কুবলা খান’—এ যেমন কোলরিজ। নিজের মুখে কারণে অকারণে সে স্নো ঘসত খুব, কিন্তু তার কবিতার এতটুকু প্রসাধন করতে চাইত না। বলত, অনেক ফুলের মধ্যে থাক না কিছু কাঁটা, কণ্টকিত পুষ্পই ত নজরুল ইসলাম। কিন্তু মোহিতলাল তা মানতে চাইতেন না। নজরুলের গুরু ছিলেন এই মোহিতলাল। গজেন ঘোষের বিখ্যাত আড্ডা থেকে কুড়িয়ে পান নজরুলকে। দেখেন উদ্বেলতা যেমন আছে আবিলতাও কম নয়। স্রোতশক্তিকে ফলদায়ী করতে হলে তীরের বন্ধন আনতে হবে, আনতে হবে সৌন্দর্য আর সংযম, জাগ্রত বুদ্ধির বশে আনতে হবে ভাবের উদ্দামতাকে। এই বুদ্ধির দীপায়নের জন্যে চাই কিছু পড়াশোনা–অনুভূতির সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ। নিজের পরিবেষ্টনের মাঝে নিয়ে এলেন নজরুলকে। বললেন, পড়ো শেলি-কীটস, পড়ো বায়রন আর ব্রাউনিং। দেখ কে কি লিখেছে, কি ভাবে লিখেছে, মনে স্থৈর্য আনো, হও নিজে নিজের সমালোচক, কল্পনার সোনার সঙ্গে চিন্তার সোহাগ মেশাও। “দে গরুর গা ধুইয়ে”–নজরুল থোড়াই কেয়ার করে লেখাপড়া। মনের আনন্দে লিখে যাবে সে অনর্গল, পড়বার বা বিচার করবার তার সময় কই। খেয়ালী সৃষ্টিকর্তা মনের আনন্দে তৈরি করে ছেড়ে দিয়েছে গ্রহ-নক্ষত্রকে, পড়ুয়া জ্যোতিষীরা তার পর্যালোচনা করুক। সেও সৃষ্টিকর্তা।

    ভাবের ঘরে অবনিবনা হয়ে গেল। কোনো বিশেষ এক পাড়া থেকে নজরুল-নিন্দা বেরুতে লাগল প্রতি সপ্তাহে। ১৩৩২-এর কার্তিকের “কল্লোলে” নজরুল তার উত্তর দিলে কবিতায়। কবিতার নাম সর্বনাশের ঘণ্টা :

    “রক্তে আমার লেগেছে আবার সর্বনাশের নেশা,

    রুধির-নদীর পার হতে ঐ ডাকে বিপ্লব-হ্রেষা।

    হে দ্রোণাচাৰ্য্য! আজি এই নব জয়-যাত্রার আগে

    দ্বেষ-পঙ্কিল হিয়া হতে তব শ্বেত পঙ্কজ মাগে

    শিষ্য তোমার; দাও গুরু দাও তব রূপ-মসী ছানি

    অঞ্জলি ভরি শুধু কুৎসিত কদর্যতার গ্লানি।…

    চিরদিন তুমি যাহাদের মুখে মারিয়াছ ঘৃণা-ঢেলা

    যে ভোগানন্দ দাসেদের গালি হানিয়াছ দুই বেলা,

    আজি তাহাদের বিনামার তলে আসিয়াছ তুমি নামি,

    বাঁদরেরে তুমি ঘৃণা করে ভালবাসিয়াছ বাঁদরামি।

    হে অস্ত্র-গুরু! আজি মম বুকে বাজে শুধু এই ব্যথা,

    পাণ্ডবে দিয়া জয়-কেতু হলে কুক্কুর-কুরু নেতা।

    ভোগ-নরকের নারকীর দ্বারে হইয়াছ তুমি দ্বারী

    ব্রহ্ম অস্ত্র ব্রহ্মদৈত্যে দিয়া হে ব্রহ্মচারী!

    তোমার কৃষ্ণ রূপ-সরসীতে ফুটেছে কমল কত,

    সে কমল ঘিরি নেচেছে মরাল কত সহস্র শত,

    কোথা সে দীঘির উচ্ছল জল কোথা সে কমল রাঙা,

    হেরি শুধু কাদা, শুকায়েছে জল, সরসীর বাঁধ ভাঙা।…

    মিত্র সাজিয়া শত্রু তোমারে ফেলেছে নরকে টানি

    ঘৃণার তিলক পরাল তোমারে স্তাবকের শয়তানী!

    যাহারা তোমারে বাসিয়াছে ভালো করিয়াছে পূজা নিতি

    তাহাদের হানে অতি লজ্জায় ব্যথা আজ তব স্মৃতি।…

    আমারে যে সবে বাসিয়াছে ভালো, মোর অপরাধ নহে,

    কালীয়দমন উদিয়াছে মোর বেদনার কালীদহে–

    তাহার দাহ তো তোমারে দহেনি, দহেছে যাদের মুখ

    তাহারা নাচুক জুলুনীর চোটে। তুমি পাও কোন সুখ

    দগ্ধমুখ সে রাম-সেনাদলে নাচিয়া হে সেনাপতি,

    শিবসুন্দর সত্য তোমার লভিল এ কি এ গতি?…

    তুমি ভিড়িওনা গো-ভাগাড়ে-পড়া চিল শকুনের দলে

    শতদলদলে তুমি যে মরাল শ্বেত সায়রের জলে।

    ওঠ গুরু, বীর, ঈর্ষা-পঙ্ক-শয়ন ছাড়িয়া পুনঃ,

    নিন্দার নহ নান্দীর তুমি, উঠিতেছে বাণী শুন–

    উঠ গুরু উঠ, লহ গো প্রণাম বেঁধে দাও হাতে রাখী,

    ঐ হের শিরে চক মারে বিপ্লব-বাজপাখী!

    অন্ধ হয়ো না, বেত্র ছাড়িয়া নেত্র মেলিয়া চাহ

    ঘনায় আকাশে অসন্তোষের বিদ্রোহ-বারিবাহ।

    দোতলায় বসি উতলা হয়ো না শুনি বিদ্রোহ-বাণী

    এ নহে কবির, এ কাঁদন ওঠে নিখিল-মৰ্ম হানি।…

    অর্গল এঁটে সেথা হতে তুমি দাও অনর্গল গালি,

    গোপীনাথ ম’ল? সত্য কি? মাঝে মাঝে দেখো তুলি জালি

    বরেন ঘোষের দ্বীপান্তর আর মির্জাপুরের বোমা

    লাল বাংলার হুমকানী—ছি ছি এত অসত্য ওমা,

    কেমন করে যে রটায় এ সব ঝুটা বিদ্রোহী দল!

    সখী গো আমায় ধর ধর! মাগো কত জানে এরা ছল!…

    এই শয়তানী ক’রে দিনরাত বল আর্টের জয়,

    আর্ট মানে শুধু বাঁদরামি আর মুখ-ভ্যাঙচানো নয়।…

    তোমার আর্টের বাঁশরীর সুরে মুগ্ধ হবে না এরা

    প্রয়োজন-বাঁশে তোমার আর্টের আর্টশালা হবে নেড়া।…

    যত বিদ্রূপই কর গুরু তুমি জান এ সত্য বাণী

    কারুর পা চেটে মরিব না, কোনো প্রভু পেটে লাথি হানি

    ফাটিবে না পিলে, মরিব যেদিন মরিব বীরের মত

    ধরা মার বুকে আমার রক্ত রবে হয়ে শাশ্বত।

    আমার মৃত্যু লিখিবে আমার জীবনের ইতিহাস

    ততদিন গুরু সকলের সাথে করে নাও পরিহাস!”

    মনে আছে এই কবিতা নজরুল কল্লোল-আপিসে বসে লিখেছিল এক বৈঠকে। ঠিক কল্লোল-আপিসে হয়তো নয়, মণীন্দ্রর ঘরে। মণীন্দ্র চাকী “কল্লোলে”র একক কর্মচারী। নীরব, নিঃসঙ্গ। মুখে একটি হ্রস্ব নির্মল হাসি, অন্তরে ভাবের স্বচ্ছতা। ঠিকমত মাইনে-পত্র পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন অভাবের রুক্ষ রাজপথ দিয়ে হাঁটছে। অথচ এক বিন্দু অভিযোগ নেই, অবাধ্যতা নেই। ভাবখানা এমনি, “কল্লোলের” জন্যে সেও তপশ্চারণ করছে, হাসিমুখে মেনে নিচ্ছে দারিদ্রের নির্দয়তাকে। লেখকরা যেমন এক দিকে সেও তেমনি আরেক দিকে। সে কম কিসে! সে লেখে না বটে কিন্তু কাজ করে, সেবা করে। সেও তো এক নৌকার সোয়ারি।

    খোলার চালে ঘুপসি একখানা বিচ্ছিন্ন ঘর ওই মণীন্দ্রর। কল্লোল-আপিসের সঙ্গে শুধু একফালি ছোট্ট একটা গলির ব্যবধান। মণীন্দ্রর ঘর বটে, কিন্তু যে-কাউকে সে যে-কোনো সময় তা ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। নিয়মিত সময়ে নজরুল কবিতা লিখে দিচ্ছে না, বন্ধ করো তাকে সেই ঘরে, কবিতা শেষ হলে তবে খুলে দেয়া হবে ছিটকিনি। কাশী থেকে দৈবাৎ সুরেশ চক্রবর্তী এসে পড়েছে, থাকবার জায়গা নেই, চলে এস মণীন্দ্রর ঘরে। প্রেমেন এসেছে ছুটিতে, মেসের দরজা বন্ধ তো মণীন্দ্রর দরজা খোলা। দুপুরবেলা ব্রে খেলতে চাও—সেই কালো বিবি-গছানো কালান্তক খেলা—চলে যাও মণীন্দ্রর আস্তানায়। চারজনের মামলায় ষোলোজন মোক্তারি করে হুল্লোড় বাধাও গে। কখন হঠাৎ শুনতে পাবে তোমার পাশের থেকে আশু ঘোষ লাফিয়ে উঠেছে তারস্বরে : ‘আহাহাহা, করস কি, দুরির উপর তিনি মারিয়া দে–’

    গুপ্ত ফ্রেণ্ডস-এর আশু ঘোষ! কি সুবাদে যে “কল্লোলে” এল কে বলবে। কিন্তু তাকে ছাড়া কোনো আড্ডাই যেন দানা বাঁধে না। একটা নতুন স্বাদ নিয়ে আসত, ঋজু ও দৃপ্ত একটা কাঠিন্যের স্বাদ। নির্ভীক সারল্যের দারুচিনি। আশুকে কোনোদিন পাঞ্জাবি গায়ে দিতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না–শার্ট-কোট তো সুদূরপরাহত। চিরকাল গেঞ্জি-গায়েই আনাগোনা করল, খুব বেশি শালীনতার প্রয়োজন বোধ করলে পাঞ্জাবিটা বড়জোর কাঁধের উপর স্থাপন করেছে। আদর্শের কাছে অটলপ্রতিজ্ঞ আশু ঘোষ, পোশাকেও দৃঢ়পিনদ্ধ। অল্পেই সন্তুষ্ট তাই পোশাকেও যথেষ্ট। তার প্রীতির উৎসারই হচ্ছে তিরস্কারে—আর সে কি ক্ষমাহীন নির্মম তিরস্কার! কিন্তু এমন আশ্চর্য, তার কশাঘাতকে কশাঘাত মনে হত না, মনে হত রসাঘাত,–যেন বিদ্যুতের চাবুক দিয়ে মেঘ তাড়িয়ে রোদ এনে দিচ্ছে। খাঁটি, শক্ত ও অটুট মানুষের দরকার ছিল “কল্লোলে”।

    আশু ঘোষের গেঞ্জিও যা, দীনেশরঞ্জনের ফ্রিল-দেয়া হাতা-ওয়ালা পাঞ্জাবিও তাই। দুইই এক দুদিনের নিশানা। আমাদের তখন এমন অবস্থা, একজনে এক পুরো আস্ত একটা সিগারেট খাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। কাঁচি, এবং আরো কাঁচি চললে পাসিং শো। সিগারেট বেশির ভাগ জোগাত অজিত সেন, জলধর সেনের ছেলে। “কল্লোলে”র একটি নিটুট খুঁটি, তক্তপোশের ঠিক এক জায়গায় গ্যাঁট-হয়ে বসা লোক। কথায় নেই হাসিতে আছে, আর আছে সিগারেট বিতরণে। কুণ্ঠা আছে একটু, কিন্তু কৃপণতা নেই। সবাই দাদা বলতাম তাকে। আশ্চর্য, জলধর সেনকেও দাদা বলতাম। আই-সি-এসের ছেলে আই-সি-এস হয়েছে একাধিক, কিন্তু দাদার ছেলের দাদা হওয়া এই প্রথম। যেমন কুলগুরুর ছেলে কুলগুরু। নিয়ম ছিল সিগারেট টানতে গিয়ে যেই গায়ের লেখার প্রথম অক্ষরটুকু এসে ছোঁবে অমনি আরেকজনকে বাকি অংশ দিয়ে দিতে হবে। পরবর্তী লোক জিতল বলে সন্দেহ করার কারণ নেই, কারণ শেষ দিকে খানিকটা ফেলা যাবে অনিবার্য। তবে পরবর্তী লোক যদি পিন ফুটিয়ে ধরে টানতে পারে শেষাংশটুকু, তবে তার নির্ঘাৎ জিত।

    এ দিনের দৈন্যের উদাহরণস্বরূপ দুটো চিঠির টুকরো তুলে দিচ্ছি। একটা প্রেমেনের, আমাকে লেখা :

    “কিন্তু সুখের বা দুঃখের বিষয় হোক, Testএ পাশ হয়ে গেছি সসম্মানে। এখন ফি-এর টাকা জোগাড় করে উঠতে পারছি না। তাই আজ সকালে তোকে চিঠি লিখতে বসব এমন সময় তোর চিঠি এল। এবার তুই কোন ওজর দেখাতে পাবি না। যা করে হোত, দশটা টাকা আমাকে পাঁচ দিনের মধ্যে পাঠিয়ে দিবি। আমি পরে কলকেতায় গিয়ে শোধ করব। সত্যি জানিস Testএর ফি দিতে পারছি না। কলকেতায় দিদিমার কাছে একটি পয়সা নেই, এখন বুড়িকে বিড়ম্বিত করাও যায় না। এ সম্বন্ধে আর বেশী কিছু লিখলাম না, তোর যা সাধ্য তা তুই করবি জানি। তোর ভরসায় রইলাম।

    Finalএ পাশ হব কি না জানি না, কিন্তু ছুটি যে একেবারে নেব, খাব কি? একটা  কথা আমি ভালোরকমেই জানি যে দারিদ্র সমস্ত idealismকে শুকিয়ে মারতে পারে। আমি বড়লোক হতে মোটেই চাই না, কিন্তু অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম আর সাহিত্যসৃষ্টি এই দুকাজ একসঙ্গে করবার মত প্রচুর শক্তি আমার নেই। সে আছে যার সেই মহাপুরুষ শৈলজাকে আমি মনে-মনে প্রায় প্রণাম করে থাকি।

    এবার কলকেতায় গিয়ে যদি গোটা ত্রিশ টাকা মাইনের এমন একটা কাজ পাই যাতে অতিরিক্ত একঘেয়ে খাটুনি নেই, তা হলে আমি তাতেই লেগে যাব এবং তাহলে আমার একরকম চলে যাবে। কোনো স্কুলের Librarian-মত হতে পারলে মন্দ হয় না। অবশ্য কেরানীগিরি আমার পোষাবে না।

    শরীর ভালো নয়। ঢাকার জল হাওয়া মাটি মানুষ কিছুই ভালো লাগছে না। হয়তো জীবনের উপরই বিতৃষ্ণার এই সূচনা।”

    আরেকটা শৈলজার চিঠি, দীশেরঞ্জনকে লেখা :

    বৃহস্পতিবার, বারবেলা

    “দাদা দীনেশ,

    …দু দিন আমি পটুয়াটোলার মোড় থেকে ফিরে এসেছি। জানি, এতে আমার নিজের দোষ কিছু নেই, কিন্তু যে পরাজয়ের লজ্জা আমার অষ্টাঙ্গ বেষ্টন করে ধরেছে তার হাত থেকে আজ পর্যন্ত নিষ্কৃতি পাচ্ছি না যে। আমার মত লোকের বই ছাপানো যে কত দূর অন্যায় হয়েছে তা আমি বেশ বুঝতে পেরেছি। তাই সমস্ত বোঝার ভার আপনার ঘাড়ে চড়িয়ে দিয়ে আমি একটুখানি সরে দাঁড়াতে চাই।

    এখন কি হয়েছে শুনুন। কাবলিওয়ালার মত তাগাদা দিয়ে রায়-সাহেবের কাছে ‘হাসি’ ‘লক্ষ্মী’র জন্য ৫০০ পাঁচ শ টাকা আদায় করেছি, তার পরেও শ খানেক টাকা বাকী ছিল। এখন তিনি সে টাকা দিতে অস্বীকার করেছেন। কাজেই বোঝা এসে পড়েছে আমার ঘাড়ে। এ নিঃস্ব ভিখারীর পক্ষে শ খানেক টাকার বোঝাও যে ভারী দাদা। কিন্তু এখন আমি করি কি? গত দু’দিন আমি বই লিখে প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে উপযাচকের মত একশটি টাকার জন্যে ঘুরে বেড়িয়েছি, কিন্তু এ অভাগার দুর্ভাগ্য, কারও কাছ থেকে একটা আশ্বাসের বাণীও আমার ভাগ্যে জোটেনি। …আমি এ অন্ধকার আবর্তের মধ্যে পড়ে ভাববার কোনও পথ খুঁজে পাচ্ছি না।

    আমায় একবার এ সব দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি দিন। লোটা কম্বল সম্বল করে ‘বোম কেদারনাথ’ বলে আমি একবার বেরিয়ে পড়তে চাই। এ সব সর্বনাশ আবর্জনার মধ্যে প্রাণ আমার সত্যসত্যই ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে।….

    ‘হাসি’ ‘লক্ষ্মী’র আবেষ্টনের মধ্যে হাত-পা যেন বাধা হয়ে রয়েছে, তাই ‘কুছ পরোয়া নেই’ বলতে কেমন যেন সঙ্কোচ হচ্ছে। এ বন্ধন থেকে যদি শনিবার দিন মুক্তি পাই তাহলে বুক ঠুকে বলছি–কুছ পরোটা নাই! তাহলে–

    সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে

    মুখ হাসে মোর চোখ হাসে আর টগবগিয়ে খুন হাসে।

    লিখেছেন,–হাসছ তো শৈলজা? আঃ, কি আর বোলব ভাই, এমন সান্ত্বনার বাণী অনেকদিন শুনিনি। আজ আমার মনে পড়ছে— সে আজ বহুদিনের কথা—আর একজন, তার নিজের বেদনা বক্ষের গাঢ় রক্তাক্ত ক্ষতমুখ দু’হাত দিয়ে বজ্রমুষ্টিতে চেপে ধরে কয়েছিল মেয়েদের মত তোমার এ কান্না সাজে না, তুমি কেঁদো না।…

    সে কথা হয়ত আজ ভুলে ছিলুম, তাই আমার ক্ষণে-ক্ষণে মনে হয়–

    হাসি? হায় সখা, এ তো স্বর্গপুরী নয়,

    পুষ্পে কীট সম হেথা তৃষ্ণা জেগে রয়

    মৰ্মমাঝে।

    আশা করি সকলেই কুশলে আছেন। আমার ভালোবাসা গ্রহণ করুন। শনিবার দিন রিক্তহস্তে এ দীন দীনেশের দরজায় গিয়ে দাঁড়াবে—তাঁর অন্তরের বিরাট ক্ষুধা একটুখানি সহানুভূতির নিবিড় করুণা চাওয়ার প্রত্যাশী!”

    এই সময় আমি এক টেক্সট-বুক প্রকাশকের নেকনজরে পড়ি। সেই আমার পুস্তক প্রকাশকের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎকার। অনুরোধ হল, নিচু ক্লাশের স্কুলের ছাত্রদের জন্যে বাঙলায় একখানা রচনা-পুস্তক লিখে দিতে হবে—হাতি-ঘোড়া, উষ্ট্র-ব্যাঘ্র নিয়ে রচনা। তন্‌খা পঞ্চাশ টাকা। সানন্দচিত্তে রাজি হয়ে গেলাম, প্রায় একটা দাও পাওয়ার মত মনে হল। লেখা শেষ করে দিলাম অল্প কয়েক দিনের মধ্যে—লেখার চেয়েও লেখা শেষ করতে পারাটাই বেশি পছন্দ হল প্রকাশকের। টাকার জন্যে হাত বাড়ালে প্রকাশক মাত্র একটি টাকা দিয়েই ক্ষান্ত হলেন। বললাম—বাকিটা? আস্তে-আস্তে দেব, বললেন প্রকাশক, একসঙ্গে একমুষ্টে সব টাকা দিয়ে দিতে হবে পষ্টাপষ্টি এমন  কথা হয়নি। ভালোই তো, অনেক দিন ধরে পাবেন। কিন্তু একদিন এই অনেক দিনের সান্ত্বনাটা মন মেনে নিতে চাইল না। হন্তদন্ত হয়ে দোকানে ঢুকে বললাম, টাকা দিন। প্রকাশক মুখের দিকে চেয়ে থেকে বললেন, এত হন্তদন্ত হয়ে চলেছেন কোথায়? বললাম, খেলা দেখতে। খেলা দেখতে? যেন আশ্বস্ত হলেন প্রকাশক। সরবে হিসেব করলেন শুনিয়ে-শুনিয়ে গ্যালারি চার আনা আর ট্রাম ভাড়া দশ পয়সা। সাড়ে ছ আনাতেই হবে, সাড়ে ছ আনাই নিয়ে যান! বলে সত্যি-সত্যি সাড়ে ছ আনা পয়সাই গুনে দিলেন।

    বাঙলা দেশের প্রকাশকের পক্ষে তখন এও সম্ভব ছিল!

  • নয়

    নয়

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    নয়

    সান-ইয়াৎ-সেন আসত “কল্লোলে”। সান-ইয়াৎ-সেন মানে আমাদের সনৎ সেন। সনৎ সেনকে আমরা সান-ইয়াৎ-সেন বলতাম। ‘অৰ্ধাঙ্গিণী’ নামে একখানা উপন্যাস লিখেছিল বলে মনে পড়ছে। আধপোড় চুরুট মুখে দিয়ে প্রায়ই আসত আড্ডা দিতে, প্রসন্ন চোখে হাসত। দৃষ্টি হয়তো সাহিত্যের দিকে তত নয় যত ব্যবসার দিকে। ‘বাণিজ্যে বাঙ্গালীর স্থান’ বলে কিছু একটা লিখেওছিল এ বিষয়ে। হঠাৎ একদিন ‘ফাঁসির গোপীনাথ’ বলে বই বের করে কাণ্ড বাধালে। কল্লোল-আপিসেই কাণ্ড, কেননা “কল্লোল”ই ছিল ঐ বইয়ের প্রকাশক। একদিন লাঠি ও লালপাগড়ির ঘটায় কল্লোল-আপিস সরগরম হয়ে উঠল। জেলে গোপীনাথের যেমন ওজন বেড়েছিল বইএর বিক্রির অঙ্কটা তেমনি ভাবে মোটা হতে পেল না। সরে পড়ল সান-ইয়াৎ সেন। পষ্টাপষ্টি ব্যবসাতে গিয়েই বাসা নিলে।

    কিন্তু বিজয় সেনগুপ্তকে আমরা ডাকতাম ‘কবরেজ’ বলে। শুধু বদ্যি বলে নয়, তার গায়ের চাদর-জড়ানো বুড়োটে ভারিক্কিপনা থেকে। এককোণে গা-হাত-পা ঢেকে জড়সড় হয়ে বসে থাকতে ভালবাসত, সহজে ধরা দিতে চাইত না। কিন্তু অন্তরে কাষ্ঠ কার্পণ্য নিয়ে “কল্লোলের” ঘরে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারে এমন তোমার সাধ্য কি। আস্তে-আস্তে সে ঢাকা খুললে, বেরিয়ে এল গাম্ভীর্যের কোটর থেকে। তার পরিহাস-পরিভাষে সবাই পুলকম্পন্দিত হয়ে উঠল। একটি পরিশীলিত সূক্ষ্ম ও স্নিগ্ধ মনের পরিচয় পেলাম। তার জমত বেশি সুকুমার ভাদুড়ির সঙ্গে। হয়তো দুজনেই কৃষ্ণনগরের লোক এই সুবাদে। বিজয় পড়ছে সিকস্‌থ ইয়ার ইংরিজি, আর সুকুমার এম এস-সি আর ল। দুজনেই পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট। কিংবা হয়তো আরও গভীর মিল ছিল যা তাদের রসস্ফুর্ত আলাপে প্রথমে ধরা পড়ত না। তা হচ্ছে দুজনেরই কায়িক দিনযাপনের আর্থিক কৃচ্ছ।

    কষ্টে-ক্লেশে দিন যাচ্ছে, পড়া-থাকার খরচ জোগানো কঠিন, অবন্ধু সংসারের নির্দয় রুক্ষতায় পদে পদে বিপন্ন, কিন্তু সরসবচনে সুখসৃষ্টিতে আপত্তি কি।

    বিজয় হয়তো বললে, ‘সুকুমারটা একটা ফল্‌স্‌।’

    সুকুমার পালটা জবাব দিলে, ‘বিজয়টা একটা বোগাস।’

    হাসির হল্লোড় পড়ে যেত। ঐ সামান্য দুটো কথায় এত সবার কি ছিল আজকে তা বোঝানো শক্ত। অবিশ্যি উক্তির চেয়ে উচ্চারণের কারুকার্যটাই যে বেশি হাসাত তাতে সন্দেহ নেই। তবু আজ ভাবতে অবাক লাগে তখনকার দিনে কত তুচ্ছতম ভঙ্গিতে কত মহত্তম আনন্দলাভের নিশ্চয়তা ছিল। দুটি শব্দ—‘ইয়ে’, আর ‘উঁহু’—বিজয় এমন অদ্ভুতভাবে উচ্চারণ করত যে মনে হত এত সুন্দর রসাত্মক বাক্য বুঝি আর সৃষ্টি হয়নি। নৃপেনকে দেখে ‘নেপোয় মারে দই’ কিংবা আফজলকে দেখে কেউ যদি বলত ‘ডাবজল’, নামত অমনি হাসির ধারাবর্ষণ। আজকে ভাবতে হাসি পায় যে হাসি নিয়ে জীবনে তখন ভাবনা ছিল না। বুদ্ধি-বিবেচনা লাগত না যে হাসিটা সত্যিই বুদ্ধিমানের যোগ্য হচ্ছে কিনা। অকারণ হাসি, অবারণ হাসি। কবিতার একটা ভাল মিল দিতে পেরেছি কিংবা মাথায় একটা নতুন গল্পের আইডিয়া এসেছে এই যেন যথেষ্ট সুখ। প্রাণবহনের চেতনায় প্রতিটি মুহূর্ত স্বর্ণঝলকিত। কোন দুর্গম গলির দুর্ভেদ্য বাড়িতে নিভৃত মনের বাতায়নে উদাসীনা প্রেয়সী অবসর সময়ে বসে আছেন এই ম্লান দিগন্তের দিকে চেয়ে—এই যেন পরম প্রেরণা। আয়োজন নেই, আড়ম্বর নেই, উপচার-উপকরণ নেই–একসঙ্গে এতগুলি প্রাণ যে মিলেছি এক তীর্থসত্রে, জীবনের একটা ক্ষুদ্র ক্ষণকালের কোঠায় খুব ঘেঁসাঘেঁসি করে যে বসতে পেরেছি একাসনে–এক নিমন্ত্রণে—এই আমাদের বিজয়-উৎসব।

    সুকুমারের গল্পে নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসারের সংগ্রামের আভাস ছিল, বিজয়ের গল্প বিশুদ্ধ প্রেম নিয়ে। যে প্রেমে আলোর চেয়ে ছায়া, ঘরের চেয়ে ঘরের কোণটা বেশি স্পষ্ট। যেখানে কথার চেয়ে স্তব্ধতাটা বেশি মুখর। বেগের চেয়ে বিরতি বা ব্যাহতি বেশি সক্রিয়। এক কথায় অপ্রকট অথচ অকপট প্রেম। অল্প পরিসরে সংযত কথায় সূক্ষ্ম আঙ্গিকে চমৎকার ফুটিয়ে তুলত বিজয়। দুটি মনের দুদিকের দুই জানালা কখন কোন হাওয়ায় একবার খুলছে আবার বন্ধ হচ্ছে তার খেয়ালিপনা। দেহ সেখানে অনুপস্থিত, একেবারে অনুপস্থিত না হলেও নিরুচ্চার। শুধু মনের টেউয়ের ঘূর্ণিপাক। একটি ইচ্ছুক মনের অদ্ভুত ঔদাসীন্য, হয়তো বা একটি উদ্যত মনের অদ্ভুত অনীহা। তেরোশ তিরিশের প্রায় গোড়া থেকেই বিজয় এসেছে “কল্লোলে”, কিন্তু তার হাত খুলেছে তোরেশ একত্রিশ থেকে। তেরোশ একত্রিশ-বত্রিশে কটি অপূর্ব প্রেমের গল্প সে লিখেছিল। যে প্রেম দূরে-দূরে সরে থাকে তার শূন্যতাটাই সুন্দর, না, যে প্রেম কাছে এসে ধরা দেয় তার পূর্ণতাটাই চিরস্থায়ী—এই জিজ্ঞাসায় তার গল্প গুলি প্রাণস্পন্দী। একটি ভঙ্গুর প্রশ্নকে মনের নানান আঁকাবাঁকা গলিঘুঁজিতে সে খুঁজে বেড়িয়েছে। আর যতই খুঁজেছে ততই বুঝেছে এ গোলকধাঁধার পথ নেই, এ প্রশ্নের জবাব হয় না।

    বিজয় কিন্তু আসে মণীশ ঘটকের সঙ্গে। দুজনে বন্ধু ছিল কলেজে, সেই সংসর্গে। একটা বড় রকম অমিল থেকেও বোধহয় বন্ধুত্ব হয়। বিজয় শান্ত, নিরীহ; মণীশ দুর্ধর্ষ, উদ্দাম। বিজয় একটু বা কুনো, মণীশ নির্বারিত। ছ-ফুটের বেশি লম্বা, প্রস্থে কিছুটা দুঃস্থ হলেও বলশালিতার দীপ্তি আছে তার চেহারায়। অতখানি দৈর্ঘ্যই তো একটা শক্তি। “কল্লোলে” আত্মপ্রকাশ করে সে যুবনাশ্বের ছদ্মনাম নিয়ে। সেদিন যুবনাশ্বের অর্থ যদি কেউ করত ‘জোয়ান ঘোড়া’, তাহলে খুব ভুল করত না, তার লেখায় ছিল সেই উদ্দীপ্ত সবলতা। কিন্তু এমন বিষয় নিয়ে সে লিখতে লাগল যা মান্ধাতার বাপের আমল থেকে চলে এলেও বাংলাদেশের ‘সুনীতি সংঘের’ মেম্বাররা দেখেও চোখ বুজে থাকছেন। এ একেবারে একটা নতুন সংসার, অধন্য ও অকৃতার্থের এলাকা। কাণা খোঁড়া ভিক্ষুক গুণ্ডা চোর আর পকেটমারের রাজপাট। যত বিকৃত জীবনের কারখানা। বলতে গেলে, মণীশই “কল্লোলে”র প্রথম মশালচী। সাহিত্যের নিত্যক্ষেত্রে এমন সব অভাজনকে সে ডেকে আনল যা একেবারে অভূতপূর্ব। তাদের একমাত্র পরিচয় তারাও মানুষ, জীবনের দরবারে একই সই-মোহর-মারা একই সনদের অধিকারী। মানুষ? না, মানুষের অপচ্ছায়া? কই তাদের হাতে সেই বাদশাহী পাঞ্জার ছাপ-তোলা সনদ? তারা যেসব বিনা টিকিটের যাত্রী। আর, সত্যি করে বলো এটা কি দরবার, না বেচাকেনার মেছোহাটা? তারা তো সব সস্তায় বিকিয়ে যাওয়া ভুষিমাল।

    যুবনাশ্বের ঐ সব গল্পে হয়তো আধুনিক অর্থে কোনো সক্রিয় সমাজসচেতনতা ছিল না, কিন্তু জীবন সম্বন্ধে ছিল একটা সহজ বিশালতাবোধ। যে মহৎ শিল্পী তার কাছে সমাজের চেয়েও জীবনই বেশি অর্থান্বিত। যে জীবন ভগ্ন, রুগ্ন, পর্যদস্ত, তাদেরকে সে সরাসরি ডাক দিলে, জায়গা দিলে প্রথম পংক্তিতে। তাদের নিজেদের ভাষায় বলালে তাদের যত দগদগে অভিযোগ, জীবনের এই খলতা এই পঙ্গুতার বিরুদ্ধে কশায়িত তিরস্কার। দেখালে তাদের ঘা, তাদের পাপ, তাদের নির্লজ্জতা। সমস্ত কিছুর পিছনে দয়াহীন দারিদ্র। আর সমস্ত কিছু সত্ত্বেও একটি নিষ্পঙ্ক ও নীরোগ জীবনের হাতছানি।

    ভাবতে অবাক লাগে যুবনাশ্বের সেই সব গল্প আজও পর্যন্ত পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়নি। চব্বিশ বছর আগে বাংলাদেশে এমন প্রকাশক অবিশ্যি ছিল না যে এ গল্পগুলি প্রকাশ করে নিজেকে সম্ভ্রান্ত মনে করতে পারত। কিন্তু আজকে অনেক দৃষ্টিবদল হলেও এদিকে কারু চোখ পড়ল না। ভয় হয়, অগ্রনায়ক হিসেবে যুবনাশ্বের নাম না একদিন সবাই ভুলে যায়। অন্তত এই অগ্রদৌত্যের দিক থেকে এই গল্পগুলি সাহিত্যের ইতিহাসে গণনীয় হয়ে থাকবে। এরাই বাংলা সাহিত্যে নতুন আবাদের বীজ ছড়ালে। বাস্তবতা সম্বন্ধে সরল নির্ভীকতা ও অপধ্বস্ত জীবনের প্রতি সশ্রদ্ধ সহানুভূতি এই দুই মহৎ গুণ তার গল্পে দীপ্তি পাচ্ছে।

    ‘কালনেমি’-র ডাকু জোয়ান মরদ—রেলে কাটা পড়ে কাজের বার হয়ে যায়। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে স্ত্রী ময়নাকে নিয়ে পটলডাঙার ভিখিরিপাড়ায় এসে আস্তানা নেয়। ডাকুকে রোজ রাস্তার মোড়ে বসিয়ে দিয়ে ময়না দলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে ভিক্ষের সন্ধানে, ফিরে এসে আবার স্বামীকে তুলে নিয়ে যান। কিন্তু সেই ভিখিরিপাড়ায় স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের কোনো অস্তিত্ব নেই, নিয়ম নেই থাকবার। সেখানে প্রতি বছরই ছেলে জন্মায়, কিন্তু বাপ-মার ঠিক-ঠিকানা জানবার দরকার হয় না। কেউ কারু একলার নয়। ময়না এ জগতে একেবারে বিদেশী, কিছুতেই খাপ খাওয়াতে পারে না। এই বিরুদ্ধ পরিবেশের সঙ্গে। তাই একদিন রতনার আক্রমণে সে রুখে ওঠে।

    স্বামীকে গিয়ে বলে—তু একটা বিহিত করবিনে?

    একটু চুপ করে থেকে ডাকু তাকে বুকে সাপটিয়ে ধরে। বলে—তা হোকগে। থাকতেই হবে যখন হেতায় তখন কি হবে আর ঘাঁটিয়ে?—আয় তুই …।

    ময়না চারিদিকে তাকিয়ে আশ্রয় খোঁজে। গা ঝাড়া দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় স্বামীর কবল থেকে।

    ডাকু বলে—চললি কোতা?

    রতনার কাছে।

    কিন্তু ডাকু তাতে দমে না। বলে—দোহাই তোর, আমাকে একেবারে ফাঁকি দিসনে। একটিবার আসিস রেতে—

    ‘গোষ্পদ’ গল্পে অন্য রকম সুর। একটি ক্ষণকালিক সদিচ্ছার কাহিনী। খেঁদি-পিসি পটলডাঙার ভিখিরিদলের মেয়ে-মোড়ল। একদিন পথে ভঘরের একটি বিবর্জিত বউকে কুড়িয়ে পায়। তাকে নিয়ে আসে বস্তিতে। প্রথমেই তো সে ভিক্ষুকের ছাড়পত্র পেতে পারে না, সেই শেষ পরিচ্ছেদের এখনো অনেক পৃষ্ঠা বাকি। তাই প্রথমে খেঁদি ধমক দিয়ে উঠল। বললে, আমাদের দলে যাদের দেখলে, সবই ত ওই করত এককালে। পরে, বুড়ো হয়ে, কেউ ব্যায়রামে পড়ে পথে বেরিয়েছে। তোমার এই বয়সে অমন চেহারা—তা বাপু, নিজে বোঝ—

    মেয়েটি ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

    এবার আর খেঁদি কান্না শুনে খিটখিট করে উঠল না। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে কি ভাবল। হয়তো ভাবল এই অবুঝ মেয়েটাকে বাঁচানো যায় কিনা। যায় না, তবু যত দিন যায়। তাই সে একটা নিশ্বাস ফেলে বলল,—আচ্ছা থাকো। কিন্তু এ চেহারা নিয়ে কলকাতা হেন জায়গায় কি সামলে থাকতে পারবে? আমার খবরদারিতে যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ অবিশ্যি ভয় নেই। কিন্তু সব সময় কি আমি চোখ রাখতে পারব?

    না, ভয় নেই। থাকো, কোথায় যাবে এই জঙ্গলে? যতক্ষণ ঘরে খেঁদি আছে ততক্ষণ, ততটুকু সময় তো মেয়েটি নিরাপদ।

    ‘মৃত্যুঞ্জয়’ প্রেমের গল্প—গোবরগাদায় পদ্মফুল। ও-তল্লাটে চঞ্চু সবচেয়ে ঝানু বদমাইস, হৃদয়হীন জানোয়ার। থাকত ক্ষ্যান্তর ঘরে— ক্ষ্যান্ত হচ্ছে খেঁদির ডান-হাত। দলের সেরা হচ্ছে চঞ্চু, তাই তার ডেরাও মজবুত—ক্ষ্যান্তর ঘর। এ হেন চঞ্চু একদিন ময়লা, রোগা আর বোবা এক ছুঁড়িকে নিয়ে এসে দলে ভর্তি করে দিলে। কিন্তু সেই থেকে, কেন কে জানে, তা আর ভিক্ষেয় বেরোতে মন ওঠে না। শুধু তাই নয়, সেদিন সে পটলাকে চড়িয়ে দিয়েছে একটা মেয়ের হাত থেকে বালা ছিনিয়ে নেবার সময় তার আঙুল মুচড়ে ভেঙে দিয়েছে বলে। চঞ্চুর এই ব্যাপার দেখে সবাই খাপ্পা হয়ে খেঁদিকে গিয়ে ধরল। বললে,— ‘এর একটা বিহিত তোকে আজই করতে হবে পিসি। নইলে সব যে যেতে বসেছে। ড্যাকরার কি যে হয়েছে কদিন থেকে সাধুগিরি ফলাতে শুরু করেছে মাইরি।’

    খেঁদি গিয়ে পড়ল চঞ্চুকে নিয়ে। মুখিয়ে উঠল : ‘বল মুখপোড়া, তুই ভেবেছিস কি? দলের নাম ডোবাতে বসেছিস রে।’

    চঞ্চু হাঁ-না কোনো জবাব দিল না।

    একজন বলল ‘অরে, ও তো এমন ছেল না। ওই শুঁটকি মাগী। এসেই তো ওকে বিগড়েছে! ওকে না তাড়ালে চঞ্চুকে ফেরাতে পারবি না—’

    খেঁদি বলল, ‘সত্যি করে বল তুই, ও-মাগী তোর কে? আমি কেন, দশজনে দেখছে, ওই তোকে সারছে। ও কে তোর?’

    বোবা মেয়েটাও ইতিমধ্যে এসে পড়েছে ঘরের মধ্যে। চঞ্চু তার দিকে তাকিয়ে রইল স্পষ্ট করে। বললে, ‘ও আমার বোন।’

    বোন? খেঁদির দলে বোন? মা-বোনের ছোঁয়াচ তো ঢের দিনই সবাই এড়িয়ে এসেছে।

    — ‘শোন, এই তোকে বলছি’—খেঁদি খেঁকিয়ে উঠল—‘ও মাগীকে তোর ছাড়তে হবে। যেখান থেকে ওকে কুড়িয়ে পেয়েছি, কাল গে সেইখানে রেখে আসবি নইলে—’

    চঞ্চু তাকাল খেঁদির দিকে।

    —‘নইলে দল ছাড়তে হবে তোকে। আগেকার মত যদি হতে পারিস তবেই থাকতে পারবি, নইলে আর নয়। বুঝেছিস?’

    ভোর রাতের আবছা আলোয় খেঁদি পিসির আস্তানা থেকে বেরিয়ে এল চঞ্চু, সেই বোবা মেয়েটার হাত-ধরা। অনেক দিন চলে গেল, আর তাদের হদিস নেই।

    রতন টিপ্পনি কাটল,— ‘বলেছিনু কিনা। শক্ত একটা কিছু বেঁধেছে বাবা। নইলে চঞ্চুর মত স্যায়ন ঘাগী—’

    তেরোশ বত্রিশের “কল্লোলে” যুবনাশ্ব তিনটি গল্প লেখে— ‘মন্থশেষ’, ‘ভুখা ভগবান’ আর ‘দুর্যোগ’। এর মধ্যে ‘দুর্যোগ’ অপরূপ। পটলডাঙার গল্প নয়, পদ্মার উপরে ঝড় উঠেছে—তার মধ্যে যাত্রীবাহী স্টিমার—‘বাজার্ডে’র গল্প। জোরালো হাতে লেখা। কলম যেন ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে।

    ‘গতিক বড় সুবিদার না জোগন্নাথ, ঝোরি-বিষ্টি আইব মনে হয়। বুচি লো, চুন দে দেহি এট্টু—’

    সতরঞ্চির ওপর হুঁকো ও গামছা-বাঁধা জলতরঙ্গ টিনের তোরঙে ঠেস দিয়ে আজানু গোলাপী পাঞ্জাবি ও তদুপরি নীল স্ট্রাইপ-দেওয়া টুইলের গলফ-কোট গায়ে একটি বছর সাতাশ-আটাশের মদনমোহন শুয়েছিল। বোধ করি তারই নাম জগন্নাথ। সে চট করে কপালের লতায়িত কেশগুচ্ছের ওপর হাত বুলিয়ে নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললে,—

    ‘ডাইল! হালায় আপনের যত গাজাখুরি কথা। হুদাহুদি ঝরি আইব ক্যান? আর আহেই যদি হালার ডর কিসের? আমরা ত হালার জাইল্যা ডিঙিতে যাইত্যাছি না।’

    আকাশের দিকে চেয়ে মনে হল, ঝড় আসা বিচিত্র নয়। সমস্ত আকাশের রং পাংশু-পিঙ্গল, ঈশান কি নৈঋত কি একটা কোণে হিংস্র শ্বাপদের মত একরাশ ঘোর কালো মেঘ শিকারের ওপর লাফিয়ে পড়বার আগের মুহূর্তের মতই ওৎ পেতে বসেছে। তীরে গাছের পাতা স্পন্দহীন, কেবল ষ্টিমারের আশপাশ ঘুরে গাংচিলের ওড়ার আর বিরাম নেই! চারদিকে কেমন একটা অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা থমথম করছে।

    হঠাৎ চোখে পড়ল একটি লোক আমার পাশ কাটিয়ে ফিমেল-কম্পার্টমেণ্টের ধারে গিয়ে আপাদগ্রীবা সতরঞ্চি মুড়ি দিয়ে উবু হয়ে বসল। বসে সন্তর্পণে একবার কপালের কেয়ারিতে হাত বুলাতেই চিনতে পারলাম সে পুর্বোক্ত শ্রীমান জগন্নাথ। হাবভাবে বুঝলাম, শ্ৰীমান ভীত হয়েছেন।

    বাইরে তাকিয়ে দেখি কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব ওলটপালট হয়ে গেছে। আকাশ-কোণের শ্বাপদজন্তুটা দেহ-বিস্তার করে আকাশের অর্ধেকের বেশি গ্রাস করে ফেলেছে। অন্ধকারে কিছু চোখে পড়ে না, থেকে-থেকে চারদিক মৃদু আলোক-কম্পনে চমকে-চমকে উঠছে। সে আলোয় ধূসর বৃষ্টি-ধারা ভেদ করে দৃষ্টি চলে না, একটু গিয়েই প্রতিহত হয়ে ফিরে আসে। শিকার কায়দায় পেয়ে ক্ষুধার্ত বাঘ যেমন উদ্বিগ্ন আনন্দে গোংরাতে থাকে, সমস্ত আকাশ জুড়ে তেমনি শব্দ হচ্ছে…।

    ‘যান যান, আপন-আপন জায়গায় যান। গাদি করবেন না এক মুড়ায়—দ্যাহেন না হালার জা’জ কাইত অইয়া গেছে—’

    উপদেশ শোনা ও তদনুসারে কাজ করবার মত স্থান ও কাল সেটা নয়, তাই নিজ-নিজ জায়গার ওপর কারো বিশেষ আকর্ষণ দেখা গেল না; যিনি পরামর্শ দিচ্ছিলেন, তাঁরও না।

    বাহিরে অষ্ট দিকপালের মাতামাতি সমানে চলছে। অবিরল বৃষ্টি, অশ্রান্ত বিদ্যুৎ, আকাশের অশান্ত সরব আস্ফালন, সমস্ত ডুবিয়ে উন্মত্ত বায়ুর অধীর হুহুঙ্কার। তারই ভেতর দিয়ে আমাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল, ‘বাজার্ড’ ষ্টিমার বায়ুতাড়িত হয়ে কোন এক ঝড়ের পাখীর মতই সবেগে ছুটে চলেছে।

    হঠাৎ মনে হল কে যেন ডাকছে। কাকে, কে জানে। ওকি,—আমাকেই—

    ‘শুনুন একবার এদিকে—’

    চেয়ে দেখি মেয়ে-কামরার দরজার কাছে দাড়িয়ে বছর কুড়িবাইশের একটি সাদাসিধে হিন্দু ঘরের মেয়ে। আমি এগিয়ে যেতেই তিনি ব্যগ্রভাবে বললেন—‘অবি—অবিনাশবাবুকে ডেকে দেবেন একটু? অবিনাশ বোস। অনেকক্ষণ হল নীচে গেছেন, ফেরেন নি। তিনি আমার স্বামী।’

    বিধ্বস্ত জনসংঘের মধ্যে হাতড়ে-হাতড়ে অনেক কষ্টে অবিনাশবাবুর সন্ধান পাওয়া গেল। ডেক, সেলুন, হস্পিটাল কোথাও তিনি নেই–জাহাজ ডুবছে—এই মহামারণ দুর্যোগে তিনি শুঁটকি মাছের চ্যাঙারির মধ্যে বসে আছেন নিশ্চিন্ত হয়ে। নিশ্চিন্ত হয়ে? হ্যাঁ, ঘাড় দাবিয়ে উবু হয়ে বসে বিপন্না অপরিচিতার স্বামী অবিনাশ বেসি পাশের একটি অর্ধনগ্ন জোয়ান কুলি-মেয়ের দিকে তাকিয়ে কাব্যচর্চা করছেন।” নিশ্চিন্ততা, না, দুর্যোগ?

    মণীশের চেয়েও দীর্ঘকায় আরো একজন সাহিত্যিক ক্ষণকালের জন্যে এসেছিল “কল্লোলে”, গল্পলেখার উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতি নিয়ে। নাম দেবেন্দ্রনাথ মিত্র। কত দিন পরে চলে গেল সার্থক জীবিকার সন্ধানে, আইনের অলি গলিতে। দেবীদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও ওকালতিতে গেল বটে, কিন্তু টিকে ছিল শেষ পর্যন্ত, যত দিন “কল্লোল” টিকে ছিল। মণীশের সঙ্গেই সে আসে আর আসে সেই উদ্দাম প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে। ছাত্র হিসাবে কৃতী, রসবোধের ক্ষেত্রে প্রধী, চেহারায় সুন্দর-সুঠাম— দেবীদাস “কল্লোলে”র বীণার একটি প্রধান তন্ত্রী ছিল। উচ্চ তানের তন্ত্রী সন্দেহ নেই। ঝড়ের ঝংকার নিয়ে আসত, দুর্নিবার আনন্দের ঝড়। নিয়ে আসত অনিয়মের উন্মাদনা। উজরোল, উতরোল, হুল্লোড় পড়ে যেত চারদিকে। দেবীদাস কিন্তু রবাহূত হয়ে আসেনি। এসেছে স্বাধিকারবলে, সাহিত্যিকের ছাড়পত্র নিয়ে। “কল্লোলে” একবার গল্পপ্রতিযোগিতায় দেবীদাসের গল্পই প্রথম পুরস্কার পায়। যত দূর মনে পড়ে, এক কুষ্ঠরোগী নিয়ে সে গল্প। একটা কালো আতঙ্কের ছায়া সমস্ত লেখাটাকে ঢেকে আছে। সন্দেহ নেই, শক্তিধরের লেখনী।

    “কল্লোলে” ভিড় যত বাড়ছে ততই মেজবৌদির রুটির পাঁজা শীর্ণ হয়ে আসছে—সে জঠরারণ্যের খাণ্ডবদাহ নিবৃত্ত করবার সাধ্য নেই কোনো গৃহস্থের। চাঁদা দাও, কে-কে অপারগ হাত তোল, চাঁদায় না কুলোয় ধরো কোনো ভারী পকেটের খদ্দেরকে। এক পয়সায় একখানা ফুলকো লুচি, মুখভরা সন্দেশ একখানা এক আনা, কাছেই পুঁটিরাম মোদকের দোকান, নিয়ে এস চ্যাঙারি করে। এক চ্যাঙারি উড়ে যায় তো আরেক চ্যাঙারি। অতটা রাজাহার না জোটে, রমানাথ মজুমদার স্ট্রিটের মোড়ে বুড়ো হিন্দুস্থানীর দোকান থেকে নিয়ে এস ডালপুরি। একটু দগ্ধভক্ষ খাবে নাকি, যাবে নাকি অশাস্ত্রের এলাকায়? অশাসনের দেশে আবার শাস্ত্র কি, শেয়ালদা থেকে নিয়ে এস শিককাবাব। সঙ্গে ছন্দ রেখে মোগলাই পরোটা!

    আর, তেমন অশন-আচ্ছাদনের ব্যবস্থা যদি না জোটাতে পারে, চলে যাও ফেভরিট কেবিনে, দু’ পয়সার চায়ের বাটি মুখে করে অফুরন্ত আড্ডা জমাও।

    মির্জাপুর স্ট্রিটে ফেভরিট কেবিনে কল্লোলের দল চা খেত। গোল শ্বেতপাথরের টেবিল, ঘন হয়ে বসত সবাই গোল হয়ে। দোকানের মালিক, চাটগেঁয়ে ভদ্রলোক, নাম যতদূর মনে পড়ে, নতুনবাবু, সুজনসুলভ স্নিগ্ধতায় আপ্যায়ন করত সবাইকে। সে সম্বর্ধনা এত উদার ছিল যে চা বহুক্ষণ শেষ হয়ে গেলেও কোনো সঙ্কেতে সে যতিচিহ্ন আঁকত না। যতক্ষণ খুশি আজ্ঞা চালিয়ে যাও জোর গলায়। কে জানে হয়তো আড্ডাই আকর্ষণ করে আনবে কোনো কৌতূহলীকে, তৃষার্তচিত্তকে। পানের অভাব হতে পারে কিন্তু স্থানের অভাব হবে না। এখুনি বাড়ি পালাবে কি, দোকান এখন অনেক পাতলা হয়েছে, এক চেয়ারে গা এলিয়ে আরেক চেয়ারে পা ছড়িয়ে দিয়ে বোস। শাদা সিগারেট নেই একটা? অন্তত একটা খাকি সিগারেট?

    বহু তর্ক ও আস্ফালন, বহু প্রতিজ্ঞা ও ভবিষ্যচিত্রন হয়েছে সেই ফেভরিট কেবিনে। “কল্লোল” সম্পূর্ণ হত না যদি না সেদিন ফেভরিট কেবিন থাকত।

    এক-একদিন শুকনো চায়ে মন মানত না। ধোঁয়া ও গন্ধ-ওড়ানো তপ্ত-পক্ক মাংসের জন্যে লালসা হত। তখন দেলখোস কেবিনের জেল্লাজমক খুব, নাতিদূরে ইণ্ডোবৰ্মার পরিচ্ছন্ন নতুনত্ব। কিন্তু খুব বিরল দিনে খুব সাহস করে সে-সব জায়গায় ঢুকলেও সামান্য চপ-কাটলেটের বেশি জায়গা দিতে পকেট কিছুতেই রাজি হত না। পেট ও পকেটের এই অসামঞ্জস্যের জন্যে ললাটকে দায়ী করেই শান্ত হতাম। কিন্তু সাময়িক শান্তি অর্থ চিরকালের জন্যে ক্ষান্ত হওয়া নয়। অন্তত নৃপেন জানত না ক্ষান্ত হতে। তার একমুখো মন ঠিক একটা না-একটা ব্যবস্থা করে উঠতই।

    একদিন হয়তো বললে, ‘চল কিছু খাওয়া যাক পেট ভরে। বাঙালি পাড়ায় নয়, চীনে পাড়ায়।’

    উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। ‘পয়সা?’

    ‘পয়সা যে নেই তুইও জানিস আমিও জানি। ও প্রশ্ন করে লাভ নেই।’

    ‘তবে?’

    ‘চল, বেরিয়ে পড়া যাক একসঙ্গে। বেগ-বরো-অর-ষ্টিল, একটা হিল্লে নিশ্চয়ই কোথাও হবে। আশা করি চেয়ে-চিন্তে ধারধুর করেই জুটে যাবে। শেষেরটার দরকার হবে না।’

    দু’জনে হাঁটতে সুরু করলাম, প্রায় বেলতলা থেকে নিমতলা, সাহাপুর থেকে কাশীপুর। প্রথম প্রথম নৃপেন মোল আনা চেনা বাড়িতে ঢুকতে লাগল, শেষকালে দু-আনা এক-অনা চেনায়ও পেছপা হল না। মুখচেনা নামচেনা কিছুতেই তার উদ্যম-ভঙ্গ নেই। আমাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে একেকটা বাড়িতে গিয়ে ঢোকে আর বেরিয়ে আসে শূন্য মুখে, বলে, কিছুই হল না, কিংবা বাড়ি নেই কেউ, কিংবা ছোট একটি অভিশপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে দুচরণ মেঘদূত আওড়ায়। এমনিতে স্থির হয়ে বসে থাকতে যা হত হাঁটার দরুন খিদেটা বহুগুণ চনচনে হয়ে উঠল। যত তীব্র তোমার ক্ষুধা তত দূর তোমার যাত্রা। সুতরাং থামলে চলবে না, না-থামাটাই তো তোমার খিদে-পাওয়ার সত্যিকার সাক্ষ্য। কিন্তু রাত সাড়ে আটটা বাজে, ডিনার টাইম প্রায় উত্তীর্ণ হয়ে গেল, আর মায়া বাড়িয়ে লাভ কি, এবার ভাল ছেলের মত বাড়ি ফিরে যৎ প্রাপ্তং তৎ ভক্ষিতং করি গে। হাত ধরে বাধা দিলাম নৃপেনকে, বললাম, ‘এ পর্যন্ত ঠিক কত পেয়েছিস বল সত্যি করে?’

    হাতের মুঠ খুলে অম্লান মুখে নৃপেন বললে, ‘মাইরি বলছি, মাত্র দু’টাকা।’

    দু’ টাকা! দু’টাকায় প্রকাণ্ড খ্যাঁট হবে। ঈষদূন খাওয়া যাবে আকণ্ঠ। তবে এখনো চীন দেশে না গিয়ে শ্যামরাজ্যে আছি কেন?

    হতাশমুখে নৃপেন বললে, ‘এ দু’টাকায় কিছুই হবে না, এ দু’টাকা আমার কালকের বাজার-খরচ।’

    এই আমাদের রোমাণ্টিক নৃপেন, একদিকে বিদ্রোহী, অন্যদিকে ভাবানুরাগী। ভাগ্যের রসিকতায় নিজেও ভাগ্যের প্রতি পরিহাসপ্রবণ। বস্তুত কল্লোল যুগে এ দুটোই প্রধান সুর ছিল, এক, প্রবল বিরুদ্ধবাদ; দুই, বিহ্বল ভাববিলাস। একদিকে অনিয়মাধীন উদ্দামতা, অন্যদিকে সর্বব্যাপী নিরর্থকতার কাব্য। একদিকে সংগ্রামের মহিমা, অন্যদিকে ব্যর্থতার মাধুরী। আদর্শবাদী যুবক প্রতিকূল জীবনের প্রতিঘাতে নিবারিত হচ্ছে—এই যন্ত্রণাটা সেই যুগের যন্ত্রণা। শুধু বন্ধ দরজায় মাথা খুঁড়ছে, কোথাও আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছে না, কিংবা যে জায়গায় পাচ্ছে তা তার আত্মার আনুপাতিক নয়—এই অসন্তোষে এই অপূর্ণতায় সে ছিন্নভিন্ন। বাইরে যেখানে বা বাধা নেই সেখানে বাধা তার মনে, তার স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের অবনিবনায়। তাই একদিকে যেমন তার বিপ্লবের অস্থিরতা, অন্যদিকে তেমনি বিফলতার অবসাদ।

    যাকে বলে ‘ম্যালাডি অফ দি এজ’ বা যুগের যন্ত্রণা তা “কল্লোলে”র মুখে স্পষ্টরেখায় উৎকীর্ণ। আগে এর প্রচ্ছদপটে দেখেছি একটি নিঃসম্বল ভাবুক যুবকের ছবি, সমুদ্র পাবে নিঃসঙ্গ ঔদাস্যে বসে আছেকেন—উত্তাল তরঙ্গশৃঙ্গটা তার থেকে তখনও অনেক দূরে। তেরোশ একত্রিশের আশ্বিনে সে-সমুদ্র একেবারে তীর গ্রাস করে এগিয়ে এসেছে, তরঙ্গতরল বিশাল উল্লাসে ভেঙে ফেলছে কোন পুরোনো না পোড়ো মন্দিরের বনিয়াদ। এই দুই ভাবের অদ্ভুত সংমিশ্রণ ছিল “কল্লোলে”। কখনো উন্মত্ত, কখনো উন্মনা। কখনো সংগ্রাম, কখনো বা জীবনবিতৃষ্ণা। প্রায় টুর্গেনিভের চরিত্র। ভাবে শেলীয়ান, কর্মে হ্যামলেটিশ।

    এ সময়টায় আমরা মৃত্যুর প্রেমে পড়েছিলাম। বিপ্লবীর জন্যে সে সময় মৃত্যুটা বড়ই রোমাণ্টিক ছিল—সে বিপ্লব রাজনীতিই হোক বা সাহিত্যনীতিই হোক। আর, সঙ্গ বা পরিপার্শ্ব অনুসারে রাজনীতি না হয়ে আমাদের ভাগে সাহিত্য। নইলে দুই ক্ষেত্রেই এক বিদ্রোহের আগুন, এক ধ্বংসের অনিবার্যতা। এক কথায়, একই যুগ-যন্ত্রণা। তাই সেদিন মৃত্যুকে যে প্রেয়সীর সুন্দর মুখের চেয়েও সুন্দর মনে হবে তাতে আর বিচিত্র কি।

    সেই দিন তাই লিখেছিলাম:

    নয়নে কাজল দিয়া

    উলু দিও সখি, তব সাথে নয়, মৃত্যুর সাথে বিয়া।

    আর প্রেমেন লিখেছিল :

    আজ আমি চলে যাই

    চলে যাই তবে,

    পৃথিবীর ভাই বোন মোর

    গ্রহতারকার দেশে,

    সাক্ষী মোর এই জীবনের

    কেহ চেনা কেহ বা অচেনা।

    তোমাদের কাছ হতে চলে যাই তবে।

    যে কেহ আমার ভাই যে কেহ ভগিনী,

    এই উর্মি-উদ্বেলিত সাগরের গ্রহে

    অপরূপ প্রভাত-সন্ধ্যার গ্রহে এই

    লহ শেষ শুভ ইচ্ছা মোর,

    বিদায়পরশ, ভালোবাসা;

    আর তুমি লও মোর প্রিয়া

    অনন্তরহস্যময়ী,

    চিরকৌতূহল-জ্বালা—

    অসমাপ্ত চুম্বনখানিরে

    তৃপ্তিহীন।…

    যত দুঃখ সহিয়াছি

    বহিয়াছি যত বোঝা, পেয়েছি আঘাত

    কাটায়েছি স্নেহহীন দিন

    হয়ত বা বৃথা,

    আজ কোনো ক্ষোভ নাই তার তরে

    কোনো অনুতাপ আজ রেখে নাহি যাই—

    আর নৃপেনের গলায় রবীন্দ্রনাথের প্রতিধ্বনি :

    মৃত্যু তোর হোক দূরে নিশীথে নির্জনে,

    হোক সেই পথে যেথা সমুদ্রের তরঙ্গগর্জনে,

    গৃহহীন পথিকেরি

    নৃত্যচ্ছন্দে নিত্যকাল বাজিতেছে ভেরী

    অজানা অরণ্যে যেথা উঠিতেছে উদাসমর্মর

    বিদেশের বিবাগী নির্ঝর

    বিদায় গানের তালে হাসিয়া বাজায় করতালি,

    যেথায় অপরিচিত নক্ষত্রের আরতির থালি

    চলিয়াছে অনন্তের মন্দিরসন্ধানে,

    পিছু ফিরে চাহিবার কিছু যেথা নাই কোনোখানে।

    দুয়ার রহিবে খোলা, ধরিত্রীর সমুদ্রপর্বত

    কেহ ডাকিবে না কাছে, সকলেই দেখাইবে পথ।

    শিয়রে নিশীথরাত্রি বহিবে নির্বাক,

    মৃত্যু সে যে পথিকেরে ডাক।

    পথিকেরা সেই ডাক যেন তখন একটু বেশি-বেশি শুনছিল। পথিকদের তার জন্যে খুব দোষ দেয়া যায় না। তাদের পকেট গড়ের মাঠ, ভবিষ্যৎ অনির্ণেয়। অভিভাবক প্রতিকুল, সমালোচক যমদূতের প্রতিমূর্তি। ঘরেবাইরে সমান খড়গহস্ততা। এক ভরসাস্থল প্রণয়িনী, তা তিনিও পলায়নপর, বামলোচন। আর তাঁর যারা অভিভাবক তারা আকাট গুণ্ডামার্কা। এই অসম্ভব পরিস্থিতিতে কেউ যদি মরণকে “শ্যামসমান” বলে, মিথ্যে বলে না।

  • দশ

    দশ

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    দশ

    জিজ্ঞাসা ও নৈরাশ্য, সংগ্রাম ও অপূর্ণতা এই দুই যতির মধ্যে দুলছে তখন “কল্লোলে”র ছন্দ। সে সময়কার প্রেমেনের দুটো চিঠি—প্রথমটা এই—

    “অচিন, আমি অধঃপাতে চলেছি। তাও যদি ভালো ভাবে যেতে পারতুম! জীবন নিয়ে কি করতে চাই ভালো করে বুঝি না, যা বুঝি তাও করতে পারি না। মাঝে-মাঝে ভাবি, বোঝবার দরকার কিছু আছে কি? এই যে দার্শনিক কবি মানবহিতৈষী মহাপুরুষেরা মাথা ঘামিয়ে মরছেন এ ঘর্ম বোধ হয় একেবারেই নিরর্থক। জীবনটাকে যে বেঁকিয়ে দুমড়ে বিকৃত করে ছেড়ে গেল, আর যে প্রাণপণ শক্তিতে জীবনকে কবিতা করার চেষ্টা করলে, দুজনেই বাজে কাজে হয়রান হল সমানই। তুমি বলবে আনন্দ আর দুঃখ—আমি বলি, তার চেয়ে ছেড়ে দাও, যার আদি বুঝি না অন্ত বুঝি না, ছেড়ে দাও তাকে নিজের খেয়ালে। হাসি পেলে হাস, আর যেদিন শ্রাবণের আকাশ অন্ধকারে আর্দ্র হয়ে উঠবে সেদিন জেনো ও মেনো কাঁদতে পাওয়াটাই পরম সৌভাগ্য। কোন দিন যদি খুশী হয়, নিজের সমস্ত সত্যকে মিথ্যার খোলসে ঢেকে নিজের সঙ্গে খুব বড় একটা পরিহাস কোরো, কোন ক্ষতি হবে না।

    আমরা ছোট মানুষ, কুয়োর ব্যাঙ, কিছু জানি না, তাই ভাবি আমরা মস্ত একটা কিছু। নিজেদের জগতে চলাফেরা করি, ছোট্ট চেতনার আলোকে নিজের ঘরে নিজের সত্তার প্রকাণ্ড ছায়াটা দেখি আর মনে মনে ‘বড়-বড়’ খেলা করি। কিন্তু ভাই আজ যদি এই পৃথিবীর গায়ের চুলকানির কীটের মত এই সমস্ত মানুষ জাতটার সবাই মিলে পণ করে উচ্ছন্নে যাই, এই বিপুল নিখিলে এই বিরাট আকাশে কোনখানে এতটুকু কান্না জাগবে না, উল্কাপাত হবে না, অগ্নি বৃষ্টি হবে না, প্রলয় হবে না, বিরাট নিখিলে একটি চোখের পালক খসবে না।

    তবে যদি মানুষকে একটা কথা শেখাতে চাও, আমি তোমার মতে—যদি এই নির্বোধ মানুষ জাতটাকে শেখাও শুধু স্ফূর্তির, নিছক স্ফুর্তির উপাসনা—এই দেবতা-ঠাকুরকে দূর করে দিয়ে, ঝেঁটিয়ে ফেলে সব সমাজশাসন সব নীতির অনুশাসন—শুধু জীবনটাকে আনন্দের সরাবখানায় অপব্যয় করতে—তবে রাজী আমি।

    কিন্তু আনন্দ, সত্যকারের আনন্দ পেতে হলে চাই আবার সেই বন্ধন, চাই আবার সেই সমাজশাসন, যদিও উদারতর; চাই সত্যের ভিৎ, যদিও দৃঢ়তর—চাই সচেতন সৃষ্টি প্রতিভা, চাই বিভিন্ন জীবনপ্রেরণার এমন সংযম ও সংযোগ যা সঙ্গীত।

    সুতরাং এতক্ষণ সব বাজে বকেছি—বাজে বকব বলেই বাজে বকেছি। কারণ চিঠি লেখার চরম উদ্দেশ্য জীবনের নির্মম বাস্তবতাকে কিছুক্ষণের জন্যে অপদস্থ করে হাস্যাস্পদ করা।

    আজ এখানে বেজায় বাদল, কাল থেকেই শুরু হয়েছে। শাল মুড়ি দিয়ে এলোমেলো বিছানায় বসে চিঠি লিখছি। এখন রাত সাড়ে সাতটা হবে। খুব সম্ভব তুই এখন গল্প লিখছিস—লিখছিস হয়ত বিরহী নায়ক তার প্রিয়ার ঘরের প্রদীপের আলোকে নিজের ব্যর্থ কামনার মৃত্যু দেখছে। হয়ত কোন ব্যথিত প্রণয়ী তোর হৃদয়ের কান্নার উৎসে জন্ম নিয়ে আজ চলল মানুষের আনন্দলোকের অবিনাশী মহাসভায়—যেখানে কালিদাসের যক্ষ আজো বিলাপ করছে, যেখানে পৃথিবীর সমস্ত মানস্রষ্টার সৃষ্টি অমর হয়ে আছে।

    একদিন নাকি পৃথিবীতে কান্না থাকবে না, কাঁদবার কিছু থাকবে না। সেদিনকার হতভাগ্য মানুষেরা হয়ত শখ করে তোদের সভায় কাঁদতে আসবে আর আশীর্বাদ করবে এই তোদের, যারা তাদের ক্রন্দনহীন জীবনের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিবি।”

    দ্বিতীয় চিঠি:

    “বড় দুঃখ আমার এই যে কোন কাজই ভাল করে করতে পারলুম না। জীবনের মানেও বুঝতে পারি না। জানি শক্তিসংগ্রহে সুখ, পূর্ণ উপভোগ সুখ। কিন্তু সুখ আর কল্যাণ কোথায় এক হচ্ছে বুঝতে পারি না।

    জীবনটা যখন চলা তখন একটা দিকে ত চলা দরকার, চার দিকে সমানভাবে দৌড়াদৌড়ি করলে কোন লাভ হবে না নিশ্চয়ই। সেই পথের লক্ষ্যটা একমাত্র আনন্দ ছাড়া আর কি করা যেতে পারে ভেবে পাচ্ছি না।…

    আনন্দ কল্যাণের সঙ্গে না মিশলেই যায় সব ভেঙে। অনেক ধনী হয়ে অনেক টাকা বাজে অপব্যয় করার আনন্দ আছে, খুব ব্যভিচারী লম্পট হওয়াতেও আনন্দ আছে, সর্বত্যাগী বৈরাগী তপন্থী সন্ন্যাসী হওয়াতে আনন্দ আছে, কিন্তু কল্যাণের সঙ্গে আনন্দ মেশে না, তাই গোল। এগিয়েও ভুল করতে পারি, পেছিয়েও। পাল্লা সমান রেখে কেমন করে চলা যায় তাও ত ভেবে পাই না।

    আমার মনে হয় আনন্দ আমার কাছে আনন্দ আর দুঃখ দুঃখ, শুধু এই জন্যেই যে, আনন্দ জীবনের সার্থকতার প্রমাণ আর দুঃখ মৃত্যুর ভ্রূকুটি। কথাটা একটু হেঁয়ালি ঠেকছে। আর যখন দেখা যায় আনন্দ জীবনের মূলচ্ছেদেও মাঝে মাঝে পাওয়া যায় তখন আরো হেঁয়ালি দাঁড়ায় বটে কথাটা। তবু আমার মনে হয় কথাটা সত্যি।

    আর এ ছাড়াও, অর্থাৎ এ যদি সত্যি না হয়, তবু আনন্দ ছাড়া জীবনের পথের পাতা আর আমাদের কেউ নেই। যারা কর্তব্য-কর্তব্য বা বিবেক-বিবেক বলে চেঁচিয়ে মরে তারা আমার মনে হয় একেবারে অন্ধ, না হয় একেবারে পাগল। কি কর্তব্য আর বিবেক কি বলে এটা যদি ঠিক করতেই পারা যাবে তাহলে আর এত গোল কেন? জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তো বিবেক তৈরি হয়েছে আর কর্তব্য-অকর্তব্য প্রাণ পেয়েছে।

    এই যে পাণ্ডাটি আমাদের, এ মাঝে-মাঝে ভুল করে, কিন্তু নাচার হয়ে আমাদের তাকেই সঙ্গে নিতে হবে পথ দেখাতে।

    এমনিতর অনেক কথা ভাবি কিন্তু কিছু ঠিক করতে পারি না। ছেলেবেলা একটা সহজ idealism ছিল, ভালো মন্দ বেশ সুস্পষ্টভাবে মনে বিভক্ত হয়ে থাকত। মনে হত পথটা জানি চলাটাই শক্ত—এখন দেখছি চলার চেয়ে পথটা জানা কম কথা নয়।

    এই ধর জীবনের একটা programme দিই। বিদ্যা জ্ঞান স্বাস্থ্য শক্তি সৌন্দর্য শিল্পসাধনা গেল প্রথম। দ্বিতীয় ভালবাসা পাবার। ধর পেলুম কি পেলুম না। তারপর আরো সাধনা পরিপূর্ণতার জন্যে। পরের উপকার, বিশ্বমানবের জন্যে দরদ, পৃথিবীজোড়া দুঃখ দারিদ্র্য হাহাকারের প্রতিকার চেষ্টায় যথাসাধ্য নিজেকে লাগান। তৃতীয় সারা জীবন ধরেই ভূমার জন্য তপস্যা, সারাজীবন ধরে দুঃখকে অবহেলা করবার ব্যর্থতাকে তুচ্ছ করবার মৃত্যুকে উপহাস করবার শক্তি অর্জন।

    বেশ! মন্দ কি। কিন্তু যত সহজ দেখাচ্ছে ব্যাপারটা, আসলে মোটই এমনি সহজে মীমাংসা হয় না। কি যে ভূমা আর কি যে পরিপূর্ণতা, কি যে মানুষের উপকার আর কি যে শিল্প আর জ্ঞান তা কি মীমাংসা হল?…

    না। মাথা গুলিয়ে যায়। আসল কথা হচ্ছে এই যে, আফ্রিকার সব চেয়ে আদিম অসভ্য Bushman-এর একটা বিংশ শতাব্দীর সম্পূর্ণ এরোপ্লেন পেলে যে অবস্থা হয় আমাদের এই জীবনটা নিয়ে হয়েছে তাই। আমরা জানি না এটা কি এবং কেন? এর কোথায় কি তা তো জানিই না, এর সার্থকতা ও উদ্দেশ্য কি তাও জানি না। হয়ত আমাদের আনাড়ি নাড়াচাড়ায় কোন একটা কল নড়ে-চড়ে পাখাটা একবার ঘুরে উঠছে, আমরা ভাবছি হাওয়া খাওয়াই এর উদ্দেশ্য, কি হয়ত পাখা লেগে কারুর গা হাত-পা কেটে যাচ্ছে তখন ভাবছি এটা একটা উৎপীড়ন।

    উপমাটা ঠিক হল না। কারণ অবস্থা ওর চেয়ে খারাপ এবং আফ্রিকার Bushman-এর কাছে একটা এরোপ্লেন যত জটিল ও অর্থহীন, অদ্ভুত জীবনটা আমাদের কাছে তার চেয়ে ঢের বেশি। মানুষ কত কোটি বছর পৃথিবীতে এসেছে এ নিয়ে বৈজ্ঞানিকদের তর্ক আজও শেষ হয়নি, সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি, কিন্তু জীবনের অর্থ যে আজও পাওয়া যায়নি এ নিয়ে মতভেদ নেই বোধ হয়।

    কবিত্ব করা যায় বটে এই বলে যে বোঝা যায় না বলেই জীবন অপরূপ মধুর সুন্দর, কিন্তু ভাই, মন হা হা করে। কি করি এই দুর্বোধ অনধিগম্য জীবন নিয়ে? যতদিন না মৃত্যু-শীতল হাত থেকে আপনি খসে পড়বে ততদিন এমনি করে ছুটোছুটি করে মরব আর কেঁদে কাটাব?

    তা ছাড়া শুধু সুখ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবার উপায়ও যদি থাকত। তাও ত নেই। আমি হয়ত কুৎসিত আর একজন চিররুগ্ন, আর একজন নির্বোধ, আর একজন অন্ধ বা পঙ্গু, আর একজন দীন ভিখারীর মেয়ে। বলছ আনন্দ না পাও আনন্দের সাধনা কর, কেমন? কিন্তু জন্মান্ধের দেখতে পাবার সাধনা খঞ্জের নৃত্যসাধনা করা বোকামি নয় কি? স্কুল জগতে যেমন দেখছি মনের জগতেও অমনি নেই কে বলতে পারে? বোবা হয়ে গানের সাধনা তপস্যা করতে বল কি? জীবনের কোন গানের সাধনায় আমি বোবা তাত জানি না। আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ি যদি হয় ত আমার গায়েই লাগবে।”

    কি হবে এত সব জিজ্ঞাসায় জর্জরিত হয়ে, সক্রেটিসীয় দার্শনিকের মত মৃত্যুরূপী পরিপূর্ণতার প্রতীক্ষা করে? তার চেয়ে চলো, মাঠে চলো, মোহনবাগানের খেলা দেখে আসি।

    মোহনবাগান। আজকাল আর যেন তেমন করে বাজে না বুকের মধ্যে। সেই ইস্ট ইয়র্কস নেই, ব্ল্যাক-ওয়াচ ডারহামস এইচ-এল-আই ডি-সি-এল-আই নেই, সেই মোহনবাগানও নেই। আজকালকার মোহনবাগান যেন মোহন সিরিজের উপন্যাসের মতই বাসি।

    কিন্তু সেসব দিনের মোহনবাগান মৃত দেশের পক্ষে সঞ্জীবনী ছিল। বলা বাহুল্য হবে না, রাজনীতির ক্ষেত্রে যেমন ছিল বন্দেমাতরম তেমনি খেলার ক্ষেত্রে ‘মোহনবাগান’। পলাশীর মাঠে যে কলঙ্ক অর্জন হয়েছিল তার স্থান হবে এই খেলার মাঠে। আসলে, মোহনবাগান একটা ক্লাব নয়, দল নয়, সে সমগ্র দেশ—পরাভূত, পদানত দেশ, সেই দেশের সে উদ্ধত বিজয়-নিশান।

    এ কথা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না যে মোহনবাগানের খেলার মাঠেই বাঙলা দেশের জাতীয়তাবোধ পরিপুষ্ট হয়েছিল। যে ইংরেজবিদ্বেষ মনে-মনে ধূমায়িত ছিল মোহনবাগান তাতে বাতাস দিয়ে বিশুদ্ধ আগুনের সুস্পষ্টতা এনে দিয়েছে। অত্যাচারিতের যে অসহায়তা থেকে টেররিজম জন্ম নেয় হয়তো তার প্রথম অঙ্কুর মাথা তুলেছি এই খেলার মাঠে। তখনো খেলার মাঠে সাম্প্রদায়িকতা ঢোকেনি, মোহনবাগান তখন হিন্দু-মুসলমানের সমান মোহনবাগান—তার মধ্যে নেবুবাগান কলাবাগান ছিল না। সেদিন যে ‘ক্যালকাটা’ মাঠের সবুজ গ্যালারি পুড়েছিল তাতে হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে হাত মিলিয়েছিল, একজন এনেছিল পেট্রল, আরেকজন এনেছিল দিয়াশলাই। সওয়ার পুলিশের উজ্জ্বল ঘোড়ার খুলে একসঙ্গে জখম হয়েছিলে দুজনে।

    সে-সব দিনে খেলার মাঠে ঢোকার লাঞ্ছনার কথা ছেড়ে দিই, খেলা মাঠে ঢুকে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে যে অবিচার অনুষ্ঠিত হতে দেখে দেশের লোক, তাতে রক্ত ও বাক্য দুইই তপ্ত হয়ে উঠেছে ইংরেজের বিরুদ্ধে। আর এই তপ্ত বাক্য আর রক্তই ঘরে-বাইরে স্বাধীন হবার সংকল্পে ধার জুগিয়েছে। সেসব দিনের রেফারিগিরি করা ইংরেজের একচেটে ছিল, আর সেই একচোখো রেফারি পদে-পদে মোহনবাগানকে বিড়ম্বিত করেছে। অবধারিত গোল দেবে মোহনবাগান, হুইসল দিয়েছে অফসাইড বলে। ফাউল করলে ক্যালকাটা, ফাউল দিলে না, যদি বা দিলে, দিলে মোহনবাগানের বিপক্ষে। কিছুতেই মোহনবাগানকে দাবানো যাচ্ছে না, বিনামেঘে বজ্রপাতের মত বলা-কওয়া-নেই দিয়ে বসল পেনাল্টি। একেকটা জোচ্ছরি এমন দুকান-কাটা ছিল যে সাহেবদের কানও লাল না হয়ে থাকতে পারত না। একবার এমনি ক্যালকাটার সঙ্গে খেলায় মোহনবাগানের বিরুদ্ধে রেফারি হঠাৎ পেনাল্টি দিয়ে বসল। যেটা খুবই অসাধারণ, ব্যাক থেকে কলভিন না বেনেট এল শট করতে। শট করে সে-বল সে গোলের দিকে না পাঠিয়ে কয়েক মাইল দূর দিয়ে পাঠিয়ে দিলে। সেটা রেফারির গালে প্রায় চড় মারার মত—দিবালোকের মত এমন নির্লজ্জ ছিল সেই পেনাল্টি। খেলোয়াড়ের পক্ষে রেফারিকে মারা অত্যন্ত গর্হিত কর্ম সন্দেহ নেই, কিন্তু তিক্তবিরক্ত হয়ে সেদিন যে ড্যালহৌসির মাঠে বলাই চাটুজ্জে ক্লেটন সাহেবকে মেরেছিল সেটা অবিস্মরণীয় ইতিহাস হয়ে থাকবে।

    শুধু রেফারি কেন, সমস্ত শাসকবংশই মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রী ছিল। নইলে ১৩০৩ সালে মোহনবাগানকে ক্যালকাটার বিরুদ্ধে শিল্ড-ফাইন্যালে খেলানো হত না। সেদিন রাত থেকে ভুবনপ্লাবন বা, সারা দিনে এক বিন্দু বিরাম নেই। মাঠে এক হাঁটু জল, কোথাও বা এক কোমর, হেদো না থাকলে সে-মাঠে অনায়াসে ওয়াটার-পোলো খেলা চলে। ফুটবল বর্ষাকালের খেলা সন্দেহ নেই, কিন্তু বর্ষারও একটা সীমা আছে সভ্যতা আছে। মোহনবাগান তখন দুর্ধর্ষ দল, ফরোয়াডে শরৎ সিঙ্গি, কুমার আর রবি গাঙ্গুলি—তিন তিনটে অভ্রান্ত বুলেট—আর ব্যাকে সেই দুর্ভেদ্য চীনের দেয়াল—গোষ্ঠ পাল। ক্যালকাটা ভাল করেই জানে শুকনো মাঠে এই দুর্বারণ মোহনবাগানকে কিছুতেই শায়েস্তা করা যাবে না। সুতরাং বানভাসা মাঠে একবার তাকে নামাতে পারলেই সে কোনঠাসা হয়ে যাবে! শেষদিকে বৃষ্টি বন্ধ করানো গেলেও খেলা কিছুতেই বন্ধ করানো গেল না। ক্যালকাটা কর্তৃপক্ষের সে অসঙ্গত অনম্রতা পরোক্ষে দেশের মেরুদণ্ডকেই আরো বেশি উদ্ধত করে তুললে। যে করে হোক পরাভূত করতে হবে এই দম্ভদৃপ্তকে। যে সহজ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এসেও ভুলতে পারে না সে উপবিতন, সে একতন্ত্রী।

    আর, মোহনবাগানকেও বলিহরি! খেলছিস ফুটবল, ছুটতে গিয়ে যেখানে প্রতিপদে আছাড় খেতে হবে, পায়ে বুট পরে নিস না কেন? উপায় কি, বুট পরলে আর ছুট দিতে পারব না, ছেলেবেলা থেকে অভ্যেস যে। দেশে-গাঁয়ে যখন বাতাবি নেবু পিটেছি তখন থেকে, সেই সুরুর থেকেই তো খালি-পা। জুতো কিনি তার সঙ্গতি কই? স্কুল-কলেজে যাবার জন্যে এক জোড়া জোটানোই কষ্টকর, তায় মাঠে-মাঠে লাফাবার জন্যে আরেক জোড়া? মোটে মা রাঁধেন না, তপ্ত আর পান্তা। দেখ না এই খালি পায়েই কেমন পক্ষিরাজ ঘোড়া ছুটাই। কেমন দিগ্বিজয় করে আসি। ভেব না, তাক লাগিয়ে দেব পৃথিবীর। খালি পায়েই ঘায়েল করব বুটকে। উনিশশো এগারো সনে এই খালি পায়েই শিল্ড এনেছিলাম। এবার পারলাম না, কিন্তু, দেখো, আবার পারব। যে সব তোমরা।

    যাব তো ঠিক, কিন্তু দুপুরের দিকে হঠাৎ কোথা থেকে এক টুকরো কালো মেঘ ভেসে এসেছে, অমনি নিমেষে সকলের মুখ কালো হয়ে গেল। হে মা কালীঘাটের কালী, হে মা কালীতলার কালী, তোমরা কে বেশি কালো জানি না, কিন্তু এ মেঘ তোমাদের গায়ে মেখে-মেখে মুছে দাও মা, তোমাদের কালো কেশে উড়িয়ে নিয়ে যাও কৈলাসে। কত তুকতাক, কত মানৎ, কত ইষ্টম, হাওয়া উঠুক, ধুলো উডুক, মেঘ লণ্ডভণ্ড হয়ে যাক। সব সময় প্রার্থনা কি আর শোনে! মেঘের পরে মেঘ শুধু জমাটই হতে থাকে, ঘন নৈরাশ্যের পর ঘনতর মনস্তাপ। সে যে কী দুঃসময় তা কে বা বোঝে, কাকে বা বোঝাই! ঘাড় গলা উঁচু করে শুধু আকাশের দিকে তাকানো আর মেঘের অবয়ব আর চরিত্র নিয়ে গবেষণা। পশ্চিমের মেঘ যে অমোঘ হয় এই মর্ন্তুদ সত্য চার আনার সবুজ গ্যালারিতে বসেই প্রথম উপলব্ধি করেছি। ফটিকজল পাখি আছে শুনেছি, এখন দেখলাম ফটিকরোদ পাখি। যারা জল চায় না রোদ চায়, মেঘের বদলে মরুস্থলীর জন্যে হা হা করে। হেঁকে বৃষ্টি আসবার ছড়া আছে, মেঘ-মারণমন্ত্রের প্রথম ছড়া সৃষ্টি হয় এই মোহনবাগানের মাঠে!

    ওরে মেঘ দূরে

    যা শিগগির উড়ে।

    নেবুর পাতা করমচা

    রকে বসে গরম চা!

    তবু, পাহাড় সরে তো মেঘ সরে না। ব্যঙ্গের ভঙ্গিমায় নেমে আসে বাস্তব বৃষ্টি। মনে হয় না ঘনকৃষ্ণ কেশ আকুলিত করে কেউ কোনো নীপবনে ধারাস্নান করছে। বরং মনে হচ্ছে দেশের মাথার উপর ঝরে পড়ছে দোর্দণ্ড অভিশাপ। আর যেমনি জল ঝরল অমনি মোহনবাগানের জৌলুস গেল ধুয়ে। আশ্চর্য, তখন তাতে না রইল আর বাগান, না বা রইল মোহ। তখন তার নাম গোয়াবাগান বা বাদুড়বাগান রাখলেও কোন ক্ষতি নেই।

    তবু কালে-ভদ্রে এমন একেকটা রোমহর্ষক খেলা সে জিতে ফেলে যে তার উপর আবার মায়া পড়ে, মন বসে। বারেবারে প্রতিজ্ঞা করে মাঠ থেকে বেরিয়েছি ও-হতচ্ছাড়ার খেলা আর দেখব না, আবার বারেবারেই প্রতিজ্ঞা-ভঙ্গ হয়েছে। তাই তেরোশো তিরিশের হারের পরও যে আবার মাঠে যাব—কল্লোলের দল নিয়ে—তা আর বিচিত্র কি। ওরা খেলে না জিতুক, আমরা অন্তত চেঁচিয়ে জিতব। জিত আমাদের হবেই, হয় খেলায় নয় এই একত্রমেলায়।

    “কল্লোলে”র লাগোয়া পূবের বাড়িতে থাকত আমাদের সুধীনসুধীন্দ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়। আমাদের দলের সর্বকনিষ্ঠ তরুণ উৎসাহী। সুগৌর-সুন্দর চেহারা, সকলের স্নেহভাজন। দলপতি স্বয়ং দীনেশ। যৌবনের সেই যৌবরাজ্যে বয়সের কোনো ব্যবধান ছিল না, আর মোহনবাগানের খেলা এমন এক ব্যাপার যেখানে ছেলে-বুড়ো শ্বশুরজামাই সব একাকার, সকলের এক ক্ষুরে মাথা মোড়ানো। অতি উৎসাহে সামনে কারু পিঠে হয়তো চাপড় দিয়েছি, ভদ্রলোক ঘড় ফেরাতেই চেয়ে দেখি পূজ্যপাদ প্রফেসর। উপায় নেই, সব এখন এক সানকির ইয়ার মশাই, এক গ্যালারির গায়েক-গায়েন। আরো একটু টানুন কথাটা, এক সুখদুঃখের সমাংশভাগী! তাই, ঐ দেখুন খেলা, বেশিক্ষণ ঘাড় ফিরিয়ে চোখ গোল করে পেছনে তাকিয়ে থাকার কোন মানে হয় না। বলা বাহুল্য, উত্তেজনার তরলে ঐ সব ছোটখাট রাগ-দুঃখের কথা ভুলে যেতে হয়, আর দর্শকদের বহু জন্মের সুকৃতির ফলে মোহনবাগান যদি একবার গোল দেয়, তখন সেই পূজ্যপাদ প্রফেসরও হাত-পা ছুড়ে চীৎকার করেন আর ছাত্রের গলা ধরে আনন্দ-মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খান। সব আবার এক খেয়ার জল হয়ে যায়।

    বস্তুত আট আনার লোহার চেয়ারে বসে কি করে যে ভদ্রলোক সেজে ফুটবল খেলা দেখা চলে তা আমরা কল্পনাও করতে পারতাম না। এ কি ক্রিকেট খেলা, যে পাঁচ ওভার ঠুকঠাক করবার পর খুঁচ করে একটা ‘গ্লান্স’ হবে, না, সাঁ করে একটা ‘ড্রাইভ’ হবে। এর প্রতিটি মুহূর্ত উদ্বেগে উত্তেজনায় ঠাসা, বল এখন বিপক্ষের গোলের কাছে, পলক না পড়তেই আবার নিজের নিজের হৃৎপিণ্ডের দুয়ারে। সাধ্য কি তুমি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকতে পার। এই, সেণ্টার কর, ওকে পাশ দে, ঐখানে থ্রু মার্—এমনি বহু নির্দেশ-উপদেশ দিতে হবে তোমাকে। শুধু তাই? কখনো কখনো শাসন-তিরস্কারও করতে হবে বৈ কি। খেলতে পারিস না তো নেমেছিস কেন, ল্যাকপ্যাক করছিস যে মাল খেয়ে নেমেছিস নাকি, বুক দিয়ে পড় গোলের কাছে, পা দু’খানা যায় তো সোনা দিয়ে মিউজিয়মে বাঁধিয়ে রাখব। তারপর কেউ যদি গোল ‘মিস’ করে, তখন আবার উল্লম্ফন : বেরিয়ে যা, বেরিয়ে যা মাঠ থেকে, গিন্নির আঁচল ধরে থাক গে। আর যদি রেফারি একটা অমনোমত রায় দেয় অমনি আবার উচ্চঘোষ : মারো, মারো শালাকে, থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দাও। এ সব মহৎ উত্তেজনা গ্যালারি ছাড়া আর কোথায় হওয়া সম্ভব? উঠে দাঁড়াতে না পারলে উল্লাস উল্লোল হওয়া যায় কি করে? তাই গ্যালারিতেই আমাদের কায়েমী আসন ছিল, মাঝ-মাঠে সেণ্টারের কাছাকাছি, পাঁচ কি ছয় ধাপ উপরে। প্রায়ই আমরা এক সঙ্গে যেতাম কল্লোল-আপিস থেকে—দীনেশদা, সোমনাথ, গোরা, নৃপেন, প্রেমেন, সুধীন আর আমি— কোনো কোনো দিন আশু ঘোষ সঙ্গে জুটত। আরো কিছু পরে অবোধ সান্যাল। অবিশ্যি যে সব দিন এগারোটা-বারোটায় এসে লাইন ধরতে হত সে সব দিন মাঠের বাইরে আগে থেকে সবাই একত্র হওয়া যেত না, কিন্তু মাঠে একবার ঢুকতে পেরেছ কি নিশ্চিন্ত আছ তোমার নির্ধারিত জায়গা আছে। নজরুল আরো পরে ঢোকে খেলার মাঠে এবং তখনো সে বেশ সন্ত্রান্ত ও খ্যাতিচিহ্নিত। তাই সে জনগণের গ্যালারিতে না এসে বসেছে গিয়ে আট আনার চেয়ারে, কিন্তু তার উল্লাস-উড্ডীন রঙিন উত্তরীয়টি ঠিক আছে। অবিশ্যি চাদর গায়ে দিয়ে খেলার মাঠে আসতে হলে অমনি উচ্চতর পদেই আসা উচিত। আমাদের তো জামা ফর্দা-ফাঁই আর জুতো চিচিংফাঁক। বৃষ্টি নেই এক বিন্দু, অথচ তিন ঘণ্টা ধস্তাধস্তি করে মাঠে ঢুকে দেখি এক হাঁটু কাদা। ব্যাপার কি? শুনলাম জনগণের মাথার ঘাম পায়ে পড়ে-পড়ে ভূমিতল কাদা হয়ে গেছে। সঙ্গে না আছে ছাতা না বা ওয়াটারপ্রুফ—শুধু এক চশমা সামলাতেই প্রাণান্ত। কনুয়ের ঠেলায় কত লোকের চশমা যে নাসিকাচ্যুত হয়েছে তার ইতি-অন্ত নেই। আর চক্ষুলজ্জাহীন চশমাই যদি চলে যায় তবে আর রইল কি? কখনো-কখনো ভূমিপৃষ্ঠ থেকে পাদস্পর্শ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, জলে ভাসা জানি, এ দেখছি স্থলে ভাসা। নগ্ন পদের খেলা দেখতে রিক্ত হাতে শূন্য মাথায় কখনো ব নগ্ন পদেই মাঠে ঢুকেছি।

    শুধু গোকুলকেই দেখিনি মাঠে, তার কারণ “কল্লোলে”র দ্বিতীয় বছরেই তার অসুখ করে আর সে-অসুখ আর তার সারে না। কিন্তু যতদুর মনে পড়ে শৈলজা একদিন গিয়েছিল আর চুপি-চুপি জিগগেস করেছিল, ‘গোষ্ঠ পাল কোন জন?’ আরো পরে, বুদ্ধদেব বসুকে একদিন নিয়ে গিয়েছিলাম, সে বলেছিল, ‘কর্নার আবার কাকে বলে?’ শুনেছি ওরা আর দ্বিতীয় দিন মাঠে যায়নি।

    তবু তো এখন কিউ হয়েছে, আগে-আগে ঘোড়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে ঢুকতে হয়েছে, মাঝদিকে গুণ্ডার কাছ থেকে বেশি দরে টিকিট কিনে। আগে-আগে গ্যালারির বাইরে কাঁটা-তারের বন্ধন ছিল না, বাইরের কত লোককে যে কত জনে টেনে তুলেছে ভিতর থেকে তার লেখাজোখা নেই। যাকে টেনে তুলছে সে যে সব সময়ে পরিচিত বা আত্মীয়বন্ধু তার কোনো মানে নেই, দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে তাও বলা যায় না, তবু নিঃস্বার্থভাবে পরোপকার করা—এই একটা নিষ্কাম আনন্দ ছিল। এখন কাঁটাতারের বড় কড়াকড়ি, এখন কিউর লাইন এসে দাঁড়ায় হল-য়্যাণ্ড-য়্যাণ্ডার্সন পর্যন্ত, খেলা দেখায় আর সেই পৌরুষ কই।

    নরক গুলজার করে খেলা দেখতাম সবাই। উল্লাসজ্ঞাপনের যত রকম রীতিপদ্ধতি আছে সব মেনে চলতাম। এমন কি পাশের লোকের হাত থেকে কেড়ে ছাতা ওড়ানো পর্যন্ত। বৃষ্টি যদি নামত তো চেঁচিয়ে উঠতাম সবার সঙ্গে : ছাতা বন্ধ, ছাতা বন্ধ। ঘাড় সোজা রেখে ভিজতাম। শেষকালে যখন চশমার কাচ মুছবার জন্যে আর কোনো কাপড় থাকত না তখনই বাধ্য হয়ে কারু ছাতার আশ্রয়ে বসে পড়তে হত। খেলা যদি দেখতে চাও তো বসে থাকো ভিজে বেরাল হয়ে। মনে আছে এমনি এক বর্ষার মাঠে হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে এক ছাতার তলায় গুড়ি মেরে বসেছিলাম সারাক্ষণ। বৃষ্টির জলের চেয়ে পার্শ্ববর্তী ছাতার জলই যে বেশি বিরক্তিকর মর্মে মর্মে বুঝেছিলাম সেদিন।

    কিন্তু যদি আকাশভরা সোনার রোদ থাকে, মাঠ শুকনো খটখটে, তবে সব কষ্ট সহ্য করবার দায়ধারী আছি। আর সে গগনদাহন গ্রীষ্মের কষ্টই কি কম! তারপর যদি দুপুর থেকে বসে থেকে মাথার রোদ ক্রমে-ক্রমে মুখের উপর তুলে আনতে হয়। কিন্তু, খবরদার, ভুলেও জল চেও না, জল চাইতে না মেঘ এসে উদয় হয়! যা দেবী সর্বভূতেষু তৃষ্ণারূপেন সংস্থিতা তার ধ্যান কর। বরফের টুকরো বা কাটা শশা। বা বাতাবিনেবু না জোটে তো শুকনো চীনেবাদাম খাও। আর যদি ইচ্ছে করো আলগোছে কারো শূন্য পকেটে শুকনো খোসাগুলো চালান করে দিয়ে বকধার্মিক সাজো।

    যেমনি দুই দিক থেকে দুই দল শূন্যে বল হাই কিক মেরে মাঠে নামল অমনি এক ইঙ্গিতে সবাই উঠে দাঁড়াল গ্যালারিতে। এই গ্যালারিতে উঠে দাঁড়ানো নিয়ে বন্ধুবর শচীন করকে একবার কোন সাপ্তাহিকে আক্ষেপ করতে দেখেছিলাম। যতদূর মনে পড়ে তার বক্তব্য ছিল এই, যে, গ্যালারিতে যে যার জায়গাই বসেই তো দিব্যি খেলা দেখা যায়, তবে মিছিমিছি কেন উঠে দাঁড়ানো? শুধু যে যোগ্য উত্তেজনা দেখানোর তাগিদেই উঠে দাঁড়াতে হচ্ছে তা নয়, উঠে দাঁড়াতে হচ্ছে আট আনার চেয়ার ও চার আনার গ্যালারির মধ্যেকার জায়গায় লোক দাঁড়িয়েছে বলে। বাধ্য হয়েই তাই গ্যালারির প্রথম ধাপের লোককে দাঁড়াতে হচ্ছে এবং তার ফলে একে-একে অন্যান্য ধাপ। তাছাড়া বসে বসে বড় জোর হাততালি দেওয়ার মত খেলা তো এ নয়। উঠে দাঁড়াতেই হবে তোমাকে, অন্তত মোহনবাগান যখন গোল দিয়েছে। কখনো-কখনো সে চীৎকার নাকি বালি থেকে বালিগঞ্জ পর্যন্ত শোনা গেছে। সে চীৎকার কি বসে-বসে হয়?

    তবু এত করেও কি প্রত্যেক খরার দিনেই জেতাতে পেরেছি মোহনবাগানকে? একেবারে ঠিক চূড়ান্ত মুহূর্তে অত্যন্ত অনাবশ্যক ভাবে হেরে গিয়েছে দুর্বলতর দলের কাছে। কুমোরটুলি এরিয়ান্স হাওড়া ইউনিয়নের কাছে। ঠিক পারের কাছে নিয়ে এসে বানচাল করে দিয়েছে নৌকো। সে সব দুর্দৈবের কথা ভাবতে আজো নিজের জন্যে দুঃখ হয়—সেই ঝেড়ো কাক হয়ে ম্লান মুখে বাড়ি ফিরে যাওয়া। চলায় শক্তি নেই, রেস্তরাঁয় ভক্তি নেই—এত সাধের চীনেবাদামে পর্যন্ত স্বাদ পাচ্ছি না—সে কি শোচনীয় অবস্থা! ওয়ালফোর্ডের ছাদ-খোলা দোতলা বাস-এ সান্ধ্যভ্রমণ তখন একটা বিলাসিতা, তাতে পর্যন্ত মন ওঠে না, ইচ্ছে করে ট্রামের সেকেণ্ড ক্লাশে উঠে মুখ লুকোই। কে একজন যে মোহনবাগানের হেরে যাওয়ায় আত্মহত্যা করেছিল তার মর্মবেদনাটা যেন কতক বুঝতে পারি। তখনই প্রতিজ্ঞা করি আর যাব না ঐ অভাগ্যের এলাকায়। কিন্তু হঠাৎ আবার কোন সুদিনে সমস্ত সংকল্প পিটটান দেয়। আবার একদিন পাঞ্জাবির ঘড়ির পকেটে গুনে-গুনে পয়সা গুঁজি। বুঝতে পারি মোহনবাগান যত না টানে, টানে সেন্টারের কাছাকাছি সেই কল্লোলের দল।

    আচ্ছা, এরিয়ান্স হাওড়া ইউনিয়ন—এরাও তো দিশি টিম, তবে এরা জিতলে খুশি হই না কেন, কেন মনে-মনে আশা করি এরা মোহনবাগানকে ভালবেসে গোল ছেড়ে দেবে, আর গোল ছেড়ে না দিলে কেন চটে যাই? যখন এরা সাহেব টিমের সঙ্গে খেলছে তখন অবিশ্যি আছি আমরা এদের পিছনে, কিন্তু মোহনবাগানের সঙ্গে খেলতে এসেছ কি খবরদার, জিততে পাবে না, লক্ষ্মী ছেলের মত লাড্ডু খেয়ে বাড়ি ফিরে যাও। মোহনবাগানের ঐতিহ্যকে নষ্ট কোনো না যেন।

    রোজ-বোজ খেলা দেখার ভিড় ঠেলার চেয়ে মোহনবাগানের মেম্বর হয়ে যাওয়া মন্দ কি। কিন্তু মেম্বর হয়েও যে কি দুর্ভোগ হতে পারে তারও দৃষ্টান্ত দেখলাম। একদিন কি একটা খবরের কাগজের স্তম্ভকাপানো বিখ্যাত খেলায় দেখতে পেলাম তিন-চারজন মেম্বর মাঠে না ঢুকে বাইরে বসে সিগারেট ফুঁকছে, তাদের ঘিরে ছোট্ট একটি ভিড়। বিশ্বসাতীত ব্যাপার—ভিতরে ঐ চিত্ত-চমকানো খেলা, আকাশঝলসানো চীৎকার—অথচ এ কয়জন জাঁদরেল মেম্বর বাইরে ঘাসের উপর বসে নির্লিপ্ত মুখে সিগারেট খাচ্ছে আর মন্দ মন্দ পা দোলাচ্ছে। ভিড়ের থেকে একজন এগিয়ে গিয়ে বিস্মিত স্বরে জিগগেস করলে, ‘এ কি, আপনারা মাঠে ঢোকেন নি যে?’ ভদ্রলোকের মধ্যে একজন বললে: ‘আমরা তো কেউ মাঠে ঢুকি না, বাইরেই বসে থাকি চিরদিন। আমরা non-seeing মেম্বর।’ তার মানে? তার মানে, আমরা অপয়া, অনামুখো, অলক্ষুণে, আমরা মাঠে ঢুকলেই মোহনবাগান নির্ঘাৎ হেরে যায়, মেম্বর হয়েও আমরা তাই খেলা দেখি না, বাইরে বসে যাতে ঘাস কাটি আর চীৎকার শুনি।

    এই অপূর্ব স্বার্থশূন্যতার কথা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার যোগ্য। বাড়িতে বা অন্য কোথাও গেলে বা বসে থাকলে চলবে না, খেলার মাঠে আসতে হবে ঠিক, আর খেলার মাঠে অনায়াসে ঢোকবার হকদার হয়েও ঢুকবে না কিছুতেই, বাইরে বসে থাকবে এককোণে—এমন আত্মত্যাগের কথা এ যুগের ইতিহাসে বড় বেশি শোনা যায়নি। আরো একটা উদাহরণ দেখেছি স্বচক্ষে একটি খঞ্জ ভদ্রলোকের মাধ্যমে। কি হল, পা গেল কি করে? গাড়ি-চাপা? ভদ্রলোক কঠিন মুখে করুণ ভাবে হাসলেন। বললেন, ‘না। ফুটবল-চাপা।’ সে কি কথা? আর কথা নয়, কাজ ঠিক আদায় করে নিয়েছেন ষোল আনা। শুধু আপনাকে বলছি না, দেশের লোককে বলছি। সবাই বলেছিলেন ফুটবল মাঠে পা-খানা রেখে আসতে, আপনাদের কথা শুনে তাই রেখে এসেছি। কই এখন সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে রাখবেন না যাদুঘরে?

  • এগার

    এগার

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    এগার

    ফুটবল খেলার মাঠে দু’জন সাহিত্যিককে আমরা আবিষ্কার করি। শিবরাম চক্রবর্তী সেন্টারের কাছে গ্যালারির প্রথম ধাপে দাঁড়াত—তাকে টেনে আনতে দেরি হত না আমাদের দশচক্রে। গোলগাল নধরকান্তি চেহারা, লম্বা চুল পিছনের দিকে ওলটানো। সমস্তটা উপস্থিতি রসে-হাস্যে সমুজ্জল। তার মধ্যে শ্লেষ আছে কিন্তু দ্বেষ নেই—সে সরসতা সরলতারই অন্য নাম। “ভারতী”তে অদ্ভুত কত গুলো ছোট গল্প লিখে অস্বাভাবিক খ্যাতি অর্জন করেছে, আর তার কবিতাও স্পষ্টস্পর্শ প্রেমের কবিতা—আর সে-প্রেম একটু জ্বর হলেও জল-বার্লি-খাওয়া প্রেম নয়। শিবরামের সত্যিকারের আবির্ভাব হয় তার একান্ত নাটিকায়—“যেদিন তারা কথা বলবে” আজকালকার গণসাহিত্যের নির্ভুল পূর্বগামী। সেই স্তব্ধতার দেশে বেশি দিন না থেকে শিবরাম চলে এল উজ্জ্বল-উচ্ছল মুখরতার দেশে। কলহাস্যের মুখরতা। শিবরাম হাসির গল্পে কায়েমী বাসা বাঁধলে। বাসা যেমন পাকা, স্বত্ব তেমনি উঁচুদরের।

    হাসির প্রাণবন্ত প্রস্রবণ এই শিবরাম। সব চেয়ে সুন্দর, সবাইকে যখন সে হাসায় তখন সেই সঙ্গে সঙ্গে নিজেও সে হাসে এবং সবাই চেয়ে বেশি হাসে। আর, হাসলে তাকে অত্যন্ত সুন্দর দেখায়। গালে কমনীয় টোল পড়ে কিনা জানি না, কিন্তু তার মন যে কী অগাধ নির্মল, তার পরিচ্ছন্ন ছায়া তার মুখের উপর ভেসে ওঠে। পরকে নিয়ে হয়ত হাসছে তবু সর্বক্ষণ সেই পরের উপর তার পরম মমতা! শিবরামের কোন দল নেই দ্বন্ধও নেই। তার হাসির হাওয়া জন্যে প্রত্যেকের হৃদয়ে উন্মুক্ত নিমন্ত্রণ। শিবরামই বোধ হয় একমাত্র লোক যে লেখক হয়েও অন্যের লেখার অবিমিশ্র প্রশংসা করতে পারে। আর সে-প্রশংসায় এতটুকু ফাঁক বা ফাঁকি রাখে না। আজকালকার দিনে লেখক, লেখক হিসেবে যত না হোক, সমালোচক হিসেবে বেশি বুদ্ধিমান। তাই অন্য লেখককে পরিপূর্ণ প্রশংসা করতে তার মন ছোট হয়ে আসে। হয়ত ভাবে, অন্যকে প্রশংসা করলে নিজেই ছোট হয়ে গেলাম। আর যদি বা প্রশংসা করতে হয় এমন কটা ‘কিন্তু’ আর ‘যদি’ এনে ঢোকাতে হবে যাতে বোঝা যাবে লেখক হিসাবে তুমি বড় হলেও বোদ্ধা হিসেবে আমি আরো বড়। মানে প্রশংসা করতে হলে শেষ পর্যন্ত আমিই যেন জিতি, পাঠকেরা আমাকেই যেন প্রশংসা করে। বুদ্ধির সঙ্গে এমন সংকীর্ণ আপোষ নেই শিবরামের। যদি কোনো লেখা তার মনে ধরে সে মন মাতিয়ে প্রশংসা করবে। আর প্রশংসা করবে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, নিজের জন্যে এতটুকু সুখ-সুবিধে না রেখে। এই প্রশংসায় তার নিজের বাজার উঠে গেল কিনা তার দিকে না তাকিয়ে। যতদূর দেখেছি, শিবরামই তাদের মধ্যে এক নম্বর, যারা লেখক হয়েও অন্য লোকের লেখা পড়ে, ঠিকঠাক মনে রাখে ও গায়ে পড়ে ভালো লেখার সুখ্যাতি করে বেঁড়ায়।

    কিন্তু এক বিষয়ে সে নিদারুণ গম্ভীর। অন্তত সে-সব দিনে থাকত। হাইকোর্টের আদিম বিভাগে কি এক মহাকায় মোকদ্দমা হচ্ছে তার ফলাফল নিয়ে। অবিশ্যি অফল নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই, কেননা অফলে যেমনটি আছে তেমনটিই থাকবে—মুক্তারামবাবুর স্টিটে মেসে সেই ‘তক্তারামে’ শোওয়া আর ‘শুক্তারাম ভক্ষণ—এ তার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। কিন্তু ফল হলেই বিপদ। তখন নাকি অর্ধেক বা আর সেই সঙ্গে আস্ত একটি অর্ধাঙ্গিনী জুটে যাবার ভয়। মোকদ্দমায় যে ফল হয়নি তা শিবরামকে দেখলেই বোঝা যায়। কেননা এখনো সে ঐ একই আছে, দেড় হয়নি; আর মুক্তির আরামে আছেও সেই মুক্তারামবাবুর মেসে। সারাজীবনে যে একবারও বাসা বদল করে না সে নিঃসন্দেহ খাঁটি লোক।

    মাঠে ফুটবল খেলা হচ্ছে, আর শিবরামের মুখে চলেছে শব্দের খেলা। কুমার হয়তো একটা ভুল পাশ দিলে, অমনি বলে উঠল ‘কু-মার’; কিংবা গোষ্ঠর সঙ্গে প্রবল ধাক্কা লেগে ছিটকে পড়ল বিপদের খেলোয়াড়, অমনি বলে উঠল : ‘এ বাবা, শুধু গোষ্ঠ নয়—গোস্ত’। মাঠের বাইরেও এমনি খেলা চালাত অবিরাম। জুৎসই একটা নাম পেলেই হল—শত্রু-মিত্র আসে যায় না কিছু। নিজের নামের মধ্যে কি মজার pun রয়েছে শুধু সেই সম্বন্ধেই উদাসীন।

    আরেক আবিষ্কার আমাদের বিশুদা-বিশ্বপতি চৌধুরী। একখানা বই লিখে যে বাংলা সাহিত্যে জায়গা করে নিয়েছে। ‘ঘরের ডাক’-এর কথা বলছি—খেলার মাঠেও তার সেই ঘরের ডাক, হৃদয়ের ডাক। সহজেই আমাদের দলের মধ্যে এসে দাঁড়াত আর হাসাত অসম্ভব উচ্চ গ্রামে। হাত অথচ নিজে এতটুকু হাসত না—মুখ-চোখ নিদারুণ নিলিপ্ত ও গম্ভীর করে রাখত। সমস্ত হাসির মধ্যে বিশুদার সেই গাম্ভীর্যটাই সব চেয়ে বেশি হাস্যোদ্দীপক। শিবরাম শুধু বক্তা, কিন্তু বিশুদা অভিনেতা। শিবরামের গল্প বাস্তব কিন্তু বিশুদার গল্প একদম বানানো। অথচ, এ যে বানানো তা তার চেহারা দেখে কারু সন্দেহ করার সাধ্য নেই। বরং মনে হবে, এ যেন সদ্য-সদ্য ঘটেছে আর বিশুদা স্বয়ং প্রত্যক্ষদর্শী। এমন নিষ্ঠুর ও নিখুঁত তার গাম্ভীর্য। উদ্দাম কল্পনার এমন মৌলিক গল্প রচনার মধ্যেও বাহাদুরি আছে। আর সব চেযে কেরামতি হচ্ছে, সে-গল্প বলতে গিয়ে নিজে এতটুকু না-হাসা। মনে হয়, এ যেন মোহনবাগান গোল দেবার পর গো–ল না-বলা। শুনলে হয়তো সবাই আশ্চর্য হবে, মোহনবাগান গোল দেয়ার পরেও বিশুদা গম্ভীর থেকেছে।

    তার গাম্ভীর্যটাই কত বড় হাসির ব্যাপার, একদিনের একটা ঘটনা স্পষ্ট মনে আছে। খেলার শেষে মাঠ পেরিয়ে বাড়ি ফিরছি, সঙ্গে বিশুদা। সেদিন মোহনবাগান হেরে গেছে যেন কার সঙ্গে, সকলের মন-মেজাজ অত্যন্ত কুৎসিত। বিশুদা যেমন-কে-তেমন গম্ভীর। কতদূর এগোতেই সামনে দেখি কতকগুলো ছোকরা দুই দলে ভিন্ন হয়ে গিয়ে একে-অন্যকে নৃশংসভাবে গালাগাল করছে। আর এমন সে গালাগাল যে কালাকাল মানছে না। তার মানে, একাল নিয়ে তত নয়, যত পূর্বপুরুষদের কাল নিয়ে তাদের মতান্তর। প্রথম দলের দিকে এগিয়ে গেল বিশুদা। স্বাভাবিক শান্ত গলায় বললে, ‘কি বাবা, গালাগাল দিচ্ছ কেন?’ বলেই বলা-কওয়া নেই কতকগুলি চান্ত গালাগাল বিশুদা তাদের লক্ষ্য করে ছুড়ে মারল। তারা একদম ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল—কে এই লোক! পরমুহূর্তেই অপর দলকে লক্ষ্য করে বিশুদা বললে, ‘সব ভদ্রলোকের ছেলে তোমরা, গালাগাল করবে কেন?’ বলেই ওদের দিকে কতকগুলো গালাগাল ঝাড়লে। প্রথম দল তেড়ে এল বিশুদার দিকে : ‘আপনি কে মশাই আমাদের গালাগাল দেন?’ দ্বিতীয় দলও মারমুখো : ‘আপনি গালাগাল করবার কে? আপনাকে কি আমরা চিনি, না, দেখেছি?’ দেখতে দেখতে দু দল একত্র হয়ে বিশুদাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হল। বিশুদার গম্ভীর মুখে দুষ্টু একটু হাসি। করজোড় করে বললে, ‘বাবারা, আর কেন? যে ভাবেই হোক, দু দলকে মিলিয়ে দিয়েছি তো! যাও বাবারা বাড়ি যাও। এমনি একত্র হয়ে থাক—মাঠের খেলায় দেশের খেলায় সব খেলায় জিততে পারবে। আমার শুধু মিলিয়ে দেওয়া কথা। নইলে, আমি কেউ না।’

    ছেলে দল শুদ্ধু হেসে উঠল। বিশুদার ধোপে কোথাও যায় এতটুকু ঝগড়াঝাটি রইল না।

    বিশ্বপতি আর শিবরাম “কল্লোলে” হয়তো কোনোদিন লেখেনি কিন্তু দু জনেই “কল্লোলে”র বন্ধু ছিল নিঃসংশয়। মনোভঙ্গির দিক থেকে শিবরাম তো বিশেষ সমগোত্র। কিন্তু এমন একজন লোক আছে যে আপাতদৃশ্যে “কল্লোলে”র প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও প্রকৃতপক্ষে “কল্লোলে”র স্বজনসুহৃদ। সে কাশীর সুরেশ চক্রবর্তী—“উত্তরা”র উত্তরসাধক।

    আমরা তার নাম রেখেছিলাম ‘চটপটি’। ছোটখাটো মানুষটি, মুখে অনর্গল কথা, যেন তপ্ত খোলায় চড়বড় করে খই ফুটছে—একদণ্ড এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে নারাজ, হাতে-পায়ে অসামান্য কাজকে সংক্ষিপ্ত করার অসম্ভব ক্ষিপ্রতা। এক কথায় অদম্য কর্মশক্তির অন্য প্রতিমান। একদিন “কল্লোলে”র কনওয়ালিশ স্ট্রিটের দোকানে এসে উপস্থিত—সেই সর্বত্রগামী পবিত্রর সঙ্গে। কি ব্যাপার? প্রবাসী বাঙালিদের তরফ থেকে দুর লক্ষ্ণৌ থেকে মাসিকপত্রিকা বের করা হয়েছে—চাই “কল্লোলে”র সহযোগ। সম্পাদক কে? সম্পাদক লক্ষৌর সার্থকনামা ব্যারিস্টার—এ পি সেন—মানে, অতুলপ্রসাদ সেন আর প্রথিতযশা প্রফেসর রাধাকমল মুখোপাধ্যায়। তবে তো এ মশাই প্রৌঢ়পন্থী কাগজ, এর সঙ্গে আমাদের মিশ খাবে কি করে? আমরা যে আধুনিক, অমল হোমের প্রশস্তি-অনুসারে “অতি-আধুনিক”। আমরা যে উগ্রজ্বলন্ত নবীন।

    কোনো দ্বিধা নেই। “উত্তরা” নিরুত্তর থাকবে না তোমাদের তারুণ্যের বাণীতে। যেমন আমি, সুরেশ চক্রবর্তী, ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের বন্ধুর ডাকে নিমেষেই সাড়া দিয়ে উঠেছি। কে তোমাদের পথ আটকাবে, কে মুখ ফিরিয়ে নেবে অস্বীকারে? আর যা আন্দাজ করেছ তা নয়। অতুলপ্রসাদ অবিশ্যি ভালোমানুষ, বাংলা সাহিত্যের হালচাল সম্বন্ধে বিশেষ ওয়াকিবহাল নন। মোটা আয়ের প্র্যাকটিস, তাই নিয়ে মেতে থাকেন। যখন এক-আধটু সময় পান, হালকা গান বাঁধেন। (হালকা মানে গড়ন-পিটনটা হালকা, কিন্তু সে গভীরসঞ্চারী। সে সোজা হৃদয়ের থেকে উঠেছে বলেই বোঝা যায় তার হৃদয়ও কত গভীর আর কত গাঢ়।) তিনি শুধু নাম দিয়েই খালাস। প্রবাসী বাঙালির উন্নতি চান, আর তার মতে উন্নতির প্রথম সোপানেই মাতৃভাষায় একখানি পত্রিকা দরকার। তাকে তোমরা বিশেষ ধোরো না। আর রাধাকমল? বয়সে তিনি প্রবীণ হলেও জেনে রাখো, তিনি সাহিত্য-প্রগতিতে বিশ্বাসী, নতুন লেখকদের সমর্থনে উদ্যতাস্ত্র। তাকে আপন লোক মনে কোরো। আর অত উচ্চদৃষ্টি কেন? সামনে এই বেঞ্চিতে যে সশরীরে বসে আছি আমি, তাকে দেখ। যে আসল কর্ণধার, যে মূলকারক।

    সুরেশ চক্রবর্তী কি করে এল সাহিত্যে, কবে কখন কি লিখল, বা আদৌ কিছু লিখেছে কিনা, প্রশ্ন করার কথাই কারু মনে হল না। সাহিত্যে তার আবির্ভাবটা এত স্বভাবসিদ্ধ। সাহিত্য তার প্রাণ, আর সাহিত্যিকরা তার প্রাণের প্রাণ। সব সাহিত্য আর সাহিত্যিকের খবর-অখবর তার নখদর্পণে। সে যে বিশেষ করে অতি-আধুনিকদের নিমন্ত্রণ করেছে এতেই তো প্রমাণ হচ্ছে তার উদার ও অগ্রসর সাহিত্যবুদ্ধির। যদিও কাশীতে সে থাকে, আসল কাশীবাস তো সৎসঙ্গে। আমাদের যখন ডাকছে, বললাম সুরেশকে, তার কাশীবাস এতদিনে সফল হল।

    ‘শেষকালে কাশীপ্রাপ্তি না ঘটে।’ আমাদের মধ্যে থেকে কে টিপ্পনি কাটলে।

    না, তেরোশ বত্রিশে যে “উত্তরা” বেরিয়েছিল তা এখনো টিকে আছে। “কল্লোলে-কালিকলম-প্রগতি” আর নেই, কিন্তু “উত্তরা” এখনো চলছে। এ শুধু একটা আশ্চর্য অনুষ্ঠান নয়, সুরেশ চক্রবর্তীই একটা আশ্চর্য প্রতিষ্ঠান। সাহিত্যের কত হাওয়া-বদল হল, কত উত্থান-পতন, কিন্তু সুরেশের নড়চড় নেই, বিচ্ছেদ-বিরাম নেই। ঝড়ের রাতেও নির্ভীক দীপস্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে উপেক্ষিত নিঃসঙ্গতায়।

    “উত্তরা”র দু’জন নিজস্ব লেখক ছিল; যদিও তারা মার্কামারা নন, মননে-চিন্তনে তারা তর্কাতীত আধুনিক, আর আধুনিক মানেই প্রগতিপন্থী। প্রগতি মানে প্রচলিত মতানুগত না হওয়া। দুজনেই পণ্ডিত, শিক্ষাদাতা; কিন্তু শুনতে যেমন জবড়জং শোনাচ্ছে, তাদের মনে ও কলমে কিন্তু একটুকুও জং ধরেনি। রূপালি রোদে ঝিলিক-মারা ইস্পাতের মত তাতে যেমন বুদ্ধির ধার তেমনি ভাবের জেল্লা। এক হচ্ছেন লক্ষ্ণৌর ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, আর হচ্ছেন কাশীর মহেন্দ্র রায়। একজন বাক্যকুশল, আরেকজন সুমিতাক্ষর। কিন্তু দুজনেই আসর-জমানো মজলিসী লোক—আধুনিকতার পৃষ্ঠপোষক। একে একে সবাই তাই ভিড়ে গেলাম সে-আসরে। নজরুল, জগদীশ গুপ্ত, শৈলজা, প্রেমেন, প্রবোধ, বুদ্ধদেব, অজিত। ঝকঝকে কাগজে ঝরঝরে ছাপা—“উত্তরা” সাজসজ্জায়ও উত্তমা। সবাইরই মন টানল।

    সব চেয়ে বড় ঘটনা, সাহিত্যের এই আধুনিকতা প্রথম প্রকাশ্য অভিনন্দন পায় এই প্রবাসী “উত্তরা”য়। সেই উদ্যোগ-উদ্ভবের গোড়াতেই। আর, স্বয়ং রাধাকমলের লেখনীতে। দুঃসাহসিক আন্তরিকতায় তার সমস্ত প্রবন্ধটা অত্যন্ত স্পষ্ট ও সত্য শোনাল। শুধু ভাবের নবীনতাই নয়, ভাষার সজীবতাকেও তিনি প্রশংসা করলেন। চারিদিকে হৈ-চৈ পড়ে গেল। আমরা মেতে উঠলাম আর আমাদের বিরুদ্ধ দল তেতে উঠল। যার শক্তি আছে তার শত্রুও আছে। শত্রুতাটা হচ্ছে শক্তিপূজার নৈবেদ্য। আমাদের নিন্দা করার মানেই হচ্ছে আমাদের বন্দনা করা।

    মোহিতলালকে আমরা আধুনিকতার পুরোধা মনে করতাম। এক কথায়, তিনিই ছিলেন আধুনিকোত্তম। মনে হয়, যজন-যাজনের পাঠ আমরা তার কাছে থেকেই প্রথম নিয়েছিলাম। আধুনিকতা যে অর্থে বলিষ্ঠতা, সত্যভাষিতা বা সংস্কারসাহিত্য তা আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম তার কবিতায়। তিনি জানতেন না আমরা তাঁর কবিতার কত বড় ভক্ত ছিলাম, তার কত কবিতার লাইন আমাদের মুখস্ত ছিল।

    “হে প্রাণ-সাগর! তোমাতে সকল প্রাণের নদী

    পেয়েছে বিরাম, পথের প্লাবন-বিরোধ রোধি’!

    হে মহামৌনি, গহন তোমার চেতনতলে

    মহাবুভুক্ষাবারণ তৃপ্তি-মন্ত্র জ্বলে!

    ধন্বন্তরি! মন্বন্তর-মন্থ-শেষ–

    তব করে হেরি অমৃতভাণ্ড-অবিদ্বেষ!”

    কিংবা

    “পাপ কোথা নাই—গাহিয়াছে ঋষি, অমৃতের সন্তান–

    গেয়েছিল আলো বায়ু নদীজল তরুলতা—মধুমান!

    প্রেম দিয়ে হেথা শোধন-করা যে কামনার সোমরস,

    সে রস বিরস হতে পারে কভু? হবে তার অপযশ?”

    ফুটপাতের উপর গ্যাসপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি যখন আমাদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কবিতা পড়িয়ে শোনাতেন তখন আবৃত্তির বিহ্বলতায় তার দুই চোখ বুজে যেত। আমরা কে শুনছি বা না শুনছি, বুঝছি বা না বুঝছি, এটা রাস্তা না বাড়ি, সে-সব সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ছিল, তিনি যে তদশতচিত্তে আবৃত্তি করতে পারছেন সেইটেই তার বড় কথা। কিন্তু যদি মুহূর্তমাত্র চোখ মেলে দেখতেন সামনে, দেখতে পেতেন আমাদের মুখে লেশমাত্র বিরক্তি নেই, বরং ভক্তির নম্রতায় সমস্ত মুখ-চোখ গদ্গদ হয়ে উঠেছে। স্থান ও সময়ের সীমাবোধ সম্বন্ধে তিনি কিঞ্চিৎ উদাসীন হলেও তার কবিতার চিত্তহারিতা সম্বন্ধে আমরা বিন্দুমাত্র সন্দিহান ছিলাম না।

    তিনি নিজেও সেটা বুঝতেন নিশ্চয়। তাই একদিন পরমপ্রত্যাশিতের মত এলেন আমাদের আস্তানায়, শোপেনহাওয়ার-এর উদ্দেশে লেখা তার বিখ্যাত কবিতা “পান্থ” সঙ্গে নিয়ে। সেই কবিতা “আধুনিকতায়” দেদীপ্যমান। “কল্লোলে” বেরিয়েছিল তেরোশ বত্রিশের ভাদ্র সংখ্যায়। আর এ কবিতা বের করতে পারে “কল্লোল” ছাড়া আর কোনো কাগজ তখন ছিল না বাংলাদেশে।

    “সুন্দরী সে প্রকৃতিরে জানি আমি—মিথ্যা সনাতনী!

    সত্যেরে চাহি না তবু, সুন্দরের করি আরাধনা–

    কটাক্ষ-ঈক্ষণ তার–হৃদয়ের বিশল্যকরণী।

    স্বপনের মণিহারে হেরি তার সীমন্ত-রচনা!

    নিপুণা নটিনী নাচে, অঙ্গে অঙ্গে অপূর্ব লাবণি!

    স্বর্ণপাত্রে সুধারস, না সে বিষ?—কে করে শোচনা!

    পান করি সুনির্ভয়ে, মুচকি হাসে যবে ললিত-লোচনা!

    জানিতে চাহি না আমি কামনার শেষ কোথা আছে,

    ব্যথায় বিবশ, তবু হোম কবি জ্বালি কামানল!–

    এ দেহ ইন্ধন তায়—সেই সুখ! নেত্রে মোর নাচে

    উলঙ্গিনী ছিন্নমস্তা! পাত্রে ঢালি লোহিত গরল!

    মৃত্যু ভৃত্যরূপে আসি ভয়ে-ভয়ে পরসাদ যাচে!

    মুহূর্তের মধু লুটি—ছিন্ন করি হৃদ্‌পদ্মদল!

    যামিনীর ডাকিনীরা তাই হেরি একসাথে হাসে খল-খল!

    চিনি বটে যৌবনের পুরোহিত প্ৰেম-দেবতারে,–

    নারীরূপা প্রকৃতিরে ভালোবেসে বক্ষে লই টানি;

    অনন্তরহস্যময়ী স্বপ্নসখী চির-অচেনারে

    মনে হয় চিনি যেন-এ বিশ্বের সেই ঠাকুরানী।

    নেত্র তার মৃত্যু-নীল।—অধরের হাসির বিথারে

    বিস্মরণী রশ্মিরাগ! কটিতলে জন্ম-রাজধানী।

    উরসের অগ্নিগিরি সৃষ্টির উত্তাপ-উৎস! জানি তাহা জানি।”

    অবিস্মরণীয় কবিতা। বাংলা সাহিত্যের অপূর্ব ঐশ্বর্য। তারপর তার “প্রেতপুরী” বেরোয় অগ্রহায়ণের “কল্লোলে”।

    “হেরি উরসের যুগ্ম যৌবনমঞ্জরী

    যে-অনল সর্ব-অঙ্গে শিরায় সঞ্চরি

    মৰ্ম্ম গ্রন্থি মোর

    দাহ করি গড়ে পুনঃ সোহাগের স্নেহ-হেম ডোর–

    সে-অনল পরশের আশে

    মোর মত দেখি তারা ঘুরে ঘুরে আশে তব পাশে।

    বিলোল কবরী আর নীবিবন্ধু মাঝে

    পেলব বঙ্কিম ঠাঁই যেথা যত রাজে–

    খুঁজিয়া লয়েছে তারা সর্ব-অগ্রে ব্যগ্র জনে-জনে,

    অতনুর তনু-তীর্থে–লাবণ্যের লীলা নিকেতনে।

    যত কিছু আদর-সোহাগ

    শেষ করে গেছে তার! মোর অনুরাগ,

    চুম্বন আশ্লেষ—সে যে তাহাদেরি পুরাতন রীতি,

    বহুকৃত প্রণয়ের হীন অনুকৃতি!…

    আজি এ নিশায়—

    মনে হয়, তারা সব রহিয়াছে ঘেরিয়া তোমায়!

    তোমার প্রণয়ী, মোর সতীর্থ যে তারা!

    যত কিছু পান করি রূপরসধারা–

    তারা পান করিয়াছে আগে।

    সর্বশেষ ভাগে

    তাদেরি প্রসাদ যেন ভুঞ্জিতেছি হায়!

    নাহি হেন ফুল-ফল কামনার কল্প-লতিকায়,

    যার পরে পড়ে নাই আর কারো দর্শনের দাগ,

    —আর কেহ হরে নাই যাহার পরাগ।

    ওগো কাম-বধূ!

    বল, বল, অনুচ্ছিষ্ট আছে আর এতটুকু মধু?

    রেখেছ কি আমার লাগিয়া সযতনে

    মনোমঞ্জুষায় তব পীরিতির অরূপরতনে?

    আমারো মিটেছে সাধ

    চিত্তে মোর নামিছে বহুজনতৃপ্তি-অবসাদ।

    তাই যবে চাই তোমাপানে–

    দেখি ওই অনাবৃত দেহের শ্মশানে।

    প্রতি ঠাঁই আছে কোনো কামনার সদ্য বলিদান!

    চুম্বনের চিতাভস্ম, অনজের অঙ্গার-নিশান!

    বাঁধিবারে যাই বাহুপাশে

    অমনি নয়নে মোর কত মৌনী ছায়ামূর্তি ভাসে।

    দিকে দিকে প্রেতের প্রহরা!

    ওগো নারী, অনিন্দিত কান্তি তব!–মরি মরি রূপের পসরা!

    তবু মনে হয়

    ও সুন্দর স্বর্গখানি প্রেতের আলয়!

    কামনা-অঙ্কুশ-ঘাতে যেই পুনঃ হইনু বিকল

    অমনি বাহুতে কারা পরায় শিকল!

    তীব্র সুখ-শিহরণে ফুকারিয়া উঠি যবে মৃদু আর্তনাদে–

    নীরব নিশীথে কারা হাহারে উচ্চকণ্ঠে কাঁদে।

    মোহিতলালও এলেন “উত্তরা”য়—এলেন আমাদের পুনরাবর্তী হয়ে। “কল্লোলে”র সঙ্গে সঙ্গে “উত্তরা”ও সরগরম হয়ে উঠল। কিন্তু কত দিন যেতে-না-যেতে কেমন বৈসুর ধরল বাজনায়! মতে বা মনে কোন অমিল নেই, তবু কেন কে জানে, মোহিতলাল বেঁকে দাঁড়ালেন—কল্লোলের দলের যে সব লেখক তোমার কাগজে লেখে তাদের সংশ্রব যদি না ত্যাগ করো তবে আমি আর “উত্তরা”য় লিখব না! সুরেশ মেনে নিতে চাইল না এ শর্ত। ফলে, মোহিতলাল বর্জন করলেন “উত্তরা”। সুরেশ আরো দুর্দম হয়ে উঠল। এত প্রাখর্য যেন সইল না অতুলপ্রসাদের। তিনি সরে দাঁড়ালেন। তবু সুরেশ অবিচ্যুত। রাধাকমল আছেন, যিনি “সাহিত্যে অশ্লীলতা” নামক প্রবন্ধে রায় দিয়েছেন আধুনিকতার স্বপক্ষে। কিন্তু অবশেষে রাধাকমলও বিযুক্ত হলেন। সুরেশ, একা পড়ল। তবু সে দমল না, পিছু হটল না। প্রতিজ্ঞার পতাকা খাড়া করে রাখল।

    তবু, কেন জানি না, “কল্লোলের” সঙ্গে শুধু “কালি-কলমের” নামটাই লোকে জুড়ে দেয়—“উত্তরা”র কথা দিব্যি ভুলে থাকে। এ বোধ হয় শুধু অনুপ্রাসের খাতিরে। নইলে, একই লেখকদল এই তিন কাগজে সমানে লিখেছে—সমান স্বাধীনতায়। “কালি-কলমের” মত “উত্তরা”ও এই আধুনিক ভাবের তন্ত্রধারক ছিল। বরং “কালি-কলমের” আগে আবির্ভাব হয়েছিল “উত্তরা”র। “কালি-কলমের” জন্মের পিছনে হয়তো খানিকটা বিক্ষোভ ছিল, কিন্তু “উত্তরা”য় শুধু সৃজন-সুখের মহোল্লাস। “কল্লোল”–“কালি-কলমে”র বহু অসম্পূর্ণ কাজ “উত্তরা” করে দিয়েছে। যেমন আরো বহু পরে করেছে “পূর্বাশা”।

    নিজে লেখেনি, অকণ্টক সূযোগ থাকলেও কোনদিন প্রতিষ্ঠা করতে চায়নি নিজের সাহিত্যিক অহমিকা, অবিচল নিষ্ঠায় সাহিত্যের ব্রতোদ্‌যাপন করেছে, প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে শুধু সাহিত্যিকের সুকীর্তি। এ চিরসংগ্রামশীল দুর্জয় ব্যক্তিত্বকে কি বলে অভিহিত করব? সুরেশকে নিশ্চয় সাহিত্যিক বলব না, বলব সাহিত্যের শক্তিদীপ্ত ভাস্কর। রূপদক্ষ কারুকার।

    মোহিতলালের মত যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তও আমাদের আরাধনীর ছিলেন—ভাবের আধুনিকতার দিক থেকে যতীন্দ্রনাথের দুঃখবাদ বাংলাসাহিত্যে এক অভিনব অভিমত। আমারে তদানীন্তন মনোভাবের সঙ্গে চমৎকার মিলে গিয়েছিল। দুঃখের মধ্যে কাব্যের যে বিলাস আছে সেই বিলাসে আমরা মশগুল ছিলাম। তাই নৈরাশ্যের দিনে ক্ষণে-ক্ষণে আবৃত্তি করতাম ‘মরীচিকা’। এমনি টুকরো-টুকরো লাইন :

    “চেরাপুঞ্জির থেকে

    একখানি মেঘ ধার দিতে পার গোবি-সাহারার বুকে?”

    “তুমি শালগ্রাম শিলা

    শোয়া-বসা যার সকলি সমান, তারে নিয়ে রাসলীলা!”

    “মরণে কে হবে সাথী,

    প্রেম ও ধর্ম জাগিতে পারে না বারোটার বেশী রাতি!”

    “মিছে দিন যায় বয়ে

    উপরে ও নীচে ঘুমের তুলসী—এই শালগ্রাম হয়ে।”

    “চারিদিক দেখে চারিদিক ঠেকে বুঝিয়াছি আমি ভাই,

    নাকে শাঁক বেঁধে ঘুম দেওয়া ছাড়া অন্য উপায় নাই।

    ঝিম ঝিম নিশ্চিন্ত–

    নাকের ডগায় মশাটা মশাই আস্তে উড়িয়ে দিন ত।”

    যতীন্দ্রনাথও নিমন্ত্রণ নিয়েছিলেন “কল্লোলে”র। যতদূর মনে পড়ে তার প্রথম কবিতা বেরোয় “কল্লোলে”র দ্বিতীয় বছরে মাঘমাসে। কবিতার নাম অন্ধকার:

    “নিদ্রিতা জননীবক্ষে সুপ্তোখিত শিশু

    খেলা করে লয়ে কণ্ঠহার।

    কোন মহাশিশু ক্রীড়ামুখে

    তব বুকে

    ঘুরাইছে জ্যোতিৰ্ম্মালা বিশ্ব শৃঙ্খলার?

    অন্ধকার, মহা অন্ধকার!”

    এর পরে আরো কয়েকটি কবিতা তিনি লিখেছিলেন—তার মধ্যে তার “রেল-ঘুম”টা উল্লেখযোগ্য। চলন্ত ট্রেনের অনুসরণ করে কবিতার ছন্দ বাঁধা হয়েছিল। সত্যেন দত্তের পালকি বা চরকার কবিতার মত। আমাদের কাছে কেমন কৃত্রিম মনে হয়েছিল, কেমন আন্তরিকতাবর্জিত। মনে আছে, প্রমথ চৌধুরীকে পড়িয়ে শোনানো হয়েছিল কবিতাটা। তিনি বলেছিলেন, ‘মরীচিকা’র কবির কোনো কবিতাই অপাঙক্তেয় হতে পারে না! এর মোটে বছর খানেক আগে ‘মরীচিকা’ বেরিয়েছে। একখানা ছোট কবিতার বইয়ে এরি মধ্যে যতীন্দ্রনাথ বিদগ্ধজনমনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।

    যতীন্দ্রনাথের মিতা যতীন্দ্রমোহন বাগচিও কি তাই না এসে পারেন “কল্লোলে”? আর তিনি এলেন, ভাবতে অদ্ভুত লাগছে, একেবারে মদিরযৌবনের বেশে, কবিতার নামও “যৌবন-চাঞ্চল্য”।

    “সহজ স্বচ্ছন্দ মনোরথ–

    ভুটিয়া যুবতী চলে পথ।

    টসেটসে রস-ভরপুর

    আপেলের মত মুখ

    আপেলের মত বুক

    পরিপূর্ণ প্রবল প্রচুর

    যৌবনের রসে ভরপুর।

    মেঘ ডাকে কড় কড়

    বুঝিবা আসিবে ঝড়,

    তিলেক নাহিক ভর তাতে।

    উঘারি বুকের বাস

    পূরায় মনের আশ

    উরস পরশ করি হাতে;

    অজানা ব্যথায় সুমধুর

    সেথা বুঝি করে গুরগুর।

    যুবতী একেলা পথ চলে

    পাশের পলাশ বনে

    কেন চায় ক্ষণে-ক্ষণে

    আবেশে চরণ যেন টলে

    পায়ে-পায়ে বাধিয়া উপলে।

    আপনার মনে যায়

    আপনার মনে গায়

    তবু কেন আন-পানে টান!

    করিতে রসের সৃষ্টি

    চাই কি দশের দৃষ্টি?

    স্বরূপ জানেন ভগবান!”

    “কল্লোলে”র যৌবন-চাঞ্চল্য তা হলে খালি “কল্লোলে”রই একচেটে নয়!

    না, কি “কল্লোলে”র সুর আরো উচ্চরোলে বাঁধা? তার চাঞ্চল্য আরো বেগবান? তার যাত্রা আরো দুরান্বেষী?

    “বৃন্তবন্ধহারা

    যাব উদ্দামের পথে, যাব আনন্দিত সর্বনাশে,

    রিক্তবৃষ্টি মেঘসাথে, সৃষ্টিছড়া ঝড়ের বাতাসে,

    যাব, যেথা শঙ্করের টলমল চরণ-পাতনে

    জাহ্নবী তরঙ্গমমুখরিত তাণ্ডব-মাতনে

    গেছে উড়ে জটাভ্রষ্ট ধুতুরার ছিন্নভিন্ন দল,

    কক্ষচ্যুত ধূমকেতু লক্ষ্যহারা প্রলয়-উজ্জ্বল

    আত্মঘাতমদমত্ত আপনারে দীর্ণ কীর্ণ করে

    নির্মম উল্লাসবেগে, খণ্ড খণ্ড উল্কাপিণ্ড ঝরে,

    কণ্টকিয়া তোলে ছায়াপথ—

    তাই কি চলেছি আমরা?

  • বার

    বার

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    বার

    রবীন্দ্রনাথকে প্রথম কবে দেখি?

    প্রথম দেখি আঠারোই ফাল্গুন, শনিবার, ১৩৩০ সাল। সেবার বি-এর বছর, ঢুকিনি তখন “কল্লোলে”। রবীন্দ্রনাথ সেনেট হলে কমলা-লেকচার্স দিচ্ছেন। ভবানীপুরের ছেলে, কলকাতার কলেজে গতিবিধি নেই, কোণঠাসা হয়ে থাকবার কথা। কিন্তু গুরুবলে ভিড় ঠেলে একেবারে মঞ্চের উপর এসে বসেছি।

    সেদিনকার সেই দৈবত আবির্ভাব যেন চোখের সামনে আজও স্পষ্ট ধরা আছে। সুষুপ্তিগত অন্ধকারে সহসোত্থিত দিবাকরের মত! ধ্যানে সে-মূর্তি ধারণ করলে দেহ-মন রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। ‘বাঙ্মমনশ্চশ্রোত্রঘ্রাণপ্রাণ’ নতুন করে প্রাণ পায়। সে কি রূপ, কি বিভা, কি ঐশ্বর্য! মানুষ এত সুন্দর হতে পারে, বিশেষত বাংলাদেশের মানুষ, কল্পনাও করতে পারতুম না। রূপকথার রাজপুত্রের চেয়েও সুন্দর। সুন্দর হয়ত দুর্লভদৰ্শন দেবতার চেয়েও।

    বাংলাদেশে এক ধরনের কবিয়ানাকে ‘রবিয়ানা’ বলত। সে আখ্যাটা কাব্য ছেড়ে কাব্যকারের চেহারায়ও আরোপিত হত। যাদের লম্বা চুল, হিলহিলে চেহারা, উড়ুউড়ু ভাব, তাদের সম্পর্কেই বলা হত এই কথাটা। রবীন্দ্রনাথকে দেখে মনে হল ওরা রবীন্দ্রনাথকে দেখেনি কোনোদিন। রবীন্দ্রনাথের চেহারায় কোথাও এতটুকু দুর্বলতা বা রুগ্নতার ইঙ্গিত নেই। তার চেহারায় লালিত্যের চেয়ে বলশালিতাই বেশি দীপ্যমান। হাতের কবজি কি চওড়া, কি সাহসবিস্তৃত বিশাল বক্ষপট! ‘শ্লথপ্রাণ দুর্বলের স্পর্ধা আমি কভু সহিব না’ এ শুধু রবীন্দ্রনাথের মুখেই ভাল মানায়। যিনি সাঁতরে নদী পার হয়েছেন, দিনের বেলায় ঘুমুননি কোনোদিন, ফ্যান চালাননি গ্রীষ্মকালের দুপুরে।

    পরনে গরদের ধুতি, গায়ে গরদের পাঞ্জাবি, কাঁধে গরদের চাদর, শুভ্র কেশ আর শ্বেত শ্মশ্রু–ব্যক্তমূর্তি রবীন্দ্রনাথকে দেখলাম। এত দিন তার রচনায় তিনি অব্যক্তমূর্তিতে ব্যাপ্ত হয়ে ছিলেন, আজ চোখের সামনে তাঁর বাস্তবমূর্তি অভিদ্যোতিত হল। কথা আছে, যার লেখার তুমি ভক্ত কদাচ তাকে তুমি দেখতে চেও না। দেখেছ কি তোমার ভক্তি চটে গিয়েছে। দেখে যদি না চটো, চটবে কথা শুনে। নির্জন ঘরে নিশব্দ মূর্তিতে আছেন, তাই থাকুন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বেলায় উলটো। সংসারে রবীন্দ্রনাথই একমাত্র ব্যতিক্রম, যার বেলায় তোমার কল্পনাই পরাস্ত হবে, চূড়ান্ততম চূড়ায় উঠেও তাঁর নাগাল পাবে না। আর কথা—কণ্ঠস্বর? এমন কণ্ঠস্বর আর কোথায় শুনবে?

    যত দূর মনে পড়ে, রবীন্দ্রনাথ মুখে-মুখে বক্তৃতা দিয়েছিলেন—পর-পর তিন দিন ধরে। পরে সে বক্তৃতা লিপিবদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ভাবছিলুম, যে ভাল লেখে সে ভাল বলতে পারে না—যেমন শরৎচন্দ্র, প্রমথ চৌধুরী, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বেলায় কিছুই অনিয়ম নয়। অলোকসম্ভব তাঁর সাধনা, অপারমিতা তার প্রতিভা। প্রথম দিন তিনি কি বলেছিলেন তা আবছা-আবছা এখনো মনে আছে। তিনি বলেছিলেন, মানুষের তিনটি স্পৃহা আছে—এক, টিকে থাকা, I exist; দুই, জানা, I know, তিন, প্রকাশ করা, I express। অদম্য এই আকাঙ্ক্ষা মানুষের। নিজের স্বার্থের জন্যে শুধু টিকে থেকেই তার শেষ নেই; তার মধ্যে আছে ভূমা,বহুলতা। যো বৈ ভূমা তদমৃতং, অথ যদল্পং তৎ মর্ত্যং। যেখানে অন্ত সেখানেই কৃপণতা, যেখানে ঐশ্বর্য সেখানেই সৃষ্টি। ভগবান তো শক্তিতে এই ধরিত্রীকে চালনা করছেন না, একে সৃষ্টি করেছেন আনন্দে। এই আনন্দ একটি অসীম আকুতি হয়ে আমাদের অন্তর স্পর্শ করছে। বলছে, আমাকে প্রকাশ করো, আমাকে রূপ দাও। আকাশ ও পৃথিবীর আলো এক নাম “রোদসী”। তারা কাঁদছে, প্রকাশের আকুলতায় কাঁদছে।

    রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনের বক্তৃতার সারাংশ আমার ডায়রিতে লেখা আছে এমনি : “বিধাতা দূত পাঠালেন প্রভাতের সূৰ্য্যালোকে। বললে দূত, নিমন্ত্রণ আছে। দ্বিপ্রহরে দূত এসে বললে রুদ্র তপস্বীর কণ্ঠে, নিমন্ত্রণ আছে। সন্ধ্যায় সূৰ্যাস্তচ্ছটায় গেরুয়াবাস উদাস দূত বললে, তোমার যে নিমন্ত্রণ আছে। তারপর দেখি নীরব নিশীথিনীতে তারায়-তারায় সেই লিপির অক্ষর ফুটে উঠেছে। চিঠি তো পেলাম, কিন্তু সে-চিঠির জবাব দিতে হবে না? কিন্তু কি দিয়ে দেব? রস দিয়ে বেদনা দিয়ে—যা সব মিলে হল সাহিত্য, কলা, সঙ্গীত। বলব, তোমার নিমন্ত্রণ তো নিলাম, এবার আমার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করো।”

    নিভৃত ঘরের জানলা থেকে দেখা অচেনা আকাশের নিঃসঙ্গ একটি তারার মতই দূর রবীন্দ্রনাথ। তখন ঐ মঞ্চের উপর বসে তার বক্তৃতা শুনতে-শুনতে একবারও কি ঘূণাক্ষরে ভেবেছি, কোনদিন ক্ষণকালের জন্যে হলেও তাঁর সঙ্গে পরিচিত হবার যোগ্যতা হবে? আর, কে না জানে, তার সঙ্গে ক্ষণকালের পরিচয়ই একটা অনন্তকালের ঘটনা।

    ভাবছিলুম, কত বিচিত্রগুণান্বিত রবীন্দ্রনাথ। যেখানে হাত রেখেছেন সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন। সাহিত্যের কথা ছেড়ে দিই, হেন দিক নেই যেদিকে তিনি যাননি আর স্থাপন করেননি তার প্রভুত্ব। যে কোনো একটা বিভাগে তাঁর সাফল্য তাকে অমরত্ব এনে দিতে পারত। পৃথিবীতে এমন কেউ লেখক জন্মায়নি যার প্রতিভা রবীন্দ্রনাথের মত সর্বদিঙ্মুখী। তা ছাড়া, যেখানে মেঘলেশ নেই সেখানে বৃষ্টি এনেছেন তিনি, যেখানে কুসুমলেশ নেই সেখানে পর্যাপ্তফল। “অপমেঘোদয়ং বর্ষং, অদৃষ্টকুসুমং ফলৎ।” আচ্ছন্নপ্রবাহা গঙ্গার মত তার কবিতা—তার কথা ছেড়ে দিই, কেননা কবি হিসেবেই তো তিনি সর্বাগ্রগণ্য। ধরুন, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রহসন। ধরুন, প্রবন্ধ। কত, বিচিত্র ও বিস্তীর্ণক্ষেত্রে তার প্রসার—ব্যাকরণ থেকে রাজনীতি। অনেকে তো শুধু ভ্রমণকাহিনী লিখেই নাম করেন। রবীন্দ্রনাথ এ অঞ্চলেও একচ্ছত্র। তারপর, চিঠি। পত্রসাহিত্যেও রবীন্দ্রনাথ অপ্রতিরথ। কত শত বিষয়ে কত সহস্র চিঠি, কিন্তু প্রত্যেকটি সজ্ঞানসৃজন সাহিত্য। আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা বলতে চান? তাতেও রবীন্দ্রনাথ পিছিয়ে নেই। তার “জীবন স্মৃতি” আর “ছেলেবেলা” অতুলনীয় রচনা। কোথায় তিনি নেই? যেখানেই স্পর্শ করেছেন, পুষ্পপূর্ণ করেছেন। আলটপকা অটোগ্রাফ লিখে দিয়েছেন ছুটকো-ছাটকা—তাই চিরকালের কবিতা হয়ে রয়েছে। তবু তো এখনো গানের কথা বলিনি। প্রায় তিন হাজার গান লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ, আর প্রত্যেক গানে নিজস্ব সুরসংযোগ করেছেন। এটা যে কত বড় ব্যাপার, স্তব্ধ হয়ে উপলব্ধি করা যায় না। মানুষের সুখ-দুঃখের এমন কোনো অনুভূতি নেই যা এই গানে সুরসুমধুর হয়নি। প্রকৃতির এমন কোনো হাবভাব নেই যা রাগরঞ্জিত হয়নি। শুধু তাই? এই গানের মধ্য দিয়েই তিনি ধরতে চেয়েছেন সেই অতীন্দ্রিয়কে, সে শ্রোতস্য শ্রোত্রং, মনসা মনঃ, চক্ষুষ চক্ষুঃ। যে সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাস অথচ সর্বেন্দ্ৰিয়বিবর্জিত। এই গানের মধ্য দিয়েই উদ্ঘাটিত করেছেন ভারতবর্ষের তপোমূর্তি। এই গানের মধ্য দিয়ে জাগাতে চেয়েছেন পরপদানত দেশকে।

    ঢেউ গুনে-গুনে কি সমুদ্র পার হতে পারব? তবু ঢেউ গোনা না হোক, সমুদ্রস্পৰ্শ তো হবে।

    সাহিত্যে শিশুসাহিত্য বলে একটা শাখা আছে। সেখানেও রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়রহিত। তারপর, ভাবুন, বিদেশীর পক্ষে ইংরেজের ইংরিজি লেখা সহজসাধ্য নয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ অতিমর্ত্য। ইংরিজিতে তিনি শুধু তাঁর বাংলা রচনাই অনুবাদ করেন নি, মৌলিক প্রবন্ধ লিখেছেন এবং দেশে-দেশে বক্তৃতা দিয়ে এসেছেন বহুবার। সে ইংরিজি একটা প্রদীপ্ত বিস্ময়। তাঁর নিজের হাতে বাজানো বাজনার সুর।

    যে লেখক, সে লেখার বাইরে শুধু বক্তৃতাই দিচ্ছে না, গান গাইছে। আর যার সাহিত্য হল, সঙ্গীত হল, তার চিত্র হবে না? রবীন্দ্রনাথ পট ও তুলি তুলে নিলেন। নতুন রূপে প্রকাশ করতে হবে সেই অব্যক্তরূপকে। সর্বাঙ্গসুন্দর রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখাটিও সুন্দর। কবিতা লিখতে কাটাকুটি করেছেন, তার মধ্য থেকে ব্যঞ্জনাপূর্ণ ছবি ফুটে উঠেছে—তার কাটাকুটিও সুন্দর। আর এমন কণ্ঠের যিনি অধিকারী তিনি কি শুধু গানই করবেন, আবৃত্তি করবেন না, অভিনয় করবেন না? অভিনয়ে-আবৃত্তিতে রবীন্দ্রনাথ অসামান্য।

    বক্তৃতা শুনতে শুনতে এই সব ভাবতুম বসে বসে। ভাবতুম, রবীন্দ্রনাথই বাংলা সাহিত্যের শেষ, তাঁর পরে আর পথ নেই, সংকেত নেই। তিনিই সব-কিছুর চরম পরিপূর্ণতা। কিন্তু “কল্লোলে” এসে আস্তে আস্তে সে-ভাব কেটে যেতে লাগল। বিদ্রোহের বহ্নিতে সবাই দেখতে পেলুম যেন নতুন পথ, নতুন পৃথিবী। আরো মানুষ আছে, আরো ভাষা আছে, আছে আরো ইতিহাস। সৃষ্টিতে সমাপ্তর রেখা টানেননি রবীন্দ্রনাথ–তখনকার সাহিত্য শুধু তারই বহুকৃত লেখনের হীন অনুকৃতি হলে চলবে না। পত্তন করতে হবে জীবনেব আরেক পরিচ্ছেদ। সেদিনকার কল্লোলের সেই বিদ্রোহ-বাণী উদ্ধতকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলুম কবিতায় :

    এ মোর অত্যুক্তি নয়, এ মোর যথার্থ অহঙ্কার,

    যদি পাই দীর্ঘ আয়ু, হাতে যদি থাকে এ লেখনী,

    কারেও ডরি না কভু; সুকঠোর হউক সংসার,

    বন্ধুর বিচ্ছেদ তুচ্ছ, তুচ্ছতর বন্ধুর সরণি।

    পশ্চাতে শত্রুরা শর অগণন হানুক ধারালো,

    সম্মুখে থাকুন বসে পথ রুধি ববীন্দ্র ঠাকুর,

    আপন চক্ষের থেকে জ্বালিব যে তীব্র তীক্ষ্ণ আলো

    যুগ-সূৰ্য ম্লান তার কাছে। মোর পথ আরো দূর!

    গভীর আত্মোপলব্ধি—এ আমার দুর্দান্ত সাহস,

    উচ্চকণ্ঠে ঘোষিতেছি নব-নর-জন্ম-সম্ভাবনা;

    অক্ষরতুলিকা মোন হস্তে যেন নহে অনলস,

    ভবিষ্যৎ বৎসরের শঙ্খ আমি–নবীন প্রেরণা!

    শক্তির বিলাস নহে, তপস্যায় শক্তি আবিষ্কার,

    শুনিয়াছি সীমাশূন্য মহা-কাল-সমুদ্রের ধ্বনি

    আপন বক্ষের তলে; আপনারে তাই নমস্কার!

    চক্ষে থাক আয়ু-ঊর্মি, হস্তে থাক অক্ষয় লেখনী॥

    সেই কমলা-লেকচার্সের সভায় আরেকজন বাঙালি দেখেছিলাম। তিনি আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। চলতি কথায়, বাংলার বাঘ, শূর-শার্দুল। ধী, ধূতি আর দার্ঢ্যের প্রতিমূর্তি। রবীন্দ্রনাথ যদি সৌন্দর্য, আশুতোষ শক্তি। প্রতিভা আর প্রতিজ্ঞা। এই দুই প্রতিনিধি—অন্তত চেহারার দিক থেকে—আর পাওয়া যাবে না ভবিষ্যতে। কাব্য ও কর্মের প্রকাশাত্মা।

    সাউথ সুবার্বন ইস্কুলে যখন পড়ি, তখন সরস্বতী পূজার চাঁদার খাতা নিয়ে কয়েকজন ছাত্র মিলে একদিন গিয়েছিলাম আশুতোষের বাড়ি। দোতলায় উঠে দেখি সামনের ঘরেই আশুতোষ জলচৌকির উপর বসে স্নানের আগে গায়ে তেল মাখাচ্ছেন। ভয়েভয়ে গুটি-গুটি এগিয়ে এসে চাঁদার খাতা তার সামনে বাড়িয়ে ধরলাম। আমাদের দিকে পা বাড়িয়ে দিয়ে তিনি হুঙ্কার করে উঠলেন : পেন্নাম করলিনে? আমরা খাতাটাতা ফেলে ঝুপঝুপ করে প্রণাম করতে লাগলাম তাকে।

    তেরোশ বত্রিশ সাল—“কল্লোলে”র তৃতীয় বছর—বাংলাদেশ আর কল্লোল দুয়ের পক্ষেই দুর্বৎসর। দোসরা আষাঢ় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন মারা যান দার্জিলিঙে। আর আটই আশ্বিন মারা যায় আমাদের গোকুল, সেই দার্জিলিঙেই। শুধু গোকুলই নয়, পর-পর মারা গেল বিজয় সেন গুপ্ত আর সুকুমার ভাদুড়ি।

    মঙ্গলবার, বিকেল ছটার সময়, খবর আসে কলকতায়—চিত্তরঞ্জন নেই। আমরা তখন কল্লোল-আপিসে তুমুল আড্ডা দিচ্ছি, খবর শুনে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। দেখি সমস্ত কলকাতা যেন বেরিয়ে পড়েছে সর্বস্বহারার মত। কেউ কারু দিকে তাকাচ্ছে না, কার মুখে কোনো কথা নেই, শুধু লক্ষ্যহীন বেদনায় এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পরদিন শোনা গেল, বৃহস্পতিবার ভোরে স্পেশ্যাল ট্রেনে চিত্তরঞ্জনের মৃতদেহ নিয়ে আসা হবে কলকাতায়। অত ভোরে ভবানীপুর থেকে যাই কি করে ইষ্টিশানে? ট্রাম-বাস তো সব বন্ধ থাকবে। সমবায় ম্যানসনসের ইঞ্জিনিয়র সুকুমার চক্রবর্তীর ঘরে রাত কাটালাম। আমি, সুকুমারবাবু আর দীনেশদা। সুকুমারবাবু দীনেশদার বন্ধু, অতএব “কল্লোলে”র বন্ধু, সেই সুবাদে আমাদের সকলের আত্মজন। দরদী আর পরোপকারী। জীবনযুদ্ধে পর্যুদস্ত হচ্ছেন পদে-পদে, অথচ মুখের নির্মল হাসিটি অস্ত যেতে দিচ্ছেন না। বিদেশিনী মেয়ে ফ্রেডাকে বিয়ে করেন কিন্তু অকালেই সে-মিলনে ছেদ পড়ল। এসে পড়লেন একেবারে দৈন্য ও শূন্যতার মুখোমুখি। ক্ষমাহীন সংগ্রামের মাঝখানে। তাই তো বেনামী বন্দরে, ভাঙা জাহাজের ভিড়ে, “কল্লোলে” তিনি বাসা নিলেন। এমনি অনেকে সাহিত্যিক না হয়েও শুধু আদর্শবাদের খাতিরে এসেছে সেই যৌবনের মুক্ততীর্থে। সেই বাসা ভেঙে গিয়েছে, আর তিনিও বিদায় নিয়েছেন এক ফাঁকে।

    রাত থাকতেই উঠে পড়লাম তিন জনে। হাঁটা ধরলাম শেয়ালদার দিকে। সে কি বিশাল জনতা, কি বিরাট শোভাযাত্রা—তা বর্ণনা সুরু করলে শেষ করা যাবে না। “কৃষাণের বেশে কে ও কৃশতনু কৃশানু পুণ্যছবি”—স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী একজন শববাহী। আট ঘণ্টার উপর সে শোভাযাত্রার অনুগমন করেছিলাম আমরা—নৃপেন সহ আরো অনেক বন্ধু, নাম মনে পড়ছে না—দিনের ও শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত। কলকাতা শহরে আরো অনেক শোভাযাত্রা হয়েছে কিন্তু এমন আর একটাও নয়। অন্তত আর কোনো শোভাযাত্রায় এত জল আর পাখা বৃষ্টি হয়নি!

    শ্রবণ সংখ্যায় “কল্লোলে” চিত্তরঞ্জনের উপর অনেক লেখা বেরোয়, তার মধ্যে অতুল গুপ্তের দেশবন্ধু প্রবন্ধটা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি:

    “জুলাই মাসের মডার্‌ন্‌ রিভিউতে অধ্যাপক যদুনাথ সরকার চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যু সম্বন্ধে যা লিখেছেন তার মোটা কথা এই যে, চিত্তরঞ্জনের প্রভাবের কারণ তার দেশবাসীরা হচ্ছে কৰ্ত্তাভজার জাত। তাদের গুরু একজন চাইই যার হাতে নিজেদের বুদ্ধি-বিবেচনা তুলে দিয়ে তারা নিশ্চিন্ত হতে পারে। অধ্যাপক মহাশয়ের মতে দেশের লোকের উপর চিত্তরঞ্জন দাসের প্রভাবের স্বরূপ আমাদের জাতীয় দুর্বলতার প্রমাণ। কারণ সে প্রভাবের একমাত্র কারণ ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ, ইউরোপের মত কাটা-ছাঁটা অপৌরুষেয় তত্ত্বপ্রচারের ফল নয়।…

    লোকচিত্তের উপর চিত্তরঞ্জনের যে প্রভাব তা কোনও নিগূঢ় তত্ত্বের বিষয় নয়। তা সূর্যের মত প্রকাশ। চোখ না বুজে থাকলেই দেখা যায়। পরাধীন ভারতবর্ষে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগছে। আমাদের এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা চিত্তরঞ্জনে মূর্ত হয়ে প্রকাশ হয়েছিল। সেই মুক্তির জন্যে যে নির্ভীকতা, যে ত্যাগ, যে সৰ্বস্বপণ আমরা অন্তরে-অন্তরে প্রয়োজন বলে জানছি, কিন্তু ভয়ে ও স্বার্থে জীবনে প্রকাশ করতে পারছি না, সেই নির্ভীকতা, সেই ত্যাগ ও সেই পণ সমস্ত বাধামুক্ত হয়ে চিত্তরঞ্জনে ফুটে উঠেছিল। চিত্তরঞ্জনের ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ ও জনসাধারণের উপর তার প্রভাব দু-এরই এই মূল। আইন-সভায় যারা চিত্তরঞ্জন উপস্থিত না থাকলে একরকম ভোট দিত, তার উপস্থিতিতে অন্য রকম দিত, তারা দেশের মুক্তিকামী এই ত্যাগ ও নির্ভীকতার মূর্তির কাছেই মাথা নোয়ত। চিত্তরঞ্জনের সম্মুখে দেড়শ বছরের ব্রিটিশ শান্তির ফল প্রভু-ভয় ও স্বার্থভীতি ক্ষণেকের জন্য হলেও মাথা তুলতে পারত না। এই যদি কর্তাভজা হয়, তবে ভগবান যেন এ দেশের সকলকেই কর্তাভজা করেন, অধ্যাপক যদুনাথ সরকারের অপৌরুষের তত্ত্বের ভাবুক না করেন।…

    ডেমোক্রেটিক শাসন অর্থাৎ ‘গুরু’দের শাসন। তার ফল ভাল হবে কি মন্দ হবে তা নির্ভর করে কোন ‘ডেমস’ কাকে গুরু মানে তার উপর। ভারতবর্ষের ‘ডেমস’ যে গুরুর খোঁজে শবরমতীর আশ্রমে কি দেশবন্ধুর বিশ্রাম-আবাসেই যায়, দৈনিক কাগজের সম্পাদকের অফিসে নয়, এটা আশার কথা, মোটেই ভয়ের কথা নয়। অধ্যাপক সরকার যাকে ডেমক্রেটিক বলে চালাতে চাচ্ছেন সে হচ্ছে সেই aristocratic শাসন, যা ইউরোপের শাসকসম্প্রদায় এতকাল ডেমক্রেটিক বলে চালিয়ে আসছে।

    পণ্ডিতে না চিনুক দেশের জনসাধারণ চিত্তরঞ্জনকে যথার্থ চিনেছিল। তারা তাই তার নাম দিয়েছিল ‘দেশবন্ধু’। ঐ নাম দিয়ে তারা জানিয়েছে তাদের মনের উপরে চিত্তরঞ্জনের প্রভাবের উৎস কোথায়। পণ্ডিতের চোখে এটা না পড়তে পারে, কারণ এক শ্রেণীর পাণ্ডিত্য পৃথিবীর কোনও যুগে কোনও দেশেই সমসাময়িক কোনও মহত্বকে চিনতে পারে নাই, কেন না তার কথা পুঁথিতে লেখা থাকে না।”

    তেরোশ একত্রিশ সালের শেষ দিকেই গোকুলের জ্বর শুরু হয়। ছবি এঁকে আয়ের সুবিধে বিশেষ করতে পারেনি—অথচ আয় না করলেও নয়। প্রত্নতত্ত্বের রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধীনে চাকরি নিয়ে একবার পুনাতে চলে যায়। বছর খানেক চাকরি করবার পর বম্বেতে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে—দিন-রাত একটুও ঘুমুতে পারত না। বম্বের সলিসিটর কথঙ্কর ও তার স্ত্রী গোকুলকে তাদের বাড়িতে নিয়ে এসে সেবা-যত্ন করে সুস্থ করে তোলেন, কিন্তু চাকরি করার মত সক্ষম আর হল না। কলকাতায় ফিরে আসে গোকুল। কথঙ্কর ও তার স্ত্রী মালিনীর প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার তার শেষ ছিল না। মালিনী গোকুলকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন ও গোকুলের জন্মদিনে বম্বে থেকে কোনো না-কোনো উপহার পাঠাতেন। তারই দেওয়া কালো ডায়েলের ওমেগা রিস্টওয়াচ গোকুলের হাতে শেষ পর্যন্ত বাঁধা ছিল।

    গোকুল তার মামার বাড়িতে ছিল, অনেক বিধি-বাধার মাঝখানে। শরীর-মন দুর্বল, তার উপরে অর্থাগম নেই। না এঁকে না লিখে কিছুতেই স্বাধীনভাবে জীবিকার্জন হবার নয়। এমন অবস্থায় গোকুলের দিদিমণি (বড় বোন) বিধবা হয়ে চারটি ছোট-ছোট নাবালক ছেলে নিয়ে গোকুলের আশ্রয়ে এসে পড়েন। কালিদাস নাগ গোকুলের দাদা, তখন ইউরোপে। অনেক বাধা-বিপদ ঠেলে অনেক ঝড়-জল মাথায় করে বিদেশে গিয়েছেন উপযুক্ত হয়ে আসতে। কালিদাসবাবুর অনুপস্থিতিতে গোকুল বিষম বিব্রত হয়ে পড়ে, কিন্তু অভাবের বিরুদ্ধে লড়তে মোটেই তার অসম্মতি নেই। ভবানীপুরে কুণ্ডু রোডে ছোট একটি বাড়ি ভাড়া করে দিদি ও ভাগ্নেদের নিয়ে চলে আসে। এই ভাগ্নেদের মধ্যেই জগৎ মিত্র কথাশিল্পীর ছাড়পত্র নিয়ে পরে এসে ভিড়েছিল “কল্লোলে”। শিবপুরের একটা বাড়িতে দিদিমণির অংশ ছিল। দিদিমণির স্বামীর মৃত্যুর পর, যা সচরাচর হয়, দিদিমণির শরিকরা তা দখল করে বসে। অনেক ঝগড়া-বিবাদের পর শরিকদের কবল থেকে দিদিমণির সে-অংশ উদ্ধার করে গোকুল। সে-বাড়িতে দখল নিতে গোকুলকে কত ভাবে যে অপমানিত হতে হয়েছে তার আর সীমা সংখ্যা নেই। সেই অংশটা ভাড়া দিয়ে দিদিমণির কিছু আয়ের ব্যবস্থা হয়, কিন্তু পুরোপুরি সংসার চলে না। মামার বাড়িতে থাকতে পাবলিক স্টেজে থিয়েটার দেখার সাহস করতে পারত না গোকুল। সেই গোকুল ভয়ে-ভয়ে অহীন্দ্র চৌধুরীদের Photoplay syndicateএ এসে যোগ দেয়। তখনকার দিনে ফিল্মে যোগ দেওয়া মানেই একেবারে বকে যাওয়া। কিন্তু একেবারে না খেতে পাওয়ার চেয়ে সেটা মন্দ কি? স্টুডিয়োতে আর্টিস্টের কাজ, মইয়ের উপরে উঠে সিন আঁকা, স্টেজ সাজানো—নানারকম শারীরিক ক্লেশের কাজ করতে হত তাকে। শরীর ভেঙে পড়ত, কিন্তু ঘুম হত রাত্রে। বলত, আর কিছু উপকার না হোক, ঘুমিয়ে বাঁচছি।

    কালিদাসবাবু ডক্টরেট নিয়ে ফিরলেন বিদেশ থেকে। গোকুল যেন হাতে চাঁদ কপালে সুয্যি পেয়ে গেল। মা-বাপ হারা ভাইয়ে-ভাইয়ে জীবনের নানা সুখ-দুঃখ ও ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অপূর্ব বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। বিদেশে দাদার জন্যে তার উদ্বেগের অন্ত ছিল না। যেমন ভালবাসত দাদাকে তেমনি নীরবে পূজা করত। দাদা ফিরে এলে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। দাদাকে কুণ্ডু লেনের বাড়ি ছেড়ে দিয়ে সে দিদিমণি ও তার ছেলেদের নিয়ে চলে এল তাদের শিবপুরের বাড়িতে। সেই শিবপুরের বাড়িতে এসেই সে অসুখে পড়ল।

    জ্বরের সঙ্গে পিঠে প্রবল ব্যথা। সেই জ্বর ও ব্যথা নিয়েই সে ‘পথিকের’ কিস্তি লিখেছে, করেছে ‘জাঁ ক্রিস্‌তফের’ অনুবাদ। ক’দিন পরেই রক্তবমি করলে, ডাক্তার পরীক্ষা করে বলে দিলে, যক্ষ্মা।

    শিবপুরের বাড়িতে আমরা, “কল্লোলে”র বন্ধুরা, প্রায় রোজই যেতাম গোকুলকে দেখতে, তাকে সঙ্গ দিতে, সাধ্যমত পরিচর্যা করতে।

    অনেক শোকশীতল বিষণ্ণ সন্ধ্যা আমরা কলহাস্যমুখর করে দিয়ে এসেছি। গোকুলকে এক মুহূর্তের জন্যেও আমরা বুঝতে দিই নাই যে আমরা তাকে ছেড়ে দেব। কতদিন দিদিমণির হাতের ডাল-ভাত খেয়ে এসেছি তৃপ্তি করে। দিদিমণি বুঝতে পেরেছেন ঐ একজনই তাঁর ভাই নয়।

    একদিন গোকুল আমাকে বললে, ‘আর সব যাক, আর কিছু হোক থোক, স্বাস্থ্যটাকে রেখো, স্বাস্থ্যটাকে ছেড়ে দিও না।’

    তার স্নেহকরুণ মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

    ‘যার স্বাস্থ্য আছে তার আশা আছে।’ নিশ্বাস ফেলল গোকুল : ‘আর যার আশা আছে তার সব আছে।’

  • ষোল

    ষোল

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    ষোল

    জানালা থেকে রোদ নেমে গেলেই কাবুলের চঞ্চলতা বাড়ে। বড় সুসময় বয়ে যাচ্ছে। বাবুর্চিপাড়া, বাবুপাড়া, কেরাণী পাড়ার ঘরগুলিতে এখন পুরুষদের সংখ্যা কম। কাজ কম্মের ধান্দায় দশটার আগেই পাড়া খালি করে তারা বের হয়ে যায়। তখন কাবুল উঁকি দিয়ে দেখে। গ্যারেজের চাবি নিয়ে আঙুলে রিঙ ঘোরায়। আর একটু সময়—কারণ হাসিরাণীর বাড়িতে এখনও কিছুটা স্নান আহারের তাড়া আছে। কুম্ভর ভাই দুলাল, শম্ভু, কলেজে গেলেই বাড়িটা ফাঁকা। সুরেনের মেয়েটাকে কুম্ভ পাহারায় রেখে যায়। ওতে তার সুবিধাই হয়েছে। ফাইফরমাস দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিলেই সব সুনসান। অবশ্য ইদানীং হাসিরাণীর সতীপনা বেড়েছে। মেয়েটা হয়ে যাওয়ার পরেই আর গায়ে ফায়ে বেশী হাত দিতে দেয় না। তবু কি যে হয়, হাসিরাণীর গোলগাল টোবলা মুখ, চোখের সামনে ভাসে! মাথা ঝিম মেরে থাকে। কেবল জানলায় চোখ রেখে বসে থাকে। এই রাধিকাবাবু গেল, এই কুম্ভ গেল। শম্ভু দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। সেও বের হয়ে যাচ্ছে। বাকি থাকল এক। কাবুল বেশ অস্থির হয়ে পড়েছে। ঘরে পায়চারি করছে। কান চোখ মুখ কেমন গরম, জ্বর আসার মত। সে এক দণ্ড বসে থাকতে পারছে না। হাসিরাণী বোঝে না কত সে করে। কুম্ভর ছ্যাঁচড়া স্বভাব। বৌরাণী সব জানে, টের পায়। তার তখন এক কথা, ছ্যাঁচড়া লোকটা তোমাদের আছে বলেই সিট মেটাল টিকে আছে। সব অভিযোগ সব সময় খণ্ডন করে দেয়। এবং কুম্ভ যদি কখনও এসে দেখতে পায়, রাধিকাবাবু যদি দেখতে পায় কাবুল বারান্দায় বসে হাসিরাণীর সঙ্গে গল্প করছে—সহজেই হজম করে নেয়।

    ঐ এক গেরো। কাবুল তখন বেশ সরল মানুষের মত হেসে দেয়। আরে কুম্ভ যে। তোমার শালা বড় খারাপ স্বভাব। বৌকে ছেড়ে থাকতে পার না। চা খাচ্ছি। এ বাড়ির চা না খেলে দিনটাই খারাপ যায়। এই হাসি এত কিপ্টে কেন বাবা! এক কাপ চাও দেবে না! অথবা নানা রকমের কথা, ইষ্টবেঙ্গল মোহনবাগানের কথা। সিনেমার নায়ক-নায়িকার কথা। কোথাও যদি দুর্ঘটনা ঘটে থাকে তার কথা। কেবল কথা।

    রাধিকাবাবু জানে, কুম্ভর চাকরি কাবুল করে দিয়েছে। রাধিকাবাবু জানে তিনি যে বিশ্বাসী মানুষ, এটা কাবুলই বলে বলে এখনও বৌরাণীর কাছে ঠিক রেখেছে। অর্থাৎ এ-বাড়িতে কি খাওয়া হয়, কি বৈভব আছে, তা বৌরাণীর কানে যায় না কাবুল হাতে আছে বলেই। যা মাইনে তাতে পেট চালানো দায়। অথচ রাধিকাবাবু এখনও দেশের বাড়িতে দুর্গা পুজো করেন। মেয়েদের মাসোহারা পাঠান। ছেলেদের সবার নামে ব্যাংকে একাউণ্ট করে দিয়েছেন। একটা আমবাগান, নারকেল বাগান, দশ বিঘের ওপর নীলগঞ্জের কুঠিবাড়ি বেনামে কিনে নিয়েছেন রাজার কাছ থেকে। এত সব করছেন, অথচ বিশ্বাসী হতে আটকাচ্ছে না। মূলে আছে কাবুল। হাত ছাড়া হলেই সব দাপট যাবে।

    কাবুল না থাকলে কুম্ভকে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াত হত। চাকরি করে দেবার পরই কুম্ভ এসে বাপকে একদিন বলল, সব চুরি হয়ে যাচ্ছে বাবা। স্ক্র্যাপ বিক্রি করছে, টাকা জমা পড়ছে না। বুড়ো ম্যানেজার মেরে দিচ্ছে।

    রাধিকাবাবু বলেছিলেন, তার আমি কি করব?

    —রাজার কানে কথাটা তোলেন!

    —শুনবেন কেন? আমার ত ওতে কথা বলার এক্তিয়ার নেই। আসলে নিজের পাছায় ঐ যে কি লেগে থাকে না, তাই না হয়েছে রাধিকাবাবুর! সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। তার ওপর পুত্রের ঝামেলা তিনি কাঁধে নিতে রাজি না। যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। দোষের কিছু না।

    সুতরাং কাবুলকেই ধরতে হয়। কুম্ভর কাবুলই ভরসা। এক সঙ্গে বড় হয়েছে। এক সঙ্গে পড়েছে, ফুটবল খেলেছে। বেশ্যালয়ে গেছে কাবুলের টাকায়। এস্টেট থেকে মাসহারা পায় কাবুল। সে অনেক টাকা। যত ফূর্তি-ফার্তা কাবুলই তাকে করিয়েছে। এখনও কাবুল সহায়। কাবুলকেই সে কান ভারি করেছিল। তারপর কি সুসময় কুম্ভর। রাজা ডেকে পাঠিয়েছিলেন। রাজা সব খবর নিতে থাকলেন। সনৎবাবুকে ডেকে বলেছিলেন, সিট মেটালের ম্যানেজার সব ত ফাঁক করে দিচ্ছে। খবরটা রাখেন। সনৎবাবু বলেছিলেন না জানি না। আমার বিশ্বাস হয় না। আমি তাকে খুবই ধার্মিক মানুষ জানি। তখন লাগে সনৎবাবুর পেছনে। এই করে এত দুরে আসা কুম্ভর। কুম্ভ তখন হাসিরাণীকে বলত, কাবুল এলে আদরযত্ন কর। কুম্ভ জানত হাসিরাণীর প্রতি কাবুলের দুর্বলতা আছে। কুম্ভ বাড়ি না থাকলেও সে আসত ঠিক বাড়ির ছেলের মত। এখন যত দিন যাচ্ছে কাবুলের আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে। আর দশজনও দেখছে, কিন্তু রাধিকাবাবু চুপ, কুম্ভ কখনও ফিরে এসে দেখলেও চুপ। ভিতরটা গুম মেরে গেলেও ওপরে ঠাট্টা তামাশা। এখন ও আর তত সহজে বলতে পারে না, কাবুল আমার জন্য যা করেছে! কাবুল না থাকলে হাসিরাণীর মুখে হাসি ফুটত না।

    কাবুল এবার নিঃশ্বাস ছেড়ে বাঁচল। যাক দুলালটাও চলে গেল। এখন কোয়ার্টারে শুধু হাসিরাণী আর সুরেনের মেয়েটা। এই দুজন। হাসিরাণী ঠিক এখন মেয়েকে নিয়ে মজেছে। সে পেছন থেকে গিয়ে একটা হুঁম করবে। হাসিকে ভয় পাইয়ে দেবে। তারপর মোড়া টেনে সুরেনের মেয়েটাকে বলবে, এই যা, রবির দোকান থেকে গরম সিঙাড়া কচুরি আন। হাসি চা লাগাও। যেন এই চায়ের জন্য ফন্দি ফিকির করে গোপনে ঢুকে যাওয়া। বলে রাখা, এখনও সময় হয়নি, কুম্ভকে বলো, সবটাই খেলিয়ে তুলতে হয়।

    তখন কুম্ভ বলল, দাদা শরীরটা ভাল লাগছে না। অফিস যাচ্ছি না। আপনি যান। সাধারণত অতীশ এবং কুম্ভ একই সঙ্গে কারখানায় যায়। কোনদিন কাবুলের সঙ্গে রাজবাড়ির আলগা কাজ থাকলে কুম্ভর যেতে দেরি হয়। সেদিন অতীশ একা যায়। আজও হয়ত কোন কাজ-টাজ পড়ে গেছে! সে বলল, কাবুলবাবুর সঙ্গে কোথাও বের হবেন!

    কুম্ভ বারান্দায় গোল টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে কিছু যেন ভাবছে, অতীশের কথা শুনতে পায় নি। কালও রাজার সঙ্গে কথাবার্তা প্রায় ঠিক। আগে মাইনে বাড়ান, মাল বাড়ান, ওভারটাইম বন্ধ করুন, সব ঠিক আছে। কিন্তু অর্ডারপত্র কম। বেশি অর্ডারপত্র নিতে হলেই রামলাল পিয়ারিলালের দরকার। এত বছর এই করে চলে আসছে আজ হঠাৎ রামায়ণ গাইলেই হবে কেন! রাজাও কথা দিয়েছিল—কিন্তু তারপর সব কেমন ওলটপালট হয়ে গেছে। কে সেটা করে! তবে সে অতীশকে যতটা বোকা ভেবে থাকে, সে ততটা নয়। বোকা ঠিক নয়, যতটা ভাল মানুষ ভাবে ততটা ভালমানুষ নয়। বৌরাণীর সঙ্গে কি কোনও গোপন সম্পর্ক আছে! কে জানে! কুম্ভ মনে মনে ভীষণ জেদি হয়ে উঠেছে। চোখ মুখ লাল। অতীশ ফের কোনও কথা বলতে সাহস পেল না। সে এই সব মুখে কি ধরা পড়ে, জানে। এবং কুচক্রীকে সে ভয় পায়, আর কুম্ভর মুখে বাঘের মুখ দেখে ফেলে বলেই ভয়। এখন আর সে মানুষের মুখে বাঘের মুখ দেখতে চায় না। টুটুল মিণ্টু আছে। মিণ্টুর জন্য সে ভেবেছে একবার নিবেদিতায় যাবে। নির্মলার শরীর ভাল যাচ্ছে না। এখানে এসে রোগা হয়ে গেছে। নির্মলার দাদা এসে একবার কিছুদিন নিয়ে রাখতে চেয়েছিল, অতীশের অসুবিধা হবে ভেবে যায় নি। আসলে নির্মলার এখন একার হাতে সংসার। সে টানতে পারছে না। অভাব বাড়ছে। এই সব সাত-পাঁচ চিন্তা ভাবনায় সে যখন ট্রাম রাস্তা পার হচ্ছিল তখন কুম্ভ ঘরের দিকে হাঁটছে।

    আসলে উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষকে কখনও কখনও ভারি গোলমালে ফেলে দেয়। এবং এই আকাঙ্ক্ষা মানুষকে কখনও কখনও বড় রক্তাক্ত করে। মেজাজ-মর্জি ঠিক রাখা যায় না। কুম্ভ বাড়ি ঢুকেই মেজাজ-মর্জি ঠিক রাখতে পারছে না। দাঁত চেপে হজম করে যাচ্ছে। সুরেনের মেয়েটা নেই। সে ঢুকেই বলল, ও গেল কোথায়?

    কাবুলের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কুম্ভ অসময়ে! অবশ্য অসময়ে কুম্ভ আরও এসে দেখেছে, খোস মেজাজে হাসির সঙ্গে নানা রকমের সে গুল ঝেড়ে যাচ্ছে। কাবুল জানে দায়টা কুম্ভর কোথায়। সে সহজেই খুব সরল মানুষ হয়ে যেতে পারে। কুম্ভকে দেখেই বলল, কি বে খুব জোর ল্যাং খেলি তো!

    কুম্ভ হাসির দিকে তাকিয়ে বলল, একটু গরম জল বসাও। দাঁত ব্যথা করছে। হাসি বলল, বসাও না, আমি কি বসে আছি। কুম্ভ কিছু বলল না। ব্যাগটা ঘরের ভিতর রেখে নিজেই কেটলিতে জল ঢালতে থাকল। হাসি যেন পাত্তা দিচ্ছে না। সে ত কাবুলকে নিয়ে কিছু করছে না, মেয়েটার গায়ে তেল মাখাচ্ছে। কাবুল পাশে মোড়ায় বসে আছে। কে আসে কে যায় হাসির যেন মাথাব্যথা নেই।

    কুম্ভ জলটা ঢেলে স্টোভে কেটলিটা নিজেই বসিয়ে দিল। খুব গম্ভীর। কাবুল লক্ষ্য করছে সব। কাবুল এটা টের পায়, কুম্ভর যতই মেজাজ বিগড়ে যাক, যতই দাঁত ব্যথা করুক এখন উঠতে চাইলেই ধরে রাখবে। বসিয়ে রাখবে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রাজবাড়ির ভেতরের খবর নেবার জন্য দাঁত ব্যথা সত্ত্বেও অনর্গল বকবে। সে বলল, কুম্ভ জলটা বেশি করে দে। তোর বৌকে ত বলে পারলাম না। একটু চা পর্যন্ত করে দেয় না এলে। আমার মূল্য ধরে দেখছে না।

    —বাদ দে ভাই আমাদের কথা। সে ঘরে গিয়ে সব খুলে একটা লুঙ্গি পরে এল। তারপর কারো দিকে তাকাল না। কারণ তাকালেই হাসিকে সে নষ্ট মেয়ে ভাবছে। হাসির মুখ দেখলেই ধরে পেটাতে ইচ্ছে করছে। শরীরে তার এত কি জ্বালা! গতরের জ্বালা, সে আমারও কম নেই।

    হাসি বেশ খুশি। কুম্ভর দাঁত ব্যথার জন্য এতটুকু কোন সহৃদয়তা নেই। সে মেয়েটার টুবলা গালে চুমু খাচ্ছে। দু-হাত দু-পা মুঠো করে ছেড়ে দিয়ে বলছে, ফুক্কা। মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠছে। একবার কুম্ভর দিকে টেরচা করে চেয়েছে। তারপরই ভেবেছে, তুমি একটা ম্যাঙ্গো। আমাকে ধষ্টাবে। লোকটাকে ত কিছু বলতে পার না। ভাল লাগলে কি করব! রাজবাড়ির গন্ধ লোকটার গায়ে। সে একবার এটা বলেও ফেলেছিল, সন্দ যখন বারণ করে দাও না। তুমি না করলে আমিই করব।

    কুম্ভ জলে পড়ে যাবার মত চিৎকার করে উঠেছিল, আরে না, না! চটাতে যেও না। বন্ধু-বান্ধব লোক। এক সঙ্গে মানুষ হয়েছি, মা বাবা কেউ নেই, পিসতুতো ভাইয়ের কাছে আছে। আছে বলেই যে কুম্ভর রক্ষা সেটা আর বলে না। সুতরাং হাসি ভয় পায় না। বরং মজা পায়। দুজন পুরুষকে নিয়ে খেলতে মজা পায়। মেয়েটা হবার পর পুরো একমাস সিনেমা না দেখে ছিল। সাত পাকে বাঁধা বইটা হাসি চারবার দেখেছে। আবার এলে দেখবে। এসেও ছিল। চলেও গেছে। এক মাসে হাসির জীবনে অনেক ক্ষতি হয়েছে। মেয়েটা হওয়ায় এই ক্ষতি। তারপর টেবির কাছে রেখে সেটা বাকি তিন মাসে পুষিয়ে নিয়েছে। এখন তার আকাশ বড় ঝকমক করেছে। সে একা কাটায় কি করে! আর পুরুষ মানুষের ক্ষমতা কতদূর সে জানে। ওদের দৌড় বিছানা পর্যন্ত। যতই লম্ফঝম্ফ হোক রাতে সব কাত। না, শরীর ভাল্লাগছে না। আমাকে ঘুমোতে দাও। আর যায় কোথায়। সোহাগে সোহাগে তখন পাগল করে ছাড়বে। কি চাই, শাড়ি—দেব। অলংকার—দেব। সিনেমা—দেখাব। তখন আর পৃথিবীতে কিছু বাদ থাকে না—সব এনে শ্রীচরণ পদ্মে হাজির। সুতরাং হাসি কুম্ভর দাঁতের ব্যথায় গা করল না। রাত এলেই সব সেরে যাবে। ব্যথা-টেথা সব পগার পার। হালুম হুলুম তখন। খাব খাব তখন।

    কাবুল বলল, হাসি তুমিও পার। দাঁত ব্যথা বলতে! জলটা বসিয়ে দিতে কি তোমার ক্ষতি ছিল বুঝি না!

    হাসি কাবুলের কথাও গ্রাহ্যি করল না। সে মেয়েকে চান করাতে থাকল। রোদে জল দিয়ে রেখেছিল, সেটা দিয়ে চান করাচ্ছে। দুগাছা দূর্বা দেওয়া জলে। জলে কোন সংক্রামক বীজাণু থাকতে পারে ভেবে এই দিয়ে রাখা; পুজো-আর্চায় যা লাগে শিশুর স্নানে তা দিলে সংসারে পাপ থাকে না। অথচ শরীরে কি যে থাকে! শিশু বড় হয়, বালিকা হয়, যুবতী হয়। কুম্ভ হয়, হাসি হয়, কাবুল হয়। আর এ সময়ই মনে হল অতীশ হয়। সবই হয় পৃথিবীতে। লোকটা তাকে বলেছিল, লক্ষ্মীর পট কিনে দেবে। এখন যেন সেটাই বেশি তাকে কামড়াচ্ছে। কন্যেটির শরীর মুছিয়ে দিতে গিয়ে বিড়বিড় করছিল, কেউ কথা রাখে না। যে যার মত মিছে কথা বলে। লক্ষ্মীর পট কিনে দেব একটা। তার আর নামগন্ধ নেই।

    কুম্ভ আর পারল না। সেই লোকটা এই বাড়িতেও ঢুকে গেছে। রাজবাড়িতে ঢুকেছে ঢুকুক। এ-বাড়িতে কেন। সে কালীঘাটের কালীর মানসপুত্র। তার ঘরে লক্ষ্মীর পট কেন আবার। সরল সুধা। সে সহসা চীৎকার করে উঠল, আর কিছু চাই না!

    —চাইলেই দেয় কে?

    কাবুলের দিকে তাকিয়ে কুম্ভ বলল, দেখছিস, দেখছিস হারামজাদী মাগী কি বলছে!

    কাবুল খুব মান্যিগণ্যি মানুষের মত বিচারে বসে যায়। অযথা মাথা গরম করছিস কেন তোরা?

    —আমি করছি। বল, আমি করছি!

    —কেউ করছিস না। নে, চুপ কর।

    হাসি মেয়ের জন্য দুধ গরম করবে! জল গরম এখনও হয়নি। ঠাস করে কেতলি নামিয়ে দুধটা বসিয়ে দিল। মেয়েটা এক হাতে ঝুলছে।

    —দেখলি ত। আমি কি তোর মাগী গোলাম!

    —ছোটলোকের মত কথা বলবে না বলে দিচ্ছি। হাসির চোখ গরম হয়ে গেল।

    কুম্ভ বলল, একশবার বলব। নষ্টামির আর জায়গা পাস না!

    হাসি মেয়েটাকে খাটে শুইয়ে দিয়ে এসে বলল, একশবার করব। মুরদ থাকে ত সামলিও।

    কুম্ভ কেমন বিচলিতবোধ করে। কাবুলের দিকে তাকিয়ে বলল, সব যাবে। তুই জানিস লক্ষ্মীর পট কিনে দিয়ে সে কি করতে চায়?

    —সে তুমি বোঝগে। আমার সময় নেই বোঝার কে কি করতে চায়।

    কাবুল বুঝতে পারছে বিষয়টা তাকে নিয়ে নয়। নতুন ম্যানেজারবাবুকে নিয়ে। অতীশ হাসিকে লক্ষ্মীর পট কিনে দেবে বলেছিল। সেদিন গাড়িতেই যেন কথাটা হয়েছে। অতীশকে হাত করার জন্য সঙ্গে হাসিকেও নিয়েছিল কুম্ভ। কাবুল কিছুটা রেগে গিয়েই বলল, তা কিনে দিলেই পারিস। হাসি একটা ঘরে লক্ষ্মীর পট বসাতে চায়, তা করে দিচ্ছিস না কেন? ঠাকুর দেবতা বলে কথা।

    ঠাকুর দেবতাই সম্বল কুম্ভর। তার এতে সায় যে নেই তা নয়। কিন্তু যে মানুষটা তার উপার্জনে বাগড়া দিয়ে যাচ্ছে, তার অমঙ্গল কামনা করছে, সেই মানুষের পরামর্শমত লক্ষ্মীর পট কেন আসবে বাড়িতে।

    কুম্ভ বলল, আরে তুই মেয়েছেলে, লোকটা তোর কোন উপকারে লাগে বুঝিস না! কেবল কেড়ে নিতে এসেছে। গয়নাগাটি পরে খ্যামটা নাচ এবারে তোর বের করে দেবে! এতবড় সুযোগ নাহলে হাতছাড়া হয়। সময় খারাপ যাচ্ছে কাবুল। তুই যে বলছিলি, আমার হাতটা কাকে দিয়ে দেখাবি। পাথর-টাথর ধারণ করলে গ্রহের কোপ কমে যায়। সব গ্রহের দোষে হচ্ছে বুঝি। কিন্তু কি করব বল। তুমিও তো শালা কোন কম্মের নও। তোমার দাদাটি আর এক নপুংসক।

    কাবুল এতক্ষণে কুম্ভর জ্বালাটা কোথায় বুঝতে পারছিল। দাদাকে টেনে আনায় সে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছে। আজ কিছু একটা হয়েছে। কি হয়েছে সেটা সে আন্দাজ করতে পারল। ভেবেছিল কুম্ভ বাপকে দিয়ে কাজ উদ্ধার করবে। রাতে খাবার টেবিলেই দাদা তাকে বলেছিল, বুঝছিস ভায়া দুটো দু’রকমের; একটা চোর ছ্যাঁচড়া, অন্যটা গোঁয়ার। কোনটাকে যে সামলাই। সে শুধু ফুট কেটে বলেছিল, অতীশবাবু যদি পারে করুক না। দু’নম্বরী মাল বানিয়ে কতদিন চলবে!

    আর সেই কথায় বৌদিরও সায় ছিল। বলেছিল, অতীশকে নিয়ে আসাই ভুল হয়েছে। ওর বাপ জ্যাঠাকে আমি জানি। রক্তে দোষ আছে। তাকে দিয়ে তুমি পারবে না।

    কাবুল বলেছিল, সব হবে বৌদি। ঠেলার নাম বাবাজী। এখন হচ্ছে না, পরে হবে।

    এইসব কথাবার্তা রাতে হয়েছে। সে কুম্ভর পক্ষে একটা কথাও বলেনি। কুম্ভ যে চোর ছ্যাঁচোড় সেই খবরও কাবুলই দাদার কানে পৌঁছে দিয়েছিল। আর তার কাজই এখন এটা। সে সব কনসার্নে ঘুরে বেড়ায়। নিচু মহলের লোকদের সঙ্গে মিলে মিশে যেতে পারে। এবং রাজার ভাই বলে সবাই কারখানার খবর তার মারফত সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে চায়। বাপকে দিয়ে উদ্ধার পেতে চাইছে কুম্ভ। সেয়ানা হয়ে উঠেছে। ভেবেছে তার আর দরকার নেই। এখন বোঝ, কত ধানে কত চাল। কাবুল বলল, আমাকে আগে থাকতে বলবি ত। কি হয়েছে বলবি ত!

    কুম্ভ কি ভেবে বলল, না কিছু হয়নি।

    —হয়নি ত শালা অফিস যাসনি কেন! এসেই বৌ-এর ওপর হম্বি-তম্বি করছিস কেন?

    —মানুষের শরীর খারাপ হতে পারে না!

    —তোমার শরীর খারাপ! তালেই হয়েছে।

    —কেবল রাজ-রাজড়ার বুঝি শরীর খারাপ হয়!

    কাবুল বুঝতে পারল, আবার শালা দাদাকে টেনে আনবে। পরে বৌদিকে। বৌদির সঙ্গে অতীশের বাল্যপ্রণয় ছিল কিনা, তাও কুম্ভ অনায়াসে বলে যেতে পারে। মুখে ওর কিছু আটকায় না। মর্জি মত কাজ না হলেই সব মানুষ ওর কাছে খারাপ। কাজ উদ্ধারের জন্য সবকিছু করতে পারে। না পারলে দুনিয়া শুদ্ধু লোক তার কাছে ইতর এবং ধান্দাবাজ। সেই লোক এখন বারান্দার এক কোনায় গুম মেরে বসে আছে।

    টেবি তখনই এল একঠোঙা সিঙাড়া নিয়ে। কাবুল হাসির দিকে তাকিয়ে বলল, কুম্ভকে দাও।

    কুম্ভ টেবির দিকে শুকিয়ে বলল, নারে আমি খাব না। তোরা খা। দাঁতে ব্যথা।

    —আরে খা খা। মাথা গরম করিস না। মাথা গরম করলে কাজ হয় না। এই হাসি, দাও না। তোমাকে দিতে বলছি না। খেলেই দাঁত ব্যথা সেরে যাবে।

    কুম্ভ দেখল, হাসি দুটো প্লেটে দুটো করে কচুরি একটা করে সিঙিড়া রাখছে। একটা কুম্ভর দিকে ঠেলে এগিয়ে দিল। এত অবহেলা। কুম্ভর মাথার রক্ত উঠে গেল। বদমায়েশ মেয়েমানুষ, তুই আমার বৌ, না কাবুলের। তার কথায় আমাকে ঠেলা মেরে প্লেট এগিয়ে দিস। প্রায় লাথি মেরে প্লেটটা ছিটকে ফেলে দিত। কিন্তু তখনই কাবুল প্রায় দৈব বাণীর মত বলল, আমি ত আছি। আমাকে বললি না কেন। দু-নম্বরী মাল করাতে চাস, কোম্পানি বসে যাবে, তোর ভয়, সব বলবি ত।

    কুম্ভ আর পারল না। ক্ষোভে দুঃখে চোখে জল এসে গেছিল প্রায়। সর্বত্র সে মার খাচ্ছে। ঘরে বাইরে। কাবুল যদি পারে। সে বলল, রাজার বাপের সাধ্যি নেই কারখানাকে বাঁচাতে পারে। ওটাতে কি আছে। ছাপা বার্নিশ কত সেকেলে। দু’নম্বর মাল লোকে করাবে না’ত, এক নম্বরী করাতে যাবে! তোমার দাদা জানে না, যা ছাপা বার্নিশ তাতে এক নম্বরী মালও দু-নম্বরী হয়ে যায়। খদ্দেররা দায়ে পড়ে এখানে আসে। সস্তায় মাল পাবে বলে আসে। এদিকে গোড়া কেটে আগায় জল ঢালছে শুয়োরের বাচ্চা।

    শুয়োরের বাচ্চা কথাটা অতীশকে উপলক্ষ করে। তার দাদাকে নয়। এতেই কাবুল কিঞ্চিৎ খুশি। যাক সুমতি হয়েছে কুম্ভর। সে বলল, নে এবার খাত। হাসি তোমার জন্য রেখেছ ত!

    —রেখেছি।

    কুম্ভর এটাও জ্বালা। কোনও মান অপমান নেই। ঠিক নিজের জন্য রেখে দিয়েছে। কেবল খাব খাব করে। স্নানটান করে দুপুরের খাবার খাবি কোথায়, তা না কাবুলকে দিয়ে এক ঠোঙা গরম কচুরি সিঙাড়া আনিয়েছে। আমি কি তোকে কিছু খেতে দি না। তোর এত রস!

    কাবুল বলল, কিরে খা। তুই না খেলে খাই কি করে। ও টেবি নে, তুই একটা নে। কাবুল নিজের প্লেট থেকে টেবিকে একটা তুলে দিল।

    কুম্ভ এখন খাচ্ছে। কচুরিতে কামড় বসিয়ে বলল, তোর দাদাকে বুঝিয়ে বলিস। খুবই ভুল করল। বলিস এগ্রিমেণ্ট আমাকে দিয়েছে ফয়সালা করার জন্য। নতুন বাবুর সেই মুরদটিও নেই। কারখানার লোকেরা সব ক্ষেপে আছে। মাইনে বাড়িয়ে ওভারটাইম বন্ধ করার তালে আছে, ওরা তো নেকু নয় যে ম্যানেজারের ফন্দি ফিকির বুঝবে না।

    কাবুলের বলতে ইচ্ছে হল, তুই একটা পয়মাল! কিন্তু বলল না। রাগ করবে। রাগ পড়ে আসছে। পড়ে আসবেই। কুম্ভ আরও সব গড় গড় করে বলার জন্য জল খাচ্ছে। দাঁতে ব্যথা-ফেতা কিছু নেই। কাবুল এগিয়ে বসল। বলল এগ্রিমেণ্ট তোকে দিল কেন!

    এই দেখ না। বলে কুম্ভ উঠে গিয়ে ব্যাগ থেকে এগ্রিমেন্টের দু-কপি বের করল। দেখল কিছু তারপর বাইরে এসে বলল, আমাকে দিয়েছে। পারে নি। ভেবেছিল একাই করবে। দু-চারবার কথা বলে বেপাত্তা। কি করি, এই দেখ না। তবে ভাই আমি চেষ্টা করব। সাধ্যমত করব। সে বলতে গেছিল, এটা নিয়ে ল্যাজে খেলাব, কিন্তু কি ভেবে বলল না। ভেতরের কথা সে কাউকে আর বলবে না। বৌটা যার বিশ্বাসঘাতক, সে আর অন্যকে বিশ্বাস করে কি করে! সবাইকে আপন ভেবে সে ঠকেছে।

    কাবুল বলল, তুই পারবি। সেটা দাদা জানে। বোঝে।

    —এইত মুশকিল, কাজ করব আমি বাগড়া দেবে তুমি। আমি ত’ মানুষ।

    কাবুল চা সিঙাড়া সব খেয়ে ফেলেছে ততক্ষণে! হাসি মেয়েটাকে কাবুলের কোলে দিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। কুম্ভ গুম মেরে গেল ফের। ওর কোলে দিতে পারত হাসি! সে তোর কে রে!

    কাবুল উঠে এসে মেয়েটাকে কুম্ভর কোলে ফেলে দিল, নে ধর। বাপ হবি তুই, সামলাব আমি। বেশ মজা।

    মেয়েটাকে কোলে নিতেই কি যে হয়ে যায় কুম্ভর। কারো ওপর আর কোন যেন অভিমান থাকে না। সে মিথ্যে সংশয়ে ভুগছে। হাসিরাণী পায়ে ধরে একদিন বলেছিল, তোমাকে ছাড়া আমি কিছু জানি না। আমার আর কে আছে! বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছিল। গরীব ঘরের মেয়ে বলেই এই হেনস্থা। এবং তখন কুম্ভ হাসিরাণীর মাথা কোলে নিয়ে বার বার চুমু খেয়েছে, অভিমান ভাঙিয়ে বলেছে—তুমি ত বোঝ হাসি, তোমাকে বাদে আমি সর্বহারা। তুমি ছাড়া আমারও কেউ নেই। তারপর দু’জনেই ফিক করে হেসে দিয়েছিল। আলো জ্বেলে হাসি যাত্রার সখির মত সাজতে বসেছিল। যখন সব হয়ে যায়, নিশুতি রাত, ঘুম, নাক ডাকিয়ে লম্বা ঘুম। কুম্ভর পাশে হাসিরাণী। একেবারে খালি গা হাত পা, শরীর ভাঁজ করে পড়ে আছে। সন্তানের জনকজননী হতে গেলে এ সবই লাগে। কুম্ভ সকালে ওঠার সময় চাদরটা শরীরে টেনে দেয়। বড় ভয়ংকর লাগছিল তখন হাসিকে। মেয়েমানুষ সব পারে সুতরাং কুম্ভ নিশীথে একরকম, সকালে একরকম, সকালে তার কালীকবচ পাঠ, প্ৰাতঃস্নান, কালী কলকাত্তাওয়ালির ফটোর সামনে বসে অসুর নাশিনীর ধ্যান। তারপর, দিগ্বিজয়। আজ তার বাধা পড়েছে। সে যেন হত্যা দিতে এসেছে অসুর নাশিনীর কাছে। সেটা কে? হাসি না বৌরাণী! সে কেন জানি বুঝতে পারল, হাসি হলেও নিস্তার নেই, বৌরাণী হলেও নেই। কিন্তু সে জানে, কত ধানে কত চাল। সেটাই তার সম্বল।

    সেই সম্বল নিয়েই কুম্ভ কথা শুরু করল কারখানার কর্মীদের সঙ্গে। কথাবার্তার সময় সে আর মনোরঞ্জন! সে বলেছে, বেশি লোকের দরকার নেই। কোম্পানির পক্ষে সে, কর্মীদের পক্ষে মনোরঞ্জন। কথাবার্তা শুরু হল এইভাবে—

    —আরে মনোরঞ্জন! এস এস। খবর কি! তোমার বড় ছেলে এখন কি করছে?

    —কিছু তো করছে না।

    —কিছু না করলে চলবে কেন?

    —কোথায় পাবে বলুন।

    কুম্ভর ঘরে মনোরঞ্জন বাদে এখন কেউ নেই। অতীশবাবুর ঘরে দুজন কাস্টমার। পাশের ঘরে দুজন অ্যাসিস্ট্যাণ্ট কাজ করছে। মেশিনপত্র চললে, এমনিতেই কিছু শোনা যায় না। তাদের কথা অন্য কেউ শোনার চেষ্টা করলেও শুনতে পাবে না। কারণ কুন্তু প্রত্যেক ঘর থেকে তার ঘরের দূরত্ব এবং ধ্বনিতরঙ্গ কখন কতটা তারতম্য হয় সব মাপজোক করে বসে আছে। কোথা থেকে কতটা শোনা যায় সে জানে। তাকে এজন্য সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। সে বলল, রাজার কাছে বলব তোমার ছেলের কথা।

    —কুম্ভবাবু!

    কুম্ভ চোখ তুলে চাইল।

    —আপনি ত অ্যাগ্রিমেন্টে রাজি হতে বারণ করেছেন!

    —করেছি। দরকার বুঝেছিলাম বলে করেছি। তারপরই কুম্ভ কি বলবে ভেবে পেল না। মনোরঞ্জন মুখের ওপর স্পষ্ট কথাটা শুনিয়ে দেবে সে আন্দাজ করতে পারেনি। সে মনে মনে বলল, আমি কুম্ভকুমার আমার ডরালে চলবে কেন! ঘাবড়ে গেলে চলবে কেন! সে একটা ফস করে পকেট থেকে সিগারেট বের করে মনোরঞ্জনকে দিয়ে বলল, ধরাও। মনোরঞ্জন তার চেয়ে বয়সে বড়, লম্বা ঢ্যাঙা। শুধু হাড় ক’খানা সম্বল করে কাজ করছে। কুম্ভর হাড় মাস দুই আছে। কুম্ভ-ই প্রবল প্রতিপক্ষ। সুতরাং সেভাবেই বলল, রাজার মেজাজ ভাল না। বড়বাবু কানে কি ফুসমন্তর দিয়েছে, কে জানে। রাজা বলেছেন, মাল না বাড়ালে কোম্পানি ক্লোজ করে দেবে। আমি চাইছি আপাতত সেটা বন্ধ করতে। তোমরা মেনে নাও। পরে কত অজুহাত পাবে। যদি দেখ ওভারটাইম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন সুযোগ বুঝে কোপ বসাবে।

    —দেখুন কুম্ভবাবু, একজন বিবেচক মানুষের মত সে বলল, ওভারটাইম আছে বলে ছেলে মাগ নিয়ে বেঁচে আছি। না থাকলে শুকিয়ে মরব।

    —কেন মাইনে বাড়ছে!

    —সেটা আর কত! ওতে হেলপারদের পোষাতে পারে, আমাদের পোষাবে না। আমাদের দিকটা আর একটু দেখুন।

    কুম্ভ বলল, এখন আর তা হবে না। তোমাদের কথা দিচ্ছি পরে হবে। অ্যাগ্রিমেণ্ট দু-বছরের। দেখই না কি দাঁড়ায়।

    মনোরঞ্জন জানে, হেলপাররা একপায়ে খাড়া। আরও যারা বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে তারাও রাজি। কেবল তার মত মোল্লারা বাধ সাধবে। কিন্তু যদি ছেলেটার কিছু হয়ে যায়, যদি পরে অজুহাত সৃষ্টি করা যায়। কুম্ভবাবু তো বলেই দিয়েছেন, তোমাদের অজুহাতের শেষ নেই। দরকার মনে করলে এটা ওটা খারাপ দেখিয়ে যেমন খুশি মাল দিতে পার। বড়বাবুরও বলার কিছু থাকবে না। রাজাকেও কচু দেখানো গেল।

    মনোরঞ্জন বলল, একটা দিন আমাদের ভাবতে দিন।

    পরদিন কুম্ভবাবু এসে অতীশের ঘরে ঢুকে বলল, ওরা রাজি। সুতরাং মিঞাবিবি যখন রাজি তখন শুভদিন দেখে সেরে ফেলা ভাল।

    অতীশের মনে হল লোকটা ভোজবাজি জানে! কুম্ভর মনে হল সে দিগ্বিজয়ী। সে তার মত করে সই করিয়ে নিচ্ছে। কোম্পানির কি থাকল সেটা বড় নয়, আসল কথা সে এই কোম্পানির কত অপরিহার্য মানুষ রাজা এবার ভেবে দেখুক।

    অতীশকে খুবই তখন ম্রিয়মান দেখাচ্ছিল। সে ভাবছিল, তার মত অপদার্থ লোক কতদিন এভাবে কাজ চালিয়ে যাবে। কারখানায় এলে নরকে ডুব দিতে হয়, সেটা যদি সে আগে জানত। শীত পার হয়ে গ্রীষ্ম আসতেই সেটা আরও টের পেল অতীশ। কুম্ভ একদিন মুখের ওপরই এসে বলল, দাদা, আপনাকে নিয়ে আর পারা যাবে না। কত মাইনে পাই খদ্দেররা জানবে কেন? আপনি নিজের সম্পর্কে কি ভাবেন! সত্যি কথার ভাত আছে। মর্যাদা আছে। এত কম মাইনে পাই, সেটা বলার দরকার কি! লোকে শুনলে কি ভাববে!

    অতীশ কি কথায় কথায় যেন সেদিন একজন খদ্দেরকে কথাটা বলে ফেলেছিল। সে ত জানে না, কুম্ভবাবু অন্যরকম বলেছে। সে বলল, যা পাই তাইত বলব!

    এতে আপনার সম্মান বাড়ল! আপনি এই পেলে আমরা কি পাব, ওরা টের পাবে না। তিনগুণ বাড়িয়ে বলি, সেটা আপনার দিকে চেয়ে, কারখানার কথা ভেবে, রাজার মানসম্মান যায় বলে। আপনি সেটাও বোঝেন না!

    অতীশের মনে হল, সে ঠিক পৃথিবীর মানুষ না। সে যে পরিমণ্ডল থেকে এসেছে, সেখানে এইসব তাকে শেখানো হয়নি। মাইনের সঙ্গে একটা মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন থাকে সেটাও সে ভাল করে ভেবে দেখেনি। চারপাশটা সেই অজানা সমুদ্রের চেয়েও ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে তার। সেখানে জীবনমৃত্যু অহরহ সামনাসামনি হাজির। এখানে জীবনমৃত্যুর চেয়ে আরও বেশি কিছু কঠিন সত্য হাজির। দিন যত যায় আচ্ছন্নতা তার তত বাড়ে।

  • হরিদাসের গুপ্তকথা

    হরিদাসের গুপ্তকথা

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    গ্রন্থপরিচয়

    ‘হরিদাসের গুপ্তকথা’ নামের বইটি বেশ দুষ্প্রাপ্য। বইটি সম্পর্কে অনেকের ধারণা যে এটি বোধহয় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আপাত নিষিদ্ধ ধরনের কোন বই। কিন্তু বইটি এককালে বেশ জনপ্রিয় ছিল। বইটির লেখক শ্রীভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩১০ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ মোটামুটি ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে। নিঃসন্দেহে বইটি তারও আগে লেখা হয়েছিল। আর কাহিনীর ঘটনাক্রম তারও বেশকিছু বছর আগেকার। উপন্যাসটি চার খণ্ডে বিভক্ত।

    কাহিনীর নায়ক হল হরিদাস নামের একটি ছেলে। কাহিনীর আরম্ভের সময়ে তার বয়স চোদ্দ বছর। মোটামুটি হিসাব করে দেখা যায় তার জন্ম ইংরেজি ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে। হুগলি জেলার সপ্তগ্রামে চোদ্দ বছর বয়েসে হরিদাসের যাত্রা শুরু হয় এক গ্রামের পাঠশালা থেকে। সে নিজের কোন পরিচয় জানত না। পাঠশালার গুরুমশাইয়ের বাড়িতে সে লালিত। গুরুমশাইয়ের মৃত্যুর পর সে বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচিত হতে বাধ্য হয়। এরপর সাত-আট বছর নানা ঘটনার ঘনঘটার মধ্যে দিয়ে এই দরিদ্র সহায় সম্বলহীন অনাথ বালক কিভাবে নিজের পরিচয় জানল এবং পরিশেষে বিরাট ধনী জমিদারে পরিণত হল তারই রোমাঞ্চকর আখ্যান এই বই।

    উপন্যাসটিতে হরিদাসের নায়িকাও উপস্থিত। তার নাম অমরকুমারী। নানা বিপত্তি পেরিয়ে শেষ অবধি হরিদাস এবং অমরকুমারীর মিলন হয়।

    উপন্যাসটিতে প্রচুর চরিত্র। উপন্যাসের শেষপ্রান্তে এসে প্রতিটি চরিত্রেরই পরিণাম দেখানো হয়েছে। নানা রকম নাটকীয়তায় ভরপুর এই উপন্যাস। শেষে এসে সব কিছুকেই একটি বিন্দুতে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব রহস্যেরই সমাধান করা হয়েছে। বইটিকে একটি অ্যডভেঞ্চারের গল্প বললেও ভুল হয় না। প্রায় ৬৮০ পাতার বইটিতে প্রচুর রোমাঞ্চকর ঘটনার সন্নিবেশ ঘটেছে। নানা রকম চুরি, ডাকাতি, জালিয়াতি, খুন-খারাপি, আত্মহত্যা, কিডন্যাপিং, পুলিশ-দারোগা, মামলা-মোকদ্দমা, ভূতুড়ে ঘটনা এবং ষড়যন্ত্রের ঘটনায় ঠাসা। সিপাহী বিদ্রোহের চাক্ষুষ বর্ণনাও এতে স্থান পেয়েছে।

    ঊনবিংশ শতকের বাঙলি এবং ভারতীয় জীবনের নানা বিচিত্র ঘটনার বর্ণনা এতে রয়েছে। এর সাথে আরো যুক্ত হয়েছে নানা রকম কেচ্ছা এবং ব্যাভিচারের ঘটনা। এবং প্রেমের ঘটনাও কিছু কম নেই। তখনকার সমাজব্যবস্থার একটি বাস্তব চিত্র দেখা যায়। বাঙালি বাড়িতে ব্যভিচারের ঘটনা যে কত বেশি ছিল তার বর্ণনা পড়লে অবাক হতে হয়। অনেক পুরুষই কোন আত্মীয় মহিলার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক রাখতেন এবং অনেক সময়ে বিপদে পড়লে তাদের নিয়ে গৃহত্যাগও করতেন। বেশিরভাগ সময়েই তাঁরা বারাণসীর মত কোন তীর্থস্থানে গিয়ে নাম পরিচয় এবং সম্পর্ক ভাঁড়িয়ে থাকতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক সম্মানও আদায় করতেন।

    লেখক লিখছেন যে– “বাঙ্গালীদলের বেশী কলঙ্ক। জাতিতে জাতিতে, জাতিতে বিজাতিতে, সম্পর্কে সম্পর্কে, সম্পর্কে নিঃসম্পর্কে, বাঙ্গালী নর-নারী পাপলিপ্ত হলেই নিরাপদের আশাতে কাশীতে পালিয়ে আসে; মাতুলের ঔরসে ভগিনী-পুত্রী, পিতৃব্যের ঔরসে ভ্রাতৃকুমারী, ভ্রাতার ঔরসে বিমাতৃকুমারী, ভাগিনেয়ের ঔরসে মাতুলানী, জামাতার ঔরসে শ্বশ্রু-ঠাকরানী, শ্বশুরের ঔরসে যুবতী পুত্রবধূ গর্ভবতী হলেই কাশীধামে পালিয়ে আসে! গর্ভগুলি নষ্ট কোত্তে হয় না, কাশীর পবনের প্রসাদে বংশ-রক্ষা হয়।”

    মনে রাখতে হবে এই বর্ণনার সময়কাল ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহেরও আগের! খুনোখুনির ঘটনাও বেশ কিছু আছে। আর আছে সেই সময়ের ভালো-খারাপ পুলিশ এবং বিচার ব্যবস্থার বর্ণনা। উপন্যাসটিতে পুলিশকে বেশ করিৎকর্মা হিসাবেই দেখানো হয়েছে। তবে তারা যে উৎকোচ গ্রহনেও সিদ্ধহস্ত তার ঈঙ্গিতও রয়েছে।

    কাহিনীর পটভূমিকাও বদলেছে বারে বারে। তৎকালীন ভারতবর্ষের নানা তীর্থস্থানের বর্ণনাও এতে রয়েছে। পশ্চিমের গুজরাট থেকে আরম্ভ করে পূর্বের ত্রিপুরা পর্যন্ত উপন্যাসটির ব্যাপ্তি। কাহিনী ছুঁয়ে গেছে ভারতের বিভিন্ন শহর যেমন বরোদা, আমেদাবাদ, আগ্রা, মথুরা, বৃন্দাবন, পাটনা, বারাণসী, কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, ঢাকা, বর্ধমান, কানপুর, গৌহাটি। এই কাহিনী যে সময়ের সেই সময়ে ভারতে রেলপথ ছিল না বা সবে স্থাপিত হতে আরম্ভ করেছে। তাই বিভিন্ন স্থানে যাওয়াও অনেক কষ্টকর ছিল এবং তাতে বিপদের ভয়ও ছিল যথেষ্ট।

    হরিদাসের নিজের বক্তব্য ও মন্তব্য থেকে লেখকের ব্যক্তিতের বিষয়েও জানতে পারি। ইংরেজ শাসন বিষয়ে তিনি বেশ খুশি তবে সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে তিনি উভয় পক্ষেরই নৃশংসতার জন্য সমালোচনা করেছেন। রানী ভিক্টোরিয়াকে তিনি ভক্তি করতেন। তিনি ছিলেন বাল্যবিবাহ এবং জাতিভেদ প্রথার একজন সমর্থক। এবং অসবর্ণ বিবাহ প্রথার বিরোধী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সৎ এবং উপকারী।‘হরিদাসের গুপ্তকথা’ একটি উপন্যাস হলেও পড়লেই বোঝা যায় যে এটির পিছনে অনেক সত্য, লেখকের নিজের চোখে দেখা ঘটনাও রয়েছে। এটিকে একটি ঐতিহাসিক বিবরণও বলা যায়। তাই ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগের একটি চমৎকার বর্ণনা আমরা পাই।

  • ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    সাহিত্যিক ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (১৮৪২-১৯১৬) একজন বাঙালী অনুবাদক, সম্পাদক, সাহিত্যিক। তিনি ১৮৪২ সালের ১০ জুলাই মাতামহাশ্রম চব্বিশ পরগণার অন্তর্গত বারুইপুর সন্নিহিত শাসন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যে ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রধানত মিশনরী স্কুলে অধ্যয়ন করেন।

    অল্প বয়স হতেই তাঁকে অন্নসংস্থানে মনোযোগী হতে হয়। স্কুলের পাঠ সমাপ্তির পর তিনি বারুইপুরের সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের তৃতীয় শিক্ষকের পদে অধিষ্ঠিত হন। সময় সময় তিনি গৃহ শিক্ষকের কাজ করে জীবিকা অর্জ্জন করেন।

    উনবিংশ শতকের শেষে যে কয়জন গদ্য লেখক ও অনুবাদক বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে তুলেছেন ভুবনচন্দ্র তাদের মধ্যে অন্যতম একজন। অনুবাদকর্মে তিনি বিশেষ কৃত্বিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর অক্লান্ত লেখনি বাঙালিকে বৈদেশিক গল্পের একান্ত দেশিরূপের স্বাদ এনে দিয়েছে। ইংরেজি ভাষায় তাঁর প্রগাঢ় বুৎপত্তি থাকা সত্ত্বেও মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার টানে বাংলা সাহিত্যে তিনি মনোনিবেশ করেন।

    ভুবনচন্দ্র কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রতিষ্ঠিত বিদ্যোৎসাহিনী সভার লিপিকার ছিলেন। সম্পাদক কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘পরিদর্শন’ দৈনিক পত্রিকায় ভুবনচন্দ্রের অনেক কবিতা প্রকাশিত হ’ত। ১৮৬২ সালে ভুবনচন্দ্র উক্ত পত্রিকার সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে প্রধানত গ্রাহকগণের অনাদরের কারণে কালীপ্রসন্ন সিংহ ‘পরিদর্শক’ পত্রিকার প্রচার বন্ধ রাখেন। কিন্তু ভুবনচন্দ্রের প্রতি তিনি প্রসন্ন থাকায় তাকে ভাল চাকরি পাইয়ে দিবেন এ আশ্বাসে তাঁর নিকট রাখেন। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্‌শা’ ১ম খণ্ড প্রচারের অব্যবহিত পরেই ভুবনচন্দ্র পুনরায় কালীপ্রসন্ন সিংহের আশ্রয় লাভ করেন। দুবছর পর তিনি স্বয়ং কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোমে’র আদর্শে ‘সমাজ কুচিত্র’ নামে একটি সামাজিক নক্‌শা প্রকাশ করেন। তিনি এটি ‘সাহসের অদ্বিতীয় আশ্রয় অনরেবল হুতোম’কে উৎসর্গ করেন। ছদ্ম নামে প্রকাশিত হলেও প্রকৃতপক্ষে এটাই ছিল ভুবনচন্দ্রের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। অনেকের মতে কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোম প্যাঁচার নকশার অনেক রচনা তার লেখা।

    পরে তিনি সোমপ্রকাশ পত্রে দেড় বছর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সম্ভবত ১৮৬৮ সালে তিনি সংবাদ প্রভাকরের সহকারী সম্পাদক পদে যোগদান করেন। উক্ত পদে তিনি দীর্ঘ ২২ বছর কর্মরত ছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি বিদূষক (১৮৭০) ও পূর্ণশশী (১৮৭৩) নামে দুটি মাসিকপত্র সম্পাদন করেন। ১৮৫৭ সালে তিনি সাপ্তাহিক বসুমতী (১৮৯৬) পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৯৮ সালে পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিকট তিনি উক্ত দায়িত্ব অর্পণ করে বসুমতীর গ্রন্থপ্রকাশ বিভাগে যোগদান করেন। কিন্তু সম্পাদকীয় বিভাগ থেকে তিনি পুরোপুরিভাবে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। তাছাড়া তিনি ১৯০০ সালে প্রকাশিত জন্মভূমি মাসিক পত্রিকার ১১শ ভাগের (১৩০৯) প্রথম কয়েক সংখ্যার সম্পাদকের কাজ করেন। উক্ত পত্রিকায় তাঁর অনেক কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ ছাপা হয়।

    বাংলা সাহিত্যের সব বিভাগেই ভুবনচন্দ্র তাঁর কৃতিত্বের সাক্ষর রেখেছেন, তিনি সারাজীবন দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও সাহিত্য চর্চা থেকে নিবৃত্ত হননি। তাঁর রচিত কাব্য, গল্প-উপন্যাস, সামাজিক নক্‌শা, প্রহসন, ইতিহাস, জীবনী, ভ্রমণ কাহিনী রয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: সমাজ-কুচিত্র (১৮৬৫), তুমি কি আমার (উপন্যাস, ১৮৭৩-৭৯), মধু-বিলাপ (অমিতাক্ষর কাব্য, ১৮৭৩), রহস্য-মুকুর (উপন্যাস, ১৮৮৩), ঠাকুরপো (প্রহসন, ১৮৮৬), তুমি কে (অমিতাক্ষর কাব্য, ১৮৮৭), বঙ্কিমবাবুর গুপ্ত কথা (উপন্যাস, ১ম খণ্ড-১৮৯০, ২য় খণ্ড-সম্বৎ ১৯৪৭), গুপ্তচর (ডিটেকটিভ উপন্যাস, ১৮৯৮), মহাদেবের মাদুলী (রঙ্গরচনা), রামকৃষ্ণ-চরিতামৃত (১৯০১), চন্দ্রমুখী (ডিটেকটিভ গল্প, ১৯০২), ধর্ম্মরাজ (সচিত্র সমাজ-রহস্য, ১৯০৯), লণ্ডন রহস্য (অনুবাদ), বিলাতী গুপ্তকথা, স্বদেশ বিলাস, রামকৃষ্ণচরিতামৃত, বাবুচোর, প্রভৃতি। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন “মায়াকানন” নামে ট্রাজেডি নাটক অসমাপ্ত রেখে মাইকেল মধুসূদন দত্ত মৃত্যুবরণ করলে ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায় নাটকটি সম্পূর্ণ করেন।

    ১৮ জুলাই ১৯১৬ সালে ভুবনচন্দ্রের মৃত্যু হয়।