Category: অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

  • নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে

    নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে

    নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে, লেখক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়; প্রচ্ছদ শিল্পী পূর্ণেন্দু পত্রী, প্রথম প্রকাশ এপ্রিল ১৯৭১; প্রথম অখণ্ড সংস্করণ : জানুয়ারী ১৯৯৯। উৎসর্গ— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এবং আমার মাকে।

    নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে হল অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত একটি জনপ্রিয় বাংলা উপন্যাস। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের দেশভাগ নিয়ে লেখা বাংলা উপন্যাসের মধ্যে অন্যতম সেরা উপন্যাস হিসাবে বিবেচিত। দেশভাগজনিত বহু সমস্যার অনবদ্য মানবিক দলিল এটি। রচনা কাল ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ। কলকাতার “করুণা প্রকাশনী” হতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে প্রথম প্রকাশিত হয়।

    প্রেক্ষাপট
    পূর্ব বাংলার বর্তমানে বাংলাদেশের এক গ্রাম এর কেন্দ্রীয় ভূগোল। সেখানকার সাধারণ মানুষ, হিন্দু মুসলমানের পারস্পরিক সম্পর্ক, জমিদার ও প্রজার সম্পর্ক আর সেই সঙ্গে সমস্ত গ্রাম্য প্রকৃতি, গাছপালা, পশুপাখি নিয়ে রূপায়িত হয়েছে গভীর মমতায়। বহু বিচিত্র চরিত্রের সন্নিবেশ, তাদের নানা বৃত্তির নানা মানসিকতা পরিস্ফুট হয়েছে। ঔপন্যাসিকের লুপ্ত অতীতের প্রতি বেদনা আর স্মৃতিমেদুর জগতের বিবরণ বর্ণিত হয়েছে চারশত বারো পৃষ্ঠার এই বইতে।

    নামকরণ
    উপন্যাসের মাঝে কয়েকবার ঘুরে ফিরে এসেছে নীলকণ্ঠ এক পাখির কথা, অবশ্যই রূপক হিসাবে। মানুষের চিরকালের না-পাওয়ার আর্তি – ওই পাখি। মানুষ তার মনের গোপন কামনাবাসনার জন্য, সুখ-দুঃখে গড়া জীবনে সবসময় এক নীল রঙে গড়া পাখির সন্ধানে ঘুরে ফেরে। উপন্যাসের চরিত্রেরা কখনো সমুদ্রের অসীম নীলে, উদ্বাস্তু কলোনির বাঁশঝাড়ে, পুকুরপাড়ের অর্জুন গাছে ক্ষণিকের জন্য সেই নীল পাখির দেখা পান। মহেন্দ্রনাথও প্রতিনিয়ত সেই নীলকণ্ঠ পাখি খুঁজে চলেন। হাতের তালি বাজিয়ে সেই পাখিকে ফেরানোর চেষ্টা করেন। পাখি ফেরে না ….. আকাশ নীল, স্বচ্ছ জল নীল, প্রকৃতির মাঝে এই রহস্যময় নীলে ঠাকুরদার আত্মাও নীল। নীলের অসীম গভীরতায়, বেদনাহত মুখও নীলবর্ণের। দেশভাগের যন্ত্রণা লেখকের সত্তাকে যে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল অনুভবী পাঠককে সেই ‘নীল সত্য’ কে উপলব্ধি করার অবসর দিয়েছে উপন্যাসটি।

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরও তিনটি মহতী উপন্যাস ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, ‘অলৌকিক জলযান’ এবং ‘ঈশ্বরের বাগান’ – প্রত্যেকটি বিষয় বৈচিত্র্যে, লিখনশৈলীর ভঙ্গিতে এবং সেই বিশ্বময় ছড়ানো সেই রহস্যময় পাখিটি খুঁজে ফেরার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসাবে বাংলা সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে। এগুলি ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ সিরিজের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্ব হিসাবে বিবেচিত।

    উপন্যাসটির প্রাপ্তি
    উপন্যাসটি কেবল বাংলা সাহিত্য জগতে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে তাই নয়,ভারতীয় সাহিত্যকেও সমৃদ্ধ করেছে। ভারতের ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট-এর উদ্যোগে এটি ক্লাসিক পর্যায়ে উন্নীত এবং বারোটি মূল ভারতীয় ভাষায় এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ‘শরৎ পুরস্কার’ এবং ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে এই উপন্যাসটির জন্য লেখক আই.আই.পি.এম প্রবর্তিত “সুরমা চৌধুরী আন্তর্জাতিক স্মৃতি পুরস্কার” লাভ করেন যার সাম্মানিক মূল্য দশ লক্ষ টাকা।

    বিদ্বজ্জনের প্রতিক্রিয়া
    সাহিত্যিক বিমল কর লিখেছেন—
    অতীনের সেরা লেখা, এর মধ্যে অতীনের সত্তা ডুবে আছে, আমরা যাকে বলি ভর পাওয়া লেখা।

    অশোক মিত্রের মতে—
    পুতুলনাচের ইতিকথা’র পর এতটা আর অভিভূত হই নি।

    সমরেশ মজুমদার ও শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে—
    এই সময়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।

  • প্রথম খণ্ড

    প্রথম খণ্ড

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    প্রথম খণ্ড

    দেশভাগ নিয়ে ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ সিরিজের চারটি পর্ব। প্রথম পর্ব ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’, দ্বিতীয় পর্ব ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, তৃতীয় পর্ব ‘অলৌকিক জলযান’, চতুর্থ পর্ব ‘ঈশ্বরের বাগান’। কিংবদন্তী তুল্য উপন্যাস ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ সম্পর্কে অগ্রজ সাহিত্যিক বিমল কর লিখেছেন, ‘অতীনের সেরা লেখা, এর মধ্যে অতীনের সত্তা ডুবে আছে, আমরা যাকে বলি ভর পাওয়া লেখা। ‘পুতুলনাচের ইতিকথার পর এতটা আর অভিভূত হইনি’—অশোক মিত্র। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে এই সময়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’—শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে এই সময়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’—সমরেশ মজুমদার। সমকালের আর এক বিশিষ্ট সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ লিখেছিলেন—‘দুই বাংলার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের ঐক্যে বিশ্বাসী বলে আমার জানাতে দ্বিধা নেই যে, অতীনের এই রচনা এযাবৎকালের নজিরের বাইরে। ভাবতে গর্ব অনুভব করছি যে, আমার সমকালে এই তাজা তেজস্বী খাঁটি লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে। আজ হয়ত তিনি নিঃসঙ্গ যাত্রী। কিন্তু বিশ্বাস করি, একদা আমাদের বংশধরগণ তাঁর নিঃসঙ্গ যন্ত্ৰণা অনুভব করে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তিরস্কার বর্ষণ করবে। ‘পথের পাঁচালীর’ পর এই হচ্ছে দ্বিতীয় উপন্যাস যা বাংলা সাহিত্যের মূল সুরকে অনুসরণ করেছে।’ পাঠিকা ঝর্ণা নাগ শিবপুর থেকে লিখেছিলেন—‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ পড়ে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। ঈশ্বরের সৃষ্ট সুন্দর পৃথিবী দেখে মুগ্ধ হয়ে যেমন তার সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে কৌতুক বিস্ময় জাগে এও তেমনি।’ এমন অজস্র চিঠি এবং সাহিত্যঋণের কথা স্বীকার করা হয়েছে অন্য তিনটি পর্ব ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, ‘অলৌকিক জলযান’ এবং ‘ঈশ্বরের বাগান’ সম্পর্কেও। বিদগ্ধ এবং গুণী ব্যক্তিরা লিখেছেন, ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ যদি মহৎ উপন্যাস, ‘অলৌকিক জলযান’ তবে মহাকাব্য বিশেষ—আর ‘মানুষের ঘরবাড়ি সোনার কিশোর জীবনের অবিনাশী আখ্যান। শেষ পর্ব ‘ঈশ্বরের বাগান’–এতে আছে দেশভাগ জনিত উদ্বাস্তু পরিবারটির সংগ্রামী বিষয়, অভিনব চরিতমালা এবং পটভূমি সহ জীবনের রোমাঞ্চকর অভিযানের লৌকিক-অলৌকিক উপলব্ধি পুষ্টি খণ্ডিত বঙ্গের অখণ্ড বর্ণমালা।

    ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের পরিচ্ছেদ সমূহ—

  • এক

    এক

    সোনালী বালির নদীর চরে রোদ হেলে পড়েছে। ঈশম শেখ ছইয়ের নিচে বসে তামাক টানছে। হেমন্তের বিকেল। নদীর পাড় ধরে কিছু গ্রামের মানুষ হাট করে ফিরছে। দূরে দূরে সব গ্রাম মাঠ দেখা যাচ্ছে। তরমুজের লতা এখন আকাশমুখো। তামাক টানতে টানতে ঈশম সব দেখছিল। কিছু ফড়িং উড়ছে বাতাসে। সোনালী ধানের গন্ধ মাঠময়। অঘ্রানের এই শেষ দিনগুলিতে জল নামছে খাল-বিল থেকে। জল নেমে নদীতে এসে পড়ছে। এই জল নামার শব্দ ওর কানে আসছে। সূর্য নেমে গেছে মাঠের ওপারে। বটের ছায়া বালির চর ঢেকে দিয়েছে। পাশে কিছু জলাজমি। ঠাণ্ডা পড়েছে। মাছেরা এখন আর শীতের জন্য তেমন জলে নড়ছে না। শুধু কিছু সোনাপোকার শব্দ। ওরা ধানখেতে উড়ছিল। আর কিছু পাখির ছায়া জলে। দক্ষিণের মাঠ থেকে ওরা ক্রমে সব নেমে আসছে। এ সময় একদল মানুষ গ্রামের সড়ক থেকে নেমে এদিকে আসছিল—ওরা যেন কি বলাবলি করছে। যেন এক মানুষ জন্ম নিচ্ছে এই সংসারে, এখন এক খবর, ঠাকুরবাড়ির ধনকর্তার আঘুনের শেষ বেলাতে ছেলে হয়েছে।

    ঈশম শেষ কথাটা শুনেই হুঁকোটা ছইয়ের বাতায় ঝুলিয়ে রাখল। কলকে উপুড় করে দিল। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে বের হল। উপরে আকাশ নিচে এই তরমুজের জমি আর সামনে সোনালী বালির নদী। জল, স্ফটিক জলের মতো। ঈশম এই ছায়াঘন পৃথিবীতে পশ্চিমমুখো হয়ে দাঁড়াল। বলল, সোভান আল্লা। শেষে আর সে দাঁড়াল না। নদীর পাড় অতিক্রম করে সড়ক ধরে হাঁটতে থাকল। ধনকর্তার পোলা হইছে—বড় আনন্দ, বড় আনন্দ। সব খুদার মেহেরবানি। সড়কের দু’ধারে ধান, শুধু ধান—কত দূরে এইসব ধানের জমি চলে গেছে। ঈশম চোখ তুলে দেখল সব। বিকেলের এইসব বিচিত্র রঙ দেখতে দেখতে তার মনে হল, পাশাপাশি এইসব গ্রাম—তার কত চেনা, কতকালের মেমান সব-নিচে খাল, মাছেরা জলে লাফাচ্ছে। সে সড়কের একধারে গামছা পাতল। নিচে ঘাস, গামছা ঘাসের শিশিরে ভিজে উঠছে। সে এসব লক্ষ করল না। সে দু’হাঁটু ভেঙে বসল। খালের জল নিয়ে অজু করল। সে দাড়িতে হাত বুলাল ক’বার। মাটিতে পর পর ক’বার মাথা ঠেকিয়ে আকাশ দেখতে দেখতে কেমন তন্ময় হয়ে গেল। অঘ্রানের শেষ বেলায় ঈশম নামাজ পড়ছে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে বলে ওর ছায়াটা কত দূরে চলে গেছে। খালের জল কাঁপছিল। ওর ছায়াটা জলে কাঁপছে। কিছু হলদে মতো রঙের ফড়িং উড়ছে মাথার উপর। সূর্যের সোনালী রঙে ওর মুখ আশ্চর্যরকমের লাল দেখাচ্ছিল। যেন কোন ফেরেস্তার অলৌকিক আলো এই মানুষের মুখে এসে পড়েছে। সে নামাজ শেষ করে হাঁটতে থাকল। এবং পথে যাকে দেখল তাকেই বলল, আঘুনের শেষ ফজরে ধনকর্তার পোলা হইছে। ওকে দেখে মনে হয় তরমুজ খেত থেকে অথবা সোনালী বালির চর থেকে একটি খবর সকলকে দেবার জন্য সে উঠে এসেছে। সে সড়ক অতিক্রম করে সুপারি বাগানে ঢুকে গেল। বৈঠকখানাতে লোকের ভিড়। বাইরে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। সে প্রায় সকলকেই আদাব দিল এবং ভিতরে ঢুকে নিজের জায়গাটিতে বসে তামাক সাজতে থাকল।

    সোনালী বালির নদীতে সূর্য ডুবছে। কচ্ছপেরা ধানগাছের অন্ধকারে ঘাপটি মেরে আছে। এইসব কচ্ছপ এখন একটু শক্তমতো মাটি পেলেই পাড়ে উঠে ডিম পাড়তে শুরু করবে। অনেকগুলি শেয়াল ডাকল টোডারবাগের মাঠে। একটা দুটো জোনাকি জ্বলল জলার ধারে। জোনাকিরা অন্ধকারে ডানা মেলে উড়তে থাকল। পাখিদের শেষ দলটা গ্রামের উপর দিয়ে উড়ে গেল। নির্জন এবং নিরিবিলি এইসব গ্রাম, মাঠ। অন্ধকারেও টের পাওয়া যায়। মাথার উপর দিয়ে পাখি উড়ে যাচ্ছে। সে জানে ওরা কোথায় যায়। ওরা হাসান পীরের দরগাতে যায়। পীরের দরগায় ওরা রাত যাপন করে। শীতের পাহাড় নেমে এলে ওরা তখন দক্ষিণের বিলে চলে যাবে। ঈশম এবার উঠে পড়ল।

    .

    ঈশম ডাকল, ঠাইনদি আমি আইছি।

    দরজার বাইরে এসে ছোটকর্তা দাঁড়ালেন।—ঈশম আইলি?

    —হ, আইলাম। ধনকর্তারে খবর দিতে পাঠাইছেন? না পাঠাইলে আমারে পাঠান। খবর দিয়া আসি। একটা তফন আদাই কইরা আসি।

    ছোটকর্তা বললেন, যা তবে। ধনদাদারে কবি, কাইলই যেন রওনা দেয়। কোনও চিন্তার কারণ নাই। ধনবৌ ভাল আছে।

    —তা আর কমু না! কি যে কন! ঠাইনদি কই?

    —মায় অসুজ ঘরে। তুই বরং বড় বৌঠাইনরে বল তরে ভাত দিতে

    ঈশম নিজেই কলাপাতা কাটল এবং নিজেই এক ঘটি জল নিয়ে খেতে বসে গেল।

    বড়বৌ বলল, পাতাটা ধুয়ে নাও।

    ঈশম পাতাটার উপর জল ছিটিয়ে নিল। বলল, দ্যান।

    বড়বৌ ঈশমকে খেতে দিল। ঈশম যখন খায় বড় নিবিষ্ট মনে খায়। ভাত সে একটাও ফেলে না। এমন খাওয়া দেখতে বড়বৌর বড় ভাল লাগে। ঈশমকে দেখতে দেখতে ওর বিবির কথা মনে হল। ঈশমের ভাঙা ঘর, পঙ্গু বিবি, নাড়ার বেড়া এবং জীর্ণ আবাসের কথা ভেবে বড়বৌ-এর কেমন মায়া হল। অন্যান্য অনেকদিনের মতো বলল, পেট ভরে খাও ঈশম। একটু ডাল দেব, মাছ? অনেক দূর যাবে, যেতে যেতে তোমার রাত পোহাবে।

    ঈশম নিবিষ্ট মনে খাচ্ছে, আর হাত-দশেক দূরের অসুজ ঘরটা দেখছে। সেখানে ধনমামি আছেন, ঠাইনদি আছেন, ঈশম ঘরের কোণায় কোণায় বেতপাতা ঝুলতে দেখল। মটকিলা গাছের ডাল দেখল দরজাতে ঝুলছে। ঘরে প্রদীপ জ্বলছে। বাচ্চাটা দুবার ট্যাও ট্যাও করে কাঁদল, ভিজা কাঠের গন্ধ, ধোঁয়ার গন্ধ, ধূপের গন্ধ মিলিয়ে এ বাড়িতে একজন নবজাতকের জন্ম। টিনকাঠের ঘর, কামরাঙা গাছের ছায়া—ধনমামি, বড়মামি—এবং এ-বাড়ির বড়কর্তা পাগল, একথা মনে হতেই ঈশম বলল, বড়মামি, বড়মামারে দ্যাখতাছি না।

    বড়বৌ বড় বড় চোখ নিয়ে ঈশমকে শুধু দেখল। কোনও কথা বলল না। বললেই যেন চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসবে। ঈশম যেন এই চোখ দেখে ধরতে পেরেছে বড়মামা এখন বাড়িতে নেই। অথবা কোথায় থাকে, কই যায় কেউ খোঁজখবর রখে না। রাখবার সময় হয় না। অথবা দরকার হয় না। ঈশম ডাল দিয়ে সবক’টা ভাত হাপুস করে মাকড়সার মতো গিলে ফেলল। বড়মামি এখন কাছে নেই। বৈঠকখানায় লোক পাতলা হয়ে আসছে। বড়মামির বড় ছেলে, ধনমামির বড় ছেলে রান্নাঘরে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিচ্ছে।

    ঈশম বৈঠকখানা থেকে লাঠি নিল একটা, লণ্ঠন নিল হাতে। ঈশম মাথায় পাগড়ি বাঁধল গামছা দিয়ে। এই আঘুন মাসের ঠাণ্ডায় কাদাজল ভাঙতে হবে। খাল পার হতে হবে, বিল পার হতে হবে। গামছা মাথায় সে পাঁচ ক্রোশ পথ হাঁটবে। কোথাও খালের পাড়ে পাড়ে,কোথাও পুলের উপর দিয়ে, কখনও চুপচাপ, কখনও গাজির-গীত গাইতে গাইতে ঈশম দীর্ঘপথ হাঁটবে। ঈশম রান্নাঘর অতিক্রম করবার সময় দেখল কুয়োতলার ধারে বড়মামি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কার জন্য যেন প্রতীক্ষা করছেন। ঈশমকে দেখে বড়বৌ বলল, ঈশম দেখবে তো তোমার বড়মামাকে ট্যাবার বটতলায় পাও কিনা, তুমি তো বটতলার পথেই যাবে।

    ঈশম বাঁশঝাড় অতিক্রম করে মাঠের অন্ধকারে নেমে যাবার সময় বলল, আপনে বাড়ি যান। যাইতে যাইতে যদি পাই—পাঠাইয়া দিমু। এই বলে ঈশম ক্রমে অন্ধকার মাঠে মিশে যেতে থাকল। ঈশমকে আর দেখা যাচ্ছে না, শুধু মাঠের ভিতর লণ্ঠন দুলছে।

    ঈশমের ডান হাতে লাঠি, বাঁ হাতে লণ্ঠন। অঘ্রান মাস। শিশির পড়ছে। এখনও ভাল করে ধানখেতের ভিতর আল পড়েনি। সরু পথ খেতের পাশে পাশে। পথ থেকে বর্ষার জল নেমে গেছে—পথের মাটি ভিজা, কাদামাটিতে পা বসে যাবার উপক্রম। অথচ পা বসে যাচ্ছে না—কেমন নরম তাল তাল মাটির উপর দিয়ে ঈশম হেঁটে যাচ্ছে। গাঢ় অন্ধকার বলে ঈশম চারদিকে শুধু লন্ঠনের আলো এবং তার অস্তিত্ব ব্যতিরেকে অন্য কিছু প্রত্যক্ষ করতে পারল না। এ অঞ্চলে হেমন্তে শীত পড়তে আরম্ভ করে। শীতের জন্য ঝোপজঙ্গলের কীট-পতঙ্গরা কেমন চুপচাপ হয়ে আছে। ঈশম লণ্ঠন তুলে এবার উঁচু জমিতে উঠে এল। পাশে করলার জমি। উপরে ট্যাবার পুকুর আর সেই নির্দিষ্ট বটগাছ। এখানে অনেক রাত পর্যন্ত বড়কর্তা বসে থাকেন। এখানে বড়কর্তাকে অনেকদিন গভীর রাতে খুঁজে পাওয়া গেছে। ঈশম লণ্ঠন তুলে ঝোপে-জঙ্গলে বড়কর্তাকে খুঁজল। ঝোপে ঝোপে জোনাকি। বটের জট মাটি পর্যন্ত নেমেছে। পুরানো জট বলে জটসকল ভিন্ন ভিন্ন ঘরের মত ছায়া সৃষ্টি করছে। সে ডাকল, বড়মামা আছেন? সে কোনও উত্তর পেল না। তবু লণ্ঠন তুলে গাছটার চারধারে খুঁজতে থাকল—তারপর যখন বুঝল তিনি এখানে নেই, তিনি অন্য কোথাও পদযাত্রায় বের হয়েছেন, তখন ঈশম ফের নিচু জমিতে নেমে হাঁটবার সময় দূরে দূরে সব গ্রাম, গ্রামের আলো, হাসিমের মনিহারি দোকানে হ্যাজাকের আলো দেখতে দেখতে নালার ধারে কেমন মানুষের গলা পেল।

    সে বলল, কে জাগে?

    অন্ধকার থেকে জবাব এল, তুমি ক্যাডা?

    —আমি ঈশম শেখ। সাকিম টোডারবাগ। ঈশম যেন বলতে চাইল, আমি গয়না নৌকার মাঝি ছিলাম। এখন ঠাকুরবাড়ির খেয়ে মানুষ। অন্ধকার মানি না। বাবু ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার বাস। নদীর চরে তরমুজ খেত পাহারায় থাকি। ঠাকুরবাড়ির বান্দা আমি। বয়স বাড়ছে, গয়না নৌকা চালাতে আর পারি না।

    —আমি আনধাইর রাইতে হাসিম ভূঁইঞা জাগি। সাকিম কলাগাইছা।

    —অঃ, হাসিম ভাই। তা কি করতাছ?

    —মাছ ধরতাছি। দ্যাখছ না জল নামতাছে। আমি কৈ মাছের জাল পাইতা বইসা আছি। ঘুট-ঘইটা আনধাইরে কই রওনা দিলা?

    —য্যামু মুড়াপাড়া। ধনকর্তার পোলা হইছে। সেই খবর নিয়া যাইতাছি।

    —ধনকর্তার কয় পোলা য্যান?

    —এরে নিয়া দুই পোলা। তোমার কাছে কাঠি আছে, বিড়িটা আঙ্গাইতাম।

    ঈশম বিড়ি ধরাল। ওর বড়কর্তার জন্য মনটা খচখচ করছে। বড়কর্তা রাতে বাড়ি না ফিরলে বড়মামি অন্ধকারে মানুষটার জন্য জেগে থাকবে। সে বলল, বড়মামারে দ্যাখছ?

    —দুফরে দ্যাখছিলাম—নদীর চরে হাঁইটা যাইতাছে।

    ঈশম কেমন দুঃখের গলায় বলল, ভাইরে, তোমার আমার ছোটখাটো দুঃখ। ঠাকুরবাড়ির দুঃখে চক্ষে পানি আসে। ঈশম ফের হাঁটতে থাকল। সে হন হন করে হেঁটে যাচ্ছে। ফাওসার খাল পার হবার জন্য সে হন হন করে হেঁটে যাচ্ছে। হাট ভাঙার আগে যেতে পারলে সে গুদারাঘাটে মাঝি পাবে। নতুবা এই শীতে সাঁতার কেটে খাল পার হতে হবে। ঠাণ্ডার কথা ভাবতেই ওর শরীরটা কেমন কুঁকড়ে গেল।

    ইচ্ছা করলে ঈশম একটা সংক্ষিপ্ত পথ ধরে আরও আগে খালের পাড়ে পৌঁছাতে পারত। কিন্তু একটি অজ্ঞাত ভয়, বিশেষ করে বামন্দি-চকের বুড়ো শিমুল গাছটা এবং ওর বাজে-পোড়া মরা ডাল বড় ভয়ের কারণ। নিচে কবর, আবহমানকাল ধরে মানুষের কবর, হাজার হবে, বেশিও হতে পারে—ঈশম ভয়ে সেই পথে খালের পাড়ে পৌঁছাতে পারছে না।

    ঈশম হাতের লাঠিটা এবার আরও শক্ত করে ধরল। সে ভয় পেলেই আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকায়। আল্লা মেহেরবান। সে যেন আসমানে তার সেই মেহেরবানকে খুঁজতে থাকে। অজস্র তারা এখন বিন্দু বিন্দু হয়ে জ্বলছে। নিচে সেই এক শুধু গাঢ় অন্ধকার। দূরে দূরে সব গ্রামের আলো, হ্যাজাকের আলো—গাছের ফাঁকে এবং ঝোপজঙ্গলের ফাঁকে এখনও দেখা যাচ্ছে। পরাপরদীর পথ ধরে কিছু লোক যাচ্ছিল জল ভেঙে—ওদের হাতে কোনও আলো নেই—জলে ওদের পায়ের শব্দ। কিছু কথাবার্তা ঈশমের কানে ভেসে আসতে থাকল।

    সে ক্রমে খালের দিকে নেমে যাচ্ছিল। ওর হাঁটু পর্যন্ত ধানগাছ শিশিরে ভিজছে। ঈশম পরাপরদীর পথ থেকে ক্রমশ ডাইনে সরে যাচ্ছে। এ অঞ্চলে সে কোন মানুষের সাড়া পাচ্ছে না। নীরবে যেন একটা মাঠ গাভীন গরুর মতো অন্ধকারে শুয়ে আছে। পথ ধরে কোনও হাটুরে ফিরছে না। ফসলের ভারে গাছগুলি পথের উপর এসে পড়েছে। সে লাঠি দিয়ে গাছগুলি দুদিকে সরিয়ে দিচ্ছে এবং পথ করে নেমে যাচ্ছে। খালের পাড়ে গিয়ে দেখল গুদারা বন্ধ। মাঝি এপারে নৌকা রেখে চলে গেছে। নৌকাটা অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বাঁ পাশে সে কয়েক কদম হেঁটে গেল। অদূরে মনে হল আকাশের গায়ে একটা লণ্ঠন জ্বলছে। ঈশম জানত, এ সময়ে জেলেনৌকা থাকবে—বর্ষার জল খাল বিল ধরে নেমে যাচ্ছে। যে জল এ অঞ্চলে উঠে এসেছিল জোয়ারে—আঘুন মাসের টানে তা নেমে যাবে। জলের সঙ্গে মাছ এবং কচ্ছপ। জেলেরা এসেছে, খড়া জাল নিয়ে খালের ভিতর জাল পেতে অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে আছে। ঈশম খালের পাড়ে সেই লণ্ঠনের আলো পর্যন্ত হেঁটে গেল। পাড়ে গিয়ে দাঁড়াল। ডাকল, আমি ঈশম। আমারে পার কইরা দ্যাও। আমি যাইতাছি এক খবর নিয়া। ধনকর্তার পোলা হইছে। তারপর সে কেন যে হঠাৎ ডাকল, বড়মামা আছেন, বড়মামা! বড়মামি আপনের লাইগা জাইগা বইসা আছে, বাড়ি যান। কোনও উত্তর এল না। শুধু একটা নৌকা ওপার থেকে ভেসে এল। বলল, ধনকর্তার পোলা হইছে?

    ঈশম বলল, হ।

    —তবে কাইল যামু, একটা গরমা মাছ লইয়া যামু। মাছ দিয়া একটা পিরান চাইয়া নিমু। বলে সে পাটাতন তুলে অন্ধকারে একটা বড় মাছ টেনে বের করল। ইশম লণ্ঠনের আলোতে নীল রঙের তাজা মাছটা পাটাতনে লাফাতে দেখল। চোখ দুটো বড় অবলা। যেন এক পাগল মানুষ নিরন্তর এইসব মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফুল-ফল পাখি দেখে বেড়াচ্ছে—এই চোখ দেখলে, পাগল মানুষটার চোখ শুধু ভাসে। বড়মামি বড় বড় চোখ নিয়ে প্রত্যাশায় বসে আছে, কখন ফিরবে মানুষটা। সে বলল, বড়মামারে দ্যাখছ?

    মানুষটা বলল, বড়কর্তারে আইজ দেখি নাই।

    ঈশম আর কোনও কথা বলল না। এইসব মাঠে পাগল মানুষ দিনরাত ঘুরে বেড়ান। কোন অন্ধকারে,কোথায় তিনি কার উদ্দেশে হেঁটে যান ঈশম টের করতে পারে না। তাকে খাল পার করে দিলে, সে মাঠ ধরে হাঁটতে থাকল শুধু।

    এখন সে পাটের জমি ভাঙছে। এখানে এখন কোনও ফসল নেই। কলাই, খেসারি এসব থাকার কথা—কিন্তু কিছুই নেই। শুধু ফসলহীন মাঠ। শুধু খোঁচা খোঁচা দাড়ির মতো পাট গাছের গোড়া উঁকি মেরে আছে। যোগী-পাড়াতে এত রাতেও তাঁত বোনা হচ্ছে। মাঠেই সে তাঁতের শব্দ পেল। সে গ্রামে উঠে যাবার মতলবে কোনাকোনি হাঁটছে। জেলেদের নৌকাগুলি এখন আর দেখা যাচ্ছে না। শুধু খড়া জালের মাথায় বাঁশের ডগাতে লণ্ঠনের আলো প্রায় যেন এক ধ্রুবতারা—ওকে পথের নির্দেশ দিচ্ছে। সে কতটা পথ হেঁটে এল, এবং কোনদিকে উঠে যেতে হবে—অন্ধকারে সেই এক আলো তাকে সব বাৎলে দিচ্ছে। এ মাঠের শেষেই সেই বুড়ো শিমুল গাছটা যেন ক্রমে অবয়ব পাচ্ছে। দিনের বেলাতে এ-জমি থেকে গাছটা স্পষ্ট দেখা যায়। সেই গাছটার পাশের গ্রামে একবার মড়ক লেগেছিল—ঈশম কেমন ভয়ে ভয়ে হাঁটছে! শিমুলগাছটার দূরত্ব ঈশমকে কিছুতেই ভয় থেকে রেহাই দিচ্ছে না। সে যত দূর দিয়ে যাচ্ছে তত মনে হচ্ছে গাছটা ওর দিকে হেঁটে আসছে। ডান পাশে প্রায় আধ ক্রোশ হেঁটে গেলে সেই গাছ এবং নিচে তার কবরভূমি—যেহেতু টিলা জমি থেকে একবার সে গাছটাকে দেখতে পেয়েছিল, একদিন হাট ফেরত রাতে গাছটার মাথায় সে আলো জ্বলতে দেখেছিল—সেজন্য ঈশম ভয়ে ভয়ে দ্রুত পা চালিয়ে যোগীপাড়াতে উঠে এল। কেউ দেখে ফেললেই বলবে, এলাম সেই কবর ভেঙে—কারণ ঈশমের মতো সাহসী পুরুষ হয় না—এ তল্লাটে সে এমন একজন সাহসী মানুষ। কিন্তু ঈশম কোনওকালে তার ভয়ের কথা খুলে বলে না। সাহসী বলে সে রাতেবিরেতে পরাণের ভিতরে ভয় লুকিয়ে রেখে চোখ বুজে চলে যেতে থাকে। যোগীপাড়াতে উঠতেই মানুষের শব্দে, চরকার শব্দে এবং শানা মাকুর শব্দে ভয়টা কেটে গেল। তারপর পরিচিত মানুষের গলা পেয়ে বলল, আমীর চাচার গলা পাইতাছি।

    —তুমি……?

    —আমি ঈশম।

    —এত রাইতে!

    —যামু মুড়াপাড়া। ধনকর্তার পোলা হইছে—খবর লইয়া যাইতাছি। আপনার শরীর ক্যামন?

    —ভাল নারে বাজান। ভাল না। একটু থেমে বলল, বড়কর্তার মাথাটা আর ঠিক হইল না?

    —না চাচা।

    —শোনলাম বুড়া কর্তা চক্ষে দেখতে পায় না।

    —না। সারাদিন ঘরে বইসা থাকে। বড়মামি, বুড়া ঠাইরেন দেখাশুনা করে।

    —পোলাটা পাগল হইল আমার কর্তার-অ চক্ষু গেল।

    —হ চাচা।

    —তা একটু বইস। তামাক খাও।

    —আর একদিন চাচা। আইজ যাইতে দ্যান। ঈশম কথা বলতে বলতে সৈয়দ মিস্ত্রির শোলার মাচান অতিক্রম করে রামপদ যোগীর আমবাগানে ঢুকে গেল। তারপর গ্রামের মসজিদ পার হয়ে মাঠে পড়তেই শিমুল গাছটার কথা মনে হল। সে জোরে জোরে মনের ভিতর সাহস আনার জন্য বলল, এলাহী ভরসা। গাছটা যেন ক্রমে শয়তান হয়ে যাচ্ছে। শয়তানের মতো পিছু নিয়েছে। মাঝে-মাঝে হাতের লাঠিটা লণ্ঠনটা ভয়ানক ভারী-ভারী মনে হচ্ছে। সে ভাবল—এমন তো হবার কথা নয়। সে ভাবল, অনেক রাত, অনেক দূরে সে কত মানুষের সুসংবাদ, দুঃসংবাদ বয়ে নিয়ে গেছে—অথচ আজ এখনও সে ফাওসার চক ভাঙতে পারেনি। শিমুল গাছটা বড় কাছে মনে হচ্ছে। কখনও পেছনে তাড়া করছে, কখনও সামনে! সে দু’বার লাঠিটা মাথার উপর বন বন করে ঘোরাল। ওর পাইক খেলার কথা মনে হল-লাঠি খেলায় ওস্তাদ ঈশম এই মাঠে গাছটাকে প্রতিপক্ষ ভেবে মাঝে মাঝে লাঠি ঘোরাতে থাকল। লণ্ঠনটা সে বাঁ হাতে রেখে ডান হাতে লাঠি মাথার উপর ঘোরাচ্ছে এবং নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। যখন ধানগাছগুলো পা জড়িয়ে ধরেছে, সে লাঠি দিয়ে ধানগাছ সরিয়ে ফের হাঁটছে। সে লাঠি দিয়ে মাঝে মাঝেই ধান গাছ সরাচ্ছিল—কিছুটা নিজেকে অন্যমনস্ক করার জন্য, কিছুটা পথ পরিষ্কার করার জন্য। মাঠে নেমেই শরীরটা ঠাণ্ডা মেরে যাচ্ছে। ভয়ানক শক্ত সমর্থ শরীর ঈশমের। এই বুড়ো বয়সেও সে `ঘাড়-গলা শক্ত রাখতে পেরেছে। অথচ এই রাত, অন্ধকার, বিশাল বিলেন মাঠ এবং যে শিমুল গাছটা এতক্ষণ ওকে তাড়া করছে—এই সব মিলে তাকে কেমন গোলমালের ভিতর ফেলে দিয়েছে। ঈশম লণ্ঠনের আলোতে যেন পথ দেখতে পাচ্ছে না। এই বিল ভেঙে উঠতে পারলেই ফের গ্রাম, ফের গ্রামের পথ, গোলাকান্দালের ভূতুড়ে পুল এবং পুরীপূজার মাঠ। ফের গ্রামের পর গ্রাম, তারপর বুলতার দিঘি এবং নমশূদ্রপাড়া-পেড়াব পোনাব, মাসাব গ্রাম।

    অন্ধকার বলেই আকাশে এত বেশি তারা জ্বলজ্বল করছিল। বিলেন জমি নিচে নামতে নামতে যেন পাতালে নেমে গেছে। আলপথগুলি এখনও ঠিক মতো পড়েনি, অঘ্রান গেলে, পৌষ এলে এবং ধানকাটা হলে পথগুলি স্পষ্ট হবে। এই বিলে পথ চিনে অন্য পারে উঠে যাওয়া এখন বড় কষ্টকর।

    অনেকক্ষণ ধরে ঈশম একটি পরিচিত আলপথের সন্ধান করল। যারা মেলাতে যায়, অথবা বান্নিতে, তারা এই আলপথে বিলের অন্য পাড়ে উঠে যায়, ধানজমির ফাঁকে ফাঁকে কোথায় যেন পথটা লুকিয়ে আছে। সে সন্তর্পণে গাছ তুলে তুলে দেখছে আর এগুচ্ছে। এই বুঝি সেই পথ, কিছু দূরে গেলেই মনে হচ্ছে, না সে ঠিক পথে আসেনি-পথটা ওকে নিয়ে বিলের ভিতর লুকোচুরি খেলছে। তারপর ভাবল, বিলের জমির ধারে ধারে হাঁটতে থাকলে সে নিশ্চয়ই পাশের গ্রামে গিয়ে উঠতে পারবে। মনে মনে আবার উচ্চারণ করল, এলাহী ভরসা। তাকে এ-রাতে, এ-বিল, এ-মাঠ অতিক্রম করতেই হবে। অন্ধকারে পথ যত অপরিচিত হোক, শয়তানের চোখ যত ভয়ঙ্কর হোক—সে এ-মাঠ ঠেলে অন্য মাঠে গিয়ে পড়বেই। ধনকর্তাকে খবর দেবেই।

    সে কখনও দৃঢ় হল। অথবা কখনও সংশয়ে ভুগে সে কেমন দুর্বল হয়ে পড়ছে। সে যেন ক্ৰমে এই বিলের ভিতর ডুবে যাচ্ছে। এবং মনে হচ্ছে তার, সে একই জায়গায় ঘুরে ঘুরে ফিরে আসছে। সে আদৌ এগুতে পারছে না। সে এবার বলল, খুদা ভরসা। সে যে ঘুরে ফিরে একই জায়গায় ফিরে আসছে পরখ করার জন্য হাতের লাঠিটা ধানগাছ সরিয়ে কাদামাটিতে পুঁতে দিল। সে সেই নির্দিষ্ট স্থানটি চিনে রাখার জন্য কিছু গাছ উপড়ে ফেলল। একটা কাকতাড়ুয়ার মতো করে গাছগুলিকে বেঁধে রাখল লাঠিতে। তারপর গোলমতো চারপাশে একটা দাগ দিল।

    অনেকক্ষণ ধরে এই বিল এবং পথ ওর সঙ্গে রসিকতা করছে। সে একটু সময় বসল। বিশ্বচরাচর নিঝুম। মনে হয় ঠিক যেন এই বিল সেই পাগল ঠাকুরের মতো রহস্যময়। সে নিজের মনে হাসবার চেষ্টা করল। অথচ গলা শুকনো। ওর সামান্য কাশি উঠে এল গলা থেকে। দ্রুত সেই শব্দ বিলের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল। অপরিচিত শব্দ কোথাও। সে কান পেতে রাখল। এখন এই মাঠ আর তার কাছে পাগল ঠাকুরের মতো রহস্যময় নয়, নিঃসঙ্গ মাঠ অঘ্রানের শিশিরে ভিজে ওর পঙ্গু স্ত্রীর মতো ঘুমাচ্ছে অথবা রাতের কীটপতঙ্গ সকল, ঝিঁঝিপোকা সকল শীতের মরসুমের জন্য আর্তনাদ করছে। কবে শীত আসবে, কবে শীত আসবে, মাঠ ফাঁকা হবে, শস্যদানা মাঠে পড়ে থাকবে, আমরা উড়ে উড়ে খাব, ঘুরব-ফিরব, নাচব-খেলব। সে যত এইসব শুনতে থাকল, যত এইসব চিন্তায় বিষণ্ণ হতে থাকল তত সেই ভয়াবহ শিমুল গাছটা মাথায় আলো জ্বেলে ওর দিকে যেন এগিয়ে আসছে।

    শিমুল গাছটার মাথায় আলোটা জ্বলছে আর নিভছে। অথবা নিভে গিয়ে আলেয়া হয়ে যাচ্ছে। দূরে দূরে যেন বিলের এ-মাথা থেকে অন্য মাথায় আলেয়াটা ওকে নেচে নেচে খেলা দেখাচ্ছে। সে বলল, ভালরে ভাল! এভাবে বসে থাকলে ভয়টা ওকে আরও পঙ্গু করে দেবে। সে দ্রুত উল্টো মুখে ছুটতে পারলেই কোন-না-কোন গ্রামে উঠে যেতে পারবে।

    সুতরাং সে হাতের লণ্ঠন নিয়ে দ্রুত ছুটতে থাকল। হাতের লণ্ঠনটা দু’বার দপদপ করে জ্বলে উঠল। লণ্ঠনটা নিভে যাবে ভয়ে সে দ্রুত ছুটে যেতে পারল না। সে দু’হাঁটুতে আর শক্তি পাচ্ছে না। বার বার কেবল পিছনের দিকে তাকাচ্ছে। সে এবার দেখল, স্পষ্ট দেখতে পেল, শিমুল গাছটা যথার্থই এগিয়ে আসছে। সে দেখল গাছের মাথায় আলো আর ডালে ডালে মড়কের মৃতদেহ ঝুলছে। সে ধানখেত পার হয়ে কাকতাড়ুয়া জায়গাটায় ফিরে এসেছে। শিমুল গাছটা সহসা জীবন্ত হয়ে গেল। এতক্ষণে তবে সে একই বৃত্তে ঘুরছে! ভয়ে বিবর্ণ ঈশম দস্যুর মতো লাথি মারল কাকাতাড়ুয়াকে। উপড়ানো গাছগুলি অন্ধকারে বিলের প্রচণ্ড হাওয়ায় উড়তে থাকল।

    সে বলল, শয়তানের পো ভাবছটা কি শুনি! বিলের পানিতে আমারে ডুবাইয়া মারতে চাও! বলেই সে লাঠিটা তুলে উপরের দিকে ঘোরাল। যেমন সে মহরমের দিন বাজনার সঙ্গে সঙ্গে সামনে-পিছনে অথবা উপরে-নিচে, ডাইনে-বাঁয়ে লাঠি ঘোরাতো, লাঠি এগিয়ে দিত, পিছিয়ে আনত, সে উপরের দিকে উঠে যাবার সময় তেমন সব খেলা দেখাতে থাকল। এই বিলের জমি এবং শিমুল গাছটার ভয়ে সে এখন মরিয়া। কিন্তু খেলা দেখালে হবে কি—কারা যেন ওকে পেছনে টানছে। চারপাশে হাঁটছে কারা। মনে হচ্ছে সারা বিলে মানুষের পায়ের শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে। একদল অবয়বহীন শয়তান ওর সঙ্গে হাঁটছে অথচ কথা বলছে না। অন্ধকারে সে কেবল উপরে ওঠার পরিবর্তে নিচে নেমে যাচ্ছে। এবারে সে চিৎকার করে উঠল, খুদা এইটা কি হইল! ধনকর্তাগ, আমারে কানাওলায় ধরছে। সে লণ্ঠন ফেলে লাঠি ফেলে বিলের আলে আলে ঘুরতে থাকল। ধানপাতা লেগে পা কেটে যাচ্ছে। সে বার বার একই জায়গায় ঘুরে ঘুরে এসে হাজির হচ্ছে। আর এ সময়ই সে দেখল ভুতুড়ে আলোটা একেবারে চোখের সামনে জ্বলছে নিভছে। সেই আলোর হাজার চোখ হয়ে গেল, অন্ধকারের ভিতরে ভূতের মতো চোখগুলো জ্বলছে। ঈশম আর লড়তে পারল না, ধীরে ধীরে আলের উপর সংজ্ঞাহীন হয়ে গেল।

    .

    আগে সুন্দরআলি লণ্ঠন হাতে। পিছনে ধনকর্তা। তিনি চারদিন আগে ধনবৌর চিঠি পেয়েছেন। ধনবৌ লিখেছে—শরীরটা আমার ভাল যাচ্ছে না, এ সময় তুমি যদি কাছে থাকতে। ধনবৌর চিঠি পেয়ে চন্দ্রনাথ আর দেরি করেন নি। বড় কাছারি বাড়িতে মেজদা থাকেন, তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, দাদা, আমি একবার বাড়ি যামু ভাবছি। আপনের বৌমা চিঠি দিছে। অর শরীর ভাল না—একবার তবে ঘুইরা আসি। ভূপেন্দ্রনাথ তার সঙ্গে সুন্দরআলিকে দিয়েছেন। রাত হয়ে যাবে যেতে। সেরেস্তায় কাজের চাপ পড়েছে—নতুবা তিনি নিজেও বাড়ি যেতেন। ছেলে হয়েছে এমন খবর জানা থাকলে চন্দ্ৰনাথ এতটা বোধহয় উদ্বিগ্ন হতেন না। তিনি দ্রুত পা চালিয়ে হাঁটছেন। সুন্দরআলিকে নিয়ে লণ্ঠন হাতে নেমে এসেছেন। শীতলক্ষ্যার পাড়ে পাড়ে এসে বাজার বাঁয়ে ফেলে মাসাব পোনাব হয়ে বুলতার দিঘি ধরে ক্রমশ এগিয়ে চলেছেন। পেয়াদা সুন্দরআলি মাঝে মাঝে কাশছিল। নির্ভয়ে নিঃশব্দে তাঁরা এ মাঠে এসে নেমেছেন। মাঠ পার হলেই ফাওসার খাল, তারপর দু’ক্রোশ পথ। বাড়ি পৌঁছাতে দেরি নেই। এমন সময়ে সুন্দরআলি চিৎকার করে উঠল, নায়েব মশাই, খুন। হাত থেকে লণ্ঠনটা পড়ে যাবে ভাব হল সুন্দরআলির। সুন্দরআলি পেছনের দিকে ছুটে পালাতে চাইল।

    ধনকর্তা হকচকিয়ে গেলেন, এখানে খুন-ডাকাতি!

    সুন্দরআলি বলল, মাঠের উপর দিয়া আসেন কর্তা। নিচ দিয়া আমি যামু না।

    ধনকর্তা এবার জোরে ধমক দিলেন, আয় দ্যাখি, কি খুন কে খুন দ্যাখি। ধনকর্তা লণ্ঠন তুলে সন্তর্পণে মানুষটার মুখের উপর ধরলেন। মানুষটা বড় চেনা যেন। তিনি নাড়তে থাকলেন ওকে। দেখলেন শ্বাস-প্রশ্বাস পড়ছে। তিনি ডাকলেন, ঈশম, তর কি হইল? ঈশম, অঃ ঈশম! ঈশমের শরীরে কোনও আঘাতের চিহ্ন নেই—তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন সব।

    ঈশমের পাশে বসে ধনকর্তা চোখ টেনে দেখলেন। না সবই ঠিকঠাক আছে। এবার মনে হল–বিলেন মাঠে এমন আঁধারে ঈশম পথ হারিয়েছে। তিনি বিল থেকে জল আনলেন। রুমালে ভিজিয়ে ভিজিয়ে জল দিলেন চোখেমুখে এবং একসময় জ্ঞান ফিরলে বললেন, কিরে তর ডরে ধরছে। আমি তর ধনমামা।

    ঈশম চোখ মেলে ধীরে ধীরে দেখল। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারল না। তারপর কেমন অবিশ্বাসের গলায় ডাকল, ধনমামা! আপনে ধনমামা! ধনকর্তাকে দেখে সে কেঁদে ফেলল। মামাগ, আমারে কানাওলায় ধরছে! সারাটা মাঠ, বিল, জমি ঘুরাইয়া মারছে। শরীরটা আর শরীর নাইগ মামা।

    —আস্তে আস্তে হাঁট। বিলে তুই আইছিলি ক্যান?

    এতক্ষণ পর ঈশমের সব মনে হল। কেন এসেছিল এই মাঠে, কোথায় যাবে, কী করবে, কী খবর দিতে হবে সব এক এক করে মনে পড়ল। ধনমামা, আপনের পোলা হইছে। আমিও আপনের কাছে যামু বইলা বাইর হইছি। পথে এই কাণ্ড—কানাওলা।

    ধনকর্তা বিশাল বিলেন মাঠে আলো-আঁধারে দাঁড়িয়ে কি জবাব দিতে হবে ভেবে পেলেন না। আকাশে তেমনি হাজার নক্ষত্র জ্বলছে। ঠাণ্ডা হাওয়া ধানের গন্ধ বয়ে আনছে। ঈশম সে সময় বলল, চলেন মামা আস্তে আস্তে হাঁটি। যেতে যেতে খুব সংকোচের সঙ্গে বলল, আমারে একটা তফন দিতে হইব।

    ওরা হেঁটে হেঁটে একসময় ট্যাবার পুকুর পাড়ে এল। অশ্বত্থ গাছ পার হতে গিয়ে ঈশম ডাকল, বড়মামা আছেন, বড়মামা! কোনও উত্তর এল না। পুকুর পাড়ে গভীর ঝোপ-জঙ্গল। এত রাতে এই জঙ্গলে বসে থাকলে কিছুতেই কেউ টের পাবে না। ভিতরে কেউ আছে কি নেই—দিনের বেলাতেও টের পাওয়া যায় না। ঈশম অথবা চন্দ্রনাথ বৃথা আর ডাকাডাকি করল না। করলা খেত পার হয়ে ধানের জমিতে নেমে আসতেই টের পেল যেন খেতের ভিতর খচখচ শব্দ হচ্ছে। ধান খেতে সামান্য জল। পায়ের পাতা ডোবে কি ডোবে না। ঈশম লণ্ঠন তুলতেই দেখল—বড়কর্তা। ধান খেতের ভিতর বড়কর্তা কেমন উবু হয়ে বসে আছেন। ঈশম খেতের ভিতর ঢুকে বলল, উঠ্যান। বাড়ি যাইতে হইব। বড়মামি আপনের লাইগা জাইগা আছে। কিন্তু বড়কর্তার মুখে কোনও কথা ফুটে উঠল না। যেমন বসেছিলেন তেমনি বসে থাকলেন। কিছুতেই উঠছেন না। কিসের উপর চেপে বসে আছেন। পায়ের নিচে অন্ধকার এবং ধান গাছ। খচখচ শব্দ। গাছগুলি নড়ছে। সে লণ্ঠনটা নিচে নামাতেই দেখল একটা বড় কাছিম। একটা প্রকাণ্ড কাছিমকে চিৎ করে তিনি তার উপরে বসে আছেন। কাছিমটা পা’গুলি বের করে মুখ বের করে কামড়াতে চাইছে। কিন্তু তাঁর হাত পা নাগাল পাচ্ছে না। কেবল গাছগুলি নড়ছে। ঈশম কি বলতে যাচ্ছিল, সঙ্গে সঙ্গে কাছিমের বুকে বসে বড়কর্তা হেঁকে উঠলেন, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    ঈশম বলল, বড়মামা, এইটা আপনে কি করছেন? এতবড় একটা কাছিম ধইরা বইসা আছেন? তারপর সে বলল, আপনে বাড়ি যান। ধনমামায় আইছে। ধনমামার পোলা হইছে।

    ধনকর্তা বললেন, উইঠা আসেন বড়দা। কাছিমটা ঈশম লইয়া যাইবখন।

    বড়কর্তা ভাল মানুষের মতো ধনকর্তাকে অনুসরণ করলেন। বড়কর্তা কখন ছুটতে থাকবেন, কখন হাতে তালি বাজাবেন—এই সব ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার জন্য ধনকর্তা সন্তর্পণে পিছনে পিছনে হাঁটতে থাকলেন। বড়কর্তা অন্ধকারে ছুটতে চাইলে ধনকর্তা বললেন, আমার হাতে লাঠি আছে বড়দা। ছুটবেন ত বাড়ি মারমু। ঠ্যাঙ ভাইঙ্গা দিমু।

    চন্দ্রনাথের মুখে এমন কথা শুনে বড়কর্তা ঘুরে দাঁড়ালেন। আমাকে তুমি ভর্ৎসনা করছ চন্দ্ৰনাথ! এমন এক করুণ মুখ নিয়ে চন্দ্রনাথকে দেখতে থাকলেন। তিনি যেমন কোনও কথা বলেন না, এখনও তেমনি কোনও কথা না বলে অপলক চেয়ে থাকলেন। এমন চোখ দেখলেই মনে হয় এই উত্তর চল্লিশের মানুষ বুঝি এবার আকাশের প্রান্তে হাত তুলে তালি বাজাবেন। চাঁদের কাকজ্যোৎস্না এখন আকাশের সর্বত্র। যথার্থই এবার বড়কর্তা দুহাত উপরে তুলে হাতে তালি বাজাতে থাকলেন, যেন আকাশের কোন প্রান্তে তাঁর পোষা হাজার হাজার নীলকণ্ঠ পাখি হারিয়ে গেছে। হাতের তালিতে তাদের ফেরানোর চেষ্টা। আর ধনকর্তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব কিছু নতুন করে লক্ষ করলেন—বড়দার বড় বড় চোখ, লম্বা নাক, প্রশস্ত কপালের পাশে বড় আঁচিল, সবচেয়ে সেই সূর্যের মতো আশ্চর্য রঙ শরীরের এবং সাড়ে ছয় ফুটের উপর শরীরে ঋজুতা। দেখলে মনে হবে মধ্যযুগীয় কোন নাইট রাতের অন্ধকারে পাপ অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছেন! চন্দ্রনাথ দেখলেন, বড় এবং গভীর চোখ দুটো সারাদিন উপবাসে কোটরাগত। দুঃখে চন্দ্রনাথ চোখের জল রোধ করতে পারলেন না। বললেন, বড়দা আপনে আর কত কষ্ট পাইবেন, সবাইরে আর কত কষ্ট দিবেন!

    বড়কর্তা ওরফে মণীন্দ্রনাথ শুধু বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা। ফের তিনি আকাশের প্রান্তে তালি বাজাতে থাকলেন। সেই তালির শব্দ এত বড় মাঠে কেমন এক বিস্ময়কর শব্দ সৃষ্টি করছে। এইসব শব্দ গ্রাম মাঠ পার হয়ে সোনালী বালির চর পার হয়ে তরমুজ খেতের উপর এখন যেন ঝুলছে। মণীন্দ্রনাথের বড় ইচ্ছা, জীবনের হারানো সব নীলকণ্ঠ পাখিরা ফিরে এসে রাতের নির্জনতায় মিশে থাক—কিন্তু তারা নামছে না—বড় কষ্টদায়ক এই ভাবটুকু। তিনি এবার চন্দ্রনাথকে অনুসরণ করে ঘরের দিকে চলতে চলতে যেন বলতে চাইলেন, চন্দ্র, তোমার ছেলে হয়েছে, বড় আনন্দ! অথচ কথার অবয়বে শুধু এক প্রকাশ, গ্যাৎচোরেৎশালা। এবার তিনি নিজের এই অপ্রকাশের দুঃখে কেমন দুঃখিত হলেন—এত নক্ষত্র আকাশে অথচ তাঁর পাগল চিন্তার সমভাগী কেউ হতে চাইছে না। সকলেই যেন তাঁর ঠ্যাঙ ভেঙে দিতে চাইছে। মণীন্দ্রনাথ আর কোনও কথা না বলে সেজভাইকে শুধু অনুসরণ করে হাঁটতে থাকলেন।

  • দুই

    দুই

    ঢাক-ঢোলের বাজনা শোনা যাচ্ছে। ব্যাগপাইপ বাজাচ্ছে কেউ—মনে হয় কেউ দামামা বাজাচ্ছে। একদল লোক ঢাক-ঢোল বাজিয়ে গোপাট ধরে উঠে আসছে। শচীন্দ্রনাথ পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে সেই শব্দ শুনছিলেন। বুঝি ফেলু ফিরছে নারাণগঞ্জ থেকে। ফেলুর গলায় কালো তার বাঁধা। সে হা-ডু-ডু খেলে ফিরছে। কাপ-মেডেল কালো একটা কাপড়ে ঢাকা।

    এবারেও ফেলু তবে গোপালদির বাবুদের বিপক্ষে খেলে এসেছে। মুখের উপর ফেলুর চাপদাড়ি আছে বলে আর কাঁধে সব সময় গামছা ফেলে রাখে বলে গেঞ্জির উপর বুকের ছাতিটা কাছিমের মতো, কত প্রশস্ত মাপা যায় না। কিন্তু কাছে এলে দলটা মনে হল—না, ফেলুর দল নয়, অন্য দল। তবে কি ফেলু এবারে হেরে এল! ওর দলবল ফিরছে না কেন? এই প্রথম তবে ফেলু হেরে গেছে। ফেলুর যৌবন চলে যাচ্ছে তবে। যখন ওর যৌবন ছিল—তখন এই তল্লাটে দুই আদমি ফেলু আর সাবু—দুই বড় খেলোয়াড়, হা-ডু-ডু খেলোয়াড়। তখন এই তল্লাটে বিশ্বাসপাড়া, নয়াপাড়া, এমন কি দশ-বিশ ক্রোশ দূরে অথবা গোপালদির মাঠ পার হয়ে সেই মেঘনার চরে ওদের খেলা দেখার জন্য কাতারে কাতারে লোক—ফেলু হ্যা-রে…রে…ডু…ডু বলে যখন দাগের উপর বাঘের মতো লাফিয়ে পড়ত—যখন ফাইনাল খেলার দামামা বাজত, ব্যাগপাইপ বাজত, তখন ফেলুর মুখ দেখলে মনে হতো ফেলু বড় কুশলী খেলোয়াড়। তখন কত মেডেল গলায় ঝুলত তার।

    কত কাপ এনে দিয়েছে সে তার দলের হয়ে! দিন নাই রাত নাই, ফেলু বিশ পঁচিশ ক্রোশ পথ হেঁটে খেলতে চলে গেছে। একবার বড় শহরে খেলতে গিয়েছিল, ফেরার পথে পালকিতে। জয় জয়ার ফেলুর। পালকির দুপাশে দু’মানুষের মাথায় দুই কাপ, ডে-লাইট জ্বালিয়ে দামামা বার্জিয়ে ওরা শহর থেকে গ্রামে ফিরেছিল। নাঙলবন্দের মাঠ এবং নদী পার হলে গ্রামের মানুষেরা বৌ-বিবিরা সেই যে দাঁড়িয়ে গেল দেখতে, তার আর শেষ নেই। ওরা ফেলুকে দেখছিল, দুই বড় কাপ দেখছিল, কালো তার গলায় দলের হা-ডু-ডু খেলোয়াড়দের দেখছিল—য্যান ঢাকার ঝুলনযাত্রা যায়। সেই ফেলু তবে এবারে হেরে গেছে! অন্য দলের মানুষেরা, জয় গোপালদির বাবুদের কি জয়…বলতে বলতে যাচ্ছে। শচীন্দ্রনাথের কেন জানি এ সময়ে ফেলুর মুখটা দেখতে ইচ্ছা হল। ফেলু হয়তো হেরে গিয়ে আগে বাড়ি চলে এসেছে। আর কিছু না পেয়ে হয়তো বিবি আন্নুকে ধরে পেটাচ্ছে।

    চন্দ্রনাথ এ-সময় তাঁর জাতক দেখছেন। আঁতুড়ঘরে শশীবালা চন্দ্রনাথকে আর একটু ঝুঁকতে বললেন। ধনবৌ পান খেয়েছে। ঠোঁট লাল। এ-ক’দিন সিঁদুর দিতে নেই কপালে—কপাল সাদা। ঘরের ভিতরে ভিজা কাঠ জ্বলছে। কিছু শতচ্ছিন্ন নেকড়া। এক কোনায় আগুনটা গনগন করছিল। দু-হাতে ধনবৌ জাতককে সামনে তুলে ধরল, চন্দ্রনাথ ছেলে না দেখে ধনবৌর মুখ দেখলেন, কেমন সাদা হয়ে গেছে মুখটা—শালুক পাতার মতো রঙ মুখে। ধনবৌর চোখ, আবার মা হতে পেরেছে বলে জ্বলজ্বল করছিল। হাতের নোয়া, লালপেড়ে কাপড়, দুহাতে জাতককে তুলে ধরার ভঙ্গি, সবটুকু মিলে ফিসফিস করে বলার মতো—কেমন দ্যাখছ। কার মতো হইব! তোমার মতো, না আমার মতো?

    তখন মণীন্দ্রনাথ একটা অশ্বত্থ গাছের নিচে এসে দাঁড়ালেন। এই পথ দিয়ে হা-ডু-ডু খেলার দলটা চলে গেছে। তিনি কাপ মেডেল এবং মানুষের উল্লাস দেখার জন্য ওদের পিছনে পিছনে বের হয়ে পড়েছিলেন—এখন তারা নয়াপাড়ার মাঠে নেমে গেছে। তিনি তাদের সঙ্গে অতদূর গেলেন না। এই অশ্বত্থ গাছটার নিচে এলেই দূরের এক যেন দূর্গ দেখতে পান। দূর্গে হয়তো অশ্বারোহী কিছু যুবক এখন কদম দিচ্ছে। দূর্গের দরজা খুলে গেলে যেমন হাজার সেনা বের হয়ে মাঠে চত্বরে খেলা দেখায়—এখন যেন তেমনি গাছের উপরে হাজার গাঙশালিক মাথার উপর উড়ে-উড়ে খেলা দেখাচ্ছে! যারা নদী থেকে ফিরে আসেনি, যারা খুঁটে খুঁটে নদীর চরে অথবা বিলে পোকামাকড় খাচ্ছে, তারা এবারে ফিরে আসবে। ফিরে এলেই তিনি এই গাছের নিচে বসে আপন মনে এক মনোরম জগৎ বানিয়ে বসে থাকবেন।

    গাছটার নিচে কিছু মটকিলার গাছ, কিছু বেতপাতার ঝোপ এবং বনকাশের জঙ্গল। কিছু ছাতার পাখি অনবরত ঝোপে-জঙ্গলে নেচে বেড়াচ্ছে। মণীন্দ্রনাথ গাছটাকে প্রদক্ষিণ করার মতো ঝোপ-জঙ্গলের চারপাশে ঘুরতে থাকলেন। এত বড় গাছ। ঈশ্বরের মতো এই গাছ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে যেন। এবং তিনি ঈশ্বরকেই যেন প্রদক্ষিণ করছেন এমন একটা ভাব তাঁর চোখে মুখে। মুখ উঁচু করে গাছটা দেখছেন আর কি যেন বিড়বিড় করে বকছেন। তখন মুসলমান গ্রামের পুরুষেরা যেতে-যেতে আদাব দিল। বলল, কী মানুষ কী হইয়া গ্যাল! ওরা বলল, বাড়ি চলেন—দিয়া আসি। মণীন্দ্রনাথ ওদের কথায় বালকের মতো হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লেন। তারপর ওরা যেই চলে গেল—সন্তর্পণে ঢুকে ঝোপের ভিতর বসে গেলেন। চুপচাপ ঝোপের ভিতরে বসে মটকিলার ডাল ভেঙে দাঁত মাজতে থাকলেন। কতদিন যেন দাঁত মাজেননি, কতকাল সব ভুলে বসেছিলেন যেন—তিনি মুখে দুর্গন্ধ দূর করার নিমিত্ত দাঁত ঘষে ঘষে সাদা করে তুলছেন। আবেদালি উঠে আসছিল গ্রামে, সে দেখল ঝোপের ভিতর পাগল ঠাকুর। সে বলল, কর্তা বাড়ি যান। আসমানের অবস্থা ভাল না।

    মনীন্দ্রনাথ ঝোপের ভিতর থেকে আবেদালির কথা শুনেও হাসলেন। মুসলমান. বিবিরা শালুক তুলে বাড়ি ফিরছিল। ওরা ঝোপের ভিতর খচখচ শব্দ শুনে উঁকি দিল। শিশুর মতো পাগল ঠাকুর ঝোপের ভিতর হামাগুড়ি দিয়ে কি যেন অন্বেষণ করছেন। বিবিরা বলল, কর্তাগ, বাড়ি যান। মা-ঠাইরেন চিন্তা করব—আসমান বড় টান-টান ধরছে।

    আবেদালি বাড়ি উঠে ভাবল–কর্তারে ধইরা নিয়া গ্যালে হয়। কিন্তু বুড়ো ঠাকুরুণ শশীবালার কথা মনে করে কেমন সঙ্কুচিত হয়ে গেল। যদি তিনি অসন্তুষ্ট হন, যদি বলেন, তুই ক্যান অরে ধইরা আনলি। আবার অরে সান করান লাগব, এই সব ভেবে উঠোনে আর দাঁড়াল না। সে চন্দদের নৌকায় কাজ করে। নদীতে নৌকা থাকে। ক’দিন পর বাড়ি ফিরছে—ক্লান্ত এবং অবসন্ন তবু কী এক কষ্টের কথা ভেবে আসমানের দিকে তাকিয়ে ওর ডর ধরে গেল। ঝড়-জল আসমান ফেটে নামলে মানুষটা ভিজে-ভিজে মরে যাবে। সে মাঠে নেমে গেল। এবং নদীর চরে ঈশমের ছই, সে ছইয়ের দিকে হাঁটতে থাকল। ঈশমকে খবরটা দিয়ে ঘরে ফিরবে।

    ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। আকাশের অবস্থা দেখে মাঠ থেকে মানুষেরা গ্রামে উঠে গেল। গরু-বাছুর নিয়ে গৃহস্থেরা ফিরে এল বাড়ি। ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে, শিলাবৃষ্টি হতে পারে, আকাশটা ক্রমে কালো হয়ে গেল। দুটো-একটা সাদা বক ইতস্তত উড়ে উড়ে নিরুদ্দেশে চলে যাচ্ছিল। খুব থমথমে ভাব। ডালপালা একটাও নড়ছে না। মুসলমান গ্রামে মোরগেরা ডাকতে থাকল। যত আকাশ কালো হচ্ছে, যত এই পৃথিবী ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে মণীন্দ্রনাথ তত উল্লাসে ফেটে পড়ছেন। কি উল্লাস, কি উল্লাস! তিনি যেন ঘুরে-ফিরে নাচছিলেন। তিনি আকাশ দেখে, পাগলপারা আকাশ দেখে যেমন খুশি হলে তালি বাজান, ভুবনময় তালি বাজে—তিনি নেচে-নেচে তালি বাজাতে থাকলেন! টুপটাপ বৃষ্টি, গাছপাতা ভিজে যাচ্ছে। গরমে মাথা শক্ত হয়ে যাচ্ছে—এই টুপটাপ বৃষ্টি, আকাশের ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা ভাব ওঁকে সামান্য সহজ করে তুলছিল। কিন্তু এক্ষুনি শচী আসতে পারে, চন্দ্রনাথ আসতে পারে। ওরা এসে তাঁকে জোর করে নিয়ে যেতে পারে। ঈশ্বরের মতো গাছটার কাছ থেকে নিয়ে যেতে পারে ভাবতেই তিনি কাপড়ের আঁচলে গাছের ডালে নানা রকমের গিঁট দিতে থাকলেন। ঝড়ে ওঁকে ঠেলতে পারবে না, গ্রামের মানুষেরা ধরে নিয়ে যেতে পারবে না। তিনি কাপড়টা গোটা খুলে গাছের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেললেন।

    টোডারবাগ থেকে নেমে আবেদালি সড়ক ধরে হাঁটতে থাকল। বাড়ির কাজ ফেলে, নামাজ ফেলে সে ঈশমের জন্য নদীর চরে নেমে যাচ্ছে। ছইয়ের নিচে কোনও লণ্ঠন জ্বলতে দেখল না। সে আলে দাঁড়িয়ে ডাকল, অ ঈশম চাচা, আছেন নাকি? বৃষ্টি পড়ায় আবেদালির শরীর ভিজে গেছে। ঠাণ্ডা হাওয়ার জন্য শীত করছে। সুতরাং সে বেশিক্ষণ আপেক্ষা করতে পারল না। সে নিজের গাঁয়ে ফিরে ঘরে ওঠার মুখে ডাকল, জব্বরের মা, আমি আইছি দরজা খোল। অথচ কোনও সাড়া না পেয়ে সে কেমন ক্ষেপে গেল। সে চিৎকার করে ডাকল, তরা মইরা আছস নাকি!

    বৃষ্টির শব্দের জন্যই হোক অথবা অন্য কোনও কারণে—জব্বর দরজা খুলতে দেরি করছে। আবেদালি বার বার ঝাঁপের দরজায় ধাক্কা মারতে থাকল। জব্বর দরজা খুললে সে কেমন পাগলের মতো চিৎকার করে বলল, তর মায় কই রে?

    —মায় গ্যাছে সামুগ বাড়ি।

    —ক্যান্ গ্যাল। আবেদালি তফন দিয়ে শরীর মুখ মুছল।

    —সামুগ বাড়িতে জাল্‌সা আছে।

    আবেদালি তিন-চারদিন পর বাড়ি ফিরেছে। সুতরাং গ্রামের কোথায় কি হচ্ছে জানার কথা নয়। আবেদালি চন্দদের বড় নৌকা নিয়ে নারাণগঞ্জে সওদা করতে গিয়েছিল। দন্দির বাজারে চন্দদের মুদির দোকান! আবেদালি চন্দদের বড় নৌকার মাঝি। ঘরে ফিরে সে কেমন শান্তি পাচ্ছিল না। ওর মনটা কেবল খচখচ করছে। এখনও হয়তো বড়কর্তা ঝোপে বসে আছেন। বাড়ির মানুষেরা বড়কর্তার জন্য ভাবছে। হয়তো কেউ কেউ খুঁজতে বের হয়ে গেছে। সে এবার ছেলের দিকে তাকাল–বলল, জব্বর, একটা কাম করবি বা’জান।

    জব্বর কেমন ঝাঁঝের গলায় বলল, কারণ এখন কত কথা এই বয়স্ক মানুষটা তাকে বলতে পারে, যাও মাঠের খেড় তুইলা আন। পানিতে ভিজা গেলে গরুতে খাইব না!—কী করতে কন!

    প্রথম ভাবল বিবির কথা বলবে। সে এসেছে—কোথায় বিবি এসে তাকে এখন খানাপিনার অথবা মর্জি মোতাবেক কিছু কথাবার্তা—তা না জাল্‌সায় পরাণ খুইলা দিছে। সে বিরক্ত হয়ে বলল, তর মায়েরে ডাক দিনি।

    —মায় কি অখন আইব?

    —আইব না ক্যান রে। তিনদিন ধইরা লগি বাইছি—এই জানডার লাগি তগ মায়া-মমতা নাই রে!

    —আর বেশিদিন কষ্ট করতে হইব না বা’জান

    এমন কথায় আবেদালি কি যেন টের পেয়ে বলল, হ, চুপ কর।

    জব্বর চুপ করে ছেঁড়া মাদুরটার এক পাশে বসে থাকল। সহসা বলল, হুঁকা খাইবেন বা’জান? আবেদালি বুঝল, জব্বরও এসময় একটু হুঁকা খেতে চায়। মনটাতে খোশ-মোজাজ এনে দেবার জন্য বলল, সাজা।

    জব্বর হুঁকা সাজাল। বাপকে দিল। তারপর নিজেও দু’টান দিয়ে বলল, আপনে নামাজ পড়েন, আমি ভাতটা বাড়তাছি।

    —নামাজ পড়মু না! আবেদালি এবার উঠল। বৃষ্টির জলে বদনা ভরল। এবং হাতে মুখে জল দিল। বাইরে জোর বর্ষণ হচ্ছে। মাঝে মাঝে আকাশটা চিরে যাচ্ছে। যেন কে মাঝে মাঝে আসমানের গায়ে স্বর্ণলতা ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে-ফালা ফালা আকাশে গর্জন উঠছিল—আবেদালির ঘরটা যেন পড়ে যাবে। শণের চাল পচে গেছে। টুই দিয়ে জল গড়িয়ে নামছে। পাটকাঠির বেড়া পচে গেছে। বাঁশের উপর ছেঁড়া পাটি এবং কাঁথা বালিশ, নিচে ছেঁড়া চাটাই। আবেদালি ছেঁড়া চাটাইয়ের উপর খেতে বসল। বৃষ্টির সঙ্গে হাওয়া দিচ্ছে, মাদার গাছের একটা ডাল ভেঙে পড়ল। আবেদালি ডাকল, অ, জব্বর! জব্বর! খুব ধীরে এবং সে সোহাগের গলায় ডাকল।

    —কিছু কন আমারে?

    —একটা কাম করতে পারবি?

    —কী কাম?

    —তুই একবার বা জান ঠাকুরবাড়িতে গিয়া ক’দিনি, বড়কর্তা গোরস্থানের বটগাছটার নিচে বইসা আছে। বা’জানরে, বড় কষ্ট বড়কর্তার—যা, একবার গিয়া কর্তার বাড়িতে খবর দে।

    —আমি পারমু না বাজান। আমারে অন্য কামের কথা কন!

    আবেদালি এবার খাবার ফেলে উঠে পড়ল। সে জব্বরের মুখের সামনে গিয়ে খেঁকিয়ে উঠল—যেন সে জব্বরকে মেরেই ফেলবে—পা’টা পিঠের কাছে নিয়ে কি ভেবে সরিয়ে আনল। বলল হালার পো হালা, তুমি আমার বাপজান। তোমার কথায় আমি চলুম!

    জব্বর তেমনি মাথা নিচু করে বসে থাকল।—আমারে অন্য কামের কথা কন। সে যেন কি স্থির করে রেখেছে মনে-মনে। সুখে এবং স্বচ্ছন্দে দিন যায় না–বাপ তার কত দিন পরে ঘরে ফিরে এসেছে। এসে কোথায় মিষ্টি কথা বলবে—তা না কেবল খ্যাক খ্যাক করছে খাটাশের মতো। সে ভিতরে-ভিতরে এতক্ষণ যা প্রকাশ করতে চাইছিল না, বাপের মর্জি দেখে, এই নিষ্ঠুর চেহারা দেখে মরিয়া হয়ে উঠল—যেন বাপ ফের বললে সে মুখের উপরে বলেই দেবে।

    —কি যাবি না!

    —না। আমারে অন্য কামের কথা কন।

    —তা হইলে আমার কথা থাকব না!

    —না।

    —ক্যান, কী হইছে! আবেদালি এবার স্বর নামাল।

    —আমি লীগে নাম লেখাইছি।

    —ত হইছে ডা কি! হইছে ডা কী ক? নাম লেখাইয়া বা’জানের কোরান-শরিফ শুদ্ধ কইরা দিছ!

    —কী হইব আবার। হিন্দুরা আমাগ দ্যাখলে ছ্যাপ ফালায়, আমরা-অ ছ্যাপ ফ্যালামু।

    —জাল্‌সাতে বুঝি এডাই হইতাছে!

    জব্বর এবার চুপ করে থাকল।

    বাপ্ বেটা এবার দু’জনেই চুপ। আবেদালি ফের খেতে বসে গেল। মাথা নিচু করে খেতে বসে গেল। ঝালে—কি ছেলের কথায়, চোখ ছলছল করছে বোঝা যাচ্ছে না। সে নিজের এই দুঃখটুকু সামলাবার জন্য জল খেতে থাকল। তারপর খুব ধীরে ধীরে যেন অনেক দূর থেকে বলার মতো বলল, বড়কর্তা পানিতে ভিজতাছে, তুই না গেলে আমি যামু। আবেদালি বদনার নল মুখে পুরে দিল এবং হাঁসের মতো কোৎ করে জলটা যেন গিলে ফেলল। তারপর বাকি জলটা মুখে রেখে অনেকক্ষণ কুলকুচা করল। দাঁতের ফাঁকে যা কিছু ভোজ্য দ্রব্য—যেখানে যেমন যে-ভাবে দাঁতের ফাঁকে লেগে আছে—সে জিভ দিয়ে দাঁতের ফাক থেকে বাকি খাদ্যবস্তুর স্বাদ নিতে নিতে কেমন নিষ্ঠুর চোখে ফের জব্বরের দিকে তাকাল। বলল, তুমি আমার ভাত পাইবা না, কাইল থাইকা তোমার ভাত বন্ধ। আবেদালি মরিয়া হয়ে উঠল। পুত্রের এমন সম্মান-অসম্মানবোধ ওর ভাল লাগল না। তিন দিনের পরিশ্রম এবং এ-সময়ে ঘরে বিবির অনুপস্থিতি ওকে পাগল করে দিল। একবার ইচ্ছা হল ঘরের কোণ থেকে সড়কিটা নিয়ে পেটে খোঁচা মারে—কিন্তু কি ভেবে সে বলল, আল্লা, দ্যাশে এটা কী শুরু হইল!

    আবেদালির কাঁচা-পাকা দাড়ি বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। কুপির আলোতে আবেদালির মুখ ভয়ানক উদ্বিগ্ন। ঢাকায় রায়ট লেগেছে—এসব কথা কেন জানি বার বার মনে পড়ছে। হিন্দু-মুসলমান উভয়ই জবাই হচ্ছে। সব কচুকাটা। মুসলমান জবাই হলেই সে কেমন উত্তেজিত হয়ে পড়ে—কিন্তু বড়কর্তা ধনকর্তার এবং পাশের গ্রামের অন্যান্য অনেক হিন্দুর উদারতা, পুরুষানুক্রমে আত্মীয় সম্পর্ক সব দুঃখ, উত্তেজনা মুছে দেয়। দরজার ভিতর থেকেই হাত বাড়াল আবেদালি। একটা মাথলা মাথায় টেনে অন্ধকার পথে নেমে গেল।

    .

    শচী হাঁটছিলেন। আগে ঈশম যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে, সংসারে নানা রকমের দুঃখ জেগে থাকে—এই যে বড়কর্তা বিকেল থেকে নিরুদ্দেশে চলে গেল—কই গেল—ঝড়ে জলে এখন কোথায় আছে—এসব বলছিলেন। শত্রুর য্যান এমন না হয়! অশান্তি, অশান্তি! মারা গ্যালে-অ ভাবতাম, গ্যাছে। কতকাল এই দেখতে হবে ঈশ্বর জানে!

    শচী এই ঝড়-বৃষ্টিতে এবং শীতের হাওয়ায় কাঁপতে থাকলেন। ঈশমও শীতে কাঁপছে। ঝড়জলের ভিতর দ্রুত পা চালিয়ে হাঁটছিলেন। ওরা অনেকগুলি জমি অতিক্রম করে মুসলমান পাড়ার ভিতর ঢুকতেই দেখলেন, ইমতালির বড় ছেলে মনজুর বারান্দায় বসে আছে। সামনে কোরাণশরিফ—উপরে দড়ি দিয়ে বাঁধা লণ্ঠন। ঝড়জল কমে গেছে। সে যেমন সাঁজ হলে রোজ পড়তে বসে তেমনি পড়তে বসার সময় দেখেছে—ঝড়জলে গ্রাম ভেসে যাচ্ছে। সে গরুগুলি গোয়ালে তুলে, হাঁসগুলি খোঁয়াড়ে রেখে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে বসেছিল। ঝড়জল থামতেই দরজা জানালা খুলে দিয়েছে। আকাশ তেমন গর্জন করছে না। সুতরাং সে পা দুটো ভাঁজ করে অনেকটা নামাজ পড়ার ভঙ্গিতে বসার সময় দেখল লাউমাচানে আলো এসে পড়ছে! তারপর আলোটা বাড়ির দিকে উঠে এলে দেখল—ঠাকুরবাড়ির ছোটকর্তা—শচী ঠাকুর। সঙ্গে ঈশম। ওরা এত রাতে—এ-পাড়ায়! সে তাড়াতাড়ি নেমে গেল। বলল, কর্তা এই ম্যাঘলা দিনে বাইরে বাইর হইছেন!

    —বড়দারে দ্যাখছস এদিকে?

    —না-গ কর্তা তাইনত আইজ ইদিকে আসে নাই।

    মনজুর হ্যারিকেনটা হাতে নিল। বলল, আপনে বসেন! আমরা পাড়াটা খুঁইজা দ্যাখতাছি।

    শচী বললেন, তুই আবার এই বৃষ্টিতে যাবি কি করতে। সকলে কষ্ট কইরা লাভ নাই। বলে হাঁটতে থাকলেন। মনজুর কোনও কথা বলল না। শুধু সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে থাকল। এ-সময়ে গ্রামে কিছু কুকুর ডেকে উঠল। ফেলুর বাড়িটা বাঁশঝাড়ের নিচে অন্ধকারে ডুবে আছে। শচীর ইচ্ছা হল বলতে, ফেলু কি হাইরা গ্যাছে। ফেলুর বাড়িতে এত অন্ধকার! কুপি জ্বালাইয়া অর বিবিটা ত নলিতে সূতা ভরে! আইজ সাড়াশব্দ পাই না ক্যান। কিন্তু বলতে পারলেন না। কুল গাছে ফুলের গন্ধ। বৃষ্টি এবং ঝড়ের জন্য কিছু ফুল মাটিতে পড়ে আছে। শচী এসব মাড়িয়ে সহসা দেখতে পেলেন বড় একটা ডে-লাইট জ্বলছে সামুদের বাড়ি। বড় টিন-কাঠের ঘর, চওড়া বারান্দা, মূলি বাঁশের বেড়া, এবং ঠিক দরজার মুখে বাঁশে আলোটা ঝুলছে। সামনে সামিয়ানা টাঙানো ছিল, খুলে ফেলা হয়েছে। ঝড়জল একেবারে থেমে গেলে ফের সামিয়ানা টাঙানো হবে। এখন লোকগুলি ঘরে বারান্দায় এবং বৈঠকখানায় গিজগিজ করছে। অন্ধকারে গ্রামে সহসা এই আলো শচীকে বিস্মিত করল।

    মনজুর যেন টের পেয়ে গেছে। কর্তার মনে সংশয়। কর্তা কি যেন ভাবছেন। সে বলল, খুলেই বলল, জাল্‌সা কর্তা। শুনছি ইখানে সামসুদ্দিন লীগের একটা অফিস খুলব। ঢাকা থাইকা আইসা সামু আমাগ লীগের পাণ্ডা হইয়া গ্যাল।

    শচী কোনও উত্তর করলেন না। সামুর এই ব্যাপারটা শচীর ভাল লাগল না।

    মনজুর বলল, সামুরে ডাকি কর্তা। আপনে আইছেন।

    শচী বললেন, না দরকার নাই। ব্যস্ত আছে, ডাইকা ব্যতিব্যস্ত কইরা লাভ নাই।

    তবু খবর দিল মনজুর। ছোটকর্তা তোমার বাড়ির পাশ দিয়া যাচ্ছে তুমি বসে বসে জাল্‌সা করছ, একবার যাও। কর্তারে কও বইতে, পান-তামুক খাইতে।

    খবর পেয়ে সামসুদ্দিন তাড়াতাড়ি বের হয়ে এল। বলল, আদাব কর্তা।

    —ক্যামন আছ সামু?

    —ভাল নাই কর্তা। ধনকর্তার নাকি পোলা হইছে?

    —হ!

    —তবে মিষ্টি খাওয়ান লাগব। যামু একদিন।

    শচী এতক্ষণ যা বলবেন না ভাবছিলেন, অন্য কথা বলবেন ভাবছিলেন, কিন্তু মনের ভিতর কি রকম গোলমাল শুরু করে দিল। বললেন, চ্যালা-ফ্যালা যোগাড় হইছে। খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কথাটা বললেন শচী।—হঠাৎ পাণ্ডা সাজলা। আগে না আজাদের খুব ভক্ত আছিলা।

    সামসুদ্দিন খুব বিব্রত বোধ করল। সে অন্য কথায় চলে আসতে চাইল। বলল কর্তা, বইসা যান।

    মনজুর বলল, বড় কর্তারে খুঁজতে বাইর হইছে।

    এবার সামসুদ্দিন শচীর সঙ্গে হাঁটতে থাকল। যেন একটা কী নৈতিক দায়িত্ব আছে এইসব মানুষের ভিতর। সংসারে এ যে এক মানুষ, অমন মানুষ হয় না—পাগল হয়ে যাচ্ছে। সব ফেলে—যা কিছু প্রিয়, যা কিছু সুখের—সব ফেলে মানুষটা কেবল নিরুদ্দেশে চলে যেতে চাইছে। সবাই সুতরাং চুপচাপ হাঁটছে। ঘরগুলি পরস্পর এত বেশি সংলগ্ন যে শচীকে প্রায় সময়ই নুয়ে পথ পার হতে হচ্ছিল, একটু সোজা হয়ে দাঁড়ালেই ঘরের সনচা এসে মাথায় ঠেকছে। এই বাড়িঘরের যেন কোনও নির্দিষ্ট সীমানা নেই—একটা বাড়ির সঙ্গে আর একটা বাড়ি লেগে আছে—কার কোন ঘর, কে কোন বাড়ির মালিক মাঝে-মাঝে শচীর পক্ষে নির্দিষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ বাড়িটা আবেদালির। বাড়ির উঠোনে আর একটা ঘর উঠছে। শচী ভাবলেন, আবেদালির দিদি জোটন নিশ্চয়ই ফিরে এসেছে। ঘরটা দেখলেই তিনি টের করতে পারেন। টের করতে পারেন কিছুদিন আগে জোটন বিবি ছিল, এখন বেওয়া হয়েছে। জোটনের সব সমেত তিনবার নিকাহ্। শচী হিসাব করে দেখলেন—এবারটা নিয়ে চারবার হবে। তালাক অথবা স্বামীর মৃত্যুর পর জোটন প্রতিবার আবেদালির কাছে চলে আসে। আবেদালি তখন লতা এবং খড়ের সাহায্যে উত্তর দুয়ারি ছোট্ট খুপরি ঘরটা তুলে দেয়—এই পর্যন্ত আবেদালির সঙ্গে জোটনের সম্পর্ক। তারপর কিছুদিন ধরে জোটনের জীবনসংগ্রাম। ধান ভেনে দেওয়া, চিঁড়া কুটে দেওয়া পাড়াপ্রতিবেশীদের এবং যখন বর্ষাকাল শেষ হয়, যখন হিন্দু গৃহস্থের পূজা-পার্বণ শেষ তখন জোটন অনেক দুঃখী ইমানদারের সঙ্গে ভাতের হাঁড়িটা ধুয়ে-পাকলে জলে নেমে পড়ে। এবং সব পাট খেত চষে বেড়াতে থাকে শালুকের জন্য। শালুক শেষ হলে আবেদালির কাছে নালিশ— দ্যাশে কি পুরুষমানুষ নাইরে আবেদালি। সেই জোটন উঠানের উপর আলো দেখে মুখ বার করল। দেখল, শচীকর্তা হাঁইটা যান উঠানের উপর দিয়া। সে একবার ডাকবে ভাবল, কিন্তু বড় মানুষকে ডাকতে সাহস পেল না।

    শচী নেমে যাচ্ছিলেন, তখন আবেদালির দরজা খুলে গেল। ওরা পা টিপে-টিপে হাঁটছিল। জব্বর দরজা খুলতেই শচী দাঁড়ালেন। সব মাতব্বরদের দেখে জব্বর কিঞ্চিৎ ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। প্ৰথমে কী বলবে ভেবে পেল না। পরে সামুকে দেখে যেন সাহস পেল। বলল, বা’জী আপনেগ বাড়ি গেছে কর্তা

    —ক্যান রে?

    —বড়কর্তার খবর দিতে। বড়কর্তা গোরস্থানে বইসা আছে।

    ওরা আর দেরি করল না। তাড়াতাড়ি উঠান থেকে নেমে সড়কের উদ্দেশে হাঁটতে থাকল। জব্বর সকলকে দেখে ঘরে আর থাকতে পারল না। সে-ও ওদের পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকল। বৃষ্টি ধরে এসেছে। ঝ’ড়ো হাওয়া আর বইছে না। গাছের মাথায়, ঝোপে-জঙ্গলে আবার তেমনি জোনাকি জ্বলতে শুরু করেছে। রাতের অন্ধকারে এই পাঁচটি প্রাণী মাঠে নেমে সেই গোরস্থানের বট গাছটার দিকে চোখ তুলে তাকাল।

    ঈশম যেন সকলের আগে পৌঁছাতে চায়। সে বলল, কর্তা, পা চালাইয়া হাঁটেন।

    অঘ্রাণের প্রথম শীত বলেই জোনাকির এই অল্প-অল্প আলো, প্রথম শীত বলেই কোড়া পাখি এত রাতেও ডাকছে না, ঘাস মাটি, বৃষ্টিতে ভিজে সব জল শুষে নিয়েছে। শক্ত মাটি। সড়কে কোথাও পথ পিচ্ছিল নয়—বরং শান্ত স্নিগ্ধ এক ভাব। অনেকদিন পর বৃষ্টি হওয়ায় ধানের পক্ষে ভালো হবে – সুদিন আসবে, দুর্দিন থাকবে না। ঈশম বড় বড় পা ফেলে হাঁটছে। কেউ কোনও কথা বলছিল না, যেন শচী ওদের সব দুষ্টুবুদ্ধি ধরতে পেরেছেন—যেন পুরুষানুক্রমিক আত্মীয়বোধটুকুতে দুঃখ ও বেদনা সঞ্চারিত হচ্ছে।

    সামসুদ্দিন মনে মনে কেমন এক অপরাধবোধে পীড়িত—যার জন্য সে প্রায় চুপচাপ হাঁটছিল।

    লণ্ঠন তুলে বটগাছটার নিচে খুঁজতেই দেখল, বড়কর্তা ফাঁসির মতো ঝুলে আছেন। ফাঁসটা গলায় নয় কোমরে। ধনুকের মতো বেঁকে আছেন। অথবা সার্কাসের তাঁবুতে খেলোয়াড় যেমন খেলা দেখায় তেমনি তিনি পিককের খেলা দেখাতে চাইছেন। ঝড়, শিলা-বৃষ্টি শরীরের উপর কিন্তু ক্ষত চিহ্ন রেখে গেছে। শরীরের ভিতর কোথাও এক যন্ত্রণা, ভালোবাসার যন্ত্রণা অথবা স্বপ্নের ভিতর এক মঞ্জিল আছে, মঞ্জিলে জাদুর পাখি আছে—সেই পাখি তাঁর হাতছাড়া হয়ে গেছে। এখন তিনি তার সন্ধানে আছেন। মনে হয় পাখি উড়ে গেছে, তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে, সওদাগরের দেশ পেরিয়ে কোথায় জলপরীদের দেশ আছে, পাখি এখন সেখানে দুঃখী রাজপুত্রের মাথায় বসে কাঁদছে। তখনই ভিতরে বড়কর্তার কী যেন কষ্ট হয়—নিজের হাত নিজে কামড়াতে থাকেন। ওরা দেখল মানুষটা হাত কামড়ে ফালা ফালা করে দিয়েছেন। এবং জঙ্গলের উপর ঝুলে আছেন।

    ঈশম মটকিলার জঙ্গলে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে গেল। সে এ-গাছ ও-গাছ করে বড়কর্তাকে জঙ্গলের ভিতর থেকে মুক্ত করল। ঠাণ্ডায় বড়কর্তার চোখ-মুখ কাতর। অথবা যেন তিনি নিশিদিন জলের নিচে ডুবে ছিলেন—জল থেকে কারা তাঁকে তুলে এনে ঝোপে-জঙ্গলে ফেলে গেছে। হাত-পা সাদা ফ্যাকাশে। ঈশম জঙ্গল থেকে বের করে কাপড়টা ভালো করে পরিয়ে দিল। বড়কর্তা নিজের কব্জি থেকে নিজের মাংস তুলে নিয়েছেন। হাত মুখ রক্তাক্ত, বড়কর্তার শরীর মুখ এ-মুহূর্তে বীভৎস দেখাচ্ছে। চাপ-চাপ রক্তের দাগ। গাছের ডালে-ডালে পাখিদের আর্তনাদ-নির্জন মাঠে সকলকে সহসা বড় ক্লান্ত করছে যেন।

    শচী লণ্ঠন তুলে মুখ এবং কব্জি দেখতেই বড়কর্তা হেসে দিলেন। শিশুর মতো সরল হাসি। শচী তাকাতে পারছেন না। তাড়াতাড়ি এখন বাড়ি নিয়ে যেতে হয়। দূর্বা ঘাস তুলে শচী ক্ষতস্থানে রস ঢেলে দিলেন। জ্বালা এবং যন্ত্রণায় মুখটা কুঁচকে যাচ্ছে। তিনি কিছু বলছেন না। চিৎকার করছেন না। সবার সঙ্গে এখন আউলের মতো হেলে-দুলে হাঁটছেন শুধু।

    সামসুদ্দিন হাঁটতে হাঁটতে বলল, কর্তারে লইয়া কাশী, গয়া, মথুরা ঘুইরা আইলেন—কেউ কিছু

    করতে পারল না! ভাল করতে পারল না!

    মনজুর বলল, কইলকাতায় লইয়া গেলেন—বড় ডাক্তার দেখাইলেন, কেউ কিছু করতে পারল না?

    শচীর গলাতে অন্ধকারেও হতাশা ফুটে উঠতে থাকল! বললেন, কেউ কিছু করতে পারল না! দশ-বারো বছর ধইরা কত দেশ-বিদেশ করলাম!

    মনজুর বলল, হাসান পীরের দরগায় সিন্নি দিলাম—না, কিছু হইল না।

    শচী আর কথা বলছেন না। সকলেই এ দুঃখে যেন কাতর। যেন এই দুঃখ পাশাপাশি সব গ্রামকে বিপর্যস্ত করছে। বড়কর্তাকে নিয়ে একদা এই সব পাশাপাশি গ্রামের কত আশা, কত আকাঙ্ক্ষা। কত দিন থেকে বড়কর্তার অবিস্মরণীয় মেধাশক্তির পরিচয় পেয়ে এ-অঞ্চলের মানুষেরা গৌরব বোধে আচ্ছন্ন। আমাদের অঞ্চলেও একজন আছেন, আমরা একজনকে সবার সামনে রাজকীয় সম্মানে হাজির করতে পারি। সবার প্রীতি এবং স্নেহ যেন এই ক্ষণজন্মা পুরুষকে অতি আদরে মনের ভিতরে সংগোপনে লালন করছে—সেই মানুষ দিন-দিন কী হয়ে যাচ্ছেন!

    মনজুর এ-সময়ে শচীকে প্রশ্ন করল, আইচ্ছা কর্তা, বা’জী আমারে কয়, বুড়াকর্তা নাকি জীবনে মিছা কথা কয় নাই!

    শচী বললেন, শুনছি, লোকে তাই কয়।

    —তবে এত বড় একটা তাজা শোক পাইল ক্যান?

    শচী উত্তর করতে পারলেন না। আকাশে যে মেঘ ছিল বাতাসে কেটে যাচ্ছে। ওরা গোপাট ধরে পুকুরপাড়ে উঠে এল না, ওরা নরেন দাসের গয়া গাছটার নিচ দিয়ে পথ সংক্ষিপ্ত করল। নরেন দাসের উঠোনে উঠে দেখল, কোনও আলো জ্বলছে না। নরেন দাসের তাঁতঘরেও কোনও শব্দ নেই। এত তাড়াতাড়ি সকলে শুয়ে পড়েছে! সামসুদ্দিন ভাবল নরেন দাসের বোনটা বিধবা হয়ে ফিরে এসেছে—সুতরাং শোক এ-বাড়ির আনাচে-কানাচে ছমছম করছে। সে একদিন দূর থেকে মালতীকে দেখেছে। বিধবা হবার পর থেকে মালতী ব্লাউজ পরে না। মালতীর কোনও সন্তান নেই। যে সালে বিলের জলে কুমীর আটকা পড়ল সে সালেই মালতীর বিয়ে হল। নরেন দাস বিয়েতে খরচ-পত্তর করেছিল। সুতরাং পাঁচ সাত বছর হবে মালতী এই গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়েছিল। ফুটফুটে রাজপুত্রের মতো বর। ছোটোখাটো মানুষের চোখ দুটো ইচ্ছে করলে সামু এখন মনে করতে পারে। নরেন দাস নসিন্দি থেকে চারটে ডে-লাইট এনে ঘরে-বাইরে সকল স্থানে আলো জ্বেলে, আলোময় করে, চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলেছিল বরের হাত ধরে, মালতীর মা নাই, বাপ নাই, তুমি ওর সব। নরেন দাস অনেকক্ষণ চৌকিতে পড়ে কেঁদেছিল। সকলে চলে গেল, বাড়ি ফাঁকা ঠেকল। তবু নরেন দাস দু’দিন তক্তপোশ থেকে উঠল না। ছোট বোনটা এ-বাড়ির যেন প্রজাপতির মতো ছিল। শুধু সারা দিন উড়ত, উড়ত। গাছের ছায়ায়, পুকুরের পাড়ে পাড়ে লটকন গাছের ডালে-ডালে মেয়েটা যেন নীলকণ্ঠ পাখি খুঁজে বেড়াত। সামু, রঞ্জিত ছিল বড় কাছের মানুষ তখন। ওরা কত দিন চুকৈর আনতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছে। মালতী বিধবা হয়ে ফিরলে সে আর কথা বলতে পারেনি। কারণ ঢাকার রায়টে স্বামী তার কাটা গেছে।

    বাড়িতে ঢুকে শচী ডাকলেন মা জল দ্যাও।

    কাকার গলা পেয়ে লালটু বৈঠকখানা থেকে বের হয়ে এল। চন্দ্রনাথ বের হয়ে এলেন। শশীবালা স্বামীর পায়ের কাছে বসেছিলেন এতক্ষণ, উঠোনে শচীর গলা পেয়েই নেমে এলেন। মহেন্দ্রনাথ ছেলের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। আজকাল মণির নূতন উপসর্গ হয়েছে। কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়া। এতদিন সে বৈঠকখানায় শুধু বসে থাকত অথবা পুকুর পাড়ে পায়চারি করতে করতে গাছপালা পাখির সঙ্গে কী যেন বিড়বিড় করে বকত। ছেলে ফিরেছে শুনেই কম্বলটা হাতড়ে মুখের উপর টেনে কাৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন। ভিতরে যে উৎকণ্ঠা ছিল সেটা কেটে গেছে।

    শশীবালা উঠোনে নেমে অনেক লোক দেখতে পেয়ে বললেন, তরা!

    —আমি সামু ঠাইরেন।

    —আমি মনজুর, ঠাইরেন।

    বড় বৌ জানালা দিয়ে সব দেখছে। স্বামীর দীর্ঘ চেহারা এবং বলিষ্ঠ মুখ আর কি যেন তার ভিতরে এক আত্মপ্রত্যয়ের ছবি—সে ছবি মাঝে মাঝে হাওয়ায় দুলতে থাকলে—বড় বৌ হাত তুলে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে—ঈশ্বর আমার এই মানুষকে তুমি দেখে রেখো, উঠোনে মানুষজন বলে সে নেমে আসতে পারল না।

    শশীবালা সকলকে বসতে বলে ঘরে ঢুকে গেলেন। সামান্য জল, তুলসীপাতা এবং চরণামৃত এনে শচী আর মণির শরীরে ছিটিয়ে দিলেন। জল আনালেন এক বালতি। চন্দ্রনাথ পাট ভাঙা কাপড় বের করে আনলেন। ক্ষতস্থানে গাঁদা পাতার রস দিয়ে হাতটা বেঁধে দিলেন।

    সামসুদ্দিন বলল, ঠাইরেন, আমরা যাই।

    —যাও। রাইত অনেক হইছে। সাবধানে যাইও। তারপর কি ভেবে শশীবালা উঠোনের মাঝখানে এসে বললেন, সামু, চাইর পাঁচদিন ধইরা তর মায়রে দ্যাখি না!

    —ম্যার কমরে ব্যাদনা হইছে। উঠতে পারতাছে না। বাতের ব্যাদনা মনে হয়।

    —খাড়। বলে তিনি ঘরে ঢুকে একটা পুরনো শিশি বের করে আনলেন। বললেন, শিশিডা নিয়া যা সামু। কমরে ত্যাল মালিশ করতে কবি

    ওরা চলে গেল। ঈশম লণ্ঠন হাতে তরমুজ খেতে নেমে গেল। সোনালী বালির নদীর চরে তরমুজ খেতে ছইয়ের ভিতর সারা রাত সে বসে থাকবে। খরগোশ অথবা ইঁদুর কচি তরমুজের লতা কেটে দেয়। রাতে সে বসে টিনের ভিতর ডংকা বাজাবে। অনেক দূর থেকে কেউ প্রহরে জেগে গেলে সেই ডংকা শুনতে পায়, শুনতে পেলেই ধরতে পারে ঈশম, ঠাকুরবাড়ির বান্দা লোক, ঈশম এখন তরমুজ খেতে ডংকা বাজাচ্ছে। ডংকা বাজিয়ে ইঁদুর বাদুড় সব তাড়িয়ে দিচ্ছে।

    ছোটকর্তা শচীন্দ্রনাথ নিজের ঘরে বসে তখন দৈনন্দিন হিসাব লিখছেন। বড়কর্তাকে হাতমুখ পরিষ্কার করে রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া হল। তিনি ডাল দিলে ডাল খেলেন, ভাত দিলে শুধু ভাত, মাছ অথবা মাংস খাওয়ার সময় হাড়গুলি গিলে ফেললেন। কেমন বড় বড় চোখে তিনি রান্নাঘরটা দেখতে থাকলেন। তখন শশীবালা বললেন, মণিরে আর কষ্ট দিও না। তরকারী ভাতের লগে মাইখা খাও।

    মার এমন কথায় মণীন্দ্রনাথ কীটসের একটি প্রেমের কবিতা পূর্বাপর ঠিক রেখে গভীর এবং ঘন গলায় আবৃত্তি করে শোনালেন। মা অথবা চন্দ্রনাথ কেউ তার একবর্ণ বুঝল না। বলতে বলতে তিনি বড়বৌর দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকলেন। যেন নিদারুণ কোন যন্ত্রণার কথা তিনি বার বার এইসব কবিতার ভিতর পুনরাবৃত্তি করতে চাইছেন। যেন এই পৃথিবী নিরন্তর অসহিষ্ণুতায় ভুগছে। মণীন্দ্রনাথ এ সময়ে নিজের কপালে এবং মাথায় হাত বোলাতে থাকলেন, মাগো, তোমরা আমাকে আদর করো, এমন ভাব মণীন্দ্রনাথের চোখে মুখে। তাঁর অপলক দৃষ্টি যেন বলছে—আমার বড় কষ্ট বড় যন্ত্রণা!

  • তিন

    তিন

    সম্পর্কে জোটন বিবি আবেদালির দিদি হয়।

    সেই জোটন শোলার ছোট্ট ঝাঁপটা টেনে ঘর থেকে মুখ বার করল। এখনও ভোর হয়নি। সারা রাত জোটনের চোখে ঘুম নেই। মসজিদে সামু আজান দিচ্ছে, জোটন ঘরে বসে অন্ধকারে ছেঁড়া হোগলা এবং ছেঁড়া কাঁথাটা ভাঁজ করে এক পাশে রেখে দিল। অন্ধকার কাটছে না, সুতরাং ঘরের আসবাবপত্র অস্পষ্ট—শিকাতে দুটো হাঁড়ি, দুটো সরা—দু’দিন থেকে জোটনের ভাত নেই, দু’দিন ধরে জোটন শালুক সিদ্ধ করে খাচ্ছে। সে অন্ধকারে বসে শালুকগুলি খেতে থাকল। শুকনো বলে গলায় আটকাচ্ছে—একটু জল খেল জোটন। আবার দরজা ফাঁক করে যখন আকাশ দেখল—আকাশ পরিষ্কার, মোরগেরা ডাকছে—জোটন দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল।

    মসজিদের ওপাশটায় সূর্য উঠছে। আবেদালি বদনা হাতে মাঠ থেকে উঠে এল। আবেদালির বিবি জালালি পাতা দিয়ে উঠোনের এক কোনায় ভাত রান্না করছে। আবেদালিকে দাওয়ায় বসতে দেখে জোটন বলল, কি রে, মানুষটা ত কাইল আইল না।

    না আইলে আমি কি করমু। আবেদালি জোটনের এই ইচ্ছায় বিরক্ত। তিন তিনবারের পর ফের নিকাহের শখ!

    দু’দিন না খেয়ে জোটনও ভয়ানক হয়ে উঠেছে। সে আবেদালিকে বলল, দন্দি যাওনের সময় মানুষটার খোঁজ কইরা যাবি। মানুষটা বাইচা আছে, না, মরছে কবি আইয়া!

    কমু গ কমু! আবেদালি দেখল জোটনের মুখ ভয়ানক শুকনো। দু’দিন না খেতে পেয়ে জোটনের চোখ কোটরাগত। বলল—তুই দুফরে আমার ঘরে খাইস। আবেদালি এবার জালালির মুখটা দেখল। সূর্য উঠছে বলে রোদের রঙ জালালির খড়খড়ে মুখটা আরও খড়খড়ে করে দিচ্ছে এবং আবেদালির এমত কথায় জালালির মুখটা রাগে ফোটকা মাছের মতো ফুলতে থাকল।—আরে, আরে, করতাছস কি। তর গাল যে ফাইট্টা যাইব!

    জোটন বুঝতে পেরে বলল, না রে থাউক। আমার খাওয়নের লগে কি আছে!

    আবেদালি বুঝল জোটন খাবে না। সে দেখল, জোটন উঠোন থেকে নেমে যাচ্ছে। জোটন রাস্তায় নেমে গেল এবং সড়ক ধরে হাঁটল না। যেখানে এখনও ধান খেতে জল আছে অথবা খেতের আল জাগছে সেই সব পথ ধরে কী যেন খুঁজতে খুঁজতে চলেছে।

    জোটন এই সব নরম মাটির আশ্রয়ে কচ্ছপের ডিম খুঁজছে। এ সময়ে কচ্ছপেরা ডিম পাড়বে মাটির আলে। জোটন এসময়ে এই সব মাটির আশ্রয় থেকে ডিম বের করে পশ্চিমপাড়া উঠে যাবে ভাবল এবং ডিমগুলি দিয়ে বলবে, আমারে এক টুকরি চাইল দিয়েন। সে এক দু’করে বিলের জমির অনেক আল ভাঙতে থাকল। সূর্য বিশ্বাসপাড়ার ফাঁক দিয়ে অনেক উপরে উঠে যাচ্ছে। ধান গাছের শিশির, ঘাসের শিশির, লাই খেতের শিশির সব বিন্দুবৎ হয়ে পড়েছে এবং ইতস্তত রোদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। মানুষটা গতকাল এল না, সে পুঁটলি বেঁধে বসে ছিল, মৌলভি সাবকে বলা ছিল, সাক্ষী ঠিক ছিল—অথচ মানুষটা এল না। মুশকিলাসান নিয়ে মানুষটা উঠোনে উঠে ডেকেছিল একদিন, এটা আবেদালির বাড়ি না? আবেদালি, জালালি এবং সকলে ফোঁটা নিয়েছিল—জোটনও উঠেছিল, ফোঁটা নিয়েছিল— পীরের দরগায় লোকটা থাকে। উঁচু, লম্বা গোটা গোটা চোখ—নাভির নিচে দাড়ি নেমে গেছে, গায়ে শতচ্ছিন্ন জোব্বা, মাথায় ফেটি এবং গলায় বিচিত্র রকমের মালা-তাবিজ। জোটন ফকির মানুষটার মহব্বতের জন্য প্রথম দর্শনে বিস্মিত এবং শীতের নরম রোদ যেন তাকে গভীর রাত পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সেদিন।

    জোটন আলের ধারে ধারে তীক্ষ্ণ নজর রেখে হাঁটছে। কচ্ছপের ডিম এখানে নেই, সে হাঁটতে থাকল। সে ইতস্তত তাকাল এবং কয়েকগুচ্ছ ধানের ছড়া শামুকে কেটে কাপড়ের নিচে লুকিয়ে ফেলল। ওর পাশ দিয়ে কামলারা অন্য জমিতে উঠে যাচ্ছে—জোটন বসে পড়ল—যেন সে যথার্থই কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করছে। সে উঠছে না। কামলারা অন্য জমিতে এখন ধান কাটছে। জোটন ধান কাটছে না। হাতের ধারালো শামুকটা সে পেটের নিচে গুঁজে রেখেছে। জোটন অন্য জমিতে কামলাগুলিকে দেখার জন্য গোড়ালিতে ভর করে উঁকি দিল—জমিটা কার স্থির করার ইচ্ছায়। দূরে গরুগুলিকে জলে নেমে যেতে দেখল—মানুষটা এল না, সেই মুশকিলাসানের মানুষটা। তেরটি সন্তানের জননী জোটন আবার মা হবার জন্য এই আলে দাঁড়িয়ে কেমন ছটফট করতে থাকল। চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ বছরের রমণী জোটন খোদাকে যেন এই ধানের জমিতে খুঁজছে—খোদার মাশুল উঠছে না গতর থেকে এমন ভাব এখন।

    দু’দিন পেটে ভাত নেই—আফশোস। দু’দিন হাইজাদির বিলে গ্রামের অন্য অনেকে দুঃখী ইমানদারদের সঙ্গে শালুক তুলেছে, দুঃখী হলেই ইমানদার হবে, খোদাকে স্মরণ করবে—এমনও একটা বিশ্বাস আছে জোটনের। এই যে এখন জোটন শামুকের ধারালো মুখটা দিয়ে কট করে আর একটা ধানের ছড়া কাটল এবং কোঁচড়ে লুকিয়ে ফেলল—যেন পেটের খিদে ভয়ানক দুঃসহ, খোদার কাছে নিজের গোনাগারের জন্য জোটন মোনাজাত করল—হায়রে খোদা, পেটের জ্বালায় সব হয়। সুতরাং জমির মালিককে যেন বলার ইচ্ছা, ভয় করার কিছু নেই, আর কিছু না হোক, জোটনের ইমান আছে। তোমার শক্ত ধানের ছড়া কাটছি না, আলের উপর যেসব ছড়া নুয়ে আছে শামুকের ধারালো মুখে তাই কেটে নিচ্ছি। হাসিমের বাপ নয়াপাড়ার নিমগাছ অতিক্রম করলে জোটন কট করে আরও একটা ধানের ছড়া কেটে কোঁচড়ে লুকাল। এবং এ-সময় মালতীর কথা মনে হল। নরেন দাসের ছোট বোন মালতী বিধবা হয়ে বাপের বাড়ি ফিরে এসেছে। বিধবা মালতীর টানে জোটন পুবের বাড়ির বোন্না গাছটার ফাঁক দিয়ে নরেন দাসের তাঁতঘর দেখল। তাঁতের শব্দ শুনতে পাচ্ছে—মাকুর শব্দ এবং চরকার শব্দ। জোটন কট করে তার ধানের ছড়া কাটতেই পিছন থেকে কে যেন চিৎকার করে উঠল—এই জুটি, মাথার খুলি ভাইঙ্গা দিমু।

    জোটন মুখ ঘুরিয়ে দেখল ঈশম আসছে। সে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, না ঈশম ভাই, আমি এহানে কিছু করতাছি না।

    —তুমি আসমান দ্যাখতাছ। যা বাড়ি যা। কথা বাড়াইস না।

    সুতরাং বাড়ি উঠে যাওয়ার মতো করেই জোটন হাঁটতে থাকল, কিন্তু যেই ঈশম মসজিদের কুয়াতে জল তোলার জন্য বালতি নামাল—জোটন টুক করে আলের পরে বসে গাছের ছায়ায় নিজেকে ঢেকে ফেলল। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে যেতে যেতে দেখল এক জায়গায় হাত লেগে মাটি সরে গেছে এবং সাদা গোল গোল ডিম বের হয়ে পড়ল। জোটন কী খুশি! সব আল্লার মর্জি। জোটন এবার উঠে দাঁড়াল। ইমান এবং মুশকিলাসানের লম্ফটা ওকে উষ্ণ করছে। দূরে দূরে সব ধান কাটা হচ্ছে। ধানের আঁটি বাঁধছে মুনিষেরা, ওরা গাজীর গীত গাইছে। দূরে দূরে গানের স্বর তরঙ্গ, নরেন দাসের বিধবা বোন মালতী এবং গতরাতের নিষ্ফল প্রতীক্ষা জোটনকে কাতর করছে। মালতীর বিয়ে হবে না, বাকি জীবন গতর কোনও মাশুল দেবে না—আল্লা নারাজ হবে। এই গতর মাটির মতো পতিত ফেলে রাখলে গুনাহ্। জোটন এই জন্যই মালতীর জীবনকে, ধর্মকে না-পাক কাফেরের মতো ভাববার ইচ্ছায় শরীরের জড়তা কাটাতে গিয়ে দেখল, বোন্না গাছের নিচে মালতী চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ওর শরীরে সাদা থান ভোরের হাওয়ায় উড়ছে। জোটন মালতীকে দেখে তাড়াতাড়ি সব ক’টা ডিম ভিজা মাটির ভিতর থেকে তুলে আঁচলে বেঁধে ফেলল।

    অন্যদিন হলে জোটন মালতীর সঙ্গে অন্তত কিছু কথা বলত। কিন্তু আজ মালতীর এই নিঃসঙ্গতা যথার্থই ওকে গীড়িত করছে। এক অহেতুক অপরাধ-বোধে মালতীর সঙ্গে সে কোনও কথাই বলতে পারল না। জোটন এই পথ ধরেই গেল—অপরিচিতের মতো তামুকের খেতে উঠে গেল। দেখল, মালতী বোন্না গাছ পার হয়ে লটকন গাছের নিচ দিয়ে পুকুরপাড়ে দাঁড়াল এবং হাঁসগুলিকে জলে সাঁতার কাটতে দেখে কোন আনমনা হয়ে গেল।

    জোটন আর দাঁড়াল না। এখানে দাঁড়ালে কষ্টটা বাড়বে। তারপর শালুক খেয়ে শরীরে শক্তি পাচ্ছে না। সে তাড়াতাড়ি নরেন দাসের বাড়ি পার হয়ে গ্রামের রাস্তায় হাঁটতে থাকল। বকুল গাছটা অতিক্রম করে ঠাকুরবাড়ির সুপারি বাগান। সে সন্তর্পণে বাগানে ঢুকে গাছতলায় সুপারি খুঁজতে থাকল। সে খুঁজে খুঁজে কোথাও যখন একটাও সুপারি পেল না, সে গাছের মাথার দিকে তাকাল এবং প্রার্থনার ভঙ্গিতে বলল, আল্লা একটা গুয়া দ্যা। সব গাছগুলির মাথায় সুপারি ঘন এবং হলুদ রঙের। হলুদ রঙের এই সুপারির খোসা ছাড়িয়ে একটা পান মুখে দেবার বড় শখ জোটনের। সে দেখল একটা কাঠঠোকরা পাখি এ-গাছ ও-গাছ করছে। আহা রে, আল্লা রে, একটা দ্যা না রে। তখনই বুড়ো ঠাকরুণের গলা শুনতে পেল সে। জোটন চুপচাপ বাগানের পাশে ঘন লটকন গাছের জঙ্গলে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। জোটন অনেক্ষণ এই ঝোপের ভিতর পাখিটার বদান্যতার জন্য বসে থাকল। পাখিটা উড়ছে, জোটন ঝোপের ফাঁক দিয়ে দেখতে দেখতে উত্তেজিত হতে থাকল। পাখিটা সুপারির ওপর এবার ঘন হয়ে বসল, দুটো ঠোকর মারল এবং সঙ্গে সঙ্গে তিন চারটা সুপারি গাছের গোড়ায় ছড়িয়ে পড়ল—য্যান মাণিক্য। যেন জোটনের সমস্ত দিনের ইচ্ছা এখন এই গাছটার ছায়ায় রূপ পাচ্ছে। জোটন চারপাশটা ভালো করে দেখল! পুকুরঘাটে বুড়ো ঠাকরুণ স্নান করছে। সে সব দেখছে, অথচ তাকে কেউ দেখতে পেল না। সে তাড়াতাড়ি গাছটার নিচে ছুটে গেল। সুপারি তিনটা আঁচলে বেঁধে সে হাঁটছে। সে বৈঠকখানা পার হয়ে ঠাকুরবাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। ডাকল—বড় মামি আছেন নাকি? বলতে বলতে সে পাছদুয়ারে ঢুকে আঁতুড়ঘরের সামনে দাঁড়াল। বলল, ধনমামি, একবার মানিক রে দ্যাখান। মানিকের লাইগ্যা কাছিমের ডিম আনছি। বড়মামিকে দেখে বলল, কাছিমের ডিম রাইখ্যা এক টুকরি চাইল দ্যান। চাল পেলে বলল, দুইডা পান নিমু বড়মামি

    —নে গা। গাছতলায় মেলা পান পইড়া আছে।

    জোটন চালগুলি আঁচলে বাঁধল। এবং বড়ঘরের পিছনে ঢুকে আলকুশী লতার কাঁটা ঝোপ পার হয়ে একটা শ্যাওড়া গাছের নিচে দাঁড়াল। পানের লতা গাছটাকে জড়িয়ে আছে, সে দুহাতে যতটা পারল পান কুড়িয়ে নিল, ছিঁড়ে নিল। সে বাড়ির ওপর দিয়ে গেল না। সে আলকুশী লতার ঝোপ ভেঙে মাঠে নেমে গেল। জল-কাদা ভেঙে ফের পুবের বাড়ির পুকুরপাড় ধরে ধান খেতের আলে উঠে যাবার সময় দেখল, মালতী আকাশ দেখছে। জোটন এবার মালতীকে ফেলে চলে যেতে পারল না। সে একটু হেঁটে এসে মালতীর পাশে চুপ করে বসল। ডাকল—মালতী!

    মালতী কথা বলল না। মালতী কাঁদল। জোটন মালতীর মুখ দেখতে পাচ্ছে না অথচ বুঝল মালতী চোখের জল ফেলছে। জোটন ফের ডাকল, মালতী কান্দিস না। কাইন্দা কি করবি। সব নসিব মালতী।

    জোটন উঠে পড়ল। মেয়েটা শোকে কাঁদছে, কাঁদুক। ওর তিন নম্বর খসমের কথা স্মরণ করতে গিয়ে গলা বেয়ে একটা শোকের কান্না উঠে আসতে থাকল। বেলা বাড়ছে। পেটে প্রচণ্ড খিদে। যে চাল আছে জোটনের দু’ওক্ত হয়ে যাবে। সে হাঁটবার সময় গোপাট থেকে কিছু গিমা শাক সংগ্রহ করল। তারপর আবেদালির ঘর অতিক্রম করে উঠোনে উঠেই তাজ্জব বনে গেল—যে মানুষটা কাল রাতে আসেনি, যে মানুষটার জন্য সে প্রায় সমস্ত রাত জেগে বসে ছিল, সেই মানুষটা ছেঁড়া মাদুরে নামাজের ভঙ্গিতে বসে তফন সেলাই করছেন। নীল কাঁথার মতো ঝোলা, মুশকিলাসানের লম্ফ, ভিন্ন ভিন্ন সব তাবিজের মালা, কুচ ফলের মালা, এবং পুঁতির হার—এই সব বিচিত্র বস্তুর সমন্বয়ে এখন ফকির সাব যেন ঘোড়দৌড়ের পীরের মতো।

    জোটন ফকির সাবকে দেখে বলল, সালেমালেকুম।

    ফকির সাব এতক্ষণে জোটনকে দেখতে পেলেন এবং বললেন, ওয়ালেকুম সেলাম।

    জালালি ঘরের কোণে ঘোমটা টেনে বসে আছে। জোটনেরও ইচ্ছা হল এ সময় বড় ঘোমটা টেনে ছোট ঘরটায় বসে থাকে। কিন্তু খিদমতের অসুবিধা হবে ভেবেই যেন শরমের জন্য দিল খুলে দিতে পারল না। সেই জালালির ঘরে ঢুকে বলল, মানুষটা খাইব, কি যে খাওয়ামু!

    জোটনের ফিসফিস কথা ফকির সাব শুনতে পেলেন।—আমার জন্য ভাইবেন না। দুইডা শাক-ভাত কইরা দ্যান। দেখেন, নিশ্চিন্তে ক্যামনে খাইয়া উঠি।

    জোটন বলল, জালালি, দুইটা পুঁটির সুঁটকি দ্যা।

    জোটন রান্নার জন্য, শোলার-পারা থেকে এক আঁটি শোলা নামিয়ে আনল। ঘরের পিছনে শোলাগুলিকে মড়মড় করে ভাঙল এবং ভাঁজ করে ঘরে ঢুকতে দেখল—ফকির সাব তখনও তফনে তালি মারছেন বসে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে জোটন ফকির সাবের প্রশস্ত বুক এবং কব্জি দেখে—গতরে খোদার মাশুল উসুল হতে বেশি সময় নেবে না—সুতরাং সুখী মনে জোটন রান্না করতে বসল। দু’সাল হল গতর বেশরমভাবে প্রায় রাতে বেইমানি করতে চাইছে। রাতে যতবার এমন হতো জোটন ছেঁড়া মাদুরে বসে আল্লাকে স্মরণ করে গতরের এই সব বেওয়ারিশ ইচ্ছাকে তাড়াতে চাইত। তিন তিনবার তালাক পেয়ে জোটন যেন বুঝতে শিখেছে ওর শরীরের খাক মেটাবার শক্তি পুরুষমানুষের ছিল না।—সুতরাং তালাক দিল—বলল, ইবলিশের গতর কেবল খাই-খাই। সে ফের উনুনে কিছু শোলা গুঁজে দিল এবং ফকির সাবের শরীর দেখল বেড়ার ফাঁক দিয়ে। সমস্ত চালটাই সে রান্না করছে। দু’জনের মতো ভাত। সে সুঁটকি মাছ দুটোকে আগুনে পুড়িয়ে নিচ্ছে, সে অনেকগুলো লাল চাঁটগাই লঙ্কা বেঁটে নিচ্ছে পাথরে, বড় বড় দুটো পেঁয়াজ কেটে সুঁটকি দুটোকে মড়মড় করে সানকির এক পাশে গুঁড়ো করে রাখল। তারপর লঙ্কা, পেঁয়াজ, নুন এবং সুঁটকির বর্তা বানাতে গিয়ে জিভে জল এল, এখন সে ইচ্ছা করলে দু’জনের ভাত যেন একা খেয়ে নিতে পারে। কিন্তু বাড়িতে মেহমান—সে তার ক্ষুধাকে নিবৃত্ত করল কিছুক্ষণের জন্য। ভাতের ফ্যানা টগবগ করে ফুটছে। সোঁদা সোঁদা গন্ধ ভাতের। সে ফ্যানটা গেলে একটা সানকিতে যত্ন করে রাখল, নুন মেশাল—সবটা ফ্যান পিছন ফিরে চুকচুক করে গিলতে থাকল—আহাঃ, এতক্ষণে যেন চোখ তার দৃশ্যমান বস্তুগুলিকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, ফকির সাহেবকে পীরের মতো মনে হল—দরগার পীর এই ফকির সাহেব। জোটন নিজের শরীরের দিকে নজর দিয়ে বুঝল, এ শরীরও ভয়ানক শক্তসমর্থ। ফকির সাবকে কাবু করতে খুব একটা আদা নুন লাগবে না। জোটন মনে মনে হাসল। বেড়ার ফাঁক দিয়ে ডাকল, ফকির সাব সান করতে যান। আমার খানা পাকান হইয়া গ্যাছে।

    ফকির সাব সব তল্পিতল্পা সঙ্গে নিয়েই ঘাটে গেলেন, এমন কি মুশকিলাসানের আধারটাও। জোটন এই ঘরে বসে কাকের শব্দ পেল, আকাশে রোদ, গাছে এবং শাখাপ্রশাখায় রোদ। জাফরি রঙের ছায়া ঘরের পিছনে। বেত ঝোপে বোলতার চাক—নিচে বোন্না গাছের ঘন জঙ্গল, ফকির সাব হাসিমদের পুকুরে স্নান করতে গেছেন। জোটন বিবি গাজীর গীত ধরল গুনগুন করে। জোটন বিবির স্বপ্ন জাগছে চোখে, বেত ঝোপে বেথুনের মতো এই স্বপ্ন কবে টসটস করে পাকবে…জোটন স্বপ্নের কথা ঠিকঠাক ভাবতে পারছে না…স্বপ্নটা গাজীর গীতে গায়ানদারের হাতের ছড়ি য্যান; চাঁদের মতো মুখ করে চ্যাপ্টা নাকে চোখে জোটনের সকল সুখকে দ্যাখতাছে।

    জোটন তাড়াতাড়ি পাশের একটা গর্ত থেকে ডুব দিয়ে এল। চুলের জল ঝেড়ে ভাঙা আয়নায় ডুরে শাড়ি পরে নিজের সুন্দর মুখটি দেখল। উজ্জ্বল দাঁতের পাটি দেখে রাতে পীরের দরগায় সুখের হীরামন পাখির কথা মনে করে কেমন বিহ্বল হতে থাকল।

    ফকির সাহেব ছেঁড়া মাদুরে বেশ পরিপাটি করে খেতে বসলেন। ভিজা লুঙ্গি সিম লতার মাচানে শুকোচ্ছে। তিনি খেতে বসে দু’বার আল্লা উচ্চারণ করে আকাশ দেখলেন—আকাশ পরিষ্কার, বড় তকতকে এই উঠোনে ঝকঝকে আকাশের নিচে বসে গবগব করে খেতে পারলেন না। যেমন পরিপাটি করে বসেছেন তেমন ধীরে সুস্থে এক সানকি মোটা ভাত সুঁটকির ভর্তা দিয়ে কিঞ্চিৎ মেখে বেশ তারিয়ে তারিয়ে খেতে থাকলেন। নিচে দুটো-একটা ভাত পড়ছে—তিনি আঙুলের ডগায় তুলে সন্তর্পণে মুখে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন, যেন এই মোটা ভাত ফুরিয়ে গেলে আর পাওয়া যাবে না—আল্লার বড় অমূল্য ধন। সানকির ভাতটা শেষ করতেই দেখলেন, জোটন আর এক সানকি ভাত এনে সামনে রেখেছে। তিনি সে ভাতটাও পরিপাটি করে শেষ করলেন। এবং ভাতের অপেক্ষায় ফের বসে থাকলেন। সহসা আবিষ্কারের ভঙ্গিতে তিনি মাদুরের এবং সানকির সংলগ্ন ভাতটিও আঙুলের চাপে মুখে তুলে দিয়ে বসে থাকলেন। নামাজের ভঙ্গিতে এই বসে থাকা ভাবটুকু সাবের বড় আরামদায়ক। এই সব জোটন ঘরের ভিতর থেকে লক্ষ করে শরমে মরে যাচ্ছে। সে হাঁড়ির ভিতর হাত দিল। শেষ দু’মুঠো ভাত সানকিতে তুলে শেষ ভর্তাটুকু তার কিনারে রেখে মাদুরের উপর রেখে দিল। ফকির সাব বললেন, বস্ হইব। ইবারে আপনে গিয়া খান।

    জোটন ঘরের এক কোনায় বসে থাকল। ওর মাথাটা ঘুরছে। সে খুঁটিতে হেলান দিল। কোমর থেকে ডুরে শাড়িটা খসে পড়ছে। আবেদালি নেই, জব্বর নেই, থাকলে বলত, আমার ঘরটা বন্ধক রাইখ্যা এক প্যাট ভাত দ্যা। সে ক্ষুধায় যন্ত্রণায় থাকতে না পেরে গিমা শাকগুলো সিদ্ধ করল এবং খেল। সে কিছু কাঁচাপাকা বেথুন এনে খেল। এ সময়ে উঠোনে গাছের ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। কাক, শালিকরা প্রায় সকলে ডালে, ঝোপে জঙ্গলে যেন ঝিমোচ্ছে। ফকির সাব ছেঁড়া মাদুরে পড়ে ঘুমোচ্ছেন। জোটন আর বসে থাকতে পারল না। শরীরের জড়তায় সে ডুরে শাড়ির আঁচল পেতে মেঝের ওপর পেট রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।

    বিকেল বেলাতে যখন উঠানের ওপর দিয়ে পাখিরা ডেকে গেল, যখন সাত-ভাই-চম্পা পাখিরা লাউ মাচানের নিচে কিচমিচ করল অথবা ধানের আঁটি নিয়ে কামলারা সড়কের ওপর কদম দিচ্ছে তখন জোটন ক্লান্ত অবসন্ন শরীরটাকে টেনে টেনে তুলল। ফকির সাব হুঁকা খাচ্ছেন বসে। সব পোঁটলা-পুঁটলি যত্ন করে বাঁধা, যেন তিনি এখন উঠবেন, শুধু হুঁকা খাওয়াটা বাকি। জোটন আর অপেক্ষা করতে পারল না। ঘর থেকেই বলল, ফকির সাব, আমারে লইয়া যাইবেন না?

    ফকির সাব ঝোলাঝুলি কাঁধে নিতে নিতে বললেন, আইজ না। অন্যদিন হইব। কোরবান শেখের সিন্নিতে যামু। কবে ফিরমু ঠিক নাই। উঠোন থেকে নেমে যাওয়ার সময় দরজার ফাঁকে জোটনের শীর্ণ মুখে আশ্চর্য বিষাদ ধরতে পেরে উচ্চারণ করলেন, আল্লা রসুল, আহা এই ইচ্ছার সংসারে আমরা কতদূর যাব, আর কতদূর যেতে পারি। ফকির সাহেব ওইমত চিন্তা করলেন। তিনি হাঁটতে হাঁটতে ধরতে পারলেন, জোটনের চোখ দুটো এখনও ওকে অনুসরণ করছে অথবা যেন জোটন দেখল হাঁসের পালক মালতীর শরীরে—ইচ্ছার জল গড়িয়ে পড়ছে অথবা পীরের শরীর গাজীর গীদের গায়ানদারের লাঠি য্যান…হাঁটতাছে…হাঁটতাছে…চাঁদের মতো মুখ করে চ্যাপ্টা চ্যাপ্টা নাকে চোখে জোটনের সকল দুঃখকে দ্যাখতাছে। জোটন এবার ডুকরে কেঁদে উঠল-আল্লা রে, তর দুনিয়ায় আমার লাইগ্যা কেউ বুঝি নাই রে!

  • চার

    চার

    একটা হাড়গিলে পাখি অনবরত সেই থেকে ডাকছে। বাড়িটার উত্তরে মোত্রা ঘাসের জঙ্গলে। এখন সেখানে নানারকমের কীটপতঙ্গ উড়ে বেড়াচ্ছে। বড় বড় কুমীরের মতো দুটো গোসাপ ঝোপের ভিতর ঢুকে গেল। পাখিটা তবু ডাকছে, অনবরত ডাকছে। মালতী আতাফল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে সব শুনল। সে জঙ্গলের কাছে যেতে সাহস পাচ্ছে না। একাদশীর পরদিন, বেশ ঝালটাল খেতে ইচ্ছা হচ্ছে। বেতের ডগা সেদ্ধ খেতে ইচ্ছা হচ্ছে। নরম নরম ডগা একটু সর্ষের তেল এবং কাঁচা লঙ্কা হলে তো কথাই নেই। মালতী নরম বেতের ডগা কাটার জন্য আতাফল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকল। বেতঝোপে বোলতার চাক, ঝোপের ভিতর পাখিটা ডাকছে অথবা সাপে যদি ছানা খায়, পাখি গিলে খায়—এমন ভয়ে মালতী গাছটার নিচে থেকে নড়তে পারল না। মালতীর হাতে একটা লম্বা বাঁশ। বাঁশের ডগায় সে একটা পাতলা দা বেঁধে রেখেছে। সে কেবল ইতস্তত করছিল। গাছে আতাফুলের গন্ধ।

    ছোট একটা বেগুন খেত অতিক্রম করে আভারানীর রান্নাঘর। নরেন দাসের সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁতের ঘরে অমূল্য তাঁত বুনছে। মাঝে মাঝে ওর মেঘভাসি গান ভেসে আসছিল। নরেন দাসের বৌ আভারানী বারান্দায় বসে বসে ডাঁটা কুটছে। মালতী এখনও বেতের ডগা নিয়ে ফিরছে না—সে ডাকল, মালতী অ মালতী ব্যালা বাড়ে না কমে।

    মালতী আতাফুলের গন্ধ শুকতে শুকঁতে কেমন বিভোর। ঝোপের ভিতর পাখিটার কেমন থেকে থেকে কান্না। দূরে জব্বর হাল চাষ করছে জমিতে। এটা কি মাস, ফাল্গুন হতে পারে, মাঘের শেষ হতে পারে। মালতী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হিসেব করল। এখন জব্বর অকারণে উঠে আসতে পারে, এসে বলতে পারে, মালতী দিদি এক বদনা পানি দ্যান। মালতী এমন সব দৃশ্য দেখতে দেখতে অথবা শুনতে শুনতে হাঁকল, বৌদি, আমার জঙ্গলে ঢুকতে ডর করে। হাড়গিলে পাখিটা সেই থাইকা ডাকতাছে।

    —হাড়গিলা পাখি ডাকতাছে ত তর কি?

    —মনে হয় পাখিটারে সাপে গিলতাছে।

    —তরে কইছে?

    মালতী আর কথা বাড়াল না। দেখল মালতী, গোপাট পার হয়ে সামু এদিকে হেঁটে আসছে। এসে একটা কাগজের মতো কিছু ফেলুকে দিয়ে গাছের গুঁড়িতে সেঁটে দিচ্ছে। মালতী ডাকল সা…মু…উ…, অ…সা…মু…উ।

    সামু বুঝল মালতী স্বামীর শোক ভুলে যাচ্ছে। বুঝল শৈশবে মালতী যেমন ওকে দিয়ে ঝোপজঙ্গল থেকে চুকৈর ফল আনিয়েছে, বেত ফল আনিয়েছে অথবা শাপলা-শালুকের দিনে যেমন সামু কত ফুল ফল তুলে দিত, তেমনি আজ হয়তো কিছু তুলে আনতে বলবে—সে গাছের নিচ থেকেই হাত তুলে জবাব দিল। বলল, আইতাছি। ইস্তাহারটা ঝুলাইতে দে।

    মালতী সেই আগের মতো গলা ছেড়ে কথা বলল, কিসের ইস্তাহার রে সামু?

    —লীগের ইস্তাহার।

    —অরে আমার লীগ। আগে শোনত, পরে লীগ করবি।

    সামু কাছে এলে বলল, দুইটা বেতের ডগা কাইটা দে। বলে, দা এবং বাঁশটা সে সামুকে এগিয়ে দিল।

    সামুসুদ্দিন দাটা বাঁশের আগায় শক্ত করে বাঁধল। তারপর ঝোপের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। হাড়গিলে পাখিটা আর ডাকতে পারছে না। কেমন নিভে আসছে। থেকে থেকে অনেকক্ষণ পর পর ডাকছে। ঝোপজঙ্গল ভেঙে ভিতরে ঢুকলে কিছু পোকা উড়ল এবং মুখে শরীরে বসল। সে পোকামাকড় শরীর থেকে উড়িয়ে দিয়ে দুটো কচি বেতের ডগা কেটে আনল।–দ্যাখ, আর লাগব নাকি?

    —না। মালতী দা-টা এবং বাঁশটা সামুকে মাটিতে রাখতে বলল।

    সামু বাঁশটা মাটিতে রেখে দিল। মালতী আলগা করে তুলে নিয়ে হাঁটছে। সামু পেছনে পেছনে আসছে, মালতী মুখ না ঘুরিয়েও তা টের পেল। দা-টা সামু বাড়ি রেখে যাক—মালতীর এমন ইচ্ছা। যেতে যেতে মালতীর মনে হল শরীরে ব্লাউজ নেই—খালি গা, পিঠ বুক খালি, বার বার সে কাপড় সামলেও যেন শরীর ঢেকে রাখতে পারছে না। মানুষটা পেছনে আসতে আসতে ওর শরীর থেকে আতাফুলের সুবাস নিচ্ছে, সুবাস নিতে নিতে মানুষটা কতদূর পর্যন্ত যাবে টের পাচ্ছে না। মালতী তাড়াতাড়ি কাপড়ের আঁচলটা চাদরের মতো করে শরীর ঢেকে দিল। পেছনে সামু আসছে ভাবতেই, শরীরে কী যে এক কোড়াপাখি আছে—সময়ে অসময়ে কেবল ডাকে, কোড়াপাখিটা ডেকে উঠতেই মালতীর গা কাঁটা দিল। সুতরাং সে পিছনের দিকে না তাকিয়েই বলল, সামুরে, সামু, তর আর আসতে হইব না। তুই বাড়ি যা।

    সামু নিঃশব্দে দা-টা নরেন দাসের বারান্দায় রেখে মাঠে নেমে গেল। মালতী বেতের খোল তুলতে তুলতে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে। কচি কচি নরম শাঁস। সেদ্ধ দিলে একবারে মাখনের মতো নরম। আতপ চালের সুগন্ধ, সামান্য ঘি আর বেতের ডগা সেদ্ধ বৈধব্যের এক মনোরম ভোজ্যদ্রব্য। একাদশীর পরদিন এমন নরম ডগা পেয়ে মালতীর জিভে জল এসে গেল। সঙ্গে সঙ্গে শৈশবের কিছু ছবি ওর চোখের উপর ভেসে উঠল। সামসুদ্দিন, রসো, রঞ্জিত কতদিন মালতীকে মাঠ থেকে মেজেন্টা রঙের চুকৈর ফল এনে দিয়েছে। তারপর কোন কোন ঋতুতে বেতফল, লটকন ফল এমন কি বকুল ফুল সংগ্রহের জন্য ওরা পরস্পর প্রতিযোগিতা করত। এমন সব সুখস্মৃতিতে দিনটা কাটলেও রাত কাটতে চায় না মালতীর। জানালা খোলা রেখে কেবল সাদা জ্যোৎস্নায় মাঠ দেখতে ভালবাসে। মাঝে মাঝে সেই জ্যোৎস্নায় এক দানবের মতো মহাকাল—কি যে এক মহাকাল, কি যে তার মুখব্যাদান, রাঙাজবার লাখান চক্ষে ঠোঁট ব্যাদান কইরা রাখে–রাক্ষুসি এক, তারে তাড়া কইরা মারে। সারারাত তখন ঘুম আসে না মালতীর। শেষ রাতের দিকে ঘুম আসে। যখন ঘুম ভাঙে তখন ভোরের সূর্য অনেক উপরে। আভারানী ডেকে ডেকে হয়রান। নরেন দাস তাঁতঘর থেকে হাঁকবে—অরে ঘুমাইতে দ্যাও। এতবড় শোকটা অরে ভুলতে দ্যাও। ঘুমের ভিতর এক সুখপাখি মালতীর কেবল কাইন্দা কাইন্দা মরে-জলে নাও ভাসাওরে, আমারে লইয়া যাও বিলের জলে, ডুইবা মরি আনধাইরে।

    মালতী আতা বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখল, সামু নিঃশব্দে কখন চলে গেছে। তাঁত ঘরে চরকার শব্দ, মাকুর শব্দ। উঠোনে ধানের মলন দিচ্ছে মনজুর। চারটা বড় বড় মেলার গরু মলনে তুলে দিচ্ছে।

    দীর্ঘ দু’মাস পর মালতীর চোখ এই আকাশ এবং ধরণীকে প্রীতিময় ভেবে খুশি। ভোরে সেজন্য সামুকে চিৎকার করে ডাকতে পারল। কতকাল পর যেন সে এই মাটির মতো ফের সুজলা সুফলা অথবা যেন দুঃখের ভারে নিয়ত ভুগতে নেই—সে খুব খুশি খুশি মুখে অনেকদিন পর আঁচলে মুখ মুছল। অনেকদিন পর সে ছুটে গেল পুকুরের পাড়ে, পেয়ারা গাছের নিচে। গাব গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে দেখল গাছে কোনও পাকা গাব আছে কিনা–থাকলে সে কোটা দিয়ে গাব পাড়বে, তারপর গাবের বিচি চুষতে চুষতে স্বামীর ঠোঁট অথবা জিভে কি ভয়ঙ্কর স্বাদ—সে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে একটা পাকা গাব খুঁজে পেলে ফুৎফাৎ বিচি বাতাসে ওড়াবে। গাবের পাকা পিছল বিচি আর স্বামীর ঠাণ্ডা জিভ চুষতে যেন এক রকমের। একটা পাকা গাব খাবার জন্য ওর সুন্দর কচি মুখটা কেমন লাল হয়ে উঠল। বিধবা মালতী গাছের নিচে দাঁড়িয়ে এখন গাছ দেখছে কি পাখি দেখছে বোঝা যাচ্ছে না।

    না, গাছে একটাও পাকা গাব নেই। শীতকাল শেষ হলে পাকা গাব আর গাছে থাকে না। সে বাড়ি উঠে এলে দেখল আভারানী, মালতী কি খাবে, কি খেতে ভালবাসে—বিধবা মানুষের কি আর রান্না, তবু যত্ন নিয়ে সাদা পাথরে মালতীর তরকারী কেটে রাখছে। মালতী চুপচাপ বৌদির পাশে ঘন হয়ে বসল, বলল—সামু আগের মতই আছে বৌদি। ডাকলাম আর দৌড়াইয়া আইসা পড়ল। বেতের ডগা কাইটা দিল।

    আভারানী বলল, সামু কি একটা পাস দিল না ল?

    —সামু অর মামার বাসায় থাইকা পাস দিল। তোমাগ জামাইর কাছে কত দিন ঘুরছে একটা চাকরির লাইগা। চাকরি একটা দেখছিল, কিন্তু বৌদি কি যে হইল…মালতী এই পর্যন্ত বলে আর প্রকাশ করতে পারল না, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল—বৌদি আমার যে আর বাঁচতে ইচ্ছা হয় না।

    আভারানী বলল, কান্দিস না।

    বৌদিকে মালতী কাজে সাহায্য করছে। ধীরে ধীরে সে কিছু বেতের ডগা কুচি করে নিল। এইসব করতে করতে মনের ভিতর সেইসব বিসদৃশ ঘটনা উঁকি মারলে চুপচাপ হয়ে যায় মালতী। বড় বড় চোখে সংসারের সব কিছু দেখে। এবং বড় অর্থহীন মনে হয়। চুপচাপ বসে থাকলেই স্বামীর নানারকমের ছোটখাটো মান-অভিমানের কথা মনে হয়। জলে চোখের কোণটা ভিজে যায়। মালতীর এখন আর কিছুই ভালো লাগল না। সুতরাং বারান্দা থেকে উঠে ফের বেগুন খেত অতিক্রম করে যেখানে হাড়গিলে পাখিটা ডাকছিল সেদিকে হেঁটে গেল। নির্জন এই জায়গাটুকু ওর ভালো লাগছে। সে অন্যমনস্কভাবেই লেবু গাছ থেকে দুটো পাতা ছিঁড়ল। পাতাদুটো মুচড়ে গন্ধ নিল। এবং অকারণ জঙ্গলে বসে প্রিয়তমের চোখ মুখ ভাবতে ভাবতে, আহাঃ, কত বিচিত্র সব মধুর স্মৃতি—শেষে আরও কী সব ভেবে ভেবে উদাস।

    এখান থেকে হিজল গাছটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পথ ধরে যারা গেল তারা সকলেই ইস্তাহারটা ঝুলতে দেখল। যারা পড়তে পারছে, তারা দাঁড়িয়ে ইস্তাহারটা পড়ছে। সামু বেকার, সুতরাং লীগের পাণ্ডা। সামু গাছে গাছে মুসলমান গাঁয়ে গাঁয়ে এই ইস্তাহার ঝুলিয়ে শান্তি পাচ্ছে। মালতীর বড় ভয়ঙ্কর ইচ্ছা ইস্তাহারটা পড়ে দেখে—সামু ইস্তাহারে কী লিখেছে অথবা ধীরে ধীরে গিয়ে সকলের অলক্ষে সন্তর্পণে ছিঁড়ে দেয়। দিলে কেউ টের পাবে না। সামু টের পেলে শুধু বলবে, এডা করলি ক্যান?

    —ক্যান করুম না। দেশটা কেবল তর জাতভাইদের?

    —ক্যান আমার জাতভাইদের হইব। দেশডা তর আমার সকলের।

    —তবে কেবল ইসলাম ইসলাম করস ক্যান?

    —করি আমার জাতভাইরা বড় বেশি গরু-ঘোড়া হইয়া আছে। একবার চোখ তুইল্যা দ্যাখ, চাকরি তগ, জমি তগ, জমিদারী তগ। শিক্ষা দীক্ষা সব হিন্দুদের।

    —হইছে। মনে মনে মালতী ফয়সালা করে ইস্তাহারটার দিকে হাঁটতে থাকল। ইস্তাহারটা ঝুলছে। সামনের দুটো ধানজমি পার হলেই গাছটা। গাছটা নরেন দাসের। যেন এই গাছে ইস্তাহার ঝোলানোর উদ্দেশ্য, মালতীও একবার পড়ে দেখুক—ইসলাম বিপন্ন। এই বিপন্ন সময় থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে হবে।

    এখন মাঠ ফাঁকা। ধান গাছ, কলাই গাছ, এমন কি মটরের জমি ফাঁকা। কিছু তামাকের খেত, পেঁয়াজের খেত। সে হেঁটে যাবার জন্য আলে আলে গেল না। সবাই জমি চাষ করে রেখেছে। শুকনো জমি। বড় বড় ডেলা মাটির। জমি ভেঙে সে সোজা হেঁটে গেল। হাঁটুর উপর কাপড় তুলে, দ্রুত গাছটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাটিতে পায়ের ছাপ, এবং আকাশ কতদিন পর নীল স্বচ্ছ। মালতী গাছটার দিকে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে। হাওয়ায় চুল উড়ছে। পাশের জমিতে একদা রসো এবং বুড়ি ডুবে মরেছিল এমন এক স্মৃতির উদয় হতে সে স্বল্প সময়ের জন্য এখানে দাঁড়াল। যেন কোনও এক অশ্রুজল নিরপেক্ষ ভালোবাসার বৃত্ত এই জমিতে দীর্ঘদিন পত্তন করে রেখেছে মানুষেরা।

    সে হাঁটতে থাকল। ইস্তাহারটা এখনও বাতাসে নড়ছে। গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে মালতী ইস্তাহারটা পড়তে পড়তে উত্তেজিত। হক সাহেব নতুন নতুন কথা বলছেন। নাজিমুদ্দিন সাহেবের একটা ছবি ইস্তাহারের এক কোণে। মালতী এ-সময়ে দেখল দূরের সব জমিতে হাল চাষ হচ্ছে। ওরা হাল চাষ করছে এবং গান গাইছে। সামসুদ্দিনের এই বিদ্বেষ মালতীর ভালো লাগল না। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে সন্তর্পণে ইস্তাহারটা গাছ থেকে টেনে তুলে ফেলল। তারপর হনহন করে বাড়িতে উঠে এসে যেখানে হাড়গিলে পাখিটা সেই সকাল থেকে ডাকছে—সেখানে দাঁড়িয়ে থাকল। স্বামীর মুখ মনে হতেই সে চিৎকার করে বলতে চাইল—আমি ঠিক করছি। সামুরে, তর সর্দারি আমার ভাল লাগে না। তুই তো ভাল মানুষ আছিলি রে।

    হাড়গিলে পাখিটা আবার ডাকতে শুরু করেছে। কুহক্ কুহক্‌ ডাকছে। ঝোপের কোথায় যে শব্দটা উঠছে—কিসের জন্য যে পাখিটা অনবরত ডাকছে মালতী বুঝতে পারল না। শব্দটা মনে হয় বড় দূর থেকে ভেসে আসছে। মোত্রাঘাসের জঙ্গলে জল নেই। জল নেমে গেছে, গাছের গুঁড়িতে হলদে মতো দাগ। সে, ডাকটা কোথায় উঠছে, কেন পাখিটা নিরন্তর ডেকে চলেছে দেখার জন্য বেগুন খেতে বসে ঝোপের ভিতর উঁকি দিল। পাখিটা ডাকছে, অনবরত ডাকছে—নিশ্চয়ই ওর কোনও অসহ্য কষ্ট। সে নানাভাবে উঁকি দিতে থাকল—কখনও বেত পাতা সরিয়ে, কখনও জঙ্গল ফাঁক করে, কখনও মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে ঝোপে জঙ্গলে পাখিটা কোথায় আছে দেখার জন্য উদগ্রীব হল। সে মোত্রাঘাসের জঙ্গলে ঢুকে গোড়ালি তুলে উঁকি দিল—ওখানে নেই পাখিটা, শব্দটা যেন ঝোপের গহন অবস্থান থেকে আসছে। সে বাড়ি থেকে কোটা এনে ভিতরটা খোঁচা দিয়ে দেখবে এই ভেবে চোখ ফেরাতেই দেখল ভীষণ কালো রঙের একটা পানস সাপ ঠেলে ঠেলে ঘন ঝোপে ঢুকে যাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু নড়তে পারছে না। কেমন লাল ঠিক বেদানার কোয়ার মতো চোখ নিয়ে মালতীকে দেখছে। পাখিটার প্রায় অর্ধেকটা শরীর সাপটার মুখে এবং গলায়। এতবড় পাখিটাকে কি করে গিলছে দ্যাখ! মালতী ভয়ে চিৎকার করে উঠল, বৌদি, দ্যাখেন আইসা কাণ্ড! হাড়গিলা পাখিরে পানস সাপটা কি কইরা গিলতাছে।

    —আল মরা, তরে খাইব। বলে আভারানী ছুটে এসে হাত ধরে টেনে আনল মালতীকে। আর মালতী জমিতে উঠেই দেখল সামু এ দিকেই হনহন করে আসছে। মুখে ওর কার্তিক ঠাকুরের মতো সরু গোঁফ এবং সমস্ত অবয়বে অভিমানের চিহ্ন। সামসুদ্দিন মালতীর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। নরেন দাসের বৌ অদূরে ভীত-সন্ত্রস্ত। অথচ দেখল সামু অত্যন্ত বিনীত। ক্ষত-বিক্ষত, এমন স্বর গলায়—বলছে, তুই ইস্তাহারটা ছিঁড়লি ক্যান মালতী?

    —ছিঁড়লাম, হইছেডা কি?

    —তুই জানস না, ঢাকা থাইকা কত কষ্ট কইরা এগুলি আনাইতে হয়। কোন দিন আর ছিঁড়বি না!

    —ছিঁড়ুম, একশবার ছিঁড়ুম, এমন কথা বলার ইচ্ছা হল মালতীর। কিন্তু সামুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে পারল না। সে এবার কি ভেবে বলল, দ্যাখছস কতবড় হাড়গিলা পাখিটারে সাপটা ধইরা খাইতাছে।

    সামসুদ্দিন তাড়াতাড়ি পিছনের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। এবং দেখল সাপটা এবার পাখিটাকে প্রায় গিলে এনেছে এবং গিলে ফেলতে পারলেই টেনে টেনে শরীরটা এদিকে নিয়ে আসবে। আর যদি কোনও কারণে সাপের মুখ থেকে পাখি ফসকে যায়—তবে আর নিস্তার নেই। সামু, এবার ধমক দিল, এই ছেরি, ভয়-ডর নাই? যা বাড়ি যা।

    —আরে আমার শাসকরে। মালতী কিঞ্চিৎ দজ্জাল মেয়েমানুষের মতো গলার স্বর করতে চাইল—কিন্তু না পেরে হোহো করে হেসে দিল।

    —হিটকানি থাকব না মালতী। মুখ থাইক্যা আহার ছুইটা গেলে সাপের মাথা ঠিক থাকে না।

    —মানুষের মাথা ঠিক থাকে?

    সামসুদ্দিন কেমন চোখ ছোট করে তাকাল। মালতীকে দেখল। মালতীর শরীরে পুবের দেশ থেকে বন্যা আসার মতো অথবা উজানি নদীর মতো রূপলাবণ্যে ঢল নেমেছে। বিধবা হলে কি যুবতী মাইয়ার শরীর রূপের সাগরে ভাইস্যা যায়! মালতীকে সামু শেষ পর্যন্ত বলল, যা বাড়ি যা। জঙ্গলে আর খাড়াইয়া থাকতে হইব না।

    মালতী নড়ল না। মালতী ফের ঝোপটার ভিতর উঁকি দিল। একটা শুকনো ডালে সাপটা শরীর পেঁচিয়ে রেখেছে। লাল চোখ দুটো বেদানার কোয়ার মতো উজ্জ্বল। ওরা একটু দূরে এসে দাঁড়াল। ওরা এখন কথা বলছে না—পাখিটাকে সাপের গলায় অন্তর্হিত হতে দেখছে। গলাটা ফুলে ফুলে সহসা সরু হয়ে গেল। তারপর সাপটা মৃতের মতো ডালে ঝুলতে থাকল একসময়।

    পরদিন ভোরে মালতী সকালে উঠে হাঁসগুলোকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে পুকুরে ফেলল। একটা গাছের গুঁড়িতে বসে জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল। শরীরে সাদা থান, শরীরের লাবণ্য এই কাপড়ের বিসদৃশ রঙে চাপা পড়ছে না। মালতীর সোনার শরীর—প্রজাপতির মতো মন অথচ রাতে গভীর ঘুমের জন্য এ-সময় গাছের গুঁড়িটার মতো মনটা বড় নির্বোধ। পায়ের পাতা ডুবিয়ে গাছের গুঁড়িতে বসে আছে। হাঁসগুলি জলে নেমেই এখন সাঁতার কাটবে, এবং এক রকমের খেলা—ওরা জলে ভেসে ভেসে অথবা ডুবে ডুবে অনেক নিচে চলে যাচ্ছে এবং ভেসে উঠেই পুরুষ হাঁসটা অন্য হাঁসগুলিকে তাড়া করছে অথবা পুরুষ হাঁসটা ছুটে ছুটে—যেমন তার মানুষ তাকে ছুটে ছুটে ঘরের ভিতর অথবা বাগানের ভিতর এবং রাত গভীর হলে লুকোচুরি খেলা—ছুইছুই খেলা—খেলতে খেলতে যখন আর ছুটতে পারত না তখন মানুষটা তাকে সাপ্টে ধরত এবং পাঁজাকোলা করে নিয়ে যেন কোন এক পাহাড়ে অথবা নদীর পাড়ে চলে যেতে চাইত—কী যে সুখ সুখ খেলা-হাঁসগুলি এখন তেমনি সুখ সুখ খেলা খেলছে। মালতীর পা ক্রমে স্থির হয়ে আসছে—শরীর শক্ত হয়ে আসছে। সুন্দর পা ওর জলের নিচে মাছরাঙার মতো ক্রমে ডুবে যাচ্ছিল। কেবল থেকে থেকে রঞ্জিতের কথা মনে পড়ছে। সে তখন বালক ছিল। ঠাকুরবাড়ির বড়বৌর ছোট ভাই। সে এখন কোথায় আছে কে জানে! শুনেছে সে এখন নিরুদ্দেশ। কেউ তার খোঁজ রাখে না।

    পুকুরের ও-পাশের ঝোপটায় একটা বড় মাছ নড়ে উঠল। কৈশোরে মালতী মাছ ধরত—যখন বর্ষাকাল, যখন গয়না নৌকায় বাদাম উড়ত, ঝোপেজঙ্গলে টুনি ফুল ফুটে থাকত, তখন এই ঘাটে কত যে চেলা মাছ, ডারকীনা মাছ এবং শাড়ি-পরা পুঁটি মাছ—মালতী সরু ছিপ দিয়ে বর্ষাকালে শাড়ি-পরা পুঁটি মাছ ধরত। একদিন নির্জন বিকেলে রঞ্জিত পাশে দাঁড়িয়ে মাছ ধরতে ধরতে ফিসফিস করে বলেছিল—যাবি? যাবি মালতী?

    মালতী জানত রঞ্জিত এই কথায় কী বলতে চায়। সে অবুঝের মতো চোখে মুখে এক বোকা ভাব ছড়িয়ে রাখত। রঞ্জিত আর বলতে সাহস পেত না।

    মালতী গাছের গুঁড়িতে বসে থাকল। উঠতে ইচ্ছা করছে না। পুকুরের জল নিচে নেমে গেছে। সুতরাং গাছের গুঁড়িটাকেও গড়িয়ে গড়িয়ে নিচে নামানো হয়েছে। গাছের গুঁড়িটা ছিল সিঁড়ির মতো—সেই কবে গুঁড়িটা এখানে ছিল। রসো, রঞ্জিত, সামু বর্ষায় গুঁড়ি থেকে জলে লাফ দিয়ে পড়ত, ডুবত, ভাসত অথবা সাঁতার কেটে বর্ষার জলে ঝোপে জঙ্গলে লুকিয়ে মালতীকে ভয় দেখাত। রাতের কিছু কিছু স্বপ্ন, পুকুরের জল, হাঁসগুলির সুখী জীবন, সামনের মাঠ এবং যব-গমের খেত, কিছু কৃষকের এক সুরে ফসল কাটার গান সব মিলে মালতীকে কেমন আচ্ছন্ন করে রাখছে। রাতের কিছু স্বপ্ন অস্পষ্ট ‘স্মৃতির মতো—প্রিয়তমের মুখ গন্ধপাদালের ঝোপ থেকে যেন উঁকি মারছে। প্রকৃতির নীরবতা এবং ভোরের এই মাধুর্য মালতীকে ক্লিষ্ট করছে—হিজল গাছে সামু ইস্তাহার ঝোলাল—দেশটা দিন দিন কি যে হয়ে যাচ্ছে! মালতী এবার পুকুর থেকে হাতমুখ ধুয়ে উঠে এল। প্রিয়তমের মুখ স্মৃতির অতল থেকে তুলে এনে ঈশ্বরের নাম স্মরণ করতে গিয়ে দেখল চোখে জল মালতীর।

    নরেন দাস ফিরছে পশ্চিমপাড়া থেকে। ওর হাতে গলদা চিংড়ি। সে দেখল, মালতী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেমন নিবিষ্ট মনে হাঁসগুলির সাঁতারকাটা দেখছে। কেমন অন্যমনস্ক মালতী। নরেন দাস ইচ্ছে করেই গলায় এক রকমের উপস্থিতির শব্দ করল এবং যখন দেখল সংকোচে মালতী এতটুকু হয়ে গেছে—কি যেন তার ধরা পড়ে গেছে ভাব—এই যে খেলা, হাঁসের খেলা—খেলা তার ইহজীবনে আর বুঝি হবে না—সব শেষ। কেমন সে বিহ্বলভাবে তাকাল। নরেন দাসও কেমন সরল বালকের মতো, যেন কিছু বুঝতে পারেনি এমন এক চোখ নিয়ে তাকল। বলল, দ্যাখ দ্যাখ, কতবড় ইছা মাছ ধইরা আনলাম। মাছগুলি ভাতে সিদ্ধ দেইস। কিন্তু তখনই মনে হল, দাসের বোন মালতী বিধবা। সে একটা বড় দীর্ঘশ্বাস চেপে বাড়িতে উঠে গেল।

    মালতী দাদার সঙ্গে পুকুরপাড় থেকে উঠে যাবার সময় বলল, দাদারে, সামু হিজল গাছটাতে ইস্তাহার ঝোলায়, অরে বারণ কইরা দেইস।

    —বারণ কইরা দিলে অন্যখানে ঝোলাইব।

    মালতী বুঝল প্রতিবাদে নরেন দাস যথার্থই অক্ষম। সুতরাং মাসখানেক পর সামসুদ্দিন যখন ফের ইস্তাহার ঝোলাতে এল, মালতী মাঠ পার হয়ে নেমে গেল। বলল, ইস্তাহার ঝুলাইবি না।

    —ক্যান?

    —গাছটা আমার দাদার।

    —তা হয়েছে কি!

    —তর গাছ থাকলে সেখানে ঝুলইয়া দে।

    —আমার গাছ এডা। তুই যা করতে পারিস করবি।

    —বড় বড় কথা কইবি না সামু। অদিনের পোলা, অখনই মাতব্বর হইয়া গেছস! নাকে তর দুধের গন্ধ আছে।

    —তর নাকে কিসের গন্ধ ল ছেরি। বলে ইস্তাহরাটাকে গাছে উঠে অনেক উপরে ঝুলিয়ে দিল।—নে পাড়। কত তর ক্ষ্যামতা দেখি।

    —আইচ্ছা! মালতী হনহন করে বাড়ি উঠে গেল। গাব গাছটার নিচে এসে দাঁড়াল।

    সামু মালতীর এই রাগ দেখে মনে মনে হাসল। মালতী আগের মতেই জেদী একগুঁয়ে মালতী। কিন্তু মনের ভিতর কী এক শপথ সব সময় কাজ করছে। গাঁয়ে উঠে যাবার সময় ওর চোখমুখ দৃঢ় দেখাল। অথচ গাঁয়ের সবুজ বন ঝোপ দেখে মনটা আর্দ্র হয়ে উঠেছে। মালতীর শস্যদানার মতো রঙ শরীরের—তাছাড়া শৈশবের কিছু কিছু প্রীতিপূর্ণ ঘটনা, স্বামীর সাম্প্রদায়িক মৃত্যু এবং বৈধব্য বেশ, সব মিলে মনে এক অপার বেদনা সঞ্চার করছে সামুর। এই উগ্র জাতীয়তাবোধ ওর ভাল লাগল না। সে ছুটতে থাকল। সে আর হিজল গাছে ইস্তাহার ঝোলাবে না, অন্য কোনখানে গিয়ে ইস্তাহারটা টাঙিয়ে দেবে। সে ছুটে মাঠে নেমে দেখল, হিজল গাছের নিচে মালতী—একটা লম্বা বাঁশ দিয়ে—মনে হয় ওর সেই বাঁশটা, যা দিয়ে বেতের ডগা কেটে দিয়েছিল—মালতী টেনে ইস্তাহারটা নামাচ্ছে। কেমন পায়ের রক্ত সব সামুর মাথায় উঠে এল। উত্তেজনায় অধীর সামু স্থির থাকতে পারল না। কাছে এসে রুষ্ট মুখে দাঁড়াতেই মালতী হেসে দিল।—কি দ্যাখলি, পাড়তে পারি কিনা!

    মালতীর এই উচ্ছ্বলতাকে অপমান করার স্পৃহা সামুর। এই প্রবঞ্চনামূলক ঘটনাতে সে নিজের দুর্বলতাকে দায়ী করে অত্যন্ত দৃঢ় এবং রুক্ষ কণ্ঠে বলল, তুই না বিধবা হইছস মালতী। এই হাসি ত তর মুখে ভাল লাগে না।

    —সামু…রে! মালতী, ইস্তাহারসহ ঢলে পড়ার মতো গাছের গুঁড়িতে বসে পড়ল। এক শিশুসুলভ কান্নায় ভেঙে পড়ছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বিধবা মানুষের হাসতে নেই। মালতী বিধবা, সামু বার বার কথাটা যেন মনে করিয়ে দিল। সামু মালতীর এমন চোখমুখ সহ্য করতে না পেরে গাঁয়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। মালতী ক্রমে শান্ত হয়ে এল। পায়ের কাছে ইস্তাহার। মাঠ ফাঁকা। সে এবার মুখ তুলে দেখল সামু নেই—দূরে সে গ্রামের দিকে উঠে যাচ্ছে। কিছু মেলার গরু যাচ্ছে! গলায় ওদের ঘণ্টা বাজছে। কিছু লটকন গাছ, এখন বসন্তকাল বলে গাছে কোনও ফল নেই। নানারকম পাখি উড়ে এসেছে এ দেশটায়। বিলের জল কমে গেছে, সেই বড় বিলে, বাবুদের হাতি আসার কথা, কারণ এ-সময়ে বিলের জলে নানারকমের হাঁস উড়ে আসবে। ওর মনে হল, অনেক দিন ধরে সে সেই হাতি, মুড়াপাড়ার হাতির গলায় ঘণ্টা বাজতে শুনছে না। এই হাতি দেখলে সে সাহস পায়।

    তারপর এ অঞ্চলের ঘাস ফুল পাখি চৈত্রের গরম বাতাস সহ্য করে কাল-বৈশাখীর অপেক্ষাতে থাকল। এখন মাঠ খাঁ খাঁ করছে। আকাশ কাঁসার বাসনের মতো রঙে ধূসর হয়ে আছে। কিছু পাখপাখালি আকাশে উড়লে মনে হয় খড়কুটো উড়ছে। যেন এই মাঠ এবং নদী আর তরমুজ খেত সব পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। সূর্যের রঙ কমলার খোসার মতো। পলাশ গাছ নেড়া নেড়া। শিমুল গাছে নতুন পাতা এসেছে। ধানের খেত, কলাইর খেত সব এখন চাষবাসের উপযোগী। এ সময়ে চাষ দিয়ে রাখলে ফলন ভালো হবে, আগাছা জন্মাবে না। ঠাকুরবাড়ির ছোট ঠাকুর জমিতে হালচাষ কেমন হচ্ছে দেখে ফিরছেন। মালতী, ঠাকুরবাড়ির ধনকর্তার ছোট ছেলে সোনাকে কোলে নিয়ে আ আ করে তু তা করে, কি আমার সোনারে ধনরে বলে, গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বিকেলের হাওয়া খাচ্ছিল। মাঝিবাড়ির শ্রীশ চন্দ দন্দির হাটে যাবে, নরেন দাসকে এক বাণ্ডিল সূতা কিনে দেবে—সেসব জেনে যাবার জন্য এদিকে হেঁটে আসছে। মালতীকে দেখে বলল, তর দাদায় কই। মালতী বলল, দাদায় তানা হাঁটতাছে। আপনের শরীর ভাল ত কাকা?

    জবাবে শ্রীশ চন্দ বলল, এই আছে একরকম। হাটের সুখ এখন নাই ল মা। পরাপরদীর বাজারে সব মুসলমানরা এককাট্টা। অরা ঠিক করছে হিন্দুগ দোকান থাইকা আর কিছু কিনব না

    —কি যে হইল দেশটাতে! মালতী একটা পলাশ গাছ দেখতে দেখতে এমন ভাবল। সোনা ওর বুকে লেপ্টে আছে। ঘুমাবে বোধ হয়। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে সর্বত্র। শরীর ঠাণ্ডা হচ্ছে। শরীর এবং মন দুই-ই হালকা বোধ হচ্ছে। সামু ঢাকা গেছে। এ-পাড়াতে সামু অনেকদিন আসছে না। হয়তো অনুশোচনার জন্য আসছে না। এমন যখন ভাবছিল মালতী তখনই দেখল একজন মিঞা মাতব্বর গোছের মানুষ হিজল গাছটার নিচে এসে দাঁড়াল। লম্বা একটা ইস্তাহার গাছে ঝুলিয়ে দিল।

    মিঞার পরনে তফন, গায়ে জোব্বা এবং গালে দাড়ি। মালতী বাড়ির শেষ সীমানা পর্যন্ত এল অথচ মাঠে নেমে যেতে সাহস পেল না। ইস্তাহারটা ঝুলিয়ে মানুষটি নিজের গাঁয়ে উঠে গেল না। কে এই মানুষ! মালতী দূর থেকে কিছুতেই চিনতে পারল না। ইস্তাহারটি এখন গাছের উপর নিশানের মতো উড়ছে। মানুষটা মালতীদের বাড়ির দিকে উঠে আসছে। নরেন দাসের ভিতর বাড়ির রাস্তা ধরে উঠে আসছে। মালতী ভাবল, দাদাকে ডাকবে। বলবে, দ্যাখছস দাদা, একটা মিঞা মানুষ বাড়িতে উইঠা আইতাছে। কিন্তু কাছে আসতেই—ওমা! একি তাজ্জব! সামু ওর কার্তিক ঠাকুরের মতো গোঁফ চেঁচে ফেলে গোটা গালে মৌলবী-সাবের মতো দাড়ি রেখেছে। মালতী সহসা কোনও কথা বলতে পারল না। সামুকে আর সামু বলে চেনা যাচ্ছে না। সে যেন কেমন ওর কাছে একেবারে অপরিচিত মানুষ হয়ে গেছে। সামু পর্যন্ত মালতীকে চিনছে না এমন ভাব চোখেমুখে। সে সোজা উঠে আসছিল, কথা বলছিল না; চোখমুখ শান্ত। সে কেমন বুক ফুলিয়ে হেঁটে গেল। মালতী এবার রাগে দুঃখে চিৎকার করে উঠল, দাদারে দেইখ্যা যা—কোনখানকার এক মিঞা বাড়ির ভিতর দিয়া যাইতাছে।

    নরেন দাস দূরে তানা হাঁটছিল। সে দূর থেকে কে মানুষটা চিনতে পারল না। সে ফ্রেমটা মাটিতে রেখে গাবগাছটার নিচে তাকাতেই দেখল, যথার্থই একজন মিঞা মানুষ মোত্রাঘাসের জঙ্গল পার হয়ে বাড়ির দিকে উঠে আসছে। সে চিৎকার করে ডাকল, অঃ মিঞা, ঠ্যাং ভাইঙা দিমু। পথ দেইখা হাঁটতে পার না। সদর অন্দর নাই তোমার!

    আর মালতী গাবগাছটার গুঁড়িতে দাঁড়িয়ে হা হা করে হেসে উঠল। মালতী প্রতিশোধের ভঙ্গিতে গাছের কাণ্ডে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সারা মুখে মনে প্রতিশোধের স্পৃহা। সোনা সেই হাসি শুনে কেমন চমকে গেল ঘুমের ভিতর। সে কোলের ভিতর ধড়ফড় করে জেগে উঠল। সোনা এখন কাঁদছে। এবং কয়েক মাস আগে এই জঙ্গলে একটা পানস সাপ একটা হাড়গিলে পাখিকে গিলে অনেকক্ষণ শুকনো ডালে মৃতের মতো পড়েছিল। এইসব দৃশ্য মনে হওয়ায় মালতীর আকাশ দেখার ইচ্ছা হল—নিচে এই মাঠ, ধরণীর সুখ-দুঃখ, মৃত পলাশের ডাল আর কোলে ধনকর্তার ছোট ছেলে সোনা সব মিলে মালতীকে কেমন অসহায় করে তুলছে। সামসুদ্দিন ততক্ষণে সদর রাস্তায় উঠে গেছে। সে একবার ফিরে পর্যন্ত তাকাল না। মালতীর মনে হল অনেকদিন পর বড় মাঠ পার হতে গিয়ে সে পথ হারিয়ে ফেলেছে।

    .

    এভাবে এ-দেশে বর্ষাকাল এসে গেল। বর্ষাকাল এলেই যত জমি-জায়গা খাল-বিল সব জলে ডুবে যায়। শুধু গ্রামগুলো দ্বীপের মতো ভাসতে থাকে। বর্ষাকাল এলেই গ্রাম থেকে বড় বড় নৌকা যায় উজানে। খাল-বিল-মাঠে বড় বড় মাছ উঠে আসে। ধানখেতে কোড়া পাখি ডিম পাড়ার জন্য বাসা বানায়; আত্মীয় কুটুম যা কিছু এ অঞ্চলের, এ-সময় বাড়ি বাড়ি আসতে থাকে। শাপলা শালুক ফুটে থাকে জলে। জলপিপি শালুক ফুলের উপর সন্তর্পণে এক পা তুলে শিকারের আশায় জলের দিকে চেয়ে থাকে।

    বর্ষাকাল এলেই বুড়োকর্তা মহেন্দ্রনাথ ঘরে আর বসে থাকতে পারেন না। তিনি ধীরে ধীরে বৈঠকখানার বারান্দায় এসে বসেন। একটা হরিণের চামড়ার উপর বসে বিকেলবেলাটা কাটিয়ে দেন। বয়স তাঁর আশির উপর। চোখে আজকাল আর একেবারেই দেখতে পান না। তবু বাড়ির উঠোনে, শেফালী গাছে এবং বাগানে যে সব নানারকম গাছ আছে, কোথায় কোন গাছ আছে, কি ফুল ফুটে আছে তিনি এখানে এসে বসলেই তা টের পান। তিনি এখনে বসলেই ধনবৌ সোনাকে রেখে যায় পাশে। একটা মাদুরের উপর সোনা হাত পা নেড়ে খেলে। মহেন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে ওর সঙ্গে কথা বলেন। ওর কোমরে রুপোর টায়রা, হাতে সোনার বালা, এই ছেলে হেসে হেসে বৃদ্ধকে নানা বয়সের ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি এই অতি পরিচিত বিকেলের গন্ধ নিতে নিতে সোনার সঙ্গে বিগত দিনের গল্প করেন—প্রায় যেন সমবয়সী মানুষ, একে অপরের অসহায় অবস্থা বোঝে। সোনা অ…আ…ত-ত করে আর বুড়ো মানুষটা তখন যেন দেখতে পান, পাট কাঠির আঁটি উঠোনের উপর দাঁড় করানো। উঠোন পার হলে দক্ষিণের ঘর। তার দরজা। ফড়িঙেরা নিশ্চয়ই এ বাদলা দিনে উড়ছে। এটা শরৎকাল। শরৎকাল এলেই ভূপেন্দ্রনাথ নৌকা পাঠাবে মুড়াপাড়া থেকে। অষ্টমীর দিন সে মহাপ্রসাদের আস্ত একটা কাটা পাঁঠার ছাল ছাড়ানো ধড় নিয়ে আসবে।

    তখন বড়বৌ এদিকে এল। হাতে গরম দুধ। শ্বশুরের সামনে দুধের বাটি রেখে পায়ের কাছে বসল। সামনে পুকুর। আম-জাম গাছের ছায়া। তারপর মাঠ। বর্ষাকাল বলে শুধু জল আর জল। যেখানে পাটের জমি—পাট কাটা হয়ে গেছে বলে সমুদ্রের মতো অথবা বড় বিলের মতো, যেন সেই এক বিল — রূপকথার রাজকন্যা জলে ভেসে যায়। বড়বৌ নদী মাঠ এবং জল দেখলে এইসব মনে করতে পারে। বড় বিলের কথা মনে হয়।—বিয়ের দিন বড় নৌকা করে সে এ-অঞ্চলে এসেছিল। এত বড় বিলে পড়ে বড়বৌর বুকটা ধড়ফড় করে উঠল, কারা যেন এ-বিলের কথা বলতে বলতে যায়—কিংবদন্তীর পাঁচালীর মতো বলতে বলতে যায়—এক সোনার নৌকা রূপোর বৈঠা এ-বিলের তলায় ডুবে আছে। রাজকন্যার নাম সোনাই বিবি। বড়বৌ মেঘলা আকাশ দেখতে দেখতে সেই প্রথম দিন স্বামীর মুখে বিলের গল্প মনে করতে পেরে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল। স্বামীর মাথার ভিতর কি গণ্ডগোলের পোকা তখনই ঢুকে গেছিল। নতুবা বাদলা দিনে হাটুরে মানুষের মতো এমন গল্প বলবেন কেন!

    বড়বৌ সোনার মুখের আদলটা দেখল ভাল করে। দেখতে দেখতে মনে হল এই মুখ ধনকর্তার মতো নয়, ধনবৌর মতো নয়। এ-মুখ বাড়ির পাগল মানুষটার মতো। বড়বৌ কলকাতায় বড় হয়েছে, কিছুকাল কনভেন্টে পড়েছে। পাগল ঠাকুরকে তার এখন আর পাগল বলে মনে হয় না। যেন সে তার কাছে এখন প্রায় মোজেসের মতো অথবা কোন গ্রীক পুরাণের বীর নায়ক—যুদ্ধক্ষেত্রে হেরে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছে। বড়বৌ বলল, সোনার মুখ আপনার বড়ছেলের মতো হবে বাবা।

    মহেন্দ্রনাথ একটু হাসলেন! তারপর কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেলেন। বললেন—মণির সাড়াশব্দ পাইতাছি না।

    —পুকুরপাড়ে বসে আছে।

    মহেন্দ্রনাথ অনেকদিন থেকেই একটা কথা বলবেন বলে ভাবছিলেন। বড়বৌকে কিছু বলার ইচ্ছা ছিল। যেন বড়বৌর বাপের বাড়ির দিকের মানুষের একটা ধারণা–হয়তো মনে মনে বড়বৌ নিজেও সেটা বিশ্বাস করে, কিন্তু আমি তো জীবনে মিছা কথা কই নাই, তঞ্চকতা করি নাই। আমি এই বয়সে তোমারে একটা কথা কই—বিশ্বাস কর, না কর, কই! এমন ভেবে বললেন, বড়বৌমা, আমার ত সময় ফুরাইছে। তোমারে একটা কথা কমু ভাবছিলাম বৌমা।

    বড়বৌ সামান্য হাসল। বলল, বলুন না।

    —জান বৌমা, মণি যখন ছুটি নিয়া বাড়ি আসত আমি গর্বে বুক ফুলাইয়া থাকতাম। এ-তল্লাটে এমন উপযুক্ত পোলা আর কার আছে কও। সুতরাং আমি তোমার বাবারে কথা দিলাম। মাইনসে কয় আমার পোলা পাগল হইছে আমি নাকি বিয়ার আগেই জানতাম।

    বড়বৌ কোনও জবাব দিল না। সে বুড়ো মানুষটার পাশে সোনাকে কোলে নিয়ে বসে থাকল।

    —বোঝলা বৌমা, মণি যে-বারে এন্ট্রাস পরীক্ষায় জলপানি পাইয়া প্রথম হইল—সব্বাইরে কইলাম নারায়ণ আমার মুখ রাখছে। আর বিয়ার পরই যখন পাগল হইল তখন কইলাম নারায়ণ আমার তামাশা দেখছে। তিনি যেন এ-সময় কি খুঁজতে থাকলেন হাত বাড়িয়ে।

    চক্ষু স্থির, ঘোলা ঘোলা চোখ। চুল এত সাদা, গালের দাড়ি এত সাদা যে মানুষটাকে সান্তাক্লজের মতো মনে হয়। চামড়া শিথিল। বড়বৌ বলল, আপনার লাঠিটা দেব?

    —না বৌমা, তোমার হাতটা দ্যাও।

    বড়বৌ হাতটা বাড়িয়ে দিলে বৃদ্ধ সেই দু’হাত চেপে ধরে বললেন, বৌমা তুমি অন্তত বিশ্বাস কইর মণি তোমার বিয়ার আগে পাগল হয় নাই। জাইনা শুইনা আমি পাগলের সঙ্গে তোমারে ঘর করতে আনি নাই। বলে বৃদ্ধ একেবারে চুপ মেরে গেলেন। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। মুখের রেখাতে এতটুকু ভাঁজ নেই। এক ভাবলেশহীন মুখ, মুখে কোনও আর ইচ্ছার রেখা ফুটে নেই, শুধু উদাস আর উদাস। মহাকালের যাত্রী হবার জন্য যেন পৃথিবীর এক পান্থশালায় জলছত্র খুলে বসে আছেন, সারাজীবন ধরে সকলকে জল দিয়েছেন, অবশেষে সেই জলের তলানিটুকু দিয়ে হাতমুখ প্রক্ষালন করে দূরের তীর্থযাত্রী হবার জন্য উন্মুখ। বৃদ্ধ অনেক দূর থেকে যেন কথা বলছেন, মণির মার কথা শুনলে বুঝি এমন হইত না। দ্যাখ বড়বৌ, আমি বাড়ির কর্তা, মণি আমার বড় পোলা—সে কিনা ভাব কইরা ম্লেচ্ছ মাইয়া বিয়া করব—ঠিক না বৌমা! এইটা ঠিক কথা না।

    বড়বৌ এ-সব কথা শুনলে আর স্থির থাকতে পারে না। চোখ ভার হয়ে আসে। সোনার টুকরো ছেলে ভালবেসে পাগল। কথা বললেই যেন এখন দরদর করে চোখে জল চলে আসবে। সে অন্য কথা বলল, চলুন বাবা, আপনাকে ঘরে দিয়ে আসি।

    —আমি আর একটু বসি বৌমা। বসলে মনটা ভাল থাকে। বারান্দায় বইসা থাকলে বর্ষার শাপলা শালুকের গন্ধ পাই। মনে হয় তখন ঈশ্বরের খুব কাছাকাছি আছি। তোমার মায় কই?

    —মা গেছেন পদ্মপুরাণ শুনতে। আপনার পদ্মপুরাণ শুনতে ইচ্ছে হয় না বাবা?

    —পদ্মপুরাণ ত আমি নিজেই। মাগো—সারাজীবন আমি চাঁদ সদাগরের পাঠ করছি, তুই বেহুলার। বৃদ্ধ টেনে টেনে বললেন, যেন এই বয়সে কেবল বর দেওয়া যায়—এখন এমন এক বয়স আর এমন এক মানুষ তিনি—সংসারে, এ-মানুষ প্রায় ঈশ্বরের শামিল যেন—তিনি টেনে টেনে যেন অনেক দূর থেকে বলছেন—বৌমা, তুমি আমার সতী সাবিত্রী। শাঁখা সিঁদুর অক্ষয় হউক মা তর।

    .

    গভীর রাতে বড়বৌ ঘুমে আচ্ছন্ন! একটা আলো ঘরে নিবু নিবু হয়ে জ্বলছে। জানালা খোলা। বর্ষার জলজ বাতাস ঘরে ঢুকে বড়বৌর বসনভূষণ আলগা করে দিচ্ছে। বড়বৌ হাত দুটো বুকের উপর প্রায় প্রার্থনার ভঙ্গিতে রেখেছে। দেখলে মনে হবে, সে ঘুমের ভিতরও তার মানুষের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্ৰাৰ্থনা করছে। তখন মণীন্দ্রনাথ ঘরে পায়চারি করছিলেন। ওঁর চোখে ঘুম নেই। তিনি দরজা খুলে ফেললেন সহসা। নদীর ওপারে তিনি কাকে যেন ফেলে এসেছেন মনে হল।

    আকাশে এখনও কিছু কিছু নক্ষত্র জেগে আছে। ঠাকুরঘরের পাশেই সেই শেফালি গাছ, ফুলেরা ঝরছে, ঝরে আছে, এবং কিছু কিছু বোঁটায় সংলগ্ন। ওরা ভোরের জন্য অথবা রোদের জন্য প্রতীক্ষা করছে। মণীন্দ্রনাথ দুই হাতে গাছের নিচ থেকে কিছু ফুল সংগ্রহ করে বোঁটার হলুদ রঙ হাতে মাখলেন। রাত নিঃশেষ হয়ে আসছে। তিনি কি ভেবে এবার বাঁশঝাড়ের নিচে এসে দাঁড়ালেন। সামনে ঘাট–বর্ষার জল উঠোনে উঠে আসবে বুঝি, তিনি ছোট কোষা নৌকায় উঠে লগিতে ভর দিতেই নৌকাটা জলে নেমে গেল—কিছু গ্রাম মাঠ ঘুরে সেই নদীর পাড়ে চলে যাবেন—যেখানে তাঁর অন্য ভুবন নিঃসঙ্গ নির্জন নদীতীরে খেলা করে বেড়াচ্ছে।

    মাথার ভিতর এক অ-দৃষ্ট যন্ত্রণা মণীন্দ্রাথকে সর্বদা নিরুপায় করে রাখে। মণীন্দ্রনাথ কেবল নির্জনতা চান।

    কোষা নৌকা ক্রমশ গ্রাম মাঠ এবং ধানখেত অতিক্রম করে বিশাল বিলের জলে অদৃশ্য হচ্ছে। চারিদিকের গ্রামগুলি খুব ছোট মনে হচ্ছে। আকাশের সঙ্গে সব গ্রামগুলি যেন ছবির মতো হয়ে ফুটে আছে। কোনও শব্দ নেই—ভয়ানক নির্জন নিঃসঙ্গ প্রান্তর। দূরে সোনালী বালির নদীর রেখা অল্পে অল্পে দৃশ্যমান হচ্ছে। মণীন্দ্রনাথ পদ্মাসন করে বসে থাকলেন—সাধুপুরুষের মতো ভাব চোখে-মুখে। বিলের জমিতে গভীর জল—এক লগির চেয়ে বেশি হবে। মণীন্দ্রনাথ চুপচাপ বসে এই জলের ভিতর পলিনের মুখ যেন দেখতে পাচ্ছেন। পলিন কি করে যেন তার নদীর জলে হারিয়ে গেল। নদীর পাড়ে খেলা ছিল, কত খেলা! হায়, তখন কেবল সেই দূর্গের কথা মনে হয়! বড় মাঠ, মাঠের পাশে দূর্গ, দূর্গে কেবল থেকে থেকে জালালি কবুতর উড়ত। মণীন্দ্রনাথ এবার মুক্ত কণ্ঠে পরমপুরুষের মতো কবিতা আবৃত্তি করতে থাকলেন। কবিতার অবয়বে সেই এক স্মরণচিহ্ন—কীটস নামে এক কবি ছিলেন—তিনি বেঁচে নেই। পলিন মণীন্দ্রনাথের মুখে কবিতার আবৃত্তি শুনতে শুনতে এক সময় দূর্গের গম্বুজের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে যেত।

    কিছু হিজল গাছ অতিক্রম করলে নন্দীদের ঘাট। ঘাট পার হলে মুসলমান গাঁ। অনেকদিন পর যেন তিনি ঘাটে নৌকা বাঁধলেন। সর্বত্র গ্রামের ঘাটে ঘাটে পাট পচানো হয়েছে—পচা গন্ধ উঠছে, ইতস্তত কচুরিপানার ঝাঁক-নীল সাদা রঙের কচুরি ফুল এবং পাতিহাঁস ঘাটে নড়ছে। ঘাটে ঘাটে কুমড়োর মাচান, মাচানের নিচে কুমড়োলতা নেমে গেছে। তিনি সব কিছু দেখে শুনে সতর্ক পা ফেলে উপরে উঠে গেলেন। এক তকতকে উঠোনে উঠে যেতেই ধান গোলার ফাঁক থেকে হামিদ বের হয়ে এল। বলল—সব বলাই অবশ্য নিরর্থক, তবু এত বড় মানুষটা, মানুষটার আর বয়স কত, সেই যে, যবে একবার হামিদ, হাসান পীরের দরগাতে এই মানুষকে বসে থাকতে দেখেছিল—মানুষটা যেন চোখের ওপর শৈশব পার করে যৌবনে পা দিয়েছে, যৌবন থেকে কিছুতেই নড়ছে না, শক্ত বাঁধুনি, শরীরের গঠন একেবারে আস্ত একটা দ্রুতগামী অশ্বের মতো—সে বলল, আমাগ কথা এতদিনে মনে হইল বড়ভাই!

    মণীন্দ্রনাথ বড় বড় চোখে হামিদকে দেখলেন। একটু হাসলেন।

    হামিদ বলল, একটু বইসা যান বড়ভাই।

    মণীন্দ্রনাথ ওর উঠোনে উঠে গেলে হামিদ একটা জলচৌকি দিল বসতে।—বসেন বড়ভাই। সে সকলকে ডেকে বলল, কে কোন খানে আছ দ্যাখ আইসা, বড়ভাই আইছেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে হামিদের মা এল, হামিদের দুই বিবি এসে হাজির হল। বেটা, বিবিরা সকলে। এবং গ্রামে যেন বার্তা রটি গেল—সকলে এসে ঘিরে দাঁড়াল মণীন্দ্রনাথকে। সকলে আদাব দিল। মণীন্দ্রনাথ কোনও কথা বলছেন না, যতক্ষণ না বলেন ততক্ষণই ভালো। একসময় হামিদ ভিড়টাকে সরে যেতে বলল। মণীন্দ্রনাথ সকলের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছেন। হামিদ তখন তার ছোট বিবিকে বলল, বড়ভাইয়ের নৌকায় একটা কুমড়া তুইলা দিঅ। যেন গাছের যা কিছু ভালো, নতুন যা কিছু, এই মানুষকে না দিয়ে খেতে নেই।

    গ্রামের উপর দিয়ে এক সময় হাঁটতে থাকলেন মণীন্দ্রনাথ। পিছনে গাঁয়ের ছোট বড় উলঙ্গ শিশুরা এবং বালক বালিকারা আখ খেতে খেতে মণীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করছে। তিনি ওদের কিছু বলছেন না। ছোট-বড় গর্ত, বাঁশঝাড় এবং কর্দমময় পিচ্ছিল পথ অতিক্রম করে তিনি হাজি সাহেবের বাড়ির সামনে দাঁড়ালেন। বৃদ্ধ হাজি সাহেব হুঁকোর নলে মুখ রেখে কোলাহল শুনে ধরতে পারলেন, পাগল ঠাকুর আজ এ-গাঁয়ে অনেকদিন পর উঠে এসেছে। হাজি সাহেব হুঁকো ফেলে ছুটে এলেন। বললেন, ঠাকুর বইসা যাও। এদিকে আর আস না। হাজি সাহেব জানেন, এইসব কথা পাগল ঠাকুরের সঙ্গে নিরর্থক তবু এত বড় মানী ঘরের ছেলে–কোনও কথা বলবেন না তিনি—পাগল ঠাকুর এই পথ ধরে চলে যাবে—কেমন যেন ঠেকছে।

    মণীন্দ্রনাথ এখানে বসলেন না। কয়েকবার চোখ তুলে হাজি সাহেবকে দেখলেন তারপর সেই এক উচ্চারণ—গ্যাৎচোরেৎশালা।

    হাজি সাহেব হাসলেন এবং চাকরকে ডেকে বললেন, পাগল ঠাকুরের নৌকায় দুই ফালা সবরীকলা রাইখা আসবি। হাজি সাহেব মণীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করে যেন বলতে চাইলেন–ঠাকুর, কলাগুলি নিয়া যাও, পাকলে খাইয়। গাছের কলা—তোমারে না দিয়া খাইলে মনটা খুঁতখুঁত করবে। তারপর হাজি সাহেব আল্লার কাছে যেন নালিশের ভঙ্গিতে বলতে থাকলেন, বুড়া কর্তার কপালে এই আছিল খোদা!

    বর্ষাকাল। ঘন ঘন বৃষ্টি হচ্ছিল বলে পথ ভয়ানক কর্দমাক্ত। কোথাও হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছে—সুতরাং মণীন্দ্রনাথের কষ্ট হচ্ছিল হাঁটতে। পথের দু’পাশে আবর্জনা, মলমূত্রের দুর্গন্ধ। মণীন্দ্রনাথ এ-সবের কিছুই টের করতে পারছেন না। গ্রামের মুসলমান বিবিরা পাগল ঠাকুরকে দেখে পলকে ঘরে নিজেদের আড়াল করে দিচ্ছে। ওরা বড় নিঃস্ব। সুতরাং শরীরে পর্যাপ্ত আবরণ নেই। পুরুষেরা এখন প্রায় সকলেই মাঠে অথবা অন্যত্র পাট কাটতে গেছে। ওরা বিকেলে ফিরবে। মণীন্দ্রনাথ গ্রামটাকে চক্কর মেরে ফের ঘাটে এসে বসলেন নৌকায়। তারপর উদ্যোগী পুরুষের মতো সংগৃহীত বস্তুসকলকে একপাশে সাজিয়ে রেখে নৌকা বাইতে থাকলেন বর্ষার জলে। ঘাটে উলঙ্গ শিশুরা, বালক-বালিকারা পাগল ঠাকুরকে নেচে গেয়ে বিদায় জানাল। আর এ-সময়ই তিনি মনে করতে পারলেন বড়বৌ অপেক্ষা করতে থাকবে এবং বড়বৌর জন্য মনটা কেমন করে উঠছে। বড়বৌর সেই গভীর চোখ মণীন্দ্রনাথকে বাড়িমুখো করে তুলল। অথচ বিলের ভিতর পড়েই মণীন্দ্রনাথের বাড়ি ফেরার স্পৃহা উবে গেল। তিনি বিলের ভিতর চুপচাপ বসে থাকলেন। কতক্ষণ এভাবে বসে থাকলেন, কতক্ষণ তিনি সকালের সূর্য দেখলেন, বিশ্বাসপাড়া, নয়াপাড়ার উপর একদল কাকের উপদ্রব এবং ধানখেতে ঢুব ঢুব শব্দ কতক্ষণ তাঁকে অন্যমনস্ক করে রেখেছিল তিনি জানেন না। তিনি জলে নেমে গেলেন এবং স্বচ্ছ জলে সাঁতরাতে থাকলেন, শরীরের সর্বত্র গরম—এতবার ডুব দিয়েও তাঁর শরীরের ভিতরে যে কষ্ট, কষ্টটাকে দূর করতে পারছেন না। এই নির্জন বিলে এসে চুপচাপ বসে থেকে তিনি কতবার ভেবেছেন অপরিচিত সব শব্দ অথবা অশ্লীল উচ্চারণ থেকে বিরত হবেন। কিন্তু পারছেন না। সব কেমন ক্রমশ ভুল হয়ে যাচ্ছে। সব কেমন স্মৃতির অতলে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। জীবনধারণের জন্য কি করা কর্তব্য—অনেক ভেবেও কোনও পথ ঠিক করতে পারছেন না। তখন ভয়ঙ্কর বিরক্তভাব ওঁকে আরও প্রকট করে তোলে। দুহাত ওপরে তুলে চিৎকার করতে থাকেন—আমি রাজা হব।

    বিকেলের দিকে ভূপেন্দ্রনাথ এলেন কর্মস্থল থেকে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ক’দিন থেকেই বাপের জন্য মনটা খারাপ লাগছিল। বুড়ো মানুষটার জন্য ভূপেন্দ্রনাথের বড় টান। এখনও যেন তিনি সকলকে আগলে আছেন। যৌবনে ভূপেন্দ্রনাথের কিছু আদর্শ ছিল। এখন আর তা নেই। স্বাধীনতা আসবে, স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বপ্ন চোখে ভাসত। কিন্তু বড়দা পাগল হয়ে গেল—এত বড় সংসার শুধু জমি এবং যজমানিতে চলে না, ভূপেন্দ্রনাথ স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেলেন। বুড়ো মানুষটার জন্য, এত বড় সংসারের জন্য তিনি পায়ে হেঁটে নতুন ধানের ছড়া আনতে চলে গেলেন। সংসারে তাঁর জীবন প্রায় এক উৎসর্গীকৃত প্রাণ যেন। বিবাহ করা হয়ে উঠল না। চন্দ্রনাথের বিয়ে দিলেন; এখন শুধু কাজের ফাঁকে ফাঁকে এই দেশে চলে আসা এবং বুড়ো মানুষটার পাশে সংসারের গল্প, জোতজমির গল্প, কোন জমিতে কোন ফসল দিলে ভালো হবে—এমন সব পরামর্শ। মনেই হয় না মানুষটার জীবনে অন্য কিছুর প্রয়োজন আছে।

    ভূপেন্দ্রনাথ নৌকা থেকে নামতেই বাড়ির সকলে যেন টের পেয়ে গেল—মুড়াপাড়া থেকে নৌকা এসেছে, চাল, চিনি, কলা, কদমা এবং বর্ষাকাল বলে বড় বড় আখ এসেছে। ধনবৌ তাড়াতাড়ি ঘোমটা টেনে ঘরে ঢুকে গেল। তিনি এখন এ-পথেই উঠে আসবেন।

    তিনি প্রথমেই বাড়িতে উঠে ছড়িটা বারান্দায় রেখে যে-ঘরে বুড়ো মানুষটা চুপচাপ বসে থাকেন সেখানে উঠে গেলেন। বাবাকে, মাকে প্রণাম করলেন। বুড়ো মানুষটা তাঁর কুশল নিলেন। মনিবের কুশল নিলেন। শরীর কেমন, এ-সব জিজ্ঞাসাবাদের পর মনে হল উঠোনে কে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝি বড়বৌ। বড়বৌকে প্রণাম করতে হয়। উঠোনে নেমে বাড়িটার কী কী পরিবর্তন হয়েছে লক্ষ করতে গিয়ে মনে হল বাড়িটার সেই শুকনো ভাবটা নেই। বাড়ির চারদিকে ঝোপঝাড়গুলি বেড়ে উঠেছে। উত্তরের ঘর পার হয়ে কামরাঙা গাছের পাশে ছোট একটা মাচান। মাচানে কিছু শশার লতানে গাছ, হলদে ফুল। কচি শশা দুটো-একটা ঝুলছে। পাশে ঝিঙের মাচান, করলার মাচান। চন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই ওগুলো লাগিয়ে গেছে। সেই দুই নাবালককে খুঁজতে থাকলেন তিনি। ওরা এখন বাড়িতে নেই—কোথায় গেল! গোটা বাড়িটা এই দুই নাবালক—লালটু পলটু চিৎকার চেঁচামেচি করে জাগিয়ে রাখে। ওদের জন্য সে হলদে রঙের পুরুষ্ট আখ এনেছে। মোটা এবং সরস। নরম এই আখ ওদের খুব প্রিয়। নিজে ভেঙে দিতে পারলে কেমন যেন মনটা ওঁর ভরে যায়। অরা গেল কৈ! এমন একটা প্রশ্ন মনে মনে।

    সেই দুই বালক তখন ছুটছিল। মেজকাকা এসেছে। পলটুর মেজকাকা লালটুর মেজ জ্যাঠামশাই—ওরা গ্রামের ওপর দিয়ে ছুটছে। ওরা খবর পেয়ে গেছে মুড়াপাড়া থেকে নৌকা এসেছে। নৌকা আসা মানে ওদের জন্য আখ এসেছে, কমলার দিনে কমলা, তিলা-কদমার দিনে তিলা-কদমা। অথবা আম-জাম জামরুলের দিনে নানারকমের ফল। ওরা এসে দেখল, অলিমদ্দি মাথায় করে সব চাল-ডাল-তেল অথবা করলা-ঝিঙে নামাচ্ছে। একটা বড় মাছ এনেছেন, সেটা গলুইর নিচে, লালটু পলটু দু’জনে মাছটাকে টেনে তুলে আনছে। প্রায় এখন যেন উৎসবের মতো বাড়ি। কেবল বড়বৌ বিষণ্ণ চোখে চারদিকে কাকে যেন সারাদিন থেকে খুঁজছে। কে যেন তার চলে গেছে, আসার কথা, আসছে না। বড়বৌর বড় বড় অসহায় চোখ দেখে ভূপেন্দ্রনাথ ধরতে পারলেন—বড়দা আবার নিরুদ্দেশে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে যেন ভিতরে কী এক কষ্ট ভেসে উঠল। বড়বৌর মুখের দিকে আর তাকাতে পারলেন না।

    বিকেলের দিকে বুড়ো মানুষটা ভূপেন্দ্রনাথের কাছ থেকে নানারকম খবর নেবার জন্য বারান্দায় বসে থাকলেন। ভূপেন্দ্রনাথ পায়ের কাছে বসে সব বলছিলেন—এটা স্বভাব তাঁর। মুড়াপাড়া থেকে এলেই বাবাকে পৃথিবীর সব খবর দিতে হয়। বাবুরা অর্ধসাপ্তাহিক আনন্দবাজার কাগজ পড়েন। বাবুদের পড়া হয়ে গেলে ভূপেন্দ্রনাথ প্রায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব মুখস্থ করে ফেলেন। কেউ এলে তখন পত্রিকার খবর, যেন তার নখদর্পণে এই জগৎ সংসার। বাড়িতে এলে প্রাজ্ঞ ব্যক্তির মতো দেশের কথা বর্ণনা করেন। কাগজ থেকে কিছু খবরের কথা উল্লেখ করে বললেন, এবারে লীগপন্থীরা যে-ভাবে উইঠাপইড়া লাগছে তাতে আবার রায়ট লাগল বইলা।

    বৃদ্ধ অত্যন্ত আস্তে আস্তে বললেন, হাফিজদ্দির পোলা সামুরে তুই ত চিনস! সে নাকি টোডারবাগে লীগের ডেরা করছে। গাছে গাছে ইস্তাহার ঝুলাইতাছে। দেশটা দিন দিন কি হইয়া যাইতাছে বুঝি না।

    ভূপেন্দ্রনাথ বললেন, বাবা, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দ্যাখলাম, গারো পাহাড় থেকে শহরে একজন সন্ন্যাসী আইছে। ভূত-ভবিষ্যৎ সব কইতে পারে। ভাবছিলাম বড়দারে নিয়া যামু।

    —যাও, যা ভাল বোঝ কর।

    —সঙ্গে ঈশম চলুক।

    বড়বৌ ঘরের ভিতর বসে বসে চাল, প্রায় দু’বস্তা চাল, ঝেড়ে তুলে রাখছে। সবজি যা এসেছে সাজিয়ে রাখছে। পাগল মানুষটাকে নিয়ে যাবে ওরা। সামান্য আশার আলো মনের ভিতরে জ্বলে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই কেমন তা নিভে গেল। মানুষটাকে নিরাময় করার জন্য কত চেষ্টা—দেখতে দেখতে প্রায় দশ বছর কেটে গেল। মানুষটা কিছুতেই ভালো হচ্ছে না।

    —আজকাল ত মণি দুই তিনদিন বাড়ি আসে না। কই থাকে, খায় ঈশ্বরই জানে।

    ভূপেন্দ্রনাথ যেন বলতে চেয়েছিলেন—এ ভাবে না খেয়ে ঘুরছে, কোথায় থাকছে, কোথায় রাত কাটাচ্ছে কেউ কিছু বলতে পারছে না—বরং বেঁধে রাখা ভালো। কিন্তু বলতে পারলেন না, কারণ এই ঘরে এখন মা আছেন, বড়বৌ আছে—ওরা সকলে এমন কথা বিশ্বাসই করতে পারবে না, তা’হলে যেন বাবা যে দু’দিন আরও বাঁচতেন তাও বাঁচবেন না। সুতরাং তিনি অন্য কথা বললেন, সোনারে আনেন দেখি, দ্যাখতে কেমন হইল দ্যাখি।

    বড়বৌ সোনাকে কোলে দিলে কেমন তাজ্জব হয়ে গেলেন তিনি। একেবারে বড়দার মুখ পেয়েছে। সোনাকে কাঁধে করে বারবাড়িতে চলে এলেন। সোনা যেমন অ আ ত ত করে কথা বলে তেমনি কথা বলছিল। অপরিচিত মানুষ দেখে সে এতটুকু কাঁদেনি। বরং মাঝে মাঝে কুটুস কুটুস দাঁতে কামড়াচ্ছিল। সোনার দুটো ছোট ইঁদুরের মতো দাঁত উঠেছে।—পোলা, তোমার অসুখ হইব দ্যাখতাছি। বলে দাঁতে দুটো টোকা দিলেন। যেন এই শিশুকে দাঁতে আঘাত করে ওর কঠিন অসুখ থেকে রক্ষা করছেন ভূপেন্দ্রনাথ। সোনা ভয়ঙ্করভাবে কেঁদে উঠতেই পাশের বাড়ির দীনবন্ধু পিছন থেকে ডাকল, মাইজা ভাই, ঢাকায় নাকি আবার রায়ট লাগব শুনছি।

    —তা লাগতে পারে।

    —কেডা জিতব মনে হয়?

    —কী কইরা কই! হার জিতের কি আছে ক?

    —কী দুর্ধর্ষ দ্যাখেন, দুধের পোলা, হালার হালা কথা নাই বার্তা নাই চাকু চালায়।

    —তুই দ্যাখছস নাকি?

    —তা দ্যাখমু না ক্যান। মালতীর বিয়ার সময় একবার ঢাকা শহরে গেছিলাম। ঘুইরা ফিরা দ্যাখলাম শহরটা। এলাহি কাণ্ড—না!—রমনার মাঠে গ্যালাম, সদর ঘাটের কামান দ্যাখলাম।

    .

    সন্ধ্যার পর ধনবৌ পশ্চিমের ঘরে হারিকেন জ্বেলে রেখে গেল। হাত-পা ধোওয়ার জল রেখে গেল। একটা জলচৌকি, ঘটি এবং গামছা রেখে দিল। তিনি হাত-পা ধুয়ে ঘরে ঢুকে যাবেন। আর বের হবেন না। কারণ গ্রামে খবরটা রটে গেছে। মুড়াপাড়া থেকে মাইজা কর্তা এসেছেন। বিশ্বের খবর তাঁর জানা আছে। গ্রামের পালবাড়ি থেকে মাঝিবাড়ি অথবা চন্দদের বাড়ি থেকে প্রৌঢ়গণ হাতে লাঠি এবং লণ্ঠন নিয়ে খড়ম পায়ে ঠাকুরবাড়ি এসে ডাকল, ভূপেন আছ? মাইজা কর্তা আছেন?

    ভূপেন্দ্রনাথ তখন হয়তো তক্তপোশে বসে ঈশ্বরের নাম নিচ্ছিলেন অথবা ঈশমের কুশলবার্তা। তখন তিনি এক দুই করে খড়মের শব্দ শুনতে পেলেন। গ্রামের বয়স্ক মানুষেরা এখন এসে ভিড় করবে। আড্ডা দেবে এবং পত্রিকার খবর নেবে। দেশের খবর, বিদেশের খবর, গান্ধীজী কি ভাবছেন, এমন সব খবরের জন্য ওরা উন্মুখ হয়ে থাকে। তিনি এই আড্ডার প্রাণ। তিনি তখন ঈশ্বরের চেয়েও বড়, তার কথা এদের কাছে ঈশ্বরের শামিল—এই বিশ্বাস লোকগুলির মনে। তিনি তখন বলবেন, দেশের বড় দুরবস্থা হারান।

    —ক্যান কাকা?

    —কাইল সারা বাজার ঘুইরা বাবুরহাটের একটা শাড়ি পাইলাম না।

    ক্যান এমন হইল?

    —কি জানি! মহালে তর আদাই নাই। এদিকে তোমার সারা ভারতে আইন অমান্য আন্দোলন চালাইতেছেন গান্ধী। ইংরাজরাও ছাইড়া কথা কইতাছে না। লাঠি চালাইতেছে। গুলি করতাছে। এদিকে তোমার বিলাতের প্রধানমন্ত্রী লীগের পক্ষ নিছে। সুতরাং বুঝতেই পারছ লীগের পোয়াবার।

    মাঝিবাড়ির শ্রীশ চন্দ্র বলল, ঘোর কলিকাল আইসা গেল মাইজা ভাই।

    ভূপেন্দ্রনাথ বললেন, চারিদিকে তর একটা ষড়যন্ত্র। আনন্দময়ী কালীবাড়ির পাশে বনজঙ্গলের ভিতর পুরানো একটা বাড়ি আছে, একটা দিঘি আছে। কেউ খবর রাখে না। এখন তর চরের মৌলভি-সাব কয় ওটা নাকি মসজিদ। মুসলমানরা কয় নামাজ পড়ব।

    —তা হইলে গণ্ডগোল একটা লাগব কন!

    —বাবুরা কি ছাইড়া দিব? জায়গাটা অমর্ত্যবাবুর! পাশে আনন্দময়ী কালীবাড়ী। আগুন জ্বলতে কতক্ষণ।

    —অঃ, আমার হোমন্দির পো’ রে, দেশে আর বিচার নাই। আমাগ জাতধর্ম নাই। পূজা-পাৰ্বণ নাই। মাকালী নিব্বংশ কইরা দিব। তখনই সে দেখল উঠোনে ঈশম বসে তামাক টানছে। মাইজা কর্তা এলে একটু দেরি করে সে গোয়ালে গরু বাছুর তোলে। ঈশমকে দেখে সে কেমন জিভে কামড় দিয়ে ফেলল। উঠোনে মানুষটা বসে আছে সে খেয়ালই করেনি। এবার কেমন গলা নামিয়ে দুঃখের সঙ্গে বলল, আমার দোকান থাইকা মাইজা ভাই মুসলমান খরিদ্দার সওদা করতে চায় না। কতদিনের সব খরিদ্দার। কত বিশ্বাসের সব—অরা সরিবদ্দির দোকানে খায়।

    এ-সময় সকলেই চুপ হয়ে গেল। কেউ কোনও কথা বলতে পারল না। শ্রীশ চন্দ তার দুঃখের কথা বলে চুপ হয়ে গেছে। ভূপেন্দ্ৰনাথ হুঁকা টানছেন। জোর হাওয়ার জন্য আলোটা মৃদু-মৃদু কাঁপছিল। দূরে সোনালী বালির নদী থেকে গয়না নৌকার হাঁক আসছে। শচীন্দ্রনাথ ঠাকুরঘরে শীতল ভোগ দিচ্ছেন। ঘণ্টার শব্দ, গয়না নৌকার হাঁক এবং ঈশমের ব্যাজার মুখ সকলকেই কেমন পীড়িত করছে। বুড়ো মানুষটা ঘরে শুয়ে শুয়ে কাঁদছেন। কোথায় এখন তাঁর পাগল ছেলে হেঁটে বেড়াচ্ছে অথবা গাছের নিচে শুয়ে আছে কে জানে। বড়বৌ পুবের ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে আছে। সামনে কামরাঙা গাছ, গাছ পার হলে বেতের ঝোপ এবং ডুমুরের গাছটা পার হলে মাঠ। বড় চাঁদ উঠে আসছে গাছটার মাথায়। এখন সাদা জ্যোৎস্না সর্বত্র। গাছগুলি স্পষ্ট। ফাঁকা মাঠে ধানগাছে সামান্য কুয়াশার পাতলা আবরণ। সে পথের দিকে তাকিয়ে আছে—যদি কোনও মানুষের ছায়া এই পথে উঠে আসে, যদি মানুষটা লগি বাইতে থাকে সামনের মাঠে অথবা নৌকার শব্দ পেলেই চমকে ওঠে—এই বুঝি এল, সাধু-সন্ন্যাসীর মতো এক উদাসীন মানুষ বুঝি বাড়ি ফিরে এল। পাগল মানুষটার প্রতীক্ষাতে বড়বৌ দাঁড়িয়ে আছে। ওর মানুষটার জন্য কেন জানি কেবল কান্না পাচ্ছিল।

    .

    কিছুদূর এসেই মণীন্দ্রনাথের বাড়ি ফেরার স্পৃহা উবে গেল। তিনি বার বার ধানখেতের চারপাশে ঘুরতে থাকলেন এবং মাঝে মাঝে নৌকাকে ঘুরিয়ে দিয়ে লগিটাকে মাথার উপর লাঠিখেলার মতো ঘোরাতে থাকলেন। এই যে নক্ষত্রপুঞ্জ আছে, আকাশ রয়েছে এবং বিলের জলে কোড়া পাখি ডাকছে সব কিছুর ভিতর কোন এক অদৃশ্য সংগ্রাম তাঁর। পাটাতনে লাফ দিচ্ছিলেন। হাতে ধরে কি যেন আয়ত্তে এনেছেন, তারপর গলা টিপে হত্যা। যত তিনি লাঠিটা ঘোরাচ্ছিলেন তত বন-বন শব্দ হচ্ছে। দূরে যারা পাট কাটছিল তারা দেখল বিলের জলে নৌকা ভাসছে আর পাগলঠাকুর মথার উপর লগি ঘোরাচ্ছে। কি মানুষটা কি হইয়া গ্যাল এমন সব চিন্তা।

    তিনি অনেক দূরে চলে এসেছিলেন নৌকা বাইতে বাইতে। সুতরাং ঘরে ফিরতে বেশ দেরি হবে। বড়বৌর বড় এবং গভীর চোখ দুটো তাকে এখন কষ্ট দিচ্ছে এই ভেবে যখন ধানখেত ভেঙে ঘরে ফেরার স্পৃহাতে লগি তুলছেন তখনই দেখতে পেলেন, সোনালী বালির নদীর বুকে একটা বড় পানসি নাও। তার কেন জানি মনে হল—এই নৌকায় পলিন আছে। পলিনকে নিয়ে এই নাও কোন এক অদৃশ্যলোকে হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি পাটাতনের নিচ থেকে বৈঠা বের করে জলে বড় বড় ঢেউ তুলতেই নৌকাটি গিয়ে হুমড়ি খেয়ে নদীতে পড়ল। স্রোতের মুখে তিনি ভেসে চলেছেন। এখন কোনও বেগ পেতে হচ্ছে না মণীন্দ্রনাথকে—তিনি পানসি নৌকাটার পেছনে হাল ধরে শুধু বসে আছেন।

    পানসি নৌকার মানুষেরা দেখল পিছনে পিছনে একটা নৌকা আসছে। হালে বসে আছে উদোম গায়ে গৌরবর্ণ এক সুপুরুষ। রোদে পুড়ে রঙটা তামাটে হয়ে গেছে। হালে মানুষটা প্রায় যেন চোখ বুজে আছে। এই বর্ষা এবং তার স্রোত যেদিকে নিয়ে যায় যাবে—মানুষগুলি দেখে হাসাহাসি করছিল। ভিতরে জমিদার পুত্র এবং বাঈজী বিলাসী একঘরে এক বিছানায়। গান শেষে কিছু কিছু কৌতুকের কথাবার্তা। এবং সরোদের টুংটাং শব্দ। বিলাসী তারে হাত রেখে পা দুটো ছড়িয়ে-হায় সজনিয়া, এমন এক ভঙ্গি টেনে পড়ে আছে। চোখমুখ জড়িয়ে আসছিল, নেশায় ওরা পরস্পর তাকাতে পারছে না। মণীন্দ্রনাথ দীর্ঘপথ ওদের কেবল অনুসরণ করলেন। তিনি সরোদের গম্ভীর আওয়াজের ভিতর কেবল যেন এক মেয়ের মুখ দেখতে পান—তিনি পলিনের অবয়ব এবং তার মুখ, তার প্রেম সম্পর্কিত সকল ঘটনা এই ধানখেতের ফাঁকে ফাঁকে সোনালী বালির নদীর চরে, জলে সর্বত্র দেখতে পাচ্ছেন। অথচ এক সময় আবার সবই কেমন গুলিয়ে গেল। কেন যে এত দীর্ঘ পথ পানসি নৌকার পিছনে অনুসরণ করলেন, মনে করতে পারছেন না। কোন পথ ধরে ঘরে ফিরতে হবে সব যেন ভুলে গেলেন। তিনি এবার নদী থেকে চরে উঠে আসার জন্য নৌকার মুখ ফেরালেন, কাশবনের ভিতর ঢুকে আর পথ পেলেন না। সূর্য পশ্চিমে হেলে গেছে—এবার সূর্যাস্ত হবে—কিছু গগনভেরী পাখির আর্তনাদ আকাশের প্রান্তে শোনা যাচ্ছিল এবং দূরে হাটফেরত মানুষেরা ঘরে ফিরছে। তিনি নৌকার পাটাতনে এবার শুয়ে পড়লেন। শরীরের কোথায় কী যেন কষ্ট। তৃষ্ণার্ত এবং ক্ষুধার্ত। অথচ কী করলে এই কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পাবেন বুঝতে পারছেন না। সুতরাং চুপচাপ শুয়ে থেকে গগনভেরী পাখির আর্তনাদ কোথায় কোন আকাশে উড়ছে খুঁজতে থাকলেন। আকাশ একেবারে নিঃসঙ্গ। কোথাও একটা পাখি একটা ফড়িঙ পর্যন্ত উড়ছে না। তিনি ক্লান্ত গলায় যেন বলতে চাইলেন, পলিন, আমি তোমার কাছে যাব।

    দূরে কোন গ্রাম—সেখান থেকে কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ ভেসে আসছে। কোন মুসলমান গ্রাম থেকে আজানের শব্দ। কিছু কিছু নক্ষত্র আকাশে ফুলের মতো ফুটে উঠছে। এখন আকাশটাকে তত আর নিঃসঙ্গ মনে হয় না। কতদূর এইসব নক্ষত্রের জগৎ—ইচ্ছা করলে ওদের ধরা যায় না! এইসব নক্ষত্রের জগতে অথবা নীহারিকাপুঞ্জে নৌকায় পাল তুলে ঘুমিয়ে থাকলে কেমন হয়! তিনি কত বিচিত্র চিন্তা করতে করতে সবকিছুর খেই হারিয়ে সহসা কেমন উত্তেজনা বোধ করেন।

    কিছু জোনাকি জ্বলছে ধানগাছের পাতার আড়ালে। জ্যোৎস্নায় এই ধরণী শান্ত এবং স্থির। অল্প অল্প হাওয়া দিচ্ছে। সমস্ত দিনের ক্লান্তি এই মিষ্টি হাওয়ায় কেমন উবে গেল। ফের পলিনের মুখ মনে পড়ছে। মণীন্দ্রনাথ কাৎ হয়ে শুয়েছিলেন এবং বিড়বিড় করে বকছিলেন। দেখলে মনে হবে না—তিনি এখন সুদূর কলকাতায় কোনও ইউরোপীয় পরিবারের সঙ্গে আলাপ করছেন। মনে হবে বিড়বিড় করে কি শুধু বকে যাচ্ছেন। জোরে জোরে উচ্চারণ করলে ইংরেজির স্পষ্ট উচ্চারণে সব ধরা পড়ত, কিন্তু হাতের ওপর মাথা রেখে অথবা এইসব কথা তাকে শুধু পাগল বলেই প্রতিপন্ন করছে। আমি পলিনকে ভালবাসি—এই উক্তি পরিবারের সকলের কাছে চিৎকার করে বলতে পারলে যেন খুশি হতেন। অথচ অঘটন ঘটে গেল। মণীন্দ্রনাথ যেন পিতৃসত্য পালনে বনবাসে গমন করলেন। পিতৃ আজ্ঞা শিরোধার্য করতে গিয়ে দ্বিধা এবং দ্বন্দ্বে অবশেষে বলেই ফেললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    মণীন্দ্রনাথ যখন দেখলেন মাঠে অথবা নদীর জলে কোথাও কোনোও নৌকার শব্দ উঠছে না তখন তিনি দাঁড়িয়ে বলতে চাইলেন, পলিন, আমি পাগল হইনি। আমাকে সবাই অযথা পাগল বলছে। আমি তোমার কাছে গেলেই ভালো হয়ে যাব। এইসব কথা এখন মাঠে মাঠে জলে জলে বনে বনে ঘাসে ঘাসে সর্বত্র প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরছে—আমি পাগল হইনি। সবাই অযথা আমাকে পাগল বলছে।

    .

    রাত বাড়ছে। লালটু পলটু পড়ছে দক্ষিণের ঘরে। ঈশম আজ বুঝি বাড়ি যাবে না, গেলেও রাত করে যাবে। সে দক্ষিণের ঘরে মাদুর পেতে শুয়ে আছে। ধনবৌ হেঁশেলে। শশীবালা দরজায় বসে, কোলে সোনা ঘুমিয়ে পড়েছে। তিনি তালপাতার পাখা নাড়ছেন। গরম পড়েছে বেশ। পশ্চিমের ঘরে যারা এতক্ষণ বসে রাজাউজির মারছিল, রাত গভীর হলে এক এক করে সকলে চলে গেল। দীনবন্ধু কেবল যায়নি। সে মেজকর্তার পায়ের কাছে বসে হুঁকো টানছিল। এবং জমিদারী সেরেস্তার গল্প শুনে কর্তার মন জয় করার তালে ছিল। দীনবন্ধু এতদিন যে জমিটা ভোগ করছে ভাগে, সে কর্তাকে খুশি করে জমিটার ভোগদখল চাইছে।

    শশীবালা রান্না হলে সকলকে খেতে ডাকলেন। বড়বৌ কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি পেতে দিল। লালটু পলটুর জন্য ছোট পিঁড়ি। জল দিল। বড় দোচালা ঘর। মুলি বাঁশের বেড়া সিমেণ্ট বাঁধানো মেঝে। শশীবালা এখন দরজার কাঠে হেলান দিয়ে ছেলেদের খাওয়া দেখবেন। বড়বৌ পরিবেশন করবে, ধনবৌ হেঁশেলে ঘোমটা টেনে বসে থাকবে—মাঝে মাঝে কানের কাছে কথা ধনবৌর, ফিসফিস করে কথা—এটা ওটা বড়বৌকে এগিয়ে দেবে।

    খেতে বসেই ভূপেন্দ্রনাথের মনটা ভারি হয়ে উঠল। বড়দার আসন পড়েনি। একটা দিক খালি! সেদিকে তাকিয়ে ভূপেন্দ্রনাথ বললেন, বড়দা কখন বাইর হইছে?

    শচীনাথ পঞ্চদেবতার উদ্দেশে নিবেদন করছিলেন তখন, জলটা গণ্ডুষ করবে, ঠিক তখন মুখ তুলে তাকালেন। তাঁর এখন খেয়াল থাকে না—বড়দার আসন খালি, তিনি জলটা গণ্ডুষ-করে বললেন, পরশু ভোরে বৌদি উইঠা দেখে দরজা খোলা। ঘাটে গিয়া দেখি কোষাটা নাই। হাসিমের বাপ কইছে তাইন নাকি দুপুরে বিলের দিকে নৌকা বাইয়া নাইমা গ্যাছে।

    —কাইল একবার চল দেখি—অলিমদ্দিরে লইয়া যাই।

    —চলেন। তবে মনে লয় পাইবেন না। কই থাকে কই যায় কেউ জানে না।

    বড়বৌ কোনও কথা বলছিল না। বসে বসে শুনছিল। এবং চোখে জল এসে গেলে ঘোমটা সামান্য টেনে দিল। কোন নালিশ নেই এমন ভাব চোখে-মুখে। কোনওদিন সুপুরুষ লোকটি আদর করে কথা বলেনি। কোনও প্রেম সম্পর্কিত সুখী ঘটনা ইদানীং আর ঘটছে না। শুধু মাঝে মাঝে তাও ক্বচিৎ কখনও বুকের কাছে টেনে এনে দস্যুর মতো কি এক আদিম প্রেরণা যেন, চোখমুখ ঘোলা ঘোলা—মানুষ বলে চেনা যায় না। বুকের কাছে নিয়ে একেবারে বন্যজীবের মতো করতে থাকে; বড়বৌ শরীর ছেড়ে দেয়—যা খুশী করুক—পাগল মানুষটাকে সে শিশুর মতো, অথবা সন্তানের মতো, অথবা তুমি যে এক আদিম মানুষ সে কথা তুমি কি করে ভুলে যাও—আমাকে দ্যাখো, খেলা কর। বন্যজীবের মতো বুকের কাছে টেনে নেবার ঘটনাও সে আঙুলে গুনে বলতে পারে—কত দিন, কতবার—জ্যোৎস্না রাত ছিল, না অন্ধকার রাত ছিল, সব বলে দিতে পারে।

    দু’দিনের উপর হয়ে গেছে। মানুষটা ফিরছে না। বড়বৌ পাগলঠাকুরকে আপনার ধন বলে জানে। মণীন্দ্রনাথ নামক ব্যক্তিটি বড় অপরিচিতি। বিয়ের পিঁড়িতে সে যেন এই পাগল মানুষটাকেই দেখেছিল। অশান্ত পুরুষ, জীবন থেকে তাঁর সোনার হরিণ হারিয়ে গেছে—মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন, অভিশাপ দেবার বাসনা যেন এবং মনে হচ্ছিল তিনি তাঁর লাবণ্যময়ীকে গিলে খাবেন। এত লোকজন, এত আলো আর সমারোহ, তবু বড়বৌর সেদিন ভয় করছিল। রাতে দিদিকে ডেকে বলেছিল, দিদি আমার বড় ভয় করছে। মানুষট। যেন আমাকে গিলে ফেলবে। আমাকে তোমরা কি দেখে বিয়ে দিলে! এমন গ্রাম জায়গায় আমি থাকবো কী করে! পরে বড়বৌ বুঝেছিল,—মানুষটি নিরীহ এবং মস্তিষ্ক বিকৃতি আছে। ততদিনে সে এই সুপুরুষ ব্যক্তিটিকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবেসে ফেলেছে। সুতরাং দুঃখকে জীবনের নিত্য অনুগামী ভেবে আজ-কাল আর নিজের জন্য আদৌ ভাবে না—মানুষটার জন্য রাতে কেবল ঘুম আসে না, কেবল জেগে বসে থাকে মানুষটা কখন ফিরবে।

    রাত ঘন হচ্ছিল। ঘাটে বড়বৌ বাসন মাজছে। সোনা কাঁদছিল বলে ধনবৌকে পাঠিয়ে দিয়েছে। সে এখন একা এই ঘাটে। শশীবালা খেয়েদেয়ে এইমাত্র বড়ঘরে ঢুকে গেছেন। নির্জন রাতে এমন কি বুড়ো মানুষটার কাশির শব্দও ভেসে আসছে না। বোধ হয় এখন সকলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। নৌকাটা অলিমদ্দি ঘাটে রাখেনি। ঘাটের কিছুটা দূরে লগিতে বেঁধে ঘুমিয়ে পড়েছে। বড়বৌর বাসন মাজা হয়ে গেছে, তবু উঠতে ইচ্ছা করছে না। ঘাটের একপাশে লণ্ঠনের আলোতে বড়বৌর মুখ বিষণ্ণ। জ্যোৎস্না রাত বলে দূরের মাঠ দিয়ে নৌকা গেলে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আজ আর কুয়াশা ভাবটা নেই। বড়বৌ এই ঘাটে সেই নিরুদ্দিষ্ট মানুষের জন্য বসে আছে। তিনি হয়তো আসছেন, এক্ষুনি এসে পড়বেন। বড়বৌর কথা মনে ভেসে উঠলে মানুষটা পাগলের মতো ঘরের দিকে ছুটতে থাকেন।

    রাত বাড়ছে। একা একা ঘাটে বসে থাকতে আর সাহস পেল না বড়বৌ। শুধু ঝোপ জঙ্গলে কিছু অপরিচিত পাখ-পাখালি, কীট-পতঙ্গ রাতের প্রহর ঘোষণায় মত্ত। আলকুশি লতার ঝোপে ঢুব-ঢুব আওয়াজ। গন্ধপাদাল ঝোপে ঝিঁঝিঁ-পোকা ডাকছে। রাত গভীর হলে, নিশীথের প্রাণীরা কত হাজার হবে লক্ষ হবে এবং লক্ষ কোটির প্রাণের সাড়া এই ভুবনময়। গভীর রাতে জেগে থেকে টের পায় বড়বৌ, যেন মানুষটা এখন নিশীথের জীব হয়ে জলে-জঙ্গলে ঘোরাফেরা করছে।

    রান্নাঘরে বাসনকোসন রেখে পুবের ঘরে উঠে যাবার মুখেই মনে হল ঘাটে লগির শব্দ। বড়বৌর বুকটা কেঁপে উঠল। তাড়াতাড়ি ছুটে গেল ঘাটে। মানুষটা লাফ দিয়ে নৌকা থেকে নামছে। নৌকোটাকে টেনে প্রায় জমিতে তুলে ফেলল। কোন দিকে দৃকপাত নেই। লম্বা উঁচু মানুষটা—কী যে লম্বা আর কী যে রহস্যময় চোখ—এই সুদৃশ্য জ্যোৎস্নায় যেন এক দেবদূত আকাশ থেকে নেমে এসেছেন। বড়বৌ দেখল মানুষটার শরীরে কোনও বসন নেই। একেবারে প্রায় উলঙ্গ এবং শিশুর মতো বড়বৌকে জেগে থাকতে দেখে হাসছে। নৌকায় কচু কুমড়া কলা। যার যা কিছু প্রথম গাছে হয়েছে, মানুষটাকে দিয়ে দিয়েছে। বড়বৌ বিস্ময়ে কোনও কথা বলতে পারল না। যেন এক সন্ন্যাসী দীর্ঘদিন তীর্থ-ভ্রমণের পর নিজের ডেরাতে হাজির হয়েছে। অন্যদিন হলে তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে কাপড় পেড়ে আনত। আজ কিছুই ইচ্ছা হল না, এই সাদা জ্যোৎস্নায় এমন এক শিশুর মতো যুবকটিকে নিয়ে কেবল খেলা করে বেড়াতে ইচ্ছা হচ্ছে।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    পাঁচ

    তখন বিকেলবেলা। বর্ষার জল মাঠে থইথই করছে। জোটন গোপাট ধরে জল ভাঙতে থাকল। সে সাঁতার কেটে পাশের গ্রামে উঠে যাবে। সে জলজ ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে ঝোপ-জঙ্গল অতিক্রম করে কেবল সাঁতার কাটছে। সে সাঁতার কেটে ঠাকুরবাড়ির সুপারি বাগানে উঠে দেখল একটাও সুপারি পড়ে নেই। ঘাটে একটা তেমাল্লা নৌকা বাঁধা। ছই-এর নিচে দুই মাঝি নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। জলে সে সারাক্ষণ সাঁতার কেটেছে। শাড়ি ভিজে গেছে। জবাফুল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে সন্তর্পণে শাড়িটাকে খুলে চিপে ফেলল। তারপর ফের প্যাঁচ দিয়ে পড়তেই মনে হল—কোথায় যেন কারা চিঁড়া কুটছে। তালের বড়া ভাজছে। সে নাক টেনে গন্ধ নিল। চিঁড়া কোটার শব্দ ভেসে আসছিল। মামাদের এখন ভাদ্রমাস। ভিটা জমিতে আউশ ধান, আউশ ধানের চিঁড়া—সে ভাবল, চিঁড়া কুটে দিলে ওর নসিবটা খুলে যাবে।

    সে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। দেখল মাইজা কর্তা পশ্চিমের ঘরে তক্তপোশে একটা মোটা পুঁথি পড়ছেন। জোটন মাইজা কর্তাকে দেখেই দরজার সামনে দাঁড়াল। কে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ তুলতেই দেখলেন আবেদালির দিদি জোটন। জোটনের শরীরটা একটু রু দেখাচ্ছে। চুল জোটনের নেই বললেই হয় এবং শণের মতো। মুখে কোনও কমনীয়তা নেই। ওর শরীরের গঠনটা কেমন যেন ভেঙে যাচ্ছে। গালে মেচেতা সুতরাং মুখটি কুৎসিত দেখাচ্ছিল। ভূপেন্দ্রনাথ বলল, কিরে জুটি, তুই।

    —হ কর্তা, আমি। আবার ফিরা আইছি।

    —আবার তরে তালাক দিল?

    —হ। কিন্তু নিব্বৈংশায় না দিল পোলা, না দিল এক ফালি ত্যানা!

    —পোলা না দিছে ভাল করছে—পোলা আইনা খাওয়াইবি কি?

    জোটন সেটা ভাল বোঝে বলে অন্য কথা আর বলল না। মাইজা কর্তা আবার বড় পুঁথিতে মন দিয়েছেন। চশমার ভিতর কর্তার সহৃদয় মুখ দেখে বলতে ইচ্ছে হল, মাইজাকর্তা, আমারে পুরান-দুরান যা হয় একখানা ঠিক কইরা দ্যান। কিন্তু বলতে পারল না। যেন বললে শোনাত—সেই ফকিরসাব এসেছিলেন, কষ্টের যা কিছু সঞ্চয় ছিল, মোটা ভাত একটু শুকনো মাছের বাটা দিয়ে মানুষটা সবক’টা ভাত খেয়ে সেই যে চলে গেলেন আর এলেন না। যেন জোটন এই দরজায় দাঁড়িয়ে মনে করতে পারে—ফকিরসাব হুঁকো খাচ্ছিলেন, সব পোঁটলা-পুঁটলি যত্ন করে বাঁধা। যেন তিনি উঠবেন, হুঁকো খাওয়াটা বাকি। জোটন ধৈর্য ধরে বসে থাকতে পারেনি। সে বলেছিল-ফকিরসাব, আমারে লইয়া যাইবেন না? ফকিরসাব ঝোলাঝুলি কাঁধে নিতে নিতে বলেছিলেন—আইজ না। অন্যদিন হইব। কোরবান শেখের সিন্নিতে যামু। কবে ফিরমু ঠিক নাই। সেই যে বলে চলে গেলেন আর এলেন না মানুষটা। আর আসবেন কিনা ঠিক নেই। তাকে একটা মানুষ ঠিক করে দেবার জন্য সে যেন দোরে দোরে ঘুরছে।

    আমারে একটা পুরান-দুরান যা হয় ঠিক কইরা দ্যান—বলতে সাহস পেল না। তিনবার তালাক এই শরীরকে যেন দুর্গন্ধময় করে রেখেছে—মাইজা কর্তা বললেন, কিছু কবি?

    —কি কমুগ কর্তা। আমার চলে কি কইরা!

    —আবার তর পাগলামি আরম্ভ হইছে। এইটা ঠিক না। মাইজা কর্তা বুঝতে পারছিলেন, পুরান-দুরান মানুষ ঠিক করে দেবার কথাটা সে বলতে এসেছে। জোটন কর্তার মুখে এমন কথা শুনে আর দাঁড়াল না। আতাবেড়ার পাশ দিয়ে ভিতর বাড়িতে ঢুকে গেল।

    ধনমামি বড়মামি দাঁড়িয়ে আছেন। হারান পালের বৌ চিঁড়া কুটে দিচ্ছে। মালতী সঙ্গে আছে। জোটন বলল, দ্যান, আমি চিঁড়া কুটি

    জোটন অতি অল্প সময়ে চিঁড়া কুটে খোলায় ছড়িয়ে দেখাল। সে যে ভাল চিঁড়া কুটতে পারে, চিঁড়াগুলি ওর বেশ বড় বড় হয়—খোলায় ছড়িয়ে যেন সকলকে দেখাতে চাইল। জোটন ওর চিঁড়াগুলি অন্য একটা বেতের ঢাকিতে রাখল। শশীবালা এই চিঁড়া দেখলে খুশি হবেন। যাবার সময় এক খোলা চিঁড়া ওর আঁচলে ঢেলে দেবেন।

    ধনবৌ বলল, তর নাকি আবার বিয়া বসনের শখ হইছে?

    —অঃ আল্লা, এডা এতদিনে জানলেন। কিন্তু পাইতাছি কই।

    —তর ক্ষমতা আছে জুটি!

    —কি যে কন আপনারা। শরমের কথা আর কইয়েন না। এডা গতরের কথা। আপনের-অ আছে আমার-অ আছে। আপনে সুখ পান কথা কন না, কর্তা আসে যায়। আমার মানুষ নাই, মানুষ আসে না যায় না। সুখ পাই না, কথা কই। এইসব বলে জোটন চিঁড়া কুটতে থাকল ফের, ওর মুখে একরকমের শব্দ; শব্দটা কোড়াপাখির ডাকের মতো। ভাদ্র মাস বলেই এত গরম এবং তালের পিঠা হচ্ছে বাড়ি বাড়ি—তার গন্ধ গ্রামময়। মাঠময়। হারান চন্দের বৌ ধান খোলাতে ভাজছে, শুকনো কাঠ গুঁজে দিচ্ছেন শশীবালা। সকলেই কোন-না-কোন কাজে ব্যস্ত। জোটন একটু জল চাইল। বড়বৌ জল আনতে গেছে কুয়াতে। আর এ সময় জাম গাছে একটা ইষ্টিকুটুম পাখি ডাকল। কাহাইলের দুধারে বস্তা পাতার সময় সে চোখ তুলে দেখল—গাছে পাখিটা ডাকছে। সে বলল, ধনমামি, গাছে ইষ্টিকুটুম পাখি। মেমান আসব।

    রান্নাঘরে পবন কর্তার বৌ, তার ছেলেপুলে, সবাই বেড়াতে এসেছে। শশীবালা এই বর্ষাকালটা সব নাইয়রীদের জন্য যেন প্রতীক্ষায় বসে থাকেন। সারা বর্ষাকাল কুটুম আর কুটুম। ধনবৌ তখন নিঃশ্বাস ফেলতে পারে না। বড়বৌকে সারাদিন হেঁশেলে পড়ে থাকতে হয়। মুখ ফসকে ধনবৌ বলে ফেলেছিল আর কি—আর কুটুম না। কিন্তু ঘরে পবন কর্তার বৌ। সে বলতে পারল না, পাখিটারে উড়াইয়া দে জুটি। সারা বর্ষাকাল কুটুম আর কুটুম। দিন-রাইত নাই, আইতাছে যাইতাছে। অথচ বুড়ো ঠাকরুণ শশীবালার বড় শখ কুটুমে। কোন্ কুটুম কি খেতে পছন্দ করে—শশীবালার সব মুখস্থ

    এ-সময়ে মেঘনা-পদ্মাতে ইলিশের ঝাঁক উঠতে থাকবে। জোটন জানত, এসময় ঠাকরুণ কুটুমের জন্য ভাল-মন্দ খাবার অথবা নাইয়রীরা ঘুরে বেড়াবে ঘরময়, উঠোনময় শিশুদের কোলাহল, ঘাটে ঘাটে নৌকা বাঁধা—এইসব দৃশ্য, আর জোটন তখন দেখল হারান পাল নৌকা থেকে এক গণ্ডা ইলিশ নামাচ্ছে। বড় বড় ইলিশ-রূপোর মতো উজ্জ্বল রঙ অবেলার রোদে চিকচিক করছিল। জোটন ইলিশমাছগুলি দেখে চোখ নামাতে পারছে না।

    ওর ইলিশমাছগুলির দিকে তাকিয়ে থাকা–খুব করুণ অথবা রহস্যময় মনে হয়—যেন কতদিন এইসব মাছের স্বাদ ভুলে গেছে জোটন। শশীবালা এসব লক্ষ্য করে বললেন, রাইতে খাইয়া যাইস জুটি। জুটির চোখদুটো কেমন সহসা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বলল, ঠাইনদি, মাছগুলির প্যাটে ডিম হইব মনে হয়।

    —তরে ডিম ভাজা দিতে কমু।

    সে আর কি বলবে ভেবে পেল না। একমনে আবার চিঁড়া কুটতে থাকল। সেই কোড়াপাখির ডাকটা ওর ভিতর থেকে এখনও উঠছে। ওর পরনের শতচ্ছিন্ন শাড়িটা এতক্ষণে শুকিয়ে উঠেছে। বড়বৌ জোটনকে এক খোলা চিঁড়া দিল খেতে, সে খেল না। আঁচলে পোঁটলা বেঁধে নিল। পলটু এনে ক’টা কাঁচা সুপারি দিল। আঁচলে তা বেঁধে নিল। রাত হয়ে যাচ্ছিল অনেক। সে কলাপাতা ধুয়ে বসে থাকল—রান্না হলেই সে খেতে পাবে।

    জোটন খেতে বসে পেট ভরে খেল। চেটেপুটে খেল। বড় যত্নের সঙ্গে ভাত ক’টি খেল। বেগুনের সঙ্গে ইলিশমাছের স্বাদ এবং আউশ ধানের মোটা ভাত জোটনকে এই পরিবারের সহৃদয়তা সম্বন্ধে অভিভূত করছে। বুড়ো ঠাকরুণ, ধনবৌর উদারতা যেন এই পরিবারের পাগল ঠাকুরের মতো। এই ভোজনের সঙ্গে রাতের জ্যোৎস্না এবং এক পাগল মানুষের অস্তিত্ব, বুড়ো কর্তার সাত্ত্বিক ধারণা, ভূপেন্দ্রনাথের সততা, সব মিলে জোটনকে সুখ দিচ্ছে। আর কতকালের মেমান যেন এইসব পরিবার। সে বড়বৌকে ডেকে বলল, মামি গ, অনেকদিন পরে দুইডা প্যাট ভইরা ভাত খাইলাম। এ খাওয়নের কথা ভুলতে পারি না।

    বড়বৌ ওর দুঃখের কথা শুনে বলল, তুই যে বললি, কোন্ দরগার এক ফকিরসাব তোকে নিকা করতে চায়?

    —কি যে কন মামি! খোয়াব ত কত দ্যাখলাম গ মামি। কিন্তু আল্লার মর্জি না হইলে আপনে আমি কি করমু!

    —কেন, আবেদালি যে বলে গেল ফকিরসাব এসেছিল।

    —আইছিল। প্যাট ভইরা ভাত গিলছিল। গিল্যা আমারে কয় কি, আপনে থাকেন, আমি কোরবান শেখের সিন্নিতে যামু। ফিরনের সময় আপনারে লইয়া ফিরমু। এই বইলা নিব্বৈংশায় আইজ-অ গ্যাছে কাইল-অ গ্যাছে মামি।

    —যখন বলে গেছে তখন ঠিকই আসবে।

    জোটন আর কোনও কথা বলল না। সে কলাপাতায় সব এঁটোকাঁটা তুলে জামগাছের অন্ধকার অতিক্রম করে বড়ঘরের পিছনে এসে দাঁড়াল। গন্ধ পাদালের ঝোপ ছাড়িয়ে সে তার এঁটোকাঁটা নিক্ষেপ করল। জ্যোৎস্না রাত বলে এই ঝোপ-জঙ্গল, দূরের মাঠ, সবুজ ধানখেতের অস্পষ্ট ছবি তার ভালো লাগে। সে হিসাব করে বুঝল প্রায় দু’সাল হবে গতর আল্লার মাশুল তুলছে না। বিশেষ করে এই রাত এবং ঝোপ-জঙ্গলের ইতস্তত অন্ধকারের ছবি অথবা আকণ্ঠ ভোজনে এক তীক্ষ্ণ ইচ্ছা জোটনকে কেমন কাতর করছে। ফকিরসাবকে এ-সময়ে বড় বেশি মনে পড়ছিল।

    সে বড় মামির কাছ থেকে একটা পান চেয়ে নিল। কাঁচা সুপারি একটা আস্ত চিবোতে চিবোতে বাগানের ভিতর ঢুকে গেল। এক মন্ত্রবৎ ইচ্ছাশক্তি এই বাগানের ভিতর ওকে কিছুক্ষণ রেখে দিল—যদি একটা পাকা সুপারি, গাছ থেকে টুপ—এই শব্দ ঘাসের ভিতর, সে কান খাড়া করে রাখল—কোথায় টুপ এই শব্দ জেগে উঠবে—কখন বাদুড়েরা উড়ে আসবে। কিন্তু একটা বাদুড় উড়ে এল না। টুপ্ শব্দ হল না। শুধু কাঁচা সুপারির রসে মাথাটা কেমন ভারী ভারী, নেশার মতো মনে হল। সে এখন জলে নেমে যাবে। সাঁতার কেটে গ্রামে উঠে যেতে হবে। জ্যোৎস্না রাত। জলে সাদা জ্যোৎস্না এবং জোটন জলে নেমে যাচ্ছিল, ধীরে ধীরে সে শাড়ি হাঁটুর উপর তুলে ফেলল। যত জলে নেমে যেতে লাগল, তত সে শাড়ি ক্রমে উপরে তুলে তুলে এক সময় কোমরের কাছে নিয়ে এল। না, জল কেবল বাড়ছে। সে শাড়ি খুলে মাথার উপর তুলে একটা গোসাপের মতো জলে ভেসে পড়ল। এক কাপড় জোটনের। ভিজা কাপড়ে রাত্রিবাস বড় কষ্টের।

    ঝোপ-জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে জোটন দেখল নরেন দাসের বারান্দায় একটা কুপি জ্বলছে। পুবের ঘরে কোনও তাঁতের শব্দ হচ্ছে না। অমূল্য ওদের তাঁত চালায়। অমূল্য বাড়ি গেলে তাঁত বন্ধ থাকে। তাছাড়া সূতা পাওয়া যাচ্ছে না বাজারে। তার জন্যও নরেন দাস রাতে তাঁত বন্ধ করে রাখতে পারে। এখন আর জোটন নলী ভরতে পারছে না। জোটন অনেক কষ্টে একটা চরকা কিনে যখন বেশ দু’পয়সা কামাচ্ছিল, যখন ভাবল হিন্দু বাড়ির বৌদের মতো ছোট একটা কাঁসার থালা কিনে বড়লোক হবে এবং যখন সুতার মোড়া দু’পয়সা থেকে চার পয়সা হয়ে গেল এবং একজন ফকিরকে পোষার ক্ষমতা হচ্ছে তখন কিনা—বাজারে সূতা পাওয়া যাচ্ছে না।

    জোটন জল কাটছিল। দু’হাতে ব্যাঙের মতো জলের ওপর ভেসে ভেসে যাচ্ছে। হাত-পা জলের ভিতর ফুটকরি তুলছে। এই গরমে জলের ঠাণ্ডাটুকু, আকাশের স্বাচ্ছন্দ্যটুকু এবং পুব দিকের বড় চান্দের হাসি জোটনের ভিতর কতদিন পর মাশুল তুলতে বলছে। আকণ্ঠ খেয়ে শরীরে এখন কত রকমের শখ জাগছে। দূরের মাঠে একটা আলোর ফুলকি। সামনে সব পাটের জমি। পাট কাটা হয়ে গেছে—জল স্বচ্ছ। হাওয়ায় জল থইথই করছে চারদিকে। স্বচ্ছ জলে জোটন শরীরের উত্তাপ ঢালছিল—য্যান কতকাল গাজীর গীতের বায়নদারের মতো সূর্যের উত্তাপ না পেয়ে অবসন্ন। সে এসময় একমুখ জল নিয়ে আকাশমুখো ছুঁড়ে দিল। বলল আল্লা, তর দুনিয়ায় আমার কি কামডা থাকল ক’দিনি!

    আকাশে জ্যোৎস্না। জলে শাপলা-শালুক রয়েছে আর মাঠ শেষে আম-জামের ছায়া প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করছে। শাপলাফুলের মতো সে জল থেকে মুখটা তুলে দুটো মান্দার গাছ অতিক্রম করতেই দেখল, গোপাটের বটগাছটার নিচে একটা হারিকেন এবং নৌকার ছায়া। একটা মানুষেরও যেন। সে তাড়াতাড়ি জলের ভিতর হারিয়ে যাবার জন্য ঘাসের বনে শরীর আড়াল করে দিল। কিন্তু পালাবর সময় জলে শব্দ বুঝি একটা মাছ পালাচ্ছে। অথবা বঁড়শীতে, বোয়ালের বঁড়শীতে বড় বোয়াল মাছ আটকে গেছে। মানুষটা নৌকা নিয়ে মাছের খোঁজে এসে দেখল কে এক মানুষের মতো ঝোপে-জঙ্গলে জলের ভিতর ভেসে যাচ্ছে। জোটন তাড়াতাড়ি গলা পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে শ্যাওলার জঙ্গলে শরীর লুকোতে চাইল—কিন্তু পারল না। ওর মুখের ওপর লণ্ঠন তুলে মনজুর বলছে, জোটন তুই।

    জোটন শরমে চোখ বুজে ফেলল। চোখ বুজেই বলল, হ আমি!

    —কই গ্যাছিলি?

    —গ্যাছিলাম ঠাকুরবাড়ি। পথ ছাড়, যাই।

    মনজুর জলের ভিতর ওর অবস্থা বুঝে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। সে মুখ ফেরাল না। অথচ বলল আমি ভাবলাম বুঝি বড় একটা মাছ বঁড়শীতে ধরা পড়ছে।

    —আর কিছু ভাবস নাই।

    —আর কি ভাবমু। বলে সে নৌকাটার উপর বসল।

    —ক্যান, অন্য কিছু ভাবন যায় না। তুই ইদিকে ক্যান। বলে জোটন চোখ খুলল। কথাবার্তায় যেন সব সঙ্কোচ কেটে গেছে। দেখল, মনজুর খালি গায়ে। পরনে অত্যন্ত মিহি গামছা। তাও জলে ভিজে খানিকটা উপরে উঠে গেছে। মনজুর কিছুতেই জোটনের দিকে তাকাচ্ছে না। জোটনের ভারি হাসি পেল। তর ত ম্যালা পয়সা। একটা বড় গামছা কিনতে পারস না?

    মনজুর বলল, তুই যা দিনি।

    —যামুনা ত, কি করবি। জোটনের ভিতর ইচ্ছাটা বড় চাড়া দিচ্ছে!

    —কি আবার করমু। সে তার এই পরিস্থিতির জন্য অজুহাত দেখাল। বলল, হাইজাদি গ্যাছিলাম। ওষুধ আনতে। ফিরতে রাইত হইয়া গ্যাল। গোপাটে আইছি বঁড়শীতে মাছ লাগছে কিনা দ্যাখতে। আইয়া দ্যাখি তর এই কাণ্ড। জ্যোৎস্না রাইতে জায়গাটারে আনধাইর কইরা আছস। তর লগে দ্যাখা হইব জানলে তফন পইরা আইতাম

    মনজুর জোটনের সমবয়সী। শৈশবের কিছু ঘটনা উভয়ে এ-সময়ে স্মরণ করতে পারল। একদা শৈশবে এইসব পাটখেতের আলে-আলে ওরা ঘুরে বেড়িয়েছে। জোটন সেইসব স্মৃতির কথা স্মরণ করতে চাইল অথচ সঙ্কোচবোধে কিছু বলতে পারছে না। দু’সালের অধিক এই শরীর জ্বলে-জ্বলে খাঁক্। জোটন কাতর গলায় বলল, পথ দে। যাই।

    —তরে ধইরা রাখছি আমি!

    জোটন এই জল দেখে, রাতের জ্যোৎস্না দেখে এবং আকণ্ঠ ভোজনে কি যে তৃপ্তি শরীরে—জোটন কিছুতেই নৌকা অতিক্রম করে সাঁতার কাটতে পারল না। শরীর ওর ক্রমে কেমন জলের ওপরে ভেসে উঠছিল। জলের ওপর ব্যাঙের মতো যেন একটা সোনালী ব্যাঙ জোনাকি খাবার জন্য জলে ভেসে হাঁ করে আছে। মনজুর কোনও কথা বলছে না দেখে সে-ই বলল, আসমানের চান্দের লাখান তর মুখখান। কিন্তু দেইখা ত এহনে ত মনে হয় অমাবস্যার আনধাইর রাইত। য্যান ডরে শুকাইয়া গ্যাছে।

    —শুকাইয়া গ্যাছে! তরে কইছে।

    মনজুর ওর রুগ্ন বিবির মুখটা স্মরণে এনে কিঞ্চিৎ বিব্রত হয়ে পড়ল। দীর্ঘদিন বিবির রুগ্ন শরীর ওর গরম কজের ভিতর জল ছিটাতে পারেনি। শুধু মনজুর জ্বলছে, জ্বলছে। একটা, সাদির যে শখ ছিল না—তা নয়, তবু মনজুর বিবিকে যথার্থই ভালোবাসে। মনজুর অনেক কষ্টে যেন বলল, পারবি আনধাইর রাইত আলো করতে। এবং মনজুর মুখ ফেরাতেই আবার শরীরটাকে জলের ভিতর জোটন ডুবিয়ে দিল। সামনে পিছনে জলজ ঘাস। বেশ আব্রু সৃষ্টি করেছে। জোটন এই জলজ ঘাসের ভিতর মনজুরকে নিয়ে ডুব দিতে চাইল। আর মনজুর সহ্য করতে না পেরে দু’হাতে যেন একটা মরা মাছ নৌকায় তুলে আনছে—টানতে-টানতে নৌকার পাটাতনে তুলে ফেলল।

    কিছুক্ষণ পরে পাটখেতের ফাঁক দিয়ে কেমন একটা কান্নার শব্দ গ্রাম থেকে ভেসে আসতে থাকল। জোটন শুনতে পাচ্ছে, মনজুর শুনতে পাচ্ছে। নৌকোর ওপর কিছু পোকা উড়ছিল। ধানের জমিতে চাঁদের আলো বড় মায়াময়। সুখ অথবা আনন্দ এই পাটাতনে এখন গড়াগাড়ি খাচ্ছে। সব দুঃখ ভেসে যাচ্ছিল জলে, সব উত্তাপ চাঁদের আলোর মতো গলে-গলে পড়ছে। ইচ্ছার সংসারে মনজুর পুতুল সেজে বিবির মরা মুখ দেখতে দেখতে বলল, ক্যাডা ক্যান্দে ল।

    —মনে হয় তগ বাড়ি থাইক্যা আইতাছে।

    —তবে বিবিডা বুঝি গ্যাল।

    জোটন দেখল পক্ষাঘাতগ্রস্ত রুগীর মতো মনজুরের মুখ। সব উত্তাপ এখানে ঢেলে দিয়ে মনজুর হাউহাউ করে কাঁদছে আর নৌকাটা বাইছে।

    .

    কুকুরটাকে ফেলে দিয়ে গেছে কারা। জলের ভিতর ফেলে দিয়ে নৌকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। কুকুরটা আপ্রাণ বাঁচার জন্য জলে সাঁতার কাটছে। কোনওরকমে নাকটা জাগিয়ে রেখেছে জলে। তারপর মনে হল টানমতো জায়গা। কুকুরটা সামান্য উঠে দাঁড়াল। না, দূরে কোনও গ্রাম দেখা যাচ্ছে না। হতাশায় চোখ-মুখ কাতর। শেষ বর্ষা এখন। জল, ধানখেত থেকে পাটখেত থেকে নেমে যাচ্ছে।

    পাগল ঠাকুর তখন নৌকাটাকে আলে আলে টেনে নিচ্ছিলেন। সোনা পাটাতনে হামাগুড়ি দিয়ে এগোচ্ছে। ধানগাছ হেলে পড়ছে। শ্রাবণ-ভাদ্রের সেই স্বচ্ছ ভাবটুকু আর নেই। জল ঘোলা। জলে পচা গন্ধ উঠছে। দু’ধারে কাদা জল, শামুক পচা দুর্গন্ধময় জলজ ঘাস। নৌকাটাকে কবিরাজের জমিতে ঢুকিয়ে দিতেই মনে হল একটা কুকুর দাঁড়িয়ে আছে। চোখে-মুখে কাতর চেহারা। কুকুরটা পাগল ঠাকুরকে দেখে বলল, ঘেউ।

    পাগল ঠাকুর দাঁড়ালেন। তারপর পুরানো কায়দায় হাত কচলে বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    কুকুরটা ফের বলল, ঘেউ।

    পাগল ঠাকুর বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    জল কম বলেই আলের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে কুকুরটা। একপাশে দাঁড়িয়ে ওদের যাওয়ার জায়গা করে দিয়েছে। কুকুরের এই ভদ্রতাটুকু পাগল ঠাকুরের ভাল লাগল। তিনি আর তাকে মন্দ কথা বললেন না। তিনি পাশ কাটিয়ে নৌকা টেনে নেবার সময়ই কি মনে হতে পেছনে তাকালেন—কুকুরটা অবোধ বালকের মতো তাকিয়ে আছে। তিনি এবার আদর করার ভঙ্গিতে মুখে এক ধরনের শব্দ করতেই, জলের ভিতর ছপছপ শব্দ তুলে কুকুরটা পাশে এসে দাঁড়াল। পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথ কুকুরটার মুখে চুমু খেলেন এবং নৌকায় তুলে বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    কুকুরটা পাটাতনের এক পাশে দাঁড়াল। গা ঝাড়ল। তারপর লম্বা হয়ে আড়মোড়া ভাঙল এবং জিভটা বের করে রাখল কিছুক্ষণের জন্য। পাগল ঠাকুর এবং সোনাকে দেখতে দেখতে হাঁপাচ্ছে। কুকুরটা লেজ নাড়ছে অনবরত। মণীন্দ্রনাথ তখন লগি মারছেন।

    মণীন্দ্রনাথ শালুকের ফল তুলে খেলেন। ফল ভেঙে সোনাকে খেতে দিলেন। সোনা শক্ত জিনিস এখনও খেতে পারে না। সে খেতে গিয়ে বিষম খেল। ওর চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে। তিনি ওকে কোলে নিয়ে একটু আদর করলেন।

    দুটো জমি পার হলে হাসান পীরের দরগা। শীতের শেষে তিনি এখানে ঘুরে গেছেন। তখন পীরের মেলা ছিল, সিন্নি ছিল। গ্রাম পার হয়ে মানুষেরা এসেছিল এবং মোমবাতি জ্বেলে সওদা করে ঘরে ফিরেছিল। এখন কোনও মানুষের সাড়াশব্দ নেই। শুধু ভাঙা-মসজিদ এবং পীরসাহেবের কবরের পাঁচিলে কয়েকটা কাক অনবরত উড়ছে, সোনার কিছুতেই কান্না থামছে না। তিনি এক হাতে সোনাকে বুকে নিয়ে অন্য হাতে লগি বাইতে থাকলেন। হাসান পীরের নির্জন দরগাতে নৌকা ভিড়িয়ে এক সময় ভিতরে উঠে গেলেন।

    কাকগুলি পাঁচিলের উপর চিৎকার করছে। পীরসাহেবের কবরের পাশে পলাশ গাছটা এখনও তেমনি আছে। পাগল মানুষটাকে দেখে কাকগুলি পলাশ গাছটার উপর এসে বসল। ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর দিয়ে দূরের মাইনর স্কুলটা দেখা যাচ্ছে। মণীন্দ্রনাথ হেঁটে-হেঁটে একদা এই বিদ্যালয়ে বিদ্যাভাস করতে আসতেন।

    ভিটেমাটির মতো এই জমিটা উঁচু। কয়েকটা আমগাছ কিছু পাখপাখালি, বেতঝোপ, কাঁকড়া, সাপ এবং মোত্রাঘাসের জঙ্গল নিয়ে পীর সাহেব কবরের নিচে ঘুমোচ্ছেন। বন্যায় জল পীরসাহেবকে ছুঁতে পারে না। তখন অদূরের নদী-নালার কচ্ছপেরা পর্যন্ত নরম মাটির খোঁজে পীরসাহেবের কাছে চলে আসে। ডিম পাড়ার জন্য আশ্রয় চায়, ডিমে তা দেবার জন্য আশ্রয় চায়। অঘ্রাণ মাস, বেলা পড়তে দেরি নেই। সোনা তখনও কাঁদছিল। কুকুরটা ওদের পায়ে পায়ে হাঁটছে। কবরখানায় দুটো একটা পাতা ঝরে পড়ল। হেমন্তের শীত ভাবটা সকল ঘাস পাখি এবং পীরসাহেবের পাঁচিলের গায়ে জড়িয়ে আছে। পাঁচিলের নিচে কতরকমের গর্ত। কবরের বেদী থেকে ভাঙা কাঁচ আলগা হয়ে গেছে।

    মণীন্দ্রনাথ সোনাকে কোলে নিয়ে এই পাঁচিলের চারিদিকে ঘুরতে থাকলেন। কাকগুলি নির্জন নিঃসঙ্গ দরগায় সহসা মানুষ দেখে কেমন ক্ষেপে গেল। ওরা মণীন্দ্রনাথের মাথার উপর ঘুরে-ঘুরে উড়তে থাকল। কতদিন অথবা দীর্ঘ সময় বাদে মণীন্দ্রনাথ পীরসাহেবের দরগাতে এসেছেন, কতদিন অথবা দীর্ঘ সময় বাদে মণীন্দ্রনাথ পীরসাহেবকে গলায় দড়ি দিয়ে মরার কারণটা জিজ্ঞাসা করতে চাইলেন।

    সোনা এখন আর কাঁদছে না। পাগল ঠাকুর সোনাকে ঘাসের উপর শুইয়ে দিলেন। কুকুরটা এতক্ষণ পায়ে-পায়ে ঘুরছিল। মণীন্দ্রনাথ সোনাকে রেখে একটু হেঁটে গেলেন সামনে। কুকুরটা সোনার পাশে বসে থাকল। একটুকু নড়ল না। ঘাসের ওপর শুয়ে সোনা হাত-পা ছড়িয়ে এখন খেলছে। মণীন্দ্রনাথ যেন কোথায় যাচ্ছেন। তিনি পাঁচিলের দরজা টপকে ভিতরে ঢুকে গেলেন এবং বললেন, গ্যাৎচোরে শালা। যেন বলতে চাইলেন, পীরসাহেব, তোমার দরগাতে মেলা বসেছে, তুমি হিন্দু-মুসলমান সকল মানুষের পীর, তুমি গলায় দড়ি দিলে কেন, বলে বেদীটার পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং একটা শুকনো ডাল এ সময় অন্য পাশে ভেঙে পড়ায় তিনি দেখলেন, ছাতিম গাছের মগডালে কিছু শকুন বাসা বেঁধেছে।

    পাগল মানুষ বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা। বলার ইচ্ছা যেন, পীরসাহেব ভিতরে আছেন? তিনি বেদীটার পাশে বসলেন এবং কান পাতলেন মাটিতে—পীর সাহেবের মুখটা মনে করতে পারছেন, বুড়ো অথর্ব তখন পীরসাহেব। মণীন্দ্রনাথ দূরের বিদ্যালয় থেকে পাঠ নিয়ে ফেরার পথে এই দরগাতে এসে পীরসাহেবের দাড়ি-গোঁফবিহীন মুখটা দেখতেন। এবং সেই পীরসাহেব একদিন কেন যে রাত্রে গলায় দড়ি দিয়ে ছাতিম গাছটায় ঝুলে থাকলেন! হায়! ঈশ্বর জানেন, এমন মানুষ হয় না এবং কথিত ছিল পীরসাহেবের আহারের প্রয়োজন হতো না। পীরসাহেবের হুঁকো-কল্কে কোমরে বাঁধা থাকত। তিনি এই দরগার চারপাশে ঘুরতেন শুধু এবং রাতের অন্ধকারে যখন দূরে দূরে শুধু ইতস্তত গয়না নৌকার আলো, দূরে দূরে সব গ্রাম গভীর মায়ায় আচ্ছন্ন তখন তিনি শাক-পাতা অথবা পুরানো ছাতিম গাছের ডাল বেয়ে উঠে শকুনের ডিম অন্বেষণ করতেন, কচ্ছপেরা এই দরগাতে অথবা খালের ধারে হেমন্তের শেষে, শীতের প্রথমে ডিম পেড়ে রেখে যেত—তাও অন্বেষণ করে ঘরে তুলে রাখতেন।

    এখন আর সেসব শাক-পাতার গাছ এই দরগাতে নেই। হেজে মজে গেছে। বর্ষাকাল গেছে বলেই দরগার চারধারে নানারকমের আগাছার জঙ্গল—কিছু ঘাসের চিহ্ন। নরম ঘাসে সোনা ঘুমোচ্ছে—এই সময় সোনার কথা মনে হওয়ায় তিনি পাঁচিলের কাছে এসে দাঁড়ালেন। যখন দেখলেন সোনা ঘাসের ওপর শুয়ে ঘুমোচ্ছে, কুকুরটা পাহারায় আছে, তখন তিনি ফিরে এলেন। পাঁচিলটার ভিতরের দিকে প্রচুর জায়গা। বড় বড় গর্ত, কবর থেকে যেন ঢাকনা খুলে কারা মানুষ তুলে নিয়ে গেছে। বড় বড় শান পড়ে আছে। শান দিয়ে ঢেকে দিলেই একটা মানুষ গায়েব। কেউ জানবে না শানের নিচে একটা মানুষ আটকা পড়েছে। প্রচুর জায়গা দেখে, ঘর করে এখন কেমন এই দরগায় বসবাসের ইচ্ছা মণীন্দ্রনাথের। মেলার সময় যেখানে মোমবাতি জ্বেলে দেওয়া হয়, পীরসাহবের নামে সিন্নি চড়ানো হয়, সেই জায়গাটুকু শুধু পরিষ্কার। সেই জায়গাটুকুতে দূর্বাঘাস এবং সেই জায়গাটুকুতেই একটা কুঁড়েঘর ছিল, ভাঙা হাঁড়ি কলসি ছিল, কিছু দ্রব্যগুণ ছিল পীরসাহেবের—যার দৌলতে হাসান চোর ফকির হল এবং এক সময় পীর বনে গেল। মালা, তাবিজ নানারকমের হাড় সংগ্রহের বাতিক ছিল হাসানের। গোর দেবার সময় সবই ওর কবরে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন লম্বা বেদীর ওপর শকুনেরা শুধু হাগছেই। কাক এবং অন্য পাখপাখালি—যেমন শালিকের কথাই ধরা যাক, বড় বেশি ভিড় করছে এই দরগাতে। আর এই হাসান পীরই বলেছিলেন, তর যা চক্ষু মণি, চক্ষুতে কয় তুই পাগল বইনা যাবি।

    —কী যে কন পীরসাহেব!

    —আমি ঠিক কথাই কই ঠাকুর। তর সব লিখাপড়া মিছা। পীর-পয়গম্বর হইতে হইলে তর মত চক্ষু লাগে, তর শরীর মুখ লাগে। তর মত চক্ষু না থাকলে পাগল হওন যায় না, পাগল করন যায় না। আর ফোর্ট উইলিয়ামের র‍্যামপাটে বসে পলিন বলত, তোমার চোখ বড় গভীর বড় বিষণ্ণ মণি। ইত্তর আইজ আর গ্লুমি। অথবা বোটানিক্যালের পুরানো বটের ছায়ায় পলিন ববকাটা চুলে বিলি কেটে মিহি ইংরাজিতে উচ্চারণ করত, এস, আমরা দু’জনে একসঙ্গে বসে কীসের কবিতা আবৃত্তি করি। দেয়রস নান আই গ্রীভ টু লিভ বিহাইণ্ড বাট ওনলি, দি’। তখন দূরের নারকেল গাছ অথবা গঙ্গাবক্ষে জাহাজের বাঁশি এবং সমুদ্র থেকে আগত সব পাখিদের পাখার শব্দ উভয়কে অন্যমনস্ক করত। ওরা তখন পরস্পর নিবিষ্টভাবে পরস্পরকে দেখত। কবিতা উচ্চারণের পর পাখির পালকের মতো উভয়ে হালকা এক বিষণ্নতায় ডুবে থেকে কথা বলত না।

    পলিন বলত, চলো এইসব জাহাজে উঠে আমরা অন্য কোনও সমুদ্রে চলে যাই। মণীন্দ্রনাথ এই দরগায় বসে সেই সব স্মৃতিতে এখন কাতর হচ্ছিলেন। তাঁর ইচ্ছার ঘরে পলিন…১৯২৫-২৬ সাল, পলিন তখন তরুণী, প্রথম মহাযুদ্ধে পলিনের দাদার মৃত্যু এবং সেই পরিবারে কোনও রাতের আঁধারে মোমবাতির সামনে যীশুখ্রিস্টের ছবি, হাঁটু গেড়ে পলিনের বসে থাকা—কি সব স্মৃতি যেন বার বার মাথার ভিতর ভেসে ওঠে, আবার মিলিয়ে যায়। মণীন্দ্রনাথ কিছু মনে করতে পারেন না। তাঁর এখন কেবল ভালোমানুষের মতো কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছিল, ইচ্ছা হচ্ছিল এই দরগার মালিক হাসান পীরকে বলতে, আবার সেখানে ফিরে-যেতে পারি না পীরসাহেব? অথচ কথা বলার সময় সেই এক উচ্চারণ। আর এ-সময় পাখিরা উড়তে থাকল। হেমন্তের রোদ নেমে গেছে। বর্ষার জল এখন জলাজমিতে হাঁটু জলে এসে থেমেছে। ছোট ছোট চাঁদা মাছ, বৈচা মাছ ধানের গুঁড়িতে লেজ নেড়ে শ্যাওলা খাচ্ছে! শীতের এই আমেজ সকল প্রাণী-জীবনে শুভ এক বার্তা বয়ে আনছে। তবু অনেক মোত্রাঘাস পেরিয়ে, অনেক বন-জঙ্গল পেরিয়ে, নদী-নালা অতিক্রম করে শুধু সেই ফোর্ট উইলিয়ামের দুর্গ, তার সবুজ মাঠ এবং গম্বুজের মাথায় জালালি কবুতর উড়ছে—মণীন্দ্রনাথ দরগার বেদীতে বসে এখন কেবল দুর্গের মাথায় সূর্য দেখছেন। যেন পলিন সেই সূর্যের আলো এই অবেলায় দরগার মাঠে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

    সোনা বসে নেই, অথবা হামাগুড়ি দিয়ে সোনা এগিয়েও যাচ্ছে না। সে ঘুমিয়ে পড়েছে। কুকুরটা বসে রয়েছে। নড়ছে না। তবুও যেন কেমন ঘুম পাচ্ছে। কুকুরটা চোখ বুজেছিল। মণীন্দ্রনাথ আরও দেখলেন হেমন্তের রোদ খুব সরু হয়ে পাঁচিলের গায়ে লেগে আছে। সোনার জলের মতো এই রেখা চিকচিক করছে। মণীন্দ্রনাথ পলাশের ডাল ফাঁক করে আকাশের ভিতর মাথা গুঁজে দিলেন এবং সেই আলোর জল যেখান থেকে ঝরে পড়ছে, তাকে দুহাতে ধরতে চাইলেন। বড় উষ্ণ মনে হচ্ছে সেই আঁধারকে। সুতরাং লাফ দিয়ে পাঁচিল টপকালেন। তারপর দু’হাত ওপরে তুলে সেই আলোর ঘর সূর্যকে ধরার জন্য ছুটতে থাকলেন। অথচ যত এগোচ্ছেন সূর্য তত ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। ঘাস জঙ্গল পার হলেই দরগার জমি শেষ। তিনি ক্রমশ মাঠে নেমে যেতে থাকলেন, মাঠে হাঁটুজল, জল ভেঙে এগুতে থাকলেন—যেন ঐ সূর্য পালিয়ে যাচ্ছে যে রথে, তিনি সেই রথে এখন উঠে যাবেন এবং অশ্বের বল্গা ধারণ করবেন। তারপর সূর্যকে নিয়ে সেই নিরুদ্দেশে, যেখানে পলিন এখন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে। আর তা যদি না হয় এই সূর্যকে এনে অশ্বত্থের ডালে ঝুলিয়ে দেবেন। এই ধরিত্রীর সব লাঞ্ছনা দূর করতে, অন্ধকার সরিয়ে দিয়ে সূর্যকে ধরে আনবেন। অর্থাৎ তিনি যেন ধরিত্রীকে সব কলুষ-কালিমা থেকে রক্ষা করার জন্য অথবা এক প্রিয় নিদর্শন রাখার জন্য পাগলের মতো ধানখেত, শীতল জল এবং খাল-বিল সাঁতরে যখন ট্যাবার পুকুরপাড়ে উঠলেন তখন দেখলেন সূর্য পলাতকের মতো গাছগাছালির অন্য প্রান্তে নেমে গেছে। তিনি সূর্যকে ওপারে বিলের জলে অদৃশ্য হতে দেখে ভেঙে পড়লেন। পরাজিত সৈনিকের মতো একটা গাছে হেলান দিয়ে যেন বন্দুকের নল হাতে রেখেছেন এমন ভাবের এক ভঙ্গি টেনে দাঁড়িয়ে থাকলেন। চারপাশে রাতের সব কীটপতঙ্গের আওয়াজ আর তার সঙ্গে অতিদূর থেকে আগত এক শিশুকান্না। তাঁর মাথার ভিতর ফের যন্ত্রণা হতে থাকল। পিছনে যেন কি ফেলে এসেছেন, একেবারেই মনে করতে পারছেন না। এতদূর থেকে কান্না সেই শিশুর, মনে হয় মাঠময় হাজার শিশু উচ্চরোলে কাঁদছে। তাঁর কিছুই মনে পড়ছে না। কর্দমাক্ত পথে তিনি বাড়ি ফিরে যাবেন। পথটা তাঁর খুবই চেনা। চারদিকে অন্ধকার নেমে আসছে, অথচ দূর থেকে আগত শিশুকান্নার জন্য ব্যথিত হচ্ছিলেন। সোনা যে একা বসে বারান্দায় খেলছিল, পাগল-জ্যাঠামশায়ের সঙ্গে ভাঙা ভাঙা কথা বলছিল এবং তিনি যে তাকে আদর করে নিয়ে পাড়া বেড়াতে বের হয়েছেন, সকলের অলক্ষ্যে নৌকা নিয়ে-সোনা দ্যাখো, কত জমিন মাঠ, এই মাঠ এবং জমির ভিতর তুমি বড় হবে, এই তোমার জন্মভূমি, মায়ের চেয়ে বড়, ঈশ্বরের চেয়ে সত্য এই ঘাস ফুল মাটি–অথচ এখন কিছুতেই সেসব তিনি মনে করতে পারছেন না—কখন ঘর থেকে বের হয়েছেন, কে, কে তাঁর সঙ্গে ছিল।

    কুকুর, সোনা এবং কোষা নৌকাটা দরগার মাটিতে পড়ে থাকল। দরগার মাটিতে হাসান পীরের স্পর্শ ওদের জন্য থাকুক। ছাতিমের ডালে শকুনের আর্তনাদ—এইসব নির্জন নিঃসঙ্গ গ্রামকে ভয় দেখাচ্ছে। আর মণীন্দ্রনাথ ঘরে ফিরেই দেখলেন—সব মানুষ ছোটাছুটি করছে। প্রতিবেশীরা এসে জড়ো হয়েছে। সোনা কি করে নিখোঁজ হয়ে গেছে সংসার থেকে। ধনবৌ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, পাগল মানুষ বাড়ি একা ফিরেছেন, কোষা নৌকা আনেননি। ধনবৌ, বড়বৌ সকলেই কাঁদছিল। অন্ধ মানুষ মহেন্দ্ৰনাথ উঠোনে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মণীন্দ্রনাথ বুঝলেন—বাড়ি থেকে সোনা হারিয়ে গেছে। ওরা সকলে মিলে সোনাকে অন্বেষণ করছে। এবার মণীন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে সব মনে করতে পারলেন, ধীরে ধীরে সকলের অলক্ষ্যে জলে নেমে গেলেন। হাঁটুজল ভেঙে যত এগুতে থাকলেন, তত কুকুরের আর্তনাদ স্পষ্ট হতে থাকল। তত তিনি বলতে চাইলেন যেন—হাসান পীর, তুই আছিস, তোর দরগা আছে, আমার সোনা তোর কাছে গচ্ছিত আছে। তিনি অন্ধকার পথে ছুটে চললেন। তিনি জল-কাদা ভেঙে ছুটলেন। তিনি ঘেমে যাচ্ছেন। কাদা জলে মুখ-শরীর ভরে যাচ্ছে। তিনি শুধু এখন কুকুরের ডাক অনুসরণ করে হেঁটে যাচ্ছেন। হাতে কোনও লণ্ঠন নেই—কোনও পরিচিত শব্দ পাচ্ছেন না। থেকে থেকে দূরে শেয়ালের আর্তনাদ। একটা কুকুর কী করে পারবে এত শেয়ালের সঙ্গে। সোনা, সোনারে। কেমন ভালোমানুষের মতো মুহূর্তে আবেগ ভরে ডেকে ফেললেন। আমি তোকে জঙ্গলে ফেলে এসেছি। আর কিছু বলতে পারলেন না। আলো ছিল না, তবু নক্ষত্রের আলোতে তিনি পথ চিনে নিতে পারছেন। অবশেষে তিনি আরও কাছে গিয়ে বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা। তিনি জোরে জোরে একই উচ্চারণে ডাকলেন অথচ কুকুরটা কাছে আসছে না। পাঁচিলের কোন এক গহ্বর থেকে কুকুরটা যেন ডাকছে। তিনি ভিতরে ঢুকে দেখলেন, সোনা হামাগুড়ি দিচ্ছে আর কাঁদছে। কুকুরটা পাশে পাশে থাকছে। অনবরত কান্নায় ভেঙে আসছে গলা। শুধু গলাতে এখন একটা হিক্কার শব্দ। পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথ তাড়াতাড়ি সোনাকে বুকে তুলে নিলেন এবং আদর করতে থাকলেন। সোনার হাত মুখ স্পর্শ করে, অক্ষত সোনার শরীরের জন্য এক অপার আনন্দ—ধনবৌর মুখ, ব্যথিত সংসার আর কুকুরটাকে কাছে টেনে এক নতুন সংসার-বার বার তিনি কৃতজ্ঞতায় কুকুরটাকে চুম খেয়ে কেমন পাগলের মতো ছুটে গিয়ে কোষা নৌকাটাতে উঠতেই শুনলেন, একদল ধূর্ত শেয়াল পাঁচিলের পাশে হুক্কাহুয়া করছে। তিনি আকাশ এবং দরগার ভাঙা কাচের স্বচ্ছ ভাবকে মথিত করে হেসে উঠলেন। কুকুরকে বললেন, আকাশ দ্যাখো, সোনাকে বললেন, নক্ষত্র দ্যাখো—ঘাস ফড়িং-ফুল-পাখি দ্যাখো, জন্মভূমি দ্যাখো। তারপর নিজে দেখলেন আকাশের গায়ে লেখা রয়েছে—সোনার মুখ, পলিনের চোখ। কুকুরটা পাটাতনে দাঁড়িয়ে নীরবে লেজ নাড়ছে।

  • ছয়

    ছয়

    আরও কিছুকাল পরে। সোনা নিবিষ্ট মনে তরমুজ খেতে বসে মাটি খুঁড়ছিল। বেলে মাটি, সুতরাং সে অনেকটা মাটি তুলে ফেলল। সোনালি বালির চর এখন শুকনো। চর পার হলে নদীর জল পাতলা চাদরের মতো, তিরতির করে কাঁপছে। স্বচ্ছ জলে ছোট ছোট মালিনী-মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে। সোনা ছোট একটা নারকেলের মালার সাহায্যে জল নিয়ে এল নদী থেকে। ছোট গর্তটা জলে ভরে দিল। যেহেতু নদীতে হাঁটুজল, পার হয় গরু, পার হয় গাড়ি, সেজন্য হাঁটু জলে নেমে একটা মালিনী-মাছ ধরল সোনা। মাছটা অঞ্জলিতে রেখে সে নদী থেকে প্রথমে গর্তটার সামনে এসে দাঁড়াল। জলে মাছটা ছেড়ে খরগোশের মতো মাথা উঁচু করে দিল তরমুজ-পাতার ভিতর থেকে। দেখল, দূরে ছই-এর নিচে বসে ঈশম দাদা তামাক খাচ্ছে। সোনার প্রতি অথবা তরমুজের প্রতি যেন সে লক্ষ রাখছে। সোনা তরমুজ-পাতার আড়ালে নিজেকে আর একটু ঢেকে ফেলল। ছোট-শরীর সোনার। শরীরের রঙ বালির চরের মতো। সোনার পা খালি এবং এটা বসন্তকাল। নদীর চর থেকে বসন্তকালীন হাওয়া উঠে আসছে। বাতাস জোর বইছিল বলে তরমুজের পাতা ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। সেজন্য পাতার ফাঁকে সোনার শরীর স্পষ্ট। পাতার ফাঁকে সোনাকে নিবিষ্ট মনে বসে থাকতে দেখে ঈষৎ চিন্তিত হল ঈশম। সে ভাবল—সোনাডা আবার বইসা বইসা তরমুজের লতা উপড়াইতাছে না ত! সে ছই-এর ভিতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হল। ডাকল, সোনা কর্তা কই গ্যালেন?

    সোনা তাড়াতাড়ি পাতার ভিতর আরও লুকিয়ে গেল। প্রথমত, সে একা একা বাড়ি থেকে এ জগতে চলে এসেছে, দ্বিতীয়ত, সে একটা গর্ত করে নদী থেকে জল এনে পুকুর তৈরি করছে। পুকুর তৈরি করতে গিয়ে দুটো তরমুজের লতা উঠে এসেছে। এসব অপরাধবোধ ওর মনে কাজ করছে। সে একবার পাতার ফাঁক দিয়ে মাথা উঁচু করে দেখল, ঈশম তাকে খোঁজবার জন্য এদিকেই আসছে। সোনা তাড়াতাড়ি পাতার ফাঁকে মাটির সঙ্গে মিশে হামগুড়ি দিতে থাকল। ঈশম যত ওর দিকে এগিয়ে আসছে তত সে পাতার আড়ালে উপরে উঠে যব খেতের ভিতর ঢুকে গেল এবং চুপচাপ বসে থাকল।

    ঈশম যেখানে সোনাকে বসে থাকতে দেখেছিল এখন সেসব জায়গা নির্জন। দুটো তরমুজের লতা উপড়ানো। একটা ছোট গর্তে কিছু জল এবং একটা মালিনী-মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে। জলটা ক্রমশ কমে আসছে। মাছটা যেন উঁকি দিয়ে ঈশমকে দেখতে পেয়ে জলের ঘোলাটে অন্ধকারে লুকাল। ঈশম ফের ডাকল, সোনা কর্তা আমার, কই গ্যালেন?

    যেখানে নদীর পাড় ক্রমশ উঁচু হয়ে গ্রামের সঙ্গে মিশে গেছে সেখানে যবের খেত, গমের খেত। খেত পার হলে গোপাট। কবিরাজবাড়ি। নীল রঙের ডাকবাকস। এখন যব গম কাটার সময়। কিছু গাঙশালিক যব গম খেতে উড়ছে। ঈশম ফের ডাকল সোনা কর্তা, কই গ্যালেন গ! আমি আপনের লগে পারি! আইয়েন কর্তা, আইলে কান্দে লইয়া নদী পার হমু।

    সোনা ডাক শুনতে পেল কিন্তু আড়াল ছেড়ে এতটুকু নড়ল না। ঈশমের সঙ্গে এখন ওর পলান্তি খেলার শখ যেন। সে যব খেতের ভিতর আরও ঘন হয়ে বসল। সে বসে বসে শুকনো ঘাস ছিঁড়তে থাকল। যব গাছ নড়ছিল। ঈশম জমির আল থেকে টের করতে পারছে সব। সে দ্রুত হেঁটে এসে যব খেতে ঢুকে সোনাকে সাপটে ধরল এবং বলল, এহনে যাইবেন কইগ কৰ্তা?

    সোনা হাত ছুঁড়ছিল যব খেতের ভিতর। ওর চিৎকারে যব গম খেত থেকে সব গাঙশালিক বিকেলের রোদে উড়ে গেল। ওরা উড়ে উড়ে নদীর চরে নেমে গেল। সোনা বলল, না যামু না। আমারে ছাইড়া দ্যান।

    —আপনারে আমি কিছু কইছি? আইয়েন আমার লগে। ছই-এর নিচে বসুম, আসমান দ্যাখমু। বলে, সোনাকে কাঁধে তুলে হাঁটতে থাকল ঈশম

    সোনার এখন আর পরাজিত ভাবটুকু নেই। সে কাঁধে পা দোলাতে থাকল। সোনালী বালির নদীতে জল, কিছু নৌকা, কিছু গ্রামের মানুষ দেখল সোনা। বসন্তের বাতাস এখন যব, গম খেতে ঢুকে অদৃশ্য হচ্ছে। নদীর পাড় ধরে যত দূর চোখ গেল শুধু যব গমের পাকা শীষ, কিছু হিজল গাছ এবং তার পাতা গাছের নিচে বিছানো শতরঞ্জের মতো। সোনা বলল, রাইতে আপনের একলা ডর করে না?

    —না গ কর্তা! আল্লা ভরসা। ডরে ধরলে আল্লার নাম লই।

    —নিশিতে যদি ধইরা লইয়া যায়?

    —আমারে নিব না।

    —নিব, দেইখেন। নিশিতে ধরলে আপনে ট্যার-অ পাইবেন না।

    —আমাকে নিব না। নিশি ব্যাডা আমার মিতা।

    —তবে মায় যে কয়, তুমি একলা কোনখানে যাইঅ না সোনা। নিশিতে ধইরা লইয়া যাইব-অ। নিশি নাকি ইচ্ছা করলে মার মত হইতে পারে, আপনের মত হইতে পারে।

    —তা হইতে পারে।

    —আমি আর কোনখানে যামু না।

    —আর যাইয়েন না।

    এবার সোনা ঈশমের মুখ দেখার চেষ্টা করল। চারপাশে মাঠ। ওর নানা রকমের ভয়ডরের কথা মনে হল। যবের শীষ ওর শরীরে লাগছে। ওর শরীর চুলকাচ্ছিল। ঈশমের কাঁধ থেকে নেমে সোনা তরমুজ খেতের ভিতর ঢুকে গেল। সে বলল, আমি একলা যামু না বাড়িতে। আপনের লগে যামু ঈশম দাদা। তারপর সে তার প্রিয় মাছটিকে খুঁজতে থাকল। ঈশমকে বলল, আপনে যান ছই-এর ভিতর, আমি পরে আইতাছি। সে একটা তরমুজের ওপর বসে গর্তের ভিতর মাছটাকে খুঁজতে থাকল। জলের নিচে মাছাটা এখন লুকোচুরি খেলছে। সে গ্রামের দিকে তাকাল, বেলা পড়ে আসছে। তরমুজ গাছের ফাঁকে ফাকে রোদ জলের রেখার মতো বেয়ে বেয়ে নামছে। সে দেখল একটা বড় তরমুজ, পাতার উপরে উঠে গেছে। সে দীর্ঘ সময় নদীর জলে সূর্যের আলো পড়তে দেখল। সে দীর্ঘ সময় বড় তরমুজটার ওপর বসে আকাশের ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে মেঘের ছায়া দেখল এবং বিচিত্র রকমের সব পাখিদের গ্রামের দিকে উড়ে যেতে দেখল। ওর এখন উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না। ঈশম বার বার ছই-এর ভিতর থেকে ডাকছিল। তামাকের গন্ধ এদিকে নেমে আসছে, কিছু বালিহাঁসের শব্দ পেল সোনা, তবু সে উঠল না। সে নিবিষ্ট মনে নদীর চর দেখছে। বড় নির্জন এই অঞ্চলটা। একটা ভালুকের মুখ সে যব গমের খেতে দেখতে পেল। সে তাড়াতাড়ি ছই-এর দিকে হেঁটে যাবার সময়েই মনে করতে পারল ভালুকের মুখটা ছবির বইয়ে দেখা। সুতরাং ভীত হবার মতো কোনও ঘটনাই যেন নেই। ছই-এর ভিতর ঢুকে সোনা বলল, নিশি ব্যাডা আমার-অ মিতা। আমি কেয়রে ডরাই না।

    সোনা ছই-এর নিচে ঢুকে কিছুক্ষণ লাফালো। মাচানের নিচে মালসাতে তামাক খাবার জন্য ঈশম আগুন ধরে রেখেছে। ধোঁয়া উঠছিল।—বাইরে আইয়া বসেন, আসমানের নিচে কত সুখ দ্যাখেন। ঈশম বলল।

    ঈশম পা ছড়িয়ে বসল। তরমুজ খেতে সোনা ওর কোলে বসে বলল, আমারে যে কইলেন কান্দে কইরা নদী পার করব্যান, কই করল্যান না-ত! দীর্ঘকাল থেকে সোনার নদী পার হবার ইচ্ছা। কিন্তু ঈশম ওর কথায় রা করল না বলে মনে মনে অভিমান হতে থাকল। দূরে দূরে নদীর জল পাতলা চাদরের মতো কাঁপছিল। দু’জন বোরখা গরা বিবিকে দেখল নদীর পাড় ধরে যব গম খেতের ফাঁকে চরে নেমে আসছে। সে এবার যথার্থই ভীত হল। সে এবার ঈশমের কাছে খুব ঘন হয়ে বসল। ঈশম দাদার সেই সব ভূতের গল্প মনে পড়ছে—দু’চোখ সাদা, অন্য কোনও অবয়ব নেই। রাত্রিবেলা মায়ের বর্ণিত সেই সব রাক্ষস খোক্কোসেরা বালির চরে সন্তর্পণে নেমে আসছে যেন! সে খুবই কাতর গলায় বলল, ঈশম দাদা আমি মার কাছে যামু।

    —যাইবেন, আমার লগে যাইয়েন।

    —না, আমি এখন যামু

    দু’জন বোরখা পরা বিবি নদীতে নেমে যাচ্ছে। পিছনে নয়াবাড়ির বড় মিঞা। সে বুঝল বড় মিঞার দুই বিবি। সুতরাং সে হাত তুলে ডাকল, অঃ বড় মিঞা, বড় মি…ঞা। বড় মিঞাকে ধরবার জন্য সে সোনাকে কাঁধে নিয়ে তরমুজ খেত অতিক্রম করতে থাকল।

    নদীর পাড় ধরে বড় মিঞা এগিয়ে আসছে। ঈশম এখন বালির চর অতিক্রম করছে। এইসব ঘটনায় সোনা ভীত এবং বিব্রত। সে শুধু বলছে আমি যামু না, মার কাছে যামু। অথচ সে দেখল ঈশমের গলার আওয়াজে সেই অবয়বহীন কালো রঙের বোরখা দুটো পুতুলের মতো স্থির। সে বুঝল, ক্রমশ ওরা পরস্পর পরস্পরের সম্মুখীন হচ্ছে। সে আবার বলল, আমার ডর করতাছে, আমি বাড়ি যামু।

    ঈশম বলল, অঃ বড় মিঞা, ইট্টু খাড়ও। তোমার বিবিগ দ্যাখাইয়া লইয়া যাও। বোরখা পইরা যাইতাছে দেইখা সোনা কর্তার ডরে ধরছে।

    বড় মিঞার কুৎসিত বীভৎস মুখ; বসন্তের দাগ মুখে, একটা চোখ সাদা এবং মৃত।

    সোনা এবার ঈশমকে খুব শক্তভাবে জড়িয়ে ধরল। বলল, আমি দুষ্টামি করমু না। আমারে ছাইড়া দ্যান।

    সোনার এমন কথায় বড় মিঞা না হেসে পারল না। বলল, ধনকর্তার পোলা?

    —হ! ঈশমও হাসল। ডরান ক্যান। আপনেগ পুরান আমলের চাকর।

    এখন সোনালী বালির নদীর জলে সূর্যের শেষ আলো সোনার রাজহাঁসের মতো দেখাচ্ছে। সেই কালো অবয়ব-বিহীন বস্তু দুটো নীরব এবং নিশ্চল, যেন কোনও জাদুকরের মন্ত্রগুণ এই দুই অপরিচিত প্রেতাত্মাকে বেঁধে রেখে ভূতের খেলা দেখাচ্ছে। সোনা ঈশমকে শেষবারের মতো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল—সার্কাসে সিংহের খেলা দেখার মতো এক অযাচিত ভয়, রোমাঞ্চকর সব দৃশ্য। বিসদৃশ অবয়ব- -বিহীন অন্ধকার রঙের বস্তু দুটো এগিয়ে আসছে।

    ঈশম বলল, এইবার তোমার দুই লবেজান বিবিরে দ্যাখাও। সোনাকর্তার ডরডা ভাঙাইয়া দ্যাও দ্যাখছ মুখে রা নাই।

    চারিদিকে গমের খেত। পাড়ে পাড়ে লটকন গাছ আর তেমনি গাছে গাছে নীলকণ্ঠ পাখিদের মতো শালিকেরা আশ্রয় নিয়েছে। কিচিরমিচির শব্দ। দূরে গাভীর ডাক। সূর্যের আলো তেমনি যেন সোনার রাজহাঁস। সেই আশ্চর্য বিস্ময়মুগ্ধ প্রকৃতির নীরবতার ভিতর বড় মিঞা তার দুই বিবির বোরখা তুলে দিল—আশ্চর্য মুখ এবং পাতলা গড়ন যুবতীদের—বড় মিঞার দুই বিবি—দুগ্‌গা ঠাকুরের মতো মুখ, গড়ন, নাকে নথ এবং পায়ের মলে ঝমঝম শব্দ। সোনার কাতর চোখ দুটো এখন নদীর জলে আঁধার রাতে নৌকার আলো যেন—বিস্ময়ে চকচক করছে।

    ছোট বিবি বলল, আইয়েন কর্তা, কোলে আইয়েন। বলে ঈশমের কোল থেকে সোনাকে নিজের কোলে তুলে নিল এবং মুখের কাছে মুখ রেখে বলল, কি দ্যাখতাছেন বড় বড় চক্ষু দিয়া?

    সোনা কোনও জবাব দিতে পারল না। সে ছোট বিবির মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ঈশমকে দেখল। ঈশম এখন বড় মিঞার সঙ্গে ফসলের গল্প করছে।

    বড় বিবি বলল, কর্তা, চলেন আমাগ লগে।

    সোনা চোখমুখ বুজে বলল, না।

    সোনা ফের ছোট বিবির মুখের দিকে তাকালে, বলল, আমারে আপনের খুব পছন্দ লাগছে। হা গ বড় মিঞা, সোনা কর্তায় য্যা আমারে নজর দিতাছে। বলে খিলখিল করে হেসে উঠল।

    হাসি শুনে ঈশম বলল, তর হাসিডা আগের মতই আছে। সহসা মনে পড়ার ভঙ্গিতে ঈশম বলল, জাবিদা, তর ম্যায় ক্যামন আছে ল?

    —ভালই আছে ভাইসাব।

    ছোট বিবি সোনার চিবুক ধরে বলল, কর্তা, আমারে নিকা করতে হইলে গালে বড় বড় দাড়ি রাখন লাগব। দাড়ি না হইলে শখ মজাইতে পারবেন না। বড় বড় চক্ষু হইছে, ভারি ভারি নাক মুখ হইছে, নদীর চরের মত শরীরের রঙ হইছে—সব হইছে গ করতা, বড় খুবসুরত হয়েছেন। কিন্তু দাড়ি নাই গ গালে। বলে আড়চোখে বড় মিঞার দিকে তাকাল। বড় মিঞার মৃত চোখটা পর্যন্ত এমন কথায় সজাগ হয়ে উঠল। ছোট বিবির চোখে তখন মানিক জ্বলছিল। হেসে বলল, ডর নাই। এবং সোনাকে বুকের সঙ্গোপনে রেখে ভাবল; আল্লা, সোনা কর্তার মত একডা পোলা দ্যান।

    বড় মিঞা বলল, যাই ঈশম ভাই। ব্যালা পইড়া গ্যাছে। ঘরে ফিরতে রাইত হইব। সময় পাইলে যাইয়েন।

    ছোট বিবি বলল, ভাইসাব, ন্যান আপনের কর্তারে। বলে ছোট বিবি সোনাকে নিচে নামিয়ে রেখে মুখে বোরখা নামিয়ে দিল। তারপর ওরা চলতে থাকল। ওরা নদীতে নেমে যাচ্ছে। ওরা জল অতিক্ৰম করে ওপারে উঠে গেল। বড় মিঞা আগে, ছোট বিবি বড় বিবির পিছনে এবং সঙ্গে যেন ওদের রোদের ছায়া হেঁটে যাচ্ছে। সোনা ঈশমের হাত ধরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। বড় বিবির প্রতিবিম্ব জলে ভাসছে। ওরা নদীর পাড় ধরে হাঁটছিল—ওরা সরে যাচ্ছে ক্রমশ। সোনার কষ্ট হতে থাকল—বড় বড় চোখ, দুগ্‌গা ঠাকুরের মতো নাকমুখ, নাকে নথ, পায়ে খাড়ু, এখনও ঝমঝম শব্দটা কানে বাজছে। তারপর সেই ছবির ভালুকটা আবার চোখের ওপর ভেসে উঠল। সে ঈশমকে বলল, মায় কইছে আমারে একটা বন্দুক কিনা দিব।

    ঈশমও যেন এতক্ষণে কী সব ভাবছিল। বড় বিবির যৌবনকাল অথবা অন্য কোনও প্রিয় ঘটনা ওকে কিছুক্ষণের জন্য অন্যমনস্ক করে রেখেছিল। এবং এও হতে পারে…সূর্য ডুবছে, গাভীসকলের শব্দ এখন শোনা যাচ্ছে না, ঘাস নিয়ে মাঠ থেকে কামলা ফিরছে, সুতরাং ঘরে ফেরার সময় হলেই পঙ্গু বিবির কথা মনে হয়। বড় মিঞার কপালে সুখ, দুই বিবিকে নিয়ে ঘরে ফিরছে। তখন সোনা বলছে, বন্দুকটা দিয়া আমি একটা ভালুক মারমু।

    ঈশম এবারও কোন জবাব দিল না। সে সোনার হাত ধরে তরমুজ খেতের ভিতর ঢুকে গেল। কয়েকটি বড় বড় তরমুজ তুলে ছই-এর ভিতর রেখে দিল, তারপর ঝাঁপ বন্ধ করে বলল, লন যাই।

    সোনা মাচানের নিচে নেমে বলল, আমারে কান্দে লইয়া নদী পার হইবেন না?

    আইজ থাকুক। সন্ধ্য হইয়া আইতাছে, ধনমামি খোঁজাখুঁজি করব। তাড়াতাড়ি লন, বাড়ি যাই।

    তরমুজ খেত অতিক্রম করতেই সোনার মনে পড়ল ওর প্রিয় মালিনী-মাছটা একা পড়ে আছে তরমুজের জমিতে। সে বলল, ইট্টু খাড়ন, মাছটারে নদীর জলে ছাইড়া দিয়া আসি।

    সোনা লাফ দিয়ে তরমুজের পাতা এবং ফল ডিঙিয়ে গেল। সে খুঁজে খুঁজে নির্দিষ্ট জায়গাটুকু খুঁজে পেল না, তখন হতাশ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকল তরমুজের জমিতে। ঈশম বার বার ডেকেও সাড়া পেল না। কাছে এলে কেমন ভারি গলায় সোনা বলল, মালিনী-মাছটারে পাইতাছি না।

    ঈশম সোনার হাত ধরে গর্তটার সামনে নিয়ে দাঁড় করাল। গর্তটাতে এখন জল নেই। মালিনী-মাছটা বালি মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সোনা গর্তটার পাশে বসল। হাতের তালুতে মাছটাকে রেখে উল্টে পাল্টে যখন যথার্থই বুঝল মাছটা মরে গেছে, কেমন এক শোকার্ত চোখ নিয়ে চারদিকে তখন তাকাতে থাকল। ওর উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না এখন। মালিনী-মাছের চোখ ওকে পীড়িত করছে অথবা যেন ছোট বিবির মুখ….সে এবার ধীরে ধীরে মাছটাকে বালি মাটিতে শুইয়ে দিল। পাড়ের মাটি দিয়ে শরীর মুখ ঢেকে দিল। এবং একটা ছোট্ট তরমুজ পাতা ছিঁড়ে ওর কবরের ওপর ছাউনির মতো করে রেখে দিল। তারপর ঈশ্বরের কাছে ছোট এই মাছের জন্য প্রার্থনা করার সময় দেখল, যব গম খেতের ফাঁকে বড় মিঞা তার সাদা মৃত চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। যেন বলছে, হাউ মাউ কাউ মানুষের গন্ধ পাঁউ। অথচ সোনা দেখল সেই এক মাঠ–যব গম খেত, চরের বালিতে তরমুজের ঘন রঙ এবং নদীর জলে অবেলার শেষ রোদ আর নদীর ওপার থেকে বড় নিঃশব্দে সেই একটি মৃত চোখ–মুখে দাড়ি নিয়ে এগিয়ে আসছে। সুতরাং সব ফেলে ঈশমকে ফেলে চরের জমি ভেঙে কেবল ছুটতে থাকল সোনা। কেবল মনে হচ্ছে ওকে নিশিতে পেয়েছে। নিশির ডাকে সে এই সব নির্জন জায়গায় চলে এসেছে। সে ঈশমকে পর্যন্ত গরুর ছানা ভেবে এই অপরচিত জায়গা থেকে পালাতে চাইল। সে ছুটছে—ছুটছে। কিন্তু বেশি দূর ছুটতে পারল না। যব গম খেতের আলে পথ হারিয়ে ফেলল। ওর ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল। সে জোরে কাঁদতে পারল না পর্যন্ত। সে ভয়ে বিবর্ণ। চারদিকে যব গমের শীষ এবং তার শরীর দেখা যাচ্ছে না।

    সে ভয়ে চোখ বুজে যখন পথ খুঁজছিল, যখন যথার্থই অন্ধকার নেমে গেছে মাঠে এবং আশেপাশে শেয়ালেরা ডাকতে আরম্ভ করেছে, তখন ঈশম সোনাকে বুকের কোমল উষ্ণতায় ভরে দিল। বলল, কর্তা, আপনে আমারে ফালাইয়া যাইবেন কই?

    এবার চোখ খুলল সোনা। দেখল সেই পরিচিত জায়গা, সেই প্রিয় বকুল গাছ…গাছের ছায়ায় অজস্র বকুল ফুলের গন্ধ। সোনা এবার নির্ভয়ে বলল, আমি কোনখানে যামু না ঈশম দাদা। আপনেরে রাইখা কোনখানে যামু না।

  • সাত

    সাত

    ক্রমে কিছু সময় গেল। কিছু বছর কেটে গেল।

    মাঠের শেষ শস্যকণা ঘরে উঠে গেছে। এখন চৈত্রের মাঝামাঝি

    মাঠ এখন ধু-ধু করছে। শুকনো জমিতে হাল বসছে না। সর্বত্র চাষবাসের একটা বন্ধ্যা সময়। যতদূর চোখ পড়ছে, সমানে সাদা ধোঁয়াটে ভাব। শুকনো কঠিন জমি পাথরের মতো উঁচু হয়ে আছে। পাখ-পাখালি যেন সব অদৃশ্য অথবা সব জ্বলে পুড়ে গেছে। মনেই হয় না এই সব জমিতে সোনার ফসল ফলে, মনেই হয় না এখানে কোনও দিন বর্ষায় প্লাবন আসে। ঝোপ-জঙ্গল ফাঁকা ফাঁকা। গরিব দুঃখীরা ঝরাপাতা সংগ্রহ করছে। মুসলমান চাষীবৌরা এইসব ঝরাপাতা সংগ্রহের সময় আকাশ দেখছিল।

    জোটনও আকাশ দেখছিল কারণ তার এখন দুর্দিন। ফকিরসাব সেই যে নাস্তা করে পাঁচ বছর আগে সিন্নির নাম করে চলে গেছে আর ফিরে আসেনি। আবেদালিও আকাশ দেখছিল কারণ চাষবাসের কাজ একেবারেই বন্ধ। নৌকার কাজ বন্ধ। গয়না নৌকার কাজ শীতের মরশুমেই বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে নতুন শাক-পাতা মাটি থেকে বের হবে, সেজন্য জোটন আকাশ দেখছিল। বৃষ্টি হলে চাষবাসের কাজ আরম্ভ হবে, সেজন্য আবেদালি আকাশ দেখছিল। এই অঞ্চলে আকাশ দেখা এখন সকলের অভ্যাস। কচি কচি ঘাস, নতুন নতন পাতা এবং ভিজে ভিজে গন্ধ বৃষ্টির—আহা মজাদার গাঙে নাইয়র যাওয়ানের লাখান। জোটন বলল, বর্ষা আইলে আবেদালি তুই আমারে নাইয়র লইয়া যাবি?

    আবেদালি বলল, তর নাইয়র যাওনের জায়গাটা কোনখানে!

    —ক্যান, আমার পোলারা বাইচা নাই?

    —আছে, তর সবই আছে। কিন্তু কে-অ তরে খোঁজ-খবর করে না।

    জোটন আবেদালির এই অপমানকর কথার কোনও উত্তর দিল না। গতকাল আবেদালির কোনও কাজ ছিল না। আজ সারাদিন হিন্দুপাড়া ঘুরে ঘুরে একটা কাজ সংগ্রহ করতে পারেনি। এখন চৈত্র মাস। সব কিছুতে টান পড়েছে। আবেদালি, গৌর সরকারের শণের চালে নতুন শণ লাগিয়ে দিয়েছে। যা মিলবে—সামান্য যা কিছু। সে পয়সার কথা বলেনি। আবেদালি সারাটা দিন কাজ করেছে—যেহেতু কামলার সংখ্যা প্রচুর এবং মুসলমান পাড়াতে রুজিরোজগার বন্ধ, যার গরু আছে সে দুধ বেচে একবেলা ভাত, অন্য বেলা মিষ্টি আলু সেদ্ধ খাচ্ছে। আবেদালির গরু নেই, জমি নেই, শুধু গতর আছে। গতর বেচে পর্যন্ত পয়সা হচ্ছে না। সারাদিন খাটুনির পর গৌর সরকারের সঙ্গে পয়সা নিয়ে বচসা হয়ে গেল। কুৎসিত গাল দিয়ে চলে এসেছে আবেদালি।

    আবেদালির বিবি জালালি তখনও পেট মেঝেতে রেখে পড়ে আছে। সারাদিন কিছু পেটে পড়ে নি। জব্বর আসমানদির চরে গান শুনতে গেছে।

    জালালি পেট মাটিতে রেখেই বলল, পাইলা নি?

    আবেদালি কোনও উত্তর করল না। সে তার পাশ থেকে ছোট পুঁটুলিটা ঢিল মেরে মেঝেতে ছুঁড়ে দিল! সামনে জোটনের ঘর। ঘরের ঝাঁপ বন্ধ। জালালি পুঁটিলিটা দেখতে পেয়েই তাড়াতাড়ি উঠে বসল। এবং দাঁড়িয়ে খোলা কাপড়ের গিঁট ফের পেটে শক্ত করে বাঁধল। আবেদালি অন্যমনস্ক হবার জন্য হুঁকো নিয়ে বসল। আর জালালি ঝরাপাতা উঠানে ঠেলে ঘোলা জলে পাতিল হাঁড়ি খলখল করে ধুতে গেল।

    আবেদালি কতক্ষণ হুঁকো খাচ্ছিল টের পায়নি। সে দেখল উনানের ওপাশে বসে জালালি হাঁড়িতে চাল দিচ্ছে। ওর খাটো কাপড়। দু হাঁটুর ভিতর দিয়ে পেটের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। শালী, মাগীর বড় পেট ভাসাইয়া রাখনের অভ্যাস। শরীর দেয় না আর। তবু এই ভাসানো পেট আবেদালিকে কেমন লোভী করে তুলছে। আবেদালি বেশিক্ষণ বিবিকে এভাবে বসে থাকতে দেখলে কখনও কখনও কলাইর জমি অথবা একটা ফাঁকা মাঠ দেখতে পায়। সে ফের নিজেকে অন্যমনস্ক করার জন্য বলল, জব্বাইরা গ্যাল কোনখানে? কাইল থাইকা দ্যাখতাছি না।

    জালালি আবেদালির দুষ্ট বুদ্ধি ধরতে পারছে যেন। সে বলল, জব্বাইরা গুনাই বিবির গান শুনতে গ্যাছে। কাঠের হাতা দিয়ে ভাতের চালটা নেড়ে দেবার সময় জালালি বলল, গুনাই বিবির গান শুনতে আমার-অ ইসছা হয়।

    এত অভাবের ভিতরও আবেদালির হাসি পাচ্ছে। এত দুঃখের ভিতর আবেদালি বলল—পানিতে নদী-নালা ভাইসা যাউক, তখন তরে লইয়া পানিতে ভাইসা যামু।

    জালালির এইসব কথাই যেন আবেদালির ছাড়পত্র। মাঠে নামার অথবা চাষ করার ছাড়পত্র।

    আবেদালির দিদি জোটন এতক্ষণ দাওয়ায় বসে সব শুনছিল। এত সুখের কথা সে সহ্য করতে পারছিল না। সে সন্তর্পণে ঝাঁপটা আরও টেনে চুপচাপ বসে থাকল। কোনও কর্ম নেই—শুধু আলস্য শরীরে। শার চুলের গোড়া থেকে চিমটি কেটে কেটে উকুন খুঁজছিল। আর জালালির এত সুখের কথা শুনেই যেন চুলের গোড়া থেকে একটা উকুনকে ধরে ফেলতে পারল। জোটনের মুখে এখন প্রতিশোধের স্পৃহা—মান্দার গাছের নিচে মনজুরের মুখ ভেসে উঠল। উকুনটাকে দু’নখের ভিতর রেখে ঝাঁপের ফাঁকে উঁকি দিতেই দেখল, উঠানের অন্য পাশে আবেদালি। জালালিকে সে সাপ্টে যেন বাঘ ঘাড় কামড়ে অথবা থাবার ভিতর শিকার নিয়ে পালাচ্ছে। জালালি লতার মতো দু’পায়ের ফাঁকে ঝুলে আছে। এখন চৈত্র মাস বলে কথায় কথায় ঘূর্ণি ঝড়। ধুলো উড়ে এসে ঝাপটা মারল—উঠোন অন্ধকার হয়ে ওঠায় ঘরের ভিতর আবেদালি কি করছে শিকার নিয়ে, দেখতে পেল না। সে রাগে দুঃখে এবার মাঠের ভিতর নেমে ধুলোর ঝড়ে ডুবে গেল।

    চৈত্র মাস সুতরাং রোদে খাঁ-খাঁ করছে মাঠ। পুকুরগুলিতে জল নেই। একমাত্র সোনালী বালির নদীর চরে পাতলা চাদরের মতো তখনও জল নেমে যাচ্ছে। মসজিদের কুয়োতে জল নেই। গ্রামের দুঃখী মানুষেরা অনেকদূর হেঁটে গিয়ে জল আনছে। সোনালী বালির নদীতে ঘড়া ডুবছে না। নমশূদ্রপাড়ার মেয়ে-বৌরা সার বেঁধে জল আনতে যাচ্ছে। ওরা খোঁড়া দিয়ে জল তুলছে কলসিতে। ট্যাবার পুকুরে, কবিরাজ বাড়ির পুকুরে, ঘোলা জল। গরু নেমে নেমে জল একেবারে সবুজ রঙ হয়ে গেছে। বড় দুঃসময় এখন। সে বের হবার মুখে কলসি নিয়ে বের হল। সোনালী বালির নদী থেকে এক ঘড়া জল এনে হাজি-সাহেবের বাড়িতে উঠে যাবে। বুড়ো হাজি সাহেবের জন্য এত কষ্ট করে জল বয়ে আনলে কিছু তেলকড়ি মিলতে পারে—পয়সা না হোক, এক কোনকা ধান। সে নেমেই দেখল মাঠে কারা যেন ছুটে ছুটে যাচ্ছে। একদল লোক খাঁ-খাঁ রোদের ভিতর দিয়ে পালাচ্ছে। ওদের মাথায় বোধ হয় ওলাওঠার দেবী। বিশ্বাসপাড়াতে ওলাওঠা লেগেছে। সে এতদূর থেকে মানুষগুলিকে স্পষ্ট চিনতে পারছে না।

    মাঠে পড়েই জোটনের মনে হল—জালালি এখন উদোম গায়ে ঘরের ভিতর। উনানে ভাত সেদ্ধ হচ্ছে। পাতা, খেড় অথবা লতাপাতায় আগুন ধরে গেলে আগুন লাগতে কতক্ষণ! নদীর দিকে হেঁটে যাবার সময় জোটনের এমন সব দৃশ্য মনে পড়ছিল। চৈত্র মাসে আগুন যেন চালে বাঁশে লেগেই থাকে। জোটনের মন ভাল ছিল না, সেজন্য দ্রুত হাঁটছে। সকলেই জল নিয়ে ঘরে ফিরছে, তাকেও তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। গ্রামে গ্রামে ওলাওঠা মহামারীর মতো। যেসব লোক রোদের ভিতর পালাচ্ছিল তারা ক্রমশ জোটনের নিকটবর্তী হচ্ছে। একেবারে সামনা-সামন্তি। জোটন তাড়াতাড়ি পাশে কলসি রেখে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। গাধার পিঠে ওলাওঠা দেবী যাচ্ছেন। মাথায় করে মানুষরা ঢাকের বাদ্যি বাজাতে বাজাতে নিয়ে যাচ্ছে। জোটন ওদের পিছন পিছন বেশিদূর গেল না। সড়কের ধারে সব মান্দার গাছ। মান্দার গাছে লীগের ইস্তাহার ঝুলছে। জোটন সেই মান্দার গাছের ছায়ায় গ্রামের দিকে উঠে গেল।

    পথে ফেলু শেখের সঙ্গে দেখা। ফেলু বলল, জুটি, পানি আনলি কার লাইগ্যা?

    জোটন থুতু ফেলল মাটিতে। মানুষটার সঙ্গে কথা বললে গুনাহ। মানুষটা এক কোপে আনুর মরদকে কেটে এখন আন্নুকে নিয়ে ঘর করছে। একদিন বসে বসে আবেদালিকে এইসব গল্প শুনিয়েছে—মানুষটার বুকের কি পাটা? ভয়ডর নাই। সামসুদ্দিনের সঙ্গে এখন লীগের পাণ্ডাগিরি করছে।

    জোটন কিছুতেই কথা বলছে না। আলের পাশে দাঁড়িয়ে ফেলুর যাবার পথ খালি করে দিচ্ছে।

    কিন্তু ফেলুর লক্ষণ ভাল না। সে দাঁড়িয়ে থাকল সামনে। কেমন মুচকি হাসছে। ওর একটা চোখ বসন্তে গেছে। মুখ কী ভয়ঙ্কর কুৎসিত। অর্ধেকটা মুখ ঢাকা থাকে এখন। হাডুডু খেলার রস মরে গেছে। গতরে তেমন শক্তি নেই বুঝি। তবু চোখটা ভয়ঙ্করভাবে কেবল জ্বলছে। ফেলু মুচকি হেসে বলল, জুটি, তর ফকিরসাব তবে আর আইল না?

    —কি করতে কন তবে। না আইলে কি করমু! জোটন ফের থুতু ফেলল।

    ফেলু এবার অন্য কথা বলল। কারণ জোটনের মুখ দেখে ধরতে পারছে এইসব ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকাটা সে পছন্দ করছে না। সে এবার খুব ভালো মানুষের মতো বলল, মানুষগুলাইন মাথায় কইরা কি লইয়া যাইতাছে।

    —ওলাওঠা দেবীরে লইয়া যাইতাছে।

    —মাথাটা ভাইঙ্গা দিলে ক্যামন হয়?

    জোটন এবারেও দাঁত শক্ত করে বলতে চাইল যেন, তর মাথাটা ভাঙমু নিব্বৈংশা। অথচ মুখে কোনও শব্দ করল না। লোকটার জন্য সকলের ভয়ডর। কার মাথা কখন নেবে, হাসতে হাসতে হ্যাৎ করে মাথা কাটতে ফেলুর মতো ওস্তাদ আর নেই। মানুষটাকে কেউ ঘাঁটায় না। যেন ঘাঁটালেই সে রাতের অন্ধকারে বিসমিল্লা রহমানে রহিম বলে কোরবানির খাসির মতো গলার নলি ছিঁড়ে দেবে। কোরবানির দিনে মানুষটা আরও ভয়ঙ্কর। সুতরাং জোটন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর থেকে বের হয়ে আসতে চাইল।

    ফেলু দেখল চৈত্রের শেষ রোদ বাঁশগাছের মাথায়। সামসুদ্দিন তার দলবল নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এখন সামনের মাঠ ফাঁকা। লতানে ঝোপ আর শ্যাওড়া গাছের জঙ্গল, আর জঙ্গলের ফাঁকে ওরা দু’জন। একটু ফষ্টিনষ্টি করার মতো মুখ করে সামনে ঝুঁকল, তারপর ফিসফিস করে বলল, দিমু নাকি একটা গুঁতা।

    জোটন এবার মরিয়া হয়ে বলল, তর ওলাওঠা হইবরে নিব্বৈংশা। পথ ছাড়, না হইলে চিৎকার দিমু। বলা নেই, কওয়া নেই, এমন একটা হঠাৎ ঘটনার জন্য জোটন প্রস্তুত ছিল না। ফেলু হাসতে হাসতে বলল, রাগ করস ক্যান! তর লগে মসকরা করলাম। তারপর চারিদিকে চেয়ে হাসতে হাসতে বলল, শীতলা ঠাইরেনের ডর আমারে দেখাইস না জোটন। কস তো আইজ রাইতে মাথাটা লইয়া আইতে পারি।

    সামসুদ্দিন দলবল নিয়ে সঙ্গে যাচ্ছে। লীগের সভা হবে। শহর থেকে মৌলবীসাব আসবেন। সুতরাং ফেলুকে নেতা গোছের মানুষের মতো লাগছে। পরনে খোপকাটা লুঙ্গি। গায়ে হাতকাটা কালো গেঞ্জি। আর গলাতে গামছা মাফলারের মতো প্যাঁচানো। সে জোটনকে পথ ছেড়ে দিল। ওরা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। ওদের ধরতে হবে। সে আল ভেঙে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে। মাঠ থেকে ওলাওঠা দেবীও গ্রামের ভিতর অদৃশ্য। তখন ধোঁয়ার মতো এক কুণ্ডলী গ্রাম মাঠ পার হয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। সে যা ভাবছিল তাই। জল নেই নদী-নালাতে। মাঠ শুকনো, পাতা শুকনো। আর সারাদিন রোদে পাতার ছাউনি তেতে থাকে, পাটকাঠির বেড়া তেতে থাকে। জোটন কাঁখের কলসি নিয়ে দ্রুত ছুটছে। সে দেখল পাশের গ্রাম থেকেও মানুষেরা ছুটে আসছে। যারা সোনালী বালির নদীতে জল আনতে গিয়েছিল তারা পর্যন্ত দুঃসময়ে আগুনের উপর সব জল ঢেলে দিল

    কিন্তু এই আগুন আগুনের মতো আগুন, বাতাসের সঙ্গে মিলে-মিশে অশিক্ষিত এবং অপটু হাতের গড়া সব গৃহবাস ছাই করে দিতে থাকল। জোটনের ঘরটা পুড়ে যাচ্ছে। আবেদালির ঘরটা সকলের আগে পুড়েছে। আবেদালি জালালির অগোছালো শরীরটা সেই আগের মতো সাপ্টে ধরে রেখেছে। নতুবা ছুটে গিয়ে আগুনে ঝাঁপ দিতে পারে। ওর কাঁথা, বালিশ, মাদুর, কলাইকরা থালা সানকি সব গেল। পুড়ে যাচ্ছে। ঠাস ঠাস করে বাঁশ ফাটছে, হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ হচ্ছে। আগুন গ্রামময় ছড়িয়ে পড়ছে। সুতরাং কাঁচা বাঁশ অথবা কলাগাছ এবং কাদা জল সবই প্রয়োজনীয়। চারিদিকে বীভৎস সব দৃশ্য। যাদের কাঁথা বালিশ আছে তারা কাঁথা বালিশ মাঠে এনে ফেলল। জালালি তখন আমগাছের নিচে বসে কপাল থাপড়াচ্ছে। পুবের বাড়ির নরেন দাস একটা দা নিয়ে এসেছে। যেসব ঘরে আগুন লাগেনি এবার লেগে যাবে—হল্কা বের হয়ে হয়ে লম্বা হচ্ছে, চাল থেকে চালে আগুন লাফিয়ে পড়ছে, সেইসব চাল কেটে দিচ্ছে। ঘর আল্গা করে দিচ্ছে। যেন আগুন আর ছড়াতে না পারে। মানুষেরা সব হুমড়ি খেয়ে পড়েছে, আগুন নেভানোর জন্য। কুয়োর জল ফুরিয়ে গেছে। হাজি সাহেবের পুকুরে যে তলানিটুকু ছিল তাও নিঃশেষ। মনজুরদের পুকুরে শুধু কাদামাটি। এখন লোকে কোদাল মেরে কাদামাটি চালে ছুঁড়ছে। তখন দূরে ওলাওঠা দেবীর সামনে ঢাক বাজছিল, ঢোল বাজছিল। বিশ্বাসপাড়াতে হরিপদ বিশ্বাস হিক্কা তুলে মারা গেল। সাইকেল চালিয়ে গোপাল ডাক্তার ছুটছে বাড়ি বাড়ি টাকার জন্য, রুগী দেখার জন্য। সে যেতে যেতে আগুন দেখে এইসব অশিক্ষিত লোকদের গাল দিল। ফি বছর হামেশাই কোনও কোনও দুঃখী গ্রামে এমন হচ্ছে। হাতুড়ে বদ্যি গোপাল ডাক্তারের এখন পোয়াবারো। রুগী কামিয়ে অর্থ, গরিব লোকদের অনটনে অর্থ দিয়ে সুদ। আলের উপর গোপাল ডাক্তার এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ক্রিং ক্রিং বেল বাজাচ্ছে। যেন বলছে, কে আছ এস, টাকা নিয়ে যাও, ওষুধ নিয়ে যাও! অর্থ দিয়ে সুদ দেবে, ঋণশোধ করবে।

    খড়ম পায়ে শচীন্দ্রনাথও ছুটে এসেছিলেন। জোটন, আবেদালি এবং গ্রামের অন্য সকলে সান্ত্বনার জন্য ওকে ঘিরে দাঁড়াল। শচীন্দ্রনাথ সকলের মুখ দেখলেন। সকলে এখন আবেদালি এবং জালালিকে দোষারোপ করছে। শচীন্দ্রনাথ বললেন, কপাল।

    সামসুদ্দিনের দলটা অনেক রাতে সভা শেষ করে ফিরে এল। ওরাও ঘুরে ঘুরে সকলকে সান্ত্বনা দিতে থাকল। আগুন নেভানোর চেষ্টায় বড় বড় বাঁশের লাঠি অথবা কাদামাটি নিক্ষেপ করে যখন বুঝল—কোনও উপায় নেই, সব জ্বলে যাবে—তখন ওরা মসজিদের দিকে চলে গেল। মসজিদটা এখন দাউদাউ করে জ্বলছে।

    চোখের উপর গোটা গ্রামটা পুড়ে যাচ্ছে। বিশ্বাসপাড়াতে এখন ওলাওঠা দেবীর অর্চনা হচ্ছে। মাঠে সব চাষের জমিতে পোড়া কাঁথা পেতে যে যার ভস্ম থেকে তুলে আনা ধন-সম্পত্তি আগলাচ্ছে। আগুনে ওদের মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

    যখন আগুন পড়ে এল এবং এক ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব—জোটন শোকে আকুল হতে থাকল। ঘন অন্ধকার চারদিকে। থেকে থেকে ধোঁয়া উঠছে। সে অন্ধকারের ভিতর পোড়া ভস্ম ধন-সম্পত্তির আশায় চুপি চুপি হাজিসাহেবের গোলাবাড়িতে উঠে এল। সে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছিল। সে ঘুরেও গেল কতকটা পথ। ধান চাল পোড়া গন্ধ। আশেপাশে সব হা-অন্ন মানুষদের হা-হুতাশের শব্দ ভেসে আসছে। অন্ধকারে জোটন পরিচিত কণ্ঠ পেয়ে বলল, ফুফা, আমার ঘরটা গ্যাল। ভালই হয়েছে। যামু গিয়া যেদিকে চোখ যায়। ঘরটার লাইগা বড় মায়া হইত। ফকিরসাব আর বুঝি আইল না, এও বলার ইচ্ছা। যখন এল না তখন আর কার আশায় সে এখানে বসে থাকবে। পরিচিত মানুষটা অন্ধকারে বসে টের পেল, জোটন অনেক কষ্টে এমন কথা বলছে।

    পরিচিত মানুষটি বলল, আবেদালির আফুর দুফুর নাই!

    জোটন এবার ফিরে দাঁড়াল। কাকে কি কমু কন। পুরুষমানুষ দিন নাই রাইত নাই খামু খামু করে, কিন্তু তুই মাইয়ামানুষ হইয়া আফুর দুফুর দ্যাখলি না। উদাম কইরা গায়ে গতরে পানি ঢাললি।

    জোটন আর দাঁড়াল না। সে বকতে বকতে অন্ধকারে হাজিসাহেবের গোলাবড়িতে ঢুকে গেল। বড় বড় গোলা ভস্ম হয়ে গেছে। ধান-পোড়া মুসুরি-পোড়া গন্ধ উঠছে। কোথাও থেকে এই দুঃসময়ে একটা ব্যাঙ ক্লপ ফ্লপ করে উঠল। জোটন আগুনের ভিতর খোঁচা মারল একটা। না, কিছু বের হচ্ছে না। অন্ধকারের ভিতর কিছু ছাইচাপা আগুন শুধু কতকটা ঝলসে উঠে ফের নিভে গেল। আগুনে জোটনের মুখ পোয়াতির মুখের মতো–লোভী এবং পেট সর্বস্ব চেহারা। সেই আগুনে জোটন অন্ধকারে পথ চিনে নিল। তখন ঢাকের বাজনা, ঢোলের বাজনা ওলাওঠা দেবীর সামনে। তখন হাজিসাহেব তার তিন বিবির কোলে ঠ্যাং রেখে কপাল চাপড়াচ্ছেন আর হাজিসাহেবের তিন বেটার তিন বিবি, মাঠের মধ্যে চষা জমির উপর বিছানা পেতে ওৎ পাতার মতো অপেক্ষা করছে।

    জোটনের মনে হল এই অন্ধকারে সে একা নয়। অন্য অনেকে যেন হাতে কাঠি নিয়ে পা টিপে টিপে গোপনে আগুনের ভিতর ঢুকে খোঁচা মারছে। দূর থেকে মনে হল হাজিসাহেবের একটা ঘর—সবটা জ্বলেনি। অথবা আর জ্বলবে না। সে লাফিয়ে এগোল। সে ঘরের ভিতর গতকাল কয়েক লাছি পাট দেখেছিল। জোটনের পরাণ এখন ভাদ্রমাসের পানির মতো টলমল করছে। আর তখন জোটনের পায়ের শব্দে অন্ধকার থেকে কে যেন বলল, কেডা?

    —আমি…আমি…।

    জোটনের মনে হল অন্ধকারে আর এক মানুষ যেন গোপনে তন্ন তন্ন করে কি খুঁজছে।

    জোটন বলল, তুমি কেডা?

    জোটনের মনে হল ফেলু শেখ। সেও অন্ধকারে আগুনে পোড়া সম্পত্তি চুরি করতে এসেছে। অথবা মাইজলা বিবির সনে পীরিত তার। হাজিসাহেবের মাইজলা বিবিও এই রাতের অন্ধকারে যখন কেউ কোথাও জেগে নেই, সকলে মাঠে নেমে গেছে, কিছু ফেলে গেছে এই নাম করে ফিরে এলে ফেলু শেখ চুপি চুপি চিনে ফেলবে। কার টের পাবার কথা! ফেলু সেই এক জ্বালা নিবারণের জন্য, কি যে এক জ্বালা, উজানে যেতে হাজিসাহেব ভোলা অঞ্চলের পাশে কোন এক সাগরের কূল থেকে এই মাইজলা বিবিকে তুলে এনেছিলেন। তখন সঙ্গে ছিল ফেলু। ফেলু ফুসলে ফাসলে টাকার লোভ দেখিয়ে হাজিসাহেবের নৌকায় এনে তুলেছিল মাইজলা বিবিকে। তখন হাজিসাহেব হাজি নন, তখন ফেলুর যৌবন কত বড়, ফেলুর কত নামডাক—জোয়ান মরদ ফেলু পীরিত করার অছিলা খুঁজছিল মাইজলা বিবির সনে। বোধ হয় এখন সংগোপনে গানটা গায় মাইজলা বিবি। যখন কলিমুদ্দি সাহেব হজ করতে গেলেন এবং যখন হাজি হয়ে ফিরে এলেন তখন মাইজলা বিবির সেই গান গলায়। একা আতাবেড়ার পাশে বসে বসে গাইত। ঘাটে ফেলু বসে থাকত। সে ওদের তখন বড় নৌকার মাঝি—কাজ কারবারে তাকে হাটে-বাজারে যেতে হয়, সওদা করে আনতে হয়। তাই মাইজলা বিবির সনে পীরিত রঙ্গরস করার অছিলাতে ঘাটের মাঝি হয়ে সে বসে থাকত। কিন্তু কলিমুদ্দি হজ করে এসে সবই টের পেয়ে গেলেন। তিনি বললেন, মিঞা, তোমার এই আছিল মনে। তারপর হাজিসাহেব ঘাট থেকে তাড়িয়ে দিলেন ফেলুকে। সে কবেকার কথা! সেই থেকে ফেলু আর হাজিসাহেবের বাড়ি যেতে পারে না। মাঝে মাঝে মাইজলা বিবির মুখ ওর পরাণে দরিয়ার বান ডেকে আনে। তখন সে একা একা প্রায় পাগল ঠাকুরের শামিল। সে গোপাটে অথবা অন্ধকার রাতে চুপি-চুপি অশ্বত্থের নিচে নেমে আসে। ঝোপ-জঙ্গলে উবু হয়ে বসে থাকে। আতাবেড়ার পাশে কখন উঁকি দেবে মুখটা। বিবি আন্নু আজকাল হাজিসাহেবের বাড়িতে আসে-যায়। ছোট বিবির সঙ্গে আন্নুর খুব ভাব। সেই বিবি ওকে লুকিয়েচুরিয়ে তেল দেয়, ডাল দেয়, মাসকলাইর বড়ি দেয়। আন্নু বলে ছোট বিবি দেয়—কিন্তু জোটনের মন বলে সব মাইজলা বিবির কাজ। মাইজলা বিবির সনে পীরিত বড় ফেলুর।

    জোটন বোঝে সব। আন্নু দেখায় ছোটবিবির সঙ্গে তার বড় ভাব—সখী সখী গলায় দড়ি ওলো সখী ভাব।

    আর ফেলুর যখনই ভাবের কথা মনে হয় তখন আর একমুহূর্ত দেরি করতে পারে না। সে এই অন্ধকারে আগুনের ভিতর মাইজলা বিবিকে দেখার বাসনাতে বসে আছে। যদি আসে। চারিদিকে হল্লা–কে কোথায় ছুটছে—কে কোথায় আছে কে জানে। এই ত সময়। সুতরাং সে এখানে বসে বিবির উঠে আসার অপেক্ষায়—কি জাদু বিবির চোখে আর কি জাদু আছে এই মনের ভিতর। এই মন কি যেন চায় সব সময়। ফেলু কি যেন চায় সব সময়। তার ঘরে যুবতী বিবি আন্নু। ফেলুর বয়স দুই কুড়ির ওপরে হয়ে গেছে—তবু মনটা কি যেন চায়। এত অভাব অনটনের ভিতরও ভিতরটা কি পেতে কেবল ইসছা ইসছা করে। কিসে যে সুখ—এই আন্নুর জন্য সে কী কাণ্ড না করেছে! আলতাফ সাহেবের গলাটা সে হ্যাৎ করে কেটে ফেলেছে। পাটখেতের ভিতর আলতাফ সাহেব বাছ-পাট কেমন হয়েছে দেখতে এসেছিল। বুড়ো আলতাফ সাহেবের শেষ পক্ষের বিবিকে সে ঈদের পার্বণে পীরের দরগায় দেখে প্রায় পাগলের মতো—কি করে, কি করে! কি করবে ফেলু ভেবে উঠতে পারল না। তখন ফেলুর যৌবনকাল যায়-যায়। সে তল্লাটের ফেলু। সুতরাং সে ঈদের আর এক পার্বণে মেমান সেজে চলে গেল আলতাফ সাহেবের বাড়ি। ওকে সে পাটের ব্যবসা করতে বলল- য্যান ফেলু কত বড় মহাজন। সে দাড়িতে আতর মাখত তখন, ভাল তফন কিনে আনতো বাবুর হাট থেকে। মন খুশ থাকলেই ম্যাডেল ঝোলাত গলায়।

    বুড়ো আলতাফ খেলার বড় উৎসাহদাতা ছিল। ফেলুর সঙ্গে কত জান পচান, কত বড় খেলুড়ে ফেলু তার বাড়ি মেমান হয়ে এসেছে—বিবি, বেটারা দেখুক। খেলোয়াড় ফেলুকে সে অন্দরমহলে একদিন ঢুকিয়ে দিল। ফেলুর পীরিতের ছলাকলা সব যেন জানা। ফাঁকা বুঝে ফুলের কুঁড়ির মতো আলতাফের ছোটবিবিকে কাছিমের মতো বুকের ছাতি দেখাল একদিন। আন্নু দেখল সেই বুকের ছাতিতে মেডেলগুলি ঝকঝক করছে। আন্নুর তখন মনে পড়েছিল ছোট বয়সের কথা। বালিকা আন্নু খেলা দেখতে গেছে—হা-ডু-ডু খেলা। ফেলু এসেছে খেলতে পরাপরদির হাটে। সেদিন হাটবার ছিল না, তবু কি লোক, কি লোক! দু’দশ মাইলের ভিতর কোনও যুবা পুরুষ আর সেদিন ঘরে ছিল না। মেলার মতো প্রাঙ্গণে-প্রাঙ্গণে নিশান উড়ছিল—য্যান ঈদ-মুবারক। ফেলু সেই মেলার প্রাণ ছিল। খেলা শেষ হলে ফেলুর জয়-জয়কার। আন্নু, বালিকা আন্নু সেদিনই কেমন ফেলুর ভালোবাসায় পড়ে গেল। সেই ফেলু এসেছে মেমান সেজে—আলতাফ সাহেবের বিবি নিজেকেই যেন শুধাল, এই আছিল তর মনে! তারপর সময় বুঝে হ্যাঁৎ করে গলাটা কেটে ফেলল ফেলু। পাটখেতের ভিতর হ্যাঁৎ করে কেটে ফেলল গলার নলিটা। যেমন সে কোরবানির দিন দশ পাঁচটা কোরবানিতে চাকু চালায়, বিশমিল্লা রহমানে রহিম বলে, তেমনি সে বিসমিল্লা রহমানে রহিম বলে হ্যাঁৎ করে নলিটা আলতাফ সাহেবের কেটে ফেলল। যেদিন সে বিবিকে বোরখা পরিয়ে নিয়ে আসে, সেদিন সে, হ্যাঁৎ করে গলা কেটে ফেলেছে কথাটা প্রথম জানাল বিবিকে। আন্নু শুনে বলল, এই আছিল তর মনে! বলে সেই বিস্তীর্ণ মাঠের ভিতর হা-হা করে হেসে উঠেছিল। আন্নুকে দেখলে মনেই হবে না ফেলুর জন্য সে এত বড় হত্যাকাণ্ড হজম করে গেছে।

    অন্ধকারে ফেলু দূরের একটা ছায়া-মূর্তি দেখছিল আর ভাবছিল। বুঝি চুপি চুপি মাইজলা বিবি উঠে আসছে। কিন্তু এখন এ কিকার গলা, জোটন মনে হয়! সে ধরা পড়ে যাবে, চুরি করতে এসেছে এই আগুনের ভস্ম ধনসম্পত্তি থেকে-তার ভয় ধরে গেল।

    জোটন তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলল, নাম কইতে পার না মিঞা! আমি কেডা।

    —আমি মতিউর। ফেলু অন্ধকারে দাঁড়িয়ে মিথ্যা কথা বলল।

    —তোমাগ আর মানুষগুলান কই?

    —আগুন দেইখ্যা পালাইছে।

    —তুমি এখানে কি করতাছ?

    —সানকিডা খুঁজতাছি।

    —হাজিসাহেব জানে না, বৈঠকখানা ঘরডা পুইড়া যায় নাই।

    —আগুনে বড় ডর হাজিসাহেবের। লোকটা দূর থেকেই কথা বলছে। এই ভস্মরাশিকে এখন সকলেরই ভয়। গলাটা স্পষ্ট নয়। গলাটা কখনও ফকির সাহেবের মতো, কখনও মনে হচ্ছে ফেলুই মতিউরের গলায় কথা বলছে। তারপর মনে হল অন্ধকারে লোকটা কিছু কুড়িয়ে পেয়েছে। এবং পেয়েই এক দৌড়।

    জোটন বলতে চাইল—ধর-ধর। কিন্তু বলতে পারল না। সে নিজেও একটা সানকি খুঁজতে এসেছে অথবা কিছু চাল, পোড়া ধান হলে মন্দ হয় না, পোড়া কাঁথা হলে মন্দ হয় না—সে এখন যা পেল তাই নিয়ে আমগাছের নিচে জড়ো করল। জালালি সব জোটনের হয়ে সংরক্ষণ করছে। সে ভস্মরাশি থেকে খুঁজে-পেতে আনছে আর জালালিকে দিয়ে আবার অন্ধকারে খুঁজতে চলে যাচ্ছে।

    তখন কান্না ভেসে আসছিল বিশ্বাসপাড়া থেকে। তখন ওলাওঠা দেবীর সামনে আরতি হচ্ছিল। ওলাওঠাতে আবার হয়তো কেউ মারা গেল। জোটন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সানকি, ভাঙা পাতিল অথবা পেতলের বদনা খুঁজতে খুঁজতে সেই কান্না শুনছে। রাত তখন অনেক। মাঠের ভিতর দিয়ে কারা যেন নদীর পাড়ের দিকে ছুটছে আর গাছের নিচে ইতস্তত যেসব লম্ফ জ্বলছিল—বাতাসে সব এক-দুই করে নিভে যাচ্ছে। মাঠে একটামাত্র হারিকেন জ্বলছে। হারিকেনটা হাজিসাহেবের। মহামারী লাগলে যেমন এক অশরীরী বাতাসে ভেসে বেড়ায় তেমনি এই ভস্মরাশির অন্ধকারে জোটন ভেসে বেড়াতে লাগল। জোটন অন্ধকারে পা টিপে-টিপে হাঁটছে। হাজিসাহেব মাঠে এখন কেবল সোভান আল্লা, সোভান আল্লা বলে চেঁচামেচি করছেন। তিনি ঘুমোতে পারছেন না। মাঠের ভিতর তিনি তাঁর ছোট বিবিকে নিয়ে আছেন। কে কখন কি করে যাবে—ভয়ে ঘুম আসছিল না। যাদের ভাঙা ঘর শুধু গেছে, ছেঁড়া হোগলা বিছিয়ে ঘুম যাচ্ছে তারা। সকাল হলেই হিন্দু পাড়াতে রুজি রোজগারের জন্য উঠে যেতে হবে এবং হিন্দু পাড়াতেই সব বাঁশ কাঠ। সব শণের জমি ওদের। ওদের থেকে চেয়ে আনলে ঘর এবং ঘর বানাতে বানাতে ঘোর বর্ষা এসে যাবে। জোটন এ-সময় নিজের ঘরের কথা ভাবল, ফেলু সময়-অসময় গুতা দিতে চায়, মনজুরের মতো চোখ-মুখ গরম ছিল না, চান্দের লাখান গড়বন্দি আছিল না—দিমু তরে একদিন একটা গুতা—এইসব ভেবে জোটন নিজের অভাব জোড়াতালি দিয়ে আধপোড়া ঘরের ভিতরে আর একটা বদনা পেয়েই একদৌড়। সে জালালির পাশে এসে বসল, দ্যাখ কি আনছি।

    জালালি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বদনাটি দেখল। কুপির আলোতে এত বড় একটা আস্ত পেতলের বদনা—সে কিছুতেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। আবেদালি ঘাড় কাৎ করে তাকিয়ে আছে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছা তার।

    —এক বদনা পানি আন ঢক-ঢক কইরা খাই। বদনা দেখেই আবেদালির কেমন জলতেষ্টা পেয়ে গেল।

    জালালি বলল, আমি যাই। যদি কিছু মিল্যা যায়।

    জোটন জল আনতে গেছে। আশেপাশে কেউ নেই। আবেদালি তাড়াতাড়ি বসে পড়ল। তারপর এক থাপ্পড় নিয়ে গেল গালের কাছে। বলল, তর এত সাহস! তুই যাবি চুরি করতে। পরে সে গামছা দিয়ে মুখ মুছল। ঘামে গরমে মুখ চুলকাচ্ছে। সে আমগাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসতেই দেখল জোটন জলের জন্য উঠে যাচ্ছে। জলের বড় অভাব। সে অন্ধকারে এখন জল চুরি করতে যাচ্ছে।

    জালালি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর কচ্ছপের মতো গলা লম্বা করে দিল। তারপর চিৎকার করে বলল,তর লাইগাই ত নিব্বৈংশা আগুন লাগল রে।

    চিৎকারে ভয় পেয়ে গেল আবেদালি।—আমার লাইগ্যা বুঝি!

    এবার জালালি খলখল্ করে উঠল, আমি সকলরে না কইছি ত কইলাম কি!

    —কি কইবি?

    —কমু তাইন আমারে ঘরে জোর কইরা ধইরা নিছে।

    —ঘরে নিছি, ভাল করছি। তুই নাড়া দিয়া রানতে-রানতে প্যাট ভাসাইলি ক্যান?

    —তার লাইগ্যা বঝি সময়-অসময় নাই?

    গোটা ঘটনাটাই আগুনের মতো। আবেদালি এবার আরও ঘন হয়ে বসল।—আমার বুঝি ইচ্ছা হয় না ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করি।

    .

    ফকিরসাব নিমগাছটার নিচে বসলেন। গাছটাতে একটা কাকও উড়ছে না। সুতরাং ফকিরসাব এ-গাঁয়ের ঘরগুলো দেখলেন। বৈশাখ মাস শেষ হচ্ছে। এখন গাছে-গাছে আমের ভাল ফলন। তিনি তাঁর মালা-তাবিজের ভিতর থেকে একটা বড় পুঁটুলি বের করলেন। আর গোস্তের ওজন দেখবার সময় মনে হল এবার গ্রামের কোরবানির সংখ্যা কমে গেছে। তিনি হাত গুণে বলতে পারছেন যেন সংখ্যায় কত তারা, বকরি ঈদে এত কম কোরবানি এই প্রথম আর এই জন্যই কাকগুলি গোস্ত খুঁজে খুঁজে হন্যে হচ্ছিল। কাকগুলি উড়ে উড়ে হয়রান হয়ে গেছে। অথচ কিছুই মিলছে না। ওরা উড়ে উড়ে এদিক-ওদিক চলে গেল। সুতরাং তিনি কিঞ্চিৎ নিশ্চিন্ত বোধ করছেন। কোথাও পুঁটুলির ভিতর পান-সুপারি আছে অথবা চুনের কৌটা থেকে চুন নিয়ে ঠোঁটে লাগাবার সময়ই সুখী পায়রার মতো অনেকদিন আগের কসমের কথা মনে পড়ে গেল।

    সামনে সড়ক। দূরে কোথাও আজ হিন্দুদের মেলা আছে। ফকিরসাব মনে করতে পারলেন, হয়তো এদিনেই নয়াপাড়া পার হলে ঘোড়দৌড়ের মাঠে মরশুমের শেষ ঘোড়দৌড় হবে। একবার ঘোড়দৌড়ের মাঠে গেলে হয়। কিন্তু অনেক দিন পর এদিকে আসায় কসমের কথা মনে পড়ে গেল। সড়কের পথে গলায় ঘণ্টা বাজিয়ে ঘোড়া যাচ্ছে। বিশ্বাসপাড়ার কালু বিশ্বাসের ঘোড়া—য্যান নয়নের মণি। ঘোড়াটার রঙ কালো কুচকুচে। কপাল সাদা আর সোনালী কড়ির মালা ঝুলছে ঘোড়ার গলাতে। ঘোড়াটা সড়ক ধরে দূরে চলে গেল। গ্রীষ্মের শেষ জল-ঝড়ে এ অঞ্চলের কিছু বাড়ি-ঘর ফেলে দিয়েছে। মাঠে ছোট ছোট পাটের চারা বাতাসে দুলছে। ইতস্তত মাঠের ভিতর মাথলা মাথায় চাষীরা পাটের জমিতে নিড়ান দিচ্ছিল আর আল্লা ম্যাঘ দ্যা, পানি দ্যা—এই গান গাইছিল। চৈত্রের খরা রোদ এবং শুকনো ভাবটা কেটে গেছে। এখন শুধু সবুজ প্রান্তর এবং মানুষের মুখে সুখের ইচ্ছা অথবা যেন বছর শেষ, দুঃখ শেষ—এখন অভাব কম, গরিব মানুষেরা অন্তত শাক-পাতা খেয়ে বাঁচবে। বিশেষ করে এইসব গ্রীষ্মের দিনে কচি পাট-পাতার শাক অথবা শুক্তোনি এক সানকি ভাতের সঙ্গে মন্দ নয় এবং যখন কোরবানির গোস্ত মুশকিলাসানের পাত্রটার নিচে যত্ন করে রাখা আছে, যখন মনে হচ্ছিল শেষ বয়সের সম্বল জোটন বিবিকে ধরে নিলে গোস্তের মতোই সস্তা হবে, তখন সড়ক ধরে সামনে গ্রামটার দিকে হাঁটা যাক।

    মুশকিলাসানের আধারে তেল নেই। দরগার ছইয়ের নিচে রসুন গোটা ভিজানো আছে। তার তেল বড় উজ্জ্বল আলো দেয়। তেল নেই বলে আর এ-অঞ্চলে তিনি রাতে মুশকিলাসানের লম্ফ নিয়ে ঘুরতে পারবেন না। দরগায় গিয়ে লম্ফে আবার তেল ভরতে হবে। ফকির সাহেবের ইচ্ছা ছিল রসুন গোটার তেলে মুশকিলাসানের লম্ফ জ্বালাবেন এবং ছোটদের চোখে সুর্মা টেনে আস্তানা সাহেবের দরগাতে রসুলের কাছে দোয়া, জোটনের জন্য দোয়া ভিখ মেগে নিবেন। কিছুই হল না।

    মসজিদের কুয়া থেকে প্রথম জল তুলে পা ধুলেন ফকিরসাব। তারপর শতচ্ছিন্ন এক জোড়া কাপড়ের জুতো, যার ফাঁকে কচ্ছপের গলার মতো বুড়ো আঙুলটা বের হয়ে আসে এবং জুতোর ভিতর পা গলাবার সময় একটা ইষ্টিকুটুম পাখি ডেকে উঠলে ফকিরসাব ভাবলেন, দিনটা ভালোই যাবে। শেষে আবেদালির বাড়িতে ওঠার মুখেই ডাকতে থাকলেন, মুশকিলাসান সব আসান করেন এবং এইসব বলতে বলতে উঠেই তিনি বুঝতে পারলেন পরবের দিনে জোটন বাড়ি নাই। তিনি যেন এই উঠোন এবং ঝোপ জঙ্গলকে বললেন, ওনারে ডাইকা দিলে ভাল হয়। অনেক দূর থাইক্যা আইছি, আবার কবে আমু ঠিক নাই। তাই ভাবছি অরে নিয়া যামু। তারপর কারও উপর ভরসা না করে নিজেই ছেঁড়া লুঙ্গি ঘাসের উপর বিছিয়ে বসে পড়লেন। খুব সন্তর্পণে মালা-তাবিজ খুলে পোঁটলা-পুঁটলি পাশে রাখলেন অন্য কোনও দিকে তাকাচ্ছেন না। যেন সব ঠিকই করা আছে, উকিল বলা আছে, মৌলবী সাবকে বলা আছে আর দু-চারটে দোয়া। ফকিরসাব এবার গলা খেকারি দিয়ে চোখ তুলতেই দেখলেন, জালালি ঝোপ-জঙ্গল ভেঙে জোটনকে খবর দিতে হাজিসাহেবের বাড়ির দিকে ছুটছে।

    ফকিরসাব ছেঁড়া তফনের উপর বসে জামরুল গাছের ফাঁকে সেই অস্পষ্ট মুখ দেখতে পেলেন। জোটন আসছে। আগের শক্তিসামর্থ্য যেন গায়ে নেই। জোটন নিজের ঘরে ঢুকে গেল। ফকিরসাব জোটনকে আর দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি নানারকম শব্দে ধরতে পারছেন জোটন এখন আর্শিতে নিজের মুখ দেখছে। ভিজা শনের মতো চুল—কত কষ্টে খোঁপা বাঁধা! আর তিনি মুখ না তুলেও যেন ধরতে পারছিলেন, জোটন বেড়ার ফাঁকে ফকিরসাবের মুখ হাত-পা অথবা সব অবয়ব দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে যাচ্ছে।

    ফকিরসাব গাছ-গাছালিকে যেন ডেকে বললেন, তাড়াতাড়ি করতে হয়।

    ঘরের ভিতর জোটন সরমে মরে যাচ্ছিল। ঘরের ভিতর ফিসফিস্ শব্দ, আবেদালিরে আইতে দ্যান।

    ফকিরসাব উঠোন থেকে বললেন, উকিল দ্যাখতে হয়।

    জোটন এবার যেন গলায় শক্তি পাচ্ছে। ভাইবেন না। আবেদালি আইসা সব ঠিক কইরা দিব।

    ফকিরসাব সঞ্চিত কোরবানির গোস্তের উপর হাত রেখে বললেন, ব্যালায় ব্যালায় রওনা হইতে হয়। না হইলে গোস্ত পইচা যাইব। বলে ফকিরসাব গোস্তের পুঁটলিটা নাকের কাছে এনে শুঁকে বললেন, গোস্তে মশলা নুন দিতে আপনের হাত কেমন?

    এবার জোটন ঘরের ভিতর খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, ঘরে নেওয়ার আগে একবার পরখ কইরা দ্যাখতে সাধ যায় বুঝি!

    —দ্যাখতে ইচ্ছা যায়, কিন্তু ব্যালা যে পইড়া আইতাছে।

    জোটন দাঁত খুঁটছিল। মুখ কুলকুচা করে হাঁড়ির ভিতর থেকে পান সুপারি বের করে মুখে পুরল। তারপর ঝোপের ফাঁকে যখন দেখল জালালি আসছে, যখন দেখল গোপাটের অশ্বত্থ গাছের মাথা থেকে রোদ নেমে যাচ্ছে এবং যখন কামলা ফিরছে মাঠ থেকে, মাথায় পাট গাছের আঁটি, ঘাসের বোঝা, আর আবেদালি পরবের দিনও ঠাকুরবাড়ির কাজে গেছে—ফেরার সময় এখন, হয়তো সে ফিরছে, তখন জোটন ঠোট রাঙা করে বাবুর হাটের ডুরে শাড়ি পরে দেখল বুকের মাংস একেবারে শুকিয়ে গেছে। সে একটু ঠোট থেকে থুতু এনে, বুকে মেখে দিল। পাতলা থুতু দিয়ে শরীরের শুকনো ভাবটা কমনীয় করতে চাইছে অথবা মনে হল, ফকিরসাহেবের বুড়ো হাড় অঘ্রানী ধানের মতো—আশ্রয় দেবে, নিকা করবে এবং ফাঁকা মাঠের মতো উদোম গায়ে রঙ্গরস করবে। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা-আল্লার মাশুল তুলতে এই বয়সেও গতর কম কৌশল করবে না।

    বেলায় বেলায় আবেদালি এল। বেলায় বেলায় করণীয় কাজটুকু আবেদালি করে ফেলল। দু-চারজন গাঁয়ের লোক জমা হয়েছে উঠানে। আবেদালি সকলকে পান-তামুক খাওয়াল। হাজিসাহেবের ছোট বিবি একটা ছেঁড়া বোরখা দিল জোটনকে। আগুনের ভস্ম থেকে যে পেতলের বদনাটা তুলে এনেছিল, ফকিরসাহেবের পাশে সেটা রেখে দিল জোটন।

    দুটো মেটে কলসি এনেছিল জোটন লাঙ্গলবন্দের বান্নি থেকে—যাবার সময় জোটন জালালিকে ডেকে কলসি এবং ঘরের সামান্য জিনিসপত্র অর্থাৎ গ্রীষ্মের দিনে সংগ্রহ করা ঝরা পাতা, পাটকাটি এবং দুটো সরা,—সব দিয়ে দিল। আর ছেঁড়া তফনে জোটন তার ভাঙা আর্শি, ঠাকুরবাড়ির বৌদের পরিত্যক্ত ভাঙা কাঠের চিরুনী, একটা সানকি আর সম্বলের মধ্যে কিছু ভাতের শেউই বাঁধা পুঁটলি হাতে তুলে নেবার সময়ই অন্যান্যবারের মতো আবেদালির হাত ধরে কেঁদে ফেলল। এবার নিয়ে চারবার নিকা, এবং এবার নিয়ে চারবার জোটন এই উঠান ছেড়ে বাপের ভিটা ছেড়ে মিঞা মানুষের সঙ্গে খোদার মাশুল তুলতে চলে যাচ্ছে। ফকিরসাব পোঁটলাপুঁটলি যত্ন নিয়ে বাঁধছে। পিতলের বদনাটা হাতে নিয়ে দু’বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বদনা থেকে পানি চুষে খেলেন। তারপর বাকি পানিটুকু ফেলে দিয়ে—বাঁ-হাতে পেতলের বদনা, কাঁধে ঝোলাঝুলি এবং ডানহাতে মুশকিলাসান, মুখে আল্লার নাম অথবা রসুলের নাম নিতে নিতে গোপাটে নেমে যাচ্ছেন। জোটন একহাতে একটা পুঁটলি নিয়ে আবেদালির ঘরে ঢুকে বোরখাটা মাথার ওপর তুলে দিল। আবেদালিকে বলল, জালালির দিকে তাকিয়ে বলল, জালালিরে মাইর-অ ধইর-অ না ভাই। জালালিকে বলল, সময় মত দুইটা রাইন্দা দ্যাইস।

    এসব কথা বলার সময়ই জোটনের চোখ থেকে জল পড়ছিল। কত দীর্ঘদিন পরে ফের এই নিকা এবং এদিনে সে তার মোট তেরটি সন্তানের কথা মনে করতে পারল। যেন তাদের জন্যই চোখে জল। কোথাও তার দীর্ঘদিন ঠাঁই হয় না। জোটন চতুর্থবার স্বামীর ঘর করতে যাচ্ছে এবং আল্লার মাশুলের জন্য এই যাত্রা। যদি কোনও কারণে আল্লার দরবার শেষ হয়ে গিয়ে থাকে তবে সে ফের ফিরে আসবে এবং সোনালী বালির নদীতে অথবা বিলে শালুক তুলে, বাড়ি বাড়ি চিঁড়া কুটে, পরবে পরবে গেরস্থ মানুষের কাজ করে দুঃখে সুখে তার দিন কেটে যাবে।

  • আট

    আট

    বাইরে ইতস্তত মুরগি চরে বেড়াচ্ছিল। ভুখা পেটে জালালি ঘরের দাওয়ায় বসে। সামসুদ্দিন এবং তার মজলিস, অথবা ভিতর বাড়িতে অলিজানের রান্না গোস্ত (মেহমানদের ভোগের জন্য) সবই বিসদৃশ। জালালি কচুর ঝোপ অতিক্রম করে মাঠে দৃষ্টি দিল। ধানখেতে কিছু হাঁস শব্দ করছে— প্যাঁক প্যাঁক। ওর পেট মোচড় দিয়ে উঠল। মকবুলের আতাবেড়াতে বাছ-পাট শুকোচ্ছে। তিন চারদিন ধরে বৃষ্টি হয়নি বলে মাটি শুকনো, ঘাস শুকনো। খামারবাড়িতে জামরুল গাছ। গাছে জামরুল ফল ঝুলছে। এবং রোদের জন্য ওদের পাখির মতো মনে হচ্ছিল। আর গ্রামময় রসুন পেঁয়াজের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। আর হাঁসগুলি তখনও গোপাটের ধানখেতে প্যাঁক প্যাঁক করে ডাকছে। সুতরাং জালালি বসে থাকতে পারছে না। মালতীর হাঁসগুলি আবার এই মাঠে। মিঞা মাতব্বরেরা মজলিস শেষ করে গোসলে যাচ্ছে। জালালি অলিজানের পাছদুয়ারে বসেছিল—চোখমুখ শুকনো এবং কাতর কণ্ঠ। অলিজান যেন তার এই প্রাচুর্যকে জালালির চোখের উপর ভাসিয়ে দিল। মেমানগণ বর্ষার জলে পানিতে গোসল করতে গেল। ওরা ডুব দিল অথবা জলে সাঁতার কাটল, তারপর নামাজ শেষ করে শীতলপাটিতে খেতে বসে গেল গোল হয়ে। বেশ খাওয়া–মাছের ছালোন, মুরগীর গোস্ত, রসুন সম্বারে মুগের ডাল। ওরা খেয়ে সানকিতে কুলকুচা করল। ওরা একই বদনার নলে মুখ রেখে পানি খেল। ওরা কোনও উচ্ছিষ্ট খাবার রাখল না। জালালির বসে থেকে হাঁটু ধরে গেছিল। জালালি থুতু গিলে শেষ পর্যন্ত নিজের কুঁড়েঘরটাতে আশ্রয় নিয়ে সকলের প্রতি এবং আল্লার প্রতি ক্ষুব্ধ কথাবার্তা নিক্ষেপ করে শান্তি পাচ্ছিল। মালতীর হাঁসগুলি প্যাঁক প্যাঁক করছে গোপাটের ধানখেতে; সুতরাং সে গামছা পরে গোপাটের জলে শালুক তুলতে নেমে গেল।

    মেমান সকল চলে গেল। সামসুদ্দিন ঘাটে সকলকে বিদায় জানাল। ওদের নৌকা গোপাট ধরে চলতে থাকল। কিছু পাটখেত অতিক্রম করলে নৌকাগুলি আর দেখা গেল না—মাঝে মাঝে লগির ডগাটাকে উঠতে নামতে দেখা গেল। ওরা পুবের বাড়ির পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। পুবের বাড়ির মালতী অথবা নরেন দাসের বিধবা বোন মালতীর কথা মনে হল সামসুদ্দিনের। হিজল গাছের ইস্তাহারটাকে কেন্দ্র করে যে বচসা এবং অপমানে উভয়ে ক্ষত-বিক্ষত ছিল—এ সময়ে সবই কেমন অর্থহীন লাগল। বার বার সেই এক ইস্তাহার ঝুলত। অর্থাৎ এই দেশ সামুর, এই দেশ সামুর জাতভাইদের। গাব গাছটার নিচে মালতীর সঙ্গে কতদিন দেখা—কিন্তু মালতী কথা বলত না। কৈশোরে বয়সের কিছু স্মৃতি মনে করে কেমন কষ্ট বোধে পীড়িত হল সামু।

    ফতিমা পাশ থেকে ডাকল, বা’জান।

    সামু কেমন আঁৎকে উঠল, কিছু কইলি?

    —বা’জান, মায় আপনেরে ডাকতাছে।

    সামু ফতিমার মুখ দেখে, জলের নীল রঙ দেখে, এই ঘাস এবং মাটি দেখে, ক্রমশ সে কেমন ইসলাম প্রীতির জন্য এক গভীর অরণ্যের ভিতর ডুবে যেতে থাকল। সেই অরণ্যে সে দেখল কোনও এক ফকিরসাব ধর্মের নিশান হাতে নিয়ে মুসকিলাসানের আলোতে পথ ধরে শুধু সামনের দিকে হাঁটছেন। আলোর বৃত্তে বৃদ্ধের মুখ—অস্পষ্ট এক ইচ্ছার তাড়নাতে তিনি ক্লান্ত। সামু বার বার ডেকেও সেই শীর্ণ ক্লান্ত ফকিরকে ফেরাতে পারছে না। তিনি হেঁটে যাচ্ছেন এবং তিনি সামুকে শুধু অনুসরণ করতে বলছেন।

    ফতিমা ঘুরে এসে সামনে দাঁড়াল। বলল, মায় আপনেরে ডাকতাছে।

    সে ভিতর বাড়িতে ঢুকে গেল। তার বিবির খালি গা, নাকে নথ। বিবির চোখ ছোট, সুর্মাটানা হাতে নীল কাচের চুড়ি। পরনে ডুরে শাড়ি। গায়ে সেমিজ নেই, কাপড়ের নিচে সায়া নেই। সাদাসিধে এক প্যাচে কাপড় পরনে,সুতরাং শরীরে সকল অবয়বই প্রায় স্পষ্ট। অলিজানের শরীরটা এখন গাভীন গরুর মতো। শুধু যেন শুয়ে থাকতে পারলে বাঁচে। অথচ চোখ সুর্মাটানা বলে ইচ্ছার চেয়ে চোখে আবেগ বেশি। সে বলল, বেলা বাড়ে না কমে? আপনে খাইবেন না?

    সামু তক্তপোশে খেতে বসল। ওর বিবি কাছে বসে খাওয়াল। সামুকে খুব চিন্তিত দেখে বিবি বলল, কি ভাবতাছেন?

    সামু উত্তর দিল না। নিঃশব্দে খেয়ে যেতে থাকল।

    —কি, কথা কন না ক্যান?

    সামু বিরক্ত হল। বলল, তর সব কথায় কাম কি! দুইডা ভাত দিবি তা দ্যা। কতা বাড়াইস না।

    অলিজান বলল, কি কথা বাড়াইলাম?

    সামু মুখ তুলে অলিজানের মুখ দেখল, চোখ দেখল। অলিজানের চোখে কি যেন একটা আছে—যা দেখলে সে সব রাগ দ্বেষ হিংসা ভুলে যায়। সে বলল, আমি ভোটে লীগের তরফে খারমু ঠিক করছি। ছোট ঠাকুরের বিরুদ্ধে খারমু।

    —আপনের মাথায় যে কি ঢুইকা পড়ে না! বুঝি না! ক্যান, কী দায় পড়ছে ওই কাইজ্যা ডাইকা আননের। ছোট ঠাকুর আপনের কী ক্ষতি করছে? তিনি ত খুব ভালো মানুষ।

    সামসুদ্দিন বলল, আমি কইছি তাইন খারাপ মানুষ! বলে সে উঠে পড়ল। হাত মুখ ধুলো এবং যখন দেখল বেলা পড়তে দেরি নাই—ধনু শেখ পাটের আঁটি ঘরে তুলছে তখন নাও নিয়ে এবং ধনু শেখকে নিয়ে জলের ওপর ভেসে গেল। সে সব ঝোপজঙ্গল ভেঙে পুকুরের জল কেটে মাঠে গিয়ে পড়ল। এখন মসজিদের চালে মোরগ হেঁটে বেড়াচ্ছে। গরুছাগল সব উঠোনের উপর। বাড়ির সকল পুরুষরাই খাটতে গেছে। শুধু মনজুর নিজের জমি চাষ করে। হাজি সাহেবের কিছু জমি আছে। নয়া পাড়ার ইসমতালী বড় গেরস্থ। অলিজানকে সাদি করে সামু ভাবল, ইসমতালী-সাব এবার তার কথা বলবে। কিন্তু বড় হিন্দু ঘেঁষা লোক। সঙ্গে সঙ্গে সামুর মুখটা কঠিন দেখাল। আর এ-পাশের শালুকের জমি অতিক্রম করে জঙ্গলের ভিতর হাঁসের শব্দ পেতেই সে চোখ তুলে তাকাল। মনে হল ঝোপের ভিতর কোনও মানুষের চিহ্ন যেন। সে বলল, ঝোপের ভিতর ক্যাডা?

    ঝোপের ভিতর থেকে কোনও মুখ উঁকি দিল না। আশেপাশে বেতঝোপ এবং শ্যাওড়া গাছ। কিছু সোনালী লতা শ্যাওড়া গাছটাকে ঢেকে রেখেছে। একদল হাঁস ভয়ে প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে পুবের বাড়ির দিকে ছুটছে। আর তখন সে দেখল পানির তলা থেকে কাদামাটি সব উপরে উঠে আসছে। যেন কোনও গো-সাপ একটা বড় সাপকে ধরে পানির নিচে সামলাতে পারছে না, যেন পানির নিচে ঝোপের পাশে একটা প্রাগৈতিহাসিক জীব হেঁটে বেড়াচ্ছে।

    সামু পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল। ধনু শেখ নৌকা থামিয়ে দিল। এবং নৌকাটাকে ঝোপের পাশে নিয়ে যেতেই দেখল জলের ওপর শাপলা-শালুকের পাতার ফাঁকে জালালি মুখ জাগিয়ে নিশ্বাস ফেলছে।

    সামু বলল, আপনে এহানে কি করতাছেন?

    জালালি গলাটা কিঞ্চিৎ তুলে বলল, শালুক তুলতাছি রে বাজী।

    —এহানে কি শালুক হইছে?

    —হইছে। ইট্টু ইট্টু হইছে। বলে সে ডান হাতে একটা শালুক তুলে দেখাল সামুকে। বলল, বড় হয় নাই, কষা। তারপর জালালি বিকালের রোদে মুখ রেখে বলল, তর চাচায় ফাওসার গয়না নৌকায় মাঝি হইয়া গ্যাল কবে! না খত, না পয়সা! খাই কি, ক! এয়ের লাইগ্যা, শালুক তুইল্যা চিবাইতাছি।

    জালালি গলা পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে রেখেছে এবং জালালির চোখ দুটোতে আতঙ্ক। জালালির শুকনো মুখ দেখে সামুর কষ্ট হতে থাকল। শাপলা-শালুকের জমি পার হলে ধানখেত। মালতীর হাঁসগুলি ধানখেতের ভিতর ভয়ে ভয়ে ডাকছে। সে আকাশে কোনও বাজপাখি উড়তে দেখল না—কোনও ঝোপজঙ্গলে শেয়ালের চোখ দেখল না—শুধু জালালির মুখটা লোভের জন্য পাপের জন্য ধীরে ধীরে বীভৎস হয়ে উঠছে, যেন মুখটা এখন যথার্থই শেয়ালের মতো।

    জালালি তার জায়গা থেকে এতটুকু নড়ল না। দু’হাতে হাঁসটার গলা জলের নিচে টিপে ধরেছে। এতক্ষণ ধরে সংগ্রামের পর সে ক্লান্ত! সামুর চাকরটা এখন লগি বাইছে। হাঁড়িটা বাতাসে ভেসে দূরে সরে যাচ্ছে। সামু গোপাটের অশ্বত্থ গাছটার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেলে গাল দিল জালালি, নিব্বৈংশা। এহানে কি করতাছেন? তর মাথা চিবাইতেছি। বলে সে একটা গিরগিটির মতো জলে সাঁতার কাটতে থাকল। হাঁসটা ওর ডান হাতে। এবং হাঁসটাকে সে জলের নিচে সব সময় লুকিয়ে রাখার জন্য এক হাতে সাঁতার কেটে হাঁড়িটাকে যখন আয়ত্তে আনল তখন সামু অনেক দূরে—তখন বিকেলের রোদ সরে যাচ্ছিল এবং তখন আকাশে নানা রঙের মেঘ জমে ঈশান কোণটাকে কালো, গম্ভীর করে তুলছে।

    এবার সে বাড়ির দিকে উঠে যাবার জন্য হাঁসটাকে আড়ালে হাঁড়িতে ঢুকিয়ে দিল। পুরুষ্টু হাঁসের পেটটা এখনও নরম এবং উষ্ণ। সে পেটে হাত রেখে উত্তাপ নেবার সময় দেখল, অনেকগুলি ধানখেত পার হলে পুবের বাড়ির গাবগাছ, গাছের নিচে মালতী। মালতী ওর হাঁসগুলিকে খুঁজছে। জলের ওপর শরীরটাকে তুলে সে উঁকি দিল। এবং দূরে মানুষের শব্দ পেল জালালি। সে পরনের গামছাটা খুলে ভয়ে হাঁড়ির মুখটা ঢেকে দিল। দূর থেকে মালতীর গলাও ভেসে আসছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নামছে চারদিকে। পাটখেতের ভিতর দিয়ে অন্য প্রান্তে কিছু দেখা যাচ্ছে না। জায়গাটা নির্জন। অশ্বত্থগাছ পার হলে মনজুরদের ঘর। ধনার মা বুড়ি ছাতিম গাছের নিচে বসে এখন প্রলাপ বকছে। সে ঘরের দিকে উঠে যাবার সময় যখন দেখল কোথাও কোনও মানুষের চোখ উঁকি দিয়ে নেই, যখন অন্ধকার ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে তখন উষ্ণ পেটটাতে আর একবার হাত রাখল। সে গামছা তুলে ফের মৃত হাঁসটাকে উঁকি দিয়ে দেখল এবং চাপ চাপ অন্ধকারের ভিতর মৃত হাঁসটার পেটে হাত রেখে ফের বড় রকমের একটা ঢোক গিলে মাংস খাবার লোভে মরিয়া হয়ে উঠল।

    জলের ওপর দিয়ে মালতীর কণ্ঠ ভেসে আসছে—আয়, তৈ তৈ।

    দূরে ধানখেতের ভিতর হাঁসগুলি তেমনি প্যাঁক প্যাঁক করছে। ঘন ধান-গাছের ভিতর হাঁসগুলি লুকিয়ে আছে। মালতী জলে নেমে গেল। হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে ডাকল, আয়, তৈ তৈ। আয়….. আয়। চারদিকে অন্ধকার। হাটুরেরা ঘরে ফিরছে। খালের ধারে লগির শব্দ। নৌকার শব্দ। সে অন্ধকারে কোনও পরিচিত হাটুরের মুখ দেখতে পেল না। অমূল্য সূতা আনতে গেছে হাটে। শোভা, আবু ঘরে ঘরে আলো জ্বালছে এবং জল দিচ্ছে দরজাতে। নরেন দাসের বৌ বৃষ্টি আসবে ভেবে সব শুকনো পাটকাটি ঘরে নিয়ে রাখছে। আর ঝড়বৃষ্টি এলে হাঁসগুলি পথ ভুল করে দূরে চলে যেতে পারে অথবা কত রকমের দুর্ঘটনা…মালতী প্রাণপণে ডাকতে থাকল, আয়, তৈ তৈ।

    শোভা, আবু গাবগাছের নিচে পিসির গলা শুনতে পেল। সেই কখন থেকে পিসি হাঁসগুলিকে ডাকছে। ওরা কাফিলা গাছ অতিক্রম করে পিসির জন্য জলে নেমে গেল এবং পিসির সঙ্গে গলা মিলিয়ে ডাকতে থাকল। আর দূরে সামুর নৌকা ভেসে যাচ্ছে। বৃষ্টি আসবে জেনেও সামু ঘরে ফিরছে না। জালালি বৃষ্টির রঙ আকাশে দেখতে পেল। জলের পাশে কাঁটা গাছের সব ঝোপ। ঝোপ পার হলে, মান্দার গাছের নিচে ওর পাটকাঠির বেড়া দেওয়া ঘর। ভিজে মাটির গন্ধ আসছে। জোটন ফকিরসাবের সঙ্গে দরগায় চলে গেছে। বাড়িটা একেবারে ফাঁকা। হাজিসাহেবের খামারবাড়ি পার হলে তবে অন্য ঘর। অন্ধকার এবং নির্জনতা সত্ত্বেও মৃত হাঁসটাকে সে গামছা দিয়ে সন্তর্পণে ঢেকে রেখেছে। বৃষ্টি নামবে। বর্ষাকাল বলে ঘরের আশেপাশে এবং সর্বত্র আগাছার জঙ্গল। এক সবুজ সবুজ গন্ধ। সুতরাং জালালি সব দেখে-শুনে নগ্ন শরীরটাকে ঘরের দিকে গোপনে তুলে নিয়ে গেল। গামছা দিয়ে যেহেতু সে হাঁড়ির মুখ ঢেকে রেখেছিল, সেহেতু নগ্ন! অন্ধকার বলে, বৃষ্টি আসবে বলে গাবগাছের নিচে মালতীর গলা শোনা যাচ্ছে না—আশেপাশে শুধু কীট-পতঙ্গের আওয়াজ।

    মালতী দেখল ওর হাঁসি তিনটে ফিরে আসছে। হাঁসাটা নেই। মালতীর বুকটা কেঁপে উঠল। কত কষ্টের এই হাঁসা। প্রতিপালন করা কত বেদনা-সাপেক্ষ। ওর প্রিয় হাঁসাটাকে না দেখে মালতী চিৎকার করে উঠল, বৌদি গো, আমার হাঁসাটা কই। হাঁসি তিনটা আইতাছে, আমার হাঁসাটা ক‍ই গ্যাল!

    নরেন দাসের বৌ পাঁজা করে সব শুকনো পাটকাঠি তুলছিল। পাটকাঠিগুলিতে মড়মড় শব্দ হচ্ছে—সুতরাং সে মালতীর চিৎকার শুনতে পাচ্ছে অথচ স্পষ্ট বুঝতে পারছে না মালতী কী বলছে। সে পাটকাঠি ফেলে গাবগাছতলায় ছুটে গেল এবং জলের পাশে দাঁড়িয়ে বলল, কী হইছে তর?

    —দ্যাখেন, কি হইছে! হাঁসি তিনটি আছে, হাঁসাটা নাই। কেমন কান্না-কান্না গলায় মালতী বলল।

    —দ্যাখ, কোনখানে পলাইয়া রইছে।

    —আপনের যে কথা বৌদি! অর পরাণে বুঝি ডর নাই?

    —ডর আছে ল, ডর আছে। অমূল্য আসুক। নৌকা লইয়া খুঁজতে বাইর হইবনে। তুই জল থাইক্যা উইঠা আয়।

    সুতরাং মালতী জল থেকে উঠে এল। ওর মনটা বিষণ্ণতায় ভরে আছে। কান্না কান্না এক আবেগ বুকের ভিতর জমা হচ্ছে ক্রমশ। ওর এই হাঁসা বড় প্রিয়, বড় কষ্টে সে লালন করেছে এবং বিধবা যুবতীর একমাত্র অবলম্বন। ঝড় জলে সেই ছোট ছোট চারটা পাখি যে দিন নরেন দাস ডুলাতে করে ঘরে নিয়ে এসেছিল, সেইদিন থেকে কত যত্নের সঙ্গে এদের সে ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছিল। ছোট ছিল বলে ওরা কচি ঘাস খেতে পারত না, ওরা ভাত খেতে পারত না সুতরাং সে ছোট ডারকিনা মাছ ধরত পুকুর থেকে, ছোট ছোট জিড় তুলে যত্নের সঙ্গে খাইয়ে পুকুর-ঘাটে ছেড়ে ওদের বড় হতে সাহায্য করত। মালতী জল থেকে উঠে আসার সময় প্রাণপণ ডাকল, আয়, আয়, তৈ তৈ।

    অন্ধকার বলে, বৃষ্টি আসবে বলে ওরা আর গাবগাছের নিচে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারল না।

    .

    জালালি ঘরের ভিতর কুপি জ্বালল। ঘরে তার ছেঁড়া হোগলা এবং শিকাতে ঝোলানো নাঙলবন্দের বান্নি থেকে আনা হাঁড়ি পাতিল। একটা ভাঙা উনুন। কুপিটা জ্বলতে থাকল। সে ভিজা গামছাটা বিছিয়ে তার উপর মৃত হাঁসটাকে রেখেছে। ওর দরজার ঝাঁপ বন্ধ ছিল। কুপির আলোতে ওর তলপেট চকচক করছে। মুখে পেটুকের গন্ধ। সে হাঁসটার তলপেটে চাপ দিতেই বুঝল উষ্ণতা মরে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে হাঁসটার শরীরের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে ওর শরীরের সব পালক দ্রুত তুলতে থাকল। ওর শরীর থেকে এখনও ইতস্তত জল ঝরছে। এই জলের জন্য নিচের মাটি ভিজে উঠছে—কাদা-কাদা ভাব। সে যত্নের সঙ্গে হাঁসটাকে, গামছাটাকে শুকনো মাটিতে টেনে আনল, যত্নের সঙ্গে হাঁটু গেড়ে মাংস ভক্ষণের নিমিত্ত প্রাণপণে মৃত হাঁসটাকে আগুন জ্বেলে সেঁকতে থাকল। বাইরে বৃষ্টি।

    কতদিন থেকে যেন পেটে ভাত নেই, কতদিন থেকে যেন জাম-জামরুল খেয়ে, কখনও শালুক খেয়ে জালালি ক্ষুধা মিটিয়েছে। পেট ভরে খাবার জন্য সারাদিন থেকে খোয়াব দেখছিল। বিকেলের এই হাঁসটা সে-খোয়াবকে সার্থক করছে। সুতরাং সে তার আল্লার কাছে এ মেহেরবানিটুকুর জন্য খুশি। খুশির জন্যই হোক অথবা ক্ষুধার তাড়নাতেই হোক এবং লোভের জন্যও হতে পারে সে কাপড় পরতে ভুলে গেছিল। ওর তলপেটের ফাটা সাদা সাদা দাগগুলোতে এখনও কিছু জলের রেখা চিকচিক করছে, অনেকটা মানচিত্রের নদী-নালার মতো। কি ভেবে জালালি তলপেটে হাত রাখল এবং ভাবল এই তলপেটে ফের চর্বি হবে, ফের আবেদালি গয়না নৌকার কাজ সেরে ঘরে ফিরবে।

    জালালি হাঁসটার পেটের ভিতর থেকে নখ দিয়ে টেনে টেনে ময়লাগুলো বের করবার সময়ই ভাবল আবেদালির বড় দুঃখ। সে বলত, জব্বইরা হওয়নের পর তর প্যাট যে নাইমা গ্যাল আর উঠল না, আর তর পেটে চর্বি ধরল না।

    জালালি মনে মনে বলল এ-সময়, তুমি আমারে হপ্তায় হপ্তায় হাঁসের গোস্ত খাইতে দ্যাও দ্যাখ ক’দিনে প্যাটে চর্বি লাগাইয়া দ্যাই। ওর এ-সময় মালতীর কথাও মনে হল। মালতী বিধবা যুবতী। দিন দিন মালতীর রূপ খুইল্যা পড়তাছে। আল্লা, আমারে অর রূপটা দিলি না ক্যান। বাইরে বৃষ্টি ঘন হয়ে নামছে তখন।

    এবার হাঁসের শরীর থেকে চামড়াটা তুলে ফেলল জালালি। বাঁশের চোঙাতে সরষের তেল নেই। একটু তেল আনতে সে কোথাও যেতে পারছে না বৃষ্টির জন্য! সুতরাং সে অনেকক্ষণ ধরে শরীরটাকে সেঁকছিল আর তার জন্য সেদ্ধ-পোড়া এক ধরনের গন্ধ উঠছিল। সে এই সেদ্ধ-পোড়া মাংস একটু নুন লঙ্কাতে ভেজে দুটো সানকিতে রাখল। এক টুকরো মুখে দিল, তারপর ফুৎ করে হাড়টা মুখ থেকে বের করে চেখে চেখে মাংসটা খাবার সময় দেখল, হাঁসের পালকগুলো কখন সব বাতাসে ঘরময় হয়ে গেছে। গাছার ওপর কুপিটা দপদপ করে জ্বলছে। আলোটার দিকে চেয়ে, ঘরময় পালকগুলো দেখে এবং চুরি করে হাঁস ভক্ষণের নিমিত্ত মনে মনে অসহায় হয়ে পড়ল জালালি। আবেদালি জানতে পারলে মারধোর করবে। সেজন্য জালালি আর মাংসের হাড় না চিবিয়ে খুঁটে খুঁটে সব পালকগুলো তুলে বৃষ্টির ভিতর জলে নেমে গেল। জল ভেঙে অন্ধকারের ভিতর গোপাটের দিকে চলতে থাকল। তারপর অশ্বত্থের নিচে যে ঝোপ-জঙ্গল ছিল, সেখানে সব পালকগুলি ছড়িয়ে দিয়ে বলল, আল্লা আমার ক্ষুধা পাইছে। আমি যাই। এখন বৃষ্টির জলে জালালির সব দুঃখ ধুয়ে যাচ্ছে। সুখের জন্য জালালি ঘরের দিকে ফিরছে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সে বিদ্যুতের আলোয় দেখল, পাটখেত নুয়ে পড়েছে। সেই সব পাটখেত পার হলে জলের ওপর একটি আলোর বিন্দু ঘুরতে দেখল। এবং সন্তর্পণে কান পাতলে শুনতে পেল যেন তখনও মালতী ওর হাঁসাটাকে ডাকছে—আয়, আয়, তৈ তৈ। সে আর এতটুকু দেরি করল না। সে ঘরের ভিতর ঢুকে ঝাঁপ বন্ধ করে দিল। শরীর মুখ মুছল। এবার একটু সময় নিয়ে গামছাটা ভালো করে প্যাঁচ দিয়ে পরল। একটা কাঠের টুকরোর উপর বসে হাঁসের হাড় এবং গোস্ত চুষতে থাকল জালালি। মনে হল, মালতী যেভাবে ডাকছে—এখনই হয়তো হাঁসটা সানকির ওপর ডেকে উঠবে। সে গব গব করে এবার মাংস ছিঁড়ে খেতে থাকল। অথবা গিলতে থাকল। সে কিছুতেই হাঁসটাকে সানকির ওপর আর প্যাঁক প্যাঁক করে ডেকে উঠতে দিল না।

    .

    বৃষ্টি থামলে সামসুদ্দিন ঘরের দিকে ফিরল। ধনু শেখ নৌকা বাইছিল। দূরে ধানখেতের ভিতর অন্য একটি আলো দেখে মালতীর কণ্ঠ শুনে বুঝল, মালতী এখনও হাঁসগুলি পায়নি। মালতী এবং অমূল্য প্রাণপণ ডাকছে—আয়, আয়, তৈ তৈ এবং এই শব্দ গ্রাম মাঠ পার হয়ে বহু দূরে চলে যাচ্ছে—বড় দুঃখের এই ডাক, বড় কষ্টের। মালতীকে অনেকদিন পর সামু এই মাঠে দেখল—কী যেন অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছে। অমূল্য নৌকা বাইছিল; ধানখেতের ভিতর, পাটখেতের ভিতর অথবা অন্য কোনও ঝোপ-জঙ্গলে হাঁসটা ভয়ে লুকিয়ে আছে কি না দেখছে মালতী। এ-সময় মালতী দেখল, অন্য একটা নৌকা, পাটাতনে সামসুদ্দিন। সামসুদ্দিন যেন কিছু বলতে চাইছে। হারিকেনের আলোতে সামসুদ্দিনের মুখ স্পষ্ট। মালতী এক বিজাতীয় ঘৃণাবোধে সামুর সঙ্গে প্রথমে কথা বলতে পারল না। সামু যেন হালে তামাসা দেখছে। মালতীর কান্না পাচ্ছিল হাঁসটার জন্য। সে মাথা নিচু করে বসে থাকল। সামসুদ্দিনকে দেখে কোনও কথা বলল না। সামু আজ অপমানিত বোধ করল না কারণ মালতীর এই বসে থাকাটুকু সহায়-সম্বলহীন নারীর মতো। সুতরাং সে বলল, তর হাঁসগুলি বাড়ি যায় নাই?

    —হাঁসগুলি গ্যাছে। হাঁসাটা যায় নাই।

    মালতী সংক্ষিপ্ত জবাব দিচ্ছিল। মালতী মাথা নিচু করে বসেছিল, চারদিকে ভিজা বাতাসের গন্ধ চারদিকে আঁধার আরও ঘন। বৃষ্টি আরও ঘন হয়ে নামছে। সামু এবং অমূল্য দুজন মিলেই এবার ডাকতে থাকল, আয়, তৈ তৈ। কোথাও কোনও হাঁসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না শুধু অশ্বত্থ গাছটায় জোনাকি জ্বলছে। নিচে হাঁসের পালক উড়ছে। পালকগুলো জলে নৌকার মতো ভেসে যাচ্ছে।

    সামু, অমূল্য এবং মালতী গলা মিলিয়ে ডাকল। ওরা লণ্ঠন তুলে ধান-গাছের ফাঁকে অন্বেষণের সময় দেখল জলে ইতস্তত হাঁসের পালক ভেসে যাচ্ছে। গোপাটের অশ্বত্থ গাছটার নিচে এসে যথার্থই মালতী ভেঙে পড়ল। পালকের ধূসর রঙ, অশ্বত্থের ঘন জঙ্গল সব মিলে সে হাঁসটার মৃত্যু সম্বন্ধে সচেতন হতেই ডুকরে কেঁদে উঠল।

    এই কান্নার জন্যই হোক অথবা পালকের অবস্থানের জন্যই হোক, সামসুদ্দিন বিকেলের কিছু কিছু ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে দেখল, জঙ্গলের ফাঁকে যেন জালালির মুখ। সুতরাং অযথা সে আর হাঁসটাকে খুজল না। সে জানত এই হাঁসগুলিকে মালতী সন্তানবৎ স্নেহে লালন করে আসছে। মালতী বিধবা—সুতরাং বিধবা যুবতীর একমাত্র সম্বল!… সামু রাগে দুঃখে প্রথমে কথা বলতে পারল না। জালালির মুখটা ওর চোখের ওপর কেবল ধূর্ত শেয়ালের মতো ভেসে উঠছে, এবং মালতীর বেদনাবোধ সামুকে প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তুলল।

    সামু বলল, বাড়ি যা মালতী।
    অমূল্য বলল, চলেন দিদি।
    সামু বলল, কান্দিস না মালতী।

    মালতী এবার চোখ তুলল এবং সামুকে দেখে ভাবল সেই সামু—যার চোখ ছোট এবং গোল গোল ছিল—সেই সামু যে শান্ত ছিল, এবং মালতীর দুঃখে কৈশোর বয়সে কাতর হতো। সামু যেন আজ যথার্থই দাড়ি-গোঁফহীন পুরুষ—সামু যেন এক হিন্দু যুবকের মতো আজ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং মালতীর দীর্ঘদিনের ঘৃণাবোধ সরে গেল। সে অনেকক্ষণ নির্বোধ বালিকার মতো সামুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। কিছু বলল না।

    নৌকা দুটো পাশাপাশি ছিল।

    হারিকেনের আলোতে ওদের মুখ স্পষ্ট ছিল। গ্রামের ভিতর থেকে কুকুরের ডাক জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসছে। বিশ্বাসপাড়াতে হ্যাজাকের আলো এবং আকাশে অস্পষ্ট মেঘের ছায়া। কিছু নক্ষত্ৰ যেন মালতীর শোকতাপকে আরও গভীর করছে। এই শোকতাপ সামুর ভিতরেও সংক্রামিত হল। সামসুদ্দিন বালক বয়সে এই গ্রাম মাঠ পার হয়ে বাপের হাত ধরে ধরে কোথাও চলে যাচ্ছে…যেন চারিদিকে ঢাকঢোল বাজছে—চারিদিকে পাইক-বরকন্দাজ…ওর বাপ দুগ্‌গা ঠাকুরের সামনে লাঠিখেলা দেখাচ্ছে—সামুর মনে হল, সেই সব কীর্তিমান পুরুষেরা আজ অথর্ব এবং এক নতুন ভাবধারা, নতুন ধর্মবোধ মানুষকে সংকীর্ণ করে তুলছে। সে জালালির ওপর যথার্থই ক্ষেপে গেল। সে মনে মনে বলল, শালীর প্যাটে পাড়া দিয়া গোস্ত বাইর করমু।

    সামুর নৌকা ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকল। ক্রমশ অদৃশ্য হতে থাকল। পিছনে অমূল্য, মালতী এবং হারিকেনটা পড়ে থাকছে। হারিকেনের আলো কিছুদূর পর্যন্ত অন্ধকারটাকে ঠেলে রেখেছিল, সামু যত দূরে সরে যেতে থাকল তত মালতীর মুখ অস্পষ্ট হতে থাকল।…মালতী যেন এক রহস্যময়ী নারী। বৃষ্টির জল ধানগাছ থেকে টুপটাপ জলে এবং নৌকার পাটাতনে ঝরছে, ঠিক মালতীর চোখের জলের মতো। সামু দূর থেকে চিৎকার করে বলল, তুই বাড়ী যা মালতী। অমূল্যকে বলল, অমূল্য, নৌকা ঘাটে লইয়া যাও। রাইতের ব্যালা এই মাঠময়দানে ঘুইর না। নির্জনে মালতীর এই বসে-থাকাটুকু সামুকে অসহায় করে তুলেছিল, কারণ, কলজের ভিতর কৈশোরের কাঁটাটা বড় বেশি আজ খচখচ করছে।

    .

    ধনু শেখকে নৌকাটা আবেদালির ঘাটে সন্তর্পণে ভিড়িয়ে দিতে বলল সামু। বলল, লগির য্যান শব্দ না হয়।

    সামু সন্তর্পণে পা টিপে টিপে ওপরে উঠতে থাকল। ওকে হাঁটু পর্যন্ত কাদা ভাঙতে হল। এখন ঝোপ-জঙ্গল থেকে বৃষ্টির জল গড়িয়ে নামছে। এখনও গাছ থেকে টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা বাতাসে ঝরে পড়েছে। ঘরের ভিতর স্তিমিত আলো। ভিতরে কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। আবেদালি নেই, জব্বর গেছে বাবুর হাটে এবং জোটনও অনুপস্থিত। বড় ভুতুড়ে মনে হচ্ছিল। সে ঝোপের বেতপাত সরিয়ে বেড়ার ফঁকে চোখ ঠেলে দিল। দেখল, ছোট এক লম্ফ জ্বলছে। জালালি প্রায় নগ্ন হয়ে বসে আছে পিঁড়িতে। সে সানকির সব হাড় চুষছিল। হাড়ে কোনও গোস্ত লেগে নেই। সে দাঁতের ফাঁকে হাড়গুলোকে মড়মড় করে ভেঙে খাচ্ছিল। তারপর পানি খাচ্ছে। সামু দেখল, পানির ওপর যে ধূর্ত শেয়ালের মুখটা ভেসে ছিল জালালির – সারাদিন পর গোস্ত ভক্ষণে—সে মুখ সহজ এবং সুন্দর। সে মুখে আল্লার দোয়া। পানি খেতে খেতে দুবার সে তার আল্লার নাম স্মরণ করল। সামু গরিব এই মানুষগুলির জন্য ফের অরণ্যের ভিতর হেঁটে যেতে চাইছে, সুতরাং মালতীর হাঁস চুরির কথা অথবা জালালির পেট পাড়া দিয়ে গোস্ত বের করার কথা সব কেমন যেন মন থেকে নিঃশেষে মুছে গেল। কারণ জালালি একটা ছেঁড়া হোগলা পেতে এখন নামাজ পড়ছে। রসুলের মতো মুখ—সামনে দুহাত প্রসারিত জালালির। সামসুদ্দিন কিছুই বলতে পারল না। দীর্ঘ এই সংসারযাত্রার আসরে সে যেন কালনেমিনির মতো এক অলীক লঙ্কাভাগে মত্ত। ওর পা সরছিল না। মাটির সঙ্গে পা গেঁথে যাচ্ছে।

  • নয়

    নয়

    শীতকাল এলেই মানুষটা কিছুদিন যেন ভালো থাকে। ঠাণ্ডার জন্য মণীন্দ্রনাথ গায়ে র‍্যাপার জড়িয়েছেন। আগের মতো খালি গায়ে থাকছেন না। এমন করে ভালো হতে হতে একদিন হয়তো যথার্থই ভাল হয়ে যাবেন। তখন কোথাও দু’জনে চলে যাবে এক সঙ্গে—কোনও তীর্থে অথবা বড় শহরে। অথবা সেই যে বলে না, এক মাঠ আছে, মাঠের পাশে বড় দিঘি আছে, দিঘিতে বড় বড় পদ্মফুল ফুটে থাকে, বড়বৌ গ্রীক পুরাণের এই নায়ককে নিয়ে একদিন যথার্থই সেখানে চলে যাবে। মানুষটা ভালো হলেই জলদানের নিমিত্ত কোনও জলছত্রের পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে। তখন হয়তো কোথাও দূরে গীর্জায় ঘণ্টা বাজবে, পুরোহিতেরা মন্ত্র উচ্চারণ করবে—পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথ কোনও হ্যামলক গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সোনার হরিণের স্বপ্ন দেখবেন।

    বড়বৌ মানুষটাকে আজ স্বাভাবিক দেখে এক বাটি গরম দুধ নিয়ে এল। সঙ্গে নতুন গুড়, মর্তমান কলা। কিছু গরম মুড়ি। বড় আসন পেতে সে মানুষটার জন্য অপেক্ষা করতে থাকল।

    সেই আশ্বিনের কুকুরটা মণীন্দ্রনাথের পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছিল। সোনা দক্ষিণের বারান্দায় পড়ছে। কুকুরটা মাঝে মাঝে ঘেউঘেউ করছিল। লাল জবা গাছটার নিচে দুটো শীতের ব্যাঙ্ ক্লপ ক্লিপ করছে। মণীন্দ্রনাথ গরম দুধ, মর্তমান কলা, নতুন গুড় মেখে খেলেন। কিছু তার প্রিয় কুকুরকে দিলেন। তারপর উঠে আসার সময় মনে হল সোনা চুপি চুপি পড়া ফেলে এদিকে আসছে। বড়কর্তা খুব খুশি—তিনি, কুকুর এবং সোনাকে নিয়ে শীতের ভোরে মাঠে নেমে গেলেন।

    ওরা সোনালী বালির নদীতে এসে নামল! এখন জলে তেমন স্রোত নেই। জল কমে গেছে। যেন ইচ্ছা করলে হেঁটে পার হওয়া যায়। পাড়ের পরিচিত মানুষেরা সোনা এবং মণীন্দ্রনাথকে আদাব দিল। আশেপাশে সব মুসলমান গ্রাম। ওদের দেখেই নৌকা নিয়ে মাঝি এ পাড়ে চলে এল। নৌকায় কুকুরটা সকলের আগে লাফিয়ে উঠেছে। সোনার অনেকদিনের ইচ্ছা—কোন ভোরে, পাগল জ্যাঠামশাইর সঙ্গে গ্রাম মাঠ দেখতে বের হবে। প্রতিদিন ক্রোশের পর ক্রোশ হেঁটে দুপুরে অথবা সন্ধ্যায় জ্যাঠামশাই ক্লান্ত সৈনিকের মতো বাড়ির উঠোনে উঠে আসেন, পায়ে তাঁর বিচিত্র নদী-নালার চিহ্ন থাকে, গরমে তরমুজ এবং শীতের শেষে আখের আঁটি সঙ্গে আনেন। সোনার কাছে মানুষটা বনবাসী রাজপুত্রের মতো। কতরকমের গল্প শোনার ইচ্ছা এই মানুষের কাছে—পাগল বলে অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প শোনাতেন। নির্জন নিঃসঙ্গ মাঠ পেলেই বলতে থাকেন। পাগল বলে গল্পের আরম্ভও নেই শেষও নেই।

    জ্যাঠামশাই বলতেন, পদ্মপুকুর যাবি?

    জ্যাঠামশাই বলতেন, ইলিশমাছের ঘর দেখবি?

    তারপর কোনও উত্তর না পেলে বলতেন, রূপচাঁদ পক্ষী দেখবি?

    সোনা কোনও উত্তর করত না। উত্তর দিলেই বলবেন, গ্যাৎচোরেৎশালা। তবু একবার সে খুব সাহস সঞ্চয় করে বলেছিল, আমি পঙ্খীরাজ ঘোড়া দ্যাখমু। দ্যাখাইবেন?

    মণীন্দ্রনাথের যেন বলার ইচ্ছা, তোমার পদ্মপুকুর দেখতে ইচ্ছা হয় না! ইলিশমাছের ঘর দেখতে ইচ্ছা হয় না। রূপচাঁদ পক্ষী দ্যাখো না! দ্যাখো কেবল, পঙ্খীরাজ ঘোড়া। পঙ্খীরাজ ঘোড়া একটা আমারও লাগে। পাই কোথা! বলে সোনার দিকে অবাক চোখে তাকিয়েছিলেন।

    আজ আর সোনার কিছুতেই পঙ্খীরাজ ঘোড়ার কথা মনে হল না। সে আজ পড়া ফেলে চলে এসেছে। মা, ছোট কাকা খুঁজছেন। সোনা কই গ্যাল, দ্যাখেন, পোলাটা কই গ্যাল—সকলে খুঁজবে। সোনার ভারি মজা লাগল। মা ওকে ফতিমাকে ছুঁয়ে দেবার জন্য মেরেছে। ঠাকুমা বলেছে ওর জাতধর্ম গেল। ওকে সকলে অযথা হেনস্থা করেছে। কতদিন লালটু পলটু ওকে, একটু কিছু করলেই কান ধরে ওঠ বোস করিয়েছে—আজ ওরা সকলে ভাবুক। সে, জ্যাঠামশাইর সঙ্গে বাড়ি থেকে চুপি চুপি বের হয়ে পড়ল। পাগল বলে তিনি শুধু হেসেছিলেন। পাগল বলে তিনি তাকে এই যাত্রার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। যেন বলেছিলেন, কোথাও পঙ্খীরাজ ঘোড়া আকাশে উড়ে বেড়ায়, কোথাও না কোথাও শঙ্খের ভিতর শঙ্খকুমার পালিয়ে থাকে আর কোথাও না কোথাও ঝিনুকের ভিতর চম্পকনগরের রাজকন্যা ‘সাপের’ বিষে ঢলে আছে। তুমি আমি সেখানে চলে যাব সোনা। সবার জন্য বড় মাঠ, সোনালী ধানের ছড়া, নিয়ে আসব।

    আহা, ওরা কত গ্রাম মাঠ ফেলে চলে যাচ্ছে। যত ওরা এগুচ্ছিল তত আকাশটা ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে। সোনা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সে ক্ষুধায় অবসন্ন হয়ে পড়েছে। এতটা হেঁটেও সে আকাশ ছুঁতে পারছে না কিছুতে। ওর কতদিনের ইচ্ছা, জ্যাঠামশাইর সঙ্গে বের হয়ে সে, যে আকাশটা নদীর ওপারে নেমে গেছে—সেটা ছুঁয়ে আসবে। কিন্তু কি করে জাদুবলে আকাশটা কেবল সরে যাচ্ছে।

    কিছু পরিচিত লোক এই নাবালক শিশুকে পাগল মানুষের সঙ্গে দেখে বিস্ময়ে বলে উঠল, সোনাবাধু, আপনে। জ্যাঠামশাইর লগে কোনখানে যাইতেছেন। হাঁটতে কষ্ট হয় না!

    সোনা খুব বড় মানুষের মতো ঘাড় নাড়িয়ে বলল, না।

    কিন্তু মণীন্দ্রনাথ বুঝতে পারছেন সোনা আর যথার্থই হাঁটতে পারছে না। তিনি ওকে কাঁধে তুলে নিলেন। এখন সূর্যের উত্তাপ প্রখর। ঘাসের মাথায় আর শিশির পড়ে নেই। সূর্য মাথার ওপর উঠে গেছে। এ-সময় ওরা, কোথাও যেন ঘণ্টা বাজছে এমন শুনতে পেল।

    সোনার মনে হল বুঝি সেই পঙ্খীরাজ ঘোড়া। সে হাততালি দিতে দিতে বলল, জ্যাঠামশয় পঙ্খীরাজ ঘোড়া।

    আশ্বিনের কুকুরটা সহসা চলতে চলতে থেমে পড়ল। সে কান খাড়া করে শব্দটা শুনল এগিয়ে আসছে।

    মণীন্দ্রনাথের এখন বাড়ি ফেরার কথা মনে পড়ছে। সেই ঘণ্টাধ্বনি শুনেই বুঝি বাড়ির কথা মনে পড়ে গেল। ডানদিকে এক দীর্ঘ বন। বনের ভিতর দিয়ে হাঁটলে ফের সেই সোনালী বালির নদী পাওয়া যাবে, নদীর পাড়ে তরমুজ খেত। এখন হয়তো তরমুজের লতা এক দুই করে বিছিয়ে যাচ্ছে ঈশম। আর তখন বনের ভিতর কত রকমের গাছ। সেই ঘণ্টার শব্দ ক্রমে নিকটবর্তী হচ্ছে। বনের ভিতর কত রকমের গাছ—সব চেনা নয়। তবু গন্ধ গোলাপজামের, লটকন ফলের। সব ফল এখন প্রায় নিঃশেষ সোনা গাছে গাছে কি ফল আছে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল তারপর ফাঁকা মাঠে নামতেই দেখল, এক আজব জীব। অতিকায় জীব। ওর গলায় ঘণ্টা বাজছে। সোনা চিৎকার করে উঠল, ঐ দ্যাখেন জ্যাঠামশয়।

    কুকুরটা ছুটতে চাইল এবং ঘেউঘেউ করে উঠল। জ্যাঠামশাই কুকুরটাকে ধরে রাখলেন। সোনাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে পাশাপাশি যেন তাঁরা তিন মহাপ্রাণ সেই আজব জীবের জন্য প্রতীক্ষা করছেন। কাছে এলেই ছুটতে থাকবেন তাঁরা, অন্য পথে চলে গেলে কোনও ভয় থাকবে না।

    সোনা বিস্ময়ে কথা বলতে পারছে না। আসলে এত বড় মাঠ এবং এক বিরাট জীব—এ-হাতির গল্প সে মেজ-জ্যাঠামশাইর কাছে শুনেছে। জমিদার বাড়ির হাতি। হাতিটা দুলে দুলে ওদের দিকে নেমে আসছে। কাছে এলে, ওর মতো বয়সের এক বালক হাতির মাথায় বসে অঙ্কুস চালাচ্ছে দেখতে পেল। যে ভয়টুকু ছিল প্রাণে তা একেবারে উবে গেল। সে আনন্দে চিৎকার করে উঠল, জ্যাঠামশয়।

    জ্যাঠামশাই কতদিন পর যেন কথা বললেন, ওটা হাতি।

    সোনা বলল, হাতি!

    জ্যাঠামশাই বললেন, ওটা মুড়াপাড়ার হাতি।

    কিন্তু এ-কি! হাতিটা যে ওদের দিকেই ধেয়ে আসছে। বড় বড় পা ফেলে উঠে আসছে। এত বড় একটা জীব দেখে আর এমনভাব এগিয়ে আসছে দেখে সোনা ভয়ে গুটিয়ে গেল। একেবারে ওদের সামনে এসে পড়েছে। জ্যাঠামশাই নড়ছেন না। কুকুরটা ছুটোছুটি করছে। সোনা ভাবছিল পালাবে কিনা, ছুটবে কিনা অথচ এত বড় বিস্তৃত মাঠ পিছনে–সামনে ঝোপ–সে কোন দিকে ছুটে যাবে স্থির করতে পারল না। ভয়ে সে শুধু জ্যাঠামশাইকে জড়িয়ে ধরল। বলল, আমি বাড়ি যামু।

    জ্যাঠামশাই কোনও উত্তর করলেন না। তিনি এখন শুধু অপলক দৃষ্টিতে হাতিটাকে দেখছেন। যত নিকটবর্তী হচ্ছে তত তিনি কেমন মনে মনে অস্থির হয়ে উঠছেন।

    ক্ষোভে এবং আতঙ্কে এবার সোনা, জ্যাঠামশাইর হাত কামড়ে দিতে চাইল। জ্যাঠামশাই ওর কথা শুনতে পাচ্ছে না। সে বলল, আমি মার কাছে যামু। বলে কাঁদতে থাকল।

    কিন্তু আশ্চর্য, হাতিটা ওদের সামনে এসে চার পা মুড়ে বশংবদের মতো বসে পড়ল। মাহুত, জ্যাঠামশাইকে সেলাম দিল। তারপর হাতিটাকে বলল সেলাম দিতে। হাতিটা শুঁড় তুলে সেলাম দিল।

    জসীমের ছেলে ওসমান সামনে বসে। জসীম পিছনে। সে বলল, আসেন কর্তা হাতির পিঠে চড়েন। আপনেগ বাড়ি দিয়া আসি।

    ওরা এতদূর এসে গেছেন যে জসীম পর্যন্ত বুঝতে পারছিল বেলাবেলিতে পাগল মানুষ এই নাবালককে নিয়ে ঘরে ফিরতে পারবেন না। সে তাদের হাতির পিঠে তুলে নিল। সোনা হাতির পিঠে বসে মেজ-জ্যাঠামশাইর কথা মনে করতে পারছে। তিনি মুড়াপাড়া থেকে বাড়িতে এলেই এই হাতির বিচিত্র গল্প করতেন—হাতিতে চড়ে একবার ওঁরা শীতলক্ষ্যা নদী পার হয়ে কালীগঞ্জে যেতে এক ভয়ঙ্কর ঝড় এবং একটা গাছ উপড়ে এলে এই হাতি গাছ রুখে মেজ-জ্যাঠামশাইকে মৃত্যু থেকে রেহাই দিয়েছিল। সোনার এ-সব মনে হতেই হাতির জন্য মায়া হতে থাকল। এখন মনে হচ্ছে তার, হাতির পিঠে চড়ে সামনের আকাশ অতিক্রম করে চলে যেতে পারবে। হাতিটা হাঁটছে। গলায় ঘণ্টা বাজছে। পিছনে আশ্বিনের কুকুর। কুকুরটা পিছনে ছুটে ছুটে আসছে। কত গ্রাম কত মাঠ ভেঙে, ঝোপজঙ্গল ভেঙে ওরা হাতির পিঠে–যেন কোনও এক সওদাগর বাণিজ্য করতে যাচ্ছে—সপ্তডিঙায়, সাতশো মাঝির বহর…সোনা যুদ্ধ জয়ের মতো ঘরে ফিরছে।

    জসীম সোনাকে বলল, কখন আপনেরা বাইর হইছিলেন?

    সোনা বলল, সেই ভোরবেলা।

    —মুখ ত আপনের শুকাইয়া গ্যাছে।

    —ক্ষুধা লাগছে, কিছু খাই নাই।

    —খাইবেন? বলে জসীম পাকা পাকা প্রায় দুধের মতো সাদা গোলাপজাম কোঁচড় থেকে তুলে দিল। মিষ্টি এবং সুস্বাদু গোলাপজাম। সোনা প্রায় খাচ্ছিল কি গিলে ফেলছিল বোঝা দায়।

    তখন হতিটাকে দেখে কিছু গাঁয়ের নেড়িকুকুর চিৎকার করছিল। কিছু আবাদী মানুষ বাবুদের হাতি দেখছিল—মুড়াপাড়ার হাতিটাকে নিয়ে জসীমউদ্দিন প্রতি বছর এ-অঞ্চলে ঠিক হেমন্তের শেষে, শীতের প্রথম দিকে চলে আসে। বাড়ি বাড়ি হাতি নিয়ে জসীম খেলা দেখায়।

    জসীম সোনাকে বলল, কর্তা পাগল জ্যাঠামশয়র লগে যে বাইর হইলেন—যদি আপনেরে ফালাইয়া তাইন অন্য কোনখানে চইলা যাইত?

    —যায় না। জ্যাঠামশয় আমারে খুব ভালোবাসে।

    জসীম বলল, পাগল মাইনসের লগে বাইর হইতে ডর লাগে না?

    সোনা বলল, না। লাগে না। জ্যাঠামশয় আমারে লইয়া কতখানে চইলা যায়। একবার হাসান পীরের দরগায় আমারে রাইখা আইছিল, না জ্যাঠামশয়! সোনা পাগল জ্যাঠামশাইকে সাক্ষী মানতে চাইল।

    মণীন্দ্রনাথ ঘাড় ফিরিয়ে সোনাকে দেখলেন। যেন এখন কত অপরিচিত এই বালক। বালকের সঙ্গে কথা বলা অসম্মানজনক। তিনি তার চেয়ে বরং সামনের আকাশ দেখবেন। আকাশ অতিক্রম করে আরও দ্রুত চলে যাওয়া যায় কিনা অথবা যদি তিনি আকাশ অতিক্রম করে চলে যেতে পারেন–সামনে এক বিরাট দুর্গ পাবেন, দুর্গের ভিতর পলিন—তিনি এইসব ভেবে হামাগুড়ি দিতে চাইলেন হাতির পিঠে এবং সেই ক্ষুদ্র বালক ওসমানকে তুলে অঙ্কুশ কেড়ে হাতিকে নিজের খুশিমতো চালিয়ে নিতে চাইলেন—হাতি আমাকে নিয়ে তুমি দ্রুত হেঁটে পলিনের দেশে চল—সেই কোমল মুখ আমি আর কোথাও দেখছি না।

    জসীম চিৎকার করে উঠল, কর্তা, আপনে কি করতাছেন কর্তা! ওসমান পাগল মানুষটার দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেল। তিনি তার অঙ্কুস কেড়ে নিতে আসছেন। সোনা পিছন থেকে একটা পা চেপে ধরল।—জ্যাঠামশয় আপনে পইড়া যাইবেন। মণীন্দ্রনাথ আর নড়তে পারলেন না। তিনি করুণ এক মুখ নিয়ে সোনার দিকে তাকালেন। কারণ সোনার চোখে এমন এক জাদু আছে যা তিনি কিছুতেই অবহেলা করতে পারেন না। মাঠ পার হলে তিনি দেখলেন, পুবের বাড়ির নরেন দাস মাথায় কাপড়ের গাঁট নিয়ে বাবুর হাটে যাচ্ছে। হাতির গলায় ঘণ্টা বাজছিল বলে গ্রামের সব বালকবালিকা ছুটে এসেছে। আর নরেন দাসের বিধবা বোন মালতী সেই শ্যাওড়া গাছটার পাশে দেখল বড় বড় সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। শতরঞ্জি পেতে দেওয়া হয়েছে। মিঞারা, মৌলবীরা এসে জড়ো হচ্ছে। আর এই গ্রামের সর্বত্র, অন্য গ্রামের গাছে গাছে, মাঠে মাঠে ইস্তাহার ঝুলিয়ে চলে গেছে সামসুদ্দিনের লোকেরা অথবা তার ডান হাত যাকে বলা যায়—সেই ফেলু শেখ। তাতে কিছু শব্দ লেখা ছিল। লেখা ছিল—পাকিস্তান জিন্দাবাদ। লেখা ছিল, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান আর লেখা ছিল নারায়ে তকদির। মালতী নারায়ে তকদির এই শব্দের অর্থ জানত না। একদিন সে ভেবেছিল, চুপি চুপি সামসুদ্দিনকে অর্থটা জিজ্ঞাসা করবে।

    মালতী এবার নিজের দিকে তাকাল। শরীরের লাবণ্য ক্রমে বাড়ছে। স্বামীর মৃত্যুর পর ফের ঢাকায় গত মাসে দাঙ্গা হয়ে গেছে। ওর শ্বশুর এসে বলে গেল, ঢাকায় শাঁখারীরা, কুট্টিরা বড় বদলা নিছে। সেদিন থেকে মালতী খুশি। সামুরে, তুই গাছে গাছে ইস্তাহার ঝুলাইয়া কি করবি! সামুকে মনে মনে গাল দিল মালতী।

    সামিয়ানার নিচে মুসলমান গ্রামের লোকেরা জড়ো হচ্ছে। সিন্নির জন্য বড় উনুন ধরানো হচ্ছে। বড় বড় তামার ডেকচিতে দুধে জলে চালের গুঁড়ো সেদ্ধ হচ্ছে। গোপাট ধরে হাতির পিঠে রাজার মতো তখন পাগল মানুষ ঘরে ফিরে আসছেন।

    মালতী দেখল হাতির পিঠে পাগল ঠাকুর বাড়িতে উঠে আসছেন। ঘণ্টার আওয়াজে যে যেখানে ছিল ছুটে এসেছে। এই ঘণ্টার শব্দ কোনও শুভ বার্তার মতো এই অঞ্চলের সকল মানুষের কানে বাজছে ওরা মনে করতে পারল, সেই পয়মন্ত হাতি লক্ষ্মীর মতো রূপ নিয়ে, শুভ বার্তা নিয়ে তাদের দেশে চলে এসেছে। এই হাতির জন্য যারা গেরস্থ বৌ, যারা কোনওকালে একা একা ঘরের বার হয়নি তারা পর্যন্ত বাড়ির সব নাবালকের পিছু পিছু ঠাকুরবাড়ির দিকে হাঁটতে থাকল।

    অথবা হাতিটা যখন পরদিন উঠোনের ওপর এসে মা মা বলে ডাকবে তখন সব গেরস্থ বৌদের প্রাণে ‘এই হাতি আপনার ধন’ অথবা ‘এই হাতি মা লক্ষ্মীর মতো’। এই হাতি বাড়ির উঠোনে উঠে এলে জমিতে সোনা ফলবে। ওরা হাতির মাথায় কপালে লেপে দেবার জন্য সিঁদুর গুলতে বসে গেল। হাতিটার কপালে সিঁদুর দিতে হবে, ধান দূর্বা সংগ্রহ করে রাখল সকলে। আর মালতী দেখল, হাতির পিঠে পাগল মানুষ হাততালি দিচ্ছেন। হাতির পিঠে সোনা। ফতিমা, সোনাবাবুকে নিচ থেকে বলছে, আমারে পিঠে তুইলা নেন সোনাবাবু। ফতিমা হাতির পিঠে ওঠার জন্য ছুটছিল। আর তখন ফতিমার বা’জী সামসুদ্দিন সামিয়ানার নিচে বড় বড় অক্ষরে ইস্তাহার লিখছিল, ইসলাম বিপন্ন। বড় বড় হরফে লিখছিল—পাকিস্তান জিন্দাবাদ।

    মালতী এইসব দেখতে দেখতে ডেফল গাছটার নিচে বসে কেমন আবেগে কেঁদে ফেলল। সে চিৎকার করে বলতে চাইল, সামুরে, তুই দেশটার কপালে দুঃখ ডাইকা আনিস না।

    হাতিটা পুকুরপাড় ধরে উঠে যাবার সময় আমের ডাল, অর্জুনের ডাল এবং জামগাছের ডাল অর্থাৎ নিচে যা পেল সব মটমট করে ডালপালা ভেঙে শুঁড় দিয়ে মুখে পুরে দিতে থাকল। আর সেই স্থলপদ্ম গাছটা, যে গাছের নিচে বসে পাগল মানুষটা স্বচ্ছ আকাশ দেখতে ভালোবাসতেন—সেই গাছটা পর্যন্ত মটমট করে ভেঙে হাতিটা মুখে ফেলে কট করে একটা শব্দ, প্রায় কাটা নারকেল খেলে মানুষের মুখে যেমন শব্দ হয়, হাতির মুখে স্থলপদ্ম গাছের ডালপালা কাণ্ড তেমন শব্দ তুলছে। জসীম বার বার অঙ্কুশ চালিয়েও হাতিটাকে দমিয়ে দিতে পারল না। হাতিটা গাছটাকে চেটে পুটে খেয়ে ফেলল। রাগে দুঃখে পাগল জ্যাঠামশাই হাত কচলাতে থাকলেন। তাঁর এই স্থলপদ্ম গাছ, তাঁর সখের এবং নীরব আত্মীয়ের মতো এই স্থলপদ্ম গাছের মৃত্যুতে তিনি বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    মাঠের ভিতর সামিয়ানা টাঙানো। মোল্লা মৌলবীরা আসতে শুরু করছে। ধানকাটা হয়ে গেছে বলে নেড়া নেড়া সব মাঠ। শস্য বলতে কিছু কলাই গাছ, মসুরি গাছ। ফেলু শেখ সব জুড়িদারদের নিয়ে বড় বড় গর্ত করছে। হাজিসাহেবের চাকর দুধ ফোটাচ্ছে। বড় বড় তামার ডেকচিতে দুধ এবং জলে চালের গুঁড়ো, মিষ্টি, তেজপতা, আখরোট, এলাচ, দারুচিনি, জাফরান, লবঙ্গ। পুরানো তক্তপোশের ওপর ছিন্ন চাদর পাতা। আর হাজিসাহেবের তিন ছেলে উজান গিয়েছিল ধান কাটতে, তখন একটা খ্যাস এনেছিল উজান থেকে। সেই খ্যাস পেতে প্রধান মৌলবীসাবের জন্য একটা আসন করা হয়েছে। সব মুসলমান চাষাভুষা লোক ক্ৰমে সামিয়ানার নিচে জড়ো হচ্ছিল।

    শচীন্দ্রনাথ জানতেন, এমন একটা ঘটবে। সামসুদ্দিন ভোটে এবারেও হেরে গেছে। লীগের নাম করে এবারেও সে মুসলমান চাষাভুষা লোকের সব ভোট নিতে পারেনি, শচীন্দ্রনাথ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দাঁড়িয়ে এবারেও ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন। সুতরাং তিনি এমন একটা ঘটনা ঘটবে জানতেন। সামসুদ্দিন ঢাকা গেছিল। সাহাবুদ্দিন সাহেবের আসার কথা। এত বড় একটা মানুষ আসবে এদেশে, একবার ওঁরও ইচ্ছা ছিল সামিয়ানার নিচে গিয়ে দাঁড়াতে। কিন্তু গোটা ব্যাপারটাই ধর্মীয় করে রেখেছে। বোধ হয় নিমন্ত্রণ করলেও তিনি যেতে পারতেন না।

    হাতিটা পুকুরপাড় ধরে উঠে আসার সময় তিনি এসব ভাবছিলেন। জসীম হাতিটাকে এখন উঠোনে তুলে আনছে। হাতিটা কাছে এলে তিনি বললেন, জসীম ভালো আছ?

    —আছি কর্তা। জসীম হাতিটাকে সেলাম দিতে বলল।

    —মাইজাদা ভালো আছেন?

    জসীম একটু নুয়ে বলল, হুজুর ভালো আছেন।

    —অনেকদিন পর ইদিকে আইলা।

    —আইলাম। আপনেগ দেখতে ইসছা হইল, চইলা আইলাম।

    —বাবুরা বুঝি এখন বাড়ি নাই?

    —না। বাবুরা ঢাকা গ্যাছে।

    সোনাকে এবার ছোটকাকা বললেন, হারে সোনা, তর ক্ষুধা পায় না। অরে নামাইয়া দে জসীম। অর মায় ত গালে হাত দিয়া ভাবতাছে, পোলাটা গ্যাল কৈ?

    হাতিটা পা মুড়ে বসে পড়ল। সোনা নেমে গেল। গ্রামে এখন এই হাতির জন্য উৎসবের মতো আনন্দ। জসীমের ছেলে ওসমান নেমে গেল। সবাই ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। জসীম পাগল মানুষটার দিকে তাকিয়ে বলল, কর্তা, নামেন। পাগল মানুষ তিনি, তিনি এই কথায় শুধু হাসলেন। তিনি নেমে যাওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলেন না। এই হাতি তাঁর প্রিয় স্থলপদ্ম গাছ খেয়ে ফেলেছে। ক্ষোভে জ্বলছেন। গাছের নিচে বসলেই তিনি জাহাজের সেই অলৌকিক শব্দ শুনতে পেতেন। কাপ্তান মাস্তুলে উঠে নিশান ওড়াচ্ছে। জাহাজটা পলিনকে নিয়ে জলে ভেসে গেল। আর হাতিটা সেই স্মৃতিসহ স্থলপদ্ম গাছটা চেটেপুটে খেয়ে এখন চোখ বুজে আছে।

    শচীন্দ্রনাথও অনুরোধ করলেন হাতির পিঠ থেকে নামতে; কিন্তু পাগল মানুষ তিনি—হাতির পিঠে সন্ন্যাসীর মতো পদ্মাসন করে বসে থাকলেন। এতটুকু নড়লেন না। জোর করতে গেলে তিনি সকলের হাত কামড়ে দেবেন। অথবা হত্যা করবেন সকলকে, এমন এক ভঙ্গি নিয়ে স্থলপদ্ম গাছের শেষ চিহ্নটুকু দেখতে থাকলেন।

    জসীম দেখল হাতির পিঠে বড়কর্তা বসে কেবল বিড়বিড় করে বকে যাচ্ছেন। তিনি কারও অনুরোধ রাখছেন না। শচীন্দ্রনাথ বার বার বলছেন, দু’চারজন মাতব্বর মানুষ হাতিটা ঠাকুরবাড়ি উঠে আসতে দেখে জড়ো হয়েছিল—তারাও বলছে, বড়কর্তা নামেন। হাতিটা অনেকটা পথ হাঁইটা আইছে, অরে বিশ্রাম দ্যান। বড়কর্তা ভ্রূক্ষেপ করলেন না, তিনি বরং হাতিটার কানের নিচে পা রেখে বলতে চাইলেন, হেট্‌ হেট্।

    তখন হাতিটা ইঙ্গিত পেয়ে উঠে দাঁড়াল। পাগল মানুষ বড়কর্তা হাতিটা নিয়ে বের হয়ে পড়লেন। জসীম ডাকল, কর্তা এইডা আপনে কি করেন! কর্তা, অঃ কৰ্তা!

    বাড়ির প্রায় সকলেই বিপদ বুঝতে পেরে পিছনে ছুটল। ততক্ষণে হাতিটা পুকুরপাড় ধরে নিচে নেমে যাচ্ছে। পুবের বাড়ির মালতী দেখল, পাগল ঠাকুর মুড়াপাড়ার হাতিটা নিয়ে মাঠে নেমে যাচ্ছে। মাঠে নরেন দাসের জমি পার হলেই সেই শ্যাওড়া গাছ, গাছে ইস্তাহার ঝুলছে, গাছে গাছে সামসুদ্দিন ইস্তাহার ঝুলিয়ে সেই এক বাক্য বলছে, ইসলাম বিপন্ন, পাকিস্তান জিন্দাবাদ। লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান। অথবা নারায়ে তকদির এবং এমন সব অনেক কথা লেখা আছে—যা মালতীর দু’চোখের বিষ। মালতীর চিৎকার করে বলার ইচ্ছা, সামুরে তর ওলাওঠা হয় না ক্যান!

    তখন হাতিটা নরেন দাসের জমি পার হয়ে মাঠের ওপর দিয়ে ছুটছে। পিছনে ছোট ঠাকুর, জসীম, জসীমের পুত্র ওসমান ছুটছে। গ্রামের কিছু ছেলে-বুড়ো ছুটছে। ওরা সকলে হৈ হৈ করছিল—কারণ পাগল মানুষ এক অবলা হাতি নিয়ে মাঠে ঘৌড়দৌড়ের বাজী জেতার মতো ছুটছে। কিছুদূর গেলে সামসুদ্দিনের সামিয়ানা টাঙানো মণ্ডপ। মণ্ডপের বাইরে খোলা আকাশের নিচে বড় বড় ডেকছি—ফেলু সিন্নি চড়িয়েছে। মৌলবীসাব আজান দিয়ে এইমাত্র মঞ্চে উঠে নামাজ পড়ছেন। যারা দূর গাঁ থেকে সভায় ইসলাম বিপন্ন ভেবে সিন্নির স্বাদ নিতে এসেছে অথবা ইসলাম এক হও এবং এই যে কাফের জাতীয় মানুষ যাদের পায়ের তলায় থেকে সংসারের হাল ধরে আছি—কি না দুঃখ বল, এই জাতি তোমাদের কী দিয়েছে, জমি তাদের, জমিদারী তাদের—উকিল বল, ডাক্তার বল সব তারা—কী আছে তোমাদের, নামাজ পড়ার পর এই ধরনের কিছু কিছু উক্তি—যা রক্তে উত্তেজনার জন্ম দেয়—মানুষগুলি কান খাড়া করে মৌলবীসাবের, বড় মিঞার এবং পরাপরদির বড় বিশ্বাসের ধর্মীয় বক্তৃতা শোনার সময় পিছনে ফেলু শেখের চিৎকারে একে অন্যের ওপর ছিটকে পড়ল। সেই ঠাকুরবাড়ির পাগল ঠাকুর এক মত্ত হাতি নিয়ে এদিকে ছুটে আসছে। সবাই হৈ হৈ করতে থাকল। তিনি পাগল মানুষ, হাতি অবলা জীব—সারাদিনের পরিশ্রমের পর হাতিটা বুঝি ক্ষেপে গেছে। হাতিটা পাগলা হাতির মতো শুঁড় উঁচু করে চিৎকার করতে করতে সেই সামিয়ানার ভিতর ঢুকে সব লণ্ডভণ্ড করে দিল।

    ফেলু তামার ডেকচিগুলির পাশে লুকিয়েছিল। ভিতরে দুধে জলে চালের গুঁড়োতে টগবগ করে ফুটছে। সেই মত্ত হাতি ভিতরে ঢুকে গেলে সকলে নানাভাবে মাঠের ওপর দিয়ে ছুটছে। সকলে দৌড়ে দৌড়ে নিজের প্রাণ রক্ষা করছে। সামসুদ্দিন আতঙ্কে ভাঙা তক্তপোশের নিচে লুকিয়ে পড়ল। ফেলু পালাচ্ছিল, পালাতে গিয়ে হাতিটার একেবারে সামনে পড়ে গেল। হাতিটা সহসা ওকে শুঁড়ে জড়িয়ে ধরল এবং ধরার জন্য একটা হাত ভেঙে গেল। সকলে চিৎকার করছে দূরে, কেউ কাছে আসতে সাহস পাচ্ছে না, হায় হায় করছে, একটা মানুষ হাতির পায়ের নিচে বুঝি শেষ হয়ে গেল। মণীন্দ্রনাথ হাতির পিঠে বসে গালে হাত দিয়ে হাতি কতটুকু কি পারে যেন এমন কিছু দেখছিলেন। যেন তিনি ভাবে মগ্ন। হাতির পিঠে চড়ে বেশ তামশা দেখা যাচ্ছে যেন, যেন এমনি হওয়া উচিত ফেলুর। পাগল ঠাকুর এবারে ফের হাতির কানের নিচে পা দিয়ে খোঁচা মারতেই একান্ত বশংবদের মতো ফেলুকে মাটির ওপর পুতুলের মতো দাঁড় করিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি হাতিটাকে এই স্থান-কাল-পাত্র পরিত্যাগ করে চলে যেতে বললেন। আর হাতিটাও স্থান-কাল-পাত্র পরিত্যাগ করে মাঠের ওপর দিয়ে ছুটতে থাকল।

    .

    তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। তখন নদীর চরে ঈশম তরমুজের লতা নিড়ান দিয়ে সাফ করে দিচ্ছিল। হেমন্তের শেষে শীত এসে যাচ্ছে। সূর্য পশ্চিমে নামতে থাকলেই ঘাসে ঘাসে শিশির পড়তে থাকে। জসীম চিৎকার করছিল, আর হাতিটার পিছনে ছুটছিল। বাবুদের হাতি—সে এই অঞ্চলে হাতি নিয়ে ঘুরতে এসে কী এক দুর্যোগে পড়ে গেল—সেই বিস্তীর্ণ মাঠের ভিতর থেকে পাগল মানুষকে হাতির পিঠে তুলে না নিলেই এখন মনে হচ্ছে ভাল হতো। সেই যে তিনি হাতির পিঠে চড়ে বসলেন আর নামতে চাইলেন না। এখন কী হবে! হাতিটা ক্রমশ মাঠ ভেঙে গ্রামে, গ্রাম ভেঙে মাঠে পড়ছে। হাতির পিঠে মণীন্দ্রনাথ তালি বাজাচ্ছেন। গ্রামের ছোট বড় সকলে পিছনে ছুটে ছুটে যখন হাতিটার আর নাগাল পেল না, যখন হাতিটা নদীর চর পার হয়ে অন্ধকারের ভিতর অদৃশ্য হয়ে যেতে থাকল—তখন মণীন্দ্রনাথ চুপচাপ বসে বুঝলেন—আর ভয় নেই। হাতিটাকে কৌশলে তিনি যেন বলে দিলেন, অবলা জীব হাতি, তুমি এবার ধীরে ধীরে হাঁটো। তোমাকে এখন আর কেউ খুঁজে পাবে না।

    রাত হয়ে গেছে। এটা কোনও মাঠ হবে, বোধ হয় দামোদরদির মাঠ হবে। আর একটু গেলেই মেঘনা। নদীর পাড়ে বড় মঠ। অন্ধকারে এখন মঠ দেখা যাচ্ছে না। শুধু ত্রিশূলের মাথায় একটা আলো জ্বলতে দেখা যাচ্ছে।

    .

    শচীন্দ্রনাথ তখন বাড়ির ভিতর। আরও সব মানুষজন এসেছে। জসীম উঠোনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। এত বড় হাতি নিয়ে পাগল ঠাকুর কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। সে মাহুত হাতির—বাবুদের হাতি, লক্ষ্মীর মতো পয়মন্ত হাতি—এখন কী হবে, সে ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছিল না। উঠোনের ওপর গ্রামের লোকেরা কী করা যায় পরামর্শ করছে। গ্রামে গ্রামে এখন খবরটা পৌঁছে গেছে। ঈশম লণ্ঠন হাতে আবার বের হয়ে পড়েছে এবং প্রায় একদল মানুষ লণ্ঠন হাতে সোনালী বালির নদীর চরে নেমে যাচ্ছে। তারা জোরে জোরে ডাকছিল। জসীমও বেশিক্ষণ অপেক্ষা করেনি। সে ওসমানকে রেখে একা সেই দলটার সঙ্গে মেশার জন্য কাঁধে গামছা ফেলে দৌড়াতে থাকল।

    সামসুদ্দিন লণ্ঠন হাতে মাঠে দাঁড়িয়ে আছে। ফেলু খুব বেঁচে গেছে এ যাত্রা। ওকে ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একটা তছনছ ভাব এবং পাগল ঠাকুর ইচ্ছা করে এমন একটা ঘটনা ঘটিয়েছেন যেন, যেন তিনি জানতেন সামসুদ্দিনের এই যে ইস্তাহার ঝুলিয়ে স্বার্থপর মানুষের মতো একই সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হবার বাসনা—এই বাসনা ভালো নয়। পাগল মানুষ তিনি। এইটুকু ভেবে গোটা উৎসবের মতো এক ছবিকে তছনছ করে চলে গেছেন। সামসুদ্দিনের আপ্রাণ চেষ্টার দরুন এই মাঠে এত বড় একটা জাল্‌সা হতে পারছে। এত বড় জাল্‌সাতে শহর থেকে মোল্লা মৌলবীরা এসেছিল। ওরা যখন হাজিসাহেবের বাড়িতে উঠে, তোবা তোবা, কি এক বেমাফিক কাজ হয়ে গেল। সামসুদ্দিনের ইচ্ছা হল এখন সে নিজের হাত কামড়ায়। আর মনে হল গোটা ব্যাপারটাই এক ষড়যন্ত্র। যেন ছোট ঠাকুর আবার ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হতে চায়। আবার কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ছোট ঠাকুর দাঁড়াবে এবং কবিরসাবকে ধরে এনে কংগ্রেসের পক্ষে বড় এক বক্তৃতা করাবে। সে ভাবছিল, এমন একটা হাতি পাওয়া যাবে না সেদিন! হাতির পিঠে ফেলু বসে থাকবে। অথবা ফেলুকে দিয়ে মণ্ডপে আগুন ধরিয়ে দিলে যেন সব আক্রোশের শোধ নেওয়া যাবে। লণ্ঠন হাতে সামসুদ্দিন জব্বরকে দিয়ে সব তৈজসপত্র, ভাঙা টুল টেবিল, ছেঁড়া সামিয়ানা এবং বড় শতরঞ্জ সব একসঙ্গে মাঠ থেকে বাড়িতে তুলে আনার সময় এসব ভাবল।

    তখন বাড়ির বৃদ্ধ মানুষটি প্রশ্ন করেছিলেন—তিনি অতিশয় বৃদ্ধ বলেই ঘরের ভিতর বসে প্রদীপের মৃদু আলোতে সামান্য কাশছিলেন, এখন আর তিনি তেমন বেশি ঘর-বার হন না—অধিকাংশ সময় ঘরের ভিতর খাটে একটা বড় তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে শুয়ে থাকেন—অতিশয় গৌরবর্ণ চেহারার এই মানুষ উঠোনে গোলযোগ শুনে বড়বৌকে প্রশ্ন করলেন, কি হয়েছে বড়বৌ? উঠোনে এত গণ্ডগোল ক্যান?

    বড়বৌ প্রদীপে আলো একটু উসকে দিল। টিন-কাঠের ঘর। জানালা দিয়ে শেষ হেমন্তের ঠাণ্ডা বাতাস ভেসে আসছে। বড়বৌ এই সংসারে বৃদ্ধ শ্বশুরের দেখাশুনা করার সময় প্রায়ই জানালায় দূরে সব মাঠ দেখতে পায় এবং সেই মাঠে সংসারের এক পাগল মানুষ ক্রমান্বয়ে হেঁটে হেঁটে কোথায় যেন কেবল চলে যেতে চাইছেন। উঠোনের সেই গণ্ডগোল, মানুষটার এভাবে হাতিতে চড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া এ-সব বড়বৌকে বিপন্ন করছে। মানুষটা আবার ক্ষেপে গেলেন। ভোরেও বড়বৌ এই মানুষকে খেতে দিয়েছে। ভালোমানুষের মতো খেয়ে প্রতিদিনের মতো নিরুদ্দেশে চলে গেছিলেন। সংসারের ছোট এক বালক সোনা সঙ্গ দিয়েছে মাঠে মাঠে এবং গ্রামে গ্রামে। তারপর কোন এক দূর গ্রাম থেকে মাঠ ভেঙে সোনার হাত ধরে এই পাগল মানুষ গ্রামের দিকে ফিরছিলেন, তখন জসীম আসছে হাতিতে চড়ে। জসীমের ছেলে ওসমান হাতির সামনে। ওরা দেখল সেই বড় মাঠে ঠাকুর ছোট বালকের হাত ধরে কোথায় যেন চলে যাচ্ছেন। এই মানুষটার জন্য তল্লাটের সকলের কষ্ট—কারণ এমন মানুষ হয় না, কথিত আছে তিনি দরগার পীরের মতো এক মহৎ পুরুষ। জসীম পাগল ঠাকুরকে হাতির পিঠে তুলে বলেছিল, চলেন বাড়ি দিয়া আসি কর্তা। জসীম, সোনা এবং পাগল মানুষকে বাড়ি পৌঁছে দিতে গিয়ে এই কাণ্ড। বড়বৌ খুব দুঃখের সঙ্গে বৃদ্ধের পায়ের কাছে বসে সব বলল। বৃদ্ধ পুত্রের হাতিতে চড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার ঘটনা শুনে পাশ ফিরলেন শুধু। বৃদ্ধের মুখে এক অসামান্য কষ্ট ফুটে উঠেছে। বড়বৌর কাছে ধরা পড়ে যাবেন ভাবতেই মুখ ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে শুধু অন্ধকার দেখতে থাকলেন। এই সময়ে তাঁর এক পাগল ছেলে মাঠময় ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং সব দুঃখের মূলে তিনি—তাঁর জেদ, এ সব ভেবে তাঁর দুঃখের যেন অন্ত ছিল না। তিনি বললেন, বৌমা, জানালাটা বন্ধ কইরা দ্যাও। আমার শীত করতাছে।

    —একটা কম্বল গায়ে দ্যান বাবা।

    —না। জানালাটা বন্ধ কইরা দ্যাও।

    বড়বৌ জানালা বন্ধ করার সময়ই দেখল কামরাঙা গাছের ওপারে যে বড় মাঠ, ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর থেকে দেখা যাচ্ছে—সেখানে অনেক লণ্ঠন। বড়বৌ বুঝল, এইসব মানুষ যাচ্ছে অন্ধকারের ভিতর পাগল মানুষ এবং হাতিটাকে খুঁজতে

    আর জসীম অন্ধকারে ডাকছিল হাতিটার নাম ধরে-লক্ষ্মী, অ লক্ষ্মী! সে সবার আগে ছুটে ছুটে যাচ্ছিল। যেন তার ঘরের বিবির মতো এক রমণী অন্ধকারে নিরুদ্দেশ হয়েছে অথবা সেরা মানুষ পাগল ঠাকুর—দশাসই চেহারা, গৌরবর্ণ—ঠিক পীরের মতো এক মানুষের সঙ্গে তার পোষা হাতি, তার ভালোবাসার লক্ষ্মী চলে গেছে। সে প্রাণপণ ডাকছিল, লক্ষ্মী অ লক্ষ্মী! আমি তর লাইগা চিঁড়ামুড়ি তুইলা রাখছি, লক্ষ্মী অ লক্ষ্মী, তুই একবার অন্ধকারে ডাক দিহি, মাঠের কোন আনধাইরে তুই বইসা আছস একবার ডাইকা ক’ দিহি। আমি পাগল ঠাকুরের মতো তরে লইয়া ঘরে ফিরমু।

    ঈশম বলছিল, আরে মিঞা, এত উতালা হইলে চলব ক্যান। বড়কর্তা বড় মানুষ। হাতি অবলা জীব, ভালবাসার জীব। তিনি হাতির মতো পোষা জীব লইয়া পলিনেরে খুঁজতে বাইর হইছেন।

    জসীম বলল, পলিন, কোন পলিনের কথা কন!

    —আরে আছে মিঞা।

    জসীম বলল, হাঁটতে বড় কষ্ট। কিস্সা কইলে বেশি হাঁটতে পারি।

    ঈশম বলল, বড় মানুষের কথা অধমের মুখে ভাল শুনাইব না। অথবা যেন ঈশমের বলার ইচ্ছা—মিঞা, তল্লাটের লোক কে না জানে এ-কথা। তুমি এডা কি কও! তুমি জান না কর্তা ফাঁক পাইলে নৌকায়, না হয় হাঁটতে হাঁটতে নিরুদ্দেশে যান। তারপর ঈশম এক বর্ষার কথা বলল। এক বর্ষাকালে পাগল ঠাকুর নৌকা নিয়ে তিনদিন নিরুদ্দেশ ছিলেন, তার গল্প করল। সোনালী বালির নদীর জলে তখন স্রোত ছিল। তিনি একা স্রোতের মুখে নৌকা ছেড়ে বসেছিলেন। যেন সেই নাও তাঁকে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে অথবা গঙ্গার জেটির পাশে বড় এক জাহাজে পৌঁছে দেবে। পাগল মানুষ বলে তিনি মনে মনে বিলের ভিতর বড় এক কলকাতা শহর বানিয়ে বসেছিলেন এবং সারাদিন সারা রাত ধরে যেন তিনি সেই বিলের জলে পলিনকে খুঁজেছিলেন। বিলের জলে এক স্বপ্ন ভাসে, স্বপ্নে সেই বড় কলকাতা শহর—গাড়ি ঘোড়া হাতির মিছিল, আর ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ, দুর্গের পাশে মেমরিয়েল হল—কার্জন পার্ক। গড়ের মাঠে সাহেবরা উর্দি পরে কুচকাওয়াজ করছে। পাগল ঠাকুর হে হে করে হাসতে হাসতে শুধু বলছিলেন, গ্যাৎচোরেৎশালা। কারণ তাঁর প্রতিবিম্ব জলে দেখা যাচ্ছিল, আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। শহরটা নিমেষে কেমন জলের নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল। পাগল মানুষের প্রতিবিম্ব তখন শুধু পরিহাস করছে, হায় বেহুলা জলে ভাইস্যা যায় রে, জলে ভাইস্যা যায়।

    সবই যেন জলে ভেসে যাচ্ছিল। এতবড় বিল, এই অন্ধকার চারদিকে, জোনাকিরা জ্বলছে। উড়ে উড়ে জোনাকিরা পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথকে এবং হাতিটাকে ঘিরে ধরল। মণীন্দ্রনাথ হাতির পিঠে চড়ে বিলের পাড়ে পাড়ে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। বিলের জলে শুধু অন্ধকার। হেমন্তকাল বলে ঠাণ্ডা বাতাস উঠে আসছে। পাকা ধানের গন্ধ মাঠে মাঠে। এই অন্ধকারে হাতির পিঠে বসে পাকা ধানের গন্ধ পাচ্ছিলেন। আর আকাশে কত হাজার নক্ষত্র, পাগল মানুষ প্রতিদিনের মতো হাতির পিঠে বসে সেইসব নক্ষত্র দেখতে দেখতে, যেন সেইসব নক্ষত্রে কোনও একটি তার প্রিয় পলিনের মুখ—তিনি হাতিতে চড়ে অথবা নৌকায় উঠে কিছুতেই আর সেই প্রিয় পলিনের কাছে অথবা হেমলক গাছের নিচে পৌঁছতে পারলেন না। তিনি হাতিটাকে সম্বোধন করে বললেন, হ্যাঁ লক্ষ্মী, তুমি আমাকে নিয়ে পলিনের কাছে যেতে পার না। সেই সুন্দর মুখ—ঝরনার জলের উৎসে তুমি আমাকে পৌঁছে দিতে পার না!

    সহসা এই পাগল মানুষের ভিতর পূর্বের স্মৃতি তোলপাড় করলে তিনি আর স্থির থাকতে পারেন না। মনে হয় আর কিছুদূর গেলেই তিনি তাঁর প্রিয় হেমলক গাছটি খুঁজে পাবেন এবং সেই হেমলক গাছের নিচে সোনার হরিণটি বাঁধা আছে। এইভাবে কতদিন একা একা মাঠ থেকে মাঠে, গ্রাম থেকে গ্রামে এবং এমন তল্লাট নেই এ-অঞ্চলে তিনি যেখানে একা-একা চলে যান না, তারপর এক-সময় ফের মনে হয় সেখানে আর তিনি এ-জীবনে পৌঁছাতে পারবেন না। সুতরাং সেই এক বড়বৌর মুখ এবং তার বিষণ্ণ চোখ পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথকে অস্থির করে তোলে। তিনি ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকেন। তখন মনে হয় হাতিতে অথবা নৌকোয় কখনও সেই হেমলক গাছের নিচে পৌঁছানো যাবে না। সোনার হরিণেরা বড় বেশি দ্রুত দৌড়ায়।

    জসীম, ঈশম এবং নরেন দাসের দলটা সারারাত লণ্ঠন হাতে খুঁজে হাতিটা এবং মানুষটাকে বার করতে পারল না। ওরা সবাই রাতের দিকে ফিরে এসেছিল। আরও দুটো দলকে শচীন্দ্রনাথ পুবে এবং পশ্চিমে পাঠিয়েছিলেন। তারা নানা রকমের খবর দিল। কেউ বলল, অশ্বত্থ গাছের নিচে গত রাতে পাগল মানুষ এবং হাতিটাকে দেখেছে। কেউ বলল, বারদির মাঠের উত্তরে একদিন দেখা গেছে মানুষটাকে। উত্তর থেকে খবর এল, পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথ হাতিটাকে দিয়ে সব আখের খেত খাইয়ে দিচ্ছেন। কেউ কিন্তু হাতিটার নাগাল পাচ্ছে না। সপ্তাহের শেষ দিকে আর কোনও খবর এল না। সবাই তখন বলল, না আমরা পাগল মানুষ এবং হাতিটাকে দেখিনি।

    বাড়িতে প্রায় সকলের মুখে একটা শোকের ছবি। কেউ জোরে কথা বলছে না। লালটু, পলটু, সোনা সারাদিন বড়িতেই থাকছে। পুকুরপাড়ের অর্জুন গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ওরা প্রতিদিনই হাতিতে চড়ে মানুষটা ফিরছেন কিনা দেখত। বিকালের দিকে জ্যাঠামশাই মাঠের ওপর থেকে উঠে আসবেন প্রতীক্ষায় অর্জুন গাছটার নিচে বসে থাকত। সঙ্গে থাকত সেই আশ্বিনের কুকুর। ওরা প্রিয় মানুষটির জন্য গাছের নিচে বসে সারা বিকেল, যতক্ষণ সন্ধ্যা না হতো, যতক্ষণ গোপাট অতিক্রম করে মাঠের বড় অশ্বত্থ গাছটায় অন্ধকার না নামত, ততক্ষণ অপেক্ষা করত। আর এ-ভাবেই একদিন কুকুরটা ঘেউঘেউ করে উঠল—কুকুরটা কেবল চিৎকার করছে—সূর্য তখনও অস্ত যায় নি। তখন ওরা দেখল কুকুরটা দৌড়ে দৌড়ে মাঠে নেমে যাচ্ছে। আবার সোনার কাছে উঠে আসছে। ওরা দেখল পুবের মাঠে আকাশের নিচে কালো একটা বিন্দুর মতো কি কাঁপছে। ক্রমে বিন্দুটা বড় হচ্ছে। হতে হতে ওরা দেখল এক বড় হাতি আসছে। সোনা চিৎকার করে বাড়ির দিকে দৌড়ে গেল, হাতিতে চইড়া জ্যাঠামশয় আইত্যাছে।

    গ্রামের সকলে দেখল পাগল মানুষ ক্লান্ত। বিষণ্ণ। চোখমুখে অনাহারের ছাপ। তিনি হাতির পিঠে প্রায় মিশে গেছেন।

    হাতিটা হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল উঠোনে। যেন এই হাতি আর কোথাও যাবে না। এখানেই বসে থাকবে। জসীম বলল, কর্তা নামেন। লক্ষ্মীরে আর কত কষ্ট দিবেন!

    গ্রামের সকলে অনুরোধ করল নামতে। কিন্তু তিনি নামলেন না।

    শচীন্দ্রনাথ বললেন, তোমরা সকলে বাড়ি যাও বাছারা, আমি দেখি। বলে, তিনি হাতিটার কাছে গিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, বড়দা, বড়বৌদি কয়দিন ধইরা কিছুই খায় নাই। বৌদিরে কত আর কষ্ট দিবেন!

    কিন্তু কোনও লক্ষ্মণ নেই নামার। শচীন্দ্রনাথ বললেন, সোনা, তর বড় জ্যাঠিমারে ডাক।

    বড়বৌ ঘোমটা টেনে ডালপালা ভাঙ্গা স্থলপদ্ম গাছটার নিচে এসে দাঁড়াল। শচীন্দ্রনাথ বললেন, আপনে একবার চেষ্টা কইরা দ্যাখেন

    বড়বৌ কিছু বলল না। সেই সজল উদ্বিগ্ন এক চোখ নিয়ে হাতির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে মণীন্দ্রনাথ হাতি থেকে নেমে বড়বৌকে অনুসরণ করলেন—তিনি এখন এক সরল বালক যেন। তাঁর এখন বড়বৌর দুই বড় চোখ ব্যতিরেকে কিছু মনে আসছে না। ঘরে ঢুকে দেখলেন, তাঁর প্রিয় জানালাটা খোলা। তিনি সেখানে দাঁড়ালেই তার প্রিয় মাঠ দেখতে পান। এবং তখন মনে হয় মাঠে বড় এক হেমলক গাছ আছে, নিচে পলিন দাঁড়িয়ে আছে। এতদিন অকারণে তিনি নদী বন মাঠের ওপারে পলিনকে খুঁজেছেন।

  • দশ

    দশ

    বড়বৌ পূজার ফুল তুলছিল। শীতকাল। বাগানের ভিতর শীতের সব ফুল ফুটে আছে। খুব ভোরে মালতী স্নান করতে এসেছিল ঘাটে। ঘাটে শীতের কুয়াশা ছিল তখন, ঘাটের সিঁড়িতে রোদ ছিল না। কিরণী আবু পাড়ে বসে ব্রতকথা বলছিল—ওঠ ওঠ সুয্যিঠাকুর ঝিকিমিকি দিয়া…তখন মালতী ঘাটে নেমে গেল। ঘাটে এসে বড়বৌ দেখল, মালতী শীতের ঠাণ্ডায় জলে ডুবে ডুবে স্নান করছে। যেন এই শীত, শীত নয়, মালতী জলের উপর ভেসে যেতে থাকল।

    মালতী এক সময় জল থেকে উঠে পড়ল। ভেজা কাপড়ে হিহি করে কাঁপছে। সে বড়বৌকে ভেজা কাপড়েই কিছু ফুল তুলে দেবার অছিলায় অতসী গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকল।

    বড়বৌ বলল, তোর এই সাত সকালে স্নান?

    মালতী কোনও কথা বলল না। সে ফুলগাছ অথবা ঝোপজঙ্গলের ভিতর উঁকি দিয়ে কি যেন অনুসন্ধান করছে। দেখলে মনে হবে, ওর কিছু হারিয়ে গেছে। সুতরাং মালতীকে বিষণ্ন দেখাচ্ছে। মালতীর পরনে ডুরে শাড়ি-পাতলা। শাড়ি দেখে সেই স্বপ্নটার কথা মনে করতে পারছিল—সেই স্বপ্ন, স্বপ্নে সে মধুমালা সেজে বসেছিল। মালতী ডুরে শাড়ি পরে মধুমালা সেজে বসেছিল। মদনকুমার আসবে, সেই মদনকুমার, যার সখের সীমা ছিল না, যে হাটে বাজারে গেলেই ডুরে শাড়ি কিনতে ভালোবাসতো মালতীর জন্য। স্বপ্নে সেই মানুষ কতদিন পর রাতে ওর কাছে এসেছিল। পাশে বসেছিল। দাঙ্গার কথা বলার সময় মুখ বড় করুণ। তারপর সব ভুলে মানুষটা গল্প করতে করতে ওর মুখ চিবুক টেনে শেষে মালতীকে কোলে নিয়ে ধপাস করে মোটা গদিয়ালা বিছানাতে ফেলে দিয়েছিল। আর কী? আর কী করেছিল স্বপ্নে? স্বপ্নে স্বামীর সঙ্গে সহবাস। সে সহবাসের পর সোজা পুকুরঘাটে স্নান করতে চলে এসেছে। মালতী শরীরের উত্তাপ জলে ভাসিয়ে পাড়ে উঠতেই শুনতে পেল, দক্ষিণের ঘরে এখন কে যেন দুলে দুলে পড়ছে, পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির। শীতের সকাল। মাঘমণ্ডলের ব্রতকথা শেষ করে পালেদের দুই মেয়ে পুকুর পাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছিল। ওরা কবিতার মতো আবৃত্তি করছিল, ওঠ ওঠ সুয্যিঠাকুর ঝিকিমিকি দিয়া, না উঠতে পারি আমি ইয়লের লাগিয়া।

    সোনা পড়ছিল, পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির।

    লালটু পড়ছিল, অ্যাট লাস্ট দি সেফিস জায়েণ্ট কেম্।

    পলটু পড়ছিল, এ প্লাস বি হোল স্কোয়্যার…

    দক্ষিণের ঘরে তখন পড়ার প্রতিযোগিতা চলছে। ওরা তিনজনই চেঁচিয়ে পড়ছে। বাড়িতে দূরদেশ থেকে দীর্ঘদিন পর বুঝি সেই যুবক ফিরে এসেছে। বোধ হয় এখন উচ্চ স্বরে পড়ে এই বালকেরা কত বেশি পড়ছে এবং কত কঠিন পড়া পড়তে হয়, চেঁচিয়ে মানুষটাকে জানাচ্ছে। মালতী গতকাল সন্ধ্যায় খবর পেয়েছে। কিন্তু সংকোচের জন্য আসতে পারেনি। মানুষটাকে দেখার বড় ইচ্ছা। প্রায় সারা রাত সে যেন মানুষটার জন্য জেগেছিল।

    লালটু একই লাইন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ছে। অ্যাট লাস্ট দি সেফিস্ জায়েন্ট কেম্। সেফিস্ জায়েন্ট। মনে মনে উচ্চারণ করল কথাটা। ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। সেই কবেকার কথা। তখন বিলের জলে কুমীর ভেসে আসেনি, তখন মালতী ফ্রক পরত। একদিন সেই কৈশোরে সেফিস জায়েন্ট লুকোচুরি খেলতে গিয়ে মালতীকে সাপ্টে ধরেছিল। চুমু খেয়েছিল। মালতী রাগে দুঃখে ঠিক রাগে দুঃখে বলা চলে না, কেমন যেন রঞ্জিত ওকে না বলে না কয়ে চুমু খেয়ে—কী একটা ফাজিল কাজ করে ফেলেছে। বলতে হয় কিছু, না বললে, কুমারীর সম্মান থাকে না। বড়বৌকে বলে দেবে এমন ভয় দেখিয়েছিল রঞ্জিতকে। পরদিন ভোরে বাপ-মা মরা সেলফিস্ জায়েন্ট কিছু না বলে কয়ে ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল।

    ঠাকুরবাড়ির বড়বৌর পিতৃমাতৃহীন ছোট ভাই-এর খোঁজ-খবর কেউ আর দিতে পারেনি। তারপর কত জল সোনালী বালির নদীতে ভেসে গেল, কত শীত, কত বসন্ত চলে গেল। বিলের জলে যেবার কুমীর ধরা পড়ল—মালতীর সেবারেই বিয়ে। মালতী একদিন চুপি চুপি বলেছিল, বড়বৌদি, রঞ্জিত আপনেরে চিঠি দ্যায় না?

    —দ্যায়।

    —কি ল্যাখে।

    —কিছু লেখে না। শুধু লেখে ভালো আছি।

    —ঠিকানা দেয় না।

    —ঠিকানা দিতে নেই

    —ক্যান?

    —দেশের কাজ করে। ঠিকানা দিতে নেই।

    শীতের সূর্য উঠতে চায় না। রোদ দিতে চায় না। গাছপালার ছায়ায় বাড়িগুলি ঢেকে থাকে। বুড়ো মানুষেরা রোদের জন্য প্রায় হাহাকার করছিল। ভোরের দিকে তখন খুব অন্ধকার নয়, আবার আলোও নয়—মালতী চুপি চুপি ঘাটে আসার সময় দেখেছিল, অমূল্য তাঁতঘরের পাশে বসে আগুন পোহাচ্ছে। খড়কুটো এনে—শীতের দিন বলে শুকনো পাতা সংগ্রহ করে রেখেছিল অমূল্য। অমূল্য বসে সেই খড়কুটোর ভিতর আগুন জ্বেলে শীত থেকে রক্ষা পেতে চেয়েছিল। আর শোভা, আবু, নরেন দাসের বৌ আগুনের পাশে গোল হয়ে বসেছিল।

    মালতী দরজা খুলে বের হবার মুখেই দেখল অমূল্য ওর দিকে তাকিয়ে আছে। মালতী সোজা উঠানে নেমে এল না। চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। আগুনের ভিতর থেকে অমূল্যর মুখ ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। স্বপ্নে দেখা মৃত মানুষটার মুখ, চোখে আর ভাসছে না। শুধু অমূল্যর মুখ চোখে ভাসছে। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল এক অশুচি ভাব শরীরের সর্বত্র। শীতে কোথায় অমূল্যের পাশে বসে আগুন পোহাবে, কোথায় শীতের ভিতর উত্তাপ খুঁজবে-তা না করে মালতী ছুটে গেছে পুকুরে। স্বামীর মৃত মুখ মনে করে জলে অধিক সময় ডুব দিয়ে থেকেছে। অমূল্যর মুখ ভুলে থাকার জন্য, পাপ চিন্তা ভুলে থাকার জন্য মালতী শীতের জলে, ঠাণ্ডা হিমের মতো জলে বোধহয় ডুব দিয়েছিল।

    সুতরাং স্থলপদ্ম গাছটির পাশে দাঁড়িয়ে মালতী মনে করতে পারল না, সে কোন নির্দিষ্ট কারণে এসে জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মালতী এখন ঠাকুরঘরে প্রণাম করছে এবং বিড়বিড় করে বকছে। নিজেকে গালাগালি দিচ্ছে। সে ঠাকুরঘরের দরজায় মাথা ঠুকছিল। যেন ভগবানের ইচ্ছা—বিধবা মানুষের যৌবন থাকতে নেই, সুখ থাকতে নেই, ভালোবাসা থাকতে নেই। যৌবন থাকলে পাপ, ভালোবাসা থাকলে পাপ এবং সুখ চাইলে পাপ। মালতী মাথা ঠুকে ঠুকে বলতে চাইল যেন, ভগবান, তুমি আমার পোড়া যৌবন হরণ করে নাও। আমার পোড়া কপাল। ভালোবাসার কপাল থাকলে আমার মানুষ ঘরে থাকত। রায়টে কাটা পড়ত না। স্বপ্নটার কথা কেবল মনে আসছিল মালতীর। কতদিন পর যেন যথার্থই তার কাছে জল চাইতে এসেছিল। কিন্তু সে যতবার জল নিয়ে ওর হাতে দিয়েছে ততবার মানুষটার মুখ বদলে গেছে। মুখটা যেন অমূল্যের। তাঁতঘরে অমূল্য যেমন হেসে হেসে কথা বলে, যেমন খুব সহজে নেকা নেকা কথা বলে—যেন কিছু জানে না অমূল্য, কিছু বোঝে না, দিদি, অ মালতী দিদি, আমার ঘরে জল পাঠাইয়া দ্যান। দিদি, আপনের জন্য বেথুন পাইড়া আনছি, দিদি, জলের তলে শালুক হয়, শালুকের ফল হয়—আপনের জন্য আমি কী না করছি। স্বপ্নে নিজের মানুষটাকে জল দিতে গিয়ে মালতী কেবল সেই অমূল্যকে বিছানার ওপর বসে থাকতে দেখল।

    মালতী ঘরে ফিরে কাপড় ছাড়ল, সাদা থান পরল একটা। তাঁতের চাদর গায়ে দিল। ঘরের পাশে পেয়ারা গাছের নিচে মালতী আগুন জ্বালল। আজ ইচ্ছা করেই মালতী অমূল্যর পাশে গিয়ে আগুন পোহাতে বসল না। যেন ওর পাশে আগুন পোহাতে বসলেই শরীরের গ্লানিটা আবার ভেসে উঠবে। সে আবুকে ডেকে আনল, শোভাকে কিছু শুকনো কাঁঠালের ডাল এনে দিতে বলল—শীতের জন্য হাত পা বড় বেশি সাদা দেখাচ্ছে। শীতের ভিতর আদর করে ঠাণ্ডা হাত আবুর গালে ঘষে দিল। হাত গরম করতে চাইলে শোভার গালে হাত রাখে। মেয়েগুলি এই শীতেও কেমন গালগলা গরম করে রেখেছে।

    শীতের রোদ লম্বা হয়ে নামছে। বাড়ির নিচে সব জমি, বড় বড় তামাক গাছ সামনের মাঠে। পেছনে সব পেঁয়াজের জমি–পেঁয়াজ, রসুন, আলু, বাঁধাকপি। এবং নরেন দাস জমির জন্য, তাঁতের জন্য সারা মাস খেটে খেটে এই সংসারকে সোজা করে রাখছে! নরেন দাস তার এই সংসারকে বড় বেশি ভালোবেসে সারাক্ষণ মাঠে অথবা তাঁতঘরে কোন-না-কোন কাজের ভিতর ডুবে থাকে। নরেন দাস, পুবের বাড়ির নরেন দাস জমিতে এখন পেঁয়াজের গুঁড়িতে মাটি তুলে দিচ্ছে। মালতী দেখল, এই আগুনের ভিতর থেকে দেখল, নরেন দাস জমির মাটি সোনার মতো হাতে নিয়ে অপলক চেয়ে থাকছে। নরেন দাস মাটির ভিতর কি রস আছে, ফসলের মাটি কি রস দিয়ে গড়া, এই যে সোনার ফসল ঘরে ওঠে কিসের এত পুণ্য এই সংসারে—বোধ হয় নরেন দাস মাটির ভিতর তার রহস্য খুঁজছিল। মাটির সঙ্গে বিড়বিড় করে নরেন দাস তখন কথা বলতে আরম্ভ করে দিয়েছে অথবা গাছগুলির সঙ্গে হতে পারে, কারণ ওর চারদিকে তামাক গাছ, চীনাবাদামের গাছ। কত যত্ন করে জল টেনে নরেন দাস মাটির ভিতর এইসব শস্যকণা পুঁতে দিয়েছিল। এইসব শস্যের জন্য নরেন দাসের বড় ভালোবাসা। প্রতিদিন ভোর হলে নরেন দাস সে তার নিজের জমির ভিতর নেমে আসবে, কিছু না কিছু মাটি গাছের গুঁড়িতে দিতে দিতে গাছের সঙ্গে কথা বলবে, খেতে ভুলে যাবে। জীবনের অন্য সুখ-দুঃখের কথা ভুলে যাবে।

    মালতী বড় একটা ঘটি নিল জলের, কিছু মুড়ি, তেল দিয়ে মেখে বড় বড় দুটো পেঁয়াজের টুকরো নিল হাতে, নুন এবং কাঁচা লঙ্কা নিয়ে জমির পাশে নেমে গেল নরেন দাসকে খেতে দিতে। আর আসার সময় দেখল, গ্রামের সব মানুষই এই শীতের সকালে জমি এবং ফসলের ঘ্রাণে মাঠে নেমে যাচ্ছে। ঠাকুরবাড়ির ছোট ঠাকুর নেমে গেল মাঠে, পিছনে ঈশম—ওরা নিশ্চয়ই সোনালী বালির চরে নেমে যাচ্ছে। ঈশম নিশ্চয়ই জমি থেকে জল নেমে যাচ্ছে না বলে চিন্তিত। নিশ্চয়ই ছোট ঠাকুরকে বিশ্বস্ত মানুষ ঈশম জমিতে নিয়ে গিয়ে এই জল নিয়ে কী করা যায়, কীভাবে জল নামিয়ে দেওয়া যায়, চরের বুক থেকে, সেইসব সলাপরামর্শ করবে। তখন গোপাট ধরে বাজারে যাচ্ছিল মনজুর, জব্বর এবং অন্য অনেকে। নয়াপাড়ার বিশ্বাসেরা, হাসিমের বাপ জয়নাল, আবেদালি কেউ যেন বাকি নেই। সকলে ষাঁড় গরু নিয়ে মাঠের রোদে নেমে আসছে। ফেলু শেখ হাজিসাহেবের খোদাই ষাঁড়টাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে মাঠে। এদের এখন শুধু ফসলের জন্য চাষাবাদ আর এই চাষাবাদই মানুষগুলির সব—আশা আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন অথবা ভালোবাসা। আর কী চায় মানুষগুলি? মানুষগুলি তারপর ধর্ম করতে চায়। হিন্দু পাড়াতে তখন যাত্রা নাটক হবে, রাবণ বধের পালাগান, রামায়ণ গান, রাম সেজে আসবে লোকনাথ পাল। মাঝিবাড়ির বড় সামিয়ানার নিচে ঢোলক বাজবে—গ্রামের বুড়োবুড়িরা তখন কেউ ঘরে থাকবে না। এই শীত এলে কবিগান হয় চন্দদের বাড়ি, বড় বড় ডে-লাইট জ্বলবে, মনে হবে তখন গ্রামটা মেলার মতো। পরাপরদির হাট থেকে দোকানপাট তুলে শ্রীশচন্দ্র চলে আসবে। শীত এলেই কতরকমের মেলা বসবে, দূরে দূরে কত মানুষ চলে যাবে, ঘোড়দৌড় হবে, বাজি জেতার জন্য বিশ্বাস পাড়াতে রোজ ঘোড়দৌড়ের মহড়া হচ্ছে।

    সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, অমূল্যও তাঁতঘরে মহড়া দিচ্ছে। অথচ এই অমূল্য আগে কত হাবাগোবা ছিল। এই অমূল্য সারাক্ষণ তাঁত বুনে ঘরের বার হলে চোখ তুলে তাকাত না পর্যন্ত। অমূল্য মালতীর বান্দা লোক ছিল। সেই অমূল্য কী করে গত বর্ষায়—ওরা সেই যে অষ্টমীর স্নানে এক সঙ্গে এক নৌকায়, বড় নৌকা, প্রায় তেমাল্লা হবে, পাড়ার বড় পিসি, ধনবৌ, মাঝিবাড়ির কালপাহাড়ের মা, নরেন দাস – প্রায় গ্রামের গোটা লটবহর এক নৌকায় শুয়ে বসে একদিনের পথ নাঙ্গলবন্ধ, নাঙ্গলবন্ধের বান্নিতে মালতী সকলের সঙ্গে স্নান করতে গিয়েছিল। অষ্টমীর স্নানে কত মানুষ, নদীর দু-পাড়ে কত দেব-দেবীর মূর্তি। মাটি দিয়ে গড়া ভৈরব ঠাকুরের বড় নীল রঙের পেটের দিকে তাকিয়ে অমূল্য রসিকতা করেছিল। বড় নদী, দু’পাড়া প্রায় দেখা যায় না নদীর। কত নৌকা এসেছে। কত মানুষ এসেছে স্টিমারে, আর পাপ ঢেলে পুণ্য নিতে দু’পাড়ে তিল ধারণের স্থান ছিল না। মালতীও সকলের সঙ্গে নদীর জলে স্নান করতে নেমেছিল। পাড়ে অমূল্য। পকেটে তামার পয়সা। মালতীর হয়ে ঠাকুরের দক্ষিণা, তিলতুলসী সব সংগ্রহ করে দিচ্ছিল। গোটা মেলাতে সে-ই সারাক্ষণ মালতীকে দেখাশুনা করেছে। সে মালতীকে নিয়ে ঘুরেছে—একটা লক্ষ্মীর পট কিনে দিয়েছিল অমূল্য, মালতীর জন্য পয়সা খরচ করতে পেরে অমূল্য গুনগুন করে এক সময় গান ধরেছিল। পয়সা খরচ করার হকদার হতেই মালতী অমূল্যের জিম্মায় কী করে যেন চলে গেল। অমূল্য মালতীকে এক সময় বলেছিল, দিদি আসেন, সাঁতার দিয়া নদী পার হই।

    —নদী পার হইতে তোমার বুঝি ইচ্ছা যায় অমূল্য!

    —বড় ইচ্ছা যায়।

    —নদীর জলে এক কুম্ভীর ভাইস্যা যায়, তোমার গানটা মনে পড়ে অমূল্য?

    অমূল্য বলেছিল, পড়ে।

    মালতী ভিড়ের ভিতরে অমূল্যর দিকে অপলক তাকিয়ে বলেছিল, বড় ডর ঐ কুম্ভীরকে।

    —কোন ডর নাই মালতী দিদি। এবং ডর নাই বলেই হয়তো অমূল্য সারাটা দিন মালতীকে নিয়ে ঘুরতে পেরেছিল। অষ্টমীর স্নানে মালতীকে আর কেউ এত আদর করে সোহাগ করে মেলা দেখায়নি। শোভা, আবু সঙ্গে ছিল না। নরেন দাস তাঁতের কাপড়ের দোকান খুলে বসেছিল আর সেই থেকে অমূল্য হাবাগোবা থাকল না। বান্দা লোক অমূল্যর খাই খাই সহসা বড় বেশি বেড়ে গেল।

    সূর্য এবার গোপাটের ওপাশে উঠে এল। এখন হাতে পায়ে শীতটা জমে নেই। মালতী দেখল হাঁসগুলি গর্তের ভিতর প্যাক প্যাক করছে। মালতী গর্তের মুখ থেকে টিনটা তুলে দিল। হাঁসগুলি গলা বের করে দিল প্রথম। বড় পুরুষ হাঁসটা সকলকে ঠেলে প্রথম বের হয়ে এল। অমূল্য বারদীর হাট থেকে পুরুষ হাঁসটা কিনে দিয়েছে মালতীকে। গত বর্ষায় কোথায় যে তার প্রিয় পুরুষ হাঁসটা হারিয়ে গেল, রাতের অন্ধকারে বিলের মাঠে সে এবং অমূল্য পুরুষ হাঁসটাকে ঝোপে জঙ্গলে খুঁজে খুঁজে পেল না। অন্ধকার রাতে হাঁসটার অন্বেষণে নৌকায় মালতী এবং অমূল্য ধানখেতের ভিতর ঘোরাঘুরি করছিল। সামু নৌকায় গ্রামে ফেরার সময় ওদের দেখে অমূল্যকে বলেছিল, অমূল্য বাড়ি যাও। মালতীকে বলেছিল, আনধাইর রাইতে মাঠে ঘাটে একা ঘুরতে নাই মালতী। বাড়ি যা। হাঁসটা আমি দ্যাখতাছি কই গ্যাল। সামু শেষ পর্যন্ত হাঁসটার খোঁজ দিতে পারেনি, হাঁসটা নিখোঁজ হবার পর থেকেই মালতী বড় ম্রিয়মাণ ছিল। অমূল্যর পুরুষ হাঁসটা নীল, কালো এবং খয়েরী রঙের। কী করে, কত কষ্ট করে এবং সারা হাট ঘুরে মাত্র এই একটা তাজা হাঁস মালতীর জন্য অমূল্য সংগ্রহ করতে পেরেছে, প্রায়ই কথায় কথায় এই হাঁসের জন্য অমূল্যর কী কষ্ট গেছে, অমূল্য কত লোককে একটা ভালো পুরুষ হাঁস মালতী দিদির জন্য বলে রেখেছিল—সময়ে অসময়ে কথাটা শোনাবার চেষ্টা করত। আর এই হাঁস কিনে দেবার পর থেকে অমূল্যর আবদারটা আরও বেড়ে গেল। অমূল্য, তুমি তাঁত বুনে খাও, বিধবার ধম্ম কী বুঝবে! যেন মালতীর বলার ইচ্ছা, বিধবার সম্মান বৈধব্যে, বিধবার শাক অন্নে। তুমি অমূল্য, তাঁতের খটখট শব্দ শুনে দু’কান ভোঁতা করে রেখেছ, নাকে তোমার গন্ধ থাকে না, চোখে তোমার স্বপ্ন ঝোলে—আমি বিধবা মালতী সারাদিন এই সংসার করে, ঘরদোর পরিষ্কার রেখে তোমার তাঁতের নলী ভরে শাক অন্নে আমার ভুরিভোজন। ঢেকুরে আঁশের গন্ধ থাকলে আমার সম্মান বাঁচে না। পুরুষ হাঁসটার মতো বনেবাদাড়ে, জলের ঘাটে অথবা রাতের আঁধারে ঘাড় কামড়ে সুখ পেতে চাও, তাতে আমার সম্মান বাঁচে না। তুমি আমায় ভালোবাসা দাও, শুধু আঁশের আশায় ঘুরলে আমিও একদিন গলা কামড়ে দেব। শুধু আঁশে আমার ভালোবাসা কথা কয় না।

    স্বপ্নটা দেখার পর থেকেই কেন জানি অমূল্যর প্রতি নৃশংস ভাবটা আরও বেড়ে গেল। অমূল্য আর জব্বর বড় বেশি ঘুরঘুর করছে। মালতী ভাবল, দাদাকে একদিন সে সব বলে দেবে। কারণ জব্বরও কম যায় না। জব্বরের কথা মনে আসতেই মালতীর মুখটা ঘৃণায় কুঁচকে গেল।

    মালতী এখন হাঁস নিয়ে ঘাটে যাচ্ছে। মনে মনে অমূল্য ওর ভিতরে তাঁত বুনছে। একবার এদিক, একবার ওদিক। পুরুষ হাঁসটা অন্য হাঁসগুলিকে জলে নামতে দিচ্ছে না। তার আগেই ঠোঁট কামড়ে ঝগড়া করতে চাইছে। মালতী পুরুষ হাঁসটার কাণ্ড দেখে অন্যদিনের মতো আজও মুখে আঁচল চাপা দিল। ওর ভিতর থেকে এখন আবার সেই দুষ্ট হাসিটা মুখে খেলে গেল। তর সয় না। মালতী হাঁসগুলিকে জলের দিকে নিয়ে যাবার সময় কথাটা বলল। আর এইসব দেখলেই মনটা তাঁতের মাকুর মতো কেবল এদিক ওদিক করতে থাকে। এই একটা ইচ্ছার ভাব থাকে ভিতরে, সাপ্টে ওকে কেউ খেয়ে ফেলুক। কিন্তু ফের কেন জানি মনে হয়, বিধবা মানুষের এই ইচ্ছা ভালো নয়। তখন শুধু স্নানের ইচ্ছা, ডুবে ডুবে শরীর থেকে সব পাপ চিন্তা মুছে দেবার ইচ্ছা। যেন স্নান না করলে জাত যাবে। তারপর আবার মনে হয় বিধবার আবার জাত, বিধবার আবার ছোট বড়—সবল যুবতী মালতী যার অঙ্গে লাবণ্য ঝরে পড়ে—যার মুখ পেঁয়াজের কোমল খোসার মতো নরম আর যার ইচ্ছার ঘরে অমূল্য শুধু একটা বাঁদর—সারাক্ষণ লেজ তুলে বসে আছে, সেই অমূল্যকে স্বপ্নে দেখে মুখ বড় বিস্বাদ লাগছিল।

    হাঁসগুলি জলে নেমে গেলে মালতী একবার চারদিকে তাকাল। হাঁসগুলি ডুবে ডুবে স্নান করছে। কেউ নেই কাছে। তামাক খেত পার হলে উঁচু জমি, জব্বর সেখানে হালচাষ করছে। নরেন দাস জমির নিচ থেকে রস তুলে পেঁয়াজ রসুন অথবা চীনাবাদামের শরীর পুষ্ট করার চেষ্টায় আছে। আর যেন কোথাও কোনও দৃশ্য ঝুলে নেই। শুধু ঠাকুরবাড়ির সোনা পড়ছে—পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির। লালটু পড়ছে, অ্যাট লাস্ট দি সেফিস্ জায়েন্ট কেম। জব্বর হাল চাষ করছে। মালতীকে দেখতে পেলে জব্বর গাই গরু ফেলে এক্ষুনি ছুটে আসবে—মালতী দিদি, বদনাতে পানি দ্যান। গলাটা শুকাইয়া গ্যাছে মালতী ভাবল, জব্বর এলে সামসুদ্দিনের খবর নেবে। সামু এখন এখানে নেই। ঢাকা গেছে। পাগল ঠাকুর হাতি দিয়ে ওদের জলসা ভেঙে দিয়েছিলেন। ফেলু শেখের হাত ভেঙে দিয়েছেন। তারপর থেকে সামু বুঝি হিন্দুপাড়া আসা ছেড়ে দিয়েছে। ছোট ঠাকুর শচীন্দ্রনাথ একদিন গোপাটে দাঁড়িয়ে সামুর সঙ্গে কি সব কথা বলতে বলতে বচসা করেছিলেন। সেই থেকে সামু আর আসে না। সামুর মেয়েটা মাঝে মাঝে গোপাটে এসে ওদের ছাগল গরুগুলি নিয়ে যায়। বড় নথ নাকে দিয়েছে মেয়েটা। ঠাকুরবাড়ির অর্জুন গাছটার নিচে দাঁড়িয়েছিল। কারও জন্য অপেক্ষা করছিল। মালতী চুপি চুপি হেঁটে গিয়ে বলেছিল, কিরে ফতিমা, তুই!

    ফতিমার ছোট চোখ। বড় নথ নাকে। শিশু বয়সের মুখচোখ শুধু লাবণ্যে ভরা। বিনুনী বাঁধা চুল। ফতিমা কিছুক্ষণ মালতীর দিকে তাকিয়ে বলেছিল, পিসি, সোনাবাবুরে দিয়েন। বলে, সে কোঁচড় থেকে দুটো লটকনের থোকা মালতীর হাতে দিয়েছিল।

    অসময়ে লটকন ফল! সুতরাং মালতী বিস্মিত

    ফতিমা নিজেই বলল, আবেদালি চাচা উজান থাইকা আনছে

    মালতীর কেন জানি দু’হাতে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছা হয়েছিল। কিন্তু মুসলমানের মেয়ে ছুঁয়ে দিলেই জাত যাবে। সে লটকনের ফল খুব আলগা করে হাতে নিল। সে ফতিমাকে ছুঁল না। শুধু হাসতে হাসতে বলল, সোনাবাবুর লাইগা বড় কষ্টরে তোর। বড় হইলে বাবুর লগে বিয়া দিয়া দিমু।

    ছোট মেয়ে। অথচ সামান্য রসিকতা ফতিমাকে কেমন লজ্জিত করেছিল। ফতিমা আর দাঁড়ায় নি। সে গোপাট ধরে ছুটছিল। লজ্জায় হোক অথবা অন্য এক কারণ যেন, মেয়েটাকে গোপাট ধরে ছুটে যেতে সাহায্য করছে। অথবা এত যে গাছগাছালি যার ছায়া সারা গ্রামে এবং মাঠে জড়িয়ে আছে তার ভিতর নিরন্তর এক সুষমা আছে যেন। এই সুষমা, ভালোবাসার সুষমা মেয়েটার সারা অঙ্গে লেপ্টে আছে। হেমন্তের শেষ বিকেল ছিল সেটা। মেয়েটা ক্ৰমে এক সুষমার ভিতর হারিয়ে গেল।

    সেই সুষমা মালতীকে দীর্ঘদিন অভিভূত করে রেখেছে। সোনা পড়ছে তখনও—পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির। হাঁসগুলি জলে ডুবছিল ভাসছিল। পাড়ে দাঁড়িয়ে মালতী। জলে ওর লম্বা ছায়া, মালতী জলে নিজের মুখ দেখতে পাচ্ছে। এই পাড়ে দাঁড়িয়ে কত কথা মনে হয়, সামুর কথা মনে হয়। রসো এবং বুড়ির কথা মনে হয় আর সেই মানুষের কথা মনে হয়। সে মানুষ কৈশোরে ওকে সাপ্টে চুমু খেয়েছিল তারপর ভয়ে নিরুদ্দিষ্ট। সেই মানুষ গত রাতে এসেছে। এখন আর তেমন ছোট নেই। কথায় কথায় ঝগড়া করবে না। এখন মানুষটা বড় এবং মহৎ। মানুষটা দেশের কাজ করে বেড়াচ্ছে। জেলে ছিল কিছুদিন। সবই এখন কেন জানি গল্পকথার মতো মনে হয়। মালতী জলে আর হাঁস দেখতে পাচ্ছিল না, শুধু মানুষটার শরীর মুখ জলের ওপর ভেসে যেতে দেখছে। এই মানুষটাকে দেখার জন্য কেমন পাগলের মতো ঠাকুরবাড়ির ঘাটে সারাটা সকাল ডুবে ডুবে স্নান করল। বড়বৌর জন্য পূজার ফুল তুলে দিল। এমন কি ঠাকুরঘরের পাশে মানুষটাকে দেখতে পাবে ভেবে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু কোথায়! ফের সেই অমূল্যর মুখ, অমূল্য এবং জব্বর উভয়ে মিলে কেবল যেন ওকে গিলতে আসছে। সে মানুষটার জন্য ঠাকুরঘরের দরজায় অধিক সময় অপেক্ষা করতে পারল না—কেউ দেখে ফেলে এই ভয়ে। এমন কি বড়বৌকে বলতে পারল না, বৌদি, রঞ্জিত নাকি কাইল রাতে আইছে? কারণ, ভালোবাসার সুষমা মালতীর চোখে। মালতী রঞ্জিতকে দেখার জন্য ঘাটের পাড়ে যেসব ঝোপজঙ্গল ছিল সেখানে নিজেকে অদৃশ্য করার ইচ্ছাতে বসে পড়তেই কে যেন বলে উঠল, মালতী, তুমি এখানে একা।

    মালতীর বুকটা ধড়াস করে উঠল। সে পিছনের দিকে মুখ ফেরাতেই দেখল রঞ্জিত দাঁড়িয়ে আছে। হাত ধরে আছে সোনা। সব লুকোচুরি এবার বুঝি ফাঁস হয়ে গেল। মালতী প্রথম মাটি থেকে কিছুতেই চোখ তুলতে পারল না, পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির—এখন আর কেউ পড়ছে না। সব সহসা বড় চুপ মেরে গেছে। এমন কি কীট-পতঙ্গের আওয়াজ টের পাওয়া যাচ্ছে না। মালতী ভয়ে ভয়ে বলল, হাঁস ছাড়তে আইছি। এই বলে মুখ তুলে তাকাল রঞ্জিতের দিকে। মনে হল এখন কোথাও কিছু চুপ হয়ে নেই। সকল কিছু ডেকে বেড়াচ্ছে, হাঁস-মুরগি,গরু-বাছুর, কাকপক্ষী সকলেই কলরব করছে। ঠিক তখনই মালতী তাঁতঘরে অমূল্যর ঠকঠক তাঁতের শব্দ শুনতে পেল।

    রঞ্জিতকে দেখে মালতীর দীর্ঘদিন পর সব ভয় কেটে গেছে। জব্বর অথবা অমূল্য কেউ বুঝি আর তাকে গিলে খেতে পারবে না।

    কোথাও যেন তখনও একই স্বরে কে পড়ে আছে—অ্যাট লাস্ট দি সেফিস্ জায়েন্ট কেম। মালতী কান পেতে শোনার সময় রঞ্জিতের দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসল। রঞ্জিতও সামান্য না হেসে পারল না।

  • এগার

    এগার

    মালতীর দিনগুলি মন্দ কাটছিল না। রঞ্জিত আসার পরই মালতীর মনে হল ওর কী যেন হারিয়ে গিয়েছিল জীবন থেকে, কী যেন নেই, সংসারে কী না থাকলে ফাঁকা ফাঁকা মনে হয় এমন এক জিনিস রঞ্জিত ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে মালতীর জীবনে ফিরে এসেছে।

    শীতকাল বলে বেলা তাড়াতাড়ি পড়ে যায়। শীতকাল বলে জলে বাঁশ পচা গন্ধটা তেমন তীক্ষ্ণ মনে হচ্ছে না। আর শীতকাল বলেই গ্রামের সকলে সকাল সকাল জল নিতে চলে আসে কুয়োতে।

    চাকের কুয়ো লম্বা। গলা পর্যন্ত দাঁড়ালে দেখা যায়। কুয়োতলা পার হলে বাঁশঝাড়। ঈশম শক্ত বাঁশ খুঁজছে। রঞ্জিত একটা করে কোপ মেরে আলগা করে দিচ্ছে আর ঈশম সেই বাঁশ টেনে বের করে কঞ্চিগুলি ছেঁটে দিচ্ছিল। যারা জল নিতে এসেছিল ওরা বেশিক্ষণ কুয়োতলায় অপেক্ষা করল না। বড়বৌর সেই নিখোঁজ ভাইটি ফিরে এসেছে। সরু গোঁফ, বড় চোখ আর বিদেশ বিভুঁয়ে থাকে বলেই হয়তো শরীরে এক ধরনের শ্যামল লাবণ্য। মালকোঁচা মেরে ধুতি পরেছে, চুল কোঁকড়ানো, মাথার মাঝখানে সিঁথি—লম্বা মানুষ রঞ্জিতকে এখন আর দেখলে চেনাই যায় না, বাপ-মা মরা সেই বালক এত বড় হয়ে এখন মশাই হয়ে গেছে।

    যারাই জল নিতে এসেছিল তারা সকলেই প্রায় বালতি ফেলছে কুয়োর ভিতর এবং জল তুলে আনার সময় রঞ্জিতকে দেখছে। সুদর্শন এই যুবকটিকে সকলেই একনজরে চিনতে পেরেছিল, কতদিন আগের কথা যেন, কেউ কেউ ডেকে ওর সঙ্গে কথা বলল, যাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, সে যাদের দিদি বলে ডাকত, পাড়াপড়শী যারা এক সময় ওকে স্নেহ-ভালোবাসা দিয়েছিল, মা-মরা ছেলে বলে যারা ওকে সামান্য ভালোমন্দ হলে ডেকে খাওয়াত তারা জল তুলে নিচে নেমে গেল এবং ওর সঙ্গে কথা বলে ঘরে ফিরে গেল।

    মালতী এল সকলের শেষে। ওর কাঁখে কলসী, পরনে তাঁতের শাড়ী। মালতী যে বিধবা, এ-শাড়ি পরলে মনে হয় না। মনে হয় কুমারী মালতী শখ করে এখন জল তুলতে এসেছে। মনে হয় মালতী এই মানুষের সামনে সাদা থান পরতে লজ্জা পায়। সে এসেই সোজা কুয়োতলায় কলসী রেখে যেখানে রঞ্জিত বাঁশ কাটছিল সেখানে গিয়ে দাঁড়াল—এত বাঁশ! এত বাঁশ দিয়া কি হইব?

    রঞ্জিত বলল, জলে ভিজিয়ে রাখব। লাঠি হবে, পাকা বাঁশের লাঠি।

    সোনা আশেপাশে ছোটাছুটি করছে। সে এই নতুন মানুষটিকে কখনও ছাড়ছে না। মানুষটি তাকে কত দেশ-বিদেশের সব অদ্ভুত গল্প বলছে। অদ্ভুত সব ম্যাজিকের কথা বলছে।

    সোনা বলল, পিসি, রঞ্জিত মামা রাইতের ব্যালা ম্যাজিক দেখায়।

    মালতী আর একটু নেমে গেল। যেখানে ঈশম বাঁশের গুঁড়িতে দা রেখে কাটা বাঁশ ঝাড় থেকে টেনে নামাচ্ছে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল এবং বলল, তর মামার কথা আর কইস না!

    রঞ্জিত মালতীর দিকে তাকাল না। সে বাঁশের কঞ্চি কেটে সাফ করছে কারণ মালতীর কোনও রহস্যজনক কথা শুনলেই শুধু সেই দৃশ্যটা মনে পড়ে। সেদিন মালতী রাগে অথবা ক্ষোভে কিংবা হয়তো উত্তেজনায় কেঁপে কেঁপে উঠেছিল। চোখ মুখ লাল, চোখ ভিজা ভিজা, যেন মালতীর সব সতীত্ব রঞ্জিত কেড়ে নিয়েছে। প্রায় মালতী কেঁদে ফেলেছিল। রঞ্জিতের সেই কথা মনে হয় আর মনে হয়—মালতী তোমার সেই দৃশ্যটা মনে পড়ে না। মালতী তুমি দিদিকে আর কিছু বলনি তো!

    রঞ্জিত এবার মালতীর দিকে সহজভাবে তাকাল। বলল, মামার কথা বলতে নেই কেন?

    রঞ্জিত এমনভাবে তাকাল, যেন মালতীরও সেই দৃশ্যটা মনে পড়ুক এমন এক ইচ্ছা। সুতরাং মালতী আর দেরি করল না। সে জল ভরে চলে গেল। চলে গেলেই শেষ হয়ে যায় না। যেতে যেতে বড়বৌদির সঙ্গে গল্প করল। বড়বৌ এবং ধনবৌ ঢেঁকিতে ঠাকুর-ভোগের জন্য ধান ভানছে। ভানা ধান ঢেঁকির মাথার কাছে বসে শশীবালা ঝাড়ছিলেন। পাগল ঠাকুর আজ কোনওদিকে বের হয়ে যাননি। তিনি উঠোনে আপন মনে পায়চারি করছেন। মালতী উঠোনে এসেও বাঁশের কোপ শুনতে পেল। এই বাঁশ দিয়ে কী হবে, বাঁশ দিয়ে লাঠি হবে! তার তোড়জোড় হচ্ছে। মানুষটার শরীর হাত পা মুখ, সারাক্ষণ কেন জানি বুকের ভিতর নড়েচড়ে বেড়ায়। এমন মানুষটাকে দেখার জন্য ছলছুতো করে কেবল এ-বাড়িতে চলে আসা। কী আর কাজ মালতীর, নরেন দাস এখন আর বাড়িতে নেই। অমূল্য মাথায় ডুরে শাড়ি নিয়ে বাবুর হাটে গেছে নরেন দাসের সঙ্গে। এখন বাড়িতে শুধু শোভা, আবু, মালতী। আভারানী আছে, কিন্তু এত নিরীহ যে মনেই হয় না একটা মানুষ বাড়িতে আছে। আভারানীকে রঞ্জিত বৌদি বলে ডাকে। রাতের বেলায়, যখন শীত বলে সকলে তাড়াতড়ি শুয়ে পড়ে, যখন বৈঠকখানায় শচীন্দ্রনাথ লালটু পলটুকে পড়াতে বসেন তখন রঞ্জিত নিজের ঘরে বসে সামান্য আলোতে কি সব বড় বড় বই পড়ে। কত পড়ে মানুষটা! মানুষটা এখন কম কথা বলে, বেশি কথা বললে মালতীর দিকে তাকিয়ে একটু হাসে, যেন অজ্ঞ লোকের কথা শুনে হাসছে। তখন অভিমানে মুখটা লাল হয়ে ওঠে মালতীর। মানুষটা তখন অপরাধীর মতো চোখ করে তাকায়। তাকালেই কিছু দৃশ্য, ভয়ে মানুষটা নিরুদ্দেশে চলে গেল।

    মালতী একদিন বলেছিল, এত ডর পুরুষ মাইনসের ভালো না।

    —আমার আবার ডর কিসের?

    —ডর না! মুখে কইলেই কি সব কওয়ন যায়!

    —আমার কিন্তু মনে হয়েছিল তুমি দিদিকে সত্যি বলে দেবে।

    —আর কিছু মনে হয় নাই ত!

    —আবার কি মনে হবে!

    —ক্যান, মালতীর নামে কত কথা মনে হইতে পারে।

    —আমার আর কিছু মনে হয়নি মালতী। আমি তারপর অনেক দূরে চলে গেছলাম। আসাম চলে যাই। সেখান থেকে ফিরে আসি দু’বছর পর। কলকাতায় লাহিড়ীমশাইয়ের সঙ্গে দেখা। তিনিই আমাকে প্রায় টেনে তুলেছেন। বলতে বলতে থেমে যেত রঞ্জিত। স্বপ্ন দেখতে শিখে গেলাম। এ-সব এখন খুব তুচ্ছ মনে হয়। বোধ হয় বেশি বলা হয়ে গেল। তার গোপন জীবনের কথা বুঝি ফাঁস হয়ে গেল। সে সহসা থেমে আর কিছু বলতে চাইত না। নিজের কথা ভুলে গিয়ে বলত, তুমি কেমন আছ। তোমার সব খবরই আমি রাখতাম। তুমি যে এখানে চলে এসেছ তাও। কিন্তু তারপর?

    —তারপর আবার কি! যেন বলার ইচ্ছা, তারপর খা আছে সে তো দেখতেই পাচ্ছ। এই নিয়ে আছি।

    —সামুকে আর দেখি না কেন?

    —সামু ঢাকা গ্যাছে। লীগ লীগ কইরা দ্যাশটারে জ্বালাইয়া দিল।

    —সামু তবে পার্টি করে!

    —পার্টি না ছাই। মালতীকে খুব হিংস্র দেখাচ্ছিল। মালতী বলল, লাঠি ত বানাইতেছ মেলা। কিন্তু লাঠিতে মাথা ভাঙতে পার কয়টা?

    —লাঠি তো মালতী মাথা ভাঙার জন্য নয়, মাথা রক্ষা করার জন্য। আমি ভেবেছি, এখানেই মূল আখড়া করব। তারপর আরও তিনটে ছোট ছোট আখড়া খুলব। একটা বামন্দিতে, একটা সম্মান্দিতে আর একটা বারদীতে। তারপর সেখানে থেকে যারা শিখে ফেলবে তারা আবার তিনটে করে নতুন আখাড়া খুলবে। গ্রামে গ্রামে আখড়া খুলে আমাদের প্রত্যেককে লাঠি খেলা, ছোরা খেলা সব শিখে নিতে হবে। নিজের মাথা রক্ষা করার জন্য এসব করছি। অন্যের মাথা ভাঙার জন্য নয়।

    মালতী কেমন লজ্জা পেল বলে। তারপর বলল, তুমি আমারে দুই চারটে কৌশল শিখাইয়া দ্যাও। আমারে লাঠি খেলা শিখাইলে তোমার আবার জাত যাইব না ত?

    —জাত যাবে কেন?

    —আমি মেয়েমানুষ। অবলা জীব।

    —অবলা জীবদেরই বেশি শিখতে হবে। আরম্ভ হোক, সব গোছগাছ করে নি। খেলা জমে উঠুক।

    —খেলা শিখাইবে কে?

    —আমি।

    —তুমি আবার এইসব শিখলা কবে?

    —এক ফাঁকে শিখে ফেলেছি।

    —তুমি কত না কিছু জান! কত কিছু না করতে পার!

    —আমি কিছুই করতে পারিনি মালতী। কত কিছু করার আছে আমাদের। তুমি সব জানলে অবাক হয়ে যাবে।

    —আমারে দলে নাও না।

    —দল পেলে কোনখানে?

    —এই যে তুমি লাঠিখেলার দল করতাছ।

    দল কথাটা বলতেই রঞ্জিত কেমন সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। দল বলা উচিত নয়। কারণ সে এখানে গোপনে কিছুদিন বসবাস করতে এসেছে। সে বলল, না, কোন দল করছি না মালতী। আমার দল করার কি আছে।

    —ক্যান, বৌদি যে কইল তুমি দ্যাশের কাজ কইরা বেড়াও।

    —তা হলে দিদি তোমাকে সব বলেছে। বলে সামান্য সময় চুপ করে থাকল রঞ্জিত। সকালবেলার রোদ ওদের পিঠে পড়ছিল। ওরা দীনবন্ধুর বড় ঘরটার পিছনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। লালটু পলটু সোনা সকলেই ওকে ঘিরে আছে। ওরা মালতী পিসিকে দেখছে। মামা, মালতী পিসির মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে, মালতী পিসি মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলছে।

    মালতী কিছু বলতে যাচ্ছিল। দেখল এইসব ছোট ছোট ছেলেদের সামনে বলা ঠিক না। মালতী আর কথা না বলে চলে গেল।

    খুব গোপনে কাজ করছিল রঞ্জিত। সে লাঠি খেলা ভিতর বাড়ির উঠোনে, জ্যোৎস্নায় অথবা মৃদু হারিকেনের আলোতে শেখাবার চেষ্টা করছে। যেন কেউ না জানে। কেবল বড়বৌ, ধনবৌ পাগলা ঠাকুর সাক্ষী থাকত। সোনা, লালটু, পলটু ঘুমিয়ে পড়লে উঠোনে লাঠি খেলা আরম্ভ হতো। কিন্তু একদিন রাতে সোনা পাশে খুঁজতে গিয়ে দেখল মা নেই। মা কোথায়! সে ঘুম থেকে উঠে বসল। দরজা খোলা। উঠোনে লাঠির ঠকাঠক শব্দ পাচ্ছে। জ্যোৎস্না রাত। আবছা আলোতে সে বুঝতে পারল, মা উঠোনের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছেন। সে নেমে দরজা পার হয়ে মায়ের কাছে চলে গেল। আট দশজন গ্রামের জোয়ান লোক রঞ্জিত মামার কাছে লাঠি খেলা শিখছে। অন্য পাশে কারা যেন—বুঝি মালতী পিসি, বুঝি কিরণী দিদি এবং ননী, শোভা, আবু। ওরা কাঠের ছোরা নিয়ে খেলছিল, খেলা শিখছিল। মা এবং জেঠিমা পাশে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিল আর বোধহয় পাহারা দিচ্ছিল। এদিকে কেউ আসছে কিনা লক্ষ রাখছে। লাঠির ঠকাঠক শব্দ উঠছে। শির, বহেরা কটি এমন সব শব্দ। ছোট মামা কেমন মন্ত্রের মতো তালে তালে বলে যাচ্ছেন। মাঝে মাঝে ছোট মামা লাঠি ঘুরাতে ঘুরাতে এত বেগে এদিকে ধেয়ে আসছেন যে টের পাওয়া যাচ্ছে না ছোট মামার হাতে লাঠি আছে, কেবল বনবন শব্দ। তিনি ঘুরে ঘুরে, কখনও ডান পা তুলে, কখনও বাঁ পা তুলে, যেন মানুষটা এই লাঠির ভিতর বেঁচে থাকার রহস্য খুঁজে পেয়েছে, মানুষটা লাঠিটাকে নিজের ডান হাত বাঁ হাত করে ফেলছে, যেমন খুশি লাঠি চালাচ্ছে। সোনা মাঝে মাঝে লাঠির ভিতর ছোট মামার মুখটা হারিয়ে যাচ্ছে দেখতে পেল।

    সোনাও খুব উত্তেজনা বোধ করছিল ভিতরে ভিতরে। সামান্য কাকজ্যোৎস্না। কামরাঙা গাছের ওপাশে তেমনি বিস্তৃত মাঠ নিঃসঙ্গ জ্যোৎস্নায় শুয়ে আছে। পাগল জ্যাঠামশাই দাওয়ায় বসে হাত কচলাচ্ছেন আর মাঝে মাঝে ক্ষেপে গিয়ে সেই এক উচ্চারণ। সংসারে যেন আপদ লেগেই আছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ছোট মামা মাঝে মাঝে ছুটে যাচ্ছিলেন মালতী পিসির দিকে। মালতী পিসি কাঠের ছোরা নামাতে গিয়ে কোথায় ভুল করছে শুধরে দিচ্ছেন। দাওয়ার পাশে সব বড় বড় লাঠি দাঁড় করানো। তেল মাখানো বলে লাঠিগুলি এই সামান্য জ্যোৎস্নায়ও চকচক করছে। কেউ লাঠি ঘুরাতে ঘুরাতে পরিশ্রান্ত হলে, লাঠিটা দাওয়ার পাশে রেখে উঠোনের উপর দু’পা ছড়িয়ে বসে যাচ্ছে। ছোট মামা হাতকাটা গেঞ্জি গায়ে অনবরত দৃষ্টি রাখছেন সকলের উপর। সোনা আর কাফিলা গাছের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে ছুটে মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

    ধনবৌ বলল, তুমি সোনা!

    —আমার ভয় করতাছে।

    ঘরের অন্ধকারে সোনা একা থাকতে ভয় পাচ্ছিল। সে ফের বলল, মা এইটা কি হইতাছে?

    —লাঠিখেলা।

    রঞ্জিত দেখতে পেল সোনা ঘুম থেকে উঠে এসেছে। সে সোনাকে কাছে ডেকে বলল, তুই খেলা শিখবি?

    —শিখমু। খুব আগ্রহের সঙ্গে কথাটা বলল সোনা।

    —কিন্তু অনেক সাধনা করতে হয়।

    সোনা সাধনা কথাটার অর্থ জানে না। সোনা বলল, মা সাধনা মানে কি মা?

    রঞ্জিত বলল, ধনদি কি বলবে। আমার কাছে আয়। সাধনা মানে হচ্ছে তুমি যা করবে, একাগ্রচিত্তে করবে। কেউ তোমার এই ইচ্ছার কথা জানবে না।

    —আমি কমু না।

    —হ্যাঁ বলতে নেই। যদি না বল, তবে তোমাকে শেখাতে পারি।

    —দ্যাখবেন, আমি কমু না

    রঞ্জিত জানত এইসব কথার কোনও অর্থ হয় না। এইসব বালকদের রঞ্জিত দলে নিয়ে নিল। বলে দিতে পারে, নাও পারে, তবু ওদের একাগ্রচিত্ত করার জন্য মাঝে মাঝে রঞ্জিত নানাভাবে বক্তৃতা করত। সুতরাং সোনা, লালটু, পলটু এই দলে ক্রমে ভিড়ে গেল। ওরা খেলার চেয়ে ফাইমরমাস খাটায় বেশি উৎসাহ বোধ করত। রাত ঘন হলে কোনওদিন সোনা ঘুমিয়ে পড়ত। ওর খেলার কথা মনে থাকত না। ভোর হলে মামাকে বলত, আমি তোমার লগে কথা কমু না।

    —কেন কি হল?

    —তুমি কাইল আমারে খেলাতে লও নাই।

    —তুমি তো ঘুমিয়ে পড়েছিলে।

    .

    সোনা মাঝে মাঝে মামার মতো অথবা বড় জেঠিমার মতো কথা বলতে চেষ্টা করত। মামা যেন তার অন্য গ্রহের মানুষ। স্পষ্ট এবং ধীর গলায় কথা বলে। মালতীরও ইচ্ছা হত রঞ্জিতের মতো কথা বলতে। বড়বৌদি এবং এই রঞ্জিতের কথা এত মিষ্টি যে, মনের ভিতর কেবল গুনগুন করে বাজে। ওদের কথা এতটুকু কর্কশ নয়। মালতীর মনে হত ওর কথা কর্কশ। সে সেজন্য যতটা পারে রঞ্জিতের সঙ্গে কম কথা বলে। রঞ্জিত আজকাল কাজের কথা ব্যতিরেকে অন্য কথা বলতেই চায় না। সে তাকে বাড়ি পৌঁছে দেবার সময় বলত, তোমার খুব একাগ্রতার অভাব মালতী। তুমি খুব যেন অন্যমনস্ক, খেলার সময় অন্যমনস্ক হলে মাথায় মুখে কোনদিন লেগে যাবে।

    মালতী তখন উত্তর দিত না। কি উত্তর দেবে! এই খেলা যেন নিত্য তার সঙ্গলাভের জন্য। যেন এই মানুষ এসে গেছে তার, এখন আর ভয় কিসের! রঞ্জিতের সব কথা সেজন্য সে চুপচাপ শুনে যেত কেবল। কোনও কোনদিনও মালতীকে স্বাভাবিক করে তোলার জন্য সে এই অঞ্চলের ভাষা ব্যবহার করত। তখন আরও গা জ্বলে যেত মালতীর। এসব গ্রাম্য আঞ্চলিক ভাষা যেমন কর্কশ তেমন শ্ৰীহীন! রঞ্জিত এমন ভাষায় কথা বললে, তার কাছে আর কিছু চাইবার থাকে না। মালতী বিরক্ত হয়ে বলত, তোমার আর ঢং করতে হবে না রঞ্জিত। ইচ্ছা করলে আমিও তোমার মতো কথা বলতে পারি। তুমি যা ভাল করে বলতে পার না, তা বলো না। বড় খারাপ লাগে। তোমার সঙ্গে আমি ছেলেবয়স থেকে বড় হয়েছি।

    রঞ্জিত কেমন অবাক হল ওর কথা শুনে। তোমাকে মালতী আর গ্রাম্য বলে ধরাই যায় না।

    মালতী বলল, তবু যার যা তার তা। আমার মুখে তোমার ভাষা মানাইব ক্যান। তুমিও যা ভাল কইরা কইতে পার না, তা কইতে যাইয় না। বড় খারাপ লাগে শুনতে।

    .

    সোনা বলল, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তুমি ডাকলা না ক্যান?

    —ঠিক আছে, আজ রাতে তোমাকে ডেকে তুলব। কিন্তু শর্ত আছে।

    —শর্ত! শর্ত কথাটাই শোনেনি সোনা। সে বলে, ছোটমামা শর্ত কি! –তুমি সোনা শুধু মাঠ দেখেছ।

    —মাঠ দেখেছি।

    —ফুল দেখেছ।

    —ফুল দেখেছি। সোনা মামার মতো কথা বলতে চেষ্টা করল।

    —আর সোনালী বালির চর দেখেছ।

    —চর দেখেছি। তরমুজ দেখেছি।

    —কিন্তু শর্ত দ্যাখো নি।

    —না।

    শর্ত বড় এক দৈত্য। এই দৈত্য কাঁধে চাপলে মানুষ অমানুষ হয়ে যায়। আবার অমানুষ মানুষ হয়ে যায়।

    —তোমার দৈত্যটা কি কয় ছোটমামা?

    —আমার দৈত্যটা অমানুষকে মানুষ হতে কয়।

    —দৈত্যটা আমারে আইনা দ্যাও না।

    —বড় হও। বড় হলে এনে দেব। রঞ্জিত এই বলে সোনাকে কাঁধে তুলে ঘোরাতে থাকল। বড় উঠোনে লাঠি খেলা হয়, ছোরা খেলা হয়। চারধারে বড় বড় টিন-কাঠের ঘর। পালবাড়ির উঠোন থেকে কিছু দেখা যায় না ভিতরে। রাত হলেই উঠোনটা মানুষে ভরে যাবে।

    .

    আতা বেড়ার ওপাশ থেকে একটা চোখ অপলকে দেখছে রঞ্জিতকে। রঞ্জিতের পেশীবহুল শরীর দেখে চোখটা তাজ্জব বনে যাচ্ছে। রঞ্জিতের খালি গা। রঞ্জিত সোনাকে কাঁধে নিয়ে ঘোরাচ্ছে। কখনও সোনাকে দুহাত ধরে ঘোরাচ্ছে। সোনা খুব আনন্দ পাচ্ছিল। ওর মাথা ঘুরছিল। কিছুক্ষণ ঘুরিয়েই সে সোনাকে মাটির ওপর ছেড়ে দিচ্ছে, সোনা টলছিল, দু’হাত বাড়িয়ে আবার আবার করছিল। শচীন্দ্রনাথ উঠোন পার হয়ে যাবার সময় দেখলেন, রঞ্জিত সোনাকে নিয়ে উঠোনে খেলা করছে। শচীন্দ্রনাথ কিছু বললেন না। সকালবেলা পড়ার সময়। কিন্তু সোনার পরীক্ষা হয়ে গেছে। সে পরীক্ষায় খুব ভালো করেছে। সোনার স্মৃতিশক্তি প্রখর। এই সকালে উঠোনের ওপর মামা ভাগ্নেকে নিয়ে এমন মত্ত দেখে মনে মনে খুশি হলেন তিনি। শীতকালে ওদের মামাবাড়ি যাবার কথা। ধনবৌ ওদের পরীক্ষা হয়ে গেলেই বাপের বাড়ি যায়। শীতের সময় খুব কুয়াশা হয় মাঠে। কলাই গাছে কলাই শুঁটি। আর মাঠে মাঠে সর্ষের ফুল হলুদগোলা রঙের মতো।

    শীতের দিনেই হত খাবার, রকমারি খাবার। পিঠে-পায়েস তখন বাড়ি বাড়ি। তখন বড় বড় লোকদের বাড়িতে বাস্তুপূজা। ভেড়া বলি, তিলা কদমা আর তিলের অম্বল। নানা রকমের খাবার। তখন বাজারে গেলেই বড় পাবদা মাছ—কি সোনালী রং আর কি বড় বড়! কালিবাউশ, বড় বাগদা চিংড়ি আর দুধ। শীত এলেই অঞ্চলের গাভীরা তাদের সঞ্চিত দুধ সব ঢেলে দেয়। তখন অভাবটাও পল্লীতে পল্লীতে জাঁকিয়ে বসে থাকে না। তখন সংসারে সংসারে আনন্দ উৎসব। সব দিনমজুর তখন কাজ পায় গেরস্থবাড়িতে। জিনিসপত্রের দাম সস্তা হয়ে যায়। আর শীতকাল এলেই লালটু পলটু গ্রামের সব ছেলেদের সঙ্গে মাঠে নেমে গিয়ে গোল্লাছুট খেলে। শুধু মাঠ, ধান কেটে নেওয়া হয়েছে বলে নরম মাটির শুকনো নাড়া, পা পড়লেই খড়খড় শব্দ। তখন যত পারো ছোটো। ছুটে ছুটে পড়ে যাও মাটিতে—কিন্তু শরীরের কোথাও এতটুকু আঘাত লাগবে না।

    শচীন্দ্রনাথ আতা বেড়ার পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখলেন, মালতী দাঁড়িয়ে আছে। কাফিলা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কি যেন করছে। শচীন্দ্রনাথ বললেন, তুই এখানে?

    —আঠা নিমু। বলে কাফিলা গাছ থেকে আঠা তুলে নেবার মতো অভিনয় করল। বস্তুত মালতী এই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে একজন মানুষকে ওপাশে বেড়ার ফাঁকে চুপি চুপি দেখছিল। কেউ এলেই খুঁটে খুঁটে যেন গাছ থেকে আঠা নিচ্ছে এমনভাব চোখেমুখে। সে এই করে প্রাণভরে রঞ্জিতকে দেখছিল। ভোরে উঠেই মালতীর হাতে যা কাজ ছিল, যেমন উঠোন ঝাঁট দেওয়া আর বাসন ঘাটে নিয়ে যাওয়া, তারপর হাঁসগুলি ছেড়ে দেওয়া—এইসব কাজ করে দেখল আর কিছু করণীয় নেই। আভারানী রান্নাঘরে চিঁড়ার ধান ভিজিয়ে রাখছে। চুপি চুপি সে ঠাকুরবাড়ি চলে এল। মালতী আতা বেড়ার পাশে একটু সময় অপেক্ষা করল। প্রথম উঁকি দিতে সাহস পায়নি। একটা কিছু অছিলা দরকার। বেড়ার সঙ্গে কাফিলা গাছ। গাছ থেকে একটু একটু আঠা ঝরছে। সে একটা পাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। কেউ দেখতে পেলে বুঝবে মালতী আঠা নিচ্ছে গাছ থেকে। সে আতা বেড়ার ফাঁকে উঁকি দিল। মরিয়া হয়ে সে উঁকি দিয়ে রঞ্জিতকে দেখতে থাকল। অপমানকর ঘটনা ঘটে যেতে পারে এই নিয়ে, কলঙ্ক পর্যন্ত রটে যেতে পারে এই নিয়ে, সে তাও ভুলে গেল। নরেন দাস বাড়িতে নেই, অমূল্য বাবুর হাটে শাড়ি বিক্রি করতে গেছে, তাঁত এখন ক’দিনের জন্য বন্ধ। সুতরাং মালতীর প্রায় ছুটির দিন এগুলি। সে এইসব দিনে খেলে, বেড়িয়ে, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে তেঁতুলের আচার মুখে স্বাদ নিতে নিতে বেশ সময় কাটিয়ে দিতে পারবে। তার পর পুরীপূজার মেলা। সে এবার রঞ্জিতকে নিয়ে পুরীপূজার মেলায় চলে যাবে। তারপর সেই মেলার প্রাঙ্গণে সারকাসের হাতি, সিংহ, বাঘ, মাঠে ঘোড়দৌড় এবং মন্দিরের এক পাশে ডোমেদের শুয়োর বলি এসব দেখে, জিলিপি রসগোল্লা মুখে পুরে সারা মাঠ ছুটে বেড়িয়ে—কী যে এক আনন্দ, কী যে এক সুখ বসত করে মনের ভিতর—বুঝি সুখের জন্য এই মানুষ রঞ্জিত এখন তার জীবনের সব কিছু। সে মরিয়া হয়ে বেড়ার ফাঁকে একটা চোখ রেখে দাঁড়িয়ে থাকল।

    বিকেলের দিকে যখন বেলা একেবারেই পড়ে এল, যখন বৈঠকখানার উঠোনে আলো মরে গেছে, সোনা, লালটু,পলটু যখন একটা করে বাঁশের লাঠি তুলে নিয়ে পুবের ঘরে সাজিয়ে রেখে দিচ্ছিল—তখনই গলা পাওয়া গেল। পুকুরপাড় থেকে ডেকে ডেকে উঠে আসছে কে!

    বৈঠকখানার উঠোনে এসে ডাকল, রঞ্জিত নাকি আইছে?

    শচীন্দ্রনাথ সামুকে দেখে সামান্য বিস্মিত হলেন। কিছুদিন আগে জমি সংক্রান্ত ব্যাপারে শচীন্দ্রনাথ সামুকে গালমন্দ করেছিলেন। কথা কাটাকাটি হয়েছে। সেই সামু ফের এ বাড়িতে উঠে এসেছে বলেই বোধ হয় তিনি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন। তিনি স্বাভাবিক থাকার জন্য অন্য কথা টেনে আনলেন। বললেন, তর মায় নাকি বিছানা থাইকা আর উঠতেই পারে না।

    —পারে না কর্তা।

    —তারিণী কবিরাজের কাছে একবার যা।

    —গিয়া কি হইব কর্তা। বোধ হয় শীতটা আর পার হইব না।

    —তবু একবার গিয়া দ্যাখ। যদি তাইন একবার তর মায়েরে দেইখা যান। আমার চিঠি নিয়া যা। সামু বলল, দ্যান চিঠি। পাঠাই। দ্যাখি কি হয়।

    —দ্যাখি কি হয় না! তুমি পাঠাইবা। পিসিরে অচিকিৎসায় মারবা সে হইতে দিমু না।

    সামুর মুখে সামান্য প্রসন্ন হাসির রেখা ভেসে উঠল। নাকের নিচে ছাঁটা গোঁফ এবং থুতনিতে অতি সামান্য নুর—খুব লক্ষ করলে বোঝা যায় থুতনির নিচে সেই নুরটাকে যেন সামু গোপনে লালন করছে। এক সময় সামুর মুখে বড় বড় দাড়ি দেখে শচীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—তরে দেখলে সামু, পিসার কথা মনে হয়। শচীন্দ্রনাথ সামুর বাবার কথা মনে করিয়ে দিয়ে সামুকে মহান করে তুলছিলেন যেন। তারপর কতদিন গেছে, মালতীকে ইচ্ছা করেই গালে বড় দাড়ি দেখিয়ে যেন প্রতিশোধ তুলতে চেয়েছিল। তারপর একসময় মনে হয়েছে, প্রতিশোধ কোথাও কারও জন্য অপেক্ষা করে থাকে না, সময় এলে সব জলের মতো মনে হয়, হাস্যকর মনে হয়। নিজের ছেলেমানুষীর কথা ভেবে লজ্জায় মুখ ঢেকে দিতে ইচ্ছা যায়। সুতরাং এখন সামু আবার ভদ্রগোছের যেন। বিশেষ করে শিক্ষিত, মার্জিত রুচির পুরুষ। যেন এখন সামু রঞ্জিত একরকম। সামুর পরনে তফন, ডোরাকাটা। ধানগাছের মতো রং তফনের। আর গায়ে হাল্কা গেঞ্জি, পুরুহাতা শার্ট। সে এবার শচীন্দ্রনাথের দিকে না তাকিয়েই বলল, শোনলাম রঞ্জিত ফিরা আইছে?

    —হ, আইছে। এতদিন কলিকাতায় আছিল, আবার ফিরা আইছে।

    সামু আর শচীন্দ্রনাথের জন্য অপেক্ষা করল না। ডাকল, কৈ ঠাকুর, কৈ গ্যালা। একবার এদিকে বাইর হও। দেখি চেহারাটা। তুমি আমারে চিনতে পার কিনা দেখি।

    রঞ্জিত বৈঠকখানার উঠোনে এসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল—তুই সামু না?

    —তাহলে দেখছি ভুইলা যাও নাই।

    —ভুলব কেন!

    —কি জানি বাবা, তুমি কোনখানে চইলা গেলা। কোন চিঠিপত্র নাই। বড় বৌঠাইরেনের লগে দেখা হইলে কইছি, রঞ্জিতের চিঠি পাইলেন নি! একেবারে নিরুদ্দেশে গ্যালা। কোন চিঠিপত্র নাই।

    রঞ্জিত বলল, ভিতরে এসে বোস।

    —সাঁজ বেলাতে ঘরে বইসা থাকবা? চল না মাঠের দিকে যাই।

    এটা মন্দ কথা নয়। মাঠের দিকে বলতে—সেই সোনালী বালির নদীর চর। সেই নদী, এক আবহমানকালের নদী। কথায় কথায় রঞ্জিত সামুকে অনেক কথাই বলল, অনেক দিনের অনেক কথা। এক ফাঁকে মালতীর কথাও।

    জ্যোৎস্না উঠে গেলে, পরিচ্ছন্ন আকাশ। ওরা আলের ওপর দিয়ে হাঁটছিল। এই সব যব গম খেত পার হলেই নদীর চর। নদী সাপের মতো বিস্তৃতি নিয়ে এই চর, মাঠ এবং গাঁয়ের মাঝে শুয়ে আছে। তরমুজের লতা খুব ছোট বলে এবং বাতাস দিচ্ছিল বলে অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় দূর থেকে একপাল খরগোশের মতো মনে হচ্ছে। ওরা যেন নিরন্তর সেই বালির চরে ছুটে বেড়াচ্ছিল। নদীর জল নেমে গেছে। কি আর জল—সেই এক রকমের, মনে হয় পার হয় গরু, পার হয় গাড়ি। ওরা নদীর জলে কাপড় হাঁটু পর্যন্ত তুলে নেমে গেল। স্ফটিক জল। নিচে নুড়ি পাথর, মাথার ওপর আকাশ। সাদা জ্যোৎস্না। নদী পার হলে গ্রাম, কিছু ঘন বন, আর পুবে হেঁটে গেলে এক বাঁশের সাঁকো পাওয়া যায়। সেই সাঁকোর ওপর মালতীকে নিয়ে একদিন সামু এবং রঞ্জিত চলে গিয়েছিল। নদীর জল মাঠ ভেঙে চুকৈর ফল, টকটক মিষ্টি মিষ্টি ফল, আনতে ওরা চলে গিয়েছিল। তারপর ওরা ফেরার পথে বড় মাঠ পার হতে গিয়ে পথ হারিয়ে সারাক্ষণ মাঠময়, গ্রামময় ঘুরে ঘুরে সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরলে নরেন দাস ধমক দিয়েছিল। ওরা বাড়িতে ঢুকলেই মালতীকে কাজ দিয়ে তাঁতঘরে পাঠিয়ে দিত।

    তখন সামু বলেছিল, ঠাকুর একটা বুদ্ধি দ্যাও।

    রঞ্জিত বলেছিল, নরেন দাস মাছ খেতে ভালোবাসে।

    —কি মাছ?

    —ইচা মাছ।

    সেবার ভাদ্র কি আশ্বিন মাস ছিল। ঠিক এখন মনে পড়ছে না ওদের। বর্ষার জল নেমে যেতে আরম্ভ করেছে। জলের নিচে সব জলজ ঘাস পচতে শুরু করেছে। দুর্গন্ধ জলে। জলের মাছ বড় বিল, নদী অথবা সমুদ্রে পালাতে পারলে যেন বাঁচে। খাল ধরে মাছগুলি নেমে যবে। ঠিক জায়গা মতো জলের নিচে চাই পেতে রাখতে পারলে মাছে চাই ভরে যাবে। চিংড়ি মাছে ভরে যাবে। বড় বড় গলদা চিংড়ি। কিন্তু বড় কষ্ট। বিশেষ করে সাপখোপের ভয়, জোঁক এবং জলজ কীট-পতঙ্গের ভয়। ওরা সব তুচ্ছ করে গায়ে রসুন গোটার তেল মেখে মাছ ধরার জন্য সাঁতরাতে থাকল। পচা জল সাঁতরে খালের বড় বট গাছটার নিচে চাই পেতে সেই বটগাছের ডালে সারারাত পাহারা দিয়ে পরদিন প্রায় দুই ঝুড়ি গলদা চিংড়ি নরেন দাসের উঠোনে এনে ফেলতেই চকিতে যেন বলে উঠেছিল, আরে, তরা করছসটা কি! সেই যে উভয়ে চকিত চোখে দেখেছিল, নরেন দাসের কী যে লোভ! নরেন দাস, বিষয়ী মানুষ নরেন দাস, লোভে আঁকুপাঁকু করছিল—আর কোনওদিন কখনও ছোট মেয়ে মালতীরে ধরে রাখেনি। মালতী প্রায় সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে এই অঞ্চলের সর্বত্র ছুটে বেড়িয়েছে।

    এই মালতীর জন্য ওরা কত দুঃসাহসিক কাজ করে বেড়াত! সেই মালতী এখন কত বড় হয়েছে। রঞ্জিত হাঁটছিল আর ভাবছিল। ভাবতে ভাবতে এক সময় বলে ফেলল, মালতী বড় সুন্দর হয়েছে, কতদিন পর দেখা। মালতী এখন কি লম্বা হয়েছে!

    সামু এবার মুখ তুলে তাকাল। বলল অরে নিয়া বড় ভয় আমার। একদিন রাইতে দেখি অমূল্যরে নিয়া আনধাইরে হাঁস খুঁজতে মাঠে বাইর হইছে।

    রঞ্জিত বোধ হয় কিছুই শুনছিল না। মালতীকে সে প্রথম দিন দেখে চমকে গিয়েছিল। ওর মুখ থেকে যেন ফসকে বের হয়ে গেছিল—কি সুন্দর তুমি! কিন্তু বলতে পারেনি। কোথায় যেন ওর মনে এক অহঙ্কার আছে, আত্মত্যাগের অহঙ্কার। তবু মনের ভিতর ভালো লাগার আবেগ সময়ে অসময়ে খেলা করে বেড়াচ্ছিল। সামুর সঙ্গে দেখা হতেই মনে হল, এই মানুষ একমাত্র মানুষ যাকে তার ভালো লাগার কথাটুকু বললে কোনও ক্ষতির কারণ হবে না। সে জলের কিনারে হেঁটে যাবার সময় মালতীর কথা বলছিল। নির্মল জলের মতো মালতী পবিত্র হয়ে আছে এমন সব বলার ইচ্ছা। জলে জ্যোৎস্না চিকচিক করছে। জলের শব্দে ছোট ছোট মাছেরা ছুটে আসছে পায়ের কাছে। দাঁড়িয়ে গেলে সেই সব কুঁচো মাছ পায়ে ঠোকর মারছিল। দু’জনই প্রায় সময় সময় একেবারে চুপ মেরে যাচ্ছে আবার কথা উঠলে নানারকমের কথা, কথায় কথায় রঞ্জিত বলল, তুই নাকি লীগের পাণ্ডা হয়েছিস!

    সামু এ-কথার কোনও জবাব দিল না। কারণ কথাটার ভিতর বোধ হয় রঞ্জিতের অবজ্ঞা আছে। সে যেন ঠিক এখন শচীন্দ্রনাথের মতো কথা বলছে। শচীন্দ্রনাথ অথবা অন্যান্য হিন্দু মাতব্বর ব্যক্তিরা ওর দল সম্পর্কে যেমন উন্নাসিকতা রক্ষা করে থাকেন ঠিক তেমনি যেন রঞ্জিত ওর পার্টি সম্পর্কে অবজ্ঞা দেখাতে চাইল। সুতরাং সামু অন্য কথায় চলে আসার জন্য বলল, চল উপরে উইঠা যাই। চরে বইসা হাওয়া খাই।

    রঞ্জিত চরে উঠে এগিয়ে গেল। তারপর সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বলল, কি রে জবাব পেলাম না যে। –ও কথা, বাদ দ্যাও ঠাকুর।

    কেন বাদ দেব। আরও কি বলতে যাচ্ছিল। সহসা যেন সামু বলে ফেলল, ওটা আমার ধর্মের কথা। বলেই হাত ধরে রঞ্জিতকে টেনে বসাল। ছুঁইয়া দিলাম। সান করতে হইব না ত! রঞ্জিত এমন কথায় হা হা করে হেসে উঠল। কিন্তু হাসতে হাসতেই কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল রঞ্জিত। সব যেন কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। সামু এবার ধীরে ধীরে বলল,কতদিন আছ ঠাকুর? বলে দূরে নদীর জল দেখতে থাকল।

    —ঠিক নেই। যতদিন পারি থাকব! বলার ইচ্ছা যেন, আত্মগোপন করে আছি। যদি ধরিয়ে না দিস তবে বোধ হয় এবার এখানে অনেকদিন পর্যন্ত থেকে যেতে পারব।

    সামু এবার ওর দিকে মুখ ফেরাল। এখন সে আর এই বালিয়াড়ি দেখছে না। নদী দেখছে না। এবং এত যে রহস্যময় গ্রাম মাঠ ফসল পড়ে আছে তাও দেখছে না। সে শুধু রঞ্জিতের মুখ দেখছে। সে রঞ্জিতের মুখে সেই ছায়া দেখছে—বোধ হয় আত্মত্যাগের অহংকার এই মানুষের মুখে, অন্য মানুষের ধর্মে কর্মে একেবারেই বিশ্বাস নেই। সে মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলল, আমার মাইয়াটারে তোমারে আইনা দ্যাখামু ঠাকুর। মাইয়াটা এখন ঠিক মালতীর ছোট বয়সের মত হইছে। কেবল ছুটে ছুটে বেড়ায় গোপাটে। মাইয়াটারে দ্যাখলে, আমার তোমার কথা মনে হয়। তুমি আমারে ঠাকুর অবিশ্বাস কইর না, অবহেলা কইর না। বলে কেমন মুখ ব্যাজার করে ফেলল সামু।

    —মালতী বলল, তুই ঢাকায় থাকিস, সেখানে পার্টি করছিস!

    —মালতী বড় অবজ্ঞা করে ঠাকুর। মালতী আমার লগে আর প্রাণ খুইলা কথা কয় না।

    —বুঝি অবিশ্বাস করছে?

    —জানি না ঠাকুর। বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা জানি না।

    ঠিক তখনই জ্যোৎস্নার ভিতর মনে হচ্ছিল এক মানুষ, পাগল মানুষ হেঁটে নদী পার হচ্ছেন। ওপারে গ্রামের ভিতর লণ্ঠন জ্বলছিল, জলে সেই লণ্ঠনের অলো ভাসছে। পাগল মানুষ, মণীন্দ্রনাথ নদী পার হচ্ছিলেন বলে জলে সামান্য ঢেউ উঠছে। আলোর রেখাগুলি ছত্রখান হয়ে গেল।

  • বার

    বার

    ফেলু দাওয়ায় বসে গরজাচ্ছিল। বাঁ হাতে এখন আর একেবারেই শক্তি পাচ্ছে না। হাতটার দিকে তাকালেই ভয়ঙ্কর এক আক্রোশ বুক বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে—তুমি ঠাকুর, পাগল ঠাকুর, তোমার পাগলামি ভাইঙ্গা দিমু।

    হাতটা ওর বাঁ হাত। কব্জিতে জোর নেই। কালো পোড়া বিশীর্ণ রঙ ধরে আছে কব্জির চামড়াতে। দু’পাশের মাংস ফুলে ফেঁপে আছে, যেন কব্জির দু’পাশে মাংস বেড়ে একটা মোটা গিঁট হয়ে যাচ্ছে। কালো তার বাঁধা। কালো তারে মন্ত্র পড়া সাদা এক কড়ি ঝুলছে। কড়ির গলায় ফুটো করে হাতে বাঁধা সুতো নিয়ে ফেলু কেবল গজরাচ্ছিল। কিছু কাক উড়ছিল উঠোনে, কিছু শালিখ পড়ছিল মাচানে আর বিবি গেছে পশ্চিম পাড়াতে এক শিশি তেল ধার করতে। ফেলু আছে মাছ পাহারায়।

    উঠোনের ওপর শীতের রোদ কাফিলা গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে নিচে এসে নামছে। এই সামান্য রোদেই ফেলু মাচানে মাছ ছড়িয়ে বসে আছে তারপর আরও সামনে খানা-ডোবা এবং জমি, জমিতে কোনও ফসল হয় না। ছোট্ট একখণ্ড জমি ফেলুর। বাড়ির উত্তরে এই জমি, বাঁশ গাছের ছায়া জমিটাকে বড় অনুর্বর করে রেখেছে।

    ওর গলায় কালো তার বাঁধা। গলায় চৌকো রুপোর চাকতি। সব সময় পালোয়ানের মতো চেহারা করে রাখার সখ ফেলুর। ফেলুর যৌবন নেই, কিন্তু এখনও শক্ত ঘাড় গলা দেখলে, ঘাড় গলা হাত দেখলে, তাজ্জব বনে যেতে হয়! মানুষটার মুখ ফসলহীন মাঠের মতো। রুক্ষ, দাবদাহে যেন সবসময় পুড়ে যাচ্ছে। একচোখে তাকালে বুকটা কেঁপে ওঠে। চোখের ভিতর মণি আছে, মণির ভিতর সব সময় নৃশংস এক ভাব। সুখী পায়রা আকাশে উড়তে দেখলেই ধরে ফেলার সখ, দুই পাখা ছিঁড়ে দেবার সখ। এবং ঠ্যাং খোঁড়া করে দিতে পারলে গাজীর গীতের বায়ানদারের মতো চান্দের লাখান মুখখান এমন সব বলতে থাকে।

    ফেলু বড় হা-ডু-ডু খেলোয়াড় ছিল। তখন তার দুই হাতের ওপর শত্রু পক্ষের কী আক্রোশ! ঐ হাত যেভাবে পারো ভেঙে দাও। থাবা মারলে ফেলু, সকলে বাঘের মতো ভয় পায়।

    চত্বরে খেলা হচ্ছে। গোপালদি বাবুদের দল খেলছে—দশ টাকা আগাম আরও দশ ফেলুর ঐ বাঘের মতো থাবা মচকে দিতে পারলে কিন্তু হায়,কে কার থাবা মচকায়! ফেলু ছুটছে। একবার এ-মাথায় আবার ও-মাথায়। সে খুব দ্রুত ছুটতে ভালোবাসে। দাগের উপর পড়েই সে লাফ দেয়, যেন সে লাফ দিয়ে আসমান ছুঁতে চায়। ঐ ওর কায়দা। শক্ত হাত-পা পেশীতে সূর্যের আলো ঝলমল করত। কালো খাটো প্যান্ট, কালো গেঞ্জি আর রুপোর তাগা গলায়, যেমন লম্বা ফেলু, তেমন কুৎসিত মুখ শরীর-মনে হয় তখন ফেলু জয় মা বলে অথবা আল্লা আল্লা বলে—হা মা ঈশ্বরী বলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। দুই পায়ে কাইচি চালাও–ফেলু যে ফেলু সে পর্যন্ত পাহাড়ের মতো মুখ থুবরে পড়বে। তখন ফেলুর কোমরে বসে উল্টোভাবে এমন এক মোচড় দিতে হবে যেন বাঘের থাবা বেড়ালের হয়ে যায়। বাবুদের বায়নার মুখে ছাই দিয়ে যে ফেলু সেই ফেলু। খেলার শেষে টেরটি পাওয়া যায় না, ফেলুর কোথাও শরীর জখম হয়েছে।

    সেই ফেলু বসে বসে এখন নিজের হাত দেখছে। কাক তাড়াচ্ছিল এবং ভাঙা হাতের দিকে তাকিয়ে বড়ঠাকুরকে গাল পাড়ছিল—পাগলামির আর জায়গা পাও না ঠাকুর, তোমার পীরগিরি ভাইঙ্গা দিমু। তারপর সে হুঁস করল। একটা কাক ফের এসে ঘরের চালে বসেছে। কাকটা সেই থেকে জ্বালাতন করছে। কাক একটা নয়, অনেক। ধরে ফেলেছে, সে ব্যারামি নাচারি মানুষ। সে ক্রমে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। গিঁটে গিঁটে ব্যাদনা। হাতির শুঁড় ওর সব শক্তি নিয়ে চলে গেছে। কিন্তু ফেলুর জ্বলন্ত দুই চোখ, বিশেষ করে পোকায় খাওয়া চোখটা এখন বড় বেশি ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছিল। কাকটা বোধ হয় সেই চোখটা দেখতে পায়নি। সে চোখটা দেখাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াল। কাকটা উড়ে এসে উঠোনে বসল। চোখটা দেখতে পায়নি। সে এবার তেড়ে গেল। তুমি আমারে পাগল ঠাকুর পাইছ। বলেই সে ডান হাতটা উঁচু করতে গিয়ে দেখল, হাতটা পুরোপুরি নিরাময় হয়নি। বাঁ হাতটা পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। ডান হাতটা নিরাময় হচ্ছে না। বিবি গেছে এক শিশি তেল ধার করতে আর সে ঘরের মাগের মতো বসে আছে মাছ পাহারায়।

    বিবির ওপর রাগটা বাড়ছিল। পাটকাঠি নিয়ে হাতে কত আর কাক-শালিখ তাড়ানো যায়। কাক-শালিখ, মাছের লোভে বাজপাখি পর্যন্ত উড়ে আসতে পারে। বাজপাখির কথা মনে আসতেই গৌর সরকারের কথা মনে এসে গেল। হাজিসাহেবের পাঁচনের খোঁচা, সময়ে অসময়ে সেই সন্দেহের পোকা কুরে কুরে খেলে, হাজিসাহেবে পাঁচনের খোঁচা মারেন মইজলা বিবিরে, আর প্রতাপ চন্দের নাভিতে তেল মাখানোর অভ্যাস, অভ্যাসটার কথা মনে আসতেই ফেলু ভাবল—ওরা কাক চিল নয়, ওরা বাজপাখি নয়, ওরা লাল নদীর ঈগল। বড় মাছ বাদে ওরা খায়না।

    সব জমি জিরাত ওদের। সুদিনে দুর্দিনে কামলা খাটলে পয়সা। ফেলুকে গৌর সরকার বড় ভয় পায়। সে ফেলুকে ভয় পায় গতর দেখে নয়, এমন গতরের কামলা ওর ঘরে কত বাঁধা আছে। ভয়, ফেলু নাকি যৌবনে অথবা সেদিনও রাতে-বিরেতে কোথায় চলে যেত। দরকার পড়লে সে দশটা টাকার বিনিময়ে দশটা মাথা এনে দিতে পারে—সেই ফেলু কি তাজ্জব, একটা কাক তাড়াতে পারছে না। ফেলু রাগে হতাশায় লুঙ্গিটা ডান হাতে ঝাড়তে থাকল বার বার।

    রোদে মাছ শুকানো হচ্ছে। ছোট্ট একটা উঠোন নিয়ে ফেলুর ঘর। একটা পেয়ারা গাছ। নতুন বিবি পুরনো হয়ে গেছে। সাত আট সাল হল সে বিবিকে ধরে এনেছে। বয়স আর কত বিবির, দেড় কুড়ি হবে, কি দু-এক বছর বেশি হতে পারে। কাঁচা যৌবনের ঢল বিবির বড় বেশি। পাড়াময় রসিকতা কত—বিবিটা আলতাফ সাহেবের। কি করে, কে কখন আলতাফ সাহেবের কাটা মাথা পাট খেতে আবিষ্কার করেছিল কেউ জানে না। তারপর বছর পার হয়নি, ফেলু আলতাফ সাহেবের খুবসুরত বিবিকে ঘরে এনে তুলেছে। কেউ রা-টি করেনি। ফেলু বড় দাঙ্গাবাজ মানুষ। ভয়ে বিস্ময়ে কেউ ওকে ঘাঁটাতে সাহস পায় না। সেই ফেলু এখন এক কাক, সামান্য কাকের সঙ্গে পেরে উঠছে না।

    মাছ রোদে শুকাচ্ছে। এক ফাঁকে একটা কাক এসে মাছ নিয়ে উড়াল দিল। ক্ষোভে হতাশায় ফেলু কাকটাকে তেড়ে গেল। কোমর থেকে লুঙ্গিটা খুলে গেছে, সে প্রায় উলঙ্গ হয়ে কাকটার পিছনে ছুটতে গিয়ে দেখল, প্রায় সব কাকগুলো ওর মাছের মাচানে বসে মাছ খাচ্ছে। রাগে দুঃখে সে ছেঁড়া তফনটা তুলে আর হাঁটতে পারল না। প্রায় হামাগুড়ি দেবার মতো হেঁটে গিয়ে দেখল, কাক যে সামান্য কাক, সেও বুঝে ফেলেছে ফেলুর আর তাগদ নেই। সে মরা মাছগুলির দিকে নিজের পোকায় খাওয়া চোখটা খুলে দাঁড়িয়ে থাকল। সে নড়তে পারছে না। নড়লে বাকি কয়টা মাছও আর থাকবে না। ওর ডান হাত সম্বল, বিবির ওপর সংসার। মাছের এ-অবস্থা দেখলে বিবি তাকে কুপিয়ে কাটবে। সে মাচানের পাশে বসে মাছগুলিকে ফের ছড়িয়ে রাখল। পুঁটি মাছ, চেলা মাছ। ইতস্তত ছড়িয়ে রাখলে বিবি এসে ধরতে পারবে না, কাকে এসে মাছ নিয়ে গেছে। সামু ফের ঢাকা গেছে, ফিরছে না। সামুর মার কাছ থেকে এক কাঠা ধান এনেছে ধার করে, সেও কী দিয়ে শোধ হবে, কবে, কীভাবে কাজ করতে পারলে শোধ হবে সে বুঝে উঠতে পারছে না। একমাত্র যুবতী বিবি আন্নু সব দেখেশুনে করছে।

    আন্নুর ওপর এ সময় তার কেমন মায়া হতে থাকল। সে লুঙ্গিটা তুলে এবার পরল। আন্নু বেগম, বড় মনোরম নাম। কিন্তু আন্নুটার শরীরে এত বেশি তেজ—প্রায় যেন সরকারদের তেজী ঘোড়া-লম্বা মাঠ পেলেই কেবল দৌড়াতে চায়। বড় মাঠে ফেলু এখন আর ঘোড়ায় চড়ে ছুটতে পারে না। কোমরে টান ধরে। সমানে ছুটতে গেলে বড় অবশ অবশ লাগে শরীরটা। আন্নু ক্ষেপে গিয়ে বলে,মরদ আমার! ঠেলে ফেলে দেয় পিঠ থেকে, মাটিতে থুবড়ে পড়ে মুখ হাঁ করে ফেলে ফেলু। তখনই একটা সন্দেহের কোড়া পাখি ফেলুকে কুরে কুরে খায়। সে অতি কষ্টে যেন নদীর চর পার হতে হতে ডাকছে আন্নু, আৰু রে, পাগল ঠাকুর আমারে কানা কইরা দিছে।

    ছোট গ্রাম। কয়েক ঘর মুসলমান পরিবার। হাজিসাহেবের বাড়িতে চারটা চার-দুয়ারী নতুন টিনের ঘর আছে। কিছু গাইগরু আছে, বড় দুটো মেলার গরু আছে। তারপর সামুদের কিছু জমি, নয়াপাড়ার মাঠে ওদের কিছু জমি আছে। সম্বৎসর সামুদের ঐ ফসলে চলে যায়। ভাল দু’কানি পাটের জমি থাকলে আর কী লাগে! সামুর মিঞাজানেরা বড় গেরস্থ। সুতরাং অভাবে অনটনে ধান, খৈ, মুড়ি সবই চলে আসে। তারপর আর যারা আছে প্রায় সবাই আল্লার বান্দা। গতরের ওপর নির্ভর। আবেদালির জমি নেই। মনজুর অধিকাংশ জমি ভাগচাষ করে। ঈশম ত শালা! বলে ফেলু একটা খিস্তি করল। পঙ্গু বিবি ঈশমের। সামুদের আতাবেড়া পার হলে হজিসাহেবের গোলাবাড়ি এবং পরে একটা বেতঝোপ আর আতাফলের একটা বড় গাছ, গাছের নিচে ভাঙা কুঁড়েঘর—কোন আদ্যিকাল থেকে বিবিটা সেখানে পড়ে গোঙাচ্ছে। কি কঠিন ব্যাধি! বিবিটাকে সে কোনওদিন ভালোবাসতে পারেনি! ওর একমাত্র সম্বল এক তরমুজ খেত।.. সেই খেতে বসে থাকে মানুষটা। এখন শীতের দিন, এইসব দিন পার হলে গ্রীষ্মের দিন আসবে। তখন যেন ঈশম সওদাগরের মতো। ঠাকুরবাড়ির বান্দা ঈশম তরমুজ বিক্রি করবে, আর সব টাকা তুলে দেবে ছোট ঠাকুরের হাতে। ওর গর্ব সে জমি থেকে ছোট ঠাকুরের হতে কত টাকা তুলে দিতে পারল।

    গ্রামের পর গ্রাম অথবা বিস্তীর্ণ মাঠ। মুসলমান গ্রামগুলিতে হাহাকার যেন বেশি। কোনও কোনও গ্রামে হাজিসহেবের মতো ধনী আছেন, তাদের সুখ অন্য ধরনের। ওরা, ওদের ছেলেরা উজানে যায়, পাটের ব্যবসা করে কেউ। মসজিদে ইন্দারা বানিয়ে ওরা সিন্নি ছড়ায়। এইসব দেখে অজ্ঞ ফেলুর বড় ইচ্ছা বড় একটা নাও বানায়। সেই নাও নিয়ে পাটের ব্যবসা করার সখ। পাটের দালাল অথবা ফড়ে হতে পারলে বড় সুখের। যা করে হাজিসাহেব হজ করে আসলেন পৰ্যন্ত।

    আর হিন্দু গ্রামগুলির দিকে তাকাও—পুবের বাড়ির নরেন দাস—তার জমি আছে, তাঁতের ব্যবসা আছে। দীনবন্ধুর দুই তাঁত দুই বউ। সুখে আছে লোকটা। আর ঠাকুরবাড়ির মানুষেরা শোনা যায় তল্লাটের বিদ্বান বুদ্ধিমান মানুষ। বড় ঠাকুর পাগল মানুষ। মেজ ঠাকুর, সেজ ঠাকুর দু’দশ ক্রোশ হেঁটে গেলে মুড়াপাড়ার জমিদারদের কাছারিবাড়ির নায়েব গোমস্তা। জমিদারদের বড় বিশ্বাসভাজন লোক। ওদের সচ্ছল সংসার। তারপর পালবাড়ি-জমি আছে ওদের, মিলের কাজ আছে। তারপর মাঝিরা—ওদের বড় বড় গরু। ইচ্ছা করলে ওরা প্রায় মেলায় গরু দৌড়ে বাজি জিতে আসতে পারে। ক্বচিৎ দু’ একবার নয়াপাড়ার মিঞাজানেরা বাজিতে জিতে গেলে—সে যেন মাঝিদেরই বদান্যতা। বারবার কাপ মেডেল নিলে মইনসে কয় কি! ওরা মেলার গরু মাঠে নিয়ে যায়নি বলে মিঞাজানেরা দৌড়ে বাজি জিতে গেল।

    শেষে পড়বে কবিরাজ বাড়ি। নীল রঙের ডাক-বাক্স লাল রঙের ঘোড়া আছে বাড়িতে। প্রতাপ মাঝি ধনী লোক, বিশ্বাসপাড়ার মাঠে, ফাউসার মাঠে এবং সুলতানসাদির মাঠে সব সেরা জমিগুলি ওর। শেষে আর দ্যাখো গোঁর সরকার—শালীর সনে পীরিত যার, যে ছন ছাইতে গেলে জলপান করতে দেয় না, েমানুষ সুদে এবং লালসায় বড় হচ্ছে-অপরের সুখ দুঃখের বোধগম্যি কম—কেবল টাকা টাকা, টাকা পেলে সে নিজের কলিজা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারে। ফেলু ভাবতে ভাবতে দাঁত শক্ত করে ফেলল—তোমা-গ মশাইরা জবাই করতে পারলে শান্তি। সে চিৎকার করে উঠল, ঠাকুর, পাগল তুমি! তোমার পাগলামি—সে আর বলতে পারল না, কাকগুলি ওকে অন্যমনস্ক দেখে ফের নেমে এসেছে। সে হুস হুস করতে থাকল। ভারি দুর্দশা তার। বিবিটা এখনও ফিরছে না, কি করছে এতক্ষণ! হাজিসাহেবের ছোট ছেলে কি আন্নুর পেটে হাঁটু রাখতে চায়। সে চিৎকার করে উঠল, হালার কাওয়া আমারে ডরায় না। হালার বিবি আমারে ডরায় না। সে বিবিকে খুন করবে বলে পাগলের মতো হেসে উঠল। সে হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বলল, পোড়া হাত কি ভাল হইব আল্লা! সে বাঁ-হাতটা কোনও রকমে ডান হাতে চোখের সামনে তুলে আনল। দেখল কব্জির চামড়া কুঁচকে গেছে। ফোলা কব্জি, কব্জিতে কানাকড়ি বাঁধা কালো তার ঝুলছে। মনে হয় এই ফেলু ঈশমের বিবির মতো পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। সে উঠোন থেকেই পাগলের মতো চিৎকার করতে থাকল, আন্নু রে, আন্নু।

    তখন আবেদালির বিবি জালালি যাচ্ছে বাড়ির নিচ দিয়ে। বাঁশ ঝাড়ের নিচে শীর্ণ জালালিকে দেখে মনে হল বিলে নেমে যাচ্ছে জালালি। এখন গরিব গরবাদের শালুক তুলবার সময়! আশ্বিন-কার্তিকে সামনের সব মাঠ আর অঘ্রান-পৌষে বিলেন জমিতে কট করে ধানের ছড়া শামুকের মুখে কেটে কোঁচড় ভরা যায়। এখন মাঠে কিছু নেই। ফাঁকা মাঠ। যব গমের ফলন হয়নি। এখন শুধু বিলে নেমে যাওয়া শালুকের জন্য। জালালি শালুক তুলতে বিলের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। জালালিকে দেখে বলল, ভাবি, আন্নুরে দ্যাখছেন নি?

    জালালি গামছাটা সঙ্গে রেখেছে। মাথায় ওর একটা পাতিল ছিল। পাতিলটার জন্য মুখ দেখা যাচ্ছে না। পাতিলটা মাথায় ছিল বলেই হয়তো ফেলুর কথা ওর কানে যায়নি। অথবা গেলেও অস্পষ্ট। সুতরাং জালালি পাতিলটা মাথা থেকে নামিয়ে এনে বলল, কি কও মিঞা? আমারে কিছু কও নাকি!

    —আর কি কমু গ! বলে ফেলু যে ফেলু, সে পর্যন্ত গাইগরুর মতো মুখে নির্বোধের হাসি নিয়ে তাকাল।

    —কিছু কইতে চাও?

    —আন্নু গেছে এক শিশি তেল আনতে। আইতাছে না।

    জালালি বলল, আইব নে। বলে জালালি দাঁড়াল না। সে ফের পাতিলটা মাথায় নিয়ে মাঠে নেমে গেল। বড় মাঠ সামনে। বাঁ পাশে সোনালী বালির নদী, নদীর চর। চর পার হয়ে সোজা উত্তরমুখো হাটলে সেই বিল। ফাওসার বিল। বিলে একবার ঈশমকে কানাওলায় ধরেছিল—এত বড় বিল এ-পরগণাতে কেন, এ-জেলাতে বুঝি আর নেই। একবার বিলের জলে কুমীর ভেসে এসেছিল, বড় এক অজগর সাপ ভেসে উঠেছিল। তারপর এই বিলের নানা রকমের কাছিমের গল্প, গজার মাছের গল্প, এবং রাতে সপ্তডিঙা মধুকরের গল্প কিংবদন্তীর মতো এ-অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। সেই বিলে জালালি যাচ্ছে শালুক তুলতে। শুধু জালালি নয়, অনেকে, এমন প্রায় হাজার হবে। ওরা শালুক তুলে আনবে। ওরা ভোরে শালুক তুলতে বের হয়ে যাচ্ছে। ফেলু উঠোনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।

    আবেদালি এ সময়ে দেশে চলে আসবে। বর্ষা, শরৎ, হেমন্তে সে গয়না নৌকার মাঝি। শীত, গ্রীষ্ম আর বসন্তে সে হিন্দু পাড়ায় কামলা খাটবে। এই তো গ্রাম—গ্রামে মাত্র সামু মাতব্বর মানুষের মতো চলাফেরা করতে পারছে। যত সামু মাতব্বর মানুষ হয়ে যাচ্ছে, যত হিন্দু যুবকেরা সম্মান দিয়ে কথা বলছে, তত ফেলু সামুর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। সে যেন সামুর বান্দা হয়ে যাচ্ছে ক্রমে।

    যেন এক মানুষ মিলে গেছে সমাজে, মাত্র এক মানুষ, যে এইসব ভদ্র হিন্দু পরিবারের মানুষদের চেয়ে কোনও অংশে কম যায় না। সামু ঢাকা থেকে এলেই ফেলুর ঘুরঘুর করা বেড়ে যায়। সে ওর ভাঙা হাত সম্পর্কে নালিশ দেবার সময় ক্ষোভে-দুঃখে ভেঙে পড়ে। ভিতরে ভিতরে এইসব হিন্দু সুখী পরিবারের বিরুদ্ধে তার আক্রোশ ভয়ঙ্করভাবে পীড়ন করলে সামু যেন মোল্লা-মৌলবীর মতো কিছুটা আসানের কথা শোনাতে পারে। সামুর লীগ পার্টি—জিন্দাবাদ—আমাদের জন্য একটা দেশ চাই। এই দেশে আমাদের ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটা জায়গা চাই। তারপরে যে কথা শুনলে ফেলুর ঘুম চলে আসে—একদিন এ-দেশটা দুঃখী মানুষের হয়ে যাবে। ফেলু দুঃখী মানুষ ভাবতে সে প্রায় তার গোটা স্বজাতিকে ভেবে ফেলেছিল। তার জন্য কতরকমের জেহাদ—ধর্মযুদ্ধ চাই। তার জন্য কতরকমের বিপ্লব চাই, সামু বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়ত। আমাদের জন্য দেশ, এই দেশ মাটি ফসল সব আমাদের জন্য হবে। আমাদের সুখের জন্য হবে। অধিকাংশ মানুষ যখন আমরাই এই দেশে বসবাস করছি, তখন এই দেশ আমাদের।

    সামু যখন বইয়ের ভাষায় টেনে টেনে কথা বলতে থাকে, তখন মনে হয়, ফেলুর সব ফেলে ঐ এক মানুষের পিছনে থেকে জাতির সেবা করলে কাজটা মোল্লা-মৌলবীর চেয়ে কম ধর্মীয় হবে না। কিন্তু হাত ভেঙে কী হয়ে গেল সে! কাকগুলি মাছের লোভে মাথার ওপর উড়ছে। সে হুস্ করল। বলল, হালার কাওয়া, আমার নাম ফেলু শেখ। সে মাথার উপরে ডান হাতে পাটকাঠিটা ঘোরাতে থাকল।

    আর তখনই বাছুরটা হাম্বা করে ডাকল। হাড় বের করা বাছুরটার মুখ দিয়ে ঠাণ্ডায় লাল পড়ছে। বাছুরটার ঠাণ্ডা লেগেছে, শীতে বাছুরটা ফুলে ঢাক হয়ে আছে। রোদে নিয়ে গেলে ফুলে থাকা ভাবটা গরমে কমে যাবে। তা’ছাড়া হাতে একটা কাজ পাওয়া গেল। এত বেলায়ও যখন আন্নু ফিরে এল না, বাছুরটা ক্ষুধায় হাম্বা করছে—ওকে নিয়ে তবে মাঠে নেবে যেতে হয়। খোঁটাতে বেঁধে দিলে কিছু ঘাসপাতা খেতে পাবে। ঘাসপাতা খেলে শক্ত হবে বাছুরটা।

    আন্নু আসছে না। কী করা যায়? সে তাড়াতাড়ি ডান হাতে মাছগুলি তুলে ফেলল। ঘরের ভিতর মাছ রেখে ঝাঁপ বন্ধ করে দিল। সে বাছুর নিয়ে গোপাটে নেমে গেল। খোঁটা পুঁতে দিলে দেখল কাতারে কাতারে লোক বিলে শালুক তুলতে যাচ্ছে। সব মুসলমান বিবি, বেওয়া। ওরা এ-অঞ্চলের সব মুসলমান গ্রাম থেকে নেমে যাচ্ছে। আর এই তো সামনে বিশাল বিলেন মাঠ। হাইজাদির সরকাররা পুকুরপাড়ে বাস্তুপূজা করছে। ভেড়া বলি হচ্ছে। ঢাক বাজছে, ঢোল বাজছে।

    বাস্তুপূজার জন্য ঠাকুরবাড়ির ছোট ঠাকুর বের হয়ে পড়েছেন। তিনি হিন্দু গ্রামে উঠে সব হিন্দু গেরস্থবাড়িতে বাস্তুপূজার তিল-তুলসী দেবেন। বাস্তুপূজায় ঢাক বাজছে। পূজা-পার্বণে ঘুরে বেড়াবেন, মন্ত্র পড়বেন। ঈশম আজ তাঁর সঙ্গে যাবে না। সে কাল যাবে। চাল কলা এবং তৈজসপত্র সব বোচকা বেঁধে আনবে।

    সংরকারদের বাস্তুপূজায় কত মেয়ে-বউ এসেছে নতুন শাড়ি পরে কপালে সিঁদুরের টিপ, হাতে সোনার গহনা, পরনে গরদের শাড়ি আর ওদের কেমন মিষ্টি চেহারা—কী সুন্দর মুখ। একেবারে য্যান হেমন্তে সোনালী বালির নদীর চর। পূজা হচ্ছে, পার্বণ হচ্ছে। কুটুমের মতো ঠাকুরবাড়ির বড়বৌ, ধনবৌ পুকুরপাড়ে নেমে এল। জমির বুকে ছোট কলাগাছ, নিচে ছোট ঘট। ঘটের ওপর নারকেল আর চারধারে সব নৈবেদ্য—যেন ভোজ্যদ্রবের অভাব নেই। তিলা কদমা শীতের যত খাদ্যদ্রব্য সব ওদের আয়ত্তে।

    আর কী জ্বালা, জ্বালা নিবারণ হয় না জলে, জালালি জলের দিকে নেমে যাবার জন্য মাঠের ওপাশে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আর কী জ্বালা, বাছুরটা কিছুতেই ঘাসে মুখ দিচ্ছে না। শীতের ঘাস—শিশিরে ভিজে আছে ঘাস। যতক্ষণ রোদ ভালোভাবে না উঠবে, যতক্ষণ হিম ঘাস থেকে ভালোভাবে না মরে যাবে ততক্ষণ বাছুরটা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে, ঘাসে মুখ দেবে না। সে রাগে দুঃখে বাছুরটা ঘাস খাচ্ছে না বলে পেটে লাথি বসিয়ে দিল। বাছুরটা দু’হাঁটু মুড়ে মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। কারণ ওর মনে হচ্ছিল বাছুরটা তাড়াতাড়ি ঘাস ক’টা না খেয়ে ফেললে, এক ফাঁকে হাজিসাহেবের খোদাই ষাঁড়টা অথবা গৌর সরকারের দামড়া গরুটা এসে চেটে পুটে এই তাজা ঘাস খেয়ে ফেলবে। এই ঘাস সে যেন মাঠে নেমে আবিষ্কার করে ফেলেছে। তাড়াতাড়ি বাছুরটা ঘাস খেয়ে ফেললে আর কেউ এসে ভাগ বসাতে পারবে না। কিন্তু বলিহারি যাই হালার মাগী আন্নু ভাগে এক বাছুর এনেছে! এমন এক মরা বাছুর যার কপালে সুখ নাই, গায়ে বল নাই, আছে কেবল মল-মূত্র ছড়ানো ছিটানো অথবা ধ্যাবড়ানো। আন্নুর কথা মনে হতেই সে সব ফেলে গাঁয়ের দিকে উঠে যাবে ভাবল। এক শিশি তেল ধার করতে এত দেরি!

    দূরে ঢাক বাজছে, ঢোল বাজছে। ওর কানে বড় বেঢপ লাগছে শব্দটা। জালালিকে দেখা যাচ্ছে। অনাহারে জালালি কাতর! এখন ফাওসার বিলে নেমে যাবার জন্য প্রতাপ চন্দের ঘাট পার হচ্ছে। সে, সামনে যেসব জমি আছে, শ্যাওড়া গাছের বন আছে তা অতিক্রম করে বেনেদের পুকুরপাড় ধরে হাঁটছে। সেই এক বিস্তীর্ণ মাঠ, মাঠের সব জমি প্রতাপ চন্দের। সেই সব জমি পার হলে ফওসার খাল। খালের পাড়ে পাড়ে যত জমি পড়বে- পাটের, আখের, এমনকি করলার জমি, সব গৌর সরকারের। তারপর যত জমি, সব হাজিসাহেবের। হাজিসাহেবের তিন বিবি, ছোট বিবির বয়স আর কত—এই এক কুড়ি চার-পাঁচ হবে। হাজিসাহেব ঈদের দিনে তিন বিবি মসজিদে নিয়ে যাবার সময় চারদিকে নজর রাখেন। সতর্ক নজর। কেউ নজর দিয়ে গিলে ফেলল কিনা দেখেন। অন্তরালে কিছু দেখা যায় কিনা, হেই হেডা কি হইছে। নজরে লালসা ক্যান, বলে হয়তো একটা পাঁচনের খোঁচা মারেন মাইজলা বিবিরে। খোঁচা দিয়ে কন, বিবিরে, অঃ সোনার বিবি, পথ দেইখা হাঁট। তখন কেবল কেন জানি মনে হয় ফেলুর, পাঁচনটা কেড়ে নিয়ে এক বাড়ি হালার হালা, হাজির মাথায়। ভাবতে ভাবতে এসব, ফেলুর মাথায় খুন চড়ে যায়, ফেলু স্থির থাকতে পারে না—কেবল কি সব মনে হয়। ফেলু, যে ফেলু কোন মাতব্বর নয়, জলে-জঙ্গলে যে ফেলু মানুষ হয়েছে, যে ফুেলকে উজান থেকে হাজিসাহেব ধরে এনেছিল—উজানি নৌকাতে ধান কাটা সারা হলে, ফেলু হাজিসাহেবের পেটে পিঠে পায়ে রসুন গোটার তেল গরম করে মেখে দিত, সেই ফেলুর কেন জানি বড় সাধ মাঝে মাঝে হাজিসাহেবের মাইজলা বিবিরে একবার বোরখার অন্তরালে উঁকি দিয়া দ্যাখে।

    সে গোপাটে দাঁড়িয়ে ছিল। বড় সেই অশ্বত্থ গাছটির নিচে বিচিত্র সব মটকিলা গাছের ঝোপ, পাতাবাহারের জঙ্গল। শীতকাল বলে জঙ্গলের ভিতরটা শুকনো খটখটে। ভিতরে ঢুকে গোসাপের মতো ঝোপের আড়ালে সন্তর্পণে পড়ে থাকলে হয়তো মাইজলা বিবিরে দেখা যাবে—কারণ, ও-পাশটায় হাজিসাহেবের অন্দরের পুকুর। ঝোপের ভিতর থেকে উঁকি দেবার আগে চারপাশটা সে দেখে নিল। বাঁদিকে আবেদালির ঘর, কেউ এখন ঘরে নেই। আমগাছটার নিচে ভাঙা ঘর এখন খালি। উত্তর-দুয়ারী ঘরে সেই কবে জোটন বাস করত, এখন জোটন নেই বলে বর্ষায় বৃষ্টিতে ঝড়ে ঘরটা একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কিছু ঝোপজঙ্গল, বেতগাছ আবেদালির বাড়িটাকে সব সময় অন্ধকার করে রাখে। কোনও রকমেই শীতের সূর্য আবেদালির উঠোনে নামতে চায় না।

    আর এইসব ঘর উঠোন এবং ঝোপ-জঙ্গল পার হলেই—হাজিসাহেবের আতাবেড়ার ওপাশে তিন বিবির গলা, কাচের চুড়ির মতো জলতরঙ্গ বাজিয়ে চলেছে। কি হাসে! হাসতে হাসতে মনে হয় হালার দুনিয়া গিলা ফ্যালবে। সিঁথিতে বড় লম্বা টান ধানখেতের সাদা আলের মতো। আর ডুরে শাড়ি হাঁটুর নিচে বেশিদূর নামতে চায় না। ঝোপের ভিতর থেকে ফেলু মরিয়া হয়ে এবার উঁকি দিল। হাত পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে, ডান হাতটা কোনওরকমে কাজে লাগছে এখনও, কবে এই হাতটা পঙ্গু হয়ে যাবে—সে প্রায় একটা মরা সাপের মতো ঝোপের ভিতর পড়ে থাকল। ঝোপের পাশ দিয়ে ঘাটের পথ। হাজিসাহেবের অন্দরের পুকুরের পানি কি কালো। পানি দেখলেই বিবি-বৌদের পেটে জ্বালা ধরে। তলপেটটা শিরশির করতে থাকে। কালো পানির টানে চুপি চুপি সময়ে-অসময়ে মাইজলা বিবি ঘাটে নেমে আসে। এলেই খপ করে হাত ধরে ফেলবে, ধরে ঝোপের ভিতর টেনে-ফেলু আর অপেক্ষা করতে পারল না। সে কচ্ছপের মতো এবার গলাটা তুলে ধরল। সে মরা সাপের মতো বেশি সময় শিকারের আশায় ঝোপের ভিতর পড়ে থাকতে পারছে না।

    যখন মন খুশিতে উজান বয় না তখন ডাকে আন্নু। আর যখন মন উজানি নদীর মতো মাতাল তখন ডাকে, আন্নু বেগম। পেট পুরে খেতে পারলে ডাকে বেগমসাহেবা। ফেলু বেগমাসাহেবার জন্য পাগল, আর পাগল এই মাইজলা বিবির সুরমাটানা চোখের জন্য। ঘাট থেকে তাড়িয়ে দেবার পর এই অশ্বত্থের ঝোপ ওর মতো নিরালম্ব মানুষের সামান্য আশ্রয়। সে ঝোপের ভিতর একটা মরা গো-সাপের মতো সেই থেকে পড়ে আছে—মাইজলা বিবি এ-পথে এখনও ঘাটে এসে নামছে না।

  • তের

    তের

    এখন শীতের দিন। জমি থেকে সব ফসল উঠে গেল বলে মাঠ ফাঁকা। কেবল নরেন দাস অথবা মাঝি-বাড়ির শ্রীশচন্দ্র, প্রতাপ চন্দ কামলা দিয়ে নিচু জমিতে তামাকের চাষ করছে। আর সব উর্বরা জমি থাকলে সেখানে পেঁয়াজ, রসুন এবং চীনাবাদামের গাছ দেখা যাচ্ছে। এই পথে কেউ বড় এখন আসবে না। এলেও ঝোপের ভিতর যে একটা মানুষ শিকারী বেড়ালের মতো ওৎ পেতে আছে টের পাবে না। জালালির শরীরটা এখন মাঠের শেষে অদৃশ্য হয়ে গেছে। পুবের বাড়ির মালতী গরু নিয়ে এসেছে গোপাটে। সে গোপাটে গরুর খোঁটা পুঁতে চলে যাচ্ছে।

    সরকারদের ঘাট পাড়ে তেমনি ঢাক বাজছে, ঢোল বাজছে। মাঠে মাঠে বাস্তুপূজার নিশান উড়ছে। ঠাকুরবাড়ি, পালবাড়ি এবং বিশ্বাসপাড়া যেদিকে তাকানো যাচ্ছিল সব দিকে সেই ঢোলের বাজনা আর মেষ অথবা মোষের আর্তনাদ। মোষ বলির সময় হলে সরকারদের পঞ্চাশজন ঢাকি একসঙ্গে ছররা ছোটাবে। সে একবার একটু কাৎ হয়ে গলাটা কচ্ছপের মতো যেন বাড়িয়ে দিল। মনে হল মাইজলা বিবির মুখ শরীর ঝোপের অন্য পাশে–ঠিক ঘাটের মধ্যে নেমে আসছে। ভেসে উঠেও উঠল না। মরীচিকার মতো ঝিলিমিলি করছে শুধু। আহা, ভেতরটা কেমন করছিল ফেলুর।

    তখন হাইজাদির সরকারেরা করজোড়ে নতুন গামছা গলায় দাঁড়িয়ে আছে। মোষের ধড় এবং মুণ্ডু নিতে যারা শীতলক্ষ্যার পার থেকে এসেছিল, তারা ঘাটের অন্য পাড়ে দাঁড়িয়ে। মাঠে মাঠে উৎসব আর ঝোপের ভিতর ফেলু। সে মাইজলা বিবির মরীচিকা দেখার জন্য ঝোপের ভিতর কচ্ছপের মতো গা তুলে রাখল।

    মালতী গোপাটে গরুর খোঁটা পুঁতে তাড়াতাড়ি শোভা আবুকে নিয়ে ঠাকুরবাড়ির ঘাটে স্নান করতে চলে গেল। বাস্তুপূজা বলে সকাল সকাল আভারানী স্নান করেছে। মাঠে অমূল্য কলাগাছ পুঁতে এসেছে। এবং দুর্বাঘাস চেঁচে চারদিকটা পরিচ্ছন্ন করে শুকনো আমের ডাল বেলপাতা সব পেড়ে এনে বারকোষে রেখে দিয়েছে। গোটা তিনেক জমি পার হলে ঠাকুরবাড়ির ভিটা জমি। সেখানে বড়বৌ ধনবৌ সকাল সকাল স্নান করে চলে এসেছে। সোনা, ঠাকুরঘর থেকে কাঁসি নিয়ে ছুটছে। সোনা কাঁসিটা জোরে জোরে বাজাচ্ছিল। পুকুরের জলে কচুরীপানা কলমিলতা এবং শীতের সময় বলে গাছে কোনও ফল নেই, ফুল বলতে কিছু শীতের ফুল ঝুমকোলতা, শ্বেতজবা, রাঙাজবা। বাস্তুপূজায় রাঙাজবা দিতে নেই। শ্বেতজবা কে ভোর না হতেই গাছ থেকে চুরি করে নিয়ে গেছে। বড়বৌ সাজিতে সামান্য ফুল সংগ্রহ করতে পেরেছেন। খুঁজেপেতে কিছু শ্বেতজবা, কিছু পলাশ ফুল আর টগর। গাঁদা ফুল কিছু আছে। শীতের জন্য শ্বেতজবা তেমন ফোর্টে না ভালো, ফুলগুলি কুঁকড়ে আছে—অসময়ের ফুল বড় হতে চায় না।

    তখন জালালি সমস্ত গরিবদুঃখী মানুষের সঙ্গে সেই বড় বিলে, প্রকাণ্ড বিলে—এ-পাড়ে দাঁড়ালে যার ও-পাড় দেখা যায় না, যে বিলে ভিন্ন ভিন্ন সব কিংবদন্তী রয়েছে, বিলের চারপাশে নলখাগড়ার বন, মাঝে মাঝে উঁচু ডাঙা, আবার দু’দশ একর নিয়ে গভীর জল, কালোজল বড় গভীর—যেখানে মানুষ যেতে, নৌকা বাইতে ভয়, তেমন বিলে নেমে যাচ্ছে জালালি। জলের ভিতর কি এক দৈত্য থাকে বুঝি, কিংবদন্তীর দৈত্য। ওর পেট পিঠ জ্যোৎস্না রাতে ময়ূরপঙ্খী নৌকার মতো। নৌকা যেন এক জলে ভাসে, জলে ভেসে নৌকা যায়, ময়ূরপঙ্খী ভেসে যায়। তারপর মানুষের সাড়া পেলে টুপ করে জলের নিচে ডুবে যায়—হায়, মানুষের অগম্য বুদ্ধি। অজ্ঞ মানুষের বিশ্বাস, অলৌকিক ঘটনার মতো ঘটনা নেই। দুপুর রাতে চরাচরে যখন মানুষ জেগে থাকে না, যখন সারা বিলটা পাঁচ-দশ ক্রোশ জুড়ে জলের ভিতর ডুবে থাকে, যখন জ্যোৎস্নায় ফসলের মাঠ ভরে থাকে তখন জলে এক ময়ূরপঙ্খী নাও ভাসে—ভিতরে রাজকন্যা এক, চাঁদবেনের পুত্রবধূ হবে হয়তো, বেহুলা লখীন্দরের পাঁচালি মানুষের প্রাণে বিহ্বলতা জাগায়।

    নৌকা বিলের জলে ভেসে উঠলে আলোতে আলোময়। যেন মাঝ বিলে আগুন ধরে গেছে। তেমন বিলে নেমে যাবার আগে জালালি জলটা প্রথম মাথায় দিল, পরে মুখে জল দিল, তারপর গোসাপের মতো জলে ভেসে গেল। শীত কনকন করছে—কিন্তু পেটের জ্বালা বড় জ্বালা, জ্বালা নিবারণ হয় না জলে। কবে আবেদালি গেছে, মাস পার হয়ে যাবে প্রায়, ঘুরে এল না এখনও। এলেও দু’চার হপ্তা পেট পুরে খাওয়া। তারপর ফের উপোস। জালালি জলে ভাসতে থাকল। ফুৎ করে জল মুখে নিয়ে হাওয়ার ভিতর জল ছুঁড়ে দিতে থাকল।

    সব মানুষ সাঁতার কেটে যেখানে শাপলা-শালুকের পাতা ভেসে আছে সেদিকটায় চলে যেতে থাকল ক্রমশ। বড় শালুকের জন্য সকলের লোভ বেশি। এ-জলে কি আছে কি নেই,কেউ বড় জানে না। বরং কী নেই, কী থাকতে না পারে এই বিস্ময়। সেই এক সালে হাজার হাজার মানুষ পুরীপূজার মেলা থেকে ফিরে আসার সময় দেখেছিল—বিলের ঠিক মাঝখানে কালো রঙের এক মঠ ভেসে উঠেছে। ভেসে উঠতে উঠতে কিছু ওপরে উঠে থেমে গেল। তারপর ফের নিচে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল। প্রায় স্বপ্নের মতো ব্যাপারটা। যারা দেখেছে, তারা মন্ত্রের মতো বিশ্বাস করেছে, যারা দেখেনি তারা আজগুবি গল্প মনে করেছে। আর যাদের অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাস আছে তারা, খবরটাকে নিয়ে নতুন কিংবদন্তী সৃষ্টি করেছে। মনে হয় বুঝি ঈশা খাঁ সোনাই বিবিকে নিয়ে এ-বিলে লুকিয়ে রয়েছে। সেই জাহাজের মতো হালের দাঁড় কালো রঙের মঠের মতো জলের ওপর ভেসে ওঠে মাঝে মাঝে। শুধু একটু দেখিয়েই যেন ডুব দেয়। যেন বলে, দ্যাখো, দ্যাখো আমি এখনও বুড়ো বয়সে সোনাইরে নিয়ে বড় সুখে আছি বিলের ভিতর। তোমরা আমার অনিষ্ট করলে, আমিও তোমাদের অনিষ্ট করব। সেই ভয়ে ভরা ভাদরে সোজা বিলের মাঝ বরাবর কেউ নৌকা ছাড়ে না। এ-বিল বড় ভয়ঙ্কর। বিলের তল নেই, জলের নিচে মাটি নেই। শুধু যেন অন্ধকার আর প্রাচীন সব লতাগুল্ম নিয়ে চুপচাপ জলের ভিতর ডুবে আছে। ভয়ে এ-বিলে কেউ নৌকায় বাদাম দেয় না। বড় নিভৃতে যেতে হয়, যেন ঈশা খাঁর কালঘুম ভেঙে না যায়।

    অঞ্চলের মানুষেরা এ-বিলকে দানবের মতো ভয় পায়। ঈশম যে ঈশম, সে পর্যন্ত এ বিলের পাড়ে এসে পথ হারিয়ে ফেলেছিল। কি এক জীনপরী পিছু লেগে ওকে রাতের বেলায় অজ্ঞান করে দিয়েছিল। সেই বিলে গরিবদুঃখী মানুষেরা পেটের জ্বালা নিবারণের জন্য জলে নেমে গেল।

    পেটের জ্বালা বড় জ্বালা, জ্বালা মরে না জলে। জলের ভিতর ভেসে ছিল জালালি, যেন নেমে গেলেই পেটের জ্বালা নিবারণ হবে। কিন্তু হায়, জলের ভিতর কাদার ভিতর কোথাও শালুকের নাম গন্ধ নেই। রোজ রোজ তুলে নিয়ে গেলে কি আর থাকে! কিছু মরা শাপলা পাতা সামনের জলে উল্টে আছে। শীতের দিনে শাপলা ফুল আর ফোটে না। শাপলা ফুলে কালো কালো ফল হয়েছে। সে দুটো ফল সাঁতরাতে সাঁতরাতে সংগ্রহ করে ফেলল। এবং জলের ভিতরই জালালি ভাসতে ভাসতে খেতে থাকল। ভিতরে এক ধরনের কালো কালো বীচি, এক ধরনের সোঁদা সোঁদা গন্ধ, স্বাদ বলতে মরি মরি কিছু না, খেতে হয় বলে খাওয়া। পেটের ভেতর জ্বালা থাকলে কী খেতে না সখ যায়। লাল আলুর মতো সেদ্ধ করে খেতে হয় শালুকের ভেতরটা। একটু নুন দিয়ে, কোনও কোনও সময় তেঁতুলের অল্প গোলা ফেলে দিলে প্রায় অমৃতের মতো স্বাদ। লোভে সাঁতার দিতে থাকল জালালি। সামনে দুটো শালুক পাতা জলের ভিতর ডুবে আছে। লতা দুটো ধরার জন্য সে জলের ভিতর ডুব দিল। জলের নিচে নেমে গেল। অনেক নিচে, লতা ধরে ধরে আলগোছে তা ধরে ধরে—জোরে টান দিলে লতাটা ছিঁড়ে যাবে, লতা ছিঁড়ে গেলে সব গেল, জাদুর ঘরে নেমে যাবার সিঁড়িটা তুলে নেবার মতো হবে। সুতরাং খুব সন্তর্পণে জলে ডুবে যাবার জন্য, অন্ধকার মাটিতে হাতড়ে বেড়ানোর জন্য, ডুবুরির মতো বুড়বুড়ি তুলে প্রায় হারিয়ে গেল। জলের নিচে বড় ভয়। ভয়ে চোখ খুলছে না জালালি। চোখ খুললেই মনে হয় কোন জাদুকরের দেশে সে পৌঁছে গেছে। জলের নিচে জলজ ঘাসেরা তাকে নেচে নেচে ভয় দেখায়। নীল অথবা সবুজ মনে হতে হতে একটা কালো কুৎসিত অন্ধকার চারপাশ ঢেকে ফেলে। সে এক শ্বাসে জলের নিচে ডুবে নিমেষে জল কেটে আবার ওপরে ভেসে উঠল। তারপর কত দীর্ঘকাল পর যেন আকাশ মাটি এবং সূর্য দেখতে পেয়েছে এমন নিশ্চিন্তে শ্বাস নেবার সময় মুখটা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে—সোনার চেয়েও দামী একটা বড় শালুক ওর হাতে।

    পাতিলটা ঢেউ খেয়ে একটু দূরে সরে গেছে। সে পাতিলটাক টেনে এনে শালুকের শেকড়গুলি প্রথম কামড়ে ছিঁড়ে দেখল শালুকটা যত বড় ভেবেছিল—ঠিক তত বড় নয়। শালুকটা বোধ হয় রক্ত শাপলার। পেতি শাপলার সালুক বেশ মিষ্টি। সাদা শাপলার শালুকে কষ বেশি। রক্ত শাপলার শালুকে অল্প তিতাভাব থাকে। তবু শালুকটাকে পরিচ্ছন্ন করে খুব যত্নের সঙ্গে পাতিলের ভিতর রেখে পাড়ের দিকে তাকাল। কেউ আর পাড়ে দাঁড়িয়ে নেই। যে যার মতো শালুকের খোঁজে জলে ভেসে দূরে চলে যাচ্ছে। আবেদালি আসে না, কতকাল আসে না, সেই কবে গয়না নৌকার মাঝি হয়ে চলে গেল—আর আসে না। জব্বর আসে না। সে বাবুর হাটে তাঁতের কাজ নিয়ে চলে গেছে। জোটন এসেছিল একটা মুরগি নিয়ে আবেদালিকে খাওয়াবে বলে, মুরগিটা উড়াল দিয়ে সেই যে হাজিসাহেবের বাড়িতে চলে গেল, আর এল না। হাজিসাহেবের ছোট বিবি কোতল করে ফেলল মুরগির গলাটা।

    বিলের জলে দুঃখী মানুষেরা শালুকের খোঁজে ভেসে বেড়াচ্ছিল। চারপাশের গ্রাম থেকে দুঃখী মানুষেরা হেঁটে এসে নেমে গেল জলে। বেলাবেলিতে সকলে জল ছেড়ে উঠে যাবে। এই শীতের শেষে আর যখন শালুক থাকবে না, যখন জলের ওপর আর কোনও শালুক পাতা ভাসবে না অথবা এই বিলের জল শান্ত নিরিবিলি, তখন ঝোপেজঙ্গলে অথবা জলের ওপর বালিহাঁস ভাসবে। নানা রকমের পাখি, লাল-নীল পালকের পাখি, জলপিপি এবং ভিন্ন ভিন্ন সব বক ছোট বড় চকাচকিতে প্রায় বিলটা ছেয়ে যাবে। তখন মুড়াপাড়ার জমিদারবাবুর ছেলেরা হাতিতে চড়ে আসবেন, তাঁবু ফেলবেন বিলের ধারে এবং ভোরে অথবা জ্যোৎস্নায় পাখি শিকার করে তাঁবুতে পাখির মাংস, ওরা শীতের শেষে মাসাধিক কাল পাখির মাংসে বন মহোৎসব চালাবে।

    গ্রীষ্মকালটাই জালালির বড় দুঃসময়। প্রায় মাটিতে পেট দিয়ে পড়ে থাকতে হয়। বর্ষা এলে ধানের জমিতে, পাটের জমিতে আবেদালির কাজের অন্ত থাকে না। বর্ষা শেষ হলে জল কমতে থাকলে, শাপলা ফুল ফুটতে থাকলে মাটির নিচে অন্নের মতো প্রিয় এই শালুক, দুঃখী মানুষদের, নিরন্ন মানুষদের একমাত্র সম্বল এই শালুক, বর্ষা এলেই মাটির ভিতর জন্ম নিতে থাকে। এই জলা জমি আর মাটির অন্তরে শালুক আপনার প্রিয় ধন—যেন ফেলতে নেই, অবজ্ঞা করতে নেই। বসে থাকলে পাপ, ভেসে বেড়ালে পুণ্য। জালালি পাতিলটার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে বেড়াতে থাকল। ডুব দিলে তখন অন্য কেউ হাত বাড়িয়ে পাতিল থেকে শালুক তুলে নিতে পারে।

    সামনে শুধু জল, প্রায় অনন্ত জলরাশি। শালুকের লোভে সে খুব দূরে চলে এসেছে। বোধ হয় এর পর আর শালুক নেই। ডান দিকে পদ্মফুলের বন। বাঁ দিকে স্ফটিক জল। সামনের জলে কি যেন সব ভেসে বেড়াচ্ছে। কি হবে আর–বড় গজার মাছ হবে হয়তো। বড়-বড় মাছ, থামের মতো লম্বা গজার মাছ। কালো কুচকুচে, মাথায় মুখে লাল সিঁদুর গোলা রঙ, গায়ে অজগর সাপের মতো চক্র। ওর ভয় লাগছিল। তবু মনে হয়, ভয়ে হোক বিস্ময়ে হোক কেউ এতদূর আসেনি। কেউ আসেনি বলেই বোধ হয় কিছু ইতস্তত শালুক এখনও পড়ে আছে। সে ভয় থেকে রেহাই পাবার জন্য চোখ বুজে জলের নিচে ডুব দিল। কিন্তু জলের নিচে চোখ খুলতেই মনে হল—বড় একটা গজার মাছ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। লেজ নাড়ছে। স্থির। গজার মাছটা জালালিকে দেখছে। জলের নিচে আজব একটা জীব, বোধ হয় মনুষ্যকুলের কেউ হবে—প্রায় ব্যাঙের মতো নিচে নেমে আসছে। প্রাচীন সব জলজ ঘাস এবং লতার ভিতর মাছটা মুখ বার করে রেখেছে। জালালি চোখ খুলতেই শুধু মাছটার মুখ দেখতে পাচ্ছে। কালো ভয়ঙ্কর মুখ একবার হাঁ করছে, আবার জল গিলে মুখ বন্ধ করছে। জালালিকে মাছটা এতটুকু ভয় পাচ্ছে না। বরং জালালিকেই ভয় পাইয়ে দিচ্ছে।

    হায়, পেটের জ্বালা, বড় জ্বালা, জ্বালা সহে না প্রাণে। ভয়ে বিস্ময়ে জালালি জলের নিচে এতটকু হয়ে আছে। তবু লোভ সামলাতে পারল না জালালি। আর একটু নিচে গেলেই মাটিতে হাত লেগে যাবে এবং শালুকটা আয়ত্তে চলে আসবে। দমে আসছিল না। সে তাড়াতাড়ি শ্বাস নেবার জন্য জল কেটে ভেসে উঠল। দম নিল, একটু সময় ভেসে থেকে বিশ্রাম নিল। ফের ডুবে জলের নিচে চলে যেতে থাকলে দেখতে পেল, সবুজ এক দেশ, নীল জলের গালিচা পাতা। অন্ধকার, ক্রমে অন্ধকার আরও ঘন হয়ে আসছে। তারপরই লতার গোড়ায় ঠিক মাটিতে যেখানে শাপলা পাতার লতা এসে থেমে গেছে সেখানে হাতটা ঠেকে গেল। অন্ধকারেও টের পাচ্ছিল জালালি, মাছটা মুখ হাঁ করে এগিয়ে আসছে। অতিকায় মাছ। তবু একটা মাছ, সে যত অতিকায় হোক, বড় হোক, সে মাছ। একটা মাছ, সামান্য মাছ, তুমি মাছ যত বড়ই হও—আমি মনুষ্যকুলে জন্মে তোমাকে ভয় পাব! বোধ হয় সে এমন কিছু ভাবতে ভাবতে শালুকের গোড়া চেপে ধরল। তারপর সে দেখল মাছটা সবুজ রঙের ঘাসের ভিতর মুখটা নাড়ছে। খুব সন্তর্পণে নাড়ছে আর জালালিকে দেখছে। শালুকটা হাতে পেয়ে জালালির সাহস বেড়ে গেল। সে ভ্রূক্ষেপ করল না। সে আর একটু এগিয়ে গেল। মাছটা এবার পিছু হটে যাচ্ছে। সে এবার আর দেরি করল না। যখন মাছটা ভয় পেয়ে যাচ্ছে তখন আর ডুবে থেকে কি হবে। সে ভোঁস করে জল কেটে শুশুকের মতো পিঠ ভাসিয়ে দিল।

    সেই কবে একবার জালালি জলের নিচে হাঁস চুরি করে গলা টিপে ধরেছিল, কবে একবার মালতীর পুরুষ হাঁসটাকে ঝড়ের রাতে পুড়িয়ে নরম মাংস এবং ঠ্যাঙ চিবিয়ে আল্লার দুনিয়া বড় সুখের ভেবে বড় একটা ঢেকুর তুলেছিল—এখন শুধু তার কথা মনে আসছে। সেই মৃত হাঁসটার মতো মাছ, মাছটার চোখ সারাক্ষণ জলের নিচে স্থির হয়ে ছিল। যেন এক বড় অজগর সাপ ওকে গিলতে আসছে এমন মনে হল। কিন্তু সাপ হলে সব জায়গাটা এতক্ষণে প্লাবনের মতো তোলপাড় হতে আরম্ভ করত। এত স্থির থাকত না। সে এটাকে মনের ভয় ভাবল। জলের নিচে চোখ খুললেই মনে হয় সব বিচিত্ৰ গাছগাছালি যেন প্রাণ পেয়ে তার দিকে ধেয়ে আসছে। সে সহজে সেজন্য চোখ খুলতে চায় না।

    সবুজ রঙের কদম ফুলের মতো ঘাসের অন্ধকারে জালালি বুঝতে পারেনি কী তার দিকে এগিয়ে আসছে। সে বেশ সুখে একটার পর একটা ডুব দিয়ে গভীর জলের ভিতর চলে যেতে থাকল। ঠিক ডুবুরীর মতো জলের নিচে ডুবে যাচ্ছে, জলের ওপর ভেসে উঠছে। তেমন অসংখ্য মানুষ এখন পাড়ে দাঁড়ালে দেখা যাবে, জলের ভিতরে তারা ডুবে যাচ্ছে, জলের ওপর ভেসে উঠছে। কখনও শালুক পাচ্ছে, কখনও পাচ্ছে না। আর ঠিক কখন পাবে কেউ বলতে পারছে না। সব শাপলালতার গোড়ায় শালুক থাকে না। ফলে শালুক তোলার দলটা বিলের জলে ছড়িয়ে পড়ছিল। সুর্য ওপরে উঠে গেছে। দুরে চোখ মেলে তাকালে, শুধু গভীর জল—শান্ত এবং কালো। সেখানে এক শীতল ঠাণ্ডা ঘর রয়েছে যেন। ওপার দেখা যাচ্ছে না। অনন্ত জলরাশি কত প্রাচীনকাল থেকে ভিন্ন ভিন্ন কিংবদন্তী নিয়ে বিলের ভিতর ভেসে বেড়াচ্ছে। শীতের সময় জলের রঙটা আরও কালো হয়ে ওঠে। শীতের সময় চারপাশের নলখাগড়ার ঝোপ থেকে পাখিরা অন্যত্র উড়ে যায় এবং ঝোপের ভিতর যেখানে জল থেকে জমি ভেসে উঠেছে সেখানে বিষাক্ত সাপেরা গর্তের ভিতরে মরার মতো শীতের ঠাণ্ডায় পড়ে থাকে। গ্রীষ্মের জন্য, বর্ষার জন্য ওদের প্রতীক্ষা। বর্ষা পড়লেই অথবা বসন্তকালে যখন সূর্য মাথার উপর কিরণ দেয় তখন বিষাক্ত সাপ সব মাঠ থেকে জলে নেমে যায়। জলের ওপর ভেসে বেড়ায়। দূরের গজারী বন থেকে তখন কিছু ময়াল সাপ পর্যন্ত এই বিলের জলে নেমে আসে। জালালি জলের ভিতর দেখছিল লাল চোখ দুটো ওর দিকে সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকছে। কিছুই স্পষ্ট নয়। কারণ অন্ধকার বড় প্রকট জলের গভীরে। নীল অথবা সবুজ রঙের ঝোপের ভিতর যদি আরও দুটো শালুক খুঁজে পাওয়া যায়—প্রলোভনে জালালি একটা পাতিহাঁস হয়ে গেল আর জলের ভিতর ডুবে-ডুবে লাল চোখ দুটোকে মরণ খেলা দেখাতে থাকল।

    .

    তখনও ফেলু ঝোপের ভিতর শুয়ে আছে। নেমে আসছে, আসছে না। এলেই খপ করে ধরে ঝোপের ভিতর টেনে নেবে। কামরাঙা গাছের ছায়ায় বিবির শরীর দেখা যাচ্ছে, যাচ্ছে না। এদিকে রোদ মাথার ওপর উঠে এল। অথচ বিবির মুখ দেখা গেল না, অঙ্গ দেখা গেল না। মাঠের ভিতর বাস্তুপূজার ঢাক-ঢোলের বাজনা কখন থেমে গেছে। পুকুরপাড়ে বড়বৌ। সোনা মাঠের ওপর দাঁড়িয়ে কথা নেই বার্তা নেই কাঁসি বাজাচ্ছে—ট্যাং ট্যাং। পূজা পার্বণ শেষ। এখন সব তিল তুলসী, বারকোষ, নৈবেদ্য এবং তিলা কদমা আর অন্যান্য ভোজ্যদ্রব্য বাড়ি নিয়ে যাওয়া। বড় সাদা পাথরে পায়েস—ধনবৌ সাদা পাথরে পায়েস নিয়ে যাচ্ছে। ফল ফুল, নতুন গামছা, ঘট আর নারকেল নিয়ে যাচ্ছে রঞ্জিত। মাঠের ভিতরই প্রসাদ বিতরণ হচ্ছে। গ্রামের যুবা পুরুষেরা, বৃদ্ধ, বৃদ্ধারা প্রসাদ নিয়ে চলে যাচ্ছে। তারপর হ্যাজাকের আলো জ্বলবে রাতে। সরকাররা পুকুরের পাড়ে চার পাঁচটা হ্যাজাক জ্বালাবে। পথের ওপর ডে-লাইট জ্বলবে। তখন মাঠে মাঠে আরও সব হ্যাজাকের আলো, আলোতে এই মাঠ এবং গ্রাম সকল একসময়, মাত্র এক রাত্রির জন্য ডুবে থাকবে আর ভেড়ার মাংস এবং আতপ চাউলের সুগন্ধ মাঠময় কী যে গন্ধ ছড়াবে! ফেলুর জিভে জল এসে গেল। রঞ্জিত এখন অন্য জমিতে মালতীকে দেখছে। মালতী বড় ব্যস্ত। সে কিছু লোককে বসিয়ে খিচুড়ি পায়েস খাওয়াচ্ছে। শীতের রোদে বেশ আমেজ ছিল। উত্তুরে ঠাণ্ডা হাওয়ায় বেশ শীত-শীত ভাব। সকলে পেট পুরে খেয়ে রোদের ভিতর ঘাসের ওপর যেন প্রায় গড়গাড়ি দিচ্ছে।

    আর সোনা তখন কাঁসি ফেলে গোপাট ধরে ছুটছে। ফতিমা গোপাটে ছাগল দিতে এসে ইশারাতে সোনাকে ডাকল। যেন ফতিমা শীতের ঠাণ্ডায় একটা কচ্ছপ আবিষ্কার করে ফেলেছে। কচ্ছপটাকে ধরার জন্য সে সোনাকে ডাকছে। এখন শীতকাল। শীতের জন্য কচ্ছপেরা বেশিক্ষণ জলে থাকতে পারে না। পাড়ে উঠে রোদ পোহায়। অথবা জমির ভিতর কচ্ছপেরা লুকিয়ে থাকে। লাঙ্গলের ফালে মাটির ভিতর থেকে কচ্ছপ উঠে আসতে পারে। কিন্তু ফতিমা সোনাকে সে-সবের কিছুই দেখাল না। অশ্বত্থ গাছটার নিচে সোনাকে টেনে নিয়ে গেল। ঝোপের ভিতর কি আছে দ্যাখেন। বলে ফতিমা চুপি দিল। বুঝি মানুষ হবে, পাগল ঠাকুর হবে। ফতিমা অন্তত তাই ভেবেছিল। সোনাবাবুর পাগল জ্যাঠামশাই যিনি রাত-বিরাতে, কোনওদিন খুব ভোরবেলা উঠে মাঠ পার হয়ে সোনালী বালির নদী পার হয়ে নিরুদ্দেশে চলে যান, সেই মানুষই হয়তো আজ বেশি দূর না গিয়ে এই অশ্বত্থের নিচে মটকিলা ঝোপের ভিতর শুয়ে শুয়ে পাখির সঙ্গে গল্প করছেন। ছোট মেয়ে ফতিমা, সামুর একমাত্র মেয়ে ফতিমা জানে না—এই মানুষ পাগল মানুষ নন, এ অন্য মানুষ—ফেলু শেখ। ফেলু শেখ এখনও চুপচাপ সেই পরাণের চেয়ে প্রিয়, মরণে যার স্মৃতি ভোলা দায়—সেই এক পরমাশ্চর্য যুবতীকে খপ করে ঝোপের ভিতর টেনে নেবার জন্য আত্মগোপন করে আছে।

    সোনা ঝোপের ভিতর উঁকি দিয়ে ডাকল, জ্যাঠামশয়। কারণ যখন সব দেখা যাচ্ছে না তখন পাগল মানুষ ব্যতীত আর কে হবেন। এই অঞ্চলে তিনিই তো একমাত্র মানুষ যাঁর কাছে এই মাঠ, গাছগাছালি এবং পরবের দিনে উৎসব সব সমান।

    ফেলু এত নিবিষ্ট যে কতক্ষণ থেকে অপেক্ষা করছে খেয়াল নেই। কার যেন গলা, কে যেন ঝোপে উঁকি দিয়ে পিছনে ডাকছে। হাত পিঠ মুখ ফেলুর দেখা যাচ্ছে না। ঘন ঝোপের বাইরে শুধু পা দুটো দৃশ্যমান, এই পা দেখে ধনকর্তার ছোট পোলা টের পেয়েছে মানুষ আছে ঝোপের ভিতর। ওরা এখন হামাগুড়ি দিয়ে ভিতরে ঢুকছে। আগে সোনা পিছনে ফতিমা। সে তাড়াতাড়ি ধড়ফড় করে উঠে বসল। ঝোপ থেকে পাগলের মতো ছুটে বের হয়ে যাবে ভাবল, কিন্তু তাড়াতাড়ি করলে ধরা পড়ে যাবে, সে কি যেন হাতড়াতে থাকল। তার কি যেন হারিয়ে গেছে।

    সোনা এবং ফতিমা বুঝতেই পারেনি, এমন একটা নীরস মানুষ ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে। সোনা বলল, আপনে!

    ফেলুর কি হারিয়ে গেছে এমন চোখমুখ। সে বলল, ঝোপের ভিতর শিকড়-বাকড় খুঁজতাছি।

    —কি হইব?

    —হাতটা জোড়া লাগব।

    সোনা বলল, পাইলেন নি?

    —না রে কর্তা, পাইলাম না। কৈ যে সব লুকাইয়া থাকে, বলে ফেলু ফতিমার দিকে কটমট করে তাকাল। ঝোপের ভিতর ফতিমা এবং সোনা। ফেলু সোনাবাবুকে কিছু বলল না। শুধু ফতিমার দিকে তাকিয়ে মনে-মনে গজরাতে থাকল, সামু মাইয়াটারে বড় আসকারা দ্যায়। মাইয়াটারে ইংরাজি শিখায়। এত অধর্ম ভাল নয় মনে হল ফেলুর। আর সঙ্গে সঙ্গে পাগল ঠাকুরের মুখ ভেসে ওঠে, মুখ ভেসে উঠলেই ভিতরের সেই অধম্মটা জেগে ওঠে। হাতের দিকে তাকালে ক্ষোভের সীমা থাকে না। ফেলুর প্রতিপত্তি কমে যাচ্ছে। সেই যে বিবি আন্নু সে পর্যন্ত তেলের নাম করে হাজিসাহেবের ছোট বিবির কাছে চলে গেল। ছোট বিবির কাছে গেল কি ছোট সাহেবের কাছে গেল কে জানে! এখনও সে ফিরছে না। ফেলু তাই ভাবল একটু তাড়াতাড়ি করা যাক। বিবির কথা মনে হতেই সে পা চালিয়ে হাঁটল। তাড়াতাড়ি করতে গেলে বড় বাগের ভিতর দিয়ে সোজা উঠে যেতে হয়। পথ নেই, শুধু বাঁশের জঙ্গল। কিছু বেতগাছ এবং চারপাশটা অন্ধকার। দিনের বেলায় হেঁটে যেতে গা ছমছম করে। পাশেই গ্রামের কবরখানা। ফেলু হন হন করে হাঁটছিল। বাঁ হাতে একেবারে শক্তি নেই। কব্জিতে মন্ত্রপড়া কড়ি ঝুলছে। যদি বিবি এখনও সং করে বেড়ায় সে বিবির পেটে এক লাথি মারবে। তার শরীর এবং দাঁত শক্ত হয়ে যাচ্ছে। আর তক্ষুনি দেখল বিবি তার বাগের অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসছে। কিন্তু হাতটা—পঙ্গু হাত নিয়ে কিছু করতে পারল না। বাগের অন্ধকার থেকে বের হতেই সে মুখের উপরে ভয়ঙ্কর চিৎকার করে উঠল, তুই আন্নু!

    আন্নু দাঁড়াল না। এমন মানুষটাকে সে আর ভয় পায় না। পাশ কাটিয়ে যাবার সময় বলল, তুমি মানুষটা ক্যামনতর! কইলাম হুস করতে কাওয়া আর তুমি বাগের ভিতর ঘোরতাছ!

    —তুই এহানে ঝোপে-জঙ্গলে কি করতাছস?

    —সঙের লাইগ্যা তোমারে খোঁজতাছি।

    —আঃ। বিবিটাও ইতর কথা কইতে শিখা গ্যাছে। কারে লাথি মারে ফ্যালু! নিজের পেটে লাথি মারে! ফেলু রাগে দুঃখে নিজের পেটে একটা লাথি মারতে চাইল। বিবিটা পর্যন্ত ধরে ফেলেছে ফেলু পঙ্গু হয়ে গেছে। সুতরাং কে কার পেটে এখন লাথি মারে। আন্নু পরম কুলীন এক যুবতী কন্যার মতো বাগের ভিতরে ডুব দিয়ে জল খাচ্ছে, একাদশীর বাপও টের পাচ্ছে না। ফেলু কেমন কাতর গলায় বলল, তুই মনে করস আমি কিছু বুঝি না! হালার কাওয়া।

    —আর তুই মনে করস আমি-অ কিছু বুঝি না। ফেলুর মুখের ওপর ঝামটা মারল আন্নু।

    —তুই যুবতী মাইয়া, তর বোঝনের না আছে কি ক’। বলে ফেলু কথা আর বাড়াল না। একটু দূরে কাঁঠাল গাছে সোনা, ফতিমা নিচে। কাঁঠাল পাতা অথবা ডাল ভেঙে দিচ্ছে ফতিমার ছাগলটাকে। গোলমাল বাধালে অথবা চিৎকার চেঁচামেচি করলে এখানে ওরা ছুটে আসতে পারে। ছুটে এলেই সব ফাঁস হয়ে যাবে। সে অশ্বত্থের ঝোপে আত্মগোপন করেছিল, গাছে তখন কাক উড়ছিল না, মেলায় গরু যাচ্ছে, গলায় ঘণ্টা বাজছিল আর ঘাসের ভিতর পড়ে থেকে মাইজলা বিবির সনে সঙ—সব টের পাবে যুবতী মেয়ে আন্নু। সে চুপচাপ অন্নুর শরীরের আঁশটে গন্ধটা এবারের মতো হজম করে গেল। সে পাগলের মতো চিৎকার করতে থাকল, গোসল কইরা বাড়ি ঢুকবি। না হয়, তর একদিন কি আমার একদিন। আর এই হজম করার যাবতীয় রাগ গিয়ে পড়ল পাগল-ঠাকুরের ওপর, সে এক হাতিতে চড়ে ওর দুই হাত ভেঙে এখন মাঠে ময়দানে পাখি ওড়াচ্ছে, এবং বাতাসে ফুঁ দিয়ে চলে যাচ্ছে। সেই মানুষকে বাগে পেলে পীর না বানিয়ে ছাড়ছে না। রাগ এবং বিদ্বেষ ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। বিবি আন্নু এই ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর এতক্ষণ তেল আনার নাম করে, ওকে মাছ পাহারায় রেখে এসে কী করছিল সব যেন জানা।

    কিন্তু অসহায় ফেলু দু’হাত ওপরে তুলতে গিয়ে দেখল, সে নাচারি, বেরামি মানুষ। এমন জবরদস্ত বিবির সঙ্গে সে বুঝি ইহজীবনে লড়তে পারবে না। লড়তে পারলে বোধ হয় এই অন্ধকার বাগের ভিতর এখন এক প্রলয়ঙ্কর খণ্ডযুদ্ধ বেধে যেত। অগত্যা ভালো মানুষের মতো আন্নুর পিছনে পিছনে, যেন সে এবং আন্নু, মেমান বাড়ি থেকে বাগের ভিতর দিয়ে ফিরছে—কোনও তঞ্চকতা নেই, পরস্পর তেমনভাবে হাঁটছে, মাঠে তখনও ঢাক বাজছে, ঢোল বাজছে। মালতী প্রসাদ বিতরণ করছে মাঠে। কাগজের লাল নীল পতাকা উড়ছে বাতাসে। মাঠের ভিতর সাদা ধবধবে গরদ পরে মালতী, নিষ্ঠাবতী, ধর্মাধর্ম যার একমাত্র সম্বল, যে সকলের মতো হাঁস পুষে বড় করছে, পুরুষ হাঁসটার জন্য যার মমতা আর বর্ষায় যে চুপচাপ নিঃশব্দে বৃষ্টিতে ভেজে সারারাত ধরে, সেই মালতী, বিধবা মালতী এখন বাস্তুপূজার পায়েস খাওয়াচ্ছে সকল মানুষকে।

    গাছের ডালে সোনাবাবু। ফতিমা দুষ্টু প্রজাপতির মতো চারা কাঁঠাল গাছটার চারপাশে ঘুরছে এবং লাফাচ্ছে। ছাগলটার জন্য সে ডালপাতা সংগ্রহ করছে। সোনা ছাগলটার জন্য ডাল ভেঙে দিচ্ছিল গাছের। কাঁঠাল পাতা খাবার জন্য ছাগলটা, ছোট্ট এক বাচ্চা ছাগল দু’পায়ে ভর করে লাফ, দিচ্ছিল। সোনা ছাগলটার পাতা খাবার আনন্দে, গাছের সব কচিকাঁচা ডালপাতা ভেঙে ছাগলটার দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে। ছাগলটার পাশে এখন পাতার ডাঁই। সোনা লাফ দিয়ে গাছ থেকে নেমে পড়ল। পড়তেই কানের কাছে মুখ এনে ফতিমা ফিসফিস করে বলল, যাইবেন সোনাবাবু?

    —কোনখানে?

    —বকুল ফল আনতে যাইবেন?

    — কতদূর?

    —বেশি দূর না। বলে, আঙুল তুলে দেখাল—ঐ যে দ্যাখছেন না হাসান পীরের দরগা। দরগার ডাইনে ট্যাবার পুস্কনি, আমরা যামু পুস্কনির পাড়ে।

    —ছোটকাকা বকব।

    —যামু আর আমু।

    সোনা চারিদিকে তাকাল। পূজা-পার্বণের দিনে কারো কোনও লক্ষ নেই। লালটু, পলটু ছোটকাকার সঙ্গে চরু রান্নার জন্য গেছে। ছোটমামা গেছে সরকারদের বাস্তুপূজাতে। শোভা, আবু, কিরণী বাস্তুপূজার প্রসাদ খেয়ে বেড়াচ্ছে। পূজা-পার্বণের দিনে কে কোথায় যায়—কে কার খবর রাখে! পাগল জ্যাঠামশাই ভোরে কোনদিকে বের হয়ে গেছেন, কেউ টের করতে পারেনি। সোনা মনে মনে ভাবল, বেশি দেরি হলে সকলে ভাববে, সোনা গেছে জ্যাঠামশাইর লগে। সুতরাং সোনা বোঁ বোঁ শব্দ করতে থাকল মুখে। তারপর ওরা মাঠের ওপর দিয়ে ছুটতে থাকল। বড় মাঠ, উত্তরে গেলে হাসান পীরের দরগা। দরগার পাশ দিয়ে সাইকেলে গোপাল ডাক্তার নেমে আসছে। গোপাল ডাক্তার ওদের দেখে ফেলবে ভয়ে ওরা দালানবাড়ির খালের ভিতর নেমে গেল। দু’জনে চুপচাপ মাথা গুঁজে উবু হয়ে বসে থাকল। এত বড় মাঠের ভিতর সোনা এবং ফতিমাকে একা একা ঘুরতে দেখলে আশঙ্কার কথা। তুমি সোনা, সেদিনের সোনা, একা একা এত বড় বিশাল বিলেন মাঠে নেমে এসেছ—কি সাহস তোমাদের! চল চল বাড়ি চল। অথবা কিছু তিরস্কার। কিংবা বাড়িতে খবরটা পৌঁছে দিলে ছুটবে ঈশম, তার প্রিয় তরমুজ খেত ফেলে ছুটবে। আর মাঠের ভিতর দাঁড়িয়ে অথবা বিলেন মাঠে নেমে গিয়ে ডাকবে, সোনাবাবু কৈ গ্যালেন! অঃ সোনাবাবু।

    কবে একবার সোনা একা-একা তরমুজ খেতে নেমে গিয়েছিল—কবে, সেই কতকাল আগে সোনা প্রথম গ্রামের বাইরে বের হয়ে দক্ষিণের মাঠে—সোনালী বালির নদীর চরে তরমুজ খেতের ভিতর হারিয়ে গিয়েছিল সঠিক মনে নেই, কিন্তু সেই তরমুজ খেত, মালিনী মাছ এবং বড় মিঞার দুই বিবি—দুর্গাঠাকুরের মতো মুখ, নাকে নথ দুলছিল, কি এক রোমাঞ্চ যেন জীবনে, সোনা এখন সেই এক রোমাঞ্চকর লোভে ছুটছে। ফতিমা কাপড়টা গামছার মতো করে প্যাঁচ দিয়ে পরেছে। শরীরে ফতিমার জামা নেই। কোনও ফ্রক নেই। খালি গা। নাকে নথ দুলছে ফতিমার। কানে পেতলের মাকড়ি। নাকের বাঁশিতে সোনার নাকচাবি। চাবির মুখটা চ্যাপ্টা চাঁদের মতো। কথা নেই বার্তা নেই সোনা ফতিমার নাকটা চ্যাপ্টা করে ধরে নাকের ভিতর সেই চ্যাপ্টা চাঁদ কি করে বাঁশিতে আটকে আছে দেখল। ফতিমার খুব লাগছিল নাকে। কিন্তু সোনাবাবু, ছোট্ট সোনাবাবু…শরীরে যার চন্দনের গন্ধ লেগে থাকে আর মাথায় কি সুমধুর গন্ধ! সোনাবাবু তার নাক উল্টে বাঁশিতে এখন চ্যাপ্টা চাঁদের মুখ উঁকি দিয়ে দেখছে

    ফতিমার শরীর শিরশির করে আনন্দে কাঁপছিল। সে বলল, সোনাবাবু চলেন। গোপাল ডাক্তার গ্যাছে গিয়া। দূরে মাঠের আলে গোপাল ডাক্তারের ঘণ্টি বাজছে। আর প্রান্তরে যখন শস্য নেই, যখন মাঠ ফাঁকা, শুধু মাঝে মাঝে ছোট ছোট ঝোপ-জঙ্গল দাঁড়িয়ে আছে তখন ছুটে যাওয়া ভালো। ওরা ছোটার সময়ই দেখল, ট্যাবার পুকুরের নিচে যে মাঠ আছে সেখানে পাগল জ্যাঠামশাই। তিনি হনহন করে বিলের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। সোনা আর মুহূর্ত দেরি করল না। সে যেন জ্যাঠামশাইকে মাঠের ওপর আবিষ্কার করে ফেলেছে তেমন গলায় ডাকল, কিন্তু মানুষটা হনহন করে হেঁটে যাচ্ছেন তো যাচ্ছেনই। ঢাক ঢোল বাজছে তো বাজছেই। বাস্তুপুজোর মোষ বলির রক্ত খাঁড়াতে লাগছে তো লাগছেই। আর সোনা, ফতিমা মাঠের ওপর দিয়ে ছুটছে তো ছুটছেই। ওরা ছুটছিল আর ডাকছিল। ওরা ঢিবির ওপর উঠে ডাকল, জ্যাঠামশয়! কে কার কথা শোনে! জ্যাঠামশাই পুকুরটার পাড়ে পাড়ে যে বন আছে তার ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

    সংসারে কত কিছু ঘটে, কত কিছু ঘটে না। ফসল ফলে না সব সময় মাঠে। এখন কোথাও রুক্ষ মাঠ, কোথাও জমিতে তামাকের পাতা দেখা যাচ্ছে। পেঁয়াজ, রসুন, আলু, বাঁধাকপি উঁচু জমিতে পুকুর থেকে জল তুলে পেঁয়াজ আলু-বাঁধাকপির চাষ করছে বড় গেরস্থ প্রতাপ চন্দ। আলে আলে দুই বালক-বালিকা ছুটছে। ঢিবি থেকে নেমে মাঝিদের বড় জমি পার হয়ে ছুটছে। অকালের ফল বকুল ফল বনের ভিতর। ওরা বকুল ফলের অন্বেষণে ছুটে যাচ্ছে। ফতিমা ফল কুড়াবে, সঙ্গে সোনাবাবু আছে, ভরদুপুরের রোদ রয়েছে, আর শীতে সূর্য মাথার ওপর বলে ওদের এতটুকু শীত করছে না। খালি গায়ে খালি পায়ে ছুটছে। যেন দুটো খরগোশ তাড়া খেয়ে বনের দিকে পালাচ্ছে।

    সহসা মনে হল সোনার, ওরা বড় বেশি দূরে চলে এসেছে। এতবড় বন সামনে! সোনা ভয়ে এতটুকু হয়ে গেল! ওরা আর বাড়ি ফিরে যেতে পারবে না।

  • চৌদ্দ

    চৌদ্দ

    জায়গাট বড় নির্জন, পুকুরটা প্রাচীন। মজা দিঘির মতো দাম এবং কচুরিপানায় ঠাসা। পাড়ে পাড়ে কত বিচিত্র গাছগাছালি গভীর বনের সৃষ্টি করেছে। ছোট বড় লতার ঝোপ-পায়ে হাঁটা সামান্য পথ। পথে শুকনো ঘাসপাতা। মাটিতে মরা ডাল, পাখির পালক। বোধ হয় মাথার ওপরে প্রাচীন এক অর্জুনের ডালে পাখিদের রাতের আস্তানা। তার নিচে কত যুগ ধরে, মাছের এবং মানুষের হাড়, গরু-বাছুরের হাড়। পাশেই এক জরদ্‌গবের মতো কড়ুই গাছ। গাছটার ভিতর কত বিচিত্র খোঁদল, ডালপালা নিয়ে প্রায় আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একপাশে সব মৃত গাছের ডাল, ডালে ডালে হাজার হবে শকুন সার সার বসে রয়েছে। ওরা গাছটার নিচে যেতে সাহস পেল না। কিন্তু এইটুকু পথ পার হতে না পারলে ওরা অকালের ফল বকুল ফল খুঁজে পাবে না। বকুল গাছটা বড় নয়, ছোট। ঝোপজঙ্গলে গাছটাকে খুঁজে বের করা কঠিন। গাছটার খোঁজখবর ফতিমাকে জোটন দিয়ে গেছে। আবেদালির দিদি জোটন আবেদালির জন্য একটা মুরগি এনেছিল, মুরগিটা উড়াল দিয়ে চলে গেল হাজিসাহেবের আতাবেড়াতে। আতাবেড়ার পাশে ছোটবিবির সঙ্গে দেখা, জোটনকে ছোটবিবি বলল, মুরগিটা মাঠের দিকে নেমে গেছে। মাঠে নামলেই মনে হল জোটনের, দূরে কি একটা কেবল ছুটছে। বুঝি কুকুর হবে। বেড়াল হতে পারে। মাঠের ওপর দিয়ে অকারণে ছুটে পালাচ্ছে। মাঠে নামতেই হাজিসাহেবের ছোট বেটার সঙ্গে জোটনের দেখা।—ঐ যায়, যায়। দেখা যায়। সব শলাপরামর্শ যেন ঠিক ছিল। ছোট বেটা জোটনকে অকারণ সেই মাঠের দিকে হাত তুলে মুরগির খোঁজে যেতে বলে দিল।

    জোটন মুরগিটা চুরি করে এনেছিল আবেদালিকে খাওয়াবে বলে। জোটনের ধারণা এখন সেই মুরগি ফাঁক বুঝে তার গ্রামের দিকে পালাচ্ছে। পোষা মুরগি, বড় সোহাগের মুরগি মৌলবীসাহেবের। আদরের মুরগি মাঠের উপর দিয়ে ছুটে পালাচ্ছে। সে কি ভেবে তাড়াতাড়ি মুরগি ধরার জন্য ছুটতে থাকল। যদি এ মুরগি চলে যায় যদি টের পায় মৌলবীসাব, মুরগি যাবার পথে জোটন চুরি করে নিয়ে গেছে তবে আর রক্ষে থাকবে না। সেই মুরগি যখন দূর থেকে অস্পষ্ট, মনে হচ্ছে কি একটা ট্যাবার পুকুর পাড়ে বনের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে, তখন জোটনও না ছুটে পারল না। এত সখ করে, এত কুরশিস করে মুরগিটা ধরে এনেছিল আবেদালিকে খাওয়াবে বলে, এখন হায় সেই মুরগির চৈতন্য উদয়। কি হবে! কি হবে! সুতরাং ছোটা ভালো। মুরগি ধরার জন্য জোটন কাপড় হাঁটুর ওপর তুলে ছুটতে থাকল। ছুটতে ছুটতে ট্যাবার পুকুরের পাড়ে, ভিতরের জঙ্গলে। কিন্তু শেষে আর পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। মুরগিটা যদি গাছের ডালে চুপচাপ বসে থাকে, উঁকি দিয়ে দেখতে থাকল।

    তখন মুরগির গলা টিপে ধরেছে ছোটবিবি। হাজিসাহেবের ছোটবিবি মুরগি হালাল করে হাতের ভিতর শক্ত করে ধরে রেখেছে। ছেড়ে দিলেই ক্যা-ক্যা করে ডেকে উঠবে। তখন বনে বনে জোটন খুঁজছিল, হায়, মুরগি, তুই কোথায় গেলি! ঝোপে-জঙ্গলে জোটন মুরগি খুঁজতে এসে কপাল থাবড়াতে থাকল। তখন মনে হল ঝুঁটিতে লাল রঙ মুরগির, ঝোপের ভিতর লাল রঙের কি যেন দেখা যায়। সে লোভে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে বনের ভিতর ঢুকে পড়ল। কিন্তু হায় ঢুকে দেখল, গাছের ডালে লাল বকুল ফল। অকালে বকুল ধরেছে গাছটাতে। পাকা ফল দু’চারটে নিচে পড়ে আছে। একটা বিড়াল কি নেড়ি কুকুর এই বাগের ভিতর ঢুকে গেল। আবছা অস্পষ্ট শীতের রোদে দূর থেকে বিড়াল কুকুর না অন্য কোনও জীব ধরা যাচ্ছিল না। জোটন ভেবেছিল, ওর মুরগি পালাচ্ছে। নাকের বদলে নরুন পাবার মতো জোটন মুরগির বদলে বকুল ফল তুলে নিল। সেই ফল এনে সে ফতিমার হাতে দিয়েছে, আর বলেছে সেই আশ্চর্য বকুল ফলের গাছটা বনের ভিতর লুকিয়ে আছে।

    গাছটার অনুসন্ধানে এসে সোনার ভয় ধরে গেল। সে বলল, আমার ডর করতাছে ফতিমা।

    —ডর কিসের। আইয়েন আপনে। বলে ফতিমা সোনার হাত ধরে কড়ুই গাছটার দিকে তাকাল। বড় বড় শকুন, ওরা নিবিষ্ট মনে বসে আছে। কড়ুই গাছটার দিকে তাকালেই সোনার ভয়টা বাড়ছে। ওরা শকুনের রাজা গৃধিনীকে দেখতে পেল, মগডালে বসে রাজার মতো তাবৎ পৃথিবীর কোথায় কোন মৃত জীব পড়ে আছে বাতাস শুঁকে টের পাবার চেষ্টা করছে। অন্য শকুনগুলি ঠোঁট গুঁজে বোধ হয় ঘুমোচ্ছে। কেউ কেউ হয়তো ঘাড় নিচু করে ওদের একবার দেখে নিল—ছোট ছোট কাঠের পুতুলের মতো মনুষ্যকূলের দুই জীব নিচে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু শকুনের রাজা সবসময় জেগে। সে ক্ষুধার জন্য শিকারের খবর দেবে। সে-ই একমাত্র উঁচু মুখে আকাশের অন্য প্রান্তে কী উড়ে যাচ্ছে, কারা উড়ে যাচ্ছে, কত হবে…আর যদি মৃত জীবের গন্ধ ভেসে আসে, সে প্রথম দু’পাখা বাতাসে ছড়িয়ে দেবে, তারপর উড়তে থাকবে আকাশে—প্রায় তখন মনে হয় নির্বাণ লাভের মতো এইসব বড় বড় পাখি কোন এক অদৃশ্য জগতের সন্ধানে উড়ে যাচ্ছে।

    কিন্তু রাজা শকুনটা ওড়ার বদলে কেবল উঁকি দিয়ে ওদের দেখছে। ফতিমা, যে ফতিমা, একা গোপাটে ছাগল নিয়ে আসে, যে মাথায় করে সানকিতে নাস্তা নিয়ে যায় জমিতে, যার ভয়ডর একেবারে কম—পাটখেত বড় হলে অথবা নির্জন মাঠের ভিতরে যখন বড় বড় পাটগাছগুলি ফতিমার মাথা পার হয়ে উঁচুতে উঠে যায়, যখন সামনের আলপথ সিঁথির মতো, দু’ধারে পাটগাছ ঘন বনের সৃষ্টি করে রাখে, তেমন পথে কতবার ফতিমা একা একা চলে এসেছে ছাগলটার দড়ি ধরে—সেই ফতিমা পর্যন্ত ভয় পেয়ে গেল। রাজা শকুনটা নিচের দিকে উঁকি দিলে সে লাফ দিয়ে ছুটতে চাইল সোনাবাবুর হাত ধরে।

    যেন এই গাছটা গল্পের সেই সদর দেউড়ি—গাছটা রাক্ষস খোক্কসের মতো সদর দেউড়িতে পাহারা দিচ্ছে। সদর দেউড়ি পার হতে পারলেই ফুল-ফল রাজকন্যা মিলে যাবে। ফতিমা সাহসে ভর করে ফুল-ফলের জন্য এবং সেই অত্যাশ্চর্য জগতের জন্য সোনাবাবুকে ঠেলে ঠুলে পাখির পালক, মাছের হাড়, মানুষের হাড়, পাখিদের মলমূত্র অতিক্রম করে বনের ভিতর ঢুকে গেল। ভিতরে বিচিত্র বর্ণের ছোট ছোট পাখি উড়ে বেড়াচ্ছিল। পাখিরা ডাকছিল। প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। একটা গিরগিটি ক্লপ ক্লপ শব্দ করে ডাল থেকে পাতায় উঠে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকল। জায়গাটা বড় নির্জন, নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছে সোনার। কোথাও কোনও মানুষের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। দূরে কে যেন কেবল কাঠ কেটে চলেছে—তার শব্দ ভেসে আসছিল। কান পাতলে ঢাক-ঢোলের শব্দ শোনা যায়। ওরা এমন একটা জায়গায় চলে এসে এই প্রথম পরস্পর অসহায় চোখ তুলে তাকাল।

    ফতিমা বলল, সোনাবাবু, আপনেরে ছুইয়া দিছি। বাড়ি গেলে সান করতে হইব।

    সোনা মা’র ভয়ে বলল, তুই ছুইলি ক্যান।

    —আমি ছুইলাম, না আপনে ছুইলেন। বাঁশিতে নাকচাবিটা আপনে দ্যাখলেন না!

    —মায় শুনলে আমারে মারব। সোনার চোখের ওপর সেই দৃশ্যটা এতক্ষণে ভেসে উঠল। সেই বর্ষার মতো। সেই ফতিমার আঁচলে প্রজাপতি বেঁধে দিয়েছিল বলে মা ওকে খুব মেরেছিল। ফতিমার কথায় সোনার যথার্থই ভয় ধরে গেল। বলল, তুই কইস না। আমি তরে ছুইয়া দিছি মায়েরে কইস না।

    —আমি কইতে যামু ক্যান!

    —কইলে ঠিক মায় আমারে মারব।

    —কোনদিন কমু না।

    —তিন সত্য!

    —তিন সত্য।

    সোনা যেন এবার একটু নিশ্চিন্ত হল। ফতিমা না বললে, এ-কথা কেউ আর জানতে পারবে না।

    চারিদিকে বড় বড় গাছ। অপরিচিত গাছ। ঝোপ-জঙ্গল লতায়-পাতায় প্রায় কোথাও কোথাও নিবিড় অরণ্য সৃষ্টি করে ফেলেছে। ওরা সেই অরণ্যের ভিতর বকুল গাছটিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। যেন ওরা বলতে চাইছে, বৃক্ষ, তুমি এতদিন কার ছিলে?

    বৃক্ষ উত্তর দিল, রাক্ষসের

    —এখন কার?

    —এখন তোমাদের।

    —তবে তুমি আমাদের ফল দাও। বকুল ফল।

    ওরা পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এগুতে পারছে না। চারপাশটায় যেন জঙ্গলের শেষ নেই। কতদূর হেঁটে যাওয়া যেন এই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে! শুকনো ঘাসপাতা পায়ের নিচে। কত দীর্ঘদিনের মানুষ-বিবর্জিত জায়গা। ওরা হামাগুড়ি দিয়ে অথবা সন্তর্পণে-কাঁটাগাছ পার হবার জন্য ছোট ছোট লাফ দিচ্ছিল। আর মনে মনে সেই গল্পের মতো বলা, বৃক্ষ তুমি কার ছিলে?

    —রাজার ছিলাম।

    —এখন কার?

    —এখন তোমার?

    —তবে ফল দাও। বকুল ফল!

    বৃক্ষ কখনও রাজার, কখনও রাক্ষসের। বৃক্ষ, অঃ বৃক্ষ! ওরা বৃক্ষ বৃক্ষ বলে চেঁচাতে থাকল। কোথায় গেলে তুমি বৃক্ষ! ওরা বনের ভিতর হেঁকে ডেকে বেড়াতে থাকল। ওরা কেবল গাছটার অন্বেষণে আছে। মগডালে বসে শকুনেরা চিৎকার করছিল, বনের বিচিত্র সব শব্দ উঠছে। ঘস ঘস—ডালে ডালে পাখিদের কলরব ছিল আর ছিল দুই বালক-বালিকা। ওরা ভয়ে ভয়ে বকুল গাছটার উদ্দেশে হাঁটছে।

    আর ঠিক তখন মনে হল বনের ভিতর কে বা কারা হুঁম হুঁম শব্দ করে ক্রমশ ওদের দিকে এগিয়ে আসছে, ঠাকুরমার কাছে শোনা গল্পের সেই ভূত-প্রেত অথবা ডাকিনী-যোগিনীর মতো। ফতিমা ফিফিস্ করে বলল, সোনাবাবু ঐ শোনেন।

    সোনা একটা মরা গাছের গুঁড়িতে বসেছিল। ও আর হাঁটতে পারছিল না। পায়ে লাগছিল। পায়ে কাঁটা ফুটেছে। ওর মনে হল এখন এইসব ফেলে খোলা মাঠের ভিতর নেমে যেতে পারলে বড়দা মেজদা ট্যারা হয়ে যাবে। আমারে একটা দে, সোনা বড় ভাল পোলা, দে দে, একটা দে, বলে বড়দা মেজদা ওর চারপাশে ঘুর ঘুর করবে। ফতিমাও বড় শখ করে এই বনের ভিতর পালিয়ে এসেছে ফল নেবে বলে, কিন্তু বনের ভিতর সেই হুম্ হুম্ শব্দটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে।

    বনের ভিতর ওরা চুপচাপ বসেছিল। ওদের ভিতর আতঙ্ক–এবারে কিছু একটা হয়ে যাবে। ওরা পালাতে গিয়ে ঘন গাছপালার ভিতর ক্রমে আরও হারিয়ে যাচ্ছিল। বনটা যে ভিতরে ভিতরে এত বড় ওদের জানা ফ্লি না। বনের ভিতর ঢুকে গেলেই গাছটা সদর দেউড়ির সেপাইর মতো সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে, এবং ওদের অঞ্জলিতে বকুল ফল ভরে দেবে এমন একটা ধারণা ছিল, কিন্তু হায়! এখন ওরা এত ভিতরে ঢুকে গেছে যে, কোনদিকে গেলে মাঠ এবং পরিচিত পথ মিলে যাবে বুঝতে পারছে না। ফতিমার মুখ-চোখ শুকনো দেখাচ্ছে। বনময় সেই শব্দ কেবল ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে এইসব জঙ্গলের ভিতর কে বা কারা সহসা সহসা অট্টহাস্য করছিল। ঠাকুরমার গল্পের মতো যেন কে বা কারা বলছে হাঁউ-মাঁউ-কাউ, মানুষের গন্ধ পাঁউ। ওরা ভয়ে, মৃত্যুভয়ে চোখ বন্ধ করে সামনের ঘাস, শুকনো পাতা, জঙ্গল যা কিছু সামনে পড়ছে সব মাড়িয়ে ছুটছে। অথচ সামনের খোলা মাঠ এখনও দেখা যাচ্ছে না। ওরা শুকনো ডাল, পাখির পালক, গাছ এবং মানুষের হাড় অতিক্রম করে কেবল ছুটতে থাকল। কিন্তু সামনে আর পথ নেই, ফের পিছনের দিকে ছোটা। অথচ সেই এক অট্টহাসি পিছনে ছুটে আসছে তো আসছেই। ডালপালা ঝোপ-জঙ্গল ভেঙে ওদের ধরার জন্য ছুটে আসছে। সূর্যের অমিত তেজের মতো বনের ভিতর সেই এক অট্টহাসি গাছপালা ভেঙে দুম-দাম শব্দ করে তোলপাড় করে বেড়াচ্ছে।

    তখন মাঠের ভিতর হুম্-হুম্-হুম্ শব্দ। রাজ-রাজেশ্বর কি জয়! জয়-যজ্ঞেশ্বর কি জয়—কারা যেন মাঠ ভেঙে এমন বলতে বলতে চলে যাচ্ছে। সোনা ভয়ে গাছপাতার ভিতর লুকিয়ে পড়ল। ফতিমাও জঙ্গলের ভিতর মুখ ঢেকে শুয়ে পড়ল। আর মুখ তুলতেই দেখল, ঝোপের ভিতর থেকে খোলা মাঠ দেখা যাচ্ছে। প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ জনের একটা দল খোলা মাঠের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। ষোলজন লোক বাঁশের ভিতর কাটা মোষটা ঝুলিয়ে নিয়েছে। চার-পা বাঁধা কাটা মোষটা মরা গরু-বাছুরের মতো ঝুলছে। ঠিক পেটের মাঝখানে বসানো কাটা মোষের মাথাটা। দড়ি দিয়ে মাথাটাকে পেটের ওপর বেঁধে রাখা হয়েছে। মাথাটা চোখ খুলে রেখেছে, কান ঝুলিয়ে রেখেছে। এবং শস্যবিহীন মাঠ দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছে। লোকগুলি জয় যজ্ঞেশ্বর কি জয়, রাজ-রাজেশ্বর কি জয় বলতে বলতে নেমে যাচ্ছে। ওরা ঝোপের ভিতর প্রায় যেন শ্বাস বন্ধ করে পড়ে আছে। ভয়ঙ্কর দৃশ্য এখন শুধু চোখের উপর ভাসছে। গলা এত শুকনো যে, ওরা ডাকতে পর্যন্ত পারল না। বলতে পারল না, আমরা ঝোপের ভিতর আটকা পড়েছি। কোনদিকে রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না। আর কিছুক্ষণ এভাবে থাকলে আমরা মরে যাব

    লোকগুলি কাটা মোষ নিয়ে চলে যাচ্ছে। পিছনে যারা আসছে, তাদের মাথায় চাল, ডাল। একটা মোষের মাংস খাবার মতো মানুষের জন্য চাল-ডাল-তেল। ওরা শীতলক্ষ্যার পাড় থেকে এসেছে। পূজার প্রসাদ মোষের মাংস ফেলতে নেই তাই এইসব মানুষ এসেছে শীতলক্ষ্যার পাড় থেকে এই কাটা মোষ নিয়ে যেতে। ওরা মোষটা নিয়ে যেন পাল্কি কাঁধে বেহারা যায়—হুঁ-হোম-না, যেন বরের সঙ্গে বধূ যায়—হুঁ-হোম-না, যেন মোষের পেটে কাটা মাথা যায়—হুঁ-হোম-না! বড় কুৎসিত এই দৃশ্য। মুণ্ডবিহীন মোষ পেটে মাথা নিয়ে দুলতে দুলতে যাচ্ছে। বনের ভিতর তখন ডালপালা ভেঙে বেড়াচ্ছে কে? অট্টহাস্য, অট্টহাস্য! মগডালে শকুনের আর্তনাদ, ঝিঁঝিপোকার ডাক এবং সেই দ্রুত ডালপালা ভাঙার শব্দ—ওরা ভয়ে এবার চোখ বুজে ফেলল, কারণ বনের ভিতর পথ করে সেই অট্টহাস্য ওদের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। ওদের দুজনকে শক্ত দুই বাহুতে জড়িয়ে ধরেছে। মাটি থেকে টেনে উপরে তুলে নিচ্ছে। যেন দুই পুতুল। সোনা রুপোর পুতুল। দৈত্যটা দুই কাঁধে দুই সোনা রুপোর পুতুল ফেলে বনের বাইরে বের হয়ে এল। তখন দুই পুতুল প্রাণ পেয়ে ঝলমল করে উঠেছে। দৈত্যটা বুঝি এত আনন্দ আর দু’হাতে সামলাতে পারছিল না। চিৎকার করে উঠল, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    তখনও মাঠে ঢাক বাজছে, ঢোল বাজছে। বাস্তুপূজা শেষ হলেই পুরীপুজোর মেলা। মেলায় দোকানপত্র যাচ্ছে গোপাট ধরে। বাঁশ কাঁধে মানুষ যাচ্ছে। ত্রিপল মাথায় মানুষ যাচ্ছে। সোনালী বালির নদীর জলে এখন কত সওদাগর নৌকা ভাসাল। বাদাম তুলে খাঁড়ি ধরে ব্রহ্মপুত্রে পড়বে। তারপর ফের বাঁক নিলে সেই প্রকাণ্ড বিল—পাঁচ ক্রোশের মতো বিল রয়েছে। খালের জল বিলে পড়েছে। বিল পার হলেই মেলার প্রাঙ্গণ! বড় কাঠের পুল পার হলে যজ্ঞেশ্বরের মন্দির। মন্দিরের পাশে সারকাসের তাঁবু পড়েছে।

    সেই বিলের কথা মনে পড়ছিল পাগল ঠাকুরের। তিনি সোনা এবং ফতিমাকে মাঠে এনে ছেড়ে দিলেন। সোনার সব ভয় উবে গেছে। ফতিমা পর্যন্ত এখন হি-হি করে হাসছে। ওরা বাড়ি ফেরার জন্য দৌড়াতে লাগল। বেলা পড়ে আসছে, শীতের বেলা। সামসুদ্দিন ঢাকা গেছে। আজ ঢাকা থেকে ফেরার কথা। ফতিমা দ্রুত ছুটতে থাকল। ঢাকা থেকে বা’জান কাঁচের চুড়ি কিনে আনবে। ফিরে ফতিমাকে বাড়ি না দেখলে খুব রাগ করবে বাজান। কানের দুল আনবে। মা’র জন্য ডুরে শাড়ি আনবে। বা’জান সময়-অসময় নেই সেই শহরে চলে যায়। দু’চার দিন পর ফের ফিরে আসে! সেই ঢাকা শহরে বড় হলে ফতিমা যাবে! যেতে যেতে তেমন গল্পও করল ফতিমা

    সোনা বলল, আমি-অ যামু। বাবায় কইছে বড় হইলে আমারে লইয়া যাইব।

    —বা’জী কইছে আমারে সদর ঘাটের কামান দেখাইব।

    —বাবায় কইছে আমারেও সদর ঘাটের কামান দেখাইব। রমনার মাঠ দেখাইব। বুড়িগঙ্গার জলে সান করাইব।

    —বা’জী কইছে লিখা-পড়া শিখলে মোটরে চড়াইব!

    —বাবায় কইছে ফাস্ট হইলে রেলগাড়ি কইরা ঢাকায় নিয়া যাইব।

    —রেলগাড়ি ছোট। ছোট গাড়িতে সোনাবাবু যাইব!

    —মোটরগাড়ি রেলগাড়ির ছোট।

    —হ কইছে? ফতিমা সোনার মুখের সামনে গিয়ে মুখ বাঁকাল।

    —কিছু জানস না ছেরি, দিমু এক থাপ্পর।

    —দ্যান ত দ্যাখি। থাপ্পর দিবেন! আপনের মায়রে কইয়া মাইর খাওয়ামু না তবে! কমু, সোনাবাবু।

    আমারে ছুইয়া দিছে।

    —আমি যে তরে ছুইয়া দিছি, তুই কইয়া দিবি!

    —তবে মোটরগাড়ি ছোট এডা কন ক্যান!

    —আর কমু না।

    ফতিমা আর দেরি করল না। এই বাবুটির উপর বিজয়নী হয়ে উল্লাসে ছুটছে। মাথার চুল উড়ছে। কোমর থেকে ডুরে শাড়ি খুলে পড়ছে। ছুটতে ছুটতে কোনওরকমে প্যাঁচ দিচ্ছে কোমরে। কোনওরকমে কাপড় সামলে মল বাজিয়ে ছুটছিল। পায়ে মল, রুপোর মলের ভিতর ছোট লোহার দানা। ফতিমা ছুটছিল আর পায়ের মল বাজছিল ঝম ঝম। ছুটতে ছুটতে দু’বার ফিরে তাকাল পিছনে। এতটুকু নড়ছে না, সেই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ক্ষোভে দুঃখে ভেঙে পড়ছে সোনাবাবু। ফতিমা বিজয়িনীর মতো ঘুরে ফিরে লাফ দিল, হাঁটল, দু’পা এগিয়ে ফের লাফ দিল। ফের ঘুরে ফিরে চরকিবাজির মতো মাঠের ওপর ঘুরছে। যেন এক চঞ্চল খরগোশ কচি ঘাস থেকে এক কামড় খাচ্ছে, দু’কামড় নষ্ট করছে। ফতিমা মাঠের উপর দিয়ে চঞ্চল খরগোশের মতো ছুটছিল। কিন্তু মনে মনে সোনা, যে সোনার শরীরে সব সময় চন্দনের গন্ধ লেগে থাকে, যে সোনাবাবুর মুখ ঘাসের মতো নরম, কচি কলাপাতার মতো যে লাজুক, তেমন মানুষকে মাঠে একা ফেলে যেতে কেমন কষ্ট হচ্ছিল ফতিমার। ফতিমা এবার দাঁড়াল। পিছন ফিরে ডাকল, আইয়েন, আমি খাড়াইছি।

    সোনা রাগে এবং ক্ষোভে চিৎকার করে উঠল, না, আমি যামু না।

    ফতিমাও গলা ছেড়ে বলল, আপনে না আইলে, আমি-ও যামু না।

    দু’জন দু’জমির শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকল। সোনা কিছুতেই নড়ছে না।

    ফতিমা ছুটে সোনার নাগালে চলে গেল। চলেন।

    —না, আমি যামু না।

    —চলেন। না হয় আপনের রেলগাড়িটাই বড়। তারপর ফতিমা আরও কি যেন বলতে চেয়েছিল। বলতে পারল না। অথবা মনের ভিতর হয়তো এমন কথা উঁকি মারতে পারে—মেলায় গেলে আমরা রেলগাড়িতে যাব। বড় গাড়ি না হলে আমরা দু’জনে যাব কি করে! অথচ ফতিমা কথাটা প্রকাশের ভাষা ঠিক খুঁজে পেল না। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল কিছু সময়। তারপর সোনার হাত ধরে বলল, আমারে একটা কারতিক পূজার ছিরাঘট দিবেন?

    —দিমু।

    —আইয়েন, ইবারে মাঠের ওপর দিয়া ছুটি। ওরা হাত ধরে শীতের রোদে কিছুক্ষণ ছুটে দেখল, পুকুরপাড়ে মালতী। ওরা তাড়াতাড়ি হাত ছেড়ে দিল। হাত ছেড়ে দিয়ে দু’জন দু’দিকে ছুটতে থাকল।

    সেই যে ঢাক বাজছিল, ঢোল বাজছিল আর থামছে না। পঞ্চাশটা ঢাকি অনবরত ঘাড় কাৎ করে বাজাচ্ছে তো বাজাচ্ছেই। সরকারদের বাস্তুপূজা অঞ্চলে বিখ্যাত। লোকজনের সীমা সংখ্যা নেই। আত্মীয় কুটুম্ব, গ্রামের নিবাসিগণ, কিছু গরিব প্রজা আর সব মাতব্বর ব্যক্তি লাঠি হাতে ঘোরাফেরা করছিল। পুকুরপাড়ে হাজার মানুষ হবে, দূর দূর গ্রাম থেকে ওরা এসেছে। ধোপা নাপিত নমঃশূদ্র। ওরা পাত পেতে খিচুড়ি খাচ্ছে। আর মাঠের উপর দিয়ে মোষ যাচ্ছে, সেই যেন পাল্কি কাঁধে বেহারা যায়। ওরা মুসলমান গ্রামগুলির পাশ দিয়ে যাবার সময় শিব ঠাকুর কি জয়, রাজ রাজেশ্বর, যজ্ঞেশ্বর কি জয়, এইসব বলছিল। পেটে মাথা নিয়ে মোষ চলেছে। মাঠের ওপর, ঘাসের ওপর বিন্দু বিন্দু রক্ত পড়ছে—ধর্ম আমাদের সনাতন, এত কচি মোষ তল্লাটে বলি হয়না। এত বড় খাঁড়া তল্লাটে আর কার আছে। আর এই ধর্মের মতো পূতঃপবিত্র কী আছে—জয় রাজ রাজেশ্বর, যজ্ঞেশ্বর কি জয়। বিলের পাশ দিয়ে যেতে যেতে মানুষগুলি কাটা মোষ বাঁশে ঝুলিয়ে জয়ধ্বনি করছিল। বিলের গরিব দুঃখী মানুষগুলি যারা শালুক তুলতে এসে জলের ভেতর সাদা হয়ে যাচ্ছে—হাত পা ঠাণ্ডা—এবং শীতে শিথিল হয়ে যাচ্ছে, যারা মাঝে মাঝে পাড়ে বসে রোদ পোহাচ্ছিল, তারা পাড়ের উপর দেখল বিন্দু বিন্দু এক ঝাঁক পাখির মতো মানুষগুলি কাঁধে মোষ নিয়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার কাটা মোষের পেটে মাথাটা হড়কে নিচে পড়ে গেল। এত খাড়া ছিল বিলের পাড় যে পড়বি তো পড় একেবারে সেই গরিব দুঃখীদের পায়ের কাছে। সহসা এমন কাণ্ড! ধড়বিহীন মুণ্ড ওদের পায়ের কাছে পড়ে আছে।

    মোষের কাটা মুণ্ড দেখে ওরা তোবা তোবা বলে উঠল। এক কোপে কাটা মুণ্ড ওরা দেখে কেমন গুনাহ করে ফেলল। এত বড় বিলে ওরা দুঃখী মানুষ সব শালুক তুলতে এসে এমন কুৎসিত দৃশ্য দেখে ফেলে চোখে কানে কেমন আঙুল দিল অথবা বুঝি ভয়, এই যে বিল দেখছ, বড় বিল, বিলে কত না কিংবদন্তী, কত না সাপখোপ, অজগর আর কত না জলজ ‘ঘাস জলের ভিতর। লতাপাতা কীট-পতঙ্গ বড় বড় জোঁক নাকে কানে ঢুকে গেলে কে কাকে রক্ষা করে। সুতরাং ওরা মুণ্ডটার দিকে আর তাকাল না। সূর্য অস্ত যাচ্ছে, এবারে ঘরে ফিরতে হয়।

    শীতকাল বলে উত্তরের হাওয়া ক্রমশ প্রবল হচ্ছে। আকাশ বড় পরিচ্ছন্ন। মনে হয় এবার পৃথিবী উজাড় করে সব ঠাণ্ডা এই মাটির উপর, এই বিলের উপর নেমে আসবে। এতক্ষণ বিলের জলে সহস্র পাতিল ভেসেছিল, এখন একটিমাত্র পাতিল জলে ভাসছে। জলে একা এক পাতিল ভাসলে বড় ভয়। সেই পাতিলের মানুষটা কোথায় গেল! দ্যাখো দ্যাখো পাতিলের মানুষটা কোথায় গেল!

    সূর্য তেমনি অস্ত যাচ্ছিল। শালুক ফুল ফোটে না আর। দূরে সব পদ্মপাতা, পদ্মপাতার পাশে ছোট এক পাতিল একা একা জলে ভেসে বেড়াচ্ছে। মানুষটা কোথায় গেল! পাতিলের মানুষটা! জলের মানুষ সব পাড়ে উঠে এসেছে। যে যার শালুকের পাতিল মাথায় পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখছে—একটা পাতিল বিলের জলে উত্তরে হাওয়ায় ভেসে ভেসে গভীর জলে চলে যাচ্ছে।

    কে তখন হাঁকল, দ্যাখো, বিলের জলে পাতিল ভাইস্যা যায়।

    কে তখন ফের হাঁকল, দ্যাখো পানির তলে মানুষ ডুইবা যায়।

    কিন্তু এক ত্রিকালজ্ঞ বৃদ্ধা, মুখে জরার চিহ্ন, ক্লিষ্ট চেহারা, সে জোর গলায় হাঁকরাতে থাকল, বিল আবার একটা মানুষ কাইরা নিল। সেই বৃদ্ধা নিয়তির মতো দাঁড়িয়ে যেন বলতে চাইল, এটা হবেই। সালের পর সাল বিল ক্ষুধা নিয়ে জেগে থাকে। ফাঁক পেলেই গিলে খায়। কিন্তু মানুষটা কে? কে ডুবে গেল জলে!

  • পনের

    পনের

    জালালি লাল চোখ দুটোর সঙ্গে জলের ভিতর তামাশা করছিল। সেই চোখ দুটো এগোচ্ছে পিছোচ্ছে। জলের নিচে ডুব দিলে ঘন নীল অথবা সবুজ রঙ চারদিকে প্রেতের মতো ভেসে বেড়ায়। নিচে সূর্যের আলো যতটুকু পৌঁছায় ততটুকু আবছা দেখা যায়। কিন্তু গভীর জলের ভিতর জালালি আদৌ বুঝতে পারেনি, বড় রাক্ষুসে গজার মাছটা ওকে মরণ কামড় দেবার তালে আছে। ফাঁক পেলেই এসে খুবলে মাংস তুলে নেবে। কারণ মাছটা তার আস্তানায় জালালির উপদ্রব আদৌ সহ্য করতে পারছে না।

    জালালি জলের ভেতর ডুবে দেখল, মাটি খুব মসৃণ। কোনও মাছের আস্তানা হলেই–বড় মাছ হতে হয়, রুই কাতলা অথবা কালিবাউস, বড় প্রকাণ্ড হতে হবে, হলেই নিচে, গভীর জলের নিচে বৃত্তাকার সমতল আবাস। চারপাশের ঘন ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর মাছের এই নিঃসঙ্গ নিবাস। নিবাসের আশেপাশে যত জালালি শালুকের জন্য ঘুরঘুর করছিল তত মাছটা ক্ষেপে যাচ্ছিল। তত মাছটার লেজ কাঁপছে জলের নিচে। তত এগুচ্ছে পিছোচ্ছে। ভয় পাচ্ছে মানুষ দেখে, অথবা ভয় পাচ্ছে না, ঘোড়ার মতো কদমে পাখনা নাড়াচ্ছে। মাছটার শরীরে বড় বড় চক্র। অজগর সাপের গা যেন। বড় একটা কালো রঙের থাম যেন। শরীরে তার মানুষের চেয়ে কত অধিক শক্তি, সেই শক্তি নিয়ে দুর্বল জালালির বুক থেকে খুবলে মাংস তুলে নেবার জন্য জোরে এসে ধাক্কা মারল। জালালির মাথাটা নিচের দিকে ছিল তখন। জলের নিচে শালুক, মাটিতে শালুক—জালালি দু-ঠ্যাং ফাঁক করে প্রায় ব্যাঙের মতো ক্রমে নিচে নেমে যাচ্ছিল। ঠিক নিচে নেমে যাবার মুখে মাছটা এসে বুকে ধাক্কা মারল।

    জালালির এবার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। জলের ভিতর মাছটা অতিকায় পশুর মতো দাপাচ্ছে। ফলে জলে ঘূর্ণি উঠছিল। জলের ভিতর মাছটা ঘাস লতাপাতাগুলি উল্টে পাল্টে ক্ষীণকায় জালালি ক সাপটে ধরল। শেষবারের মতো সে ঘাস-লতাপাতা ফুঁড়ে ওপরে ভেসে ওঠার দুবার চেষ্টা করতে গিয়ে একটা ঢেকুর তুলল। একটা বড় শ্বাস নিতে গিয়ে জল গিলে ফেলল অনেকটা। ফের উঠতে গিয়ে যখন আর পারছিল না, তখন জলের ভিতরই শ্বাস নেবার চেষ্টা করতে গিয়ে মনে হল রাজ্যর সব জল পেটে ঢুকে যাচ্ছে। যত অন্ধকারের ভিতর শালুকের লতা এবং সেইসব পদ্মপাতার শক্ত লতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাইছিল এবং প্রাণের যাতনায় ছটফট করছে তত লাল চোখ দুটো বড় হতে হতে এক সময় আগুনের গোলা হয়ে গেল, তারপর ফস করে নিভে যাওয়ার মতো, জলের সঙ্গে জল মিশে গেলে যেমন হয় ঠিক তেমনি আগুনের গোলা দুটো জলের সঙ্গে মিশে একটা কুসুমের মতো রঙ নিয়ে খানিকক্ষণ জেগে থাকল। তারপর জালালির প্রাণটুকু ফুটকরি তুলে জলের উপর ভেসে উঠলে কুসুমের রঙটাও আর থাকল না। ঘোলা জলটা ক্রমে থিতিয়ে আসতে থাকল। জলজ জঙ্গল, লতাপাতা ঝোপ-ঘাস সব জলের নিচে চুপ হয়ে আছে। আর নড়ছে না। লতাপাতার ভিতর একটা মানুষ আটকা পড়ল। আজব জীব মনে হচ্ছে এখন জালালিকে। ঘাড় গলায় লতাপাতা পেঁচিয়ে আছে। পায়ের নিচে এবং বুকের চারপাশে অজস্র কদম ফুলের মতো জলজ ঘাস লেপ্টে আছে। জালালি উপুড় হয়ে আছে। পা দুটো উপরের দিকে মাথাটা নিচের দিকে হেলানো। একটা ছোট মাছ রূপালী ঝিলিক তুলে জালালির নাকে মুখে এবং স্তনে সুড়সুড়ি দিচ্ছে।

    গজার মাছটা নড়ছিল না। সে দূরে লেজ খাড়া করে একদৃষ্টে ঘটনাটা দেখছে। যখন দেখল আজব জীবটা লতাপাতায় আটকে গিয়ে আর নড়তে পারছে না তখন নিজের আস্তানার চারপাশে বিজয়ীর মতো পাক খেল। তারপর দ্রুত পাখনা ভাসিয়ে তীরের মতো দক্ষিণের দিকে ছুটতে থাকল। সকলকে যেন খবর দিতে হয়-দ্যাখো এসে আমার আস্তানায় একটা আজব জীবকে আমি ধরে ফেলেছি।

    মাছটা এত বড় আর কপালে মনে হয় সিঁদুর দেওয়া—মাছটা কত প্রাচীনকালের কে জানে! মাছটার গায়ে কত মানুষের আজন্মকাল থেকে কোঁচ অথবা একহলার শিকারচিহ্ন। মাছটার ডান ঠোঁটে দুটো বোয়ালের বঁড়শি নোলকের মতো দুলছে। মাছটার গায়ে কোচের ছোট ছোট কালি। খুঁজলে, একটা দুটো নয়, অনেক কটা যেন মাংসের ভিতর থেকে বের করা যাবে। সেই মাছটা এবার আনন্দে এবং উত্তেজনায় বিলের ভিতর জল ফুঁড়ে আকাশের দিকে লাফিয়ে উঠল। তারপর সেই পাড়ের লোক, যারা পাতিল একা ভেসে যায় বলে হায় হায় করছিল, তারা দেখল বিলের জলে এমন একটা মাছ নয়, যেন হাজার লক্ষ মাছ সেই প্রাচীন বিলের জল ফুঁড়ে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে, নেমে আসছে। ভয়ে এবং বিস্ময়ে মানুষগুলি দেখল অনন্ত জলরাশির ভিতর বড় বড় রাক্ষুসে সব গজার মাছ কুমিরের মতো জলের উপর ভেসে উঠেছে। ওরা যেন সন্তর্পণে সকলকে সাবধান করে দিল—বাপুরা দ্যাখো, আমাদের তামাশা দ্যাখো। আমরা জলের জীব, তাবৎ সুখ আমাদের জলে।

    সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। বিলের জলে সূর্যের লাল রঙ। আকাশে লাল রঙ। মানুষগুলির মুখে আগুনের মতো উজ্জ্বল এক রঙ। গরিব দুঃখী মানুষেরা অসহায় মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শীত। উত্তুরে হাওয়ায় সব শীত এসে এই বিলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। জলে ডুবে ডুবে ওদের হাত পা সাদা হয়ে গেছে। ওরা একসঙ্গে সেই হাজার রাক্ষুসে গজার মাছের ডুব দেওয়া এবং কখনও কখনও জল ফুঁড়ে বাতাসের দিকে উঠে যাওয়া দেখছে। এমন হয়। সেই প্রাচীন বৃদ্ধা যার শরীরে প্রায় কোনও বাস ছিল না, যে আগুন জ্বালাবার জন্য ঘাসপাতা সংগ্রহ করছে এবং যে আগুন জ্বালাতে না পারলে, গামছার মতো জ্যালজ্যালে শাড়িটা শুকিয়ে নিতে না পারলে প্রচণ্ড শীতে এই বিলের পাড়েই মরে পড়ে থাকবে; সে ঘাসপাতায় আগুন জ্বেলে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলছে—কী বলছে বোঝা যাচ্ছে না, শুধু চোখমুখ দেখলে ধরা যাচ্ছে—যেন বলার ইচ্ছা, হে তোমরা বাপুরা মনুষ্যজাতিগণ দ্যাখো, মাছের খেলা দ্যাখো। আনন্দের দিনে একসঙ্গে ওরা কেমন ঘোরাফেরা করছে দ্যাখো। তোমরা খবর রাখ না মনুষ্যগণ, নোয়া নামক এক নবি জলে নৌকা ভাসিয়েছিলেন। সেই মহাপ্লাবনের দিন স্মরণ কর। এমন সব কথাই বুঝি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে চাইছিল বৃদ্ধা কিন্তু এসব বলবার অর্থ কি! জালালি, যার স্বামী আবেদালি, যে গয়না নৌকার মাঝি, যার বিবি এখন জলের নিচে দুই ফেরাস্তার আলোর জন্য প্রতীক্ষা করছে, তার আর মহাপ্লাবনের খবর নিয়ে কী হবে! সুতরাং বৃদ্ধার দিকে কেউ আর তাকাল না। সকলে শীতের ভিতর শুধু আগুনটুকুর জন্য লোভী হয়ে উঠল। সকলে জালালি জলে ডুবে যাওয়ার ঘটনাটা পর্যন্ত ভুলে গেল সহসা। ওরা নিজেদের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বিলের পাড় থেকে ঘাসপাতা এনে শুকনো সব ঘাসপাতা খড়কুটো এবং ঝোপজঙ্গল থেকে ডালপালা এই অগ্নিকুণ্ডে সকলে নিক্ষেপ করতে থাকল। বিলের ভিতর ক্রমে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। পাড়ে আগুন মাথার ওপর উঠে গিয়ে প্রায় আকাশ ছুঁয়ে দিতে চাইছে। কী লেলিহান জিহ্বা! সেই আগুনের প্রচণ্ড উত্তাপ পেয়ে মনে হল সেই সহস্র মাছ বিলের দিকে চলে যাচ্ছে।

    পাড়ে দাঁড়িয়ে তখন বিশাল মানুষ পাগলঠাকুর। তিনি আগুন দেখে শীত নিবারণের জন্য ছুটে গেলেন না। তিনি হাত কচলে শুধু বললেন, গ্যাৎচোরেৎশালা। কারণ বিলে মানুষ ডুবে গেল। দুই পদ্মকলির নিচে মানুষ ডুবে গেল। জলে ডুবে শালুক তুলতে গিয়ে মানুষটা আর উঠল না।

    শীতের জন্য পাড়ের মানুষেরা আগুনের চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিলের সেই পাতিলটা নড়ছে না। বাতাস পড়ে গেছে। দূরে পদ্মপাতার ভিতর পাতিলটা ভাসতে ভাসতে আটকে গেল। বিলের জলে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল বলে ক্রমে জলটা রক্তবর্ণ, ফিকে রক্তিম আভা, ক্রমশ ফিকে হতে হতে একেবারে নীল হয়ে গেল। নীল থেকে সবুজ এবং পরে কালো জল। এখন এই অনন্ত জলরাশি মনে হচ্ছে স্থির। জলে কোনও ফুটকরি ভাসছে না। শীতের ভয়ে মাছগুলি পর্যন্ত নড়তে সাহস পাচ্ছে না। পাগলঠাকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে ফের উচ্চারণ করলেন, গ্যাৎচোরেৎশালা।

    মোষের কাটা মুণ্ড তেমনি বিলে পড়ে থাকল! মানুষগুলি যারা কাটা মোষ নিয়ে শীতলক্ষ্যার পাড়ে যাবে তাদের কাছে বুঝি মাথাটা আদৌ লোভনীয় নয়। মাথাটা এখানে ওখানে ফেলে দিতেই হয়। মোষের সব মাংস খাওয়া যায় না। তবু নিতে হয়। প্রসাদ ফেলতে নেই। মাথা নিলে চালডালের পরিমাণটা বাড়ে। সুতরাং এই বিলের ভিতর কাটা মুণ্ড মোষের আগুনের উত্তাপে কান দুটো খাড়া করে দিল। আহা, সেই কখন শীতের ভোরে অবলা কচি মোষটাকে স্নান করানো হয়েছিল, তেল-সিঁদুর মাথায় দিয়ে কচি ঘাস খেতে দিয়েছিল। গলায় করবী ফুলের মালা। পায়ে রক্তজবার মালা ঠিক নূপুরের মতো। যেন ধর্মক্ষেত্রে কচি মোষের বাচ্চাটা এবার মরণ নাচন নাচবে।

    অবলা মোষের এই বাচ্চা শীতের সকালে স্নান করে হাড়িকাঠের পাশে শুয়েছিল। শীতে নড়তে পারছিল না। রাজার মতো তার আপ্যায়ন। ছোট কচিকাচা ছেলেরা নূতন জামা-কাপড় পরে, কী সুন্দর ফুটফুটে মেয়েরা নূতন ফ্রক পরে কচি ঘাস রেখে গেছে সামনে। সারা সকালটায় ওর কত সোহাগ ছিল। বুড়ো বামুনঠাকুরের মাথায় বড় টিকি, টিকিতে রক্তজবা বেঁধে সেই যে এক সের ঘি নিয়ে বসে গেল, আর কিছুতেই ওঠে না। ঘাড়ে গলায় ঘি মেখে মোষের, চবর চবর সে পান চিবুচ্ছিল। ঘাড়ে-গলায় ঘি মেখে মাংসের ভিতরটা নরম করে দিচ্ছিল। যেন খাঁড়া আটকে না যায়। কি প্রাণান্তকর চেষ্টা সফল বলির জন্য। কিন্তু হলে কী হয়, মোষের প্রাণবায়ু গলায় আটকে আছে। সব খেতে বিস্বাদ ঢাকঢোলের বাজনায়, ধূপধুনোর গন্ধে, চন্দনের গন্ধে, ফুল-বেলপাতার গন্ধে এবং ভয়ঙ্কর শীতে মোষটা বড় নির্জীব ছিল সারাদিন। এখন একটু আগুনের তাপ এসে গায়ে লাগতেই কাটা মুণ্ড কান খাড়া করে দিল। পাগলঠাকুর এইসব দেখে, না হেসে এবং না বলে পারলেন না—গ্যাৎচোরেৎশালা।

    তখন গ্রামে গ্রামে খবর রটে গেল—এ সালেও বিলের জলে মানুষ ডুবেছে। এমন কোনও সাল নেই, বছর যায় না, মানুষ ডুবে না মরে এই জলে। কিংবদন্তীর পাঁচালিকে রক্ষা করে আসছে যেন। সুতরাং সর্বত্র খবর—ফাওসার বিলে, যে বিল বিশাল, যে বিলের তল খুঁজে পাওয়া যায় না, মানুষ যে বিলে পড়লে পথ হারিয়ে ফেলে, তেমন বিলে এ সালে আবেদালির বিবি জালালি ডুবে মরল। টোডারবাগের আবেদালি গয়না নৌকা চালাতে সেই যে বর্ষার দিনে নেমে গেছে আর উঠে আসে নি। জব্বর বাবুর হাটে গেছে। সুতরাং মানুষজন পাঠাতে হয়, না হলে বিল থেকে লাশ তোলা যাবে না। কোথায় কোন জলে ডুবে আছে অথবা কিংবদন্তীর রাক্ষসটা জালালিকে নিয়ে কোথায় ডুব দিয়েছে কে জানে!

    বিলের মানুষগুলি আগুন নিভে গেলে যে যার গাঁয়ের দিকে রওনা হল। এখন জ্যোৎস্না নামবে বিলের উপর। সমস্ত বিলটা জ্যোৎস্নায় সারা রাত ডুবে থাকবে, পাতিলটা ভেসে যেতে যেতে এক সময় অদৃশ্য হয়ে যাবে। হাওয়া উঠলে সেই পাহাড়ের মতো কালো বস্তুটা বিলের ভিতর থেকে ফের ভেসে উঠতে পারে। কি বস্তু, কোন জীব, কোথায় এর নিবাস—দৈত্যদানো অথবা অন্য কিছু বোঝা ভার। কেউ কেউ জীবটাকে দেখেছে, এমন একটা প্রচলিত ধারণা আছে অঞ্চলের মানুষদের। বিলের পাড় ধরে হাঁটলেই কথাটা মনে হয়। এত বড় বিল এবং কালো জল দেখে অবিশ্বাস করা যায় না যেন। প্রাচীন বিল—কথিত আছে, নবাব ঈশা খাঁ এই বিলে সোনাই বিবিকে নিয়ে ময়ূরপঙ্খী নৌকায় কত রাতের পর রাত কলাগাছিয়ার দুর্গের দিকে মুখ করে বসে থাকতেন। চাঁদ রায়, কেদার রায় কলাগাছিয়ার দুর্গ তছনছ করে দিয়েছে। সোনাইকে উদ্ধারের জন্য জলে জলে সপ্তডিঙা যায়—সোনাইকে উদ্ধারের জন্য সাতশো মকরমুখী জাহাজ পাল তুলে দিয়েছে! জলে বৃদ্ধ ঈশা খাঁর মুখে লম্বা সাদা দাড়ি ফকির দরবেশের মতো মাথায় তাঁর সোনার ঝালর, কোমরে অসি আর পিছনে কালো রঙের বোরখার ভিতর প্রতিমার মতো সোনাই, সোনাই বিবি—স্থির অপলক দৃষ্টি সামনে। ওরা বিলের ভিতর আত্মগোপন করে ছিল। এই আত্মগোপনের ছবি কিংবদন্তীর পাঁচালির মতো বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। ফলে তামাক খেতে খেতে ফেলু ভাবল, জালালি এখন কিংবদন্তীর দেশে যেফৎ খেতে চলে গেছে। এবার ঈশা খাঁ, সোনাই বিবি, সেই পাহাড়ের মতো দানোটা এবং বিলের হাজার হাজার রাক্ষুসে গজার মাছ ফেরাস্তার অলৌকিক আলোতে জলের নিচে পথ দেখিয়ে নবাববাড়ির অন্দরে নিয়ে যাচ্ছে জালালিকে।

    কেবল পাগল ঠাকুরই এখন একা দাঁড়িয়ে। প্রথমে পাতিলটা যে জায়গায় ছিল আর যে জায়গায় জালালি ডুব দিয়েছিল, সেই জায়গাটার দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন। ডান দিকে কাঁশবন পার হয়ে কিছুটা জলের ভিতর নেমে যেতে হয়। দুটো বড় পদ্মের কলি জল ফুঁড়ে ফুটে উঠেছে এবং ঠিক তার পাশেই জালালি শেষবারের মতো ডুব দিয়ে আর উঠতে পারেনি। পাতিলটা ভেসে ভেসে দূরে সরে গেল বলে আর দেখা গেল না। জ্যোৎস্নায় অদৃশ্য সব। ঠিক পায়ের নিচে শুধু সেই কাটা মুণ্ড। কাটা মুণ্ড পাগল ঠাকুরের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। কিছু বলতে চায় যেন। রক্তবীজের বংশ। যেখানে এক ফোঁটা রক্ত সেখানে সেই রক্তবীজ দৈত্য—হাজার হাজার, লাখে লাখে। রক্তবীজ অসুরের মতো এই মোষের মুণ্ডটা প্রাণ পেয়ে যাচ্ছে। পাগল ঠাকুর বিস্ময়ে দেখছিলেন, দেখতে দেখতে মনে হল মোষের মুণ্ডটা প্রশ্ন করছে, ঠাকুর তুমি কী দেখছ?

    পাগল ঠাকুর বললেন, আমি বিলের জ্যোৎস্না দেখছি।

    —ঠাকুর তুমি জ্যোৎস্না ছাড়া আর কি দেখতে পাচ্ছ?

    —তোমাকে দেখতে পাচ্ছি।

    —আমি কে?

    —তুমি এক অবলা জীব মোষ।

    —মোষের বুঝি ঠাকুর প্রাণ থাকে না?

    —থাকে।

    —তবে তোমরা আমাকে অযথা হত্যা করলে কেন?

    —তোমাকে হত্যা করা হয়নি, দেবতার নামে উৎসর্গ করা হয়েছে।

    —দেবতা সে কে?

    —দেবতা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। আলো দিচ্ছেন, ফুল ফোটাচ্ছেন, সংসারের যাবতীয় পাপ মুছে পুণ্য ঘরে তুলে আনছেন।

    —আর কিছু করছে না?

    —আরও অনেক কিছু করছেন। জীবের পালন, সৃষ্টি, স্থিতি, লয় সব তাঁরই হাতে।

    —তবে আমি নিমিত্ত মাত্র! ভোগের নিমিত্ত!

    —নিমিত্ত মাত্র। ভোগের নিমিত্ত

    মোষটা এবার হেসে উঠল।

    পাগল ঠাকুর বললেন, তুমি হাসছ কেন?

    —ঠাকুর, তোমার কথা শুনে।

    পাগল ঠাকুরকে এবার খুব বিমর্ষ দেখাল। তিনি মোষটার দিকে তাকাতে পারছেন না। তাকালেই ফের হেসে উঠবে। তিনি অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলেন। দুই পদ্মকলির নিচে জালালি ডুবে আছে দেখতে থাকলেন। সামনে শুধু জলরাশি। হাওয়ার জন্য এখন জলে ঢেউ উঠছে। জলের শব্দ ভেসে আসছিল তীরে। দূর থেকে ঢাক-ঢোলের শব্দ তেমনি ভেসে আসছে। কেমন গুমগুম শব্দের মতো মনে হচ্ছে। যেন ঝড় আসছে। অথবা মনে হয় হাজার বছর ধরে সেই রাক্ষস ছুটে আসছে। রাজপুত্রের হাতে পাখি পাখির ডানা ছিঁড়ে ফেলছে রাজপুত্র। পড়ি-মরি করে সেই হাজার লক্ষ রাক্ষসের দলটা রাজপুরীর দিকে ছুটে আসছে। কান পাতলে মনে হয় সেই রাক্ষসেরা অনন্ত কালের গর্ভে পাখির রক্তপানের লোভে ছুটছে। পাখি রাজপুত্রের হাতে। খুশিমতো ডানা পা এবং মুণ্ড ছিঁড়ে দিলেই শেষ। কিন্তু হায়, রাজপুত্র পাথরের, পাখি পাথরের! সুখী রাজপুত্র রাতের বেলায় পাখি হাতে স্বপ্ন দেখতে দেখতে পাথর হয়ে গেছে।

    মোষটা বলল, কী ঠাকুর, তাকাচ্ছো না কেন?

    পাগল ঠাকুর জবাব দিলেন না।

    —ঠাকুর, তুমি সামান্য কাটা মুণ্ডের হাসি সহ্য করতে পার না, আর আমি কী করে খাঁড়ার ঘা সহ্য করেছি বল!

    পাগল ঠাকুর বললেন, দ্যাখো তোমাকে বাপু আমি কিছু বলছি না! তুমি আমার পিছনে লাগবে না।

    —ঠিক আছে। তবে আমি উড়াল দিলাম। বলে মুণ্ডটা দু’পাশে পলকে দুটো ডানা গজিয়ে নিল, তারপর বিলের ওপর উড়তে থাকল।

    —আরে কর কি, কর কি! পাগল ঠাকুর কাটা মুণ্ড ধরতে গেলেন।

    —কেন আমাকে তোমার ভগবানের চেয়ে খারাপ দেখাচ্ছে এখন! বাদুড়ের মতো দেখাচ্ছে না! অতিকায় বাদুড়ের মতো! বলে মোষের মাথাটা পাগল ঠাকুরের সামনে পেণ্ডুলামের মতো দুলতে দুলতে বলল, কেমন লাগে দেখতে! বাদুড়ের মতো লাগছে না! লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর বুকে এমন সব বাদুড় ছিল। এখন আর তারা নেই। একদল আরও বড় সরীসৃপ এসে ওদের খেয়ে ফেলল। কিন্তু তারা তোমাদের মতো আর যাই করুক, ধর্মের নামে ভণ্ডামি করেনি। ঈশ্বরের নামে সব অপকর্ম চালায়নি।

    কাটা মুণ্ডটার কাণ্ডকারখানা দেখে পাগল ঠাকুর বড় বেশি বিরক্ত হলেন। বড্ড জ্বালাতন করছে মুণ্ডটা, ভালো মানুষ পেলে যা হয়। তিনি পাড় ধরে হাঁটতে থাকলেন—কিন্তু আশ্চর্য, সব সময় সেই মোষের মুণ্ডটা দুটো বড়ো পাখা নিয়ে ওর চোখের সামনে ঠিক পেণ্ডুলামের মতো ঝুলছে তো ঝুলছেই কেউ যেন অদৃশ্য এক সুতো দিয়ে মোষের মুণ্ডটাকে আকাশ থেকে ছেড়ে দিয়েছে। পাগল ঠাকুর হাঁটছেন, মোষের মুণ্ডটা ক্রমশ পিছনে সরে যাচ্ছে। পাগল ঠাকুর পিছনে হাঁটছেন, মোষের মুণ্ডটা এবার এগুচ্ছে। এ তো বিষম জ্বালাতন হল! তিনি এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য থেকে মুক্ত হবার জন্য ছুটতে থাকলেন। একবার সামনে, একবার পিছনে। যেন একা একা মাঠে গোল্লাছুট খেলছেন। একবার উত্তরে, একবার দক্ষিণে। পশ্চিমে পুবে যেদিকে গেছেন, মোষের মুণ্ডটা ওঁর চোখের উপর একটা অতিকায় বাদুড় হয়ে ঝুলছে। কখনও মুণ্ডটা হাসছে, কখনও কাঁদছে। কখনও বলছে, শালা মনুষ্যজাতির মতো ইতর জাতি দেখিনি বাপু। খুশিমতো ঈশ্বরের নামে আমাকে দু’টুকরো করে বিলের পাশে ফেলে চলে গেল।

    পাগল ঠাকুর যে পাগল ঠাকুর, তাঁর পর্যন্ত ভয় ধরে গেল। তিনি সব ভুলে মাঠময় ছুটে বেড়াতে থাকলেন। এবং সেই এক চিৎকার অতিকায় বাদুড়কে উদ্দেশ করে, গ্যাৎচোরেৎশালা! সামসুদ্দিন ঢাকা থেকে ফিরেই শুনল, জালালি ডুবে গেছে জলে। গ্রামের কেউ একবার খোঁজ করতে যায়নি পর্যন্ত। সে তাড়াতাড়ি দলবল নিয়ে মাঠে বের হয়ে পড়ল। দু’জন লোককে দু’জায়গায় পাঠিয়ে দিল। একজন আবেদালি এবং অন্যজন জব্বরকে খবর দিতে চলে গেল। সে তার দলবল নিয়ে বিলের পাড়ে পৌঁছাতে বেশ রাত করে ফেলল। ওরা পাড়ে পৌঁছেই দেখল, জ্যোৎস্নার ভিতর মাঠময় কে যেন ছুটে বেড়াচ্ছে। দেখলে মনে হবে ঘটনাটা আধিভৌতিক। মনে হবে কোনও জিনপরী, ঈশ্বরের ভয়ে পাগলের মতো ছুটে পালাচ্ছে। সামসুদ্দিন পর্যন্ত হকচকিয়ে গেল। দলের লোকেরা বলল, ভাই সামু, চলি রে। কার কপালে কি আছে কওয়ন যায় না।

    সামু এবার চিৎকার করে উঠল, মাঠের ভিতর কে জাগে কও!

    উত্তরে এক পরিচিত শব্দ, গ্যাৎচোরেৎশালা। মাঠের ভিতর মনুষ্য জাগে। সকলের প্রাণে এবার জল এসে গেল। পাগল ঠাকুর সাদা জ্যোৎস্নায় এই মাঠের ভিতর ছুটাছুটি করছেন। ভূত প্রেত, দৈত্য-দানোর ভয় ওদের আর থাকল না। সামু চিৎকার করে প্রতিধ্বনি তুলল, বড়কর্তা, আমি সামু! আবেদালির বিবি জালালি জলে ডুইবা গ্যাছে! তারে আমরা তুলতে আইছি।

    সুতরাং কিংবদন্তীর ভয়টা ওদের মুহূর্তে উবে গেল। ওরা এবার অলস অথবা মন্থর পায়ে জলের কাছে নেমে গেল। যারা বিলে শামুক তুলতে এসেছিল তাদের দু’একজন সঙ্গে আছে। সামসুদ্দিন তদের একজনকে নিয়ে বিলের ধারে ধারে ঘুরতে থাকল। কোথায় শেষবার ওরা জালালিকে দেখেছে এবং তখন বেলা ক’টা তার একটা আন্দাজ করতে চাইল সামু। হাসিমদের বড় নৌকাটা জলের নিচ থেকে তুলে আনার জন্য কয়েকজন লোক চলে গেছে। নৌকা এলেই জলের ভিতর অন্বেষণে নেমে যাবে। জালালির কাপড় জলে ভেসে থাকতে পারে, ফুলে ফেঁপে জালালি জলের ওপর ভেসে উঠতে পারে।

    কিন্তু নৌকা ভাসিয়ে মনজুর যখন এল, যখন জয়নাল গলুইতে লগি বাইছে এবং নৌকার ওপর প্রায় পঁচিশ-ত্রিশজন লোক, জ্যোৎস্না রাতে বিলের জলে ঢেউ উঠছে—পদ্মপাতার উপর কোনও গাঙফড়িঙের শব্দ, রাতনিশুতি হচ্ছে অথবা জালালির কোনও হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না, তখন মনে হল দূরে কি ভেসে যায়! ওরা বিলের ভিতর ঢুকে দেখল সেই পাতিল, পাতিলে কিছু শালুক, শালুকের ওপর চাঁদের আলো মায়াময়। গোটা আট-দশ শালুক সারাদিনে ডুবে ডুবে জালালি সংগ্রহ করেছিল। শালুকের ভিতর একটা বড় ঝিনুক। বড় ঝিনুক জলের তলায় মিলে গেলে স্বপ্ন দেখা—ঝিনুকে যদি মুক্তো থাকে, বোধ হয় জালালি জলের নিচে স্বপ্ন দেখেছিল, বেগম হবার স্বপ্ন। সামসুদ্দিন নুয়ে পাতিলটা পাটাতনে তোলার সময় কাতর গলায় হাঁকল, চাচি, তর রাজ্যে এখন কারা জাগে!

    জল থেকে কোনও উত্তর উঠে এল না। সে এবার চারদিকে তাকাল। বিলের পাড়ে একের পর এক ছোট ছোট গ্রাম। গরিব-দুঃখীদের নিবাস। গ্রামে যারা মোল্লা-মৌলবী মানুষ, হাটে তাদের সুতোর অথবা পাটের কারবার আছে। আর আছে হিন্দু মহাজন। এবং হক সাহেবের ঋণসালিশী বোর্ড! মানুষগুলি আত্মরক্ষার কৌশল ধীরে ধীরে জেনে ফেলছে। সে অন্যান্য সকলকে লক্ষ করে বলল, তবে দ্যাখছি পাওয়া গ্যাল না।

    কেউ কোনও শব্দ করল না। করলেই সামু ওদের জলের নিচে ডুব দিতে বলবে। এই শীতে জলে নামলে হিমে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। ওরা কেমন ইতস্তত করতে থাকলে সামু বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে, আপনারা নৌকায় থাকেন, জলে ডুব দিয়া আমিই খুঁজি। বলে, দলের মানুষেরা যেখানে শেষবার জালালিকে দেখেছে বলেছে, সামু গামছাটা পরে সেখানে ডুব দিল।

    বিলে এত মানুষজন দেখেই বুঝি মোষের মুণ্ডটা চোখের উপর থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। পাগল ঠাকুর সামান্য সময় পেলেন ভাববার। তিনি ভাবলেন, এমন কেন হল! সামান্য এক অবলা জীবের এত রোষ! তিনি তাড়াতাড়ি সেই রোষ থেকে রক্ষা পাবার জন্য সামুদের নৌকার দিকে হাঁটতে থাকলেন। নৌকাটা জলের উপর এক জায়গায় থেমে আছে। এবং একজন মানুষ একা জলে সাঁতার কাটছে। জলে ডুব দিচ্ছে। ভয়-ভীতির তোয়াক্কা করছে না! এতগুলো মানুষ নৌকার উপর দাঁড়িয়ে তামাসা দেখছে। আর একটা মানুষ দামের ভিতর শীতের রাতে আটকে পড়বে? কে এমন অবিবেচক মানুষ! পাগল ঠাকুর প্রায় জলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। জালালি যেখানে ডুবেছে তার চেয়ে অনেক দূরে ওরা খোঁজাখুঁজি করছে। সামুর এই অনর্থক পরিশ্রমের জন্য পাগল ঠাকুর রুষ্ট হচ্ছিলেন। তাছাড়া একা একা মাঠে হাঁটলে ফের মোষের কবলে পড়ে যাবেন ভেবে পাড়ে দাঁড়িয়ে তালি বাজালেন। যেন তোমরা আমায় নৌকায় তুলে নাও এমন বলার ইচ্ছা।

    মনজুর পাটাতনে দাঁড়িয়ে হাঁকল, তালি বাজায় কোন্ মাইনষে?

    উত্তর নেই। কেবল কে অনবরত বিলের পাড়ে তালি বাজাচ্ছেন। ওর বুঝতে আদৌ কষ্ট হল না, ঠাকুরবাড়ির পাগল ঠাকুর তালি বাজাচ্ছেন। নৌকায় ওঠার জন্য তালি বাজাচ্ছেন। মনজুর এবার চিৎকার করে বলল, যাইতাছি কর্তা, খাড়ান।

    নৌকা পাড়ের কাছে গেলে কোথায় পাগল ঠাকুরনৌকায় উঠে আসবেন—তা না, জলে ঝাঁপ দিয়ে সেই দুই পদ্মকলির দিকে ছুটে যেতে থাকলেন। পাগল মানুষের শীত গ্রীষ্ম সব সমান। মানুষটা বুঝি পুরোপুরি ক্ষেপে গেছে। তিনি সকলকে পিছনে ফেলে দুই পদ্মকলির উদ্দেশে একটা বড় সাদা রাজহাঁসের বেগে চলে যেতে থাকলেন। দশাসই মানুষ, তল্লাটে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। যেমন লম্বা তেমনি অসীম শক্তির ধারক মানুষটি। সকল কিংবদন্তীর দৈত্যদানোকে কলা দেখিয়ে দুই পদ্মকলির ভেতরে ডুবে গেলেন। দাম, লতাপাতা, পদ্মের লতা ছিঁড়ে ফুঁড়ে জালালির জীর্ণ লাশটাকে টেনে বের করে ফেললেন। তারপর চুল ধরে জলের ওপর ভেসে সাঁতরাতে থাকলেন। তীরের বেগে সাঁতার কাটছেন। মানুষগুলি ভয়ে বিস্ময়ে রা করতে পারছে না। ঠিক এক পীর, দরগার পীর পাগল মানুষ যেন। সকলকে বিস্মিত করে শরীরটা কাঁধে ফেলে জল ভেঙে উপরে উঠে গেলেন তিনি। কোনওদিকে তাকালেন না। কাঁধে মৃতদেহ, সামনে ফসলবিহীন মাঠ, আকাশে কিছু নক্ষত্র জ্বলছিল, আর দূরে তেমনি ঢাকের বাদ্যি বাজছে। পাগল ঠাকুরের সহসা মনে হল তিনি জালালিকে নিয়ে হাঁটছেন না। যেন সেই ফোর্ট উইলিয়ামের দুর্গ, দুর্গের মাথায় কবুতর উড়ছে এবং র‍্যামপার্টে ব্যাণ্ড বাজছিল! এখন ঢাকের বাদ্যি শুনে সেসব মনে করতে পারছেন। কাঁধে তাঁর জালালি নয়, যুবতী পলিন। পলিনকে নিয়ে হাঁটছেন। এটা ফসলবিহীন মাঠ নয়, এটা যেন সেই র‍্যামপার্ট। পাশে দুর্গ। একদল ইংরেজ সৈন্যের কুচকাওয়াজের শব্দ, ওরা পিছন থেকে পলিনকে কেড়ে নেবার জন্য ছুটে আসছে। পাগল ঠাকুর এই ভেবে ছুটতে থাকলেন।

    ওরা দেখল মাঠের ওপর দিয়ে তিনি ছুটে যাচ্ছেন। পাগল মানুষ তিনি, কোনদিকে চলে যাবেন জালালিকে নিয়ে কে জানে! তা ছাড়া তিনি বিধর্মী মানুষ। সেই মানুষের কাঁধে মৃত জালালি। ওরা ছুটতে থাকল। মৃত জালালিকে নিয়ে অন্য কোনও মাঠে অথবা নদীর ওপারে চলে গেলে ইসলামের গুনাগার হতে তবে আর বাকি থাকবে না। এখন জালালিকে ধর্মমতে আবেদালি পর্যন্ত দেখতে পাবে না। আর কিনা এই পাগল মানুষ বিধর্মী মানুষ সব পিছনে ফেলে মাঠ ধরে ছুটছেন। ওরা তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে মাঠের মাঝখানে পাগল ঠাকুরকে ঘিরে ফেলল। ধীরে ধীরে ওরা পাগল ঠাকুরের নিকটবর্তী হতে থাকল। ওরা বুঝতে দিচ্ছে না জালালিকে কাঁধ থেকে তুলে নেবার জন্য ওরা ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। ওদের এই কৌশল ধরে ফেলতে পারলে তিনি ফের ছুটবেন। যেমন এক হেমন্তের বিকেলে মুড়াপাড়ার হাতি নিয়ে মাঠে ঘাটে বের হয়ে পড়েছিলেন।

    ওরা ওকে ঘিরে ফেলে চারদিকে সতর্ক নজর রাখল। সামু কাছে গিয়ে বলল, চাচিরে দ্যান।

    অদ্ভুত ব্যাপার। একেবারে ভালোমানুষ তিনি। খুব ধীরে ধীরে, যেন রু অসুস্থ মানুষকে কাঁধ থেকে নামাচ্ছেন। ধীরে ধীরে তিনি জালালিকে শুইয়ে দিলেন। শুইয়ে দেবার সময় গলগল করে ভিতর থেকে জল উগলে দিল জালালি। শরীরটা সাদা ফ্যাকাসে। চোখের মণি দুটো স্থির। অপলক তাকিয়ে সকলকে দেখছে। ডুরে শাড়িটা আলগা হয়ে গেছে। সামু কাপড়টা খুলে জলটা চিপে ফেলে দিল। তারপর শাড়িটা দিয়ে লাশটা ঢেকে দিল। তারপর জালালির সঙ্গে কার কি সম্পর্ক, কে এই লাশ বহন করে নেবার অধিকারী—যারা পুত্রবৎ তারাই শুধু লাশ বহন করে নিয়ে যেতে পারবে এইসব ভেবে সে চার-পাঁচজন মানুষকে লাশটা বেঁধে ফেলতে বলল। একটা বাঁশের সঙ্গে বেঁধে যেমন কাটা মোষ নিয়ে মানুষেরা গিয়েছিল, জয় যজ্ঞেশ্বর কি জয় বলে জয়ধ্বনি করছিল, তেমনি ওরা আল্লা রহমানে রহিম বলে চলে যাচ্ছিল মাঠ ধরে!

    আবেদালির বিবি শালুক তুলতে এসে জলে ডুবে মরে গেল। কিংবদন্তীর দেশে জালালি শহীদ হয়ে গেল। এই নিয়ে ফের একটা সাল উত্তেজনা থাকবে—যেমন রসো এবং বুড়ি সেই কোন এক সালে জলে ডুবে মরেছিল, কেউ টের পায়নি, হেমন্তের কোন অপরাহ্ণে কঙ্কাল আবিষ্কার করে বিস্মিত হয়েছে অঞ্চলের মানুষেরা। তারপর সব গালগল্প। অশিক্ষিত অথবা অর্ধশিক্ষিত মানুষেরা যখন রাত হয়, যখন কেউ জেগে থাকে না, তখন অঞ্চলের এইসব খালবিল, শ্মশানের অথবা কবরখানার অলৌকিক ঘটনা নিয়ে তারা ডুবে থাকে। ভূত-প্রেতের বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে ভালোবাসে।

    ওরা যত এগুচ্ছিল ততই ঢাক এবং ঢোলের শব্দ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সারারাত ঢাক ঢোল বাজবে। হ্যাজাকের আলো এখন মাঠময় আর মাঝে মাঝে বাজি পুড়ছে। হাউই উড়ছে আকাশে। মালতীর চোখে ঘুম আসছিল না। পার্বণের খাওয়া চালকলা, তিলাকদমা ফুলেফলে ভরা। তারপর খিচুড়ি পায়েস। বড়বৌ আলাদা ডেকে আবার পায়েস খেতে দিয়েছিল মালতীকে।

    মালতী লেপ কাঁথার ভিতর শুয়ে জানালা দিয়ে মাঠের জ্যোৎস্না দেখছিল। বাস্তুপূজার দিনে জ্যোৎস্না বড় রহস্যময়। ঠিক যেন কোজাগরী লক্ষ্মীপূর্ণিমা। বাজি, আতসবাজি আর নাড়ু মোয়া। খেতে খেতে আকণ্ঠ। এই জ্যোৎস্নায় বিলের জলে জালালি ডুবে আছে। কথাটা ভাবতেই মালতীর কেমন দম বন্ধ ভাব হচ্ছে। সে উঠে বসল। ওরা এখনও আসেনি। এলে গোপাটে ওদের কথাবার্তা থেকে টের পাওয়া যেত জালালিকে খুঁজে পাওয়া গেছে কিনা!

    মালতী অনেক চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারল না। লেপ-কাঁথা গায়ে জড়িয়ে কেমন চুপচাপ উদাস ভঙ্গিতে জানালার কাছে বসে থাকল। সারাদিন শরীরে খুবই ধকল গেছে। নৈবেদ্য সাজাবার জন্য পেতলের হাঁড়ি মেজে সাফসোফ করেছে। নরেন দাসের নানারকম বাতিক। এই বাস্তুপূজা জমির জন্য, ফসলের জন্য। প্রাণের চেয়ে মূল্যবান ফসল। সুতরাং কোথাও ত্রুটি থাকলে রক্ষা নেই। বিষয়ী মানুষ নরেন দাস অমূল্যকে পর্যন্ত ছুটি দিয়েছে এই দিনে। মালতী সেই কোন ভোর থেকে দুধের বাসন, পেতলের হাঁড়ি মেজে সাফসোফ করেছে। তারপর সারাদিন মাঠ আর বাড়ি। বাস্তুপূজা মাঠে হয়। মাঠে সব টেনে নিয়ে যেতে হয়েছে। আবার মাঠ থেকে টেনে বাড়িতে তুলতে হয়েছে। প্রায় এক হাতে সব কাজ, শোভা আবু সামান্য সাহায্য করেছে। অমূল্য দুপুর পর্যন্ত ছিল, তারপর সে বাড়ি চলে গেছে। ফলে মালতী সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্বাস ফেলার সময় পায়নি। তাড়াতাড়ি সেজন্য হাত পা ধুয়ে শুয়ে পড়েছে ঘুমোবে বলে। কিন্তু হায় কপাল, ঘুম আসে না চোখে। কিসের আশায় কি যেন কেবল বুকে বাজে। মনে হয় এই জ্যোৎস্না রাতে চুপচাপ মাঠে একা দাঁড়িয়ে থাকতে। পাশে এক ভালোবাসার মানুষ থাকবে শুধু। ওর প্রিয় সেই স্বার্থপর দৈত্যটির কথা মনে হল।

    দৈত্যটি তার সারাদিন মাঠে মাঠে প্রসাদ খেয়ে বেড়িয়েছে—একবার মালতীর পূজা দেখতে এল না। সে, সরকারদের বাস্তুপূজা দেখতে ওর জমির পাশ দিয়ে চলে গেল অথচ ওর এমন নিয়মনিষ্ঠার পূজা দেখে গেল না। ভিতরে ভিতরে ক্ষোভে মরে যাচ্ছিল। যেন মানুষটার ওপর রাগ করেই সে সারাদিন ক্রমান্বয়ে কাজ করেছে। এই ক্ষোভের জ্বালা ভয়ঙ্কর। সে ভিতরে বড় কষ্ট পাচ্ছিল। মানুষটার বড় বেশি গরিমা মনে মনে। দেশের কাজ করে বেড়ায় বলে অহঙ্কারে পা পড়ে না।

    জ্যোৎস্নায় মাঠ এখন ভেসে যাচ্ছে। গাছগাছালি সব সাদা হয়ে গেছে। এতটুকু অন্ধকার নেই কোথাও। এমন জ্যোৎস্না যেন কতকাল ওঠেনি। এমন জ্যোৎস্নায় ঘুম আসে না চোখে।

    মালতীর প্রথম মনে হয়েছিল বেশি খাওয়ার জন্য ভিতরটা হাঁসফাস করছে এবং ঘুম আসছে না চোখে। ক্ষোভে অভিমানে ঘুম আসছে না, অথবা মানুষটাকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছা হচ্ছে। ফলে জ্বালা ভিতরে, বুকের ভিতর কী এক ভীষণ জ্বালা। মাঝে মাঝে বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠছে। বুঝি সে এল। চুপিচুপি ওর জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। কিন্তু না, কেউ এল না। কেউ আসবে না। শুধু একা জেগে বসে থাকা। মালতী ফের শুয়ে পড়ল। জ্যোৎস্নায় মাঠ আদিগন্ত ভেসে যাচ্ছে। ওর মুখে জ্যোৎস্নার লাবণ্য ছড়িয়ে পড়ছে। সে নিজের ঘাড় গলা ছুঁয়ে দেখল। কি মসৃণ ত্বক, কী মনোরম এই শরীর। সে ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে পড়ছে। সে রঞ্জিতকে ভুলে থাকার জন্য স্বামীর স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করল। স্বামীর সঙ্গে সহবাসের দৃশ্য ভাববার চেষ্টা করল—যদি মনের ভিতর তার অস্থির ভাবটা কাটে। কিন্তু সেই পুরানো দৃশ্য, একঘেয়ে দৃশ্য নিয়ে বেঁচে থাকা যায় না। পুরানো সহবাসের দৃশ্য কোনও আর উত্তেজনার জন্ম দেয় না। সে মনে মনে ভাবল, না কোথাও আর জ্যোৎস্না নেই। সে লেপটা গোটা মাথায় মুখে ছড়িয়ে দিয়ে ভিতরটা অন্ধকার করে দিল। এখন শুধু মালতীর চারপাশে অন্ধকার। সব স্বপ্ন শহরের দাঙ্গা শেষ করে দিয়েছে। নূতন করে স্বপ্ন দেখলে পাপ। মালতী এই পাপের ভয়ে লেপের নিচে মুখ লুকিয়ে ফেলল, অন্ধকারে নিজে নিজে পাপ করে বেড়ালে কে আর টের পাবে! স্বামীর মুখ যখন কিছুতেই মনে আসছে না, পুরানো সহবাসের ছবি যখন চোখের উপর ক্যালেণ্ডারের পাতার মতো নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে গেছে তখন অন্ধকারে সরু সুন্দর আঙুলের স্পর্শ শরীরে রোমাঞ্চ এনে দিচ্ছে। আঙুলগুলো শরীরের ভিতর নানারকম পাপ কাজ করে বেড়াচ্ছে, শরীরে আবেশ এনে দিচ্ছিল। সতী সাবিত্রীর মতো পুণ্যবতী না হয়ে মনে মনে অন্ধকারের ভিতর রঞ্জিত নামক এক যুবকের স্মৃতিভারে আপন শরীরের ভিতর পাপকে অন্বেষণ করে বেড়াল—গোপনে এই পাপকার্য বড় ভালো লাগে। প্রাণের চেয়েও আপন মনে হয়। আহত সাপ মরে যাবার আগে শরীর যেমন গুটিয়ে আনে আবার সবটা ছেড়ে দেয় এবং এক সময় সোজা লম্বা হয়ে পড়ে থাকে, তেমনি মালতী শরীর ক্রমে গুটিয়ে আনছে এবং সহসা শরীর ছেড়ে দিচ্ছিল। তুলে দিচ্ছিল। তার এখন অসহায় আর্তনাদ এই শরীরের ভিতরে। কী যেন নেই পৃথিবীতে, কী যেন তার হারিয়ে গেছে। সারা শরীরে এখন তার ভালোবাসার অনুসন্ধান চলছে শুধু। কত আপন আর কত প্রিয় অনুসন্ধান। হায়, মানুষের অন্তরে এই ভালোবাসার ইচ্ছা কী করে হয়, কোন অন্ধকার থেকে সে উঁকি মারে, কখন সে সব পাপ-পুণ্য বিসর্জন দিয়ে মরমিয়া সন্ন্যাসিনীর মতো পাগল-পারা হয় কেউ বলতে পারে না। মালতী ঘন ঘন শ্বাস ফেলছিল। বুঝি সেই এক বাউল শরীরে নৃত্য-গীত বাজায়, আমারে বাজাও তুমি রসের অঙ্গুলি দিয়া। তারপর কোড়াপাখির ডাকের মতো শব্দ—ডুব্‌ ডুব। মালতী একেবারে নিস্তেজ হয়ে গেল। কিন্তু এ-কি! গোপাটে কারা এখন ছোটাছুটি করছে! কে যেন আকাশফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ছে! মালতীর গলা চিনতে কষ্ট হল না। জব্বর কাঁদছে। ওর মা শালুক তুলতে গিয়ে ডুবে মরেছে। জব্বর এমনভাবে কবে কাঁদতে শিখল! ঠিক শিশুর মতো আকাশ বিদীর্ণ করে কেঁদে উঠছে—মা মা। মালতী ছুটে সাদা জ্যোৎস্নায় নেমে গেল। বাঁশে ঝুলিয়ে লাশটা নিয়ে সামু গোপাট ধরে এবার বুঝি উঠে আসবে।

  • ষোল

    ষোল

    গোপাটের চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা প্রায় সকলেই জেগে গেল। তা ছাড়া সন্ধ্যার পর থেকে পাড়ার বৌ-ঝিরা কুয়োতলায় অথবা পুকুরপাড়ে, কখনও আতাবেড়ার ফাঁকে উঁকিঝুঁকি মেরেছে—এই বুঝি এল! সামসুদ্দিন যখন তার দলবল নিয়ে গেছে তখন লাশ তুলে আনতে কতক্ষণ! কিন্তু যারা বয়সে প্রাচীন, যারা বিলের অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস রাখে, তাদের কাছে এটা সামুর পণ্ডশ্রম। ওরা বৈঠকখানায় অথবা উঠোনে এবং গোয়ালের পাশে বসে তামাক খাচ্ছিল। আর বিলের সব অলৌকিক গল্পের ফোয়ারা ছোটাচ্ছিল। প্রতিবেশীদের ছোট ছোট শিশুরা, নাবালকেরা সেইসব প্রাচীন পুরুষদের পাশে বসে দলে দলে গল্প শুনছিল।

    ঈশম সোনাকে সেই কিংবদন্তীর গল্প শোনাচ্ছিল।

    হেমন্তের এক বিকেলে সোনাবাবু জন্মালেন। ঈশম তরমুজ খেতে তরমুজের লতা পাহারা দিচ্ছিল। তখন সোনালী বালির নদীর চরে কাশফুল ফুটে থাকার কথা। ধান কাটা হয়ে গেছে তখন। সোনাবাহু ম্যাউ ম্যাউ করে বেড়ালের মতো অসুজ ঘরে কাঁদছেন। সোনা ঈশমের কাছে সেই ম্যাউ ম্যাউ কান্নার কথা শুনে বলল, যান! আপনে মিছা কথা কন।

    —না গ কর্তা, মিছা কথা কই না। যেন তার বলার ইচ্ছা, সংসারে এমনটা হয় কত! মাথায় পাগড়ি বাইন্দা রওনা দিলাম, ধনকর্তারে খবর দিতে। তারপর বোঝালেন নি কর্তা, রাইত, কি ঘুটঘুইটা আনধাইর। মনে হইল বামুন্দির মাঠের বড় শিমুল গাছটা, মাথায় একটা চেরাগ জ্বালাইয়া আমার দিকে হাঁইটা আইত্যাছে। কি ডর, কি ডর! বিলের পানিতে মনে হইল কে য্যান আমরে ডুবাইয়া মারতে চায়।

    —মারতে চায়! সোনা প্রায় চোখ কপালে তুলে কথাটা বলল।

    —হ। কি কমু কর্তা। বিলের লক্ষ্মীরে ত আমরা দেখি নাই কোনদিন। রূপবতী কন্যা–সোনার নাও পবনের বৈঠাতে পানি থ্যাইক্যা ফুস কইরা ভাইসা ওঠে। আনধাইর রাইতে ভাসে না, রাইত ফর্সা হইলে ভাসে। চান্দের আলো থাকলে ভাসে। পূর্ণিমার দিনে সেই নাও দেখলে তাজ্জব। কী সাদা কী সাদা! সেই জলে ডুইবা গ্যালে আর ভাসে না জলে, বলে গান ধরে দিল ঈশম।

    সোনার এই গল্প কেন জানি ভালো লাগছিল না। বিলের অলৌকিক গল্প শুনে ওর ভয় ধরে যাচ্ছে। সেই জলে ডুইবা গেলে আর ভাসে না জলে। এখন কেন জানি বার বার মার কথা মনে আসছিল সোনার। মা বিকেলে বকাবকি করেছেন, তুমি কোনখানে যাও সোনা, কোনখানে থাক ঠিক থাকে না। কোনদিন তুমি জলে ডুইবা মরবা।

    সোনার মনে হল মা ঠিকই বলেছেন। বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানোর সখ বড় বেশি ওর। কবে থেকে এমন অভ্যাস গড়ে উঠেছে সোনা নিজেও জানে না। ছোট মানুষের যা হয় সোনার তাই হল। ভয় ধরে গেল প্রাণে। কোনওদিন সে না বলে না কয়ে মাঠে নেমে যাবে—তারপর সেই বিল, প্রকাণ্ড বিলে নেমে যাবার নেশা, কোনদিন সে জলে ডুবে মরে থাকবে কেউ টের পাবে না। সেজন্য সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, না আর না। আর কোনদিন সে বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়াবে না। সে একা অথবা পাগল জ্যাঠামশায়ের সঙ্গে কোথাও চলে যাবে না। গেলে সেই যে গল্প অথবা কিংবদন্তীর পাঁচালি-জলে ডুইবা গ্যালে আর ভাসে না জলে—সেই জলে অথবা ডাঙায় যেখানেই হোক সে আর একা যাবে না। মা সারাদিন চিন্তা করেন। মার চোখে ভয়ের চিহ্ন দেখে এখন সে কেমন অতি কর্তব্যপরায়ণ অথবা যেন সদা সত্য কথা বলিবে, যেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের গল্প—মায়ের জন্য ঝড় জলের ভিতর অবলীলাক্রমে দামোদর নদী পার হয়ে যাচ্ছেন-সোনা এবার ভাবল, সে মায়ের অবাধ্য কোনও দিন হবে না। সেও মায়ের জন্য সব করবে। কেন জানি তার মার কথা মনে হলেই ঈশ্বরচন্দ্রের কথা মনে হয়। সে কেমন যেন মনে মনে ঈশ্বরচন্দ্রের মতো আদর্শবাদী সত্যবাদী হতে চাইল। ঈশ্বরচন্দ্রের মতো সেও মায়ের জন্য সব করবে। মার যা অপছন্দ তা করবে না, যা পছন্দ তা করবে। ঈশম গান করছে তেমনি, ডুইবা গ্যালে আর ভাসে না জলে।

    এখন বড়ঘরে ঠাকুর্দা কাশছেন। ওরা এই উঠোনের পাশে বসে সব শুনতে পেল।

    ঈশম একসময় গান থামিয়ে বলল, বোঝলেন নি কর্তা, সাঁজ লাগলেই রাজকন্যা বিলের পানিতে সূর্য হাতে ডুব দ্যায়।

    —আর ভাসে না জলে?

    —ভাসে। সারা রাইত পানির তলে দুই হাত সূর্যেরে লইয়া সাঁতার কাটে। কাটতে কাটতে নদী ধ‍ইরা সাগরে যায়। সাগরে সাগরে মহাসাগরে। ভোর হইতে না হইতে পুবের আকাশে ভাইস্যা ওঠে। আসমানে সূর্যটারে টানাইয়া দ্যান রাজকন্যা। তারপর পলকে তিনি অন্তর্ধান করেন।

    —কোনখানে তিনি অন্তর্ধান করেন?

    —বিলের পানিতে।

    —আপনে দ্যাখছেন।

    —আমি দ্যাখমু কি গ কর্তা। আপনের মায়রে জিগাইয়েন। পাগল কর্তারে জিগাইতে পারেন। সোনা ভাবল, হয়তো হবে। এত বড় যখন বিল আর সোনার নাও পবনের বৈঠা যখন রাজকন্যার জিম্মায়, তখন তার নদী ধরে সাগরে পড়তে কতক্ষণ! সাগরে সাগরে কতদূর চলে যায় রাজকন্যা। এখন রাজকন্যা তবে কোন সাগরে আছে—দক্ষিণের না উত্তরের? ওর প্রশ্ন করার ইচ্ছা, কোন সাগরের নিচে এখন রাজকন্যা সাঁতার কাটছে? সূর্য হাতে রাজকন্যা নীল জলের ভিতর সোনালী মাছের মতো মুখে রুপোলী সূর্য নিয়ে কোন জলের নিচে সাঁতার কাটছে? এসবও জানার ইচ্ছা। ঈশম তখন বলছিল, সকাল হইলে রাজকন্যা পুব সাগরে ভাইস্যা ওঠে। সুর্যটারে আসমানে টানাইয়া দ্যায়। তারপর রাজকন্যা টুপ কইরা পানির নিচে ডুইবা যায়। সোনা যেন এবার কতদিন পর এই সূর্য ঠাকুরের চালাকিটা ধরে ফেলেছে।

    ওর বার বার এক প্রশ্ন ছিল, সূর্য তুমি যাও কোথা? বাবা বলেছেন, সে বড় হলে রহস্য জানতে পারবে। এখন কিন্তু তার কাছে সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে গেল। সূর্য যায় মামার বাড়ি। বিলের নিচে মামা-মামিদের ঘরে যায়।

    সোনা চুপচাপ বসেছিল। ঈশম গোয়ালে কি কাজের জন্য উঠে গেল। ঈশম চলে গেলে উঠোনের উপর একা ওর ভয় করতে থাকল। সে তাড়াতাড়ি ছুটে বড় ঘরে উঠে গেল। ঘরে ঠাকুমা আছেন, ঠাকুরদা তক্তপোশের উপর কাঁথা বালিশ চারদিকে রেখে বসে আছেন। বড় বড় বালিশ দিয়ে ঠাকুরদাকে ঘিরে রাখা হয়েছে। বালিশগুলি ওঁর অবলম্বনের মতো কাজ করছিল। মাথার কাছে পিলসুজে বাতি জ্বলছে। রেড়ির তেলের প্রদীপ। নীলচে রঙ এই আলোর। মুখে-চোখে বিদ্যুতের মতো আলোটা লম্বা হয়ে যাচ্ছে। ঠাকুমা সন্ধ্যাহ্নিকের জন্য ঠাকুরঘরে চলে যাবেন এবার। যতক্ষণ ঠাকুমা ঘরে ছিলেন, সোনা পায়ে পায়ে ঘুরঘুর করেছে। ঘুরঘুর করার সময়ই ঈশ্বরচন্দ্রের কথা ফের মনে হল। দামোদর নদীর কথা মনে হল। সে আবার ভাবল, মায়ের জন্য সব করবে। আর ঘুরেফিরে সেই কথা মনে হল—বিলে রাজকন্যা, মাঠে ফতিমা। ফতিমা ওকে ছুঁয়ে দিয়েছে। সে স্নান করেনি। এসব শুনলে মা রাগ করবেন। মার কঠিন মুখের কথা ভাবতেই ওর প্রায় কান্না পেতে থাকল। মা আজ গরদের শাড়ি পরেছেন, পূজা-পার্বণের দিনে মা সারাদিন গরদ পরে থাকেন। মাকে তখন ভালো মানুষের ঝি মনে হয়। মাকে জলের মতো নির্মল মনে হয়, সাদা শাপলা ফুলের মতা পবিত্র মনে হয়। সুতরাং সেই পবিত্র এবং নির্মল জলের পাশে অশুচি শরীর নিয়ে থাকলে পাপ। সোনা এখন কি করবে ভাবতে পারছিল না। বলবে, ফতিমা আমাকে ছুঁয়ে দিয়েছে। না কিছুই বলবে না—চুপচাপ থেকে যাবে, সে কিছুই স্থির করতে পারছে না। ওর ভিতর থেকে ভয়ে ভয়ে কেমন শীত উঠে আসছিল, সে দাঁড়াল না। এক দৌড়ে পশ্চিমের ঘরে ঢুকে গেল। কী শীত, কী শীত! কী ঠাণ্ডা, এই ঠাণ্ডায় স্নান করা বড় কষ্ট! সোনা গায়ের চাদরটা আরও ভালোভাবে জড়িয়ে নিল। তারপর মায়ের পাশে বসে পড়ল। ওর স্নান করবার কথা মনে থাকল না। এখন কেবল বিলের সেই রাজকন্যার কথা মনে আসছে। রাজকন্যার মুখে রুপোলী সূর্য। সূর্য মুখে রাজকন্যা একটা মাছের মতো জলের নিচে সাঁতার কাটছে।

    উৎসবের দিনে এই ছুটাছুটি সোনাকে খুব ক্লান্ত করেছিল। সে রাতে খেল না পর্যন্ত। তক্তপোশে উঠে সকলের অলক্ষ্যে শুয়ে পড়ল। ওর আজ পড়া নেই। উৎসবের জন্য ছুটি। আজ উঠোনে লাঠিখেলা ছোরাখেলা বন্ধ। লালটু পলটু সেই যে ছোটকাকার সঙ্গে পূজার চরু রান্না করতে গেছে, ফেরেনি। সারা বিকেল সে একা ছিল। বড় জেঠিমা এখনও রান্নাঘরে, রাত্রে আজ কোনও রান্নার কাজ নেই। ঠাকুরদা সামান্য ফল সেদ্ধ খাবেন। ঠাকুরমা গরম দুধ খাবেন। তাঁদের সেই কাজটুকু করতে পারলে মা-জেঠিমার ছুটি। মা এখন ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। সে এখন একা এই ঘরে। হারিকেনের আলোটা নিবু নিবু টিনের চাল, চালে কুয়াশা জমেছে। ফোঁটা ফোঁটা জল জমে নিচে পড়ছে। টুপ টাপ শব্দ হচ্ছিল। কান পেতে রয়েছে সোনা। যেন কে বা কারা উপরের কাঠের পাটাতনে হেঁটে বেড়াচ্ছে। সোনা মাকে ডাকতে পারত। তার ভয়ের কথা বলতে পারত। অন্যদিন কোনও ভয় থাকে না, আজ ভয়ের কথা বললে মা বিরক্ত হবেন। সে মাকে ডাকতে সাহস পেল না।

    একটা মানুষ জলে ডুবে মরে গেছে আর কাটা মুণ্ড পেটে নিয়ে মোষ যায় মাঠে, দৃশ্যটা মনে পড়তেই সে লেপ দিয়ে মাথা ঢেকে দিল। মনে হল তার শরীরটা অশুচি। সে ফতিমাকে ছুঁয়ে স্নান করেনি। শরীর অশুচি থাকলে অপদেবতা ঘাড়ে চাপতে সময় নেয় না। সে নিজেকে অশরীরী আত্মাদের কাছ থেকে রক্ষা করার জন্য লেপ দিয়ে শরীর মুখ ঢেকে দিল। ছোট মানুষ, মনে কত রকমের ভয়, ওর বার-বারই মনে হচ্ছিল ফাঁক পেলেই সেই বিলের অপদেবতাও লেপের ভিতর ঢুকে যাবে। ওকে সুড়সুড়ি দেবে। ওকে হাসিয়ে মেরে ফেলবে অথবা ওর নাকে-মুখে কল্পিত এক ঘ্রাণ দেবে মেখে। মেখে দিলেই সে দাসানুদাস–সেই অপদেবতা তাকে বিলের জলে হেঁটে যেতে বলবে। অপদেবতার পিছনে-পিছনে সে জলের ওপর দিয়ে হাঁটতে গেলেই ডুবে যাবে। ওর ভিতরে-ভিতরে বড় কষ্ট হচ্ছিল। মা-বাবার জন্য কষ্ট হচ্ছে। সে ক্রমে লেপের নিচে গুটিয়ে আসছে। কারা যেন এখন ঘরটার চারপশে ফিসফিস করে কথা বলছে। সোনা মনে মনে দেবতাদের নাম স্মরণ করছে। তখন ঘরের আলোটা ক’বার দপদপ করে নিভে গেল। ঘর অন্ধকার। সোনা এবার লেপ থেকে মুখ বার করতেই দেখল জানালায় সাদা জ্যোৎস্না এবং সেখানে যেন কার মুখ। বুঝি জালালি উঁকি দিয়ে সোনাকে দেখছে। সোনা এবার ভয়ে চিৎকার করে উঠল। কাটা মোষের গলা নিয়ে জালালি ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

    চিৎকার শুনে রান্নাঘর থেকে ধনবৌ ছুটে এসেছে। সোনা থরথর করে কাঁপছিল। জানালায় আঙুল তুলে কি যেন দেখাতে চাইছে। ধনবৌ দেখল, জানালায় এখন শুধু জ্যোৎস্না খেলা করে বেড়াচ্ছে।

    ধনবৌ বলল, চিৎকার দিলি ক্যান!

    সে বলল, মানুষ।

    —মানুষ কই থাইকা আইব! শুইয়া পড়।

    সোনা এবার ভয়ে কেঁদে ফেলল–মা, আমারে ফতিমা ছুঁইয়া দিছে।

    —আবার সেই মাইয়াটার লগে তুমি গেছ!

    সোনা নিজের দোষ ঢেকে বলল মা, আমি অরে ছুঁই নাই।

    ধনবৌ সোনাকে কিছু আর বলল না। সে ঠাকুরঘরের দিকে হাঁটতে থাকল। পরনে গরদের শাড়ি, ফুল-বেলপাতার গন্ধ, চন্দনের গন্ধ শরীরে। মাকে পবিত্র ফুলকুমারী মনে হচ্ছে সোনার। সে মায়ের পিছনে আল্‌ল্গা হয়ে হাঁটছে। অন্ধকার ছিল না। জ্যোৎস্নায় মাঠ-ঘাট ভেসে যাচ্ছে। ঈশম বোধ হয় এতক্ষণে তরমুজ-খেতে পৌঁছে গেছে। রঞ্জিতও বৈঠকখানা ঘরে বসে কি লিখছিল মনোযোগ দিয়ে—সে ক্রমাগত লিখে যাচ্ছে। আর ধনবৌ উঠোন পার হয়ে যাচ্ছে। সোনা প্রথম ভেবেছিল মার যা রাগ—তিনি নিশ্চয়ই ওকে পুকুরে নিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে হিমের মতো জল, জলে ডুব দিতে বলবেন। সে ভয়ে ঠক্‌ঠক্‌ করে কাঁপছিল।

    মা ঠিক শেফালি গাছটার নিচে এসে বললেন, সোনা তুমি দাঁড়াও।

    সোনা দাঁড়াল।

    মা পুকুরের দিকে নেমে গেলেন না। ঠাকুরঘরের দরজা খুলে তামার পাত্র থেকে তুলসীপাতা নিলেন, সামান্য চরণামৃত নিলেন। জলটা সোনার শরীরে এবং নিজের মাথায় ছড়িয়ে দিয়ে হাঁ করতে বললেন সোনাকে। হাঁ করলে তুলসী-পাতাটা সোনার মুখে আল্গা করে ছেড়ে দিয়ে বললেন, খাও! এবং সঙ্গে সঙ্গে মনে হল সোনার, শরীর থেকে তার সমস্ত ভয় মন্ত্রের মতো উবে গেছে। সে মাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, মা আমি আর একা মাঠে যামু না।

    ধনবৌ সোনার কথার জবাব দিল না। তামার পাত্র থেকে গণ্ডুষ করে জল নিল এবং দ্রুত ছুটে গেল ঘরে। ঘরের ভিতর, বিছানায় তক্তপোশে জলটা ছিটিয়ে দেবার সময়ই শুনল, গোপাটে হৈ-চৈ। জব্বর কাঁদছে।

    বড়বৌ তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হয়ে এল। রঞ্জিতও সব ফেলে নেমে এল উঠোনে। ধনবৌ দরজায় শেকল তুলে দিল। এক সঙ্গে ওরা পুকুরপাড়ের দিকে হেঁটে গেল। সোনা পিছনে। সেও সন্তর্পণে ওদের পিছু পিছু পুকুরপাড়ে নেমে গেল।

    দীনবন্ধু আর ওর দুই বৌ সুখী দুঃখী এসে দাঁড়াল বুকলতলায়। প্রতাপ চন্দ এসে দাঁড়াল চিলাকোঠার পাশে। ওর তিন স্ত্রী এবং সন্তান-সন্ততি অনেক। ওরা ছাদের উপর দঁড়িয়ে জালালিকে দেখার জন্য প্রতীক্ষা করতে থাকল। শ্রীশ চন্দ, অবিনাশ কবিরাজ এবং গৌর সরকারের ছেলে-মেয়ে বাঁশঝাড়ের নিচে দাঁড়িয়েছিল—দলটা আসছে। কেমন ভৌতিক মনে হচ্ছে সব। জলে ডোবা মানুষ উঠে আসছে। জোৎস্না পর্যন্ত কেমন মরা-মরা, সাদা ফ্যাকাসে। এমন কি এখন হাওয়ায় একটা কলাপাতা নড়লে পর্যন্ত টের পাওয়া যায়। চুপচাপ। নিঃশব্দ। আকাশে এতটুকু মেঘ নেই। সাদা মেঘ থাকলে, হাওয়া থাকলে এবং ঝোপ জঙ্গলে কোন কীট-পতঙ্গ শব্দ করলে বোধহয় ব্যাপারটা এত বেশি ভৌতিক মনে হতো না। এমন কি ঢাকঢোলের বাজনা থেমে গেছে! ভয়ঙ্কর সাদা জ্যোৎস্নায় ওরা দেখল গোপাট ধরে মানুষগুলি উঠে আসছে। সোনা এবার মাকে জড়িয়ে ধরল, কারণ সেই মুখটা, কাটা মোষের মুণ্ড পেটে নিয়ে যেন ফের উঁকি দেবে।

    ধনবৌ সোনাকে তাড়াতাড়ি কোলে তুলে নিল।

    লাশটা বাঁশে বাঁধা। লাশটা ঝুলে-ঝুলে উঠে আসছে। রঞ্জিতও ভাবল একবার ডেকে সামসুদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে। কিন্তু মাঠের দিকে তাকাতেই মনে হল এখনও উৎসবের ছবি জেগে আছে। একটু পরে অর্থাৎ শেষ রাতের দিকে সরকারদের পুকুরপাড়ে বাজি পোড়ানো হবে। রঞ্জিত ডাকতে সঙ্কোচ বোধ করল।

    আর সোনার মনে হল দুপুরের ছবি যায়। কাটা মোষ পেটে মাথা নিয়ে যায়। সব স্পষ্ট নয়, তবু মনে হয় জালালির মাথাটা নিচের দিকে ঝুলে আছে। চুলগুলি শণের মতো খাড়া হয়ে আছে। সোনা ভয়ে এবার মাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু মার কোনও সাড়া-শব্দ পাচ্ছে না। তিনি এই দৃশ্য দেখে কেমন শক্ত হয়ে গেছেন।

    সাধারণত এমনি হয় মানুষের। শোকের ছবি দেখলে কষ্ট নামক একটা বোধ সংক্রামিত হতে থাকে ভিতরে। মনে হয় একদিন না একদিন সকলকে সব কিছু ছেড়ে যেতে হবে। ভুবনময় সাদা জ্যোৎস্না ছড়িয়ে আছে। বড়বৌ অর্জুন গাছটার নিচে। জালালির লাশ নিয়ে ওরা মাঠ পার হয়ে চলে গেল।

    তারপরই ওরা সকলে দেখল, সেই মানুষ, কিংবদন্তীর মানুষ গোপাট ধরে রাজার মতো উঠে আসছেন।

    সাদা জ্যোৎস্নায় পাগল ঠাকুরকে সন্ন্যাসীর মতো দেখাচ্ছে।।

    সোনা দেখল, জ্যাঠামশাই এখন কোনও দিকে তাকাচ্ছেন না। সোজা গোপাট ধরে হেঁটে আসছেন। সামনে এসে পড়তেই বড় জেঠিমা ছুটে গোপাটে নেমে গেলেন। রঞ্জিতও নেমে গেল। জ্যাঠামশাইকে দেখে সোনার সব ভয় উবে গেল। সে ছুটে গিয়ে গোপাটে নেমে ডাকল, জ্যাঠামশাই।

    বড়বৌ, পথ আগলে আর মানুষটাকে বেশি দূরে যেতে দিল না। সে পাগল মানুষের হাতে হাত রাখল। হাত রাখলে এই মানুষ একেবারে সরল বালক বনে যান। তাঁর খালি গা, হাত-পা ঠাণ্ডা, শীতে মানুষটা আরও সাদা হয়ে গেছে। কাপড় ভিজা। মানুষটার সর্দিকাশি পর্যন্ত হয় না। আর বড়বৌ পারছে না। মানুষটার দিন-দুপুর নেই, কখন কোথায় চলে যান, কখন আসেন ঠিক থাকে না। এত বড় উৎসবের দিনে মানুষটকে সে আহার করাতে পারেনি। আলাদা করে সব রেখে দিয়েছে—যদি মানুষটা রাতে আসে, যদি মানুষটা ভোরের দিকে ফিরে আসে—সেই আশায় বড়বৌ শ্বেতপাথরের বাটিতে সব কিছু ভাগে ভাগে আলাদা করে রেখেছে।

    পাগল ঠাকুর বেশিক্ষণ শক্ত হয়ে থাকতে পারলেন না। বড়বৌর চোখে সেই এক বিষণ্ণতা। সাদা জ্যোৎস্নায় সেই বিষণ্ণতা যেন আরও তির্যক্। মানুষটা এবার চুপচাপ বড়বৌর হাত ধরে ঘরের দিকে উঠে যেতে থাকলেন। চারদিকে একবার চোখ মেলে তাকালেন, কেন যে বের হয়েছিলেন মনে করতে পারছেন না। কিসের উদ্দেশে এই বের হওয়া। কার স্মৃতির জন্য এমন উতলা হওয়া। কারা ওঁর জীবনের সোনার হরিণটি বেঁধে রেখেছে। কোথায় এমন হেমলক গাছ আছে—যার নিচে এক সোনার হরিণ বাঁধা—কল্পিত সেই সোনার হরিণটি কোন মাঠে—পাগল ঠাকুর ভাবতে-ভাবতে বিচলিত বোধ করলেন। কে সে? যুবতী পলিন কি চাঁদের বুড়ির মতো? অপলক কি তার চোখ! সে কি কোনও ঝরনার পাশে খরগোশের ঘরে বাস করছে! অথবা প্রতিদিন ঝরনার জলে স্নান, যুবতী পলিন হায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে…দুর্গের মাথায় জালালি কবুতর এবং সামনে কত জাহাজ। জহাজে করে যুবতী এসেছিল এ-দেশে বাপের কাছে। সে জাহাজঘাটায় বাপের সঙ্গে তাকে রিসিভ করতে গেছিল। কিছু কিছু স্মৃতি ফের মনে পড়ছে। স্পষ্ট নয়, ভাসা-ভাসা। যুবতীর মুখে কি অপরূপ লাবণ্য, নীল চোখ। আর ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে প্রতিদিন দুর্গের র‍্যামপার্টে বসত। এসব মনে এলেই কেমন উদাস হয়ে যান। তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা মাথার ভিতর। আবার স্মৃতিভ্রষ্ট। যুবতীর চোখ মুখ এবং শরীরের লাবণ্য কেবল পাগল প্রায় মাঠে মাঠে ঘুরিয়ে মারছে তাঁকে। তিনি কিছুতেই সেই নীল চোখ, লাবণ্যভরা মুখ স্মরণ করতে পারলেন না। প্রিয়জনের মুখ এবং স্মৃতি স্মরণ করতে না পারলে যা হয়—রাগে দুঃখে বেদনায় এবং হতাশায় ক্রমশ অস্থির হয়ে ওঠেন। ফলে সেই আক্রোশের চিৎকার, গ্যাৎচোরে শালা।

    রঞ্জিতও দেখল মাঠে সে একা। দূরে ইতস্তত এখনও মাঠের ভেতর হ্যাজাকের আলো জ্বলছে। মাঠ, বিশাল বিলেন মাঠ, মাঠে আলো—বিশ্বাস পাড়াতে হ্যাজাকের আলো, সরকারদের পুকুরপাড়ে হ্যাজাকের আলো এবং দু-একজন মানুষ এখনও প্রসাদ পাবার লোভে মাঠ পার হয়ে চলে যাচ্ছে। রঞ্জিত একা-একা কিছুক্ষণ ঠাণ্ডার ভিতর পায়চারি করল। ওকে খুব অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। বোধহয় মনের ভেতর আখড়ার কাজকর্মগুলি সম্পর্কে সে সমস্যা-পীড়িত। সে সকলের অলক্ষ্যে, প্রায় গোপনে কাজটা চালাচ্ছে—সমিতির এই নির্দেশ। কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে ওর লাঠিখেলা, ছোরাখেলার আখড়া সম্পর্কে সামসুদ্দিন এবং তার দলবল ভালোভাবেই জেনে গেছে। ওরা অর্থাৎ এই সব হিন্দুরা নিজেদের সাহসী এবং শক্তিশালী করে তুলছে। আত্মরক্ষার নিমিত্ত এইসব হচ্ছে। পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস। হিন্দুরা জনসংখ্যায় কম। ওরা কম-বেশি সব মধ্যবিত্ত। এবং নিচু জাতি যারা, যেমন নমশূদ্র সম্প্রদায়—তাদের ভিতর এই লাঠিখেলা, ছোরাখেলার হুজুগ এসে গেছে। এইসব কারণে পরস্পর নির্ভরতা ক্রমশ কমে আসছিল। ভিন্ন দুই জাতি, ফলে ক্রমশ দুই দিকে ধাবিত হচ্ছে। বোধহয় সমিতির কাছে দীর্ঘ এক চিঠিতে এইসব ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিল রঞ্জিত। এবং এই মৃত্যু, জালালির জলে ডুবে মরা প্রায় জীবন-সংগ্রামের জন্য বলা যায়। শালুক তুলতে গিয়ে জালালি পদ্মপাতায় আটকে মরে গেল। বোধহয় রঞ্জিতকে মানুষে-মানুষে এই প্রকট আর্থিক বৈষম্যও পীড়িত করছিল। সে সমিতিকে এইসব লিখেও জানাবে ভাবল।

    ঠিক তখনই মনে হল নরেন দাসের জমিতে সাদা কাপড়ে কে এক মানুষ দাঁড়িয়ে তাকে দূর থেকে দেখছে। রঞ্জিত বুঝল মালতী মাঠে নেমে এসেছে। সে সবার সঙ্গে ফিরে যায়নি। সে ক্রমে সন্তর্পণে এদিকে এগিয়ে আসছে। নিঃসঙ্গ এই মালতীর জন্য ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল। সে নিজেকে অর্জুন গাছটার পাশে অদৃশ্য করে রাখল। কিন্তু হায়, কে কাকে লুকায়, কে কাকে অদৃশ্য করে! মালতীর চোখ বড় প্রখর এবং বুকের ভিতর যে সুখ পাখিটা ডাকছিল, দূরে জ্যোৎস্নায় রঞ্জিতকে দেখে সেই সুখপাখি ফের কলরব করতে থাকল। ধিকধিক করে বুকের ভিতরটা জ্বলছে। এমন দিনে কার না ইচ্ছা হয় সামনের দিগন্ত প্রসারিত মাঠে অদৃশ্য হতে! যখন জ্যোৎস্নায় সমস্ত জগৎ সংসার ডুবে আছে, কার না ইচ্ছা করে অগাধ সলিলে ডুবে মরতে

    আর কার না ইচ্ছা করে এমন সুপুরুষ দেখলে ভালোবাসতে। বড়বৌ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। টেবিলের ওপর হারিকেন জ্বলছে। পাগল মানুষ এখন প্রায় নগ্ন। বড়বৌ ভিজা কাপড় শরীর থেকে খুলে ফেলল। শ্বেতপাথরের মতো শক্ত অবয়ব। বুকের পেশি এত প্রবল যে মনে হয় একটা বড় হাতি অনায়াসে বুকের ওপর তুলে নাচাতে পারেন। পেটে চর্বি নেই। পাতলা মাংসের ওপর সাদা চামড়া—ঠিক যেন নদীরেখার মতো কোমল লোমশ বুকের পেশি থেকে একটা রেখা নাভি বরাবর নিচে নেমে এক আদিম অরণ্য সৃষ্টি করেছে। বড়বৌ সাদা তোয়ালে দিয়ে শরীরের সব বিন্দু-বিন্দু জলকণা খুব যত্নের সঙ্গে শুষে নিল। পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথ ঠিক যেন একটা বড় কাঠের পুতুল। কল লাগানো কাঠের পুতুল। এতটুকু নড়ছে না। এতটুকু অন্যমনস্ক হচ্ছে না—কেবল বড়বৌর সেই বড় বড় চোখ, ভালোবাসার চোখ অপলক দেখছেন। হাত তুলে দিতে বললে হাত তুলে দিচ্ছেন। বসতে বললে বসে পড়ছেন।

    উৎসবের দিন। বড়বৌ সব খাদ্যবস্তু ভিন্ন ভিন্ন থালাতে সাজিয়ে রেখেছে। তিনি কিছু খাবেন, কিছু খাবেন না। আবার হয়তো সবটাই খেয়ে ফেলতে পারেন। তারপর আরও খাবার জন্য বড়বৌর হাতটা কামড়ে ধরতে পারেন। দিতে না পারলে সাপ্টে তুলে নেবেন পাঁজাকোলে। এবং ছুটতে থাকবেন মাঠ-ময়দানে। অথবা এই খাটের ওপর নিরন্তর মানুষটা বড়বৌকে ফেলে রেখে, কখনও উলঙ্গ করে দেন, কখনও এক সুন্দর যুবতীর মুখের ঘ্রাণ নেবার মতো মুখে মুখ দিয়ে পড়ে থাকেন—কখন যে কি করবেন কেউ বলতে পারে না। সবই প্রায় তাঁর অত্যাচারের শামিল এবং এই অত্যাচারের আশায় বড়বৌ সারা দিনমান অপেক্ষা করে। দিনের শেষে তিনি ফিরে না এলে জানালায় বড়বৌ দূরের মাঠ দেখে। সেই মাঠ দেখতে দেখতে কত রাত শেষ হয়ে যায় তবু পাগল ঠাকুর ফিরে আসেন না। হয়তো তিনি কোনও গাছের নিচে শুয়ে নীল আকাশের গায়ে নক্ষত্র গুণছেন। তখন তাঁর মুখে কত সব কবিতা উচ্চারণ। ভালোবাসার কবিতা শুয়ে শুয়ে নক্ষত্র দেখতে দেখতে উচ্চারণ করেন। কবিতার সেই পক্তি সব বড়বৌকে এক নীল চোখ এবং সোনালী চুলের কথা বার বার মনে করিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে শ্বশুর ঠাকুরের উদ্দেশে আবেগে বলার ইচ্ছা, আপনি কেন মানুষটাকে পাগল করে দিলেন বাবা! আপনার ধর্মাধর্ম মানুষটার চেয়ে বড় কেন ভাবলেন। কেন আপনি ওঁকে কলকাতা থেকে তার করে নিয়ে এলেন। জোর করে তাঁকে বিয়ে দিলেন। ঘরে একজন ম্লেচ্ছ বৌ থাকলে, এর চেয়ে কী বড় ক্ষতি হতো আপনার চোখে জল এসে গেল বড়বৌর। কাপড় পরবার সময় চোখের জলটা আচ্ছন্ন করে দিল সব কিছু। মণীন্দ্রনাথকে বড় ঝাপসা দেখাচ্ছে এখন। পাট-ভাঙা কাপড় পরাবার সময় বড়বৌ কিছুক্ষণ বুকের ভিতর মুখ লুকিয়ে রাখল। কাঠের পুতুলটা এতটুকু নড়ছে না। যদি তাঁর সামান্য অত্যাচার আরম্ভ হয়, যদি তিনি দু’হাতে জোরজার করে বড়বৌকে উলঙ্গ করে দেন—কিন্তু পাগলঠাকুর আজ এতটুকু উত্তেজিত হলেন না। তিনি যেন এখন সন্ন্যাসীর মতো ফলদানের নিমিত্ত প্রতীক্ষা করছেন। হাতে বুঝি দণ্ডি দিলে তাই হতো।

    উৎসবের দিন বলে তসরের জামা গায়ে দেওয়া হল। কোঁকড়ানো চুলে চিরুনী দেওয়া হল। ঠিক যেন বরের সাজে পাগল মানুষ এখন দাঁড়িয়ে আছেন। এমন দৃশ্য বড়বৌ দেখে আবেগে গলে পড়ল।—এমন সুপুরুষ হয় না গো, বলতে বলতে সে প্রায় কেঁদে ফেলল। হাত ধরে এনে বড়বৌ পাগল মানুষটাকে আসনে বসাল। তারপর এক-এক করে উৎসবের ফুল-ফল বাতাসা, তিলাকদমা, পায়েস এবং খিচুড়ি—কত রকমারি খাবার থালার পাশে; বড়বৌ মাঝে-মাঝে এটা-ওটা এগিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু আজ পাগল মানুষ মণীন্দ্রনাথের কোনও খাবার স্পৃহা দেখা গেল না। তিনি সব নেড়েচেড়ে উঠে পড়লেন। তারপর নরম বিছানাতে সুন্দর এক রাজপুত্র যেমন শুয়ে থাকে, রুপোর কাঠি সোনার কাঠি যেমন পায়ে মাথায় দিয়ে শুয়ে থাকে, ঠিক তেমনি শুয়ে থাকলেন মণীন্দ্রনাথ। এতটুকু পাট ভাঙেনি কাপড়ের গোড়ালি পযন্ত টানা কাপড়, কোঁচা সোজা পায়ের কাছে নেমে এসেছে। দু’হাত আড়াআড়ি করে বুকের ওপর রাখা। তিনি বুকের ওপর হাত রেখে ঘরের কড়িকাঠ গুণছেন। স্থির অপলক দৃষ্টি। পাশে বড়বৌ। বসে আছে তো আছেই। চোখে ঘুম আসছে না। বার বার দু’গালে চুম খাচ্ছে। জামার নিচে বুকের ভিতর নরম হাতের আঙুল ক্লিবিল করে বেড়াচ্ছিল—যদি মানুষটা সোনা রুপোর কাঠির স্পর্শে মুহূর্তের জন্য জেগে ওঠে। না মানুষটা আজ কিছুতেই জাগছে না। এমন উৎসবের দিন বিফলে গেল! সে মানুষটার রোমশ বুক থেকে হাত তুলে নিল এবার। কোনও উত্তেজনা নেই দেখে লেপ গায়ে দিয়ে কাঠের পুতুল বুকে নিয়ে শুয়ে থাকল সারা রাত। কাঠের পুতুলটা ঘুমায় না—কিন্তু কালঘুম বড়বৌর—কখন দুচোখ ঘুমে জড়িয়ে আসে, কখন মণীন্দ্রনাথ ধীরে-ধীরে রাজপুত্রের খোলস ছেড়ে হাঁটু কাপড়ে বের হয়ে যান, বড়বৌ টের পায় না। কালঘুম বড়বৌর সব কিছু হরণ করে নিয়েছে।

    .

    তাবুদের ভিতর ততক্ষণে জালালিকে রাখা হয়ে গেছে। মালতী সেই অর্জুন গাছটার উদ্দেশে পা টিপে টিপে হাঁটছে। আর তখন, ফেলু পাড়ে দাঁড়িয়ে জালালির কবর ঠিক মতো খোঁড়া হল কিনা দেখছে।

    বিলে তখন গজার মাছটা আপন আস্তানায় ফিরে এসেছে এবং সন্তর্পণে পদ্মলতার ভিতর আজব জীবটাকে দেখতে না পেয়ে বিস্ময়ে লেজ নাড়ছে। কে চুরি করে নিয়ে গেল—কোথায় কোন জলে আজব জীবটা ভেসে বেড়াচ্ছে! অনুসন্ধানের জন্য গজার মাছটা জলের ওপর পাখনা ভাসিয়ে সাঁতার কাটতে থাকল।

    তাবুদের ভিতর জালালির মুখটা সাদা কাপড়ে ঢাকা। নতুন কাপড়ের কফিন দিয়েছেন হাজিসাহেব। হজিসাহেবের তিন বিবি উষ্ণ জলে গোসল করিয়েছে। সব কাজ-কর্ম ওরাই দেখেশুনে করছে। চুলে বেণী বেঁধে দিয়েছে, আতর দিয়েছে, চন্দনের গন্ধ দিয়েছে—এখন আর কে বলবে সামান্য গয়না নৌকার মাঝি আবেদালির বিবি জালালি!

    তাবুদে জালালি, মসজিদে ইমাম। আল্লার কাছে জালালির জন্য দোয়া চাইছে সবে। তিন সারিতে গ্রামের সব পুরুষ মসজিদের ভিতর দাঁড়িয়ে কান স্পর্শ করে—হে আল্লা, এমন বিরাট বিশ্বময় তোমার অপার মহিমা—আমরা সামান্য মানুষ, আমাদের আর কি করণীয় আছে, বিশ্বময় সৌরজগতের অপার লীলা তুমি ছড়িয়ে দিয়েছ, হে আল্লা, যে ঘাস মাঠ ফসল এবং পাখিদের সব কলরব শুনছি, তোমার করুণার কথা কে না জানে—তুমি সকলকে আশ্রয় দাও, তুমি আমাদের এই দুঃখী জালালিকে তোমার অপার মহিমার আশ্রয়ে তুলে নাও—ওরা বোধ হয় ওদের দোয়া ভিক্ষার ভিতর এমন কিছুই বলতে চাইছিল।

    জ্যোৎস্না রাত, ঢাক-ঢোল বাজছে, ইতস্তত হ্যাজাকের আলো মাঠে ঘাটে এবং তাবুদের ভিতর জালালি মুখ ফিরে শুয়ে আছে। সামসুদ্দিন ইমামের কাজ করছিল। মসজিদের পাশে আতাফলের গাছ, গাছে রাজ্যের সব পাখির নিবাস, অসময়ে এত লোক দেখে ওরা সকলেই জেগে গেল, কলরব করতে থাকল এবং কিছু আতাফলের পাতা প্রায় ফুলের মতো তাবুদের ওপর ঝরে পড়তে থাকল।

    তারপর সকলে মিলে লা ইলাহা ইল্লাল্লা মোহম্মদ রসুলাল্লা—তাবুদ কাঁধে নিয়ে মানুষগুলি মাঠে যাবার সময় আল্লা এক, মহম্মদ তার রসুল, এইসব বলছে। তখনও সরকারদের পুকুরপাড়ে ঢাক বাজছে ঢোল বাজছে। তখনও মাঠময় জ্যোৎস্না। ওরা লণ্ঠন হাতে, কেউ কুপি হাতে, বোরখা পরে বিবিরা—যাদের নামার কথা নয় কবরে তারা পর্যন্ত দুঃখী মানুষ জালালির জন্য বটগাছের নিচে নেমে এসেছে। গাঁয়ের পুরুষেরা চারপাশে দাঁড়াল। হাজিসাহেব অসুস্থ, তিনি আসতে পারেননি। অন্যান্য প্রায় সকলে কবরের চারপাশটায় দাঁড়িয়ে আছে। তাবুদ থেকে জালালিকে বের করা হল। একপাশে সামু, জব্বর অন্য পাশে। ওরা নিচে নেমে গেল। ফেলু ডান হাত দিয়ে কাটা বাঁশগুলি সামু কবর থেকে উঠে এলেই সাজিয়ে দেবে। উত্তরের দিকে মাথা এবং দক্ষিণের দিকে পা রেখে জালালিকে শুইয়ে দেওয়া হল। মুখটা ঘুরিয়ে দিল পশ্চিমে—মক্কা মদিনা দেখুক জালালি—এই করে ওরা উপরে উঠে এলে ফেলু এক হাতে কাটা বাঁশগুলি কবরের ওপরে বিছিয়ে দিল, কিছু ইস্তাহার বিছিয়ে দিল—তাতে লেখা আছে, মুসলিম লীগ—জিন্দাবাদ যেন কবরে সাক্ষ্য হিসাবে ওরা ওদের শপথপত্র রেখে দিল। এই শপথপত্র কবরে মাটি ঝুরঝুর করে পড়ে না যাবার জন্য এবং গরিব মুসলমানদের বেঁচে থাকবার উত্তরাধিকারের দৌলতকে কেউ যেন অস্বীকার করতে না পারে; অথবা যেন সামুর বলার ইচ্ছা—চাচি, আমরা এই ফসল এবং মাঠ আমাদের জাতভাইদের দিয়ে যাব, আমরা এমন সব সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছি। ধর্ম আমাদের সকলের ওপরে—রসুল আমাদের মহম্মদ, আল্লা এক—তাঁর কোন শরিক নাই।

    সকলেই একটু একটু করে কবরে মাটি দিল। তারপর সব মাটি কবরের ওপর তুলে দেওয়া হল। চেপে মাটি দিল, মাটির ওপর গোসলের বাকি জল ঢেলে দিল জব্বর। তিনটা জীয়ল গাছ পুঁতে, ওরা পেছনের দিকে তাকাল না, ওরা গ্রামের দিকে উঠে যেতে থাকল। ঠিক ওরা সকলে আড়াই পা গিয়েছে, তক্ষুনি এক অলৌকিক আলো কবরের ভিতরে ঢুকে গেল। ফতিমা বাপের পাশে হাঁটছিল। বাপ তাকে ফেরাস্তার গল্প বলছে। সেই যেন এক কিংবদন্তীর গল্প—বেহেস্তের এক সিঁড়ি পড়ে গেল, আলোর সিঁড়ি। কবরের ভিতর অলৌকিক আলোর প্রভায় জালালি জেগে গেল।

    দুই ফেরাস্তা প্রশ্ন করল, তুমি কে?

    জালালি বলল, আমি জামিলা খাতুন।

    —তোমার ধর্ম কি?

    —ধর্ম ইসলাম।

    —আল্লা কে?

    —আল্লা এক, তাঁর কোন শরিক নেই।

    —রসুলের নাম?

    —হজরত মহম্মদ।

    —এঁকে চেন? বলেই দুই ফেরাস্তা আলো ফেলল মুখে।—কে তিনি?

    হজরত মহম্মদ। জালালি ফের ঘুমের ভিতর যেন ঢলে পড়ল।

    জালালিকে দুই ফেরাস্তা কোলে তুলে নিলেন। অলৌকিক আলোয় জালালির শরীর লীন হয়ে গেল। ঠিক যেন এক কিংবদন্তীর সূর্য—যায় যায়, বিলের জলে ডুবে যায়। বিল থেকে নদীতে, নদী থেকে সাগরে, মহাসাগরে—শেষে এক সময় রাজকন্যা টুপ করে জলে ভেসে উঠে দুই ডানা মেলে দেয় আকাশে, পুবের আকাশে সূর্য লটকে দিয়ে আবার সাগরের জলে ডুবে অদৃশ্য হয়ে যায়।

    তখন সোনা মায়ের পাশে শুয়ে একটা ঘোড়ার স্বপ্ন দেখল। একটা ঘোড়ার দুটো মুখ। ঘোড়াটা অন্ধ। সারকাসের তাঁবু থেকে ঘোড়াটাকে ক্লাউন টেনে বের করে এনেছে। তারপর ফাঁকা মাঠে ঘোড়াটাকে ছেড়ে দিল। অন্ধ ঘোড়া এখন একবার পুবে আবার পশ্চিমে ছুটছে। ঘোড়ার পিঠে এক হতভাগ্য মানুষ—সে একবার পুবে আবার পশ্চিমে ডিগবাজি খাচ্ছে। প্রায় সারকাসের খেলার মতো। দর্শক মাত্র দুজন। সোনা এবং ফতিমা। সোনা এবং ফতিমা এমন মজার খেলা দেখে হাততালি দিতে থাকল। পিছনে পাগল জ্যাঠামশাই দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ওদের, মাঠে সারকাসের খেলা যেন দেখাতে এনেছেন।

    জ্যোৎস্না মরে আসছে, ভোর হতে দেরি নেই। গ্রামের সবাই জালালিকে কবর দিয়ে উঠে যাচ্ছে। বাগের পথে ফেলু দাঁড়াল। সারা মাঠময় কুয়াশার জন্য দৃষ্টি এগুচ্ছে না। ক্রমশ কুয়াশা চরাচর এত আচ্ছন্ন করে দিল যে ফেলু প্রায় নিজেকেই দেখতে পাচ্ছিল না। ভোর রাতের ঠাণ্ডা—হাত পা সব বরফ হয়ে যাচ্ছে। আন্নু সবার আগে উঠে গেছে, ঘুমের বাতিক বড় বেশি বিবির। মনজুর উঠে গেল, হাজি সাহেবের বড় বিবি উঠে গেল। জব্বরকে সামু ধরে নিয়ে যাচ্ছে। সামুর বিবি পেছনে পেছনে উঠে আসছে। বোরখা দেখে চেনা যাচ্ছিল সব—কার বিবি, বিবির কি রকমফের, শুধু সেই বোরখাটার চোখে সাদা গুটি সুতার কাজ। জ্যোৎস্নায় সহসা দেখে ফেললে প্রায় ভূত বলে বিভ্রম হতে পারে। সেই বোরখার নিচে যুবতী মাইজলা বিবি। তোর সনে পীরিত আমার ওলো সই ললিতে, ফেলু মনে মনে মরিয়া হয়ে উঠল। আবার সেই বুকের ভিতর আঁকুপাঁকু শব্দটা হচ্ছে। কাজটা খুব নিমেষে করে ফেলতে হবে। যেন অন্য মানুষ টের না পায়। কুয়াশা এত ঘন যে এক হাত সামনের মানুষটাকে স্পষ্ট দেখা যায় না। অস্পষ্ট কুয়াশার ভিতর, সেই বোরখাটা চিনে ঠিক মতো ধরতে না পারলে ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে যাবে। সে শীতে হি হি করে কাঁপছিল। মাত্র একটা হাত তার সম্বল। জবরদস্ত বিবিকে কাবু করতে কতক্ষণ সময় নেবে। ভাববার সময়ই মনে হল কুয়াশার পর্দার ওপর মাইজলা বিবি ভেসে উঠেছে। সঙ্গে সঙ্গে সে খপ করে সাপটে ধরল এক হাতে। ওর ভিতরে প্রায় যেন এখন অযুত হস্তীর বল। সে মুখে ডান হাতটা চেপে ঠেলতে ঠেলতে ঝোপের ভিতর ফেলে বাঘের মতো হঙ্কার দিল, রা করবি না বিবি। আমি তর পরাণের ফেলু।

  • সতের

    সতের

    সবার শেষে ঈশমও গ্রামে উঠে যাচ্ছে। উঠে যাবার পথে মনে হল, ঝোপের ভিতর এক প্রলয়ঙ্কর কাণ্ড। প্রায় সাপে বাঘে ধস্তাধস্তি হচ্ছে যেন। বোধ হয় মড়ার গন্ধ পেয়ে হাসান পীরের দরগা থেকে শেয়াল উঠে এসেছে। গোসাপও হতে পারে। প্রায় কুমীরের মতো বড় বড় গোসাপ নদীর চরে সে কতদিন ঘুরতে দেখেছে। এখন এই ঝোপের ভিতর কামড়াকামড়ি করছে। ঈশম ভয়ে দ্রুত গ্রামের দিকে ছুটে গেল।

    ভোরের স্বপ্ন, যেমন তাজা তেমনি মিষ্টি। আর বোধ হয় প্রথম স্বপ্ন দেখতে শিখল সে। স্বপ্ন দেখার পরই ঘুম ভেঙে গেল। সে শুনতে পেল বড় ঘরে ঠাকুরদা ঈশ্বরের স্তোত্র পাঠ করছেন। বড়: জ্যেঠিমা, ছোট কাকা এই শীতের ভোরে ঠাকুরদাকে উঠোনের ওপর এনে দাঁড় করিয়েছেন।

    বৃদ্ধ দীর্ঘদিন পর বায়না ধরেছেন—তিনি আজ সূর্যোদয় দেখবেন। তিনি সেই কবে অন্ধ হয়ে গেছেন—দীর্ঘদিন ঘরের বার হননি, তিনি ঘরে বসেই প্রতিদিন ভোর রাতের দিকে ঈশ্বরের স্তোত্র পাঠ করেন—হে ঈশ্বর, তোমার করুণা ফুলে ফলে, ফসলের মাঠে, তুমি করুণাময়।

    বৃদ্ধের কথা না রাখলে অনর্থ ঘটবে। সুতরাং ওরা বৃদ্ধের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকল। ঠিক কামরাঙা গাছটার নিচে দাঁড়ালে পুবের আকাশ স্পষ্ট। সূর্য উঠবে। পুবের আকাশ ফর্সা হয়ে গেছে। পাখিরা উড়ে যাচ্ছিল। মসজিদে আজান দিচ্ছে সামসুদ্দিন। মোরগেরা ডাকছে। বড়বৌ পূজার ফুল তুলতে চলে গেছে। বৃদ্ধ মানুষটি সূর্যোদয় দেখার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। কতকাল যেন—কত দীর্ঘকাল যেন সূর্যোদয় দেখেননি, কতকাল তিনি যেন এমন পাখির কলবর শুনতে পাননি। কামরাঙা গাছটার নিচে তিনি সোনা, লালটু, পলটুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। সূর্য উঠলেই বলতে হবে—সূর্যোদয় হচ্ছে। তিনি এই যে সূর্য, আলোর দেবতা, ঈশ্বরের অংশ, ঈশ্বর জনে জনে ফুলে ফুলে বিরাজমান—সর্বত্র তিনি, তিনি এক এবং বহু, তিনি সীমাসংখ্যার অতীত, মহাবিশ্বের তিনিই সব—তাঁর সেই আলোর দূতকে স্বাগত জানাবেন। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার সুর্যোদয়ের কথা তাঁকে আর বলতে হল না। তিনি নিজেই যেন টের পাচ্ছেন সূর্য আকাশে উঠে আসছে। কুয়াশার জল কামরাঙা গাছ থেকে টুপটাপ ঝরছিল। লাল নীল পাখির পালক উড়ছিল। ফ্লানেলের জামা গায়ে খড়ম পায়ে বৃদ্ধ মানুষটি সূর্য উঠতেই দু’হাত তুলে প্রণাম করলেন। মহাবিশ্বে আমরা সামান্য মানুষ। তুমি মানুষের জরাজীর্ণ জীবনকে আলোকিত কর। রোগ শোক সব হরণ করে নাও।

    সূর্যোদয়ে এত রহস্য আছে সোনার জানা ছিল না। সেও ঠাকুরদার দেখাদেখি সূর্যকে প্রণাম করল এবং ঠাকুবদার সঙ্গে গলা মিলিয়ে সূর্যস্তব পাঠ করল।

    শচীন্দ্রনাথের অন্য কিছু কাজ ছিল। মাঠে ঈশমকে নিয়ে নেমে যেতে হবে। গৌর সরকার সীমানা ভেঙে দিচ্ছে জমির। এসব দেখার জন্য, আর বোধ হয় ঘটনাটা মামলাবাজ গৌর সরকারকে একটু সমঝে দেবার জন্য তিনি দ্রুত মাঠে নেমে যাবেন স্থির করেছিলেন। উত্তেজনায় রাতে শচীন্দ্রনাথের ঘুম হয়নি, কারণ মাটির মতো ভালোবাসার সামগ্রী আর কি আছে!

    সূর্য আকাশে উঠে গেছে। মনে হল বৃদ্ধের এখন আর কোনও অবলম্বনের প্রয়োজন নেই। সূর্যের উত্তাপে শরীরের ভিতর প্রাণের আবেগ—সেই যৌবনের মতো অথবা শৈশবের মতো মনে হয়, তিনি এখন একা একা, কেউ কিছু বলে না দিলেও কোথায় কোনদিকে গেলে গোপাট পড়বে, কোনদিকে গেলে পুকুরপাড়ের প্রিয় অর্জুন গাছটা পড়বে এবং নদী আর কতদূর, কতটা মাঠ এগুতে পারলে সোনালী বালির নদীর চর, চরে এখন তরমুজের লতা কত বড়, কত সবুজ সব লতাপাতা তিনি চোখ বুজে বলে দিতে পারেন। তিনি যেন বলতে চাইলেন, শচি, তুমি মাঠে নাইমা যাইতে চাও–যাও, আমার জন্য তোমার কোন চিন্তার কারণ নাই। আমি একলা মানুষ। সংসারে এই তো হয়—স্ত্রী-পুত্র এত, তবু নিজেকে কেবল একা মনে হয়। তিনি শচীন্দ্রনাথকে শুধু বলেছিলেন, সে যেন মাঠে যাবার আগে তাঁর চাঁদির বাঁধানো লাঠিটা দিয়ে যায়। কতকাল আগে, তখন প্রৌঢ় মহেন্দ্রনাথের কি দাপট! তিনি চাঁদির বাঁধানো লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে গ্রাম মাঠ পার হয়ে চলে গেছেন। সেই মানুষ কতকাল ঘরের বার হননি। প্ৰায় অথব এখন তিনি। কিন্তু কথা আছে এ-সালে তিনি দেহরক্ষা করবেন। কুষ্ঠী ঠিকুজি এবং রাশিফল এমনই সব বলছে। শীতকালে বুড়ো মানুষের মৃত্যুভয় অসীম। কার্তিকের টান, বড় টান। কার্তিকের টান বানের জলের মতো। গ্রাম মাঠ সাফ করে বুড়ো মানুষদের নিয়ে যায়। ঠিক সেই সময়ে একদিন তাঁর সন্তান ভূপেন্দ্রনাথ বলেছিল, বাবা, এবারে চন্দ্রায়ণটা কইরা ফেলি।

    তিনি পুত্রের ইচ্ছার কথা ধরতে পেরেছিলেন। বয়স হয়েছে। কার্তিকের টানে বড় কষ্ট পাচ্ছিলেন। দ্বাদশ ব্রাহ্মণ ভোজন এবং চন্দ্রায়ণ করালে পাপ খণ্ডন হবে। পাপ খণ্ডন হলেই এই সংসার থেকে মুক্তি। তখন বায়ুতে পঞ্চভূত হয়ে আত্মাটা মিশে যাবে। তিনি ভূপেন্দ্রনাথের কথায় রুষ্ট হয়েছিলেন।—আমার ত যাওয়নের সময় হয় নাই। হইলে টের পামু। তোমাগ ঘণ্টা বাজাইতে হইব না।

    আর শীতের মাঝামাঝিতে মনে হল মহেন্দ্রনাথ আবার তাজা হয়ে যাচ্ছেন। এবং কানে যেন ভালো শুনতে পাচ্ছেন। শরীরের জড়তা ক্রমশ উবে যাচ্ছে। এখন তিনি বিছানাতে ওঠা বসা করতে পারেন। হাঁটা চলা করতে পারেন। আর মনে হল তিনি ফের শতবর্ষ বাঁচার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।

    তিনি এবার তাঁর তিন নাতিকে উদ্দেশ করে-বড় কচিকাঁচা বয়স ওদের, তাঁর সন্তানেরা সবই শেষ বয়সের, প্রথম দিকে কোনও সন্তানাদি হবে না বলেই ঠিক ছিল, তিন নাতিকে উদ্দেশ করে কিছু বলতে গিয়ে এমন সব ছবি মনে পড়ে গেল তাঁর। তিনি বললেন, আমার মাঠে নাইমা যাইতে ইচ্ছা হয়। তোমরা আমারে মাঠে নিয়া যাইবা?

    এই কথায় তিন নাতিকে বড় উৎফুল্ল দেখাল। ওরা ঠাকুরদার এমন একটা অভিপ্রায় জেনে আনন্দে উৎফুল্ল। এখনও সূর্য উপরে উঠে আসেনি।

    পলটুর হাত ধরে মহেন্দ্রনাথ গোপাটে যাচ্ছেন। লালটু আগে আগে হাঁটছে। সোনা পিছনে পিছনে হাঁটছে। ঠাকুরদার হাতে চাঁদি বাঁধানো লাঠি। লাঠির মুখটা সোনাব্যাঙের মাথা যেন। চোখ বোজা, কান খাড়া, কোনও-কোনও সময় মনে হয় শজারুর মুখের মতো লাঠির মাথাটা হাঁ করা। মহেন্দ্রনাথ লাঠিটা ডান হাতে ভালো করে ধরলেন। তিনি যেন এখন সব কিছু দেখতে পাচ্ছেন, সেই প্রৌঢ় বয়সের মতো। কোথাও একটা শ্বেতজবা ফুটে আছে। তিনি বললেন,দ্যাখ ত পলটু, মনে হয় গাছে একটা জবা ফুল ফুইটা আছে।

    লালটু বলল, আছে।

    লালটু পলটু সোনা অবাক। হ্যাঁ, গাছে মাত্র একটা শ্বেতজবা ফুটে আছে।

    সোনা বলল, ঠাকুরদা স্থলপদ্ম গাছটায় ফুল হইছে।

    —অসময়ে ফুল। বলে তিনি পুকুরপাড় ধরে নেমে যাবার সময় বললেন, তরা আমারে তেঁতুল গাছটার নিচে নিয়া আইলি!

    ওরা ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। অন্ধ মানুষকে যেমন সবাই ধরাধরি করে পথ পার করে দেয় তেমনি এই তিন নাবালক মহেন্দ্রনাথকে মাঠের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পুকুরপাড় ধরে হাঁটার সময় তিনি প্রায় এক-এক করে সব গাছের নাম বলে যাচ্ছিলেন। কখনও কদবেল গাছ অথবা কখনও জামরুল গাছের নিচ দিয়ে যাচ্ছেন, বলে দিতে পারছেন। যেতে যেতে সহসা তিনি থেমে পড়লেন। বললেন, জলে একটা বোয়াল মাছ ভাইসা আছে।

    ওরা দেখল, হ্যাঁ, পুকুরের জলে বড় একটা বোয়াল মাছ ভেসে দাম খাচ্ছে। সোনা বলল, দ্যাখি আপনের চোখ দুইটা। বাবায় আইলে কইয়া দিমু, আপনে মিছা কথা কন। চক্ষে দ্যাখতে পান ঠিক। মহেন্দ্রনাথ সোনার কথা শুনে হাসলেন। তিনি পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে মাছের গন্ধ পাচ্ছিলেন, এবার লাঠি ঠুকে ঠুকে জায়গাটাকে চেনার জন্য বললেন, তরা বড় জামগাছটার নিচে নিয়া আইছস্!

    তিনজন ওরা এবার একসঙ্গে হেসে উঠল। বলল, ঠাকুরদা কইতে পারল না।

    মহেন্দ্রনাথ আরও সামান্য সময় চিন্তা করলেন। কতদিন পর ঘর থেকে বের হয়েছেন, সূর্যোদয় দেখবেন বলে। আর নিজের এই বাসভূমি যা তিনি তিলেতিলে অর্জন করেছেন, যে ভালোবাসা তাঁকে এখনও ঈশ্বরের সংসারে ডুবে যেতে দেয় না, সেই জগৎ এত অপরিচিত হয়ে গেল! তিনি এমন ভুল বলে ফেললেন! প্রায় শতবর্ষের অভিজ্ঞতা এই মাটি এবং মানুষ সম্পর্কে—তিনি এই তিন নাবালকের কাছে কিছুতেই হার স্বীকার করতে চাইলেন না। তিনি স্মৃতির ভিতর ডুবে মণিমাণিক্য অনুসন্ধানের মতো কোথায় কোন গাছের পরে কি গাছ ছিল, কখন কোন গাছ ছিল, কখন কোন গাছ তিনি কেটে ফেলেছেন—সব মনে-মনে অনুসন্ধান করে বেড়ালেন। তেঁতুল গাছটার পর জামরুল গাছের পাতার গন্ধ আসছিল নাকে, তারপর মনে হল রোদ মাথায় মুখে—তবে বড় জামগাছটা হবে ঠিক। কিন্তু নাতিরা তাঁর যেভাবে হেসে উড়িয়ে দিল তাতে তিনি বড় মুষড়ে পড়েছেন। নাকে বড়-বড় শ্বাস টানলেন—যদি নিঃশ্বাসে কোনও অন্য কোন পরিচিত গন্ধ ভেসে আসে। যদি তাঁর জল মাটির জন্য ভালোবাসা তাঁকে ফের অন্তর্যামী করে তোলে।

    এবার মহেন্দ্রনাথ বললেন, খেজুর গাছের নিচে আইছি।

    নাবালক তিন নাতি আরও জোরে হেসে উঠল। ঠাকুরদাকে নিয়ে এবার তারা খেলায় মেতে গেল। ‘সেই যেন চোর-চোর খেলা। ঠাকুরদা অন্ধ। অন্ধ বলেই ওরা ধরে নিল ঠাকুরদার চোখ বাঁধা। ওরা ঠাকুরদার চারপাশে চোর-চোর খেলছিল অথবা চোর চোর বলে চিৎকার করছিল—ঠাকুরদা ওদের ছুঁতে পারছেন না। ওরা ঠাকুরদাকে নিয়ে শক্ত খেলায় মেতেছে। ওরা এবার ঠাকুরদাকে সামনের মাঠে নিয়ে যাবে এবং যেতে যেতে বলবে, আপনি কোথায়? ঠাকুরদা বলবেন, আমি খামার বাড়িতে। তারপর ওরা যতদূর হেঁটে যাবে, উত্তরে, দক্ষিণে যেদিকে চোখ যায়—ফের এক প্রশ্ন, আমরা কোথায়? তিনি যেন বলবেন, আমরা ভিটা জমির ওপর। খেলার মতো ঘটনাটা হয়ে গেল। এমন খেলা বুঝি হয় না। ওরা প্রশ্ন করছিল আর বিজ্ঞের মতো ঠাকুরদার দিকে তাকিয়ে উত্তরের প্রত্যাশা করছিল। সোনা কেবল হরিণ শিশুর মতো ঠাকুরদার চারপাশে লাফাচ্ছে। ঠাকুরদা ঠিক বলতে পারলেই আবার টেনে নিয়ে যাওয়া রথের মতো—ওরা এক পুরনো রথ যেন ভালোবাসার পথ ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

    জরাজীর্ণ রথটি পথের ওপর অতিকায় এক বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়েছিল। হাতে লাঠি, গায়ে শাল, মাথায় লাল টুপি এবং হাতে শীতের দস্তানা। তিনি গরম মোজা পায়ে দিয়েছেন, পায়ে সাদা কেডস জুতো—তিনি হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলেন, তাঁর প্রিয় নাবালকেরা কোথায় তাঁকে টেনে নিয়ে এসেছে। তিনি একবার ভাবলেন ডেকে বলবেন, দ্যাখ বৌমারা, তোমার পোলারা আমারে কই লইয়া যইতাছে। কিন্তু বলতে পারলেন না। কেমন যেন পুকুরপাড়ে নেমে এসে তিনি মজা পেয়ে গেছেন। তিনি চুপচাপ লাঠিটা ঝোপে-জঙ্গলে ঠুকে ঠুকে এগুতে থাকলেন। এক সময় মনে হল লাঠিতে শক্ত একটা কিছু ঠেকছে। এতক্ষণে মনে হল তিনি বড় জামগাছটা কেটে একটা অর্জুন গাছ লাগিয়েছিলেন। ওঁর মুখ চোখ এবার আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল—তোমরা আমারে অর্জুন গাছটার নিচে নিয়া আইছ।

    ঠাকুরদা এবার ঠিক বলে ফেলেছেন। সোনা মনে মনে চাইছিল, ঠাকুরদা ঠিক-ঠিক বলে ফেলুক। কারণ তিনি যে ভাবে নিরালম্ব মানুষের মতো এই পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন এবং বড়দা মেজদা যে-ভাবে ঠাকুরদাকে হেনস্থা করছে—তাতে ওঁর কষ্টটা কেবল বাড়ছিল। যেই সঠিক বলে ফেলেছেন, যেই তিনি বুঝতে পেরেছেন ওঁকে অন্য পথে পুকুরের পাড়ে নিয়ে আসা হয়েছে এবং মুখে নাবালকের মতোই যখন আর গর্বের অন্ত নেই, তখন সোনা আনন্দে একটা লাফ না দিয়ে থাকতে পারল না; যেন উত্তরটা মহেন্দ্রনাথ দেয়নি, উত্তরটা সোনা দিয়েছে।

    ওরা মহেন্দ্রনাথকে আরও টেনে নামাতে চাইলে তিনি বললেন, আমি আর যামু না। আমারে তোমরা ঝোপে-জঙ্গলে নিয়া যাইতে চাও! বান্দরের মতো নাচাইতে চাও! আমি নাচমু না। বলে তিনি অর্জুন গাছটার নিচে বসে পড়লেন। দুর্বাঘাস ছিল কিছু, রোদ এসে পড়েছে কখন। ঘাসে কোনও শিশিরবিন্দু ছিল না। বসে পড়ে তিনি চারধারে কি খুঁজতে থাকলেন।

    সোনা বলল, কি খোঁজেন।

    —আমারে।

    সোনা বুঝতে পারল না কথাটা।

    —আমারে খুঁজি। আমারে তোমরা এইখান রাইখা দিয়। তারপর তিনি কি ভেবে চুপ করে গেলেন। হয়তো তাঁর এই তিন নাতি ওঁর এই প্রিয় স্থানটুকুর খবর রাখে না। তিনি মাটির ওপর ফের ভালোবাসার হাত রাখলেন। সব ছেলেদেরই বলে রেখেছেন, তাঁর এই ভালোবাসার মাটিতে তাঁকে যেন দাহ করা হয়। তিনি নিজেই স্থানটি নির্বাচন করে রাখার সময় স্মারক হিসাবে অর্জুন গাছ লাগিয়েছেন।

    সূর্যের আলো গাছের মাথায় পড়ায় বেশ উষ্ণ মনে হচ্ছিল চারিদিকটা। মাঠে মেলার গরু নেমে যাচ্ছে। কিছু গাছের ছায়া ইতস্তত পাড়ে-পাড়ে। বুড়ো মানুষ মহেন্দ্রনাথ পা ছড়িয়ে নাতিদের নিয়ে অর্জুন গাছের নিচে বসে রয়েছেন। দেখলে মনে হয় চোখ বুজে কিছু ভাবছেন। বোধ হয় স্মৃতিতে তাঁর একমাত্র পাগল ছেলের জন্য কষ্ট। তিনি পলটুর মাথায় হাত রেখে বললেন, পড়াশুনা কইর। বাবারে কষ্ট দিয় না।

    মাঠে আবেদালির বিবির কবরটা দেখা যাচ্ছে। কবরের পাশে তিনটে জিয়ল গাছ পোঁতা। একটা মোরগ কবরটার ওপর এক পায়ে দাঁড়িয়ে শীতের সূর্যকে দেখছে। আর এই জলালিকে নিয়ে পাগল ঠাকুর গত রাতে ফিরে এসেছেন। মণীন্দ্রনাথ, বড় ছেলে তাঁর, পাগল ছেলে, সে এখন কোথায় কে জানে!

    পলটু কোনও উত্তর করল না। বাপ সম্পর্কে পলটুর একটা অসম্ভব রকমের অবজ্ঞা আছে। সে বাপের সঙ্গে কোথাও যায় না। বরং সোনার সঙ্গে ভাব বেশি। পলটু অন্য কথায় এল। সে বলল, চলেন, ঠাকুরদা, আমরা গোপাটে নাইমা যাই।

    মহেন্দ্রনাথ পলটুর কথা শুনেও শুনলেন না। তিনি এখন অন্য কথা ভাবছিলেন। জালালি জলে ডুবে মরেছে। কবরে একটা মোরগ উত্তর-দক্ষিণ ঘুরছে। আর সূর্যের উত্তাপ সমানভাবে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছিল। গতকাল পার্বণের দিন গেছে। পূজার শেষে বলির বাজনা যেন থামছে না। আর অঞ্চলের বয়সী মানুষটি এখন তাঁর প্রিয় মাটিটুকুর উপর বসে আছেন। এখানেই তিনি চিরকালের মতো মহানিদ্রায় মগ্ন হবেন। এখানেই তাঁর দেহ সবাই ধরাধরি করে নিয়ে আসবে—চোখের উপর তিনি দৃশ্যটা ঝুলতে দেখলেন। ছেলেরা চারপাশে ঘিরে থাকবে, গ্রামের পর গ্রাম থেকে লোক জড়ো হবে—অঞ্চলের মানুষেরা হরিসংকীর্তন করবে, চন্দনের কাঠ পুড়বে, ঘৃত-দধি দুগ্ধ ঢেলে দেওয়া হবে, তার ভিতরে তিনি যজ্ঞের হবির মতো জ্বলতে থাকবেন। এবং তাঁর পাগল ছেলে তখন অর্জুন গাছটায় হেলান দিয়ে জ্বলন্ত মানুষটাকে দেখতে দেখতে দু’হাত তুলে চিৎকার করে উঠবে। সহসা এই পাগুল পুত্রের মুখ তাঁকে কেমন বিষণ্ণ করে দিল। পাগল পুত্র চিতার আগুনের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন নালিশ–বাবা, আপনি আমার সর্বনাশ করেছেন। আপনি আমার সব ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছেন। আপনার ধর্মবোধ আমার জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমি এক পাগল, আমার চিন্তাশক্তি নাই, আমার পাগল চিন্তার সমভাগী হতে কেউ চায় না—কেবল যেন মনে হয় মাথার ভিতর এক স্বপ্ন নিরালম্ব মানুষের মতো পাক খাচ্ছে, কেবল কে যেন সেই স্বপ্নের ভিতর চলে যেতে থাকে। আপনি সেই মানুষ, আত্মার কাছাকাছি আমার যে যুবতী ছিল, যুবতীর নাম পলিন, উঁচু লম্বা এবং নীল চোখ তার, তাকে আপনি দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। সমুদ্র আমি দেখিনি বাবা, কিন্তু বসন্তের আকাশ দেখেছি, আকাশের নিচে সোনালী বালির নদীর জল, জলে তার মুখ ভাসে। আকাশের কোনও বড় নক্ষত্র অন্ধকারে জলে প্রতিবিম্ব ফেললে মনে হয়, সেই মেয়ে কত দূরদেশ থেকে ডাকছে, মণি, যাবে না? উইলো ঝোপের পাশে বসে আমরা দুজনে সান্তাক্লজের গল্প করব। তুমি যাবে না? আর দেখছি শীতের মাঠে ঘাসে ঘাসে কত শিশিরবিন্দু। শিশিরবিন্দুর মতো সেই পবিত্র মুখ আপনি কেড়ে নিয়েছেন বাবা। নালিশ দিতে দিতে চিতার আগুনের দিকে তাকিয়ে বিদ্বান বুদ্ধিমান পাগল ছেলে হাউহাউ করে কাঁদছে।

    মহেন্দ্রনাথ লাঠিটা এবার আরও জোরে চেপে ধরলেন। মনের ভিতর কতকাল থেকে অনুশোচনা। মৃত্যুর জন্য যত প্রস্তুত হচ্ছেন ততই পাগল ছেলের জন্য অনুশোচনা বাড়ছে। তত তিনি নিজেকে অসহায় ভাবছেন। তাঁর কেন জানি মনে হয়, আর দেরি করে লাভ নেই। তাড়াতাড়ি চন্দ্রায়ণটা করে ফেলতে হয়। দ্বাদশ ব্রাহ্মণভোজনের ব্যবস্থা করতে হয়। ব্রাহ্মণ খাইয়ে প্রায়শ্চিত্তটা সেরে ফেললেই—সংসার থেকে চিরদিনের জন্য নির্বাসনের দলিলটা মিলে যাবে। ঈশ্বরে সমর্পিত প্রাণ আর সাংসারিক দুঃখবোধে পীড়িত না হলেই যেন ভালো হয়। তিনি পলটুকে বললেন, আমারে ঘরে নিয়া যা। বলে তিনি পলটুর কাঁধে ঘরে ফেরার জন্য হাত রাখলেন।

    বস্তুত তিনি নিজের সংসারে ফিরতে চাইলেন। ওরাই যেন তাঁকে তাঁর নির্দিষ্ট ঘরটিতে পৌঁছে দেবে। যে-ঘর থেকে একদা সূর্যোদয় দেখবেন বলে বের হয়েছিলেন, ঠিক সেই ঘরে। অন্ধকার ঘর, বায়ুশূন্য এবং মাঝে মাঝে ঝিল্লির ডাক শোনা যায়—কেম নিঃশব্দ এবং নির্জন, পাশে কেউ নেই। সব শূন্য। একটা শূন্যের মতো বায়ুশূন্য ঘরে ফের ফিরে যাওয়া। তিনি চোখ বুজলে তেমন একটা আলোহীন বায়ুহীন ঘরের দৃশ্য দেখতে পান।

    কিন্তু দুষ্ট বালকদের মতলব বোঝা দায়। ওরা ওদের ঠাকুরদাকে নিয়ে বেশ রঙ্গ-তামাশা আরম্ভ করে দিল। ওরা ওদের প্রিয় ঠাকুরদাকে ধরে নিয়ে যেতে থাকল। গোপাট পার হয়ে অশ্বত্থ গাছের নিচটাতে এসে দাঁড়াল তারা। ওরা মহেন্দ্রনাথকে গাছতলায় ছেড়ে দিয়ে বলল, এবারে কন ত কোনখানে আইছেন?

    বৃদ্ধ তাদের খুব অনুনয়-বিনয় করতে থাকলেন—কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন ওদের হাতে যখন পড়েছেন, তখন তাঁর হেনস্থার শেষ নেই। ওরা ওঁকে নিয়ে খেলায় মেতে গেছে। ওরা ওঁকে ঝোপে-জঙ্গলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। তিনি প্রায় করজোড়ে বললেন ওদের, সোনাভাই, ধনভাই, বড়ভাই, তোমরা বড় লক্ষ্মী পোলা। তোমরা আমারে ঘরে নিয়া যাও।

    সোনা বলল, ঠাকুরদা, ডর নাই। টোডারবাগের বটগাছটার নিচে আইছি। লালটু বলল, আমরা আপনের লগে মাঠ পলান্তি খেলুম। বলেই ওরা মহেন্দ্রনাথকে গাছের নিচে ধীরে ধীরে বসিয়ে দিল। যেন মহেন্দ্রনাথ ওদের সমবয়সী বন্ধু। তারপর ওরা ছুটে ছুটে বেড়ালো—চিৎকার করে সবাইকে যেন বলতে চাইল—রাজা হুই গাছের নিচে বইসা আছে। রাজারে ছুঁইয়া দিলেই জিত! মহেন্দ্ৰনাথ এমন খেলায় ঘরের কথা ভুলে গেলেন। গাছের ডালে পাখি, পাখিরা সব কলরব করছে। কোথাও দূরে গরু-বাছুরের ডাক, অনেক দূরে কে যেন কাঠ কাটছে। আর অনেক দূর দিয়ে কে যেন হেঁটে চলে যায়। বুঝি সেই পাগল ছেলে। আর মনে হল তাঁর, চারপাশে প্রকৃতির কোলে সেই এক শৈশব ঘুরে ফিরে আসে। তিনি লাঠি কোলে রেখে বসে আছেন। স্থির। প্রায় বুদ্ধমূর্তির মতো চোখ বুজে তিনি বসে আছেন। দূরে সোনালী বালির নদীর জলে নৌকা ভাসে, পাল তোলা নৌকার খুঁটিতে নীল রঙের পাখি—তিনি বসে বসে সেই শৈশবকে যেন দেখতে পাচ্ছেন, শৈশব ঘুরে ফিরে চলে আসে, সেই এক নাও নদী ধরে যায়, পাশে সেই এক লাল নীল পাখি উড়ে উড়ে আসে। তাঁর চারপাশে শৈশব এখন খেলা করে বেড়াচ্ছে। তিনি পুরানো শৈশবের প্রতীক। ওরা এখন গান গাইছে মাঠে, লুকোচুরির গান। গ্রামের অন্য সব বালক বলিকা এই খেলায় ভিড়ে গেছে। সুভাষ, কিরণী, কালাপাহাড় এমনকি টোডারবাগ থেকে ছোট্ট ফতিমা পর্যন্ত নেমে এসেছে।

    মহেন্দ্রনাথের চোখে এখন আর পাগলপুত্রের মুখ ভাসছে না। কারণ,সংসারে সুখ সব সময় থাকে না। সংসারে দুঃখও সব সময় ভাসে না। শুধু এক দূরের শৈশব বারবার এই প্রকৃতির কোলে ঘুরে ফিরে চলে আসে। তিনি মনে মনে নিজের সেই হরানো শৈশবকে ফিরে পাবার জন্য গুনগুন করে লুকোচুরি গান গাইতে থাকলেন। শৈশব বুঝি মাথার উপরের বটবৃক্ষ অত বড় ছিল না। তবু তিনি তাঁর শৈশবের সাঙ্গোপাঙ্গদের গাছের নিচে দেখতে পেলেন। ওর খেলা করে বেড়াচ্ছে। এবং তিনি যে গান গাইছিলেন, সেই গান সমস্বরে ওরা গেয়ে চলেছে। কিন্তু সময় বড় সামান্য। কত আর সময় হবে—তাঁর মনে হল সহসা, ওরা কেউ বেঁচে নেই, ওরা এই বটবৃক্ষের নিচে কী করে আর ফিরে আসবে। মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল। ভিতর থেকে কে যেন কেবল বলছে, তারা কেউ বেঁচে নেই, একা তুমি পুরী পাহারা দিচ্ছ। যেন এতদিনে ধরতে পারলেন এই গাছপালা পাখির ভিতর তিনি আর কেউ নন। তিনি পরিত্যক্ত মানুষ সবুজ বনে মৃত বৃক্ষের মতো তিনি জায়গা দখল করে আছেন। অথবা জীর্ণ মঠের মতো, মঠ থেকে সন্ন্যাসী পুণ্য করতে তীর্থে বের হয়ে গেছেন। তিনি আর বসে থাকতে পারলেন না। একা একা সবার অলক্ষ্যে তিনি নদীর দিকে পাগলের মতো নেমে যেতে থাকলেন।

    সোনা-ই প্রথমে চিৎকার করে উঠল, ঠাকুরদা গাছতলাতে নাই।

    ওরা সকলে এত মশগুল ছিল খেলাতে, ঝোপে-জঙ্গলে ওরা এত বেশি ছুটছিল যে, টেরই পায়নি কখন বুড়ো মানুষটা নদীর দিকে নেমে গেছেন। ওরা সবাই এবার গ্রামের দিকে চিৎকার করে বলতে বলতে উঠে আসছে—ঠাকুরদা হারাইয়া গেছে। গাছতলাতে নাই, কোনখানে নাই।

    .

    ঈশম চরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়েছিল। চারদিকে তরমুজের লতা। হলুদ রঙের ফুল। বড় বড় লতার ফঁকে ফাঁকে উটপাখির ডিমের মতো তরমুজ। যেন এক অতিকায় উটপাখি এই বালির চরে ডিম পেড়ে রেখে গেছে। কালো কুচকুচে রঙ। এবার শীত যেতে-না-যেতেই তরমুজে ছেয়ে গেল। মেলায় এবার অনেক তরমুজ যাবে। ছোটঠাকুর ব্যাপারীর সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন। তিনি আল নিয়ে মামলা করবেন ভেবে বাড়ি থেকে নেমে এসেছিলেন। পথে ব্যাপারীর সঙ্গে দেখা। তিনি জমিতে চলে এলেন। এসে তাজ্জব বনে গেলেন। ঈশম ওকে একবারও বলেনি, ফলন এত ভালো হয়েছে। ক’দিনের ভিতর জমিটার চেহারা পাল্টে গেছে। মেলায় যাবে তরমুজ। কাল পরশু থেকে এই পথে অথবা চরের পাশ দিয়ে বড় বড় ঘোড়া উঠে যাবে। মেলায় ঘোড়দৌড় হবে। সোনালী বালির নদীতে পাল তুলে নৌকা যেতে আরম্ভ করেছে। এ মাসটাই নৌকা চলবে। তারপর জল কমে গেলে পারাপার করতে হাঁটু জল থাকে। ঈশম জমি থেকে এক দুই করে তরমুজ সংগ্রহ করছে।

    ঈশম ছুটে যাচ্ছে। পাতার ফাঁকে উঁকি দিয়ে দেখছে। তারপর টোকা মারছে। ডাঁসা তরমুজ খেতে স্বাদের হয়। সে টোকা দিয়ে বুঝতে পারে কোন তরমুজ জমি থেকে তুলে নেবার সময় হয়েছে। এক-একটা তরমুজ বিশ-ত্রিশ সের ওজনের। সে একসঙ্গে দুটো তুলে আনতে পারছে না। এমন কি কোনও কোনও তরমুজ সে বুকের কাছে তুলে প্রায় যেন পাঁজাকোলে নিয়ে আসছে। সে ছইয়ের পাশে এক-দুই করে তরমুজ জড়ো করার সময়ই দেখল, এদিকে একটা মানুষ টলতে টলতে নেমে আসছে। কত লোকই আসে! সে ভলো করে লক্ষ করেনি। নিবিষ্ট মনে সে শুধু তরমুজ জড়ো করছে। তার যেন হাতে সময় নেই। সময় চলে যাচ্ছে। সে দূরে দেখল বাতাসে তরমুজের পাতা ফাঁক হয়ে যাচ্ছে, ফাঁক হয়ে গেলেই বড় একটা তরমুজের পিঠ সে দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল। বাতাস আর নেই। কাছে গিয়ে দেখল বড় বড় পাতা তরমুজটাকে ঢেকে দিয়েছে। সে চারিদিকে চোখ মেলে খুঁজতে থাকল। পাতার ভিতর পড়ে থাকলে টের পাওয়া যায় না। তরমুজ ফেলে রাখলে নষ্ট হয়ে যায়। সে আর একবার বাতাসের জন্য অপেক্ষা করল। বাতাস উঠলেই পাতার ফাঁকে তরমুজটা সে দেখে ফেলবে—এই ভেবে চোখ তুলতেই দেখল, মানুষটা দু’বার আছাড় খেয়েছে, দু’বার উঠে দাঁড়িয়েছে। টলছে। কে এই মানুষ! শীতের রোদে পাগলের মতো নদীর দিকে নেমে আসছে। সে ভালো করে লক্ষ করতেই বুঝল, আরে এ যে সেই মানুষ, সে ছুটতে থাকল। নদীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এত সাহস হল কী করে, চোখে দেখতে পায় না, তাজ্জব। মানুষটা লাঠি ঘুরিয়ে যেন তার যৌবনকাল, যেন বাতাসের সঙ্গে মানুষটা লড়ছে, লাঠি ঘোরাচ্ছে, দ্যাখো, আমি মহেন্দ্রনাথ এখনও কতদূর হেঁটে যেতে পারি, দ্যাখো, আমি মহেন্দ্ৰনাথ কতকাল এই মাটিতে বসবাস করছি, এখন কিনা আমার পোলারা কয় চন্দ্রায়ণ করেন বাবা। কি সাহস! মানুষটা লাঠি ঘুরিয়ে হাঁটতে গিয়ে বার বার মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছেন। আর একটু হলেই গড়িয়ে গিয়ে নদীর জলে পড়বেন। ঈশম ছুটতে ছুটতে গিয়ে ধরে ফেলল। তারপর পাঁজাকোলে তুলে নিতেই দেখল, হাত পা ছিঁড়ে গেছে। রক্ত পড়ছে। এমন কেন করছেন তিনি! এখন যেন ঠিক একটা পতুলের মতো মুখ—মানুষটার, সেই জবরদস্ত চেহারা নেই। একেবারে ছোট মানুষ হয়ে গেছেন। ছোট্ট শিশুর মতো কাঁদছেন।

    —আপনের কি হইছে কর্তা! কোনদিকে যাইবেন ঠিক করছেন।

    —আমারে তুই কই লইয়া যাইতাছস?

    —বাড়ি যাইবেন।

    –বাড়ি! বৃদ্ধ এবার চোখ বুজে ফেললেন। তিনি এটা কী করতে যাচ্ছিলেন! তিনি তাঁর বড় ছেলের মতো নিরুদ্দেশে হাঁটছিলেন কেন! মনের ভিতর কিসের এই অনুতাপ। নিজের ছেলেমানুষীর জন্য কেমন অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন।-আমারে নামাইয়া দে।

    —শরীর কি হইছে দ্যাখছেন?

    —কি হইছে?

    ঈশম ইচ্ছা করেই চুপ করে থাকল। শরীরে রক্ত নেই বোঝা যাচ্ছে। কোনও কোনও জায়গা কেটে গেছে অথচ রক্তপাত হচ্ছে না। সে তাড়াতাড়ি পুকুরপাড়ে উঠলেই সকলে ছুটে এল। সেই বৃদ্ধ মানুষ, আলখাল্লা পরা মানুষ, অঞ্চলের সর্বশেষ মানুষ পথ হারিয়ে ফেলেছিল। তিনি সকলকে অন্তত এমনই বললেন।

  • আঠার

    আঠার

    এ-ভাবেই শেষে মেলার দিন এসে গেল। ঘোড়া উঠে আসতে আরম্ভ করল এক দুই করে। গোপাট ঘরে বড় বড় ঘোড়া চলে যাচ্ছে। মাসাধিককাল মেলা। শনিবারে ঘৌড়দৌড় হবে। গলায় ঘণ্টা বাজলে মানুষেরা মাঠে নেমে ঘোড়া দেখে, কার ঘোড়া যায়। নয়াপাড়ার ঘোড়া কি বিশ্বাসপাড়ার ঘোড়া! মাঠে ঘোড়ার মুখ ভাসলেই মানুষগুলি ঘোড়া যায় বলে চিৎকার করতে থাকে।

    মেলায় যাবে সকলে। রঞ্জিত যাবে, মালতী যাবে। আবু, শোভা যাবে। ছোট ঠাকুর যাবেন। তরমুজ যাবে নৌকায়। এখন নৌকায় তরমুজ বোঝাই হচ্ছে। যাবে না শুধু সোনা। লালটু পলটু পর্যন্ত জামা পরে ঠিক হয়ে আছে, সূর্য উঠলেই ওরা হাঁটতে শুরু করবে। সোনা যাবে না, কারণ সোনার এতদূর হেঁটে যেতে কষ্ট হবে। এতদূর হেঁটে যেতে পারবে না।

    সোনা বারান্দায় বসে আছে। সে সব কিছু দেখছে এবং মনে মনে অভিমানে ভেঙে পড়ছে। কারও সঙ্গে কথা বলছে না। ছোটকাকা না বললে সে মেলাতে যেতে পারবে না। বাড়ির কেউ সাহস করে কাকাকে বলতে পারছে না। সোনা মাকে সকাল থেকে বায়না করছে, আমি যামু, তুমি ছোট কাকাকে কও, আমি যামু। মা পর্যন্ত সাহস পায়নি বলতে। ধনবৌ গতকাল একবার বলেছিল, সোনা যদি মেলায় যায়। ছোটকাকা ধনবৌকে মেলার ভিড়ের কথা বলেছিল, এতদূর সে যেতে পারবে না হেঁটে, এসব বলেছিল। আর ধনবৌ বলতে সাহস পায়নি।

    সোনা থামে হেলান দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সব কিছু দেখছে, এবং লালটু পলটু পাটভাঙা প্যান্ট জামা পরে ছুটোছুটি করছে, দেখতে পেয়ে ভ্যাক করে কেঁদে দিল। যত সকলের সময় হয়ে যাচ্ছে মাঠে নেমে যাবার, তত সে ভেঙে পড়ল। কারণ শেষ পর্যন্ত আশা ছিল ছোটকাকা তাকে কাঁদতে দেখে মেলায় যেতে বলবে।

    ঈশম আসছিল তরমুজ মাথায় করে। সে এত বড় একটা তরমুজ আবিষ্কার করে অবাক। প্ৰায় এক মণের চেয়ে বেশি ওজন। সে তরমুজটা নৌকায় তুলে দেয়নি। বাড়িতে নিয়ে এসেছে। সবাইকে কেটে কেটে খেতে বলবে। আর কাটলেই ভিতরে লাল রঙ, কালো বীচি, বসন্তকালে এই তরমুজের রস শরবতের মতো। সে উঠোনে উঠেই ডাকল, সোনাবাবু কই গ। দাওটা আনেন।

    রঞ্জিত ছিল উঠোনে দাঁড়িয়ে। শোবা আবু এসেছে উঠোনে। মালতী এসেছে। যারা মেলায় যাবে তারা সবাই উঠোনে ভিড় করছে। গাঁয়ের নিচে পথ, পথ ধরে মানুষেরা সার বেঁধে মেলায় যেতে আরম্ভ করছে। সবাই মেলায় যাবে, যাবে না শুধু সোনা। সে ঈশমের ডাক শুনতে পেয়েছে। কিন্তু উঠোনে নেমে গেল না। থামে হেলান দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে শুধু।

    রঞ্জিতকে বলল ঈশম, দ্যান, কাইটা সকলেরে দ্যান।

    ঈশম বড় দুটো কলাপাতা কেটে আনল। প্রথম তরমুজ, ঠাকুরের জন্য কিছুটা আলাদা করে রাখা হয়েছে। বাকিটা রঞ্জিত কেটে সবাইকে দিল। দেবার সময় ঈশম বলল, সোনাবাবু কৈ? তাইনরে

    দ্যাখতাছি না।

    লালটু বলল, সোনা কানতাছে।

    —কান্দে ক্যান!

    –মেলায় যাইব বইলা।

    —আপনেরা যাইবেন, সোনাবাবু যাইব না?

    —ছোটকাকায় না করছে।

    —না করলেই হইব। বলে সে ভিতরে ঢুকে ডাকল, সোনাবাবু কই! কেডা কইছে আপনে মেলায় যাইবেন না! আমি আপনেরে মেলায় লইয়া যামু। কার সাধ্য আছে না করে দ্যাখি।

    ছোটকাকা বললেন, এতদূর হাঁইটা যাইতে পারব না। কে অরে কোলে নিয়া হাঁটব?

    —আমি হাঁটমু। চলেন কর্তা।

    যেন সহসা আকাশের সব মেঘ কেটে গেল। সোনার কি যেন হারিয়ে গিয়েছিল, সহসা মিলে গেছে। সে মাকে বলল, মা আমারে ছোটকাকায় যাইতে কইছে। ঈশম দাদা আমারে লইয়া যাইব। সোনা ছুটে ছুটে সকলকে বলতে থাকে। ঠাকুমাকে বলল, ঠাকুরদাকে বলল, আমি মেলাতে যামু। ঈশম দাদা আমারে লইয়া যাইবে। মেলায় যাবার নামে সে প্রায় আত্মহারা হয়ে গেল। এ যেন এক জীবন, মেলা, বানি, নদীনালা সব মিলে মানুষের প্রাণে এক বন্যা বয়ে আনে। রহস্যটা এতদিনে সোনা জানতে পারবে। মেলাতে কি রহস্য, কারা জাগে মেলাতে, ঘোড়দৌড় হলে বাজি জেতার জন্য সবাই আকুল হয় কেন—এসব মনে হচ্ছিল সোনার। সোনা ঈশমের হাত ধরে সবার আগে আগে মাঠে নেমে গেল। কিছু হেঁটে কিছু কাঁধে চড়ে এবং যখনই সোনা আর হাঁটতে পারছিল না, ঈশম কাঁধে তুলে নিচ্ছে। বেশিদূর যেতে না যেতেই বালিয়াপাড়া পার হলে নদীর পাড়ে সোনা জলছত্র দেখল। তারপর গাছের নিচে, সারি সারি হিজল গাছের নিচে সোনা বিন্নির খৈ এবং লাল বাতাসা দেখল। দু’পয়সার বিন্নির খৈ, এক পয়সার বাতাসা কিনে দিল ঈশম। ছোটকাকা থাকলে কিছুতেই খেতে পারত না, খেতে দিত না। কেউ কেউ আগে উঠে গেছে। সোনা দু’পকেটে বিন্নির খৈ রেখেছে, ঠোঙাতে বাতাসা। সে হাঁটছিল আর বিন্নির খৈ খাচ্ছিল। খেতে খেতেই দেখল বড় মাঠে তাঁবু পড়েছে। তাঁবুর মাথায় পতাকা উড়ছে। যজ্ঞেশ্বরের মন্দির দেখা যাচ্ছে। অশ্বত্থ গাছ ফুঁড়ে মন্দিরের ত্রিশূল আকাশের দিকে উঠে গেছে। আর সারি সারি ঘোড়া দরগার জমিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কেউ তালপাতার বাঁশি বাজাচ্ছে। নদীতে কত নৌকা লেগে রয়েছে। ওদের একটা নৌকা আসবে। তরমুজের নৌকা। নদীনালা ঘুরে আসতে সময় লেগে যাবে।

    রঞ্জিতের একটা দল আসবে নারায়ণগঞ্জ থেকে। এই মেলাতে দলটা ছোরা খেলা, লাঠি খেলা দেখাবে। ভুজঙ্গ, গোপাল দুদিন আগে মেলায় চলে গেছে। তাঁবু ফেলতে হবে। ছোট ছোট, এই তের চোদ্দ বছরের মেয়েরা আসবে, সাদা ফ্রক গায়ে, কালো প্যান্ট পরে এবং পায়ে কেডস জুতো। কথা ছিল, বাবুদের কাছারি বাড়িতে ওরা থাকবে। সমিতির নির্দেশে এইসব হচ্ছে। রঞ্জিত এমনভাবে চলাফেরা করছে, দলটার সঙ্গে তার যেন কোনও সম্পর্ক নেই। বরং ভুজঙ্গই সব করছিল।

    মালতী ঠিক যজ্ঞেশ্বরের মন্দিরে উঠে যাবার মুখেই দেখল, জব্বর ইস্তাহার বিলি করছে মেলাতে। সে মালতী দিদিকে দেখে এক গাল হেসে দিল।–দিদি, আপনে আইছেন। মালতী দেখল, ওর পাশে অপরিচিত দু’চারজন মুসলমান পুরুষ, মালতী ভয়ে হাসতে পারল না। একবার ইচ্ছা হল জানতে, মেলায় সামু এসেছে কিনা, কিন্তু জব্বরের দু’পাশের লোকগুলি এমনভাবে তাকাচ্ছিল যে, সে কিছুতেই দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। নদী থেকে স্নান করে আসতে হবে। কিছু ফুল বেলপাতা তিল তুলসী লাগবে—মালতী সোজা মন্দিরে উঠে গেল।

    আর তখনই একটা বাচ্চা ছেলে, ছেলের বয়স আর কত হবে, মেলায় হারিয়ে গিয়েছে। হাতে তার একটা ছোট্ট ছাগশিশু। দিদি গেছে স্নান করতে নদীর ঘাটে। ওকে গাছতলায় দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছে—দিদি আসবে, এলেই মন্দিরে উঠে যাবে।

    সংসারে তখন জ্বালা যন্ত্রণার কথা উঠেছে। ভিতরে এক মন আছে মানুষের, পাগলের মতো সেই মন নদী দেখলে কেবল উথালপাথাল করে। মেলায় এমন কত সুন্দরী হিন্দু মেয়েদের ভিড়। স্নান করে উঠে এলে, ভিজে কাপড়ে উঠে এলে, কী যে দেখায়, যুবতী মেয়ের সর্ব অঙ্গে কালসাপ যেন, কেবল দেখলেই ছোবল মারতে ইচ্ছা যায়। স্থির থাকা যায় না।

    গোপালদির বাবুদের ছেলেরা গোটা মেলাতে ভলান্টিয়ার দিয়েছে।—ওহে মানব জাতির সন্তানেরা, মিলেমিশে থাক, কুকাজ করলে ধরে বেঁধে নিয়ে যাব। জলছত্র দিয়েছে। কেউ হারিয়ে গেলে তার সন্ধান দিচ্ছে। ব্যজ পরা বাবুদের ছেলেরা কেউ কেউ ঘোড়ায় চড়ে দিকে দিকে খবর নিয়ে যাবার সময়ই শুনল, কে কার স্তন টিপে দিয়েছে। যুবককে ধরে ফেলেছে। লুঙ্গি পরা, গলায় গামছা বাঁধা, বগলে পাচনের লাঠি, মাতব্বর মানুষের মতো মেলা দেখতে এসেছিল। লোভে, যখন ভিড়, স্নানের ঘাটে ভিড়, তখন পরিচিত মেয়ের স্তনে হাত দিলে সব গোপন করে রাখবে—কিন্তু হিন্দু নারী, সে তার মানসম্মানের জন্য বোকার মতো হাউহাউ করে কেঁদে দিল। বাবুদের এক ছেলে দেখে ফেলেছে। কড়া নজর সবদিকে। মুঠিতে ধরে পাছায় এক ধাঁই করে লাথি মারল। সঙ্গে সঙ্গে মেলায় খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ কিছু বলতে সাহস করছে না। দরগার ঘোড়াগুলি ঘাস খাচ্ছে। বিকেল হলে মাঠে নেমে যাবে। কত বড় প্রশস্ত মাঠ। দুরে দূরে সব লাল নীল নিশান উড়ছে। দুটো একটা ঘোড়া, বোধ হয় মুড়াপাড়ার সুরেশবাবুর ঘোড়াটা এখন ধু ধু মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সাদা রঙের ঘোড়া তীরবেগে ছুটে আসছিল।

    আর তীরবেগে ছুটে যাচ্ছিল জব্বর। সে দেখল তার স্বজাতিকে টেনে বেঁধে নিয়ে কাছারি বাড়িতে তোলা হচ্ছে। কেউ একবার মুখ ফুটে কিছু বলছে না। তার স্বজাতিরা মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে। সে প্রায় যেন যোজন দূরে লাফ মেরে যেতে পারে, তেমনি লাফ দিয়ে ছুটে গেল এবং ভিড়ের ভিতর পড়ে হুংকার দিয়ে উঠল, কই লইয়া যান অরে।

    কে একজন বলল, কাছারি বাড়ি।।

    —হ্যায় কি করছে!

    —স্তন টিপা দিছে।

    —দিছে ত কি হইছে। বলেই সে ভিড় ঠেলে আরও এগিয়ে গেল। ওর দলটাও এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওরা সেই যুবকের নাগাল পেল না। একদল ব্যাজ পরা লোক আনোয়ারকে কাছারি বাড়িতে তুলে নিয়ে গেল। পাছায় লাথি, কিল চড় ঘুষি, হায় আনোয়ার, তোমার মনে যে কি ইচ্ছা, এমন সুন্দর স্তনে, ফোটা পদ্মফুলের মতো স্তনে তুমি নাকি জলের অতলে স্বপ্ন দেখছিলে–যেন এক রূপালী মাছ ভাইস্যা যায়। তুমি খপ করে ধরতে গেছিলে!

    ক্রমে সূর্য নেমে যাচ্ছিল। বড় তাঁবুতে ফরাস পাতা। সেখানে বাবুদের মেয়েরা বসবে। সুন্দর সুন্দর অলঙ্কার গায়ে। দেবীর মতো মুখ। ঝলমল চোখে ঘোড়দৌড় দেখবে। অথবা নদীতে যে হাজার নৌকা ভেসে রয়েছে—সেই সব নৌকা থেকে দাসদাসী উঠে এলে মেলাময় আনন্দ, দরগা থেকে তখন এক দুই করে ঘোড়া ঠিক এই তাঁবুর নিচে প্রথম নেমে আসবে, বাবুদের প্রথম সেলাম দিয়ে কদম দিতে দিতে মাঠে নেমে যাবে—যেন আমরা এসেছি দুর দেশ থেকে, বাজি জিতে আমরা চলে যাব, আপনারা মেহেরবান লোক, আপনাদের এই মাঠে ঘোড়া ছোটাব। বাজি জিতব। বলে ঘোড়াটার খেলা দেখাতে শুরু করেছিল। এক দুই করে ঘোড়া তার পা তুলে বাবুদের ছোট ছোট মেয়েদের নাচ দেখাচ্ছিল।

    তখন মেলাতে দুটো দল। কাছারি বাড়িতে হিন্দু যুবকেরা উঠে গেছে। নিচে মুসলমান যুবকেরা। পুলিশ এসেছে। ওরা বাবুদের সপক্ষে কথা বলছিল। আইন আছে। বিচার আছে। থানায় চালান দেওয়া হবে।

    কিন্তু কে কার কথা শোনে! কাছারি বাড়ি ভেঙে আনোয়ারকে ওরা কেড়ে নিতে গেলে বাবুদের বন্দুক গর্জে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া নাচছিল দুরে, সেই ঘোড়া ভয় পেয়ে ছুটতে থাকল। যে যেদিকে পারছে ছুটতে থাকল। ঈশম তরমুজ বিক্রি করছিল। সোনা লালটু পলটু সার্কাসের তাঁবুতে বাঘ সিংহের খেলা দেখছে। ব্যাগপাইপ বাজছিল, বাঘটা থাবা চাটছে। উঁচু রিঙে একটি ফুটফুটে মেয়ে খেলা দেখাচ্ছে, তখন সেই বন্দুকের গর্জনে সারা মেলাটায় কিরকম যেন অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ল।

    দুটো লাশ পড়ে গেছে। ক্রমে অন্ধকার মশালের আলো দেখা যেতে লাগল। কাছারি বাড়িতে বাবুদের মেয়েরা উঠে গেছে। দরগা থেকে সব ঘোড়া এক এক করে নেমে আসছে। সহিসের হাতে মশাল। মেলাময় মশাল জ্বলছে। মাঝে মাঝে আল্লা হো আকবর ধ্বনি উঠছিল। কাছারি বাড়িতে হিন্দুরা প্রাণ রক্ষার্থে চিৎকার করছে, বন্দে মাতরম্।

    কে কোথায় ছিটকে পড়ছে বোঝা যাচ্ছে না। সোনা, লালটু, পলটুকে তাঁবুর ভিতর বসিয়ে দিয়ে ঈশম চলে এসেছিল। সার্কাস ভেঙে গেলে ওরা ঈশমের কাছে চলে আসবে এমন ঠিক ছিল। ঈশম মেলাতে দাঙ্গা বাঁধতেই সার্কাসের তাঁবুর দিকে ছুটে যাচ্ছে। অন্ধকার হয়ে গেছে। লোকজন যে যেদিকে পারছে ছুটছে। সেই ছোট্ট ছাগশিশু এবং বাচ্চাটা কারা চেপ্টে দিয়ে চলে গেছে। দিদির আশায় সে দাঁড়িয়েছিল, দিদি এলেই মন্দিরে উঠে যাবে। যখন ঘটনাটা ঘটে দুপুর হবে, আর এই দুপুর থেকেই গুঞ্জন। ক্রমে ক্রমে জব্বর এলে সেই গুঞ্জন বাড়তে থাকে—সবাই ভেবেছিল, মেলাতে বান্নিতে এমন হামেশাই ঘটে। মাতব্বর মানুষেরা এসে সব মিটমাট করে দেয়, কিন্তু তাজ্জব এই জব্বর—সে সকলকে বলছিল, আপনেগ ইজ্জত নাই। আপনেরা গরু ঘোড়া আর কতদিন হইয়া থাকবেন। ঠিক সামুর গলার স্বরে সে চিৎকার করছিল। এত মানুষজন দেখে ওর কেমন জুস এসে গেছিল ভিতরে। সে এবার নিজেকে, সে যে কত বড়, এবং ইচ্ছা করলে কি না করতে পারে, বলে আনোয়ারকে কেড়ে নেবার জন্য কাছারি বাড়িতে উঠে যাবার সময় দেখল বন্দুক গর্জে উঠছে। সে এতটা আশাই করতে পারেনি। পর পর দুটো লাশ ওর সামনে মুখ থুবড়ে পড়ল। আগুন জ্বলতে কতক্ষণ। এবার যেন সকলে মশালে আগুন জ্বালিয়ে ছুটে আসবে এবং সব তছনছ করে কাছে পিঠে যার যা কিছু অমূল্য মনে হবে ফেলে মাঠের ভিতর দৌড়াতে থাকবে।

    ঈশমও সাকার্সের তাঁবুর দিকে ছুটছে। হায় গেল, সব গেল! সে চিৎকার করে ডাকছে। সোনাবাবু! তাঁবুর সামনে এসে দেখল, তাঁবু আর নেই। সব তছনছ করে দিয়েছে। তাঁবুর একটা দিকে আগুন জ্বলছে বাঘ সিংহ ঝলসে যাচ্ছে। কাছে কোথাও কোনও লোকজন নেই। যেন নিমেষে সব লুঠপাট করে তুলে নিয়ে গেছে কারা

    ঈশম কি করবে স্থির করতে পারছে না। সে বড় মুখ করে সোনাবাবুকে নিয়ে এসেছে। হায়, কি হবে! সে আকুল হতে থাকল। আর পাগলের মতো কাছারি বাড়ির দিকে উঠে যাবে ভাবল। কিন্তু কাছে গিয়ে মনে হল—বাবুরা যে-ভাবে রুখে আছে ওর পরনে লুঙ্গি, সে কিছুতেই আর সে দিকে যেতে সাহস পেল না। তারপর মনে হল তিন নাবালক এদিকে ছুটে আসতে পারে না। কারণ ওরা পথ হারিয়ে ঠিক যেখানে সে তরমুজ বিক্রি করছিল সেদিকেই ছুটে যাবে। সে আর দাঁড়াল না। গোটা মেলাটা ক্ষেপে গেছে। চারপাশে আগুন। এই আগুন যেন কতকাল থেকে মাটির ভিতর এতদিন আত্মগোপন করেছিল। কত দিনের অপমান এইসব মানুষ হজম করে এখন বদলা নিচ্ছে। সে কী করবে ভেবে পেল না। আগুনের ভিতর দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে থাকল, সোনাবাবু কৈ গ্যালেন গ। লালটুবাবু। আমি গাঁয়ে ফিরমু কি কইরা। মুখ দ্যাখামু কি কইরা! সে পাগলের মতো আগুনের ভিতর কেবল ডাকতে লাগল। সে ডাকতে ডাকতে ছুটছিল। চারধারে কাচ ভাঙা, কাচের চুড়ি ভেঙে পথটা লাল নীল সবুজ মিহিদানার মতো পথ, পথে ছুটতে গিয়ে ওর হাতপা কেটে যাচ্ছে। ওর হুঁশ ছিল না। ওরা হয়তো গাছের নিচে ওর জন্য দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু হায়, এসে দেখল সেখানে কেউ নেই। শুধু বড় বড় তরমুজ চারদিকে কারা ছড়িয়ে দিয়ে মাঠের অন্ধকারে মিশে গেছে। তরমুজে সব চাপ চাপ রক্ত। ওর শরীর শিউরে উঠল। পাগলের মতো হেঁকে উঠল, কেডা আমার মানুষ কাইড়া নিছ কও! বলে সেও উন্মত্ত মেলাতে কাদের হত্যা করার জন্য ছুটে গেল। সে ফাঁকা মাঠের ভিতর দাঁড়িয়ে উন্মত্তপ্রায় চিৎকার করে ডাকতে থাকল, সোনাবাবু কৈ গ্যালেন। রা করেন। কোন্ আনধাইরে লুকাইয়া আছেন কন, আমি ঈশম। আমি, সোনাবাবু বাড়ি নিয়া যামু। আপনেরে বাড়ি নিয়া না যাইতে পারলে আমার জাত মান কুল সব যাইব।

    ঘোড়াগুলি দ্রুতবেগে ছুটছে। যেসব ঘোড়া দরগায় ছিল তারা প্রায় সকলে জব্বরের হয়ে যেন লড়ছে। এটা যে কী করে হয়ে গেল—দোকানপাট লুঠ, মনিহারি দোকান, কাপড়ের দোকান এবং কামার কুমোরেরা এসেছে হাঁড়ি-কলসী, দা-বঁটি নিয়ে—সে সবও লুঠপাট হচ্ছিল। সার্কাসের তাঁবু থেকে দু-তিনটে মেয়ে উধাও হয়ে গেল। এবং মানুষেরা নদীর পাড়ে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। সামনের বড় বড় সব তরমুজের নৌকা, হাঁড়ি পাতিলের নৌকা, আর কিছুই টের পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু জলের ভিতর হাহাকারের শব্দ। কেউ কোনওদিকে তাকাচ্ছে না। যে যার প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছে। ঘোড়ার পায়ের নিচে অথবা আগুনের ভিতর কার কখন প্রাণ যায় বোঝা দায়। সড়কি, বর্শা, সুপুরির শলা হাজার হাজার দু’দলের ভিতর কোথা থেকে সহসা আমদানি হয়ে গেল। যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র। দীঘির দু’পাড়ে দু’দল অন্ধকারে প্রতীক্ষা করছে। রাত বাড়লেই ঝাঁপিয়ে পড়বে।

    রঞ্জিত বিকেলের দিকেই প্রথম আঁচ পেয়েছিল। সে তার দলবল নিয়ে কাছারি বাড়িতে উঠে গেল। এখন সোনা লালটু পলটু আর মালতীকে খুঁজে বের করতে হবে। মেলাতে এলে মালতী অধিক সময় মন্দিরে কাটায়। সে ওদের কাছারি বাড়ি তুলে দিয়ে প্রথম মালতীর খোঁজে চলে গেল। মালতী ঠিক যেখানে বড় একটা মঠ আছে, মঠের দরজায় যেখানে ভিড়, ভিড়ের ভিতর মালতী পূজা দেখার জন্য প্রায় যেন হামাগুড়ি দিচ্ছে। রঞ্জিত আঁচল ধরে ফেলল। বলল, শোভা আবু কোথায়?

    —ওরা মন্দিরে আছে।

    —ওদের নিয়ে চলে এস।

    মালতী ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে।

    রঞ্জিত বলল, দেরি করো না। আমি সার্কাসের তাঁবুতে যাচ্ছি। ঈশমকে খবর দিতে হবে। অনেক কাজ। মেলায় গণ্ডগোল হতে পারে।

    রঞ্জিত হনহন করে হাঁটছে। দিঘির এ-পাড়ে রকমারি কাচের চুড়ির দোকান। তারপর ফুল ফলের দোকান। তারপর বিন্নির খৈ। মিষ্টির দোকান কত! তেলেভাজার দোকানগুলি পার হয়ে এলেই ফাঁকা মাঠ। মাঠে এখন তাঁবুর ভিতর গোপালদির বাবুরা বসে আছে। এই মাঠ পার হলে সাকার্সের তাঁবু, দুটো ছোট বড় সার্কাস। রঞ্জিত টিকিট কিনে দিয়েছে। ঈশম ওদের বসিয়ে দিয়ে বের হয়ে এলে কথা ছিল—সার্কাস দেখা শেষ হলে যেখানে ঈশম তরমুজ বিক্রি করবে সেখানে সবাই চলে যাবে। রঞ্জিত দেরি করতে পারল না। এখানে সে ছদ্মবেশী মানুষ। তার পরিচয়ের জন্য লোক হাঁটাহাঁটি করতে শুরু করেছে। সে যতটা পারল দ্রুত সার্কাসের তাঁবুতে ঢুকে যাবার জন্য হাঁটতে থাকল। জিলিপির দোকান থেকে তখনও একটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এমন কুৎসিত আকার নেবে মেলাটা অন্তত জিলিপি ভাজার মনোরম গন্ধ থেকে তা টের পাওয়া যায়নি। কেবল রঞ্জিত এবং অন্য কেউ বুঝি ভেবেছিল—সময়টা দুঃসময়। মেলা ছেড়ে এখন যা . যার মতো ফেরা দরকার।

    মেলাতে শচীন্দ্রনাথের আসার কথা ছিল। তিনি এলে এই জব্বরকে কব্জা করতে পারতেন। শচীন্দ্রনাথকে জব্বর ভয় পায়। কারণ আবেদালির সুখে-দুঃখে শচীন্দ্রনাথ আত্মীয়ের মতো। রঞ্জিত হাঁটতে হাঁটতে এসব ভাবল। সে সার্কাসের তাঁবুতে আসতেই দেখল, সার্কাস ভেঙে গেছে। গণ্ডগোলের আঁচটা ওরাও টের পেয়েছে। সব খেলা না দেখিয়ে, বাঘের খাঁচায় বাঘ, সিংহের খাঁচায় সিংহ পুরে দিল। রঞ্জিত গেটের সামেন ওদের তিনজনকে দেখে বলল, তোমাদের আর ওদিকে যেতে হবে না। আগে তোমাদের কাছারি বাড়ি দিয়ে আসি। রঞ্জিত ভেবেছিল, ওদের কাছারি বাড়ি তুলে দিয়ে ঈশমকে খবর দেবে এবং ঈশমকে সব তরমুজ নৌকায় তুলে দিতে বলবে। কাছারি বাড়ি পর্যন্ত রঞ্জিত যেতে পারল না। সূর্য অস্ত যাচ্ছে তখন—বন্দুকের গর্জন, এবং হল্লা। মানুষজন নিহত হচ্ছে।

    রঞ্জিত তাড়াতাড়ি একটু পিছনের দিকে হেঁটে গেল। ওর মনে পড়ে গেল মালতীকে সে বলে এসেছে, সার্কাসের তাঁবুর গেটে সে থাকবে। তাড়াতাড়ি সে তাঁবুর গেটে এসে দাঁড়াতেই দেখল, পেছনের দিকটায় কে তাঁবুতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সে এই বালকদের নিয়ে কী করবে! মালতী এখনও আসছে না, অথবা মালতী কী ওদের না দেখে ফের মন্দিরে চলে গেছে। এখন তো হাতে প্রাণ—কখন প্রাণ যায়, আর মালতীর মতো সুন্দরী যুবতী—সে এবার কেমন আকুল হয়ে ওদের নিয়ে সোজা মন্দিরের দিকে ছুটে গেল। সোনা ঠিক কিছুই বুঝতে পারছে না। সহসা কেন এমন হল! যেন পঙ্গপালের মতো সব মানুষ নদীর দিকে ছুটে যাচ্ছে। সে দেখল আবু একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। সোনা বলল, মামা ঐ দ্যাখেন আবু।

    রঞ্জিত বলল, তোর পিসি কোথায়?

    আবু কাঁদছিল শুধু। বুঝল আবু এই মেলাতে হারিয়ে গেছে। এখন আর মালতীকে খোঁজা অর্থহীন। ওর বুকটা কেঁপে উঠল। ওদের কোনও নিরাপদ স্থানে পৌঁছে না দিতে পারলে সে স্বস্তি পাচ্ছে না। কিন্তু কীভাবে কাছারি বাড়ির দিকে উঠে যাওয়া যায়। সে পিছনের দিকে তাকাতেই দেখল—আগুন জ্বলছে। একমাত্র নদীর দিকেই নেমে যাওয়া যেতে পারে। নৌকা আছে। তরমুজের নৌকা। সে ওদের নিয়ে ছুটতে থাকল। অন্ধকার হয়ে গেছে। মানুষজন সব আর চেনা যাচ্ছিল না। মাঝে মাঝে দূরের আগুন সহসা হল্কা ছাড়লে কিছু কিছু মুখ দেখা যাচ্ছে। নির্বিচারে হিন্দু-মুসলমান—এদিকটাতে মিলেমিশে আছে। সবাই প্রাণের দায়ে নিরাপদ স্থানের জন্য ছুটছিল।

    রঞ্জিত দেখল নৌকাটা কে আলগা করে দিয়েছে। একটু দূরে ভেসে রয়েছে। সে জলে ঝাঁপ দিল। এবং মাঝ নদী থেকে নৌকা আনার জন্য সাঁতরাতে থাকলে দেখল, জলের ওপর কি সব ভেসে রয়েছে। সে বুঝতে পারল সেই ভীত সন্ত্রস্ত মানুষেরা জলে ভেসে রয়েছে। আগুন থেকে এবং হত্যা থেকে প্রাণ রক্ষার্থে ডুবে ডুবে নদী পার হচ্ছে। সে দেখল কিছু কিছু নৌকা তীরবেগে ছুটে যাচ্ছে। সে আর দেরি করল না। নৌকায় উঠে গেল। এবং মনে হল তার কিছু আবছা মতো মানুষের আভাস সেই নৌকায়

    রঞ্জিত চিৎকার করে উঠল, তোমরা কে?

    কোনও শব্দ ভেসে আসছে না।

    —কে তোমরা?

    এবার বুঝি গলা চিনতে পেরে মালতী কেঁদে ফেলল, আমি মালতী।

    —তুমি! পাশে কে?

    —শোভা, আবুরে পাইতেছি না।

    এখন আর কথা বলার সময় নয়। নৌকাটা তীরের দিকে টেনে নিয়ে যাবার সময় বলল, আবুকে পাওয়া গেছে। আর সোনা লালটু সবাই পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর একটু থেমে বলল, বৈঠা দেখছি না, লগি নেই—কোথায় গেল সব!

    মালতী কোনও জবাব দিল না। তার এখন আর কোনও ভয় নেই। সে প্রাণপণে রঞ্জিতকে সাহায্য করার জন্য হাতে জল টানছিল। নৌকা পাড়ে এলে রঞ্জিত অন্ধকারে দেখল সেই মশালের আগুন এদিকেই ছুটে আসছে। সর্বনাশ, ওরা টের পেয়েছে আত্মরক্ষার্থে নদীর জলে মানুষ ভেসে পার হয়ে যাচ্ছে ওপারে। সে এ-মুহূর্তে কি করবে ভাবতে পারল না। মনে হচ্ছে নিশ্চিত হত্যা—নির্বিচারে হত্যা। সে সোনার চোখ দেখল। সোনা কিছুই বুঝতে পারছে না যেন। এমন একটা হাসিখুশির মেলা, মেলাতে কত পাখি উড়ে এসেছে, কত রঙ-বেরঙের ঘোড়া, তালপাতার বাঁশি, তিলাকদমা, বাতাসা, কী সুন্দর সব লাল-নীল নিশান উড়ছিল-এখন সেসবের কিছু নেই—কী করে তছনছ হয়ে গেল—শুধু চারদিকে আগুন জ্বলছে। মাঠে সেই সব অশ্বারোহী পুরুষ–কদম দিচ্ছে। হাতে মশাল। মশালের আলোতে মৃত্যুর কাছাকাছি যে মানুষ তাদের মুখ দেখার বাসনা। সবাই উঠে এলে রঞ্জিত জোরে নৌকাটা নদীতে ঠেলে দিল। তারপর প্রাণপণে সবাই জল টানতে থাকল হাতে। তরমুজের নৌকা, রঞ্জিত এক দুই করে সব তরমুজ জলে ফেলে পাড়ের দিকে ভাসিয়ে দিতে থাকল। অন্ধকারে এইসব তরমুজ জলে ভেসেছিল। জলে ভেসে ভেসে মানুষের মাথার মতো কত শত মানুষ জলে মুখ ডুবিয়ে পৈশাচিক উল্লাস থেকে আত্মরক্ষা করছে। আর ঠিক মাঝ নদীতে এসেই মনে হল সেই মশাল হাতে দলটা মাঠ শেষ করে নদীর কাছাকাছি এসে যাচ্ছে। ওরা যদি দেখতে পায়, বর্শা ছুঁড়ে দিতে পারে। অথবা জল সাঁতরে চলে আসতে পারে। সে সবাইকে এবার নৌকা থেকে জলে নামিয়ে দিল। তারপর নৌকাটা জলে কাৎ করে রাখল। দূর থেকে দেখলে মনে হবে—খালি একটা নৌকা ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে। বরং কাছেপিঠে যেসব তরমুজ ভেসে যাচ্ছে অন্ধকারে ওরা সেইসব তরমুজ মানুষের মাথা ভেবে যে যার বল্লম অথবা শলা ছুঁড়ে দিলেই হাত খালি হয়ে যাবে, তখন আর নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকবে না, মাঠে উঠে যাবে। ওরা নৌকার ওপাশে শরীর লুকিয়ে জলের ভিতর মাছ হয়ে থাকবে এবং সন্তর্পণে নৌকাটাকে টেনে ওপারে নিতে পারলেই যেন ভয়ডর কেটে যাবে। ওরা নৌকাটাকে গুণ টানার মতো নিয়ে যাবে তারপর।

    মালতী একপাশে। মাঝে সোনা লালটু পলটু এবং আবু শোভা–শেষ মাথায় রঞ্জিত। শুধু সবার হাতদুটো নৌকার কাঠে। আর গোটা শরীর মুখ নৌকার ছায়ায় আড়াল করা। যেন এই নৌকায় কিছু মানুষজন ছিল, এখন ওরা নদীর জলে ডুবে গেছে। খালি নৌকা কাটা মাথা নিয়ে যায়। দু-চারটে তরমুজ গলুইর ওপর ইতস্তত ছড়নো। অন্ধকারে এমন একটা দৃশ্য তৈরি করে রাখল রঞ্জিত।

    কখন কী যেন হয়ে যায় মানুষের ভিতর। যারা ঘোড়ায় চড়ে এই হত্যাকাণ্ডে মেতে গেছে, রঞ্জিত জানে—ওরা, ঘরে বিবি বেটা রেখে এসেছে। বাজি জিতে গেলে পালা-পার্বণের মতো উৎসব লেগে যাবে। গ্রামে গ্রামে সেই বাজি জেতার মেডেল গলায় ঝুলিয়ে মানুষের কাছে দোয়া ভিক্ষা করবে। এখন দেখলে কে বলবে—এরাই সেইসব মানুষ। অন্ধকারের ফাঁক থেকে সে দেখল, ওদের হাতে সুপারির শলা, যেন এক হত্যার খেলায় মেতে গেছে। ওরা সুপারির শলা, বল্লম সেইসব তরমুজের বুকে সড়কির মতো গেঁথে দিতে থাকল আর উল্লাসে ফেটে পড়ছিল। ওরা কাফের হত্যা করছিল।

    আর তখন এক মানুষ নদীর পাড়ে পাড়ে যায়। অন্ধকারে সে মানুষটা ডাকছে, সোনাবাবু কৈ গ্যালেন গ।

    অন্ধকার থেকে সাড়শব্দ আসছে না।

    দূরে তখন নৌকা ভাসিয়েছে রঞ্জিত। ওরা পাড়ে উঠে এবার ছুটতে থাকবে।

    মানুষটা ডাকছিল, আমি কারে লইয়া ঘরে ফিরমু। মানুষটা এ-পারে ডাকছে। ও-পারের মাঠে তখন ছুটতে গিয়ে আছাড় খেল সোনা। দূর থেকে, অনেক দূর থেকে কে যেন তাকে ডাকছে। সোনা ডাকল,

    মামা! আমারে কে ডাকে!

    রঞ্জিত অন্ধকার মাঠে ওকে কোলে তুলে নিল। বলল, কথা বলো না। ছোটো। সে ফিসফিস করে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, সামনে হিন্দুগ্রাম পড়বে। সেখানে রাত কাটাতে হবে। অন্ধকারে মালতীকে নিয়ে যেতে সাহস পাচ্ছে না। সারারাত না হেঁটে সামনের গ্রামে সে আশ্রয় নেবে ভাবল।

    মানুষটার ডাক ক্রমে কেমন ক্ষীণ হতে হতে এক সময় বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। সোনাবাবু আছেন? আমি ঈশম। আমি কারে লইয়া বাড়ি যাই কন!

    সোনার বার বার মনে হচ্ছিল, ওকে কে নদীর ওপারে ডাকছে! কে যেন এই নদীর পাড়ে পাড়ে ওকে অনুসন্ধান করে বেড়াচ্ছে। দূর থেকে সেই গলার স্বর সে কিছুতেই চিনতে পারছে না। সে ভয়ে পড়ি মরি করে ছুটতে থাকল। ভয়, নিশিটিশি হতে পারে। তাকে নিশিতে ডাকছে।