Category: অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

  • বার

    বার

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    বার

    অন্যদিনের চেয়ে চন্দ্রনাথের আজ আরও সকালে ঘুম ভেঙে গেল। দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। খালি পা। খেটো ধুতি পরে আছেন। পায়ে খড়ম। বাইরে বের হয়ে উঠোনে এসে দাঁড়ালেন। পূব আকাশটা এখনও ফর্সা হয়নি। নিঃশব্দ ব্রাহ্মমুহূর্ত। এই মুহূর্তটি তাঁর অতি প্রিয়। কোথা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যে যায়! রাত শেষ হয়ে আসছে, কিছু নক্ষত্রের শেষ ঝিকিমিকি। কীট-পতঙ্গের ডাক তেমন শোনা যাচ্ছে না! আবছা অস্পষ্ট আলো পৃথিবীতে জেগে উঠছে। তিনি সোজা দাঁড়িয়ে থাকলেন। গলায় উপবীত। আবছা অস্পষ্ট আলোয় ঈশ্বরের মহিমা অনুভব করলেন। জায়া জননীর মত এই নিবাস। সব কিছুর মধ্যে চন্দ্রনাথ অনুভব করলেন অশেষ করুণা তাঁর। তিনি প্রতিদিনের মত নতজানু হলেন, তারপর উঠোন থেকে নখাগ্রে মাটি তুলে কপালে তারপর জিবে এবং বাকিটুকু মাথায় ঘষে দিলেন।

    চারপাশের গাছপালা আকাশ সমান উঁচু হয়ে উঠতে চাইছে। বাতাস বইছিল। সামান্য হাওয়ায় গাছগুলির শাখা-প্রশাখা আন্দোলিত হচ্ছে। এই সব গাছপালা সবই তাঁর রোপন করা। ঘন জঙ্গল কেটে তিনি এখানে তাঁর ঘর-বাড়ি তৈরি করেছিলেন। যখন যেখানে খবর পেয়েছেন সুস্বাদু আম জামের গাছ আছে, সেখানে ছুটে গেছেন। একবার তিনি বালির ঘাট থেকে একটি আমের কলম নিয়ে এসেছিলেন। হাতে পয়সা ছিল না। দশ ক্রোশ রাস্তা হেঁটে সেই কলম কাঁধে করে নিয়ে এসেছিলেন। সব ফলমূলের গাছগুলিই এখন সজীব। তারা এই বাড়িঘরে সন্তান সন্ততির মতই বেঁচে আছে। কেউ ডাল পাতা ছিঁড়লেও তাঁর কষ্ট হয়। শেকড় ক্রমেই গভীরে প্রবেশ করছে।

    এই ব্রাহ্মমুহূর্তে তিনি কেন জানি সব গাছপালার নিচে দিয়ে হেঁটে যেতে থাকলেন। গাছগুলো ছুঁয়ে দেখলেন। পরপর আমগাছ, তারপর দু’টো কাঁঠাল গাছ। নারকেল গাছের সারি পশ্চিমের দিকে। বাঁদিকে দুটো সফেদা ফলের গাছ, লিচু গাছ। কাঠাখানেক জুড়ে লেবু গাছের ঝোপ। এদিকটায় তিনি গন্ধপাঁদালের লতা লাগিয়ে রেখেছেন। কাঠাখানেক জুড়ে আছে বাঁশের ঝাঁড়। তাঁর এই গাছপালার মধ্যে তিনি এক আশ্চর্য সবুজ ঘ্রাণ অনুভব করেন। এত প্রিয় এই সব কিছু তাঁর অথচ আজ তাঁর কিছুই ভাল লাগছে না। চন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে এসে এবার করবী গাছটার নিচে দাঁড়ালেন। দূরবর্তী বড় সড়কে গরুর গাড়ির আওয়াজ উঠছে। সদরে যাবে বলে শাক-সবজি বোঝাই করে চাষী মানুষেরা বের হয়ে পড়েছে। আর মাথার ওপরে পাখিদের ডানার শব্দ। এরা বোধহয় সবার আগে টের পায়, রাত শেষ হতে বেশি দেরি নেই। যে যার জায়গা মত চলে যাবার জন্য আকাশের প্রান্ত দিয়ে উড়ে যায়।

    চন্দ্রনাথ সকলের অলক্ষ্যে প্রতিদিন এই ঘোরাঘুরিটা করেন। মানুষ জানেই না এই সময়টাতে ঈশ্বরের কাছাকাছি আসার প্রকৃষ্ট সময়। এই সময়টায় পৃথিবীর রূপ বদল ঘটে। চন্দ্রনাথ এসব ভাবতে ভাবতে খালের পাড়ে এসে দাঁড়ালেন। ওপারে তাঁর বিঘে কয় ভুঁই—ধানী জমি, সবুজ আভা নিয়ে চারা বড় হচ্ছে। হাত দিলেই টের পাওয়া যায় পাতায় পাতায় শিশির ভেজা আশ্চর্য এক সমারোহ। প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করেন চন্দ্রনাথ, বড় মূল্যবান সময় চলে যাচ্ছে। ঘোরাঘুরি করে এসব না দেখলে বোঝাই যায় না, কত মূল্যবান এই চাষ আবাদ। সব সময় উত্তেজনা। সেই কাদান থেকে আরম্ভ করে বীজ বপন, তার বীজতলা থেকে চারা গাছ তুলে রুয়ে দেওয়া, তাদের জমিতে লেগে যাওয়া, বড় হওয়া, কি এক বড় প্রতীক্ষা যেন। এই প্রতীক্ষার মত অমূল্য ইচ্ছে মানুষের আর কি থাকতে পারে চন্দ্রনাথ বুঝতে পারেন না। এর মত প্রবল আকর্ষণ মানুষের আর কি থাকতে পারে। অতীশ এসব উপেক্ষা করে চলে গেল! আজ বৌমা দাদু দিদিভাইও চলে যাবে। তাই কদিন থেকেই চন্দ্রনাথের নাড়িতে বড় টান ধরেছে। সকলের অজ্ঞাতে দিশেহারার মত নিজের আবাসে ঘোরাঘুরি করছেন।

    কিছু কাক তখন কা-কা করে উঠল। তিনি দাঁড়িয়ে কাকের শব্দ শুনলেন। কাকেরা নানাভাবে ডাকে। এদের ডাকে শুভ অশুভ ধরা যায়। এদের ডাকে কখনও প্রবল দীর্ঘশ্বাস থাকে। বড়ই আর্ত সে ডাক। গেরস্থের তাতে অমঙ্গল বাড়ে। কাকের ডাকে মানুষ টের পায় আর শুয়ে থাকার সময় নেই। তিনি তার আগেই উঠে পড়েছেন। কিছু ঘাস মাড়িয়ে তিনি খালি পায়ে এখন হেঁটে যাবেন। শিশির ভেজা ঘাসে হেঁটে বেড়ালে আয়ু বাড়ে তাঁর এমন একটা বিশ্বাস আছে। রোগভোগ কম হয়। ধানের আলে তিনি নেমে গেলেন। গাছের গোড়ায় পরিমিত জল আছে। কিছু আগাছা জন্মাচ্ছে। এগুলি সাফ করা দরকার। যত গাছ বাড়ে তত কালো হয়ে ওঠে ধানগাছের গুচ্ছ। তত তিনি ছেলেমানুষের মত পুলক বোধ করেন। মনে হয় ঈশ্বরের মত নিজেও সৃষ্টি করে যাচ্ছেন একটা নতুন পৃথিবী। এই পৃথিবীর বাসিন্দা রামি ভামি গোলা পায়রার দল, দুটো কুকুর, একপাল হাঁস, তিনটে গাভী এবং ধনবৌ সন্তান-সন্তুতি আর নিরিবিলি নানাবিধ ফলের গাছ। দূর থেকে নিজের আবাসের প্রতি তখন তাঁর ভারি মমতা বাড়ে। লোকজনে ভরে আছে—সেই বাড়িটা আজ অনেকাংশে খালি হয়ে যাবে। এই দুঃখে তিনি ভারি পীড়িত হচ্ছিলেন।

    পূব আকাশ ফর্সা হয়ে উঠছে। আকাশের নিচে গাছপালা এবং পাখিদের এবার স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে। কেমন যেন গভীর স্বপ্ন থেকে এটা তাঁর ধীরে ধীরে জেগে ওঠা। একটায় ট্রেন। প্রহ্লাদ সঙ্গে যাবে। লটবহর কাল রাতেই বাঁধাছাঁদা হয়ে গেছে। কালই বৌমাদের যাত্রা করিয়ে রেখেছেন। অলকার সঙ্গে উত্তরের ঘরে আজ বৌমা শুয়েছে। বড় ঘরে আজ তারা আসতে পারবে না। মিণ্টু অত সব বোঝে না। বড়ই অবুঝ। তার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ চন্দ্রনাথের বিশ্বাস বড় ঘরে এলে শুভ যাত্রার বিঘ্ন ঘটবে।

    একবার ভেবেছিলেন নিজেই সঙ্গে যাবেন। কেমন জায়গায় অতীশ তার আবাস ঠিক করেছে, নিজে দেখে এলে শান্তি পেতেন। কিন্তু সন্তোষের মাতৃ বিয়োগ হওয়ায় যাওয়া হচ্ছে না। কাল ষোড়শ শ্রাদ্ধ। যজমানের শান্তি অশান্তি বলে কথা। তিনি অন্য পুরোহিতের কথা বলেছিলেন, কিন্তু সন্তোষ মুখ ব্যাজার করে ফেলেছিল। আর ওর মার পূজাপার্বণে বড় খুঁতখুঁতে স্বভাব ছিল। যত দেরিই হোক, যত উপবাসে কষ্টই পাক, তিনি ফুল বেলপাতা না দিলে বৃদ্ধা তৃপ্তি পেত না। কিছু আহারও করত না। লাঠি ঠুকে ঠুকে সকালবেলায় চলে আসত ওর মা। ঠাকুর প্রণাম, চন্দ্রনাথের পায়ের ধুলো নিয়ে ঠুকঠুক করে আবার চলে যেত। গাছের যা কিছু কর্তাকে না দিয়ে নিজে খেয়ে তৃপ্তি পেত না। এ একটা ঠেক রয়ে গেছে বলেই চন্দ্রনাথ নিজে যেতে পারছেন না। মনে মনে অস্বস্তি বোধ করছেন।

    আর সকাল হলেই চন্দ্রনাথের হাঁক-ডাক, ও বৌমা ওঠো। প্রণাম সেরে ফুল বেলপাতা তুলে দাও। পূজার ঘরে একটু সকাল সকাল ঢুকতে হবে বৌমা। হাসু ওঠ। রাধানাথকে বলবি যেন তিনটে রিকশা আনে। প্রহ্লাদ তুই বাবা ঘাসপাতা কেটে রেখে যা। বাড়ি থাকবি না, গরুগুলি খাবে কি। এই বলে তিনি টং থেকে কবুতরগুলো ছেড়ে দিলেন। পায়ে পায়ে সেই শ্রাবণীর কুকুর দুটো ঘুরছে। শ্রাবণীর মেলা থেকে আসার পথে কেন জানি কুকুর দুটো তাঁর পিছু নিয়েছিল। যতই তিনি দূরছার করেন, নড়ে না। হাঁটতে থাকলে, কুকুর দুটো পেছনে হেঁটে আসে। বাড়িতে ফিরে দেখেন, ওরা তেমনি আসছে। সেই থেকে ওরাও এবাড়ির বাসিন্দা হয়ে গেল। আগের কুকুরটা নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার পর যে জায়গাটা সংসারে খালি পড়েছিল, এরা আসায় তা আবার ভরভর্তি হয়ে গেছে। তিনি সেই কুকুরটাকে আর খুঁজেই পেলেন না। প্রথম মনে হয়েছিল বেইমান, পরে মনে হয়েছে, দূরের রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে মরে থাকলে কে টের পাবে। কেউ লোভ দেখিয়ে নিয়েও যেতে পারে। বড় সাবলীল ছিল কুকুরটা। এই শ্রাবণীরা আসায় তাঁর সেই দুঃখটা এখন অনেক কমে গেছে। রামিটা দুদিনের জন্য কোথায় চলে গিয়েছিল, আবার ফিরে এসেছে। যে যায় সে ফিরে আসে না, এই ভয়টা বড়ই তাঁর বেশি। বড় ছেলে সতীশ কী রকমের হয়ে গেল! অতীশও চলে গেল। বৌমা চলে যাচ্ছে। নাড়ির টান ছিঁড়ে গেলে কে আর সুস্থির থাকতে পারে। তিনি আজ সকাল থেকে আরও বেশি বিমর্ষ হয়ে উঠেছেন।

    হাসুর সহজে ঘুম ভাঙে না। সে শুয়ে উঁ আঁ করছে। উঠছে না। চন্দ্রনাথ বললেন, ও ধনবৌ তোমার সন্তানেরা তো কেবল ঘুমাতে শিখেছে। আর কিছু শিখল না। কখন থেকে ডাকছি, কিছুতেই উঠছে না।

    ধনবৌ অন্যদিন হলে বিরূপ আচরণ করত। কিন্তু আজ ভারি চুপচাপ। সংসারে ত কাজের শেষ নেই! এখন ছেলেদের নিয়ে পড়লে অশান্তি বাড়বে। টুটুল ঘুম থেকে উঠেই ঠামা ঠামা করছিল। গোটা তিনেক কথা টুটুল বলতে পারে। মা বাবা ঠামা। দাদু বলতে পারে না। এজন্য ধনবৌ মনে মনে খুশি। দেখ সংসারে কার টান কত বেশি। শুধু ঈশ্বর ঈশ্বর করে সারাটা জীবন কাটালে। দুটো পয়সা সঞ্চয় করলে না। ছেলের হাত তোলার ওপর বাঁচতে হবে ভেবেই ঘাবড়ে গেছ। বুঝি না কিছু মনে কর! বড়টা তো কবেই সম্পর্ক ছিঁড়েছে। শুধু চিঠিপত্র আর অসুখ-বিসুখের খবর দেয়। অভাবের খবর দেয়। এখন দ্যাখো এরা গিয়ে কি করে। সকালবেলায় ধনবৌ বিরূপ হয়ে উঠলে এসবই বলতেন। কিন্তু আজ এরা চলে যাবে। সকালবেলায় ঝগড়া করতে মনটা সায় দিচ্ছিল না।—বাসি কাপড় চোপড় ছেড়ে ঠাকুরঘরে ঢুকে গেল। ঠাকুরের বাসনপত্র, তামার টাট কোষাকুষি সব বের করে সোজা ঘাটে। অলকাকে ডেকে তুলে দিয়ে গেল। বলল, টুটুলকে নিয়ে একটু গাছতলায় বেড়া। আমার কাছে এখন আর আনিস না।

    চন্দ্রনাথ আজ নিজেই গুণে গুণে একশ একটা তুলসীপাতা তুললেন। পাতাগুলিতে আবার কোনও খুঁত না থাকে। তুলসীপাতা কলাপাতায় ভাঁজ করে ঠাকুরঘরে রেখে এলেন। শালগ্রামের মাথায় এই একশ একটা তুলসীপাতা তিনি উৎসর্গ করবেন। রাস্তাঘাটে কত রকমের চোর-জোচ্চোর অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কলকাতায় পৌঁছাতে যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, এজন্য তিনি তার হাতের পাঁচ কাছে রেখে দিচ্ছেন। তা না হলে নিশ্চিন্তে রাতে ঘুমাতে পারবেন না। আত্মীয় অনাত্মীয় প্রতিবেশীর বেলায় যেমন তিনি ঠাকুরের সামনে বসে খুব নিমগ্ন হলে চোখের ওপর ছবি ভেসে উঠতে দেখেন—নিজের সন্তান-সন্তুতির বেলায় সেটা সহজে দেখতে পান না। ফলে বয়স যত বাড়ছে তত আরও বেশি ধর্মভীরু, বেশি উচাটন, বেশি যেন কঠিন হয়ে পড়ছে ঘরবাড়ি ঠিকঠাক রেখে যাওয়া। শত্রুপক্ষ চারিদিকে। কে কখন কি তুলে নেবে—ঈশ্বর নিজেও কম যায় না। তার কোপকেই সব চেয়ে বেশি ভয়। ফলে সকালবেলায় তিনি ঠেঙিয়ে গেছেন বুড়ি-বিবির হাতায়। হাতার দীঘি থেকে দুটো পদ্ম তুলে এনেছেন, লক্ষ্মী জনার্দনের পায়ে দেবেন বলে। গাছ থেকে নিজেই আজ গোটা গোটা সব পদ্ম তুলে আর কি করণীয় কাজ বাইরের পড়ে থাকল —ফুল বৌমাই তুলবে—বাড়তি আর কি কাজ আছে, বিগ্রহ আর কি পেলে আরও বেশি তুষ্ট হবেন—এইসব চিন্তার জাল থেকে মুক্তি পেলে মনে হল সামান্য তামাকু সেবনও চায় ঠাকুর। প্রহ্লাদকে তামাক সাজতে বলে নিজে একটা কুশাসনে পদ্মাসন করে বসলেন। সকালবেলায় বিগ্রহের পূজা না হওয়া পর্যন্ত জল গ্রহণ করেন না। মাঝে মাঝে তামাকু সেবন। তিনি চোখ মেলে দেখলেন টুটুল হামাগুড়ি দিয়ে উঠে আসছে। পৈঠায় ভর দিয়ে উঠে আসছে। তারপর পিঠে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে টিকি টানছে।

    —ও বৌমা দেখ, আবার আমার টিকি টানছে। আমি কিন্তু চিমটি কাটব। আ আমার লাগছে!

    টুটুল অ আ তু তু করছে। বিচিত্র রহস্য টের পায় বুঝি টুটুল এর মধ্যে। চন্দ্রনাথ ভারি আরাম বোধ করছিলেন। গায়ে গা লেপ্টে আছে। টুটুলের শরীরে আশ্চর্য উষ্ণতা আছে। চন্দ্রনাথ চোখ বুজে টের পাচ্ছিলেন—বংশের পিণ্ডদানের প্রথম অধিকারী এখন তার গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এতে তিনি কেমন এক পরম আনন্দ পান। মানুষের আর কি লাগে। বড়টার কেবল মেয়েই হচ্ছিল। তিনি মেয়েদের ব্যাপারটাকে কিছুটা অচ্ছুতের মত মনে করেন। এদের পিণ্ডদানে আত্মা পরিতৃপ্ত হয় না। যেন কোন দূর গ্রহলোকে বসে আছেন চন্দ্রনাথ। তাঁর এত কষ্টের ঘরবাড়ি দেখতে পাচ্ছেন। পূর্বপুরুষদের জল দেবার অধিকারী এই শিশু। এবং মনে হয় দূরের গ্রহলোক থেকে তাঁর পিতামহ প্রপিতামহ সবাই দেখছেন, চন্দ্রনাথের পাশে তাঁর নাতি অভীক দীপঙ্কর ওরফে টুটুল বসে বসে তাঁর টিকি টানছে।

    চন্দ্রনাথ বললেন, দাদু পারবি ত ঘাড় দিতে।

    টুটুল আরো সজোরে টিকি ধরে টান দিল। খুব বড় নয়, লম্বা নয় বেঁটে খাটো টিকি। টুটুল ওটাকে কব্জা করতে পারছে না। ব্রহ্মতালু থেকে টুটুল বোধহয় চায় ওটা তুলে নিতে। বার বার চেষ্টার পরও যখন পারল না, তখনই টুটুল ভ্যাক করে কেঁদে দিল।

    চন্দ্রনাথ নাতিকে কি আর করেন। কাঁধে তুলে নিয়ে বের হয়ে গেলেন। কোথাও যাবেন মনে হয়। আসলে তিনি এই বাড়ি-ঘরের জন্য যে মায়া বোধ করেন তাঁর এই উত্তরাধিকার তেমন মায়া বোধ করুক মনে মনে বোধ হয় এমন চাইছিলেন। গাছ-পালায় ভর্তি বাড়ি-ঘর। পাখ-পাখালি কত—প্রজাপ্রতি ফড়িং কীট-পতঙ্গ সব মিলে এক প্রবহমান জীবন ধারা। এই জীবনধারায় তাঁর এক বছরের নাতি অভীক দীপঙ্করকে নিয়ে পরিভ্রমণে বৃত হলেন। তিনি হেঁটে যাচ্ছেন, পায়ে পায়ে শ্রাবণীরা আসছে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। গাছপালার ভিতর দিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন, আর অজস্র কথা বলছিলেন। কথাগুলো বড়ই অকিঞ্চিতকর। তবু কেমন গভীর এবং তীক্ষ্ণ।

    চন্দ্রনাথ বললেন, কত বড় আকাশ দেখ।

    আবার বললেন, সামনে কি বিস্তৃত মাঠ!

    বললেন, এখানেই আমরা ঘোরাঘুরি করব। কেউ বেশি দূরে যাব না। বেশি দূর যেতে পারি না। পরমায়ু শেষ হলে আমি তোমাদের সবাইকে দেখতে পাব। সুখে থাকলে আত্মা শান্তি পাবে।

    ধীরেনের মা সামনে পড়ে গেছে।—ওমা কর্তার ঘাড়ে এ কে গ। কি কথা বলছেন গ ঠাকুর।

    চন্দ্রনাথ বড়ই লজ্জায় পড়ে গেলেন।—আর বলিস না। ঘাড়ে চড়ে ঘুরবে বলছে। খুব কান্নাকাটি করছিল।

    —বৌমারা নাকি চলে যাবে আজ?

    —হ্যাঁ।

    —এই ত সংসার গ কর্তাঠাকুর। কে কোনদিকে যায় ঠিক থাকে না। মরণ আপনার। জ্বালায় জ্বলবেন।

    অলকা তখন মিণ্টুকে খাওয়াচ্ছিল। দুধ মুড়ি কলা। মিণ্টু খাচ্ছে আর বলছে আমরা বাবার কাছে আজ চলে যাব না পিচি!

    নির্মলার সামান্য গোছগাছ বাকি। সেটা সকাল সকাল সেরে নিচ্ছিল। আজ আড়াই মাস মানুষটা নেই। এদিকে একবার আসেও নি। কত সহজে ভুলে থাকতে পারে। অভিমান, বড় অভিমান, কেন যে ভিতরে এই চাপা অভিমান—কোনও প্রকাশ নেই। কাছে গেলেও প্রকাশ করতে পারবে না। এত দিন থাকি কি করে! তুমিই বা থাক কি করে! এবং অভ্যন্তরে কেমন রোমাঞ্চ। মানুষটাকে কত দীর্ঘকাল যেন না দেখে আছে! দু-আড়াই মাস সময়টা এত দীর্ঘ হয় এই প্রথম সেটা টের পেল নির্মলা। আর যে কি হয়, যেন সময় শেষই হচ্ছে না। তারপর যাত্রা, রিকশা, ট্রেন উন্মুখ আকাঙ্ক্ষা—এই নিয়ে সে কতকাল যেন প্রতীক্ষায় বসে থাকবে। মনের মধ্যে এক অব্যক্ত সুখানুভূতি যা পরম এবং চরম, কদিন থেকে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। যেন স্টেশনে নামলে নির্মলা চোখ তুলে মানুষটার দিকে তাকাতেই পারবে না। সে কত দীর্ঘ চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে মাঝে মাঝে সে নির্লজ্জ বেহায়ার মত তার রাতে ঘুম হয় না জানিয়েছে। আরও কত ইচ্ছের কথা ছিল—ভাবতেই কেমন লজ্জা বোধে নির্মলা পীড়িত হতে থাকল। চিঠিতে অত উতলা না হলেই যেন তার ভাল ছিল। চার বছরে তাকে মানুষটা যা না চিনেছে, এই আড়াই মাসে চিঠির মারফতে তাকে যেন আরও বেশি চিনে ফেলেছে। এবং সেখানে কিছুটা এমন ইচ্ছের প্রকাশ ছিল, যা ভাবলে চোখে-মুখে রক্তচাপ বেড়ে যায়। ফলে নির্মলা সকাল থেকে একটু বেশি চুপচাপ আজ। কারণ তার মনে হয়, এই পরিবার থেকে ছিন্ন হবার সময় তাকে কিছুটা দুঃখী দেখানো দরকার।

    চন্দ্রনাথ আজ সকাল সকাল হাতার পুকুর থেকে স্নান সেরে এলেন। স্নান সারতে তিনি নিত্যকালী স্তোত্র, সূর্য কবচ, গায়ত্রী কবচ পাঠ করেন। আজও সেই মন্ত্রোচ্চারণ—কেমন গম্ভীর নিনাদের মত শোনায়। বাড়ির মানুষজন প্রাণিকুল সহ এই গাছপালা মাঠ, প্রতিবেশিদের মঙ্গলার্থে তার এই বিশ্বাস এই মন্ত্রপাঠ, মানুষের অকাল মৃত্যু অপমৃত্যু বিনাশ করে। জনপদ শস্যহানি থেকে বেঁচে যায়! দুর্ভিক্ষ মহামারী দেখা যায় না। নিরন্তর বিশ্বাসের মধ্যেই তাঁর এই মন্ত্রোচ্চারণ। ধরণীর শান্তি বজায় রাখার জন্য এটি তাঁর কাছে অমোঘ আয়ুধ। আজ আরও বেশি এ বিষয়ে তিনি কেমন সচেতন হয়ে পড়েছেন। কারো সঙ্গে তিনি এখন একটা কথাও বলছেন না। পূজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঠাকুরঘরে এক সমাহিত মানুষের মত বসে থাকবেন। ঠাকুরঘরে ঢোকার সময় নির্মলা শুনতে পেল বাবা বলে চলেছেন—ব্রহ্মোবাচ—গায়ত্রা কবচং বক্ষ্যে ধর্মকামার্থ সিদ্ধিদ্ম। তারপর তিনি দরজা ভেজিয়ে দিলেন। নির্মলা আগেই স্নান সেরে নিয়েছে। আজ তাকে অন্যদিনের চেয়েও পবিত্র দেখাচ্ছিল। কপালে গোল লাল বড় সিঁদুরের টিপ, সূর্যাস্তের মত সিঁথিতে লাল আভা। লাল পেড়ে শাড়ি পরনে, ভেজা চুল সারা পিঠে ছড়ানো। সে আগেই ফুলফল নৈবেদ্য সব সাজিয়ে রেখে এসেছে। যেখানে যা দরকার দূর্বা আতপচাল, হরিতকী তিল তুলসী সব। পঞ্চ দেবতার উপাচার সহ ঠাকুরের আলাদা আলাদা নৈবেদ্য। এছাড়া সন্তানের শুভ কামনায় তিনি স্থির করেছিলেন সামান্য ভোগ দেওয়া হবে লক্ষ্মীজনার্দনকে। ফলে আরও সকালে মা স্নান সেরে ভোগের আয়োজন সেরে ফেলেছে। এবং এগারোটা বাজতে না বাজতেই চন্দ্রনাথ পূজা-আর্চার কাজ সেরে ঘণ্টা কাঁসি বাজালেন। শঙ্খে ফুঁ দিলেন। এই সব তাঁর করার অর্থ, যত দূর এই শব্দ তরঙ্গ যাবে, তত দূর মানুষজনের কোনও আপদ-বিপদ থাকবে না। ধর্মবিশ্বাসী মানুষটা এতক্ষণে যেন কিছুটা বিচলিত ভাব কাটিয়ে উঠেছেন। হাসিমুখে পূজার ঘর থেকে বের হয়েই ডাকলেন, টুটুল কৈ রে।

    টুটুলকে ভানু কোলে নিয়ে ঘুরছিল, সে দাদুর ডাকে ঠিক সাড়া পায়। সে বুঝতে পারে, দাদু তাকে এখন খেতে দেবে। ভানুর কোল থেকে জোরজার করে নেমে হেঁটে যাবার চেষ্টা করলে, চন্দ্রনাথ এসে ধরে ফেললেন—এখনও খুব ভাল হাঁটতে পারে না। কিছুটা গিয়েই পড়ে যায়। কিন্তু শিশুও ঈশ্বরের মহিমা বুঝি টের পায়। ঠিক হাত তুলে বলছে, আমা আমা। অর্থাৎ প্রসাদ দাও। আমি খাব। মিণ্টু কোথায় খেলছিল, সেও দৌড়ে এসেছে। প্রতিবেশীদের বালকবালিকারা দৌড়ে এসেছে। তারা হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে। সবার হাতে হাতে চন্দ্রনাথ ঈশ্বরের মহিমা বিতরণ করতে লাগলেন। বললেন, তোরাই ঈশ্বর। চাল কলা নারকেল এবং সামান্য পায়েস সবাইকে বিলিয়ে দিয়ে বললেন, ওদের খেতে দিয়ে দাও ধনবৌ। প্রহ্লাদ কোথায় রে? খেয়ে নে। সময় হয়ে গেছে।

    হাসু ভানু আজ বাড়ি থেকে নড়েনি। সারাটা সকাল ভাইপো ভাইঝিকে নিয়ে পড়েছিল। অলকা সহসা চিৎকার করে বলছে, মা এখন আর কার তুমি নাক টানবে। ধনবৌ রান্নাঘরে—কোন সাড়া দেয়নি। অলকা আবার বলছে, মা তোমার নাতির বোঁচা নাক তুলতে পারলে না। এ সংসারে সবাইর নাক দীর্ঘ। টুটুল মায়ের গড়ন পেয়েছে। নির্মলার নাক কিছুটা চাপা। ধনবৌর কাজই ছিল স্নানের আগে টুটুলের সারা শরীর ভাল করে তেল মালিশ করে রোদে ফেলে রাখা। দু’আঙুলে তেল নিয়ে নাকটাকে টেনে তোলা। নিত্য কাজের মধ্যে এই বড় কাজটা আজ থেকে আর করতে পারবে না। বোঁচা নাক নিয়েই টুটুলটা আজ চলে যাবে। এজন্য ধনবৌ বড়ই কাতর হয়ে পড়েছে। চোখে তার জল এসে গেছিল।

    দেশভাগের পর সংসারটা অগাধ জলে পড়ে গিয়েছিল। কিনা দিন গেছে! কত জায়গা ঘুরে শেষ পর্যন্ত এই আবাস, বাড়ি ঘর। সুখে দুঃখে সব সন্তান-সন্তুতি নিয়ে এই বাড়িটা যখন ডালপালা মেলে দিচ্ছিল, তখনই সতীশ লিখল, মেসের খাওয়া সহ্য হচ্ছে না। সে বাসা করেছে। চন্দ্রনাথ চিঠি পেয়ে গুম হয়ে বসে ছিলেন। তারপর সব খালি করে ওরা চলে গেল।

    এদেশে আসার পর চন্দ্রনাথ মাঝে মাঝেই অভাবের তাড়নায় উধাও হয়ে যেতেন। তখন চন্দ্রনাথ একদণ্ড স্থির হয়ে বসতে পারতেন না। কখনও স্টেশনে কখনও পোড়ো বাড়িতে কখনও রাস্তায় স্ত্রী-পুত্র ফেলে কোথায় না কোথায় চলে গেছেন। তারপর ফিরে এসেছেন আবার। মাথায় বড় পুঁটলি। তারপর এই বাড়িঘর—সেও কত অনটনের মধ্যে। যখন সুখের মুখ দেখার কথা তখন আবার অন্য রকম এক কষ্ট। মানুষের কপালেই বুঝি এমন থাকে। মুখ গুঁজে ধনবৌ রান্নাঘরে কাজ সারতে সারতে এমনই ভেবে যাচ্ছিল আর মাঝে মাঝে কেন যে চোখ জলে ভার হয়ে আসছে।

    যেন সেই মা মা ডাকটা ধনবৌ এখনও শুনতে পায়। গভীর রাতে দরজায় দাঁড়িয়ে কেউ ডাকছে, মা মা আমি। আমি ফিরে এসেছি। বাঁশের মাচান থেকে ধড়ফড় করে জেগে উঠেছিল ধনবৌ। পাশের মানুষটাকে ঠেলে তুলে বলেছিল হ্যাগ সোনা ডাকছে। শুনতে পাচ্ছ। চন্দ্রনাথ এটা আগেও দেখেছে, ধনবৌ হঠাৎ হঠাৎ রাতে জেগে উঠে বলত, ঐ শোন সোনা ডাকছে না! কাজেই মানুষটার বিশ্বাসই হয়নি। মনের ভুল। সেদিনও চন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ঘুমোও। মন হাল্কা কর। ঈশ্বরকে ডাক। তিনিই তোমার সন্তান আবার ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু সেদিন ধনবৌ কোন কথাই শোনেনি। বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলে দাঁড়াতেই–বারান্দার অন্ধকারে ছায়ামুর্তি—দেখেই বুকে জড়িয়ে ধরেছিল।—ওগো আমি ভুল বলিনি? এস না।

    চন্দ্রনাথ, অন্ধকারে ধনবৌ কি সব হাবিজাবি প্রলাপ বকছে ভেবে নিজেও দ্রুত পায়ে নেমে গেলেন। দেখলেন অন্ধকারে কেউ ধনবৌর পায়ে পড়ে আছে। ক্ষমা প্রার্থীর মত। চন্দ্রনাথ বলেছিল, কে?

    —সোনা। তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না। অলকা ওঠ। আলোটা জ্বাল। আলো জ্বাললে চন্দ্রনাথ পুত্রের লম্বা চওড়া সাহেব-সুবো চেহারা দেখে বিশ্বাস করতে পারেননি, এ তাঁর সোনা। কৈশোরে হারিয়ে যাওয়া এ তাঁর মেজ পুত্র। যেন যৌবনের সেই বড়দা এসে হাজির হয়েছেন আবার। যেন সোনা সেই পাগলঠাকুর—যে কৈশোরে হারিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসেছে। একেবারে অবিকল বড়দার মত চোখ মুখ গায়ের রঙ, তেমনি দীর্ঘকায়, চন্দ্রনাথ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছিলেন বলতে বলতে। ধনবৌ বলেছিল, ঠিক বলছ! বড় ভাসুরঠাকুর যৌবনে এমন দেখতে ছিলেন!

    —ঠিক এই রকম। এই রকম উঁচু লম্বা মানুষ। এমনই বড় বড় চোখ। ভারি সুন্দর পোশাক ছিল গায়ে।

    অতীশকে নিয়ে সেই থেকে কেমন একটা আশঙ্কা ধনবৌর মনে। কারণে অকারণে অতীশের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখত—যদি সেই সব চিহ্ন অবিকল কখনও ধরা পড়ে যায়। এই ভয়ে সে বেশিক্ষণ অতীশের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতেও পারত না। বুকটা কখনও হিম হয়ে আসত। পরিবারে কে যেন বলে গেছে বংশে বড় অভিশাপ। কেউ না কেউ পাগল হয়ে যাবেই। যদি বংশ দোষে অতীশ পাগল হয়ে যায়—সুপুরুষ—ভারি সুপুরুষ হয়ে গেছে অতীশ। তিন চার বছরে শরীরে ভারি পরিবর্তন এসে গেছে। ঠিক সেই পাগল মানুষটার মত আচ্ছন্ন থাকতে ভালবাসে। বড় গভীর চোখ। গভীরে কোথাও কিছু বুঝি বাজে। সেটা কি, কখনও ধনবৌ ধরতে পারেনি। চুপচাপ শান্ত নিরীহ —আবার পড়াশোনা, কাজ এবং সংসারে লেপ্টে থেকেও যেন সে ভারি আলাদা মানুষ। অতীশকে ধনবৌ কিছুতেই বুঝতে পারত না। আবার জাহাজে যেতে চেয়েছিল। বাপের ইচ্ছে নয়, ধনবৌ না পেরে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছিল—তারপরই অতীশ অবাধ্য হতে বুঝি সাহস পায়নি। এখানেই থেকে গেল। গাছপালার মত শেকড় গজিয়ে দিল। সে ঘরবাড়ি ছেড়ে কখনও খুব বেশিদূর হেঁটে যেত না। কেমন আচ্ছন্ন থাকার স্বভাব। কিন্তু কেন সে এত আচ্ছন্ন থাকে চুপচাপ থাকে, বড় বিষাদ চোখে মুখে—তার কারণ ধনবৌ এতদিনেও টের পায়নি! মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক থাকলে বলেছে, সোনা তুই এত কি ভাবিস?

    অতীশ বলত, কৈ কিছুই নাত।

    —তুই আমার পেটে হয়েছিস না আমি তোর পেটে হয়েছি! আমি বুঝি না!

    অতীশ তখন হেসে ওঠার চেষ্টা করত। মার ভয় দূর করার জন্য বলত, লীলাময় বলেছে, ওর জামাইবাবুকে বলে কোনও স্কুলে ঢুকিয়ে দেবে।

    —হ্যাঁ বাবা, এখানেই দেখ কিছু একটা হয় কিনা। তুই ছিলি না—তোর বাবা কেমন জলে পড়ে গেছিল। কাছে থাক, খাই না খাই শান্তি।

    তারপর ধনবৌর মনে হয়েছিল বিয়ে থা দিলে হয়ত চোখ মুখের আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে যাবে। আর গাছের নিচে চুপচাপ বসে থেকে বিকেলটা কাটিয়ে দেবে না। কিংবা একা একা হেঁটে বেড়াবে না কোথাও। নির্মলা আসার পরও সেই ভাবটা গেল না। মিণ্টু হবার পর ভেবেছিল ঠিক হয়ে যাবে। মিণ্টু টুটুল হবার পর ধনবৌ লক্ষ্য করেছে, অতীশ কিছুটা সুস্থির বোধ করছে। এভাবে যদি সেরে যায়। ইদানীং মনে হয়েছে ধনবৌর অতীশের আচ্ছন্নতা কেটে গেছে। কিন্তু নির্মলা সেদিন চুপি চুপি বলতেই বুকটা আবার কেঁপে গেছে। নির্মলা বলেছে আমি বলেছি বলবেন না। ও বলতে বারণ করেছে। কিন্তু বড় ভয় হয়।

    —কি ভয়!

    —ও রাতে মাঝে মাঝে ঘরে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে বসে থাকে।

    —ধূপকাঠি জ্বালিয়ে বসে থাকে!

    —হ্যাঁ, মা।

    —তুমি কিছু বল না?

    —কি বলব! এমন চোখ-মুখ, বলতে সাহস হয় না।

    ধনবৌ চন্দ্রনাথকে ডেকে বলেছিল, শুনছ!

    চন্দ্রনাথ হাতে দাঁ নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। হাতে ঘাস পাতা লেগে আছে। ধনবৌ চাল বাছছিল, সেসব ফেলে রেখে ফিসফিস গলায় বলেছিল, বৌমা কি বলছে!

    —কি বলছে!

    —অতীশ মাঝরাতে ঘরে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে বসে থাকে।

    নির্মলা বলেছিল, চোখে মুখে কেমন আতঙ্ক। ভয় পেলে, ঘাবড়ে গেলে যেমনটা হয়।

    —কবে থেকে হয়েছে?

    —স্কুলের ঝামেলার পর থেকেই।

    চন্দ্রনাথ দা’টা পাশে রেখে বারান্দায় বসে পড়েছিলেন—কিছুক্ষণ মাথাটা নিচু করে দূর অতীতে কোনও পাপ কাজ করেছিলেন কিনা যেন স্মরণ করার চেষ্টা। না। তেমন কোনও পাপ কাজ তিনি করেন নি। তাঁর পুত্র পাগল হয়ে যাবে তিনি ভাবতে পারেন না। শুধু বললেন, কিছু বল না। আমি দেখছি। তারপর একদিন খেতে বসে এটা-ওটা নিয়ে কথা হবার সময় চন্দ্রনাথ প্রশ্ন করেছিলেন, সোনা তুমি কি ভয় পাও?

    —ভয় পাব কেন?

    —দেখ সোনা জীবনে নানাভাবে গোলযোগ দেখা দেয়। তুমি বাঁচবে, অথচ কোন গোলযোগ পোহাবে না সে হয় না। তোমার ভীতির কারণ আমি বুঝতে পারছি না।

    অতীশ বুঝতে পেরেছিল, নির্মলা ভয় পেয়ে সব বলে দিয়েছে। সে বলেছিল, মাঝে মাঝে নাকে কিসের দুর্গন্ধ লেগে থাকে। ঘুম ভেঙে যায়। আর ঘুম আসে না। তখন ধূপকাঠি জ্বালাই। স্বস্তি বোধ করি।

    —দুর্গন্ধটা কিসের?

    অতীশ চুপ করে থাকত।

    —দুর্গন্ধটা কিসের বলবে ত!

    —মানুষের। অতীশ কেমন মরিয়া হয়ে যেন না বলে পারল না।

    —আমার গায়ে কি সেটা পাও? তোমার মার! বৌমার! পুত্রকন্যার!

    অতীশ ভাত নাড়ছিল। খাচ্ছিল না। বড় কঠিন প্রশ্ন তুলেছেন বাবা। সেকি জবাব দেবে বুঝতে পারছিল না।

    চন্দ্রনাথ কিছুটা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, জবাব দাও। কথা বলছ না কেন? পাপ কাজ করলে মানুষের শরীরে দুর্গন্ধ থাকে। সবাই টের পায় না। কেউ কেউ টের পায়। তবে আমার বিশ্বাস মানুষের কোনও পাপ কাজের দুর্গন্ধ দশটা ভাল কাজে মুছে যায়।

    অতীশ ক্রমেই গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিল।

    চন্দ্রনাথ ফের বলেছিলেন, বুঝলে পৃথিবীতে যখন এসেই গেছ, তখন প্রশান্ত চিত্তে সব ভাল মন্দ মেনে নাও। এতে কম কষ্ট পাবে।

    সোনার মনে হয়েছিল, যেন সেই স্যালি হিগিনস তাকে পৃথিবী সম্পর্কে সুপরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। সে খেতে খেতেই বুড়োর সেই মন্ত্রোচ্চারণের মত কথাগুলি হুবহু মনে করতে পারছিল—ছোটবাবু মনে রাখবে গুডম্যান ইট টু লিভ, ব্যাডম্যান লিভস টু ইট। সে বলল, গন্ধটা সব সময় পাই না। এখানে এসে ভালই ছিলাম। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাজটা নিয়েই ফেরে পরে গেছি। কটুবাবুদের মিথ্যে অভিযোগের পর থেকেই এক রাতে ঘুম ভেঙে গেল বাবা। ওরা মিথ্যে করে আমার নামে ডি পি আইয়ের কাছে অভিযোগ করেছে। যাতে কাজ ছেড়ে দি সে-জন্য। মানুষের নীচতা আমাকে বড় কষ্ট দেয়।

    —তারপরই বুঝি গন্ধটা পাচ্ছ!

    —তাই।

    —মনে কর না, তারা কেউ তোমার কোনও অনিষ্ট করতে পারেন। তিনি যদি অনিষ্ট না করেন তাদের কি ক্ষমতা অনিষ্ট করার। মনে কর না এটাও তোমার জীবনের পক্ষে তাঁর কোন শুভ ইচ্ছার প্রকাশ।

    অতীশ হেসে দিয়েছিল। কারণ এছাড়া তাঁর অন্য কোনও উপায় ছিল না। সে বলেছিল, আপনার একটা আশ্রয় আছে। আমার তাও নেই।

    চন্দ্রনাথ জানেন শৈশব থেকেই তার এই পুত্রটি ঈশ্বরের প্রতি বিরাগ। পরিবারের আর দশজনের মত তার ধর্মবোধ গড়ে ওঠেনি। আচারবিচার নিয়ে মাঝে মাঝে পিতাপুত্র কথা কাটাকাটি হয়েছে, ঈশ্বর আছেন, এও তাঁর পুত্র বিশ্বাস করতে কষ্ট পায়। মৃত্যুর পর সব শেষ সে এমন ভেবে থাকে। আত্মা এবং পরলোক সম্পর্কেও ভারি অবিশ্বাস। তিনি কিছু বইয়ের উল্লেখ করে বলেছিলেন, এসব পড়, জানতে পারবে।

    অতীশ ভিতর থেকে ভীষণ বেয়াড়া হয়ে উঠেছিল। বলেছিল, মৃত্যুর পর কি আছে কেউ জানে না বাবা। যদি কেউ কিছু বলে থাকে, মিছে কথা বলেছে। আমার বোধবুদ্ধিতে তোমাদের ঈশ্বরকে ধরতে পারি না।

    —এখন পারবে না। আর একটু বয়েস হোক সবই পারবে। তারপরই চন্দ্রনাথ বিচলিত বোধ করেছিলেন। যদি সেটা না হয় অতীশের, তবে মানুষের দুর্গন্ধ তার নাকে লেগেই থাকবে। এবং এই দুর্গন্ধটাই তাকে শেষ পর্যন্ত পাগল করে দিতে পারে। তিনি বলেছিলেন, তোমার জন্য তিনি না থাকুন, তোমার সন্তান সম্ভতির জন্য অন্তত থাকুন। চন্দ্রনাথ কিছুটা বিরক্ত হয়েই যেন পুত্রকে এমন কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন।

    অতীশ শুধু বলেছিল, আমারও ভরসা এরা যদি বেঁচে থাকে, ভাল হয়, সজ্জন হয়, তবে তা আপনার পুণ্যফলেই হবে।

    চন্দ্রনাথ আবার অনেক সুদূর থেকে একথা বলেছিলেন যেন, আমি চাই আমার পাপ-পুণ্য বলে যদি কিছু থাকে তা তোমাকে স্পর্শ করুক। ঈশ্বর তোমাকে দুর্গন্ধ মুক্ত করুন।

    নির্মলা পাশের ঘর থেকে শুনতে শুনতে কাঠ হয়ে গেছিল। এমন ঈশ্বরবিহীন মানুষ নিয়ে তাকে সারা জীবন ঘর করতে হবে। ভাবতে গিয়ে ভয়ে কান্না উঠে আসছিল। তবু আশা, বাবা বলেছেন, তাঁর পাপপুণ্য বলে যদি কিছু থাকে তা মিণ্টু টুটুলকে স্পর্শ করবে। সেই আশায় আজ যাবার সময় বাবার দেওয়া সবকিছু যত্নের সঙ্গে নিয়ে নিল। বাবার হস্তাক্ষরে লেখা কালীর স্তোত্র, গায়ত্রী কবচ—কবচ পাঠ করতে বলেছেন, বিপদে আপদে কবচ পাঠ করলে সব আপদ কেটে যায়। আর ঠাকুরের ফুল-বেলপাতা—সেও সঙ্গে দিয়েছেন। সব শেষে তিনি যাত্রা করার আগে টুটুলকে বারান্দায় বসিয়ে তার মাথার ওপর গোটা পাটা তুলে দিয়ে বলেছেন, ঈশ্বর তোমাকে অনুসরণ করুক। ঈশ্বর তোমার সহায় হোন।

    সারি সারি তিনটে রিকশা যাচ্ছে। গাছপালার অভ্যন্তরে তিনটে রিকশা চলে যাচ্ছে। গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন চন্দ্রনাথ ধনবৌ অলকা এবং প্রতিবেশীরা। চন্দ্রনাথ হাত তুলে দিয়েছেন। টুটুলও মায়ের মাথা ডিঙিয়ে পিতামহের প্রতি হাত তুলে দিয়েছে। নির্মলা পেছন ফিরে শুধু দেখল। যাত্রা আরম্ভ। কোথায় শেষ সে জানে না। তার চোখে জল নেমে এল।

  • তের

    তের

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    তের

    এই কলকাতা শহরে তখন একজন ভোজবাজিওয়ালা খেলা শুরু করার পাঁয়তাড়া করছে। ডুগডুগি বাজছিল। বাঁশের খুঁটি পোঁতা হয়ে গেছে। লোকজন জমছে না। সে হাঁকছিল, খেলা শুরু হ’গেল। রূপায়াকা খেলা জাদুকা খেলা। মরণ তারের খেলা। চাকতি কা খেলা। তার বিবি-বাচ্চা লেড়কি সব হরদম সং সেজে নাচছিল। হারমোনিয়াম বাজছিল।

    লোকজন সব নানা ধান্দায় ছুটছে। সময় নেই। শুধু রূপায়া চাই। চাই জৌলুস। মানুষেরা তবু কেউ কেউ কেন যে কৌতূহলী হয়ে যায়—সূর্য ডোবার আগে এই নিরস ইঁট কাঠের শহরে পরম রোমাঞ্চ বোধ করে দাঁড়িয়ে যায়। লোকটির পরনে হাফ-হাতা জামা প্যাণ্ট, মাথায় জোকারের টুপি—পেটে চুনকালি দিয়ে মানুষের কঙ্কাল—হারেরে হাভাতে—বড়ই মরণ আমার। বাচ্চাভি রূপায়াকা জাদু ঘুচক লিয়া। এই ঘুচক লিয়া শব্দেই অতীশ থমকে দাঁড়িয়ে গেল। শহরের এদিকটায় একটা খালপাড়—ব্রীজের মুখে কেউ ঘুচক লিয়া বলছে। সে সবার মত ভিড়ের ভেতর নিজেও উঁকি দিল। ভোজবাজিয়ালা বছর খানেকের বাচ্চাকে একটা ফুলপরী সাজিয়ে ছেড়ে দিয়েছে রাস্তায়। চোখে কালো কাপড় বাঁধা। ট্যাক থেকে যেখানে যে যা ছুড়ে দিচ্ছে—বাচ্চাটা হামাগুড়ি দিয়ে ছুটছে ঠিক সেদিকে।

    —টান বুঝেন বাবু। টেনে লিয়ে আসছে। ও বাচ্চাকা কৈ তরিকা নেহি বাবু। যো কুচ তরিকা ই রুপায়াকো। তারপর হাত তুলে নেচে নেচে সে বলছিল, খানদানি বলেন, আমদানি বলেন, জামদানি বলেন, সব রূপায়াকা মেহেরবান। পয়দা হোয়া ও রোজ। লেকিন রূপায়া চিন লিয়া।

    অতীশ সত্যি আশ্চর্য হয়ে গেল দেখে, সেই সেদিনের পয়দা, ভাল করে হামাগুড়ি দিতে শেখেনি, কিন্তু পয়সা চিনে গেছে। চোখ বাঁধা। অথচ যারা যেখানে যেদিকে পয়সা ছুঁড়ে দিচ্ছিল বাচ্চাটা হামাগুড়ি দিয়ে সেদিকেই ছুটে যাচ্ছে। হামাগুড়ি দিতে দিতে পয়সার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এবং পয়সা হাতে নিয়ে আর দিতে চাইছে না। সে খেলাটা দেখে সত্যি তাজ্জব বনে যাচ্ছিল। তার তাড়া আছে। সে সকাল সকাল অফিস থেকে বের হয়েছিল। আরও কিছু কেনাকাটা বাকি। আজ নির্মলা আসবে। ক’দিন থেকে তার কি উত্তেজনা! নির্মলা, সেই সুন্দর দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটি এই বড় শহরে চলে আসছে। মিণ্টু টুটুল আসছে। প্রহ্লাদ কাকা নিয়ে আসবেন। ক’দিন থেকেই তার রাতের ঘুমটুম সব গেছে। কাল রাতে কি যে গেছে! এত বড় একটা বাসা বাড়িতে সে একা। সারাটা রাত তাকে আর্চি বনি নির্মলা টুটুল মিণ্টু ঘিরে রেখেছিল! সে টুটুলের কথা ভেবে কেমন ভয় পেয়ে গেছিল। কারণ সে স্পষ্ট দেখেছে, রাতের আঁধারে কেউ তার পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। কোনও ছায়ামূর্তি। সে মনের ভুল ভেবে আলো জ্বালিয়েছিল। না কিছুই নেই। কিন্তু দরজার ওপাশে কোনও মৃত হাত ঝুলে থাকলে যেমন দেখা যায় তেমন একটা হাতের ছায়া। সে চিৎকার করে উঠেছিল, কে ওখানে দাঁড়িয়ে! হাতের ছায়াটা দুলছে। বড় বড় তিনটে ঘর সামনে বিশাল বারান্দা, পাশে রান্নাঘর। প্রাসাদের পেছনের দিকে ওকে থাকতে দেওয়া হয়েছে। ঘরগুলো কত লম্বা-উঁচু যেন। সে মই দিয়েও ছাদের নাগাল পাবে না। কথা বললে গম-গম করে উঠছে। সে জোরে কথাও বলতে পারছিল না। চিৎকার করতে গিয়ে বুঝতে পেরেছিল, গলা খুবই তীক্ষ্ণ হয়ে যায়—ঘুম ভেঙে যেতে পারে সবার। সে ধীরে ধীরে আবার বলেছিল, তুমি কে। অন্ধকার থেকে হাত বের করে ভয় দেখাচ্ছ!

    তখনি হাতের ছায়াটা অদৃশ্য হয়ে গেল। এতে অতীশ আরও ভয় পেয়ে গেছিল। সারা শরীরে ঘাম। সেই প্রেতাত্মার কোনও প্রভাব-টভাব হবে। সে সাহসী মানুষের মত দরজার কাছে এগিয়ে গেল। না কিছু নেই। দুটো টিকটিকি তাড়া খেয়ে ছুটছে। সামনের দরজা খুলে সে বারান্দায় বের হয়েছিল। কেউ যেন বারান্দা দিয়ে চলে যাচ্ছে। কোনও ছায়া নেই অথচ জলীয় বাষ্পের মত কোনও মানুষের অবয়ব। সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস সে দেখেছে। প্রায় তার মত বারান্দার ওপর দিয়ে হাওয়ায় ভেসে গেল! এবং বাইরে পাতাবাহারের গাছগুলির মধ্যে ঢুকে মিশে গেল সব কিছু। জ্যোৎস্না এবং হাওয়ায় তখন শুধু পাতাবাহারের গাছগুলো দুলছে। অতীশ দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে এসেছিল। সে গাছের পাতায় হাত দিতেই আতঙ্কে হিম হয়ে গেল। পাতার গায়ে সদ্য লেগে থাকা জলকণা। আর্চিকে সে কখনও আর এ-ভাবে, প্রত্যক্ষ করেনি। আর্চির প্রেতাত্মা অদৃশ্য হবার আগে আর কখনও এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ রেখে যায় নি। তারপরই যা হয় ভয়ে সে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে সারারাত বসেছিল। নির্মলা টুটুল মিণ্টুকে সে রক্ষা করতে পারবে কিনা জানে না। আর্চি বনিকেও এ-ভাবে তাড়া করেছে শেষপর্যন্ত।—ঐ দেখ দেখ, জ্যোৎস্নায় কি ভেসে বেড়াচ্ছে!

    জ্যোৎস্নায় হাত পা কাটা কখনও মুণ্ডুহীন মানুষের ছায়া দেখে অতীশ ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল। বিশাল সমুদ্র—রাতে ঝড় গেছে। ঝড়ের সময় বোটের সামনে অয়েল ব্যাগ ঝুলিয়ে দিয়েছিল। সারা আকাশময় জলকণা ভেসে বেড়াচ্ছে। তালগাছ প্রমাণ সব উঁচু ঢেউয়ে বোট আছাড় খেয়ে পড়ছে। অতীশ হাল ধরে বসে আছে পাথরের মত। বনি ছইয়ের নিচে বসে অন্ধকারে চোখ বুজে। এত অন্ধকার যে বোটের ও পাশটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল না। কিছু গড়িয়ে পড়েছিল। বনি লাফিয়ে বের হয়ে টর্চ জ্বেলে পাটাতন তুলে দেখতে গেছে কি পড়ে গেল! না, কিছুই পড়েনি। সব ঠিকঠাক। আবার পাটাতনের নিচে হুড়মুড় শব্দ। অতীশ বিপদে পড়ে যাচ্ছিল। পাটাতনের নিচে কে এত দাপাদাপি করছে! সে বলল, নিচে ঢুকে দেখ। আসলে সে হাল ছেড়ে উঠে যেতে পারছিল না। বড় বড় ঢেউ থেকে অজস্র জলকণা তার গায়ে এসে লাগছে। ঢেউয়ে বোট একটা তালপাতার ডোঙার মত দুলছে। হাল বেসামাল হলেই ওরা সেই অন্তহীন গভীর সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হয়ে যাবে। অতীশ সে-জন্য হাল ছেড়ে যেতে পারছিল না। সে বনিকে বার বার ধমকাচ্ছে। ও-কি করছ বনি। দেখ না। দেখ। নিচে দেখ।

    বনি আবার পাটাতন তুলে বলেছে, না কিছু পড়ে যায়নি ছোটবাবু। জায়গারটা জায়গায় আছে। ঐ দেখ ছায়াগুলো সমুদ্রে আর ভেসে বেড়াচ্ছে না।

    তারপর সারারাত ঝড় আর এই হুড়মুড় শব্দ। ঝড় উঠলেই এলবা আর বোটে থাকে না। আকাশে নিরন্তর ঢেউয়ের মাথায় ডানা ঝাপটায়। কখনও নেমে আসে, কখনও উঠে যায়। এই করে সারা আকাশময় সমুদ্রময় তখন তার খেলা। না কি এলবাও টের পেয়েছে, আর্চির আক্রমণ ঘটেছে বোটে। ভয়ে সেও পালিয়েছে।

    সকালের দিকে ঝড়টা থেমে গিয়েছিল। সমুদ্রকে চেনাই যাচ্ছিল না। শান্ত বালিকার মত সে যেন হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। মৃদু হাওয়া, এবং পালে সামান্য হাওয়া লাগায়, বোট ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। সকালে ওরা আশা করেছিল, দ্বীপটিপ পেয়ে যাবে। চারদিন হয়ে গেল অথচ কোনও কিছুর চিহ্ন নেই। শুধু দিগন্তব্যাপী আকাশ আর সমুদ্র। দিগন্তব্যাপী অসীম শূন্যতা। আর ভয়ংকর কঠিন এক মৃত্যুর যেন হাতছানি। তবু বনি অন্যদিনের মতই উনুন জ্বেলেছিল। চাপাটি করেছে। ঝড়ে গোটা দশেক উড়ুক্কু মাছ এসে পড়েছিল বোটে। সেই মাছভাজা আর চাপাটি। সকালে শুধু মাছ ভাজা দিয়ে ব্রেকফাস্ট, দুপুরে চাপাটি মাছ ভাজা। রাতে চাল ডালে খিচুড়ি মাছ ভাজা। এবং জ্যোৎস্নায় যখন নিরিবিলি বনি অতীশকে বুকে নিয়ে বলছে—আমরা তো বাঁচব না। এ-কদিন যা কিছু আমাদের প্রিয় খেলা আছে খেলে নিই। এবং সেই পরম মুহূর্তে সহসা চিৎকার করে উঠেছিল বনি, ঐ দেখ। দেখ ছোটবাবু আকাশে কি ভেসে রয়েছে।

    ঠিক সেই মুখ। জলীয় বাষ্পের মত আর্চি ভেসে ভেসে চলে আসছে অথবা নেমে আসছে। কিছুটা দূরে এসেই সেটা কেমন স্থির হয়ে থাকল। নড়ল না। তারপর যেমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় তেমনি আকাশের নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেতে থাকল। একদিকে মুণ্ডুটা ভেসে গেল, একদিকে পা, হাত আঙুল সব ছিন্ন ভিন্ন হয়ে আকাশের গায়ে পেঁজা তুলার মত উড়ে বেড়াতে থাকল। বনি তাড়াতাড়ি গাউন টেনে ছোটবাবুকে বুক থেকে ঠেলে দিল, ছোটবাবু, কেন কেন তুমি ওকে খুন করতে গেলে। কেন? কেন?

    ছোটবাবু একজন নাবালকের মত মুখ করে বসে ছিল। জবাব দিতে পারেনি। অতি দূর থেকে সেই সতর্কবাণী, কেউ যেন সমুদ্রের ধ্বনি তরঙ্গ থেকে বার বার প্রতিধ্বনি করে যাচ্ছে, ছোটবাবু তোমার ক্ষমা নেই। আর্চি তোমাকে ক্ষমা করবে না। সেই দূর অতীত থেকেই, তাকে তিনি যেন আবার বলছেন, মানুষের এই ভাগ্য ছোটবাবু। সে এ-ভাবেই পাপপুণ্যে জড়িয়ে যায়।

    আর তখনই অতীশের চোখ মুখ অস্থির হয়ে ওঠে। আসলে সে যত জড়িয়ে যাচ্ছে, বয়স বাড়ছে, দায়দায়িত্ব গ্রহণ করছে তত এক অদৃশ্য আতঙ্ক তার চারপাশে বেড়াজালের মত ঘিরে ফেলছে। কেউ জানে না সে খুনী। তবু ভয় পায়। কেউ সাক্ষী নেই, তবু সে ভয় পায়। সেই সমুদ্রে আর্চির শেষ অস্তিত্বটুকু অতিকায় মাছে হয়তো গ্রাস করেছে। লণ্ডভণ্ড করে খেয়েছে তার শরীর। ওদের রক্তে আর্চির কোনও অণু-পরমাণু বেঁচে থাকলেও থাকতে পারে। আর্চির শরীর ওদের প্রোটিন যুগিয়েছে। নতুন রক্ত কণিকার জন্ম দিয়েছে। তারাই হয়তো সাবলীল এখনও। সে ভেবেছিল, মাছে খেলেও শেষ হয়ে যায় না। মানুষ মরেও শেষ হয়ে যায় না। কোথাও না কোথাও ধূলিকণায় সে পড়ে থাকে। বৃষ্টিপাত হয়, মাটির উর্বরা শক্তি বাড়ে। ঘাস জন্মায়। ঘাস মাটি থেকে রস শুষে নেয়। সেই মানুষের অস্তিত্ব তার শরীরে—গাভীরা ঘাস খায়, দুধ দেয়। মানুষ আবার প্রোটিন সংগ্রহ করে। এবং শরীরে তার বীজের জন্ম হয়। সে এ-ভাবে কোনও পুনর্জন্মের কথা ভেবে থাকে—এ-ছাড়া মানুষের অন্য কোনও পরলোকে তার বিশ্বাস নেই। সে তার জীবনের সবটুকু অনুভূতি দিয়ে এটা বার বার ভেবে দেখেছে। এত সব সত্ত্বেও কি করে সে আর্চির প্রেতাত্মায় বিশ্বাসী বোঝে না।

    সে তার জীবনের এই কালো দিকটার কথা পৃথিবীর কাউকে বলেনি! বাবাকে না, নির্মলাকে না, কাউকে না। বাবাকে বললে, জানে শান্তি পেত। তিনি তাকে নানাভাবে দৈবের কথা বলে অনুপ্রাণিত করতে পারতেন। ঈশ্বরের কথা বলে ভয় কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু সে জানে, বাবা শুনলেই বলবেন, এ-বেশ হয়েছে তোমার। ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই, ভূতে তোমার বিশ্বাস আছে। অর্থাৎ বাবা বলতে চাইবেন, যেমন পৃথিবীতে ঈশ্বর আছেন, তেমনি ভূতও আছে। একজনকে বাদ দিয়ে আর একজনকে স্বীকার করা যায় না। সুতরাং এই ভয় দূর করতে হলে তোমার ঈশ্বর বিশ্বাস দরকার। তা না হলে উরাট মাঠে বীজ রোপণ করা যায় না।

    অতীশ স্ট্যান্ডে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। সোজা স্টেশনে যাবে। চারপাশে মানুষজন পোকার মত থিকথিক করছে। বাসগুলিতে ওঠা যাচ্ছে না। বাসের পাদানিতে পর্যন্ত একটু পা রাখার ফাঁকা জায়গা নেই। কখনও সে বাসের ভিড় এড়াবার জন্যও হেঁটে অফিসে চলে যায়। তাঁর হাঁটার অভ্যাস আছে। কিন্তু আজ তাড়া আছে। আশেপাশে একটাও ট্যাকসি নেই। রিকশাতে যেতে পারে। তাতে আর কতটা সময় বাঁচবে। সে তারপর ভাবল, বাসে না গিয়ে ট্রামে গেলে হয়। ভিড়টা কম মনে হয় ট্রামে। কোনরকমে সে গুঁতোগুঁতি করে একটা ট্রামে উঠে গেল। নানারকম কথা হচ্ছে। সরকার কম্যুনিস্টদের গ্রেপ্তার করছে। কে যেন বলল, চীনের দালাল এরা। এবং এ সময়েই মনে হল, দেয়ালে ভেসে উঠছে লেখা, চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান। এটা মনে হবার কারণ কি সে বুঝতে পারল না। তবু এইসব ভাবনা তাকে স্বস্তি দেয়। অফিসে বোনাস নিয়ে কোন প্রকার গণ্ডগোল হয়নি। গত বছরের এগ্রিমেণ্ট ছিল। সেই সুবাদে সব হয়ে গেছে। এ-ভাবে নিজেকে আর কি ভাবে অন্যমনস্ক রাখবে বুঝতে পারছে না। অমলার কথা তাদের বৈভবের কথা ভাবতে পারে। এখন অন্য যে কোনও ভাবনাই তাকে আর্চির অস্বস্তির হাত থেকে রক্ষা করবে। কিংবা আড়াই মাসে টুটুল আর কতটা বড় হয়েছে! বাবাকে চিনতে পারবে ত! কারণ টুটুল মিণ্টু জানেই না তারা যত বড় হচ্ছে তত সে অসহায় বোধ করছে। নিরাপত্তার অভাব এত বেশি এই শহরে যে মানুষগুলোকে পাগলা কুকুর বানিয়ে ছেড়েছে।

    তখনই ট্রামটা স্টপেজে এসে গেল। ঘড়িতে পাঁচটা বেজে গেছে। সে কেমন দৌড়ে যাচ্ছিল। চারপাশের মানুষজনের প্রতি কোনও তার ভ্রূক্ষেপ নেই। এখনই এনকোয়ারিতে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে, ক নম্বর প্ল্যাটফরমে ট্রেনটা আসছে। লেট আছে কিনা। একটা প্ল্যাটফরম টিকিট কাটতে হবে। এগুলো সে স্টেশনে ঢুকেই সেরে ফেলল। ঘড়িতে দেখল, আরও আধ ঘণ্টাখানেক সময়। এই সময়টা সে কি করবে! এই সময়টা সে ভাবল মানুষজনের মুখ দেখে কাটিয়ে দেবে। অবশ্য এত নোংরা প্ল্যাটফরম যে পা ফেলার জায়গা নেই। দলে দলে উদ্বাস্তু আবার আসছে। সারা স্টেশন জুড়ে বাক্‌স প্যাঁটরা মলিন পোশাক পরা উদ্বাস্তুর দল। সেও এ-ভাবে তার বাবার সঙ্গে এ-দেশে এসেছিল। এখনও সেই মিছিল চলছে। এত ভালমানুষ জন্মায়, অথচ মানুষের নীচতা তাতে নষ্ট হয় না। ঈশম দাদার কথা আজ অনেকদিন পর হঠাৎ কেন জানি মনে পড়ে গেল। তিনি কেমন আছেন কে জানে। এরা কোথা থেকে এসেছে জিজ্ঞেস করলে হয়।—কোথা থেকে।

    —ফরিদপুর বাবু।

    লোকটা আরও কথা বলতে চাইছিল। কিন্তু অতীশ জানতে চায়, সেই সোনালী বালির নদীর চরের কাছাকাছি কেউ আছে কিনা। থাকলে যেন প্রশ্ন করত, ফতিমাকে চেনেন? সামসুদ্দিনকে। ঈশম দাদাকে। তারপরই মনে হল সবটাই সে কোনও অদৃশ্য প্রেতাত্মার ভয় থেকে করছে। এইসব মানুষেরাও এক অদৃশ্য প্রেতাত্মার শিকার। ঈশ্বর এবং প্রেতাত্মা কেউ কম যায় না। এরা ঈশ্বরের নামে তাড়া খেয়ে ভিটে মাটি ছেড়েছে। এবং এই সময় সে কেমন তার বাবার ওপর কিছুটা বিজয়ী। সে মনে মনে বলল, বাবা আপনার ঈশ্বরের অবস্থা দেখে যান। আপনার ঈশ্বর ঈশমদাদার ঈশ্বরের এই পরিণতি।

    সে তারপর আর দাঁড়াল না। দেখল সামনে সংখ্যায় প্ল্যাটফরম নম্বর ঝুলছে। ভিতরে ঢুকে গেল। কোথায় দাঁড়ালে ঠিক হবে বুঝতে পারছে না। পাশের প্ল্যাটফরমে একটা লোকাল গাড়ি এসে ভিড়ছে। মুহূর্তে প্ল্যাটফরমটা মশামাছির মত ভনভন করতে থাকল। চিৎকার এবং গুঞ্জন, ট্রেনের হুইসিল কানে প্রায় যেন গরম ইস্পাত ঢেলে দিচ্ছে। এবং কি ভয়ংকর উত্তেজনা তার। সে পায়চারি করছিল, আর ভাবছিল, কখন নির্মলার মুখ দেখতে পাবে। আগের দিকে থাকবে, না পেছনের দিকে থাকবে সেটা চিঠিতে জানালে ভাল করত। সে-ভাবে সে জায়গা ঠিক করে নিতে পারত। এবং সে বেশ অস্থির হয়ে পড়ছিল। পুত্র কন্যার মুখ দেখার জন্য অধীর হয়ে পড়ছে। কিছুটা সে বিচলিত বোধ করছে। দীর্ঘদিন পর স্বামীস্ত্রীর সঙ্গে দেখাদেখির বিষয়টা তার জানা নেই। আজ কেন জানি নির্মলার জন্য বড় বেশি আবেগ তার। কাল রাতেও। কিন্তু সবটা মাটি করে দিয়ে গেছে আর্চির প্রেতাত্মা। এখন আবার সেই জুজুর ভয়টা গ্রাস করতে চাইলে সে জোর করে ভাবল, সব মনের ভুল। সব সে ভুল দেখে। পাপবোধ তাকে পীড়ন করে চলেছে। যে ভাবেই হোক তাকে মনের জোরে লড়ে যেতে হবে। সে খুব স্বাভাবিক মানুষ। কাল রাতে জাগরণ গেছে নির্মলাকে কিছুতেই টের পেতে দেবে না। নির্মলা তবে ভেঙে পড়বে। এখানে ভেঙে পড়লে নির্মলাকে দেখার কেউ নেয়। ওখানে অন্তত আর কেউ না থাকুক তার বাবা ছিলেন।

    অতীশ মনে মনে বলল, কিরে টুটুল আমাকে চিনতে পারবি ত। ভুলে যাসনি ত আমাকে। হামাগুড়ি দিতে দিতে উঠে দাঁড়াস। দু-হাত তুলে বা বা করিস। সে নিজের সঙ্গে নিজে যখন এ-ভাবে কথা বলছিল তখনই ট্রেনটা প্ল্যাটফরমের ভেতরে মাথা বাড়িয়ে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সে ছেলেমানুযের মত ছোটাছুটি লাগিয়ে দিল। সে জানালাগুলো দেখে যাচ্ছে। কত মানুষ, ভদ্রজন, ভেণ্ডার, চাষী, শ্রমিক স্ত্রী পুত্র নিয়ে পরিবার, যুবক যুবতী, বুড়ো বুড়ি এবং হল্লা চেচাঁমেচি—সব আছে কেবল নির্মলা নেই। সে শেষ কামরা পর্যন্ত ছুটে গেল। না নেই। ওরা তাহলে আসেনি! চারপাশে মিছিলের মত মানুষজন। সে দ্রুত ছুটে যাচ্ছে। আহাম্মকের মত কতবার যাত্রীদের সঙ্গে ধাক্কাফাক্কা খেয়ে যখন একেবারেই নিরাশ, ফিরে যাচ্ছে তখনই চিৎকার মেজদা এদিকে। ঐ তো নির্মলা। প্ল্যাটফরমে বাক্স পেঁটরা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। টুটুল কোথায়? মিণ্টু! কিছুটা দুর থেকেই মিণ্টুকে দেখতে পেল। টুটুল দু-হাতে মায়ের পা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

    তাড়াতাড়ি বের হওয়া দরকার। মানুষটা ছুটে আসছে। সারা রাস্তার ক্লান্তি উদ্বেগ মুহূর্তে নির্মলার জল হয়ে গেল। মানুষটা আসছে। প্রায় ছুটে আসছে। নির্মলা তাড়াতাড়ি টুটুলকে কোলে তুলে নিল।

    অতীশ হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, এত সামনে থাকবে বুঝব কি করে! ওদিকে খুঁজছি। প্ৰহ্লাদ কাকা সব নামিয়েছে ত। হাসু একবার দেখে আয় আর কিছু আবার পড়ে থাকল কিনা।

    আর তখনই আশ্চর্য ছোট্ট টুটুল কেমন সহসা মার কোল থেকে অতীশের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল। টুটুল, দু-হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বাবাকে দেখে এতটুকু শিশু বোঝে কি করে সে বাবা। সে তার প্রিয়জন। অতীশও দু-হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। টুটুল অতীশের কোলে উঠেই গলা জড়িয়ে ধরেছে। অতীশ বলল, –তুই আমাকে চিনতে পারলি। –আমার কত ভয় ছিল, আমাকে ভুলে গেছিস হয়ত।

    নির্মলা বলল, কাণ্ড দেখ ছেলের। আমরা যেন কেউ না।

    অতীশ নির্মলার কথায় হাসল। সে এই প্রথম নির্মলার দিকে চোখ তুলে তাকাল। লক্ষ্য করল নির্মলা ওর দিকে ভাল করে তাকাতে পারছে না। ক্লান্তি অথচ চোখে মুখে বড় বেশি অধীরতার ছাপ। সে বুঝতে পারছিল, নির্মলা ওকে গোপনে দেখছে। তাড়াতাড়ি সে কিছুটা অন্যমনস্ক হবার মত বলল, নাও হাঁটো।

    কুলিরা মাথায় দুটো নীল রঙের ট্রাংক বিছানা তুলে নিয়েছে। মিণ্টু পা পা হেঁটে যাচ্ছে। টুটুলটা ভীষণ পাজি। বাবাকে দখল করে বসে আছে। ওর ভারি হিংসা হচ্ছিল! সে কাছে গিয়ে বলল, বাবা আমি মিণ্টু।

    —হ্যাঁ মা। তুমি আমার মিণ্টু। বলে সে নুয়ে এক হাতে মিণ্টুকেও বুকে তুলে নিল। এবং দুজনেই পরম নির্ভয়ে বাবার গলা জড়িয়ে কেমন শরীরে বাবা বাবা গন্ধ শুঁকছে। যেতে যেতে অতীশের মনে হচ্ছিল, শিশুরা বোধহয় গন্ধ শুঁকে টের পায় কে তার আপনজন। টুটুল কত কথা বলছে যার মাথামুণ্ডু সে কিছুই বুঝছে না। এক অতিকায় শেডের নিচে সে তার পুত্রকন্যাকে বুকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পরম গভীর উষ্ণতায় অতীশ জীবনের অন্য এক মহিমা অনুভব করল আজ। যেন কতকাল ধরে এদেরই প্রতীক্ষায় সে এই পৃথিবীতে বসেছিল।

    হাসুর হাতে একটা অ্যাটাচি, একটা লেদার ব্যাগ। প্রহ্লাদ কাকা নিয়েছে বড় একটা পুঁটলি। মার দেওয়া সব টুকিটাকি জিনিষ আছে এতে। প্রহ্লাদ কাকার কাছে ওটা খুবই মহার্ঘ বস্তু। সব ফেলে গেলেও যেন কিছু আসে যায় না। কিন্তু এটা বাসায় পৌঁছে দেওয়া তার বড় দরকারী কাজ। নানারকমের আচার, আমসত্ব, লেবু, আনারস, গাছের পেয়ারা, ক্ষেতের মুসুরি ডাল, কিছু সুগন্ধ আতপ চাল—ছেলে কি খেতে ভালবাসে না বাসে, সব ঐ পোঁটলাটা খুললেই বোঝা যাবে। সুতরাং প্রহ্লাদ কাকা খুব প্রফুল্ল চিত্তে এখন যেতে পারছে। সে এই কলকাতা শহরে কখনও আসেনি। দরজার গোড়ায় সব নামিয়েই বলল, মেজবাবু আমাকে একবার কালীঘাট দর্শন করিয়ে দেবেন।

    নির্মলা শেষ পর্যন্ত এত বড় বাসাবাড়ি দেখে অবাক। পুরানো বাড়ি, নতুন চুনকাম করা, দু- ঘরে দুটো তক্তপোশ। একটা টেবিল, বসার দুটো চেয়ার এবং বাসাটার পক্ষে এগুলি খুবই অকিঞ্চৎকর—কারণ, সোফা সেট, বাতিদান কিছুই নেই। জানালায় পর্দা কেনার পয়সা মানুষটার হয়নি। গাঁয়ের বাড়িতে একভাবে কেটে যায়। শহরে এলে যেন এসবের দরকার বোধ হয়। কিন্তু নির্মলা মানুষটাকে জানে—চলে যাবার মত হলে সে বেশি কিছু চায় না। নির্মলার বাপের বাড়ির আত্মীয়স্বজন বড়ই প্রতিষ্ঠিত জীবনে। ওর বাবার যেমন গাড়ি বাড়ি আছে, আত্মীয়স্বজনদেরও তেমনি। সেদিক থেকে তার মানুষটা প্রায় খুব গরীবই বলা চলে। এবং মানুষটার এ-জন্যই তার বাপের বাড়ির প্রতি একটা তাচ্ছিল্য ভাব আছে। গরীবের অহংকার তো ঐ এক জায়গায়। সব কিছু তুচ্ছ করে দেখা। এবং তার মানুষটার ধারণা দেশটা যা তাতে বাড়ি গাড়ি সোফা সেট মানুষের মানায় না। যে পারে তাকে কিছুটা অধার্মিক হতেই হয়। কোনও না কোনভাবে সে শোষণের হাতিয়ার হয়ে পড়ে।

    এই রাজবাড়ি, বাসা এবং সামনে পাতাবাহারের গাছ, কিছু দূরে বড় এক শেফালী ফুলের গাছ, তারপরে বাগান, বাবুর্চি পাড়া, পুকুর, মাঠ এবং ছোটখাট একটা ঈশ্বরের বাগান এটা— এ-সব খবর চিঠিতেই জানতে পেরেছিল নির্মলা। মনে মনে সে এমনই আশা করেছিল। বাতিগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। কুম্ভবাবু খবর পেয়ে এসে গেছে। টুটুলকে কোলে নিয়ে আদর করছে। নির্মলাকে বৌদি বৌদি করছে। ওর বৌ এসে ঘরদোর ঠিকঠাক করতে লেগে গেল নির্মলার সঙ্গে। অতীশ হাসুকে স্নান করে নিতে বলল। স্টোভে চা বসানো হয়েছে। কুম্ভবাবুর কথাবার্তা শুনে নির্মলা খুব খুশি। মানুষটা তাহলে একজন ভাল সহকারী পেয়ে গেছে। শহরে এ-সবের বড়ই দরকার।

    অতীশ বলল, প্রহ্লাদকা, এখন একটু চা মিষ্টি খাও। পরে রান্না হলে খাবে।

    —নাগো মেজবাবু। সারা রাস্তায় বৌমা বড়ই খাইয়েছে। মিষ্টি খেয়ে সুখ পাব না। রাত হলেই খাব।

    টুটুল কখন তক্তপোশের নিচে গিয়ে বসে আছে। মিণ্টু টুটুলের ঠ্যাং ধরে টেনে আনছে। আর ডাকছে বাবা বাবা টুটুল কথা শুনছে না। দুষ্টুমী করছে। আমাকে কামড়াচ্ছে।

    নির্মলা বলল, তোরা এসেই দু’জনে লাগলি!

    অতীশের এসব বড় ভাল লাগছিল। এতদিন সে যেন বনবাসে ছিল। মনমরা, কেউ নেই, কেমন সম্পর্কহীন হয়ে পড়ছিল। আর্চি এই সুযোগে তার ওপর বেশ হামলা চালিয়ে গেছে। এখন আর্চি আসতে ঠিক ভয় পাবে। আর কাউকে না পাক টুটুল মিণ্টুকে পাবে। কারণ এ-বয়সে এরা বড়ই পবিত্র। ফলে আর্চির আক্রোশ থাকার কথাও নয়। তারপরেই কেন জানি মনে হল, এরা তার জাতক, যদি আর্চি এদের কোন অনিষ্ট করতে চায়; যদি আর্চি টের পেয়ে যায় তার পৃথিবী বলতে এরাই। সে কিছুটা তক্ষুনি কেমন ম্রিয়মাণ হয়ে গেল। সামনেই বড় সেই পুকুর। কালো জল। হেঁটে হেঁটে যদি টুটুল চলে যায়, যদি পড়ে যায়, অথবা কে জানে, কোনও এক অদৃশ্য আক্রোশ কখন কিভাবে যে আক্রমণ করবে! পুকুরটা যে এত ভয়ের হতে পারে, টুটুল মিণ্টু আসার পরই অতীশ কেমন টের পেয়ে গেল সেটা।

    নির্মলা তখন চা করে এনেছে। কুম্ভবাবু বলল, বৌদি কেমন লাগছে জায়গাটা।

    —খুব ভাল। আর একটা মিষ্টি দি—?

    কুম্ভ বেশ মনোযোগ সহকারে খাচ্ছে। অতীশকেও দেওয়া হয়েছে। চা নিয়ে তক্তপোশে বসতেই কোথা থেকে ঠিক গন্ধ পেয়ে টুটুল টলতে টলতে চলে আসছে। এক মাথা চুল, চোখ টানা। আর চাপা নাক বাদে এই ছেলের আর সবই বাপের মত। অতীশ ছেলেকে ভাল করে দেখছিল। টলতে টলতে এসে হাঁটুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। অতীশ ছেলেকে বসালে টুটুল গা বেয়ে উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে বাপের চা টেনে নিতে চাইল। মিষ্টির প্লেট টেনে ফেলে দিতে চাইল। বাধ্য হয়ে অতীশ কিছুটা মুখে দিতেই শান্ত, চুপচাপ। আসনপিঁড়ি হয়ে ভাল ছেলে হয়ে গেল টুটুল। কেবল মুখের খাবার শেষ হয়ে গেলেই অস্থির হয়ে পড়ছে। মিণ্টু টুটুলের এতটা সহ্য করতে পারছিল না। সে বড় হয়ে গেছে এ-বোধটুকু খুব প্রবল। কাছে এসে বলল, নাম নাম। বাবা খাচ্ছে। খেতে নেই। কিন্তু জোরজার করেও নামাতে পারছে না। টুটুল বাপের জামা খামছে ধরে রেখেছে।

    অতীশ এবার মিণ্টুকে তুলে নিল আর এক পাশে। এবং মিণ্টুর মুখে দিতেই সেও খুব ভাল মেয়ে হয়ে গেল। বলল, বাবা পুতুল দেবে। আমি পুতুল নেব। বাবা, একটা না বড় সাপ তেড়ে গেছিল। তুমি ভয় পাও না বাবা?

    —হ্যাঁ মা আমিও ভয় পাই।

    —টুটুলটা দুষ্টু, ও ভয় পায় না।

    দিদির এসব কথা টুটুল গ্রাহ্য করছে না। সে প্রাণপণ বাপের সঙ্গে খেয়ে চলেছে। নির্মলা একবার এসে ধমক লাগাল, মানুষটাকে বসে তোরা শান্তিতে একটু খেতে দিবি না। নাম বলছি। অতীশের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কি! নিজে খাচ্ছ না কেবল ওদের খাইয়ে যাচ্ছ। পেট ছাড়লে আমি কিছু জানি না বাপু।

    সবই এত ভাল লাগছে কেন। এই যে সামান্য অভিমান নির্মলার তাও এত মধুর মনে হচ্ছে কেন! সে নিজে আরও উপভোগ করার জন্য টুটুলের মুখে সামান্য সিঙাড়ার কুচি দিতেই ঝাল খেয়ে থুতু ছিটাতে থাকল। তারপর না পেরে বাপের ধোয়া জামায় মুখ ঘষতে লাগলে জামাটায় হলুদ ছোপ ধরে গেল। নির্মলা এসে যখন দেখল রেগে কাঁই।—দাগটা উঠবে ভাবছ!

    অতীশের সবই ভাল লাগছিল। বড় ভাল লাগছিল। জীবনের এই ভাল লাগাটার দাম সামান্য দাগে কিছু আসে যায় না। সে বলল, কুম্ভবাবু হাসিরাণীকে একটা লক্ষ্মীর পট কিনে দেবেন। মাঝে মাঝে কেন জানি মনে হয় সংসারে এই পটটা বড়ই দরকার।

    কুম্ভ মনে মনে বলল, সবই দেব। আগে আপনাকে কি দিই দেখুন। তার এখন কাজ এ লোকটাকে বাগে আনা। সেই যে কি বলে না, ঘোড়া হাতি গেল তল, তারপরের লাইনটা সে মনে করতে পারল না। প্রথম রাউণ্ডে সে জিতেছে। নবর কাজে বাগড়া দিয়েছে। সনৎবাবুর ইগোতে ধুনি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। দ্বিতীয় রাউণ্ডটা জটিল ছিল বলেই পারেনি। রাজার কাছে ফয়সালার সময় সে আর সনৎবাবু এক পক্ষ থাকবে এমনটা তার মনে হয়েছিল—কিন্তু স্যারটি বেশ কায়দা করে ধরি মাছ না ছুঁই পানির মত ভণ্ড সেজে বসলেন। ফলে দ্বিতীয় রাউণ্ডে তার হার হয়েছে। তাছাড়া এই লোকটার পেছনে বউরাণী আছে। রাজা একটা ম্যাড়া। কি যে তুকতাক করেছে—বউরাণীর ওপর এখন রাজবাড়িতে কারো কথা নেই। শেষপর্যন্ত জাল মাল তৈরী করা নিষিদ্ধ হয়ে গেল। যুদ্ধক্ষেত্রে জয় অনিবার্য সে জেনে এসেছে। এতে তার সহায় মা তারা। সকালে উঠেই স্নান সেরে মার পায়ে রাঙাজবা দেয়। ভূলণ্ঠিত হয়। মা, মাগো আমার কি অপরাধ বল। অজ্ঞানের জ্ঞান তুই মা তারা। ভুল হলে পথ দেখাস মা। সে হেরে গিয়ে মায়ের কাছে প্রায় হত্যা দিয়ে পড়েছিল। বুড়ো ম্যানেজারকে তাড়ানো থেকে লেবার প্রব্লেম ট্যাকল করা কত ওস্তাদী লাগে হাসিরাণী যদি বুঝত! সবই মায়ের কৃপা। এখন কৃপা পরবশে সে বুঝছে, কিছুদিন এই লোকটার হিতৈষী সেজে থাকা ভাল। কোনদিকে কে ধোঁয়া দেবে কে জানে। সে বলল, কি যে বলেন না দাদা! হাসিকে লক্ষ্মীর পট দেবেন তা আবার আমাকে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে?

    —না যদি কিছু মনে করেন আবার!

    —এই বোঝলেন, বৌদি দেখুন বৌদি, ও বৌদি আমাকে কেমন পরপর ভাবছে।

    নির্মলা সব গোছগাছ করছিল, সে শুনতে পাচ্ছে সব। পাশের ঘর থেকেই বলছে, আপনার দাদার আবার ঈশ্বর বিশ্বাস কবে থেকে হল। ওতো এসব কিছু মানে না।

    অতীশের কোলে টুটুল। হাসুর স্নান হয়ে গেছে। নির্মলা ও-ঘর থেকেই কথা বলছে। ঈশ্বর বিশ্বাস নিয়ে কথা বলছে, টুটুলকে কোলে নিয়ে সে কেমন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আসলে আশ্রয়। হাসিরাণীর কিছুটা আশ্রয়ের অভাব আছে। কাবুল-বাবুর সঙ্গে সম্পর্কের কথাও তার মনে এসেছে। সেই থেকে কেন জানি মনে হয়েছে—একটু আশ্রয় পেলে প্রলোভনের হাত থেকে হাসি মুক্তি পাবে। মা জ্যাঠিমারা যেমন সব প্রলোভন থেকে নিজেদের আত্মরক্ষা করতে শিখেছিলেন হাসিরাণীও তেমনি তার প্রলোভন থেকে মুক্তি পাক।

    মানুষের শুভাশুভের বিশ্বাস থেকেই কথাটা বলা। এটাকে অতীশ সেভাবে ঠিক ঠিক ঈশ্বরে বিশ্বাস ভাবে না।

    কুম্ভবাবু ভূত দেখার মত অতীশকে দেখছে। মানুষের ঈশ্বর বিশ্বাস না থাকলে সে শুনেছে শয়তান হয়ে যায়। একমাত্র শয়তানেরই ঈশ্বর বিশ্বাস থাকে না। আর সেই উটকো সব কম্যুনিষ্ট আছে তারাও এটা করে না। কুম্ভর কাছে কম্যুনিষ্ট আর শয়তান এক। সে তাদের ফারাক বড় বেশি বোঝে না। সে বলল, দাদা আপনি তাহলে কম্যুনিষ্ট।

    অতীশ হা হা করে হেসে উঠল। বলল, সুযোগ পেলাম কোথায়। দাড়ি গোঁফ না গজাতেই পেটের টানে বের হয়ে পড়েছি।

    —কিন্তু এটা ত ভাল কথা নয়।

    তারপরে তলে তলে কুম্ভর কূট অভিসন্ধি কাজ করতে থাকে। এই শয়তানের ভয় রাজবাড়িকে বড়ই কাবু করে রেখেছে। কম্যুনিষ্ট গন্ধ পেলেই হল। এবং এই সুযোগটা হাতছাড়া করা তার বোকামি হবে। সে আরও সামান্য রগড়ে দেখতে চাইল, বলল, ঈশ্বর ত কারো ক্ষতি করে না দাদা। তিনি মঙ্গলময়। সন্তান-সন্ততি নিয়ে ঘর করেন, ঈশ্বর বিশ্বাস করেন না, অসুখে বিসুখে ভরসা পাবেন কিসে।

    অতীশ বলল, এখনও ভেবে দেখিনি সেটা!

    যাই হোক কুম্ভ বুঝতে পারল, সহজে নড়ে বসবে না। ধীরে ধীরে চামড়া খসাতে হবে। একদিনে হবার নয়। সে উঠে যাবার সময় বলল, দাদা যাই। তারপর টুটুলকে চুমু খেল। মিণ্টুকে দুবার লাফিয়ে ওপরে তুলে ধরে ফেলল।

    নির্মলা বলল, মানুষটা বেশ।

    অতীশ কিছুই বলল না। সে জানালায় দেখল সেই পাতাবাহারের গাছ। সবাই শুয়ে পড়লে সে গোপনে বের হয়ে দেখবে—আজও পাতায় জল লেগে আছে কিনা। তারপর কেমন ভীতু গলায় নির্মলাকে ডেকে বলল, সামনেই পুকুর। টুটুল মিণ্টুকে চোখে চোখে রেখো। পুকুরটা ভাল না। প্রায় বছরই কেউ না কেউ ডুবে যায়।

  • চৌদ্দ

    চৌদ্দ

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    চৌদ্দ

    চার-পাঁচ দিন ধরে কি বৃষ্টি। সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া। পথঘাট ট্রাম-বাস বাড়ি-ঘর সব বৃষ্টিতে লেপ্টে ছিল। সকালের কাগজে শুধু এক খবর। দেশের কোথায় বন্যা, কোথায় ব্রিজ ভেঙে গেছে, কোথায় ট্রেন অচল হয়ে থেমে আছে তার খবরে সকালের কাগজটা ভরা। বড় বড় হেড লাইন, যেন কাগজে তখন এই খবরটাই মানুষের পড়ার কথা। সব কাগজগুলোয় সংবাদদাতাদের নিদারুণ অভিজ্ঞতার বর্ণনা, শষ্যহানির খবর। গবাদি পশু সব ভেসে গেছে। জলবন্দী মানুষজন উদ্ধারের জন্য মিলিটারি নেমেছে। বর্ষাকাল এলেই এই এক খবর। তারপর হেমন্ত আসে। সোনালী ধানের মাঠ তখন দিগন্তব্যাপী। বান বন্যায় ভেসে গিয়েও মানুষের জন্য কিছু না কিছু আবাদ টিকে থাকে।

    মানসনারায়ণ চৌধুরীর ঘরেও আজকাল কেউ কাগজ দিয়ে যায়। সে বাথরুম থেকে ফিরেই দেখতে পায় কাগজটা পড়ে আছে। আজকাল সে আর উত্তেজিত হয় না। উত্তেজিত হলেই মাথার মধ্যে অযথা সব রেলগাড়ি ঢুকে যায়। সে ঠাণ্ডা মাথায় আজকাল কাগজ পড়তে পারে। এখন তার ঘরে তালা পড়ে না। সে ইচ্ছে মত রাস্তায় বের হতে পারে। একদিন গড়ের মাঠে গিয়েও বসেছিল। বাইরে যেতে চাইলে তাকে পুরানো ভকসল গাড়িটা দেওয়া হয়। বাহাদুর তাকে শহরটা ঘুরিয়ে দেখায়। কোনো পার্কে তার পায়চারি করতে ভাল লাগলে রাত করে ফিরতে ভালবাসে। কিন্তু রাজেনটা আবার কি মনে করবে—সেতো স্বাভাবিকভাবেই সব করে যায়, কিন্তু ঠিক সময় না ফিরলেই একটু বেশি হাঁটাহাঁটি করতে চাইলেই কেমন সংশয়ের চোখে তাকায় রাজেন। যেন সে বড়ই কুকর্ম করে ফেলছে।

    বৃষ্টির জন্য কদিন এই ঘরেই বন্দী হয়ে আছে। কাগজটা সারাদিন উল্টে-পাল্টে দেখে। কখনও কখনও একই লাইন বার বার পড়ে। নবীন যুবকের পাশে বসে থাকলে সে কেমন স্বস্তি পায়। অতীশের চোখে এমন কিছু আছে যা তাকে বেঁচে থাকার প্রেরণা দেয়। সেটা কি সে ধরতে পারে না। বেচারা পঞ্চানন বলেছে, হুজুর অতীশবাবুকে বলেন ত ডেকে দি। পঞ্চানন কি বুঝতে পেরেছে সে অতীশের জন্য টান বোধ করে। সে ত কখনও কাউকে কিছু বলে নি। কিছু দিন তার পাশের ঘরটায় অতীশ ছিল। ওর ছবির খুব প্রশংসা করেছে অতীশ। বলেছে, দাদা আপনি কেন ছবি আঁকা ছেড়ে দিলেন। ওটা ছাড়বেন না। মানুষের ত বেঁচে থাকার জন্য কিছু একটা চাই। কতদিন পর যেন শুনতে পেল সে সত্যি ভাল ছবি আঁকে। তাঁর হাত পরিষ্কার। মাষ্টারমশাইরাও এমন বলতেন। মডেলের ক্লাসে তার মত সুন্দর সতেজ ছবি কেউ আঁকতে পারত না। সবচেয়ে ওটাই ছিল তার প্রিয় ক্লাস। ইদানীং সে আবার ছবি আঁকা শুরু করেছিল। বৃষ্টিতে বের হতে পারে নি। সরকারবাবুর কাছে পঞ্চাননকে দিয়ে একটা লিষ্ট পাঠিয়েছিল। একটা ইজেল, কিছু জলরঙ এবং বুরুশ পঞ্চানন দিয়ে গেছে। ছবি আঁকতে না পারলে তাঁর মাথার মধ্যে রেলগাড়ি ঢুকে না গেলেও পাশ দিয়ে চলে যায়। ছবি আঁকতে না পারলে তাঁর কষ্ট হয়—তখন হাবিজাবি মাথায় যা আসে তাই দেয়ালে লিখতে থাকে। যেন গত জন্মের কথা লিখে যাচ্ছে। সেই কথাগুলো রাজেন এত ভয়াবহ ভাবে কেন সে বোঝে না। ঘরে যারা ঢুকতে পায় তারা দেখে ফেলবে ভয়েই রাজেনটা তখন তালা দিয়ে দিতে বলে? তারপর আবার নদীর জল সরে গেলে যেমন বালিয়াড়ি পড়ে থাকে তেমনি কখনও সে গত জন্মের কথা ভুলে গেলে, ভাল পোশাকে, বনেদীয়ানার সব পুরস্কার কপালে—আর তারপরই ঘরে চুনকাম হয়ে যায়। বার বার, পাঁচ-সাত বার বছরে ঘরটা চুনকাম করা হয়ে যায় এভাবে। মানস খুবই এতে মজা পায়।

    কিন্তু সেই নবীন যুবক উসকে দিয়ে গেল, প্রায় আগুনে ঘি ঢালার মত, বলে গেল মানসদা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এটা বড় দরকার। আপনার কি হারিয়েছে আমি জানি না, মানুষ কিছু না হারালে এমন হয় না। আপনার ছবি আঁকা খুব দরকার। অভ্যাসটা রাখুন। অন্য এক রহস্য খুঁজে পেলে যা হারিয়েছে তা আবার ফিরে পাবেন।

    অতীশ চলে যাবার পর সে পঞ্চাননকে দিয়ে একটা ফিরিস্তি পাঠিয়ে দিয়েছিল। ঘরে এখন ইজেল, রঙ, বার্নিস যা দরকার সব আছে। বৃষ্টির কদিনে সে একটা মাত্র ছবি আঁকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কি এঁকেছে সে নিজেই বুঝতে পারছে না। সে প্রথম আঁকতে চেয়েছিল, নদীর পাশে রাজবাড়ি, সামনে বালির চর, দুজন অশ্বারোহী যুবক রাজবাড়ির দিকে উঠে আসছে। ঘোড়া দুটো কদম দিচ্ছিল। প্রথম ছোট একটা আর্ট পেপারে স্কেচ করতে গিয়ে মনে হল একটা ঘোড়ার মুখ বড়ই লম্বা। আর একটা বড়ই বেঁটে। তারপর মনে হল, ঘোড়ার মুখই হয় নি কেমন জিরাফের মুখের মত লম্বা। তবু রঙ তুলি নিয়ে যখন বসল—সেটা শেষ পর্যন্ত কি দাঁড়াল বুঝতে পারছে না। আবছা অন্ধকারে এক বিশাল রাজবাড়ির ছায়া, আরও অস্পষ্ট দুটো ঘোড়া, অশ্বারোহী আছে কি নেই বোঝা যায় না। কেবল সাদা বালিয়াড়ি আর নদীর জল স্পষ্ট। তার মনে হল, কাগজে রঙ দেয় নি বলে বালিয়াড়িটা সাদা দেখাচ্ছে। সেটা এই ছবির সঙ্গে বেমানান। সে সেখানে কিছু পিংক কালার এবং ব্লু রঙে আবছা ছাই রঙ করে দিতেই গোটা ছবিটা বিশ্রী হয়ে গেল। মনে হল ঘোড়ায় চড়ে ফেরার পথে প্রাসাদ অলিন্দে কিরানা ঘরানার ধারক কোনও সঙ্গীতশিল্পীর সুর ছবিতে জেগে উঠছে না। গোটা ছবিটাই তার কাছে কেন জানি অর্থহীন মনে হচ্ছে।

    তারপর মানস ছবিটা দু’দিন ফেলে রেখে অন্য একটা ছবিতে মন দিয়েছিল। কিছু কাঁচের গ্লাস। লাল মদ। দুজন প্রবীণ মানুষ দরজা দিয়ে ঢুকছেন। একজনের মাথায় উষ্ণীষ, গায়ে রাজার পোশাক। অন্যজন টাক মাথা বেঁটে-খাটো মানুষ। ধুতি পাঞ্জাবি পরনে। কিন্তু মুখটা একজনের উটের মত হয়ে গেল। অন্যজনের বাঘ। সে বুঝল, হবে না। সে তারপর কদিন কিছুই আঁকেনি। কদিন থেকে অতীশের পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না, যে তাকে ডেকে দেখাবে। সে দেখলে বুজতে পারত ছবিটা কিভাবে শেষ করা যায়। মাথায় এক রকমের চিন্তা থাকে, ছবিটা আঁকতে গেলে সেই চিন্তা গুলিয়ে যায়। তখন আর মনে করতে পারে না আসলে সে কি আঁকতে চেয়েছিল।

    পঞ্চানন সকালের খাবার নিয়ে এসেছে। ওর খাওয়া হলে সব নিয়ে যাবে। সে খেতে খেতে বলল, অতীশবাবুকে ডেকে আনবি বলছিস?

    —হুজুর আপনার চোখ মুখ ভাল নয়। অতীশবাবু ছিলেন বলে বেশ ভাল ছিলেন।

    —তা ছিলাম। কিন্তু বেচারা বৌ-ছেলেপিলে নিয়ে এসেছে। কারখানার কাজের চাপ। রাত-দিন পড়ে থাকছে শুনছি, বাড়িতে কি পাবি?

    —হুজুর দেখে আসব?

    —আয়।

    —কিছু বলব?

    —আজ রববার না?

    পঞ্চানন বলল, আজ্ঞে।

    —দাঁড়া। বলে মানস একটি চিঠি লিখল—অতীশ, তুমি আমাকে ভুলে গেছ। আমি তোমার মানসদা। বড়ই বিপদে আছি। সময় এবং সুযোগমত একবার পারলে এস।

    পঞ্চানন অতীশকে একেবারে সঙ্গে নিয়েই এসেছে। বারান্দায় ঢুকে পঞ্চানন বলল, যান ভিতরে যান।

    অতীশ ভিতরে ঢুকে দেখল, মেঝেতে অজস্র ছবি ছড়ানো! সে খুব আগ্রহের সঙ্গে একটা তুলে নিয়ে দেখল—বিরাট ফাঁকা ঘরে দুজন সারেঙ্গিবাদক বসে আছে। নামাজ পড়ার মত হাঁটু ভাঁজ করে বসার ভঙ্গী। চোখ উর্ধ্বনেত্র। ছাদের ফুটো থেকে একটা হাত বের হয়ে আসছে। ঠিক এমনই একটা ছবি বিলিয়ার্ড টেবিলটা যে ঘরে আছে সেখানে বাঁধানো রয়েছে। অতীশের মনে হল, তবে সেই ছবিটাও এই মানুষ এঁকেছেন। ছবিটা দেখে সে প্রথম ভয় পেয়ে গেছিল। একটা কালো কোট তার হাত দেয়াল ফুটো করে বের করে দিয়েছে। নিচে নিস্তরঙ্গ জল। ছবিটা দেখে ভয় পাওয়ায় শরীর বেশ শিরশির করে উঠেছিল।

    অতীশ বলল, অনেক ছবি দেখছি।

    —অনেক কোথায়। দুটো ত।

    সে বলল, এই যে।

    মানস বলল, ওগুলো কিছু না। তুমি এটা দেখ। কিছু হয়েছে কিনা দেখ। অতীশ দাঁড়িয়েই ছবিটা দেখছিল।

    —বসে দেখ না। এই পঞ্চানন, চেয়ারটা এগিয়ে দে-না।

    অতীশ বসতে বসতে বলল, আপনি করেছেন কি!

    মানস কিছুটা যেন শঙ্কা বোধ করল। তাহলে কি সে সত্যি যা আঁকতে চেয়েছিল সেটাই ফুটে বের হচ্ছে। আর অতীশ সেটা বুঝতে পেরে ভয় পেয়ে গেছে। রাজবাড়ির চেহারাটা অতীশ তাহলে দেখতে পাচ্ছে। সে বলল, তুমি ভয় পাচ্ছ?

    অতীশ মানসদার কথার অর্থ ধরতে পারল না। ছবিটা থেকে মুখ তুলে মানসদার দিকে তাকিয়ে থাকল।

    —ভয় পাচ্ছ কিনা বল! ছবিটা তাহলে যা আঁকতে চেয়েছি তাই হয়েছে বলছ। রাজেনটা তবে ক্ষেপে যাবে। কি যে করি!

    অতীশ ভারি অবাক হল। বলল, ছবিটা আমাকে দিন। বাঁধিয়ে রাখব। দেয়ালে টাঙাব। রাজেনদা রাগ করবে কেন।

    —কি জানি। আমি ত রাজেনকে ক্ষমাই করে দিয়েছি।

    তার বলতে ইচ্ছে হল, রাজেনদা আপনার কে হয়! এ-বাড়িতে এসে বুঝেছি, সবাই এখানে বুঝে ফেলেছে, এই শেষবেলা, যে যে ভাবে পারো গুছিয়ে নাও। সিগনাল ডাউন হল বলে। একমাত্র আপনিই নির্বিকার। রাজার সব লোক এখন টের পেয়েছে—এদের যা অবশিষ্ট আছে তার কিছুটা লুটেপুটে নিলেও তিন পুরুষের নিশ্চিন্তি। কিন্তু আপনি বসে আছেন। আপনি এই রাজবাড়িতে আশৈশব মানুষ। পুরানো লোকেরা কিছু খবর রাখে। কুম্ভ মাঝে মাঝেই বলে, বলতে পারি বলব না। এ-ব্যাপারে আমার আগ্রহ অনাগ্রহ সমান। ভয় যদি কুম্ভ আপনাকে ছোট করতে চায়, রাজেনদাকে ছোট করতে চায়। মানুষ ছোট হয়ে যাচ্ছে দেখলে আমার কেন জানি কষ্ট হয়।

    —এই কি—তুমি ছবিটা নিজেই কেবল দেখছ! কি দেখছ বলছ না কেন!

    —একটা বড় স্মৃতিসৌধ মনে হচ্ছে আঁকতে চেয়েছেন।

    তারপর কি ভেবে অতীশ বলল, গভীর অন্ধকার থেকে দু’জন অশ্বারোহী পুরুষ উঠে আসছে। পেছনে সাদা বালিয়াড়ি। বোধহয় জ্যোৎস্না পড়ায়, সেটা হয়েছে। আকাশ আবছা মেঘে ঢাকা। ফাঁকে ফাঁকে জ্যোৎস্না বৃষ্টির জলের মত নেমে আসছে। তার পেছনে নদী, ওপরে অস্পষ্ট কুয়াশা। সময়টা শীতকাল—ছবিটা দেখে তাই তো মনে হচ্ছে।

    মানস ছবিটা ওর হাত থেকে টেনে নিল। নিজে ভাল করে দেখল, আবার। কিন্তু কিছুই মিলছে না। সেই কুমারদহ রাজবাটীর ছবি এটা যেন নয়। সে ত এখন ভগ্ন প্রাসাদ। দেবোত্তর সেবাইত, দু’জন গোমস্তা একজন খাজাঞ্চি মাত্র থাকে। বিরাট সব আম বাগান, শহরে কিছু বাড়ি ভাড়া, একটা বাজার, কিছু বালির চর এবং বড় বড় সব তৈলচিত্র, মাঝে মাঝে রাজেনটা বিদেশ গিয়ে কি করে সব, তারপরই সাহেব-সুবোরা আসে। সব নিয়ে গাড়ি করে চলে যায়—কাঠের কাজ করা বাতিদান থেকে মিনে করা সব সৌখিন আসবাবপত্র, পূর্বপরুষদের সংগ্রহ করা ছবিও পাচার করে দেয় তারা। এই রাজবাড়ির ঘরে ঘরেও জমে আছে সব এমন কত অমূল্য সম্পদ। সব খালি করে দিচ্ছে রাজেনটা। সে ত আঁকতে চায় নি। আঁকতে চাইলে শস্য-বিহীন একটা মাঠের সে ছবি আঁকত। তাতেই বড় রকমের শূন্যতা ধরা যায়। আসলে যে পাপ বাপ-পিতামহের আমল থেকে জমা হয়ে আছে তার কিছুটা প্রথা-প্রকরণ মেনে ছবি আঁকা ছিল তার বিষয়বস্তু। অতীশ ধরতে পারছে না। না সে চেয়েছিল, ঘোড়ায় সে এবং রাজেন। পেছনের অন্ধকারে খুব আবছা নারী মূর্তি—সেটা অতীশ কেন খেয়াল করল না। সেই আবছা নারীমূর্তিটা রাজপ্রাসাদ গ্রাস করছে সেটা অতীশের নজরে এল না কেন! অতীশ অন্য সব ছবিগুলিও তুলে তুলে দেখছে। ছবিগুলির নাম দিয়েছেন, সাদা ফুল। বসন্ত। নদীতটে আমি জারজ সন্তান। কালের ঘোড়া। পতিতালয়। এমন সব কত হিজিবিজি নাম। ছবির সঙ্গে নামগুলির প্রায় কোন দিক থেকেই মিল নেই। যেমন ‘বসন্ত’ ছবিটাতে শুধু কালো কিছু ফুটকরি। আঁকাবাঁকা গাছের অভ্যন্তরে কোনও পক্ষী শাবকের লেজ। দুটো সরীসৃপ গাছের গোড়ায় ওৎ পেতে বসে আছে। অতীশ এ-বয়েসেই কিছু কিছু শিল্পীর জীবনী পড়েছে। কোনও না কোনওভাবে এরা অধিকাংশই অর্ধ-উন্মাদ। সে এবার মানসদার দিকে তাকাল। কিছু তাকে বলছেনও না। কোথাও যদি আরও ছবি থাকে—সেখানে যদি মানসদা নিজেকে তুলে ধরেন। সে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকল। একটা ছবি আশ্চর্য লাল রঙে আঁকা। আগুনের লেলিহান গ্রাসের মধ্যে নির্বিঘ্নে এক উলঙ্গ নারী বসে আছে। মুখ চোখ আশ্চর্য রকমের শান্ত। নাম দিয়েছেন ব্যভিচারিণী। একমাত্র এই ছবিটার সঙ্গে নামকরণের আশ্চর্য সার্থকতা পেয়ে বলল, মানসদা এ ছবিটা কবে আঁকলেন।

    ছবিটা দেখে বলল, ও ওটা অমলার ছবি। ফেলে দাও। আমার কাছে ছবিটার কোনও দাম নেই। ইচ্ছে করলে নিয়ে যেতে পার। তোমার সঙ্গে শুনেছি খুব ভাব। তারপরই কেমন সচকিত হয়ে গেলেন। কি যেন তার জিজ্ঞেস করার আছে অতীশকে। মানসদা এবার হাত থেকে ছবিটা ঝেড়ে ফেলে দিলেন। এতক্ষণ যেন বড়ই অপবিত্র বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছিলেন, বললেন অমলাকে তুমি চেন শুনেছি।

    —কার কাছে শুনলেন?

    —আমার কাছে সবাই খবর দিয়ে যায়। ও বাবু এবারে আবার খেলা জমে উঠল।

    অতীশ বলল, একথা কেন?

    —এই আর কি। ওরা বোঝে রাজেনটা আমাকে ঠকাচ্ছে। আমাকে সম্পত্তির উত্তরাধিকার দিচ্ছে না। আমাকে ওরা খুব ভালবাসে না!

    অতীশ এইসব পারিবারিক রেষারেষি শুনতে কখনও আগ্রহী হয় না। বিষয় আশয়ের প্রতি এমনিতেই একটা তার উদাসীনতা আছে। সেটা বোধহয় সে বাবার কাছ থেকেই পেয়েছে। মানুষের চলে যাবার মত উপার্জন থাকলে খুব ছোটাছুটি তার পছন্দ নয়। সে তা করেও না। সংসারে ব্যভিচার ঢুকলে যা হয়। সেটা টাকার হতে পারে, নারীর হতে পারে, যেমন এখন সে বুঝেছে যে কোনভাবে সব সম্পত্তি স্বনামে রাখা রাজেনদার আর নিরাপদ নয়। তার সম্পত্তি গ্রাস করার জন্য সবাই উদ্যত। আইন বদলাচ্ছে। এবং এমন একসময় আসবে যখন বসবাস এবং উপার্জনে চলে যায় মত সম্পত্তি ছাড়া তার আর কিছুই থাকবে না। রাজেনদার বাবার ঠাকুদা দুটো কোলিয়ারি বিক্রি করে এই এস্টেট গিলেণ্ডার কোম্পানী থেকে উদ্ধার করেছিলেন। তারপর থেকেই বাড়িয়ে যাওয়া ছিল তাঁর স্বভাব। প্রভুত্ব এবং পৌরুষ এই দুই মিলে এস্টেটের যখন রমরমা তখনই স্বাধীনতা। জমিদারী চলে গেল। সরকারী কমপেনসেসন বাদে যা থাকল তাও কয়েক কোটি টাকা। খেলিয়ে তুলতে পারলে অনেক। বার চোদ্দ বছরে রাজেনদা বুঝি সব বুঝে ফেলেছেন, অকর্মণ্য সব মানুষজন পুষে রেখেছেন, সব ব্যবসাই যেতে বসেছে এবং এ জন্য দায়ী তাঁর আমলারা। আসলে আভিজাত্য যে জীবনে কাঁটা হয়ে আছে সেটা রাজেনদা বুঝতে পারছেন না। ফলে বেনামে সম্পত্তি বিক্রি বাট্টার সময় টাকাটার হিসেব থাকে না। পচা টাকায় এই রাজপ্রাসাদ ভরে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে এই পচা টাকার গন্ধ সে পায়, মানসদা পায়। সুরেন পায়। তারপরই মনে হয় বড়ই বিদঘুটে সব চিন্তাভাবনা। এগুলি নিয়ে তার মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। কিন্তু সে বুঝতে পারে আগুনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে শরীর পুড়বে না, এমন রসিকতার কথা কবে কে শুনেছে। সেজন্য অতীশ ভারি বিমর্ষ বোধ করছিল।

    মানসদা বললেন, নবীন যুবক তোমার কপালে সন্ন্যাস-টন্ন্যাস নেই ত!

    অতীশ হাসল।

    —কথা বলছ না কেন। মাথা গুঁজে ছবিতে এত কি দেখছ। যা দেখছ তা ঠিক। এই জরুলটাও জঙ্ঘায় আছে। হাত দিলে টের পাবে। আমি মিছিমিছি ছবি আঁকি না।

    আসলে আগুনে উবু হয়ে বসে থাকা নারীমূর্তিটি অতীশকে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। বুঝি অমলার সঙ্গে মানসদার কোনও গভীর সম্পর্ক আছে।

    ছবিটা যে কোনও নারীমূর্তিরই হতে পারে। কারণ উবু হয়ে বসা। মুখ দেখা যাচ্ছে না। চুল আগুনের মধ্যে ঝলকাচ্ছে। এবং পেট জঙ্ঘা বাহু সবই স্পষ্ট। ছবিটা একবার দেখার পরই চোখ সরিয়ে নিয়েছিল অতীশ। কিন্তু মাথা তোলেনি বলে মানস ভেবেছে, সে ছবিটাই দেখছে। মানসদার কথায় অতীশ ফের ছবিটা দেখে আঁতকে উঠল। তাঁর মনে হল সত্যি অমলা তাঁর সামনে উলঙ্গ হয়ে বসে আছে। সে ভিতরে কাঁপছিল।

    —তুমি অমলাকে তবে চেন?

    অতীশ বলল, চিনি

    —কবে থেকে?

    —অনেককাল আগে। আমি তখন খুব ছোট। ওদের জমিদারিতে আমার বাপ জ্যাঠারা কাজ করতেন।

    —তাহলে এখন থেকে তুমিই আমার হয়ে অমলাকে যা বলবার বলবে।

    অতীশ চুপ করে থাকল।

    —কী চুপ করে থাকলে কেন?

    —ওকে ত আমি দুদিনের বেশি এখানে দেখিনি। তাছাড়া আমার সঙ্গে দেখাও হয় না।

    —হবে।

    —হলে বলব।

    —কি বলবে শুনলে নাত।

    —কি বলব?

    —শুধু বলবে আমি সত্যি পাগল নই। ওকে এটা তোমায় বোঝাতে হবে।

    —আপনি সত্যি তো পাগল নন। কে বলেছে আপনি পাগল!

    —সে তুমি বললে হবে কেন? পৃথিবী শুদ্ধ সব লোক বললেও হবে না। তারপরই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। জানালায় গিয়ে কি দেখার চেষ্টা করলেন। গলা বাড়িয়ে ডাকলেন, পঞ্চানন। পঞ্চানন এলে বললেন, আমাদের একটু চা খাওয়া।

    অতীশ কেমন আবার বিভ্রমের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। সে বলল, আচ্ছা মানসদা, প্রাসাদের বড় হলটায় একটা ছবি দেখলাম। একটা কোটের কালো হাতা, কাঠের বেড়ার ফুটো দিয়ে বের হয়ে আছে। এটা আপনার আঁকা?

    —মনে করতে পারছি না।

    —বিলিয়ার্ড টেবিলটা যে-ঘরে আছে।

    —অমলা হয়ত এখনও দু একটা ছবি রেখেছে। হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। রাজেনটা আমার কিছুই রাখতে দেয় না। ছেলেবেলা থেকেই ও বড় হিংসুটে স্বভাবের ছিল। আমার সব কিছু কেড়ে নিতে চাইত। তারপর সামান্য থেমে কেমন নির্লিপ্ত গলায় বললেন, তুমি পল সেজনের নাম শুনেছ?

    অতীশ বলল, না।

    —সে যাই হোক। ছবিটা দুই নারীর। সম্ভবত মা মেয়ের। সম্ভবত দুই বোনের। কি ছবি এখন আমি ঠিক মনে করতে পারছি না। কিন্তু চোখ দুটো আমি নিবিষ্ট হলে এখনও দেখতে পাই। সেই চোখ বালিকার সেই চোখ যুবতীর, চোখ মায়ের, চোখ বারবনিতার। এতগুলো চোখ সেই দুই নারীর চোখে তিনি এঁকে ছিলেন। এক জোড়া চোখ কখন কেমন হবে বলতে পার না।

    মানসদার কথাবার্তা শুনতে শুনতে অতীশের কেমন মাথা ধরে যাচ্ছিল। এই মুহূর্তে সে যা ভাবছে, তিনি সেখানে থেকে তাকে কত সহজে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন। সে বলতে চেয়েছিল, সেই হাতটা আপনার আঁকা কিনা। সেই হাতটাই আমি ভুলে নির্মলার আসার আগের দিন রাতে দরজার পাশে ঝুলতে দেখেছি কিনা। সেই হাতটাই আমার মাথার মধ্যে আর্চির প্রেতাত্মার ভয় আবার ঢুকিয়ে দিয়েছে কিনা! কিন্তু বলে লাভ নেই। অমলাই হয়ত বাঁধা দেবে। আর্চির কথাটা তাঁকে বললে কেমন হয়। কারণ এই মানুষ তার কাছে প্রথম যেন কত গোপন খবর এ বাড়ির বলে দিল। অথবা দৈন্যের কথা, পরাজয়ের কথা—এসব কথা সহজে মানুষ অন্য মানুষকে বলতে চায় না। মানসদা তাকে বেশ স্পষ্টই যেন বলে দিল, তোমার কাছে আমার কিছু গোপনীয় নেই। তোমাকে অতীশ আমি বিশ্বাস করি।

    অতীশ বলল, আপনার প্রেতাত্মায় বিশ্বাস আছে?

    মানসদা উঠে দাঁড়ালেন, চোখ বড় বড় করে বললেন, সেটা আবার কি?

    অতীশ একেবারে জলে পড়ে গেল। এমনভাবে সে বোকা বনে যাবে বুঝতে পারে নি। সে তবু মরিয়া হয়ে বলল, কালো কোট গায়ে একটা হাত শুধু আঁকলেন কেন! কি অর্থ এ ছবির।

    —দেখ সত্যি আমি মনে করতে পারছি না।

    —আপনি সব পারেন। ইচ্ছা করলে সব পারেন। ভূতেও বিশ্বাস করতে পারেন। আপনি পারেন না এটা আমি বিশ্বাস করি না।

    পাজামা পাঞ্জাবি পরা মানুষটিকে বড়ই সুদীর্ঘ এক মহিমময় পুরুষের মত মনে হচ্ছে। এবং তখনই মনে হল মৃত রাজার চেহারার সঙ্গে মানসদা’র বড় বেশি মিল। কিন্তু সে শুনেছে, রাজেনদা এই সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী। রাজার সঙ্গে রাজেনদার চেহারার অমিলটাই বেশি। আদৌ দীর্ঘকায় নয়, গৌরবর্ণ নয়, বড় চোখ নয়, নাক, নাকটা কার মত! কারো মত নয়। মানুষের মত নয়! কিছুটা শিম্পাজির মত। এত চাপা নাক নিয়ে রাজেনদাকে শেষ পর্যন্ত মোটা গোঁফের আশ্রয় নিতে হয়েছে।

    অতীশ চা খেয়ে উঠে পড়ল।

    —তা হলে তুমি কিন্তু বলবে।

    অতীশ মনে করতে পারল না তাকে কি বলতে হবে। কারণ কালো কোট এবং হাত, আগুনে ছবি, দুই নারী এবং দুই অশ্বারাহী ক্রমাগত তার মাথার মধ্যে ঠোকাঠুকি করছিল। এখানে এসে আর্চিব প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় সে সব সময় শঙ্কার মধ্যে থাকে। প্রথম দিন থেকেই এখানে একটা কালো হাত মাথার মধ্যে ঢুকে বসে আছে এবং ওটাই ওকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। মানসদার ছবিগুলি না দেখলে সেটা যেন মনে হত না। অন্তত একটু যুক্তি খাড়া করতে পেরে সে নিশ্চিন্ত হতে গিয়ে কি বলতে হবে ভুলে গেছে। সে কিছু না ভেবেই বলল, বলব।

    নিচে নামতেই নবর সঙ্গে দেখা। সে বলল, স্যার, আপনার কাছে যাচ্ছিলাম।

    নব একটা ধুতি ফেরতা দিয়ে পরেছে। খালি গা। গলায় পৈতাটা ভারি চকচক করছিল। সে আজকাল খালি গায়েই ঘোরাফেরা করছে। পৈতাটা রোজই বোধ হয় মাজে। একদিন মিণ্টুকে ডাকতে গিয়ে দেখেছিল পুকুরে নাই-জলে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে মন্ত্রপাঠ করছে। অতীশ বুঝতে পেরেছিল নব এখন তার কাজে কর্মে খুব আন্তরিক। দেখা হয়ে যাওয়ায় সে বলল, ভাল আছ।

    নব ও-সব কথার উত্তর দিল না। –একদিন গেলেন না স্যার।

    অতীশ বলল, যাব।

    —স্যার জমে উঠেছে খুব!

    নব তার শনিপূজার কথা বলছে, —পয়সা হচ্ছে?

    —একাউণ্ট রাখছি। তবে সবই পাঁচ পয়সা দশ পয়সা। গুড বিজনেস সেণ্টার। কমপিটিশনও আছে স্যার। আমার দেখাদেখি পাশেই আর একটা শনির থান গজিয়ে উঠছে। পাল্লা চলছে খুব। আসছে শনিবারে আসুন না স্যার। তিনজন ঢাকি ঢাক বাজাবে। একটা ছিল ওরা দুটো করায় আমি তিনজন ঢাকি বায়না করেছি। আপনারা পূজার সময় থাকলে শোভা বাড়ে। বৌদি যদি যান! আপনারা গণ্যমান্য লোক যদি পূজার সময় কাছে থাকেন গুডউইল বাড়ে।

    সে নবর হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্যই বলল, যাব এবং সে বাসার দিকে হাঁটা দিলেই নব ছুটতে ছুটতে আবার আসছে।

    —স্যার, এখানে বলব কি –না বাসায় গিয়ে বলব?

    —কী বলবে!

    —চলুন। খুব জুররী কথা।

    ভারি ঝামেলা করছে নব। কিন্তু চাকরির কথা দিয়ে রাখতে পারে নি, অতীশের এই একটা অস্বস্তিও আছে। সে সোজা বলতে পারল না, এখন নয়। আমার মেলা কাজ পড়ে আছে। সে বলল, এখানেই বল না!

    —স্যার, রাজার সঙ্গে এখানকার এম এল এর খুব ভাব। ওরা মিলে যদি উদ্বোধন করে আমার পূজাটা।

    —সে এখন কি করে হবে? পূজা ত তুমি আরম্ভই করে দিয়েছ।

    —পঞ্চম হপ্তা-পূর্তি উপলক্ষে এই সিলভার জুবলি-টুবলির মত! এই উপলক্ষে যদি…

    অতীশ বিরক্ত হচ্ছিল। আবার মজাও পাচ্ছিল। কিন্তু তাকে নির্মলার কাজের বিষয়ে একজন স্কুল সেক্রেটারির সঙ্গে আজ দেখা করার কথা। খুবই গণ্যমান্য লোক। রাজেনদা নিজেই চিঠি দিয়েছেন। এখন এসব নিয়ে তার ভাববার একদম সময় নেই। সে বলল, কাল সকালে এস। আলোচনা করা যাবে।

    তবু নব যায় না।—স্যার, ওরা মাইক লাগিয়ে শনিমাহাত্ম্য প্রচার করছে। ওরা স্যার এম এল একে দিয়ে উদ্বোধন করিয়েছে, ইস মাইরি স্যার কি যে ভুল হয়ে গেল!

    অতীশ ছাড়া পাবার জন্য বলল, তুমি তো সপ্তাহ পূর্তি করছই তখন না হয় ভেবে দেখা যাবে। হঠাৎ নব প্রায় পায়ে পড়ে গেল। স্যার আমার প্রেস্টিজ নিয়ে টানাটানি। আপনি আমাকে বাঁচান। অতীশ বলল, আমার ত কোন পরিচিত এম এল এ নেই। পাবলিক ফাংসন করে এমন লোককে ধর।

    নব কিছুটা হতাশ গলায় বলল, হামুবাবুকে বলেছি। তিনি পারেন। কিন্তু টাকা চায়। অত টাকা দেব কোত্থেকে।

    অতীশ দেখল নবকে ভারি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখাচ্ছে। আসলে কাকে ধরলে কিভাবে হবে সেটা নব ঠিক জানে না। অন্ধকারে হাতড়াচ্ছে। কাছে তাকে পেয়ে ভেবেছে এই সেই লোক —একে ধরলে হয়ে যেতে পারে। কিন্তু অতীশ তাকে কোন ভরসা দিতে পারছে না। এবং পরদিন সকালে শুনল অতীশ, নব কাকে ধরে একজন হবু কবি ঠিক করেছে। তিনিই বক্তৃতা করবেন। তারপর সে আরও এক সকালে শুনল নবকে ধরে পাড়ার ছেলেরা খুব ঠ্যাঙ্গিয়েছে। তার জায়গা কেড়ে নিয়েছে। এত পয়সা হচ্ছিল নবর, সেটা তাদের সহ্য হয় নি। অবশ্য পরে নব তাকে বলেছে আসলে প্রতিপক্ষ দলের কারসাজি। পাড়ার ছেলেরা মিলে দুটো জায়গাই দখল করে নিয়েছে। বেকার যুবক শুধু তুমি না আমরাও। বে-পাড়া থেকে এসে লুটেপুটে খাবে সে হচ্ছে না। নব শেষে বাধ্য হয়ে তার পুরানো প্রফেসানেই আবার ফিরে এল। সে কিছুদিন ধরে মনোযোগ দিয়ে আবার অঙ্ক কষে যাচ্ছে। অঙ্ক কষলে মাথা পরিষ্কার হয়, এমন একটা সুন্দর প্রফেসান হাত ছাড়া হয়ে গেছে শুধু নির্বুদ্ধিতার জন্য। মাথা সাফ না থাকলে কিছু হবে না। সে মাথা সাফ করার জন্য আবার বসে যেতেই কুম্ভবাবু খবর দিল, বুঝলেন দাদা নবর হয়ে গেল!

    কত মানুষেরই এভাবে হয়ে যাচ্ছে। অতীশ বলল, কার কবে হবে ঠিক কি! নব কি…

    —না না খুন-টুন হয়নি। গাড়ির তলায়ও পড়েনি।

    অতীশ ফোনে কথা বলছিল। ঠিক মন দিয়ে শুনতে পারছে না। কুম্ভবাবু ইতিমধ্যে আরও কিছু ঝামেলা তৈরী করেছে। কাস্টমারদের দিয়ে কিছু মিথ্যা অভিযোগ তৈরী করিয়েছে। মাল পাঠালে রঙ ঠিক হয় নি, কামড়ি খুলে যাচ্ছে, ঢাকনা আলগা এমন সব রিপোর্ট দিয়ে মাল ফেরত পাঠাবার বেশ একটি পাকা বন্দোবস্ত তলে তলে করে এসেছে। অতীশকে এ-জন্য সব সময় সতর্ক থাকতে হচ্ছে। সুপারভাইজারকে বলেছে, সব ডাইস মেরামত করান। কোটার টিন থেকে খরচ করুন। বাজারের টিন থেকে কাজ করবেন না। এক গেজের মাল দিন। আর এ সময়ই কুম্ভবাবু বলল, নবর হয়ে গেল।

    ফোন ছেড়ে দিয়ে বলল, নবর কি হয়ে গেল!

    —নব দেশ ভ্রমণে বের হয়ে গেল।

    —সে খুবই ভাল কথা।

    —টেপিটাকে বলেছে আমার বৌর কাছেই রেখে যাবে। খেতে দিলেই হবে। বৌদির কাছে সুখীকে রাখুন না। সুখীর রান্নার হাত ভাল। সুরেন ত পাগলা কুকুর হয়ে গেছে। কাকে এখন কামড়ায় দেখুন। হামু কাকা বলেছে, বাতাসীর খোরাক পোশাক দেবে। অতীশ বলতে পারত, বাগড়া না দিলে নবটার দেশ ভ্রমণ হাতে লেখা থাকত না। সুরেনটাও হাঁফ ছেড়ে একটু বাঁচত। তারপরই মনে হল মানুষের মধ্যে কি যে থাকে! কুম্ভবাবু সত্যি সুরেনের ভাল করার জন্য বেশ চিন্তিত। তাঁর কথাবার্তা খুবই আন্তরিক, যেন দায়টা সুরেনের নয় তার নিজের। কুম্ভবাবুকে আজ বড় ভালমানুষ মনে হল তার। শেষে বলল, আপনার বৌদিকে বলে দেখি।

    —বৌদির চাকরি হলে ত লোক লাগবেই। রাজার চিঠি নিয়ে গেছেন যখন…

    অতীশ বলতে পারত, হবে না। সবারই নিজেদের লোকজন আছে। ওদের না হয়ে নির্মলার হবে সে আশা করে না। সংসারে বেশ টানাটানি। মাসের শেষটা আর কাটতে চায় না। লেখা থেকে টাকা পেলে চলে যায়, না হলে নির্মলার সংসার টানতে কষ্ট হয়। প্রাচুর্য থেকে এলে মানুষ সেই কষ্টটা আরও বেশি টের পায়। মাঝে মাঝে নির্মলার মুখ দেখলে সে সেটা ধরতে পারে। নিৰ্মলা শান্ত স্বভাবের মেয়ে, তবু গত মাসে বলেছিল, টুটুলের জুতো নেই। বাবাকে ক’টা কম টাকা পাঠাও। অতীশের মনে হয়েছিল, নির্মলা বাড়ির দিকটা বুঝতে চাইছে না। টাকা কম দিলে বাবা কষ্ট পাবেন। বাবা কষ্ট পেলে কোথায় যেন সে জোর হারিয়ে ফেলে। শুধু বলেছিল, লেখা থেকে কিছু টাকা আসবে। ও দিয়ে করে নিও।

    নির্মলা বলেছিল, কোন সঞ্চয় নেই। অসুখ-বিসুখ হলে কি করবে। কত রকমের দায় আদায় থাকে। তখনই কুম্ভ বলল, আপনি আমার মেয়ের নামটা আর দিলেন না। আপনারা আলাদা জাতের মানুষ, হাসির খুব ইচ্ছে আপনি নাম রাখেন।

    অতীশের মুখে কুট হাসি ফুটে উঠল। এই মানুষটাই তাকে সর্বক্ষণ বিড়ম্বনার মধ্যে দেখতে চাইছে। এই মানুষটাই তার সবচেয়ে উপকারী লোক। কারণ এই মানুষটাই তার নামে ব্যাঙ্কে একটা একাউণ্ট খুলে দিয়ে বলেছে, লেখা থেকে আপনার যা চেক আসে, ব্যাংকে জমা রাখুন। টাকার জন্য তাহলে মায়া বাড়বে। মায়া বাড়লে সংসারে মন বসবে। আপনি বড় অসংসারী লোক মশাই। তখন মনেই হয় না, কনটেনারের দাম বাড়িয়েছে বলে, সে পার্টিদের ঘরে ঘরে গিয়ে পরামর্শ দিয়ে এসেছে, রিজেক্‌ট বলে ফেরত পাঠিয়ে দাও। ধৰ্ম্মপুত্তুর কোথায় যায় দেখি। আগরয়াল কিছু মাল ফেরতও পাঠিয়েছে। সে বড় বিপদের মধ্যে আছে। ভয়ে ভয়ে আছে। আবার কে কখন ফোন করে বলবে, এই ছাপা? চলবে না। ঢাকনা লুজ চলবে না। খুঁত বের করলেই হল!

    এমনিতেই কনটেনারের দাম বাড়াবার জন্য অর্ডারপত্র কম আসছে। এতেও কুম্ভবাবুর হাত আছে কিনা কে জানে। ওভারটাইম কমে গেছে। ভিতরে ভিতরে শ্রমিক অসন্তোষ বাড়ছে। অতীশ অফিস ঘরে বসেই সেটা টের পায়। আসলে সারাদিনে যা কাজ দেয়, তিনঘণ্টা ওভারটাইম দিলে তারা প্রায় সেই কাজটা তুলে দেয়। উৎপাদন বাড়াতে না পারলে সে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। মাইনে বাড়াবার দাবি করেছিল, সে বলেছে, সব হবে, আগে ঠিক হোক, কতটা তোমরা মাল বানাতে পার। ওরা বলেছে, যা হয় তাই। তার বেশি হবে না। কুম্ভ দুদিকেই তাল দিচ্ছে। সে যে কোনওভাবে গণ্ডগোল পাকাতে চায়। অতীশ বুঝতে পারে তার চারপাশে তখন আর্চি ঘোরাফেরা করে। সে সুদূরে দেখতে পায়, বনি হাঁটু মুড়ে বসে বাইবেল পড়ছে। প্রার্থনা করছে বনি, ঈশ্বরের কাছে নতজানু হয়ে বসে আছে। ছোটবাবুর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছে দু’হাত তুলে।

    চারপাশে শান্ত সমুদ্র। বাতাস পড়ে গেছে। এক ফোঁটা মেঘ নেই আকাশে। আগুনের মত সমুদ্রের জলে তাত। বনি ছোটবাবুকে বলছে, এস পাশে বোসো। আমাদের এখন আর ঈশ্বর ছাড়া কেউ নেই। শুধু প্রাণ বলতে জলের নিচে কিছু পারপয়েজ মাছের ঝাঁক। এলবা দুদিন হল নিখোঁজ। সে আর রাতে ফিরে আসছে না। একটু থেমে কি ভেবে বনি আবার বলল, ছোটবাবু, কবরে আমার ছোট্ট একটু জায়গা দরকার।

    ছোটবাবু বুঝতে পারছিল না, বলল, বনি এ-সব আজেবাজে বকছ কেন। তখনই ছোটবাবু শুনতে পেল, হাই। সেই কণ্ঠস্বর ঠিক অবিকল সে মনে করতে পারছে। স্যালি হিগিনস, শেষ বারের মত সব বলে যাচ্ছেন, আর্চিকে তুমি খুন করেছ, সে তোমাকে ক্ষমা করবে না। সুতরাং সমুদ্রের অতীব মায়ায় পড়ে গেলে মরীচিকা দেখতে পাবে। তেষ্টায় যখন বুক ফেটে যাবে সমুদ্রে স্নান করে নিতে পার। ঘামে যে নুন বের হয়ে যাবে, শরীর ঠাণ্ডা হলে তা লাঘব হবে। সামান্য লোনা জলও খেতে পার। ঘাম কম হবে তবু পিপাসা না গেলে বুঝতে পারবে চোখ মুখ বসে যাচ্ছে—গলা শক্ত হয়ে যাচ্ছে কাঠের মত। তখন যদি পার কোন মাছ শিকার করে ইউ ক্যান সাক হার ব্লাড। মনে রাখবে যা হয়ে থাকে, মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়। পাগল হয়ে যায়। পাশের লোকটির ওপর ঝাঁপিয়ে তার টুঁটি কামড়ে ধরে তুমি বনিকে অনায়াসে ধরতে পার। ইউ ক্যান সাক হার ব্লাড। তাহলে তুমি আর মরীচিকা দেখতে পাবে না। প্রাণ ফিরে পাবে।

    ছোটবাবু বুঝল সমুদ্রের হাহাকার দেখে বনি পাগল হয়ে যাচ্ছে। সে চিৎকার করে উঠল, বনি প্লিজ মাথা খারাপ কর না। আমরা শিগগির গাছপালা মাটি দেখতে পাব।

    বনি হাসল। দু চোখ বেয়ে জল ঝরছে। ছোটবাবু দুটো হাত নিজের হাতে তুলে বাইবেল থেকে কিছু পাঠ করে শোনাল। ছোটবাবু বুঝতে পেরেছিল, ঈশ্বর এবং সমুদ্র সাক্ষী রেখে বনি তার সব অস্তিত্ব ওকে অর্পণ করেছে। তারও মনে হল প্রজ্বলিত কোনও অগ্নি সাক্ষী রেখে সে সেই দায়িত্ব যেন গ্রহণ করছে।

    আবার সেই পীড়ন, অতীশ বুঝতে পারছে, ছোটবাবু তাকে পীড়ন করছে। শরীরে আবার এসে পোকার মত উড়ে বসেছে। মগজের ঘিলু থেকে অস্থি মজ্জায় সবর্ত্র প্রচণ্ড কামড়। মাথাটা তার কেমন করছে।

  • পনের

    পনের

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    পনের

    দিন ছোট হয়ে আসছিল। রাজবাড়ির ছাদের কার্নিসে সূর্য হেলে গেলে মিণ্টু টুটুল জানালায় এসে দাঁড়ায়। সামনে পাতাবাহারের গাছ, তারপর পথ, দু’পাশে রাজবাড়ির বাগান। নতুন বাড়ির পাশে রক্তকরবী গাছটায় টুটুল একটা ফড়িং আবিষ্কার করেছিল। সেই থেকে সে বিকেল হলেই, মাকে বলে, আমি দাব। ফড়িং ধরব। দুটো একটা কথা ফুটেছে। মা শুয়ে আছে। মিণ্টু টুটুল ফাঁক বুঝে নেমে এসেছে তক্তপোশ থেকে। দুবার দরজায় ছুটে গেছে। দরজা টেনেছে—মাকে ডাকতে সাহস পাচ্ছে না; পালিয়ে দুজন ফড়িংটা ধরার মতলবে ছিল। দরজা বন্ধ দেখে ওরা কি ভাবল কে জানে, দরজা ফাঁক করে উবু হয়ে কি দেখল। একটা লোক আসছে—সেই মোটা মত লোকটা। টুটুল ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য জানালায় উঠে দাঁড়াল। ডাকল, অ্যাঁ অ্যাঁ। সঙ্গে সঙ্গে দুমবার সিং বলল, খোকনবাবু ভাল?

    টুটুল বলল, দুমবা ভাল।

    —হ্যাঁ ভাল খোকনবাবু।

    মিণ্টুর সঙ্গে কথা বলছে না বলে বড় অভিমান। সে বলল, ভাই আমার খাতা খেয়ে ফেলেছে।

    —তাই নাকি! খুব খারাপ।

    —ভাইটা না প্যাণ্ট পরতে চায় না। ভাইটা সারাদিন ন্যাংটা থাকে।

    দুমবার বলল, ব্যাং ধরে নুনুতে ঝুলিয়ে দেব।

    টুটুল অত সব কিছুই বোঝে না। তার সঙ্গে যে কথা বলে সেই তার বন্ধু। সারাক্ষণ তার কথা বলা চাই। না বললে দু’ঠ্যাং ছড়িয়ে কাঁদতে বসে। এই যে লোকটা দিদির সঙ্গে কথা বলছে টুটুলের ভাল লাগছে খুব। সেও অজস্র কথা বলছে। হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। মিণ্টু বলল, টুটুল প্যাণ্ট পরে আয়। ব্যাং বেধেঁ দেবে।

    টুটুল মুখ নাক গলিয়ে দিয়েছে শিকের ফাঁকে। সে কথাবার্তার বিষয়টা ঠিক বুঝে উঠতে পারে। দুমবার সত্যি কোথা থেকে একটা ব্যাং ধরে নিয়ে এল। টুটুল ভয়ে জানালা থেকে নেমে সোজা এক দৌড়। মার বিছানায় উঠে গেল লাফ দিয়ে। তারপর দুহাতে খামচে ধরল মাকে।

    নির্মলার ঘুম ভেঙে গেলে দেখল টুটুল বড় বড় চোখে বলছে—মা ব্যাঙো। ব্যাঙো আসছে।

    নির্মলা টুটুলের সব কথা বুঝতে পারে না। সে বলল, হ্যাঁ ব্যাঙো আছে। ঘুমাতে পর্যন্ত দিস না। চোখে তোদের একফোটা ঘুম নেই! দিদি কোথায়? নির্মলা বিছানায় উঠে বসল।

    টুটুল তাড়াতাড়ি মায়ের কোলে উঠে বসল, ব্যাঙো আসছে। খাবে। আমি ভাল। দিদি ভাল না। মিণ্টু তখন ভাইয়ের হয়ে দুমবার সিংকে সামলাচ্ছে। ভাই আর ল্যাংটো থাকবে না। প্যাণ্ট পরে থাকবে। ভাই ভাই। বলে সে তখন চেঁচাচ্ছে। মিণ্টু কার সঙ্গে কথা বলছে! তক্তপোশ থেকে নির্মলা নেমে গেল। সারা শরীরে শাড়ি জড়িয়ে বারান্দায় আসতেই দেখল, দুমবার মিণ্টুর সঙ্গে কথা বলছে। হাতে একটা জ্যান্ত ব্যাঙ। দুমবার মিণ্টুর কাছে এগিয়ে বলছে, ভাই কোথা। ভাইকে ঝুলিয়ে দেব। এবং তখনই বারান্দায় নির্মলাকে দেখে বলল, নমস্কার মাইজি, খোকাবাবু পালিয়েছে। সে হাসতে থাকল।

    —আর বল না। সারাটাক্ষণ ভাইবোনে মারামারি। একটু যদি ঘুমোয়। তোমার ভয়ে তক্তপোশে বসে আছে। নামছে না। নির্মলা পেছনে তাকিয়ে দেখল, টুটুল উঁকি দিয়ে সেই দুমবার জানালায় আছে কিনা দেখছে। নির্মলা বলল, ভাল হয়েছে। কিছুতেই জামা প্যাণ্ট পরবে না। সব খুলে বসে থাকে। তুমি রোজ আসবে।

    দুমবার সঙ্গে মার এত কি কথা হচ্ছে! উঁকি দিয়েই টুটুল কেমন ঘাবড়ে গেল। সেই ব্যাঙটা হাতে ধরে রেখেছে। তক্তপোশ থেকেই টুটুল বলল, জামা কৈ। আমার জামা কৈ!

    মিণ্টু এবার ভাইকে সাহস দেবার জন্য বলল, দুমবার, ব্যাঙো চলে গেছে।

    টুটুল দিদির কথা বিশ্বাস করল না। জামা কৈ জামা কৈ করছে। নির্মলা জামা প্যাণ্ট পরিয়ে দিতেই টুটুল কি করবে বুঝতে পারছে না, কিন্তু লোকটি যে ভারি রহস্যময় জগতের বাসিন্দা টুটুলের কাছে। কিম্ভূতকিমাকার পাগড়ি মাথায়। পায়ে নাগরাই জুতো, সাদা ফতুয়া গায়ে। আর লম্বা সাদা প্যাণ্ট। সবচেয়ে বিরাট তার বপু আর গোঁফ। টুটুলকে একদিন দুমবার গোঁফ ধরতে দিয়েছিল। সেই থেকেই দুজনে ভারি বন্ধুত্ব। মিণ্টু বের হলেই টুটুল বলবে, দুমবার যাব। দুমবারই একদিন কাঁধে নিয়ে মিণ্টু টুটুলকে রাজবাড়ি ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। পুকুর পাড়ের শান বাঁধান ঘাটে দুমবার এক বিকেলে ওকে নিয়ে বসেছিল। ছোট ছোট বেলে মাছ স্ফটিক জলে দেখেছে টুটুল। গোলঘরে দুটো খরগোস থাকে। টুটুল তাও দেখেছে। আর হেমন্ত চলে যাচ্ছে, বেলা ছোট হয়ে আসছে, পূবের মাঠ অথবা শস্যক্ষেত্র থেকে উড়ে আসছে অজস্র ফড়িং প্রজাপতি। এই গাছপালা প্রজাপতি এবং পাখির ডাক শোনার জন্য বিকেল হলেই টুটুল ছটফট করে। মিণ্টুর হাত ধরে ঘুরে বেড়ায়। খুব বেশি দূর যাবার নিয়ম নেই। ঐ রক্তকরবী গাছটা পর্যন্ত। সেখানে গিয়েই ভাই বোন দাঁড়িয়ে থাকে। বাবা তার এই পথ দিয়ে ফিরে আসে।

    দুমবার নির্মলাকে বলল, আমার সাথে খুব ভাব হয়ে গেছে মাইজি। গেল কোথায় খোকাবাবু। হাতে কিছু নেই। দুহাত ওপরে তুলে ভারি ছেলেমানুষের মত দেখাল, হাত খালি। ব্যাঙ্গো নেই। খোকনবাবুর মুখ কোথায়!

    নির্মলা দুমবারের সব খবরই রাখে। সেই কবে বালক বয়সে দেশ ছেড়ে রাজ-বাড়িতে হাজির হয়েছিল মানুষটা। তারপর থেকেই গেল। কুমারবাহাদুর আর মানসবাবুকে ছেলেবেলা কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে। মানসবাবু কুমারবাহাদুরের সম্পর্কে কিছু একটা হয়। সেটা কি নির্মলা জানে না। টুটুলের বাবাই বলেছে, সম্পর্কে একটা বড় রহস্য আছে। তবে সেটা কি রহস্য টুটুলের বাবাও জানে না। দুমবারও কিছু বলে না। সে অনেক কথা বলে, সম্পর্কের প্রসঙ্গ উঠলে দুমবার চুপ করে থাকে। আর সেই থেকে দুমবার রাজবাড়ি ছেড়ে যায় না যখন মানসদা পাগল হয়ে যায়, দুমবার ওপর ভার পড়ে তাকে সামলানোর। সে পাগড়ি মাথায় নাগরা জুতো পরে মানসদার কাছে লাঠি হাতে হাজির হয়। তারপরই মানসদা নাকি প্রকৃতিস্থ হয়ে যায়। এ-বাড়িতে বৌরাণীর নিজস্ব কিছু জার্সি গরু আছে। সকালে-বিকেলে দুমবার এক বালতি দুধ নিয়ে যায় এই জানালার পাশ দিয়ে। এইটুকু কাজ করতে দেখে। আর কখনও দেখে—ভারি পরিপাটি, মাথায় পাগড়ি, পায়ে নাগরাই জুতো। এ দিকটায় এলেই হাঁক দেবে, খোকনবাবু পরী ধরে আনতে যাব। যাবে নাকি।

    দুমবার মাতৃভাষাও বুঝি ভুলে গেছে। মাঝে মাঝে কথায় কিছুটা পশ্চিমা টান থাকে। বয়স জিজ্ঞেস করলে বলে প্রথম যুদ্ধের কথা। সেই যুদ্ধে নাম লেখাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে বের হয়ে এসেছিল। কম বয়স দেখে পল্টনে নেওয়া হয় নি। তারপরই দুমবার আর কি করে। দেশে ফিরে গেলে বাপ গাছ পেটা করবে—ভয়ে আর যায়ই নি। দুমবার মা নেই। সে হবার পরই মা-জননী চলে গেছে এমন বলে। সবচেয়ে বিস্ময়, পৃথিবীতে লোকটার আপন বলতে কেউ নেই। কিন্তু তার জন্য তার এতটুকু আপশোস নেই। দুমবারকে নির্মলা সব সময় দেখেছে ভারি প্রসন্ন চিত্ত। মিণ্টুকে বলেছে, পরী ধরে এনে দেবে। দুমবারকে দেখলেই দুই ভাই-বোন পরীর কথা জিজ্ঞেস করতে ভোলে না। দুমবারকে দেখলেই দুই ভাই-বোন জানলায় লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। পরীটা ধরা পড়েছে কিনা মিণ্টু জিজ্ঞেস করলে বলবে, ও ধরা পড়ে যাবে। শীতকাল আসুক না। তখন কুয়াশা হয়। খুব কুয়াশা, ভারি চাদরের মত। পরীরা রাজবাড়িতে নেমে আসে। ছাদে ঘুমিয়ে থাকে। ছোট্ট পরীটা সে ধরবে ঠিক করেছে। দু-একবার ধরেওছিল। তবে বড় কান্নাকাটি করে। মা মা রে। সে ছেড়ে দিয়েছে। শীতের কুয়াশায় পরীরা আটকে থাকে। শীত না এলে হবে না।

    মিণ্টু বলেছিল, উড়ে যাবে না।

    —তা কি উড়তে পারে। কুয়াশায় পাখা ভিজে যায় না মিণ্টুদিদি। উড়তে পারে না। খপ করে তখন…

    মিণ্টুর ভারি কান্না পায়।

    —কতটুকু দেখতে?

    এই তোমার মত। ঠিক তোমার মত দেখতে। দুটো ডানা জুড়ে দিলে মিণ্টুদিদি পরী হয়ে যাবে।

    —ব্যাং আমি পরী হব কেন? পরীদের মা-বাবা থাকে?

    দুমবার এমন কথায় কিছুটা বিভ্রমে পড়ে গেল। পরীদের মা-বাবা থাকে কিনা তারও জানা নেই। মা-বাবা বড়ই প্রিয় মানুষের। তার কিছুই নেই। শুধু রাজবাড়ির সব কাচ্চা-বাচ্চা তার এখন বন্ধু। তার নাগরাই জুতো মাথার পাগড়ি দেখে ভারি মজা পায় সবাই। সে বলল, তোমার মা-কোথায়?

    —ঐ তো আমার মা।

    দুমবার বলল, না না। ওতো আমার মা। জিজ্ঞেস করে দেখ না।

    —হ্যাঁ বলেছে। আমার মা।

    টুটুল বলল, আমার মা। বলেই মাকে জড়িয়ে ধরল। যেন দুমবার সত্যি অধিকার করতে আসছে তার মাকে। সঙ্গে সঙ্গে মিণ্টু নেমে গেল জানালা থেকে। মাকে পিছন থেকে ধরে বলল, তোমার মা না। আমাদের মা।

    নির্মলার এখন কাজ অনেক। বেলা পড়ে আসছে। ঘর ঝাঁট দেওয়া, ঘর মোছা, কলপাড়ে বাসন মাজা সব পড়ে আছে। এগুলো তাকে বেলা থাকতেই সেরে রাখতে হয়। হাতের কাজ শেষ না করে ফেললে, সন্ধ্যার পর মিণ্টুকে নিয়ে বসতে পারে না। ওকে এ বছরই স্কুলে দেওয়া দরকার। রাস্তা পার হলে নিবেদিতা কিণ্ডার গার্টেনে ভর্তির কথাবার্তা বলে এসেছে। খুব কড়াকড়ি। মানুষটা ত অফিস থেকে ফিরেই দু-দণ্ড বসতে পারছে না। হাত মুখ ধুয়ে বের হয়ে যায়। নির্মলার কাজের জন্য ছুটাছুটি করছে। কিছুই হচ্ছে না। নিত্য অভাব বাড়ছে।

    নির্মলা ওদের ছেড়েও যেতে পারছে না। সংসারে কি যে হয়! চার পাঁচ বছর আগে এরা তার কেউ ছিল না। সে জানতও না অতীশ বলে এক যুবক তার জন্য কোথাও বড় হচ্ছে। কোথাকার কে, সে এসে এই জীবনে সবটা জায়গা জুড়ে বসে গেছে। যত মিণ্টু টুটুল তাকে দুমবার নিয়ে যাবে ভেবে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল, তত সে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল।

    পাতাবাহারের গাছগুলির ও-পাশে দুমবারও কেমন চঞ্চল হয়ে ওঠে শিশুদের মত।—মাকে আমি নিয়ে যাব। তোমাদের মা-বাবা থাকবে আমার কিছু থাকবে না! বড়ই কাতর দেখাচ্ছে মিণ্টু-টুটুলকে।

    নির্মলা বলল, ছাড়। কাজ আছে কত! আমি তোদের মা হই। দুমবারও।

    এই কথায় মিণ্টু কিছুটা সাহস পায়। বলে, দুমবার দাদা আমার পরী আছে জানো।

    —কোথা পরী। কে ধরে দিল!

    মিণ্টু মাকে ছেড়ে দিয়েই ছুট। সে তার ছোট্ট পুতুল এনে দেখাল, দ্যাখ। কি সুন্দর চোখ, নাক আমার পরী। নির্মলা দেখল, টুটুল মিণ্টু আবার জানলায় উঠে গেছে। দুমবার কিছু কেড়ে নেবে না তাদের। সাহস ফিরে পেয়ে আবার জমে গেছে। এই ফাঁকে সব কাজটাজ করে ফেলা দরকার। কাজের লোক ইচ্ছে করেই রাখে নি যতটা টাকার সাশ্রয় করা যায়। খরচ বাড়ছে সেই অনুপাতে আয় বাড়ছে না। মাঝে মাঝে মানুষটার মুখ দেখলে প্রাণে কেমন ভয় ধরে যায়। চোখ মুখে অদৃশ্য এক যাতনা বয়ে বেড়াচ্ছে। খুলেও কিছু বলে না। লেখার টেবিলে বসে থাকে। কি ভাবে! তারপর কোনও কোনও সকালে সহসা খুব প্রসন্ন হয়ে যায়। বুঝতে পারে, লেখাটা শেষ করতে পেরেছে। একমাত্র লেখা শেষ করতে পারলেই সে শিষ দেয়, বাজার যায়। ভাল মাছটাছ কেনে। মিণ্টু টুটুলের পাশে বসে এক সঙ্গে খায়। নির্মলার সাহস বাড়ে।

    কলপাড় থেকে এসে দেখল দুমবার নেই। পুতুলটা নিয়ে ভাই-বোনে মারামারি শুরু করে দিয়েছে। টুটুল চেপে ধরেছে পুতুলের একটা পা। মিণ্টু ভাইয়ের মুখ খামচে ধরেছে। কেউ টু শব্দ করছে না। ঝগড়া করছে—কাছে না গেলে নির্মলা বুঝতে পারত না। টুটুল ক্ষণে ক্ষণে বড় জেদি হয়ে যায়। দিদির যা কিছু সবই তার দরকার। মিণ্টু কিছু নিয়ে বসলেই টুটুল সেটা নিয়ে টানাটানি শুরু করে দেয়। কাছে গিয়ে নির্মলা ছেলেকে কোলে তুলে নিল!

    —এভাবে ভাইকে খামচে দেয়। মিণ্টু হেরে গিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকল। আমার সব কিছু ও নিয়ে নেবে। পুতুলটার হাত ভেঙে দিয়েছে। বাবাকে এলে বলব, টুটুল আমাকে মারে। টুটুল আমাকে কামড়ায়।

    নির্মলা বলল, দিদিকে তুই মারিস কেন? মারলে দিদি তোকে ভালবাসবে!

    মিণ্টু ক্ষেপে গিয়ে বলল, তোকে আজ বেড়াতে নিয়ে যাব না। দুমবার পরী ধরে দেবে, তোকে দেব না। রাতে শুয়ে থাকবি, দুমবা এসে ব্যাঙ্গো ঝুলিয়ে দেবে। নির্মলা ছেলেকে কোলে নিয়ে হাত-পা মুছিয়ে দিচ্ছে। মুখ মুছিয়ে দিচ্ছে, কাজল টেনে দিচ্ছে চোখে এবং সুন্দর পরিপাটি এক শিশু শিশু খেলায় মনটা ভরে আছে তার। মিণ্টুর রাগ এতে আরও বাড়ছে। সে ব্যর্থ হয়ে রান্নাঘরের দরজার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। যেন সে হারিয়ে গেছে। এবারে মা কাঁদুক। টুটুলটাও কাঁদুক—দিদি নেই।

    অতীশ অফিস থেকে তখন হেঁটেই বাসায় ফিরছিল। তার কিছু ভাল লাগছে না। কারখানার দেয়ালে পোষ্টার পড়ছে। নানা রকম দাবী। অতীশ কি করবে বুঝতে পারছে না। আসছে মাসে মাইনে দেবে কিভাবে সে জানে না। বাজারে দেনা বাড়ছে। কোটার টিন তোলার টাকা নেই। অর্ডারপত্র কম। চার পাশ থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ। দু’নম্বরী মাল করলে এক্ষুনি কিছু কাস্টমার বড় রকমের অ্যাডভান্স করতে রাজি। কিন্তু অতীশের ভেতরের সেই গোঁয়ার লোকটা মাথা পাততে রাজি হচ্ছে না। কুম্ভবাবুর কাছে তারা বার বার দরবার করছে। বার বার ফিরে যাচ্ছে। নামী কিছু প্রতিষ্ঠান এই কোম্পানীর দীর্ঘকালের খদ্দের। তারা বাজার দর শুধু দেখে না, মালের ফিনিসিং দেখে। মেটালবকস্ কিংবা এই জাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠান সিট মেটালের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। সিট মেটালকে এদিক-ওদিক ছড়ানো-ছিটানো ছোট ছোট কারখানাগুলির সঙ্গে লড়তে হয়। প্রিন্টিং ফিনিসিং দুই তাদের বেশ ভাল। অতীশ জানে লিথো প্রিন্টিং অচল। কিন্তু আপাতত সে কিছু করতে পারছে না। প্রিন্টিং মেশিন কিংবা কিছুটা রদবদল করে জিংক প্লেটে ছাপার ব্যাপারে যে টাকাটা দরকার হাতে সে টাকা নেই। এই সব চিন্তা ভাবনা মাথার মধ্যে কেউ যেন পেরেক ঢোকায়। আর সব সময়ই মনে হয় সেই এক অশুভ প্রভাব সর্বত্র কাজ করছে।

    সে ফুটপাথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে। পাশে এত লোকজন, অথচ এরা তার কেউ না। হেমন্তকাল এটা। শীতের বেলার মত কলকাতার রোদ্দুর ঠাণ্ডা তাপহীন। শরীরটা ভাল লাগছে না বলে সে তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বের হয়ে এসেছে। এবং কি যে হয়, অফিস থেকে বের হয়ে এলেই তার মনে হয় কেমন একটা মুক্তির স্বাদ। যতক্ষণ থাকে, এক দণ্ড সে নিজের কথা ভাবতে পারে না। অজস্র সমস্যা। রঙের সমস্যা, ডাইসের সমস্যা, ওভারটাইমের সমস্যা। কেবল মনে হয়, এরা কেন যে ঠিকমত কাজ করে না। ওরা যা পারে তার সিকি ভাগ কাজও দেয় না। এই দুর্বুদ্ধি তারা যে কোথায় পায়। সে তো জাহাজে কাজ করে দেখেছে—পুরো আট ঘণ্টা কাজ। এক দণ্ড তার ফুরসত ছিল না। কাজে কোনও ফাঁকি ছিল না। মাইনে কম, কিন্তু যা পরিস্থিতি মাইনে বাড়াতে গেলেই প্রডাকসান বাড়ান দরকার। সে সবাইকে ডেকে বার বার বুঝিয়েছে। ওরা বলেছে ভেবে দেখি স্যার। সে বলেছে, এত কম মাইনেতে তোমরা বাঁচবে কি করে? কোম্পানিকে বাঁচাও, আমি তোমাদের বাঁচার পথ দেখছি। তখন ওরা খুব ভাল মানুষের মত স্বীকার করে গেছে, স্যার আপনি ঠিকই বলেছেন। কেউ কেউ গোপনে বলে গেছে, স্যার লাগানি—ভাঙানি হচ্ছে। কিছু করা যাচ্ছে না।

    অতীশ হাঁটতে হাঁটতে বুঝতে পারছিল, সংসারে ভাল থাকার কোন দাম নেই। সে ভাবল, কালই কুম্ভবাবুকে এই কাজে লাগাবে। কুম্ভবাবুর স্বভাব তাকে বড় করে দিলে সে সব করতে রাজি হয়। কুম্ভবাবু চায় সবটাই তার হাত দিয়ে হোক। এবং পরদিনই সে কুম্ভবাবুকে অফিসে ডেকে বলল, আপনি দেখুন না ওদের সঙ্গে কথা কয়ে কিছু একটা করতে পারেন কিনা। কুম্ভ বলল, সব বেইমান দাদা। বেটারা খেতে পেতিস না, হাতে পায়ে ধরে ঢুকেছিলি। ঢুকেই অন্য চেহেরা। তা আপনি যখন বলছেন, দেখছি।

    কুম্ভ জানে, তার একটা আলাদা সুবিধা আছে। সে যখন এদের টোপ দেবে, তখন অন্য কেউ আর এক পাশে টোপ ফেলে বসে থাকবে না। সব কিছু বানচাল করে দিতে চায়, আর কিছুর জন্য না শুধু সে দেখাতে চায়, সব সেই করতে পারে। অতীশবাবু এভাবে সহজে তার কবজায় আসবে, সে কল্পনাই করতে পারে নি। সারাদিনে মাত্র দু’হাজার মাল দিলে পড়তা পড়ে? বলুন। বলে অতীশ টাইপ করা একটা লিষ্ট কুম্ভবাবুকে দিল। তারপর বলল, ওরা যদি কাজে আন্তরিক হয়—আমি কিন্তু খুব বেশি কিছু চাইনি, আরে কোম্পানি বাঁচলে, আমরা বাঁচব—কেন যে এরা এটা বুঝতে চায় না আমার মাথায় আসে না। আপনি কি মনে করেন? আপনি ত অনেকদিন এখানে। আমার চেয়ে এটা আরও বেশি ভাল বুঝবেন।

    কুম্ভ তালিকাটি দেখল। যা পারে তার চেয়ে কমই চেয়েছেন। যতবার অতীশবাবু এ-নিয়ে ফয়সালা করতে চেয়েছে, ততবার সে তলে তলে বাগড়া দিয়েছে।—তোমরা রাজি হলেই মরবে। কোম্পানির কাছে এটা রেকর্ড হয়ে থাকবে। এগ্রিমেন্টে গেলেই ফেঁসে যাবে।

    কুম্ভ বলল, মাইনে কি রকম বাড়াতে চান?

    অতীশ আরও একটি টাইপ করা তালিকা দিল তাকে। দুজন অফিস অ্যাসিস্ট্যাণ্ট আছে তার। সে তাদের দিয়েই সব করিয়ে রেখেছে।

    তালিকাটি কুম্ভ ভাল করে দেখে বলল, আপনি ত দেখছি রাজাকে দেউলিয়া করে ছাড়বেন দাদা।

    অতীশ কিছুটা হতাশ গলায় বলল, এ-কথা কেন?

    —আপনি দাদা মনে মনে কম্যুনিষ্ট আছেন। না হলে কেউ এমন এগ্রিমেণ্ট করে।

    অতীশ বলল, মনোরঞ্জনের সঙ্গে এই নিয়েই তো কথা বলেছি। কিন্তু ওরা রাজি হয় নি। আপনি আরও কমাতে চান।

    —তা না হলে অ্যাগ্রিমেণ্ট করে লাভ কি। সবটাই ওরা খাবে। রাজার থাকবেটা কি!

    —রাজা তো এখান থেকে কিছুই পান না।

    —কিছু পান না বলবেন না, পেতেন। আপনি আসায় সেটা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু জানেন ত এরা এ-সব শুধু দেখে দেখে আর দেখে। যদি কিছু না করতে পারেন যতই আপনার পেয়ারের লোক হোক…

    অতীশ মুখ নিচু করে বসে আছে। কিছু যে পেতেন না ঠিক না। পেতেন। স্ক্র্যাপ বিক্রির টাকা কিছুটা কুম্ভ মারত, কিছুটা রাজাকে দিত। সে আসার পর স্ক্র্যাপ বিক্রির টাকা রাজাকে এক পয়সাও ঠেকায় না। সব টাকাই কোম্পানির খাতায় জমা করে নেয়। রাজার এতে ক্ষোভ বাড়তেই পারে। তার যেমন জোর আছে অমলা তেমনি কুম্ভবাবুর জোর তার বাবা। সে এসে বুঝেছে এত বড় এস্টেটের এখনও যা কিছু স্থাবর অস্থাবর আছে তার বেচাকেনায় একটা বড় রকমের ব্যভিচার রয়েছে। এই ব্যভিচার সম্পর্কে শুধু ওপর মহলের দু-একজন আমলাই খবর রাখে। রাধিকাবাবু তার একজন। খুব একটা ঘাঁটাঘাঁটি করতে রাজাও তাকে সাহস পায় না।

    অতীশ বলল, এটা অন্যায় মনে করেছি। স্ক্র্যাপের টাকা তিনি পেতে পারেন না। আর এতে কটাই বা টাকা, এটা পেলে না পেলে তাঁর কিছু আসবে যাবে না। আমাদের আসবে যাবে।

    কুম্ভ হা হা করে হেসে উঠল।—দাদা আপনি কোন যুগের লোক। টাকা মানুষের আত্মার কাছাকাছি। এদের কাছে আত্মার বিনাশ আছে কিন্তু টাকার বিনাশ নেই। শুধু রেখে যাওয়া। বাড়িয়ে যাওয়া।

    অতীশের সবই কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল। এই লোকটা রাজার হয়ে এত ভাবে, এই লোকটাই রাজার এমন অপযশ গায়। সে বলল, কোম্পানির লাভ হলে তিনি তো ডিভিডেণ্ড পাবেনই।

    —ভালোই হয়েছে। এতদিন সবুর সইবে না। আর কোম্পানির লাভ বলছেন, এত সোজা! লাভ হলেই হতে দিচ্ছেটা কে। এখন নতুন আছেন, রাজা হাত দিচ্ছে না। পরে হাত দেবেনই। শুধু একটু রয়েসয়ে হাত বাড়াবেন এই যা।

    অতীশ সবই বুঝতে পারে। যত বুঝতে পারে তত শিটিয়ে যায়। তত এক অশুভ প্রভাব টের পায় মাথার ওপর ঘোরাঘুরি করছে। ওর চোখ কেমন স্থির হয়ে থাকে। অসহায় মানুষের মত শুধু বলে, যা ভাল বুঝুন করুন।

    কুম্ভ বলল, রাজার সঙ্গে সনৎবাবুর সঙ্গে কথা বলে নিয়েছেন?

    অতীশ বলল, ওরা দেখেছেন।

    —কী বলল দেখে?

    —বলেছেন, ঠিক আছে। যদি তোমার মনে হয় এতে সুবিধা হবে তাই কর। তখনই কুম্ভ বলল, চা খাব দাদা। বলেই বেল টিপে সুধীরকে ডাকল। সুধীর এলে চা করতে বলা হল। তারপর ফিসফিস গলায় কিছু যেন বলল কুম্ভ। কিন্তু ও-ঘরে প্রিন্টিং মেশিন চলছে। গুমগুম আওয়াজ। অতীশ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে না। সে তাকিয়ে থাকল। কুম্ভর মনে হল মানুষটা ভারি নিরুপায় এখন। এবং এখনই তাকে নিয়ে খেলা জমিয়ে তোলার প্রকৃষ্ট সময়। সে তালিকা দুটি ভাঁজ করে ব্যাগে ভরে রাখল। পরে ব্যাগের মধ্যে আর যা যা থাকার কথা দেখল ঠিক আছে কিনা। যেন একটা মোক্ষম অস্ত্র পেয়ে গেছে। সে ত আর অতীশবাবুর মত বলবে না, আমি তোমাদের সঙ্গে কথা বলছি, সে বলবে, রাজার এই ইচ্ছে। রাজা এর চেয়ে এক পয়সাও বাড়াবে না। সে আগেই গেয়ে রেখেছিল মনোরঞ্জনকে, যাই করুন, রাজা এ-সব মানবে না। এগ্রিমেন্টের কোনো দাম নেই। দরকার পড়লে কারখানা বন্ধ করে দেবে। ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু হচ্ছে। আসলে সে রাধিকাবাবুর ছেলে, এবং সহজেই রাজবাড়ির অনেক গুহ্য কথা জানার তার সুযোগ আছে। মনোরঞ্জন এটা বিশ্বাস করে। মনোরঞ্জন মানেই তার কর্মীরা। ইউনিয়নের সে এক নম্বর পাণ্ডা।

    কুম্ভ চা খেতে খেতে বলল, দেখতো সুধীর, আমার ওখানে কেউ বসে আছে কিনা। যদি থাকে বসতে বলবি। তারপর অতীশের দিকে তাকিয়ে বলল, মাইনে ত দেখছি কারো কারো প্রায় দ্বিগুণ করে দিয়েছেন। যা মাল দেবে, সবটা ত ওরাই খেয়ে নিচ্ছে দেখছি।

    —তা হবে কেন। কোম্পানির অন্য সব খরচা একই থাকছে। মার্জিনেল প্রফিট বাড়বে।

    কুম্ভ বুঝতে পারে, অতীশবাবুর মাথা পরিষ্কার। সব ঠিক বোঝে। সামান্য ত্যাঁদর হলে আখের গোছাতে পারত। সেটাই নেই। এ সময়ে মানুষের যেটা সব চেয়ে বেশি দরকার। সে আবার সেই ফিসফিস গলায় বলল, আমাদের জন্য কি রাখলেন?

    অতীশের এটা মাথায় আসে নি। মাইনে বাড়লে সবার বাড়া উচিত। সে বলল, আগে এটা হোক, অর্ডার-পত্র বেশি আনুন। আমাদেরও হবে।

    কুম্ভ তত সহজে বুঝবে কেন। সে বলল, আমরাও দাদা মাইনে ভাল পাই না। একজন কেরাণীর মাইনেও দেন না। ওতে চলে না। আসলে সে জন্যই যে তাকে ধান্দাবাজি করতে হয় সেটা ও বলে ফেলল, মানুষ চোর হয়ে জন্মায় না দাদা। পরিবেশ তাকে চুরি করতে শেখায়। কি, আপনি মানেন কিনা বলুন!

    অতীশ বলল, সব সময় নয়।

    হারামি। নিজের খুঁটি থেকে এক পা নড়বে না। তারপরই মনে মনে সে প্রফুল্ল হয়ে উঠল। আজই পিতৃদেবকে দিয়ে রাজার সঙ্গে একটা গোপন সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করতে হবে। তালিকা দুটো এখন তার সম্বল। সে যে রাজার দিকটা কতটা দেখে, এই তালিকা দিয়েই আর একবার তা প্রমাণ করার চেষ্টা করবে। এবং সে উঠে পড়তেই সুধীর এসে বলল, বসে আছে। কুম্ভ কি ভেবে আবার বসল। লোকটা যখন এসে গেছে তখন কাজটা সেরে যাওয়া ভাল। সে বলল, দাদা দশ টন পি সি আর সি পাওয়া যাচ্ছে। নেবেন? খুব সস্তায় হবে।

    —নরম মাল ত!

    —নরম মাল।

    —কত করে বলছে?

    —সে দামের কথাটা লিখে দিল।

    অতীশ বলল, পাঁচশ করে হবে কিনা দেখুন।

    কুম্ভর খিস্তি করতে ইচ্ছে হল। ঠিক সব খবর রাখে। তবু তার পনের টাকা করে দালালি থাকবে। অনেক কমে গেল। অগত্যা বলল, টাকাটা আজই দিন। না হলে রাখা যাবে না।

    অতীশ বলল, মালটা পাঠিয়ে দিতে বলুন। সবটাই এক সঙ্গে দিয়ে দেব। তারপর কি মনে হতেই বলল, কত গেজ।

    কুম্ভ বলল, চলে যাবে। ত্রিশ একত্রিশ হবে। এসর্টেড।

    পরদিন কুমারবাহাদুরের ঘরে তিনজনের এক সঙ্গে ডাক পড়ল। সনৎবাবু ভিতরে ঢোকার আগে সবটা বুঝে নিয়েছেন। আসলে অতীশ হেলপারদের মাইনে অনেক বাড়াবার প্রস্তাব দিয়েছে। যারা সাতাশ টাকা পেত, তারা পাবে পঞ্চাশ টাকার মত। পাঞ্চম্যান, ফিটার কামড়িম্যান, লেম্যানের মাইে বাড়াবার প্রস্তাব দিয়েছে গড়ে কুড়ি টাকা করে। প্রিণ্টার ব্লকম্যানদের আরও কম। এই এগ্রিমেণ্ট সবচেয়ে উপকৃত হবে হেলপাররা। তারাই সংখ্যায় বেশি। অতীশ এ-সব ভেবেই এটা করেছে। সে গরিষ্ঠের সমর্থন পেতে চায়। এরাই সবচেয়ে বেশি শোষিত। তালিকা দুটো করার সময় অতীশের মাথায় এই ভাবনাই কাজ করেছে। কিন্তু মনোরঞ্জন এবং ইউনিয়নের পাণ্ডারা সায় দিচ্ছে না। এই এগ্রিমেণ্ট মেনে নিলে, তাদের ওভার-টাইম বন্ধ হয়ে যাবে—এমন কেউ বুঝিয়েছে। অতীশ বলেছে, আমরা পার্টিদের কাছ থেকে আরও অর্ডার আনব। প্রথম দিকে অসুবিধে হলেও আখেরে তোমাদের লাভ হবে। এত সব করেও সে পারে নি। এখন কুম্ভবাবুর হাতে ভার দিতেই রাজার ঘরে ডাক পড়েছে। সে বুঝতে পারছে না, কেন আবার কুমারবাহাদুর তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। সনৎবাবুর সঙ্গে পরামর্শ করেই এই তালিকা তৈরি করেছিল।

    ভিতরে ঢুকেই অতীশ দেখল রাজেনদা বড় গম্ভীর। নীল রঙের টাই পরেছেন। চোখে নীল রঙের চশমা। গোঁফে দুটো একটা পাকা চুল সে আগে দেখেছে—আজ তাও নেই। মুখে পাইপ। তিনজনই ঢুকে প্রথমে দাঁড়িয়ে থাকল। অতীশ দেখছে, তিনি একটা ডিডের পাতা উল্টে যাচ্ছেন। এরা যে এসেছে, দাঁড়িয়ে আছে তা যেন তিনি বিন্দুমাত্র টের পান নি। অতীশ বুঝতে পারে বড়লোকদের এটা অভিনয়। এত ব্যস্ততার কিছু থাকতে পারে না। বাড়ির তিন চার বিঘে জমির ওপর গম চাষ হয়েছে। গমের সবুজ গাছগুলির ওপর দিয়ে কিছু শালিখ পাখি এখন ওড়াউড়ি করে। শহরের মানুষজন যখন ফুটপাথে বস্তিতে জায়গার অভাবে কালাতিপাত করছে, তখন তার চার বিঘে জমিতে অমলার সখের গম গাছগুলি সহসা চোখের উপর মাথা দুলিয়ে গেল। প্রাসাদের বিশাল এলাকার একপাশে ট্রাম লাইন, আর একপাশে রেল লাইন, উত্তরে হাসপাতাল, ইস্কুল, বস্তি বাড়ি এবং ঘিঞ্জি শহর। কত সুন্দরভাবে এরই মধ্যে মানুষটা বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। শহরের ময়লা জল পথ ঘাট উপচে এই বাড়িতে কোনওদিন ঢুকে যেতে পারে তিনি বোধ হয় একেবারেই ভাবেন না সেটা। কুমারবাহাদুর বললেন, বোসো। সনৎ বাবুকে বললেন, বসুন। ওরা উভয়ে বসে পড়ল। কুম্ভ তখনও দাঁড়িয়ে আছে। অন্য দিন অতীশই বলে, এ-পাশে এসে বসুন। আজ সে কিছু বলতে পারল না। সে কেমন টের পায়, কুম্ভবাবু জল বেশ ঘোলা করে দিয়েছে। রক্ত মাথায় উঠে যাচ্ছে। এবং মাথা ঝিমঝিম করছে। সে মাথা নিচু করে বসে থাকল।

    কুমারবাহাদুরই বললেন, তুই আবার দাঁড়িয়ে থাকলি কেন? বোস। সেই বাড়ির ছেলের মত, কুম্ভ যে এ-বাড়িতেই জন্মেছে, বড় হয়েছে, এ-বাড়ির জন্য তার যে একটা মায়া থাকবে তাতে আর অবিশ্বাসের কি আছে।

    কুম্ভ বসতেই বললেন, তোর কি মনে হয়?

    —এগ্রিমেণ্ট ঠিকই আছে তবে…

    —তবে কি বল!

    —অর্ডারপত্র কম। অর্ডারপত্র না বাড়িয়ে এই এগ্রিমেন্টে যাওয়া ঠিক হবে না।

    —কেন হবে না? কুমারবাহাদুর আবার প্রশ্ন করলেন।

    —কুম্ভ বলল, কাজ ঠিক ঠাক না পেলে ফাঁকা মাঠ হয়ে যাবে।

    —স্পষ্ট করে বল!

    —লোকজন বসে পড়বে।

    অতীশের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি এ দিকটা ভেবে দেখেছ?

    অতীশ বুঝতে পারছে, কুম্ভবাবু সুযোগ সন্ধানী হয়ে উঠছে। কুম্ভবাবু অন্যভাবে বিষয়টা তার বাবাকে বুঝিয়েছে। তার বাবা কুমারবাহাদুরের সঙ্গে কাজ সেরে ওঠার সময় হয়ত বলেছিল, কুম্ভ বলল, অতীশ ত ঠিক বোঝে না, ভাল মানুষ, ভাল মানুষ দিয়ে ত কুমারবাহাদুর সব কাজ হয় না, ঐ ত কি একটা এগ্রিমেণ্ট করতে যাচ্ছে, গোড়ায় গলদ … এবং এই সবই মাথায় অতীশের কিলবিল করে পাক খাচ্ছে। সে কি বলবে বুঝতে পারছে না। মনে হল, সত্যি সে এদিকটা ভেবে দেখে নি। সে খুবই অক্ষম মানুষ। তার পক্ষে ঠিক এভাবে এগ্রিমেণ্ট করার কথা ভাবা ঠিক হয় নি। তারপরই সে কেমন ম্রিয়মান হয়ে যাচ্ছিল—আর ঠিক সেই সময় মনে হল কুম্ভবাবু চায় আবার সেই দু’নম্বর মাল ছাপাবার সুযোগটাকে কব্জা করতে। এই সুযোগে রাজার কাছ থেকে অনুমোদনটা করিয়ে নিতে চায়। সঙ্গে সঙ্গে মাথার মধ্যে রক্তপাত শুরু হয়ে যায়। মানুষের পক্ষে এতটা ধান্দাবাজি ঠিক না। দু’নম্বর মাল দিয়ে কি হয় সে জানে। সে পীড়িত বোধ করতে থাকল।

    সনৎবাবু বললেন, প্রচুর অর্ডারপত্র হাতে থাকলেই অতীশ এটা তোমার সম্ভব।

    অতীশ কোথায় যেন এবার দৃঢ়তা পেয়ে যাচ্ছে। সে বলল, যা আছে তাতে বসে যাবার কথা না।

    কুমারবাহাদুর পাইপ খুঁচিয়ে আবার চোখ বুজে ধোঁয়া টানলেন। ধোঁয়া আসছে না। খুক খুক কাশলেন কেমন একটা জব্দ করার মতলবে যেন ওরা তিনজনই ওর চারপাশে এখন কাশতে শুরু করেছে। বেশ সময় নিয়ে কুমারবাহাদুর তারপর বললেন এরা যদি মাল বাড়িয়ে দেয়, তুমি যদি মালের দাম না কমাও যদি বাজার হাত ছাড়া হয়ে যায় তখন কি করবে?

    চাপটা প্রবলভাবে আসছে। অতীশ বলল, দাম কমালেও এর চেয়ে অর্ডারপত্র বেশি আসবে না। আমাদের নতুন কাস্টমার খুঁজতে হবে। মান্ধাতার আমল থেকে যারা আছে তারাই নিচ্ছে।

    কুমারবাহাদুর বললেন, তার কিছু ব্যবস্থা নিয়েছ?

    —কিছু কিছু চিঠি পাঠিয়েছি। ধরুন কে এম পি রাজি হয়েছে! প্রিন্টিং আরও ভাল চায়। লিথো ব্লকে চলবে না। জিংক প্লেটে যেতেই হবে। কোটা, ইমপোর্ট লাইসেন্স সব দরকার। টাকা নেই।

    —তুমি বেশ আছ, টাকা নেই, তুমি এদিকে সবার মাইনে বাড়াতে চাইছ।

    —ওরা মানবে না। আপনাকে বাড়াতে হবেই। সেটা আজ নয় কাল।

    কুমারবাহাদুর বললেন, আজ-কালের মধ্যে তফাত অনেক হে ভায়া। তোমরা সেটা বুঝতে শেখ নি। হাতের কাছে যা পাবে তাই নিয়ে নাও এখন। তারপর এগ্রিমেন্টে যাও।

    সেই দু’নম্বরী মালের প্রসঙ্গে আসছে। শেঠজি, রামলাল, কিশোরীলাল, পিয়ারীলালেরা ঘোরাফেরা করছে। অতীশ বলল, আগে ইউনিয়নের সঙ্গে এগ্রিমেণ্ট হোক। তারপর দেখি বসে যায় কিনা। যদি যায় এরা ত আছেই। এখন তাড়াহুড়ো করে খুব লাভ নেই।

    এবার কুমারবাহাদুর কুম্ভবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, তাহলে ওটা করে ফেল। অতীশ তো রাজি আছে। বসে যদি যায়, তখন না হয় শেঠজীদের মালের কথা ভাবা যাবে। কুম্ভর মনে হল হেরে যাচ্ছে। সে বলল, আজ্ঞে তাই তবে হবে। কিন্তু কুম্ভের মুখ দেখে অতীশ বুঝতে পারল, সে সহজে তাকে নিস্তার দেবে না।

    কুম্ভর মেজাজ বিগড়ে গেলে চোখ দুটো লাল হয়ে যায়। এটা মানুষের পক্ষে খারাপ। অতীশের কাছে এটা মনে হয় ভারি বিপজ্জনক বিষয়! সে আর্চিকেও দেখেছে, রেগে গেলে মাথা ঠিক রাখতে পারত না। আর্চির ছিল বনির ওপর প্রলোভন। এবং প্রলোভনে পড়ে গিয়ে সে ছোটবাবুকে যখনই সুযোগ পেত নির্যাতন করত। কুম্ভবাবু টাকার প্রলোভনে সেই একই কাজ করছে। এবং এটা যে কখন নিদারুণ নিষ্ঠুর হয়ে উঠবে, অতীশ আবার দেখতে পাবে একটা বাঘের মত মুখ— যেন ডোরাকাটা, প্রায় আর্চির মত মাথা উঁচিয়ে বসে আছে—সে ভীত হয়ে পড়েছিল। সে মনে মনে বলল, না না, ওটা বাঘের মুখ না। মানুষের মুখ। বাঘের মুখ হয়ে গেলেই মনে হবে, হত্যায় কোন পাপ নেই। যদি আর্চির মুখে সে সামান্যতম মানুষের অবয়ব খুঁজে পেত! তবে বোধহয় খুন করতে পারত না। সে পেছন থেকে ডাকল, কুম্ভবাবু। আসলে সে আবার মুখটা দেখতে চায়। মুখের অবয়বে মানুষের মুখ দেখতে চায়। কারণ সে নিজেকে বড় ভয় পায়। নিজেকে সে বিশ্বাস করে না।

    কুম্ভবাবু বারান্দায় এসে বলল, আমাকে ডাকছেন দাদা?

    অতীশ অপলক দেখতে থাকল মুখটা। আর্চির মত বেঁটে, রং ফর্সা, নাক থ্যাবড়া, চোখ গোল গোল, ঝাঁটা গোঁফ এবং মাথায় কদমছাঁট চুল। সে বলল, গোঁফটা অত বড় কেন রেখেছেন কুম্ভবাবু?

    কুম্ভ বলল, কি হয়েছে তাতে?

    অতীশ ভীরু বালকের মত বলল, আমার ভয় করে।

    কুম্ভ হা হা করে হেসে উঠল। এবং সেই হাসিতে অতীশ কেমন ম্রিয়মান হয়ে যায়। বুঝতে পারছে, সে স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছে না। সে এমন হয়ে যায় কেন! তার মাথার মধ্যে কে টরে টক্কা বাজায়!

  • ষোল

    ষোল

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    ষোল

    জানালা থেকে রোদ নেমে গেলেই কাবুলের চঞ্চলতা বাড়ে। বড় সুসময় বয়ে যাচ্ছে। বাবুর্চিপাড়া, বাবুপাড়া, কেরাণী পাড়ার ঘরগুলিতে এখন পুরুষদের সংখ্যা কম। কাজ কম্মের ধান্দায় দশটার আগেই পাড়া খালি করে তারা বের হয়ে যায়। তখন কাবুল উঁকি দিয়ে দেখে। গ্যারেজের চাবি নিয়ে আঙুলে রিঙ ঘোরায়। আর একটু সময়—কারণ হাসিরাণীর বাড়িতে এখনও কিছুটা স্নান আহারের তাড়া আছে। কুম্ভর ভাই দুলাল, শম্ভু, কলেজে গেলেই বাড়িটা ফাঁকা। সুরেনের মেয়েটাকে কুম্ভ পাহারায় রেখে যায়। ওতে তার সুবিধাই হয়েছে। ফাইফরমাস দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিলেই সব সুনসান। অবশ্য ইদানীং হাসিরাণীর সতীপনা বেড়েছে। মেয়েটা হয়ে যাওয়ার পরেই আর গায়ে ফায়ে বেশী হাত দিতে দেয় না। তবু কি যে হয়, হাসিরাণীর গোলগাল টোবলা মুখ, চোখের সামনে ভাসে! মাথা ঝিম মেরে থাকে। কেবল জানলায় চোখ রেখে বসে থাকে। এই রাধিকাবাবু গেল, এই কুম্ভ গেল। শম্ভু দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। সেও বের হয়ে যাচ্ছে। বাকি থাকল এক। কাবুল বেশ অস্থির হয়ে পড়েছে। ঘরে পায়চারি করছে। কান চোখ মুখ কেমন গরম, জ্বর আসার মত। সে এক দণ্ড বসে থাকতে পারছে না। হাসিরাণী বোঝে না কত সে করে। কুম্ভর ছ্যাঁচড়া স্বভাব। বৌরাণী সব জানে, টের পায়। তার তখন এক কথা, ছ্যাঁচড়া লোকটা তোমাদের আছে বলেই সিট মেটাল টিকে আছে। সব অভিযোগ সব সময় খণ্ডন করে দেয়। এবং কুম্ভ যদি কখনও এসে দেখতে পায়, রাধিকাবাবু যদি দেখতে পায় কাবুল বারান্দায় বসে হাসিরাণীর সঙ্গে গল্প করছে—সহজেই হজম করে নেয়।

    ঐ এক গেরো। কাবুল তখন বেশ সরল মানুষের মত হেসে দেয়। আরে কুম্ভ যে। তোমার শালা বড় খারাপ স্বভাব। বৌকে ছেড়ে থাকতে পার না। চা খাচ্ছি। এ বাড়ির চা না খেলে দিনটাই খারাপ যায়। এই হাসি এত কিপ্টে কেন বাবা! এক কাপ চাও দেবে না! অথবা নানা রকমের কথা, ইষ্টবেঙ্গল মোহনবাগানের কথা। সিনেমার নায়ক-নায়িকার কথা। কোথাও যদি দুর্ঘটনা ঘটে থাকে তার কথা। কেবল কথা।

    রাধিকাবাবু জানে, কুম্ভর চাকরি কাবুল করে দিয়েছে। রাধিকাবাবু জানে তিনি যে বিশ্বাসী মানুষ, এটা কাবুলই বলে বলে এখনও বৌরাণীর কাছে ঠিক রেখেছে। অর্থাৎ এ-বাড়িতে কি খাওয়া হয়, কি বৈভব আছে, তা বৌরাণীর কানে যায় না কাবুল হাতে আছে বলেই। যা মাইনে তাতে পেট চালানো দায়। অথচ রাধিকাবাবু এখনও দেশের বাড়িতে দুর্গা পুজো করেন। মেয়েদের মাসোহারা পাঠান। ছেলেদের সবার নামে ব্যাংকে একাউণ্ট করে দিয়েছেন। একটা আমবাগান, নারকেল বাগান, দশ বিঘের ওপর নীলগঞ্জের কুঠিবাড়ি বেনামে কিনে নিয়েছেন রাজার কাছ থেকে। এত সব করছেন, অথচ বিশ্বাসী হতে আটকাচ্ছে না। মূলে আছে কাবুল। হাত ছাড়া হলেই সব দাপট যাবে।

    কাবুল না থাকলে কুম্ভকে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াত হত। চাকরি করে দেবার পরই কুম্ভ এসে বাপকে একদিন বলল, সব চুরি হয়ে যাচ্ছে বাবা। স্ক্র্যাপ বিক্রি করছে, টাকা জমা পড়ছে না। বুড়ো ম্যানেজার মেরে দিচ্ছে।

    রাধিকাবাবু বলেছিলেন, তার আমি কি করব?

    —রাজার কানে কথাটা তোলেন!

    —শুনবেন কেন? আমার ত ওতে কথা বলার এক্তিয়ার নেই। আসলে নিজের পাছায় ঐ যে কি লেগে থাকে না, তাই না হয়েছে রাধিকাবাবুর! সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। তার ওপর পুত্রের ঝামেলা তিনি কাঁধে নিতে রাজি না। যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। দোষের কিছু না।

    সুতরাং কাবুলকেই ধরতে হয়। কুম্ভর কাবুলই ভরসা। এক সঙ্গে বড় হয়েছে। এক সঙ্গে পড়েছে, ফুটবল খেলেছে। বেশ্যালয়ে গেছে কাবুলের টাকায়। এস্টেট থেকে মাসহারা পায় কাবুল। সে অনেক টাকা। যত ফূর্তি-ফার্তা কাবুলই তাকে করিয়েছে। এখনও কাবুল সহায়। কাবুলকেই সে কান ভারি করেছিল। তারপর কি সুসময় কুম্ভর। রাজা ডেকে পাঠিয়েছিলেন। রাজা সব খবর নিতে থাকলেন। সনৎবাবুকে ডেকে বলেছিলেন, সিট মেটালের ম্যানেজার সব ত ফাঁক করে দিচ্ছে। খবরটা রাখেন। সনৎবাবু বলেছিলেন না জানি না। আমার বিশ্বাস হয় না। আমি তাকে খুবই ধার্মিক মানুষ জানি। তখন লাগে সনৎবাবুর পেছনে। এই করে এত দুরে আসা কুম্ভর। কুম্ভ তখন হাসিরাণীকে বলত, কাবুল এলে আদরযত্ন কর। কুম্ভ জানত হাসিরাণীর প্রতি কাবুলের দুর্বলতা আছে। কুম্ভ বাড়ি না থাকলেও সে আসত ঠিক বাড়ির ছেলের মত। এখন যত দিন যাচ্ছে কাবুলের আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে। আর দশজনও দেখছে, কিন্তু রাধিকাবাবু চুপ, কুম্ভ কখনও ফিরে এসে দেখলেও চুপ। ভিতরটা গুম মেরে গেলেও ওপরে ঠাট্টা তামাশা। এখন ও আর তত সহজে বলতে পারে না, কাবুল আমার জন্য যা করেছে! কাবুল না থাকলে হাসিরাণীর মুখে হাসি ফুটত না।

    কাবুল এবার নিঃশ্বাস ছেড়ে বাঁচল। যাক দুলালটাও চলে গেল। এখন কোয়ার্টারে শুধু হাসিরাণী আর সুরেনের মেয়েটা। এই দুজন। হাসিরাণী ঠিক এখন মেয়েকে নিয়ে মজেছে। সে পেছন থেকে গিয়ে একটা হুঁম করবে। হাসিকে ভয় পাইয়ে দেবে। তারপর মোড়া টেনে সুরেনের মেয়েটাকে বলবে, এই যা, রবির দোকান থেকে গরম সিঙাড়া কচুরি আন। হাসি চা লাগাও। যেন এই চায়ের জন্য ফন্দি ফিকির করে গোপনে ঢুকে যাওয়া। বলে রাখা, এখনও সময় হয়নি, কুম্ভকে বলো, সবটাই খেলিয়ে তুলতে হয়।

    তখন কুম্ভ বলল, দাদা শরীরটা ভাল লাগছে না। অফিস যাচ্ছি না। আপনি যান। সাধারণত অতীশ এবং কুম্ভ একই সঙ্গে কারখানায় যায়। কোনদিন কাবুলের সঙ্গে রাজবাড়ির আলগা কাজ থাকলে কুম্ভর যেতে দেরি হয়। সেদিন অতীশ একা যায়। আজও হয়ত কোন কাজ-টাজ পড়ে গেছে! সে বলল, কাবুলবাবুর সঙ্গে কোথাও বের হবেন!

    কুম্ভ বারান্দায় গোল টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে কিছু যেন ভাবছে, অতীশের কথা শুনতে পায় নি। কালও রাজার সঙ্গে কথাবার্তা প্রায় ঠিক। আগে মাইনে বাড়ান, মাল বাড়ান, ওভারটাইম বন্ধ করুন, সব ঠিক আছে। কিন্তু অর্ডারপত্র কম। বেশি অর্ডারপত্র নিতে হলেই রামলাল পিয়ারিলালের দরকার। এত বছর এই করে চলে আসছে আজ হঠাৎ রামায়ণ গাইলেই হবে কেন! রাজাও কথা দিয়েছিল—কিন্তু তারপর সব কেমন ওলটপালট হয়ে গেছে। কে সেটা করে! তবে সে অতীশকে যতটা বোকা ভেবে থাকে, সে ততটা নয়। বোকা ঠিক নয়, যতটা ভাল মানুষ ভাবে ততটা ভালমানুষ নয়। বৌরাণীর সঙ্গে কি কোনও গোপন সম্পর্ক আছে! কে জানে! কুম্ভ মনে মনে ভীষণ জেদি হয়ে উঠেছে। চোখ মুখ লাল। অতীশ ফের কোনও কথা বলতে সাহস পেল না। সে এই সব মুখে কি ধরা পড়ে, জানে। এবং কুচক্রীকে সে ভয় পায়, আর কুম্ভর মুখে বাঘের মুখ দেখে ফেলে বলেই ভয়। এখন আর সে মানুষের মুখে বাঘের মুখ দেখতে চায় না। টুটুল মিণ্টু আছে। মিণ্টুর জন্য সে ভেবেছে একবার নিবেদিতায় যাবে। নির্মলার শরীর ভাল যাচ্ছে না। এখানে এসে রোগা হয়ে গেছে। নির্মলার দাদা এসে একবার কিছুদিন নিয়ে রাখতে চেয়েছিল, অতীশের অসুবিধা হবে ভেবে যায় নি। আসলে নির্মলার এখন একার হাতে সংসার। সে টানতে পারছে না। অভাব বাড়ছে। এই সব সাত-পাঁচ চিন্তা ভাবনায় সে যখন ট্রাম রাস্তা পার হচ্ছিল তখন কুম্ভ ঘরের দিকে হাঁটছে।

    আসলে উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষকে কখনও কখনও ভারি গোলমালে ফেলে দেয়। এবং এই আকাঙ্ক্ষা মানুষকে কখনও কখনও বড় রক্তাক্ত করে। মেজাজ-মর্জি ঠিক রাখা যায় না। কুম্ভ বাড়ি ঢুকেই মেজাজ-মর্জি ঠিক রাখতে পারছে না। দাঁত চেপে হজম করে যাচ্ছে। সুরেনের মেয়েটা নেই। সে ঢুকেই বলল, ও গেল কোথায়?

    কাবুলের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কুম্ভ অসময়ে! অবশ্য অসময়ে কুম্ভ আরও এসে দেখেছে, খোস মেজাজে হাসির সঙ্গে নানা রকমের সে গুল ঝেড়ে যাচ্ছে। কাবুল জানে দায়টা কুম্ভর কোথায়। সে সহজেই খুব সরল মানুষ হয়ে যেতে পারে। কুম্ভকে দেখেই বলল, কি বে খুব জোর ল্যাং খেলি তো!

    কুম্ভ হাসির দিকে তাকিয়ে বলল, একটু গরম জল বসাও। দাঁত ব্যথা করছে। হাসি বলল, বসাও না, আমি কি বসে আছি। কুম্ভ কিছু বলল না। ব্যাগটা ঘরের ভিতর রেখে নিজেই কেটলিতে জল ঢালতে থাকল। হাসি যেন পাত্তা দিচ্ছে না। সে ত কাবুলকে নিয়ে কিছু করছে না, মেয়েটার গায়ে তেল মাখাচ্ছে। কাবুল পাশে মোড়ায় বসে আছে। কে আসে কে যায় হাসির যেন মাথাব্যথা নেই।

    কুম্ভ জলটা ঢেলে স্টোভে কেটলিটা নিজেই বসিয়ে দিল। খুব গম্ভীর। কাবুল লক্ষ্য করছে সব। কাবুল এটা টের পায়, কুম্ভর যতই মেজাজ বিগড়ে যাক, যতই দাঁত ব্যথা করুক এখন উঠতে চাইলেই ধরে রাখবে। বসিয়ে রাখবে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রাজবাড়ির ভেতরের খবর নেবার জন্য দাঁত ব্যথা সত্ত্বেও অনর্গল বকবে। সে বলল, কুম্ভ জলটা বেশি করে দে। তোর বৌকে ত বলে পারলাম না। একটু চা পর্যন্ত করে দেয় না এলে। আমার মূল্য ধরে দেখছে না।

    —বাদ দে ভাই আমাদের কথা। সে ঘরে গিয়ে সব খুলে একটা লুঙ্গি পরে এল। তারপর কারো দিকে তাকাল না। কারণ তাকালেই হাসিকে সে নষ্ট মেয়ে ভাবছে। হাসির মুখ দেখলেই ধরে পেটাতে ইচ্ছে করছে। শরীরে তার এত কি জ্বালা! গতরের জ্বালা, সে আমারও কম নেই।

    হাসি বেশ খুশি। কুম্ভর দাঁত ব্যথার জন্য এতটুকু কোন সহৃদয়তা নেই। সে মেয়েটার টুবলা গালে চুমু খাচ্ছে। দু-হাত দু-পা মুঠো করে ছেড়ে দিয়ে বলছে, ফুক্কা। মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠছে। একবার কুম্ভর দিকে টেরচা করে চেয়েছে। তারপরই ভেবেছে, তুমি একটা ম্যাঙ্গো। আমাকে ধষ্টাবে। লোকটাকে ত কিছু বলতে পার না। ভাল লাগলে কি করব! রাজবাড়ির গন্ধ লোকটার গায়ে। সে একবার এটা বলেও ফেলেছিল, সন্দ যখন বারণ করে দাও না। তুমি না করলে আমিই করব।

    কুম্ভ জলে পড়ে যাবার মত চিৎকার করে উঠেছিল, আরে না, না! চটাতে যেও না। বন্ধু-বান্ধব লোক। এক সঙ্গে মানুষ হয়েছি, মা বাবা কেউ নেই, পিসতুতো ভাইয়ের কাছে আছে। আছে বলেই যে কুম্ভর রক্ষা সেটা আর বলে না। সুতরাং হাসি ভয় পায় না। বরং মজা পায়। দুজন পুরুষকে নিয়ে খেলতে মজা পায়। মেয়েটা হবার পর পুরো একমাস সিনেমা না দেখে ছিল। সাত পাকে বাঁধা বইটা হাসি চারবার দেখেছে। আবার এলে দেখবে। এসেও ছিল। চলেও গেছে। এক মাসে হাসির জীবনে অনেক ক্ষতি হয়েছে। মেয়েটা হওয়ায় এই ক্ষতি। তারপর টেবির কাছে রেখে সেটা বাকি তিন মাসে পুষিয়ে নিয়েছে। এখন তার আকাশ বড় ঝকমক করেছে। সে একা কাটায় কি করে! আর পুরুষ মানুষের ক্ষমতা কতদূর সে জানে। ওদের দৌড় বিছানা পর্যন্ত। যতই লম্ফঝম্ফ হোক রাতে সব কাত। না, শরীর ভাল্লাগছে না। আমাকে ঘুমোতে দাও। আর যায় কোথায়। সোহাগে সোহাগে তখন পাগল করে ছাড়বে। কি চাই, শাড়ি—দেব। অলংকার—দেব। সিনেমা—দেখাব। তখন আর পৃথিবীতে কিছু বাদ থাকে না—সব এনে শ্রীচরণ পদ্মে হাজির। সুতরাং হাসি কুম্ভর দাঁতের ব্যথায় গা করল না। রাত এলেই সব সেরে যাবে। ব্যথা-টেথা সব পগার পার। হালুম হুলুম তখন। খাব খাব তখন।

    কাবুল বলল, হাসি তুমিও পার। দাঁত ব্যথা বলতে! জলটা বসিয়ে দিতে কি তোমার ক্ষতি ছিল বুঝি না!

    হাসি কাবুলের কথাও গ্রাহ্যি করল না। সে মেয়েকে চান করাতে থাকল। রোদে জল দিয়ে রেখেছিল, সেটা দিয়ে চান করাচ্ছে। দুগাছা দূর্বা দেওয়া জলে। জলে কোন সংক্রামক বীজাণু থাকতে পারে ভেবে এই দিয়ে রাখা; পুজো-আর্চায় যা লাগে শিশুর স্নানে তা দিলে সংসারে পাপ থাকে না। অথচ শরীরে কি যে থাকে! শিশু বড় হয়, বালিকা হয়, যুবতী হয়। কুম্ভ হয়, হাসি হয়, কাবুল হয়। আর এ সময়ই মনে হল অতীশ হয়। সবই হয় পৃথিবীতে। লোকটা তাকে বলেছিল, লক্ষ্মীর পট কিনে দেবে। এখন যেন সেটাই বেশি তাকে কামড়াচ্ছে। কন্যেটির শরীর মুছিয়ে দিতে গিয়ে বিড়বিড় করছিল, কেউ কথা রাখে না। যে যার মত মিছে কথা বলে। লক্ষ্মীর পট কিনে দেব একটা। তার আর নামগন্ধ নেই।

    কুম্ভ আর পারল না। সেই লোকটা এই বাড়িতেও ঢুকে গেছে। রাজবাড়িতে ঢুকেছে ঢুকুক। এ-বাড়িতে কেন। সে কালীঘাটের কালীর মানসপুত্র। তার ঘরে লক্ষ্মীর পট কেন আবার। সরল সুধা। সে সহসা চীৎকার করে উঠল, আর কিছু চাই না!

    —চাইলেই দেয় কে?

    কাবুলের দিকে তাকিয়ে কুম্ভ বলল, দেখছিস, দেখছিস হারামজাদী মাগী কি বলছে!

    কাবুল খুব মান্যিগণ্যি মানুষের মত বিচারে বসে যায়। অযথা মাথা গরম করছিস কেন তোরা?

    —আমি করছি। বল, আমি করছি!

    —কেউ করছিস না। নে, চুপ কর।

    হাসি মেয়ের জন্য দুধ গরম করবে! জল গরম এখনও হয়নি। ঠাস করে কেতলি নামিয়ে দুধটা বসিয়ে দিল। মেয়েটা এক হাতে ঝুলছে।

    —দেখলি ত। আমি কি তোর মাগী গোলাম!

    —ছোটলোকের মত কথা বলবে না বলে দিচ্ছি। হাসির চোখ গরম হয়ে গেল।

    কুম্ভ বলল, একশবার বলব। নষ্টামির আর জায়গা পাস না!

    হাসি মেয়েটাকে খাটে শুইয়ে দিয়ে এসে বলল, একশবার করব। মুরদ থাকে ত সামলিও।

    কুম্ভ কেমন বিচলিতবোধ করে। কাবুলের দিকে তাকিয়ে বলল, সব যাবে। তুই জানিস লক্ষ্মীর পট কিনে দিয়ে সে কি করতে চায়?

    —সে তুমি বোঝগে। আমার সময় নেই বোঝার কে কি করতে চায়।

    কাবুল বুঝতে পারছে বিষয়টা তাকে নিয়ে নয়। নতুন ম্যানেজারবাবুকে নিয়ে। অতীশ হাসিকে লক্ষ্মীর পট কিনে দেবে বলেছিল। সেদিন গাড়িতেই যেন কথাটা হয়েছে। অতীশকে হাত করার জন্য সঙ্গে হাসিকেও নিয়েছিল কুম্ভ। কাবুল কিছুটা রেগে গিয়েই বলল, তা কিনে দিলেই পারিস। হাসি একটা ঘরে লক্ষ্মীর পট বসাতে চায়, তা করে দিচ্ছিস না কেন? ঠাকুর দেবতা বলে কথা।

    ঠাকুর দেবতাই সম্বল কুম্ভর। তার এতে সায় যে নেই তা নয়। কিন্তু যে মানুষটা তার উপার্জনে বাগড়া দিয়ে যাচ্ছে, তার অমঙ্গল কামনা করছে, সেই মানুষের পরামর্শমত লক্ষ্মীর পট কেন আসবে বাড়িতে।

    কুম্ভ বলল, আরে তুই মেয়েছেলে, লোকটা তোর কোন উপকারে লাগে বুঝিস না! কেবল কেড়ে নিতে এসেছে। গয়নাগাটি পরে খ্যামটা নাচ এবারে তোর বের করে দেবে! এতবড় সুযোগ নাহলে হাতছাড়া হয়। সময় খারাপ যাচ্ছে কাবুল। তুই যে বলছিলি, আমার হাতটা কাকে দিয়ে দেখাবি। পাথর-টাথর ধারণ করলে গ্রহের কোপ কমে যায়। সব গ্রহের দোষে হচ্ছে বুঝি। কিন্তু কি করব বল। তুমিও তো শালা কোন কম্মের নও। তোমার দাদাটি আর এক নপুংসক।

    কাবুল এতক্ষণে কুম্ভর জ্বালাটা কোথায় বুঝতে পারছিল। দাদাকে টেনে আনায় সে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছে। আজ কিছু একটা হয়েছে। কি হয়েছে সেটা সে আন্দাজ করতে পারল। ভেবেছিল কুম্ভ বাপকে দিয়ে কাজ উদ্ধার করবে। রাতে খাবার টেবিলেই দাদা তাকে বলেছিল, বুঝছিস ভায়া দুটো দু’রকমের; একটা চোর ছ্যাঁচড়া, অন্যটা গোঁয়ার। কোনটাকে যে সামলাই। সে শুধু ফুট কেটে বলেছিল, অতীশবাবু যদি পারে করুক না। দু’নম্বরী মাল বানিয়ে কতদিন চলবে!

    আর সেই কথায় বৌদিরও সায় ছিল। বলেছিল, অতীশকে নিয়ে আসাই ভুল হয়েছে। ওর বাপ জ্যাঠাকে আমি জানি। রক্তে দোষ আছে। তাকে দিয়ে তুমি পারবে না।

    কাবুল বলেছিল, সব হবে বৌদি। ঠেলার নাম বাবাজী। এখন হচ্ছে না, পরে হবে।

    এইসব কথাবার্তা রাতে হয়েছে। সে কুম্ভর পক্ষে একটা কথাও বলেনি। কুম্ভ যে চোর ছ্যাঁচোড় সেই খবরও কাবুলই দাদার কানে পৌঁছে দিয়েছিল। আর তার কাজই এখন এটা। সে সব কনসার্নে ঘুরে বেড়ায়। নিচু মহলের লোকদের সঙ্গে মিলে মিশে যেতে পারে। এবং রাজার ভাই বলে সবাই কারখানার খবর তার মারফত সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে চায়। বাপকে দিয়ে উদ্ধার পেতে চাইছে কুম্ভ। সেয়ানা হয়ে উঠেছে। ভেবেছে তার আর দরকার নেই। এখন বোঝ, কত ধানে কত চাল। কাবুল বলল, আমাকে আগে থাকতে বলবি ত। কি হয়েছে বলবি ত!

    কুম্ভ কি ভেবে বলল, না কিছু হয়নি।

    —হয়নি ত শালা অফিস যাসনি কেন! এসেই বৌ-এর ওপর হম্বি-তম্বি করছিস কেন?

    —মানুষের শরীর খারাপ হতে পারে না!

    —তোমার শরীর খারাপ! তালেই হয়েছে।

    —কেবল রাজ-রাজড়ার বুঝি শরীর খারাপ হয়!

    কাবুল বুঝতে পারল, আবার শালা দাদাকে টেনে আনবে। পরে বৌদিকে। বৌদির সঙ্গে অতীশের বাল্যপ্রণয় ছিল কিনা, তাও কুম্ভ অনায়াসে বলে যেতে পারে। মুখে ওর কিছু আটকায় না। মর্জি মত কাজ না হলেই সব মানুষ ওর কাছে খারাপ। কাজ উদ্ধারের জন্য সবকিছু করতে পারে। না পারলে দুনিয়া শুদ্ধু লোক তার কাছে ইতর এবং ধান্দাবাজ। সেই লোক এখন বারান্দার এক কোনায় গুম মেরে বসে আছে।

    টেবি তখনই এল একঠোঙা সিঙাড়া নিয়ে। কাবুল হাসির দিকে তাকিয়ে বলল, কুম্ভকে দাও।

    কুম্ভ টেবির দিকে শুকিয়ে বলল, নারে আমি খাব না। তোরা খা। দাঁতে ব্যথা।

    —আরে খা খা। মাথা গরম করিস না। মাথা গরম করলে কাজ হয় না। এই হাসি, দাও না। তোমাকে দিতে বলছি না। খেলেই দাঁত ব্যথা সেরে যাবে।

    কুম্ভ দেখল, হাসি দুটো প্লেটে দুটো করে কচুরি একটা করে সিঙিড়া রাখছে। একটা কুম্ভর দিকে ঠেলে এগিয়ে দিল। এত অবহেলা। কুম্ভর মাথার রক্ত উঠে গেল। বদমায়েশ মেয়েমানুষ, তুই আমার বৌ, না কাবুলের। তার কথায় আমাকে ঠেলা মেরে প্লেট এগিয়ে দিস। প্রায় লাথি মেরে প্লেটটা ছিটকে ফেলে দিত। কিন্তু তখনই কাবুল প্রায় দৈব বাণীর মত বলল, আমি ত আছি। আমাকে বললি না কেন। দু-নম্বরী মাল করাতে চাস, কোম্পানি বসে যাবে, তোর ভয়, সব বলবি ত।

    কুম্ভ আর পারল না। ক্ষোভে দুঃখে চোখে জল এসে গেছিল প্রায়। সর্বত্র সে মার খাচ্ছে। ঘরে বাইরে। কাবুল যদি পারে। সে বলল, রাজার বাপের সাধ্যি নেই কারখানাকে বাঁচাতে পারে। ওটাতে কি আছে। ছাপা বার্নিশ কত সেকেলে। দু’নম্বর মাল লোকে করাবে না’ত, এক নম্বরী করাতে যাবে! তোমার দাদা জানে না, যা ছাপা বার্নিশ তাতে এক নম্বরী মালও দু-নম্বরী হয়ে যায়। খদ্দেররা দায়ে পড়ে এখানে আসে। সস্তায় মাল পাবে বলে আসে। এদিকে গোড়া কেটে আগায় জল ঢালছে শুয়োরের বাচ্চা।

    শুয়োরের বাচ্চা কথাটা অতীশকে উপলক্ষ করে। তার দাদাকে নয়। এতেই কাবুল কিঞ্চিৎ খুশি। যাক সুমতি হয়েছে কুম্ভর। সে বলল, নে এবার খাত। হাসি তোমার জন্য রেখেছ ত!

    —রেখেছি।

    কুম্ভর এটাও জ্বালা। কোনও মান অপমান নেই। ঠিক নিজের জন্য রেখে দিয়েছে। কেবল খাব খাব করে। স্নানটান করে দুপুরের খাবার খাবি কোথায়, তা না কাবুলকে দিয়ে এক ঠোঙা গরম কচুরি সিঙাড়া আনিয়েছে। আমি কি তোকে কিছু খেতে দি না। তোর এত রস!

    কাবুল বলল, কিরে খা। তুই না খেলে খাই কি করে। ও টেবি নে, তুই একটা নে। কাবুল নিজের প্লেট থেকে টেবিকে একটা তুলে দিল।

    কুম্ভ এখন খাচ্ছে। কচুরিতে কামড় বসিয়ে বলল, তোর দাদাকে বুঝিয়ে বলিস। খুবই ভুল করল। বলিস এগ্রিমেণ্ট আমাকে দিয়েছে ফয়সালা করার জন্য। নতুন বাবুর সেই মুরদটিও নেই। কারখানার লোকেরা সব ক্ষেপে আছে। মাইনে বাড়িয়ে ওভারটাইম বন্ধ করার তালে আছে, ওরা তো নেকু নয় যে ম্যানেজারের ফন্দি ফিকির বুঝবে না।

    কাবুলের বলতে ইচ্ছে হল, তুই একটা পয়মাল! কিন্তু বলল না। রাগ করবে। রাগ পড়ে আসছে। পড়ে আসবেই। কুম্ভ আরও সব গড় গড় করে বলার জন্য জল খাচ্ছে। দাঁতে ব্যথা-ফেতা কিছু নেই। কাবুল এগিয়ে বসল। বলল এগ্রিমেণ্ট তোকে দিল কেন!

    এই দেখ না। বলে কুম্ভ উঠে গিয়ে ব্যাগ থেকে এগ্রিমেন্টের দু-কপি বের করল। দেখল কিছু তারপর বাইরে এসে বলল, আমাকে দিয়েছে। পারে নি। ভেবেছিল একাই করবে। দু-চারবার কথা বলে বেপাত্তা। কি করি, এই দেখ না। তবে ভাই আমি চেষ্টা করব। সাধ্যমত করব। সে বলতে গেছিল, এটা নিয়ে ল্যাজে খেলাব, কিন্তু কি ভেবে বলল না। ভেতরের কথা সে কাউকে আর বলবে না। বৌটা যার বিশ্বাসঘাতক, সে আর অন্যকে বিশ্বাস করে কি করে! সবাইকে আপন ভেবে সে ঠকেছে।

    কাবুল বলল, তুই পারবি। সেটা দাদা জানে। বোঝে।

    —এইত মুশকিল, কাজ করব আমি বাগড়া দেবে তুমি। আমি ত’ মানুষ।

    কাবুল চা সিঙাড়া সব খেয়ে ফেলেছে ততক্ষণে! হাসি মেয়েটাকে কাবুলের কোলে দিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। কুম্ভ গুম মেরে গেল ফের। ওর কোলে দিতে পারত হাসি! সে তোর কে রে!

    কাবুল উঠে এসে মেয়েটাকে কুম্ভর কোলে ফেলে দিল, নে ধর। বাপ হবি তুই, সামলাব আমি। বেশ মজা।

    মেয়েটাকে কোলে নিতেই কি যে হয়ে যায় কুম্ভর। কারো ওপর আর কোন যেন অভিমান থাকে না। সে মিথ্যে সংশয়ে ভুগছে। হাসিরাণী পায়ে ধরে একদিন বলেছিল, তোমাকে ছাড়া আমি কিছু জানি না। আমার আর কে আছে! বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছিল। গরীব ঘরের মেয়ে বলেই এই হেনস্থা। এবং তখন কুম্ভ হাসিরাণীর মাথা কোলে নিয়ে বার বার চুমু খেয়েছে, অভিমান ভাঙিয়ে বলেছে—তুমি ত বোঝ হাসি, তোমাকে বাদে আমি সর্বহারা। তুমি ছাড়া আমারও কেউ নেই। তারপর দু’জনেই ফিক করে হেসে দিয়েছিল। আলো জ্বেলে হাসি যাত্রার সখির মত সাজতে বসেছিল। যখন সব হয়ে যায়, নিশুতি রাত, ঘুম, নাক ডাকিয়ে লম্বা ঘুম। কুম্ভর পাশে হাসিরাণী। একেবারে খালি গা হাত পা, শরীর ভাঁজ করে পড়ে আছে। সন্তানের জনকজননী হতে গেলে এ সবই লাগে। কুম্ভ সকালে ওঠার সময় চাদরটা শরীরে টেনে দেয়। বড় ভয়ংকর লাগছিল তখন হাসিকে। মেয়েমানুষ সব পারে সুতরাং কুম্ভ নিশীথে একরকম, সকালে একরকম, সকালে তার কালীকবচ পাঠ, প্ৰাতঃস্নান, কালী কলকাত্তাওয়ালির ফটোর সামনে বসে অসুর নাশিনীর ধ্যান। তারপর, দিগ্বিজয়। আজ তার বাধা পড়েছে। সে যেন হত্যা দিতে এসেছে অসুর নাশিনীর কাছে। সেটা কে? হাসি না বৌরাণী! সে কেন জানি বুঝতে পারল, হাসি হলেও নিস্তার নেই, বৌরাণী হলেও নেই। কিন্তু সে জানে, কত ধানে কত চাল। সেটাই তার সম্বল।

    সেই সম্বল নিয়েই কুম্ভ কথা শুরু করল কারখানার কর্মীদের সঙ্গে। কথাবার্তার সময় সে আর মনোরঞ্জন! সে বলেছে, বেশি লোকের দরকার নেই। কোম্পানির পক্ষে সে, কর্মীদের পক্ষে মনোরঞ্জন। কথাবার্তা শুরু হল এইভাবে—

    —আরে মনোরঞ্জন! এস এস। খবর কি! তোমার বড় ছেলে এখন কি করছে?

    —কিছু তো করছে না।

    —কিছু না করলে চলবে কেন?

    —কোথায় পাবে বলুন।

    কুম্ভর ঘরে মনোরঞ্জন বাদে এখন কেউ নেই। অতীশবাবুর ঘরে দুজন কাস্টমার। পাশের ঘরে দুজন অ্যাসিস্ট্যাণ্ট কাজ করছে। মেশিনপত্র চললে, এমনিতেই কিছু শোনা যায় না। তাদের কথা অন্য কেউ শোনার চেষ্টা করলেও শুনতে পাবে না। কারণ কুন্তু প্রত্যেক ঘর থেকে তার ঘরের দূরত্ব এবং ধ্বনিতরঙ্গ কখন কতটা তারতম্য হয় সব মাপজোক করে বসে আছে। কোথা থেকে কতটা শোনা যায় সে জানে। তাকে এজন্য সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। সে বলল, রাজার কাছে বলব তোমার ছেলের কথা।

    —কুম্ভবাবু!

    কুম্ভ চোখ তুলে চাইল।

    —আপনি ত অ্যাগ্রিমেন্টে রাজি হতে বারণ করেছেন!

    —করেছি। দরকার বুঝেছিলাম বলে করেছি। তারপরই কুম্ভ কি বলবে ভেবে পেল না। মনোরঞ্জন মুখের ওপর স্পষ্ট কথাটা শুনিয়ে দেবে সে আন্দাজ করতে পারেনি। সে মনে মনে বলল, আমি কুম্ভকুমার আমার ডরালে চলবে কেন! ঘাবড়ে গেলে চলবে কেন! সে একটা ফস করে পকেট থেকে সিগারেট বের করে মনোরঞ্জনকে দিয়ে বলল, ধরাও। মনোরঞ্জন তার চেয়ে বয়সে বড়, লম্বা ঢ্যাঙা। শুধু হাড় ক’খানা সম্বল করে কাজ করছে। কুম্ভর হাড় মাস দুই আছে। কুম্ভ-ই প্রবল প্রতিপক্ষ। সুতরাং সেভাবেই বলল, রাজার মেজাজ ভাল না। বড়বাবু কানে কি ফুসমন্তর দিয়েছে, কে জানে। রাজা বলেছেন, মাল না বাড়ালে কোম্পানি ক্লোজ করে দেবে। আমি চাইছি আপাতত সেটা বন্ধ করতে। তোমরা মেনে নাও। পরে কত অজুহাত পাবে। যদি দেখ ওভারটাইম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন সুযোগ বুঝে কোপ বসাবে।

    —দেখুন কুম্ভবাবু, একজন বিবেচক মানুষের মত সে বলল, ওভারটাইম আছে বলে ছেলে মাগ নিয়ে বেঁচে আছি। না থাকলে শুকিয়ে মরব।

    —কেন মাইনে বাড়ছে!

    —সেটা আর কত! ওতে হেলপারদের পোষাতে পারে, আমাদের পোষাবে না। আমাদের দিকটা আর একটু দেখুন।

    কুম্ভ বলল, এখন আর তা হবে না। তোমাদের কথা দিচ্ছি পরে হবে। অ্যাগ্রিমেণ্ট দু-বছরের। দেখই না কি দাঁড়ায়।

    মনোরঞ্জন জানে, হেলপাররা একপায়ে খাড়া। আরও যারা বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে তারাও রাজি। কেবল তার মত মোল্লারা বাধ সাধবে। কিন্তু যদি ছেলেটার কিছু হয়ে যায়, যদি পরে অজুহাত সৃষ্টি করা যায়। কুম্ভবাবু তো বলেই দিয়েছেন, তোমাদের অজুহাতের শেষ নেই। দরকার মনে করলে এটা ওটা খারাপ দেখিয়ে যেমন খুশি মাল দিতে পার। বড়বাবুরও বলার কিছু থাকবে না। রাজাকেও কচু দেখানো গেল।

    মনোরঞ্জন বলল, একটা দিন আমাদের ভাবতে দিন।

    পরদিন কুম্ভবাবু এসে অতীশের ঘরে ঢুকে বলল, ওরা রাজি। সুতরাং মিঞাবিবি যখন রাজি তখন শুভদিন দেখে সেরে ফেলা ভাল।

    অতীশের মনে হল লোকটা ভোজবাজি জানে! কুম্ভর মনে হল সে দিগ্বিজয়ী। সে তার মত করে সই করিয়ে নিচ্ছে। কোম্পানির কি থাকল সেটা বড় নয়, আসল কথা সে এই কোম্পানির কত অপরিহার্য মানুষ রাজা এবার ভেবে দেখুক।

    অতীশকে খুবই তখন ম্রিয়মান দেখাচ্ছিল। সে ভাবছিল, তার মত অপদার্থ লোক কতদিন এভাবে কাজ চালিয়ে যাবে। কারখানায় এলে নরকে ডুব দিতে হয়, সেটা যদি সে আগে জানত। শীত পার হয়ে গ্রীষ্ম আসতেই সেটা আরও টের পেল অতীশ। কুম্ভ একদিন মুখের ওপরই এসে বলল, দাদা, আপনাকে নিয়ে আর পারা যাবে না। কত মাইনে পাই খদ্দেররা জানবে কেন? আপনি নিজের সম্পর্কে কি ভাবেন! সত্যি কথার ভাত আছে। মর্যাদা আছে। এত কম মাইনে পাই, সেটা বলার দরকার কি! লোকে শুনলে কি ভাববে!

    অতীশ কি কথায় কথায় যেন সেদিন একজন খদ্দেরকে কথাটা বলে ফেলেছিল। সে ত জানে না, কুম্ভবাবু অন্যরকম বলেছে। সে বলল, যা পাই তাইত বলব!

    এতে আপনার সম্মান বাড়ল! আপনি এই পেলে আমরা কি পাব, ওরা টের পাবে না। তিনগুণ বাড়িয়ে বলি, সেটা আপনার দিকে চেয়ে, কারখানার কথা ভেবে, রাজার মানসম্মান যায় বলে। আপনি সেটাও বোঝেন না!

    অতীশের মনে হল, সে ঠিক পৃথিবীর মানুষ না। সে যে পরিমণ্ডল থেকে এসেছে, সেখানে এইসব তাকে শেখানো হয়নি। মাইনের সঙ্গে একটা মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন থাকে সেটাও সে ভাল করে ভেবে দেখেনি। চারপাশটা সেই অজানা সমুদ্রের চেয়েও ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে তার। সেখানে জীবনমৃত্যু অহরহ সামনাসামনি হাজির। এখানে জীবনমৃত্যুর চেয়ে আরও বেশি কিছু কঠিন সত্য হাজির। দিন যত যায় আচ্ছন্নতা তার তত বাড়ে।