Category: অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

  • সাতাশ

    সাতাশ

    ।। সাতাশ।।

    গাছপালা, সবুজ গাছপালার ভেতর দিয়ে, তারপর আনারসের ক্ষেত মাইলের পর মাইল, কোথাও কমলালেবুর বাগান এবং নীলকুঠি, পাশে স্যালি হিগিনস, সঙ্গে খাবার নানারকমের এবং কোনো উপত্যকায় গাড়ি উঠে গেলে নির্মল আকাশের নিচে উজ্জ্বল রোদে ওর বালিকার মতো হেঁটে যাওয়া, পর্বতগাত্রে নিজের নামের পাশে স্যালি হিগিনস এই সব বর্ণাঢ্য ছবি ভেসে উঠলে ভেতরে ভেতরে কেমন গুম মেরে যান। সে-বয়সে এলিসকে সত্যিই বালিকা ভাবা চলে। সমুদ্রে এলিসের ভীষণ একঘেয়ে জীবন, এই ডাঙ্গায়, কোন রেস্তোরাঁতে বসে সামান্য মদ্যপান, এবং চাইনিজ অথবা ফরাসী খাবার খেতে খেতে লাস্যময়ী হয়ে যাওয়া সবই সেদিনের কথা মনে হলে তিনি আর স্থির থাকতে পারেন না। এবং এসব ভাবলেই এলিস ওর সামনে এসে দাঁড়ায়, বলে, আমি এলিস। হিগিনস, আমাকে তুমি চিনতে পারছ না? তারপরই সেই পতনের শব্দ পান। জাহাজ থেকে সমুদ্রে কেউ পড়ে গেল। তিনি এলিসের ভাবনায় এ-জন্য কখনও মগ্ন হয়ে যান না।

    ছোটবাবু, জ্যাক পায়ের কাছে চুপচাপ বসেছিল। হিগিনস কিছু না বললে, সে কিছু আর বলতে পারে না। বোধ হয় হিগিনস টের পাচ্ছিলেন, ছোটবাবু এভাবে বসে থাকতে বিব্রত বোধ করছে এবং জ্যাকও যখন আর কোনো কথা বলছে না, তখন ঠিক চুপচাপ থাকা ঠিক না। তিনি বললেন, পাখিগুলো কোত্থেকে যে এল!

    ছোটবাবু যা হোক একটা কথা পেয়ে গেছে। সে বলল, এটা কেন যে হল?

    —আমি এর কিছু জানি না। তিনি পায়ের ওপর পা রেখে দোলাতে থাকলেন। একবার চুলের ভেতর আঙ্গুল চালিয়ে চুল টানলেন। ওপরের পাটির দাঁত ঠেলে আবার ঠিক জায়গায় বসালেন। কথা শুরু করার আগে ঠিক তাঁর এমন সব অভ্যাস বজায় রাখেন। তিনি ফের বললেন, জাহাজের অনেক কাহিনী, গল্পগাঁথা হয়ে যায়। নাবিকের ডাইরী থেকে এমন সব আজগুবী কাহিনী অনেক পাওয়া যায়। যার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা চলে না। তোমার মনে আছে হয়তো, কী ভয়ংকর ব্রেকারের ভেতর পড়ে গেছিলে। এর কার্যকারণ আমরা জানি না। ডাইরীতে লেখা থাকবে। এই যেমন অনেকের লেখা থাকে। নাবিকের ডাইরী থেকেই জেনেছিলাম, প্রশান্ত মহাসাগরে এ-সব পাখিদের আস্তানা রয়েছে। কিন্তু কেউ খুঁজে বের করতে পারে নি বলে কাল্পনিক ভেবেছে সবাই।

    তিনি বললেন, এই যে জ্যাক। ঘুমোচ্ছ?

    জ্যাক বলল, যাঃ ঘুমোব কেন?

    —কথা বলছ না। হাটুর ভেতর মাথা গুঁজে রেখেছ?

    জ্যাক যেন সমবয়সী বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছে। সে তার বাবাকে একদম পাত্তা দিতে চাইল না। ছোটবাবুর ভারি মজা লাগছিল। জ্যাক কেমন অনায়াসে বলে ফেলল, বাবা আমার ঘুম পাচ্ছে। তোমার কোনো কথা শুনতে আর ভালো লাগছে না।

    ছোটবাবুকে ভালো শ্রোতা পেয়ে বুড়ো মানুষটা বর্তে গেছেন। জাহাজে তাঁর কথা বলার লোক কম। ছোটবাবুকে প্রথম থেকেই ভালো মানুষ ভেবে ফেলেছেন। ছোটবাবুর সব সে জেনেছে—জ্যাক তো যত কথা বলে তার বেশির ভাগ ছোটবাবুকে নিয়ে। ছোটবাবুর পাশে বসে থাকতে জ্যাকের ভাল লাগার কথা। কিন্তু জ্যাক বসে থাকতে চাইছে না, এত তাড়াতাড়ি ঘুম পাচ্ছে—জ্যাকের কি ভাল লাগছে না বুড়ো মানুষটাকে—কেমন চাপা অভিমান তাঁর—জ্যাক বড় হয়ে গেছে বুঝতে পারছেন, ঠিক বালিকার মতো স্বভাব এখন আর তার নেই। মাঝে মাঝে জ্যাক এমন গম্ভীর হয়ে যায় যে, তিনি নিজে পর্যন্ত কথা বলতে ভয় পান।

    সুতরাং ছোটবাবুই তার একমাত্র সময় কাটানোর মতো মানুষ। ওপরে থার্ড-মেট আছে। বারোটা পর্যন্ত তিনি জেগে থাকবেন। ওরা ছেলেমানুষ—ওদের বেশি রাত পর্যন্ত আটকে রাখা ঠিক না। তবু যা বলছিলেন, শেষ না করলে ছোটবাবুর মনে তার সম্পর্কে সংশয় থেকে যাবে। সমুদ্র সম্পর্কে সঠিক ধারণা হবে না।

    তিনি বললেন, সমুদ্রে কি হয় না হয় কেউ বলতে পারে না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগের ঘটনা। জাহাজে তখন চিফ-মেটের প্রমোশন পেয়েছি। চীন উপসাগরে জাহাজ। সকালের দিকে আরও দুটো জাহাজ পাশাপাশি। এই ধর পঞ্চাশ মাইলের ভেতর। মাঝে মাঝে ঠিক বেতার সংকেত চলে আসছে। দুপুর পর্যন্ত আমরা খবরাখবর ঠিক রেখে যাচ্ছি। আর বিকেলে খবর এরিয়া স্টেশন থেকে—এস এস সিটি অফ পানামার খোঁজ নেই। কোনো এস-ও-এস ছিল না। সমুদ্রে কোনো ঝড় নেই। ঘন্টা তিনেকের ভেতর হংকং থেকে উড়ো জাহাজ ফ্লাই করল, আমরা এগিয়ে গেলাম—কিচ্ছু দেখা গেল না। জাহাজ মিসিং। জাহাজের কুটোগাছটি কোথাও আমরা ভেসে যেতে দেখলাম না। একেবারে রহস্যের অন্তরালে সে চলে গেল।

    তিনি থেমে বললেন, এভাবে কত জাহাজ মিসিং হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ওরা যে গভীর সমুদ্র থেকে উঠে আসা কোন প্রাচীন দানবের সাক্ষাৎ পায়নি কে বলবে। জাহাজটাকে যে নিমিষে কোন চম্বুকের পাহাড় অতল সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়নি কে বলবে, অথবা এইসব বিষাক্ত পাখিদের মতো আরও অতিকায় নাটকীয় কিছু ঘটেনি কে বলবে। সব তো লেখা থাকে না। লেখা থাকলেও কাল্পনিক ভেবে নিতে কতক্ষণ।

    —কিন্তু আর্চির মুখের দাগ!

    —সবাই বলবে, মারামারি করতে গিয়ে কেউ আঁচড়ে খামচে দিয়েছে। জাহাজ থেকে নেমে বেটারা বেশ গল্প ফেঁদেছে এ-সবও যে বলবে না তার বিশ্বাস কি! তবু তুমি যা দেখলে ভাববে, জাহাজ সমুদ্রে এভাবেই সব প্রতিকূলতার ভেতর পড়ে যায়। ওঁর ইচ্ছে থাকলে বাঁচেন, ইচ্ছে না থাকলে বাঁচেন না। সমুদ্রে তিনিই সব। বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। জ্যাক সত্যি ঝিমুচ্ছিল। তিনি ডাকলেন, জ্যাক শুতে যাও। এই জ্যাক তুমি ঘুমোচ্ছ? ঠিক ঘুমোচ্ছ।

    —হ্যাঁ আমি ঘুমোচ্ছি। বলে জ্যাক যখন উঠে দাঁড়াল, জ্যাকের চোখ লাল। জ্যাক ঘুমিয়ে পড়েছে এটা ভাবতে সে লজা পাচ্ছে। সে বলল, তুমি যাচ্ছ?

    —তোমরা যাও। বলে তিনি যুবক বয়সে যেভাবে সিঁড়ি ভাঙতেন, প্রায় তেমনি সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন। জ্যাকের কেবিন যেহেতু বোট-ডেকে সে দরজার পাশে এসে বলল, গুড-নাইট।

    ছোটবাবু বলল, গুড-নাইট। কিন্তু জ্যাক দেখল, ছোটবাবু নিচে সিঁড়ি ধরে নেমে যাচ্ছে না। সে বোট-ডেক ধরে হেঁটে যাচ্ছে। সে ডাকল, এই ছোটবাবু কোথায় যাচ্ছ আবার?

    —একটু পরে শোব। ঘুম পাচ্ছে না।

    —এই যে বললে, ঘুম পাচ্ছে খুব। ওপরে উঠবে না।

    —এখন আর পাচ্ছে না।

    —আমারও পাচ্ছে না বলে সে দৌড়ে ছোটবাবুর কাছে চলে গেল।

    —কোথায় যাচ্ছ? —কোথাও না।

    —তুমি রাগ করেছ ছোটবাবু?

    —রাগের কি আছে!

    —না এই যে ডেকে আনলাম। মিথ্যে কথা বলে বাবার কাছে বসিয়ে রাখলাম।

    —আরে না। তুমি যে কি না জ্যাক। ঘুমোও গে তো।

    জ্যাক বলল, কি যে সুন্দর লাগছে না আকাশটা।

    —কত নক্ষত্র! ছোটবাবু দাঁড়িয়ে গেল।

    —দ্যাখো এরা সবাই জাহাজটার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে না, আমাদের সঙ্গে সবাই যাচ্ছে তাহিতিতে।

    —তাইতো!

    ওরা বোটের আড়ালে দুজনে বসে পড়ল। জ্যাক তার পাশে বসেছে, একেবারে গা ঘেঁসে এবং পুষিবেড়ালের মতো করছে। জ্যাক কি যে ছেলেমানুষী করছে। এবং মাঝে মাঝে সে বিরক্ত হয়ে পড়ছে। বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, তুমি ঠিক হয়ে বোস। এভাবে গোটা শরীর ছেড়ে দিলে বসতে পারি। কিন্তু বলতে পারে না। জ্যাক এখন চুপচাপ আকাশ দেখছে। নক্ষত্র দেখছে। সাত-পাঁচ মুখে যা আসছে বলে যাচ্ছে। ওর বাবা রাতের পর রাত নক্ষত্র দেখে জেগে থাকতে পারত। ওর বাবা কোন্ আকাশে কোন্ সময়ে কি কি নক্ষত্রের সমাবেশ ঘটে বলে দিতে পারে। যেমন তার ইচ্ছে বাবার কাছ থেকে সে সব নক্ষত্রের নাম জেনে নেবে, এবং রাতে যখন কিছু ভাল লাগবে না, ছোটবাবুকে সঙ্গে করে বোট-ডেকে উঠে আসবে এবং এক-দুই করে সমস্ত আকাশের নক্ষত্রের নাম বলে যাবে ছোটবাবুকে। কি যে সব মাথামুন্ডু বলছে। ওর পিঠে হেলান দিয়ে জ্যাক বেশ সুখে বসে রয়েছে। জ্যাকের মুখ যমুনাবাজুর দিকে। ওর মুখ সমুদ্রের দিকে।

    তখন মনে হল ঠিক নিচে আরও একজন একাকী এভাবে দাঁড়িয়ে আছে। উইন্ডসেলের পাশে, চুপচাপ, সমুদ্রের নির্জনতার ভেতর আকাশ দেখছে। প্রথমে ভূতটুতের ব্যাপার ভাবল, তারপর তড়াক করে লাফিয়ে দেখতে গেল কে এভাবে দাঁড়িয়ে? কাছে গিয়ে বুঝতে পারল, এনজিন সারেঙ। সাদা চুল সাদা দাড়িতে এমন সুন্দর চেহারা জাহাজে আর একটিও নেই। ছোটবাবু বলল, চাচা আপনি।

    —তুই! তুই এখনও জেগে আছিস। শরীর খারাপ করবে।

    —আমি একা না। জ্যাকও আছে।

    —জ্যাক! কেমন গুটিয়ে গেলেন এনজিন-সারেঙ।

    ছোটবাবু বলল, জ্যাক ভীষণ ভাল চাচা। জ্যাক এগিয়ে এস।

    সারেঙ-সাব বললেন, থাক থাক। বলে টুইন ডেক ধরে হাঁটতে থাকলেন। ছোটবাবু কি করবে বুঝতে পারল না। পাশে পাশে হেঁটে গেল। মানুষটা পৃথিবীতে ভীষণ একা। এখানে দাঁড়িয়ে এত রাতে কি দেখছিলেন সে বুঝতে পারল না। গত রাতে ওরা একটা দুঃস্বপ্নের ভেতর ছিল, কেউ যেন এখন তা মনে করতে পারছে না। সে এগিয়ে গেল। বলল, চাচা আপনার শরীর ভাল তো? এমন একটা প্ৰশ্ন এত উদ্বিগ্ন গলায় জাহাজে কেউ তাঁকে করতে পারে তাঁর জানা ছিল না। তিনি দাঁড়ালেন। ছোটবাবুর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ভাল আছি। বুড়ো মানুষের সব সময় ভাল থাকা ছাড়া উপায় থাকে না ছেলে।

    ছোটবাবু বলল, আপনাকে দেখে ভীষণ খারাপ লাগছে।

    —কেন রে!

    —আপনাকে বড় একা মনে হয়।

    —আমি একা থাকব কেন। আমার আল্লা আছেন না। তিনি থাকলে আমার আর কিছু লাগে না ছেলে। আমি তাঁর কাছে আছি ভাবতে ভাল লাগে। সবাই ঘুমিয়ে থাকলে, জাহাজ ডেকে চুপচাপ দাঁড়াতে ভাল লাগে। এত বড় সমুদ্রে রাতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলে তাঁকে খুব কাছে পাওয়া যায়।

    এবং এভাবে সারেঙ-সাবকে দেখলেই আর একজন মানুষের কথা সে না ভেবে পারে না। ঠিক যেন সেই মানুষ তাকে রক্ষা করতে জাহাজে উঠে এসেছেন। দেশভাগের সময় যে তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে গেলে মনে হত ওর পৃথিবীতে তার কিছু হারায় নি, তিনি ছিলেন তাদের একজন। জাহাজে উঠে ছোটবাবু অন্ততঃ সেই একজনকে আবার ফিরে পেয়েছে। সে বলল, চাচা আমি ঠিক পারছি তো!

    চাচা বুঝতে না পেরে, ওর দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

    –এই কাজ কর্ম। আপনি তো ভয়ে জাহাজে নিতে চাননি। আমি কিন্তু চাচা আপনার এতটুক অসম্মান হয় তেমন কাজ করি নি।

    —তুই এ-সব বলছিস কেন?

    —আমার কেবল ভয় হত, আপনি ছোট না হয়ে যান। হাতে ধরে আপনি আমাকে এনেছেন।

    —আমাকে তো তুই অনেক বড় করে দিয়েছিস।

    ছোটবাবু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল।

    এনজিন-সারেঙের চোখ ছলছল করছে। বললেন, পারবি। পারবি তুই। আর দাঁড়ালেন না। দ্রুত চার নম্বর ফল্কা পার হয়ে গ্যালির কাছে উঠে গেলেন। জ্যাক কিছু বুঝতে পারল না। সে দূরে দাঁড়িয়ে শুধু দেখছে। ছোটবাবু কেমন মুহ্যমান। এটা যে কি হয় মাঝে মাঝে ছোটবাবুর। মাস্তুলের নিচে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ছোটবাবু কি তার লিট্ল প্রিন্সেস-এর জন্য খোলা ডেকে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। সারেঙ-সাব কি তাকে কোনো খবর দিয়ে গেল। এবং কাছে গিয়ে ডাকল, এই ছোটবাবু, ছোটবাবু! তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন?

    ঘুম থেকে জেগে ওঠার মতো মুখ, নিমেষে, সে তার ছোট আর এক গ্রহ থেকে যেন ঘুরে এল। তাদের প্রিয় আশ্বিনের কুকুরের কথা মনে হল। বর্ণময় লতাপাতা ঘেরা এক পৃথিবী, সেখানে একজন মানুষ কেবল হেঁটে যাচ্ছেন। তাঁর মুখে কিটসের কবিতা। সে বলল, জ্যাক তুমি কিটসের কবিতা আবৃত্তি করতে পার?

    —কিটসের কবিতা! কেন বলতো!

    —এই এমনি। বলে সে হাঁটতে থাকল। সে বলতে পারল না, আমি যে গ্রহ থেকে এসেছি জ্যাক সে ভারি সুন্দর গ্রহ। এত দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তেমনি সুন্দর ছোট্ট গ্রহ কোথাও খুঁজে পেলাম না। মানুষের জন্মভূমি বড় প্রিয়। প্রিয় তার সেই গাছপালা, শৈশব আর আশ্বিনের কুকুর। একজন মানুষের হাতীতে চড়ে মাঝে মাঝে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া, তাঁর ফিরে আসা, তাঁর কবিতা আবৃত্তি এবং মাঝে মাঝে কি হয়ে যেত আমাদের সবার, তিনি না থাকলে আমাদের কিছু নেই এমন মনে হত। সে-সব তুমি বুঝবে না।

    তখনই জ্যাক বলল, দ্যাখো দ্যাখো!

    ছোটবাবু ওপরের দিকে তাকাল। সত্যি সে আশ্চর্য হয়ে গেল দেখে। লেডি-অ্যালব্রাটস ক্রোজনেস্টের মাথায় বসে রয়েছে। এবং নিচে আলো, আলোর ডুম দুলছে। যেন কতদিন পর সে ফিরে এসেছে। সমুদ্রে উড়ে উড়ে ক্লান্তিতে ঘুম পাচ্ছে পাখিটার। এবং এক আক্রোশ এই পাখিকে কেন্দ্র করে। যে-কোনো সময় যে কেউ বন্দুকের নলে পাখিটাকে নামিয়ে আনতে পারে। যেমন তার আশ্বিনের কুকুরের জন্য কষ্ট হত, তেমনি এই পাখিটার জন্য মায়া। সারেঙ-সাব, কাপ্তান, ওর সেই হাতীতে চড়ে মাঝে মাঝে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া পাগল জ্যাঠামশাইর সঙ্গে ভারি মিল পাখিটার। নিঃসঙ্গ সে। পাখিটাকে আজ আর তাড়িয়ে দিতে পারল না। বরং মনে হল, মাস্তুলের নিচে সে নিজে এবার থেকে বসে থাকবে। পাহারা দেবে পাখিটাকে। ভোররাতে সমুদ্রে উড়িয়ে ধীরে ধীরে চলে যাবে কেবিনে। তারপর ঘুম যাবে। পাখিটার জন্য নিশীথে এই গভীর সমুদ্রে এক আশ্চর্য ভালবাসা গড়ে উঠল। সে বলতে চাইল, হে মহান লেডি, আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমোন। অধম নিচে পাহারায় থাকল।

    এ-ভাবেই মানুষের কখনও কিছু একটা হয়ে যায়। কখন কার জন্য ভালবাসা গড়ে উঠবে সে জানে না। লেডি-অ্যালবাট্রসের জন্য ছোটবাবুর কাজ বেড়ে গেল। সে জ্যাককে তার কেবিনে পৌঁছে দিল। নিজে নেমে এল নিচে। এখন ঘড়িতে দশটা বেজে পঁচিশ। সে আসার সময় জ্যাককে বলে এসেছে, দোহাই কাউকে বলবে না, লেডি-অ্যালাবাট্রস, রাত গভীরে জাহাজের মাস্তুলে এসে বসে থাকে, ঘুমোয়। সকালের দিকে জাহাজিদের ঘুম না ভাঙতে সে সমুদ্রে উড়ে যায়। কেউ টের পায় না, রাতে পাখিটা এই জাহাজের মাস্তুলে নিজের বাসভূমি তৈরি করে নিয়েছে। সবচেয়ে ভয় এখন আর্চিকে। সে যা কিছু ভালবাসবে, আর্চি জানতে পারলেই তা বিনষ্ট করবে। যদি কখনও পাখিটার ভোর রাতে ঘুম না ভাঙে…!

    এখন যা করণীয়, একটা টাইমপিস ঘড়ি। ভোর রাতের দিকে সে এলার্ম দিয়ে রাখবে। এলার্ম বাজলে উঠে পড়বে বাংক ছেড়ে। এবং চারপাশে সতর্ক নজর রাখবে। খুব সন্তর্পণে গিয়ে দাঁড়াবে মাস্তুলের গোড়ায়। তারপরে হাতে তালি বাজিয়ে পাখিটাকে জাগিয়ে দেবে এবং উড়িয়ে দেবে।

    জাহাজে দু’জনের দুটো টাইমপিস ঘড়ি আছে। একটা কাপ্তান স্যালি হিগিনসের, আর অন্যটা এনজিন সারেঙের। সে এনজিন সারেঙের কাছ থেকে অনায়াসেই চেয়ে নিতে পারে। কারণ জাহাজে ওয়াচের পর ওয়াচ চলে। যেমন এনজিন-রুমে গ্রিজার ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় চলে। তার কাজ আধ ঘন্টা আগে পরবর্তী ওয়াচের লোকদের জাগিয়ে দেওয়া। তার কাজ যথাসময়ে পরবর্তী ওয়াচের সবাইকে সজাগ করা। সারেঙসাবের ঘড়ি না হলেও চলে। তবু তিনি ঘড়িটা কাছে রাখেন, মধ্যরাতে ওয়াচের সব লোকেরা মাঝে মাঝে ভীষণ ক্ষেপে যায়। মারামারি পর্যন্ত আরম্ভ করে দেয়। একটু আগে পরে হয়ে গেলে এমন হয়।

    তবু যা মনে হল, সে সারেঙ-সাবের কাছে ঘড়ি চাইলে তিনি দেবেন। কিন্তু যদি তিনি ঘড়িটা না থাকলে সত্যি অসুবিধা বোধ করেন তাহলে কি হবে বুঝতে পারল না। ঘড়িটা নেই, অসুবিধা হচ্ছে, তিনি মুখ ফুটে কখনও বলবেন না। সে তো তাঁকে এতদিনে প্রায় জেনে ফেলেছে।

    সবচেয়ে ভাল হয় ডেবিডের সঙ্গে কথা বলে রাখা। ওর ডিউটি বারোটা-চারটা। চারটায় সে যখন কেবিনে ফিরে আসবে, তখন তাকে ডেকে দিলেই চলবে। সে সোজা গিয়ে ডেবিডের দরজায় আঙুলে টোকা মারল। ডেবিড দরজা খুললে বলল, তোমাকে একটু বিরক্ত করতে এলাম।

    ছোটবাবুর কথা বলার স্বভাবই এ-রকমের। ছোটবাবু ভেবেছিল, ডেবিড হয়তো ঘুমোচ্ছে। ওকে ডাকা ঠিক হবে কি হবে না বুজতে পারছিল না। তবু যখন না ভেবে চলে এসেছে তখন এভাবেই কথা বলা উচিত। ডেবিডের বোধ হয় চোখে ঘুম লেগে এসেছিল। স্লিপিং গাউনের দড়ি আঁটতে আঁটতে বলল, কি ব্যাপার বলবে তো!

    —ব্যাপার কিছু না। আমার খুব সকালে ওঠা দরকার। ঘুম ভাঙতে দেরি হয়ে যায়। ওয়াচ থেকে ফেরার সময় আমাকে একটু ডেকে দেবে!

    –দেব।

    —রোজই দেবে।

    —তা দেব।

    —অন্ততঃ যতদিন না তাহিতিতে পৌঁছাচ্ছি।

    —হবে হবে। কিন্তু এত সকালে!

    ছোটবাবু চলে গেল। কিছু আর বলল না। কি যে দরকার সকালে ওঠার! পাগল! ডেবিড এ নিয়ে আর কিছু ভাবল না। সে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। জাহাজে উঠলে নানারকমের বাতিক দেখা দেয়। ছোটবাবুকে খুব সকালে ওঠার বাতিকে পেয়েছে।

    এবং সে ওয়াচ থেকে ফেরার সময় ঠিক মনে রেখেছে। সে ডাকল, এই ছোট, ওঠো।

    ছোট বলল, উঠেছি।

    এক ডাকেই ছোটবাবু সাড়া দিয়েছে। ডেবিড ভেবে পেল না, ছোটবাবুর রাতে ঘুম হয়েছে কিনা। না আদৌ ঘুমোয় নি। সে সারারাত সকালে উঠতে হবে বলে জেগে বসেছিল। ডেবিড বলল, ছোট, কফি খাবে?

    ছোটবাবু বলল, না।

    এলি-ওয়েতে সে এ-ভাবে দাঁড়িয়ে ফের বলল, তোমার সকালে কফি খেতে ভাল লাগে না?

    —না সেকেণ্ড।

    আসলে ছোটবাবু তো বলতে পারে না, তোমার সঙ্গে কফি খাওয়া মানে, তুমি গল্প আরম্ভ করে দেবে। অথবা আমি কি করছি না করছি তোমার জানা হয়ে যাবে। ছোটবাবু দরজা কিছুতেই খুলল না। ডেবিড দাঁড়িয়ে থেকে কিছুক্ষণ কি ভাবল, তারপর নিজের কেবিনে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

    দরজা বন্ধের অস্পষ্ট শব্দে সে বুঝতে পারল ডেবিড চলে গেছে। সে এবার খুব সন্তর্পণে দরজা খুলে মুখ বাড়াল। এলি-ওয়েতে কেউ নেই। কেউ থাকার কথাও না। পাঁচ-নম্বরের এখন নিচে নামার কথা। তিন-নম্বরের এনজিন-রুম থেকে ফিরে আসার কথা। এনজিন-রুমের ফায়ারম্যান, টিণ্ডাল ওয়াচ শেষ করে ফিরে যাবে। সে আর একটু সময় অপেক্ষা করল। দরজা বন্ধ করে বসে থাকল। কারণ ডেবিডের হাত মুখ ধোওয়ার ব্যাপার আছে, কফি না খেয়ে শুতে যাবে না, তিননম্বর এনজিনিয়ার এসেই শুয়ে পড়বে না, সেও কোনো না কোনো কারণে এলি-ওয়ে ধরে হেঁটে যেতে পারে। দেখা হয়ে গেলে দাঁড়িয়ে দু একটা কথা বলতেই হবে। অসময়ে ছোটবাবু এলি-ওয়ে ধরে কোথায় যাচ্ছে এ-সব প্রশ্ন স্বাভাবিক কারণেই ওদের মনে হতে পারে। সুতরাং একটু অপেক্ষা করে তবে যাওয়া ভাল।

    সে যখন হেঁটে গেল—কেবিনের সব দরজা বন্ধ। শুধু আলো জ্বলছে, সরলরেখার মতো। অনেক দূরে—একটা খোলা সরু বাকসের মতো দরজা দেখা যাচ্ছে। সে চারপাশে সতর্ক নজর রেখে হেঁটে গেল ডেকে। অস্পষ্ট অন্ধকার। আলোগুলো দুলছে। দূরের সমুদ্রে কেমন সঙ্গীতের মতো একটা বাজনা বাজছে। সমুদ্রের এই সংগীত এবং ওপরে লেডি-অ্যালবাট্রস পাখার ভেতর ঠোঁট গুঁজে ঘুমিয়ে আছে —আর জাহাজের ওপর দিয়ে আকাশটা তার নক্ষত্রমালা নিয়ে একেবারে একটা নীল আচ্ছাদনের মতো হয়ে গেছে এসব দেখতে দেখতে সে দাঁড়িয়ে গেল। ওর শরীরে সাদা পোষাক। সাদা পায়জামা, সাদা হাফসার্ট এবং বাথরুম স্লিপার পায়ে। সে চটি পরে আসেনি, যদি শব্দে কেউ টের পায়, ছোটবাবু যাচ্ছে ডেকে। অসময়ে ছোটবাবু ডেকে যাচ্ছে কেন!

    আসলে এইসব নিরিবিলি সমুদ্রের ভেতর দাঁড়িয়ে না থাকলে টের পাওয়া যায় না, জীবনে এক মুহ্যমান ব্যাপার থেকে যায় কখনও কখনও। তখন হিসেব করে পৃথিবী থেকে পাওনা গণ্ডা মিটিয়ে নেবার কথা মনে থাকে না। কি দরকার যে ছিল ওর, সে বুঝতে পারছিল না। সারারাত সে দুচোখ এক করতে পারেনি। যদি ডেবিড ডেকে দিতে ভুলে যায়। ডেবিডের ওপর সে বিশ্বাস রাখতে পারে নি। তারপর ভেবেছে, সে জেগে না গেলে পাখিটা ঘুমিয়ে পড়বে, সকালে কেউ ওপারে তাকালেই দেখতে পাবে—লেডি অ্যালবাট্রস মাস্তুলে বসে রয়েছে। এমন একটা প্রতিশোধের সুযোগ পাওয়া ভার—সুতরাং ছোটবাবু রাতে কিছুতেই ঘুমোতে পারল না। মাস্তুলের নিচে দাঁড়িয়ে সে শুধু পাখিটার অসহায়তার কথা ভাবছে। ভাবতে ভাবতেই সে জোরে তালি বাজাল। আর সঙ্গে সঙ্গে পাখিটা ঠোঁট পাখার ভেতর থেকে বের করে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখল। নিচে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে। হাত তুলে হুঁশহাঁশ করছে।

    লেডি অ্যালবাট্রস ডানা মেলে দিল আকাশে। তারপর উড়তে থাকল। সূর্য যেদিকে ওঠার কথা সেদিকে উড়ে উড়ে যেতে থাকল।

    পরদিন সকালে ডেবিড আবার তাকে ডেকে দিল। সে উঠে সামান্য সময় বসে থাকল, এবং যখন সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত সে পাখিটাকে উড়িয়ে দিল! সে বুঝতে পারছে আর দুদিন। ঠিক বন্দরের কাছে গেলে, পাখিটা আবার ডাঙ্গা পেয়ে যাবে। তাকে আর তখন এত সকালে না উঠলেও চলবে। ডাঙ্গা পেলে পাখিটা আর একটা পুরুষ পাখিও খুঁজে পাবে। তখন আর পাখিটা অসহায় থাকবে না। নিজের মতো কেউ মিলে গেলে, পাখিটা আবার একটা জাহাজের পেছনে উড়তে উড়তে নিজের দ্বীপে ফিরে যেতে পারবে।

    এ-ভাবে সে পাখিটাকে এখন সময় পেলেই—কারণ সে দেখেছে যখন পাখিটা দূরে দূরে উড়ে বেড়ায়, অথবা খুব কাছে এসে যায়, সে পাখিটাকে কিছু নরম মাংস, এই যেমন মাংসের হাড় এবং সে কখনও চিফ-কুকের গ্যালি থেকে উচ্ছিষ্ট হাড় মাংস পকেটে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কাছে এলেই সে মাংস হাড় ছুঁড়ে দিলে খুব সুন্দরভাবে পাখিটা নেমে এসে ধরে ফেলে। সমুদ্রে পড়ে যাবার আগেই হাড় মাংস তুলে নিয়ে যায় ঠোঁটে। এবং দূরে গিয়ে একটা হাঁসের মত জলে সাঁতার কাটতে থাকে, গলা উঁচু করে হাড় মাংস গিলে ফেললে বোধহয় পাখিটার সজীবতা বাড়ে—তাকে আর মনেই হয় না খুব অসহায়। বরং এ-ভাবে ছোটবাবুর হাতে তার খাবার প্রত্যাশা বেড়ে যায়।

    এবং এ-দুদিনেই সে দেখেছে, ডেকে তাকে দেখলেই তার কাছাকাছি উড়তে ভালবাসে পাখিটা সবসময় খাবার থাকে না। তার ডেকে কাজ। উইনচে কাজ থাকার দরুন সে দেখেছে, কখনও তার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেছে পাখিটা। সে তখন বুঝতে পারে পাখিটা কিছু খেতে চায়। হাতের কাজ ফেলে প্রায় দৌড়ে চলে যায় তখন ছোটবাবু। চিফ-কুকের গ্যালি থেকে যত উচ্ছিষ্ট খাবার, দু’পকেটে, যতটা পারে তুলে নেয়। তারপর সন্তর্পণে আবার চলে যায় স্টারবোর্ড-সাইডে। এদিকটায় কেউ বড় আসে না। ছোটবাবু একটা নিভৃত জায়গায় দাঁড়িয়ে পাখিটাকে খাওয়ায়।

    মৈত্র এবং’ অমিয়, ইয়াসিন, জব্বার, কখনও সারেঙ-সাব দেখেছে ছোট চুপচাপ দাঁড়িয়ে পাখিটাকে দেখছে। ওরা কেউ বুঝতে পারছিল না, ছোট এভাবে দু’দিন ধরে মাঝে মাঝে এখানে দাঁড়িয়ে থাকে কেন। সারেঙ-সাব বিকেলে বলেছিল, হ্যাঁ রে কি করিস মাস্তুলের নিচে।

    সারেঙ-সাবের কাছে সে মিথ্যা কথা বলতে লজ্জা পেল। সে বলল, দেখবেন। বলেই পকেট থেকে এক টুকরো মাংস বের করে জোরে সমুদ্রে ছুঁড়ে দিল। কোথায় ছিল পাখিটা, ঠিক নজর আছে, বাজপাখির মতো শাঁ শাঁ করে উড়ে এল। জলে পড়ার আগে ঠিক ঠোটে তুলে উড়তে উড়তে দূরে চলে গেল।

    সারেঙ সাব বললেন, আমাকে দে তো, আমি দ্যাখি একবার।

    —একটু দাঁড়ান। এখন দিলে হবে না। দেখছেন না বিবি এখন পরিপাটি করে খাচ্ছে। সাঁতার কাটছে। জলে ডুবে স্নান করছে।

    জাহাজের একঘেঁয়েমির ভেতর পাখির এই সমুদ্রে স্নান করা, উড়ে বেড়ানো, পাখায় সমুদ্রের জল নিয়ে ক্রমে এগিয়ে আসা, অথবা এই যে মনোরম হয়ে যাচ্ছে সমুদ্রটা, সমুদ্র আর খালি খালি লাগছে না, সমুদ্রে এভাবে সাঁতার কাটতে কাটতে পাখিটা সত্যি যে এক আশ্চর্য পৃথিবী গড়ে তুলছে—ছোটবাবুর সঙ্গে না দাঁড়ালে টের পাওয়া যায় না। ছোটবাবুর পাশে দাঁড়িয়ে পাখিটার কাণ্ডকারখানা দেখে সারেঙ মুগ্ধ হয়ে গেলেন। বললেন, এবারে দেব।

    —দিন, খাওয়া হয়ে গেছে। খাবারের লোভে দেখুন আবার কি কাছে এসে গেছে! কিন্তু এটা কেন হচ্ছে। সারেঙ দু’বার ছুঁড়ে দিলেন, দু’বারই পাখিটা দূরে সরে গেল। এসে ছোঁ মেরে তুলে নিল না।

    —কি রে খাচ্ছে না কেন?

    —ভয় পাচ্ছে।

    —তুই দে তো আবার

    ছোটবাবু জোরে ছুঁড়ে দিল।

    পাখিটা ঠিক আসছে। জাহাজটা ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে বলে পাখিটা এসে যখন ধরে ফেলে তখন পিছিলের কাছাকাছি চলে যায় পাখিটা। ওরা ঠিক জাহাজের মাঝখানে রয়েছে। খাবার নিয়ে যখন উড়ে চলে যায়, তখন দুজনকেই পেছনে উঁকি দিয়ে দেখতে হয়। এবং খাওয়া হয়ে গেলেই আবার উড়ে এল। সারেঙ-সাব বললেন, দেব এবার!

    —দিন।

    তিন বারের বার পাখিটা সারেঙ-সাবকে আর ভয় পেল না। ঠিক তুলে নিয়ে গেল।

    ছোটবাবু বলল, আপনাকে চিনে ফেলেছে। আপনাকে পাখিটা ভালবেসে ফেলেছে। আপনি দিলেই খাবে। আপনাকে দেখলেই পাখিটা আপনার মাথার ওপরে উড়ে আসবে। তারপর সে ফিসফিস করে বলল, চাচা কাউকে বলবেন না। বললে, মেজ-মিস্ত্রি জানতে পারবে। পাখিটার ওপর খুব রাগ। ভুলিয়ে এনে গুলি করতে পারে।

    সারেঙ-সাব বললেন, মুখের দাগ ওর যাচ্ছে না।

    ছোটবাবু বলল, উল্কি পরার মতো হয়ে গেছে মুখটা। তারপর বলল, ঐ দেখুন আবার আসছে। সারেঙ-সাবের নামাজ পড়ার সময় হয়ে গেছে। তিনি নামাজ পড়তে চলে যাচ্ছেন। তিনি এই ছেলেটার মায়ায় জড়িয়ে পড়েই কেমন জীবনে গণ্ডগোলে পড়ে গেছেন। আবার একটা পাখি! এখন এ-সব থেকে যত দূরে থাকা যায়। তিনি যেতে যেতে বললেন, কাপ্তানকে একবার বল না। এজেণ্ট অফিসকে লিখে তোর বাড়ির ঠিকানাটা আনতে পারে কিনা?

    —কি করে পারবে!

    —ওরা না পারে এমন কাজ নেই। ইচ্ছে থাকলে ওরা সব পারে।

    ছোট, সারেঙ-সাবের পাশে পাশে হেঁটে গেল। বলল, চাচা এটা হয় না। এতবড় মানুষটাকে আমি বলতে পারি!

    —কাপ্তান তোকে খুব ভালবাসে ছোট। তুই জানিস তা।

    —কি জানি, বুঝছি না।

    —বুঝছিস না? বলে হাঁটতে হাঁটতে একবার ছোটবাবুকে পাশ থেকে দেখলেন। ওরা এখন ডেক- ভাণ্ডারির গ্যালিতে উঠে গেছে। সারেঙ-সাবের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে এদিকে চলে এসেছে। একবার সামনের দিকে তাকাল। না কেউ দেখছে না। সে বলল, ঠিকানা পাবে কি করে?

    –কেন, আগে তোরা যে জায়গায় ছিলি, পাশাপাশি বাড়ির কেউ খবর দিতে পারে!

    –যদি পারত, তবে ঠিকানা ওরা রি-ডাইরেক্ট করতে পারত। পোস্টাফিস থেকে নট ক্লেইমড় হয়ে ফিরে আসত না।

    –পোস্টাফিসের দায় পড়েছে!

    —আসলে কি জানেন চাচা, বলে সে এবার সিঁড়ি ধরে ধরে নিচে নেমে যাচ্ছে। বাঁ-দিকে সারেঙের ফোকসাল। তিনি এখানে একা থাকেন। সারেং ওকে একটা মোড়া এগিয়ে বসতে দিল।—আসলে কি জানেন, বাবা জ্যাঠামশাই এখানে এসে নিজেদের সম্মান বজায় রাখতে পারলেন না। না খেয়ে বাঁচা যায় বোধহয় বাবা জ্যাঠামশাই ভেবেছিলেন। তবু মান সম্মানটুকু থাকুক। সেটুকু বোধহয় শেষ পর্যন্ত ওঁদের ছিল না। ওঁরা যাবার সময় কাউকে কিছু ঠিকানা রেখে যান নি। ওঁরা অপরিচিতের মতো বাঁচতে চাইতেন। প্রতিবেশী বলতেও তেমন কিছু ছিল না। বন-জঙ্গল সাফ করে মাত্র আবাস তৈরি করেছিলেন।

    —তোর এক কাকা আছেন না!

    —আছেন! এ-দেশে এসে তিনি ভিন্ন হয়ে গেলেন। বাবা জ্যাঠামশাইর সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখেন নি।

    অনেকদিন পর যেন ছোটবাবুর মনে হল, সে ডাঙ্গার মানুষ। সারেঙ-সাব এক এক করে সব মনে করিয়ে দিচ্ছেন। ওর মুখটা আবার বেজার হয়ে গেছে। সে তবু বলল, চাচা আপনি, ডেকসারেঙের মতো কাঠের পুথিদান করে নিতে পারেন না!

    সারেঙ-সাব দেখলেন, ওর ছেঁড়া বইটা বাংকে পড়ে আছে। তিনি সময় পেলেই যখন জাহাজে একঘেঁয়েমি মনে হয় ভীষণ, যখন একঘেঁয়েমির যন্ত্রণায় জাহাজিরা ফোকসালে মারামারি পর্যন্ত লাগিয়ে দেয় তখন এই পবিত্র কোরান শরীফ তাঁর একমাত্র শান্তি পারাবার। তিনি বুঝতে পারলেন, ছোট তার দেশ-বাড়ির কথায় কষ্ট পাচ্ছে। সে, তাঁকে অন্য কথায় নিয়ে আসতে চায়। তিনি ইচ্ছে করেই আর ওর বাড়ি সম্পর্কে কোন কথা বললেন না। বাংকের দড়ি থেকে গামছাটা নিলেন। বাংকের নিচ থেকে বদনা বের করলেন। এখন অজু করতে যাবেন। যাবার সময় বললেন, কাঠের পুথিদানে বইটা রেখে পড়তে আমার ইচ্ছে হয়। বার বার ভাবি একটা কিনব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে না। ভুলে যাই।

    ছোট বলল, আমি একটা কিনে দেব আপনাকে।

    সারেঙ-সাব বললেন, তুই আমাকে কিনে দিবি কেন? পয়সা বেশি হয়েছে!

    ছোটবাবু চোখ তুলে তাকালে তিনি আর বলতে পারলেন না, না ছেলে, তোকে কিনে দিতে হবে না। তোর কোনো জিনিস আমি নেব না। আমাকে তুই এটা দিয়ে বলতে চাস, সব আপনার দিয়ে দিলাম। তোমাকে আমি ছোটবাবু সে সুযোগ দিচ্ছি না। কিন্তু মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। শুধু বললেন, দিস। আমাকে কিছু দিতে যাই তোর ভাল লাগে দিস। তারপর তিনি হাত মুখ ধুয়ে দুটো রুটি, একটু চা খেলেন। অজু করলেন শেষে। মেসরুমে তিনি নামাজ না পড়ে খোলা আকাশের নিচে হ্যাচের ওপর মাদুর বিছিয়ে নামাজ পড়তে বসলেন। মাথায় সাদা টুপি সাদা লুঙ্গি। লক্ষ্ণৌ কাজকরা সাদা পাঞ্জাবি। যেন এক সন্ত মানুষের মতো। সাদা দাড়িতে কি যে সুন্দর দেখাচ্ছে মানুষটাকে। কোনো কালে পৃথিবীতে মানুষটার আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল, তিনি তাঁর স্ত্রীকে জাহাজ থেকে ফিরে গিয়ে দেখতে পাননি, বালিকা স্ত্রীর জন্য সেই তরুণ বয়সে কখনও শোক করেছিলেন, শান্ত সুষমামণ্ডিত মুখ দেখে এখন আর তা একেবারেই মনে হবে না। দেখে মনে হয় পৃথিবীতে তিনি সারা জীবন এ-ভাবেই বেঁচে ছিলেন।

    আর পরদিন সকালেই ড্যাং ড্যাং আসছে, বন্দর চলে আসছে। ছোট দ্বীপমালা দূরে দূরে। সকাল হচ্ছে সমুদ্রে। সিউল-ব্যাঙ্ক ক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে। পানামা থেকে প্রায় দু হাজার মাইলের যাত্রা-পথে কত ঘটনার সাক্ষী যেন জাহাজটা। সকালের রোদে দ্বীপের গাছপালা কেমন মায়াবী। দ্বীপের সবুজ গাছপালার পাশ কাটিয়ে সিউল-ব্যাঙ্ক ক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে। ডেবিড ওয়াচ থেকে ফিরে এসেই দূরবীন নিয়ে বসে গেছে। আর চোখে কি যে হয়, চারপাশের গাছপালার ভেতর দূরে দূরে সব দ্বীপের অধিবাসীরা মনে হয় হেঁটে বেড়াচ্ছে। সে জানেও না, এইসব দ্বীপগুলোতে মানুষ আছে কিনা, কিন্তু সুন্দর গাছপালা, বালিয়াড়ি, রং-বেরঙের ঝিনুক চোখে পড়লে সে বিশ্বাস করতে পারে না, এমন একটা দ্বীপে মানুষের আবাস নেই। মনে হয় গাছপালা, লতাপাতার অথবা প্রবালের প্রাচীর পার হলেই সকালের সূর্য পৃথিবীতে যেমন কিরণ দেয় এখানেও তেমনি কিরণ দিচ্ছে।

    এবং এসব ভাবতে ভাল লাগে। সিউল-ব্যাংক যাচ্ছে, দ্বীপ-টিপ সে জানে না, তাহিতিতে সে যাচ্ছে। সেই কবে, খৃষ্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে মানুষের বিশ্বাস ভেলায় করে চার হাজার মাইল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পেরু থেকে যে সভ্যতা এখানে বিস্তার করেছিল তার মতো তাদের এই অভিযান। বিশেষ করে জ্যাকের তো এমনই মনে হয়। যেন সেই প্রাচীনকালে সে তাদের একজন কেউ ছিল। এবং সঙ্গে আর যে যে ছিল মনে হয় এই ছোটবাবু, আর কে, আর বাবা, আর কে? আর-আর বুড়ো সারেঙ। ব্যাস এই চার জন হলেই সে ভেলায় করে, যত প্রাচীনকালই হোক, সেই ব্যাবিলিয়ান সভ্যতার আগে, কিংবা গ্রীক সভ্যতার আর আর যদি ভাবা যায় ফারাওদের আমলে সে আর ছোটবাবু ছিল সেই অভিযানের প্রথম নারী-পুরুষ এবং এখানে তাদের বংশধরেরাই হাজার হাজার বছর পর ছোটবাবুর ফিরে আসার জন্য প্রতীক্ষা করছে। এ সব ভাবতে ভীষণ ভাল লাগছিল জ্যাকের। মনে মনে সে এভাবে কত রকমের যে আজগুবি স্বপ্ন ছোটবাবুকে নিয়ে ভাবতে ভালবাসে।

    আসলে এখন তো আর মনে হয় না, জাহাজটা ছিল সমুদ্রে, গভীর সমুদ্রে, বিষাক্ত পাখিদের আক্রমণের কথাও মনে আসার কথা নয় তাদের। দ্বীপ, গাছপালা এবং মাটি দেখলেই নিমেষে সবাই সমুদ্রের সব দুঃখ ভুলে যায়। এখন ঠিক অমিয় টব বাজাচ্ছে। সবাই সুর ধরে গাইছে। তাদের গানের লহরি যেন সেই নৌকা বাইচের গান, দূর থেকে দূরে—হা-হা-হো, হা-হা-হো ক্রমে শব্দটা সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ছে।

    জাহাজ সিউল-ব্যাংক এখন আর মনে হয় না পুরোনো। মনে হয় আর দশটা হাল আমলের জাহাজের চেয়ে তার নৈপুণ্য বেশি। জাহাজিরা সব দুঃখ ভুলে যাচ্ছে। কাপ্তান এবং চিফ-মেট এখন ব্রীজে। হাওয়া উঠে আসছে। সামনেই সেই মূল ভূখণ্ডের উপকূল। শহর এখনও দেখা যাচ্ছে না, মাইল চার-পাঁচ এগিয়ে সামান্য সাউথ-সাউথ-ওয়েস্টে বাঁক নিতে হবে। তখনই চোখে পড়বে সুন্দর পরিপাটি বন্দরের ছবি, দুটো একটা স্কাই স্ক্র্যাপার। আর সেই বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে প্রশস্ত পথ। ড্যাং ড্যাং করে লাল নীল রঙের গাড়ি কেবল এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে যেন ছুটে যাচ্ছে, ভেতরে সুন্দরী সব রকমারী যুবতীরা পর্বতগাত্রের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে।

    সিউল-ব্যাংক ক্রমশ কক্স উপসাগর পাড়ি দিচ্ছে। জাহাজের মাস্তুলে কার্সিফ্ল্যাগ টাঙিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সামনে পেছনে জ্যাক-ফ্ল্যাগ, এনসাইন-ফ্ল্যাগ পতপত করে উড়ছে। পাইলট উঠে এসেছে জাহাজে, পাইলট জাহাজের ভার নিয়েছে এবং আবার ড্যাং ড্যাং। সমুদ্রে সিউল-ব্যাংক আর নেই, এখন বন্দরের ভেতর জাহাজ ক্রমে ঢুকে গেলে চারপাশে শুধু জাহাজ, মাস্তুল, সেই এক বন্দরের ছবি—চারপাশে সব নানা দেশের জাহাজ, নানা বর্ণের পতাকা, নানা রঙের চিমনি, এবং চিমনির রং দেখে, জাহাজের পতাকা দেখেই বলে দেয়া যায়, কোন দেশের জাহাজ, কোন কোম্পানীর জাহাজ।

    টাকা কে কত তুলবে—যেমন একশ সি এফ পির সমান, এক দশমিক ষোল সেণ্ট। পাউণ্ড মূল্যে দাঁড়ায় দশমিক চুয়াল্লিশ পাউণ্ড। ছোটবাবুকে বোধহয় সবচেয়ে বেশি টাকা তুলতে হচ্ছে। সে তুলেছে ত্রিশ পাউণ্ডের মতো। ওতে ওর দুটো বয়লার স্যুট এবং এক প্রস্থ স্যুট হয়ে যাবে। আর অনেকে যে যা টাকা তুলবে, তার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। এজেণ্ট-অফিস থেকে লোক এসে গেছে। সঙ্গে চিঠিপত্র। জাহাজিদের চিঠিপত্ৰ কম

    জাহাজে আবার বাঁধাছাদার কাজ। সেকেণ্ড-মেট, চিফ-মেট পেছনে সামনে। আবার সেই বাঁধা বুলি—হারিয়া হাফিজ। নিচে ছোট টাগবোটে এ-দেশের মানুষ—তাহিতিয়ান, চুল খাড়া খাড়া, শরীরের তুলনায় মাথাটা বড় মনে হয়, এবং শ্যামলা রং, আর পোশাক ঢিলেঢালা। ওরা হাসিল তুলে নিয়ে যাচ্ছে এবং কিনারায় নিয়ে হাসিল বেঁধে ফেলছে বিটে। মানুষগুলোর সঙ্গে ভারতীয় চেহারার ভারি মিল। যেমন ওরা বন্দরে ঢোকার আগে দেখেছে সব ছোট ছোট নৌকা। একজন দাঁড় ফেলছে। যে দাঁড় ফেলছে সে আছে মাঝখানে, আগে একজন বসে রয়েছে, হাতে ছিপ, পেছনে একজন হাল ধরে বসে আছে। হালে যারা আছে—অধিকাংশ মেয়ে। পোশাক বলতে ঘাসের স্কার্ট পরা, ওদের বুকে সামান্য ব্রেসিয়ার। কেউ লুঙ্গির মতো পরে আছে, খোপকাটা সব রং-বেরঙের চাদর। খালি গা। কেউ সামান্য জাঙ্গিয়া পরেই মাছ ধরছে নিবিষ্ট মনে। জাহাজটা ওদের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। জাহাজিরা কাজ ফেলে ওপরে উঠে এসেছে। জাহাজ জাহান্নামে যাক, তবু ওরা সমুদ্রে এমন সব সুন্দরী মেয়েদের দেখে হাত না তুলে পারবে না। মেয়েগুলোও জাহাজিদের হেইল করছে। ছোটবাবু ছেলেমানুষের মতো অবাক হয়ে দেখছে।

    জাহাজ বন্দরে বেঁধে ফেললেই ছুটি। কাপ্তান ছুটি ঘোষণা করেছেন। কেবল একজন ফায়ারম্যান নিচে থাকবে। কোয়ার্টার-মাস্টার থাকবে গ্যাংওয়েতে পাহারায়। স্টুয়ার্ডকে থাকতে হবে। রসদ আসবে। অর্ডারমাফিক রসদ ঠিক ঠিক স্টিভেডর দিয়েছে কিনা দেখতে হবে। এদিক ওদিক হলে রিপোর্ট রেখে যেতে হবে। আর থাকছেন কাপ্তান নিজে, চিফ-মেট। আর পিছিলে দুই সারেঙ। আর সবাই যে-যার মতো ছটি ভোগ করবে।

    জ্যাক বলল, বাবা আমি যাব?

    —কোথায়?

    —ডেবিডের সঙ্গে। ওরা এখন বের হচ্ছে।

    কাপ্তান কিনারায় যাবেন না। তাহিতিতে কবে আর কে আসছেন! বনি তো কখনও আর সুযোগ পাবে না। তিনি ডেবিডকে ডেকে পাঠালেন। ডেবিড এলে বললেন, তোমার সঙ্গে জ্যাক যাচ্ছে।

    ডেবিডের মুখটা সামান্য তেঁতো হয়ে গেল। কি যে দরকার—সে ভেবেছিল নেমেই লি- বেলভিডিয়ারে ফরাসী খাবার খাবে। ছোটবাবু যদি সঙ্গে যায়, যাবে বলে মনে হচ্ছে না, ওর পুরানো দোস্ত অমিয়, মৈত্র। ওর সঙ্গে যাবে বোধ হয়। সে দেখেছে, দু’বার মৈত্র এসে ঘুরে গেছে। কেউ না গেলেও তার ক্ষতি নেই এবং ওর মনে হল কেউ না গেলেই ভাল হয়। সে একা একা এভিনিউ প্রিন্স হ্যানয় ধরে অথবা ওরা-কিকিতে চাইনিজ খাবার অথবা সেই গোগাঁর মিউজিয়ামে, এবং মিউজিয়াম- কাম-বারে সুন্দরী রমণীদের কথাবার্তা—একটু অন্ধকার হলে, অবশ্য অন্ধকার না হলেও ক্ষতি নেই, দ্বীপের বালিয়াড়িতে ঘুরে বেড়ানো অথবা রোদে পিঠ দিয়ে পড়ে থাকা ভারি মনোরম। বড় গোল ছাতার নিচে দু’জনে বসে থাকবে। নীল রঙের চশমা থাকবে মেয়েটার চোখে, শুধু ব্রেসিয়ার বুকে, এবং হাল্কা সিল্কের জাঙ্গিয়া আর নরম উরু, নাভির কোমল ত্বকের নিচে গভীর উষ্ণতা। সামান্য মদ, সঙ্গে, পিসান- ক্রু, লোবস্টার অথবা মেরিও ফিস মশালায় ভাজা—কি যে সুস্বাদু! জ্যাক সঙ্গে গেলে সব মাটি। কাপ্তান যা একখানা চরিত্র করেছে জ্যাকের! মেয়েমানুষ দেখলেই ঘাবড়ে যায়। ঠিক ঘাবড়ে যায় না। কেমন বিগড়ে যায় জ্যাক।

    ছোটবাবু এতসব দেখে লেডি-অ্যালবাট্রসের কথা একেবারে ভুলে গেছে। পাখিটাকে সে শেষ বারের মতো কোথায় দেখেছে মনে করতে পারছে না। ঠোঙার খাবার নিয়ে সে ঘুরছিল তখন। না, কাছে কোথাও পাখিটা নেই। নেই, নেই। বোধ হয় জাহাজ যখন সাউথ-সাউথ-ওয়েস্টে ঢুকে যাচ্ছিল, তখনই সে এটা বুঝতে পেরেছিল। জাহাজে সবার সঙ্গে পাখিটাও যাত্রী ছিল তাদের। পাখিটা নেই বলে চারপাশের সবকিছু বিস্বাদ ঠেকল। ওর বন্দরে নেমে যেতে ইচ্ছে করছিল না।

    তবু একবার নামতে হবে। বোট দ্য ফেয়ারে একজন ভাল ডাক্তারের খোঁজ সে কিনারার লোক থেকে সংগ্রহ করেছে। মৈত্রদাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে একবার যেতে হবে। সে ভাবল, ফেরার পথে যা টাকা বাঁচবে তাই দিয়ে বয়লার স্যুট এবং বাঁচলে একপ্রস্থ স্যুট কিনে ফিরে আসবে। দ্বীপের ভেতর গাড়ি ভাড়া করে ঘোরার টাকা আর হাতে থাকবে না।

    ছোটবাবু ঠোঙার খাবারগুলো ফেলে দিল না। ছোট ছোট চিড়িয়াপাখি দলে দলে মাস্তুলের মাথায় উড়ছে। জাহাজের চারপাশে তাদের কলরব। এবং ঢং করে কোথাও বড় লোহার পাত ফেলার শব্দ, অর্থাৎ বন্দরে ঢুকলে যেসব অতিকায় শব্দের ভেতর ডুবে যেতে হয়—পাখিদের কলরব তা থেকে আলাদা করা যায় না। সে খাবারগুলো পাখিগুলোকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিল। তারপর ফিরে আসার সময় দেখছে, ডেবিড কেমন অন্যমনস্ক ভাবে হেঁটে যাচ্ছে এলি-ওয়েতে। ছোটবাবুকে দেখেও সে কিছু বলছে না।

    ছোটবাবু ডাকল, এই ডেবিড!

    ছোটবাবুর এমন ডাকে মনেই হয় না ডেবিড তার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। একেবারে অমিয় মৈত্রের মতো কাছের মানুষ হয়ে গেছে। ডেবিড বলে না ডাকলেই বরং সেকেণ্ড-মেট রাগ করে। সে বলল, আমাকে কিছু বলছ ছোটবাবু?

    —মুখটা এত গোমড়া কেন?

    —না, কিছু না।

    —এমন তো কখনও তোমার মুখে দেখি না।

    —আর বলবে না, প্রায় ফিসফিস গলায় বলল, অর্ডার হয়েছে জ্যাককে নিয়ে শহরটা দেখতে হবে, দ্বীপের ভেতরটা যতদূর সম্ভব দেখাতে হবে। গাড়ি ভাড়া করতে বলছে। টাকা সব কাপ্তানের। কিন্তু, বলেই সে থেমে গেল। ছোটবাবু জানে বাকিটা ঠিক বলবে। সে তাকিয়ে থাকল।

    —আচ্ছা বলত, কতদিন পর বন্দর পেলাম, এখন এসব ভাল লাগে! এগুলো কাপ্তানের টরচার। এমন একজন বালককে নিয়ে আমি কোথায় যাই! বারে যেতে পারব না, মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারব না। কাপ্তান কি ভাবে আমরা মানুষ না?

    ছোটবাবু কি বলবে! সে তো বলতে পারে না কাপ্তান এটা ঠিক করেন নি। সে বলতে পারত, আমি নিয়ে যেতে পারতাম, জ্যাক আমার কাছে দু’বার এসেছিল কিন্তু আমার কাজ অনেক। মৈত্রদাকে ডাক্তার দেখাতে হবে। কতক্ষণ লাগবে, তাতো জানি না ডেবিড, এবারের মতো তুমি নিয়ে যাও। কোথায় যাচ্ছে সে জ্যাককে বলেছে। কোন রাস্তায় কত নম্বর সব বলেছে। জ্যাক আর পীড়াপীড়ি করেনি। তাছাড়া সে জ্যাকের সঙ্গে জাহাজ থেকে নামতে পারে না। আর্চি দেখলে ক্ষেপে যাবে।

    ডাক্তার দেখিয়ে বের হবার মুখে জ্যাক আর ডেবিড হাজির। এদিকটায় সব দোকানপাট চাইনিজদের। কাঠের বাড়িগুলো বেশ সুন্দর দেখতে। ছোট একটা উপত্যকার মতো জায়গাটা। বাড়িগুলোর লাগোয়া সব ফুলের বাগান। সমানে বড় খেলার মাঠ। এবং বেলা প্রায় তিনটে, বসন্ত কাল অথবা গরমের সময় বলে মানুষজনেরা পাতলা কটনের জামা নানা লতাপাতা আঁকা জামা গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন জ্যাক তাকে বলল, কার অসুখ ছোটবাবু?

    ছোটবাবু বলল, অসুখ কারো তেমন হয়নি। মৈত্রদাকে খুব মনমরা দেখাচ্ছে। মৈত্রদা এভাবে থাকলে জ্যাক এবং ডেবিড দুজনেই টের পাবে কিছু হয়েছে বড়-টিণ্ডালের। সে মৈত্রকে বলল, চল একটা শো দেখি কোথাও।

    অমিয় বলল, তোরা যা। আমি একটু ঘুরে পরে যাচ্ছি।

    ডেবিড বলল, এখন আবার শো দেখার কি হল, চল না বরং লা পয়েন্ট ভেনাসে প্রথম ইউরোপিয়ান সেলারদের মোমের সব মূর্তি রয়েছে, দেখে আসি।

    ছোটবাবুর কোথাও যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। মৈত্রদার অসুখটা ভারি খারাপ। ইনজেকসান পরপর দু’বার দিয়েছে। খুব ভিরুলেন্ট টাইপের অসুখ, এখানে মৈত্রদার থেকে যাওয়া দরকার। ক্রমান্বয় ইনজেকসান ওষুধপত্র পড়লে হয়তো সেরে যেত। কিন্তু উপায় নেই। কিছু ট্যাবলেট সঙ্গে নিয়েছে। নিউ প্লাইমাউথে গেলে বেশ অনেক দিন সময় পাওয়া যাবে। তখন থরো ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করা যাবে মনে হচ্ছে। এতদিন কি যে হবে! সে এসব ভাবতে ভাবতে দ্বীপের এই ছোট্ট শহরটির মানুষজন, রাস্তাঘাট, উঁচু-নিচু টিলার গায়ে ছবির মতো ছিমছাম শহরটিকে একেবারে উপেক্ষা করল।

    তখন জ্যাক যেন মরিয়া হয়ে বলল, এই যে অমিয়। আপনি বড়-টিণ্ডালকে নিয়ে যান। ছোটবাবু আমাদের সঙ্গে যাবে।

    এসব কথা বললে অমিয়র সাহস নেই না করে। সে মৈত্রকে একটা ট্যাকসিতে তুলে নিয়ে চলে গেল।

    ডেবিড বলল, ছোটবাবু আমি এখানে আছি। সন্ধ্যার পর এখানে তোমরা আমার খোঁজ করবে।

    ছোটবাবু এবারে জ্যাককে ভাল করে দেখল। জ্যাক পরেছে হাফহাতা ঢোলা সিল্কের সার্ট। দামী প্যান্ট ক্রিমসন কালারের। মোটা সাদা বেল্ট। একটা সবুজ টুপি মাথায়। হাতে লম্বা তরবারির মতো লাঠি। কোমরে চাবির রিং। হিপপকেটে লেদারের পার্স। চুলের নীলাভ রঙে উজ্জ্বল রোদ এসে একেবারে জ্যাককে কাউ-বয় বানিয়ে দিয়েছে।

    ছোটবাবু বলল, জ্যাক তাহলে কোথায় যাবে?

    —তাহারা হোটেলস্ হিলে যাব। ট্যাকসি ডাকলেই ঠিক আমাদের নিয়ে যাবে।

    জাহাজ থেকে নামার আগে এ-দেশের দুটো একটা কথা ওরা জেনে নিয়েছে। যেমন মৌরুরা অর্থাৎ অনেক ধন্যবাদ। ছোটবাবু ট্যাকসিতে উঠে গেলে বলল, মৌরুরা।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল জ্যাককে ওর সঙ্গে ভিড়িয়ে দিয়ে ডেবিড রক্ষা পেয়েছে।

    ছোটবাবু ট্যাকসিয়ালাকে বলল, টাহারা।

    জ্যাক বলল, নো। এখন আমরা যাব মিউনিসিপাল মার্কেটে।

    মিউনিসিপাল মার্কেট দুটো রাস্তার ক্রশিঙে। নাম জানে না ওরা রাস্তার। জ্যাক ছোটবাবুর জন্য কিছু কিনবে বলে লা-কাভেতে ঢুকে গেল। ওরা ফরাসী অথবা তাহিতিয়ান ভাষা জানে। ইংরেজি ওরা কিছু কিছু বুঝতে পারে। সুতরাং জ্যাক স্যুটের রং পছন্দ করতে গিয়ে সেলস-গার্লদের বিরক্ত করে মারছে। জ্যাক লক্ষ্য করছে সেলস্-গার্লগুলো হাঁ করে দেখছে ছোটবাবুকে। সে বুঝতে পারল বেশি দেরি করলে, ছোটবাবুকে ওরা কিডন্যাপ করতে পারে। নেভি ব্লু রঙের ভারি স্নিগ্ধ একপ্রস্থ স্যুট পছন্দ করে বলল, ছোটবাবু তুমি পরে এস। পরে এলে গলায় ওর পছন্দ মতো টাই কিনে পরিয়ে দিল। এবং এটা সে বুঝতে পারছে, এখানে বেশি দেরি করলে ছোটবাবুকে ওরা গিলে খেয়ে ফেলবে। ছোটবাবুর মোমের মতো শরীরে কেউ কেউ ছাতির মাপ নেবার সময় বড় বেশি ঝুঁকে পড়েছিল। আর ছোটবাবুও কেমন, ওদের দিকে তাকিয়ে বেশ হেসে মজে যাচ্ছে। সে যে এটা পছন্দ করছে না ছোটবাবু বুঝতে পারছে না। এত আগলে সে তাকে বেড়াবে কি করে? প্রায় টানতে টানতে ছোটবাবুকে বের করে নিয়ে গেল। যেন ছোটবাবু আর এখান থেকে নড়বে না—ওর রকমসকম দেখে তাই মনে হচ্ছিল।

    ট্যাকসিতে জ্যাক ছোটবাবুর সঙ্গে কথা বলল না। নিজের খুশিমতো নামছে উঠছে। ছোটবাবুকে বসিয়ে রেখেছে ট্যাকসির ভেতর। সে ফরাসী পারফিউম কিনে এনেছে। ছোটর হাতে দিয়ে আবার লাফিয়ে লাফিয়ে রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে। ছোটবাবু এমন একটা গাড়ি পার্ক করার জায়গায় বসে বেশ নিরিবিলি মানুষজন দেখছিল। এখন চারটে বেজে গেছে। ওদের অফিসকাছারি ছুটি। গাড়িগুলো সব হৰ্ণ দিতে দিতে বের হয়ে যাচ্ছে। ফরাসী রাজকর্মচারীদের দেখলেই চেনা যায়। ওদের পোশাক ভীষণ বর্ণাঢ্য। তাহিতিয়ান সুন্দরীরা ঘাসের চটি, ঘাসের স্কার্ট পরে কি সুন্দর হেঁটে-হেঁটে যাচ্ছে। ওর ইচ্ছে হচ্ছিল লাফিয়ে নেমে যায়। এবং এরা কোথায় যে থাকে!

    ছোটবাবু দেখে অবাক, দুটো বেদিং স্যুট কিনে এনেছে জ্যাক। একটা মেয়েদের একটা ছেলেদের। জ্যাকের তবে দেশে ইতিমধ্যেই প্রেমিকা বড় হয়ে যাচ্ছে। সে যখন ফিরে যাবে তখন হয়তো ওরা দু’জনেই বেশ বড় হয়ে যাবে। তারপরই ফের জ্যাক ফিরে এল। দুটো বর্শা। সমুদ্রের নিচে ডুবে ডুবে মাছ ধরার জন্য এমন বর্শার দরকার। দু’জোড়া ফিন, দু’জোড়া অকসিজেন সিলিণ্ডার। এ-সব কিনে টাকা নষ্ট করার কি যে দরকার সে বুঝছে না। কিন্তু জ্যাক এমন মুখ গোমড়া করে রেখেছে যে সে একটা কথা বলতে সাহস পাচ্ছিল না। জ্যাক একটা ঝিনুকের মালা পর্যন্ত কিনে ফেলল। আর শেষে যা কিনা দেখে অবাক না হয়ে পারল না ছোটবাবু, সারা মিউনিসিপাল মার্কেট চষে সে কিনে ফেলল পাখির পালকে তৈরি এ-দেশের মেয়েদের ট্রাইবাল পোশাক। সে বলল, জ্যাক তোমার কি মাথা খারাপ!

    —হ্যাঁ আমার মাথা খারাপ। তুমি আমার সঙ্গে একটা কথা বলবে না বলছি।

    ছোটবাবু বলল, ঠিক আছে। সেও গুম্ মেরে বসে থাকল। এখন ট্যাকসি ড্রাইভার যাচ্ছে তাহারা হোটেলস্ হিলে। সব শহরটা ঘুরিয়ে এবং এদিক ওদিক দেখিয়ে সন্ধ্যার আগে সে তাদের সেই তাহারাতে নিয়ে যাবে। জ্যাক বলেছে, ওরা পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে সমুদ্রে সূর্যাস্ত দেখবে।

    যেতে যেতে ইংরেজিতে সব বলে যাচ্ছে ট্যাকসিয়ালা।—আসলে আমাদের এ-দ্বীপটার দুটো ভাগ। বরং দুটো পাহাড় বলা যেতে পারে। সবুজ উপত্যকা নামতে নামতে সরু একটা জমিতে দুটো দ্বীপ ভাইবোনের মতো মিশেছে। বড় দ্বীপটার নাম তাহিতি-নু, ছোটটার নাম তাহিতি-ইতি। এমন সুন্দর দ্বীপ স্যার আর কোথাও দেখতে পাবেন না। দু’দিন থেকে যান, সব ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেব। প্রায় বিজ্ঞাপনের ভাষায় ড্রাইভার কথা বলে যাচ্ছে। একটু ঘুরে গেলে দেখতে পেতেন আমাদের শেষ সম্রাট পামারা ফিফথ-এর স্মৃতিসৌধ। তিনি মদ খেতে ভীষণ ভালবাসতেন বলে সমাধির মাথায় রয়েছে এক অতিকায় গোল গম্বুজ, দেখতে প্রায় একটা মদের পিপের মতো। তার আর কিছুর সঙ্গে জীবনে প্রেম ছিল না স্যার। তার লাইফ-লঙ লাভ অ্যাফেয়ার উইথ দা ড্রিংকসকে আমরা ভুলিনি। সে বলল, দেয়ার আর অলসো এ নাম্বার অফ মিউজিয়াম—পিপিতি মিউজিয়াম, গঁগা মিউজিয়াম এবং লা পয়েন্ট ভেনাসে সতেরো’শ ঊনসত্তরে ক্যাপ্টেন কুক, ফার্স্ট ড্রপড্ এনকোর ইন দিজ আয়ল্যাণ্ড। অথবা যেতে পারেন বোটানিক্যাল গার্ডেনে—এ্যাণ্ড স্যার, হোয়েন ইউ আর টায়ার্ড অফ লুকিং এট দা গার্ডেনস, ইউ ক্যান টেক এ টু-আওয়ার গ্লাস বটড্ বোট টুর অফ দা লেগুন অ্যাণ্ড দা গার্ডেনস অফ দা সি।

    ছোটবাবুর ইচ্ছে হল বলতে, এবারে থামো বাপো। অনেক হয়েছে। গাড়িটা শাঁ করে তখন মোড় ঘুরে ওপরে উঠে যেতে থাকল। দু’পাশে বিচিত্র সব গাছ, যেন দ্বীপবাসীরা সারা পৃথিবী খুঁজে খুঁজে সব দামী গাছপালা পাহাড়টার চারপাশে লাগিয়ে দিয়েছে। এবং কত সব গাড়ি গাছের ছায়ায়, যেমন বড় বড় ইউকন গাছের ছায়ায় গাড়িগুলো ঘুরে ঘুরে ওপরে উঠে যাচ্ছে। জ্যাক একটা কথা বলছে না। ছোটবাবুকে দেখলে মেয়েগুলো কি যে হ্যাংলার মতো চলে আসে। ছোটবাবু জানে না কেন, এটা ঠিকনা। জাহাজে বনি বড় হচ্ছে। ছোটবাবু কিছুতেই টের পাচ্ছে না। এসব ভেবে জ্যাক আরও গম্ভীর হয়ে গেছে। অধীর হয়ে গেছে। অধীর হয়ে উঠছে।

    বোধহয় সেই পাহাড়ের মাথায় সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে বনি একটা কেলেঙ্কারি করে বসত। কি সুন্দর দেখাচ্ছে সমুদ্রটাকে। একেবারে লাল এবং সবুজ দ্বীপমালা দূরে, আর নীলাভ অন্ধকার দ্বীপের আকাশে, যেন এক আশ্চর্য বর্ণমালা সমুদ্র, আকাশ এবং দ্বীপমালা মিলে গড়ে তুলছে। আর তখন যুবক যুবতীরা হেঁটে হেঁটে গাছের ছায়ায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। নিচে নেমে যাচ্ছে কেউ, ওপরে উঠে আসছে কেউ এবং পৃথিবী যখন বর্ণমালায় সেজে রয়েছে তখন ওরা ঠিক থাকে কি করে! ঘাসের ওপর ওরা শুয়ে পড়েছে। গাছের ছায়ায় ওরা চুমো খাচ্ছে, বনি দেখতে দেখতে অধীর হয়ে যাচ্ছে। এবং একসময় পাশে বসে ঘাস ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলছে, ছোটবাবু এস আমরা নেমে যাই। কেউ টের পাবে না।

    ছোটবাবু বলল, মেয়েরা তোমাকে মারবে জ্যাক। যাও না, গিয়ে একবার বলে দ্যাখো না। কি বলে দ্যাখো। তারপরই ছোটবাবু কেমন ক্ষেপে যাবার মতো বলে যেতে থাকল, জ্যাক, আমি কিছু জানি না। তোমার যা খুশী কর। আমি এখন জাহাজে ফিরব। তোমার মাঝে মাঝে কি যে হয়! তারপরই যেন বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, জাহাজে মেয়ে সেজে বিপদে ফেলে দিয়েছিলে, আবার এখানে কিছু একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড করে ফেললে কাপ্তানের কাছে মুখ দেখাতে পারবে না জ্যাক! তোমার এ-বয়সে এত সাহস ভাল না।

    জ্যাকের কখন যে কি মর্জি—সে বুঝতে পারে না। জ্যাককে জোর করে তুলে নিয়ে না গেলে কিছুতেই যাবে না। জ্যাক এখন ঘাসের ওপর পাশ ফিরে শুয়ে আছে। ঘাসের ভেতর দু’হাতে মুখ ঢেকে রেখেছে। এবং জ্যাকের শরীরের গঠন মেয়েদের মতো। সে পাশে শুয়ে ওকে ডাকল, এই কি হচ্ছে!

    —কিছু না। বলে ধড়ফড় করে জ্যাক উঠে গেল। এবং গাড়ির দিকে ছুটে গেল। সেও জ্যাকের পেছনে পেছনে ছুটতে আরম্ভ করল। বালিকার মতো মুখ, হাতে পায়ে লম্বা জ্যাক—জাহাজে থেকে থেকে ওর মতো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জাহাজে থাকলে বোধহয় এটা হয়। সবাইকে নষ্ট হয়ে যেতে হয়। গাড়িতে বসে জ্যাকের বলতে ইচ্ছে হল, আমার কিছু ভাল লাগছে না ছোটবাবু। জাহাজে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। তুমি আমাকে কোথাও নিয়ে চল।

  • আঠাশ

    আঠাশ

    ।। আঠাশ।।

    সারা রাস্তায় জ্যাক আর একটা কথাও বলল না।

    ছোটবাবু ক্যু দ্য কমার্সে লি জেসমিনে ঢুকে গেল। ডেবিডের এখানে থাকার কথা। একটা টেবিলে মেয়েরা ছেলেরা মদ খাচ্ছে। খাবার খাচ্ছে। কাগজের ফুল মাথার ওপর, রঙবেরঙের বেলুন, ডায়াসে একটা মেয়ে মাইকের সামনে হাত পা তুলে নাচছে। গান গাইছে। পোশাক বলতে সামান্য হাল্কা পোশাক এবং হাত তুললে, পা তুললে প্রায় মেয়েটার গাউনের ভেতর থেকে সব দেখা যাচ্ছে। সে এসব দেখলে ভেতরে ভেতরে মজা পায়, এবং ওপরে ওপরে কেমন একটা পাপবোধ কাজ করতে থাকলে সে ভালভাবে তাকাতে পারে না। যেন সে এসবের কিছুই দেখছে না। কেবল ডেবিডকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

    কোনো টেবিলে ডেবিড নেই। একটা টেবিলে মেয়েরা ছেলেরা গোল হয়ে বসে আছে। ওরা জাহাজি হয়তো। ওদের হাতে রঙবেরঙের তাস, আসলে ওগুলো তাস নয়, মেয়েদের ছবি। ছবির মেয়েরা এখানে এসে জড় হয়েছে। দু-একজন, মেয়েদের বগলদাবা করে বের হয়ে যাচ্ছে। সেই গর্ভিনী তিমি শিকার করে ফিরে আসার মতো নাবিকের মুখে হিংস্রতা ফুটে উঠছে। ছোটবাবু বুঝতে পারল ডেবিড কাউকে বগলদাবা করে আগেই বের হয়ে গেছে তবে।

    ছোটবাবু গাড়ির দরজা খুলে ঢুকে গেল ভেতরে। বলল, নেই।

    জ্যাক হাঁ বা হুঁ কিছু বলছে না।

    ছোটবাবু অগত্যা ড্রাইভারকে বলল, পোর্ট-এরিয়াতে চলুন।

    ওরা পোর্ট-এরিয়াতে নেমে গেল। এখানে দু’পাশে ফাঁকা জমিন, পাহাড়। সি-ম্যান মিশনের পাশ দিয়ে ওরা জেটিতে নেমে গেল। সেই সব বড় বড় ক্রেনের ছায়া। দুটো একটা কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। জাহাজে কোথাও ব্যাণ্ড বাজছে। কোনো জাহাজে কাপ্তানের জন্মদিন হয়তো পালন করা হচ্ছে, অথবা দেশের কোনো উৎসবের ব্যাপার অথবা জাতীয় সঙ্গীত গাইছে কেউ।

    ছোটবাবু গাড়ি থেকে গুনে গুনে সব নামাল। জ্যাক এবং সে একগাদা লট-বহর নিয়ে অস্পষ্ট অন্ধকারে ঠিক দুটো মাকড়সার মত সিঁড়ি ধরে জাহাজে উঠে যাচ্ছে। সারা রাস্তায় জ্যাক কোনো কথা বলল না। কথা না বললেই ভয়। জ্যাক আবার কি করে বসবে! সে জ্যাকের কেবিনে সব পৌঁছে দিল। এমন কি জ্যাক যে ওর জন্য দামী স্যুট কিনেছে তাও।

    ছোটবাবু নিজের কেবিনে নেমে এল। জ্যাক একবার বলল না এটা তোমার, এটা নিয়ে যাও। বোধহয় এত রেগেছে জ্যাক, যে সে আর ওটা ওকে দেবেই না। দু-চার মাস গেলে জ্যাক আরও লম্বা হয়ে যাবে, তখন অনায়াসে সে নিজেই পরতে পারবে। ছোটবাবু এ-নিয়ে আর কিছু ভাবল না।

    তখন আর্চি দরজা ফাঁক করে চেঁচাচ্ছে – বয়!

    বয় এলে বলল, স্টুয়ার্ডকো মাংতা।

    স্টুয়ার্ড এলে বলল, ওয়ান বটল্ মোর।

    স্টুয়ার্ডের মুখ ভীষণ সাদা। সে এখন দেবে কোত্থেকে। সব তো সিল করা। কাস্টম দেখেশুনে সব সিল মেরে গেছে। তবু সে বুঝতে পারল, যে ভাবেই হোক ওকে দিতে হবে।

    সে বলল, সাব বিয়ার মাংতা।

    —আঃ ড্যাম ইয়োর বিয়ার!

    এক কেস বিয়ার সে আলাদা রেখেছে। কিন্তু মুখের যা অবস্থা। মেজ-মিস্ত্রিকে যেন মদ না দিলে এক্ষুনি ওর পাছায় লাথি বসিয়ে দেবে। এবং মুখের যা গঠন! আর এইসব দাগ, এই মলমূত্রের দাগ আর ওর দাম্ভিকতা সব মিলিয়ে স্টুয়ার্ডকে ভাবনায় ফেলে দিল। সে পার্ক-সার্কাসের মানুষ। তিন পুরুষ পার্কসার্কাসে। উর্দুভাষী মানুষ। বাঙালীদের সঙ্গে ভালো বাংলা বলতে পারে না, সাহেবদের সঙ্গে ভালো ইংরেজী বলতে পারে না, পারে না বলেই সাহেব ধরে আনতে বললে বেঁধে নিয়ে আসে। বাইরে কোথাও যদি পাওয়া যায়। পোর্ট-এরিয়াতে পাওয়া মুশকিল। সে আর কি করে! সাহেবকে খুশি না করতে পারলে রাতে সে ঘুম যেতে পারবে না।

    সে তার অসুস্থ শরীরে ছোটবাবুর কেবিনের পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল। অসুস্থ এই জন্যে, বোধহয় সামান্য হাঁপানি আছে। এবং একটা টান রয়েছে গলার কাছে। কি করে ছাড়পত্র পায় জাহাজে—এটা জানা থাকলে বোধহয় এখন এমন ছোটাছুটি করতে হত না স্টুয়ার্ডকে। যেমন জাহাজ তেমনি তার সব মানুষজন। সেকেণ্ড-কুক যদি না ঘুমোয়। সে খৃষ্টান মানুষ, বাল-বাচ্চা আছে। সস্তায় মদ দু-এক বোতল সে নিজের ঘরে রেখে দেয় এবং সময়ে সে অফিসারদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করে থাকে। মিড- সিতে এটা প্রায়ই হয়, এবং এটা সেকেণ্ড-কুকের ভালো একটা ব্যবসা। সে সেকেণ্ড-কুকের ঘরে এসে বলল, সেকেণ্ড-এনজিনিয়ার ঝুটুমুট ঝামেলা কিয়া হায়। তোমরা পাশ একঠো পাঁইট হোগা?

    স্টুয়ার্ডকে মান্য করতে হয়। সে সেকেণ্ড-কুক জাহাজের। স্টুয়ার্ডের মর্জি হলে অন্য সফরে ওকে চিফ-কুক বানিয়ে নিতে পারে। সে বলল, হায় লিজিয়ে। এবং প্রায় কাছা খিঁচে ছুটে যাবার মতো স্টুয়ার্ড যাচ্ছে। এবং মনে মনে আর্চির ওপর ভীষণ ক্ষেপে যাচ্ছে। বন্দরে এলে কেন যে এভাবে কেবিনে পড়ে থাকা, বাহার মে যেতনা জরুরৎ পিঁও—এতনা ঝামেলা জাহাজ মে কিঁও। সে তবু বোতলটা দিয়ে একেবারে কৃতার্থ মুখে দাঁড়িয়ে থাকল—যেন সে এতবড় একটা কাজ মেজ-মিস্ত্রির জন্য করতে পেরে খুব খুশী।

    আর্চি এতসব ভাবে না, এত দেরি কেন হচ্ছে! সে যখন দেখল, স্টুয়ার্ড এনেছে তখন ওর প্রায় মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে বোতলটা তুলে নিল। স্টুয়ার্ডকে একটু হাসতে পর্যন্ত সময় দিল না।

    এবং আর্চি চুপচাপ বসে আবার খাচ্ছে। সে আয়নার সামনে বসে ছিল। সে একবার দুপুরে বের হয়েছিল। ডাক্তার দেখে বলেছে—সময় নেবে। কত সময়? ডাক্তার তা বলতে পারেনি। এই মুখ নিয়ে সে বন্দরে যেন আর কখনও নামতে পারছে না। সব দামী দামী মলম এবং ওষুধ এনেছে। কিন্তু কিসে কি হবে সে বুঝতে পারছে না। এমন একটা বন্দরে তাহিতি মেয়েরা—আহা কি সুস্বাদু খাবারের মতো, তারপর কেন যে মনে হয়ে যায়—নো মি বয়। তারপর কেন যে মনে হয়ে যায়—ইউ নটি গার্ল, তারপর কেন যে মনে হয়ে যায় নীল চোখ, নীলাভ চুল, এবং ফুল ফুটছে। ফুল ফুটছে মনে হলেই সে কেমন আর বসে থাকতে পারে না। জাহাজে ক্রমশঃ ফুলটা তার পাপড়ি মেলে দিচ্ছে। পাপড়িতে সূর্যের আলো এসে পড়বে, সমুদ্রের বাতাস লাগবে এবং মধ্যযামিনীতে পাপড়িতে ফোঁটা ফোঁটা শিশিরবিন্দু পড়লে আহা শিশিরবিন্দু, সে উঠে হাল্কা তামাটে রঙের পানীয় মুখের কাছে এনে প্রায় সবটাই ঢেলে দিল গলায়- ঢোক গিলে বলল, শিশিরবিন্দু। ফোঁটা ফোঁটা শিশির বিন্দু। বেশ মনোরম, কচি ভেড়ার মাংসের মতো। শরীরে সুবাস থাকলে দু-হাত-পা ছড়িয়ে তারপর অবিরাম গতিতে সন্তর্পণে মজে যাওয়া। মজে যাওয়া কথাটা বলতে গিয়ে একটা হিক্কা তুলল। মজে যাওয়া, টু দাই হার্টইন দাই …..। এলোমেলো কথাবার্তা। সে পুরো কথা বলতে পারছে না। তবু বলতে হয় বলা। ভাঙ্গা ভাঙ্গা কথা। এবং জড়িয়ে আসছে কথা। সে আয়নার সামনে দু-আঙুলে নিজের চোখ ফাঁক করে দেখছে। বলছে, ফিল লোনলি। মাচ মাচ! আবার হিক্কা। ইউ নটি গার্ল বি হ্যাপি অ্যান্ড ড্রিঙ্ক। আই ড্রিঙ্ক মাচ, ভেরি মাচ্ সে এই বলে ঘুরে যেতে থাকল। এবং সে বুঝতে পারছে না, ওর পা হাঁটু মুড়ে আসছে কেন। আই লাভ, আই লাভ ইউ নটি গার্ল। অঃ ইউ লাভলি বয়। বয়। বয়। সে কিছুটা বাংকে, কিছুটা নিচের কার্পেটে, কিছুটা কদর্য মুখ ঢেকে রাখার মতো বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকল। দরজা লক করা। অনেক রাতে হুঁশ হলে টের পাবে—সে যা-তা কি সব করেছে কেবিনে।

    তখন মনে হবে, সে মেজ-মিস্ত্রি আর্চি। তার পজিসান প্রায় কাপ্তানের পরে। বড়-মিস্ত্রি চলে গিয়ে তাকে এ সুবিধা করে দিয়ে গেছে। সে নিজের মাতলামি দেখে সামান্য ঘাবড়ে যাবে।

    ছোটবাবু তখন মৈত্রদাকে খুঁজতে এসে দেখল সে কেবিনে নেই। অমিয়, মৈত্র জাহাজে এখনও ফেরেনি। তাকে দেখলেই পিছিলে সবাই জড় হতে থাকে। কথা বলার জন্য সবাই তাকে ঘিরে নানারকমের প্রশ্ন করে যায়। অসময়ে ছোটবাবু পিছিলে এসেছে—কি ব্যাপার। তখন ছোটবাবু, মৈত্র এবং অমিয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানল সেই যে গেছে ফেরেনি। ডেবিডের কেবিনে এসে দেখল সেও নেই। দু’বার ডেকে সাড়া পেল না। পোর্ট-হোল দিয়ে উঁকি মারল—না সেও ফেরেনি। এতরাতে না ফেরায় ছোটবাবুকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখাল। ওরা শহরে এত রাতে কি করছে!

    সে গ্যাঙ-ওয়ে ধরে নেমে এল। পোর্ট-এরিয়া একেবারে নিরিবিলি। শুধু জাহাজগুলো দাঁড়িয়ে আছে। সে একা একা হেঁটে গেল। অস্পষ্ট আলোতে ক্রেনের নিচে কাউকে যেতে দেখলেই কাছে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্য জাহাজের নাবিক। বেশ মাতাল হয়ে ফিরছে। কারো গলায় লারে লারে গান। কি ভাষা, কোন দেশের মানুষ, বোঝার উপায় থাকে না। কেবল দেখলে মনে হয়, জাহাজে এসে সবাই বড় মনোটনিতে ভুগছে। মাতাল হয়ে সবাই সব ব্যর্থতা ভুলে এখন জাহাজে উঠে যাচ্ছে। সবার ব্যর্থতা সেই ডেবিডের মতো। কোনো গ্রহান্তরে স্ত্রী-পুত্র আত্মীয়-স্বজন ফেলে এসে কোনো মেয়ের সান্নিধ্যে সব ভুলে থাকতে চায়। এমন মনে হলে সবার জন্য ওর মায়া হয়। মৈত্রদাকে দুটো কড়া কথা বলবে, মনে থাকে না। এমন শরীর নিয়ে কি দরকার ছিল এ-সবের। এবং তখনই মনে হল, দুজন মাতাল মানুষ গলা জড়াজড়ি করে ফিরছে। সে বুঝতে পারল অমিয় এবং মৈত্র। সে ওদের কাছে গেল না। কাছে গেলে ধরা পড়ে যাবে এবং অস্বস্তিতে পড়ে যাবে ওরা। পরে এল ডেবিড। অনেক দূর থেকে ওর মাতাল গলায় গান সে শুনতে পেল। ভীষণ চেঁচাচ্ছে। আর এভাবেই এইসব নাবিকেরা, বন্দরে রাত যাপন করে থাকে। কাপ্তান হয়তো জেগে বসে থাকেন, লক্ষ্য রাখেন কে কে ফিরল। কেউ মাতাল অবস্থায় সিঁড়ি ধরে উঠতে না পারলে তাকে তুলে আনা হয়। চ্যাংদোলা করে সবাই তাকে তুলে এনে বাংকে ফেলে রাখে। ছোটবাবু দেখল, ডেবিড সিঁড়ির কাছে এসে ওপরে উঠতে ইতস্তত করছে। সিঁড়ি ধরে সে উঠতে পারছে না। এবং সিঁড়ি ধরে উঠতে না পারলে যা হয়, নিচে সিঁড়ির গোড়ায় চুপচাপ বসে থাকে। ডেবিডও বেশ জায়গা সাফ করে বসে পড়বে বুঝি। তখন ছোটবাবু ওর হাত কাঁধে তুলে নিয়ে বলল, এস।

    –কে ও?

    —এস। চিৎকার করবে না। ষাঁড়ের মতো এতক্ষণ চেঁচাচ্ছিলে কেন!

    —চিৎকার করছি। ষাঁড়ের মতো! আমি! কখখনও না।

    —বেশ, করছ না। এখন উঠে এস।

    —কি উঁচু! আমি একটা পাখি হয়ে যেতে পারি। দেখবে!

    —না দেখাতে হবে না। দেখাতে গেলে সে সত্যি পাখির মতো উড়তে চাইবে। অর্থাৎ দু-হাত মেলে ডাইভ দেবে, ডাইভ দিলে জাহাজ আর জেটির ফাঁকে পড়ে যাবে। আর জীবনে উঠতে হবে না।

    এনজিন সারেঙ তখন ফোকসালে বসে তাঁর পবিত্র গ্রন্থের পাতা উল্টে যাচ্ছেন। এখন তাঁর সবই প্রায় মুখস্থ। তিনি চোখ বুজে সব বলে যেতে পারেন। উচ্চারণ এবং শব্দের ভেতর এক অলৌকিক ব্যাপার থেকে যায়। সারারাত তিনি এভাবে তার সব সুরা অথবা আয়াত এক এক করে গম্ভীর গলায় যেন বলার ইচ্ছে হে মানুষেরা বলো : আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সেসব কার জন্যে; তিনি নিজের ওপরে বিধান করেছেন করুণা; নিঃসন্দেহে কেয়ামতের দিন তিনি তোমাদের একত্রিত করবেন। বলো, আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা আল্লাহ্ ভিন্ন আর কাউকে কি আমি রক্ষাকারী বন্ধুরূপে গ্রহণ করবো? আর যদি আল্লাহ্ তোমাদের দুঃখ দিয়ে স্পর্শ করেন তবে তা সরিয়ে নেবার তিনি ভিন্ন কেউ নেই; আর যদি তিনি তোমাদের স্পর্শ করেন শুভকর কিছু দিয়ে তবে নিঃসন্দেহে তিনি সব কিছুর ওপরে। এভাবে সারেং-সাব নিজের ভেতরে ডুবে যান। তাঁর কোনো তখন আর আকাঙ্ক্ষা থাকে না। সারা দিনমান এই যে অমানুষিক পরিশ্রম সব মনে হয় তাঁর সেই জ্ঞানী ঐশী শক্তিকে স্পর্শ করার জন্য।

    মজুমদার, বংকু, ইয়াসিন, মনু এখন ফোকসালে বসে তাস খেলছে। বাদশা মিঞা উপুড় হয়ে দেখছে তাস খেলা। চা আসছে মাঝে মাঝে। এখানেও রয়েছে এক ঐশীশক্তিসম্পন্ন মানুষ। নিজের সে একটা জগত তৈরি করে নেয়। মাথার ওপর ছাদ, তার ওপরে নীল আকাশ এবং নক্ষত্রমালার কথা মনে থাকে না। মনে থাকে না পৃথিবী একটা গ্রহ, লক্ষ কোটি গ্রহের ভেতর সে আছে এবং এই যে আকাশের নীহারিকাপুঞ্জমালা, তার ভেতর থেকে এখন এক নিরিবিলি বন্দরে চারজন মানুষ তাস খেলছে ভাবতে ভৌতিক লাগে। সব ক্রিয়াকলাপই এখন অর্থহীন।

    অথবা যদি ভাবা যায় গ্রহ-নক্ষত্রের মতো পৃথিবী আপন অক্ষরেখায় ঘুরছে—পৃথিবীর বার্ষিকগতি আহ্নিক গতি আছে, একটা কমলালেবুর মতো ওর গড়ন—সমুদ্র-পৃষ্ঠে একটা সাদা জাহাজ, একটা এজন্য যে পৃথিবীতে যারা সিউল-ব্যাংকের নাবিক তারা পৃথিবীতে একটা জাহাজের কথাই ভেবে থাকে—আর কিনা সেই ছোট্ট জাহাজ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পৃথিবীর সমুদ্র-পৃষ্ঠে ভেসে ভেসে তাহিতি নামক এক সুন্দর দ্বীপে এসে পৌঁছে গেছে। ওদের তাসখেলা দেখলে, কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যা বোঝা দায়। ইয়াসিন তখন ট্রাম বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল। কে বলবে পৃথিবী গ্রহ তখন। কে বলবে, এই সৌরজগতে ওরা প্রায় অস্তিত্বহীন। কিছু আসে যায় না এতবড় সৌরলোকে কোন ঐশীশক্তি কি ট্রামকার্ড হাতে রেখে খেলছে!

    অবাক, ওদের খেলা, ওদের খেলায় নিবিষ্টতা এবং এই যে চা এল, কেউ শুকনো পান খাচ্ছে দুটো শুকনো সুপুরি দিয়ে, মনেই হবে না দেখে তারা কোনো অংশে কম সুখে আছে। সকালে জাহাজ ছাড়বে, ওদের খেলা দেখলে একেবারেই তা মনে হচ্ছে না। গ্রহ নক্ষত্র পৃথিবীর অবস্থান অথবা এই সমুদ্র তার বিশালতা ঝড় টাইফুন সবই অকিঞ্চিৎকর তাদের কাছে। তাস খেলার মতো প্রিয় আর কি আছে পৃথিবীতে তারা জানে না। এও এক ঐশীশক্তি—তাদের সব দুঃখ ভুলিয়ে দিচ্ছে।

    তখন ডেক-সারেঙ, ডেক-টিণ্ডাল ঘুমিয়ে আছে বাংকে। ওদের নাক ডাকছিল। ভাণ্ডারী জ্যাঠা তখন লুঙ্গি পাল্টে নিচ্ছেন। সবার খাওয়া না হলে তিনি নামতে পারেন না। এখন হয়তো মুখ ধুয়ে সামান্য আফিং খাবেন। এক বিন্দু এই আফিং তাঁকে সারারাত কত রকমের স্বপ্নের ভেতর যে ডুবিয়ে রাখবে। যেন সারাদিন এই যে পরিশ্রম, এই সামান্য আরামটুকুর জন্য। কেউ এসে বিরক্ত করলে চিৎকার চেঁচামেচি লাগিয়ে দেবেন। অথবা মনে হবে কুরুক্ষেত্র, এমনকি সারেঙ-সাব পর্যন্ত এসময় ওকে ঘাঁটান না। তিনি খুব নিবিষ্টতার সঙ্গে সামনে জলের গ্লাস, এক বিন্দু আফিং রেখে পা ভাঁজ করে বসলেন। তারপর জল মুখে আফিং-এর বিন্দু গলায় ছেড়ে দিয়ে চোখ বুজে ফেললেন। যতক্ষণ ঝিমুনি না আসবে এভাবে বসে থাকবেন। ঝিমুনি এলে কাত হয়ে শোবেন। তারপর কি সব নানারকমের উদ্ভট সব দৃশ্য, এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে তাঁর মনেই হয় না বেঁচে থাকার জন্য পৃথিবীতে আর কি লাগে!

    এভাবে সব বাংকেই কিছু না কিছু হচ্ছে। কেউ হাসছে। কেউ ফিসফিস করে বন্দরে কিসব করে এল, পাশের জাহাজিটিকে বলছে এবং ঘুম আসছে না বলে বারবার হাই তুলছে।

    ছোটবাবু একা দাঁড়িয়ে আছে। ওর হাই উঠছিল। ঘুম পাচ্ছিল। এবং সবার মতো এখন এ জাহাজে একটা পাখি একমাত্র তার ঐশী-শক্তি। কারণ ওর মনে হয়েছিল পাখিটা ঠিক ফিরে আসবে। হয়তো গোপনে মাস্তুলের ডগায় পাখিটা বসে রয়েছে। তার ঘুম পাচ্ছে, তবু সে এলি-ওয়ে ধরে হেঁটে গেল। মাস্তুলের নিচে দাঁড়িয়ে দেখল, পাখিটা নেই। পাখিটা সত্যি ফিরে গেছে। সে আর আসবে না। লেডি- এ্যালবাট্রস নিজের মতো আশ্রয় খুঁজে পেয়ে গেছে। পাখিটার জন্য আর তাকে উচ্ছিষ্ট হাড়-মাংস সংগ্রহ করে রাখতে হবে না।

    সে একা একা ফিরে গেল। জাহাজে উঠে অদ্ভুত স্বভাব গড়ে উঠেছে। ডাঙ্গায় তার এভাবে কোন পাখি না থাকলে এত একা একা লাগে ভাবতে পারত না। সে একা একা যখন যাচ্ছিল, যখন চারপাশে এলি-ওয়ের আলো, যখন মেন-এনজিন চলছে না বলে পায়ের শব্দে টের পাওয়া যাচ্ছে একজন অসহায় মানুষ একা একা হেঁটে যাচ্ছে, সামান্য শব্দেই মনে হচ্ছে অতিকায় ঘটনা ঘটছে জাহাজে তখন বনি ওপরে পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছে। বনির কিছুতেই ঘুম পাচ্ছিল না। তার শরীরে সুন্দর পোশাক। নীল রঙের গাউন পায়ের পাতা পর্যন্ত। হাল্কা গাউন। এত পাতলা যে ভেতরের সব কিছু স্ফটিক জলের মতো স্বচ্ছ। সে একা দাঁড়িয়ে আছে। সে ফিস ফিস করে নিজের সঙ্গে কথা বলছে, ছোটবাবু, আমি বনি। মি-গার্ল। আমার ঘুম আসছে না ছোটবাবু।

    তখন কাপ্তান স্যালি হিগিনস একটা চিঠি বারবার পড়ছেন।

    দুপুরে কাপ্তান স্যালি হিগিনস চিঠিটা পেয়েছেন। হেড-অফিস থেকে ওর নামে জরুরী চিঠি। দুপুরে তিনি চিঠির ভাঁজ খুলে দেখেছিলেন মিস্টার রিচার্ড ফেল ওকে একটা ব্যক্তিগত চিঠি লিখেছেন। চিঠিটা পড়ে তিনি তখন গুম হয়ে বসেছিলেন। সারাদিন চিঠিটার কথা ভেবেছেন। মিঃ ফেল প্রায় যেন অনুনয় বিনয় করে লিখেছেন এবং যা লিখেছেন এতে তাঁরও ঘাবড়ে যাবার কথা। মিঃ ফেলের পুত্রের কথা চিঠিটাতে ছিল না, কিন্তু বার বার মনে হয়েছে সেই হাসি খুশি মানুষটি আর তেমনটি নেই। জাহাজ স্ক্র্যাপ করার কথা তিনি আর ভাবছেন না। এখন শুধু একমাত্র স্যালি হিগিনসই ত্রাস থেকে তাঁকে রক্ষা করতে পারেন। মিঃ ফেল পুত্রের মৃত্যুর পর আর সিউল-ব্যাংকের লাভ লোকসান দ্বিতীয়বার খতিয়ে দেখেন নি। সিউল-ব্যাংক যদি সমুদ্রে ডুবে যেত, অথবা চড়ায় আটকে থাকত কোথাও—আচ্ছা আপনি স্যালি হিগিনস পারেন না, সিউল-ব্যাংককে কোন চড়ায় তুলে দিতে—এমন একটা অনুনয়ও যেন চিঠিটার ভেতরে পরোক্ষভাবে ছিল। মিঃ ফেল কোম্পানীর কর্তাব্যক্তি। সিউল-ব্যাংকের পরবর্তী সমুদ্রযাত্রা সম্পর্কে কিছু খোলাখুলি খবর পাঠিয়েছেন।

    প্রথমে তিনি জানিয়েছেন, মিঃ হিগিনস, আশা করি কুশলে আছেন। তারপর লিখেছেন আপনার জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি বৃটিশ ফসফেট কোম্পানীর সঙ্গে আমাদের এক বৎসরের পুরো একটা চুক্তি হয়েছে। সেই চুক্তি অনুসারে জাহাজ এখন সমুদ্রেই থাকবে। নারুদ্বীপ, কাকাতিয়া দ্বীপ, ওসানিকআয়ল্যান্ড, সামোয়া, টোঙ্গা, নিউক্যালেন্ডোনা, নিউ হেরিডস, গোয়াম—এসব দ্বীপ থেকে জাহাজ ফসফেট নেবে, এবং অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে, নিউজিল্যান্ডের উপকূলের ছোট ছোট বন্দরে সেসব নামিয়ে দেবে। যদিও দীর্ঘ সফর হয়ে যাবে, তবু আমাদের এখন আর কি করণীয় বুঝতে পারছি না। আপনি আমাদের সুখে- দুঃখে দীর্ঘদিন আছেন, সিউল-ব্যাংক জাহাজ আপনার প্রিয় জাহাজ।

    হিগিনস বুঝতে পারেন কর্তাব্যক্তিরা কখনও সহজ কথাটা সহজভাবে লেখেন না। ওঁরা যেন বলতে চান আমাদের দক্ষিণ সমুদ্রেই কাজকর্ম বেড়ে গেছে। সেখানে সিউল-ব্যাংককে না থাকলে চলবে না। এটা কিছুতেই স্বীকার করছেন না, জাহাজকে আর বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি থাকতে দেবেন না। যত দূরে সম্ভব, জাহাজটাকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। জাহাজ যত উত্তরমুখী উঠতে থাকে যত ইংলিশ-চ্যানেলের কাছে চলে যায় তত হেড-অফিসে উত্তেজনা দেখা দেয়। নানাভাবে সব এজেন্ট অফিসে তখন চিঠি, কি ব্যাপার জাহাজ কেন এভাবে উঠে আসছে। এশিয়া, আফ্রিকার বন্দরগুলোতে খোঁজ নিন। সিউল- ব্যাংকের জন্য ঠিক কার্গো পেয়ে যাবেন। যদি না পান দেখুন জাভা সুমাত্রা বোর্ণিওতে। সেখানে ঠিক কার্গো পেয়ে যাবেন। যত সত্বর সম্ভব জাহাজের কার্গো দিন। জাহাজ খালি ফেলে রাখবেন না। খালি ফেলে রাখলে কোম্পানীর আর্থিক ক্ষতি।

    তারপর লেখা আছে দক্ষিণ সমুদ্র ছাড়া এ-জাহাজ কার্গো পাবে না। সুতরাং দক্ষিণ সমুদ্রে যতদিন সম্ভব বৃটিশ ফসফেট কোম্পানীর হয়ে জাহাজ ভাড়া খাটুক। আশা করি এতে আপনার সায় আছে।

    হিগিনস চিঠিটা ভাজ করে রাখলেন। রিচার্ড ফেল ওঁকে নিজে চিঠি লিখেছেন। এবং অফিসিয়াল চিঠি নিশ্চয়ই তিনি নিউ প্লাইমাউথে গিয়ে পেয়ে যাবেন। বোধ হয় মিঃ ফেলের ভয় ছিল কি জানি এত দীর্ঘদিনের সফর যদি হিগিনস করতে না চান এবং তিনি এভাবে জানেন তাঁর ব্যক্তিগত চিঠি অনেক বেশি কাজের হবে। .

    হিগিনস ভেবেছিলেন, নিউ-প্লাইমাউথ থেকে খালি জাহাজ যাবে, পোর্ট-মেলবোর্ণে। তারপর কাছাকাছি বন্দর জিলাঙ, সেখানে গম বোঝাই হবে—এবং জাহাজ আবার ভারত মহাসাগর পার হয়ে সুয়েজের ভেতর দিয়ে ঠিক ভূমধ্যসাগর একদিন পার হয়ে যাবে। এবং বে-এফ-বিসকে পার হলে তিনি এতদিনের সমুদ্র-অভিযান, অভিযানই তাঁর কাছে, কারণ এমন একটা ভাঙ্গা জাহাজ নিয়ে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানো ভেলায় চড়ে পাহাড়ী নদী পার হবার মতো। তাঁর কাছে যেহেতু অভিযানের সামিল তিনি অন্তত তাঁর জীবনের অভিযান সফল ভেবে বন্দরে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো জাহজাটাকে স্যালুট জানাতে পারবেন—কিন্তু যেটা সবচেয়ে দুর্ভাবনা, এবং যা নিয়ে তিনি সারাটা দিন ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন—বনি জাহাজে এতদিন থাকলে কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে। তিনি নিজে টের পাচ্ছেন এ জাহাজে কেউ কেউ যেন বাতাসে গন্ধ শুঁকে বেড়াচ্ছে। জাহাজে কোথায় যেন একটা মেয়ে মেয়ে গন্ধ। তখনই তিনি ভীষণভাবে মুষড়ে পড়েন। এই জাহাজ এবং বনি। বনি এবং এই জাহাজ। কার কথা এখন তিনি বেশি ভাববেন। অথচ চিঠিটা মিঃ ফেলের ব্যক্তিগত চিঠি। কিছুটা শেষদিকে অনুনয়ের মতো। আমাদের বিপদ থেকে ত্রাণ করুন—এমন একটা আর্ত সুর আছে চিঠিটাতে। শেষের দিকে যতই সতর্ক থাকুন মিঃ ফেল ধরা পড়ে গেছেন। লুকেনারের প্রেতাত্মা কোথাও কি সত্যি তবে জাহাজটাতে রয়েছে। কারণ লুকেনারের সেই প্রেতাত্মা চায় না মানুষের হাতে এই জাহাজের হাড়-পাঁজর খুলে নেওয়া হোক। তারপর তিনি নিজেই অবাক, জাহজাটার কথা ভাবতে গিয়ে জাহাজের মতো ভাবতে পারছেন না কেন! হাড় পাঁজরের কথা ভাবছেন। যেন সিউল-ব্যাংক তাঁর কাছে সত্যি মানুষের মতো অনুভূতিপ্রবণ। বোধহয় তিনি মরে গেলে তাঁর আত্মাও এ-জাহাজ থেকে নড়তে চাইবে না। আর তখন দেখতে পেলেন সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে। এলিস! এলিস তুমি! তিনি এলিসকে ধরবেন বলে পাগলের মতো সিঁড়ি ধরে নেমে যেতে থাকলেন। তিনি যত এগিয়ে যাচ্ছেন তত এলিস সরে সরে যাচ্ছে। তখন ডাঙ্গায় কোথাও ঢং ঢং করে বারোটার বেল বাজছে। হিগিনস উন্মত্তের মতো ছুটে যাচ্ছেন।

    হিগিনস ডাকলেন, এলিস শোনো।

    এলিস ছায়ার মতো কেমন আগে আগে হাঁটছে। এবং আলো অন্ধকারে এত কাছে এলিস যে তিনি হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারেন, তিনি কেবল চাইছেন এলিস ওঁর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলুক। তিনি বললেন, এলিস তুমি বল, তোমার কোন দোষ ছিল না?

    এলিস তবু চলে যাচ্ছে। কোন কথা বলছে না। সে টুইন-ডেকে নেমে যাচ্ছে। সে এবার স্টার বোর্ডের এলি-ওয়েতে ঢুকে গেছে। এলিস তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! তারপর এলিস ঠিক ছোটবাবুর কেবিনের পাশ দিয়ে আবার ওপরে উঠে ঠিক বনির দরজার সামনে অদৃশ্য হয়ে গেল। এখানেই তিনি এলিসকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করার আগে মাথায় আঘাত করেছিলেন। এবং তখন রাত…আর সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝিমঝিম করতে থাকল। চিৎকার করে উঠলেন, বনি বনি।

    বনি দরজা খুলে দেখল বাবা এত রাতে তার দরজায়। বাবার ভীত সন্ত্রস্ত মুখ দেখে বলল, কি হয়েছে! তুমি এত রাতে নেমে এসেছ কেন?

    বনির খেয়াল ছিল না। সে সেই হাল্কা পোশাকেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। হিগিনসের হুঁশ হল। তিনি যা দেখলেন, বনি বড় হয়ে গেছে, খুব বড় হয়ে গেছে,। বনি ঠিক এলিসের মতো। ঠিক এলিসের মতো বনির রাতের পোশাক। হিগিনস আর চোখ তুলে মেয়েকে দেখছেন না। তিনি সিঁড়ি ধরে ধীরে ধীরে ক্লান্ত পায়ে উপরে উঠে যাচ্ছেন।

    আর তখন বনি হতবাক! ছিঃ ছিঃ সে এটা কি করে ফেলল। বাবার সামনে সে একেবারে বে- আবরু। দরজা বন্ধ করে আয়নায় আর দাঁড়াতে সে সাহস পেল না। সংকোচে সে কেমন গুটিয়ে গেল। সে তো ছোটবাবুর কাছে যাবে। বার বার প্রতিদিন সে একবার মনে মনে এ-পোশাকে ছোটবাবুর সামনে বসে থাকে। ফুল ফুটতে থাকলে যে-সব আকাঙ্ক্ষা ফুলের যেমন ফুলেরা রাত জেগে শিশিরের শব্দের মতো ঘুমোয় না তেমনি বনি ঘুমোতে পারে না। ফুলের মতো ছোটবাবু চারপাশে তার ফুটে থাকে।

    বনি এই প্রথম নানা কারণে সারারাত চোখ এক করতে পারল না।

    আর সকালেই ড্যাং ড্যাং পূজোর বাজনার মতো জাহাজের দড়িদড়া আবার উঠে যাচ্ছে, নোঙর তুলে ফেলা হচ্ছে। কেউ বুঝতেই পারে না জাহাজটার ভেতরে অজস্র দুঃখ, জাহাজটা এইসব দুঃখ নিয়ে ফের সমুদ্রে পাড়ি দিচ্ছে।

    বিকেলের দিকে তখন জাহাজ বেশ দূর সমুদ্রে এবং তখনই কেউ যেন হেঁকে যাচ্ছিল, লেডি- অ্যালবাট্রস উড়ছে।

    ছোটবাবু উইনচের তলা থেকে বের হয়ে এল। এবং বোট-ডেকে উঠে সত্যি সে বিস্মিত পাখিটা আবার জাহাজের পেছনে উড়ে আসছে। পাখিটা হয়তো ভেবেছে ম্যান-আলবাট্রস এ জাহাজেই কাঠের বাক্সে বন্দী আছে। তাকে সে না নিয়ে ফিরে যাবে না।

  • ঊনত্রিশ

    ঊনত্রিশ

    ।। ঊনত্রিশ।।

    পর পর দু’রাত স্যালি হিগিনস ঘুমোতে পারলেন না। দেয়ালে ক্রাইস্টের মুর্তি। যতবার চেষ্টা করেছেন সোজা রাখার, ততবার কাত হয়ে গেছে। তার পায়ের নিচে তিনি সারারাত চুপচাপ বসে থেকেছেন। ভেবেছিলেন, সোজা করে রাখতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। জাহাজে কোন পিচিং নেই। সমুদ্র একেবারে শান্ত। জাহাজ দুলে দুলে চললে এটা হতে পারত। কিন্তু কি যে হয়ে গেল! কলকাতা বন্দর থেকে ছাড়ার সময় চীফ-মেট বেশ সোজা করে রাখতে পেরেছিল, কিন্তু আবার ঠিক আগের মতো। ইচ্ছে করলে দেয়ালে পেরেক ঠুকে প্রায় আবার যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার মতো কিছু একটা করে ফেললে, মূর্তিটাকে সোজা রাখা যেত। কিন্তু তিনি তা করতে ভয় পাচ্ছেন।

    আসলে একটা শঙ্কা এবং ভয় তাঁকে ক্রমে গ্রাস করছে। হয়তো যীশু ঠিকই আছেন, ঠিকভাবে সোজা সরলরেখায় ঝুলে আছেন কিন্তু মনের ভেতর শঙ্কা তাঁকে ক্রমে সব বিভ্রমের ভেতর ফেলে দিচ্ছে। স্যালি হিগিনস ঘুমের পোশাক পরেছিলেন—রাতের পোশাক ঢিলেঢালা হওয়া স্বাভাবিক—ঢিলেঢালা আছে ঠিকই তবু যতবার শুতে গেছেন মনে হয়েছে সমস্ত শরীরে পোশাকটা ফাঁসের মতো এঁটে যাচ্ছে। পাল্টে আর একটা পরেছেন—তাও সেই একরকমের। যতবার যত পোশাক পাল্টেছেন সবই যেন অন্যের মনে হয়েছে—নিজের মনে হচ্ছে না, এবং কি যে অস্বস্তি তখন, লাফিয়ে উঠে পড়েছেন, কখনও পোর্ট-হোল খুলে আকাশ দেখেছেন, ঠিক ঠিক সব নক্ষত্র আকাশে আছে কি নেই দেখেছেন, দরজা খুলে ব্রীজে যারা ডিউটিতে আছে তারা আছে কিনা দেখেছেন—না সবই ঠিক আছে। মাস্তুল, চিমনি, ব্রীজের উইংস, ডেবিড, কোয়ার্টার-মাস্টার সব তাঁর চেনা, তবু কেন যে মনে হচ্ছিল—জাহাজটা সিউল-ব্যাঙ্ক নয়, জাহাজটা কোনো ভুতুড়ে জাহাজ। ভুতুড়ে জাহাজে উঠে তিনি লুকেনারের পোশাক পরেছেন। পোশাকটা কেমন ভারি, যেন অনেক পোশাক—একটা দুটো নয়, অজস্র পোশাকের ভার তাঁকে একটা কিম্ভুতকিমাকার মানুষ বানিয়ে দিচ্ছে। যখন এসব ভেবে কুলকিনারা পান না, তখনই মাথা নিচু করে যীশুর পায়ের কাছে বসে থাকেন। তাঁর সারারাত ঘুম হয় না। বিড় বিড় করে বকেন, হ্যালেলুজা আই এ্যাম অন মাই ওয়ে।

    তখন সমুদ্রের ভেতরে শুনতে পান দীর্ঘ শবযাত্রার মিছিল—তাদের নিথর পায়ের শব্দ, এবং শবাধারে ফুলের ভেতরে কীটের আস্তানা—কটকট করে তারা ফুলের পাপড়ি কাটছে। তাঁর দৃষ্টি দেয়াল থেকে উঠে সেই সমুদ্রের শান্ত প্রবাহের ভেতর আটকে গেলে বুঝতে পারেন, সকাল হয়ে যাচ্ছে। তিনি বুঝতেই পারেন না কেন সারারাত তিনি না ঘুমিয়ে ছিলেন। সব কিছু কেমন নিজের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকে।

    তখন কাপ্তান-বয় এসে যায়। বাইরের ডেক চেয়ারে গিয়ে তিনি বসেন। এক কাপ কফি, কফি খেতে খেতে বুঝতে পারেন চোখ জ্বালা করছে—এভাবে পর পর দু’রাত না ঘুমিয়ে শরীরে অবসাদ। উঠতে ইচ্ছে করে না। বনিকে ডেকে পাঠাতে ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে হয় সব খুলে মেয়েটাকে বলেন—বনি, আমার এমন কেন হচ্ছে? বনি তুমি সত্যি করে বল তো, রাতে তুমি হাল্কা পোশাকে কোথায় গিয়েছিলে? এলিস না তুমি! এলিস এবং তুমি দুজনে মিলে ভীষণ আমাকে বিভ্রমের ভেতর ফেলে দিয়েছ?

    মাঝে মাঝে তাঁর সহসা কেন যে মনে হয় এ-জাহাজে এলিস আসবে কোত্থেকে! হয়তো রাতে বনি, এই জাহাজে মেয়ে হয়ে যায়। সারাদিন ছেলের পোশাকে থেকে বনি যখন আর পারে না, রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, যে যার ওয়াচ ওপরে নিচে যখন করছে, তখন বনি গোপনে রাতের পোশাকে জাহাজে ঘুরে বেড়ায়। এবং তারপরই তিনি যা ভেবেছিলেন, বনি গোপনে ঘুরে বেড়াতে পারে, কিন্তু তাঁর চোখের ওপর দৃশ্যমান হলে বনির গোপনীয়তা কিছু থাকে না। আর তখনই ভেবে পান না, বনির এত সাহস কি করে সম্ভব। কিন্তু বনিকে তো তিনি বারবার এলিসের মতো দেখেছেন। বনির পোশাক দেখেছেন, হাল্কা পোশাক—যে-পোশাকে এলিস ওঁর জন্য কেবিনে অপেক্ষা করত। বনি ঠিক সেই পোশাকে কেবিনের দরজা খুলে ওঁর সামেন দাঁড়িয়েছিল। বনি কি তবে রাতে তাঁকে সারা জাহাজ ঘুরিয়ে মেরেছে? বনির ভেতরে এলিস যদি আশ্রয় নেয় তখন! এমন তো ঘটনা তিনি ডাঙ্গায় কত শুনেছেন। এবং বুনি হয় তো তখন সজ্ঞানে থাকে না, মাথার ভেতরে তার এক অশুভ আত্মা ক্রমাগত পাক খেতে থাকে। বনি এলিস হয়ে যায়। আসলে এলিস তাঁকে নিষ্ঠুরতার ভেতর ফেলে ভীষণ মজা পাচ্ছে। এমন সুন্দর মেয়েটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে।

    এসব চিন্তা তাঁকে বেশ কাবু করে ফেলেছিল। আর সেই থেকে তিনি ঘুমোতে পারছেন না। একটা ঘোরের ভেতর পড়ে গেছেন তিনি। বনি রাতের পোশাকে সামনে দাঁড়ালে ঘোরের ভেতর মনে হয় এলিস দাঁড়িয়ে আছে। জাহাজে বনি বলে তাঁর মেয়ে আছে, এবং জাহাজে মেয়ে থাকতে পারে ঘোরের ভেতর কিছুতেই মনে থাকে না। এই শেষ সমুদ্র সফরে এসব একে একে তাঁকে কঠিন অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে। তখন যিশুর পায়ের কাছে, বাইবেলের কোন পবিত্র সুরা পাঠ করে আত্মশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষা। মাথায় আর কিছু আসে না। অন্যান্য অনেক কাপ্তানের জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার পেছনে বোধ হয় কিছু এমন রহস্যজনক ঘটনা থেকে গেছে। তাঁরা ভয়ে হয়তো জাহাজের নামে মিথ্যা দুর্নাম রটিয়ে বন্দরে নেমে গেছে। বার বার অসুস্থ হয়ে তাঁরা ফিরে গেছেন জানেন, কিন্তু আসলে কেন এটা হয়েছে—সঠিক কিউ- টি-জি মাঝে মাঝে পাওয়া যায় না কেন এবং জাহাজ নিশীথে সমুদ্রে ঘুরিয়ে মারলে পাগল হয়ে যাবার কথা ঠিক—তবু মনে হচ্ছে তাঁরা লুকেনারের মৃত আত্মা অথবা এলিসের মোহে পড়ে গিয়ে এক সময় অসুস্থ হয়ে পড়তেন। কিন্তু এসব কর্তৃপক্ষকে বলে তো আর তিনি তামাসার ভেতর পড়ে যেতে পারেন না।

    তিনি কফি খাচ্ছিলেন। তাঁর পাইপ থেকে ধোঁয়া উঠছে না। কখন নিভে গেছে। দু’দিনে তিনি আরও বুড়ো হয়ে গেছেন। সূর্য সমুদ্রে ভেসে উঠছে। সেই যায় যায়, যেন সূর্য সন্ধ্যার আগে সমুদ্রে ডুবে পালিয়ে যায়, তারপর সারারাত সাঁতার কাটতে থাকে, এবং আবার সকালের দিকে সমুদ্রে একটা গোলাকার অগ্নিপিন্ডের মতো ভেসে ওঠে। অথবা মনে হয় অতিকায় জাহাজের মতো রাজহাঁসটা একটা সোনার ডিম পেড়ে ওপরে উঠে গেল। যত সময় যায়, তত ডিমটা সেই নীল আকাশের নিচে সামান্য উষ্ণতার জন্য লেগে থাকে, এবং সন্ধ্যা হলেই ডিম ফুটে যায় কিংবা ডুবে যায়, আবার সকালে ভেসে ওঠে—এ সবের ভেতর মনে হল, বনিকে সামনের বন্দরে বরং নামিয়ে দেবেন। বনিকে তিনি ক্রমে একটা বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। জাহাজ থেকে বনি নেমে গেলেই হয়তো এলিস প্রতিশোধ নেবার আর কোন অবলম্বন পাবে না। নিজের সম্পর্কে ভাবেন না। বয়স হয়েছে, সমুদ্রে যে-কোনোভাবে মৃত্যু অনিবার্যতার সামিল।

    এবং আর যা ভাবলেন, বনিকে কিছু প্রশ্ন করার আছে। তা না হলে তাঁর অস্বস্তি কাটবে না। কফি খাওয়া হলে তিনি কাপ্তান-বয়কে বললেন, একবার জ্যাককে পাঠিয়ে দেবে।

    জ্যাক ঘুমোচ্ছিল। সে দু’তিন দিন বাবার কাছে যায়নি। লজ্জায় সংকোচে সারাদিন কেবিনে কাটিয়ে দিয়েছে। ওর যে এটা কি করে হল? এবং বাবা মনে মনে বিরক্ত হতে পারেন। এত সকালে যখন সে শুনতে পেল, তাকে তিনি ডাকছেন, সে লাফ দিয়ে উঠে বসল। বাইরে কাপ্তান বয়ের গলা। সে বলল, যাচ্ছি।

    হাত মুখ ধুয়ে ঠিক সেই ঢোলা পুরুষের পোশাকে জ্যাক যখন উঠে গেল ওপরে, বাবার পাশে যখন দাঁড়িয়ে ডাকল, আমি বনি, তখন কাপ্তান ধীরে ধীরে চোখ তুলে মেয়েকে অনেকক্ষণ দেখলেন। মুখ থেকে এক আশ্চর্য নীল আভা যেন বের হচ্ছে। গোলাপী রঙ এবং নীল চোখে কি যেন আশ্চর্য সজীবতা। পৃথিবী ফুলে ফলে ভরে গেলে এমন হয়। তিনি যে ডেকেছেন, ভুলেই গেছিলেন। মেয়েটাকে দেখতে দেখতে কেন তিনি ডেকেছেন মনে করতে পারলেন না। তারপর খানিকক্ষণ কি ভেবে যখন মনে করতে পারলেন—কেমন সংকোচ হল তাঁর। বনি সম্পর্কে কি যে আজেবাজে দু’রাত ধরে ভেবেছেন। শুধু বললেন, বোস। তোমাকে ডেকেছিলাম! হ্যাঁ—মনে হয়েছে। আচ্ছা বনি, খুব সন্তর্পণে বললেন, তোমার শরীর ভাল যাচ্ছে?

    এই সাতসকালে বাবার এমন কথা শুনে সে আশ্চর্য হয়ে গেল। বলল, কেন বল তো বাবা?

    —না এমনি। দু’দিন দেখিনি। ভাবলাম…।

    —আমার শরীর ভাল আছে বাবা।

    —আচ্ছা বনি, তোমার কি কখনও—তারপরই কেমন সতর্ক হয়ে গেলেন। এ-সব তো বনিকে ভেবেছেন বলবেন না। আবার কেন সেই এক কথা।

    বনি দেখতে পেল, বাবার মুখের দৃঢ়তা একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আর যেন তার বাবা ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস নন, সামান্য একজন ডাঙ্গার মানুষ। সমুদ্রে দীর্ঘদিন থাকলে মানুষের যে আত্মপ্রত্যয় থাকে তাঁর মুখে বিন্দুমাত্র তার চিহ্ন নেই। সে যেন তার বাবার সঙ্গে কথা বলছে না, কেমন অপরিচিতের মতো তিনি। এবং তখনই সেই ভয়টা গুড়গুড় করে ওঠে। আর্চিকে দেখলে সে যেমন দৌড়ে পালায়, বাবাকে দেখেও তার এখন দৌড়ে পালাতে ইচ্ছে করছে।

    তখনই স্যালি হিগিনসের যে কি হয়ে যায়। তিনি বললেন, বনি তুমি বড় হয়ে গেছ।

    বনি এবার মাথা নিচু করে পায়ের কাছে বসে পড়ল।

    জাহাজিরা তখন যে যার কাজ করে যাচ্ছে। ডেক-জাহাজিরা ডেক ধোয়ামোছা করছে। একদল জাহাজি ফল্কার ওপর মাদুর বিছিয়ে নামাজ পড়ছে। পিছিলে কেউ চর্বি ভাজা রুটি খাচ্ছে। ছোটবাবু বালতি হাতে, তেলের টব কোমরে গুঁজে মেইন-মাস্টের নিচে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ওপরে চিফ-মেট ব্রীজে পায়চারি করছে। ওরা দেখতে পেল, সাতসকালে বাপ-বেটাতে ব্রীজের পাশে চার্টরুমের বারান্দায়, কি সব গোপন সলাপরামর্শ চলছে।

    স্যালি হিগিনস বললেন, জাহাজ খারাপ জায়গা। এখানে রাখতে তোমাকে আর সাহস পাচ্ছি না বনি।

    বনির মুখ থমথম করছে। বোধ হয় চোখ ফেটে জল বের হয়ে যাবে। সে কিছু বলছে না। কেবল চুপচাপ শুনে যাচ্ছে।

    বাড়ির পরিচারকদের লিখে দিচ্ছি, তুমি যাচ্ছ। তোমার পিসি এসে থাকবে। আমার ফিরতে আর এক বছর। এ কটা দিন দেখতে দেখতে তোমার কেটে যাবে।

    বনির মুখ দেখা যাচ্ছে না। চুল বড় হয়ে গেছে বলে মুখ ঢেকে গেছে। তিনি চান বনি কিছু বলুক। কিন্তু বনি দু-হাঁটু মুড়ে অসহায়ভাবে বসে রয়েছে। স্যালি হিগিনস বুঝতে পারেন, বনির স্বভাব আগের মতো নেই। স্থির ধীর। বয়স হলে মেয়েরা এভাবে বসে থাকতে ভালবাসে। আগের বয়সে বনি এত সহজে এ কথাটা মেনে নিত না।

    তিনি ফের বললেন, ভাল হয়ে থাকবে। তোমাকে আমি বাড়ি ফিরে সারপ্রাইজ দেব।

    বনি এবার উঠে যাচ্ছিল। সে কিছুতেই বাবাকে যেন ওর মুখ দেখাতে চায় না। মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। বাবা তার এই দুঃখ টের পাক সে চায় না। সে ছুটে বের হয়ে গেল। এবং কেবিনের দরজা বন্ধ করে বিছানায় হাউ হাউ করে ভেঙে পড়ল।

    তখন কি যে দ্রুতবেগে মেন-এনজিন ঘুরপাক খাচ্ছে। কি অতিকায় শব্দ মেন-এনজিনের। একেবারে যেন প্রপেলার স্যাফট ভেঙ্গে-চুরে দিতে চাইছে। দ্রুতবেগে ঘুরছে প্রপেলার স্যাফট। এনজিনের অতিকায় পিস্টন নেমে আসছে, উঠে যাচ্ছে। ক্রাংক-ওয়েভ ঘুরে ঘুরে নেমে যাচ্ছে, কনডেনসারে স্টিম ক্রমে ঠান্ডা হচ্ছে আর পাম্প চলছে অনবরত, তার কিট কিট শব্দ এবং বয়লারের গেজে লাল দাগ সঠিক স্টিমের জায়গায় কাঁপছে একটা কবুতরের পাখার মতো।

    বনি বিছানায় ঠিক এমনি থরথর করে কাঁপছে। ফুলে ফেঁপে উঠছে ওর শরীর। সে দু’হাতে বিছানার যাবতীয় বালিশ চাদর একসঙ্গে করে বুকের কাছে টেনে আনছে। সে কিছুতেই এই দুঃখ, ভেতরে যে এক আশ্চর্য ভালবাসা তার এ জাহাজে গড়ে উঠেছে—কাউকে বলতে পারল না। সে বলতে পারল না, বাবা জাহাজ ছেড়ে চলে গেলে আমি মরে যাব। যেন বললেই বাবা টের পেয়ে যেতেন, যা তিনি আশংকা করেছিলেন ঠিক। বনি এ-জাহাজে ভারি কষ্টের ভেতরে পড়ে গেছে। বনিকে তিনি কিছুতেই কষ্টের ভেতর ফেলে দিতে চান না।

    ছোটবাবু তখন পালিয়ে পালিয়ে পাখিটাকে খাবার খাওয়াচ্ছিল। সেই সকাল থেকে সে চারপাশে সতর্ক নজর রেখে যায়। আর্চি অথবা পাঁচ-নম্বরের চোখে পড়লেই তাকে আবার নিচে নামিয়ে দেওয়া হবে। বয়লার-প্লেট তুলে ভেতরে নামিয়ে দেবে তাকে। এবং প্লেট ফেলে কতদিন যেন মনে হয় দীর্ঘকাল ওকে সেই অন্ধকারে—পচা জল আর তেল-কালির ভেতর ফেলে রাখতে চায়। সে ভয়ে ভয়ে থাকে। খুব ভালো ছেলের মতো কাজকর্ম করে এবং এই যে দু’দিন জ্যাকের সঙ্গে তার দেখা হয় নি —সেটা কপাল ভাল, দেখা না হলেই সে বেঁচে যায়। জ্যাকের জন্য অযথা এই কষ্টের ভেতর পড়ে যেতে তার ভয় হয়। কিন্তু পাখিটার বেলায় সে অন্যরকম। সে ফাঁক পেলেই পাখিটাকে খাবার খাওয়ায়। আর্চিকে তখন সে এতটুকু যেন গ্রাহ্যের ভেতর আনে না। তখন সে কেমন জেদী একগুঁয়ে।

    তখন মৈত্র পরীতে নামবে। হাতে দস্তানা। গায়ে সেই নীল পোশাক। মাথায় ক্রিকেট ক্যাপ। এবং বোধ হয় সে এবং অমিয় ছোটবাবুকে মনে মনে খুঁজছিল। ছোটবাবু ক’দিন হল ওদের সঙ্গে কথা বলছে না। ছোটবাবুর সঙ্গে প্রায় দিনই দু-একবার ডেকে দেখা হয়, খুব কাজের মানুষের মতো ছোটবাবু উইনচের ভেতর মুখ গুঁজে রাখে। ডেক ধরে কারা হেঁটে গেল যেন ছোটবাবু টের পাচ্ছে না। ভীষণ নিবিষ্ট কাজে এমন একটা ভাব। আসলে ছোটবাবু রাগ করেছে।

    মৈত্র দেখছে, ছোটবাবু পাখিটার খাওয়া হয়ে গেলে ফিরে আসছে। খুব খুশী ছোটবাবু। পাখিটাকে খাওয়াতে পারলে ছোটবাবুর আর কোন দুঃখ থাকে না এবং এই ঠিক সময়। অমিয় বলল, এই ছোটবাবু তুই আমাদের সঙ্গে কথা বলছিস না কেন? খুব গরম হয়েছে?

    ছোটবাবু বলল, মৈত্রদাকে না নিয়ে গেলেই পারতে।

    মৈত্র বলল, রাখ রাখ বাপু, আলগা দরদ তোর দেখাতে হবে না। কেমন আছি একবার তো খবর নিলি না।

    —তুমি ভাল থাকলে আমার কি হবে? ছোটবাবু কেমন গম্ভীর গলায় কথা বলল। ছোটবাবুর এমন কঠিন মুখ মৈত্র কখনও দেখে নি। ছোটবাবু যেন নিজের ভেতর ক্রমে একজন সঠিক মানুষকে খুঁজে পাচ্ছে। আগে এই ছেলেটা ছিল একেবারে নরম মাংসপিন্ড, যা খুশি বানানো যেত। এখন ইচ্ছে করলেই আর ছোটবাবুকে যা খুশি বানানো যাবে না। এবং এভাবেই বোধ হয় ক্রমে এক সমীহ গড়ে ওঠে। জাহাজে ছোটবাবু উঠেছিল সবার অপোগন্ড হয়ে, এখন মৈত্রের মনে হল, জাহাজে অপোগন্ড সে নিজে। অমিয়, মনু এবং বংকু সবাই সুখে দুঃখে ছোটবাবুর কাছে পরামর্শ নিতে পারে। সে বলল, ছোট ভুল হয়ে গেছে। কিছু মনে করিস না। এখন ভাল আছি।

    —এ-ভাল তোমার ভাল নয়। তোমাকে দাদা সাবধান হতে হবে। তারপর কেমন সহসা মনে পড়ার মতো বলল, শেফালী বৌদির চিঠি আর এল?

    —না। বোধ হয় রাগ করেছে। করুক গে। আমি কি করব। টাকা থাকলে যদি না পাঠাতাম তবে বলতে পারত। কেমন মৈত্র মুখ গোমড়া করে রাখল।

    —তাহিতিতে চিঠি লিখলে?

    —লিখেছি। প্লাইমাউথে জবাব পাব আশা করছি।

    —বাবা হলে কিন্তু আমাদের খাওয়াতে হবে।

    —হ্যাঁরে খাওয়াব। বাবা হলে খাওয়াব না তো কখন খাওয়াবো। এত খাটছি কি জন্য। এবং ছোটবাবুর মনে হল এক্ষুনি মৈত্র চোখ বুজে তার সেই শিশুসন্তানের কথা ভাবতে ভাবতে নিবিষ্ট হয়ে যাবে।

    মৈত্র বলল, বলত ছোট, “মেয়ে হবে না ছেলে হবে?

    ছোটবাবু বলল, তোমার কি ভাল লাগে? মেয়ে না ছেলে?

    অমিয় বলল, মেয়ে হোক মৈত্র। তোর মেয়ের সঙ্গে বড় হলে আমি প্রেম করতে পারব।

    —খুব রস দেখছি।

    —দ্যাখ মৈত্র, বলে ওরা স্টার-বোর্ড ধরে হাঁটছে। ছোটবাবু দাঁড়িয়ে এভাবে গল্প করতে পারে না। তবু এভাবে দেশ-বাড়ি অথবা ডাঙ্গার কথা ভাবলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। এবং অহেতুক কথাবার্তা—কোনো মাথামুণ্ডু নেই তবু বলে যাওয়া, আর বাজি রাখা, বারবার এভাবে বাজি রাখতে ভালবাসে নাবিকেরা। যেন মৈত্র বাজি ফেললে, ছেলে হলে অমিয় দেবে, চার পাউণ্ড, অমিয় রাজী কিন্তু মেয়ে হলে, মেয়ে হলে তুমি হেরে যাবে মৈত্র। তুমি তখন কত দেবে? সেও বলল, চার পাউণ্ড। চার পাউণ্ড যেই দিক এবং নিজেরা কিছু চাঁদা তুলে ফেললে বেশ ভোজ হবে কিনারায় এবং স্ফূর্তি সারারাত। অমিয় বলল, ছোটবাবু, তুই কিছু দিবি না?

    —আমিও চার পাউণ্ড দেব।

    —তাহলে চার চার আট হয়ে গেল। অমিয় দেখল বংকু, অনিমেষ কোথাও রঙ করে ফিরছে। এখন টিফিন, সকালের চর্বিভাজা রুটি চা খেতে ওরা পিছিলের দিকে যাচ্ছে। অমিয় ওদের জামা ধরে বলল, তুমি এক পাউণ্ড, অনিমেষ তুমি এক পাউণ্ড। মনু দেবে দশ শিলিং, জব্বার দেবে দশ শিলিং তা অনেক হয়ে যায়।

    বংকু বুঝতেই পারল না কিসের পাউণ্ড আর কিসের দশ শিলিং। সে বলল, তোমার বাপের পয়সা! চাইলেই পাওয়া যায়।

    অমিয় অন্য সময় হলে মারামারি লাগিয়ে দিত। সামান্য অহেতুক কথাবার্তায় সহজেই জাহাজে মারামারি লেগে যায়, এখনও যেত, কিন্তু ছোটবাবুর সামনে বংকু বাবা তুলে কথা বলে ঠিক করে নি। ছোটবাবু বলল, দিবি তো একটা পাউণ্ড, কথা বলিস একশো পাউণ্ড ওজনের। শোন, আমরা ঠিক করেছি মৈত্রদা বাবা হলে এক রাতে বেশ জমজমাট কাটাব। নিউ. প্লাইমাউথে খবর ঠিক এসে যাবে। তখন দশ মাস না এগারো? ছোটবাবু এত উত্তেজিত যে, বৌদিকে নিয়ে সামান্য রসিকতা পর্যন্ত করে ফেলল।

    —তা ছোটবাবু কত মাস হবে, বৌদির কাছে চিঠি দিয়ে জেনে নিতে পারিস।

    তখন ওয়াচ থেকে লোকেরা উঠে আসছে। অমিয় মৈত্র ওপরে। ওদের লোক নিচে নেমে গেছে। ওরাও নামবে এবার। সুতরাং মৈত্র, অমিয় আর দাঁড়াতে পারল না।

    ওরা বলল, আমরা যাইরে। বলে লাফিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে বোট-ডেকে উঠে গেল।

    দুপুরে খাবার নিয়ে তখন ঝামেলা। বনির কেবিনে তখন কাপ্তান হিগিনস এবং কাপ্তান-বয়। দুজনের চেষ্টায় বনি সামান্য পরিজ খেল। বনি কিছুতেই খাবে না বলছে। ওর শরীর ভাল না থাকলে হিগিনস ভীষণ বিচলিত বোধ করেন। কি হয়েছে—কিছু জানতে পারছেন না। তিনি ভেতরে ভেতরে বিরক্ত বোধ করছেন। আর মেজাজ সামলাতে না পারলে বলছেন, কি হয়েছে বলবে তো?

    —কিছু হয় নি বাবা। তুমি চিন্তা কর না।

    —তবে খাচ্ছ না কেন?

    —খেতে একদম ইচ্ছে করছে না।

    হিগিনস মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। চোখ মুখ ফোলা ফোলা। খুব কান্নাকটি করলে এমন হয়। তিনি বুঝতে পারলেন না, বনি কেন কাঁদতে পারে। তাঁকে ছেড়ে বনির থাকতে কষ্ট হবে ঠিক, তবু সে তো সামান্য কয়েকটা মাস। আর তাছাড়া তিনি তো চিরদিন থাকছেন না। তখন কি হবে বনির? এ-সব মনে হলেই তিনি নিজেও আর জোর পান না, বনিকে ধমক দিতে পারেন না। বলতে পারেন না, মানুষ না খেলে বাঁচে!

    বনি বলল, তুমি ভেব না বাবা। সব ঠিক হয়ে যাবে।

    কিন্তু বিকেলে ফল, কফি সব এমনি পড়ে থাকল। রাতে একটু পোট্যাটো-অনিয়ন মুখে তুলেছে। সামান্য মাংসের রোস্ট মুখে দিয়েছে। আর কিছু না। পরদিন সে আরও কম। এবং এভাবে কমে গেলে সবাই জেনে ফেলল জ্যাক ক্যাবিনে অসুস্থ।

    ছোটবাবু দেখছে, জ্যাক ক’দিন ডেকে একেবারেই বের হচ্ছে না। যতবার ওর কেবিনের পাশ দিয়ে গেছে ততবার দেখেছে দরজা বন্ধ। পোর্ট-হোলে উঁকি মেরে দেখেছে, পর্দা ফেলা। কিছু দেখা যায় না। কাপ্তান হিগিনসের ভীষণ দুঃখী মুখ! জ্যাকের তবে কিছু হয়েছে—এবং কিছু হয়েছে শুনলেই সে স্থির থাকতে পারে না। সেই যেমন সে লতিফ বাংকারে পড়ে গেলে কারো নিষেধ গ্রাহ্য করেনি, এখন তেমনি সে কিছুটা মনে মনে একগুঁয়ে। ইচ্ছে হল, রাতে একবার জ্যাকের কেবিনে যাবে। আর্চি তখন মাতাল থাকবে, তার হুঁস থাকবে না। সে সময় মত জ্যাকের কেবিনে উঠে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকল, জ্যাক, আমি ছোটবাবু। দরজা খোল।

    জ্যাক ভেতরে আছে বোঝাই যায় না। কোন সাড়াশব্দ নেই। সবাই ডাইনিং হলে রাতের খাবার খেয়ে নিয়েছে। এবারে যে যার মতো শুয়ে পড়বে। সকাল সকাল শুয়ে পড়া দরকার। রাত থাকতে ওকে তুলে দেয় ডেবিড। সে তার নিত্য দিনের কাজের মতো খুব সকালে পাখিটাকে আকাশে অন্ধকারে উড়িয়ে দেয়। সকাল সকাল শুয়ে না পড়লে রাত থাকতে উঠতে কষ্ট হয় ছোটবাবুর।

    দরজায় দাঁড়িয়ে ফের ডাকল, জ্যাক, আমি ছোটবাবু। দরজা খোল।

    জ্যাক দরজা খুলছে না।

    কাপ্তান হিগিনসের দরজা খোলা। আলো জ্বলছে না। ব্রীজে এখন থার্ড-মেটের ডিউটি। ছোটবাবু একটা উইণ্ডসেলের আড়ালে দাঁড়িয়ে ডাকছে। খুব জোরে ডাকতে পারছে না। খুব সন্তর্পণে সে জ্যাককে ডাকছে। এবং এটা জ্যোৎস্না রাত বোঝাই যায়। মাথার ওপর চাঁদ। মায়াবী জ্যোৎস্নায় সমুদ্রের গর্জন সে শুনতে পাচ্ছে। অথচ জ্যাক এমন একটা সময়ে সাড়া দিচ্ছে না। ওর মনে হল,জ্যাক তবে সত্যি খুব অসুস্থ। বিছানা থেকে উঠতে পারছে না হয়তো। সে নিজেকে ভীষণ অপরাধী ভাবল। এই জাহাজে, ঠিক নিচে সে রয়েছে—সারাদিন কাজের পর জ্যাকের সঙ্গে বোট-ডেকে চুপচাপ বসে থাকা এবং কখনও কখনও জ্যাক আপনজনের মতো এমন কথাবার্তা বলে তাকে যে মনেই হয় না, জাহাজে উঠে জ্যাকের সঙ্গে পরিচয়। যেন জ্যাক কতকালের চেনা।

    আসলে সে বুঝতে পারে জ্যাক যে সেই তাহিতিতে ওর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল, তারপর থেকে কেমন চাপা অভিমান। জ্যাক নিজে এসে ডেকে না নিয়ে গেলে সেই বা যায় কি করে। জ্যাক একদিনও আর নিচে নামে নি। তাকে ডেকে নিয়ে যায় নি। তাকে ডেকে কথা বলেনি। সেও নিজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কেমন সচেতন হয়ে উঠেছিল—জ্যাক ডেকে না কথা বললে যেন জীবনেও সে কথা বলবে না।

    এর ফলে সে কাজের শেষে ডেবিডের ঘরে বসে আড্ডা দিয়েছে। অথবা ডেবিডের সঙ্গে মদ্যপান- এটা ওর সারাদিন পর বেশ ভাল লেগে গেছিল। সামান্য মদ্যপানের পর ডাইনিং হলে নানারকমের খাবার, তারপর আর সে দাঁড়াতে পারত না। সোজা কেবিনে ঢুকে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ত। ওর চোখ জড়িয়ে আসত ঘুমে। জ্যাক ওপরে অসুস্থ, সে চিন্তাই করতে পারত না।

    সে এবার দরজায় ধীরে ধীরে টোকা মারল। বলল, জ্যাক, আমি ছোটবাবু। তুমি অসুস্থ শুনলাম। তোমাকে দেখতে এসেছি। কিছুটা সে অপরাধ স্বীকার করার মতো কথা বলল।

    এবার মনে হল দরজাটা নড়ছে। দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল। জ্যাককে চেনাই যায় না। কেমন শীর্ণকায়, দুর্বল। জ্যাক এতটা যেন কেবল ছোটবাবুর জন্য হেঁটে এসেছে।

    জ্যাক দরজা বন্ধ করে দিতে চাইল।

    ছোটবাবু বলল, খোলা থাক না! এখন আর্চি এদিকে আসবে না।

    জ্যাক তবু দরজা বন্ধ করে ধীরে ধীরে নিজের বিছানায় একটা চাদর টেনে শুয়ে পড়ল। তারপর ছোটবাবুকে অপলক দেখতে থাকল।

    ছোটবাবু বলল, কি হয়েছে। তোমার চোখ-মুখ কোথায় গেছে জ্যাক!

    জ্যাকের ঠোঁটে সামান্য হাসি ফুটে উঠল। আবার কেমন মিলিয়ে গেল সেই সুন্দর হাসিটুকু! তারপর সেই এক বিবর্ণ চোখমুখ জ্যাকের।

    ছোটবাবু বসে থাকতে পারল না। ওর কপালে হাত রাখল। জাহাজ এখন ভিড়িয়ে দেওয়া দরকার। কিন্তু কাছাকাছি বন্দর বলতে নিউ-প্লাইমাউথ। ডেবিডের কাছে সে সব খবর নিতে পারত। আর সে ভেবে পাচ্ছে না, জ্যাক এত রুগ্ন হয়ে গেছে অথচ ডেবিড, একদিনও ওকে কিছু বলেনি। কাপ্তান কি ডেবিডকে ডেকে জ্যাকের সম্পর্কে কোনো পরামর্শ করেনি! জ্যাকের কপাল ঠাণ্ডা। সে থাকতে না পেরে বলল, কোনো ওষুধ খাচ্ছ না?

    জ্যাক বলল, আমার কোন অসুখ করেনি ছোটবাবু। তুমি ভাববে না।

    —তুমি কি হয়ে গেছ দেখেছ? একবার আয়নায় দেখেছো?

    —এই তো দেখতে পাচ্ছি।

    তা দেখতে পাবে জ্যাক। পায়ের কাছে বড় কাঠের আলমারিতে মানুষ-সমান উঁচু আয়না ফিট করা। জ্যাক শুয়ে শুয়ে ওর সব দেখতে পায়। জ্যাক এবার কেমন স্বাভাবিক গলায় বলল, লেডি-অ্যালবাট্রস আবার জাহাজে ফিরে এসেছে শুনলাম।

    ছোটবাবু জ্যাককে স্বাভাবিক গলায় কথা বলতে দেখে সামান্য আশ্বস্ত হল। বলল, এসেছে। তোমাকে কে বলল?

    জ্যাক বলল, আমি ওর কান্না শুনতে পাই ছোটবাবু।

    —তুমি ওর কান্না শুনতে পাও!

    —মাঝ-রাতে সে আমার কেবিনের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। আর কেমন একটা শব্দ, ঠিক যেন কান্নার মতো। তুমি শুনতে পাও না ছোটবাবু?

    ছোটবাবু বলল, না। তারপর বলল, তুমি ঘুমোও না?

    —আমার ঘুম আসছে না ছোটবাবু।

    —এ-বয়সে ইনসমনিয়া খুব খারাপ। জাহাজ বাঁধলেই ভাল ডাক্তার দেখাবে।

    জ্যাক উঠে বসার চেষ্টা করলে বলল, শুয়ে থাকো। ওঠার কি আবার দরকার!

    জ্যাক কোন কথা শুনল না। বেশি সময় এখানে বসে থাকা ছোটবাবুর ঠিক না। বাবা শুতে যাবার আগে আর একবার আসবেন। অবশ্য দরজা বন্ধ থাকলে, সে ঘুমোচ্ছে ভেবে তাকে আর নাও ডাকতে পারেন। তিনি ওপরে উঠে যাবেন। কিন্তু ছোটবাবু তো এ-সব জানে না। বাবা টের পেয়ে গেছে, সে জাহাজে বড় হয়ে গেছে। যখন বড় হয়ে গেছে তখন আবার ওর কেবিনে ছোটবাবুর গলা পাওয়া যায় কেন? ছোটবাবু বিপদে পড়ে যেতে পারে। ছোটবাবুর যা স্বভাব, সে তো বারবার কেবল জোরে কথা বলতে চাইবে। চুপচাপ বসে থাকার মানুষ না ছোটবাবু।

    জ্যাক ভালভাবে দাঁড়াতে পারছে না। দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে। এখন আবার বিছানা ছেড়ে ওঠার কি যে দরকার! সে বলল, আমি ধরব জ্যাক! তুমি কোথাও যাবে? বাথরুমে গেলে দরজা খুলে দিচ্ছি। আমি ধরছি তোমাকে। এস।

    ছোটবাবু জ্যাকের কাছে গেলে প্রায় মাথাটা ছোটবাবুর কাঁধে এলিয়ে দিল। ভারি আরাম বোধ করছে জ্যাক। ওর দু’চোখ ফেটে জল আসছে। ছোটবাবু ওর চোখে জল দেখে ঘাবড়ে যেতে পারে। সে বেশ আলগাভাবে মুখটা ঘুরিয়ে আলমারির দরজা খুলে ফেলল। এবং কি খুঁজে বের করার মতো উবু হয়ে বসল।

    ছোটবাবু বলল, আমাকে বল না, বের করে দিচ্ছি।

    জ্যাক এবার মুখে কোনরকমে আঙ্গুল ঠেকিয়ে আস্তে কথা বলতে বলল ছোটবাবুকে। সে তারপর একটা প্যাকেট, আরে সেই প্যাকেটটা জ্যাক টেনে বের করছে। তারপর আলমারির দরজা বন্ধ করে বাংকে উঠে এল। এবং তাকাল ছোটবাবুর দিকে।—তোমাকে খুব জ্বালিয়েছি জাহাজে? না ছোটবাবু?

    –সে তো জ্বালিয়েছ। তার জন্য আমি ভাবি না।

    —আর তোমাকে জ্বালাচ্ছি না। বলে সে উঠে ওর কাছে গিয়ে বলল, তোমার স্যুট। এটা পরবে। আমি যখন চলে যাব, তখন তুমি ডেকে এ-পোশাকটা পরে দাঁড়িয়ে থাকবে। কেমন! মনে থাকবে তো!

    ছোটবাবু অবাক! সে বলল, তুমি চলে যাচ্ছ? তোমার অসুখের জন্য কাপ্তান তোমাকে নামিয়ে দিচ্ছেন!

    জ্যাক বলল, হ্যাঁ। আমার খুব একটা বড় অসুখ, মানুষের যেন এটা না হয় ছোটবাবু! জ্যাকের কথাবার্তা কেমন অভিজ্ঞ মানুষের মতো। এ-বয়সে জ্যাক এত বুঝতে পারে কি করে। সে বলল, কি অসুখ আমরা জানতে পারলাম না।

    —কাপ্তানের ছেলের অসুখ। সবাই জানলে আর সে কাপ্তানের ছেলে হবে কেন ছোটবাবু।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল, সে সামান্য অনধিকারচর্চা করে ফেলেছে। সে বলল, তা ঠিক। তুমি বাড়ি পৌঁছে আমাকে চিঠি দেবে কিন্তু।

    আর তখনই হাহাকার শব্দে জ্যাক কেমন ভেঙ্গে পড়ল। জ্যাক ছেলেমানুষের মতো কাঁদছে। ছোটবাবু কি যে করে! সে বলল, কি হয়েছে জ্যাক! এই জ্যাক—আহাঃ, কি হয়েছে বলবে তো? সে তাড়াতাড়ি কিছু বুঝতে না পেরে কাপ্তানকে ডাকতে যাবে ভাবল, আর তখন নিষ্ঠুর গলা জ্যাকের। সে বলল, ছোটবাবু তুমি এবারে যাও। আমি ঘুমোব। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। কাউকে ডাকতে হবে না। আমি ভাল আছি। তুমি ভাল থেকো। সাবধানে থেকো।

    আর ছোটবাবু তখন কি করে। সে দ্রুত নেমে এল সিঁড়ি ধরে। শেষের কথাগুলো কেমন ভয়ের। ওকে জ্যাক সাবধানে থাকতে বলেছে। জাহাজে এবার কি কোন গণ্ডগোল আরম্ভ হবে। জাহাজে কি কোন বিদ্রোহ দেখা দেবে। জাহাজিরা এতদিন একনাগাড়ে জাহাজ চালিয়ে ক্লান্ত। দেশে ফেরার জন্য সবাই ক্ষেপে যাচ্ছে। জাহাজ হয়তো আর দেশের মুখে পাড়ি দিচ্ছে না। যা স্বাভাব এই জাহাজের, হয়তো সারামাসকাল দক্ষিণ সমুদ্রেই পড়ে থাকবে। ডেবিড ওকে তবে মিথ্যে বলেনি।

    ঘুম এল না ছোটবাবুর। সে শুয়ে শুয়ে এ-পাশ ওপাশ করল, জ্যাকের কি যে চোখমুখ হয়েছে! এমন সুন্দর ছেলেটা ক’দিনে কি হয়ে গেছে! চেনাই যায় না। সে পোর্ট-হোল খুলে রেখেছে। বাইরে জ্যোৎস্না। প্রপেলারের শব্দ ভেসে আসছে। জল কেটে এত সব নির্যাতনের ভেতরও জাহাজ ঠিক যাচ্ছে। ওর ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসল এবার। বারোটার ওয়াচ শেষ হয়েছে। শেষ ঘণ্টি থেকে সে তা টের পেয়েছিল।

    ভোররাতে ডেবিড ছোটবাবুকে ডেকে সাড়া পেল না। অন্য সময় দু-তিন ডাকেই সে সাড়া দেয়। আজ আবার ডেকেও যখন সাড়া পেল না, তখন ডেবিডের মনে হয়েছিল ঘুমোক ছেলেটা।

    এবং সকালে কে জানত, মাস্তুলের ওপরে পাখিটারও ঘুম ভাঙবে না। ঠোঁট গুঁজে সে-ও ঘুমিয়ে ছিল, সে তো জানত, ছোটবাবু রোজকার মতো মাস্তুলের নিচে এসে ওর ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেবে। ছোটবাবু হাতে তালি না বাজালে ওর সকাল হয় না।

    এবং তখনই খবর ছোটবাবুর কেবিনে, শিগগির ছোট, অমিয় এসে ওর দরজায় ধাক্কাচ্ছে। ওপরে গিয়ে দ্যাখ কি হচ্ছে!

    ছোটবাবু লাফিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াল। দরজা খুলে বলল, কি হয়েছে?

    মেজ-মিস্ত্রি বন্দুক নিয়ে ওপরে উঠে গেছে। পাখিটাকে হয়তো মারবে।

    ছোটবাবুর তখন দিক-বিদিক জ্ঞান ছিল না। একেবারে পাগলের মতো। জ্যাকের কেবিন পার হতেই দেখল আর্চি ক্রলিং করছে বোট-ডেকে। সে বন্দুক নিয়ে বোটের নিচে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। পাখিটা বুঝতেই পারছে না, কেউ তাকে হত্যা করার জন্য আড়ালে এগিয়ে আসছে। ছোটবাবু এবারে সবকিছু অগ্রাহ্য করে আর্চির ওপর লাফিয়ে পড়ল। গুলি ছোড়ার মুখে বন্দুকের নল ঘুরিয়ে দিল। হয়তো বন্দুকের বাঁট দিয়ে মাথায় আর্চি বাড়ি বসিতে দিত, কিন্তু তখন ক্ষমাপ্রার্থনার ভঙ্গীতে ছোটবাবু বলছে, সি’জ দ্য ওনলি ওম্যান ইন দ্য সিপ, স্যার।

    তারপর সে বলল, এ্যাণ্ড টু মোর ডেজ টু হ্যাভ দ্য পোর্ট এবং সঙ্গে সঙ্গে আর্চির ভয়ংকর নিষ্ঠুর মুখ দেখে সে কেমন ঘাবড়ে গেল। বলল, প্লিজ একম্‌কিউজ মি স্যার!

    মেজ-মিস্ত্রি আর্চি সোজা নেমে গেল। লেডি-অ্যালবাট্রস আবার উড়ছে। উড়ে উড়ে দিগন্তের দিকে চলে যাচ্ছে। বন্দুকের আওয়াজে যে যেখানে ছিল উঠে এসেছিল। ওরা দেখছে ছোটবাবু চুপচাপ একা দাঁড়িয়ে আছে বোট-ডেকে। মেজ-মিস্ত্রি বন্দুক হাতে নেমে যাচ্ছে। পিঠ কুঁজো মানুষটা কেন যে এত ফুঁসছে।

    আর তখন কি যে হয়ে যায়—সেই শব্দতরঙ্গ, অথবা বলা যেতে পারে ঘণ্টাধ্বনি ছোটবাবুর মাথার ভেতর কেউ ঢং-ঢং করে বাজাচ্ছে—যেন সমুদ্রের গভীরে ঘণ্টাধ্বনি হচ্ছে, যেন আকাশে-বাতাসে এবং সমুদ্রের সব তরঙ্গমালায় সেই ঘণ্টাধ্বনি—তাকে সতর্ক হতে বলছে। অথচ ছোটবাবু কি বুঝতে পারে না, মাথার ভেতর ও-ভাবে কে তার ঘণ্টাধ্বনি করতে থাকে, কোন সে সন্ন্যাসী—সে তখন কেবল দেখতে পায়, এক জলদস্যুর পোশাকে তার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। মুখে তার মুখোস। বাঘের মুখোশ পরে সেই জলদস্যু বোট-ডেকে হাঁটছে। তারপরই কেন যে সেই মখোশ সে দেখতে পেল আর্চির মুখে। মুখে ডোরাকাটা সব কালো কালো দাগ, চোখের পাশে, গোঁফের নিচে। হিংস্র মুখ আর্চির।

    তার সঙ্গে আর্চি একটা কথা বলল না। আর্চির অহংকারী মুখ দেখে সে বুঝতে পেরেছে, আৰ্চি তাকে ক্ষমা করেনি। এবং পরদিন সকালে জাহাজ বন্দর পেলে সে সেটা ঠিক টের পেল। তখন সে উইনচে কাজ করবে বলে ডেকে হেঁটে যাচ্ছিল, মনে হল পেছনে কেউ ডাকছে—ম্যান ওদিকে নয়। এদিকে। ভীষণ অসহিষ্ণু গলা এবং দাম্ভিকতার যেন শেষ নেই। পেছনে তাকাতেই দেখল, আর্চি এলি-ওয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সিগারেট খাচ্ছে। আর্চির চোখদুটো বাঘের মতো জ্বলছে।

    এতদিনে টের পেল ছোটবাবু, আসলে আর্চির মুখটা জিরাফের মতো হয়ে যায়নি। আর্চির মুখটা বাঘের মতো হয়ে গেছে। হিংস্র বাঘকে মানুষ অনায়াসে হত্যা করতে পারে। এবং তখনই ওর মনে হল, মাথার ভেতরে অথবা মগজের সব শিরা-উপশিরায় কেউ আর ঘণ্টাধ্বনি করছে না। সব ঠিকঠাক। বন্দরে জাহাজ বাঁধাছাদা শেষ।

    সে নেমে যেতে থাকল।

  • ত্রিশ

    ত্রিশ

    ।। ত্ৰিশ।।

    মৈত্র জাহাজ বাঁধলেই সিঁড়ি ধরে নেমে গেল। সে যেন প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছে। কোথাও একজন ডাক্তারের সঙ্গে তার এক্ষুনি দেখা করা দরকার। ট্যাবলেটে কাজ হচ্ছে না। জ্বালা-যন্ত্রণা কমে গেছিল, মনে হয়েছিল সেরে যাবে। কিন্তু দুরাত থেকে আবার জ্বলছে। দু’রাত সে চোখ এক করতে পারেনি। মনে হচ্ছে ভেতরের সব রক্তে বিজবিজ করছে পোকা। এবং জ্বালায় অসহ্য যখন, সে নিজের ফোকসালে বসে বসে চুল ছিঁড়ছে। অমিয়কে একবারও ডেকে তোলেনি। ওয়াচের সময় দাঁত কামড়ে কাজ করেছে। এমন কি শেফালীর চিঠি আসার কথা। এজেণ্ট-অফিস থেকে লোক এসেছে। সারেঙ চিঠি আনতে গেছে। একটু অপেক্ষা করলেই সে চিঠিটা দেখে যেতে পারত কিন্তু মনে হয়েছে একদণ্ড দেরি করলে সে মরে যাবে। রক্তের ভেতরে পর পর সুঁই না ফোটালে সে আর বাঁচবে না।

    তখন একটা লোক কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। ঝুড়িতে সব গোলাপের গুচ্ছ। মৈত্র নেমে গেলে সে উঠে এল। সে এখন ডাইনিং হলে ফুল দিয়ে যাবে। সব দামী দামী ফুল। লাল সাদা গোলাপ। সবুজ রঙের অন্য সব কি ফুল। লোকটা ফুল বেচে খায়। সে জেনে ফেলেছে—আজ এ জাহাজে একটা উৎসব হবে। লাঞ্চে সবাই তাজা সুস্বাদু খাবার খেতে পাবে। চিফ-কুকের গ্যালিতে জাহাজ বাঁধা-ছাদার সঙ্গে শূকরছানা চলে এসেছে। তাছাড়া একেবারে এখনই কিলখানা থেকে আনানো। বড় টার্কি। ছোট ছোট মুরগীর ছানা, আর ডিম এবং ফলের রস। লোকটা শুধু স্টুয়ার্ডকে ডাইনিং হলের জন্য ফুল দিয়ে -গেল না। প্রত্যেক কেবিনে ফুল দিয়ে গেল।

    কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। সবই কাপ্তানের মর্জি মতো হচ্ছে। স্টুয়ার্ড আদেশমতো কাজ করে যাচ্ছে। চিফ-কুক মেনু-মাফিক কাজকাম করবে ভেবেছিল, কিন্তু সবই কেমন গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছে। স্টোররুম থেকে কিছুই আসছে না। সব সদ্য বাজার থেকে কিনে আনা হচ্ছে। এবং যেন কোন উৎসবের আয়োজন হচ্ছে এ জাহাজে। কেক বানাবার জন্য দামী মসলাপাতি। দু’রকমের পুডিং। নিত্য যা খায় অফিসার মানুষেরা আজকের খাবার একেবারে আলাদা। ভেড়ার বাচ্চা শূকরছানা আস্ত, সব আস্ত রোস্ট—বড় বড় রেকাবীতে সাজানো থাকবে—টমাটো স্লাইস। স্যালাড একেবারে তাজা সব ফলের আর কি মনোহারিণী ভোজের তালিকা। চিফ-কুকের জিভে জল এসে যাবার মতো।

    জ্যাক চুপচাপ কেবিনে বসেছিল। ও পরেছে প্রায় বেলবটমের মতো পোশাক। সে নীল রঙের প্যান্ট এবং দামী সিল্কের ফুল পাখি আঁকা সার্ট পরেছে। পায়ে হাল্কা সু। এবং চুপচাপ বাবাকে দেখছে।

    হিগিনস মেয়ের পাশে বসে ওর বাকসো গুছিয়ে দিচ্ছেন। আর সব কথাবার্তা—এই যেমন বাড়ি ফিরে বাগানের যত্ন ঠিক হচ্ছে কিনা দেখা এবং পিসিমাকে ভালবাসতে হবে। দরকার হলে গ্রীষ্মের ছুটিতে কনটিনেন্ট ঘুরে আসতে পারে। ব্ল্যাক ফরেস্টে পিকনিক এবং প্যারিসের কোনো মিউজিয়ামে ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকা ইচ্ছে করলে শিখতে পারে। ওর বন্ধু হামবোল্ট বাতিঘরে যখন আছে কিছু ভাল না লাগলে ছোট মোটর বোটে বিকেলে সেই পাহাড়ী দ্বীপে চলে যেতে পারে। বেশ ভাল লাগবে। ছোট ছোট সব কচ্ছপ দেখতে পাবে, আর সে গাছপালার ভেতর থেকে তখন দেখবে দূরে সব জাহাজ ভেসে যাচ্ছে, তখন সে তার বাবার কথা মনে করতে পারবে। আর ক’দিন। সে গুনে গুনে একবছর পার করে দিতে পারবে সহজেই। মানুষের জীবনে একটা বছর তেমন বড় নয়। হিগিনস মেয়েকে কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসব বোঝাচ্ছিলেন।

    তখন আর্চি বলল, ম্যান এখানে!

    ছোটবাবু দেখল, আর্চি টর্চ মেরে বয়লারের পেটের নিচে ঢুকে যেতে বলছে। সে ঠিক টর্চের আলোর শেষ প্রান্তে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে গেল।

    —ম্যান দ্যাখো ওখানে ট্যাংক-টপের একটা ঘুলঘুলি আছে।

    ছোটবাবু দেখল শুধু স্তূপীকৃত ছাই। প্রায় ফুটের ওপর এই ছাই ক্রমান্বয় পড়ে পড়ে কাদার মতো হয়ে আছে। এবং তিনটে বয়লারের পেটের নিচে এভাবে প্রায় একটা সমতলভূমি হয়ে গেছে। কখনও এনজিনের নিচে, কখনও পোর্টসাইডের বয়লারের পাশে, কখনও ঠিক জেনারেটরের পাশে প্লেট তুলে ফেললে একটা ঘুলঘুলি পাওয়া যায়। এসব ঘুলঘুলি দিয়ে ঢুকে গেলেই কোনো না কোনো বিলজ্‌ পাওয়া যায়। জল রাখার সব আধার। কিন্তু সে এমন একটা জায়গায় কখনও নামেনি। সে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকছে, নাকে মুখে ছাই লাগছে। সামান্য সোজা হলেই বয়লারের পেটে ঠাস করে মাথা লেগে যাচ্ছে। হামাগুড়ি না দিলে এদিক ওদিক ঠোক্কর খাচ্ছে। অন্তত সে যাতে জখম না হয়, তার জন্য খুব সন্তর্পণে এগিয়ে গেলে মনে হল দাঁত শক্ত করে আর্চি উচ্চারণ করছে—হেল। ‘হেল’শব্দটি আর্চির ঠোঁটের ডগায় থাকে। হেল না বলতে পারলে সে যেন ঠিক কাজ করাতে পারে না। ছোটবাবু ঠিক জায়গায় ঢুকে সোজা হয়ে বসতে চাইল। পারল না। ঘাড় বাঁকিয়ে প্রায় হাঁটুর কাছে মাথা এনে বসে থাকল। আর্চি উঁকি দিয়ে দেখছে ছোটবাবুকে। ওর হাতে লোহার জালিতে রাবারে মোড়া বালব। সে সেটা ছোটবাবুর মুখের সামনে দোলাচ্ছে।

    ছোটবাবু বলল, শুধু ছাই স্যার।

    —সাফ করতে হবে ম্যান। সাফ করে দ্যাখো আছে।

    এতবড় জায়গায় ছাই তুলতেই বারোটা বেজে যাবে। তারপর কি কাজ আছে বিল্‌জে সে জানে না। ওর দু’পা ক্রমে ছাইয়ের ভেতর বসে যাচ্ছে। বসে যাওয়ায় সামান্য সুবিধা সে পেয়েছে। মাথাটা সামান্য সে তুলতে পারছে। একটা টিনের হাতল এবং বালতি গড়িয়ে দিচ্ছে আর্চি। ওগুলো পরিষ্কার হলে—বাকি কাজের কথা বলবে।

    আর একজন হলে কাজটা অনেক সহজে করা যেত। সে ভরে দিত, কেউ তুলে নিয়ে গেলে আর কষ্ট হত না। সে বারবার সন্তর্পণে যখন বালতি টেনে বাইরে বের হয়ে আসছে তখন কোথাও না কোথাও টুটা-ফাটা অ্যাজবেস্টরে লেগে হাত-পা মুখ কেটে যাচ্ছে। আর জ্বালা করছে এভাবে। সে তবু খুব যত্নের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছিল। এবং শরীরে শক্তি পাচ্ছে না। নুয়ে থাকার দরুণ ঘাড় কোমর ধরে যাচ্ছে। ওপাশে আছে একজন ফায়ারম্যান। সে বুঝতেই পারছে না, বয়লারের পেটের নিচে ঠিক ট্যাংক-টপের ওপরে বসে কেউ কাজ করছে। বালতি বালতি ছাই ওপরে জমা করে রাখছে ছোটবাবু। তারপর যখন আর পারছে না চিৎ হয়ে শুয়ে থাকছে ছাইগাদায়। এবং কখন এগারোটা বাজবে, ঠিক এগারোটা বাজলেই ছুটি, সে স্নান করবে, লাঞ্চে যাবে, আজ আবার সে শুনেছে, জ্যাক চলে যাবে বলে, জ্যাকের সম্মানে ডাইনিং হলে ভোজ দিচ্ছেন কাপ্তান। সে যখন গ্যালির পাশ দিয়ে আসছিল তখন অতি উপাদেয় সব সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণ পেয়েছে। যেন সে যে এখানে এখন লম্বা হয়ে শুয়ে আছে, এখানেও সেই ঘ্রাণ, এবং জোরে নাক টানলে সে ঠিক ঠিক টের পাচ্ছে। আর তখনই মনে হল সেই ঘুলঘুলি, সে আবিষ্কার করে ফেলেছে। নাট-বোল্টে মোড়া। প্রায় ডিম্বাকৃতি ঢাকনা।

    আর্চি তখন তার টর্চ দুলিয়ে নেমে আসছে।

    সে নিচ থেকে দেখতে পাচ্ছে সিঁড়িতে আর্চির পা। আর্চি বাদে আর কে হবে! এনজিন-রুমে এখন কোনো কাজ নেই। টুকিটাকি কাজ কিছু ওপরে আছে। সিলিণ্ডারের কাছে, যেখানে সার্কুলেটিং ফ্যান সিলিন্ডারের মাথার ওপর রয়েছে, সেখানে থার্ড-এনজিনিয়ার মেরামতের কাজ করছে। গোটা এনজিন- রুম ফাঁকা। বন্দরে প্রথম দিন বলে, কোনো কোলবয় অথবা ফায়ারম্যান এনজিন-রুমে মাজা-ঘসার কাজ করতে আসেনি।

    আর্চিকে নেমে আসতে দেখে ভীষণ কাজে মনোযোগী হয়ে গেল ছোট। সে আর লম্বা হয়ে শুয়ে নেই। খুটখাট কাজ করছে।

    তখন আর্চি বলল, ম্যান ওপেন ইট। বলে সে একটা নাইন-সিকস্টিনথ স্প্যানার ছুঁড়ে দিল। এগারোটার ঘণ্টা পড়ে গেছে। সুতরাং এখন আর কিছু করতে হবে না। আবার লাঞ্চের পর এসে নামবে। তখন আর্চি বলল, ম্যান ওপেন ইট। ম্যান নেমে যাও। বিল্জ-পাম্প কাজ করছে না। নিচে নেমে ডানদিকে ঢুকে একেবারে পোর্ট-সাইডের কিনারায় চলে যাবে।

    পেটে ভীষণ খিদে। তবু সে দাঁত শক্ত করে স্প্যানার নাটে বসিয়ে দিল। নাট খুলবে কেন! সেই কত যুগ আগে জাহাজ নির্মাণের সময় যে মুখ বন্ধ করা হয়েছিল বোধ হয় তারপর কেউ আর খোলেনি। নোনা জলে নাট-বোল্ট জাম হয়ে গেছে। জং ধরে এমন হয়েছে যে সে কিছুতেই কিছু করতে পারছে না। নাট-বোল্ট একটা দুটো নয়, চারপাশে ডিমের মতো আকারের ঢাকনার সর্বত্র এই সব নাট-বোল্ট। সে চিজেল আর হাতুড়ী না হলে একটাও খুলতে পারবে না। এবং এত ক্ষিদে পেটে যে এসব কাজ করলে ওর শরীরের সব রক্ত, পেটে কিছু না পড়লে হিম হয়ে আসবে।

    সে বলল, একটা চিজেল স্যার।

    সেকেণ্ড একটা চিজেল ছুঁড়ে দিল। এত জোরে দিয়েছিল যে সে যদি লুফে না নিতে পারত তবে কপালে এসে পড়ত। আর্চি কি ইচ্ছে করে এমনভাবে ঢিল মেরেছে! সে তো কত সামান্য ওর কাছে। আর্চি সহজেই তাকে অপমান করতে পারে। মা-মাসি তুলে গালাগাল করতে পারে। কপালে চিজেল ছুঁড়ে ওর কি লাভ!

    আর্চি বলল,ম্যান কাজ না সেরে ওপরে উঠবে না। বলে সে চলে গেল।

    ছোটবাবু শুনল ঢং ঢং করে বারোটা বাজছে। সে গোটা চারেক নাট কেটে কেটে খুলেছে। সে ঘেমে নেয়ে গেছে। ওর সাদা বয়লার স্যুট এখন আর সাদা নেই। জল-কাদায় মাখা সারা বয়লার স্যুট, হাতে, মুখে, মাথায় সর্বত্র, তেল চিটচিটে রং ধরেছে। এবং সে জানে সবাই স্নান করে ডাইনিং হলের দিকে হাঁটছে। এমন একটা সুন্দর ভোজে সে থাকবে না। সবাই গল্পগুজব করে খাবে—সে থাকবে না।

    সে নামার আগে দেখেছে ডাইনিং হলটা আজ একেবারে নতুন করে সাজানো হয়েছে। প্রত্যেকের টেবিলে দামী গোলাপের গুচ্ছ। সবাই দামী পোশাকে একেবারে পরিপাটি মানুষের মতো খেতে যাবে। সে তখন কাজ করছে নিচে। জ্যাকের বিদায়-উৎসবে সে থাকবে না। ওর কেমন চোখ ফেটে জল আসতে থাকল। জ্যাক চারটায় জাহাজ থেকে নেমে যাবে। যা কাজ কি মর্জি আর্চির কে জানে, তাকে আর ওপরে উঠতে দেবে কিনা এখন এবং সে যদি না খেয়ে থাকে একমাত্র ডেবিড খোঁজ নেবে। কাপ্তান লক্ষ্য করতে নাও পারেন—ওর মন ভাল নেই! ছেলেটাই একমাত্র সম্বল, তাকে পাঠিয়ে দিতে হচ্ছে—বোধহয় জ্যাক আবার কি বিপদে ফেলে দেবে কাপ্তানকে সেই ভয়ে আর না পাঠিয়ে থাকতে পারছেন না। সে আর একটা নাট কেটে ফেলার জন্য নুয়ে খুব জোরে যেই না হাতুড়ির ঘা বসাতে গেছে—অমনি ফসকে একেবারে বুড়ো আঙুলের ওপর। গোটা হাতটা মনে হচ্ছিল অবশ হয়ে আসছে। কেউ নেই। সে আঙুল ধরে বসে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর রাগে দুঃখে দমাদম বকসে হাতুড়ি দিয়ে মারতে থাকল। যেন তার এত দিনের ক্ষোভ এই মুহূর্তে আগুনের ফুলকির মতো চারপাশে ছিটকে পড়ছে।

    জ্যাক সবচেয়ে রঙ্গীন পোশাক পরতে পারত আজ। সবচেয়ে জমকালো পোশাক। কিন্তু তার কিছুই ভাল লাগছে না বলে যেমন সে অন্যদিন পোশাক পরে থাকে আজও তেমনি সাদাসিদে পোশাকে দরজার বাইরে এসে দাঁড়াল। হিগিনস মেয়ের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন বনি ভীষণ সহজভাবে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরের রিক্ততা বাবা টের পাক সে চায় না।

    বনি বলল, চল বাবা।

    সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে দেখল, অন্য সবাই ওদের জন্য প্রতীক্ষা করছে। প্রায় প্যারেডের মতো আগে হিগিনস পরে জ্যাক তারপর চিফ-মেট, আর্চি, থার্ড এনজিনিয়ার, ডেবিড এবং ক্রমে লাইন বেঁধে হেঁটে হেঁটে সবাই যাচ্ছিল তখন মাত্র একজন নেই। ছোটবাবুকে না দেখে জ্যাক মনে মনে যে ভীষণ ভেঙ্গে পড়ছে—কাউকে বুঝতেই দিচ্ছে না। ছোটবাবু বলে জাহাজে কেউ আছে সে যেন জানে না। এত বেশি হাসি খুশি এবং এমন মেজাজ শরিফ মনেই হয় না সে একমাত্র একজনের জন্য এত সব করেছিল!

    স্টুয়ার্ড, কাপ্তান-বয়, মেস-রুম বয় এবং অন্য বয়-বাবুর্চিরা ঝকমকে পোষাকে যাওয়া-আসা করছে। রেডিওগ্রামে বাজনা বাজছে। নীল আলো এবং বর্ণমালা সব কাগজের ফুলের। যেন একটা ক্রীসমাস উৎসব এই জাহাজে। তখন জাহাজের তলায় কেউ রাগে ক্ষোভে দমাদম বয়লারের পেটে ঘা মারছে বোঝাই যাচ্ছে না।

    কাপ্তান নিজে দাঁড়িয়ে সবাইকে বসতে অনুরোধ করলেন। একটা মাত্র আসন এক কোনায় খালি থাকছে। মনে হল একজন আসে নি। সে না এলে তিনি যেন বসতে পারেন না। চিফমেটও দেখল ছোটবাবুর আসন খালি। তিনি ডেবিডের দিকে তাকালেন। এটা ভীষণ বেয়াদপী ছোটাবাবুর —সময়- জ্ঞান ছেলেটার ভীষণ কম। কাপ্তান অপেক্ষা করছেন এবং চিফ-মেট নিজে দরজার বাইরে এসে এলি- ওয়েতে লক্ষ্য রাখছেন—ডেবিড বুঝতে পেরে বলল, স্যার, ছোটবাবু তো কেবিনে নেই। দু’বার খোঁজ করেছি। সে যে কোথায় বুঝতে পারছি না।

    আর্চি চুরি করে তখন জ্যাককে দেখছে। জ্যাক, আর্চি এবং অন্য সবাই দাঁড়িয়ে আছে। হিগিনস না বসলে ওরা কেউ বসতে পারছে না। আর্চি শেষ পর্যন্ত যেন কৈফিয়ত দেবার মতো বলল, ছ- নম্বর নিচে আছে স্যার। বিজে জল উঠে আসছে। পাম্প কাজ করছে না। সারভিস পাম্প চালিয়ে দেখা হয়েছে। কেবল হাওয়া টানছে।

    হিগিনিস জানেন এনজিনের জরুরী সব কাজের দায়িত্ব এখন আর্চির। এনজিনের ভাল মন্দ সব ওর জিন্মায়। সুতরাং তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। তারপর চড়া সুরে বাজনা বাজতে থাকল। টেবিলে সাজানো সব রঙ-বেরঙের খাবার। আস্ত চিকেন টার্কি এবং ভেড়ার বাচ্চার রোস্ট—দামী মদ।

    হিগিনস দাঁড়িয়ে ছোটখাটো একটা বক্তৃতা করছেন। জ্যাক চলে যাবে বলে মন খারাপ বুঝতে দিচ্ছেন না। জ্যাক চুপচাপ মাথা নিচু করে শুনে যাচ্ছিল। বাবা সবই বাইবেল থেকে যেন পড়ে শোনাচ্ছেন। মানুষের ইতিহাস, বিশেষ করে সমুদ্রে মানুষ কত অসহায় এ-সব বলছিলেন। যেন তিনি বক্তৃতা শেষ করে বলতে চাইলেন—যতক্ষণ বেঁচে থাকো ঈশ্বরের পৃথিবীতে—খাও দাও, কাজ করো। আর আনন্দ করো। মানুষ এ-ভাবেই তার জীবন শেষ করে দেয়।

    জ্যাক ভেতরে ভেতরে হাহাকারে ভুগছে। এতসব জাঁকজমকের ভেতর ছোটবাবু নেই। আর্চি তাকে বন্দী করে রেখেছে জাহাজের তলায়। ছোটবাবু খেতে খুব ভালবাসে। সে দেখেছে ছোট ভাল খাবার পেলে ভীষণ খুশী হয়ে খায়। ছেলেমানুষের মতো কোনটা আগে খাবে ঠিক করতে পারে না। কখনও কখনও দেখেছে ছোটবাবু টেবিলের নিয়মকানুন ভেঙ্গে নিজের খুশিমতো খেয়ে উঠে গেছে। কতদিন দেখেছে, ডেবিড এই নিয়ে পেছনে লেগেছে, ছোটবাবুকে এত করেও টেবিল ম্যানার্স শেখাতে পারেনি। আসলে ছোটবাবু খাবার লোভে পড়ে গেলে কাঁটা চামচের ব্যবহার একেবারে ভুলে যায়। সেই প্রাচীন মানুষের মতো দু’হাতে নিয়ে আকণ্ঠ পান করে। জ্যাক যত এ-সব মনে করতে পারছে তত হাহাকারে ভুগছে। সে একটা কথাও বলতে পারছে না কারোর সঙ্গে।

    কিন্তু কথা না বললে তো চলবে না। বাবা এইমাত্র তাঁর বক্তৃতামালা শেষ করেছেন। এবার তাকে দুটো একটা কথা বলতে হবে। সে জাহাজের কেউ নয়, কেবল বাবার সঙ্গে সে জাহাজে উঠে এসেছে। এত বড় লম্বা সফরে সে এত বেশি বড় হয়ে গেছে, যে আর বড় না হলেও চলবে। সে বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় রহস্যের কথা এখানেই জানতে পেরেছে। সে তার বক্তৃতামালায় এ-সবই বলতে পারত। কিন্তু সে উঠে দাঁড়ালে বুঝতে পারল, মাথা ভীষণ ঝিম ঝিম করছে। কেমন অন্ধকার দেখছে চোখে-মুখে

    সে চোখ বুজেই যেন কোনরকমে সব রকমের দুঃখ হতাশা হজম করে শক্ত গলায় বলল, জাহাজে অনেকদিন আপনাদের সঙ্গে ছিলাম। এবারে চলে যাচ্ছি। যদি সামান্য দোষ-ত্রুটি কোথাও আমার আপনাদের চোখে পড়ে থাকে আশা করি ক্ষমা করবেন। বলেই সে একেবারে সোজা বসে পড়ল। আর একটা কথাও সে যে বলতে পারত না, বলতে গেলে একটা কেলেঙ্কারী করে ফেলত, এবং ধরা পড়ে যেত, এটা সে বসে পড়েই বুঝতে পেরেছিল।

    তখন রিনরিন করে বাজনা বাজছে। স্টুয়ার্ড দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার সার্ভিস দেখে মনে হচ্ছে কাপ্তান ভীষণ খুশী। কোথাও কোনো ত্রুটি রাখেনি সে। কিন্তু সে দেখল, কাপ্তান আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। খাবার আগে সামান্য সময় ঈশ্বরের নামে মাথা নিচু করে রাখলেন। ওঁর দেখাদেখি সবাই মাথা নিচু করে রাখল। তারপর তিনি সবার দিকে তাকিয়ে কি দেখলেন শেষে বললেন, কিছু খবর আপনাদের জানা দরকার মনে করছি। আমাদের জাহাজ এখন এক বছরের মতো সাউথ-সিতে ঘোরাফেরা করবে। আমরা মাটি টানার কাজে সেই-সব দ্বীপগুলোতে ফের চলে যাব।

    সেইসব দ্বীপগুলো বলতে ওরা বুঝতে পারছে কোন সব দ্বীপ। কাপ্তান আর কিছু ভেঙ্গে বলবেন না ওরা বুঝতে পারছে। এমন একটা সময়ে এ-সব খবর দিচ্ছেন কেন কাপ্তান—ওরা বুঝতে পারছে না, এমন সব দামী খাবার টেবিলে, খাবার থেকে ধোঁয়া উঠছে—চারপাশের সবকিছু যখন ভীষণ মনোরম তখন তিনি কেন যে একটা এমন দুঃসংবাদ দিচ্ছেন। কারণ এটা দুঃসংবাদই বটে। ভাঙ্গা জাহাজে আরও এভাবে এক বছর ঘুরলে নির্ঘাত কেউ আর দেশে ফিরতে পারবে না।

    কারণ এদের সবার জানা আছে, বড় বড় বন্দরে জাহাজ যায় না। ছোট ছোট বন্দরে কেউ খবর রাখে না—কি আছে জাহাজের কি নেই। বেশ যখন আছে, পত পত করে কার্সি ফ্ল্যাগ উড়ছে, তখন উড়তে দাও। বড় বড় বন্দরে সে-সব চলবে না। সার্ভে থেকে গণ্ডগোল বাধাবে। এবং কাপ্তান সব জেনে-শুনে এতগুলো জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। সামান্য ছোটখাটো মেরামত চলবে—বড় ধরনের মেরামত—যেমন এক্ষুনি আর্চি চিৎকার করে বলতে পারে—স্যার বয়লার চকের অবস্থা ভীষণ খারাপ। বয়লার-চক মেরামত করতে হলে ঠিক বড় বন্দরে দু-তিন মাস জাহাজ বসিয়ে দিতে হবে। এবং যখন সার্ভে থেকে লোক এসে দেখবে—ঠুকে ঠুকে দেখবে—বলবে, আরে এতো আর জাহাজ নেই মরে কবে ভূত হয়ে গেছে তখন কোম্পানীর ঘরে আর্চির নাম অনেক পেছনে চলে যাবে। সুতরাং সবাই এখন মুখ বুজে সব শুনে যাচ্ছে। কোনো প্রতিবাদ করতে পারছে না।

    তারপর কাপ্তান সবাইকে বললেন, আপনারা বসুন। এবং কোনো শ্রেণীকক্ষে যেন তিনি দাঁড়িয়ে বলে যাচ্ছেন—এই যে জাহাজ সিউল- ব্যাংক—এতদিনের সফরে আপনারা তাকে আর নাও ভালবাসতে পারেন। দেশে ফেরার জন্য আপনারা এখন সবাই উদগ্রীব বুঝতে পারি—কিন্তু কোম্পানীর ক্ষতি হোক আমরা কিছুতেই চাই না। এতে আমাদের সুবিধা হবে না। আমরা যখন খেটে খাওয়া লোক—কোম্পানীর ভালমন্দের ওপর আমাদের জীবন, তখন আশা করি চোখ বুজে আমরা ঠিক সমুদ্রে একটা বছর কাটিয়ে দিতে পারব। বলেই তিনি কি ভাবলেন, মেয়েকে দেখলেন। জ্যাক একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে পারছে না, বাবা এখন এ-সব কথা বলছেন কেন। সে দেখল, তখন বাবা আবার বলে যাচ্ছেন—

    স্যালি হিগিনস গীর্জার পাদ্রীর মতো গাঢ় গলায় বললেন, জাহাজ এবং সমুদ্র সম্পর্কে কিছু কথা আপনাদের খুলে বলতে চাই। তিনি একটু নুয়ে এবার টেবিলের ওপর ঝুঁকে দাঁড়ালেন, কাঁধে ওর সোনালী স্ট্রাইপগুলো খুব ঝক ঝক করছে। নীল রঙের স্যুট এবং মাথায় টুপি থাকলে পুরোপুরি ইউনিফরমে থাকতেন। তিনি মাথায় একবার হাত বুলালেন এবং যেমন দাঁত ঠেলে ওপরে তুলে দেন তেমনি দিয়ে কথাবার্তা শুরু করার সময় বললেন, জাহাজ সিউল-ব্যাংক আর দশটা জাহাজের মতো নয়। সবার ভেতরে একটা গুঞ্জন উঠছে। কেউ অবশ্য জোরে প্রতিবাদ করতে পারছে না। যেন বলার ইচ্ছে, আমরা বার বার এক কথা শুনতে চাই না।

    তিনি বললেন, সিউল-ব্যাংক গেটস হার পোর্ট ইন টাইম।

    তিনি বললেন, বেশ জোর দিয়ে বললেন, ভেরি ফেথফুল। ভেরি ভেরি ফেথফুল সি ইজ। সবাই বুঝতে পারল কাপ্তান সিউল-ব্যাংকের বিশ্বস্ততা সম্পর্কে বলছেন।

    তিনি বললেন, এটা আমার বিশ্বাস, যতই সে মরে ভূত হয়ে যাক আপনারা জানেন, সামান্য থেমে তিনি একটু মুচকি হেসে বললেন, সার্ভে থেকে আমাদের জাহাজটার অস্তিত্ব অনেক ক’ বছর আগেই বেমালুন ধুয়ে মুছে গেছে। আপনাদের কে ছিল সেই উনিশশো সাতচল্লিশে, কেউ ছিলেন আপনারা? ডেবিড উঠে বলল, আমি ছিলাম স্যার।

    তিনি বললেন, মনে আছে ইস্টার আয়ল্যাণ্ডের কাছে ভীষণ নিম্নচাপের ভেতর পড়ে গেছিলাম। সেই ঘূর্ণিঝড়ের কথা তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে ডেবিড, পানামা থেকে চারটা জাহাজ, পর পর, সব আধুনিক জাহাজ—তোমার তো মনে আছে ডেবিড, আমরা প্রায় একই লংগিচুড, ল্যাটিচুডে রান করছি—তিনটে জাহাজের একটাও পার পায়নি, কারও ব্রীজ উড়িয়ে নিয়েছে, একটা জাহাজ তো ডুবেই গেল—কি অন্ধকার আর বজ্রপাত, বোধহয় এনজিনে বজ্রপাতেই জাহাজটা ডুবেছিল—আর কি হতে পারে, আমরা তো ঘণ্টা তিনেকের ভেতর পৌঁছে দেখলাম পৃথিবী কালো করে সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গমালা। সমুদ্রের রং সাদা এবং কুয়াশার মতো দিকচক্রবাল—কুটোগাছটি খুঁজে পাইনি—বাট দ্য সিপ এস এস সিউল-ব্যাংক মুভস অন।

    তারপরই কিছুটা নাটকীয় ভঙ্গীতে বললেন, তথাপি এই জহাজ কিন্তু কারো অপরাধ ক্ষমা করে না। জাহাজের নাবিকগণ আপনারা মনে রাখবেন, সমুদ্রে কোন পাপ কাজেরই ক্ষমা নেই। আমার বয়স হয়েছে, এখন এটা আমি বুঝতে পারছি। আপনারা অনেকে এখনও যুবক আছেন, অথবা বয়স আপনাদের বাড়ছে, আপনারা সংস্কার ভেবে সব উড়িয়ে দিতে পারেন, কিন্তু বয়স বাড়লে এটা আপনিও বুঝতে পারবেন। আসলে কি কাপ্তান এতক্ষণ এত কথা আৰ্চিকে উদ্দেশ্য করে বলছেন। আর্চি গতকাল লেডি-এ্যালবাট্রসকে হত্যা করতে চেয়েছিল।

    আর্চি, তখন মুখের চারপাশে হাত বুলিয়ে দেখছে। যেন বুঝতে পারছে দাগগুলো ক্রমে আরো প্রকট হয়ে উঠছে। ভেতরে তখন তার প্রতিশোধের স্পৃহা বেড়ে যায়। আর্চির মুখ থমথম করছে।

    এবং এভাবেই কিছুটা এলার্মিং বেল বাজিয়ে দিয়ে কাপ্তান স্যালি হিগিনস বসে পড়লেন। সবাই যে যার ন্যাপকিন হাঁটুতে বিছিয়ে নিয়েছে। সবাই প্রায় উপুড় হয়ে পড়েছে। দু’একজনের ফিস ফিস গলায় কথা, কাপ্তানের বুড়ো বয়সে, নাতির বয়সী ছেলেকে নিয়ে দুটো একটা রসিকতা। খুব আস্তে আস্তে চিবিয়ে চিবিয়ে এ সব কথাবার্তা যখন চলছিল, তখন জ্যাক ভীষণ ঝুঁকে আছে টেবিলে। কি খাচ্ছে, কি খাচ্ছে না সে বুঝতেই পারছে না।

    ডেবিড বুঝতে পারছে না, এভাবে এমন একটা সুন্দর লাঞ্চের সময় কাপ্তান এলার্মিং বেল বাজিয়ে দিলেন কেন? লেডি অ্যালবাট্রসের কথা ভেবে, না অন্য কোন দূরবর্তী বিদ্রোহের আশঙ্কার কথা ভাবছেন তিনি। অর্থাৎ মিড্‌-সিতে যদি শেষ পর্যন্ত কিছু হয়ে যায়—কারণ জানা আছে, সেই প্রাচীনকাল থেকে—নাবিকেরা দীর্ঘদিন সমুদ্রে ঘুরতে ঘুরতে পাগল হয়ে যায়—তারা ডাঙ্গায় ফেরার জন্য যে কোনো ইতর কাজ করে ফেলতে পারে। এবং পুরো এক বছর—মাটি টানার কাজ, সব খাবার ভেতর থেকে উঠে আসছে। কাপ্তান প্রথম থেকেই এলার্মিং বেল বাজিয়ে দিয়ে সবাইকে সতর্ক করে দিলেন। জ্যাককে নামিয়ে দিয়ে তিনি নিজে ঝাড়া হাত পা হয়ে যেতে চান

    এবং এটা ডেবিডের কাছে ভীষণ স্বার্থপরতার ব্যাপার মনে হল। জীবন বলতে একমাত্র জ্যাক, আর সবাই যেন সিউল-ব্যাংকের কলকব্জা। স্ক্রু-নাট-বোল্টের সমান। জাহাজের সঙ্গে তাদের ভাগ্য জড়িয়ে আছে। ডেবিডের খেতে ভাল লাগছে না।

    আর ছোটবাবু না থাকায় ডেবিড কেমন ভালভাবে খেতে পারছে না। ছোটবাবুকে আর্চি নিচে এত কি জরুরী কাজ দিয়ে রেখেছে—একবার সে ভাবল খেয়ে উঠে দেখে আসবে।

    এবং যখন সে নেমে গেল নিচে, দেখল কোথাও ছোটবাবু তখন নেই। সে মেন-জেনারেটারের পাশে দাঁড়িয়ে ডাকল, ছোটবাবু!

    কেউ সাড়া দিচ্ছে না।

    সে পোর্ট-সাইডের বয়লারের পাশে দাঁড়িয়ে ডাকল, ছোটবাবু! কেউ সাড়া দিচ্ছে না।

    সে এভাবে প্রপেলার-শ্যাফট পার হয়ে গেল এবং ছোটবাবুর নাম ধরে ডাকলে কেবল গমগম করছে এনজিম-রুম। সব কলকব্জা বন্ধ জাহাজের। কেবল বিজ-পাম্প চলছে। তার কিট কিট সামান্য শব্দ। আর শব্দ বলতে দুটো একটা কক ফ্যাচ ফ্যাচ করছে। সামান্য স্টিম বের হচ্ছে ককের মুখ থেকে। এমন কি এনজিন-রুমে কেউ কাজ করছে না। একেবারে ফাঁকা। ছোটবাবু তবে কোথায়!

    আর্চি ছোটবাবুকে এভাবে কেন জব্দ করছে বুঝতে পারছে না। আর্চি অমানুষের মতো ব্যবহার করছে ছোটর সঙ্গে! সে সিঁড়ি ধরে ওঠে যাবার সময় দেখল, থার্ড, এনজিনের ফিল্টার খুলছে। একেবারে ওপরে। সার্কুলেটিং ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়ে কাজ করছে। সে বলল, থার্ড, ছোটবাবুকে দেখেছ?

    সে বলল, ছোটবাবু তো নিচে কাজ করছিল।

    –নেই

    –তবে বোধহয় ওপরে উঠে গেছে।

    তখন জ্যাক খুব স্বাভাবিক গলায় শিস দিচ্ছে ফানেলের গুড়িতে। চারপাশটা সে দেখছে। সে এবার নিচে নামবে। খুব সন্তর্পণে নামতে হবে। বাবা দেখে ফেললে টের পেয়ে যাবেন। সে এভাবে শিস দিয়ে যেন বোঝাতে চাইছে—ছোটবাবু বলে এ-জাহাজে সে কাউকে চেনে না।

    যখন দেখল, কেউ নেই এবং এবারে নামা যাবে—সে টুপ করে সিঁড়িতে নামতে নামতে প্ৰায় অদৃশ্য হয়ে গেল বোট-ডেক থেকে। সে ক্রমে সিঁড়ি ধরে নেমে যেতে থাকল। দেখলে মনেই হবে না আর জ্যাকের উঠে দাঁড়ারার পর্যন্ত ক্ষমতা নেই। সে দ্রুত লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে গেল। তাকে ফের তাড়াতাড়ি উঠে যেতে হবে। ব্রীজে বাবা এখন জাহাজের অন্য অফিসারদের সঙ্গে কথা বলছেন। সকালে তিনি তাঁর সব গোছগাছ করে দিয়েছেন। এখন আবার নেমে এসে কি কি বাকি থাকল সব দেখেশুনে একেবারে ঠিকঠাক করে বিদায়ের আগে যেমন হাত তুলে দেওয়া, বাবা তেমনি সময় হলে হাত তুলে দেবেন। আর তখনই তাকে এজেণ্ট-অফিসের লোকদের সঙ্গে নেমে যেতে হবে।

    ঘুরে ঘুরে সিঁড়িটা যত নামছে তত তার বুক কাঁপছে। সে আরও নিচে নেমে গেল। বয়লার রুম পার হয়ে এনজিন-রুমে ঢুকে গেল।

    সে ডাকল, ছোটবাবু!

    কেউ সাড়া দিচ্ছে না।

    সে ডাকল, ছোটবাবু আমি এখন চলে যাব, তুমি কোথায়?

    না, কেউ সাড়া দিচ্ছে না।

    —ছোটবাবু! সে প্রায় ফিসফিস গলায় ডাকছে। জোরে ডাকলে ওপরে থার্ড আছে, শুনতে পাবে।

    থার্ড অনেক উঁচু থেকে বলল, হ্যাল্লো!

    জ্যাক খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, হ্যাল্লো। কোনো উদ্বিগ্নতা নেই গলায়। যেন জাহাজ থেকে নেমে যাবার আগে ঘুরে ফিরে এনজিন-রুমটা দেখছে।

    থার্ড বলল, কি মজা! তুমি হোমে ফিরে যাচ্ছ।

    জ্যাক বলল, ভীষণ মজা। হোমে ফিরে যাচ্ছি। কথা বলছে আর সন্তর্পণে দেখছে সে কোথায়! ওদিকটায় থাকতে পারে। ওখানে একবার আর্চি ছোটবাবুকে ট্যাংকের ভেতরে নামিয়ে দিয়েছিল। না ওখানে নেই। থাকলে প্লেট তোলা থাকত।

    ছোট্ট জ্যাক এখন দানবের মতো এনজিনের চারপাশে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সে একটা পুতুলের মতো হেঁটে বেড়াচ্ছে যেন। তার কেমন চোখ-মুখ সাদা হয়ে যাচ্ছে। সে ঝুঁকে কখনও টানেল-পথে নেমে, কখনও সিঁড়ি ধরে ওপরে ওঠে, স্মোক-বকসের ভেতর যদি এবং এভাবে সে আবার নিচে ঘুরে ঘুরে স্টারবোর্ডের ভেতর ঢুকে যেতেই দেখল, বয়লারের পাশে ছোটবাবুর তেলের টব, বালতি। ছোটবাবু ঠিক এখানে কোথাও আছে। সে খুব সন্তর্পণে ডাকল, ছোটবাবু, আমি চলে যাচ্ছি। তোমার এখনও কাজ শেষ হল না!

    না, কেউ সাড়া দিচ্ছে না। সে ফের বলল, ছোটবাবু, তুমি কী মানুষ না ছোটবাবু! আমি চলে যাব, এখনও তোমার কাজ শেষ হচ্ছে না! সে বয়লারের নিচে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে খুঁজল। ডাকল ফের, ছোটবাবু, তুমি কোথায়?

    আর তখনই আশ্চর্য ফ্যাসফ্যাসে গলার আওয়াজ। শীতে ঠাণ্ডা লেগে ভেঙ্গে গেলে যেমন হয়ে থাকে অথবা মনে হয় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে কেউ নিচে বোধহয় প্রাণপণ ওপরে উঠে আসার জন্য লড়াই করছে।

    জ্যাক পাগলের মতো হয়তো চিৎকার করে উঠত ভয়ে। কিন্তু সে তো ছোটবাবুকে ভালবাসে না। সে তো ভেবেই নিয়েছে, ছোটবাবুর কথা আর ভাববে না। তবু চলে যাবার আগে সে একবার দেখা করে যেতে চায়। কিন্তু ছোটবাবু কি উঠতে পারছে না! উপরে উঠতে এত দেরি করছে কেন ছোটবাবু! ছোটবাবু কি এভাবে বিজের ভেতর পড়ে থেকে একেবারেই ঠাণ্ডা হয়ে যাবে! আর তখন মাথায় কি যে হয়ে গেল তার। সে দ্রুত ছুটে গেল ওপরে সিঁড়ি বেয়ে। ওপরে উঠে বলল, বাবা সবাইকে ডাকো। এবারে আমি যাব।

    তখন সব ঘরে খবর পৌঁছে গেল। জাহাজের ছোটসাব নেমে যাবে। সবাইর সঙ্গে নেমে যাবার আগে দেখা-সাক্ষাতের পালা প্রায় যেন ঐতিহাসিক ঘটনার মতো সবাই যে যার ভাল পোশাকে ওপরে উঠে যাচ্ছে। নিয়মমাফিক ছোটবাবু হাজিরা না দিলে আর্চির গাফিলতি—আর্চির অধীনে একটা ছোট ছেলে ছোকরা কাজ করে, নিয়ম-কানুনের ধার ধারে না, বেয়াদপ। এবং আর্চি নিজে নেমে এসে ডাকল, হেই বাস্টার্ড। ওপরে যাও, পোশাক পাল্টে বোট-ডেকে যাবে।

    তখন ছোটবাবু প্রায় কোনরকমে সিঁড়ি ভেঙে উঠছিল। রাস্তায় দেখা কাপ্তান-বয়ের সঙ্গে। আপনার বড় দেরি, জলদি যান। ছোটসাব চলে যাচ্ছে। ছোটবাবু আর পারছে না। শীতে সে হি হি করে কাঁপছে। সে ওপরে উঠে যাচ্ছে। ফানেলের গুঁড়ি ধরে উঠে যাচ্ছে। উঠেই দেখল সবাই এসে গেছে। চিফ-মেট, সেকেণ্ড-মেট, ‘থার্ড-মেট, রেডিও-অফিসার এবং এনজিনের সবাই। ডেবিড চেঁচাচ্ছে—ছোটবাবু, শিগগির নিচে নেমে যাও। এটা কি হয়েছে তোমার! কোথায় ছিলে? তোমাকে ভীষণ কুৎসিত দেখাচ্ছে।

    ছোটবাবু কোনও কথার জবাব দিতে পারছে না। জামা-প্যান্ট জবজবে ভেজা। ভীষণ ঠাণ্ডা হাওয়া সমুদ্র থেকে উঠে আসছে। গরম দেশের মানুষ ছোটবাবু, শীতে একেবারে চোখ সাদা হয়ে গেছে। আর কালো ধূসর। যেন ভূতের মতো সে একটা ডামি। ফানেলের গুঁড়িতে পোকামাকড়ের মত লেপ্টে আছে। নিচে নেমে সাফসোফ হয়ে আসতে অনেক সময়। জ্যাকের সঙ্গে তবে ওর শেষ পর্যন্ত দেখাই হবে না। সে শীতে হি হি করে কাঁপতে থাকল।

    আর্চি হিংস্র বাঘের মতো ক্ষেপে যাচ্ছে। যেহেতু ওপরে কাপ্তান, চার্ট-রুমের পাশে জ্যাক, আর ফানেলের গুঁড়িতে বাস্টার্ড ছ’নম্বর। সব মিলে ওকে ভীষণ অস্থির দেখাচ্ছে। কাপ্তান অথবা জ্যাক না থাকলে পাছায় একটা লাথি মারতে পারত। এভাবে তাকে অন্তত অপ্রস্তুত করতে পারত না ছ-নম্বর।

    জেটিতে তিনটে মনোরম দামী গাড়ি। একটাতে জ্যাক এবং কাপ্তান নিজে থাকবে। দু-নম্বর গাড়ি এজেণ্ট-অফিসের খোদ কর্তার, তিন-নম্বর গাড়ি খালি। কেউ সঙ্গে গেলে যেতে পারে।

    জ্যাকের সেই সাধারণ পোশাক। মনে হচ্ছে জাহাজেই সে আছে; কোথাও যাবার কথা নেই তার। সে খুব ধীরে ধীরে বাবার পেছনে নেমে আসছিল। সবার সঙ্গে হ্যাণ্ড-শেক করার একটা ব্যাপার রয়েছে। আসলে সে দূর থেকেই দেখে ফেলেছে। সে দেখে আর এক পা নড়তে পারেনি। মূর্তিমান ভূতের মতো ছোটবাবু ফানেলের গুঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে। শীতে কাঁপছে আর ফ্যাক ফ্যাক করে হাসছে। হেসে দু’হাত তুলে বিদায় জানাচ্ছে। দু’পাটি উজ্জ্বল সাদা দাঁত কেবল জ্যাক দেখতে পেল। একজন মানুষের অবয়বে এভাবে ক্রমান্বয়ে নিষ্ঠুরতার দাগ, এবং এই মানুষ অতীব সরল, যেন কিছু আসে যায় না, শীতে দাঁড়াতে পারছে না দাঁত ঠকঠক করছে, ঠোঁট বরফের মত সাদা, তবু অকপট সরল হাসিটুকু লেগে রয়েছে ঠোটে। যেন সেই এক জোকার হাসি ঠাট্টায় সব দর্শকদের উত্তেজিত করে রাখছে, নিজে মরে যাচ্ছে টের পাচ্ছে না।

    এবং জ্যাক বোধহয় এভাবে বুঝতে পারে, ছোটবাবুর ভেতরে রয়েছে এক আশ্চর্য দুঃখী মানুষ। সেই দুঃখী মানুষটির সঙ্গে অন্তত নেমে যাবার আগে একবার দেখা হোক সে চেয়েছিল, সে জানত এই দুঃখী মানুষকে আর্চি বাঘের মতো থাবায় খেলাবে। যত দিন যাবে আর্চির থাবা হিংস্র হয়ে উঠবে। তবু সে স্থির ছিল, কিছুতেই ভেঙ্গে পড়বে না। স্থির ছিল, ছোটবাবুকে সে ভুলে যাবে। কিন্তু ক্রমে কি যে হয়ে যায়, দূর থেকে একজন সাধারণ জোকার, কত উঁচু ফানেলের গুঁড়িতে দাঁড়িয়ে হাত তুলে দিতে পারে, কত কষ্টের ভেতরও অকপটে হাসতে পারে তখন সে তো সামান্য জ্যাক। সেও সবার দিকে হাত তুলে দিল। কিছুটা বিদায়ের ভঙ্গীতে। ওদের দিকে সে আর এক পা হেঁটে গেল না। সে কেবিনের দিকে ফিরে যেতে থাকল।

    কাপ্তান সারাদিন অস্বস্তিতে কাটিয়েছেন। কোনো রকমে ওয়েলিংটন পর্যন্ত গাড়িতে নিয়ে যেতে পারলে ভাবনা থাকবে না। বনিকে তিনি সুন্দর সুন্দর পোশাক কিনে দেবেন। দু-চারদিন বনির সঙ্গে থাকবেন। মেয়েদের পোশাকে বনি তখন এত বেশি উৎফুল্ল হয়ে যাবে যে মনেই থাকবে না তার বুড়ো বাপ জাহাজে কাজ করে। এবং বুঝতে পারেন সুন্দর পোশাকে বনিকে দু-দণ্ড একা থাকতে হবে না। সে তার ঠিক নিজের মতো কাউকে খুঁজে পাবে। খুঁজে পেলে সত্যি বনি আর বুড়ো বাপকে মনে রাখতে পারবে না।

    আর তখন তিনি কেমন হতবাক। বনি কেবিনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। কেবিনের দিকে ফিরে যাচ্ছে বনি। কেবিনে বনির কিছু পড়ে নেই তো! তাছাড়া মেয়েদের কোথাও যাবার আগে কাজ থাকে কিছু। ভাবলেন, বনি এক্ষুনি ফিরে আসবে।

    বেশ সময় পার হয়ে যাচ্ছে। তিনি বার বার ঘড়ি দেখছেন। এত সময় লাগার কথা না। তিনি এগিয়ে গিয়ে দেখলেন বনি দরজায় ঠেস দিয়ে কেমন স্থির উদাস চোখে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি এত কাছে, তাঁকে যেন বনি দেখতেই পাচ্ছে না। হঠাৎ কেমন ভয় পেয়ে ডাকলেন, বনি!

    বনির মনে হল কেউ তাকে ডাকছে। সে দেখল বাবা সামনে। বাবাকে দেখেই মনে হল কোথাও তার যাবার কথা। সে ভেতর থেকে তখন এক কঠিন দুঃখ সামলে নিচ্ছিল। স্থির নিশ্চিত গলায় এবং খুব শান্তভাবে বলল, আমি যাব না বাবা, তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না।

    –কি বলছিস বনি! সবাই অপেক্ষা করছে।

    –তুমি ওদের চলে যেতে বল বাবা। তোমাকে ছেড়ে থাকলে আমি মরে যাব বাবা। একেবারে শিশুর মতো বনি বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে বলতে বলতে কেঁদে ফেলল।

    তিনি নিজে এখন কি করবেন বুঝতে পারছেন না। দূরে ওরা দাঁড়িয়ে আছে। নিচে এজেণ্ট-অফিসের বড় কর্তা। সব ঠিকঠাক। বনি কাঁদছে। কতদিন যেন বনি এভাবে কাঁদেনি। তিনি সেই কবে যেন মনে করতে পারছেন না বনি ওঁর বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদত। এবারে মনে করতে পারছেন। বনি ওর মা চলে যাবার পর এভাবে ওর বুকে মুক লুকিয়ে কাঁদত। আর বলত বাবা আমি মা’র কাছে যাব। আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে চল। এবং এভাবেই মনে হয়—তিনিই সব দুঃখের মূলে। বনিকে তিনি আর একটা শক্ত কথা বলতে সাহস পান না। এবং যেন এই মেয়ে এখন জোরে জোরে চিৎকার করে বলতে পারে বাবা, আমি কি অপরাধ করেছি যে জাহাজ থেকে তুমি আমাকে নামিয়ে দিতে চাইছ।

    তিনি ধীরে ধীরে বোটডেকে-হেঁটে গেলেন। কারও দিকে তাকালেন না। কেমন মাথা নীচু করে রাখলেন এবং বলে গেলেন বন্ধুগণ আপনারা যান। জ্যাক জাহাজে থাকবে। এই ভাঙ্গা জাহাজে জ্যাক থাকছে। আপনারা আমাকে আর নিশ্চয়ই স্বার্থপর ভাববেন না।

    তারপর ফের তিনি চিৎকার করে উঠলেন, হেই, হেই সেকেণ্ড। সেকেণ্ড বললেই সবাই বুঝতে পারে তিনি আর্চিকে ডাকছেন। ডেবিডকে ডাকলে তিনি বলতেন হেই সেকেণ্ড-মেট। তিনি আর্চিকে বললেন, বন্দুকটা আমার কেবিনে রেখে আসবে। ওটা আর ধরবে না। আর যখন আর্চি বন্দুকটা দিতে এসেছিল, তিনি ক্রোজ-নেস্টের একটা ঝুলন্ত বালব দেখিয়ে বললেন, হাতের টিপস্ দেখবে, বলেই বালবটা ক্রোজ-নেস্ট থেকে গুলিতে উড়িয়ে দিলেন। বললেন, কি মনে হচ্ছে। হাত ঠিক আছে তো!

    তারপর থাকে সেই দ্বীপ সমুদ্র আর মানুষের অন্তহীন রহস্য। জাহাজটা আবার কবে সমুদ্রে যাত্রা করবে, এবং কি সব অঘটনের অপেক্ষায় আছে কেউ জানে না। তবু দেখা যায় জাহাজের মাস্তুলে কার্সি ফ্ল্যাগ উড়ছে। আর বনির পোর্ট-হোলে কত সব অপার্থিব নক্ষত্রমালা। ছোটবাবুর মুখ প্রতিটি নক্ষত্রে বিন্দু বিন্দু হয়ে জ্বলছে। কোথাকার এক ছোটবাবু জীবনের সব কিছু তার হরণ করে নিয়েছে। সে নিশীথে মানুষটার শুভাশুভের জন্য তার ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিল।

  • একত্রিশ

    একত্রিশ

    ।। একত্রিশ।।

    নিউ-প্লিমাথ আসলে ভারি ছোট বন্দর। বন্দরে চার-পাঁচটা জাহাজ ভিড়তে পারে। ঠিক পাহাড়ের নিচে সমুদ্র। বাতাসে প্রবল ঢেউগুলো যেখানে ভেঙে খান খান হয়ে যায় তার পাশে এক যেন বিশাল দীঘি। নীল জল টলমল করছে। সমুদ্রের ভেতরই দীঘির মতো পাড় বাঁধানো অথবা সহসা দেখলে মনে হয় প্রবালের বলয়রেখা। একটু কাছে গেলেই বোঝা যায় সমুদ্রের নিচ থেকে কংক্রিটের দেয়াল তুলে এই ছোট্ট নির্মাণকার্য সুপটু হাতে সম্পন্ন করা হয়েছে।

    ডিসেম্বর মাস। গ্রীষ্মের সময় বলে আয়ন বায়ু এখন নেমে আসছে। জোরে হাওয়া উঠছে। সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ কনক্রিটের দেয়ালে এসে মাথা কুটে মরছে। প্রচণ্ড গর্জনে সব সময় এইসব ঢেউ ভাঙার শব্দ, অথবা এক অতীব গর্জন এবং মনে হয় যেন সদলবলে ছুটে আসছে অগণিত ঢেউ আর কংক্রিটের দেয়াল ভেঙে দেবার জন্য নিরন্তর কেবল ফুঁসে ফুঁসে মরছে।

    ভেতরে সিউল-ব্যাংক জাহাজ ভিড়ে আছে। সঙ্গে আরও দু-তিনটে জাহাজ। দেখে মনে হয় অস্ট্রেলিয়াগামী। অথবা এরা সব দ্বীপটিপ পার হয়ে এখন নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিচ্ছে। জাহাজে তেমন ত্বরা নেই, তেমন মাল ওঠা নামার ব্যস্ততা নেই। বড় শান্ত জেটি। দু’টো-একটা ট্রাক এসে সকাল থেকে লাগছে। মাল নিয়ে আবার পাহাড়ী পথ বেয়ে উঠে যাচ্ছে। দূরে দেখা যাচ্ছে এগমন্ট হিলের শীর্ষদেশ। সাদা বরফে ঢাকা, আর জেটি পার হলে ঠিক এই বন্দর অথবা শহরের মতোই ছোট্ট বেলাভূমি—সকাল থেকে মানুষরা রোদে পিঠ দিয়ে বসার জন্য অথবা সমুদ্রে সাঁতার কাটবে বলে ছোট বর্শা এবং অক্সিজেন সিলিণ্ডার পিঠে বেঁধে বড় ছাতার নিচে অপক্ষো করছে।

    আর রয়েছে সারি সারি পাইন গাছ। ঠিক পাইন বলা চলে না, পাইনের মতো সরু লম্বা নয়, অনেক ডালপালা নিয়ে গাছগুলো মাথায় উঁচু। নীল আকাশের নিচে এই সব সবুজ গাছ পাহাড়ময়। কৌরি-পাইনের জঙ্গল এভাবে সর্বত্র। আর ঠিক তারই পাশে জেটি থেকে কংক্রিটের পথ সোজা ওপরে উঠে বাঁদিকে মোড় নিয়েছে। উঁচু-নিচু পথের দু’পাশে ছোট ছোট উপত্যকায় লাল নীল কাঠের বাড়ি। সামনে ছোট সবুজ লন আর কারুকার্যময় গোলাপের বাগান। বোধ হয় এখন গ্রীষ্মের দিন বলে কেবল এই গোলাপ আর ক্রিসেন্থিমামের সমারোহ। এবং মনে হয় শান্ত নিরিবিলি আশ্রমের মতো এই বন্দরটি। কোথাও কোন ব্যস্ততা নেই। কেমন ছুটির দিনের মতো সব

    তবু মৈত্র ফেরার পথে দেখেছিল, সব দোকানপাট নানাবর্ণের লাল নীল হলুদ কাগজে সাজানো হচ্ছে। মৈত্র বুঝতে পেরেছিল হপ্তা দুই পার করে দিতে পারলেই বড়দিনের উৎসব। ডাক্তার মানুষটি খুব ভাল। ইচ্ছে করলেই ধরিয়ে দিতে পারত। প্রথমে ভীষণ চেঁচামেচি করেছে। গালাগাল করেছে। ইংরেজী ভাষায় গালাগাল শুনতে মৈত্রের বেশ ভাল লাগে। আরও ভাল লেগেছিল, যখন ভদ্রলোক ওকে নানাভাবে বুঝিয়েছিল, কত খারাপ অসুখ এটা। সে এটা লুকিয়ে রেখে ভাল করেনি। তবু কথা আদায় করে নিয়েছে, বাপু তুমি কোথাও কিন্তু যাবে না। গেলে মরে যাবে। মানুষটি তাকে স্থানীয় মাউরি মেয়েদের সম্পর্কে এমন সব ভয়-টয় ধরিয়ে দিল যে বোধ হয় মৈত্র আর বাপের জন্মেও ওধার মাড়াবে না।

    কিন্তু মানুষের জীবনে যা হয়ে থাকে, মৈত্র সুই ফুটিয়ে আরাম বোধ করছিল। যখন সে জাহাজ থেকে নেমে পিকাকোরার দিকে হেঁটে যায় তখন সে কিছু দেখেনি। ট্যাকসিতে সে প্রায় মৃগীরুগীর মতো পড়ে ছিল। ডাক্তার মানুষটি সত্যি সুমহান, ওকে সামান্য কিভাবে যে ম্যাসেজ করে দিয়েছে, শরীরে যেন আর বিন্দুমাত্র গ্লানি নেই। সে ভেবেছিল জীবনে আর কখনও খারাপ কাজ করবে না। সন্ধ্যার সময় ডাক্তার মানুষটি বলেছিল, এবারে যাও বাছা। যে ক’দিন থাকবে একবার করে আসবে এখানে। ডাক্তারের সুন্দর গোলাপ-বাগানটি তার ভাল লেগেছিল। সেখানে সে প্রথম সুন্দর একটি বালিকাকে দেখে থমকে দাঁড়াল। ছ-সাত বছরের বালিকাটি ওকে দেখে হাত নাড়ছে।

    সেও হাত নাড়ল।

    মৈত্র ভেবেছিল, ডাক্তারবাবুর মেয়ে। মানুষটির ওপর ওর ভীষণ কৃতজ্ঞতা তার ওপর গোলাপের বাগানে এমন ফুটফুটে মেয়ে—সে এক মুহূর্ত আর দেরি না করে প্রায় দু’হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বালিকাটি পরম ঔৎসুক্যে ওকে দেখছিল শুধু। ওর কাছে যেতে সাহস পায়নি। রেলিঙের ও- পাশে দাঁড়িয়ে কেমন বিরস মুখে বলছে, ইউ সেলর?

    মৈত্র বলল, ইয়েস মি সেলর। মি মৈত্ৰ।

    —মাই ফাদার ওয়াজ অলসো সেলর।

    —এখন?

    —এখন নেই!

    –কেন নেই। কি হয়েছে?

    —জানি না।

    মৈত্র বুঝতে পারল, সে ডাক্তারবাবুর কেউ নয়। পাশাপাশি বাড়ির কেউ হবে, আত্মীয়ের মতো হবে। আর কে আছে এমন সুন্দর কাঠের লাল নীল রঙের বাড়িতে? ছবির মতো ছিমছাম। সমুদ্র থেকে সামান্য ওপরে পাহাড়ের উপত্যকায়, একেবারে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো ছোট্ট রহস্যময় জগত। মেয়েটি বর্ণাঢ্য ছবির মতো বাড়িটার যেন প্রাণ। সে বলল, তোমার নাম?

    —আমার নাম ম্যাণ্ডেলা।

    —খুব সুন্দর নাম। কোথায় থাকো?

    ম্যাণ্ডেলা মৈত্রকে রেলিঙের ফাঁক দিয়ে উবু হয়ে দেখছে। ম্যাণ্ডেলা পরেছে পাতলা কটনের ফ্রক। পায়ে পাতলা স্লিপার। ঘন সোনালী চুলে রিবন বাঁধা। সে কোথায় থাকে কিছু বলল না।

    মৈত্র বলল, মি সেলর কি করে বুঝলে?

    ম্যাণ্ডেলা বলল, মামাবাবু তোমাকে খুব বকেছে।

    মৈত্র বুঝতে পারল, ম্যাণ্ডেলা ভেতরে কোথাও তখন ছিল। সে আড়ালে সব শুনেছে।

    ম্যাণ্ডেলা বলল—তোমার জাহাজে আমি যাব।

    —আমার জাহাজ ভাল না। ভাঙা জাহাজ।

    —ভাঙা জাহাজে থাক কেন?

    —এবারে একটা ভালো জাহাজ কিনে ফেলব।

    ম্যাণ্ডেলা বোধ হয় একা। ওর সঙ্গে কেউ বোধহয় কথা বলে না। –ম্যাণ্ডেলা, মামাবাবু তোমাকে খুব ভালবাসে?

    ম্যাণ্ডেলা বলল—আমরা ওখানে থাকি। বলে পাশে এক ফার্লং-এর মতো দূরে ঠিক আর একটি ছোট্ট উপত্যকায় কিছু আপেল গাছের ফাঁকে মিকি-মাউসের মতো একটা বাড়ি এবং কি যে হয়ে যায় মৈত্রের, এখানে সব বাড়িগুলিই ছেলেবেলার বইয়ের ছবিতে দেখা বাড়ির মতো। বাড়িগুলো কুটীরের মতো। কাঠের দেয়ালে কাঁচের জানালা। ছাদ কাঠের মনে হয় এবং চিমনি কালো রঙের। একই রকমের সব বাড়ি। শহরের ভেতরে ইট কাঠের দালান, পাকা রাস্তা, ট্রাম গাড়ি সবই আছে। মৈত্র ম্যাণ্ডেলার সঙ্গে কথা বলতে বলতে দূরের বাড়িটা দেখল

    —ওখানে কে থাকে?

    —মা।

    —মা।

    —তোমার বাবা?

    —আমার বাবা ভাঙা জাহাজে সমুদ্রে গিয়েছিল। অনেকদিন আগে—বাবার জাহাজ সমুদ্রে ডুবে গেছে।

    মৈত্র বুঝতে পারছে এ পরিবারে সমুদ্র এবং জাহাজ আর তার নিরুদিষ্ট জীবন নিয়ে একটা দুঃখের প্রাসাদ গড়ে উঠেছে। মৈত্রের কেন যে ম্যাণ্ডেলাকে কোলে তুলে নিতে ইচ্ছে হচ্ছে। সে বলল, কাল আবার আসব। তুমি যাও। মামাবাবু তোমাকে ডাকছে দ্যাখো।

    মৈত্র ড. বুচারকে আর একবার দূর থেকে হাত তুলে কৃতজ্ঞতা জানাল।

    মৈত্র এভাবে উঁচু-নিচু পথ ধরে এখন বন্দরের দিকে হাঁটছে। আকাশে দু’টো-একটা নক্ষত্র যীশুর জন্মদিনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ভীষণ ঠাণ্ডা বাতাস সমুদ্র থেকে উঠে আসছে। এদেশের মানুষদের কাছে এখন গ্রীষ্মকাল আর মৈত্রের মনে হচ্ছে তার দেশে শীতকালেও এত ঠাণ্ডা থাকে না। সে গরম উলেন কোট-প্যান্ট পরেছে। গলায় মাফলার জড়ালে কনকনে ঠাণ্ডায় সে এত বেশি শীতে ঠাণ্ডা হয়ে যেত না। সুন্দর সব আলোর ডুম খাড়া পাহাড় থেকে ঝলে পড়েছে রাস্তায়। মানুষের ভিড় নেই। সে একটা বাসে চড়ে বন্দরে নেমে যেতে পারত। কিন্তু কেন জানি ঠাণ্ডায় অথবা এই দেশের মনোরম গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় হেঁটে যেতে তার ভাল লাগছিল।

    আর যেন পড়ে আছে পেছনে সেই মিকি-মাউসের মতো বাড়িটা। ওখানে ম্যাণ্ডেলার মা থাকে। ওর মনে হচ্ছিল জানালায় ঠিক ম্যাণ্ডেলার মতো এক যুবতী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ম্যাণ্ডেলা হয়তো এতক্ষণে বাড়ি ফিরে গেছে। মাকে সে তার গল্প করবে। ওর মার মুখে আকাশের দু’টো একটা নক্ষত্রের মতো বোধ হয় এখন নিঃসঙ্গতা। ওর বার বার সেই নিঃসঙ্গতার কথা মনে হতেই শেফালী অনেক দূরের এক যুবতী এবং প্রতীক্ষা অথবা সন্তান ধারণে শেফালীর মুখে ক্লিষ্টতার ছাপ এসব চিন্তা, একটু ভালভাবে বেঁচে থাকা ওর এখন দরকার—কিছু টাকার সংস্থান করতে পারলে শেফালীকে পাঠিয়ে দেবে।

    সে বেশ দ্রুত হাঁটছে। ম্যাণ্ডেলা এবং তার মা অথবা শেফালী, শেফালীর কথা মনে হলেই সে বুঝতে পারে ঠিক পাঁচ-সাত বছর পর ওর সন্তান ম্যাণ্ডেলার মতো বড় হয়ে যাবে। সমুদ্রগামী জাহাজে সে হয়তো কোন দ্বীপের পাশ দিয়ে যাবার সময় মনে করতে পারবে—সেই সন্তানের মুখ। তখন তার, ইচ্ছে হবে পৃথিবী থেকে যাবতীয় খেলনা কিনে নিয়ে যাবে তার শিশু সন্তানের জন্য। ভারি মজা হবে দেশে ফিরলে। যতবার সমুদ্র ঘুরে দেশে ফিরে যাবে ততবার সে তার কাছে প্রথম প্রথম ভীষণ দূরের মানুষ। শেফালী নানাভাবে বোঝাবে, তোমার বাবা। বাবা বলে ডাকো। আচ্ছা তুমি কী? শেফালী হয়তো কপট রাগে মুখ গোমড়া করে থাকবে তখন, জোর করে কোলে তুলে নিতে পারছ না?

    কিন্তু কি যে হয়ে যায় শেফালীর কাছ থেকে জোর করে তুলে নিলেই কাঁদবে ছেলেটা। যদি মেয়ে হয় সুন্দর ফ্রক-পরা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নানাভাবে বলতে হবে কাঁদে না। অথবা কাঁধে নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে সব সুন্দর সুন্দর খেলনা কিনে দেবে ওকে। তারপর সামান্য চেনাজানা হয়ে গেলে এবং যখন বাবা বলে সত্যি ডেকে ফেলবে তাকে তখনই একটা চিঠি হাজির। ঠিক ঠিক পরিচয় হতে না হতেই আবার জাহাজে ভেসে পড়া। ভাবতে ভাবতে মৈত্রের মুখটা কেমন বিমর্ষ হয়ে গেল।

    সে বন্দরে নেমে খুব আশ্চর্য হয়ে গেল। কোথায় তার জাহাজ! পর পর তিনটে জাহাজ। একটাও সিউল-ব্যাংকের মতো দেখতে নয়। সে ঠিক ঠিক চিনে আসতে পারেনি হয়তো। সারি সারি ক্রেন। দু’টো ট্রাক পর পর। দু-একজন মানুষ। জেটির ওপাশে বেলাভূমি শূন্য। আর অন্ধকার তারপর। সে ঘন অন্ধকারে ঢুকে যাচ্ছে। সামান্য জেটির আলোতে শেষ মাথায় এসে বুঝতে পারল অন্ধকারের ভেতর সিউল-ব্যাংক ঘাপটি মেরে আছে। মাস্তুলের আলো জ্বলছে না। সিঁড়িতে ওঠার মুখে অন্ধকার যেন চাপ বেঁধে আছে। জাহাজে আলো নেই। আলো না থাকলে মরা এবং ভুতুড়ে মনে হয় জহাজটাকে মেন-জেনারেটর বোধ হয় গেছে। স্ট্যাণ্ড-বাই সমুদ্রেই খারাপ হয়ে গিয়েছিল।

    সে জাহাজে ওঠার মুখে গ্যাঙওয়েতে দেখল কোয়ার্টার মাস্টার মহসীন চুপচাপ অন্ধকারে বসে রয়েছে। সারাদিন প্রায় সে জাহাজে ছিল না এবং এখন এমন অন্ধকারে কোয়ার্টার মাস্টারকে বসে থাকতে দেখে ভাবল কিছু বলবে। জাহাজে আলো নেই কেন অথবা তোমরা সব জাহাজের আলো নিভিয়ে দিয়েছ কেন? সে কিছু বলতে পারল না। অন্ধকার এবং নিশীথে জাহাজের এমন দূরবস্থায় সে বিচলিত বোধ করছিল।

    মহসীন বলল, যান ভেতরে যান।

    ভেতরে সে কোথায় যাবে। মহসীন এভাবে কথা বলছে কেন। সে বলল—কি হয়েছে?

    মহসীন বলল—জাহাজে আরও এক বছর।

    —তার মানে!

    —জাহাজ মাটি টানার কাজে লাগবে।

    —জাহাজ এবার দেশে ফিরছে না?

    —না। সাউথ-সীতে জাহাজ যাচ্ছে।

    —সেই মাটি টানা।

    —হ্যাঁ। আল্লা মুবারক।

    অর্থাৎ মহসীন আল্লার নাম করে যেন জাহাজের সব কসুর ভুলে থাকতে চাইছে।

    মৈত্র বলল—মেন-জেনারেটর গেছে—

    —কি আর আছে জাহাজে। আপনি তো জানেন সব!

    মৈত্র হাঁটতে থাকল ফের। কি মনে হওয়ায় ফের সে ফিরে দাঁড়াল।

    —জ্যাক নেমে গেছে?

    —না।

    —তার চলে যাবার কথা।

    —যাননি। বাপ বেটা যে কি ভাবে!

    মৈত্র আর দাঁড়িয়ে থাকল না। তারও একটা দায়-দায়িত্ব আছে। সে বুঝতে পারছে এখন সবাই এনজিন-রুমে। সোজা সে ফোকসালে না ঢুকে বোট-ডেকে উঠে গেল। অন্ধকার পথে হাতড়ে হাতড়ে সিঁড়ি ধরে নামতে থাকল নিচে। এত অন্ধকার যে কিছু দেখা যাচ্ছে না। তবু সে প্রায় চোখ বুজে নেমে যেতে পারে। এতবার ওঠা-নামা করে এটা তার হয়েছে। নিচে একেবারে বয়লার-রুমে ঢুকেই বুঝতে পারল ওপাশে এনজিন-রুমে হল্লা শোনা যাচ্ছে। সে ঠিক তেমনি বয়লার ধরে ধরে সামনে এগিয়ে স্টারবোর্ড সাইডের ভেতরে ঢুকে গেল। কী অন্ধকার! একেবারে গভীর অন্ধকারের অতলে সে যেন ডুবে যাচ্ছে। এবং ও-পাশে গেলে দেখল অনেকগুলো টর্চ জ্বলছে। মেন-জেনারেটর খুলে ফেলা হয়েছে। এনজিন-রুমের প্রায় সবাই দড়িদড়া টানাটানি করছে। এবং সে বুঝতে পারল আর একটু বাদেই মেন-জেনারেটর ঠিক হয়ে যাবে।

    মেজ-মিস্ত্রী ভীষণ চিৎকার চেঁচামেচি করছে। থার্ড ঝুঁকে আছে টর্চ হাতে। কয়েলের ওপর কি সব জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আসলে টিণ্ডাল মৈত্র বুঝতে পারল তাপ্পি মারা হচ্ছে। এত তাপ্পি মেরে জাহাজ কখনও চলতে পারে বিশ্বাস হয় না। একটু দূরে কাপ্তান আর চিফ-মেট কি সলা-পরামর্শ করছেন। সে দূরে দাঁড়িয়ে শুধু দেখল। কাজে হাত লাগাল না। অন্ধকারে কেউ দেখতেও পাচ্ছে না। সে যদি ছায়ার মতো সিঁড়ি ধরে উঠেও যায় কেউ টের পাবে না। সারেঙ, ছোট-টিণ্ডাল, কিছু ফায়ারম্যান দড়িদড়া টেনে গলদঘর্ম। ওরা কেউ এনজিনের কলামে হেলান দিয়ে আছে। কেউ এভাপরেটারের পাশে হাঁসফাস করছে। মৈত্র যেমন নেমে এসেছিল তেমনি চুপচাপ গোপনে ওপরে উঠে গেল। কেবল ছোটবাবু নেই মনে হল।

    মেন-ডেকে এসে প্রায় হাঁপ ছেড়ে বাঁচল মৈত্র। চারপাশে আলো। বাতিঘরে আলো, জেটিতে আলো। সী-ম্যান মিশানের মাথায় বড় গম্বুজ—সেখানে আলো। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে উঁচু-নিচু সব জায়গায় নক্ষত্রের মতো বাতিগুলো ঝকমক করছে। আর সেই মিকি-মাউসের মতো বাড়িটালনে সবুজ ঘাস, ঘরে সাদা রঙের কার্পেট পাতা, কাঁচের জানালায় দু’টো একটা জোনাকির মতো বড়দিনের উৎসবের বাতি জ্বলছে। অথবা কোথাও ক্রিসমাস ট্রি নানাবর্ণের সব জোনাকিতে ভরে আছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে ম্যাণ্ডেলা। হাত ধরে আছে ওর মা। ম্যাণ্ডেলা দূর সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায় এমন এক নাবিকের গল্প বলছে। ওর মা চুপচাপ শুনছে।

    ওর কেন জানি মনে হল এভাবে নিশীথে একা এই অন্ধকার মেন-ডেকে দাঁড়িয়ে, আসলে ওটা ম্যাণ্ডেলা নয় অথবা ওর মাও নয়। শেফালী তার সন্তানের হাত ধরে সমুদ্রগামী এক নাবিকের স্বপ্ন দেখছে। শেফালী জানে না সেই নাবিক এখন এক কঠিন অসুখে ভুগছে। শেফালী এবং সেই অনাগত সন্তানের কথা ভেবে মৈত্রের চোখে জল এসে গেল।

    তারপরেই সে হেসে দিল। চোখে জল আসে ওর এটা সে ভাবতে পারে না। ছোটবাবু দেখলে বলত, তুমি কাঁদতে পার দাদা, এটা তো জানতুম না। তোমার ব্যবহার দেখে তো মনে হয় পৃথিবীতে কিছু তুমি পরোয়া কর না। মায়া দয়া তোমার তবে আছে!

    সে এবারেও অন্ধকারে সামান্য হাসল।—ওটা এমনি। কারো জন্য আমার কষ্ট হয় না।

    শরীরের জ্বালা যন্ত্রণা বেশ কমে যাওয়ায় পৃথিবীটা আবার ওর কাছে মনোরম হয়ে যাচ্ছে। এ ক’দিন সমুদ্রে মনে হয়েছিল বেঁচে থাকা বড় কষ্ট। কখনও কখনও জ্বালা যন্ত্রণায় সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে হয়েছে। গোপনে ডেকে উঠে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়লে কেউ টের পেত না ওর শরীরে এমন একটা নোংরা অসুখ আছে। অথচ শেফালী এবং যে আসছে, কি যে ভালবাসা জাগে প্রাণে, কিছুতেই সে তাকে অবহেলা করতে পারেনি। এবং বার বার তখন ওর চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে বুয়েনস আয়ার্সের মেয়েটা। কি নরম উজ্জ্বল শরীর। কি সুন্দর স্তন! আর নাভিমূলে রয়েছে সমুদ্রের এক অলৌকিক দ্বীপ। ছুঁয়ে দিলেই সুধা পারাবার। সে তার কথা ভাবলেও কষ্ট পায়। নোংরা অসুখটার জন্য সেই নচ্ছার মেয়েটা দায়ী এটা তার কখনও মনে হয় না।

    আর তখন মনে হল অন্ধকারে দু’টো একটা ছায়া এদিকে এগিয়ে আসছে। সে বুঝতে পারছে না কে বা কারা। আলো না জ্বললে অন্ধকারে নিচে নেমে লাভ নেই। গ্যালিতে বোধ হয় রান্নাবান্না সব বন্ধ। এবং সবাই এখন আফট্-পিকে বসে রয়েছে হয়তো। সবাই থাকবে এটা সে ভাবতে পারে না। অন্ধকার ভাল না লাগলে কেউ কেউ বন্দরে নেমে যেতে পারে। এমনিতেও পারে। অমিয় নিশ্চয়ই নিচে নেমে গেছে। তখনই সে বুঝতে পারল, ছোটবাবু এবং ডেভিড। ডেভিড ফিসফিস করে কি সব বলছে। সংগোপনে জাহাজে কিছু এমন ঘটেছে যা তাকে আরও বেশি অস্বস্তির ভেতর ফেলে দিয়েছে। জ্যাকের জাহাজে থেকে যাওয়া, এক বছরের ওপর মাটি টানার কাজে, ফের জাহাজ দক্ষিণ সমুদ্রে থেকে গেল, মহসীন মিয়ার আল্লা মুবারক বলা—সবই কেমন রহস্যজনক। সে ভেবেছিল ছোটকে ডেকে জিজ্ঞাসা করবে, কিন্তু ছোট আর ডেভিড দেখতেই পায়নি পাশে ঠিক মাস্তুলের নিচে একজন মানুষ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। ডেভিড সঙ্গে আছে বলে সে ডাকতে পারল না।

    ডেভিড তখন বলছে, তোমার কি মনে হল, তিনি জানতে পেরেছেন?

    —কি জানি! কি করে বলব।

    —আমি মনে মনে কিন্তু কথাটা ভেবেছিলাম। জোরে বলিনি ওটা তোমাকে হলপ করে বলতে পারি। লাঞ্চে আমার কিন্তু মনে হয়েছিল কাপ্তান ভারি স্বার্থপর। ছেলেকে দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

    যত ফিসফিস করেই বলুক, মৈত্র কথাগুলো শুনতে পেয়েছে। ছোটবাবুর সঙ্গে ডেভিডের অন্তরঙ্গতা আছে জানে, কিন্তু ছোটবাবুর কাছে ডেভিড যেন স্বীকারোক্তির মতো কথা বলছে। ছোটবাবুকে সালিশ মানছে।

    মৈত্র বুঝতে পারল এই সামান্য সময়ে জাহাজে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেছে। সেটা কি ঠিক অনুমান করতে পারছে না। সকালের দিকে যখন যায় সে শুনেছিল, আর্চি আবার ছোটবাবুকে বিজে নামিয়ে দিয়েছে। সে ভেবেছিল একবার এ-নিয়ে একটা গণ্ডগোল পাকাবে। হোক না সে অফিসার, কিন্তু সে তো বাঙালী। তাকে এভাবে র‍্যাগিং করলে সহ্য করা হবে না। তারপর মনে হয়েছে নিজের বিষের জ্বালায় সে মরছে, কে ছোটবাবু, কে আর্চি, কে বাঙালী, কে তার দেশের মানুষ চুলোয় যাক—আর এখন সে দেখছে ছোটবাবু এমন একটা দুর্ঘটনার ভেতরও বেশ ঘুরে বেড়াতে পারছে। যেন তার কিছুই হয়নি।

    মৈত্র আরও শোনার জন্য উইণ্ডসেলের আড়ালে দাঁড়িয়ে গেল। তখন ছোটবাবু বলছে, আমার তো মনে হয় কাপ্তান এমনি বলেছেন

    —তুমি বিশ্বাস কর ছোটবাবু, আমি স্বার্থপরতার কথা সহজে ভাবিনি। যা বলেছিলাম, মিলে যাচ্ছে?

    ছোটবাবু চুপ করে থাকল। কিছু বলছে না।

    —তোমার মনে নেই, বলেছিলাম, জাহাজ মাটি টানার কাজ নেবে। জাহাজটার মাথামুণ্ডু এখন বুঝতে পারছি সত্যি কিছু নেই। তুমি বিশ্বাস কর ছোটবাবু এ-সব বলা অবশ্য ঠিক না, তুমি কিন্তু কাউকে বলবে না, তাহিতিতে আসার সময় ভুলে, কোর্স-লে আমি নিউ-প্লিমাথের করে ফেলেছিলাম। জাহাজ সেই কোর্স-লে ধরেই যাচ্ছে জানি। কিন্তু চোখের ওপর দেখেছি—তারপর যা বলল ডেভিড, শুনে মৈত্র হাঁ। এই তবে জাহাজ! এর সম্পর্কে ওরা অনেক কিছু কিংবদন্তীর মতো শুনেছে, কিন্তু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কিছু ছিল না। সে প্রায় উত্তেজনায় বলেই ফেলেছিল আর কি—মেজ-মালোম আপনি কী বলছেন!

    ডেভিড বেশ জোরে জোরেই বলল, কারণ যখন কেউ নেই পাশে, তখন জোরে বললে কি আর ক্ষতি হবে। ক্ষতি যা হবার তো হয়ে গেছে। সে বলল, সেজন্য আমি ভেবেছিলাম, ভাঙা জাহাজের কথা ভেবে জ্যাককে তিনি পাঠিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের আরও একবছর মিড়-সীতে, দ্বীপে দ্বীপে ঘোরা, যেন আমরা জাহাজের কলকব্জা। আমাদের বাড়ি যেতে ইচ্ছে হয় না। আমাদের ছেলে-বৌ নেই। তাই ভেবেছিলাম, কাপ্তান এটা স্বার্থপরের মতো কাজ করছেন। অথচ দ্যাখো কি বিস্ময়ের ব্যাপার বোট-ডেকে তিনি আমাদের বললেন, জ্যাক থাকছে। আপনাদের সঙ্গেই থাকছে। আশা করি আর আপনারা আমাকে স্বার্থপর ভাবতে পারবেন না।

    তারপর ডেভিড কেমন বলতে বলতে ক্ষেপে গেল—সোয়াইন! দ্য বাস্টার্ড! ও থট-রিডিং জানে ছোটবাবু। ও শুয়োরের বাচ্চা নিজেই একটা ভূত! ভূত না হলে ভুতুড়ে জাহাজ কে চালাতে পারে বল!

    ছোটবাবু বুঝতে পারছিল, ডেভিড কাপ্তানকে জুজুর মতো ভয় পায়। সামান্য কথায় না হলে কেউ এমন মুষড়ে পড়তে পারে না। সে বলল,তুমি অযথা ভয় পাচ্ছ ডেভিড। কাপ্তান এ-সব আদৌ হয়তো ভাবেনই নি।

    —কি যে বলছ না ছোট? জ্যাক থাকল তো আমাদের কি এল গেল!

    —কিছু না।

    —তবে! অথচ দ্যাখো কি কথা! আশা করি আপনারা আমাকে আর স্বার্থপর ভাববেন না।

    —ভাঙা জাহাজ, জাহাজ নিয়ে আরও এক বছর সমুদ্রে থাকা ভয়ের! জ্যাক নেমে গেলে এটা তো সবাই মনে করতেই পারে—কাপ্তান ভারি স্বার্থপর। তিনি হয়তো তাই ভেবে বলেছেন।

    —কি জানি। আমার ভাল লাগছে না জানো।

    মৈত্র বুঝতে পারল, জ্যাক শেষ পর্যন্ত জাহাজে থেকে গেছে। জ্যাককে নিয়ে কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে। জাহাজ এ-বন্দরে থাকছে মাসের মতো। মাল খালাস হবে। কাল থেকে জাহাজের চেহারা পাল্টে যাবে। জেটিতে কিনারার লোক, সারি সারি ট্রাক হারিয়া হাপিজ আর সারা ডেকময় সালফারের গুঁড়ো কুয়াশার মতো ভেসে বেড়াবে। যারা ফল্কায় কাজ করবে প্রত্যেকের মুখে কাপড় বাঁধা থাকবে। সালফার বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলে হাত-পা ভীষণ জ্বালা করে। তারপর জাহাজ কোথায় যাবে, কোন বন্দরে কেউ জানে না। ভাঙা জাহাজ না বলে ভূতুড়ে জাহাজই বলা ভাল।

    অন্ধকার জাহাজে হেঁটে যেতে পর্যন্ত গা ছমছম করছে মৈত্রের। সে আড়ালে আড়ালে উঠে যাচ্ছে। এখন সে যেন একা কিছুতেই অন্ধকারে নিচে আর নামতে পারবে না। ডেক-জাহাজীদের গ্যালিতে কেউ নেই। জাহাজে এমন অন্ধকার দেখেই হয়তো সবাই বন্দরে নেমে গেছে। আর তখনই মনে হল লণ্ঠন হাতে কেউ সিঁড়ি ধরে উঠে আসছে! এমন একটা বন্দরে লণ্ঠনের আলো দেখে সে আরও ঘাবড়ে গেল। কে উঠে আসছে! লণ্ঠনের আলোতে বন্দরে কেউ এভাবে উঠে আসে তার জানা নেই। গ্যাংওয়েতে মহসীন পাহারা দিচ্ছে। ওর চোখের সামনে মনে হল লণ্ঠনটা দুলছে।

    এমন অন্ধকারে যা হয়ে থাকে, সামান্য আলো দেখে প্রায় যেন সবাই সেদিকে ছুটছে। এবং বুঝতে পারল ডেকের অন্ধকারে এতক্ষণ সবাই প্রায় গাঢাকা দিয়ে ছিল। গাঢাকা, না জাহাজ মাটি টানার কাজে যাচ্ছে শুনে সবাই দিশেহারা! সবাই হতবাক হয়ে এতক্ষণ যে যেখানে দাঁড়িয়ে সারেঙের হাঁক শুনেছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে গেছে। আর নড়তে পারে নি। আলো দেখে সবার হুঁশ ফিরে এসেছে। ওরা নড়েচড়ে উঠেছে।

    ক্রমে লণ্ঠন পিছিলের দিকে চলে আসছে। দু’একজন ডেক-জাহাজি সঙ্গে। ঠিক পিছিলে উঠেই মৈত্রের মুখের ওপর লণ্ঠন তুলে বলল, জাহাজটা ভারতবর্ষ থেকে এসেছে না?

    মৈত্র বলল, হ্যাঁ। কেন বলুন তো! এবং মৈত্র বুঝতে পেরেছিল, সঙ্গের দু’ একজন ডেক-জাহাজিকে সে প্রশ্ন করেছে। ওরা ইংরেজী জানে না বলে কিছু বলতে পারে নি। মৈত্র অথবা অমিয়র কাছে শেষ পর্যন্ত ধরে আনতেই হত। ডেক-অফিসার, অথবা এনজিন-অফিসারদের কাছে নিয়ে যাবার সাহস নেই। কিংবা বেশ মজা করা যাবে, যখন এত সুন্দর ছিমছাম উজ্জ্বল বন্দরে সামান্য লণ্ঠনের আলোতে কেউ কিছু খুঁজে বেড়ায় নির্ঘাত মাথায় কিছু ছিট-ফিট আছে।

    বুড়ো মতো মানুষটি কিছু না বলে সহসা নাম ধরে চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। সে যেন কিছু হারিয়ে ফেলেছে এমন ভাব। আর তখন মৈত্র দেখল সোনালী চুলের মেয়ে অন্ধকার থেকে ছুটে এসেছে। এবং দেখে মনে হল, লজ্জায় অথবা সংকোচে সে বুড়ো মানুষটার সঙ্গে ছিল না। সে এসেই বলল, এই তো আমি।

    —কোথায় ছিলি! আচ্ছা দ্যাখুন তো কি অন্ধকার। এমন অন্ধকার তো জাহাজে কখনও থাকে না।

    মৈত্র বলল, জেনারেটর ফেল করেছে।

    —আচ্ছা, আপনারা সবাই ভারতীয় তো?

    মৈত্র বলল, আমরা সবাই। তারপরই বলল, না, সবাই না। আমরা দু’জন। আর একজন আছে। সে কেবিনে থাকে। তারপর কি হিসাব করে বলল, মোট ছ’জন। মৈত্র হিসেবের ভেতর ফাইভারকেও বাদ দিল না।

    —ভাল। বেশ ভাল। কিন্তু বড় বেশি অন্ধকার। অন্ধকার জানেন আমার একদম সহ্য হয় না।

    মৈত্র বুঝতে পারছে না এই রাতে এমন একটা ভিন্ন পরিবেশে এই অপরিচিত বুড়ো মানুষটি কিসের আশায় জাহাজে উঠে এসেছে। যুবতী মেয়েটির ভীষণ সংকোচ, সে প্রায় সময় বুড়ো মানুষটার আড়ালে থাকতে ভালবাসছে। এতগুলো ক্ষুধার্ত নেকড়ের ভেতর যুবতীকে তার ভাল লাগল না। মানুষটি কি জানে না জাহাজে এভাবে এমন অন্ধকারে উঠে আসতে নেই। মানুষটিকে তো পুরো ইংরেজ মনে হচ্ছে। মাউরি সম্প্রদায়ের হলে তবু কথা ছিল, আর মানুষ সংগ্রহের জন্য এলে এখানে সে আসবে কেন। তার আরও বেশি আশা করা উচিত।

    তখন বুড়ো মানুষটি বলল, আলো জ্বলবে না?

    —বুঝতে পারছি না।

    —একটু ভেতরে নামা যেত তবে!

    অদ্ভুত সব কাণ্ড-কারখানার ভেতর মৈত্রের দিন কেটেছে। এখন আবার এই ঝামেলা। ওর শরীর তেমন মজবুত নয়। সে আগের মতো নেই। আগের মতো থাকলে এতটা বিরক্ত হত না। বরং এই যে যুবতী মেয়ে আড়ালে আড়ালে থাকতে চাইছে কখনও তার সাদা গাউন, হলুদ জ্যাকেট দেখা যাচ্ছে, কখনও যাচ্ছে না, কেমন মোহময়ী এবং এই অন্ধকারে এত বড় প্রলোভন থেকে সে কিছুতেই নিজেকে রক্ষা করতে পারত না। শুধু সেই মেয়ে ম্যাণ্ডেলা আর মিকি-মাউসের মতো বাড়িটা এবং শেফালীর মুখ, তার জাতক তাকে এখন ভালো মানুষ হয়ে যেতে বলছে। সে তখন সামান্য ধমকের সুরেই বলল, নিচে নেমে কি হবে?

    —কথা ছিল!

    —কি কথা?

    —এই বলছিলাম আপনারা যদি রোববার আমার বাড়িতে আসেন।

    মৈত্র সত্যি খুব রেগে গেল। সে প্রায় বলেই ফেলেছিল, এখানে এ-সব চলবে না। যান। কিন্তু সে বলার আগেই মেয়েটি সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, আমার দাদু আপনাদের নেমন্তন্ন করতে এসেছেন। আজই পত্রিকাতে দেখেছে—সিউল-ব্যাংক পোর্ট ধরছে।

    মৈত্র দেখল চারপাশে তখন আরও অনেক জাহাজি। সবাই প্রায় ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। যে যেখানে ছিল এসে গেছে। এই অন্ধকারে আর কারো যেন গা ছমছম করছে না। মনে হচ্ছে একটা আশ্চর্য জিনিস মিলে গেছে, জাহাজে এ-সব থাকলে বুঝি ভয় থাকে না, গা ছমছম করে না।

    এবার কেন জানি যুবতীকে তেমন অবহেলা করার মতো মনে হল না। যুবতী ধীর স্থির। সহজভাবে কথা বলছে। মৈত্র বলল, চলুন বসবেন।

    ভেতরে ঢোকার মুখেই আলো জ্বলে গেল। সবাই হাততালি দিয়ে উঠল। নিমেষে জাহাজটা যেন প্রাণ পেয়ে গেল। মৈত্র বলল, আলোটা এবার নিভিয়ে দিন।

    মেয়েটি বলল, আলোটা থাক। সে আলোটা একটু কমিয়ে এক পাশে রেখে দেবার সময় বলল, এই আপনার কেবিন! মেয়েটি ছোটবাবু যে বাংকে থাকত দাদুকে নিয়ে সেখানে বসে গেল। বলল, আমার নাম মিস ক্যাথারিন উড। এবং সে তার দাদুর নাম বলে ফোকসালের চারপাশটা দেখতে থাকল।

    মৈত্র দেখল ভিড় চারপাশে। বঙ্কু, মজুমদার, মনু এবং অন্য অনেকে দরজায় ভিড় করেছে। মৈত্র এক ধমক লাগাল।—এখানে কী। অসভ্যের মত দাঁড়িয়ে আছিস। যা, যা বলছি।

    কেউ গেল। কেউ গেল না। মৈত্র তাদের ভিতরে বসতে বলল।

    ক্যাথারিন তখন দাদুর দিকে তাকাল। এবারে বল।

    মি. উড বললেন, ক’দিন জাহাজ থাকছে?

    মৈত্র বলল, মাসখানেক হয়ে যাবে।

    —ক্রিসমাসের উৎসব পর্যন্ত তাহলে আছেন?

    —আছি।

    —বেশ বেশ। খুব উৎফুল্ল দেখাল মি. উডকে। আমরা থাকি শহরের শেষ মাথায়। শহরের একটু বাইরে বলতে পারেন। খামার আছে, কিছু হাঁস মুরগী ভেড়ার পাল আছে। জায়গাটা আপনাদের ভাল লাগবে। এই আমার নাতনি আর আমি আছি। আমাদের আর কেউ নেই। আমি ভারতবর্ষের মানুষ। ঠাকুর্দার বাবা ভারতবর্ষে বিহারে সিংভূম অঞ্চলে খনির ইজারাদার ছিলেন।

    মৈত্র আর খারাপ কিছু ভাবতে পারল না। অমিয় না থাকায় যেন ভালই হয়েছে। থাকলে ভীষণ ঝামেলা বাধাত। সে বলল। আপনারা এ-দেশে কবে এসেছেন?

    মি. উড বলতে সংকোচ বোধ করছিলেন।

    তখন ক্যাথারিন দাদুর হয়ে বলল, ভারতবর্ষ স্বাধীন হলে দাদু এখানে চলে আসেন। ক্যাথারিন ঘড়ি দেখে বলল, আপনারা রোববারের রাতে আমাদের সঙ্গে খাবেন। ভারতবর্ষের মানুষ এ-বন্দরে এসে ফিরে গেছে, একবেলা তিনি খাওয়াতে পারেন নি, এটা আমরা ভাবতে পারি না। আমাদের খামার, চাষাবাদ দেখলে আপনাদের ভালই লাগবে।

    —একটু বসুন। আমি আসছি। সে ছোটবাবুকে ডাকতে গেল। ওর আবার সময় হবে কিনা। এই বলে সে কিছুক্ষণের ভেতরে ছোটবাবুকে নিয়ে এলে, ক্যাথারিন ছোটবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকল। ছোটবাবু মেয়েদের দিকে সোজাসুজি তাকাতে পারে না। সে মেয়ে দেখে বরং একটু হকচকিয়ে গেল। মৈত্রদা কিছু ভেঙে বলে নি।

    তখন মৈত্র বলল, এই আমাদের ছোটবাবু। ক্যাথারিন তুমি ওকে বলে যাও।

    ক্যাথারিন বলল, আমার দাদুর ইচ্ছে রোববার রাতে আপনারা আমাদের সঙ্গে আহার করেন।

    ছোটবাবু মৈত্রদার দিকে তাকাল। সে কি বলে।

    মৈত্র বলল, আমরা যাব।

    ছোটবাবু বলল, ভারি মজার ব্যাপার।

    ক্যাথারিন বাংলা ভাষা বোঝে না। তবু অপলক তাকিয়ে ছোটবাবুর কথা যেন শুনছে। ছোটবাবু ফ্লানেলের বুকখোলা শার্ট পরেছে। ফ্লানেলের পাজামা। ছোটবাবুর, পুষ্ট শরীর এবং আশ্চর্য সজীব গন্ধ সমুদ্রের। দূর সমুদ্রের নাবিকেরা ডাঙা দেখলে যেভাবে আকুল হয়ে পড়ে, ছোটবাবুর কথাবার্তা শোনার তেমনি একটা তীব্র আকুলতা বোধ করছে ক্যাথারিন। ওর চোখ মুখ দেখে মৈত্র এটা ধরতে পেরেছে।

    মৈত্র বলল, আমরা যাব।

    ক্যাথারিন বলল, আমি আপনাদের নিয়ে যাব।

    আর মৈত্র সে-রাতেই একটা আশ্চর্য স্বপ্ন দেখল। সারারাত সে একই স্বপ্নে যেন ঘুরে ঘুরে বৃত্তাকার চঞ্চলতার ভেতর ডুবে যাচ্ছিল। স্বপ্নে সে মৈত্র থাকল না। বাংলাদেশের নাবিক বসন্তনিবাস হয়ে গেল। সে বন্দরে এলেই ছোট ছোট শিশুরা টের পেয়ে যায়—শহরে বসন্তনিবাস এসে গেছে। পার্কে ছোট ছোট মেয়েরা ছেলেরা তখন সকাল সকাল খেলতে চলে আসে।

    তার গায়ে লম্বা আলখেল্লা। লাল আর রুপোলী রঙের রাংতা আঁটা এবং রাংতার ওপর বিচি বর্ণের সব খেলনা সেপটিপিন দিয়ে আটকানো। সে নানারকম দ্বীপ থেকে খেলনা কিনে নিয়ে যায়। মরিশাসের কাঠের হাতি, কলম্বোর উদ্‌বেড়াল আর হাবসী দ্বীপের কাঠবেড়ালি ওর বড় প্রিয়। যখন সে হাঁটে খেলনাগুলো নেচে বেড়ায় শরীরে। পাখিরা সব উড়ে আসে সমুদ্র থেকে। মাথায় থাকে তার নীল রংয়ের টুপি, টুপিতে ময়ূরের পালক। পালকটা বাতাসে নড়লে আশ্চর্য মানুষ হয়ে যায় সে। কিছু প্রজাপতি উড়ে আসে তখন বন থেকে। শিশুরা বালিকারা চারপাশে লাফায়। সে শরীর থেকে খুলে খুলে খেলনাগুলো ওদের দিয়ে দেয়। সে এভাবে ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে ভালবাসে। আর কোথাও যায় না। কাজ শেষ হলেই পার্কের কাছে একটা দেবদারু গাছের নিচে এসে বসে থাকে।

    তার আর অন্য জাহাজিদের মতো সরাইখানায় খেয়ে দেয়ে ফূর্তি করতে ভাল লাগে না। বরং লম্বা বুটজুতো পরে সে যখন হাঁটে, নিজের ভেতরে এক আশ্চর্য মানুষ আছে, সে টের পেয়ে যায়। জাহাজে ফিরে এসে টুপিটা খোলার সময়, সন্তর্পণে পালকটা খুলে রাখে। ওটা খোয়া গেলে সে আর আশ্চর্য মানুষ থাকবে না। পাখিরা উড়ে আসবে না সমুদ্র থেকে। মাথার ওপর থেকে প্রজাপতিরা ফিরে যাবে বনে। তার প্রাণের চেয়ে বেশি মায়া হয় তখন পালকটার জন্য। পালকটা হারিয়ে গেলে সে ফের সাধারণ মানুষ হয়ে যাবে। স্বপ্নটা কিছুতেই শেষ হচ্ছে না।

    সে জাহাজে ফিরে দেখল, মাথায় তার পালক নেই। সে বুঝতে পারল ওটা ওরা কেউ নিয়ে গেছে। সে ওদের নিয়ে সমুদ্রের ধারে ধারে গান গেয়ে বেড়াচ্ছিল। বাংলাদেশের গান গাইছিল। অথবা চারপাশে ওরা যখন হাত ধরে গোল হয়ে পা তুলে নাচছিল তখন কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে।

    সে আবার ফিরে গেল দেবদারু গাছটার নিচে। ওরা আসবে। সে সবাইকে পালকের কথা বলবে ভাবল। কিন্তু আশ্চর্য, সবাই এসেছে। কেবল ম্যাণ্ডেলা আসে নি। সে হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের ধারে সেই মিকি-মাউসের মতো বাড়িটার দিকে চলে যেতে থাকল। সে পৌঁছে দেখল, ম্যাণ্ডেলাদের বাড়ির সামনে একটা সিলভার ওকের গাছ আছে। গাছটা দেখেই বাড়িটা চিনতে পারল। মনে হচ্ছে বাড়িটা খালি, কেউ নেই। কেবল ছোট ঝাউগাছের নিচে সে দেখতে পেল একটা ক্যাঙ্গারুর বাচ্ছা। সে ওকেই বলল, ম্যাণ্ডেলা বাড়িতে আছে?

    ক্যাঙ্গরুর বাচ্চাটা কক-কক করে ডাকতেই একটা লাল রঙের জানালা খুলে গেল, ম্যাণ্ডেলার শুকনো মুখ ভেসে উঠল। তার কেমন মায়া বেড়ে গেল। যেন ম্যাণ্ডেলা সত্যি ধরা পড়ে গেছে।

    সে বলল, কাউকে বলব না ম্যাণ্ডেলা। তুমি আমার পালক চুরি করেছ কাউকে বলব না। পালকটা আমাকে ফিরিয়ে দাও।

    ম্যাণ্ডেলা কেমন কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, ওটা আমার মা’কে এনে দিয়েছি বসন্তনিবাস। আমার মা একটা ময়ূরের পালক স্বপ্নে দেখেছে। এক রাজা বিদেশ থেকে এসেছে, তার মাথায় ময়ূরের পালক। তোমাকে আমার সেই রাজা মনে হয়েছে। আমার মায়ের খুব অসুখ।

    স্বপ্নটা কিছুতেই শেষ হচ্ছিল না।

    একটু থেমে বলল ম্যাণ্ডেলা, রাতে মা’র স্বপ্নটা আমিও দেখেছি। দেখলাম, পালকটা এনে মায়ের শিয়রে রেখে দিতেই মা ভাল হয়ে উঠছে। তুমি আমার মাকে দেখবে?

    সে ম্যাণ্ডেলার হাত ধরে ঘরে ঢুকে গেছে। সে দেখল, পাতলা মসলিনে শরীর ঢেকে ম্যাণ্ডেলার মা শুয়ে আছে। মুখ কেমন নীল হয়ে গেছে। চোখ দু’টো আশ্চর্য তাজা।

    আর ওটা ফিরিয়ে নেবার ইচ্ছে হল না তার। যদিও সে জানে বন্দরে ওটা পরে বের হতে না পারলে বসন্তনিবাস পাগল হয়ে যেতে পারে। পালকটা যেন এক সন্ত-মানুষ তাকে দিয়েছিল। বলেছিল, বন্দরে যাবি ওটা মাথায় পরবি। নীল আকাশের নিচে হেঁটে গেলে দেখতে পাবি সমুদ্র থেকে সব পাখিরা, বন থেকে সব প্রজাপতিরা উড়ে আসছে। ওটা পরলে তুই এক দামী মানুষ হয়ে যাবি।

    তবু কেন জানি ম্যাণ্ডেলার শুকনো মুখ, ওর মায়ের আশ্চর্য তাজা চোখ দেখে ওটা ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছে হল না বসন্তনিবাসের। সে একা একা ফিরে এল জাহাজে। পাখিরা অথবা প্রজাপতিরা আর কেউ মাথার ওপর উড়ে এল না।

    বসন্তনিবাস সাধারণ মানুষ হয়ে যেতেই মৈত্রের ঘুম ভেঙে গেল। স্বপ্নটা শেষ হয়ে গৈল। ধড়ফড় করে উঠে বসল। দেখল, অমিয় জাহাজে ফেরেনি। ওর বাংক খালি। খাবার ঢাকা পড়ে আছে। দরজা খোলা। সে দরজা বন্ধ করে ফের শুয়ে পড়ল। শুয়ে পড়ার সময় মনে হল ম্যাণ্ডেলার মা’র মুখ অতীব তার চেনা। কোথায় যেন তাকে সে দেখেছে। বুঝতে পারল স্বপ্নে সারাক্ষণ এলসা দ্য কেলিকে সে দেখেছে। শেফালী হয়তো। ঠিক তেমনি একজন সমুদ্রগামী মানুষের ঘরে ফেরার প্রতীক্ষায় শুয়ে আছে। এবং শেফালীর কথা ভাবতে ভাবতে সে আর সারারাত কিছুতেই ঘুমোতে পারল না।

  • বত্রিশ

    বত্রিশ

    ।। বত্ৰিশ।।

    সকাল থেকে ভীষণ কুয়াশা। চারপাশের কিছু দেখা যাচ্ছে না। আবার ঠাণ্ডা জোর পড়েছে। রবিবার বলে জাহাজিদের ছুটি। কুয়াশার আবছা অন্ধকারে গোটা বন্দর এলাকা একেবারে ডুবে আছে। পাশের মানুষটিকে পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না, কেবল জাহাজের ভোঁ ভোঁ শব্দ। মোটর-বোটগুলো ভীষণ হাঁকছে। আবছা অন্ধকারে কিছু দেখতে পাচ্ছে না বলে কেবল ভোঁ ভোঁ করছে। আর্চি জাহাজেই আছে। বের হচ্ছে না। গতকাল বিকেলে বের হয়ে সে ভীষণ ঝামেলায় পড়ে গিয়েছিল। এমন হবে যদি জানত, তবে বের হত না।

    বন্দর এলাকাতে সে টের পায় নি, সবাই ওকে দেখছে। সবারই চোখ ট্যারা কারণ মানুষের মুখ বাঘের মতো হয়ে যায় দেখতে, আর্চিকে দেখার আগে তারা তা জানত না। শহরে সে গিয়েছিল কিছু কেনা-কাটা করবে বলে। পিকাকোরা পার্কে ঘুরে বেড়াবে ভেবেছিল। যদি কোনও মাউরি মেয়ের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়ে যায়। শুঁড়িখানায় ঢুকে মেয়েদের খোঁজ খবর নিয়েছিল, এমনকি বন্দর থেকে বের হবার মুখে দু-এক জায়গায় খোঁজ করতে গিয়ে দেখেছে বৃথা। খোঁজ খবর সে পায় নি, এবং দেখাসাক্ষাৎ হয় নি তা ঠিক না। ওকে দেখলেই—সবাই এত বেশি হাসাহাসি করেছে অথবা দরদামে এমন একটা ভাব দেখিয়েছে আর্চির পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেছে। যত পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যাচ্ছে তত ক্ষেপে যাচ্ছিল। জাহাজে বালিকা যুবতী হচ্ছে, আর বালিকা যে তার হাত কামড়ে দিয়েছিল প্রায়, ছেড়ে না দিলে ঠিক কামড়ে দিত, এ-সব ভেবে সে আজ সকাল থেকেই মদ খাচ্ছে।

    আর্চি দরজা বন্ধ করে বসে রয়েছে। মেস-রুম-বয় মাঝে মাঝে ডাকলে হাজিরা দিচ্ছে। আর কিছু না। জাহাজের কাজকাম শেষ হয় না। সবাইকে কাজ ভাগ করে দিয়েছে। ছোটবাবুকে বিল্‌জে পাঠাতে পারলে সে যেন প্রতিশোধ নিতে পারত। কিন্তু সে আর পাঠাতে পারছে না। সবাইকে নামতে হবে, একদিন ছ’নম্বর নামলে দ্বিতীয় দিন পাঁচ নম্বর, এভাবে ঘুরে ঘুরে সবাই কাজটা করবে। সে যত মদ খাচ্ছিল তত বুঝতে পারছে জাহাজে এভাবে সে সবাইকে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে না। কাপ্তান টের পেয়ে গেছে, ছোটবাবুকে অহেতুক বিজের ভেতর সে ফেলে রেখেছিল। বিন্জ-পাম্প ঠিক কাজ করছে, কোথাও কোনো বাল্ব আর্চি ইচ্ছে করে এঁটে দিয়েছিল এবং বিজে জল জমিয়ে এটা করেছে তিনি তা টের পেয়েছেন। এটা ওর উন্নতির পক্ষে ক্ষতিকর। সে এখন কিভাবে যে ছোটবাবুকে ফের নাজেহাল করবে বুঝতে পারছে না। উপায় উদ্ভাবনের জন্য সে কেবল পায়চারি করছে। গতকাল শহরের শিশুরা ওকে একটা অদ্ভুত জীব ভেবে পেছনে পর্যন্ত লেগেছিল।

    আর তখন ছোটবাবু লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে ডেকে। কান খাড়া করে রেখেছে। বারোটার ঘণ্টা বাজলেই ছুটি। যা কাজ দিয়েছে মেজ-মিস্ত্রী সে আর চার নম্বর মিলে বারোটার ভেতর শেষ করে ফেলতে পারবে। রবিবারে কাজকর্ম কাপ্তান খুব একটা পছন্দ করেন না। অন্তত বন্দরে একটা দিন সপ্তাহে ছুটি থাকবে না, একটা দিন সপ্তাহে ডাঙায় নেমে হৈ-চৈ করবে না, তা হয় না। এত লম্বা সফরে জাহাজিদের মন-মেজাজ ঠিকঠাক রাখা চাই। মেজ-মিস্ত্রী খুব কাজ দেখাচ্ছে।

    সুতরাং বারোটার পর তার ছুটি। সে ভাল করে স্নান করবে। বেশ গরম জলে স্নান। তারপর ডাইনিং হলে আহার। এবং বার বার মনে হচ্ছিল সে আসছে। ক্যাথারিন আসছে। তাদের নিতে আসবে ক্যাথারিন।

    জ্যাকের সঙ্গে আবার কথা বন্ধ। সে তার বাবার কাছে অথবা কেবিনে থাকছে। মাঝে মাঝে ফানেলের গুঁড়িতে চিপিঙ করার ছুতোয় বসে থাকছে। সে পাশ কাটিয়ে গেলে আগের মতো ছুটে আসছে না। সে যদি কথা বলে সেই ভয়ে যেন জ্যাক কাজে বেশি মনোযোগী হয়ে যাচ্ছে। জ্যাক কাজে বেশী মনোযোগী হয়ে গেলে ছোটবাবু কথা বলতে আর সাহস পায় না। জ্যাকের চুল শুধু পেছন থেকে দেখতে পায়। চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে। নীলাভ চুলে সোনালী সূর্য মাঝে মাঝে কিরণ দিলে, সে থমকে দাঁড়ায়। বালিকার মতো কেন যে মনে হয় তখন জ্যাককে। সে দাঁড়িয়ে পড়ে।

    এবং এভাবে ওর ভারি ইচ্ছে ছিল বলে, জ্যাক, ক্যাথারিন আসছে।

    কিন্তু জ্যাক কোনো কথাই বলতে চায় না। সে বলতেই পারে নি, জ্যাক ক্যাথারিন আসছে। তুমি যাবে আমাদের সঙ্গে?

    সে গতকাল সন্ধ্যায় নিচে নেমে যাবার সময় দেখেছে, জ্যাক বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। সারাদিন জ্যাক ওপরে ছিল। দিনের বেলাতে বাইরে বের হওয়া যাচ্ছে না, কেবল সারা ডেকময় সালফারের গুঁড়ো উড়ছে। সবাই মাথায় টুপি পরে এবং রুমাল বেঁধে মুখ ঢেকে কাজকর্ম করছে। জ্যাক বোধ হয় এত নোংরা ঘাঁটতে পছন্দ করে না। সে সারাদিন বাপের সঙ্গে ব্রীজেই প্রায় বসেছিল। একবার নিচে থেকে বলার ইচ্ছে ছিল, যাবে নাকি জ্যাক। আমরা পিকাকোরা পার্কে ঘুরতে যাচ্ছি। আগামীকাল মিস ক্যাথারিন আসছে। ভারী সুন্দর মেয়ে। কথা বললে বুঝতে পারতে ক্যাথারিন কত ভালো মেয়ে।

    মিস ক্যাথারিন উড, ভারী সুন্দর নাম মেয়ের। সে একবার মাত্র মুখ তুলে দেখেছিল। ভাল করে দেখেও নি। ক্যাথারিন ওকে চুরি করে দেখছিল। সে যে কেন ভাল করে দেখতে পারল না। একবার সেও চুরি করে দেখবে ভেবেছিল। কিন্তু যদি চোখে চোখ পড়ে যায়। ওকে বেহায়া ভাবতে পারে। তারপর আর সে জানেই না ক্যাথারিন দেখতে কেমন। চার-পাঁচ দিনেই ক্যাথারিন ওকে ভীষণ চঞ্চল করে তুলেছে। এ-বয়সে মেয়েদের জন্য এমন, আরও বড় হলে সে কি না করে ফেলবে।

    দুপুরের দিকে কুয়াশা পাতলা হয়ে যাচ্ছে। ছোটবাবু স্নানাহার শেষে বেশ পরিপাটি বেশভূষায় নিজের কেবিনে বসে রয়েছে। ক্যাথারিন আসছে, সে ডেভিডকে পর্যন্ত বলে নি। সে কেবিনের কোথাও এতটুকু অপরিচ্ছন্ন রাখে নি। যে লোকটা গোলাপ ফুলের তোড়া দিয়ে যায় সে তাকে আজ সবার চেয়ে বড় ফুলের গুচ্ছ দিতে বলেছিল। সাদা গোলাপের গুচ্ছ। ফলদানিতে গোলাপগুচ্ছ। শিশিরে ভেজা গন্ধ এত টাটকা যে সে মাঝে মাঝে নিশ্বাস টেনে নিচ্ছিল। ক্যাথারিন এলেই মৈত্রদা এখানে নিয়ে আসবে।

    ছোটবাবু তার মায়ের ছবিটা মুছে ফের টানিয়ে রাখছে। একটা সুন্দর মেয়ের ছবি ক্যালেণ্ডারের পাতায় বেশ হাসছে। সে এখন যেন ছবির মেয়েটাকেই ক্যাথারিন ভাবছে। কেমন লাগছে কেবিনটা। ভাল লাগছে না। তোমরা মেয়েরা ভাল না বললে আমাদের কিছু ভাল লাগে না।

    টিপয়ের ওপর কিছু বই। কোথায় কি রাখলে ভাল দেখাবে, একবার যদি জ্যাককে ডেকে এনে দেখাতে পারত। জ্যাক কি করছে! সে জ্যাকের সঙ্গে এ-ব্যাপারে কথা না বলে যেন স্বস্তি পাচ্ছে না। জ্যাকের কেবিনে ঢুকে দেখেছে যেখানে যা রাখলে ঠিক ঠিক মানায় জ্যাক ঠিক সেভাবে সব সাজিয়ে রাখতে জানে। বয়-বাবুর্চিদের কাজ তার পছন্দ না। সে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে ডাকল, জ্যাক।

    জ্যাক কেবিনে নেই। জ্যাক বোট-ডেকে একটা ডেক-চেয়ারে চুপচাপ বসে বই পড়ছে। সে পেছনে দাঁড়িয়ে ডাকল, জ্যাক আমার কেবিনে একটু আসবে?

    জ্যাক চারপাশে সন্তর্পণে কি দেখল। তারপর বলল, তুমি যাও। আমি যাচ্ছি।

    সে নিচে নেমে ভেবেছিল, জ্যাকের আসতে দেরি হবে। অথবা জ্যাক এখন আসছে না। ওকে এড়িয়ে যাচ্ছে। মৈত্রদার ফোকসালে যেতে পারত। সকাল থেকে সে একবারও অমিয়কে দেখে নি। কে কে যাচ্ছে তাও ঠিক জানে না। বাংকের সাদা চাদরে ফুল-লতাপাতা আঁকা। এবং একেবারে পাটভাঙা বলে বেশ মনোরম। সে চাদরটা ভাল করে টেনে দিল। সাদা দেয়ালে সামান্য কালো দাগ, সে তাড়াতাড়ি সাবান জল এনে মুছে সবকিছু পরিচ্ছন্ন করে দেবার সময় দেখল, জ্যাক দরজা খুলে ঢুকছে। এবং ধীরে ধীরে কেবিনের দরজা বন্ধ করে অনেকটা নিশ্চিন্ত গলায় বলছে, কী, আমাকে ডেকেছ কেন?

    ছোটবাবু বলল, কেবিনটা দেখে কিছু মনে হচ্ছে না?

    –কী মনে হবে?

    ছোটবাবু কেমন দমে গেল। তার অগোছালো কেবিন এমন পরিপাটি জ্যাক কবে দেখেছে! জ্যাক কিছু বুঝতে পারছে না কেন? সে বলল, বারে, তুমি দেখছ না কোথাও এতটুকু ময়লা নেই। সুন্দর গোলাপের গুচ্ছ ফুলদানিতে!

    —সে তো দেখতে পাচ্ছি।

    —তবে! সব ঠিকঠাক আছে, তাই না?

    জ্যাক বুঝতে পারল না ছোটবাবু কি বলতে চাইছে।

    —এই যেখানে যা রাখা দরকার।

    জ্যাক বলল, না। হয় নি। ফুলদানিটা তো ঠিক রাখো নি। আর ওখানে ওভাবে বই রাখে? লকারের মাথায় ওটা কি ঝুলছে!

    ছোটবাবু প্রায় জিভে কামড় বসিয়ে দিয়েছিল।—তাই তো। ওর নোংরা বয়লার স্যুট, লকারের মাথায় ফুলে ফেঁপে থাকায় দেখা যাচ্ছে। জ্যাক যেখানে দাঁড়িয়েছে সেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়! সে তাড়াতাড়ি লাফিয়ে বাংকে উঠে গেল। বয়লার স্যুটটা চাপা দিয়ে বলল, এবার?

    জ্যাক নিজেই হাত লাগাল। এবং জ্যাক যেন এ-কেবিনে এসে প্রাণ পেয়ে গেছে। সে অজস্র কথা বলছে আর কাজে হাত লাগিয়ে এমন চেহারা করে ফেলল কেবিনটার যে ছোটবাবু দেখে অবাক। সে বুঝতে পেরেছিল কেবিনটাকে সে আগের মতোই এলোমেলো করে রেখেছে। কেবল জায়গা বদল ছাড়া এতক্ষণ সে কিছুই করতে পারে নি।

    জ্যাক কাজ করতে করতে বলেছিল, হঠাৎ তোমার এমন সুমতি ছোটবাবু!

    —আর বলবে না। ক্যাথারিন আসছে।

    —ক্যাথারিন! কেমন সহসা কর্কশ গলায় জ্যাক বেঁকে দাঁড়াল। কাজে হাত নেই। সে যেন বজ্রপাতে স্থির।

    —মিস ক্যাথারিন উড, ভারী সুন্দর মেয়ে। সে আজ আমাদের নিয়ে যাবে। এলে তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।

    জ্যাক চিৎকার করে বলল, না।

    ছোটবাবু একেবারে থ। সে বলল, না কেন? তোমার ভাল লাগবে জ্যাক। আমার কি যে ভাল লেগেছে। ওর সঙ্গে কথা বললে তোমারও ভাল লাগবে।

    জ্যাক সহসা যা কিছু আছে এই কেবিনে, সে যেভাবে যা কিছু সাজিয়েছিল, নিমেষে কেমন পাগলের মতো লণ্ডভণ্ড করে দিতে থাকল। আর বলতে থাকল, তুমি একটা নচ্ছার পাজি। তুমি নরক ছোটবাবু।

    ছোটবাবু হতাশ। জ্যাক মেয়ের কথায় আবার ক্ষেপে গেছে। সেই ভয়ঙ্কর চোখ। যেন জ্যাক এক্ষুনি এ-কেবিনে আগুন ধরিয়ে দেবে এবং সে যখন দেখল জ্যাক মুহূর্তে ওর সুন্দর ফুলদানিটা আছাড় মেরে ভেঙে ফেলছে তখন আর স্থির থাকতে পারল না। সে বলল, জ্যাক প্লিজ। আমি আর তোমাকে ডাকব না। তুমি ওটা ভেঙে ফেলো না। এবং হাত ধরে ফেললে জ্যাক কেমন আরও পাগলের মতো হাত ছিনিয়ে নিল। তারপর দু’হাতে ছোটবাবুর ফ্লানেলের শার্ট ছেঁড়া কাগজের মতো ছিঁড়ে দরজা খুলে ছুটে বেরিয়ে গেল। ছোটবাবু পাথরের মতো স্থির। একটা আর কথা বলতে পারছে না। আয়নায় নিজের ছেঁড়া পোশাকের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হল। জ্যাক তুমি পাগল। তুমি আমার এমন সুন্দর দিনটা এভাবে নষ্ট করে দিলে!

    তখন মৈত্রদার গলা—ছোট আছিস?

    ছোটবাবু তাড়াতাড়ি বিছানার চাদারটা টেনে গায়ে জড়িয়ে ফেলল। বলল, একটু দাঁড়াও। তাড়াতাড়ি সে ভাঙা ফুলদানি গোলাপের পাপড়ি সংগ্রহ করার সময় দেখল ক্যাথারিনকে নিয়ে মৈত্রদা ঢুকে যাচ্ছে। ঢুকেই মৈত্র অবাক। ঘরটাতে যেন এখুনি একটা খণ্ডযুদ্ধ হয়ে গেছে। মৈত্র বলল, ছোটবাবুর কেবিন।

    ছোটবাবু বলল, এই আমার কেবিন। বস।

    মৈত্র বলল, ফুলদানিটা হাত থেকে ফেলে ভেঙেছিস?

    ছোটবাবু বলল, হ্যাঁ। পড়ে গেল।

    —বাংকের এ অবস্থা কেনরে? ভারি নোংরা তুই। এমন সুন্দর কেবিনটাকে কি করে রেখেছিস? ছোটবাবু বলল, সময় পাই না দাদা। একবার ইচ্ছে হল বলে, নচ্ছার ছেলেটা আবার আমার পেছনে লেগেছে। চিৎকার করে বলতে পারলে যেন তার দুঃখ হতাশা লাঘব হত। কিন্তু সে বলতে গিয়েও থেমে গেছে। কাপ্তানের ছেলে জ্যাক। সারেঙসাব বার বার তাকে সতর্ক করেছেন। সে তার বোকামির জন্য ভুগছে—কে কি করতে পারে।

    মৈত্র বলল, ক্যাথারিন তুমি কিছু মনে করবে না। আমাদের ছোটবাবুর ভারি অগোছালো স্বভাব।

    —না-না। এ-বয়সে এটা হয়।

    ছোটবাবুর বলতে ইচ্ছে হয়েছিল—হ্যাঁ হয়। তুমি আমাকে আর শেখাবে না। কিন্তু মুখে সামান্য হাসি ফুটিয়ে বলল, কখন এলে?

    —এই এক্ষুনি।

    মৈত্রদার দিকে তাকিয়ে ছোটবাবু বাংলায় বলল, ওকে তোমার ফোকসালে নিয়ে বসাও। আমি যাচ্ছি। ছোটবাবুকে ভীষণ রাগী দেখাচ্ছিল। মৈত্র কেন জানি ছোটবাবুর সঙ্গে আর একটা কথা বলতে সাহস পেল না। সে ক্যাথারিনকে নিয়ে ডেক পার হয়ে গেল। এবং ক্যাথারিন এসেছে, জাহাজে ডেকের ওপর তাকে দেখা গেছে, সবার মুখে তখন যেন একটাই শব্দ, মেয়ের নাম ক্যাথারিন। পাতলা ভয়েলের স্কার্ট, এবং হাঁটুর নিচে খালি পায়ের সুচারু দৃশ্য। হাতে সাদা দস্তানা। এবং সোনালী চুল। স্কার্টের ওপর মীনা করা রঙ্গীন কাঁচের প্রজাপতি। এবং চোখ ভারি সুন্দর মেয়েটার। নাক একটু চাপা। থুতনির এক পাশে প্রজাপতির মতো দ্বীপবাসীদের ছোট উল্কি আঁকা। আর সুগন্ধ শরীরে। তখন সব নাবিকেরা যে যার খাবার ফেলে উঁকি মেরে দেখছিল।

    তারপর এক সময় ছোটবাবু, মৈত্র, বন্ধু, অনিমেষ নেমে যেতে থাকল। অমিয় নেই। সকাল থেকে সে কোথায় বের হয়েছে। সংগোপনে সে কিছু একটা করছে। ওরা যেতে যেতে দেখতে পেল না, ঠিক ওপরে তখন বোট ডেকের কোনো কেবিনে দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া লুকিয়ে কেউ দেখতে পারে। এবং ওরা বুঝতে পারছে না, জ্যাক পোর্ট-হল থেকে অপলক দেখছে। ছোটবাবুর পাশে সেই মেয়েটা। মেয়েটার মুখ সে দেখতে পাচ্ছে। ওরই মতো লম্বা। চুল সোনালী—কি সুন্দর পোশাক পরে এসেছে। ছোটবাবুকে নিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। কেমন যাদুমন্ত্রের মতো ছোটবাবুর পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে। আর এক অতীব অধীরতা। ওর ভেতরে হাহাকার বাজছে। সে ছোটবাবুর কেবিনে যা সব করে এসেছে! আর এ-সব ভেবে সে ভীষণ ম্রিয়মাণ। কেবল ওদের চলে যাওয়া দেখছে। পোর্টের ওপাশে ওরা হারিয়ে গেল। ক্রেনের ছায়া পার হলে ছোট পাহাড়ী উপত্যকাতে ওরা উঠে গেল। আর জ্যাক একান্তে সে-সব দেখতে দেখতে কি করবে স্থির করতে পারল না।

    আয়নায় সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। নিজেকে দেখল। সে এবার ওর সবচেয়ে ভাল পোশাক এবং দামী আতর, প্রজাপতি ক্লিপ কিছু রয়েছে কিনা, সোনালী দস্তানা অর্থাৎ ক্যাথরিন যে যে পোশাকে এ জাহাজে উঠে এসেছে ঠিক সেই সেই পোশাকে—যেমন সে হাতে শেষ পর্যন্ত সোনালী দস্তানা না পরে সাদা দস্তনা পরেছে। পাতলা ভয়েলের স্কার্ট এবং ওর শরীর এত বেশি সুচারু যে সব পোশাকই ভীষণ মানিয়ে যায়। জ্যাক জানত না মেয়েটার থুতনির নিচে ছোট্ট একটা প্রজাপতি উল্কি আছে। প্রজাপতির এই উল্কি ক্যাথারিনকে মায়াবিনী করে ফেলতে পারে। জ্যোৎস্না রাতে যদি ক্যাথরিন মাঠ পার হয়ে যায় ছোটবাবুর সঙ্গে তবে ঠিক ক্যাথারিনের উল্কিটা উড়ে উড়ে ছোটবাবুর চিবুকে বসে পড়বে। জ্যাক দুর থেকে দেখেছে ক্যাথারিনকে। অভিমানে সে প্রথম দেখতেই চায়নি। কিন্তু পরে কি মনে হয়েছে সে কেমন মেয়ে যার সঙ্গে ছোটবাবু অনায়াসে চলে যেতে পারে—জ্যাক শেষ পর্যন্ত স্থির থাকতে পারে নি। পোর্ট-হোলের কাঁচ খুলে দেখেছে ওরা হাসতে হাসতে তখন জেটি পার হয়ে যাচ্ছে। থুতনির নিচে প্রজাপতির উল্কি আঁকা আছে ক্যাথারিনের, জ্যাক এত দূর থেকে তা টের পেল না। প্রজাপতি আঁকা আছে দেখতে পেলে জ্যাক ঠিক পেনসিলে থুতনির নিচে সুন্দর একটা প্রজাপতি পর্যন্ত এঁকে রাখত। ছোটবাবুকে বলতে পারত, দ্যাখো থুতনির নিচে আমারও ছোট্ট প্রজাপতি আছে। আমাকে তুমি অবহেলা করে এত কষ্ট দিও না।

    আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে ক্রমে ভীষণ অধীর হয়ে পড়ল জ্যাক। ভেতরে কি যে ভীষণ জ্বালা! ওর কিছু ভাল লাগছে না। সব ভেঙেচুরে দিতে ইচ্ছে করে। এবং নিজেকে সে ভেতরে বন্দী করে রেখেছে। সে দেখেছে রেগে গেলে তার মাথা ঠিক থাকে না। ওপরে উঠে বাবার পাশে বসে থাকতে পারত। যখন তার সবকিছু হারিয়ে যায় বাবার পাশে বসে থাকলে কেমন একটা নিরিবিলি শান্তি। সব শোক দুঃখ বাবার কাছে গেলে সে ভুলে যেতে পারে। কিন্তু এখন তার বাবার কাছে যেতে পর্যন্ত ইচ্ছে হচ্ছে না। সে বুঝতে পারছে ওর চোখে ভীষণ জ্বালা ফুটে উঠেছে। সে এখন কি করবে ঠিক বুঝতে পারছে না।

    সে কতক্ষণ এভাবে ঠিক ক্যাথারিনের মতো পোশাক পরে দাঁড়িয়েছিল জানে না। সে কতক্ষণ এ-ভাবে নিজেকে দেখতে দেখতে নিবিষ্ট হয়ে গিয়েছিল বুঝতে পারছিল না। সে এখন কি করবে! সে সহসা আর্তনাদ করে উঠল, আমি কি করব ছোটবাবু। আমাকে তুমি কেন বুঝতে পার না।

    বোধহয় এই বুঝতে না পারার জন্য জ্যাক মরিয়া হয়ে উঠেছিল। কিছু একটা করার কথা ভেবে ছটফট করছিল। যেন ছোটবাবুকে ছিঁড়ে ফুঁড়ে দিয়েও তার শান্তি নেই। সে নিজেকে নানাভাবে ক্ষত- বিক্ষত করে এখন ছোটবাবুর কাছে ধরা দিতে চায়। ওর ইচ্ছে হচ্ছিল, ছোটবাবু ফিরে এলে, সে ছোটবাবুর কেবিনে ঢুকে যাবে। দরজা বন্ধ করে দেবে। তারপর দু’হাতে যে-ভাবে ছোটবাবুর ফ্লানেলের শার্ট দাঁতে ছিঁড়ে ফেলেছে, তেমনি নিজের পোশাক নাভিমূল পর্যন্ত ছিঁড়ে দেখাবে—এই দ্যাখো—আমি কি দ্যাখো। আমি বনি। কাপ্তানের একমাত্র মেয়ে বনি। বাবা আমাকে গোপনে জাহাজে ছেলে সাজিয়ে রেখেছে।

    তারপর যখন মনে হয়, এ-ভাবে ধরা দিলে তার কাছে ভীষণ ছোট হয়ে যাবে বনি, তখন দুঃখ আর অবিমিশ্র কান্না। বালিকার মতো দু’চোখ ভাসিয়ে দিতে পারে গোপনে। কেউ জানল না, ক্ষোভে দুঃখে মেয়েটা নিজের কেবিনে একান্তে বসে কাঁদছে।

    তখন ক্যাথারিন বলল, কেমন লাগছে ছোটবাব?

    —খুব সুন্দর।

    —এমন সুন্দর দেশ আর হয় না।

    —তা হবে। ছোটবাবুর কথায় যেন প্রাণ ছিল না।

    গাড়ি যাচ্ছে। গাড়ি চালাচ্ছিল ক্যাথারিন। শহর ছাড়ালেই বড় রাস্তা। ক্যাথারিন বলল, গাড়ি ওয়েস্ট কোস্ট রোড ধরে যাচ্ছে। দূরে এগমন্ট হিলের চূড়ো দেখতে পাচ্ছ?

    ছোটবাবু কথা বলছে না। মৈত্র বুঝতে পারছে ছোটবাবুর রাগ পড়ে নি। রাগ পড়লে ছোটবাবু ছেলেমানুষের মতো এটা কি ওটা কি করত। মৈত্র বলল, তোর কি হয়েছে রে ছোট?

    —কি আবার হবে!

    তখন অনিমেষ বলল, সত্যি ভারি সুন্দর জায়গা। ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না।

    বঙ্কু বলল, এমন সুন্দর মেয়ে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলে কারো ছেড়ে যেতে ভাল লাগে না।

    ক্যাথারিন বুঝতে পারছে না, বাংলায় বললে না বোঝারই কথা। অনিমেষ বন্ধু ভাল ইংরেজী বলতে পারে না। একবার ইচ্ছে হয়েছিল মৈত্র বলে, বন্ধু ক্যাথারিন তোদের কথা বুঝতে পারছে না। যতটুকু পারিস ইংরেজীতে বল। ও হয়তো ভাববে ওর সম্পর্কে কিছু বলছিস। কিন্তু মৈত্র জানে, তবে অনিমেষ বন্ধু একেবারে চুপ মেরে যাবে। একটা কথাও বলবে না। কথা বলতে ওদের সংকোচ হবে।

    মৈত্র ক্যাথারিনকে বলল, বন্ধু অনিমেষ ভাল ইংরেজী জানে না। ওরা কথা বললে তুমি কিছু মনে কর না।

    ক্যাথারিন যেন কিছুই শুনছে না। সে সাদা রঙের গাড়ির ভেতরে স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে অনেক দূরে যেন কিছু দেখছে। আসলে কিছুই দেখছে না। বড় বড় ট্রাক বাস সব সাঁ সাঁ করে বের হয়ে যাচ্ছে। এবং যেন গাড়ি নিজের ইচ্ছেমতো গতিবেগ বাড়িয়ে প্রায় উড়ে চলেছে। ক্যাথারিনের চুল মাঝে মাঝে উড়ে এসে মুখে পড়ছে। সে ছোটবাবুকে এই দেশ সম্পর্কে কত কথা বলে যে যাচ্ছে।

    ক্যাথারিন বলল, আসলে ছোটবাবু আমাদের ছোট শহরটা এগমন্ট ন্যাশানাল পার্কের ভেতরে। ডানদিকে ডসন ফলস্ ফেলে চলে যাচ্ছি। ঐ যে দেখছ পাহাড়ের ওপর বাড়িটা, ওটা ডসন ফলস্ টুরিস্ট লজ। দু’একদিন এখানে এসে থাকতে পার। এখন তত ভিড় নেই। ফেব্রুয়ারিতে ন’দিন ধরে আমাদের পাইন ফেস্টিভ্যাল। তখন তোমরা হয়তো থাকবে না।

    মৈত্র বলল, থেকে যেতেও পারি। যা আমাদের একখানা জাহাজ।

    ক্যাথারিন কেমন ছেলেমানুষের মতো বলল, থেকে গেলে কি যে মজা হবে না! দাদু একেবারে সে ক’দিন তোমাদের তার যা কিছু ভাল ভাল খাবার—এই যেমন ছোট ভেড়ার বাচ্চার রোস্ট আর তোহে রো স্যুপ। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ওস্টার থেকে তৈরি। দাদু ঠিক তোমাদের হোয়াইটবেইট না খাইয়ে ছাড়বে না। আরও কত সব খাবারের নাম যে বলে যেতে লাগল ক্যাথারিন। যেন দেশটাতে শুধু পর্যাপ্ত খাবার, এবং ফুলে ফলে ভরা। ওরা যেতে যেতে আপেলের বাগান দেখতে পেল মাইলের পর মাইল। আঙ্গুরের জমি, গমের ক্ষেত, ভেড়ার পাল পাহাড়ী উপত্যকাতে হাজারে হাজারে চরে বেড়াচ্ছে। আর কেবল সবুজ সমারোহ।

    ছোটবাবুর যা স্বভাব, খাবারের নাম শুনলেই জিভে জল আসে। ওর যত রাগ জ্যাকের ওপর ছিল ক্রমে কমে আসছে। এই মেয়ে, ক্যাথরিন ওর সমবয়সী হবে, অথবা কিছু বড় হতে পারে, কি সুন্দরভাবে গাড়ি চালাতে শিখে গেছে। আর যেন কতকালের চেনা, কত সহজ কথাবার্তা। মনেই হয় না তিন-চার দিন আগে সামান্য সময়ের জন্য ওরা ক্যাথারিনকে দেখেছিল। ওর এখন কথা বলতে বেশ ভাল লাগছে। সে বলল, শীতকালে ঠাণ্ডায় খুব কষ্ট পাও না!

    –কেন বল তো?

    –এখনই যা শীত।

    ক্যাথারিন হেসে ফেলল। কোথায় শীত! ছোটবাবু জ্যাকের দেওয়া গরম পোশাক পরে এসেছে। কারণ এর চেয়ে দামী স্যুট ওর নেই। ক্যাথারিনকে সে তার পোশাক এবং সৌন্দর্যে মুগ্ধ করতে চেয়েছিল। এটা ছোটবাবুর স্বভাব। মেয়েদের সঙ্গে সহজে কথা বলতে পারে না। কিন্তু ক্যাথারিন যেভাবে অতি সহজে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে তাতে সে কিছুতেই আর চুপচাপ থাকতে পারছিল না।

    ক্যাথারিন বলল, আমাদের দেশটাতে খুব শীতও পড়ে না, খুব গরমও পড়ে না। দশের বেশি নামে না সাতাশের বেশি ওঠে না। এমন সুন্দর দেশ কোথায় পাবে বল।

    –তুমি তো ভারতবর্ষে থাকতে। তোমার তো কষ্ট হবার কথা।

    –বাবা মা মারা যাবার পর দাদু আমাকে এখানে খুব ছোটবয়সে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মামারা এখানে থাকতেন। বছর চার-পাঁচ আগে দাদু আসেন।

    বাবা মার কথা বলেই মেয়েটা চুপ মেরে গেল। বুড়ো মানুষটার কোথায় দুঃখ ছোটবাবু এতক্ষণে ধরতে পারছে। মৈত্রও কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। রাতের বেলা বুড়োকে দেখে এবং এই মেয়ে ক্যাথারিনকে দেখে সে যা সব ভেবেছিল!

    বন্ধু অনিমেষ পেছনে আছে। ওরা বোধহয় ক্যাথারিনের সব কথা ঠিক বুঝতে পারছে না। নিজেরা নানারকম কথা বলে যাচ্ছিল, কখনও ক্যাথারিনের চুল, কখনও সুন্দর মেয়ে রাস্তায় দেখলে অথবা এই ক্যাথারিন যে বেশ তাদের বাড়ি-ঘরের কথায় ভুলিয়ে রাখছে এ-সব সম্পর্কে অদ্ভুত অদ্ভুত সব মন্তব্য। ভাগ্যিস ক্যাথারিন বুঝতে পারছে না। বুঝতে পারলে ক্যাথারিনের লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠত।

    ছোটবাবুর মনে হল, বুড়ো মানুষটা তার সন্তান সন্ততি অথবা বাপ পিতামহকে এবং এ-ভাবে বলা যায়, ওর যা কিছু নিজের বলতে, সবাইকে ভারতবর্ষের মাটিতে রেখে এসেছে। যতই চলে আসুক দূরে, কখনও কখনও স্মৃতি তাকে অস্থির করে তোলে। সে তখন হয়তো কোনো জাহাজের সন্ধানে থাকে। ভারতবর্ষের নাবিকেরা বন্দরে এলে এই বুড়ো মানুষটা রাতের বেলা লণ্ঠন জ্বেলে তাদের খুঁজে বেড়ায়। শহরে বন্দরে লণ্ঠন জ্বেলে চলে আসা কিছুটা বিস্ময়ের। একবার ভেবেছিল বলবে, ক্যাথারিন, তোমার দাদু কি চোখে কম দেখতে পান!

    ক্যাথারিন নিজেই এখন বলছে, বাবা মারা যাবার পর দাদু কেমন ভীতুগোছের মানুষ হয়ে গেছেন। সামান্য অন্ধকার দেখলেই ভীত হয়ে পড়েন। অন্ধকার একদম সহ্য করতে পারেন না। যতই আলো থাক, তাঁর ঘরে সব সময় রাতে লণ্ঠন জ্বেলে রাখা হবে। কখন কি তার-টার শর্ট হয়ে যাবে, অন্ধকারে ডুবে যাবেন ভাবতেই ওর মুখ নীল হয়ে যায়।

    গাড়ি চলছিল আর এমন সব কথাই হচ্ছিল। ওরা অনেকটা পথ চলে এসেছে। কখনও সমতল ভূমি, কখনও নীল পাহাড়ী উপত্যকা পার হয়ে যাচ্ছে। আর সেই ড্যাং ড্যাং করে পুজোর বাজনার মতো কেবল কি যেন বাজছে ছোটবাবুর মনে। সে ক্যাথারিনকে চুরি করে দেখছিল।

    মৈত্র বলল, বেশ দূর!

    —কোথায়! ক্যাথারিন ঘড়ি দেখল, মাত্র চল্লিশ মিনিটের মতো এসেছি। আর চল্লিশ মিনিট। বেশ তবেই দেখতে পাবে আমাদের বড় কৌরি-পাইন গাছটা। তার ছায়ার ভেতর কিছুটা দূরে—বেশ জায়গা নিয়ে আমাদের বাড়িটা। ছুটির সময় আমি দাদুর কাছে থাকি। আমাদের এখন লম্বা ছুটি। ক্রিসমাস- ডে, বকসিং-ডে, এনিভারসারি-ডে পাইন-ফেস্টিভ্যাল সব এক সঙ্গে পড়েছে।

    ছোটবাবু বলল, অমিয়র কি ব্যাপার বল তো!

    ক্যাথারিন বুঝতে না পেরে তাকাল।

    মৈত্র বলল, না তোমাকে না। আমাদের আর একটা অপোগণ্ড আছে। ওটাকে নিয়ে আসা গেল না। তারপর ছোটবাবুর দিকে তাকিয়ে বাংলায় বলল, ইয়াসিন গতকাল রাতে ওকে পিকাকোরা-পার্কে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে। সঙ্গে সুন্দর মতো একজন মাউরি মেয়ে রয়েছে।

    —খুব সুন্দর! ছোটবাবু কথাটা বেশ জোরে বলল।

    —খুব সুন্দর! লক্ষ্য করেছিস মাউরি মেয়েরা একেবারে বাঙালী মেয়েদের মতো।

    ছোটবাবু বলল, আসলে এরা কিন্তু পলিনেশিয়ান। আমাদের মা বোনদের সঙ্গে খুব মিল ক্যাথারিন এখন চুপচাপ। ওরা যা সব বলছে তার এক বর্ণও বুঝতে পারছে না।

    মৈত্র বলল, আমরা মাউরি যুবক-যুবতীদের কথা বলছি ক্যাথারিন। ওরা ঠিক আমাদের মতো দেখতে।

    ক্যাথারিন বলল, ছোটবাবু কিন্তু দেখতে তোমাদের মতো নয়।

    ছোটবাবু বলল, আমি রাজার মতো দেখতে। সে হা হা করে হেসে উঠল।

    ক্যাথারিন বলল, তোমাকে কেমন যেন লাগে। তোমার দাড়ি না থাকলে তোমাকে হয়তো এত ভাল লাগত না। তুমি খুব সুন্দর দেখতে ছোটবাবু।

    বন্ধু বুঝতে পেরে বলল, ছোটবাবু তোমার হয়ে গেল।

    অনিমেষ বলল, এই আমরা নেমে যাব। তুমি যাও। তোমার জন্যই এতসব হচ্ছে।

    মৈত্র বলল, কি সব হচ্ছে! তোরা কি সব জায়গায় এক রকম থাকবি।

    ক্যাথারিন এবার বলল, আমরা এসে গেছি। ঐ দ্যাখো আমাদের সেই কৌরিপাইন গাছটা।

    পাশেই ছোট ছিমছাম মাউরি গ্রাম। ঠিক বড় রাস্তার ওপরে। একজন মাউরি বুড়ো মতো মানুষ মাঠে ভেড়ার পাল চরাচ্ছে। প্রায় চারপাশটা যেন তৃণভূমি। ছোট ছোট কাঠের বাড়ি-ঘর এবং দু’পাশে ছোট্ট জলের রেখা, প্রায় পরিখার মতো খনন করা। ওপরে কাঠের পাটাতন। তার ওপরে গাড়িটা উঠে গেলে ওরা দূরে প্রায় ফার্লং-এর মতো দূরে দেখতে পেল সেই বুড়ো মতো মানুষটা সাদা পোশাকে রোদে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে।

    .

    তখন জ্যাক ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে যাচ্ছে। হিগিনস তখন জরুরী চিঠি লিখছেন হেড-অফিসে। জাহাজের অবস্থা জানিয়ে চিঠি দিচ্ছেন। মেন-জেনারেটর ঠিকমতো কাজ করছে না, বয়লার-চক বসে যাচ্ছে—যা সব মেরামত দরকার এ-বন্দরে সারা যাবে না, জাহাজের সব মেরামতের জন্য বড় বন্দরে দু’ চার মাস বসিয়ে না দিলে চলছে না, এ-সব বিস্তারিত লিখে জানাচ্ছেন। জাহাজ ফসফেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বন্দরগুলিতে যাবার কথা। পোর্ট মেলবোর্নে অথবা মেলবোর্ন বন্দরের সাউথ- ওয়ার্ফ জেটিতে ক’মাস ফেলে রাখা দরকার। সাউথ-ওয়ার্ফ জেটিতে সব ভাঙা জাহাজ মেরামতের কাজ হয়ে থাকে, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কিছু ব্যবস্থা করে ফেলতে পারলে হিগিনস জাহাজ নিয়ে বন্দরে ঠিক ঢুকে পড়তে পারবেন। সবই নির্ভর করছে এখন হেড অফিসের মর্জির ওপর।

    খুবই জরুরী চিঠি। ‘একান্ত গোপন’ খামের ওপর লেখা। একমাত্র রিচার্ড ফেল চিঠিটা খুলে পড়তে পারবেন। তখন জ্যাক পাশের চেয়ারে চুপচাপ বসে রয়েছে। তিনি খেয়াল করেননি বনি চার্ট-রুমে ঢুকেছে। চার্ট-রুমের দেয়ালে সব চাবির রিঙ। জাহাজের সব কেবিনের এবং স্টোররুমের সব চাবি ঝুলছে। বনি চাবির গোছা হাঁটকাচ্ছে বসে বসে। বনিকে খুব নিরীহ এবং শান্ত স্বভাবের মনে হচ্ছিল।

    হিগনিস বলল, আমার সঙ্গে তুমি বের হতে পার বনি। অকল্যাণ্ডে যাচ্ছি।

    বনি বুঝতে পারছে বাবা এজেন্টের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। এখন বের হলে ফিরতে অনেক রাত হবে। গাড়ি যত জোরেই যাক তিন ঘণ্টার আগে বাবা অকল্যাণ্ডে পৌঁছাতে পারবেন না। ফিরতে অনেক রাত হলে আজ আর ছোটবাবুর সঙ্গে দেখা হবে না। ফিরে হয়ত দেখবে ছোটবাবু নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। ছোটবাবুর সঙ্গে সে আজই যা হয় হেস্ত নেস্ত কিছু করে ফেলবে। কারণ মাথার ভেতরে অস্থিরতা তার ক্রমে বাড়ছে। সে কোথাও দু’দণ্ড স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছে না। কেবল সেই রাস্তাটা, যেখানে সে দেখতে পাবে হেলে দুলে নেমে আসছে ছোটবাবু, রাস্তাটার দিকে বারবার নজর চলে যাচ্ছে। কেন যে মনে হচ্ছে জাহাজ ছেড়ে তাকে ছেড়ে, ছোটবাবুর কোথাও বেশি সময় ভাল লাগবে না।

    বনি বলল, আমার ভাল লাগছে না।

    কাপ্তান বললেন, যাবার সময় ওয়াতেমো গ্রামের ভেতর দিয়ে যাব। গ্রামটা পার হলেই আমাদের গাড়ি সুন্দর একটা গুহার ভেতরে ঢুকে যাবে। কিছুদূর গেলেই দেখা যাবে শুধু পাথর আর পাহাড়, পাহাড়ের ছাদ। মধুর চাকের মতো হিজিবিজি সব জোনাকিদের আবাস। লাল নীল হলুদ রঙ হ্রদের জলে ভাসছে। নৌকায় বেড়াচ্ছে কত সব মানুষ। তাদের দেখতে প্রায় রঙীন ছবির মতো। গ্লো- ওয়ার্মি—গ্রুতোতে হাজার হাজার লার্ভা পাহাড়ের ছাদে দেয়ালে জাদুকরের মতো আলোর মালা তৈরি করছে। এ-সব দেখার জন্য পৃথিবীর সব লোক চলে আসে। এত হাতের কাছে অথচ তুমি যাবে না, এটা ঠিক না।

    বনি ততক্ষণে ঠিক চাবিটা খুঁজে বের করে ফেলেছে। সে চাবির গোছাটা পকেটে প্রায় গোপনে ভরে রাখল। বাবা নিরন্তর যেমন কথা বলতে ভালবাসেন, কাজও করতে ভালবাসেন। বনির দিকে তিনি তাকিয়ে কিছু বলছেন না। এই মাথার টুপিটা ঠিক করতে করতে অথবা কোনো মানচিত্রে লাল একটা টিক মারার সময়, অথবা স্টোররুমের স্টক দেখার সময় তিনি যে অনায়াসে গল্প করে যেতে পারেন, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। বনি বাবার এই অফিস-ঘরে চাবি চুরি করতে এসেছে তিনি তা টেরই পেলেন না।

    বনি বলল, বাবা শরীরটা ভাল নেই

    বনি বড় হয়ে যাচ্ছে বলে মাঝে মাঝে শরীর খারাপ হবে—সুতরাং আর পীড়াপীড়ি করা যুক্তিসঙ্গত নয় ভেবে বললেন, সাবধানে থেকো। বেশি রাত হলে ফিরতে নাও পারি। চিন্তা করবে না। চিফ থাকছে জাহাজে। অসুবিধা হলে ওকে বলবে। থার্ড-মেট সঙ্গে যাচ্ছে।

    বনি সরল বালিকার মতো ঘাড় কাত করে দিল। বলল, আচ্ছা।

    তারপর সে নেমে গেল। নিজের কেবিনে ঢুকে এখন শুধু অপেক্ষা করা, বাবা যতক্ষণ জাহাজে থাকছে, সে কিছু করতে পারছে না। এবং পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে কখন বাবা নেমে যান, দেখার জন্য অপেক্ষা করতে থাকল। আর নেমে গেলেই সে সোজা সিঁড়ি ধরে নিচে নামতে থাকল। এ-সময়ে সবাই প্রায় বাইরে, কেবল আর্চি নিজের কেবিনে, অথবা ঘোরাঘুরি কখন একবার দেখা যাবে বালিকাকে। বনি এ-সব ভেবে খুব দ্রুত চারপাশ দেখে কেবিনের দরজা খুলে ফেলল। এলি-ওয়ে ফাঁকা খাঁ খাঁ করছে। ডাঙা পেলে যা হয় মানুষের, জাহাজে কেউ থাকতেই চায় না। সে ভিতরে ঢুকে খুব সন্তর্পণে দরজা লক করে ফেলল।

    কেবিনে ঢুকে আলো জ্বেলে দিল জ্যাক। ভেতরে তেমনি সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ফ্লানেলের ছেঁড়া জামা প্যান্ট পড়ে আছে একপাশে। সে হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর দু’হাতে খুব যত্নের সঙ্গে তুলে নিল ছেঁড়া জামা প্যান্ট। ভাঁজ করার সময় ছোটবাবুর অসহায় মুখ বার বার দেখতে পেল।

    তার কিছু এখন ভাল লাগছে না। কেন যে তার মাথা এ-ভাবে মাঝে মাঝে খারাপ হয়ে যায়। মনে হয় পৃথিবীতে সবাই ওর সঙ্গে শত্রুতা করে যাচ্ছে। তখনই মাথার ভেতরে একটা তীব্র ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায়। চোখ মুখ লাল হয়ে ওঠে। সে নিজেকে তখন আর কিছুতেই সামলাতে পারে না।

    সে ভারি অসহায়। দুঃখী মুখ তার। সে এখন বাংকে বসে আছে চুপচাপ। কাঁধের ওপর সেই ছেঁড়া জামা প্যান্ট। এখনও যেন ছোটবাবুর গায়ের উষ্ণতা সে জামা প্যান্টের ভেতর টের পাচ্ছে। তারপর নিচু হয়ে ভাঙা কাচ, ফুলের পাপড়ি, ছেঁড়া কাগজের টুকরো একপাশে কুড়িয়ে জমা করতে থাকল। বিছানার চাদর বেশ টেনে টেনে বিছিয়ে দিল। আয়না সব জলের দাগ। সাদা মসৃণ তোয়ালে দিয়ে আয়নার কাঁচ ভাল করে মুছে, সে তার কেবিনের এক গুচ্ছ সাদা গোলাপ ফুলদানিতে ভরে রাখল। এবং ছোটবাবুর মায়ের ছবি দেয়ালে, সে লণ্ডভণ্ড করে দেবার সময় ওটাও কি করে নিচে পড়ে গেছে—তুলে, হাতের ভেতর কিছুক্ষণ ঝুঁকে দেখতে থাকল। কাঁচ অথবা ফ্রেম কিছু নষ্ট হয় নি। একটা বড় টিপ কপালে। হাতে সাদা শংখের কিছু অলংকার পরেছে। শাড়ি-পরা মাথার প্রায় সবটা ঢাকা হুবহু ছোটবাবুর মুখ। ছোটবাবু মেয়ে সেজে থাকলে ওর মার মতো হয়ে যেত। অনেকক্ষণ এ-ভাবে সে দেখল ছবিটা। এখনও ছোটবাবু পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে এই যুবতীকে। ওর ভীষণ হিংসে হচ্ছিল, আবার কখনও অভিমান, যেন বলার ইচ্ছে ছোটবাবু কিছু বুঝতে পারে না কেন। দেয়ালে ভাল করে টাঙ্গিয়ে রাখল ছবিটা। তারপর সে যেখানে যা কিছু দাগ জলের অথবা ভাঙা কাচের সব মুছে যেমন চেয়েছিল ছোটবাবু তেমনি রেখে ওপরে উঠে গেল।

    সারা বিকেল সে বোট-ডেকে বসে থাকল। কখনও পায়চারি করে বেড়াল। সন্ধ্যার সময় সে ফোনে জানতে পারল বাবা আজ ফিরছে না। কাল সকালে তিনি ফিরছেন। সঙ্গে সঙ্গে বনির সব অস্থিরতা কেটে গেল। রাত বাড়লে সে একটা ছোট এটাচি কেসে তার যাবতীয় সবকিছু—এই যেমন সাদা সাটিনের লম্বা গাউন, সাদা মোজা, সাদা জুতো, জরির মূল্যবান জ্যাকেট, সুগন্ধ আতর, পাতলা দুধের মতো নীলাভ ক্রিম নিয়ে নিচে নেমে গেল। সে সন্তর্পণে ছোটবাবুর কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখে বুঝল কেউ নেই। সে যত দ্রুত সম্ভব সতর্কতার সঙ্গে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল। ভেতর থেকে দরজা লক করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর এক এক করে সে তার পুরুষের পোশাক শরীর থেকে খুলে ফেলতে থাকল। সব খুলে ফেলতেই নিজেকে সে খুঁজে পেল। সে বনি। তার সুন্দর স্তনে গভীর ভালবাসার কোমল উষ্ণতা ক্রমে জন্ম নিচ্ছে। জংঘার পাশে সোনালি রেশমে ঢাকা এক আশ্চর্য দ্বীপের বর্ণমালা। সে ক্রমে এ-ভাবে অধীর হয়ে উঠছে।

    সে তার মূল্যবান পোশাক, এই যেমন মসলিনের ওপর কারুকার্যময় ফুলফল লতাপাতা আর গভীর উজ্জ্বলতা নিয়ে আছে তার রেশমের মতো নীলাভ চুল, গুচ্ছ গুচ্ছ চলে সে অলিভ পাতার সুগন্ধ মেখে আস্তে আস্তে নরম আঙুলে সারা মুখময় আশ্চর্য সব পারফিউম ছড়িয়ে বসে থাকল। মাঝে মাঝে চোখ মেলে আয়নায় সে নিজেকে দেখছে। যেন পা হাত এবং নাভিমূলে আছে প্রাচীন ফারাও-সম্রাজ্ঞীদের সব রহস্য আর শরীরে সেই সুদূর অতীত থেকে তেমনি প্রবহমান—নীল নদের অববাহিকায় অথবা ইউফেটিস নদীর তীরে যে যুবতী স্নান শেষে ফিরে গেছে খোঁপায় গমের শিস সে আছে তারই মতো। তারই মতো চুলে গোলাপ ফুল গুঁজে পোর্ট-হোলে ছোটবাবুর জন্য অপেক্ষা করছে। তখন আকাশের নক্ষত্রমালা প্রতিবিম্ব ফেলছে সমুদ্রে। অনেক দূরে গীর্জায় তখন ঘণ্টা বাজছিল। ওয়েস্ট কোস্ট রোড ধরে দূরন্ত গতিতে ছোটবাবুর গাড়ি ছুটছে তখন

    ভীষণ ভীরু নিষ্পাপ এক পবিত্র প্রতীক্ষা বনির। ছোটবাবু আসছে। বাতাসে ফলের পাপড়ির মতো বনি উত্তেজনায় কাঁপছিল।

  • তেত্রিশ

    তেত্রিশ

    ।। তেত্রিশ।।

    তখন র‍্যাঁ রা লাঁ। ডিং ডিং।

    তখন ছোটবাবুর চুল উড়ছে। আর জোরে জোরে গান গাইছে মাউরি যুবক। বেশ দ্রুতগতিতে খালি রাস্তা পেয়ে গাড়ি প্রায় সে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ক্যাথারিন, ওর বুড়ো দাদু, মামা মামীরা বিদায় জানাতে কৌরি-পাইন গাছটা পর্যন্ত এসেছিল। ক্যাথারিনের মুখে ছিল ভীষণ বিষণ্ণতা। সে বলেছে আগামী রোববার আবার আসবে। সে ছোটবাবুকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছে ওদের ডেয়ারিফার্ম, ওদের তৃণভূমি, ওদের গমের জমি, আপেলের বাগান আর আঙ্গুরের উপত্যকা

    তখন র‍্যাঁ র‍্যা লাঁ। ডিং ডিং। মাউরি যুবক গাইছে। সুন্দর গান। হলুদ রঙের দামী গাড়ি, উজ্জ্বল কোঁকড়ানো চুল মাউরি যুবকের এবং সাদা উর্দি-পরা, একেবারে খুশীতে উপচে পড়ছে। সে এতগুলো বিদেশী মানুষকে বন্দরে পৌঁছে দিতে পারছে বলে ভীষণ খুশী। এবং সে জানে বুড়ো উড সাহেব ওদের সারাক্ষণ কি বলেছে। বলেছে আসলে এ-দেশটার যা কিছু বৈভব সব ইংরেজদের গড়া। এবং যা কিছু আজকের প্রাচুর্য সব আমরা না এলে হত না। আসলে খাবার নাম করে ধরে এনে এ-সব বলা ছাড়া আর কিছু কাজ নেই যেন মানুষটার। চার বছরের ওপর সে ওদের ফার্মে আছে। চিনতে বাকি নেই। কিন্তু সে গান গাইছে এবং পেছনে চারজন নাবিক ওরা বেশ হল্লা করছে। মাঝে মাঝে সুন্দর মতো মানুষটি ওদের থামতে বলছে। সে গান গাইছে, কারণ সেও কম যায় না। সে এতক্ষণ এই দেশের যা কিছু সৌন্দর্য অথবা প্রতিপত্তি বলা যায়—টাসম্যান না এলে যে কিছুই হত না অর্থাৎ তিনিই প্রথম পলিনেশীয় মানুষ যিনি জাহাজে চড়ে চলে এসেছিলেন এ-দেশে তারপর এমন সুন্দর দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো, দেশটি আবিষ্কার করে ফিরে গেলেন—সেই ডিং ডিং বাজনা, দলে দলে সমুদ্রে একেবারে জারি গান গেয়ে বৈঠা বেয়ে ওরা পাল খাটিয়ে চলে এসেছিল।

    সে বেশ গর্বের সঙ্গে বলে যাচ্ছিল আসলে ওদের সবটাই পড়ে পাওয়া চোদ্দ গণ্ডা। বোঝলেন না স্যার, আমরা না এলে কোথায় থাকত এ-সব ফুটানি।

    অনিমেষ বলছিল—তা ঠিক।

    মৈত্র একটু বেশি খেয়ে ফেলেছে। অনিমেষ বন্ধু একটু খেলেই মাতলামি করতে ভালবাসে। ছোটবাবু চুপচাপ বসে রয়েছে। রাত এখন নটা বেজে সতেরো। জ্যোৎস্না এবার উঠবে। পূবের আকাশে কিছু পাইন গাছের ফাঁকে জ্যোৎস্না দিগন্তে ঝলমল করছিল।

    খাবারের তালিকা ছিল বেশ লম্বা। যদিও ওরা কেউ খেয়ে খুব খুশী নয়। খেতে হয় খাওয়া। একেবারে অখাদ্য বানিয়ে রেখেছে সব। তবু ওরা খেয়ে ঢেকুর তুলেছে। খাবার শেষে সামান্য ড্রিংকস। কিন্তু যা হয় খেতে থাকলে কেবল খেতেই ইচ্ছে হয়। এত খাওয়ার পরও ওরা চার জন ভীষণ ভদ্র ছিল কথাবার্তায়। এমন কি যখন টলছিল আর জাতীয় সঙ্গীত গাইছিল সবাই তখনও কে বলবে ওরা জাহাজি। অনিমেষ বলেছিল, ধর, বলেই সে ষাঁড়ের মতো যেই না গাইলে, ধন ধাইন্যে আর তখনই মৈত্র হা হা করে উঠেছিল, অনিমেষ, ওটা ধন ধাইন্যে হবে না ধন-ধান্যে বল। আর যতবারই ধন ধান্যে অনিমেষের গলায় ধন ধাইন্যে হয়ে যায় ততবার হা হা করে হেসে দিয়েছিল বন্ধু আর মৈত্র। যদিও ক্যাথারিন অথবা ওর আত্মীয়েরা এর এক বিন্দু বুঝতে পারে নি, ওদের গান ওরা বেশ চেঁচিয়ে শেষ করেছে। ক্যাথারিন বড় একটা হলঘরে পিয়ানো বাজিয়েছিল। ওরা খালি গলায় গাইবে বলে তখন ক্যাথারিন পিয়ানোর ওপর ভর করে কেবল দেখছিল—ওরা চারজন দাঁড়িয়েছে। ওরা জনগণ গাইল না ওরা গাইল ধন ধান্যে পুস্পে ভরা কারণ এ-গানটাই বেশি শিখিয়েছে অমিয় ওরা কিছু ভাল না লাগলে গাইত জাহাজে এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।

    তখন মাউরি যুবক গাড়িতে গাইছিল—রা র্যাঁ লাঁ। ডিং ডিং। সব দেশবাসীদেরই এক কথা এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।

    মাউরি যুবক তখন সাঁ করে গাড়ি ঘুরিয়ে বলল, বুঝলেন না স্যার, যত রাস্তা-ঘাট এই ধরুন না সেন্ট্রাল রোড ধরে যদি আপনারা কখনও অকল্যাণ্ড থেকে ওয়েলিংটনে যান, দেখতে পাবেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর দৃশ্য। রোতোঁরা কিন্তু পলিনেশিয়ান নাম। রেস্তোঁরার ভেতর দিয়ে চলে গেছে সেন্টাল রোড। ওয়েফোতো নদী পাবেন যেতে যেতে। দু’-পাশে দেখতে পাবেন সব সুন্দর সুন্দর গরম জলের প্রস্রবণ। রোতোঁরা হ্রদের মতো হ্রদ আর একটাও নেই পৃথিবীতে। জল বরফের পাতলা চাদরে ঢাকা। অথচ হ্রদের পাড়ে আপনি খালি পায়ে হাঁটতে পারবেন। ঠাণ্ডা নেই। এত বেশি উষ্ণতা। সুন্দর ইংরেজীতে লোকটা বলে যাচ্ছিল—রোতোঁরা ইজ দ্য সেন্টার অফ মাউরি লাইফ অ্যাণ্ড কালচার, উইথ এ মডেল ভিলেজ। সে তারপর বলল, আপনারা সেখানে গেলে মাউরি কনসার্ট শুনতে পেতেন। পারলে সে যেন এখন গাড়ি সেখানে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়। এবং সেই ডিং ডিং বাজনা। সে এতসব ওদের হয়ে বলতে পারায় খুব খুশী। সে কেবল গুনগুন করে জ্যোৎস্না রাতে গান গাইছিল।

    জ্যোৎস্না রাতে গান গাইতে সবারই ভাল লাগে। অনিমেষ বন্ধু যা খুশি গাইছিল। ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। শীত তেমন লাগছে না। দু’পাশের বাড়ি-ঘর উপত্যকা অথবা নির্জন বনভূমি ফেলে গাড়ি ক্রমে নিউপ্লিমাথের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাঠের পর মাঠ সব ফাঁকা জমিন। মাঝে মাঝে হাই-ওয়ে ধরে বাস ট্রাক যাচ্ছে, আর কিছু দেখা যাচ্ছিল না। কেবল চারপাশে পাইনের বনাঞ্চল। এবং তার ভেতর মরা চাঁদ কেমন শীতের জ্যোৎস্নায় স্থির হয়ে আছে দিগন্তে। ছোটবাবু কিছুই দেখছিল না। দেখতে ভাল লাগছিল না। মাথাটা বেশ ঝিম-ঝিম করছে। সে একপাশে মাথা কাত করে দিয়েছে। ক্যাথারিন যেন সারাক্ষণ ওকে কিছু বলতে চেয়েছিল। অথবা ওর সুন্দর রঙ এবং লাবণ্য শরীরে, কখনও চোখের তারায় সমুদ্রের নেশা। ছোটবাবুর কি যে ভাল লাগছিল। সেই তৃণভুমিতে ঘাসের ভেতর হারিয়ে গিয়ে ডেকেছিল, ছোটবাবু দ্যাখো কি সুন্দর ভেড়ার বাচ্চাটা। একটা সাদা ভেড়ার বাচ্চা কোলে নিয়ে ঘাসের ভেতর থেকে ক্যাথারিন উঠে এসেছিল।

    ক্যাথারিনকে ছেড়ে আসার সময় তার ভীষণ খারাপ লাগছিল। আগামী রবিবার সে আসবে। সাতটা দিন তার এখন ক্যাথারিনের কথা ভাবতে ভাবতে কেটে যাবে। সে বুঝতে পারছিল এ-ভাবে তার সব এখন নতুন নতুন কষ্ট তৈরি হবে মনে। ক্যাথারিনকে দেখার আগে সে এটা কখনও বুঝতে পারত না।

    এবং ওপরে অর্থাৎ জাহাজে ওঠার সময় মনে হয়েছিল ভারী একাকী সে। তার মাকে সে এসময় অন্যদিন মনে করতে পারত। কিংবা কখনও ঘুম ভেঙে গেলে সে ভাবত, মা তার জেগে আছে হয়তো। আজ সে কিছুই মনে করতে পারছে না। বরং জাহাজের একঘেয়েমী কাজ ভীষণ বিরক্তিকর। আর্চি তাকে অযথা কষ্ট দিচ্ছে। জ্যাক আজ যা করেছে! সব মনে হতেই সে ভীষণ ব্যাজার করে ফেলল মুখ। সামান্য নেশা এবং নেশায় টলছে, এটা সে যেন কাউকে বুঝতে দিতে চায় না। তবু ঠাণ্ডা বাতাসে এবং বেশ সময় পার হয়ে গেছে বলে এখন আর মাথা তেমন ভারি নয়। বরং এমন নেশাতে শুয়ে শুয়ে ক্যাথারিনকে ভাবতে তার ভাল লাগবে।

    আর সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দু’বার চাবি ঘুরিয়ে অবাক। দরজা খুলছে না। সে হয়তো ছুটে ডেভিডকে চিৎকার করে ডাকত, দ্যাখো কে আমার কেবিন বন্ধ করে রেখেছে। এ-সব কি হচ্ছে! আমাকে জ্যাক কি ভাবে!

    আর তখনই দরজা সামান্য খুলে গেল।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল নেশার জন্য এমন হয়েছে। চাবি ঘুরছিল না ঠিকমতো। চাবি সে ঠিকমতো লাগাতে পারে নি। শেষে চাবি ঠিকমতো ফের ঘুরিয়েছে বলেই হয়তো খুলে গেছে দরজা। ভেতরে ঢুকে

    নিরিবিলি দরজা বন্ধ করার সময়ও লক্ষ্য করল না ওর কেবিনে সাদা গোলাপ গুচ্ছ। এবং সুন্দর বিছানাতে অলিভ পাতার গন্ধ। যে গন্ধটা নিজের শরীরে আছে অথবা ক্যাথারিনের পাশে পাশে হাঁটলে যে হালকা আতরের গন্ধ ছিল এখনও যেন তেমনি এক গন্ধ। আসলে বুঝি সেই সুন্দর স্বপ্নটা সে মনের ভেতরে ভাসতে দেখছে। যে-ভাবে স্বপ্ন দেখলে শরীর ক্রমে হাল্কা সৌরভে ভরে যায়, ভাল লাগে, বেশ এক ভেতরে ভেতরে স্বপ্নের খেলা অথবা লুকোচুরি বলা যায় নিজের সঙ্গে নিজের, সে ঘরে ঢুকে নিজের সঙ্গে নিজের খেলা আরম্ভ করে দেবে ভাবল—এবং তখনই মনে হল সাদা মসলিনের ভেতর কেউ নীহারিকাপুঞ্জ হয়ে আছে। যা সে ধরতে পারবে না, ছুঁতে পারবে না, কেবল চুপচাপ বসে দেখতে পাবে। পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে সে যেমন আগে সমুদ্রে নক্ষত্র দেখত আকাশে এও তেমনি। প্রায় সেই নীহারিকাপুঞ্জের মতো রহস্যময়ী।

    সে চুপচাপ বসে তাকে দেখতে থাকল।

    ওর ভালই লাগছিল। সে একটু নেশার ভেতর এমন দেখবে নাতো কি দেখবে! সেই সুন্দর নীহারিকাপুঞ্জ তেমনি পোর্ট-হোলে মুখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে।

    সে বলল, বেশ মনোহারিণী। তোমাকে আমি দেবী বলতে পারি। পোর্ট-হোলে মুখ রেখেছ কেন। একবার ফিরে দাঁড়াও। দেখি তোমাকে। বড় হতে হতে এমন একজনকেই চেয়েছি মেয়ে।

    বেশ কুহেলিকা। ছুঁয়ে দেখবে নাকি। নড়ছে না। তালপাতার বাঁশির মতো তার তীক্ষ্ণ শরীর। বেশ লম্বা উঁচু সাদা জুতো মোজা, হাতে সাদা দস্তানা, নীলাভ চুলে গোলাপের কুঁড়ি, সাদা রিবন চুলে। মোমবাতির শিখার মতো জ্বলছে।

    ছোটবাবু গলার টাই আলগা করতে থাকল। সে ভালভাবে দাঁড়াতে পারছে না অথবা সেই তৃণভূমিতে ছুটে ছুটে এখন হয়তো ক্লান্ত। বাংকের ওপর বসে টাই খুলে ফেলল। কোট খুলে প্যান্ট খুলে চুপচাপ ঘুমের পোশাক পরে ফেলল। মেয়েটা এখনও তেমনি দাঁড়িয়ে আছে। নড়ছে না। সে বলল, এবারে, যাও। আমি ঘুমোব।

    চোখেমুখে জল দিলে সব কেটে যেতে পারে। সে বাথরুমে ঢুকে চোখে ভাল করে জলের ঝাপটা দিল। ঘাড়ে জল থাবড়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে তুলতে চাইল। সে তো আজ খুব একটা বেশি খায় নি। সামান্য খেয়েই এমন ভুল দেখতে শুরু করেছে! জাহাজে নানারকম কিংবদন্তী আছে। সে ভাঙা জাহাজে আছে বলে সবকিছু মেনে নিয়েছে। সব ভৌতিক ব্যাপার অথবা কিংবদন্তীর মতো এই জাহাজ চলেছে তো চলেছেই। জাহাজ তার সবকিছু নিয়ে এইসব ভৌতিক ঘটনার ভেতর চলছে। সে এখন আর এ-সবে কিছুতেই ভয় পাবে না।

    তবু সে দরজা খুলতে সাহস পাচ্ছে না। খুললেই আবার হয়তো দেখে ফেলবে, কোনো রহস্যময়ীর মুখ। বরং সে ভেতরেই দাঁড়িয়ে থাকবে যতক্ষণ তার অন্তত নেশা ঠিকমতো না কেটে যাচ্ছে। এমন ভেবে একাকী গোপনে বাথরুমে পালিয়ে থাকছে। মাথা পরিষ্কার না হলে সব আজগুবি ছবি কেবল দেখতে পাবে কেবিনে।

    তখন মৈত্র দেখল একটা চিঠি গড়াগড়ি খাচ্ছে ওর বাংকে। সে হাতমুখ ধুয়ে শুয়ে পড়বে ভেবেছিল। এ-বন্দরে পৌঁছেই তার একটা চিঠি পাওয়ার কথা। শেফালীর চিঠি। কিন্তু একটাও চিঠি আসে নি। এমন কি সে পানামা ক্যানেলে ভেবেছিল চিঠি পাবে, নিউ অরলিনসে ভেবেছিল ঠিক চিঠি পাবে, ভিকটোরিয়া বন্দরে যদি একটা চিঠি আসত—চিঠি না এলে যা হয় অভিমান, চিঠি না এলে যা হয় যেন শেফালী তাকে ভুলে যাচ্ছে। শেফালীকে বুয়েনস আয়ার্স থেকে টাকা পাঠাতে পারে নি বলে সেই যে রাগ করে আর চিঠি দিল না আজও তেমনি। চিঠিটা পেয়েই সে লাফিয়ে উঠল। চিঠি। চিঠিতে চুমো খেল। কে দিয়েছে, কোথাকার চিঠি, সে একবারও ভেবে দেখল না। কারণ পৃথিবীতে এখন একমাত্র একটি মেয়েই তার কথা ভাবে। মাত্র একজন যুবতীর চোখে ঘুম থাকে না, সে না থাকলে যুবতী ভারি একাকী এবং একঘেয়েমীর ভেতর এই চিঠি লেখা শুধু—আর কিছুই না। চিঠিটা পেয়েই সে ছেলেমানুষের মতো কি করবে ভেবে পেল না। এমন একটা চিঠি এতক্ষণ অবহেলায় বাংকে পড়ে ছিল ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। সারেঙ-সাব ওর বাংকে চিঠি রেখে গেছেন। বিছানা ঠিকঠাক করে শুয়ে পড়ার সময় এমন একটা চিঠি! সে তাড়াতাড়ি চিঠিটা পড়তে আলোর নিচে দাঁড়িয়ে গেল। আর তখনই কেমন গণ্ডগোল হয়ে যায়। চিঠির ঠিকানায় শেফালীর হাতের লেখা জ্বলজ্বল করছে না। অন্য হাতের লেখা। সে তাড়াতাড়ি খামের ভেতর থেকে চিঠি বের করে নিল। না ভেতরেও অন্য কেউ কিছু লিখেছে। সে আরও দ্রুত শিরোনামা পড়ে অবাক হয়ে গেল। পরম কল্যাণবরেষু—এবং পিসিমা তাকে চিঠি লিখেছে। চিঠির ভেতর ওর জাহাজ কবে ফিরছে কারণ শেফালী মাস দুই আগে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করেছে এ-সব কথা—মৈত্র চিঠিটা পড়তে পড়তে কেমন পাথর হয়ে যাচ্ছিল। দিন-মাসের সে হিসাব ঠিক মেলাতে পারছে না। কেমন একটা গণ্ডগোলের ছবি গোটা চিঠিটাতে এবং সে হতবাক, এখন সে ভেবে পাচ্ছে না কিভাবে দিন-মাসের হিসেব করতে হয়। বার বার বোকার মতো কড় গুনে দেখছে সময়মতো সে তো শেফালীর কাছে ছিল না। শেফালীর ছলনা সে তবে ধরতে পারেনি।

    জাহাজিদের ভাগ্যে এমন ঘটনা নতুন নয়। সে তবু বার বার কড় গুনে নিজের হিসেবের ভুল ধরার জন্য কেমন মরিয়া হয়ে উঠল।

    এখন ফোকসালে কেউ নেই। এত রাত যে, বোধহয় অমিয় জাহাজে আর রাতে ফিরছেই না। অমিয় থাকলে তাকে বলা যেত, তোর অঙ্কে মাথা কেমন রে? আমার হিসেবটা মিলছে না। এত বার কড় গুনেও মেলাতে পারছি না। তুই দেখ তো মেলাতে পারিস কিনা।

    তারপরই কেমন হুঁস ফিরে আসছে। সে কি ভাবছে সব! সে তো কাউকে হিসেবটার কথা বলতে পারবে না। সে কি ধীরে ধীরে পাগল হয়ে যাবে। কারণ বলা তো যায় না, সে এখন থেকে সামনে কাউকে পেলেই হয়তো বলবে, দেখুন তো মশাই, সময়মতো তখন আমি বাড়ি ছিলাম কিনা। না তখন আমি সমুদ্রে, শেফালীর একা একা ভাল লাগছিল না বলে বিমলবাবুর সঙ্গে চুপি চুপি দেখা করেছিল, কথা বলেছিল, তারপর আর ভাবতে পারে না। কেমন পা টলতে থাকল। মাথা ঘুরতে থাকল। তার সামান্য অবলম্বন তাও ক্রমে মুছে যেতে থাকল।

    বাথরুমে তখনও ছোটবাবু চুপচাপ। দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখলে মনে হবে শীতের রাস্তায় বিদেশ বন্দরে পথ হারিয়ে ফেলেছে। সকাল না হলে সে আর জাহাজে ফিরতে পারছে না।

    অমিয় তখন হেঁটে ফিরছিল জাহাজে। মাউরি যুবতী তাকে কতরকমের স্বপ্নের কথা বলেছে! দূরগামী সমুদ্রের মানুষ অমিয়। মেয়েটা অমিয়কে সমুদ্রের বেলাভূমিতে আবিষ্কার করেছিল। এবং এইসব মেয়েরা সমুদ্র থেকে ঘুরে-আসা মানুষদের দেখলেই টের পায়—ওরা সমুদ্র-মানুষ। ওদের গায়ে সমুদ্রের গন্ধ লেগে থাকে। চোখে সমুদ্রের নেশা। ভাল করে চোখ তুলে দেখতে পর্যন্ত ভয় পায়।

    এবং অমিয় বলেছিল, মেয়ে, আমার কাছে সাত রাজার ধন এক মানিক আছে। চল না কোনো দ্বীপে। আমরা একটা দ্বীপ কিনে ফেলতে পারব। আমার আর সমুদ্রে ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগছে না।

    .

    তখন বনি ক্রমে অস্থির হয়ে পড়ছে। তার ভেতর কি যে অধীরতা, সে কিভাবে ছোটবাবুর বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে বুঝতে পারছিল না। সে আশা করেছিল, ছোটবাবু তার পাশে এসে দাঁড়াবে, আদর করে ওকে বুকে টেনে নেবে—অথবা কখনও সে দু’হাত তুলে দিলে ছোটবাবু বুঝতে পারবে, সে বনি, সে মেয়ে। তার সব ছেলেমানুষী ছোটবাবু সহজেই ক্ষমা করে দেবে।

    কিন্তু বাথরুমে যেন এখন কেউ নেই। জলের ঝাপটা কখন থেমে গেছে। ঝর ঝর করে জল পড়ার শব্দ পর্যন্ত হচ্ছে না। একেবারে চুপচাপ এবং দূরে সব পাহাড়ী উপত্যকাতে নক্ষত্রের মতো আলোগুলো ক্রমে নিভে আসছে। ক্রমে এই শহর বন্দর এবং সমুদ্র শীতের ঠাণ্ডায় নিঝুম। সে হাত পা নাড়ালে পোশাকের খসখস শব্দ পর্যন্ত টের পাচ্ছে।

    আর মেজ-মিস্ত্রি তখন স্থির চোখে শুয়ে আছে। ওকে দেখলেই বোঝা যাবে গায়ে সৌরভ মেখে যে বালিকা বড় হচ্ছে জাহাজে তার জন্য চোখে ঘুম নেই। কি নরম মাংস, আর অস্থিমজ্জায় লোলুপতা। সে শুয়ে শুয়ে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ঠোঁট চাটছে।

    .

    ডেভিড জাহাজে ফেরে নি। সে ফিরবে না। বন্দরে থেকে গেছে। শীতের জ্যোৎস্নায় কোনো সবুজ মাঠে সে এবং এক যুবতী পাহাড়ের নিচে জড়াজড়ি করে রয়েছে। এমন উষ্ণতা সে আর কোথাও পাচ্ছে না। সমুদ্রের গর্জন তাদের মাঝে মাঝে ভীষণ চঞ্চল করে তুলছে।

    আর নিচে এনজিন-রুমে মাত্র একজন ফায়ারম্যান—মাত্র একটা বয়লার চালু, এই জাহাজে আলো জ্বেলে সব উষ্ণতা রক্ষা করছে সে। সেই কিট কিট শব্দ ব্যালাস্ট পামপের। সেই একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে মহাকায় যন্ত্রদানব। তার চার বড় লোহার থামের ওপর ঘোড়ার পিঠের মতো লম্বা সিলিণ্ডার। যেন সেই আবহমানকাল থেকে অহর্নিশ ছুটতে ছুটতে প্রাচীন অশ্বের মতো সে সহসা এখন স্থির। সমুদ্রে আবার কোথাও যুদ্ধ ঘোষণা না হলে সে আর ছুটছে না। সে এখন চুপচাপ কেবল বিশ্রাম নিচ্ছে, অথবা চোখ বুজে ঝিমুচ্ছে।

    জেটিতে দাঁড়িয়ে এ-সব কিছুই বোঝা যাবে না। শুধু দেখা যাবে জাহাজ সিউল-ব্যাংক। সে কিনারায় লেগে রয়েছে। সমুদ্রের অতিকায় ঢেউ ভেঙ্গে সে এসে এখানে ভিড়েছে বোঝাই যায় না। তার আলো, ঘর, বাতি সবকিছু এত শান্ত আর এত নিরীহ

    .

    তখন ছোটবাবু দরজা খুলে বের হবে ভাবল। এ-ভাবে ভয়ে লুকিয়ে থাকা ঠিক না। সে সাহসী হতে চাইছে। সে চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে পারত, সবাই এসে যখন দেখতে পেত, ভূতটুত কিছু নেই, তখন হাসি ঠাট্টা মশকরা, সে আর এ-জাহাজে জোকারের মতো কাজকর্ম করতে পারে না।

    আর এ-ভাবে যা হয়, সে নিজেকে কাপুরুষ ভেবে ফেলল। সে সব অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছে। যত সহ্য করছে তত সবাই তাকে পেয়ে বসেছে। সে বরং ভাবল, সকাল হলে, জ্যাকের জামা-প্যান্ট ঠিক ডেকে দাঁড়িয়ে যেমন দু’হাতে তার সবকিছু টেনে জ্যাক ফালা ফালা করে দিয়েছিল তেমনি, সে সব ফালা ফালা করে দেবে। কাপ্তানের কাছে নালিশ গেলে সে বলবে, সে অকপটে বলবে—স্যার আমার জামা-প্যান্ট দেখুন। আমি কি করেছি! আমাকে বার বার কতবার এ-ভাবে জ্যাক অসম্মান করবে!

    দরজায় খুট করে শব্দ হতেই বনি মুখ ফেরাল।

    ছোটবাবু দরজা খুলে আবার যেন ভূত দেখেছে। পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, আবার তুমি জ্যাক! এবং সেই ঘণ্টা-ধ্বনি মাথায়, যেন সীমাহীন অন্ধকারে এক অতিকায় ঘণ্টা নিরবধিকাল মাথার ভেতরে বেজে চলেছে। সে এ-ভাবে চোখে মুখে অন্ধকার দেখলে সহসা কেমন প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠতে থাকল। জ্যাক যে আবার চাতুর্যে মনোহারিণী—এসব তার কাছে ভীষণ মূল্যহীন। জ্যাক যে থর থর কাঁপছে চোখে মুখে পৃথিবীর যাবতীয় সুষমা নিয়ে সে তার কিছুই লক্ষ্য করছে না। যেন দীর্ঘকালের অসম্মান অপমান মুহূর্তে দু’হাতে ওর সুন্দর গাউন ছিঁড়ে ফেলে দিলেই শেষ হয়ে যাবে।

    জ্যাক বলল, আমি বনি, আমি মেয়ে। তুমি এটা কি করছ ছোটবাবু!

    ছোটবাবু কিছু যেন শুনতে পাচ্ছে না। কেবল ঘণ্টা-ধ্বনি, চোখ জ্বলছে ছোটবাবুর। কাণ্ডজ্ঞানহীন যুবকের মতো ছোটবাবু দু’হাতে ওর সাদা মসলিনের গাউন চেপে ধরেছে। গলার কাছে ছোটবাবুর শক্ত দু’হাত। বনি ছোটবাবুর চোখ দেখে কাতর, সে বার বার বলছে, ছোটবাবু আমি মেয়ে। তুমি বিশ্বাস কর আমি মেয়ে।

    আর ছোটবাবুর মাথায় তেমনি ঘণ্টা-ধ্বনি। সেই পাহাড়ের ওপর সে ঠিক জলদস্যুর মতো উঠে যাচ্ছে যেন। কোনো হুঁশ নেই। সে দেখতেও পাচ্ছে না ঠিক হাতের নিচে সেই অসংখ্য তরঙ্গ মালা সমুদ্রের, ছিঁড়ে দিলেই প্রলয়ঙ্কার ঘটনা ঘটে যাবে পৃথিবীতে। দু’হাতে পোশাকের ভেতর হাত চালিয়ে ক্রমে সে সুন্দর পোশাক ফালা ফালা করে দিতে গেলে—কি যে কাতর চোখ মুখ। বনি কিছুতেই ছোটবাবুর সঙ্গে পেরে উঠছে না। দু’হাতে সে তার পোশাক সামলাচ্ছে। আর সেই শক্ত হাতের ভেতর কখন যে নাভিমূলে, ছোঁড়া পোশাকের ভেতর নীলাভ বর্ণমালা অবিকল যুবতীর শরীর হয়ে গেল, ছোটবাবু বুঝতে পারছে না। মাথায় শিরা-উপশিরায় রক্তের চাপ, জোরে শ্বাস পড়ছে—সে পাগল হয়ে যাচ্ছে না তো! চোখের সামনে সে এ-সব কি দেখছে! ছেঁড়া পাল খাটানো জাহাজের অভ্যন্তরে সাগরের তাজা মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছে সবকিছু। জ্যাক নড়ছে না। যেন জ্যাকের আর কিছু করণীয় নেই। জ্যাক কোনরকমে দু’হাতে তার রত্নরাজি বিছানার চাদর টেনে শুধু ঢেকে ফেলল। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়ল।—ছোটবাবু, তুমি এত নিষ্ঠুর।

    ছোটবাবু চিৎকার করে উঠল, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি জ্যাক। এ-সব আমি কি দেখছি! আমি কি দেখছি এ-সব!

    বনি দেখছে ছোটবাবুর চোখে বিভ্রম। চোখে মুখে ভীষণ হতাশা। কেমন মায়া আবার বেড়ে যায়। বনির বলার ইচ্ছে হল, তুমি পাগল হয়ে যাও নি। তুমি আমাকে বিশ্বাস কর ছোটবাবু। ঈশ্বরের দোহাই। তুমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দ্যাখো আমি বনি। আমি মেয়ে। আমার সবকিছুর ভেতর আমি বনি। তুমি ঠিকই দেখছো। সে এ-সব কিছুই বলতে পারল না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেবল কাঁদছে। ছোটবাবু যদি সত্যি পাগল হয়ে যায়। ওর চোখের দিকে কিছুতেই তাকানো যাচ্ছে না। চোখে কেমন বিভীষিকা। ছোটবাবুর কি আবার সেই মাথার আঘাত অথবা মাথার ভেতর তার কিছু হচ্ছে! আঘাত ভীষণ প্রবল ছিল, জ্যাক বার বার প্রশ্ন করেও কোন সঠিক জবাব বাবার কাছ থেকে পায় নি। ছোটবাবুর চোখ এখন পাথরের মতো স্থির। বনি কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।

    ছোটবাবুর পাথরের মতো মৃত চোখ দেখতে দেখতে নিজের লাঞ্ছনার কথা বনি একেবারে ভুলে গেল। ছোটবাবুকে এখন নিরাময় করে তুলতে না পারলে সে মরে যাবে। সে ওর ছেঁড়া পোশাকে কোনরকমে শরীর ঢেকে উঠে দাঁড়াল। ছোটবাবুর ঠিক বুকের কাছে মুখ রাখার মতো ধীরে ধীরে বলল, তুমি এস। সে যেন সেই চিরদিনের যুবতীদের মতো স্নেহের স্বরে ডেকে নিয়ে গেল ছোটবাবুকে। ফিসফিস গলায় বলল, আমি মেয়ে ছোটবাবু। তুমি বিশ্বাস কর আমি মেয়ে। আমি বনি। বাবা আমাকে ভয়ে ছেলে সাজিয়ে রেখেছে।

    ছোটবাবু নড়ছে না। স্থির। অপলক। জ্যাককে সে দেখছে।

    বনি বুঝতে পারছে এখনও বিভ্রম কাটে নি। সে বলল, ছোটবাবু, আর্চি জাহাজে উঠেই টের পেয়েছে, আমি মেয়ে। তোমাকে আমি ভালবাসি বলে ওর ভীষণ হিংসে। সে তোমাকে বারবার বিজে নামিয়ে কষ্ট দিচ্ছে।

    আর এইসব কথাই তার মগজে বার বার ঘণ্টা-ধ্বনির মতো যেমন শব্দগুলো কখনও আর্চি আৰ্চি, ঘণ্টার শব্দ—আর্চি আর্চি, আবার কখনও বিল্জ বিল্জ, ঘণ্টার শব্দ—বিল্জ বিল্জ—এ-ভাবে সেই এক শব্দতরঙ্গ নিরবধিকাল ধরে বেজে বেজে তাকে কখন যেন আবার নিরাময় করে দেয়।

    বনি বলল, তুমি পাগল হয়ে যাও নি। তুমি ভাল আছো।

    ছোটবাবু বলল, তাহলে তুমি জ্যাক নও। তুমি বনি।

    —আমি বনি ছোটবাবু। বলে, সে আবার তার বুকের ওপর থেকে দু’হাত বাতাসে ডানার মতো ভাসিয়ে দিল। চোখ মাটিতে রেখে সে যে মেয়ে তার প্রকাশ শরীরের সব চারুকলাতে তুলে ধরতে ধরতে কখন কিভাবে যে ছোটবাবুর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিজেও জানে না। ছোটবাবু অবোধ বালকের মতো যেন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে তখন। ওপারে ওর ঘুড়ি উড়ে যাচ্ছে বাতাসে। সে কেবল সেই দূরন্ত বাতাসে ক্রমে দেখতে পাচ্ছিল, ঘুড়িটা অনেক দূরে, অনেক শস্যক্ষেত্র পার হয়ে চলে যাচ্ছে। যেন এই তার নিয়তি। কিছু আর করার নেই। এবারে সে বনিকে ভীষণ আবেগে জড়িয়ে ধরল। তারপর কি করতে হবে সে তো এখনও ভালো জানে না। সে ভীষণ ছটফট করতে থাকল।

    বনি মুখ তুলে তাকিয়ে আছে।

    ছোটবাবু বলল, আমি কি করব তারপর?

    বনি বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল। ধীরে ধীরে বলল, আমিও ঠিক জানি না ছোটবাবু আমরা কি করব তারপর!

  • চৌত্রিশ

    চৌত্রিশ

    ।। চৌত্রিশ।।

    মৈত্র বলল, এই তোর নাম কিরে?

    ছেলেটা বলল, আমার নাম ওয়াকা। তুমি আবার ভুলে গেছ!

    —আচ্ছা ওয়াকা, তোর কি ভাল লাগে?

    —আমার? সে কি ভেবে বলল, তোমাকে। তুমি পৃথিবীর সব দেশে গেছ?

    —তা আমি গেছি।

    —আচ্ছা আমাদের লায়ন-রকের পর কি আছে বসন্তনিবাস?

    —সমুদ্র।

    —তারপর?

    —তারপর অস্ট্রেলিয়া। ওয়াকা তুই পড়াশোনা করিস না?

    ওয়াকা বলল, ওদের আমি ডেকে আনছি। আমাকে একটা বেশী দেবে।

    মৈত্র বলল, ম্যাণ্ডেলাকে বলবি আমি এসে গেছি।

    —বলব। বলে ওয়াকা ঘরে ঘরে যেন খবর দিতে চলে গেল।

    এবং মৈত্র বসে থাকল। জায়গাটা বেশ সমতল। মসৃণ। চারপাশে ছোট সব পাহাড়ের ঢিবি। ঢিবিতে সব ছোট ছোট বাড়ি। নিচে ট্রামলাইন। একটু নিচে হাল্কা কুয়াশা জমেছে। এবং সূর্য অস্ত যাবে এবার। পাশে স্কুলবাড়ির মাঠ খালি। ফাদার মাঠে দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড় দেখছেন। এবং মৈত্র বসে রয়েছে। সে পরেছে কালো রঙের জোব্বা। ওর শরীরে পৃথিবীর যাবতীয় খেলনা। ওর ইচ্ছে হচ্ছে একবার ম্যাণ্ডেলার বাড়ি যাবে। সে প্রতিদিন এখানে চলে আসে। তার পকেটে সব চকোলেট। এবং ঝুমঝুমি। সে যেতে যেতে কখনও মাথায় লম্বা ফুলের টুপি পরে নেয়। সে সমুদ্রের ধারে ধারে ঘুরে বেড়াবার সময় ওয়াকা সঙ্গে থাকে। ওয়াকা নামটা সে কিছুতেই মনে রাখতে পারে না। প্রতিদিন ওর নামটা জেনে নিতে হয় এবং মৈত্র দেখল তখন ওয়াকা গাছের ফাঁকে, পাহাড়ের ছায়ায় দৌড়ে আসছে। ওয়াকার রঙ শ্যামলা, চোখ কালো, কালো চুল এবং ওয়াকা একটা পাতলুন পরেছে, একটা কোট, নিচে জামা নেই, সাদা কেডস জুতো ছেঁড়া। ওয়াকা এসেই আরো একটা চকোলেট চেয়ে নিল।

    সবাই এসে যে যার নাম বলে মৈত্রের চারপাশে দাঁড়িয়ে গেল। হাত পাতল।

    —ম্যাণ্ডেলা এল না কেন রে? মৈত্র বলল।

    —ম্যাণ্ডেলা ওর মার সঙ্গে বেড়াতে গেছে।

    ম্যাণ্ডেলা না এলে কেমন সবকিছু অর্থহীন মনে হয়। অবশ্য ওয়াকা খুব আমুদে ছেলে। ওর বাবা মেষপালকের কাজ করে বেড়ায়। মা ফলের দোকানে কাজ করে। ওয়াকার পড়াশোনা ভাল লাগে না। সে সারাদিন বেলাভমিতে যারা আসে, তাদের ফাই-ফরমাস খাটে এবং জাহাজের নাবিকদের সঙ্গে আলাপ করার খুব ইচ্ছে। অনেক দিন থেকে সে ভেবেছে একজন জাহাজির সঙ্গেই বন্ধুত্ব করবে। সে তার মার সঙ্গে মাসখানেক হল এ-শহরে চলে এসেছে। এবং এসেই এমন সুন্দর বেলাভূমি আর সমুদ্র এবং পাহাড়, পাইনের বনভূমি দেখে একেবারে তাজ্জব। ওর ইচ্ছে সে বড় হয়ে নাবিকের কাজ করবে। ওয়াকার সঙ্গে আলাপ হবার পর এমন জানতে পেরেছে মৈত্র।

    ওয়াকা সেদিন বলেছিল, গুড মর্নিং মিস্টার সেলার।

    মৈত্র বলেছিল, আমি মিস্টার সেলার নই হে ছোকরা। আমি বসন্তনিবাস। ম্যাণ্ডেলার কাছে যাচ্ছি। খুব সুন্দর মেয়ে। ওর জন্য এই দ্যাখো কি নিয়ে যাচ্ছি।

    —দেখি কি নিয়ে যাচ্ছ!

    —একটা সাদা ঘোড়া। এটা এনেছি জাভা দ্বীপ থেকে। তোমার কি চাই?

    —আমায় একটা টুপি দিতে পার। নারকেল পাতার টুপি।

    —কাল পাবে। এবং পরদিন মৈত্র সোজা ডেক-টিণ্ডাল হাসানের ঘরে ঢকে গিয়েছিল। ওর একটা তালপাতার টুপি আছে। সমুদ্রে যখন ভীষণ রোদ থাকে, হাসান মাথায় টুপি পরতে ভালবাসে। মৈত্র, ওয়াকার জন্য টুপিটা গোপনে চুরি করেছিল। এবং ওয়াকাকে সে টুপিটা পরিয়ে একটা ছবি তুলেছিল পর্যন্ত। মৈত্র ওয়াকার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে ছবিটাতে।

    ওয়াকা বলত, বসন্তনিবাস, তুমি তিমি মাছ দেখেছ?

    —অনেক। তিমি মাছের একটা বাচ্চা ধরেছিলাম একবার। তারপর জাহাজে চৌবাচ্চা বানিয়ে রেখে দিয়েছিলাম। একদিন ভীষণ ঝড় আর বৃষ্টি। দেখি বেটা লাফিয়ে ডেকে পড়ে গেছে। আমরা ক’জন মিলে ওটাকে চৌবাচ্চায় রাখতে গিয়ে সমুদ্রে পড়ে গেছিলাম। সেই থেকে আর বাচ্চা পেলেও এখন আর ধরে রাখি না। বড্ড ঝামেলা।

    —সত্যি ঝামেলা। ওয়াকা বলল, ওদের দাও। কখন থেকে হাত পেতে রয়েছে।

    সে একটা একটা করে দামী চকোলেট দিল। ওদের মুখ দেখল। তোমাদের মা-বাবাকে কিন্তু আবার বলে দেবে না, বলল মৈত্র।

    ওয়াকা বলল, ওরা তোমার সঙ্গে আজ খেলবে না।

    —খেলবে না কেন?

    —ওদের স্কুল খুলে যাবে। সকাল সকাল বাড়ি ফিরে যেতে হবে। পড়াশোনা না করলে ওরা বড় হবে কি করে?

    —কাল খেলবে তো?

    —তোমাকে আরও সকাল সকাল আসতে হবে বসন্তনিবাস। এখনতো সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে।

    মৈত্র বলল, কাল আমি ছুটি নেব ওয়াকা। সকাল সকাল চলে আসব। ওয়াকা শোনো। বলে কাছে ডাকল। ম্যাণ্ডেলাকে বলবে কাল আমি ওঁদের বাড়ি যাব।

    ওয়াকা বলল—ম্যাণ্ডেলা দের ফিরতে দেরি হবে।

    —কবে ফিরবে?

    —তাতো জানি না। ওদের চাকরটা কিছু বলতে পারছে না।

    আচ্ছা ওয়াকা, ম্যাণ্ডেলার মা’র সব সময় অসুখ-বিসুখ লেগে থাকে তাই না?

    —সর্দি জ্বর হতে দেখেছি। একদিন খুব কাশছিল।

    —আর কিছু না।

    সব ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তখন বলল—এই আমরা খেলব না।

    ওয়াকা বলল—না, তোমরা বাড়ি যাও। রাত হলে তোমাদের মা-বাবারা বকবে।

    বসন্তনিবাস বলল, ওরা থাক না। ওরাতো কোনো গণ্ডগোল করছে না।

    ওয়াকা হাত ছুঁড়েফুঁ ড়ে বলল, আরে এদের মা-বাবাকে তো তুমি জান না, ভীষণ বাজে।

    হয়তো তখন পাহাড়ের ওপরে কাঠের বাড়িতে কোনো জানালায় উঁকি দিয়ে কেউ দেখছে।

    ওয়াকা টের পেয়েই বলছে, এই টিকি, তোকে তোর মা দ্যাখ খুঁজছে। তাড়াতাড়ি যা।

    তখন হয়তো অন্য পাহাড়ের ছাদে দাঁড়িয়ে ডাকছে, টপু। টুপু কোথায় রে!

    —যাই বাবা।

    ছোট্ট এইসব মাউরি ছেলেমেয়েরা চারপাশে দাঁড়ালে মৈত্র সব কষ্ট ভুলে যেতে পারে। ম্যাণ্ডেলার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি দিনের আলাপ। এবং ওর মামা ডঃ বুচার বলেছিল—বেশি আশকারা দেবে না, তবে তোমার রক্ষে থাকবে না।

    মৈত্র, ম্যাণ্ডেলা আসেনি বলে কেমন গোমড়ামুখে বসে থাকল। ওয়াকা ওর পাশে ঠিক ওর মতো দু’পায়ের ওপর ভর দিয়ে বসে আছে। যেন কতদিনের বন্ধুত্ব দু’জনে। বসন্তনিবাস একটা বাচ্চা তিমি পুষেছিল। এর চেয়ে বড় খবর ওয়াকা পৃথিবীতে কি আছে জানে না।

    টুপু, টিকি এবং অন্য সবাই দাঁড়িয়ে আছে। কেউ যাচ্ছে না। ওয়াকা খুব বিরক্ত হচ্ছে।—এই তোরা যা। আমরা এখন উঠব।

    মৈত্র বলল—আচ্ছা ওয়াকা, ম্যাণ্ডেলার মা’কে কখনও হাসতে দেখেছ?

    ওয়াকা মাথা চুলকাল। বলল—মনে করে দেখি। তোরা এখনও দাঁড়িয়ে! আর নেই। আবার যখন আসবে নিয়ে আসবে। তারপর কি ভেবে বলল—হ্যাঁ, হাসতে দেখেছি।

    —কবে?

    —এই তো সেদিন।

    —যাঃ হতেই পারে না। জাহাজডুবির পর হাসতে দেখেছ?

    —জাহাজডুবি! ওহো, আমাদের মনেই নেই। ম্যাণ্ডেলার বাবা জাহাজডুবিতে নিখোঁজ হয়েছে। জাহাজডুবির পরও হাসতে দেখেছি।

    —মিথ্যে কথা। মৈত্র উঠে দাঁড়াল। রাগে ওর হাত-পা কাঁপছে।—ওয়াকা, তুমি মিথ্যে কথা বলছ।

    —তা হবে। তুমি যাচ্ছ!

    —জাহাজে ফিরছি।

    —চল, সঙ্গে যাচ্ছি।

    ওরা দু’জনেই লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে এল। পাথর কেটে সব রাস্তা। এখন চারপাশের সব বাড়ি- ঘরগুলোতে আলো জ্বলছে। কোথাও আলো জ্বেলে মেয়েরা টেনিস খেলছে। মসৃণ সবুজ ঘাসের ভেতর ওরা যখন দৌড়ায়—ওদের সুন্দর পা-হাত-মুখ এবং সাদা পোশাক দেখতে দেখতে মৈত্র কেমন তন্ময় হয়ে যায়। তখন ওয়াকা হঠাৎ ডেকে ওঠে, এই বসন্তনিবাস, তুমি জাহাজে যাবে না?

    মৈত্র মনে করতে পারে জাহাজে তার কাজ। সে এদেশের কেউ নয়। ওয়াকা তার কেউ নয়। এই বাচ্চা শিশুরা ওর কেউ নয়। সে আপন মনে চুপচাপ হাঁটে। তারপর আবার সহসা অবিশ্বাসের ভঙ্গীতে বলে, সত্যি বলছ হেসেছিল।

    —আমার তো তাই মনে হয়। নামতে গিয়ে ওয়াকার মাথা থেকে টুপি পড়ে গেছিল। সে টুপিটা তুলে নিল, দু’বার ঝেড়ে ওটা আবার মাথায় পরে বলল—আমি দেখেছি। ওকে অনেকবার হাসতে দেখেছি।

    —অনেকবার! মৈত্র কেমন মুখ গোমড়া করে ফেলল। স্বপ্নটার সঙ্গে ঠিক মিলছে না। সে বলল- আচ্ছা ওয়াকা, তা হলে যাচ্ছি। আসলে ওয়াকা ঠিক বুঝতে পারে না। ছেলেমানুষ, না বোঝারই কথা ম্যাণ্ডেলার মা হাসতেই পারে না। বরং মৈত্রের ইচ্ছে হল একবার বলে, জানো ওয়াকা, আমি যতদূর জানি তিনি লম্বা একটা মেহগিনি খাটে কেবল শুয়ে থাকেন। সারা শরীর নরম সাদা সিল্কের চাদরে ঢাকা। মুখের রং ফ্যাকাশে। কেবল চোখ দুটো তাজা। ভীষণ তাজা আর মাঝে মাঝে সেই ছোট্ট ক্যাঙ্গারুর বাচ্চাটা বিদেশী লোক দেখলেই কুঁই কুঁই করে ওঠে।

    ওয়াকা বলল—ওদিকে কোথায় যাচ্ছ! ওদিকে কোনো রাস্তা নেই। শুধু বন। গভীর বনের ভেতর ঢুকে গেলে আর বের হতে পারবে না বসন্তনিবাস।

    মৈত্র তখনই একটা ভীষণ ঠাণ্ডা গলার স্বর শুনতে পেল। সে ভীষণ ভয় পায়। সেই ছোটবাবু আর ডেভিড। হাতে তাদের টর্চ। ছোটবাবু বলছে, এদিকে এস ওয়াকা, তুমি ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলে। সারাদিন তুমি ওর সঙ্গে ছিলে?

    —কোথাও না স্যার।

    ডেভিড, মৈত্রকে নিয়ে আগে যাচ্ছে। ছোটবাবু ওয়াকার সঙ্গে

    ওয়াকা তখন বলেছিল—বসন্তনিবাস তো বিকেলের দিকে কুইনস পার্কে গেছে। তার আগে ওকে আমরা দেখিনি। সারাদিন আমি ওর সঙ্গে থাকব কি করে!

    ছোটবাবু ভেবে পেল না সারাটা সকাল দুপুর মৈত্রদা কোথায় ছিল। জাহাজে এসে সে নানারকম ঝামেলায় ক্রমে জড়িয়ে যাচ্ছে। ক্যাথারিন এসে এক রোববারে ফিরে গেছে। বন্ধু অনিমেষ এক রোববারে সবার হয়ে গেছে। ছোটবাবু যেতে পারছে না। সেই যে সে জেনে ফেলেছিল বনিকে আর তখন থেকে সে একেবারে অন্য মানুষ। কেমন সে দায়িত্বশীল মানুষ, অথবা কখনও উইনচের নিচে বনি এসে যখন ওর এটা ওটা এগিয়ে দেয় সে ভেবে পায় না বনিকে কি বলবে। বনি সহজেই অজস্র কথা বলতে পারে, বনির সঙ্গে সারারাত বোট-ডেকে বসে গল্প করতে করতে কখনও রাত কাবার হয়ে যায় এবং বনিকে নিয়ে সে ঘুরেও আসতে পারে যেন—বনি ভীষণ বুদ্ধিমতী। সঙ্গে ডেভিডকে নিতে ভালবাসে আর তারপর বনি ডেবিডকে কোন পাবে বসিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দেয়—কথা থাকে ফেরার সময় তুলে নেবে ডেবিডকে। ছোটবাবু চুপচাপ থাকে। বনির চুল বড় হয়ে যাচ্ছে। বনির চুল বাতাসে উড়তে থাকে। বনির ভারি খারাপ স্বভাব–সে কথা বলার সময় অযথা হেসে ছোটবাবুকে ঠেলে দেয় সামান্য। ছোটবাবু তখন না বলে পারে না, এই পড়ে যাব কিন্তু। পড়ে গেলে মরে যাব।

    আসলে ছোটবাবু ওয়াকাকে বলতে চাইল, ওকে বেশি দুর নিয়ে যাবে না। আমাদের জাহাজ শিগগির ছেড়ে দেবে। আমরা সামোয়াতে যাব। ওঁকে নিয়ে আমরা খুব চিন্তায় পড়ে গেছি ওয়াকা! এমন হাসিখুশী মানুষটা হঠাৎ কি যে হয়ে গেলেন!

    ওয়াকা বলল—যাচ্ছি স্যার।

    ওরা হাঁটতে হাঁটতে সী-ম্যান মিশানের কাছে এসে গেছে। ছোটবাবু ওয়াকাকে বলতে পারত—তোমরা ওকে বেশি দূরে নিয়ে যাবে না। ওর মাথায় গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে। জাহাজে এটা হয়। বড় একঘেয়েমী কাজ জাহাজে। তুমি তো জানো না ওয়াকা—মৈত্রদার দেশে স্ত্রী আছে। মানুষটা তার বৌকে ভীষণ ভালবাসে। ওর ছেলে হবে। ছেলে হলে একদিন ভোজ দেবার পর্যন্ত কথা ছিল। এখন সেসব আর ভাবি না।

    তরপর যেন বলতে পারত, তোমাদের কি কিছু বলে মৈত্রদা? এই যেমন তাঁর বৌর কথা বাচ্চার কথা। চিঠির কথা। চিঠি একটাও কেবিনে পাওয়া যাচ্ছে না। স্যালি হিগিনস চিফ্-মেট সবাই দুঃসংবাদে ওর ফোকসালে নেমে দেখেছিল, চুপচাপ মৈত্রদা বসে রয়েছে। চোখ ঘোলা। কাজে বের হয়নি। এবং সারেঙকে সারারাত অযথা খিস্তিখেউড় করেছে। সারারাত সব চিঠিতে আগুন জ্বালিয়ে হাত-পা সেঁকেছে।

    ওয়াকা চলে যাচ্ছিল। ছোটবাবু বলল—তোমার সঙ্গে ফের দেখা হলে আমাদের খবর দেবে।

    —আচ্ছা। সে এবার সত্যি চলে যাচ্ছিল।

    ছোটবাবু বলল—তুমি কোথায় থাকো?

    সে একটা পাহাড়ের টিলা দেখিয়ে বলল—ঠিক তার নিচে। রাস্তার নাম সাইমন স্ট্রীট। সে যে বাড়ির আউট-হাউসে রাতে শুয়ে থাকে তার ঠিকানা পর্যন্ত দিয়ে দিল।

    ওয়াকা বুঝতে পারছিল না এমন ভালো মানুষটাকে তাঁরা খুঁজে নিয়ে যাচ্ছে কেন। বসন্তনিবাস তো জাহাজেই ফিরছিল। বেশি রাতও হয়নি। এর চেয়ে কত বেশি রাত করে জাহাজিরা বন্দরে ফেরে। আর সে দেখেছে বসন্তনিবাসের মতো সমুদ্রের গল্প কেউ বলতে পারে না। ওরা দু’জনে অনেক দিন গল্প করতে করতে সারাটা দিন কাটিয়ে দিয়েছে। বসন্তনিবাস ওয়াকাকে ভাল ভাল খাবার খাইয়েছে দোকান থেকে। যেন বসন্তনিবাসের এর চেয়ে বড় কাজ পৃথিবীতে আর নেই।

    বনি গ্যাংওয়েতে দাঁড়িয়েছিল। সে ছোটবাবুকে উঠে আসতে দেখে বলল—পেলে?

    —পেয়েছি। আসছে।

    বনি দেখল মানুষটা অন্ধকার থেকে উঠে আসছে। কালো পোশাক শরীরে। নানা রঙের রাংতা আঁটা। সেফটিপিনে সব লাল নীল ফিতে, হলুদ প্রজাপতি। বড়দিনের উৎসবে যেমন সবাই লম্বা টুপি পরে হৈ-চৈ করে বেড়ায় বড়-টিণ্ডালের মাথায় তেমনি লম্বা টুপি। টুপিতে সব হলুদ নীল ফুল। বোধহয় ওয়াকা বলে ছেলেটা বড়-টিণ্ডালকে ফুল দিয়ে এভাবে সাজিয়ে দেয়।

    জাহাজে মৈত্রদা কারো সঙ্গে কথা বলছে না। কাজের সময় ঠিক কাজ করে যাচ্ছে। ছুটির দিনে সে সকালেই বের হয়ে পড়ে। কোনো কোনোদিন রাতে ফেরে না। একদিন ওয়াকা এসেই খবর দিয়েছিল, সমুদ্রের ধারে বালিয়াড়িতে শুয়ে আছে বসন্তনিবাস। ওয়াকা কিছুতেই জাহাজঘাটায় নিয়ে আসতে পারছে না।

    এসব দিনেও ছোটবাবু, বন্ধু অথবা অনিমেষকে নিয়ে খুঁজতে বের হয়। কোনোদিন ডেভিড থাকে সঙ্গে। অমিয় কেমন স্বার্থপরের মতো ব্যবহার করছে। মাঝে মাঝে তার হাতে থাকে লম্বা একটা থলে। থলের মুখ ঢাকা। দু’দিন গ্যাংওয়েতে কোয়ার্টার-মাস্টার ধরেছিল। সে ব্যাগ খুলে দেখালে কোয়ার্টার- মাস্টার অবাক। এসব ছাই পাশ সে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! অমিয় একটা কথাও বলেনি। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় মাথা বোধ হয় কারো ঠিক নেই। আরো এক বছর থাকতে হবে জাহাজে, দেশে ফেরা যাচ্ছে না। এই সব শুনেই হয়তো ভয়ে বড়-টিণ্ডাল পাগল হয়ে গেল। এবং সে নিজেও ভাল নেই। জাহাজের এই হাল তবিয়ত—কখন কি হয় অথচ মুখ ফুটে বলার কারো সাহস নেই। কোয়ার্টার-মাস্টার তারপর অমিয়কে একটা প্রশ্নও করেনি।

    একদিন ছোটবাবু অমিয়কে ডেকে খুব কথা শুনিয়েছিল।—তুই কিরে! মৈত্রদার কোন খোঁজ-খবর নিস না। কোথায় থাকিস!

    অমিয় বলেছিল, ছোটবাবু, জাহাজের অবস্থা ভাল না তোমাকে বলে দিলাম। মৈত্রদা সেয়ানা লোক। পাগলামি করলেই ভেবেছে দেশে পাঠিয়ে দেবে। ও-সব আমরা বুঝি।

    —তুই কি বলছিস যা তা!

    —সত্যি কথা বলছি। তুমি তো আর জাহাজিদের খবর রাখো না। মন কারো ভালো নেই। এই যে এক বছরের জন্য কাপ্তেন সাউথ-সীতে ভেসে বেড়াবে সেটা কেন তুমি জান?

    —ফসফেট টানবে জাহাজ

    —ধুস, তুমি একটা আহাম্মক ছোটবাবু? ওটাতো একটা ওজুহাত। জাহাজ এখন কোম্পানির কর্তারা ডুবিয়ে দিতে পারলে বাঁচে। ওটা ওপরের দিকে উঠতে থাকলেই বাবুদের জ্বর আসতে থাকে।

    ছোটবাবু একটা কথা বলতে পারল না। বেশ কানাঘুষা তবে জাহাজে যেই হোক প্রচার ভালই চালিয়ে যাচ্ছে।

    ছোটবাবু বলল. আমার এসব বিশ্বাস হয় না। সব গুজব।

    —তুমি নতুন ছোটবাবু। তোমার কেউ নেই। মা-বাবা-ভাই বোনের খোঁজ খরব রাখ না। তুমি কি করে বুঝবে আমাদের দুঃখ।

    ছোটবাবু কেবিনে পায়চারি করছিল। অমিয় বসে রয়েছে। ছোটবাবু ভেবেছিল, কি করে এমন একটা গুজব থেকে জাহাজটাকে রক্ষা করা যায়। ডেবিড মাঝে মাঝে ক্ষেপে গেলে এমনই বলত। তার তখন বিশ্বাস করতে ভাল লাগত। ডেবিড কি এখন সবাইকে একই কথা বলে বেড়াচ্ছে। কতবার জাহাজ পথ হারিয়েছিল, কিউ-টি-জি কতবার সঠিক পায়নি, কম্পাস রীডিং ঠিক না পেলে যা হয়, যতই মেরামত করা হোক অথবা নতুন কম্পাস জাহাজে উঠলেই সবাই কেমন গণ্ডগোলে পড়ে যায়। আসলে সবই গুজব সে বলতে পারত। ক’ বার ক’জন কাপ্তান পাগল হয়ে নেমে গেছে জাহাজ থেকে তার একটা লিস্ট যেন এখুনি টানিয়ে দিতে পারে অমিয়! এবং ছোটবাবু এটা বুঝতে পেরেছে ফোকসালে নেমে। সবার চোখে-মুখে ভীষণ অসন্তোষ। সুযোগ পেলেই সারেঙকে যা তা বলছে। সুতরাং অমিয় তাকে তো স্বার্থপর ভাববেই।

    ছোটবাবু বলল—মৈত্রদা তোকে কিছু বলেছে?

    —কী বলবে?

    ছোটবাবু বলল—এসব গণ্ডগোল হবার এমন কিছু কথা যা থেকে আমরা ধরতে পারি—অর্থাৎ কোনো ক্লু যদি আবিষ্কার করা যায়।

    —তুমিও যেমন ছোটবাবু। মৈত্র কাঁচা ছেলে। সে আগে যদি কিছু বলতই তবে তোমরা তো সব ধরেই ফেলতে।

    —আমার তো মনে হয় বাড়ি থেকে কিছু খারাপ খবর-টবর এসেছে।

    —তুমি সেই ভেবে থাকো। আমি এখন উঠব। জাহাজ এবার ছাড়ছে। তুমিও সাবধানে থেকো। যা সব শুনেছি ওতে কারো নিস্তার নেই। কাপ্তান আস্ত একটা শয়তান। কাপ্তান মানুষ হলে এমন ভাঙা জাহাজ নিয়ে দরিয়ায় ভাসতে সাহস পেত না।

    ছোটবাবুর মনটা কেমন দমে গেল। এ জাহাজে বনি আছে এবং কাপ্তেন জেনে-শুনে এত বড় দায়িত্বের ভেতর কেন যাচ্ছেন! ছোটবাবু কি ভেবে বলল—আচ্ছা ঠিক আছে, তুই যা।

    অমিয় যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

    ছোটবাবু তখনও পায়চারি করছে। বড়-মিস্ত্রির নেমে যাওয়া, বিষাক্ত পাখিদের উড়ে আসা, আর্চির ক্রুদ্ধ মুখ, বনিকে জাহাজে নতুনভাবে আবিষ্কার, মৈত্রদার সহসা পাগল হয়ে যাওয়া, তাকে খুবই চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। এবং জাহাজে কাপ্তান নিজেও কিসব দেখতে পান। একজন মেয়ে সবসময় সোনালী গাউনের ভেতর জ্যোৎস্না রাতে জাহাজ- ডেকে পায়চারি করে বেড়ায়। এসব মনে হতেই সে সোজা মৈত্রদার ফোকসালে চলে গেল। শেফালীবৌদি সম্পর্কে কিছু বললে একটা কথা বলে না। আজ অন্যভাবে কথা আরম্ভ করবে ভাবল। গতকাল থেকে ওকে আটকে রাখা হয়েছে। কোথায় নেবে যাবে কে জানে। সারেঙের সঙ্গে পরামর্শ করে ছোটবাবু এছাড়া আর কোনো পথ খুঁজে পায়নি। জাহাজ ছেড়ে দিলে যদি আবার সব ঠিকঠাক হয়ে যায়!

    ছোটকে দেখেই কেমন ছেলেমানুষের মতো বলল—তুই এলি!

    ছোটবাবু বলল—আচ্ছা মৈত্রদা, তোমাকে যদি দেশে পাঠিয়ে দেয়া যায় কেমন হবে?

    —আমাকে! দেশে! কি হবে!

    —তবে তুমি এমন করছ কেন?

    —কী করছি। তোরাই তো আমাকে যা তা করছিস। কাল আমাকে জাহাজ থেকে নামতে দিসনি। কোয়ার্টার-মাস্টার আমাকে নামতে দেয়নি। তোরা কী ভেবেছিস!

    —আমরা কিছু ভাবিনি। তুমি যদি দেশে যেতে চাও সবাই মিলে আমরা কাপ্তানকে ধরব। সবাই বললে তিনি আমাদের কথা ফেলতে পারবেন না।

    —তুই মাঝে মাঝে খুব সরল হয়ে যাস ছোট। আমার দেশে যাবার কী হল! এতগুলো লোক জাহাজে কাজ করতে পারছে আমি পারব না!

    —সমুদ্রের বালিয়াড়িতে শুয়ে থাকো কেন! জাহাজে ফিরে আসো না কেন!

    —সকাল হলেই চলে আসতাম। জাহাজে না ফিরলে আমার কাজ কে করবে! তোদের নিজেদের মাথা ঠিক নেই। কিসব গুজব জাহাজে ছড়ানো হচ্ছে খবর রাখিস!

    ছোটবাবু বলল—জাহাজটাতো সত্যি ভাল না। সবাইতো বলছে ভুতুড়ে জাহাজ। কত কাপ্তান জাহাজটার পাগলামীতে নিজেরা পাগল হয়ে গেছে। আমরা তো ভাবলাম এ-সফরে তোমাকে দিয়ে বোধহয় এটা আরম্ভ হল।

    মৈত্র খুব সরলভাবে হাসল।—তুই খুব ভয় পেয়ে গেছিস।

    —ভয় পাব না বল! তুমিই তো বলেছিলে ছোট, আমরা আছি ভয় কি। এখন যদি তোমরা এমন করতে থাকো তবে আমি কি করি বলত!

    দু’ একজন জাহাজি দরজায় উঁকি দিয়েছিল। ছোটবাবু ওদের চলে যেতে বলায় কেউ ভিড় করে নি। সারেঙসাব সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সব শুনছেন। ছোটবাবু, মৈত্রমশাইকে নানাভাবে বোঝাচ্ছে।

    ছোটবাবু বের হবার মুখে হঠাৎ ছুটে গেল মৈত্ৰ।

    —এই শোন। ছোটবাবু ঘুরে দাঁড়ালে বলল, আমি কিন্তু কাল কিনারায় যাব একবার। কোয়াটার-মাস্টারকে বলে দিস যেন আমাকে ছেড়ে দেয়। ছোটবাবু বলল, আচ্ছা বলে দেব। ওপরে উঠে সারেঙসাবকে বলল, কাল যেতে দিন। আমি কাল ওর সঙ্গে থাকব। জাহাজতো এবার ছেড়েই দিচ্ছে।

    পরদিন শেষবারের মতো সালফার গাড়িতে বোঝাই হচ্ছিল। টংলিং টংলিং করে সব মালগাড়ি একে একে চলে যাচ্ছে। ক্রেনগুলো এবার সরিয়ে নেওয়া হবে। ডেরিকগুলো সব নামিয়ে দেওয়া হবে। জল মারা হবে সর্বত্র। সব সালফার গুড়ো এখন ধুয়েমুছে একেবারে খালি জাহাজ এবং গ্যাংওয়েতে দাঁড়ালেই বোঝা যায় জাহাজ কত খালি, জাহাজের সিঁড়ি একেবারে সোজা হয়ে গেছে।

    বিকেলে নেমে গেল মৈত্রদা। সেই জমকালো পোশাকে। মৈত্রদা সারাদিন কাজ করেছে। যেভাবে ছোটবাবু দেখে থাকত বয়লার-রুমে আজও তেমনি দেখেছে। কাজকাম কম বলে সকাল সকাল ছুটি। মৈত্রদা নেমে গেল। পেছনে পেছনে যেন মৈত্রদা বুঝতে না পেরে সে নেমে গেল। এবং বনি আবার তার পেছনে পেছনে নেমে গেল। তার পেছনে নেমে গেল আর্চি। আর্চি নেমে যেতে না যেতেই একদল বাচ্চা এসে ঘিরে দাঁড়াল আর্চিকে। বাঘের মতো মানুষটাকে ওরা এমন ক্ষেপিয়ে তুলল যে, আৰ্চি আর সাহস পেল না। সে উঠে এসে সারাক্ষণ পায়চারি করল বোট-ডেকে। সে এখন কি করবে স্থির করতে পারছে না। যতদূর জ্যাক চলে যাচ্ছে তত দূরে সে তাকিয়ে আছে। কাপ্তান চার্ট-রুমে ভীষণ ব্যস্ত। তিনি, ডেবিড, চিফ-মেট শেষবারের মতো জাহাজের কোর্স-লে ঠিক আছে কিনা দেখে নিচ্ছেন। ক্রমে স্যালি হিগিনস ভীষণ সতর্ক। চারপাশের বাতাসে গন্ধ শুঁকে ভয়ঙ্কর ঝড়ের আশঙ্কাতে আতঙ্কিত। অথচ চোখমুখ দেখে বোঝাই যাবে না, বরং তিনি আগের চেয়ে বেশী হাসিঠাট্টায় মজে আছেন। সরল সহজভাবে কথা বলছেন সবার সঙ্গে। একজন সফল কাপ্তানের মতো সবসময় চলাফেরা। শেষ সফরে তিনি তো ভেঙে পড়তে পারেন না। তিনি তো বলতে পারেন না সিউল-ব্যাঙ্ক সত্যি অচল জাহাজ। ওকে ফের এতদিন সমুদ্রে একনাগাড়ে কিছুতেই চালানো যাবে না।

    আবার হয়তো কখনো কখনো মনে হয় সিউল-ব্যাঙ্ক এতদিন সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে নিজের ভেতরেই সে সৃষ্টি করেছে এক ঐশী শক্তি। এর সামনে সব সমুদ্রঝড়, সাইক্লোন, টাইফুন অথবা বিষাক্ত পাখিদের আক্রমণ—অর্থহীন। ভারি বিশ্বস্ত জাহাজ। মানুষের চেয়ে অনেক বেশী, স্ত্রী এলিসের চেয়ে আরও বেশি, তিনি সবকিছুর ওপর বিশ্বাস হারালেও সিউল-ব্যাঙ্কের ওপর বিশ্বাস হারাতে পারেন না। তাঁর তখন সাহস বাড়ে। তিনি তখন অনায়াসে মাথায় টুপি টেনে চঞ্চল বালকের মতো মাঠের শেষ গোলপোষ্টে দাঁড়িয়ে যেতে পারেন। দু’হাত তুলে প্রায় ঈশ্বরের সামিল সাহস এবং প্রতিযোগিতা, এই প্রতিযোগিতায় তিনি তো জীবনে কখনও হেরে যান নি। কর্তৃপক্ষের আস্থাভাজন মানুষ। শেষ সফরে হঠকারী কিছু করে ফেলতে পারেন না।

    তখন বনি হাত তুলে ডাকল, ছাটবাবু দাঁড়াও। আমি আসছি।

    ছোটবাবু পেছনে তাকিয়ে দেখল, বনি আসছে। বনির পুরুষের পোশাক বেশ মনেরম। এবং বনির ওপরে ওর খুশী হবার কথা। কিন্তু এখন সে ভীষণ রেগে যাচ্ছে। কি দরকার আসার। ওর ফিরতে ফিরতে কত রাত হবে কে জানে? আর মৈত্রদা কোথায় কতদূর যাবে সেতো জানে না। কেবল আড়ালে আড়ালে লক্ষ্য রাখা। সন্ধ্যা হলেই বলতে হবে, এবারে চল। ওয়াকা এবং সে মৈত্রদাকে জাহাজে নিয়ে আসবে। আর তখন কিনা বনি! সে বলল, কী, তুমি আবার কেন!

    —কিছু হবে না। বাবাকে বলে এসেছি।

    আর তখন ছোটবাবু দেখল, মৈত্রদা কোথাও নেই। সে যেই না অন্যমনস্ক হয়েছে, পেছনে তাকিয়েছে, কথা বলেছে বনির সঙ্গে, তখনই মৈত্রদা ভ্যানিশ! সে বলল, আরে মৈত্রদা কোথায়!

  • পয়ত্রিশ

    পয়ত্রিশ

    ।। পয়ত্রিশ।।

    তখন মৈত্ৰ-হাঁটছে। বেশ পা চালিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। চারপাশের বাড়ি-ঘরের জানালা সব খুলে যাচ্ছিল। ছোট ছোট ছেলেরা-মেয়েরা দৌড়ে নেমে আসছে। চিৎকার করছে, বসন্তনিবাস। বসন্তনিবাস একটা কথা বলছে না। মাথায় সেই রাজার টুপি পরে সে হাঁটছে। পকেট থেকে একটা দু’টো দামী চকোলেট ছোটদের দিয়ে প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে সব পার হয়ে চলে যাচ্ছে। কখনও ট্রামে, কখনও বাসে, এবং যখন যেখানে যেভাবে উঠে যাচ্ছে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে—মানুষটার পোশাক ভারি মনোরম। সে হেসে সবার সঙ্গে কথা বলছে—সবাইকে গুড আফটারনুন বলছে। বসন্তনিবাস মাথা নুয়ে কখনও সবাইকে অভিবাদন জানাচ্ছে। যেন সে এ-পোশাকে এখন এ-শহরের পার্কে অথবা যেখানে উইলো ঝোপ অথবা কৌরিপাইনের বনভূমি আছে হেঁটে সেখানে যাবে। আর চারপাশ থেকে সত্যি বুঝি প্রজাপতিরা উড়ে আসবে এবার। সমুদ্র থেকে পাখিরা।

    সে আজ কোথাও থামছে না। কোথাও ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ছুটছে না, অথবা সে যেন এখন হরেক রকম খাবারের ফেরিওয়ালাও নয়, সে বরং সোজা চলে যাবে ম্যাণ্ডেলাদের বাড়ি। জাহাজ ছাড়ার আগে একবার ম্যাণ্ডেলার মা’র সঙ্গে দেখা করা দরকার। কারণ সেই যুবতী মেয়ে জাহাজডুবির পর হাসতে পারে বিশ্বাস হয় না। ওয়াকা ঠিক মিথ্যে কথা বলেছে। সে নিজের চোখে না দেখে কখনও বিশ্বাস করতে পারবে না।

    এবং তার মনে হচ্ছিল সেই ছোট্ট উপত্যকাতে উঠে গেলে ঠিক দেখতে পাবে, দু’টো উইলো গাছ, একটা সিলভার-ওক, সিলভার-ওকের নিচে ছোট্ট একটা ক্যাঙ্গারুর বাচ্চা, ওকে দেখেই কুঁই কুঁই করতে থাকবে। আর তখন জানালা খুলে যাবে, ম্যাণ্ডেলা দু’হাত তুলে চিৎকার করবে—মা, বসন্তনিবাস! বসন্তনিবাস বলে সে ছুটে এসে ওকে জড়িয়ে ধরবে। আর তখন সেই ক্যাঙ্গারুর বাচ্চাটা কেবল লাফাবে চারপাশে এবং ঠিক স্বপ্নে যেমন সে দেখেছিল ভারি চেনা মুখ, এলসা দ্য কেলির মতো দুঃখী মুখ ম্যাণ্ডেলার মা’র। মাথার ভেতর কেবল বারবার সেই স্বপ্নটা ঘুরে বেড়ায়। আসলে এটা স্বপ্ন কিনা সে বুঝতে পারে না। তার ভাবনায় এভাবে কিছু ইচ্ছে হয়তো কখনও স্বপ্নের মতো কাজ করে—তখন সে আর স্থির থাকতে পারে না। সেই ছোট্ট উপত্যকায় যেন কতকালের বিষাদ, সে ঠিক পৌঁছে গেলেই সব নিরাময় হয়ে যাবে। ম্যাণ্ডেলার মা হাসতে হাসতে বলবে, আপনি বুঝি বসন্তনিবাস। ম্যাণ্ডেলা এসে আপনার খুব গল্প করে। ঘুমোবার সময় আপনার কথা বলে ওকে ঘুম পাড়াতে হয়।

    এভাবে জীবনটাকে ভাবতে ভীষণ ভাল লাগছিল মৈত্রের। সে আর মৈত্র থাকতে চাইছে না। শেফালী তার স্ত্রী ভাবতে ভাল লাগছে না, শেফালী বরং নষ্টচরিত্রের মেয়ে। বিশ্বাস রাখতে পারেনি। শঠতা বোধ হয় মৈত্রকে এভাবে পাগল করে দেয়। তার এখন যা ভাল লাগে, কোন পবিত্র নারী সুধাপারাবার এবং জাহাজডুবির পর সেই মুখ, কেবল যুবতীর মুখে বিষণ্ণতা থাকবে। নিজের মানুষ সুমদ্রে হারিয়ে গেলে কি আর থাকে। সে হাঁটছিল আর স্বপ্ন দেখছিল। ভাবছিল অথবা স্বপ্ন দেখছিল—দেখছিল অদ্ভুত সব দৃশ্য তার চোখের ওপর নৃত্য করে বেড়াচ্ছে। শহরের পাহাড়ে পাহাড়ে অথবা উপত্যকায় কিছু নেই যেন, কেবল সেই সুন্দর উপত্যকাতে কেউ চোখ মেলে তাকিয়ে আছে, সমুদ্রে কবে আবার বসন্তনিবাসের জাহাজ ভেসে আসবে।

    মৈত্র স্বপ্নে দেখতে পায় সকাল হলেই ম্যাণ্ডেলা সমুদ্রের ধারে নেমে আসছে। ক্যাঙ্গারুর বাচ্চাটা ওর পায়ে পায়ে ঘোরে তখন, মা তার জানালায় বসে থাকে। মা তার ক্রমে ভাল হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে কোনো সকালে ম্যাণ্ডেলার হাত ধরে মা তার সমুদ্রে নেমে আসে। বড় করুণ চোখে তাকায়। তার কা’কে কি যেন ফিরিয়ে দেবার কথা। মায়ের চোখ দেখলে ম্যাণ্ডেলাও তা টের পায়।

    বসন্তনিবাসের মনে হয়, ম্যাণ্ডেলার মা’কে সেই যে এক বাংলাদেশের নাবিক পালক দিয়ে গেল আর এল না। সাদা রঙের জাহাজ সমুদ্রে যেতে দেখলেই বুঝি মনে হয় তার মা’র, ওটা বুঝি বসন্তনিবাসের জাহাজ। সে আবার বুঝি এ বন্দরে আসছে। এ-ভাবে কখনও ভাবতে ভাল লাগে বসন্তনিবাসের।

    আবার কখনও ভাবতে ভাল লাগে ম্যাণ্ডেলার মা সুন্দর একটা নীল রঙের গাউন পরে আছে। পায়ে সাদা রঙের জুতো। হাতে লাল রঙের দস্তানা। শীত নেই তবু যুবতী দস্তানা পরে বসে থাকতে ভালবাসে। দস্তানা পরে সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু জাহাজটা বন্দরে ভিড়ছে না। ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে। যুবতীকে তখন পাইন গাছের নিচে সাদা পুতুলের মতো ভাবতে ভাল লাগে বসন্তনিবাসের। আবার কখনও মনে হয় ভীষণ শীত। তুষারপাত হচ্ছে কেবল। শীতে বরফ জমেছে পাইনের পাতায়। গাছগুলো থেকে পাতা ঝরছে। নেড়া গাছে বুড়ো মানুষের সাদা দাড়ির মতো তুষারকণা ঝুলছে। ম্যাণ্ডেলার হাত ধরে মা তার ঘরে ফিরছে। জানালা বন্ধ করে দিচ্ছে। শুধু সামান্য শার্শি খোলা থাকে অথবা বারবার তুষারপাতে জানালা আবছা হয়ে গেলে সাদা তোয়ালে দিয়ে মুছে দিচ্ছে কাঁচ। ঝকঝকে কাঁচের ভেতর দিয়ে সমুদ্র দেখছে। যদি জাহাজটা আবার ফিরে আসে।

    কোনো কোনো রাতে ওরা দেখতে পায় বুঝি গভীর সমুদ্রে একটা জাহাজ নোঙর ফেলে আছে। জাহাজটা কিনারায় ভিড়তে পারছে না। ভীষণ ঝড় সমুদ্রে। খুব ঝড় উঠলে ওরা আর জাহাজটাকে দেখতে পায় না। বুঝি বসন্তনিবাসের জাহাজ সমুদ্রে ডুবে গেছে। বোধ হয় তখন ম্যাণ্ডেলার বুক কাঁপে। মা হাঁটু গেড়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে তখন। বসন্তনিবাস হাঁটছিল আর এমন সব ভাবছিল যেতে যেতে।

    সে ঠিক উপত্যকার নিচে এসে দেখল গোলাপের বাগান, বড় বড় গোলাপ। স্বপ্নের সেই সিলভার ওক-গাছটাও ঠিক আছে। ধূসর রঙের জানালা, ঝকঝক করছে জানালার কাঁচ। বাড়িটার পেছনে গভীর অন্ধকারের মতো দাঁড়িয়ে আছে রাশি রাশি পাইন, আর নীলবর্ণের পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সে এবার প্রায় মই বেয়ে ওঠার মতো উপরে উঠে যাচ্ছে। এবং গলা বাড়িয়ে সে দেখতে পেল দরজা জানালা বন্ধ। ম্যাণ্ডেলা নেই। বাড়িটাতে কেউ নেই। ক্যাঙ্গারুর বাচ্চাটা নেই। গাছটা আছে। এবং সে দেখতে পেল, সুদৃশ্য সব বেতের চেয়ার। যেন এইমাত্র কেউ বসে বসে এখানে অপেক্ষা করে চলে গেছে। সে তখন চিৎকার করে ডাকল, ম্যাণ্ডেলা। আমি বসন্তনিবাস। কেউ কোন সাড় দিচ্ছে না।

    তারপর সে আবার চিৎকার করে ডাকল, আমি বসন্তনিবাস। আমার পালকটা ফিরিয়ে দেবে বলেছিলে, আমি ওটা নিতে এসেছি। এবং সঙ্গে সঙ্গে সে ভেবে পেল না এমন কেন বলছে, কিসের পালক! কার পালক! কি সে ফিরিয়ে নিতে চায়। স্বপ্নটার সঙ্গে সে জীবনের মিল এভাবে খুঁজে বেড়াচ্ছে কেন। এবং তখনই মনে হল দরজা খুলে এক অদ্ভুত প্রকৃতির মানুষ বের হয়ে আসছে। ওর চেহারা ভীষণ বন্য। চোখ দুটো জ্বলছে। ভেতরে যেন সে কি করছিল। বাধা পেয়ে রাগে চিৎকার করতে করতে বের হয়ে আসছে। আরে সেই ফেরিওয়ালা লোকটা! শহরে মাঝে মাঝে কিছুদিন থেকে দেখা যাচ্ছে। সে বলল, পালক! কিসের পালক? কি চাই তোমার?

    বসন্তনিবাস বলল, ম্যাণ্ডেলা নেই?

    —ম্যাণ্ডেলা মেলা দেখতে গেছে। মৈত্রের মনেই ছিল না এখানে এখন পাইন-ফ্যাস্টিভ্যাল আরম্ভ হয়ে গেছে। ছেলে-বুড়ো সবাই ছুটছে মেলায়। সে একা একা শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে বলল, আমাকে ম্যাণ্ডেলা দেখলে চিনতে পারত। আমার সঙ্গে ওর ভারী বন্ধুত্ব।

    তখন লোকটা হা হা করে হাসছিল। এবং ঘরের ভেতর থেকে আবার আর এক ঝলক হাসি। দরজার বাইরে এসে দাঁড়াতেই বুঝল এই ম্যাণ্ডেলার মা। চুল সোনালী এবং স্বপ্নে দেখা মেয়েটির মতো নয়। চোখে ভীষণ জ্বালা। যেন বসন্তনিবাস এসে সব গোলমাল করে দিয়েছে। এমন একটা সময়ে কোথাকার উটকো একটা লোক সব তছনছ করে দিচ্ছে। সে তার এলোমেলো পোশাক ঠিক করতে করতে বলল, তুমি এখানে কি চাও?

    —ম্যণ্ডেলাকে।

    —ম্যাণ্ডেলা! বন্য লোকটা হাসতে হাসতে একেবারে সব উড়িয়ে দেবার মতো হাত নাড়ছিল। শরীরে তার সামান্য পোশাক। এটুকু না থাকলেও যেন কোন ক্ষতি ছিল না। জাহাজডুবিতে যে কেউ মারা গেছে এখানে, তার কোন চিহ্ন পেল না। বরং মনোরম বিকেলে ওরা সমুদ্র দেখতে দেখতে বোধ হয় বেঁচে থাকার নিরন্তর সুষমার কথা কেবল ভাবছিল। সে বলল, আচ্ছা ম্যাণ্ডেলাকে বলবেন আমি এসেছিলাম।

    —বলব। বলেই ওরা ঘরে ঢুকে গেল। দরজা বন্ধ করে দিল।

    .

    বনি তখন বলল, এস আমরা এখানে বসি।

    ছোটবাবু বলল, বনি আমার সবকিছু, কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।

    বনি বিরাট একটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে আছে। সে ছোটবাবুর দিকে সোজা তাকাতে পারছে না। সে তাকালেই যেন ছোটবাবু ওর ইচ্ছের কথা ধরে ফেলবে। সে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, তুমি ভয় পাচ্ছ ছোটবাবু?

    ছোটবাবু গাছের গুঁড়িতে কনুই রেখেছে। এত কাছে যে বনির চুলের ঘ্রাণ উঠে আসছে নাকে এবং সামান্য এলোমেলো হাওয়া উঠলে দু’টো-একটা চুল পর্যন্ত মুখে এসে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। তবু তার কি যে হয়, সে কেমন ভয়ে ভয়ে বলছে, বনি, তুমি যদি কোনোদিন আবার জ্যাক হয়ে যাও। যদি কোনোদিন দেখি সবটাই ভুল। সবটাই মরীচিকার মতো কিছু। তারপর যদি আর্চি……

    বনি এবার ওর গলা জড়িয়ে ধরল। তারপর যেমন এই পার্কে সব বড় বড় গাছের ভেতর জোড়ায় জোড়ায় সব ছুটে বেড়াচ্ছে কখনও বনভূমির ভেতর অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে তেমনি অদৃশ্য হয়ে যাবার ইচ্ছে হলে সে বলল, ছোটবাবু তোমার যে কি হয় মাঝে মাঝে। তুমি কেন এমন হয়ে যাও! আমাকে দেখলে গুটিয়ে যাও কেন? আমি কি করে বোঝাব আমি বনি! আর্চি! ফঃ!

    ছোটবাবু দেখল বনির চোখ চিক চিক করছে। অথচ ছোটবাবু খুব সহজেই সবকিছু করে ফেলতে পারে না। তার নানাভাবে সব অভিজ্ঞতা জাহাজে গড়ে উঠছে কিন্তু নিজে তো জানে না, কতটা কি হলে শরীরের পবিত্রতা ঠিক থাকে। বারবার কাছাকাছি থাকলেই ভয় ছোটবাবুর—কখন কি অশালীন কিছু করে ফেলবে এবং মুখে সবসময় হতাশা জেগে থাকে। সে তখন প্রাণ খুলে হাসতে পারে না, প্রাণ খুলে ছুটতে পারে না। বনিকে দেখতে দেখতে কেবল তন্ময় হয়ে যায়। তখনই ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে, জড়িয়ে চুমো খেতে ইচ্ছে হয়। এবং কাছাকাছি এ-ভাবে যখন জ্যাক ঠিক এসে যায়, ছোটবাবু একেবারে শক্ত কাঠ। যেন সে ছুঁয়ে দিলেই বনি, বনি থাকবে না। আবার জ্যাক হয়ে যাবে। দুরন্ত জ্যাক পাটাতনে লাফিয়ে নামবে এবং তেমনি পায়ে থাকবে হান্টার সু, এবং জল দস্যুদের পোশাক শরীরে। ঝড়ের সমুদ্রে ওকে আবার মাস্তুলের ডগায় তুলে দিয়ে সবাইকে ট্রাপিজের খেলা দেখাবে।

    বনি বলল, এস।

    ছোটবাবু বনির সঙ্গে হাঁটতে থাকল।

    বনি বলল, কত বড় গাছ!

    ছোটবাবু ওপরে গাছের শাখা-প্রশাখা দেখল।

    বনি বলল, চল ওদিকটাতে।

    ওরা দু’জনে ঘুরে ঘুরে পার্কটা দেখল। রঙ্গিন সব গাছপালা। সোনালী রোদ এবং হ্রদের জলে ছোট ছোট স্কিপ। স্কিপ ভাড়া করে যুবক-যুবতীরা লেগুনের মতো খাল বিল ধরে চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পিকাকোরা পার্কে বোধ হয় এভাবে অনেক সব ছোট ছোট স্কিপ বড় বড় গাছের ছায়ায় বেশ কিছু দূরে পাহাড়ের ঢালু চড়াইয়ে এখন লেগে রয়েছে। বনির খুব ইচ্ছে ছোটবাবু এভাবে ওকে নিয়ে কোনো নিরিবিলি জায়গায় চলে যাক। ছোটবাবুর শরীরে আছে এক আশ্চর্য ঘ্রাণ। পাশে পাশে হাঁটলে তার নেশা লেগে যায়। অথচ ছোটবাবু যেন বোঝে না কিছু, জানে না কিছু এবং বোধ হয় রঙিন জলে ডুব দিয়ে কিছু কুড়িয়ে আনতে তার ভারি ভয়। সে কিছুতেই ছোটবাবুর ভয় ভেঙে দিতে পারছে না।

    বনি ডাকল, ছোটবাবু

    ছোটবাবু তাকাল। ছোটবাবুর মুখ সহসা ভীষণ উজ্জ্বল দেখাল। সে বলল, বনি তুমি এত সুন্দর। একটু থেমে ধীরে ধীরে বলল, আমরা এভাবে নষ্ট হয়ে যাব!

    বনির মুখ থমথম করছে। চারপাশে গাছপালা তেমনি আকাশ ছুঁয়ে দিতে চাইছে, পাতার ফাঁকে মনোরম রোদ, আর কোনো গভীর অরণ্যে যেন বাজনা বাজছে। পাতার কুটিরে সব সুন্দর সুন্দর যুবক-যুবতীরা বসে আছে, বিয়ার খাচ্ছে। ফুল ফল কাগজের রঙ্গিন পতাকার ভেতর ওরা কেউ হেঁটে যাচ্ছিল, অথবা কেউ ভারি কাছাকাছি। কিংবা দূরে গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে যেন কানের কাছে ফিসফিস করে কথা বলে যাচ্ছে যুবক-যুবতীরা। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। ছোটবাবু তখন দেখছিল, বনি সরু রাস্তা ধরে জোরে হেঁটে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে বনি জানে না।

    আর ছোটবাবু পেছনে পেছনে নানাভাবে বোঝাচ্ছিল, এই কোথায় যাচ্ছ, এই বনি কি হচ্ছে, এই আমি তো বুঝে কিছু বলি নি, বনি, শোন। সে যত জোরে হাঁটছে বনি তার চেয়ে বেশি দ্রুত হাঁটছে। এবং বনির জমকালো পুরুষের পোশাকের ভেতর অথবা শরীরে ছোটবাবু বুঝতে পারছিল কঠিন কিছু খেলা করে বেড়াচ্ছে অথচ ছোটবাবুর এমন কেন যে হয়—যেন বনি ভারি মনোরম পবিত্র অকাঙ্খা, ছুঁয়ে দিলে বনি অপবিত্র হয়ে যাবে। সে এ-সব কারণে বোধহয় বনিকে কেবল বুঝিয়ে যাচ্ছিল—কারণ সে বুঝতে পারছে বনি আর একটা কথা বলবে না। সে এবার বনির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল। বলল, সবাই দেখছে। দ্যাখো ওরা তোমার রাগ দেখে বোধহয় হাসাহাসি করছে।

    বনি বলল, জাহাজে ফিরব।

    ছোটবাবু বলল, এটা সে রাস্তা নয়।

    —সে চিনে যাব।

    —যেতে পারবে না।

    —সে আমি বুঝব। ছাড়ো বলছি। তা না হলে ভাল হবে না।

    ছোটবাবু হাত নামিয়ে দিল। বলল, ঠিক আছে, যাও। আর জাহাজে ফিরছি না।

    বনি এবার তাকাল। তারপর বলল, তা হলে আমাকে কোথায় যেতে বলছ? একেবারে সমর্পণ করে দেবার মতো গলা বনির।

    ছোটবাবু বলল, এস কিছু খাওয়া যাক।

    বনি বলল, বাবা রাগ করবে।

    —তুমি বসে থাকবে। আমি খাব। তুমি কোল্ড ড্রিংকস নেবে।

    —আর কিছু না?

    —না।

    তখন ওয়াকা দেখতে পেল বসন্তনিবাস সমুদ্রের বালিয়াড়িতে হেঁটে যাচ্ছে। সে বসন্তনিবাসকে দেখেই ছুটতে থাকল। যত দূরেই যাক, বসন্তনিবাসকে সহজেই চেনা যায়। ওরা মেলা থেকে ফিরছিল। মাথায় ওরা সবাই পাইন পাতার টুপি পরেছে। ওরা রং-বেরংয়ের বেলুন হাতে ফিরছে। টুপু টিকি ওতাটুনু সবাই মিলে উৎসবের সাজে নেমে আসছে। বসন্তনিবাসকে দেখেই বাড়ি ফেরার কথা ওরা ভুলে গেছে। ওদের কেউ পাতার বাঁশি বাজাচ্ছিল, কেউ ফুলের মালা গলায় পরেছে। মেয়েরা সবুজ পোশাক পরেছে, ছেলেরা সাদা পোশাক। সূর্য তখন সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে। এক মায়াবী আলো এখন এই সুন্দর শহরের ওপর। বসন্তনিবাস সমুদ্রের জলে নেমে যাচ্ছে। পায়ের পাতা ভিজে যাচ্ছে তার।

    ওয়াকা ডাকল, বসন্তনিবাস আমরা এসে গেছি।

    বসন্তনিবাস একটা কথা বলল না। সে তেমনি হেঁটে যেতে থাকল।

    ওয়াকা বলল, বসন্তনিবাস তোমার পালক পেলে?

    বসন্তনিবাস বলল, না। ওয়াকা, কে যে ওটা নিয়ে গেল!

    ততক্ষণে ওরা সবাই সেই সমুদ্রের বালিয়াড়িতে বসন্তনিবাসকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। উৎসবের দিন বলে, কেউ আজ এখানে রোদ পোহাতে আসে নি। শহরের সর্বত্র অথবা রাস্তায় অথবা বনের ভেতরে সবাই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে। মদ খাচ্ছে, বেলুন ওড়াচ্ছে, কাগজের রঙ্গিন মালার ভেতর সব মানুষেরা যেন ক’ দিনের জন্য তাদের হারানো পালক ফিরে পেয়েছে। জমকালো পোশাক পরে সবাই এখন পাতার বাঁশি বাজাচ্ছে।

    বসন্তনিবাস বলল, আমাদের জাহাজ কাল ছেড়ে দিচ্ছে ওয়াকা।

    —আবার কবে আসবে?

    —জানি না ওয়াকা। আবার যখন আসব তখন হয়তো তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না। তখন বড় হয়ে যাবে ওয়াকা।

    ওয়াকা বলল, আমাদের সঙ্গে নাচবে?

    বসন্তনিবাস বলল, কি নাচ?

    —এই আমাদের নাচ। আমরা গান গাইব। তুমি পাতার বাঁশি বাজাবে। বলেই ওয়াকা একটা লম্বা প্রায় ক্ল্যারিওনেটের মতো একটা লম্বা পাতার বাঁশি ওর হাতে দিয়ে দিল। বলল, বাজাও।

    বসন্তনিবাস বার বার ফুঁ দিয়েও কোন সুর বের করতে পারল না।

    —এই দ্যাখো, বলে লম্বা পাতার বাঁশিতে ওয়াকা সুন্দর এক সুর তৈরী করে ফেলল। এবং সবাই তখন ঘুরে ঘুরে পা তুলে হাত তুলে নাচছে। মানুষটা কাল জাহাজে সমুদ্রে ভেসে যাবে, সেই প্রাচীনকালে, ভেলায় চড়ে যারা সমুদ্রে গিয়েছিল ঠিক তাদের মতো এখন বসন্তনিবাস। বসন্তনিবাস এ ক’ দিনে নিজের মানুষ হয়ে গিয়েছিল। বসন্তনিবাসকে ছেড়ে দিতে ওদের বোধ হয় কষ্ট হচ্ছিল। বসন্তনিবাসকে ঘিরে এই সব ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা তারপর নাচতে থাকল গাইতে থাকল। এবং সমুদ্র থেকে তখন বাতাস উঠে আসছে। তারা তেমনি নাচছে গাইছে, সর্বত্র এক দুঃখ অথবা বিষণ্ণতা—কি যেন মানুষের এক সময় হারিয়ে যায়, তারপর আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বসন্তনিবাসকে তারা সমুদ্রের ধারে ধারে এভাবে নিয়ে নাচতে নাচতে এগিয়ে চলল।

    যা হয়ে থাকে, এ-ভাবে মানুষজনের ভিড় বেড়ে যাচ্ছিল। সবাই দেখল পাইন-ফেস্টিভ্যালে বেশ সং বের করেছে ছেলে-ছোকরারা। দ্বিগুণ উৎসাহে তখন মৈত্র বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে। যেন সেই এক ব্যাণ্ড-মাস্টার—মঞ্চে দাঁড়িয়ে কখনও উঁচু লয়ে আবার কখনও একেবারে নুয়ে নানারকম স্বরের ভেতর মৈত্র নিজের সব জ্বালা ভুলে থাকতে চাইছে। শহরের মানুষেরা বুঝতেই পারছে না লোকটার একটা পালক ছিল সেটা তার অজ্ঞাতে কে চুরি করে নিয়েছে। সে যে এখন নেচে নেচে বাঁশি বাজাচ্ছে সেই হ্যামিলনের বাঁশিয়ালার মতো এবং সে যে ইচ্ছে করলে শহরের সব ছেলেমেয়েদের নিয়ে সমুদ্রে নেমে যেতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। সব পাহাড়ী উপত্যকাতে দরজা জানালা খুলে যাচ্ছে। ওরা কেউ কেউ আবার বসন্তনিবাসকে উদ্দেশ্য করে সিল্কের রুমাল উড়িয়ে দিচ্ছে। এবং ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দলে দলে মিশে যাচ্ছিল।

    তখনই ছোটবাবুর সেই শীতল কণ্ঠস্বর। ছোটবাবু মোড়ে এসে একটা ভীষণ জ্যামের ভেতর পড়ে গেছিল। বনি পাশে বসে রয়েছে। মৈত্রদাকে সে খুঁজছে গাড়ি নিয়ে। তখন সবাই হা হা করে হাঁকছিল, আসছে। সেই বিরাট মিছিল পাইন ফেস্টিভ্যালের সব ছেলে-ছোকরারা মেয়েরা এখন মিছিলে একে একে যোগদান করছে। সামনে ওয়াকা আর বসন্তনিবাস। ওরা দু’জনই বাঁশি বাজাচ্ছে। কখনও উঁচু লয়ে কখনও পেছন ফিরে আবার কখনও উপত্যকার দিকে মুখ তুলে। এবং সহসা যখন দেখতে পেল সে ঠিক ম্যাণ্ডেলাদের বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে আছে, ওপরে ম্যাণ্ডেলা হাত নাড়ছে তখনই পাশ থেকে কেউ ডাকছিল, মৈত্রদা জাহাজে চল।

    গাড়ির পাশে মিছিলটা চলে এসেছে। আর এমন সময়ে ওয়াকা ছোটবাবুকে গাড়ির ভেতর দেখতে পেল। বসন্তনিবাসকে ছোটবাবু কিছু যেন বলছে। কি বলছে ওয়াকা বুঝতে পারছে না। ছোটবাবু এবং বসন্তনিবাস দাঁড়িয়ে কথা বলছে বলে লম্বা মিছিলটা থেমে আছে। যারা ড্রাম, ব্যাগপাইপ অথবা বিউগল বাজাচ্ছিল অথবা যারা ম্যাণ্ডোলিন বাজাচ্ছে তারা ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আবার কখন বসন্তনিবাস ব্যাণ্ড-মাস্টারের মতো প্রায় ঘুরে ঘুরে কখনও উটের মতো মুখটি তুলে বাঁশি বাজাবে। তেমনি সবার মাথায় রং-বেরংয়ের পাতার মুকুট, গায়ে কেউ কেউ পাতার অলঙ্কার পরেছে। আর রং-বেরংয়ের গ্যাস-বেলুন মাথার ওপর উড়ছে।

    বসন্তনিবাস বলল, ওয়াকা আমি যাচ্ছি।

    ওয়াকা বলল, মানে! চলে গেলে এত বড় মিছিলটাকে লিড্‌ করবে কে?

    বসন্তনিবাসের যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু কেন জানি ছোটবাবুর মুখের ওপর আর এখন কথা বলতে সে সাহস পায় না। দুষ্টু বালকের মতো সে এখন জাহাজে আছে। যেন অভিভাবকের মতো এই ছোটবাবু। সে ফাঁক পেলেই জাহাজ থেকে নেমে আসে। আর ছোটবাবু খুঁজে খুঁজে শেষ পর্যন্ত জাহাজে নিয়ে যায়। শক্ত চেহারা আর তার নেই। ছোট ছোট এই বালক-বালিকাদের সঙ্গে থেকে থেকে কেমন সরল সহজ হয়ে গেছে।

    তখন ওয়াকা বলল, স্যার আমরা ওকে জাহাজে পৌঁছে দেব। আপনি ওর জন্য ভাববেন না।

    ছোটবাবু বলল, জাহাজ কিন্তু ওয়াকা কাল ছেড়ে দেবে।

    ওয়াকা বলল, জানি। তারপরই ওয়াকা আবার হাঁটতে থাকল। ছাড়া পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে মৈত্রদা বাঁশি বাজাচ্ছে। স্বরটা আশ্চর্য মেলডিতে ভরা। মৈত্রদা এ-ভাবে কবে বাঁশি বাজাতে যে শিখল! বুয়েনস আয়ার্সে মানুষটা সার্কাসে সিংহের খেলা দেখাতো, এখানে ব্যাণ্ড-মাস্টার। মৈত্রদার পক্ষে সবই বুঝি সম্ভব। অথবা অন্তরেই থাকে আশ্চর্য এক সুর, মাঝে মাঝে তা আপনি বেজে ওঠে!

    মিছিলটা চলে যেতে থাকল আর পেছনে পেছনে গাড়ি ট্রাম বাস ছোটবাবুর গাড়ি ধীরে ধীরে এগুচ্ছে। বনি পাশে। এক সময় বনি বলল, এস না ছোটবাবু মিছিলের সঙ্গে হেঁটে চলি, বলে নেমে গেল গাড়ি থেকে। ছোটবাবুর হাত ধরে ঠিক এই শহরের বাসিন্দাদের মতো হেঁটে যেতে থাকল। এক সময় বনি বলল, বড়-টিণ্ডাল ভীষণ আমুদে লোক, না ছোটবাবু?

    ছোটবাবু কি বলবে বুঝতে পারছে না। সে শুধু বলল, হবে হয়তো। এবং তারা এ-ভাবে যেতে যেতে এক সময় সুন্দর একটা গীর্জার সামনে থেমে গেল। বনি চিৎকার করে বলল, দ্যাখো দ্যাখো ছোটবাবু কত সাদা ফুল। ওরা দেখল গীর্জায় উঠে যাবার দু’ধারে বড় বড় গাছে সব সাদা ফুল। এবং বর-কনে উঠে যাচ্ছে। ওদের দু’হাতে অজস্র ফুলের গুচ্ছ। সিঁড়ি ধরে সবাই উঠে যাচ্ছে। ছোটবাবু আর বনি রেলিঙে দাঁড়িয়ে আছে। বনি সেই সব গাছের ভেতরে উঁকি দিয়ে আর মাথা তুলছে না। যেন হামাগুড়ি দিয়ে সেও উঠে যাবে। সিঁড়িতে কি দেখতে দেখতে বুকে ক্রস টানছে বনি। ছোটবাবু ক্রস টানছে না বুকে। বনির বোধহয় বুকে ভয় গুড়গুড় করতে থাকে। সে নিজেই ছোটবাবুর বুকে ক্রস টেনে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।

    ছোটবাবু বারবার ডেকেও কোনো সাড়া পেল না। বনি মাথা নুয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দূরে কোথাও ম্যাণ্ডোলিন বাজাচ্ছে কেউ। এবং মাইকে ঘোষণা হচ্ছিল আর ধর্মীয় সংগীত তখন গীর্জায়। জোনাকিরা সমস্ত গাছে গাছে ছড়িয়ে পড়ছে। ঘাসের ভেতর কুয়াশা, বিন্দু বিন্দু শিশিরপাতের শব্দে জেগে আছে। বনি বলল, ছোটবাবু জাহাজে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। এস এখানে চুপচাপ বসে থাকি।

    ছোটবাবু গীর্জার ঠিক সিঁড়ির নিচে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। ওরও জাহাজে উঠে যেতে ইচ্ছে করছে না। গাছে গাছে সাদা ফুল। জোনাকিরা উড়ছে। নক্ষত্রেরা এবার আকাশে ভেসে বেড়াতে থাকবে। পাইনের বনে সমুদ্রের ঠাণ্ডা বাতাস সব এলোমেলো করে দিচ্ছিল। তখন ছোটবাবু বলল, মাকে তোমার কথা জানিয়ে যদি একটা চিঠি দিতে পারতাম বনি। যেন আরও বলার ইচ্ছে ছিল তবে আজ আর কোন দুঃখ থাকত না। সে কিছুই আর বলল না। ঘাসের ওপর দু’হাত ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। ওর ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। ওর হাই উঠছিল।

    ওদের জাহাজে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। বনি কখনও ওর পিঠে পিঠ দিয়ে কখনও ঘুরে ঘুরে ঠিক সবুজ লতাপাতার মতো শরীর তার এ ভাবে বড় হয়ে যাচ্ছিল। অথচ জাহাজে উঠে সে একেবারে জ্যাক। পুরুষের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে সে এখন সিঁড়ি ভাঙছে।

    তারপর আবার সেই ড্যাং ড্যাং বাজনার মতো বাজনা। কেউ যেন মাস্তুলের ওপর দাঁড়িয়ে বিউগিল বাজাচ্ছে। জাহাজ বন্দর থেকে নেমে যাবার সময় এমনই মনে হয়। যেন সেই ক্রোজনেস্টে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ, গায়ে তার বিচিত্র পোশাক। দুরে সব পাইনের বনভূমি। আরও দূরে পাহাড়ের শীর্ষদেশ, বরফে রুপোলী কখনও সোনালী আবার কখনও আকাশের মতো গভীর নীল রঙ হয়ে যায়। অথবা সমুদ্রের তলদেশে যে সব ডলফিনের গায়ে থাকে বিচিত্র রঙ মনে হয় চারপাশে অথবা আকাশে তেমন রঙের ফোয়ারা। দেখতে দেখতে বড় বেশি তখন এই পৃথিবীকে ভালবাসতে ইচ্ছে হয়।

    তখন জাহাজটা ডাঙার মায়া কাটিয়ে সমুদ্রে নেমে যাচ্ছে। আর তখন কে বলবে হাজার হাজার বেলুন, এটা অবশ্য আজগুবি গল্পের মতো শোনাবে কারণ বন্দরে সকাল থেকেই একটা শিশুদের মেলা অথবা মিছিল বলা যেতে পারে এসে জড়ো হয়েছিল। সব ওয়াকার কাণ্ড। তাদের প্রিয় বসন্তনিবাস চলে যাচ্ছে। জাহাজ আবার কবে আসবে কেউ জানে না। জাহাজটা শেষ পর্যন্ত ডাঙায় ফিরে যাবে কিনা, জাহাজিরা দেশে ফিরতে পারবে কিনা যখন কেউ কিছু বলতে পারছিল না তখন এইসব ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নানা রঙের বেলুন উড়িয়ে দিচ্ছে। মাথায় তাদের পাতার টুপি এবং ব্যাণ্ড বাজাচ্ছিল। ওয়াকা দৌড়ে দৌড়ে সবার সবকিছু ঠিক-ঠাক করে দিচ্ছে তখন। মৈত্রদা ওপরে উঠে সবাইকে হাত নাড়ছিল।

    স্যালি হিগিনস্, বনি, রেডিও-অফিসার এবং যাদের ওয়াচ ছিল না অর্থাৎ যাদের কাজকর্ম জাহাজ সমুদ্রে নেমে গেলে আরম্ভ হবে কেবল তারাই দেখছিল। যারা নিচে নেমে গেছে, বয়লারে আগুন দিচ্ছে তারা দেখতে পাচ্ছে না। অথবা যাদের কাজ ছিল দড়িদড়া তুলে ফেলা, ডেরিক নামিয়ে রাখা, ফল্কায় কাঠ ফেলে ত্রিপলে ঢেকে দেওয়া, তারা কাজ করতে করতে দেখছে। জাহাজটা ছেড়ে দিলে বেলুনগুলো ঠিক জাহাজের ওপরে উড়ে আসছে এবং ওরা জাহাজ নিয়ে যত সমুদ্রে নেমে যাচ্ছে তত সেই সব শিশুর কোলাহল হাততালি অথবা ‘গুড-বাই বসন্তনিবাস’ ক্রমে স্তিমিত হয়ে আসছে। আর কি আশ্চর্য সেই সব বেলুন ক্রমে জাহাজ ছাড়িয়ে আরও গভীর সমুদ্রে উড়ে গেল। তীরের মানুষেরা তাজ্জব। এমন ঘটনা ওরা জীবনেও দেখে নি। একটা জাহাজ, সাদা রঙের জাহাজ, নীল সমুদ্রে কেমন জল কেটে ক্রমে দিগন্তের দিকে ভেসে যাচ্ছে। পাহাড়ের উপত্যকায় অথবা শীর্ষদেশে যে-সব ঘর বাড়ি আছে—সব ঘর-বাড়ির জানালা খোলা। ছেলে যুবা বুড়ো বুড়িরা দেখতে পেল একটা সাদা রঙের জাহাজ, জাহাজের ওপর আকাশের গায়ে সব বিন্দু বিন্দু জলকণার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে অজস্র বেলুন এবং ক্রমে তা দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। প্রথমে জাহাজের মানুষ-জন তারপর জাহাজ তারপর ডেরিক মাস্তুল এবং আরও পরে শুধু ক্রোজ-নেস্ট দেখা যাচ্ছে।

    ক্রমে এভাবে স্বপ্নের ভেতর থেকে আসা জাহাজটা আবার স্বপ্নের দেশে চলে যাচ্ছে। ওয়াকা টুপু টিকি এবং ম্যাণ্ডেলা শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিল। যতক্ষণ চোখের ওপর জাহাজটা ছিল ততক্ষণ নিবিড়ভাবে দেখছে। এই জাহাজে বসন্তবিনাস চলে গেল। জাহাজ ভাঙা পুরানো, জাহাজটা ঠিক আর দশটা জাহাজের মতো তারা ভাবতে পারে না। যেন এ-জাহাজ চিরদিনের চিরনতুন। এবং এমন জাহাজেই আবার কোনোদিন হয়তো বসন্তনিবাস এ বন্দরে চলে আসবে। ওরা এমন ভাবতে ভাবতে ঘরে ফিরে গেল।

    এখন আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। একটু সময় পাওয়া যাচ্ছে। দুপুরের দিকে জাহাজ বন্দর ছেড়েছে। তীরের গাছপালা পাহাড় এখনও মেঘের মতো ঝুলে আছে। সমুদ্রে সামান্য পিচিং আছে বলে জাহাজ দুলছে। স্যালি হিগিনস রেলিঙে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখছেন। জাহাজ সামোয়াতে যাচ্ছে। এ-বন্দরেও একজন নেমে গেল। বোধহয় ছোটবাবুর সেজন্য মন খারাপ। তাকে জাহাজ ছাড়ার সময় ওপরে দেখা যায় নি। তিনি দেখেছিলেন প্রথম থেকেই এরা তিনজন ছিল খুব কাছাকাছি। একই ফোকসালে ওরা থাকত। এখন তিনজন তিন রকমের। বড়-টিণ্ডলের মাথয় সামান্য গোলমাল। দেশে পাঠানো চলে। কিন্তু বড়- টিণ্ডাল কাজের সময় খুব দায়িত্বশীল আর এ ছাড়া এভাবে ক্রু নেমে গেল জাহাজ চলবে কি করে! এবং যা হয়ে থাকে, ক্রু নেমে গেলেই কিছু কাজকর্ম থেকে যায়। এজেণ্ট অফিসে খবর দেওয়া, স্থানীয় পুলিশ অফিসে খরব দেওয়া, এ-ছাড়া দায়িত্ব হিসেবে থেকে যায় ওর দেশবাড়িতে খবর পাঠানো। সকালটা নানা ঝামেলায় কেটেছে, রসদ দু’মাসের মতো নেওয়া হয়েছে। সকাল থেকে রসদ উঠছিল। বিফ, ভেড়ার মাংস, ডিম, মুরগী, লেটুস, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, চাল, ডাল, তেল, নুন, এবং নানা রকমের সস্ জেলি মাখন পাউরুটি এবং বরফ-ঘরে এখন সব বড় বড় আস্ত গরু ভেড়া মুরগী হুকে ঝুলছে। যেগুলো হালাল করা তাদের ভিন্ন নম্বর এবং আলাদা রাখা হয়েছে। জাহাজে অধিকাংশ মুসলমান ক্রু। তাদের জন্য এই সব আলাদাভাবে করা হয়ে থাকে। সব দিকে নজর তাঁর। এবং যদিও চীফ-মেটের কাজ এ-সব তবু তিনি নিজে ভাল করে বুঝে না নিতে পারলে স্বস্তি পান না।

    এবং বন্দরের শেষ তিন-চারদিন তিনি ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন। কোন কারণে যেন কোথাও ত্রুটি থেকে না যায়। সফর যত লম্বা হবে তত জাহাজিরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠবে। এবং অধিকাংশ সময় যা দেখা যায় খাবার-দাবার নিয়েই এই সব জাহাজিরা প্রথম ঘোঁট পাকাবার চেষ্টা করে। সেজন্য তিনি রসদ নেবার সময় বেশি বেশি সব নিয়েছেন। বরফ-ঘরের কুলিং মেশিন যাতে খারাপ না হয়ে যায়, এবং যে কোন কারণে খাবারে পোকা লেগে যেতে পারে—তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব দেখেশুনে নিশ্চিন্ত হয়েছেন এবং জাহাজের যতটা মেরামত দরকার সাধ্যমত যা করতে পেরেছেন করে নিয়েছেন। জাহাজের ধোয়া-মোছা হয়ে গেলে তিনি সব অফিসারদের নিয়ে হাল থেকে আরম্ভ করে, নোঙর ফেলার জিপসি ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিয়েছেন। কেবল এনজিন রুমের একটা জায়গা ভীষণ দুর্বল থেকে গেল। বয়লরের চক, বিশেষ করে মাঝখানের বয়লার চক সামান্য বসে গেছে মনে হচ্ছে, অবশ্য চোখে ঠিক ধরা যাচ্ছে না। তিনটে বয়লার একই লেভেলে থাকার কথা। মাঝখানের বয়লারটা যেন সামান্য নিচে বেশি ঝুঁকে আছে। অবশ্য সিউল-ব্যাংকের কোনো কিছুই এভাবে ভাল করে দেখলে ঠিকঠাক নেই। জাহাজ তবু যথানিয়মে চলছে। মাঝে মাঝে দুশ্চিন্তায় মাথা ভার হয়ে গেলে তিনি এভাবেই ভেবে নিতে চান। এবং সব দুশ্চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে দিতে চান।

    ক্রমে জাহাজ চারপাশে সমুদ্র নিয়ে জেগে থাকলে তিনি একটা ডেক-চেয়ারে বসে পড়লেন। জাহাজে এই একটু দিনের আলো আর তারপর অন্ধকার সমুদ্রে। এখন কি সময়, কি তিথি, কতটায় সমুদ্রে জোয়ার আসবে এবং কখন কোন জলের নিচে কোন পাহাড় অথবা উপত্যকা মিলে যাবে তিনি সব জানেন বলে বাইবেলের পাতা ওল্টাতে থাকলেন। সেই প্রাচীন নাবিক নোয়ার কথা মনে পড়ছে। একটা অতিকায় জাহাজে তিনি সব তুলে নিয়েছিলেন। এবং এ তিন-চারদিন যা ধকল গেছে তাতে নিজেকে সেই প্রাচীন নাবিকের অনুসরণকারী ভাবতে ভাল লাগছিল। এমন কি তিনি পালিয়ে এ জাহাজে এক জোড়া পুরুষ-: মণীও রেখেছেন। মহাপ্লাবনে পৃথিবীর সব ডুবে গেলেও সিউল-ব্যাংক সমুদ্রে ভেসে থাকবে—কখনও কখনও সিউল ব্যাঙ্ককে এভাবে ভাবতে ভীষণ ভাল লাগে তাঁর। তখনই দেখলেন জ্যাক ও-পাশের সমুদ্রে দূরবীনে কি দেখছে। দেখতে দেখতে উত্তেজিত গলায় কাকে ডাকছে।

    তিনি রেলিঙে ঝুঁকে ডাকলেন, জ্যাক। জ্যাক মাথার ওপরে ব্রীজের উইংসে দেখল বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে বাইবেল। জ্যাক কেমন অধীর গলায় বলল, বাবা দ্যাখো। দূরে দ্যাখো।

    খালি চোখে তিনি সমুদ্রের দিগন্তে কিছু দেখতে পেলেন না। ঢেউ-এর সামান্য চড়াই-উৎরাই ভেঙে অনেক দূরে শুধু অনন্ত জলরাশি। তিনি বললেন, কিছু দেখা যাচ্ছে না।

    সঙ্গে সঙ্গে জ্যাক দৌড়ে ওপরে উঠে গেল। বাবকে দূরবীনটা দিয়ে সোজা আবার নেমে গেল। সমুদ্রে সূর্যাস্তের সময় বলে জ্যাকের নীলাভ পোশাক ভারী উজ্জ্বল। খালি জাহাজ বলে সামান্য পিচিং- এ বেশ দুলছে। জ্যাক প্রায় টলতে টলতে এক সময় নেমে গেল এবং অদৃশ্য হয়ে গেল। এবং সে যখন ফিরে এল স্যালি হিগিনিস্ দেখলেন, ছোটবাবুকে টানতে টানতে নিয়ে আসছে।

    স্যালি হিগিনস্ মেয়ের এমন কাণ্ড যেন দেখতে পান নি, অথবা হয়তো মনে কখনও অভিমান, যে কোনো অত্যাশ্চর্য ঘটনা এখন কোনো যুবকের জন্য, বনি তার আর কেউ নয়, ক্রমে মেয়েটা দূরে সরে যাচ্ছে, তিনি দেখেও না দেখার ভান করে দূরবীনে মগ্ন হয়ে থাকলেন। এবং তখনই দেখলেন, অনন্ত জলরাশি ভেঙে সে আসছে। সেই পাখিটা।

    স্যালি হিগিনস্ এবার দূরবীনটা জ্যাকের হাতে ফিরিয়ে দিলেন। চশমাটা ঠিকঠাক করে নেমে গেলেন নিচে। ওপরে ওরা দু’জন সমুদ্রে একটা পাখি খুঁজছে।

    তখন ছোটবাবু বলল, লেডী-অ্যালবাট্রস আবার আসছে। ও ভেবেছে আমরা ওর পুরুষ-পাখিটাকে বন্দী করে রেখেছি।

    জ্যক বলল, পাখিটার কথা ভুলেই গেছিলাম। আমাদের কথা কিন্তু পাখিটা মনে রেখেছে।

    আর্চিও দেখল আবার সেই পাখিটা জাহাজের পেছনে আসছে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। আসলে পাখিটাকে দেখে, না বোট-ডেকে ছোটবাবু এবং জ্যাককে কাছাকাছি দেখে বোঝা গেল না। সে চিৎকার করতে করতে ছুটছে, দ্যাট ভেরি আলি বার্ডস ফ্লাইং এগেন্। সে যেন জাহাজের সব নাবিকদের সতর্ক করে দিচ্ছে—ডেনজার এহেড্‌। তোমরা বাছারা সবাই সাবধান হয়ে যাও। কাপ্তানের পোষা শয়তানটা আবার উড়ে আসছে। এবারে কি ঘটবে কেউ বলতে পারবে না।

  • ছত্রিশ

    ছত্রিশ

    ।। ছত্রিশ।।

    আর্চি-র ঘুম আসছিল না। সে আজ এক ফোঁটা মদ পর্যন্ত খায় নি। সে মদ খেতে পারত, মদ খেলে এক সময় সে ঘুমিয়ে পড়তে পারত। সকালে ঘুম ভাঙলে সে আবার সব ভুলে যেতে পারত। ঘুম ভাঙলে রাতের সব জ্বালা কেমন মরে যায়।

    নেশা করলে সে নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। এবং তার মনে হয় মাঝে মাঝে নেশা না করে থাকলে সে ঠিক ঠিক যা ভেবে থাকে করে ফেলতে পারবে। সেজন্য জেগে থাকা। ঘড়িতে বারোটা বাজছে। একটা বাজছে। সে উঠে বসল। জাহাজের পিচিং বাড়ছে। নেশা না করে ভালই করেছে।

    সে দরজা খুলে বের হয়ে পড়ল। টলে টলে হাঁটছে। পিচিং থাকলে জাহাজে ঠিকমতো হাঁটা যায় না। সমুদ্রে ঝড় ওঠার আশঙ্কা। বিকেলের দিকে রেডিও-অফিসার বলেছে, ঝড় উঠতে পারে।

    গঙ্গাবাজুর গ্যাং-ওয়েতে সে নেমে গেল। রেলিঙে সে দাঁড়িয়ে থাকল। আকাশ অন্ধকার, সমুদ্রে কোনো প্রতিবিম্ব ভাসছে না। এবং চারপাশে এত বেশি অন্ধকার যে পাখিটা কোথায় কি ভাবে আছে সে বুঝতে পারছে না।

    এ-জাহাজে একজন যুবতী এখন শুয়ে আছে। ঠিক যুবতী না, যুবতী হবার মুখে, ডাঁশা আপেলের মতো। আর্চির ঘুম আসছিল না। ওর চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে—ডেনজার এহেড্‌। পাখিটা অন্ধকারে উড়ছে না। কোথাও সে লুকিয়ে রয়েছে। যুবতী শুয়ে আছে, ওর হাত-পা গমের শীষের মতো পুষ্ট। আর্চি আর স্থির থাকতে পারছে না।

    মনে হল কেউ আসছে। ওয়াচের লোক-টোক হবে। সে টুপ করে সিঁড়ির নিচে বসে পড়ল। এ সময় এভাবে চোরের মত ঘুরে বেড়ানো ঠিক না। দেখে ফেললে জাহাজিরা বলবে, আর্চি রাতে জাহাজে ঘুরে বেড়ায়! অহেতুক ঘুরে বেড়ানো ঠিক না। ভুতুড়ে জাহাজটা আরও তবে ভুতুড়ে হয়ে যাবে।

    সিঁড়ি ধরে কোয়ার্টার মাস্টার নেমে গেল। হাতে মগ তার। চা করার জন্য চিফ-কুকের গ্যালিতে যাচ্ছে। সে এবার সামান্য পা চালিয়ে হাঁটল। তারপর ঠিক সোজা এলি-ওয়েতে ঢুকে গেল। বাঁ পাশের কেবিনগুলোর দরজা বন্ধ। লাল কার্পেটে ওর ছায়া দুলছে। সমুদ্রে পিচিং বাড়ছে। সামান্য ঝড় ঝঞ্ঝা সমুদ্রে সবসময় প্রায় থাকে। তার ওপর জাহাজ খালি। সমুদ্রে একটু বাতাস উঠলেই জাহাজের ভীষণ টাল-মাটাল অবস্থা। আর্চি দ্রুত এলি-ওয়ে পার হয়ে গেল। এবং ঠিক ছোটবাবুর দরজায় সে দাঁড়িয়ে গেল। চোখে-মুখে সংশয়। ভেতরে কেউ কথা বলছে না তো!

    এটা আজকাল কি যে হয়েছে আর্চির। সংশয়, সে বুঝতে পারছে—ছোটবাবুর সঙ্গে জ্যাকের একটা হীন সম্পর্ক গড়ে উঠছে। এবং সে আর আজকাল এসব মনে হলে একেবারে স্থির থাকতে পারে না। প্রতিদিন ঈর্ষায় সে মদ খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকে—আগের মতো ঝাল মেটাতে পারে না, কখনও কখনও সে আরও কি সব ভেবে পাগলের মতো কাজকর্ম করে ফেলতে চায়—কিন্তু সে জানে মাতাল মানুষেরা কিছু একটা শেষ পর্যন্ত করতে পারে না। সে এখন থেকে ভেবেছে মাতাল হবে না। এবং সে ঘুরে বেড়াচ্ছে যদি রাতে ছোটবাবুর কেবিনে জ্যাক নেমে আসে অথবা ছোটবাবু জ্যাকের কেবিনে উঠে যায়। সে একটা সুযোগের অপেক্ষায় আছে।

    সে দরজায় কান পেতে দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর সে দু’বার আস্তে টোকা মারল দরজায়। যদি কথা থাকে জ্যাক আসবে, টোকা মারবে, তবে রাসকেলটা ঠিক উঠে এসে দরজা খুলে দেবে। আর্চি আবার খুব ধীরে ধীরে দু’বার টোকা মারল। না, রাসকেলটা ভীষণ সেয়ানা। কিছুতেই ধরা পড়বে না অথবা হয়তো আজ কথা নেই কারো নামার। সে সন্তর্পণে হেঁটে যাচ্ছিল। কেউ টের পেলে সে খুব অস্বস্তির ভেতর পড়ে যাবে। দশটা ওজুহাত দাঁড় করাতে হবে সে কেন অসময়ে এভাবে জাহাজের অলি-গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

    আর্চি এবার দু-লাফে সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেল। আর ঠিক ডানদিকে জ্যাকের কেবিন। পাশে ব্রীজে উঠে যাবার সিঁড়ি। সিঁড়ির মুখে কাপ্তানের ঘর। সে ওপরে উঠেই ডানদিকের উইণ্ড সেলের পাশে দাঁড়িয়ে গেল। ব্রীজ থেকে ওকে এখন কেউ দেখতে পাবে না। অথচ সে দেখতে পাচ্ছে ব্রীজে ডেবিড দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকার সমুদ্রে ঝুঁকে আছে ডেভিড। কাপ্তানের পোর্ট- হোলে অন্ধকার। বোধহয় শয়তানটা এখন আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে। আর্চি আজ যেন প্রথম টের পেল ওপরে কাপ্তান এবং নিচে রাসকেলটা, মাঝখানে জ্যাক, কড়া পাহারা। বাতাসে গন্ধ শুঁকে শয়তানটা টের পেয়েছে কিছু। ঠিক সিঁড়ির গোড়ায় একটা দৈত্যকে পাহারায় রেখেছে। ওর চোয়াল সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হয়ে গেল।

    ধূর্ত বেড়ালের মতো আর্চির চোখ-মুখ জ্বলছে। সে ঘুরে বোটের দিকটায় হেঁটে গেল। এবং যেখানে সে দাঁড়িয়ে দেখেছিল জ্যাক হাত তুলে পা তুলে ব্যালেরিনার মতো নাচছে, ঠিক সেখানটায় দাঁড়িয়ে গেল। পোর্ট-হোল বন্ধ। পর্দা ঝুলছে। সে কিছু দেখতে পেল না আজ। তবু সে ভীষণ লোভে পড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। সে নড়ল না। দেয়াল ফুঁড়ে তার এখন ভেতরে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে অথবা নৃশংস ঘটনা ঘটে যায়, যদি সে কিছু একটা করে ফেলে নিজের জন্য এবং লালসা বলা যেতে পারে—হাতে পায়ে কী যে শীতল অস্থিরতা তার, যেন সারা শীরর কেবল জ্বলে যাচ্ছে, খাঁ খাঁ করছে। এবং সে এতই কামুক যে তার রক্ত-মাংসে অথবা অস্থিমজ্জায় কেবল সেই নরম মাংসের প্রলোভন। ক্ষুধার্ত বাঘের মতো সে হন্যে হয়ে ঘুরছে। ঘুরতে ঘুরতে নরম হরিণের মাংস দেখেছে সামনে ঝুলে আছে। চারপাশে কাঁটাতারের মতো বেড়া। ভয়ে সে আর এগুতে পারছে না।

    অসহ্য রাগে এবং ঈর্ষায় আর্চি এখন ফুঁসছে।

    তখনই দু’টো একটা বজ্রপাতের শব্দ। আকাশটা গুম গুম করছে। ফালা ফালা করে দিচ্ছে কেউ আকাশ। অথবা মনে হয় হিংস্র থাবা উঁচিয়ে আছে কেউ। সারা আকাশময় বিদ্যুতের আলো সূর্যের মতো প্রখর। চারপাশের অন্ধকার, মুহূর্তে সরে যাচ্ছে। আবার অন্ধকার এবং সাঁ সাঁ করে বাতাস, ঠিক বাতাস বললে ভুল হবে, প্রায় ঝড়ের সামিল, সাদা ফেনা সমুদ্রে এবং তরঙ্গ-সংকুল জলরাশির ভেতর আর্চি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টলছিল।

    জাহাজটা জল কেটে যাচ্ছে। লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে ঝড়ের সমুদ্র।

    সহসা ঝড়টা মধ্যরাতে কেমন চাঙ্গা হয়ে উঠল। রেডিও-অফিসার হয়তো ট্রান্সমিটার-রুমে। আলোর ভেতর নানারকম না, ঘুরিয়ে ঝড়ের খবর দিচ্ছে। যদি ঝড় আরও বাড়ে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় ঝড়ের খবর পাঠাতে হবে। এবং ঝড় যে তেমন প্রবল নয় এক পশলা বৃষ্টিপাতের ভেতর সেটা সে টের পেয়ে জ্যাকের দরজার দিকে হেঁটে যেতে থাকল।

    আর তখনই সেই শয়তান পাখিটা যা ‘সে ভেবেছিল ঠিক লুকেনারের প্রেতাত্মা হবে, অদৃশ্য সেই প্রেতাত্মা একটা পাখির মতো মাথার ওপরে উড়ে যেতে থাকল। ঝড়ে পড়ে পাখিটা আনন্দে এমন করছে, না, সে সবাইকে জাগিয়ে দিতে চায়, আর্চি বুঝতে পারল না। পাখিটা সহসা আবার অদৃশ্য হয়ে গেল।

    সে একটু সরে এসে পাখিটাকে খুঁজল। অন্ধকার। গভীর অন্ধকারে সে বুঝতে পারল না পাখিটা কোন দিকে উড়ে গেল। আবার কখন উড়ে আসবে মাথার ওপর সেটাও সে ঠিক জানে না। এবং কেন জানি মনে হল শুধু রাসকেলটাকেই কাপ্তান পাহারাদার রাখেনি, এই পাখিটাকেও সে পাহারাদার রেখেছে। জ্যাকের দরজায় হেঁটে গেলেই লুকেনারের প্রেতাত্মা ওর মাথার ওপর উড়ে এসে একটা পাখি হয়ে ভাসতে থাকবে। এবং কিছু করলেই চোখ খুবলে তুলে নেবে।

    ঝড়-বৃষ্টিতে দু-একজন নাবিক তখন ভিজে ভিজে এনজিন-রুমে নেমে যাচ্ছে। কর্কশ শব্দ বজ্রপাতের। সাঁ সাঁ বাতাসে সমুদ্র কেমন উত্তাল, এবং মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকালে নীলাভ আলোতে আকাশ পৃথিবী আর সমুদ্র কেমন অতিশয় অলৌকিক। পাখিটা মাথার ওপর ভীষণ কর্কশ গলায় ডাকছে। সে ভয়ে কিছুতেই দরজার সামনে এগিয়ে যেতে পারল না। পাখিটার চোখ ভীষণ জ্বলছে। আর একটু এগুলেই অন্ধকার সমুদ্র থেকে পাখিটা সহসা উড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। অতর্কিতে ওর দু’চোখ খুবলে তুলে নেবে। আর এক পা এগুতে সাহস পেল না। সে নিচে ফের নেমে গেল। এবং দরজা বন্ধ করে আয়নায় দাঁড়ালে বুঝতে পারল চোখে মুখে তীব্র ঘৃণা। সে হেরে যাচ্ছে। সে কিছুতেই কিছু করে উঠতে পারছে না। আসলে ঝড়ে পড়ে পাখিটা জাহাজের চারপাশে ঘুরছে সে সেটা কিছুতেই ভাবতে পারছে না।

    এবং এভাবে ভয় পেলে যা হয়ে থাকে, সে ভেবে ফেলল, কাল সে আর ভয় পাবে না। কাল, অথবা যে কোনো দিন যদি সে ঘুমোতে না পারে, এবং ওপরে উঠে যায়, এভাবে ভয় পেয়ে নিচে চলে আসবে না। ঘড়ি দেখে বুঝতে পারল সকাল হতে বেশি দেরি নেই। এখন ফের ওপরেও আর উঠে যাওয়া ঠিক হবে না। তাকে আরও বেশি সাহসী এবং চতুর হতে হবে। সে এবার শুয়ে পড়ল।

    সকালের দিকে ছোটবাবু ঘুম থেকে উঠে বিস্মিত। রাতে বেশ ঝড় বৃষ্টি হয়েছে সমুদ্রে। এখন একেবারে সমুদ্র শান্ত এবং নিরিবিলি। এত নিরিবিলি যে মনেই হয় না রাতে ঝড় হয়েছে। আসলে সে স্বপ্ন দেখেছে কিনা বুঝতে পারছে না। রাতে দরজায় কেউ ওকে ডেকেছিল যেন, মৃদু আঘাত দরজায়, যদি বনি হয়ে থাকে, সে হাত-মুখ ধুয়ে ওপরে গেল। এবং বনির দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকল, জ্যাক, কাল রাতে আমাকে তুমি ডেকেছিলে?

    জ্যাক দরজা খুলে বলল, না তো।

    -–কাল রাতে ঝড় বৃষ্টি হয়েছে?

    —না তো!

    —কিন্তু দুপুররাতে মনে হল জাহাজটা ভীষণ দুলছে!

    জ্যাক বলল, কি জানি, আমি তো কিছু টের পাইনি!

    —তুমি মেয়ে রাতে কিছু টের পাও না?

    মেয়ে বলতেই জ্যাক কেমন লজ্জা পেল। বলল, যাঃ, তুমি যে কি না। কেউ শুনতে পেলে।

    —কেউ শুনতে পাবে না। একটু থেমে বলল, আমার কিন্তু ভাল ঘুম হয় না। তুমি যে কি করে এত ঘুমোও!

    —কেন, কি হয়েছে। বলেই জ্যাক বাইরে এসে দাঁড়াল। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছোটবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। এবং সত্যি মনে হল ছোটবাবু রাতে ভাল যেন ঘুমোতে পারে না। ওর কেমন দুশ্চিন্তা হল। ছোটবাবুকে নিয়ে এমনিতেই জাহাজে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। বাবাকে সে নানাভাবে বুঝিয়েছে, ছোটবাবুর ওপর আর্চির ভীষণ রাগ। এখন আর আর্চি তাকে ঘাঁটাতে সাহস পায় না। তবু কখনও কখনও মনে হয় আর্চি ছোটবাবুকে কিছু একটা করে ফেলতে পারে। তখন ভয়ে ওর বুক কাঁপে

    ছোটবাবু ফানেলের ওদিকটায় হাঁটতে হাঁটতে চলে যাচ্ছে। কিছু বলছে না। সমুদ্র থেকে ঠাণ্ডা বাতাস উঠে আসছে। রোদ এখন জাহাজের সর্বত্র তেরচা হয়ে পড়ছে। এবং জাহাজ দুলছে, দুলবেই, কারণ খালি জাহাজে কখনও দুলোনি না থেকে পারে না, সমুদ্র যতই শান্ত হোক। ছোটবাবু রেলিঙে ঝুঁকে বলল, আমার রাতে কী যে আজকাল হয়!

    —কী হয়? জ্যাক আরও বেশি ঝুঁকে দাঁড়াল। এবং ঝুঁকে ছোটবাবুর মুখ দেখতে চাইল’।

    –মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি আমাকে ডাকছ। দরজায় কড়া নেড়ে বলছ, ছোটবাবু আমি বনি, দরজ খোল।

    জ্যাক বলল, ছোটবাবু, আমিও ঠিক এমন শুনতে পাই। আমারও কেমন মনে হয়, কেউ আমাকে ডাকছে, যেন দরজায় দাঁড়িয়ে বলছে, আমি ছোটবাবু, দরজা খোল বনি।

    ছোটবাবু বলল, কেন এমন হয় বুঝতে পারছি না।

    —হ্যাঁ ছোটবাবু, আমিও বুঝতে পারছি না। দুপুররাতে দু-একবার দরজা খুলে দেখেছি, না কেউ নেই। কখনও জ্যোৎস্নায় চুপচাপ কেমন হেঁটে গেছি। যদি কোথাও তুমি লুকিয়ে থাক। আমার মনে হয়েছিল, তুমি লুকিয়ে আছ কোথাও। ঠিক কোথাও লুকিয়ে আছ। প্রথমে ট্যাংকের ওপাশে উঁকি দিলাম, নেই। চারপাশে খুঁজে দেখেছি, নেই। তখন মনে হল কেউ আসছে। বোধহয় এনজির-রুমের কেউ। ওপরে জল নিতে এসেছিল ফিরে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে নেমে গেলাম। তারপর ছুটে ওপরে উঠে গেলাম। ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই কি ভয়! কেউ যদি দেখে ফেলত—কি যে হত না!

    এই সাতসকালে বনি এ-সব বলছে। বনির সঙ্গে সে প্রতিদিন বিকেলে, কখনও কখনও রাতে আজকাল চুপচাপ বোট-ডেকে বসে থাকে। বনি কত রকমের গল্প করতে ভালোবাসে। যেন বনি তাকে নানাভাবে এক মনোরম জগতে নিয়ে যেতে চায়। বনিকে দেখলেই ভরা নদীর কথা মনে হয়। তীরের গাছপালা ফেলে যেন এক দুরন্ত নদী প্রবহমান—সেই বনি কখনও এ-সব বলেনি, অথচ সাতসকালে এ-সব কথা! সে বলল, তুমি তো আগে কিছু বলনি!

    —তুমি ভয় পাবে বলে বলিনি।

    —যদি রাতে তখন তোমাকে কেউ মেয়ের পোশাকে দেখে ফেলত!

    জ্যাক এবার একটু একটু সোজা হয়ে দাঁড়াল। জ্যাক সাদা বয়লার স্যুট পরেছে। হিপ-পকেটে চিপিং করার হাতুড়ি। হাতে চামড়ার দস্তানা। পায়ে সাদা কেড্‌স্‌ এবং বয়লার-স্যুটে কোথাও কোথাও লাল নীল রঙের দাগ। চুল বড় হয়ে ঘাড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ওকে অনায়াসে মেয়েদের মতো চুল রাখছে বলে ঠাট্টা করা যেতে পারে, এবং মুখে ডিমের মতো মসৃণতা আর এত বেশি লাবণ্য যে ছোটবাবুর এই সাতসকালে বনিকে চুমো খেতে ইচ্ছে হল। সে বনিকে একদিন চুমো খাবে ভেবেছিল, এবং মনের ভেতরে এমন সব কত রকমের ইচ্ছে যেমন কখনও কখনও সে ভেবে থাকে বনিকে নিয়ে নিরিবিলি একটা সাদা চাদরের নিচে শুয়ে থাকবে, কখনও ইচ্ছে হয় বনির শরীরের উষ্ণতা তাকে ভীষণ আরাম দেবে। কোনো পাইনের ছায়ায় সে আর বনি, বনির হাত ওর হাতে, এবং কপালে চুমো খেলে কোন নষ্ট হয়ে যাবার কথা মনে থাকে না।

    বনি ভেবেছিল, ছোটবাবু আরও কিছু বলবে। কিন্তু একেবারে চুপচাপ। কেবল কি যে ভাবছে। ওর দিকে একবার চোখ তুলে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত। এমন কি ছোটবাবুর যে কাজে যাবার সময় হয়ে যাচ্ছে, ওর কেবিনে এতক্ষণে চা এসে গেছে এবং পোশাক পাল্টে বালতিটা নিয়ে উইনচের নিচে পড়ে থাকতে হবে—সে সবও যেন মনে করতে পারছে না। তখন বনি বলল, কেউ আমাকে দেখেনি ছোটবাবু। তুমি অযথা ভাববে না।

    —এটা তোমার ঠিক না বনি।

    —কী ঠিক না!

    —এই যে হুট করে বের হয়ে যাওয়া।

    —আমার জন্য তুমি ভাবো ছোটবাবু?

    —না, ভাবি না।

    বনি বলল, তবে আর কি! যখন ভাবো না… বনি চলে যাচ্ছিল।

    ছোটবাবু বলল, এই, ভাল হচ্ছে না।

    বনি বলল, আমি যাচ্ছি।

    ছোটবাবু বলল, চল নিচে।

    —নিচে নামব না। তোমার তো সাহস দেখছি খুব বেড়ে গেছে।

    ছোটবাবু বলল, কেন জানি তোমাকে নিয়ে ভয় হয় বনি।

    —আমার কিছু হবে না।

    —রাতে হুট-হাঁট বের হবে না।

    —আরে আমার বের হতে বয়ে গেছে।

    —তবে বের হও কেন বলতো!

    —তুমি ডাকলে বের হব না?

    —আমি ডাকলেও বের হবে না।

    —এসব বলছ কেন!

    —কি জানি! কে যে আমাদের ডাকে! গলার স্বর অবিকল নকল করে ডাকে। দরজা খুলে দেখেছি, কেউ নেই। আজ রাতে দরজায় কেউ ঠিক টোকা মেরেছে, দরজায় কেউ টোকা মেরেছে আমি স্পষ্ট শুনতে পেয়েছি বনি।

    তারপর ছোটবাবুর বলার ইচ্ছে হল, আসলে বনি আমি তোমার জন্য জেগে থাকি। ভাল ঘুম হয় না। কেবল মনে হয় তুমি ঠিক আর স্থির থাকতে পারবে না। নেমে আসবে। জাহাজে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে তখন তুমি খুব সন্তর্পণে নেমে আসবে কেবিনে। শরীরে তোমার আশ্চর্য বাতিঘর, আমি টের পাচ্ছি বাতিঘরে তুমি আলো জ্বেলে রেখেছ। ঠিক ঠিক তুমি অথবা আমি কখনও এক জায়গায় পৌঁছে যাব।

    দরজার কাছে এসে বনি বলল, আমার যে কী হয় মাঝে মাঝে, তুমি বিশ্বাস কর ছোটবাবু সবাই ঘুমিয়ে পড়লে মনে হয় তুমি ঠিক চলে আসবে। তুমি যেমন পছন্দ কর, এই যেমন লতাপাতা অথবা গোলাপ ফুলের রঙ নিয়ে সুন্দর দামী ফ্রক পরে বসে থাকি। আমি আর কিছু পারি না ছোটবাবু। তারপর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কেবল স্বপ্ন দেখি, তুমি চলে আসছ। কখনও নদীর পাড়ে হেঁটে হেঁটে কখনও ফসলের খেত মাড়িয়ে অথবা মনে হয় তুমি তুষারপাতের সময় শীতে মরে যাচ্ছ। আমি তোমাকে নিয়ে কোনো গরম বিছানায় শুইয়ে দিচ্ছি। নিজে শুয়ে পড়েছি তোমার পাশে। আরও যে কি সব করে ফেলি না! আমার ভারি লজ্জা করছে বলতে।

    বনি কথা বললে কি যে আশ্চর্য সুন্দর কথা বলতে পারে! আর একনাগাড়ে এত কথা বোধহয় বনির এই প্রথম। এবং ছোটবাবু দেখল বনির মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। চোখে মুখে অতীব ইচ্ছের এক খেলা। চুলে এখন বনির মুখ ঢাকা। কিছুটা দেখা যাচ্ছে কিছুটা দেখা যাচ্ছে না। ওর কত কাজ নিচে কিন্তু কি যে হয় ছোটবাবুর, বনিকে ফেলে ওর আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না! কেবল বনির চারপাশে ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে হয়। এবং রাতে যখন বনি দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকে তখন ইচ্ছে হয় সেই সুন্দর কেবিনের চারপাশে ঘুরে বেড়াতে। কিছুতেই তার নিচে নামতে ইচ্ছে হয় না। এতগুলো ইচ্ছের কথা সে বনিকে এখন বলতে পারত কিন্তু সে কিছুই বলল না। সে নেমে গেল। বনি দেখল ছোটবাবু চুপচাপ ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে। এবং একসময় ওর আর কিছুই দেখা গেল না। বনি দরজা বন্ধ করে বসে থাকল। সে আজ কোনো কাজ করবে না ভাবল। ছোটবাবু কোথায় কাজ করবে সে জানে। যদি সময় এবং সুযোগ পাওয়া যায় সে ছোটবাবুর পাশে বসে এটা ওটা এগিয়ে দেবে ভাবল।

    এবং সবাই দেখল উইনচে ছোটবাবু কাজ করছে। পাশে ঝুঁকে রয়েছে বনি। বনির হাতে নানা সাইজের স্প্যানার। ছোটবাবু যেটা যখন চাইছে বনি এগিয়ে দিচ্ছে। অথবা বনি কোনটা কি সাইজের স্প্যানার বুঝতে না পারলে ছোটবাবু বের হয়ে আসছে উইনচের নিচ থেকে। একটা একটা করে স্প্যানার হাতে নিয়ে এক একটা স্প্যানারের সাইজ এবং তার নাম মুখস্থ করাচ্ছে।

    স্যালি হিগিনস ব্রীজ থেকে সব দেখতে পাচ্ছিলেন। মেয়ের ওপর জোর করার সাহস কেমন তার কমে গেছে। অথবা তিনি হয়তো চান বনি সুখে থাকুক। বনি খুশী থাকুক। বনি যা পছন্দ করে তিনি তাতে বাধা দিতে দুঃখ পান। মেয়েটার জীবনে দুর্ভোগ এত বেশি যে সামান্য সুখ থেকে তাকে আর বঞ্চিত করতে ইচ্ছে হয় না। যদিও জানেন চিফ-মেট এটা পছন্দ করছে না। ছোটবাবুর যতই সাধুসন্তের মতো চেহারা হোক—ওর মায়াবী চোখ এবং শরীরের দৃঢ়তা যতই সবাইকে অবাক করে দিক, ছোটবাবু বছর শেষ হতে না হতেই প্রাচীন নাবিকের মতো অভিজ্ঞ হয়ে উঠবে।

    আর তখনই জাহাজে এলার্মিং বেল বেজে উঠল। ট্রান্সমিটার রুমে কোনো জরুরী খবর। রেডিও- অফিসার ছুটে যাচ্ছে। এবং ফের তাকে দেখা গেল, খুব চিন্তিত মুখে সে ফিরে আসছে। প্রায় ছুটে এসে কাপ্তানের সামনে দাঁড়িয়ে গেল। কথা বলতে পারছে না ঠিকমতো। কেবল হাঁপাচ্ছে। কোনোরকমে ঢোক গিলে সে বলার চেষ্টা করল—সামথিং রং স্যার। ট্রান্সমিটারে অদ্ভুত সব খবর আসছে।

    স্যালি হিগিনস সহসা চিৎকার করে উঠলেন—হোয়াটস্ রং ম্যান

    চিফ্-মেট, ডেবিড এবং থার্ড-মেট পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। সাধারণত কাপ্তান এত সহজে উত্তেজিত হন না। বরং সবকিছু দেখেশুনে কথা বলার স্বভাব তাঁর। অবশ্য মাঝে মাঝে যে মাথা গরম না করেন’ এমন নয় কিন্তু কোনো বিপদে তিনি এমনভাবে কখনও উত্তেজিত হয়ে পড়েন না।

    রেডিও-অফিসার বলল, এস-ও-এস আসছে।

    —এস-ও-এস। বলেই দু’লাফে উঠে গেলেন তিনি। ওর সঙ্গে অন্য সবাই ওপরে উঠে গেল। ওরা হাঁটু গেড়ে বসে এমন কিছুই বুঝতে পারল না যে এটা একটা এস-ও-এস! আর আশ্চর্য রেডিও- অফিসারও এমন কিছু বুঝতে পারছে না, সে বার বার এটা ওটা ঘোরাচ্ছে এবং কর্কশ শব্দ ভেতরে। কানে তালা লেগে যাচ্ছে—কিছু মানুষের হৈ চৈ শব্দ, যেন কোথাও আগুন লেগেছে। ভীষণ অগ্নিকাণ্ডের ভেতর জাহাজ ডুবে গেলে যা হয় কখনও যেন কেউ হাত তুলে বাঁচাও বাঁচাও বলছে। ছুটোছুটি দাপাদাপি তেলের পিপে ফাটার শব্দ। হুড়মুড় করে কিছু পড়ে গেল। রেডিও অফিসার ঘামছে আর বলছে, শুনতে পাচ্ছেন স্যার! শুনতে পাচ্ছেন না! ঐ তো শুনুন আবার আর্ত চিৎকার—কাছাকাছি কোথাও জাহাজডুবি হচ্ছে মনে হচ্ছে।

    অথচ জাহাজডুবি কোথায় হচ্ছে ওরা কেউ বুঝতে পারছে না। চিফ-মেট দূরবীনে দেখছে চারপাশটা। কাপ্তান নিজেও দেখলেন দিগন্তে কোথাও কিছু ভেসে নেই। রোদে এখন যেন সমুদ্র পুড়ে যাচ্ছে অথবা ইস্পাতের মতো রং সমুদ্রের। কোথাও কোনো জাহাজ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি দিগন্তে ধোঁয়া উঠছে না। র‍্যাডারে কিছু আসছে না। ওরা কি করবে কিছুই বুঝতে পারছিল না।

    কাপ্তান বললেন, এরিয়া-স্টেশন থেকে তো কোনো খবর আসছে না।

    —তাই তো? কাপ্তানের কথায় সবাই কেমন একটা সূত্র পেয়ে গেল।

    তিনি এবার বললেন, জলদি এরিয়া-স্টেশনকে ধরো। বলো, আমরা এমন একটা খবর পাচ্ছি যেন কোথাও সমুদ্রে কোনো জাহাজে আগুন লেগেছে। জাহাজ ডুবছে। ওরা রেসক্যূ চাইছে। কিন্তু র‍্যাডারে কিছু আসছে না। চারপাশে কোথাও কিছু দেখা যাচ্ছে না।

    তখন জ্যাক সহসা চোখ তুললেই দেখতে পেল ব্রীজে অফিসারদের ভিড়। সবাই সেখানে জড়ো হয়েছে। কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে—মাংকি আয়ল্যাণ্ডে বার বার বাবা উঠে যাচ্ছেন আবার নেমে আসছেন। কখনও দূরবীনে কি দেখছেন। সে দেখতে পেল তখন লেডি-অ্যালবাট্রস মাথার ওপর উড়ছে। এবং বারোটার লাঞ্চে ওর কাজ লেডি-অ্যালবাট্রসকে খাওয়ানো। কাজটা সে ছোটবাবুর কথামতো করছে। এবং যেন এ-জাহাজে কিছুদিনের ভেতর সে ছোটবাবুর অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে যাবে। যেমন এখন ছোটবাবু তাকে খুব খাটাচ্ছে। একদণ্ড বিশ্রাম দিচ্ছে না। নানারকমের সব পার্টস খুলছে লাগাচ্ছে। ওর কাজ সব তেলের ভেতর ভিজিয়ে রাখা, শিরীষ দিয়ে ঘসে ঘসে জং তুলে ফেলা। কখনও কখনও ধমকও খাচ্ছে। অর্থাৎ কখনও ভুল করে ফেললে ছোটবাবু দাঁত শক্ত করে, এই মেমের বাচ্চা বলেই হেসে ফেলছে।

    তাছাড়া ছোটবাবু যতক্ষণ কাজের ভেতর থাকে খুব সিরিয়াস। বনি একবার ভুলে নাইনথ্ সিকস্টিন স্প্যানার হাতের কাছে দিতে পারেনি—আর কি ধমক! ইচ্ছে হয়েছিল সব মুখে ছুঁড়ে ফেলে চলে যাবে। কিন্তু সে কিছুতেই আর ছুঁড়ে দিতে পারে না। সে চলে গেলে জানে সবই ছোটবাবুর এক হাতে করতে হবে। বার বার উইনচের নিচ থেকে ওকে উঠে আসতে হবে, বারবার ধোয়ামোছা করতে হবে। এবং সবার ছুটি হয়ে গেলেও দেখা যাবে ছোটবাবুর ছুটি হয়নি। সে এসব ভেবে প্ৰায় যতটা সম্ভব রাগ সামলে কাজ করে যাচ্ছিল। কথা বলছিল না। ছোটবাবু বুঝতে পেরে বলেছিল, এই জ্যাক কথা বলছ না কেন!

    জ্যাক জবাব দিচ্ছে না। গুম মেরে বসে আছে। ঠিক পায়ের নিচে। এবং নুয়ে তেলের টবটার ভেতর কি খুঁজছে। নাট-বোল্ট-বিয়ারিং সে সব ঘসে সাফ করছে। ছোটবাবু যে ডাকছে একেবারে শুনতে পাচ্ছে না।

    ছোটবাবু এবার নিচে থেকে উঠে এল। উইনচের ড্রামে ভর দিয়ে বলল, রাগ করেছ মেয়ে জ্যাক চুল কপাল থেকে সরিয়ে চোখ তুলে তাকাল। তেলকালি মুখে এবং বিচিত্র রঙে বহুরূপী সেজে উইনচের নিচ থেকে ছোটবাবু উঠে এসেছে। সে হেসে ফেলল। বলল, না রাগ করিনি।

    —তবে কথা বলছ না কেন?

    —ভাল লাগছে না ছোটবাবু। আমার আর ভাল লাগছে না এভাবে থাকতে। আমি আর পারছি না। তারপর কেমন মাথা নিচু করে রাখল বনি। যেন শত চেষ্টাতেও আর ছোটবাবু বনির কোনো সাড়া পাবে না।

    ছোটবাবু আরও নুয়ে প্রায় কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, এই!

    বনি তেমনি বসে থাকল। তেলের টবে সে যেন কিছু খুঁজছে। এবং সে আর কথা বলবে না স্থির করে নিয়েছে যেন। কথা বললেই ধরা পড়ে যাবে, ছোটবাবুকে নিয়ে সে কি করতে চায় ছোটবাবু বুঝে ফেলবে। বুঝে ফেললেই সে ছোটবাবুর কাছে খুব খাটো হয়ে যাবে।

    ছোটবাবুর ইচ্ছে হচ্ছে দু’হাতে ওর নরম রেশমের মতো সব চুল এলোমেলো করে দিতে। হাতে তেলকালি, সে কিছু করতে পারছে না। দু-একজন ডেক-জাহাজি যেতে যেতে দেখতে পাচ্ছে কাপ্তানের ছেলেটা ছোটবাবুর পায়ের কাছে বসে রয়েছে। নিবিষ্ট মনে কাজ করছে। ছেলেটার মাথার কাছে ঝুঁকে আছে ছোটবাবু। এনজিন-সারেঙ একদম পছন্দ করেন না জ্যাককে। ছোটবাবুর এত কাছে জ্যাককে বসে থাকতে দেখে মুখ গোমড়া করে চলে যাচ্ছিলেন। তখনই ছোটবাবু ডাকল, চাচা।

    সারেঙ বলল, আমার কাজ আছে ছেলে। এনজিন-রুমে যাচ্ছি।

    ছোটবাবু সব টের পায়। সে বলল, চাচা জ্যাক আপনাকে ডাকছে। ছোটবাবু জানে জ্যাকের কথা বললে তিনি কাছে না এসে পারবেন না।

    এনজিন-সারেঙ ভীষণ বিরক্ত। কি করবেন বুঝতে পারছেন না। কিন্তু কাপ্তানের ছেলে ডেকেছে তিনি চলেও যেতে পারেন না। কাছে গিয়ে বললেন, জী আমাকে…..

    বনি বলল, আমি তোমাকে ডাকিনি সারেঙ। ছোটবাবু মিথ্যা কথা বলেছে।

    জ্যাকের চোখ-মুখ দেখে কেন জানি তিনি তাকে আর খুব খারাপ ভাবতে পারলেন না। ছোটবাবুর মুখে সামান্য হাসি। সে যেন বলতে পারলে খুশী হত, জ্যাক আসলে ছেলে নয় চাচা, সে মেয়ে। সে আমাকে ভীষণ ভালবাসে। পুরুষের পোশাকে সে আর থাকতে পারছে না। এবং সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতর জ্যাকের কষ্টটা ভীষণ তোলপাড় করতে থাকলে বলতে ইচ্ছে হল, জাহাজে যদি একজন মেয়ে থেকেই যায় তবে কি অপরাধ বলুন তো!

    এনজিন-সারেঙ দেখল ছোটবাবু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু বলছে ন। সারেঙ বললেন, কিছু বলবি?

    ছোটবাবু বলল, না।

    —দেশে ফেরার জন্য মন খারাপ?

    ছোটবাবু কি বলবে বুঝতে পারল না। দেশে ফেরার কথা আছে অথবা জাহাজে চিরদিন কেউ থাকে না এমন কথা সে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। সে কতদিন যেন তার লিটল প্রিন্সেসকে মনে করতে পারেনি। সেই তাজা মণিমুক্তা আবিস্কারের পর এ জাহাজটাই মনে হয়েছে তার সব। জাহাজ ছেড়ে গেলে সে মরে যাবে। সে বলল, কবে যে আমরা ফিরব! বলতে হয় কিছু তাই বলা। আসলে সে যেন বলতে চাইল, একটা নূতন দেশের খবর পেয়ে গেছি চাচা। এখন কে আমার বেশি কাছের বুঝতে পারছি না।

    এনজিন-সারেঙ বললেন, দেখতে দেখতে তোর এখন সময় কেটে যাবে। জাহাজে প্রথম সাত আট মাস খুব কষ্টের। যেন ফুরাতে চায় না। তারপর দেখবি সব সহজ হয়ে গেছে। একদিন দেশেও ঠিক ফিরে যাবি ছেলে।

    সারেঙ-সাব এসব বলে যখন চলে গেলেন ছোটবাবুর মন খারাপ হয়ে গেল। সত্যি তো সে চিরদিন জাহাজে থাকছে না। বনির সঙ্গে সে আর একটা কথা বলতে পারল না। সে খুবই মিইয়ে গেল। সারেঙ-সাব যেন তাকে মনে করিয়ে দিয়ে গেলেন—তুমি ছেলে বেশি জড়িয়ে পড়বে না। সারেঙ-সাব কি সব বুঝতে পারেন! তিনি কি প্রথম থেকেই জানেন জ্যাক আসলে ছেলে নয় সে মেয়ে। কাপ্তানের নির্দেশমতো জ্যাক সম্পর্কে সব মিথ্যে প্রচার চালিয়ে গেছেন।

    তখন বনি বলল, ছোটবাবু তুমি আজ আমার কেবিনে আসবে?

    —কখন?

    —রাতে। বাবা যখন ঘুমিয়ে পড়বে। ডেবিডের যখন ওয়াচ থাকবে।

    ছোটবাবু কি ভাবল। সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলতে পারল না।

    বনি ফের বলল, কোন ভয় নেই। আমি আর তোমাকে ক্লাউন বানাতে চাইব না। তুমি তো সব নিজের চোখেই দেখেছ?

    —না না, আমি মানে বুঝতে পারলে ঠিক তা ভাবছি না।

    —তবে কি ভাবছ?

    —কেউ যদি টের পায়!

    —পাক্। তুমি আসবে। কথা দাও।

    —গিয়ে কি করব? বোকার মতো ছোটবাবু কী সব বলে ফেলে।

    —গিয়ে আবার কি করবে! কেউ তো কিছু করতে বলেনি!

    বনি হাসবে কি কাঁদবে বুঝতে পারল না। তবু ধীরে ধীরে বলল, কিছু করবে না। তোমার সামনে সুন্দর ফ্রক পরে আমি বসে থাকব ছোটবাবু। আর কিছু চাই না। এটা আমার স্বপ্ন বলতে পার। রোজ সেজেগুজে বসে থাকি মনে হয় কেবল তুমি আসবে। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়ি টের পাই না। সকাল হয়ে গেলে মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়।

    ছোটবাবু বলল, যাব।

    আর তখনই রেডিও-অফিসার কানে ইয়ার-ফোন লাগিয়ে হেঁকে যাচ্ছে, হ্যালো হ্যালো এরিয়াস্টেশন জিরো টু টু থ্রি….হ্যালো সিউল-ব্যাংক বলছি। মুখ ক্রমশ হতাশায় সাদা হয়ে যাচ্ছে। পাশে স্যালি হিগিনস্ চুপচাপ বসে রয়েছেন—যত মুখটা রেডিও-অফিসারের সাদা হয়ে যাচ্ছে তত ভেতরে ভেতরে অসহায় বোধ করছেন। অথচ একটা কথা বলছেন না। আশ্চর্য নির্বিকার তিনি।

    সহসা চিৎকার করে উঠল রেডিও-অফিসার—হ্যালো সিউল-ব্যাংক বলছি। বাউণ্ড ফর সামোয়া এবং সে আরও জোরে দ্রাঘিমা অক্ষাংশের বিবরণ দিতে দিতে হাত পা- শিথিল করে ফেলল। বলল, নো রেসপনস্ স্যার। কোথাও কেউ রেসপনস্ করছে না।

    চিফ-মেটের মুখ থেকে ফ্যাস করে কথাটা বেরিয়ে গেল, স্ট্রেঞ্জ!

    স্যালি হিগিনিস তখন ধীরে ধীরে নেমে আসছিলেন। তেমনি নির্বিকার। চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে ঠিক আর দশটা দিনের মতোই জাহাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। কোথাও কোনো গণ্ডগোল নেই। কাপ্তানের এমন নির্লিপ্ত মুখ দেখে ওরা আরও ভেতরে ভেতরে ক্ষেপে যাচ্ছিল অথবা যা হয়ে থাকে অসহায় মানুষগুলো এখন কি করবে বুঝতে পারছে না। কেবল পিঁপ্ পিঁপ্ শব্দ ট্রান্সমিটারে। আশ্চর্য, এরিয়া- স্টেশনকে কিছুতেই ধরা যাচ্ছে না। অবাক, সকালেও রেডিও অফিসার টি.আর. পাঠিয়েছে। অর্থাৎ জাহাজের নাম কোম্পানির নাম কত জি. আর. টি. কত এন. আর. টি. এবং কোন কোস্টে জাহাজ যাচ্ছে, স্পীড এবং নেকসট পোর্ট অব কল্ কি সব জানিয়েছে। অথচ দু’ঘণ্টা বাদে ফের এরিয়া-স্টেশনকে কিছুতেই ধরতে পারছে না। নানাভাবে চেষ্টা করেও পারছে না। এবং কি যে হয়ে গেছে! ওরা কি ভুল করে অন্য সমুদ্রে চলে এসেছে। কম্পাস কি ঠিক রিডিং দিচ্ছে না। কতসব আজগুবি ভাবনা যে মাথায় এসে জড়ো হচ্ছে। ওরা তখন দেখল, স্যালি হিগিনস চার্টরুমের দরজা খুলে ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেছেন।

    চিফ-মেটের সামনে রেডিও-অফিসার প্রায় বলে ফেলেছিল বাস্টার্ড! কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়েছে। এমন একটা সময়ে জাহাজের সর্বময় যিনি তাঁর চোখেমুখে এতটুকু উৎকণ্ঠা নেই। তিনি নিচে নেমে গেলেন! কিছু বললেন না!

    কিউ. টি. জি. বার বার চেয়েও সে যখন বিফল তখনও দেখছে রিসিভারে সেই হাহাকার শব্দ। চারপাশে আগুন লাগলে জাহাজিরা যেভাবে আত্মরক্ষা করে থাকে অথবা চিৎকার চেঁচামেচি এবং বাঁচাও বাঁচাও বলে থাকে তারপর প্রচণ্ড দাবদাহের মতো বিস্ফোরণের শব্দ, যেন কোনও জাহাজের প্রচণ্ড বিস্ফোরণে একটা দিক উড়ে গেছে—তেমনি সব শব্দ পেয়ে ওরা সবাই ঘামতে থাকল। রেডিও- অফিসার মাংকি-আয়ল্যাণ্ড থেকে এখন ছুটে নামতে পারলে যেন বাঁচে।

    স্যালি হিগিনস তখন বেশ আরাম করে পাইপে আগুন ধরাচ্ছেন। পোর্ট-হোল খুলে দেখছেন দুপুরের রোদে সমুদ্র ইস্পাতের চাদর গায়ে জড়িয়ে শুয়ে আছে দিগন্তে। চোখ ঝলসে যাচ্ছে। তিনি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না কেন এমন হচ্ছে! চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। ওপরে যারা আছে তারা এক্ষুনি হয়তো নেমে আসবে। পরামর্শ চাইবে, স্যার আমরা এখন কি করব? এখন কি করতে হবে তিনি নিজেও ঠিক কিছু জানেন না।

    ওরা যখন এল, তিনি শুধু বললেন, আমাদের সামনে জাহাজ চালিয়ে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।

    ওরা চলে যাচ্ছিল। তিনি ওদের ফের ডাকলেন। রেডিও-অফিসারকে বললেন, তুমি চেষ্টা করে যাও। চিফ-মেট এবং ডেবিডকে বললেন, এসব আজেবাজে ব্যাপার যত কম জানাজানি হয় ততই ভাল।

    ডেবিডের বুঝতে অসুবিধা হল না এটা তাকেই উদ্দেশ্য করে বলা—কাপ্তান তাকে সর্তক করে দিলেন। এমনকি জ্যাক ছোটবাবু কেউ জানবে না। ওকে এখন খুব সাবধানে চলাফেরা করতে হবে। ছোটবাবুর সঙ্গে যত দেখা না হয় দেখা হলেই কি যে হয়ে যায়—গোপন কিছু থাকে না। এমন একটা অতিশয় খবর সে জানে সবার আগে সে তা ছোটবাবুকে জানাতে পারবে না ভাবলে কেমন যেন লাগে। সে সারাটা দিন ছোটবাবুর কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াল। দেখা হলেই এমন অতিশয় খবরটি ঠিক সে ছোটবাবুকে ফাঁস করে দেবে। এটা তার ভারি খারাপ স্বভাব। কাপ্তান ওর চোখমুখ দেখে ঠিক ধরে ফেলেছেন। এসব ভেবে নিজের ওপরই সে এবার ক্ষিপ্ত হয়ে গেল। ছোটবাবু তার কে! তার কাছে সব বলতে না পারলে সে কেন এমন মনমরা হয়ে থাকবে। সে ফের আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল মুহূর্তে এবং নিজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এত বেশি সচেতন যে, কিছুতেই কিছু বলবে না। অথচ ঠিক ছোটবাবুর সঙ্গে সে হাজার রকমের কথা বলে যাবে ভেবে ছোটবাবুর কেবিনে ঢুকে বলল, হ্যাল্লো ছোটবাবু, তুমি কেমন আছ?

    ছোটবাবু অবাক। ডেবিড যেন দূর দেশ থেকে ফিরে এসেছে। যেন কতদিন দেখা হয় নি। ডেবিড খুবই গম্ভীর এবং পাইপ টানছে ডেবিড। কিছুটা চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলছে।

    ছোটবাবু বলল, ডেবিড তোমার শরীর বোধ হয় ভাল নেই। কারো ওপর তুমি ভীষণ রেগে গেছ।

    —কেন? কেন? আমি কারো ওপর রেগে যাব কেন?

    —আমার কিন্তু তাই মনে হচ্ছে।

    —ও নো নো।

    ছোটবাবু বলল, কফি খাবে না চা?

    —তুমি যা বলবে।

    ছোটবাবু হেসে ফেলল। বলল, আচ্ছা। বলে বেল টিপে বয়কে ডাকল। বয় এলে এক কাপ কফি দিতে বলল।

    ডেবিড বলল, তুমি!

    —আমার এখন খেতে ইচ্ছে করছে না। তুমি খাও।

    ডেবিড বলল, কেন কি হয়েছে তোমার। মন ভাল নেই?

    —না, মন বেশ ভাল আছে। তারপর সামোয়াতে নেমে কি প্রোগ্রাম?

    —সামোয়া! তুমি পাগল ছোটবাবু। আমরা সামোয়াতে যাব! তার আগেই দেখো জাহাজের কি হয়! প্রোগ্রাম! ক্ষিপ্ত হয়ে গেল বলতে বলতে। তারপর সহসা চোখ বুজে নিজেকে কিছুটা সামলে বলল, আমার যে কি হয় মাঝে মাঝে ছোটবাবু বুঝি না। সামোয়াতে নেমে যাব, ফূর্তি করব, মদ খাব। সুন্দরী মেয়ে যদি পেয়ে যাই ওঃ মাই গড আমার এখন ওপরে কত কাজ! এখানে আমি বসে আছি! বলেই ডেবিড দু’লাফে উঠে গেলে ছোটবাবু বাইরে এসে দাঁড়াল। কফি এখন ব্রীজে পাঠিয়ে দিতে হবে। সে ওপরে উঠে ডেবিডকে কিছু বলতে গিয়ে দেখল ব্রীজে চারজন অফিসার অনবরত দূরবীনে কি দেখে যাচ্ছে। সব জাহাজিরা যে যার ফোকসাল থেকে বের হয়ে এসেছে। আবার কি সেই সব বিষাক্ত পাখিরা জাহাজ আক্রমণ করতে চলে আসছে। ছোটবাবু তাড়াতাড়ি নিচে নেমে গেল। দরজা বন্ধ করে দিল। জ্যাকের কেবিনে এসে ডাকল জ্যাক, তুমি ভেতরে আছো? জ্যাক তুমি কোথায়? এখন কেন জানি মনে হচ্ছে সবার আগে জ্যাক কোথায় আছে দেখা। সে খুঁজে বেড়াতে লাগল জ্যাককে, জ্যাককে দেখা হলেই বলতে হবে, কোথায় ঘুরছ! সামনে আমাদের কত বিপদ তুমি জান না! কেবিন থেকে কোথাও নড়বে না।

    তখন জ্যাক ওপাশের আড়াল থেকে মুখ বার করে ডাকল, ছোটবাবু আমি এখানে। আর সঙ্গে সঙ্গে ছোটবাবুর মুখে হাসি ফুটে উঠল। জ্যাক কাছে থাকলে তার আর কোনো আতঙ্ক থাকে না। সে জ্যাকের পাশে দাঁড়িয়ে গেল। সমুদ্রে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। কোয়ার্টার-মাস্টার জাহাজের পতাকা মাস্তুল থেকে নামিয়ে ফেলছে। তারপর মাস্তুলের মাথায় আলো জ্বালিয়ে ফিরে যাচ্ছে ফোকসালে। চারপাশটা ক্রমে ধূসর হয়ে উঠছে, ক্রমশ সূর্য সমুদ্রের নিচে ডুবে গেলে এক লালবর্ণের কুসুম কুসুম উষ্ণতা চারপাশে এবং সেই উষ্ণতা মরে গেলে নীলবর্ণের সমুদ্রে কেমন ক্রমে ধূসর হতে হতে শূন্যতায় ডুবে যায়।

    জ্যাক আর ছোটবাবু শূন্যতার ভেতর এক সময় কেমন মিশে গেল। ওদের আর দেখা গেল না।

  • সাইত্রিশ

    সাইত্রিশ

    ।। সাইত্রিশ।।

    এই জাহাজ যেন নিরবধিকাল এভাবেই চলবে। এর চলার শেষ নেই। স্যালি হিগিনস নিজের কেবিনে জেগে আছেন। বেতার সংকেতের জন্য রেডিও-অফিসার সেই যে বসে রয়েছে ওপরে আর নামছে না। কোনো নতুন খবর বেতারে ভেসে এলেই কথা আছে তাকে জানানো হবে। তিনি পোর্ট- হোল খোলা রেখেছেন। বেশ গরম পড়েছে। তবু সমুদ্র বলে তেমন গরম মনে হচ্ছে নাা। পোর্ট- হোল খোলা রেখে বসে থাকতে ভালই লাগে। জ্যোৎস্না রাত হলে তো কথাই নেই। অন্ধকার রাতেও তার বেশ ভাল লাগে। আকাশের গায়ে দু’টো একটা নক্ষত্র ক্রমে সরে যায়। এই বয়সেও কখনও মনে হয় সবকিছুই তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে। ঘুমিয়ে পড়লেই সব শেষ হয়ে গেল। তিনি কি ভেবে চিফ-মেটকে ডেকে পাঠালেন। তার সঙ্গে পরামর্শ করা দরকার।

    চিফ-মেট এলে বললেন, বোস।

    চিফ-মেট জেগেই ছিল। বিপদের সময় জাহাজে ওদের জেগেই থাকতে হয়। বার বার চেষ্টা করেও এরিয়া-স্টেশনকে শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল না! কাছাকাছি অন্য সব স্টেশনেও খবর পাঠানো হয়েছে—কোথাও থেকে কোন জবাব আসছে না। যেন জাহাজটার সব সংযোগ নষ্ট হয়ে গেছে। পৃথিবীর সবকিছু থেকে জাহাজটা ক্রমে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এখন জ্যাক নিচে কি করছে, কে জানে। হয়তো জ্যাক শুয়ে আছে। জ্যাক ঘুমোচ্ছে। পোর্ট-হোল সে খোলা রাখে না। দরজা বন্ধ থাকে। পাখা চালিয়েছে, না ভুলে গেছে। ওর তো স্বভাব দিন দিন ভারি মিষ্টি হয়ে যাচ্ছে। আগের মতো জ্যাক দুষ্টুমী করে না। কারো পেছনে লাগে না। জাহাজটা বিপদে পড়ে গেলে জ্যাককে কিভাবে যে রক্ষা করবেন এবং যা মনে হয় এ-সব সময়ে, একমাত্র সেই ঈশ্বর, করুণাময় ঈশ্বরের কথা বেশী করে মনে হতে থাকলে তিনি বললেন, চিফ-মেট তোমার কি মনে হয়?

    চিফ-মেট বলল, স্যার কি বলব, ঠিক বুঝতে পারছি না। আমার জীবনে তো এমন দেখি নি।

    স্যালি হিগিনসও এমন বলতে চাইলেন, আমিও চিফ-মেট এ ধরনের ঘটনার সম্মুখীন হই নি। যদিও মনে হচ্ছে আমরা ঠিকই যাচ্ছি। এবং চার্টের ওপর পেন্সিলে দাগ কেটে বললেন, জাহাজ এখন এখানে আছে। যদি বড় রকমের ঝড়ে পড়ে না যাই নেক্সট ফ্রাইডেতে বন্দর পেয়ে যাব।

    চিফ-মেট বলল, সেই যেন হয় স্যার!

    স্যালি হিগিনস মুখ দেখে বুঝতে পারলেন চিফ-মেট ভীষণ আতঙ্কে ভুগছে। এ-সব সময়ে সবারই বাড়ি ঘরের কথা মনে হবার কথা। তিনি ‘চিফ-মেটের স্ত্রী এবং ছেলেপিলেদের কথা পাড়লেন। এবং বললেন, তোমরা নিশ্চিত থাকতে পার আমরা ঠিক ঠিকই যাচ্ছি। ট্রানসমিটারে কোথাও কোনো গণ্ডগোল হয়েছে। আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।

    কেবিনে খুব কম-পাওয়ারের আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। খুব স্বাভাবিক দেখাচ্ছে না কাউকে। স্যালি হিগিনস দু’ গ্লাসে সামান্য মদ ঢেলে নিলেন। বললেন, খাও।

    চিফ-মেট প্রায় সবটাই খেয়ে ফেলল একসঙ্গে।

    স্যালি হিগিনস বললেন, ডেবিড কি করছে?

    —জানি না স্যার।

    —চল সব ঘুরে ঘুরে দেখা যাক। ভাল কথা, ডেক-জাহাজি কাউকে পেছনে ডিউটি দিয়ে দাও। এখন চারপাশে লক্ষ্য রাখা দরকার।

    চিফ-মেট বলতে পারত, ফরোয়ার্ড পিকে যখন ওয়াচ রয়েছে তখন আফটার-পিকে গিয়ে কি হবে? কিন্তু সে জানে তিনি না বুঝে কিছু বলেন না। সে বলল, এক্ষুনি খবর পাঠাচ্ছি তবে। এবং ডেক- সারেঙ এলে বলল, পিছিলে ওয়াচ রাখবে। লক্ষ্য রাখবে দূরে কিছু দেখা যাচ্ছে কিনা।

    এবং স্যালি হিগিনস, চিফ-মেট আর ডেবিডকে নিয়ে বের হয়ে পড়লেন। জাহাজের আলোগুলো যেন তেমন জোর নয়। চারপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কেবল গোটা জাহাজটা অন্ধকারে প্রবল বেগে ধেয়ে চলছে। নিচে বাংকার। কোল-বয় কেউ হবে জোরে জোরে নিচে কয়লা ফেলছে। মেডিসিন- কার টেনে নিয়ে যাচ্ছে আসছে তার শব্দ। ব্রীজে তখন কাঁচের ভেতর পায়চারি করছে থার্ড-মেট। কম্পাসের সামনে হুইল ধরে আছে মহসীন। তিনি প্রায় সবাইকে অভয় দিতে যেন বের হয়েছেন। নেভী ব্লু স্যুট এবং উজ্জ্বল সোনালী বোতাম, কালো স্যু পায়ে কাঁধে চার-চারটা স্ট্রাইপ। ব্যাণ্ড বাজলে মনে হতো তিনি এখন কোনো যুদ্ধজাহাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। সামনে শত্রুপক্ষের জাহাজ।

    জাহাজে যেহেতু মাত্র চার-পাঁচজন জানে, একটা কোথাও কিছু গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে জাহাজে এবং মনে হয় সেই হেতু অন্য সবাই খুব স্বাভাবিক। অন্তত স্যালি হিগিনস বয়লার-রুমে নেমে এটা বিশেষভাবে টের পেলেন।

    ছোট-টিণ্ডালের ওয়াচ। সে উইণ্ড-সেলের নিচে বসে স্টিম-গেজের কাঁটা দেখছিল। অসময়ে কাপ্তানকে দেখে সে হৈ-চৈ বাধিয়ে দিল। জোরে কয়লা মারতে বলল সবাইকে। কাপ্তানকে বলল, গুড-নাইট স্যার।

    কাপ্তান ওর কথা বেশ দূর থেকে শুনেছেন, এবং বেশ সহজভাবে তাকিয়েই বললেন, গুড-নাইট। তিনি এই যে বয়লার-রুমে নেমে এসেছেন এবং এবার এনজিন-রুমে ঢুকে যাবেন, হয়তো দেখবেন, চার-নম্বর ঝুঁকে আছে টেবিলে, কারণ সে তো জানে না, জাহাজে এখন নানাভাবে সব দুর্ঘটনার খবর আসছে এবং সামনে কোথায় কি আছে সমুদ্রে কেউ বলতে পারছে না। অর্থাৎ যখন বার বার বেতার- সংকেত পাঠিয়েও কিছু জানা যাচ্ছে না তখন হয়তো অলৌকিক কিছু ব্যাপার সমুদ্রে ঘটে যাচ্ছে। অলৌকিক না বলে ভৌতিক বলাই ভাল। অথবা লুকেনার, সেই প্রাচীন নাবিকের অদৃশ্য আত্মার ছলনা হতে পারে, জাহাজে দীর্ঘদিন কাজ করলে এ-সব বিশ্বাস করতে ভাল লাগে। এবং যখন কোনো হদিস নেই কিছুর সব সংযোগ বিচ্ছিন্ন তখন আর কি ভাবা যায়! কলকব্জা সব ঠিক অথচ ভৌতিক সব কোলাহল, কি যে ব্যাপার—এবং অসময়ে নামা বোধ হয় ঠিক হল না। কারণ তিনি অসময়ে নেমে এসেছেন বলে সবাই কেমন সংশয়ের দৃষ্টিতে ওঁকে দেখছে। তিনি খুব স্বাভাবিক গলায় চার-নম্বরের সঙ্গে কথা বললেন। চার-নম্বর খুব সহজে ব্যাপারটাকে মেনে নিতে পারল না—কেউ ঠিক ঠিক কাজ না করলে কাপ্তান সেকেণ্ড এনজিনিয়ারকে ডেকে পাঠাতে পারতেন, জাহাজে এটাই নিয়ম অথচ অসময়ে চিফ-মেট, ডেবিড এবং স্বয়ং কাপ্তান নিজে। সে পেছন থেকে ডেবিডের হাত ধরে ফেলল। কাপ্তান এবং চিফ-মেট তখন লাফিয়ে সিঁড়ি ভাঙছেন। সময় বুঝে চার নম্বর বলল, কি ব্যাপার! হঠাৎ কৰ্তা নিচে নেমে এলেন!

    ডেবিড হয়তো বলেই ফেলত, আমরা ক্রমে এক রহস্যের ভেতর ঢুকে যাচ্ছি। কিন্তু সামলে নিল নিজেকে। বলল, সব কর্তার মরজি। ঘুম আসছে না—বুড়ো মানুষ, ঘুম এমনিতেই কম, কি খেয়াল হল, বলল, জাহাজটা ঘুরে দেখব চল! ঘুরছি।

    ডেবিড আর বেশী কথা বলল না। কি বলতে শেষে কি বলে ফেলবে! সে তাড়াতাড়ি সিঁড়িতে উঠে গেল। অনেক পেছনে পড়ে গেছে। এত পেছনে পড়ে গেলে কর্তার গোঁসা হতে পারে। সে সিঁড়ি ভেঙে দ্রুত ওপরে উঠে গেল। এবং হাত নেড়ে বাই বাই করল চার-নম্বরকে। ভালো থাকো, কোথায় যচ্ছো জনো না, না জানাই ভাল। কিছু হলে হঠাৎ কিছুর সম্মুখীন হবে, আমাদের মতো সেই সকাল থেকে দগ্ধাবে না। বেশ আছো, ভালো আছো।

    ওপরে উঠে দেখল, সিউল-ব্যাংক অন্ধকারের ভেতর আলোর মালা পরে যেন দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে সীমাহীন জলরাশি, টেরই পাওয়া যাচ্ছে না। জাহাজটা চলছে না থেমে আছে বোঝা যাচ্ছে না।

    ডেবিডের বুকটা ছাঁত করে উঠল। চোখের ওপর এটা কি দেখছে! জাহাজটা আর সে-জাহাজ নেই। ভাঙা এবং বুড়ো জাহাজ, অথচ সেজে আছে যুবতীর মতো। কিছুতেই পুরানো হতে চাইছে না। জাহাজের সব আলো কেউ আজ জ্বালিয়ে দিল। কোথাও কোনো অন্ধকার নেই। ডেকে যেন উৎসব হবে, না হলে সব আলো, যেমন করিডোর ধরে গেলে যত অলোর ডুম, সব জ্বালা হয় না কখনও অথচ এখন জ্বলছে। যেমন উইংসের দু-পাশে যেমন ডেরিকের গোড়ায় এবং গ্যালির দু- পাশে ক্রু-গ্যালির ছাদের নিচে অর্থাৎ সর্বত্র এমনভাবে সব আলো জাহাজে জ্বলছে, অথচ ওরা যখন এনজিন-রুমে নেমে যাচ্ছিল তখন জাহাজের সব আলো এভাবে জ্বালা ছিল না। জ্বালা থাকলে সে এতটা বিভ্রান্তির ভেতর পড়ে যেত না। কেবল মনে হচ্ছে, স্যালি হিগিনস সমস্ত জাহাজটা ঘুরে দেখবেন বলে সহসা কেউ সব আলো জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। সামান্য অন্ধকারের ভেতর জাহাজে নিশীথে হাঁটতে গা ভারি ছম ছম করে।

    আর তা ছাড়া এখন তো তারা আর কোনও কথা বলতে পারছিল না। ক্রু-গ্যালির দিকে যখন হিগিনস হেঁটে যাচ্ছিলেন তখন ডেবিড জাহাজের পাশে দাঁড়িয়ে একটু অন্ধকারে উঁকি মারবে ভেবেছিল। উঁকি দিয়ে দেখবে, সমুদ্রের জল কেটে জাহাজ সত্যি এগুচ্ছে না ভুতুড়ে দরিয়ায় জাহাজটা থেমে আছে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি ওরা হেঁটে যাচ্ছে এত বেশী দ্রুত ওরা ডেক পার হয়ে গেল যে ডেবিড একা ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে সাহস পেল না। সে প্রায় দৌড়ে ওদের নাগালে চলে গেলে। জাহাজটা এভাবে এত কিম্ভূতকিমাকার এবং আকাশে নক্ষত্রেরা এত স্থির যে ডেকে একা দাঁড়িয়ে থাকলে ভয়ে এমনিতেই মরে যাবে। সাদা ফ্যাকাশে হয়ে যাবে। যেন কেউ ওর শরীর থেকে সব রক্ত শুষে নিয়ে ডেকে ফেলে রেখে গেছে মনে হবে। এবং এমন যে জাহাজে কখনও না হয়েছে তা নয়।

    সে প্রায় দৌড়ে ক্রু-গ্যালির ছাদের নিচে চলে গেল। আগে আগে স্যালি হিগিনস, চিফ-মেট। কি যে কেবল দেখে বেড়াচ্ছে! ডেক-সারেঙ খবর পেয়ে নিচে থেকে উঠে এসেছে এবং সালাম জানাচ্ছে। স্যালি হিগিনস কিছুই লক্ষ্য করছেন না। তিনি ঝুঁকে এখন সুমদ্রে কি দেখছেন। ডেবিড সঙ্গে সঙ্গে সময় বুঝে রেলিঙে ঝুঁকে পড়ল। দেখল প্রপেলার ভীষণভাবে গজাচ্ছে। জাহাজ খালি বলে নীল জলে প্রপেলার অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কুয়াশার মতো মনে হয়। প্রপেলার ঠিক ঠিক ঘুরে যাচ্ছে। জাহাজ থেমে নেই। ওর কিছুটা এখন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো।

    সে আবার ঠিক সহজভাবে হেঁটে যেতে থাকল। বরং হাঁটা-চালায় সে নিজেকে বেশী সাহসী প্ৰমাণ করার জন্য কিছুক্ষণ একা ডেকে দাঁড়িয়ে পাইপ টানল। যেন পৃথিবীতে সাহসী মানুষের মতো বেঁচে থাকা দরকার। আর দুরে তখন লেডী-অ্যালবাট্রস উড়ছে। কখনও জাহাজের মাস্তুলে এসে পাখা ঝাপটাচ্ছে, কখনও ওর কর্কশ চিৎকার ভেসে আসছে বাতাসে। অন্ধকারে মনে হবে কেউ গলা ছেড়ে কাঁদছে। এমন সব কর্কশ আওয়াজ যেন ওরা কখনও শোনে নি। লেডী-অ্যালবাট্রস কি টের পেয়েছে জাহাজের সামনে কোন কঠিন বিপদ এবং যদি জাহাজডুবির আশঙ্কা থাকে, অর্থাৎ সেই যে অন্ধকার সমুদ্রে সহসা কোনো বেতার-সংকেত থাকে না, সহসা দেখা গেছে, কোথাও কোনো চুম্বকের আকর্ষণে তলিয়ে যাচ্ছে জাহাজ কিম্বা কোনো অগ্নুৎপাতে পড়ে গেলে কারণ এই সমুদ্রের সীমাহীন জলরাশির নিচে অজস্র এমন সব অদৃশ্য ভয়, আর এও তো ঠিক যদি সেইসব সমুদ্রের প্রাগৈতিহাসিক জীবেরা কখনও সমুদ্রের সারফেসে চলে আসে, সময় বুঝে যদি টেনে নিচে নামিয়ে নিয়ে যায়, অথবা যে সব অলৌকিক ঘটনা সমুদ্রে মাঝে মাঝে দেখা যায়, যেমন একবার ডেবিড দেখেছিল, সমুদ্রের নিচ থেকে এক অগ্নিস্তম্ভ আকাশে উঠে যাচ্ছে, যেমন সে এটা কত দেখেছে, জলরাশির ভেতর অজস্র নক্ষত্র টুপটাপ যেন ঝরে পড়ছে। অর্থাৎ সমুদ্রে নিশীথে ডেকে দাঁড়িয়ে থাকলে এমন সব বিচিত্র অভিজ্ঞতা না হয়ে পারে না, তখন বেতার-সংকেতে গণ্ডগোল তেমন কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। সে অনায়াসে কেবিনে ঢুকে এখন একটু ঘুমিয়ে নিতে পারে। সে এবার গিয়ে শুয়ে পড়বে ভাবল। সে খুব সাহসী মানুষ ঘুমিয়ে প্রমাণ করবে।

    আর তখনই মনে হল মাস্তুলের নিচে কেউ বসে রয়েছে। সে লক্ষ্যই করে নি, কেউ এত রাতে মাস্তুলের নিচে বসে থাকতে পারে। এবং এভাবে কেউ মাস্তুলের নিচে বসে থাকলে ভয়ের কথা সে কাছে গিয়ে দেখল, বড়-টিণ্ডাল চুপচাপ বসে রয়েছে। ডেবিডকে দেখেও ওঠে দাঁড়াচ্ছে না। সে ডাকল, এবং ডাকলে বড়-টিণ্ডাল ঠিক সাড়া দিল, বলল, স্যার আপনি! ঘাবড়ে গিয়ে বলল, আমার এখন ওয়াচ।

    —ওয়াচ! এখন তো নেকস্ট ওয়াচ আরম্ভ হতে আরও এক ঘণ্টার ওপর। এত আগে উঠে বসে আছ!

    —স্যার নিচে ভীষণ গরম। গরমে ঘুমোতে পারছি না।

    .

    মৈত্র এবার উঠে দাঁড়াল। সে ওয়াচের পোশাক পরে আছে। হাতে দস্তানা। মাথায় কিছু ওর গণ্ডগোল ছিল। বন্দর থেকে জাহাজ ছাড়ার সময় অজস্র শিশুদের বেলুন উড়িয়ে দেওয়া, ওয়াকা বলে একজন মাউরি বালকের অবিরাম ব্যাণ্ড বাজিয়ে যাওয়া এবং বড়-টিণ্ডাল সেই যে ডেকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ওদে বিদায় জানিয়েছিল সব এখন মনে পড়ছে। বড়-টিণ্ডালকে বন্দরে রাজার মতো লাগছিল। এখন সেই বড়-টিণ্ডাল কেমন দুঃখী মানুষ। মাস্তুলের নিচে হেলান দিয়ে বসে আছে। বোধ হয় সে ঝিমুচ্ছিল। অথবা আকাশের নক্ষত্র দেখতে সে এখন ভালবাসছে। এভাবে তার স্ত্রীর কথা সে মনে করতে পারে হয়তো, হয়তো এইসব নক্ষত্র দেখতে দেখতে সে প্রায় সব শিশুদের কথা মনে করতে পারে—ফোকসালে শুয়ে থাকলে সে বোধ হয় কিছু মনে করতে পারে না, মাস্তুলের নিচে এসে সে- জন্য ওয়াচের অনেক আগে বসে থাকে। সে নিজের সঙ্গে জাহাজের সঙ্গে এভাবে ভেসে ভেসে যায়।

    ডেভিডআর দাঁড়াল না। শুয়ে পড়বে ভেবেছিল, কিন্তু ওয়াচের খুব আর একটা দেরীও নেই। পাশের কেবিনগুলোতে পাঁচ-নম্বর, স্টুয়ার্ড এবং ছোটবাবু সবাই ঘুমোচ্ছে। ওরা বুঝতেই পারছে না বেতারে সব রহস্যজনক খবর আসছে। সে ভাবল, আরও কিছুক্ষণ জেগে থাকবে। তার ওয়াচের সময় চিফ- মেট কাপ্তান জেগে থাকবেন কিনা সে জানে না। সে যদি একা হয়ে যায়। সে একা ব্রীজে! রেডিও- অফিসার ওপরে থাকবে হয়তো, যতক্ষণ কোনো সঠিক খবর না পাচ্ছে ততক্ষণ রেডিও-অফিসার নড়তে পারছে না ভেবে ডেবিড কিছুটা আশ্বস্ত। কারণ স্যালি হিগিনসের মতো এই সব বুড়ো কোয়ার্টার- মাস্টারগুলো হাড়ে হাড়ে বজ্জাত। এদের ঠিক বিশ্বাস করা যায় না। রাতের বেলা মাঝে মাঝে ভীষণ সংশয়ের ভেতর ফেলে দেয়। ভেতরে প্রাণ আছে বোঝা যায় না, ঠিক একটা মমির মতো। অনেক সময় সে দেখেছে ডাকলেও সাড়া দেয় না। সুতরাং ভরসা মাত্র রেডিও-অফিসার। ও কি আর এখন মানুষ আছে? ওর চোখমুখ দেখলেই ভয় লাগছে! ওর মুখচোখ কি সাদা আর ফ্যাকাশে! তবু জাহাজে, একা ব্রীজে যখন সে ডিউটিতে থাকবে, অন্তত একজন তার মাথার ওপরে মাংকি-আয়ল্যান্ডে জেগে থাকবে। তার ভয়ে ঘাবড়ে যাবার কিছু নেই।

    আর সে ঠিক যা ভেবেছিল তাই। ডিউটির সময় সে দেখল, স্যালি হিগিনস ধার্মিক নাগরিকের মতো বলছে, চিফ-মেট তুমি বরং একটু ঘুমিয়ে নাও। আমি আছি। আর চিফ-মেট চলে গেলে হিগিনস বললেন, ডেবিড দরকার হলে ডাকবে। দরজা বন্ধ করে দিলেন তিনি। এবার বোধ হয় তিনিও শুয়ে পড়লেন। সে বলল, হারামী।

    মনে মনে হারামী কথাটা কতবার যে ইতিমধ্যে আর্চিও উচ্চারণ করেছে। সে সেই সকাল থেকে ভাবছে, ভাবতে ভাবতে মাথাটা ভার এবং প্রায় ঝিম ঝিম করছে। এবং রাত হলেই শরীরের রক্তপ্রবাহ ভীষণ অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। গেল রাতে সে ভেবেছিল, দরজায় শব্দ করলে, ছোটবাবুর কথা ভেবে ঠিক দরজা খুলে দেবে জ্যাক। খুলে গেলে তার আর যা যা করার ইচ্ছে যেমন সে ঢুকেই বলত, খুব দরকারে হঠাৎ এসে গেলাম জ্যাক, তোমার ঘুমের কোনো অসুবিধা ঘটালাম না তো? সে এভাবে জ্যাকের সঙ্গে অসময়ে দেখা করে প্রাণপণ বোঝাতে চাইবে, তার কিছু খারাপ ইচ্ছে নেই। যদিও সে দু’ একবার বলবে, জ্যাক তুমি যে মেয়ে আমি আগেই টের পেয়েছি, আসলে জাহাজে আমার মতো তোমাকে কেউ বুঝতে পারে নি, কাপ্তান ভীষণ খারাপ কাজ করছেন, এ-ভাবে আর কতদিন তুমি থাকবে, জাহাজে একজন মেয়ে যদি থেকেই যায়, আহা যদি থেকেই যায়, জ্যাক আসলে মাথা আমারও ঠিক নেই, কেমন গন্ডগোল হয়ে যায় তোমাকে ভাবতে ভাবতে এবং তখন কোনটা করা ঠিক, কোনটা করা ঠিক না, বুঝতে পারি না। তুমি চিৎকার চেঁচামেচি করতে পার, কিন্তু ওপরে কেউ শুনতে পাবে বলে মনে হয় না। আমি অবশ্য এমন কিছু করব না, যে তোমাকে চিৎকার চেঁচামেচি করতেই হবে, শেষ পর্যন্ত বন্ধুত্ব যদি করে ফেলি, এই ধর তোমার খবরটুকু শুধু আমি রাখব আমার-টুকু, তুমি, আহা মুখ সরিয়ে নিচ্ছ কেন, তোমার কোমরে হাত রাখতে দাও, দ্যাখো না, নাভির নিচে, আহা কি যে গরম উলের মতো আরাম, আহা, কি হচ্ছে, আমি বুঝি দেখিনি—তুমি সেই ম্যানকে চুমো খেয়েছ, চিৎকার চেঁচামেচি করলে সব ফাঁস

    করে দেব।

    সে টুক করে দরজা খুলে ফেলল। সন্তর্পণে গলা বাড়িয়ে দেখল, এলি-ওয়ে ধরে কেউ হেঁটে যাচ্ছে কিনা। না, কেউ নেই। কেবল কে যেন এলি-ওয়েতে আজ সব উজ্জ্বল আলো জ্বালিয়ে রেখে গেছে। এত জোর আলো সাধারণত কখনও থাকে না। বাইরে বের হয়ে সে আলো সব নিভিয়ে দিল। অন্ধকারে কিছুক্ষণ প্রায় দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বুঝল সহজেই ওপরে উঠে যাওয়া যায়, সে আর দেরি করল না। ছোটবাবুর কেবিনের পাশ কাটিয়ে সিঁড়ির মুখে যেতে হবে। ওর এত কাছে সিঁড়ির মুখ, অথচ মনে হচ্ছে পথটা অনেক লম্বা আর বড় হয়ে গেছে। এক দৌড়ে সে কিছুতেই সেখানে পৌঁছাতে পারবে না।

    তারপর কি ভেবে সে খুব সহজ হয়ে গেল। সে এত বেশি ভয় পাচ্ছে কেন? সে তো অনায়াসে মধ্যরাতে এনজিন-রুমে নামার জন্য স্বাভাবিকভাবে সিঁড়ির মুখ পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে। সে স্বাভাবিকভাবেই সিঁড়ি পর্যন্ত হেঁটে গেল। ছোটবাবুর কেবিনের পাশে দাঁড়িয়ে কান পাততে ইচ্ছে হল, যদি গোপনে জ্যাক ছোটবাবুর কেবিনে নেমে আসে। তা হলে যেন তুরুপের তাস। সহজেই হাতে পেয়ে যায়। সবার কাছে সে গোপন রাখবে, জাহাজে কোন মেয়ে নেই। কোন ভালবাসা নেই। কেবল বিনিময়ে সে বাকি সফর যুবতীকে নিয়ে ফূর্তি করে যাবে। এবং যেন এই ফূর্তি তার হকের। সে যেমন বন্দরে নেমে মেয়েদের শরীরে তার হক খুঁজে পায়, জাহাজে তেমনি মাত্র ফুটে ওঠা কুঁড়ির পাপড়ি ছিঁড়ে খেতে খেতে যুবতী তার হকের ধন ভেবে ফেলেছে। তার প্রাপ্য সে বুঝে নিতে যাচ্ছে অথবা বুঝতে পারবে সে আর আহাম্মক নয়। এবং শরীরে কামুক গন্ধ তার। সে যথাযথ বিষয়ী মানুষ হয়ে গেছে বুঝতে পারবে। জাহাজে বালিকা যুবতী হবে, আর সে চিৎপাত হয়ে পড়ে থাকবে জাহাজে, আঙ্গুল চুষবে কেবল, তেমন মানুষ সে নয়। চোখের ওপর এমন ভোগ্যপণ্য বে-হাত হয়ে যাবে সে ভাবতে পারে না।

    আর বোধ হয় এ-ভাবেই সব মানুষ সব কাজের পেছনে যুক্তি খাড়া করে থাকে। আর্চিও এটা যুক্তিযুক্ত কাজ ভেবেছে। কারণ সে দেখেছে ভাল কথায় মেয়েটি সব সময় চোখ ত্যারচা করে থাকে, তাকে গঙ্গাবাজুতে দেখলে, মেয়েটা যমুনা-বাজুতে পড়ি মরি করে ছুটতে থাকে—সে আর এ-ভাবে কতক্ষণ পারে? সে তো একটা মানুষ? ফুল ফুটবে, সে গন্ধ শুঁকবে না কি করে হয়!

    আর তখন ছোটবাবু নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। দেখে কে বলবে কেবিনে দুরন্ত বালিকা যুবতী সেজে ওর জন্য অপেক্ষা করছে। বরং দেখে মনে হবে ছোটবাবুর কোথাও যাবার কথা নেই। ঘরে সবুজ আলো। বুকের ওপর ওর দু-হাত কিছুটা প্রার্থনার মতো। নীল দাঁড়ি সবুজ আলোর ভেতর মিহি ঘাসের মতো নরম। ওর চোখ ভারি। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। পাখার হাওয়া এত প্রবল যে, ঘাম হবার কথা নয়, কিন্তু কেন জানি দেখে মনে হবে ছোটবাবু স্বপ্ন দেখছে। ছোটবাবু এত রাত পর্যন্ত বোধ হয় জেগে থাকতে পারে না। সে ঘুমোবার আগে কেবল ভাবছিল কখন ডেবিডের ওয়াচ আরম্ভ হবে। ডেবিডের ওয়াচ আরম্ভ হলেই কথা থাকে কাপ্তান তার কেবিনে ঘুমিয়ে পড়বেন। তখন দরজায় সামান্য কড়া নাড়া। সে কড়া নাড়লেই দেখবে বনি ফ্রক গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। এমন সর্ব মুহ্যমান দৃশ্যের কথা সে কেবল শুয়ে শুয়ে ভাবছিল, আর ঘড়ি দেখছিল। সে কি করবে অথবা কি ভাবে কথা বলবে বনির সঙ্গে, যেমন বনিকে বলা যেতে পারে, আচ্ছা বনি তোমাদের বাড়ির পাশে আমার কেন জানি মনে হয় খুব বড় একটা বন আছে। তোমাকে দেখলেই মনে হয়, বনের ভেতর তুমি খেলা করে বেড়াতে, সামনে সমুদ্র, দূরে বাতিঘর—বনের গাছাপালার ভেতর অজস্র পাখি আছে মনে হয়। রঙিন পাখিরা কখনও ঝাঁকে ঝাঁকে তোমার মাথার ওপরে উড়ে যাচ্ছে অথবা মনে হয় কখনও বালিয়াড়িতে তুমি দাঁড়িয়ে আছ, তোমার পায়ের পাতা জলে ডুবে আছে, ছোট ছোট মাছেরা খেলছে তোমার চারপাশে, জলে কখনও ফ্রক ভিজে যাচ্ছে, কখনও ফ্রক উড়ে যাচ্ছে বাতাসে, আবার মনে হয় তুমি চুপি চুপি দেখছ পাহাড়ের কোলে বসে আমি কি করছি, তোমাকে যুবতী ভাবলেই আমার এমন মনে হয়, যেন কতকাল থেকে তুমি কোনো ফুলের উপত্যকাতে হেঁটে বেড়াচ্ছ। কারো আসার কথা, তুমি ফুলের ভেতর অথবা ঘাসের ছায়ায় নিজেকে দেখতে দেখতে কখন বড় হয়ে গেছ টের পাও নি।

    ছোটবাবুর আরও কি সব মনে হয়। তখন চোখ মুখ ওর জ্বালা করতে থাকে। ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়তে থাকে। কারণ সুন্দর মায়াবী শরীর বনির। লম্বা দু’হাত কারুকার্যময় ব্যালেরিনার মতো। ছোটবাবু বইয়ে সুন্দর সুন্দর সব ব্যালেরিনার ছবি দেখেছে, একেবারে দু’হাতে যেন দু’আকাশের সবকিছু নক্ষত্র সে পেড়ে আনতে চায় অথবা কখনও যখন মনে হয়.বনি দু’হাতে আবার সব নক্ষত্র আকাশের গায়ে লটকে দিচ্ছে তখন ওর পা এবং জংঘা, জংঘার পাশে কোমল অভিমানিনী তার, উজ্জ্বল সমুদ্রের তরঙ্গমালার মতো। ধেয়ে আসছে, প্রবল বেগে ধেয়ে আসছে। যেন ছোটবাবুকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, দূরে অনেক দূরে নিজের মতো নির্জন দ্বীপে তাকে নিয়ে কেবল ঘুরে ঘুরে কোনো পাহাড়শীর্ষে উঠে যাওয়া। এবং উঠেই যেন বলছে, আমি ঝাঁপ দিই ছোটবাবু। তুমি আমাকে তুলে আনবে। আর তো

    আমার মরে যেতে ভয় করে না।

    ছোটবাবুর বলতে ইচ্ছে হয়, মরে যেতে ভাল লাগে তোমার! –

    —জানি না কেন মরে যেতে এত ভাল লাগে।

    আসলে এখন ছোটবাবু বুঝতে পারে ওকে সামান্য জড়িয়ে ধরলেই আর ওর মরে যেতে ইচ্ছে করবে না। বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে বলবে, এই।

    –কী!

    —তুমি খুব খারাপ।

    ছোটবাবুর তখন ইচ্ছে হয়, সে আরও দুষ্টুমী করে ফেলবে। কিন্তু তারপরই মনে হয়, সে তো বনির কেউ নয়, বনি কাপ্তানের মেয়ে, জাহাজ দেশে ফিরে গেলেই সে নেমে যাবে। হয়তো বনি হাত নাড়বে ডেক থেকে। চোখে বিন্দু বিন্দু জল। এবং তখন বনি ওর দিকে সোজা তাকাতে পারবে না। তখনই মনে হয় সেও ফুল ছিঁড়ে খেতে ভালবাসে। নিজেকে ভারী নষ্ট চরিত্রের মানুষ সে ভেবে ফেলে। এমন পবিত্র আকাঙ্ক্ষা অথবা ফুলের মতো তাজা প্রাণ সে বিনষ্ট করতে পারে না।

    যদিও বিনষ্ট কথাটার সঠিক অর্থ সে এখনও ভালভাবে বুঝে উঠতে পারে না। তখনই বড় বড় হাই উঠতে থাকে, কেমন যেতে ইচ্ছে করে না আর ওপরে। ঘুমিয়ে পড়তে কেবল ভাল লাগে। অকারণ সে ফুল ছিঁড়ে খেতে পারে না।

    এটা যে সংস্কার অথবা প্রাচীন গাঁথার মতো শরীরে আজন্ম লেপ্টে আছে—ছুঁয়ে দিলেই নষ্ট হয়ে যায় না, সে যদি জানত এবং বুঝতে পারত এ-সবে নষ্টামি বলে কিছু নেই বরং পবিত্রতা আছে, সে কিছুতেই ঘুমিয়ে পড়তে পারত না।

    তখন আর্চি কেবিনের চারপাশে সন্তর্পণে হাঁটছে। সব দেখেশুনে সে দরজায় দাঁড়াবে।

    তখন রেডিও-অফিসার প্রায় উবু হয়ে বসে আছে। কোনো খবর, অথবা আগুন আগুন এমন সব ভৌতিক গন্ডগোল থেকে যদি জাহাজটা রক্ষা পায়।

    তখন ডেবিড প্রায় গভীর অন্ধকার সমুদ্রে তাকিয়ে আছে। চুপচাপ। তাকেই এখন কাঁচের জারে মমির মতো দেখাচ্ছে। সুতরাং আর্চি জ্যাকের দরজায় দাঁড়াতে পারে এবার। খুট খুট করে দরজায় শব্দ করতে পারে।

    এবং কান পেতে থাকল আর্চি। নিচ থেকে এনজিনের শব্দ উঠে আসছে—কতটা জোরে অর্থাৎ সে কতটা জোরে কথা বললে অথবা জ্যাক কতটা জোরে কথা বললে ওপরে কাপ্তান জেগে যাবে না, যেন সেটা সে আন্দাজ করছে। সমুদ্রে ঝড়ো হাওয়া নেই। সামান্য হাওয়াতে যেমন সমুদ্র উত্তাল থাকার কথা এবং যে-ভাবে সব শব্দ সমুদ্রে তৈরি হয়—তার চেয়ে বেশি না, সে বুঝতে পারল এই ঠিক সময় এবং এমন ভেবে দরজায় দাঁড়িয়ে যেই খুট খুট শব্দ তখনই সমুদ্রে অগ্নিকান্ড। মুহূর্তে সারা আকাশ যেন আলোকিত হয়ে গেল, চারপাশে সমুদ্র লাল হয়ে গেছে। একেবারে কাছাকাছি একটা জাহাজে আগুন জ্বলছে। ধোঁয়া এবং পোড়া তেলের গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। ডেবিড চিৎকার করতে করতে নেমে আসছে। আফটার পিকে ঢং ঢং করে এলার্মিং বেল বাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যে যেখানে ছিল লাইফ- জ্যাকেট পরে উঠে আসছে। আর্চি দেখল স্যালি হিগিনস ব্রীজে উঠে যাচ্ছেন। চিফ-মেট সিঁড়ির মুখে উঠে আসছে। সে তাড়াতাড়ি প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে নিচে পালিয়ে যেতে থাকল। সমুদ্রে এমন ভয়াবহ অগ্নিকান্ড পর্যন্ত তাকে বিস্মিত করতে পারল না। সে উন্মত্তের মতো ছুটে যাচ্ছে নিচে। জোরে যতটা জোরে সম্ভব লাথি মারছে ছোটবাবুর দরজায়। হাঁকছে, লেজি বাগার। যেন ছোটবাবুই সময় বুঝে সুমদ্রে অগ্নিকান্ড এবং তার বাড়াভাতে ছাই দিয়েছে।

    ছোটবাবু দরজা খুলে বিস্মিত। আর্চি সামনে। সে ভেবেছে সকাল হয়ে গেছে। কাজের সময় হয়ে গেছে। আর্চি তাকে সে-জন্য গালাগাল করছে। সে বলল, গুডমর্নিং স্যার।

    আর্টি বলল, গুডমর্নিং। এবং তারপর কেমন অমায়িক হয়ে গেল কথাবার্তায়। তুমি ম্যান ঘুমোচ্ছ! তুমি তো আচ্ছা লোক হে! জাহাজে আগুন লেগেছে জান না।

    তাহলে জাহাজে কিছু ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে! এখনও এলার্মিং বেল বাজছে। সে তাড়াতাড়ি লাইফ- জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে নিল। এবং তখন দেখতে পাচ্ছে জ্যাক হাঁপাতে হাঁপাতে নেমে আসছে নিচে। সেই কাউ-বয়দের মতো পোশাক। শরীরে তার সোনালী লাইফ-জ্যাকেট। আর্চি ভীষণ খুশী যেন আর কি জ্যাক এসে গেছে! সে কত অমায়িক এমন দেখানোর জন্য বলল, তোমরা ওপরে যাও, আমি যাচ্ছি। বলেই সে প্রায় ছুটে কেবিনের দিকে চলে গেল।

    ছোটবাবু বলল, কি হয়েছে জ্যাক। এলার্মিং বেল বাজছে! বলেই সে ওপরে ছুটে যেতে চাইলে জ্যাক খপ করে হাত ধরে ফেলল। এখন যে যার কাজে নিচে ওপরে ছুটছে। যেমন মেজ-মিস্ত্রি আর্চি নিচে নেমে গেছে। বোট ডেকে ডেক-জাহাজিরা জড়ো হচ্ছে। খুব চিৎকার চেঁচামেচি যখন এ-ভাবে হচ্ছিল তখন জ্যাক পাগলের মতো টলতে টলতে এলি-ওয়ের অন্ধকারে নিয়ে ছোটবাবুকে দাঁড় করিয়ে দিল। রাগে সে ফুঁসছে। আঁচড়ে কামড়ে দিচ্ছে ছোটবাবুকে। ছোটবাবু যত বলছে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বনি তত আরও ক্ষেপে যাচ্ছে। তারপর ঠিক পোকামাকড়ের মতো লেপ্টে যাচ্ছে শরীরে। ছোটবাবুর ঠোটে গালে কপালে পাগলের মতো চুমো খাচ্ছে জোর-জার করে। ছোটবাবু হতভম্ব। সে বাধা পর্যন্ত দিতে পারছে না! এমন একটা ভয়াবহ অগ্নিকান্ড সমুদ্রে, আর বনি এটা যে কি ছেলেমানুষী করছে!

  • আটত্রিশ

    আটত্রিশ

    ।। আটত্রিশ।।

    স্যালি হিগিনস এনজিন-রুমে টেলিগ্রাম পাঠালেন—স্ট্যান্ড বাই

    জাহাজ থেমে গেল। কাপ্তান নিজে সব করে যাচ্ছেন। তিনি চিফ-মেটকে ডাকলেন। বোট হারিয়া করা দরকার। কে কে যাবে সব চটপট বলে দিতে হবে।

    তিনি স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছিলেন না। কেউ পারছিল না। সবাই ওর চারপাশে ঘুরছে। বোট- ডেকে সব ডেক-জাহাজিরা এখন মাস্তার দিয়েছে। এনজিন-রুমের সিঁড়ি ধরে নামছে মেজ-মিস্ত্রি। এ- সময়ে ওকে সব সময় নিচে থাকা দরকার। সে পছন্দমতো পাঁচ-নম্বর এবং তিন-নম্বরকে কাছে রাখল। আগুন জাহাজটাতে তেমনি জ্বলছে। খুব বেশি দূরে মনে হচ্ছে না। মনে হয় মোটর-বোটে গেলে আধঘন্টার মতো লাগবে। তবু এই মাঝরাতে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কতদূর হবে। বরং যখন আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে মনে হচ্ছে খুবই কাছে জাহাজ, আবার যখন কমে আসছে, মনে হচ্ছে জাহাজ দূরে ভেসে চলেছে। এ-সবের ভেতরই ওরা দেখতে পাচ্ছিল, আগুন ছড়িয়ে পড়ছে সমুদ্রে। জাহাজিরা রেলিঙে ঝুঁকে আছে। ওরা নিয়মকানুন মানতে চাইছে না। এক্ষুনি যদি কাপ্তান নেমে আসেন আর দেখতে পান সবাই এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে ভীষণ ক্ষেপে যাবেন। কিন্তু যা সব হচ্ছে সমুদ্রে ওরা তো সব দেখে হতবাক।

    রেডিও-অফিসার কাছাকাছি সব স্টেশন ধরার চেষ্টা করছে। আশ্চর্য! একটা স্টেশন থেকে সে জবাব পাচ্ছে না। এতবড় সমুদ্রের এই দু’চারশ মাইলের ভেতর কি কোনো জাহাজ নেই! পাঁচ-সাতশ মাইলের ভেতর! সে ক্রমে ক্ষেপে যাচ্ছিল, আর যত দূরের সব স্টেশনে বার্তা পাঠিয়ে দিচ্ছে, ইয়েস, দি সিপ’স বার্নিং। না, কেউ জবাব দিচ্ছে না। হ্যালো, সিউল-ব্যাংক বলছি, নেকস্ট পোর্ট অফ কল সামোয়া —না কোথাওকেউ জবাব দিচ্ছে না। সে ফের বলল, মনে হচ্ছে এটা একটা তেলের জাহাজ। সে কাঁচের ভেতর দিয়ে সমুদ্র দেখছে আর বলছে, সে এত বেশি উত্তেজিত যে কেবল বলেই যাচ্ছে—কেউ শুনছে কিনা তার খেয়াল থাকছে না—হ্যাঁ মনে হচ্ছে হ্যালো ইয়েস, আনডার দ্য হরাইজন, কিন্তু কেউ কিছু সাহস দিচ্ছে না, একেবারে চুপচাপ। সে যেন আছাড় মেরে এবার সব ভেঙে দেবে। দরজার মুখে স্যালি হিগিনস চিফ-মেট দাঁড়িয়ে আছেন। পাশাপাশি কোন্ কোন্ জাহাজের সঙ্গে কথা বলা গেল জানতে চাইছেন। অথবা শেষ পর্যন্ত এরিয়া-স্টেশন থেকে কোনো খবর এসেছে কিনা। এবং সিউল-ব্যাংক যে এখন স্ট্যান্ড-বাই, দু’টো বোট নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এ-সব খবরও এরিয়া-স্টেশনকে পৌঁছে দিতে পারলে ভাল হত। স্যালি হিগিনস পুরানো কাপ্তান—জাহজাডুবি সম্পর্কে তিনি অভিজ্ঞ। এবং তিনি জানেন, কোথায় সামান্যতম ত্রুটি হলে কাপ্তানের ওপর এসে সব দোষ বর্তায়, আর কতটা বিবেচনার সঙ্গে কাজ করলে শেষ পর্যন্ত কাপ্তান স্যালি হিগিনস সাহসী, সমুদ্রে শয়তানের ঘাড় ঠিক সময়ে মটকে দিয়েছেন। এবং বোধহয় এভাবেই সব কিংবদন্তী তৈরি হয়ে যায়। যেমন স্যালি হিগিনস যখন উঠে যাচ্ছিলেন ওপরে অথবা নিচে নেমে আসছিলেন, জাহাজিরা তখন একজন মানুষের চলাফেরা দেখে সাহসী হয়ে উঠছে। এবং বোধ হয় এক্ষুনি তিনি নাম ঘোষণা করবেন —হাই

    কার কার নাম থাকবে, অর্থাৎ বোটে কে কে যাবে। সবাই তো এমন একটা অগ্নিকান্ডের সামনে সহজে যেতে চায় না। কারণ কাছাকাছি গেলে, কখন খোল থেকে সব নানারকমের বিস্ফোরণ হবে কে জানে! তিনি এক এক করে নাম হেঁকে যাবেন, ঠিক নাম বললে ভুল হবে, নম্বর হেঁকে যাবেন, অবশ্য এ-ব্যাপারে পরামর্শদাতা ডেক-সারেঙ আর চিফ-মেট এবং সঙ্গে এনজিন-সারেঙ থাকতে পারেন। যারা কখনও দু-চার কথায় সারেঙের সঙ্গে বচসা করেছিল, কেন যে মাথা গরম করতে গেল, এবং ওদের মনে হচ্ছিল ঠিক ডেক-সারেঙ ওদের নাম দিয়ে দেবে। ওরা বোট-ডেকে চুপচাপ ছিল। এমন কি দূরে যে এতবড় একটা অগ্নিকান্ড ঘটছে তাও আর দেখতে সাহস পাচ্ছে না।

    আসলে সমুদ্রটা তখন লাল হয়ে গিয়েছিল। চারপাশে, একেবারে মনে হচ্ছে দিগন্তব্যাপী এক উজ্জ্বল আলোকমালা গড়ে তুলছে জাহাজটা। নীলাভ নক্ষত্রমালায় যেন আগুন লেগে গেছে।

    কেউ বলছিল, ওটা যাত্রী-জাহাজ হবে।

    কেউ বলছিল, ওটা তেলের জাহাজ।

    মান্নান কোথা থেকে এসে ভিড়ের ভেতর উঁকি মেরে বলল, দূর শালা ওটা মাছ ধরার জাহাজ তিমি মাছ ধরার জাহাজ হবে, বলে দিলাম। শালা তিমির চর্বি না হলে আগুন এত সাদা হয় না।

    মনু বলল, তুই তো তিমি মাছ ধরার জাহাজে কাজ করতিস।

    —না করলে বুঝি মিঞা হয় না।

    —আরে রাখো বে, দ্যাখো না শালা জাহাজ কেমন ফুটছে। তিমি মাছ বেরিয়ে যাবে।

    এবং সবাই উদ্বিগ্ন। কেউ কেউ খোঁড়াতে পর্যন্ত থাকল। এনজিন-সারেঙ তখন দেখলেন বাদশা মিঞা আসেনি। ওর তো, ওয়াচ নেই। এখন বড়-টিন্ডালের ওয়াচ। তিনি তাড়াতাড়ি খুঁজতে থাকলেন—এত চেঁচামেচি, কারো কথা কানে আসছে না। তিনি হেঁকে গেলেন, ছোট-টিন্ডাল। কোথাও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

    পিছিলে এসে দেখলেন একেবারে খালি ফোকসাল। কেউ নেই। কারও থাকার কথাও নয়। মাস্তার বললে সবাইকে তো বোট ডেকে হাজিরা দিতেই হবে। তখন ছোট-টিন্ডাল যে কোথায় গেল। এবং তখনই মনে হল ভেতরে কেউ গোঙাচ্ছে। সে ভেতরে ঢুকে তাজ্জব। এমন গরমে বাদশা মিঞা কম্বল গায়ে শুয়ে রয়েছে। এবং কাছে যেতেই সে হাউ হাউ করে কাঁদছে।

    সারেঙ-সাব জানেন, ভয় পেয়ে বাদশা মিঞা শুয়ে আছে, যদি বোটে ওকে নামিয়ে দেওয়া হয়। বাদশা মিঞার মুখ দেখে তিনি ক্ষেপে গেলেন। তবু তাঁর স্বভাবে আছে এক আশ্চর্য গাম্ভীর্য। তিনি বললেন, ছোট-টিন্ডাল, ওঠো। ওঠো বলছি।

    সারেঙ-সাবের ভয় হচ্ছিল, এভাবে এখন এখানে তার থাকা ঠিক না। যে কোন সময় বাড়িয়ালা তার খোঁজ করতে পারেন। তিনি বাদশা মিঞাকে, তারপর মনে হল শুধু বাদাশা মিঞা নয়, আরও দু’একজন এভাবে লুকিয়ে আছে। সবাইকে প্রায় গোরুর পাল ঘরে থেকে মাঠে নিয়ে যাবার মতো উঠে গেলেন। এবং তখনই তিনি দেখলেন, আশ্চর্য সব আগুনের ফুলকি সমুদ্রে ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে। এবং হাজার হাজার এভাবে সারা সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়তে থাকল।

    স্যালি হিগিনস বললেন, চিফ-মেট দেখছ!

    —দেখছি স্যার।

    ডেবিড বলল, স্যার, সব মশাল জ্বলছে সমুদ্রে।

    একজন জাহাজি তখন নিচ থেকে হেঁকে উঠল, স্যার, মনে হচ্ছে মশালের মিছিল। হাজার হাজার মশাল এভাবে জাহাজের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।

    আর যখন এভাবে সব ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল, স্যালি হিগিনস বোট হারিয়া করার তোড়জোড় করছেন, এবং চারপাশে সেই সব আগুনের ফুলকি ভেসে বেড়াচ্ছে তখন ছোটবাবু প্রাণপণ চেষ্টা করছে জ্যাককে ওপরে নিয়ে আসতে। জ্যাক পাগলের মতো লেপ্টে রয়েছে শরীরে। কেবল ছোটবাবুর পিঠে বুকে মুখ ঘসছে। ছোটবাবুকে নিয়ে কি করবে সে যেন বুঝতে পারছে না।

    ডেক-জাহাজি এলার্মিং বেল বাজিয়ে যাচ্ছে সমানে।

    ছোটবাবু বলল, জ্যাক ছাড়ো বলছি। কি হচ্ছে এ-সব

    জ্যাক একটা কথাও বলছে না। সে লতাপাতার মত জড়িয়ে আছে। এবং নানাভাবে ছোটবাবুর শরীরে উন্মত্তের মতো ঘাড়ে গলায় ঠোটে চুমো খাচ্ছে।

    ছোটবাবু আর ধৈর্য রাখতে পারছে না। বোট-ডেকে ওদের না দেখতে পেলে কেউ খুঁজতে চলে আসতে পারে। তখন কি যে হবে না!

    এবার সে প্রায় জোর-জার করে জ্যাককে ছাড়াতে চাইল। জ্যাক প্রায় পেছনে ঝুলে থাকার মতো! এবং এটা বড় অসম্মানের—ছোটবাবুর জন্য সে সারারাত প্রায় জেগে বসেছিল। এবং যেন সময় পাওয়া গেছে, সবাই একটা ভয়ঙ্কর ঘটনায় যখন ওপরে ছোটাছুটি করছে তখন ছোটবাবুকে নিয়ে ছেলেমানুষের মতো কখনও অভিমানে আঁচড়ে-কামড়ে দিতে চাইছে, কখনও চুপ-চাপ বুকে মুখ লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে চাইছে, এমন একটা নির্জন অন্ধকার থেকে সে কিছুতেই যেতে চাইছে না।

    সমানে এলার্মিং বেল বাজছে তো বাজছেই।

    ছোটবাবুর মনে হল, সবাই ওপরে উঠে গেছে, এবং কেবল সে আর বনি এভাবে পালিয়ে রয়েছে অন্ধকারে। ওর ভয় ধরে গেল। বনিকে নিয়ে প্রায় টানতে টানতে সিঁড়ির মুখে চলে গেল। আর প্রায় টেনে-হিঁচড়ে বনিকে ওপরে তুলে হাত ছেড়ে দিল। বনি আক্রোশে তখন প্রচন্ড ফুঁসছে। সে যেন তার সব কান্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।

    ওপরে উঠে ছোটবাবু স্তম্ভিত। সে এ-সব কি দেখছে? আগুন, চারপাশে আগুন। দূরের জাহাজ থেকে সব আগুনের গোলা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ছে জলে। আর পড়েই ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে, বিন্দু বিন্দু হয়ে যাচ্ছে, তারপর আরও ছোট, আকাশের নিচে অজস্র প্রদীপের মতো ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে, কখনও মনে হচ্ছে আকাশের নিচে অজস্র সোনার পদ্ম সমুদ্রে ফুটে উঠেছে। এমন গভীর নিশীথে সে এ-সব দেখে কারো সঙ্গে একটা কথা বলতে পারল না। কি বলবে! সবার চোখেই ভীষণ ত্রাস। সবাই ব্যাপারটা রেলিং-এ ঝুঁকে বোঝার চেষ্টা করছে।

    থার্ড-মেট দাঁড়িয়েছিল পোর্ট-সাইডের ঠিক দুটো বোটের মাঝখানে। বোট হারিয়া করার ভার তার ওপর! ডেক-সারেঙ, ডেক-টিন্ডাল বোটের ওপর উঠে গেছে। কপিকলে তেল ঢেলে দিচ্ছে। দড়ি টানাটানি করে কপিকল সহজ করে নিচ্ছে। অর্থাৎ যেন বোট নামতে নামতে মাঝখানে আবার আটকে না যায়।

    সমুদ্রে বোট নামিয়ে দেবার সব রকমের প্রস্তুতি চলছে।

    তখন ডেবিড ছোটবাবুর পাশে এসে কাঁধে হাত রাখল। ডেবিডকে দেখে কিছুটা সে আশ্বস্ত। সে বলল, দেখছ সমুদ্রটা কি ভয়ংকর দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে হাজার হাজার সোনার পদ্ম সমুদ্রে ভাসছে। আবার নিভে যাচ্ছে।

    ডেবিড বলল, আসলে ওটা তেলের জাহাজ। তেলের জহাজে আগুন লাগলে এমন হয়। সমুদ্রে তেল যত ছড়িয়ে যায়, আগুন তত ছড়িয়ে যায়। ঢেউ এসে সেগুলো আরও ভেঙে দেয়। আগুন ক্রমশ বিন্দুবৎ হতে হতে কখনও আগুনের ফুলকি হয়ে যায়।

    ছোটবাবুর আর কথা বলতে ভাল লাগছিল না। জাহাজটাতে সেই মানুষগুলি এখন কি না করছে! অথবা সবাই হয়ত পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। এবং এ-সব ভাবলেই ছোটবাবু ভীষণ ছটফট করতে থাকে। লেডি-অ্যালবাট্রস সমুদ্রে কোথাও উড়ছে না। সে পাখিটাকে খুঁজতে একবার গঙ্গা-বাজুতে ছুটে গেল, আবার যমুনা-বাজুতে—পাখিটাকে সে দেখতে না পেয়ে জোরে জোরে ডাকতে চাইল, এলবা। লেডি- অ্যালবাট্রসকে সে কখনও কখনও এভাবে ডাকতে ভালবাসে। না, কোথাও নেই। সমুদ্রে আর অন্ধকার একেবারে নেই। স্পষ্ট সবকিছু দেখা যাচ্ছে। আগুনের আভায় দাঁড়ালে যেমন শরীর মানুষের স্পষ্ট হয়ে যায়, তেমনি আকাশ, তার নক্ষত্রমালা এবং সমুদ্র খুবই স্পষ্ট। এমন কি যদি এলবা আকাশে উড়ে বেড়াতো এখন তার প্রতিবিম্ব জলে দেখা যেত, পাখিটা সমুদ্রে নেই তবে। পাখিটাকে না দেখা গেলেও ওর প্রতিবিম্ব দেখে বুঝতে পারত, সমুদ্রেই আছে পাখিটা। কোথাও হারিয়ে যায় নি।

    যখন সবাই বোট নামিয়ে দেবার জন্য হুড়োহুড়ি করছে তখন ছোটবাবু বোট-ডেক থেকে নিচে নেমে ডাকল, এলবা। বেশ জোরে গলা ছেড়ে ডাকতে ইচ্ছে হল। এটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে ভেবে সে ফোরমাস্টের নিচে এসে দাঁড়াল। এখানে পাখিটা কখনও আজকাল বসে থাকে। ওপরে তাকালে দেখল এলবা ঠিক বসে রয়েছে। এবং পাখার নিচে ঠোঁট গুঁজে ঘুমোচ্ছে। সমুদ্রে এমন সাংঘাতিক জাহাজডুবি অথচ পাখিটার এতটুকু ভ্রুক্ষেপ নেই। সমুদ্রে আর দশটা রাতের মতো সে যেন নিশ্চিন্ত। ছোটবাবু পাখিটাকে ঘুমোতে দেখে ঘাবড়ে গেল। এই সব ঘটনার ভেতর কোথাও যেন একটা আশ্চর্য রহস্যের গন্ধ পাচ্ছে সে। সে ধীরে ধীরে ফের ওপরে উঠতেই কাপ্তানের গলা পেল—হাই

    স্যালি হিগিনস কাউকে ডেকে কিছু বলছেন। চার্ট-রুমের রেলিঙে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। দু’টো বোঁট ঠিকঠাক নামানো যাচ্ছে কিনা লক্ষ্য রাখছেন। ঠিক না হলেই মাঝে মাঝে চড়া গলায় হাঁকছেন—গালাগাল করছেন। এবং দু’টো একটা খারাপ কথাও মুখ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য এ-সময়ে মাথা ঠিক রাখা মুশকিল। সবাই নির্দেশমতো কাজ করে যাচ্ছে। নিচে এনজিন-রুমে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন, জাহাজ স্লো চালাতে হবে। যতক্ষণ তিনি ফের নির্দেশ না দিচ্ছেন জাহাজ সামনের দিকে এগুবে। আরও কিছু এগিয়ে দেখা গেল, জাহাজটার সামনে আগুন, পেছনে লোক-লস্কর আবছা দেখা যাচ্ছে। ওরা নিচে ঝাঁপ দিতে চাইছে এমন অস্পষ্ট সব ছবি।

    তখনই বোট হারিয়া করতে বললেন স্যালি হিগিনস।

    দু’টো বোট ক্ৰমে নিচে নেমে যেতে থাকল। লম্বা দড়ি সব ফেলে দেওয়া হচ্ছে। কাপ্তান নাম বলছেন, অথবা নম্বর বলছেন, আর তারা লাফিয়ে দড়ি বেয়ে নিচে নেমে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এক দণ্ড দেরি করতে পারছে না কেউ। আর তিনি নির্দেশ দিচ্ছেন—অর্থাৎ কাজ এবং কথা একসঙ্গে চলছে।

    তিনি বললেন, দু’নম্বর বোটে চিফ-মেট, ফাইভার, তিনজন ক্রু। তিনজন ক্রুর তিনি নম্বর বলে গেলেন।

    ওরা নেমে নিচে দাঁড়িয়ে আছে। বোট দুলছে ভীষণ। এখনও দড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়নি। একটু শুধু এগিয়ে নেওয়া হয়েছে বোট। এক নম্বর বোট নেমে যাচ্ছে। কেউ একটা কথা বলছে না, এখন কে যাবে! তখনই তিনি চিৎকার করে বললেন, হাই। হাই বলতেই সবাই সতর্ক হয়ে গেল। তিনি হেঁকে গেলেন, ডেবিড, ছোটবাবু, সঙ্গে তিনজন ক্রু। তিনি ক্রুদের নম্বর বলে গেলেন। ওরা সবাই লাইফ- জ্যাকেট পরেই ছিল। কেবল এখন দড়ি ধরে নেমে যাওয়া। ওরা ঠিক এক একজন পুতুলের মতো যেন খেলনার দড়ি বেয়ে নেমে যেতে থাকল। বোট অনেক নিচে। প্রথম ডেবিডকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সে ঠিক জায়গা মতো নেমে যেতে পারে নি, কিছুটা ফসকে গিয়ে একেবারে সমুদ্রে পড়ে গেল। কিন্তু হলে কি হবে এসব সময়ে সবাই এত বেশী সতর্ক থাকে যে মুহূর্তে সে জল কেটে বোটে ঠিক ঝুঁকে পড়ল। ওপর থেকে চেঁচামেচিতে সে কিছু বুঝতে পারছে না। কেবল হাত তুলে সে ইশারা করল। সে ভাল আছে। তারপর ছোটবাবু এবং পাশে সে দেখল জ্যাক দড়ি ধরে আছে। কিছুতেই আল্গা করছে না। আবার চার্ট-রুমের রেলিঙ থেকে কাপ্তানের চড়া গলা, হাই

    জ্যাক বলল, আমি যাব বাবা?

    কাপ্তান বিরক্ত গলায় বললেন, না। দড়ি আল্‌ল্গা করে দাও।

    জ্যাক দড়ি আল্গা করে দিতে থাকল। তখন কাপ্তান নিচে নেমে এসেছেন। জ্যাক কেন এখন এ- জায়গায়, এ-কাজ তো ছোট-টিণ্ডালের এবং ডেক-বোসানের। তিনি দড়ি আল্গা করার জন্য তাদেরই রেখেছেন। কিন্তু কাছে এসে কেমন মনে হল ভীষণ স্বার্থপরের মতো কাজ করে ফেলেছেন। এতগুলো জীবনকে তিনি ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ডের সামনে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, নিজের সন্তানের বেলায় তিনি না বললেন। কিন্তু তিনি ততক্ষণে স্থির করে ফেলেছেন, এ-সময়ে কাউকে কিছু না বলাই ভাল। ইশারায় তিনি শেষবারের মতো নির্দেশ দিলে বোটগুলো সমুদ্রে দুলে উঠল।

    তিনি নির্দেশ দিলেন, সাবধানে এগুবে। তেল ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। আগুন বাঁচিয়ে বোট সামনে নিয়ে যাবে। একটা বোট থাকবে। আর একটা বোট চলে আসবে। দরকার হলে আরও লোকজন যাবে। তিনি নিজে যেতে পারলে ভাল করতেন। কিন্তু চিফ-মেট স্যমুয়েল বার বার এ-অভিযানে কর্তৃত্ব চাইছে। এ-সব ঘটনা পৃথিবীর সব কাগজগুলোতে ছাপা হয়ে যায়। কারণ এক দুর্ধর্ষ অভিযান এটা। চিফ-মেট জাহাজের খুব কাছ থেকে দেখবে সব। এবং যেন সিউল-ব্যাংক থাকল বেস-ক্যাম্পের মতো। দরকার মতো সব চেয়ে পাঠানো হবে। যদি কেউ ইতিমধ্যে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে থাকে তাদের তুলে আনা, তাদের দেখাশোনা, সেবাশুশ্রূষা, সামনে অনেক কাজ, তিনি বনির কাঁধে হাত রেখে বললেন, যাদের উদ্ধার করা হবে তাদের তুমি দেখাশোনা করবে জ্যাক। খুব একটা বড় কাজ তোমাকে দেওয়া গেল।

    তারপর তিনি পাইপে আগুন জ্বালালেন। কি নিথর সমুদ্র! আর নির্জনতা। সমুদ্র এতটুকু ফুঁসছে না। সামান্য যেটুকু ঢেউ আছে, অস্পষ্ট অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না। আর দূরে সেই অগ্নিকাণ্ড। একটা দিক জাহাজের এখনও অক্ষত। ওখানে যদি সব নাবিকেরা আশ্রয় নিয়ে থাকে। এবং উদ্ধারের আশায় বসে থাকে। যারা পুড়ে গেছে এবং অর্ধদগ্ধ তাদের জন্য সব রকমের ব্যবস্থা, কফিন এবং ফার্স্ট-এড সবকিছু তাঁর চিন্তা-ভাবনার ভেতর রাখতে হচ্ছে।

    এরপর সিউল-ব্যাংকের সার্চলাইট জ্বেলে দেওয়া হল। যতক্ষণ বোটগুলো দেখা যাচ্ছে তাদের সামনে পেছনে সার্চ-লাইটের আলো ফেলা হতে থাকল। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সর্বত্র এখন আলো ফেলে মহাসমুদ্রে মানুষ খোঁজাখুঁজি চলছে।

    জ্যাক দাঁড়িয়ে ছিল ব্রীজে। আরও অনেকে ব্রীজে এসে জড়ো হচ্ছে। কোনো বাধানিষেধ কেউ মানছে না। দূরে জল কেটে হাঁসের মতো দুটো বোট ভেসে যাচ্ছে। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছিল। ছোটবাবু নুয়ে কি সব করছে! বোধহয় সমুদ্রের জল হাতের কাছে বলে সর্বত্র দু’হাতে জল ছিটিয়ে দিচ্ছে। সব আগুনের ফুলকি, ঠিক ফুলকি বলা যায় না, কিছুটা পদ্মকলির মতো ছোট ছোট আগুনের শিখা, ঢেউ খেয়ে জ্বলছে নিভছে। অজস্র বয়ার আলোর মতো, খুব তীব্র গতিতে বোটগুলো ঢেউ ভেঙে খান খান করে এগিয়ে যাচ্ছে। এবং যারা ব্রীজে অথবা নিচে বোট-ডেকে অথবা আরও নিচে টুইন-ডেকে ছোটাছুটি করছে তারাও বসে নেই। কেবল দেখছে কোথাও কালো বিন্দুর মতো অথবা সাদা লাইফ-জ্যাকেট ভাসছে কিনা! দেখলেই তিন নম্বর বোটের ডাক পড়বে। যদিও বোটের সব লোকজন ঠিক করা থাকে, যেমন কে কোন বোটে জাহাজডুবির সময় উঠে যাবে ঠিক থাকে কিন্তু যখন জাহাজডুবি না হয়ে উদ্ধারকারী হয়ে যায় তারা, তখন সব কাপ্তানের মরজি। কে যাবে, কে যাবে না বলে দেবেন তিনি। সুতরাং যারা যাবার জন্য প্রস্তুত ছিল অথচ যেতে পারে নি, কারণ এ-সব ভয়াবহ সময়ে অনেকে কেমন আত্মত্যাগের জন্য অনুপ্রাণিত হয়ে পড়ে—সুতরাং যেতে না পারায় হতাশ মানুষের মতো দাঁড়িয়ে দেখছে, যেন বিন্দুর মতো কিছু সমুদ্রে ভেসে গেলেই বোট নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। কিছু একটা না করা পর্যন্ত স্বস্তি নেই যেন।

    এটাই হয়ে থাকে, নিশীতে মহাসমুদ্র এক অতিকায় দুয়ে রহস্য, এবং ভেতরে মহামায়া অর্থাৎ এই সব আগুনের ভেতর কঠিন কিছু আবিষ্কারের নেশায় পেয়ে যায়। তখন কিছুটা সবাই বেহুঁশ, মাথা ঠিক রাখা, মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করা খুবই কঠিন। কঠিন বলে স্যালি হিগিনসের এতটুকু অস্থিরতা নেই চলা-ফেরাতে। বরং জ্যাককে এখন সমুদ্রের সব প্রাচীন ইতিহাস শোনাবার জন্য, যেমন বলতে পারেন আফ্রিকা এবং এশিয়া একসময় একই মহাদেশ ছিল। অথবা তুষার যুগের আগের ঘটনা বলার সময় তখনকার গাছপালা কেমন ছিল বলবেন। প্রাচীন সব অতিকায় হাতির ফসিল আবিষ্কারের গল্প বলবেন এবং যেন তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন, সাইবেরিয়া অঞ্চল তখন তুষারাবৃত ছিল না। সব ঘাস তরুলতা এবং বন্য প্রাণীরা চরে বেড়াচ্ছে, তারপর সহসা সেই তুষার ঝড়। তুষারপাত বছরের পর বছর। এবং সেই মদ্দা হাতির শুঁড় তুলে ছোটা, ছুটতে ছুটতে এক সময়ে খাদের ভিতর ক্রমে তুষারে ঢাকা পড়ে যাওয়া। হিম হয়ে যাওয়া। রক্ত মাংস সব একেবারে ফ্রিজ। এমন অজস্র হাতির পালের গল্প, উট বন্য বরাহের গল্প, খরগোশের গল্প তিনি একের পর এক অনায়াসে যেন বলে যেতে পারেন। কোথায় কোন জাহাজে আগুন লেগেছে উদ্ধারকারীর দল এগিয়ে যাচ্ছে, তিনি বেস-ক্যাম্পে প্রতীক্ষায় আছেন খবর আসবে—আরও সাহায্য চাই, দড়িদড়া চাই, গ্যাস-সিলিণ্ডার চাই, তার জন্য এতটুকু ভ্রুক্ষেপ নেই। এমনই মানুষ যখন স্যালি হিগিনস তখন চিৎকার করতে করতে ছুটে আসছে রেডিও-অফিসার, স্যার, শিগগির আসুন। দেখে যান কি কাণ্ড!

    স্যালি হিগিনস কেবিন থেকে ছুটে বের হয়ে ব্রীজের রেলিঙে ঝুঁকে পড়লেন। এটা কি দেখতে পাচ্ছেন? এটা কেন হচ্ছে? চারপাশের সেই সব খণ্ড খণ্ড আগুন সহসা নিভে গেছে। কোথাও আগুন নেই। কেবল সেই অর্ধদগ্ধ জাহাজ তিনি দেখতে পাচ্ছেন। যত দূর সম্ভব সার্চ-লাইট ফেলে দেখলেন বোট দু’টো দেখা যাচ্ছে না। জাহাজটা তো কাছেই জ্বলছিল। এখন মনে হচ্ছে জাহাজটা তেমন কাছে নেই, বেশ দূরে সরে যাচ্ছে।

    রেডিও-অফিসার বলল, স্যার কি হবে?

    নিচে তখন চেঁচামেচি সোরগোল। আগুন-লাগা জাহাজটাকে কিছুতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বোট দেখা যাচ্ছে না, এমন সব চিৎকার ভেসে আসছিল। এনজিন-রুমে স্ট্যাণ্ড-বাই আর্চি, থার্ড-এঞ্জিনীয়ার। বয়লার- রুমে আছে মৈত্র, তিনজন ফায়ারম্যান। বাংকারে তেমনি ঝুপ ঝুপ কয়লা ফেলার শব্দ। আর এইসব হট্টগোলের ভেতর হিগিনস বুঝতে পারলেন না জাহাজের আগুন এভাবে ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে কেন। তিনি ঘড়ি দেখলেন, দু’টো বেজে গেছে। এক ঘণ্টার মতো বোট সমুদ্রে ভেসে গেছে। সার্চ-লাইটের আওতায় হয়তো বোট নেই, কাজেই খুব ভয়ের নয় বোট না দেখা। কিন্তু তাঁকে যা ভীষণ চিন্তিত করছে, জাহাজটা ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে। দূরে সরে যাচ্ছে, না আগুন ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে কোনটা? কারণ এত দূর থেকে কিছুই সঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

    তিনি সহজভাবে বললেন, হ্যালো এনজিন-রুম। মাউথ-পাইপের সামনে মুখ রেখে বলে গেলেন, এনজিন-রুমে আর্চি কান পেতে শুনছে—তিনি বলছেন তখনও, একটা আশ্চর্য ব্যাপার আর্চি, জাহাজের আগুন কমে আসছে, বোটগুলো দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে এগোনো দরকার। তারপর আর্চির জবাবের জন্য অপেক্ষা না করে ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে দেবার মতো টেলিগ্রামের কাঁটা ঘুরিয়ে দিলেন। এনজিন- রুমে কাঁটা ঘুরে এস্টার্ন থেকে এ-হেডে চলে এল। তারপর কাঁটা ‘ফুল’ এই নামাঙ্কিত শব্দের ওপর আটকে তির্ তির্ করে কাঁপতে থাকল। সঙ্গে সঙ্গে আর্টি লিভার টেনে ধরল। এনজিন গর্জে উঠল। প্রপেলার-স্যাফট ধীরে ধীরে তারপর সামান্য দ্রুত তারপর আরও দ্রুত ক্রমে ক্র্যাংক-ওয়েভগুলো চরকিবাজির মতো ঘুরতে ঘুরতে একটা গোলাকার বৃত্ত হয়ে গেল। সিউল-ব্যাংক ফুল স্পীডে আবার সমুদ্রে এগিয়ে যাচ্ছে।

    তখন ডেবিড কেমন হুঁশ ফিরে পাবার মতো বলল, কী ব্যাপার বল তো?

    ছোটবাবু বলল, কী?

    —কিছু বুঝতে পারছ না?

    —না তো।

    –দেড় ঘণ্টা বোট চালিয়ে কোথায় এলাম?

    —কেন, কি হয়েছে?

    —দেখছ না চারপাশে কিছু দেখা যাচ্ছে না?

    —ছোটবাবু বলল, তাই তো!

    —আমাদের জাহাজটা দেখতে পাচ্ছ?

    অনেক দুরে ছোট্ট একটা ভেলার মতো দেখা যাচ্ছে সিউল-ব্যাংক। খুব ছোট। ছোটবাবু বলল, ঐ তো সিউল-ব্যাংক। তারপর আতঙ্কে ফেটে পড়ল সে, আমাদের দু’নম্বর বোট?

    –দেখা যাচ্ছে না।

    ডেবিড এবার ছেলেমানুষের মতো অন্ধকার সমুদ্রে চিৎকার করে উঠল, মি. স্যামুয়েল? তোমরা কোথায়?

    কোনো সাড়া নেই। সমুদ্রে জোরে চিৎকার করলে অনেক দূরে সেই শব্দ ভেসে ভেসে যায়। কিন্তু মোটর-বোটের শব্দে সে কিছু শুনতে নাও পারে। ডেবিড এবার বোট থামিয়ে জলের কাছে ঝুঁকে থাকল। যদি দু’নম্বর বোটের শব্দ কানে ভেসে আসে।

    মান্নান বলল, এই চঁইয়া হইছে কি কও?

    ছোটবাবু বলল, কিছু হয় নি। ডেবিডের মুখ দেখে ওরাও একটা কিছু আন্দাজ করতে পারছে। কিন্তু ডেবিড এবং তার ইংরেজী কথাবার্তা বিন্দুবিসর্গ বুঝতে না পেরে মান্নান ক্ষেপে যাচ্ছে।

    ডেবিড বলল, এত দূর এলাম অথচ দ্যাখো মনে হচ্ছে বোট একেবারে এগোচ্ছে না। বোটের প্রপেলার কতটা ঘুরছে দেখার জন্য সে ঝুঁকে পড়ল, এবং সমুদ্রে বেশ দ্রুত জল কেটে বোট যে এগিয়ে যাচ্ছে বোঝাই যায় এবং ওরা যে অনেকটা পথ চলে এসেছে পেছনে তাকালে সেটা আরও স্পষ্ট, এবং সিউল-ব্যাংক ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে, জাহাজের আগুনও ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, আরও কিছু সময় চালিয়ে দেখা দরকার। এবং এক সময়ে মান্নান আর ধৈর্য ধরতে না পেরে বলল, ছোটবাবু তুমি কি মিঞা, কোনখানে নিয়া আইলা!

    ছোটবাবুর বুকটা কেঁপে উঠল। সিউল-ব্যাংক ওদের দৃষ্টির বাইরে কখন চলে গেছে! যত ডিগ্রিতে বোট চালিয়ে এসেছে ঠিক তার বিপরীতমুখী গেলে সিউল-ব্যাংক জাহাজে পৌঁছানো যাবে। তবু ভয়ে কেমন সে গুটিয়ে গেল এবং তখনই দেখল সেই সমুদ্রে অতিকায় অগ্নিকাণ্ড যা তাদের নানা প্রলোভনে ফেলে এত দূরে নিয়ে এসেছে, নিমেষে সহসা দিগন্তের আকাশ আলোকোজ্জ্বল বর্ণমালায় ভরে দিয়ে সমুদ্রগর্ভে অদৃশ্য হয়ে গেল। আর কিছু থাকল না। কেবল অন্ধকার চারপাশে আর সমুদ্রে সেই উজ্জ্বল ফসফরাস অথবা নানা বর্ণের ছোট ছোট অতি-ছোট সব মাছ। শুঁড় আছে এবং কুচো চিংড়ির মতো মাছের মুখে অজস্র লাল নীল আলো। যেন আকাশের মতো নানা নক্ষত্রমালায় সমুদ্র সেজে আছে। এ- হেন সময়ে ডেবিড এবং ছোটবাবু কি করবে বুঝতে পারল না। ঠায় বসে থাকল অন্ধকারে। কেবল মাঝে মাঝে ডেবিড চিৎকার করছে, মি. স্যামুয়েল আমরা এখন কি করবো? যেন সে তার চিৎকার সুদূর সেই অদৃশ্য জাহাজে পৌঁছে দিতে চাইছে। স্যালি হিগিনস আমরা কোথায় এলাম? অন্ধকার সমুদ্রে সেই চিৎকার ভেসে যাচ্ছে।

    ছোটবাবু বলল, বোট ফেরাও।

    কম্পাসের কাঁটা দেখে ডেবিড বোট ঘুরিয়ে দিল। এভাবে বোট গেলে ঘণ্টা দু-একের ভেতর ওরা সিউল-ব্যাংক জাহাজে পৌঁছে যাবে। এবং এখন জাহাজ, আগুন, সমুদ্রগর্ভে তার অন্তর্হিত হওয়া কেমন ভীতির সঞ্চার করছে। ওরা চুপচাপ, একটা কথাও বলতে পারছে না, আরও সব রহস্যময় ঘটনা যে ঘটবে না কে বলবে। এবং মনে হচ্ছিল, ভোঁস করে হয়তো একটা অতিকায় তিমি ভেসে উঠবে, অথবা একটা নয়, একপাল, অথবা এমন গভীর সমুদ্রে সামান্য একটা বোট, কত যে অসহায়, ছোটবাবু প্ৰথম টের পেয়ে খুব ভারী গলায় বলল, ডেবিড শেষ পর্যন্ত আমরা ফিরতে পারবো তো?

    .

    আর সেই মধ্যযামিনীতে জাহাজে যেন একটা তোলপাড় আরম্ভ হয়ে গেল। বয়লার-রুমে দু’বার ছুটে এসেছে মেজ-মিস্ত্রি আর্চি। জাহাজ একবার এস্টার্ন একবার এ-হেড অর্থাৎ নেভিগেশানে কোথাও কিছু গণ্ডগোল, কখনও স্লো কখনও হাফ, কখনও ফুল, কি যে ছাই মাথামুণ্ডু সব ঘটনা। এখন খবর এসেছে যত জোরে পারো এ-সমুদ্র থেকে পালাও। ফায়ারম্যানদের চোখ-মুখ ধকধক করে জ্বলছে। স্টিম কিছুতেই উঠছে না। মৈত্র বার বার ছুটে যাচ্ছে। বয়লার গেজ দেখছে, ঠিক স্টিম না উঠলে সে নিজে জোর করে কেড়ে নিচ্ছে স্লাইস। একেবারে বয়লারের পেটে ঢুকিয়ে আগুন উল্টে-পাল্টে দিচ্ছে এবং লেলিহান সেই আগুন ফঁস করে বের হয়ে আসছে। মৈত্রের হাতের শিরা উপশিরা এবং অমানুষিক চোখ মুখ দেখলেই বোঝা যায় ঠিক ঠিক বয়লার স্টিম না দিলে একেবারে গলা টিপে ধরবে। রাশি রাশি কয়লা ফার্নেসে, তিন তিনটে বয়লারের ন’টা ফার্নেসে আগুন জ্বলছে। প্রায় সেই আগুন ভয়াবহ আর এক অগ্নিকাণ্ডের মতো। এবং তখনই মৈত্র দেখল যথাযথ স্টিম-গেজের কাঁটা লাল দাগটাতে এসে কাঁপছে।

    স্যালি হিগিনস তখনও ব্রীজে পায়চারি করছেন। রেডিও-অফিসার জেগে আছে। এখনও ট্রান্‌সমিটারে কোনো খবর নেই। একেবারে ঠাণ্ডা। নব্ ঘোরালে দূরবর্তী কোনো বেতার থেকে গানবাজনা ভেসে আসছে। কোনোটা সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল থেকে, কোনোটা আবার শৌখিন বেতারবিদ্ পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় তার শখের খবর পৌঁছে দেবার চেষ্টা করছে। এতে করে রেডিও-অফিসার বুঝতে পারছে বেতারযন্ত্রটি ঠিক আছে—কোনো গণ্ডগোল নেই। যা কিছু গণ্ডগোল এই সমুদ্রের অথবা আবহাওয়া কোনো কারণে দূষিত হয়ে আছে। এমন সব আজগুবি চিন্তায় মাথাটা তার ক্রমে খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

    আর তখনই মনে হল দূরে অন্ধকার সমুদ্রে একটা আলো ভেসে আসছে। দূরবর্তী মাঠে একজন নিশীথের মানুষ যেভাবে হাতে লণ্ঠন নিয়ে হেঁটে যায়, তেমনিভাবে খুব ধীরে ধীরে আলোটা দুলছে সমুদ্রে। তিনি বুঝতে পারলেন একটা বোট আসছে। কিন্তু আর একটা বোট? তাকে আশেপাশে কোথাও দেখা গেল না। যেমন এসব সময়ে জাহাজ থামিয়ে দেওয়ার কথা থাকে, বোট এলে সব লোকজন তুলে নেবার কথা থাকে তেমনি তিনি তাদের তুলে নেবেন বলে জাহাজ থামিয়ে দেবার জন্য টেলিগ্রাম পাঠিয়ে দিলেন নিচে। জাহাজ আবার থেমে গেল। ঘড়িতে দেখলেন তিনটে বেজে গেছে।

    দড়ির সিঁড়ি নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে এক এক করে সব জাহাজি, শেষে ফাইভার এবং চিফ- মেট উঠে এল। ওদের পোশাক জলে ভিজে গেছে। এবং ওরা কেউ একটা কথা বলতে পারছিল না। ওরা আস্তানায় ফিরে আসতে পেরেছে শেষ পর্যন্ত। এখন শুধু বিশ্রাম। ভীষণ একটা ভয়াবহ উত্তেজনা থেকে রেহাই পেলে যা হয়ে থাকে, গলা বুজে আসছে কথা বলতে। চিফ-মেট রিপোর্ট করছে সব। এক নম্বর বোট তো ওদের সঙ্গেই ফিরে আসার কথা, চিফ বলল, সে এক নম্বর বোটের খবর জানে না।

    বোট-ডেকে আবার জটলা। সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্যালি হিগিনস এখন কি করবেন বুঝতে পারছেন না। তবু শান্ত গলায় বললেন, আপনারা যান। আমাদের এখন অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। জাহাজ এখানেই থামিয়ে রাখা হোক। ওরা ঠিক ফিরে আসবে। ভয়ের কিছু নেই।

    একে একে আবার বোট-ডেক খালি হয়ে গেল। দু’জন ওয়াচে রয়েছে সামনে পেছনে। ব্রীজে স্যালি হিগিনস নিজে থাকছেন। চিফ-মেটকে তিনি ছেড়ে দিলেন। আর যারা বোটে ছিল তাদের ছুটি। স্যালি হিগিনস দেখলেন একমাত্র একজন এখনও বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। সে কেবিনে ফিরে যাচ্ছে না। তিনি তার কাছে গিয়ে বললেন, বনি, এবার শুয়ে পড়। রাত জেগে শরীর খারাপ করবে না।

    না আর একজনও আছেন। স্যালি হিগিনস আরও নিচে ঠিক টুইন-ডেকে দেখলেন এনজিন-সারেঙ দাঁড়িয়ে আছেন। রেলিঙে ভর করে দূরের সমুদ্রে কিছু কেবল অনুসন্ধান করছেন।

    হিগিনস ওপরে ব্রীজে উঠে যাবেন ভাবলেন। চিফ-মেটের সঙ্গে আরও সব কথাবার্তা ছিল। কখন কিভাবে ছাড়াছাড়ি হয়, কখন ওরা কিভাবে বুঝতে পারল, বোট চালিয়ে কিছুতেই আগুনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারছে না। তারা এমন কিছু দেখেছে কিনা যাতে মনে হতে পারে অস্বাভাবিক কিছু। শয়তানের হাত যদি থেকে থাকে, অথবা এমন কিছু দেখেছে কিনা, যাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যথার্থই জাহাজডুবি। তিনি সিঁড়ি ধরে উঠে যাবার সময় এসব মনে করতে পারলেন। কিন্তু এখন সবাইকে অহেতুক ভয়ের ভেতরে রেখে কাজ নেই। বরং খুব স্বাভাবিকভাবে তিনি উঠে গেলেন ওপরে। যেন তিনি ওপরে উঠে ঘুমিয়ে পড়বেন। এক নম্বর বোট যেন কথা আছে যথাসময়ে ফিরে আসবে—চিফ-মেটকে জাগিয়ে রেখে দরকার নেই। অথবা এও হতে পারে খুব বেশী তিনি গুরুত্ব দিতে চাইছেন না, কারণ তিনি জানেন এখন একমাত্র তাঁর চিন্তা এক নম্বর বোটের মানুষগুলো সম্পর্কে। ওরা ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি আর কিছু ভাবতে পারবেন না। যদি ওরা আকাশে রকেট ছুঁড়ে সিগন্যালিং করে সেই আশায় তিনি ব্রীজে উঠে যাচ্ছেন।

    আর তখনই মনে হল একটা লম্বা ছায়া ওঁর পেছনে চলে আসছে। নিশুতি রাতে জাহাজ সমুদ্রে থেমে আছে। চারপাশে শুধু কালো অন্ধকার। এবং এত বেশী নির্জনতা জাহাজে যে কেউ সিঁড়িতে পা রাখলে পর্যন্ত টের পাওয়া যায়। তিনি শুধু ছায়া দেখে চমকে উঠলেন। বোধ হয় জোরে হাই বলে চিৎকার করে উঠতেন, কিন্তু চোখ ফিরিয়ে দেখলেন, বনি ওঁর পেছনে পেছনে উঠে আসছে।

    তিনি বিরক্ত গলায় বললেন, তোমাকে শুয়ে পড়তে বললাম। ওপরে উঠে আসছো কেন?

    বনি বলল, বাবা!

    স্যালি হিগিনস সিঁড়ির এক ধাপ ওপরে। এক ধাপ নিচে বনি। মুখোমুখি দু’জন এবং অজস্র নক্ষত্র তেমনি আকাশে জ্বলছে। দু’জনের মুখে উইংসের আলো দুলছে। ভেবেছিলেন আরও ভারী গলায় বনিকে কেবিনে ফিরে যেতে বলতে পারবেন। কিন্তু তার মুখ দেখে শেষে আর তা বলতে পারলেন না। তিনি আবার উঠে যেতে লাগলেন এবং ব্রীজের ভেতর ঢুকে যাবার আগে বললেন, বনি আমাকে কিছু বলবে!

    —বাবা!

    স্যালি হিগিনস বললেন, বোস।

    চারপাশে কাঁচে মোড়া বলে এখানে বসলে জাহাজের সবটা দেখা যায়। এবং জাহাজের সবচেয়ে ওপরে বলে তিনি খুব দূরে যত দূরেই হোক সমুদ্রের কোথাও যেন আগুনের ফুলকি দেখলে বুঝতে পারবেন এক নম্বর বোট ফিরে আসছে।

    বনি বসল না। বাবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকল।

    স্যালি হিগিনস একপাশে ঝুঁকে কি দেখলেন! আকাশের একটা নক্ষত্র দিগন্তের নিচে ঝুলে আছে। এত নিচে যে মনে হয় আলোর ফুলকির মতো। আর সমুদ্রে সামান্য ঢেউ আছে বলে নক্ষত্রটা একবার দেখা যাচ্ছে একবার দেখা যাচ্ছে না। তিনি বোটের আলো ভেবে এগিয়ে গিয়েছিলেন। যখন বুঝতে পারলেন ওটা আলো নয় নক্ষত্র, জলের ওপর নিচে ভেসে ভেসে খেলা করছে তখন কম্পাসের ওপর ভর করে ডাকলেন, বনি।

    বনি কাছে এলে বললেন, কিছু করার নেই। এখন শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের উপায় নেই। আর তিনি আছেন, তিনি বলতে সেই ঈশ্বরের পুত্রের কথা বলতে চাইলেন স্যালি হিগিনস

    বনি বাবাকে আর একটা কথাও বলতে পারল না। সে যে এসেছিল অনেক কথা বলবে বলে!–বাবা, যদি বোটে কেউ হারিয়ে যায় কি হবে, ওরা দ্বীপ-টিপ পাবে না! ওরা কোথাও একটা ডাঙা পেয়ে যাবে তো! বাবা, কাছাকাছি কি কি দ্বীপ আছে? যদি কোনো স্রোতের মুখে পড়ে যায় বাবা। আচ্ছা বাবা, সমুদ্রে বোট হারিয়ে গেলে তাদের কি কি কষ্ট হতে পারে। জল ফুরিয়ে গেলে কি হবে? খাবার?

    স্যালি হিগিনস সহসা দেখলেন, বনি আর ব্রীজে নেই। প্রথমে ভাবলেন বোধ হয় ওর কেবিনে ফিরে গেছে। কিন্তু কেবিনে ফিরে গেলে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেতেন। কোথায় গেল! তিনি ব্রীজের এদিক- ওদিক চার্ট-রুম এবং পাশে নিজের কেবিনে উঁকি দিতেই দেখলেন মেয়ে তাঁর যীশুর পায়ের নিচে হাঁটু মুড়ে বসে আছে। এবং দু’পায়ে বনির কপাল ঠেকে আছে। এমন ভঙ্গীতে তিনি বনিকে বসে থাকতে দেখে বুঝতে পারলেন, ছোটবাবু এখন বনির সব। ছোটবাবু এখন বনির সব। এই সব শব্দ তাঁর বুকের ভেতর থেকে বার বার উঠে আসতে থাকল। তিনি বুঝি আর বনির কেউ নন—তার চোখ জলে চিকচিক করছে।

    এখন থেকে বনির জীবনে ছোটবাবু সব। এবং এসব বুঝতে পারলেই ভেতরের কষ্টটা বেড়ে যায় চুপচাপ বসে থাকেন ব্রীজে। চোখ ভীষণ উদাসীন হয়ে যায়। পৃথিবীতে এত বড় একটা কষ্ট আছে মানুষের তিনি যেন জাহাজে এটা ক্রমে বুঝতে পারছেন। তারপর কেন যে তিনি ছোটবাবুর ওপর ক্ষেপে যান, যেন শুধু এ জাহাজে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কেবলমাত্র লুকেনার নয় অথবা এই যে নিশীথে জাহাজ সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে এবং একটা বোটের সন্ধান এখনও নেই, যেন না থাকাই ভাল, তিনি মনে মনে ছোটবাবুকে সমুদ্রে ফেলে যেতে পারলে বোধ হয় সবচেয়ে খুশী হতে পারতেন। নির্ভর করার মতো ছিল তাঁর সামান্য একটা মেয়ে, কোথাকার কে ছোটবাবু জাহাজে এসে তাঁর কাছ থেকে তাও কেড়ে নিচ্ছে।

    এতদিন যা তিনি ভেবেছেন, মেয়েটার নানারকমের আবদার শুধু তিনি মেটাচ্ছেন, ছোটবাবুর হয়ে বনির কথাবার্তা সব একজন সমবয়সী মানুষের জন্য দুঃখবোধ আর কিছু না এবং এ বয়সে বনি যদি জাহাজে কোনো প্লে-মেট খুঁজে না পায় তবে নানা কারণে ওর নিজের জীবনই যেন বনি অতিষ্ঠ করে তুলত। প্রায় সেই জেদ থেকে আত্মরক্ষার নিমিত্ত সব সহ্য করে গেছেন—এখন সেই অপোগণ্ড ছোটবাবু তাঁর নাড়ি ধরে টান দিয়েছে। যেন এখুনি তিনি ফের টেলিগ্রাম পাঠাতে পারলে বাঁচতেন, মুভ এ-হেড নিখোঁজ বোটের জন্য আমাদের বসে থাকলে চলবে না। ক্যাপ্টেন লুকেনার সমুদ্রে আবার তাঁর হাত বাড়িয়েছেন।

    কিন্তু তিনি জানেন তাঁর নাম স্যালি হিগিনস। নিজের এই নামটির প্রতি তিনি অতিশয় মোহগ্রস্ত এবং ভেতরে ভেতরে এক আশ্চর্য ধর্মবোধ যা বয়স বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে। এবং কর্তব্যপরায়ণ মানুষ হিসেবেই তাঁকে এখন যেন ছোটবাবুকে জাহাজে তুলে নিতে হবে। যতটা সতর্ক ছিলেন এখন তার চেয়ে বেশি সতর্ক। সার্চ-লাইট জ্বালিয়ে রেখেছেন সামনে। ওয়াচম্যান বার বার চারপাশে আলো ফেলে দেখে যাচ্ছে এবং সেই আলো দূরবর্তী সমুদ্রে যদি দৃশ্যমান হয় বোট তবে ঠিক ঠিক দেখে ফেলবে, ঐ যে জাহাজের আলো। এবং এটা ঠিক রাতে যতটা সুবিধাজনক জাহাজে ফিরে আসা,.সকাল হয়ে গেলে সে সুবিধা থাকে না। রোদ উঠলে সমুদ্র ঝলসে যাবে। কারণ যত ইকুয়েডরের দিকে জাহাজ উঠে যাবে তত সমুদ্র তেতে উঠবে। তত সমুদ্র ইস্পাতের মতো রং ধরবে। সাদা জাহাজের রং আর সমুদ্রের রং প্রায় কখনও কখনও এক হয়ে গেলে ওরা কাছাকাছি চলে এলেও স্থির করতে পারবে না জাহাজটা কোথায়!

    এ-ভাবে যত সময় যেতে থাকল ক্রমে তত তিনি অস্থির হয়ে উঠছেন। কি করবেন ঠিক বুঝতে পারছেন না। এ-ভাবে জাহাজ থামিয়ে অপেক্ষা করা ঠিক হচ্ছে কিনা বুঝতে পারছেন না। চারপাশে শুধু গভীর অন্ধকার, আর কিছু নক্ষত্র মাথার ওপর এবং দূরে সমুদ্র তেমনি প্রবলভাবে ফুঁসছে। আর মনে হয় তখন সব অদৃশ্য শয়তানেরা সমুদ্রের ওপর হাত তুলে দিচ্ছে। তারা এগিয়ে আসছে। তারা যেন ওঁর গলা টিপে ধরবে এবার। অথচ তিনি চুপচাপ বসে পাইপ টানছেন। পাশে কোয়ার্টার-মাস্টার, হুইলের পাশে স্ট্যাণ্ড-বাই। নড়ছে না। সেই প্রাচীন মমির মতো তার মুখ।

    সামান্য বোটের জন্য এ সমুদ্রে অপেক্ষা করা ঠিক হচ্ছে কিনা বুঝতে পারছেন না। সামান্য ক’জন জাহাজির জন্য জাহাজটা যদি আবার নতুন দুর্ঘটনায় পড়ে যায়। ক্যাপ্টেন লুকেনার এবং তাঁর অশুভ প্রভাব তো সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। এমন একটা সুযোগ হেলায় ছেড়ে দেবেন তিনি হিগিনস কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না।

    অথবা এই যে আগুন, আগুনের ফুলকি, ট্র্যান্সমিটারে ভৌতিক সব আর্তনাদ, এবং সহসা সব আবার হাওয়া, সবই সেই ক্যাপ্টেন লুকেনারের ছলনা নয় কে বলবে! সেই ধূর্ত মানুষটির অশুভ প্রভাবে জাহাজ কখন যে আবার অস্থির হয়ে উঠবে। ঠিক কিউ-টি-জি পাওয়া যাবে না, এবং টি-আর ধরা যাবে না। অথবা নিশিদিন সমুদ্রে ঘুরিয়ে মারার যে স্বভাব ওঁর রক্তে আছে—যদি আবার সবই এক এক করে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, তিনি কি করবেন! দুঃর্ভাবনায় তিনি ক্রমে অস্থির হয়ে উঠছেন। কখনও পায়চারি করছেন পাগলের মতো। আবার কখনও মাথার চুল ছিঁড়ছেন, এমনভাবে দু’হাতে তিনি চুল টানছেন মাথার। কারণ জাহাজ সিউল-ব্যাংক কখনও এত ধূর্ত হয়ে যায়, ওর কম্পাসে ম্যাগনেটিক কারণে এত বেশি গণ্ডগোল থাকে যে তিনি দেখেছেন বার বার কম্পাস পাল্টেও কিছু হয়নি, এবং এমন যে জাইরো-কম্পাস যার তুলনা নেই, তাও কেমন ঠিকঠাক তখন কাজ করে না। এবং এ-সব মনে হলে তাঁর বুঝতে অসুবিধা হয় না, সবই সেই ধূর্ত মানুষটির কাজ। তাঁর অশুভ প্রভাব ঠিক ঠিক কাজ করে যাচ্ছে।

    আবার ভেবেছেন কখনও, হয়তো জাহাজের ভেতরে আছে সব রকমারি ইস্পাতের স্তর সাজানো, পুরানো আমলের কারিগরেরা এমন সব ইস্পাতের ব্যবহার রেখেছেন যার স্বভাব জানা ছিল একমাত্র ক্যাপ্টেন লুকেনারের। স্যালি হিগিনসও দীর্ঘদিনের সফরে জেনে ফেলেছেন, জটিল-প্লাস মাইনাসের একটা অতি সূক্ষ্ম ব্যবহার আছে। ওটা ধরতে না পারলেই সব গেল। আর সবটা যে শুধু অংকের ব্যাপার, কে বলবে। কিছু অনুভূতি। আবার মনে হয় বিশ্বাস রাখা দরকার জাহাজের ওপর, ভালোবাসার দরকার, সব মিলিয়ে জাহাজটা চলে। ভালবাসা না পেলে জাহাজটা চলে না।

    জাহাজটা যত বিশ্বাসী হয়ে উঠছে, প্রিয় হয়ে উঠছে, তত সেই অশুভ প্রভাব ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। তিনি বুঝতে পারছেন, এই শেষ সফরে তাঁর সর্বস্ব গ্রাস করতে চায় সে।

    পায়চারি করতে করতে ক্যাপ্টেন লুকেনারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাঁর বেড়ে যায়। তিনি চিৎকার করে বলতে চাইলেন, মিঃ লুকেনার, আমি জাহাজ ঠিক বন্দরে পৌঁছে দেব। আপনি কিছুতেই আমাকে ঘাবড়ে দিতে পারবেন না।

    তারপর ভাবলেন নিশীথে ভয় পেয়ে তিনি কি অদ্ভুত সব আজেবাজে কথা বলছেন! নিজের ওপর আর বিশ্বাস রাখতে পারছেন না! আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেখতে পেলেন সেই দৃশ্য! এলিস অন্ধকারে রেলিঙে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে একজন লম্বা মত মানুষ। যার মুখ দেখা যায় না।

    সহসা তিনি চিৎকার করে উঠলেন, কোয়ার্টার-মাস্টার!

    —ইয়েস স্যার।

    —স্টার-বোর্ড সাইডে দ্যাখো। কিছু দেখতে পাচ্ছ?

    —না তো স্যার!

    আবার তিনি ডেক-চেয়ারে বসে পড়লেন। বোট সমুদ্রে দেখা যাচ্ছে না। না আকাশে কোনো রকেটের ফুলঝুরি। ওরা অন্তত আকাশে রকেট ছুঁড়ে তাঁদের অবস্থান বলে দিতে পারত। আসলে বোধ হয় ওরাও সেই অশুভ প্রভাবের পাল্লায় পড়ে গেছে। যেমন এলিস জাহাজে উঠে পড়ে গিয়েছিল। তিনি কিছুতেই তাকে রক্ষা করতে পারেন নি।

  • উনচল্লিশ

    উনচল্লিশ

    ।। উনচল্লিশ।।

    এবং এভাবে একজন মানুষ স্মৃতি-বিস্মৃতির জটিলতায় তলিয়ে যাচ্ছিলেন। যতই অবিশ্বাস করতে চান সবকিছু তত যেন তাঁকে পেয়ে বসে, তত তিনি রহস্যজনক কথাবার্তা শুনতে পান।—তুমি কতটুকু জানো! তুমি যা জানো তার কতটা তুমি বিশ্বাস কর। যা তুমি জান না, যা তুমি বুঝতে পার না তাকে তুমি অবিশ্বাস করবে কি করে! আবার মনে হয় কেউ হাসছে। ওঁর নির্বোধের মত চোখমুখ দেখলেই কেউ হাসছে। যখন ভেবে কুলকিনারা পান না, কেবল হাতড়ে বেড়ান তখন যদি ওঁর বোকামি দেখে কেউ হেসে ফেলে তিনি কি করতে পারেন! মাঝে মাঝে সেই হাসি একেবারে পাগল করে দেবার মতো—নো, নো, তোমাদের হাসি শুনতে পাচ্ছি না আমি!

    মনে আছে তাঁর, তিনি তখন সিউল-ব্যাংকের পুরোপুরি কাপ্তান। তিনি কাপ্তান স্যালি হিগিনস। ভীষণ জাঁকজমক করে জাহাজ কার্ডিফ বন্দর থেকে ছাড়ছে। এমন একটা জাহাজের ভার স্যালি হিগিনসের ওপর। বহু হাতবদলের পর যখন জাহাজ খুব সস্তায় পাওয়া গেছে তখন আর ভাবনা কি! এবং স্যালি হিগিনস আর তাঁর স্ত্রী এলিস জাহাজে। যারা বিদায় জানাতে এসেছিল বন্দরে, ইয়েস মনে পড়ছে, রিচার্ড ফ্যালের বাবা ম্যাথিউ ফ্যাল নিজে এসেছিলেন জাহাজঘাটায়। জাহাজ সওদা নিয়ে জাভা সুমাত্রা যাচ্ছে। তিনি হ্যাণ্ড-শেক করার সময় বলেছিলেন—উইশ্ য়োর গুডলাক। তোমার সমুদ্রযাত্রা শুভ হোক।

    আসলে স্যালি হিগিনস জানতেন একটা গণ্ডগোলে জাহাজ তাঁকে দেওয়া হয়েছে। জাহাজটা কেউ রাখতে পারেনি। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই হাতবদল হয়ে যাচ্ছে! এমন একটা জাহাজ এবং একবার জাহাজটাকে তিনি ঠিক ঠিক পৌঁছে দিয়ে যখন প্রমাণ করেছেন, তিনি পারেন আর যার ফলে কোম্পানির কর্তাব্যক্তি খুশি হয়ে একেবারে সোজাসুজি তাঁকে জাহাজের ভার দিয়ে ফেললেন, তখন মনে হয়েছিল, নিজের এই সুনাম তিনি কিছুতেই ক্ষুণ্ণ হতে দেবেন না। জীবনে তা ক্ষুণ্ণ হতে দেননি। শেষ সফরেও তিনি সোজা থাকতে চাইছেন। তখনই মনে হল আবার সেই হাসি। ঠিক হাসি কিনা বোঝা যায় না, কখনও মনে হয় দীর্ঘশ্বাসের মতো। জাহাজের সাউণ্ডিং পাইপ নিচে বিজে নেমে গেছে। জল সরে যাবার শব্দ, কিন্তু অন্ধকারে কেন যে মনে হয় ঠিক পেছনে ঘাড়ের ওপর কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে। তিনি তখন চেঁচিয়ে বলতে চান, কে! কে! আর তখনই মনে পড়ে তিনি স্যালি হিগিনস, কাপ্তান, এস. এস. সিউল-ব্যাংক। তিনি ফের চেয়ারটাতে ফিরে আসেন। রাত দুপুরে এই অন্ধকার সমুদ্র ক্রমশ রহস্যময়ী হয়ে উঠছে। সার্চ-লাইট তেমনি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফেলা হচ্ছে। বোটের পাত্তা নেই। জলে হিস্ হিস্ শব্দ। এসব কারণে সব আজগুবি শব্দ, কখনও হাসির মতো কখনও দীর্ঘশ্বাসের মতো কানে এসে বাজছে।

    তারপরই কেমন থমকে যান। বিচলিত বোধ করেন। হাত-পা কাঁপতে থাকে। সত্যাসত্য নির্ণয় করতে গেলে সব কেমন অবিশ্বাস্য ঠেকে। মনে হয় সব ভুল। আসলে সেই যে একটা ভীতি ছিল জাহাজ সম্পর্কে, কিছু একটা আছে জাহাজটার ভেতর, জাহাজটাকে কিছু ভর করে থাকে—কোনো অদৃশ্য আত্মা, এমন সব কত ঘটনা জাহাজ সম্পর্কে লুকেনার সম্পর্কে কানে এসেছে এবং লুকেনার তো মানুষ ছিলেন না। বেঁচে থাকতেই লোকটা ছিল সী-ডেভিল। দুরন্ত, দুর্বিনীত ধূর্ত প্রতিপক্ষের অজস্র যুদ্ধ জাহাজের মোকাবেলা করেছেন তিনি। এমন সব গল্প শুনে শুনে মনের কোথাও এক আশ্চর্য দুর্বলতা প্রশ্রয় পেয়েছে মনে হয়। এবং এমন মনে হলেই তিনি গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে চান, কিন্তু…….।

    জাহাজে এলিস উঠে এসেছিল। নতুন ক্যাপ্টেনের নতুন বৌ। বয়সের ফারাক যাই হোক না কেন। বরং সেদিনও বোধ হয় ছিল এমনি অন্ধকার রাত্রি। জাহাজ ইকুয়েডরের দিকে উঠে যাচ্ছিল। তিনি কেবিনে এলিসকে বুকে জড়িয়ে চুমো খাচ্ছিলেন। আর তখুনি মনে হল পোর্ট-হোলে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ হাসছে। পেছন ফিরে দেখলেন—কিছু নেই। সমুদ্রের সামান্য জলোচ্ছ্বাসে এমন শব্দ কখনও হাসির মতো অথবা বাতাসেরা যখন জলের ওপর দিয়ে ভেসে ভেসে যায় তখন তার হিস্ হিস্ শব্দ ক্ৰমান্বয় ভেসে গেলে সবই মনের ভুল ভেবে পোর্ট-হোলের কাঁচ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

    জাহাজ সিঙ্গাপুর থেকে ছেড়ে বেশ ক’দিন ভালই যাচ্ছিল। ঠিক জাভা অথবা সুমাত্রার কাছাকাছি জায়গায়, সমুদ্রে তখন ভীষণ সাদা জ্যোৎস্না, সারা আকাশময় কি আশ্চর্য সুগন্ধময় বাতাসের খেলা। চার্ট-রুমে তিনি বসে আছেন। ওসনোগ্রাফী সম্পর্কে সামান্য পড়াশোনা করছিলেন। রাত যে অনেক হয়ে গেছে একেবারে টের পাননি। এলিস কি না ভাবছে! এলিস বেশি রাত জেগে থাকতে পারে না। একটু রাত হলেই ঘুমিয়ে পড়ার স্বভাব। এলিস এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে পারে না। হয়তো অভিমানে এলিসের মুখ থমথম করছে। এমন কি যে একবার ওকে ডেকে মনে করিয়ে দেবে, কত রাত আর বসে থাকব, তুমি আসছ না কেন, এসবও ওকে জানায়নি। তিনি সেজন্য মনে মনে ভীষণ দুঃখিত। ভেবেছিলেন সোজা কেবিনে ঢুকে ওকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেলে সব অভিমান নিমেষে ভেঙে যাবে। কিন্তু বাইরে বের হয়ে দেখেছিলেন, এলিস নিচে দাঁড়িয়ে আছে। বোট-ডেকে বোটের মাঝখানে এলিস। পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে যেন। মাথায় তার জাহাজি টুপি, শরীরে জাহাজি পোশাক। মানুষটার মুখ তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। এবং মনে হয়েছিল জাহাজের কোনো যুবক অফিসার ওর পাশে দাঁড়িয়ে গল্প-গুজব করছে। এত রাতে এভাবে গল্প-গুজব এলিসকে যেন মানায় না। একজন ক্যাপ্টেনের স্ত্রীর পক্ষে এটা ঠিক না। এলিসের এটা বোঝা উচিত।

    সেদিন আরও রাত করে নিচে নামলেন। একেবারে থার্ড-অফিসারের সব কাজকর্ম দেখে সইসাবুদ শেষে নিচে যখন নেমে এসেছিলেন তখন রাত বারোটার ঘণ্টা পড়ছে।

    কিন্তু অবাক এত রাত পর্যন্ত এলিস জেগে আছে! ওর শরীরে রাতের পোশাক। শরীরে দামী আতরের গন্ধ। ওর শরীরে পাতলা সিল্কের সোনালী গাউন। এত স্পষ্ট সব যে তিনি একমুহূর্ত অপেক্ষা করতে পারেন নি। এলিসকে বুকে জড়িয়ে বলেছিলেন, বোট-ডেকে কার সঙ্গে গল্প করছিলে!

    এলিস ভীষণ বিস্মিত। সে চোখ বড় বড় করে বলেছিল, কার সঙ্গে গল্প করব!

    —দু’ নম্বর বোটের পাশে দাঁড়িয়েছিলে?

    —তা ছিলাম তো। তুমি আসছ না।

    —কেউ পাশে ছিল?

    —কি বলছ যা তা!

    —তোমার পাশে কেউ ছিল, তুমি আমাকে বলছ না!

    —মাই গড়

    স্যালি হিগিনস বুঝতে পারলেন এলিস কিছু গোপন করতে চাইছে। তিনি বললেন—ঠিক আছে। এলিস কেমন সরে দাঁড়াল। হিগিনসের চোখে মুখে ভীষণ নিষ্ঠুরতা।

    হিগিনস বললেন—ঠিক আছে। এস। বলে তিনি প্রায় জোর করে বিছানায় টেনে ফেলে দিলেন। চোখে মুখে অতিশয় সংশয়। তিনি ছটফট করছিলেন। তাঁর সঙ্গে এলিসের বয়সের তফাত অনেক। এবং এসব সময়ে যা হয়ে থাকে কেমন অমানুষের মতো এলিসকে উল্টে-পাল্টে নিচ্ছিলেন, বয়স হয়ে গেছে বলে কোনো তরুণ যুবকের চেয়ে তিনি কম নন। কারণ তিনি বস্তুত তাঁর সব শরীরের নৃশংসতা এলিসের সুন্দর শরীরে ছড়িয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, তুমি এলিস নষ্ট হয়ে গেলে আমিও নষ্ট হয়ে যেতে পারি। বস্তুত এলিসকে সেদিন তিনি রেপ্ করেছিলেন।

    এবং সেই থেকে ছিল জাহাজে লুকোচুরি খেলা। কখনও বোট-ডেকে কখনও আরও দূরে, তিনি আর রাতে কখনও দেখতে পেলেন না একা এলিস কোথাও দাঁড়িয়ে আছে। রাতে তিনি যতবার এলিসকে নির্জনে কোথাও দেখেছেন, এলিস একা থাকছে না। ওর পাশাপাশি একজন জাহাজি মানুষ পুরো ইউনিফরম পরে দাঁড়িয়ে আছে।

    তিনি তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এত সচেতন যে তাঁর স্ত্রী সংগোপনে কিছু করছে এটা প্রমাণ করার জন্য কাউকে ডেকে কোনো সংশয়ের কথা বলতে পারেন নি। কেবল নিজে একা একা জ্বলে পুড়ে খাঁক হয়েছেন। এলিসকে বললে কখনও স্বীকার করত না। একদিন তো হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছিল এলিস। আমাকে তুমি দেশে পাঠিয়ে দাও প্লিজ। এবং তাই হয়তো করতেন। কিন্তু জাহাজি মানুষের জীবন কখনও সুখের হয় না, এটা তিনি জানেন। জেনেও যখন কিছু করতে পারছেন না, সব ঠিকঠাক, পরবর্তী বন্দরে এলিস নেমে যাচ্ছে, নেমে যাবার আগে জাহাজ কি যে ঝড়ের মুখে পড়ে গেল! সেই প্রচণ্ড টাইফুনের ভেতর জাহাজ যখন হাবুডুবু খাচ্ছে, যখন তিনি চার্ট-রুমে ব্যস্ত এবং বিস্তারিত খবর পাঠাচ্ছেন এরিয়া- স্টেশনকে মিনিটে মিনিটে, রেডিও-অফিসার নেমে এসে খবর দিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের ঢেউ কতটা উচ্চতা রেখে এগিয়ে আসছে আর সমুদ্রে ভয়ংকর সাদা ফেনা কেবল আর কিছু দেখা যাচ্ছে না, কেবল তুষারপাতের মতো আকাশে জলকণা উড়ে বেড়াচ্ছে, সাঁ সাঁ হাওয়ায় বোট-ডেক ধরে হাঁটা যাচ্ছে না, তখনই মনে হল নিচে এলিস দ্রুত নেমে যাচ্ছে। এবং এলিসকে অনুসরণ করার জন্য তিনিও এগিয়ে যাচ্ছেন—তারপর এলিস কেমন সন্তর্পণে সেই এলি-ওয়ে ধরে টলতে টলতে এগিয়ে যাচ্ছে—শেষে বোট-ডেকে ফের উঠে আসতে চাইলে আবার মনে হল সেই জাহাজি মানুষ যার মুখ কখনও তিনি দেখেননি, পেছন ফিরে যে কেবল দাঁড়িয়ে থাকে, উঁচু লম্বা প্রায় দেখতে জাহাজের থার্ড-অফিসারের মতো সে অনুসরণ করছে এলিসকে। কিন্তু তিনি নেমে কিছু দেখতে পেলেন না। একটা প্রচণ্ড ঢেউ জাহাজটাকে ভীষণ কাত করে দিল। আর মনে হল রেলিং ধরে কেউ পালাচ্ছে। তিনি কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না। কেমন সব গোলমাল হয়ে গেল। যেন অদৃশ্য এক অশুভ প্রভাবে দরজার মুখে তিনি এলিসকে মাথায় মেরে ফেলে দিলেন। হাতে ছোট্ট একটা হাতুড়ি। আর তখন সেই অট্টহাসি সমুদ্রের ঢেউগুলো পার হয়ে নক্ষত্রের দিকে ছুটে যাচ্ছে। কেউ যেন জয়লাভ করে লাফাতে লাফাতে সমুদ্র পার হয়ে চলে গেল।

    প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাসের ভেতর জাহাজটা থরথর করে কাঁপছিল। তিনি সেই ঝড়ের রাতে সহসা আর্তনাদ করে ওঠার মতো ছুটে গিয়েছিলেন বোটের পাশে। হয়তো পা ফসকে পড়েই যেতেন। অথবা তাঁকে জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিত। তিনি জানতেনও না তখন প্রচণ্ড রোষে আবার সেই অশুভ প্রভাব এগিয়ে আসছে, তিনি হাঁফাচ্ছিলেন, অন্ধকারে কে আপনি! এভাবে কোথায় দাঁড়িয়ে হাসছেন! এবং বোটের নিচে পড়ে আছে এলিস। কেউ ব্রীজ থেকে নেমে আসতে পারে, বয়লার-রুম থেকে কেউ উঠে আসতে পারে—কিছুই তাঁর মনে ছিল না। প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাস বোট-ডেক ভাসিয়ে নিয়ে গেল। যেহেতু স্যালি হিগিনস অভিজ্ঞ এবং তিনি জানেন তখন কি করণীয়, লাফ দিয়ে পাশের একটা রড ধরে ফেললেন দু’হাতে। ভেসে থাকলেন জলে। জল নেমে গেলে তিনি সোজা ছুটে গেলেন দরজার পাশে। দেখলেন এলিস নেই। এলিসকে সমুদ্রের ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এলিসের কোনো চিহ্ন নেই। তাঁর পোশাক ভিজে গেছে। কেমন শীতে কাঁপছিলেন। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা চারপাশে মনে হচ্ছিল। শীতে যেন হাত-পা স্থবির হয়ে আসছে। নড়তে পারছিলেন না। কাঁপতে কাঁপতে কোনোরকমে ব্রীজে উঠে যেতে চাইছেন। আর কি আশ্চর্য, বার বার সিঁড়ি থেকে তিনি গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছেন। পা স্লিপ করে যাচ্ছে। কে যেন তাঁকে ব্রীজে কিছুতেই উঠতে দিচ্ছে না। এতটুকু শক্তি নেই শরীরে। তিনি সিঁড়ির গোড়ায় যতক্ষণ পারলেন ঝুলে থাকলেন। তারপর কি হয়েছিল মনে নেই। আর তিনি মনে করতেও চান না। কিন্তু কি যে হয়, বোট হারিয়ে যাবার পর পুরোনো সব স্মৃতি তাঁকে আরও বেশি যেন কাবু করে ফেলছে। তিনি তেমনি বসে আছেন। থার্ড-মেট ওপরে উঠে এসেছে এবং যেহেতু জাহাজ স্ট্যাণ্ড-বাই, সবাই মাঝে মাঝে ওপরে উঠে দেখছে, বোট ফিরে আসছে কিনা। তখন থার্ড-মেট না বলে পারল না, স্যার আপনি এবারে যান। আমরা আছি।

    স্যালি হিগিনস ঘড়ি দেখলেন চারটা বেজে গেছে। তিনি কেবিনে গিয়ে শুয়ে পড়তে পারেন। কিন্তু জানেন কিছুতেই দু’চোখ এক করতে পারবেন না। এতটা বিচলিত কেন বুঝতে পারছেন না। আসলে কি তিনি সেই অপোগণ্ডটার কথা ভেবে ভীষণ বিচলতি হয়ে পড়ছেন! তিনি কি এই অপোগণ্ডের জন্য ভেতরে ভেতরে নিজেও এক ভীষণ মায়ায় জড়িয়ে পড়েছেন!

    তিনি তখন ভেবে পান না, ছোটবাবু কেন কখনও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে যায় তাঁর! আবার কখনও মনে হয়, ছোটবাবুর শান্তশিষ্ট মুখে চোখে এক অদ্ভুত সারল্য—ছেলেটাকে কোথাও ফেলে গেলে তিনি যেন বাকি জীবন শান্তি পাবেন না। বোটে অন্য যারা আছে তাদের কথা একবারও ভাবতে পারছেন না কেন? ভীষণ স্বার্তপর মনে হলে তিনি উঠে দাঁড়লেন। বলতে চাইলেন, তুমি কে হে? তোমার জন্য আমার এত ভাবনা! তারপরই বুঝি মনে হয়ে যায় মেয়েটা তাঁর নিচে বসে রয়েছে। সেও ঘুমোচ্ছে না। আসলে বনির কথা ভেবে বোধ হয় এমন মনে হচ্ছে তাঁর। তিনি প্রায় জোর করে উঠে পড়লেন। এবং কেবিনে ঢুকে দেখলেন বনি পোর্ট-হোলে মুখ রেখে ভোরের সমুদ্র দেখছে। তিনি বললেন, বনি এস আমরা দু’কাপ কফি খাই। তিনি মেয়েকে একটু অন্যমনস্ক করার জন্য বললেন, এখানেই মুখ ধুয়ে নাও। তারপর বেল টিপে ডাকলেন, কোয়ার্টার-মাস্টার। কোয়ার্টার মাস্টার এলে কফির কথা বলে দিলেন।

    .

    তখন নীল জলে শুধু একটা সাদা বোট আর তার পাঁচজন আরোহী। ওদের মুখে কোনো কথা নেই। সবাই অবাক, দেখছে সিউল-ব্যাংক জাহাজটা সামনে কোথাও নেই। চারপাশে কেবল শুধু জল আর জল। দিগন্তব্যাপী শুধু সমুদ্র আপন মহিমায় জেগে রয়েছে। দু’টো একটা মাছ, কখনও ছোট ছোট মাছের ঝাঁক বোটের পেছনে ভেসে ভেসে আসছে। আর কখনও অতিকায় সব হাঙ্গরের ঝাঁক পাইলট-ফিশদের তাড়া করছে। আবার কখনও দেখছে ছোট ছোট সব র‍্যামোরা মাছ বোটে এসে শামুকের মতো লেগে রয়েছে। ওরা কেউ, কোনো একটা র‍্যামোরা মাছ তুলে আনছে। জলে হাত দিলেই মাছগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে এগিয়ে আসছে এবং চুম্বকের মতো হাতে সেঁটে যাচ্ছে। অদ্ভুত ওদের মুখ। এবং নানা বর্ণের ছবি মাছের গায়ে। হাতে সেটে গেলে টেনে তুলতে হচ্ছে। প্রায় জোঁকের মতো ওদের যেন রক্ত শুষে নেবার ক্ষমতা।

    ডেবিড দূরবীন নিয়ে এলে দূরের সমুদ্র দেখতে পারত। কিন্তু ওরা ভুলে সঙ্গে দূরবীন আনেনি, ওরা এমন কি এল-বি সেট সঙ্গে আনলেও পাশাপাশি সব জাহাজে খবর পাঠাতে পারত। ওরা রকেট ছুঁড়ে আকাশের গায়ে সিগন্যালিং করতে পারত, কিন্তু সকাল হয়ে গেছে। সমুদ্রে সূর্য উঠে আসছে। আকাশে রকেটের আলো ফ্যাকাশে হয়ে যাবে। এখন ওদের কি করণীয় বুঝতে পারছে না। সামান্য হাওয়া উঠেছে। বড় বড় জলের আবর্তে বোট কেবল উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ভাসছে। ওদের মুখ দেখলেই বোঝা যায় ভারি অসহায় মুখ। প্রতিটি দণ্ড পল ভয়াবহ দীর্ঘ সফরের মতো, যেন ওরা আর তাদের আস্তানায় ফিরতে পারবে না। মান্নান সারাক্ষণ খিস্তি করছে। সবাইকে যা মুখে আসে বলছে। বোধহয় সেও আর কিছু ভেবে উঠতে পারছে না। ডেবিড নিজেও কিছু আর ভাবতে পারছে না। চুপচাপ, এবং এভাবে ক্রমে ওরা দেখতে পেল, সমুদ্রের বুকে লাল সূর্য, সমুদ্রের নীল রং ক্রমে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে, রোদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ গরম। বোটের জল বিন্দুমাত্র ওরা ব্যবহার করেনি। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর কিছু একটা স্থির করে ফেলতেই হবে। জাহাজ না পেলেও, ওরা কম্পাসের কাঁটা দেখে সোজা কেবল বোট চালিয়ে যাবে। ভরসা তাতেও নেই, কারণ মোটর-বোট বলে ওরা যা তেল এনেছে সঙ্গে সে বড় কম সময়ের জন্য। ভরসা, যারা যাত্রী, সবাই প্রায় জোয়ান। বোট ওরা দাঁড়ে টানতে পারবে কিছুক্ষণ—সেটাই বা কতদূর! এবং যতদিন শরীরে শক্তি থাকে, খাবার থাকে—খাবার বলতে শুকনো খাবার, আর তো ঝড়ের সময় এমন ছোট্ট বোটের কোনো পাত্তা পাওয়া যাবে না। ওরা বুঝতে পারছিল, মৃত্যুর মুখোমুখি ওরা ক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে।

    ছোটবাবু দাঁড়গুলো সব এক এক করে টেনে বের করছে। ডেবিডের ভীষণ হাসি পাচ্ছিল ছোটবাবুর কাণ্ড দেখে! অসীম অন্তহীন সমুদ্রে ছোটবাবু ভেবেছে দাঁড় টেনে কোথাও ঠিক পৌঁছে যেতে পারবে।

    ছোটবাবু বলল, ডেবিড তুমি তো সমুদ্রের অনেক কিছু জানো। সামনে কোথাও দ্বীপটিপ আছে?

    ডেবিড বলল, কাছাকাছি এমন কিছু নেই ছোটবাবু। এখন ভরসা একমাত্র কোনো জাহাজ যদি দেখতে পায়।

    রোদে ওদের মুখ পুড়ে যাচ্ছে। ইস্পাতের রং ধরছে সমুদ্রে। ডেবিড বলল, এখানে থাকা বাদে কোনো উপায় নেই। সিউল-ব্যাংক খুঁজতে বের হলে যদি এদিকটায় ঘুরে যায়।

    ছোটবাবু বলল, ডেবিড তোমার বাড়ির কথা মনে পড়ছে না!

    ডেবিড বুঝতে পারল ছোটবাবু তাকে সাহসী করে তুলতে চাইছে। ছোটবাবু হয়তো নিজেও বাড়ির কথা ভাবছে। ওর মতো মনে মনে ভেঙে পড়ছে, কিন্তু বুঝতে দিচ্ছে না।

    ছোটবাবু বলল, দ্যাখো আমরা দাঁড় টেনে ঠিক ডাঙা পেয়ে যাব। অথবা কোনো জাহাজ আমাদের দেখতে পেলে তুলে নেবে। আচ্ছা ওরাই বা কি করছে? সে বনিকে আসার সময় অযথা ঠেলে ফেলে দিয়েছিল। এখন কেন জানি মনে হচ্ছে কাজটা সে ভাল করেনি। আর হয়তো বনির সঙ্গে তার জীবনে দেখা হবে না। সে বলল, তোমার কি মনে হয় ডেবিড, ওরা আমাদের ফেলে চলে গেছে!

    —বুঝতে পারছি না।

    —তোমার কি মনে হয়, বলেই সে বুঝতে পারল, এখন এসব বলা ঠিক হবে না। বোট যদি শয়তানের প্রভাবে পড়ে যায় তবে কেউ রক্ষা পাবে না। বরং এখন যতটা পারা যায় সবাইকে স্বাভাবিক রাখা দরকার। সে কিছু লজেন্স বের করে নিল। সবাইকে একটা একটা করে দিল, প্রায় রেশনের সামিল, এখন কিছুতেই ওরা বেহিসাবী হতে পারে না। গলা শুকিয়ে উঠছে। আর সমুদ্র থেকে যেন এবার ক্রমে প্রচণ্ড উত্তাপ উঠতে আরম্ভ করবে। আসলে ওরা এমন একটা পরিস্থতিতে পড়ে ঘাবড়ে গেছে। গলা শুকিয়ে চ্যাট চ্যাট করছিল।

    —একটু পানি, দু’নম্বর জাহাজি সোলেমান এমন বলল।

    ছোটবাবু বাকেট থেকে একটু জল ঢালতে গেলে ডেভিড চিৎকার করে উঠল।

    —এটা তুমি কি করছ ছোটবাবু!

    –সোলেমান জল খেতে চাইছে।

    —এখন জল দেবে না।

    বোটের দায়দায়িত্ব ডেবিডের। সুতরাং যা কিছু সে করবে ডেবিডের অনুমতি নিয়ে। সে একটা একটা করে লজেন্স বের করে দিয়েছিল, যেন তাও ঠিক হয়নি। ডেবিড না বললে সে কিছুই দিতে পারে না। কিন্তু সবার চোখ যেভাবে জ্বলছে, কখন ডেবিডকে ওরা জলে ফেলে দেবে কে জানে! এবং মনে হল সেই যেন নিরুদ্দেশ যাত্রা। ক্রমে সবাই ক্ষুধায় তেষ্টায় অমানুষ হয়ে উঠছে। মান্নান আর মান্নান নেই। সে একটা অমানুষ হয়ে যাচ্ছে। সে নিজেও একটা অমানুষ! সব খাবার এবং জল শেষ। বুকে অসহ্য কষ্ট। চোখ কোটরাগত। আর শুধু নানারকমের সব ভয়ঙ্কর ছবি সমুদ্রে। এবং এটা হয়, বোট অসীম সমুদ্রে হারিয়ে গেলেই এটা হয়। বিচিত্র সব হেলোসিনেসান—কখনও মনে হয় একটা বড় ক্রস সমুদ্রে ঝুলে আছে, কখনও মনে হয় অতিকায় সব উড়ুক্কু মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসছে অথবা মরুভূমির মতো দূরে উট দেখা যায়, মরূদ্যান দেখা যায় আর বিচিত্র সব সামুদ্রিক অপদেবতারা তখন চারপাশে হাত নেড়ে ভয় দেখাতে থাকে। এবং মনে হল, তখন বোটের সবাই কংকালসার মানুষ, ওরা সবাই মিলে ডেবিডের রক্ত চুষে খাচ্ছে। এসব ভেবে ছোটবাবুর মুখ কেমন সহসা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ছোটবাবু বসেছিল গলুইয়ে, ডেবিড বোটের পাছাতে আর ডানদিকে মান্নান। সোলেমান মাঝখানে। আর বাঁদিকে জব্বার। ওরা সমুদ্রে সতর্ক হয়ে গেছে ভীষণ। বোটটা ভীষণ দুলছে। এবং বার বার ছোটবাবু সমুদ্রের গভীরে এই নীল জল পার হয়ে, আরও গভীরে, যে অন্ধকার আছে সেখানে কতটা আরও গভীর, এবং

    ডুবে গেলে সেই জলরাশির ভেতর হাঙ্গরেরা কিভাবে ছুটে আসবে, ওর শরীর থেকে মাংস খুবলে খুবলে খাবে ভাবতে ভাবতে সে শিউরে উঠল। সে একটা কথা বলছে না। সে কেমন ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠল। পাগলের মতো সে চারপাশে তাকাতে থাকল। সোলেমানের মতো সে নিজেও যেন তেষ্টায় কষ্ট পাচ্ছে। এবং এমনকি সে যে দু’টো একটা কথা বলবে সহজভাবে তা পর্যন্ত পারছে না। সে চুরি করে একটা লজেন্স বেশী খেয়ে ফেলল।

    ক্রমে সূর্য মাথার ওপরে উঠে আসছে। ডেবিড ঘড়ি দেখে বলল, দশটা বাজে। কি করবে ছোটবাবু?

    ছোটবাবু বলল, জাহাজটাতো এখানেই থাকার কথা!

    জব্বার বলল, ছোটবাবু তুই বেশি মাতব্বরি করবি না। কিছু জানিস না কেবল মাতব্বরি চালাচ্ছিস। তুই কী বুঝিস সমুদ্রের। আমাদের এখানে ঘুরে আসা ঠিক হয়নি। যদি কিছু হয় তোমাকে খুন করব ছোটবাবু।

    ডেবিড বুঝতে পারল ক্রমে সবাই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বচসা, মারামারিও শুরু হয়ে যেতে পারে। সবাই সবাইকে দোষারোপ করতে থাকবে। এখন যত বেশি মাথা ঠাণ্ডা রাখা যাবে তত তেষ্টা কম পাবে। গলা কম শুকোবে। ঘাম কম হবে। এসব নিয়ে ছোটখাটো একটা সে বক্তৃতা পর্যন্ত দিয়ে যখন বুঝতে পারল কোনো আশা নেই, মৃত্যু ক্রমে দু’হাত তুলে সমুদ্রে নাচানাচি শুরু করে দিয়েছে এবং দূরে সব শিস্ শোনা যাচ্ছে, হয়তো হাজার হাজার ডলফিন ভেসে আসছে, তাদের হাঁক-ডাক শোনা যাচ্ছে—তখন নিজেরাও ক্রমে সমুদ্রের জীব হয়ে যাচ্ছে ভেবে আবার চুপচাপ হয়ে গেল।

    বোটটা তেমনি সমুদ্রের জলে দুলছে। লাফাচ্ছে। ওদের শরীরও দুলছে। ওরা আবার সামান্য কুটোগাছটি যদি ভেসে আসে এ আশায় কি যে অসহায় চোখে কেবল দেখে যাচ্ছে, কেবল সমুদ্র যেখানে শেষ হয়ে গেছে মনে হয়, দূরে অতিদূরে যেখানে দিগন্তরেখায় আকাশ নেমে গেছে সেখানে সবাই একসঙ্গে কিছু একটা দেখছে, দেখতে পাচ্ছে বিন্দুর মতো নীল সমুদ্রে সচল কি ভেসে আসছে।

    ডেবিড চিৎকার করে উঠল, ওটা কি আসছে ছোটবাবু?

    —বুঝতে পারছি না।

    —মান্নান?

    —জানি না স্যার।

    —সোলেমান?

    —কি যে আসছে!

    —জব্বার? :

    —কিছু একটা ছুটে আসছে।

    আর তখনই দু’হাত তুলে ছোটবাবু সেই মহাসমুদ্রে সামান্য একটা বোটের ওপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল—লেডি-অ্যালবাট্রস আসছে সেকেণ্ড। বোট ফেরাও। সে আমাদের নিতে এসেছে।

    ওরা দেখল সেই অতিকায় পাখিটা ঢেউয়ের ওপর ভেসে এগিয়ে আসছে। অথবা কখনও অনেক ওপরে উঠে যেন কিছু দেখছে। নিচে শুধু জলরাশি, জলে ওর প্রতিবিম্ব ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে। এবং দূরে সে কেমন দেখতে পায়, আর এক দিগন্তে সেই জাহাজ, যেখানে তার পুরুষপাখিটা রয়েছে কাঠের বাসে বন্দী এবং একজন মানুষের মুখ বুঝি তার অতীব চেনা, সে থাকতে না পেরে উড়ে উড়ে দেখছে কোথায় সে।

    এসবই ছোটবাবু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেবল ভাবছিল। তার ভাবতে ভাল লাগছিল। বোট দ্রুতগতিতে পাখিটার পেছনে ধেয়ে চলেছে, এবং পাখিটার কাছাকাছি চলে গেলে ওরা দেখতে পেল, আগে আগে সে উড়ে উড়ে যাচ্ছে, পেছনে তারা। মান্নান ছোটবাবুকে আনন্দে জড়িয়ে ধরেছে। ডেবিড নড়তে পারছে না। হালে সে বসে রয়েছে। এবং সামনে ওরা চারজন একেবারে মুহ্যমান, যেন অতিশয় স্থির এবং নির্বাক গভীর সমুদ্রে কুটোগাছটির মতো পাখিটা তাদের এখন একমাত্র অবলম্বন।

    ছোটবাবু যেমন আজকাল পাখিটাকে আদর করে ডাকে, কখনও এলবি, আবার কখনও এলবা বলে, তেমনি সে ডাকল, এলবা ঠিক ঠিক নিয়ে যাচ্ছ তো! আমাদের জাহাজটা আর কতদূর? জাহাজে সবাই ভাল আছে তো? যেন মনে হয়েছিল ছোটবাবুর, কতকাল আগে অনেকদিন হয়ে গেছে ওরা জাহাজ ছেড়ে এসেছে। ঠিক আর তাকে জাহাজ ভাবা যায় না, বাড়ি-ঘরের মতো। প্রবাসী মানুষের মতো সে এখন ঘরে ফিরে যাচ্ছে। এবং গলা খুব খাটো করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, বনি কেমন আছে? চাচা কেমন আছে? সে বলতে পারল না। কারণ তখনই দূরে সেই সিউল-ব্যাংক, অস্পষ্ট ছায়ার মতো দিগন্তে ভেসে উঠেছে! ওরা আনন্দে সবাই সবকিছু ফেলে, এমনকি ডেবিড হাল ছেড়ে নৃত্য শুরু করে দিল। বোট যে ঘুরপাক খেয়ে ভরাডুবি হতে পারে সে খেয়াল পর্যন্ত নেই ডেবিডের। সে শুধু বলল, ডেবিড যেভাবে লাফাচ্ছো, বোট যে ডুববে!

    ছোটবাবুর কথায় ওরা কেউ এতটুকু দমল না। তখন আর কি করা, হালে সে গিয়ে নিজেই বসল। প্রায় বোটটাকে সে জলের ওপর দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইল—বনি, আমি আসছি। আমরা সত্যি ফিরে আসছি। বনি, মাই লিটল্‌ প্রিন্সেস, দু’হাত তুলে কেবল এসব বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল তার।

    তখন জাহাজে সবাই ওপরে উঠে এসেছে, সবাই বোট দেখে হাত নাড়ছে। এবং কেউ কেউ চুপচাপ কেবল দেখছে সে আসছে। ছোটবাবু হাল ধরে বসে আছে। লেডি-অ্যালবাট্রস বোটের সামনে আর নেই। বোট পৌঁছে দিয়ে সমুদ্রের নিরিবিলি আকাশে অথবা গভীর সমুদ্রে অদৃশ্য হয়ে যাবার চেষ্টা করছে। তখন রেডিও-অফিসার ঝুঁকে আছে বেতার-যন্ত্রটির ওপর। পিঁপ্ পিঁপ্ আর করছে না। রিন্ রিন্ করে কিছু ভেসে আসছে। গলা চেনা মনে হচ্ছে,যেন কতকাল পর আবার খোঁজখবর নিচ্ছে। তার মুখ চোখ অধীর। প্রথম খুব অস্পষ্ট, এবং মনে হচ্ছে হিসিং-সাউণ্ড, যেন খুব গভীর গোপন কথাবার্তা। রেডিও- অফিসার বুঝতে পারছে না। হেড-ফোন আরও জোরে চেপে ধরছে, ইয়েস, ইয়েস, হ্যাঁ হ্যাঁ সিউল- ব্যাংক। এস. এস. সিউল-ব্যাংক বলছি, ইয়েস ইয়েস, হ্যাঁ হ্যাঁ নেক্‌স্ট পোর্ট অফ কল সামোয়া, ইয়েস ড্যানসিং গার্ল, একুশ বারি স্ট্রীট, লণ্ডন। ইয়েস, ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস অফ হার কমাণ্ড। আর সঙ্গে সঙ্গে সে প্রায় উত্তেজনায় গালাগাল করতে যাচ্ছিল। রাসকেল, তোমরা এতক্ষণ কি করছিলে? তোমরা কি সব ঘুমোচ্ছিলে!

    কিন্তু কে কাকে বলে! অপরপ্রান্ত থেকে ভয়ঙ্কর সব কথাবার্তা ভেসে আসছে।—তোমরা কি সব নেশাভাঙ করে আছ! সকাল থেকে চেষ্টা করছি, কিছুতেই ধরতে পারছি না। আর যা হয়ে থাকে দিকে দিকে ওরা খবর পাঠিয়েছে, সকাল আটটার পর থেকে এস. এস. সিউল-ব্যাংকের কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। আর সব খবর, যেমন জাহাজ কোন কোর্সে যাচ্ছে, তার ওয়েদার রিপোর্ট এবং সবকিছু জানিয়ে এরিয়া-স্টেশন থেকে পৃথিবীর সর্বত্র প্রায় ইথারে ভেসে গেছে, জাহাজ এস. এস. সিউল-ব্যাংক নিখোঁজ। এবং যা হয়েছিল, হেড-অফিসে মি. রিচার্ড ফ্যাল্ তখন মাত্র কথাবার্তা চালাবেন স্থির করেছেন, এবং এটা তৃতীয়বারের চেষ্টা—জাহাজ স্ক্র্যাপ করার সঠিক কথাবার্তা হবে, জাহাজ সাউথ-সীতে থাকতে থাকতেই কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে। স্যালি হিগিনসের এটাই শেষ সফর, তারপর এই জাহাজের জন্য কোনো আর মাস্টার-মেরিনার পাওয়া যাবে না। স্যালি হিগিনস থাকতে থাকতেই কিছু একটা করে ফেলতে না পারলে যতদিন যাবে তত সিউল-ব্যাংক ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। এবং যা তিনি ভেবে শেষ পর্যন্ত স্থির করেছেন, স্যালি হিগিনসকে দিয়েই বিক্রি-বাট্টার দলিলে সই করাতে পারলে ব্যক্তিগত বিপদ থেকে তিনি ত্রাণ পাবেন। এমন একটা দুরভিসন্ধি যখন মাথায় খেলছে ঠিক তখনই খবর এসেছিল, এস. এস. সিউল-ব্যাংক মিসিং।

    হেড-অফিসের সব মানুষ আনন্দে যে-যার টেবিল থেকে উঠে পড়েছিল, তবু শোক-জ্ঞাপনের মতো কিছুটা চেহারা রাখতে হয়, ভেতরের আনন্দ, অর্থাৎ সেই দুর্ভোগবহনকারী জাহাজটা আর কখনও নানারকমের দুঃসংবাদ বয়ে আনছে না, সে শেষ হয়ে গেছে, ফিস্ ফিস্ গলায় কেমন চারপাশের মানুষগুলো নড়েচড়ে বসেছিল, কেউ কেউ মি. ফ্যালের ঘরে ছুটে খবরটার সত্যাসত্য প্রমাণের ইচ্ছায় পাগল হয়ে যাচ্ছিল, তখন মি. ফ্যাল চুপচাপ বসে আছেন। তিনি কাগজটা উল্টে পাল্টে দেখছেন। সামনে বসে রয়েছেন এক ভদ্রলোক। নাম মি. হ্যামিলটন। তিনি এসেছেন, জাহাজ কেনাবেচার ব্যাপারে। জাহাজ এস. এস. সিউল-ব্যাংক যখন দক্ষিণ সমুদ্রে আছে তাকে সহজেই জাপানের উপকূলে ভিড়িয়ে দেওয়া যাবে। প্রাথমিক কথাবার্তা যখন এভাবে এগোচ্ছিল, তখন এমন একটা খবরে মি. ফ্যাল প্রায় মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলতে গিয়েও বুকটা কেমন ধড়াস করে উঠল—আসলে সিউল-ব্যাংক মিসিং। এটা তো মাঝে মাঝে দু-একবার হয়েছে। এমন রেকর্ড তো অফিসের খাতাপত্রে রয়েছে। আবার যথানিয়মে সমুদ্রের কোথাও তাকে দেখা যাবে। এমন যে কতবার হয়েছে! তিনি কেমন ভীষণ আবার হতাশায় ডুবে কথা শুরু করে দিতে চাইলেন।

    হ্যামিলটন বললেন, তাহলে আর কথাবার্তা বলে লাভ নেই।

    ফ্যাল্ বললেন, বসুন। চা খান।

    হ্যামিলটন বললেন, খুব বড় রকমের লোকসানের মুখে পড়ে গেলেন।

    ফ্যাল্ বললেন, হবে।

    হ্যামিলটন একটু বিস্মিত। এতবড় দুর্ঘটনা ঘটে যাবার পরও মানুষটা বিচলিত নয়। এতগুলো মানুষের জীবন সংশয়, সমুদ্রে জাহাজডুবি সুতরাং পৃথিবীর সর্বত্র বড় বড় হরফে যখন ছাপা হয়ে যাবে, এস. এস. সিউল-ব্যাংক নিখোঁজ তখনও একজন মানুষ কত সহজভাবে চা খেতে বলছেন।

    হ্যামিলটন চা খাবার পর বললেন, উঠি।

    ফ্যাল্ বললেন, কথাবার্তা কিন্তু শেষ হয়ে যায় নি।

    হ্যামিলটন বুঝতে না পেরে টুপিটা মুখের কাছে এনে ফের নামিয়ে নিলেন। বললেন, কথাবার্তা আর কি থাকতে পারে?

    —খোঁজখবর নেবেন

    —আপনাদের আরও জাহাজ আছে?

    মি.ফ্যাল উঠে দাঁড়ালেন। তিনি সামান্য ভারি চেহারার মানুষ—এবং তিনি হ্যান্ডশেক করার সময় বললেন, স্ক্র্যাপ করার মতো নেই।

    —তবে?

    —দু’একদিনের ভেতর জাহাজটার খবর আমরা পেয়ে যাব!

    —কিন্তু এত বড় একটা খবর, আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না। চোখ প্রায় কপালে তুলে হ্যামিলটন কথাটা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। সেই ভাল, যেন না হয়, করুণাময় ঈশ্বর ওদের রক্ষা করুন।

    বিকেলে ফ্যাল্ হ্যামিলটনকে ফোনে জানালেন কাল আসবেন। এস.এস. সিউল-ব্যাংক বহাল তবিয়তে আছে। মাঝে একদিন শুধু ওর টি-আর পাওয়া যাচ্ছিল না। ওটা কিছু না। ট্রানসমিটারে গন্ডগোল হলে এসব হয়। যেন কত সহজে তিনি এর ব‍্যাখ্যা দিয়েছিলেন হ্যামিলটন সাহেবকে। নিজের দুর্ভাবনার কথা, জাহাজ নিয়ে যে তিনি তাঁর পুত্রের মৃত্যুর পর ভয়াবহ একটা দুর্ভাবনায় পড়ে গেছেন কি করে কি করা যায়, এবং যে জন্য তিনি সব সময় ভাবছেন, স্যালি হিগিনসের শেষ সফর যখন এটা, এবং আর যখন কাউকে পাওয়া যাবে না অর্থাৎ যিনিই উঠুন না কেন, জাহাজ তাঁকে সমুদ্রে নিশীথে এ-ভাবে এক দু’বার ঘুরিয়ে মারলেই পাগল হয়ে যাবেন। এবং জাহাজের নামে যখন এমন সব কিংবদন্তী তৈরি হয়ে যাচ্ছে অথবা বলা যেতে পারে—সেই জাহাজ এস.এস. সিউল-ব্যাংক আসছে আসছে, মাস্তুলে লম্ফ জ্বালিয়ে আসছে, যেন কতকাল থেকে এভাবে সে সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে, তাকে কিছুতেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যাচ্ছে না—তখন স্যালি হিগিনসই একমাত্র কিছু একটা করতে পারেন। ভাবলেন, তিনি নিজে কোনো সই-সাবুদে যাবেন না। এস.এস. সিউল-ব্যাংক তাঁর পরিবারের কাউকে সহ্য করতে পারে না। বরং স্যালি হিগিনসের সঙ্গে যখন এত দহরম মহরম তিনিই তার শেষকৃত্য করে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক। বিক্রি-বাট্টার কাগজপত্রে স্যালি হিগিনস কর্তৃপক্ষের হয়ে অনায়াসে সই-সাবুদের কাজটা সেরে ফেলতে পারেন। বোধ হয় এস.এস. সিউল-ব্যাংক নিজেও এটা মেনে নেবে। তার রোষে তখন আর তাঁকে অথবা তাঁর পরিবারের কাউকে পড়ে যেতে হবে না। তিনি মনে মনে ভীষণ খুশী এবং এমন কি তিনি গাড়ি থেকে নেমে বড় লনের ভেতর হেঁটে যেতে যেতে নাবালকের মতো শিস্ দিতে থাকলেন। কতদিন পর যেন সেই অশুভ প্রভাবের হাত থেকে নিষ্কৃতির একটা পথ খুঁজে বের করতে পেরেছেন।

    তখন রেডিও-অফিসার আরও নুয়ে পড়ছে। সে বলছে, কি কি বললেন! সে যেন পারলে আরও জোরে চিৎকার করে উঠত।

    —এমন হয়েছে।

    —কি বাজে কথাবার্তা।

    —না বাজে নয়। এটা হয়েছে।

    —ঠাট্টা হচ্ছে!

    অপর প্রান্ত থেকে তখন আর কোনো কথা ভেসে আসছে না। সে নিচে না নেমেই হল্লা শুরু করে দিল। বলল, স্যার শিগগির আসুন। কি বলছে এরিয়া-স্টেশন শুনুন।

    সে তারপর ফের বলল, কবে হয়েছে?

    —এই বছর দুই আগে।

    —কাদের জাহাজ ছিল? —আমেরিকান অয়েল-ট্যাংকার।

    —আমেরিকান অয়েল-ট্যাংকার!

    কাপ্তান এলে হেড-ফোন খুলে দিয়ে বলল, শুনুন কি বলছে এরিয়া স্টেশন।

    তিনি বললেন, ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস বলছি।

    —গুড আফটারনুন স্যার।

    —ইয়েস গুড আফটারনুন।

    —স্যার, জাহাজের কোনো ক্ষতিটতি হয়নি তো?

    —না।

    —সবাই নিরাপদে ফিরে এসেছে?

    —হ্যাঁ। লাস্ট বোট এই মাত্র এল।

    —সবার শরীর ভাল তো?

    স্যালি হিগিনস কেমন বিরক্ত গলায় বললেন, সবাই ভাল। তোমরা এতক্ষণ কোথায় ছিলে!

    —আমরা তো স্যার ঠিকই খবর নিচ্ছি। কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারছিলাম না।

    স্যালি হিগিনস বললেন, দুপুর রাতে জাহাজডুবি হল কোনো খবর রাখো!

    —ওটা স্যার কিছু না। মাঝে মাঝে জাহাজিরা এটা দেখে থাকে।

    —তারে মানে!

    —বছর দুই আগে এখানে একটা অয়েল-ট্যাংকার ডুবেছিল। কি করে আগুন লেগে যায়। একটা দিকতো বিস্ফোরণে উড়েই গেল। আর একটা দিক ডুবে গেল তারপর। কাউকে রক্ষা করা যায়নি। কেউ যেতেই পারেনি কাছে। চারপাশে আগুন কেবল আগুন। সারারাত সমুদ্রে সব আগুনের ফুলকি ভেসেছিল।

    স্যালি হিগিনস শুনে কেমন হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি কি বলবেন বুঝতে পারছিলেন না, তখন আবার গলা ভেসে এল, মাঝে মাঝে এ সমুদ্রে এলেই কোনো কোনো জাহাজের নাবিকেরা এটা দেখে ফেলে। এমন আরও দু-একবার হয়েছে তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যান।

    স্যালি হিগিনস এমনই কিছু সন্দেহ করেছিলেন। তিনি এতটুকু বিচলিত হলেন না। কেবল রেডিও- অফিসারকে বললেন এসব ভৌতিক খবর গোপন রাখতে। জাহাজিদের ভেতর খবরটা ছড়িয়ে পড়া ঠিক না। শুধু বলে দিলেন জাহাজডুবি হয়েছে খবর সঠিক। অলৌকিক কিছু নয়। কারণ তিনি তাঁর প্রাচীন অভিজ্ঞতা থেকে এমন সব খবর আরও কিছু দিতে পারেন। তা ছাড়া তিনি তো সেই প্ৰথম থেকে এ জাহাজে এমন সব আরও ঘটনা দেখেছেন। চোখের ভুল বার বার ভাবতে চেয়েছেন। এবং সমুদ্রে শয়তানের পাল্লায় জাহাজ এভাবে পড়ে যেতে পারে তিনি বাদে আর কে বেশি বিশ্বাস করেন। তবু সবাইকে একটা জাহাজডুবির খবর দিয়ে নিরাপদে এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। তিনি খুব সহজভাবে নেমে এলেন। বোট থেকে এখন সবাই উঠে আসছে। এক এক করে সবাই দেখা করে যাচ্ছে তাঁর সঙ্গে। বনি একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সারেঙ ছোটবাবুকে জড়িয়ে ধরেছে আর যারা ছিল সবাই এখন বোট-ডেকে হল্লা করছে। এবং বোট তুলে নেওয়া হচ্ছে। আবার এস.এস.সিউল-ব্যাংক সমুদ্রে ভেসে চলেছে। বোধ হয় টের পেয়ে গেছে ওর মৃত্যুর সমন এখন হেড-অফিসে টাইপ হচ্ছে। ক্রমশ সে কেমন ফের বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে চলায় ফেরায়। রাত বারোটায় কম্পাসের ডিভিয়েশান দেখে হিগিনস সেটা যেন আরও বেশি টের পেলেন। জাহাজ ঠিক চার্ট-মতো রান করছে না। আবার সে অস্থির হয়ে উঠছে।

  • চল্লিশ

    চল্লিশ

    ।। চল্লিশ।।

    রাতে মৈত্র ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিল।

    ওর এটা আজকাল খুব বেশি হচ্ছে। ঘুমিয়ে পড়লেই সুন্দর সব স্বপ্ন দেখছে। এবং অধিকাংশ সময় স্বপ্নে ম্যান্ডেলা সমুদ্র-তীরে দাঁড়িয়ে থাকে। পায়ের কাছে ক্যাঙ্গারুর বাচ্চাটা লাফায়। দূরে একটা পাইন গাছের ছায়ায় ছোট্ট সাদা রঙের বাড়ি, সামনে সব নানা বর্ণের গাছ-গাছালি।

    স্বপ্ন দেখলেই সে আর যা দেখতে পায়, ম্যান্ডেলার মাথায় লাল রঙের টুপি, হাতে সাদা দস্তানা। ম্যান্ডেলার চুল সোনালী রঙের। ওর মুখ নরম আর কি তাজা। কেবল বুকে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ম্যান্ডেলাকে সে যেন কিছুতেই হাসিখুশি দেখতে পায় না। চোখ দু’টো ভারী ভারী, একটু আদর করলেই টস টস করে দু’গাল বেয়ে চোখের জল নেমে আসবে। তখনই ওর ইচ্ছে হল জাদুমন্ত্রে সে মেয়েটাকে কোনো দ্বীপে পৌঁছে দেবে। যেখানে জাহজডুবিতে একজন মানুষ সমূদ্রে আটকে পড়েছে। একটা নির্জন দ্বীপে সে আছে। ম্যান্ডেলাকে নিয়ে যেতে পারলে মানুষটার আর কোনো দুঃখ থাকবে না।

    স্বপ্নটা ঘুরে ফিরে কখনও একই রকমভাবে বার বার সে দেখে ফেলে।

    যেমন সে দেখে ফেলে সকাল হলেই ম্যান্ডেলা সমুদ্রের ধারে নেমে আসছে। ওর মা জানালায় বসে দেখতে পাচ্ছে, ম্যান্ডেলা বালিয়াড়িতে পায়ের ছাপ রেখে কেবল এগিয়ে যাচ্ছে। বাতাসে ওর চুল উড়ছে। চারপাশে ছুটে বেড়াচ্ছে ক্যাঙ্গারুর বাচ্চাটা। সে পালকটা দিয়ে আসার পর মা তার ভাল হয়ে যাচ্ছে। আর ওর মা’র চোখে সেই দূরের সমুদ্র, যেন কতকাল পর তার ঘরের মানুষ ফেরার কথা, চোখ- মুখ উত্তেজনায় অধীর। ম্যান্ডেলার মা’কে সেই যে এক বাংলাদেশের নাবিক পালক দিয়ে গেল আর এল না। সাদা রঙের জাহাজ দেখলেই ম্যান্ডেলার মা’র মনে হত ওটা বসন্তনিবাসের জাহাজ। সে আবার এ-শহরে ফিরে আসছে। মা তার তখন সুন্দর নীল রঙের গাউন পরতে ভালবাসে। পায়ে সাদা রঙের জুতো। জাহাজিদের নীল রঙটা ভারি পছন্দ তার। ম্যান্ডেলার মা বোধহয় বুঝতে পারে সব। হাতে তার লাল রঙের দস্তানা।

    শীত নেই তবু স্বপ্নে ম্যান্ডেলার মা দস্তানা পরে সমুদ্রের ধারে চলে আসে। ম্যান্ডেলার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু জাহজাটা নোঙর না ফেলে চলে যেত। নানারকম বার্চ গাছের নিচে ম্যান্ডেলার মা’কে সাদা পুতুলের মতো মনে হতো তখন।

    এভাবে স্বপ্নে ম্যান্ডেলার দেশে শীত এসে যায় কখনও। বরফ পড়তে থাকে। পাইন গাছগুলো সাদা হয়ে যায়। একটা লাল রঙের বল আকাশে কেউ ছুঁড়ে দেয় তখন। বলটা গড়িয়ে নিচে পড়ে যায় না। আকাশের গায়ে লটকে থাকে সূর্যের মতো। তুষারপাতের সময় কখনও স্বপ্নে মৈত্র দেখতে পায় ম্যান্ডেলা আর তার মা জানালার কাঁচ বন্ধ করে বসে আছে। তুষারপাত দেখতে দেখতে বুঝি কখনও মনে হয় মাহিমের ঘোড়া পাহাড়ে যাচ্ছে সাদা মস্ খেতে। বরফের ছবি ফুলের মতো ভেসে থাকে জানালায়। হাত দিয়ে বার বার মুছে দিতে ভাল লাগে ম্যান্ডেলার।

    কখনও স্বপ্নে বসন্তনিবাস দেখতে পায় সমুদ্রে বড় বড় তিমি মাছ ভেসে যাচ্ছে। সব সাদা তিমি মাছ। মাছের ওপর বরফ জমে, কখনও অতিকায় দ্বীপের মতো। সারি সারি পালতোলা নৌকার মতো ওরা ভেসে যায়। অথবা ওরা এক পাল ভেড়ার পাল যেন, জলের ওপর এমন অজস্র ছবি। ডলফিনগুলো লেজ নেড়ে নেড়ে একটা বাচ্চা মেয়ের কাছে চলে আসছে, আদর খেতে। স্বপ্নে বসন্তনিবাস ম্যান্ডেলাকে নিয়ে তখন সমুদ্রে নেমে মাছের সঙ্গে খেলা শুরু করে দেয়।

    আর এভাবে এক আশ্চর্য সুষমা তৈরি হয়ে গেলেই ম্যান্ডেলার মা’র বোধহয় মনে হয় আগামী বসন্তে আবার সেই বসন্তনিবাস চলে আসবে। পাইন-পাতার লম্বা বাঁশি থাকবে তার হাতে। সে আর ওয়াকা এবং শহরের সব ছেলেদের পেছনে পেছনে ব্যান্ড বাজিয়ে যাবে। ব্যান্ড-মাস্টার বসন্তনিবাস।

    আবার কোনো কোনো রাতে মৈত্র স্বপ্নে বসন্তনিবাস হয়ে গেলে দেখতে পায়, ওর জাহাজটা গভীর সমুদ্রে নোঙর ফেলে আছে। একটা বোটে সে নেমে যাচ্ছে। যেন কোনো দূরবর্তী বন্দরে যাবার কথা। যাবার পথে দেখা করে যাচ্ছে ম্যান্ডেলা আর তার মা’র সঙ্গে। কি যেন ওদের দিয়ে যাবার কথা আছে।

    কোনো কোনো রাতে ম্যান্ডেলা আর তার মা সারারাত যেন জেগে থাকে। দূরে একটা জাহাজ নোঙর ফেলে আছে, জাহাজ থেকে কেউ আসবে। ওরা সারা-রাত, দরজা খুলে দেবে বলে জেগে বসে আছে। যদি বসন্তনিবাস এসে ফিরে যায়। রিন-রিন্ করে তখন বসন্তনিবাসের মাথায় একটা আশ্চর্য বাজনা বাজতে থাকে। মানুষের সুখ-দুঃখের অতীত এক জাদুকরের বাজনা, সে তখন জেগে নিজের ভেতরই নিজে বিভোর হয়ে থাকে। তার আর কিছু ভাল লাগে না।

    কখনও সে স্বপ্নে দেখতে পায় সমুদ্রে ঝড় উঠলেই ম্যান্ডেলার মা ভীষণ দুঃখী। ঝড় উঠলেই বুঝি ম্যান্ডেলার বাবার কথা খুব বেশি করে মনে পড়ে যায়। এবং যেবারে ওর বাবা ক্যাঙ্গারুর বাচ্চাটা নিয়ে এসেছিল সেকি আনন্দ আর উৎসব বাড়িতে। সারাক্ষণ বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে, তখন তো ম্যান্ডেলা আরও ছোট, সে বাচ্চাটাকে সামলাতে পারত না, ফাঁক পেলেই দু’ লাফে পালিয়ে যেত এবং এক রাতে যখন বাচ্চাটাকে খুঁজে পাওয়া গেল না, ম্যান্ডেলার কি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না! কিন্তু সকালে কি আশ্চর্য, দরজা খুললে ম্যান্ডেলা দেখতে পেয়েছিল বাচ্চাটা গুঁড়ি মেরে দারজার কাছে শুয়ে আছে। ম্যান্ডেলা বলেছিল, সেবারই যে বাবা জাহাজে গেল আর ফিরে এল না। স্বপ্নে বসন্তনিবাস সে-সব হুবহু দেখে গুম মেরে বসে থাকত। তার কিছু ভাল লাগত না।

    স্বপ্নে মাঝে মাঝে ম্যান্ডেলার সঙ্গে কথাবার্তা হলে সে শুনতে পায়, ম্যান্ডেলা করুণ মুখে বলছে, তারপর আর বাবা ফিরে এল না। মা বিছানা নিলে। মনে হয়েছিল মা বাঁচবে না। যেমন বাবা সমুদ্রে চলে গেছে মা’ও তেমনি একদিন কোথাও চলে যাবে।

    বসন্তনিবাসের তখন কতরকমের ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে হয় পৃথিবীর কোথাও থেকে সে একটা জাদুকরের টুপি নিয়ে আসবে মেয়েটার জন্য, ক্যাঙ্গারুর বাচ্চাটার জন্য একটা ঘন্টা। ম্যান্ডেলা টুপি পরলেই যেখানে খুশি চলে যেতে পারবে, সঙ্গে ওর প্রিয় ক্যাঙ্গারুর বাচ্চা হাইতিতি। ম্যান্ডেলা আর হাইতিতি বাতাসে ভেসে যাবে, এবং সঙ্গে সে। তারপর পৃথিবীর যেখানে যত দ্বীপ আছে, খুঁজে দেখবে কোথায় আটকা পড়েছে মানুষটা। যেন হাইতিতি গন্ধ শুঁকে টের পেয়ে যাবে এবং পেলেই ওরা কোনো নির্জন দ্বীপে পাহাড় গাত্রে দেখতে পাবে মানুষটা দাঁড়িয়ে তার মেয়ের ছবি আঁকছে। নির্জন দ্বীপে সে সময় পেলেই বালিয়াড়িতে অথবা পাহাড়ের গায়ে মেয়ের ছবি এঁকে যায়। তার শরীরে পাতার পোশাক। ঘাসের কুটিরে সে থাকে। কচ্ছপের ডিম খেয়ে মানুষটা বেঁচে আছে দ্বীপে।

    আর যা ভাবে বসন্তনিবাস, যেন মানুষটাকে নিয়ে ফিরতে পারলেই, ম্যান্ডেলার মা’র অসুখ সেরে যাবে। ম্যান্ডেলাকে ফেলে কোথাও আর চলে যাবে না।

    রাতে আবার সে স্বপ্ন দেখল! ম্যান্ডেলার জন্য সে নিয়ে গেছে জাদুকরের টুপি আর হাইতিতির জন্য একটা ঘন্টা। জানালায় দাঁড়িয়ে আছে ম্যান্ডেলা। চারপাশে সাদা জ্যোৎস্না। আর গীর্জায় ঘন্টা বাজছিল। সমুদ্র থেকে এলোমেলো বাতাসে সবুজ পাইনের বন যেন উড়ছে। বসন্তনিবাস বাতাসে ভাসতে ভাসতে পাইনের বন পার হয়ে গেল। এবং ঠিক জানালার পাশে ছোট্ট উইলোর ঝোপে নেমে ডাকল, ম্যান্ডেলা, হাইতিতি। জানালায় ম্যান্ডেলা, ওকে দেখে চিনতে পারছে না। সে যত বলছে, আমি বসন্তনিবাস, আমাকে চিনতে পারছ না? হাইতিতি পিট্‌পিট্ করে তাকাচ্ছে আর তখনই ম্যান্ডেলা দৌড়ে বের হয়ে বলছে, কোথায় তুমি, তোমাকে তো দেখতে পাচ্ছি না। আর তখনই বসন্তনিবাসের মনে হয়, সে তার মাথার পালকটা খুলে না ফেললে ম্যান্ডেলা দেখতে পাবে না। যেই না খুলে ফেলা, বসন্তনিবাস জ্বলজ্বল করে উঠল। বলল, মা কোথায়?

    ম্যান্ডেলা বলল, বসন্তনিবাস তুমি কী সুন্দর, বসন্তনিবাস তুমি পাতার পোশাক পরে আছ কেন?

    —তোমার মা কোথায়?

    —মা ছুটি কাটাতে মারুয়াতে গেছে।

    —সেটা আবার কোন দ্বীপ?

    —সাউথ আয়লান্ডে।

    —আমরা ওখানে এখন যেতে পারব না?

    —অনেক দূর।

    —তুমি কার সঙ্গে থাকো?

    —বুড়ি মা আছে। ড়াকব?

    —না না ডাকতে হবে না। এটা তুমি রাখো। এটা মাথায় পরলেই তুমি বাতাসে ভেসে যেতে পারবে। কেউ দেখতে পাবে না। ঘন্টাটা হাইতিতির গলায় ঝুলিয়ে দেবে। সেও তোমার সঙ্গে যেখানে খুশি ভেসে যেতে পারবে। কেউ দেখবে না। কেবল ঘন্টা বাজবে। লোকে শুনতে পাবে বাতাসে ঘন্টা বাজছে। আর কিছু বুঝতে পারবে না। বাতাসে ঘন্টা বাজলেই পৃথিবীর লোকেরা বুঝতে পারবে ম্যান্ডেলা তার বাবাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সঙ্গে তার প্রিয় ক্যাঙ্গারুর বাচ্চা হাইতিতি।

    —তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে না?

    —আমিও থাকব।

    —কি মজা হবে। বলেই সে লাফাতে লাফাতে বসন্তনিবাসের কাছে চলে গেল। টুপিটা মাথায় পরে ফেলতেই হঠাৎ একটা ঘুড়ির মতো বোঁ করে ওপরে উঠে গেল। ভেসে যাচ্ছে। ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল, বসন্তনিবাস, আমি উড়ে যাচ্ছি। আমি পড়ে যাব। মরে যাব।

    বসন্তনিবাস হাসল, তুমি যা ইচ্ছে করবে, বলবে। যা বলবে, টুপিটা তাই শুনবে।

    —আমি নামব। কোথাও আমি যাব না।

    —কোথায় নামবে বল।

    —বাড়িতে।

    একেবারে ছোট্ট পুতুলটির মতো নেমে এল ম্যান্ডেলা। বসন্তনিবাস ম্যান্ডেলাকে তারপর কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াল সারা শহর যেখানে যত খাবার সব তিনজনে মিলে গর্ গর্ করে খেয়ে ফেলতে থাকল। যত প্লাস্টিকের খেলনা সব কিনে সে উজাড় করে ফেলল। যত সুন্দর সুন্দর পোশাক সব সে ম্যান্ডেলার জন্য কিনে ফেলল। যেন ম্যান্ডেলাকে পৃথিবীর সবকিছু দিয়ে যেতে পারলে তার আর দুঃখ থাকবে না।

    সে বলল, ম্যান্ডেলা আর ভয় পাবে না?

    ম্যান্ডেলা বলল, না।

    —ভয় পেলে আমাকে ডাকবে। আমি চলে আসব। কেমন!

    মেয়েটা ঘাড় কাত করে তাকাল। বলল, আচ্ছা। তারপর কেমন কুয়াশার ভেতর ম্যান্ডেলা এবং হাইতিতি হারিয়ে যেতে থাকল। আর মনে হল, কেউ ডাকছে তাকে। সে চোখ মেলে কিছুতেই তাকাতে পারছে না। সে বুঝতে পারছে এক নম্বর পরীর গ্রীজার ওকে জাগিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। এমন সুন্দর স্বপ্নটা তার নষ্ট হয়ে গেল। সে জেগে চুপচাপ শুয়ে থাকল। স্বপ্নের উষ্ণতা তার শরীরে লেগে আছে এখনও। প্রপেলার সমুদ্রের অতলে ঘুরছে, তার শব্দ পাচ্ছে শুয়ে। বোধহয় সমুদ্রে সামান্য ঝড়-ঝঞ্ঝা উঠেছে। পোর্ট-হোল দিয়ে জল নেমে আসছে নিচে। সে উঠে পোর্ট-হোল বন্ধ করে দিল। এবং এই হয়, জাহাজ প্রায় তিনদিন আগে বন্দর পাবার কথা। বন্দর পাচ্ছে না। ভয়াবহ কিছু ঘটছে জাহাজে, তারা কেউ তা বুঝতে পারছে না।

    আর এ-সবে এখন তার কিছু আসে যায় না। বরং সে এখন এভাবে কেন জানি পৃথিবীতে একজন সত্যিকারের বসন্তনিবাস হয়ে বাঁচতে চায়। তার আবার কখনও ইচ্ছে হয়, চুপচাপ এভাবে সারাজীবন সমুদ্রে ভেসে বেড়াবে—ডাঙায় নামবে মাঝে মাঝে, দু’হাতে সব সুন্দরী মেয়েদের সাপ্টে খেয়ে ফেলবে, আবার কখনও মনে হয়, ওর তো কিছুই নেই পৃথিবীতে, বরং সে ম্যান্ডেলার জন্য একটা পাতার বাঁশি কিনবে। ওয়াকা, সে আর ম্যান্ডেলা এবং সেই হাইতিতি মিলে একটা সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলবে। তারপর মনে হয়, কেউ তো তার জন্য অপেক্ষা করে নেই। শরীরে বিজবিজে ঘা দেখা দিচ্ছে ফের। যেন তার খারাপ ইচ্ছেগুলো যখন মাথানাড়া দিয়ে ওঠে তখনই বিজবিজে ঘা তার শরীরে একটা সবুজ ঘন ঘাসের বীজের মতো ছড়িয়ে থাকে এবং যখন যেমন খুশি সুড়সুড়ি দিচ্ছে, তখন শুধু মদ্যপান আর কখনও সমুদ্রের ধারে ধারে ঘুরে বেড়ানো। বাতাসে দু’হাত তুলে সমুদ্রকে বলা, কি আরাম জীবনধারণে। ওর এক হাতে সেই বড় মাপের জনি-ওয়াকার, সে সেটা যেন আকাশের অথবা সমুদ্রের মাথায় বাড়ি মেরে সহজেই ভেঙে ফেলতে পারে।

    সে পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে এমন সবই কেবল ভাবছে। ছোটবাবুর সঙ্গে কতদিন যেন দেখা হয় না। দুই গ্রহের এখন মানুষ তারা। আগে তবু খোঁজখবর নিত। আজকাল প্রায় সে এদিকটায় আসেই না। একবার ইচ্ছে হয় ছোটবাবুকে সে ডেকে বলে, খুব বড় হয়ে গেছিস না। আমি আর কেউ না? আমরা বাদে জাহাজে আর তোর কে ছিল। কেমন ওর পৃথিবীতে এভাবে সবার ওপর আশ্চর্য অভিমানে চোখ ফেটে জল আসে—আমি আর থাকব না জাহাজে। দেখবি, এবারে ঠিক নেমে যাব। আমাকে তোরা কেউ খুঁজে পাবি না।

    তারপর ফের ভেবে ফেলে, কি সব আজেবাজে সে ভাবছে। ছোটর তো এখন অনেক কাজ, অনেক দায়িত্ব। জাহাজের মেরামত সারাদিন লেগে আছে। নিঃশ্বাস ফেলারই সময় নেই। দেখা করবে কখন আজ সকালে ওয়াচ থেকে ফিরে এসে শুয়ে পড়বে না। জেগে থাকবে। ছোটর সঙ্গে দেখা করবে। বলবে, ছোট তুই আমাকে চিনতে পারিস? আমি তোর মৈত্রদা। ভুলে যাসনি তো।

    সকালে মৈত্র দেখা করতে গেলে ছোট বলল, আমি তোমাকে ভুলব কি করে! আমি রোজই ভাবি। একবার তোমার ফোকসালে যাব। কিন্তু কি যে হচ্ছে জাহাজে, তুমি দেখছ তো সারাক্ষণ এটা ভেঙে যাচ্ছে, ওটা ভেঙে পড়ছে। কখন কি হবে কেউ বলতে পারে না। তারপরই সে কেমন সতর্ক হয়ে যায়। এসব কথা বলা অনুচিত। একান্ত গোপন খবর, মাঝে মাঝে বনি তাকে কিছু কিছু বলে ফেলে। বনি! আশ্চর্য নাম। ওর কেবল বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, দাদা, জ্যাক তো ছেলে নয়। মেয়ে। তোমরা মনে মনে যা ভাবো ঠিক। বোধ হয় গোপন থাকছে না। কারণ এখন তো সে দেখলেই বনিকে বুঝতে পারে, বনি যতই ঢোলা পোশাক পরে থাকুক, ওকে পুরুষ মনে হয় না। ওর শরীরের গঠন একটু মনোযোগ দিলেই বোঝা যায় পুরুষের শরীর এমন হবে কেন। বুকের নিচু অংশে কেমন সহসা সমান্তরাল এবং সামান্য বেশ বেখাপ্পা লাগে দেখতে। এটাও হতে পারে, জাহাজে একজন মেয়ে থাকবে ভাবতেই ভীষণ বিস্ময়। বরং ওর শরীরে একটু অন্য মেজাজ আছে, মেয়ে মেয়ে ভাব আছে এই পর্যন্ত। তবু একবার সংগোপনে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, আচ্ছা দাদা, জ্যাককে তোমরা কি ভাবো! তারপর আর যা মনে হয় সে তো বার বার পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েও প্রথমদিকে বিশ্বাস করতে পারেনি জ্যাক মেয়ে। আজগুবি ভাবনা ভেবে সে বার বার জ্যাককে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। এবং যা হয়ে থাকে, জাহাজে উঠে কেমন সমকামিতায় পেয়ে বসে। সব পুরুষের শরীরে তখন মেয়ে মেয়ে গন্ধ—জ্যাক তো অসামান্য সুন্দরী, নীলাভ বড় চুল, ঢোলা কিছুটা বেল-বটসের মতো পোশাক, সহজেই মেয়ে ভাবতে ভাল লাগে। দুৰ্বলতা এভাবে উঁকি মারবে বেশি কি?

    ছোট বলল, বিকেলে আমরা বন্দর পাচ্ছি দাদা।

    —ক’দিন থেকেই তো শুনছি।

    ছোটবাবু বলতে পারত, কম্পাস রিডিং-এ বেখাপ্পা ডিভিয়েশান। ভুতুড়ে জাহাজ, সমুদ্রে সবাইকে ঘুরিয়ে মারছে। কাপ্তান কিছুতেই সেটা স্বীকার করছে না। কেবল অফিসারদের ধমকের ওপর রাখছে। কেউ এদিক-ওদিক কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না। ছোটবাবু বলল, ঠিক আমরা বন্দর,পেয়ে যাব।

    এবং বিকেলে ওরা ঠিকই বন্দর পেয়ে গেল। দ্বীপ দেখে কেউ নিচে ছিল না। সবাই ওপরে উঠে এসেছে। সামোয়ার গেটওয়ে দেখা যাচ্ছে। নিউ-প্লিমাউথ থেকে জাহাজ চোদ্দ দিনের মাথায় বন্দর পাবে কথা ছিল। কিন্তু হিসাব করে দেখা গেল সোজা তিন হপ্তা লেগে গেছে। পাগো-পাগো শহরের ইট কাঠ দালান, পাহাড়ের ছায়া এবং গাছের জঙ্গল ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

    ওরা ক্রমে, দেখতে পেল, এখানে বন্দর বলতে তেমন কিছু নেই। জাহাজ নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে থাকে। সামনে ছোট ছোট পাহাড়। তারপর ওরা দেখতে পেল, জাহাজ ক্রমে আরও এগিয়ে যাচ্ছে। থামছে না। রাত নেমে আসে। বন্দরে জাহাজ কেন যে নোঙর ফেলছে না।

    আসলে জাহাজটা ওখানে নোঙর ফেলার কথা না। দ্বীপের পাশে পাশে জাহাজ চলছে। এতদিন জাহাজ সোজা উঠে এসেছে প্রায় পঁচানব্বই ডিগ্রীতে। এখন জাহাজ সোজা বাইশ ডিগ্রীতে ঘুরে যাচ্ছে। ওরা গেটওয়ে পার হয়ে ওয়েস্টার্ন সামোয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরদিন দুপুরের দিকে এরা ঠিক ঠিক বন্দর পেয়ে গেল। বন্দর বলতে কিছু অবশ্য দেখা যাচ্ছে না। সারি সারি পাহাড় এবং দীর্ঘ বালিয়াড়ি ডান দিকে। সমুদ্রে মাছ ধরার নৌকা। অসংখ্য নারকেল গাছ আর সেই আনারসের খেত। তাহিতির মতো প্রায় হুবহু দেখতে দ্বীপটা। বোধ হয় সাউথ প্যাসিফিকের সব দ্বীপগুলোর গাছপালা অথবা তার ছোট ছোট পাহাড় এবং উপত্যকায় সব বর্ণময় ফুল ফুটে থাকা—একরকমের। ওরা দাঁড়িয়ে ছবির মতো দ্বীপ এবং দ্বীপবাসীদের দেখার চেষ্টা করছিল। ডেভিড তেমনি বাইনোকুলার নিয়ে বসে গেছে। সে আঁতি-পাতি করে খুঁজছে একটা মেয়ে। ছোটবাবু চলে যাচ্ছিল পাশ কাটিয়ে। সে আজ বলল না, এনি ওম্যান সেকেন্ড। সে কেমন নির্বিকার। ডেবিড মনে মনে হাসছে। জ্যাককে ভীষণ ভয় ছোটবাবুর।

    তা যা হোক জ্যাক দাঁড়িয়েছিল চার্ট-রুমের দরজায়। এখন যতটা সম্ভব ডেবিড লুকিয়ে থাকতে চায়। জাহাজ বাঁধাছাদা হলে সে যেমন একা নেমে যায় অথবা সঙ্গে ছোটবাবু, ছোটবাবু থাকলে বেশ জমবে ভাল। সামোয়ান মেয়েরা বেঁটে হলে কি হবে, ভারি মজবুত। রং তামাটে, তা হোক—ওরা যখন গ্লাসে কাভা ঢেলে দেয় কি যে সুন্দর, এবং আশ্চর্য নেশা, গাছের মূল থেকে তৈরি মদ, কিছু লবস্টার বাদাম তেলে ভাজা, ভারী মনোরম খেতে। সে কিছুতেই জ্যাকের পাল্লায় পড়ে যাবে না। যেন শিশু নাবালকটিই আছে বোঝে না কিছু, জানে না কিছু। আমি নেই এর ভেতর। আমি বাপু পারব না, অন্য কাউকে দ্যাখো। সে যাতে জ্যাক দেখতে না পায়, দেখে ফেললেই বাবাকে আবদার করবে, আমি ডেবিডের সঙ্গে যাব। ভারি বয়ে গেছে, এমন একটা বেয়াদপ ছোকরাকে নিয়ে ঘুরতে। সে প্রায় বোটের নিচে কিছুটা হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে গেল। যেন কিছুতেই ওকে কেউ দেখতে না পায়।

    তখন ছোটবাবু ডাকছিল, এলবা। তুমি কোথায়। সে পকেটে খাবার নিয়ে এলবাকে খুঁজছে। আশ্চর্য, পাখিটা দ্বীপের কাছাকাছি এসে আবার কোথায় হারিয়ে গেল। সে সকালেও দেখেছে জাহাজের পেছনে এলবা উড়ে আসছে। এখন কোথাও নেই। সে তাড়াতাড়ি বোট-ডেকে উঠে সোজা বাইনোকুলারটা ডেবিডের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল। তারপর যতদূর চোখ যায় দেখছে, চারপাশে সে খুঁজছে—কোথায় এলবা! নেই। কেবল অসংখ্য ছোট ছোট পাখি, কবুতরের মতো, কখনও ওর দূরবীনের কাঁচে পড়ে ভীষণ বড় হয়ে যাচ্ছে, আবার খালি চোখে ভীষণ ছোট হয়ে যাচ্ছে। প্রায় সাদা পায়রার মতো সমুদ্রে ঝাঁকে ঝাঁকে বসে থাকছে আবার উড়ে যাচ্ছে। অতিকায় সোনালী ডানার পাখিটা কাছে কোথাও নেই। থাকলেও গভীর সমুদ্রে কোথাও বসে রয়েছে। ভেসে বেড়াচ্ছে, ডুব দিয়ে হয়তো নীল জলে ছোট ছোট মাছ ধরে খাচ্ছে। ডাঙার কাছাকাছি পাখিটা কিছুতেই কেন যে থাকতে চায় না!

    আবার মনে হয়, হয়তো পাখিটা শেষ পর্যন্ত জাহাজ ছেড়ে চলে গেল। কিন্তু বার বার দেখেছে জাহাজ গভীর সমুদ্রে ঢুকে গেলেই এলবা পেছনে উড়তে থাকে। যেন কোথাও ওৎ পেতে বসে থাকে, কখন জাহাজ আবার সমুদ্রে ভেসে পড়বে। এই নিয়ে তিন তিন বার এলবা ডাঙা এলে নিখোঁজ হয়ে গেছে। ওর মনটা কেমন ভার হয়ে গেল। এবং একদিন সে সত্যি দেখবে পাখিটা আর জাহাজের পেছনে উড়ছে না। এ-সব মনে হলেই তার ভাল লাগে না। জ্যাক ওপরে দাঁড়িয়ে তখন ডাকল, হাই।

    ছোটবাবু ওপরে তাকাতেই দেখল, ঠিক মাথার ওপরে জ্যাক। খুব হাসছে।

    ছোটবাবু বলল, হাসছ কেন!

    —আমরা বিচে যাচ্ছি।

    —বিচে মানে?

    —বারে, দেখতে পাচ্ছ না। কত সুন্দর বিচ্ সামনে।

    —আমি যাচ্ছি মৈত্রদাকে নিয়ে।

    —তুমি যাবে না আমাদের সঙ্গে?

    —না। আমি মৈত্রদার সঙ্গে যাব। সে বলতে চাইল, তোমার খুশিমতো আমি কিছু করব না। সে একটু শক্ত হতে চাইল।

    —বাবা নিয়ে যাবে।

    ব্যাস মুখ চুন হয়ে গেল ছোটবাবুর। সে বলল, এই।

    —কি!

    —নিচে এস না।

    —কি হয়েছে। বনি সোজা নিচে এসে বলল।

    —আমি যেতে পারব না। একটু ম্যানেজ কর না।

    —আচ্ছা বাবাকে বলব।

    —আরে শোনো। তুমি বলবে না যেন আমার যেতে ভাল লাগছে না।

    —বলব না।

    —আরে শোনো, এত লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে যাচ্ছ কেন। আমাকে সবটা বলতে দাও।

    —বল। সিঁড়িতে উঠতে উঠতে বনি থেমে গেল। এবং সেই নীলাভ সমুদ্রে তখন ছোট ছোট ঢেউ। দুরন্ত বালিকার মতো চঞ্চল।

    —বড়-টিণ্ডালের শরীরটা ভাল না। আর সে হয়তো বলেই ফেলেছিল, ডাক্তারের কাছে আবার যেতে হবে। কিন্তু খুব বুদ্ধিমানের মতো বলল, বুঝতে পারছ তো বড়-টিণ্ডালের মাথাটা গেছে। আমাদের তো জাহাজে কেউ নেই। আমরাই আমাদের সব। বড়-টিণ্ডালকে নিয়ে একটু শহরটা ঘুরব।

    বনি উঠে যাচ্ছিল। কিছু না বলেই সিঁড়ির শেষ ধাপে উঠে যাচ্ছে। ছোটবাবু সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে বেশ জোরে বলল, এই জ্যাক, তুমি কিছু বললে না!

    —কি বলব!

    —তিনি আবার রাগ করবেন না তো?

    —সে আমি কি জানি!

    —ধুস্। যত সব বাজে ব্যাপার। এই জ্যাক, তুমি নিচে এস বলছি।

    জ্যাক আবার সুড়সুড় করে নেমে এল।–শোনো, তুমি সব পার। তুমি শোনো। এখানে এস, বসি বলেই বসতে যাবে যখন, দেখল, বোটের নিচে ডেবিড হামাগুড়ি দিচ্ছে। ডেবিড পালাতে চাইছে। ছোটবাবু অবাক, ডেবিড এ-ভাবে হামাগুড়ি দিচ্ছে কেন?—কি ব্যাপার! সে ডাকল, ডেবিড তুমি এখানে কি করছ!

    ইশারায় কথা বলতে বারণ করে ডেবিড ও-পাশে লাফ দিয়ে নেমে গেল। বনি হেসে দিল।—ডেবিড ভেবেছে ওকে নিয়ে আমি শহর ঘুরতে যাব। তারপরই কেমন মুখ ভারী করে ফেলল জ্যাক। সে বলল, আসলে তোমরা কেউ আমাকে পছন্দ কর না ছোটবাবু। মাঝে মাঝে কি যে খারাপ কাজ করে ফেলি!

    —আরে না না। তুমি যে কি না, তুমি আবার খারাপ কাজ কোথায় করতে গেলে!

    —আমি খুব খারাপ মেয়ে। তুমি না বললেও এটা বুঝি। আমার রাতে কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না। কেবল সারারাত কি যে আজেবাজে স্বপ্ন দেখি।

    ছোটবাবু বলল, স্বপ্ন দেখলে খারাপ হয় না। সবাই স্বপ্ন দেখে। আমিও দেখি। যে স্বপ্ন দেখে না সে মানুষ না।

    বনি বলল, জানো, শহরটার খুব সুন্দর নাম—আপিয়া।

    ছোটবাবু বলল, হাওয়াই থেকে অস্ট্রেলিয়ায় যাবার মাঝা মাঝি সমুদ্রে এমন একটা সুন্দর শহর আছে কে বলবে!

    বনি বলল, আমার কতরকমের ইচ্ছে হয় ছোটবাবু।

    ছোটবাবু বলল, সেটা সবারই হয়। আমার হয় না!

    —তোমার মনে আছে ছোটবাবু তাহিতিতে দু’জোড়া ফিন্ কিনেছিলাম। দু’টো মাছ মারার বর্শা

    —হ্যাঁ। সত্যি তো। ওগুলো কোথায়?

    —আছে।

    –দেশে গিয়ে সমুদ্রে বেশ মাছ ধরতে পারবে। কাজে লাগবে, নষ্ট হবে না।

    বনি পারলে যেন এক্ষুনি দৌড়ে পালায়। এমন নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ সে জীবনেও দেখেনি। বনি আর বলতে পারল না, ও দু’টো তোমাকে নিয়ে সমুদ্রে সাঁতার কাটব বলে কিনেছিলাম। সমুদ্রের নিচে মাছ ধরব বলে কিনেছিলাম। তুমি আমি। আর কেউ না। বনি তো বুঝতে পারছে না, ছোটবাবু কিছুতেই আর আশকারা দিতে চাইছে না। কারণ, ছোটবাবু শুধু একবার বলেছিল সে জেগে থাকে। কখন দরজায় বনি এসে না জানি বলবে, দরজা খোলো। তারপর থেকে যেন গভীর রাতে শুনতে পায়, বনি দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকছে। আর তারপরই বনি জাহাজে যা করল! কোনো ভয়ডর নেই। এত মরিয়া হয়ে উঠলে ভাল লাগে! ছোটবাবুর তো ভয় করারই কথা। সে তো আর কাপ্তানের ছেলে নয় যে যা খুশি করতে পারবে। অথচ কোনো দোষ হবে না। এবং সেই এক ভয় থেকে সে যেন আবার যতটা পারছে, দূরে থাকতে চাইছে। যদিও সে জানে, বনিকে নিয়ে, যে কোনো জায়গায় চলে যাবার মতো রোমাঞ্চ সে আর কিছুতে পাবে না। এবং সে চোখ বুজলেই টের পায় বনি পরেছে সোনালী জ্যাকেট, লম্বা স্যু, পাজামা আর মোটা বেল্ট কাউ-বয়দের মতো, সমুদ্রের পাড়ে পাড়ে ওরা দু’জনে কেবল ছুটছে।

    খুব হতাশ গলায় বনি বলল, আমি যে খারাপ বাবাও বোধ হয় টের পেয়েছে।

    সঙ্গে সঙ্গে ছোটবাবুর মুখ একেবারে ব্যাজার হয়ে গেল। তবে কি কাপ্তান টের পেয়েছেন, সেও ভাল ছেলে নয়। সে বনির সব দেখে ফেলেছে। ছোটবাবু বলল, আমার কথা কিছু বলেছেন?

    বনি বুঝতে পারল ভীষণ স্বার্থপর ছোটবাবু। সে নিজেকে ছাড়া কিছু আর ভাবে না। তার বলতে ইচ্ছে হল, হ্যাঁ বলেছেন। তুমি এমন দামী সার্টিনের গাউন ফালা ফালা করে দিয়েছ, আমি বুঝি চুপ করে থাকব! বাবা সব জানে। বাবা তোমাকে গিলোটিনে দেবে বলেছে। তারপরই ওর আবার কি যে হয়ে যায় ভেতরে—সে ছোটবাবুকে নিয়ে কখনও এমন নিষ্ঠুরতার কথা ভাবতে পারে না। ছোটবাবু কিছুই বুঝতে পারে না। দুঃখে চোখ তার ভারী হয়ে আসছে। সে বলল, ছোটবাবু তুমি কবে মানুষ হবে!

    —কেন কাপ্তান যে আমাকে বলেন, তুমি খুব বড় হবে। সারেঙ যে বলে, তুই আমার মান রেখেছিস! মানুষ হয়ে গেছিস। কিন্তু বনি কোনো সাড়া দিচ্ছে না। বনি কেমন সামান্য ঝুঁকে বসে রয়েছে! ওর মুখ দেখা যাচ্ছে না। ওর সুন্দর হাত, আর আঙ্গুলগুলো একেবারে কাছাকাছি মাখনের ছোট ছোট স্লাইস যেন। সজীব আর তাজা! গোলাপী আভা মুখে। ভেতরে ভেতরে ছোটবাবু এসব দেখলে মাঝে মাঝে একেবারেই স্থির থাকতে পারে না। বনি সামান্য আহত হলে ওর ভেতরটা কেমন কাঁপে। তখন নুয়ে বনির সব মুখটা না দেখতে পেলে সে কেমন অস্থির হয়ে পড়ে।

    বনি তবু কোনো কথা বলল না। সে মুখ নিচু করে রেখেছে। এবং ওপরে চার্ট-রুমে কাপ্তান। চিফ- মেট দেখে গেল ওরা দু’জনে পাশাপাশি বসে আছে। এখন ছুটির সময়। জাহাজ বাঁধাছাদা হয়ে গেলে প্রায় সবারই ছুটি হয়ে যায়। এতদিন সমুদ্রে এক-নাগাড়ে থেকে থেকে ওরা এখন সবাই যে যার মতো নেমে যাবে বন্দরে। কেউ কোনো প্রশ্ন করবে না। কেবল ওরা দু’জন এখনও চুপচাপ বোট-ডেকে বসে আছে। কেউ কথা বলছে না।

    ছোটবাবু বলল, বনি, কি হচ্ছে! কথা বলছ না কেন!

    বনি মুখ তুলে তাকাল। চুলের ভেতরে বনির মুখ দেখা যাচ্ছে। চোখে তার আশ্চর্য মায়া। ছোটবাবু বলল, এই বনি, তিনি কি টের পেয়েছেন!

    —জানি না।

    —তবে তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো কেন?

    —তোমাকে ভয় কোথায় দেখালাম!

    —বারে, তুমি খারাপ হলে আমি খারাপ হয়ে যাব না। আমি তো কিছু করিনি। এবং ছোটবাবুর মুখ চোখ ভীষণ কাতর দেখাল।

    বনি সামান্য হাসল। সে ছোটবাবুর দুঃখী মুখ একদম সহ্য করতে পারে না। সে যেন সাহস দিচ্ছে ছোটবাবুকে। শুধু বলল, বাবা টের পেয়েছে, আমি বড় হয়ে গেছি।

    —বললেন বুঝি, তুমি বড় হয়ে গেছ!

    –ডেবিডের সঙ্গে বেড়াতে বের হব বললাম। সঙ্গে তুমি থাকবে। তিনি রাজী হলেন না। বললেন, আমি যাব। আমার সঙ্গে তুমি চল। তারপর আমার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। কি ভাবলেন। বললেন, ছোটবাবুকে বল সে আমাদের সঙ্গে যাবে।

    ছোটবাবু বলল, তাহলে আমি যাব বনি। মৈত্রদার একটা ব্যবস্থা করে আসছি। বংকুকে বলে আসি, সে সঙ্গে থাকবে। বেশী দেরি হবে না। তুমি আমাকে ফেলে কিন্তু চলে যাবে না। সে পিছিলের দিকে ছুটে যেতে থাকল।

    এবং তারপর যা হয়ে থাকে, সবার মতো স্যালি হিগিনস, বনি, ছোটবাবু জাহাজ থেকে নেমে গেল। জাহাজ বয়াতে বাঁধা। ওরা মোটর-বোটে নেমে গেল। তখন আপিয়া শহরে বিকেলের রোদ। তখন নারকেল গাছে সমুদ্রের বাতাস, সামোয়ান নরনারীদের বিচিত্র পোশাক রোদে ঝিকমিক করছে। ওরা শহরে ঢুকে গেল। গাড়ি ওদের ঠিক করা ছিল। দু’পাশে সব পাহাড়ের ছায়া। সবুজ আভা গাছের জঙ্গল চারপাশে। সুন্দর সুন্দর সব পাহাড়ী ঘর-বাড়ি ছোট ছোট উপত্যকাতে। পেছনে বনি আর ছোটবাবু সামনে কাপ্তান স্যালি হিগিনস। ওরা বিচ্ ধরে কেউ হেঁটে গেল না। ওরা শহরের ভেতর ক্রমে ঢুকে যেতে লাগল।

    আর সব গল্প। যেতে যেতে স্যালি হিগিনস এই দ্বীপের সব প্রাচীন গল্প-গাথা এক এক করে বলে যেতে থাকলেন। কবে প্রথম সাতসমুদ্র পার হয়ে মিশনারিরা চলে এসেছিল। কবে এসেছিলেন রবার্ট লয়াস স্টিভেনশান। মার্গারেট মিড এবং সমরসেট মম সুযোগ পেলেই এখানে এসে কিছুদিন কাটিয়ে যান। যখনই তাঁদের কিছু ভাল লাগে না, এমন একটা বন্য পৃথিবীতে তাঁদের চলে আসতে ইচ্ছে হয়। কি সব গাছপালা আর সবুজ পাহাড় দ্বীপে, কখনও চারপাশে থাকে শুধু রকমারি পাথর। সামোয়ান বন্য মেয়েদের গলায় থাকে ফুলের হার। এরা ফুলের অলংকার পরতে ভীষণ ভালবাসে। এদের দীর্ঘদিনের বন্যজীবন যাপনে রয়েছে অদ্ভুত এক শান্তিপ্রিয় স্বভাব। এখনও নগর-সভ্যতা এদের জীবন নষ্ট করে দিতে পারেনি। চারপাশে নীল সমুদ্র, দূরে পাগো-পাগো দ্বীপের ভালবাসা আর রয়েছে অসংখ্য প্রবাদ এই দ্বীপ সম্পর্কে। আর এই সব বনাঞ্চলে আছে সবুজ এক গন্ধ। একবার এই সব গভীর বনে ঢুকে গেলে ফিরে যেতে ইচ্ছে হয় না। ভেতরে রয়েছে অরণ্য মানুষের বসবাস। তাদের ভালবাসায় পড়ে গেলে মানুষের আর রক্ষে থাকে না।

    তিনি কখনও একজন ভূতাত্ত্বিকের মতো কথা বলতে ভালবাসছেন। কখনও তিনি এদের জনসংখ্যা সম্পর্কে হুবহু বর্ণনা দিচ্ছেন। এই আটশ বর্গমাইলব্যাপী ভূখণ্ডে রয়েছে অজস্র ফসফেট। অস্ট্রেলিয়ার বড় বড় বন্দরগুলোতে ফসফেট নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের মতো এমনি অনেক জাহাজ শুধু সারা মাসকাল ফসফেট নিয়ে যায়। দু’লক্ষ লোকের বোধহয় এতেই চলে যায়। খুব কম এদের চাহিদা। আর যখন আছে চারপাশে এত বড় সমুদ্র তখন জীবনধারণের মতো সব কিছু তারা সহজেই পেয়ে যায়।

    তিনি বলে যাচ্ছিলেন, এখানে ডিসেম্বর আর এপ্রিল পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের সময়। তোমাদের ভাগ্য ভাল, আকাশ এত পরিষ্কার। এখন তো শুধু ঝড় আর বৃষ্টিপাতের সময়। আমেরিকান সামোয়া আমরা পেছনে ফেলে এসেছি। ওটার চেয়ে আমার এ-দ্বীপটা বেশী ভাল লাগে। সব গাছপালা দেখে আমার তো এখানেই থেকে যেতে ইচ্ছে করছে। তোমাদের ইচ্ছে করছে না?

    ছোট বলল, আমার খুব ইচ্ছে করছে।

    —জ্যাক তোমার?

    —আমার! সে কি বলবে ঠিক বুঝতে পারছে না। আমারও ইচ্ছে করে—কিন্তু বললেই যেন ধরে ফেলবেন, ছোটবাবুর জন্য তার ভীষণ টান। সে বলল, আমার ইচ্ছে করে না।

    ওদের গাড়ি তখন সমুদ্রের ধারে ধারে যাচ্ছিল। জ্যাক বুঝতে পারছে না বাবা তাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন। ছোটবাবুকে দেখলে মনে হয়, জীবনে ও যেন গাড়িতে চড়ার সুযোগ পায়নি। সে গাড়িতে উঠে বেড়াতে পারলেই খুশী।

    তবে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সে জানতে চায় না। পাশে সমুদ্র, সমুদ্রের ধারে ধারে গাড়ি বাঁক নিচ্ছে বার বার। আর ছোটবাবু বাচ্চা ছেলের মতো ভয় পাচ্ছে। বনি ওটা বুঝতে পেরে বলল, বাবা, ছাটবাবুকে এস আমরা এখানে নামিয়ে দি।

    স্যালি হিগিনস বুঝতে পারছেন, বনি ছোটবাবুকে নিয়ে মজা করছে। ছোটবাবু হয়তো এক্ষুনি বলে উঠবে, না স্যার, আমাকে নামিয়ে দেবেন না। নামিয়ে দিলে আমি জাহাজে ফিরতে পারব না। আর বোধ হয় এ-জন্যেই ছোটবাবুকে তাঁর ভীষণ ভাল লাগে।

    স্যালি হিগিনস বললেন, আমরা যাচ্ছি উপুলুতে। এখন মাদা-পাসের ভেতর ঢুকে যাব। দু’পাশে তখন দেখতে পাবে আশ্চর্য সব প্রস্রবণ। স্রোতস্বিনী নদীর মতো পাহাড় থেকে গড়িয়ে নামছে। আর দু’পাশে দেখবে কত সব বিচিত্র রকমের ফুল। যেন সারাটা পাহাড় ফুলের সমারোহে ডুবে আছে। আশ্চর্য ঘ্রাণ ফুলের। চারপাশটা ফুলের সৌরভে ম’ ম’ করছে।

    ওরা ক্রমে এভাবে পাহাড়ের চড়াই-এ উঠে যাচ্ছিল। অনেক নিচে সমুদ্র। কিছুক্ষণ বাদে জ্যোৎস্না ওঠার কথা। এজেন্ট-অফিসের গাড়ি, বিশ্বস্ত ড্রাইভার—আর অতিকায় গাড়ির বনেটে মাঝে মাঝে দু’টো একটা ফুলের পাপড়ি উড়ে এসে পড়ছে অথবা প্রজাপতির মতো অসংখ্য ফুলের পাপড়ি বাতাসে ভেসে যাচ্ছে। ছোটাবাবু এসব দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে যাচ্ছিল। সে যে একজন সামান্য বাঙালী, সে যে ক্লাস টেনে ওঠার আগে রেলগাড়ি দেখেনি, এবং যে-বার দেশ ছেড়ে চলে আসে তখন গোয়ালন্দ- মেলে মুরগীর মাংসের গন্ধ এবং মাঝে মাঝে পদ্মানদীর অতিকায় ঢেউ দেখে সে যে ভয়ে জ্যাঠামশাইকে জড়িয়ে ধরেছিল এখন তাকে দেখে কিছুতেই আর তা বিশ্বাস করা যায় না। সে পরেছে হাল্কা চকলেট কালারের স্যুট। কালো বো। চকচকে জুতো, বুটিদার মোজা, সাদা ফুল-শার্ট। বনির বার বার ওকে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল। ছোটবাবুর শরীর থেকে আবার সেই চন্দনের গন্ধ উঠছে। নরম নীল রঙের দাড়িতে হাত রাখলে বনি বুঝি গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়বে।

    বাবা পাইপ টানছেন। মাঝে মাঝে ছাই ছাইদানিতে ঝেড়ে ফেলছেন। দু’একজন সামোয়ান নারীপুরুষ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। গাড়িটা এত বেশি জোরে ছুটছে যে সব ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর সেই ড্যাং ড্যাং বাজনার মতো। স্যালি হিগিনস তাঁর স্ত্রী, তাঁর জাহাজ, সমুদ্রের ঝড় সব এভাবে ভুলে যেতে চাইছেন।

    —বুঝতে পারলে ছোটবাবু, উপুলুতেই রবার্ট লয়াস স্টিভেনশান বাড়ি বানিয়েছিলেন। তাঁর দেশে ফিরে যেতে আর ইচ্ছে হয়নি। মাউণ্ট ভিয়াতে তাঁর সমাধি আছে।

    ছোটবাবুর একবারও জানতে ইচ্ছে করছিল না কে এই স্টিভেনশান! সেতো সমরসেট মমের ‘অফ হিউমান বণ্ডেজ’ পড়েছে। এসব বই এখন জ্যাক ওকে সংগ্রহ করে দেয়। কখনও ডেবিড। তার চেয়ে চারপাশের দৃশ্যাবলী বেশী ভাল লাগছিল। পাশে জ্যাক। মাঝে মাঝে জ্যাক ওকে চুরি করে দেখছে। তখন কে স্টিভেনশন, কে মার্গারেট মিড, অথবা মাউণ্ট ভিয়াতে কার সমাধি আছে কিছু অসে যায় না। সে শরীর এলিয়ে দিয়েছে। ওর মাথার চুল উদাসীনভাবে বাতাসে ভাসছে। দ্বীপটা একজন লেখকের পক্ষে ভারী মনোরম জায়গা। তার মনে হল পৃথিবীতে শুধু লেখকদের সে হিংসে করতে পারে। সে তার এই সমুদ্রযাত্রায় যেসব বর্ণমালা দেখতে পেল কখনও তার হুবুহ বর্ণনা মানুষের কাছে যদি পৌঁছে দিতে পারত।

    তখন স্যালি হিগিনস বললেন, ঐ যে দেখছ, সমুদ্রে আর একটা দ্বীপ ভেসে আছে, মনে হয় আলাদা দ্বীপ, আসলে ওটা আলাদা নয় একেবারে। ছোট্ট সরু, এই ফুট পাঁচেকের মতো একটা প্রবালের রাস্তা আছে। তারপরই ছোট্ট দ্বীপে আমরা বসে কফি খাব। ইচ্ছে করলে সমুদ্রের জলে তখন তোমরা প্রচুর স্যামন মাছ দেখতে পারো। দ্বীপের চারপাশে এখন দলে দলে স্যামন মাছ ডিম পাড়তে আসবে। সমুদ্রের অতলে রুপোলী মাছের ঝাঁক দেখার জন্য বহু লোক এখানে চলে আসে। কখনও শোনা যায় এক বাজনা। পাথরের ফাঁকে নিচে দেখা যায় শুধু নীল জল। মাছগুলো সমুদ্রে যখন লেজ নেড়ে চলে যায়, বুঝলে আমার মনে হয়, ওখানে সব স্ফটিক স্তম্ভ আছে কোথাও, যার চারপাশে ঘুরে বেড়ালে মনে হয় আশ্চর্য অর্কেস্ট্রা সমুদ্রের নিচে কেউ অবিরাম বাজাচ্ছে।

    ছোটবাবু আর বনি দ্বীপে সেই জায়গাটা খুঁজে বেড়াল। স্যালি হিগিনস ওদের সঙ্গে হেঁটে পারছেন না। চারপাশে মনোহারিনী জ্যোৎস্না। আর শুধু পাথর। একটা গাছ নেই। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে নীল জল উজ্জ্বল আরশির মতো। একটা জায়গায় এসে ওরা থমকে দাঁড়াল। সমুদ্রের অতলে সুন্দর সব শব্দতরঙ্গ। ওরা কান পেতে শুনল, সত্যি সমুদ্রের অতলে কারা যেন কখনও উঁচু লয়ে, কখনও ধীরে ধীরে অর্কেস্ট্রা বাজিয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্য এক মিউজিক!

    ওরা তিনজন কতক্ষণ এভাবে সেই শব্দতরঙ্গের ধ্বনিতে অভিভূত ছিল, কতক্ষণ ওরা তিনজন সেই দ্বীপে চুপচাপ মাথায় হাত রেখে পাহাড়ে শুয়ে থেকেছিল মনে নেই—কেবল মনে আছে, হঠাৎ ড্রাইভার চিৎকার করে ওদের তিনজনকেই সচকিত করে দিয়েছিল, স্যার আপনারা দেরী করবেন না। সমুদ্রে জোয়ার আসার সময় হয়ে গেছে। এবার চলে আসুন। জোয়ার এলে সমুদ্রের নিচে দ্বীপটা ডুবে যাবে।

    তারপর স্যালি হিগিনস প্রায় পাগলের মতো বনি আর ছোটবাবুকে নিয়ে দৌড়েছিলেন। গাড়িতে উঠে বসেছিলেন। এবং জাহাজে ফিরে এসে শুনলেন বড়-টিণ্ডাল নিখোঁজ। বড় টিণ্ডালকে পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই ফিরে এসেছে কেবল সে আসেনি। জাহাজে তখন ভীষণ গোলমাল শুরু হয়ে গেছে।

  • একচল্লিশ

    একচল্লিশ

    ।। একচল্লিশ।।

    ছোটবাবু তখন ডেকের ওপর দিয়ে জোরে ছুটছে। যাকে সামনে দেখছে তাকেই বলছে, বন্ধু কোথায়। সারেঙ-সাব ছিলেন গ্যালির দরজায় দাঁড়িয়ে, ছোটবাবু সেখানে থেমে গেল, সামান্য দম নিল। বলল চাচা, বন্ধু কোথায়?

    —নিচে তো ছিল। বড়-টিণ্ডালকে পাওয়া যাচ্ছে না শুনেছিস?

    বড়-টিণ্ডালকে পাওয়া যাচ্ছে না, পাওয়া যাবে। গভীর রাতে হয়তো সে ফিরে আসবে একা একা। একজন জাহাজি মানুষ রাতে ফিরে আসেনি, সকালে ফিরে আসবে। সকালে ফিরে না এলেই ভাবনার কথা, কিন্তু মৈত্রদা বন্ধুর সঙ্গে ছিল, সহসা বন্ধু দেখেছে, শহরে ভিড়ের ভেতর মৈত্র পালিয়ে গেছে। জাহাজে ফিরে ছোটবাবু এ-সব শুনেছিল।

    তারপার আর যা শুনেছে, সেটা খুবই ভয়ের। বন্ধু মৈত্রদাকে হারিয়ে খোঁজখুঁজি করছে, করতে করতে আপিয়া শহরের শেষ প্রান্তে দেখেছে ছোট ছোট বালির ঢিবি, সেখানে সব খরমুজের রস পান করছে মেয়েরা, সেখানে মৈত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওর হাতে ছিল বড় মাপের একটা জনি-ওয়াকার। সে সেটা প্রায় বগলদাবা করে হাঁটছিল। ওর বিচিত্র পোশাক দেখে সবাই চোখ ট্যারা করে ফেলেছিল। এই যেমন শরীরে ছিল তার প্লাসটিকের খেলনা, সেফটিপিনে আটকানো সব নীল পাথরের মালা, ঝিনুকের পুতুল, হলুদ রঙের পাতার বাঁশি। এবং মাথায় লম্বা টুপি জোকারের মতো। সবাই, যেমন বুড়ো- বুড়িরা, অথবা যুবতীরা মৈত্রকে ঘুরে ফিরে দেখছিল। মৈত্র কথা বলছিল সবার সঙ্গে, সামোয়ান নারী-পুরুষেরা, অথবা কিছু বিদেশিনী যারা, খরমুজের রস চেটে খাচ্ছিল, তারা হাঁ করে দেখছিল।

    কিছু ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ওর পায়ে পায়ে ঘুরছিল। সে সবাইকে গুড-আফটারনুন বলছিল। আর কথায় কথায় ম্যাণ্ডেলার গল্প, তার মায়ের গল্প বলছিল। ম্যাণ্ডেলার বাবার জাহাজডুবির গল্প বলছিল। একটা দু’টো করে লজেন্স চকোলেট দিচ্ছিল ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের। কাউকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে নীল রঙের পাথরের মালা পরিয়ে দিচ্ছিল।

    বন্ধু কোনো কথা বলছিল না। দূরে, আড়ালে দাঁড়িয়েছিল। কারণ জায়গাটা ছিল মেলার মতো। অথবা যা হয়ে থাকে বিকেলে সবাই বালিয়াড়িতে নেমে আসে, সমুদ্রের সাঁ সাঁ গর্জন শুনতে শুনতে—খরমুজের রস খেতে ভারি মনোরম, রস চেটে খাবার সময় মৈত্রের নাম জিজ্ঞাসা করলে বলেছিল—মি. বসন্তনিবাস। বসন্তনিবাস কথাটা ওদের কাছে স্পষ্ট না বলে সে আবার বলেছিল, মি. ব…স…ন্ত…নি…বা…স। আণ্ডারস্ট্যাণ্ড?

    সবাই প্রায় বাউ করার মতো বলেছিল, ইয়েস ই বসনটো নি….বা….স। নিবাস।

    —ইয়েস মি নিবাস। বন্ধু সব সময় আড়ালে আড়ালে ছিল। দেখে ফেললেই ফের ছুটে কোথাও মৈত্র পালিয়ে যাবার চেষ্টা করল। গোপনে তাকে কেউ অনুসরণ করছে বুঝতে পারলেই আবার সে ছুটবে।

    জাহাজে ফিরে ছোটবাবু এমন সব নানাজনের কাছে শুনেছে। সবাই ডেকে উঠে এসেছে। কেউ বোধহয় নিচে নেই। এবং কি করা যায়, কাপ্তানের কাছে ইতিমধ্যে রিপোর্টে হয়ে গেছে। তিনি ব্রীজে অফিসারদের সঙ্গে বোধ হয় পরামর্শ করছেন। আর ছোটবাবু ঘরে ঘরে খুঁজে বেড়াচ্ছে বঙ্কুকে। বন্ধুর মুখ থেকে সব শুনতে না পারলে সে স্বস্তি পাচ্ছে না।

    —বন্ধু আছিস, বন্ধু!

    মনু বলল, এই তো এখানে ছিল। কোথায় গেল!

    আবার সে ডাকল, বন্ধু। বন্ধু কোথায়?

    ডেক-কশপ বলল, বন্ধু বোধহয় মেস-রুমে গেছে।

    কিন্তু ছোটবাবু ওপরে উঠে দেখল মেস-রুম খালি। করিডরে নানাজনের জটলা। কেউ চেঁচামেচি করছে, ভারী হট্টগোল, ওরা জাহাজে থাকবে না এমন বলছে। থাকলে বড়- টিণ্ডালের মতো ওরাও পাগল হয়ে যাবে। আসলে বড়-টিণ্ডালের কিছু হয়ে গেলে যেন ওরা আরও জোর পাবে। ওদের বিদ্রোহ করতে সুবিধা হবে। ছোটবাবুকে দেখে ফেললে সবাই চুপচাপ—একটা কথা বলছে না। কারণ ছোটবাবু তো আর ওদের সুখ-দুঃখ বুঝবে না। বেশ আরামে আছে, অফিসার মানুষ। ছোটবাবু ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালে সুবোধ বালক হয়ে যাচ্ছে সবাই।

    এ-ভাবে ঘুরতে ঘুরতে ছোটবাবু টের পেল, সবাই ওকে ক্রমে অবিশ্বাস করতে আরম্ভ করেছে। কেউ ওদের উসকে দিচ্ছে, কে দিচ্ছে বুঝতে পারছে না। ডেবিড উত্তেজিত হয়ে আছে। এক বছর আরও জাহাজে থাকতে হবে, সে সবাইকে গোপনে বড়-টিণ্ডালকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত করে রাখতে পারে। আসলে কেউ সঠিক বলতে পারছে না মৈত্রদার কি হয়েছে।

    এবং এ-সময়ে মনে হল, মাস্তুলের নিচে কারা দাঁড়িয়ে সংগোপনে অন্ধকারে সলাপরামর্শ করছে। ছোটবাবু বলল, বন্ধু তোকে খুঁজছি। মৈত্রদা কোথায়?

    বন্ধু বলল, জানি না।

    —জানি না মানে!

    —আমি কি করে জানব ছোটবাবু!

    —বন্ধু! এই প্রথম ছোটবাবু কেমন অহংকারী গলায় কথা বলল, আর যেন নতুন সে এক ছোটবাবু, সে আর আগের সেই ছোটবাবু নিরহঙ্কারী ছোটবাবু নয়। যেন কোনো এক জাদুবলে, ছোটবাবু, তার আত্মপ্রত্যয় খুঁজে পেয়েছে। সে বলল, ঠিক ঠিক বল, মৈত্রদা কোথায়! কোথায় ওকে শেষবারের মতো দেখেছিস! অহেতুক গুজব ছড়িয়ে সবার মাথা খারাপ করে দিস না।

    বন্ধু বলল, আমি তো তোর কথা মতো ওর সঙ্গেই ছিলাম। তারপর দেখি সে ভিড়ের ভেতর নেই। আমি কি করব!

    —আর খুঁজে পাস নি?

    —পেয়েছিলাম। ওর বগলে তখন একটা বড় মদের বোতল। সে সামান্য দম নিয়ে বলল, তারপর যা করে। একদল ছোট ছোট ছেলেপেলে। সে তাদের নিয়ে পাতার বাঁশি বাজাচ্ছিল। ঘুরছিল ফিরছিল। আড়ালে আড়ালে ওকে লক্ষ্য রাখছিলাম।

    —তখন ক’টা বাজে?

    —বিকেলে হবে। এই মানে সূর্য সমুদ্রে অস্ত যাচ্ছিল।

    —কোথায় তখন তোরা?

    সে বলল, বিচটা দেখছিস? বেশ লম্বা বিচ। অনেক দূরে কাল সকালে দেখা যাবে, দেখবি খুব দূরে একটা পাহাড়, সাঁকোর মতো সমুদ্রে ঢুকে গেছে। অতদূর যেতে হয় না। তার একটু এদিকে, সী-বিচে যারা বেড়াতে এসেছিল তাদের সঙ্গে পাগলামি করছিল মৈত্র। ওরা বেশ মজা পেয়ে ওকে সবাই বসন্তনিবাস বলে ডাকছিল।

    সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বন্ধু বার বার কতবার যে একটা কথাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেছে। চিফ-মেট ডেকে পাঠিয়েছিল বন্ধুকে। সে তাকে বলে এসেছে। ডেক-সারেঙ তাকে চিফ-মেটের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। যতটা পেরেছে সে ভাঙা ভাঙা ইংরেজীতে সবটা বুঝিয়ে বলতে চেয়েছে। ডেক- সারেঙ, আর পাঁচ-নম্বর, চিফ-মেটকে মাঝে মাঝে বিশদভাবে ব্যাপারটাকে আরো ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছে। চিফ-মেট সব লগ-বুকে নোট করে নিয়েছে। তারপর সেখান থেকে নেমে আসতেই মেজ- মিস্ত্রি আর্চি প্রায় অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসার মতো বলেছে, একে একে তোমরা সবাই যাবে। সেই অশুভ প্রভাব আবার জাহাজে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। বুড়ো হিগিনসকে আর মানতে চাইছে না। বন্ধু ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিল কথাটাতে। সে সবাইকে বলেছে, আর্চি বলেছে আমাদের কারো রক্ষা নেই। মৈত্রকে দিয়ে শুরু।

    কি শুরু কোথা থেকে শুরু—কী যে সব হচ্ছে জাহাজে ছোটবাবু কিছুই বুঝতে পারছে না। সবারই চোখ প্রায় জ্বলছে। একটা আজগুবি জাহাজে ওরা উঠে এসে বিপদে পড়ে গেছে এমন ভাব যেন! এনজিন-সারেঙ ভয়ে ভয়ে আছে। সে খুব জোর গলায় এখন কথা বলতে পারছে না। যাদের সে জোর করে কলার টেনে জাহাজে তুলে এনেছিল তারা সবাই যেন ওৎ পেতে আছে। সময় এবং সুযোগ এলেই গলা টিপে ধরবে এনজিন-সারেঙের। গ্যালিতে এনজিন-সারেঙ চুপচাপ ভীতু মানুষের মতো লুকিয়েছিল। ছোটবাবু এতক্ষণে যেন আঁচ করতে পারছে সব। আর বুঝি এ-ভাবেই জাহাজে কখনও কখনও বিদ্রোহ দেখা দেয়। কোনো কিছু ভাববার তখন আর জাহাজিদের ক্ষমতা থাকে না।

    ছোটবাবু প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছে সব। সে বলল, তারপর, তারপর কি?

    বন্ধু বলল, আমি তো জানি আমাকে দেখলেই দৌড়ে পালাবে।

    —দৌড়ে পালাবে বুঝলি কি করে?

    —মৈত্রকে বললাম আমার সঙ্গে বের হতে। বললাম ছোটবাবু তোমাকে একা বের হতে বারণ করেছে। মৈত্র তেড়ে মেরে বলল, ছোটবাবু কে। ছোটবাবু বলে কাউকে তো চিনি না। কি করি বল! তুই বলে গেছিস। অনিমেষও বলল, লক্ষ্য রাখা দরকার। কিন্তু কাকে লক্ষ্য রাখব! সোজাসুজি বলে দিল, আমার সঙ্গে কাউকে যেতে হবে না। আমার কিচ্ছু হয়নি।

    তারপর বন্ধু বলল, তুই ছোট জানিস, বেশি চেঁচামেচি করলে, হয়তো সারেঙ ঝামেলা করবে, একেবারেই নামতে দেবে না। আটকে রা।বে। ভাবলাম নেমে যাক, পেছনে পেছনে আমিও নেমে যাব। আর নেমে যেই না দেখল, আমি পেছনে আছি, কি খিস্তি! যা মুখে আসে। তারপর সেই শহরের একটা গোলমেলে জায়গায় এসে গেছি, দেখি মৈত্র নেই। অনেক দূরে একটা গলির ভেতর দিয়ে দৌড়াচ্ছে। আমি সঙ্গে থাকি কিছুতেই সে রাজি না।

    —সঙ্গে থাকলে পাগলামি করবে কি করে! তারপর কেমন চিৎকার করে ছোটবাবু বলল, কোথায় গেল তারপর?

    বন্ধু বলল, সত্যি জানি না। আমার যে কি লোভ হল! ভাবলাম একটু খরমুজের রস খাই। ভাঁড়ে সামান্য খরমুজের রস, তামাটে রঙ, কি যে খেতে সুস্বাদু ছোটবাবু, আর তখন দেখি, একদল লোক চেঁচামেচি করছে, ঐ যে চলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে! ফিরে দেখি অনেক দূরে একটা লোক পাহাড়ের সেই যে লম্বা সাঁকো আছে, তার নিচ দিয়ে সমুদ্রের দিকে ছুটে যাচ্ছে। ছোটবাবু আমি স্পষ্ট কিছু দেখিনি।

    —সমুদ্রের দিকে!

    —ওদিকে মাইলের পর মাইল সমুদ্রের ভেতরে সব অদ্ভুত বালির ঢিবি আছে। গাছপালা নেই। পাথর নানা রঙের। জোয়ার এলে সব ডুবে যায়।

    ছোটবাবু আবার বলল, তখন কটা বাজে?

    —আমি ঘড়ি দেখিনি। সূর্য ডুবে গেছে বলে সারা সমুদ্র তখন লাল ছিল ভীষণ।

    —তুই বুঝলি কি করে মৈত্রদা গেছে?

    —ওরা তো সবাই বলছিল আরে লোকটার দেখছি একদম মাথা খারাপ। কোথায় যাচ্ছে! এ- সময়ে ওদিকে কেউ যায় না। ওরা সবাই হা হা করে কিছুটা ছুটে গিয়ে ফিরে এসেছে। আমিও ভালো কিছু দেখিনি খরমুজের রস খেয়ে ততক্ষণে বেশ নেশা ধরে গেছে। কেবল দেখছি ক্রমে বিন্দুর মতো কালো একটা ফড়িং অনেক দূরে সমুদ্রের ওপর নাচছে। ওটা মৈত্র, না একটা ফড়িং কি করে বুঝব! ছোটবাবু বুঝতে পারল, তারাও এমন একটা ঢিবিতে চলে গিয়েছিল। ঢিবিগুলোর একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। সে আর এক মুহূর্তে দেরি করল না। যদিও জানে জোয়ার হয়তো এসে গেছে, না এলেও আর দেরি নেই। ওরা জোয়ারের আগে ফিরে এসেছে, এবং জোয়ার এলে জাহাজে টের পাওয়া যায়। যেন জাহাজটা লাফিয়ে অনেক উঁচুতে উঠে যায় এমন মনে হয়। যাই হোক সে লাফিয়ে পার হয়ে গেল ফল্কা। এলি-ওয়েতে ঢুকে দরজায় নক করল, ডেবিড দরজা খোলো। বোধহয় ভেতরে ডেবিড নেই। সে ওপরে উঠে দেখল স্যালি হিগিসন সবাইকে গালাগাল করছেন। জাহাজে তিনি ছিলেন না, এতক্ষণ সবাই এভাবে চুপচাপ বসে আছে! খোঁজাখুঁজির দায়দায়িত্ব কেউ নিচ্ছে না। যদিও এসব ঘটনায় স্থানীয় পুলিস সাহায্য করতে পারে, এবং লাইফ-সেভিং সমিতি। স্যালি হিগিনস এক এক করে সবাইকে ফোনে খবরটা দিয়েছেন—আর বড়-টিণ্ডালকে যে জাহাজে রাখা যাবে না, দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে, দেশে পাঠিয়ে দেবার কথা মনে হলেই তাঁর মাথাটা ভীষণ গরম হয়ে যায়। এসব লোকগুলো জহাজটাকে ভালবাসে না। মিথ্যা পাগলামি করে দেশে ফিরে যেতে চায়। দেশে ফিরে যাবার একটা মোক্ষম ওষুধ। আর সঙ্গে সঙ্গে স্যালি হিগিনসের ভীষণ তিক্ত চোখ মুখ। সারেঙকে ডেকে পাঠালেন, বললেন, বড়- টিণ্ডালকে জাহাজ থেকে আর নামতে দেবে না। প্রায় লগ-বুকের ওপর একটা আদেশনামার মতো তিনি কথা বললেন।

    তখন মৈত্র জ্যোৎস্না রাতে একটা ঢিবির ওপর বসেছিল। সে লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে এসেছে সব ঢিবি, বালির চরা। অনেক দূরে সেই পাহাড়ের ছাদ প্রায় সাঁকের মতো দু’হাত বাড়িয়ে যেন এগিয়ে আসছে ওকে ধরতে। কিছুতেই সে ধরা দেবে না। সে কেবল লাফ মেরে ঢিবি, বালির চরা পার হয়ে যাচ্ছিল ক্রমাগত। জ্যোৎস্না রাত বলে অস্পষ্ট সবকিছু চারপাশে।

    ওর পায়ের কাছে সমুদ্র। আর দ্বীপে অজস্র পাথর, লাল লাল পাথর। সে একটা দু’টো করে হাতে পাথর নিচ্ছে, আর দূরে ঢিল ছুঁড়ে দিচ্ছে। একটা মাটির ভাঁড়। ভাঁড়ে সে মদ ঢালছে, খাচ্ছে। মাঝে মাঝে একাকী সে সেই খালি ভাঁড় নিয়ে পৃথিবীকে যেন বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে নাচছে। সে ক্রমে মাতাল হয়ে উঠছে। সে বসন্তনিবাস। সে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সব পাতার বাঁশি বানিয়ে দিয়েছে। সে ইচ্ছে করলে বাতাসের ওপর ভেসে যেতে পারে—এই যে সামনে সমুদ্র, অনায়াসে সমুদ্র পার হয়ে যাবে, ওর মাথায় যখন পালক গোঁজা, যখন সে বসন্তনিবাস এবং যদি হাইতিতির ঘণ্টা বাতাসে বাজতে থাকে তখন সে কিছু ভাবে না। সে সাদা জ্যোৎস্নায় এমন একটা নির্জন দ্বীপে বসে অনায়াসে সারারাত মদ খেতে পারে, নাচতে পারে, অমিয় যেসব গান গাইত মদ খেলে, তেমন একটা গান, বাবু আমার কিছু ভাল লাগে না…সে নেচে নেচে গাইছিল।

    আর তার মনে হচ্ছিল সমুদ্র চারপাশে তার ঘুরে ঘুরে নাচছে। সে এখন যেদিকে তাকাচ্ছে শুধু নীল জল। কেবল ওর ঢিবিটা উঁচুমতো এবং মনে হয় নিচে অর্কেস্ট্রা বাজছে। কান পাতলে আশ্চর্য সে মিউজিক শুনতে পাচ্ছে সমুদ্রের নিচে। এবং মনে হল সে অদ্ভুত একটা দেশের বাসিন্দা হয়ে গেছে। এক্ষুনি সে বাতাসে ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পাবে। আসছে আসছে। ম্যাণ্ডেলা হাইতিতি বাতাসে ভেসে আসছে। সে এবার মাটির ভাঁড় সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দিল। সে আর ভাঁড়ে মদ ঢালতে পারছে না, হাত কাঁপছে। ঢালতে গেলে পড়ে যাচ্ছে মদ। হাত তার ঠিক নেই। সে টলছে। তার চেয়ে মনে হল গলায় ঢেলে দেবে সোজা। সে হাঁ করে কিছুটা ঢেলে দিল মুখে। মুখ কুঁচকে গেল। বাঁ হাতের তালুতে মুখ মুছে শুয়ে থাকল চিৎ হয়ে। আকাশে অজস্র নক্ষত্র এবং জ্যোৎস্না সমুদ্রের জলে সাদা মসলিনের মতো ছড়িয়ে আছে। ওর আর যা মনে হচ্ছিল এক্ষনি শুনতে পারে বাতাসে ঘণ্টাধ্বনি। সে দেখতে পাবে একে একে সবাই নেমে আসছে। ম্যাণ্ডেলা, ম্যাণ্ডেলার মা, হাইতিতি, এলসা দ্য কেলি—সেই মেয়েটা যার শরীরে বিজবিজে ঘা। ওরা সবাই নেমে এলে কোথাও তার যাবার কথা

    বোধহয় সেই মানুষটা জাহাজডুবির পর নির্জন দ্বীপে যে আটকা পড়েছিল—সেও আসছে। সে চিৎকার করে বলল, তুমি একা দ্বীপে কি করতে পার? সে বুঝতে পারল, মানুষটা এখন বড় বড় গাছ কেটে তার গুঁড়ি কেটে ভেলার মতো বানাচ্ছে। অতিকায় সব কচ্ছপ তুলে নিচ্ছে ভেলাতে। সুস্বাদু জল নিচ্ছে ঝরনা থেকে। পাল বানিয়েছে বড় বড় ইউকন গাছের পাতা দিয়ে। মানুষটা ফিরে আসছে। ফিরে আসছে। সমুদ্রে ঝড়ঝঞ্ঝার ভেতর দিয়ে মানুষটা সমুদ্রের ওপর পাল তুলে চলে আসছে। বড় বড় কচ্ছপের বুক কেটে সে মাংস বের করছে। আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে নিচ্ছে মাংস। সমুদ্রের জলে সামান্য চুবিয়ে খাচ্ছে। কি যে সুস্বাদু মনে হচ্ছে। শরীরে তার পাতার পোশাক। মাথায় পাতার টুপি। মুখে বড় বড় দাড়ি। চুল লম্বা। তার ভেলাটা সমুদ্রে বেশ হেলে-দুলে এগিয়ে আসছে। তারপর কেন যে তার মনে হল, লোকটা আর কেউ নয়। সে নিজে। ঝড়ের রাতে বাড়ি ফিরে দেখছে, শেফালী ঘরে নেই। শেফালী বিমলবাবুর স্ত্রী হয়ে গেছে ফের। আর মনে হল ম্যাণ্ডেলার মতো একটা ছোট মেয়ে জানালা খুলে এমন বন্য একটা মানুষকে দেখে ভয়ে চিৎকার করছে। সে কিছুতেই বলতে পারছে না, আমি বসন্তনিবাস। বিশ্বাস কর ম্যাণ্ডেলা আমি বসন্তনিবাস। তোমার মা’কে ডাকো। তার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।

    তখন একটা মাছি কোত্থেকে এসে মুখের ওপর বসল। সে ভাল করে হাত নাড়াতে পারছে না। সমুদ্র ফুঁসছে। পাহাড় সমান তরঙ্গমালা ক্রয়ে এগিয়ে আসছে। তীব্র শীস্ বাজছে আকাশে-বাতাসে। ব্রেকার ভেঙে যাচ্ছে, ফসফরাস পায়ের নিচে জ্বলে জ্বলে নিভে যাচ্ছে। যেন অজস্র জোনাকি পোকা ঘোরা ফেরা করছে জলে, আবার নিভে যাচ্ছে। সব প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ঢেউ চলে আসছে আবার, আবার সেই জোনাকি পোকারা, পায়ের কাছে ক্ৰমে এত কাছে চলে আসছে কি করে! এবং মনে হচ্ছে ক্রমে দ্বীপটা ছোট হয়ে যাচ্ছে, ক্রমে মনে হচ্ছে, সে চারপাশে শুধু সমুদ্র দেখছে, সমুদ্রের জল গুলিয়ে উঠছে পেট গুলিয়ে ওঠার মতো। এবং আর সে উঠতে পারছে না। সে শুয়ে শুয়ে এ সব দেখছে। যেন এবার সে হাত দিলেই সমুদ্রের নাগাল পাবে। এবং ওর শেষ বিন্দু সেই মদ্যপানের অন্তিম মুহূর্তে মনে হয়, মাছিটা ভীষণ গণ্ডগোল বাঁধিয়ে দিয়েছে। সে বার বার ধরতে চাইছে মাছিটাকে। সে বার বার উঠে দাঁড়াতে চাইছে মাছিটাকে ধরার জন্য। জলের কল্লোল দমকে দমকে চারপাশে এত বেড়ে যাচ্ছে যে অনেক দূরে কে তাকে ডাকছে শুনতে পাচ্ছে না। সে কান পেতে শোনার চেষ্টা করছে, কে ডাকছে। মনে হচ্ছে অনেক দুরে সমুদ্রের তরঙ্গমালায় ভেসে চলে আসছে ডাকটা, মৈত্ৰ..দা তু..মি কোথায়। সে শুনতে পাচ্ছে। ভারি অস্পষ্ট। তবু মনে হচ্ছে ছোট তাকে ডাকছে। তার তখন ভীষণ হাসি পাচ্ছিল। সে ফের উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। বলতে চাইল, আমি এখানে ছোটবাবু। সমুদ্র চারপাশে নেচে বেড়াচ্ছে। আমি একটা টিবির ওপর শুয়ে আছি। কিন্তু সে উঠতে পারছে না কেন! চোখে ভাল দেখতেও পাচ্ছে না। এখন যেদিকে হাত দিচ্ছে শুধু জল, জল উঠে আসছে, আবার নেমে যাচ্ছে, জল চারপাশে ছড়িয়ে যাচ্ছে। সমস্ত শরীরে এখন জলকণা উঠে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে তাকে। ঝাপসা মনে হচ্ছে চারপাশটা। আর তখনও দূরে কেউ ডাকছে—টিণ্ডাল।

    কেউ ডাকছে—মৈত্র।

    কেউ ডাকছে—মৈত্রদা তুমি কোথায়!

    কেউ ডাকছে—বড়-টিণ্ডাল।

    কেউ ডাকছে—বসন্তনিবাস।

    সঙ্গে সঙ্গে সে উঠে দাঁড়াল ঢিবিটার মাথায় সে দাঁড়িয়ে গেল। সে এক হাতে বোতল বাতাসে উঁচিয়ে ধরল। কোনরকমে টলতে টলতে খালি বোতলটা বাড়িয়ে দিল আকাশের দিকে। জড়ানো গলায় বলল, মি বসন্তনিবাস। মনার্ক অফ অল আই সার্ভে। সে শেষবারের মতো জল এগিয়ে আসতে থাকলে সমুদ্রের মাথায় খালি বোতলটা ভাঙবে ভাবল। তার ভারি ইচ্ছে ছিল জীবনে, সমুদ্রের মাথায় বড় মাপের একটা বোতল ভাঙবে। কতদিন পর সে সুযোগটা পাচ্ছে ভেবে হা হা করে হেসে উঠল। দিগন্তব্যাপী কালো অন্ধকার এগিয়ে আসছে। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টলছিল। তবু বাতাসে উঁচিয়ে রেখেছে বোতলটা। মারবে। কাছে এলেই মারবে। মেরে মাথা ফাটিয়ে দেবে। মাগির ছেনালীপনা বের করবে।

    তখনও সেই বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের ভেতরে আর্ত ডাক, মৈত্রদা তুমি কোথায়! অস্পষ্ট সেই স্বর গুনগুনিয়ে বাজছে মৈত্রের মাথায়। সে আরও উৎফুল্ল হয়ে উঠছে। বেশ প্রতিশোধ নেওয়া যাবে, সে ছেলেমানুষের মতো আনন্দে ফের ছুটে পালাবে ভাবল। ছোটবাবু জ্যোৎস্না রাতে হয়তো তাকে দেখে ফেলেছে। পাহাড়ের ছাদ দু-হাত লম্বা করে যাকে ধরতে পারে নি, তুমি ছোটবাবু তার নাগাল পাবে! আর সেই বোতলটা তখনও ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো হাতে দুলছে। যেন সেই এবট অফ এবট ব্রথক, ঘণ্টা বাজাচ্ছে পাহাড়ের মাথায়, এদিকে না, এদিকে না। জল পায়ের পাতা ভিজিয়ে চলে গেল। এখন শুধু জল, আর জল। আর তরঙ্গমালা এবং ক্রমে সেই জলের চারপাশে শুধু ভয়াবহ ঘূর্ণি, অথবা নীল জলে, অতিকায় পাহাড়ের মতো শ্বাপদরা নিঃশ্বাস ফেলছে। এত বেশী জলকণা উড়ছে যে সে শ্বাস ফেলতে পারছে না।

    তখনও দূরে, সমুদ্রের এইসব গর্জনের ভেতর একটা ক্ষীণ ডাক ভেসে আসছিল, মৈত্রদা কাল থেকে আমি তোমার সঙ্গে বের হব। তুমি কোথায়? কাল আ…মি… কোথাও যা-চ্ছি না।

    শিশুর মতো সে পুলকে বলল, আমি এখানে। সে বোতলে চুমু খেতে খেতে বলল, আমি এখানে ছোটবাবু। আমি ভাল আছি।

    জল আরও ওপরে উঠে আসছে। সে আর দাঁড়াতে পারছিল না। সে যে এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল, আসুক এলেই মারবে, কিন্তু এখন সে হাতের বোতল ঠিকবুকের কাছে এনে টলতে টলতে বসে পড়তেই তরঙ্গমালা চলে যেতে থাকল ওপর দিয়ে। নিচে সে ভেসে ভেসে প্রায় সেই জলের ভেতর কাটা ঘুড়ির মতো লাট খেতে খেতে হারিয়ে যাচ্ছিল। এবং শিশুর আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছিল। সমুদ্রের অতলে শিশুরা কাঁদছে। সে আরও জোরে জলের নিচে বোতলটাকে একমাত্র সন্তানের আত্মরক্ষার্থে যেন চেপে ধরল। তারপর শুধু নীল জলের খেলা, অবিমিশ্র জল তার আপন প্রবাহে মত্ত। কোথাকার কে এক বসন্তনিবাস স্রোতের মুখে পড়ে কুটোগাছটির মতো ভেসে যাচ্ছে, তার বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই।

    পাহাড়ের উঁচু মতো জায়গায় তখন ওরা দাঁড়িয়েছিল। বিশ্বচরাচরে এ-ভাবে জ্যোৎস্না কখনও জোয়ারের জলে মিশে যায়, অথবা উঁচু সব তরঙ্গমালা ক্রমে নিস্তেজ হতে হতে শান্ত সমুদ্রের জলরাশি হয়ে যায়, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। সমুদ্রের প্রবল গর্জন এ-ভাবে ক্রমে কমে আসতে থাকল। জল উঁচু হতে হতে সেই পাহাড়-ছাদের কাছাকাছি জায়গায় চলে এসেছে। এখন মনে হচ্ছে পাহাড়ের ছাদে ছাদে জেটির মতো, অনেকটা সমুদ্রের ভেতরে অনায়াসে হেঁটে যাওয়া যেতে পারে। ওরা শেষ প্রান্তে এসে বুঝল, কিছু করার নেই।

    পুলিস কর্তৃপক্ষ জানাল, জল নেমে না গেলে কিছু করা যাবে না।

    সমুদ্রে ভেসে গেলে খোঁজাখুঁজি করে যারা, তাদের দলটা ফিরে এসেছে। তারাও একই কথা বলল।

    রাত ক্রমশ বাড়ছে। প্রবল জোয়ারের মুখে জ্যোৎস্না তেমনি ছায়া ফেলে যাচ্ছে। পাহাড়ের মাথায় সব অজস্র মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। অথবা এখন এক খবর এই দ্বীপের ভেতর, একজন মানুষ সমুদ্রের ছলনায় আবার পড়ে গেছে। কোন খোঁজ-খবর নেই!

    ডেক-সারেঙ এনজিন-সারেঙ সমেত প্রায় জাহাজ খালি করে সবাই চলে এসেছে! ওরা কেউ আর বিন্দুমাত্র উৎসাহ পাচ্ছে না জাহাজে ফিরে যেতে। ছোটবাবুর গলা ভেঙে গেছে ডাকতে ডাকতে। বনি ছোটবাবুকে বার বার বুঝিয়েছে—এ-ভাবে ডেকে লাভ নেই। কতদূরে কোথায় আছে বড়-টিণ্ডাল! তুমি অযথা ডাকছ।

    ছোটবাবুর মন তবু মানছিল না। যেন তার বিশ্বাস তার আওয়াজ পেলেই মৈত্রদার সব অভিমান ভেঙে যাবে। আবার ফিরে আসবে।

    সমুদ্র দেখে এখন মনেই হবে না, কখনও প্রবল তরঙ্গমালায় সে ক্ষেপে যায়। আশ্চর্য শান্ত হয়ে গেছে। বিকেলে যা ছিল বেড়াবার জায়গা, যেখানে মানুষেরা বসে খরমুজের রস পান করেছে এখন তা সব সমুদ্রের অতলে। সকাল হতে না হতেই আবার বালিয়াড়ি জেগে উঠবে। সামোয়ান পুরুষ- রমণীদের তখন দেখা যাবে সমুদ্রের কিনারে ঝিনুক, শঙ্খ, স্টার-ফিশ কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এবং কত রকমের সব বড় বড় ঝিনুক—ঝিনুকের ভেতর কখনও কখনও ওরা মুক্তো খুঁজে পায়। সকাল হলে আর বোঝা যারে না, সমুদ্র এখানে গতকাল মাথাসমান উঁচু জলরাশি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল।

    স্যালি হিগিনস একটা কথা বলছেন না। সবার সামনে, একেবারে সেই ছাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছেন। পাথরের সাঁকো নীল জলে ভেসে আছে মাত্র। বাতাস আসছে। ওঁর চুল পোশাক সব উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। ওঁর হাতে রুপোলী স্টিক। তিনি স্টিকে ভর করে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর শেষ সফরে এমন একটা দুর্ঘটনা বড়ই তাঁকে বিষণ্ণ করে দিচ্ছে। তিনি ভাবছেন, এমন তো হবার কথা না। সমুদ্রে এত দীর্ঘদিনের সফর, কখনও তিনি এমন বিচলিত বোধ করেন নি। এতো প্রায় আত্মহত্যার সামিল। তিনি কি এখন করবেন ভেবে উঠতে পারছেন না।

    তবু সব স্থির সিদ্ধান্তের মতো, লাঠি উঁচিয়ে বললেন, আমাদের এখন জাহাজে ফিরতে হবে। সবাই স্যালি হিগিনস আর কি বলবেন ভেবে দাঁড়িয়ে থাকল। কেউ নড়ল না।

    তিনি বললেন, বড়-টিণ্ডাল এটা ভাল কাজ করল না।

    ওরা দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে পারছে ওরা, স্যালি হিগিনস একটা কথা শেষ করছেন আর মাথা নিচু করে রাখছেন। যেন সমুদ্রের কাছে তিনি পরাজয় স্বীকার করছেন এমনভাবে লাঠিতে ভর করে দাঁড়িয়ে আছেন।

    তিনি ফের বললেন, ওকে পেলে আগাপাশতালা চাবকাতাম। তারপর যেমন জিভে দাঁত ঠেলে আবার ঠিক জায়গায় বসিয়ে দেন তেমনি বসিয়ে দিতে দিতে বললেন, স্কাউণ্ডেল।

    তারপর তিনি আর একটা কথাও বললেন না। ঠিক লাঠি সামনে তরবারির মতো উঁচু করে হেঁটে যেতে থাকলেন। কে এল, কে এল না পেছনে ফিরে একবার দেখলেন না। সোজা সমুদ্রকে ওঁর লাঠির ঋজুতা দেখিয়ে ছাদের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে থাকলেন। জুতোয় ঠকঠক শব্দ শোনা যাচ্ছে। নীল রঙের জাহাজি পোশাক, পাতলা কদম ছাঁটের চুল এবং সাদা এক মহীয়ান যুবক এখন যেন পাহাড় বেয়ে শীর্ষে উঠে যেতে চাইছে।

    প্রথম ডেবিডের হুঁশ হল। আরে চলে যাচ্ছে বুড়ো। সবাই তোমরা দাঁড়িয়ে থাকলে কেন!

    সারেঙ তাঁর এনজিন-রুম কর্মীদের প্রায় চুন মুখে বলার মতো হেঁকে বললেন, ফিরে যান সবাই।

    ডেক-সারেঙ তাঁর লোকদের বলল, নসিব মিঞা। পেটের দায়ে তোমরা ভাঙা জাহাজে মরতে এসেছ।

    ছোটবাবু বলল, সবাই চাচা পেটের দায়ে এসেছে। এখন এ-সব বলার সময় না। প্রায় চিৎকার করে উঠেছিল সে। কেউ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, টুটি ছিঁড়ে নিতে পারে এখন, বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারে নি। এবং যেন জাহাজিরা মারপিট শুরু করে দিতে পারে সহজেই সামান্য কথায় ডেক-সারেঙের অপমান হবে সে বুঝতে পারে নি। ডেক-সারেঙকে অপমান—তার লোকেরা সহ্য নাও করতে পারে। দূরে দাঁড়িয়ে তখন খাটো গলায় শিস্ দিচ্ছিল আর্চি।

    এনজিন-কশপ হাত উঁচিয়ে বলল, লম্বা লম্বা বাত দেশে গিয়ে ঝাড়বে ছোটবাবু।

    ছোটবাবু অবাক! সে বলল, কশপ আপনাকে কিছু বলি নি।

    বনি বলল, ছোটবাবু চল।

    ছোটবাবু এগিয়ে গেল। বলল, কশপ মাথা গরম করছেন কেন? এখন আমাদের মাথা গরম করার সময় না।

    ডেবিড বলল, কি বলছে ছোটবাবু?

    ছোটবাবু বলল, কিছু না।

    এনজিন-সারেঙ বললেন, ছোট তুই ঝামেলায় থাকিস না।

    —কিসের ঝামেলা চাচা!

    এনজিন-কশপ তখনও বেশ সোরগোল করছে। সবাইকে তাতাচ্ছে। ছোটবাবু ডেক-সরেঙকে অসম্মান করেছে। কথাবার্তা ঠিক জানে না। বেয়াদপ। এবং কশপ যখন এ-ভাবে চিল্লাচিল্লি করছিল, তখন জ্যাক বলল, ছোটবাবু কি বলছে কশপ?

    ছোটবাবু তেমনি নিস্পৃহ গলায় বলল, কিছু না।

    এনজিন-সারেঙ বললেন, ছোটবাবু তুই চলে আয়। বলে হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলেন।

    —ওরা কিছু একটা করতে চাইছে, কি চাইছে আমিও ঠিক জানি না। শুধু বুঝতে পারি, ওদের মতলব ভাল না।

    ছোটবাবু হাঁটতে হাঁটতে বলল, ওরা কি করতে চায়, আমি সব জানি।

    সারেঙ সহসা দাঁড়িয়ে গেলেন। –কি করতে চায়?

    —চায়, কিছু একটা করতে চায় চাচা। এখন তোমাকে বলা যাবে না।

    —ওরা তোর কোন ক্ষতি করবে নাতো?

    —তা করতে পারে। তুমি ভেব না।

    এনজিন-সারেঙ আর একটা কথাও বলতে পারলেন না। আর্চি পেছনে তার দলবল নিয়ে আসছে। ছোটবাবু বুঝতে পারছে আর্চি বাজে গুজব ছড়াচ্ছে জাহাজে। সে জাহাজিদের তার পক্ষে টানছে। তারপর কি কি করতে পারে আর্চি তার সব যেন জানা। সে বলল, মৈত্রদা তুমি থাকলে কত আমার সাহস থাকতো বলতো। সে দু-হাত তুলে চিৎকার করে বলতে পারলে যেন বাঁচত, তুমি ভারী স্বার্থপর মৈত্রদা। কিন্তু কিছু বলতে পারল না। ওর চোখ জলে ভার হয়ে আসছিল। অমিয় নেই, মৈত্রদা নেই। ভারী নিঃসঙ্গ, সে ভীষণ একলা। এত বড় প্রতিপক্ষের সঙ্গে কি করে যুঝবে এখন!

  • বিয়াল্লিশ

    বিয়াল্লিশ

    ।। বিয়াল্লিশ।।

    ছোটবাবু সারারাত ঘুমোতে পারল না। আবার মাথার ভেতর সেই ঘণ্টাধ্বনি। ঘণ্টাধ্বনি হলে ভীষণ অস্বস্তি। জলতেষ্টা পায়, হাত পা এবং শরীরে কেমন অস্থিরতা, যেন এক অসহ্য দাহ নিয়ত মাথার ভেতরে কখনও ঘণ্টাধ্বনির মতো, কখনও রেলগাড়ির চাকার মতো ঘড় ঘড় করে আকাশ- বাতাস কাঁপিয়ে চলে যাচ্ছে।

    ছোটবাবু চুপচাপ বোট-ডেকে দাঁড়িয়েছিল। পাশে ডেবিড। ডেবিডের যা স্বভাব, সে নানাভাবে ছোটবাবুকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। ছোটবাবু ডেবিডের একটা কথাও শুনতে পাচ্ছে না। এত জোরে মাথার ভেতর ঘণ্টাধ্বনি হলে কিছু শোনা যায় না। ছোটবাবু দু’হাতে রেলিং চেপে দাঁড়িয়ে আছে। দেখলে মনে হবে, ওর দু’হাতের পেশিতে এত বেশি শক্তি প্রায় মড়মড় করে লোহার রেলিং গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলবে যেন। সে দূরের সমুদ্রে কেবল গর্জন শুনতে পাচ্ছে। জোয়ারের জল বোধ হয় ধীরে ধীরে নামছে। এবং এ-কারণে যা হয়ে থাকে, কখনও কখনও মৈত্রদার মুখ সমুদ্রের গভীরে নীল জলের ভেতরে দেখে ফেলে। যেন মানুষটা গভীর নীল জলে এখন একটা মাছ হয়ে সাঁতার কাটছে। এবং পাশে কোনো দ্বীপটিপ আছে কিনা খুঁজছে। তারপর যা হয়ে যায়, সে দেখতে পায় দূরে দাঁড়িয়ে দ্বীপের মাথায় মৈত্রদা ডাকছে।—এই ছোটবাবু আমাকে ফেলে তোরা চলে যাচ্ছিস, আমাকে নিবি না! সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় মৈত্রদা সাঁতার কেটে জাহাজে উঠে আসার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কেউ তাকে নিতে চাইছে না। তারপর আশ্চর্য সে দেখতে পাচ্ছে মৈত্রদা ডুবে যাচ্ছিল। সমুদ্র আর তার অতিকায় সব ঢেউ মিলে মৈত্রদাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আর্চি যেন জাহাজে তখন বিউগল বাজাচ্ছে। ছোটবাবু তখন কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে সামান্য অবলম্বন ডেবিড, ডেবিডকে বলে ফেলল, ডেবিড তোমার কী মনে হয়?

    ডেবিড বুঝতে পারল না ছোটবাবু কী বলতে চাইছে।

    ছোটবাবু বলল, তুমি কী বিশ্বাস কর জাহাজ কোনো অশুভ প্রভাবে আছে?

    ডেবিড বলল, সে তো ছোটবাবু জাহাজটার আজন্ম একটা রোগ। এ-নিয়ে তুমি এখন ভাবছ কেন!

    —আচ্ছা ডেবিড, তোমার কি সত্যি মনে হয় মৈত্রদা সমুদ্রে ভেসে গেছে। সমুদ্রে ডুবে গেছে। আসলে কেউ তো ঠিক ঠিক দেখেনি।

    —কিছু তো বলা যাবে না। হয়তো দেখা যাবে সকালে বাঁশি বাজাতে বাজাতে জাহাজটায় বড়- টিণ্ডাল ফিরে আসছে! সে যা একখানা মানুষ!

    ছোটবাবু বলল, ডেবিড তোমাকে তবে পেট ভরে মদ খাওয়াব।

    —ঠিক!

    —ঠিক ডেবিড।

    তারপর আবার ছোটবাবু কেন যে দেখে ফেলে আর্চি ক্রমে তার দলবল ভারী করে এগিয়ে আসছে। প্রথমে আর্চি পরে পাঁচ-নম্বর এবং পরে এভাবে ডেক-সারেঙ, এনজিন-কশপ মার্চ করে যাচ্ছে বোট- ডেকে। ওরা প্রথমে বিউগল বাজাচ্ছিল। তারপর সবাই কেমন বন্দুকের নল উঁচু করে দাঁড়ায়। এবং ক্রমে সে দেখতে পায় সার সার ওরা তিনজন—কাপ্তান স্যালি হিগিনস, বনি এবং সে। অর্থাৎ একটা রহস্য জড়িয়ে আছে জাহাজে। এটা পাপ, কার্গো-শিপে মেয়েমানুষ রাখা পাপ। এবং একটা উন্মত্ততা তখন চারপাশে নেচে বেড়াচ্ছিল। প্রায় উলঙ্গ করে দেবার মতো বনিকে আর্চি সবার সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এই আপনাদের জ্যাক। কাপ্তানের শয়তান ছেলে। ছেলে না মেয়ে? বলুন। জ্যাকের শরীর মাস্তুলে ঝুলিয়ে রেখে এমন বলছে যেন আর্চি।

    আর ছোটবাবু দেখতে পায় তখন কি হুল্লোড় জাহাজে। সবাই এগিয়ে আসছে গন্ধ শুঁকে। যেন সবাই গিরগিটি হয়ে যাচ্ছে। আসছে। মাথা উঁচিয়ে দেখছে সবাই। আবার ছুটে আসছে। মুহূর্তে প্রায় সেই হুল্লোড় বনিকে বগলদাবা করে তুলে নিচ্ছে যেন। এবং ছোট ছোট মাখনের স্লাইস মুখে পুরে জিভ দিয়ে চেটে চেটে খাচ্ছে। বনি চিৎকার করছে, ছোটবাবু বাঁচাও।

    মাথায় এভাবে ঘণ্টাধ্বনি হলে সে যে কি করে! সে ডেবিডের সঙ্গে আর একটা কথা বলতে পারছে না। ওর চোখ জ্বলছে। আর্চির দলবল সহজেই ভারী হয়ে যেতে পারে—সে শুধু বলে দেবে মিড়-সীতে তোমাদের আমি জাদু দেখাব হে নাবিকগণ। তোমরা তো জানো জাহাজ পুরানো ভাঙা—এক বছরের নাম করে এনে তোমাদের ছলেবলে স্যালি হিগিনস দু’বছর রেখে দিচ্ছে। তারপর আরও কত বছর রাখবে কে জানে—দেশে ফেরার কথা ভেবে তোমরা পাগল হয়ে যাবে। কিন্তু আমি তোমাদিগকে দেখাতে পারি এক আশ্চর্য নারী সুধা-পারাবার। জিভ চেটে চেটে সে প্রায় ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো বনির পোশাক খুলে নেবে। সবার সামনে বনিকে উলঙ্গ করে ফেলবে।

    জ্যাক তখন বাইরে এসে বলল, ছোটবাবু তুমি এখনও জেগে আছ?

    ডেবিড বলল, কিছুতেই নিয়ে যেতে পারছি না।

    ছোটবাবু জ্যাককে দেখে ক্ষেপে গেল। বলল, এত রাতে তোমার এখানে কি দরকার! তুমি কি করতে বের হয়েছ? ভেতরে যাও।

    জ্যাক বলল, তোমরা কথাবার্তা বলছ, আমার ঘুম আসে?

    ছোটবাবুর তারপর মনে হল সে আর বনিকে আগের মতো মর্যাদা দিচ্ছে না। বনিকে বরং ভারী অসহায় এবং দুঃখী মনে হচ্ছে। বনির জন্য এভাবে তার যেন কি আশ্চর্য মায়া। একই টুকুতেই সে খুব বেশী বিচলিত হয়ে পড়ছে! সে বলল, যাচ্ছি।

    বনি বলল, যাচ্ছি না। এক্ষুনি যাবে।

    ছোটবাবু আর দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না। দূরে শহর, শহরের আলো। বাতাস তেমনি বইছে এবং সবকিছু ঠিকঠাক কেবল একজন জাহাজি এখনও জাহাজে ফেরেনি। অথবা সমুদ্রের গভীরে সে শুয়ে আছে। সে কিছুতেই ডেবিডের মতো ভাবতে পারছিল না সকাল হলে সে মৈত্রদাকে দেখতে পাবে পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাতার বাঁশি বাজাচ্ছে।

    বনি বলল, ডেবিড তুমি ওকে নিয়ে যাও।

    ডেবিড বলল, সেই কখন থেকে তো বলছি।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল, ওর জন্য সবাই বিব্রত হয়ে পড়েছে। সে ডেবিডকে বলল, চল।

    বনি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকল। ছোটবাবু নিচে নেমে না গেলে সে এভাবে যেন দাঁড়িয়ে থাকবে। দরজা থেকে নড়বে না। ডেবিড আগে আগে নামছে। ছোটবাবু পেছনে পেছনে নেমে যাবার সময় সিঁড়ির মুখে দেখল বনি তখনও দাঁড়িয়ে আছে। সে বলল, দাঁড়িয়ে থাকলে কেন। ভেতরে যাও।

    বনি এবার আর দাঁড়াতে পারল না। সে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ না করলে যেন নিশ্চিন্ত হতে পারছে না ছোটবাবু। সে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

    ছোটবাবু তখন নামছে। নিচে নেমে দরজা খুলে চুপচাপ বিছানায় বসে থাকল। পোর্ট-হোল খোলা। গরম পড়েছে ভীষণ। সে জোরে পাখা চালিয়ে দিল। মৈত্রদার দু’টো একটা কথা তার মনে হচ্ছে—তাহলে তুমি জাহাজের ছোটবাবু। মৈত্রদা জাহাজের কোল-বয়দের ছোটবাবু বলে ডাকত। ছোটবাবু নামটা মৈত্রদার দেওয়া। সে যে অতীশ দীপঙ্কর ভৌমিক যেন গলা চেঁচিয়ে বললেও কেউ আর বিশ্বাস করবে না। দেশভাগের আগে সে ছিল সোনা, জাহাজে উঠে সে হয়ে গেল ছোটবাবু। মৈত্রদা তাকে এ-জাহাজে ছোটবাবু বানিয়ে নিজে বেশ সরে পড়ল। আর যা হয়, এ-সব কথা মনে হলেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। বিশ্বাসই করতে পারে না, মৈত্রদার সঙ্গে তার আলাপ পুরো এক বছরও হয়নি অথচ মানুষটা ছিল তার সব যেন। এবং রাগে দুঃখে সে বলল, কাল যদি তোমাকে না দেখি সকালে পাড়ে দাঁড়িয়ে পাতার বাঁশি বাজাচ্ছ তবে কাপ্তানের মতো আমিও তোমাকে আগাপাশতলা চাপকাব। তুমি ভেবেছ কি!

    ডেবিড বেশ ভেবে খুশী তখন—বড়-টিণ্ডাল যা একখানা মানুষ এত সহজে ভেসে যাবে বিশ্বাস করা যায় না। হয়তো সত্যি সে সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবে তার দলবল নিয়ে জেটিতে বেলুন উড়াচ্ছে বাঁশি বাজাচ্ছে তখন বিকেলে সে ছোটবাবুর পয়সায় আকণ্ঠ মদ খাবে! সকাল হলে সে আর ছোটবাবু সঙ্গে না হয় বড়-টিণ্ডালকে নেওয়া যাবে। তারপর মদ্যপান। লারে লারে গান গলায়। ওরা যে অন্য গ্রহে তাদের সবকিছু রেখে এসেছে তখন আর মনেই হবে না। ডেবিড আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। ছোটবাবু সহজে শুয়ে পড়তে পারল না। আলো নেভাতে ইচ্ছে হল না। পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে থাকল।

    ওপরে এভাবে বনিও দাঁড়িয়ে আছে। তারও ঘুম আসছিল না। ছোটবাবুর সঙ্গে এনজিন-কশপের কিছু একটা হয়েছে। এনজিন-কশপের কথা ছিল ছ’নম্বর হবার। কিন্তু সে হতে পারেনি। ওর রাগ স্বাভাবিকভাবে ছোটবাবুর ওপর থাকবে। ছোটবাবু এনজিন-কশপের সঙ্গে বাংলায় কথাবার্তা বলছিল। সে কিছুই বুঝতে পারেনি। ছোটবাবুকে সে বলেছিল, কি হয়েছে! ছোটবাবু বলেছিল, কিছু না। এই পর্যন্ত! তারপর সেও ছোটবাবুকে কেন জানি দ্বিতীয়বার…আর কিছু বলতে সাহস পায়নি। ছোটবাবুর মুখ ভীষণ থমথম করছিল। অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় যতই ছোটবাবু গোপন করুক সব সে বুঝতে পেরেছে। ছোটবাবুর মাথায় আবার সেই ঘণ্টাধ্বনি হচ্ছে। বাবা তাকে ঠিকই বলেছিলেন, বনি ছোটবাবুর মাথায় কিছু হচ্ছে না তো! সেই যে ক্রোজ-নেস্ট থেকে পড়ে ছোটবাবুর মাথায় পেরেক ঢুকে গেছিল এবং পর পর সব দৃশ্য মনে হলে সে স্থির থাকতে পারে না। সে কিছুতেই আজ বলতে পারেনি, যতই অস্বীকার কর তোমার কিছু হচ্ছে না, আমি কিন্তু বলছি মাথায় তোমার কিছু হচ্ছে। তুমি আমাকে সব গোপন করছ।

    আর বনি আশ্চর্য হয়ে গেছে আগের মতো ছোটবাবু নেই। কেমন ক্রমে রাশভারী হয়ে যাচ্ছে। আগের মতো সহজেই জেদ বজায় রাখতে পারে না বনি। অন্য সময় হলে সে কি করত জানে না কিন্তু আজ যখন ‘কিছু না’ বলে এড়িয়ে গেল তখন অপমানে দিনের পর দিন কথা না বলে থাকতে পারত। অথচ সে মনে মনে ভারি খুশী। ছোটবাবুকে তার সমীহ করতে ভাল লাগছে। ছোটবাবু তাকে সব বললেই বোধহয় খাটো হয়ে যেত।

    ছোটবাবু তখন নিচে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছে বনি ঘুমোয়নি। মাথার ওপর বনির কেবিন। হাঁটাহাঁটি করলে টের পাওয়া যায়। জাহাজ নোঙর ফেলে রাখলে এত বেশি নির্জনতা যে বনি কাঠের পাটাতনে নেমে কার্পেটের ওপর কিভাবে কোনদিকে হেঁটে যাচ্ছে তা পর্যন্ত ধরা যায়। বনি এইমাত্র পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়েছিল এখন হেঁটে সে তার বাংকে এসে বসেছে। আর কোন শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। বোধহয় বনি এবার শুয়ে পড়ল।

    ছোটবাবু এভাবে পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে দূরের শহর দেখছে। আর নক্ষত্রমালার মত ঝিকমিক করছে শহরের আলো যেন হাজার জোনাকি-পোকা আকাশের গায়ে স্থির হয়ে আছে। আর দূরে তেমনি সমুদ্রগর্জন। সমুদ্র অবিরাম দ্বীপটার চারপাশে ফুঁসছে। জ্যোৎস্নায় দ্বীপের উঁচু পাহাড় অথবা টিলাতে ঘরবাড়িগুলো দেখা যাচ্ছে না। রাস্তার আলো ঘুরে ঘুরে ওঠে গেছে। আর কি বিস্ময় কখনও মিনারের মতো অথবা গম্বুজের মতো মনে হচ্ছে ছোট ছোট পাহাড়গুলোকে। আলোগুলো গম্বুজের গায়ে মীনা- করা মণি-মুক্তার মতো। এমন সব সুন্দর পৃথিবী ফেলে মানুষের চলে যেতে ইচ্ছে হয় কেন সে বুঝতে পারে না।

    আবার মনে হল মাথার ওপর কাঠের পাঠাতনে কেউ হাঁটছে। বনি তবে ঘুমোতে পারছে না। বনি আবার পোর্ট-হোলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ওর ইচ্ছে হচ্ছে এক্ষুনি ওপরে উঠে দরজায় দাঁড়িয়ে বলে, বনি কী হচ্ছে! তোমার জন্য আমি ঘুমোতে পারব না! এভাবে দাপাদাপি করলে নিচে কারো ঘুম হয়।

    আর তখনই মনে হল কোথায় যেন বনির ওপর সে অধিকার পেয়ে গেছে। বনি হয়তো নিজেই অধিকারটুকু অজান্তে তাকে দিয়ে দিয়েছে। অথবা বোধহয় এমনই হবার কথা। সে তো বনির পায়ের শব্দ প্রথম থেকেই মাথার ওপর শুনতে পেত। সে তো কখনও এভাবে ভাবেনি বরং বনির পায়ের শব্দ মাথার ওপর না হলে ওর ঘুম আসত না। কাপ্তানের ছেলে সামান্য দাপাদাপি হুল্লোড় করবে না তো কে করবে! তার তখন মনেই হত না ওপরে কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে। তার ঘুম ঠিক চলে আসত। আর এখন সে শুনতে পাচ্ছে বনি খুট-খুট করে কিছু কাটছে। বনি তারপর খুব জোরে পোর্ট-হোলের কাঁচ ঠেলে দিচ্ছে এবং স্ক্রু এঁটে দিচ্ছে। তার শব্দ পর্যন্ত কান পাতলে শোনা যাচ্ছে। বনি কি সারারাত ঘুমোবে না।

    সে এবার দরজা খুলে ওপরে উঠে ডাকল, বনি।

    বনি দরজা খুলে বলল, কী?

    —ঘুমোচ্ছ না কেন? কেবল খুটখাট শব্দ করছ!

    বনির শরীরে রাতের পোশাক। বনি কী বলেই চোখ নামিয়ে নিয়েছে। আর যেন ছোটবাবু এক অধিকারের সাম্রাজ্য পেয়ে গেছে। এখানে সে খুশিমতো বিচরণ করবে। তার চোখেমুখে অতীব অহংকার। সে বলল, ঘুমোচ্ছ না কেন?

    —ঘুম আসছে না ছোটবাবু।

    ছোটবাবু বলল, তুমি না ঘুমালে আমার ঘুম আসবে না বনি। আমাকে তোমরা সবাই এত কষ্ট দাও কেন!

    বনি বলল, যাচ্ছি। বনি আর কিছু বলল না। বনি অধীরতায় ডুবে যাচ্ছে। সে কিছুতেই সোজাসুজি ছোটবাবুর দিকে তাকাতে পারল না। ছোটবাবু আজ সারাদিন তাকে ধমকের ওপর রেখেছে। অভিমানে তার কান্না পাচ্ছিল। সে দরজা বন্ধ করে দেবার সময় বলল, ছোটবাবু আমি আর খুটখাট শব্দ করব না। আমি ঠিক এবার ঘুমিয়ে পড়ব।

    ছোটবাবু নিচে এসে আর ওপরে কোন শব্দ শুনতে পেল না। ওপরের কেবিনটা নিথর। এতটা নিথর যেন ভয়ের। কেবল এখন কেন জানি মনে হচ্ছিল, বেশ তো ছিল বনি। যেন সে এবং বনি পৃথিবীতে শুধু জেগে ছিল। বনি ঘুমিয়ে পড়েছে কি চুপচাপ শুয়ে পড়েছে, পাশ ফিরছে না, শ্বাস জোরে ফেলছে না—পাছে তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, বুঝতে পারছে না। এতটা সে না করলেই পারত। ওপরে উঠে ওকে ভৎর্সনা না করলেও চলত। ভৎসনা শব্দটাই মনে আসছিল ঘুরে ফিরে।

    এই জাহাজ, বনি, পাশে দ্বীপমালা এবং আরও ওপরে আছেন স্যালি হিগিনস, তিনি কি করছেন! আর্চি কি করছে! কারা যেন ওর এলি-ওয়ে ধরে ছুটে গেল। এবং ডানপাশের এলি-ওয়েতে কয়েকজন মানুষ এক সঙ্গে সন্তর্পণে হেঁটে গেলে যেমন একটা রহস্য থেকে যায় তেমনি রহস্য। অর্চি কি জেগে রয়েছে? অথবা জাহাজের কোনো অন্ধকারে সবাইকে নিয়ে সলাপরামর্শ করছে? ওর কিছুতেই ঘুম আসছিল না। একবার সে দরজা খুলে ডেক-ফল্কা সব ঘুরেও দেখে এল! কেউ জেগে নেই। গ্যাং- ওয়েতে কোয়ার্টার-মাস্টার ঝিমুচ্ছে। গভীর রাতে সে একা আবার ফিরে এল কেবিনে। দরজা বন্ধ করে ফের শুয়ে পড়ল।

    খুব ভোরে জাহাজে সোরগোল উঠে গেল।

    ছোটবাবু দরজা খুলেই শুনল, বড়-টিণ্ডালের লাশ পাওয়া গেছে।

    ছোটবাবু যেন কথাটা আগ্রহের সঙ্গে শুনছে। তা হলে সকালে পাড়ে দাঁড়িয়ে মৈত্রদা পাতার বাঁশি বাজাচ্ছে না! সে কেমন বিহুলপ্রায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এক পা নড়তে পারল না। মনে হল ওর কিছু আর করণীয় নেই। কোথায় কে কিভাবে বসন্তনিবাসের মৃতদেহ আবিষ্কার করেছে তার জানার যেন কোন আগ্রহ নেই। কেবিনের দরজায় চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। ওর সামনে দিয়ে হেঁটে গেল বাটলার, মেস-রুম-বয়, থার্ড-অফিসার। ওরা সবাই ডেকে ছুটে যাচ্ছে। সে যাচ্ছে না। সে পোর্ট-হোলে গিয়ে পর্যন্ত দাঁড়াচ্ছে না। সে যেন এখন চুপচাপ হাতমুখ ধুয়ে এক কাপ চা খাবে, কাজের পোশাক পরে তেলের টব, বাকেট নিয়ে যেমন রোজ উইনচে চলে যায় তেমনি যাবার কথা। বড়-টিণ্ডাল কে, সে তাকে যেন চেনে না! চোখমুখ দেখলে বিশ্বাসই হবে না সে বড়-টিণ্ডাল বলে কাউকে চিনত।

    ডেবিড এসে দেখল ছোটবাবু চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। ডেবিডকে দেখে একটা কথা বলছে না।

    এনজিন-সারেঙ ছুটে এসেছেন।

    –কোথায়।

    –ছোট তুই যাবি না?

    বড়-টিণ্ডালের লাশ পাওয়া গেছে।

    ছোটবাবু বলল, তোমরা যাও, আমি যাব না।

    ডেবিড এবং রেডিও-অফিসার যাবে। স্যালি হিগিনস, বনি গ্যাঙ-ওয়েতে চলে গেছে। মোটরবোট সিঁড়ির কাছাকাছি অপেক্ষা করছে।

    সারেঙ বললেন, তুই না হলে হবে কেন?

    –আমার কি দরকার! আপনারা যান।

    –কি বলছিস ছোট! ওর কাজ-কামে কি দরকার হবে আমরা কি করে জানব!

    –আমি তো কিছু জানি না কি কি করতে হবে।

    ডেবিড এবার যেন ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে।–ছোটবাবু, সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। স্যালি হিগিনস, আর্চি, চিফ-মেট সবাই। ছোটবাবু তবু কথা বলছে না। সে ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর ছোটবাবু পোশাক পাল্টে বের হয়ে এল। সারারাত সে ঘুমোয় নি বলে চোখ লাল। সে বাইরে এসে দেখল নিচে বোটে সবাই উঠে গেছে। ওর জন্য বোট ছাড়ছে না। ওকে ধরে-বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

    সে বোটে উঠে গেল। সে সমুদ্রের দিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। ওকে কেউ দেখুক সে যেন চায় না। দূরে সেই বেলাভূমিতে শহর ভেঙে সব লোক নেমে এসেছে। সেই বিচিত্র মানুষটি জোয়ারের জলে ভেসে গেছিল আবার সমুদ্র তাকে ঠেলে দিয়ে গেছে কিনারায় এবং শহরের সর্বত্র তখন একই খবর। জাহাজের সেই বিচিত্র বসন্তনিবাস মারা গেছে। তখন সকালের রেডিওতে আবহবার্তা, তখন রেডিওতে এ-ছোট খবরটাও ছিল বেলাভূমিতে একজন বিদেশী মানুষের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। জাহাজ সিউল-ব্যাংকের নাবিক। মানুষজন ছুটছে সেই বিদেশী মানুষের মৃতদেহ দেখতে।

    ওরাও সবাই সেই পাহাড়-ছাদের নিচে চলে এসেছে। কে বলবে গতকাল রাতে জল ছিল এখানে ছাদের সমান। এখন বেলাভূমি শুকনো। যারা শঙ্খ, ঝিনুক সংগ্রহ করতে এসেছিল তারা দেখেছে একজন মানুষ উপুড় হয়ে পড়ে আছে। একটা বড় মাপের জনি-ওয়াকারের বোতল বগলে। সন্তানকে আদর করার মতো বুকের কাছে জড়িয়ে রেখেছে। এই সব মানুষেরা ছুটে ছুটে খবর দিয়েছে সব শহরবাসীদের, সেই লোকটা, বিকেলে যে লোকটা মেলায় ঘুরে বেড়িয়েছিল বেলুন উড়িয়েছিল বাতাসে, লজেন্স চকোলেট সব শিশুদের বিতরণ করেছিল—যে সারাক্ষণ পাতার বাঁশি বাজিয়ে বলেছিল, মি বসন্তনিবাস সেলর—মারা গেছে। সমুদ্রের জলে ডুবে মারা গেছে।

    সবাই মিলে পথ করে দিলে ওরা ভেতরে ঢুকে গেল। ছোটবাবু বাচ্চা ছেলের মতো পাশে বসে পড়েছে। সে যে কাঁদছে কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না।

    স্যালি হিগিনস লাঠিতে ভর করে মাথার দিকে দাঁড়িয়ে আছেন। ঝুঁকে দেখছেন। দেখতে দেখতে বললেন, তুমি আমার ভারি বদনাম করলে হে ছোকরা। তিনি চিফ-মেটকে বললেন, চিফ জলদি বোট আনো। বোটে করে ওকে জাহাজে নিয়ে যেতে হবে। অনেক কাজ। আপনারা এখান থেকে সরে যান মা-মাসিরা। এই যে ছেলে-ছোকরারা তোমরা যাও বাপু। সঙ্গে সঙ্গে পুলিসের লোকেরা ভিড়টা সরিয়ে দিচ্ছে। স্যালি হিগিনস বললেন, আমি আপনাদের বড়কর্তার সঙ্গে একটু কথা বলব। বলে পুলিসের কাছ থেকে ঠিকানা নিলেন। তারপর ডাকলেন, ছোটবাবু, তুমি আবার ঝুঁকে বসে আছ কেন? ওঠো ওঠো।

    হঠাৎ স্যালি হিগিনস ভারি চটপটে এবং ব্যবহারে জাদুকরের মতো মুখ, একজন জাহাজি এভাবে বেলাভূমিতে শুয়ে আছে, তিনি যেন লাঠি উঁচিয়ে বলবেন, এক দুই তিন ওঠো, জাহাজে চলো। তারপরই বড়-টিণ্ডাল উঠে দাঁড়াবে। জাহাজের দিকে হাঁটতে আরম্ভ করবে। এমনই মনে হচ্ছিল স্যালি হিগিনসকে দেখে।

    –এই ছোটবাবু, এখনও তুমি ঝুঁকে আছ। ওঠো। ওকে তুলে নাও। দেখছ না জলে সব ভিজে যাচ্ছে আমাদের।

    সকালের সমুদ্র তেমনি শান্ত এবং প্রবহমান। ছোট ছোট ব্রেকার এসে ওদের সবার জুতো মোজা ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। জলে ডাঙায় পড়ে থাকার মতো বড়-টিণ্ডাল শুয়ে আছে। ছোট ছোট ব্রেকার এলে জল ওর চারপাশে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ছোটবাবু এবার মৈত্রদাকে দু’হাতে পাঁজাকোলে তুলে বলল, কোথায় নিয়ে যেতে হবে স্যার?

    —ওপরে নিয়ে যাও। জলে ভিজে তো ঢোল হয়ে যাচ্ছে।

    মৈত্রদা ভীষণ ভারী। এমন জবরদস্ত মানুষটাকে সে সহজেই কাঁধে ফেলে নিতে পেরেছিল। প্রথম পাঁজাকোলে তারপর কাঁধে ফেলে নিলে জল বমি করেছে হড়-হড় করে। এবং প্রায় হাল্কা হয়ে গেলে ছোটবাবু দেখল সবাই ওকে অবাক চোখে দেখছে। এত বড় লাশটাকে কত সহজে কাঁধে ফেলে নিতে পারছে ছোটবাবু, প্রায় দৈত্যের সামিল। আর্চির গলা শুকিয়ে কাঠ। সে বলল, স্যার আমরা জাহাজে ফিরে যাচ্ছি।

    স্যালি হিগিনস বললেন, নো।

    আর্চি বোধ হয় অপমানে ফেটে পড়েছিল। সে দাঁড়িয়ে গেল—বোট আসতে দাও। স্যালি হিগিনস এমন বলে দেখলেন ছোটবাবু তখনও দাঁড়িয়ে আছে। কাঁধে মৈত্রের মৃতদেহ। তিনি কিছু বলছেন না তিনি অন্য অনেক কথা বলছেন—এই যে ডেবিড তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন! দ্যাখো বোট আসছে কিনা! —সারেঙ, এনজিন-সারেঙ!

    এনজিন-সারেঙ ছুটে এলেন।—তুমি কি করছ?

    এনজিন-সারেঙ বললেন, ওদের তো দাহ করার নিয়ম। ওরা তো স্যার লাশ কবর দেবে না।

    –তা হলে কি কি করতে হবে ঠিকঠাক করে ফেল। আমরা দেরি করব না।

    স্যালি হিগিনস দেখছেন, ছোটবাবু লাশ কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার চেয়ে ছোটবাবু দীর্ঘকায় এক মানুষ, আত্মপ্রত্যয়ের অভাব সামান্য। সব ঠিক হয়ে যাবে। দাঁড়িয়ে থাকতে দাও। এই যে ডেক- সারেঙ, বলতেই ডেক-সারেঙ লাফিয়ে লাফিয়ে কাছে চলে গেল। বলল, আদাব স্যার।

    স্যালি হিগিনস বললেন; আদাব। বড়-টিণ্ডাল কেন মরল বল তো?

    –জানি না স্যার।

    —তুমি ডেক-টিণ্ডাল?

    –জানি না স্যার!

    –তুমি তুমি

    বনি বলল, কতক্ষণ লাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। ওকে নামাও।

    স্যালি হিগিনস ডাকলেন, দ্যাখো তো বোট আসছে কিনা জ্যাক!

    আর্চি বলল, ঐ যে আসছে স্যার। আসছে। সে আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না, বোটের কাছে ছুটে গেল। স্যালি হিগিনস সামান্য হাসলেন। বললেন, ছোটবাবু এবার ওকে নামাও।

    ছোটবাবু বলল, নামিয়ে কি হবে? বরং স্যার বোটে তুলে দি।

    বোট কিছুটা দূরে। ডেবিড বলল, ছোটবাবু ওকে নিচে রাখ। আমরা লাশ ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছি।

    ছোটবাবু কিছু বলল না। এগিয়ে যেতে থাকল। বোটে সে একেবারে মৈত্রদাকে শুইয়ে দেবে। বোধহয় ছোটবাবুর ভীষণ ঘাম হচ্ছিল এবং এত ভারী ওজনের মানুষটাকে কাঁধে ফেলে রাখা যাচ্ছে না। এক হাতে দু’পা, কাঁধে শরীর এবং ডান হাতে আর একটা হাত, আহত কোন সৈনিকের মতো ছোটবাবু তার মৈত্রদাকে নিয়ে যাচ্ছে। বোধহয় সে মৈত্রদাকে কোনো মৃত মানুষের মতো ভাবতে পারছে না। জলে ডুবে মরা মানুষেরা কখনও বেঁচে ওঠে—হয়তো বোটে নিয়ে যেতে যেতে মৈত্রদা ফিক করে হাসবে, কিরে ছেলে না মেয়ে? এমন যখন হতে পারে তখন তাকে একজন আহত সৈনিকের মতো সে নিয়ে চলল। বেঁচে গেলে যেন বলতে না পারে, রাখ রাখ তোরা তো আমাকে মেরেই ফেলেছিলি। এবং এভাবে ছোটবাবু মৈত্রকে শুইয়ে দেবার সময় বোটের চারপাশে সবাই জড়ো হতে থাকলো। একটা মাত্র বোট। ঠিক থাকল বাকি সবাই হেঁটে যাবে জাহাজে। বোটে ছোটবাবু ডেবিড বন্ধু এনজিন- সারেঙ। বনি উঠতে চেয়েছিল। ছোটবাবু বলল, নো। তুমি হেঁটে যাও।

    আর এখন এই যে একজন সমুদ্র-মানুষের শেষ কাজ, শেষ কাজ বলতে ওরা মৈত্রকে দূর সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে আসতে পারে—একজন সমুদ্র-মানুষের সমাধি এভাবে হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বন্ধু অনিমেষ ধার্মিক নাগরিকের মতো চোখ মুখ করে রেখেছে। বহুদিন পর মনে হয়েছে ওরা জাতিতে হিন্দু ওদের ধর্মে নানা বিধিনিষেধ আছে, তীরের কাছাকাছি কোথাও একটা দাহ করার জায়গা খুঁজে বের করতে হবে। ওরা ছোটবাবুকে বলল, ছোটবাবু তুমি কিন্তু কিছুতেই রাজী হবে না।

    বনি আবার বলল, ছোটবাবু আমাকে নাও। আমি যাব।

    ছোটবাবু বলল, উঠে এস। বলেই ওরা বোট ছেড়ে দিল। ওদের অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হবে, ছোটখাটো সব দ্বীপমালা ভেসে রয়েছে। জাহাজটা আছে সামনে, মনে হয় কাছাকাছি। কিন্তু এই সব দ্বীপমালা চারপাশে, অনেক ঘুরে ঘুরে যেতে হবে। মোটর-বোটে ওরা ভেসে যাবার সময় দেখল মৈত্রদা নিরীহ স্বভাবের মানুষ, ঘুমিয়ে আছে মতো। শরীর এখনও শক্ত হয়নি। দু’টো একটা প্লাস্টিকের খেলনা জামায়, ছোট পুঁতির মালা। পকেটে হাত দিয়ে পেল সামান্য ক’টা চকোলেট। এবং জামাটা ওপরে উঠে গেলে ছোটবাবু অবাক, পেটে পিঠে অদ্ভুত সব নীল চাকা চাকা দাগ। সামান্য দুর্গন্ধ। জামা ওঠে এলে সবাই কেমন চোখ মুখ কুঁচকে দেখল শরীরে মানুষটার কিছু বাকি ছিল না। এনজিন-সারেঙ বললেন, ছোট সর্বনাশ তুই ঘাটছিস! তোর রক্ষা থাকবে না।

    ছোটবাবু জেদী বালকের মতো নরম হাতে জামা টেনে দেখল। বনি আছে নয়তো সে প্যান্ট খুলে দেখত, কোথায় কোথায় মানুষটা শরীরে এমন কঠিন অসুখ নিয়ে বেঁচেছিল। বনি আছে বলে সে ফের জামা টেনে বলল, বন্ধু কাঠ পাবি কোথায়?

    বন্ধু বলল, ছোটবাবু তুমি কিন্তু আমাদের কথার বাইরে যাবে না। গেলে হাতাহাতি হবে।

    অনিমেষ বলল, আমরা মৈত্রকে আগুনে পোড়াব। মাটির নিচে কিছুতেই চাপা দেব না। ধর্মাধর্মের ব্যাপারটা তুমি অবহেলা করবে না।

    ডেবিড বলল, বড়-টিণ্ডালের এত বড় অসুখ ছোটবাবু তুমি জানতে না!

    ছোট কি বলবে! সে বলল, না। সে সোজাসুজি মিথ্যা কথা বলল।

    –তোমরা ছোটবাবু মরবে।

    ছোটবাবু বলল, ডেবিড আমার কিছু করার ছিল না

    এবং ভীষণ চিন্তিত দেখাল ডেবিডকে। ডেবিড বলল, লোকটা ঘায়ের জ্বালায় পাগল হয়ে গেল। আর তোমরা চুপচাপ দেখে গেলে!

    ছোটবাবু ভারী লজ্জায় পড়ে গেছে মতো মাথা নিচু করে রেখেছে।

    তখন বনি বলল, ডেবিড, বড়-টিণ্ডালের শরীরে ওসব কি!

    ছোটবাবু সহসা চিৎকার করে উঠল, বনি!

    এবার ছোটবাবু ডেবিডের দিকে না তাকিয়েই বলল, ডেবিড এসব কথা আর কেউ যেন না জানে। মৈত্রদার ইচ্ছে নয় কেউ জানুক। আমরা ক’জনই না হয় জানলাম, মৈত্রদা একটা নোংরা অসুখে মরে গেল। আর তখনই ছোটবাবুর মুখটা ভারী বিষণ্ণ হয়ে যায়। যেন মনে হয় ওর উচিত ছিল ডেবিডকে সব খুলে বলা। মৈত্রদার ভয়ে সে এটা করেনি। মৈত্রদা তা হ’লে বেঁচে যেতো। সে বলল, ডেবিড আমি জানতাম। মৈত্রদার ভয়ে বলিনি। এখন মনে হচ্ছে আমি সত্যি মানুষটাকে মেরে ফেললাম। বুঝতে পারছি আমার আরও সাহসী হওয়া দরকার।

    ডেবিড বলল, ছোটবাবু জাহাজে মানুষ এভাবেই বাঁচে। তোমার দুঃখ করার কিছু নেই। নসিবে আছে মরবে—তুমি কিছু করতে পার না।

    বন্ধু তখন আবার বলছে, ছোটবাবু আমরা কিন্তু মৈত্রকে পোড়াব।

    ছোটবাবু বলল, পোড়াবি তো পোড়াবি। বার বার বলার কি আছে!

    –তুমি যা মানুষ। ভালো মানুষের মতো রাজী হয়ে গেলে আমাদের কথা কেউ তখন শুনবে না।

    ওরা ছ’জন মানুষ আর মাঝখানে লম্বা হয়ে পড়ে আছে বসন্তনিবাস। আকাশ ভীষণ মেঘলা। সমুদ্রের জল তেমন নীল নয় আর। কেমন ঘোলা দেখাচ্ছে। ওরা দু’টো-একটা দ্বীপের পাশ দিয়ে জাহাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হালে বসে আছে সামোয়ান মাঝি। মানুষটার কাছে আশ্চর্য লাগছে, কোথাকার মানুষ কোথায় এসে মরে গেল। লোকটার স্ত্রী, ছেলেমেয়েরা কোথায় থাকে জানার খুব তার ইচ্ছে। সেও দু’টো একটা কথা বলছে।

    দু’এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল এ-সময়। ওদের বোট এখন জাহাজের নিচে ভিড়ে গেছে। সিঁড়ির কাছে বোট বেঁধে ছোটবাবু বন্ধু ওপরে উঠে গেল। কিভাবে কি হবে ওরা এখনও জানে না। জাহাজে মাল বোঝাই হবার কথা সকাল থেকে। কিন্তু সকালে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেলে সব বন্ধ হয়ে গেল। জাহাজে মাল বোঝাই হবে না। একজন মৃত জাহাজির সম্মানে সব কাজকর্ম বন্ধ। ছোটবাবু, ডেবিড, এনজিন-সারেঙ হেঁটে যাচ্ছিল। অন্য জাহাজিরা এখন রেলিঙে ঝুঁকে আছে। বড়-টিণ্ডালের লাশ দেখছে। খুবই হতাশা মুখে এবং আর্চি তেমনি জাহাজিদের পাশে পাশে হেঁটে যাচ্ছে। মুখে সে চুরুট রেখে জাহাজের মাস্তুলে নানাবিধ দুর্ঘটনার ছবি প্রত্যক্ষ করছে। সেও বেশ ঝুঁকে দেখছে।

    তখন স্যালি হিগিনস ব্রীজ থেকে হাঁকলেন, কোয়ার্টার-মাস্টার!

    কোয়ার্টার-মাস্টার এলে বললেন, ছোটবাবুকে ডাকো।

    ছোটবাবু প্রায় দৌড়ে ওপরে উঠে গেলে হিগিনস বললেন, দাহ করা যাবে না। স্থানীয় মানুষেরা আপত্তি করবে।

    ছোটবাবু বলল, কেন স্যার?

    –ভারী বীভৎস ব্যাপার বলছে। ফোনে কথাবার্তা বললাম, কিছু করা গেল না। শহরের মেয়র রাজী হচ্ছে না। গণ্ডগোল বেঁধে যেতে পারে।

    সে বলল, যদি দূরে এই ধরুন দশ-বারো মাইল দূরে কোনো দ্বীপে নিয়ে যাই! সেখানে পুড়িয়ে আসি!

    –দেখি তবে।

    তিনি ফোন করে সব খবরাখবর নিলেন। বললেন, হবে। তাহলে তোমরা বোট নিয়ে ভেসে পড়।

    দু’টো বোট ভাড়া করেছে চিফ-মেট। এখন কে কে যাবে? স্যালি হিগিনস বললেন, ছোটবাবুকে জিজ্ঞাসা কর, কে কে যাবে?

    কাছে কোথাও ছোটবাবু ছিল না। সে তখন জাহাজের পাশে ছোট্ট বোটটাতে নেমে গেছে। তীরে সব মানুষদের জটলা। সূর্য ক্রমে সমুদ্র থেকে ওপরে উঠে আসছে। দলে দলে সব সাদা রঙের পাখি জাহাজটার মাথায় উড়ছিল। ছোটবাবু বড়-টিণ্ডালের জামা প্যান্ট খুলে ফেলছে। বনি উঁকি দিলেই হাঁকছে, এই তোমার এখানে কি! যাও ভেতরে যাও। বনি মুখ ব্যাজার করে কেবিনে ঢুকে বসে থাকছে। বার বার ভাবছে—আর যাবে না। সারাক্ষণ ধমকের ওপর রাখলে কার মেজাজ ঠিক থাকে!

    এনজিন-সারেঙ অবাক, জ্যাক ছোটবাবুকে কবে থেকে এত মান্য করতে শিখল। তিনি একেবারে হাঁ। সব দেখে-শুনে এখন ইচ্ছে হচ্ছে তাকেও ছোটবাবু কিছু বলুক। কিছু এই যেমন সামান্য চন্দন কাঠ কোথায় পাওয়া যাবে। সামান্য ঘি স্টোর রুমে পাওয়া যাচ্ছে—কাঠের জন্য বন্ধু আর ডেবিড চলে গেছে। ছোটবাবু তাকেও পাঠালে পারত। জব্বার মনু বাদশা মিঞা চুপচাপ বড়-টিণ্ডালের পাশে বসে রয়েছে। এবং যা হয়ে থাকে সবাই নিজের নিজের সুখ দুঃখ অর্থাৎ এই মৃত্যু মানুষের কোন দূরবর্তী আকাঙ্ক্ষার মতো, মৃত্যু তাদের যেন অনেক বড় করে দিয়েছে। কিছুতেই ওরা আর ছোট কাজ করতে পারবে না। একজন জাহাজি নানাকারণে পৃথিবীর অন্যসব মানুষের চেয়ে আলাদা।

    বোট ছাড়ার সময় হয়ে যাচ্ছে। যারা যারা যাবে হাত তুলে ছোটবাবু ইশারায় ডাকছে। যেমন যাচ্ছে ছোট-টিণ্ডাল, এনজিন-সারেঙ, বড়-টিণ্ডালের ওয়াচের তিনজন ফায়ারম্যান, দু’জন কোলবয় স্যালি হিগিনস নিজে, ডেবিড, বন্ধু, অনিমেষ। বনি লাফিয়ে নামছে। বেহায়ার মতো জাহাজের ওপরে দাঁড়িয়ে হাঁকছে, ছোটবাবু আমি যাব। ছোটবাবুর তাকাবার পর্যন্ত সময় নেই। হাত তুলে সে ইশারায় না করছে। স্যালি-হিগিনস নেমে আসার সময় দেখতে পেলেন বনি কেবিনের দিকে ব্যাজার মুখে ফিরে যাচ্ছে। তিনি বললেন, বনি যাবে? গেলে চল।

    বনি বলল, না বাবা আমি যাব না।

    বনি বোধ হয় মানুষের এই নিষ্ঠুর পরিণতি দেখতে সাহস পাচ্ছে না।

    আর একটা বোট নিয়ে ফিরছে বন্ধু এবং ডেবিড। ওরা কাঠ মেটে হাঁড়ি এবং নতুন সাদা থান এনেছে। এবং বাঁশ লম্বা মতো দু’টো। কিছু শুকনো ডাল আর সব চন্দন কাঠ। পাটকাঠি পাওয়া যাচ্ছে না। তার চেয়ে নরম ঘাসের কাণ্ড এনেছে যা পাটকাঠির মতো জ্বলবে। তারপর দু’টো বোট সমুদ্রে ক্রমে একটা দ্বীপ খুঁজে বেড়াতে বেড়াতে বেশ পাঁচ-ছ মাইলের মাথায় একটা আশ্চর্য সবুজ রঙের পাথরের দ্বীপ পেয়ে গেল। দূর থেকে দ্বীপ বলে চেনা যায় না। সমুদ্র যেন সহসা ঢেউ তুলে স্থির হয়ে গেছে। ঢেউটা আর নড়ছে না। উঁচু নিচু সব ঢেউ আর তার উপত্যকা। ওরা কাছে গেলে বুঝতে পারল বেশ ছোট দ্বীপটা। ফার্লং-এর মতো দ্বীপটা প্রস্থে দৈর্ঘ্যে সমান। ওরা চারজন, ডেবিড বন্ধু সামনে, অনিমেষ ছোটবাবু পেছনে, উঠে যেতে থাকল।

    মাচানের ওপর শুয়ে আছে বড়-টিণ্ডাল। পেছনে আসছে সবাই। মাথায় করে তুলে আনছে কাঠ বাঁশ। এবং স্যালি হিগিনসের হাতে চন্দনের কাঠ। সারেঙের হাতে ঘি-এর টিন। সব নিয়ে উঁচু একটা জায়গা দেখে ওরা উঠে যাচ্ছে। চারপাশে শুধু সমুদ্র আর তার তরঙ্গমালা। সবুজ পাহাড়ের মাথায় সেই এক অগ্নিকাণ্ডের আয়োজন। ডেবিড এবং স্যালি হিগিনস দূরে দাঁড়িয়ে ক্রমে কৌতুহলী হয়ে উঠেছেন। মানুষের শরীর আগুনে পুড়ে যায়—জীবনেও ওঁরা দেখেন নি। কেমন ভয়ে কৌতুহলে ওঁরা সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে দেখছেন।

    ছোটবাবু সমুদ্র থেকে হাঁড়িতে জল তুলে আনছে। জলে স্নান করানো হচ্ছে বড়-টিণ্ডালকে। বড় একটা পাথরের ওপর বসন্তনিবাস শুয়ে আছে। ঘড়া ঘড়া জল ঢালা হচ্ছে। একে একে সবাই জল এনে ওর শরীরে ঢেলে দিল। তারপর সাদা নতুন কাপড় এবং কাঠ সাজিয়ে রাখা হচ্ছে। সূর্য ঠিক তখন সমুদ্রে অস্ত যাবার মুখে। ছোটবাবু মৈত্রদার মুখে আগুন দেবার সময় বলল, বন্ধু, তোরা হরিবোল দিলি না; সবই যখন হল এটা বাদ যাবে কেন?

    এবং এই এক শব্দ পাহাড়ের মাথায় আর এই দিগন্তে। এখন সমুদ্র জয় করে অথবা আকাশ- বাতাস জয় করে ছুটে যাবে। ওরা তার চিতা প্রদক্ষিণ করল। ছোটবাবুর সেই ঠাকুরদার দৃশ্যের কথা মনে পড়ছে। এবং পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিল। কি যে ভয় ছিল তখন! এখন সে সাহসী মানুষের মতো অথবা বলা যায় অভিভাবকের মতো কাঠের নিচে আগুন দিয়ে পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকল। আগুন ক্রমে প্রবল হয়ে উঠছে। কাঠের ফাঁকে ফাঁকে আগুন ক্রমে আকাশ ছুঁয়ে দিতে চাইছে।

    আর আগুনের ভেতর ছোটবাবু সহসা কেন যে বনির মুখ দেখে ফেলল। জাহাজে বনি একা। স্যালি হিগিনস পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে মানুষের সৎকার দেখছেন। কেমন হুঁশ ছিল না তার। ছোটবাবু পাশে দাঁড়িয়ে ডাকল, স্যার।

    –কিছু আমাকে বলবে?

    –অনেক রাত হবে। আপনি বরং স্যার ফিরে যান একটা বোটে। সে ডাকল, চাচা! সারেঙ পাহাড়ের মাথায় উঠে গেলে বলল, আপনারা ফিরে যান। আমরা একেবারে শেষ হয়ে গেলে ফিরব। একটা বোট এখানে থাক।

    হিগিনস জাহাজে ওঠার মুখে দেখলেন, বনি বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে আছে! আবার সেই সাদা জ্যোৎস্না সমুদ্রে। বোট-ডেকে বনিকে আবছা দেখা যাচ্ছে। বনির কাছে গিয়ে বললেন, ওদের ফিরতে রাত হবে বনি।

    –ওরা কতদূর গেছে?

    তিনি এবার দূরে অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় দেখলেন নক্ষত্রের মতো সমুদ্রের বুকে আগুনটা জ্বলছে।–এই যে দেখছ, দেখতে পাচ্ছ না, মাঝে মাঝে একটা উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আগুন আকাশে কখনও বেশ দপ্ দপ্ করে জ্বলছে আবার নিভে যাচ্ছে দেখতে পাচ্ছ?

    —হ্যাঁ বাবা।

    –ওখানে ওরা একটা দ্বীপে বড়-টিণ্ডালকে আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি এবার বললেন, ভয় করলে ব্রীজে এসে বসতে পার।

    এবং তখনই হঠাৎ ওপরে কোয়ার্টার মাস্টারের গলা। স্যার ফোন। সে বলতে বলতে নেমে আসছে। ওপরে উঠে তিনি বললেন, ইয়েস ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস, বলুন। তারপর চুপচাপ। আবার বললেন, ইয়েস ইয়েস। কিন্তু এটা কেন হচ্ছে। বনি দেখল বাবার মুখ দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে।

    ফোনে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, হোয়াট

    –স্যার রিচার্ড ফ্যালের এমনি নির্দেশ আছে।

    –নো নো। আমি পারব না। বলতে বলতে উত্তেজনায় তিনি থরথর করে কাঁপছেন। তারপর কেমন স্তিমিত গলায় বললেন, আসবেন। নিশ্চয়ই আসবেন। তারপর বসে পড়লেন। কেমন রক্ত- শূন্য হয়ে গেছেন সহসা। সাদা ফ্যাকাশে মুখ। বনির দিকে তাকিয়ে আছেন। আর চোখ নামাচ্ছেন না। বনি বাবাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, বাবা কি হয়েছে! বাবা! বাবা!

    স্যালি হিগিনস ভীষণ নিথর। ঠাণ্ডা। যেন জীবনে আর একটা কথা বলবেন না।

  • তেতাল্লিশ

    তেতাল্লিশ

    ।। তেতাল্লিশ।।

    তখন সমুদ্রের পাড়ে পাড়ে সব সামোয়ান নর-নারীদের ভীড়। ওরা জ্যোৎস্নায় দাঁড়িয়ে দূরবর্তী পাহাড়ের মাথায় আগুন জ্বলতে দেখছে। অতি-উৎসাহী মানুষেরা বোট-ভাড়া করে পাহাড়টার কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। কি করে যে একজন মানুষকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এবং পাহাড়ের চারপাশে ওদের দেখে ছোটবাবু অবাক-–বোটের সব মানুষেরা এসে হাত নাড়ছে নিচে। ওপরে ওরা উঠে আসতে চায়। দেখতে চায়।

    ছোটবাবু না বললে যেন কেউ উঠতে পারছে না। সে বলল, আসুন। এবং ওদের কেউ কেউ মানুষের সেই আধ-পোড়া শরীর দেখে কেমন ঘাবড়ে গেল। ডেবিড খুব বেশি সময় কাছে থাকতে পারে নি। ও-পাশের ছোট একটা পাহাড়ের মাথায় সে শুয়ে আছে। ওর শরীর গোলাচ্ছে। ছোটবাবু ওকে ওদিকে রেখে এসেছে। কারণ মানুষের মাংসের সেই উৎকট পোড়া গন্ধে ছোটবাবুও ঠিক ছিল না। বন্ধু, অনিমেষ খুব সাহসী মানুষের মতো কাজ করে যাচ্ছে। ছোটবাবু মাঝে মাঝে আগুন কমে গেলে উসকে দিচ্ছে, কাঠ ফেলে দিচ্ছে। কাঠের নিচে আধ পোড়া শরীর ঢেকে দিয়ে সে সবসময় যতটা পারছে না দেখে থাকছে।

    যারা এসেছিল বোট-ভাড়া করে, তারা কেউ বেশি বয়সের কেউ কম বয়সের। বেশ নিজেদের ভাষায় কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের মাথায় বলে একসঙ্গে বেশি লোক উঠতে পারছে না। পাঁচ সাতজনের একটা দল উঠে আসছে, আবার ওরা নেমে গেলে আর একদল উঠে আসছে।

    অনিমেষ বলল, বেটা বেশ মরে গিয়ে এখানে অমর হয়ে থাকল।

    আসলে বোধহয় এই দ্বীপবাসীদের কাছে এটা একটা খবর—যেন দিন কাল মাস কেটে যাবে, বছরের পর বছর কেটে যাবে, তবু খবরটা ওরা বয়ে বেড়াবে আজীবন। বাংলাদেশের নাবিক বসন্তনিবাস এখানে সমুদ্রে ডুবে মরেছিল। ঐ যে দেখছ পাহাড়টা, সমুদ্র থেকে খাড়া উঠে গেছে, ঠিক আকাশের নিচে, তার মাথায় সারারাত আগুনটা জ্বলেছিল। একজন-মানুষের শরীর প্রায় সারারাত পাহাড়ের মাথা জ্বলেছিল—বড় দুঃসাহসিক ঘটনা।

    সুতরাং প্রথমে মনে হয়েছিল একজন মানুষের শরীর আগুনে পোড়ালে দ্বীপবাসীরা সহজে মেনে নাও নিতে পারে। পরে মনে হয়েছে, যেন এই দ্বীপবাসীদের জীবনে এটা একটা নতুন রোমাঞ্চ। কারণ সমুদ্রের পাড়ে পাড়ে হাজার হাজার এখন মানুষ। জ্যোৎস্নায় দিগন্তে নক্ষত্রের মতো আগুনের সামান্য ফুলকি দেখছে। আগুনের সেই ফুলকি নিভে না গেলে ওরা বুঝি কেউ ঘরে ফিরবে না। একজন ঘরছাড়া মানুষের মৃত্যুতে ওরা বেদনা বোধ করছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শোক প্রকাশ করছে। দেখে মনে হচ্ছে মেয়রকে ধরে হয়তো এ-বছরের বাজেটে পাহাড়ের মাথায় সামান্য একটা স্মৃতিসৌধের জন্য খরচ রাখবে, যেন আগামী বছরের জুন-জুলাইর ভেতর তার নির্মাণকার্য শেষ হয়ে যায়। এত সব মানুষ যখন বালিয়াড়িতে, সমুদ্রের ধারে ধারে এবং পাহাড়ী উপত্যকাতে দাঁড়িয়েছিল তখন একটা স্মৃতিসৌধ সামান্য ঘটনা। সেই সাদা জ্যোৎস্নায় ছায়া ছায়া সব মানুষের মিছিল। আর আগুন নিভে নিভে শেষ হয়ে আসছে।

    চারপাশে সমুদ্র তেমনি ফুঁসছে। সমুদ্র পাহাড়টার চারপাশে মাথা কুটে মরছে। ওরা ডেবিডকে ডেকে নিয়ে এল। এখন সমুদ্র থেকে জল আনতে হবে। চিতা নিভিয়ে দিতে হবে। ছোটবাবু জল এনে চিতার ওপর ঢেলে দিল। বলল-–দাদা, তোমাকে এখানে রেখে গেলাম, সুখে থেকো।

    অনিমেষ বলল, থাক শালা সুখে থাক।

    বন্ধু বলল, তুমি তো থাকলে বড়-টিণ্ডাল। তোমার বৌকে আমরা ফিরে গিয়ে মুখ দেখাব কি করে!

    ডেবিড জল ঢেলে দিল।

    জব্বার এবং অন্য সবাই জল ঢেলে তারপর নেমে এল নিচে। সমুদ্রে ওরা ডুবে স্নান করল। তারপর ভেজা জামা-কাপড়ে বসে থাকল বোটে সবাই। কেউ একটা কথা বলছে না। আকাশে নক্ষত্রমালা তেমনি জেগে আছে। পাহাড়টা ক্রমে জ্যোৎস্নায় অস্পষ্ট হয়ে গেল। ক্রমে ওরা তীরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এবং জাহাজে আলো, মাস্তুলে তেমনি লম্ফ জ্বলছে। ওরা বোট ভিড়িয়ে ওপরে উঠে যেতে থাকল।

    তখন গ্যাঙ-ওয়েতে কোয়ার্টার-মাস্টার বললে, আল্লা মুবারক।

    ছোটবাবু বলল, আল্লা মোবারক।

    কোয়ার্টার-মাস্টার হাত টেনে বলল, কাপ্তানের শরীর ভাল না।

    –কি হয়েছে! ডেবিড শুনছ?

    –কী!

    –কাপ্তানের শরীর ভাল না।

    কোয়ার্টার-মাস্টার বলল, ফিট, ফিটের ব্যামো।

    ছোটবাবু এবং ডেবিড এক মুহূর্ত আর দেরি করল না। জব্বার আর বন্ধুকে বলল, তোরা যা। ভিজে জামা প্যান্ট পরে বেশিক্ষণ থাকিস না এবং ছোটবাবু নিজের কেবিনে এসে তাড়াতাড়ি পোশাক পাল্টে নিল। পাশের কেবিনগুলো বন্ধ। সবাই ঘুমিয়ে আছে হয়তো। রাত গভীর,কোন সাড়া শব্দ নেই। সে ওপরে ওঠে বনির কেবিনে টোকা মারল। সাড়া শব্দ এখানেও কিছু নেই। বনির কাছে জানতে পারত কি হয়েছে। ও-পাশের পোর্ট-হোলে উঁকি মেরে দেখল, বনি কেবিনে নেই। সে এবার সিঁড়ি ধরে আরও ওপরে উঠতে থাকল। চার্ট-রুমের পাশে কাপ্তানের খাসকামরা। দরজা খোলা। ভেতরে আলো জ্বালা। সে উঁকি দিয়ে দেখল, পায়ের কাছে আর্চি বসে আছে। মাঝে চিফ-মেট। কাপ্তানের বাংক দেখা যাচ্ছে। কাপ্তানের শরীর চাদরে ঢাকা সে বুঝতে পারল। চিফ-মেট ছোটবাবুকে উঁকি দিতে দেখে বলল, কাম-ইন

    —ছোটবাবু।

    –কাম-ইন, কাম-ইন। যেন প্রাণ পেয়েছেন হাতে। এবং মুখে সরল বালকের মতো হাসি।

    ছোটবাবু ভেতরে ঢুকলে বললেন, বোস। মুখ এত গোমড়া কেন। আরে, আমার কিছু হয়নি। বড়-টিণ্ডাল! ওটা একটা আহাম্মক। ওর জন্য কষ্ট পেয়ে লাভ নেই।

    ছোটবাবু কখনও কাপ্তানের খাস-কামড়ায় আসে নি। একটা সবুজ রঙের আলো জ্বলছে। তিনি শুয়ে আছেন। বুক পর্যন্ত সাদা চাদরে ঢাকা। নকল দাঁতের দু’পাটি খোলা। খুব বুড়ো এবং শীর্ণকায় মনে হচ্ছে স্যালি হিগিনসকে। এবং কেন জানি মনে হল মানুষটা প্রাচীন মানুষের মতো ভীষ্মের শরশয্যায় যেন শুয়ে আছেন। সে পাশে বসে বলল, কেমন আছেন?

    —খুব ভাল। জ্যাক তুমি শুতে যাও। কতক্ষণ এ-ভাবে বসে থাকবে।

    এবং ছোটবাবু দেখল, জ্যাক মাথার কাছে বসে আছে। তার দিকে তাকাচ্ছে না। অথবা সে যে কেবিনে এসেছে একেবারে যেন বুঝতে পারে নি, জ্যাক কি যে চুপচাপ এবং সেও কেন জানি আর একটা কথা বলতে পারল না। এমন একটা সুন্দর কেবিন, ঠিক মাথার কাছে যীশুর মূর্তি। নিচে ছোট্ট গোল টেবিল। ফুলদানিতে কিছু ফুল। হুকে জাহাজি টুপি ঝুলছে। লকার অতিকায়। দু’টো পোর্ট-হোল দু’দিকের দেয়ালে। তিনি বুকে দু-হাত প্রার্থনার মতো রেখেছেন। ছোটবাবুর কেমন ভাল লাগছে না। ডেবিড এখনও আসছে না কেন!

    তখন স্যালি হিগিনস বললেন, বেশ সময় লেগে গেল তোমাদের।

    ছোটবাবু বলল, হ্যাঁ সার। ডেবিড এখনও আসছে না কেন! সে দরজার দিকে বার বার তাকাচ্ছে।

    হিগিনস বললেন, বড়-টিণ্ডালের বাড়িতে কে আছে?

    —ওর স্ত্রী।

    –আর কেউ নেই?

    –আর কে আছে জানি না।

    –কালই খবরটা পাঠিয়ে দিতে হবে। চিফ-মেট বলল, আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা তো আছি।

    ডেবিড ঝড়ের মতো ঢুকে প্রথমে পালস্ দেখল কাপ্তানের। তারপর চোখ টেনে দেখল। দেখি জিভ। বের করুন। ছোটবাবু উঠে দাঁড়িয়েছে। ওরা দু’জন প্রায় এখন যেন সমবয়সী মানুষ। ওরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে স্যালি হিগিনসকে দেখছে। জ্যাক বসে রয়েছে মাথার কাছে। একটা কথা বলছে না। জ্যাকের পোশাক আরও ঢিলে-ঢালা। আর্চি আড়চোখে জ্যাককে দেখছে। এবং এ-কেবিনে সে যেন জ্যাককে দেখার জন্যই বসে রয়েছে। এই যে মেয়ে জ্যাক, এবং এই যে সুগন্ধ মেয়ের চারপাশে—কেমন এক কূট আকর্ষণ। সে সারারাত জেগে যেন বসে থাকতে পারবে। জ্যাক বসে থাকলে রাত জেগে বসে থাকতে এতটুকু কষ্ট হবে না তার।

    ডেবিড বলল, আপনি ঘুমোন স্যার।

    স্যালি হিগিনস বললেন, আমার ঘুম আসছে না ডেবিড।

    –না ঘুমোলে তো চলবে না। এই জ্যাক, তুমি আর বসে থাকবে না। যাও। শুয়ে পড়ে গে। স্যার, সে চিফ-মেটের দিকে তাকাল।

    চিফ-মেট বলল, যাচ্ছি।

    ডেবিড এবার আর্চির দিকে তাকিয়ে বলল, কি ব্যাপার তোমার ঘুম পায় না? এস। সে প্রায় সবাইকে নিয়ে বাইরে বার হয়ে এল। একজন কোয়ার্টার-মাস্টার শুধু জেগে বসে থাকল বাইরে। আলো নিভিয়ে দেওয়া হল। ওকে এ-ভাবে জাগিয়ে রাখা ঠিক হয় নি। পাল্সের বিটে সামান্য গণ্ডগোল এখনও আছে। ওরা বোট-ডেকে নেমে গেল। জ্যাক বলল, ফোনে কথা বলার সময় অজ্ঞান হয়ে যান। ডাক্তার বলে গেছেন, দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনায় এমন হয়েছে।

    জ্যাক আবার বলল, বাবা ফোনে কথা বলতে বলতে খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েন।

    –কার সঙ্গে কথা বলছিলেন? ডেবিড রেলিঙে দাঁড়িয়ে এমন বলল।

    –বুঝতে পারলাম না। কেবল শেষে বলতে শোনলাম, আসবেন। তারপরই বসে পড়লেন। আর আমার দিকে ভূত দেখার মতো তাকিয়ে থাকলেন।

    বোধহয় মধ্যযামিনীতে ওরা এভাবে বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে বিচিত্র চিন্তাভাবনার ভেতর কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। জাহাজ সম্পর্কে নতুন কিছু কি খবর এসেছে। চিফ-মেট পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। বয়সে প্রবীণ মানুষটি রাতের পোশাক পরে আছেন। মাথার ওপর সেই নিরবধিকালের আকাশ আর তার নক্ষত্রমালা। ওপরে কাপ্তান, জাহাজের সবচেয়ে দামী মানুষটা বুকের কাছে করজোড়ে হাত রেখে শুয়ে আছেন। বার বার জিজ্ঞাসা করেও ওরা ফোনে কি কথা হয়েছে জানতে পারে নি। এমন কি নতুন দুঃসংবাদ রয়েছে এই প্রাচীন জাহাজকে কেন্দ্র করে যার জন্য এমন প্রবীণ অভিজ্ঞ মানুষটা পর্যন্ত বিচলিত বোধ করছেন। ওরা কেউ আর কথা বলতে পারল না। নিঃশব্দে যে যার কেবিনের দিকে হাঁটতে থাকল!

    সকালে যে যার মতো ঘুম থেকে উঠেছিল, যে যার মতো চা খেয়ে ডেকে উঠে এসেছিল। পাহাড়ের মাথায় সেই আগুনের শিখা আর নেই। সূর্য লাল বলের মতো পাহাড়ের মাথায় জেগে উঠেছে। এই সমুদ্র, দ্বীপের নারকোল গাছ, অথবা আভা গাছের জঙ্গল দেখতে দেখতে কে বলবে, গত রাতে ওরা ও-পাশের একটা পাহাড়ে একজন মানুষকে চিরদিনের মতো রেখে এসেছে। সকালের সব কাজ-কর্মের ভেতর বড়-টিণ্ডালের দু’টো একটা কথা এবং অথবা শোক-সন্তাপ, এবং এরই ভেতর ওরা কাজ করে যাচ্ছিল। ফল্কা থেকে ত্রিপল খুলে ফেলা হচ্ছে। কাঠ ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে। ডেরিক টেনে তোলা হচ্ছে। মাল বোঝাই হবে বলে সবাই এক দণ্ড দাঁড়াতে পারছে না। বড় বড় সব টাগ-বোট এগিয়ে আসছে ক্রমশ। বড় বড় পিপে ভর্তি ফসফেট। এবং সামোয়ান মানুষেরা টাগ-বোট জাহাজের কাছে নিয়ে এসে হাঁকছে—হাড়িয়া।

    আর এ-ভাবে যখন জাহাজে হাড়িয়া হাফিজ শব্দ, কাঠ ফেলার শব্দ, ঘর্ ঘর্ করে বড় বড় পিপে উঠে যাচ্ছে ডেরিকে, নিচে অনেক নিচে খাদের মতো জাহাজের তলায় নেমে যাচ্ছে পিপেগুলো—তখনই দেখা গেল একটা সাদা রংয়ের বোট জাহাজের দিকে ভেসে আসছে। দু’জন মানুষ একজন বেঁটে মতো, একজন লম্বা মতো, সাদা পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে বোটে। ওদের একজনের হিপ পকেটে ছোট্ট মতো একটা হাতুড়ি। জাহাজটা দেখেই, বেঁটে মতো মানুষটা হাওয়ার ওপর হাতুড়িটা দোলাচ্ছে।

    আর সেই হাতুড়িটা দোলাতে দোলাতে লোকটা লাফ মেরে সিঁড়িতে উঠে এল। তারপর সিঁড়ি কাঁপিয়ে সে আরও ওপরে উঠে আসছে। পেছনে সেই লম্বা মতো মানুষ। ওরা দু’জন প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে জাহাজের সেই শেষ তলায় উঠে যাচ্ছে। গোলগাল মানুষটা, যেন প্রস্থে দৈর্ঘ্যে সমান—যার শরীর বেঢপ, যার মুখে স্মিত হাসি এবং হাসলে কান পর্যন্ত নড়তে থাকে, সে কেমন মাঝে মাঝে দুষ্টু ছেলের মতো বালকেডে হাতুড়ি ঠুকে দেয়ালে কান পেতে কি শুনছে। শুনতে শুনতে তখন সেই মানুষের চোখে মুখে কি অপার বিস্ময়। যেন সেই শব্দ লোহার অভ্যন্তরে ঢুকে নানারকমের খেলা প্রায় লুকোচুরি খেলার মতো অথবা হৃৎপিণ্ডের শব্দ শোনার মতো কান পেতে শুনছে শরীরে তার শিরা-উপশিরা কতটা ঠিক আছে।

    এনজিন-সারেঙ বয়লার-রুম থেকে উঠে আসার সময় দেখলেন, অদ্ভুত দেখতে একটা লোক ফানেলের গুঁড়িতে উবু হয়ে আছে। সে ফানেলের পাশে উবু হয়ে কি দেখছে! তারপরই মনে হল উবু হয়ে দেখছে না, কান পেতে কি শুনছে! হাতুড়িতে দু’বার ঠুকেই কান পেতে বড় সন্তর্পণে শুনছে কিছু। চোখে মুখে দুষ্টু বালকের মতো হাসি। খুশীতে তার প্রাণ ভরে যাচ্ছে। হাতুড়িটা আনন্দে বাতাসে ছুঁড়ে আবার লুফে নিচ্ছে।

    আর তখন লম্বা মতো মানুষটি হাতের ইশারায় ডাকল তাকে। বড় বেশি তোমার বাপু নেশা! জাহাজে উঠেই কাজকাম আরম্ভ করে দিয়েছ! এস দেখি জাহাজের বুড়ো কর্তা কি বলে! কাল ফোনে যা তেড়ে উঠেছিলেন, এখন হাতে হাতুড়ি দেখলে ঘাড় ধরে নামিয়ে দেবেন। দিতে পারেন।

    —ভিতরে আসতে পারি?

    চিফ-মেট বলল, কাকে চাই?

    —ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস। বলে সে একটা লম্বা কাগজ চিফ-মেটের নাকের ডগায় তুলে ধরল।

    লোকটার সাহস আছে! বলা কওয়া নেই একেবারে ব্রীজে উঠে এসেছে। কিন্তু কাগজটা পড়ে সে বুঝতে পারল—হেড অফিসের খোদ কর্তার লোক সুতরাং যা হয়ে থাকে, আদর আপ্যায়নের শেষ থাকে না। আপনারা বসুন। দেখছি। ক্যাপ্টেন কাল থেকে সামান্য অসুস্থ। দেখি–বলে সে সীল করা খাম হাতে নিয়ে ঢুকে গেল কাপ্তানের ঘরে। তিনি বেশ উঠে বসেছেন—এবং ফলের রস খাচ্ছেন। জ্যাক সব হাতের কাছে এগিয়ে দিচ্ছে।

    চিফ-মেট বলল, স্যার দু’জন লোক এসেছে। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।

    স্যালি হিগিনস গ্লাস রেখে দিলেন—তা হলে ওরা এসে গেছে! ফলের রস তখন মাত্র সামান্য খেয়েছেন।

    জ্যাক বলল, তুমি খেয়ে নাও না বাবা! ওরা তো বসছে। ওরা তো চলে যাচ্ছে না।

    চিফ-মেট বলল, স্যার ওদের ভেতরে নিয়ে আসব?

    –না। ওদের চার্ট-রুমে বসতে বল, আমি যাচ্ছি।

    –কিন্তু স্যার, আপনার এ-শরীরে যাওয়া কি ঠিক হবে!

    –কিচ্ছু হবে না। ওদের বসতে বল।

    জ্যাক বলল, বাবা

    –কী!

    –তুমি যাবে না। ওদের এখানে আসতে বলি।

    স্যালি হিগিনস ডাকলেন, চিফ-মেট! সেই হাই করে ডাক। একেবারে আগের মতো স্বাভাবিক। এতটুকু বিচলিত বোধ করছেন না।

    –আজ্ঞে কিছু বলছেন স্যার?

    –আমার শরীর ভাল না, এ-সব আবার বল নি তো!

    চিফ-মেটের চোখ মুখ শুকিয়ে গেল। সে তো আগেই বলে দিয়েছে। চিফ-মেট বলল, স্যার!

    –তোমাদের কবে যে কাণ্ডজ্ঞান হবে! যাও। তিনি এবার বেশ সহজভাবে নেমে এলেন বাংক থেকে। যেন সেই যৌবনে ফিরে যাচ্ছেন। প্রথমে তিনি তাঁর দু’পাটি দাঁত মুখে পুরে দিলেন। একেবারে যুবকের মতো মুখ হয়ে গেল। তিনি তাঁর ইউনিফরম পরে নেবেন। কাপ্তান-বয় হাজির থাকল। বড় বড় পিপে সব ওপরে উঠে যাচ্ছে, নিচে নেমে যাচ্ছে। ছোটবাবু মাথায় টুপি পরে তেলের টব আর বালতি নিয়ে এক একটা উইনচের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকছে, মাল ওঠা-নামা, অর্থাৎ গিয়ার, লিভার এবং সবকিছু ঠিক মতো চলছে কিনা দেখে আবার অন্য উইনচে ছুটে যাচ্ছে। দড়িদড়া বেয়ে উঠে যাচ্ছে সব মানুষ। কুলিরা সব হাঁকডাক করছে। ওরা হাত তুলে বলছে, হাড়িয়া, মাল নেমে যাচ্ছে। ওরা বলছে, হাফিজ, খালি পিপে উঠে ভেসে যাচ্ছে বাতাসে।

    জ্যাক পরেছিল সাদা রঙের ট্রাউজার। হাঁটু পর্যন্ত গোটানো। মাথায় সেও টুপি পরেছে। এবং চারপাশে ফসফেটের গুঁড়ো, কুয়াশার মতো উড়ছে বলে সে একটা নিরিবিলি জায়গায়, অর্থাৎ ট্যাঙ্ক- টপে শরীর এলিয়ে দিয়ে সামনের রেলিঙে পা রেখে দূরের সমুদ্রে গভীর এক নীল নির্জনতা দেখতে পাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না বাবাকে লোকটা কি বলেছিল! যারা দেখা করতে আসছে তারা কি সেই লোক! বাবাকে সে দেখেছে, যখন ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়েন তখন সব কিছু তাঁর বেশি ঠিকঠাক চাই। কারো তিনি তখন সামান্য ত্রুটি সহ্য করতে পারেন না। মার্জনা করা তো দূরের কথা। সে বুঝতে পারছিল, বাবা ভেতরে ঠিকঠাক নেই। সে দমে গেল খুব।

    তখন স্যালি হিগিনস পুরোপুরি ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস। চকচকে সাদা জুতো, সাদা মোজা, সাদা প্যান্ট, সাদা হাফ-শার্ট, সোনালী স্ট্রাইপ কাঁধে চার চারটা। মাথায় এংকারের সোনালী ছবি আঁকা কাপ্তানের টুপি। ফিটফাট এবং খুবই রাশভারি মানুষ দেখাচ্ছিল তাঁকে। ভেতরে ঢুকলে ওরা দু’জন উঠে দাঁড়াল। পাশে চিফ-মেট আজ্ঞাবহনকারী মানুষের মতো দাঁড়িয়ে আছে।

    লম্বা মতো মানুষটি ঝুঁকে সামান্য হাত বাড়াল, নাম বলল।

    বেঁটে মতো মানুষটি ঝুঁকে নাগাল পাচ্ছিল না কাপ্তানের হাত। পেট ভীষণ মোটা। টেবিলের ও পাশে পেটের চর্বি থকথক করছে। জামার ওপরে পেট ভেসে রয়েছে। মোটা বেল্ট। বেল্ট খুলে ফেললেই প্যাণ্ট হড় হড় করে পড়ে যাবে। স্যালি হিগিনস আরও বেশি ঝুঁকে হাত বাড়ালেন। বললেন, ইউ দেন মিস্টার ইয়াদু ওসাকা।

    —ইয়েস ইয়েস ওসাকা। ইয়াদু ওসাকা।

    —বসুন।

    ওরা বসে পড়ল। তিনি বললেন, কফি।

    চিফ-মেট মুখ বাড়াল দরজায়। কাপ্তান-বয় সোজা দাঁড়িয়ে আছে। সে হুকুমের প্রতীক্ষায় আছে।

    –কফি।

    স্যালি হিগিনস মাথা থেকে টুপি খুলে পাশের হুকে ঝুলিয়ে দিলেন। খুব সতর্ক চোখ মুখ। তিনি জানতেন, এরা কি বলবে। তিনি বললেন, কবে এসেছেন এখানে।

    —সকালের ফ্লাইটে।

    —মি. ফ্যাল কেমন আছেন?

    —ভাল।

    —তাঁর স্ত্রী।

    —ভালো আছেন।

    —তাহলে সবাই ভাল আছে। দেখি আপনাদের কাগজপত্র। মি. হ্যামিলটন আপনাকে আগে কোথাও দেখেছি?

    —না স্যার।

    —মুখটা খুব চেনা চেনা।

    মি. হ্যামিলটন ভীষণ লম্বা আর রোগা। দালাল লোকেরা দেখতে যেমন হয়ে থাকে—এবং পৃথিবীতে সব দালাল লোকদের মুখই বুঝি এমন হয়। মি. হ্যামিলটন বুঝি তাই খুব চেনা চেনা লাগছিল। ফাইল থেকে সীল করা খাম বের করে আলোতে দেখে ছিঁড়ে ফেললেন। এবং চিফ-মেটকে বললেন, তুমি আসতে পার। কাছাকাছি থাকবে। ডাকলে সাড়া দেবে।

    তিনি খামের ভেতর থেকে লাল রঙের প্যাডে দেখলেন সেই সমনের নোটিস। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে তাঁর।

    —তারপর ইয়াদু ওসাকা, জাহাজটা একবার দেখবেন বলছেন?

    —ইয়েস স্যার। পুরানো জাহাজ। একটু বাজিয়ে নিতে হবে। বলেই সে তার হিপ পকেট থেকে ছোট্ট একটা হাতুড়ি বের করে প্রায় কানের ভেতর গুঁজে ফেলল। যেমন স্বর্ণকারদের হাতুড়ি পাতলা চকচকে এবং দামী ইস্পাতের তৈরি হয়ে থাকে অথচ ভারি মনোরম, কানের ভেতর পেনসিল গুঁজে রাখার মতো এমন একটা ভারি হাতুড়ি লোকটা অনায়াসে কানে গুঁজে রেখে দিল। সারাজীবন সে এ-কাজটাই করেছে। পুরানো জাহাজ কেনা-বেচার কাজ। জাহাজের ইস্পাত ঠুকে ঠুকে দেখে নেবে কতটা কি মাল আছে জাহাজে। কানে এখন লোকটা পেনসিল গুঁজে রাখার বদলে হাতুড়ি গুঁজে রাখে। কানের পাশে কড়া পড়ে গেছে। কানটা ভারী হয়ে গেছে।

    স্যালি হিগিনস দেখলেন, কফি এসে গেছে। তিনি কফি ঢালতে ঢালতে বললেন, জাহাজটা দেখে আপনাদের কিছু মনে হচ্ছে না!

    —জাহাজটা তো স্যার অনেকদিন থেকেই দেখার ইচ্ছে ছিল। এত শুনেছি। এখন দেখে তো আর দশটা জাহাজের মতোই লাগছে। ইয়াদু ওসাকা ঢোক গিলল বলতে বলতে।

    —তাই তো হওয়া উচিত।

    মি. হ্যামিলটন বলল, মাঝখানে শুনলাম আপনাদের জাহাজের কোনো খবর নেই।

    —মাঝে মাঝে থাকে না। খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন স্যালি হিগিনস। এত দিনের একটা বিশ্বাস এরা ভেঙে দিতে এসেছে?

    —যাক ভালোয় ভালোয় শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন।

    —ভারী বিশ্বাসী জাহাজ।

    ইয়াদু ওসাকার শুধু মুখটা দেখা যাচ্ছে। গলা পর্যন্ত টেবিলে ঢাকা। শুধু মুখটা দেখতে পাচ্ছেন স্যালি হিগিনস। হাঁড়ির মতো মুখ। চুল কালো। সজারুর কাঁটার মতো চুল খাড়া। সব সময় স্মিত হাসি। হাসলে দু’টো কান নড়তে থাকে। লোকটা কেন যে হাসছে। কান নড়তে থাকলে ভীষণ অস্বস্তি।। এবং মনে হচ্ছিল ইয়াদু ওসাকা একটা পিপে থেকে গলা বের করে কথা বলছে। কান মলে কান নাড়া বন্ধ করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে।

    ওসাকা খুব গলে গেছে মতো বলল, ভারী ইচ্ছে ছিল, ঠিক ইচ্ছে না বরং স্বপ্ন বলতে পারেন, সিউল-ব্যাংক জাহাজ আমার হাত দিয়ে পাস্ হবে।

    স্যালি হিগিনসের সত্যি ইচ্ছে হল কান ধরে বের করে দেবেন। কিন্তু তিনি দাঁত ঠেলে দিলেন ওপরে—বয়েস হয়েছে আমারও ইয়াদু ওসাকা। সত্যি মিথ্যা যা খুশি শুনে এটাকে স্ক্র্যাপ করার জন্য পাগল হয়ে গেছেন। তারপর কেমন জেদী বালকের মতো ভাবলেন, আসলে জাহাজকে ভয় তারও কম নয়। এতদিন তিনি তাকে বাগে রেখেছিলেন, জাহাজ এখন শেষ সফরে তাঁর হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি বললেন, জাহাজ তো আপাতত জিলঙ যাচ্ছে।

    —তা যাক। হ্যামিলটন বললেন। আপনাদের চুক্তি শেষ না হলে এটাকে ভাগাড়ে নিয়ে যাচ্ছি না। মি. ফ্যাল সব আমাদের বলেছেন।

    স্যালি হিগিনস বললেন, যদি এর ভেতর কিছু হয়ে যায়!

    —চুক্তিপত্র সে-ভাবেই করা আছে? একটু থেমে হ্যামিলটন চোখ বড় বড় করে বলল, কিছু হবে বলে কি আপনার মনে হচ্ছে?

    —না না এমনি বললাম। সব কথাবার্তা খোলামেলা থাকা ভাল।

    —আপনি তো শুনেছি জাহাজটাকে সব অশুভ প্রভাব থেকে রক্ষা করে আসছেন।

    —এ-সব গল্পকথা। জাহাজ ঠিকই আছে। গুজব বলতে পারেন।

    —আমরা তো জাহাজটা সম্পর্কে এত শুনেছি স্যার, উঠেই মনে হয়েছিল, আমাদেরও কিছু একটা হয়ে যাবে।

    স্যাালি হিগিনস হা হা হেসে করে উঠলেন।

    ইয়াদু ওসাকা মুখ ভার করে ফেলল। এই প্রথম হিগিনসকে দেখলেন, ইয়াদু ওসাকার মুখে কোন কথা নেই। বিমর্ষ। সেই বলল, আমরা তো শুনেছি ক্যাপ্টেন লুকেনার নিজের তদারকে জাহাজটা বানিয়েছিলেন।

    —তা হয়তো হবে।

    ওসাকা বলল, স্যার সব খবরাখবর নেবার জন্য হামবুর্গ কিছুদিন থেকে গেলাম। রেজিস্টার খাতা, সাল তারিখ, সব জাহাজের নাম ঘেঁটে দেখলাম কোথাও এর কোন রেকর্ডই নেই।

    —আছে কোথাও। সব দেখা তো আপনার পক্ষে সম্ভব নয়!

    —তা ঠিক বলেছেন স্যার। তবে হামবুর্গ শহরের বাইরে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা। সে কেবল বলল, সিউল-ব্যাংক, জাহাজের নাম নয়। অন্য নাম ছিল জাহাজটার। ক্যাপ্টেন লুকেনারকে সে চিনত। কাউণ্ট পরিবারের ছেলে তিনি। বাবার নাম—কি যেন যাক গে ভুলে গেছি। তিনি শেষ পর্যন্ত আর ক্যাপ্টেন লুকেনার ছিলেন না। তাঁকে সী-ডেভিল বলা হত। সমুদ্রে একটা জাহাজ আর একটা মানুষ—অনেক কীর্তিকাহিনী আছে। সে একটা রোমহর্ষক ঘটনা স্যার। বলে ফ্যাক করে হাসতে গিয়ে কেমন চেপে গেল সব কথা।

    স্যালি হিগিনস ছাড়বেন কেন! ক্যাাপ্টেন লুকেনার সম্পর্কে লোকটা কিছু খবর রাখে তবে! তিনি বললেন, জাহাজের কি নাম ছিল আপনি জানেন? ক্যাপ্টেন লুকেনার যে জাহাজটা চালাতেন তার নাম আপনার মনে আছে?

    ওসাকা উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। বসে থেকে সে স্যালি হিগিনসকে যেন ভালভাবে দেখতে পাচ্ছে না। ক্যাপ্টেন লুকেনার কিংবদন্তীর মানুষ, আর এ-যেন আরও বড়। তাঁকে ভাল করে দেখতে না পেলে যেন ঠিক জমছে না। ওসাকা দাঁড়িয়ে বেশ স্বাভাবিক বোধ করছিল। স্যালি হিগিনস তাকে কি বলেছেন ভুলে গেছে। উল্টে সে বলল, জার্মান ইমপিরিয়াল সার্ভিসে তিনি লেফটেনান্ট কম্যাণ্ডার ছিলেন।

    —ওর জাহাজটার নাম জানেন? স্যালি হিগিনস বিরক্ত মুখে কথাটা বললেন।

    —হ্যাঁ স্যার। সেলার। কেউ বলে, সিজলার। কেউ বলেছে সিজালার! সঠিক কি হবে জানি না! হ্যাঁ স্যার বাপের নাম মনে পড়েছে—বাপের নাম গ্র্যাফ ফেলিকস্ ফন্ লুকেনার

    স্যালি হিগিনস এবার কাগজপত্র দেখছেন। ওর দিকে তাকাচ্ছেন না। সে কি পরীক্ষা দিচ্ছে। সে কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, ওটা বাপের নাম না ছেলের নাম মনে নেই স্যার।

    স্যালি হিগিনস কাগজপত্র একটা পেপার-ওয়েটে চাপা দিলেন। তারপর কেমন হাই তুলে বললেন, লুকেনার সম্পর্কে এত আপনার কৌতূহল কেন?

    ওসাকা বলল, স্যার জাহাজটা সম্পর্কে কত কি শুনেছি, সত্যি যদি অশুভ প্রভাব থাকে—যদিও এ-সবে আমার বিশ্বাস নেই তবু কি হয় জানেন স্যার, মন তো মানুষের দুর্বল, দুর্বল মহুর্তে সবই সত্যি মনে হয়। সেজন্য কিছু কিছু খোঁজখবর নেওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল। সবই পেয়েছিলাম—ওদের পারিবারিক মর্যাদা—ওর ঠাকুরদার বাপের খবর। সে একটা ইতিহাস। ওর ঠাকুরদার বাপ শুনেছি স্যার ঘোড়ার ঘাস কাটত।

    হ্যামিলটন জানে ওসাকা খুব মজার লোক। স্যালি হিগিনস হেসে ফেলেছিলেন, কিন্তু লোকটা যদি জোরে হাসলে ঘাবড়ে যায়, তিনি সামান্য হাসলেন, হ্যামিলটন জোরে হাসল।

    ওসাকা বলল, বিশ্বাস করুন, ঘোড়ার ঘাস কাটতে কাটাতে লোকটা অশ্বারোহী সৈন্য হয়ে গেল। নিজে সৈন্যদল গড়ে তুলল। তখন তো স্যার রাজারা সব ভাড়াটে সৈন্যদল রাখতেন। তখন ওর ঠাকুরদার বাপের বয়স বেশি হয় নি। তের বছরে ঘর ছেড়েছিল, ঘোড়ার ঘাস কাটার কাজ নিয়েছিল, তখন তো স্যার প্রুসিয়ান ওআর চলছে। প্রুসিয়ান আর্মিতে সে তার সৈন্যদল নিয়ে ভিড়ে গেল। এবং ফ্রেডারিক দ্য গ্রেটের আণ্ডারে একজন তখন সে জাঁদরেল জেনারেল। এক নিঃশ্বাসে এতটা বলে সে ভোঁস করে শ্বাস নিল।

    হিগিনস বললেন, আপনি দেখছি অনেক খবর রাখেন!

    —রাখব না স্যার! ওর ঠাকুরদার বাপের তো শেষ পর্যন্ত গিলোটিন হয়েছিল! বলে চোখ গোল করে ফেলল ওসাকা।

    —গিলোটিন! যেন কত স্বাভাবিক কথা। স্যালি হিগিনস বললেন, শেষ পর্যন্ত ক্যাপ্টেন লুকেনারের কি হয়েছিল বলতে পারেন?

    —সে তো ঘুরে ঘুরে জেনেছি অনেক। কিন্তু একটার সঙ্গে আর একটার কোন মিল নেই স্যার।

    স্যালি হিগিনস বললেন, মিল পাওয়া খুব কঠিন।

    ওসাকা বলল, স্যার এক গ্লাস জল খাব।

    স্যালি হিগিনস জল আনতে বলে কাগজের ওপর সামান্য ঝুঁকে পড়লেন। দু’বার তিনবার করে কাটা ক’টা লাইন বার বার পড়লেন। –এখানে তো দেখছি আপনাদের বিক্রি-বাট্টা দর দাম সব কথাবার্তা শেষ। জাহাজ বেচে দিয়েছে তবে!

    —হ্যাঁ স্যার।

    —তবে আর দেখবেনটা কি!

    হ্যামিলটন আমতা আমতা করতে থাকল।

    ওসাকা বলল, এতদূর থেকে উড়ে এলাম স্যার, একবার ঘুরে সবটা দেখে যাব না! দেখে না গেলে ঘুম হবে! আপনার হত স্যার বলুন! তাছাড়া অনেক সইসাবুদ আছে। দেখিয়ে দেব, বলে সে প্রায় ঝুঁকে টেবিলের ওপর লাফ দিয়ে উঠে আসতে চাইল।

    —তাছাড়া কোথায় কি কি আছে!

    —ঠিক আছে আপনি বসুন।

    ওসাকা ভালো ছেলের মতো বসে পা নাড়াতে থাকল।

    হিগিনস বললেন, গিলোটিন হয়েছিল? ওসাকা খুব বিনীত ছাত্রের মতো আবার দাঁড়িয়ে গেল। সে মুখস্থ বলে যাবার মতো বলল, স্যার ফ্রেডারিক দ্য গ্রেট মহা পাজি লোক ছিল। ওর ঠাকুরদার বাপ যুদ্ধ জয়ের পর পাওনা-গণ্ডা মিটিয়ে নিতে গেলে বললে, পাওনা-গণ্ডা কি, দেশের জন্য যুদ্ধ করেছ, কিচ্ছু হবে না। রাগে দুঃখে সব তকমা রাজার পায়ে রেখে সোজা প্যারিসে। তখন স্যার ফরাসী বিপ্লব চলছে। বিপ্লবে যোগ দিয়ে ফেলল। বেশ রাজার বিরুদ্ধে লড়ছে। ভালই লড়ছিল। কাল হল সেই এক পাওনা-গণ্ডা নিয়ে। সে প্যারিসে ফিরে তার দাবির কথা বলল। তার সৈন্যদলের মাইনে বাকি পড়েছে কতদিন—না দিলে চলছে না। ওরা বলল, তোমার বাপু গিলোটিন। একজন লোককে টাকা পয়সা না দিয়ে গিলোটিন করা কত সহজ বলুন। বলে আবার ফ্যাক করে হেসে দিল।

    স্যালি হিগিনস শুধু বললেন, খুব সহজ। তারপর দ্বিতীয় আর কোনো কথা না। শুধু বললেন, কোথায় কোথায় সই করতে হবে বলে দিন। সব কাগজপত্র পড়ার আর তাঁর ধৈর্য নেই। এখনই হয়তো তিনি হাই করে ফের চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দেবেন।

    ওসাকা ঢক ঢক করে সব জলটা খেয়ে ফেলল তখন। বলল, স্যার এখানে। বলে সে ঘুরে স্যালি হিগিনসের প্রায় ঘাড়ের কাছে চলে এল। হাতের চেটোতে মুখ মুছে একটা একটা করে পাতা উল্টে যেতে থাকল, আর স্যালি হিগিনস সই করে যাচ্ছেন। হাত কাঁপছিল সই করতে, বোধ হয় ভীষণ দুর্বল শরীর। একবারে মাংকি-আয়ল্যাণ্ডে উঠে গোটা জাহাজটা দেখার ইচ্ছে হয়েছিল তাঁর। তারপর ভেবেছেন কি হবে দেখে! একটা জীবন এ-ভাবে বাজি রেখেছিলেন একটা জাহাজের পেছনে, এখন তাও শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি বললেন, ওসাকা, পুরানো জাহাজ সম্পর্কে খোঁজখবর করার তোমার বোধ হয় একটা নেশা আছে?

    —তা আছে স্যার। পৃথিবীর সব প্রাচীন জাহাজ কবে কোথায় কিভাবে বিক্রি হয়েছে বলে দিতে পারি।

    —তা যখন পার সিউল-ব্যাংক কত পুরোনো নিশ্চয়ই বলতে পারবে।

    –পারি না।

    —কেন?

    —খোঁজখবর কেউ শেষ পর্যন্ত সঠিক দিতে পারে নি।

    —তার মানে?

    —মানে স্যার এও হয় ওও হয়।

    স্যালি হিগিনস বললেন, তুমি বেশ মানুষ হে ওসাকা।

    ওসাকা বলল, এখানে একটা সই বাদ যাচ্ছে স্যার। এত সব কথার ভেতরও ওসাকার হিসেব ঠিক আছে। ভুলে কিছু বাদ যাচ্ছে না।

    স্যালি হিগিনস বললেন, তাহলে সিজলারকে কিনে নিয়ে যাচ্ছ ভাবছ?

    —আমার তো মনে হয় তাই। তবে কি জানেন স্যার! এখন আর পাতা ওলটাচ্ছে না সে। পনের বিশ পাতার একটা ডীড। প্রতিটি পাতায় প্রতিটি অক্ষরের প্রতি ওসাকার নজর ঠিক আছে। চোখে মুখে যতটা বোকা বোকা, কাজে কর্মে, তার বিপরীত। বরং ওসাকা ভীষণ ধূর্ত স্বভাবের। সে বলল, সিজলারের সী-ডেভিলের কি হয়েছিল কেউ ঠিক বলতে পারেনি। কেউ বলেছে জাহাজটা ডুবে গেছে বাল্টিক সমুদ্রে। কেউ বলেছে, প্রথম মহাযুদ্ধে তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। ইংরেজদের হাতে জাহাজটা চলে যায়। আবার কেউ বলে থাকেন স্যার, জাহাজটা ডুবেও যায় নি, কেউ ধরেও নিয়ে যায় নি। তিনি নিজে জলদস্যু হবার জন্য মিথ্যা প্রচার করে সরে পড়েছেন। এখনও নাকি লুকেনারকে দেখা যায় কোনো নির্জন দ্বীপে। তিনি পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ বলে থাকে তিনি কোনো কোনো বন্দরে পর্যন্ত মাঝে মাঝে ছদ্মবেশে চলে আসেন। তাঁকে একা একা হাঁটতে দেখা যায়। সমুদ্রের পাড়ে পাড়ে তিনি হেঁটে যাচ্ছেন। মনে হয় তিনি আমাদের ভেতরই আছেন স্যার। এরা কখনও মরে যায় না। আমাদের ভেতরেই বেঁচে থাকে।

    স্যালি হিগিনস এবার উঠে পড়লেন। তিনি যে নিজে গিলোটিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন কথাবার্তায় এতটুকু বোঝা যাচ্ছে না। সামান্য একটা ডীড সই করার মতো সব কাজ সেরে বললেন, তাহলে চলুন জাহাজটা আপনাদের দেখিয়ে দি। কোথায় কি আছে, রিপোর্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পাবেন। কিছু আবার এদিক ওদিক বিক্রি হয়ে গেলে আপনাদের সত্যি ক্ষতির কারণ ঘটবে।

    —তা স্যার ঠিক।

    স্যালি হিগিনস উঠে টুপি টেনে নিলেন। তারপর কিছু যেন ভাবছেন এমনভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে মাথায় টুপি পরে নিলেন। পাছে ভেঙে পড়েন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন গত রাতের মতো—ঠিক না। বনি কাছে কোথাও নেই। থাকলে হয়তো সত্যি ভেঙে পড়তেন। অন্যমনস্ক থাকার জন্য বললেন, ফানেল আমরা পাল্টে ছি বছর পনের আগে। ওসাকা ফানেলে দু’বার হাতুড়িতে ঘা মেরে দেখল। স্যালি হিগিনসের কথার সত্যাসত্য যাচাই করে সে খুশী হল। সিঁড়ি ধরে ক্রমে বয়লার-রুমে—এই তিনটে বয়লার। বাঁ দিকে স্টার-বোর্ডে ঢুকে গেল ওরা। পাশে দু’টো জেনারেটর, রেসিপ্রোকেটিং এনজিনের কলকব্জা, কনডেনসার, পাম্প, পাইপের নাম এবং প্রপেলার স্যাফট, সব কাগজের সঙ্গে মিলিয়ে নিল ওসাকা। তারপর প্রপেলার স্যাফটের মাথায় চড়ে বসেছে ওসাকা। সে হাতুড়িতে ঘা মারছে, আর চোখে মুখে এক অতীব বিস্ময়। যেন ভেতরে শুধু স্টিল পোরা নেই, অন্য কিছু ধাতু, সোনাদানা নেইতো! স্যালি হিগিনসের এমনই মনে হতে থাকল। একটা কসাইর মতো চোখ মুখ ওসাকার। লোভে লালসায় চোখ মুখ অধীর। ওসাকা বলল, স্যার শুনতে পাচ্ছেন?

    স্যালি হিগিনস বললেন, কী?

    —আসুন। কান পেতে শুনুন। বলে সে হাতুড়ি দিয়ে ঠুং ঠুং করে ক’বার ঘা মারল।

    স্যালি হিগিনস কান পেতে তেমন কিছু শুনতে পেলেন না।

    —শুনতে পাচ্ছেন না আওয়াজটা অনেক দূরে পর্যন্ত স্যাফটের গা বেয়ে চলে যাচ্ছে। যেন এখানে আঘাত করলে সারা জাহাজটা কাঁপছে। সারা জাহাজটা ঝনঝন করে বাজছে। মিরাকল্, সামথিং মিরাকল্ স্যার সে বলতে পারত। কিন্তু খুবই বোকামীর কাজ হয়ে যাবে, পরে যদি জাহাজডুবির খবর দিয়ে বিক্রি-বাট্টার ডীড অচল করে দেয়। সে যে খুশীর চোটে কি সব করতে যাচ্ছিল! সে ঝুলে স্যাফট থেকে নেমে পড়বে ভাবল। নামার সময় মনে হচ্ছে, এত নিচে সে লাফিয়ে নামতে পারবে না। ধপাস করে পড়ে যেতে পারে। সে হেঁটে হেঁটে কিছুটা দুরে গেলে স্যাফট জয়েণ্টে নামার ধাপ পাবে। ততটা হেঁটে গেলে নেমে যেতে পারবে। কিন্তু সে হাতুড়ি দুলিয়ে ডাকল, মি. হ্যামিলটন আসুন। ওর কাঁধে এক হাত রেখে প্রায় শরীর বেয়ে নিচে এল ওসাকা। বলল, কেনাবেচাতে সামান্য লাভ লোকসান থাকে স্যার। এ নিয়ে আর ভেবে লাভ নেই। চলুন ওপরে ওঠা যাক।

    স্যালি হিগিনস দেখলেন টানেলের দরজায় চিফ-মেট, ডেবিড, ছোটবাবু সবাই অপেক্ষা করছে।

    এ-শরীর নিয়ে কি যে এত নামার দরকার নিচে, ওরা ভেবে পেল না! আর এ-দু’টো লোক সেই থেকে এত কি কথা বলছে! এত কি দেখছে! লোকটার হাতে সেই হাতুড়ি। কানে গুঁজে রাখছে ফের। ওরা স্যালি হিগিনসকে খুঁজতে এসেছে এখানে। শরীর ভাল না। কি যে করছেন!

    স্যালি হিগিনস ওপরে উঠে বললেন, মি. ফ্যালকে আমার অভিবাদন থাকল। বলবেন, আমরা ভাল আছি।

    ওসাকা বোটে উঠে হওয়ায় হাতুড়িটা দুলিয়ে বলল, বলব আপনারা ভাল আছেন। তারপর ওসাকা দেখল, সিউল-ব্যাংক জলে ভেসে আছে। যত দূরে বোট চলে যেতে থাকল তত জাহাজটা ক্রমে ছোট হবার পরিবর্তে চোখের ওপর বড় হয়ে যেতে থাকল। ভয়ে ওসাকার শরীরে কেমন জ্বর এসে গেল। মাথা ঘুরছে।

  • চুয়াল্লিশ

    চুয়াল্লিশ

    ।। চুয়াল্লিশ।।

    —স্যার!

    স্যালি হিগিনস পাশে চোখ ফেরালেন।

    —ওপরে চলুন স্যার।

    —ওপরে? আচ্ছা।

    —স্যার!

    —যাচ্ছি।

    বনি একটা কথা বলছে না। চোখে মুখে তার ভারী দুর্ভাবনা। সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ছোটবাবু বনিকে নানাভাবে বোঝাচ্ছিল। সামান্য সাহসী হতে বলছে। বনি যেন ছোটবাবুর একটা কথাও বুঝতে পারছে না।

    ডেবিড এবং চিফ-মেট বুঝতে পারছে না কি করবে। আবার বলল, স্যার আপনি সেই কখন থেকে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন। ওরা তো চলে গেছে। আর দেখা যাচ্ছে না। ওপরে চলুন এবার। শরীর আপনার ভাল নেই।

    স্যালি হিগিনস বললেন, চল।

    ওরা পোর্ট-সাইড ধরে এবার হেঁটে যেতে থাকল। সোজা ছোটবাবুর কেবিনের ও-পাশে হেঁটে গেল।

    তিনি ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভাঙতে থাকলেন। খুব সতেজ এবং কিছু হয় নি মতো উঠে যাচ্ছিলেন। কেউ আর একটা কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না। লোক দু’টো কে, ওরা কেন এসেছিল—বেঁটে মতো লোকটা ভারী অদ্ভুত—অকারণ যেখানে সেখানে হাতুড়ি ঠুকছিল!

    ডেবিড, চিফ-মেটের কানের কাছে মুখ এনে বলল, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে স্যার।

    —কি ঘটবে মনে হয়? চিফ-মেট সিঁড়ি ধরে ওঠার সময় এমন বলল।

    ডেবিড ফিস্ ফিস্ গলায় কথা বলছিল।

    —কিছু একটা ঘটবে। ঠিক ঘটবে। ওর মুখ দেখে আপনি বুঝতে পারছেন না স্যার!

    —কি ঘটবে? কি ঘটতে পারে!

    ওরা ততক্ষণে দু’জনই বোট-ডেকে উঠে এসেছে।

    চিফ-মেট সামান্য কি ভেবে বলল, কিন্তু এটা ঠিক না। এমন শরীরে জাহাজের অতলে নেমে যাওয়া ঠিক না। এতটা ওঠা-নামা করা তাঁর উচিত হয় নি। কিছু একটা সত্যি ঘটে গেলেও ঘটে যেতে পারে।

    স্যালি হিগিনস সিঁড়ি ধরে আরও ওপরে উঠে যাচ্ছেন তখন। মনে হচ্ছে না গতকাল তিনি অসুস্থ ছিলেন, সংজ্ঞা হারিয়েছিলেন। বেশ স্বাভাবিক গলায় না তাকিয়ে ডাকলেন—চিফ-মেট।

    চিফ-মেট, ডেবিডকে বোট-ডেকে ফেলে ওপরে প্রায় দু-লাফে উঠে গেল।

    বনি আর ছোটবাবু আরও পেছনে আসছে। বনি দেখল বাবা চিফ-মেটকে নিয়ে চার্ট-রুমে ঢুকে যাচ্ছেন।

    ডেবিড জ্যাককে পেছনে আসতে দেখে বলল, তুমি জানো জ্যাক, এরা কারা?

    —না ডেবিড। এরা কারা জানি না।

    জাহাজে তেমনি ফসফেটের গুঁড়ো উড়ছে। টাগ-বোট সব আসছে যাচ্ছে। টাগ-বোট থেকে তেমনি বড় বড় ফসফেটের পিপে সব হাড়িয়া হাফিজ হচ্ছে। তেমনি কোলাহল জাহাজে। উইনচের প্রচণ্ড শব্দ। তেল কালি বার্নিশের গন্ধ। আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ। ঠিক বাংলাদেশের গ্রীষ্মের রোদ আর বাতাসের মতো আবহাওয়া। দড়িদড়া, রঙের টব, জাহাজ সমুদ্র এবং দ্বীপমালার ভেতর তেমনি আছে তার ছোটবাবু। তবু সব কেমন তার বর্ণহীন। সে কিছুতেই কেন জানি ভাল করে সাড়া দিতে পারছে না। এই তো পাশে তার ছোটবাবু হাঁটছে—তবু কি যে এক ভয়!

    ছোটবাবুর কাজ পড়ে আছে উইনচে। সে এক্ষুনি হয়তো নেমে যাবে। ডেবিডও থাকবে না। সে তখন এই বোট-ডেকে আরও একা হয়ে যাবে। বাবার কাছ থেকে সবটা না জানতে পারলে বনি নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। চিফ-মেট এখনও কেবিন থেকে বের হচ্ছে না। বাবা আর চিফ-মেট এত কী যে পরামর্শ করছে! বের হলে সে ঠিক দেখতে পাবে। এবং যখন বের হয়ে এল চিফ-মেট এক দণ্ড বনি আর নিচে দাঁড়াল না। লাফিয়ে ওপরে উঠে গেল। ভেতরে ঢুকে ডাকল, বাবা!

    স্যালি হিগিনস মাত্র টেবিলে মাথা রেখেছেন। বনি জাহাজে আছে তার যেন মনেই ছিল না। মাথার ভেতরে সোরগোল উঠে উঠে জট পাকিয়ে যাচ্ছে—ঘূর্ণির মতো অথবা রথের চাকার মতো বন্ বন্ কেবল ঘুরছে। তিনি তখন আর চারপাশে কিছু দেখতে পাচ্ছেন না। বনি এই যে তাঁকে এসে ডাকল কতদূর থেকে যেন সেই ডাক, বাবা তুমি এমন হয়ে যাচ্ছ কেন! যেন চিনতে সময় লেগে যাচ্ছে তাঁর—বনি তাঁর আত্মজা, রক্তে মাংসে বনি তাঁর। আত্মার চেয়ে প্রবল অস্তিত্বে বেঁচে আছে—কিছুই মনে করতে পারছিলেন না এতক্ষণ। বনিকে চিনতে কত যে সময় লেগে যাচ্ছে তাঁর।

    বাবা কেবল তাকে দেখছেন। একটা কথা বলছেন না। সে ভয় পেয়ে ফের ডেকে উঠল, বাবা তোমার কি হয়েছে?

    তিনি খুবই নিস্তেজ গলায় বললেন, কিছু হয় নি তো!

    —লোক দু’টোর সঙ্গে তুমি এনজিন-রুমে নেমে গেলে কেন?

    —ওরা জাহাজটা দেখতে এসেছিল।

    —চিফ-মেটকে পাঠালে পারতে। ডেবিড ছিল, তুমি নেমে গেলে কেন?

    —তাতে কি হয়েছে! সেই সরল বালকের মতো, অথবা বনির এমন যে সুন্দর লাবণ্যময় শরীর, যেন প্রায় তাঁর মতো, অথবা বোধহয় কৈশোরে তিনি এমনই ছিলেন দেখতে—এবং সঙ্গে সঙ্গে যেন প্রবল বেঁচে থাকার ইচ্ছে সারা শরীরে—তিনি সাহসী বালকের মতো উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, তোমার সঙ্গে আমি আজ খাব বনি। তারপর ঠিক আগের মতো দরজার বাইরে গলা বাড়িয়ে হাঁকলেন কোয়া…র্টা…র মা-স্টা…র।

    কোয়ার্টার-মাস্টার এলে বললেন, কাপ্তান-বয়।

    কাপ্তান-বয় এলে বললেন, জ্যাকের কেবিনে আমি খাব। ডাইনিং-হলে জানিয়ে দেবে। তারপর রনির বড় বড় চুল এলোমেলো করে দিয়ে বললেন, তাহলে আমরা একসঙ্গে খাচ্ছি।

    বাবাকে সহসা এত খুশী দেখে সে কেমন অবাক হয়ে গেল। ঠিক সেই চিরদিনের এক স্নেহময় পিতার মুখ, সে কি আর বলবে, সে যে ভেবেছিল অনেক কিছু বলবে, বাবা, তুমি এত ভাবো কেন? তোমার তো বাবা বেঁচে থাকার মতো সব আছে। একটা ভাঙা জাহাজ নিয়ে তোমার এত কি দায়! তুমি কেন বলতে পার না, জাহাজ আর চলবে না। তোমার এমন কি দাসখত দেয়া আছে ভাঙা জাহাজ চালিয়ে নিতেই হবে! কিন্তু বাবার হাসিখুশী মুখে কখনও এত বেশি ছেলেমানুষী থাকে যে সে আর রাগ করতে পারে না।

    সে আর কিছু বলতে পারল না। নিচে নেমে গেল। বাবা নিমেষে তার সব দুর্ভাবনা ঝড়ো বাতাসের মতো উড়িয়ে নিয়ে গেলেন। সে সহজেই নিচে নেমে বাথরুমে ঢুকে গেল। এবং বাথরুমের সাদা টবে সব দামী সুগন্ধ ছড়িয়ে জলের ভেতরে একটা সোনালী মাছ হয়ে ভেসে থাকল চুপচাপ। ছোটবাবুর কথা ভেবে বার বার জলের ভেতরে ডুবে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে।

    খাবার টেবিলে বনি বলল, বাবা ওরা জাহাজটার কি দেখতে এসেছিল?

    —ওরা জাহাজটার সব ইস্পাত দেখতে এসেছিল।

    —ইস্পাত!

    —জাহাজটা ওরা কিনতে চায়!

    —এই পুরেনো ভাঙা অচল জাহাজ ওরা কিনে কি করবে।

    —এখনও এর যা আছে বনি…যেন জাহাজটা ভাঙা পুরোনো বললেই তিনি ক্ষেপে যান ভেতরে ভেতরে! তিনি কফি খাচ্ছিলেন, আর চুরি করে বনির মুখ দেখছিলেন। বনি জাহাজটাকে পুরোনো ভাঙা বলছে, বনির এমন কথাবার্তা তাঁর একেবারে পছন্দ না। বনির কাছে তিনি কিছুতেই মুখ ভার করতে পারেন না। এই যে তিনি বনির সঙ্গে খেলেন, বনিকে নানাভাবে উৎসাহ দিচ্ছেন—যেন বনি কিছুতেই তাঁর দুর্ভাবনার কথা টের না পেয়ে যায়, পেয়ে গেলে তিনি জানেন মেয়েটা সারাক্ষণ জাহাজে মুখ গোমড়া করে রাখবে। তিনি সারাক্ষণ ভাবতে চেষ্টা করছেন, গতকাল এমন কিছু তাঁর হয় নি। এবং দুর্ভাবনা এত বেশি প্রবল যে বার বার মুখের ওপর একটা ঘন কালো ছায়ায় ঢেকে গেলে তিনি প্রায় জোরে হেসে দেবার চেষ্টা করছেন, আর তখন কিনা বনি বলছে, ভাঙা পুরোনো জাহাজ—যেন তিনি এখন জোরে চিৎকার করে উঠতে পারতেন, বনি পৃথিবীতে সবাই জাহাজটাকে নিয়ে উপহাস করেছে, আমি সহ্য করে গেছি। কিন্তু তুমি কর না। তুমি জাহাজটাকে ভাঙা অচল বললে আমি আমার সব সাহস হারিয়ে ফেলব।

    বনি দেখল, বাবা মুখ মুছে ধীরে ধীরে বের হয়ে যাচ্ছেন। জাহাজটা অচল বললে বাবা ভীষণ ক্ষেপে যান। সে কেন যে এমন বলতে গেল! দরজার বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখল, ওপরে তিনি চুপচাপ ব্রীজে দাঁড়িয়ে আছেন। কাঁচের ভেতর অষ্পষ্ট ছায়া দেখা যাচ্ছে। বনির মনটা আবার ভার হয়ে গেল।

    তখন স্যালি হিগিনস যেন এই সামনে যা কিছু আছে কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। কেবল দেখতে পাচ্ছেন একটা জাহাজ। সেই কবে থেকে তিনি তার যাত্রী, জাহাজটা তাঁকে নিয়ে নিরবধিকাল সমুদ্রে ভেসে চলেছে। আর তখনই তাঁর সদর্পে বলতে ইচ্ছে হয়, আসলে বনি, জাহাজটা লুকেনারের হাড় দিয়ে তৈরি। সমুদ্রে সে কখনো ডুবে যেতে পারে না। তারপর তাঁর কি যে হয়ে যায়, দু-হাত ওপরে তুলে আকাশ ছুঁয়ে দেবার মতো ইচ্ছে। বলার ইচ্ছে চিৎকার করে—সি…জা…রা। জাহাজের আসল নাম সি…জা…রা। প্রায় আর্কেমেডিসের সূত্র আবিষ্কারের মতো তিনি যেন কতদিন পর, প্রায় দীর্ঘকাল বলা চলে এবং এই শেষ সফরে জেনে ফেলেছেন—অতি প্রাচীন জাহাজ এই সিউল-ব্যাংক। তার বয়স-কাল নির্ণয় করা অর্থহীন। এবং এখন আর যা তাঁর মনে হয়, জাহাজের ভেতরেই আছে সেই এক ঐশী শক্তি। বনি তুমি সব অবহেলা করতে পার, কিন্তু তাঁকে তুমি পার না। দোহাই বনি, এসব বলে তুমি তার কোপে পড়ে যেও না।

    আর সঙ্গে সঙ্গে সেই কঠিন দুর্ভাবনা। জাহাজের গিলোটিন হয়ে গেল। কিংবদন্তীর মতো যে ছিল তাঁর কাছে অজয় অমর, কলমের এক খোঁচায় সে শেষ হয়ে গেল। এখন তাঁর ইচ্ছে করছে যদি পারতেন জাহাজ নিয়ে সমুদ্রে পালিয়ে বেড়াতেন। গিলোটিনের হাত থেকে বাঁচবার তাঁর কাছে আর কোনো পথ নেই। তারপর বুঝতে পারেন সব অর্থহীন—মি. ফ্যালের ব্যক্তিগত চিঠি এবং কিছু তার বাক্যাংশ মাথা কুরে কুরে খাচ্ছে। দুর্বলতা ভেবে যত চেয়েছেন সবকিছু ভুলে থাকবেন, তত সেই বাক্যাংশ কঠিন সংশয়ের ভেতর নিক্ষেপ করছে। তিনি কিছুতেই এই অতিশয় অভিনয়ের ভেতর আর নিজেকে গোপন রাখতে পারছেন না। মূর্ছা যাবার ভয়ে কেবিনে ঢুকে টেবিলে মাথা রেখে ফের বসে পড়লেন। বিকেলে সবাই দেখল, ব্রীজের ডেক-চেয়ারে স্যালি হিগিনস মাথা এলিয়ে দিয়েছেন। বাইবেল ওল্টাচ্ছেন। পাতার পর পাতায় কি যেন কেবল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তিনি পড়লেন, হ্যাভ কনফিডেন্স ইন দ্য লর্ড, ইন অল দাই ওয়েজ থিংক অন হিম, অ্যাণ্ড হি উইল ডাইরেকট দাই স্টেপস। ঈশ্বর আর কোথায় কি বাইবেলের পাতায় নির্দেশ রেখেছেন বসে বসে দেখছেন। পাগলের মতো পাতার পর পাতা উল্টে যাচ্ছেন। এবং এখন দেখে মনে হয় একজন আত্মমগ্ন মানুষ তিনি। ভীষণ ঝুঁকে পড়েছেন বাইবেলের ওপর। এত যে জাহাজের চারপাশে ব্যস্ততা, ঘড় ঘড় শব্দ এবং অতিকায় শব্দের ভেতর সব কর্মপ্রণালী ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তিনি যেন তা একেবারে শুনতে পাচ্ছেন না। বাইবেলের পাতায় শব্দের ভেতর বার বার তিনি ভিকটিম শব্দটি আবিষ্কার করে অতিশয় মর্মান্তিক চোখ মুখ করে রেখেছেন। এবং এ-ভাবে বার বার শেষবার, শেষবারে তিনি নিজে তার শিকার। মি. ফ্যালের ধুর্ততা চোখের ওপর চশমার কাঁচে জ্বল জ্বল করছে।

    —আপনি আমাদের আজীবন সহযোগী। মি. হিগিনস, আপনার ওপর আমরা নানা কারণে নির্ভরশীল। বোর্ড আপনাকে পরিচালকবর্গের অন্যতম করে নিয়েছেন। এতে আমরা সম্মানিত বোধ করছি। আপনার অধিকারের ভেতরেই আছে সে। অধিকার শব্দটির দ্বারা কিছু অর্জন করা বোঝায়। অর্জন করেছেন তিনি, জাহাজের বিশ্বাস অর্জন করেছেন। আর বিশ্বাস শব্দটির সঙ্গে গিলোটিন শব্দটি বার বার চোখের ওপর আগুনের রিং হয়ে যেতে থাকল। তিনি চোখ মুছে ফের চশমা পরে নিলেন। চোখের ওপর তিনি কি যে সব ভেসে উঠতে দেখলেন! এবং মনের এ দুর্বলতা তিনি কিছুতেই পরিহার করতে পারছেন না কেন? আর তখনই বাইবেলের ভেতর সেই সব শব্দ, যেন কোনো দেবদূত পাথরের গায়ে বড় বড় শাবলে রোপণ করে যাচ্ছেন—নাথিং ক্যান বি কমপেয়ার্ড টু এ ফেথ ফুল ফ্রেণ্ড, অ্যাণ্ড নো ওয়েট অফ গোল্ড অ্যাণ্ড সিলভার ইজ এবল টু কাউন্টারভেল দ্য গুডনেস অফ হিজ ফাইডেলিটি। তিনি ভীষণ ঘামছেন। খালি গা তাঁর। সাদা রংয়ের হাফ-প্যান্ট। মুখ চোখ ক্রমশ আবার লাল হয়ে যাচ্ছে—সেই সব শব্দ পাহাড়ের গায়ে এত বেশী বড় হয়ে যাচ্ছে। এত বেশী কাঁপছে এবং ক্রমে এগিয়ে আসছে যে তিনি আর বসে থাকতে পারছেন না। যেন বার বার সেই সব শব্দ বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত করছে তাঁকে। সহসা আবার পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা লেখা সব মুছে গেল! যেন সেখানে ডেভিল তার শাবলে বড় বড় অক্ষরে ফের রোপণ করে যাচ্ছে নতুন সব শব্দ—বাই দ্য এনভি অফ দ্য ডেভিল, ডেথ কেম ইনটু দ্য ওয়ালর্ড। ডেথ, একাকী গোপনে দু-বার উচ্চারণ করার সময় তিনি কেঁদে ফেললেন। দোহাই আপনার, তিনি যেন বাতাসে তাঁকে ছুঁতে চাইলেন। বনিকে ছাড়া আমি আর কিছু ভাবতে পারি না। দোহাই আপনি তাকে রক্ষা করুন।

    তারপর আর যা মনে হয়, তিনি পাগল হয়ে যাচ্ছেন না তো! নিজেকে অকারণ কেন বারবার বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত করছেন! সাধারণ একটা জাহাজকে কেন বার বার ভাবছেন তার প্রতিটি রি রক্ত-মাংসের। কেন ভাবছেন এক্ষুনি জাহাজের হাড়-পাঁজরে বিদ্যুৎ খেলে যাবে! আর তিনি এ- সব কি দেখছেন চোখের ওপর।

    —সত্যি সারা ডেকে বিদ্যুৎপ্রবাহ, সেই কোনো মরুভূমির মরীচিকার মতো তিনি দেখতে পাচ্ছেন বনি আতঙ্কে চিৎকার করছে, লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। তিনি ব্রীজে যেন ঝুঁকে পড়েছেন। চিৎকার করে ডাকছেন, বনি ওদিকে না। এদিকে চলে এস। হায়! বনি কিছুতেই এদিকে চলে আসতে পারছে না। অক্টোপাসের মতো বিদ্যুৎপ্রবাহের বেড়াজালে আটকা পড়েছে। মেয়েটা সোনালী লতায় ক্রমশ ঢেকে যাচ্ছিল। আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি ফের বোধহয় না পেরে হাতের বাইবেল ছুঁড়ে দিতেন; ছুঁড়ে দিলেই সব বিদ্যুৎপ্রবাহ ঈশ্বরের অমোঘ বাণীতে ছাই হয়ে যাবে, তখনই মনে হল অনেক দূরে সমুদ্রে অথবা বাতাসের গায়ে কেউ রোপণ করে যাচ্ছে আশ্চর্য সব অভয় বাণী—কল্ আপন্ মি ইন দ্য ডে অফ ট্রাবল, আই উইল ডেলিভার দী, অ্যাণ্ড দাউ শ্যালট গ্লোরিফাই মি।

    তারপর সব আবার ঠিকঠাক। জাহাজটা যেন একেবারে আর দশটা জাহাজের মতো। এতক্ষণ তিনি কেবল জাহাজটা দেখতে পাচ্ছিলেন, আর কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন না। বনি ডেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে, আর কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন না। তিনি নিজে ব্রীজে দাঁড়িয়ে আছেন—আর কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন না। এখন তিনি আবার সব দেখতে পাচ্ছেন। চারপাশে টাগ-বোটে মাল খালাস করে চলে যাচ্ছে। একজন খালাসি রং করে ফিরছে। ফলঞ্চা খুলে পাশে রেখে গোপনে সিগারেট খাচ্ছে। বড় বড় কাঠে নাবিকেরা ফল্কা ঢেকে দিচ্ছে। ডেরিকের দড়িদড়া তুলে নিয়ে যাচ্ছে ডেক-কশপ। ছোটবাবু উইনচের নিচ থেকে মাথা বের করে রেখেছে। এবারে সে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে আসবে। বনি বোট- ডেকে দাঁড়িয়ে ডেবিডের সঙ্গে গল্প করছে।

    আবার এ-ভাবে পৃথিবীতে আর একটা দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে পাহাড়ের মাথায়। সমুদ্রে সব পাখিদের ছায়া। ওরা দ্বীপে ফিরে আসছে। লেডি-অ্যালবাট্রস কোথাও হয়তো আছে, অথবা সমুদ্রের গভীরে নীল জলে এখন মাছ ধরে খাচ্ছে। সে বোধহয় তার পুরুষ-পাখিটার কথা একেবারে ভুলে গেছে। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সময় কত স্মৃতি, কত ছবি। এবং এইসব ছবির শব্দমালা আর শোনা যায় না, পৃথিবীর অন্ধকারে অথবা সৌরজগতের সেই প্রবহমান ধারায় মিশে গেলে কত ক্ষুদ্র, কত সামান্য এ-সব মনে হয়। স্যালি হিগিনস এ-সব ভেবে বোধহয় মনের দুর্বলতা পরিহার করতে চাইছেন। শক্ত হতে না পারলে তিনি ডুবে যাবেন। পাগল হয়ে যাবেন।

    কোয়ার্টার-মাস্টার জাহাজের সব আলো জ্বেলে দিচ্ছে তখন। ফোর-মাস্টের আলো জ্বেলে, দু- পাশের সব আলো জ্বালতে জ্বালতে সে ছুটছে। মেন-মাস্টে তাকে আলো জ্বালতে হবে। জাহাজের যেখানে যা কিছু অন্ধকার সে দু-হাতে এখন সরিয়ে দিচ্ছে। সব আলো জ্বেলে, সব পতাকা ঘরে নিয়ে যাবে সে। তারপর হয়তো মাদুর বিছিয়ে খোলা ডেকে উদার আকাশের নিচে সারাদিন কেটে গেলে পৃথিবীর সেই মহিমময়ের কাছে সামান্য নতজানু হওয়া। বাই দ্য এনভি অফ দ্য ডেভিল, ডেথ কেম ইনটু দ্য ওয়ালর্ড। মানুষের নতজানু না হয়ে উপায় নেই। পাপ এবং বিশ্বাসভঙ্গের জন্য মানুষের নতজানু না হয়ে উপায় নেই। এবং এ-সব মনে হলেই তিনি কেমন ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়েন। তাঁর সব সাহস নিমেষে উবে যায়। তিনি তখন কি যে করবেন ঠিক করতে পারেন না। কখনও তিনি পাতার পর পাতা না দেখে বাইবেলের সব স্তবক আবৃত্তি কার যান। অথবা কখনও তিনি কোনো স্পিরিচুয়াল সঙ গলা ছেড়ে গাইতে চান—পারেন না। হাত তুলে দু-হাতে করুণা ভিক্ষার মত গলা ছেড়ে তাঁর ভীষণ ভাল লাগে ভাবতে তিনি গাইছেন—আই অ্যাম অন্ মাই ওয়ে। অথবা কখনও আই অ্যাম অন মাই ওয়ে টু ক্যানানা-ল্যাণ্ড। তারপরই মনে হয় নাভির ভেতর থেকে গলার স্বরে ভেসে আসবে সেই ঈশ্বরের জন্য প্রতীক্ষা—গ্লোরি হ্যালেলুজা, আই অ্যাম অন্ মাই ওয়ে। আমি আপনার কাছেই যাচ্ছি। কোনো উপত্যকার পথে, অথবা কোনো দ্বীপমালার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে, অথবা সব সবুজ গাছের ছায়ায়, দূরবর্তী নক্ষত্রের মতো ঘুরে ঘুরে দু-হাতে করুণা ভিক্ষার মতো তিনি যেন গেয়ে যাচ্ছেন, গ্লোরি হ্যালেলুজা, আই অ্যাম অন্ মাই ওয়ে।

    —স্যার!

    স্যালি হিগিনস মুখ তুলে তাকালেন।

    —ডাক্তার নিচে দাঁড়িয়ে আছে।

    –ডাক্তার আবার কেন! আমি তো ভালো আছি। বেশ ভালো। এখানে তাকে নিয়ে এস।

    —ভিতরে গেলে ভাল হত না স্যার!

    —তোমরা ভারী জ্বালাতন কর চিফ। আমাকে নিয়ে হঠাৎ তোমাদের কেন যে এত দুর্ভাবনা বুঝি না। বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সমুদ্র থেকে জোর হাওয়া উঠে আসছে। তিনি ইচ্ছে করলে তাঁর পোশাক পুরোপুরি পরে নিতে পারেন। আর স্বভাবে তিনি প্রায় এ-রকমের। ধড়াচূড়া পরে তিনি একেবারে এখন ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস। ভেতরে ডাক্তার এলে হাত বাড়িয়ে হ্যাণ্ড-শেক করলেন। বললেন, তোমার কি মনে হয় ডাক্তার, এ-বয়সে তুমি আর আমার কিছু ভাল করতে পার?

    —না স্যার।

    —তবে এসেছ কেন!

    ডাক্তার এর ওর মুখের দিকে তাকাতে থাকল। তখন বনি বলল, তুমি শুয়ে পড়তো বাবা। আর একটা কথা বলতে পারলেন না। একেবারে ভীতু বালকের মতো শুয়ে পড়লেন। বনি যতক্ষণ পায়ের কাছে আছে আর বোধহয় তিনি একটা কথাও বলতে পারবেন না। সামান্য দুষ্টুমি করার ইচ্ছে ছিল ডাক্তারের সঙ্গে। বনির জন্য তাও হল না। চুরি করে মাঝে মাঝে মেয়ের মুখ দেখছেন। বনি ডাক্তারের মুখ দেখছে। ডেবিড ডাক্তারকে নানাভাবে সাহায্য করছে। কতটা রক্তচাপ শরীরের দেখছে এবং কানে নল লাগিয়ে বুক দেখছে। বনি প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ডাক্তার কি বলবে শোনার জন্য চোখের পলক পড়ছে না।

    ডাক্তার সব ব্যাগের ভেতরে ভরে নেবার আগে, জিভ দেখল, চোখ দেখল, পেট টিপে দেখল। দু’টো-একটা প্রশ্ন। বনি অথবা চিফ-মেট কখনও ডেবিড জবাব দিচ্ছে। এবং সকালে জাহাজের এনজিন- রুমে নেমে গেছিলেন এ-সবও যখন বলা বাদ গেল না আর যখন ডাক্তার বলল, ভাল আছেন, কোনো ভয় নেই, তখন স্যালি হিগিনস হা হা করে হেসে দিলেন।

    —তবে! বলেই স্যালি হিগিনস একেবারে সোজা উঠে বসেছিলেন।

    —তবে আপনি এ-বয়সে যত বিশ্রাম নেবেন তত ভাল।

    স্যালি হিগিনস সহসা গলা ছেড়ে গান গেয়ে উঠেছিলেন বুঝি—হাত তুলে বলার ইচ্ছে—আই অ্যাম অন্ মাই ওয়ে, আই অ্যাম এ ফলিং অ্যাণ্ড এ রাইজিং, বাট আই অ্যাম অন্ মাই ওয়ে।

    স্যালি হিগিনস সহসা বললেন, ডাক্তার তুমি গান জানো?

    ডাক্তার মানুষটি সামান্য না হেসে পারল না। কাপ্তান সত্যি মজার মানুষ। অথচ সে দেখছে, অফিসাররা কেমন ভীতু মুখ করে সবাই দাঁড়িয়ে আছে পাশে। যমদূতের মতো ভয় স্যালি হিগিনসকে। সে এবারে বলল, জানি স্যার।

    —তোমরা?

    চিফ-মেট অবাক। স্যালি হিগিনস রাশভারী কর্তব্যপরায়ণ এবং স্থির ধীর কাপ্তান। কিংবদন্তীর মতো তাঁর জীবন। এবং যেহেতু দীর্ঘদিন একটা অচল জাহাজ চালিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি আর দশজন কাপ্তানের মতো একেবারে শুধু কলকব্জার ওপর নির্ভরশীল নন, এবং জাহাজ চালাতে গেলে একটা স্থির বিশ্বাস থাকা বাঞ্ছনীয়, মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করা যত মঙ্গলজনক এবং তিনি যখন এ-ভাবে একজন সফল কাপ্তান তখন গলা ছেড়ে গান গাওয়া খুব একটা অমর্যাদার ব্যাপার নয়—কিন্তু কি বলবে সে! কাপ্তান ওর দিকে এখনও তাকিয়ে আছেন। সে বলল, গলা মেলাতে পারব।

    —তা হলেই চলবে। তুমি ডেবিড?

    ডেবিড মাথা ঝাঁকাল।

    —ছোটবাবু কোথায়? ছোটবাবুকে ডাকো। আমরা সবাই এখন গলা ছেড়ে গাইব, গ্লোরি হ্যালেলুজা, আই অ্যাম অন্ মাই ওয়ে। আই হ্যাভ হ্যাড টাইম বাট্ আই অ্যাম অন্ মাই ওয়ে। হ্যাড এ মাইটি হার্ড টাইম, গ্লোরি হ্যালেলুজা, আই অ্যাম অন্ মাই ওয়ে। ডাক্তার এবং সবাই মিলে পায়ে তাল দিয়ে গাইছে। যেন জাহাজে এখন পিয়ানো থাকলে, বনি পিয়ানো বাজাতে পারত। অথচ ছোটবাবু বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। সে কোনোদিন কোনো গানের সঙ্গে ঠিকমতো গলা মেলাতে পারে না। আর এ তো বিদেশী গান, এবং গলা চিরে যাচ্ছে—এ-ভাবে অসুস্থ কাপ্তানের কি যে মরজি, হয়তো ভেতরে একটা গণ্ডগোল ঘটে গেছে সবার, সবাই এখন এইসব স্পিরিচুয়ালের ভেতর সামান্য অবলম্বন খুঁজছে। মানুষ এ-ভাবে দীর্ঘদিন সমুদ্রে ভেসে বেড়ালে মাথা ঠিক রাখতে পারে না।

    স্যালি হিগিনস খুশীর চোটে ডাক্তারকে পরদিন লাঞ্চে নেমন্তন্ন করে ফেললেন, তুমি বেশ গাও হে ছোকরা। তোমার গলা ভারী দরাজ। আমিও এক সময় খুব গলা ছেড়ে গাইতে পারতাম। এখন পারি না।

    বনির ভয় লাগছিল, বাবা হয়তো এবার বলবেন, আর একটা। সে তাড়াতাড়ি বাবাকে বলল, বাবা, তুমি আমার রেকর্ডগুলো শুনবে?

    স্যালি হিগিনসের যেন সহসা বাঁধ ভেঙে গেছে। তিনি বনির কথা একেবারে শুনতে পেলেন না। বুড়োমানুষটা বাঁধানো দাঁতের জন্য ভাল গাইতেও পারেন না—অথচ ডাক্তারের গলায় এবং সকলের গলায় গানটা আশ্চর্য এক স্বর, কখনও উঁচু লয়ে, কখনও নিচু লয়ে, কখনও ফিস্ ফিস্ গলায় আবার কখনও লম্বা যেন সরল রেখার মতো। ক্রমে জাহাজের বাঁশি বেজে উঠেছে। তিনি ফের বললেন, ধরো, হাত তুলে এই ছোট্ট কেবিনের ভেতর, ঠিক ছোট কেবিনে কুলোচ্ছে না বলে তিনি প্রায় হাত তুলে গাইতে গাইতে ব্রীজে উঠে যাচ্ছেন—হোললার, হে ওম্যান হে গার্ল ডোনচ্ ইউ হিয়ার মি, কলিং ইউ, মাই ওম্যান সো সুইট সো সুইট!

    বনি ডাকল, বাবা। তুমি এত জোরে গাইবে না!

    স্যালি হিগিনস হাত সরিয়ে দিয়ে একেবারে স্থির হয়ে গেছেন

    সবাই এ-ভাবে স্থির। আর মনে হচ্ছিল বাবা সারাদিন এ-ভাবে কি যে সব করে যাচ্ছেন! কোনো মাথামুণ্ডু নেই। সে ডাকল, বাবা! বাবা! বাবাকে ধরে ফেল্ল।—তুমি থামো বাবা। তারপর কেমন চিৎকার করে বলল, আপনারা থামুন। বাবা বাবা!

    স্যালি হিগিনস তারপর ধপাস করে বসে পড়লেন। খুব জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন। তারপর ঢোক গিলে বললেন, বুঝলে এখন আর সত্যি পারি না। আমার খুব প্রিয় গান এটা। পারি না আর পারি না।

    বনি এবার বাবার পাশে বসে বলল, বাবা আবার যদি তুমি গাও, আমি কিন্তু ভীষণ কাণ্ড করব!

    স্যালি হিগিনসের মনে হল, মেয়েটা তাহলে এখনও তাঁর বেঁচে আছে। তিনি বললেন, আর গাইব না। আমার আর কি গাইবার আছে!

    আর তখন আর্চি জাহাজের অন্ধকারে পায়চারি করছিল। কতদিন সে ডাঙায় নামতে পারে নি। ডাঙায় নামতে পারলে তার ভেতরের অসুখটা নিরাময় হত। সাময়িক নিরাময় তাকে হয়তো ক্রমে এ-ভাবে এক কঠিন নিয়তির দিকে এত সহজে ঠেলে দিত না। সে ডাঙায় নামতে পারলে কোনও সুন্দরী রমণী, অথবা কি যে হচ্ছে ডাঙ্গাথেকে সে প্রায় আছে নির্বাসনের মতো এবং যে কোনো বন্দরে নেমে গেলেই যুবতীরা যেন তার কাছ থেকে আত্মরক্ষার্থে পালাতে চায়। কোথাও সে দেখেছে, শিশুরা তাকে নিয়ে তামাশা করতে ভালবাসছে। ভয়ে সে আর জাহাজ থেকে নামতে পারছে না। আয়নায় যত নিজের মুখ দেখছে তত ক্ৰমে সে ভয় পেয়ে যাচ্ছে নিজেকে। এবং অন্ধকারে সে এখন বেশি থাকতে ভালবাসছে। ডাইনিং হলে সে যাচ্ছে না। মেস-রুম-বয় তার খাবার কেবিনে দিয়ে আসছে। এ-ভাবে সে ঠিক বড়-মিস্ত্রির মতো ক্রমে অন্ধকারের জীব হয়ে যাচ্ছিল। আর তখন জাহাজে বালিকা যুবতী হচ্ছে। জাহাজে বালিকা….বালিকা, প্রায় রেকর্ডের বাজনার মতো বালিকা যুবতী হচ্ছে।

    এবং এ-ভাবে আর্চি দেখছে, বরং সে এখন আলো দেখলে ভয় পেয়ে যায়। কেউ তার মুখ দেখুক তা সে চায় না। যতটা পারে সে মুখ লুকিয়ে রাখে। জ্যাককে দেখলে সে আর আগের মতো দৌড়ে যেতে পারে না। কারণ জ্যাক এমন কদর্য মুখ দেখলে ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। ক্যাপ্টেনের ঘরে গতরাতে সে কিছুক্ষণ বসেছিল, উঠতে ইচ্ছে করছিল না, জ্যাক ওর দিকে একবারও ভয়ে তাকাচ্ছিল না। সে লোভের ভেতরে পড়ে যাচ্ছিল, রক্তপ্রবাহ সারা মুখে এবং সে ভেতরে ভেতরে নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছিল। সে কেবিনে ফিরে দু-হাতে কদর্য ডোরা কাটা কাটা দাগ মুছে দিতে চেয়েছে, যতবার মুছে দিতে চেয়েছে, ততবার দেখেছে দাগ-গুলো আরও প্রকট, আর গভীর—কি যে কালো আর কুৎসিত হয়ে যাচ্ছে এবং আশেপাশে সাপের মতো নীলাভ সাদা রং স্বাভাবিক চামড়ায়—সে যেন উইচ, আফ্রিকার ঘন অরণ্যের ভেতর কোনো অরণ্য সর্দারের যুবতী কন্যার চামড়া তুলে নিচ্ছে। সে একটা উইচ, সে একটা উইচ।

    আসলে এ-জাহাজে যত রাত বাড়ছিল তত সে ঘুমোতে পারছিল না। মাঝে মাঝে সে ক্ষেপে যায়—শরীরে আশ্চর্য লোভ লালসা, কোনো বালিকা যুবতী হবার মুখে শুয়ে আছে, তার চুলে সমুদ্রের গন্ধ, শরীরে কি যে নরম আস্বাদন, মাংস খুবলে নিতে ইচ্ছে করছে বার বার, জংঘায় তার রয়েছে চমৎকারিত্ব—যেন হাতের পেশী সেই চমৎকারিত্ব সব লুণ্ঠন করে নেবে। সে এ-ভাবে ক্রমে যখন অমানুষ হয়ে যায় আর পারে না, চুপি চুপি একটা শ্বাপদের মতো উঠে যায়। গভীর রাতে সে দেখেছে কখনও কেউ না কেউ বালিকার মাথার ওপরে সতর্ক পাহারায় থাকে—কখনও লুকেনারের প্রেতাত্মা, কখনও লেডি-অ্যালবাট্রস, কখনও সমুদ্রের অগ্নিকাণ্ড, কখনও বজ্রপাতের মতো কিছু আধিভৌতিক শব্দ আকাশের অভ্যন্তরে বাজতে থাকে। বার বার সে ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে আসছে। এবং যা হয়ে থাকে, আবার দু’রাত পার হয় না, কেবল জ্যাকের কেবিনের চারপাশে খাঁচায় পোরা বাঘের মতো এ-পাশ ও-পাশ শুঁকে শুঁকে যাওয়া, জ্যাক যেখানে বসেছিল, যেখানে দাঁড়িয়ে গল্প করেছিল সেখানে শুঁকে শুঁকে সে কুকুরের মতো ঘ্রাণ নিতে নিতে অমানুষ হয়ে যায়। তখন ঘুম আসে না, মদ খেতে ভাল লাগে না, ভাঙা আয়না আরও ভেঙে দুমড়ে সে একটা অতিকায় মনস্টার যেন। আর অন্ধকার তার বড় প্রিয়। সে সলাপরামর্শ করে থাকে—যেমন কখনও ডেক-সারেঙ কখনও এনজিন- কশপ অন্য সবাই যারা জাহাজের আধিভৌতিক ঘটনায় ম্রিয়মাণ তাদের সহজেই সে উসকে দিতে পারে। এখন একমাত্র সম্বল এইসব নিরীহ গোবেচারা জাহাজিরা। সবাই তার হাতে এসে গেলে, জাহাজে বিজয় লাভ করতে সময় লাগবে না। তখন সে যুবতী হবার মুখে বালিকার সবকিছু চমৎকারিত্ব লুণ্ঠন করে নেবে।

    অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তার মনে হল সব মিছিলের মতো কারা অন্ধকারে এগিয়ে আসছে। যেন বাতাসে ভর করে প্রথমেই এসে দাঁড়াচ্ছে ছোটবাবু। সে সজোরে ছোটবাবুর পেটে ঘুষি বসিয়ে দিল এবং দেখা গেল ডেক-সারেঙ দাঁড়িয়ে আছে মেন-মাস্টের নিচে। সে ছোটবাবুর গলায় দড়ি পরিয়ে দিচ্ছে। এবং উইনচে চালিয়ে সোজা মাস্তুলে লটকে দেওয়া হচ্ছে। আ—হাততালি। তার ক্রুরতা ক্রমে এভাবে কবে যে সফল হবে!

    আর্চি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে শুধু পায়চারি করছে। এদিকটায় কেউ আসে না। কারণ এখানে বড়-মিস্ত্রি থাকতে একবার ভূত দেখেছিল। অথবা কেউ কেউ জাহাজে রাতের গভীরে কোনো যুবতীর ছায়া দেখেছে। আর কি যেন আছে এদিকটায়, নানা কারণেই সব সময় এ জায়গাটায় কেউ আলো জ্বালিয়ে দেয় না—অথবা মনে হয় যতবার আলো জ্বালানো হয়েছিল, ক্যাপ্টেন কোথাও অন্ধকার রাখতে যত বারণ করেছেন তত সে মাঝে মাঝে এদিকটার লাইন অকেজো করে রাখে। এবং যেহেতু তার হাতে মেরামতের দায়-দায়িত্ব কে আর ভাবে—কোথায় আলো কিভাবে জ্বলবে। এবং এই অন্ধকারে সে দেখতে পেল, বাতাসে ভর করে এসে দাঁড়িয়েছিল স্যালি হিগিনস। আর্চি হা হা করে হেসে উঠল। বলল, স্যার আপনাকে আমরা কিছু করব না। সামনের দ্বীপটাতে আপনাকে আমরা রেখে চলে যাব। আলেকজাণ্ডার সেলকার্ক। হা-হা-হা!

    জ্যাক তুমি কি দেখছ! তোমার কিছু অনিষ্ট করব না। তোমার শুধু চমৎকারিত্ব লুণ্ঠন করে নেব। তোমার অস্থিমজ্জায় আমি প্রবেশ করে যাব জ্যাক। তোমার একটা সুন্দর নাম রাখব। পুরুষের নাম তোমার খাতা থেকে কেটে দেব। আর কিছু করব না। সত্যি বলছি, আর কিছু করব না।

    তখন স্যালি হিগিনস সিঁড়ি ধরে নামছিলেন। তিনি চার্ট-রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিছু কাজকাম বাকি। গতকাল থেকে অদ্ভুত একটা দুর্ভাবনায় সময় কেটেছে। কোনও কাজ করতে পারেন নি। কেবল মনে হয়েছে যে-কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটে যাবে। ভবিতব্য ভেবে মাথা পেতে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

    এখন সময় যত চলে যাচ্ছে তত তিনি হাল্কা বোধ করছেন। বার বার দু’বারের মতো তিনবারের মাথায় কিছু ঠিক ঘটবে, এবং ভয়ংকর সেই ঘটনার মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছিলেন—প্রথমবার থিও ফ্যাল নিজে, দ্বিতীয়বার রিচার্ড ফ্যালের একমাত্র জাতক উইলিয়াম ফ্যাল। তখন রিচার্ড ফ্যাল গাড়ি ঘুরিয়ে নিচ্ছিলেন। হুডখোলা গাড়ি। বারান্দার পাশ থেকে সেই প্রাসাদের মতো বাড়ির রাস্তায় চলন্ত গাড়িতে ধপাস করে কিছু এসে পড়েছিল। সবকিছু ঠিকঠাক। কেবল কাগজপত্রে সইসাবুদ—তারপর সিউল-ব্যাংককে আর দশটা পুরোনো ভাঙা জাহাজের মতো নাকে দড়ি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে—তারপরই ঠিক ছিল উৎসব প্রাসাদে, এতবড় একটা আজীবন উদ্বেগ শেষ হয়ে গেল বলে যখন উৎসবের আয়োজন ঠিকঠাক তখন হুডখোলা গাড়িতে একমাত্র জাতকের মৃতদেহ। দোতলার রেলিং টপকে কেউ তার বালকপুত্রকে নিচে ঠেলে ফেলে দিয়েছে। রিচার্ড ফ্যাল দেখলেন ঘাড়টা বেঁকে গেছে, মনে হয় ঘাড় মটকে ছুঁড়ে দিয়েছে নিচে। এবং রিচার্ড ফ্যাল পাগলের মতো নেমে গেছিলেন। উন্মাদের মতো চিৎকার করেছিলেন সিঁড়ি ধরে ওপরে ছুটে যাওয়ার সময়—সব শেষ। তারপর তাঁর গলার স্বর ভয়ংকরভাবে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছিল।—দ্য সী-ডেভিল। যেন খবর পাঠাবেন, মাঝ সমুদ্রে নিয়ে সিউল- ব্যাংকে পুড়িয়ে দাও। পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দাও। সে আমাদের সব কেড়ে নিচ্ছে। তিনি তারপর কিছুতেই তৃতীয়বার জাহাজ স্ক্র্যাপ করার আদেশপত্রে একটা কথা লিখতে সাহস পান নি।

    আসলে দৈব-দুর্ঘটনার সঙ্গে যদি অকারণ কিছু হয়ে যায় তবে তার কি দোষ! অযথা সিউল-ব্যাংককে দোষারোপ করার অর্থ হয় না।

    সামান্য জড় পদার্থ এই জাহাজ। শুধু কলকব্জায় চলে। কোনো অনুভূতি থাকতে পারে না। অথচ বার বার একে দোষারোপ করে অতিকায় ভীতির ভেতর পড়ে যাচ্ছে সবাই। কাল রাতে সেই পুনরাবৃত্তিব কথা ভেবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, অথচ মুখে বলা যায় না, ভারী হাস্যকর ব্যাপার—এবং কেউ গুলগল্প ভেবে একজন বনেদী কাপ্তানের এতদিনের ঐতিহ্যে কলঙ্ক লেপে দেবে বলে স্থির করেছিলেন, সব তিনি ঠাণ্ডা মাথায় করে যাবেন। যতই ভাবুন সবকিছু ঠাণ্ডা মাথায় করে যাবেন, শেষ পর্যন্ত আর তিনি খুব ঠাণ্ডা মাথায় ছিলেন না। তিনি সারাক্ষণ বনিকে ভুলে থাকার জন্য একটা না একটা অস্বাভাবিক কিছু করে গেছেন। এসব মনে হলেই বুঝতে পারেন দীর্ঘ দিনের অতীব এক বিশ্বাস ভেতরে বাসা বেঁধে আছে। তার হাত থেকে তিনি কিছুতেই নিষ্কৃতি পাচ্ছেন না। এবং মাঝে মাঝে এই যে বনিকে ডেকে পাঠাচ্ছেন, ডেকে বলছেন, আচ্ছা বনি তোমার শরীর ভাল তো। এবং এ-সব প্রশ্নে তিনি দেখেছেন, বনি বড় বড় চোখে ওঁর দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলে না। বড় বেশি অবাক হয়ে যায়। তিনি তখন নিজের দুর্বলতা ধরতে পেরে কেমন শুকনো গলায় বলেন, জাহাজ তো খুব একটা ভালো জায়গা নয়। সাবধান থাকলে ক্ষতি কি?

    তখনই আবার মনে হয় সেই ভয়াবহ বজ্রপাতে কেউ মারা যাচ্ছে। পৃথিবীতে কত লোক বজ্ৰপাতে মারা গেছে অথচ সেই নির্দিষ্ট খবরে তিনি স্থির থাকতে পারবেন না কেন! এটা তিনি কাকতালীয় ভাবতে পারছেন না কেন। এবং সেটা কাকতালীয় ব্যাপার ভাবলেই তাঁর বেশি ভাল লাগার কথা। রিচার্ড ফ্যালের শ্রীমান তো ভীষণ চঞ্চল ছিল স্বভাবে। পরিচারকদের সব সময় দুর্ভাবনায় অস্থির করে রাখত। সে যে সহজ পথ ভেবে রেলিং টপকে পালাতে চায়নি এবং নিচে পড়ে যায় নি কে বলবে! তিনি মাথা থেকে অহেতুক দুর্ভাবনা সরিয়ে দেবার জন্য হাজার রকম ব্যাখ্যা করতে থাকলেন সবকিছুর। নতুন করে আবার সব ভাবছেন। না ভাবলে তিনি পাগল হয়ে যাবেন

    তবু রক্ষে দুর্ঘটনা ঘটে যাবার আগেই কাগজপত্র সব ঠিকঠাক করে দিয়েছেন। এটা একটা তাঁর বড় রকমের জয়লাভ। তিনি সিঁড়ি ধরে এক ধাপ নামলেন, আর হিজিবিজি সব চিন্তা তাঁর মাথায়। সহজে তরতর করে নিচে নেমে যেতে পারছেন না। অনেক উঁচু থেকে তিনি দেখতে পাচ্ছেন রাজমহিষীর মতো সিউল-ব্যাংক ভেসে আছে সমুদ্রের জলে। আর দু’টো বড় মাস্তুলে তেমনি লম্ফ জ্বলছে। হাওয়ায় তার দড়ি-দড়া তেমনি বাতাসে দোল খাচ্ছে। কোনো কিছুতে যেন তার আসে যায় না। শুধু মনে হল বনিকে বলে দিতে হবে, বনি তুমি কিন্তু রেলিং ঘেঁষে কখনও দাঁড়াবে না। নিচে ঠেলে ফেলে দিলে তো কিছু করার থাকবে না। তখন যত দোষ হবে সিউল-ব্যাংকের। মনে হবে সত্যি কিছু একটা অশুভ প্রভাব এ-জাহাজে আছে।

    স্যালি হিগিনস চার্ট-রুমে ঢুকে বললেন, তোমার ঘড়িতে কটা বাজে চিফ-মেট?

    চিফ-মেট ভারি অবাক। মাস্টার তাকে জিজ্ঞেস করছেন কটা বাজে! সময় মেলাচ্ছেন ঘড়িতে। সময় তো তাঁর ভুল হবার কথা না। সময় ঠিকঠাক থাকার কথা। চিফ-মেট বলল, ন’টা বাজে স্যার।

    —আমার ঘড়িতেও ঠিক ন’টা। ভীষণ কারেক্ট সময়। দ্যাখো দ্যাখো সেকেণ্ড এবং মিনিটের কাঁটা ঠিক দু’জনের একজায়গায় দেখে স্যালি হিগিনস খুবই পুলকিত হয়ে পড়লেন। তাঁর হাতের ঘড়ি কোনো অশুভ প্রভাবে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু চিফ-মেটের ঘড়ি এবং যেখানে যত রকমের সময় নির্ধারণের ব্যাপার আছে সর্বত্র দেখে দেখে বুঝতে পারলেন কোনো ভুল-ত্রুটির ভয় নেই—সময় ঠিক –বারো ঘণ্টা পার হয়ে ছত্রিশ মিনিট। এবং এভাবে তিনি বসে বসে কেবল দণ্ড পল দেখে যাচ্ছেন। মিনিটের কাঁটা একবার ঘুরে গেলেই সেই শৈশবের মতো প্রায় লাফিয়ে উঠছেন—এক দুই তিন গুণে যাচ্ছেন। যত সময় পার হয়ে যাবে তত তার রোষ কমে আসবে। রোষের মুখে একরকম, সময় পার হয়ে গেলে অন্যরকম।

    সারারাত তিনি ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো এভাবে চিন্তাভাবনায় দুলেছেন। পায়চারি করেছেন। ঘুমোতে পারেন নি। মাঝে মাঝে পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে দেখেছেন, সর্বত্র শুধু নক্ষত্রেরা ভেসে যাচ্ছে আকাশে। কখনও তিনি সিঁড়ি ধরে নেমে এসেছেন নিচে। বনি দরজা খুলে যদি কোথাও চলে যায়? কোনো অশুভ শক্তি তাকে যদি আকর্ষণ করে, মাথায় তো তখন কিছু থাকে না। বোকার মত দরজা খুলে হেঁটে যেতে পারে। বার বার এভাবে নিচে ওপরে, কখনও মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, কখনও ঠিক বনির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভেবেছেন, কেবিনের ভেতর বনি নেই, ফাঁকা ঘর তিনি পাহারা দিচ্ছেন, তখনই বুকটা কেঁপে ওঠে, মুহূর্তপ্রায় তাঁর আর অপেক্ষা করার সময় থাকে না—বনি বনি, তুমি কি করছ! বনি!

    বনি দরজা খুলে মুখ বাড়িয়ে বলছে, কি হল বাবা? এত রাতে? তুমি এখনও ঘুমোও নি! চল ওপরে!

    —আরে না। তুমি ঘুমোও। আমি ঠিক উঠে যেতে পারব। আচ্ছা শোনো, দরজা খুলবে না। কেমন? জাহাজ তো ভাল জায়গা না! কেউ ডাকলে দরজা খুলবে না। দরজাটা ভাল করে লক করে দাও। কি দিয়েছ?

    —হ্যাঁ দিয়েছি। তবু ঠেলে দেখলেন একবার। রাতটা কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। সেই এলিসের মৃত্যুর . দিনের মতো। প্রত্যেকটা মিনিট ঘণ্টার চেয়েও বেশি লম্বা হয়ে যাচ্ছে। আর তাঁর ঘুম আসছে না। ঘুম এলেও তিনি ঘুমোতে যাচ্ছেন না। ক্রমে রাত এভাবে বাড়ছে। তিনি আর কেবিনের ভেতরও থাকতে পারছেন না। যেন কেউ বনিকে অসতর্ক মুহূর্তে বের করে নিয়ে যাবে। তিন চার্ট-রুমের রেলিঙে চলে এলেন। এখানে দাঁড়ালে বনির দরজা দেখা যায়। উইংসের আলো এসে পড়েছে দরজায়। সামান্য শব্দ হলে তিনি ঠিক টের পাবেন। এবং সমুদ্র থেকেযত প্রবল হাওয়া আসুক, দরজা খোলার শব্দ ঠিক শুনতে পাবেন। বনি কোথাও দরজা খুলে চলে যেতে চাইলে তিনি ঠিক টের পাবেন।

    নিশীথে নক্ষত্রেরা তখনও তেমনি আকাশে এবং দিগন্তে পারাপারহীন অসীমতায় কিরণ দিচ্ছে। সামনে শহরের সব আলো ঘর বাতি। কোথাও বাড়িঘরের ছায়া। জাহাজে কোথাও কোনো এতটুকু শব্দ নেই। একেবারে শব্দহীন অন্তহীন যাত্রার মতো তিনি দাঁড়িয়ে আছেন ওপরে। গোপনে পাহারা দিচ্ছেন। কোনোরকমে রাতটা পার করে দিতে পারলেই দুর্ভাবনার অনেকটা লাঘব। তখন সহসা যেন দূরে কিছু দেখতে পাচ্ছেন! ঠিক মেন-মাস্টের গোড়ায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তার ছায়া বড় হয়ে যাচ্ছে ক্রমে এবং ক্রমে ছায়াটা লম্বা হয়ে যাচ্ছে। লম্বা হতে হতে প্রায় বনির কেবিনের কাছাকাছি চলে আসছে। তিনি কাঠ হয়ে গেছেন দেখতে দেখতে। ভারি সন্তর্পণে সে এগিয়ে আসছে। জাহাজের অস্পষ্ট আলোতে তিনি বুঝতে পারছেন না, এভাবে টলতে টলতে গভীর রাতে বোটডেকে কে উঠে আসছে। তিনি কিছুতেই আর স্থির থাকতে পারলেন না। রেলিঙে ঝুঁকে চিৎকার করে উঠলেন, কে? কে ওখানটায়! ঠিক বনির দরজার কাছে এসে গেছিল। এখন পালাচ্ছে। মুখটা ভীষণ নিচু করে রেখেছে। ওপর থেকে দেখা যাচ্ছে না। তিনি বললেন, কে? কে আপনি? সঙ্গে সঙ্গে চোখের ওপর থেকে ছায়াটা টুপ করে ডুবে গেল। বনির দরজার সামনে ঠিক নিচে নামার সিঁড়ি। সিঁড়িতে ছায়াটা অদৃশ্য হয়ে গেল। তখন সেই মধ্য যামিনীতে হাহাকার শব্দে স্যালি হিগিনসের কণ্ঠস্বর গমগম করে বেজে উঠল, কে? কে আপনি! আপনি কি জাহাজের সেই অশুভ প্রভাব। আপনি কি ক্রমে আবার প্রতিহিসংসাপরায়ণ হয়ে উঠছেন!

  • পঁয়তাল্লিশ

    পঁয়তাল্লিশ

    ।। পঁয়তাল্লিশ।।

    ছোটবাবু ফিস্ ফিস্ গলায় ডাকল, বনি।

    বনি বলল, বাবা আমাকে জাহাজ থেকে আর নামতে দেবে না ছোটবাবু।

    ছোটবাবু বলল, কেন নামতে দেবে না! ডেবিড যাচ্ছে।

    —বাবা কিছুতেই রাজী হচ্ছে না।

    ছোটবাবু সুন্দর পোশাক পরে ওপরে উঠে এসেছে। সারাদিন ভীষণ খাটুনি গেছে। সে তাড়াতাড়ি কাজ সেরে স্নান করেছে ভাল করে। এ ক’দিন মন ভাল ছিল না। মৈত্রদার মৃত্যুর পর সে কেমন নিঃসঙ্গ বোধ করছিল। বিকেলে তার কোনদিন জাহাজ থেকে নামতে ইচ্ছে হয়নি। সকাল থেকে আজ ডেবিড বারবার ওর কাছে এসেছে। তাকে নিয়ে কিনারায় নেমে যাবে। শহরে ঘুরবে। কোনো পাবে বসে সামান্য ড্রিংকস। এভাবে একটু উৎফুল্ল হওয়া। তখনই মনে হয়েছে গেলে মন্দ হয় না। সে, বনি আর ডেবিড। বনির সঙ্গে কতদিন যেন একা একা শহরের রাস্তায় অথবা সমুদ্রের ধারে সে হেঁটে যায়নি। সে বলেছিল বনিকে, আমরা বিকেলে কিনারায় যাব।

    বনি বলেছিল, আমিও যাব।

    কিন্তু এখন বনি কেমন নিস্পৃহ, তার কোনো ইচ্ছে নেই যাবার। সে চুপচাপ জাহাজের ডেক চেয়ারে বসে আছে। কিছু বই একটা টিপয়ের ওপর। খুশিমতো যে কোনো বই তুলে দু’টো-একটা পাতা ওল্টে দেখছে আবার রেখে দিচ্ছে। আসলে তার কিছু ভাল লাগছে না। বাবা দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছেন। সে বলল, জানো ছোটবাবু বাবা রাতে একেবারে ঘুমোয় না।

    ছোটবাবু পা ছড়িয়ে পাশে বসে পড়ল। বলল, কেন কি হয়েছে?

    —বাবা মাঝে মাঝে আমার দরজায় নেমে আসেন।

    —কেন নেমে আসেন? কি করে টের পাও তিনিই নেমে আসছেন!

    —আমি বুঝতে পারি ছোটবাবু। বাবা সিঁড়ি ধরে নেমে এলেই বুঝতে পারি। মাঝে মাঝে বাবা নেমে এসেও নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন না। ডাকেন। আমি জেগে থাকলে সাড়া দেই। বাবা কেন যে এমন হয়ে যাচ্ছেন!

    ছোটবাবু বলল, বুড়োর শেষ সফর। আর সমুদ্রে আসতে পারবেন না। সমুদ্রের জন্য বুড়োর শোক উথলে উঠছে।

    —তা এভাবে আমার কেবিনের দরজায় সেজন্য দাঁড়িয়ে থাকবেন কেন?

    —ভাল লাগে না ঘুম আসে না। নিজের বলতে পৃথিবীতে এখন শুধু তুমি। সারাক্ষণ তোমাকে কাছে কাছে রাখতে চান।

    —আরে না। তা ঠিক না। পরশু রাতে কি হল তুমি তো জান না!

    —কী হয়েছে!

    —আমার ঘুম আসছিল না। কেন যে ছোটবাবু ঘুম আসে না! যখন আর পারছিলাম না, ভাবলাম গোপনে তোমার কেবিনে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকব। জাহাজে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কে টের পাবে বল! দরজা খুলে দেখি বাবা ওপরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছেন। একা। ব্রীজের সব আলো নিভিয়ে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছেন। কার সঙ্গে কথা বলছেন যেন। বাবাকে আমি এভাবে কখনও দেখিনি! সন্তর্পণে দরজা খুলেছিলাম। সামান্য গলা বাড়াতেই দেখেছি বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। মনে হল বাবা টের পান নি, দরজা বন্ধ করে দেব ভেবে আবার যেই না সরে গেছি তখনই বাবা ডাকলেন, ভাল করে দরজা লক করে দাও। এত রাতে আবার উঠেছ কেন?

    ছোটবাবু বলল, ঠিক একটা কেলেঙ্কারী করবে বনি। তুমি কেন এত রাতে দরজা খুলতে গেলে! মাথায় তোমার কি চাপে!

    বনি ভীষণ দমে গেল। ছোটবাবু পর্যন্ত তিরস্কার করছে। কেউ তাকে বুঝতে পারছে না। সে আর একটা কথাও বলল না। বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকল।

    ছোটবাবু তখন আরও ক্ষেপে যায়। না, না, বনি এটা তুমি ঠিক করনি। তুমি বুঝতে পারছ না কেন তোমার এভাবে বের হওয়া ঠিক না।

    —আমি কি করব ছোটবাবু। পারি না, দু’বার তোমার দরজায় পর্যন্ত অন্ধকারে নেমে গেছিলাম। তুমি বকবে বলে দরজায় গিয়েও ডাকতে পারি নি। আবার ফিরে এসেছি। তুমি ভারি নিষ্ঠুর ছোটবাবু।

    ছোটবাবুর মাথায় এখন কিছু শব্দ বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে—স্যালি হিগিনস ঠিক অনুমান করেছেন, বনি পালিয়ে কোথায় যেতে চায়। বনি পালিয়ে ছোটবাবুর কেবিনে যেতে চায়। সে কেমন এবার শাসনের গলায় বলল, পোর্ট মেলবোর্নে তোমাকে ঠিক নামিয়ে দিতে বলব।

    বনি বলল, কেউ আমাকে নামাতে পারবে না ছোটবাবু।

    –কেউ দেখে ফেললে কি হবে বলতো! বুড়ো মানুষটাকে আমরা মুখ দেখাব কি করে বল তো। আর ভাবছ সবাই চুপচাপ থাকবে! আর্চি তখন পেয়ে বসেব না তোমাকে! বনি, দোহাই ছেলেমানুষী কর না।

    বনি তাকাল না পর্যন্ত। খুবই গম্ভীর মুখ। বয়সী যুবতীর মতো মুখ গম্ভীর করে রেখেছে। বই-এর পাতা উল্টে যাচ্ছে। মুখ তুলে ছোটবাবুকে একবারও দেখছে না। ছোটবাবু পাশে বসে আছে, থাকুক। ছোটবাবুর তো কেবল এখন তিরস্কার করার স্বভাব। ছোটবাবু, তুমি এত স্বার্থপর কেন—যেন ছোটবাবুর এই স্বার্থপরতাকে কিছুতেই সে সহ্য করতে পারছে না। পারলে সে এখন উঠে চলে যেত। কিন্তু ছোটবাবু যা একখানা মানুষ! অপমানজ্ঞান এত, হয়তো তারপর দিনের পর দিন কথা বলবে না। যেন বনি বলে সে কাউকে কখনও চেনে না। তার বলার ইচ্ছে হল, ছোটবাবু তুমি নিজেকে ছাড়া আর কারও কথা ভাব না। কিন্তু কিছু বলতে পারল না। তোমার তো ছোটবাবু খুশী হওয়ার কথা। আমি তোমার জন্য এত করতে পারি, তুমি আমার জন্য এটুকু সহ্য করতে পারবে না!

    ছোটবাবু কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। বনি কথা না বললে তার মাথায় এখন আরও বেশি রক্ত উঠে যায়। সে বলল, নামিয়ে না দিলে তোমার ঠিক শাস্তি হবে না।

    —বললাম তো কেউ পারবে না ছোটবাবু। মরে যাব, তবু কেউ তোমরা পারবে না।

    ছোটবাবু সহসা খুবই দমে গেল। চোখ তুলে বনির মুখ দেখল। ভীষণ থমথম করছে। সারা মুখে রক্তচাপ। বোধহয় মেয়েটার অপমানে চোখ জ্বালা করছে। ছোটবাবু বলল, বনি, আমি তোমার ভালোর জন্য বলছি। তোমাকে নিয়ে বনি আমার ভারী ভয়।

    সহসা বনি এবার জ্বলে উঠল। ওর দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল, কেন তুমি জাহাজে উঠে এলে ছোটবাবু! তোমার সঙ্গে আমার দেখা না হলে কি ক্ষতি ছিল! তুমি কেন আমার সব এভাবে চুরি করে নিয়েছ! কেন কেন? এখন তুমি তামাশা দেখছ। কিছু হলে তোমার কলঙ্ক হবে বলছ। তুমি এত ছোট, তুমি এত স্বার্থপর ছোটবাবু। তুমি ভাল না, তুমি খারাপ। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ল!

    ছোটবাবু বলল, এই বনি, ছিঃ কি হচ্ছে! বনি প্লিজ এমন করে না। শোনো! বনি প্লিজ, ডেবিড উঠে আসছে।

    বনি তাড়াতাড়ি বই দিয়ে মুখ ঢেকে দিল।

    ডেবিড কাছে এসেই হৈ-চৈ বাধিয়ে দিয়েছে।—কি ব্যাপার তোমরা এখানে! সেজেগুজে বসে আছি, পাত্তা নেই তোমাদের, এই জ্যাক চল। তুমি যাবে বলেছ। তা চল! দুষ্টুমি করবে না। আরে তুমি চলে যাচ্ছো কেন! যাবে না!

    ছোটবাবু দেখল, বনি মুখ আড়াল করে কেবিনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। সে তাকিয়ে থাকল, তারপর কেবিনের ওপাশে চলে গেলে বলল, জ্যাক যাবে না। ওর শরীর ভাল নেই বলছে।

    —কি হল আবার?

    —কি জানি কে জানে! ছোটবাবু বলতে বলতে ভারী অন্যমনস্ক হয়ে গেল। সে কিছু দেখছে না মতো হেঁটে যাচ্ছে ডেক ধরে। ডেবিড পেছনে পেছনে যাচ্ছে। ছোটবাবু বোটে উঠেও একটা কথা বলল না ডেবিডের সঙ্গে। ডেবিড দড়ি খুলে দিল। ছোটবাবু তেমনি দাঁড়িয়ে আছে। ও পরেছে কালো প্যান্ট হাওয়াইন শার্ট—পায়ে সাদা মোজা আর কালো জুতো। ওর দিন দিন চুল ঠিক জ্যাকের মতো বড় হয়ে যাচ্ছে। এবং কি যে সুমহান চোখমুখ হয়ে যাচ্ছে ক্রমে! দাড়ি সেই নীলাভ রঙের পাতলা, ক্রমে ঘন হচ্ছে। চোয়াল ভীষণ ভারী। এবং নাকের কিছুটা অংশ এখন দেখা যাচ্ছে—শরীরে সবুজ ঘাসের মতো কখনও রঙ, কখনও মনে হয় ঘাড়ে মসৃণতা অত্যধিক। হাতের পেশী শক্ত, ডেবিড়ের কেমন ভয় ভয় করতে থাকল। বলল, ছোটবাবু তুমি এমন গুম মেরে আছ কেন!

    ছোটবাবু বলল, কই না তো!

    —তোমার কিছু হয়েছে ছোটবাবু?

    —কি হবে?

    —কি হয়েছে জানি না। কিছু হয়েছে এটুকু বলতে পারি।

    —আরে না। কিচ্ছু হয়নি। ছোটবাবু বোটে উঠে ডেবিডের পেছনে চলে এল। দাঁড় টানবে বলে বসে পড়ল। ওর মুখে অজস্র রেখা তৈরি হচ্ছে—নানারকমের সংশয়।—আর্চি সারারাত আবার জাহাজে জেগে থাকছে!

    সে নুয়ে দাঁড় টানছে। ক্রমশ আর্চি চারপাশে নেচে বেড়াচ্ছিল। স্যালি হিগিনস, আর্চি, পুরনো জাহাজ, এই যুবতী মেয়ে আর সব নানারকম সংশয় ক্রমে ছোটবাবুকে অস্থির করে ফেলছে। সে একটা কথা বলতে পারছে না। মনে হচ্ছে জাহাজ সমুদ্রে ভেসে গেলেই ভয়ঙ্কর কিছু ঘটবে। এসব ভাবনার ভেতর জ্যাকের মুখ বড় বেশি হারিয়ে যাচ্ছিল। তখন ইচ্ছে হচ্ছিল, একবার গোপনে পেছনে তাকায়। যদি জ্যাক জাহাজে দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে সে বোট থেকে দেখবে।

    এবং তখনই কি যে হয়ে যায়, সে দেখতে পায় পোর্ট-হোলে সেই মুখ। সে ফিরে তাকাতেই ধীরে ধীরে হাত নাড়ছে—আমি আছি ছোটবাবু ভয় নেই। আমি পোর্টহোলে দাঁড়িয়ে তোমাকে দেখছি। তুমি যত দূরেই যাও আমি আছি সঙ্গে! ছোটবাবু মনে মনে বলল, আমিও আছি বনি। সে দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে থাকল। বনি হাত নাড়ছে। সহসা এক আশ্চর্য সুখানুভূতিতে ছোটবাবুর মনটা ভরে গেল। চোখ ঝাপসা হয়ে গেল বনির কথা ভেবে।

    ছোটবাবু বলল, ডেবিড আমি কিন্তু বেশি খাব না। আমাকে তাড়াতাড়ি জাহাজে ফিরতে হবে। বনিকে জাহাজে একা ফেলে সে একদণ্ড কোথাও আর থাকতে পারছে না।

    আর যা মনে হল ছোটবাবুর, বনি জাহাজে না থাকলে সেও ঠিকঠাক যেন জাহাজে বেঁচে থাকবে না। ডেবিডকে নিয়ে সে বেশি সময় কিনারায় থাকল না। বালিয়াড়িতে সে এবং ডেবিড কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়াল। সন্ধ্যা হয়ে গেলে ওরা দু’জন পাশাপাশি বসল। আভা ঘাসের মদ খেল দু’জনে। কিছু খাবার। ডেবিড ওর সঙ্গে ফিরে এল না। সে একা ফিরে এল জাহাজে।

    এবং এভাবে আর কখনও ছোটবাবুকে নেমে যেতে দেখা গেল না। সারাদিন কাজের পর সে বোট- ডেকে জ্যাকের সঙ্গে বসে থাকত। গল্প করত। ডেবিড বার বার এসে ফিরে গেছে। ওকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেনি। সূর্যাস্তের সময় ছোটবাবু রেলিঙে দাঁড়িয়ে থাকলে ডেবিড বুঝতে পারত, যেভাবে ছোটবাবু জাহাজে উঠে এসেছিল এখন আর সেভাবে ছোটবাবু বেঁচে নেই। কেমন ধীরস্থির এবং চরিত্রের দৃঢ়তা ছোটবাবু জাহাজে বড় হতে হতে পেয়ে গেছে। ছোটবাবু কথা বললে মনে হয়, অনেক দূর থেকে কথা বলছে। ছোটবাবুকে আর আগের ছোটবাবু কিছুতেই ভাবা যাচ্ছে না।

    মাসাধিককাল জাহাজ এ-বন্দরে থেকে গেল। ফসফেট ডেরিকে বোঝাই হচ্ছে। ক্রেনে যত সহজে একটা জাহাজ বোঝাই হতে পারে ডেরিকে তত সহজে হয় না। সময় লেগে যায়। এখন জাহাজ বোজাই হয়ে গেলে ফের যাত্রা। জাহাজ আপাতত যাবে জিলঙে। পোট-মেলবোর্ন পার হয়ে মাইল চল্লিশ

    দূরে ছোট্ট বন্দর। সব মাল সেখানে খালাস করা হবে। স্যালি হিগিনসের কাজকর্ম এবং অফিসারদের সব দেখাশোনা শেষ। বন্দর ছাড়ার আগে সেই এক নিশান উড়িয়ে দেওয়া। সবাইকে বলে দেওয়া চব্বিশ ঘণ্টার ভেতর জাহাজ আবার ছাড়ছে। বয়লার-রুমে সব বয়লারের স্মোক-বক্স একেবারে পরিষ্কার করে নেয়া হয়েছে। ক্রস-বাংকারে কয়লা লেভেলিং হচ্ছে। কোনো কারণে উঁচু নিচু পড়ে থাকা কয়লায় গ্যাস হতে পারে। আগুন লেগে যেতে পারে জাহাজে। কোথাও কোনো কারণে গাফিলতি থেকে না যায়। প্রায় বিশদিনের মতো জাহাজ ফের সমুদ্রে ভেসে চলবে। মে মাসের মাজামাঝি সফর। দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ুর গতিবেগ ক্রমশ এখন বাড়ছে। সমুদ্রের আবহাওয়া খুবই খারাপ থাকার কথা। ঝড় বৃষ্টিতে জাহাজটা ভেসে চলবে সমুদ্রে। ফল্কার ওপরে কাঠ, কাঠে ত্রিপল এবং চারপাশে কিল্ এঁটে সবকিছু ধোয়ামোছা শেষ। কোথাও কিছু পড়ে নেই ডেকে। ঝড়ের দরিয়ায় পড়ে গেলেও কিছু ভাসিয়ে নিতে পারবে না। কোথায় কি রঙ চটে গেছে, খুঁজে খুঁজে দেখছে ডেক-টিণ্ডাল। রং-এর টব কোমরে ঝুলিয়ে জাহাজিরা ছোটাছুটি করছে। নিচে ওপরে ভেতরে বাইরে এভাবে রঙ করে নেয়া হচ্ছে—সব ডেরিক নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। এবং মজবুত সব গিঁটের সাহায্যে বাঁধাছাঁদা শেষ। উইন্‌চগুলোতে ত্রিপলের ঢাকনা পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জাহাজের লাব্বাস-লাইন আবার জলে পড়ে আছে। জাহাজ চলতে আরম্ভ করলেই দড়ি-রিঙে ছোট্ট একটা ডালিমের মতো গুলি ঘুরতে থাকবে অনবরত। জাহাজের গতি মাপার জন্য এটা ঠিকঠাক করে নেয়া দরকার!

    জলের ট্যাংকগুলোতে কত জল আছে, জাহাজের ড্রাফট ঠিক থাকল কিনা, ভাঙা জাহাজ বলে খুশিমতো দু-এক ফুট ড্রাফট এদিক-ওদিক হওয়ার উপায় নেই। কম হলে ক্ষতি নেই। বেশি হলে বোধহয় জল এবং কয়লার ওপর দিয়ে যাবে। জল কম হলে রেশনিং করে দেয়া যেতে পারে। কাজেই সব চার্ট, সব স্টক, জাহাজের কোথায় কি কতটা আছে সব এক এক করে বুঝে নিচ্ছেন স্যালি হিগিনস। তিনি সবাইকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছেন, যেমন প্রত্যেকবার জাহাজ ছাড়ার আগে দেখে নেন। বন্দরে তিনি দু’বার বোট-মাস্টার করিয়েছেন—যদিও বন্দরে বোট-মাস্টার করা কোনো জরুরী ব্যাপার থাকে না। জাহাজের লাইফ-বয়াগুলো সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিচ্ছেন। শেষ সফরে তিনি ভীষণ সতর্ক। লাইফ-বয়া, লাইফ-জ্যাকেট, দু’টো বড় বড় কাঠের পাটাতন, সবই যেখানে যেভাবে থাকে ঠিকঠাক আছে দেখতে পেলেন। লাইফ-বোটের শুকনো খাবার, জল, তেল, লণ্ঠন, সী-অ্যাংকার সব ঠিকঠাক আছে। বোটের ওপরে ত্রিপলে ঢাকা। পুরানো বলে কোথাও ফুটাফাটা। দু’টো মোটর বোটেই দেখলেন লাইফ- বোটে ট্র্যানমিটার সেট নেই। ও দু’টো চার্ট-রুমে থাকে। বোট-মাস্টারের সময় রেডিও-অফিসার হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে এসেছিল, আবার তুলে রেখেছে বোঁধহয় চার্ট-রুমে। ঝড়জলে ও দু’টো আবার সময়-কালে যদি নষ্ট হয়ে যায়। রেডিও-অফিসার তবে বুঝতে পারছে, স্যালি হিগিনসের কাছে ফাঁকি দেবার উপায় নেই। দরকার মতো হাতের কাছে আসল ত্রাণকর্তা। ট্র্যান্‌সমিটার সেটটি বিকল—তখন মাথা চাপড়ানো ছাড়া অন্য উপায় আর থাকবে না। চার্ট-রুমে রেখে ভালই করেছে।

    এভাবে জাহাজে পর পর সব কাজ হয়ে গেলে, গ্যাঙ-ওয়ে থেকে সিঁড়ি টেনে তোলা হতে থাকল। এটাই সবার শেষের কাজ। জাহাজের সঙ্গে ডাঙ্গার শেষ যোগসূত্র এভাবে উঠে এলেই মনে হবে চারপাশে সর্বত্র যেন কেউ সেই বিউগিল বাজিয়ে দিচ্ছে ফের। সমুদ্রে, অসীম অনন্ত সমুদ্রে জাহাজ সিউল- ব্যাংক তার বিশ্বাস অবিশ্বাস আর কিংবদন্তী নিয়ে ভেসে চলেছে। মনের ভেতরে তখন যার যত দুর্বলতা সব এক এক করে দেখা দিতে থাকে। মৃত্যু এবং বেঁচে থাকা দুইই পরম আত্মীয়ের মতো মনে হয়। শেষ চিঠি তারা পৌঁছে দেয় এজেন্টের হাতে। আমরা যাচ্ছি জিলঙ। বেঁচে থাকলে সেখানে আমরা তোমাদের চিঠি পাব।

    ঠিক একই দৃশ্য আবার, জাহাজ যত সমুদ্রে এগিয়ে যায় ডাঙা যত দূরে সরে যায়, জাহাজিদের মন তত খারাপ হতে থাকে। স্বভাব যে কি মানুষের—ডাঙা যতক্ষণ দেখা যাবে কেউ নড়বে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে সেই দ্বীপ এবং দ্বীপের বর্ণমালা দেখতে দেখতে ঠিক স্বদেশের মতো কষ্ট বুকে। যে-কোনো ডাঙাই তখন তাদের দেশ মনে হয়। ঐ দ্বীপটাতেই যেন বেঁচে রয়েছে তার স্ত্রী পুত্র অথবা মা এবং মনে হয় কোনো সবুজ শস্যক্ষেত্র পার হলেই সে তার ছোট্ট কুটির দেখতে পাবে। যুবতী স্ত্রী দরজায়। চোখ তুলে বলছে, তাহলে এলে! সফরে বের হলে ঘরে ফেরার নিশ্চিন্ত সম্ভাবনা বুঝি মানুষের থাকে না।

    ওরা সেই দ্বীপটার পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। মৈত্রকে এ দ্বীপটায় রাখা হয়েছে। এখনও কাঠ-কয়লা কিছু পোড়া কাঠের অংশ ভাঙা হাঁড়ি দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রের এই দ্বীপে যেন বেশ তাকে মানিয়ে গেছে। অশান্ত তরঙ্গমালার ভেতর আশ্চর্য দ্বীপটা। নির্জনতা প্রবল। হা হা করে বাতাস সারাক্ষণ বয়ে যাচ্ছে আর দ্বীপে মৈত্রের সব অস্তিত্ব ছড়িয়ে আছে। দ্বীপটা এখন মৈত্রদার। বোধ হয় কোন সফরে যদি আবার সে ফিরে আসে দেখতে পাবে বসন্তনিবাসের নামে কেউ এখানে একটা স্মৃতিসৌধ গড়ে দিয়ে গেছে। ছোটবাব; দ্বীপটার কোথায় কিভাবে মৈত্রদাকে পুড়িয়ে দিয়েছিল এক এক করে বনিকে বলে যাচ্ছে—এবং সেই যে জাহাজে ওঠার সময় তার সব ভরসা ছিল মৈত্রদা, সেই মানুষ তার নাম দিয়েছিল জাহাজে ছোটবাবু এসব বলতে বলতে শেফালীবৌদির গল্প এবং কখনও যে মৈত্রদা স্বপ্ন দেখত একটা বড় পাইন গাছে কেউ ঝুলিয়ে রেখেছে বড় একটা তিমি মাছের কংকাল, নিচে মৈত্রদা দাঁড়িয়ে আছে—এসব কথা সে বলতে বলতে দেখল বনি হাঁ করে তাকে দেখছে। ছোটবাবু বলল, বনি, তুমি কি দেখছ! দ্বীপে মনে হচ্ছে না মৈত্রদা আমাদের হাত তুলে টা টা করছে!

    বনি বলল, শুনছ?

    —কী!

    —তুমি শুনতে পাচ্ছ না!

    —না।

    —বাবা আবার সেই গানটা বাজাচ্ছেন।

    ছোটবাবু ওপরে তাকাল। ব্রীজে ডেবিড পায়চারি করছে। পাশে হুইলের সামনে তিন-নম্বর কোয়ার্টার- মাস্টার। মাথায় টুপি। মুখ প্রায় টুপিতে ঢাকা। সে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে আদিগন্ত সমুদ্রের জলরাশি খেলাচ্ছলে যেন অসীমে ভেসে যাচ্ছে অথচ সেই সঙ্গীত ঠিক সঙ্গীত বলা যাবে না, আশ্চর্য এক মেলোডি বোধ হয়। যখন কোনো জাহাজি সমুদ্রে থেকে যায় স্যালি হিগিনসের দুঃখবোধ বাড়ে। কিংবা স্যালি হিগিনস এখন কোথায়? সে বলল, তিনি তো কোথাও নেই বনি?

    বনি বলল, বাবা ঠিক ঘরে বসে বাজাচ্ছেন। এবং বনি ঠিক বুঝতে পারছে না বাবা আবার এত দুঃখের ভেতর ডুবে যাচ্ছেন কেন। বাবা যখন সবকিছুর ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন, এমন কি তাঁর ঈশ্বরের ওপর তখন তিনি এ গানের ভেতর, এমন একটা সুরের ভেতর ডুবে যান। বাবা, মা চলে যাবার পর, এভাবে গান বাজিয়ে বাঁচার মতো আশ্রয় খুঁজেছিলেন। আবার কি বাবা এমন একটা আশঙ্কার ভেতর পড়ে গেছেন, যেন কোনো তাঁর অতীব আপন কিছু শেষ অবলম্বন হারিয়ে ফেলছেন। শেষ অবলম্বন বলতে বনি জানে সে নিজে এবং বাবাকে এভাবে ভায়োলিন বাজাতে শুনে কেমন শঙ্কা বোধ করল।

    ওরা দু’জনই ভীষণ ঝুঁকে ছিল সমুদ্রে। ছোটবাবু দ্বীপটা দেখছে দূরে সরে যাচ্ছে। দ্বীপটা দেখতে দেখতে লেডি-অ্যালবাট্রসের কথা মনে পড়ছে। এখনও দিগন্তে ওকে দেখা যাচ্ছে না। যত জাহাজ সমুদ্রে ঢুকে যাচ্ছে তত ভাবছিল পাখিটা দিগন্তে কোথাও উড়ে উড়ে আসছে দেখতে পাবে। কাছে এলে সে ঠিক চিনে ফেলবে। অথচ পাখিটা নেই, দ্বীপটা দূরে সরে যাচ্ছে; বনি এখন বোটে হেলান দিয়ে বসে আছে। ওর চোখ কেমন স্থির। সে খুব নিবিষ্ট হয়ে যাচ্ছে যেন। একটা পা সে তুলে দিয়েছে রেলিঙে। প্যান্ট গোটানো হাঁটুর কাছাকাছি। পায়ে পাতলা চাঁদমালার জুতো। খালি পা, মোজা পরেনি বলে ভারী মনোরম। ছোটবাবু বোধ হয় চুরি করে বনির খালি পা এবং আরও কিছু, এভাবে কি সব ভাবছিল—লেডি-অ্যালবাট্রসের কথা মনে আসছে। প্রিয় পাখিটার কথা পর্যন্ত সে বনির খালি পা এবং সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ভুলে যাচ্ছে—আর এ সময়ে বনির কি দরকার ছিল এমন একটা উদ্ভট পোশাকে নেমে আসার। মাথায় তালপাতার টুপির ভেতর জাফরিকাটা হলুদ রং, বাঁ-হাত ঘাড়ের কাছে, আর ডান-হাত বুকের কাছে। লাল রঙের জ্যাকেট পরেছে। মোটা বেল্ট আর পোশাকের আঁটসাট শক্ত আবরণের ভেতর শরীরের ভাঁজ যেন ফুটে বের হচ্ছে! এত সাহস বনির কি করে হচ্ছে! সে জানে খুব কাছে তার কেবিন, সে বুকের ওপর ইচ্ছে করলে ন্যাপকিন ফেলে সব একেবারে গোপন করে ফেলতে পারে—কিন্তু এখানে যদি এখন ডেবিড চলে আসে! যে কেউ এলেই সামনাসামনি দাঁড়ালে টের পাবে, যেন জ্যাক মেয়ে। অথচ সে জানে এমন করে ওকে কেউ দেখে ফেললেও বিশ্বাস করবে না সে মেয়ে। কারণ সে জানে, এটা একটা আজগুবি কথা কার্গো-শিপে মেয়ে! কারণ এ তো আর যাত্রী বহন করে না, অথবা কোনো কার্গো-শিপে দশ-বারোজন যাত্রীর ব্যবস্থা কখনও কখনও থেকে যায়। কিন্তু সিউল-ব্যাংক যাত্রী নেবে দূরে থাক দামী কার্গো পর্যন্ত সে পায় না। আর সেখানে মেয়ে-যাত্রী, মেয়ে! ভাবাই যায় না যতই তুমি মেয়ে মেয়ের মতো থাকো। কেউ ভাববে না তুমি মেয়ে! তুমি মেয়ে সেজে সবাইকে লোভে ফেলে দিচ্ছ এমন ভেব না! আর তখনই মনে হল, কেবল আর্চি, আর্চি জানে, আর্চি জানে জ্যাক বনি। আর্চি জ্যাককে কেবিনে টেনে নিতে চেয়েছিল। সে কেমন ভেতরে ভেতরে গণ্ডগোলের ভেতর পড়ে যাচ্ছে। সে বনিকে কি বলবে বুঝতে পারল না। তখনও ভায়োলিন বাজাচ্ছেন স্যালি হিগিনস। সে বলল, জ্যাক দিন দিন তোমার খুব সাহস বাড়ছে।

    —সাহস?

    —হ্যাঁ। তুমি কি পরেছ!

    —কেন পুরুষের পোশাক।

    —ভাল দেখাচ্ছে না। সব বোঝা যাচ্ছে। এত আঁট, বিশ্রি দেখাচ্ছে।

    —যা!

    —হ্যাঁ সত্যি বলছি।

    —তুমি জানো বলে বুঝতে পারছ।

    —আচ্ছা বনি, ছোটবাবু পাশে বসল, আর্চি তবে টের পেল কি করে?

    জ্যাক সব বলল। ‘ইউ নটি গার্ল’ থেকে সে যে একদিন কেবিনে ব্যালেরিনার মতো পোশাক পরে নাচছিল এবং এমন কি সে যে একদিন ডেকে মাতাল ছোটবাবুকে গভীর রাতে কেবিনে দিয়ে আসার নামে বারবার গোপনে চুমো খেয়েছিল সব বলে গেল। সে আর মাথা উঁচু করে যেন কথা বলতে পারছে না। সে বলল, আমি আর্চির কাছে নিজের দোষে ধরা পড়ে গেছি ছোটবাবু!

    —আর্চি সবাইকে যদি বলে দেয়?

    —দিতে পারে।

    —দিলে কি হবে বুঝতে পারছ?

    —জানি ছোটবাবু। বাবাও বোধ হয় অনুমান করতে পারছেন সব

    —তুমি অহেতুক বুড়ো মানুষটাকে ভাবনার ভেতরে ফেলে দিয়েছে।

    —কি করব ছোটবাবু। আমার কপাল।

    —ছোটবাবু বলল, আর্চি এখনও কিছু বলছে না।

    —বলছে না কি করে জানো?

    —ঠিক খবর চলে আসবে।। বন্ধু অনিমেষ জব্বার এখনও আছে জাহাজে।

    —আর্চি ধূর্ত ছোটবাবু। সে একা মজা লুটতে চায়। সে কাউকে সহজে বলবে না।

    তারপর ওরা কেউ আর কথা বলতে পারল না। চুপচাপ পাশাপাশি বসে থাকল। সূর্য অস্ত গেছে। সমুদ্রে অন্ধকার। এবং অনেক রাতে চাঁদ উঠবে আকাশে। ফ্যাকাশে সমুদ্রে তখন জাহাজের শুধু কলকব্জার শব্দ। আর হয়তো সারারাত স্যালি হিগিনস ভায়োলিন বাজাবেন। ছোটবাবু বলল, কি তিনি বাজাচ্ছেন বনি?

    বনি বলল,

    নোবডি নোজ দি ট্রাবল আই সি
    নোবডি নোজ বাট জেসাস।
    নোবডি নোজ দি ট্রাবল আই সি
    গ্লোরি হ্যালেলুজা।

    ছোটবাবু বলল, সত্যি আমরা জানি না কি ঘটবে। এনজিন-কশপ মাঝে মাঝে আজকাল আর্চির কেবিনে খুব আসছে।

    এবং রাতে কেউ ঘুমোতে পারল না। ছোটবাবু বারবার বোট-ডেকে উঠে এসেছে। যতবার সে বোট- ডেকে উঠে এসেছে সেই গান—সেই গান—নোবডি নোজ দি ট্রাবল আই সি! স্যালি হিগিনস বারবার একই গান বাজিয়ে যাচ্ছেন। এবং সে বুঝতে পারছে না—কিভাবে জাহাজে তিনি আছেন, সামটাইমস আই অ্যাম আপ, সামটাইমস আই অ্যাম ডাউন ও ইয়েস লর্ড, আরও কি যেন আছে—তিনি গোপনে ভাঙা জাহাজ নিয়ে ফ্যাকাশে সমুদ্রে ভেসে চলেছেন। চারপাশে সমুদ্রের হাহাকারের ভেতর তিনি ক্রমে ঢুকে যাচ্ছেন। ভেতরে তাঁর অতীব যাতনা। কি এখন করণীয় ছোটবাবু বুঝতে পারছে না। নিরিবিলি আকাশ আর সমুদ্রে তিনি ফ্যাকাশে এক অন্তহীন করুণা ঈশ্বরের ধরতে পেরে কেমন বিচলিত। এবং সে তখন বুঝতে পারছিল এলবা জাহাজের পাশাপাশি কোথাও আছে। ওর পাখার শব্দ এইমাত্র কোথাও যেন দ্রুত ভেসে আসছে। সে বোট-ডেক ধরে নিচে নেমে গেল। আলোগুলো জাহাজের বিরামহীন জ্বলে যাচ্ছে। ফ্যাকাশে সমুদ্রের ভেতর চাঁদের নিভৃত আলো বড় বেশি ভীতিময়। ছায়া ছায়া এক বিশ্বচরাচবে ওরা ভেসে বেড়াচ্ছে। এলবা মাস্তুলের ওপর বসে আছে সে দেখতে পেল। পাখিটাও বুঝি বুঝতে পারছে সব। ঠোঁট গুঁজে যতবার সে ঘুমোবে ভেবেছিল ততবার সে কি এক আতঙ্কে জেগে যাচ্ছে। আর বাতাসে পাখা মেলে সমস্ত হতাশা সরিয়ে দিতে চাইছে বুঝি। সে দাঁড়িয়ে থাকল মেন-মাস্টের নিচে। পাখিটাকে ফিফিস্ করে ডাকল, এলবা তুমি তো সমুদ্রে আবহমানকাল এভাবে বেঁচে আছো। তুমি কি বুঝতে পারছ, আমরা এ ভাঙা জাহাজে কোথায় যাচ্ছি!

    তখনও স্যালি হিগিনস বাজাচ্ছেন—ওভার মাই হেড আই হিয়ার ট্রাবল ইন দ্য এয়ার, দেয়ার ইজ এ হেভেন সাম হোয়েয়ার—আপ এবাভ মাই হেড, অ্যাণ্ড আই নো, ইয়েস আই নো দেয়ার ইজ এ হেভেন সাম হোয়েয়ার…।

    তারপর গম গম করে বাজছে—ভায়োলিনে তিনি দ্রুত ছড় টেনে যাচ্ছেন বুঝি

    জেরি;

    টিমবার, টিমবার!

    লর্ড দিস টিমবার গটা রোল।

    টিমবার টিমবার…।

    বনি শুয়ে শুয়ে সব শুনতে পাচ্ছিল। ওপরে উঠে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। বাবাকে নিরস্ত করা দরকার। কিন্তু দরজা খুলতে সে সাহস পাচ্ছে না। দরজার কাছে সে এখন দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে বাবার সব গান তাঁর ঈশ্বরের কাছে লিপি পাঠানোর মতো। এখন তিনিই তাঁর সব। তাঁর উদ্দেশ্য এবং বিধেয়। অর্থাৎ তিনি নিমিত্ত মাত্র। বাবা তাঁর জীবনের সব সুখ-দুঃখ করুণাময় ঈশ্বরের পায়ে সমর্পণ করছেন। বনি বুঝতে পারছে বাবার আর কোনো অবলম্বন নেই। বাবা এখন বিধ্বস্ত মানুষের প্রতিচ্ছবি। সে এখন কি করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। ওর কেবল বাবার জন্য কান্না পাচ্ছিল।

  • ছিচল্লিশ

    ছিচল্লিশ

    ।। ছিচল্লিশ।।

    ডেবিড তখন নেমে যাচ্ছিল সিঁড়ি ধরে। ওর ওয়াচ শেষ। সে ঘুমোবার আগে আকাশের সব নক্ষত্রমালা দেখবে। সকাল হবার আগে যে সব নক্ষত্র ওর চারপাশে দিগন্তে অথবা মাথার ওপর থাকে তাদের দেখে জাহাজের সাইট নেবে। এ-সব কাজের পর ওর আর কিছু করণীয় থাকে না। তার শুয়ে পড়ার কথা। সারারাত কাপ্তান ঘুমোন নি। কেবল ভায়োলিন বাজিয়েছেন। বুড়ো মাঝে মাঝে বেশ ধার্মিক মানুষ হয়ে যান। এবং এত ভাল ব্যবহার যে মনেই হয় না তখন তিনি তাদের ওপরআলা। তিনি যেন তাদের সবাইকে নিয়ে এক সংসারের মানুষ। তাদের জন্য বুড়ো মানুষটার ভাবনার অন্ত নেই। লগ- বুক জমা নেবার সময় বুড়ো মানুষটা একটা কথা বলেন নি। কোনোরকমে আপদ বিদায় করতে পারলে যেন বাঁচেন। উপাসনার মতো মনে হয়েছিল তাঁর চোখ মুখ। সারারাত তিনি ভায়োলিন বাজাবেন, এটা সে ওয়াচ বুঝে নেবার সময় টের পেয়েছিল। থার্ড-মেট বলেছে বুড়ো ভায়োলিনে স্পিরিচুয়ালস বাজাচ্ছে। শেষ সফরে বুড়ো মানুষটা বুঝি আর নিজের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না।

    তবু যা হয়ে থাকে, ব্রীজে পায়চারি করার সময় সমুদ্রে সে অনেকক্ষণ ঝুঁকে ছিল। পাশে চার্ট-রুম, তার পাশে কাপ্তানের কেবিন। কেবিনের দরজা বন্ধ। শুধু পোর্ট-হোল খোলা। খুব স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল সব এবং এ-সব বাজনার ভেতর এক আশ্চর্য কাতর অভিমান অথবা বলা যায় জাহাজিদের দুঃখ থেকে থাকে। বাড়ির জন্য ওর মনটা ভার হয়ে উঠেছিল। কতকাল সে যেন এবিকে না দেখে আছে। মনে হয় অনেক অনেক বছর আগে, সে জাহাজে উঠে এসেছে, তার ছেলেমেয়েরা অনেক অনেক আগে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়েছে, এখন ফিরে গেলে সে তাদের বুঝি আর ঠিক ঠিক চিনতে পারবে না। তারা সবাই বড় হয়ে গেছে।

    এ-সব কারণে সে সোজা নিচে নেমে যেতে পারে নি। বোট-ডেকে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকেছে। সমুদ্রে ঠাণ্ডা বাতাস। আর যা থাকে শুধু নক্ষত্র আকাশে দপদপ করে জ্বলছে। যেন কোনও অতিকায়, অলৌকিক সত্ত্বা সেই সব নক্ষত্রের আলো সকাল হয়ে যাচ্ছে বলে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিচ্ছে। ক্রমে এ- ভাবে আকাশ নক্ষত্রশূন্য করে দিয়ে তিনি সমুদ্রে অন্তর্হিত হয়ে যাচ্ছেন। এবং ক্রমে এ-ভাবে চাঁদ ডুবে গেল। ক্রমে এনজিনের শব্দ ফানেলের ধোঁয়া আর দিনের আলো ফুটে উঠবে বলে দিগন্তের আকাশে সামান্য লাল আভা। দু’টো একটা পারপয়েজ মাছ জাহাজের খুব কাছাকাছি এসে আবার ডুবে গেছে। এবং মনে হল তখন বোটের ও-পাশে চুপচাপ কেউ দাঁড়িয়ে আছে। একা। সে ডাকল, ছোটবাবু।

    ছোটবাবু কোনো সাড়া দিল না।

    সে উঠে বোটের ও-পাশে চলে গেল। বলল, তুমি এত সকালে!

    ছোটবাবু বলল, ডেবিড তুমি কিছু বুঝতে পারছ?

    ডেবিড একেবারে হাঁ। সে বলল, কি!

    ছোটবাবু বলল, কিছু বুঝতে পারছ না?

    ডেবিড বলল, না তো।

    —তুমি টের পাচ্ছ না আর্চির ঘরে খুব লোকজন আসছে?

    –কখন?

    —রাতে। এনজিন-কশপ ডেক-সারেঙ তার দলবল।

    ডেবিড বলল, ওরা কেন আসে রাতে!

    ডেবিডকে কিছু বলা নিরর্থক। আসলে ছোটবাবু বুঝতে পারছে ডেবিড, জাহাজে সংগোপনে একটা বড়রকমের ষড়যন্ত্র গড়ে উঠছে টের পাচ্ছে না। সে সব খুলে বলতেও পারছে না। সে বলল, এলবা আবার ফিরে এসেছে।

    –কোথায়?

    –মেন-মাস্টে বসে রয়েছে।

    ডেবিড দেখল সেই অতিকায় পাখিটা মাস্তুলের ওপর ঘুমোচ্ছে। সে বলল, ওকে জাগিয়ে দাও।

    —থাক না। ঘুমোচ্ছে ঘুমোক। সমুদ্রে যেটুকু সামান্য অন্ধকার ছিল, এখন আর তাও নেই। চারপাশের সমুদ্র বেশ শান্ত নিরীহ। এবং তখন ছোটবাবুর মনে হল, ঠিক নর্থ-ইস্ট-নর্থে একটা কালো অতিকায় পাহাড় সমুদ্রের বুক চিরে ক্রমান্বয়ে আকাশের গায়ে বড় হয়ে যাচ্ছে। পরিচ্ছন্ন আকাশের নিচে একটা কালো পাহাড় সমুদ্রের অতলে ডুবে আছে, আর দিগন্তের লাল আভার নানাবর্ণের কিরণ সেই গম্বুজ অথবা মিনারের মতো জেগে-ওঠা পাহাড়টাকে ঝলসে দিচ্ছিল।

    পাহাড়টা দেখতে দেখতে তার খেয়াল নেই কখন সূর্য সমুদ্রে জেগে গেছে। কখন এনজিন-কশপ তার দলবল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাজের কথা নিচে, ওরা নিচে না নেমে সবাই জড়ো হচ্ছে বোট- ডেকে। ওরা খুব ভালো মানুষের মতো বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। আর্চি খুব দ্রুত সিঁড়ি ভাঙছে। স্যালি হিগিনসের দরজায় দাঁড়িয়ে হাঁকছে—ডেনজার এহেড স্যার।

    ডেবিড ছোটবাবুকে বলল, কি ব্যাপার! আর্চি চিৎকার করছে কেন!

    ছোটবাবু এবার পেছনে তাকাল। দেখল একদল জাহাজি আর্চির পেছনে পেছনে যাচ্ছে। সে তাদের ভেতর এনজিন-সারেঙকে দেখতে পেল না। এবং অন্য অনেকের ভেতর সে পাঁচ নম্বর সাব, ডেক- সারেঙকে দেখতে পেল। ডেক-সারেঙ আর্চির সঙ্গে গোপনে কি সব পরামর্শ করছে তখনও। ছোটবাবু বুঝতে পারছে, শেষ কামড় আর্চি এবার বুঝি বসাতে চায়।

    ছোটবাবু আর দেরি করল না। সোজা নেমে পিছিলের দিকে ছুটতে থাকল। গ্যালিতে ঢুকে ভাণ্ডারীকে বলল, চাচা সারেঙ-সাব কোথায়?

    ভাণ্ডারী রুটি বেলছিল। সে ব্যালনা দিয়ে সামান্য পিঠ চুলকে বলল, নিচে।

    নিচে খোঁজ করেন। ছোটবাবু নিচে নেমে অবাক। ওর ঘরে কেউ নেই। সারেঙ-সাব একা বাংকে বসে আছেন। সে ডাকল, চাচা!

    সারেঙ-সাব মুখ তুলে বললেন, বোস। কি ব্যাপার!

    —ওরা জাহাজে মাস্তার দিয়েছে কেন?

    –লতিফ রাতে পরী দেখেছে। জাহাজে রাতে পরী ঘুরে বেড়ায়।

    —মিথ্যে কথা। তুমি কখনও দেখেছ?

    –আমি কি করে দেখব!

    —কে কে দেখেছে? ছোটবাবুর সংশয়ে প্রায় দম আটকে আসছিল। সারেঙ-সাব কত সহজে কথাটা বললেন! সারেঙ-সাব জানেন না এতে কি সব সাংঘাতিক সত্যাসত্য লুকিয়ে আছে। ওর দু-হাতে চুল ছিড়তে ইচ্ছে হচ্ছে মাথার। বনি, বনি প্রায় সে তোতলাতে থাকল। সারেঙ-সাব ছোটবাবুকে এত বিচলিত কখনও দেখেননি। তিনি বললেন, কি হয়েছে! তুই এমন করছিস কেন! বিড়বিড় করে কি সব বলছিস! বোস না।

    সে বলল, আর কে দেখেছে?

    —আরও সব কে কে দেখেছে!

    —কখন?

    —যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে, ডেকের ওপর লোকজন থাকে না তখন। পরীর মতো কেউ জাহাজে ঘুরে বেড়ায়। ইয়াসিন দেখেছে। এনজিন-কশপ বলছে, সেও দেখেছে। ভুতুড়ে জাহাজ। ওরা কেউ থাকবে না জাহাজে। নেমে যাবে বলছে। পোর্ট এলেই নেমে যাবে।

    ছোটবাবু বলল, আপনি এ-সব বিশ্বাস করেন চাচা! এবং তার এখন বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, বনি খুব ছেলেমানুষ চাচা, সে তো পাগলের মতো কখনও কখনও মেয়ের পোশাকে রাতে আমার কেবিনে নেমে আসে। সতর্ক থেকেও সে দু’এক রাতে লোকজনের সামনে পড়েছে তাই বলে পরী হতে যাবে কেন! সত্যি বলছি এটা ভুতুড়ে জাহাজ নয় চাচা। অথচ সে একটা কথাও বলতে পারল না। সে প্রায় এবার গোপনে চাচার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসল। বলল, সব বাজে কথা। সব মিথ্যে কথা।

    —মিথ্যে নাও হতে পারে। আল্লার দুনিয়ায় জিন পরী থাকবে না সে কি করে হয়! তার জন্য ভয়ের কি আছে। বাড়িয়ালা তো মাঝে মাঝে পরী দেখতে পায়। কৈ তিনি তো ভয়ে জাহাজ থেকে নেমে যাচ্ছেন না।

    —না না সব মিথ্যে কথা। সে প্রায় দু’হাত তুলে চিৎকার করতে থাকল। সব মিথ্যে কথা চাচা। জাহাজটার নামে অযথা দোষ চাপিয়ে সবাই নেমে যেতে চায়।

    সারেঙ-সাব মুখে সামান্য সাদা পাতা ফেলে বললেন, তুই তো দেখেছিস। তুইও তো একবার রাতে কি দেখে পালিয়ে এসেছিলি।

    —সব মনের ভুল চাচা। তারপর বলতে ইচ্ছে হল, সব আর্চির ষড়যন্ত্র। সে জ্যাককে ধরিয়ে দিতে চায়। কাপ্তানকে ছোট করতে চায়। কিন্তু সে কেবল ছটফট করতে থাকল। কিছুতেই সারেঙ-সাবকে বোঝাতে পারছে না—যদিও দেখে থাকে, সে বনি। জ্যাক রাতে মেয়ের পোশাকে জাহাজে ঘুরে বেড়াতে ভালবাসে। তারপর যা হয়, সব রাগ বনির ওপর। এবারে মর। আমি কিচ্ছু জানি না। সবার সামনে তোমাকে আর্চি উলঙ্গ করে ছাড়বে। তারপর মনে হল সে এ-সব কি ভাবছে! সে বলল, আমি যাচ্ছি। আপনি বসুন। ওরা মনে হয় সবাই মিলে কাপ্তানকে অপমান করতে চায়!

    সে আর দেরি করল না। পিছিলে উঠেই সে দেখতে পাচ্ছে, বোট-ডেকে সিঁড়ির মুখে আর্চি হাত নেড়ে জাহাজিদের কি সব বক্তৃতা করছে। জাহাজে মৈত্রদা নেই। তার রাগ তখন মৈত্রদার ওপর। তুমি ভীষণ স্বার্থ পর দাদা। এমন একটা সময়ে আমি কি করি! বনি কোথায়! সে কেবিনের ভেতরে বোধহয়। ওর এখন বাইরে বের হওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু সে কি দেখছে! বনি দরজা খুলে ছুটে ওপরে উঠে যাচ্ছে কেন! প্রায় লাফ দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে বোট-ডেকে উঠে গেল। ডাকল, জ্যাক তুমি এখানে কেন! কিন্তু কার কথা কে শোনে। জ্যাক আর্চিকে বলছে, কেন চেঁচাচ্ছেন। বাবা ঘুমোচ্ছে। কি হয়েছে আপনাদের। জ্যাকের চোখ জ্বলছে। সারারাত জেগে কাপ্তান বোধহয় তবে সত্যি এখন ঘুমোচ্ছেন। কিন্তু কে কার কথা শুনছে! চেঁচামেচি জটলা, কেউ বলছে, পুড়িয়ে দাও সব। কেউ বলছে, আমরা দরকার হলে কাপ্তানকে জলে ফেলে দিতে পারি। চিফ-মেট, সেকেণ্ড মেট ডেবিড, রেডিও-অফিসার এবং অন্যসব অফিসার জাহাজের ব্রীজে উঠে এসেছে। ওরা বুঝতেই পারছে না এইসব জাহাজিরা এখন কি চায়। ওদের চোখ মুখ এমন ‘রক্তাক্ত কেন। চোখ জ্বলছে সবার। আর্চির কথাবার্তা ওরা একেবারে বশংবদের মতো শুনছে। যত শুনছে তত আর্চি জুস পেয়ে যাচ্ছে। আর তখনই ক্ষিপ্ত বাঘের মতো, কাপ্তান দরজা খুলে বের হয়ে এসেছেন। বলছেন চিৎকার করে—হাই! এই উল্লুকের বাচ্চা, চেঁচাচ্ছ কেন? কি হয়েছে।

    সঙ্গে সঙ্গে আর্চির গলা খাটো হয়ে গেল। আমতা আমতা করতে থাকল। আর্চি কি বলতে গেছে ফের এক ধমক। এবং সঙ্গে সঙ্গে আর্চি ঢোক গিলে যেন সব হজম করে নিল। যেন সে কত পবিত্ৰ ইচ্ছাতে জাহাজের এত ওপরে উঠে এসেছে। জাহাজের ভাল চায়, তার তো দায় নেই, তবু কাপ্তানের কথা ভেবে সে এতটা দায়িত্ব নিয়ে এখানে এসেছে। সে না এলে এরা সব জংলী নেটিভ ইণ্ডিয়ান অবিনয় আসামীরা এতক্ষণে জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিত। এমন সব বললে, কাপ্তান নিস্পৃহ গলায় বললেন, কি হয়েছে! তোমাদের জন্য একটু ঘুমোতে পারলাম না।—এই আর্চি এই চিফমেট কি বলছে ওরা!

    চিফ-মেট বলল, বুঝতে পারছি না স্যার।

    —তবে আছ কি করতে? যত সব হতভাগার দল!

    এবং কাপ্তানকে দেখে সবাই কিছুক্ষণ একেবারে চুপ মেরে গিয়েছিল। কোন কথা বলছে না। বাড়িআলা বলতে! ভেতরে ভয় ষোল আনা। এনজিন-কশপ তবু একপা এগিয়ে গিয়েছিল কিছু বলবে। আর তখনই চিফ-মেট তড়তড় করে নিচে নেমে একেবারে সারেঙের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, কি, কি বলছে ওরা?

    এনজিন-সারেঙ হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসেছেন। এতটা হবে তিনি বুঝতে পারেননি। ওদের দৌড় আর্চি অথবা চিফ-মেট পর্যন্ত। কিন্তু তিনি ভাবতে পারেন নি একেবারে খোদ বাড়িআলার কেবিনে গিয়ে হামলা করবে। তিনি এক ধমক লাগালেন। বললেন, এনজিন-কশপ আমি কী মরে গেছি। তিনি আর্চির দিকে তাকাতেই বুঝলেন আর্চি ওর কথা একদম পছন্দ করছে না। আর্চিকে তিনি বলতে পারতেন, জী সাব, জাহাজে এনজিন-কশপ কে! আমি থাকতে সে আসে কেন! সে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাচ্ছে কেন! কিন্তু তিনি বুঝতে পারছেন আর্চির মতলব ভাল না। কি বলবেন এনজিন-কশপকে মুহূর্তে গুলিয়ে ফেললেন।

    আর্চি তখন বলল, স্যার এরা কি বলছে শুনুন।

    কাপ্তান এখনও স্লিপিং গাউন পরে আছেন। প্রায় আলখেল্লার মতো দেখতে! সাদা চুল। চোখে তাড়াতাড়ি চশমা দিতে ভুলে গেছেন। নিচে যারা যারা দাঁড়িয়ে আছে সবাইকে তিনি ঠিক চিনতে পারছেন না। চিফ-মেট দাঁড়িয়ে আছে—কি সব বলছে। তিনি তার একবর্ণ শুনতে পাচ্ছেন না। জ্যাক একপাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। ডেবিড বিড়বিড় করে বকছিল, ছোটবাবু পরী, হোয়াট পরী!

    এত দুঃখেও ডেবিডের কথায় ছোটবাবুর হাসি পাচ্ছিল। আর সে দেখছে তখন সেই অখণ্ড মেঘের পাহাড় এসে সুউচ্চ পর্বতমালার মতো সমুদ্রে বড় হয়ে যাচ্ছে। নর্থ-ইস্ট-নর্থে আর আকাশ দেখা যাচ্ছে না। এত বড় সুউচ্চ পর্বতমালা মনে হয় ক্রমে সমুদ্র আকাশ এবং ছোট্ট অসহায় জাহাজটাকে সহজেই ঢেকে দেবে। রেডিও-অফিসার কেন যে এখনও দাঁড়িয়ে আছে! অথবা এ জাহাজের নেভিগেটার ডেবিড, চিফ-মেট সবাই এখানে দাঁড়িয়ে এমন একটা বিদ্রোহের ভেতর চুপ মেরে গেছে কেন? সমুদ্রে এত বড় বড় সব পাহাড়শ্রেণী—কোথাও তার মাথা বরফে ঢাকা আবার কোথাও নীলবর্ণের সব পাইনের মতো গভীর অন্ধকার যেন একটা তাড়কা-রাক্ষসীর মতো আকাশের ওপর দিয়ে ভেসে আসছে। কেউ লক্ষ্যই করছে না ওটা কি। মেঘের এমন বর্ণমালা সে যেন ডাঙায় কোনদিন দেখেনি। প্রচণ্ড গরমে সমুদ্র মরুভূমির মতো তেতে উঠছে। আর চিফ-মেট তখন বলছে, পরী, হোয়াট পরী! পাঁচ-নম্বরকে বলতে যাবে, হোয়াট পরী তখন সাবাস নেবার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে ডেক-সারেঙ। সে চেঁচিয়ে বলছে—ওম্যান–ঘোস্ট স্যার। ওম্যান-ঘোস্ট সিন। এভরি নাইট ওম্যান-ঘোস্ট ওয়াক। উই স স্যার। উই স।

    ছোটবাবু সোজা দাঁড়িয়ে আছে। সে লক্ষ্য রাখছে জ্যাক তখন কোথায়। আর্চি জ্যাককে কিভাবে দেখছে। কাপ্তান ঝুঁকে আছেন নিচে। চিফ-মেট ওপরে উঠে গিয়ে না বললে তিনি বোধ হয় কিছু বুঝতে পারছেন না। তিনি কেবল মাঝে মাঝে আর্চির দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছেন। আর তিনি লক্ষ্য রাখছেন চিফ কতক্ষণে ওপরে উঠে আসবে। আর্চির কথা তিনি একদম শুনতে চাইছেন না। তিনি চিৎকার করে উঠলেন—হাই।

    সঙ্গে সঙ্গে চিফ-মেট লাফিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে গেল। বলল, ওম্যান ঘোস্ট।

    সঙ্গে সঙ্গে স্যালি হিগিনসের মুখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। এবং খুব সহজেই তিনি সেই ফ্যাকাশে মুখ লুকিয়ে ফেলার জন্য হা হা করে হেসে উঠলেন। দু’পাটি বাঁধান দাঁত নেই বলে হাসির শব্দ তেমন তীব্র হল না। তিনি তাড়াতাড়ি ঢুকে গেলেন কেবিনে এবং দাঁত আর চশমা পরে ফের ফিরে এসে বললেন, কি হয়েছে তাতে! আমিও তো দেখি। দুর্বল মুহূর্তে মানুষ এসব দেখে থাকে।

    আর্চি বলল, স্যার আপনার দেখা ওদের দেখা তফাত আছে না!

    কাপ্তান বললেন, আর্চি, তোমরা এখন যেতে পার।

    আর্চি চিৎকার করে বলল, আপনারা যান। কিন্তু একজনও নড়ছে না দেখে বলল, কেউ যাচ্ছে না স্যার।

    স্যালি হিগিনস ওপর থেকে ফের ঝুঁকে পড়লেন—হাই। ওদের যেতে বল।

    স্যালি হিগিনস দু’জন সারেঙকে উদ্দেশ করে কথাটা বললেন।

    ডেক-সারেঙ মাথা নিচু করে রাখল। যেন স্যালি হিগিনসের এক বর্ণ ইংরেজী সে বুঝতে পারছে না। এই যে ছোটবাবু সামনে কি চুপচাপ ভাল মানুষ। সারেঙ ফের বলল, আপনারা এখন কি করবেন ভেবে দেখুন। বাড়িআলা আপনাদের যেতে বলছেন।

    ওরা একসঙ্গে হাত তুলে বলল, আমাদের কি হবে জেনে নিন।

    স্যালি হিগিনস কেমন ভেতরে ভেতরে এই সব মানুষের জেদ দেখে মুষড়ে পড়েন। জ্যাককে হঠাৎ ধমকে উঠলেন, তোমার এখানে কি? যাও কেবিনে যাও।

    আর্চি খুব খাটো গলায় সামান্য শিস দিচ্ছে। জ্যাক ফাঁপড়ে পড়ে গেল। জ্যাক নেমে গেলে সে খুব ভাল মানুষের মতো বলল, আপনারা কী! সামান্য পরী দেখে জাহাজ ছেড়ে পালাতে চাইছেন! ছি ছি!

    ওরা বলল, হ্যাঁ সাব জাহাজ ভাল না। অনেক সয়েছি। মৈত্র মশায় পাগল হয়ে গেল। সমুদ্রে অগ্নিকান্ড, বিষাক্ত পাখিদের আক্রমণ, রাতে জাহাজে পরী ঘুরে বেড়ায়। আমাদের কপালে আর কি আছে জানি না। হুজুর এবারে আমরা ক্ষেমা চাই।

    আর্চি চোখ ট্যারা করে বলল, জাহাজে মেয়েভূত কি করে থাকবে! আর একটা মেয়ে থাকলেও না হয় কথা ছিল। জাহাজে মেয়ে থাকবে কি করে? হুঁ। কার্গো-শিপ, কি বলেন স্যার। সে স্যালি হিগিনসের মুখের ওপর কথাটা বলে ভারি অন্যায় করে ফেলেছে। তাড়াতাড়ি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে প্রায় স্বগতোক্তির মতো বলল, অ্যাবসার্ড। জাহাজে মেয়ে ভাবা যায় না। সে হা হা করে হেসে উঠল। জাহাজে মেয়ে ভাবা যায় না।

    স্যালি হিগিনস কেমন সব সাহস হারিয়ে ফেলছেন। তিনি ফ্যাসফেসে গলায় আর্চিকে সমর্থন জানালেন। সত্যি কার্গো-শিপে মেয়ে ভাবা যায় না।

    —তা হলে স্যার! এটা একটা কথা! ওরা বলবে আর আমরা বিশ্বাস করব। এরা জংলী অসভ্য অজ্ঞ, এদের ভুল ভেঙে দেয়া দরকার না স্যার।

    স্যালি হিগিনস ভেতরে ভেতরে ছটফট করছেন। গুরুতর সব কথাবার্তা। আর্চি তার স্বপক্ষে কথা বলছে। আর্চির ওপর সংশয় এবং আর্চিকে তিনি উল্লুকের বাচ্চা বলে অসম্মান করেছেন! তিনি নিজের কাছে কৈফিয়ত দেবার মতো বললেন, আমার মাথার ঠিক নেই আর্চি। ওদের বুঝিয়ে তুমি বিদায় কর। যেন এটুকু বলে তিনি এবার ভেতরে ঢুকে যাবেন। এবং ফের ঘুমোবেন।

    আর্চির বলার ইচ্ছে হল, বাঞ্চোত এবার তুমি বেশ ঘায়েল হয়েছ। তোমাকে নিয়ে আমি দ্যাখো না কি খেলাটা খেলছি, উল্লুকের বাচ্চা শয়তান তুমি। সব গোপন রেখেছ। তোমার বজ্জাতি বের করে দিচ্ছি। সে তারপর পরম পুরুষের মতো চোখ-মুখ করে রাখল কিছুক্ষণ। কিভাবে এখন এগোবে, সামান্য চোখ বুজে যেন ঠিক করে নিচ্ছে। সে তারপর খুব বিজ্ঞজনের মতো জাহাজিদের বলল, আপনারা এবার সবাই দেশে ফিরতে চাইছেন। আপনাদের এতদিন একনাগাড়ে সমুদ্র সফর আর ভাল লাগছে না। আপনারা মেয়েমানুষ দেখতে ভালবাসেন। সবসময়—যেমন যে কোনো কাজের সময় মাথায় একটা মেয়েমানুষের ছবি থাকে…তাকে নিয়ে আপনারা স্বপ্ন দেখতে ভালবাসেন। কতরকমভাবে মেয়েমানুষ চিবিয়ে খেতে আপনাদের ইচ্ছে হয়। ভেতরে রহস্যময় জ্বালা। সমুদ্রের একঘেয়েমীতে মেয়েমানুষের প্রতি সবারই লোভ ভীষণ। জাহাজে যদি পেয়ে যাই—আহা সুস্বাদু খাবারের মতো, কাজেই মাঝে মাঝে চোখের ওপর ওদের ছায়া দেখবেন না তো একটা বুড়ো শয়তানের মুখ দেখবেন আপনারা! সে মাঝে মাঝে খারাপ কথায় এলে আর্চি আমাদের দিয়ে আরম্ভ করছে। সে বলছে এই যে আমরা কবে থেকে ভাবছি দেশে এবার হয়তো ফিরব অথচ জাহাজটা কিছুতেই মুখ ফেরাচ্ছে না, আমরা ভেতরে ভেতরে মরিয়া হয়ে উঠছি। জাহাজে আগুন লাগিয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে এটা খুব দোষের না। খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা নাবিক আমাদের একটা ইজ্জত আছে। আমরা খুশিমতো কিছু করতে পারি না। সে একটু থামল। একনাগাড়ে বলতে বলতে সে একবার দেখে নিল কে কোথায় আছে। জ্যাক কোথায়! জ্যাক নেই। কেবিনে নেমে গেছে। ওর দরজা খোলা। এবং সে বুঝতে পারছে জ্যাক নিচে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছে। ওপাশে দৈত্যটা দাঁড়িয়ে আছে। মাথা নিচু করে রেখেছে। বয়লার স্যুট পরেছে বলে ওর শরীর আরো বেশি মজবুত দেখাচ্ছে। আর্চি ছোটবাবুর মুখ দেখতে পাচ্ছে না। সে আরও ক্ষেপে গেল।—এই শয়তানের বাচ্চা তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে কেন! কাজ নেই! এটা তোমার বাবার জাহাজ, কাজ না করে ঘুরে বেড়াবে!

    ছোটবাবু চোখ তুলে তাকাল। শয়তানের বাচ্চা সে ছাড়া আর কে হবে। আর্চি দুলে দুলে কথা বলছে। আর্চি যেন বাঘের মুখোশ পরে আছে। আর্চি ওপরে দাঁড়িয়ে রিঙের খেলা দেখাচ্ছে এখন। ছোটবাবু একটা কথা বলতে পারছে না। আর্চিকে এভাবে দেখলে ঠিক একটা জানোয়ার না ভেবে পারা যাচ্ছে না। কি অসীম ধূর্ত এবং একজন সাধারণ নাবিকের মতো স্যালি হিগিনস চিফ-মেটের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। আর্চির মুখের ওপর কারো কথা বলার সাহস নেই। আর্চি তেমনি খাঁচায় পোরা বাঘের মতো দুলে দুলে একবার সামনে একবার পেছনে হেঁটে যাচ্ছে। ছোটবাবু এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। মাথায় সেই ঘন্টা আবার বাজছে। সেই ঘন্টার শব্দ, যেন মাথার ভেতরে অজস্র বুদবুদ উঠছে শব্দের তরঙ্গে। আর তেমনি মাথার ওপর সেই মহাকায় রাশি রাশি মেঘ ছড়িয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। গাছের শেকড়ের মতো ফালা ফালা বিদ্যুতের ছটা আকাশের গায়ে ফুটে উঠে অন্তর্হিত হয়ে যাচ্ছে। কড় কড় শব্দ—প্রায় বজ্রপাতের সামিল। সবাই সহসা সেই বজ্রপাতের শব্দে লক্ষ্য করল সমুদ্রে ভয়ংকর ঘন অন্ধকার। প্রায় যেন আকাশ আর সুমদ্র গভীর অন্ধকারে ক্রমে এক হয়ে যাচ্ছে। জাহাজের সব আলো আবার ডেকে জ্বালিয়ে দিতে হবে। দিনের এই মধ্যপ্রহরে এটা যে কি হয়ে যাচ্ছে—কেউ একদম পাত্তা দিচ্ছে না। আর্চি কি বলে শেষ করবে বক্তৃতাটা তার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে। ছোটবাবু শেষ পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে পারল না। কারণ আর্চি প্রবল প্রতাপান্বিত মানুষ হয়ে যাচ্ছে ফের। যেমন জাহাজে উঠে আর্চিকে দেখলে ভয়ে সংশয়ে বুক গলা শুকিয়ে যেত এখনও তেমনি। ছোটবাবু সন্তর্পণে নেমে গেল উইনচে। উইনচে নেমে একটা বড় হাতুড়িতে দমাদম ঘা মারতে থাকল। সব ভেঙে চুরে সব মিথ্যা সব মিথ্যা বানানো স্যালি হিগিনস, আপনি কেন এত বড় একটা ট্রাপে পড়ে যাচ্ছেন, আর্টি কেন আপনার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে—আপনি স্যালি হিগিনস বুঝতে পারছেন না আৰ্চি কি চায়! বনি তুমি, তুমি এর জন্য দায়ী। তোমাকে আমাদের জাহাজ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া ছাড়া আর বুঝি কোনো উপায় থাকবে না। আর তার কি যে হয়ে যায়—না না বনিকে কেন জাহাজ থেকে ছুঁড়ে ফেলা হবে! স্যালি হিগিনস আপনি আর্চির ট্র্যাপে পড়বেন না। আর্চি শেষে কি বলবে আমি জানি। আমি আমি বার বার এই আমির ভেতর হাঁটু মুড়ে কেমন একদল আমি তার মাথার ভেতর কেবল বুদবুদ তুলে ছত্রখান হয়ে যাচ্ছে।

    তখনই আর্চি চিৎকার করে বলছে, ঐ দ্যাখুন স্যার—ঐ যে বসে আছে। দেখতে পাচ্ছেন ঐ দেখুন আবার সে ফিরে এসেছে। শয়তানটা সবকিছুর মূলে। ঐ শয়তান পাখিটা। আপনারা বিশ্বাস করুন যতদিন নচ্ছার পাখিটা ছিল না, জাহাজের সব ঠিক-ঠাক ছিল। পাখিটা উড়ে আসার পর থেকেই জাহাজটা শয়তানের পাল্লায় পড়ে গেছে। পাখিটা আসলে পাখি না স্যার। পাখিটা আমার ধারণা ক্যাপ্টেন লুকেনারের প্রেতাত্মা।

    একটু থেমে আর্চি ফের বলল, – বুঝলেন স্যার—ডেনজার এহেড। ওর মতলব ভাল না। ওর জন্য আমাদের সামনে যত বিপদ। জাহাজিরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে থাকে—হওয়া স্বাভাবিক। এখন আমাদের এই সংস্কারকে না মেনে উপায় নেই। আমাদের কি করা উচিত বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই। ওটাকে সরিয়ে দিতে না পারলে জাহাজের বিপদ কাটবে না। আমি বলছি স্যার আমি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি ওটা সরিয়ে দিতে পারলে আপনার জাহাজে কেউ আর পরী দেখবে না। কেউ আত্মহত্যা করবে না, বিষাক্ত পাখিদের আক্রমণ ঘটবে না, সমুদ্রে অগ্নিকান্ড দেখা যাবে না—সবাই ভাবছে পাখিটা এভাবে জাহাজের পেছন নিয়েছে কেন! আপনারা বলুন—কে আছেন বলতে পারেন, সে প্রায় কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে এবং এভাবে যেন গলা চিরে যাবে।

    —আপনারা বলুন কে কবে দেখেছেন এভাবে একটা অ্যালবাট্রস দিন নেই রাত নেই মাসের পর মাস জাহাজের পেছনে উড়ে বেড়ায়। একে যদি আপনারা ভয়ে কিছু করতে সাহস না পান আমি আমি এতগুলো মানুষের জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করতে রাজী আছি।

    এবং সঙ্গে সঙ্গে সব জাহাজিরা আর্চির শেষ কথা এবং কোনরকমে প্রায় সব কথার কিছু কিছু অর্থ ধরতে পেরে বুঝতে পেরেছে আর্চি তাদের শুভাশুভের জন্য আত্মত্যাগের বাসনা জানিয়েছে। সবাই প্রায় জয়ধ্বনি দেবার মতো থি চিয়ার্স ফর আর্চি এবং সেই শব্দমালার ভেতর যেন একটা কঠিন নিয়তি থেকে পরিত্রাণের চেষ্টা করছে বারবার। তারা এখন সবাই আর্চির জন্য সহজেই প্রাণ বিপন্ন করতে পারে।

    আর্চি একটু দম নিয়ে বলল, তাহলে আপনারা যেতে পারেন। সবাই সঙ্গে সঙ্গে জটলা থেকে বের হয়ে আসছিল এবং ঠিক বোট-ডেক থেকে নেমে যাবে তখনই ফের চিৎকার, আমি শুধু হাতে লড়ব কি করে! এতো আর একটা সাধারণ পাখি নয়। দেখুন কেমন জুলজুল করে তাকাচ্ছে। দি ডেভিল। দি সী ডেভিল। লেট হার ডাই। সে হাত তুলে মেন-মাস্টের ওপর নিশ্চিন্তে বসে থাকা পাখিটার দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার সময় খুব সতর্ক গলায় বলল, স্যার।

    স্যালি হিগিনস আর্চির অশুভ মুখের দিকে তাকালেন।

    আর্চি স্যালি হিগিনসের কাছে গিয়ে খুব নিচু গলায় বলল, —স্যার, জ্যাককে সাবধানে রাখবেন। খুব বেঁচে গেছে জ্যাক। ওরা জ্যাককে সন্দেহ করছিল। আপনি গোপনে একটা পাপ কাজ জাহাজে চালিয়ে যাচ্ছেন। সব ঘুরিয়ে দিলাম। বন্দুকটা দেবেন। ওটাকে না মেরে ফেললে হারামজাদারা স্বস্তি পাবে না। অল ইন্ডিয়ান ডগস লাইক টু কিল দ্য বার্ড। পাখিটাকে মেরে ফেললে যদি আপদ দূর হয় ক্ষতি কি স্যার। জাহাজ থেকে সংশয় যত সরিয়ে দিতে পারেন ততই মঙ্গল।

    স্যালি হিগিনস, চিফ-মেট পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। স্যালি হিগিনস আর একটা কথা বলতে পারছেন না। তাঁর সত্তাসুদ্ধ টান দিয়েছে আর্চি। চিফ-মেট নিচে নেমে গেল। এমন হবে সে যেন জানত। বারবার সে বলেছে বনিকে রাখা ঠিক হবে না, সে বড় হয়ে যাচ্ছে। এবং আর্চির চোখে মুখে অতীব লোভ। আর্চি সেয়ানা অথচ খুব সৎ মানুষের মতো এখন ক্যাপ্টেনের সব যেন উপকার করে যাচ্ছে! আর্টিকে সাহস নেই আর তিনি ঘাঁটাতে পারেন। যেন ঘাঁটালেই আর্চি চিৎকার করে উঠবে, ইফ ইউ লোয়ার দ্য বোট, ইউ উইল গেট দিস হারপুন ইন ইউর বেলি। সুতরাং স্যালি হিগিনসকে আর্চি যা যা বলবে সব সুড়সুড় করে মেনে নিতে হবে। ঘাঁটালেই জ্যাকের ছদ্মবেশ খুলে দেবে আর্চি।

    এখন স্যালি হিগিনস আর আর্চি। আর্চি দু’পায়ের ওপর ভর করে বেশ শক্ত চোখে মুখে দেখছে স্যালি হিগিনসকে। স্যালি হিগিনস দূরবর্তী আকাশে যেন কিছু দেখতে পাচ্ছেন। অজস্র বিদ্যুতের ছটা এবং স্তব্ধ সমুদ্র। প্রলয়ঙ্কর ঝড় ওঠার আগে সবকিছু মন্থর স্থির। বাতাস একটুকু বইছে না। জাহাজিরা সবাই কাজে লেগে গেছে ফের। অ্যালবাট্রস পাখিটা ঝড়ের পূর্বাভাস বোধহয় নাকে শুঁকে টের পাচ্ছে। মাঝে মাঝে সে পাখা ছড়িয়ে উড়ে যাবে ভাবছিল আবার কি ভেবে ঠোঁট গুজে দিচ্ছে। আর্চি বন্দুক না নিয়ে নামবে না। ঘোর অন্ধকারে জাহাজ সমুদ্র মানুষজন সব ডুবে যাচ্ছে। গুমগুম শব্দ উঠছে সমুদ্রে। আর্চি সেই মৃদু গলায়, যেন কাক-পক্ষী টের না পায় একেবারে অনুগত মানুষের মতো বলল, স্যার ওরা বলছে জাহাজটা দোষ পেয়েছে। সেই এক কথা সবার মুখে। অশুভ প্রভাবে জাহাজ পড়ে গেছে। কে বা কারা যে ছড়িয়ে দিচ্ছে সব গুজব!

    তিনি নিজে এক রকমভাবে এ-সব বিশ্বাস করতে ভালবাসেন, কিন্তু আর্চি এ-সব নিজের কাজে লাগাচ্ছে। অন্যসময় হলে পাছায় লাথি মেরে এখান থেকে নামিয়ে দিতেন—ইউ লোফার, হিপোক্র্যাট, দ্য আগলিয়েস্ট ক্রীচার…এখন তিনি যেন শুধু কোয়ার্টার-মাস্টারকে খবর পাঠাতে পারেন—জাহাজে হিবিং-লাইন বেঁধে দিতে বল, বোট-ডেকে টুইন-ডেকে যেখানে জাহাজিরা হেঁটে যায় হিবিং-লাইন বেঁধে দিতে বল। টানেল-পথ খুলে দিতে বল। ক্রমে যা বুঝতে পারছি ঝড় মহাপ্রলয়ের মতো নেমে আসছে সমুদ্রে। তিনি ডাকলেন, সেকেন্ড!

    —ইয়েস স্যার।

    —কাম ইন

    আর্চি, স্যালি হিগিনসোর সঙ্গে কেবিনের ভেতর ঢুকে গেল।

    তিনি একটা কথা বললেন না। লকারের দরজা খুলে ধরলেন। আর্চি একেবারে হামলে পড়ল বন্দুকটার ওপর। তারপর বের করে বাঁটে দু’টো থাপ্পড় মেরে ওর নল ট্রিগার সব দেখেশুনে যখন মনে হচ্ছে না নকল কিছু ধরিয়ে দিচ্ছেন না তখন সে ভাবল বেশ সহজেই এখন নেমে যাওয়া যায়। আর কথা বলার তেমন কিছু দরকারও নেই। আর তখনই কেন জানি মনে হল হাজার হোক জাহাজের সর্বময় কর্তা, দু’দন্ড দাঁড়িয়ে অভয় দিলে বুড়োটা সাহস পাবে। সে বলল, স্যার।

    স্যালি হিগিনস কিছু খুঁজছেন মনে হচ্ছে।

    সে আবার বলল, স্যার।

    স্যালি হিগিনস বললেন, ক্যারি অন ম্যান।

    সে বলল, স্যার, আমি বলেছি জ্যাককে খুব ছোটবেলা থেকে দেখছি। জ্যাক জ্যাক। কোনো সংশয় থাকা ঠিক না।

    স্যালি হিগিনস বললেন, ওরা বিশ্বাস করে!

    —হ্যাঁ স্যার। ওরা ভয় পেয়েছে বড়-টিন্ডালের আত্মহত্যায়। পাগল হয়ে গেছিল তো! স্যালি হিগিনস আবার কিছু খুঁজছেন। তিনি চাইছেন ধূর্ত লোকটা এটা নিয়ে এক্ষুনি বের হয়ে যাক। পোর্ট-মেলবোর্ণ পর্যন্ত ওর হাতে থাকা ছাড়া উপায় নেই। গোপন পাপ কাজ, গোপনে জাহাজে মেয়ে তুলে আনা! নিজের ওপর তিনি সব বিশ্বাস এ-ভাবে হারিয়ে ফেলছেন কেন? কেন বারবার মনে হচ্ছে এই গোপনীয়তা তাঁকে এক কঠিন শাস্তির ভেতর ফেলে দিয়েছে। জাহাজ স্ক্র্যাপ করার কথা ওঠার সময় দু’ দু’বার যেভাবে সব সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে ওর বেলায় কি সে ঘটনা আরও বীভৎস আকার নেবে! এই যে বন্দুকটা হাতে নিয়ে আর্চি লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে গেল, নিচে নেমে সে কি এক্ষুনি প্ৰথম পাখিটা পরে ছোটবাবু এবং পরে সে নিজে, চিফ-মেট সবাইকে হত্যা করে জাহাজে সে আর…আর….পাইরেট ক্যাপ্টেন লুকেনারের মতো পাইরেট…জলদস্যু… সে আর…। তিনি চিৎকার করে উঠলেন—বনি বনি।

    বনি তখন প্রায় মূর্ছা যাবার মতো, সে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখেছিল আর্চি খুব আয়াসে নেমে আসছে সিঁড়ি ধরে। হাতে বন্দুক। যেন সে শিকারে যাচ্ছে। চোখে মুখে ভারী উদাসীনতা। তাকে দেখেও যেন চিনতে পারছে না। এবং তখনই ছোটবাবুর অসহায় মুখ, ছোটবাবু কোথায়, সে ছোটবাবুর কাছে ছুটে যাবে ভাবছিল। দাঁড়িয়ে থাকলে সে মুর্ছা যাবে আর ঠিক সেই মুহূর্তে মনে হল বাবা তাকে ডাকছেন। সে ভেতরে গেলে দেখল, বাবা উদ্‌ভ্রান্তের মতো লকার থেকে টেনে নামাচ্ছেন।—সব পোশাক, বই ডায়েরি যা কিছু তাঁর প্রিয় সব ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছেন নিচে। আর বলছেন, কোথায় রাখলাম বনি।

    বনির মাথার ঠিক নেই। কতদূরে গেছে সে শয়তানটা! বাবার এ-সব ছুঁড়ে ফেলার চেয়ে বাবা কেন বন্দুকটা দিতে গেল জানা বেশি দরকার।—কেন কেন বাবা তুমি ওটা হাতছাড়া করলে, পারলে বনি আঁচড়ে খামচে বাবার পোশাক ছিঁড়ে ফেলবে। স্যালি হিগিনস মেয়ের আচরণে এতটুকু ক্ষুব্ধ হতে পারলেন না। কি খুঁজছিলেন ভুলে গেলেন। বনির মাথায় মুখ রেখে বললেন, নিয়ে গেল। আমাকে ভয় দেখিয়ে নিয়ে গেল। আর বনি তখন বলছিল, না না না, এটা বাবা আমি নিয়ে আসব। আমি নিয়ে আসব বাবা। যা হবার হবে বলে সে প্রায় বাবাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল, তারপর নিচে নেমে গেল।

    আর্চির সামনে দু’হাত তুলে বনি বলল, আৰ্চি।

    স্যালি হিগিনস পেছনে পেছনে ছুটে গেলেন। ধরে আনতে হবে। তিনি নিচে নেমে অত দ্রুত ছুটতে পারবেন কেন! বনি আর্চির সঙ্গে বোধহয় ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু করে দিয়েছে এতক্ষণে। কিন্তু নিচে নেমে অবাক। আর্চির বন্দুকটা জ্যাকের হাতে।

    আর্চি বলল, ছেলেমানুষ। চাইল দিয়ে দিলাম স্যার। থাক ওর কেবিনে। জেদি ছেলে তো। বুঝিয়ে ঠিক আমি নেব। আপনাকে ভাবতে হবে না। সামান্য বন্ধুত্ব স্যার। সব ঠিক হয়ে যাবে।

    স্যালি হিগিনস বললেন, জ্যাক তুমি ভারি অন্যায় করেছ।

    জ্যাক একটা কথা বলল না। সে দৌড়ে বন্দুকটা লকারে রেখে আবার বের হলে দেখল বাবা ওপরে উঠে যাচ্ছেন। ওর সঙ্গে একটা কথা বলছেন না। আর্চি দাঁড়িয়ে আছে। আর্চি শিস দিচ্ছে। আর্চির কাছে যেতে সে আর সাহস পেল না। সে কোথায় যাবে এখন বুঝতে পারছিল না। বাবার কি হারিয়েছে, বাবার কাজে সাহায্য করলে সব রাগ বাবার পড়ে যাবে।

    তখনই আর্চি ডাকল, জ্যাক।

    জ্যাক থমকে দাঁড়ল।

    —জ্যাক, বন্দুকটা খুব যত্ন করে রাখবে। কখন আবার দরকার হবে। দরকার মতো চেয়ে নেব। কাউকে দেবে না কিন্তু। তোমার কাছে রাখবে।

    জ্যাক বলল, আচ্ছা।

    আর্চি পাশে এসে দাঁড়াল। বলল, আলবাট্রস পাখিটাকে তুমি খুব ভালবাসো?

    জ্যাক বলল, হ্যাঁ।

    —কিন্তু পাখিটাকে তো সরিয়ে দিতেই হবে। জাহাজিরা তা না হলে ক্ষেপে যাবে। জাহাজে মারদাঙ্গা আরম্ভ হলে কেউ তো রক্ষা পাবে না জ্যাক।

    জ্যাক হাঁটতে থাকল।

    আর্চি বলল, জ্যাক আকাশটা কী ভীষণ কালো হয়ে উঠেছে। এবং সঙ্গে সঙ্গে কড়কড় করে বজ্রপাতের শব্দ। ওরা দু’জনই সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে গেল। আর্চি এত কাছে এই প্রথম জ্যাকের—চুলের গন্ধ পর্যন্ত নাকে আসছে। নেশার মতো, পোশাক খুলে ফেললে মেয়েরা সব বড় নরম আর মসৃণ। ত্বকে আশ্চর্য প্রলোভন। হাতে এবং পায়ে অথবা জংঘায় সর্বত্র মেয়েটা ফুটে উঠছে। ফুটে উঠছে, পাপড়ি মেলে দিচ্ছে, পাপড়ি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। বন্দুকটা সে যে-কোনো সময় নিয়ে নিতে পারবে। যেন অবুঝ মেয়ের মতো বন্দুকটা আগলে রাখছে জ্যাক। যাক আসল কাজটা তার হয়ে গেল। জ্যাকের কেবিনে ঢোকার একটা ছাড়পত্র রেখে দিল সে। যে-কোনো সময় সে সুযোগ পেলেই এখন জ্যাকের কেবিনে ঢুকে যেতে পারবে। এবং দুরন্ত ঘোড়ার মতো ফাঁকা মাঠ পেলেই ছুটবে। এখন শুধু সময় এবং সুযোগের প্রতীক্ষা। ভাল ভাল কথা, জ্যাকের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং যেন কত গভীর তার এই মমতাবোধ, জ্যাক আর জাহাজে একা নয়, সে পাশে থাকছে—এত সহজে এমন একটা সুযোগ চলে আসবে বুঝতে পারেনি। এখন স্বভাবে বেশ সে সজ্জন তার কোনো স্পৃহা নেই একেবারে সে জ্যাকের বশংবদ যেন জ্যাক বললে মাস্তুলের ডগায় উঠে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। সে বলল, জ্যাক তুমি আমাকে ভয় পাও কেন বলত?

    জ্যাক বলল, কোথায়?

    —আমার কেবিনে তুমি আস না। নিজের কেবিন ছেড়ে কোথাও যাও না। সবার কেবিনে যাবে সবার সঙ্গে মেলামেশা দরকার। জাহাজে রাতে বের হতে নেই। যেন এখন আর্চি কথা বলছে না, ছোটবাবু কথা বলছে। গলার স্বরে কি কপট অভিনয়।

    জ্যাক বলল, যাব।

    —কখন জ্যাক?

    —যাব। সময় হলেই যাব।

    —এস। কোনো ভয় নেই। আরে আমি ত মানুষ। তুমি একজন সাধারণ মানুষকে ভয় পাবে কেন। মুখে দাগফাগ হয়েছে সব সেরে যাবে।

    জ্যাক আর কোনও কথা বলল না। আর্চির সঙ্গে সে এবার ওপরে উঠে যেতে থাকল সিঁড়ি বেয়ে।

    আর্চি দেখল তখন আকাশের ফালা ফালা সব সাদা কালো মেঘেরা দজ্জাল মেয়েমানুষের মতো ছটোছুটি করছে। আর যা হয়ে থাকে সমুদ্রে সেই গুমগুম আওয়াজ ক্রমে এগিয়ে আসছে। লেডি অ্যালবাট্রস ওর ভারী হাতের কাছে এখন। সে যে কোনো সময় তাকে বন্দুকে নামিয়ে আনতে পারে। এখন নামিয়ে না এনে ভালই করেছে। যেন নামিয়ে আনলেই স্যালি হিগিনস বলতেন বন্দুকটা আমার কেবিনে রেখে দেবে আর্চি। স্যালি হিগিনসের চেয়ে এই চপলমতি বালিকা অনেকটা তার স্বপক্ষে কাজ দেবে। সে যা চায়, দরজা খুলে বলবে জ্যাক শিগগির বন্দুকটা দাও। না দিলে লোয়ার দ্য বোট আই উইল গেট দিস হারপুন ইন ইউর বেলি।

    তখনই জাহাজে সামাল সামাল রব উঠছে। চোং মুখে সারেং হেঁকে যাচ্ছে—দরিয়া ক্ষেপে গেছে মিঞারা। বুঝি কেয়ামতের দিন এসে গেছে। ডেক-ঠিন্ডাল তখন সব লম্বা হিবিং-লাইন ছুঁড়ে দিচ্ছে ডেকে। অন্ধকারে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না।

    যে যার মতো এখন ডেক ছেড়ে চলে যাচ্ছে। পোর্ট-হোল বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। ঝড় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্র ক্ষেপে গেল। অতিকায় সব ঢেউ ক্রমে জাহাজটাকে দোলনার মতো দোলাতে শুরু করে দিল। কখনও মনে হচ্ছে জাহাজটা দুলে দুলে সমুদ্রে মরণ নাচন নাচছে। কখনও ঢেউ ছড়িয়ে যাচ্ছে ডেকে। ডেক ভাসিয়ে দিয়ে সোঁ সোঁ শব্দে জলরাশি নিমেষে কোথায় উধাও হয়ে যাচ্ছে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামছে। এলোমেলো বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে সব। দিনের বেলাতে আলো জ্বেলে ঘরে ঘরে যেখানে যা কিছু আলগা সব লকারে পুরে দেওয়া হচ্ছে। গ্যালির দরজা বন্ধ করে দিয়েছে ভান্ডারী। প্রপেলার মাঝে মাঝে জলের নিচ থেকে ওপরে উঠে যাচ্ছে। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গমালার ভেতর ডেকচি হাঁড়ি কড়াই হাতাখুন্তি সব ছিটকে কোথায় কোনটা চলে যাচ্ছে, এক হাতে সামলাতে পারছে না ভান্ডারী। চারপাশে কিছু দেখা যাচ্ছে না। আকাশটা ভীষণ ছোট হয়ে গেছে। যেন কালো বোরখায় ঢেকে দিয়েছে কেউ সমুদ্র। তার নিচে জাহাজটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। আর চরাত চরাত অজস্র কাঁচের জার ভেঙে যাবার মতো আকাশে বজ্রপাতের শব্দ। যে কোনো মুহূর্তে এখন জাহাজে আগুন লেগে যেতে পারে। স্যালি হিগিনস হাতের কাছে ঠিক তখনই পেয়ে গেলেন—তিনি পাতার পর পাতা উল্টে এক জায়গায় বড় বড় অক্ষরে দেখতে পেলেন—দাউ শ্যালট ফিয়ার দ্য লর্ড দাই গড অ্যান্ড শ্যা সার্ভ হিম ওনলি।

    তারপর এক জায়গায় আরও বড় বড় অক্ষরে দেখতে পেলেন, যেন আকাশের বুকে বিদ্যুতের ছটায় কেউ লিখে দিয়ে যাচ্ছে—বি কনভারটেড টু মি, অ্যান্ড ইউ শ্যাল বি সেভড। মুহূর্তে শরীরের সব জড়তা, ভয় কেটে গেল। তিনি ঝড়ের ভেতর সিঁড়ি ভেঙে জাহাজের ওপরে উঠে যেতে থাকলেন। তাঁর এখন সবাইকে অভয় দেয়া দরকার। বিশেষ করে সিউল-ব্যাংককে। সিউল-ব্যাংক ঝড়ের সমুদ্রে এখন যে কোনো মুহূর্তে পথ হারিয়ে ফেলতে পারে।

    লেডি-অ্যালবাট্রসের ভারী আনন্দ। ঝড়ের ভেতর পাখা ছেড়ে দিলে খুশিমতো সে আকাশের নক্ষত্রমালার কাছে যেন পৌঁছে যেতে পারবে। সে এবার পাখা মেলে দিল বাতাসে।

    স্যালি হিগিনস মাংকি-আয়ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে তখন দেখছেন, প্রবল বেগে তরঙ্গমালা কালো অক্ষত প্রাচীরের মতো এগিয়ে আসছে। সাদা ফেনা। সমুদ্রে যেন বরফের পাহাড় জমে উঠছে আর ঝাপসা চারপাশ—কাঁচের ওপর বৃষ্টিপাতে তিনি সব ঝাপসা দেখতে পাচ্ছেন। জাহাজটা কাত হয়ে জলের নিচে ঢুকে যাচ্ছে মতো। আবার ভেসে ওঠে স্টারবোর্ড সাইডে হেলে যাচ্ছে। কখনও সেই অক্ষত কালো অন্ধকারের প্রাচীর ডেকের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। সব ফল্কা সব উইনচ মায় ডেরিকের মাথা পেরিয়ে সমুদ্র লক্ষ লক্ষ ক্ষেপা মোষের মতো ছুটে যাচ্ছে। তিনি দু’পা ফাঁক করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছেন। পারছেন না। প্রচন্ড ঝড়ের মুখে জাহাজটা পড়ে গেল। জাহাজে কে বনি, কে আর্চি, কে সেই লুকেনার সব তিনি ভুলে গেলেন। এখন জাহাজটাকে বন্দরে পৌঁছে দেওয়া ছাড়া পৃথিবীতে আর তাঁর কোনো যেন দায়িত্ব নেই। তিনি ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস। এস.এস.সিউল-ব্যাংক আন্ডার হিজ কম্যান্ড।