Category: অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

  • আট

    আট

    একদিন বাড়ি এসে শুনলাম, মিমি এসেছিল। মিমি কলকাতা থেকে কাকে ধরে আমাদের কজনের পাশ ফেলের খবর নিয়ে এসেছে। ওদের প্রভাব আছে—আনাতেই পারে। সবার আগে আমাদের বাড়িতে এসে খবর দিয়ে গেছে, মাসিমা বিলু পাশ করেছে। মিমি নাকি আনন্দে মায়াকে জড়িয়ে ধরে বলেছে, তোমার দাদা পাশ করেছে—তোমাদের কী আনন্দ! দাদাকে বল, হ্যাঁ।

    মায়াকে ঘরে ডেকে বললাম, ও কোন ডিভিসনে পাশ করেছে জিজ্ঞেস করলি না!

    সেই তো! মায়া কেমন অবাক হয়ে গেল। মিমিদির খবরটা নেওয়া হয় নি। সে ছুটে গেল বাইরে, মাকে বলল, মিমিদি পাশ করেছে মা?

    —জানি না তো!

    বাবাকে বলল, মিমিদি পাশ করেছে বাবা?

    —কিছু তো বলল না!

    হঠাৎ পরিবারের সবাইকে কেন জানি আমার সহসা স্বার্থপর মনে হল। যে মেয়েটা বাড়ির ছেলের খবর বয়ে দিয়ে যায় তার পাশ ফেলের খবরটা নেওয়ার দরকার পর্যন্ত কেউ মনে করল না। মিমির পাশ ফেল নিয়ে কোনো কথা বলার অপেক্ষা সে-রাখে না। র‍্যাংক নিয়ে তার ভাবনা।

    বাবা হঠাৎ বললেন, হ্যাঁ বলেছে। ও নিজ থেকেই যেন একবার বলল, আমিও পাশ করেছি মেসোমশাই। এসেই মিমি আমাকে তোর মাকে প্রণাম করল। আসলে খেয়াল ছিল না।

    খেয়াল না থাকারই কথা। বাবার কাছে এত বড় খবর কেউ কখনও আজ পর্যন্ত দিয়ে যায় নি। মিমি এসেই নাকি চলে গেছে। তোর মা বলল, একটু বস। মিষ্টিমুখ করে যেতে হয়।

    সে নাকি বলেছে, আর একদিন হবে।

    তবু বাবা ছাড়েন নি—সে হয় না মা, তুমি এত বড় খবর নিয়ে এলে, একটু মিষ্টিমুখ করবে না হয় না। বস। বলেই নাকি মাকে বলল, দুধ দাও। দুটো মোয়া দাও। পূজার সন্দেশ আছে দাও। নাড় করেছিলে সেদিন, থাকলে দাও।

    সব খবরই মায়ার। বলল, জানিস দাদা মিমিদিকে দেখলে আমার কেমন কষ্ট লাগে। তুই কখন এসে পড়বি ভয়ে তটস্থ থাকে। যতক্ষণ বসেছিল, কেবল রাস্তার দিকে চোখ। মিমিদি চোরের মতো আসে। তুই কিন্তু আবার মিমিদিকে বলতে যাস না। মিমিদি আমাদের বাড়ি এলে ক্ষেপে যাস কেন বুঝি না। ছোড়দা মিমিদিকে কিছুতেই ছাড়বে না। ছোড়দার এক কথা, মিমিদি কোথায় তুমি নাটক করছ বল না। আমি দেখতে যাব।

    —মিমি কি বলল?

    —বলল, না, ও তোমাকে দেখতে হবে না। মন দিয়ে পড়াশোনা কর। দেখছ তো মেসোমশাই সারাদিন এক দণ্ড বসে থাকেন না। সব কিছুর প্রতি কি যত্ন। ঘরবাড়ি, গাছপালা সব। তোমরা যদি মানুষ হও তবে তাঁর এ-সব করা সার্থক।

    আমার মনে হল, বেশ উপদেশ ঝাড়ছে মিমি। এ-বাড়ির সবার মানুষ হওয়া নিয়ে ভাবনা। কে তাকে এত দায় চাপিয়ে দিল।

    আমার মুখ গোমড়া দেখে মায়া বলল, তোর কাগজ দু-একদিনের মধ্যে বের হবে। তোকে একবার মিমিদি যেতে বলেছে।

    —কোথায় যাব! বাড়িতে পাওয়া যায় না।

    —সে তো বলে যায় নি। কেবল বলল, দাদাকে বল, পাশের খবর দিয়ে গেলাম, দাদাটি যেন একবার দয়া করে দেখা করে।

    মিমির সঙ্গে আমার যে দেখা হয় না তা নয়। আমাদের কাগজে অস্থায়ী অফিসে দেখা হয়। কখনও বিকালে টাউন হলের মাঠে বসে যখন সবাই আড্ডা মারি তখন দেখা হয়। ওর সঙ্গে চার পাঁচজন পার্টির ক্যাডার থাকে। জরুরী কাজের খবরটুকু দিয়েই উধাও। অস্থায়ী অফিসে লেখা নিয়ে কখনও কোনো বিতর্কে মিমি সহজে জড়িয়ে পড়তে চায় না। কারণ জানে যত লেখা সম্পর্কে সে খুঁটিনাটি ত্রুটি উল্লেখ করবে, তত আমি ত্রুটিগুলো আদৌ ত্রুটি নয়, শিল্পের খাতিরে মানিয়ে গেছে, এমন বলে তার বিরোধিতায় নামব। কাজেই চুপচাপ থাকাই বাঞ্ছনীয় মনে করে। আমার সঙ্গে কোনো পরিচয় নেই এমনও ভাবতে পারে হঠাৎ দেখলে কেউ। সে আমাকে একা পেতে চায়। কিন্তু এই একা পাওয়ার মধ্যে আমার দু দু-বার যা অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে ওকে সতীসাধ্বী ভাবতে কষ্ট হয়। এটা আবার হলে মাথা বিগড়ে যেতে পারে।

    মায়া আমাকে চুপচাপ থাকতে দেখে বলল, জানিস দাদা, মিমিদি না যাবার সময় কেমন শুকনো মুখ করে চলে গেল।

    —কেন বাবা কিছু বলেছে?

    আমি জানি বাবা তো আমার কাউকে কোন রূঢ় কথা বলেন না। মিমিকে তো বলতেই পারেন না। মিমি বাবার কাছে মৃণ্ময়ী, সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। যে সংসারে যাবে ধনে জনে লক্ষ্মী বিরাজ করবে।

    –নারে দাদা, বাবা কি বলবে! বাবা শুধু বললে, মিমি বিলুর আর একটা সুখবর আছে। তুমি জানলে খুবই খুশি হবে। ও একটা চাকরি পাচ্ছে। প্রাইমারী স্কুলের মাস্টারি। মুকুলের জামাইবাবু করে দিচ্ছে। সংসারে এটা আমাদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় খবর।

    মায়া তারপর থেমে দরজার বাইরে উঁকি দিল। তারপর ফের আমার টেবিলটার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, শুনেই মিমিদির মুখটা কেমন শুকনো হয়ে গেল। মিমি কি চায় না, একটা প্রাইমারী স্কুলে আমি মাস্টারি করি।

    খুব সাহসী মানুষের মতো বললাম, বাদ দে। ওর শুকনো মুখ দেখলে তো আমাদের পেট ভরবে না। প্রাইমারী স্কুলের মাস্টারি কি খারাপ কাজ! কত ছেলে লাইন দিয়ে আছে। নিজের লোক না থাকলে, এ-কাজও এখন কারো জোটে না। তারপর মনে হল মায়াকে এ-সব বলে লাভ নেই। আমি প্রাইমারী স্কুলে মাস্টারি করি, তাতে কার কি পছন্দ অপছন্দ এ-সব ভাবলে চলবে না। আর এটাও ভেবে কুল পাই না, মিমিরা তো শ্রমিক দরদী, গরীব মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করতে চায়। তাদের কাছে মানুষের কাজ দিয়ে মনুষ্যত্বের বিচার হয় না। কেউ ছোট না, কেউ বড় না। সবাই সব কাজে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। ছোট ভাববার কোনো কারণই থাকতে পারে না। সে তবে কেন আমার এত বড় খবরে শুকনো মুখ করে চলে গেল! আসলে সে আমাদের ভাল চায় না।

    মায়া বলল, মিমিদি কিন্তু বলে গেল তোকে যেতে। কোথাও আর যাবে না বলেছে। বাড়ি গেলেই দেখা পাবি।

    —কেন, ও যে মহেশ নাটকে শুনছি আমিনর পাঠ করবে!

    —সে তো কিছু বলল না। কেবল যাবার সময় আমাকে চুপি চুপি বলে গেল, দাদাকে বলবে কিন্তু। বলবে আমি কোথাও আর যাচ্ছি না। সারাদিন বাড়িতেই থাকব। বলবে কিন্তু লক্ষ্মীটি।

    মিমি আর কাউকে এ-কথা বলে যেতে পারে না। মায়া মেয়ে বলেই তাকে বলে যেতে পেরেছে।

    মায়া বোঝে সব। বোঝে বলেই বোধ হয় গোপনে এত কথা বলল। দরজায় উকি দিয়ে দেখার মধ্যে টের পেলাম মায়ার মধ্যেও সেই নারী-মহিমা জগে উঠছে। নারী বলেই সে বুঝতে পারে মিমিদির কষ্ট কত গভীর।

    আমার মন-মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। মায়া আরও কিছু বলতে চায়, কিন্তু আমি জানি ও কি বলবে। বলবে কবে যাচ্ছিস দাদা। পিলুকে দিয়ে খবর পাঠাতে বলেছে।

    —সে আমি বুঝব। এখন যা তো। আসলে কেন জানি নিজেকে একা পাবার জন্য ছটফট করছিলাম। এটা কি মিমির আত্মসমর্পণ। মিমি কোথাও যাবে না বলে গেছে। ওর নাটক, মিছিল, ভাষণ আমার অপছন্দ বোঝে। মুখে প্রকাশ না করলেও আমার আচরণে সে টের পায়, তার গান, তার জনসভায় বক্তৃতা আমার অপছন্দ। রক্ষণশীল পরিবারে বড় হলে যা হয় এবং গরীব হলে তো কথাই নেই। সব মিলে মিমির আত্মপ্রকাশের প্রতি আমার বিরুপ ধারণাই গড়ে উঠেছে। মিমি কিছু একটা হতে চায়, কিছু করতে চায়। তার মধ্যেও আগুন জ্বলে উঠেছে। সহসা সেই আগুন ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দেবার এত বড় কী কারণ থাকতে পারে! মিমির এ-সব ছলনা নয় তাই বা কে বলবে!

    .

    যাই যাই করেও সাত আট দিন হয়ে গেল মিটার বাড়িতে যাওয়া হয়ে উঠল না। আসলে একটা বড় ঝড়ের আশংকা করছি। এই ঝড়ে আমাদের দুজনকে কোথায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে কে জানে।

    মুকুলের বাড়ি যাবার মুখে ভাবি, একবার ঘুরে আসা যাক। এত করে বলার কী আছে! মিমি যাই ভাবুক আমার পক্ষে এই কাজের সুযোগ নষ্ট করা ঠিক হবে না। মা বাবার মুখের দিকে তাকালে আমি আরও কেমন অসহায় বোধ করি। মাঝে মাঝে মনে হয় যে মেয়ে এস ডি ও সাহেবের গাড়িতে হাওয়া খেতে যায়, তার পক্ষে আমার সামান্য চাকরি নিয়ে ভাববারই বা কী থাকতে পারে। আসলে আমি একটু বেশি ভাবছি। মিমির উপর আমার অধিকারই বা কতটুকু। মিমি দুবার সামান্য দুর্বলতা প্রকাশ করেছে ঠিক— তাই বলে আমিই তার সব এমন কোনো লক্ষণ ফুটে ওঠে নি। আমাদের মধ্যে ভালবাসাবাসির কোনো কথাই হয় নি। ভালবাসাবাসির ব্যাপারটা মিমির কাছে ন্যাকামি মনে হতে পারে। আমি নিজেও সে ভাবে কিছুই ভাবি নি। ভাববার সাহসও হয় নি। কটা দিন নিজের মধ্যে একটা প্রবল সংশয় নিয়ে ঘোরাফেরা করছি মা’র বুঝতে কষ্ট হলো না!

    খেতে বসলে মা বলল, তোর কী হয়েছে বল তো!

    —কী হবে আবার!

    —কিছু খেতে চাস না। চোখ মুখ শুকনো। আয়নায় একবার নিজেকে দেখেছিস!

    তা আয়নায় রোজই তো নিজেকে দেখি। একটু বেশি বেশিই দেখি। আমার প্রতিবিম্বের সঙ্গে কথা হয়। সে বলে, কী বিলুবাবু এত কি দেখছ!

    —কিছু দেখছি না।

    —দেখছ বাবা, লুকিয়ে যাচ্ছ। যাও না ঘুরে এস। ভয় কি!

    একটা ব্যাপারে আমি বেশ তাজ্জব বনে গেছি। মিমি বলে যাবার পরও সাত আট দিন হয়ে গেল, আমি যাই নি, মিমিও আসে নিকেন গেলাম না জানতে। তবে মায়া কি নিজের অনুমান থেকে কথা বলেছে। দাদাকে যেতে বল। বলেই যেতে পারে—কিন্তু তার সঙ্গে যাবার সময় মুখ শুকনো— এ-সব বুঝল কি করে মায়া! ছেলেমানুষ সে। মিমির অন্য কোনো দুশ্চিন্তা থাকতে পারে। সেটা কি আমি জানি না। চোখে চোখ পড়লে আজকাল সে কেমন অপ্রস্তুত হয়ে যায়। মিমির কিছু একটা হয়েছে। কেমন দায়সারা কথাবার্তা সেরে সাইকেলে অদৃশ্য হয়ে গেল সেদিন। চোখের নিচে কালি পড়েছে।

    পরদিন দেখি মুকুল হাজির। সে এসেই বলল, প্যানেলে নাম উঠে গেছে। তারপর অপরূপা’ কাগজের দু’কপি আমার হাতে দিয়ে বলল, মিমি দিয়েছে। আট দশ দিনের মধ্যেই এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়ে যাবে। কাছে কোথাও কোনো স্কুলে দিতে বলেছে ছোড়দি। বাড়ি থেকেই করতে পারবে। আজকাল মুকুলকে বাড়ির ছেলে বলেই ধরে নিয়েছে মা বাবা। বাবা বললেন, এখানেই দুপুরে দুটো খেয়ে যেও।

    মুকুল রাজী হয়ে গেল।

    দুপুরের খাওয়া রে সাইকেলে দু’জনে বের হব। সাধারণত দু’জনে বের হলে, আমাদের মধ্যে আশ্চর্য এক প্রাণের সঞ্চার হয়। আজ মুকুল হয়তো লক্ষ্য করে থাকবে, আমি সকাল থেকেই খুব মনমরা হয়ে আছি। এত বড় একটা সুখবরের পরও আমি রে রে করে উঠতে পারছি না। কোথায় যেন কেবল কুণ্ঠাবোধ করছি। বের হবার মুখে মুকুল সহসা বলল, কি ব্যাপার বল তো, আজকাল তুমি যেন কেমন হয়ে যাচ্ছ।

    —কি জানি, আমি তো বুঝতে পারছি না। আমার জীবনে যে বড় একটা ঝড় উঠে গেছে মুকুলকে বলতেও পারছি না।

    মুকুল বলল, মিমিকেও দেখছি কেমন হয়ে যাচ্ছে। দু-দিন এসে তোমার খোঁজ নিয়ে গেছে।

    —কিছু বলল?

    —না তেমন কিছু না! তোমার কিছু হয়েছে কিনা জানতে এসেছিল।

    —কিছু হয়েছে মানে!

    —এই অসুখ-বিসুখ।

    —অ! আর কিছু বলেনি?

    —না।

    এরপর থাকা গেল না।

    বললাম, নাটক করতে যাচ্ছে না!

    —না, বাড়িতে ওর কিছু একটা হয়েছে। কোথাও যাচ্ছে না।

    ভিতরটা আমার কেমন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল। মুকুলের সঙ্গে সাইকেলে গঙ্গার ঘাটের দিকে চলে গেলাম। সেখানে একটা পুলের নিচে ফাঁকা মতো জায়গায় দুজনে শুয়ে থাকলাম। মুকুল সারাক্ষণ চৈতালি প্রসঙ্গে কথা বলল। চৈতালি ফার্স্ট ডিভিসন পেয়েছে। বাংলায় অনার্স নেবে। সে আমাদের এক বন্ধু মারফৎ একটি কাগজ চৈতালির বাড়িতেও পাঠিয়েছে। খুব সর্তক এই পাঠানোর ব্যাপারে মুকুল। যেন ও পাঠায় নি, বন্ধুটি হাতে করে নিয়ে গেছে। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় আছে সে। কেবল বলল, কি যে হবে!

    আমি বললাম, কী আবার হবে, খুশিই হবে!

    আসলে আমাদের বয়েসটা এমন যে আমরা শুধু স্বপ্নই দেখতে জানি! কিন্তু সেই স্বপ্নের মুখোমুখি হতে ভয় পাই। আমাদের জীবনের শুরুটাই ভাল করে হয় নি। অথচ রাজার মতো বেঁচে আছি মনে হয়। যুদ্ধ জয়ের প্রবল আকাঙ্ক্ষা। সেই যুদ্ধটা কি কেবল জানি না।

    মুকুলকে বললাম, আমার একই কাজ আছে। যাচ্ছি। মুকুলকে লালদীঘির ধারে ছেড়ে দিয়ে টাউন হলের দিকে চলে গেলাম। মিমিদের বাড়ি সোজা সামনে। মিমিদের বাড়ি আমি এই নিয়ে তৃতীয়বার যাচ্ছি। বাড়িতে ঢুকতেই কেমন অস্বস্তি লাগে। সদর দরজায় দারোয়ান। আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়াল। বললাম, মিমি বাড়ি আছে?

    —আছে। যান।

    মিমিদের বাড়ি মানুষের যাতায়াত একটু বেশিই। সামনেই ফুলের বাগানে সেই কাকাতুয়া পাখিটি আমাকে দেখে তারস্বরে চিৎকার করে উঠল, দিদিমণি, বিলু দাদা। আমি এ বাড়িতে আসার প্রথম দিনে কাকাতুয়া পাখিটার সামনে দাঁড় করিয়ে মিমি বলেছিল, বিলু দাদা। পাখিটার আশ্চর্য স্মরণশক্তি। কাকাতুয়া পাখি এত সুন্দর কথা বলতে পারে আমি জানতাম না। সামনে বিশাল বারান্দা। বড় বড় থাম। শ্বেত পাথরের টাইল বসানো। উজ্জ্বল আলোতে গোটা বারান্দা ঝকঝক করছে। ভিতরে ঢুকতেই দেখি সিঁড়ির মুখে মিমি। আমার আসার খবর পাখিটার কাছে থেকে পেয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে যেন ছুঁটে এসেছে। এসেই আমাকে ভিতরের বসার ঘরে ঢুকতে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। যেন সে তার সব রকমের যুদ্ধ জয় করায় যে অপার শক্তি বহন করে বেড়াচ্ছিল, আমাকে দেখা মাত্র সব তার কে হরণ করে নিয়েছে। একেবারে স্থাণুবৎ। আমি নিচে। সিঁড়ির মুখে রেলিং ভর করে মিমি। দামী মুর্শিদাবাদ সিল্ক পরনে। লাল নীল রঙের লতাপাতা শাড়িতে। মিমি আশ্চর্য এক দেবী মহিমায় প্রকাশিত। কিছু বলছে না। বড় ধীরে ধীরে নেমে আসছে। সন্তর্পণে। এদিক ওদিক হলেই যেন টলে পড়ে যাবে।

    মিমি রেলিং ধরে নেমে আসছে। খুব সর্তক পায়ে। আমাকে অপলক দেখছে।

    আমিও কেমন বিহ্বল চোখে তাকিয়ে আছি। উঠে গিয়ে হাত ধরে নামিয়ে আনলে যেন ভাল হয়। ওর কি কোনো বড় রকমের অসুখ করেছে। এত চঞ্চল ছিল ক দিন আগে, আর কি হয়ে গেছে।

    ধীরে ধীরে কাছে এসে বলল, বোস!

    আমার উদ্বেগ সারা চোখে মুখে টের পেয়ে মিমি হাসল। বড় নির্জীব হাসি। বললাম, তোমার কী হয়েছে পরী?

    পরী বড় আস্তে বলল, কিছু না। যাক তবু যে এলে। কবে থেকে আশায় আছি তুমি আসবে। সারাদিন বারান্দায় বসে থাকি। রাস্তায় মানুষজন দেখি। তোমাকে দেখতে পাই না। যেন মিমির খুব কষ্ট হচ্ছিল কথাগুলো বলতে।

    আমি বললাম, তুমি বোস। দাঁড়িয়ে থাকলে কেন!

    সে সোফার হাতলে ভর করে বসল।

    আমার হঠাৎ কি যেন হল। বললাম, কী হয়েছে তোমার। কী হয়েছে বলবে তো! না ভাল্লাগে না। কিছু বলছে না। কী মেয়ে রে বাবা।

    —কিছু হয় নি। সত্যি বলছি কিছু হয়নি। সে এইটুকু বলে সোফায় মাথা এলিয়ে দিল। চোখ ছাদের দিকে। ছাদে ঝোলান ঝাড়লণ্ঠন, বাতাসে রিন রিন করে বাজছে। দেয়ালে বড় বড় তৈলচিত্র, মিমিদের পূর্বপুরুষদের সব বাঘা বাঘা ছবি। মোটা গোঁফ, মাথায় পাগড়ি। গলায় পাথরের মালা। দামী পোশাকে মানুষগুলো বংশগৌরব রক্ষা করে চলেছে। দেয়ালে ঝুলে থেকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, তোমার আস্পর্ধার শেষ নেই। ছবিগুলোর দিকে তাকাতে আমার কেন জানি ভয় করছিল। এত বড় প্রাসাদতুল্য বাড়িতে দু-একজন ঠাকুর চাকরের দেখা পাওয়া গেল। ওরা সিঁড়ি ধরে উঠে যাবার সময় আমাকে দেখে ঠিক চিনতে পেরেছে। কালী বাড়ির বাবাঠাকুরের বড় অনুগ্রহভাজন এই তরুণ যুবক। তারা বোঝে এ-বাড়িতে বাবাঠাকুরের সুবাদে আমার আলাদা মর্যাদা আছে। যাবার সময় দূর থেকেই গড় হয়ে ওরা উঠে যাচ্ছে।

    মিমির দাদুকে দেখছি না। আমি যতবার এসেছি, দেখেছি তিনি বসার ঘরে কারো জন্য যেন অপেক্ষা করছেন। সিল্কের পাঞ্জাবি পাট করা ধুতি পরনে, পায়ে রুপোলি কাজ করা চটি। তিনিই ডেকে হেঁকে মিমিকে উপরে খবর পাঠিয়েছেন।

    ওর বাবা কাকারা অবশ্য এতটা ডাকাডাকি করেন না। দেখলেই প্রশ্ন কেমন আছ? বাবাঠাকুর কেমন আছেন? আজ কাউকে দেখছি না।

    মিমি বলল, কাগজটা দেখলে?

    —দেখেছি।

    —কভার? -দেখেছি।

    —কভার পছন্দ হয় নি?

    —হয়েছে।

    —আমি জানি তুমি কী পছন্দ কর। দুটো প্রজাপতি একটা ফুল এঁকেছি এজন্য। কোনো ঝাণ্ডামার্কা ছবি আঁকি নি। তোমার খুব ভয় ছিল ও-রকম ছবি হবে বলে।

    —ভয় না। মুশকিল কি জান, আমার বাবা একরকমের, তোমরা একরকমের আবার তুমি আর এক রকমের। আচ্ছা পরী তুমি বিশ্বাস কর, আমরা এ-ভাবে মানুষকে শোষণ থেকে উদ্ধার করতে পারব? আমরা নিজেরা যদি কাজে এবং মননে ঠিক না থাকি—এই বাহ্যিক বিপ্লবের আড়ম্বরে আসল ইস্যুটাই হারিয়ে যাচ্ছে না। মানুষ যদি নিজের ঘর থেকে বিপ্লব শুরু না করে, বাইরের লোক এসে বিশেষ করে তোমাদের মতো মানুষেরা তাদের ভাল ভাল কথা বললেই শুনবে কেন। তাদের সঙ্গে তোমাদের জীবনের কোনো মিলই নেই।

    —আজ না হয় এ-সব কথা থাক। আমি তোমাকে জানি অনেক পীড়ন করেছি। আজ আমার সঙ্গে এ-সব বলে শত্রুতা নাই করলে।

    এ-সময় মনে হল সিঁড়ি ধরে কেউ আসছে। হাতে ট্রে। চা খাবার উপর থেকে আসছে।

    মিমি উঠে গিয়ে ট্রেটা হাতে নিল। সন্তর্পণে টেবিলে রেখে দু-কাপ চা বানাল। একটা আমাকে দিল, মিষ্টির প্লেট, জল দিল। নিজে এক কাপ চা সামনে রেখে বসল। আঁচল দিয়ে গা ঢাকল ভাল করে। শাড়ি টেনে পায়ের পাতা ঢেকে দিল।

    মিমির এই বসার ভঙ্গি আমাকে এক আশ্চর্য সুষমার জগতে নিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারি। ওর দীর্ঘ ঋজু চেহারা, দেবীর মতো চোখ মুখ, তিল ফুলের মতো নাক এবং এলোমেলো চুলের সুঘ্রাণ কোনো এক অলৌকিক মহিমার কথা যেন আমাকে কানে কানে বলছে।

    মিমি বলল, খাও।

    —আমি কিছু খাব না। তুমি এ-রকম কেন হয়ে গেলে। কেন! কেন। অসুখ করে নি বলছ, হয় মিছে কথা বলছ, নয় এড়িয়ে যাচ্ছ আমাকে।

    —তুমি তো আমার কিছুই পছন্দ করতে না বিলু! আমি তো সব ছেড়ে দিয়েছি।

    —ছেড়ে দিতে তো বলি নি! তুমি যেমন আছ তেমনি থাক। তবু ভাল হয়ে যাও। আমি তোমার সব মেনে নেব।

    —ঠিক বলছ মেনে নেবে?

    —হ্যাঁ। আমি অপছন্দ করি বলে, পার্টি, নাটক মিছিল সব তুমি ছেড়ে দিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়বে এ আমি কখনও চাই নি। সত্যি বলছি চাই নি।

    —কিন্তু আমি যে সব ছেড়ে দিতে চাই। পায়ের নিচে মাটি থাকলে কিছুই ছেড়ে দিতে আমার কষ্ট হবে না। গাছ তো মাটিতে বেঁচে থাকে। আমার গোড়া উপড়ে নিতে চায় এখন সবাই।

    —সবাই মানে।

    —মা বাবা কাকা দাদু সবাই।

    —তারা তোমার খারাপ করবে কেন!

    –করছে।

    হঠাৎ যেমন হয় ক্ষেপে যাবার স্বভাব আমার, চিৎকার করে বলে উঠি, কি হয়েছে খুলে বলবে তো!

    —আগে কথা দাও।

    —কি কথা!

    —আমার পায়ের নিচেকার মাটি সবাই সরিয়ে নিলেও তুমি নেবে না।

    –সবাই সরিয়ে নিলে, আমি একা কি করতে পারি।

    —ওটুকু থাকলেও আমি ফুল হয়ে ফুটে থাকতে পারব।

    এসব হেঁয়ালিপূর্ণ কথা আমার মাথায় ঠিক খেলছে না। মিমি কি বলতে চায়। মিমির কি বাসনা?

    বললাম,পরী প্লিজ, তুমি খুলে বল। খুলে বল কী হয়েছে। না হলে আমি এক্ষুনি চলে যাব।

    সহসা পরী হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। বলল, বিলু তুমি আমার চরম শত্রু। তুমি কেন এত বড় সর্বনাশ আমার করলে। কেন, কেন। কি করেছি আমি! আমার কি দোষ!

    আমি হতবাক। আমি ওর সর্বনাশ করেছি। বড় নিচ মনে হলো নিজেকে। পরীর সম্পর্কে কোথাও তো কোনোদিন কোনো কুৎসা রটনা করেছি আমার মনে পড়ে না। আমার জন্য পরীর জীবন নষ্ট হয়ে গেল।

    আমি কথা বলছি না দেখে, মাথা নিচু করে রেখেছি দেখে পরী ধীরে ধীরে উঠে চলে গেল। সামনের বেসিনে গিয়ে চোখে জলের ঝাপটা দিল। আঁচলে মুখ মুছে ফের এসে বসল। চা ঠাণ্ডা হচ্ছে। আমাদের দুজনের কারোরই মনে নেই সামনে চা ঠাণ্ডা হচ্ছে। আমরা কেমন দুজনেই অতলে ডুবে যাচ্ছিলাম। বিশেষ করে আমি। কিছু বলারও সাহস পাচ্ছি না। পরীর সর্বনাশ করতে আমি কোনো দিন চাই নি। পরীকে কেউ নিন্দা করলে আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে যেত। সেই পরী আমার নামে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে।

    উঠে পড়ে বললাম, জেনে শুনে কোনো সর্বনাশ আমি তোমার করি নি। না জেনে করলে ক্ষমা করে দিও।

    সহসা মিমি তার শীর্ণ হাত বাড়িয়ে আমার হাত চেপে ধরল। কি ঠাণ্ডা হাত! কিছু বলছে না। আমারও মনে হল বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে গেছি। নড়তে পারছি না। শরীর অবশ হয়ে আসছে। বসে পড়লাম। মিমি অত্যন্ত ক্ষীণ গলায় বলল, তুমি চাকরিটা নিচ্ছ!

    —না নিলে কি উপায়!

    —পড়াশোনা বন্ধ করে দিচ্ছ?

    —আপাতত তাই।

    আর এ সময়েই দেখলাম মিমির দাদু সিঁড়ি ধরে নেমে আসছেন। আমাকে দেখেই যেন তিনি স্বর্গ হাতের কাছে পেয়ে গেছেন। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তিনি কাছে চলে এসে বললেন, কখন এসেছ?

    —এই খানিকক্ষণ।

    —ভাল হয়েছে। তুমি মিমিকে একটু বুঝিয়ে যাও তো—ও তোমার কথা শোনে। পরেশ চন্দ্ৰ কে চেন! আরে আমাদের সদরের এস ডি ও। পাকা কথা দিতে পারছি না। বড় অশান্তি চলছে। ঝড়। দেখেছ তো কী চেহারা করেছে। অথচ পরেশের বাবার খুব আগ্রহ—এমন সুপাত্র কেউ হাতছাড়া করে! তুমি বল।

    —করা উচিত নয়।

    সহসা মিমি সাপের মতো ফণা তুলে উঠে দাঁড়াল। গেট আউট। আই সে গেট আউট। তুমি কে আমার। উচিত অনুচিত তুমি ঠিক করবে।

    দাদু সহসা খুবই ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন, ছি! মিমি কী হচ্ছে! তুই এটা কী বলছিস বিলুকে?

    মিমি আবার ভেঙে পড়ল, দাদু তুমি জান না, ও আমার কত বড় শত্রু, দাদু তুমি জান না, ওর শত্রুতার শেষ নেই। তারপর সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে গেল। মুখে আঁচল চেপে সে তার হাহাকার কান্না সমালাচ্ছে।

    আমি এ সময় কি করব বুঝতে পারছি না। আমরা দুজনেই ধরা পড়ে গেছি। মাথা নিচু করে বসে ছিলাম। উঠে যে বের হয়ে যাব সে সাহসও নেই, শক্তিও নেই।

    কেমন ঘাবড়ে গেছি খুব। মিমির দাদু এখন কী বুঝলেন কে জানে। পাশে বসে বললেন, ও কি! চা খাবার কিছু খেলে না।

    —খাচ্ছি।

    তিনি হাসলেন, নরেশ, ও নরেশ।

    যেন সবাই উৎকর্ণ হয়ে থাকে- নরেশ হাঁক শুনেই নেমে আসছে।

    —আর এক কাপ চা দে বিলুকে।

    আমি বললাম, থাক। চা খাব না।

    —তবে মিষ্টিগুলো খাও।

    তারপরই তিনি বললেন, ওর কোনো ইচ্ছেই আমরা অপূর্ণ রাখি নি বিলু। কিন্তু মেয়েদের একটা বয়েস থাকে, যখন সব মানিয়ে যায়। পরে আর মানায় না। ও কিছুতেই রাজী হচ্ছে না। বাবাঠাকুরও বলেছেন, রাজযোটক। হাতছাড়া করবি না। কী ফ্যাসাদে পড়েছি বল। পরেশের দেবদ্বিজে ভক্তি প্রবল। বাবাঠাকুরের কাছে মাঝে মাঝে চলে যায়। তারপর কি ভাবলেন, তুমি তো জান বিলু আমরা সব অবহেলা করতে পারি কিন্তু বাবাঠাকুরের নির্দেশ অমান্য করতে পারি না। বাড়ির সব কাজে তাঁর অনুমতি না হলে চলে না।

    আমি শুধু বললাম, যাই।

    —না যাবে না। বোস। তোমার সঙ্গে পরামর্শ আছে।

    আসলে এই মানুষটি কালীবাড়িতে দেখেছেন, কথায় কথায় বাবাঠাকুর আমাকে ডেকে পাঠাতেন। বলতেন, নে তুই আমার পাশে বোস। বই খুলে রাখ। ভুল হলে ধরিয়ে দিবি। বাবাঠাকুরের ভুল ধরিয়ে দিতে আমিই পারি, কারণ বাবাঠাকুর হয়ত আমাকে খুব অনাথ ভেবেছিলেন। আমার বিষণ্ণতা বাবাঠাকুরের মধ্যে কোনো অপত্য স্নেহেরও জন্ম দিতে পারে— যে কারণেই হোক মন্দিরে একমাত্র থানের ফুল বেলপাতা আমিই তুলে সবার হাতে দিতে পারতাম। আর কাউকে তিনি মন্দিরে ঢুকতে দেন না। অবশ্য বদরিদা এবং বৌদি ঢুকতে পারে। এসব পরীর দাদু জানেন বলেই হয়ত আমার পরামর্শ এই পরিবারে এত বেশি দরকার।

    অথচ আমি বুঝতেই পারছি না—সংকট শুধু তো এ-পরিবারের নয়। আমারও।

    কাজেই বলতেও পারলাম না, আমি ছেলেমানুষ—এত বড় সংকটে আমার পরামর্শে কী আসে যায়।

    তবু বসে আছি। উঠতে পারছি না।

    তিনি বললেন, তুমি মিমিকে বুঝিয়ে বল। এখন বলে লাভ নেই। মাথা ঠাণ্ডা হোক। পরে বলবে।

    কবে আবার আসছ?

    —দেখি।

    —দেখি না, আমি ভেবেছিলাম নিজেই যাব। কিন্তু মিমির এক কথা। গিয়ে দেখ না! বিলু ওদের বাড়ি আমাদের যাওয়া পছন্দ করে না। গেলে খারাপ হবে বলে শাসিয়েছে। তুমি কাল সকালে আসবে। আসছ তো!

    আমার কী হল কে জানে, বললাম, দাঁড়ান, আমি এখনই কথা বলছি।

    দাদুর মুখটি কেমন শুকিয়ে গেল। এত বড় মানুষ, দাপট যাঁর সারা শহরে, সেই মানুষ মিমি সম্পর্কে এত দুর্বল এই প্রথম টের পেলাম।

    তিনি বললেন, তোমাকে আবার অপমান করতে পারে।

    বলার ইচ্ছে হল, অপমান আমার গা-সওয়া। দেশ ভাগের পর থেকেই নানাভাবে মান-অপমানে জ্বলছি। মিমি আমাকে আর কি অপমান করবে! ওর অপমান অমার কাছে কত মধুর যে এখন এই বুড়ো মানুষটিকে বোঝাই কী করে।

    মিমির দাদু উপরে উঠে গেলেন।

    মিমি আবার নেমে আসছে।

    আমি হেসে ফেললাম। বড় অভিমানী বালিকা। মুখ থমথম করছে।

    বললাম, বোস।

    মিমি বসল।

    —আমি মাস্টারি করি তুমি চাও না।

    মিমি চুপ করে থাকল।

    —মানুষ এতে ছোট হয়ে যায় না।

    কেমন বালিকার মতো মিমি বলল, তুমি তাহলে যে আর পড়াশোনা করতে পারবে না। তুমি জান না বিলু তুমি কি তুমি জান না, জানলে পেটি একটা মাস্টারি করতে যেতে না।

    —মাথা ঠাণ্ডা করে ভাব। তুমি তো জান আমার বাড়ির অবস্থা।

    —জানি।

    –চাকরিটা অভাবের সংসারে পড়ার চেয়ে বেশি দরকার। আচ্ছা তুমি বুঝছ না কেন, ইচ্ছে থাকলে মানুষ কী না করতে পারে।

    —তা পারে।

    —তবে।

    মিমি এবার আমার দিকে তাকাল। বড় শান্ত চোখ। বলল, পারবে?

    —পারতেই হবে। আমার স্বপ্নই আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আগুন যখন জ্বালিয়ে দিয়েছ, দেখ না সে কতটা জ্বলতে পারে। সামান্য একটা চাকরি করলেই আমার ভেতরের আগুন নিভে যাবে তোমাকে কে বলল। অবোধ বালিকার মতো এসব ভাবলেই বা কী করে।

    হঠাৎ মিমির চোখ কোমল হয়ে গেল। আমার হাত ধরে বলল, বিলু আমি যে তোমার আয়নায় নিজেকে দেখতে ভালবাসি। আমার মরণ হল না কেন। তুমি যদি ছোট হয়ে যাও, সরু গলিতে ঢুকে পড় সেখান থেকে আমি তোমাকে কী করে বের করে আনব?

    —সরু গলি তো শেষ পর্যন্ত বড় সড়কে গিয়ে মেশে।

    পরী আজ এই যেন প্রথম বুঝতে পারল, আমি তার চেয়ে পৃথিবীর এই গাছপালা, মাঠ, নদী এবং বড় সড়কের কথা বেশি জানি। শুধু বলল, তুমি যা ভাল বোঝ কর। আমার কিছু বলার নেই। তারপরই পরী বড় বিমর্ষ হয়ে পড়ল। বলল, দাদুর কাছে কিছু শুনলে?

    —শুনেছি।

    —কী করব বলে যাও।

    আমি বললাম, একবার বাবাঠাকুরের কাছে আমাকে যেতে হবে আর কি। আমি জানি তিনি সাধক মানুষ। তিনি রাজযোটক বলতেই পারেন। কিন্তু তোমার যে অমত আছে তা তো তিনি জানেন না। শুধু বাবাঠাকুরকে এই খবরটাই দিতে হবে। ভেবো না।

    আর সঙ্গে সঙ্গে পরী সত্যি যেন অবোধ বালিকা হয়ে গেল। আমাকে জড়িয়ে ধরল, বিলু, আমি তোমার পায়ে পড়ব। দোহাই তুমি আমাকে রক্ষা কর।

    সেবারে মিমি গোটা পরিবারটিকে সংকট থেকে ত্রাণ করার জন্য আমার পা ছুঁয়েছিল অনিচ্ছায়। এবং তারই হেতুতে আমি প্রথমে মিমির কাছে মার বিষয় হয়ে গেছিলাম। ফাঁক পেলে মিমি আমাকে আড়ালে আবডালে হেনস্থা করেছে। আজ সে নিজের ইচ্ছায় পা ছুঁয়ে প্রণাম করল।

    বললাম, উঠি মিমি। মাথা খারাপ কর না আমি আছি।

    মিমি বলল, তুমি আছ বলেই আমি বেঁচে থাকব। তুমি আছ বলেই আমি আর নষ্ট হয়ে যেতে পারব না। তারপর মিমি আমার সঙ্গে দরজা পর্যন্ত এল। বলল, শুনবে না?

    —কী শুনব?

    —সেই কবিতাটা। ‘জীবন বড় দুরন্ত বালকের হাতছানি।

    —এখন!

    মিমি চোখ নামিয়ে নিল। আমি বুঝি, অমার কবিতা পাঠে সে কোথাও মুক্তির স্বাদ খোঁজে। কেন জানি মনে হল আজ সারাক্ষণ পরীর পাশে বসে থাকি। পরীকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। মনের সঙ্গে আমার কথার এতটুকু যে মিল থাকে না মিমিই বোধ হয় সেটা সবার আগে টের পায়। বললাম, বল। শুনি।

    পরী প্রতিমার মতো দাঁড়িয়ে আমার কবিত, আবৃত্তি করে গেল— যতদুর যাই অগাধ স্বার্থপরতা/যত দূরেই যাক, একদিন থাকে না তার কোলাহল :/ সে হয় অবনত বৃক্ষ মৃত্যু তীক্ষ্ণ সুধা/ফুল যদি ফোটে, ফুটে থাকে আমার ঈশ্বর/ শেষ বিকেলে।। যদি হেঁটে যায়—আমার প্রতিমা / প্রতিমার মতো দুই হাতে থাকে তার করবদ্ধ অঞ্জলি/ আমার সব অপমান মিছে/ সে আছে বলেই বেঁচে থাকি, বাঁচি/ জীবন বড় এক দুরন্ত বালকের হাতছানি।

    মিমি এবার চোখ খুলে আমাকে দেখল। উদ্ভাসিত চোখ। কুয়াশার জলে ধোয়া মুখ। সব বিবর্ণতা যেন নিমেষে কেটে গেছে। বললাম, বাবা ঠিকই বলেন।

    পরী বলে, কী বলেন?

    —ও মিমি হবে কেন, ও তো মৃণ্ময়ী। বাবা তোমাকে পরী বললে রাগ করেন। মিমি বললেও। পরী আর কোনো কথা বলল না, শুধু বের হবার সময় বলল, সাবধানে যেও।

    আমি বের হয়ে রাস্তায় নেমে গেলাম। সাইকেলে চলে যাচ্ছি। পেছন ফিরে তাকালে দেখতে পাব, পরী বারান্দায় ইজিচেয়ারে শুয়ে আমাকে লক্ষ্য রাখছে। পৃথিবীটা যেন অন্যভাবে আজ আমার সামনে হাজির। সরু রাস্তাটা বড় সড়কে কোথায় গিয়ে পড়েছে আমাকে তা আজ থেকে পরীর জন্য যেন খুঁজে বার করতেই হবে।

    চার পাশের আলো ঘরবাড়ি পাকা সড়ক ধরে গাছপালার ছায়ায় চলে যাচ্ছি। যাচ্ছি, না বার বার ফিরে আসছি। কার কাছে। পরীর কাছে! যত দূরেই যাই সে যেন টানে। পরীর উপর দিয়ে বড় একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সেই ঝড় থেকে শেষ পর্যন্ত যদি তার আত্মরক্ষা না করতে পারি। নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। শহর পার হয়ে গুমটি ঘরের কাছে আসতেই গভীর অন্ধকার। রেল- লাইন পার হয়ে পঞ্চানন তলার মাঠে আমি। মাথার উপর আকাশ আর অজস্র নক্ষত্র। ধরণী শান্ত। শস্যক্ষেত্রে আবাদের শুরু। কোথাও কীটপতঙ্গের আওয়াজ। জীবনে পরী না থাকলে আমি কত নিঃস্ব এই প্রথম টের পেলাম। এবং পরীর জন্য আশ্চর্য আবেগে ভেসে গেলাম। নিজের জন্য কেউ এ- ভাবে কাঁদে আগে জানতাম না। আমার চোখ পরীর কথা ভেবে জলে কেন যে ভেসে যাচ্ছিল।

  • নয়

    নয়

    বৃষ্টি বাদলার দিনে বাড়িঘরের চেহারা কেমন পালটে যায়। কদিন থেকে অবিরাম বৃষ্টি। মাঠ- ঘাট ভেসে গেছে। বাড়ির সামনে এক চিলতে খাল। কবে এখানকার স্থানীয় মহারাজ—এই অঞ্চলে আখের চাষ করবেন বলে এই খাল কাটিয়েছিলেন, মহারাজদের খেয়াল—কে কী বোঝায়, আর তাতেই লেগে পড়া। দু-এক বছর চাষ আবাদে বানের জলের মতো টাকা কামাবার ধান্দা। তিনি চাষবাস বন্ধ করে দিতেই জায়গাটা ঝোপ জঙ্গল, বাঁশের বন, এবং বলতে গেলে ঘোর অরণ্য—এমন একটা অঞ্চলেই আমার বাবা জলের দরে জমি পেয়ে এখন বলতে গেলে থিতু হয়ে বসেছেন। প্রাইমারী স্কুলে চাকরি হয়ে যাওয়ায় বাবার অভাব অনটনও আর সেভাবে নেই। মোটামুটি আমরা ভালই আছি।

    কেবল মা’র আপসোস আমার আর পড়াশোনা হল না। আর দুটো বছর পড়তে পারলেই গ্র্যাজুয়েট হওয়া যেত। ছিন্নমূল পরিবারের পক্ষে এটা যে কত বড় মর্যাদার প্রশ্ন বাবা বুঝলেন না। আমারও গোঁয়ার্তুমি কম নয়। পড়ার চেয়ে চাকরিটাই বেশি। মাঝে একদিন পরী এসে ক্ষোভে দুঃখে যা মুখে আসে বলে গেছে! ফ্যামিলি ট্যুর প্যাকেজ

    পরী বলে গেছে, আসলে মাসিমা ওর জেদ। মেসোমশাইকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। কত করে বোঝালাম, আর তো দুটো বছর, তর সইল না। চাকরি না হলে ওর অন্ন জুটবে না। অন্নই সার বুঝেছে। আসলে আমি বুঝি পরী মনে প্রাণে চায় না, আমি একটা প্রাইমারী ইস্কুলে মাস্টারি করি। এই নিয়ে পরীর সঙ্গে পরে আবার কথা কাটাকাটি হয়েছে। দেখাশোনা বন্ধ হয়েছে। অবশ্য আমার দিক থেকে সাড়া না পেলে, সে বোধহয় স্থির থাকতে পারত না। বেহায়ার মতো সাইকেলে চলে এসেছে শহর থেকে। একটা কলোনিতে আমরা আছি। পরী এই কলোনিতে কেন বার বার আসে লোকের বুঝতে কষ্ট হয় না। অবশ্য সবাই বোঝেও বড় লোকের ঝি। কতরকমের খেয়াল — আমার মতো একটা খেলনা পেয়ে পরীর সাময়িক মতিভ্রম হয়েছে। বয়স বাড়লে কেটে যাবে। আমারও বিশ্বাস তাই। পরীকে পাত্তা না দেওয়াটা আবার কেমন একটা স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে ইদানীং।

    সকালবেলায় বাবা পাটের জমি থেকে উঠে এসে বললেন, তুমি একবার পরীদের বাড়ি যাবে। পরীর ঠাকুরদার সঙ্গে দেখা, বললেন, বিলুকে আসতে বলবেন, বড় বিপাকে পড়েছি।

    বিপাকে পড়ারই কথা। রায়বাহাদুরের একমাত্র নাতনি, আদরে আদরে মাথাটি গেছে। একসঙ্গে কলেজে পড়ার সময় সেটা ক্রমে বুঝেছি। বিপাক থেকে আমিই এত বড় সম্ভ্রান্ত বংশকে রক্ষা করতে পারি তিনি জানেন। কিন্তু সেদিন যেভাবে পরী তাদের বিশাল বৈঠকখানা ঘরে সহসা চিৎকার করে উঠেছিল, তাতে পরীর দাদুর ঘাবড়ে যাবারই কথা!

    বাবা পাটের জমি থেকে উঠে এসেছেন তবে এই কারণে। আমাকে খবরটা দেবার জন্য।

    স্কুলে বের হব। স্নান সারা। বারান্দায় মায়া আসন পেতে দিচ্ছে। আসনে বসে গণ্ডুষ করার সময় বললাম, কোথায় দেখা হল?

    —কাদাইয়ে। মানুর বাসা থেকে বের হচ্ছি। দেখি গাড়ি থেকে তিনি নামছেন।

    —তোমাকে দেখে নামলেন!

    —তাই তো মনে হল।

    —চিনলেন কী করে!

    —কেন ওদের অন্নপূর্ণা পূজায় সেবারে গেলাম না।

    আমি ভুলে গেছি। পরীই সবাইকে দাদুর হয়ে নিমন্ত্রণ করে গিয়েছিল। আমার বারণ ছিল, না, না যাবে না। তোমরা কিছুতেই যাবে না।

    বাবার এক কথা—দেবদেবী নিয়ে তিনি খেলা করতে পারেন না। পিলু বলেছিল, দাদাটা যে কী! পরীদি কত করে বলে গেছে!

    মা’র কথা, সংসারের মঙ্গল অমঙ্গল আছে না!

    সতুরাং সবাই গেলেও আমি যাইনি। পরী আমার বাবা-মাকে তাদের বৈভব দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। আসলে অন্নপূর্ণার পূজা একটা অজুহাত। এসব কারণে পরীর উপর আমার যত ক্ষোভ। বাবা হাঁটুর উপর কাপড় পরেন। পায়ে জুতো পরেন না। বিশাল টিকি রেখেছেন। তাতে আমাদের গৃহদেবতার পূজা শেষে লাল জবা বেঁধে দেন। সবই করা সংসারে অশুভ প্রভাব যাতে পড়তে না পারে। মা’র ভাল একখানা শাড়ি নেই। পিলুর জামা প্যান্ট ক্ষারে কাচা। সুতরাং বাবা তার লটবহর নিয়ে অন্নপূর্ণার প্রসাদ নিতে গেলে, বিলুর মান-সম্মান কতটা পরীদের বাড়ি বজায় থাকে, বাবা যদি বুঝতেন।

    কী বলল!

    মুসুরির ডাল দিয়ে ভাত মাখছি। বৃষ্টি ধরে এসেছে। দুটো গরম কুমড়ো ফুলের বড়া মা খুন্তিতে তুলে দিয়ে গেল। গ্রাস তুলব মুখে বাবা বললেন, তোমার কথা জিগ্যেস করল।

    —আমার কথা!

    —হ্যাঁ, বলল, তুমি সত্যি সত্যি প্রাইমারী স্কুলের মাস্টারিটা করছ কিনা। বাবা কলকেয় টিকে গুঁজে দুবার গুড় গুড়ক টানলেন। বাবার কথা এরকমেরই। বিশেষ করে তামাক খাবার সময় বাক্য অসমাপ্ত রেখেই মনোযোগ সহকারে হুঁকায় নিমগ্ন হওয়া—দেখলে মনে হবে আর তাঁর কথা নেই, উঠে পড়া যাক— তখনই আবার কথা শুরু —বললাম, ঈশ্বরের কৃপায় বিলুর কাজটা হয়েছে। বললাম আশীর্বাদ করবেন, সুনামের সঙ্গে যেন কাজটা করতে পারে। সরকার মাইনে দিচ্ছে, একরকমের সরকারি কাজই বলতে পারেন।

    বাবার সঙ্গে কেন যে রায়বাহাদুরের দেখা হয়ে যায়। এটাও যেন একটা কাকতালীয় ব্যাপার। বলার ইচ্ছে হল, শুনে বোধহয় তিনি খুবই প্রীত হলেন। কত বড় সরকারি কাজ, প্রীত হবারই কথা। কিন্তু আমার কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে না। কলেজ ছেড়েছি বলে, পরীর জ্বালা আছে। পরীর এই জ্বালাই যেন আমার মধ্যে জেদ বাড়িয়ে দিয়েছে—আমি তোমার গোলাম! তোমার পছন্দমতো আমি সব করব! আমরা কত গরিব তোমরা বোঝ না। চাকরিটা হাতছাড়া হলে আবার কবে চাকরি পাব ঠিক আছে। পড়াশোনায় আমার নম্বরও খুব ভাল নয়। পাশ করে যাচ্ছি কোনরকমে। তাই এর চেয়ে আর কী ভাল চাকরি হতে পারে। আমি যা তাই। চাকরি করব, কলেজ যাব না। দেখি তুমি কী করতে পার। তুমি অর্নাস নিয়ে পড়বে। জেলার সেরা ছাত্রী, জলপানি পেয়েছ, পড়াশোনা তোমাকে সাজে। সেদিন পরীর খোঁজ করতে গিয়ে এ-সবই ছিল দু-পক্ষের মধ্যে বিতর্কের বিষয়। এবং আরও বড় বিষয় যেটা, সেটাই বেশি আমাকে ভাবাচ্ছে। পরীর বাবা কাকারা সম্বন্ধ ঠিক করছে এস ডি ও সাহেবের সঙ্গে। পরীর চেয়ে সাত আট কি দশও হতে পারে বড়। পরী রাজি হচ্ছে না। পরীদের সংসারে এই নিয়ে অশান্তি। নিজের উপরই ক্ষোভ হয়, কেন যে ওদের অশান্তিতে আমাকে জড়াচ্ছে।

    আমি বললাম, পরীর দাদুর সঙ্গে দেখা হলে বলে দেবেন, আমার সময় হবে না!

    বাবা আমার ঔদ্ধত্যে অবাক হয়ে গেলেন! —কী বলছে বিলু। কত বড় মানী মানুষ। মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ~~ সোজা কথা। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, রোজই তো বিকেলে শহরে যাও। মৃন্ময়ীদের বাড়ি যেতে তোমার এত আপত্তি কেন?

    আপত্তি কেন বোঝাই কী করে!

    বাবা তো জানেন না, সেদিন পরী আমাকে কী বলেছে। জানলে বাবারও মাথা খারাপ হয়ে যাবে।

    আমি বাবাকে এড়িয়ে যাবার জন্য মিছে কথা বললাম, পরী পছন্দ করে না।

    বাবা হুকোটা বেড়ায় ঝুলিয়ে উঠে পড়লেন। বললেন, মৃন্ময়ী তো এমন স্বভাবের মেয়ে নয়। সে যা ভাল বোঝ করবে। বাবা কী বুঝলেন কে জানে। উঠোনে নেমে পাটের জমির দিকে রওনা হলেন। পাট কাটা হচ্ছে। কাছে না থাকলে জনমজুর দিয়ে কাজ করানো যায় না। কাজেই বাবা রাস্তায় অদৃশ্য হয়ে গেলে, জামা প্যান্ট পরে সাইকেলে চেপে বসলাম।

    পরীর এখন এক কথা, দুটো তো বছর। এতদিন চলেছে, দুটো বছর চলবে না। না হয় আর একটু কষ্ট করবে সবাই।

    আমি বলেছি, না। তা হয় না কষ্টের সীমা আছে।

    —তাহলে ঠিকই করে ফেলেছ পড়া ছেড়ে দেবে। আমার কথা রাখবে না।

    —ঠিক করে ফেলেছি!

    তারপর আমরা দু’জনই চুপচাপ। অন্যদিকে আমি তাকিয়েছিলাম। পরীর এক কথা, তুমি পড়া ছেড়ে দিলে আমার কোনো সম্বল থাকবে না বিলু। আমি ভারী একা হয়ে যাব।

    আমি হাঁ! বলে কী। শুনে বলেছিলাম, প্রাইমারী ইস্কুলের মাস্টারি তোমার অপছন্দ বুঝি। তোমার পছন্দ নিয়ে আমার ভাবলে চলবে না পরী। আমার নিজেরও পছন্দ-অপছন্দ আছে। একা হয়ে গেলেও কিছু করার নেই।

    সহসা পরী সেদিন কেমন ক্ষিপ্ত হয়ে গেল, তোমাকে দিয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু হবে না। তোমার কোনো স্বপ্ন নেই। স্বপ্ন না থাকলে বড় হওয়া যায় না। সব তোমার মরে যাবে। তারপরই উঠে চলে গিয়েছিল। আবার কী ভেবে ফিরে এসে বলল, স্বপ্ন না থাকলে মানুষ বড় হতে পারে না। তুমি কী সেটা বোঝ!

    আমি বলেছিলাম, বুঝে দরকার নেই। অনেক বোঝা হয়ে গেছে। মাথায় কবিতা ঢুকিয়ে জীবনটাকে আমার জগাখিচুড়ি কেন বানাতে চাও বুঝি না! ও করে কিচ্ছু হয় না। আমার তো নয়ই।

    আসলে সবই জেদের বশে বলা। ও যদি আমার চাকরিট কে এত অপছন্দ না করত আমি হয়তো, এসব বলতাম না। কবিতা লেখার মধ্যে যে আশ্চর্য মুক্তি আছে—একটা ভাল কবিতা লিখতে পারলে মনে হয় আমি রাজার মত বেঁচে আছি—পরীই আমাকে কবিতার পোকা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে এবং আমার কবিতা নিয়ে ওর গর্বের শেষ নেই—সুতরাং বুঝতে পারি পরীকে একমাত্র মোক্ষম আঘাত হানতে পারি শুধু কবিতাকে অপমান করে। আমি তাই করেছিলাম। দেখ পরী যাকে যা সাজে। আমাকে সাজে না। কবিতা তো নয়ই।

    সাইকেলে যাচ্ছি, আর ভাবছি।

    সাইকেলে চাপলেই আমি কেমন যেন এক ঘোড়সওয়ার মানুষ। দ্রুত গাছপালা, মাঠ পার হয়ে যাওয়ার মধ্যে আশ্চর্য এক আনন্দ আছে। এখন কেমন লাগছে। কোনো আনন্দ নেই। ভিতরে ভিতরে আমিও ঠিক নেই। আড্ডায় কথাবার্তা কম। পরীদের বাড়ির সেই ঘটনার পর কিছু করতে ইচ্ছে হয় না। কবিতা লিখতে ইচ্ছে হয় না। অপরূপা কাগজ বের হবে কি হবে না তা নিয়ে গরজ নেই। এবং বাড়িতে থাকলেই আমার মাথা গরম থাকে, মা’র এমন অভিযোগ। সাইকেলে উঠলে সেটা থাকে না।

    পরীর দাদু উপরে উঠে ফের পরীকে নিচে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। যাবার সময় বলেছিলেন, তুমি একটু বোস বিলু।

    পরী ধীরে ধীরে নেমে এসে আমার সামনে বসেছিল। মেঝের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, তুমি পার বিলু।

    —কী পারি?

    –পরেশচন্দ্র এঁটুলির মত লেগে আছে।

    পরী নিজের স্বভাবদোষেই মরেছে। তোর কী দরকার ছিল এস ডি ও সাহেবকে আশকারা দেবার। না দিলে সে এত পাগল হয় কী করে—পরেশচন্দ্র তার বাবা-মাকে কলকাতা থেকে নিয়ে এসেছে- ঘন ঘন যাতায়াত। এমন সুপাত্র পরীর দাদুই বা হাতছাড়া করে কী করে। কেন জানি মনে হয় পরীর আশকারা না থাকলে পরেশচন্দ্র এত পাগল হত না। নিজের দোষে নিজে মরেছে, আমি কেন তার সঙ্গে মরতে যাব!

    বলেছিলাম, দোষ তোমার।

    —মানছি সব দোষ আমার। আচ্ছা বিলু মানুষ ভুল করে না? আমি কী জানতাম এটা এতদূর গড়াবে। বন্ধুর মতো মিশলে কী দোষের

    —দোষের-অদোষের বলছি না।

    —তবে কী বলছ?

    বলেছিলাম, পরেশচন্দ্র খারাপ কী! তোমার এত অমতের কী থাকতে পারে বুঝি না। বিয়ে হলে দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।

    পরী ফোঁস করে উঠেছিল, আমি যা বলছি পারবে কিনা বল। অত কথা আমি শুনতে চাই না। তোমরা আমাকে জান না। আমি সব করতে পারি। বিয়ে হলে ঠিক হবে কি বেঠিক হবে সেটা আমি বুঝব।

    বলে কী। আমি আশ্চর্য হয়ে গিয়ে বলেছিলাম, আমাকে কী করতে বলছ।

    পরীকে এতদিন দেখে বুঝেছি, সে সহজে ভেঙে পড়ার মেয়ে নয়। পরীদের সংসারে ঝড় উঠেছে, পরীর বাইরে ঘোরাঘুরি আর বাপ -কাকারা পছন্দ করছেন না, কারণ পরেশচন্দ্রের ইচ্ছে নয়, পরী মিছিল করে, পরী ইউনিয়ন করে, পরী অপরূপা কাগজ করে। পরী এখন ঘরে থাকবে—যেমন দশটা মেয়ে বিয়ের আগে কোথাও বের হয় না, পরীও সে ভাবে থাকবে, পরেশচন্দ্র এমন চায়।

    পরেশচন্দ্রের সবই ভাল। জাঁদরেল মানুষ। অল্প বয়সে কত বড় দায়িত্বশীল কাজ করছেন সরকারের। মাথায় কবিতার পোকা না থাকলে পরেশচন্দ্রের মতো ব্যক্তি আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। একটা জায়গায় পরেশচন্দ্র হেরে বসে আছে—সে সেটা জানে না। জানে না বলেই পরীর মতো মেয়েকেও জীবনে আর দশটা বিষয়ের মতো অর্জন করা যায় ভেবে ফেলেছে।

    আমি বলেছিলাম, আমাকে কী করতে হবে বল। যদিও আমি জানি পরী দুম করে এমন কথা বলতে পারে যাতে আমার হৃৎপিণ্ড উপড়ে আসতে পারে। কিন্তু পরীর কাতর মুখের দিকে তাকালে বোঝা যায়, জীবনে সে এত বড় সর্বনাশের মুখোমুখি কখনও হয়নি। আমার তো ধারণা ছিল, পরী এস ডি ও সাহেবের জিপে যখন ঘুরে বেড়ায়—কোথাও কিছু একটা কিন্তু আছে। আছে বলেই পরীর প্রতি সংশয়। আমি সহজে তাকে কোনো আশকারা দিতে রাজি না।

    পরী মাথা নিচু করে বসেছিল। কিছু বলছিল না।

    —বল।

    রাখার মতো হলে রাখব।

    —তুমি একবার বাবাঠাকুরের কাছে যদি যাও। সেই এক কথা।

    কিছুটা স্বস্তিবোধ করেছিলাম। ভাগ্যিস বলেনি, আমাকে নিয়ে পালাও। কারণ পরী পারে না এমন কাজ নেই। বলেছিলাম, কেন?

    —তুমি তো জান বাবাঠাকুর পারেন-

    আরে এ যে দেখছি আমি নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছি। আসলে আমি নিরুপায়। সব যাব করে যাওয়া হচ্ছে না। পরীকে কেন যে কথা দিতে গেলাম। এখন বুঝতে পারছি, বিষয়টা খুব সহজ নয়। কতদিন হয়ে গেল কালীবাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি। বাবার অভিযোগ, মার অভিযোগ, তুমি একবার গেলে না। তুমি পরীক্ষায় পাশ করলে, খবরটা দিতে হয়। তোমার বদরিদা, বউদি, বাবাঠাকুর কত খুশি হতেন।

    সত্যি যাওয়া দরকার। সেবাইত বদরিদা, আর বউদির মতো মানুষ হয় না। আমার পড়াশোনার খরচ তিনিই দিতেন। থাকা খাওয়া সব। এবং প্রায় বাড়ির আর একজন হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মধ্যে একটা বেইমান বাস করে টের পাই। তোমার হাত ধরে বলছি, তুমি যাও। বাবাঠাকুরকে তুমি বললে বুঝবেন। বলবে, মৃন্ময়ীর ইচ্ছে নয় এখন বিয়ে করে। পড়াশোনা করছে। বাবাঠাকুর তো পড়াশোনা পছন্দ করেন। আমাকে মাথায় হাত দিয়ে বলেছেন, তোর হবে।

    পরীর কাতর মুখ দেখে কথা দিয়ে এসেছিলাম, যাব। বাবাঠাকুরকে বুঝিয়ে যে করেই হোক পরীর গলার কাঁটা তুলে ফেলতে হবে।

    —কথা দিচ্ছ।

    না পরীর দিকে তাকানো যায় না। কার আশায় এই সজল চোখ। প্রাইমারী ইস্কুলের একজন মাস্টারকে নিয়ে তার কোনো স্বপ্ন থাকতে পারে না। ভাল লাগা আর ভালবাসা দুটো তো এক নয়। আমাকে তার ভাল লাগতে পারে—এ পর্যন্ত। এর বেশি নয়। কথা দিয়ে এসেছি, যাব।

    সেই যাওয়াটা আজও হয়নি। কী যে করি।

    সাইকেল থেকে নেমে ইস্কুলের মাঠে হেঁটে যাচ্ছি। পাশে মসজিদ, মসজিদ সংলগ্ন মাটির দেওয়াল ঘেরা লম্বা চালাঘর। ছোট ছোট সব বাচ্চারা ছোটাছুটি করছে। সামনে বড় সড়ক। দু-পাশেই বাড়িঘর। গরিব মুসলমান মানুষজন চারপাশে। স্কুলের হেড স্যার জাহির সাহেব। চালাঘরের দরজা নেই। টেবিল চেয়ার রাখার জন্য শেষ দিকটায় একটা ঘরের দরজার বন্দোবস্ত হয়েছে। স্কুল ছুটি হলে সব ঘর থেকে টেবিল বেঞ্চ ব্ল্যাকবোর্ড ও ঘরটায় নিয়ে গিয়ে তুলে রাখা হয়। ইস্কুলের খাতাপত্র জাহির সাহেবের বাড়িতে থাকে। আমাকে নিয়ে পাঁচজন শিক্ষক। জাহির সাহেব লুঙ্গি পরেন। মাথায় দেন ফেজ টুপি। লম্বা আলখাল্লার মতো পাঞ্জাবি গায়ে দেন। পায়ে জুতো পরেন না। তিনি চাবি নিয়ে না আসা পর্যন্ত মসজিদের পাশে আমগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

    স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা তখন মাঠে ছোটাছুটি করে। দৌড়ে বেড়ায়। তাদের নতুন মাস্টার গাছতলায় দাঁড়িয়ে আছে বুঝতে পেরেই দু-একজন দৌড় লাগাল। জাহির সাহেবের বাড়ি কিছু জমি পার হয়ে গাছপালা ঘেরা গাঁয়ের মধ্যে। এত কাছে বাড়ি অথচ একদিনও বলেন নি, চলুন বাড়ি। একটু বসবেন। কাউকেই বলেন না। ওরা দু’একজন কেন ছুটছে বুঝতে পারছি। আমার ঘড়ি নেই, থাকার কথাও নয়। মিলের ভোঁ শুনে আমরা সময় ঠিক করি। দশটায় ভোঁ পড়ে। ওই শুনে চানে যাওয়া, খেতে বসা। তারপর সাইকেল চালিয়ে আসা। এগারটা বেজে যাবার কথা। রোজই দেখি, দেরি হয়ে গেছে ভেবে যতই দ্রুত সাইকেল চালাই না কেন, স্কুলের দরজা তখনও বন্ধ।

    যারা ছুটে গিয়েছিল, তারাই আবার ফিরে আসছে। এসেই তালা খুলছে। ওরা বুঝতে পারে তালা খুললেই, আমি সাইকেল ঘরে তুলে ফেলব। আমি দাঁড়িয়ে থাকলে ওদের দৌড়ঝাঁপ করতে অসুবিধা হয় বুঝি। সেজন্য কিনা, এটা প্রায় রোজকার ঘটনা, সময়মত ইস্কুলের দরজা খোলা হয় না। আমি বুঝতে পারি, জাহির সাহেবই হোক আর কল্যাণ, বসিরুদ্দিন যেই হোক—ইস্কুলের কাজটা ফাউ। জোতজমি ঘরবাড়ির আর দশটা কাজ সেরে, একটু সময় করে ইস্কুলে এসে কিছুক্ষণ দয়া করে থেকে যাওয়া। আমার এত তাড়াতাড়ি আসাটা জাহির সাহেবের খুব একটা পছন্দ নয়। কিছু বলতে পারেন না, খোদ একজন স্কুল ইন্সপেক্টর আমার এই চাকরির মূলে। এমনিতে সমীহ করেন। আগেকার কালের গুরু ট্রেনিং পাশ। স্কুলের গোড়ার দিক থেকে আছেন। গাঁয়ের মান্যগণ্য মানুষ।

    স্কুল করে ফিরতে তিনটে সাড়ে তিনটে বাজে। এসে ভাত খেয়ে নিজের ঘরে খানিকক্ষণ লম্বা হয়ে শুয়ে থাকি। চাকরিটা হয়ে যাওয়ায় বাড়িতে আমার ওজন আরও বেড়ে গেছে। আগের মত আর পিলু যখন-তখন ঘরে ঢুকে ষাঁড়ের মতো কাউকে ডাকাডাকি করে না। সে ইস্কুলে যায়। ইস্কুল থেকে ফিরে খুব সন্তর্পণে বইখাতা টেবিলে রাখে। আমি লম্বা হয়ে শুয়ে আছি দেখতে পায়। মুখের উপর হাত ফেলা। ফলে চোখ ঢাকা থাকে। আমি যে ঘুমাইনি, জেগেই আছি সে টের পায়।

    ঘুম আসার কথাও নয়।

    কেন জানি আশঙ্কা হয় যে-কোনোদিন, যে-কোনো বিকেলে পরীর দাদু গাড়ি নিয়ে বাবার বাড়িঘরে হাজির হবে। কেন যে পরীর সঙ্গে আমার পরিচয় হল—এটা আমাকে ভাবায়। বড়লোকদের মর্জি আমি ঠিক বুঝতে পারি না। বাবা সকালে বলেছেন, যা ভাল বোঝ কর। অর্থাৎ বাবাও আমাকে আর ঘাঁটাতে চান না।

    কিন্তু টের পাই ভিতরে আমিও কম অস্থির হয়ে উঠিনি। যে করেই হোক বাবাঠাকুরকে সব বুঝিয়ে বলতে হবে। কিন্তু বোঝাই কী করে। একেবারে বেটা ন্যাংটা সন্ন্যাসী। গেরুয়া নেংটি পরে থাকেন। মন্দির সংলগ্ন তাঁর ঘর। মেঝের উপর কম্বল পাতা থাকে শীত-গ্রীষ্মে। মন্দিরে সকালে ঢোকেন। ঢোকেন এই পর্যন্ত। পূজা আর্চা তাঁর নিজের পছন্দ মাফিক। ইচ্ছে হলে ফুল জল দেন, ইচ্ছা না হলে দেন না। বড় জাগ্রত দেবী। পূজার সময় দেবীকে উদ্দেশ্য করে মন্ত্রপাঠের চেয়ে বেশি খিস্তিখাস্তা করেন। সেবাইত বদরিদা সবসময় তটস্থ থাকেন। এহেন মানুষের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোই কঠিন।

    আমার মাঝে মাঝে এসব মনে হয়—যা ভবিতব্য তাই ঘটছে। ঘটবে। কিন্তু এটা কী আমার শরশয্যা…। রাতে ভাল ঘুম হয় না। প্রাইমারি ইস্কুলে মাস্টারি নিচ্ছি শুনে পরী মহাখাপ্পা। বলেছিল, বিলু আসলে তুমি অত্যন্ত প্রতিশোধপরায়ণ!

    আমি তখন হাঁ। বলেছিলাম, আমি প্রতিশোধপরায়ণ।

    —হ্যাঁ। তুমি আমাকে খাটো করতে পারলে আর কিছু চাও না।

    আমি প্রাইমারী ইস্কুলে মাস্টারি করলে ওর খাটো হবার কী কারণ থাকতে পারে বুঝি না।

    পরী অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলেছিল, আমিও জানি তোমাকে কী করে শায়েস্তা করতে হয়।

    এস ডি ও পরেশচন্দ্রের সঙ্গে মেলামেশাটা তাপরেই বাড়িয়ে দিয়েছিল ফের। এতটা ভাল দেখায় না ভেবেই হয়তো বাড়ি থেকে হতে পারে কিংবা পরেশচন্দ্র নিজেও বাপ মাকে আনিয়ে পরীর দাদুর কাছে প্রস্তাবটা দিয়েছিল। পরেশচন্দ্র তো জানে না, আমাকে শাস্তি দিয়ে পরী নিজে জ্বলছে। আর সেই থেকে মহাফাপরে। নিজের জালে নিজে জড়িয়ে পড়েছে।

    কিছুই ভাল লাগছে না। শুয়ে থাকতে না, বসে থাকতে না–কেমন এক গুঞ্জন ভেতরে গুঞ্জন না গঞ্জনা, জামা গায় দিয়ে সেই বাদশাহি সড়কে উঠে যাব বলে বের হচ্ছি, মা বলল, সাবধানে যাস। বাবা বললেন, সকাল সকাল ফিরবি। রাস্তাঘাট ভাল না। ট্রাকগুলো যা যমদূতের মতো ছোটে।

    সাইকেল ঘর থেকে বের করার সময় বাবা বললেন, যাচ্ছ যখন, মৃন্ময়ীদের বাড়ি ঘুরে এস। বুড়ো মানুষ, বারবার বললেন, যাক ভালই হয়েছে দেখা হয়ে, বিলুকে একবার আসতে বলবেন। না হলে আমি যেতাম পরীকে নিয়ে।

    পরী আমাদের ঘরবাড়ি দেখেছে, পরী কী শেষ পর্যন্ত ঠিক করেছে, তার দাদুকে আমাদের ঘরবাড়ি দেখিয়ে নিয়ে যাবে!

    এসব মনে হলে আমি কেমন যেন একটা মজাও পাই—তুমি আমাকে শাস্তি দিতে গিয়ে নিজেই এখন জালে জড়িয়ে পড়েছ। বোঝ এবার।

    মুকুলের কাছে যাওয়া দরকার। কিন্তু মুকুলের কাছে গেলে দেরি হয়ে যেতে পারে। মুকুল সহজে ছাড়বে না। চৈতালি একদিন নাকি ওর কাছে নিজেই হাজির। চৈতালি প্রসঙ্গ উঠলে মুকুল আর থামতে চায় না।

    পুলিশ ট্রেনিং ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে বাদশাহি সড়কে উঠলেই আগে আমার মন প্রসন্ন হয়ে উঠত। এই রাস্তা যেন আমার আজন্মকালের সঙ্গী। হাজার বছর আগেও মনে হয় এমন এক সড়ক ধরে সমানে ছুটছি। আমি এক অশ্বারোহী। খটাখট আওয়াজ উঠছে ঘোড়ার ক্ষুরের। আমার উষ্ণীষ চন্দ্রালোকে ঝলমল করছে। বড় বড় গাছের ছায়া পার হয়ে দ্রুতবেগে ছুটছি। সেই আমি আজ বিলু। আমার অশ্ব নেই, উষ্ণীষ খুলে নেওয়া হয়েছে। ভাঙা তরবারি। অবশ্য বাবার ভাষায়, যেদিন যায়, তাই সুদিন। যেদিন অনাগত, তা দুঃসময়

    সত্যি কি আমার দুঃসময় উপস্থিত! আমার তো মানসিক যন্ত্রণার জন্ম হলে কবিতা মাথায় আসে- কবে যেন সেদিন এক গভীর অন্ধকারে / দেখি মাথার উপরে আকাশ, এক অলৌকিক নক্ষত্র জ্বলেপুড়ে শেষ হয়ে যায়/নীহারিকার খবর কে আর কতটা রাখে / কে জ্বলে, কে নেভে, কোথায় দগ্ধ আত্মা করে লুকোচুরি—তুমি আমি সব তার ছাইভস্ম, উড়ে যায়/নিরন্তর মাঠ পার হয়ে ও কার অনুসন্ধান / ব্যাপ্ত বেদনা অস্থির চকমকি কাঠ— শুধু সে জানে আগুন জ্বালাতে। আমি তার আগুনে পুড়ে মরি বারবার/ যেমত অস্থির পতঙ্গ ধায় প্রজ্জ্বলিত আগুনে।

    আমিও ধেয়ে যাচ্ছি।

    রেলগুমটি পার হয়ে জেলের পাঁচিল, ঝাউগাছের বন অতিক্রম করে শহরের দিকে উঠে যাচ্ছি।

    কী মনে হল কে জানে। গেলেই পরী নেমে এসে বলবে, বিলু! দেখে আত্মাহারা হয়ে যাবে। তারপর চুপচাপ মুখোমুখি বসে থাকলে একসময় বলবে, গিয়েছিলে! আর কতদিন লড়ব! তোমরা কী চাও আমি মরে যাই। বিয়ে হলে কেউ মরে যায় পরীই বলতে পারে। তার স্বাধীন জীবন শেষ হয়ে যাবে। এ জীবন থেকে সে নড়তে চায় না। আর আশ্চর্য হাবে ভাবে বুঝিয়ে দেবে আমি তার ভরসা। বাবাঠাকুরই একমাত্র পরীর বিয়ে রদ করতে পারেন। তিনি পরীদের পরিবারে সাক্ষাৎ মহাপুরুষ। তিনি যদি বলেন, পরীর বিয়ে এখানে দিও না, আমার মনে খটকা লাগছে, তবেই সব উল্টে যাবে। পরীকে কথা দিয়ে এসেছি যাব। যাব যাব করেও যাওয়া হয়নি। পরীকে পক্ষকালের উপর এড়িয়ে চলছি।

    আজও সেই এক বারবার কেন জানি অস্বস্তিবোধ হচ্ছে। পরী আশায় রয়েছে, আমার যেতে সঙ্কোচ হচ্ছে, বলি কী করে! — পরীর জন্য তোর এত মাথাব্যথা কেন বিলু। পরী তোর কে? তার ভালমন্দ তুই কতটা বুঝিস? তার বাবা-মা আছে, বিনয়েন্দ্র আছে, তারা বোঝে না, তুই বুঝিস। যদি বলে ভাগ। দুর হ।

    কী যে করি!

    কখন আমি লালদীঘির পাড় ধরে যাচ্ছি, নিজেই টের পাইনি। এ পথটা পরীদের বাড়ি যাবার পথ নয়। আমি আমার অজ্ঞাত ইচ্ছের তাড়নায় পি ডবলু ডি-র কোয়ার্টারের দিকে এগুচ্ছি। সাইকেল নিয়ে ঢুকতেই মুকুল দরজা খুলে বারান্দায়। পাজামা পাঞ্জাবি পরনে। ভারী প্রসন্ন মুখে ভেতরে ঢুকে হাঁকডাক শুরু করে দিয়েছে। বউদি বিলু এসেছে। বউদি বউদি।

    বউদি দরজায় মুখ বাড়িয়ে বলল, আর কি, এবারে বসে পড়। দুজনের যে এত কী কথা থাকে বুঝি না। ডাকলে সাড়া পাওয়া যায় না পর্যন্ত!

    সত্যি আমরা দুজনে যখন ঘরে ঢুকে যাই, পৃথিবীর অন্য জানালা আমাদের কাছে বন্ধ হয়ে যায়।

    মুকুল বলল, ভিতরে গিয়ে বস। আমি সাইকেলটা তুলে রাখছি। ঘরে ঢুকে বললাম, বউদি এক গ্লাস জল।

    বউদি বলল, এত তেষ্টা পায় কেন?

    —কী গরম!

    —শুধু গরম। তা গরমই বলতে পার। আমারই খেয়াল নেই, ভাদ্র মাস এটা। শরতের আকাশ পরিষ্কার।

    বলতে ইচ্ছে হল, বউদি আকাশ পরিষ্কার নয়। বড়ই ঘোলা। আমার মুখ দেখে টের পাও না।

    বউদি আমাদের জননীর মতো। কখনও দিদির মতো, রঙ্গরসিকতা করলে বউদি।

    মুকুল ঘরে ঢুকে বলল, আঃ কী মজা! আজ আমরা ঘুরব।

    —কোথায়?

    —সন্ধ্যার পর বালির ঘাটের দিকে চলে যাব। আজ পূর্ণিমা। জ্যোৎস্নায় ঘুরে বেড়াব।

    —হঠাৎ!

    —আঃ কী মজা। চৈতালি এসেছিল।

    —সে তো জানি। বলেছ।

    —চৈতালি খুব খুশি। বলল, মুকুলদা তুমি এত সুন্দর লিখতে পার?

    –কী লিখতে পার?

    —কেন কবিতা, আমার কবিতা ওর ভারী পছন্দ বলেছে।

    —ওর ওপর লেখাটার কথা কিছু বলল না।

    —না!

    —ওকে তো সঙ্গীত-সম্রাজ্ঞী বানিয়ে দিয়েছ।

    —কী গায় বল! টাউন হলের ফাংশনে সেই গানটা—দিবস রজনী আমি যেন কার আশায় থাকি…অপূর্ব। অসাধারণ। কী গলা। যেন এরই প্রতীক্ষায় সে অনন্তকাল বসে আছে। ও গাইবে আমি শুনব। আমাদের থাকবে ছোট্ট বাংলো প্যাটার্নের একটা বাড়ি।

    আমি বললাম, নিশ্চয়ই কোন পাহাড়ী উপত্যকায়।

    —ঠিক বলেছ। বাংলোর চারপাশে গভীর বনজঙ্গল। ফুল-ফলের গাছ। রঙিন প্রজাপতি উড়বে। আমি বললাম, পাশে একটা ঝর্ণা থাকলে ভাল হয়।

    –ঝর্ণা কেন?

    –বা অমন সুন্দর মেয়ে আর তুমি—সারা দিন সারা বেলা শুধু গাছপালা ফুলফুল দেখবে? ঝর্ণার জলের শব্দ শুনবে না?

    —শব্দ!

    —কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে।

    —তুমি ঠাট্টা করছ বিলু?

    —না ঠাট্টা নয়। শুধু ভাবছি, এইটুকু প্রশংসাতেই এই। বুঝতেই পারছ, মেয়েরা একটুকুন প্রশংসাতেই মাথা ঠিক রাখতে পারে না।

    বউদি এক গ্লাস জল রেখে বলল, আমার হয়েছে জ্বালা।

    এ কথা কেন। ভাবলাম।

    বললাম, তোমার আবার জ্বালা কিসের! দাদা থাকতে তোমার জ্বালা হবার তো কথা নয়।

    —এই ফাজিল ছেলে।

    —বারে ফাজলামিটা দেখলে কোথায়? জ্বালা আমাদের।

    ও সবারই হয়। বয়স হলে জ্বালা হয়, জ্বালা থেকে যন্ত্রণা হয়। যন্ত্রণা থেকে ঘা হয়। তারপর সংসারে সেই ঘাটা আর শুকায় না।

    বউদি আজ কোনো ক্ষোভে জ্বলছে তবে। বউদির মুখ ব্যাজার। বললাম, কী ব্যাপার! কী হয়েছে বলবে তো?

    মুকুল আগ বাড়িয়ে বলল, ব্যাপার আবার কী! আমাকে ইকনমিক্‌স-এ অনার্স নিতে বলছে।

    মুকুল ইচ্ছে করলে ইকনমিক্‌সে অনার্স নিতে পারে। ম্যাট্রিকে টেনেটুনে সেকেণ্ড ডিভিসন। ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময়ই চৈতালির প্রেমে পড়ে যায়। চৈতালির দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য সে চেষ্টার ত্রুটি করেনি। পরীক্ষার ভাল ফলটাও চৈতালির প্রতি গোপন প্রেম, ইমপেটাসের কাজ করেছে। এবং এসব কারণে পরীক্ষার নম্বর তার আশাতীত ভাল। সে আমাকে বলেছে, মেসোমশাই জান ঠিকই বলেন—যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।

    আমি বললাম, সে তো বাবা মা’র সঙ্গে ঝগড়ায় পেরে না উঠলে চণ্ডীপাঠ শুরু করে দেন। মা তো এতে আরও ক্ষেপে যায়।

    সে বলেছিল, চৈতালির প্রেমে না পড়লে আমি এত ভাল নম্বর পেতাম না। চৈতালির দিদিরা আমাদের বাঁদর বলেছে—এখন বুঝেছে আমরা কে?

    তারপরই থেমে বলল, বড় হবার সময় কেউ পাশে না থাকলে সাহস পাওয়া যায় না। একজন এসেই যায়। সেই একজনের জন্যই তো বিলু আমরা সব করি। ঠিক কি না বল! এই যে বড় হওয়া, কবিতা লেখা, পরীক্ষার ভাল নম্বর তোলা, শুধু সে একজনের মুখের দিকে তাকিয়ে। কী বল, তাই না।

    আমি কিছু বললাম না। জল খেয়ে গ্লাসটা রাখার জন্য রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছি। দেখি বউদি বাথরুমে ঢুকে যাচ্ছে। আমাকে দেখে, বলল, বিলু শোন।

    সহসা যিনি বিকেলে গা ধুতে যাবার জন্য শাড়ি সায়া পরে ঘর থেকে বের হয়ে আসছিল, সেই আমাকে কেন যে অভিভাবকের মতো ঘরের মধ্যে ডেকে নিয়ে গেল। আমি কিছুটা হতভম্বই হয়ে গেছি। আবার কেউ কোনো নালিশ-টালিশ করেনি তো!

    বউদিকে আমরা এমনিতে খুব সমীহ করি। এক সন্তানের জননী বাপের এক মেয়ে। আদুরে। টুনি বাড়িতে নেই। বোঝাই যায়। থাকলে আমার সাড়া পেলে ছুটে আসত। লতাপাতা ফ্রক গায়ে দিয়ে টুনি আমাকে দেখলেই স্কিপিং করতে শুরু করে দেয়। সে কত ভাল স্কিপিং করতে পারে এটা দেখানোর মধ্যে ভারী আনন্দ পায়। বোধহয় ওর দাদু-দিদিমার কাছে এখন আছে। সৈদাবাদের দিকে বউদির বাপের বাড়ি। বউদির দুঃখ, এমন আংটা পরিয়ে দিয়েছে সংসার যে, এক রাত বাপের বাড়িতে থাকার সময় নেই তার। সারাটা দিন, এই বাসাবাড়িটি ছিমছাম রাখতে ব্যস্ত। একদণ্ড বসে থাকার যদি ফুরসত মেলে। আমার এসব দেখলে কেন যে মনে হয়, সংসারে এত দায় যে কে তার উপর চাপিয়ে দিয়েছে। কেউ তো বলেনি, সারাক্ষণ এই সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। জানালার পর্দা থেকে গ্রিল কোথাও এতটুকু ধুলোবালির চিহ্ন থাকে না। আসলে এটাই বোধহয় বউদির স্বপ্নের পৃথিবী। সেই স্বপ্নের পৃথিবীতে কে আবার নখের আঁচড় কাটল। এসব যখন ভাবছিলাম তখনই বউদি বলল, বন্ধুকে একটু বুঝিয়ে বল বিলু। আমরা জানি তুমি বললে ও কথা রাখবে। জামাইবাবু পর্যন্ত রেগে গেছেন।

    কী নিয়ে এত জটিলতা বুঝতে পারছি না। সংসারে তবে কী কেউ ভাল থাকে না। যেখানেই যাব আমাকে জড়ানো হবে।

    বললাম, কী হয়েছে?

    —আর কী হবে। সকালে তোমার দাদার সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে।

    মুকুল এমনিতে খুবই শান্ত স্বভাবের, কিছুটা প্রকৃতি প্রেমিক। আসলে আমরা সবাই। ভীরু প্রকৃতির না হলে কবিতা গল্প কেউ লেখে না এটাও কেন জানি আমার মনে হয়। আমরা যা চাই, স্বপ্ন দেখি— তা সোজাসুজি বলতে পারি না বলেই বোধহয় এই একটা নরম জায়গা আছে যেখানে সহজেই আশ্রয় পেতে পারি।

    বউদি বলল, বোস। দাঁড়িয়ে থাকলে কেন।

    ভিতরে ডবল খাট। মাথার দিকে দুটো জানালা। জানালায় পেলমেট রঙিন পর্দা, খাটের বিপরীত দিকে ড্রেসিং টেবিল – মাথা সমান আয়না। বিবাহিত জীবনে এই আয়নাটা মানুষের বড় দরকার। আমি নিজের পুরো ছবিটা দেখতে পাচ্ছি। আসলে ওটা আমার বাইরের ছবি। ভেতরে আর একটা ছবি আছে—যা আয়নায় আমার কোনোদিন ভাল করে দেখা হয়নি। পরী এমন আয়নার সামনেই আমাকে নিয়ে দাঁড়াতে চায়।

    বললাম, কী হয়েছে বলবে তো! কী নিয়ে কথা কাটাকাটি।

    —আর কী নিয়ে। বাবু ঠিক করেছেন, বাংলা অনার্স নিয়ে পড়বেন।

    —ভাল তো।

    —তুমিও ভাল বলছ? বৌদি জ্বলে উঠল।

    —বাংলা অনার্স নিয়ে পড়লে ক্ষতি কি?

    —ক্ষতি নয়। বউদির মুখ ভারী গম্ভীর।

    বললাম, কী ক্ষতি?

    —এর কোনো ভবিষ্যৎ আছে?

    সত্যিই বিষয়টা আমি তলিয়ে দেখিনি।

    বউদি ফের বলল, সব ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাংলায় এম পড়বেন। বাংলায় ডক্টরেট করবেন। দাদারা তো শুনে হাঁ। বাংলা নিয়ে পাশ করলে কী হয় তোমরা ভালই জান।

    বউদির গম্ভীর মুখ দেখতে আমরা অভ্যস্ত নই। আমরা দল বেঁধে আসি। আমাদের কাগজের অস্থায়ী ঠিকানা এই বাড়ি। অস্থায়ী অফিস, মুকুলের ঘর। কাজেই কোনো কোনো দিন বেশ রাত হয়ে যায় আমাদের আড্ডা ভাঙতে। মুকুলের দাদাকে আমরা সবাই বড়দা বলি। তাঁর তাস খেলার আড্ডা আছে সন্ধ্যায়। চেককাটা লুঙ্গি পরে ঘাড়ে গলায় পাউডার দিয়ে তাসের আড্ডায়। যাবার মুখে দরজায় উঁকি দিয়ে একবার দেখবেন, কে কে আছি আমরা। তারপর হেসে বলবেন, বউদির মেজাজ ঠিক আছে, আর এক রাউণ্ড চা মেরে দিতে পার। অর্থাৎ ইচ্ছে করলে আমরা আর এক রাউণ্ড চায়ের অর্ডার দিতে পারি। যেন উসকে দিয়ে যাওয়া। সেই মানুষের সঙ্গে সকালে মুকুলের কথা কাটাকাটি হয়েছে। ভাবতে খারাপ লাগছে। বললাম, আমি বুঝিয়ে বলব। বউদি বড় হালকা বোধ করল।

    তারপরই মনে হল, কী বুঝিয়ে বলব।

    আমি বললাম, কী বলতে হবে বল তো? ও ইকনমিকস-এ অনার্স নিয়ে পড়ুক এটা তোমরা চাও?

    বউদি বলল, আমি তোমার দাদা আমরা সবাই চাই ও ইকনমিকস-এ অনার্স নিক। এখন যাও বোঝাওগে। তুমি বোঝালে বুঝবে।

    —দেখছি।

    আমার উপর খুব নির্ভর—বিশেষ করে তার দেবরটির ব্যাপারে।

    বউদি ফের বলল, আমি তোমার দাদাকে বলেছি, রাগারাগি কর না। বিলুকে আসতে দাও! সব ঠিক হয়ে যাবে।

    আমি হুঁ-হাঁ কিছু না বলে বের হয়ে এলাম।

    বাইরের ঘরে ঢুকে দেখি মুকুল লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। সামনের জানালার পর্দা সরানো। ওর চোখ জানালা পার হয়ে রাস্তায়। ওর স্বভাব শুয়ে শুয়ে পা নাড়ানো। আমার দিকে না তাকিয়েই বলল, বউদির সঙ্গে নিভৃতে এত আলাপন—ভাল ঠেকছে না। চৈত্রের ঝরাপাতার বড় ওড়াওড়ি। হেমন্তের অপেক্ষায় থাকি— সোনালি ধানের গুচ্ছ, সবুজ ঘাসের মাঠ পার হয়ে যায় দেখ—উদাসী বাউল একতারা বাজায়। তারপরই ঝটকা মেরে উঠে বসে বলল, আমি আমার মতো বাঁচতে চাই। এত ব্যাগড়া দিলে চলে!

    বুঝতে পারি মুকুল আজ ভাল নেই—সে তার কবিতার দু-একটা লাইন আউড়ে মনে প্রশান্তি আনার চেষ্টা করেও পারেনি, তাই ক্ষেপে গিয়ে বলল, আমি কী নিয়ে পড়ব না পড়ব তাও বাড়ি থেকে ঠিক হবে। আমার ইচ্ছে-অনিচ্ছের দাম নেই! বলে আর একটা বালিশ সে আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি যাতে আয়েস করে বসতে পারি কিংবা পাশে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়তে পারি সেজন্যে সে একটা বালিশ আমার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমি বিছানায় না বসে পাশের চেয়ারে বসে পড়লাম। কিছু বললাম না। শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এই জানালাটা আমারও ভারী প্রিয়। রাস্তার পর মাঠ, তারপর পুলিশ সাহেবের বড় বাংলো, বিশাল এলাকা জুড়ে পাঁচিল। কতরকমের গাছপালা- বাড়ির পাশ দিয়ে জজ কোর্টে যাবার রাস্তা—অনেক দুরের এইসব দৃশ্য এবং মানুষজনের পাশাপাশি মনে করিয়ে দেয় পরীর সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শব্দ লাল রঙের লেডিজ সাইকেল। বড় শৌখিন সাইকেলে চেপে পরী কোনো বিকেলে সহসা আমাদের আড্ডায় হাজির। কত বিকেল এমন অপেক্ষায় কেটেছে। তারপর কোনোদিন সে এলে, আমি বোবা বনে গেছি। পরী এলে আমি কিভাবে কথা বলব বুঝতে পারতাম না। পরী বড় চঞ্চল, পরিহাসপ্রিয় এবং এক অদম্য উৎসাহের ভাণ্ডার। পরী এলে কেন যে গম্ভীর হয়ে যেতাম—সবাই মিলে একশটা কথা বললে, আমার একটা দুটো কথা। তার উপরেই বেশি গুরুত্ব দিত পরী। আমি হাঁ বললে হাঁ, না বললে না।

    আমি চুপচাপ থাকলে মুকুলের মধ্যে অস্বস্তি দেখা দেয়। সে জানে, স্কুলের মাস্টারি নিয়ে পরীর সঙ্গে আমার রেষারেষি চলছে। পরী একদিন মুকুলকে বলে গেছে, বন্ধুটিকে শেষ পর্যন্ত প্রাইমারী ইস্কুলের মাস্টার বানিয়ে ছাড়লে। এই তোমার বন্ধুকৃত্য! এটা মুকুলকেও বোধহয় ভাবিয়েছে। কাজটা শেষ পর্যন্ত ভাল কি মন্দ হল বুঝতে পারছে না। সে তার জামাইবাবুকে ধরাধরি না করলে কাজটা আমার হতই না। পরী এমনও নাকি শাসিয়ে গেছে, তোমাদের কাগজে আর আমি নেই। ফলে কাগজের ভবিষ্যৎ নিয়েও আমরা সংকটের মধ্যে আছি।

    অপরূপা কাগজ তো আর কাগজ নয়—আমাদের কিছু হবু গল্পকারদের প্রাণ। ওটা না বের হলে আমাদের মর্যাদা নিয়ে টানাটানি। পরীর যে বিয়ে ঠিক। বাড়ি থেকে পরীর বের হওয়া বন্ধ। কিন্তু পরীর এক কথা। এখন বিয়ে-ফিয়ে আমি করব না। পড়ব। এর চেয়ে পরী বেশী কিছু বলে না।

    পরেশচন্দ্র পরীর দাদুকে বলেছে, মিমি পড়তে চায়-পড়ুক না। পরেশচন্দ্রের বাবা বলেছেন, নিশ্চয় পড়বে। আমরা পড়াব। এমন ব্রিলিয়েন্ট ছাত্রী না পড়লে চলবে কেন। শুভ কাজ তাড়াতাড়ি হয়ে যাওয়াই ভাল।

    এখন সব কিছুতেই জট পাকিয়ে যাচ্ছে। পরীর বাড়িতে যাওয়া হচ্ছে না। গেলেই পরীর এক কথা, গিয়েছিলে!

    যাই কী করে। যাওয়া হয়নি।

    আমার মাস্টারি নিয়ে রেষারেষি পরীর সঙ্গে। পরী শেষ পর্যন্ত হয়তো বিয়ের পিঁড়িতে বসে আমাকে রক্ষা করতে পারে। দেখ এবার, তুমি প্রাইমারী ইস্কুলের মাস্টারি করতে পার আমি বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারি না! আমি সব পারি। মিছিলে যেতে পারি, পার্টির পোস্টার লিখতে পারি, আর ‘মাউন্টব্যাটন, সাধের ব্যাটন কারে দিয়া গ্যালা’ গাইতে পারি, নাটকে নায়িকার পার্ট করতে পারি—আর বিয়ের পিঁড়িতে টুক করে বসেও যেতে পারি। তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। লক্ষ্মী ঠিকই বলেছে, তোমাকে মাস্টারি মানায় না, রাখালি করগে, যেন পরী বলতে চায়, আমি সব পারি, তুমি কিছুই পার না।

    এখানে এসে আর এক জট। মুকুলের সঙ্গে ওর বড়দার সংঘর্ষ শুরু হয়েছে।

    মুকুলকে বললাম, দাদা, বউদি, জামাইবাবুর যখন ইচ্ছে ইকনমিকস-এ অনার্স নিয়ে পড়ার, তাই পড়।

    —তার মানে!

    —মানে একটাই বাংলায় অনার্স নিলে ভবিষ্যত ঝরঝরে। আমার মাস্টারির মতো।

    —বাংলায় অনার্স আমার বিধিলিপি।

    —বিধিলিপি মানে?

    —বিধিলিপি বোঝ না? নিয়তি। বুঝলে নিয়তি। বাংলায় অনার্স আমাকে নিতেই হবে।

    —নিতেই হবে।

    —নিতেই হবে। বলে মুকুল ফের চিত হয়ে শুয়ে পড়ল, যেন বড়ই অসহায়। কী করবে ঠিক বুঝতে পারছে না।

    —চৈতালির দিব্যি নাকি?

    আর তখনই রাস্তায় কাকে দেখে মুকুল ধড়ফড় করে উঠে বসল। বলল, এই শিগগির। তাড়াতাড়ি কর। দেখ কে আসছে?

    দেখলাম যিনি আসছেন, তিনি আর কেউ নন—চৈতালির দিদি। প্রচণ্ড মোটা, মাথার সামনের দিকটায় টাকের মতো, লাল রঙের সিল্ক পরা। রিকশা থেকে নেমে, দরজার কাছে এসে বউদির নাম ধরে ডাকছে।

    বউদি বাথরুমে। মুকুল দু-লাফে তক্তপোষ থেকে নেমে ওদিকের দরজা খুলে আড়ালে কথাটা বলে এদিকে আবার চলে এল। ভদ্রমহিলা বুঝতেই পারল না, কে দরজা খুলে দিল। এক দরজা দিয়ে তিনি ঢুকলেন, অন্য দরজা দিয়ে মুকুল আমার হাত ধরে টানতে টানতে বাড়ির বাইরে নিয়ে গেল। তারপর দেখছি মুকুল ঊর্ধ্বশ্বাসে হাঁটছে। আমি পিছিয়ে পড়লে বলেছে, ইস শিগগির।

    কী কারণ বুঝতে পারছি না।

    —কী হয়েছে? ছুটছ কেন!

    —চলে এস, শিগগির চলে এস।

    বাড়ির আড়ালে পড়ে যেতেই কিছুটা যেন স্বস্তিবোধ করছে মুকুল। একবার পেছন ফিরে তাকায় আবার হাঁটে।

    —আরে হলটা কী?

    —আর হল।

    এদিকটায় বড় মাঠ, ইষ্টিশনে যেতে হলে এই বড় মাঠ পার হয়ে যেতে হয়। না পেরে বললাম, আমরা কি ট্রেনে করে পালাচ্ছি?

    —প্রায় তাই বলতে পার!

    বুঝতে পারছি না চৈতালির দিদিকে দেখে মুকুল এহেন আচরণ করছে কেন! চৈতালি নিজে এসে মুকুলের কবিতার সুখ্যাতি করে গেছে। দিদির পারমিশন না পেলে চৈতালির এক পাও নড়বার উপায় নেই। সেই দিদিকে দেখে এত ভয়? ভয় হবার তো কথা নয়। বাড়ি থেকে ছাড়পত্র না পেলে মুকুলের কাছে চৈতালি আসতেই পারে না। কারণ এর আগে কম ঝক্কি যায়নি মুকুল ফাঁক পেলেই সাইকেলের মুখ ঘুরিয়ে দিত। মুকুল দিলে আমি না দিয়ে থাকি কী করে। মাধ্যাকর্ষণের টান। মুকুল এই টানে কোথায় যাবে জানি, আর গিয়ে কি দেখবে তাও জানি। বড়দি ছাড়পত্র না দিলে চৈতালি মুকুলের কাছে আসে কী করে। না কি গোপনে এসে দেখা করে গেছে! গোপনে এসে দেখা করেছে ভাবতেও কেমন রোমাঞ্চ বোধ করলাম।

    আমি ডাকলাম, এই মুকুল শোন। কোথায় যাচ্ছ?

    —পালাচ্ছি।

    —পালাচ্ছি মানে! চৈতালির দিদি কি ধাওয়া করবে ভাবছ?

    —করতে পারে।

    মুকুল আসলে কত ভীরু প্রকৃতির বুঝতে কষ্ট হয় না। ওকে সাহস দেবার জন্য বললাম, রাখ তো—দেখা আছে সব। তুমি কী অন্যায় করেছ যে ভয় পাবে। বলে দৌড়ে হাত ধরে ফেললাম।

    এখানে কিছু বড় গাছ আছে। মাঠে সবুজ ঘাস। জায়গাটা খুবই নিরিবিলি। দুজন উঠতি যুবকের পক্ষে মাঝে মাঝে এ-সব জায়গা খুবই মনোরম। প্রাণ খুলে কথা বলা যায়। ওকে হাত টেনে বসালাম। বললাম, ব্যাপার কী বল তো!

    মুকুল পা ছড়িয়ে বসেছে। গাছের কাণ্ডে শরীর হেলানো। পাঁচটার ট্রেন চলে যাচ্ছে। আকাশ নীল এবং স্বচ্ছ। শরতের আকাশ। আজ জ্যোৎস্না উঠবে।

    তখন মুকুল বলল, রুদ্রাক্ষ ধরা পড়ে গেছে।

    রুদ্রাক্ষ মুকুলের ছদ্মনাম। সে নিজের নামে কবিতা লেখে। শহরের অনুষ্ঠান নিয়ে যে আলোচনার পাতা বরাদ্দ করা আছে সেটাও সে লেখে। ছদ্মনামে না লিখলে চলে না। অনুষ্ঠানের সমালোচনাও থাকতে পারে—সবাই সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, পথেঘাটে ধরে ধোলাই দিলে কে কাকে রক্ষা করবে ভেবেই মুকুল ছদ্মনামটি নিয়েছে। অপরূপার প্রথম সংখ্যায় শহরের বাইশে শ্রাবণের অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিন-চতুর্থাংশ জায়গা চৈতালির জন্য দিয়েছে। এতে চৈতালির খুশি হবার কথা—কোনো বিপাকেই পড়ার কথা নয়, তাছাড়া চৈতালি মুকুলের সঙ্গে কথা বলেছে, এরপর আর কী হুজ্জতি হতে পারে—ভেবে পেলাম না।

    বললাম, কার কাছে?

    —আর কার কাছে! ওর দিদিরা টের পেয়েছে ওটা আমি লিখেছি।

    —খারাপ কিছু তো লেখনি।

    —খারাপ লিখব কেন? চৈতালির খারাপ হয় এমন কিছু আমি লিখতে পারি? তুমিই বল!

    —না কিছু বুঝছি না! চৈতালি তো তোমার কবিতার প্রশংসা করে গেছে। তুমিই বলেছ।

    –না করেনি।

    —তবে যে সেদিন বললে, চৈতালি কী খুশি!

    —ওটা আমার ধারণা। জান, বিলু আজকাল আমার যে কী হয়েছে! মনে মনে যা ভাবি, সেটা কেন জানি মনে হয় সত্যি ঘটেছে। চৈতালি আসবে; ঠিক আশা করেছিলাম সে আলোচনা পড়ে খোঁজ করতে আসবে, কে লিখেছে?

    —সমালোচনা পড়ে ও আসবে ভাবলে কী করে? না আসারই তো কথা।

    —বুঝলে না, মনের উপর তো আমার হাত নেই। আমি ভাবলাম, ব্যস হয়ে গেল। মনে হল সত্যি সে এসেছে। আমার সঙ্গে কথা বলেছে। মুকুলদা তুমি কী সুন্দর কবিতা লিখেছ বলেছে। এই ভাবনাটাই আমার কাছে সত্যের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। তাই বলেছিলাম। জান সে আসেনি। জান বউদিকে ওর দিদিরা বলেছে, তোর বাঁদর দেওর এটা লিখছে। চৈতালিকে নিয়ে এত পাঁচ কাহন করার কী আছে। কী কারণ। কী সূত্র। বলবি আমি একদিন যাব। ধুইয়ে দিয়ে আসব। জীবনে ও আর চৈতালিকে নিয়ে যেন লিখতে সাহস না পায়। এ কী রে বাবা, নাক টিপলে দুধ গলবে, এখনই এই ভাষা—কী যাদু বাংলা গানে, চৈতালির সেই উচ্চকিত কণ্ঠ—যেন সেতারের মুর্ছনা, শেষ হয়েও শেষ হয় না। যা অনন্ত, যা অসীম, চৈতালির গান শুনলে তা টের পাওয়া যায়। যেন আকাশ মাটি গাছপালা কীটপতঙ্গ সব স্তব্ধ। ঝড়ের পর প্রকৃতির সেই নিরুপম সৌন্দর্য তার সঙ্গীতে। এত কাব্য করা হয়েছে কেন। তোর রুদ্রাক্ষকে বলবি, আর যেন চৈতালিকে নিয়ে বাঁদরামি না করে!

    —বউদি বলল।

    —হ্যাঁ সেই তো। দাদাও জেনে গেছে।

    –কী জেনে গেছে?

    —আমি চৈতিকে নিয়ে একটু ইয়েতে আছি।

    —এটাই আমাদের গেরো। যাকে ভালবাসি সেই কেমন শত্রুপক্ষ হয়ে যায়। আমার সঙ্গে পরীর সম্পর্কটা ভালবাসার পর্যায়ে পড়ে না—বরং সবাই জানে, পরীকে আমি দু চোখে দেখতে পারি না। সংসারে আমরা উভয়ে উভয়ের চরম শত্রু। পরীর কোনো কাজই আমার পছন্দ নয়। বেহায়া বলে পরী মেশে!

    ভাবলাম, সত্যি রুদ্রাক্ষ চৈতিকে নিয়ে একটু বেশি কাব্য করে ফেলেছে।

    আমি বললাম, আর কতক্ষণ বসে থাকবে?

    —গিয়ে যদি দেখি বসে আছে!

    —থাকুক বসে। বসে থাকল তো বয়ে গেল। ভালবাসা অন্যায় নয়। আমাদের ইচ্ছে আমরা ভালবাসব। ভালবাসা মানুষের ফাণ্ডামেন্টাল রাইট তুমি জান?

    —সে তো জানি।

    —আমরা তো বলছি না, চৈতিকেও এজন্য তোমাকে ভালবাসতে হবে, কী বল? তুমি কখনও জোর খাটিয়েছ? আমাদের ইচ্ছে আমরা ভালবাসব। কার কি বলার আছে?

    —কারও কিছু বলার নেই।

    —তুমি বলেছ, আমি ভালবাসি, তোমাকেও ভালবাসতে হবে? না ভালবাসলে হুজ্জতি হবে? এমন তো দাবি করনি।

    –না।

    —তা হলে মামলা দাঁড় করাবে কার ভিত্তিতে?

    —চৈতালির দিদিরা সব পারে। হেডমিসট্রেস বলে কথা।

    —ভয় পেলে চলে না। এক কাজ করব?

    —কী করতে চাও?

    —প্রণবের মারফত কাজটা করা যায় না?

    —না, না। ও করতে যেও না। হিতে বিপরীত হবে। ও করতে যাবে না। দাদা পর্যন্ত বলল।

    —কী বলল?

    —তোরা চৈতির পেছনে লেগেছিস। চৈতিকে না দেখলে আমাদের মন মানে না, সেজন্য যাওয়া। পেছনে লাগার কী হল!

    —তুমিই বল বিলু, শুধু দেখি। আমরা শিস মারি না, মাস্তানি করি না, শুধু দেখি। চৈতিকে ‘না দেখলে মনে হয় দিনটা মাঠে মারা গেল। দূর থেকে দেখলে মনে হয় দেবী চলে যাচ্ছেন। বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়ব চৈতির সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হবে বলে।

    .

    মেয়েদের কলেজে এখনও অনার্স ক্লাস খোলা হয়নি। বাংলায় অনার্স নিতে হলে চৈতালিকে আমাদের কলেজেই ভর্তি হতে হবে। বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়ার বাসনা তবে মুকুলের সেই জন্য। এক সঙ্গে ক্লাস, এক সঙ্গে বের হয়ে আসা; করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়া। নোট টুকে নেবার ছল করে, কথা বলার সুযোগ—এত সব ভেবে মুকুল বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়বে বলে ঠিক করেছে। আর সেই নিয়ে মুকুলের বাড়িতে ঝড় উঠে গেছে।

    ক্রমে সাঁঝ নেমে এল। ইস্টিশনে আলো জ্বলছে। শহরের রাস্তায় আলো। আজ আর তবে দু বন্ধুতে সাইকেলে বালিরঘাটে জ্যোৎস্না দেখতে যাওয়া হল না। দিগন্ত প্রসারিত মাঠে নেমে জ্যোৎস্নায় ডুবে যাওয়া আমাদের বিলাস। আমি চুপ মেরে বসে থাকি, মুকুল গলা ছেড়ে গান ধরে—দিবস রজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি। আমি তখন আর বিলু থাকি না, মুকুল তখন আর মুকুল থাকে না। এক রাজার পৃথিবী আমাদের সামনে। মাথায় উষ্ণীষ, এক হাতে তরবারি, অন্য হাতে ঘোড়ার লাগাম-পেছনে বসে আছে রাজকন্যা সংযুক্তা। পৃথ্বিরাজ জয়চন্দ্রের কন্যা হরণ করে পালাচ্ছে।

    সব যুগেই এই পৃথ্বিরাজদের কপালে দুঃখ থাকে।

    বললাম, এবারে ওঠো। আমাদের সাহসী হওয়া দরকার।

    —তুমি বলছ সাহসী হতে?

    —আলবত।

    আমার মধ্যে মুকুল নুতন কিছু যেন আবিষ্কার করে মনমরা ভাবটা কাটিয়ে ফেলল। আমি এভাবে কখনও কথা বলি না। কথা সব আমার মনের সঙ্গে। বাইরের লোক দেখলে ভাবে আমি এক বিষণ্ণ মানুষ। মুকুল নিজেও এ অনুযোগ করেছে বার বার। বিলু তুমি এত বিষণ্ণ থাক কেন? এত কম কথা বল কেন? আজ আমার মধ্যে সেই বিষণ্ণতা টের না পেয়ে সে অবাকই হয়ে গেছে। এ যেন অন্য এক বিলু তার সঙ্গে কথা বলছে। দারিদ্র্য বিলুকে তবে আর পঙ্গু করে রাখতে পারছে না। দুর্জয় সাহসের অধিকারী বিলু। বলল, বিলু পারবে ফেস করতে?

    —দেখ পারি কি না?

    মুকুল বলল, তুমি পারবে। চল। নো কম্প্রোমাইজ। যদি বলে, রুদ্রাক্ষ ছদ্মনাম তোমার? বলব, হ্যাঁ! যদি বলে তুমি চৈতিকে নিয়ে কাব্য করেছ? বলব, হ্যাঁ। যদি বলে চৈতিকে নিয়ে তোমার এত কাব্য করার বাসনা কেন? বলব হ্যাঁ, বাসনা থাকে। আপনারও ছিল। মাস্টারি করে করে সব হারিয়েছেন। বিয়ে থা করলেন না। সময়ে বিয়ে না করে পস্তালেন। চৈতির জীবন আমি নষ্ট হতে দেব না।

    আমরা ফিরছি। মুকুলের আবেগ এসে গেছে। আমার বলার ইচ্ছে ছিল, এত বলার দরকার হবে না।

    তার আগেই কাট।

    হঠাৎ মুকুল থেমে গেল। কী ব্যাপার বিলু তুমি কিছু বলছ না? যা বললাম, ঠিক বলিনি?

    মনের কথা ফস করে বেরিয়ে গেল—এত বলার দরকার হবে না। তার আগেই কাট।

    —কার্ট মানে?

    —চিত্রনাট্য দেখছিলাম। তাতে কাট কথাটার খুব ব্যবহার।

    —চিত্রনাট্য দেখছিলে মানে?

    —আরে সেদিন বিমল কলকাতা থেকে নাটকের কাগজ নিয়ে এল না।

    বিমলই আমাদের মধ্যে একমাত্র নাটকের চর্চা করে। সে কলকাতায় গেলে নাটক সম্পর্কিত যত কাগজ পায় নিয়ে আসে। সেই আমার কাছে কাগজটা দেখার জন্য রেখে গিয়েছিল। কী সুন্দর ছাপা! পরিচ্ছন্ন কাগজ। আমাদের অপরূপার কোনো অঙ্গসজ্জা নেই। কাগজটার পাশে অপরূপা খুবই ম্যাড়মেড়ে। ইচ্ছে ছিল কাগজটা পরীকে দেখাব। পরী দেখলেই তার বাসনা হবে অপরূপাকেও সেভাবে সাজানো যায় কি না। কারণ কাগজটা তো আমাদের প্রাণ। কাগজের সম্পাদক আমি, কাগজের তিন- চতুর্থাংশের ইজ্জত আমার। আমার ইজ্জত বাড়লে পরী কেন জানি গর্ববোধ করে। কিন্তু একে একে এমন সব জটিলতা এসে জুটবে, কে জানত! যে-পরী কাগজের সব, তাকে নিয়েই বাড়িতে চরম অশান্তি।

    পরীর দাদু যেতে বলেছে। মুকুলকে সঙ্গে নিয়ে গেলে হয়। কিন্তু মুকুল গেলে পরীর দাদু কিছু নাও বলতে পারেন। অবশ্য উপরে নিয়ে যেতে পারেন তিনি। মুকুলকে একা নিচে রেখে উপরে যাওয়া ঠিক শোভন হবে না। মুকুল বড় সেনসিটিভ। একা যেতেও ভয় করছে। এই ভয় থেকে মুকুলের কাছে চলে আসা। অথচ বলতে পারছি না, জান পরীর বিয়ে নিয়ে অশান্তি দেখা দিয়েছে। পরীর বিয়ে শুনলে, সবাই সটকে পড়বে।—বল কী! পরীর বিয়ে! কার সঙ্গে। পরী রাজি! পড়বে না! কলেজ করবে না! আমাদের কাগজের কী হবে!

    আমার প্রাইমারী ইস্কুলের মাস্টারি করায় পরীর যাই ক্ষোভ থাকুক যতই ভয় দেখিয়ে যাক, তোমাদের কাগজে পরী আর নেই—কিন্তু মুকুল প্রণব সুধীনবাবুরা জানে, আমি সামনে গিয়ে দাঁড়ালে পরীর সব ক্ষোভ জল হয়ে যাবে। ওরা বোঝে বিলুর চরিত্রে এমন একটা ব্যক্তিত্ব আছে যা পরীর মতো মেয়েকেও ভাবায়। কাগজের আর্থিক দিকটায় কোনো জটিলতা দেখা দিলেই পরীর সামনে ওরা আমাকে ঠেলে দেয়।

    সেই পরীর বিয়ে ঠিক, পরী রাজি নয়, পরীর চোখ বসে গেছে, যেন বড় একটা অসুখ থেকে উঠেছে দেখলে মনে হয়—আর সেই চিৎকার, দাদু জান না, তুমি জান না, ও আমার কত বড় শত্রু। সেই হাহাকারের ছবি চোখে ভেসে উঠলেই আমি স্থির থাকতে পারি না। রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। কাউকে বলতেও পারি না।

    আমার বুকের মধ্যে টনটন করতে থাকে— বলি, পরী সত্যি আমি তোমার সব চেয়ে বড় শত্রু। আমার শত্রুতার শেষ নেই।

    বাবাঠাকুরের কাছে যাইনি, এও এক ধরনের শত্রুতা। সব দায়ভার আমার উপর অর্পণ করে বসে আছ, আমার উপর তোমার প্রবল বিশ্বাস-কথা যখন দিয়েছি বাবাঠাকুরের কাছে যাব। আমি না গিয়ে থাকতে পারব না। এখন বুঝতে পারছি এ যাওয়াটা আমার পক্ষে কত কঠিন। – আচ্ছা এক কাজ করলে হয় না?

    আমরা কিছুক্ষণ দুজন চুপচাপ হাঁটছিলাম। কথা বলছিলাম না। ‘কাট’ চিত্রনাট্যে ব্যবহার হয়ে থাকে। পরিচালক তার কাহিনী বিন্যাস অনেকগুলো দৃশ্যে ভাগ করে নেয়। অর্থাৎ এক একটা শট তোলার পরই কাট। আমার কাছে ‘কার্ট এই শব্দটি অনেকভাবে এখন প্রযোজ্য। মনের মধ্যে ‘কার্ট’ রয়ে গেছে। আচ্ছা এক কাজ করলে হয় না—কথাগুলি পরী সংক্রান্ত চিন্তা ভাবনা থেকে মুখ ফসকে বের হয়ে গেছে। মুকুল বুঝল চৈতালি সম্পর্কে কোনো নুতন পন্থা মাথায় আমার এসেছে। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, কী কাজ করলে হয় না বিলু?

    আমি কী বলি!

    এটা যে আমার নিজেরই সলিলকি বোঝাই কী করে! মুকুলের এমন সঙ্কট মুহূর্তে নিজের জটিলতা নিয়ে অস্থির হয়ে উঠছি তাও তো বলতে পারছি না। মুকুল তবে ভাববে বিলুটা বড় স্বার্থপর। সে নিজেকে ছাড়া কিছু ভাবে না। নিজের মান অপমান ক্ষোভ নিয়ে ব্যস্ত।

    বললাম, না। মানে আমরা যদি এখন গিয়ে বলি, দেখুন আমরা সত্যি বাজে ছেলে নই। বাঁদর নই। কারণ আমরা এখন জ্যোৎস্নায় হেঁটে যেতে চাই। জ্যোৎস্না আমাদের চারপাশে এখন খেলা করে বেড়াচ্ছে। কত রকমের প্রজাপতি উড়ছে আমাদের চারপাশে। কত রকমের গাছ আমাদের ছায়া দেয়। আমরা তারই সৌন্দর্যে বিভোর। নারী আমাদের কাছে এখন দেবী ছাড়া কিছু নয়। সব তরুণীই আরাধ্যা দেবী। এখন আমাদের কোনো বাসনা নেই। বরং চৈতালির যে কোনো অপমান আমাদের অপমান। চৈতালিকে খাটো করলে আমরাই খাটো হয়ে যাব। রুদ্রাক্ষ চৈতালির সৌন্দর্যের পূজারী।

    মুকুল অবাক হয়ে বলল, পারবে বলতে?

    —পারব না কেন?

    মুকুল সহসা যেন আলোর খোঁজ পেয়ে গেছে। ওর মধ্যে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়েছে কেউ। সে ঘুসি পাকিয়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দিল তার দুঃখ। সে বলল, পারতে হবে। হাতের তালুতে আর এক ঘুসি মেরে বলল, সত্যের বিনাশ নেই। বিলু আমাদের পারতেই হবে। কিছুতেই হেরে যাব না।

    তারপর থেমে আমার মুখের দিকে তাকাল। কী ভাবল কে জানে! সে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, আমরা হেরে যাবার জন্য জন্মাইনি। আমরা হারব না।

    সে আমার হাত তুলে ইস্তাহার দেখাবার মতো অথবা শ্লোগান দেবার মতো বলল, বল, আমরা হারব না, হারব না।

    ওকে খুশি করার জন্য বললাম, আমরা হারব না, হারব না।

    আবার সে বলল, আমরা ভয় পাব না, ভয় পাব না।

    কিছুটা ছেলেমানুষী হয়ে যাচ্ছে ভেবে বললাম, ভয় পাবার কী আছে?

    —না তবু বল হাত তুলে, বজ্রমুষ্টি তুলে বল, আমরা ভয় পাব না, ভয় পাব না।

    পি ডব্লু ডি-র কোয়ার্টার্স থেকে ইস্টিশনের পথ অনেক দূরে। ক্রোশব্যাপী এই মাঠ— উত্তরে শহরের রাস্তা লালবাগের দিকে চলে গেছে। দক্ষিণে শহরের রাস্তা জেলের পাঁচিল ঘেঁসে মোহন সিনেমার পাশ দিয়ে ইস্টিশনের দিকে গেছে। ফাঁকা মাঠের মধ্যে আমরা যতই চিৎকার করি না কেন কেউ শুনতে পাবে না। জ্যোৎস্নায় কিছু জীব এখনও মাঠে চরে বেড়াচ্ছে। ওগুলো ধোপাদের গাধা। আমরা দুজন এবং কিছু গাধা বাদে, এই মাঠে অন্য কোনো প্রাণীর সাড়া নেই।

    মুকুল আবার বলল, আমরা ভালবাসব, বাসব।

    আমি চুপ করে আছি দেখে বলল, বল, একসঙ্গে বল, আমরা ভালবাসব, বাসব।

    বুঝতে পারছি মুকুল কী সাংঘাতিক নার্ভাস ফিল করছে। এখন না বলেও উপায় নেই। এমন বন্ধু না থাকলে আমার ইস্কুলের মাস্টারিটাই হত না। মিলের টিউশনি করতে গিয়ে কী অপমানের বোঝা না বইতে হত।

    ইস্কুলের মাস্টারিটা হয়ে যাওয়ায় কত বড় নিষ্কৃতি পরী যদি বুঝত।

    আমি কিছু না বলায় মুকুল বোধহয় আহত হয়েছে। আমি যে আমার মধ্যে থাকি না, মানুষের চিন্তা ভাবনার কোনো ধারাবাহিকতা থাকে না, আমরা ভালবাসব শ্লোগান আমার মাথায় ঢোকেনি, ক্ষণিকের মধ্যে কত স্মৃতি ভিড় করে এসেছিল মুকুলকে বোঝাই কি করে?

    বললাম, কী বলতে বলছ?

    —বল, আমরা ভালবাসব, বাসব।

    দুজনে সমস্বরে বললাম, আমরা ভালবাসব, বাসব।

    —আমাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।

    —কিসের অধিকার মুকুল?

    —কেন ভালবাসার অধিকার।

    —কাকে?

    —চৈতালিকে।

    আমি আর পারলাম না। বললাম, এ তো অর্জন করতে হয়। অধিকার অর্জন করতে হয়।

    —কী করে করব বুঝতে পারছি না।

    —আমিও ঠিক জানি না। তবে নিজেকে বড় করে তোলার মধ্যেই এই অর্জনের অধিকার জন্মায়। বড় অর্থে মুকুল আমি কৃতী হতে বলছি না, একজন গরিব মানুষও খুব বড় হতে পারেন—তাঁর চরিত্রই তাঁকে বড় করে। এত অধীর হলে চলবে কেন। নারীমহিমা সব মেয়েদের মধ্যেই আছে। বুঝতে পারছি আমাদের মধ্যে হ্যাংলামিটা একটু বেশি। চৈতালিকে নিয়ে আর একটি লাইনও নয়। এবার থেকে অন্য যারা আছে, তাদের কথা থাকবে। চৈতালিকে নিয়ে অপরূপায় আর একটি লাইনও নয়।

    —তবে এত খাটাখাটনি কার জন্য?

    —কেন নিজের জন্য!

    —ধুস আমার বয়ে গেছে।

    আমি বোঝালাম, শোন মুকুল, ভেবে দেখ—শহরে লীলা রত্না কম ভাল গায় না?

    —ভাল গায়।

    —সমর অধীরও জলসায় গায়।

    — গায়।

    —এরাই শহরের সব অনুষ্ঠানের মণি।

    —চৈতালিকে বাদ দিচ্ছ কেন?

    —চৈতালিও আছে। থাক না। একবার চৈতালিকে নিয়ে লেখা গেল, এবারে রত্নাকে নিয়ে। প্রফেশনাল জেলাসি বুঝলে না? তুমি রুদ্রাক্ষ একবার দয়া করে প্রমাণ কর, সব লেখাতেই তোমার কাব্য থাকে। আমি চাই কাব্যটা রত্নার বেলায় আর একটু বেশি থাকুক। আমরা খুবই নিরপেক্ষ এটা প্রমাণ করা দরকার।

    —নিরপেক্ষ প্রমাণ করব, কাগজ কী আর বের হবে? ওর গলায় ভারী হতাশার সুর।

    —কাগজ ঠিক বের হবে। কাগজ আমরা কিছুতেই বন্ধ হতে দেব না। কাগজ আমাদের কাছে এখন মর্যাদার প্রশ্ন

    আমরা এসে গেছি। দেবদারু গাছের ছায়া পার হলেই ওদের কোয়ার্টার্সের সামনেকার বাগান। মুকুলের দাদার ফুলের শখ। জবা, জুঁই বেলফুলের গাছ। গাছগুলিতে বেলফুল ফুটেছে। জ্যোৎস্নায় গাছে খই হয়ে ফুটে আছে। বেলফুলের সুগন্ধে সারাটা বাগান ম ম করছে। মুকুল থমকে গেছে। বাগানে ঢুকছে না। আমাকে ঠেলে দিচ্ছে।

    চৈতালির প্রতি আমার কোনো দুর্বলতা নেই। তবু কেন জানি মনে হয় চৈতালি আমাদের সঙ্গে খুবই বেমানান—ঠিক যেমন পরী, সব সুন্দরী তরুণীরাই অন্য কারো জন্য যেন অপেক্ষা করে আছে। আমরা ফালতু। যত নিজেদের ফালতু মনে হয় তত কাব্যচর্চার প্রতি কেন জানি অনুরাগ জন্মায়। মাথায় এই অনুরাগের ঠেলা খেলে অনেক সাহসী কাগজ বের করে ফেলতে পারি। আর পারি বলেই লাফ দিয়ে বারান্দায় উঠে গেলাম। চৈতালির দিদিকে পরোয়া করি না। দেখলাম, বউদি একা বসে কী একটা বই পড়ছে। চৈতালির দিদি নেই।

    খুব সর্তক পায়ে ঢুকে বললাম, চলে গেছে?

    —কে?

    —মানে যে এসেছিল?

    বউদি হাহা করে হেসে দিল। তোমরা ওকে এত ভয় পাও কেন বল তো?

    —ভয়, না ভয় নয়। মানে-

    —মানে আর বোঝাতে হবে না। বন্ধুটি কোথায়

    —রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।

    —ডাক।

    আমি ডাকলাম, মুকুল ভয় নেই। চলে এস।

    মুকুল যেন কথাটার অর্থই ধরতে পারেনি—একেবারে তাজ্জব। সে বারান্দায় উঠে বলল, কে নেই! কার কথা বলছ!

    —যার থাকবার কথা ছিল!

    —তিনি কে? থাকলে আমার কী, না থাকলেই বা আমার কী। আমরা কারোর দাস নই। বউদি শাড়ি সামলে উঠে দাঁড়ালেন—বইয়ের ভাঁজে একটা কাগজ রেখে বললেন, তোমাদের কোকিলকণ্ঠী কলকাতায় চলে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হবে। আমার কাছ থেকে একটা চিঠি নিয়ে গেল। বড়দার কাছে চিঠি লিখতে হল।

    শুনে মুকুল আমি হতভম্ব।

    মুকুল কখন ঘর থেকে বের হয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেছে খেয়াল করিনি।

    —চিঠি কেন?

    —সুপারিশ।

    বউদির বড়দা প্রেসিডেন্সিতে পড়ায় জানি। নিজের দাদা নয়। বউদির বড় পিসিমার ছেলে। এটা বউদি আমাদের অনেক সময়ই শুনিয়েছেন। বউদির সুপারিশ তাহলে দরকার হয়। আর বউদির দেবরটি বাঁদর! বাড়িতে বাপু সুপারিশ চাইতে আসা কেন। কীরকম রাগ এবং বিদ্বেষ জন্মাল—স্বার্থপর— আমরা যা করি তাই অপছন্দ। বললাম, তুমি চিঠি দিলে কেন?

    বউদি আমার দিকে না তাকিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। যাবার সময় বলল, গেলে বাঁচি বাপু যা চলছে।

    তবে কী বউদিও চায় চৈতালি শহর ছেড়ে চলে যাক। চৈতালি মুকুলের মাথাটি চিবোচ্ছে। চৈতালি মুকুলের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে করে ছাড়বে। সব পক্ষই সমান। বউদি বুঝল না, আমাদের এই ভালবাসা বেঁচে থাকার রসদ। কবিতা লেখার রসদ। মুকুলের সব অনুপ্রেরণা এই মেয়েটি। সে চলে গেলে মুকুল ভারী ভেঙে পড়তে পারে। দিনে অন্তত একবার যাকে না দেখলে দিনটা বিফলে গেল এমন মনে করে—তার পক্ষে চৈতালির শহর ছেড়ে যাওয়া বড়ই হতাশা সৃষ্টি করবে। কাগজের জন্য মুকুলের খাটাখাটনি বৃথা মনে হবে। কাকে যে এখন চাঙ্গা করি। মুকুলকে না পরীকে। পরীকেও তো কথা দেওয়া আছে। না কোনোদিকে পথ পাচ্ছি না।

    ফুল স্পিডে পাখা চালিয়ে চেয়ারে বসে পড়লাম। আমাদের হয়ে কেউ ভাবে না। বউদিকে রাগিয়ে দেবার জন্য বললাম, চৈতালি চলে গেলেও মুকুল যা ভেবেছে তাই করবে।

    ঘর থেকে গলা বাড়িয়ে বউদি আমাকে দেখল। বলল, কী বললে?

    —না মানে, ও তো বলছে বাংলায় অর্নাস নেবেই।

    —নিক না। কে বারণ করেছে। আমরা আর কতদিন! বাবুর এখন পাখা গজিয়েছে। বাবুকে বলে দিও, জীবনটা এত সহজ নয়।

    আসলে বউদি তো মুকুলকে ছোট থেকে বড় করেছে। সন্তান-স্নেহ। বুঝি সব। সবসময় ভয় জীবনটা না মাটি হয়ে যায়। দুর্ভাবনা। দুর্ভাবনা কেবল দেখছি আমার বাবারই নেই। যা কপালে লেখা আছে তা নাকি খণ্ডাবার ক্ষমতা দেবতাদেরও নেই।

    পরীর দাদুর অনুগ্রহ লাভে বাবা খুবই খুশি। শহরের এমন জাঁদরেল মানুষ বাবাকে দেখে গাড়ি থামিয়ে নেমে এসেছেন, এটা বাবার ইহজীবনে সবচেয়ে বড় পুরস্কার। তাঁরই ইচ্ছে সব। না হলে একজন ছিন্নমূল মানুষের শেকড় চালিয়ে দেবার সময় এতসব সৌভাগ্যলাভ হয় কী করে। শুধু কী নেমে আসা। বাড়ির সবাইকার খোঁজখবর নিয়েছেন। পিলু পড়াশোনা করছে কিনা জানতে চেয়েছেন। দু-এক বছর বাদে পিলুর যে একটা হিল্লে হয়ে যাবে বাবা পরীর দাদুর কথাবার্তায় এমনও অনুমান করে এসেছেন। তাঁর পরিবারের পক্ষে মাথার উপর এত বড় মানুষের কৃপাদৃষ্টি পড়বে স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি।

    ও-ঘর থেকে মুকুলের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বউদি কখন এক কাপ চা, কিছু নোনতা বিস্কুট রেখে গেছে টেরই পাইনি। চোখ বুজে সোফায় গা এলিয়ে বসে আছি। আসলে মানুষ একসময় বড় হয় স্বপ্ন দেখতে দেখতে। স্বপ্নে সে রেলগাড়ি চালিয়ে দেয়। এক একটা ইস্টিশনে থামে, যাত্রী ওঠে, নেমে যায়, তারপর একসময় শেষ স্টেশনে গেলে, কেউ আর থাকে না। গাড়িটা আর সে। এখন আমি সেই রেলের চালক। বাবা-মা ভাইবোন নিয়ে রওনা হয়েছি –একটা নির্জন স্টেশনে কেউ দাঁড়িয়ে। তার আঁচল উড়ছে। নীল বাতির মতো জ্বলছে। সিগনালিং। গাড়িতে আর একজন উঠবে বলে স্টেশনে এসে অপেক্ষা করছে। তাকে এবার তুলে নাও।

    বউদি ডাকল, এই বিলু চা যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল! কার ধ্যানে মগ্ন হলে!

    তাকালাম।

    বউদি হাসল। বলল, বাবুকে ডাক।

    চেয়ে দেখি টেবিলে দু-কাপ চা। ডাকলাম, এই মুকুল, এস। ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

    —তুমি খাও।

    —আরে এস। বাংলায় অনার্স নিয়েই পড়বে। দাদা বউদি কিছু আর বলবে না!

    সহসা মুকুল লাফ দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে বলল, আমি কী নিয়ে পড়ব না পড়ব কাউকে ভাবতে হবে না। বলে চা নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল।

    বসে বসে চা-টুকু শেষ করলাম। পরীর দাদুর সঙ্গে দেখা না করে গেলে বাবার অনুযোগ শুনতে হবে। বাবা বলবেন, আমি ঠিক তোমাদের বুঝতে পারি না। নামী মানুষকে সম্মান দিতে তোমরা শেখনি। সম্মান দেখালে কেউ ছোট হয়ে যায় না। নিজেকে নিজে ছোট না করলে, কেউ তাকে ছোট করতে পারে না। তোমাদের মতিগতি আমি ঠিক বুঝতে পারি না। কী ভাববে মানুষটা! ভাবতে পারে, তোমার বাবার সংসারে কোনো নিয়মশৃঙ্খলা নেই। ভাবতে পারে, খবরটা আমি তোমাকে দিইনি। তোমার বাবার দায়িত্বজ্ঞান কম। এসবও তো তিনি ভাবতে পারেন। একবার দেখা করতে দোষ কোথায়।

    চটপট উঠে পড়লাম। –না যাওয়া দরকার। আমার জন্য না হলেও বাবার সম্মানের কথা ভেবে যাওয়া দরকার। মুকুলের ঘরে ঢুকে বললাম, যাচ্ছি। নতুন কপি সব ঠিক করে রেখ। প্রেসে দিয়ে দেব।

    মুকুল শুনল কী শুনল না বুঝলাম না। সে বলল, বউদি কী বলল? চৈতালির দিদি কেন এসেছিল? প্রেসিডেন্সিতে সত্যি ভর্তি হবে।

    —সুপারিশ পত্র নিতে

    —কার জন্য সুপারিশ?

    —চৈতালি সেনের হয়ে সুপারিশ পত্র লিখে দিলেন বউদি।

    —কার কাছে?

    —প্রেসিডেন্সির তোমাদের সেই আত্মীয়ের কাছে।

    —কেন? বউদি লিখতে গেল কেন?

    —সে তুমি জিজ্ঞেস করগে।

    চৈতালি সেন চলে গেলে এই শহরের জ্যোৎস্না মরে যাবে। চৈতালি সেন চলে গেলে, এই শহরের আর ফুল ফুটবে না। চৈতালি সেন চলে গেলে, লালদীঘির ধার, শহরের সদর রাস্তা, টাউন হল, সব নির্জন পরিত্যক্ত নগরী হয়ে যাবে। অন্তত একটা মানুষের কাছে এই শহর মৃতের শহর বলে মনে হবে। কথাটা বলি কী করে।

    মুকুল চায়ের কাপ নামিয়ে বলল, তুমি তবে বলবে না!

    কী আর করি। কেমন অসহায় চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে মুকুল, মনে হয় কিছুটা শুনেছে—সবটা শোনেনি। কিংবা সবটাই শুনেছে, আমার কাছে আবার জানতে চায় বউদির এটি ঠাট্টা কিনা। চৈতালি সেনকে নিয়ে বউদির ঠাট্টা-বিদ্রুপ আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। বললাম, চৈতালি সত্যি শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

    —আমাদের জন্য?

    —কী জানি! আমরা তো শিও দিইনি, টিজও করিনি। কেন যে চলে যাচ্ছে!

    —ঠিক জান চলে যাচ্ছে?

    —তাই তো বউদি বলল। প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হবে।

    মুকুল মাথা নিচু করে কী ভাবল। তারপর বলল, আচ্ছা বিলু এক কাজ করলে হয় না?

    -কী কাজ!

    —আমি চৈতালি সেনের কাঁটা!

    —তুমি কাঁটা হবে কেন!

    —না হলে চলে যাবে কেন। ভাবছি আমিই বরং চলে যাব। এ শহরে চৈতালি না থাকলে শহরটা অর্থহীন হয়ে যাবে।

    —কী আজেবাজে বকছ?

    —আজেবাজে বকছি না। একটা শহর/বাঁচে, বেঁচে থাকে/ সেই নারী যবে হেঁটে যায় অকুস্থলে। কী কারণ জানি না/ বাঁচি না আমি/ আমার আত্মা খাঁচায় আছে জানি/ সেই আত্মার জন্য, নীল আকাশ চাই চাই ঘরবাড়ি / বাড়ি আছে গাছ নাই, ফুল আছে পাখি নাই, নদী আছে জল নাই— সব শূন্য/অন্ধকারে ডুবে আছে গভীর নক্ষত্র।

    মুকুল তার একটি প্রিয় কবিতা বলে শুয়ে পড়ল। পাশ ফিরে মুখ লুকাল।

    আমি ওর পাশে বসলাম, বললাম, মুকুল চৈতালি না থাকুক আমরা তো আছি। ছেলেমানুষী করতে যেও না। তুমি চলে গেলে বালির ঘাটে গিয়ে আমার সঙ্গে কে তবে জ্যোৎস্না দেখবে। ভেবে দেখ তো সেই জ্যোৎস্না, বালিরঘাট, বাদশাহি সড়ক, বাঁশের সাঁকো কত কবিতার জন্মই না দিয়েছে। একা চৈতালি সেন সব কবিতার জন্ম দেয় না মুকুল! আমরাও আছি। তুমি না থাকলে আমি কত একা হয়ে যাব।

    মুকুল কী ভেবে বলল, সারাটা দিন আমি ভাল ছিলাম না। দাদা বউদির সঙ্গে ঝগড়া করেছি। একটা স্বার্থপর মেয়েকে না ভালবাসাই ভাল।

    —এই তো চাই।

    মুকুল উঠে বসল। দীর্ঘকায় মনে হচ্ছে মুকুলকে। ভরাট গাল, রেশমের মত নরম দাড়ি গালে, একমাথা ঘন চুল ব্যাকব্রাশ করা, পাঞ্জাবি গায়ে গেরুয়া রঙের বাহার যাকে বলে, এমন সুপুরুষ যেন আমার চোখে কমই ঠেকেছে। মুকুলের স্বভাব, আত্মপ্রত্যয় ফিরে পাবার জন্য ঘুসি পাকিয়ে কথা বলা—সে বলল, আমাদের একটা কিছু করতেই হবে। আমরা দূরে যাবই। সেই বহুদুরে, যেখানে অচলা পার্বতী সব বিষপান করে শিবের সঙ্গিনী। সেখানে আমরা যাবই।

    —আমাদের যেতেই হবে।

    এই যেতেই হবে বলে বেরিয়ে পড়ার সময় বললাম, তাহলে বলে যাই।

    —কী বলবে?

    —বউদিকে বলে যাই তুমি ইকনমিক্স-এ অনার্স নিয়ে পড়বে।

    —আমার না হয় হল, তোমার কী হবে?

    —কেন মাস্টারি করব। প্রাইমারী ইস্কুলের মাস্টার। দারুণ। ভাবা যায় না। কোনো দায় নেই, শুধু পড়িয়ে খালাস। তারপর মুক্ত স্বাধীন। তারপর আমার সাইকেল, আর বাদশাহি সড়ক। তারপর, শহরে বিকেল নেমে আসবে, গাছপালার ছায়ায় আমি চলে আসব তোমার কাছে। তারপর আমরা যাব, ধোবিখানার মাঠে। সেখানে সবাই মিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাহিত্যচর্চা। আর অপরূপা তো থাকলই। সে আমাদের সব। আর কিছু না পারি একটা কাগজকে ভালবাসা কম কথা নয়। কাগজ তো নয়, লিটল ম্যাগাজিন। সব নতুন কথা, নতুন খবর মানুষের ঠিকানায় পৌঁছে দেব। পুরনো সব ঝেড়ে ফেলতে হবে। নতুন জেনারেশন তৈরী হচ্ছে, আমাদের কাগজটা হবে তারই মুখপত্র। কোথাও বেঁচে না থাকতে পারি, কাগজটার মধ্যে অন্তত বেঁচে থাকতে পারব।

    আসলে মুকুল বুঝতে পারছে, ওর ভেতরে যে ঝড় উঠেছিল তার প্রশমন হওয়ায় সে দারুণ খুশি। আমার আর কোনো সম্বল নেই—বাবার দীনেশবাবু আছেন, মানুকাকা আছেন, ইদানীং পরীর দাদু সম্বল হয়ে গেছে, কিন্তু আমার মতো করে আমাকে দেখার পাশে কেউ নেই—একমাত্র মুকুল, মুকুল সেটা জানে, বোঝে। বোঝে বলেই আবেগের চোটে এত কথা বলে যাচ্ছি তা ধরতে পারি। এমনিতে আমি খুব কম কথা বলি, সাহিত্যচর্চার আসরেও একমাত্র মুকুল আর আমি এক সঙ্গে থাকলে কখন প্রগলভতা দেখা দেয়। মুকুল সব সময় মেনে নেয় আমার এই প্রগলভতা।

    মুকুল বলল, সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু মিমি তো মিছে বলেনি। ইস্কুলের মাস্টারি জামাইবাবুকে ধরপাকড় করে না দিলেই ভাল ছিল। সত্যি বোধহয় তোমার ভবিষ্যৎ ঝরঝরে করে দিলাম।

    হাহা করে হেসে ফেললাম—হেসে ফেললাম জোর করে। বিষয়টাকে উড়িয়ে দেবার অথবা হালকা করার আর কোনো পথ জানা ছিল না। বললাম, বাদ দাও মিমির কথা।

    —কি বলছ! মিমি তোমার জন্য কত ভাবে! আর তুমি একথা বলছ!

    —মিমি আর কদ্দিন!

    —কেন, কদ্দিন মানে!

    একটু রসিকতা করার প্রলোভনে, আসলে রসিকতা নয়, কোনো গুরুত্বই দিচ্ছি না প্রমাণ করার জন্য বলা, যদিদং হৃদয়ং মম…তারপর কী যেন আর সহসাই মনে হল এ কী ছলনা করছি নিজের সঙ্গে!

    —তার মানে!

    কোনো জবাব দিতে পারছি না। সব কেমন বিস্বাদ ঠেকছে। বললাম, ও কিছু না। যাই।

    মুকুল আমাকে এগিয়ে দেবার জন্য সাইকেল বের করছে। সে আমাকে রোজ রেল গুমটি পর্যন্ত রাতে এগিয়ে দিয়ে আসে। কিছুতেই ছাড়তে চায় না। সাইকেল বের করার আগে দরজায় উঁকি মেরে বললাম, বউদি যাই।

    বউদির সেই কথা, সাবধানে যেও।

    মুকুল বারান্দার নিচে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুটা পথ আমরা পাশাপাশি হাঁটব। দুজনের হাতে সাইকেল। কিছুটা পথ দুজনে সাইকেলে পাশপাশি, কিছুক্ষণ আবার গাছের ছায়ায় বসে থাকা কিংবা সাহেবদের কবরখানার কালভার্টে। কিছুতেই ছেড়ে আসতে ইচ্ছা হয় না। বাড়িতে মা-বাবা চিন্তা করে, পিলুটা রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে—এ সবের টান না থাকলে আমি যেন ফেরার কথা ভুলেই যেতাম।

    সাইকেল বের করার সময় মুকুলই মনে করিয়ে দিল, বউদিকে বললে না।

    —ওঃ ভুলেই গেছি। ও বউদি, বউদি শোনো।

    বউদি বোধহয় মুকুলের ঘরের বিছানার চাদর পাল্টাচ্ছিল— কিংবা বিছানার লণ্ডভণ্ড অবস্থা ঠিকঠাক করছিল-আসতে পারছে না ঘর থেকেই বলল, এত চেঁচাচ্ছ কেন। বলতে পার না। আমি কালা না কিরে বাবা!

    —বউদি, মুকুল ইকনমিক্স-এ অনার্স নেবে। দুজনে বসে অনেক আলোচনার পর এটাই ঠিক হল!

    বউদির ভারী গম্ভীর গলা— সে বাবু যা ভাল বুঝবেন, করবেন। তোমরা যা ভাল বুঝবে করবে।

    আসলে সংসারে যে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত, কী খাবে, পরবে সব ঠিক রাখে, তারই কোনো গুরুত্ব নেই। দু’বছরের মধ্যে কোথাকার এক বিলু এসে মাথার উপর বসে গেছে।

    বউদির অভিমানটা কোথায় টের পাই। বউদি কী জানে না—একটা বয়সে মা-বাবা, ভাইবোন, একটা বয়সে সমবয়সী বন্ধুবান্ধব, আর একটা বয়সে চৈতালি সেন। চৈতালি সেন এলেই জীবনের একটা মহৎ পর্ব শেষ। এই পর্বটার কথা মানুষ কোথাও গিয়ে ভুলতে পারে না—এই পর্বটা বড় রহস্যময়, এই পর্বটা আছে বলেই পৃথিবীটা মানুষের কছে চিরদিন বেঁচে থাকার কথা বলে। সে যখন সব হারায়, তার এই পর্বটা, নদীর পারে কোন দূরবর্তী খেয়ার মতো থেকে যায়।

    বউদির কোথায় লেগেছে বুঝি। বউদির ধারণা, আমি বুঝিয়ে সুজিয়ে মত পাল্টেছি। আসলে তো অন্য ব্যাপার। চৈতালি কলকাতায় চলে গেলে বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়ার আর কোনো মানে থাকছে না। আসল কারণ সেটাই। কিন্তু এসব কথা তো আর বউদিকে বলা যায় না।

    রাস্তায় নেমে আসতেই শরতের এক আকাশ নক্ষত্র আর জ্যোৎস্না ঝপ করে মাথার উপর নেমে এল। লালদীঘির ধারে নতুন নতুন বাড়ি উঠছে। কত রকম ফ্যাশানের বাড়ি। বাড়ির সামনে ফুলের বাগান। শৌখিন মানুষেরা এখানে থাকে। জানালায় লাল নীল রঙের পর্দা। ভিতরে নিয়ন আলো। কোনো জানালায় সদ্য যুবতী হবে বলে বসে আছে মেয়ের মেঘলা করুণ মুখ। সবই আমাদের চোখে পড়ে। বিশাল দীঘির জল নিস্তরঙ্গ। নির্জন জ্যোৎস্না সেখানে খেলা করে বেড়াচ্ছে। আমরা দুই সদ্য যুবক হয়ে ওঠা পুরুষ চারপাশে নারী অন্বেষণে থাকি। স্বপ্নে তারা আসে। কখনও কোনো ফুলের উপত্যকায় হাত ধরে নিয়ে যায়। সহবাসের হাহাকার ভেতরে। এই হাহাকার নারীকে অপার মহিমায় আমাদের কাছে সাজিয়ে তুলছেন এক অদৃশ্য শক্তি—যেতে যেতে টের পাই। আমাদের যা কিছু আমাদের বড় হওয়া তারই জন্য এমন মনে হয়। যে-পথে সে হাঁটে বড় পবিত্র মনে হয়।

    তখনই মুকুল বলল, যেখানেই যাক ছাড়া পাবে না। আমরা তাকে ছাড়ব না! তাকে ভালবাসবই।

    কার সম্পর্কে মুকুলের এই ক্ষোভ বুঝি। সব কথাতেই মুকুল আমি না বলে আমরা বলে। আমরা যেন একটা কোড। আমরা অর্থাৎ এই যারা আমাদের মতো বয়সী মানুষেরা বড় হচ্ছে, তাদের কাছ থেকে চৈতালি সেনদের আত্মরক্ষার কোনো উপায়ই নেই।

    ‘আমরা’ আরও নতুন অর্থ বয়ে আনে আমাদের কাছে। আমরা চৈতালি সেনকে ভালবাসব। এই ‘আমরা’ অর্থে আমি এবং মুকুল। মুকুল মাঝে মাঝেই বলবে চৈতালিকে আমরা দুজনেই ভালবাসব। কী বল! যেন চৈতালির মতো মেয়ের পক্ষে একজনের ভালবাসা যথেষ্ট নয়। তার জন্য দুজন পুরুষ দরকার।

    ঠাট্টা করে বলতাম, কিন্তু এক ঘরে দুজনে ঢুকব কী করে?

    —কেন, দ্রৌপদী যদি পঞ্চপাণ্ডব সামলাতে পারে, চৈতালি আমাদের দুজনকে সামলাতে পারবে না।

    —পারবে তবে অসুবিধা আছে।

    —না কোনো অসুবিধা নেই। তোমার জুতো দেখলেই বুঝব, ঘরের ভেতর তুমি আছ। আমার দেখলে বুঝবে আমি আছি।

    —তা হলে বলছ, দু-রকমের দু জোড়া।

    —তাই। তবে আর কোনো অসুবিধা থাকবে না। কী ঠিক বলিনি।

    —ঠিক না বলে আমার উপায় থাকে না। যে মেয়ে আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে, তার জন্য দু জোড়া কেন, পাঁচ জোড়া থাকলেও অসুবিধা হবার কথা না

    মুকুল ভারী তৃপ্তি পেত এমন সব আজগুবি চিন্তা-ভাবনা করে। পুরুষের কাছে মেয়েদের এই নারীমহিমার কথা চৈতালির দিদিরা টেরই পেল না। আইবুড়ো হয়ে থাকল -কিসের অপেক্ষাতে আমাদের মাথায় সেটা কিছুতেই আসে না।

    লালদীঘির পাড় ধরে আমরা হেঁটে যাই। কিছু মানুষজনের চলাফেরা, একটা রিকশা চলে গেল, আমরা এত অন্যমনস্ক থাকি যে রাস্তাটার ধার ধরে হাঁটতে হয়। সাইকেলে উঠি না। সাইকেলে উঠলেই রাস্তাটা কেমন খুব ছোট হয়ে যায়। যেন উঠতে না উঠতেই রাস্তা শেষ। শহর থেকে রেল-লাইনের দিকে যে রাস্তা গেছে, সেখানে এলে আমরা সাইকেলে চাপি। ধীরে ধীরে, হাওয়া খেতে খেতে এগোনো। আসলে বুঝতে পারি, বাড়ি গেলেই কেন জানি একা হয়ে যাই। কারো পাশে থাকার কথা যেন। সে না থাকায় অর্থহীন মনে হয় সব কিছু।

    বাড়ি যেতেই দেখলাম পিলু দৌড়ে আসছে। পিলু দৌড়ে এলেই বুঝি, বাড়িতে আমাদের জন্য কেউ সুখবর বয়ে এনেছে। খবরটা আগে পিলু দিতে না পারলে শাস্তি পায় না। কতক্ষণে দাদাকে বলবে, জানিস দাদা, আজ না……।

    শিলু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, দাদা আজ না….

    —আজ কি?

    —আজ না, মিমিদির দাদু এসেছিল।

    বুকটা কেমন কেঁপে উঠল। আমার যাবার কথা ছিল, যাইনি বলে নিজেই হাজির। পরীর কিছু হয়নি তো! শহরের এতবড় মানী মানুষ, এমন একটা জঙ্গলের মধ্যে হাজির হয়েছিল।

    বললাম, কেন এসেছিল? পরী পাঠিয়েছে?

    —পরীদি পাঠাবে কেন? পরীদি কিছু জানেই না। বাবাকে বলল, দশ কান করবেন না। চেষ্টা করছি, মনে হয় হয়ে যাবে।

    সাইকেল থেকে নামতে লণ্ঠনের আলোয় বারান্দায় বাবাকে দেখা গেল। মা পাশে বসে আছে। দুজনকে একসঙ্গে পাশাপাশি বসে পুত্রের ফেরার আশায় থাকতে কোনোদিন দেখিনি। বাবাকে মা তালপাতার পাখায় হাওয়া করছে।

    বুঝতে পারছি, আমাদের পরিবারের পক্ষে বড়ই সুখবর কেউ দিয়ে গেছে আজ। মা বাবা সবাই বড় বেশি প্রসন্ন। আমাকে দেখেই বাবা বলবেন, সাইকেলটা রেখে বিশ্রাম কর। পিলু তোর দাদার সাইকেলটা তুলে রাখ। মায়া যা, দাদাকে এক বালতি হাতমুখ ধোবার জল এনে দে।

    বারান্দায় একটা জলচৌকি, কাঠের চেয়ার। মার তাগাদাতেই এসব করা। বাড়িঘর হয়ে যাওয়ার পর আরও কত কাজ বাকি থাকে বাবাকে দেখে বুঝতে পারছি। যজন যাজনে সংসার চলে, যজমানরা কেউ কেউ বেশ সচ্ছল। শুভদিন, শুভযাত্রা, পূজা-আর্চ্চার বিধি এসব জানতে তারা আসে। বসতে দেবার কিছু না থাকলে ঘরবাড়ির সুনাম নষ্ট। মা লেগে থেকে হালে এ দুটো মূল্যবান জিনিস মিস্ত্রি লাগিয়ে করে নিয়েছে। প্রতিবেশীদের কার বাড়িতে কী নতুন জিনিস এল মার কানে পিলু তুলবেই। কিংবা বিকালে মা এর-ওর বাড়ি গেলে দেখতে পায় বালতি, পেতলের হাঁড়ি। কবে কিনলি আকাশীর মা। সের দুই চালের খিচুড়ি ধরবে। মার কাছে পেতলের ডেগ, পেতলের বালতি, পেতলের ঘটি সোনার চেয়েও দামী। বাড়ি ফিরে অপ্রসন্ন মুখে শুধু অভিযোগ, কিছু নেই, এই যে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা আসছে, একটা পেতলের ডেগ লাগে না। চেয়ে চিনতে কাহাতক আনা যায়। বাবা তখনই বুঝতে পারেন হয়ে গেল, কিনে না আনা পর্যন্ত সময়ে অসময়ে মার চণ্ডীপাঠ শুরু হয়ে যাবে।

    আজ অন্যরকম। জলচৌকিতে বসতেই বাবা বললেন, ঈশ্বরের করুণাই সব। তাঁর কী মর্জি কেউ বুঝতে পারে না।

    বাবা আমাকে কিছু বলবেন, তারই প্রস্তুতিতে এসব ভাষণ। আমি চুপচাপ আছি। পরীর দাদু কেন এসেছিল, জানার যেন বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। বড়লোকদের সম্পর্কে আমার ভাল ধারণা নেই। মনে হয় এই অর্থ প্রতিপত্তির পেছনে বড় রকমের কোনো অনাচার কাজ করছে। এঁরা সাধু পুরুষ নন। মানুষ তার পরিশ্রমের বিনিময়ে কতটা উপার্জন করতে পারে আমি বুঝি। পরীদের যা বৈভব, তা রক্ষা করতে কোথাও কারও চোখ উপড়ে ফেলা হচ্ছে না, আমি বিশ্বাস করতে পারি না। শহরের রাস্তাঘাট ধরে যাবার সময় বিশাল বিশাল বাড়িঘর দেখলেও এটা মনে হয়। এরা কেউ সৎভাবে বেঁচে নেই। সৎভাবে একজন মানুষের উপার্জন এত প্রাচুর্য এনে দেয় না—এটা আমার বিশ্বাস। পরীদের বাড়ি গেলে এটা আমার আরও বেশি মনে হয়। দাবার কূট চালে এরা প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ঘোড়া হাতি সব কেড়ে নিয়েছেন। সেই মানুষ আমাদের কলোনিতে এলে, বাবার গর্ব বোধ হতে পারে, আমার কেন জানি হয় না। বাবার প্রচণ্ড ঈশ্বর বিশ্বাসও মাঝে মাঝে আমাকে ক্ষোভের শিকার করে তোলে। ভেতরে চটে যাই—বাবা কষ্ট পাবেন বলে কিছু প্রকাশ করি না। যতটা পারি কম কথা বলি। হাঁ হুঁ এই পর্যন্ত।

    মায়া বারান্দার নিচে এক বালতি জল রেখে ঘরে গামছা আনতে গেল। চিরদিনই কিছুটা গম্ভীর এবং কম কথার মানুষ আমি। বাবার জন্যই যেন এটা হয়েছে আমার। আমার বাবা একজন অপরিচিত মানুষের কাছে যে ভাবে ঘরবাড়ির কথা খোলাখুলি বলে দেন- আমার তা পছন্দ নয়। আমার সম্পর্কেই তাঁর বেশি গৌরব। এই যে বিলুটা আই এ পাশ করল সোজা কথা। আই এ পাশ করলে সরকারি কাজ পাবেই। পাবে না মানে– প্রাথমিক ইস্কুলের মাস্টারি বেশিদিন করবে না। ঠেকা দেওয়া, চেষ্টা- চরিত্র চলছে, মানুও চেষ্টা-চরিত্র করছে। লোকের কাছে এমন শুনলেই আমার মাথা আর ঠিক রাখতে পারতাম না।—রাখেন তো আপনার মানু! তিনি আমাকে বাসের কনডাকটার করতে পারলেন না এটাই তাঁর জ্বালা। আমি সব বুঝি বাবা। নিজের ছেলেগুলো সব চোর বাটপাড় হচ্ছে, আপনার ছেলের ভাল তিনি চাইবেন কেন! না হলে একটা গ্যারেজে আমাকে ঢোকায়!

    এ-সব কথাবার্তা রাতে খেতে বসলেই বেশি হয়।

    বাবা বলতেন, মানু কী জানত গোবিন্দ তোকে মারধর করবে।

    —গ্যারেজে কী হয় আপনি জানেন না বাবা! আর বাবাকে তো বলাও যায় না, কত রকমের কুৎসিত কথাবার্তা হয়। আমাকে যার তার বাচ্চা বলে গাল দেয়। বাবাকে এইসব খিস্তিখাস্তার কথা বলতেও পারি না, অথচ বাবার মানুপ্রীতি আমার মধ্যে চরম ক্ষোভের সঞ্চার করে। সেই জ্বালায় দেশান্তরী হয়েছিলাম। ভাগ্যিস ছোড়দি ছিল। না হলে হয়ত এ-জীবনে আর ফেরাই হত না, পড়াও হত না, পরীর সঙ্গে দেখাও হত না।

    বাবার এই এক স্বভাব, কারো কাছে এতটুকু উপকার পেলে বর্তে যান। আমরা ছিন্নমূল হবার পর নানা জায়গায় ঘুরেফিরে শেষ পর্যন্ত বাবার খুবই নিকট আত্মীয় মানুকাকার বাসায় এসে উঠেছিলাম। চার-পাঁচ বছর আগে বাবা এই উঠতে পারার কৃতজ্ঞতায়, এখনও এক কথা, মানুটা না থাকলে কী যে হত!

    —দোষ নেই। গুণই বা কী আছে। ক্যাম্পে যান দাদা—ক্যাম্পে নাম লিখিয়ে দিচ্ছি। সোনার হারটা বন্ধক ছিল, সেটা নাকি সুদেই উশুল হয়ে গেল। দু-ভরির হার। ভাগ্যিস আর তোমার ভাইয়ের বুদ্ধিতে পড়িনি। সব বিক্রি করে এই জমি। থাকলে আমাদের সর্বস্বান্ত করে ছাড়ত।

    বাবার তখন আপ্তবাক্য—কেউ কাউকে সর্বস্বান্ত করতে পারে না ধনবউ। নিজে সর্বস্বান্ত না হলে, কেউ কাউকে সর্বস্বান্ত করতে পারে না।

    এখন আর বাবার সেই চরম আপ্তবাক্যটি আমাদের শুনতে হয় না। নতুন নতুন আপ্তবাক্য বাবা এখন ঝোলায় সংগ্রহ করে রাখছেন।

    একদিন কী কারণে মা’র ক্ষোভ বাবার উপরে চরমে উঠলে, কেঁদে ফেলেছিল মা–তোমার মানুভাই, বুঝলে তোমার পরম আত্মীয় আমার দু-ভরির হারটি বন্ধকই দেয়নি। তুমি ফুসলালে বলে দিয়েছিলাম। তুমিই তো বললে,—মানুর বাসায় উঠেছি, একা এতগুলি পেট চালাবে কী করে। কিছু থাকলে দাও। ওর হাতে দিই। বন্ধক দিয়ে কিছু যদি মেলে। ও টাকাটা হাতে ধরে দিতে পারলে, সময় পাওয়া যাবে—ঠিক কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

    আমরা জানতাম, মা’র স্বর্ণালঙ্কার নেই। ইস্টিশনে পড়ে থেকেছি, ভাঙা মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছি, দু-একটা অলঙ্কার যে মা বাবার হাতে তুলে দেয়নি অন্ন সংস্থানের জন্য তা নয়, তবে মা দিয়েই বলত, আর কিছু নেই। এই নেই নেই করেও মা তার শেষ সম্বল বাবার হাতে তুলে দিয়েছিল এই জঙ্গলের মধ্যে জমি কেনার জন্য। তার আগে মা’র দু-ভরির হারটি মানুকাকা সুদের নাম করে গস্ত করেছে। মানুকাকার বাড়িতে গিয়ে মা একদিন দেখে এসেছে হারটি কাকিমার গলায় শোভা পাচ্ছে। এখন আবার পরীর দাদু হাজির। তাঁর কী মর্জি বুঝতে পারছি না। তিনি কেন এই কলোনিতে হাজির বুঝতে পারছি না। আমাকে তাঁর এত কী দরকার, যে কারণে এখানে পর্যন্ত ছুটে এসেছেন। হাতমুখ ধুয়ে একসঙ্গে খেতে বসেছি রান্নাঘরে—মা থালা সাজিয়ে দিচ্ছে, মায়া পাতে পাতে নুন-দিচ্ছে, জল দিচ্ছে, বাবা গণ্ডুষ করছেন, আমি পিলু গণ্ডুষ করছি—অথচ কেউ কোনো কথা বলছি না। বোধহয় বাবা পরীর দাদুর আগমনবার্তাটি আমাকে কীভাবে দেবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না।

    বাবা খাচ্ছেন। গাছার উপর একটা কুপি জ্বলছে। শেয়াল ডাকছিল। কীটপতঙ্গের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। মা ভারী প্রসন্ন—বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। বাবাই বলবেন বোধহয় এমন ঠিক হয়ে আছে। পিলু যে পিলু রাস্তায় গিয়ে রায়বাহাদুরের আগমনবার্তাটি দিয়েছিল সেও চুপ।

    বাবা ভাত থেকে একটি ধান বেছে থালার বাইরে ফেলে দেবার সময় বললেন, বুঝলে মানুষই মানুষের সম্বল।

    আমি জানি, কিছু না বললেও বাবা তাঁর কথা বলে যাবেন।

    —বুঝলে, শুধু মানুষ হবে কেন, এই যে কীটপতঙ্গ, প্রাণিজগৎ, গাছপালা, মাটি জল হাওয়া সবই মানুষের বেঁচে থাকার জন্য। তাঁরই অশেষ করুণা না থাকলে, রায়বাহাদুরের মতো মানুষ তোমাদের ঘরবাড়িতে আসবেন কেন!

    বাবা তাঁর ঘরবাড়ি বানাবার পর, কোনো বিশিষ্ট মানুষ এলে খুবই খুশি হন। যেন বলা, দেখ এই যে ঘরবাড়ি বানিয়েছি, ও শুধু তোমার আমার আশ্রয় নয়—ঘরবাড়ির সঙ্গে মর্যাদার প্রশ্নও থাকে। মানুষজন এলে সেটা বাড়ে।

    বাবা কাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলি বলছেন ঠিক যেন এখন বুঝতে পারছি না। পরীর সঙ্গে একবার বাদশাহি সড়ক দিয়ে জিপে এস ডি ও পরেশচন্দ্র আমাদের বাড়ি হেঁটে এসেছিল একটা ম্যানাস্ক্রিপ্টের প্যাকেট দিয়ে পরী পাঠিয়েছে। এস ডি ও সাহেব আমাদের বাড়ি আসায় বাড়িঘরের মর্যাদা বাবার কাছে কী পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিল, টের পেয়েছিলাম পরে। নিবারণ দাসের সঙ্গে দেখা, কী বিলু, তোমাদের বাড়িতে নাকি সদরের এস ডি ও এসেছিলেন।

    বলেছিলাম, হ্যাঁ।

    জীবন পরানের সঙ্গে দেখা, তাদেরও এক কথা।

    কলোনির ঘরে ঘরে বাবা খবরটা পৌঁছে দিয়ে এসেছিলেন। আসলে তাঁর পুত্রগৌরব কোথায় গিয়ে ঠেকেছে সেটাই প্রমাণ করার উদ্দেশ্য। নরেশমামা পর্যন্ত তাজ্জব বনে গিয়েছিলেন শুনে। তিনি নিজে একটা মেয়েদের প্রাথমিক ইস্কুল খুলেছেন, তাঁর অনুমোদন যদি এস ডি ও সাহেবকে ধরে করিয়ে দিই—এই মানুষটির প্রতি কেন জানি আমার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা আছে। পরীকে কথাটা বলতেই, সে বলেছিল হবে। এবং হয়েও গেছে।

    বাবা ফের বললেন, তোমার তাঁর কাছে যাবার কথা, তুমি গেলে না। তোমাদের মান-সম্মান বড়ই ঠুনকো। বড়লোক কেউ এমনিতে হয় না। ভিতরে কিছু না থাকলে অত উপরে ওঠা যায় না। পূর্বজন্মের পুণ্যফল। তুমি গেলে ছোট হয়ে যেতে না। তিনি যে এলেন তাতেও তিনি ছোট হয়ে যাননি। তোমার প্রতি তাঁর কত আগ্রহ যদি বুঝতে! তোমাকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করেন।

    আগ্রহ থাকারই কথা। পরীর দাদুর এখন মহাসঙ্কট। তিনি পরী ছাড়া সংসারে কিছু বোঝেন না। পরীর বাবা রেলে খুবই বড় কাজ করেন। এখন মোকামাঘাটে আছেন। পরীর মাও সেখানে। রেলে খুবই বড় কাজ করলে, এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াতে হয়। পরী সেজন্য দাদুর কাছেই মানুষ। পরীর মাকে একবারই দেখেছি কালীবাড়িতে। পরীর বাবাও গিয়েছিলেন। রায়বাহাদুর মানুষটি পূজা উপলক্ষে বাড়ির ছেলেরা প্রবাস থেকে ফিরলে বাবাঠাকুরের কাছে সবাইকে নিয়ে যান। সেই উপলক্ষেই দেখা।

    বাবা বললেন, আই এ পাশ করে তুমি মাস্টারি করছ—এতে নাকি কোনো উন্নতি নেই।

    আমি বললাম, কী বলেছে বলুন না। কারণ ধৈর্য রক্ষা করতে পারছি না।

    বাবা মা’র দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলেন।

    —খুবই সুখবর। ঠাকুর চোখ তুলে তাকিয়েছেন।

    সুখবরটা কী বুঝতে পারছি না। পিলুর দিকে তাকিয়ে আছি সে যদি সুখবর দুম করে দিয়ে দেয়।

    কিন্তু পিলু এতবড় সুখবর দিতে সাহস পাচ্ছে না কেন বুঝি না। রায়বাহাদুরের সঙ্গে বাবার কথাবার্তার সময় পিলু কাছে থাকবে না, হয় না।

    বাবার দাঁতের ফাঁকে কুমড়োর ডাঁটার ছিবড়ে ঢুকে গেছে। বাবা এখন যা, দু-আঙুলে বের করার চেষ্টা করছেন। খুবই উত্তেজনার মধ্যে রয়েছেন, আবার কোথাও একটা যেন গলায় কাঁটা ফুটে আছে। সুখবর অথচ বাবার এহেন অবস্থায় আমি কিছুটা বিপাকে। ধৈর্য রাখা গেল না। পাত থেকে উঠে পড়লাম। আমার খাওয়া হয়ে গেছে, বাবার সুখবরের প্রত্যাশায় কতক্ষণ আর বসে থাকা যায়।

    বাবা খুব নিরুত্তাপ গলায় বললেন, বোস।

    আবার বসে পড়তে হল।

    —রায়বাহাদুর একটা চিঠি টাইপ করিয়ে রাখবেন। তুমি কাল গিয়ে সই করে দিয়ে এস।

    —কী চিঠি।

    —রেলে তোমার চাকরি। বললেন, বিলু ইস্কুলের মাস্টারি কী করবে! খুবই ধীর স্থির ছেলে। বিচারবুদ্ধি আছে। ঠিক জায়গায় পড়লে চড়চড় করে উন্নতি।

    —রেলে চাকরি!

    —তাই। বললেন, দরখাস্তটা তিনি তাঁর বড় ছেলের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। রেলের হোমরাচোমরা হতে তোমার সময় লাগবে না।

    বাবার ধারণা, পরীর বাবা রেলের হোমরাচোমরা এবং আমারও সেই সম্ভাবনা যখন আছে, তাছাড়া এমন মন্তব্য পরীর দাদু যখন করে গেছেন—তখন আমরা পরীদের প্রায় সমপর্যায়ের। বাবার গৌরব রাখার দেখছি এখন জায়গা নেই।

    বাবা বললেন, সবই গ্রহরাজের কৃপা বুঝলে। গ্রহরাজ প্রসন্ন থাকলে কেউ আটকাতে পারে না।

    গ্রহের ফেরে আমরা এতদিন দারিদ্র্য ভোগ করছি। গ্রহ প্রসন্ন, সুতরাং আমাদের সুদিন সমাগত। বাবা যেন পারলে এমনও বলতেন।

    খবরটা আমার খুবই সুখবর সন্দেহ নেই। এতটা আশা করতে পারিনি। পরী তবে সত্যি আমার জন্য ভাবে। পরেশচন্দ্রের সঙ্গে বিবাহ ঠিক, পরীর মত নেই বলে শুভ কাজ হচ্ছে না, আমার উপর দায় ছিল, বাবাঠাকুরকে ধরে বিয়ে ভেঙে দেবার ব্যবস্থা করা—কিন্তু বাবাঠাকুরের কাছে আমার যাও- য়াই হয়নি, এসব সত্ত্বেও পরী আমার জন্য ভাবে, তার সঙ্গে আমার যত বিরোধ ইস্কুলের মাস্টারি নিয়ে, সে চায় না, চায় না বললেই তো হবে না—অন্য কিছু একটা বন্দোবস্ত না করলে বাবার সংসারই বা চলবে কী করে। পরী এত বোঝে। অথচ পরীকে অপমান করার চেয়ে বড় সুখ আর আমার কিছু নেই।

    –বিলু এ লেখাটা দেখ ছাপা যায় কি না। ভদ্রলোক বলেছেন, একটা বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে দেবেন।

    —রেখে যাও। দেখব।

    —না রেখে যাব না। তোমাকে কথা দিতে হবে বিলু।

    —কথা দেওয়া যাবে না। পাঠ্য হতে হবে। অপাঠ্য হলে কী করে ছাপব? দয়া করে তোমার আমাদের কাগজের জন্য বিজ্ঞাপন সংগ্রহ না করলেও চলবে। বিজ্ঞাপনের জন্যে কাগজে ছাই-পাঁশ ছাপতে আমি রাজি না।

    পরী সহসা তখন ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। আর ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেই কেন জানি আমি আরও বেশি মজা পাই।

    পরীর তখন এক কথা, আমি বেহায়া বলে আসি। অন্য মেয়ে হলে তোমার মুখ দর্শন করত না। স্বার্থপর।

    –কে আসতে বলেছে! তুমি না থাকলেও কাগজ ঠিক চালাব।

    আমি জানি পরী না থাকলে কাগজ চালাবার মুরোদ আমাদের থাকবে না। কিন্তু পরীর কাছে আর সবই করতে রাজি কিন্তু খাটো হতে রাজি না। আসলে এদেশে আসার পর সচ্ছল পরিবারের প্রতি আমার কেন জানি বড় রাগ জন্মে গেছে। বড়লোক হলে তো কথাই নেই। পরী আমাদের ঠেকে ভিড়ে যেতেই, হাতের কাছে একটা চরম সুযোগ পাওয়া গেছে যেন। পরী কী বোঝে কে জানে, মাঝে মাঝে একা থাকলে, বিরোধের সময় চোখ জলে ভেসে যায়। আর পরী এটা জানে, আমি সব সহ্য করতে পারি, কিন্তু চোখে জল সহ্য করতে পারি না। তখন পরী যা বলবে, আমি গোলামের মতো সব করে যাব। পরীর কথাই শেষ কথা।

    নিজেকে বড়ই অকৃতজ্ঞ ঠেকছে। পরী এত করছে। অথচ আমি একবার বাবাঠাকুরের কাছে গেলাম না। আমি গেলে তিনি বালকের মতো চঞ্চল হয়ে পড়বেন জানি। চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে যাবে, ওরে বদরি, ও বউমা, দেখ বিলু এসেছে। আমার দিকে তাকিয়ে হয় তো বলবেন, এই ছোঁড়া না বলে না কয়ে ভেগে গেলি। বেটা লক্ষ্মীকে ভজাতে চেয়েছিলি-লক্ষ্মী ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। কিছুই মুখে আটকায় না। আর এ সময় যদি পায়ে গড় হই, বলি বাবাঠাকুর পরী আমাকে পাঠিয়েছে। অবশ্য পরী বললে তিনি চিনবেন না, সুতরাং বলতে হবে, বাবাঠাকুর মৃন্ময়ী আমাকে পাঠিয়েছে। পরীর দাদু আপনার অনুমতি নিতে আসবে বাবাঠাকুর। আপনি অনুমতি না দিলে মিমিদের সংসারে কুটোগাছটি নড়ে না, বাবাঠাকুর আপনি অনুমতি দেবেন না, বাবাঠাকুর মিমি বড়ই কাতর হয়ে পড়েছে বিয়ের কথা ভেবে। পরীর বিয়ে হয়ে গেলে, কোথায় এস. ডি ও সাহেব বদলি হয়ে যাবেন, আমরা পরীকে আর দেখতে পাব না, পরী আমাদের দেখতে পাবে না—পরীর কষ্ট, পড়া ছেড়ে দিতে হবে—পরীর কষ্ট, সে মিছিল করতে পারবে না, নাটক করতে পারবে না, পরী না থাকলে আমাদের অপরূপা কাগজ বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের কবিতা ছাপবার জায়গা থাকবে না। কবিতা ছাপা না হলে আমরা কী নিয়ে থাকব। কী নিয়ে বাঁচব। এসব যে কতবার ভেবেছি, ভাবতে ভাবতে রাত কাবার করে দিয়েছি, ঘুম আসেনি। পরী আমি সমবয়সী, পরী কেন বোঝে না, আমার পক্ষে এমন কথা শোভন নয়। বাবাঠাকুর বলতেই পারেন, তুই ক্যারে, ভাগ। ওর দাদু ভাল বোঝে, না তুই ভাল বুঝিস। মিমির বিয়ে হবে কি হবে না, সে ঠিক করবে ওর বাবা কাকারা। তোর কথায় আমি বলব! আমি একটা চ্যাংড়া ভেবেছিস। বের হ। এই বদরি শোন, বিলু কী বলছে! মিমির নাকি ইচ্ছে নয় বিয়েতে বসার। মিমির ইচ্ছে অনিচ্ছে কি। বাবা-মার ইচ্ছে অনিচ্ছেই সব। এ কি অনাসৃষ্টি কথা! তুই দেখছি মিমির সর্বনাশ করতে চাস্। তুই মিমির ঘোর শত্রু। ভাগ ভাগ! পরেশচন্দ্র রত্ন বিশেষ।

    সবার কাছেই পরেশচন্দ্র রত্ন বিশেষ। আমার বাবার কাছেও। এইটুকুন ছেলে সদরের এস.ডি ও। ত্রিশও হয়নি মনে হয়। কী সৌম্য আচরণ!

    রেগে গিয়ে বলেছিলাম, কী সৌম্য আচরণ দেখলেন। আপনার সঙ্গে তো কথাই হয়নি।

    —তোমার সঙ্গে কথা বলার ধরন দেখে বুঝেছি।

    পিলু তখন বলল, বাবা, দাদা রেলে কী চাকরি করবে?

    —শিক্ষানবিসীর কাজ। ট্র্যাফিক ইনসপেক্টর হয়ে যাবে পরে—এরকমই কী যেন বলল। ইস্কুলের ডাবল মাইনে হাতে পাবে। সংসারের খাওয়াপরা নিয়ে আর আমাদের ভাবতে হবে না। আসলে বুঝতে পারছি, বাবার চোখে কৃতী পুত্রের ছবি ভেসে উঠছে। যজমানি বামুনের পুত্রটি কত লায়েক বাবা পুজাআর্চা করতে গিয়ে গর্বের সঙ্গে বলতে পারবেন।

    বাবা বারান্দায় উঠে যাবার সময় বললেন, কত দেশ তোমার ঘোরা হবে। রেলের পাশ পাবে। রেলের পাশ পেলে ভাবছি তোমার মাকে নিয়ে তীর্থ করতে যাব।

    আমার বাবা এরকমেরই। এখনও কিছু ঠিকই হয়নি—অথচ ভেবে ফেলেছেন, চাকরিটা আমার হয়ে গেছে।

    বাবা এখন জলচৌকিতে বসে তামাক খাবেন।

    মা আজ এতই প্রসন্ন যে, মায়াকে পাঠিয়ে দিয়েছে বাবাকে তামাক সাজিয়ে দেবার জন্য।

    রান্নাঘর থেকেই বললে— হ্যাঁগো আমরা আগে তারকেশ্বরে যাব। জাগ্রত ঠাকুর। মানত করেছিলাম, বিলুটার ভাল কাজটাজ হলে শিবের মাথায় বেলপাতা দেব।

    —শুধু তারকেশ্বর কেন ধনবউ। কামাক্ষ্যা বল, কাশীর বিশ্বনাথ বল সব তোমার পুত্রের কল্যাণে দর্শন হয়ে যাবে। গ্রহাচার্য বলেছে, আপনার জ্যেষ্ঠ পুত্রের বৃহস্পতি এখন একাদশ স্থানে যা কিছু হবার এই সময়। বড় সুসময় আমাদের।

    এই কাজটা হলে আমি সত্যি তবে বর্তে যাব। স্বপ্নের দেশে যেন চলে যাচ্ছি। এখনই কাউকে বলা যাবে না। আগে একবার যাই, দেখা করি পরীর দাদুর সঙ্গে। দরখাস্তে সইসাবুদ হয়ে গেলে তিনি তাঁর বড় পুত্রের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। তিনি চাকরির পাকা বন্দোবস্ত করছেন এমনও বলে গেছেন পরীর দাদু। কিন্তু পরীর সঙ্গে দেখা হলে কী বলব!

    মনে হল পরীকে সোজাসুজি বলে দেওয়াই ভাল হবে, না যাইনি। বাবাঠাকুরের কাছে আমার যাওয়া হয়নি। সাহসে কুলাচ্ছে না।

    কিন্তু জানি, এমন কথা শুনলে, পরীর দু চোখে তিক্ততা ফুটে উঠবে। কাতর চোখে সহসা আগুন জ্বলে উঠবে—তুমি বিলু নিজেকে ছাড়া কিছু বোঝো না। তোমাকে আমার চিনতে বাকি নেই। তুমি আমার শত্রুতা করতে পার, কিন্তু কোনোদিন আমি তোমার শত্রুতা করব না। তোমার মাস্টারি আমার ভাল লাগছিল না, তোমার মতো ছেলে একটা প্রাইমারী ইস্কুলে পড়ে থাকলে, আমার কোনো আর অবলম্বন থাকে না। রেলে বড় চাকরি হলে, আমার সাহস বাড়বে।

    এই সুখস্বপ্নটা আমাকে কাতর করছিল। রেলের চাকরিটা হলে পরীর মর্যাদা নষ্ট হবে না। কিন্তু কোথায় সদরের এস ডি ও আর কোথায় রেলের একজন শিক্ষানবিসী। তার আগেই পরী চলে যাবে। নিজেকে কেন জানি বড় অসহায় লাগছিল। দূরে চাকরি নিয়ে চলে গেলে পরীকে আর দেখতে পাব না এও একটা কষ্ট। এই বাড়িঘরের প্রতিও টান ধরে গেছে, মাঠ পার হলে বাদশাহি সড়ক, দুই বন্ধুর সাইকেল আরোহীর অলৌকিক ভ্রমণ, বালিরঘাটে বসে জ্যোৎস্নায় ডুবে যাওয়া সব আমার হারিয়ে যাবে। আমি খুবই নিঃসঙ্গ হয়ে যাব।

    এতগুলি বিষয় আমাকে ভাবাচ্ছে।

    পিলু দরজা বন্ধ করে মশারি টানিয়ে আমার পাশে এসে শুল। বলল, দাদা আমি তোর সঙ্গে যাব।

    —যাবি। আগে কাজটা হোক।

    —কাজটা হবে।

    —কী করে বুঝলি?

    —মিমিদির বাবার হাতেই সব। মনে হয় মিমিদিরই ইচ্ছে। না হলে মিমিদির দাদু ছুটে আসতেন না।

    পাশ ফিরে শুলাম। বললাম, হবে হয়ত!

    —তুই ছুটিতে আসতে পারবি।

    —তাও বলে গেছে?

    —হ্যাঁ, সবই তো বলল, অনেক ছুটি আছে। রেলের পাশ, উপরি রোজগার কত কী! —উপরি রোজগার। সে আবার কী!

    পিলু বলল, বাবাও অবাক। বললেন, উপরি রোজগার মানে?

    —এ কাজে অনেক উপরি রোজগার। সে আপনি বুঝবেন না! আপনার ছেলে কাজে ঢুকলে বুঝতে পারবে।

    উপরি রোজগারটা ঠিক ধরতে পারছি না। ঘুষের কথা বলছেন। ঘুষ না নিলে বড় হওয়া যায় না। মর্যাদা রক্ষা হয় না পরিবারের।

    কিন্তু বাবা ঘুণাক্ষরে টের পেলে, সোজা বলবেন, দরকার নেই—মানুষের অসাধু জীবন, সংসারে মঙ্গলজনক হয় না। পাপ। কত পাপে না জানি দেশছাড়া হয়েছি, পাপ বাড়িয়ে লাভ নেই। জীবন তো একটাই। পরজন্মে, কীটপতঙ্গ হয়ে কে বেঁচে থাকতে চায়।

    অর্থাৎ এই পাপ বাবার জীবনে শুধু ইহকালের দায় নয় পরকালেরও। এমন বাবার পুত্রের পক্ষে উপরি রোজগার খুবই বিপজ্জনক বিষয়। বাবা হয়তো কথাটার অর্থ ধরতে পারেননি, অথবা ভেবেছেন, অসৎ কাজে প্রবৃত্ত হবে এমন ইন্দ্রিয়াধীন তাঁর পুত্র নয়। না হলে এই একটা কথাই বাবার সব প্রসন্নতা নিমেষে হরণ করে নিত।

    শুয়ে পাশ ফিরছি। এ-পাশ ওপাশ করছি। ঘরের বেড়াতে খোপকাটা দরমার জানালা। হাওয়া একদম ঢোকে না। বাবা এই গরমে বারান্দায় মাদুর পেতে শুয়ে থাকেন। মা-ও। মাঝরাতের দিকে গরমের তাপ কমলে ঘরে উঠে যান। আমি ঘামছিলাম। শিয়রে তালপাতার পাখা থাকে। মাঝে মাঝে হাওয়া করছি। বাইরে জ্যোৎস্না। ঘুম আসছিল না। পিলু বেশ ঘুমোচ্ছে। শরীরে এত তাপ নিয়ে বাঁচা যায় না। দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে এলাম। বারান্দায় দেখছি মা বাবা কেউ নেই। শুধু গাছপালাগুলি বাড়িটাকে এখন পাহারা দিচ্ছে। সাপের উপদ্রব আছে। তবে জ্যোৎস্নায় প্রকৃতি ভাসমান বলে সব দেখা যায়। রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। সামনে খাল। জলে ভরে গেছে। দু একটা মাছের নড়াচড়া টের পাওয়া যাচ্ছে। জোনাকি উড়ছিল। বাদশাহি সড়কে গরুর গাড়ির ক্যাঁচকোঁচ শব্দ। কোথাও কুকুর ডাকছে। কটা ডাহুক পাখি তারস্বরে ডেকে উঠল। সবই কেমন বিস্ময়ের সঞ্চার করছে। রেলের চাকরি হয়ে গেলে—এই জীবন থেকে প্রায় নির্বাসিত হয়ে যাব। কোন সুদূরে চলে যাব জানে।

    এই জ্যোৎস্নায় দাঁড়িয়ে কী এক অপার রহস্য মানুষের জীবনে, ভাবছিলাম—মানুষ নিরন্তর স্থানান্তরে চলে যাচ্ছে। তার শেকড় এক জায়গায় ঢুকে যায়, অন্য প্রজন্মে সেই শেকড় আবার আলগা হয়ে যায়। আমি চলে গেলে, বাবার এই ঘরবাড়িতে আমার জন্য রাতে কেউ আর অপেক্ষা করে থাকবে না। হুটহাট পরী চলে আসবে না। মুকুল নিখিল নিরঞ্জন সাঁঝবেলায় জ্যোৎস্নায় সাইকেলে এসে হাজির হবে না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডাকবে না, বিলু আমরা। অযথা একসঙ্গে সাইকেলগুলির বেল বেজে উঠবে না। কোনো গ্রীষ্মের দুপুরে আম গাছের ছায়ায় আমি আর মুকুল শুয়ে বসে কবিতা পাঠ করব না। আমার কবিতা মাথায় উঠে যাবে। আসলে মানুষ সঙ্গদোষে বোধহয় কবি হয়, গল্পকার হয়—পরী মাথার মধ্যে কবিতা ঢুকিয়েছিল, সঙ্গদোষে তার বাড়াবাড়ি ঘটেছে। আসলে জীবনে বাহবা অর্জনই এই কবিতাচর্চার দিকে আমায় টানছে। আর এই বাহবা পরী যখন দেয়, তখন আমি রাজার মতো বেঁচে থাকি।

    অথচ সেই পরীর খোঁজ নিইনি। তার কাছে কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি। কাল আমাকে পরীর সঙ্গে দেখা করতেই হবে। পরীকে দেখার জন্য মনটা কেন এই গভীর রাতে এত আকুল হয়ে উঠল বুঝতে পারছি না। যেন পারলে এক্ষুনি সাইকেল নিয়ে ছুটে গেলে ভাল হয়। পরী কী রোজ দোতলার বারান্দায় আমার জন্য সকাল বিকাল অপেক্ষা করে থাকে। পরীর দাদু কী পরীর কোনো খবর দিয়ে যাননি! পরীর যে বিয়ে হবে—কথাবার্তা চলছে, বাবা কী তা জানেন! এ সময় নিজের উপরই কেমন ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একবারও আমি পিলুকে ডেকে বলিনি, পরীর কথা কিছু বলল। পরী তো চুপ করে থাকার মেয়ে নয়। পরী খোলামেলা, বেপরোয়া, অথচ মেয়েটার মধ্যে কোনো অতি চালাকি নেই—এমন যার স্বভাব, সে কেন একবার অন্তত খোঁজ নিতে এল না, বাবাঠাকুরের কাছে যাওয়ার ব্যাপারটাতে আমি কী করলাম!

    তাহলে কী পরী ভেবে ফেলেছে, বিলুটা কর্মের নয়। পরী আমার উপর বিশ্বাস হারিয়েছে। যে পরীর জন্য এতটুকু সাহস দেখাতে পারে না, তার উপর নির্ভর করা নিছক পাগলামি। পরেশচন্দ্র অনেক বেশি নির্ভরশীল। ভাবতেই বুকটা ছাঁত করে উঠল। পরী হয়ত সবই মেনে নিয়েছে। তবু আমি থাকলে পরীদের পরিবারে কাঁটা হয়ে থাকব, সেই ভেবে কী পরীর দাদু আমাকে দেশান্তরী করতে চাইছেন। ঠিক কিছুই বুঝছি না।

    যত এ-সব ভাবছিলাম, তত কেমন তলিয়ে যাচ্ছি। গাছের গুঁড়িতে চুপচাপ হেলান নিয়ে বসে আছি। দরজা ভেজিয়ে বাড়ির বাইরের রাস্তায় শা-দুল্লা আমগাছের নিচে এক অসহায় তরুণ কোনো এক রাজকন্যার স্বপ্নে বিহ্বল হয়ে পড়ছে। আমার কেন জানি, পরীর জন্য চোখে জল এসে যাচ্ছিল। পরী জানেই না, তার জন্য গোপনে আমি কখনও কাঁদতে পারি। জানলে পরী না এসে থাকতে পারত না। সামনা-সামনি সব সময় পরীকে ছোট করা আমার স্বভাব। পরী সেটাই সত্য জেনে বসে আছে।

    তখনই গলা পেলাম কার!

    দেখি পেছনে, পিলু, বাবা-মা।

    ওরা এসে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে।

    বাবার প্রশ্ন, এত রাতে এখানে বসে আছ?

    —গরম। ঘরে শোওয়া যাচ্ছে না।

    পিলুর কী মনে হল কে জানে—আমাকে নিয়ে মা-বাবার যেমন দুশ্চিন্তার শেষ নেই, পিলুরও তেমনি। সে আমার হাত ধরে টানতে থাকলে, বললাম, যাচ্ছি।

    মনে হল ওরা আমার আচরণে খুবই ভয় পেয়ে গেছে। আমি কখন কী করে বসব, এই ভয়ে পিলু আমার পাশে রাতে শোয়।

    পিলুকে বললাম, হাত ছাড়। যাচ্ছি।

    –যাচ্ছি না, এক্ষুনি ওঠ।

    বাবা বললেন, তোমার কী হয়েছে! ক’দিন থেকে আবার মনমরা দেখছি। বলবে তো। না বললে বুঝব কী করে?

    কী করে বোঝাই, পরীর বিয়ের কথা হচ্ছে। পরীকে কথা দিয়েছিলাম, বাবাঠাকুরের কাছে যাব- কিন্তু যেতে পারছি না। কেন যে কথা দিতে গেলাম। পরী যদি বিশ্বাস করে থাকে, কথা যখন দিয়েছি, আমি ঠিক যাবই, যদি বিশ্বাস করে থাকে বিলুর স্বভাব নয় কথা দিয়ে কথা না রাখার। কিন্তু পরী তো বুঝছে না, কী বিপাকে পড়ে বলেছিলাম, আমি যাব।—তুমি এই নিয়ে মন খারাপ করবে না। কী চেহারা করেছ? তারপরও যদি না যেতে পারি মন মানবে কেন! তারপর সব যদি ছেড়ে চলে যেতে হয়, না গিয়েও কী উপায়! যে-ভাবে ট্রেনে, রেল স্টেশনে পড়ে থেকেছি মাসের পর মাস, যে-ভাবে চেকারবাবুদের দেখলে বাবা সাক্ষাৎ ভগবান হাজির ভেবেছেন, যে-ভাবে স্বপ্নে দেখেছি, আমার হাতে সবুজ বাতি, সবুজ বাতি দোলালে ট্রেন চলবে, না দোলালে চলবে না, একটা ট্রেনের এই স্বপ্ন এখন সত্যি হতে যাচ্ছে— অথচ সব ছেড়েছুড়ে চলে যেতে হবে—এতসব কষ্ট আমাকে বিচলিত করে তুলছে। শ্যাম রাখি না কুল রাখি আমার এখন এই অবস্থা। সেখানে ম্রিয়মাণ হয়ে থাকা ছাড়া অন্য কী উপায়।

    ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়লে, দেখলাম পিলু দরজা ভাল করে বন্ধ করে দিচ্ছে। মশারির নিচে ঢুকে সে পাখা তুলে এমনভাবে হাওয়া করছে, যেন সবটা হাওয়া আমার গায়েই লাগে।

    আমি হেসে বললাম, এই পিলু তোর কী হয়েছে রে?

    পিলু অবাক। ওর হাতপাখা বন্ধ।

    পিলু হঠাৎ ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলল, তুই দাদা কেন বের হয়ে গেছিলি? বল কেন বের হয়ে গেলি।

    —আরে এমনি। তুই কী রে!

    —আমার ভয় করছে। তুই কেমন হয়ে যাচ্ছিস দাদা।

    হঠাৎ মনে হল, আমি আর, পিলু কিংবা মায়ার জন্য, মা-বাবার জন্য, এমনকি সংসারের ভালমন্দের জন্য যেন খুশি অখুশি কিছুই হচ্ছি না। পিলু এটা বুঝতে পেরেই আশঙ্কা করছে, আমি কিছু করে না বসি। বাবা-মাও কি এমন আশঙ্কায় সর্বক্ষণ তটস্থ হয়ে থাকে। সন্তান বড় হলে জটিলতা যে কত রকমের। আমরা তো এখন বলতে গেলে বেশ ভালভাবে খেয়েপরে বেঁচে আছি—কিন্তু ভিতরে যে আমি ভাল নেই। একসময়ে শুধু পেট ভরে খাওয়ার মধ্যে যে আনন্দ পেয়েছি, এখন আর তা পাই না কেন। খাওয়াটাই সব নয়। এরপরও পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য বুঝি উত্তাপের দরকার হয়। আমার মধ্যে যে উত্তাপের সৃষ্টি হচ্ছে, তারই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় কবিতা, পরী, প্রেম, রেলের নীল বাতি। এসব না থাকলে জীবন অর্থহীন। কিন্তু এসব কথা পিলুকে বলি কী করে, বললেই বা বুঝবে কেন?

    তখনই পিলু বলল, পরীদি আর আসে না। আমি কাল যাব।

    কী করতে যাবি?

    —পরীদি আসে না কেন?

    —পরীদির বিয়ে। আসবে কী করে?

    হঠাৎ পিলু উত্তেজনায় উঠে বসল, কবে বিয়ে রে দাদা। আমাদের খেতে বলবে না! —বলবে, বিয়ে ঠিক হলে বলবে। এখনও বোধহয় হয়নি। পরীর কথা তোলায় সুযোগ এসে গেল। বললাম, ওর দাদু পরীর কথা কিছু বলল?

    –না।

    —গাড়ি নিয়ে এসেছিল?

    —রাস্তায় গাড়ি রেখে হেঁটে এসেছে।

    —তুই কোথায় ছিলি?

    —আমি কালীর পুকুরে গরু আনতে যাচ্ছি, দেখি পরীদির দাদু আসছে। হাতে সেই রুপোর লাঠি।

    —আর কেউ ছিল?

    —সেই লোকটা!

    সেই লোকটা কে বুঝি। ওঁর খাস চাকর। উঠতে বসতে যে একটা লাঠির মতো সঙ্গে থাকে। পিলু বসেই আছে। জানিস দাদা এসেই আমাদের বাড়িটা ঘুরে-ফিরে দেখলেন। আমগাছের কোনটা কী আম বাবা বললেন। পরীদির দাদু কী খুশি। বললেন, এ তো একটা আশ্রম বানিয়ে ফেলেছেন। বাবা জানিস ঠাকুরঘর খুলে নারায়ণ শিলা দেখালেন। চরণামৃত দিলে তিনি হাত পেতে নিলেন। বাবার সঙ্গে ঠাকুর দেবতা নিয়ে কথা হল। মা মায়া তো ঘর থেকে বেরই হল না। চেয়ারে বসে আমাকে ডেকে বললেন, কী খবর পিলুবাবুর?

    এমন ডাকসাইটে একজন মানুষের পক্ষে পিলুর নাম মনে রাখা সহজ নয়। কিন্তু পিলুর স্বভাবে মানুষকে আত্মীয় ভাবার এমন একটা সহজ কৌশল আছে যার জন্য একবার আলাপ জমে উঠলে তাকে ভোলবার কথা নয়। পরীদের কাকাতুয়াটি আনতে পিলু একদিন সত্যি তাদের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত। আমাদের বাড়িতে, খোঁড়া গরু, খোঁড়া বাঁদর, হাঁস, কবুতর, ছাগল, গোটা তিনেক বিড়াল এবং দুটো কুকুরের সঙ্গে কাকাতুয়াটি বেশ মানিয়ে যাবে মনে হয়েছিল তার। পরী সেদিন আমাদের বাড়ি, আমার অনিচ্ছাসত্ত্বে হাজির। যে যা চেয়েছে পরী সেদিন দিতে রাজি হয়েছিল। সেই বাড়ির মেয়ে যদি বলে, পিলু তুই কি নিবি? পিলুর কাকাতুয়া ছাড়া আর কী চাইবার থাকতে পারে। সে সোজা বলেছিল, পরীদি তোমাদের কাকাতুয়াটি দেবে? আমি পালব। তা পিলু পালতে পারে। ওর জীবজন্তুর প্রতি আলাদা একটা মায়া আছে। সেই কাকাতুয়াটি সত্যি পিলু আনতে যাবে পরী ভাবতে পারেনি। পরী বলেছিল, পারবি পুষতে? তোদের বাড়ির হুলো বেড়াল দুটোকে না তাড়ালে পাখিটাকে মেরে ফেলতে পারে। ওর দাদু সামনে। দাদুকে বলেছিল, বিলুর ছোটভাই। কী মিষ্টি দেখতে না দাদু! কাকাতুয়া নিতে এসেছে।

    আসলে পিলু কত সরল সহজ, এটা ভেবে দাদুটি বলেছিলেন, নিয়ে গিয়ে পুষতে পারবি তো? পিলুর সোজা জবাব, হ্যাঁ পারব। কী খায়?

    –কী যে খায় আমরা জানি না। আমাদের রঘু টের পায়। ওর সঙ্গে পাখিটার খাওয়া নিয়ে কথা হয়। রঘু সকাল থেকে লেগে পড়ে।

    —আমাকে বলবে না।

    —দ্যাখ না গিয়ে বলে কিনা! রঘুকে ছাড়া সে কাউকে বলে না জানি।

    পরী নাকি হাসছিল পিলুর কান্ড দেখে। সে পাখিটার সামনে দাঁড়িয়ে শিস দিয়েছে, হাতে তুড়ি মেরেছে। পাখিটা ওকে দু-বার তেড়ে গেছে, তাতেও ঘাবড়ায়নি। সে পাখিটার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছে। সুন্দর কথা বলে। পিলু বলেছিল, আমার নাম পিলু, আমার দাদার সঙ্গেই পরীদি পড়ে। এই সম্পর্কের খাতিরেই পাখিটার উচিত পিলুকে মান্য করা। কিন্তু পিলু পাখিটার কাছেই যেতে পারছিল না, দাঁড়ে ঝাপটাচ্ছিল। ধরতে গেলে ঠোকর খাচ্ছিল। পরী আর দাদু পিলুর কান্ড দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ছিল।

    পিলুর স্বভাব বেপরোয়া, সে ছাড়বে কেন, একবার জোর করে পাখিটার দাঁড়ে হাত দিতে গেলেই এমন ঠুকরে দিল যে হাত থেকে রক্ত বের হয়ে আসছে। পরী ছুটে গেছে, পরীর দাদুও।—ইস কী ছেলে রে তুই! আয়। রক্ত বের হচ্ছে!

    পরী বলেছিল, দস্যি বটে তুই।

    পিলু হাত ছাড়িয়ে বলেছিল, কিছু হয়নি।

    —হয়নি তো হয়নি। আয় বলছি। আমরা বুঝিয়ে-সুজিয়ে দিয়ে আসব।

    তারপর হাতে ডেটল তুলো ব্যান্ডেজ বেঁধে একপেট খাইয়ে রিকশায় তুলে দিয়েছিল। কাজেই পরীর দাদু যত ডাকসাইটে হোক, এমন ছেলের নাম ভুলে যেতে পারে না।

    পিলুকে বললাম, শুয়ে পড়। আমাকে হাওয়া করতে হবে না। ফের বেহায়ার মতো বললাম, পরীর কথা কিছুই বলল না?

    —না!

    —তুই পরীর কাছে যাবি কেন? —পরীদি মনে হয় রাগ করেছে।

    —রাগ করবে কেন? আমরা পরীর কে?

    পিলু আমার এমন কথায় কেমন ঘাবড়ে গেল। পরীদির জন্যই রেলে চাকরি, পরীদি না থাকলে এতবড় চাকরি কে দিত, পরীদি আছে বলেই আমার কাগজ অপরূপা অথচ তার দাদাটা বলছে কী না পরী আমাদের কে!

    পিলু এবারে শুয়ে পড়ল। আমরা দু-জনেই দু-পাশে পাশ ফিরে শুয়ে আছি। পরী আমাদের কে, বলার পর পিলু তার পরীদির উপর সব অধিকার যেন হারিয়ে ফেলেছে। পিলুও বোঝে পরী এলে আমাদের বাড়িটা মুহূর্তে কেমন বদলে যায়। পরীর ছোটাছুটি, পিলুকে হাঁকডাক করে বাইরে নিয়ে যাওয়া, মার রান্নাঘরে বসে টুকিটাকি কাজে সাহায্য করা সবটাই পরীর আলাদা এক মহিমা যেন। পিলু পর্যন্ত সেটা টের পেয়ে বুঝেছে, তার যাওয়া দরকার।

    আমি বললাম, কাল তো যাচ্ছি। দেখা হবে।

    —কাল সত্যি যাচ্ছিস?

    —যাব না! কত বড় চাকরি।

    পিলু কেন জানি আমার এত বড় চাকরি নিয়ে এই মুহূর্তে উচ্ছাস প্রকাশ করতে পারল না। আমি আর কোনো কথা বলছি না দেখে, সে ঘুমিয়ে পড়ল। কী কথা বলব। পরী ছাড়া আমার যে আর কোনো কথা নেই।

    সকালবেলায় বাবা বললেন, যাবার আগে ঠাকুর প্রণাম করে যেও। শুভ কাজে যাচ্ছ।

    পিলু সাইকেল বের করে ন্যাকড়া দিয়ে পরিষ্কার করছিল। মুড়ি দুধ কলা খেয়ে সাইকেলে বের হয়ে পড়লাম। দরখাস্তে সই করতে যেতে হবে। সইসাবুদ সেরে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা, চান খাওয়া সেরে স্কুল—খবরটা বন্ধুদের আগাম দিতে না পারলে স্বস্তি পাচ্ছি না। অথচ মনে হচ্ছে খবরটা দেব, শেষে যদি কাজটা না হয়—কতরকমের শঙ্কা আছে, তবে পরী যদি চায়, কাজটা আমার হবেই। পরীকেও দেখে আসা হবে। বাবাঠাকুরের কাছে যেতে পারিনি, এই সুযোগে সেই খবরটাও দেওয়া যাবে।

    আর আশ্চর্য, সদর দিয়ে ঢুকতেই দেখি পরী ওদের দোতলার বারান্দায় মাথা এলিয়ে বসে আছে। আমি যে ঢুকলাম, সে তা লক্ষ্য পর্যন্ত করেনি। অনেক দূরের আকাশে তার চোখ। যেন সে আমাকে চেনেই না। এই হল গিয়ে মানুষের গেরো। আমি ঢুকলাম, অথচ কোনো সাড়া নেই, কেমন জটিল সব চিন্তা-ভাবনায় মাথাটা আমার গুলিয়ে যাচ্ছিল। তবে কি সে আমাকে সত্যি বাড়ির আর দশজন অনুগ্রহভাজন ব্যক্তির মতো ভাবছে। দয়া চাই—এস। চাকরি চাই—এস। কাগজের বিজ্ঞাপন–এস। অনুগ্রহ করে সে কি মাথা কিনে নিয়েছে ভেবেছে। না কি সে লক্ষ্যই করেনি আমি এসেছি। কোন্‌টা।

    এতসব ভাববার আমার অবকাশই ছিল না। বিরাট সেই হলঘরে বুড়ো মানুষটি যেন আমার প্রত্যাশায় বসেই ছিলেন। দরজা পর্যন্ত যেতে পারিনি, তার আগেই তিনি প্রায় ছুটে এসেছেন। আমি যেতে পারি, এটা বোধহয় তাঁর বিশ্বাসের বাইরে ছিল। তিনি একটা বড় রকমের বিপর্যয়ের মুখে পড়ে গেছেন। তাঁর চোখমুখ দেখে আমার এমনই মনে হল। এই বিপর্যয় থেকে আমিই তাঁদের উদ্ধার করতে পারি—কারণ তিনি তাঁর আচরণে যেন কিছুটা বালকসুলভ, আর কেমন গোপন, খুব ধীরে এবং লঘুস্বরে কথাবার্তা-আপ্যায়ন।

    —এলে। বোস।

    বিরাট হলঘর। আর কেউ নেই। এমনকি তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী সেও না। কত রকমের মানুষজন সকাল থেকে তাঁর কাছে আসে। বাইরের বারান্দায় বসার মতো পনের-বিশজনের জায়গা করা আছে। এক একজনের ডাক পড়ে, তিনি তাদের অভিযোগ দাবিদাওয়া সম্পর্কে খবরাখবর নিয়ে ছেড়ে দেন। যতবার এসেছি, দেখেছি একজন ব্যস্ত মানুষ—অন্তত সকালের দিকটাতে তিনি শহরের মানুষজন নিয়ে ভারী ব্যস্ত থাকেন। আরও সকালে তাঁর পূজা-আর্চ্চার পাট থাকে, তখন বামুনঠাকুর এই বাড়ির সর্বত্র গঙ্গাজল ছিটিয়ে দেয়। পরনে গরদ, খালি গা, গৌরবর্ণ মানুষ, ঘন চুল, মাঝখানে সিঁথি কাটা। গায়ে নামাবলী। হলঘরের বড় দেওয়ালে বাবাঠাকুরের বড় তৈলচিত্র। এবং সিঁড়ি ধরে উঠে গেলে দেখেছি লম্বা করিডোর পার হয়ে তাঁর পূজার ঘর। সেখানেও সিংহাসনে বাবাঠাকুরের ছবি। পরী আমাকে গোটা বাড়িটা একদিন ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল। কার কোন মহল, তার বাবা-কাকারা কেউ কেউ চাকরিজীবী—জমিদারি চলে যাবার পর যেন এই বৈভব রক্ষার্থেই সবাই বের হয়ে পড়েছেন।

    তিনি আমাকে বসিয়ে সন্তর্পণে একটা দেওয়াল আলমারি খুলে একটা ফাইল বের করলেন। এসব বের করে দেবার লোকটিকে পর্যন্ত কাছে রাখেননি। ফাইল বের করে আমার সামনে একটা টাইপ করা কাগজ বের করে বললেন, সই কর।

    আমি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সই করলাম।

    মাথার উপর ঝাড়-লণ্ঠন, হাওয়ায় তখন রিনরিন করে বেজে উঠল। ঘরে আতরবাতির সুঘ্রাণ।

    তিনি আমার দিকে কিছুক্ষণ কেন যে তাকিয়ে থাকলেন বুঝলাম না। শেষে কী ভেবে বললেন, তোমার বাবাকে বলবে, তিনি যেন তোমার সার্টিফিকেট দুটো দেন। অ্যাটেস্টেড কপির দরকার হবে। কাল সকালে দিয়ে যাবে।

    আমি মার্কশিট পেয়েছি শেষ পরীক্ষার। সার্টিফিকেট এখনও পাইনি জানালাম।

    তিনি বললেন, মার্কশিট হলেই চলবে।

    কথা বলতে গিয়ে তিনি বেশ হাঁপাচ্ছিলেন। পায়ে তাঁর নাগরাই জুতো। তিনি পাখার হাওয়াতেও ঘামছিলেন।

    —কাল কোথায় গিয়েছিলে? আমি সব সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম। না এলে আমাকে ফের যেতে হত।

    আমার প্রতি এত সদয়! সবটাই পরী হেতু এমন ভাবলাম। সেই পরীর সামান্য কাজ আমি করে উঠতে পারিনি। বললাম, মিমির সঙ্গে একটু দেখা করব।

    তিনি চমকে উঠলেন। আমি এ বাড়িতে এলে রঘু বিনোদ সবাই চেঁচামেচি শুরু করে দিত— বিলু দাদাবাবু এসেছেন। বিলু দাদাবাবু শুধু পরীর সঙ্গে পড়ে না, বাবাঠাকুরের প্রিয়জন। যে মানুষটি এই বাড়ির শুভাশুভের দায় ঘাড়ে বহন করছেন, আমি সেই মানুষের বড় আপনজন। বাড়িতে এজন্য আমার আলাদা খাতির। অথচ আশ্চর্য, আজ বাড়িটা কেমন নিঝুম।

    ঠিক এইসময় সিঁড়িতে কার পায়ের শব্দ পেতেই উপরের দিকে তাকালাম। আমি এলে পরী ধীরে ধীরে লঘু পায়ে সেদিন নেমে এসেছিল। আজও সে আসতে পারে। কিন্তু না—দেখছি রঘু বড় রেকাবিতে ফলমূল মিষ্টি সাজিয়ে নিয়ে আসছে। আসলে আমার এই সমাদর আর কিছুর জন্য নয়—বাবাঠাকুর প্রসন্ন হবেন এই বোধ থেকে করা। আমাকে যে ঘাঁটাতে সাহস করছেন না, এটাও তার কারণ। আসলে বুঝতে পারি এই পরিবারে আমাকে কেন্দ্র করেই বিপর্যয় নেমে এসেছে। পরীর একগুঁয়েমি এবং সেদিনের হাহাকার কান্না থেকে গোটা পরিবারটি জেনে ফেলেছে, গেরো কোথায়। সেটা খুলে ফেলার জন্য রায়বাহাদুর মাথা ঠান্ডা রেখে এগোচ্ছেন। পরীরও হয়ত সায় আছে। সে চায় না, আমার জীবন একটা প্রাথমিক ইস্কুলে আটকে থাকক। তোমরা বিলুর জন্য কিছু একটা কর। বিলুর জন্য কিছু একটা করলে, তোমরা যা বলবে, আমি তাই করব। বিলুর হয়ে সত্যিকারের কিছু করতে পারলে পরী বোধহয় বিষও খেতে রাজি।

    ক্রমেই আমি বিষণ্ণ হয়ে পড়ছিলাম।

    আমার সামনে রকমারি জলখাবার। রায়বাহাদুর নিজ হাতে সাজিয়ে দিচ্ছেন। তিনি পরীর কথায় চমকে উঠেছিলেন, পরী সম্পর্কে একটা কথাও বললেন না। বরং এই চাকরিতে আমি যে একদিন খুবই বড় জায়গায় চলে যাব—এটা তাঁর স্থির বিশ্বাস। তিনি আমাকে আমার চাকরির বিষয়ে নানারকমের লোভনীয় কথাবার্তা বলে পরী সম্পর্কে উদাসীন রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

    আমার কিছুই খেতে ইচ্ছে করছিল না।

    রঘু সাদা পাথরের গ্লাসে এক গ্লাস ঠান্ডা জল রেখে গেল।

    পরীর দাদু বললেন, খাও।

    আমার যে খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না বুঝতে পেরে বললেন, খাও। আমি বুড়ো মানুষ। জীবনে নানা ঘাত-প্রতিঘাত আসে, সহ্য করতে হয়। সবই জানবে বাবাঠাকুরের কৃপা। তুমি তো পরম সৌভাগ্যবান, বাবাঠাকুরের কৃপা লাভ করেছ। সেদিন বাবাঠাকুরের কাছে সবাইকে নিয়ে গিয়েছিলাম—কথায় কথায় তিনি বললেন, বিলুটার কোনো খবর নেই। বদরিকে ভাবছি পাঠাব। ছোঁড়াটা কী! না বলে না কয়ে কালীবাড়ি ছেড়ে চলে গেল। মনটা জানিস মাঝে মাঝে বিলুটার জন্য বড় খারাপ লাগে। বাবা গরিব, বিলুর খুবই পড়ার আগ্রহ। দুটো বছর বিলু ছিল, দু-বছরেই কেমন আমার মধ্যে টান ধরিয়ে দিয়েছে।

    আমি মাথা নিচু করে মিষ্টি এক-আধটু খাচ্ছি আর ওঁর কথা শুনছি।

    রায়বাহাদুর কোঁচা মাটি থেকে তুলে কোলের উপর রাখার সময় বললেন, তোমার সব খবর দিয়েছি। বলেছি, বিলুর জন্য আপনি ভাববেন না। ও ভালই আছে। ওকে সমীরণ রেলের শিক্ষানবিসীতে ঢুকিয়ে দেবে। ও পাশ করেছে। ওর জীবনে অনেক উন্নতি হবে।

    আমি কিছু বলছিলাম না। কেবল একটা কথাই বার বার এখন জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হচ্ছে পরী গিয়েছিল আপনাদের সঙ্গে! পরীকে নিয়ে গিয়েছিলেন? কিংবা কেন গিয়েছিলেন! শুভকাজ, তার অনুমতি নিতে গিয়েছিলেন। তিনি কি অনুমতি দিলেন। অনুমতি দিয়ে ফেললে আমার আর কিছু করার থাকবে না জানি। আমার ইচ্ছে থাকলেও আর বলতে পারব না, বললেও তিনি শুনবেন না। তাঁর মুখ থেকে বাক্য বের করা এমনিতেই বড় কঠিন কাজ। বাক্য না, যেন আগুন। সে আগুন একবার জ্বলে উঠলে নেবানো যায় না।

    এ-সব কী করে জিজ্ঞেস করি। তবু ভেতরে এত তোলপাড় শুরু হয়েছে পরীকে দোতলার বারান্দায় দেখার পর, যে বেহায়ার মতো না বলে থাকতে পারলাম না, মিমি গিয়েছিল আপনাদের সঙ্গে?

    —গিয়েছিল।

    তারপরের প্রশ্ন যে খুবই কঠিন। বলি কী করে। পরেশচন্দ্রের সঙ্গে পরীর শুভকাজে তিনি অনুমতি দিয়েছেন—অর্থাৎ এই অনুমতি নেবার জন্যই যাওয়া কিনা! যদি বিষয়টা শেষ হয়ে গিয়ে থাকে— হয়ে যাবারই কথা, দোতলার বেতের সাদা চেয়ারে পরী যে-ভাবে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়েছিল, তাতে মনে হয় বাবাঠাকুর পরীর ফাঁসির হুকুম দিয়ে দিয়েছেন। শেষ আশ্রয় বলতে পরীর ছিল, বাবাঠাকুর। নিম্ন আদালত, উচ্চ আদালত এমনকি তার ওপরের আদালতের রায় হয়ে গেছে। একমাত্র রাষ্ট্রপতিই পারেন ফাঁসির হুকুম বাতিল করতে। যদি সেখানেও সেই রায় বের হয়ে গিয়ে থাকে।

    ভিতরে এত জ্বালা অনুভব করছি কেন! আমি সত্যি অমানুষ। পরীদের বৈভবের প্রতি আমার ঘৃণা আছে, পরীর এই বৈভবের জন্য সে দায়ী হবে কেন! সে তো বোঝে, মানুষকে না ঠকালে, একজন মানুষ, অন্যের চেয়ে বেশি প্রাচুর্যের মধ্যে বাস করতে পারে না। সে নিজে মিছিলে, ভোটের প্রচারে তার দলের হয়ে বার বার এই কথাই বলে গেছে। অথচ ভাবতে অবাক লাগে, এমন ডানপিটে মেয়ে, খোলামেলা বেপরোয়া মেয়ে কদিনে কী হয়ে গেল! এ জীবন তো পরীর পক্ষে আত্মহত্যার শামিল। পরী কি তার পরিবারের মর্যাদা রক্ষায় নিজে আগুনে আত্মাহুতি দিচ্ছে।

    খাওয়া আমার মাথায় উঠে গেল। বললাম, মিমিকে একবার ডেকে দেবেন। ওর সঙ্গে আমার কথা আছে। জীবনেও হয়ত এমন দৃঢ়তার সঙ্গে কেউ কখনো তাঁকে হুকুম করেছে তিনি জানেন না। তার মুখচোখ কেমন সহসা রক্তবর্ণ হয়ে গেল। উত্তেজনায় তিনি থরথর করে কাঁপছিলেন। যেন এই মুহূর্তে হুঙ্কার দিয়ে উঠবেন, বের হও, বের হয়ে যাও। রাস্তার কুকুর! কিন্তু এ কি দেখছি— তিনি সহসা আমার দু-হাত চেপে ধরে অনুনয় করছেন, সব রাগ বিদ্বেষ, জ্বালা তাঁর উবে গেছে, অসহায় বালকের মতো হাত ধরে অনুরোধ করছেন, তুমি যা চাও আমি দেব, তুমি যা বলবে আমি করব। কিন্তু দোহাই মিমিকে বলবে না, রেলের চাকরি হচ্ছে তোমার। বিলাসপুর তোমাকে চলে যেতে হবে।

    কিছু বলছি না আমি। কী বলব!

    সামনাসামনি দু-জন টেবিলের দু-পাশে। শ্বেতপাথরের গোল টেবিল। সব অহঙ্কার এই একটি টেবিল এক নিমেষে উল্টে দিতে পারে।

    –বিলু তোমার দু-হাত ধরে বলছি।

    তিনি আমাকে প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিতে থাকলেন।

    মাথা নিচু করে বললাম, কথা দিচ্ছি ওকে আমার কাজের কথা বলব না। রেলে কাজ পেয়েছি বলব না। এখান থেকে চলে যাচ্ছি বলব না।

    তা হলে পরী জানে না, আমার রেলে চাকরি হচ্ছে। পরী কিছুই জানে না। আমার অনুমানই ঠিক, আমাকে দূরে বনবাসে পাঠিয়ে দেবার জন্য পরীর দাদুর এই চক্রান্ত। মানুষটা কত অসহায়, কোথাকার কে এক বিলু এসে এই পরিবারে ঝড় তুলে দিয়েছে। এই প্রাচুর্যের বিরুদ্ধে বড় রকমের প্রতিশোধ নিতে পারছি ভেবে ভারী মজা অনুভব করলাম আর তারপরই আমি কেমন পাগলের মতো হা হা করে হেসে উঠলাম।

    —বিলু! বিলু। তিনি চিৎকার করছেন।

    আমি হাসছি।

    আমার সেই হাসির প্রচন্ড আওয়াজে ঝড় উঠে গেছে বাড়িটাতে। সবাই দৌড়ে নেমে আসছে। দেখতে পাচ্ছি পরীও এসে রেলিঙে ভর করে দাঁড়িয়ে। সে অবাক হয়ে দেখছে আমাকে।

    দেখলাম পরী দ্রুত দৌড়ে নেমে আসছে।

    দেখলাম পরী আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, এই বিলু কী হয়েছে! কী হয়েছে তোমার! বিলু বিলু, পাগলের মতো হাসছ কেন? আমার ভয় করছে! প্লিজ বিলু!

    পরী নার্ভাস হয়ে পড়ছে। এও এক মজা। এ পরিবার সম্পর্কে আমার কৌতূহলের শেষ ছিল না। এ বাড়িতে এলেই মনে হত এরা সব যেন ভিন্ন গ্রহের মানুষ। লম্বা দীর্ঘকায় সব পুরুষ, সৌম্য। এবং আভিজাত্য চলাফেরায়। বাড়ির ভেতরে ঢুকলে সুঘ্রাণ। সব তকতকে ঝকঝকে। মারবেল পাথরের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে ভয় লাগত। পা পিছলে পড়ে যেতে পারি। পরী কত সহজে লাফিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে যাবার সময় বলত, এস না ভয় কী! সেই পরিবারে আমার সামান্য হাহাকার হাসি ঝড় তুলে দিয়েছে।

    পরী নার্ভাস হয়ে পড়লেই পরীর চোখে জল চলে আসে। আসলে পরী বড় হয়েছে এক সুন্দর ফুলের উপত্যকায়—সে জানেই না, এই পৃথিবীতে বনজঙ্গল কাঁটাগাছই বেশি। সে জানে না, এ পৃথিবীতে বড় হতে গেলে পার হতে হয় অনেক উঁচু টিলা, গিরিখাত। আমি আর হাসতে পারলাম না। কতদিন পর যেন পরীর সঙ্গে দেখা। পরীকে বললাম, তোমার কোনো পাত্তা নেই। কী ব্যাপার?

    —কোনো ব্যাপার নেই। তুমি বোস। আর একদম হাসবে না।

    পরী কী আমার মধ্যে টের পায় এক ভালবাসার পাগল কাঙাল হয়ে আছে। অথচ ভীরু বলে চাইবার সাহস নেই। ভীরু বলে জোরজার করার ক্ষমতা নেই। সবসময় অহঙ্কার নিয়ে বেঁচে থাকার মধ্যে পরীর প্রতি আমার ছলনা আছে। ওটা আমার বর্ম। পরী কি ধরতে পেরেছে, আমার সব বিরূপতা আসলে দুর্বলতা থেকে!

    পরী আমার অস্বাভাবিক আচরণে ঘাবড়ে যেতে পারে ভেবে আমি আর হাসলাম না। আসলে পরীর দাদু আমাকে কত ভয় পান, আমি তাঁর গলার কত বড় কাঁটা, সেই ভেবে হাসা। সামান্য এক বিলু, প্রাথমিক ইস্কুলের মাস্টারি পেয়ে যে বর্তে গেছে, সেই বিলু এক দোর্দন্ড প্রতাপশালী মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে—সেই ভেবে হাসা!

    পরীকে বললাম, জান আমার যাওয়া হয়নি।

    —হয়নি তো বেশ। ও নিয়ে তোমায় আর ভাবতে হবে না। সে এবার পেছনের দিকে তাকালে দেখলাম—যে যার মতো দরজা দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। ওর দাদু পর্যন্ত। পরী এতদিন নিজে মুষড়ে পড়েছিল, আজ আমার অস্বাভাবিক ব্যবহারে সে ভেবেছে, তাকে শক্ত হতে হবে।

    পরী বলল, চল বের হব।

    —কোথায়?

    —চলই না।

    পরী যেন এই কারাগার থেকে বের হয়ে মুক্তি পেতে চায়। আবেগের বশে এসব চলে, কিন্তু জীবনের বড় হওয়ার ক্ষেত্রে আমি তার অচল পয়সা।

    দাদু সিঁড়ি থেকে ফিরে এলেন, কোথায় যাবে?

    —বাবাঠাকুরের কাছে।

    তার তখনই চিৎকার, রঘু, রঘু।

    বুড়ো মানুষটার কী ভয়ঙ্কর গম্ভীর গলা। সবাই দৌড়ে আসছে।—মিমি কালীবাড়ি যাবে। গাড়ি বের করতে বল।

    মিমি বলল, দাদু গাড়ি লাগবে না। আমি বিলুর সঙ্গে সাইকেলে যাব। বাবাঠাকুর বললেন না, বিলুকে পেলে ধরে আনবি তো!

    বাবাঠাকুরের কথায় দেখলাম তিনি একেবারে নিস্তেজ হয়ে গেলেন।

    পরীকে বললাম, বাবাঠাকুর সত্যি ধরে নিয়ে যেতে বলল?

    —হ্যাঁ বিলু, বলেই সে দৌড়ে উঠে গেল ওপরে। কত অস্বাভাবিক দেখেছি পরীকে কিছুক্ষণ আগে, মুহূর্তে পরী আবার কত স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সে কি বুঝে ফেলেছে, আত্মহত্যা করার অধিকার তার আছে, কিন্তু বিলুকে গলা টিপে মারার অধিকার তার নেই। সে কি সেই ভেবে এত সহজ হয়ে গেল। ঠিক আগেকার পরী। সিঁড়ি ধরে নেমে এল খুব সাদামাটা পোশাকে। আমার সঙ্গে সাইকেলে বের হবার সময় দারোয়ানকে বলল, পরেশচন্দ্র এলে বলবে দিদিমণি বাড়ি নেই। কখন ফিরবে ঠিক নেই।

    আর অবাক, কিছুটা এগিয়ে টাউন হলের কাছে এসে এক পায়ে মাটিতে ভর দিয়ে সাইকেল থামিয়ে বলল, চল আগে পরেশচন্দ্রের কোয়ার্টারেই খাওয়া যাক। তারপর কেমন অসহায় গলায় বলল, দাদুর কষ্টটা বুঝি। দাদুর কাছেই আমি মানুষ। দাদু বাবা সবাই চায় আমার ভাল হোক। আমি বুঝি বিলু—কিন্তু মানুষের কী ভাল কী মন্দ কেউ বলতে পারে। কোথায় সে তার ভালমন্দ খুঁজে পায় কেউ জানে না!

    পরী আমার সঙ্গে বের হয়ে আমায় কিছুটা সঙ্কোচের মধ্যে ফেলেছিল। আমার চাকরিটা শেষ পর্যন্ত হবে কিনা কে জানে। পরীর বের হয়ে আসাটা ঠিক হয়নি। যখন বিয়ে ঠিক। তাছাড়া এতবড় চাকরির খবর পরীকেও দিতে পারছি না—খুবই সুখবর। পরী বাড়ি গেলে জেনে ফেলতে পারে। বাড়ির কেউ বলে দিতেই পারে। আর কেউ না বললেও পিলু বাহবা নিতে ছাড়বে কেন!

    পরেশচন্দ্রের বাংলোর কাছে এসে পরী বলল, ধুস যত সব। চল তো!

    —কোথায়?

    —চলই না।

    ভাবলাম তবে পরী কালীবাড়ি যাবে। বললাম, পরেশচন্দ্রের সঙ্গে দরকার ছিল।

    —কিসের দরকার?

    —না মানে……এই যে এলে, এসে ফিরে যাচ্ছ।

    —কোনো দরকার নেই। ওর বোঝা উচিত, আমি কী চাই।

    —তুমি কী সত্যি চাও কেউ জানে না।

    —জানে না তো বেশ।

    তারপর পরী কেমন অকপটে বলে গেল, বিলু আমার বিয়ে হলে তোমার কষ্ট হবে না?

    —হ্যাঁ, তা একটু হবে।

    —একটু হবে?

    —বেশি হলে তোমার ভাল লাগবে?

    পরী জবাব দিল না। সে সাইকেল ঘুরিয়ে দিল—কালীবাড়ির কাছে এসে বলল, সত্যি বেচারা লক্ষ্মী!

    কালীবাড়ি এলেই আমার কাছে লক্ষ্মীর স্মৃতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে ভেবেই, কেমন ভয় ছিল, কালীবাড়ি আর আসা হয়নি। লক্ষ্মীর আত্মহত্যার পর এখান থেকে চলে গেছি—এই আত্মহত্যার মূলে আমি আর পরী। সেদিন জ্যোৎস্না রাতে পরীকে বাগানের মধ্যে আমার সঙ্গে ঘুরতে না দেখলে মেয়েটা হয়তো নিজেকে বিনাশ করত না। এসব মনে পড়লে বিষণ্ণ হয়ে যাই। মন্দিরের দরজায় লক্ষ্মীর সেই আমার জন্য অপেক্ষায় বসে থাকা, কলেজ থেকে ফিরলে হাতমুখ ধোওয়ার জল, পাজামা গেঞ্জি এগিয়ে দেওয়া—এসবই ছিল তার কাজ। কথায় কথায় বলত, দেবস্থানে মিছা কথা বলতে নাই। তা’হলে মা-কালীর অভিশাপে জিব খসে পড়বে।

    লক্ষ্মীর ধারণা সে যাকে ভালবাসে, তার পরমায়ু কমে যায়। দেড়-দু বছর একজন সমবয়সী শ্যামলা মেয়ে কাছাকাছি থাকলে টান ধরেই যায়—লক্ষ্মীই প্রথম খবর দিয়েছিল, বাড়ির নতুন মাস্টারের। পরী সেই খবর পেয়ে চিড়িয়াটিকে দেখার জন্য বাইরের ঘরে হাজির সেদিন। সেই থেকে আজ আমরা সেখানেই যাচ্ছি যেখানে পরী আছে আমি আছি, বাবাঠাকুর, বদরিদা, বউদি সবাই আছেন—নেই শুধু লক্ষ্মী। লক্ষ্মী মরার আগে নিজেকে নববধূর মতো সাজিয়েছিল। কপালে সিঁদুরের টিপ, লালপেড়ে শাড়ি, পায়ে আলতা। সিঁথিতে সূর্যাস্তের শেষ আলো—এক লম্বা লাল সড়ক- আমরা দুজনে এখন তার উপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছি।

  • দশ

    দশ

    পরী কালীবাড়ি যাবার রাস্তাটায় ঢুকে সাইকেল থেকে নেমে পড়ল। আমরা পাশাপাশি দু’জন সাইকেল চালিয়ে এসেছি। দু’জনের মধ্যে একটা কথাও হয় নি। হবার কথাও নয়।

    শহরটা কেমন ক্রমেই ঘিঞ্জি হয়ে উঠছে। শহরের ভেতর নিরিবিলি সাইকেল চালিয়ে আসা কঠিন। সরকারি খামারের পাশে এসে পড়লে দু-পাশে মাঠ দেখা যায়। রিকশা কিংবা মানুষের চলাচল কম বলে, খামারের পাশ দিয়ে আসার সময় ইচ্ছে করলে আমরা দু’জনে দু-একটা কথা যে বলতে পারতাম না তা নয়। তবু কেমন আমরা দু’জনেই নিজের মধ্যে ডুবে ছিলাম।

    ডুবে ছিলাম বললে ঠিক হবে না। আসলে পরীর কথা আমি ভাবছিলাম। আমার কথা পরী ভাবছিল।

    পরী এ-ভাবে অকপটে কথাটা বলতে পারবে ভাবিনি। ও যত অকপটে বলেছিল, আমি তার চেয়ে আরও সহজে জবাব দিতে পেরেছি। এটা কী করে বুঝি না! আমার তো জ্বালা হবার কথা। কিন্তু আশ্চর্য যেন এমন কোনো ঘটনাই নয় এটা। আর দশটা স্বাভাবিক ঘটনার মতোই পরীর বিয়ে হবে। এতে অবাক হবার কী আছে!

    আমার মধ্যে আসলে ঘটনার প্রতিক্রিয়া শুরু হয় অনেক পরে। এই যে সাইকেল চালিয়ে পাশাপাশি এসেছি, পরী একটা কথা বলেনি আমি একটা কথা বলিনি, দেখলে মনে হবে কেউ কাউকে আমরা চিনি না। এখন বুঝতে পারছি পরীর কথাগুলিই আমাকে এতক্ষণ ভাবিয়েছে।

    শুধু পরী কেন, তার দাদুর কথাও।

    যেন একটা সামান্য কথা জীবনে এমন মারাত্মক আলোড়ন তুলবে তখন যেন টেরই পাইনি। কত অনায়াসে বলতে পেরেছিলাম, হ্যাঁ, তা একটু হবে।

    পরী কেমন বিস্ময়ে চোখ তুলে দেখছিল। অনেকক্ষণ অপলক তাকিয়ে ছিল আমার মুখের দিকে। তারপর মাথা নিচু করে বলেছিল? একটু হবে?

    আমি হেসে ফেলেছিলাম। এখন ভাবছি, এমন কথা শোনার পর কেউ হাসতে পারে! আমি মানুষ! অথচ কত অনায়াসে বলেছি, বেশি হলে তোমার ভাল লাগবে?

    কালী বাড়ির রাস্তায় ঢুকেও আমরা কথা বলতে পারি নি। সাইকেল থেকে নেমে পরীর কথাও যেন আমার কানে যায় নি। কিংবা এতক্ষণে যেন মনে করতে পারছি পরী লক্ষ্মী সম্পর্কে কী একটা মন্তব্য করেছিল। কী বলেছিল পরী! আমার মাথায় কী কোন গন্ডগোল শুরু হয়ে গেছে! বেচারা লক্ষ্মী। এমন কিছু বলেছিল। যেন এক দূর অতীত থেকে কথা ভেসে আসছে।

    এই পথটা আমার চেনা কত কালের। এই রাস্তায় কিছু ইতস্তত বাড়িঘর উঠেছে। শহর ছাড়িয়ে রেল-লাইনের পাশে বেশ নির্জন জায়গা। সকালের রোদ গাছের মাথায় উঠে এসেছে। পরী লাল রঙের সৌখিন লেডিজ সাইকেলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন তার কালীবাড়িতে বাবাঠাকুরের কাছেও যাবার ইচ্ছে নেই। আমাকে তার একা পাওয়া দরকার। একা পাওয়া দরকার তাই বা মনে করছি কী করে। বললাম, কী হল! যাবে না!

    —ভাবছি।

    —ভাববার কি হল!

    —ভাবছি আমি একাই যাব। দু’জনে গেলে ভাববে, তুমি আমার গেরো। তাই বিয়েটা ভেঙে দিতে চাইছি, তিনি বুঝতে পারবেন।

    —না গেলে বুঝি বুঝতে পারবেন না।

    —কী করে বুঝবেন!

    —কেন তোমাদের পরিবারে তিনি তো অন্তর্যামী। তোমার দাদু যে আমাকে নিয়ে ফ্যাসাদে পড়েছেন, নিশ্চয়ই চোখ বুজলে টের পান বাবাঠাকুর—আমি গেলেও টের পাবেন, না গেলেও টের পাবেন।

    হাওয়া দিচ্ছিল। শরৎকাল এসে গেছে, ঠান্ডা আমেজ। পরীর রেশমের মতো ববকরা চুল উড়ছিল। সাদা সিল্ক পরনে। আঁচল একটু হাওয়াতেই খসে পড়ছে। পরী শাড়ী ঠিকঠাক করতে করতে বলল, দাদুকে ঠেস দিয়ে কথা বলছ কেন? বয়স হলে হয়। বৈভব থাকলে এটা আরও বেশি হয়। আমার দাদুর দুটোই আছে। তার একজন বাবাঠাকুর না থাকলে নির্বিঘ্নে বাঁচবেন কী করে! বাবাঠাকুর যে অন্তর্যামী নন, সেটা তুমিও বোঝো আমিও বুঝি। তুমিও কম প্রিয় নও বাবাঠাকুরের। তুমি একা গেলেই হত। কত করে বলেছি, যাও নি। আসলে তুমি স্বার্থপর। পরের জন্য কিছু করার দায় তোমার থাকবে কেন!

    আমি স্বার্থপর। পরী যেন ঠিকই বলেছে, স্বার্থপর না হলে কালীবাড়ি ছাড়ার পর একদিনও যাইনি কেন! কতবার বাবা বলেছেন যা একবার বাবাঠাকুরের কাছে। তাঁর অসীম করুণা না থাকলে চাকরিটা হত? মুকুলের জামাইবাবু উপলক্ষ্য মাত্র।

    বাবাকেও দেখেছি, কালীবাড়ির সেই আধ ন্যাংটা সাধুর প্রতি একটা অসীম ভরসা আছে। বাবা একদিন বলেছিলেন, বদরিই বা কী না ভাবছে। কালীবাড়িতে বদরি থাকতে না দিলে কী করে পড়তিস। বৌমাও তোকে পুত্রস্নেহে লালন করেছে। তোর ছাত্ররাই বা কী না ভাবছে। না বলে না কয়ে সেই যে চলে এলি, আর গেলি না। লক্ষ্মী অপঘাতে মারা গেল, এটা তার নিয়তি। তোর যে কী হয়! সংসারে নিজেকে নিয়ে কেবল ভাবলে চলে না। এতে জীবনের মন্দ দিকটাই ফুটে ওঠে।

    আর পরী তো বলবেই, যে বার বার বলেছে, এ বিয়ে একমাত্র ভেঙে দিতে পারেন বাবাঠাকুর। তুমি তো জান বিলু, দাদুর শেষ ভরসা বলতে তিনি। তিনি হ্যাঁ করলে হবে, না করলে হবে না। বাবাঠাকুর কত আক্ষেপ করেছে, বিলুটা সেই যে গেল আর এল না। ওর হয়েছেটা কী!

    কী হয়েছে বোঝাই কী করে। কালীবাড়ির রাস্তাটা শহরে যেতে আসতে পড়ে। ভিতরে ঢুকে আধ মাইল খানেক রাস্তা পার হলে গভীর বনজঙ্গলের মধ্যে মন্দির, বটতলা, সেবাইত, বদরিদা’র ঘরবাড়ি। খুবই নির্জন। মন্দিরের পিছনে বিশাল ঝিল। ও-পারে যতদূর দেখা যায় শুধু বাঁশের জঙ্গ ল। মন্দিরের সামনে রেল-লাইন, দু-পাশে যতদূর দেখা যায় শুধু আমের বাগিচা। রোজ শহরে যাই আসি। অপরূপা কাগজ বের করি। ইস্কুল করি, মুকুল, নিখিল, নিরঞ্জনের সঙ্গে আড্ডা দিই।

    রাস্তায় জড়বৎ দু’জন নারী-পুরুষ দাঁড়িয়ে থাকলে লোকের চোখে পড়ারই কথা। কেউ আমরা কথা বলছি না। যেন কালীবাড়ির রাস্তায় ঢুকে আমাদের দু’জনেরই মনে হয়েছে, পথ ভুল করেছি।

    শহরের লোকজন পরীকে চেনে না, এমন কেউ আছে আমি জানি না। এই সেই মেয়ে—এখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন যুবকের সামনে। দু’চারজন যুবক থাকবে, এটাও তাদের কল্পনার বাইরে নয়। দঙ্গল নিয়ে পরীর ঘোরার অভ্যাস। কারো হাতে ফেস্টুন, কারো হাতে পোস্টার। পরী দাঁড়িয়ে আছে, ওরা পোস্টার মারছে।

    পরীর আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকাটা অস্বাভাবিক না। অস্বাভাবিক আমার হাতে কোনো ফেস্টুন নেই, কোনো পোস্টার নেই। পরী যে আজ মাসখানেক হল বড়ই বিপাকে পড়েছে কেউ জানে না। এমন কী আমাদের অপরূপা কাগজের কবি লেখকরাও না। এজন্যে পরী আমাদের অস্থায়ী কাগজের অফিসে আসতে পারছে না কিংবা তাকে আসতে দেওয়া হচ্ছে না।

    আমার কিছুই ভাল লাগছে না।

    পরী বলল, এস হাঁটি।

    আমরা দু’জনে পাশাপাশি সাইকেল নিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। মনে হয় পরী কোনো নির্জন জায়গায় আমাকে আজ নিয়ে যেতে চায়। পরীর দাদু আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল কেন জানতে চাইতে পারে। পরীর দাদু যে আমাদের বাড়ি পর্যন্ত ধাওয়া করেছে আমার খোঁজে, সেটা শুনলে আরও হতবাক হয়ে যাবে। পরী আর শ্রীময়ী থাকবে না। ওর লাবণ্য ঝরে পড়বে সহসা, সে কঠিন রুক্ষ গলায় বলবে, বিলু তোমার আত্মসম্মান বোধটুকুও গেছে। তুমি ফাঁদে পা দিলে। তোমার কাছে চাকরিটাই বড়। অপরূপার জন্য আমার এত খাটাখাটনি তুমি এক দণ্ডে বিসর্জন দিতে পারলে। তোমার কষ্ট হল না?

    যেতে যেতে পরী বলল, কী, কথা বলছ না কেন?

    —তুমিও তো কথা বলছ না।

    —আমার আবার কথা কী।

    —তোমারই তো কথা।

    —না। আমার কোনো কথা নেই। তুমি জেনে রাখ আমি রাজি না হলে কারো ক্ষমতা নেই কিছু করে।

    —তবে তুমি এত ভেঙে পড়েছ কেন?

    ভেঙে পড়েছি তোমার কথা ভেবে। দাদুকে আমি জানি। বলেই পরী কী বলতে গিয়ে থেমে গেল।

    —কী জান?

    —দাদুর আত্মসম্মানে লেগেছে। একটা রিফুজি ছেলে তার বনেদি পরিবারে ঝড় তুলে দেবে তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। পরেশচন্দ্রকে আমি সোজা বলে আসতে পারি আমাদের বাড়ি ফের গেলে ঠ্যাং ভেঙ্গে দেব।

    —তা তুমি পার, বিশ্বাস করি। তবে আমি তা চাই না। পরেশচন্দ্র ভাল মানুষ। তোমার রূপে সে মজেছে। অপরূপার জন্য সেও কম করছে না।

    —করছে, আমি আছি বলে।

    —কেন ওর কবিতা!

    —ও তো আমার সঙ্গে আলাপ করার জন্য! ওটা পরেশের ছলনা।

    —আগে লিখত না?

    —জানি না লিখত কি না।

    আমি এবারে হেসে দিলাম। বললাম, সত্যি তোমাকে সে ভালবাসে পরী। দেখতেও খারাপ না। তাছাড়া শুনেছি, বিয়ে হয়ে যাবার পর ক্লাশ করতে পারবে। পড়ায় বাধা দেবে না। ওর বাবা তোমার দাদুকে কথা দিয়ে গেছে।

    —বিলু!

    দেখলাম পরীর মুখ লাল হয়ে উঠেছে। ওর ভেতর এতদিন অস্থিরতা কাজ করেছে, অর্থাৎ কী করবে ঠিক করতে পারছিল না, কারণ পরী তো তার দাদুকে নিজের চেয়ে বেশি ভালবাসে। তার বাবা কাকারাও কম না। সবার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সাহস যেন তার এতদিন ছিল না। আজ তাদের হলঘরে আমার হাহাকার হাসি শুনে সে ঠিক করে ফেলেছে সব। কেন যে মনে হল বাবাঠাকুরের কাছে যাবে বলে বাড়ি থেকে যে পরী বের হয়ে এল, এটা তার আর এক ছলনা।

    বললাম, পরী অবুঝ হবে না। তোমার দাদু ভাল চান তোমার। তাকে আর যাই কর, ছলনা কর না। আমি তার কষ্ট বুঝি। আমি সত্যি দেখছি তোমার মাথাটি খেয়েছি।

    পরী কিছু বলল না। আমার দিকে শুধু একবার আড়চোখে তাকাল। এই তাকানো আমাকে এত দুর্বল করে দেয় যে আমি আর নিজের মধ্যে ঠিক থাকি না। কেমন উতলা হয়ে পড়ি। পরীর চোখে এত ধার আছে, এর আগে যেন আর টের পাই নি।

    পরী সামনের খোলা একটা মাঠের মধ্যে গিয়ে বসে পড়ল। পাশের একটা আমগাছে সাইকেলটা তার দাঁড় করানো! পরী আমার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। এই রাস্তার পাশে খোলা মাঠে পরীকে নিয়ে বসে থাকতে আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। কারণ এই রাস্তায় রিকশার চলাচল আছে। মানুষজনেরও। দুপুর না হোক, শরতের এই না দুপুর না সকাল এমন একটা অসময়ে যে কোনো নারীকে সামনে নিয়ে বসে থাকতে অস্বস্তি হয়। পরীর না হতে পারে আমার হয়। আমি তো পার্টি করি না, যে গণসংযোগ করতে বের হয়ে পড়েছি, ক্লান্ত হয়ে পার্টির কোনো কর্মীকে নিয়ে গাছতলায় বিশ্রাম নিচ্ছি।

    রাস্তায় দাঁড়িয়েই বললাম, কালীবাড়ি তা হলে যাচ্ছ না।

    পরী জবাব দিল না।

    পরীর এই একগুঁয়েমি বড় বেশি আমাকে রূঢ় করে তোলে। কিন্তু আজ কেন যে তাকে একটাও রূঢ় কথা বলতে পারছি না।

    পরী বসে বসে ঘাসের ডগা ছিঁড়ছে। কার জেদ কত প্রবল সে যেন এখন যাচাই করতে বসে গেছে। আমার না তার।

    আমি আর পারলাম না। ওর পাশে গিয়ে সাইকেলে ভর করে দাঁড়ালাম। নিজেকে খুবই বুদ্ধ মনে হচ্ছে। কী বলব। তবু কথা না বললে, স্বাভাবিক না থাকলে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে উঠতে পারে ভেবে বললাম, তোমার দাদুকে বললেই পারতে বিলুকে নিয়ে বের হচ্ছি। কালীবাড়ি যাবে বললে কেন। কালীবাড়ি যাবে তো এখানে বসে থাকলে কেন। গাড়ি বের করতে বললেন, বললে কেন, না সাইকেলে চলে যাব। এ-সময় আমাদের দু’জনকে এভাবে দেখলে লোকেই বা কী ভাববে! তোমার দাদুর কানে উঠলে তিনিই বা আমার সম্পর্কে কী ভাববেন। ফুসলে বের করে এনেছি এমনও ভাবতে পারেন।

    পরী নির্বিকার। যেন আমি দাঁড়িয়ে যতক্ষণ কথা বলব, ততক্ষণ সে একটা কথারও জবাব দেবে না।

    এবার বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে বললাম, কী বলছি শুনতে পাচ্ছ।

    পরীও পাগলের মত চিৎকার করে বলল, না, শুনতে পাচ্ছি না।

    এরপর আর কী করা যায়! পরীকে ফেলে বাড়ি চলে যেতে পারি। কেন যে সকালে মরতে পরীদের বাড়ি গেছিলাম! বাবা ঠিকই বলেন গ্রহ বিরূপ হলে এসব হয়। আমার গ্রহের অবস্থান ভাল না। বাবা আমাকে প্রায়ই বলেন, যেন সাবধানে চলাফেরা করি।

    কিন্তু বাবাই তো ঠেলে পাঠালেন। রায়বাহাদুর নিজে এসেছিলেন, তোমার যাওয়া উচিত। তোমার সার্টিফিকেটগুলো নিতে ভুলো না। নারায়ণের কৃপায় রেলে কাজটা হয়ে গেলে গ্রহ শান্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বাবা গরীব বলেই ধর্মভীরু মানুষ। মানুষের সব কিছুতেই তিনি। তাঁর কৃপা না থাকলে কিছু হয় না। তাঁর কৃপা আছে বলেই শহরের এমন প্রভাবশালী মানুষ যেচে আমাদের বাড়িতে এসেছেন। আমি একটা প্রাইমারি স্কুলে পচে মরি, তিনি চান না।

    তিনি কী চান, আমার চাইতে বাবা বেশি কী বুঝবেন। এ সময় বাবার উপর ক্ষোভে দুঃখে আমার চোখে জল এসে গেল। বড় প্রলোভনে ফেলে তিনি যে আমাকে দেশছাড়া করতে চাইছেন, বাবা যদি বুঝতেন! পরী কী তবে সব টের পেয়েছে। টের পেয়ে মরীয়া হয়ে উঠেছে। আমার সব ক্ষোভ পরীর উপর নিমেষে জল হয়ে গেল। সাইকেলটা পাশে রেখে মুখোমুখি বসলাম। একজন এতবড় ঘরের নারীর যদি অসম্মান না হয় আমার মতো গরীব বামুনের অস্বস্তির কী কারণ থাকতে পারে!

    বসে একবার আমিও আড়চোখে দেখলাম পরীকে। পরীর চোখে চোখ পড়ে গেল। পরীর দু চোখ জলে ভারী। পরী শুধু বলল, বিলু, তুমি আমার অহংকার। তুমি ভেঙ্গে পড়লে আমি দাঁড়াব কোথায়। বল দাদুর সঙ্গে তোমার কী কথা হয়েছে? কেন ডেকেছিলেন। তাঁর দয়া-দাক্ষিণ্য তুমি হাত পেতে নিলে, আমার কষ্টের শেষ থাকবে না। বল, চুপ করে আছ কেন!

    আমি মাথা নিচু করে বললাম, পরী, পাগলামি কর না। আবার বলছি, তিনি তোমার ভাল চান। তুমি তাঁর কাছে মানুষ! তোমার ভাল হয়, এমন করে আর কেউ চাইতে পারে না!

    —বিলু!

    আমি চুপ করে গেলাম।। পরী তার দাদুর কোনো প্রশংসাই শুনতে চাইছে না। জেদি বালিকার মতো গোঁ ধরে আছে।

    আমরা দু’জনে আবার চপচাপ। স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়েছে। তার শব্দ কানে আসছিল। কেমন এক দূরাতীত শব্দের মতো ট্রেনটা এগিয়ে আসছে। ও-পাশের মাঠ পার হয়ে চলেও গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, আমরা দু’জনে গভীর কোনো নৈঃশব্দের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছি। আমার ভারি কষ্ট হচ্ছিল পরীর অসহায় মুখ দেখে। এক আশ্চর্য সুন্দর শ্রীভূমি যেন দৃশ্যের অন্তরালে উঁকি দিল। আমি আবার নিজের মধ্যে ফিরে এলাম। বললাম, আমি উঠি পরী। স্কুলে যেতে হবে।

    উঠে পড়লে দেখলাম পরী একইভাবে মাথা গোঁজ করে বসে আছে। যেন আমার কথা তার কানে যায়নি। তার দাদু আমাকে কেন ডেকে পাঠিয়েছিলেন, কী এমন গুরুতর খবর যে সকালবেলায় তাদের প্রাসাদতুল্য বাড়ির হলঘরে হাজির হতে বাধ্য হলাম, না জানা পর্যন্ত পরী স্বস্তি পাচ্ছে না।

    কিন্তু বুড়ো মানুষটার আর্ত মুখ চোখে ভেসে উঠতেই কেমন ম্রিয়মাণ হয়ে গেলাম। এমন অসহায় মুখ আমি জীবনেও দেখিনি। যেন আমি বিলু লম্ফের মতো এক ফুঁয়ে তার জীবনের রোশনাই নিভিয়ে দিতে পারি। এখন আমার দরকার পরীকে স্বাভাবিক করে তোলা। কারণ তার চোখ মুখ বড় অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে। বললাম, পরী শুনেছ, চৈতালী কলকাতায় চলে যাচ্ছে।

    পরীর কোনো আগ্রহ নেই চৈতালী সম্পর্কে। চৈতালীর প্রতি মুকুলের দুর্বলতা আছে জানে। দু- একবার পরী নিজেও চৈতালীকে নিয়ে মুকুলের সঙ্গে ঠাট্টা তামাসা করেছে। চৈতালী চলে গেলে মুকুল এই শহরে খুব একা হয়ে যাবে, এও জানে পরী। অথচ নির্বিকার।

    আমাকেই কথা বলতে হবে। ওকে এখন অন্যমনস্ক না করতে পারলে, আমি চলে গেলে অপমান বোধ করবে। আমার সামান্য স্কুলের চাকরিটা এমনিতেই ওর পছন্দ নয়। এ-নিয়ে দু-পক্ষই আমরা লড়ালড়ি করছি। আমি অন্তত ডিগ্রিটা নিই পরী এটা চায়। যেন পরী চায়, ও যতদিন কলেজে পড়ছে, ততদিন অন্তত পড়াশোনা চালিয়ে যাই। পরীর সঙ্গে আর কোথাও না হোক কলেজে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য দু’জনের মেশার সুযোগ থাকবে। পরী আমাকে তার নিজের মতো করে বড় করে তুলতে চায়। নিজের মতো তৈরি করে কোনো নিরুপম পৃথিবীর বাসিন্দা হতে চায়।

    অথচ তার ইচ্ছাপূরণের ক্ষমতাই নেই আমার। পরী কেন যে এটা বোঝে না। পরেশচন্দ্র মানুষটি মার্জিত বিনীত এবং ভদ্র। আমাকে তাঁর ব্যবহার মুগ্ধ করে। তাঁর বাংলোয় গিয়ে বসলে আমার গর্ব হয়। নীল রংয়ের বেতের চেয়ারে বসলে মনে হয় আমি এক রহস্যময় সমুদ্রের বাসিন্দা। কবিতা পাঠের আসরেই দেখেছি, কেমন তিনি কিছুটা সংকোচ বোধ করেন। কবিতার বাতিক না থাকলে তিনি আমাদের বড় দূরের মানুষ। দুর্বল কবিতা লেখেন। কবিতা পাঠের আসরে তিনি যখন কবিতা পড়েন আমরা কেউ কেউ মুচকি হাসি। একদিন পরীকেও দেখেছি হাসি সামলাতে না পেরে উঠে দৌড়ে ভিতরের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেছিল। পরীর উপর আমার সেদিন কী ক্ষোভ! বাইরে এসে পরীকে একা পেতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছি। বলেছি, এ কী অসভ্যতা, সবার সব হয় না। তাঁর আন্তরিকতাকে ছোট করছ কেন!

    আসলে এইসব কবিতা পাঠের আসরে আমি পরীর হিরো। আমার কবিতা সবাইকে শোনাবার জন্যই যেন, এই মাসিক কবিতা পাঠের আসর। শুধু কবিতা পাঠই হয় না। গল্প প্রবন্ধ পাঠও হয়। আমরা অপরূপা কাগজের লেখক কবিরা এই শহরে অন্য এক অহংকার নিয়ে বড় হবার মুখে পরী যে আমাকে নিয়ে কোথায় যেতে চায় বুঝি না। মাঝে মাঝে মনে হয় পরীর পার্টি বিলাসের মতো আমিও তার এক ধরনের বিলাস। কোনো শিশুর খেলনার মতো। আর তখনই মনের মধ্যে পরীর বিরুদ্ধে এক অদৃশ্য বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। মনে হয় এই কবিতার জগতে জোর করে পরীই আমাকে টেনে এনেছে। কবিতার ভূত মাথায় চাপিয়ে দিয়ে সে মজা দেখছে। মজা দেখতে দেখতে কখন সে ভেবে ফেলেছে আমার উপর তার আজন্ম অধিকার। অধিকার কেউ কেড়ে নিলে তাকে সে ক্ষমা করবে না।

    আমি হেসে বললাম, পরী তোমার ছেলেমানুষী আমার ভাল লাগছে না। তুমি উঠবে কি না বল। তোমার দাদুর কাছে কেন গেছি তোমাকে বলতে পারব না। কেন হা হা করে হাসছিলাম বলতে পারব না।

    আমি তো পরীকে বলতে পারি না, তোমার দাদুর কাছে আমি অবাঞ্ছিত। এই শহরে অবাঞ্ছিত। আমাকে তিনি রেলে চাকরীর লোভ দেখিয়ে দেশান্তরী করতে চান।

    পরী বলল, তুমি যাও। আমার যখন খুশি যাব। তোমাকে কে মাথার দিব্যি দিয়েছে দাঁড়িয়ে থাকতে।

    -–দিব্যি কেউ দেয় না পরী। লক্ষ্মী মেয়ে, ওঠো। চল তোমাকে এগিয়ে দিই।

    –তুমি যাবে কিনা বল!

    —না। তোমাকে এভাবে ফেলে আমি যেতে পারি না।

    —কেন, ভয় করে?

    —হ্যাঁ, করে।

    —কেন এত ভয়?

    —তোমাকে চিনি বলে।

    —আমাকে তুমি চেন?

    —চিনি। হেলায় তুমি যে কোন অঘটন ঘটাতে পার।

    —বলছ কী! হেলায়।

    —তা না হলে আমার সঙ্গে মজা করতে আসতে না।

    —মজা!

    —কালীবাড়ি তো ধর্মস্থান। তোমার দাদু বাবা কাকারা এসেছিলেন দেবীদর্শন করতে, বাবাঠাকুরের আশীবাদ নিতে। তুমি এসেছিলে চিড়িয়াটিকে দেখতে। মজা করতে।

    —বেশ করেছি। তাতে তোমার কী।

    পরীকে রাগিয়ে দিতে পারছি, এটাই এখন আমার লাভ। পরীকে অন্য খাতে বইয়ে দিতে পারছি, এটাই আমার সান্ত্বনা। পুরানো কথা বলে চটিয়ে দিতে পারলে পরী হয়ত আর জানতে চাইবে না, আমি কেন সাত সকালে তার দাদুর কাছে গেছিলাম।

    পরীকে বললাম, আমার কিছুই না। তবু তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি। কথায় কথায় হাসি, মজা লোটা ভাল না। এটাই জীবনে তোমার কাল হয়েছে। তুমি সহজে মজা করতে পার, আবার সামান্য অভিমানে চোখ ফেটে জল বের হয়ে আসে। দুটোই ক্ষতিকর।

    —ক্ষতি তো আমার। তোমার ক্ষতি না হলেই হল। আসলে তুমি স্বার্থপর বিলু। তুমি আত্মকেন্দ্রিক। নিজের গোঁ নিয়ে আছ।

    সাইকেলে ভর দিয়েই কথা বলছি।

    পরী বসে থেকেই জবাব দিচ্ছে। আমাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলছে। যে কোনো মানুষের কাছে এভাবে কোন নারীর সামনে উবু হয়ে থাকা অশোভন। অস্বস্তিটা আমার বাড়ছে। এবারে না পেরে ওর হাত ধরে টানলাম। বললাম, ওঠো বলছি। লোকে দেখলে কী ভাববে।

    কারণ এই ছোট শহরে আমাকে কেউ না চিনলেও পরীকে ঠিক চিনে ফেলবে। পরীর যে কোনো অসম্মান কেন যে আমার নিজের অসম্মান মনে হয়। আমি স্থির থাকতে পারি না।

    সে হাত টেনে নিল। যেন জোর করলে ধস্তাধস্তি হবে। তবু পরীকে ওঠানো যাবে না।

    পরী বলল, তুমি সামান্য ক্ষতিও স্বীকার করতে চাও না বিলু।

    —আমার অবস্থায় পড়লে বুঝতে।

    —কী বুঝতাম! তোমার চাকরি না হলে কী হত? তুমি পড়তে না!

    —অগত্যা পড়তে হত।

    —তোমাদের সংসার চলত না!

    —খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলত।

    —সেটা আর দু-পাঁচ বছর হলে ক্ষতি কী ছিল। মাসীমা তো বলেছেন, আমরা কী করব বল! অভাব কোন সংসারে না থাকে! বিলুটা আর পড়বে না। টিউশনি ছেড়ে দিল। বাঁধা মাইনের চাকরি দরকার সংসারে বুঝি।

    —তুমি পরী মা’র দিকটা দেখছ। বাবার দিকটা দেখ। সংসারে দু-বেলা অন্নসংস্থান আমাদের কত দরকার বাবাকে দেখলে বুঝতে। তুমিই আমার কাল। তুমিই সেদিন বাবাঠাকুরের মেঘদূত পাঠের সময়- মুচকি না হাসলে এতবড় অঘটন আমার জীবনে ঘটত না।

    —আমার হাসি পেলে কী করব! আমার কী দোষ।

    —এটাই দোষ। সবাই এত আগ্রহ নিয়ে শুনছে, আর তুমি তাকে মজা ভাবলে। আসলে বাবাঠাকুর আমাকে ডেকে পাশে না বসালে তোমারও আগ্রহ থাকত। কোথাকার একটা ছোকরা কিনা বাবাঠাকুরের দোসর। সে ভুল ধরে দেবে।

    —তুমি অমন গম্ভীর মুখে বসেছিলে কেন! যেন একেবারে ছোট বাবাঠাকুর। যেন কিছু জান না বোঝ না! নবীন সন্ন্যাসী। আমার ছোট বাবাঠাকুর রে! পদ্মাসনে বসে বুড়োদের মতো মুখ করে রাখতে তোমার কষ্ট হচ্ছিল না। ইচ্ছেটাও আছে দেখার, আবার মুখ গম্ভীর করে রাখবে, হাসি পাবে না!

    —কী ইচ্ছে আছে?

    —কেন মনে নেই। চুরি করে আমাকে দেখছিলে কেন, হাসি পাবে না! ছোট বাবাঠাকুর আমার প্রেমে পড়ে গেল!

    —তাকালেই প্রেমে পড়ে!

    —পড়ে। বুঝতে পারছ না।

    —না বুঝতে পারছি না। বুঝতে পারছি না বলেই চলে যাচ্ছি। বুঝতে পারলে কে যায় বল।

    –চলে যাচ্ছ মানে? কোথায়? পরী সহসা উঠে দাঁড়াল।

    —এ শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি। যেন বুঝিয়ে দিতে চাই পরীকে, আমার মতো গরীব বাবার ছেলের প্রেম হল বিলাস।

    —তুমি কোথায় যাবে?

    এবারে আর রায়বাহাদুরের মিনতির কথা মনে থাকল না। – বিলু, পরী যেন না জানে, আসলে পরী জানলে আমার আর কতটা ক্ষতি হবে। ক্ষতি হবে তার দাদুর। আমি জানি পরী আমার কোনো ক্ষতি করবে না। গেরো একটা, পরীর জেদ, না জেনে উঠবে না। এভাবে বসে থাকলে আমিই বা যাই কী করে। সব খুলে বললাম।

    পরী শুনে কেমন হতবাক হয়ে গেছে। বিস্ময় ক্ষোভ সব মিলে পরীর চোখ এখন জ্বলছে।

    —তুমি যাবে ঠিক করেছ? ঠোঁট চেপে পরী কথাটা বলল।

    —এত ভাল চাকরি আমায় কে করে দেবে?

    —আমাদের জন্য কষ্ট হবে না?

    পরী আমার দিকে তাকাচ্ছিল না। অন্যদিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে যাচ্ছে।

    —কষ্ট হলেই কী করা। রেলের চাকরি সোজা কথা।

    —অপরূপার জন্য কষ্ট হবে না। তোমার কবিতার জন্য কষ্ট হবে না?

    এবারে বললাম, ওগুলো শখ। বেকার থাকলে হং।

    —তাহলে সবটাই বেকার ছিলে বলে! কবিতা, অপরূপা, সব।

    পরীকে বোঝাতে পারছি না আমি কত অবাঞ্ছিত পরীদের পরিবারে। আমার ভেতরে বড় অভিমান এবং জ্বালা। আমি থাকলে পরী যে করেই হোক বিয়ে ভেঙ্গে দেবে। সে পারে। ওদের পরিবারের পক্ষে কত বেমানান আমি, নিজেও বুঝি। গোটা পরিবারে ঝড় উঠে গেছে। পরীর স্বাধীনতা শেষপর্যন্ত রায়বাহাদুরের মর্যাদা রাস্তায় লোটাবে, তিনি কল্পনাও করতে পারেন নি। পরীর রুচি এমন নিম্নমানের হবে, তিনি চিন্তাই করতে পারেন না। এ-নিয়ে বাড়িতে বেশ লড়ালড়ি গেছে পরীর বিধ্বস্ত চেহারা দেখলেই টের পাওয়া যায়। কিন্তু কী যে থাকে, আমি যেন চোরের মতো ওদের বৈভবের মধ্যে ঢুকে গেছি। বেহায়ার মতো পরীর সঙ্গে মিশছি। কিংবা পরীকে গুণটুন করেছি, যে-জন্য পরী স্পষ্টই বলে দিয়েছে বোধহয়, আমি রাজি না। সে তোমরা যাই ভেবে থাক। আমি পড়ব।

    না হলে পরীর দাদু আমার বাবার কাছে ছুটে যেতেন না। আমার ভাবনায় পরীর দাদুর ঘুম নেই, যেন আমাকে রেলে চাকরি দিয়ে আমার এবং বাবার দুজনেরই মর্যাদা রক্ষা করছেন। শত হলেও আমি তাঁর গুরুদেব বাবাঠাকুরের প্রিয়, পরীর সঙ্গে এক কলেজে পড়তাম—আমি প্রাথমিক স্কুলে চাকরি করলে সবার অসম্মান।

    পরী এবার সাইকেল নিয়ে হাঁটতে থাকল। পরী ভিতরে ভিতরে যে ফুঁসছে ওর চোখমুখ দেখেই বুঝতে পারছি। পরী রাস্তায় উঠে বলল, চাকরি ঠিক হয়ে গেছে?

    –হয়নি। হবে।

    —কোথায়? চোখ মুখ কুঁচকে আমার দিকে তাকাল। আমি চুপ করে আছি দেখে ফের পরী তিক্ত গলায় বলল, কোথায় হচ্ছে? কোথায় যাবে। বলো! বলো!

    —বিলাসপুরে শুনছি। ওখানেই ট্রেনিং। সামনে নাকি আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যত।

    পরী এবারে হা হা করে হেসে উঠল। ঠিক আমি যেভাবে পরীদের বাড়িতে রায়বাহাদুর হাত ধরতেই হেসে উঠেছিলাম।

    আমি এমন একজন জাঁদরেল মানুষের, যিনি মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান, যিনি সকাল হলে শহরের শতেক সমস্যা নিয়ে মানুষের সঙ্গে দেখা করেন, মানুষজন লাইনবন্দী হয়ে তাঁদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে, বাড়িতেই এই, অফিসে না জানি কত ইজ্জত,—সেই মানুষটা এত অসহায় তাঁর নাতনীকে নিয়ে ভাবতেই ভিতর থেকে জীবনের প্রবল তামাসার মতো হাহাক্কার হাসিতে ফেটে পড়েছিলাম। ওটা ছিল আমার জয়ের হাসি। বিশাল পরাজয়ে আমি যে কতটা ভেঙে পড়েছি তারও প্রকাশ।

    পরী কেন হাসছে!

    পরীকে বললাম, কী হয়েছে তোমার। এত হাসছ কেন!

    —তোমার চাকরি হবে রেলে। হাসব না, কী আনন্দ।

    —হবে বলেছেন। কাল সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে বলেছেন। এখনও হয়নি।

    —আর কিছু নিয়ে যেতে বলেন নি?

    –না।

    —ঠিক আছে। বলেই সে সাইকেলে চড়ে সোজা চলে গেল। গাছের ছায়ার এবং ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। একবারও আমার দিকে ফিরেও তাকাল না। আমি যে দাঁড়িয়ে আছি, আমি যে দাঁড়িয়েই আছি, আমার এ-দাঁড়িয়ে থাকা যে পরীর জন্য অনন্তকালের। পরী আমাকে ফেলে চলে গেল, এমন কেন মনে হচ্ছে বুঝতে পারছি না। এ-আবার আমার কেমন অভিমান!

    আমিই তো চাইছিলাম পরী চলে যাক। শহর ছাড়িয়ে জেলখানার মাঠ পার হয়ে রেললাইনের পাশে বসে থাকা কত অশোভন, এটাই কেবল মনে হচ্ছিল। পরী চলে যাওয়ায় কেমন একা হয়ে গেলাম। পরী চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকলাম।

    তখন গাছপালার ফাঁকে আমার মুখে রোদ পড়েছে। বনজঙ্গলের রাস্তাটা পার হয়ে গুমটি ঘরের দিকে হাঁটতে থাকলাম। আমার ইস্কুল আছে, বাড়ির সবাই অপেক্ষা করছে।

    এ সবই ভাবতে ভাবতে হাঁটছিলাম।

    আমার সঙ্গে সাইকেল আছে ভুলে গেছি। সাইকেল নিয়ে হাঁটছি। গুমটি পার হয়ে মনে হল, কী করব! পরী কেন যে আমার এত বড় সুখবরেও খুশি হল না। থার্ড ইয়ারে ভর্তি না হয়ে প্রাইমারী ইস্কুলে চাকরি নেওয়ায় পরীর ক্ষোভ আছে বুঝি, কিন্তু হাতের কাছে এত বড় চাকরির খবরেও পরী খুশি নয়। আমি না হয় বুঝতে পারি, কেন রায়বাহাদুর চান আমি এখান থেকে চলে যাই।—কিন্তু পরী, সেও কী টের পায় দাদুর আসল উদ্দেশ্য বিলুকে ঘরছাড়া করা। শহর ছাড়া করা।

    কখন বাড়ির রাস্তায় ঢুকে গেছি টের পাই নি। পিলু দৌড়ে আসছে। এবং আমার বাবা-মাও খবরটা পাবার আশায় প্রতীক্ষা করছে বুঝতে পারছি।

    পিলু এসেই বলল, দাদারে!

    এই দাদারে বললেই বুঝি আমার জীবনে পরীর অস্তিত্ব যত ঝড়ই তুলুক, এরাও আমার কম নয়। একদিকে পরী, আর একদিকে অভাবের সংসার থেকে আমার বাবা-মার মুক্তি। ভাইবোনদের বড় করে তোলা,–কত কাজ আমার।

    পিলু আমার খবর বাড়িতে পৌঁছে দেবার জন্য দৌড়ে গেল।—দাদা আসছে।

    এতটা রাস্তা সাইকেলে না এসে হেঁটেই চলে এসেছি টের পেতেই বুঝলাম পরী কতটা আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। পিলুর ‘দাদারে’ কথায় যেন আমি জেগে গেছি। সত্যি বেলা হয়ে গেছে। নতুন চাকরি। স্কুলে না গেলে বাবা মনে মনে ক্ষুব্ধ হবেন। বলবেন, বিলু কর্তব্যকর্মে অবহেলা ঠিক না। মানুষ কাজের মধ্যেই বাঁচে।

    বাড়ি ঢুকে দেখলাম বাবা বাড়ি নেই।

    মা’র পাশে খোঁড়া বাঁদরটা রান্নাঘরে বসে আছে। খোঁড়া বাঁদরটা মা’র ভারি ন্যাওটা। মায়া মাঠ থেকে ছাগল তাড়িয়ে আনছে। আমার ফিরে আসার অপেক্ষাতে হয়তো বাবা বসে আছেন এমন মনে হয়েছিল। কিন্তু বাবাকে বাড়ি না দেখে মনে মনে খুশি হলাম। পিলু যে দাদারে বলেই চুপ মেরে গেছে, আর একটা কথাও বলেনি কেন, এখন বুঝেতে পারলাম। আমার চোখ মুখ দেখলে পিলুই আগে টের পায়, আমি ভাল নেই। দেখেই বুঝেছে, তার দাদাটির কিছু হয়েছে। চোখ মুখ ভাল ঠেকছে না।

    পিলু তার দাদার বিষণ্ণ মুখ দেখলে অস্থির হয়ে পড়ে। সে মাকে এসেও খুব একটা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে দাদা আসছে খবরটা বোধ হয় দিতে পারেনি। অথবা কিছুই বলেনি। সে তার নিজের কাজে মন দিয়েছে। এই সংসারে সে কিছু নিজের মতো কাজ, বাবার ঘরবাড়ি বানাবার সময়ই কাঁধে তুলে নিয়েছিল। এখনও সেটা সে করে।

    সাইকেলটা বারান্দায় ঠেস দিয়ে রাখার আগে বললাম, কীরে ইস্কুলে গেলি না?

    মা টের পেয়ে আঁচলে হাত মুছে বের হয়ে এল। কিন্তু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মা কেমন জলে পড়ে গেছে বলে মনে হল।

    মাকে সান্ত্বনা দেবার জন্য বললাম, চাকরিটা হবে। কাল সার্টিফিকেট মার্কসিট নিয়ে যেতে বলেছে।

    মা কেমন ভাল বুঝল না। শুধু বলল, এত দেরি করলি কেন? কখন রান্না করে বসে আছি। তোর বাবা বলল, এত দেরি হবার তো কথা না। চাকরিটা কী তবে হচ্ছে না?

    —না, হবে।

    এতেও মা আশ্বস্ত না হলে বললাম, চাকরির জন্য ভেবো না। চাকরিটা হবেই। পরীর দাদু খুব উঠে পড়ে লেগেছে।

    মা বলল, হলেই বাঁচি বাবা। রেলের চাকরি সোজা কথা। তোর বাবা তো বলল, চাকরিটা হলে তুই আমাদের যখন-তখন তীর্থ করাতে পারবি। রেলের পাশ পাবি। এক পয়সা ভাড়া লাগবে না।

    আমি জোর করে হাসার চেষ্টা করলাম। মা’র এত আশা!

    সেই মা সহসা কেমন কাতর চোখে আমাকে দেখে ঘাবড়ে গেল। বলল, কীরে মুখে তোর কালি পড়েছে কেন! এ কি চোখ মুখের চেহারা করেছিস?

    রোদে হেঁটে এসেছি, চোখে ক্লান্তির ছাপ থাকতেই পারে। না কি মা বলেই টের পায়, ভিতরে আমার চরম সংকট। আমি অস্থির।

    সাইকেল বারান্দায় তুলে স্বাভাবিক গলায় বললাম, আমি তাড়াতাড়ি ডুব দিয়ে আসছি। ভাত বাড়। বলে আর দাঁড়ালাম না। মা সঙ্গে সঙ্গে হা হা করে প্রায় তেড়ে এল। বলল, একটু ঠান্ডা হয়ে নে। এই মায়া। ছাগলগুলোকে জল দেখাস পরে। তোর দাদাকে তেল দে। গামছা বের করে দে। পিলু গেলি কোথায়। এখন ছাগলের জন্য তোমায় ঘাসপাতা কাটতে হবে না। স্কুলে যাবি না। দাদা ফিরছে না কেন! এখনও তো স্কুলের ঘন্টা পড়েনি। তুইও বসে যা।

    খেতে খেতে বললাম, বাবাকে দেখছি না। কোথায় গেলেন। যজনযাজনে যাবার কথা নয়। কোথাও শ্রাদ্ধশান্তি আছে তাও জানি না।

    মা বলল, আর বলিস না, নবমীর কাছে গেছে।

    নবমী বুড়ি বিশাল জঙ্গলের কারবলার দিকটায় পরিত্যক্ত ইটের ভাটাতে এখনও বেঁচে আছে। নবমীর কাছে আমারও অনেক দিন যাওয়া হয়নি। আমাদের দু-বেলা অন্ন সংস্থানের সঙ্গে নবমীও লেপ্টে গেছে। নবমীর দা-ঠাকুরটি আমার পাশে বসে খাচ্ছে। নবমী সম্পর্কে একটিও কথা বলছে না। সকাল বিকাল সে-ই নবমীর জন্য কলাই করা টিনে ভাত ডাল শাক নিয়ে যায়। নবমীর জন্য দানের কোরা ধুতি, —যখন যা লাগে সেই দিয়ে আসে। বাড়িতে গরুবাছুর আছে। মাঠ থেকে নিয়ে আসা, জাবনা দেওয়া তার কাজ। এই কাজগুলির মতো নবমীর কাজটাও সে নিজ থেকেই কাঁধে তুলে নিয়েছে, ‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল পার কর আমারে’পথের পাঁচালির ইন্দির ঠাকরুণের মতো বসে আছে পারের অপেক্ষায়। তবে বনজঙ্গল সাফ করে স্রোতের মতো ছিন্নমূল মানুষ এসে যাওয়ায় বনটার সে আদি ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য আর নেই। কেবল নবমী বুড়ির ওদিকটায় এখনও কেউ ঢুকতে সাহস পায়নি। কারবালার কবরখানার পরেই জঙ্গলটা।

    গভীর জঙ্গলের ভিতর থেকে নবমীর সাড়া পেতাম,—দাঠাকুর, ভয় নেই।

    সঙ্গে সঙ্গে গভীর বনের মধ্যে আমরা দু-ভাই সাহস ফিরে পেতাম।

    সেই নবমীর কাছে বাবা গেছেন।

    খেয়ে উঠে সাইকেলে উঠতে যাব, হঠাৎ পিলু কাছে এসে বলল, দাদা আমাকে স্কুলে দিয়ে যাবি?

    পিলুর দেরি হয়ে গেছে বুঝতে পারি। বললাম ওঠ।

    সে রডে বসলে সাইকেলে বের হয়ে রাস্তায় পড়লাম।

    পিলু বলল, জানিস দাদা, নবমী না জঙ্গলটায় আর থাকতে চাইছে না।

    বললাম, কেন। বনটা ছেড়ে আসতে পারবে?

    —কে নাকি আজকাল রাতে এসে শিয়রে তার বসে থাকে।

    —কে বসে থাকে?

    —বলে না। কিছু বলে না। কে বসে থাকে বলে না। গেলেই বলবে, কিগো দা-ঠাকুর বাবাঠাকুরকে পাঠালেন না! বাবাঠাকুরকে বড় দেখতে ইচ্ছে করছে!

    বাবাঠাকুর মানে আমার বাবাকে। বাবা গেলেই নবমী গড় হবে। বনের ফল-পাকুড়, নারকেল, বেল, কয়েতবেল যখনকার যা পায়ের কাছে রাখবে। যেন বাবাকে গড় হয়ে এ-সব ফলমূল দেবার মধ্যে জীবনের অন্য এক অজ্ঞাত নক্ষত্রের খোঁজ পায়। বনটায় নবমী কতকাল ধরে পড়ে আছে। তার স্বামী ইঁটের ভাটার সর্দার ছিল। সেই কবেকার কথা। নবমী হিসেব জানে না। কেবল বলে,— এই যে যুদ্ধ হল নাগো, তখন আমার সোয়ামীটা মরে গেল। আসলে এখানে থাকতে থাকতে নবমী তার দিনকাল তিথি নক্ষত্রের হিসাব ভুলে গেছে। কখনও মনে হত স্মৃতি। তার মরদের স্মৃতি সে ভুলতে পারছে না। আমরা কতদিন বলেছি, তোমার ভয় করে না। সে কী মধুর হাসি!—ভয় পাব কেন? তেনার কথা আমি শুনতে পাই। গাছপালার ভেতর ঘুরে বেড়ালে সবাই আমার সঙ্গে কথা বলে। সবাই বলতে বুঝি, গাছপালা, বনের প্রাণীসকল এবং পাখপাখালি।

    সেই নবমী নাকি রাতে একা থাকতে ভয় পায়। বাবা কী বিধান দেবেন কে জানে।

    পিলু বলতে পারে, নবমীকে বাড়ি নিয়ে এস বাবা। নবমীর জন্য পিলুর চার পাঁচ বছরে এক আশ্চর্য মায়া গড়ে উঠেছে বুঝি।

    বললাম, কে এসে বসে থাকে জিজ্ঞেস করলি না?

    আমরা আচার্য পাড়ার ভিতর দিয়ে যাচ্ছি। নরেশ মামা এসে মাঠের মধ্যে প্রাইমারী স্কুল খুলেছেন। এবারে সিক্স সেভেন এক সঙ্গে দুটি ক্লাশও খোলা হয়েছে। পিলু সেভেনে পড়ে। সে বলল, যাবি দাদা?

    —কোথায়?

    —নবমী বুড়ির কাছে। ও বেশিদিন আর বাঁচবে না।

    তা নাই বাঁচতে পারে। এতদিন বেঁচে আছে ভাবতেই অবাক লাগে। আমার তো এক সময় মনে হত, পিলু যখন তখন ছুটে এসে খবর দেবে, জানিস দাদা নবমী না মরে গেছে। বাবাকেও দেবে। নবমীর সদ্‌গতি হয় এমন একটা বাসনা আগেই সে বাবার কাছে পেশ করে রেখেছে। যেন এই সদগতি না হলে নবমী পিলুর উপরই মরে গিয়ে আক্রোশে ফেটে পড়বে। সে আর একা সাঁজবেলায় কিংবা রাত করে বাড়ি ফিরতে পারবে না।

    —একটা লাঠি নিয়ে দরজায় বসে থাকে নবমী।

    —লাঠি কেন?

    —লাঠি না হলে তাড়াবে কী করে!

    —কাকে তাড়াবে।

    —একটা সাপ! জানিস! আজ তো তাই বলে ফেলল।

    –সাপ?

    —হ্যাঁরে, আলিসান ভুজঙ্গ। ইন্দুরখোমা সাপ বলল, ওটা নাকি যখ।

    ইন্দোরখোমা এক ধরনের গোখরো। পদ্মনাগ বলে কেউ। ফণায় খড়মের ছাপ। ইঁদুর খেতে ভালবাসে বলে আমরা ইন্দোরখোমা বলি। অমন একটা বিষধর সাপ তাড়াবার জন্য লাঠি নিয়ে বসে থাকে,— ভাবতেই অবাক হয়ে গেলাম! নবমী তো কুঁজো হয়ে গেছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারে না। ভাল করে হাঁটতে পারে না। সাপখোপের মধ্যেই এতদিন বাস করে এসেছে। কিছু বললে, এক কথা, কারো অনিষ্ট না করলে আমার অনিষ্ট করবে কেন কন দাঠাকুর।

    সেই নবমী এখন সাপের আতঙ্কে মুষড়ে পড়েছে। আতঙ্ক হবারই কথা। রাতে আবার কে এসে বসে থাকে শিয়রে। বসে থাকে, না যখটা ফণা তুলে দুলতে থাকে। কেমন একটা রহস্যের গন্ধ। বাবা গিয়ে কী করবেন! একমাত্র বাড়িতে নিয়ে আসতে পারেন। বাড়িটা চিড়িয়াখানা। এবারে তবে ষোলকলা পূর্ণ হবে। খোঁড়া বাঁদর, হাঁস, কবুতর, টিয়াপাখি, বিড়াল, কুকুর, গাই বাছুর সবই আছে। ছিল না বয়সে জরাগ্রস্ত কোনো রমণী। পরী এলে এবার বুঝতে পারবে, বাবার বাড়িঘরে আরও একটি বিচিত্র জীব হাজির হয়েছে। পরীর মজার শেষ থাকবে না। যা মেয়ে, এসেই না নবমীর সেবা শুশ্রষায় লেগে যায়। মানুষের সেবা বলে কথা! সে জন্য তার পার্টি, মিছিল, ভোটের সময় গলা ছেড়ে হাঁক—ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়। বাপ ঠাকুরদার প্রাসাদে, বাগানবাড়িতে সে লাল পতাকা তুলতে চায়।

    স্কুলের সামনে পিলুকে নামিয়ে দিতেই বলল, দাদারে তোর কী হয়েছে!

    এক ধমক লাগালাম, আমার কী হবে! যা দাঁড়িয়ে থাকিস না।

    আসলে আমি ভাল নেই, পিলু টের পেয়ে গেছে। বাবার পরে পিলুরই আমাকে নিয়ে অহংকার বেশি।

    বাবার অহংকার তার বাড়িতে পুত্রের সুবাদে এস ডি ও সাব পর্যন্ত ঘুরে গেছেন।

    মা’র অহংকার তার পুত্রটি ভারি সুন্দর দেখতে।

    আর পরীর অহংকার আমি কবিতা লিখি। আমি কবি। কবি ভাবলেই হাসি পায়। কবিতার যা ছিরি হাসি পেতেই পারে। আসলে নারীরা পুরুষের উপর জয়লাভ করতে চায়। পরী জয়লাভ করেছে। সে জোরজার না করলে এ-রাস্তায় কস্মিনকালেও হাঁটতাম না। রিফুজি বাবার ছেলের কবিতার বাই দুরারোগ্য ব্যাধির সামিল। বাবার আক্ষেপ, বিলুটার এই মতিচ্ছন্ন কেন। কিছু বলতেও পারেন না। মুকুল নিখিল নিরঞ্জন সুধীনবাবুরা শহর থেকে আমার টানে যে কলোনিতে চলে আসে আমি কবিতা চর্চা করি বলেই। বাবা এটা ঠিক বোঝেন। মুকুলের সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, মুকুলও কবিতা লেখে বলে। শহর থেকে সব কৃতী ছেলেরাই আসে এই টানে। পরী আসে। এস ডি ও আসেন। শেষ পর্যন্ত পরীর দাদু রায়বাহাদুর।

    ফলে বাবা আমার কবিতা চর্চা সম্পর্কে উদাসীন থাকেন। মুখ ফুটে কিছু বলেন না। শুধু মাকে নাকি একদিন বলেছিলেন, তোমার পুত্রটি মহাব্যাধিতে আক্রান্ত। পার তো রক্ষা কর।

    মা বুঝতে না পেরে বলেছিল, মহাব্যাধি! বলছ কী।

    —ঠিকই বলছি। উনি রাত জেগে কী করেন বুঝতে পার না?

    কবিতা বিষয়াটাই মা’র মাথায় নেই। মা, কৃত্তিবাসী রামায়ণ পড়তে পারে।

    মা’র মুখে আতঙ্ক। মা বলেছিল, বিলুর কী হয়েছে!

    —কী আবার হবে! কবিতা লেখেন। তুই গরীব বামুনের ছেলে, তোর এ-সব সাজে। তুই তো আর জমিদার নস,—যে ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং চাপিয়ে কবিতা লিখবি!

    পিলুই আমাকে এসব খবর দেয়। অসাক্ষাতে আমাকে নিয়ে মা’র সঙ্গে কথা কাটাকাটি হলে পিলু গোপনে সব বলে দেয়। বাবা কাকে ঠেস দিয়ে বলেন সেও বুঝি। আমার তখন নিজেরই হাসি পায়।

    পরীর সেই মহাকবি এখন যাচ্ছেন প্রাইমারী ইস্কুলে পড়াতে। ভাঙা লঝঝরে সাইকেলের ঝং ঝং শব্দে, দূর থেকেও মানুষজন টের পায়, আসছেন তিনি। আমাকে বেল বাজাতে হয় না। বেলটা খুলে রেখেছি অকেজো হয়ে যাওয়ায়। ব্রেক একদিকটা কোন রকমে ধরে, আর একদিকটা ধরেই না। কতবার যে দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছি শুধু কপাল গুণে।

    বাবা বলেছেন, এখন চালিয়ে নাও। দেখি শীত গেলে কিনে দিতে পারি কি না! অর্থাৎ শীত আসতে বাবার হাতে আমার মাইনের কিছুটা সঞ্চয় থেকে যেতে পারে, সেই আশায় আছেন তিনি। পুরো মাইনেটাই বাবার হাতে তুলে দি। আট আনা এক টাকা চাইলেও প্রশ্ন, কী করবে?

    আমি যে বড় হয়ে গেছি, আমার যে সামান্য হাত খরচের দরকার, আমার বাবা তা বুঝতেই পারেন না। ফলে দরকারে অদরকারে মা’র কাছেই হাত পাতি। মা গোপনে টাকাটা সিকিটা দিয়ে বলবেন, তোর বাবা যেন না জানে।

    সুতরাং নিজেকেই বললাম, তাহলে বিলু তুমি চলে যাচ্ছ? তোমার কষ্ট হবে না সব ফেলে যেতে! সব ফেলে চলে যাব। সব বলতে আমার কেন জানি এই রাস্তা, বিকেলের বাদশাহী সড়কে বন্ধুরা মিলে ঘুরে বেড়ানো, কখনও গাছের নিচে বসে কবিতা পাঠ, কে কি নতুন কবিতা লিখল জানার আগ্রহ এবং তখনই দূরে দেখতে পাই কেমন শাদা জ্যোৎস্নায় সে দাঁড়িয়ে আছে একা। পরীর দু- চোখে জল। তুমি চলে গেলে, বিলু, আমি একা হয়ে যাব।

    ইস্কুলে কিছুতেই মন বসাতে পারলুম না। দু-পিরিয়ড করে চলে এলাম। হাত মুখ ধুয়ে নিজের ঘরটায় ঢুকে গেলাম। আলগা ঘর, টালির চাল, বাঁশের বেড়া। একটা তক্তপোষ। মাদুর পাতা। মায়া এখন তার দাদার ঘর সাফসুতরো রাখে। একটা টেবিল। কোন ঢাকনা নেই। ঢাকনা লাগে এও মায়ার জানা নেই। দাদার এই ঘরটায় শহর থেকে ছিমছাম তরুণরা এসে বসে, এ জন্য মায়ার সব চেয়ে বেশি লক্ষ্য ঘরটার দিকে। রোজ সকালে গোবরজল দিয়ে নিকিয়ে রাখে। টেবিলে আমার পিলুর বইপত্র এলোমেলোঁ হয়ে থাকলে সাজিয়ে রাখে। জানালায় ছেঁড়া শাড়ি কেটে পর্দা করে দিয়েছে। টেবিলে কাচের গ্লাসে যে দিনের যে ফুল সাজিয়ে রাখে।

    আজ ফিরে এসে কিছুই ভাল লাগছিল না। অসময়ে ফিরে আসায় বাবাও উদ্বেগে পড়ে গেছেন। আসতেই বললেন, স্কুলে কিসের ছুটি?

    বললাম, ছুটি না।

    —তাহলে, শরীর খারাপ?

    —না।

    বাবা বারান্দায় বসে কথা বলে যাচ্ছেন। জলচৌকিতে বসে আছেন। আমি আমার ঘরে। সাইকেলটা তোলার সময়ই তিনি চোখ তুলে তাকালেন। কী দেখলেন জানি না। অবেলায় বাবাও আজ তাঁর নিজের পোঁটলা-পুঁটলি কেন খুলে বসেছেন জানি না।

    আজ ঘরে ঢোকার সময় বুঝতে পারলাম, বাবার নতুন করে কিছু খোঁজার পালা শুরু হয়েছে। এক নম্বর খোঁজার বিষয় হতে পারে, আমার রেলের চাকরি শেষ পর্যন্ত হবে কিনা। কাল যে আমি সার্টিফিকেট নিয়ে রায়বাহাদুরের কাছে যাচ্ছি, তার যাত্রা নাস্তি লেখা আছে কিনা। কখন কোন্ সময়ে বাড়ি থেকে বের হলে যাত্রা শুভ এসব দেখতে পারেন। দ্বিতীয়, নবমী বুড়ির কাল সমাগত কিনা। তাকে তিনি কি আশ্বাস দিয়ে এসেছেন জানি না। তৃতীয়, পরীর বিয়ের কথাবার্তা চলছে, তা রাজযোটক কিনা। এসব কাজের দায় কেউ চাপিয়ে দেয় না বাবাকে। বাবা নিজেই এসব কাজের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে ভালবাসেন।

    কিছুক্ষণ পর আবার কী যেন বললেন। আমি শুনতে পাইনি। মা রান্নাঘরে খাচ্ছে। বাবার কথাবার্তা মা-ও যে আগ্রহ নিয়ে শুনছে, এ-ঘর থেকে বুঝতে পারছি। মা কি খবরটা দিয়েছে, বিলু গোমড়া মুখে ফিরে এসেছে। ফিরে এসে তো বাবার সঙ্গে তার দেখা হয়নি।

    আবার ডাক শোনা গেল, কী করছিস। শোন।

    আমার এখন কিছু ভাল লাগছে না। তক্তপোষে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে। বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে। বাবার এই ডাকাডাকি ভাল লাগছে না। বিরক্ত। কিন্তু বাবার ঐ এক স্বভাব, সাড়া না দিলে মানুষের কর্তব্য কী, কেন জন্ম, মানুষের সঙ্গে প্রাণীজগতের কী তফাৎ, তারপর অদৃষ্ট নিয়ে পড়বেন। বলবেন, এই আমার অদৃষ্ট। ছেলের এখন পাখা গজিয়েছে। আমাকে আর মানবে কেন।

    আমার ঘরে বাবা এসে আবার হাজির না হন। এই ঘরটায় এখন যে তাঁর ছেলে নিষিদ্ধ বস্তু রাখে, বাবা জানে না। দু-একটা সিগারেট খাবার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। রাতে খাবার পর সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, গোপনে সিগারেট ধরিয়ে কবিতা লিখি। আসলে আমার কেমন মনে হয়েছে, নির্জনতার মধ্যে ডুবে না গেলে কবিতা লেখা যায় না। টেবিলের ড্রয়ারে তালাচাবি করে নিয়েছি। মা’র কাছ থেকে দু’-এক টাকা এজন্যই নিতে হয়। পিলু জানে। তবে পিলু দাদা লায়েক হয়ে গেছে ভেবেই খুশি। সে আর পাঁচ কান করেনি।

    অগত্যা গেলাম।

    বাবা বললেন, বোস।

    তারপর তেমনি পুঁথির দিকে চোখ রেখে বললেন, শুনলাম কাল তোমাকে যেতে বলেছেন। সকাল পাঁচটার আগে রওনা হবে।

    —এত সকালে গিয়ে কী করব!

    —রাস্তায় বসে থাকবে।

    বাবার এসব কথা মাঝে মাঝে মাথায় রক্ত তুলে দেয়। বললাম, রাস্তায় বসে থাকব?

    —পঞ্চাননতলায় গিয়ে বসে থাকবে রবির দোকানে।

    বাবার বিশ্বাসের সঙ্গে আমার বিশ্বাস মেলে না। বাবাকে জানি বলেই আর প্রশ্ন করিনি, কেন এত সকালে বের হব? এত সকালে আমি উঠতে পারব না। আমি তো বাইরে কোথাও যাচ্ছি না। শুভ সময়ে যাত্রা করতেই হবে! এসব বলা বৃথা জেনে উঠে পড়ব, ভাবছি, বাবার তখন প্রশ্ন, চাকরি কবে নাগাদ হচ্ছে কিছু বলেছেন মৃন্ময়ীর দাদু?

    —না।

    —তোমার জেনে নেওয়া উচিত ছিল। তোমার আগ্রহ আছে—এটা তবে তিনি টের পেতেন। উদ্যমী হও। তোমরা মানুষের সঙ্গে দেখছি মিশতে জান না। তোমার স্বভাব দিনকে-দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে।

    এ-সময়ে চুপ করে থাকাই বাঞ্ছনীয়। যখন আরম্ভ করেছেন, শেষ না করে থামবেন না। আসল কথায় তাঁর আসতে অনেকটা ভূমিকার দরকার হয়। এখন বাবার ভূমিকা পর্ব চলছে।

    —এত বেলা করে ফিরলে কেন? এত দেরি হবার তো কথা নয়।

    —কাজ ছিল।

    আমার গলায় দৃঢ়তার আভাস পেলেন। আমি যে রুষ্ট হয়ে উঠছি, তিনি বুঝতে পারছেন। আমি যে বড় হয়ে গেছি, আগেই টের পেয়ে গেছেন। কারণ, এখন আর বাবা যখন-তখন মানুষের সুখ্যাতি করতে গেলে দশবার ভাবেন। বাবার কাছে, পয়সাওয়ালা লোক মাত্রই উদ্যমী এবং উদ্যমী না হলে জীবনে বড় জায়গায় যাওয়া যায় না, এসব কথা তিনি বারবার শোনান। আমি জানি, আসলে মানুষগুলি চোর-বাটপাড়। লোককে না ঠকালে মানুষ এত বৈভবের অধিকারী হয় না।

    তিনি খালি গায়ে বসে আছেন। গলায় শাদা উপবীত এবং বাবাকে এ-সময় খুবই ধার্মিক দেখাচ্ছে। তিনি বললেন, নিবারণ দাস তো বলল, এ আপনার পূর্বজন্মের পুণ্যফল। এত বড় একজন মানুষ বিলুর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছে, বিলুর মত ছেলে প্রাইমারী ইস্কুলে পড়ে থাকলে মানাবে কেন।

    আমি আর পারছিলাম না। বললাম, আগ্রহ না দেখালেও কাজটা হবে। আপনি ভাববেন না। মুখ প্রায় ফসকে বলে ফেলেছিলাম, পরীর দাদুর গলার কাঁটা আমি।

    —পরীর দাদুর সঙ্গে এমন ব্যবহার করবে না যাতে তিনি আঘাত পান। কত করে বললেন, বিলুকে আসতে বলবেন, তুমি গেলে না। বাধ্য হয়ে নিজেই এলেন। তোমার মা-তো রোজ ঠাকুরকে বলছেন, চাকরিটা যেন হয়। এতে বাড়িঘরের সম্মান বাড়ে, বুঝতে শিখো।

    সহসা কেন যেন মনে হল, এক অন্ধকার প্ল্যাটফরমে আমি লালবাতি দোলাচ্ছি। পরীর ট্রেন ছেড়ে চলে গেল।

    বাবা পোঁটলা পুঁটলি বাঁধতে থাকলেন। কেমন নিজের সঙ্গে কথা বলার মতো বলে যাচ্ছেন, মানুষই মানুষের আশ্রয়, গাছের দুটো বড় পাকা পেঁপে তোমার মা রেখে দিয়েছেন। থলেয় করে ও-দুটো নিয়ে যাবে। বলবে, বাবা দিয়েছেন। আমাদের গাছের পেঁপে। এতে সম্পর্ক তৈরি হয়।

    আর সত্যি পারা গেল না। বললাম, কিছু আমি নিতে-টিতে পারব না।

    —ঠিক আছে, পিলুকে দিয়ে পাঠিয়ে দেব।

    —না, পাঠাবেন না।

    আমি খুবই রুষ্ট হয়ে উঠেছি। বাবা কেমন হতবাক হয়ে গেলেন। বললেন, তিনি এত করছেন, আর তাঁর জন্য দুটো গাছের পাকা পেঁপে নিয়ে যেতে পারবে না! তারপর একটু থেমে বললেন, তোমার মান-সম্মান বড় ঠুনকো। পরীর দাদু এতে বুঝতে পারবেন, বাড়ির ভালমন্দ তিনি খেলে আমরা খুশি হই।

    —তিনি তা ভাববেন না।

    —কী ভাববেন তবে।

    —ভাববেন আমার চাকরিটার জন্য ঘুষ দিচ্ছেন। কিছুতেই পাঠাবেন না। যদি পাঠান, আমি ও- চাকরি করব না। আপনার রায়বাহাদুর এলে আমি তাঁকে অপমান করব।

    —কী বললি!

    আমি যে মাথা ঠিক রাখতে পারছি না বুঝতে পারছি। আমার এই রূঢ় আচরণে বাবা কেমন বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। যেন এই অপমান রায়বাহাদুরকে নয়, বাবাকে করছি। হাতের কাছে এত বড় স্বর্গের সন্ধান যিনি এনেছেন, তাঁর প্রতি আমি এত ক্ষুব্ধ কেন বাবা তার বিন্দুমাত্র যদি আঁচ করতে পারতেন। আমার বাবার জন্য কষ্টে চোখে জল এসে গেল।

    বাবা এবার আমার দিকে তাকালেন। ভিতরে কতটা ভেঙ্গে পড়েছি বাবা টের পাবেন। বলবেন, তোমার কী হয়েছে। আমি মুখ ফিরিয়ে রেখেছি। যেন বাড়ির গাছপালা দেখছি। শরৎকাল এসে গেছে। এটা আমার বড় প্রিয় কাল। পরীর সঙ্গে শরতের জ্যোৎস্নায় আমি রেল-লাইন ধরে কবে যেন হেঁটে গেছিলাম। কবে যেন পরী বলেছিল না না বিলু, তুমি পাগলামি কর না। আমি তবে মরে যাব। পরী অতটা আসকারা না দিলে বোধহয় আজ আমাকে এত বড় সংকটের মধ্যে পড়তে হত না।

    বাবা আমার মুখ দেখতে পাচ্ছেন না। আমার রূঢ় ব্যবহারে তিনি বোধহয় ধরতে পেরেছেন, পেঁপে পাঠানো ঠিক হবে না। আমি পছন্দ করছি না। ঘুষ ভেবেছি। তিনি আমাকে শান্ত করার জন্য বললেন, ঘুষ মনে করছ কেন বুঝি না। আগেই বলেছি এতে সম্পর্ক তৈরি হয়। এই যে নবমীকে বাড়ি নিয়ে আসছি একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলে। ভেবে দেখ আমরা আসার আগে পৃথিবীর কেউ জানতই না, এই বনের মধ্যে নবমী বুড়ি একলা থাকে। পিলুই এসে খবর দিয়েছিল, তোমার মনে থাকতে পারে।

    আমি কথা বলছি না। বাবা অজস্র কথা বলে যাবেন, শুনে যেতে হবে। আমাদের বাড়িতে বাবা কখনও তুইতুকারি করেন স্বাভাবিক কথা বলার সময়। আবার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলার সময় তুমি সম্বোধন করেন। তেমনি আমরাও বাবাকে আপনি বলি আবার তুমিও বলি। সবটাই নির্ভর করে কোন কথার কতটুকু গুরুত্ব আছে তার উপর।

    —মনে রাখবে সম্পর্ক গড়ে না উঠলে মানুষ বাঁচতে পারে না। আমার মতো গরীব বামুনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে না উঠলে আসবেন কেন। পরী যে আসে, সেও কোনো সম্পর্ক থেকে। শুনেছি পরী বাড়ি এলে পর্যন্ত তুমি অখুশি হও।

    আমি বোঝাই কী করে, পরী আমাদের দারিদ্র্য উপভোগ করতে আসে। আমি চাই না, আমাদের দুরবস্থা দেখে কেউ মজা পাক!

    বাবা রামায়ণ পাঠের মতো বলে যাচ্ছেন, নবমীর স্বামী, তুমি জানো, ইঁটের ভাটায় সর্দার ছিল। পশ্চিমে কোথায় দেশ ছিল তাদের। স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেছে। বলতে পারে না। তার স্বামী ইটের ভাটাতেই দেহরক্ষা করেছে। এই গভীর জঙ্গলের মধ্যে নবমী তার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে ছিল। স্মৃতির সম্পর্ক। তারপর তাও তার হারিয়ে গেল। জঙ্গলের গাছপালা কীট-পতঙ্গের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠল। ভাটা উঠে গেল, নবমী গেল না। সে বনজঙ্গলের মধ্যে স্বামীর স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকল।

    ভাবলাম হতেই পারে। নবমীর যৌবন বয়সের স্মৃতি, কত রাতে, লন্ঠনের আলোর মুখোমুখি বসে, দু’জনের গভীর প্রেম, অথবা আকাশের নিচে বসে থাকতে থাকতে এক উষ্ণ জীবন দু’জনের— এবং নক্ষত্রমালার গভীরে টের পায় নবমী তার মানুষটি সেখানে কোথাও আছে। একজনের স্মৃতি নিয়ে পড়ে থাকতেই পারে। একজনের পেট চালাবার আহার সংগ্রহের ব্যবস্থা এই বনজঙ্গলই করেছে। শহরে নিয়ে গিয়ে কাঠ বিক্রি করতে পারে, কিংবা গাছের ফলমূলই ছিল তার বেঁচে থাকার উপায়।

    বাবা বলে যাচ্ছেন—পিলুকে দা’ঠাকুর ডাকে। পিলু গেলে কী খুশি হয়, পিলুকে একটা ছাগলের বাচ্চাও দিয়েছে। এই দেওয়াটা ঘুষ ভাবলে দোষের। সম্পর্ক গড়ে তুলেছে নবমী। পিলু গেলে, নারকেল, বেল কতকিছু দিয়েছে। যেন সারাদিন সে বনজঙ্গলের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়, কোথায় কী পড়ে আছে খোঁজার জন্য। তার দাঠাকুরের মুখে তবে হাসি ফুটে উঠবে। এই হাসিটুকু দেখার জন্য শরীরের জরাকে পর্যন্ত অগ্রাহ্য করেছে। তুমি তো দেখেছ, নবমীকে যখন পিলু আবিষ্কার করে তখনই জরা তাকে গ্রাস করেছে। নবমীর জন্য পিলু রোজ খাবার নিয়ে যায় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলেই। কোথাকার কে, এখন বায়না সে জঙ্গলে থাকবে না। একা ভয় পায়। তার ঘরে নাকি যখ ঢুকতে চায়। যে কটা দিন বাঁচবে, সে তার দা-ঠাকুরের কাছে থাকতে চায়। পিলুও দেখছি নবমীকে নিয়ে আসার জন্য পাগল। সম্পর্ক গড়ে না উঠলে এসব হয় কী করে!

    আমার বাবা এ-রকমেরই। তিনি যা বুঝবেন, তা থেকে নিবৃত্ত করা কঠিন। কেবল তিনি আমার মা’কেই সমীহ করেন, কিছুটা ভয়ও করেন।

    মা’র খাওয়া হয়ে গেছে। হাতে এঁটো থালা নিয়ে বাবার সামনে দাঁড়াল। খেতে খেতে পিতা- পুত্রের বিরোধ কী নিয়ে টের পেয়েছে। মা এবার আমার পক্ষ নিয়েই বলল, দরকার নেই পেঁপে পাঠাবার। চাকরিটা হয়ে যাক, তুমি নিজে গিয়েই একদিন বড় দুটো পেঁপে দিয়ে এস। তোমার গাছ লাগাবার হাত যশ তবে মৃন্ময়ীর দাদু টের পাবেন।

    কেউ এলে একটাই প্রশ্ন।—কত বড় বেল!

    একটাই প্রশ্ন, কী মিষ্টি আপনার গাছের আম!

    প্রশ্ন, কত বড় পেঁপে! কী সুস্বাদু। বীজ রাখবেন। নেব।

    বাবা হাসবেন তখন। আশ্চর্য তৃপ্তির হাসি। মুখে কিছু বলবেন না।

    আমরা বুঝি বাবা কী বলতে চান। আজ যেন সেটা আরও বেশি বুঝেছি, —সম্পর্ক। গাছের সঙ্গে মানুষের ভালবাসার সম্পর্ক। এরই খাতিরে তল্লাটের সবচেয়ে বড় পেঁপে আমাদের গাছে জন্মায়। বাবা পেঁপে পাঠিয়ে যেন বলতে চান, আপনি ধনবান, গুণবান, রাজধর্ম আপনার আয়ত্তে। আমার সম্পর্ক মানুষের সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে গাছপালার প্রাণীজগতের। কোন অংশে আমি খাটো নই।

    বাবা এবার সহসা উঠে দাঁড়ালেন। সামনে এসে দেখলেন আমাকে। আমার ভেতরে কষ্ট আবার না টের পেয়ে যান।—আমার বিয়ে হলে বিলু তোমার কষ্ট হবে না। সকাল থেকে বিচ্ছেদের এই বেদনা আমাকে কাতর করে রেখেছে। সকাল থেকে আমার বনবাসের খবর পেয়ে মুখে উদ্বেগের ছায়া। সকাল থেকে পরী আমাকে ‘ঠিক আছে’ এই বলে চলে গেছে। দুশ্চিন্তা। পরী কিছু না আবার করে বসে।

    আমিও বাবার কাছ থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য এখন উঠে পালাব ভাবছি, তখনই বাবা কী বুঝে বললেন—আসক্তি, মোহ ও সুখদুঃখাদি স্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হও। পরমবুদ্ধি লাভ কর।

    অগাধ জলে পড়ে না গেলে বাবা আমার এ হেন সাধুভাষার প্রয়োগ করেন না। যে জন্য বাবার কাছ থেকে সারা দুপুর পালিয়ে বেড়াবার চেষ্টা করেছি, শেষ পর্যন্ত তা আর রক্ষা করা গেল না। বোধহয় লক্ষ্মীর আত্মহত্যার পর বাবা আমার এমন থমথমে মুখ দেখেছিলেন। শুকনো মুখ দেখেছিলেন।

    আমি যে কী করি!

    কাল আমার যাবার কথা।

    বাবা মা’র স্বপ্ন এক রকমের, পরীর স্বপ্ন এক রকমের।

    রায়বাহাদুর আমাকে দুঃস্বপ্নের শরীক ভাবছেন।

    এ-হেন অবস্থায় যখন তক্তপোষে আশ্রয় নিয়েছি, তখনই টের পেলাম বাবা উঠোনে নেমে এসেছেন। গাছপালার ছায়া পড়েছে উঠোনে। ছায়ায় দাঁড়িয়ে বলছেন, মনে রেখ মানুষের শেকড় এক জায়গায় লেগে যায় না। সে যাযাবর। আজ এখানে আছে, কাল আর এক জায়গায়। বুঝতে পারি দেশবাড়ি ছেড়ে যেতে কষ্ট। ভাই বোন ছেড়ে থাকতে তোমার কষ্ট হবে। পরে আর তা থাকবে না। ছুটি- ছাটায় বাড়ি আসবে। এই আসার প্রতীক্ষা কত মধুর, তখন টের পাবে। জীবনে প্রতীক্ষা ছাড়া আর কি আছে। আমরা সবাই কোনো না কোনো প্রতীক্ষা নিয়ে বেঁচে থাকি। এটা না থাকলে জীবনে বেঁচে থাকার মাধুর্য নষ্ট হয়ে যায় বিলু।

    সহসা চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে হল, আপনি থামবেন কিনা? কিন্তু পারলাম না।

    আসলে চিৎকার করলেই আমি আমার আবেগ সামলাতে পারব না। হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলব। আমি ধরা পড়ে যাব।

    কারণ পরীর আভিজাত্য, পরীর লম্বা ঋজু অবয়ব, শরীরের সুঘ্রাণ, উলের মতো নরম উষ্ণ চুল এবং সারা শরীরের লাবণ্য আমাকে সেই কবে থেকে পাগল করে দিয়েছে। আজ এটা আমি মর্মে মর্মে অনুভব করছি। অথচ পরীর সঙ্গে আমার দুর্ব্যবহারের অন্ত ছিল না। পরীর বাড়ি আসা নিয়ে আমি কথা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। পরীকে কতভাবে না মানসিক পীড়ন সহ্য করতে হয়েছে। এখন বুঝতে পারছি আমার হীনমন্যতা থেকেই পরীর প্রতি এই দুর্ব্যবহার। যত ভাবছি তত কষ্ট পাচ্ছি। কাল গিয়ে কী দেখব কে জানে।

    রাতে আমার ভাল ঘুম হল না।

    এ-পাশ ও-পাশ করলেই জানি পিলু বলবে, ও দাদা তোর কী হয়েছে রে।

    পিলুকে নিয়ে আর এক জ্বালা। শুয়ে ঘুমের অভিনয় করলাম কিছুক্ষণ।

    অন্য রাতে জেগে বসে থাকি।

    এখন বুঝতে পারি আমার এই কবিতা লেখা পৃথিবীর একজন নারীকে শুধু অবাক করে দেবার জন্য।

    আজ একবারও কোন একটা শব্দ কবিতার শরীরে আশ্রয় পাবার জন্য মাথায় আগুন জ্বালায়নি। মগজে কোন রক্তক্ষরণ হয়নি। কী যে হয়েছে।

    চোখ জ্বালা করছে। দেখছি কেবল সামনে দাঁড়িয়ে আছে পরী। আর অনেক দূর দিয়ে কোনো নির্জন প্রান্তর ধরে হেঁটে যাচ্ছে লক্ষ্মী। দুই ভালবাসার পৃথিবীর মধ্যে পড়ে আমি হাঁসফাঁস করছি।

    লক্ষ্মীর কথা ভাবতেই কেমন ভয়ের সঞ্চার হল। আমার শেষ দেখার দৃশ্য চোখের উপর ভেসে উঠল। পায়ে আলতা, হাতে শাঁখা, কপালে বড় ধরনের সিঁদুরের টিপ, সিঁথিতে লাল দগদগে একটা রেখা। এ সব সে পেল কোথায়। রান্নাবাড়িতে পড়ে থাকত। থান পরত। কখনও কালো পাড়ের ধুতি। বিধবা সে। নিজেকে বিনাশ করার আগে নববধুর এই বেশটাই আমাকে কাতর করে রেখেছিল। এখন দেখছি লক্ষ্মী আবার আমার কাছে স্বপ্নে, সেই বেশেই দেখা দিচ্ছে। আসলে আর একটা আতঙ্ক থেকেই এমন হচ্ছে বুঝতে পারছি। সারাটা রাত এভাবে কখনও লক্ষ্মী, কখনও পরী স্বপ্নে হাজির হতে থাকলে অসহায়বোধ করতে থাকলাম।

    রাত থাকতেই বাবা এসে ডেকে দিলেন। শুভ কাজে যাচ্ছি। বাবা বললেন, তুমি মুখ ধুয়ে বারান্দায় এসে বোস। আকাশ ফর্সা হলে রওনা হবে।

    যাবার সময় বাবা ঠাকুরের ফুল বেলপাতা দিলেন সঙ্গে। যাতে কোনো কারণে ত্রুটি না থাকে, —বাবার সব দিকে নজর। ঈশ্বর না আবার তাঁর রুষ্ট হন।

    আমি কিছু বলতেও পারি না।

    কারণ বাবার ধারণা দৈবই সব। তুমি নিষ্ঠার সঙ্গে শুধু দায়িত্ব পালন করে যাবে।

    বাবার এই ঈশ্বর বিশ্বাসই মাঝে মাঝে এত বিরক্তিকর, যে কখনও চটে গিয়ে রাস্তায় ফল বেলপাতা সব ফেলে দিই। পরীক্ষা দিতে যাবার সময়, ইস্কুলের চাকরিতে যোগদানের সময় এই সব অবলম্বন আমার পকেটে ভরে দেন। আজও তার ব্যতিক্রম হল না।

    সড়কের দু-ধারে বড় বড় সব গাছের ছায়া। সূর্য উঠে গেছে। পরীর দাদু সকাল আটটার আগে নিচে নামেন না। একবার ভাবলাম মুকুলের বাসায় চলে যাই। কিন্তু এত সকালে দেখলে সে অবাক হবে।

    আমার মনে সব হিজিবিজি ভাবনা। মাথামুণ্ডু কিছুরই ঠিক থাকছে না। পঞ্চাননতলায় এসে সাইকেল রাখলাম গাছের ছায়ায়। তারপর বাবার চেনা দোকানে গিয়ে টুলে বসলাম। বাবার সে যজমান। গেলে আদর-যত্ন সে একটু বেশিই করে। অত সকালে দেখে সে অবাকই হল। উনুনে তার আঁচ দেওয়া হয়েছে। এদিকটায় এখন লোকালয় বাড়ছে। মানুষজন দেশ ছাড়া হয়ে যে-যেখানে পারছে বসে যাচ্ছে।

    এতটা সময় কী করে কাটাই।

    কতক্ষণে বেলা বাড়বে, সেই প্রতীক্ষায় ভিতরে ছটফট করছি। এবং এক সময় যখন শহরে ঢুকে গেলাম, – দেখলাম সবই ঠিকঠাক আছে। কোথাও কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে টের পেলাম না। পরী যে লক্ষ্মীর মতো ছেলেমানুষী করে বসতে পারে না, এটাও মনে হল এক সময়। সে আমার উপর বদলা নিতে পারে। সেটা কীভাবে!

    এই ভাবনাটা শেষ হতে না হতেই পরীদের সদর গেটে হাজির। দারোয়ান অন্যদিন আমাকে দেখলে উঠে দাঁড়ায়। সামনের লনে কাকাতুয়া পাখীটা দুবার পাখা ঝাপটাল। আমি যে হাজির পাখিটাও টের পেয়েছে। দারোয়ান বসেই বলল, ভিতরে গিয়ে বসুন। আমি দূর থেকেই লক্ষ্য রাখছি পরী দোতলার বারান্দায় আমার জন্য অপেক্ষা করছে কিনা। কারণ পরী তো জানে আমি সকালে আসব। পরী শুধু বারান্দায় অপেক্ষা করে না, রাস্তায় দূর থেকে দেখলেই হাত নাড়ায়

    বারান্দায় পরী নেই।

    বুকটা ধক করে উঠল।

    দারোয়ান কেমন গম্ভীর মুখে আমাকে বারান্দায় গিয়ে অপেক্ষা করতে বলল। আমি এলে এ- বাড়িতে সাড়া পড়ে যায়। আমি তো শুধু বিলু না। এই বাড়ির একমাত্র অবলম্বন বাবাঠাকুরের প্রিয়জন। আমার খাতিরই আলাদা।

    কিন্তু আজ মনে হল কোথাও কোনো বড় রকমের অঘটন ঘটেছে। খাতির করা দূরে থাকুক আমি যে এত বড় বাড়িতে এসেছি সেটাই যে বেমানান।

    এই প্রাসাদতুল্য বাড়িতে ঢুকলেই ঠাকুর-চাকরের কোলাহল শোনা যায়। লোকজন রায়বাহাদুরের অনুগ্রহের অপেক্ষায় নিচে লোহার বেঞ্চিতে কখন তাঁর দর্শন পাবে সেই আশায় বসে থাকে। আজও তারা বসে আছে। জমিদারি গেলেও প্রভাব প্রতিপত্তির খামতি নেই। কংগ্রেসের জেলা সভাপতি, মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান, — প্রভাব-প্রতিপত্তি বিন্দুমাত্র পরীদের ক্ষুণ্ণ হয়নি। পরীর বাবা কাকারা বড় পদে দেশের নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছে। রেলের বড়কর্তা পরীর পিতাঠাকুর। এত সব বৈভবের মধ্যে পরী বড় হতে হতে কেন যে ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায় শিখে গেল। পরীর এটাই হয়েছে কাল। দাদু বোধহয় ভেবেছিলেন ছেলেমানুষ, বাড়িতে রাজনীতির আবহাওয়া, দলছুট হতেই পারে। অবুঝ।

    পরীদের বাড়ি ঢুকলে আমার এ সবই মনে হয়।

    বারান্দায় এখন দুটো জালালি কবুতর কার্নিসে উড়ে এসে বসেছে। বক বকম করছিল। আমাকে দেখেও কেউ বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য করছে না।

    ভিতরে ঢুকতে যাব, একজন ষণ্ডামার্কা লোক বলল, কাকে চান?

    পরীর দাদুর নাম বললাম।

    বলল, বসুন। নামতে দেরি হবে।

    আজ আমারও কেন যে এত দুর্বলতা বুঝি না। এই বাড়িতে আর যে-কবার এসেছি, নিজেকে এত অনুগ্রহভাজন মনে হয়নি। ছোট মনে হয়নি।

    বললাম, মিমিকে ডেকে দিন।

    লোকটি আমার অচেনা। নতুন আমদানি হতে পারে। মিমিকে ডেকে দেবার কথায় বেয়াদপির আভাস পেয়ে লোকটা ত্যারচা চোখে আমাকে দেখতে থাকল।

    ধুস, এমন জড়তায় আমাকে পেয়ে বসল কেন। স্বাভাবিক থাকতে পারছি না। আমি তো হলঘরটায় ঢুকে যেতে পারি। কোনোদিন অনুমতির দরকার হয়নি। আজ দেখছি সব অন্য রকম। আসলে কৃপাপ্রার্থী বলেই হয়তো স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি আমার আজ কাজ করছে না। মনে মনে বেপরোয়া হয়ে উঠছি। আর তখনই মনে হল কেউ নামছে।

    ভিতরে ঢুকে গেলাম।

    পরীর দাদু আমাকে দেখেও দেখলেন না। আর এই লোকটাই কাল সকালে হাত ঝাঁকিয়ে বলেছিল, দোহাই বিলু তোমার চাকরিটার কথা মিমি যেন টের না পায়। আজ সেই মানুষটা কেমন ঠান্ডা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বারান্দায় গিয়ে বস। ডেকে পাঠাব।

    মগজে মনে হল কেউ ঠুক করে একটা পেরেক গুঁজে দিল। এক অসহ্য পীড়ন কিংবা অপমানের জ্বালা দগদগ করে ফুটে উঠছে সারা মুখে।

    আমিও পাগলের মতো বললাম, উপরে যাচ্ছি। পরীর সঙ্গে দরকার আছে।

    —পরী? সে কে?

    আমার হুঁশ ফিরে এল। মিমিকে আমি পরী বলে ডাকি। মিমি কলেজের প্রথম দিন থেকেই যে আমার কাছে পরী, সেটা আমি ছাড়া আর কেউ জানত না।

    হুঁশ ফিরে এলে বললাম, মিমির কাছে যাচ্ছি।

    —ও তো এখন কোথায় বের হবে।

    যাক পরী ভাল আছে। পরী শেষে লক্ষ্মীর মতো কিছু একটা না করে বসে। সেই আতঙ্কে রাতে ঘুম হয় নি। পরী বের হতেই পারে। সে পার্টি অফিসে যেতে পারে, কিংবা পার্টির হয়ে লড়ে যেতে পারে, কোনো নাটক থাকতে পারে পার্টির, তার রিহার্সেলে যেতে পারে—কিংবা প্রেসে খোঁজ নিতে যেতে পারে কভারের ব্লক হয়ে এসেছে কি না! পরী বসে থাকার মেয়ে নয়। কখন যে পড়ে আর এত ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করে আমরা ধরতেই পারতাম না।

    পরী তার ঘরেও আমায় নিয়ে বসিয়েছে। ঘরটা সাদামাটা। একটা তক্তপোষ। আর একটা টেবিল। পরীর বেশবাসও সাধারণ। ওর পছন্দের মতো লতাপাতা আঁকা সাদা সিল্ক। খুব সাজগোজ করলে সে লাল রঙের ব্লাউজ, লাল পাড়ের শাড়ি পরে। ঘরে লেনিনের একটা বড় ফটো। আর কিছু নেই। এমন কি একটা বড় আয়নাও না। এই কৃচ্ছ্রতা বাড়ির আর দশজন পরীর ফ্যাসন ভেবে বিনা দ্বিধায় মেনে নিয়েছে। কাঠের চেয়ারে কোনো কভার পর্যন্ত নেই। একজন সাধারণ পার্টি কর্মির মতোই তার ঘরটা। আমার ভাল লাগত না। আসলে মনে হত পরীর এটাও এক ধরনের বিলাস।

    পরীর দাদু কী দেখছিলেন আমার মুখে জানি না—তিনি বেশ শান্ত গলায় বললেন, পরেশ এসেছে।

    পরেশচন্দ্র! সে কেন?

    পরীর দাদু আবার বললেন, পরেশের সঙ্গে কোথায় যেন যাবে। তুমি বরং আর একদিন এসে দেখা কর।

    আমার সারা শরীরে মনে হল কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আমার তো পরীর সঙ্গে দেখা করার কথা না। পরীর দাদুর সঙ্গে দেখা করার কথা। তিনিই তো অনুনয়-বিনয় করেছেন। তিনিই তো ছুটে আমাদের বাড়ি গেছেন। বাবাকে রেলের চাকরির লোভ দেখিয়ে এসেছেন। এক রাতের মধ্যে এত বড় গন্ডগোল হয়ে গেল! তিনি ভুলে গেলেন! আজ আমায় তিনি আসতে বলেছিলেন। সে কী করে হয়! পরী, পরেশচন্দ্র, তুমি আর একদিন এস-এ সবের মানে কী!

    মনে হচ্ছিল লাথি মেরে সামনের সিঁড়ির রেলিং ভেঙে দি। কিংবা দেয়ালের সব বড় তৈলচিত্রে থুথু ছেটাই। মানুষের নিষ্ঠুরতার শেষ থাকে। আমার বাবাকে এত বড় কুহকে ফেলে দেবার কী দরকার ছিল। সরল সাদাসিধে মানুষটা গেলেই বলবেন, — দিয়ে এলি। কবে আবার যেতে বললেন! বাবাকে আমি কী বলব! বাবার বিশ্বাস এত বড় মানুষেরা কখনও ঠকায় না।

    মাথা নিচু করে বের হয়ে যাবার মুখেই মনে হল সিঁড়ি ধরে কারা নামছে। একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে। উঁচুতে তাকিয়ে দেখলাম পরী, পাশে পরেশচন্দ্র, ওর সাদা ভুটিয়া কুকুরের চেন হাতে। পরী লাফিয়ে নামছে। উর্বশীর চেয়েও আজ বেশি সেজেছে। এমন কী দূর থেকেও মনে হল পরী আজ চোখে কাজল দিয়েছে। ঠোঁটে লিপস্টিক। পরীর এ-সাজ আমি দেখিনি। পরী কতটা আগুন হয়ে জ্বলতে পারে আজ যেন আমাকে দেখাল। লক্ষ্মীর আত্মহত্যার মতো অক্লেশে পরী আজ নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে। পরী নামছে অথচ আমাকে যেন দেখতে পাচ্ছে না। দুজনেই কথায় কথায় হাসছে। উল্লাসে ফেটে পড়ছে। নিচে নেমে হঠাৎ যেন পরী আমাকে আবিষ্কার করে ফেলল, আরে বিলু। কী ব্যাপার। দাদুর সঙ্গে দেখা হয়েছে। বসে কাজটা কিন্তু করিয়ে নিও। রেলের চাকরি, সোজা কথা!

    আমার কী হল জানি না। আমি নিজের মধ্যে ছিলাম না। ঠাস করে পরীর গালে একটা চড় কষিয়ে দিলাম। আর সঙ্গে সঙ্গে দুদ্দাড় করে সবাই ছুটে আসছে। ওর দাদু চিৎকার করে বলছে, গেট- আউট স্কাউন্ডেল। গেট-আউট। এত বড় আস্পর্ধা! এই কে আছিস! দাঁড়িয়ে কী তামাশা দেখছিস! সবাই ছুটে আসছে আমাকে ধরার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে পরী আমাকে আড়াল করে দাঁড়াল।

    —তোমরা ওর গায়ে হাত দেবে না। পরীর চোখ জ্বলছে।

    আমার কাছে সবটাই নাটক মনে হচ্ছে। সবাই আমাকে মারুক, আমাকে ছিন্নভিন্ন করে দিক চাইছিলাম। নিজেকে নির্যাতন করার মধ্যে অপমানিত হবার মধ্যে পরীর উপর আক্রোশ মেটাবার এটাই যেন শেষ উপায়!

    পরী আমার হাত ধরে বলল, আমার ঘরে এস।

    আমার স্নায়ুতে তরল সিসে ঢেলে দিচ্ছে পরী। জোর করে হাত ছাড়িয়ে বললাম, আর নাটক করতে হবে না। ছাড় বলছি। তারপর এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে পাগলের মতো বের হয়ে আসার মুখে শুনতে পেলাম, এ যে তোমার কত বড় অধিকার, বিলু তুমি জান না। একবার শুধু মুখ ফিরিয়ে দেখেছিলাম। পরী সারা মুখ আঁচলে ঢেকে দিয়েছে। পরী ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

    বাইরে বের হয়ে রাস্তায় নেমে মনে হল, ছিঃ ছিঃ, এটা আমি কী করলাম। পরীকে মেরেছি, পরীকে মারতে পারলাম?

    হাতে জ্বালা বোধ করছি।

    সাইকেলের হ্যান্ডেল পর্যন্ত তাপে যেন গলে যাবে।

    নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছি, বিলু তুমি অমানুষ।

    প্রবল নিশ্বাস পড়ছে। দ্রুত সাইকেল চালিয়ে পুলিশ প্যারেডের মাঠ পার হয়ে গেলাম।

    চোখে কিছু যেন দেখতে পাচ্ছি না।

    হয়তো কোনো অঘটন ঘটে যাবে।

    সামনেই সেই ধোবিখালের মাঠ। শহরের নির্জনতা আরম্ভ। মানুষজন কোর্ট কাছারিতে যাচ্ছে। রিক্সা, গরুর গাড়ির ভিড়। আমি মাঠের মধ্যে সাইকেল ছুঁড়ে ফেলে চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়লাম। মনেই থাকল না আমার পিলুর মতো ভাই আছে। আমার অস্তিত্ব জুড়ে শুধু পরী। পরীকে আমি মেরেছি। ডান হাতটা কেমন অবশ ঠেকছে। পরীর সেই শঙ্খের মতো সাদা রঙের গালে পাঁচটা আঙ্গুলের ছাপ লাল হয়ে ভেসে আছে। বললাম, পরী, আমি সত্যি অমানুষ। জীবনেও আর তোমাকে মুখ দেখাতে পারব না।

    ঘাসের মধ্যে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলাম, বসে থাকলাম। কী করব কোথায় যাব বুঝতে পারছি না। বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না। ক্ষুধা তৃষ্ণার কথা ভুলে গেছি। এখানে বসে থাকাটাও নিরাপদ নয়। লালদীঘির ধার ধরে চেনা জানা কেউ আসতেই পারে। দেখে ফেলতে পারে। চুপচাপ এখানটায় বসে থাকলে তারা বিস্মিত হতে পারে। কিছুটা সাইকেল চালিয়ে গেলে চৈতালিদের বাড়ি। ওর দিদিরা আমাকে চেনে। লালদীঘির ধারে আমরা বিকালে অনেক দিন বেড়াই। পাশের বাড়িঘরের তরুণীরাও চেনে। নাম জানে না হয়ত, কিন্তু চেনে। যেমন আমরা শহরে সব সুন্দরী তরুণীদের চিনি, তারাও যে চেনে না সেটা অবিশ্বাস করি কী করে। দু-পক্ষই খবর রাখে আমরা কারা, তারা কারা।

    এখানে বসে থাকাটা নিরাপদ ঠেকল না। উঠে পড়লাম। পরীকে আর জীবনেও মুখ দেখাতে পারব না। কে যেন ভিড়ের মধ্যে চিৎকার করে উঠেছিল, গুন্ডা বদমাসদের কে ঢুকতে দিল! পুলিশে দিন স্যার।

    এখন সব মনে পড়ছে।

    পুলিশে দিলেই ভাল হয়। আমি যেন তাই চাইছিলাম। পরী আমাকে নিয়ে তা হলে আর মজা করতে পারবে না। পরী ইচ্ছে করেই পরেশকে ডেকে পাঠিয়েছে। আমাকে চূড়ান্ত অপমান করার জন্য পরী আগুনের মতো সেজেছে। পরী তার দাদুকে দিয়ে অপমান করিয়েছে, পরীর জেদ আমি জানি। আমি সত্যি বলছি এত অপমান সহ্য করতে পারিনি। পরীকে আমার সহসা বেশ্যা নারীর চেয়েও অধম মনে হয়েছিল।—পরী বিশ্বাস কর ইচ্ছে করে মারিনি। আমি তোমার হাতের খেলার পুতুল হতে চাই না। আমাকে নিয়ে তুমি যা খুশি করবে! আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি।

    তারপরই মনে হল, পরী চড় খেয়ে বলছে, এ তোমার কত বড় অধিকার বিলু তুমি জান না। আর সঙ্গে সঙ্গে পরীর জন্য ভিতরটা হাহাকার করে উঠল। দুমড়ে মুচড়ে যেতে থাকল। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। আমাকে আড়াল করে দাঁড়ালো, শাসালো কেউ ওর গায়ে হাত দেবে না—সব মনে পড়তেই অস্থির হয়ে পড়লাম। আমি যেন এখানে থাকলে আরও ভেঙে পড়ব। যত দূরে এখন চলে যাওয়া যায়—সাইকেলে চেপে উন্মাদের মতো নিজের কাছ থেকে পালাতে চাইলাম। বড় বিপন্ন বোধ করছি।

    কোথায় যাব, কার কাছে যাব। যেখানেই যাই না কেন আমি ধরা পড়ে যাব। মুকুলের কাছে গেলে আমি ভেঙ্গে পড়ব। মুকুল এত বেশি আমাকে টের পায় যে তার কাছে কিছুই গোপন করতে পারব না। মুকুল খোলা আকাশের মতো উদার। সে টের পাবে, পরীকে তবে যে আমি সহ্য করতে পারি না, এই কারণ। তুমি বিলু মরেছে। এ-মরণ ঠেকাবার যে কেউ নেই। মরণ তোমার হাতে। তুমিই গলায় নিজের অজ্ঞাতে ফাঁসের দড়ি ঝুলিয়ে দিয়েছ। শান্ত হয়ে বোস। তারপরই ডাকবে বৌদি, বিলু এয়েচে, দু-কাপ চা। বিলু মরেছে, জান? আর বৌদি সব শুনে বলবে, তুমি পরীকে মেরেছ? ছিঃ ছিঃ, পরী এত ভাবে তোমার জন্য। পরী কত দুঃখ করেছে, বিলুটা বৌদি কলেজ ছেড়ে দিল। প্রাইমারী ইস্কুলে মাষ্টারি নিল! আচ্ছা বল বৌদি, ওর মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারলে, সে পুড়বে আর পুড়বে। যত পুড়বে তত সে খাঁটি মানুষ হবে। বড় কবি হতে গেলে যে নিজেকে পোড়াতে হয় বৌদি। তারপরই মনে হল কী আজে বাজে ভাবাবেগে ভুগছি।

    আমি উদভ্রান্তের মত সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছি। যে কোন দিকে এখন আমার চলে যাওয়া দরকার মানুষের এই বিপন্ন বিস্ময় বড় আচমকা সব কিছু লন্ডভন্ড করে দেয়।

    এখন শুধু এক অন্তর্গত খেলা।

    আমার এই অন্তর্গত খেলা কোন নদীর পাড়ে নিয়ে যাবে জানি না।

    ভাঁকুড়ির রাস্তায় পড়ে আরও গভীর নির্জনতা টের পেলাম। কত বেলা হয়ে গেছে। চারপাশে ধানের মাঠ। সরু পথ ধরে কিছুটা গেলে রেশম গুটির গভীর জঙ্গল। নিজেকে আড়াল করার এর চেয়ে নিভৃত জায়গা যেন পৃথিবীর আর কোথাও নেই।

    মানুষের সাড়া শব্দ নেই। শুধু কীটপতঙ্গের শব্দ পাচ্ছি। কিছু গাংশালিখ উড়ে এল। ডালে পাখি। কিচিরমিচির করছে। ওরা দেখছে গাছের নিচে বসে আছে এক প্রাণ, নাম যার বিলু, যে নিজের কাছ থেকে পালাতে চাইছে,– যেন এই পালানো, কোনো গভীর অন্ধকার থেকে উঠে আসে। গভীরতায় তার নকল রহস্য ছুঁয়ে যায়। ছুঁয়ে যায় তার তীব্র রক্তক্ষরণ। পরিণাম গলায় কোনো রজ্জুর ফাঁস, এই পর্যন্ত ভেবে মনে হল, না, ঠিক হয়নি। বুঝি এগুলো সব এলোমেলো ভাবনা—’শুয়ে থাকা আকাশ/আপন মনে উদার হয়ে/উড়ে যায় যাক পাখিরা/মেঘেরা উড়ে আসবে/কোনো ফুলের উপত্যকা পার হয়ে/ঢেকে যাক সুন্দর শ্যামল পৃথিবী/নিচে আছে সবুজ ধানের মাঠ/ গাঙ ফড়িং লাফায়, এক গিরিগিটি হাঁটে/বড় প্রত্যক্ষ দৃষ্টি, ক্ষুধা তার একমাত্র বৃত্তি/আহার তার একমাত্র অহঙ্কার / সে জানে না মেঘেরা উড়ে আসে/যায় যাক পাখিরা উড়ে/

    আমি বিড় বিড় করে বকছিলাম।

    মনে হল, ‘নিরন্তর শুয়ে থাকি সবুজ মাঠ হয়ে/আলে পায়ের ছাপ, ছোপানো আলতার দাগ / ঘুমে দূরে সরে যায় সে/তার আঁচল ওড়ে হাওয়ায়/স্তনে ধানের সবুজ শিষ উষ্ণতা ছড়ায়/ সে হেঁটে যায়, আলে পায়ের ছাপ/ছোপানো আলতার দাগ ঠোঁটে।

    বললাম, পরী আমি চলে যাব বহুদূরে।

    আমি উবু হয়ে শুয়ে থাকলাম। মাথার মধ্যে শব্দগুলি খেলা করছে।

    পাখিরা আমার চারপাশে খেলা করে যাচ্ছে।

    পাখিরা আমাকে ভয় পাচ্ছে না। কারণ তারা জানে পাখির সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা নেই। আমার সব শত্রুতা পরীর সঙ্গে।

    একটা খরগোস কোথা থেকে লাফিয়ে আমার সামনে বসল। আমি কত নিথর হয়ে আছি, টের পেলাম। নড়লেই ছুটে পালাবে। নড়ছি না। কিন্তু চোখ দেখে কী টের পায়, আমার মধ্যে কোনো আত্মহননের প্রবণতা জেগে উঠছে। এই প্রথম নিজেকে আমি ভয় পেতে শুরু করলাম।

    বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। খরগোসটা চলে যাবার সময় যেন শুধু বলে গেল— বেঁচে থাক। বেঁচে থাকার চেয়ে বড় কিছু নেই।

    আমি কখনও বসে আছি, কখনও জঙ্গলে হেঁটে বেড়াচ্ছি। পলাতক আসামী। কে জানে সবাই জেনেও ফেলেছে কিনা। বাড়িতে বাবা অস্থির হয়ে পড়বেন জানি। বাবা মা পিলু সবাই। পিলু সাইকেলে যদি খুঁজতে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে কত বড় আহাম্মক আমি টের পেলাম। পিলু গেলেই শুনতে পাবে— আমি ওখানে কী বিশ্রী ব্যাপার ঘটিয়ে পালিয়েছি। পিলুকে দারোয়ান, পরীর দাদু, ঠাকুর, চাকর, সবাই চেনে।

    আকাশের রং পাল্টাচ্ছে। গভীর অন্ধকার হয়ে গেল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। সাইকেলটা নিয়ে হাঁটছি। সাপ খোপের ভয় আছে। এখন বড় রাস্তায় উঠে যাওয়া দরকার। সারাক্ষণ জঙ্গলটার মধ্যে ঘুরে টের পেলাম প্রকৃতির এক কথা—বেঁচে থাকার চেয়ে বড় কিছু নেই। মাথার মধ্যে রক্তক্ষরণ থেমে গেছে। অন্ধকারে বাড়ি ফিরলে চোখ মুখ দেখে কেউ টের পাবে না, এমন অশোভন আচরণের পর নিজের কাছেই ছোট হয়ে গেছি। পিলু খবর নিয়ে ফিরতে পারে, দাদা পরীদিকে মেরেছে।

    বাড়ি ঢুকতে সংকোচ হচ্ছিল।

    দেখছি প্রতিবেশীরা বাড়িতে এসে জড় হয়েছে। বাড়িতে না ফেরায় বাবা মা কতটা উদ্বেগের মধ্যে ছিল, টের পেলাম। কেবল পিলু কিছু বলল না।

    মা আমাকে জড়িয়ে ধরল। কাঁদছে। কোথায় ছিলি? কী হয়েছে তোর?

    বললাম, কী হবে আবার।

    কিছু না হলে তুই ফিরলি না কেন? সারাদিন কোথায় ছিলি।

    বাবা বললেন, সব অদৃষ্ট।

    এই প্রথম বাবা খুঁটিয়ে কিছু জানতে চাইলেন না। শুধু বললেন, তোমাকে তো বলেছি ধনবৌ, ঠিক ফিরে আসবে। বয়সটারই দোষ।

    এমন কি বাবা রায়বাহাদুর সম্পর্কেও কোনো প্রশ্ন করলেন না। পরীদের বাড়ি গেছিলাম কিনা তাও জানতে চাইলেন না। পিলু এসে সাইকেলটা ঘরে তুলে রাখল। মায়া এক বালতি জল রাখল হাত মুখ ধোয়ার জন্য।

    খেতে বসে ভাত নাড়াচাড়া করে উঠে পড়লাম।

    মা বলল, কী হল, কিছুই মুখে দিলি না।

    —আমার খেতে ইচ্ছে করছে না মা।

    আমার মধ্যে পলাতক মানুষের বসবাস আছে, বাবা জানেন। এর আগেও সেটা টের পেয়েছেন বলে, আজ বাবা ঠাকুরঘরে ঢুকে যাবার সময় বললেন, যাও শুয়ে পড়গে। সবই ভবিতব্য।

    আমার বাবা জীবনের সব সংকটকে সহজেই ভবিতব্যের হাতে ছেড়ে দিতে পারেন।

    ছেড়ে দিতে পারেন বলেই, আমি না ফিরলেও বাবা থানা পুলিশ করতেন না। থানা-পুলিশের নামে বাবার আতঙ্ক আছে জানি। আমার পরিচিত সবার বাড়ি যেতেন, যেমন আমি জানি মুকুলের বাসায় খোঁজখবর নিতেন, আমি কোনো চিঠি দিয়েছি কিনা। সাইকেলটার খোঁজ করতেন, কার কাছে রেখে গেলাম। আমার মধ্যে নাকি একজন বিবাগী মানুষের বাস আছে। সেই যে একবার গ্যারেজে কাজ করার সময় পালিয়েছিলাম, তখনও বাবা থানা-পুলিশ করেন নি।–গেছে আবার চলে আসবে। চঞ্চল মন।

    বাবা মা-কে প্রবোধ দিতেন, অদৃষ্ট, বুঝলে ধনবৌ। তা না হলে দেশ ভাগ হবে কেন, আমরা ছিন্নমূল হব কেন! দু’বেলা খেতে দিতে পারি না, পড়াতে পারি না, ছেলের কী দোষ। বাবার আর একটা আপ্তবাক্য, আমি তো কোনো পাপ করিনি আমার কোনো সর্বনাশ হতে পারে না।

    সর্বনাশ হয়নি।

    ছোড়দি একটা চিঠি লিখেছিল, বিলু এখানে আছে। কতদিন পর আবার ছোড়দির কথা মনে হল। আমার চেয়ে বয়সে ছোটই হবে। ছোড়দি লিখেছিল, বিলু রহমানের কাছে থাকে।

    পিলু আমার পাশে শুয়ে উসখুস করছে। আমি মটকা মেরে আছি। এ-পাশ ওপাশ করলে পিলু দুশ্চিন্তায় পড়ে যাবে। বাড়ি ফেরাতক পিলু একটা কথাও বলেনি। শুয়ে পড়লে সে দরজা বন্ধ করেছে। হ্যারিকেনের আলো কমিয়ে দিয়ে পাশে এসে শুয়েছে। ভাদ্র মাসের গরম। আমার কষ্ট হয় ভেবে সে হাত-পাখায় হাওয়া করছে। এমনভাবে করছে যেন গরমটা তারই বেশি। গরমে ঘুমোতে পারছে না। বাঁশের বেড়ার ঝাঁপ তোলা। বাইরে থেকে এক-আধটু যা হাওয়া ঢুকছে, আমার গায়ে লাগছে। সে বোধহয় চায়, আমি তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি। সে জানে ঘুম থেকে উঠলে, মনের অনেকটা ক্লেদ কেটে যায়। সেভেনে পড়লে কী হবে, দাদাকে সে সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারে। কথা বলছে না। আমারও কিছু ভাল লাগছে না। যতই ঘুমের ভান করে পড়ে থাকি না কেন, ওর বুঝতে কষ্ট হয় না, অনিদ্রার শিকার আমি। আমি ভালো নেই।

    সে যখন বুঝল, তার দাদাটির সহজে ঘুম আসবে না, তখনই ডাকল, দাদারে!

    পাশ ফিরে শুলাম।

    সে আবার ডাকল, দাদারে।

    —বল।

    —তুই পরীদিকে মারতে পারলি!

    —কে বলল তোকে, পরীকে আমি মেরেছি! কে বলল!

    —তুই মেরেছিস দাদা।

    আমার কেমন ভয় ধরে গেল। বাবা জানতে পারলে আমায় অমানুষ ভাববে। বাবা এমনিতেই নারীজাতিকে শক্তিরূপেন সংস্থিতা ভাবেন। মেয়েছেলের গায়ে হাত! এ যে গো-বধের সামিল। কিন্তু বাবা যে আমাকে কোনো প্রশ্নই করেননি। পরীকে মেরেছি জানলে, বাবা স্থির থাকতে পারতেন না। তুমি আমার কুপুত্র। বংশের কুলাঙ্গার। তোমার মুখ দর্শন করলে পাপ। নারী হল’গে দেবী। পৃথিবীর বীজ বপন করার ভার তোমার, বহন করার ভার তার। পৃথিবীর সৃষ্টি স্থিতি লয় তার করতলে। তুমি পরীর গায়ে হাত তুলতে পারলে। তোমার সম্ভ্রমে বাধল না।

    আমি কিছুই পিলুকে বলছি না। মনে হচ্ছে, কথাটা পিলুর কাছে স্বীকার করতেও কষ্ট। আমি তো সত্যি পরীকে মারিনি। অপমানের জ্বালায় মাথা ঠিক ছিল না, বলি কী করে! কেবল বলতে চাইছিলাম, আমি সত্যি মারিনি পিলু। সত্যি বলছি।

    —জানিস দাদা, আমাকে না হরি সিং বেঁধে রাখবে বলে ধরে নিয়ে গেছিল।

    —তোকে? তুই গেছিলি কেন।

    —বাবা যে পাঠাল। এত বেলা হয়েছে, তুই ফিরছিস না, আমাদের চিন্তা হয় না!

    আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। আবার পাশ ফিরে শুলাম। যেন বাকিটা শুনলে আমার আবার মাথা খারাপ হয়ে যাবে। আমার জের পিলুর উপর দিয়ে গেছে তবে! আমার মাথায় আবার টের পেলাম, কে পেরেক পুঁতে দিচ্ছে।

    —ভাগ্যিস পরীদি ছিল। কী চেঁচামেচি জানিস, — এসেছে। ওটা তো পালিয়েছে! একে ধরে রাখুন। আমাকে টানতে টানতে ভিতরে নিয়ে যাচ্ছিল। জানিস, আমার না কী ভয় ধরে গেছিল! কী হয়েছে, কিছুই বুঝতে পারছি না। তোকে ওরা কত খাতির করে। একটা লোক বলছে, এত বড় সাহস বাড়িতে ঢুকে দিদিমণির গায়ে হাত তোলে।

    —আমি তো জানি নারে দাদা, কেবল চারপাশে তাকাচ্ছি। বলছি, আমার কী দোষ! আমার দাদা মারবে কেন?

    —ওরা কেমন পাগলের মতো আমাকে টেনে-হিঁচড়ে নিচ্ছিল। আমি আর না পেরে চিৎকার করছিলাম, পরীদি, আমাকে মেরে ফেলল।

    আমি শক্ত হয়ে আছি। শুনে যাচ্ছি।

    —আর দেখি পরীদি নেমে আসছে।—তুই! এই তোমরা ওকে কী করছ! তোর দাদা তো কখন চলে গেছে। আয়, উপরে আয়। ও বাড়ি যায়নি?

    পরীদি তার ঘরে নিয়ে গেল, দেখলাম, বাড়ির সবাই কেমন গুম মেরে গেছে। কেউ টুঁ শব্দ আর করছে না।

    বললাম, পরীদি, দাদা তোমাকে মেরেছে?

    পরীদি বলল, তোকে কে বলল।

    —সবাই।

    —ধুস, তোর দাদা মারতে যাবে কেন। অত সাহস আছে ওর! তোর দাদাটা এত ভীতু জানিস জানতাম না! আর জানিস দাদা, পরীদির এক কথা, তোর দাদা বাড়ি ফেরেনি?

    —না পরীদি।

    —কোথায় গেল তবে। মুকুলের ওখানে খোঁজ নিয়েছিস?

    —যাইনি।

    —যা একবার। কোথায় গেল খুঁজে দেখ।

    —জানিস দাদা, পরীদির মুখটা না কী কালো হয়ে গেছে বলতে বলতে। মুখে একটা দিক আঁচলে ঢেকে কেবল কথা বলছিল। বলল, বোস। তারপর ফোন করল কাকে। বলল, সুধীনদা আছে। সুধীনদাকে কী বলল। ঘরে ঢোকার সময় দেখলাম, পরীদির গাল ফুলে আছে। পরীদি কেমন উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘরে ঢুকল।

    —পরীদি বলে ডাকতেই জানিস দাদা, আমার দিকে তাকাল। আমি পরীদির মুখ দেখছি। পরীদি না তাড়াতাড়ি আবার আঁচল দিয়ে গাল ঢেকে ফেলল। তুই পরীদিকে মারতে পারলি দাদা!

    আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। হ্যাঁ মেরেছি, বেশ করেছি। থামবি কিনা বল। বাড়িতে এসে সাতকাহন করে বাবা মাকে বলেছিস বুঝতে পারছি।

    —বলব কেন! পরীদি বলতে বারণ করে দিয়েছে। পরীদি আমাকে মাথায় হাত দিয়ে বলল, মাসিমা মেসোমশাইকে কিন্তু বলতে যাস না! কীরে, বলবি না তো! আমার গা ছুঁয়ে তিন সত্যি কর। পরীদির গা ছুঁয়ে আমি তিন সত্যি করে এসেছি। কাউকে বললে আমার পাপ হবে না!

    পিলু এত সরল সহজ, বাবা আমার এক ধর্মপ্রাণ মানুষ, মায়া, ছোট ভাইটা, মা সবাই পরীর ব্যবহারে এত মুগ্ধ, আর আমি এমন অমানুষ! যত শুনছি, তত চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছে।

    —পরীদি, ভিতরে ঢুকে পাথরের থালা গ্লাসে খেতে দিল। বলল, রোদে মুখ পুড়ে গেছে তোর দেখছি। খা। খিদে পেয়েছে। আর তারপরই নিচে নেমে সবাইকে কী হম্বিতম্বি।

    —তোমাদের কাঁধে- ঢাক নিতে কে বলেছে! যে আসছে, তাকেই যা-তা বলছ! দাদুর না হয় বয়স হয়েছে। বয়স হলে মাথা ঠিক থাকে না। পরীদিকে না সবাই বাঘের মতো ভয় পায় জানিস। পরীদির দাদুকে দেখলাম না। উনি নাকি ঠাকুরদালানে হত্যে দিয়ে পড়ে আছেন।

    হত্যে দিয়েছেন শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বললাম, কে বলল তোকে?

    —কে বলবে, পরীদির পিসি এসে উঁকি দিল। বলল, পরী তুই যা একবার। দেখ তুলতে পারিস কি না।

    পরীদের পরিবারে আমার হঠকারিতা কত বড় বিষবৃক্ষ রোপণ করেছে টের পেলাম। নিজের উপর আমার এত ক্ষোভ জন্মাল যে শুয়ে থাকতে পারলাম না। যেন শুয়ে থাকলে আমি হাঁসফাস করব। নিশ্বাস নিতে পারব না। দম বন্ধ হয়ে আসছে।

    আর তখনই পিলু বলল, জানিস দাদা, পরীদি বিকেলেই এসে হাজির। সঙ্গে মুকুলদা, সুধীনদারা সবাই। পরীদি বাবাকে বলল, বিলু ফেরেনি মেসোমশাই? বাবা গুম মেরে বসে ছিলেন। বাবা পরীদিকে দেখে কী বুঝল, জানি না, শুধু বলল, ও তো মা ওরকমই। চাপা স্বভাবের ছেলে। কী যে হল বুঝি না। তবে ও ফিরে আসবে। আমার মনে হয় রেলের চাকরিটা ওর পছন্দ নয়। তা তুই যদি যেতে না চাস, আমরা জোর করব কেন! তুমিই বল মা, বুঝি তোর বাড়িঘর ছেড়ে যেতে কষ্ট হবে। কিন্তু মানুষের ঠিকানা তো এক থাকে না। বদলায়। ও সেটাই বুঝতে চায় না। তুমি ভেবো না। বাড়িঘর ছেড়ে ও কোথাও গিয়ে বেশিদিন থাকতে পারে না। সেই যে একবার রাগ করে বর্ধমান চলে গেল, থাকতে পারল? পারল না। কালীবাড়ি এত কাছে, সেখানেও মন টিকল না। চলে এল। গেছে রাগ করে, আবার রাগ পড়লেই ফিরে আসবে।

    —জানিস দাদা, পরীদি গেল না। বলল, দেখি একটু। আমি সকালেই চলে যাব পরীদিকে খবর দিতে।

    আমার অবর্তমানে বাড়িতে এত ঘটনা ঘটে গেছে। পরী আমার ফেরার জন্য ছটফট করছে। বলতে পারলাম না, না যাবি না। পরী আমাদের কে? আমি মশারির বাইরে নেমে হ্যারিকেন উসকে দিলাম। জল খেলাম। দরজা খুলে বাইরের খোলা হাওয়ায় গাছের নিচে কিছুক্ষণ বসে থাকব ভাবলাম। কিন্তু পিলু দেখছি সঙ্গে সঙ্গে নেমে পড়েছে।—কোথায় যাচ্ছিস দাদা। দাদারে!

    আমাদের দু’জনের স্বভাব দু’রকমের। পিলু বাবার স্বভাব পেয়েছে। সংসারের সব মানুষই তার আত্মীয়। বাবার স্বভাবও তাই। মা আমার সবাইকে বিশ্বাস করে না। মা’র এক কথা, বল বল বাহুবল! জল জল রিদ্রের (হৃদয়ের) জল। কেউ কারো না। আমি বোধ হয় মা’র স্বভাব পেয়েছি। মা আমার সহসা ক্ষেপে যায়, অভাবের সংসারে এক এক সময় মা মাথা ঠিক রাখতে পারে না। সারাদিন বাবার পেছনে টিক টিক করত। বাবার সেখানেও এক আপ্তবাক্য, আরম্ভ হয়ে গেল চন্ডীপাঠ। অভাব কোন মানুষের সংসারে না আছে। অভাব ভাবলেই অভাব। তেনার মাপ মতো সব হচ্ছে। তুমি মাপামাপি করতে বসলে মানছে কে!

    আমার আর দরজা খুলে বের হওয়া হল না। পিলু ত্রাসের মধ্যে আছে। আমি একা চুপচাপ কোথাও বসে থাকলে সে ভয় পায়। দাদাটার মাথায় কীসের পোকা ঢুকে গেছে। বাবা মা’র দুঃখ বোঝে না। সবাই যে তার দাদাটাকে নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে আছে, সেটা ভেবে দেখে না। বের হলে, ঠিক চিৎকার করে উঠবে, বাবা বাবা, দেখ দাদা এত রাতে কোথায় চলে যাচ্ছে। আর একটা নাটক। অগত্যা শুয়ে পড়তে হল। পিলু বলল, কাল জানিস দাদা, আমাদের আর একটা ঘর উঠবে।

    বললাম, কার জন্য।

    —নবমী বুড়ির জন্য।

    এটা বাড়াবাড়ি মনে হয়। নবমী বুড়ি তার জরা নিয়ে আমাদের বাড়িটায় এসে উঠতে চায়। ওর ঘরে যখ নাকি ঢুকতে চায়। যখের ভয়ে কাবু। আমার হাসি পেল। আসলে বুড়ির যাবার সময় হয়ে গেছে। একা থাকতে ভয় পাচ্ছে। দাদাঠাকুরকে দিয়ে বাবার কাছে খবর পাঠিয়েছে। বাবাও আজ সকালে গেছিলেন। বাবার এক কথা, বন বাদাড়ে মরে পড়ে থাকবে। শেয়ালে শকুনে খাবে—ঠিক না। নিদানকালে মানুষই মানুষের ভরসা। ছ’ ছ’টা পেট চললে, আরও একটা চলে যাবে।

    পিলু কথা শুরু করলে থামতে চায় না। বলল, জানিস দাদা, নবমীর শেষ ইচ্ছে, মরার সময় আমি যেন ওর মুখে গঙ্গাজল দিই।

    মানুষের তা হলে শেষ পর্যন্ত ঐ একটা ইচ্ছেই টিকে থাকে। আর সব ইচ্ছে উবে যায়। এ-সব ভাবতে ভাবতে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে গেলাম। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি।

    সকালে ঘুম ভাঙলে টের পেলাম, বেলা হয়ে গেছে। আমাকে কেউ ডাকেনি। গায়ে কেউ চাদর জড়িয়ে দিয়েছে। ভোর রাতের দিকে সামান্য ঠান্ডা পড়ে। ঋতু বদলের সময়। চট করে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে, পিলু সব বোঝে। পিলুর একটাই অভিযোগ তার দাদাটি সম্পর্কে, দাদা বড় তার স্বার্থপর। কেবল নিজের কথা ছাড়া ভাবে না।

    আমি নিজেও এটা বুঝি। তা না হলে কাল আমার এত মাথা গরম হবার কথা নয়। পরীর দাদু বলতেই পারেন, বসগে, পরে ডেকে পাঠাব। একজন প্রাইমারী ইস্কুলের শিক্ষক, একজন চেয়ারম্যানের কাছ থেকে এর বেশি কী আশা করতে পারে। পরী, পরেশচন্দ্রের সঙ্গে কোথাও বের হতেই পারে। কথাবার্তা চলছে, পরী রাজি হচ্ছে না, এক সঙ্গে দুজনে যদি কোথাও বের হয়—পরীদের আভিজাত্য তাতে ক্ষুণ্ণ হবার কথা নয়। পরী তো আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। অথচ কাল কেন যে সহসা রায়বাহাদুরের ব্যবহারে এত অপমান বোধ করলাম, পরীর উল্লাস দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়লাম, তারপর বিশ্রি কান্ড বাধিয়ে সারাদিন নিখোঁজ হয়ে থাকলাম, বাড়ি ঘরের কথা ভাবলাম না, এর চেয়ে স্বার্থপরতা আর কী থাকতে পারে। সকালে সবাইকে মুখ দেখাতেই এখন লজ্জা করছে। দিনের আলোয় শ্রীমানকে এবারে তোমরা সবাই দেখ, বাবা হয়ত মনে মনে তাই ভাববেন। সবার সামনে দাঁড়াবার মতো আমার সাহসই যেন হারিয়ে গেছে। সংকোচে কেমন গুটিয়ে গেছি।

    অথচ শুয়ে থেকেই টের পাচ্ছিলাম, মায়া ঠাকুরঘর থেকে পূজার থালা বাসন বের করে নিয়ে যাচ্ছে। পিলু, গরু বাছুর মাঠে দিয়ে আসছে। বাবার গলা পাচ্ছি। বোধ হয় ঝিঙে, কুমড়োর ফুল, ডগা, বেগুন সবজির জমি থেকে তুলে আনতে গেছেন। মা বাসি বাসনকোসন পুকুরে ধুতে গেছে। রোদ উঠে যাওয়ার এক আশ্চর্য স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ছে সারা বাড়িটায়। নিখোঁজ পুত্রটি ফিরে এসেছে। আর কোনো দুঃখ নেই সংসারে।

    তখনই পিলুর গলা পেলাম, দাদা শিগগির ওঠ। মুকুলদারা আসছে।

    এই রে। ওরা সবাই খবর নিতে আসছে, বিলু ফিরল কি না। সঙ্গে পরী নেই তো!

    ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। জামা গায়ে দিলাম। রাস্তায় সাইকেলের ক্রিং ক্রিং বেল বেজে উঠল। নানা তার আগেই ওদের কাছে হাজির। এস, ভিতরে এস। ফিরেছে।

    —কোথায় গেছিল?

    আমি ঘরের ভিতর থেকেই শুনতে পাচ্ছি। জানালায় চুপি দিয়ে দেখছি, মকুল নিখিল নিরঞ্জন সুধীনবাবু এসেছে। পরী নেই। পরী না থাকায় অনেকটা অস্বস্তি কেটে গেল। পরীদের বাড়িতে বিলু বিশ্রী কান্ড বাধিয়ে উধাও হয়েছিল, ওরা নিশ্চয়ই জানে না। পিলুর কথা থেকেই বুঝেছি পরীদের আভিজাত্যই আমাকে এ-যাত্রা রক্ষা করেছে। ওরা পারিবারিক স্ক্যান্ডাল গোপন রাখতে হয় কী করে জানে।

    আমার ঘরেই এসে ওরা বসবে। আমার এই তক্তপোষ ওদের বসার জায়গা। বর্ষায় চারপাশে ঝোপ জঙ্গল গজিয়ে উঠছে। এখন আর গাছের নিচে মাদুর বিছিয়ে বসা যায় না। আমার এই ঘরের চেয়ে গাছের ছায়ায় মাদুরে বসে গল্প করতে বেশি ভালবাসে মুকুল। মুকুলের এক কথা, গ্রীষ্মের দুপুরে এমন আরামদায়ক ছায়া নাকি পৃথিবীর আর কোথাও গেলে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

    —বিলু কোথায়! বিলু!

    —ঘরে আছে। যাও!

    বাবা কি টের পান, তাঁর পুত্রটি এখন নিজেই বুঝতে পেরেছে, কোনো বড় গর্হিত কাজ করেছে। না হলে বাবা আজ ডাকলেন না কেন? এই বিলু ওঠ! কত বেলা হয়েছে। কত ঘুমাবি। সূর্যোদয়ের আগে বিছানা না ছাড়লে আয়ুক্ষয় হয়। বাবার এ-ধরনের অজস্র আপ্তবাক্য আছে, যা এখন আমরা শুনতে অভ্যস্ত।

    ওরা রে রে করে ভিতরে ঢুকে বলল, কী ব্যাপার। কোথায় গেছিলে না বলে না কয়ে। পরী সকালে এসে হাজির। বিলুটার তোমরা খবর নেবে না? কোথায় গেল।

    পরীই তাহলে এদের তাড়া দিয়ে পাঠিয়েছে।

    সুধীনবাবু বলল, রাতে ফোন করে জানাল সুধীনদা কাল সকালে একবার যাও। বিলুটার যা স্বভাব, আমার ভয় করে।

    পিলু এখন হাজির। সে বলল, দাদা সাইলেকটা নিয়ে যাচ্ছি। এক্ষুনি চলে আসব।

    —কোথায় যাবি?

    —এই আসব। বেশিক্ষণ লাগবে না। তারপর সে আর আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে সাইকেল নিয়ে বের হয়ে গেল।

    আমি কারো সঙ্গে সহজভাবে কথা বলতে পারছিলাম না। ওরাই বেশী কথা বলছিল। আমাদের কবিতার রোগ আছে। মুকুল বলল, কোথায় গেছিলে কবিতার খোঁজে। জায়গাটা কেমন।

    অবশ্য এটা আমাদের হয়। জীবনের সব রোমান্টিক দিকগুলি আমাদের ভারি কাতর করে রাখে। হোঁতার সাঁকোর উপর দাঁড়িয়ে জ্যোৎস্না রাতে বিলের জল দেখতে দেখতে প্রকৃতির কত রকমের রহস্য আমাদের মধ্যে জেগে ওঠে। কোনো ধুলিওড়ির মাঠে ঝড়ে পড়ে গেলেও অবিরল জলের ধারার মতো রক্তে এক রণতরী ঢুকে যায়। হৃদয় নামক বস্তুটিতে সে বিস্ফোরণ ঘটায়। ঘন্টার পর ঘন্টা, এমন কী সারা রাত জিয়াগঞ্জের শীতের গঙ্গায় ধু ধু বালিয়াড়িতে হেঁটে যাবার সময় টের পেয়েছি, কেউ আমাদের অপেক্ষায় থাকে। বালির চড়ায় আমি মুকুল নিখিল শুয়ে থেকেছি জ্যোৎস্নায়। নদীর পাড়ে শ্মশানের সেই মানুষের দাহকার্য দেখতে দেখতে আকাশ নক্ষত্র এবং ঝিঁঝি পোকার ডাকে টের পেয়েছি,—কিছুই শেষ হয়ে যায় না, ‘এই বনজঙ্গল, কিংবা শেষ অবশেষে / যেখানে যে প্রাণ বিচরণ করে / শুধু বিচরণ করে আর ধেয়ে যায় / কারণ অমোঘ নিয়তি তার পাখা মেলে থাকে/ তবু থাকে সে অনন্ত অক্লেশে। / ভ্রূণে, গভীর গোপন কোষে/ জীবনের বার্তা বার বার বহন করে/ কিছু‍ই শেষ হয়ে যায় না/ সে থাকে অন্ধকারে নিমজ্জমান / উষ্ণতায় কোনো শীতের সকালে / সে জেগে ওঠে/ কারণ, পিন্ডদানের আগে কিংবা পরে/ গোপন কোষে নিয়ত জাহাজের সাইরেন বেজে যায়।

    মুকুল বলল, কিছু গেলে? এত চুপচাপ। কী ভাবছ?

    বললাম, পেয়েছি।

    —একলা গেলে কেন! কতদূর গেলে? আমরা তোমার এ-যাত্রার সঙ্গী হতে পারলাম না।

    —অনেক দূর। অতদূর তোমাদের যেতে সাহস হত না! তাই কাউকে নিলাম না।

    মুকুল বিখ্যাত এক কবির দুটো কবিতার বই নিয়ে এসেছে। সে-ই হাল আমলের কবিতার সঙ্গে আমার যোগাযোগ রক্ষা করে। অনেক প্রিয় কবির কবিতা আমাদের মুখস্থ এখন। আমরা মাঝে মাঝেই প্রিয় কবিতার দু-এক লাইন কথায় কথায় উচ্চারণ করি। আর একটাই আকাঙ্ক্ষা আমরা কবে এমন কবিতা লিখতে পারব। ছন্দের প্রতি অনুরাগ আমার কম। ছন্দের ব্যাকরণও ভাল বুঝি না। কিন্তু গদ্য কবিতার, সুষমা সহজেই ধরে ফেলতে পারি। যেন নাড়ী ধরে টান দেয়।

    সুধীনবাবুর স্মৃতিশক্তি প্রবল। মুকুলেরও। ওরা সহজেই অনেক কবিতা মুখস্থ বলে যেতে পারে। আমি পারি না। দু-একটা পংক্তি মনে থাকে, সবটা মনে থাকে না।

    আমরা ক্রমেই এক সময় দেখলাম, কবিতার আলোচনাতেই মগ্ন হয়ে গেছি।

    সুধীনবাবু বললেন, কলকাতায় যাচ্ছি। সবার কবিতা নিয়ে যাব। তোমার দু-একটা কবিতা দাও তো ভাল হয়।

    —কী যে বলেন! আমার দেবার মতো কবিতাই নেই। আসলে মুখচোরা মানুষের যা হয়। আমার কবিতা পরীর দয়ায় অপরূপায় ছাপা চলে। কলকাতার কাগজে কবিতা। ভাবা যায় না। চরম আহাম্মক মনে হয় নিজেকে। কিংবা আস্পর্ধা। বললাম, না, আমার সত্যি কিছু নেই।

    মুকুল কেমন ক্ষেপে গেল।— তুমি না বিলু, শামুকের মতো স্বভাব তোমার। কবিতার প্রকাশ না হলে লিখে কী লাভ।

    —লাভ অলাভ বুঝি না। আমার লিখতে ইচ্ছে করে না। তোমরা পীড়াপীড়ি কর বলে লিখি। মুকুলও ছাড়বার পাত্র নয়। টেবিল থেকে খাতাটি খুঁজে বের করল। পর পর কটা পড়ে, নিজেই দুটো কবিতা টুকে নিল। বলল, ঠিক আছে, এবারে খাতাটা যত্ন করে রেখে দাও।

    এ-সময় মা থালায় করে মোয়া নাড়, তিলের তক্তি, দুধ কলা মুড়ি রেখে গেল। গরুর দুধ। পেঁপে কেটে একটা থালায় রেখে গেল। কৃতী সন্তানের বন্ধুরা এলে, বাবা তাঁর যথাসাধ্য সৎকার করতে ত্রুটি রাখেন না।

    বাবা তাঁর কৃতী সন্তানের বন্ধুদের আপ্যায়নের কোনো ত্রুটি রাখতে রাজি না। এতে তাঁর বাড়িঘরের মর্যাদা বাড়ে। মুকুল তো মাসিমা, মেসোমশাইর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এক একটা নাড়, মুখে দেবে, চেঁচিয়ে বলবে, দারুণ মাসিমা। বাবা শুনতে পান, মাও। আমি বুঝি এটা বাবার পক্ষে বড়ই সুখবর। ওরা চলে গেলে বাবা বলবেন, খাঁটি গরুর দুধ শহরে পাবে কোথায়? বাবার খুব ইচ্ছে একদিন সবাইকে খেতে বলেন। খাঁটি গাওয়া ঘি ঘরে হয়। মা সর তুলে জমিয়ে সপ্তাহে একদিন ঘি জ্বাল দেয়। সর বেটে জ্বাল দেবার সময় সত্যি সুঘ্রাণে বাড়িটা ভরে যায়। গাওয়া ঘি পাতে, খেতের বেগুন, মোচার ঘন্ট, লাউ দিয়ে মুগের ডাল এবং মাছ আর দই। মাছ বাদে প্রায় সবই এখন আমাদের বাড়িতেই মেলে। এটা একজন সংসারী মানুষের পক্ষে কত বড় সাফল্য, তাদের না খাওয়াতে পারলে সেটা যেন বোঝানো যাচ্ছে না।

    ওরা চলে গেলেই পিলু হাজির।

    সে হন্তদন্ত হয়ে ফিরছে। কোথায় গেছিল জানি না। বাড়িতে বলেও যায়নি। সাইকেল থেকে নেমে দেখল তার দাদাটি ঘরের বাইরে বের হয়েছে। আমাকে পিলু চুরি করে দেখছে। কেন দেখছে বুঝতে। পারছি না। ও কী টের পায়, আমি এখনও স্বাভাবিক নয়।

    দেখলাম সাইলেকটা রেখে আমার দিকেই আসছে।

    বললাম কোথায় গেছিলি!

    সে খুব কাছে এসে বলল, পরীদিকে বলে এলাম।

    পরীদির জন্য পিলুরও একটা কষ্ট আছে। তার দাদাটিকে নিয়ে পরীদি যে বিপাকে পড়েছে, সে সেটা বুঝতে পেরেই চলে গেছে। সে জানে, দাদার ফেরার খবর সবার আগে যদি কাউকে দিতে হয় তবে সে পরীদি। সে স্থির থাকতে পারেনি।

    পিলু ফের বলল, পরীদির এক রাতে কী চেহারা হয়েছে তাকানো যায় না।

    আমি অন্য কথা ভাবছিলাম। কাল পরী যথার্থই বিদ্রোহ করেছে হয়ত। এমন একটা বিশ্রী কান্ড ঘটার পর পরী আমাদের বাড়িতে না হলে আসে কী করে। বাপ-ঠাকুরদার কাছে আমরা এখনও সবাই ছেলেমানুষ। আঠারো উনিশ বয়সে কত আর আমাদের সাংসারিক বুদ্ধি হতে পারে। পরীদের পরিবারও তাই ভেবে থাকতে পারে। বয়সের দোষে হচ্ছে। জীবনকে বোঝার বয়সই আমাদের হয় নি এমন ভাবতে পারে। পরীর উপর সতর্ক পাহারা যে ছিল না কে বলবে! না পরেশচন্দ্রের সঙ্গে বের হয়ে এসেছিল বিকালে। মানুষটি যথার্থই ভাল মানুষ। পরীর কথায় ওঠে বসে। পরী যদি পরেশচন্দ্রকে ডেকে পাঠায়, যতই গুরুত্বপূর্ণ রাজকার্য থাকুক, ফেলে ছুটে যাবেই। কে জানে, পরেশচন্দ্রের জিপে বের হয়ে বড় রাস্তায় নেমে বলেছিল কি না, তুমি অপেক্ষা কর, আমি আসছি। বিলুর খোঁজ নিয়ে আসছি। পরী কাল সাইকেলে এসেছিল কিনা জানি না। পরেশচন্দ্র আমাদের চেয়ে কয়েক বছর বেশি আগে পৃথিবীতে এসেছে। জীবনের অভিজ্ঞতা তার আমাদের চেয়ে বেশি। পরীর সাময়িক দুর্বলতা ভেবে লেগে রয়েছে। কোনো কারণই থাকতে পারে না—পরীর মতো মেয়ের গরীব বামুনের পুত্রের জন্য এত দুর্বলতা বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না। পরীর চোখে মুখে আশ্চর্য এক দেবীমহিমা আছে সে টের পেয়েছে। পরীর শরীরের সবটাই যেন মা জগদ্ধাত্রীর জীবন্ত রূপ। এত রূপ যার তার আগুনে কোন্ পতঙ্গ পুড়ে মরতে না ভালবাসে।

    পিলুকে বললাম, শোন পিলু!

    পিলু কাছে এলে দু’ভাই বাবার ফুলের বাগান পার হয়ে রাস্তার ধারে আমগাছটার নিচে এসে দাঁড়ালাম। শোন বললে, পিলু বুঝতে পারে দাদার কোনো গোপন কথা আছে। সে-কথা দাদা তাকেই বলতে পারে। আর কাউকে না।

    খুব সতর্ক গলায় বললাম, পরী সাইকেলে এসেছিল?

    —না তো।

    —কার সঙ্গে এল? সুধীনবাবুদের সঙ্গে?

    —না তো।

    —তবে।

    —পরীদি একাই এসেছিল। পরে মুকুলদারা।

    আমার দুশ্চিন্তা, পরীর গালে আমার হাতের ছাপ থাকলে বাবা ঠিক টের পাবে। বাবা কেন, মা, মায়া সবাই।ওমা পরী তোমার গালে কালসিটে দাগ কেন, কী হয়েছিল?

    পরী যে এল, কালসিটে দাগ ছিল না? পিলুকে বললাম।

    পরীদি খুব সেজে এসেছিল।

    —সেজে এসেছিল?

    —হ্যাঁরে দাদা। কপালে বড় আলতার টিপ। মুখ ঝকমক করছিল।

    আসলে পরী কাল মুখোস পরেছিল। পরেশচন্দ্রের সঙ্গে এত সেজে বের হয়েছিল যে প্রসাধনের নিচে তার কালসিটে দাগ ঢাকা পড়ে গেছিল। এই দাগ আড়াল করার জন্য পরী তবে এত সেজেছে। দু-দিকই রক্ষা করেছে পরী। দাদুর দিক। দাদু দেখে বুঝেছে হয় তো, পরীর মোহ কেটে গেছে। না হলে পরেশচন্দ্রকে নিয়ে বিকেলে বের হবে কেন, এত প্রসাধন করবে কেন। আর বাবাকে ধোঁকা দেবার জন্য, গালের কালসিটে দাগ দেখলে বাবা প্রশ্ন না করে পারবেন না—মিথ্যা কথা বলতে পরীরও কেন জানি সংকোচ হয়, বাবার সঙ্গে মিছে কথা বলতে পারে না। বাবা মা মায়া কেউ টের না পায়, পরীর গালে কালসিটে দাগ পড়েছে। এমন সুন্দর মুখে সে দাগ কত বড় কলঙ্কের! কলঙ্কের না গৌরবের ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। পরী আমাকে নির্ঘাৎ ডোবাবে। কেমন ভয় ধরে গেল। এমন জেদি মেয়েকে আমি কেন, কারও যেন সামলাবার ক্ষমতা নেই। পরী কী ভাবে, আমি তার হাতের খেলনা?

    এ-সব জটিল চিন্তা ভাবনায় আমার মাথাটা কেমন ধরে গেল। পিলুকে বললাম, ঠিক আছে যা।

    আর তখনই দেখি বাবা কোত্থেকে দু-জন ঘরামিকে ডেকে এনেছেন। বাবা বললেন, স্কুল থেকে ফিরে কোথাও আজ আর বের হবে না।

    তারপর যেন আমার অনুমতির জন্য বলা, নবমীর ঘরটা ঠাকুরঘরের পাশেই তুলছি। কী বলিস! কাছে হবে। এই বয়সে তো তাঁর যত কাছাকাছি থাকা যায়।

    পিলু ঘরামি দুজনের সঙ্গে ছুটে গেছে বাঁশ-ঝাড়ের দিকটায়। বড় বড় কটা বাঁশের খুঁটি লাগবে। বাঁশ কাটার শব্দ কানে আসছিল।

    আমি কিছুতেই কালকের দুর্ব্যবহার ভুলতে পারছি না। পরী আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছে, না পরী যাচাই করে দেখল ওর প্রতি আমার সত্যি দুর্বলতা আছে কি না। একবার দুর্বলতা প্রকাশ করতে গিয়ে যে-ভাবে পরী নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েছিল, তারপর থেকে ওকে যতটা সম্ভব পরিহার করে চলেছি। তবে আমি পরিহার করে চললেও সে বার বার বেহায়ার মতো আমার অনুপস্থিতিতে বাড়ি ঘুরে গেছে। এতে আমার ক্ষোভ হত, সে টের পেত। কিন্তু পরী জানত না, তাকে আমি নিজের মনে করি কিনা! গতকালের দুর্ব্যবহারে টের পাইয়ে দিয়েছি, আমার সত্যি অধিকার জন্মে গেছে। না হলে আমি তাকে এমনভাবে অপমান করতে পারি না। কানের কাছে কে যেন একই সুরে কেবল ছড় টেনে যাচ্ছে,—এ-যে তোমার কত বড় অধিকার বিলু তুমি জান না। কিছুতেই এই কথাগুলি ভুলতে পারছি না। চোখ মুখে বিষণ্ণতা ফুটে উঠছে। বাবা বাড়িতে গাছপালা লাগাবার মতো যেন টের পান, তাঁর এই ঔরসজাত গাছটিতে পোকা লেগেছে।

    গাছপালা তার ঠিকমতো মাটিতে শেকড় চালিয়ে দেওয়া না পর্যন্ত বাবা বড় সতর্ক থাকেন। একজন মানুষের এই কাজ। তার উত্তরপুরুষকে ঠিকমতো রোপণ করে যাওয়া। না করতে পারলে অসফল মানুষ, কিংবা কোনো উদ্ভিদ রোপণে তাঁর যে মহিমা থাকে— নিজের সন্তানের বেলায় তা ব্যর্থ হয়েছে। লক্ষ্মীর অপমৃত্যুর পর আমার মুখে ঠিক এমনি হয়তো বিষণ্ণতা টের পেয়েছিলেন। না হলে বলতেন না, তোমাকে এক খন্ড জমি দিলাম, জমিতে তোমার খুশিমতো শাকসব্জি লাগাও। বলতে চেয়েছিলেন, মৃত্যুই শেষ কথা নয়, জীবনে বেঁচে থাকাই বড় কথা। আসলে বাবা আমাকে জীবনের অন্য এক আকর্ষণে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন। এখন সেটা বুঝি। আজও যে বললেন, স্কুল থেকে ফিরে কোথাও বের হবে না, সেই একই কারণে।

    স্কুল থেকে ফিরলে বাবা বললেন, খাওয়া হলে আমার সঙ্গে যাবে।

    সামান্য অপ্রসন্ন গলায় বললাম, আপনার সঙ্গে আমি কোথায় যাব?

    বাবা জানেন, আমি তাঁর সঙ্গে কোথাও যাওয়া আজকাল পছন্দ করি না। যজমানদের শ্রাদ্ধ শান্তিতে, বিয়ে উপলক্ষে, কখনও ন’জন, কখনও দ্বাদশ ব্রাহ্মণের দরকার হয়। বাবাই সব ঠিক করে দেন। মূল কথা বাড়িতেই আমাকে নিয়ে তিনজন সৎ ব্রাহ্মণ আছেন। এই তিনজন আমি, পিলু, বাবা। এখন আমি এ-সব নিমন্ত্রণে কিছুতেই যেতে চাই না। বাবা যেন আমাকে সঙ্গে নিয়ে যান, তাঁর যজমানদের দেখাবার জন্য, দেখ, আমার পুত্র কেমন লায়েক। কেমন সুপুরুষ। ম্যাট্রিক পাশ করেছে। কলেজের একটা পাশ দিয়েছে।

    এ-ছাড়া বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবার যজন যাজন আমার আদৌ মনঃপূত নয়। আমি পিলু দাঁড়িয়ে গেলে বাবাকে আর এ-কাজ করতে দেব না, এমনও মনে মনে কতবার ভেবেছি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছে, বাবার সম্ভ্রম-বোধ আর আমার সম্ভ্রম-বোধ যেন আলাদা। নিমন্ত্রণে গেলে নিজেকে পেটুক বামুন ছাড়া ভাবতে পারতাম না। কলেজে পড়ার সময়ই বাবাকে সাফ বলে দিয়েছিলাম, এবার থেকে বাড়ির একজন বামুন বাদ দিয়ে লিস্ট করবেন। আমি কারো বাড়িতে কোনো আত্মার সদ্‌গতি করতে রাজি না।

    বাবা শুনে অবাক হয়ে গেছিলেন। ছেলে কী তাঁর ম্লেচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। মানুষের সদ্‌গতি বলে কথা। একে তো সৎ ব্রাহ্মণ আজকাল পাওয়া কঠিন। আচার নিয়ম মানে না। গলায় পৈতা থাকলেই বামুন হয়, তিনি মানেন না। তাঁর চেনা জানা কিছু ব্রাহ্মণ শহরে আছেন, কিন্তু আজকাল এতদূর হেঁটে কোনো সৎ ব্রাহ্মণই কারো সদ্‌গতির জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে না। এ-হেন অসময়ে তাঁর নিজের পুত্রটি পর্যন্ত বেঁকে বসবে, তিনি বোধহয় অনুমানও করতে পারেন নি। এবং এক সকালে বাবা যখন আমাকে তার সঙ্গে কিছুতেই নিয়ে যেতে পারলেন না, ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, তোমার আজকাল কী হয়েছে বুঝি না। মানুষের অসময় বুঝতে হয়। আমাদের শাস্ত্রে আছে, সৎ ব্রাহ্মণ ভোজনে আত্মার সদ্‌গতি হয়। মানুষের কাজে কর্মে আমি কোথায় যাব।

    বলেছিলাম, সে আপনি বুঝবেন। আমার যেতে ভাল লাগে না। আসলে ভাল না লাগারই কথা। বাবা তো সকালে প্রাতঃস্নান সেরে নামাবলী গায়ে খড়ম পায়ে ঠক ঠক শব্দ তুলে বাড়ি থেকে নিষ্ক্রান্ত হবেন। বাবার বেলায় বের হওয়া কথাটা যেন মানায় না। নিষ্ক্রান্ত হলেন, এমনই মানায়। এত বেশি আচার বিচার, যেন মনে হবে বাবা বড়ই পুণ্য কাজ করতে যাচ্ছেন। তীর্থ করার সামিল। অথবা মনে করেন তাঁর মন্ত্রপাঠে সংসারী মানুষের আপদবিপদ কেটে যায়। অশুভ আত্মার হাত থেকে মানুষ মুক্তি পায়। মানুষের এটা কত বড় দায়, জ্যেষ্ঠ পুত্রটি যদি তা বুঝত। বাবার ক্ষোভের কারণ বুঝি। আমি বাবাকে, শুধু বাবাকে কেন, পরিবারের সবার কাছ থেকে আলগা হয়ে যাচ্ছি বাবাও এটা বোধ হয় খুব দোষের মনে করেন না। গাছ যখন বাড়ে, তখন সে দূরত্ব বজায় রাখতেই চায়, নইলে গাছটা তার নিজের ডালপালা মেলবার জায়গা পাবে কোথায়। বীজ-তলা থেকে গাছ তুলে সময়কালে রোপণ করতে না পারলে গাছে ফসল ফলবে কেন। আম জামের কলম কেটে রোপণ করতে হয়। গাছ থেকে গাছ আলাদা হয়ে নিজের মতো বাড়ে। আমিও বাড়ছি। আমার আলাদা অস্তিত্ব এ-সংসারে বীজতলা থেকে চারা গাছ তুলে নেবার মতো। এতে মা আমার যতটা কাতর, বাবা তত নন।

    পিলুই একদিন বলেছে, জানিস মা না কাঁদছিল!

    —কেন রে!

    —তুই নাকি কেমন হয়ে যাচ্ছিস।

    —আমি আবার কী হলাম!

    —সংসারে তোর টান নেই। মন উড়ো উড়ো। বাবা মা’র কান্না দেখে ঘাবড়ে গেছিল। বলল, বয়সের দোষ। পাখা গজাচ্ছে। উড়তে শিখেছে। জীবের ধর্মই নাকি এমন।

    আমাকে নিয়ে বাড়িতে যে অশান্তি চলছে, পিলুর কথায় ধরতে পারি। আমি নাকি বাড়িতে এক দন্ড থাকতে চাই না। বাইরে আমার এত কী রাজকার্য থাকে মা নাকি বুঝতে পারে না। বেশি রাত না হলে ফিরি না। সবাই বারান্দায় আমার অপেক্ষায় বসে থাকে— বাবা ক্ষোভ সামলাতে না পারলে আক্ষেপ করে বলবেন, খুবই কান্ডজ্ঞানের অভাব।

    কান্ডজ্ঞানের কত বড় অভাব কালকের ঘটনার পর এটা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছি। সে জন্য বাবা যখন বললেন, নবমী বুড়ীর জঙ্গলে যাব। তোমাকে সঙ্গে যেতে হবে। আমি না করতে পারলাম না।

    ঘরামি দু’জন, ছোট্ট কুঁড়েঘরটা আজই বানিয়ে ফেলেছে। মাথায় তালপাতার ছাউনি। চারপাশে পাটকাঠির বেড়া। ঝাঁপের দরজা একটা। মুগুর দিয়ে মাটি বসিয়ে ভিটে তৈরি করে ফেলেছে। বাবা নিজেও সারাদিন তাদের সঙ্গে খেটেছেন। পিলুকে স্কুলে যেতে দেন নি। ঘরটা তোলার ব্যাপারে পিলুর আগ্রহই বেশি। মা নিমরাজি হয়ে আছে। তবে সবাই চাইলে মা না করে কী করে। বিশেষ করে মেজ পুত্রটি কবে থেকে নবমীকে বাড়ি নিয়ে আসার জন্য বায়না ধরেছে। রাতে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে জীবন্ত একটা মানুষকে নিয়ে শেয়াল কুকুরে টানাটানি করবে ভেবেই সে অস্থির ছিল। কার জন্য কীভাবে যে মানুষের টান ধরে যায়, পরীর জন্য না হলে আমার এমন নাড়ির টান জন্মায় কী করে! দু-বছর আগেও সে জানত না পরী বলে এক নারী পৃথিবীতে বড় হচ্ছে। এখন তো সব এক দিকে, পরী একদিকে। সে পরীর ভালোর জন্য জীবনের সর্বস্ব বিসর্জন দিতে পারে। আর দিতে পারে বলেই, সে সহজে পরীর কাছে ধরা দিতে চায় না। পরী ঘনিষ্ঠ হতে চাইলেই ক্ষেপে যায়। পরীকে এমন বাড়িঘরে মানাবে কেন!

    পরীর ছলনায় শেষ পর্যন্ত ধরা দিতেই হল।

    এমন যখন ভাবছিলাম, বাবা বললেন, চল। পিলুর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি দৌড়ে যাও। খবর দাওগে আমরা যাচ্ছি। কী যে বায়না বুড়ির, সবাই গিয়ে নিয়ে আসতে হবে তাকে। আসলে নবমী তার প্রিয় বনজঙ্গল ছেড়ে চলে আসবে। আসার আগে সবাই সামনে না থাকলে যেন জোর পাবে না। দাঠাকুর, বড় দাঠাকুর, বাবাঠাকুর, সবাই তাকে নিয়ে যেতে এসেছে। যেন সেই জঙ্গলের প্রতিটি গাছপালা, কীটপতঙ্গ, প্রাণীকুলের কাছে বলতে পারবে, তোমরা আমায় এতদিন খাইয়েছ পরিয়েছ, এখন আমি ঠিকমতো হাঁটাহাঁটি করতে পারি না,—মরে থাকলে আমার আত্মার সদ্‌গতি কে করবে! তেনারা তিন বামুন ঠাকুর এসেছেন, শেষ বয়সের সম্বল তেনারা। তাঁরা আমাকে ভালই রাখবেন। দেখছ না সবাই নিতে এসেছেন।

    নবমীর এত আবদার পিলুর জন্য সহ্য করা হচ্ছে। পিলুকে আমরা জানি এ-রকমেরই।

    মা বলেছিল, বুড়ি কাঁথা কাপড়ে হেগে মুতে রাখলে কে পরিষ্কার করবে!

    পিলু বলেছিল, আমি করব মা! তুমি কিচ্ছু ভেব না। আমি সব করব।

    পিলুর কী আগ্রহ বুঝতে বাবার আর কষ্ট হয়নি। বাবা বলেছিলেন, ধনবৌ, যে যার ভাগ্যে খায়। নবমী পিলুকে শেষ আশ্রয় ভেবেছে। ক’দিন আর বাঁচবে। যে ক’টা দিন বাঁচে, মানুষের কাছে থাকুক। এতে ঘরবাড়ির পুণ্যই অর্জন হবে। এর সঙ্গে তোমার ছেলেমেয়েদের শুভাশুভও জড়িয়ে আছে। যদি কুকুর-শেয়ালে খায়, তবে মানুষের কত বড় অপমান হবে বল।

    এরপর আর মা কী বলবে!

    কেবল বলেছে, যা ভাল বোঝ কর।

    সেই ভাল বোঝাটা মা’র নিমরাজি হওয়া। আসলে এ-পরিবারে কার ঠাঁই হবে না হবে, তার শেষ অনুমতি দেবার দায়িত্ব আমার মা’র

    আমি ও বাবা যাচ্ছি। সুর্য নেমে গেছে। বাবা, পাঁজি দেখে বলেছেন সাঁঝবেলার পর যাত্রা শুভ। পিলু আগেই দৌড়ে গেছে। বেশ খানিকটা দূরত্বে বনজঙ্গলের শুরু। এদিকটায় আরও বাড়িঘর উঠেছে। কেউ বারান্দায় বসে পিতা-পুত্রকে জঙ্গলের দিকে অসময়ে যেতে দেখে, প্রশ্ন করেছে, কোথায় যাচ্ছেন কর্তা। বাবা বলেছেন, এই কারবালায় যাচ্ছি। একটু কাজ আছে। নবমীকে আনতে যাচ্ছেন ঘুণাক্ষরেও বলছেন না। বললেই তিনি যেন আবার তামাসার পাত্র হয়ে যাবেন। কর্তার চিড়িয়াখানায় আর একটি জীবের আমদানি হচ্ছে, এমন ভাবতে পারে। কেউ কেউ বুড়িকে জঙ্গলের ডাইনি বলতেও দ্বিধা করে নি। অন্যের কী দোষ, যেদিন আমি নবমীকে প্রথম দেখি, সেদিন আমারও এমন মনে হয়েছিল।

    বনজঙ্গলে ঢোকার আগে কিছু খানাখন্দ পার হতে হয়। বাবার হাতে হ্যারিকেন। পকেটে দেশলাই। বর্ষাকাল বলে বনজঙ্গল গভীর ঘন। কোথাও বড় বড় গাছ কিংবা পরিত্যক্ত ইটের ভাটার গভীর গর্তে জলাশয়। কত রকমের সব পাখি ওড়াউড়ি করছে। নির্জন নীল ধুসর বর্ণের পৃথিবীর মধ্যে আমরা ক্রমে ঢুকে যাচ্ছি। কোনো মানুষের সাড়া পাওয়া যায় না এদিকটায়। একটা সরু পথ বনজঙ্গলের ভিতর দিয়ে কারবালার লাল সড়কে গিয়ে পড়েছে। দিনের বেলাতেই আমার আর পিলুর শহর থেকে ফেরার রাস্তা শর্টকাট করতে গেলে গা ছমছম করত। কোথাও এতটুকু রোদ ঢোকে না। ডাহুক, বনমুরগি, কখনও ঘুঘুপাখির, ডাক শোনা যায়। আর সাঁঝবেলায় শেয়ালের দল কবরের গর্ত থেকে উঠে আসে। বোধহয় অন্ধকারকে তারাও ভয় পায়। যখন রাতে শেয়ালেরা চিৎকার করতে থাকে, তখন মনে হয়, এক আদিম ঘোর অরণ্যের পাশে আমরা বসবাস করি।

    বাবা বললেন, দেখে হাঁটবে।

    তাই হাঁটতে হয়। সাপখোপের উপদ্রব বড় বেশি। জঙ্গলটার একটা দিক সাফ হয়ে যাওয়ায় মানুষের তাড়া খেয়ে বিশাল সব গোখরা, চন্দ্রবোড়া, ডাঁড়াস এসে এখন এই জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। জঙ্গলটার মধ্যে খুঁজলে এখনও দু-একটা নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ে। পোড়ো বাড়ি চোখে পড়ে। এক সময় ইংরাজরা এ-তল্লাটেই তাদের ব্যবসা বাণিজ্য গড়ে তুলেছিল। লাল সড়ক ধরে গেলে, বিশাল রাজবাড়ির পাঁচিল, কাশিমবাজারের নীল মাঠ, দূরে একটা খালের মতো আদি গঙ্গায় জলজ ঘাস, এবং তারপর কী আছে আমরা জানি না। আমি আর পিলু একবার গঙ্গার ধার ধরে এগোতে গিয়ে আবিষ্কার করেছিলাম, ও-পার দেখা যায় না এমন মস্ত বড় ঝিল। নবাবের আসল প্রাসাদ ঝিলের তলায়। জগৎ শেঠের প্রাসাদ ঝিলের তলায়। কাশিমবাজারে ঢুকলেই মনে হত পরিত্যক্ত শহর। ইঁটের দালান, দাঁত বের করা, প্রতি বছরই কালে কাউকে না কাউকে খায়। এজন্য বাবা আমি খুবই সন্তর্পণে হাঁটছি। পিলুর এই বনজঙ্গলের ঘোরা খুব প্রিয় কাজ বলে, সে গন্ধ শুঁকে টের পায় কোথায় কী পড়ে আছে। পিলু যা টের পায়, আমরা পাই না।

    আমাদের সতর্ক থাকতেই হয়।

    বাবার সঙ্গে কোথাও যাওয়া আমার এখন আর হয় না। বাবার ভাষায় প্রবেশিকা পরীক্ষার বছর থেকেই। আজ যে যাচ্ছি, সে নিতান্ত দায়ে পড়ে। দায়টা বর্তেছে অনুতাপ থেকে বুঝি। পরীকে মেরে ভাল নেই, মনের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করছে, মানুষ কুকাজ করলে যা হয়, আমারও তাই হয়েছে। বাবার কথা ফেলতে পারিনি। সুবোধ বালক হয়ে গেছি।

    বাবা অনেকদিন পর তাঁর বড় পুত্রকে নিয়ে আকাশের নিচ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন।

    জঙ্গলটায় ঢুকে বাবা বললেন, নবমীকে নিয়ে যেতে বেশ রাত হবে দেখছি।

    বললাম, কাল সকালে গেলেই হত। রাত করে।

    —নবমী নাকি দিনের বেলায় আসতে রাজি না। তা ছাড়া সময়টা খুব শুভ।

    হতেই পারে। ওকে দিনের বেলায় হাঁটিয়ে নিয়ে এলে পাড়ার ছেলেরাই পিছু নেবে। সবাই বাড়ি থেকে বের হয়ে আসতে পারে। আমাদের মাথা খারাপ আছে ভাবতে পারে। পিলু পর্যন্ত তার সাঙ্গোপাঙ্গদের বলেনি, জঙ্গলের বুড়িটাকে বাবা বাড়ি নিয়ে আসবে। এমনকি পিলু একাই যায় রোজ। কারণ, দু-একজন সঙ্গে গেলে সে বুঝেছে বুড়ি ক্ষেপে যায়। বুড়িরও দোষ নেই। এমন প্রেতের মতো বুড়িকে দেখলে ভয় হবার কথা। নবমী বয়সকালে খুবই রূপবতী ছিল, বিশ্বাস করা কঠিন। ছেলে-ছোকরারা জঙ্গলে ঢুকে বুড়িকে ঢিলটিলও মেরেছে। পিলু নালিশ পাবার পরই শাসিয়ে দিয়েছে সবাইকে। এক পিলু গেলেই বুড়ি শান্ত থাকে। গড় হয়। আর কেউ গেলেই এমন শাপশাপান্ত শুরু করবে যে, ছেলেছোকরাদের রাগ বেড়ে যায়।

    সাঁঝ লাগতেই আমরা নবমীর জঙ্গলে হাজির। পিলু চিৎকার করে বলছে, নবমী, বাবা আসছে। দাদা আসছে। বের হয়ে দেখ।

    নবমী বের হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। পারল না। বেঁকে গেছে নবমী। দাঁড়াতে না পেরে বসে পড়ল নবমী। অনেক দূরে আছি। দূর থেকেই দেখলাম, সে মাটিতে মাথা ঠুকে তার বাবাঠাকুরকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।

    কাছে গেলে দেখলাম, নবমী আজ কেমন চুপচাপ। পিলুই নবমীর হয়ে কথা বলছে। কি কি করতে হবে সেই কথা। নবমী শুধু বড় বড় চোখে আমাকে বাবাকে দেখছে। ভাগ্য তার এত সুপ্রসন্ন হবে জীবনেও হয়ত ভাবতে পারেনি। কেউ তাকে শেষ সময়ে বাড়ি তুলে নিয়ে যেতে পারে, কল্পনা করতে পারেনি। পিলু যে মাঝে মাঝে বলত, নবমী তুমি আমাদের বাড়ি যাবে? ছেলেমানুষের কথা, সে বলত, আমার কপালে সইবে না দাদাঠাকুর। সেই দাদাঠাকুর শেষ পর্যন্ত সবাইকে রাজি করাতে পারবে, এখনও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না তার। বাবা তার জন্য আলাদা ঘর তৈরি করেছেন, খবরটাও কেমন দাদাঠাকুরের ছেলেমানুষী বলেই এতক্ষণ হয়ত ভেবেছে। বাবা গতকাল এসে কী জেনে গেছিলেন, তাও জানি না।

    কিন্তু পিলুর কথায় বারা যেন আকাশ থেকে পড়লেন।

    পিলু বলল, নবমী বলছে, ওর ঘরের কোণায় একটা কাঠের বাক্স আছে। ওটা নিতে হবে। কী ভারি। দেখ। বলে সে কিছু খড়কুটো সরিয়ে বাক্সটা দেখাল। কবেকার একটা কাঠের পেটি। কিন্তু উই কিংবা অন্য কোনো পোকামাকড়ের উপদ্রবে পড়েনি।

    বাবা বললেন, ওতে কী আছে তোমার

    নবমী হাতজোড় করল শুধু।

    যেন নবমী বলতে চায়, কী আছে বাবাঠাকুর শুধাবেন না। নিয়ে যেতে হবে, এইটুকু সে শুধু বলতে পারে।

    বাবা বললেন, দেখি পেটিতে কী আছে? এত ভারি!

    আর পেটি খুলে আমরা অবাক। ক’খানা আস্ত ইঁট। ইঁটের ভাটায় কাজ করত নবমীর মরদ। তারই স্মৃতি।

    বাবা হেসে ফেললেন, ওগুলো নিয়ে কী হবে?

    নবমী ফের হাতজোড় করল। যেন এগুলি সঙ্গে না নিলে নবমী তার ইঁটের ভাটার পোড়ো বাড়ি ছেড়ে নড়বে না। ছেঁড়া কাঁথা-বালিশ, এমনকি সে তার পোঁটলা-পুঁটলি সম্পর্কেও কিছু বলছে না।

    বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, মানুষটার শেষ স্মৃতি। এই নিয়ে সে বেঁচেছিল তবে। কী করবি, নিতেই হবে!

    —স্মৃতি যখন একটা-দুটো নিয়ে গেলেই হয়। সবকটা নেবার কী দরকার। আমি না বলে পারলাম না।

    বাবা উবু হয়ে তখন হ্যারিকেন ধরাচ্ছেন। গাছপালার আবছা অন্ধকারে সাঁঝবেলার আঁধার ঘন হয়ে উঠছে। ঘরের সবকিছু অস্পষ্ট। ভ্যাপসা স্যাঁতসেতে ঘর। নোনায় ইট-বালি খেয়ে গেছে। একটা দিক ধসে পড়েছে। ভাটা পরিত্যক্ত হলেও, সবাই চলে গেলেও, নবমী স্বামীর স্মৃতি আঁকড়ে এখানটায় সেই কোন্ অতীতকাল থেকে পড়ে আছে ভাবতে অবাক লাগে। বিশ্রী গন্ধ। কাঁথা-বালিশ এত নোংরা যে, তার থেকেই ভ্যাপসা গন্ধটা উঠতে পারে। নবমীর নিজেরও ভারি জীর্ণ বাস পরনে। এককালে ত্যানাকানি পরে থাকতে দেখেছি। পিলুই বাবার কাছ থেকে চেয়ে বছরে আজকাল দুটো- একটা দানের কাপড় দিয়ে যায়। একটা ছাগল আর তার গোটা তিনেক বাচ্চা গুড়ি মেরে অন্ধকার কোণে শুয়ে আছে। ঘরেই রাম ছাগলের নাদি জমা করে রেখেছে বুড়ি। দুটি মাটির মালসা ছাড়া আর কিছু বুড়ির সম্বল নেই।

    বাবা এবার হ্যারিকেনটা তুলে কাঠের পেটিটা টেনে বললেন, পিলু তুই একটা ইঁট নে। না নিলে যখন যাবে না কী করা!

    নবমী ফের বাবার দু’পায়ে গড় হয়ে পড়ল।

    পিলু নবমীর আচরণ দেখে সব বুঝতে পারে। নবমী কৃতজ্ঞতায় এতই অধীর যে, চোখ তার জলে ভেসে যাচ্ছে। কিছু বলতে গেলেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

    পিলু বলল, ও রাজি না বাবা।

    —তোকে কে বলল?

    —নবমী।

    —দাঠাকুর। বলে নবমী পিলুর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। হাড় ক’খানা সম্বল করে নবমী বেঁচে আছে। চোখ কোটরাগত। চোখের ভাষা বোঝার উপায় নেই।

    পিলু বলল, তোমার সবক’টা ইট কে নেবে। বুঝতে পারছ না, কতটা রাস্তা যেতে হবে। হেঁটে যেতে পারবে ত?

    —পারব দাঠাকুর।

    —তোমার ছাগলটাকেও নিয়ে যেতে হবে।

    — হ্যাঁ দাঠাকুর।

    —তোমাকে আমি ধরে নিয়ে যাব।

    —হ্যাঁ দাঠাকুর।

    —কেবল হ্যাঁ দাঠাকুর, হ্যাঁ দাঠাকুর। পিলু কিছুটা যেন ক্ষেপেই গেছে। তোমার এত আবদার, সবকটা ইঁট নিয়ে যেতে হবে। কে নেবে এত!

    আমি যে সবক’টা ইট পাহারা দিতেছি। আমার আর কোনো সম্বল নেই। বলে কী! এই ক’টা ইট পাহারা দিতেছি!

    বাবা বললেন, কেন? পাহারা দিতেছ কেন? তোমার যখের এত ভয় কেন?

    নবমী বোধহয় আর পারল না। কেবল কাঁদতে থাকল।

    পিলু ধমকে উঠল, আচ্ছা ফ্যাসাদ হল। দেব সবক’টা ইঁট জলে ফেলে। বাবা কত কষ্ট করে নিতে এসেছে, আর তেনার আবদারের শেষ নেই।

    বাবা বললেন, বকিস না। ওর মাথা ঠিক নেই। বনজঙ্গলে থেকে ও তো একটা গাছ হয়ে গেছে। গাছটাকে নিয়ে কোথাও লাগালেও বসবে না। যা বলছে তাই কর। কী বলছে ছাই তাও বুঝতে পারছি না।

    বাবা হ্যারিকেনটা আরও উস্কে দিয়ে বললেন, ঠিক আছে, ছাগলটা সঙ্গে নিচ্ছি। পিলু কাল এসে তোমার কাঠের পেটি থেকে ইট ক’খানা নিয়ে যাবে। সঙ্গে বনমালী আসবে। মাথায় বয়ে নিতে ওর কষ্ট হবে না। বলে একটা ইঁট বের করে ওজন দেখলেন! যেমন ইঁটের ওজন হয় তেমনি। খুব ভারি। বহু বছর আগে তৈরি ইঁট,—অথচ এতটুকু ক্ষয়ের চিহ্ন নেই।

    বাবা এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ইঁটের ভেতর সাপের আস্তানা গড়ে ওঠে। ইঁটের ডাঁই যেখানে পড়ে থাকে, সাপ সেখানে লুকিয়ে থাকতে ভালবাসে। বুড়ির মনে হয়েছে, পেটির মধ্যে সাপ ঢুকে বাসা বানাবে। ওর মরদের স্মৃতি সাপের বাসা হবে, ভেবেই হয়তো আকুল। দরজায় লাঠি নিয়ে বসে থাকে, পাহারা দেয়। সত্যি দেখছি নবমীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

    নবমী বোধহয় আর পারল না। সে দাঠাকুরের রাগ দেখেছে, দাঠাকুরকে ভয়ও পায়। দাঠাকুর মালসায় ভাত বেড়ে দেয়। তরকারি ভাজা সব। খাওয়া হলে ডোবার জল থেকে ধুয়ে রেখে যায়। ঘটি করে খাবার জল রেখে যায়। ভয় পেতেই পারে। সেই ভয় থেকেই যেন বলা, যেন দাঠাকুর রেগে গেলে রক্ষা থাকবে না, সবক’টা ইঁট ডোবার জলে ফেলে দেবে। বলবে, এবার হল। চল এবার!

    সে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে যা বলল, তার কিছু থেকে বুঝতে পারলাম, ওর মরদ ছিল লুটেরা। সেই কোন্ অতীতে পুলিশের তাড়া খেয়ে বাংলা মুলুকে চলে আসে। সেই কোন্ অতীতে নবমী নামে গাঁয়ের এক স্বাস্থ্যবর্তী তরুণীকে ভালবেসে ফেলে। তারপর থেকে পুরুলিয়ায় ইঁটের ভাটায় কাজ। নবমীর এক কথা ছিল, লুটেরার কাজ করলে জলে ডুবে মরবে। মানুষটা একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেল! এক রাতে চলে গেল কোথায়। হপ্তা পার করে ফিরল। কাঠের পেটি আর দুটো মুরগি সঙ্গে ফিরে এল। নবমী বলল, লুটেরার সব ইঁটের ভেতরে আছে গো বাবু। আমারে দিয়ে গেছে। আমি দাঠাকুরে দিয়ে যেতে চাই।

    আমাদের কারো মুখে রা নেই।

    পিলু বলল, ইট ক’খানায় কী আছে তোমার। ওতে আমার কোঠাবাড়ি হবে?

    —ভেঙে দেখেন না। কোঠাবাড়ি হবে না কেন দাঠাকুর!

    একটা ভাঙতেই আমাদের চক্ষু স্থির। সোনার একটি ছোট পিন্ড। পাঁচ-সাত ভরি ওজনের কম হবে না।

    পিলু কেমন ঘাবড়ে গেল, নবমী তুমি ডাকাতের বৌ ছিলে?

    —না দাঠাকুর। আমার কাছে মানুষটা সাচ্চা মানুষ। খেটে খেয়েছে। শেষ লুটের মাল বিচে খায়নি। বুলেছে, আমি না থাকলে, তুই বিচে খাবি। আমি খাইনি। পাহারা দিচ্ছি। বনজঙ্গল ছেইড়ে যেতে পারিনি।

    বাবা আমার মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছেন। পিলু আমি সবাই এই গভীর বনজঙ্গলের অন্ধকারে মানুষের আর এক মহিমা আবিষ্কার করে মুহ্যমান। ভালবাসলে ডাকাতও মানুষ হয়ে যায়। ভালবাসলে মেঘ হয়, বৃষ্টি হয়।

    বাবা কিছুটা যেন অস্বস্তি কাটিয়ে উঠেছেন। –তোমার মরদের পাপ দাঠাকুরের মাথায় চাপাতে চাইছ!

    —না, বাবাঠাকুর। সব পাপ তেনার। বাবাঠাকুর আপনার আলয়ে বিগ্রহ সেবা হইয়ে থাকে! তার সেবায় এসব লাগলে আমার মরেও শান্তি বাবাঠাকুর।

    নবমী বাবার ইতস্তত ভাব দেখে বলল, দাঠাকুর আমার জীবন্ত বিগ্রহ। তার সেবায় লাগুক সব পাপ আমার। সব পাপ লুটেরার। আপনি বাবাঠাকুর অন্যমত করবেন না গো।

    আমিই বাবাকে সাহস দিলাম, মানুষের সেবায় লাগলে দোষের কী!

    তবু বাবা যেন কিছু ঠিক করতে পারছেন না। আসলে আমার মা শেষ পর্যন্ত যদি রাজি না হয়। পাপের ধন ছুঁতে নেই। তবে বাবা জানেন, মা বৈষয়িক বুদ্ধি বেশি ধরেন।

    বললাম, সঙ্গে নিন। মা কী বলে দেখুন।

    বাবা যেন এতক্ষণে তাঁর সব সমস্যার সমাধান খুঁজে পেলেন। ধনবৌ কী বলে। বিষয় আশয় নিয়ে মাকে বাবা যখন কথা বলেন তখনই ধনবৌ এই সম্বোধনে ডাকেন।

    বিলু ইটগুলি ভেঙ্গে সাত আটটা স্বর্ণপিন্ডের পুঁটুলি বেঁধে ফেলেছে ততক্ষণে। সেও মা’র মতো বিষয় আশয়ে আমার কিংবা বাবার চেয়ে বেশি বুদ্ধি রাখে। সে তাড়া লাগাল, ওঠো, আমার হাত ধর।

    বাবা ছাগলের দড়িটা হাতে নিলেন।

    আমার হাতে হ্যারিকেন। আমি সবাইকে অন্ধকারে পথ দেখিয়ে নিচ্ছি। আমাদের দারিদ্র্য শেষ পর্যন্ত এভাবে দূর হবে স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি।

    বাবা বাড়ি ফিরে চুপি চুপি সব মাকে বললেন, দেখলাম মা যেন আকাশ থেকে পড়েছে।–বল কী। কৈ দেখি! দেখে বলল, এগুলি সোনা তো! এত এত! মা ঘাবড়ে গিয়ে বলল, পুলিশে ধরবে না।

    বাবা বলল, তাই তো।

    পিলু বলল, ধুস তুমি যে কী না মা।

    তারপরই বাবার মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল যেন। বলল, বিক্রি করে জমিজমা কিনে ফেলা ভাল। ঠাকুরের নামে সব জমিজমা কেনা হবে। পিলুকে, সেবাইত করে দিলে নবমীর আত্মা শান্তি পাবে। নবমী না হলে মরে গিয়েও শান্তি পাবে না। ওর জন্য না হয় আমরা কিছুটা পাপের ভাগী থাকলামই। সবাই স্বার্থপর হলে জীবন চলবে কেন?

    মা বলল, বিক্রিটা করবে কী করে। তোমার মতো লোক বেনের দোকানে নিয়ে গেলে সন্দেহ করবে না!

    পিলু বলল, কেন নিবারণ জ্যেঠা আছে।

    নিবারণ দাসের পাটের আড়ত আছে। বাবার যজমান। সব কাজ বাবার বুদ্ধি পরামর্শ নিয়ে করে। শুভ দিনক্ষণ সব। বাবার উপর নির্ভর করে ব্যবসায় বুঁদ হয়ে থাকে। নিবারণ দাসের জামাতারা এলেই বাবার কাছে আসে গড় হয়। বাবার আশীর্বাদ নেয়। নিবারণ দাস, কোনো কাজে কোথাও যাবার আগে বাবার পায়ের ধুলো নিয়ে যায়। যেন সব আপদ থেকে তবে সে রক্ষা পেয়ে যাবে। এ হেন মানুষটার নাম উঠতেই বাবা আমার স্বাভাবিক হয়ে গেলেন। বললেন, তাইতো। দাসমশাই থাকতে ভয় কি। দাসমশাই আমাকে ঠকাবে না। ঠকালে তার ঘরের লক্ষ্মী উধাও হবে ভাববেন।

    অবশ্য সে রাতে আমরা কেউ ঘুমোতে পারিনি। নবমীকে মা নতুন কোরা কাপড় দিল বের করে। পরদিন পিলু নবমীকে পুকুরঘাটে টেনে নিয়ে সাবান দিয়ে শরীর রগড়ে দিলে চিৎকার করতে থাকল, ও বাবাঠাকুর আমারে মেরে ফেলছে গো!

    পিলুর এক কথা, চট্টপ। কী করে রেখেছ শরীরটা। কী দুর্গন্ধ রে বাবা।

    বাবা বারান্দায় বসে তামাক সাজতে সাজতে বলেছিলেন, একদিনে তুই অত ময়লা সাফ করবি কী করে। আজ এই পর্যন্ত থাক। পিলু ভাল করে গা মুছিয়ে আর একটা কোরা কাপড় গায়ে পেঁচিয়ে বলল, একদম চিল্লাবে না। রান্না হলেই খেতে দেওয়া হবে।

    নবমীর আজকাল খাই খাই ভাব হয়েছে। পিলু এটা জানে বোঝে। মা নবমীর জন্য একখানা কালো পাথরের থালা বের করে দিল। পাথরের গ্লাস। বাবা তক্তপোষ বানিয়ে দিল। মশারি তোষক। ঘরে হ্যারিকেন জ্বালা থাকে রাতে। বাড়িতে আর দশটা জীবের যত্ন আত্তির মতো নবমীরও যত্ন আত্তি একটু বেশিই শুরু হল।

    বাবা নবমীর শিয়রে একখানা গীতা কিনে এনে রেখে দিলেন। দুদিন চন্ডীপাঠ করলেন নবমীর ঘরে। নবমী নিচে মেঝেয় হাত জোড় করে বসে থাকে। বাবা যখন বিগ্রহের পূজা শেষ করে বের হন, দেখতে পান নবমী লাঠি ঠুকে ঠুকে ঠাকুর ঘরের দরজার সামনে বসে আছে। বাবা চরণামৃত দিলে মাথায় ঠেকিয়ে ঠোঁটে এবং বাকিটা বুকে মেখে নেয়। আমি বিকেলে নবমীকে রামায়ণ পাঠ করে শোনাই। রামের বনবাস পড়লে বুড়ির দু’চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে আসে।

    একদিন মুকুল এসে হাজির। নবমীকে দেখে ভেবেছিলাম অবাক হবে। সে বলল, মেসোমশাইর কান্ড। আমি বললাম, না, পিলুর।

    এ-কথা সে-কথার পর মনে হল মুকুল আমার জন্য কোনো দুঃসংবাদ বয়ে এনেছে। সে বলতে ইতস্তত করছে। এ-কদিন বাবা আমাকে নবমীর কিছু কাজ হাতে তুলে দিয়েছেন। বলেছেন, এই বাড়িঘরে নবমী আছে। বড় একা। তোমার মা না পারেন, তুমি অন্তত তাকে কোনো ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে শুনিও। রামায়ণ মহাভারত ঘরেই ছিল। পরীকে ভুলে থাকার মতো একটা কাজ পাওয়া গেছে। নবমী তার জীবনের বিচিত্র ঘটনা বলতো, আমরা মন দিয়ে শুনতাম।

    নবমী বাড়িতে কিছুটা পিতামহীর ভূমিকা গ্রহণ করে ফেলল। সে যে কত সুন্দরী ছিল, কাপড় পেঁচিয়ে লাঠিতে ভর করে নেচে দেখাত। আমরা সবাই হাসতাম। সেই বীরপুরুষের কথা বলার সময় তার চোখ থেকে জল গড়াত। আসলে নবমীর যৌবনকাল থাকতেই মানুষটা ভেদবমি করে দু-দিনের মধ্যে চলে গেল। সেই অসহায় জীবনের কথা ভাবলে আমার কেন জানি বার বার লক্ষ্মীর কথা মনে হয়। পরীর কথা মনে হয়। যেন কতদিন পরীকে দেখি না। অপরূপার খবর রাখি না। সব বাবা নবমীকে বাড়িতে তুলে ভুলিয়ে রাখতে চাইছেন। বুঝলাম, মানুষ একসঙ্গে থাকলেই মায়া জন্মায়। নবমীর প্রতি আমাদের সবারই কেমন একটা টান জন্মে গেছে। আমি শহরে যাই না বলে মুকুল অনুযোগ করল প্রথম। তারপর বলল, কথা ছিল, বের হবে নাকি।

    মুকুলকে বললাম, আমার যেতে ইচ্ছে করছে না। আসলে শহরে গেলেই মন খারাপ হয়ে যাবে জানি। মন একবার খারাপ হলে সহজে তা কাটাতে পারি না।

    মুকুলের সঙ্গে সেদিন সারা সন্ধ্যা নদীর ধারে ঘুরে বেড়ালাম। অথচ মুকুল কী কথা বলতে ডেকে আনল বোঝা গেল না। পরীর কী কিছু হয়েছে। বললাম, অপরূপার লেখা প্রেসে গেছে? আসলে অপরূপা ছাড়া আমি পরীর প্রসঙ্গে আসতে সাহস পাই না। পরীর প্রতি আমার কোন দুর্বলতা নেই এটাই যেন সবাইকে বোঝাতে চাই। দুর্বলতা যদি কিছু থাকে তা পরীর। পরীর প্রতি আমার দুর্বলতা যে কত হাস্যকর বাবার ঘরবাড়িতে এলেই টের পাওয়া যায়। আমার দুর্বলতা টের পেলে যে আমাদের বাড়িঘরেরই অসম্মান, সেটা বুঝি। বামন হয়ে চাঁদ ধরার বাসনা। আহাম্মক আর কাকে বলে! আমার জন্য গোটা পরিবারের মর্যাদা নষ্ট হোক, আমি চাই না। পরীকে পরিহার করে চলার এটাও একটা বড় কারণ। পরীর জন্য মনটা আবার এত উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে উঠবে বুঝতে পারিনি। ভুলতে চেষ্টা করছি। মুকুলের সঙ্গে শহরে আসাটাই যে, আমার ঠিক হয়নি। পরী সম্পর্কে মুকুল কোনো কথাই বলল না। চৈতালী কলকাতায় চলে যাবে, কবে যাবে, কোথায় থাকবে সব খবর দিল- কিন্তু পরীর সম্পর্কে কোনো কথা নেই। কেবল ফেরার সময় মুকুল বলল, কলেজে মর্নিং ক্লাস হবে। তুমি বি-কমে ভর্তি হয়ে যাও। মেসোমশাইকে বলে এসেছি। তিনি রাজি।

    আমার পড়াশোনা নিয়ে জানতাম পরীরই মাথাব্যথা ছিল। এখন দেখছি মুকুলের মধ্যেও তা সংক্রামিত হয়েছে। বাবাকে বলে এসেছে। বাবা রাজি হতেই পারেন। সকালে কলেজ, দুপুরে স্কুল, সন্ধ্যায় অপরূপা মন্দ কী। নবমীর গুপ্তধনে কী হবে না হবে, নিবারণ দাস একদিন বাড়িতে এসে হিসাব করে গেছে। সবটা দিয়ে বিঘে ত্রিশেক ধানের জমি কেনা যেতে পারে। বাবা রাজি না। বাবার এক কথা, নবমী গতায়ু হলে তার কাজ, বৃষোৎসর্গ শ্রাদ্ধ করার বাসনা, বিগ্রহের জন্য ছোট্ট কোঠাঘর ঠিক হয়েছে, তারকপুরের মাঠে এক লপ্তে বিঘে দশেক ধানি জমি যদি পাওয়া যায়। বাবা নিবারণ দাসকে নিয়ে ঘোরাঘুরি করে শেষ পর্যন্ত এক লপ্তে না হোক, রাজার দেবোত্তর সম্পত্তি বিঘে দশেক পেয়ে গেছেন। দর দাম ঠিক করা, রেজিষ্ট্রি করা, নিয়ে বাবা ক’দিন ব্যস্ত থাকলেন। এই জমিতে মোটামুটি ভাত-কাপড়ের সুরাহা হয়ে যাবে, বাবার ধারণা। বড়টির কখন কী মর্জি বোঝা ভার। তাকে নিয়ে তিনি কম উদ্বেগের মধ্যে যে নেই, আড়ালে বাবার কথাবার্তা থেকে তা ধরতে পারি।

    বাবা নিবারণ দাসকে বলেছিলেন, দাসমশাই, আপনি আমি নিমিত্ত মাত্র। তাঁরই ইচ্ছে। জমিজমা সব তাঁর নামেই কেনা হবে। বড় বিপাকে পড়েছিলাম, আমি গতায়ু হলে গৃহদেবতার কী হবে! বড়টি তো এমনিতেই ঘোর নাস্তিক। মেজটি এখন একরকমের বড় হয়ে কী হবেন জানি না। ছোটটির অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে, শেষ পর্যন্ত ডালপালা মেলবে কিনা তাই সংশয়। আমার ব্রাহ্মণীর যা জেদ,—তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ কেউ করে সাধ্যি কী! কন্যার বিবাহ, কম দায় তো নয়। ঠাকুরের ভরসায় দেশ ছেড়েছি। এক সময় ভেবেছিলাম, জলে পড়ে যাব। ব্রাহ্মণীর চোপার ভয়ে কতবার নিজেই উধাও হয়েছি।—এখন দেখছি, বাপের দোষ পুত্রে বর্তেছে। ঠাকুরই সব করান, — এজন্য ভাবি না। একটাই ভয়, আমার পুত্র-কন্যার কাজে অন্যের মনে যেন আঘাত না লাগে।

    বাবার ভয়টা যে কী বুঝি। বাবা কী টের পেয়েছেন, পরীকে নিয়ে রায়বাহাদুর বিপাকে পড়েছেন। আমি যার হেতু! পরী এলে তো বাবা শুনেছি খুব খুশি হন। সারাক্ষণ মা মৃন্ময়ী বলতে অজ্ঞান। সেই পরী কী তবে বাবার মনে সংশয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। রায়বাহাদুরের নিজ থেকে আসা, আমাকে চাকরির লোভ দেখিয়ে দেশান্তরী করা,—আমি অবাঞ্ছিত, বাবা কী টের পেয়ে গেছেন!

    স্কুল থেকে ফিরে খেতে বসেছি, মা ভাতের থালা এগিয়ে দেবার সময় বলল, মৃন্ময়ীর দাদু গাড়ি পাঠিয়েছে।

    —গাড়ি?

    —হ্যাঁ, গাড়ি করে তোর বাবাকে নিয়ে গেল।

    মা’র মুখ ভারি প্রসন্ন। বাবা এক জীবনে বিনা টিকিটে আমাদের নিয়ে আস্তানার খোঁজে রেল- ভ্রমণে বের হত, সেই বাবাকে বাড়ি থেকে গাড়ি করে নিয়ে গেছে, ভাবাই যায় না। এ হেন বিস্ময় মা’র জীবনে কখনও ঘটবে মায়া ভাবতেই পারে না। মায়া লাফাতে লাফাতে কোত্থেকে ছুটে এল, জানিস বাবা না, পরীদিদের বাড়ি গেছে। পরীদির দাদু বাবাকে নিয়ে যাবার জন্য গাড়ি পাঠিয়েছে। পিলু স্কুল থেকে ফিরে খবরটা পেয়ে খুশি হল না। আমার ঘরে ঢুকে একবার চুরি করে আমাকে দেখল। তার দাদাটি এই খবর পেয়ে যে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়বে যেন তার জানাই ছিল।

    সে বলল, কীরে দাদা, প্যাঁচার মতো মুখ করে রেখেছিস কেন?

    সহসা চিৎকার করে উঠলাম, তোরা কী আমাকে শান্তিতে শুতেও দিবি না।

    পিলু বলল, না! তুই শুয়ে আছিস কেন?

    অবেলায় শুয়ে থাকাটা পিলুর পছন্দ না বুঝি। আমি গুম মেরে গেলে পিলু অস্থির হয়ে পড়ে। বাবার পরীদিদের বাড়ি যাওয়াটা যে ঠিক কাজ হয়নি, পিলু সেটা বোঝে।

    —জানিস দাদা, তারপর কাছে এসে ফিসফিস গলায় বলল, পরীদি এসেছিল। বাবাকে বলে গেছে তুই যেন মর্নিং কলেজে ভর্তি হয়ে যাস। নতুন ক্লাশ খুলেছে। বাবা দুঃখ করে বলেছেন, ওর কী মর্জি জানি না মা। কী যে ছাই ভস্ম ভাবে, খাতায় লেখে, মাথাটা না খারাপ হয়ে যায়। তার ওপর পড়াশোনা করলে, মাথা তো একটা,—এত ধরবে কেন? তবু তুমি যখন বলছ বলব।

    —আমি যে বলেছি, বলতে যাবেন না কিন্তু মেসোমশাই।

    —কী হবে বললে?

    —আমাকে ও দু চোখে দেখতে পারে না।

    —তা আচরণেই টের পাই। তুমি আমাদের বাড়িতে এলেই ক্ষেপে যায়। বল, বোঝাই কি করে, মানুষই মানুষের বাড়িতে আসে। শুধু মানুষ কেন, কীটপতঙ্গ পাখি সব মানুষের চারপাশে বড় হয়। তুমি কাউকেই উপেক্ষা করতে পার না।

    তখনই পরীদি কী ভেবে বলল, ঠিক আছে মেসোমশাই, ওকে আপনি বলতে যাবেন না। আমি দেখি কাউকে দিয়ে খবরটা দিতে পারি কিনা!

    তারপর থেমে পিলু কি যেন ভাবল। সে তার দাদার পাশে বসল। জামা খুলে দড়িতে ঝুলিয়ে রাখার সময় বলল, বাবা কেন গেল জানিস?

    –কী করে বলব।

    —মা, মা!

    —ও-ঘর থেকে চেঁচাচ্ছ কেন! তোমার ভাত নিয়ে কতক্ষণ বসে থাকব।

    নবমী খোনা গলায় তার ঘর থেকে বলছে, দা-ঠাকুর, খেয়ে নেন গো। সেই কখন চাট্টি মুখে দিয়ে গেছেন।

    পিলু বলল, নবমী আসায় বাড়িটা কেমন ভরে গেছে, নারে দাদা।

    পিলু আবার চিৎকার করছে, মা মা, পরীদির দাদু বাবাকে নিয়ে গেল কেন জান?

    রান্নাঘর থেকে মা বলল, কী করে জানব? তোমার বাবা জানে আর পরীর দাদু জানে।

    আমি ভীষণ অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেছি। কী করব কিছুই ঠিক করতে পারছি না। বাড়িতে থাকলে আরও যেন অস্থির হয়ে পড়ব। জামা গায়ে দিয়ে সাইকেল নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। এই উধাও হয়ে যাওয়ার মধ্যে এক গভীর আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। মাথার মধ্যে গিজগিজ করে পরীর ভালবাসার পোকা।

    পরী আমার সর্বনাশ / পরী আমার আকাশ বাতাস / গভীর রাতে নির্জনে একা হাঁটি / দেখি নক্ষত্র হয়ে সে আছে / মাথার উপরে / তার দিগন্ত প্রসারিত ডানার ঝাপটায় / ধুলো ওড়ে / ওড়ে কাঙ্গালের বসন / উলঙ্গ করে দেয় অজ্ঞাতে / —পরী আমার সর্বনাশ / জীবনে / বীজ-বপনে / বিসর্জনে।

    পরী আমার সর্বনাশ, বাড়ি এসে টের পাই।

    পিলু এসে বলল, দাদা রে ঘোর বিপদ।

    বললাম, কী হয়েছে?

    —বাবা শুয়ে পড়েছে।

    —কেন?

    —দুদিন উপবাস করবেন স্থির করেছেন।

    —উপবাস।

    —হ্যাঁ। সব জেনে গেছে। তুই পরীদিকে মেরেছিস।

    —কে বলল?

    —পরীদির দাদুর খুব অসুখ। বাবাকে ডেকে বলেছেন, শেষ জীবনে এত বড় অপমান বাড়ি বয়ে করে যাবে ভাবতে পারিনি বাঁড়ুজ্যে মশাই। আমার সব শেষ। আমার সব অহং ভেঙ্গে দিয়ে গেছে। আমার একমাত্র অবলম্বন নাতনিটাকে মেরেছে। তারপর থেকেই শয্যা নিয়েছি। আর বাঁচার আকাঙক্ষা নেই। আপনি ধার্মিক মানুষ। আপনাকে না বলতে পারলে আমার মরেও শান্তি নেই। আপনার ছেলের জন্য পরীকে ওর বাবার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এ-সব সাময়িক দুর্বলতা। দূরে গেলেই সেরে উঠবে।

    আমি শুনে যাচ্ছি। কথা বলছি না। হাত পা কাঁপছে।

    —জানিস দাদা, বাবার সে কী রুদ্রমূর্তি। আক্ষেপ, শেষে এই ছিল কপালে। নারী হল’গে শক্তিরূপিণী দেবী। সে-ই মানুষের শক্তির উৎস। যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা। তার গায়ে হাত! এ যে ধনবৌ মহাপাপ! এ-পাপের যে ক্ষমা নেই। আমি কী করব। এমন নিরপরাধ মেয়েটাকে বিলু চড় মেরেছে। এ-পাপের হাত থেকে তোমার ঘরবাড়ি রক্ষা পাবে কী করে। প্রায়শ্চিত্তের বিধান কী আছে জানি না। স্থির করেছি, দু-দিন উপবাস। স্থির করেছি দু-দিন অহোরাত্র চন্ডীপাঠ। তবে দেবী যদি প্রসন্না হন। তারপরই বাবা, মা মা বলে কেঁদে উঠলেন। আমার কোন্ পাপে বিলু এত বড় সর্বনাশ করল ধনবৌ।

    গোটা বাড়িটা নিঝুম। কারো ঘরে কেউ আলো জ্বেলে দেয় নি। নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া যায় কান পাতলে। মা, বাবার শিয়রে বসে আছে। মায়া ছোট ভাইটা বাবার পায়ের কাছে। নবমী ঠাকুর- ঘরের বারান্দায় মাদুর পেতে শুয়ে আছে। গরুগুলো গোয়ালে তোলা হয়নি। বাবা দেশভাগের দিনও এত ভেঙ্গে পড়েন নি। কেবল ভাবছি সকালে আমার এমন ভালমানুষ বাবাকে মুখ দেখাব কী করে। রাতে আমাকে ডেকে মা সাড়া পেল না। ঘরে ঢুকে বলল, ওঠ খাবি।

    —বাবা খাবে না?

    —তোর বাবার গোঁ তো জানিস।

    আমার চোখ আবার জলে ভেসে যাচ্ছে কেন? বললাম, মা আর কেউ বিশ্বাস না করুক, তুমি বিশ্বাস কর পরীকে আমি মারিনি। আমি সত্যি মারিনি মা। পরীকে আমি কোনদিনই মারতে পারি না। তারপর বললে যেন এমন শোনাত, পরীকে কষ্ট দিলে যে আমার কষ্ট তোমরা কেউ সেটা জান না।

    বাবাকে আর যেন কোনোদিন মুখ দেখাতে পারব না। আমি পরীদের বাড়িতে অবাঞ্ছিত। আজ নিজের বাড়িতেও। গভীর রাতে উঠে একটা চিরকুট লিখলাম, বাবা আপনার কু-পুত্রের মুখ দর্শন করে কষ্ট পান, সেটা আর চাই না। আমি চলে যাচ্ছি। ভাল হয়ে ফিরব। জানবেন, এটা আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। আপনার কোনো পাপ নেই বাবা। পিলুকে লিখলাম, দাদা ফিরবে বলে তুই স্টেশনে গিয়ে বসে থাকিস না। তোর দাদা একদিন না একদিন আবার ঠিক ফিরবে। মা বাবাকে দেখিস। তারপর পিলুকে লিখলাম, পরীকে বলিস, আমার জন্যে সে তার প্রিয় শহর ছেড়ে যেন চলে না যায়। আমিই চলে গেলাম। পরীকে বলিস সে চলে গেলে, কখনও যদি ফিরে আসি, শহরটাকে আমি আর ঠিক ঠিক চিনতে পারব না। শহরটাকে আগের মতো আর ভালবাসতে পারব না। ইতি তোর দাদা।

  • এক

    এক

    সকালে ঘুম থেকে উঠেই পিলুর বুক ধড়াস করে উঠল।

    দাদা বিছানায় নেই।

    বাড়িতে সবার আগে ওঠেন বাবা। ব্রাহ্ম মুহূর্তে তিনি ঘুম থেকে ওঠেন। অবশ্য পিলুর মনে হয় বাবার বোধ হয় শেষ রাতের দিকে বিছানায় পড়ে থাকতে কষ্ট হয়। রাত থাকতেই বাবা শুয়ে শুয়ে স্তোস্ত্র পাঠ করেন। বেশ জোরে। ভোর রাতের ঘুম কার না প্রিয়! সে যে এত ঘুমাতে পারে, তারও ঘুম কোনো কোনো দিন বাবার স্তোস্ত্র পাঠে ভেঙ্গে যায়। আর আশ্চর্য বাবার সেই স্তোস্ত্র পাঠ শুনতে শুনতে সে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। গীতার সব শ্লোক বাবার মুখস্থ। সে দু-একটা শ্লোকের অর্থও জেনে নিয়েছে। ঠিক জেনে নেওয়া নয়, যেন নানা কাজে কর্মে দাদাকে উপলক্ষ্য করে বলা—বুঝলে কেহ আত্মাকে আশ্চর্যবৎ মনে করে—কেহ বা আশ্চর্যবৎ বলিয়া আত্মাকে বর্ণনা করে, আবার কেহ আশ্চর্য বলিয়া শোনে। কিন্তু ইহার বিষয় শুনেও কেহ ইহাকে বোঝে না।

    দাদাটা তার দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে। বাবাও। কাল যা গেল! দাদার সেই আর্তনাদ সহসা বুকে বেজে উঠল, মা আর কেউ বিশ্বাস না করুক, তুমি বিশ্বাস কর পরীকে আমি মারিনি। মারতে পারি না।

    .

    সে দেখল দরজা খোলা। ক্যাচা বাঁশের বেড়ায় খোপ কাটা জানালা। বাবা পূজার ফুল তুলছেন। কাল বাবা দাদার অবিমৃষ্যকারিতায় ক্ষোভে রাতে অন্ন গ্রহণ করেননি। বাবা তাদের এরকমেরই। পুত্র- কন্যা কিংবা যে কেউ কোনো অশান্তির কারণ ঘটলে, বাবা সব সময় সংস্কৃত ঘেঁসা শব্দ ব্যবহার করেন। তার কাছে শুধু না, বাবার কাছে, পরীদির দাদামশাইয়ের কাছে দাদার উন্মাদের মতো আচরণ অবিমৃষ্যকারিতার সামিল মনে হয়েছিল।

    সেই দাদা বিছানায় নেই।

    রাতে মা এত সাদাসাধি করল দাদা কিছুতেই খেল না। দু’জন দু-ঘরে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে, কাউকে টলানো যায়নি।

    বাবার আক্ষেপ, শেষে এই ছিল কপালে! নারী হল গে শক্তিরূপিণী দেবী। সে-ই মানুষের শক্তির উৎস। যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেন সংস্থিতা। তার গায়ে হাত! মাকে ডেকে বলেছিলেন, এ-যে ধনবৌ মহাপাপ। এ পাপের কোনো ক্ষমা নেই। প্রায়শ্চিত্তের বিধান কী আছে জানি না, স্থির করেছি, দু-দিন উপবাস। স্থির করেছি দু-দিন অহোরাত্র চন্ডীপাঠ।

    বাবা এতে হয়তো বুঝেছিলেন দেবী প্রসন্না হবেন।

    বাবা গৃহ দেবতার ফুল তুলছেন। তাঁকে কিছুটা ক্লিষ্ট দেখাচ্ছে। পায়ে খড়ম। খটাখট শব্দ হচ্ছে- সে এ-সব দেখতে দেখতে সহসা ঘর থেকে ছুটে বের হয়ে গেল। ঘুম থেকে মা উঠেছে—কারণ সে দেখছে, পূজার বাসন নিয়ে পুকুর ঘাটে যাচ্ছে মা। নবমী বুড়ি ওঠেনি। তার দরজা বন্ধ।

    সকাল হয়নি ভাল করে।

    পিলু দৌড়ে গিয়ে মাকে বলল, দাদা কোথায়

    মা বলল, কেন, দাদা কোথায় আমি কী করে জানব। তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস কর! ঘরে নেই!

    —না না ঘরে নেই।

    মা কী ভাবল কে জানে, বাসন নামিয়ে নিজেই ছুটে এল। পিলু ততক্ষণে বাবার কাছে হাজির।

    —বাবা, দাদা বিছানায় নেই।

    —উঠে কোথাও গেছে।

    তা যেতেই পারে। চারপাশে এখনও কিছু জঙ্গল আছে-কিংবা দাদা যদি বাদশাহী সড়কে উঠে যায় ঘুরে বেড়াবার জন্য। কারণ কাল রাতে সে বুঝেছে দাদা ঘুমাতে পারছিল না। কেবল ছটফট করছে। বৃষ্টি হয়নি কিছুদিন। শরৎকাল এসে গেছে—মাঠে মাঠে ধানের চাষ। রোয়া ধান বড় হয়ে গেছে—এবং চারপাশে শরতের এক ছবি — যেমন শেফালি গাছটার নিচে সাদা ফুল, স্থলপদ্ম গাছে ফুলের কুঁড়ি, ফুটবে ফুটবে করছে—রাস্তার পাশে আমগাছগুলি ঘন সবুজ। ফড়িং উড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে। এক ঝাঁক প্রজাপতিও বাড়ির এধার ওধার জঙ্গলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল।

    পিলু ছুটে আবার তার ঘরে চলে এল। সে কী করবে ঠিক করতে পারছে না।

    একবার খালপাড়ে ছুটে যাচ্ছে, একবার পুলিশ ক্যাম্পের দিকে। আর ডাকছে, দাদারে!

    সকাল বেলায় এ-যে কী আতঙ্ক পিলু ভালই জানে। তার ক্ষোভ হচ্ছে বাবার উপর।

    কী দরকার ছিল পরীদির দাদুর কাছে যাওয়ার!

    ডাকলেই যেতে হবে। বড়লোকেদের সে দু চোখে দেখতে পারত না। তার বাবা গরীব। বাবা গরীব হলে বাড়ির আর সবাই গরীব থাকে। বাবাকে গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে গেছে। বোঝো এবার সমাদরের ঠ্যালা!

    —সাধন কাকা, দাদাকে দেখেছো। পিলু খুঁজছে।

    সাধন সরকার মিল থেকে ফিরছিল রাতের ডিউটি সেরে। যদি দাদা লাল সড়কের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায়। রাস্তায় দেখা হয়ে যেতে পারে।

    ইস তোর দাদা এত চাপা স্বভাবের। কাউকে কিছু না বলে আবার হাওয়া! সেই বছর তিন আগেও ঠিক একবার হাওয়া হয়ে গেছিল। বাড়িতে কেন যে মন বসছে না।

    কিন্তু কাল যা গেল—! বাবার যে কী দরকার ছিল বলার, এ-যে মহাপাপ ধনবৌ। এ পাপের কী প্রায়শ্চিত্তের বিধান আমার জানা নেই।

    আর বলি পরীদির দাদুই বা কী বাড়ির কলঙ্ক রটাতে আছে! পরীদি তো হজম করে গেছে।

    পিলু বাড়ি ফিরলে দেখল মায়া মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। এত সকালে, কে আর বলতে চায়, বিলুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

    মা বলল, কীরে পেলি?

    —না।

    —কোথায় গেল। বাবা, ঠাকুরঘরে ফুলের সাজি রেখে বের হয়ে কিছু বলতেই ক্ষিপ্ত হয়ে গেল মা। এ-বাড়িতে কেউ থাকবে না বলে দিলাম। কালকে তোমার নাটক করার কী দরকার ছিল। কই পরী তো এসেছিল, বিলুর খোঁজ নিতেই এসেছিল। মারলে, কেউ কাউকে খুঁজতে আসে। বল, চুপ করে থাকলে কেন। রায়বাহাদুর ডেকে বললেন, আর তুমি বিশ্বাস করে ফেললে। অহোরাত্র চন্ডীপাঠই সার তোমার বলে দিলাম।

    বাবা যেন কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন। কী ভেবে বললেন, দেখতো সাইকেলটা আছে কি না। পিলুর মনেই হয়নি, দাদা কোথাও বের হলে সাইকেল ছাড়া বের হয় না! দাদা আছে সাইকেল নেই তা যেমন তার বন্ধুরাও ভাবতে পারে না, বাড়িতেও এটা কেউ অনুমান করতে পারে না। পিলু দেখল সাইকেলটা ঠিকই আছে। ওর কেমন বুক ফেটে কান্না বের হয়ে আসছে। যেন এক্ষুনি বের হয়ে যাওয়া দরকার-লাইনের ধারে দেখে আসা—পরীদিকে দাদা এমনি এমনি মারতে পারে না।

    আর পরীদিও যত দূরেই থাক ঠিক চিনতে পারে, কে ডাকে! বিলুর ছোট ভাইটা। শ্যামলা রঙ, বিলুর মতো গায়ের রঙ পায়নি, তবু ভারি মিষ্টি মুখের ছেলেটি ডাকলে পরী থেমে পড়ত। বাড়ির কুশল নিত। চুপি চুপি বলত, আমি যে তোদের বাড়ি যাই, তোর দাদাকে কিন্তু বলিস না। কেমন লক্ষ্মী ছেলে!

    পিলু সাইকেলে চেপে বসতেই বাবা বললেন, কোথায় যাচ্ছ। রায়বাহাদুরের বাড়িতে খবর দিতে যেও না। দেখ না অপেক্ষা করে। অমন খারাপ কথা কিছু আমি বলিনি। আর আমি অমন কোনও পাপ করিনি, আমার ছেলে কিছু করে বসবে। আর একটু দেখে যাও।

    মন মানে!

    আজকাল শুধু দাদা না, সেও বাবার কথা অগ্রাহ্য করতে শিখেছে। সে সাইকেল চালিয়ে যত দ্রুত সম্ভব পঞ্চাননতলায় উঠে গেল। রেল বরাবর সে যাচ্ছে। কিন্তু সব স্বাভাবিক। দোকান পাট খুলতে শুরু করেছে। ভাবল এক ফাঁকে বোস্টাল জেলের পাশ দিয়ে শহরে ঢুকে যাবে কি না। পরীদিকে খবর দেবে কি না—কিন্তু বাড়ি ফিরে যদি দেখে দাদা হাজির, দাদা নিজেই হম্বিতম্বি হয়তো করছে— এ কীরে বাবা, এক দন্ড বাড়ি ছিলাম না, আর পিলু দক্ষযজ্ঞ বাধিয়ে দিয়েছে!

    তার ভয় দাদাকে এ-জায়গাটিতেই।

    সে নাকি তার দাদাকে নিয়ে বড় বেশি উচাটনে থাকে।

    দাদাই বলেছিল, একদিন, শোন পিলু।

    পিলু কাছে গেলে বলেছিল, তুই তোর দাদাটাকে কী ভাবিস বলত!

    —কী ভাবি—বারে, তুই আমাকে দাদা বাজে কথা বলবি না বলে দিলাম। খুব খারাপ হবে। আমি কী করেছি!

    —করিসনি। আমি বিলাসপুরে রেলে চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছি, কে বলেছে সবাইকে বলে বেড়াতে। যেখানে যাই এক কথা, কী ঠাকুর, তুমি রেলে চাকরি পেয়ছো! যাক, ঠাকুরমশাইয়ের এবার কষ্ট দূর হবে। কী বিলু, আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছ শুনলাম। রেলে চাকরি হয়েছে। ইস কত বড় কথা।

    আমাদের কলোনির ছেলে রেলে চাকরি পেয়েছে সোজা কথা!

    বিলুর তখন এক প্রশ্ন, কে বলল?

    —পিলু।

    —কে বলল!—তোমার পিতাঠাকুর।

    পিতাঠাকুরটিকে তো আর ধমক দেওয়া যায় না। বিলাসপুরে চলে যাচ্ছে, প্রথমে, এপ্রেন্টিস, পরে জুনিয়ার অফিসার রেলের—কলোনির একজন গরীব বামুনের কাছে এর চেয়ে আর কী বড় খবর থাকতে পারে।

    পিলু রেগে বলেছিল, শুধু আমাকে দুষছিস—বাবা যে মনসা পূজায় বেরিয়ে বাড়ি বাড়ি বলে এল—আসনে বসে ঘন্টা নাড়ার সঙ্গেই কথা শুরু, বুঝলে কালীপদ, বিলু তো রেলে চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছে। আসলে পিলু বুঝত এই বলে দাদা শুধু তাকে না বাবাকেও আভাসে জানিয়ে দিত—

    সে তার চাকরি নিয়ে, তার কৃতিত্ব নিয়ে এমন কী তার কবিতা লেখা নিয়েও কোনও বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না।

    দাদা বলেছিল, খুব মজা না, রেলে চাকরি নিয়ে চলে যাব, আর তুমি বাড়ির সব মজা একলা ভোগ করবে। পিলু ভেবে পায় না দাদা রেলের চাকরির নাম শুনলেই ক্ষেপে যেত কেন।

    এটা কী দাদার বনবাস।

    চাকরি নিয়েও দাদা বলেছে, বাবা, রায়বাহাদুর নিশ্চয় পারেন। জমিদারি গেছে ঠিক, তবু যা আছে, কংগ্রেসের জেলা সভাপতি— মিউনিসিপালিটির চেয়ারম্যান, ছেলেরা কৃতী। রেলে বড় ছেলে তাঁর বড় কাজ করে—কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হয় দেখুন! আসলে কী দাদা বাবাকে বলতে চেয়েছিল, পরীদির দাদুর এটা চাল-দাদাকে দূরে পাঠিয়ে দিলে পরীদি একা হয়ে যাবে কিংবা দাদা একা হয়ে যাবে। এটা কী দু’জনকে বিচ্ছিন্ন করে দেবার জন্য পরীদির দাদু বাবার উপর চাল চেলেছে। পিলু একদিন পরীদিকে বলতেই অবাক— কী বললি! বিলু বিলাসপুরে রেলে চাকরি নিচ্ছে! কৈ আমাকে তো ও কিছু বলেনি।

    পিলু পড়েছিল মহাফাঁপরে। পরীদির বাবার দৌলতে দাদার চাকরি। আর পরীদিই জানে না। সে কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিল।

    পরীদির এক কথা, গিয়ে দেখুক না তোর দাদা। কী ভেবেছে। পড়াশোনা বন্ধ করে বাবু চললেন চাকরি করতে।

    পিলু ঠিক বোঝে না, পরীদির দাদুর এই লুকোচুরি খেলা কেন! বাবাকেও বলেছে, দেখবেন যেন দু-কান না হয়। দু-কান হবে না, তা হলেই হয়েছে। আসলে পরীদির দাদু খরবটা গোপন রাখতে চাইছে নাতনির কাছ থেকে।

    দাদাও বোধ হয় গোপনে যাওয়া আসা করছিল—পরীদি আবার টের না পায়। কী যে হয়েছিল ঠিক জানে না। সে যেন কীভাবে একদিন শুনেছিল—মাকে বাবা বলছিলেন, বুঝলে এ-সব সাময়িক দুর্বলতা।

    সে যে কিছু বোঝে না তা নয়। আসলে এতবড় ঘরের মেয়ে পরীদি — ভীমরতি না হলে হয়?

    এমন কী দাদার প্রাইমারী স্কুলের চাকরি নিয়েও কম অশান্তি হয়নি পরীদির সঙ্গে দাদার।

    রাস্তার ধারে, আমগাছতলায় পরীদি ফুঁসছে।

    —কী বললে, প্রাইমারী স্কুলে? তোমার কী মান অপমান বোধ নেই। পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছ। ‘গরীব বলে কী উচ্চাশা থাকতে নেই।

    দাদারও জেদনা আর পড়ছি না। পড়াটা বিলাসিতা। হাতের কাছে এত বড় সুযোগ ছাড়তে রাজি না। আমার এর চেয়ে বেশি কিছু হবে না পরী। কেন মিছিমিছি জেদ করছ।

    —আর তো দুটো বছর।

    দাদা বলেছিল, তারপর কী হবে।

    —কিছু একটা হবেই।

    দাদাও কম যায় না। বলেছিল, হবে কচু। আমাদের এখন দু-বেলা খেয়ে পরে বেঁচে থাকা দরকার। তোমার স্বপ্ন থাকতে পারে—আমার কোনও স্বপ্ন নেই।

    খটাখটি শেষে এমন যে সে দেখেছে, পরীদি বাড়ি এলেই দাদা সাইকেলে বের হয়ে যেত। কোথায় যেত কে জানে। হয়তো মুকুলদার কাছে। ‘অপরূপা’ কাগজ নিয়ে দাদা মেতে আছে তখন। পরীদির কী আক্ষেপ, মাসিমা বিলু সত্যি আর পড়বে না! পড়া ছেড়ে দেবে।

    মা’রও কম আক্ষেপ নয়, কে বোঝায় বল। যেমন তোমার মেসোমশাই তেমনি তার পুত্র। আমরা সংসারে কে বল!

    পরীদি বাবাকেও অভিযোগ করেছিল, মেসোমশাই বিলু নাকি আর পড়বে না! প্রাইমারী স্কুলে মাস্টারি নিচ্ছে।

    —আগে পাক। কথা হচ্ছে। মুকুলের জামাইবাবুকে চেন! তিনিই চেষ্টা করছেন। হয়ে যাবে মনে হয়। ঠাকুরকে তো তুলসি দিচ্ছি রোজ। দরখাস্ত করেছে। রিফুজিদের জন্য কী নাকি স্পেশাল ক্যাডার হচ্ছে! তাতেই ঢুকিয়ে দেবে। ঠাকুরের কী ইচ্ছে তা জানব কী করে!

    —তাই বলে পড়া ছেড়ে দেবে! পরীদি কেমন হতবাক হয়ে গেছিল বাবার কথায়।

    বাবা বলেছিলেন, মানু তো বলল, বিলুর মেধা কম। বি-এ, এম-এ পড়ে কিছু হবে না। চাকরি পেলে যেন না ছাড়ে। দিনকাল বড় খারাপ।

    তবে পরীদিকে দাদা কেন যে মারল—এই রহস্যটা সে বুঝতে পারছে না।

    সাইকেলে লাইনের ধারে চক্কর মেরে বাড়ি ফিরে এল না অন্তত আর যাই করুক দাদা ক্ষোভে অভিমানে জীবন নাশ করেনি। বাড়িতে ফিরতেই সে দেখল, বাবা পঞ্জিকা খুঁজছেন।

    তা হলে কী দাদা ফিরে এসেছে। সব কেমন স্বাভাবিক। না হলে বাবা পঞ্জিকা খুঁজতে যাবেন কেন! মা কোথায়! সে ফিরে আসতেই বাবা বললেন, বিলু রাতের ট্রেনে কোথায় চলে গেছে। তোমাকে একটা চিঠি লিখে রেখে গেছে। বলেই তার দিকে বাবা একটা ভাঁজ করা কাগজ এগিয়ে দেবার সময় বললেন, যাক বাবুর যে দয়া করে এবারে কর্তব্যজ্ঞান বেড়েছে। সেবারে উধাও হলেন, ফিরে এলেন তিন মাস বাদে। এবারে কতদিন পর ফেরে দেখ।

    পিলু জানে বাবা তাদের এরকমেরই। সে তাড়াতাড়ি চিঠিটা হাত বাড়িয়ে নিতে গেলে বাবা বললেন, বয়সের দোষ। এ নিয়ে মন খারাপ করবে না। তোমার মা কান্নাকাটি করছিলেন, সুদামের বৌ তাকে নিয়ে গেছে। তোমার মা তো বোঝে না, ছেলে আর তার নেই। তার মায়া মমতা অন্য জায়গায় শেকড় চালাবার চেষ্টা করছে।

    সাইকেলটা তুলে রাখল পিলু। দাদা তাকে কী খবর দিয়ে গেল! বাবা কী চিঠি পড়েই জানতে পেরেছে! সে উঠোনে নেমে গেল। চিঠি লিখে রেখে গেছে দাদা। আর কাউকে না, শুধু তাকে। দাদার কথা ভেবে তার চোখ ছল ছল করছিল। সে চিঠিটা পড়তেও সাহস পাচ্ছিল না। যেন পড়লেই সে দাদার দুঃখটা টের পাবে—তারপর সবার সামনেই কেঁদে ফেলবে।

    সে জানে, বাবা এখন দাদার যাত্রার সময় নিয়ে ব্যস্ত। রাতের কোন সময়ে দাদা গেছে—যাত্রা শুভ, না নাস্তি এটুকু জানতে পারলেই বাবা নিশ্চিন্ত হবেন। এত বেশি নিশ্চিন্ত যে মনেই হবে না, বাড়ির বড় পুত্রটি নিখোঁজ। মেজ পুত্র লায়েক নয়—লায়েক হলে সেও যে নিখোঁজ হয়ে যাবে, কেউ ঘরে থাকে না। মানুষ অহরহ নিখোঁজ হচ্ছে, নিজের কাছ থেকেও। বাবার এ-সব আপ্তবাক্য তাদের জানা আছে বলে, পিলু ঘরে ঢুকে তক্তপোষে বসল। দাদা প্রথমে বাবাকে লিখেছে।

    ‘বাবা, আপনার কু-পুত্রের মুখ দর্শন করে কষ্ট পান, সেটা আর চাই না। আমি চলে যাচ্ছি। ভাল হয়ে ফিরব। জানবেন এটা আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। আপনার কোনো পাপ নেই বাবা।’

    তারপরই দাদা তাকে লিখেছে।

    ‘সকালে উঠেই চেঁচামেচি শুরু করিস না। দাদা নেই, দাদা কোথায়। তুই তো আমাকে নিয়ে জলে পড়ে গেছিস বুঝি। দাদা ফিরবে বলে তুই স্টেশনে গিয়েও বসে থাকিস না।’

    এটা ঠিক, সেবারে পিলু দাদা ফিরবে বলে সড়কে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। কখনও হেঁটে হেঁটে স্টেশনে। বাড়ি ফিরলে বাবা রেগে বলতেন, বড়টা নিখোঁজ তুমিও সারাদিন বাড়ির বাইরে। ভেবেছ কী! রোজ এমন বললে, সে একদিন কেঁদে ফেলেছিল, দাদা আসছে না কেন। কতদিন হয়ে গেল! তুমি যে বললে আসবে। সময় হলেই ফিরে আসবে। আমি রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি দাদা যদি ফেরে।

    তারপর দাদা লিখেছে—’তোর দাদা একদিন না একদিন ঠিক ফিরবে। মা-বাবাকে দেখিস। স্কুল কামাই করিস না। পরীর সঙ্গে দেখা হলে বলিস, আমার জন্য সে তার প্রিয় শহর ছেড়ে যেন চলে না যায়। আমিই চলে গেলাম।’

    —আবার পরী এসেছিল।

    বাবা দাদার ক্ষোভের কারণ বুঝতে পারতেন না। বিরক্ত হয়ে বলতেন, তোমার এত রাগ কেন বুঝি না। মৃন্ময়ী এলে ক্ষেপে যাও কেন বুঝি না।

    দাদা কী ভেবে যে বলত, জনসংযোগ করছে। পার্টির হয়ে জনসংযোগ! এস ডি ও সাবের গাড়িতে এসে নেমেছে। বাড়ির কুল, আচার খেয়ে কত ভাল মেয়ে দেখিয়েছে—তারপরই ক্ষিপ্ত হয়ে দাদা একদিন চিৎকার করে বলেছিল, আমরা কত গরীব দেখতে আসে আপনি বোঝেন না। পরী ভাল মেয়ে! এস ডি ও পরেশচন্দ্র নামিয়ে দিয়ে গেছে তা জানেন। আমাদের দারিদ্র্য দেখে সে মজা পায়।

    —তুমি কী বলছ বিশ্ব!

    বাবা ক্ষোভ থেকে কথা বললে, সেই সাধু বাক্য। বিলু তখন বিশ্ব হয়ে যায়।

    —আমি ঠিকই বলছি বাবা।

    পিলু চিঠিটা পড়তে গিয়ে শেষ করতে পারছে না। দাদার ভেতরে আগুন জ্বলছে। কে যে জ্বালিয়ে দিল। তার চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে। দাদা যেন এক বিন্দুও মিছে অভিযোগ করেনি। পরীদির দাদু রেলের চাকরির লোভ দেখিয়ে দু’জনকে আলাদা করে দিতে চেয়েছিল। কী ভাবে যে শেষে দাদার রেলের চাকরিটা ভেস্তে গেল সে জানে না। দাদাকে বিলাসপুরে শেষ পর্যন্ত কেন পাঠানো গেল না, তাও সে জানে না। তবে পরীদিকে বিলাসপুরে তার বাবার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বাবা অহোরাত্র চন্ডীপাঠের সঙ্গে মাকে এ-খবরটাও দিয়েছিলেন।

    কেন পরীদিকে বিলাসপুরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে টের পেয়ে দাদা নিজেই উধাও হয়ে গেল।

    দাদা লিখেছে, ‘আমিই চলে গেলাম। পরীকে বলিস সে চলে গেলে, কখনও যদি ফিরে আসি, শহরটাকে আমি আর ঠিক ঠিক চিনতে পারব না। শহরটাকে আগের মতো আর ভালবাসতে পারব না। ইতি তোর দাদা।’

    পিলু চিঠিটা ভাঁজ করে রাখল।

    কী করবে এখন কিছু বুঝতে পারছে না। পরীদিকে খবরটা দেওয়া দরকার।

    কারণ সব চেয়ে যেন দাদার খবর রাখার অধিকার পরীদিরই বেশি।

    আজ সে টের পেল, পরীদি দাদার ভবিষ্যত নিয়ে কেন এত বেশি উতলা ছিল। দাদা প্রাইমারী স্কুলের মাস্টারি নিলে কেন এত ক্ষেপে গিয়েছিল।

    সে চিঠিটা হারিয়ে না যায়, কারণ তার বাবা হয়তো বলবেন, কী পড়া হল! চিঠিটা দাও। রেখে দি। তারপর কোথায় রেখে দেবেন কে জানে। চিঠিটা পরীদিকে না দেখানো পর্যন্ত তার শান্তি হচ্ছে না।

    তখনই সে শুনতে পেল, বাবা বারান্দায় বসে কাকে যেন বলছেন, যাত্রা শুভ। অমঙ্গলের কোনো আশংকাই নেই।

    পিলু জানে, হয়ে গেল বাবার। রাতের ট্রেনেই গেছে—বাবার এমনই বদ্ধমুল ধারণা। বাড়ি ফিরে হাতে চিঠিটা পাবার পর মনে হয়েছে, দাদা কোথাও চলে গেছে—কিন্তু কখন গেছে, কোনদিকে গেছে, যেতে হলে সঙ্গে কিছু নিতে হয়, দাদা তা নিয়েছে কি না, টাকা পয়সা কার কাছ থেকে নিল— এসব অনেক প্রশ্ন তার মাথায় এল।

    সে বের হয়ে বড় ঘরের বারান্দায় উঠে গেল। বাবার সামনে রাজেন কর্মকার বসে। কোনো পূজাপাঠ থাকতে পারে। সকাল বেলায় বাবার কাজই হাত মুখ ধুয়ে পূজার ফুল তুলে, বারান্দার জলচৌকিতে বসে এক ছিলিম তামাক টানা, নয় পঞ্জিকা নিয়ে বসা। কী খাওয়া যাবে না যাবে তার এক প্রস্ত নির্দেশ রান্নঘরের প্রতি। কখনও মনে হয় পিলুর আসলে বাবার এটা দোকান সাজিয়ে বসা।

    জঙ্গল থেকে নবমী বুড়িকে বাড়ি তুলে আনার পর বাড়তি কিছু কাজ জমে গেছে তাঁর হাতে। ইটখোলায় ঘুরে এসেছেন-কিন্তু নিবারণ দাস বলেছে—আলের মাটি থেকে ভাল ইঁট হতে পারে। বাড়িতেই ইট পুড়িয়ে নিলে অর্ধেক দামে হয়ে যাবে। ইটের কারিগরদের সঙ্গেও কথা বলতে হয় সকালের দিকটায়। কাঠ কিনবেন, না নিজের লাগানো গাছ কেটে করবেন এই নিয়ে দ্বিধায় আছেন। শত হলেও হাতে করে গাছগুলিকে এত বড় করে তুলেছেন। এক একটা গাছ লেগে যেতেই কম সময় লাগেনি।

    কাটলে কোন কোন গাছ কাটা হবে এই নিয়ে মায়ের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করার সময় বলেছেন, মায়া হয় কাটতে। গাছের ঠিকমতো যৌবনই এল না, কেটে ফেলব। তবে গৃহ দেবতার পাকা মন্দির নির্মাণ—বুঝলে না ধনবৌ তার ইট কাটা হচ্ছে, তার জন্য কাঠ লাগে—আর যদি গাছগুলো ঠাকুরের কাজে লেগে যায়—সেও কম বড় সৌভাগ্য না!

    পিলু জানে, তার মা আর আগের মতো বাবাকে হেনস্থা করে না। সবই ভাগ্য। ভাগ্য যে এখন প্রসন্ন নবমী বুড়িকে তুলে আনায় মা এটা আরও বেশি টের পেয়েছেন। শেষ দিকটায় বুড়িকে সে বাড়ি থেকে দু-বেলা খাবারও দিয়ে আসত। সেই বুড়ি যে এত গুপ্তধনের মালিক, কে জানত! তা না হলে ঠাকুরের নামে এক লপ্তে এত ধানিজমিও কেনা যেত না। গৃহ দেবতার জন্য পাকা কোঠার কথাও ভাবা যেত না। পক্ষকালের মধ্যে তার দাদারও মাথায় আসত না প্রাইমারী ইস্কুলের চাকরি না করলেও বাবার ভালই চলে যাবে। বাবাকে আর দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে হবে না।

    এত সব ভেবেই হয়তো দাদা শেষ পর্যন্ত উধাও হয়ে গেল। কিংবা বাবার যে চোটপাট দাদার উপর তাও যেন সেই এক মনোবাসনা থেকে, ভেব না, তুমি না থাকলে আমাদের কোনো গতি নেই। তোমার এত আস্পর্ধা, তুমি শেষে মৃন্ময়ীর গায়ে হাত তুললে!

    বাবা দাদার সম্পর্কে এতটা নির্বিকার ভেবে তার খারাপ লাগছিল। বাবা রাজেন কর্মকারের সঙ্গে দুর্গাষ্টমী ব্রত নিয়ে কথা বলছেন। তালিকা করে দিচ্ছেন, কী কী লাগবে। এখন কিছু বললেই বাবার সেই এক কথা—ঈশ্বর নিয়ে কথা হচ্ছে। সারাটা দিন তো বাড়িই থাক না। তোমার সব জানার সময় এখন হল।

    সে মায়াকে খুঁজল। মায়াও বাড়ি নেই। সে বুঝতে পারল মায়া মা’র সঙ্গেই গেছে। নবমী বুড়ি লাঠি ভর দিয়ে এসে সামনে বসলে বাবা বললেন, ইষ্টনাম জপ করেছ তো। না ভুলে যাচ্ছ।

    —ভুল হইয়ে যাচ্ছে। বড় দাদাঠাকুর নাকি কোথায় চইলে গেছে!

    নবমী বুড়ি কানে কম শোনে। সকাল বেলায় উঠে তার কাজ লাঠি ভর দিয়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ানো। পাঁচ বিঘে জমির উপর এত সব গাছপালা যে নবমীর মাঝে মাঝে নাকি মনে হয় সে তার পূর্বেকার বনভূমিতে বসবাস করছে। বাবার নির্দেশেই নবমীকে সকালে হেঁটে বেড়াতে হয়। শত হলেও বাবাঠাকুরের বিধান — প্রকৃতির মধ্যে হেঁটে বেড়াও, বসে থেক না। বসে থাকলে শরীরে ঘুণ ধরে। যাতে শরীরে ঘুণ না ধরে তার জন্যই সে হাঁটে। কোনো গাছের নিচে বসে থাকে। পাখ-পাখালি দেখে।

    আবার হাঁটতে থাকে। কখনও বাঁশ ঝাড়ের ভিতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফেরে। সে ঘুম থেকে ওঠে সবার আগে। সে কী করে জানবে, এত বড় একটা দুঃসংবাদের কথা। কার কাছে শুনে ধেয়ে এসে যেই দেখেছে, বাবাঠাকুর বড়ই নিস্পৃহ-তখনই না বলে পারেনি, গেল কোথায় বড় দাদাঠাকুর।

    —গেছে কোথাও। সময় হলেই ফিরবে।

    পিলু আর পারল না। বলল, দাদা কোথায় গেছে তুমি জানো!

    বাবা খুবই গম্ভীর গলায় বললেন, আরবারে কোথায় গেছিল দাদা তোমারা জানতে!

    সে তবু বলল, তুমি যে বললে যাত্রা শুভ।

    —শুভই তো। পাঁজি তো তাই বলে।

    —দাদা কোনদিকে গেছে জানলে কী করে।

    বাবা এবার কী মনে করে উঠে দাঁড়ালেন। রাজেন কর্মকারের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার মা-র কোমরে ব্যথা, উঠতে বসতে কষ্ট। এটা নিয়ে যাও। বলে বাবা ঘর থেকে কলাপাতায় মোড়া কী বের করে এনে কর্মকারের হাতে দিলেন। ঘুনসিতে পরিয়ে দিতে বল। দুর্গাষ্টমীর শেষে যেন পরেন। নির্জলা উপবাসে থাকে যেন।

    বাবা এবার তার দিকে তাকিয়ে বললেন, দাদার এখন তোমার অশ্বমেধ যজ্ঞ শুরু। বুঝলে। এই যজ্ঞই মানুষকে সারাজীবন তাড়া করে। তিনি এখন ঘোড়ায় চড়ে ছুটছেন। রাজ্য জয়ে বের হয়েছেন। তাকে কে নিরস্ত্র করবে। বড় হলে সবারই শুরু হয়। শেষ হয়, তোমার বাবা, নয় এই নবমী বুড়িকে দিয়ে। বুঝলে কিছু!

    সে সত্যি কিছু বুঝতে পারছে না।

    দাদার ন’টি বিষয়ে পাশ কেন কথাটা উঠল পিলু তাও বোঝে। সে এবার পরীক্ষায় পাশ করলে ক্লাশ এইটে উঠবে। সেও আর ছোটটি নেই। সে বোঝে দাদার শেষ বিষয়ে পাশটার এখন কী পরিণতি। অন্তত বাবা তাকে কী অর্থে কথাটা বলতে চাইলেন সে বোঝে

    —তোমার দাদা আর শুধু তোমাদের নেই।

    ভাবতেই পিলুর মনটা দমে গেল।

    —আমরা তার কেউ না! আমাদের কষ্ট বুঝলি না! বাবা মা-র কষ্ট বুঝলি না! অভিমানে দেশান্তরী হলি। বাবা কী খারাপ কথা বলেছে বল। পরীদির দাদু আসলে ডেকে নিয়ে বলতে গেলে বাবাকে অপমানই করেছে। যে-বাবা পুত্র গৌরবে এতদিন এতটা দুঃখ কষ্ট সয়ে থিতু হলেন, সেই বাবাকে ডেকে পুত্রের অপমান গাইলে কোন বাবার মনে না লাগে তুই বল। তোর জন্য পরীদিকে শেষে বিলাসপুরে পাঠিয়ে দিতে হচ্ছে! বাবা এমন অভিযোগ শুনলে মাথা কী করে ঠিক রাখতে পারেন বল। ক্ষোভে না-হয় বলেছেনই।—তোমার জন্য শেষে অন্নপূর্ণাকে বনবাসে যেতে হচ্ছে? আর তাতেই তোর এত অপমান। চিঠি রেখে গেলি, পরীদি যেন শহর ছেড়ে না যায়। তুই নিজেই চলে যাচ্ছিস!

    পিলু বাবার দিকে তাকিয়ে আর কোনো কথা বলতে সাহস পেল না। সংসারের আর দশটা কাজে বাবা ক’দিন নিজেকে খুবই যে ব্যস্ত রাখবেন তাও সে বোঝে। আসলে পুত্রের এই নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টা তাঁকে ভিতরে যতই কষ্টে ফেলে দিক, উপরে তিনি সব সময় স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করবেন। সংসার ধর্ম বাবার কাছে এ-রকমেরই। কখন কী ঘটবে কেউ বলতে পারে না। আগে থেকেই তার জন্য প্রস্তুত থাকা ভাল। বাবার এই স্বভাবই তাঁকে যে কিছুটা নির্বিকার করে দেয় পিলু তা ভালই জানে।

  • দুই

    দুই

    দাদার সেই একটা বিষয়ে পাশ পিলুকে এখন কিঞ্চিৎ বিভ্রমে ফেলে দিয়েছে। তার চেয়েও বেশি বিভ্রমে ফেলে দিয়েছে, দাদা কোথায় যেতে পারে এমন কোনো নিশ্চিত ধারণা বাবার আছে—তা না হলে বাবা ধরে নিলেন কেন যাত্রা শুভ। সে নিজেও পঞ্জিকা দেখে থাকে আজকাল। ‘যাত্রা শুভ’ এই বাক্যটি কোন্ দিক নির্ণয় করছে—উত্তরে দক্ষিণে, না পুবে পশ্চিমে, অথবা নৈঋত কিংবা ঈশান কোণ—কারণ যাত্রা শুভ তো বড় একটা সব দিকে হয় না। তবে কী দাদা কোন দিকে গেছে বাবা মনে মনে ঠিক করে যাত্রা শুভ কথাটা বললেন!

    পিলু বলল, দাদা কোথায় গেছে তুমি জান!

    —কোথায় যাবে। কলকাতা ছাড়া আর কোথায় যাবে তোমার দাদা। কলকাতায় না গেলে তার নাকি কিচ্ছু হবে না। তোমার মাকে তো প্রায়ই বলত। গরীবের ঘোড়া রোগ। লেখাপড়ার পাট তুলে ইস্কুল আর আড্ডা। মুকুল বলে গেল একদিন, মর্নিং-এ বি কম ভর্তি হয়ে যাও বিলু। কলেজে নতুন কমার্স ক্লাস নাকি সরকার অনুমোদন করেছে। মাথা পাতল না। তোর মাও বলল। মিমি এসে বলে গেল, মাসিমা আপনি বলুন, যদি রাজি হয়।

    পিলু অবশ্য এতটা জানে না।

    তবে গরীবের ঘোড়া রোগটি কী সে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। রাত জেগে এক গাদা পাণ্ডুলিপি দেখত। পড়ত। পছন্দ হলে রাখত। না হলে অমনোনীত লিখে এক পাশে ফেলে রাখত। অপরূপা’য় সব গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, এমন কী এদিকটায় নিজেই ডামি তৈরি করত। এস ডি ও সাহেবের সঙ্গে জিপে কোথাও পরীদি যাচ্ছে দেখতে পেলেই আরও ক্ষেপে যেত। তখন নিজেই রাত জাগত, কেন জাগত কে জানে—টেবিলে বসে এক একটা লাইন লিখত আবার কেটে দিত। কেমন ছটফট করত ভিতরে।

    আসলে দাদার এই ঘোড়া রোগ কে ধরিয়েছে।

    কে বলেছিল কাগজ বের করতে!

    দাদা কেন যে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথা লিখত তার খাতায়। মাথা মুণ্ডু সে কিছুই বুঝত না। অথচ দাদার বন্ধুরা তাকে বাহবা দিত। পরীদি নাকি বলত, বিলু আমাদের গর্ব। সব এক ব্যাচের কবি। এক ডালের পাখি। দাদার ছাপা কবিতা পড়ে মাথামুণ্ডু সে কিছুই বুঝত না—অথচ এই নিয়ে অযথা সবার গর্ব প্রকাশই দাদার মাথাটাকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। দাদার এই নির্বাসনের জন্য কেন জানি এ-মুহূর্তে শুধু বাবাই দায়ী ভাবতে পারল না। দাদার বন্ধুরাও কম দায়ী নয়।

    সেদিন তো সুধীনদারা এসে জোর করেই দুটো কবিতা দাদার খাতা থেকে টুকে নিয়ে গেল। কলকাতায় যাচ্ছে সুধীনদা। এক ফাঁকে বড় বড় কাগজের অফিসে ঢুঁ মেরে আসবে বলেছে।

    দাদা কিছুতেই রাজি না।

    —ধুস তোমরা যে কী কর না! ও-সব কবিতা মফঃস্বল পত্রিকায় চলে। আমার তেমন কবিতাই নেই। লিখতেই পারি না।

    মুকুলদা দাদাকে অভিযোগ করেছিল, বিলু তুমি শামুকের মতো গুটিয়ে থাক কেন বলতো। সুধীনদাকে দিতে আপত্তি কেন!

    —না আমার দেবার মতো কিছু নেই।

    —বললেই হল। বলে জোর করে দাদার কবিতার খাতাটা কেড়ে নিল।

    তার দাদাটা কেমন কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে বলেছিল, কী যে তোমরা পাগলামি শুরু করলে বুঝি না। বলছি নেই। কলকাতার কাগজে দেবার মতো কোনো লেখা নেই।

    নিখিলদা দাদাকে জোরজার করে ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে গেছিল।

    পিলু একটা দুটো কথা থেকে বুঝতে পেরেছিল আসলে এটা পরীদিরই কাজ। পরীদিই সুধীনদাকে কলকাতায় পাঠিয়েছে। ‘অপরূপা’ কাগজের জন্য কিছু বিজ্ঞাপন, কারণ যারা বিজ্ঞাপনদাতা, তাদের কেউ কেউ পরীদির সম্ভবত আত্মীয় হয়। চিঠি লিখে সব ঠিকঠাক করে রেখেছে। শুধু একবার গিয়ে সই করে ব্লক আরও কী সব বোধহয় কোনো ছাড়পত্র—সে যাই হোক পিলু বুঝেছে দাদার এই স্বার্থপরতার জন্য তার বন্ধুরাও কম দায়ী নয়। পরীদি তো বটেই।

    দাদার শেষ বিষয়ে পাশটা কী তবে এই ঘোড়ায় চড়ে বসা! ভাবতেই পিলুর কবেকার সব দৃশ্য মাথায় পাক খেতে থাকে।

    বাবা পর পর প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন।

    —ফিরতে এত দেরি। কোথায় ছিলে।

    দাদা তবু রা করছে না।

    বাবা বললেন, আমরা সব দুশ্চিন্তায় ঘর বার করছি—তুমি ফিরছ না, চিন্তা হয় না। সেই কোন সকালে বের হয়ে গেছ। মানু কী বলল? রেজাল্ট আসেনি!

    —এসেছে।

    —তবে?

    —পাশ করতে পারিনি।

    বাবা কেমন সহজে গোটা ব্যাপারটা লঘু করে দিয়ে বলেছিলেন, তাতে কী রামায়ণ মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে। জীবনে সবাই পাশ করে।

    তারপর হেসে বাবা বলেছিলেন, কটা বিষয়ে পরীক্ষা দিয়েছিলে।

    শুধু এই একটি বাক্যেই পিলু যেন টের পেয়েছিল সেদিন বাবা তার কোন স্তরের মানুষ। পুত্রটির পরীক্ষাই তার কাছে বড়, কী পড়ছে না পড়ছে বাবার পক্ষে খোঁজখবর রাখাও সম্ভব না। টোলের পড়াশোনা একরকমের পুত্রটির পড়াশোনা আর একরকমের।

    দাদা বলেছিল, দশটা বিষয়।

    বাবা বলেছিলেন, কটাতে পাশ করেছ?

    দাদা কেঁদে ফেলেছিল বলতে গিয়ে, ন’টা বিষয়ে। আর বাবার তখন আশ্চর্য সরল হাসি। তার জন্য কান্না। জীবনে কে কবে সব বিষয়ে পাশ করে। যাও হাতমুখ ধুয়ে খেতে বস।

    এ-সব পুরানো স্মৃতি দাদা নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় বার বার মনে পড়ছে।

    তখনই পিলুর মনে হল, বাবা তাকে কিছু বলছেন, অথচ সে শুনতে পাচ্ছে না।

    বাবা মাঝে মাঝে নিস্তেজ গলায় কথা বলে থাকেন জলে পড়ে গেলে সাঁতার না জানলে যা হয়ে থাকে—বাবার চোখে মুখে সহসা কেমন ত্রাস ফুটে উঠতে দেখেছিল সে।

    সে বাবার কাছে গিয়ে বলল, কিছু বলছ!

    —চিঠিটা কোথায়!

    —আমার কাছে।

    —ওটা দাও।

    দাও বললেই, দেওয়া যায় না। সে বলতেও পারে না, ওটা আমার কাছে থাক।

    হঠাৎ বাবার কাছে দাদার চিঠিটা এত জরুরী কেন, সে তো এ-বাবাকে চেনে না! বাবা কী নিজে যাবেন, চিঠি হাতে রায়বাহাদুরের কাছে যাবেন। তাঁর পুত্র বিশ্বর হয়ে ক্ষমা চেয়ে আসবেন।

    বাবা চিঠিটা পড়েছেন কী! তিনি যে স্বভাবের মানুষ, তাতে তাঁর মেজ পুত্রকে সম্বোধন করে লেখা চিঠি, নাও পড়তে পারেন। বয়স হলে পুত্র কন্যাদের নিজস্ব জগত তৈরি হয় গোপন এক মহাবিশ্ব, বাবা যদি ভেবে থাকেন, সেখানে প্রবেশ করা তাঁর বয়সে অনুচিত, তিনি চিঠিটা না পড়েও দিয়ে দিতে পারেন।

    তবে না পড়লে চিঠিটা দেবার পর এতক্ষণ চুপচাপ থাকতে পারতেন না। নিশ্চয় কী লিখল জানতে চাইতেন। গোপন বিষয় ছাড়াও তো চিঠিতে কিছু লেখা থাকে—তার আশাতেই প্রশ্ন করতেন, কী লিখেছে তোমাকে। কিন্তু বাবা চিঠিটা তার হাতে দেবার পর একটাও প্রশ্ন করেন নি। দাদার চিঠি সম্পর্কে কিছু জানার আগ্রহ হবে না হয় না। তবু কী ভেবে পিলু বলল, তুমি পড়নি।

    —পড়ব না কেন! পড়েছি। আর একবার পড়ে দেখা দরকার। চিঠিটা কোথায় রাখলে!

    —আছে।

    পিলু জানে চিঠিটা বাবার কাছে ফেরত দিলে, ওটা আর সে নাও পেতে পারে। এমন কী চিঠিটা বাবা গোপনও করে ফেলতে পারেন। একজন অনুঢ়া যুবতীকে এর সঙ্গে জড়ানো হয়েছে। এটা বাবার মতো মানুষের পক্ষে কোনো অপযশের কারণ হতে পারে—কিংবা বড় পুত্রের পক্ষেও। তার জন্য রায়বাহাদুর নাতনিকে বিলাসপুরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এক ধরনের ঔদ্ধত্য প্রকাশ দাদার,এমন মনে করেও চিঠিটি তিনি গোপন করে ফেলতে পারেন। মুখে বলা, আর লিখিতভাবে থাকার মধ্যে যে আকাশপাতাল প্রভেদ এ মুহূর্তে পিলু তা টের পেয়েই বলল, দেখি—কোথায় যে রাখলাম!

    সে এবার তার ঘরে ঢুকে গেল। আসলে সে চিঠি খুঁজছে না। চিঠিটা তার পকেটেই আছে। দাদা কী নিয়ে গেল সঙ্গে! বোধহয় বাবা একবার নিজেই ঘরটায় ঢুকেছিলেন। মা, মায়া, এবং অন্য সবাই। সে দেখল, দাদার সুটকেসটা নেই। কিন্তু যদি কলকাতায় যায়—টাকা পয়সা কোথায় পাবে।

    মাইনে পেয়েতো দাদা সব টাকা মা’র হাতে তুলে দেয়। প্রথম মাইনে পাবার দিনটা তার মনে আছে। সকাল থেকেই সবাই খুব প্রসন্ন। দাদার প্রথম সরকারি উপার্জন। এর আগে দাদা দু-একটা টিউশন করে যা পেত, তাও তুলে দিত মা’র হাতে। দাদা স্কুল থেকে ফিরে আসছে না কেন, কারণ সেদিন কেন জানি মনে হয়েছিল, দাদার ফিরতে দেরি হচ্ছে।

    ঘুরে ফিরেই বার বার বাড়ি।—দাদা এল। আবার ঘুরে ফিরে বাড়ি—দাদা এল!

    বাবা বাড়ি ঢোকার মুখে জামগাছের নিচে দাদার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। বলেছিলেন—আসেনি। আসবে। এতো আর পূজার দক্ষিণা নয়, ঝনাৎ করে দু-পয়সা, বেশি হলে এক টাকা, আঁচলের খুঁট থেকে খুলে দেওয়া। কোনো সই সাবুদ নেই। সরকারের টাকা তো আর আঁচলের খুঁটে বাঁধা থাকে না, যে হাত পাতলেই পাবে। দেরি হতেই পারে।

    বাবার কাছে এবং গোটা পরিবারের পক্ষে এই সরকারি উপার্জনের প্রথম দিনটি ফলে উৎসবের মতো ছিল।

    দাদা ফিরে এলে, মা মায়াকে বলেছিল, জলচৌকিটা এগিয়ে দে। বাবা বারান্দার এক কোণায় ফুল তোলা আসনে বসে তামাক টানছিলেন। চোখ তুলে—এবং এত প্রসন্ন যে পুত্রের ফিরে আসা সম্পর্কে আদৌ তাঁর আগ্রহ আছে বোঝা গেল না। পিলু জানে তার খুবই দুঃস্বভাব। সে বাবা-মাকে এক দণ্ড সুস্থির হয়ে বসতে দেয় না। সে বাবাকে যেন কিছুটা ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেবার মতো বলেছিল, দাদা এসেছে। দাদা এসেছে।

    বাবা চোখ খুলে বলেছিলেন, চেঁচাচ্ছ কেন! দাদাকে একটু বিশ্রাম করতে দাও। কতদূর থেকে এসেছে। দুপুরের রোদ মাথায় করে এসেছে। ঠাণ্ডা হতে দাও।

    দাদার প্রাইমারী স্কুল, দু ক্রোশ দূরে। বনজঙ্গলে বসতি গড়ে তোলা একজন মানুষের পক্ষে সেটা যে আদৌ কোনো দূরত্ব নয় পিলু জানে। সাইকেলে যেতে কী আর সময় লাগে! আসলে দাদা তার কত বড় চাকরি করে কত তার গুরুত্ব বোঝাতে চেয়েছিলেন। সরকারি চাকরি সোজা কথা! আশি টাকা মাইনে সোজা কথা! পাঁচ মণ চালের দাম সোজা কথা!

    পিলু জানে বাবার কাছে টাকার দাম মণ প্রতি চালের কত দর তার হিসাবে। বাবা সারা মাসে যজন-যাজনে পান বেশি হলে দশ বারো সের চাল। সিকি, দু-আনি দক্ষিণা পেলে বাবা হতবাক। দু এক পয়সাই বরাদ্দ বেশি। যাঁরা সিকি দু-আনি দেয় তাঁরা বাবার কাছে বড়ই মূল্যবান, দেব দ্বিজে ভক্তি তাঁরা আছেন বলে আছে।

    অবশ্য তার বাবাটি দক্ষিণা কিংবা ভোজ্য গ্রাহ্য করেন না। পূজ, পূজাই। এক পয়সাও পূজা, এক আনারও পূজা। কিছু না দিলেও তিনি পুজা বিধিমতোই শেষ করেন। সবাই সমান দিতে পারবে কেন। তবু যে ধর্ম রক্ষা করছে দু-এক পয়সা দিয়ে, সেটাই বাবার কাছে বড়। মা’র এক কথা, সারাদিন না খেয়ে শেষে এই দু-মুষ্টি ভিক্ষা নিয়ে এলে। কার মুখে দেব বল! ওদেরই বা বলি কী আক্কেল। সব কিছুর দাম বাড়ে, ঠাকুরের বেলায় সেই এক পয়সা, দু-পয়সা।

    বাবার তখন বোধহয় ভিতরে পীড়ন শুরু হয়। ঠাকুর দেবতা তুষ্ট থাকলে সংসারে সুখ বাড়বে সেই আশায় তিনি পৈতৃক পেশায় লেগে আছেন। এর মধ্যে তাঁর যে ঈশ্বর উপাসনার তাগিদও আছে বাবার চোখ মুখ দেখলে পিলু টের পেত। মা’র অভিযোগের উত্তরে শুধু বলতেন, আঃ কী যে বলছ ধনবৌ!

    তখনই সে শুনতে পেল, কী পেলে! কোথায় রেখেছ। এতক্ষণ লাগে খুঁজতে!

    সেও জবাব দিল, পাচ্ছি না তো।

    —এই তো তোমাকে দিলাম।

    —তা তো জানি।

    —তোমরা সবাই দেখছি আলগা স্বভাবের হয়ে যাচ্ছ। চিঠিটার গুরুত্ব বোঝো। অন্য কারো হাতে পড়লে কী হবে জান!

    —কী আবার হবে। পিলু ঘরে বসেই আছে। চিঠিটা পরীদিকে না দেখিয়ে, দেওয়া ঠিক হবে না।

    সে পরীদিকে খবরটা না দেওয়া পর্যন্ত সুস্থির হয়ে বসতেও পারছে না। সে বাবাকে কিছুটা অন্যমনস্ক করে দেবার জন্য বলল, দাদা যে গেল, টাকা পয়সা পেল কোথায়। যেখানেই যাক থাকবে কোথায়, খাবে কী!

    —তোমার দাদা তা জানে। তা ভালই বোঝে। ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।

    -–ও তো মাইনে পেয়ে মা’র হাতেই এসে দিয়ে দেয়।

    —মাকে জিজ্ঞেস কর দিয়েছে কি না!

    অবশ্য সে জানে, মা’কে দাদা টাকা দিয়েছে কিনা, বাবা জানেন না হয় না। এ মাসের আজ তিন তারিখ। নিজের কাছে টাকা রাখার তো স্বভাব নয় দাদার।

    বাবাই বললেন, ভাগ্যিস তোমার মা বলেছিলেন, এখন রাখ, পরে নেব। হাতজোড়া দেখছ না! নিই কী করে! তোর মা পাটিসাপটা করবেন বলে চাল বাটছিলেন। ভুলে সেও দেয়নি, আর তোমার মায়েরও খেয়াল ছিল না। টাকাটা সে বোধহয় সঙ্গেই নিয়ে গেছে। এটাও বুঝবে, তাঁরই ইচ্ছে।

    —কী পেলে?

    ঘর থেকে পিলু কিছুতেই বের হচ্ছে না। এটা ফেলছে, ওটা টানছে। যেন বাবা টের পায় সে বসে নেই—খুঁজে দেখছে, ভুলে চিঠিটা কোথায় গুঁজে রেখেছে।

    —তোমাদের ঐ দোষ। চিঠিটা বাঁ-হাতে নিয়েছ। বাঁ-হাতে কোনো জিনিস কোথাও রাখলে মনে থাকে না। খুঁজে পাবে কী করে। কাণ্ডজ্ঞানের এত অভাব থাকলে চলে।

    আসলে পিলু এত ত্রাসের মধ্যে ছিল যে বাঁ-হাত না ডান-হাতে বাবার কাছ থেকে চিঠি নিয়েছে মনে করতে পারছে না। সাইকেলের হ্যাণ্ডেল ধরে ছিল—বাঁ-হাত হতেই পারে। তার ভুলও হয়নি। তবে তার হয়ে বাবাই যেন পথ বাতলে দিলেন। চিঠিটা না দিলেও চলবে—বাঁ-হাতে নিয়ে সে কোথায় রেখেছে কিছুতেই আজ আর মনে করতে পারবে না।

    তবে দাদা টাকা পয়সাও সঙ্গে নিয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে যতটা ত্রাসে পড়ে গেছিল, এখন আর ততটা ত্রাসের মধ্যে নেই। দাদা এবার না বলে কয়েও ফেরার হয়নি—টাকাপয়সাও সঙ্গে আছে— দুর্ভাবনা নেই। চিঠি রেখে গেছে। দাদা স্টেশনে গিয়ে বসে থাকতে বারণ করেছে।

    সে জামা প্যান্ট পাল্টে শহরে যাবে বলে সাইকেল বের করতে গেলেই বাবা বললেন, কোথায় যাচ্ছ? চিঠি খুঁজে পেলে না?

    —এসে খুঁজব। এবং বাবাকে আর বেশি কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সে বড় ঘর থেকে সাইকেল বের করে দ্রুত উধাও হবার সময় শুনল, বাবা ডাকছেন, কোথায় বের হলে!

    সে রাস্তায় পড়ে প্যাডেলে জোরে চাপ দেবার সময় হাত তুলে দিল—আসছি। সে দেখল না বাবা কতটা ক্ষুব্ধ। কিংবা তার যেন মনে হল, তাকালেই বাবা দৌড়ে এসে সাইকেলের ক্যারিয়ার টেনে ধরবেন। -কোথায় যাচ্ছ বলে যাবে না?

    দু’পাশে গাছপালা, নতুন বাড়িঘর, ছাগল গরু এবং রাস্তায় কুকুর বাঁচিয়ে মানুষকে বাঁচিয়ে পর্লকে ক্যাম্পের ভিতরে ঢুকে গেল। তারপর বড় সড়কে। প্রায় সে উড়ে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছে না পরীদির কথা চিঠিতে থাকায় কী এমন ত্রুটি হয়েছে। বাবা কেন ভাবছেন, এর মধ্যে একজন মেয়েকে জড়িয়ে দিয়ে বিশ্ব ঠিক কাজ করেনি।

    বাবার অসুবিধা সে বোঝে। তাঁর বড় যজমান নিবারণ দাস চিঠিটা দেখতে চাইতে পারে। কিংবা দেবীদারা খবর পেয়েই চলে আসবেন, অন্য প্রতিবেশীরাও। খবর ছড়িয়ে গেলে যা হয়। সকাল বেলাতেই বাড়িতে এক প্রস্থ হুলস্থূল গেছে। এবার ধীরে ধীরে আরও সব পরিচিত মানুষজন এসে দাদার খবর নেবে। বাবাই বলবেন, দাদা কলকাতায় গেছে। চিঠি রেখে গেছে। কেন যে এই মতিভ্রম ছেলের বুঝি না, তারপরই বাবা এখন যে নতুন আপ্তবাক্যটি বলে থাকেন, তাই হয়তো শেষে বলে মানসিক শান্তি পাবার চেষ্টা করবেন—কেহ আত্মাকে আশ্চর্যবৎ মনে করে, কেহ বা আশ্চর্যবৎ বলিয়া আত্মাকে বর্ণনা করে, আবার কেহ আশ্চর্য বলিয়া শোনে—কিন্তু ইহার বিষয় শুনেও কেহই ইহাকে বোঝে না।

    পিলু দাদাকে দেখে এটা হাড়ে হাড়ে টের পায়। সে কি দাদাকে ঠিক বোঝে না! কার উপর দাদার এত ক্ষোভ। চিঠি পড়ে বুঝেছে পরীদির উপর কোনো ক্ষোভ নেই, বাবার উপরেও না। দাদা সব দায় নিজের ঘাড়ে নিয়ে কেন যে ফেরার হয়ে গেল! দাদাকে এত দেখার পরও সত্যি সে তাকে বোঝে না।

  • তিন

    তিন

    ভোর রাতে মিমির মনে হল বেশ শীত শীত করছে। শীত করার জন্য ঘুম ভেঙেছে, না কোনো শব্দে, সে ঠিক বুঝতে পারছে না। ইদানীং তার রাতে ঘুম ভাল হয় না। মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায়— কেন যে দেখতে পায় সহসা কোনো দূরবর্তী পাহাড় শীর্ষে সে দাঁড়িয়ে আছে আর অদৃশ্য কোনো বেহালাবাদক সামনের মরুভূমি অতিক্রম করছে। মানুষটাকে দেখা যাচ্ছে না, আশ্চর্য সুরের ধ্বনি কানে আসছে। অথবা সে স্বপ্ন দেখে, একজন পরিব্রাজক এইমাত্র তার পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে। তার মুখে হিম ঠাণ্ডা বালির ঝাপ্‌টা এসে লাগছে। সে পথ চিনে যেতে পারছে না। যেদিকে দু-চোখ যায় শুধু মরু সদৃশ অঞ্চল। কোথাও গর্ত থেকে মুখ বার করে রেখেছে মরু শৃগাল। সে যেন হেঁটে যাচ্ছে পায়ের ছাপ অনুসরণ করে। ঝড় ঝাপটায় তার বসন ভূষণ আলগা হয়ে যাচ্ছে। সে বোঝে প্রকৃতি ক্রমেই তার শরীরের উপর থাবা বসাতে চায়। সে তখন মুখ দু-হাতে ঢেকে চিৎকার করে ওঠে।

    বিলু তাকে চড় মারার পর থেকেই কিছুটা যেন অনিদ্রার সে শিকার হয়েছে।

    এতদিন সে বিলুকে একরকমভাবে চিনেছিল—চড় মারার পর অন্যরকম ভাবে। সে কেন যে খেলাটা খেলতে গেল! সে তো বছর দুই তিন হয়ে গেল বিলুর সঙ্গে মিশছে। বোধহয় তার দিক থেকেই প্রবল আকর্ষণ ছিল। বিলু তো সব সময় তাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছে। বিলু কী তার অধিকারের কথা বুঝিয়ে দিয়ে গেল! সে আর কোনো হালকা চালে বিশ্বাসী নয়। বিলুর চোখে কী যেন আছে—না হলে তার এই মরণ কেন। সে কী করবে না করবে, সেটা তার মাথা ব্যথা। অথচ কেন যে বলা, না তোমাকে এটা সাজে না, ওটা কর না, কে মাথার দিব্যি দিয়েছিল এ-সব বলার জন্য! পরেশবাবুকে ডেকে না আনলেই পারত। সে শুনেছে—বিলুর রেলে চাকরি হচ্ছে। অথচ বিলু নিজে বলেনি-এমন কী দাদু পর্যন্ত গোপন করে গেছিলেন। কেন যে মাথায় আগুন ধরে গেছিল, দ্যাখ তবে। সে জানে পরেশবাবুর সঙ্গে আবার হেসে খেলে আড্ডা দিলে, তার গাড়িতে ঘুরতে বের হলে দাদুর মাথার ক্যাড়া নেমে যাবে।

    মিমি উঠে বসল।

    তার হাই উঠছে। সে আলো জ্বালাল। বাথরুম পেয়েছে। বাথরুমে ঢুকে চোখে মুখে জলও দিল।

    তারপর আর শুতে ইচ্ছা করল না। দরজা খুলে দোতলার বারান্দায় এসে সোফায় গা এলিয়ে দিল। ঝাড় লণ্ঠনের নিচে সে অন্ধকারে বসে আছে। কাল পার্টির সেমিনার আছে লালগোলাতে। তার যাওয়া দরকার। কিন্তু বাড়িতে যে-ভাবে অশান্তি শুরু হয়েছে তাতে যাওয়া কঠিন। দাদু তাঁর ঘর থেকেই বার হচ্ছেন না। মেশোমশাইকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন না কি। সে পার্টি অফিস থেকে রাতে ফিরে ঠাকুর চাকরের মুখে খবরটা পেয়েছিল।

    দাদু নাকি কান্নাকাটি পর্যন্ত করেছে।

    সে বোঝে দাদুর দুঃখটা কোথায়। তিনি শহরের প্রভাবশালী মানুষ। সারাদিন সাক্ষাৎপ্রার্থীদের ভিড়। দিন রাত লোকজনের অপেক্ষা। গাড়ি শহরে বের হলে লোকজন সম্ভ্রমে সরে দাঁড়ায়। তাঁর পক্ষে বাড়ি বয়ে এত বড় অপমান সহ্য করা কঠিন। আধা সামন্ততান্ত্রিক, আধা সাম্রাজ্যবাদী এবং বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থাই এ জন্য দায়ী সে এটা বোঝে। এও বোঝে বিলু বোকার মতো কাজটা করে ফেলেছে। সে নিজেকেও এর জন্য কম দায়ী মনে করে না। তবু কোথায় যেন এক আশ্চর্য নাড়ীর টান থেকে গেছে এই প্রাসাদের ইট কাঠে। সে ইচ্ছে করলে পার্টি করতে পারে—জনসভায় বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ভাষণ দিতে পারে, এমন কী পার্টির তরফ থেকে পথ-নাটিকায়ও অংশ নিতে পারে— তবু বের হয়ে কোনো উদ্বাস্তু যুবকের সঙ্গে সে হাত ধরে হেঁটে যেতে পারে না। অদৃশ্য নিষেধ বুঝি আঁকা ছবির মতো ফুটে ওঠে দেয়ালে।

    আসলে সে ভাল নেই।

    বাবাকে বিলাসপুরে ট্রাঙ্ককল করা হয়েছিল। দাদু কী বলেছেন, সে জানে না। মেসোমশাইকে কী অভিযোগ করেছেন তাও সে জানে না। বাবা মা ভাই বোনেরা চলে এসেছে।

    কেন যে কালীবাড়িতে নতুন মাস্টারকে দেখতে গিয়ে এই ফ্যাসাদ। দেখা না হলে, কিংবা লক্ষ্মী যদি তাদের নতুন মাস্টারের ভীতু স্বভাবের কথা না বলত, তবে কে বিলু, কে পিলু কিংবা ‘অপরূপা’ কাগজ নিয়ে তার মাথাব্যথা থাকত না। বিলুর মধ্যে কবিতার গুণ—এ-সব কত কিছু ছাইপাঁশ তার যে মনে আসছে—সে এ-সব ভেবেই আজকাল বিষণ্ণ হয়ে যায়। তার কিছু ভাল লাগে না।

    দাদু তার স্বাধীনতায় কখনও হস্তক্ষেপ করেন না। সে যে-ভাবে বাঁচতে চায়, বাঁচতে পারে— এত দিন এমনই মনে হত। কিন্তু দাদুর অসুস্থতা তাকে ভাবিয়ে তুলেছে। এ ছাড়া বিলুকে এ-ভাবে আগুনের মধ্যে সেই যেন ইচ্ছে করে ফেলে দিয়েছে। বিলুর রেলের চাকরি এক দণ্ডে বানচাল করে দিল। মাত্র ক’দিনের ছলনাতেই দাদু কাবু হয়ে গেছিলেন। সে বুঝেছিল, দাদু তাকে বিশ্বাস করেছে। সেজেগুজে পরেশচন্দ্রের সঙ্গে বের হয়ে সে যে অভিনয় করেছিল, দাদু বিশ্বাসই করতে পারতেন না। বিলুও বিশ্বাস করতে পারল না, তার চাকরিটা ভণ্ডুল করে দিতে হলে এ-ছাড়া তার অন্য উপায়ও ছিল না।

    বিলুকে দেশ ছাড়া করায় দাদুর এই চক্রান্ত মাথা পেতে নিতে পারেনি। একজন তার অভিনয়ে ঠকেছে।

    অন্যজন তাকে বিশ্বাস করে ঠকেছে। ভেবেছে, আসলে সে পরেশের। তার মতো গরীব বাবার পুত্রের পক্ষে দুর্লভ।

    বাড়ির সামনে বাগান। বাহারি সব বিদেশী ফুলের গাছ—সাদা কাকাতুয়া দাঁড়ে টাঙানো। ছবির মতো সব কিছু। সকাল হবার মুখে। আকাশ পরিষ্কার। কিছু নক্ষত্র চোখে পড়ছে। বাগানের এক কোণায় বড় একটা শেফালি গাছ—নিচে সাদা ফুল সারা রাত ধরে ঝরেছে।

    শরতের ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। কী আকাশে, কী লতাপাতায় কিংবা গাছপালার মধ্যে। এত দুশ্চিন্তার মধ্যেও ঋতুটির বোধহয় বৈরাগ্য আছে যে জন্য মিমি বিশাল কাঠের কারুকাজ করা চামড়ার নরম গদিতে মাথা এলিয়ে দিতে পেরেছে। দাদু তাকে ডেকেছিলেন, পিসি ছোটকাকা ছিলেন পাশে। ন’ কাকীমা, ছোট কাকীমাও তাকে বুঝিয়েছেন। মাথা গরম করিস না মিমি। বাবা তোর কাছে কথা চাইছে। তুই কথা দে।

    তার বাবা মা ঘৃণায় তার সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলেননি।

    মিমি জানে কথা দিলেই, দাদু এ-যাত্রায় হয়তো ভাল হয়ে উঠবেন। এ বয়সে কতটা মানসিক উদ্বেগ থেকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন সে বোঝে। যেন বিলু বাড়ির ঐতিহ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।

    সে ন’ কাকীমাকে বলেছিল, কেন যে তোমাদের ছেলেমানুষী বুঝি না! এখনই কী বিয়ে করব। পড়াশোনা শেষ করতে দাও।

    —পড়াশোনার বন্ধের কথা উঠছে কেন বুঝি না। অবুঝ হবে না। দেখছ তো বাড়িটার কী হাল হয়েছে!

    দাদুর যদি কিছু হয়!

    কিছু হলে সবাই তাকে দায়ী করবে।

    এই শরীর এত মহার্ঘ—তার রূপ আছে এবং সে জানে হেঁটে গেলে, সব মানুষ যেন চঞ্চল হয়ে পড়ে। সে তার লাল রঙের সাইকেলে চক্কর মারার সময়ও টের পায়—মানুষজন তাকে দেখছে। শহরের সর্বত্র তার অবাধ যাতায়াত। রোজ একবার সকালে কিংবা বিকেলে সে পার্টি অফিসে গিয়ে বসবেই—নানা বর্ণের পোস্টার সে লিখতে ভালবাসে। ছবি আঁকতে ভালবাসে। মানুষের শক্ত হাত মুষ্টিবদ্ধ উপরে তোলা—সে যা স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে এই সব ছবিতে তা সে ধরে রাখতে চায়।

    অথচ বিলুটা কী যে ছেলেমানুষী করে বসল। সে জানে বিলুর আর কিছুদিন পাত্তা পাওয়া যাবে না। চোরের মতো তাকে এড়িয়ে চলবে। দেখা হয়ে গেলে কথাও বলবে না। তাকেই গিয়ে বলতে হবে, কই এ সংখ্যায় তোমার কবিতা নেই কেন। কিংবা বিলুকে স্বাভাবিক করে তোলার দায়ও তার।

    অথচ পরেশচন্দ্র তাকে ছাড়বে না। হবু কবি তিনিও একজন। সে জানে কবিতা লেখার এই অপচেষ্টা সে কাগজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বলেই। পরেশচন্দ্র যেন তার দাসানুদাস। সে কেন যে তাকে ঠিক একজন পুরুষের মতো ভাবতে পারে না। বিলুর তেজ কিংবা অহঙ্কারের ছিটেফোঁটা তার মধ্যে নেই। ইস যদি সামান্য বিলুর স্বভাব পেত তবে তার পক্ষে কথা দেওয়া বোধহয় কষ্ট হত না। কিছুটা বেলেল্লাপনাই মনে হয় অথবা একটা অভুক্ত কুকুরের মতো তার পেছনে লেগে আছে। ভাবলেই কেন যে ওক উঠে আসে।

    সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তানেরা একটু বেশি বোধহয় গো-বেচারা হয়ে থাকে। পরেশচন্দ্রের যো হুকুমের তালিকায় নাম উঠে যেতেই সে তার প্রতি বিন্দুমাত্র আকর্ষণ বোধ করে না।

    সে যে কী করে!

    সাময়িক দুর্বলতা হতে পারে—তবে এ-মুহূর্তে তার কাছে এটাই বড় সত্য। বিলু যা স্বভাবের তাকে নিয়ে কতদূর যাওয়া যাবে সে এখনও ঠিক জানে না। আজ আবার তাকে ডাকা হবে সে জানে। আজ বোধ হয়, বাবাও থাকবেন। সে তার বাবাকে সমীহ করে। বাবাকে এড়িয়ে চলারও স্বভাব গড়ে উঠেছে সেই শৈশব থেকে। বাড়িতে তার কাকা কাকীমারাই বেশি আপন। মাকে সে নিজের কেউ ভাবতেই পারে না। দেখলেও মনে হবে না মা-মেয়েতে কোনো সম্পর্ক আছে।

    এটা কী কোনো প্রতিক্রিয়া কিংবা অভিমান থেকে! তার পিঠাপিঠি ভাই বোনেরা যেন মা-বাবার কাছ থেকে তাকে অবাঞ্ছিত করে রেখেছে। শৈশবের কোনো অদৃশ্য অনাগ্রহ তাকে এ-ভাবে কী শেষে বাইরে টেনে নিয়ে গেল! এ-সব কী কোনো ক্ষোভ থেকে। কিংবা সে এ-পরিবারে দাদু ছাড়া আর কাউকে কী সে ভাবে ভালবাসে না!

    সে তার মধ্যে এতদিন ধরে আশ্চর্য এক তাজা প্রাণের সাড়া পেত। সে এক দণ্ড তার ঘরে বসে থাকতে পারত না। সে গড়ে উঠছিল নিজের মতো। ঝড় উঠে গেল কবে সে নিজেও যেন জানে না।

    সে তো রওনা হয়েছিল অনুকূল বাতাসে। এমন দুর্বিপাকে তাকে পড়ে যেতে হবে কে জানত।

    বাবার হুকুম হয়ে গেছে, বাড়ির বার হবে না।

    হুকুম, মিটিং মিছিল বন্ধ।

    হুকুম, পরিবারের মান সম্মান নষ্ট করার কোনো অধিকার তোমার নেই।

    হুকুম, যদি মনে কর পরিবারের চেয়ে তোমার ইচ্ছের দাম বেশি তবে সম্পর্ক ত্যাগ করতে পার। আমরা কিছু বলব না।

    তখনই এত কেন বুকে হাহাকার বাজে।

    জন্ম জন্মান্তরের এক অনড় প্রস্তরের নিচে তাকে যেন পিষে ফেলার ষড়যন্ত্র হচ্ছে।

    সে আগের মতো আর কী নেই। তার মধ্যেও কেমন এক অর্থহীন জীবন বেঁচে থাকা গড্ডালিকা প্রবাহ ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। সুধীনদা ফোন করলে বলেছে, যা ভাল বোঝো কর।

    সুধীনদার প্রশ্ন, তোর শরীর ভাল নেই।

    —কেন বলত!

    —কেমন ধরা গলায় কথা বলছিস!

    সে কী কথা বললেই ধরা পড়ে যায়। সবাই কী তবে রহস্য টের পেয়ে গেছে। বিলু যে বাড়ি বয়ে এসে তাকে অপমান করে গেছে, সবাই কী জেনে গেছে! জানতেই পারে। পিলুর যা স্বভাব, সে তো বিলুর বন্ধুদের বাড়ি চেনে। সে বলতেও পারে সব। তবে তাকে কেউ বিলু সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করেনি। বিলুর সঙ্গে কী হয়েছে জানতে চায়নি।

    সে কেন যে হু হু করে কেঁদে ফেলল। আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে দিয়েছে। সকালের রদ্দুর বারান্দায়, কেউ দেখলে ভাবতেই পারে মিমি আঁচলে মুখ আড়াল করে ঘুমিয়ে আছে হয়তো। তখনই যেন কে বারান্দায় ঢুকে বলল, তোমার চা মিমিদি।

    মিমি সে অবস্থাতেই বলল, রেখে যাও।

    সে জানে মোহনদা চা রেখে চলে যাবে। এদিকের বারান্দাটা তার একান্ত নিজস্ব। তার ঘরের লাগোয়া। তার ঘরের দরজা দিয়েই এই বিশাল বারান্দায় ঢুকতে হয়। ঘরটা সে নিজের পছন্দমতো বেছে নিয়েছে। ঠিক অন্দরেও না, আবার সদরেও না। নিচের তলাটা একটা পুরো হলঘর। হলঘর পার হয়ে দাদুর বিশাল বসার ঘর। হলঘরে মাঝে মাঝে দাদুর সঙ্গে জেলার কংগ্রেস নেতাদের বৈঠক হয়। তখন সারা রাত্রি বাড়িটা গম গম করে। এঁরা সব মফঃস্বল শহর থেকে আসেন। কাঁদি, জিয়াগঞ্জ, জঙ্গিপুর, এমন কী আরও দূরবর্তী গ্রাম দেশ থেকেও। জেলা কমিটি গঠন নিয়ে, নির্বাচন নিয়ে কথা হয়। দাদুর পরামর্শমতো কোন অঞ্চল থেকে কে প্রার্থী হবে ঠিক করা হয়। যদিও কংগ্রেসের আলাদা অফিস আছে। হাজারদি ব্যাঙ্কের পুরো দোতলাটাই অফিস। নিজস্ব মুখপত্র আছে। তাতে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচীর সঙ্গে জেলার মানুষের অন্নকষ্টের কথাও থাকে।

    আর তার ঘরে সামান্য একটা তক্তপোষ ছাড়া তেমন কিছু নেই। টেবিল চেয়ার আছে—র‍্যাক আছে। কিছু বই, কলেজের এবং মার্ক্স-এর উপর। লেনিনের ছবি ছাড়া ঘরে কোনো ছবিও টাঙানো নেই। দাদু বলতেন, সন্ন্যাসিনী দেখছি দিন দিন আরও বেশি গোঁড়া হয়ে উঠছেন। ঘরে আর সামান্য আসবাবপত্র রাখলে লেনিন সাহেব নিশ্চয়ই রাগ করবেন না।

    মিমি বলত, ঘরে একদম জঞ্জাল বাড়াবে না। বেশ আছে। তোমার ঘরে ঢুকে তো বলি না, এটা নেই কেন, ওটা নেই কেন। আমার চলে যায়।

    দাদু প্রথম দিকে খুব রগড় করতেন—লেনিন সাহেবের যাদুটা কী বলত! তোমার মতো চৌকস রামণীকে হাত করে ফেলল। সারা জীবন এত পিছু পিছু ঘুরলাম, এ বুড়োটার ছবি দুরে থাক, তার কথাও দিনে একবার মনে হয় না তোমার!

    তার টাঙানো ফটো নিয়ে দাদুর পরিহাসে সে যোগ দিতে পারত না। কেবল বলত, ঠিক আছে যাও। আমার কাজ আছে। সে তার পাঠ্য বইয়ে নিমগ্ন হবার ভান করত। নোট নিত কাগজে। সে মেধাবী ছাত্রী, দাদুর এই এক অহঙ্কার আছে। রেজাল্ট বের হলে, দাদু হাঁ হয়ে যায়। এক কথা দাদুর- সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়াস পড়িস কখন! দারুণ রেজাল্ট দেখছি। কী যে বালকের মতো খুশিতে একে ওকে ফোন করা শুরু হয়ে যায় তখন।

    সে আয়নায় দেখেছে ক’দিনেই চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে।

    সে অবাক হয়ে ভাবে এত বড় অপমানই বা সে হজম করে গেল কী করে। বিলুর কী এ-ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না ক্ষোভ প্রকাশের। বাড়াবাড়ি করে ফেলল। তাহলে তুমি এই! ঠোটের কোণে সামান্য হাসি ঝলসে উঠল মিমির।

    সে ভাবল—না, মোকাবেলা যখন করতেই হবে, তখন তাকে স্বাভাবিক থাকতে হবে। সে চা খেয়ে ডাকল, মোহনদা, আমার চানের জল দিতে বল।

    তার নিজস্ব বাথরুমে এখনও জলের বন্দোবস্ত হয়নি। তার যাতে অসুবিধা না হয়, ইদানীং বাথরুমটা তার জন্য করা হয়েছে। তবে জলের লাইন এখনও আসেনি। ড্রামে জল ভর্তি থাকে। কুমুদ তার নিজস্ব কাজের মেয়ে। তবে কাচাকাচির কাজ সে নিজেই করে থাকে। নিচ থেকে জল টানতে কষ্ট হয় বলে কুমুদ জল টেনে দেয়। তার এটা খারাপ লাগে। অন্দরের বাথরুম এত দূরে যে সেখান থেকে জল টেনে আনার চেয়ে নিচ থেকে জল টেনে আনা ঢের সুবিধা।

    কুমুদকে এ-কাজটা করতে হচ্ছে তার অমতে। কোনো কারণে হাত পা খোঁড়া হলে, জল টানতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যেতেই পারে—দাদুর গোয়ার্তুমি—তুমি দিদি আমার কথা শুনছ না, এবং দাদু বোধহয় যতটা দ্রুত সম্ভব করে দেবেন বলেই—কটা দিনের জন্য কুমুদ জল তুলে দিক এমন সম্মতি নিয়েছিল তাঁর কাছ থেকে।

    দাদুর এক কথা, তোর এত জেদ কেন বলত দিদি। তুই কী আমাদের বৈভব সহ্য করতে পারিস না।

    মিমি বলত, পচে গেছে সব। এ-ভাবে হয় না। বাড়ির ভিতরটা ছিমছাম, টবে গোলাপ গাছ,— আর রাস্তায় বের হলে মরা কুকুর বেড়ালের পচা গন্ধ— কাঁচা ড্রেনের গন্ধ খারাপ লাগে না দাদু তোমাদের!

    —এ-জন্য কে দায়ী। আমি!

    —এই সমাজ ব্যবস্থা

    দাদু কিঞ্চিত রূঢ় গলায় বলতেন, কোনো সমাজ ব্যবস্থাই আমাদের সহ্য হবে না। নিজেরা যতদিন না ঠিক হচ্ছি। আমরা কাজ করি না, কাজ করলে তার পেছনে লাগি। এমন আত্মকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থা হাজার বছরের পরাধীনতার জের।

    বড় বড় কথা বলে দাদুকে ক্ষেপিয়ে দিতে সে ভারি মজা পায়। পরে দাদু গট গট করে নেমে গেলে সে জানালার পাশে এসে ফিক করে হেসে ফেলে। বুড়ো সারাদিন সবার সঙ্গে মেজাজ নিয়ে কথা বলবে। দু-দিন হয়তো তার সঙ্গে কথাই বলবে না। স্রোতের বিরুদ্ধে সে গা ভাসিয়ে দিয়েছে বলে দাদুর কম অনুতাপ না-আবার মনে হয়, রক্তের তেজ মরে এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। দাদু হাসতে হাসতে বলবেন, এই যে গোমড়ামুখী, দ্যাখ কী সাজে সেজেছি।

    দাদু তার বড় পরিপাটি স্বভাবের। সিল্ক না হয় মটকার পাঞ্জাবি, পাজামা পাটভাঙ্গা এবং কাঁধে চাদর—চিরদিন এই পোষাকেই দেখে এসেছে। মিহি খদ্দরের ধুতিও পরেন মাঝে মাঝে। জেলার কুটির শিল্পের সমজদার কত তিনি, পোষাকেই বুঝিয়ে দেন। কালীবাড়ির বাবাঠাকুর তাঁর জীবন্ত বিগ্রহ। দেয়াল জোড়া অয়েল পেন্টিং, বিলু বাবাঠাকুরের কাছে একসময় মানুষ—এ-জন্য বিলুর অবাধ যাতায়াতে কোনো অসুবিধা হয়নি—তবে তার সঙ্গে বিলুর সম্পর্ক টের পেয়ে দাদুর চক্রান্তের কথা মনে হলে মাথা গরম হয়ে যায়। দাদুর উপর ঘৃণায় মুখ কুঁচকে যায়।

    দাদু তুমি এত ছোট কাজ করতে পারলে!

    বাবার সঙ্গে পরামর্শ করে বিলুকে রেলে চাকরি দেবে বলেছ। তাকে দরখাস্ত করতে বলেছ। সার্টিফিকেটের নকল এটেস্ট করে দেবে বলে তাকে ঘুরিয়েছ। জানি চাকরিটা তার হতই—কিন্তু পরিণামের কথা ভাবলে না। সাদাসিধে ছেলেটাকে চাকরি দিয়ে বিদেয় করতে চেয়েছিলে। সে তোমাদের পরিবারে এত অবাঞ্ছিত। তোমরা মনে কর আমি কিছু বুঝি না। এবং এইসব চিন্তাভাবনাই তাকে কেন যে মাঝে মাঝে পরিবারের প্রতি তিক্ত করে তুলছে।

    কুমুদ এসে বলল, মিমিদি, ভিতরে যান।

    তার বুক ধড়াস করে উঠল। পরিবারের সবাই এক দিকে। কেউ তার পক্ষ নিয়ে কথা বলবে না। সবাই ভাবছে মাথা খারাপ। বিলুর সঙ্গে সম্পর্ক না রাখলেই হল! কিন্তু তাই বলে বিয়েতে মত দিতে হবে—তার বিয়ে এত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সবার কাছে। তাও পরেশচন্দ্র—মিমির শরীর কেমন শক্ত হয়ে গেল। সে ঝড়ের বেগে ঢুকে কী বলতে গিয়ে দেখল সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে- তাকে কী স্বাভাবিক দেখাচ্ছে না। তার পোষাক কী অবিন্যস্ত। সে নিজেকে দেখে চোখ ফেরাতেই অবাক— দাদুর ঘরে কাকে টেনে নিয়ে আসা হচ্ছে!

    প্রায় হেঁচড়ে টেনে আনা হচ্ছে।

    সে ছাড়া পেতে চাইছে। কেবল বলছে, আমি কী করেছি! আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কেন! ইস লাগছে! তারপরই সে চিৎকার করে উঠেছিল, মিমিদি, দেখ আমাকে কী করছে! আমাকে নাকি বেঁধে রাখা হবে। আমি ঢুকেছি কেন। না বলে কয়ে ঢুকে পড়েছি কেন!

    মিমির চোখে আগুন জ্বলছে। সেদিনও বিলুর খবর নিতে এসে পিলু ভারি বিপদে পড়ে গেছিল। দাদা ফেরেনি, সকালে তার দাদুর সঙ্গে দেখা করে ফিরে যাবার কথা। ফেরেনি। মা বাবা চিন্তা করছে। সে কতদূর থেকে হেঁটে এসেছিল। আসতেই কুমুদ, মন্মথ, মোহনদারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পরী ধীরে ধীরে নেমে গিয়ে বলেছিল, ছেড়ে দাও। ছাড় বলছি। সব চাকর বাকরেরা সোজা হয়ে গেছিল। সে পিলুকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছে। সরবত, মিষ্টি সাজিয়ে দিয়ে বলেছে, খা। তোর দাদা ফিরবে। ভাবিস না। পিলুটা কী মানুষ না, সেদিন এ-ভাবে জব্দ হবার পর আবার এসেছে! এরা তো তার দাদাকে নাগাল না পেয়ে ভাইটির উপর শোধ নিতে চাইছে। বাবার হুকুম জারি, আমার মেয়ের গায়ে হাত! আমি কখনও ক্ষমা করব! কুকুর দিয়ে খাওয়াব। চাবকাব। বাবা কেমন উন্মাদের মতো চিৎকার করছিলেন। বড়বাবুর হুকুম তালিম করতেই এ-কাজ। কিন্তু পিলুর আসার এত কী জরুরী হয়ে পড়ল!

    সে ছুটে গেল!

    পিলুকে ছিনিয়ে নিয়ে আড়াল করে দাঁড়াল।

    —একদম গায়ে হাত দেবে না।

    পরিবারের সবাই থ। পরীর এই রুদ্রমূর্তি তারা যেন জীবনেও দেখেনি। দাদুর কাতর কথাবার্তা, কাকাদের কাতর অনুনয় কিছুই মিমির কানে যাচ্ছে না। সে ফুঁসছে। হঠাৎ সে উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল, রামবিলাস, রামবিলাস। তারপর নিজেই ঝড়ের বেগে করিডোর ধরে ছুটতে থাকলে, পিলু এক দণ্ড দেরি করল না। পরীদির পিছু পিছু সেও পালাতে গেলে মিমি কেমন হুঁস ফিরে পেল। সরল এক বালকের প্রভাবে পড়ে গেল। সে এটা কী করতে যাচ্ছিল! পিলুই যেন সম্বিত ফিরিয়ে এনেছে। -পরীদি এত ছুটছে কেন। পড়ে যাবে। পিলু জানে না, সে আজ এসপার ওসপার করতে চেয়েছিল। পিলুর জন্য পারল না।

    পিলু দেখছে, মিমিদি হঠাৎ সিঁড়ির মুখে ধপাস করে বসে পড়ল। মিমিদি হাঁপাচ্ছে। সে পেছনে তাকিয়ে দেখল, বাড়ির লোকজন কিছুটা ছুটে এসে থেমে গেছে। এমন কী রায়বাহাদুর দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন। মনেই হচ্ছে না তিনি অসুস্থ।

    সে ডাকল, এই পরীদি। ছুটছিলে কেন! কী হয়েছে। আমি চলে যাচ্ছি।

    কারণ পিলুকে নিয়েই বাড়িতে বড় রকমের তাণ্ডব ঘটতে যাচ্ছিল। পরীদি যে-ভাবে ছুটে যাচ্ছিল, তাতে কিছু একটা করে বসাও বিচিত্র নয়। তাকে হেনস্থা করতে দেখেই পরীদি আগুন হয়ে জ্বলছিল। আগুন নিভে গেলে যেমন চারপাশে ছাই পড়ে থাকে— কিংবা বিধ্বস্ত কোনো দৃশ্য—এ মুহূর্তে যেন বাড়িটার সেই চেহারা হয়েছে।

    হঠাৎ পরীদি উঠে তার দিকে ছুটে এল। তারপর চুলের মুঠি ধরে পাগলের মতো ঝাঁকাতে থাকল, তুই এলি কেন মরতে। তোরা আমাকে আর কত অপমান করবি। বল, বল কেন এলি! লজ্জা হয় না, কীরে কথা বলছিস না কেন, লজ্জা হয় না, আবার যে এলি! তোকে সেদিন তাড়া করল, তবু তবু কেন এলি! কেন এলি। বলেই পিলুকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

    মানুষের কী যে থাকে। পিলুর সঙ্গে যেন পরীর জন্ম-জন্মান্তরের সম্পর্ক। নিজের ভাই বোনদের প্রতি তার কোনো টান নেই। তারা ছুটি-ছাটায় এলে দিদিকে এড়িয়ে চলে। পিলু যে কখন সেই মায়া- মমতার জায়গা বেদখল করে ফেলেছে পরী বোধহয় নিজেও জানত না। অথবা আজন্ম এই বৈভবের মধ্যে বাস করে, মানুষের অসহায় জীবন তাকে তাড়া করে থাকতে পারে। পিলু, বিলুর এক কালের প্রচণ্ড দারিদ্র্য হয়তো পরীকে টেনেছে।

    সে যাই হোক, পিলু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, আমার কী দোষ! দাদা আবার কোথায় চলে গেছে। তোমাকে কী সব লিখে গেছে।

    পরীদি যেন আর কাউকে পরোয়া করে না। সারা বাড়ির প্রতি কেমন ঘৃণায় মুখ চোখ শক্ত করে রেখেছে। পরীদি ইচ্ছে করলে যে সব করতে পারে তাও তার কেন জানি বিশ্বাস করতে কষ্ট হল না। তার দিকে অপলক তাকিয়ে বলছে, তোর দাদা কোথায় গেছে! বলে যায়নি।

    —না। বলে গেলে ছুটে আসব কেন। এই দেখ না চিঠি।

    পরীদি কাছে থাকলে সে আর কাউকে ডরায় না। অথচ আগে মনে আছে সে বাবার চাষ করা আনাজ শহরের বাজারে বেচতে এলে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকত। কী বিশাল বড় বড় থামওলা বাড়ি। কত বড় উঠোন। দোতলার জানালায় কাঠের কারুকাজ করা ঝালর। সব চেয়ে তার অবাক লাগত বাড়িটার শেষ মহলের পাশে কি বিশাল ফুল ফলের বাগিচা। একটা বিশাল সাদা পাখি দাঁড়ে ঝাপটাচ্ছে। সাদা রঙের পাখিটাকে সে কতদিন অবাক হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখত। পরীদির মতো সুন্দর মেয়েটা এ-বাড়ির সে চিন্তাই করতে পারত না।

    পরীদির মুখ কালো হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে বলল, আয় ভাই। কিছু মনে করিস না। আমার মাথা ঠিক নেই। তোর পরীদি মরে গেলে তোর কষ্ট হত ভেবেই, আর কিছু করতে সাহস পেলাম না। আসলে সে যে নিচের মহলে যাচ্ছিল, দাদুর চাবুকটা এনে সবাইকে এলোপাথাড়ি চাবকাতে চেয়েছিল— সব ভুলে গেছে। তার মধ্যে কী করে যে সহসা আত্মহননের ইচ্ছে জেগেছিল কেন এমন হয়, চাবুক আনতে যাচ্ছিল, না সিঁড়ি ধরে ছাদে উঠে যেতে চেয়েছিল—কিছুই মনে করতে পারছে না।

    কে কী বলছে, কী দেখছে তার প্রতি পরীদির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কেমন কিছুটা জড়তায় ভুগছে পরীদি। পিলু চিঠিটা বের করতে গেলে বলল, আমার ঘরে চল। পরিবারের সবাই দেখছে মিমি পিলুকে নিয়ে তার ঘরে ঢুকে যাচ্ছে।

    বিশাল করিডোর লম্বা, কতদূর যেন চলে গেছে! এতবার এসেও, নিচের ঠাকুর দালানের কোণটায় কী আছে জানে না পিলু। কিংবা নিচের ঘরগুলিতে কারা থাকে জানে না। কিছুটা পরিত্যক্ত বলেই মনে হয় ঘরগুলি। প্রায় সময় দেখেছে দরজা বন্ধ। জ্বালালি কবুতরের ওড়াউড়ি। কেউ একটা ঢিল পর্যন্ত মারতে সাহস পায় না। সকালে একবার এসে দেখেছিল, উঠোনে ছোলা মটর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, কবুতরগুলো জড় হয়ে খাচ্ছে। মানুষজন পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও ভয় পাচ্ছে না।

    মনে হয় কবুতরগুলো সব পোষা। সকালবেলায় দু’জন কাজের লোক বালতি বালতি জল এনে উঠোন বারান্দা ধুয়ে দিচ্ছে। কারণ হেগে মুতে সব নোংরা করে রাখার স্বভাব। এত জ্বালায়, তবু এ-সব কবুতর এ-বাড়ির কোনো শুভবার্তা বহন করে থাকে দেখলে এমনই মনে হয়। যেন এদের দেখভাল করার জন্যও বাড়িতে আলাদা কাজের লোক রাখা আছে।

    পিলু অনুসরণ করছে।

    সে কখনও বাড়ির এত ভিতরে ঢুকতে সাহস পায়নি। এক একটা ঘর পার হয়ে বারান্দা —লাল রঙের মেঝে, আয়নার মতো চক চক করছে। তার পায়ের ছাপ পড়ছে। ধুলো বালি মাখা পা। মুহূর্তে সারা বাড়িটা সে নোংরা করে ফেলেছে। তার নিজেরই সংকোচ হচ্ছিল। পরীদি ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। বারান্দার শেষ মাথায় সবাই এখনও দাঁড়িয়ে আছে। যেন বাড়ির মিমি, মৃণ্ময়ী সত্যি তাদের কেউ হয় না। তার তো ভয় ভিতরে। বার বার পেছন ফিরে দেখছে আর গুটি গুটি এগুচ্ছে। পারলে এক লাফে সিঁড়ি ধরে নেমে পালাত।

    নিচে সাইকেল। সাইকেলে উঠে বসলে কে আর নাগাল পায়। কিন্তু চিঠিটা সব মাটি করেছে। পরীদিকে চিঠিটা না দেখিয়ে গেলেও সে শান্তি পাচ্ছে না। তা-ছাড়া দৌড়ে পালাতে গেলেও সে শান্তি পাচ্ছে না। তা ছাড়া দৌড়ে পালাতে গেলেও পারবে না। এত মসৃণ মেঝে যে সে ভয়ে পা টিপে টিপে হাঁটছে। একটু অন্যমনস্ক হলেই যেন আছাড় খাবে— কিংবা পড়ে গিয়ে তার হাত পা ভাঙবে। সবাই তখন হা-হা করে হাসবে। কিন্তু পরীদি যখন ছুটে যাচ্ছিল সিঁড়ির দিকে তখন তো সেও ছুটে যাচ্ছিল দিকবিদিক জানশূণ্য হয়ে। বোধ হয় তখন সে নিজের মধ্যে ছিল না।

    ঝাড় লণ্ঠনের রঙির কাচ হাওয়ায় সামান্য দুলছিল। বিচিত্র বাহার ফুটে উঠেছে।

    সে পরীদির ঘরে ঢুকে যেতেই যেন মনে হল নিজের ঘর বাড়িতে ফিরে এসেছে। তার ভয় নেই। তার চালচলন আবার স্বাভাবিক হয়ে গেছে। চিঠিটি এবার পরীদিকে দিতে হয়। পরীদি নিজেই পড়ে দেখুক। কিন্তু আশ্চর্য, চিঠি সম্পর্কে পরীদির যেন কোনো কৌতূহলই নেই। ঘরে ঢুকে বলল, বোস। পালাবি না।

    সে এ-ঘরটায় এসে বসলে আশ্চর্য এক মৃদু সৌরভ পায়। বকুল ফুলের মতো সুগন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াতে থাকে। হয়তো ঘরটার পিছনে কোনো বড় বকুল গাছ আছে। কিন্তু অসময়ে তো বকুল ফুল ফোটে না। কে জানে, কোথাও কোনো গাছে বারো মাস বকুল ফুল ফুটে থাকে কিনা। এদের কোনো কিছুর সঙ্গেই তাদের জীবনের মিল নেই। সাদা পাখিটার নামই জানত না। কাকাতুয়া দেখতে এ-রকমের হয় পরীদিদের বাড়ি আসার পর জানতে পেরেছে। টিয়া, ময়না কত তো পোষা পাখি আছে। কিন্তু এ-বাড়ির পক্ষে যেন কাকাতুয়া পাখি না থাকলে সম্ভ্রমে বাধে।

    তাকে বসিয়ে রেখে পরীদি বারান্দার দিকে গেল কেন বুঝল না। কাকে ডেকে কি বলল, ঘরের ভেতর থেকে সে তাও অনুমান করতে পারল না। সে একা তক্তপোষে বসে পা দোলাচ্ছে। আর তখনই দেখল, টানা-হেঁচড়াতে তার সার্টের হাতা ছিঁড়ে গেছে। কোথাও জ্বালা হচ্ছে। পিঠের দিকে, ছাল চামড়া উঠে গেছে এবং জ্বালা হচ্ছে পরীদির ঘরে ঢুকে বসতেই টের পেল।

    দাদার জন্য তাকে যে কী ভাবে হেনস্তা হতে হচ্ছে, কত যে ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে-শুধু তাকে কেন, বাড়ির সবাইকে— মা তো এখন দরজায় বিকাল হলেই চুপচাপ বসে থাকবে—বাবাও ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়বেন। পক্ষকালও পার হবে না। ছাতা বগলে শহরে চলে আসবেন। মুকুলদার বাড়ি বাবা চেনেন। ওদের পি তরু ডি-র কোয়ার্টারের পাশে বড় কদমফুলের গাছ। যেন কোনো পরিব্রাজক অপেক্ষা করছে, মুকুলদা তো সেবারে দাদা নিখোঁজ হয়ে গেলে এমন ভাবেই বাবার নিখোঁজ সন্তানের অপেক্ষার কথা বর্ণনা করত।

    একজন প্রবীণ মানুষ বসে আছে গাছতলায়।

    ডাকলেও বাবা বাড়িতে ঢুকতেন না। তাঁর যা জামা কাপড় তাতে যেন যেখানে বসবেন সেখানেই ময়লা লেগে যাবে। বাবার এই সংকোচের কথাও মুকুলদা বলেছে দাদাকে। –তোমার কষ্ট হয় না বিলু, মেসোমশাই সকাল নেই বিকাল নেই, গাছতলায় দাঁড়িয়ে আছেন দেখি। বৌদি কত করে বলেছেন, ভিতরে এসে বসুন। মুকুল বাড়ি নেই। আসবে।

    বাবার এক কথা—ও ঠিক আছে। গাছের ছায়ায় বেশ ঠাণ্ডা।

    ঘরে যে পাখা আছে বাবার বোধ হয় তাও জানা ছিল না। কিংবা তিনি তখন পুত্রের মুখ ছাড়া এবং গাছ তলার ছায়া ছাড়া আর কিছুর মধ্যে বোধ হয় সান্তনা পেতেন না।

    মুকুলদা ফিরে এসে দেখলেই বলত, এ কি মোসোমশাই গাছের নিচে বসে আছেন ভিতের আসুন।

    বাবার তখন এক প্রশ্ন, তোমাদের কাছে কোনো চিঠি দিয়েছে। মাস দুই তো হয়ে গেল। আমরা বেঁচে আছি না মরে গেছি তারও তো খোঁজ নিতে হয়।

    মুকুলদা বলত, কী যে খারাপ লাগত বলতে, না মেসোমশাই বিলু কোনো চিঠি দেয়নি। গ্যারেজের কাজে মন বসছে না আপনাকে বললেই পারত।

    বাবার কাছে যেন এটা খুবই বিড়ম্বনার সামিল ছিল। বার বার খোঁজ নিতে এসে তিনি যেন মুকুলদাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিলেন।

    কখনও বলতেন, আর বল না, ওর মা তো ঘরে এক দণ্ড শান্তিতে তিষ্ঠোতে দিচ্ছে না। তাই বার বার আসি। কিছু মনে কর না।

    মুকুলদা কত বুঝিয়েছে, চিঠি এলেই খবর দিয়ে আসব। আপনি ভাববেন না।

    বাবা বোধ হয় মনে করতেন, তাঁর বার বার আসা মুকুলদার পছন্দ না। মুখ কাঁচুমাচু করে নাকি বলতেন, ও ঠিক আছে। তবে বাড়িতে বসে থাকি, পূজা-আর্চায় মন বসছে না—কী করি, একটু হেঁটে এলে ভিতরের কষ্টটা দমন থাকে। খোঁজ নিতে আসি বলে কিছু ভেব না।

    মুকুলদা তো একদিন ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়ে বলেছিল, তুমি মানুষ বিলু! এমন সরল সোজা মানুষটাকে কষ্ট দিতে তোমার খারাপ লাগে না। যেন সব দায় তাঁর। দেশ ছেড়ে এসে এক দণ্ড বসে থাকেন না। আর তুমি গ্যারেজে বনিবনা হল না বলে পালালে। মেসোমশাই কী বুঝবেন, কোনটা ভাল, কোনটা মন্দ। তোমার মানুকাকাই তো বলেছেন, যা নম্বর তাতে আর চাকরি জুটবে না। হাতের কাজ শিখুক— করে কম্মে খেতে পারবে।

    তারপর মুকুলদা এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলেছিল, সব দোষ তোমার। বললেই পারতে, পড়ব, গ্যারেজে ক্লিনারের কাজ আমি করতে পারব না। তা না সবার উপর অভিমান করে নিরুদ্দেশ। আর বলি বাঙাল কাকে বলে—তুমি কী করে ভাবলে দেশের প্রধানমন্ত্রী তোমার অপেক্ষাতে বসে আছেন। দেশভাগের জন্য তোমাদের এই দশা, তাঁর এ জন্য দায়িত্ব রয়ে গেছে তোমার জীবনের সুবন্দোবস্ত করা—এ সব তোমার মাথায় আসে কী করে। বাঙাল কী আর সাধে বলে।

    পিলু আমগাছের ডালে বসে সব শুনত। গাছের নিচে মাদুর বিছিয়ে দাদারা মজার মজার গল্প করত— তার দাদার বন্ধুরা শহরের মানুষ—আদব কায়দাই আলাদা। দাদার বন্ধুরা সাইকেলে দল বেঁধে এলে কী খুশি হন বাবা। বনজঙ্গলে বাস করা একজন উদ্বাস্তু মানুষের এত সৌভাগ্য হবে বাবা যেন কল্পনাও করতে পারতেন না। ঘরের ভাল মন্দ, আমের দিনে আম, জাম জামরুল, যে দিনকার যা, খাঁটি দুধ এক গ্লাস করে—যেন বাবা তাঁর আর বাড়ি করার গৌরব এর মধ্যে টের পেতেন। সেই দাদাটা শেষে পরীদিকে মারল। বাবার অন্নপূর্ণাকে মারল!

    অথচ পরীদির কোনো ক্ষোভ নেই।

    যত ভাবছে অবাক হয়ে যাচ্ছে।

  • চার

    চার

    পরীদি এল। শাড়ি সায়া পাল্টে পরীদি এল। সাদা সিল্ক, লাল ব্লাউজ, মুখে স্যান্য প্রসাধন। সামনে এসে পরীদি পিলুর জামাটা দেখে বলল, ছিঁড়ে গেছে। দেখেছিস।

    পিলু নিজের ছেঁড়া জামা আগেই দেখেছে। সে পরীদির কথায় আশ্চর্য হল না।

    —কোথাও লাগেনি তো!

    সে বলতে পারত, জ্বলছে। জামা তুলে দেখাতে পারত। সে জ্বালায় কষ্ট পাচ্ছে শুনলে পরীদিও

    কষ্ট পাবে। কিন্তু পরীদিকে এখন চিঠিটা দেখানো দরকার।

    সে বলল, দাদা কাল রাতে কোথায় আবার চলে গেছে।

    পরীদি খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, কখন গেল। দেখি চিঠিটা।

    পিলু চিঠি এগিয়ে দিল, পরীদি পড়তে পড়তে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। পরীদি দাঁড়িয়েই আছে। এ-ঘরে সে বসে আছে পরীদির যেন খেয়াল নেই। চিঠিটা পরীদি উল্টে দেখল। কোথাও কী খুঁজল। তারপর বলল, আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি কে বলল!

    —বাবা যে বললেন! তুমি বোসো পরীদি, দাঁড়িয়ে থাকলে কেন।

    — বসছি। তুই খেয়ে নে। আমরা এক জায়গায় যাব। তুই সঙ্গে থাকবি।

    পরীদির সঙ্গে যাবার তো কারো দরকার হয় না। সে দেখল, যারা তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, তাদেরই একজন সাদা পাথরের রেকাবিতে মিষ্টি ফল সাজিয়ে এনেছে। পিলু যে কিছুটা পেটুক পরীদি জানে। কিন্তু এমন অসময়ে এত খাবার দেখে তার নিজেরই সংকোচ হচ্ছিল। বলল, পরীদি, আমার খিদে নেই।

    —খাতো! লজ্জা হচ্ছে! দাদা তো লিখেছেন আবার তিনি ফিরে আসবেন। আমাকে শহর ছেড়ে যেতে বারণ করে গেছেন। এত সাহস হয় কী করে তোর দাদার! আমি শহরে থাকব কী থাকব না আমার মর্জি। তোর দাদার কথায় থাকব।

    পরীদিকে পিলু ঠিক বুঝতে পারে না। কেন এই ক্ষোভ— দাদা তো খারাপ কিছু লেখেনি। পরীদিকে দাদার জন্য বাইরে পাঠিয়ে দিতে হচ্ছে শুনে তারই খারাপ লেগেছিল। দাদার তো মন খারাপ হতেই পারে।

    পরীদি চিঠিটা নিজের ব্যাগে তুলে রেখে দিতে গেলে পিলু বলল, চিঠিটা বাবাকে ফেরত দিতে হবে।

    —চিঠিটা থাক আমার কাছে। তোর দাদার খুব আস্পর্ধা দেখছি। তিনি আমার জন্য সন্ন্যাস নিতে গেছেন। নিখোঁজ। নিখোঁজ হওয়া বের করব।

    এই রে! পিলু ঘাবড়ে গেল পরীদির কথায়। ভেবেছিল, চিঠিটা পেলে পরীদি জলে পড়ে যাবে। ছটফট করবে, কোথায় গেল, কখন গেল, থানায় ডাইরি করা হয়েছে কি না, নিখোঁজ হলে নাকি থানায় যেতে হয়—কিন্তু এটা তো আর নিখোঁজ হওয়া নয়—লিখেই তো গেছে, আমার জন্য স্টেশনে গিয়ে বসে থাকিস না। আমি ফিরব।

    পরীদির শরীরে মৃদু সৌরভ। আর পাটভাঙা সিল্ক পরায় একটু নড়লেই খস খস শব্দ উঠছে। দু-একজন উঁকি দিয়ে তামাসা দেখার মতো তাকে দেখে গেল। পরীদি বোধহয় সহ্য করতে পারছে না। ছুটে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। তার দিকে তাকিয়ে বলল, এত লজ্জা তোদের কবে থেকে হল। এখনও কিছু মুখে দিলি না।

    আসলে পরীদি যেন এবার তাদের সবার মর্যাদাকে খোঁটা দিয়ে কথা বলছে। ‘এত লজ্জা তোদের’ কথাটা তার ভাল লাগল না। পরীদি কী সব র‍্যাক থেকে টেনে নামাচ্ছে, কী যেন খুঁজছে। পরীদি যে ভাল নেই সে বোঝে। তবু এর মধ্যে পরীদি বাবাকেও যেন টেনে এনেছে।

    পরীদি বইটই যা তক্তপোষে নামিয়ে রেখেছিল, তা আবার ভাঁজ করে র‍্যাকে সাজিয়ে রাখছে। দেয়ালে সেই ছবি—সে জানত পরীদির ঠাকুরদার বাবা কী তস্য পিতা কেউ হবে। সে কোনোদিন ছবিটা সম্পর্কে প্রশ্ন করেনি। আজ হঠাৎ কেন যে তার মনে হল, এমন সুন্দর মুখে পাগলের মতো দাড়ি কেন বুঝছে না। পরীদি যদি খুশি হয়, এইভাবেই যেন বলা, তোমার কে হয় ছবিটা। দাড়ি রেখেছে কেন। একটুখানি দাড়ি।

    পরী কিছু একটা খুঁজে পাচ্ছে না। তা যে কী পরী নিজেও জানে না। অথচ খুঁজছে। সে পিলুর কথায় মুখ ফেরাল, কার কথা বলছিস?

    পিলু আঙুল তুলে দেখালে বলল, আমার কেউ হয় না। চেষ্টা করছি আমি তার কেউ হতে পারি কি না। তোর দাদা ফিরে এলে জিজ্ঞেস করিস, পরীদির ঘরের ছবিটা কার! নে দয়া করে খেয়ে উপার কর।

    —আমার খেতে ইচ্ছে করছে না বলছি।

    —পিলু, আর কত জ্বালাবি। তোকে আমি জানি না মনে করিস। কালীবাড়িতে তোর দাদার কাছে গিয়ে বসে থাকতিস।

    দাদা তাকে দেখলেই ক্ষেপে যেত।—আবার! যেন সে গেলে দাদার এবং বাবার অপমান। একটু সুস্বাদু খাবার পাতে পড়বে এই ভেবে সে পালিয়ে এক ক্রোশ পথ হেঁটে দাদার কাছে চলে যেত। দাদার কাছে চলে যেত ঠিক—তবে আমবাগানে কিংবা বটতলায় লুকিয়ে থাকত। কিংবা দাদার দুই- ছাত্র প্রায় তার সমবয়সী, তারা খোঁজখবর দিত মাস্টারমশাই কোথায়। পিলুকে ঠোঙা ভর্তি সন্দেশ এনে দিত। মাঝে মাঝে দেখতে পেত লক্ষ্মীদিকে। সে এখনও জানে না, আসলে, বাবাঠাকুর না লক্ষ্মীদি সে গেলেই মিষ্টির ঠোঙা পাঠিয়ে দিত তাকে। জঙ্গলে বসে কিছুটা খেত। বাকিটা বাবাঠাকুর প্রসাদ পাঠিয়েছে বলে, বাবার হাতে এনে দিত। দাদা কখনও জানতে পারত না।

    একবার টের পেয়ে দাদা তাকে রেল-লাইন পর্যন্ত তাড়া করেছিল—আবার যদি আসিস, আমি এখানে থাকব না বলে দিলাম। তুই কিরে, মান অপমানবোধ পর্যন্ত নেই। সবাই কী ভাবে! দাদার সেই তিরস্কার তাকে এতই পীড়নে ফেলে দিয়েছিল, যে আর কখনও যায়নি। কেবল মনে হত, তাকে দেখলেই দাদা কষ্ট পাবে। যেন সে গেলেই বদ্রিদার বাড়ির সবাই টের পেয়ে যায় তারা কত গরীব। লক্ষ্মীদি হয়তো সব বলে দিয়েছে পরীদিকে।

    তারপর না খেলে পরীদি বুঝবে, তারও কম রাগ না। তাকে অপমান করেছে বলেই খাচ্ছে না। না খেলে কষ্ট পাবে। কেউ কষ্ট পেলে তার কেন যে এত খারাপ লাগে! তার খিদেও পেয়েছে। সে আর লোভ সামলাতে পারল না। একটা সন্দেশ তুলে মুখে আস্ত ঠেসে দিতেই প্রচণ্ড বিষম খেল। কাশছে।

    —তুই কিরে, ইস, কী কাশছে! তাড়াতাড়ি মিমি জলের গ্লাসটা মুখের কাছে নিয়ে বলল, শিগগির জল খা। মাথায় চাপড় মারছে, ফুঁ দিচ্ছে। পিলুর চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে। সে প্রচণ্ড অস্বস্তি বোধ করছে। আর পরীদি পাগলের মতো কী করবে না করবে ভেবে পাচ্ছে না। কেবল বলছে, এত বড় সন্দেশ এক সঙ্গে মুখে পুরে দিতে আছে। কড়াপাকের সন্দেশ। রাক্ষসের মতো গিলছিস! কাল বাড়িতেও একবার তার একই দশা হয়েছিল।

    পিলু দেখছে সারা ঘরে সন্দেশের অংশ-বিশেষ ছড়িয়ে পড়েছে। ইস কী বিষম খেল! দাদা হয়তো তার কথা ভাবছে। বিষম খেলে বাবা বলবেন, কে আবার তোমার কথা ভাবতে শুরু করল। জল খাও। কেউ কারো কথা ভাবলেই কিছু খেতে গেলে বিষম খেতে হয়। এটা সে বিশ্বাস করে। বিশেষ করে বাবার এমন সব আপ্তবাক্য শুনে শুনে তারা বড় হয়েছে যে, বিশ্বের সব কিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণে। এই যে দাদা বের হয়ে গেল এটাও তাঁরই ইচ্ছে। কোনো শুভবোধ এর অন্তরালে কাজ করছে। এমন কী সে যে বিষম খেল, প্রায় চোখ উল্টে দিয়েছিল, এও তাঁর কোনো গূঢ় ইচ্ছে থেকে।

    এবং অবাক হয়ে দেখল, পরীদি কেমন স্বাভাবিক গলায় বলছে, মেসোমশাইকে দাদু ডেকে পাঠিয়ে কী বলেছে, জানিস!

    যাক পরীদির মধ্যে সেই রণংদেহী ভাবটা আর নেই। শান্ত স্বভাবের পরীদিকেই সে বেশি চেনে! তবে পরীদির রণংদেহী স্বরূপও তার চেনা। দাদার সঙ্গে কী নিয়ে যে খটাখটি লেগে থাকত বুঝতে পারত না।

    পরীদি তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সে কথা বলতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছে, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। খেয়ে নে। না হলে আবার বিষম খাবি। আসলে সে পরীদির কথার জবাব দেবার জন্যই জল খেয়ে আর একটা সন্দেশ হজম করতে গেলে, পরীদির এই সতর্কতা।

    তার প্লেট খালি হলে পরীদি ওটা হাত থেকে নিয়ে নিল। বলল, মুখ ধুবি আয়। বলে পরীদির বাথরুমে নিয়ে যেতেই সে বিস্ময়ে হতবাক। সুন্দর কারুকাজ করা পাথরে তৈরি কোনো মন্দিরের অভ্যন্তর যেন। বিশাল আয়না ফিট করা। সব কিছু এত ঝকঝকে যে সে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। বালতি থেকে পরী জল নিয়ে বলল, বেসিনে মুখ ধুয়ে নে। হাত পাত। আরে কী করছিস, জল নিচে পড়ছে দেখছিস না। বেসিনে জল ঢালার সময় বলল, জান বাবা না কী ক্ষেপে গেছে! বাবাকে তোমার দাদু বলেছে, শেষ বয়সে বাড়ি বয়ে অপমান। দাদার জন্য তোমাকে বিলাসপুরে পাঠিয়ে দিতে হচ্ছে। জান দাদা গুম মেরেছিল শুনে। বাবার হম্বিতম্বি দাদা জানত না। রাতে ফিরে এলে বললাম দাদাকে। সব শুনে দাদা কেমন গুম মেরে গেল।

    —বাবার গোঁ জান তো।

    —বাবা দাদাকে কুপুত্র বলেছেন।

    —বাবা বলেছেন, এ যে মহাপাপ ধনবৌ। দেবীর গায়ে হাত! এ-পাপের যে ক্ষমা হয় না। আমাদের কী হবে! জান পরীদি, বাবাকে এমন জলে পড়ে যেতে দেখিনি। বাবা রাতে কিছু খানওনি। বলেছেন, দু-দিন নিরম্বু উপবাস। দু-দিন অহোরাত্র চণ্ডীপাঠ, যদি দেবী এতে শান্ত হন। দাদাও রাতে খেল না।

    —মা এসে ডাকল। কত বোঝাল। বলল, তোর বাবাকে তো জানিস, গোঁ উঠলে তেনার বুদ্ধিভ্রংশ হয়। তুই খেয়ে নে।

    —দাদা কেমন ভেঙ্গে পড়েছিল। সত্যি বলছি দাদাকে এ-ভাবে ভেঙ্গে পড়তে দেখিনি, বলল, বিশ্বাস কর মা, আমি পরীকে মারিনি। পরীকে মারতে পারি না। আর কেউ বিশ্বাস না করুক তুমি অন্তত বিশ্বাস কর, পরীকে আমি কখনই মারতে পারি না।

    —তোর দাদা খেল!

    —না খায়নি।

    —মেসোমশাইও উপবাসে আছেন!

    —তাই। সকালে দাদা নেই। এখন তো সবাই উদ্ভ্রান্ত! কী যে হবে!

    —সবাই তোরা কাল থেকে না খেয়ে আছিস!

    পিলু চুপ করে থাকল।

    পরীদি হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে নিল। জানালার পাশে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

    সে বুঝতে পারছে না, পরীদি জানালায় তার দিকে পেছন ফিরে তাকিয়ে আছে কেন! তারপর পরীদি হঠাৎ ছুটে গেল বারান্দার দিকে। সে দাদাকে নিয়ে যেমন ত্রাসের মধ্যে আছে পরীদিকে নিয়েও কম ত্রাসের মধ্যে নেই। সেও উঠে বারান্দায় চলে গেল। পরীদি বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। সে এখন কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। কী যে করবে! আর তারপরই দেখল পরীদি চোখে মুখে জল দিয়ে বের হয়ে এসেছে। সাদা তোয়ালে কাঁধে ফেলা। মুখে সামান্য হাসি।

    পিলুর গলা বুক শুকিয়ে গেছিল। পরীদিকে হাসতে দেখে সে যেন কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। পরী বলল, চল। অনেক দেরি হয়ে গেছে।

    আশ্চর্য পরীদির সামান্য যে প্রসাধন ছিল মুখে এখন তাও নেই। তর তর করে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামতে থাকল। পেছন থেকে কে যেন বলল, কোথায় বের হচ্ছ!

    পরীদি তাকাল সিঁড়ির উপরের দিকে। পরীদির বাবা দাঁড়িয়ে সিঁড়ির মুখে। সামনে থেকে চাকর বাকরেরা সরে দাঁড়িয়েছে।

    পরীদি খানিকক্ষণ কিছু ভাবল। পিতা পুত্রীর এমন মুখোমুখী হওয়ার দৃশ্য সে জীবনেও দেখেনি।

    পরীদি শুধু বলল, তীর্থ করতে যাচ্ছি।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    পিলু মিমির গা ঘেঁসে রয়েছে। সিঁড়ি ধরে নামার সময়ও সে মিমির আড়ালে থাকছে। যেন একটু আলগা পেলেই খপ করে তাকে কেউ ধরে ফেলবে। আবার টেনে হিঁচড়ে উপরে তুলে নিয়ে গিয়ে কোনো পরিত্যক্ত ঘরে আটকে রাখবে। তেমন সুযোগ দিতে সে আর রাজি না। শত হলেও পরীদি তার একা। এত লোকজনের সঙ্গে পেরে উঠবে কেন

    পরীদি সোজা নেমে হলঘরের কোণায় ফোনের কাছে চলে গেল। তাকে ইশারায় বসতে বলে, কাকে যেন চাইল।

    —হ্যালো, হ্যাঁ আমি মিমি। সুহাসদা নেই?

    ও-প্রান্ত থেকে কেউ কিছু বলছে। পিলুর খুব আগ্রহ ফোনে কান পাতার। সে শুনতে চায় দুর থেকে কীভাবে কথা ভেসে আসে। তার এই ফোনের খেলাটা একসময় মারাত্মক ছিল। দেশলাইয়ের বাকসে সুতো বেঁধে অপর প্রান্তে কাউকে কথা বলত। এ-জন্য একবার যা পিঠে পড়েছিল! এমনই নেশা যে নতুন দেশলাইয়ের খোল চুরি করে ধরা পড়ে যায়। সব কাঠি আছে। খোল নেই। মা পই পই করে বলেছে, পিলু তোর জন্য ঘরে দেখছি কিছু রাখার উপায় নেই! তোর কাজে লাগে না কী আছে বলত। দেশলাইয়ের একটা খোল রাখা যায় না। কিন্তু সেবারে আস্ত নতুন দেশলাইয়ের খোল নিয়ে হ্যালো হ্যালো বানাতেই মা বাড়ি এলে বিরাশি সিক্কার ওজনের কিছু কিল, এবং সে পিঠ বাঁকিয়ে দিয়েছিল, শ্বাস নিতে পারছিল না—আর পরীদি সত্যিকারের ফোনে কথা বলছে!

    —সুহাসদা পার্টি অফিসে! ঠিক আছে।

    মিমি আবার ফোন কেটে দাঁড়িয়ে থাকল। পার্টি অফিসে ফোন করতে হবে। সে ঘড়ি দেখল। আধ ঘণ্টা আগে বের হয়েছে। গোরাবাজার থেকে রাধারঘাট আসতে কতটা সময় লাগতে পারে আন্দাজ করল মনে মনে। আধ ঘণ্টা হয়ে গেছে বাড়ি থেকে বের হয়েছে। সোজা এলে আধ ঘণ্টার মধ্যে এসে যাবার কথা। আবার নাও আসতে পারে। পার্টির ক্যাডারদের সামনে যদি পড়ে যায়— তবে এক টানা লেকচার শুরু করবে। তার তো কাজের শেষ নেই—কার হাসপাতালে বেড পাওয়া যাচ্ছে না, কার রেশন কার্ড হয়নি, কার স্কলারশিপের টাকা আসেনি, কে অকারণে বরখাস্ত হয়েছে, মিটিং মিছিল নিয়ে ব্যস্ত মানুষটা আধ ঘণ্টায় পার্টি অফিসে পৌঁছাতে নাও পারেন।

    পিলু ঠিক বুঝতে পারছে না পরীদি কেন চুপচাপ ফোনের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলার যন্ত্রটাও নামানো। আর দোতলায় সিঁড়ির মুখে সবাই দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। কী গভীর নৈঃশব্দ।

    যেন পরীদির আচরণে গোটা বাড়িটা স্তম্ভিত। কুকুরটা পর্যন্ত রা করছে না। পরীদিকে শুঁকছে। আসলে বাড়ির আগেকার সেই মেয়েটার সঙ্গে এ-মেয়েটার ঘ্রাণ এক আছে কি নেই শুঁকে হয়তো পরীক্ষা করছে।

    পিলু এ-হেন দৃশ্যে খুবই বিচলিত। বাবার মুখের উপর কথা তারাও এক আধ সময়ে বলে ফেলে- কিন্তু এটা যে পরিবারের মর্যাদা নিয়ে টানাটানি, পিলুর মতো ছেলেও তা টের পায়। অথচ পরীদির কোনো ভাবান্তর নেই। এ-সময় সুহাসদাকেই আবার কেন ফোন। সেও চেনে, এক ডাকে সবাই চেনে মানুষটাকে। রোগা দুবলা, বেঁটে এবং ভারি কাচের চশমা চোখে। একা, সাইকেল তার নিত্য সঙ্গী। সাইকেলে চেপে বসলেই মানুষটার মধ্যে বোধহয় কোনো আগ্রহ সঞ্চার হয়। সে তাদের কলোনিতেও দেখেছে সুহাসদাকে। বাজারের দিকটায় একবার দেখেছিল। মিলের ইউনিয়ন নিয়ে কী সব কথাবার্তা বলছিল। সুহাসদার সঙ্গে সে দেখেছে সব সময় পাঁচ দশটা ছেলে থাকে। হাঁটলে তারা হাঁটে। থামলে তারা থামে।

    —হ্যাঁ আমি। ভাবলাম পাব না। যাক শোনো, আমি কাটোয়া যাচ্ছি।

    অপর প্রান্ত থেকে কথা ভেসে আসছে পিলু বুঝতে পারছে।

    —আরে না। ও-সব কিছু না।

    মিমি আবার থেমে বলল, না আমিই করব। কবে ঠিক হল।

    —মিমি, তোমার যাওয়া বোধহয় ঠিক হবে না। এই যে সেদিন বললে, বাড়িতে তোমাকে নিয়ে অশান্তি চলছে। বের হওয়া বারণ। মুখার্জী সাবের সঙ্গে পাকা কথা বলার জন্য তোমার দাদু ওর বাবা মাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।

    —তোমার সঙ্গে এত কথা বলার সময় নেই। আমিনার পার্ট আমিই করব। আমার কোনো অসুবিধা হবে না। আর শোনো আমার সুবিধা অসুবিধা নিয়ে তোমার মাথা ঘামাতে হবে না। ছাড়ছি।

    —কী বলছ! শোনো। আর একবার ভেবে দ্যাখ। ওখানে গিয়ে থাকা খাওয়ার অসুবিধা হবে। তা ছাড়া….

    —না না। আমি যাব।

    —শোনো তুমি আমিনার পার্ট করতে পারছ না শুনে আমরাতো জলে পড়ে গেছিলাম। পরে ভাবলাম, লীনাকে দিয়েই ঠেকা কাজ চালিয়ে দেব। আমাদের জন্য অকারণ তুমি বাড়িতে অশান্তি সৃষ্টি কর না। মুখার্জী সাব তো দারুণ লোক

    —আচ্ছা আমি ছাড়ছি।

    —তুমি কী বাড়ি থেকে করছ।

    —হ্যাঁ।

    —আমি যাচ্ছি।

    —না। আমি এক্ষুনি বের হয়ে যাব।

    —কাগজ। কাগজ চলছে।

    —ছাড়ছি।

    বলেই মিমি ফোন ছেড়ে বলল, এই পিলু, কী হাবার মতো তাকিয়ে আছিস। চল!

    —আমি কথা বলব।

    –কার সঙ্গে কথা বলবি।

    পিলু এমন মুগ্ধ হয়ে গেছিল, যে সে নিজে কথা বলতে না পারলে, ফোনের রহস্যটা ঠিক জানতে পারবে না! তারপরই মনে হল, সত্যি সে কার সঙ্গে কথা বলবে! সে তো কাউকেই চেনে না। কিংবা অকারণ তো ফোনও করা যায় না। তার হ্যালো হ্যালো খেলাটা এখানে এসে এত বড় বিস্ময় হয়ে গেছিল, যে সে কেমন ঘোরে পড়ে গিয়েই কথাটা বলেছে।

    মিমি কী ভাবল কে জানে। সে ফোন তুলে কাকে কী বলল, তারপর তার দিকে তাকিয়ে বলল, কর। সুহাসদার সঙ্গে কথা বল। তারপর নিজেই বলল, সুহাসদা, পিলু তোমার সঙ্গে কথা বলবে। পিলুকে চেন না! বিশ্বর ছোট ভাই। যার কবিতার তারিফ করে বলেছিলে— ছেলেটার মধ্যে আগুন আছে।

    পিলু শিশুর মতো আব্দার করে ফেলেছে টের পেতেই সে লজ্জায় পড়ে গেল। কিছুতেই ফোন ধরছে না। আর এত বড় প্রাসাদের মতো বাড়িতে এত উত্তেজনার মধ্যে মুহূর্তে সে যেন তার এবং পরীদির আগেকার জীবনের সন্ধান পেয়ে গেছিল। কিছুক্ষণ আগে তাকে টেনে হিঁচড়ে উপরে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল—জামা ছিঁড়ে গেছে, হাফ প্যান্টও খুলে গেছিল, এবং ধস্তাধস্তিতে তার পিঠের ছাল চামড়া উঠে গেছে—পিলুকে দেখলে এখন আর বিশ্বাসই করা যাবে না। সে কিছুতেই কথা বলবে না। পরীদির গা ঘেঁসে বলছে, না। তুমি ছেড়ে দাও।

    মিমি হেসে ফোনে বলল, কথা বলবে না। লজ্জা করছে বাবুর

    —দাওনা ওকে।

    —এই পিলু। ধর।

    পিলু এবার বোধহয় সাহস পেয়ে গেছে।

    মিমি বলল, সুহাসদা কথা বলবে। ধর বলছি। আরে উল্টো করে ধরলি কেন। না না, এদিকটা কানে রাখ। তুই আচ্ছা বুদ্ধু।

    পিলু বোকার মতো ধরে আছে।

    —বল হ্যালো।

    পিলু ফোন ছেড়ে দিয়ে ছুটে পালাল। মরে গেলেও বলতে পারবে না। কেমন কৃত্রিম কথাবার্তা। হ্যালো বললেই সে যেন আর পিলু থাকবে না। সে তার বাবার দ্বিতীয় পুত্র—মাটির ঘরে বাস, ভাঙ্গা সাইকেলটা ধরলে পর্যন্ত দাদার তিরস্কার—আবার স্পোক ভেঙ্গে আনলি, তুই কী রে—তোর হাতে কিচ্ছু ঠিক থাকে না, আমার সাইকেল নিলি কেন—বলেই যে দাদার কানমলা খায়, তার পক্ষে হ্যালো বলা কত কঠিন, পিলুর ছুটে পালানো না দেখলে বোঝার উপায় নেই।

    মিমি ফোন তুলে হেসে দিল। বলল, পালিয়েছে। লজ্জা পেয়েছে। তুমি বিকালে থাকছ তো। যদি পারি যাব। দিনক্ষণ ঠিক হলে জানিও। আমি মুক্ত। জান, আমার আর কোনো দ্বিধা নেই।

    এবার পরী সিঁড়ির দিকে তাকাল। অবাক দাদু সোজা নেমে আসছে। সে জানে এ-বাড়িতে এই একটিমাত্র মানুষ তাকে যে কোনো কাজ থেকে নিরস্ত করতে পারে। দাদুকে নেমে আসতে দেখে অবাক শুধু না, কোথাও যেন এক সুপ্ত ছলনা সে টের পেল। দাদুর অসুস্থতা কী তবে ভান! কে জানে, যিনি গোপনে বিশ্বর সঙ্গে মেসোমশাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে রেলের চাকরির নামে একটা গোটা পরিবারকে ঠকাবার ষড়যন্ত্র করেছিলেন, সেই তিনি যে ভান করবেন না কে জানে। তবু দাদুর প্রতি তার টান আছে। সে দাদুকে নেমে আসতে দেখে বলল, আমি বের হচ্ছি। ভেব না। রোজই তো বের হই। এত উতলা হয়ে পড়ছ কেন। চল। ওঠো। অসুস্থ শরীরে কে তোমাকে নামতে বলেছে। ওঠো বলছি। বলে সিঁড়ি ধরে দাদুকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তর তর করে নেমে এল। সবাই তার আচরণে স্তম্ভিত। সে বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়। সোজা নেমে সাইকেল বের করে রাস্তায় নামতেই যেন সেই আগেকার মিমি। তার হাতে এখন কত কাজ।

    পিলু তার পাশে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। টাউন হলের সামনে এসে মিমি বলল, সুধীনদাকে একটা ফোন করলে হত। ঠিক আছে চল। পরে ফোন করা যাবে।

    আজ ছুটির দিন। রাস্তায় রিকশা, সাইকেলের ভিড় কম। তারা পুলিশ ব্যারাক পার হয়ে যাচ্ছে। বর্ষায় রাস্তায় খানা খন্দ। দু’জনই খানা খন্দ বাঁচিয়ে সাইকেল চালাচ্ছে।

    একটা সুন্দর মতো বাংলো বাড়ির সামনে তারা থামল। আসলে পিলু জানে না, তাকে নিয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে। সামনে বিশাল স্কোয়ার মাঠ। বাঁদিকে অফিস আদালত। আজ ছুটির দিন বলে সব ফাঁকা। এমন কী গাছতলাতেও প্রচন্ড ভিড় দেখেছে পিলু—অফিস টাইমে রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাওয়াই কঠিন। গাছতলায় স্ট্যাম্প ভেন্ডারদের আখড়া। তাদের ঘিরে কত লোকজন। কোর্ট কাছারি না থাকলে যা হয়—কেমন জনবিরল হয়ে আছে জায়গাটা।

    তার মাথায় দাদার চিঠিটা নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে। বাবা চান না, চিঠিটা আর কেউ দেখুক। পরীদি কেন যে চিঠিটা ব্যাগে রাখল!

    সে সুযোগ বুঝে বলল, চিঠিটা সঙ্গে নিয়েছ তো। বাবা কিন্তু ফিরে গেলেই চিঠির কথা বলবে।

    –মেসোমশাই দেখেছে!

    —দেখবে না। বাবাই যে চিঠিটা দিল। বলল, অযথা আর চিন্তা করবে না। তোমার খারাপ অভ্যাস–তোমাকে এজন্য বাবু চিঠি দিয়ে গেছেন।

    —মোসোমশাই তোর দাদার চিঠি দিয়ে কী করবেন!

    আর এ-সময় উর্দিপরা একটা লোক ছুটে আসছে। তারা যে গেটে দাঁড়িয়ে আছে কেউ নিশ্চয় ভিতর থেকে টের পেয়েছে। পাঁচিল এবং বাগান পার হয়ে বিশাল বারান্দা। বারান্দায় নীল রঙের বেতের চেয়ার টেবিল সাজানো। ধবধবে সাদা চাদরে ঢাকা। দূর থেকে সব কিছু এত পরিপাটি দেখেই পিলু বলল, কার বাসা এটা পরীদি। আর তখনই দেখল, আরে সেই লোকটা। তাদের বাড়ি একবার গেছিল—পরীদি পাঠিয়েছিল। বেঁটে মতো। সুন্দর ছিমছাম-লতাপাতা আঁকা আলখাল্লার মতো কী গায়ে। ডোর দিয়ে কোমরের কাছে বাঁধা। এটা খুবই বিচিত্র পোষাক — পরীদিকে দেখে উর্দি পরা লোকটার পেছনে ছুটে আসছে।

    গেটের তালা তিনি নিজেই খুলে দিলেন। গেটের দরজা টেনে ধরলেন। পরীদি তার দিকে তাকিয়ে বলল, আয়।

    আসলে মিমি বুঝিয়ে দিল ছেলেটি তার সঙ্গেই এসেছে। পরেশ চিনতেও পারে। কিন্তু না চেনার ভান করাতেই যেন বলা, আমার সঙ্গে এসেছে। বিশ্বর ভাই।

    —আই সি। তোমাদের বাড়ি আমি গেছি।

    মিমি এটাই চেয়েছিল। বিলুকে পরেশ আদৌ পাত্তা দিত না। কেবল কবিতা পাঠের আসরে বিলুবাবু বিলুবাবু করত। পরেশ এক দিন অবশ্য অভিযোগ করেছিল-বিলু শিষ্টাচার জানে না। হতে পারে। বিলু নাকি তার হাত থেকে পান্ডুলিপির বান্ডিল নিয়ে বলেছিল, ঠিক আছে। আমি পরীর সঙ্গে কথা বলে নেব। তাকে বাড়িতে নিয়ে বসায়নি—রাস্তা থেকেই বিদায় করেছে। পরেশ হাসতে হাসতে বলেছিল, দেখছি খুবই রাগী ছোকরা। আমার হাত দিয়ে পাঠানো উচিত হয়নি তোমার।

    —তুমি গাড়িতে ওদিকে যাচ্ছিলে বলে দিয়েছি। ভেবেছিলাম, আমি নিজেই দিয়ে আসব। তোমাকে যেমন পছন্দ করে না, আমাকেও না। দেখলেই ক্ষেপে যায়।

    —খুবই দাম্ভিক।

    —তা ঠিক।

    আসলে পরেশের সঙ্গে বিলুর বয়সের তফাৎ অন্তত সাত আট বছরের। বিলু তার সঙ্গে পড়ে, আর পরেশ এখানে বছর দুই হল আই এ এস ক্যাডার থেকে এসেছে। পরেশের চালচলনে কিছুটা তেজি ভাব থাকলেও কবিতা পাগল। নিজে ছাইপাঁশ যাই লেখে, মনে করে তুখোড় কবি। কলকাতার বড় বড় কাগজে তার দু-একটা কবিতা এক সময় ছাপা হয়েছে—তখন বোধ হয় পরেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। খুবই দুর্বল—অন্তত সুধীনদা মুকুলের মতে। বিলু ওর দু-একটা কবিতা পড়ার পরই কেন যে আর তার লেখা কবিতা ভুলেও দেখে না।-–ও সাহেবের কবিতা। মুকুলকে দিও। আমার কাছে দেওয়া ঠিক হবে না। হারিয়ে ফেলতে পারি।

    মিমি টের পেল পিলু খুবই অস্বস্তিতে পড়ে গেছে। তাঁর পায়ে জুতো নেই। ইজের পরনে। সার্টও ময়লা। চুল কিছুটা ধূসর। সে কী ভেবে যে বলল, পরীদি আমি যাই।

    মিমি বলল, যাবি। একসঙ্গে যাব।

    মিমি যাওয়ায় সাহেব বেশ বিহ্বল হয়ে উঠেছেন। হাতে তাঁর একটা ভারি বই। যেন তিনি বইটা পড়ছিলেন, পড়তে পড়তে টের পেয়েছেন, তার প্রিয়জন গেটে এসে দাঁড়িয়ে আছে। অসময়ে গেটে তালা দেওয়া থাকে। অসময়ে পরী আসেও না। একা তো নয়ই। সঙ্গে কেউ না কেউ থাকে।

    ঘরে ঢুকেই বলল, পরেশবাবু, তোমাকে একটু কষ্ট করতে হবে। হাতে ওটা কী বই। এত ভারি বই বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছ কেন! কষ্ট হচ্ছে না!

    পরেশ বলল, জেমস ফ্রজারের ‘গোল্ডেন বাউ’। দারুণ। দারুণ। তুমি তো পার্টি কর, তোমার অবশ্যই পড়া দরকার। দেখবে নাকি। বলে পরেশ বই-এর পাতা ওল্টাতে থাকল।

    মিমি বসে পড়েছে। দেখলে মনে হবে খুবই যেন ক্লান্ত। চুল অবিন্যস্ত হাওয়ায়। কপাল থেকে চুল সরিয়ে নিজেই উঠে গিয়ে পাখার স্পিড বাড়িয়ে দিল। আর তখনই দেখল পিলু বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে ঢুকতে ইতস্তত করছে। মিমি জানে, পিলু ধুলো পায়ে এমন সুন্দর কার্পেটের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া যায় কি না জানে না। সে হাত তুলে বলল, আরে তুই বাইরে কেন। ভিতরে আয়। কিচ্ছু হবে না। আয়।

    পিলু সাহস পেয়ে সে তার পরীদির চেয়ারের পাশে ছুটে গিয়ে বসে পড়ল।

    মিমি বলল, পরেশ, তোমাকে এক্ষুনি কয়েক জায়গায় ফোন করতে হবে। খবর নিতে হবে। ভেবে দেখলাম তুমি পার। থানা হাসপাতাল সব জায়গায় ফোন করে দেখবে। কোনো দুর্ঘটনার খবর আছে কিনা!

    পরেশ কপাল কুঁচকে বলল, হোয়াট হ্যাপ্‌ডে!

    —আরে বল না, বিশ্ব কাউকে না বলে না কয়ে কোথায় চলে গেছে।

    —ডিডন্‌ট হি টক টু এনিওয়ান বিফোর হি লেফট দ্য হাউস?

    —না না, তাহলে তোমার কাছে আসব কেন। কাউকে কিছু বলে যায়নি।

    পিলু তাড়াতাড়ি সংশোধন করে দিতে গিয়ে ধমক খেল মিমির।

    পিলু বলতে চেয়েছিল, সে বলে যায়নি, তবে

    —তবে কী হতভাগা! আসলে মিমি জানে পিলু ভারি সরল স্বভাবের ছেলে। সে চিঠির কথা বলে দিতে পারে। দাদা তার জন্য চিঠি রেখে গেছে। হাবাটা বোঝেও না, চিঠিতে যা তার দাদা লিখে গেছে তাতে কোনো মেয়ের কপাল পুড়তে পারে। সে পরী মিমি কিংবা মৃন্ময়ী বলেই হয়তো কোনো আঁচ লাগবে না। কিন্তু এ নিয়ে ঢাক পেটানো ঠিক নয়, পিলুর বোধহয় তা জানা নেই।

    পিলু থতমত খেয়ে থেমে গেল।

    পরেশ বলল, তবে কী…!

    —আরে ওর কথা কেন শুনছ!

    পরেশ আর কোনো কথা বলতেই যেন সাহস পেল না। মিমি জানে তার আগুনে পুড়ছে লোকটা। নিজেই আগ বাড়িয়ে তার বাবাকে দিয়ে প্রস্তাব দিয়েছে। এটা ঠিক সব দিক থেকেই পরেশ তার যোগ্য মানুষ—তবু কোথায় যে থেকে যায় নদীর পাড়ে মানুষের হেঁটে যাওয়ার ছবি। সেই ছবির কথা ভাবলেই জীবনের সব মূল্য কোনো শিউলিতলায় ঝরা ফুলের মতো বাসি হয়ে যায়।

    পরেশ কাকে যেন ফোনে কী বলল। কোণায় গোল মতো ছোট্ট টেবিলের উপর বাহারি ফোন। ঝালরের ঢাকনা টেবিলে। এবং ঘরের মধ্যে বিলাসের উপকরণ। একজন বাঙালী সাহেব হতে গেলে যা যা দরকার কোনো কিছুর খামতি নেই। বিশাল কাচের আলমারি। থরে থরে কাচের দামি রকমারি গ্লাস সাজানো। পাশে পরেশের নিজস্ব ছোট্ট সেলার। পিলু হাঁ হয়ে দেখছে।

    পরেশ ফোন করে দিয়ে এসে মিমির সামনে বসল। অসময়ে পরী কেন এসেছে বুঝতে পেরে সেই প্রসন্নতা আর নেই। কলোনির এক উদ্ভ্রান্ত রাগী ছোকরার জন্য তাকে ফোন করতে হচ্ছে ভেবে কিঞ্চিত বিরস মুখ। বলল, এক্ষুনি খবর পাবে। কী খাবে বল।

    —কিছু না। এক গ্লাস জল দাও। ঠান্ডা না। তুমি তো জান ঠান্ডা জল আমি খাই না। গলা ধরে যায়।

    মিমি বুঝতে পারছে, পরেশ কোনো অধস্তন কর্মচারিকে দায় সঁপে দিয়েছে।

    এখন শুধু ফোনের অপেক্ষা।

    কখন কে রিঙ করবে।

    পরেশ কী বলছে, কিছুই যেন শুনতে পাচ্ছে না।

    যেমন বলছে, গ্রান্ড ওল্ড ম্যান শুনলাম অসুস্থ।

    যেমন বলছে, আজই যেতাম। কাজে আটকে গেলাম।

    মিমি হুঁ হাঁ কিছু বলছে না। শাড়ির আঁচল টেনে দিচ্ছে। পরেশ তাকে দেখলে, আসলে কী দেখে জানে। পুরুষ মানুষের এই ব্যাধিগ্রস্ত চোখকে সে সহ্য করতে পারে না। সে জানে না, এটা কেন হয়। নানা জায়গায় সে ঘোরে। কম পুরুষই আছে তাকে দেখলে স্বাভাবিক থাকতে পারে। বিলুর সঙ্গে এত মিশেও, কেন যে তাকে সে বোঝে না। বিলুর মধ্যে সম্ভ্রমবোধ গভীর এটা সে টের পায়। যতই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করুক— সে জানে, বিলুর কাছে সে সর্বনাশ ছাড়া কিছু নয়।

    বিলু তাকে নিয়ে গোপনে একটা কবিতাও লিখেছিল। এবং সেটা চুরি করেছে। তখন কবিতাটা এতখানি গুরুত্ব পায়নি। সেটাই সে আজ র‍্যাক থেকে বই নামিয়ে খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেছে। বিলুর কবিতায় ছিল, তার প্রতি বিদ্বেষ। অন্তত তখন তাই মনে হয়েছে। আজ কেন যে মনে হল, না সে কবিতার ঠিক যেন অর্থ ধরতে পারেনি। নিরিবিলি কোনো জায়গায়, অথবা বিলুদের বাড়ি যাবার পথে কবিতাটা আর একবার দেখবে।

    বিলু খাতার পাতা ছেঁড়া দেখে বাড়িতে প্রচন্ড নাকি অশান্তি করেছিল। কে ঢোকে আমার ঘরে। কার এত সাহস। সে মায়াকে ডেকে বলেছিল, খাতার পাতাটা কে ছিঁড়ে নিয়েছে জানিস?

    মায়া বলেছে, না।

    পিলুকে বলেছে। একই জবাব।

    সে যে বিলুর অনুপস্থিতিতে তার বাড়িতে এত আপন—পিলু, মায়া, মেসোমশাই, মাসিমা ছাড়া কেউ জানে না। বিলুর ঘরে কিংবা যে কোনো ঘরে সে শুয়ে বসে থাকতে পারে। ঘুমিয়ে থাকতে পারে। বিলুর কবিতার খাতা হাতড়াতে পারে। নতুন কবিতা যা লিখল বিলু, এটা জানার তার এক অপরিসীম আগ্রহ। সে তা জানতে গিয়েই কবিতাটা আবিষ্কার করে ফেলেছিল। আর পড়ে সে বেশ মজা পেয়েছিল। জ্বালা ধরিয়ে দিতে পেরেছে—সে তো এটাই চায়। জ্বলুক। জ্বলে জ্বলে খাক হয়ে যাক। সে গোপনে খাতা থেকে পাতাটা ছিঁড়ে নিয়েছিল।

    সে যে পরেশের সঙ্গে সেজেগুজে সিঁড়ি ধরে নামছিল, তাও সেই এক জ্বালা থেকে। বোঝো জ্বালা কত গভীর। কেন এত লাগল! আমাকে দেখলে ক্ষেপে যাও আর পরেশের সঙ্গে দেখলে হৃৎপিন্ড জ্বলে যায়! কেন! কেন এটা হয়। তুমি বিলু কী মনে কর! রেলের চাকরি, বিলাসপুরে নির্বাসন- এত সোজা! কত সহজে শিস দিতে জানি, কত সহজে একজন পুরুষকে দিয়ে অভিনয়ে মেতে যেতে পারি, দাদু পর্যন্ত মজে গেল দেখে। সিঁড়ি ধরে নামছি। আগুনের মতো জ্বলছি। প্রসাধন কতটা করতে পারি ইচ্ছে করলে, টের পেলে তো। তুমি কে, তোমাকে চিনিই না—অ বিলু-দাদুর সঙ্গে দেখা করবে। বোঝো। আমি তো জানতাম তুমি আসবে। সার্টিফিকেটের নকল সঙ্গে, দাদু নিজে সব করে দিচ্ছেন, রেলের চাকরি পেয়ে উদ্ধার হয়ে যাবে—বোঝো, এক পলকে সব ভন্ডুল। তুমি সহ্য করতে পারলে না। আগুন জ্বলে উঠল মাথায়। পাগল হয়ে গেলে—তোমার পরীর পাখা গজিয়েছে। নেচে নেচে নামছে। উড়ছে। পতঙ্গ হয়ে তুমিও পুড়ে মরলে। তোমার মাথা কত সহজে বিগড়ে দিলাম- আমার কী ভয় বিলু জান না, যদি তুমি হেসে কথা বল, যদি আমার উগ্র প্রসাধন জ্বালা ধরাতে না পরত, পরেশের হাত ধরে নামতে নামতে দেখতাম — তুমি সরে দাঁড়িয়েছ, আমাদের পথ করে দিয়েছ, তবে হয়তো আমি নিজেই তোমার চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকিয়ে দিতাম। রামবিলাসকে বলতাম— একটা রাস্তার কুকুর বাড়িতে ঢুকল কী করে। তাড়াও। তাড়াও!

    কিন্তু না, তুমি ক্ষিপ্ত হয়ে গেলে। নিজেকে সামলাতে পারলে না। চোখে আগুন জ্বলে উঠল। যা-হোক মাথাটা যে গোবর পোরা নয়, সেই আমার সান্ত্বনা। পরেশকে নিয়ে রঙ্গ করছি, তোমাকে বিদ্রুপ-টের পেলে। দিক বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লে। পারলে না। নিজেকে সামলে রাখতে পারলে না। নকল মিষ্টি হাসিতে তোমাকে কী বলতে গেলাম, আর ঠাস করে গালে চড় মারলে—অঃ বিলু এ যে আমার…

    রিঙ বাজছে।

    পরেশ ছুটে গিয়ে ফোন ধরল।

    পিলু মিমি তাকিয়ে আছে।

    মিমি অপেক্ষা করতে পারছে না। সেও ফোনের কাছে চলে গেল।

    পরেশ ফোন নামিয়ে বলল, না কোনো দুর্ঘটনার খবর নেই। কুমারপুরে একজন খুন হয়েছে। আলম নাম। পারিবারিক কলহ।

    মিমির যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।

    সে বলল, আমরা যাচ্ছি। পরে আসব। ম

  • ছয়

    ছয়

    পিলুটা যে কোথায় গেল! মায়া দেখল, বাবা বিড় বিড় করে বকছেন। এই অসময়ে কেউ বাড়ি ছাড়া হলেই যেন দুশ্চিন্তা। মায়া রাস্তায় দৌড়ে গেল।

    বাড়িটাতে লোকজন আসছে যাচ্ছে। দুঃসংবাদ পেয়ে সবাই আসছে। বাবা এতক্ষণ মাকে বোঝ প্রবোধ দিচ্ছিলেন। কিছু ধর্মগ্রন্থ সম্বল। বারান্দায় বসে বাবা মাকে বলছিলেন, ধনবৌ, আমরা সবাই নিমিত্ত মাত্র। দুশ্চিন্তা কর না। তাঁর স্মরণ নাও। তিনিই গতি, তিনিই কর্তা। তিনিই প্রভু তিনিই সব কিছুর সাথী। আশ্রয় বলতেও তিনি। তিনি আমাদের শরণ সুহৃৎ। আবার তিনিই প্রলয়, তোমার আমার উৎপত্তির আধার। লয় কিংবা অবিনাশী বীজ স্বরূপ সেই অনন্ত জিজ্ঞাসার কাছে আমাদের মাথা নোয়ানো ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই। বিচলিত হলে চলবে কেন! সবাই সকাল থেকে উপবাসে আছি। রান্নার আয়োজন কর।

    যেন বাবা মাকে সবার উপবাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সংসারে তাঁর দায় সম্পর্কে সচেতন করে দিতে চাইলেন। পিলু কোথায় গেল আবার। আসব বলে বের হয়ে গেল, ফেরার নাম নেই। তারপরই বিড় বিড় করে কোনো মন্ত্র উচ্চারণ করছিলেন। বাবা নিজেকে অসহায় ভেবে ফেললে, কোন কবচ পাঠ করে থাকেন। এতে তাঁর মধ্যে সাহস সঞ্চয় হয়। সব দুগর্তির প্রতি কিঞ্চিত তিনি অবহেলা দেখাতে পারেন।

    মায়া টের পেয়েছিল, ছোড়দা ফিরে না আসায় বাবার এই দুশ্চিন্তা। এখন যেন বাড়ি থেকে কারো বের হয়ে যাওয়া ঠিক না। ছোড়দাটাও বড় অবুঝ। দেখছিস বাড়িতে কী বিপত্তি—তার মধ্যে না বলে না কয়ে কোথায় চলে গেলি। আসছি বলে গেছিস, এখনও ফেরার নাম নেই। মায়া রাস্তায় ছুটে গিয়ে দেখল, যদি দাদা ফিরে আসে। বড় সড়ক থেকে মাঠ ভাঙতে হয়। কিংবা নিমতলার দিকে যদি যায়। সে চারপাশে দাদাকে খোঁজার সময়ই দেখল—পরীদি আসছে। আর পরীদির পেছনে ছোড়দা সাইকেল চালিয়ে আসছে। ছোড়দা তবে পরীদিকেই খবর দিতে গেছিল।

    সে দৌড়ে এসে বলল, বাবা, পরীদি আসছে।

    খবরটাতে বাবা ভারি বিব্রতবোধ করলেন।

    বাবা বললেন, পিলু ওর চিঠিটা যে কোথায় রেখে গেল। যেন তিনি ভাবলেন, পরী যদি এসে টের পেয়ে যায় তারই জন্য বিলু চলে গেছে, তবে আর এক কেলেঙ্কারি। মেয়েটাই বা কী ভাববে। এমন অপরিণামদর্শী পুত্র যে চিঠি পর্যন্ত রেখে গেছে। এত কথা লেখার কী দরকার ছিল। পরী তো এসেই বিলুর ঘরে ঢুকে যাবে। নিজের মধ্যে তিনি পুত্রের দায় নিয়ে কিছুটা বিচলিতই হয়ে পড়েছেন।

    তাড়াতাড়ি বিলুর ঘরে ঢুকে গেলেন। চিঠিটা যদি এখানে সেখানে পিলু গুঁজে রাখে। আর পরী তো এসে সব খোঁজাখুঁজি করতেই পারে। কারণ বিলু কখন বাড়ি থাকবে না, কোথায় যাবে আগে থেকেই পরী জানতে পারে। সেই বিলু নিখোঁজ। কোনো চিঠিপত্র যদি রেখে যায়।

    পরীদি আসছে শুনলে বাবা রাস্তা পর্যন্ত ছুটে যেতেন।

    —পরী আসছে। কোথায় রাস্তায় গিয়ে বলতেন, মা অন্নপূর্ণা আবার আজ গরীবের ঘরে এলেন।

    বাবার এমন উক্তি একবার পিলু প্রকাশ করতেই বিলু চটে লাল। মা অন্নপূর্ণা! তা হলেই হয়েছে।

    সেই বাবা ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। মায়া উঁকি দিয়ে দেখল, বাবা দাদার বই হাঁটকাচ্ছেন, ছোড়দার খাতা বই খুঁজছেন। এবং প্রচন্ড ঘামছেন। দাদার তোষক তুলে দেখছেন। তক্তপোষের ধারে উঁকি দিয়ে খুঁজছেন। জানালার জাফরি আরও তুলে দিয়ে ঘরের অবস্থা লন্ডভন্ড করে ফেলছেন। একপ্রস্থ ছোড়দা করে গেছে, শেষ প্রস্থ বাবা করছেন। মায়া ভাবছে সব তাকে গোছগাছ করতে হবে—রেগে কাঁই। পরীদি উঠোনে ঢুকেই বলল, এই মায়া, মাসিমা কোথায়

    —মা ঘরে শুয়ে আছে।

    —মেসোমশাই।

    –দাদার ঘরে।

    মিমি পিলুকে বলল, সাইকেলটা রাখ ঘরে। সে শাড়ি গাছ কোমর করে বাঁধল –-তারপর ছুটে দাদার ঘরে ঢুকে অবাক—মেসোমশাই ঘরের সব কিছু টেনে নামিয়েছেন। মুখে ঝুলকালি। ফতুয়ায় ঝুলকালি। ঘেমে নেয়ে গেছেন। বিধ্বস্ত সব কিছুর মধ্যে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন।

    ঘরে ঢুকেই পরীর মনে হল পুত্রশোকে যেন পাগল মানুষটা। অন্তত দেখলে তাই মনে হয়। পরীর কথায় হুঁস ফিরতেই তিনি ফের তক্তপোষের নিচে ঢুকে কী সব টেনে আনতে থাকলেন।

    —কী খুঁজছেন। আমাকে বলুন। কী অবস্থা করেছেন।

    পরী দেখছে মেসোমশায়ের মাথাটাও ঝুলকালিতে লেপ্টে আছে। মাথায় ঘাস পাতার মতো কী সব জড়িয়ে আছে। আসলে আগে এই ঘরে পরী দেখেছে গরুর ঘাস কেটে রাখা হত। বিলুদের তখন দু’টো ঘর সম্বল। একটা মাটির দেয়ালের, আর বিলুর ঘরটায় পাটকাঠির বেড়া। চারপাশে আম, জাম, গাছ, লিচু গাছের কলম, পেঁপে গাছ কলা গাছ, যেমন প্রথম দিকে কলোনির ঘর বাড়ি হয়ে থাকে—সেই মেসোমশাই ধীরে ধীরে কীভাবে নিজের শেকড় বাকড় চালিয়ে দিলেন, বিলুটা বুঝল না। এত অবুঝ কখনও হলে চলে।

    কিন্তু তিনি পরীকে দেখে আদৌ খুশি হননি।

    —এই বুঝলে, পিলু এসেছে! কখন বের হয়ে গেল! ফেরার নাম নেই।

    পরী মেসোমশাইয়ের কাঁচা পাকা চুল থেকে আম পাতা তুলে বলছিল, পিলু ফিরেছে। কী খুঁজছেন বলুন না। আমি দেখছি। তারপরই ডাকল, এই পিলু, পিলু। শোনতো, মেসোমশাই কী খুঁজছেন দ্যাখতো। খুঁজে পাস কিনা দ্যাখতো।

    পিলু ঘরে ঢুকে বাবার অবস্থা দেখে হতভম্ভ। সে জানে বাবা কী খুঁজছেন! পরীদিকে বলল, দাদার চিঠিটা খুঁজছেন।

    বাবা হঠাৎ রেগে গিয়ে বললেন, দাদার চিঠি দিয়ে কী তোমরা আমার আদ্যশ্রাদ্ধ করবে, যে সেটা ঠিক ঠাক আমাকে রেখে যেতে হবে!

    পরী কখনও মানুষটিকে এত উতলা হতে দেখেনি। এমন কী রাগতেও দেখেনি। চিঠিটা তবে তাঁর খুবই জরুরী। শত হলেও পুত্রের চিঠি। তাঁর অধিকার বেশি, পরী যেন ভাবতে পারছিল না। সে ব্যাগ থেকে চিঠিটা বের করে বলল, এটা খুঁজছেন। আমার কাছে ছিল।

    —তোমার কাছে!

    পিলু পড়ে গেছে বিপদে। সেই চিঠিটা দাদার, নিয়ে গিয়ে দিয়ে এসেছে। এখনও বাবা ঠিক বুঝতে পারছেন না—পরীদির হাতে চিঠিটা গেল কী করে!

    কেমন অবুঝ শিশুর মতো পরীর দিকে তাকিয়ে থাকল মানুষটা—ছি! ছি! মিমি কী না জানি ভাবল তাঁর পুত্রের সম্পর্কে। কত বড় আশা ছিল বড় পুত্রকে নিয়ে। সেই পুত্র, পিন্ডদানের অধিকারী যিনি, যিনি তাঁর পারলৌকিক কাজের প্রথম অধিকারের দায় বহন করছেন—তিনি কিনা একটি নিষ্পাপ মেয়ের উপর কলঙ্ক চাপিয়ে উধাও। –এত অমানুষ তুমি! মাথায় তোমার পোকা ঢুকে গেছে। পোকার কামড়ে যা খুশি আচরণ করতে পার—তা তোমার ব্যক্তিগত অভিরুচি, তাই বলে একটি নির্দোষ মেয়েকে তোমার নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে জড়াতে গেলে! তুমি তোমার মা বাবার মর্যাদার কথা ভাবলে না, মেয়েটির পারিবারিক মর্যাদার কথা তোমার মাথায় এল না। গায়ে হাত তুলেই ক্ষান্ত হলে না, তার মাথায় কলঙ্কের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে গেলে। তুমি মানুষ! তুমি আমার পুত্র। কেন তুমি চলে গেছ, তার ব্যাখ্যা—পরীর জন্য চলে গেছ! ফ্যামিলি ট্যুর প্যাকেজ

    পরী বললে, বসে থাকলেন কেন। উঠুন।

    পিলু উঠোন থেকেই সব লক্ষ্য করছে। কাছে যাওয়া ঠিক না। কারণ হাতে-নাতে ধরা পড়ে গেছে বাবা, তারই জন্য। চিঠিটা আসলে বাবা গায়েব করে দিতে চেয়েছিলেন—সেটা প্রকাশ্য দিবালোকের মতো সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। বাবার মাথা ঠিক থাকতে নাই পারে। বাবাকে তো জানে, বড় অপকর্ম করেও দেখেছে, বাবার হাসি মুখ। যা হবার হয়ে গেছে—তাঁরই ইচ্ছে। হাত পা ধুয়ে পড়তে বসগে। আবার সামান্য খুঁত টের পেয়ে বাবা অগ্নিশর্মা। চিঠিটা নিয়ে বাবার এই এত জলে পড়ে যাওয়া কেন সে বোঝে না।

    পরী হাত টেনে বলল, ইস কী করেছেন—এই মায়া, একটা গামছা নিয়ে আয়। চিঠিটা নিয়ে বসে থাকলেন কেন, দিন আমি রেখে দিচ্ছি। কোথায় রাখব বলুন।

    পিলু দেখছে বাবা কেমন নিথর হয়ে গেছেন। বাবা তো এত ভেঙ্গে পড়েন না। দাদার কষ্টে, না চিঠিটা জানাজানি হয়ে গেল সেই কছে। পরীর মাথায় কলঙ্ক চাপিয়ে গেছে তাঁর সু-পুত্র।

    পরী আবার বলল, উঠুন মেসোমশাই। সকাল থেকে আপনারা কেউ কিছু খাননি। বিলু ভালই আছে। আমি সব খবর নিয়েছি। ওর জন্য ভাববেন না। কলকাতায় ওর চেনা জানা বন্ধু আছে। আমাদের অপরূপা কাগজে তাঁরা লিখতেন। এখানকার কবিতা পাঠের আসরে তাঁরা এসেছেন। সঙ্গে তো টাকা পয়সা নিয়েছে। কলকাতায় একটা পেট যে কোনো লোক চালিয়ে নিতে পারে। ও তো লেখাপড়া জানা ছেলে। আপনি এত ভেঙ্গে পড়ছেন কেন। উঠুন।

    পিলু দেখল, বাবা বের হয়ে গেলেন ঠিক, তবে তাঁর ভেতর আগের মানুষটা যেন নেই। মহা অপরাধ করেছেন এমন ভাব চোখে মুখে। এসে তিনি বারান্দায় বসলেন।

    পরীদি জানে বাবাকে কী করে তুষ্ট করতে হয়। সেও জানে, মায়াও জানে। পরীদি নিজেই নারকেলের ছোবড়া ছিঁড়ে হাতে দ্রুত ঘষে একটি পিন্ড বানিয়ে ফেলল। আগুন দিল সেই পিন্ডস্থানে। তা কলকেয় রেখে ফুঁ দিতে দিতে বাবার দিকে এগিয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে বলল, মেসোমশাই, তামাক

    বাবা কেবল দেখছেন পরীদিকে।

    পরীদি খুবই দ্রুত কাজ করছে। মা’র কাছে গিয়ে বলল, মাসিমা উঠুন। বিলু ভালই থাকবে। বাবাকে যা যা বলেছে, মাকেও তাই বলল। তারপর পরেশবাবুর কাছে গিয়ে যে খোঁজখবর নিয়েছে তাও জানাল।

    মায়া আর পরীদি যেন এখন বাড়িটায় সব। তারাই কোথায় কী আছে টেনে বের করছে। নবমী বুড়ি বলছে, আমায় দিনগো কাটাকুটির কাজটা সেরে ফেলি।

    পরীদি ডাকছে, এই পিলু, রান্নাঘরে দু-বালতি জল দে। তারপর যা গরুগুলি মাঠে দিয়ে আয়।

    বাবা বসে বসে তামাক টানছেন। কোনো বিষয়ে যেন তাঁর আর আগ্রহ নেই। চাকরি ছেড়ে গেল, কোথায় গিয়ে উঠবে জানিয়ে গেল না, একটি নিষ্পাপ মেয়েকে জড়িয়ে দিয়ে গেল। এত সব অপকর্ম বাবার মতো মানুষের পক্ষে যে খুবই দুঃসহ পিলু বোঝে। পরীও মানুষটাকে দেখে দেখে ধাত বুঝে গেছে।

    এখন যে কোনো প্রকারে মানুষটাকে ঠেলেঠুলে ঠাকুর ঘরে পাঠাতে হবে। আর মাসিমাকে তুলে চানটান করিয়ে কিছু মুখে দেবার ব্যবস্থা করতে হবে।

    পরী বলল, এই মায়া, রান্নাঘরে কাঠগুলো রেখে আয়। পরী এ-সব পারে। কারণ পরী ক্যাম্প করতে গিয়ে নানাভাবে নিজের মধ্যে মানিয়ে নেওয়ার এবং পার্টি করতে গিয়ে নানা জায়গায় যথেষ্ট অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও বেশ আনন্দের সঙ্গেই রাত্রি দিন উজাড় করে দিতে পারার স্বভাব কবে থেকে যেন গড়ে তুলেছিল। সুহাসদা মহেশ নাটকে অভিনয়ের ব্যাপারে তাকে হঠাৎ কেন যে বলল, তোমার অসুবিধা হবে। আসলে মনে হয় দাদুই তাকে ফোনে সব জানিয়ে দিয়েছিল। সুহাসদা সেই ছোটবেলা থেকে তাকে জানে। সুধীনদা জানে, শহরের এই মেয়েটি কিছুটা পাগলা আছে। এটা যদি পাগলামি হয় হবে। তার কিছু করার নেই। তার হাতে এখন কত কাজ।

    পরীদি এক ফাঁকে এসে বলল, মেসোমশাই, চিঠিটা কোথায় রাখব।

    বাবা বললেন, রেখে দাও, তোমার কাছেই রেখে দাও। পিলুকে দিতে যেও না। ওর তো কত বান্ধব! সে কী বোঝে কিসে কী হয়!

    পিলুর মনে হল, যাক তবু যে বাবা কথা বলেছেন। বাবাকে সে জীবনেও অমন চুপচাপ হয়ে যেতে দেখেনি। একটা চিঠি সামান্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় বাবা এ-ভাবে আতান্তরে পড়ে যেতে পারেন এই প্রথম টের পেল। তার খুবই আতঙ্ক – যে বাবাকে সে দেখে গেছিল, ফিরে এসে যেন অন্য বাবাকে দেখছে। বাবা কথা বলায় কেমন কিছুটা হালকা হতে পেরেছে। চিঠিটা পরীদিই রেখে দিল। আসলে বাবা বোধহয় বুঝেছে, চিঠিটা দাদা বাবাকে লিখে যায়নি, তাকেও না—লিখে গেছে পরীদির কথা ভেবেই। পরীদি না থাকলে হয়তো দাদা চিঠিটা লিখে যাওয়ার প্রয়োজনও বোধ করত না।

    এতে তার দাদার উপর ফের কেন যে অভিমান হল সে বুঝতে পারছে না।

    মায়া কাঠ কুটো রান্নাঘরে নিয়ে রাখছে। পরীদি টিন থেকে মুড়ি বাতাসা বের করল। দুধ গরম করে থালায় ঠান্ডা হতে দিল। বাবাকে, মাকে, মায়াকে খেয়ে নিতে বলল, কিন্তু বাবা ঠাকুর-সেবা না করে জল গ্রহণ করেন না। পরীদি যে জানে না তা নয়। তবে আজ হয়তো পরীদির মধ্যেও কিছু গোলমাল সৃষ্টি হয়েছে।

    বাবা বললেন, আমার তো পূজা আছে মা। তুমি নিয়ে যাও।

    —একটু খেলে কিছু হবে না।

    —না না।

    —তবে তাড়াতাড়ি যান।

    কারণ শুধু তারা কেন, পরীদিও জানে বাবা আজ ঠাকুর ঘরে ঢুকলে কখন বের হবেন কেউ বলতে পারবে না। যদি একশ একটা তুলসীপাতা নারায়ণ শিলার মাথায় চাপান — তবে দুপুর পার করে দেবেন। আর যদি মনে মনে সহস্র তুলসী স্থির করে থাকেন তবে তো হয়েই গেল। বেলা পড়ে যাবে—বাবা পদ্মাসনে বসে থাকবেন। আর উৎসর্গ করবেন সহস্র তুলসীপাতা। জীবনের অজস্র বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাবার এই উপায় বাবার জানা আছে বলেই তিনি এই বনজঙ্গলের মধ্যে ঘরবাড়ি বানিয়ে নিরুপদ্রবে বসবাস করতে পেরেছেন।

    পিলু লাফিয়ে লাফিয়ে কাজ করছে। দু-বালতি জল রান্নাঘরে রেখে দিল। সে গোয়াল থেকে গরু বের করে মাঠে দিয়ে এল। বাবা কিছুদিন থেকে বাড়ির কাজের লোক খুঁজছিলেন। নিরাপদদাকে রাখার কথা হয়েছিল। কিন্তু মা’র পছন্দ না। মাথায় গোলমাল আছে। কিন্তু তার খুবই পছন্দ নিরাপদদাকে। বাবারও।

    বাবার এক কথা, কার মাথায় গন্ডগোল নেই ধনবৌ। সবাই গোলমালে ভুগছে। গোলমালেই সংসার। গোলমালেই জন্ম মৃত্যু। গোলমালে পড়ে গিয়ে বিশ্ব ব্রহ্মান্ড ঘুরছে বোঁ বোঁ করে। কে কার মাথার দিব্যি দিয়েছিল বল, বোঁ বোঁ করে ঘুরতে। এমন ঘোরা শুরু হয়েছে তেনার কবে থামতে পারবেন জানেন না। থামলেই প্রলয়।

    মা-র এক কথা, এই শুরু হল।

    বাবা খুবই কাতর গলায় বলেছিলেন, নারে, নিরাপদ, বাড়ির দেবী তোর প্রতি তুষ্ট হতে পারছেন না।

    নিরাপদদাও ছাড়বার পাত্র না।

    তারও এক কথা।

    —কর্তা রাখেন, রেখে দেখেন। আমি বলরামবাবুর বাগানে ছিলাম। মাঠে পড়ে থাকতাম। কর্তা একটাই মহা-অপরাধ। ভাত বেশি খাই বলে ছাড়িয়ে দিল।

    —তুমি ভাত বেশি খাও বলে ছাড়িয়ে দিয়েছে, না রাতে এর ওর বাড়ি ঢিল মেরে বেড়াও বলে তাড়িয়ে দিয়েছে।

    ধরা পড়ে নিরাপদদা মা’র দিকে আর তাকাতে পারল না। তার এই একটা ব্যামো আছে। রাত হলেই, তার মাথায় পোকা ঢুকে যায়। কে কখন অপমান করে মনে রাখে। একবার বাবুদের কাঁসার থালা হারাল বলে গাছপেটা করল। বগি থালাটা সে নিয়েছিল ঠিক তবে তাকে ধরতে পারেনি। বাজারের মুকন্দ হালদার মশাই ওজনে মেরেছে—তাতেও কষ্ট ছিল না। পয়সা কম দিয়েছে তাতেও কষ্ট ছিল না। কিন্তু সে পাউরুটি চা খেয়ে দোকানে সব টাকা ফুটিয়ে দিতেই মনে হল—আরে আরও ক’দিন পাউরুটি চা খেতে পারত। সে বিড়ি খায় না, ভাত খায় না, নেশা নেই—একটাই নেশা, সকাল হলে বাদশাহী সড়কে বসে সকালের দিকে এক কাপ চা আর কোয়াটার পাউন্ড পাউরুটি। চা-এ পাউরুটি ভিজিয়ে খাবার নেশাটাই যত নষ্টের গোড়া। সে তখনই টের পেল মুকুন্দ হালদার তাকে ঠকিয়েছে। ঠকিয়েছে বলে, এমন প্রিয় খাওয়া থেকে নিরস্ত হতে হল আচমকা। চোর ছ্যাঁচোড় মুকুন্দ হালদারের কাছে গিয়ে চোটপাট।

    —মাপেন থালাখানি আবার মাপেন!

    —কিসের থালা?

    —ক্যান যে বগি থালাখান দেলাম।

    —দেলাম। শুয়ার তুই আমারে থালা দিয়েছিস!

    —দেলাম না। ওজনে মারলেন।

    —পেলি কোথায় থালা। বল কোথায় পেলি।

    —সে দিয়া কাম কি।

    মুকুন্দ আর নিরাপদ লড়ালড়ি।

    মুকুন্দ তাকে বলে, চোর।

    সে মুকুন্দকে বলে, চোর।

    বাবুমশাই জানতে পেরে বলেন, এই মুকুন্দ, দেখি থালাখানা।

    মুকুন্দ বাবুমশাইকে ভয় পায়। সে নিয়ে দেখাল।

    আরে এটাতো সেই থালা।

    ধর ধর।

    নিরাপদ দৌড়ায়, বাবুমশাইয়ের চাকর-বাকর দৌড়ায় এবং তাকে ধরে ফেলে গাছপেটা করলে, এক কথা তার, মারেন, যত খুশি মারেন। আমার দোষ নাই। ভূত ছাইড়া দিলে মজা বোজবেন! খুদা পাইলে কার দোষ। আমার। কার খিদা পায় না কন।

    সেই ভূত নিরাপদ নিজে। গভীর রাতে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে যায়। আর ইট পাথর কুড়িয়ে বাবুমশাইয়ের বাড়ির ছাদে ঢিল। টিনের ঘরে ঢিল—বন বন। ঝন ঝন। ধবাস। সে চরকি বাজির মতো দু-হাতে এত দ্রুত ঢিল ছোঁড়ে যে বাড়ির মানুষজন ভাবে, ভূতের কাণ্ড—নিরাপদ ভূত ছেড়ে দিয়েছে— হলে কী হবে, একবার ধরা পড়ে যেতেই তার এই যাদুবিদ্যাটা অকাজের হয়ে গেল। জানাজানি হয়ে গেল, নিরাপদের কাজ।

    নিরাপদদা ওঠার সময় বলে গেছে, ঠাইনদি কথা দিতে পারি, কর্তার হুকুম ছাড়া নড়ানড়ি করমু না। জান দিয়া কাজ করমু। দুই বেলা দুইডা বেশি ভাত দিয়েন, দু’মাসে ন’মাসে একখানা গামছা। বছরে একখানা কাপড়। টাকা পয়সা মনে যা লয় দিবেন। সক্কাল বেলায় ছাইড়া দিবেন, চা-পাউরুটি খাইলে সারাদিন আপনার বান্দা হইয়া থাকুম।

    মা কিছুতেই রাজি হয়নি।

    নিরাপদদা, দাদা নেই খবর পেয়ে এসে গেছিল। গরুগুলি মাঠে দিতে গেলে বলল, যান পিলুদা বাড়ি যান। বাড়িতে কর্তার কত বড় বিপদ। কানে গেল আর ছুইটা আইলাম। ঘাস কাইটা নিয়া যামুনে। কর্তার বাড়িতে দুইডা যেন অন্ন পাই। বিলুদার নাকি মস্তিষ্ক বিকৃতি হইছে। পালাইছে।

    —কে বলেছে মস্তিষ্ক বিকৃত হয়েছে। নিরাপদদা, যা জান না বলবে না।

    —না হলে পালায়! কেউ পালায় কখন। আমি পালাই সক্কালবেলায়, এই গাছপালা বন জঙ্গল, বাদশাহী সড়কে হাঁটা, বেড়ান, বুঝবেন মজাটা! জোৎস্না রাতে বালির ঘাটে গেলে ফিরতে ইসছা হয় না। মারুক ধরুক, আমাকে লোকজনে চেনে। এডা কম কথা—আমি নিরাপদ, যে যার মতো মনে লইয়ে ভাবে—চোর—পাগল, ছাগল কী না কয় আমারে কন। আমি পালাই পালাইতে পারি! নিজের রাজত্বি ছাইড়া কেউ পালায়।

    সেই নিরাপদদা এসে হাজির। এক বোঝা ঘাস মাথায়। বাবা বারান্দায় বসেছিলেন। উঠোনে এসে ঘাসের বোঝাটা ফেলে সটান মাটিতে সোজা হয়ে গেল।

    পরী মায়ার দিকে তাকালে, মায়া মাথায় আঙুল ঠেকিয়ে দেখাল। মাথার গোলমাল আছে।

    বাবা বললেন, ঘাস নিয়ে এলি নিরাপদ।

    —হ কর্তা। ঘাস। বিলুদা চইলা গ্যাছে বইলা মনে কষ্ট। আপনের মনে কষ্ট। পিলুদা একলা পারব ক্যান। এক বোঝা ঘাস নিয়া আইলাম, দ্বিপ্রহরের অন্নভোজন—যদি কৃপা করেন।

    পরী দেখল, লোকটা পরেছে খোট। খালি গা। মাথা ন্যাড়া। মাথায় খুসকি। থুতনিতে দাড়ি। চোখ কোটরাগত।

    মাথার দিকে তাকাতেই পরীকেও প্রণিপাত করে ফেলল। নিরাপদ পরীকে ভাল চেনে। একবার সে পরীদিকেও গাছের আড়াল থেকে ঢিল মেরেছিল—পরীদি বলল, তুমি পঞ্চাননতলায় থাক না।

    —আজ্ঞে হ্যাঁ। বলে দু-দন্তপাটি বিকশিত হাসি।—আপনে আমারে মনে রেখেছেন দ্যাখছি।

    পরীর কেমন মায়া ধরে যায়।

    পরী বলল, থাক। খাবে। গোয়াল পরিষ্কার করতে পারবে?

    —হ্যাঁ

    —যাও। দেখে শুনে হাত লাগাও।

    পিলু দেখল, একবার কাউকে জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করল না পরীদি। পরীদির কথায় বাবা খুবই তুষ্ট হয়েছেন। মেয়েটার মধ্যে মানুষের জন্য মায়া মমতা আছে। তার দ্বিতীয় পুত্রটির মতোই।

    নবমী নিজেই বঁটি নিয়ে এল। লাউ-এর মাচান থেকে নরম ডগা কেটে আনল। মাচানের নিচে বসে কচি লাউ হাত দিয়ে দেখল। ভারি মজা লাগে দেখতে। কিন্তু লাউ কেটে হাতে নিয়ে যাবার তাগদ নেই। দা-ঠাকুর এসে হাজির। তুমি পারবে! বলতে পার না। পিলু লাউ কেটে নিয়ে এল। জমি থেকে বেগুন তুলে এনে পরীদিকে দিল।

    এবং পরীদি তখন বলল, মায়া, মাসিমার একটা শাড়ি বের করে দেতো।

    মায়া মাকে কিছু বলল না। কারণ সে জানে সামান্য দামের শাড়ি-ব্লাউজ পরীদি পরলে মা খুশি হবে।

    আসলে কে জানে কোথায় থাকে মানুষের অবলম্বন। পরী এসে বাড়িটার হাল ধরায় সবার মধ্যেই আবার স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে। বাবা বললেন, মায়া, তেল দে। চানে যাই। ভেবে আর কী করব!

    মা-ও বলল, তুমি পারবে না পরী। তোমার অভ্যাস নেই। আমি যাচ্ছি।

    ক্রমে সব কেমন সচল হয়ে উঠছে সংসারে ফের। পরীদি তবু পুকুর থেকে চান করে এল। আসার সময় হাতে করে এক বালতি জলও নিয়ে এসেছে।

    নবমী লাউ কেটে দিল ডুমো ডুমো করে। মুগের ডালে লাউ, বেগুন ভাজা, পিলু গিমাশাক তুলে এনেছে। নিমাশাক ভাজা। তেঁতুল দিয়ে লাউ-এর চাটনি। কচু, ডাটা আলু আর লাউ-এর ডগা দিয়ে তরকারি।

    বাবা ঠাকুরঘরে ঢুকে গেছেন। আর আশ্চর্য বাবা নিত্য পূজার মতোই সময় নিলেন। একশ একটা তুলসী দিলে ঠাকুরকে এত তাড়াতাড়ি কখনও বের হতে পারতেন না। তিনি বের হয়ে এসে হাতে প্রসাদ দেবার সময় দেখলেন, পরী বারান্দায় আসন পেতে দিচ্ছে। জলের গ্লাস সাজিয়ে দিচ্ছে। থালায় ভাত বেড়ে দিচ্ছে। এমন কি মাসিমাকেও বলছে, আপনি বসে পড়ুন। আমি দিচ্ছি। নবমীকে বলছে, তোমার পাথরের থালা বের করে বসে পড়। নিরাপদকে ডেকে আনার জন্য পিলকে পাঠাল। কোথায় গিয়ে বসে আছে কে জানে।

    পিলু ডাকছে, ও নিরাপদদা, কোথায় গিয়ে বসে থাকলে!

    নিরাপদ অন্ন ফেলে বসে থাকার লোক না! কোথায় গেল! কেউ তাকে যদি আটকে রাখে। রাখতেই পারে। কোথায় কী অপকৰ্ম্ম করে বেড়ায়, নিরাপদকে দেখলে, লোকজন অনেক সময় দূর দিয়ে হাঁটে। কারণ—পাগল, ছাগল মানুষ, বেধড়ক মার খেলেও মাথা গরম করে না। উ আ করে না। কেবল হাসে। ঘটি বাটি বাইরে রাখা দায়। গাছের ফল রাতে চুরি করার অভ্যাস। কোন টানে পড়ে গেছে কে জানে!

    পরী বলল, পিলুকেও ডাক। বসে যেতে বল। নিরাপদ এলে, ওকে দিয়ে আমি বসে পড়ব।

    পিলু এসে বলল, আসছেন।

    আসলে নিরাপদর এত দেরি হবার কারণ এতক্ষণে টের পেল পরী। একটাই খোট। চান করেছে, খোটের একটা দিক ধরে বাতাসে শুকিয়েছে। শুকনো দিকটা পরে ভিজা দিকটা শুকিয়েছে। সে দেখেছিল, পুকুরের অন্য ঘাটে সে স্নান করছে। পুকুর না বলে দীঘিই বলা ভাল। সে মায়া পিলু একসঙ্গে সাঁতার কেটেছে। ডুব দিয়েছে। বাড়ি থেকে নেমে একটা জমি পার হয়ে দীঘিটা। এখনও এদিকটায় বাড়িঘর হয়নি। জঙ্গল আছে। পায়ে হাঁটা সরু পথ। শুধু এ-পাড়ার মানুষজনই পুকুরটা ব্যবহার করে। বেশ গভীর এবং কালো জল, এর পাড় দিয়ে পরী পিলুর সঙ্গে একবার বড় সড়কে উঠে গেছিল—কেন যে মনে হয়েছিল, কোনো দিন সুযোগ পেলে দু’জনে এই ঠাণ্ডা জলে অবগাহন করবে।

    আজ করেছে ঠিক, তবে বিলু ছিল না। পিলু ছিল আর মায়া ছিল। তখন কিন্তু ও-পাড়ের ঘাটে কাউকে প্রথমে দেখেনি। পরে দেখতে পেয়েছে। তেল মাখার জন্য নিরাপদ হাতে তেল নিয়েছে। হাতে পায়ে চপ চপ করছে তেলে। যখন নিরাপদ ফিরে এল, হাতে একটা লাঠি। এক হাতে দা, যেন স্নান টান সেরে পবিত্র হয়ে সে বান্দর লড়ির মূল তুলে এনেছে। কেন এনেছে জানে না। এ জন্যও দেরি হতে পারে।

    নিরাপদ লাঠিটা ঠাকুরঘরের বারান্দার চালে গুঁজে রেখে খেতে বসল। পরী আর মায়া পরিবেশন করছে। দুটো বড় কলাপাতা কেটে নিরাপদ অন্ন রাখার জায়গা বড় করে নিয়েছে। ওর পাতা বিছানো দেখেই পরী বুঝেছে, প্রথমেই অনেকটা ভাত দিতে হবে। না হলে ত্রাসে পড়ে যাবে। কতটা খেলে পেট ভরে সে বোধ হয় ভাল জানে না। নিরাপদ ভাত সাজিয়ে বলল, কাচা লংকা নাই ঠাইরেন?

    তারপর নিরাপদ কী ভেবে নিজেই উঠে গেল। গেরস্থরা কোন জমিতে কী লাগিয়েছে, চোখে চোখে রাখার স্বভাব। রান্নাঘরের পেছনে দুটো বারোমেসে লঙ্কা গাছ আছে এ-বাড়িতে সে তারও খবর রাখে। গোটা ছয়েক কালো ধানি লঙ্কা পাতের কিনারে বোঁটা সহ সাজিয়ে রাখল। পাশে নুন দিল মায়া। তার খাওয়ার প্রতি যত্নআত্তি দেখে পরী কেমন মুহ্যমান হয়ে যাচ্ছে। এত যত্ন করে কেউ খায়! খাবার আগে কিছু অন্ন হাতে নিয়ে কপালে ঠেকাল। কিছুটা খেল। উঠোনে সে খেতে বসেছে। কাক শালিক উড়ছে, ঘুরছে। সে কিছুটা অন্ন কাক শালিখের নামে পাতের কিনারে বোধ হয় রেখে দিচ্ছে।

    বাবা বলছেন, পরী, তোমরাও এবার বসে পড়। নিরাপদর দিকে তাকিয়ে বললেন, পেট ভরে খাস। পরী না এলে দুপুরের খাওয়া আজ জুটত না। আমরাও তোর মতো নিরাপদ হয়ে থাকতাম। নবমী বসেছে, তার চালা ঘরটায়। দাঁত নেই। মাড়ি দিয়ে চিবিয়ে খায়। খুবই সময় লাগে। তার পাথরের থালার পাশে পরী সব সাজিয়ে দিয়েছে। খুবই স্বপ্নাহারী নবমী সে জানে।

    পিলু দেখল, বাবা যেন কী খুঁজছেন।

    আসলে বাড়িতে আজ বাবার প্রায় ছোটখাটো ভোজ। গরুর দুধের সামান্য পায়েসও করেছে পরীদি। পরীদি কত দ্রুত কাজ করতে পারে। কে বলবে, পরীদি তাদের কেউ হয় না।

    বাবা পিলুর দিকে তাকিয়ে আছেন। তার পাশে সামান্য ফাঁকা জায়গা রয়েছে। বাবার কাছে এই ফাঁকা জায়গাটা কেন এত আগ্রহ তৈরী করছে সে বুঝতে পারছে না। তার দিকে তাকিয়েই বাবা চোখ নামিয়ে আনছেন ফাঁকা জায়গাটায়। যেন এখানে বসে আজ কারো অন্নগ্রহণ করার কথা ছিল। সে অন্নগ্রহণ করেনি। কোথাও সে চলে গেছে। আর পাশে রান্নাঘরের দরজায় পরীদি। পরীদিও বাবার এই অন্যমনস্ক চোখ দেখে কিছু টের পেয়েছে। একজন মানুষের মধ্যে কোথাও যে হাহাকার রয়েছে— পরী টের পেতেই রান্নাঘরের ভিতরে ঢুকে গেল। আর দেখল বাবা মাথা নীচু করে খাচ্ছেন। বাবা তো সোজা হয়ে খান। কখনও মুখ আড়াল করে খান না। বাবা কী দাদা এই ভোজে নেই বলে, ভেঙ্গে পড়েছেন। কাঁদছেন!

    নিরাপদদা হঠাৎ বাবার দিকে পলকে তাকিয়ে কী বুঝল কে জানে। কারণ সে উঠোনে খেতে বসেছে। উঁচু বারান্দায় বাবা। উঠোন থেকে তাদের চেয়ে বাবার মুখ নিরাপদর কাছে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। সে বলল, কর্তা নিজে পেট ভইরা খান। শোকতাপ কইরা কী করবেন। কপাল। আপনের মনোকষ্টের কথা জাইনা নিরাপদ আইজ যা করল! বলেই সে বারান্দার চালা থেকে বাঁ- হাতে লাঠি বের করে দেখাল।—এই যে লাঠিখান দ্যাখছেন, এটার গুণ অনেক। লাঠি চালান দিলাম। মাথার উপরে আকাশ, নিচে ধরণীতল, আর আপনের মতো সৎ মানুষের কাছে মিছা কথা কইলে জিভ খইসা পড়ব। ভাইবা দ্যাখেন লাঠিটারে চালান দিলাম ক্যান। ছয় মাসের মধ্যে বিলুবাবুরে দুরমুজ কইরা বাড়িতে ফিরাইয়া যদি না আনে আমার নামে কুত্তা পুইষেন।

    পরী বলল, ঠিক আছে, লাঠিটা রেখে দয়া করে খাও।

    পরীর দিকে তাকিয়ে নিরাপদদা বলল, খাওয়ন ত ফুরাইয়া যাইব না। কিন্তু কথা থাকব। যা কথা তা কাজ। অন্ন মুখে দিয়া কথা কইছি। আকাম, কুকাম করতে পারি, কিন্তু মানুষের অনিষ্ট করি নাই। বেদ বাক্য, ব্রহ্ম বাক্য দুইখান কথা আছে। লাঠিখান গুইজা রাইখা দিলাম। ছয় মাস পরে দেখতে পাইবেন লাঠির গুণ।

    পিলু জানে, নিরাপদদা তুকতাক জানে। তার কেন জানি অবিশ্বাস হল না। দাদা ফিরে আসবে— এমনিতেই আসার কথা, দাদাই লিখে গেছে—নিরাপদদা কেন যে বলল, দুরমুজ কইরা নিয়া আইব। বাবা এতক্ষণে নিজেকে বোধহয় সামলে নিয়েছেন। তিনি মুখ তুলে বললেন, নিরাপদ, পাগলামি করিস না। খা। মা অন্নপূর্ণা তোদের খাওয়া হলে খাবেন।

    কেউ আর এখন পরীকে দেখতে পাচ্ছে না। আসলে তাকে নিয়েই এ-পরিবারে এত বড় অশান্তি। . সেই কারণ। তার বোধহয় খারাপ লাগতে পারে। কে জানে কোথায় সে! আড়ালে লুকিয়ে থাকাই স্বাভাবিক।

    বাবা তখন ডাকলেন, একটু পায়েস আর হবে মা। বড় সুস্বাদু হয়েছে। মা’র দিকে তাকিয়ে বললেন, কী বল, দেবীভোগ মনে হচ্ছে না? মা কথা বলতে পারছিল না। তারও গলা ধরে গেছে।

    পরীদি এক বাটি পায়েস পাতে দিতে গেলে, বাবা হা হা করে উঠলেন।—আরে করছ কী। তোমার জন্য রাখলে না। মায়া তুমি-না না আর দেবে না!

    —খান না মেসোমশাই।

    –একলা খেলে চলে!

    তবু পরী জোরজার করে আরও এক হাতা দিতে গেলে বাবা বললেন, মৃন্ময়ী, আমরা এ-দেশে এসে অগাধ জলে পড়ে গেছিলাম। ভাল মন্দ খাওয়ার কথা ভুলেই গেছিলাম। ভোজ হলে মাথা ঠিক রাখতে পারি না। কিন্তু তোমার জন্য না রাখলে যে খেয়ে শান্তি পাব না। আর দেবে না।

    মৃন্ময়ী দেখল, মেসোমশাই বড় তৃপ্তির সঙ্গে চেটেপুটে পায়েসটুকু খেলেন। দিলে আরও খেতে পারেন। কিন্তু সে না খেলে তিনি কষ্ট পাবেন।

    পিলু পায়েসের বাটিটা দেখছে।

    মৃন্ময়ী বলল, তুই আর এক হাতা নে!

    মা তখন না বলে পারল না।—তুমি কাকে দিচ্ছ। সে দিলে না করে কখনও! পেটুক। না না ওকে দেবে না! তুই কিরে পিলু, মেয়েটা একটু খাবে না।

    পিলু বলল, থাক মিমিদি। দেখ না মা রাগ করছে।

    বাবা তখন হাত চাখছেন। বললেন, অনেকদিন পর বড় তৃপ্তির সঙ্গে খেলাম। অন্নপূর্ণার রান্না। স্বাদই আলাদা। আর দেরি কর না মৃন্ময়ী। এবারে তোমরা বসে পড়।

    পরী হঠাৎ ছুটে রান্নাঘরে ঢুকে গেল। সে তার উদগত অশ্রু রোধ করতে পারছে না। মানুষের কাছে এর চেয়ে বড় তীর্থ আর কী আছে সে জানে না।

  • সাত

    সাত

    বিকেল পড়তেই নবমীর সঙ্গে পিলুর চোটপাট শুরু হয়ে গেল। নবমী আজকাল বাবাঠাকুরের বাড়িতে উঠে এসে চোপা করতে শিখে গেছে। অবশ্য পিলু জানে, নবমীর চোপা আগেও কম ছিল না। কেবল তাকে দেখলেই বুড়ির মাথা ঠাণ্ডা হত। তার সমবয়সীদের উৎপাতের কথা জঙ্গলটায় ঢুকলে বুড়ির কাছে শুনতে পেত। নবমীর নালিশ ছিল, দেখেন দা-ঠাকুর আমারে ঢিল মেইরেছে। দ্যাখেন—বলে পায়ের গোড়ালির উপর হাত দিয়ে দেখাতেই চটে গেছিল—নাম জান, কে, কে করেছে!

    নবমী মাথা নেড়েছিল।

    —মুখ চেন?

    নবমী তাও যেন ঠিক জানে না। তবু যারা পরিত্যক্ত ইটের ভাটার বনজঙ্গলে ঢুকে উৎপাত করতে পারে তাদের সে চেনে। সবাইকে নবমীর কাছে নিয়ে গেছিল।

    নবমী ঠিক চিনতে পেরেছিল।

    —তুই ঢিল ছুঁড়লি।

    —আমারে আকথা কু-কথা কয় পিলুদা।

    নবমীর সাফ কথা, না দা-ঠাকুর, মিছা কথা

    —তুমি আমারে ছাগলের বাচ্চা কও নাই।

    —হ কইছি।

    —তুমি আমারে কও নাই ওলাওঠা হইয়ে মরবি।

    —হ কইছি।

    —তুমি আমারে কও নাই বংশে বাতি দিতে থাকব না।

    —হ কইছি।

    পিলু নবমীকেই তেড়ে গেছিল।

    —কেন বললে। বল। ছাগলের বাচ্চা কেন বললে। এটা কু-কথা না!

    —আমার ছাগলের বাচ্চা নিয়া নিব কয়। কু-কথা হইব ক্যান।

    —তুমি বোঝ না ভয় দেখায়।

    —ঘর থেইকে তাড়িয়ে দেবে কয়।

    —এটা ঘর। এটাতে মানুষ থাকতে পারে। বনজঙ্গলে থাক, আর এটা তোমার ঘর হয়ে গেল।

    —আমার স্বামীর ভিটে পিলুদা। বনজঙ্গল বলেন ক্যানে!

    —স্বামীর ভিটা! ভয়ে তো মর, রাতে সাপ ঢোকে। সারারাত ঘুমাও না। লাঠি নিয়ে দরজায় বসে থাক। শেয়ালে খটাশে টেনে নিয়ে যখন যাবে, কে রক্ষা করবে! হ্যাঁ কে তোমাকে রক্ষা করবে বল। শাপশাপান্ত করলে ঢিল ছুঁড়বে না।

    তারপর পিলু কেমন ফুঁসে উঠত— তোরাই বা কী! বুড়ির কিছু আছে। নবমীর কাছে তোদের নিয়ে আসাই ঠিক হয়নি। আগে তো ভয়ে জঙ্গলটায় ঢুকতিস না।

    —না পিলুদা, বনটায় ডাইনি থাকে। লোকে স্বচক্ষে দেখেছে। নবমী ডাইনি। হ্যাঁ–কি রে, কথা বলছিস না কেন। বনজঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। ফলপাকুড় যা পায় খায়। ছাগলটা নিয়ে জঙ্গলের মাঠে ঘাস খাওয়ায়। গাছের সঙ্গে কথা বলে, সে কী মানুষ আছে! একটা গাছ হয়ে গেছে না! গাছের সঙ্গে তোদের যত বাঁদরামি! আর কোনোদিন নবমী যদি নালিশ করে ঠ্যাং ভেঙ্গে খোঁড়া করে দেব বলে দিলাম।

    –পিলুদা, একখানা কথা!

    —কী কথা আবার।

    —নবমী য্যান আমাদের ছাগলের বাচ্চা না কয়।

    —নবমী, আর কখনও যদি শুনি, এদের মুখ করেছ, তবে তোমার ভাত জল বন্ধ। তোমার খোঁজখবর নিতে আমার বয়ে গেছে।

    —না দা-ঠাকুর, মুখ কইরব না। আপনি না এইলে আমার যে দিন যায় না দা-ঠাকুর।

    সেই দা-ঠাকুরের সঙ্গে নবমী চোপা শুরু করেছে। পরী আর মায়া বিলুর তক্তপোষে শুয়েছিল। ভাদ্র মাসের গরম। জানালার খলপাটা তুলে দেওয়ায় ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। কোথাও বৃষ্টি হয়েছে। আকাশে দুপুরের দিকে মেঘ করেছিল, আবার মেঘ কেটে গেছে। সামনের মাঠটায় আউস ধানের চাষ—ধান পেকে গেছে, জানালায় বসে সব দেখা যায়। ঘরটা তার এত চেনা, মনেই হয় না এটা তার পরবাস।

    পিলুর এক কথা, পারব না। রোজ রোজ বায়না। কে নিয়ে যায়! মানুষের আর কাজ কাম নেই। এই সেদিন গেলে স্বামীর ভিটে দেখতে। আজ আবার মাথায় ক্যাড়া উঠেছে। আমি পারব না। স্কুলের মাঠে ভলিবলের কোট কাটতে যাব।

    মিমি ঠিক বুঝতে পারছে না কেন বুড়ির এত চোপা! নবমী বুড়ির বনটা সেও চেনে। একবার কারবালার জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আসার সময় পিলু বলেছিল, জান পরীদি, এই জঙ্গলটায় একটা বুড়ি থাকে।

    মিমি অবাক হয়ে গেছিল শুনে।

    সেই প্রথম তার বিলুদের বাড়ি দেখতে আসা পালিয়ে। লক্ষ্মীকে নাকি বিলুই সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। রাস্তাটা লক্ষ্মী সে-জন্য চেনে। কালীবাড়িতে বিলুর সঙ্গে জোর করে পরিচয় করতে গিয়েই ফ্যাসাদ। মজা করার জন্যই বলেছিল, তোমাদের বাড়ি আমি যাব। লক্ষ্মী আমাকে নিয়ে যাবে বলেছে। মুখচোরা স্বভাবের বিলু সহসা ক্ষেপে গিয়ে বলেছিল, গিয়ে দেখ না।

    —কেন ঠ্যাং ভেঙ্গে দেবে।

    —কী করব গেলে বুঝবে।

    সেই থেকে তার জেদ। এবং এই জেদ শেষ পর্যন্ত তাকে বিলুর আত্মপ্রকাশের জন্য মরিয়া করে তুলবে যদি আগে টের পেত— তবে বোধ হয় এ-ভাবে গলায় তার কাঁটা ফুটে যেত না। বিলুর আত্মপ্রকাশের জন্যই যেন অপরূপা কাগজ, কবিতা পাঠের আসর-এবং এক জলছবির মতো একজন বাদ্যকার মাঠ দিয়ে ঢাক বাজিয়ে যায়। গভীর নিশীথে আশ্চর্য স্বপ্নের মতো একজন পুরুষ তার পাশে থাকুক—যার মধ্যে সে কোনো নীরব এবং নিশ্চিত মাধুর্য টের পাবে। তারই প্রতীক্ষায় সে আছে। এবং মায়া আজ তার পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ার পর বিলুর সেই আক্ষেপ, বার বার কিছু শব্দমালার মধ্যে খুঁজে বার করার চেষ্টা করেছে। পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, বিলু যেন ঠিকই লিখেছে—পরী আমার সর্বনাশ। পরী আমার আকাশ বাতাস। গভীর রাতে নির্জনে হাঁটি। দেখি নক্ষত্র হয়ে সে আছে। মাথার উপরে। তার ডানার ঝাপটায় ধুলো ওড়ে। ওড়ে কাঙ্গালের বসন। উলঙ্গ করে দেয় অজ্ঞাতে— পরী আমার সর্বনাশ/জীবনে/বীজবপনে/বিসর্জনে।

    পরী বার বার উচ্চারণ করছিল, জীবনে, বীজবপনে, বিসর্জনে। এই কথাগুলি ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সকাল থেকে যা গেছে। আর ঘুম ভাঙতেই সে শুনছে কী…..

    পিলু বলছে, ডাকাতের বৌ, তার আবার স্বামীর ভিটে।

    ছি পিলু। তুই ওভাবে বলিস না। ডাকাতের বৌ নবমী!

    পরী পায়ে শাড়ি টেনে দরজা খুলে বের হয়ে এল। কিন্তু আশ্চর্য পাশের ঘরে মাসিমা, মেসোমশাই নির্বিকার। তারা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে মনে হয় কথা বলছে।

    পিলু আর নবমীর এই কথা কাটাকাটি তারা যেন গ্রাহ্যই করছে না।

    পরীর এটা ভাল লাগল না।

    সে দেখল বুড়ি কোরা থান পরে হাতে লাঠি নিয়ে বসে আছে। কিছুটা অচল। লাঠি ভর দিয়ে উঠতে পারে। কিছুটা যে হেঁটে বেড়ায় তাও লাঠির সম্বলে। সেই নবমীর কী গলা। ডাকাতের বৌ বলাতেও কোনো আক্ষেপ নেই। কোথাও যাবে বলে সে প্রস্তুত। বাধ সেধেছে পিলু।

    পরী বলল, কী বাজে বকছিস পিলু।

    —আর বল না পরীদি, এই সেদিন ধরে ধরে নিয়ে গেছি। হাঁটতে পারে না। দু-পা গিয়ে পড়ে যায়। না ধরলে মুখ থুবড়ে পড়ে মরে থাকবে। তা তোকে কে বাবাঠাকুরের বাড়ি উঠে আসতে বলেছিল। ডর লাগে! ডর। ধনে তার যখ লেগেছে। ঘুম হয় না। লাঠি নিয়ে দরজায় ধপাস ধপাস। না আমি পারব না। একা পার তো যাও।

    পরী বলল, কিরে যা না। এত করে বলছে। তার স্বামী ডাকাত তোকে কে বলেছে!

    —কে আবার বলবে! জিজ্ঞেস কর না। না বললে আমরা জানব কী করে। তিনি নাকি ডাকাতের বৌ ছিলেন। এক বারে গরিমায় পা পড়ে না। ফোকলা দাঁতে কী হাসি, কী না, সে যদি দেখতে। ডাকাতের বৌ বলেই নাচ শুরু। লাঠিতে ভর করে ঘুরে ঘুরে কোমর বাঁকিয়ে নাচ যদি দেখতে!

    ডাকাতের বৌ, নবমী ডাকাতের বৌ—পরী বড় বড় চোখে দেখছিল। কেমন ডাকাত, কোথাকার ডাকাত, খুনটুন কত করেছে কে জানে! তবে কী জঙ্গলের মধ্যে থাকত ডাকাতের বৌ বলেই। কিন্তু পরী এটাই বা কী দেখছে! ডাকাতের বৌ বলায় নবমী কী খুশি।

    নবমী লাঠি ভর দিয়ে ওঠার সময় কঁকিয়ে বলল, ডাকাতের বৌ বলে কী আমার স্বামীর ভিটে থাকতে নাই। লিয়ে না যান, একাই চইললাম।

    পিলু সেই মতো এক দুর্বাসা যেন।—পা বাড়িয়ে দ্যাখ কী করি! যাও ঘরে। বারান্দায় বসে থাক।

    ইস্ পিলুটার মায়া দয়া নেই! জঙ্গলের মধ্যে স্বামীর ভিটে, বেশি দূরেও না, পরী বলল, চল নবমী, আমার সঙ্গে চল।

    মায়া বের হয়ে বলল, তুমি যাবে! আমিও যাব।

    পিলু বলল, তবে আমিও যাব।

    বাবা ঘর থেকে বের হয়ে বললেন, দিলে তো মাটি করে। নিত্যকার যাত্রাপালাটা দেখতে পেলে না। রোজ বিকাল হলে নবমীর নাকি মন কেমন করে। আর সাধাসাধি। পিলু যাবে না। নবমীর গোঁ যাবে। ডাকাতের বৌ বলে তারও জেদ কম না। দু’জনের তর্ক দেখলে তোমার হাসি পেত।

    পিলু বলল, জান পরীদি, কী আস্পর্ধা। বলে, কি না যোয়ান মানুষটা সামনে নাই। থাকলে দেইখতেন। তাঁর বন্ধুরে নির্যাতন! এক আছাড়ে ছাতু কইরে ফেলত। গোট গোট মল বানিয়ে দিয়েছিল। ঘাঘড়া। রেইতের বেলা ফিরে এইলে কোমরে হাত দিইয়ে নেইচেছি কত— কী যেন সব বলে না। তারপরই নবমীর দিকে আঙ্গুল তুলে বলল, মনে রেখ তুমি ডাকাতের বৌ, আমি বামুনের পোলা। এক ফুয়ে উড়ে যেত তোমার মরদ।

    পিলু ব্রাহ্মণ সন্তান কথাটা স্মরণ করিয়ে দিলেই নবমী জব্দ। বামুনের অভিশাপেই মানুষটা নাকি তার গেছে। কোন এক ব্রাহ্মণীর গা থেকে অলঙ্কার খুলে আনার সময় নাকি অভিশাপ দিয়েছিল, ভেদ বমিতে যাবি। নবমী মনে করতে পারে সব। নবমী মনে করতে পারে সেও ছিল লুটের মাল। বখরায় বনছিল না বলে, তাকে নিয়ে পালাল। কত গ্রাম গঞ্জ রেল ইস্টিশানে তারা পড়ে থেকেছে। তার জন্য মানুষটা পুলিশের তাড়ায় দেশ ছাড়া রাজ্য ছাড়া হয়ে গেল। শেষ বেলায় ইটের ভাটায়। কুলি কামিনের সর্দার।

    পরী আগে আগে হাঁটছে। পিলু, বুড়ির পেছনে। সত্যি বেশ দূর মনে হল তার বাড়ি ফিরতে হবে। রাত করে ফিরলেও কেউ বলার নেই। সে পার্টির কাজে কত জায়গায় যায় মিটিং মিছিল করতে। কত রাতে ফিরতে পারে না। খুব বেশি হলে সুহাসদাকে ফোন—এবং সুহাসদা জানে সে যেখানেই যাক, তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা পার্টির ক্যাডাররাই করে থাকে। আজ দাদু ক্ষোভে অভিমানে ফোনও না করতে পারে।

    বাঁশঝাড়ের নিচ দিয়ে উঁচু নিচু পথ। সামনে ঢিবি। ঢিবির পাশে মাটি তোলায় মজা পুকুর। শাপলা শালুক, জলজ ঘাস, এবং কত সব বিচিত্র পাখি উড়ে যাচ্ছে বনটায়। পিলু কিংবা মায়ার যেন মনেই নেই তাদের দাদা নিখোঁজ। পরীদিকে নিয়ে বেড়াতে বের হয়ে সব দেখাচ্ছিল। ওটা—উ যে চালা ঘরটা দেখছ, ওখানে আমার পিসি বাড়ি করেছে। বাড়ি না বলে জঙ্গলের মধ্যে ঝুপড়ি বললেই হয়। গোপাল করের সীমানা শেষ হতেই বনজঙ্গলের শুরু। কাঁটা গাছ, খেজুরের বন, তাল গাছ, শিশুগাছ চারপাশে। বর্ষাকাল বলে ঝোপজঙ্গল নিবিড়

    পরী বলল, ঠিক রাস্তায় যাচ্ছিস তো!

    পরী আসলে সেই রাস্তাটা চিনতে পারছে না। এমনও হতে পারে বর্ষাকাল বলে, বনজঙ্গল নিবিড় বলে সে যে ঠিক এই রাস্তায় এসেছিল মনে করতে পারছে না—কিংবা দিন দিন বাড়িঘরের সংখ্যা বাড়ায় জঙ্গলে যাবার রাস্তাটা জায়গা বদল করতে পারে। আসলে রাস্তা বলেও কিছু নেই। একটা গভীর সুমার বনে ঢুকে যাচ্ছে তারা। পরী বলল, নবমী, জঙ্গলে একা থাকতে কষ্ট হত না।

    নবমী হাতজোড় করে তখন কার উদ্দেশে যে প্রণাম করত বোঝা ভার।

    পিলু এগিয়ে গিয়ে বলল, জান পরীদি, নবমীর ছাগলের দুটো বাচ্চা। বেশি হলে জঙ্গলে রেখে আসত।

    —জঙ্গলে কেন?

    —কী জানি কেন! ওতো বলে ভূতেরা চাইত

    —ভূতেরা ছাগলের বাচ্চা চাইত। ভারি মজার ভূত তো!

    নবমী লাঠি ঠুকে ঠুকে হাঁটছে। কাঁটা গাছে তার কাপড় জড়িয়ে গেলে পরী উবু হয়ে ছাড়িয়ে নিচ্ছে। কাঁটা গাছ বাঁচিয়ে যাবারও রাস্তা নেই।

    পরী নবমীর কাপড় থেকে কাঁটা গাছ ছাড়িয়ে দেবার সময় শুনতে পেল, ভূত কেন হবে। ঠাকুর দেবতা!

    পিলু বলল, আচ্ছা পরীদি, বনে ভূত ছাড়া কিছু থাকে! ঠাকুর দেবতা থাকে বাড়িতে। নয় মন্দিরে।

    নবমীর এক কথা, দা-ঠাকুর বনের দেবতা আছেন। জানেন না গো। একলা এতটা কাল থেইকে বুঝেছি।

    নবমীর সব কথা স্পষ্ট নয়। শুধু জিভ নাড়ে। আর কী বলে বোধহয় পিলু ছাড়া আর কেউ বোঝে না। তবু বনটার কাছে এসে মনে হল পরীর, এক নারী তার যুবতী বয়সে এই জঙ্গলে উঠে এসেছিল। সঙ্গে তার মরদ। বাবুদের ইটের ভাটায় কাজ। শীত বর্ষায় গাছপালার মধ্যে থাকতে থাকতে নবমীর এই বন ছাড়া অন্য কোনো অস্তিত্ব নেই। তবু শেষ বয়সে মেসোমশাই তাকে আশ্রয় দিয়েছেন। শেয়ালে খাটাসে খেলে মানুষের অসম্মান। এখন সেই নবমী স্বামীর ভিটে দেখার জন্য পাগল। কে করবে এত!

    বিলুদের বাড়িটায় হাঁস কবুতর খোঁড়া বাঁদর গোটা ছয়েক বিড়াল, দুটো কুকুর — কী না ছিল! এখন প্রাণীর সংখ্যা কমে এসেছে। পরী মনে করে একজন উদ্বাস্তু মানুষের নানা সংস্কার গড়ে উঠতে পারে— কোন পাপে দেশ ছাড়া, এমন কোনো উচাটনে পড়েই হয়তো যাবতীয় প্রাণীজগত থেকে গাছপালার প্রতি এক অপত্য স্নেহ গড়ে উঠেছে মানুষটার। তা না হলে এই নবমীকে, যার তিনকাল গেছে, শেষ কালে যাবার সময়, তার জন্য ঘর তুলে দিয়েছে! গীতা কিনে দিয়েছে! পিলু নাকি মাঝে মাঝে রামায়ণ মহাভারতও পড়ে শোনায়। সব বিলুর কাছেই শোনা। বাড়িটা যে চিড়িয়াখানা করে তুলছে তার বাবাটি— সেটাও ক্ষোভের বিষয়। পরী তার বাড়ি যে যায়, তাও বাবা মানুষটিকে দেখতে, তার চিড়িয়াখানা দেখতে। কিন্তু বিলু বোঝে না, এই বুড়ির তিনকুলে কেউ নেই—একজন মানুষের প্রাণ কত বড় হলে তাকে বসবাসের জায়গা করে দিতে পারে। নিজে উদ্বাস্তু না হলে, হয়তো নবমীর কথা মেসোমশাইয়ের মাথাতেই আসত না।

    জঙ্গল থেকে নবমীকে তুলেও আনা হত না। রোগে ভোগে চারপাশে শুধু বনজঙ্গলের জীবজন্তুর সাড়া পাওয়া যেত। পিলুর খোটা দিয়ে কথা বলাটাও পরীর পছন্দ হচ্ছিল না। ডাকাতের বৌ! তোর দাদা কত বড় ডাকাত জানিস। তার মান অপমানের জ্বালা কত জানিস! সে কী ভাবে আমাকে হেনস্থা করত জানিস!

    কিছুই জানিস না।

    ওদের দুই বন্ধুকে সাইকেলে আসতে দেখলেই বুক ধড়াস করে উঠত। সাইকেল থামিয়ে অপেক্ষা করতাম। কতদিন কতভাবে আমাকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছে। আমাকে দেখেই মুকুল সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়াত। তোর দাদা নামত না। অবজ্ঞারও শেষ থাকে। সে সাইকেল নিয়ে ভাঁকুড়ির রাস্তায় উধাও হয়ে যেত।

    কী যে খারাপ লাগত। বুঝবি না!

    আমি কী মুকুলের সঙ্গে কথা বলার জন্য সাইকেল থেকে নেমেছিলাম। যার জন্য নামা তিনি হাওয়া।

    কী ব্যাপার মুকুল!

    খুব চটে আছে।

    কেন?

    আর কেন। কলেজ ডিবেটে যেই তুমি উঠে দাঁড়ালে, ব্যস বাবু বললেন চল। আরে যাবে কী! শোনো মিমি কী বলছে। জোরজার করে বসিয়ে রাখলাম। কিন্তু যত তুমি যুক্তি দিয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তির পক্ষে কথা বলছ, তত খেপে যাচ্ছে। যত তুমি হাততালি পাচ্ছ তত তার মুখ গোমড়া হয়ে যাচ্ছে। আর হঠাৎ জান দেখি পাশে নেই। কখন ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে। বাইরে বের হয়ে দেখছি গঙ্গার ধারে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বললাম, কী বিলু, এখানে! পরী ডিবেটে কী তুখোড় যুক্তি দিয়ে বলল, যদি শুনতে!

    আরে রাখ! বড়লোকের মাইয়া আমি চিনি। মুখে বড় বড় আদর্শের বুলি। আচ্ছা মুকুল, তুমি বিশ্বাস করতে পার এরা কখনও গরীবের দুঃখ বুঝতে পারে। ভণ্ডামী না। গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ। সব মানুষের জন্য আহার আশ্রয় উত্তাপ একমাত্র বিজ্ঞান ছাড়া সম্ভব নয়। মানুষের জন্য সমান সুযোগ- কখনও সম্ভব! এরা যতদিন আছে শুধু ভণ্ডামির আশ্রয় নিয়ে গরীব মানুষকে প্রতারিত করবে। আগেকার জমিদাররা পুকুর কেটে, মন্দির বানিয়ে গরীব মানুষদের ধোঁকা দিয়ে গেছে, এরা এখন সমাজবাদের নামে ভাঁওতা দিচ্ছে। পরীর এটা প্রতারণা। তোর কী দরকার, হ্যাঁ কে তোকে বলেছে, মিটিং মিছিলে স্লোগান দিতে, এ-আজাদি ঝুটা হ্যায়।

    মিমি জানে, একজন মেয়ের এই আত্মপ্রকাশ বিলুর একদম পছন্দ নয়। সে মিটিং মিছিলে গেলে বিলু ক্ষেপে যেত। পথ নাটিকায় অংশ নিয়েছে মিমি, শুনলেই ও রাস্তায় যেত না। সে মহেশ নাটকে আমিনার পার্ট করেছে, কলেজিয়েট স্কুলের দোতলার হলঘরে নাটক—সে কার্ড দিতে গিয়ে শুনল, বিলু বাড়ি নেই। মাসিমা মেসোমশাইকে বলেছে, পিলুকে বলেছে, তোরা যাস। সে নাটকে অংশ নেবার আগে বারান্দায় বার বার ছুটে আসত, পিলু যদি আসে। আর কেউ না আসুক পিলু ঠিক আসবে। সেই পিলুর পর্যন্ত পাত্তা নেই। তার যে কী খারাপ লাগত! পরে পিলু এলে মিমিও কথা বলত না।

    পিলুর তখন এক কথা, কী করব দাদা বারণ করেছে।

    মিমি কটাক্ষ করে বলত, একেবারে লক্ষ্মণ ভাই। দাদা বারণ করল বলেই আসবি না। আমি কেউ না। দাদার কথাই বড় হল!

    পিলু বলত, জাননা দাদা কী অশান্তি করতে পারে!

    তোর দাদা স্বার্থপর। মজা দেখাচ্ছি।

    সেও তখন ক্ষেপে যেত। আরও বেশি পার্টিঅফিস, আরও বেশি কলেজ ইউনিয়ান, সারাদিন টো টো করে ঘুরছে—আর মিমি জানে, বিলুটা চোরের মতো দূর থেকে সব দেখবে আর দিনরাত ফুঁসবে।

    এটাও ডাকাতি। আমার ভাললাগা মন্দলাগার বিন্দুমাত্র দাম নেই। জবরদস্তি করে তুমি আমার প্রাণ ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে চাও।

    .

    পিলু বলল, মিমিদি, আমরা এসে গেছি।

    সে কেমন হুঁস ফিরে বলল, নবমী কোথায়!

    –ঐ যে আসছে।

    পরী দেখল, এক অশীতিপর বৃদ্ধা কেমন বেহুঁস হয়ে স্বামীর ভিটে দেখার জন্য উঠে আসছে।

    গভীর বনজঙ্গলে মিমি কোনো ডেরা পর্যন্ত দেখতে পেল না। নবমী থাকত কোথায়! কুল গাছের জঙ্গল পার হয়ে বড় বড় সব শিরীষ গাছ, আকন্দ গাছের ঝোপ, পিটুলি লতার সমারোহ। লাল বনজ ফল। এক ঝাঁক টিয়াপাখি ঠুকরে খাচ্ছে। মানুষজনের সাড়া পেয়েই তারা উড়াউড়ি শুরু করেছিল। কিন্তু মিমি বুঝল না, শুধু বনজঙ্গলেই স্বামীর ভিটে কী করে হতে পারে। থাকার মতো একটা ঝুপড়ি হলেও বসবাসের জন্য দরকার। সেটা কোথায়?

    পিলু সারা জঙ্গলটায় ঢুকে গিয়ে কেমন এক নেশার মধ্যে পড়ে গেছে। ঝোপে জঙ্গলে কোথাও যদি পাকা পেয়ারা পাওয়া যায়—এই জঙ্গলের মধ্যে কোথাও কোনো গোপন জায়গায় সেই পেয়ারা গাছটা—পিলু বোধহয় সেটাই খুঁজছে। সে গুড়ি মেরে ঢুকছে, মায়া ডাকছে, ছোড়দা তুই কোথায়? মিমি দাঁড়িয়ে আছে একা। ছোট্ট এক তৃণখণ্ডের চারপাশে এত বড় বড় গাছের বনরাজি লীলা দেখতে দেখতে সে কিছুটা অভিভূত। এর কোনো গোপন অভিলাষ আছে সে টের পায়। এখানে একজন পুরুষ তার প্রিয়তমা নারীকে নিয়ে থাকার মধ্যে কোনো গভীর আনন্দ খুঁজে পেতেই পারে। নবমীর স্বামী মানুষটাকে কেন জানি এই মুহূর্তে একজন স্বপ্নের মানুষ মনে হল। সেও হয়তো পালিয়ে কোথাও এখন গোপন করতে চায় নিজেকে। সে আর তার প্রিয় পুরুষ। আহার আশ্রয় উত্তাপের ব্যবস্থা থাকলে এর চেয়ে ভালবাসার জায়গা আর কোথায় থাকতে পারে সে জানে না।

    এবং উলঙ্গ করে দেবার স্পৃহা নিরন্তর যে জন্মলাভ করে মনের মধ্যে, ডাকাত মানুষটি বনজঙ্গলে ঢুকে গিয়ে এটা বোধহয় আরও বেশি টের পেয়েছিল। সে জায়গাটা ছেড়ে যেতে পারেনি। সারাদিন পরিশ্রমের পর কী ঝড় বৃষ্টি, কী শীতের হাওয়ায় অথবা কোনো জ্যোৎস্না রাতে তার পরিভ্রমণ ছিল নবমীকে নিয়ে। প্রতিটি গাছের প্রতি তার মায়া জন্মে যেতেই পারে। এমনকী এই মুহূর্তে তার নিজেরও কেন যে মনে হচ্ছিল জায়গাটা ছেড়ে চলে গেলে সেও আর এক নবমী। নবমী হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে এসে মিমির পায়ের কাছে বসে পড়ল। কথা বলতে পারছে না।

    মিমি বলল, কোথায় তোমার ঘর!

    —ঐ যে হোথায়!

    মিমি কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। শুধু একটা ভাঙ্গা ইট কাঠের আস্তানা। ভিতরে কিছু নেই। যে কোনো মুহূর্তে ওটা ধসে পড়তে পারে। পরিত্যক্ত কোনো আবাস হতে পারে এটা মিমি ভাবতেই পারে না। বাইরে থেকে মনে হয় শেওলা ধরা ইটের পাঁজা। তার ভিতর থেকে, ফাঁকফোঁকর থেকে বনজ উদ্ভিদের জন্ম হচ্ছে। এবং হেমন্তে শীতে কিংবা বর্ষায় এই ইটের পাঁজার মধ্যে শেকড় চালিয়ে বেঁচে থাকার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

    —ওর ভিতর তুমি থাকতে!

    নবমীর ফোকলা মুখে পরিতৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। কিছু বলল না। সে তার আবাসের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। সামনে কবে কোন প্রাচীনকালে মাটি তুলে ইট তৈরি হয়েছিল, তার খানাখন্দ এখনও বিদ্যমান। এই খানাখন্দের জনই ছিল নবমীর জীবনলাভের উপায়। তার রোগ শোক ব্যাধি এবং সুখ সব যাবার সময় জলে বিসর্জন দিয়ে গেছে।

    কেন যে মিমির মনে হল, এমন সুন্দর জায়গা ছেড়ে কেউ যায়। মানুষটার স্মৃতি নবমীকে আটকে রাখতে পারল না। কারণ এই গভীর বনজঙ্গলের মধ্যে সব গাছপালার সঙ্গে একজন মানুষের নিরন্তর অবস্থান যে মরে যায়নি, নবমীর মুখ দেখে সে তা টের পাচ্ছিল।

    মিমি না বলে পারল না, তোমার খারাপ লাগল না, চলে গেলে!

    —সাধে কী গেছি মা ঠাকরুণ!

    —কী হয়েছিল!

    —যথ।

    —যথ!

    —হ্যাঁ মা ঠাকরুণ যখ এসে ঘোরাঘুরি করতে শুরু করল। কত ডাকতাম, তার সাড়া পেতাম না। ডর ধরে গেইছিল।

    নবমী এ-সব কী বলছে। সারা জীবন এই বনজঙ্গলে বসবাসের পর যখ এসে তাড়া করল তাকে!

    মিমি কিছুটা বিহ্বল হয়ে পড়ছে। একজন অনাথ নারীর মধ্যে যখের ভয় কেন উদয় হল, সে তা বুঝতে পারছে না। ক্রমেই সে বিস্ময়ের মধ্যে ডুবে যাচ্ছিল।

    সে বলল, তোমার মা বাবার কথা মনে পড়ে না!

    —পড়ে।

    —কষ্ট হয় না?

    –না।

    —কার কথা ভাবলে কষ্ট হয়।

    —মরদের কথা।

    —আর কারো কথা না!

    —না আরও একজন আছেন। পিলু দাদা। আমার দা-ঠাকুর।

    —তোমার দা-ঠাকুর। পিলু তো সেদিনের ছেলে।

    —উ তো এসে আমাকে দেখে পালাল না।

    —পালাবে কেন!

    —আমি যে মানুষ না মিমিদি। আমার শনের মতো চুল, কংকালসার শরীর, উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াই, ডাইনি ছাড়া কেউ কিছু ভাবতে পারত না। জঙ্গলটায় ভয়ে লোক ঢুকত না। আমি তুকতাক করে ছাগল ভেড়া বানিয়ে রাখি। বিলুদাও রেগে যেত। দা-ঠাকুর খোঁজ খবর নিতে এলেই বিলু দাদা তাড়া করত দা-ঠাকুরকে।

    নবমী কত কথা বলে যাচ্ছে।

    কবেকার সব স্মৃতি—ভাল করে বোধহয় মনেও রাখতে পারেনি। তার অসংলগ্ন কথা এটা ওটা বাদ দিয়ে জুড়ে দিলে মনে হয়, আশ্চর্য এক গভীর প্রেম ছিল তার ডাকাত মানুষটির সঙ্গে।

    সে বলল, তোমার বাবা কী করতেন!

    —তিনি তো বড় সওদাগর ছিলেন। বয়েল গাড়ি ছেইল তিন গণ্ডা। বাজারে আড়ত — চাল, ডাল, তেলের। মোকাম। ঘর দরজার সীমাসংখ্যা নাই। বাড়িতে ডাকাত পড়ল। ছিনতাই হয়ে গেলাম।

    পরী শুনছে। তার মধ্যে কোনো জলছবি ফুটে উঠছে। প্রশস্ত হলঘর — ঝাড় লণ্ঠন, চাকরবাকর, দাঁড়ে কাকাতুয়া এমন এক জলছবি ভেসে বেড়াতে থাকলে সে দেখতে পেল, সেখানে কে একজন লুণ্ঠন করার জন্য গোপনে ঢুকে গেছে। তার ভিতর হাহাকার বাজছে। কোথায় গেল বিলু! কোথায় গিয়ে উঠল। যেন সেই মৃত ডাকাত আবার অন্য ভূমিকায় এসে হাজির হয়েছে বনটায়। সেখানে সে কাউকে তুলে আনতে চায়—আবার অবাঞ্ছিত ভেবে নিজেকে কষ্ট দিতেও ভালবাসে।

    নবমীর জীবন তাকে আজ অন্য কথা বলছে। তার মা-বাবার কথা মনে পড়ে, তবে কষ্ট হয় না। তার মোকামের কথা মনে পড়ে কিন্তু কোনো অসুবিধা বোধ করে না।—দু-তিন গণ্ডা বয়েল গাড়ির কথা মনে পড়ে—কিন্তু তাতে উঠে বসার কোনো আগ্রহ নেই তার। শুধু স্বামীর ভিটায় ঘুরে ফিরে চলে আসতে চায়। পিলু মুখ করে। সে নিয়ে না এলে আজ এই তীর্থক্ষেত্রেরও খবর পেত না। তীর্থ তো মানুষ শান্তির জন্য করে। মানসিক শান্তি।

    তখনই পিলু কোত্থেকে জঙ্গলের মধ্যে উঠে দাঁড়াল। ডাকল, পরীদি, শিগগির এস।

    —কেন।

    —এস না।

    মায়াও জঙ্গলের ডালপালা সরিয়ে দূরে উঁকি দিল।—মিমিদি, এসে দেখ!

    মিমির ইচ্ছে হচ্ছিল না নড়তে। এই বৃদ্ধার সঙ্গে তার কথা বলার আগ্রহ অসীম। সে বলল, যাচ্ছি। যাচ্ছি বলে আবার কথা শুরু করে দিল।

    —তোমার মরদ কী মরে যখ হয়ে গেছিল।

    —না না। মরদ আমার সে-রকম আদমি ছেল না।

    পরী ঘাসের উপর বসে পড়েছে। দাঁড়িয়ে কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছিল। সব কথা নবমীর বুঝতেও পারছে না। সে নবমীর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল।

    দু’জন মুখোমুখি বসে।

    একজনের ঊষাকাল, অন্যজনের সাঁজ লেগে গেছে।

    পরীর কেন জানি নবমীর মুখ দেখতে দেখতে এমনই মনে হল। তার চেয়ে যে বেশি শ্রী ছিল না নবমীর শরীরে কে বলবে! সে নবমীকে বলল, ডাকাতের সঙ্গে ঘর করতে ভয় করত না।

    নবমীর আবার সেই অপরূপ স্নিগ্ধ হাসি।

    —যম। চোখের পাকে ভিরমি খেত। যমের মতো আমারে ডরাত। বলে কী নবমী!

    —তোমার চোখের পাকে ভিরমি খেত।

    —হা সাচ বুলছি। মিছা বুলছি না। ডাকাতি ছেইড়ে দিল ডরে।

    —বলে কী!

    —হ্যাঁ মিমিদি, আমি মিছা কখনও বুলি না।

    মিমির কেন যে এত আগ্রহ নবমীর সব খোঁজ খবর নেবার। সে বলল, তোমার বাবা মাকে দেখতে ইচ্ছে হত না।

    —হত। তবে মরদের ইজ্জত বড় না আমার ইচ্ছা বড় বুলেন! আমি তারে ছেইড়ে গেলে আতান্তরে পইড়ে যাবে না!

    —সেই ভেবেই যাওনি।

    লজ্জায় নবমী মাথায় আঁচল টেনে দিল।

    এ কী পরীর সহসা আবার অশ্রুপাত কেন!

    সে কথা বলতে পারছিল না। দু-হাটুর মধ্যে মুখ গুঁজে দিল। কোথায় খুঁজবে। সে জানে মেসোমশাই তার সান্ত্বনা পেয়ে আশ্বস্ত হয়েছেন। বাড়ির সবাই। কিন্তু তাকে আশ্বস্ত করবে কে! বিলু যদি কোনো প্ল্যাটফরমে শুয়ে থাকে। সে তো নিজেকে কষ্ট দেবার জন্যই সংসারের স্বচ্ছলতা থেকে সরে গেল। এক দিকে তার নিজের আত্মপ্রকাশের তাড়না, অন্য দিকে পরীর মর্যাদা নষ্ট না হয় ভেবেই সে নিখোঁজ হয়ে গেল। তার হাত পা কাঁপছে। কেন যে দেখতে পাচ্ছে, প্রখর রোদে কেউ হেঁটে যাচ্ছে। মুখচোরা মানুষ। কাউকে নিজের কষ্টের কথা কখনও মুখ ফুটে বলে না। তা ছাড়া সে কলকাতার রাস্তাঘাটও ভাল চেনে না। ভিতরে এমন উতলা হয়ে পড়ল যে কিছুক্ষণ সে আর কোনো কথা বলতে পারল না।

    নবমীর কথাতেই তার হুঁস ফিরে এল। নবমী তো জানে না, সেই শুধু ডাকাত নিয়ে ঘর করেনি। সব নারীকেই কোনো না কোনো ডাকাতের পাল্লায় শেষ পর্যন্ত পড়ে যেতে হয়।

    —আমার নিবাসে চলেন।

    নবমী লাঠি ভর করে উঠে দাঁড়াল।

    পরী আর কী করে! নবমীর জীবন যে আগ্রহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, তাতে সে তাকে যেন আর বিন্দুমাত্র অবহেলা করতে পারে না। নবমী এতটা হেঁটে এসেও কোনো ক্লান্তি বোধ করছে না। সে এখন যেন পরীদিকে নিয়ে এই বনের মধ্যে ঢুকে গিয়ে কী মজা ছিল তার বেঁচে থাকার – দ্যাখ দ্যাখ, ঐ শিরীষের তলায় মরদ শুয়ে আছে, আমি জল নিয়ে গেছি, দ্যাখ দ্যাখ, হোথায় আড়াল হয়ে গেলে মরদ খোঁজাখুঁজি করত। জ্যোৎস্না রাতে ঘুরে বেড়াত গাছের ছায়ায়—আকাশ চাঁদমালা হয়ে বিরাজ করত—এমন ভুবনমোহিনী রূপ তার যেন বনজঙ্গলে না থাকলে ডাকাত মানুষটি টের পেত না।

    ভিতরে ঢুকতে ভয় করছিল পরীর। যেন ইটের পাঁজা সব খুলে মাথার উপরে পড়বে। কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখল, মেঝে পাকা। দেয়ালে সিমেন্ট বালির পলেস্তারা, একটা বনজ গন্ধ ঘরে।

    শেষ দিকে নবমী ছাগলের দুধ আর বনের ফলমূল খেয়ে বেঁচে থাকত।

    পিলু বলেছে, বাসাটাই যেন বুড়িকে আগলে রাখত। হয়তো নবমী যখের ভয়ে পড়ে না গেলে স্বামীর ভিটে ছেড়ে যেতই না। জঙ্গলেরও থাকে প্রাণ কিংবা ভালবাসা, আর সব প্রাণীসকলের মতো নবমীও ছিল এই জঙ্গলের একজন। শেয়াল, বেজি, গো-সাপ, এমন কি সাপ খোপও ছিল তার প্রিয় সঙ্গী। আর যখন যে গাছে ফল হত, যেন নবমীর হয়ে তারা ঝরে পড়ত নিচে। পিলু গেলেই বাবাঠাকুরের জন্য ফল প্রণামী দিত। বেল, কয়েতবেল, তাল, নারকেল, আম, জাম, গোলাপজাম —কত না বিচিত্র ফলের সমারোহ। কেউ জানতই না, এই কবরভূমি সংলগ্ন জমি সরকারের খাস, আর ভূত প্রেতের উপদ্রবে কত রাতে মানুষ তালকানা হয়ে গেছে, পথ হারিয়েছে—পথ হারালেই জঙ্গলের মধ্যে এলোপাথাড়ি ছুটতে গিয়ে দেখেছে, কোনো জরাগ্রস্ত উলঙ্গ রমণী গাছের নিচে বসে ঝিমুচ্ছে। এই বনজঙ্গলে ঘরবাড়ি ওঠার আগে অঞ্চলের মানুষেরা বনটায় ঢুকতেই সাহস পেত না। নবমী বলে এক যুবতী এই জঙ্গলে প্রেত হয়ে ঘুরে বেড়ায়, নবমীর বন বলে খ্যাত, তাকে কখনও দেখা যায়, কখনও দেখা যায় না, যে দেখে সেই দৌড়ায়। পিলুই আবিষ্কার করেছিল, বনের গভীরে এক বুড়ি থাকে। চাঁদের বুড়ির মতোই ছিল প্রথম দিকে রহস্যময় — কিন্তু পিলুর বেজায় সাহস-নবমীর বনের ভিতর দিয়ে শহর থেকে সর্টকাট একটা রাস্তা সে খুঁজে বের করেছিল। রেল-লাইন পার হয়ে, নীলকুঠির পরিত্যক্ত জঙ্গল পার হয়ে কবরখানা। কবরখানার ভিতর দিয়ে গেলেই নবমীর জঙ্গল। সেই কবে থেকে মানুষেরা নবমীর নিশীথে পরিভ্রমণকে কোনো ভৌতিক ক্রিয়াকাণ্ড ভেবে তার এলাকা পরিহার করে চলেছে। পিলু যেদিন তাকে দেখেছিল, তারও কম ভয় ছিল না। এক হাতে কী একটা ফল কুড়িয়ে লাঠি ভর করে এগিয়ে আসছে। দৌড় দৌড়। এক দৌড়ে গাছপালা জঙ্গল ফেলে সে বাড়ি ফিরে নাকি বলেছিল, বাবা, বনটায় না—তারপর আর কিছু বলতে পারেনি।

    বাবা পাটকাঠির বেড়া বাঁধছিলেন। শুনে বলেছিলেন, বনটায় কী!

    পিলু চোখ বড় বড় করে বলেছিল, বনের অপদেবী।

    —বনের অপদেবী!

    — হ্যাঁ বাবা। লাঠি ঠুকে ঠুকে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

    —অপদেবী হবে কেন। চোখের বিভ্রম। অমন জঙ্গলে মানুষ আসবে কী করে। ভিতরে তো শুনেছি ঢোকাই যায় না। কেউ কেউ বলে নবমী বলে এক নারী এক কালে তার স্বামীকে নিয়ে থাকত। তারা তো সেই কবে হেজে মজে গেছে।

    —না বাবা আছে। আমি দেখেছি।

    বাবা হেসে বলেছিলেন, তুমি যে কত কিছু দেখতে পাও!

    বাবার এই কথাটাই পিলুকে নাকি জেদ ধরিয়ে দিয়েছিল। শহর থেকে ফেরার পথে সে বাদশাহী সড়ক দিয়ে আসত না। তার কাছে বাদশাহী সড়কটাও ছিল রহস্যময় এই রাস্তায় সিরাজদৌল্লা ঘোড়া ছুটিয়ে গেছেন পলাশীর মাঠে যুদ্ধ করতে। মোহনলাল মীরমদনের বাহিনী ছুটে চলেছে ঘোড়ায় চড়ে। মীরজাফর হাতীর পিঠে। দামামা বাজছে। সেই রাস্তার পাশে অলৌকিক বনটা তাকে তখন নাকি আরও বেশি টানত। নিঝুম গাছপালা থেকে কেবল পাতা ঝরছে। খস খস শব্দ শুনতে পায়। সর সর করে কারা যেন লুকিয়ে পড়ে তার পায়ের শব্দ পেলে। আর ডাহুক পাখির কলরব কিংবা বনটিয়ার ঝাঁক কোথাও। কোথাও মৌমাছির গুঞ্জন। পিলু ভিতরে ঢুকলে নাকি বিচিত্র কীটপতঙ্গের আওয়াজ পেত। তার মনে হত বনের ভিতর এক অদৃশ্য বাজনা বাজে।

    তার পরীদিকে দেখলেই পিলুর রাজ্যের সব খবর দেবার স্বভাব। বনটায় ঢুকলে তার গা নাকি ফুলে যেত। লোম খাড়া হয়ে উঠত। ঝুপ করে সামনে কে লাফিয়ে পড়ল, আরে বিশাল একটা হনুমান দলে দলে হনুরা তাকে দেখলেই কেমন বিস্ময়ে নাকি তাকিয়ে থাকত। তাকে কিছু বলত না। দু-একটা যে তাকে দেখার জন্য একবারে গায়ের কাছে চলে আসত তাও সে বলেছে। পিলু হনু দেখলে সাহস পেত। এরা তো মানুষের সমগোত্র। তা ছাড়া রামের সেতুবন্ধনে এরা ছিল বলেই রাক্ষসের দেশ থেকে সীতাকে রামচন্দ্র উদ্ধার করতে পেরেছিল। সেও নাকি দেখেছে, জঙ্গলের ভিতর মানুষ চলাচলের একটা গোপন পথ তৈরি হয়ে গেছে। খুব খেয়াল করলে ওটা বোঝা যেত। পথটা অনুসরণ করতে গিয়েই সে নবমীর এলাকায় ঢুকে তাকে দেখে ফেলেছিল।

    তারপর পিলু এই রহস্য আবিষ্কারের জন্য কতবার যে বনটায় ঢুকে গেছে। না কোথাও জনমানবের চিহ্ন নেই। সে দেখতে পেত না নবমীকে। নবমী কী তখন মানুষের সাড়া পেলে ঝোপ জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ত!

    সে তার খুশিমতো যে-সময়কার যে ফল, পেড়ে এনেছে। তালের দিনে তাল, এমন কী একবার জঙ্গলের মধ্যে একটা পাকা আনারসও সে খুঁজে পেয়েছিল!

    কে গাছ রোপণ করে!

    সে নারকেল নিয়ে আসত। ঝুনো নারকেল। এত গভীর জঙ্গলের মধ্যে একটা নারকেল গাছ, একটা লিচু গাছ পর্যন্ত সে আবিষ্কার করেছিল!

    কে রোপণ করে!

    সেই অনন্ত আগ্রহই পিলুকে কখন যে বনের রাজা বানিয়ে ফেলেছিল। কিংবা নবমী যখন বলে, মাঝে মাঝে সে দেখতে পেত কেষ্টঠাকুরের লীলা—সে নাকি তখন জোড় হাত করে ঝোপ জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে পড়ত। তাকে দেখলে ঠাকুরের লীলা যদি আর দেখতে না পায়। এমন কী সে তার ছাগলটাকেও আড়াল করে রাখত। … পিলুর যে কত কথা মনে হয়।

    পিলু গাছে উঠে ডালে বসে থাকত। কখনও গাছের ছায়ায় হেঁটে বেড়াত। বেত ঝোপ থেকে বেতের ডগা নিয়ে যেত। নারকেল পেলে নিয়ে যেত। ঠাকুর পুণ্যবান — ফলমূল তার প্রিয় হবে বেশি কী। একবার দেখেছিল, ঠাকুর ঝুড়ি এনে সারা দিনমান, বন আলু তোলার জন্য মাটি সরাচ্ছে। বিশাল বন-আলুটা ঝুড়িতে ধরছে না। ওটা মাথায় তুলতে বেজায় কষ্ট। সহ্য হয়নি। লাঠি ভর দিয়ে কাছে যেতেই পিলু চমকে উঠেছিল—আরে সেই বুড়িটা।

    পিলুর আত্মারাম খাঁচা।

    নবমী কী বুঝে বলেছিল, জঙ্গলটায় এলেন যখন কৃপা করে, একবার কপালে মাথা ঠেকাতে দিন গো দা-ঠাকুর।

    পিলু দৌড় মারবে কিনা ভাবছিল।

    নবমী তারপর সত্যি গড় হয়ে পায়ের কাছে একটা ঝুনো নারকেল রেখে বলল, দা-ঠাকুর, মানুষ তো এ-বনে ঢোকে না।

    পিলু বলেছিল, তুমি কে? তুমি নবমী। লোকে বলে হেজে মজে গেছে! মরে গেছে! —আমি মরব কেন! বেঁইচে আছি।

    —লোকে যে বলে জঙ্গলে ডাইনি থাকে।

    —না গো দা-ঠাকুর। আমর ঘরে আমি থাকি! ডাইনি থাকবে কেন!

    —তোমার ঘর আছে!

    —আছে না। হুই উদিকটায়। আসেন দা-ঠাকুর। পায়ের ধুলা দিয়ে যান। আপনার পা-খান ছুঁতে দিন। বলেই সে গড় হয়েছিল ফের।

    এর পর আর ভয় থাকে।

    সে বলেছিল, তোমার ভয় করে না! কোথায় তোমার ঘর।

    —বনজঙ্গলে থাকলে দা-ঠাকুর ঘর লাগে না গো। সব কথা শুনি। জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই। উৎপাত

    করলে ভয় দেখাই।

    —ভয় দেখাও মানে।

    —এই আছি, এই নাই। বলেই জঙ্গলে সহসা অদৃশ্য নবমী।

    —এই নবমী, তুমি কোথায়।

    নবমী ঝুপ করে ভেসে উঠেছিল জঙ্গল থেকে। …. পিলুর যে কথা কতা মনে হয়!

    নবমীর পেটে পেটে তবে এত দুষ্টুবুদ্ধি। বনটায় লোকজন ঢুকলে তার অধিকার খর্ব হয়ে যাবে। সে নিজেই নানা রঙ্গ তামাসায় মেতে গেছিল। গাছপালা এবং অরণ্যের মোহ তাকে এত দিন জড়িয়ে রেখেছিল। সেই নারী শেষে যখের ভয়ে উঠে গেল পিলুদের বাড়ি।

    মৃন্ময়ীকে যত গভীর অরণ্যে নিয়ে যাচ্ছে তত তার সব মনে পড়ছিল। পিলুই তাকে নবমীর গল্প করত। পিলুর তো গাঁজাখুরি গল্পের শেষ নেই—এও হয়তো তেমনি। কিন্তু সত্যি তবে নবমী বুড়ি আছে। আছে তার গভীর অরণ্য আর অরণ্যের প্রতি টান। আজ নবমীর সঙ্গে না এলে সে টের পেত না, কোনো নারী একা স্বামীর স্মৃতি আগলে যে কোনো দুর্গম এলাকায় বসবাস করতে পারে।

    বার বার বিলুর মুখ ভেসে উঠছে।

    সে যে কী করবে!

    কোথায় খোঁজ করবে তার।

    বছর তিন আগেও একবার বিলু নিখোঁজ হয়ে গেছিল। তখনও মেসোমশাই ছিলেন নির্বিকার। গেছে—আবার ফিরে আসবে। মেসোমশাইয়ের এত আত্মবিশ্বাস কী করে হয় সে জানে দৈব বিশ্বাসই এর মূলে। তার কাছে মানুষের জন্য এমন কী প্রাণীজগত থেকে সব গাছপালা কী নয়, এক অদৃশ্য শক্তির খেলা। সেখানে কোনো লড়ালড়ি চলে না।

    পিলু গেল কোথায়!

    মিমি ডাকল, এই পিলু, কোথায় গেলি।

    অনেক দূর থেকে পিলু সাড়া দিচ্ছে।

    ওরা ওখানটায় কী করছে ভাই বোনে!

    বেলা পড়ে আসছে। গাছপালার ছায়া ক্রমে দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। এবং সে দেখল দূরবর্তী আকাশে বিশাল চাঁদের আবছা উপস্থিতি। পূর্ণিমা পার হয়ে গেছে, প্রতিপদ কিংবা দ্বিতীয়া—সাঁজ লেগে গেলেও ভয় পাবার কিছু নেই পিলু বোধহয় জানে। পিলু কী এই অরণ্যের মধ্যে জ্যোৎস্নায় কখনও হাঁটাহাঁটি করেছে। তার ভয় না থাকারই কথা। কারণ নবমী বনটায় থাকলে রাতের বেলায় সে অনায়াসেই ঘোরাঘুরি করতে পারে।

    পরী বলল, তা হলে শেষে যখের তাড়া খেয়ে স্বামীর ভিটে ছাড়লে!

    —হা মিমিদি।

    ওরা হাঁটছিল। নবমী তার স্বামীর স্মৃতি ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছে। নবমীর এই স্মৃতি ছাড়া আর কিছু যেন সম্বল নেই—যা সে মানুষের কাছে গর্ব করে বলতে পারে।

    মিমি সব শুনছিল না। তাকে এখন আসলে যখ তাড়া করছে। সে বলল, নবমী, যখ তো গুপ্তধন পাহারা দেয়। তোমার ঘরে যখ কী করতে আসবে!

    নবমীর কী মনে হতেই চুপ করে গেল। বাবাঠাকুর তো তাকে চোটপাট করেছে—কী তোমার ইট ক’খানা নিতে হবে! পারব না। কে নেবে! তোমার ছাগল নিতে হবে, আবার কাঠের পেটি নিতে হবে। এত বাহানা চলবে না। যেতে হয় একা চল। ছাগলটা নিচ্ছি।

    কিন্তু নবমীর সেই কড়জোড়ে প্রার্থনা, পেটিখান ফেইলে যাই কী করে।

    দা-ঠাকুরও কম চোটপাট করেনি। এখন যদি খবরটা জানাজানি হয়ে যায় তবে বাবাঠাকুর গোসা করতে পারেন।

    —নবমী, আমরা কী তোমার গুপ্তধনের লোভে বাড়ি এনে তুলেছি। বল! আমরা কী জানতাম, তুমি ইট ক’খানা পেটিতে পাহারা দিচ্ছ, গুপ্তধন আগলাচ্ছ আমরা জানতাম! পিলু তো সব ক’টা ইট জলে ফেলে দিতে গেছিল। দশ কান হলে ভাববে না, তোমার গুপ্তধনের খবর পেয়েই বাড়ি তুলে এনেছি, ঘর বানিয়ে দিয়েছি। পিলু মায়া প্রতিদানে তোমাকে বিকালে রামায়ণ মহাভারত পড়ে শোনায়। তোমার সেবা যত্ন সব গুপ্তধন পেয়েছি বলে! বল, বল চুপ করে থাকলে কেন। বাবাঠাকুরের মুখ মনে পড়তেই নবমী কেমন চুপ করে গেল।

    মিমি ফের বলল, যখ দেখেছ চোখে।

    নবমী রা করছে না।

    —যখ ঘোরাঘুরি করে টের পেতে কী করে!

    নবমী রা করছে না।

    —কী হল তোমার! কথা বলছ না!

    নবমীর হাত থেকে লাঠিটা পড়ে গেছে। মিমি ওটা তুলে দিল নবমীর হাতে। যখের কথা তুললেই রা করছে না। নবমীর মুখে সেই প্রসন্নতাও নেই।

    নবমী যেন তার অজ্ঞাতেই সব ফাঁস করে দিচ্ছিল। কী যে হবে!

    তখনই পিলু মায়া লতাপাতা ঝোপজঙ্গল সরিয়ে এদিকে ছুটে আসছে। শিগগির মিমিদি এস, শিগগির।

    —কেন!

    —এসই না।

    —কেন বলবি তো।

    মায়ার মুখ শুকিয়ে গেছে।

    পিলু হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে মিমিদিকে। নবমীকে বলল, বোস। আমরা আসছি।

    —কোথায় হাত টেনে নিয়ে যাচ্ছিস?

    সামনে বিশাল এলাকা নিয়ে কবরভূমি। মিনার, পরিত্যক্ত মসজিদ, কবরের উপর শ্বেতপাথরের ফলক, কোথাও গম্বুজ আর যতদূর চোখ যায় গাছপালা, পরে লাল সড়ক, একটা গরুর গাড়ি যাচ্ছে, ঝোপ জঙ্গলের ফাঁক থেকে তাও দেখা যায়।

    জায়গায় জায়গায় শুধু ঘাস। তার উপর দিয়ে ওকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

    আর কিছু দূর গিয়েই সে যা দেখল, তার আত্মারাম খাঁচা। তাড়াতাড়ি পালাতে চাইল মিমি। পিলুর এই দুর্জয় সাহস তাকে কেমন বিচলিত করছে। সে কেবল বলছিল, সর্বনাশ!

    —কিচ্ছু করবে না। তুমি ভয় পাচ্ছ কেন!

    বিশ পঁচিশ গজ দূরে সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখার জন্য পিলু তাকে এখানটায় এনে দাঁড় করিয়েছে। পিলুর ভয় ডর কম। তাই বলে কাল নিয়ে খেলা!

    মিমি দু-জনের হাত ধরেই ছুটতে চাইল। কিন্তু পারল না।

    পিলু কেবল বলছে, সাপের সং। কিচ্ছু করবে না। দেখ না। আমরা তো কখন থেকে দাঁড়িয়ে দেখছি। তুমি আসছ না!

    যেন পিলু এই গভীর বনের জন্মরহস্য আবিষ্কারের নেশায় এতক্ষণ তার ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরীদি আসছে না দেখে সে ছুটে এসেছিল—না দেখে গেলে, পিলু ভাববে, পরীদি কী ভীতু— আলিসান দুই ভুজঙ্গ একে অপরকে জড়িয়ে লতার মতো বেয়ে উঠছে।

    ভাদ্রের শেষ বেলা—মিষ্টি ঠাণ্ডা হাওয়া। গাছের ছায়ায় তারা দাঁড়িয়ে দেখছে। দেখতে দেখতে পরীর শরীর কেমন অবশ হয়ে যাচ্ছিল। সাপের এই সহবাস তাকে কোনো গভীর অতলে ডুবিয়ে দিচ্ছে। ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের লীলায় সে অধীর। এখন ইচ্ছে করলেও সে নড়তে পারবে না। সে তাকিয়েই আছে। অবিরাম ঘাসের উপর বেয়ে বেয়ে দু’জনের এই সংলগ্ন হওয়া কোনো নারী পুরুষের উপগত হওয়ার মতো। ক্ষণিকের আশ্রয় উত্তাপ অথবা বিষবাষ্প থেকে আত্মরক্ষার সামিল— সাপ দুটো যাচ্ছে আবার ফিরে আসছে, দু’জনে মুখোমুখি ফণা তুলে দুলছে, ছোবল দিচ্ছে ভূমণ্ডলের হৃৎপিণ্ডে, তারপর আরও ঘন, আরও আরও যেন দুটো দড়ি পাক খেয়ে কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের মতো বাতাসে ভর করে দাঁড়াচ্ছে—তারপর এক অপরূপ নৃত্য, ঘুরে ঘুরে দুলে দুলে নৃত্য। ফুলে ফুলে উঠছে শরীর। রোদে ঝকমক করছে তলপেট এবং বরফের মতো সাদা পেটের সংলগ্ন স্থানে সহ-অবস্থান। শরীরে, রোমকূপে ঝড় তুলে দিচ্ছে।

    বনভূমির কী যে থাকে সবুজ ঘ্রাণ, এই বেলায় বাতাসে তার ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। পরীর চোখ বিস্ফারিত। রোমকূপে ঝড়। আকাশ বাতাস থেকে দেবদূতের মতো উঠে আসছে মাত্র একটি মুখ—সে এতই নিষ্পাপ, সে এতই ভীরু, তার যেন জোরজার করারও ক্ষমতা নেই। এখন আর চোখের সামনে কোনো কালভুজঙ্গ দেখতে পাচ্ছে না। এবার পরী নিজেই কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল—ঠিক সাপের ভঙ্গিতে এই মোচড় তাকে পীড়নের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। চোখ লাল, কান গরম—এমন কী বালক- বালিকার সামনে দাঁড়িয়ে সঙ্গম দৃশ্য উপভোগ করা অশোভনতা পর্যন্ত খেয়াল নেই। শরীরের গভীর অন্তস্তল থেকে দ্রুত কী সব সংকেত পাঠাচ্ছে হৃৎপিণ্ডে। ধক ধক করছে—বুক। সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। পিলুর কাঁধে ভর দিয়ে কোনো রকমে বলল, আমার কী হচ্ছে। জোর পাচ্ছি না। শিগগির আমাকে ধর। আমাকে নিয়ে পালা। আমি না হলে মরে যাব।

    পিলু বলল, ভয় পাচ্ছ কেন। ওরা এখন কারো ক্ষতি করবে না। আমি তো ঢিল ছুঁড়েছিলাম। ভ্রুক্ষেপ নেই। দেখ না কত ঢিল ছুঁড়েছি। আমাকে তাড়া করেছে? তবে ভয় পাবে কেন!

    পিলু জানে না, পিলু বোঝে না, সরল বালক। সাপের সং দেখার সৌভাগ্য কম মানুষের হয়। সে বলল, জান পরীদি, ইস্ কী যে খারাপ লাগছে না। যাব দৌড়ে!

    —কোথায় যাবি! কেমন ত্রাসের গলায় কথাটা বলল পরী।

    —এক দৌড়ে যাব, এক দৌড়ে আসব। জান সাপের সং-এর উপর নতুন গামছা ফেলে দিলে পুণ্য হয়। গামছাটা ঘরে রাখলে যার যা মনোবাসনা পূর্ণ হয়।

    —কে বলেছে!

    —বাবা বলেছেন।

    —যাবি! অতি কষ্টে কথাটা বলল। সারা শরীরে ঘুমের মতো কী এক জড়তা নেমে আসছে। আর তখনই দেখল সেই কালান্তক যম প্রায় পাশাপাশি ঘাসের বুক বেয়ে পরিত্যক্ত মসজিদে ঢুকে গেল।

    পরী আর পারল না। বসে পড়ল। তার পায়ে জোর নেই। দু-জংঘার মাঝে অবিরাম নদী প্রবাহ প্রবল প্রতাপে ভেসে যাচ্ছিল। পরী বসে থাকতে পারল না। পরী ঘাসের উপর শুয়ে পড়ল কাত মানুষের দ্বারা ব্রিজে ফেলল। যেন সে এক গভীর অবশ অলস মুখর রাতে উপগত হবার পর তৃপ্তি নিয়ে শুয়ে আছে। সবাই চলে গেলেও তার কিছু আসে যায় না। রোমন্থনে সেই অমৃতের স্বাদ। সমুদ্র কত গভীর এবং তার সুখে অবগাহন পরীকে বড়ই কাতর করে রেখেছে। হুঁস নেই।

    —পরীদি! কী হল তোমার! ও পরীদি, ওঠো শরীর খারাপ লাগছে! ভয় কী। দেখ কিচ্ছু নেই। ও পরীদি, ওঠো।

    পিলু দেখছে পরীদি চোখ মেলতে পারছে না। সে কেমন হায় হায় করে উঠল।

    —নবমী, নবমী।

    সে চিৎকার করে ডাকছে। নবমী বনজঙ্গলের ভেতর থেকে পিলুর ভয়ার্ত গলা পেয়ে ছুটে আসার চেষ্টা করছে। এসেই সে দেখছে পরীকে। শুয়ে, দিদিমণি অবশ।

    পিলু সব বললে, নবমী ফোকলা দাঁতে হেসে ফেলল। পরীদিকে ডাকাতে ধরেছে গো। বসেন। ঠিক হয়ে যাবে।

    জীবনের এই মাধুর্য পিলুর টের পাবার কথা নয়, নবমী জানে। নবমী তাকাল। এই অরণ্যের কোথায় সেই নিভৃত স্থান, যেখানে সে কত রাতে গাছের ছায়ায়, ঘাসের উপর ডাকাতের হাতে পড়ে উলঙ্গ হয়ে গেছে। সেই মাধুর্য জীবনে আর নেই—কিন্তু তার স্বাদ আজ যেন এক নারীর মধ্যে আবার খুঁজে পেয়েছে।

    নবমী মাথার কাছে বসে হাত বুলিয়ে দিতে থাকল শরীরে। বেশবাস কিছুটা আলগা হয়ে গেছে। দুই বালক বালিকা কেমন তাজ্জব। পরীদির হিস্টিরিয়া আছে কিনা জানে না। পরীদিকে যদি ভূতে ধরে। এত সুন্দর পরীদিকে নিয়ে কবরখানায় ঢুকে সে ভাল কাজ করেনি! কী যে করবে।

    পিলু প্রায় ছুটে যেতে যেতে বলল, নবমী, তুমি বোস। মায়া, তুই থাক। বাবাকে ডেকে আনছি।

    পরীর হুঁস ফিরে আসছে।

    ছিঃ ছিঃ সে এটা কী করে ফেলল!

    নবমী ডাকছে, যাবেন না গো দাদাবাবু। সে বলল, সাপের সং দেখে ভিরমি খেয়েছে। হুঁস ফিরে এসেছে। যাবেন না!

    পিলু চঞ্চল স্বভাবের। সে দৌড়ে এসে দেখল, পরীদি উঠে বসেছে। মাথার চুল ঠিক করছে হাত দিয়ে। আঁচল দিয়ে শরীর ঢেকে দিচ্ছে।

    পিলু হাঁটু গেড়ে বসে বলল, হেঁটে যেতে পারবে তো।

    কোটাল আসার মতো পরীর পরিতৃপ্ত মুখ। নিজেই উঠে দাঁড়াল। তারপর কী ভেবে আঁচল দিয়ে দ্রুত পেছনটা আড়াল দিল। একবার নিজেও পেছন দেখার চেষ্টা করল। আর তারপর পিলু না, আর ভাবতে পারে না! পরীদি ছুটছে। এক হাতে আঁচল কোমরের নিচে টেনে ধরে রেখেছে। আর ছুটছে। বাতাসে আঁচল উড়ে না যায়? পরীদি কোমরের পেছনে হাত রেখে শুধু বলছে, শিগগির আয়।

    কেন এই চাঞ্চল্য পিলু বুঝল না।

    নবমী গাছপালার মধ্যে দ্রুত হাঁটতে পারে না। তাকে ফেলে চলে যাওয়াও যায় না। পরী এটা বোঝে। সে শুধু বলল, আমি যাচ্ছি। তোরা আয়।

    পিলু বলল, মায়া, তুই যা পরীদির সঙ্গে। জঙ্গলে হারিয়ে গেলে রাস্তা খুঁজে পাবে না।

    মায়া তাড়াতাড়ি ছুটছে। তার ফ্রক উড়ছিল, বাতাসে পরীদি টানা ছুটছে না। ঝোপ জঙ্গল ভেঙ্গে দ্রুত ছোটাও যায় না। কোথাও বসে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে, হাঁপাচ্ছে। আবার ছুটছে। আবার দাঁড়াচ্ছে। হাঁপাচ্ছে, আবার ছুটছে। মায়াও পরীদির সঙ্গে ছুটছে, দাঁড়াচ্ছে, হাঁপাচ্ছে।

    মায়া পরীদির এই মতিগতির কিছু অর্থ ধরতে পারছে না। আর বাড়ি এসে অবাক, পরীদি কাউকে না বলেই মা’র শাড়ি সায়া ব্লাউজ নিয়ে পুকুরঘাটে চলে গেল।

    বাবা পরীদির ছুটে আসা দেখে কিঞ্চিৎ তাজ্জব হয়ে গেছিলেন। বললেন, ওরা কোথায়!

    পরীদি জল ঢালতে ঢালতে বলল, ওরা আসছে।

    নবমীও বাঁশতলা দিয়ে হেঁটে আসছে। বোধহয় জোর ছিল না—হাঁটতে আর পারছিল না। পিলু ধরে নিয়ে আসছে। এক হাতে নবমীর লাঠি। ফিরে এসেই নবমী ধপাস করে বসে পড়ল। এক গ্লাস জল খেল আলগা করে। বাঁ-হাতে মুখ মুছে দেখল, পরীদি চান করে ভিজা কাপড়ে বিলুদার ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। নবমী কেমন প্রসন্ন গলায় বলল, তীর্থ করে এলাম বাবাঠাকুর।

    —ভাল করেছ। মনে জোর পাবে। মানুষের দাঁড়াবার জায়গা একটা বড় দরকার। যখন মনে হয় চলে যাবে। পিলু না যায় মায়াকে নিয়ে যাবে। নিয়ে যাবার লোকের তো অভাব নেই।

    পরী ঘর থেকে সব শুনতে পাচ্ছিল। সে ভাল নেই। জঙ্গলে যা হল। সে কেমন আশ্চর্য এক সুখ, ঠিক সুখও বলা যায় না, জীবনে বেঁচে থাকার জন্য তারও যে দরকার ছিল নিজেকে আবিষ্কার করার। কোনো পুরুষই একজন নারীর জন্য অপেক্ষা করে না। নারীও না। তবু কেউ অদৃশ্য ছায়ার মতো তাকে অনুসরণ করে। সে তার পিছু হাঁটে। কোনো দুর্গম অঞ্চলই তার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। বিশ্ব, তুমি কী চাও! আমাকে আর কত কষ্ট দিতে চাও। নিজে আগুনের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছ। আমি কী ভাল আছি! এ কী শাস্তির মধ্যে ফেললে। এখন আমি তোমাকে কোথায় খুঁজব!

    সাড়া শব্দ না পেয়ে বাবা বললেন, দেখ তো পিলু, মিমি কী করছে!

    দরজা বন্ধ! অনেকক্ষণ হয়ে গেল। সহসা তিনি ত্রাসের মুখে পড়ে গিয়েই বলেছেন, হয়তো নিজেই দৌড়ে যেতেন। কেন এই ত্রাস তাঁর!

    পিলু দরজা ঠেলে অবাক।

    পরীদি দাদার বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সন্তর্পণে দরজা ভেজিয়ে সে বাবার কাছে ছুটে গেল। কানে কানে ফিস ফিস করে বলল, বাবা, পরীদি না কান্নাকাটি করছে। বাবা বিস্ময়ের গলায় বললেন, কাঁদছে! কেন! শরীর খারাপ! তারপরই কী ভেবে বাবা মাথা নিচু করে বসে থাকলেন। নিখোঁজ পুত্রের কথা ভেবে তাঁরও মন খারাপ হয়ে গেল। তবু তিনি উঠে দাঁড়ালেন। পরীকে সান্ত্বনা দেওয়া দরকার। আজ তিনি কেন জানি পরীকে শুধু রায়বাহাদুরের নাতনি ভাবতে পারলেন না। সে এ-পরিবারের একজন। দরজার কাছে গিয়ে বাবা তাঁর ইদানীংকার আপ্তবাক্যটি বললেন, বুঝলে মিমি, কেহ আত্মাকে আশ্চর্য মনে করে— কেহ বা আশ্চর্যবৎ বলিয়া আত্মাকে বর্ণনা করে। আবার কেহ আশ্চর্য বলিয়া শোনে। কিন্তু ইহার বিষয় শুনেও কেহ ইহাকে বোঝে না। কান্নাকাটি কর না। সে ঠিক ফিরে আসবে।

    পিলু শুনছিল। সে জানে বাবা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার সময় সাধু বাক্য বলেন।

  • আট

    আট

    সকালে পিলু আবার সাইকেল নিয়ে বের হয়ে গেল। দাদা না থাকায় সাইকেলটা নিয়ে সে যখন তখন বের হয়ে যেতে পারে। যখন খুশি ফিরতে পারে। মা বাবা কোনো ফরমাস করলে তার মেজাজ তখন আর অপ্রসন্ন হয় না। বরং সে অপেক্ষায় থাকে বাবা কী ফরমাস করবেন, মা’র কী দরকার। কাল সকালে দাদাকে বিছানায় না দেখে সাইকেলে প্রায় সারাটা দুপুর কাটিয়েছে। এটা যে কী মজা, যেন সে ঘোড়ায় চড়ে বসে—তারপর বাদশাহী সড়কে উঠে এদিক ওদিক— যেদিকে দু চোখ যায় ইচ্ছে করলে চলে যেতে পারে। দাদা বাড়ি না থাকায় ধমক খাবার ভয় নেই। বাবার ধারণা শরীরের মতো যন্ত্রও বসিয়ে রাখলে ঘুণে ধরে। ঘুণে ধরা ঠিক না। চলুক, যতক্ষণ চলছে চলতে দাও। থামলেই বিগড়াবার ভয় থাকে।

    কাল সারাটা দিন পরীদিকে নিয়েই কেটে গেল।

    আজ বাকি কাজগুলো তার করা দরকার। যেমন মুকুলদাকে খবর দিতে হবে। যদি কোনো নতুন খবর টবর পেয়ে যায়।

    সে সড়কে উঠে গেলেই হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দেয়। ট্রাক সামনে। যমদূত আসছে। সে রাস্তা ছাড়ছে না। ট্রাক, বাস দেখলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। বাপের জায়গা। নিশ্চিন্তে সাইকেল চালাতে না পারলে মেজাজ আসে না। সে সড়ক ছাড়ছে না। ট্রাকটাকে পাকা রাস্তার বাইরে নামিয়ে ছাড়বে। সে পারেও। দুরন্ত গতিতে ট্রাকের সামনে হ্যাণ্ডেল ঘুরিয়ে নেয়। বোঝো মজা! নামিয়ে ছাড়লাম শালা শুয়োরের বাচ্চা আমি! বোঝো এবার। সেও তখন মরিয়া হয়ে যায়। সেও ছেড়ে কথা বলে না। কোনো কারণে গরু ছাগল আনতে গেলে কিংবা সড়কের ধারে একা থাকলে ট্রাক দেখলেই একটা ইট কুড়িয়ে নেয়। ধাঁই করে মারে—তারপর মাঠ ধরে দৌড় আর দৌড়। ট্রাক থামতে থামতে বনজঙ্গ লের আড়ালে পড়ে যায় সে।

    বাবা একদিন শুনে তেড়ে এসেছিলেন—খুবই বিপজ্জনক খেলা। বার বার নিষেধ করছি! কখন কী হয় বলা যায়। সাইকেল নিয়ে তো বের হও না, বাড়ির আত্মাটি হাতে নিয়ে বের হও। সময় মতো না ফিরলে কত দুশ্চিন্তা তুমি বোঝো।

    এটা ঠিক। এটা তারও হয়। দাদা সাইকেলে শহরে যেত। ফিরত বেশ রাত করে। অপরূপার কত কাজ! তা ছাড়া পুলিশ মাঠে দাদাদের আড্ডা। কী নিয়ে যে দাদারা এত কথা বলে বোঝে না। ফিরতে একটু বেশি রাত হলেই সে সড়কের কাছে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায়। দুশ্চিন্তা। দাদার বেলায় এটা হত, নিজের বেলায় কেন তা হয় না বোঝে না।

    আসলে ফাঁক পেলেই তার যে সাইকেল চড়ার নেশায় পেয়ে বসে। নেশা বিষম বস্তু। বাবা বলেছেন, একবার ধরলে আগাপাশতলা ছাল চামড়া ছাড়িয়ে নেয়। তারও নেবে হয়তো। কে জানে—ট্রাকের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া, যেই টের পাচ্ছে, পেছনে ট্রাকের হর্ন, তার যে কী হয়—পাল্লা। চালাও পানসি রানাঘাট—কে পারে দেখ! কে আগে যায় দ্যাখ! হলে কী হবে শেষ পর্যন্ত তাকে রাস্তা ছেড়ে দিতেই হয়। ক্ষোভে জ্বালায় তখন তার একমাত্র ঢিল সম্বল। ট্রাক দেখলেই—মারো শালাকে। কে তার শত্রু ঠিক অবশ্য জানে না। ট্রাক না ট্রাকের ড্রাইভার। বড় হয়ে সে ভেবেছে, ট্রাকের ড্রাইভার হবে। এই একটা বাসনা আছে। কত কত সব দূর গঞ্জ, পাহাড়তলি কিংবা শস্যক্ষেত্র পার হয়ে চলে যাবে। নদী, মাঠ, সেতু পার হয়ে সে চলে যাবে। সটান বসে থাকবে—হু হু করা বাতাসে তার চল উড়বে— স্বপ্ন স্বপ্ন। সাইকেলেরই এত নেশা, আর ট্রাকের নেশা কী না জানি।

    —আরে পিলু যে! আয় আয়।

    মুকুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁত মাজছিল। মুখে পেস্টের ফেনা। কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে বলে, মুখের ফেনা ফেলে এগিয়ে গেল, গেট খুলে দিল। ভোর রাতে বেশ বৃষ্টি হয়েছে। বাগানের এখানে সেখানে জল জমে আছে। শরতের আকাশ, সকালের রোদ, রাস্তার কদমগাছ-এবং চারপাশে সবুজের সমারোহে সে বেশ প্রসন্ন। শারদীয়া অপরূপার প্রস্তুতি চলছে। বিশ্ব হয়তো কোনো জরুরী খবর দিয়ে পাঠিয়েছে পিলুকে। ওর তো মতিস্থির নেই। হয়তো কোনো লেখা পছন্দ, প্রেসে দিয়ে দাও, আবার বিকেলে ডাকে আসা কোনো লেখা পছন্দ হয়ে গেল তো ওটা ফেরত নিয়ে এস। পরে দেখা যাবে। তা ছাড়া সে যেমন ভাল নেই—চৈতালি কলকাতায় চলে যাবার পর থেকেই মনমরা, আসলে তো কাগজটা বের করার এত উৎসাহ একমাত্র চৈতালি—সেই নেই। বিশ্বও ভাল নেই। মিমির সঙ্গে বোধহয় বড় রকমের খিটিমিটি বাধিয়ে বসে আছে। কিছুতো বলে না! চাপা স্বভাবের।

    পিলু বলল, জানো মুকুলদা, দাদা না কোথায় চলে গেছে। তোমাকে কোনো খবর দিয়ে গেছে। কোথায় উঠবে! কোথায় থাকবে।

    —বলিস কী! কোথায় গেল বলে যায়নি। কখন গেল। ওর যে কী হয় মাঝে মাঝে বুঝি না।

    —না। একটা … বলেই থেমে গেল। বাবা কেন যে চিঠির কথা ফাঁস হতে দিতে চান না, সে বুঝছে না। চিঠিতে দাদা পরীদিকে জড়িয়ে গেছে। খুবই নাকি কেলেঙ্কারি ব্যাপার। দাদা তো খারাপ কিছু লেখেনি। তার জন্য পরীদিকে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে—খারাপ তো লাগবেই!

    মুকুল বলল, ভিতরে আয়। কবে গেল! কখন গেল। তুই চুপ করে আছিস কেন। মেসোমশাই থানায় গেছে? এতো ভারি ঝামেলা। কত কাজ অপরূপার। না বলে না কয়ে ফের উধাও। পাগলা আছে সত্যি। কোথায় যাবে কিছুই বলে যায়নি।

    — না।

    তার এই প্রিয় বন্ধুটি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যেতেই মুকুল কেমন কষ্টের মধ্যে পড়ে গেল। দু’জনের দুটো প্রিয় সাইকেল, দই প্রিয় নারী, কবিতা চর্চা, অর্থাৎ স্বপ্ন, বিশ্ব এ-শহর ছেড়ে চলে যেতে পারল। দু’দিন দেখা নেই, ভাবাইল, আজই যাবে, কেন যে এটা হয়! যেন কোনো এক আশ্চর্য অমোঘ বন্ধন তৈরি হয়ে গেছে দু’জনের মধ্যে। দু’জনে কতদিন চুপচাপ বসে থেকেছে বড় মাঠে কিংবা রেশম কুটির জঙ্গলে ঢুকে গাছপালার ছায়ায় হেঁটে গেছে—দু’হাত উপরে তুলে গলা ছেড়ে কবিতা আবৃত্তি, নিজেদের কবিতা পাঠ আর কখনও সাঁ সাঁ করে সাইকেল চালিয়ে নির্জন রাস্তায় কোনো বৃক্ষের ছায়া পেতে কী যে ভাল লাগত! সে নেই, নিখোঁজ। বুকটা কেমন তোলপাড় করে উঠল।

    —বাড়িতে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল।

    —না।

    তারপরই মনে হল সে মিছে কথা বলছে। বাবার হম্বিতম্বি—গায়ে হাত, দেবীর গায়ে হাত, এ-যে মহাপাপ।

    কিন্তু পাপের কথা তো বলা যায় না। তবে যে সে তার বাবাকেই ছোট করে ফেলবে। দাদাকেও। সে বলল, না মানে, মন কষাকষি চলছে। তুমি তো জান, আমার বাবা কি রকমের।

    —মিমি জানে।

    —হ্যাঁ কাল তো মিমিদি আমাদের বাড়িতেই ছিল।

    —তোদের বাড়িতে!

    পিলু বুঝল না, এতে দোষের কী আছে। তারা গরীব। কিন্তু পরীদি তো গরীব লোকদের খুব ভালবাসে। বাড়িতে কত দাপট তাও সে অনেকবার দেখেছে। বাবা কত করে বললেন, তা হয় না, তুমি বাড়ি যাও। পিলু সঙ্গে যাবে। অবশ্য পিলু জানে, পরীদি একাই যেতে পারে। তার দুর্জয় সাহস।

    —সকালে বাড়ি চলে গেল। পিলু বলল।

    —চল তো পরীর কাছে। বলেই মুকুল সাইকেল বের করতে গেলে বলল, পরীদিকে পাবে না। কোথায় যেন যাবে। নাটক আছে।

    মুকুল জানে পরী মহেশ নাটকে আমিনার পার্ট করে। কিছুদিন তাকে বাড়ি থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছিল না তাও জানে। পরেশচন্দ্রের সঙ্গে কথা চলছে। বিবাহযোগ্যা কন্যা হলে যা হয়। পরী থম মেরে বাড়িতে এতদিন বসেছিল, ভাবলেই অবাক লাগে। তবে পরী আবার বিদ্রোহ করেছে!

    মুকুল কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। সে গেট থেকেই দৌড়ে গেল। বারান্দায় উঠে বলল, বৌদি, শুনছ বিলুর কাণ্ড। সে নাকি আবার ভেগেছে।

    বৌদি দাদা সবাই বের হয়ে দেখল, পিলু তখনও বাগানের বাইরে দাঁড়িয়ে।

    —ভিতরে এস। ওখানে কেন!

    —না আমি যাই। সুধীনদা, নিখিলদাকে যদি কিছু বলে যায়।

    মুকুল সাইকেল বের করছে। সে কেমন জলে পড়ে গেছে। পিলুর কথাও মনে নেই। কিন্তু পিলু বলছে, যদি কিছু বলে যায়। তাকে কিছু বলল না, পরীকেও না, নিখিল, সুধীনদাদের কিছু বলে যাবে বিশ্ব সেই ছেলেই না। সে বলল, দাঁড়া আমি যাচ্ছি।

    বৌদি বলল, কিছু মুখে না দিয়েই বের হচ্ছ। পিলুকে ডাক। কিছু খেয়ে বের না হলে অশান্তি হবে। সে পিলুকে ডেকে বলল, আয়। ভেবে আর কী হবে। সেবারেও তো কোন এক ছোড়দির খবর পেয়ে মেসোমশাই বিশ্বকে আনতে চলে গেলেন। ওর যা স্বভাব, আর যা চেহারা, ছোড়দির অভাব হবে না। অযথা মাথা গরম করে লাভ নেই।

    পিলু তবু ঢুকল না। কারণ সে তো ভাল নেই—যতই এই শহর, এবং বোস্টাল জেলের পাঁচিল পার হয়ে কোনো দিগন্ত প্রসারিত মাঠে পড়ে যেতে ভাল লাগুক, সাইকেলের নেশা থাকুক—তবু দাদার জন্য আজ কেন জানি তার কিছু ভাল লাগছে না।

    —না আমি যাই।

    পিলু কিছুতেই ভিতরে ঢুকল না। দাদা যা মানুষ, যদি কোনো প্ল্যাটফরমে শুয়ে থাকে! যদি স্টেশনে এসে মনে হয়—কাজ ঠিক করেনি। বাড়ির কথা, পিলুর কথা ভাবলে, দাদা শেষে কোথাও নাও যেতে পারে। লজ্জায় হয়ত বাড়ি যেতে পারছে না। চিঠি লিখে গিয়ে কে আর ফিরে আসে। মান মর্যাদা যে খোয়া যায়।

    তার হাতে এত কাজ মুকুলদার সঙ্গে আটকে গেলে আজকের দিনটাও নষ্ট হবে। কোথায় কোথায় চলে যাবে—তারপর তার আসল কাজটাই হবে না।

    সে সাইকেলে যাচ্ছে। কে পেছন থেকে ডাকল, এই পিলু, তোর দাদা নাকি নিখোঁজ।

    পিলুর মাথা গরম হয়ে যায়। কলোনির সুবোধদা। কাপড়ের দোকান আছে মীরা সিনেমার সামনে। দোকান খুলতে যাচ্ছে। খবরটা তবে বাতাসের আগে উড়ছে। নিখিলদা বাড়ি নেই। সুধীনদা বাজারে গেছে। তবে মুকুলদা ঠিক খবর দেবে। তার এখন সবচেয়ে জরুরী কাজ, দুটো স্টেশনে খোঁজ নেওয়া। পিলু বাবার নির্বিকার স্বভাব পায়নি। সে তার আয়ত্তের মধ্যে যতদিন দাদা না ফিরছে, ঘোরাঘুরি চালিয়ে যাবে। আর তার কেন যে মনে হয় স্টেশনে গেলেই দেখতে পাবে দাদা দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। কেউ ডেকে না নিয়ে গেলে দাদা যেতে পারছে না। সে গেলেই দাদা সুটকেস হাতে নিয়ে তার সঙ্গে রওনা হবে।

    এই সব আশার কুহকেই সেবারে সে রোজ গাড়ি এলেই স্টেশনের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। এটা এত বেশি প্রচার হয়ে গেছিল, যে দাদা সেই ভয়ে চিঠিতে লিখে গেছে, আমার জন্য স্টেশনে গিয়ে বসে থাকিস না। মন মানে! দাদা তুই এত অবুঝ। তুই বুঝিস না, বাড়ি না থাকলে আমাদের কত কষ্ট!

    সে স্টেশনে সাইকেল তুলে প্ল্যাটফরম ধরে হেঁটে গেল। যাত্রীর ভিড়। সাড়ে আটটার ট্রেন ছাড়বে। আর সঙ্গে সঙ্গে কেন যে মনে হয় দূরে ঐ তো দাদা দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় চুল, পাজামা পাঞ্জাবি পরা। সে কাছে গিয়ে নিরাশ হয়ে গেল। দাদা না। সে উঁকি দিয়ে মুখ দেখতে দাদার বয়সী মানুষটা বলল, খোকা, কিছু বলবে।

    সে লজ্জায় পড়ে যায়। ওয়েটিং রুমের ভিতরে উঁকি দিল, তারপর মনে হল বাথরুমে থাকে যদি। সে বাথরুমের দরজা ঠেলেও দেখল। এটা তার কেন হয়। দাদা না ফিরে আসা পর্যন্ত সে বাড়িতে এখন এক দণ্ড স্থির হয়ে বসে থাকতে পারবে না। দাদা যদি না ফেরে কলকাতায় চলে যাবে। কলকাতায় গিয়ে খুঁজতে শুরু করবে। কিন্তু সে তো খুব বেশিদূর যায়নি। বাবা মাঝে মাঝে এ-দেশে এসে উধাও হয়ে যেতেন। তাঁর শিষ্য যজমান আত্মীয়রা কে কোথায় এসে উঠল খোঁজ- খবর নিতেন। বাবার তখন ট্রেনে টিকিট লাগত না। উস্বাস্তু মানুষের কাছ থেকে নাকি রেলের ভাড়া নিতে নেই—এই বিশ্বাসে বাবা সহজেই এখানে সেখানে চলে যেতে পারতেন। দু-দিনের বলে বের হতেন—ফিরতেন পক্ষকাল পরে। মা’র চোপার ভয়ে বলতেন, আর বল না নেত্যকালীর সঙ্গে ট্রেনে দেখা। সেই ধরে নিয়ে গেল। কিছুতেই ছাড়ল না।

    মাধবদির সরকাররা পূর্বস্থলীতে এসে উঠেছে। নিয়ে গেল। সেখান থেকে রানাঘাটে। হাইজাদির রাঘব ঘোষ কিছুতেই ছাড়ল না, এত বড় পাবদা মাছ, প্রায় হাতখানা মেলে ধরে পাবদা মাছের সাইজ দেখিয়েছিলেন। এ-দেশে এসে এত বড় পাবদা বাবা খাননি, পাবদা মাছ খাবার লোভেই বাবা বিনা নোটিসে থেকে গেলেন। পিলুর তখন মনে হয় বাবাও কম পেটুক না। তারপর বাবার এক কথা, রাঘব খুব আদর যত্ন করল। ছেড়ে আসি কী করে! এমন সব গল্প শুনে পিলুর মনে হয়েছিল বড় হলে রানাঘাটে যাবে। অনেক স্টেশনে কিংবা প্ল্যাটফরমে রাত্রিবাস তাদের তখন নিত্যকার ব্যাপার। সে বিছানায় উঠে বসেছিল তড়াক করে। বাবার পাবদা মাছ খাওয়ার গল্প শুনতে শুনতে মুগ্ধ হয়ে গেছিল। নানা জায়গায় তারা ঘুরেছে এ-দেশে এসে। রানাঘাট জায়গাটায় গেছে কিনা বলতেই বাবার জবাব, যাব না কেন। দেশভাগের পর রানাঘাটের উপর দিয়েই তো এলাম।

    তারপরের প্রশ্ন ছিল, রানাঘাট কতদূর। সেখানে আবার যাওয়া যাবে কি না। কারণ গেলে বড় পাবদা মাছের ঝোল খাওয়া যাবে—পিলুর এমন মনে হত। রানাঘাটে তার যাওয়া হয়নি। তিন চার বছরের উপর বনজঙ্গলে বাড়ি ঘর করার পর কোথাও আর যাওয়া যায় তাও সে এখন বিশ্বাস করে না। কিন্তু বড় হয়ে রানাঘাট যাবে—এই উচ্চাশা সে এখনও পোষণ করে থাকে। বেগে সাইকেল চালাবার সময় তার লক্ষ্য, চালাও পানসি রানাঘাট।

    যার রানাঘাটই যাওয়া হয়নি, তার পক্ষে যে কলকাতা জায়গাটা খুব নিরাপদ নয় পিলু তা বোঝে। সে কাশিমবাজার স্টেশনে ঢুকে খুঁজল। কোনো বেঞ্চিতে কেউ শুয়ে নেই। সব ফাঁকা। কেবল কিছু কাক দুরের গো-ডাউনের মাথায় কা কা করছে। সে কেমন ক্রমশই নিরাশ হয়ে যেতে থাকল। বাকি থাকল, সেই রেশম কুটির জঙ্গল। যেখানে দাদা সারাদিন একটা গাছের নিচে শুয়েছিল। পরীদিকে মেরে আসার পর জঙ্গলটায় ঢুকে গাছের ছায়ায় চুপচাপ শুয়েছিল।

    রেশম কুটির জঙ্গলটা রেললাইনের ধারে। সে সেখানে ঢুকে গেল। বড় বড় তুঁত গাছ, নীল সবুজ ঘন পাতা—রেশম গুটির চাষ। কেমন গভীর নির্জন। গাছপালার মধ্যে কোনো মানুষের সাড়া পাওয়া যায় না। তবু তার সেই আশা কুহকিনী—সে খুঁজতে খুঁজতে এক সময় চিৎকার করে উঠল, দাদারে!

    না কেউ সাড়া দিচ্ছে না।

    সে গলা ফাটিয়ে ডাকছে, দাদারে!

    না কেউ সাড়া দিচ্ছে না।

    গাছের পাতা হাওয়ায় দুলছে। ঘাসের মধ্যে কীটপতঙ্গ ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা ট্রেন চলে গেল হুইসিল দিতে দিতে। মালগাড়ির ঝাকর ঝকর শব্দ। দূরে বাসের হর্ন বাজছে। সব এত স্বাভাবিক, সব এত ঠিকঠাক, কেবল তাদের সংসারেই দাদা আগুন ধরিয়ে কোথায় যে চলে গেল! তার চোখ ফেটে জল আসছিল। সে ছাড়বে না, দাদা কী ভেবেছে! তারা মানুষ না, যা খুশি করবে। সে কেমন পাগলের মতো কেবল ডাকছে, দাদারে তুই ফিরে আয়। পরীদি তোর বিছানায় শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। তোর কোনো মায়া দয়া নেহ!

    পিলু আসলে দাদার এই নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টিতে এর চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে না। তার আর কোনো বড় সম্বল নেই। জ্বালা ক্ষোভের যন্ত্রণায় সে ছটফট করছিল। গাছের ডাল ভাঙছে। যা কিছু সামনে পড়ছে লাথি মেরে সরিয়ে দিচ্ছে। কাক পক্ষী দেখলে তেড়ে যাচ্ছে। তোমরা সুখে থাকবে, উড়বে-ওড়া বের করছি। আর ডাকছে, দাদারে। যেন সে দাদাকে পেলে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে যেত। গাছের ডাল ভেঙে ভাল ছিল না, পাখি তাড়িয়ে ভাল ছিল না—কী ভাবে যে সে খুঁজে বের করবে!

    একদিন বাবা বললেন, বুঝলে পিলু, এটাই তোমার কুঅভ্যাস! ভাল না। দাদা ফিরে আসছে না কেন, আমরা কী করব! তোমার খোঁজার পালা শুরু হয়ে গেল। সে কী এখানে আছে! জান পৃথিবীটা কত বড়। এর সাতটা সমুদ্র আছে জান। হিমালয় পাহাড় আছে জান। পাঁচটা মহাদেশ আছে জান? কুমেরু সুমেরু আছে জান! এত বড় পৃথিবীতে লুকিয়ে থাকলে কার বাপের সাধ্যি আছে খুঁজে বের করে। সে নিজে ফিরে না এলে আমরা কিছু করতে পারি না। খোঁজাখুজি সার। তুমি বের হবে না বলে দিলাম।

    কিন্তু কে কার কথা শোনে! সে সাইকেল বের করছে। সে রেলে চড়ে বেলডাঙ্গা পর্যন্ত গেছে। ভাবদা সারগাছি গেছে। সে এই করতে করতে কতদূর যেতে পারে একবার দেখবে। কলকাতায় দরকার হলে চলে যাবে।

    মায়া বলল, ছোড়দা, যাস না। সারাদিন টো টো করে কোথায় ঘুরিস, খাওয়া নেই, তোর ঘুরতে ভাল লাগে। কষ্ট হয় না। মা কাঁদে। আমার কপাল এই। যাও একটু সুখের মুখ দেখলাম, এখন দু’জনের এই মতিগতি। কেউ কারো কথা শোনে না।

    পিলু যাবেই—অগত্যা বাবা আর কী করেন। তাঁর আজ দুর্গা নবমীর ব্রত আছে। সকাল সকাল বের হতে হবে। স্নানে যাবার উদ্যোগ করছিলেন। তখনই পিলুর মাথায় ক্যাড়া উঠে গেল। সাইকেল বের করতে দেখেই বললেন, আরে তোমার দাদা তো লিখে গেছে, তোমার এই কুঅভ্যাসটি তো তার জানা। তোমাকে কী লিখে গেছে বল!

    যেন বাবা পড়া ধরছেন।

    পিলু ছাত্রের মতো বলল, স্টেশনে গিয়ে বসে থাকতে নিষেধ করে গেছে।

    —তবে!

    খড়মের একটা বাউলি খুলে গেছে। বাবা খড়মে বাউলি ঠুকে দিতে দিতে বললেন, তবে, বুঝছ সে তোমার মতো অবিবেচক নয়। সে জানে। তাকে নিয়ে তোমার মাথার ক্যাড়া উঠে যাবে। এ- জন্যই নিজের হস্তাক্ষরে লিখে গেছে। গুরুত্বটা তার বুঝছ।

    পিলু জানে তাদের বাবা এ-রকমেরই। ঈশ্বর ছাড়া তাঁর কোনো আর অবলম্বন নেই। না হলে সেই কবে এমন একটা বনজঙ্গলে ঘরবাড়ি বানাতে সাহস পায়। ছেলেপুলে নিয়ে সংসার। সামনে পুলিশ ক্যাম্প ছাড়া আর কোনো মানুষের বসতি নেই। রাতের বেলা বেড়ার পাশে শেয়াল খাটাস ঘুরে যায়। পুলিশ ক্যাম্পও খুব কাছে না। পানীয় জল আছে, প্রথমেই সেদিন বাবার ছিল এই আপ্ত বাক্যটি সার। কপর্দকশূন্য মানুষের যা হয়ে থাকে।

    —এখানে ঠাকুরকর্তা ঘরবাড়ি বানালেন। কে আছে?

    —কেন, ঈশ্বর আছেন। গাছপালা বনজঙ্গল আছে। মাটি আছে। আকাশ আছে। হাওয়া আছে! কী নেই বল?

    সুতরাং এমন বাবার সঙ্গে তার তর্ক করা বৃথা। সে সকালে এক পেট পাত্তা খেয়ে আর কোনো কথা না বলে সাইকেলে বের হয়ে গেল!

    বাবা বিরক্তিতে বললেন, যত্তসব! খুঁজবেন। বের কর খুঁজে। দেখি কী করতে পার। আরে তাঁর মর্জি না হলে, তোমার দাদা নিখোঁজ হন। তাঁর মর্জি না হলে, তিনি কখনও ফিরে আসেন।

    একদিন মিমি হুড়মুড় করে রিকশা থেকে নেমে ছুটে এল। পিলু দেখছে, পরীদি কেমন রোগা হয়ে গেছে। এর আগেও প্রায়ই খবর নিয়ে গেছে, আর খবর শুনে মুখ কালো হয়ে গেছে। ফেরেনি। কোনো চিঠিও দেয়নি। পরীদি তারপরও বলেছে, মেসোমশাই ভাববেন না—আমি বসে নেই। লোক লাগিয়েছি। কলকাতায় আমাদের কাগজের জানাশোনা ছেলেরা আছে। ওদের সব খুলে লিখেছি। সম্ভবত বিলু কলকাতায় গা ঢাকা দিয়ে বসে আছে। কফি-হাউসে খোঁজখবর নিতে বলেছি। খবর পেলেই চলে যাব।

    —তুমি চলে যাবে কেন? তোমার দাদামশাই দুঃখ পাবেন। আমিই যাব। কলকাতায় আমি গেছি! ভাববে না, আমি কলকাতা চিনি না। মা রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়েছিল। মা বাবার কথা সহ্য করতে পারে না। বলল, তুমি গেলেই হয়েছে। বাপ বেটা দু’জনকে খুঁজতেই তখন আবার পরীকে হন্যে হয়ে ছুটতে হবে।

    বাবা পরীদির দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, বোঝো! অর্থাৎ যেন বলা, বোঝো আমি কী শান্তিতে আছি।

    সেই পরীদি রিকশা থেকে লাফ দিয়ে নামল। শাড়ি সামলে এক হাতে ছুটে আসছে জাম গাছতলার নিচ দিয়ে। পিলু বারান্দায় মাদুর পেতে পড়ছিল। আর তখনই রিকশার ঘণ্টি বাজছে—সে দেখছে রাস্তা থেকে পরীদি ছুটতে ছুটতে আসছে। মুখে চোখে উত্তেজনা! পরীদি কী দাদার খোঁজ পেয়েছে! সে চিৎকার করে বলল, বাবা, পরীদি আসছে। সেও পরীদির কাছে ছুটে গেল। দাদার নিশ্চয়ই কোনো খবর আছে। না হলে এ-ভাবে কেউ ছুটে আসে না। আর তখনই মাথায় পোকা ঢুকে যায়, কোনো খারাপ খবর নয় তো! পরীদি তো সাইকেলে আসে। কলোনিতে পরীদি পার্টির কাজ করে বেড়ায়। কার লোন বের হয়নি, কার ক্যাসডোল মেলেনি, কারা নতুন এল—বসতি কোথায় দেওয়া হবে, নানা কাজে এখন পরীদি আসে। মাঝে মাঝে রাত বেশি হয়ে গেলে শহরে ফেরে না। দাদার ঘরে মায়াকে নিয়ে শোয়। সে তখন বাবার পাশে শুয়ে থাকে। সেই পরীদি রিকশাতে। খুবই জরুরী খবর— না হলে রিকশায় যেন আসতে পারে না। কাছে আসতেই দেখল পরীদির চোখে মুখে উচ্ছ্বাস। ঠিক এই পরীদিকে পিলু চেনে না।

    সে বলল, পরীদি তুমি! দাদার কোনো খবর পেলে!

    পরীদি বলল, পেয়েছি।

    পিলু লাটুর মতো পাক খেয়ে বলল, মা মা, বাবা বাবা–মায়া, দাদার খোঁজ পাওয়া গেছে। বাবা ঘরে কিছু করছিলেন। করছিলেনটা আর কী! তাঁর গামছায় বাঁধা পুঁটুলিটা ঘাঁটছিলেন। যখন তিনি অথৈ জলে পড়ে যান, ওটা করে থাকেন। এরই ভিতর তাঁর টাকা পয়সা গোঁজা থাকে। কেউ ধরলেই ক্ষিপ্ত হয়ে যান। পুঁটুলিটা তাকের উপর তুলে রাখেন। বাড়িতে ঠাকুর দেবতার পর এই পুঁটুলিটাই বাবার সব। সিঁদুর মাখা একটি রুপোর টাকাও থাকে পুঁটুলিতে। টাকাটা বাবা দেশ থেকে সঙ্গে এনেছিলেন। মাথা নেড়া একজন মানুষের মুণ্ডুর ছাপ টাকাতে। সে একবার গোপনে খুলে টাকাটা হাতে নিয়ে দেখেছিল। তাঁর পোঁটলা কেউ ধরলেই টের পান। সেদিন বাবা অগ্নিশর্মা। আমার গৃহলক্ষ্মীর উপর কার দয়া হল! কে ধরেছে। কেউ স্বীকার করে না। সেও না। বাবা গজগজ করছিলেন, আমার জিনিসে কার যে এত দরকার বুঝি না। কিছুই খোয়া যায়নি—কিন্তু কিছুতেই বাবার মেজাজ প্রসন্ন করা গেল না সেদিন।

    দাদার খবর পাওয়া গেছে শুনে সবাই ছুটে বের হয়ে এলেও বাবাকে দেখা গেল না। নবমী পর্যন্ত তার ঘর থেকে বড় দাদাঠাকুরের খবর পাওয়া গেছে শুনে গুড়ি মেরে বের হয়ে এসেছিল। কেবল বাবার সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না।

    পরীদি ছুটে এসে বারান্দায় বসে গেল। মাটি উঁচু করে ঘরের বারান্দা। গোবরজলে নিকানো। পরীদির এই স্বভাব। মাটির দাওয়ায় বসলে আকাশের নক্ষত্র নাকি খুব কাছে দেখা যায়। অদ্ভুত সব কথা। পরীদি উচ্ছ্বাসে প্রায় যেন ভেঙে পড়েছে। মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, এক গ্লাস জল খাওয়া।

    কী খবর কিছুই বলছে না। কোথায় আছে দাদা তাও বলছে না। পিলু অপেক্ষা করছে উঠোনে— দাদা কোথায় আছে? কবে আসবে? কিন্তু পরীদি কিছুই বলছে না দাদার সম্পর্কে। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, মেসোমশাই বাড়ি নেই!

    ভিতর থেকে গলা পাওয়া গেল, যাই। দেখ না, কোথায় যে রাখলাম।

    খুবই জরুরী কিছু বাবা হারিয়ে বসে আছেন। দাদার খবরের চেয়েও জরুরী বিষয় বাবার এখন আর কী থাকতে পারে পিলু বুঝতে পারছে না। এমন কী অমূল্য নিধি তাঁর হারিয়েছে যা দাদার খবরের চেয়ে বড়। পরীদি যতবারই এ-বাড়িতে এসেছে— দেখেছে বাবা ঝোপজঙ্গলে গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত। আগাছা সাফ করছেন। গাছের গোড়ায় মাটি দিচ্ছেন। সেই বাবা ঘরের ভেতর কী করছেন এখন কে জানে! পরীদিও হয়েছে, বাবা বারান্দায় এসে না বসলে যেন কোনো খবরই কাউকে দিয়ে লাভ নেই।

    পিলু আর পারল না, দাদা তোমাকে চিঠি দিয়েছে।

    —তোর দাদাকে এই চিনলি এত দিনে। সে চিঠি দেবে! তা হলেই হয়েছে। সে চিঠি দেবার পাত্র।

    —তবে কে জানাল? তুমি কলকাতায় গেছিলে!

    পার্টির মিছিল গেলে পরীদি কলকাতায় যায়। পরীদি এমনিতেও যেতে পারে। কলকাতায় তার কাকা থাকেন, এক পিসি থাকেন। তাদের বাড়ি ঘর আছে। বেড়াতে যেতে পারে। কত কারণেই পরীদি যখন তখন কলকাতায় চলে যেতে পারে। এক-দু’দিন থেকে ফিরে আসতে পারে—যদি সেখানে দাদার কোনো খবর পায়।

    পরীদির হাতে সুন্দর মলাটের একটা বই। এত যত্ন করে রেখেছে, এবং কোলের উপর রেখে যাতে ভাঁজটাজ না পড়ে—যেন এই বইটা পরীদির কাছে বাবার চণ্ডীস্রোত্রের চেয়ে মূল্যবান। কারণ পরীদি আঁচল দিয়ে এরই মধ্যে মলাটে ধুলোবালি না লাগে, মুছে আবার নিজের মুখ মুছল। কার্তিকের বেলা—রোদের তাপ কম—তবু পরীদি ঘামছে। এত যত্নে আলতো করে আঁচলে বই-এর মলাট কেউ মুছে দেয় পিলু এই প্রথম টের পেল। নিজের মুখের চেয়েও দামি বই-এর সুন্দর মলাট—এমনই মনে হল তার।

    বাবা বিরক্ত হয়ে যেন এবার বাইরে বেরিয়ে এলেন। বারান্দায় জলচৌকিতে বসে বললেন, তা হলে শ্রীমানের খবর পাওয়া গেল। আসার কোনো খবর দেয়নি!

    পরী বলল, না তা দেয়নি। খবর পাওয়া যায়নি!

    —কী বলছ। এই যে পিলু গলা ফাটিয়ে বলল, দাদার খবর পাওয়া গেছে।

    —তা পাওয়া গেছে।

    —সেটা কী! বাবার কেমন তিক্ত গলা।

    পরী যত্ন করে পত্রিকাটা এগিয়ে দিল।

    —এটা কী! এটা দিয়ে আমি কী করব!

    —কলকাতার খুব বড় কাগজ।

    –কী আছে এতে?

    —বিলুর কবিতা!

    —কবিতা!

    পিলু দেখল বাবার চোখ মুখ কুঁচকে গেছে। পরীদি কী যে করবে ভেবে পাচ্ছে না। এটা তাহলে বই নয়। পত্রিকা। দাদার কোনো খবর নেই। দাদার কবিতা ছাপা হয়েছে। বাবা যে এতে কুপিত হবেন বোঝাই যায়। দাদার কবিতা নিয়ে বাবার যত ক্ষোভ। গোল্লায় গেল। মাথায় পোকা ঢুকে গেছে। আখের সর্বনাশ!

    পরীদি বলল, বিলুর কবিতা ছাপা হয়েছে।

    —ছাপা হয়েছে তো আমি কী করব।

    —কত নামি কাগজ মেসোমশাই—।

    যেন পরীদির এত দিনে জীবন সার্থক। পিলু জানে, দাদা বন্ধুদের গর্ব—দাদা পরীদির আবিষ্কার। পরীদিই ব্লেকমেল করে দাদাকে দিয়ে কবিতা লিখিয়েছে। ব্লেকমেল কী পিলু জানে না। তবু দাদার সঙ্গে ঝগড়া বেঁধে গেলে, পরীদি চেঁচিয়ে বলত, আমি তোমাকে কবিতা লেখার জন্য ব্লেকমেল করেছি বিলু!

    —হ্যাঁ করেছ। কে যায় ও-পথে। তুমিই তো অযথা ভয় দেখালে। প্রতারণা করেছ।

    —প্রতারণা! তোমার সঙ্গে!

    —কার সঙ্গে তবে! তোমার তো একজনই আছে প্রতারণা করার লোক। তুমি বলনি, বলে দেব।

    —কী বলে দেব বলেছি।

    —আমি যে গ্যারেজ থেকে গোবিন্দের কৌটা ভেঙে কুড়ি টাকা নিয়ে সেবারে পালিয়েছিলাম বলনি! বলনি, আমি চোর। চোরকে কালীমন্দিরের পুরোহিত করা যায় না!

    —হায় সর্বনাশ, বিলু তোমার মিছে কথা বলতে জিভে আটকাল না! চোর না বললে তো মন্দিরে পুরুতগিরি করতে। সব তো ঠিক হয়ে গেছিল। দাদামশাই, তোমার মানুকাকা, মেসোমশাই মিলে ঠিকই করে ফেলেছিল। মনে নেই ছুটে এসেছিলে, পরী আমাকে বাঁচাও। বাবার যা কাছাখোলা অবস্থা রাজি হয়ে যাবেন। বর্তে যাবেন। রক্ষা কর। কার্তিক ঠাকুরকে তখন কে রক্ষা করেছিল!

    —না বলিনি।

    —মিছে কথা বলবে না। একদম বলবে না। বলনি, এখন আমি কী করব পরী!

    পিলু দেখেছে, দাদা আর কথা বলতে পারত না। একেবারে চুপ করে যেত।

    পরীদি তখনও গজ গজ করছে—আমি যত নষ্টের গোড়া না! নষ্ট করেছি। ঠিক করেছি। আরও করব। পারলে একশবার করব। হাজারবার করব। কবিতা লিখতে বললে মানুষকে নষ্ট করা হয়!

    দাদা আবার গর্জে উঠত, চুপ। তুমি বলনি, বিলু, সব করব। কবিতা লেখ। তুমি পারবে। তোমার চোখ মুখ বলছে পারবে। তোমার ভিতর জ্বালা আছে। অনুভূতি আছে স্বপ্ন আছে। তুমি পারবে। কলেজ ম্যাগাজিনের কবিতাটি দাও। তবেই দাদামশাইকে বলব, বিলুটা একটা চোর। গ্যারেজ থেকে টাকা চুরি করে একবার পালিয়েছিল। একটা চোরকে বাবাঠাকুরের জায়গায় বসাবে। ভাল দেখাবে! তোমার মা কালী রাগ করবেন না! কী বলনি! বল চুপ করে থাকলে কেন। কে আমাকে রাস্তায় টেনে নামিয়েছিল।

    পরীদি বলত, বেশ করেছি। তোমার সর্বনাশ আমি চাই। আঃ কী কবিতা! পরী আমার সর্বনাশ। আর কোনো লাইন খুঁজে পেলেন না তিনি!

    দাদার ঘরে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। বাইরে থেকে কেউ শুনছে। সেই পরীদি কত উচ্ছ্বাস নিয়ে এসেছে, আর বাবা কেবল বসে বসে তামাক টানছেন। পত্রিকাটা মাটিতে পড়ে আছে। পরীদির কাছে যা গৌরবের, বাবার কাছে বোধ হয় তা খুবই অগৌরবের।

    হঠাৎ বাবা প্রশ্ন করলেন, এতে কী পেট ভরে মা! এই যে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে বাবু দুম করে অন্তর্ধান করলেন, ফল ভাল হবে! কবিতা লিখলে পেট ভরবে!

    পরীদি মাথা নিচু করে বসে আছে।

    মা বললেন, মিমি, বিলুর কোনো খবর নেই কাগজে!

    —আছে মাসিমা। কাগজটাইতো খবর। বিলু কী সুন্দর কবিতা লিখেছে। বলে সে মা’র কাছে কাগজটা নিয়ে গেল।

    বাবা বললেন, ওনি তো কবিতা বোঝেন!

    আসলে ঠেস দিয়ে কথা।

    পরীদি বলল, কবিতা বোঝার জন্য কেউ লেখে না মেসোমশাই। পড়ে ভাল লেগে যায়। দূরের কথা বলে। স্বপ্নের কথা বলে। বেঁচে থাকার কথা বলে। কত পাঠক পড়বে। নাম জানবে। আমি তো আর কিছু চাইনি।

    বাবা বললেন, বেশ ছিল, এখানে কাগজ নিয়ে পড়েছিল। কুকর্ম সুকর্ম তার এখানকার বন্ধুরাই সামলাত। এত বড় শহরে গিয়ে কবিতা লিখে শেষে দেশসুদ্ধ যজালি!

    পরী মেশোমশাইকে জানে। তার প্রতি মেসোমশাইয়ের এ-কারণে চাপা ক্ষোভও আছে। যদি তিনি পাতা উল্টে দেখেন, পড়েন। কত বড় বড় কবির পাশে তার কবিতা ছাপা হয়েছে। না দেখলে বুঝবেন কী করে! তারপরই মনে হল, মানুষের দারিদ্র্য অনেক কিছু বোধহয় হরণ করে নেয়। ঝড়, জল, অন্ন চিন্তা, মুষ্টি নির্ভর জীবন কোন কবিকেই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে দেয় না। তিনি দেখলেও এর গাম্ভীর্য কিংবা গুরুত্ব টের পাবেন না। পরীর নিজেরই ইচ্ছে হল একবার সবটা পড়ে শোনায়।

    তখনই পিলু বলল, তুমি যে বললে, দাদার খবর আছে, এই খবর!

    —হ্যাঁ। তোর দাদা কলকাতায় গা ঢাকা দিয়ে আছে। কতদিন থাকতে পারে দেখব। পত্রিকা অফিসে গেলেই ওর খবর পাওয়া যাবে। কফি হাউসে গেলে পাওয়া যাবে। কবিরা মুখচোরা স্বভাবের হয়। আড়ালে আবডালে থাকতে ভালবাসে জানি। তবু সে ভালই আছে। এর চেয়ে বড় খবর আর কী পেতে চাস বুঝি না। আমার কাছে এর চেয়ে বিলুর আর অন্য কোনো বড় খবর যে থাকতে পারে না। কথা বলতে বলতে মিমির গলা ধরে এল।

    এতে বাবার বোধ হয় সামান্য লেগেছে। বললেন, দেখি। তারপর তিনি পাতা উল্টাতে থাকলেন কাগজটার।

  • নয়

    নয়

    সকাল থেকেই পিলুর মেজাজ খারাপ। আমাকে কিছু বলবে না। যাব বাড়ি থেকে বের হয়ে বুঝবে মজা।

    —যা না যা, একটাতো গেছে। তুইও যা। কে থাকতে বলেছে। আমি তোদের কে?

    আসলে পিলু বুঝতে পারে, দাদা বাড়ি নেই বলে মা’র চণ্ডীপাঠ শুরু হয়ে গেছে। শীতের সময়। বাড়িতে পিঠে পুলি হবে। চাল বাটা থেকে, মাষকলাই কিছুই বাদ যায়নি। ঠাকুরের ভোগ হবে। অথচ দাদাটা বাড়ি নেই। ইট কাটার আগে ঠাকুরকে সামান্য অন্নভোগ।

    সব ঝক্কি তার উপর

    —এই পিলু!

    বাবা হয়তো ডাকলেন।

    —যাতো সনাতনকে বলবি সের খানেক আরও খেজুরের গুড় দিতে। তোর মা-তো রণচণ্ডী হয়ে আছেন। ঠাকুরের ভোগ কার জন্য। আরে বোঝো না, কার জন্য। মানত করেছি যখন, দিতেই হয়। দেখি ঠাকুর কী করেন। কতটা খেলাতে পারেন। ইটের ভাটা হবে বোঝো না!

    সকাল থেকেই শুরু হয়েছিল। এক দণ্ড সে বসে থাকতে পারছে না। পরীক্ষা হয়ে গেছে। স্কুল নেই। বাড়িতে আর কে আছে ছোটাছুটি করবে। দাদাটি তো মজা করছেন। কার সঙ্গে পিলু তাও বোঝে না। পরীদি দাদার কবিতা নিয়েই হৈচৈ করছে। আরে মানুষটা কোথায় আছে কী খাচ্ছে, কারো মাথায় নেই। এক ফোঁটা জল গড়িয়ে খেতে জানে না, তার কি না এত মেজাজ!

    সকালে উঠেই একবার যেতে হয়েছে নিবারণ দাসের আড়তে। ইট কাটা হবে। মাটি তোলার কাজের জনমজুর নিবারণ দাসেরই ঠিক করে দেবার কথা। বাবার বড় যজমান। বিষয়ী মানুষ। সব কাজে কর্মে নিবারণ দাসকে খবর দাও। কোথায় ইটের ভাটা হবে, জনমজুর কত লাগবে, সাঁওতাল মেঝেন হলে ভাল হয়—সবই নিবারণ দাসের পরামর্শে। দাদা বাড়ি নেই—অথচ বাবা কোনো কাজই করতে বাকি রাখছেন না। বাবা যে ভাল নেই সে বোঝে! যখন ভাল নেই, তখন আর ইটের ভাটা পুড়িয়ে কী হবে! কার জন্য মন্দির! নবমীর গুপ্তধন বাবা পেয়ে সব ঠাকুরের নামে করে রাখছেন। জমি জমা বাড়ি ঘর সব। নবমীর ইচ্ছে, জঙ্গলে তার স্বামীর ভিটায় যেন শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা হয়। পিলু আজ নবমী বুড়ির উপরও ক্ষেপে আছে। কৈ যখন তুলে আনি তখন তো এত বায়না ছিল না! যখের ভয়! যখ ঢুকে গেছে! যখন ঢুকে গেছে তো আমরা কী করব!

    সেই নবমীর এখন সাধ, তার ভিটায় যেন একখানা শিবলিঙ্গ স্থাপন করা হয়।

    সে শুনেই হম্বিতম্বি শুরু করেছে। নবমী তোমার এত সাধ থাকলে জঙ্গলে পড়ে থাকলেই পারতে। কে করে!

    বাবা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন।—কে করে মানে!

    পিলুও আজকাল বাবার মুখে মুখে উত্তর করে। বাবা তখন গুম মেরে যান। কখনও তার ভুল ধরিয়ে দেন। কে করে মানে ঈশ্বর করেন। নবমীর ভিটায় শিবলিঙ্গ স্থাপন হবে কী হবে না তাঁর মর্জি। তুমি বললেও হবে না, না বললেও আবার হতে পারে।

    হয়ে গেল।

    সকাল থেকে এই করে তার চোটপাট শুরু। বাবা রাজি হয়েছেন। ইটের ভাটায় আর ক’খানা বেশি ইট পুড়িয়ে নিলেই হবে। বাড়িতে এই রাজসূয় যজ্ঞ চলছে, আর তার দাদাটা কলকাতায় গা ঢাকা দিয়ে আছে। কেউ কোনো খোঁজখবর নিচ্ছে না। আজ বাড়িতে ঠাকুরের ভোগ হবে। দু-দশজনকে বলাও হয়েছে—প্রসাদ নেবার জন্য—মা সকাল থেকে লেগে পড়েছে। বৃন্দাবন করের বৌ এসে গেছে। বাড়িতে গোবিন্দভোগ আতপ চালের ভাত হবে। পায়েস হবে। পিঠে পুলি কালই করে রাখা হয়েছে। ঠাকুরকে দেওয়া হবে না, তবে যারা আমন্ত্রিত তাদের পাতে দেওয়া হবে। কাল থেকে বালতি বালতি জল তোলা, ড্রামে ভরা, নিরাপদদা সকাল থেকেই কাজে লেগে গেছে—সে চেলাকাঠ এনে ফেলছে। গর্ত করছে। উনুনে বড় কড়াই, বড় তামার ডেগ বসানোর মতো গর্ত করা হচ্ছে। আর তার দাদার কথা একবারও কেউ মনে করছে না! মাথা কী গরম সহজে হয়। একবার দাদা ফিরে আসুক, মজা বুঝবে।

    বাবা বললেন, পিলু, কাজের বাড়িতে মেজাজ খারাপ করতে নেই। মা’র কথা শুনতে হয়। দেখছিস তো কেউ বসে নেই!

    বাবা পিলুকে আজ বেশ তোষামোদ করে কথা বলছেন। সকালবেলায় স্কুলের মাঠে তার কত কাজ। সবাই এসে বসে থাকবে। একটা দড়ি যোগাড় হয়ে গেছে। দুটো বাঁশও। চাঁদা তুলে বল কেনা হয়েছে। সে না গেলে কেউ কাজে হাত দেবে না। কিছুতেই মা আজ সাইকেল তাকে হাতছাড়া করবে না। চাবিটা কোথায় লুকিয়ে রেখেছে। সে দৌড়ে গেছে। সনতের দোকান থেকে খেজুরের গুড় এনে দিয়েছে। সাইকেলটা দিলে কত তাড়াতাড়ি হয়। সেই সাইকেলটাই হাত ছাড়া! কার মাথা ঠিক থাকে।

    আর এ-সময়ই বাবার কী মনে হল কে জানে! ডাকলেন, পিলু, শোন। পিলু রাগে ক্ষোভে থম মেরে আছে। কিছু বলছে না। বাবা বললেন, যখন ভোগ হচ্ছেই, এক কাজ করলে হয় না! তুই কী মনে করিস—একবার শহরে খবর দিলে হয় না, বিলুর বন্ধুদের। অন্ন প্রসাদ নিত তারা।

    বাবার এ-হেন বিবেচনায় পিলু আরও ক্ষিপ্ত হয়ে গেল। দাদা বাড়ি নেই, ভোজ হচ্ছে। দাদার বন্ধুরাও ভোগ খাবে। তাদের বলে আসতে হবে। সাইকেলটা সে এই অজুহাতে পেয়ে যেতে পারে। আসলে সাইকেলে তালা পড়ার পেছনে বাবার কোনো উসকানি থাকতে পারে। দিন-রাত টো টো করে বেড়ানোর স্বভাব হয়ে গেছিল। বাবা বার বার সাবধান করেও পারেননি। সাইকেলই তোমাকে খাবে। কিন্তু সে তো কথা শোনার পাত্র নয়। তাকে জব্দ করতে হলে সাইকেলে তালা না দিয়ে রাখলে চলবে না। প্রতিবেশীরা তার সাইকেল, আর ট্রাকের বাজি রেখে খেলা দেখে ফেললেই বাবার কাছে এসে নালিশ, ঠাকুরকর্তা, পিলু তো যমের সঙ্গে লড়ালড়ি শুরু করে দিয়েছে। তারপর বিশদ বর্ণনা। অভিযোগ এক দু-দিন নয়—মাঝে মাঝেই ওঠে। আজ কাজের দিন, কোনো অনর্থ ঘটলে—শুভ কাজ পণ্ড। তার চেয়ে সংসারে বাবার শুভ কাজের দাম বেশি!

    সে বলল, আমি পারব না।

    বাবা বললেন, সাইকলটা নিয়ে মুকুল নিখিল সুধীনকে অন্তত বলে আয়। ওরা তো আমার বাড়িতে অন্ন প্রসাদ কখনও গ্রহণ করেনি। গেরস্থের এতে মঙ্গল হয় জানিস।

    সাইকেলটা হাতে পাবে জেনেই সে শেষে রাজি হয়ে গেল। বলল, দাও তবে বলে আসি।

    বাবা বললেন, মিমিকেও খবরটা দিস।

    বাবা একপ্রস্থ ফর্দ দিয়ে নিরাপদকে আবার বাজারে পাঠিয়েছেন। পিলু সাইকেল নিয়ে বের হয়ে গেল। সে সাঁ সাঁ করে ছুটে যেতে থাকল। এবং যাবার আগে স্কুলের মাঠে বলে গেল, আজ আর তাকে পাওয়া যাবে না। বাবা অশ্বমেধ যজ্ঞ শুরু করেছেন। অশ্বমেধ যজ্ঞ কী সে জানে। নবমীকে বিকেলে রামায়ণ মহাভারত পাঠ করে শোনানোর দায়িত্ব মাঝে মাঝে তার উপর বর্তায়। দুলে দুলে সুর ধরে পড়তে মন্দ লাগে না। অভিমন্যু বধ পড়তে পড়তে সেও সবার সঙ্গে সঙ্গে কেঁদে ফেলে। সুভদ্রা জননী যেন আর কেউ না। তার নিজের মা’র কথা মনে হয়। উত্তরার কথা মনে হলে তার পরীদির মুখ ভেসে ওঠে। যেন পরীদিরই কাজ, দাদা যে আজ নিখোঁজ পরীদি তার জন্য দায়ী। সাজগোজ করিয়ে রণক্ষেত্রে পাঠিয়ে এখন নিজে হা হুতাশ করছে।

    কারণ সে পরীদিকে আবার দেখেছে, দাদার খোঁজ খবর না পেয়ে কেমন মনমরা হয়ে গেছে।

    পরীদি নিজেও গেছিল কলকাতায়। ফিরে এসে বাবাকে সব খবর দেওয়া চাই।

    পত্রিকা অফিসে গেছে। কবিতার নিচে নাকি নাম ঠিকানা লিখে দিতে হয়। ওদের খাতা থেকে যে ঠিকানাটি দেওয়া হয়েছে, তা অপরূপার ঠিকানা। মুকুলদার বাড়ির ঠিকানায় পত্রিকা এসেছে পরীদি খবর দিয়ে গেছিল।

    তারপর পরীদি আবার খোঁজাখুঁজি করেছে কলকাতায় গিয়ে। সেখানে বেলাঘাটা বলে একটা জায়গা আছে। চাউলপট্টি রোড বলে রাস্তা আছে। পোড়ো ভাঙ্গা বাড়ি, সরকার বাড়ির মাঠ পার হয়ে বড় বড় সব পুকুর ডোবা। কুঁড়েঘর সারি সারি। তারপরই একটা খাল। হাড়ের কারখানা—কী দুর্গন্ধ। সেই বস্তিতে পরীদি খোঁজ নিতে গিয়ে মহা বিপর্যয়ে পড়ে গেছিল। খুঁজতে খুঁজতে রাত হয়ে গেছে। ঝড় বৃষ্টি, আর সেই পুকুর ডোবা নালা ভর্তি ছোট ছোট ঝুপড়ি। প্রেসের কোন কিরণ বাবু বলেছে, হ্যাঁ এই নামে তো একজন আমাদের প্রুফ দেখে। ঠিকানাটা দেখুন তো। পরীদি দেখেছে,দাদার সই। নিচে কী সব নম্বর দিয়ে লেখা চাউলপট্টি রোড। জায়গাটা যে এত দুর্গম হতে পারে, এমন আস্তাকুঁড় হতে পারে পরীদি নাকি চিন্তাই করতে পারেনি। বিলু কী নিজেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। হাড় পোড়া দুর্গন্ধ, খাটা পায়খানা, মানুষ শুয়োর গাদাগাদি করে আছে। সেখানেও পরীদি খুঁজে এসেছে। সন্ধ্যা বলে একটি মেয়ে খবর দিয়েছে, বিশ্ববাবু কখন আসে, কখন থাকে, কখন যায় আমরা কেউ টের পাই না। তার ঘরটাও দেখিয়েছে। ঘরে কিছুই নেই। টিনের বাক্স। একটা খাটিয়া। একটা মাটির জার। জল নেই।

    পরীদি তারপর আর একা যেতে সাহস পায়নি। পার্টির দু-জন ক্যাডারকে নিয়ে খুঁজতে গেছে। গিয়ে দেখে নেই। পরদিন সকালেই নাকি ভাড়া মিটিয়ে সুটকেস হাতে নিয়ে চলে গেছে কোথায়। এমন দাদা যার, তার ভাই আর কত ভাল হবে! তুই পরীদিকে নাকের জলে চোখের জলে এক করছিস। তোর মায়া দয়া নেই! বাবার জন্য কষ্ট হয় না। মা’র জন্য! তুই অত কী রাজকার্য করতে গেলি, আমাদের কথা ভুলে গেলি! পরীদির গন্ধ পেলেই পালাস। তুই বল, পরীদির কী অপরাধ! পরীদির পার্টি করা তুই পছন্দ করিস না, নাটক করা পছন্দ করিস না। পরীদির এটা বিলাসিতা। বিলাসিতা হলে, তোর ঘরে রাতে শুয়ে ঘুমাতে পারে! আলো নেই, পাখা নেই। জানালা বাঁশের কঞ্চির। ছোট্ট জানালা। হাওয়া বাতাস কিছু ঢোকে না, থাকতে পারে! পরীদি তো আমাদের বাড়ি এলে যেতেই চায় না।

    এ-সব ভাবলেই পরীদিকে মনে হয় সেই উত্তরা—যে নারী তার যুবরাজকে যুদ্ধের পোষাক পরিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ছেড়ে দিয়েছে। মাথায় উষ্ণীষ, শরীরে বর্ম, ঢাল, তরবারি, তৃণ পিঠে। সব দিয়েছে, কেবল সপ্তরথী ঘিরে ধরলে, সে জানত না কী করে বাঁচতে হয়। ব্যূহ থেকে বের হতে হয়। দাদাও কী কোনো অদৃশ্য সপ্তরথীর বাণে জর্জরিত। না-হলে পালাচ্ছে কেন বার বার। সে পরীদিকে কী আর মুখ দেখাতে চায় না। জীবনের সেই জয়, যা সহজ লভ্য নয়, করতলগত নয়—যার জন্য সে অস্ত্রবিদ্যায় বিশারদ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, হয়তো ঠিকঠাক পারছে না, সে পাখি দেখলে মুগ্ধ দেখতে পায়, চোখ এখনও দেখতে পায় না, যতদিন না তার সেই দেখা পূর্ণ হচ্ছে, ততদিন কী অজ্ঞাতবাস চলবে!

    সে সবাইকে বলে ফিরে এল। কেন যে আজ মনে হল, সত্যি এই কাজের দিনে তার বাড়িতেই থাকা দরকার। সে না থাকলে বাবা একা। সে ফিরে এসে দেখল, পরীদি রান্নাঘরে বসে মুগের ডাল বাছছে। পরীদিকে গিয়ে বাড়িতে পায়নি।

    পরীদিকে বাড়িতে আর কেউ কিছু বলে না। তবে বোঝে পরীদিকে নিয়ে প্রচণ্ড তিক্ততা চলছে। পরীদি কোথায় বললে, এক কথা, তা তো তোমরা ভাল জানবে। সে তো আমাদের কিছু বলে যার না। সুহাসদাও নাকি একদিন ফোন করায় তার দাদামশাই বলেছিল, জানি না। বরং আমি জিজ্ঞেস করছি সে কোথায়! আমার মানমর্যাদা নিয়ে তোমরা আর কত হোলির রঙ খেলবে। সে কোথায় আছে, থাকবে, সে তো তোমরা জানবে। তোমরা তার সুহৃদ। আমরা তার শত্রু। সে কোথায় ঘোরে থাকে খায় তোমরাই আমার চেয়ে বেশি জানবে।

    পিলুর এ-জন্য আরও বেশি কষ্ট। কোথাও যেন ঠাঁই নেই। পরীদি বাড়িতে থাকে খায়, খুশি মতো ফেরে, বাড়ির কাজের লোকদের সঙ্গেই যা সম্পর্ক। পরীদির কখন কী দরকার জানে। পরীদি ইচ্ছে করলে প্রাসাদের মতো বাড়িতে নিরিবিলি, নিজের ঘরে, বারান্দায় বসে চুপচাপ যেমন দিন যাপন করতে পারে আবার তেমনি, সহসা সিঁড়ি ধরে নেমে নিজের লাল রঙের সাইকেল নিয়ে উধাও হয়ে যেতে পারে। শুধু বাড়িতে খবর রেখে যায়, যেন খবরটা দাদামশাইকে দেওয়া হয়।

    এখন যে পরীদি মুগের ডাল বাছছে সেও আর এক পরীদি। পার্টি করা, নাটক করা, কিংবা ক্যাডারদের নিয়ে মিছিল মিটিং করা পরীদি যেন এ নয়। ঠিক মা’র মতো, বাবার মতো একেবারে ঠাকুর ঘরের পবিত্রতা নিয়ে বসে আছে। চাল বেছে টাগারিতে রাখছে। মাকে ডেকে বলছে, এতেই হয়ে যাবে। পিলুকে দেখে বলেছে, পিলু বসে থাকিস না। নিরাপদকে নিয়ে কলার পাতা কেটে আন। আর শোন, কলার পাতাগুলো ধুয়ে রাখ। তারপরই পরীদি রান্নাঘরে ঢুকে বলল, মাসিমা, এ কী! কাঁদছেন কেন!

    পিলু দেখল বাবা বেশ তটস্থ হয়ে উঠেছেন। কেন কাঁদছে বাবা টের পেয়ে গেছেন। কারণ বাবার সঙ্গে যা কিছু মান অভিমান ঝগড়া রাতের বেলা। দাদা বাড়ি নেই, অথচ বাড়িতে অন্নভোগের আয়োজন হচ্ছে, লোকজন খাওয়ানো হচ্ছে, কেউ পারে—বড় পুত্রটি কোথায় আছে, তার কোনো সঠিক হদিস পাওয়া যাচ্ছে না—তিনি এখন অন্নভোগ নিয়ে পড়লেন।

    পিলুর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। মুখ কালো হয়ে গেল। সে শুনতে পাচ্ছে, মা বলছে, কাঁদি আর সাধে মা। যার মানুষের কোনো হুঁস নেই, তার কান্না ছাড়া আর কী সম্বল আছে বল! একবার গেল, কলকাতায় কোথায় আছে খুঁজতে গেল! তোমার বাবা দাদামশাই পারতেন। নির্বিকার পুরুষ।

    বাবা বললেন, আরে পরী পাত্তা করতে পারল না, ধরেও ধরতে পারল না, আমি গেলে তো বিষম কাণ্ড হবে।

    হঠাৎ মা কেমন দজ্জাল গলায় বলে উঠল, লজ্জা করে না, যখন বলেছিলে, এমন কু-পুত্রের মুখ দর্শন করব না। তারপর পরীদির দিকে তাকিয়ে বলল, আমার সোজা সরল ছেলেটার উপর এত অত্যাচার! ভগবান সহ্য করবে! পরী, তোমার গা ছুঁয়ে বলছি, বিলু আমাকে বলেছে, এক বর্ণ মিথ্যা বলছি না। বলেছে, মা আমি মারিনি। মারতে পারি না। বিশ্বাস কর আর যাই করি আমি পরীকে কখনও মারতে পারি না।

    এ-কথা শোনার পর পরীদিও মুখ আড়াল করে ফেলল। দু-হাতে মাকে সামলাচ্ছে, আর মুখ নিচু করে ফেলছে। উদগত অশ্রু সামলে কেন যে পরীদিও বলছে, মাসিমা থামুন। মাসিমা, আমিও জানি ও মারেনি, মারতে পারে না। মাসিমা থামুন।

    —আমি থামব বল! নিষ্কর্মা মানুষের এত বড় কথা! তোমার দাদামশাই কী বললেন, আর তিনি বিশ্বাস করে ফেললেন। আমার ছেলে কারো গায়ে হাত তোলার ছেলে! তুমি তাকে কী না বলেছ! তুমি না গেলে ও কখনও ফেরে! সে তোমার কু-পুত্র!

    পিলু, নিরাপদদা, বৃন্দাবন করের বৌ, মায়া সবাই মা’র এই দজ্জাল স্বভাবে কেমন সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছে।

    —আর তুমি বাড়ি বসে ধর্ম দেখছ। বলছ, পাপ খণ্ডন হোক, পাপ খণ্ডন হোক। সহ্য হয় বল! একবার একটা চিঠি পর্যন্ত দিলে না। গেলে না। বললে না গিয়ে, চল, যা হবার হয়ে গেছে। বাড়ি চল। বসে থাকলে। উৎসব, ইটের ভাটা, মন্দির শিবলিঙ্গ কত আয়োজন, আর আমার ছেলেটা একটা আঁস্তাকুড়ে পড়ে আছে! বলে আবার হু হু করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

    পরীদিও মা’র সামনে বসে পড়েছে। মা’র মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বলছে, মেসোমশাইকে নিয়ে আমি যাব। ঠিক খুঁজে বের করব। আপনি এ-ভাবে কাঁদবেন না। কী খারাপ লাগছে বলুন তো? ঐ দেখুন পিলু মায়া সবাই কাঁদছে। আমি কাকে সামলাই। তারপরই ধমক, এই পিলু, হচ্ছেটা কী। মায়া, যা এখান থেকে—যা!

    পরীর মুখে এসে গেছিল, আপনার পুত্রটি মানুষ না অপদেবতা। কিন্তু মাসিমা কষ্ট পাবেন!

    কার জন্য কাঁদছিস! সে কারও দুঃখ বোঝে পিলুকে বলার ইচ্ছে।

    পরী শেষে বললে, মাসিমা, অবুঝ হলে চলবে কেন। চিঠি কাকে দেবে! মেসোমশাই যাবে কোথায়! মেসোমশাইয়ের দোষ কী। দাদামশাইয়েরও দোষ নেই। তারা যে যার মতো বুঝেছে। কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ঐ দেখতো পিলু, কারা আসছে। এগিয়ে যা।

    কারা আসছে বলায় মা’র সম্বিত ফিরে এল। রান্নাঘরের কোণায় ঢুকে ঘটিতে জল নিয়ে বাইরে গিয়ে মুখ ধুয়ে এল। এখন পিলু কিংবা মায়া, পরী সবাই জানে, মা’র মুখে যতক্ষণ হাসি না ফুটে উঠবে ততক্ষণ, এই বাড়ির গাছপালায়ও অদৃশ্য কুয়াশা লেগে থাকবে। ভেজা আবহাওয়া – ভারি স্বভাবের হয়ে যাবে ঘর বাড়ি— অন্ধকার হয়ে থাকবে সবার ভেতরটা। একমাত্র মাসিমার মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই আজকের অন্নভোগ সার্থক।

    বাবা হঠাৎ উঠোনে দাঁড়িয়ে বললেন, মন খারাপ করবে না। অন্নভোগ সবারই কমবেশি থাকে। তার হাত থেকে কে কবে রেহাই পেয়েছে।

    রাতের দিকে বাড়িটা কেমন নিঝুম মনে হল পরীর। সে পিলু মাসিমা বারান্দায় বসে গল্প করছিল। মাসিমা রাতে কিছু খাবেন না। পরীরও খাবার ইচ্ছে নেই। শীতের বেলা শেষ হতে সময় লাগে না। তাদের খেতে খেতে বেলা পড়ে গেছিল। অবেলায় খেয়ে রাতে আর খাবার ইচ্ছে নেই।

    মেসোমশাই বলেছিলেন, তোমার মাসিমার বুদ্ধিতেই জমিটা কেনা হয়েছিল। ভাগ্যিস কিনেছিলাম। চার পাঁচ বছরে কী দাম হয়ে গেল।

    বাবার কাছে এটা খুবই কৃতিত্বের খবর। পিলু এটা বোঝে। বাবা যে এখানে এই গভীর বনজঙ্গলের মধ্যে প্রথম ঘর বাড়ি বানান, পরীদিকে কতবার যে সে খবর দিয়েছে। পরীদিও যতবার শুনেছে, যেন এর আগে শোনেনি। তাই নাকি! এত দাম হয়ে গেল জমি!

    পরীদি যে খুবই বুদ্ধিমতী সে বোঝে। এক দাদা ছাড়া বাড়িতে পরীদির আর কোনো শত্রু নেই। রাত হয়ে যাওয়ায় আজ থেকে গেল। পিলুর এটা যে কী আনন্দের। বিকাল থেকেই পেছনে লেগেছে, পরীদি আজ যাবে না। আমি বলে আসব। তুমি থাক পরীদি। একটা তো রাত। থেকে যাও।

    আসলে এটা কেন হয় সে বোঝে না। তাদের বাড়িতে অতিথি অভ্যাগত কেউ আসে না। মানুকাকা শহর থেকে এলে, গাছের পেঁপে, আমের সময় আম, বেলের সময় বেল—যেদিনকার যা ফল ব্যাগে করে নিয়ে যায়। বাবার তখন কী আনন্দ! এটা নে, ওটা নে। আর মা’র তখন নানা অভিযোগ। গজ গজ করবে, দিয়ে দাও, সব দিয়ে দাও। এসে তো উঠেছিলে, তাড়াবার কত ফন্দি করছিল। এখন তো বলছে, ধনদা, আমার জন্য জমি দেখুন। রিটায়ার করে ভাবছি এখানেই বাড়িঘর বানাব।

    আসলে পিলুর কাছে বাবার এই জায়গা নির্বাচন নিয়ে, এক ধরনের অহঙ্কার আছে। বাবাই পারেন, বোঝেন, কেন না, এখানে না এলে সে এই গভীর বনজঙ্গলের স্বাদই পেত না। নবমীকেও আবিষ্কার করা হত না। এক সময় তো তাদের কী ভয় লাগত! বাবা বাড়ি নেই, জঙ্গলের মধ্যে বাড়িটা- চারপাশ নিঝুম, আকাশে কিছু নক্ষত্র বাদে তাদের দেখবার কেউ নেই—তখন কুকুরের বাচ্চা তুলে এনেছিল একটা—কী না দিন গেছে!

    মা কথা বলছে না। সকালে দাদার জন্য কান্নাকাটি করার পর আর কোনো অশান্তি করেনি ঠিক, তবু নিখোঁজ পুত্রটির জন্য সারা দিন এক চাপা দুঃখ বয়ে বেড়িয়েছে।

    পরীদি চলে যেত, কেবল তার মনে হয়েছে, এই পরিবারে সে যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ কিছুটা যেন অবলম্বন থাকবে। নবমী পাশে বসে ঝিমোচ্ছিল। নবমীর খুব ইচ্ছে ছিল, আজ সে তার মরদের গল্প করে। কিন্তু কেন যে বার বার মরদের কথা তুলতে গেলেই পিলু ধমকে উঠেছে।—থাম তো ডাকাতের গল্প কে শুনবে!

    পরী বলল, আজ ডাকাতের গল্পই হোক। তুই ওকে ধমকাচ্ছিস কেন।

    —ও পরীদি, শোন না! ডাকাতের গল্প কী শুনবে—বাবা, তুমি একবার একটা ল্যাংড়া গরু নিয়ে এসেছিলে না!

    ল্যাংড়া গরুটার কথা উঠতেই মাসিমা কেন হেসে ফেলল সে বুঝল না।

    মাসিমা বললেন, আর বল না, সে যা গেছে। চণ্ডীপাঠের নামে বের হতেন, ফেরার নাম থাকত না।

    পরীর মনে হল, তা হলে মাসিমাও ডাকাতের গল্পই শুরু করেছেন।

    পরী বলল, কোথায় যেতেন?

    মা হেসে বলল, জিজ্ঞেস কর না, কোথায় যেত।

    বাবা বললেন, আমার তখন সসেমিরা অবস্থা বুঝলে। যে যেখানে পূজা-আর্চার খবর দিত, চলে যেতাম—সেখান থেকে আবার এক জায়গায়—বাড়িতে থেকে তো লাভ নেই। উপাৰ্জন চাই। ছ’ছটা মুখ। বোঝো। তা একবার ছেলেদের দুধ খাওয়াবার সখ হয়েছিল বলে বাবার সেই গরু আনা এবং পিলুর সড়কে দাঁড়িয়ে থেকে বাবার আবিষ্কারের কাহিনী বললে, পরী কেমন হতবাক হয়ে গেল।

    —বুঝলে পরী। কী না বলেছে তোমার মাসিমা! আমি অবলা মানুষ, বলেই পিজরাপোলে না দিয়ে গরুটা বামুনকে দান করে দিয়েছে। দুধ দিল না ঠিক, তবে কী জান, বামুনের বাড়িতে গোবরটাও তো কম নয়। ওটা ওরা বোঝে না! তখন ওটুকুই বা আমাকে কে দেয়। কত জায়গা থেকে আম জামের কলম, কাঁঠালের কলম এনে লাগিয়েছি। সারা বাড়িটায় এত যে গাছপালা তারও প্রাণ আছে জান! তোমার মাসিমা কত আমাকে বকাবকি করেছে জান! নির্বুদ্ধিতার শেষ নেই।

    নবমী বলল, আমার মরদ না, একবার জেল খেটে এল। দু সাল। আসার সময় আমার জন্য একটা টিয়া পাখি নিয়ে এসেছিল। পিলু বলল, আবার মরদের গল্প! থাম বলছি।

    একটা হ্যারিকেন জ্বলছে। বারান্দার এক কোণায় জলচৌকিতে বাবা বসে আছেন। মা পরীদি মায়া মাদুরে বসে আছে চাদর গায়ে। চারপাশে বাড়িটার গাছপালার ছায়া, এই হ্যারিকেনের আলো এবং পরিবারের সবাই আজ অনুষ্ঠানের পর কেন যে এত অতীতের গল্প নিয়ে পড়েছে পিলু তা বোঝে কোথা থেকে কোথায় তারা উঠে এসেছে। নবমীকে দেখলে মনেই হবে না, তারই গুপ্তধন আজ এই গরীব বামুনের পরিবারটিকে স্বচ্ছলতার মুখ দেখিয়েছে। আসলে পিলুর ভেতর মায়া দয়া বেশি। পিলু এ জন্য কম ধমক খায়নি। এই মায়া দয়াই নবমীর কাছে নিয়ে গেছে তাকে। এই মায়া দয়াই শেষে গুপ্তধন এনে দিয়েছে সংসারে।

    নবমী বলে একটা বুড়ি আছে জঙ্গলে সবাই জানত। কী খায়, কোথায় থাকে, কী পরে, কেউ খোঁজ নিত না। ওর কঙ্কালসার শরীর শনের মতো চুল আর প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় ঘেরাফেরা—কাউকেই কাছে টানেনি। বরং দেখলে পালিয়েছে। নবমী ঠিক বুঝতে পেরেছিল পিলুকে। ঠিক মানুষকেই সে চিনেছে। পিলু না নিয়ে এলে জঙ্গলেই মরে থাকত। ওর ইট ক’খানা ইটের পাঁজার মধ্যে পড়ে থাকত। মানুষের কাজে লাগত না। পরীদি জানে না। একবার ইচ্ছে হল বলে। তারপরই বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, বলি বাবা?

    বাবা বললেন, তোমার আবার কী বলার আছে! তুমি তো কোথাও পালাওনি। কাল ফিরবে বলে পক্ষকাল পরে ফেরনি। কোথাও ডাকাতি করেছ বলেও জানি না।

    বাবার এই কথায় সবাই হেসে উঠল।

    পরী ভাবল, যাক, যে চাপা কুয়াশায় ঢেকেছিল বাড়িটা তা যেন কেটে গেল।

    —বলি বাবা!

    —বল না। আমি বারণ করব কেন!

    —না ঐ যে ইট, নবমীর ঘরে ইট।

    —অ সেই কথা। পরীকে বলনি! পরী জানে না!

    পরী বুঝল না, পরী কী জানে না।

    পিলু গল্প বলার মতো যেন সব বলে গেল। পরী শুনে হাঁ। নবমী তবে তার ডাকাতের ধন ইটের মধ্যে রেখে দিয়েছিল। নবমীকে এমন প্রশ্ন করতে বলল, না না, ডাকাতের ধন হবে কেন? ও আমার গয়নাগাটি। কত যে ছেল। সব গলিয়ে রেখে দিয়েছিল। বনজঙ্গলে থাকি, কার কখন নজর যাবে—

    পরী অনেক দিন থেকে এই বাড়ির মানুষগুলির সঙ্গে মিশে আছে। নবমীকে তুলে আনার মধ্যেও মহত্ত্ব আছে—কিন্তু গুপ্তধন মেসোমশাই কিছুই নিজে ভোগ করছেন না—ঈশ্বরের প্রতি তাঁর এত নির্ভর কেমন যেন বিচলিত করে তুলল। সে এত দিন যা জেনেছে, যা পড়েছে, তার সঙ্গে মানুষের আত্মবিশ্বাস এবং ধর্মবিশ্বাসে কোনো ফারাক আছে বলে ভাবতে পারল না। সত্যি তো এ-দেশে গরীব মানুষের তো কিছুই নেই। কবে হবে তাও জানে না। কিন্তু একটা পরিবারকে এই বিশ্বাসই কী প্রবলভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে— মেসোমশাইকে না দেখলে সে টের পেত না।

    সে বলল, মেসোমশাই, আমরা একটু ঘুরে আসি।

    —কোথায়?

    —আপনার বাড়ির সবটা আমি দেখিনি। আপনার গাছপালাও না।

    বাবা তাতে খুবই খুশি। পরী বাড়ি ঢুকেছে, নবমীকে নিয়ে বনের মধ্যে গেছে। কিন্তু এই বাড়ির সব গাছপালা সে দেখেনি। কিংবা বাবা কোনো দিন বলতে পারেননি, কোথা থেকে কোন গাছের কলম এনে লাগিয়েছেন। শুধু লাগিয়েই ক্ষান্ত হননি, তার ফল খাইয়েছেন, সেখানেও শেষ ছিল না, খেয়ে যদি কেউ বলেছে, ভারি সুমিষ্টি আম, একটা কলম করে দেবেন। বাবা খুশি হয়ে কলম করে দিয়েছেন। কখনও বাড়ি বয়ে গিয়ে দেখে এসেছেন, তাঁর দেওয়া কলমের আদর যত্ন ঠিক হচ্ছে কি না!

    জ্যোৎস্না রাতে পরী গাছগুলির পাশ দিয়ে হাঁটছে, পিলু কেবল বাবার গল্প করছে। গাছপালার ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হল পরীর—মানুষ তার উত্তরপুরুষের জন্য এ-ভাবেই কিছু রেখে যায়। পরী কাঁঠাল গাছগুলির নিচে এসে দাঁড়িয়ে গেল। চারপাশে জ্যোৎস্না নেমে এসেছে। গাছপালাগুলি দাঁড়িয়ে আছে প্রহরীর মতো। একজন মানুষের এর চেয়ে বড় কী আর অবলম্বন থাকতে পারে সে ভেবে পেল না। যেন বিলু কিংবা পিলু তাদের বাবার কথা এক দিন ভুলে যেতে পারে—কিন্তু গাছগুলি কোনো দিন ভুলবে না—কত যত্নে তিনি তাদের বড় করে তুলেছেন। মানুষের সৃষ্টির তো শেষ নেই। যে যার মতো কবিতা সৃষ্টি করে।

    বিলুর কবিতা মেসোমশাইয়ের ভাল লাগবে কেন?

    মেসোমশাই বলতেই পারেন, কবিতা লিখে কী হয়।

    পিলু বলল, পরীদি, ওদিকটায় চল!

    —কেন রে!

    —বাবার বাতাবি লেবু গাছটা দেখবে না।

    জ্যোৎস্নায় এই ভ্রমণ খুবই মধুর। আসলে তাকে নেশায় পেয়ে গেছে। যেন ইচ্ছে করলে সারা রাতই গাছপালার ভেতর এখন ঘুরে বেড়াতে পারে। বিলু পাশে থাকলে কী যে ভাল লাগত। আর সহসা কেন যে মনে হল, গাছপালার মতো চাই তার একজন সরল অকপট মানুষ। -যে বৃক্ষের মতো ছায়া দেবে।

    সে এবার বলল, চল পিলু। রাত হয়েছে। এই মায়া আয়।

    .

    ঘরে মায়া আর মিমি। আলো জ্বলছে। হ্যারিকেনের অল্প আলো জ্বালা। মশারির নিচে লেপ গায়ে দিয়ে মিমি পাশ ফিরে শোয়। মায়া শুয়ে পড়েছে। মিমি মশারি গুঁজে দিল এক দিককার। তক্তপোষটা খুব বড় না। তার অসুবিধা হবার কথা। তবু মানুষের কী যে থাকে! সে পা ছড়িয়ে দিলে একটা দিকের মশারি আলগা হয়ে যাচ্ছে। বিলু আর পিলুর জন্য এই ছোট্ট তক্তপোষ। এতেই সে বছরের পর বছর শুয়ে রাত কাটিয়ে দিয়েছে। কোনো অভিযোগ ছিল না।

    কখন মনে হল, মায়া ঘুমিয়ে পড়েছে।

    তার ঘুম আসছে না।

    ঘুম আসার কথাও না।

    গাছাপালা লাগাবার মধ্যেও কবিতা আছে—ঘর বাড়ি বানাবার মধ্যেও কবিতা আছে। পূজা-আর্চার মধ্যেও আছে—নবমীর জীবনের মধ্যেও। কোথায় নেই! স্বার্থপরতার চেয়ে এই কবিতা কম কৃতিত্বের নয় এমনই মনে হল তার। বিলুকে আজ কেন জানি সত্যি স্বার্থপর মনে হল তার। তবু তার নিজের জীবনের মধ্যেও কেন এই কষ্ট, দুঃখ বিলুর জন্য সে জানে না। কিছু শেয়াল ডাকল অদুরে। কীটপতঙ্গের আওয়াজ এত গভীর হয় আগে সে জানত না। যেন এক আশ্চর্য মিউজিক সৃষ্টি হচ্ছে। এই মিউজিক মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কত দরকার, বাড়ির গাছপালার ছায়ায় হেঁটে না বেড়ালে টের পেত না। বাড়ির অন্নভোগ কত সুস্বাদু আজ মাসিমার চোখে জল না দেখলে টের পেত না। তার চোখে জল এসে গেল।

    কখন ঘুমিয়ে পড়েছে মিমি জানে না। সহসা ঘুম ভেঙ্গে গেল। কেউ যেন দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকছে, পিলু। দরজা খোল। পিলু।

    কে ডাকছে। কে! মিমি কেমন ধড়ফড় করে উঠে বসল। তার বুক কাঁপছে। গলা শুকিয়ে উঠছে। কে ডাকছে, কে!

    অবিকল বিলুর গলা। বিশ্ব কী তবে ফিরে এসেছেন!

    সে ডাকল, এই মায়া ওঠ, শিগগির ওঠ।

    মায়া উঠে বসলে বলল, কেউ দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।

    মায়া ঠিক বুঝতে না পেরে বলল, কে?

    —মনে হয় তোর দাদা।

    —দাদা।

    মিমি বলল, আস্তে। সে সন্তর্পণে নামল। হ্যারিকেনের আলোটা উসকে দিয়ে এগিয়ে যাবার সময় মনে হল, হাত পা কাঁপছে। সে পড়ে যাবে। কোনো রকমে দরজা খুলতেই দেখল, কেউ দাঁড়িয়ে নেই। কেউ না। সে বাইরে বের হয়ে এল। না কেউ না। হতাশায় তার বুক ভেঙ্গে গেল।

    চিৎকার করে বলতে পারলে, সে সান্ত্বনা পেত—বিশ্ব, আমি কী করব!

    উঠোনে হ্যারিকেনের সামনে অনাথ রমণীর মতো কে বসে! বিশ্ব কাছে এসে বলল, তুমি!

    মিমি কিছুই বুঝতে পারছে না। ভৌতিক মনে হচ্ছে সব কিছু।

    তুমি এখানে! রিকশাটা ছেড়ে দিতে গেছিলাম।

    মায়া বুঝতে পারছিল না, পরীদি একা লণ্ঠন হাতে নিয়ে কোথায় গেল। বাইরে বের হয়ে অবাক। দাদা। হাতে সুটকেস। সে চিৎকার করে উঠল, বাবা, দাদা ফিরে এসেছে।

    সহসা এই ঘরবাড়িতে সব আলো জ্বলে উঠল ঘরে ঘরে। পিলু চিৎকার করে বের হয়ে এসেছে— দাদারে। মা কেবল পাগলের মতো উঠোনে এসে লণ্ঠন তুলে পুত্রের মুখ দেখতে দেখাতে বলল, এলি তবে। রাগ পড়েছে।

    বাবা বললেন, তোমাকে অসুস্থ মনে হচ্ছে। মুখে গোটা। দেখি দেখি। বলে বাবা লণ্ঠন তুলে কী দেখে বললেন, মায়ের দয়া হয়েছে! ও ধনবৌ, শিগগির বিছানার চাদর ওয়াড় পাল্টে দাও। গায়ে হাত দিয়ে বললেন, ইস জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে!

    মিমির মুখে কথা সরছিল না। অন্ধকারে কোথায় দূরে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে।

    বাবা, দাদাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে, ঠাকুরের চরণামৃত দিলেন খেতে। বললেন, ভালই হয়েছে। মহাপাপ খণ্ডন। কপালে দুর্ভোগ থাকলে কে খণ্ডাবে বল! যাক পাপ খণ্ডন হয়ে গেল। বোঝা নামল আমার।

    মিমি বলল, পিলু, রিকশাটাকে বল থাকতে। আমি যাব।

    বিশ্ব ঘরে শুয়ে টের পাচ্ছিল। মিমি আর তার ঘরে আসেনি। রাতের ট্রেনে সে প্রায় তস্করের মতো পালিয়ে এসেছে। সন্ধ্যা জোর করে ট্রেনে তাকে তুলে দিয়ে গেছে। কেউ জানে না, সে সারা রাস্তায় প্রায় একজন তস্করের মতোই বসেছিল। ধরা পড়ে গেলে অনাসৃষ্টি হবে না কে বলতে পারে। তার সারা শরীরে কী ব্যথা। গলা বুজে আসছে। কথা বলতে কষ্ট। পিলু মায়া মা বাবা সবাই দাঁড়িয়ে আছে পাশে। এখন এই রোগের প্রতিবিধান নিয়েই বাবা ফাঁপরে পড়ে গেছেন। মিমি যে এ বাড়িতেই আছে কারো যেন খেয়াল নেই।

    বিশ্ব কোন রকমে পাশ ফেরার চেষ্টা করল। কোনো রকমে বলল, পরীকে ডাক। পরী এলে বাবা বললেন, যাও তোমরা। সবাইকে নিয়ে বাবা বের হয়ে গেলেন। বিশ্ব বললে, এত রাতে যাবে!

    —অসুবিধা হবে না। পিলুকে সঙ্গে নিয়ে যাব।

    —জানি। পিলু না গেলেও তুমি একা চলে যেতে পার। তোমার অসুবিধা হবে না জানি। একটাতো রাত। নাই গেলে। বলে পাশ ফিরে বিশ্ব চোখ বুজল। এ-মুহূর্তে বিশ্বর যেন এর চেয়ে বেশি কিছু বলার অধিকার নেই। এত কষ্ট শরীরে তবু সে বাড়িতে ফিরে পরীকে দেখতে পাবে আশাই করেনি। সব চেয়ে দুশ্চিন্তা ছিল পরীকে মুখ দেখাবে কী করে। সেই পরী বাড়িতে নিজেই হাজির।

    বাবা তখন উঠোনে দাঁড়িয়ে আবার তার ইদানীংকার আপ্তবাক্যটি উচ্চারণ করলেন, বুঝলে কেহ আত্মাকে আশ্চর্যবৎ মনে করে—কেহ বা আশ্চর্যবৎ বলিয়া আত্মাকে বর্ণনা করে—আবার কেহ আশ্চর্য বলিয়া শোনে। কিন্তু ইহার বিষয় শুনেও কেহ ইহাকে বোঝে না।

    ***

    দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত

    ‘দেশভাগ বা নীলকণ্ঠ পাখীর খোঁজে’ সিরিজের পর্বসমূহ —

  • অলৌকিক জলযান

    অলৌকিক জলযান

    ‘অলৌকিক জলযান’ দেশভাগ (নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে) সিরিজের তৃতীয় পর্ব। তবে সময়ের হিসেবে এটি ‘মানুষের ঘরবাড়ি’র আগেই প্রকাশ পেয়েছিল। সেকারণেই হয়তো নীলকন্ঠ পাখির খোঁজের সোনাকে এই বইয়ে কিছুটা হলেও খুঁজে পাওয়া গিয়েছে।

    বইতে আগের পর্বের প্রভাব খুব সামান্যই, মাঝে মাঝে শুধু প্রচ্ছন্ন আভাস রয়েছে এছাড়া এটি স্বতন্ত্র একটি উপাখ্যান। কয়লা চালিত মালবাহী জাহাজ, এস এস সিউল ব্যাংক ও এর জাহাজীদের জীবন নিয়েই গল্প এগিয়েছে। বাংলা ভাষায় জাহাজ ও সমুদ্রে নাবিকদের জীবন নিয়ে এত বিশাল কলেবরের আর কোন উপন্যাস নেই সম্ভবত। দিনের পর দিন যে মানুষেরা মাটির সংস্পর্শ পায় না, অসীম দিগন্তবিস্তৃত সাগরের নীলই যাদের বাড়িঘর, স্বভাবতই তাদের জীবন-যাপনের ধরণ আপামরজনগণের থেকে অনেক আলাদা। লেখক নিজে একসময় নাবিক ছিলেন, জাহাজের জীবন তাই তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে চেনা।

    বার বার স্ক্র্যাপ হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজ সিউল ব্যাংক নিজেই এই বইয়ের অন্যতম প্রধান চরিত্র, সেই জাহাজের নামেই বইয়ের নামকরণ ‘অলৌকিক জলযান’। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় কখনো কখনো মনে হয়েছে সিউল ব্যাংক জীবন্ত এক সত্ত্বা, সে এবং তার কাপ্তান হিগিনস যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বইয়ের ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনসের সাথে হারমান মেলভিলের, মবি ডিক উপন্যাসের ক্যাপ্টেনের অনেক মিল লক্ষ্য করেছি। সম্ভবত, দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রে জাহাজ ও তার কাপ্তান একে অপরকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকে বলেই এক জাদুবাস্তব সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে।

    মানুষের ঘরবাড়ি এবং পরবর্তীতে অলৌকিক জলযানেও লক্ষ্য করেছি অতীনবাবুর নারী চরিত্রগুলো অত্যন্ত দূর্বল। না এমন না যে গল্পে তাদের বিশেষ অবদান নেই, সেটা ভালভাবেই আছে। কিন্তু কখনই তারা শক্তিশালী চরিত্র হয়ে উঠতে পারে না। মানুষের ঘরবাড়ির লক্ষ্মী বা মৃন্ময়ী; অলৌকিক জলযানের বনি এদের ইম্প্যাক্ট মূল গল্পে বেশ ভালভাবেই আছে। কিন্তু চরিত্র হিসেবে এদের গঠন সুবিধার না। খুবই দূর্বল, মেলোড্রামাটিক এবং ‘ক্লিঙ্গি’।

    সমুদ্র ও জীবনের ছেদবিন্দুতে লেখা এক মহাকাব্য

    ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসের সোনা দেশভাগের পর চলে আসে ভারতে। কৈশোর থেকে যুবা বয়সের মাঝামাঝি সময়। নিজের যোগ্যতা দিয়ে ছিন্নমূল পরিবারের হাল ধরার ভীষণ তাগিদ। দু’বেলা পেট ভরে ভাত আর সেইলরের সাদা পোশাকে বাবা-মাকে গর্বিত করার আশা নিয়ে জাহাজে উঠে আসে সোনা। আমাদের সোনাবাবু— সোনালী বালির নদীর চর, যেখানে সে বালির মধ্যে গর্ত করে একটা মালিনী মাছ বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল, সেই নদী, সেই তরমুজ ক্ষেত পেরিয়ে সে এখন অন্তহীন সমুদ্রে এস. এস. সিউল-ব্যাংক জাহাজের নাবিক। জাহাজে সবাই তাকে ডাকে ছোটবাবু বলে। সমুদ্রের বিশালত্বে কিংবা নতুন জীবনের অভ্যস্ততায় এক সময় তার মনেই থাকে না, তার একটা দেশ আছে পৃথিবীর অপর প্রান্তে, সেখানে তার বাবা-মা, ভাইবোন কতো আলাদাভাবে জীবন কাটাচ্ছে।

    সাদা জাহাজটাকে সে কিছুতেই ভাবতে পারে না জাহাজ, আসলে সেই সৌরলোকের অন্তহীন যাত্রার মত মনে হয়, যেন চারপাশে সব গ্রহ নক্ষত্র, উপগ্রহ আর এক সৌরলোক থেকে অন্য সৌরলোকে একটা যান অনবরত ছুটছে।

    দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় বন্দরে বন্দরে বিরতি। জাহাজীরা চিঠি পায় বন্দরে পৌঁছুলে। বাদশা মিয়ার চার নম্বর বউ চিঠি লিখে পাঠায়। মৈত্রদা বাংকে শুয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বউয়ের চিঠি পড়ে। সবার চিঠি আসে। শুধু চিঠি আসে না ছোটবাবুর। রিফিউজি পরিবারটির ঠিকানা আজ এখানে, কাল সেখানে। ছোটবাবু দেখছে সমুদ্রের বিচিত্র জীবন, সমুদ্রের গর্ভে তিমি মাছের ছোটাছুটি, দেখছে জাহাজ মিসিসিপি নদীতে পড়ছে, কিন্তু জানাতে পারছে না কাউকে। বলতে পারছে না, মা, আমরা এখন মিসিসিপি নদীতে।

    এত সুন্দর কাব্যের আঙ্গিকে বাংলা সাহিত্যে কোনো পুরুষ চরিত্রের উপস্থাপন দেখিনি আগে। সোনাবাবু কিংবা জাহাজের ছোটবাবু, তাকে নিম্নস্তরের জাহাজীদের কাতারে ফেলে দেওয়া যায় না। মনে হয়, একটা সময় খুব বনেদি পরিবারের ছেলে ছিল। সেই চন্দন কাঠের সুবাস গায়ে। ছোটবাবুর শরীরের সুষমা অধীর করে দেয় বনিকে—

    যেন জীবনের এক আশ্চর্য মোহ অথবা ঘ্রাণ বলা যেতে পারে, অথবা রাজার রাজা ছোটবাবু, এবং শরীরের সর্বত্র মহিমময় ঈশ্বর কোন কৃপণতা রাখেন নি। এক আশ্চর্য মোমের শরীর, অথবা পাথরের মূর্তি। … ছোটবাবুর মুখে নীল দাড়ি। শরীরের লাবণ্য কোনো দূরবর্তী এক বনভূমির কথা অথবা কোন মরুভূমিতে একজন মুসাফিরের নিত্য হেঁটে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।

    কত রকম ব্যক্তিত্বের মানুষ এই জাহাজে। জাহাজের কাপ্তান স্যালি হিগিনস। তার একটাই দায়িত্ব—ঝড়ঝঞ্ঝা সবকিছু থেকে জাহাজকে বন্দরে পৌঁছে দেওয়া। সাদা চুল, নকল দাঁত, কাপ্তান এর সাদা ইউনিফর্ম, কাঁধে চারটে সোনালী স্ট্র্যাপ। পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে ব্যবহারের মাঝে বিরাজ করে প্রাজ্ঞতা। কাপ্তান স্যালি হিগিনস, এস.এস.সিউল-ব্যাংক‌ আন্ডার হিজ কম্যান্ড।

    দেখি ইঞ্জিন সারঙের মত বিশ্বস্ত মানুষ। কাজকর্ম শেষে সে তার কোরান খুলে বসে। আবিষ্ট মনে সূরার আয়াত পড়ে যাচ্ছে। তার পৃথিবীতে এর বেশি কিছু লাগে না।

    জাহাজে চড়ে বসে একজোড়া চড়ুই পাখি। তারাও যোগ হয় জাহাজের যাত্রী কিংবা এই উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে। যোগ হয় এক অ্যালবাট্রস যুগল। আর পুরোটা উপন্যাস জুড়ে প্রতাপশালী হয়ে রয়েছে সমুদ্র। কি মনোরম বর্ণনা—

    কেননা, সমুদ্র সেই কবে থেকে, কেউ বলতে পারে না, পৃথিবীতে অথবা সৌরজগতে বড় সে একা! একাকী সে, আছে তার মত, সে কখনও উত্তাল তরঙ্গমেলার ভেতর আকাশের নক্ষত্রদের ছুঁয়ে দিতে চায়, তার কি যে প্রলোভন তখন।

    নোনা জলে ভাসতে ভাসতে ডাঙা তখন দুর্লভ বস্তু জাহাজীদের কাছে। কোথাও একটা দ্বীপ চোখে পড়লে বা বন্দরের আবছা অবয়ব দৃষ্টিসীমার মধ্যে আসলে, জাহাজীরা সব কাজ ফেলে, ডেকে এসে দাঁড়ায়। কাজ ফেলে দূরবীন লাগিয়ে বসে থাকে ডেবিড।‌ অথবা কখনো কাজের তাড়া থাকলে ছোটবাবুকে বসিয়ে রাখে দূরবীন নিয়ে। এনি ওম্যান ছোট? সমুদ্রে নাকি জীবনধারণের জন্য ঈশ্বর সবই দিয়ে রেখেছেন। তবে আসল জিনিসটাই কিনা নেই। ওম্যান।

    একনাগাড়ে মাসাধিক শুধু জলে ভেসে থাকতে থাকতে বন্দর এলে জাহাজীরা ‘প্রকৃত জাহাজী’ হয়ে যায়। দাদার মতো শাসন করে, ছায়া দিয়ে রাখে মৈত্রদা। ‌বন্দর এলে মৈত্রদা ‘জাহাজী মৈত্র’ হয়ে যায়। এই জায়গাটায় চৌরঙ্গী বইয়ের সাথে মিল পেয়েছি। হোটেল শাজাহানে বিত্তশালীরা যেমন আদিম রিপুর তাড়নায় বেসামাল হয়ে যেতো, বন্দরে তেমনি জাহাজীরা আদিম রিপুকে ব্রেক কষাতে পারে না কোনো কিছু দিয়েই।‌

    চারিদিকে শুধু সমুদ্রের ঢেউ আর আকাশ। তার মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে সাদা জাহাজ। জাহাজের কলকব্জা, কতো রকমের মাস্তুল, ডেক—সব যার্গন এতো সাবলীলভাবে কথায় কথায় টেনে এনেছেন অতীন বাবু। চোখের সামনে চলে আসে অতিকায় পিস্টন, জাহাজের পিচিং। কিছুতেই মনে হয় না, জাহাজটা শুধু একটা জাহাজ। মনে হয় এরও প্রাণ আছে। মানুষ যেভাবে বাঁচে অক্সিজেন দিয়ে, জাহাজটা তেমনি কয়লা টেনে নিচ্ছে প্রশ্বাসে। কোথাও এর একটা আত্মা না থেকে পারে না। অন্তত এমন একটা বিশ্বাস জন্মে যায় নাবিকের মনে।

    সাড়ে চারশো পৃষ্ঠাব্যাপী এই উপন্যাস। তবুও এর ব্যাপ্তি আরো গভীর। ষাটের দশকের এস. এস. সিউল-ব্যাংক পাঠককে গোটা পৃথিবীটাই ঘুরিয়ে আনবে। ভারত মহাসাগর, আটলান্টিক, মিসিসিপি নদী হয়ে ছবির মত দ্বীপ তাহিতি। সমুদ্রের জলের নিচে ফসফরাস জ্বলে উঠলে মনে হয় নক্ষত্রপুঞ্জ ঝলমল করছে জলের নিচে। সমুদ্র ও আকাশের অসীমতায় ডুবে পরিক্রমণ করে আসা হয় ব্যক্তি-জীবনের গণ্ডিও। প্রকৃতি ও মানুষের কী অক্ষুন্ন আদিমতা। অনন্ত পারাবারকে প্রদক্ষিণ করে বয়ে চলে এই মহাকাব্য।

    অলৌকিক জলযান;  অখণ্ড সংস্করণ। প্রথম প্রকাশ – মাঘ ১৩৬৮; প্রচ্ছদ : পূর্ণেন্দু পত্রী।

    উৎসর্গ

    মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
    যিনি আমার সুখে
    আছেন, দুঃখেও আছেন।

  • এক

    এক

    ।। এক।।

    ১৭ই মে—১৯৫৩।

    এ-ভাবে সোনা ক্রমে হেঁটে যাচ্ছে। ক্রমে সেই দিনগুলো থেকে, জন্ম থেকে সে এভাবে ক্রমে হেঁটে যাচ্ছে যেন। বড় হতে হতে চার পাশের মুগ্ধতার ভিতর কখন যেন কঠিন কিছু আবিষ্কার করেও সে হেঁটে যাচ্ছে। নস্কর বাড়ির লাল পাঁচিলের পাশ দিয়ে সূর্যের আলো আসছে। সে তার ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ক্রমে সূর্য ওপরে উঠছে, সে তখনও হেঁটে যাচ্ছে। ক্যাম্বেল হাসপাতাল পার হয়ে সে হেঁটে যাচ্ছিল সারপেনটাইন লেন ধরে, তারপর সে আরও কিছু দূর গেলে দেখতে পেল ট্রাম যায়। তবু সে হেঁটে যাচ্ছে। তাকে ধর্মতলা, চৌরঙ্গী পার হয়ে যেতে হবে। সবুজ রেমপার্ট সামনে। ফোর্ট উইলিয়ামের দুর্গ বাম দিকে। এবং এভাবে আর কিছুদূর হেঁটে গেলে শিপিঙ অফিস। সে সেখানে হেঁটে হেঁটে আর পারছে না। চোখ মুখ দেখলে বোঝা যায় তার অশেষ যন্ত্রণা। সরল সহজ চোখ দুটো দুঃখে টস টস করছে।

    এভাবে সোনা শিপিঙ অফিসে আসছে-যাচ্ছে। মাসতার দিচ্ছে। জাহাজের খবর হলেই বড় বড় মাসতার পড়ে যায়। সে দাঁড়িয়ে থাকে সবার সঙ্গে। হাতে জাহাজী ছাড়পত্র ‘নলি’। ঠিক যেন অনেকটা ধর্ম-পুস্তকের মতো সে দু হাতের ভিতর নলিটাকে ধরে রাখে। দেখলে মনে হবে সে প্রার্থনা করছে।

    সবাইকে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বড় আম গাছের ছায়া ক্রমে ছোট হয়ে যায়। মানুষের ছায়া ক্রমে ছোট হয়ে আসে। জাহাজ থেকে কাপ্তান বড় মিস্ত্রি নেমে আসেন। ওরা যত কাছে এগিয়ে আসে তত বুকটা কাঁপে। সোনা তখন সোজাসুজি তাকাতে পারে না পর্যন্ত। সে প্রথম সফরে যাবে। প্রথম সফর বলে, অভিজ্ঞতা নেই বলে কেউ তাকে নিতে চায় না।

    তার যন্ত্রণা বাড়ে। বোর্ডের লেখাগুলো সব এক এক করে মুছে দেওয়া হয়। আর কোনো জাহাজের খবর নেই। আজ আর কোনো জাহাজ থেকে জাহাজী রিক্রুট করতে কেউ আসছে না। সে তবু বড় আম গাছটার ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকে। যেন মনে হয় সে আজ হোক কাল হোক, কোনও জাহাজ পাবেই। বয়স যতই ওর কম হোক, অভিজ্ঞতা কিছু না থাকুক, একদিন না একদিন সে ঠিক সবার মতো জাহাজ পেয়ে যাবে। তার আকাঙ্ক্ষা তখন বাড়ে।

    মাঝে মাঝে সোনা দেখতে পায় একজন বুড়ো মতো মানুষ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। সাদা লম্বা দাড়ি। চুল ছোট করে ছাঁটা। সাদা পাজামা। ঢোলা পাঞ্জাবি গায়ে। হাতে একটা লেদার ব্যাগ। মাসতার শেষ হয়ে গেলে তিনি এসে কিছুক্ষণ বড় আম গাছটার নিচে দাঁড়ান। কি যেন দেখেন। বোর্ডে পরদিন কোন কোন জাহাজ নোঙর ফেলছে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখার স্বভাব। জাহাজ না থাকলে লোকটাও ঠিক ওর মতো চুপচাপ ফিরে যায়।

    চারপাশে সব মানুষেরা জাহাজ পেয়ে যখন হাসি ঠাট্টায় মসগুল অথবা কেউ না পেয়ে যখন চুপচাপ চলে যাচ্ছে তখনও দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে—একটা খবর না পেলে চলছে না। জাহাজ না পেলে ওরা আর বেশীদিন এই বড় শহরে থাকতে পারছে না।

    সোনা দেখল তখন পাশে নদী। নদীতে কত জাহাজ। জাহাজের মাস্তুলে নানা বর্ণের নিশান। কোথাও জাহাজ রঙ হচ্ছে। কোথাও কোনও জাহাজ থেকে নাবিকরা নেমে ট্যাকসি ধরে শহরের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে—। আর তারা দুজন জাহাজের অপেক্ষায় মাসতারের অপেক্ষায় চুপচাপ গাছের ছায়ায় যেন কত যুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

    বুড়ো মানুষটা একদিন বললেন, তুমি বাবা জাহাজ পাচ্ছ না?

    সে বলল, না চাচা।

    —এত কম বয়সে তো জাহাজে নেয় না।

    —আমার ‘নলি’ আছে। ভদ্রা জাহাজ থেকে ট্রেনিং নিয়েছি।

    —নলি দিয়ে কিছু হয় না। সফর না দিলে কিছু হয় না।

    —আমার তবে হবে না?

    বুড়ো মানুষটা সামান্য হাসলেন। হবে না কেন, হবে। তবে খুব ঝামেলা। বুড়ো মানুষটার মুখে চোখে আবার সেই কঠিন চেহারা। যেন এই মানুষ নিত্যদিন সফর করে জাহাজের সমস্ত খবর অথবা বলা যায় প্রাচীন নাবিকের মতো চোখ-মুখ এবং তিনি জানেন, সফরে কি যে কঠিন অভিজ্ঞতা। তুমি ছেলে নাবালক বলা চলে, ভাল করে দাড়ি গোঁফ ওঠেনি, তুমি ছেলে জাহাজে যাচ্ছ, তুমি তো জান না, সমুদ্র কি ভয়ঙ্কর, ঝড় কি ভয়ঙ্কর, সি-সিকনেস কি কঠিনভাবে নাড়া দেয়, রক্ত উগলে দিলেও তুমি নিস্তার পাবে না। আর সেই দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রায় হোম-সিকনেস এক কঠিন অসুখ। তুমি যাবে জাহাজে এটা চাট্টিখানা কথা!

    আসলে বুড়ো মানুষটা বুঝি আর কথাই বলতেন না ওর সঙ্গে। কারণ চোখ-মুখ দেখলেই টের পাওয়া যায়—বুড়ো মানুষটা তাকে ভীষণভাবে উপেক্ষা করছেন। সব খবর না নিয়ে তোমার আসা ঠিক হয়নি ছেলে। তোমার জাহাজী ট্রেনিং এক, সমুদ্র সফর অন্য রকম। কিন্তু ওর বলার ইচ্ছা ছিল, চাচা, আপনি যা ভেবেছেন আমি তা জানি। আমি জানি সব। আমার বয়সের কথা আমি টের পাই। আমার চেহারার ভিতর একজন মায়াবী মানুষের ছবি আছে টের পাই। জাহাজে এমন মানুষের ছবি থাকা ঠিক না আমি জানি। তবু চাচা আমাকে অনেকটা পথ হেঁটে আসতে হয় এখানে। যতটা আমাকে ওপরে নরম মনে হয়, ভেতরে ভেতরে আমি তত শক্ত। জাহাজ ধরতে না পারলে পৃথিবীতে আমার দাঁড়াবার আর কোনও জায়গা থাকবে না চাচা।

    সোনা বলল, আপনি জাহাজ পেয়েছেন?

    বুড়ো মানুষটা বললেন, না। আমার জাহাজ আসছে। দু-চার দিনের ভিতর এসে যাবে।

    —কোন কোম্পানির?

    —ব্যাঙ্ক লাইন।

    —জাহাজের নাম?

    —এস এস সিউল ব্যাঙ্ক।

    —জাহাজে ওরা আপনাকে নেবেই?

    —নেবে না! কি যে বলছ! বলে একটা হাই তুলল বুড়ো মানুষটা। বাসটাস ধরতে হয় এমন একটা ভাব। কেমন নিশ্চিন্ত ভঙ্গী। আর তার তখন মনে হল যারা আসে সবাই একে একে জাহাজ পেয়ে যায়। সে পায় না। সে বলল, আমি যে কি করে জাহাজ পাব?

    বুড়ো মানুষটা বললেন, আমার সঙ্গে তুমি যেতে পার। বলেই কি ভাবলেন—না না ঠিক হবে না। তেলের জাহাজে তুমি বরং যাও। পার তো মোটর ভেসেলে। কয়লার জাহাজে তুমি পারবে না ছেলে।

    সেই এক কথা। বার বার সে এমন কথা শুনেছে। শুনেছে ভীষণ হাড়ভাঙ্গা খাটুনি—ঠিক খাটুনি বলা যায় না, প্রায় ক্রীতদাসের সামিল কাজ। সে বলল, আমি পারব না কেন চাচা?

    —পারবে না ছেলে। চোখ-মুখ দেখলেই ওরা বুঝতে পারে কে কেমন মানুষ। মাঝ দরিয়ায় একটা কিছু হয়ে যাক ওরা চায় না। তাও যদি দুটো-একটা সফর থাকত তবে নিতে সাহস করত।

    সোনা বুঝেছিল বুড়ো মানুষটা জাহাজে সারেঙ অথবা টিণ্ডালের কাজ করেন। দেখলেই বোঝা যায় অনেক সমুদ্র-সফর ওঁর মুখের রেখাতে। তিনি সহজেই সমুদ্র সম্পর্কে সব বলে যেতে পারেন। বলে যেতে পারেন সমুদ্রের নোনাজলের হাওয়া একবার গায়ে লাগলে কি হয়। তিনি বলে যেতে পারেন—পৃথিবীর কোথায় কি মানুষ আছে, তারা কিভাবে বাঁচে। সব মানুষেরাই এভাবে নানা কারণে সব কাজ পারে না। তখন সোনা আর সাহস পায় না বলতে, আমি ঠিক পারব।

    বুড়ো মানুষটা বললেন, সিউল ব্যাঙ্ক জাহাজটা আসলে জাহাজ না। জাহাজ হলে তোমাকে আমি নিতাম। সে যত কঠিন কাজই হোক না। আসলে ওটা একটা ইবলিশ। ইবলিশ বুঝতে পার?

    —না চাচা।

    —ইবলিশ জান না? ইবলিশ মানে শয়তান।

    তারপর মানুষটা একেবারে চুপ। কিছু বলছেন না। সাদা পাতা মুখে দেবার স্বভাব মাঝে মাঝে। কৌটা খুলে সাদা পাতা জিবে ফেলে দিয়ে বললেন, আর দাঁড়িয়ে কি হবে। জাহাজ তো আর আজকে নেই। কাল তিনটে জাহাজ আসছে। বোর্ডটা একবার ভাল করে দেখে যাও। ক্ল্যান কোম্পানীর জাহাজ পাও কি না দ্যাখো। ভাল জাহাজ। কাজ কম। খাবার-দাবার ভাল। দু-তিন মাসের পচাগোস্ত অন্তত খাওয়ায় না। লম্বা সফরেও বের হতে হয় না।

    সোনা কিছু বলছিল না। সে জানে, কালও এমনি আসবে। কালও সে এমনি ফিরে যাবে। পুরানো জাহাজিরা সফর শেষে ছ-সাত মাস বসে থেকে জাহাজ পাচ্ছে না। সব কপাল। কপাল ভাল থাকলে কেউ কেউ দু-তিন মাসেও জাহাজ পেয়ে যায়। সে তো এই পনের-ষোল দিন হল মাত্ৰ ক্ৰমান্বয় মাসতার দিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং মনে হল—এই বুড়ো মানুষটাই তাকে কেবল রক্ষা করতে পারেন। সে, যে করে হোক তাকে সহজে ছাড়ছে না।

    —জাহাজটা শয়তান কেন চাচা?

    —ওটা কোন আমলের জাহাজ কেউ বলতে পারে না। কেউ বলে ডেনিসদের ওটা যুদ্ধ জাহাজ ছিল, কেউ বলে পালের জাহাজ, আবার কেউ বলে, প্রথম মহাযুদ্ধে জাহাজটা খুব ঘায়েল হয়েছিল। মাঝ দরিয়া থেকে মাঝিমাল্লারা টেনে কার্ডিফে নিয়ে যায়। চক্ পাল্টে, বয়লার পাল্টে ওটাকে ওরা কার্গোসিপ বানিয়ে ফেলে। কিন্তু ঘাড়ে শয়তান চেপে আছে। পুরানো জাহাজ কখন দরিয়ায় যে খসে খসে পড়বে কে জানে!

    সোনা বলল, মানুষ এমন জাহাজে যায় সফর করতে!

    বুড়ো মানুষটা পেট দেখাল। এটা ছেলে, এটা।

    —আপনি যাবেন!

    —যাব না! বলেই চোখ বুজে ফেললেন। যেন কতদিন পর তার অতি প্রিয়জন আসছে।

    —বারে বা এ তো বেশ। সোনা খুব চিন্তায় পড়ে গেল। চোখ খুলছেনই না। যেন ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছেন। জাহাজটা বুঝি সাদা রংয়ের—কি আশ্চর্য নীল জলের ওপর দিয়ে জাহাজটা আসছে। সে এবার জোরে ডাকল, চাচা!

    —হুঁ। বলেই চোখ মেলে হাসলেন। দুনিয়ায় দুজন কাপ্তান আছে জাহাজটাকে চালাতে পারে। একজন উইলিয়াম, বুড়ো মানুষ, হিগিন্স আরও বুড়ো। শেষ বয়সের বিয়ে। বৌ পালিয়ে গেছে। ছোট একটা ছেলে আছে। জাহাজে কাজ করলে অবশ্য এমন হামেশাই হয়। ছেলেটাও একটা ইবলিশ। বাপের সঙ্গে সঙ্গে জাহাজে ঘুরে বেড়ায়, পড়াশোনা করে না, বেহদ্দ পাজি।

    ওর মনে হল বুড়ো মানুষটা কথা বলতে ভীষণ ভালবাসেন। আর কি যে কারণ থাকে কখনও কখনও মানুষ সহসা সবকিছু মন খুলে বলে দেয়।—আমারও কেউ নেই ছেলে। আমি আছি, দরিয়া আছে আর আছে তিনটে জ্যান্ত কসবি। জাহাজের তিনটে বয়লার। এই কসবি তিনটেকে বাগে আনতে পারে মাত্র দুজন সারেঙ। হ্যাঁ দুজন সারেঙ। বুড়ো মানুষটা কানের কাছে ঝুঁকে কেমন ফিস ফিস গলায় বললেন, মোহব্বত না থাকলে ছেলে জাহাজ চলে না। বয়লার স্টিম দেয় না।

    সে বলল, আর কেউ পারে না চাচা?

    —না। দুজনই পারে। একজন ইমানুল্লা, আর একজন এই বুড়ো মানুষ। ইমানুল্লা আসছে। খুব লম্বা, ঢ্যাঙা মানুষ। তুমি দেখলেই বুঝবে—কি শক্ত হাত-পা, মাংস, শরীর শুকিয়ে গেছে। কেবল হাড় কটা। লোহা পুড়িয়ে পুড়িয়ে যা হয়।

    সোনা বুঝেছিল, বুড়ো মানুষটা এনজিন সারেঙ। তাকেও এনজিনে কাজ করতে হবে। কোলবয় হয়ে জাহাজে উঠতে হবে। একজন এনজিন সারেঙের সঙ্গে পরিচয় থাকা ভাল। সে বুড়ো মানুষটাকে ছাড়তে চাইত না। যখন যেখানে দেখা হত দাঁড়িয়ে গল্প করত।

    পরদিনও দেখা। বুড়ো মানুষটা দোতালা থেকে নামছেন। সিঁড়ির মুখে সে দাঁড়িয়ে। কি ছেলে জাহাজ পেলে?

    —না।

    —একবার ওদিকের ব্যারাকে চলে যাও। সিটি-লাইনের জাহাজ আসছে। বোর্ডে কিছু লেখা হচ্ছে না। ওরা শুধু ক্রু নিতে আসছে। মাল খালাস-টালাস হবে না। তেলের জাহাজ। কাজ করে সুখ আছে। জাহাজটা খুব বড়। মাঝখানে ফোকসাল। দেওয়ানী তেমন লাগবে না। সারেঙ মজিদ মিঞা। স্টারবাক সাহেব কাপ্তান। ইয়র্কে বাড়ি……

    ওর মনে হল বুড়ো মানুষটা জাহাজের এন্তার ফিরিস্তি দিয়ে যাবেন। যেন পৃথিবীর কোথায় কোন সমুদ্রে কোন কোম্পানির কটা জাহাজ আছে, জাহাজের কি কি সুখ-সুবিধা, কোন কাপ্তান কেমন, কে নতুন কাপ্তান হয়ে কোথায় আসছে, কাপ্তান কি কি পছন্দ করে, এবং দরিয়ায় মানুষের জন্য আর কি সুখ-সুবিধা রাখা দরকার—অন্যান্য দেশের দরিয়ায় জাহাজিরা কি কি পেয়ে থাকে, ওরা কি কি পায় না, আসলে সব সময় ওর মাথার ভিতর বুঝি জাহাজী খবর ঠাসা থাকে। পৃথিবীতে আর কোন জীবন আছে, সুখ-দুঃখ আছে বুড়ো মানুষটা বুঝি জানেন না। অথচ তার দেরি হয়ে যাচ্ছে, বুড়ো মানুষটা কথা থামাচ্ছে না। মাসতারে সে সবার শেষে পড়ে যাবে। অবশ্য শেষে আগে বলে কিছু নেই। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা। ছায়া ছবির মতো বড় মালোম, মেজ মালোম অথবা মেজ মিস্ত্রি এসে সার সার দেখে যাবেন। ‘নলির’ ওপর উঁকি দেবেন। ক’ সফর, কনডাকট এসব দেখে ঝুড়িতে মাছ তুলে নেবার মতো তুলে নেবেন। ওর ‘নলি’ দেখে যদিও কেউ নেবে ভাবে—ওর মুখ দেখে কেউ নেয় না। জাহাজে কঠিন কদর্য শক্ত মুখ চোখ না হলে সমুদ্রের সঙ্গে যোঝা কঠিন। বড় মালোম মেজ মিস্ত্রি এটা জানেন।

    সে তাড়াতাড়ি টিনের সেড পার হয়ে ক্যান্টিনের পাশ দিয়ে বের হয়ে গেল। রাস্তা পার হলে অন্য পাশে লম্বা দোচালা টিনের ঘর সব। সামনে মাঠ। কিছু ফল-ফুলের গাছ। এবং তার ছায়ায় মানুষের জটলা। সিটি লাইনের জাহাজের নাম গন্ধ নেই। সে আরও দ্রুত হেঁটে গেল। ভাল জাহাজ, কাজ কম, কম সময়ের সফর, বেশীদিন এক নাগাড়ে সমুদ্রে থাকতে হয় না। সে যত যাচ্ছে তত এসব মনে হচ্ছে। বেশ হয় জাহাজটা পেলে।

    কে যেন তখন খবর নিয়ে এল—আসছে আসছে। লাইনে দাঁড়াও। সবাই যে যেখানে ছিল লাইনে জুটে গেল। খুব লম্বা লাইন। এনজিন রুমের জন্য ওদিকটায় মাসতার পড়েছে। সে ছুটে গেল ওদিকটায় একটু জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। চেনা জানা দু-একজনকে সে দেখতে পেল। ওর সঙ্গে ওরা ট্রেণিং নিয়েছে। এখনও জাহাজ না পেয়ে ঘুরছে। সে ওদের দেখে কেমন সাহস পেল সামান্য।

    না, সেই এক রকমের ব্যাপার। নলিটা উঁকি দিয়ে দেখলেন মেজমিস্ত্রি। তারপর কাগজে টোকা মারলেন। এবং একবার চোখ তুলে ওর মুখটা দেখেই কি ভেবে আর আগ্রহ প্রকাশ করলেন না। সে বুঝতে পারছে না কেন এমন হয়। এই যে মেজমিস্ত্রি, ভীষণ সুপুরুষ, লম্বা, মাথায় এংকোরের ছবি আঁটা টুপি। কাঁধে দুটো করে সোনালি স্ট্রাইপ, এবং সিগার টানছিলেন। তিনিও তো এ জাহাজেই কাজ করছেন। সে আর দাঁড়াল না। ওর ধারণা, বেশী দেরী করলে সেই বুড়ো মানুষটাকে সে হারিয়ে ফেলবে। তাড়াতাড়ি দু’লাফে আবার রাস্তা পার হয়ে গেল। লাফ দিয়ে পার হতে গিয়ে চটি ছিঁড়ে গেল। চটিটা হাতে নিয়ে সে এখন ছুটছে এবং সিঁড়ির মুখে গিয়ে দেখছে, বুড়ো মানুষেটা নেই। সে চোখ গোল গোল করে বসে পড়ল। মনে হল হতাশায় নাকটা সামান্য লম্বা হয়ে গেছে।

    তবু খুঁজতে হয়। সে খুঁজতে খুঁজতে ম্যাডিকেল রিপোর্টের ঘরটা পার হয়ে গেল। বাঁদিকে বড় রাস্তার ওপর যে ফুল বাগানটা রয়েছে সেখানে উঁকি মারল। একটু ডানদিকে ঘুরে পেশাপখানায় ঘুরে ঘুরে দেখল। অনেক মানুষের ভেতর বুড়ো মানুষটা নেই সে ভাবতে পারল না। এক হতে পারে চলে গেছে, অথবা ক্যান্টিনে, না কি নদীর পাড়ে চুপচাপ বসে রয়েছে। সে, সে-সব জায়গায় খুঁজে তারপর ক্যান্টিনে ঢুকতেই দেখল, বুড়ো মানুষটা হা হা করে হাসছেন।

    সে ঢুকেই ডাকল, চাচা।

    —হেই।

    —জাহাজ হল না! সে বলতে বলতে কাছে চলে গেল।

    —বোস। বুড়ো মানুষটা নিজের মানুষের মতো ওকে কাছে বসাল। বলল, আমার বিবিজান তো চলে আসছে। ভয় কি!

    সে বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকল। সারেঙ সাব এবার পাশাপাশি মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, জাহাজ পাচ্ছে না। কেউ নিচ্ছে না জাহাজে! মুখ দেখেই টের পাচ্ছে বাবু মানুষ। সখ করতে জাহাজে ঘুরতে যাচ্ছে।

    —না না সখ করতে না চাচা। সখ করবার সময় কোথায়! একথা ঠিক না।

    চা এসেছিল, বুড়ো মানুষটা চা, দুটো নিমকি বিস্কুট দিয়েছেন খেতে। সে খুব আগ্রহের সঙ্গে খাচ্ছে। এবং খাওয়া দেখেই কেন জানি টের পেলেন বুড়ো মানুষটা, ছেলেটার ভিতরে খুব খিদে। পেট ভরে খেতে পায় না।

    বুড়ো মানুষটা এবার বললেন, জাহাজ আসছে। কাল। লম্বা জাহাজ। লম্বা ডেরিক। কাপ্তানের অসুখ। জাহাজ হোমে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারছেন না। এখানে নেমে যাবেন। এবারের বাড়িয়ালা হিগিনস। সেই বুড়ো মানুষটা। কেবল চার্ট রুমে বসে বসে ঝিমোয়।

    সোনা বলল, বাড়িয়ালা!

    —আরে ঐ হল কাপ্তান। আমরা তো সারাজীবন বাড়িয়ালা বলেই চালিয়ে দিলাম। এখনকার ছোকরা জাহাজিরা এসব শুনে হাসে! তা যাক—শোন, তুই যাবি। এখনও ভেবে দেখ। সব বলে রাখা ভাল। তারপর বলবি, সব খুলে বলিনি। কাজেই ছেলে আমায় দোষ দিবি না। দিলে ভাল হবে না। আমার আবার বদনাম নিতে ভীষণ খারাপ লাগে।

    আর যারা পাশে ছিল, ওরা একে একে উঠে যাচ্ছে। বুড়ো মানুষটা এবার খিস্তি করছেন। শালারা! শালারা ভেবেছে ব্যাঙ্ক লাইনের এডেন ব্যাঙ্কে যাচ্ছি। চাচা আমারে নিবা না, আমার কথা মনে রাইখ। বেইমান—যেই শুনেছে সিউল ব্যাঙ্কে যাচ্ছি, শালারা দেখলি কেমন সুর সুর করে উঠে গেল।

    সোনা চা খেয়ে বেশ কথা বলতে জুত পাচ্ছে।

    —ওরা চাচা তোমার সঙ্গে যাবে ঠিক ছিল!

    —কিছু ঠিক ছিল না। ঘুরঘুর করার স্বভাব। বলে, বুড়োমানুষ উঠে দাঁড়ালেন। সব ফাঁস করে দিতে যেন এ-সময় বুড়োমানুষটাও আর সাহস পাচ্ছেন না।

    সে বলল, আমি কিন্তু আপনার সঙ্গে যাব।

    —যাবি যাবি। বুড়ো মানুষটা হাঁটছে আর গজগজ করছে। মুখগুলো চিনে রাখা দরকার। বেশ নানাভাবে গুছিয়ে আনছিলেন। সিউল ব্যাঙ্ক আর তেমন জাহাজ নেই। খোলনলচে পাল্টে একেবারে আলাদা। কি এর মেসরুম, কি এর ফোকসাল, চক্ পাল্টে বয়লার রিপেয়ার করে সব এখন এমন ঠিকঠাক যে কয়লা না দিলেও চলে। বেশ শুনছিল কথা কিন্তু যেই না শুনেছে বুড়ো মানুষটা আসলে সেই জাহাজেই যাচ্ছে, কাল আসছে জাহাজটা, তখনি সুর সুর করে ওরা উঠে গেল।—আচ্ছা দেখা যাবে, ভালো জাহাজ আমার নসিবে এলে দেখা যাবে—আর বলি জাহাজটা খারাপ কি! এখন তো কত জাহাজ, কত আরাম। আগে তো এসব ছিল নারে বাপু। আমরা কাজ করিনি! জাহাজ চালিয়ে সমুদ্র পার করে দিইনি—গজগজ করতে করতেই মনে হল—হ্যাঁ পাশে সেই ছেলেটা –কিছু জানে না, যেতে চায়—কালতো সিউল ব্যাঙ্কের মাসতার দিতে বললে, লাইন থেকে লোক পালাবে। অথবা কেউ দাঁড়াবে না। যারা ছ-সাত মাস থেকে জাহাজ পাচ্ছে না তারা নসিবের ওপর ভর করে বিশমিল্লা রহমানে রহিম বলে ঝুলে পড়বে। এসব যখন হবে বা হচ্ছে তখন ছেলেটাকে সব খুলে না বললে বুঝি ঠিক হবে না।

    বুড়ো মানুষটা তখন গজগজ করছেন আর হাঁটছেন। রোদের ভিতর দিয়ে হাঁটছেন। খুব তাড়াতাড়ি হাঁটার স্বভাব। যেন এই বয়সেও দেখানোর স্বভাব বয়স তেমন হয়নি। কথা খুব তাড়াতাড়ি বলেন—আচ্ছা আচ্ছা বাপু তুমি এস। যাবে যখন বলছ যাবে। এখন আমাকে আর কথা বাড়িও না। তবে ভেবে দ্যাখো একবার, ভাববে, কেন মাসতারে কেউ দাঁড়াতে চায় না। সিউল ব্যাঙ্কের নাম শুনলে সবাই পালায়। এনজিনরুমের ক্রু কিছুতেই যোগাড় করা যায় না। সব অচল মাল শেষপর্যন্ত তুলে নিতে হয়।

    বুড়োমানুষটা যত জোরে হাঁটছেন, হাতের ফোলিও ব্যাগটা যত জোরে দুলছে তত সে দ্রুত হাঁটছে পাশাপাশি। যেন ছুটে যাওয়ার সামিল। মাঝে মাঝে কথা বলতে বলতে পিছিয়ে পড়ছেন। খিদিরপুরের ব্রিজের কাছে বাস। কিছুটা পথ না হেঁটে গেলেই নয়—সুতরাং তারও বুড়ো মানুষটাকে কিছুটা পথ এগিয়ে দেবার মতো যেন কথা বলতে বলতে যাওয়া। কিন্তু অচল মালের কথায় আসতেই সে কেমন থমকে দাঁড়াল। অনেকটা পিছিয়ে পড়ল সে। হনহন করে মানুষটা দু’পাশের বাড়িঘর গাছপালার ছায়া ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। সে কেন এমন থমকে দাঁড়াল বুঝতে পারছেন না, তারপর ফের অচল মালের কথা মনে হতেই ডাকল—হেই!

    —হেই। এস। এভাবে কেউ দাঁড়ায় না!

    —হেই অচল মাল! সোনা জোরে জোরে হাসল। দুহাত ওপরে তুলে হা-হা করে হাসল।

    —হেই অচল মাল! বুড়ো মানুষটাও জোরে হা-হা করে হেসে উঠলেন।

    সে এবার ছুটে গিয়ে ধরে ফেলল বুড়োমানুষটাকে। তিনি বললেন, আসলে ওটা অচল জাহাজ, অচল মালে চলে। আসলে ওটাই হচ্ছে সবচেয়ে তেজী জাহাজ, জাহাজিরা তেজী। দুনিয়ায় তোমার এমন জাহাজ একটাই আছে।

    —হিগিন্‌স্‌ আসছে জানো? হিগিন্‌স্‌ দুনিয়ার সেরা বাড়িয়ালা। ছেলেকে ছেড়ে কোথাও যায় না। অচল জাহাজ চালিয়ে নিয়ে যায় বলে কোম্পানি কিছু বেশি সুযোগসুবিধা দেয় হিগিন্‌স্‌ সাহেবকে। তুমি না দেখলে বুঝতে পারবে না, হিগিন্‌স্‌ সাহেব কী ভীষণ রগচটা মানুষ। কেবল ছেলেটার কাছে একেবারে জুজু। ওকে হাত করতে পারলে তুমি রাজার হালে থাকতে পার।

    —কেমন বয়স?

    —তোমার গিয়ে তেরো চোদ্দ হবে। একটু বেশি হতে পারে। ঠিক জানি না।

    ওরা ক্রমে ব্রিজের ওধারে চলে গেল। এখান থেকে বুড়োমানুষটা বাসে উঠে যাবেন। সে যাবে কিসে জানে না। আসলে তাকে হেঁটে যেতে হবে। সুতরাং সে কিছু বলছে না। এখন দুটো চটিই হাতে। এবং সহসা বুড়ো মানুষটার মনে হল, এমন গরমের দিনে পিচের রাস্তার ওপর দিয়ে ছেলেটা হেঁটে এসেছে। মুখ লাল হয়ে গেছে। ভীষণ ঘামছে। জবজব করছে ঘামে। পায়ে ফোসকা পর্যন্ত পড়ে যেতে পারে। বুড়ো মানুষটা কি ভেবে বলল, চটিটা ঠিক করে নে।

    সোনা জেব উল্টে দেখাল—নেই।

    —যাবি কি করে?

    —হেঁটে।

    —কোথায় আছিস?

    —দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়ি।

    —খেতে দেয়?

    —দেয়।

    —আমার কাছে থাকবি? কোন অসুবিধা হবে না। একটা তো দিন। সোনা কেমন বিব্রত বোধ করতে লাগল।

    বুড়োমানুষটা প্রথম বাসটা ছেড়ে দিলেন। পাশের একটা দোকানের শেডে দাঁড়িয়ে ফোলিও ব্যাগটা খুলে দেখলেন—কি আছে ব্যাগে। এবং কিছু পয়সা, এই রেজকি নোট মিলে টাকা তিনেকের মতো আছে দেখে বললেন, কিছু মনে করিস না। পয়সা কটা রাখ। কাল তোর জাহাজ হবে। পরশু,সাইন হবে। সাইন হলে টাকা পাবি। আমি তখন তোর টাকাটা কেটে নেব। কিছু মনে করিস না।

    কখনও সখনও মানুষের চোখ-মুখ সজল হয়ে যায়। সে চারপাশে তাকিয়ে সেই সজল চোখ লুকিয়ে ফেলল মানুষটার কাছে। কত দিন পর, হ্যাঁ কতদিন পর একজন মানুষ তার দুঃখটা কি, সে কেন যাচ্ছে তার দেশ মাটি মানুষ ফেলে, টের পাচ্ছে। ওর মনে হল কতদিন পর আবার একজন মানুষ পৃথিবীতে তার যন্ত্রণা ঠিক ঠিক ধরতে পারছে। সে হাত পেতে পয়সা নেবার সময় সোজাসুজি তাকাতে পারল না। মনে হল মানুষটা অনেক উঁচু হয়ে গেছে। সে যতই মুখ তুলে তাকাক মানুষটার আসল মুখ দেখতে পাবে না।

    পরদিন সে অবাক, সত্যি এতবড় একটা জাহাজে ক্রু নেয়া হবে অথচ ভিড় নেই। ডেক জাহাজিদের লাইনে ভিড়টা তবু আছে, কিন্তু এনজিন ক্রুদের লাইনে খুব কম। যত লোক লাগবে তার সিকিভাগও নেই। কারণ এনজিনে তিনটে বয়লার, তিন বয়লারের জন্য তিনজন করে প্রত্যেক ওয়াচে ফায়ারম্যান। তিনটে ওয়াচের জন্য সুতরাং ন’জন ফায়ারম্যান। প্রত্যেক ওয়াচের জন্য দুজন করে কোলবয়। মোট ছ’জন। দুজন ডংকিম্যান। তিনজন গ্রিজার, একজন কসপ, বড় টিণ্ডাল, ছোট টিণ্ডাল, সারেঙ। তাছাড়াও দুজন বাড়তি। খুন জখম, জাহাজ থেকে জলে ঝাঁপ দেওয়া এসব তো আছেই। কারণ সফরে এক দুজন মানুষ মরবে, বা জলে ভেসে যাবে এ-আর বেশি কি।

    জাহাজের বড়-মালোম ডেক-জাহাজিদের বেছে নিচ্ছেন। এনজিনে কিছু বাছার নেই। গড়পড়তা সব। এমনকি দু-একজন ব্ল্যাকলিসটেড জাহাজী এ-ফাঁকে জাহাজ পেয়ে গেল। তবু হয় না। বুড়োমানুষটা ডেকে সেধে আনছেন। এনজিন জাহাজিরা কোথায় ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে তিনি জানেন। মেজমিস্ত্রি বড়মিস্ত্রি হিমসিম খাচ্ছে। ওরা জানে এমনটা হয়। জাহাজিরা যেতে চায় না এ জাহাজে। ঘুরেফিরে দুটো দল। হোমে যারা যায় তারাই আবার বছর ঘুরে এলে ফিরে আসে।

    কিন্তু বুড়োমানুষটার হয়েছে ঝামেলা। তিনি শেষপর্যন্ত একজনকে টেনে টেনে নিয়ে আসছেন। ওর লুঙ্গি খুলে যাচ্ছে। মানুষটা একহাতে লুঙ্গি আগলাচ্ছে। বুড়োমানুষটা এখনও বেশ শক্তি রাখেন। তিনি টেনে আনছেন, প্রায় যেন টেনে হেঁচড়ে নিয়ে আসছেন—যাবে না, যাবে না বললেই হল। এবং বোঝা যায় যাকে টেনে আনা হচ্ছে সে এই বুড়ো মানুষটাকে সমীহ করে—তবু যেতে চায় না—কি যে ভয়!

    সোনা এসব দেখেও ঘাবড়াল না। আর জাহাজ সে যখন পাচ্ছে না, এখানেও সে বেশিদিন থাকতে পারছে না, তখন যে কোনও জাহাজ, সে যত ভয়াবহ হোক, ভাবে না। সে যখন সাইন করে টাকা নিচ্ছিল তখনও বুড়োমানুষটা বললেন, ভেবে দ্যাখ। এখনও ইচ্ছা করলে থেকে যেতে পারিস। কিছুদিন অপেক্ষা করলে একটা ভাল জাহাজ মিলে যেতে পারে।

    সোনা হেসেছিল। কিছু বলেনি। তার গুনে গুনে টাকা নেবার স্বভাব না, কারণ সে এই প্ৰথম পরিশ্রমের বিনিময়ে টাকাটা এডভান্স পাচ্ছে। এই টাকায় কেনাকাটা করে থাকে জাহাজিরা। অনেকদিনের সফর। সফর শেষে কবে ফিরবে, কি আদৌ ফিরবে না ঠিক থাকে না। তাছাড়া বসে খেলে যা হয়, জাহাজ থেকে দেশে ফিরে এলে চুপচাপ বসে থাকা, পয়সা নেই আবার জাহাজ না পেলে টাকা- পয়সা হয় না। সুতরাং এ-টাকাটার ভীষণ দাম জাহাজিদের কাছে। সে অবশ্য তত কিছু বোঝে না। কেবল সে জানে যতটা বেশি সম্ভব এর থেকে টাকা মাকে পাঠাতে হবে। টাকা তিনেকের মতো দিতে হবে চাচাকে। বাকি টাকাটা দিয়ে একজোড়া জুতো, একটা প্যান্ট, একটা জামা, টিনের একটা সুটকেস, মাজন, এখন রেজার-টেজার দরকার হবে না, গালের দাড়ি বেশ সামান্য কোঁকড়ানো এবং অল্পস্বল্প।

    —বেশ একটা মুখে তার ঈশ্বর ঈশ্বর ভাব। সে এভাবে আরও অনেকদিন চালিয়ে দিতে পারবে। আরও কিছু কেনা দরকার। চাচাকে সে বলে জেনে নিতে পারে আর কি দরকার। সে ছুটে গিয়ে বলল, আর কি নিতে হবে।

    চাচার ফদমতো সে নিল, একজোড়া নীল রঙের প্যান্ট, নীল রংয়ের জামা। এই পরে কাজ করতে হবে। পুরানো সু কারো যদি থাকে মেরামত করে নাও। বেশ শক্ত হতে হবে তলা। সে তাও নিল। সে বেশ ঘুরেফিরে কেনাকাটা করেছে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় কেমন তার সবকিছুর ওপর দিয়ে উড়ে উড়ে যেতে ইচ্ছা হচ্ছিল। সে যেন বেশ একটা বিজয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। সে মাকে একটা চিঠি লিখতে পারে। লিখতে পারে—মা আমি জাহাজে যাচ্ছি, কবে ফিরব জানি না। আদৌ ফিরব কিনা তাও জানি না। একটা ভাঙ্গা জাহাজে সমুদ্রযাত্রা। কিন্তু সে লিখতে পারে না। মা তার তবে ভীষণ ভাববে। কেবল টাকাটা পাঠিয়ে দেবে জাহাজ ছাড়ার ঠিক একদিন আগে—এবং মা বুঝতে পারবে তার নিখোঁজ ছেলে জাহাজে চলে যাচ্ছে। অথচ তখন করার কিছু থাকবে না।

    এই কলকাতা শহরে সে আজ প্রায় তিন মাস এগারো দিনের মতো আছে। এদিক ওদিক করে আড়াই মাসের ওপর ভদ্রা জাহাজে ছিল রোববার ছুটির থাকত ছিল। সাদা কোর্তা পরে নীল রঙের জাহাজি পোশাক আর সাদা টুপি মাথায় সে কখনও হেঁটে হেঁটে অথবা অল্প পয়সার ট্রাম ভাড়ায় ঘুরে বেড়িয়েছে—এই শহর কি বড়, ‘আর কত মানুষ, মানুষেরা এখানে কেউ কেউ রাস্তায় শুয়ে থাকে, রাস্তায় মরে যায়। এসব দেখলে মনে হত সেও রাস্তায় একদিন এভাবে না খেতে পেয়ে মরে পড়ে থাকবে।

    এখন আর এসব মনে হয় না। বড় বড় শো-কেসগুলোর আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। একটা বড় জাহাজ, তার ওপর সে যেন দাঁড়িয়ে আছে, আর সমুদ্রে কি যে স্বপ্ন থাকে মানুষের, সে যাচ্ছে কোলবয় হয়ে, সবচেয়ে কঠিন এবং পরিশ্রমের কাজ। তার প্রথম সফর, কোলবয় প্রথম সফরে, দ্বিতীয় সফরে সে ঠিক ফায়ারম্যান হয়ে যাবে, আর একটা সফর দিতে পারলে সে গ্রিজার, তারপর টিণ্ডাল। একটা পরীক্ষা, ওর তো ততদিনে জাহাজি অভিজ্ঞতা হয়ে যাবে, সে তো কলেজের পড়াশুনা কিছুটা এগিয়ে রেখেছে, সে তো ইংরেজি খুব ভাল জানে, অঙ্কে সে ভালো। পরীক্ষায় বসলে অনায়াসে বি-এ-ও- টির কাছাকাছি কিছু একটা সার্টিফিকেট পেয়ে যাবে। তারপরই সে জাহাজের ফিফ্থ এনজিনিয়ার, তার পরেই ফোর্থ, থার্ড, সেকেণ্ড চিফ। এমন সব স্বপ্নের ভেতর দিন তার কেটে যায়। এমনভাবে সে এই বড় শহরের ওপর দিয়ে কখনও হেঁটে যায়নি। কেমন ভয় ভয় ছিল। মানুষজনের ভিড়ে ওকে খুব অসহায় মনে হত। এখন সে বেশ প্রায় লাথি মেরে সব উলটে পালটে যেন হেঁটে যাচ্ছে। হাঁটার ভেতর কিছুটা হাওয়ায় ভেসে যাবার মতো ভাব তার।

    হাঁটতে হাঁটতেই কেন জানি মৈত্রের কথা মনে পড়ল। মৈত্র এসেই ওকে বলেছিল, কি নাম? সে নাম বললে বলেছিল, ছোটবাবু তুমি জাহাজের?

    —ছোটবাবু!

    —কোলবয়দের আমি ছোটবাবু ডাকি।

    মৈত্র সঙ্গে যাচ্ছে। অমিয় বলে ওর চেয়ে একটু বেশি বয়সী আরও একজন জাহাজী যাচ্ছে। সেও কোলবয়। মৈত্র টিণ্ডাল। সে কাজ করত রয়েল নেভিতে। নৌ বিদ্রোহের দুটো একটা গল্প গাছের ছায়ায় সকলকে দাঁড় করিয়ে বেশ হাত নেড়ে নেড়ে শুনিয়ে দিয়েছে।

    মৈত্র বেশ তাজা মানুষ। খুব হাসিমশকরা করতে ভালবাসে। ডেকে আরও দুজন আছে। ওদের সঙ্গেও আলাপ করে নিতে হয়েছে। আসলে, দীর্ঘ সমুদ্র-যাত্রায় ওরাই সব। চাচা বলছে, এরা তোমার জাতভাই ছেলে। আর তো সব আমার জাতভাই। আগে তো কেউ তোমাদের ছিল না। এখন দুচারজন, ট্রেনিং নিয়ে জাহাজে আসছে।

    আসলে সোনা বোধহয় এতটা সাহস পেত না এই শহরকে উপেক্ষা করার। চাচা এবং মৈত্র সঙ্গে আছে বলেই তার এত সাহস। এবং সমুদ্র সফর যেন খুব বড় কাজ, এই শহরের অলিগলিতে পচে মরার চেয়ে, অসীম সমুদ্র-যাত্রায় এক কঠিন সুখ আছে। তুমি ছোটবাবু অনায়াসে সব মানুষকে অবহেলা করতে পার। এই শহরকে লাথি মারতে পার।

    মৈত্রকে দেখলে এটা বিশ্বাস করা যায়। জাহাজে মারামারি করতে গিয়ে দু-দুবার ব্ল্যাকলিস্টেড হয়েছে, গর্বের সঙ্গে বলে। সে পরোয়া করে না, বেশ একটা অহমিকা নিয়ে আছে, যেন কোনও ভয় নেই বাছারা আমরা সবাই ঈশ্বরের সন্তান। কোন শালা কার চেয়ে কম। মৈত্রর এমন সব কথাবার্তা শুনে সে মাঝে মাঝে হেসে ফেলেছে।

    —তাহলে ছোটবাবু জাহাজে মুখ গোমড়া করে থাকবে না।

    সোনা বলেছিল, না না।

    —কষ্ট হয় হবে। পারবে না যখন বলবে, আমরা আছি। কিছু লজ্জা করবে না বলতে। জাহাজে ওঠার সময় মৈত্র আগে। সে পিছনে। লম্বা সিঁড়ি। এক এক করে সবাই উঠে যাচ্ছে। মৈত্র বেশ লম্বা। খুব শক্ত মানুষ। বড় একটা সেলার হাতে। মাথায় তালপাতার নীল টুপি। মোটা বেল্ট কোমরে আঁটা। এবং জুতো কুমীরের চামড়ার। বেশ শক্ত মজবুত এবং হাঁটু পর্যন্ত জুতোর চামড়া উঠে গেছে। কিছুটা গামবোটের মতো দেখতে। সে পরেছে লাল রঙের পাতলা গেঞ্জি। সে তারপর পিছনের দিকে তাকালেই দেখল অমিয় কিং জর্জ ডকের তিন নম্বর জেটিতে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে কথা বলছে।

    আর সে যা দেখল, কেমন নিঝুম একটা জাহাজ। মাস্তুলে একটা পাখি বসে আছে। সিঁড়ির ওপাশে একটা বড় জাহাজ থেকে মাল নামানো হচ্ছে। তার অতিকায় শব্দ, আর সব সারি সারি ক্রেনের নিচে জাহাজিরা এক এক করে উঠে আসছে দল বেঁধে।

    জাহাজে ইউনিয়ান জ্যাক উড়ছে। এই জাহাজে সে এখন ছোটবাবু।

    সোনার এসব খেয়াল থাকার কথা না। সিঁড়ি ধরে ওঠার সময়ই সে ঘাবড়ে গেছে। কি লম্বা সিঁড়ি, কি খাড়া! খুব সন্তর্পণে উঠে গেছে। এবং গ্যাঙওয়েতে মাত্র একজন রয়েছে। এবং বোধহয় কোয়ার্টার মাস্টার সে। বুড়ো মানুষটা বসে বসে একটা মাছ ধরার জাল বুনছে। মাঝে মাঝে কেবল জিজ্ঞাসা করলে জবাব দিচ্ছে—ওদিকে। জাহাজিদের সে আস্তানা দেখিয়ে দিচ্ছে।

    সোনা দেখল বেশ বড় জাহাজ। সে হেঁটে গেল—সে জমুনা বাজু ধরে হাঁটছে। আগে যারা উঠে এসেছিল তারা পিছিলে দাঁড়িয়ে আছে। সে তাদের ভিতর চাচাকে দেখতে পেল। খুব সকালে চাচা সবার আগে চলে এসেছেন। মৈত্র কাছে থাকায় যত না সাহস ছিল, জাহাজে চাচাকে দেখে সে আরও সাহসী হয়ে গেল। সে বেশ লাফ দিয়ে দিয়ে যেন উঠে যাচ্ছে। বাঁদিকে বড় বড় ফলকা পার হয়ে প্রায় কাছাকাছি গিয়ে বলল, কোনদিকে?

    —নিচে নেমে যা। সিঁড়ি আছে সামনে। তোদের পছন্দ মতো ফোকসাল দেখে নে।

    এসব ব্যাপারে যা হয়, ছোটবাবু, মৈত্র, অমিয় একসঙ্গে একটা ফোকসাল বেছে নিল। ওপরে নীচে দুটো দুটো চারটে বাঙ্ক। এটা পোর্ট-সাইড, এবং পোর্ট-সাইডে সব এনজিন ক্রুদের বুঝি থাকবার নিয়ম। সে বেশ তাড়াতাড়ির মাথায় তার বাঙ্কটা দখল করে নিলে মৈত্র বলল, এটা নিলে ছোটবাবু সামলাতে পারবে তো?

    ছোটবাবু বলল, জানি না।

    —এটা নাও। তোমার ভাল হবে। দেওয়ানি কম পাবে।

    সে ভালমন্দ বোঝে না। চারপাশে কেমন একটা গন্ধ। রঙ বার্নিশ মিলে একটা পোড়া পোড়া গন্ধ। সে মোটা ম্যাট্রেসের ওপর একটা চাদর পেতে দিল। তখন মৈত্র বলল, একটু চা হলে ভাল হত ছোটবাবু। চা করে আনছি। তুমি বরং দেখে এসো অমিয় উঠে আসছে কিনা।

    তখন অমিয় উঠে আসছিল। ওর লটবরহ যেন অনেক। এত লটবহর নিয়ে সে উঠে আসতে পারছে না। ওর কাঁধে বড় দুটো কিডস ব্যাগ। সঙ্গে একটা নীল রঙের লম্বা টিন, ডান হাতে একটা সুটকেস্, সঙ্গে ফ্ল্যাকস। বাঁ হাতে কোন রকমে সমস্ত শরীরের ব্যালেন্স রেখে সে উঠে আসছে।

    ছোটবাবু তাড়াতাড়ি নিচে নেমে ওর কাছ থেকে টিনটা নিয়ে নিল। আরও সে দেখল বড় একটা ট্রাঙ্ক। এসব নিয়ে অমিয় জাহাজে উঠে আসছে। ওর ভারি অবাক লাগল, টিনের ভেতর মুড়ি, মোয়া নাড়। ওর মা ওর জন্য সমস্ত সফরে কি কি কষ্ট হতে পারে ভেবে বাঁধাছাঁদা করে যাবতীয় সুখ- সুবিধা ওর সঙ্গে গুছিয়ে দিয়েছে। ছোটবাবু অমিয়র দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল।

    সারাটা সকাল এভাবে একজন দুজন করে উঠে আসছে। কিং জর্জ ডকের চারপাশে যখন সব বড় বড় ক্রেনগুলো বড় বড় জাহাজ থেকে মাল নামাচ্ছে, সূর্য বেশ মাথার ওপর কিরণ দিচ্ছে, এবং ভীষণ গরম, ফোকসালে টেঁকা যাচ্ছে না, ডেক-সারেঙ এনজিন-সারেঙ ছুটোছুটি করছে, কাজকাম বুঝে নিচ্ছে তখন ছোটবাবু দেখল, একজন বুড়ো মতো মানুষ জেটিতে খুব দামী গাড়ী থেকে নামছেন। সঙ্গে এক টেডি বয়। ঠিক টেডি বয় বললে ভুল হবে, চুল কেমন নীলাভ রঙের, কালো প্যান্ট সাদা হাফসার্ট, হাতে একটা ক্যামেরা, চোখ ভীষণ নীল, সমুদ্রে গেলে এ চোখের রঙ কেমন হবে সে এখন বলতে পারে না।

    জাহাজের সব অফিসারেরা এখন খবর পেয়ে গেছে, ক্যাপ্টেন হিগিনস জেটিতে নেমেছেন। ওরা ছুটে ছুটে সিঁড়ি ধরে নেমে গেল। বড় মালোম জাহাজ থেকেই হাত তুলে ওয়েলকাম করছে কাপ্তানকে সব জাহাজিরা এসে ভিড় করছে রেলিঙে। এনজিন-সারেঙ নেমে গেছে নিচে। জাহাজের সর্বত্র ঘটাঙ ঘটাঙ শব্দ। আর সেই বুড়ো মতো মানুষ, সঙ্গে তার একমাত্র সন্তান, আগে আগে বেশ নিরিবিলি, যেন তার সব দেখা, জানা। পুরানো জাহাজের গন্ধে টের পান জাহাজের হাল তবিয়ত কেমন আছে, রেলিঙে হাত রেখেই টের পান, এ-সফরে কতটা নসিবে দুর্ভোগ আছে। তিনি সিঁড়ি ধরে উঠতে উঠতে গল্প করে যাচ্ছেন। কারণ সবাই তো তাঁর চেনা জানা। অনেক সফর এদের সঙ্গে তার কেটেছে। বড় মালোম তো বনিকে গত সফরে দেখেছে। বনিকে এ-সফরে দেখেও বড় একটু ঘাবড়ে যেতে পারে।

    তবু কি করা ঠিক, কাপ্তান স্থির নিশ্চয় কিছু জানেন না। কোনটা ভাল ছিল। এই নিয়ে আসাটা ভাল, না রেখে আসা ভাল ছিল। তিনি সেজন্য এ-ব্যাপারে বড়কে মোটামুটি কিছু বলবেন। বড় যে একটা প্রশ্ন তুলবে তিনি ওঠার মুখে বড়র মুখ দেখে টের পেয়েছেন। যেন বড় এতে খুশি হয়নি। অন্য কেউ এটা জানে না বলে তারা বনিকে বেশ হেইল করছে। বনি আবার কতদিন পর—আঃ সেই জাহাজ! বনি এখন হয়তো ডেকে উঠেই সারা ডেকময় ছুটে বেড়াবে। ওর দৌরাত্ম্য মাঝে মাঝে বড় বেশি কষ্টদায়ক।

    কাপ্তান বুড়ো, ভীষণ বুড়ো, লম্বা, একটু নুয়ে গেছেন। কালো প্যান্ট, সেই সাদা হাফসার্ট, গলায় টাই। গরমে ঘামছেন। চোখ সাদাটে! নীল রঙটা চোখে কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। প্রথমেই ওঁর যা অভ্যাস, জাহাজে উঠেই ব্রীজে দু’বার পায়চারি করা। দু’বার পায়চারি করলে সমস্ত জাহাজটা চোখের ওপর কেমন আশ্চর্য জ্যান্ত হয়ে যায়। যেন জাহাজটা আর জাহাজ থাকে না, কাপ্তান হাত তুলে হেই বলে চিৎকার করে ওঠেন—হেই, হেই ডার্লিঙ এসে গেছি।

    বনির আলাদা ঘর। কাপ্তানের আলাদা ঘর। ঠিক ব্রীজের পিছনে চার্ট রুম। চার্ট রুমের পাশে কাপ্তানের কেবিন। এবং তার ঠিক নিচে বনির কেবিন।

    তিনি বনিকে নানাভাবে বুঝিয়েছেন, জাহাজে তুমি বড় হয়ে যাবে। তুমি আর আগের মতো চলাফেরা করলে চলবে না। তুমি মনে রাখবে সমুদ্রযাত্রা ভয়ঙ্কর সাহসী কাজ। সেখানে নানা কারণে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে। তুমি জাননা বনি—এই ইণ্ডিয়ান জাহাজিরা কত ভদ্র। তাদের তুমি উৎপাত কর না। অবশ্য বনি বলেছে, আমি দুষ্টুমী করব না বাবা, আমি ভাল হয়ে থাকব। তোমাকে আমি দুঃখ দেব না।

    সিঁড়িতে তিনি তখন শব্দ পেলেন, ক্যাপ্টেন বয় সালাম জানাতে এসেছে। তিনি তাকে বললেন, দু’কাপ কফি পাঠাবে। জ্যাকের কেবিনে এক কাপ

    আসলে বনি এখন এ-জাহাজে জ্যাক হয়ে গেছে। গত সফরেও বনি জ্যাক ছিল। চিফ-মেটের সঙ্গে একটু পরামর্শ দরকার। সেও তো তার মত বয়সী মানুষ। এবং বনিকে ভীষণ স্নেহ করে থাকে। তিনি দেখলেন পাইপটা নিভে গেছে। বাইরে তখন চিফ-মেটের গলা, স্যার আসতে পারি?

    —ইয়েস্ কাম্ ইন্।

    চিফ-মেট এসে চুপচাপ টেবিলের পাশে বসল। মাস্টার পিছন ফিরে আছেন। উনি একটা খৃষ্টের ছবি দেয়ালে টানাচ্ছেন। ওটা সব সময় ওঁর সঙ্গে থাকে। এবার যে আরও বেশি বুড়ো হয়েছেন ওঁর হাত কাঁপা দেখে চিফ এটা টের পাচ্ছে। সে এগিয়ে বলল, দিন। আমি ঠিক করে দিচ্ছি। কারণ যতবার এটা কাপ্তান করতে গেছেন ততবার কেমন ছবিটা তেড়চা হয়ে গেছে। ঠিক সোজা থাকছে না। কাপ্তানের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। এ-সফর তার শেষ সফর। তিনি যত ঝড় সাইক্লোন থাকুক, খারাপ ওয়েদার থাকুক, চোরা হিমবাহ থাকুক, সমুদ্রের নিচে গোপন পাহাড় থাকুক, তার ডার্লিংকে বন্দরে ঠিক ভিড়িয়ে দিতে পারবেন। অথচ এবার কেমন একটা অমঙ্গলের আশঙ্কা। ছবিটা সোজা থাকছে না। চিফ এসে ছবিটা সোজা টানিয়ে দিলে কিছুটা শান্ত মুখে যেন বসতে পারছেন। কফি খেতে খেতে চিফই প্রথম বলে ফেলল, এবারও বনিকে নিয়ে এসেছেন দেখছি।

    —কিছুতেই থাকতে চায় না।

    —কিন্তু ওতো বড় হয়ে যাচ্ছে। আমরা কবে ফিরব ঠিক কি। ততদিন পর্যন্ত ওকে ছেলে সাজিয়ে রাখা যাবে?

    কাপ্তান বললেন, জানি না কি হবে। কিন্তু না নিয়ে এসেই বা উপায় কি! কার কাছে রেখে আসব, কেউ রাখতে চায় না। হোসটেল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কোনও আইনকানুন মানতে চায় না।

    তারপর আর কোনও কথা না। বড়-মালোম আর কাপ্তান চুপচাপ কেবল গরম কফি খেয়ে যাচ্ছেন। ওঁরা শুনতে পাচ্ছেন, বনি ওর রেকর্ড-প্লেয়ারে একটা পপ গান বাজাচ্ছে। বনি বোধহয় এমন শান্ত আকাশ, নিরিবিলি নদীর ছবি দেখে চুপচাপ থাকতে পারছে না। সে কেবিনের ভেতর নাচছে আর গাইছে।

  • দুই

    দুই

    ।। দুই।।

    সকাল থেকেই বেশ একটা এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে। নদী থেকে এই হাওয়া উঠে এলে মৃদু ঠাণ্ডা একটা ভাব থাকে জাহাজের ভেতর। ছোটবাবুর উঠতে দেরি হয়ে গেছে। দুবার মৈত্র অমিয় ডেকে গেছে। কিন্তু ছোটবাবু রাতে একটা দুঃস্বপ্ন দেখায় সারারাত প্রায় ঘুমোতে পারেনি। সকালের দিকে ঘুমটা এসেছিল। পোর্টহোল দিয়ে সামান্য রোদ পর্যন্ত পায়ের কাছে এসে পড়েছে। কেমন শান্ত একভাব জেটিতে। মনেই হয়নি সে একটা জাহাজের ভেতর আছে। তার মনে হয়েছিল, সে আগের মতোই আছে—কাজ কর্ম নেই, একটু দেরি করে উঠলে কোন ক্ষতি হবে না।

    সে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে এল। চারপাশে রোদ। ডেক জাহাজিরা ও-পাশে চা চাপাটি খাচ্ছে। এ-পাশে এনজিন-জাহাজিরা গ্যালিতে ভিড় করেছে। আর একটু পর কাজের সময় হয়ে যাবে। সবাই বেশ জলদি যে যার চায়ের জল গরম করে নিচ্ছে। গতকালই ওরা রেশন পেয়েছে। চা, চিনি, সিগারেট। মৈত্র, অমিয় এবং ছোটবাবু মিলে ‘বিশু’ করে নিয়েছে। তদারকির ভার মৈত্রের ওপর। চা করবে অমিয়, কাপ প্লেট ধুয়ে রাখার ভার ছোটবাবুর।

    কাল জাহাজটাকে খুব নিরিবিলি শান্ত মনে হচ্ছিল। আজ সকালে একেবারে আলাদা চেহারা। জেটি থেকে মানুষ-জন উঠে আসছে। চারপাশে সব লম্বা লম্বা জেটি। এক দুই তিন করে, সে গুনে গুনে দেখল এ-ডকে এগোরোখানা জাহাজ রয়েছে। বয়াতে বাধা জাহাজগুলোতে নৌকায় মানুষজন উঠে আসছে।

    হাওয়াটা বেশ লাগছে তো। সে এখনও জানে না কি কাজ করতে হবে তাকে। জাহাজটাকে কিছুতেই ইবলিশ মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে বেশ বড় জাহাজ। কত লম্বা হবে, সে মেপে বলতে পারে। তবে জাহাজের পেছনে আছে এনজিন আর ডেক-ক্রুদের বাথরুম, তারপরে আছে দু’পাশে দুটো মেসরুম। মেসরুম দুটোর মাঝখানে সিঁড়ি। সিঁড়ি টুইন-ডেকে নেমে গেছে। সিঁড়ির দু’পাশে দুটো ফোকসাল। পোর্ট-সাইডের ফোকসালে এনজিন-সারেঙ, পরেরটায় দুজন এনজিন টিণ্ডাল। ‘স্টাবোর্ড-সাইডের ফোকসালে ডেক-সারেঙ, পরেরটায় ডেক-টিণ্ডাল এবং কশপ। তারপর সিঁড়ি ক্রমে লোয়ার ডেকে নেমে গেলে মাঝ বরাবর বড় একটা লম্বা ঘর। ঘরে ক্রুদের জন্য রসদ। দু’পাশে লম্বা ভাগ করা সব ইনজিনক্রুদের থাকার জায়গা। ওপর নীচ বাঙ্ক মিলে অনেকগুলো পর পর ফোকসাল। লোয়ার – ডেকে ঠিক সিঁড়ির মুখের ফোকসালটায় ছোটবাবু, মৈত্র এবং অমিয় থাকে।

    ওরা তিনজন তিনটা লকার পেয়েছে। তিনজনের জিনিসপত্র আলাদা রাখা আছে। কেবল চা চিনি একসঙ্গে। ছোটবাবু সিগারেট খায় না বলে প্রথম নিতে চায়নি, পরে মৈত্রকে দিয়ে দিতে চাইলে, মৈত্র বলল, রাখো ছোটবাবু রেখে দাও। আমাদের জাহাজ আপাতত যাচ্ছে বুনো সাইরিস। সেখানে তোমার সিগারেট সোনার দামে বিক্রি হয়ে যাবে। সে টাকায় সেখান থেকে ইচ্ছা করলে দামী কম্বল কিনে নিতে পার। পৃথিবীর কোথাও এত ভাল শস্তা দামী কম্বল তৈরি হয় না। সুতরাং ছোটবাবু সিগারেট নিয়ে লকারে রেখে দিয়েছে। তার খুব ইচ্ছে মার জন্য ভাল একটা কম্বল নিয়ে দেশে ফিরবে। শীতের রাতে মার ভীষণ কষ্ট। ঠান্ডা ঘরে কাঁথায় মার শীত কমে না। ছোট ছোট ভাই-বোনেদের ঢেকেঢুকে মার জন্য বাকি কিছু থাকে না। একটা ভালো কম্বল হলে বেশ হবে।

    ডেকে দাঁড়িয়ে ছোটবাবুর মনে হল আসলে জাহাজটা ইবলিশ না। পুরানো জাহাজ হলে যা হয় কাজ সব সময় লেগেই থাকে। এখান থেকে রঙ খসে পড়ে যায়। ওখান থেকে রেলিং খসে পড়ে যায়। কাঠ উঠে যায়, এবং জাহাজ পুরানো হলে যা হয়, কেবল মেরামতের কাজ লেগেই থাকে। রঙ-বার্নিশের কাঁচা গন্ধ। জাহাজের আপ-ডেকে, মেসরুমের দু’পাশে দুটো গ্যালি। তারপর দুটো হ্যাঁচ। দু’হ্যাচের মাঝখানে মাস্তুল। মাস্তুলের দু’পাশে দুটো দুটো করে চারটা ডেরিক। মাস্তুলের গোড়ায় দুটো; করে উইনচ্। মাস্তুলের রঙ হলুদ। খোলের রঙ সাদা, কেবিনের রঙ সাদা। তারপর চীফ-কুকের গ্যালি। গ্যালির দু’পাশে দুটো এলি-ওয়ে। দুটো এলি-ওয়ে দিয়েই এনজিন-রুমে নামা যায়। দুটো এলি-ওয়ের পোর্টসাইডে থাকে এনজিনের অফিসাররা। প্রথমটায় থাকে ফিফথ-এনজিনিয়ার, পরেরটায় ফোরথ, এভাবে শেষেরটায় থাকে চীফ এনজিনিয়ার। এরা কেউ এসেছে ওয়েলস থেকে। কারু বাড়ি স্কটল্যান্ডে, কেবল ফিফথ মানে ফাইবারের বাড়ি কলকাতায়। জাতিতে বাঙালী খৃষ্টান। স্টাবোর্ড সাইডের প্রথম কেবিনটা ফাঁকা। পরের কেবিনটাতে থাকে স্টুয়ার্ড। স্টুয়ার্ড কলকাতার পার্ক সার্কাসের মানুষ। বুড়ো এবং দেখলে খুবই অথর্ব মনে হয়। একটা কি যেন অসুখ আছে তার। জাহাজঘাটায় ছোটবাবুর এমন মনে হয়েছিল। পরের কেবিনগুলোতে ছোট-মালোম, মেজ-মালোম, বড়-মালোম এবং মাঝখানে রয়ে গেছে চৌকোন একটা বিরাট ফাঁকা জায়গা। ওপরে উঠে গেলেই বোট-ডেক এবং কাঁচের স্কাইলাইট। একটা লম্বা সিঁড়ি ‘দ’-এর মতো বেঁকে বেঁকে পাতালে নেমে যাবার মতো। সিঁড়ির প্রথম ধাপে আছে প্রকান্ড সিলেন্ডার। বড় বড় লম্বা থামের মতো মোটা, স্টিম পাইপ এসে জুড়ে গেছে। সিঁড়ির পরের ধাপে রয়েছে গোল গোল লম্বা তিনটে পিস্টন রড। স্টিলের মোটা এত মোটা স্টিলের রড ছোটবাবু জীবনেও দেখেনি। আকার এবং পরিমাণ দেখে ছোটবাবু ঘাবড়ে গেছিল। নিচে নেমে গেলে ক্র্যাঙ্ক স্যাফট। লম্বা, কত লম্বা হবে, যেন ওটা যেতে যেতে টানেল পথে কোথায় হারিয়ে গেছে। ওটা গেছে ঠিক ওদের ফোকসালের অনেক নিচ দিয়ে এবং বাইরে বের হয়ে প্রপেলারকে ধরে রেখেছে। আশ্চর্য বিস্ময়ে ছোটবাবু দেখতে দেখতে বুঝল বড় বেশি তাপ্পি মারা জাহাজ। সে এনজিন-রুমে দৈত্যের মতো তিনটে অতিকায় বয়লার দেখতে পেল। বয়লারের গায়ে নানারকম পাইপ, কক এবং গেজ লাগানো আছে। এ-পাশে জেনারেটর, এভাপরেটার, ও-পাশে কনডেনসার, ব্যালেস্ট পাম্প, জেনারেল সার্ভিস পাম্প। জাহাজের ডানদিক দিয়ে ঠিক বয়লারের গা ঘেঁষে ওপাশে ঢুকে গেলে বয়লারের বিরাট তিনটে করে হাঁ-করা মুখ, যেন গিলতে আসছে। লম্বা স্টোক-হোলডে দাঁড়িয়ে সে ওপরের দিকে তাকাল। ভীষণ নিচে সে নেমে এসেছে। বয়লারের সামনে একা দাঁড়িয়ে থাকতে ওর ভীষণ ভয় লাগছিল। বয়লারের তিনটি করে ফারনেস। দুদিকে দুটো, একটা নিচে। লম্বা সব স্লাইস র‍্যাগ শোয়ানো পাশে। একটা তুলতে গিয়ে মনে হল খুব ভারি আর তখন ঝুপ করে মনে হল কিছু মাথায় পড়ছে। কালো অন্ধকার গহ্বরে ঢুকে গেলে যেমন ভয় লাগে, তেমনি একটা ভয়। এখনও ঝুর-ঝুর করে মাথার ওপর কি সব পড়ছে। গুঁড়ো গুঁড়ো, এবং ক্রমে অন্ধকার করে দিচ্ছে, প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার মতো।

    সে তাড়াতাড়ি স্টোক-হোলডের সিঁড়ি ধরে ওপরে ওঠার মুখেই দেখল কাপ্তানের বেহদ্দ ছেলেটা কি করে দেখতে পেয়েছে, নিচে সে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার হাতে চিপিঙ করার পাতলা হাতুড়ি। ফানেলের গুড়ি থেকে সব ময়লা টেনে ফেলছে। ছোটবাবু বুঝতে পারল না, ওকে দেখে এমন করছে, না, না দেখে। যেভাবেই হোক ছোটবাবু রাগ করতে পারে না। বাড়িওয়ালার ছেলে, কোন কারণেই সে মুখ গোমড়া করে উঠে যেতে পারে না। ছোটবাবু ওঠে ওর পাশ কাটিয়ে যাবার সময় সামান্য হেসে বলল, গুড-মর্নিং স্যার।

    —গুড-মৰ্ণিঙ।

    ছোটবাবুর মুখ বেশ কালো হয়ে গেছে। আসলে ও-সব কয়লার গুঁড়ো। জ্যাকেরও জাহাজে কাজ থাকে। একজন নাবিক হিসাবে ওকে উঠে আসতে হয়েছে। সে দেখতে পায়নি নিচে কেউ আছে। সে ওর খুশিমতো কাজ করে। যখন যেখানে খুশি। সে দেখছিল হলুদ রঙের চিমনি, তার চারপাশে সব কয়লার গুঁড়ো, রঙ খেয়ে নিচ্ছে। সে ভেবেছিল, জায়গাটা সাফ করে রঙ করবে। ওর তো খুশিমতো কাজ। কশপকে বলে হলুদ রঙ নিয়েছে। সে সেজন্য বেশ টেনে টেনে ময়লা নামাচ্ছে, এবং খুব নিচে একজন যে মানুষ দাঁড়িয়েছিল, এবং বয়লার দেখে ভয় পেয়ে গেছিল, তার মাথায় গিয়ে পড়েছে সব, সে জানত না। সে নিজের মতো কাজ করে গেছে। কে গুড-মর্নিং বলল, চোখ তুলে তার দেখার স্বভাব না। কারণ সে জানে, এ জাহাজে এখন কেবল সালাম সার, গুড মর্নিঙ, গুড নুন সাব। মাঝে মাঝে সে খুব বিগড়ে যায়, কেন যে এমন হয় সে জানে না। সুতরাং বনি জানে না একজন কম বয়সের জাহাজি এ জাহাজে উঠে এসেছে। বরং সে জানে এ জাহাজে সে খুব ছোট, সবাই তাকে খাতির করে থাকে। তার ওপর কথা বলার কারু যেন অধিকার নেই।

    আর ছোটবাবু দেখল, বেশ নিরিবিলি শান্তভাবে কাপ্তেনের ছেলেটা কাজ করে যাচ্ছে। আসলে ওর কাছে এটা কাজ না, খেলা। ছোটবাবু এটা দেখেই টের পেয়েছে। এবং তখনই মনে হল লম্বা চিমনি যেন আকাশ ছুঁতে চায়। তার নিচে, সাদা বয়লার স্যুট পরে নীল চোখের অতি মায়াবি মুখ সে ভেবে পায় না, কেন এই ছেলেকে সবাই খারাপ ভেবে থাকে। ওর মা নেই। মা না থাকলে মানুষের কি থাকে। ছোটবাবুর বেশ কষ্ট হচ্ছে। ছেলেটি লম্বা, অথচ বয়স কম, চোখ দেখলেই টের পাওয়া যায়, খুব নির্দোষ স্বভাবের মুখ। সে কারো দিকে বুঝি তাকায় না, না তাকিয়েই গুডমর্নিঙ বলে থাকে। এভাবেই জাহাজে যেন ছোটবাবু ওর মতো আর একজন দুঃখী মানুষকে সহসা আবিষ্কার করে ফেলল। সামনে একমডেসান ল্যাডার। কাপ্তানের ঘরে উঠে যাবার সিঁড়ি। নিচে বোধ হয় ছেলেটার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। টোপাস সকাল থেকেই চারপাশটা ভীষণ ভালভাবে সাফসোফ করছে। কাপ্তানের কেবিনের পাশে চার্ট-রুম। তারপর ব্রীজ। ব্রীজে দুটো কম্পাস। পাশে স্টিয়ারিং হুইল। সাদা রঙ ব্রীজের। দু’পাশে তার দুটো উইংস। কাপ্তান সেখানে পায়চারি করছেন অন্যমনস্কভাবে। সে ল্যাডারের আড়ালে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারল ক্রমে সে এক ভীষণ উঁচু জায়গায় উঠে এসেছে। এখান থেকে নিচে জাহাজের সামনের হ্যাঁচ দুটো চোখে পড়ছে। বড় মাস্তুল চোখে পড়ছে। দড়ি-দড়া সব চারপাশে ওপরে নিচে ছড়িয়ে আছে। দুটো হ্যাচের মাঝখানে দুটো দুটো চারটে ডেরিক। তারপর বড় একটা আলাদা উইনচ। জাহাজের নোঙর ফেলার জন্যে রাখা হয়েছে। সামনে পতাকা উড়ছে। এ-ভাবে একটা জাহাজ আর তার মানুষজন চোখের ওপর ভেসে উঠলে, সে দেখল, পেছনে কে দাঁড়িয়ে তাঁকে ডাকছে—ছেলে আমার সঙ্গে আয়।

    মুখ ফেরালে সারেঙ দেখলেন, মাথায় মুখে কয়লার ধূলোতে ছেলেকে একবোরে চেনা যাচ্ছে না। এ সবে সারেঙের ঘাবড়াবার কথা না। বললেন, কোথায় ছিলি ছেলে? মাথাটা বাঁ-হাতে ঝেড়ে দিতে দিতে বললেন, মুখে মাথায়, এসব কয়লা লাগিয়েছিস?

    —জাহাজটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম চাচা! স্টোক হোলডে ঢুকতে এমনটা হল।

    —আয় আমার সঙ্গে।

    ছোটবাবু সারেঙের সঙ্গে হাঁটতে থাকল।

    এনজিন সারেঙ যখন ছোটবাবুকে নিয়ে বয়দের কেবিন পার হয়ে বোট ডেক থেকে আপ ডেকে নেমে যাচ্ছেন তখনই জ্যাকের মনে হল, সাব না বলে কে যেন স্পষ্ট বলল স্যার। গুড মর্নিঙ কথাটা বেশ টেনে টেনে তার উচ্চারণ। জাহাজে একমাত্র অফিসাররা ওকে জ্যাক বলে ডাকে। যারা ক্রু তারা সবাই সাব, কিন্তু কে একজন বলে গেল স্যার, মনে হল স্যার বলে রসিকতা করে গেল।

    জ্যাক উঠে দাঁড়াল। ওর কোকড়ানো চুল গভীর নীল রঙের। চোখ কিছুটা উদাসীন মাঠে বরফ পড়ার মতো। নাক সুন্দর নরম, মসৃণ ঘাড় গলা, থুতনি আশ্চর্য ঢেউ খেলানো, আর গোটা মুখে গোলাপি আভা। বোধ হয় সদ্য দেশ থেকে আসার দরুন এমন দেখাচ্ছে। এবং দেখলেই বোঝা যায়, খুব ঘন নীল রঙের চুলের ভিতর ভারি মনোরম হয়ে আছে মুখখানি। জ্যাক দৌড়ে বোট-ডেক থেকে নেমে গেল।

    সূর্য তেমনি উঠে আসছে তিন নম্বর জেটির ও-পাশ থেকে। ক্রেনের ছায়াগুলো ক্রমে ছোট হয়ে আসছে। কে এমন বলে গেল, স্যার, তার কি স্যার বলার বয়স হয়েছে। সাব, বাংলা কথা জাহাজিরা বললে এটা সম্মানের বাবা এমন বলেছেন। সে সেই লোকটাকে খুঁজতে গিয়ে মনে হল, না অনর্থক খোঁজা। কাকে সে জিজ্ঞাসা করবে। এমনিতেই সে অনেক সময় খুব গুটিয়ে যায়, বাবাকে সব খুলে বলতে পারে না, তবু মাঝে মাঝে ভীষণ রেগে গেলে ওর কান্ড-জ্ঞান থাকে না। জাহাজে উঠেই সে ঝামেলা পাকালে বাবা খুব বিব্রত বোধ করবেন। ফিরে আসার সময়ে মনে হল, উইনচের তলায় কেউ ঢুকে গেছে! পা দুটো বের হয়ে আছে। উইনচের ভিতর থেকে পুরানো নাটবোল্টু টেনে টেনে খুলে আনছে। ফিফথ ঝুঁকে আছে ভিতরে। সে খুব উৎসাহ দিচ্ছে, আবার আবার। আরো জোরে আঃ লাগছে না!

    —এই তো ভাল করে লাগালাম স্যার।

    —না লাগে নি।

    —ফসকে যাচ্ছে স্যার। এবং মুখে তেলকালি লাগায় এখন আর ছোটবাবুকে আদৌ চেনা যাচ্ছে না। তবু ফানেলের নিচে সেই কোঁকড়ানো চুলের মুখ, ভারি সুন্দর এবং মুগ্ধতায় ভরা। কেন জানি ওর ভারি ইচ্ছে হচ্ছে ছেলেটির সঙ্গে বন্ধুত্ব হোক। সে তার ছেলেবেলাকার কবিতার কথা মনে করে, ফিফথকে বলল, আমি একটা কবিতা বলতে পারি স্যার।

    —মানে?

    —মানে স্যার এবার আটকে গেছে। দেখুন। বলে সে টান দিলে নাটটা আদৌ ঘুরল না। স্যার আপনি হ্যাঁচ্য দিন।

    —হ্যাঁচ্য মানে?

    —এই যে বলে না, বলুন স্যার, জ্যাক এন্ড জিল হেঁইয়; ওয়েন্ট আপ দি হিল—হেঁইয়। এই দেখুন ঘুরছে। আবার সে রেঞ্চ এঁটে বলল, জ্যাক এন্ড জিল ডাউন, হেঁইয়। ব্রেক হিজ ক্রাউন, হেঁইয়। এবার নাটটা একেবারে ঢিলে করে গা ঝাড়া দিয়ে বের হয়ে পেছনে তাকাতেই একেবারে কাঠ। জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে। সব শুনেছে। ওর মুখটা এমনিতেই চেনা যাচ্ছিল না, জ্যাককে দেখে মুখটা আরও গোলমেলে হয়ে গেল।

    জ্যাক ওর এমন কাতর মুখ দেখে হা-হা করে হেসে উঠল। হেসেই সে দু লাফে বোট-ডেকে উঠে গেল। ছোপ ছোপ কালির ভেতর ছোটবাবুর মুখ নরম দাঁড়ি কিছুটা বুড়ো ক্লাউনের মতো। এমন জোরে হাসায় ছোটবাবুও হি-হি করে হেসে দিল। পরে একেবারে শক্ত হয়ে গেল। ফের ভিতরে ঢুকে বলল, স্যার আমাদের জাহাজ কোথায় যাবে?

    —কোথায় যাবে এখনও ঠিক হয় নি।

    —শুনেছি বুনোসাইরিস যাবে।

    —বুয়েনস-এয়ার্স যাবার কথা আমরাও শুনেছি। তবে বোর্ডে তো কিছু দেয় নি এখনও।

    —স্যার, আমি জ্যাক এন্ড জিল বললাম বলে ছোট স্যার রাগ করে নি তো?

    —সে তো আমি জানি না।

    —আচ্ছা স্যার আমি না জেনে দোষ করেছি। কাপ্তান ডেকে পাঠালে এমন বললে নিশ্চয়ই ক্ষমা করে দেবেন।

    —তা দিতে পারেন। আসলে ছোটবাবুর ভিতরটা খচ খচ করছে। এদিকের উইনচ চলছে না কারণ, পুরানো জং-ধরা মেসিন। বাইরে ক্রেন থেকে বড় বড় পাটের গাঁট নামানো হচ্ছে ফল্কার ভেতর। হারিয়া হাফিজ—কেবল ক্রমাগত এমন সব শব্দ গোটা ডেকময়। সব পাটের গাঁট বোঝাই হচ্ছে। এগুলো কোথায় যাবে—ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এজেন্ট অফিস থেকে কোনও খবর দিতে পারে, কাপ্তান অথবা বড় মালোম খুলে কিছু বলছেন না। তবু আন্দাজে ধরে নেওয়া যায়। জাহাজ কোথায় যাবে ধরে নেওয়া যায়—যাবে বুনোসাইরিস।

    সে জাহাজে উঠে উঠেই এটা যে কি করে ফেলল। উইনচের তলায় সে এখন চিত হয়ে শুয়ে আছে। ওর পা দুটো ডেকের ওপর সাঁড়াশির মতো এবং সাদা পা দুটোর মোজা কালো রঙের। পুরানো হাফ-সোল মেরামত করা জুতোর ফাঁক দিয়ে বুড়ো আঙুল বের হয়ে আছে। এবং এখন যেন এই ফাইবার অর্থাৎ ফিফথ এনজিনিয়ারকে খুশি রাখা একান্ত দরকার। ফাইবার কিছুতেই উইনচের নিচে ঢুকতে চাইছে না। কারণ, এত বড় শরীরটা তার ঢুকবে না। অবাঙ্গালীর মতো লম্বা এবং ঘাড়ে- গর্দানে খুব শক্ত। বেশ যখন ছেলেটা কাজ চালিয়ে যেতে পারছে, তখন নীচে না ঢুকে বরং সাফসোফ থেকে সকালের টিফিনটা সেরে নেওয়া যাবে। পরে পরে হয়ে গেলে মন্দ কি! আসলে সারেঙের কাছে ফাইবার একজন হেলপার চেয়েছে। এ সব কাজ ফাইবারেরই করার কথা। ছোটবাবু শুধু এটা- ওটা এগিয়ে দেবে। নাট বোল্ট তেলে ধুয়ে দেবে, বাটালি হাঁতুড়ি এগিয়ে দেবার কথা। অথচ ফাইবার ওকে দিয়েই সব করিয়ে নিচ্ছে। সে এটা-ওটা ছোটবাবুকে এগিয়ে দিচ্ছিল।

    ছোটবাবুর এসব কাজ জানা। ট্রেনিং শিপে সে এমন সব কাজ করে এসেছে। সে এখন অন্য কিছু ভাবতে পারছে না। ফাইবার বাঙ্গালী সাহেব। বাঙ্গালী সাহেবকে হাত না করতে পারলে তার চলবে না। সে তো আর ছোট-স্যারকে রাগাবার জন্য এমন বলে নি। সে তো কেমন সুন্দর সব ছবির দৃশ্য ভাবতে ভাবতে ছেলেবেলাকার একটা কবিতা মনে করতে পেরেছে। জ্যাক এন্ড জিল বলে হেঁইয় দিতে গিয়ে যত গন্ডগোল। ফাইবার হাতে থাকলে একজন অন্তত তার সাক্ষী থাকবে।

    খাবার টেবিলে ছোটবাবুকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। ওরা তিনজন মিলে এক বীশু। মৈত্র, ছোটবাবু আর অমিয়। মৈত্র বলে দিয়েছে, বিফ যেন দেওয়া না হয় ওদের। সারেঙ বলেছে, আজ তো মটন দিয়েছে, কাল কি দেবে বলতে পারি না।

    ছোটবাবু খেতে বসে বিফ কি মটন দেখছে না। অথবা ওদের কথাবার্তা বেমালুম শুনছে না। সে অন্যমনস্কভাবে খাচ্ছে। সে খুব ভীতু স্বভাবের মানুষ। সে হেসে দিয়েছিল, ছোট-স্যার হেসেছেন বলে। মুখ গোমড়া রাখলে যদি আরও রেগে যায়। কিন্তু হেসে কি লাভ হল। ছোট স্যার তো তখন লাইফ বোটের ও পাশে চলে গেছে। সে হাসল কি কাঁদল কে দেখেছে।

    স্নান করে ছোটবাবু একটা সাদা প্যান্ট সাদা হাফ-সার্ট গায়ে দিয়েছে। সারা দিন সে কাজ করেছে ফাইবারের সঙ্গে। বারোটায় তাড়াহুড়ো করে ভাত ডাল খেয়েছে, বাঁধাকপি ভাজা খেয়েছে। মাংস খায়নি। এখনও জাহাজের বাসি মাংস শেষ হয়নি। যখন সকালের দিকে ভান্ডারী মাংস কাটছিল সে ভীষণ দৃশ্য, সাদা হয়ে গেছে, বরফ ঘরে মাংস দীর্ঘদিন থাকলে যা হয়।

    কাল পরশু রসদ উঠবে। মৈত্র এ-নিয়ে একটা ঝগড়া বাধিয়ে পর্যন্ত দিয়েছিল, সারেঙকে শাসিয়েছে—মটন যেন রসদে বেশী করে নেওয়া হয়। আমরা যারা হিন্দু আছি তাদের কথা ভাববেন। অথচ মৈত্র সব খায়। সে বিফ মটন মানে না। তার কাছে দুই সমান। তবে সে এমন করছে কেন! ওরা দুজন বাঙালি হিন্দু জাহাজি নতুন উঠেছে বলে। ডেকে যে দুজন উঠেছে, একজনের নাম বঙ্ক, অর্থাৎ বন্ধুবিহারী দেবনাথ। অন্যজনের নাম মজুমদার, অনিমেষ মজুমদার। মৈত্র বোধ হয় এদের নিয়ে জাহাজে একটা দল করতে চায়। আর্টিকেলে কি আছে না আছে, সে সেটা শুনতে চাইছে না।

    মৈত্র মাংসের হাড়িটা ছোটবাবুর দিকে এগিয়ে দিল। —যা লাগে নে।

    ছোটবাবু বলল, মৈত্রদা আমার মাংস খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না।

    অমিয় বলল, আমারও।

    —ওটা হলে তো চলবে না। মাংস না খেলে জাহাজ চালাবে কি করে। আবার এটা কয়লার জাহাজ। তারপর আবার জাহাজে স্টিম ঠিক থাকে না। সমুদ্রে পড়লে ঝড় উঠলে বুঝবে, বুঝবে। খাও খাও। পুরুষ মানুষ মাংস খাবে না, সে কি রকম কথা।

    ছোটবাবু বলল, মাংসের আসলে যা চেহারা দেখেছি।

    —পোকা দ্যাখো নি তো।

    —পোকা?

    —হ্যাঁ-হ্যাঁ পোকা।

    ছোটবাবুর সঙ্গে সঙ্গে ওক উঠে এল। সে সোজা দৌড়ে গেল বাথরুমে। মৈত্র শুনতে পেল, ছোটবাবু বমি করছে।

    —এ হলেই হয়েছে! সে তাড়াতাড়ি ভাত ফেলে ছুটে গেল। তুই ছোটবাবু এ-কথায় বমি করে দিলি! জাহাজে কি ট্রেনিং নিয়েছিস তবে। কচু ট্রেনিং! ওঠ। চল খাবি। তোকে জোর করে মাংস গেলাতে হবে, বমি তোর বের করে দিচ্ছি।

    এনজিন-সারেঙ মেসরুমের বাইরে ছিলেন। জোরজার করে ছোটবাবুকে মাংস খাওয়ানো হবে বলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছোটবাবুর মুখে রা নেই। এনজিন-সারেঙ মেসরুমে ঢুকে বললেন; মৈত্রমশায় কেন জোরজার করছেন। আস্তে আস্তে সব সয়ে যাবে। জোরজার করলে এই ভীতু ছেলেটা আরও ভয় পেয়ে যাবে।

    মৈত্র, জাহাজের বড় টিন্ডাল। মৈত্রকে সারেঙ যথেষ্ট সমীহ করে কথা বলছেন এবং মৈত্র এ জাহাজের একজন দায়িত্বশীল মানুষ বুঝতে পেরে ছোটবাবু বলল, তাই মৈত্রদা। সময় ঠিক করে দেবে।

    তবু মৈত্র কেমন গুম হয়ে বসে থাকল।—চল নিচে। ওরা নিচে নেমে গেলে দেখল ডেকজাহাজি বন্ধু অনিমেষ ওদের বাংকে বসে রয়েছে। অমিয়, ছোটবাবুর থালা গ্লাস ধুয়ে আনছে। ও এখনও নামে নি।

    মৈত্র ভিতরে ঢুকেই গজগজ করছিল—হয়েছে বেশ, জাহাজে যে কেন আসা। মৈত্র টান মেরে লকার খুলে ফেলল, জামা কাপড় টেনে বের করছে। এ সব দেখে ওরা ঠিক বুঝল না মৈত্র এখন কি করতে চায়। মৈত্র তারপর একটি টিন বের করে বাংকের নিচে কি খুঁজছে। অমিয় এসে গেলে, ওর হাত থেকে একটা প্লেট টেনে তোয়ালে দিয়ে বেশ করে মুছল। অমিয়র সেই টিনটা। ওতে মুড়ি মোয়া নাড় আছে। গতকাল ওরা দুটো একটা করে খেয়েছে। অমিয় বাউন্ডুলে স্বভাবের ছেলে। সে দুটো একটার বেশি নিজে খায়নি। কিন্তু এখন যেন মৈত্র নিজের টিন থেকে মুড়ি বের করে দিচ্ছে। একবার অমিয়র দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত।

    ছোটবাবুর মনে হল এটা ঠিক হচ্ছে না। অমিয়কে ওর মা সফরে যাচ্ছে ছেলে, কবে ফিরবে ঠিক কি, পূজাপার্বণে ছেলের কথা মনে হবে, ছেলের জন্য বেশ যত্ন করে মোয়া, নারকেলের নাড়, তিলের তক্তি সব কত যত্ন করে সঙ্গে দিয়েছে। এ-ভাবে শেষ করে দেওয়া ঠিক না। সে বলল, মৈত্রদা আমার কিছু খেতে ইচ্ছা হচ্ছে না।

    —খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না কেন? সারাদিন খেটে তো চোখ কোথায় গেছে! মুখ চোখ তো একেবারে ঈশ্বরের পুত্রের মতো করে রেখেছ। কে যে তোমাকে জাহাজে আসার ছাড়পত্র দিলো।

    —সেই তো মৈত্রদা।

    অমিয় বলল, খা না। কিছু তো একটা খেতে হবে।

    মৈত্র ফের বলল, আরে জাহাজে বাবা মা কেউ কারো আসে না। আমরা নিজেরাই নিজেদের বাবা মা। সংকোচের কিছু নেই।

    ছোটবাবু বলল, রাখো। খাচ্ছি।

    তখন পোর্ট-হোল দিয়ে জেটির ও-পাশের ক্রেন দেখা যাচ্ছে। বন্দরের সব মানুষেরা ঘরে ফিরে যাচ্ছে। একটা জাহাজ ঢুকছে লকগেট দিয়ে। চোঙ মুখে পাইলট দু’পাশের মানুষদের দড়িদড়া ঢিলে দেবার অথবা টেনে ধরার নির্দেশ দিচ্ছে। বেশ সুন্দর উজ্জ্বল রোদ। সূর্য গঙ্গার ও-পাশে পাটকলের চিমনি পার হয়ে নারকেল গাছের ছায়ায় নেমে যাচ্ছে। সে কেমন অনিচ্ছার সঙ্গে খাচ্ছিল। ওকে ঘিরে ওরা চারজন নানারকম গল্প চালিয়ে যাচ্ছে। আর ক’দিন জাহাজ আছে, আর ক’দিন এ-ভাবে থেকে একদিন জাহাজ গিয়ে সমুদ্রে পড়বে। ছোটবাবু তখন শুধু ভাবছিল জ্যাক যদি বাবাকে বলে দেয়, যদি বলে দেয়, আমাকে বাবা ঠাট্টা করেছে এবং সে এ-ভাবে একসময় সেজেগুজে গিয়ে ওপরে দাঁড়াল। দেখল, ডেকের পাশে মাস্তুলের নিচে জাহাজিরা বসে তাস খেলছে। সে কেবল ভাবছিল, কখন সারেঙ ডাকবে, ছেলে তোকে ডাইনিংরুমে বাড়িয়ালা ডেকেছে। এবং এ-ভাবেই ক্রমে রাত্রি বাড়ে।

    আর অজস্র নক্ষত্র আকাশে। চারপাশে জাহাজ, জেটির লাল নীল আলো। সেই পরিচিত আবহাওয়া। ঠিক সে যেমন রেলিঙে দাঁড়িয়ে ভদ্রা জাহাজে কত কিছু ভাবত, আজও তেমনি এক সময় ভাবতে গিয়ে দেখল বোট-ডেকের ও-পাশে জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে। ওর মুখে নীল রঙের আলো। উইংসের আলো মুখে বেশ একটা মহিমময় স্নিগ্ধ সুষমা সৃষ্টি করেছে। তার কেন জানি নিমেষে সব ভয় কেটে গেল।

    এবং এ-সবই কেবল বিকেলে সবুজ ঘাস মাড়িয়ে যাবার মতো। সে যে কতদিন কোনো মাঠের ঘাসের ওপর ধীরে ধীরে হেঁটে যায়নি। তার ভারি ইচ্ছে কাল বিকেলে যে চলে যাবে বড় মাঠে। একা একা হেঁটে সেই ফোর্ট উইলিয়ামের রেমপার্টে বসে থাকবে। যে ক’দিন জাহাজ এ বন্দরে আছে মাঠের ঘাসে বসে থাকবে। একা থাকলে সে নিজের সঙ্গে অজস্র কথা বলতে পারে। তার তখন কোনও কষ্ট থাকে না।

    জাহাজে মাল বোঝাই প্রায় শেষ। সবই চটের গাঁট। সামনে পেছনে চারটা ফল্কাতেই পাটের গাঁট আছে। উপরে রয়েছে কিছু চায়ের পেটি। এবং জাহাজ ছাড়ার আগের দিন এল বড় বড় খাঁচায় সব সারস পাখি। পাখিদের ডেকের ওপরই রাখা হল। মোটামুটি বোঝাই শেষ। ক্রেনগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। চব্বিশ ঘন্টায় ফ্ল্যাগ উড়ছে। সকালে জ্যাক পাখিদের খাবার দিচ্ছে। জ্যাক বেশ একটা ভাল কাজ পেয়ে চুপচাপ। সে আর কারো দিকে তাকাচ্ছে না। ছোটবাবু বেশ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পেরেছে। সে আর কখনও কাছে যায় না। জ্যাক পোর্ট-সাইড ধরে হাঁটলে, ছোটবাবু যায় স্টাবোর্ড সাইড ধরে। মুখোমুখি হতে ছোটবাবু ভীষণ ভয় পাচ্ছে।

    সারেঙকে ছোটবাবু সব খুলে বলেছিল। সারেঙ জবাবে বলেছে, খুব বেঁচে গেছ। ওর নালিশ দেবার স্বভাব না। সে কখনও বাপকে লাগায় না। এমন অতিষ্ঠ করে তুলবে, তুমিই শেষ পর্যন্ত বাড়িয়ালার কাছে ছুটবে। যতটা পার এড়িয়ে যাবে।

    সে খুবই এড়িয়ে যাচ্ছে। যদিও জ্যাকের মুখ ভারি সুন্দর, জ্যাককে কখনই খারাপ লাগার কথা না, তবু ছোটবাবু আর তাকায় না। বরং ছোটবাবু দেখল, জাহাজ লকগেট দিয়ে নামছে। বড় মিস্ত্রি, মেজ মিস্ত্রি সবাই বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক বাইনোকুলারে কিছু দেখছে।

    ছোটবাবু জানে, বাইনোকুলারটা মেজ-মালোমের। তিনি এখন কাজে ব্যস্ত। জাহাজ নদীতে না নামা পর্যন্ত তিনি অবসর পাবেন না। সে জাহাজে উঠেই মেজ-মালোমকে দেখেছে মাঝে মাঝে তিনি বসে থাকেন বোট-ডেকে। চোখে থাকে বাইনোকুলার। অনেক দূরের কিছু দেখার আশা। খুব কাছে বড় বড় হয়ে দেখা দিলে বুঝি সব কিছুর মানে অন্যরকম তাঁর কাছে।

    জাহাজের ওয়াচ আরম্ভ হয়ে গেছে। ছোটবাবুকে কোনও ওয়াচে রাখা হয়নি। এটা সারেঙ নিজেই ঠিক করেছেন। ওয়াচ ভাগের দায়িত্ব তাঁর। জাহাজে দুজন কোলবয় ফালতু। পাঁচ নম্বর অথবা চার নম্বর মিস্ত্রির সঙ্গে হেলপার হিসাবে কাজ করার কথা ওদের। ছোটবাবুকে সেজন্য ফালতু রাখা হয়েছে।

    জাহাজ যাচ্ছে কলম্বোতে। বোর্ডে লেখা রয়েছে এমন। তারপর জাহাজ যাবে লরেঞ্জোমরকুইস এবং পরে ডারবান কেপ-টাউন হয়ে সোজা দক্ষিণ আমেরিকার সেন্টিসে। তারপর বুয়েনস-এয়ার্স। এই পর্যন্ত বোর্ডে লেখা রয়েছে। তারপর জাহাজ কোথায় যাবে, কেউ জানে না। এমন কি কাপ্তান পর্যন্ত বলতে পারবেন না। আর ব্যাঙ্ক লাইনের সফর বড় বেশি লম্বা সফর। কবে জাহাজ ফিরবে হোমে কেউ জানে না। আদৌ ফিরবে কি না, কারণ সমুদ্রের মায়ায় ভীষণভাবে মানুষেরা পড়ে যায়। তখন বুঝি পৃথিবীতে মাটি গাছপালা পাখি বলে কিছু আছে মনে থাকে না।

    এবং এভাবেই সংসারে এক অতীব ইচ্ছা কখনও কখনও মানুষকে ভীষণ পাগল করে দেয়। কাপ্তানের পায়চারি দেখলে সেটা টের পাওয়া যায়। তিনি অন্যমনস্কভাবে হেঁটে যাচ্ছেন কেবল। তিনি কেবল জানেন, জাহাজের দূর্বলতম স্থান কোনটা। একটার পর একটা মেরামত করা হচ্ছে আবার অন্য জায়গায় ফুটোফাটা হয়ে যায়। বালকেডে নানারকম হিজিবিজি লোহার পাত লাগানো। কোনোটা সরে গেলে অথবা কোন কারণে ফুটোফাটা হয়ে গেলে কি হবে তিনি জানেন। এসব জানেন বলেই ব্যালেস্টের ওপর খুব নজর। একটা নয়, দুটো ব্যালেস্ট রেখেছেন। এবং এ জাহাজেই আছে একমাত্র উত্তরাধিকার তাঁর। তিনি তাকে নিয়ে উঠেছেন। তাঁর যে ভারি সখ ছিল—অন্তত একটা ছেলে। ছেলে না হলে এমন যে একটা পৃথিবী আছে, যার তিনভাগ জল, একভাগ স্থল, সমুদ্রে বের না হলে যা টের পাওয়া যায় না এবং সমুদ্রের এক ভারি আশ্চর্য টান আছে। সমুদ্রে তিনি জাহাজ নিয়ে প্রায় যাবতীয় দেশ এবং সমুদ্রের দ্বীপ, গাছপালা, ঝড় টাইফুন, তিমি মাছ, ডলফিনের ঝাঁক অথবা সিন্ধুঘোটক দেখে বেড়িয়েছেন। তাঁর মতো সেই উত্তরাধিকারও পুরুষানুক্রমে সেই ধারা টেনে নিয়ে যাবে এবং এভাবেই তিনি ভেবে থাকেন। মেয়েটাকে ছেলে বানিয়ে রাখেন। ছেলেটাকে সঙ্গে নেন। আসলে ওসব বলতে হয় চিফকে। –দ্যাখো নদী দ্যাখো। এর নাম কলকাতা বন্দর, হুগলী নদীর তীরে অবস্থিত বন্দর। তোমাদের পূর্বপুরুষরা এ বন্দরে প্রথম কলের জাহাজ নিয়ে এসেছিল। তুমি এসব দেখে রাখো।

    বনি বাপের পাশে দাঁড়িয়ে চোখে দূরবীন লাগিয়ে সব দেখছে। সে স্থির। গরমকাল। সে গলস্‌ পরেছে চোখে। যখন দূরবীন পরছে না, তখন গগল্স্ পরে থাকছে। এটা গ্রীষ্মের বিকেল, এবং সারা দিনের প্রচণ্ড উত্তাপে জাহাজ-ডেকে দাঁড়ানো যাচ্ছে না। বোট-ডেক কাঠের। ডেক-জাহাজিরা জল মারছে এখন। জাহাজ বেশ দুপাশে বয়া রেখে এগিয়ে যাচ্ছে। এনজিনে খুব একটা স্টিমের দরকার হচ্ছে না। দুটো বাঙ্কারে দুজন কোলবয় একটু ফাঁক পেয়ে বিড়ি খাচ্ছে। এবং গুহার মতো কিছু সাইড বাঙ্কার থেকে সোজা স্টোক-হোলডে নেমে গেছে। অথবা সুট বলা যেতে পারে। কয়লা হড়হড় করে নেমে গেলে আবার সুট ভরে ফেলতে হবে। ক্রস-বাঙ্কার খোলা আছে। বাংকারে কয়লা ছাদ পর্যন্ত বোঝাই। দরজা খুলে বেলচা মেরে দিলেই হড়হড় করে নেমে আসে। তিনজন ফায়ারম্যান উইণ্ডসেলের নিচে দাঁড়িয়ে স্টিম দেখছে। খুব একটা স্টিম লাগছে না। একশো আশি হলেই হয়ে যাচ্ছে। অল্প কয়লা খাচ্ছে। এখনও স্টোক-হোলড তেমন তেতে যাচ্ছে না। বালকেডগুলো হাত দিয়ে ছোঁয়া যাচ্ছে। আসলে কাজ আরম্ভ এখনও ঠিকমতো হয়নি। মৈত্রের ওয়াচ। সে মাঝে মাঝে হেঁটে যাচ্ছে। ওর নীল রঙের টুপি, হাতে দস্তানা, পায়ে পুরানো বুট জুতো। সে মাঝে মাঝে ফার্নেস-ডোর খুলে দেখছে, কোনটায় কয়লা মেরে দিতে হবে, কোনটায় র‍্যাগ মেরে ছাই ফেলে দিতে হবে, অথবা কোনটাতে স্লাইস মেরে কয়লার চাঙ টুকরো টুকরো করে দিতে হবে। সে নিজেই দেখে যায়। কখনও এয়ার বালব ছেড়ে দেয়। মাঝে মাঝে এনজিনরুম থেকে গ্রীজার ছুটে আসে। মেজ-মিস্ত্রি ছুটে আসেন। কম, কম স্টিম মাংতা। আসলে জাহাজটা যাচ্ছে ভীষণ ধীরে ধীরে। কলকাতা বন্দরকে ভারি অবিশ্বাস সকলের।

    তখন ছোটবাবু দেখল বেশ নিরিবিলি একজন মানুষ বোট-ডেকে ডেক-চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে। পাশে মেস-রুম-বয় কফি রেখে গেছে। একটা ছোট টিপয়ে দুটো বই। বইয়ের ওপর আপেল একটা। ছোটবাবু তখন স্নান সেরে ডেক ধরে উঠে যাচ্ছে। অমিয় এবং মৈত্রের ওয়াচ আছে। ওরা চারটার ওয়াচ শেষ করে উঠে এসেছে। ওদের স্নান সারতে সময় লাগবে। এসময় বাথরুমে ভীষণ ভিড়। সে একটু পায়চারি করবে বলে ডেক ধরে যাচ্ছে। আসলে ওর ফোকসালে বসে থাকতে ভাল লাগছে না। কত কথা মনে হচ্ছে। এখনও সে এ-দেশের গাছপালা, বাড়িঘর, কলের চিমনি এবং জেলেডিঙ্গি অথবা জাহাজ ঢুকছে খাড়িতে এসব দেখতে পাচ্ছে। এখনও সে দেখতে পাচ্ছে দূ’পাশে কি সুন্দর নারকেল গাছ, মানুষের ছায়া। ঘুরে ফিরে মা, ছোট ভাইবোন, বাবার মুখ নদীর জলে ভেসে উঠছে।

    মেজ-মালোমের পাশ কাটিয়ে সে নেমে যাচ্ছিল। আসলে সে চুরি করে মেজ-মালোমের দূরবীনটা দেখতে চাইছে। ওর ভারি সখ দূরবীন দিয়ে দু’পাশের গাছপালা পাখি দেখে। কিন্তু সে তো সবচেয়ে ছোট কাজ করে। সে যদিও জাহাজিদের ভিতর সবচেয়ে পড়াশোনায়ালা আদমি, এটা জাহাজে সারেঙই প্রচার করে দিয়েছে। সবাই খতটত লেখাবার জন্য আসবে সেটাও ঠিক। এবং সুন্দর ইংরেজি বলতে পারে বলে ফাইবারও বেশ পছন্দ করে ওকে কাজের সময়। চার নম্বর মিস্ত্রি দেখেছে; ছেলেটিকে কোনো কাজ একবার বললেই বুঝে নেয়। বার বার প্রশ্ন করে বিরক্ত করে না।

    মেজ-মালোমের মনে হচ্ছিল, এই যে ছেলেটি যাচ্ছে জাহাজে, যার চোখ ভারি আশ্চর্য মিষ্টি, মুখে গোঁফের রেখা, গালে দাড়ি মাত্র কালো হয়ে উঠেছে এবং প্রায় যেন লম্বা গাছের মতো শান্ত নিরীহ, কিছু বলতে চায় না, জাহাজে উঠেই চুপ মেরে গেছে তাকে একবার ডেকে বললে হয়, তুমি বাবু জাহাজে উঠেই গুম মেরে গেলে কেন? তারপরই মেজ-মালোম ডাকল, হেই।

    সে কাছে গিয়ে খুব সুন্দর এবং স্পষ্ট ইংরেজিতে বলল, আমাকে ডাকছেন স্যার?

    —হেঁ।

    সে ছুটে গিয়ে আরও সামনে দাঁড়াল।

    —এসব জায়গার কি নাম?

    —ফলতা হবে। তবে আমি স্যার ঠিক বলতে পারব না।

    —তোমার দেশ, তুমি জান না?

    —এখানে তো কখনও আসিনি স্যার।

    —কিচ্ছু নেই।

    —ছোটবাবু বলল, না স্যার, গাছ-পালা, বাড়ি-ঘর, গ্রাম, মাঠ সব আছে।

    —না, কিচ্ছু নেই।

    —না স্যার, সব আছে।

    —কিছু নেই। তুমি দ্যাখো, কিছু দেখা যায় কিনা, বলেই তিনি কফি খেতে থাকলেন।

    ছোটবাবু তাড়াতাড়ি দূরবীনটা চোখে লাগালে দেখতে পেল, বেশ সব বড় বড় কলের চিমনি। কি যে বড়! আকাশে উঠে গেছে যেন একটা নারকেল গাছ। তারপর একটা বাঁধানো ঘাট, মানুষজন নেই, চিতায় আগুন-টাগুন আছে। সে দেখছে আর বলে যাচ্ছে। সব আছে স্যার। মানুষের যা যা দরকার সব আছে স্যার।

    —আসল জিনিষটা নেই। তিনি আপেল খাচ্ছেন কামড়ে। তার গালে সামান্য দাঁড়ি মুখে প্রবীণতার ছাপ। চোখ দুটো খুব তাজা। বেশ খচমচ করে খেয়ে যাচ্ছেন। ভালো করে দ্যাখো। আমার দেখতে দেখতে চোখ টাটাচ্ছে।

    ছোটবাবু দেখছিল সব। সে বলতে বলতে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। কেমন ছায়াছবির মতো সব সরে যাচ্ছে।

    মেজ-মালোম বললেন, সব বললে হে, কিন্তু একটা কথা বললে না।

    —কি স্যার?

    —ওম্যান! ওম্যানের কথা বললে না।

    —তা স্যার দেখলাম নাতো।

    —তাহলে তুমি বলছ মানুষের জন্য যা দরকার সব আছে?

    —না স্যার ঠিক বলিনি। ছোটবাবু কি যে ফ্যাসাদে পড়ে গেল। সে মুখ খুব কাঁচুমাচু করে রেখেছে।

    —মানুষের জন্য যা যা দরকার সব আছে শুধু আসল জিনিসটাই নেই জাহাজে। বুঝবে ঠ্যালা। সমুদ্রযাত্রা কাকে বলে বুঝবে। বলেই সে থু করে আপেলের বোঁটাটা মুখ থেকে ফেলে দিল।—এজন্য বসে থাকি। বসে থাকি আর ভাবি, বেশ দিনকাল কেটে গেল। জীবনের সবটাই জাহাজে কেটে গেল। আসল জিনিসটাই মাঝে মাঝে কেমন জীবন থেকে হারিয়ে যায়। খুঁজি। খুঁজে যখন পাই তখন বন্দর থেকে জাহাজ ছেড়ে দেয়।

    ছোটবাবুর ভারি মজা লাগছিল। বেশ মানুষটা। সে পরে আছে সাদা প্যান্ট গা-খালি। গায়ের রং শঙ্খের মতো সাদা অথবা মানুষের চামড়া তুলে নিলে যে রং হয়—তেমনি সাদা লালে মিলে এক আশ্চর্য কঠিন রং এবং গরমে পুড়ে কেমন ফোস্কা পড়ার মতো। পিঠের ওপরে ঠিক কাঁধের নিচে ঘা। কিছু মলম-টলম মাখানো।

    এটা হয়। যারা শীতের দেশের মানুষ, তাদের এই গরমে রোদে ঘোরাঘুরি করলে ফোসকা পড়ে যায়। মানুষটার কোন কষ্ট হচ্ছে বোঝাই যায় না। বেশ শুনে যাচ্ছে। তারপর? —জাহাজ যাচ্ছে। জল কেটে জাহাজ যাচ্ছে। আর বাতাস কেটে ছায়াছবির মতো সব পার হয়ে যখন ছোটবাবু দেখল সূর্য অস্ত যাবার মুখে তখন মেজ ওঠে বললে, নসিব খারাপ। সে দুটো একটা যে বাংলা জানে ছোটবাবুকে এমন বলে যেন সমঝে দিতে চাইল।—নো ওম্যান। ঠোঁট উল্টে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে তড়তড় করে নেমে গেল। যেন চোখের ওপর থেকে ভোজবাজির মতো অদৃশ্য হয়ে গেল মানুষটা।

    সে একা দাঁড়িয়ে থাকল। উইংসে মাস্তুলে ডেরিকে, কেবিনে কেবিনে সব আলো জ্বলছে, লাল নীল রঙের আলো। ছোটখাটো একটা যেন শহর নিয়ে ছোটবাবু নদী ধরে সমুদ্রে নেমে যাচ্ছে। এনজিনের একটানা শব্দ উঠে আসছিল। সমস্ত আকাশ জুড়ে নক্ষত্রের যে নামটাম মুখস্থ করে রেখেছিল সে সব মনে করার চেষ্টা করল। কবে একবার একটা বিদেশী ছবিতে কোনও ধর্মীয় সঙ্গীতের সময় সে শুনেছিল এক আশ্চর্য সিমফনি। নির্জনতা, একাকীত্ব সে সিমফনির সুরে সুরে ভরা। তারপর মনে হল, এইসব নক্ষত্র দেখতে দেখতে মনে হল, সে ভীষণ একা। ভীষণ সে অসহায়। সে কোথায় যাচ্ছে জানে না, কোথায় এর শেষ জানে না, কবে ঘরে ফিরবে জানে না। এমন নিরুদ্দেশে যাত্রা মানুষের হয় তার জানা নেই। কে যেন বলেছিল এ-বংশের একজন না একজন নিরুদ্দেশে যাত্রা করে থাকে। তারা কেউ আর ফিরে আসে না। তুমি আমার জেনারেশনে সেই মানুষ ছোটবাবু। তুমি বোধহয় ফিরে আসছ না।

    মনে হল তখন কেউ পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে দেখল, মৈত্রদা।—কিরে মন খারাপ! দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিস বলে মন খারাপ। মৈত্রদা না এলে সে সত্যি ভীষণ যেন এখন ভয় পেয়ে যেত।

    ছোটবাবু ঘুরে দাঁড়াল।

    —তোর এরকম হবার কথা না তো। মন খারাপ হবে আমাদের। বিয়ে করেছি। বৌ থাকল ঘরে। আমি ভেসে গেলাম সমুদ্রে। কিছু একটা হলেও কিছু করার থাকবে না। ছুটে আসতে পারব না। কত সব চিন্তা। ভাবলে ঘুম আসে না।—আয়, একা একা থাকবি না। জাহাজে একা একা থাকা খুব খারাপ। গল্পটল্প করে সব ভুলে থাকবি।

    —এখানে আমি আছি কে বলল তোমাকে?

    —আমরা জানি কে কোথায় থাকতে পারে। বলে হাসল। তুমি যে বোট-ডেকে থাকবে আমরা জানতাম। তোমার খুব যে ইচ্ছা কাপ্তানের ছেলেটার সঙ্গে বন্ধুত্ব হোক সেটা আমরা বুঝি!

    —না মৈত্রদা। সত্যি তা না। এখান থেকে চারপাশটা স্পষ্ট দেখা যায়। এখানে মানুষজন কম থাকে, এখানে মেজ-মালোম দূরবীন নিয়ে বসেছিলেন। আমার ভারি সখ ছিল দূরবীনে পাড়ের গাছপালা দেখি।

    —বেশ করেছ। এখন এস। লক্ষ্মী ছেলেটির মতো খেয়ে নাও। কাল সকালে সমুদ্রে পড়ব। তখন আর ঠিকমতো খেতে পারবে না। জাহাজে পিচিঙ আরম্ভ হয়ে যাবে।

    মৈত্র এভাবে কখনও ছোটকে তুই তুকারি করে কখনও তোমার বলে। এভাবে সে-রাতে ছোটবাবু বেশ পেট ভরে খেল। মনে হল জাহাজে খুব একটা পরিশ্রমের কাজ থাকে না। যা শুনেছে তা, এমন কি ভীতিকর সে বুঝছে না। যদিও সমুদ্রে জাহাজ পড়বে কাল সকালে। তিন জোয়ারে জাহাজ সমুদ্রে গিয়ে পড়বে। ফলতার কাছে ওদের একবার নোঙর ফেলতে হয়েছে, রাতে এক জায়গায়, সকালে সমুদ্র দেখতে কেমন না জানি হবে।

    ভোরের দিকে ঘুম ভাঙলে মনে হল জাহাজটা একেবারে থেমে গেছে। বোধহয় নোঙর ফেলেছে। ছোটবাবু ওপরে উঠে এল। বা বেশ। সে চিনতেই পারছে না। পাইলট নেমে যাচ্ছে জাহাজ থেকে। ওপরে অজস্র পাখি। বড় বড় পাখি। যেন কি করে টের পেয়েছে একটা পুরানো জাহাজ যাচ্ছে সমুদ্রে। টের পেয়েছে, প্রচুর খাবার এই জাহাজে। ওরা মাস্তুলের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে বসে রয়েছে। আর সেই দিগন্ত বিস্তৃত নীল জলরাশি। ছোটবাবু ভাবল জলরাশি না বললে এর ঠিক ওজন থাকে না। অসীম জলরাশি। পারাপারহীন জলরাশি। আকাশ এবং সমুদ্র মিলে এক নীল ভূখণ্ড যেন। এভাবে একটা সাদা জাহাজ নীল জলরাশির ভিতর নীল আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকলে আশ্চর্য, ছবি হয়ে যায়। আর পাখিগুলো সাদা বিন্দু বিন্দু প্রজাপতির মতো অনবরত সেই ছবির ভেতর উড়ে বেড়াচ্ছে। ছোটবাবু এমন একটা নিথর জগৎ আছে, এমন একটা ধীর স্থির সমুদ্র আছে, জানত না। পাইলট সিপটাই ছিল ডাঙ্গার শেষ সূত্র। সেও ক্রমে দূরে দূরে সরে একসময় সমুদ্রের ঢেউয়ের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল।

    ছোটবাবু ডেকের ওপরে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না আর। জাহাজ এগিয়ে যাচ্ছে। দ্রুতগতিতে জাহাজ এগিয়ে যাচ্ছে। জাহাজ হেলছে দুলছে। মাস্তুল, ডেরিক, দড়িদড়া হেলছে দুলছে। এভাবে দাঁড়ালে বেশিক্ষণ সে ডেকে দাঁড়াতে পারবে না। সে দু’পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে ছিল, তারপর সামনে পেছনে বেশ ঝুঁকে ঝুঁকে তাল রেখে হেঁটে গেল। টুইন-ডেক পার হয়ে দ্রুত ছুটে গেল সামনে। জাহাজের আগিলে সে উঠে দাঁড়াল। শেষবারের মতো বোধহয় পাইলট সিপটাকে সে দেখতে চায়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। সে ফিরে আসছে। জাহাজের পিচিঙ আরম্ভ হয়ে গেল বলে মাথা পেট গোলাচ্ছে। অথচ তার কাজ ফাইবারের সঙ্গে। তাকে এ-জাহাজে এভাবে এ-সফরে কাজ করে যেতে হবে। সে আর থামতে পারে না। ফিরে যেতে পারে না।

    সে ফিরে আসার মুখেই দেখল জ্যাক মাংস কেটে পাখিদের খাওয়াচ্ছে। জ্যাক লম্বা বয়লার স্যুট পরেছে। পায়ে কেডস জুতো। ছোটবাবু সন্তর্পণে পালাচ্ছে। পালাবার সময়ই মনে হল কেউ সহসা ডাকছে—হেই। সে পড়ে যেতে যেতে কোনরকমে উঠে দাঁড়াল। দেখল, আড়চোখে তাকে দেখছে জ্যাক। সে এবার প্রায় ছুটে পালাল। জাহাজে পিচিঙ, এভাবে ছুটলে সে পড়ে যেতে পারে তার তাও মনে থাকল না।

  • তিন

    তিন

    ।। তিন।।

    বারোটা-চারটার ওয়াচ শেষে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠে এল মৈত্র। জাহাজের পিচিঙ ক্রমে বাড়ছে। সমুদ্রে বেশ বাতাস আছে। তবু আকাশ পরিষ্কার থাকলে তেমন ভয় থাকে না। ভয় অমিয় এবং ছোটবাবুকে নিয়ে। এরা দুজনই নতুন। এদের দুজনেরই প্রথম সফর। ছোটবাবু হয়ত পিচিঙ কোন রকমে সামলাবে। কারণ তাকে বাঙ্কারে কাজ করতে হচ্ছে না। কিন্তু অমিয় এ-ওয়াচেই যা দেখাল। সুট খালি পড়ে আছে। বাংকারে সে দাঁড়াতে পারছে না। র‍্যাগ দিয়ে আগুন ফার্নেস থেকে টেনে নামানোর সময় অমিয় জল জল করছিল। একসঙ্গে তিনজন ফায়ারম্যানের আগুন টানার ভিতর বেচারা নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিতে পারছিল না। ছাই উড়ছে। আগুনের গনগনে উত্তাপ, আর আগুনের ওপর জল ঢেলে দিলে প্রচণ্ড গ্যাস। সে গ্যাসের ভিতর নতুন জাহাজির সাধ্য কি দাঁড়ায়। তার ওপর ইণ্ডিয়ান কোল। একেবারে অসার।

    ওপরে এসেই মৈত্র টের পেল অমিয়র কাজ শেষ হয়নি। অমিয়র স্বভাব আগে উঠে ফানেলের গোড়ায় বসে থাকা। কিন্তু সে নেই। আকাশ বেশ মেঘলা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। এ-সব লক্ষণ ভাল না। ঝড় অথবা সাইক্লোনের লক্ষণ। এমনিতেই রক্ষা নেই, ঝড়ের ভিতর যে অমিয়টা কি করবে! পাশের বাংকারের কোলবয়, বয়সী মানুষ। তার এই নিয়ে এগারো-সফর। সে সব কায়দা-কানুন জানে। সে জানে ওয়াচের পরও কাজ করতে হবে। অন্ততঃ এক ঘণ্টা এক নাগাড়ে ওয়াচের পর কাজ না করলে সুট ভরতে পারবে না। অথবা সে এমন ভাবে এক নাগাড়ে কাজ করে যায়, কোন তাড়াহুড়ো নেই আবার আস্তেও নয়, সে বেশ সোজা সরলভাবে কাজটাকে নিয়ে ফেলেছে। বয়স হলেও মানুষটা কয়লা টানার কষ্ট গ্রাহ্যের ভেতর আনে না। সফরের অভিজ্ঞতায় সে সি-সিকনেস হজম করে ফেলেছে।

    মৈত্র, বড়-টিণ্ডাল বলে ওয়াচের দায়-দায়িত্ব তার। স্টিম ঠিক রাখার দায়-দায়িত্ব থেকে সব কিছু। সুট ভর্তি না পেলে পরের ওয়াচের ছোট-টিণ্ডাল অমিয়কে বেগার খাটিয়ে মারবে। ছোট-টিণ্ডালের দলটা নিচে নেমে গেছে। নেমে এখন আগুন টানছে ফার্নেস থেকে। ফার্ণেসের ছাই ঝেড়ে ভেতরে কয়লা হাকড়াবে। এর ভেতর অমিয় সুট ভরে না দিতে পারলে রক্ষে নেই। মৈত্র তাড়াতাড়ি ফের নেমে গেল। ভেতরে একটা লম্ফ জ্বলছে। লম্ফটা আবছা মতো দেখা যাচ্ছে। কয়লার গুঁড়ো উড়ে চার পাশটা ভীষণ অন্ধকার। প্রথমে ঢুকে সে কিছু দেখতে পেল না। তারপর চোখ সয়ে এলে দেখল, কয়লা সুট থেকে বেশি দূরেও না। সুটে কয়লা এনে ফেলছে অমিয় আর মনে হচ্ছে সব কয়লা গড়গড় করে নিচে নেমে যাচ্ছে। সে আপন মনে দুটো একটা খিস্তি করছে। দুটো-একটা অশালিন চিৎকার এবং চোখ লাল, ঘামে ওর জামা-প্যান্ট জবজবে। টুপি ভিজে গেছে। চোখ আগুনের মতো লাল। সে টলছে। ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না। বোধ হয় দু-একবার হড়-হড় করে জল খেয়ে বমিও করেছে।

    মৈত্র তাড়াতাড়ি নিজেই গাড়িটা টেনে পর পর ক’গাড়ি খুব দ্রুত কয়লা ভরে ফেলে দিল। অমিয়কে বলল, তুই বোস। এভাবে সুট ভরে না। এতক্ষণ কি করছিলি!

    ইচ্ছা হল অমিয়র, বেলচে দিয়ে ঠাস করে মৈত্রের মাথায় একটা বাড়ি মারে। সে এতক্ষণ বসেছিল বুঝি মৈত্র মনে করছে। সে বলল, টিণ্ডাল, তোমাকে কে আসতে বলেছে! যাও শালা। ভাগো। আর্মার কাজ আমি যেভাবে পারি করব। কাউকে ডাকি নি তো। শালা নবাবী দেখাতে এয়েছে।

    এসব কাজে মাথা গরম হয়। মৈত্র অনেক সফরে এমন সব দেখেছে। সেজন্য সে কিছু বলল না। কেবল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কয়লা ভরে যেতে থাকল। বলল, হাত লাগা আমার সঙ্গে। দাঁড়িয়ে থাকিস না।

    এবং এক সময় সুট ভরে গেলে ওরা ওপরে উঠে দেখল, বৃষ্টিতে ডেক ভিজে গেছে। ছোটবাবু কি করছে কে জানে! সে দুদিন থেকে দেওয়ানিতে ভুগছে। কিছু খেতে পারছে না। সব ওক দিয়ে ফেলে দিচ্ছে। এখন তো আরও বেশি হবার কথা। ছোটবাবু পিচিঙের জন্য ভাল করে রাতে ঘুমোতে পারছে না। হয়ত গিয়ে দেখবে, সে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে বাংকে। চোখে ঘুম নেই। তবু চোখ বুজে আছে। এভাবে নতুন জাহাজিদের হ্যাপা সামলাতে সামলাতে ওর সফর শেষ হয়ে যায়। কোম্পানিগুলো এসব অজুহাত দেখিয়ে, নানাভাবে এই সব নতুন জাহাজিদের নিতে চায় না। মৈত্র বোঝে এতে তার দেশের সুনাম নষ্ট। কোম্পানিগুলি এভাবে দুর্নাম ছড়িয়ে ক্রমে এ-বন্দর থেকে ক্রু নেওয়া কমিয়ে দিচ্ছে। ওরা বেশী করে এখন চালনা অথবা চাটগাঁ থেকে ক্রু তুলে নিচ্ছে। এ- সব কারণে সে অমিয়র হ্যাপা সামলাচ্ছে এখন। এবং এভাবে কিছুদিন চালিয়ে যেতে পারলেই অমিয় ঠিকঠাক একদিন সব নিজেই চালিয়ে নিতে পারবে।

    চারপাশটা অন্ধকার। সমুদ্রে কোনো রঙ ফুটে উঠছে না। সকাল হতে এখনও অনেক দেরি। অবশ্য সে এ-সময়টা জামা কাপড় ছেড়ে হাত পা ধুয়ে শুয়ে পড়ে না। সে নিজেই চা করে নেয়। অমি ও ছোটবাবুকে দেয়। তারপর সকাল হলে যখন ডেক জাহাজিরা কাজে বের হয়ে যায় তখন সে গড়িয়ে নেয়! ছোটবাবু চা খেয়েই যা সামান্য কিছু আরাম পায়।

    নুন জল মাঝে মাঝে মৈত্র খেতে দিচ্ছে ছোটবাবুকে। এতে দেওয়ানি কমে শরীরের। মাথা তেমন ঘোরে না। সব স্বাভাবিক হয়ে আসে। সে ডেক ধরে হাঁটতে হাঁটতে বুঝতে পারল, দেওয়ানি তাকেও বেশ কাহিল করেছে। প্রথম প্রথম সবাই কিছু-না-কিছু কাহিল হয়ে যায়। কিন্তু ছোটবাবুর দিকে তাকানো যাচ্ছে না। দু-তিন দিনেই চোখ কোথায় ঢুকে গেছে। সুন্দর সুশ্রী মুখ চুপসে গেছে। আর মনে হয় কি যেন একটা ভয় সবসময় ছোটবাবুর। ছোটবাবু কিছু বলছেও না। ঝড়ের সময়ই সব চেয়ে বেশি আশঙ্কা। মৈত্র কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।

    মাঝে মাঝে মৈত্র ভীষণ রেগে যায়। কেন আসা জাহাজে! কে দিব্যি দিয়েছে। তারপরই মনে হয় কেউ দিব্যি দেয় না। কিনারায় কাজের কোন সুরাহা না হলে এই সব বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা জাহাজে চলে আসে। সবারই ভেতর একটা ইতিহাস থাকে। দুঃখের ইতিহাস। কেউ সখ করে জাহাজে মরতে আসে না। তখন তার ভীষণ মায়া হয় সবার জন্য।

    সে গ্যালি পার হয়ে সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে গেল। খুব আস্তে আস্তে নামতে হয়। কেউ যেন পায়ের শব্দে জেগে না যায়। সারা সময় স্টিয়ারিং এনজিনের একটানা ক্যাচ ক্যাচ শব্দ। প্রথম প্রথম এ-জন্যও ছোটবাবুর ঘুম আসত না। সম্পূর্ণ একটা আলাদা জীবনে এই ছোটবাবু কেমন হয়ে গেছে।

    অমিয় কোন রকমে জামা-কাপড় ছেড়ে বাংকে গা এলিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু মৈত্র কিছুতেই ওকে বাংকে বসতে দিল না। একজন স্বাভাবিক জাহাজির মতো অমিয় থাকুক সে চায়। সে বলল, এই ওঠো। স্নান না করে এলে তোমাকে শুতে দেওয়া হবে না। এমন কিছু হয় নি, স্নান না সেরে তুমি বাংকে শুয়ে পড়বে। যাও। ওঠো। সে এই সব কথাগুলো খুবই আস্তে আস্তে বলছিল। যদি ছোটবাবুর চোখে সামান্য ঘুম লেগে থাকে। সে এমনকি আলো জ্বালল না। পোর্ট-হোলের কাঁচটা কে বন্ধ করে রেখেছিল। গুমোট ভাব। পাইপ থেকে ঠিকমতো হাওয়া বের হচ্ছে না। মৈত্র ছোটবাবুর পাইপের মুখ ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে দিল। বেশী হাওয়া লাগলে ছোটবাবুর ঘুম ভাল হবে। কিন্তু কি আশ্চর্য ছোটবাবু চোখ বুজেই বলছে, মৈত্রদা, আমি যে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছি না। মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছি।

    মৈত্র কেমন ক্ষেপে গেল, না দাঁড়াতে পারলে আমি কি করব!

    —আমাকে বাথরুমে যেতে হবে। কতবার চেষ্টা করেছি। তুমি একটু ধরবে?

    মৈত্র হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, ওঠ, ওঠ। কে বলছে দাঁড়াতে পারছিস না। যত সব বাজে কথা।

    —না, সত্যি মৈত্রদা দাঁড়াতে পারছি না। সকাল হয়ে যাচ্ছে ভয়ে আর ঘুম আসছে না। সারেঙের টান্‌টু শব্দ কেবল শুনতে পাচ্ছি।

    —ওঠ ওঠ বলছি। সে ঠেলে তুলে দিল। সে প্রায় যেন লাথি মারার মতো ঘাড় ঠেলে বের করে দিল ছোটবাবুকে।

    —যা যা বলছি। পেচ্ছাপ করে আয়।

    শরীর টলছে বলে সে একটু গিয়েই বালকেড ধরে দাঁড়িয়ে থাকল

    এবার মৈত্র খিস্তি করে বলল, কেন যে মরতে আসা। কেউ নেই তোমার জাহাজে। যাও ছোটবাবু। না গেলে সমুদ্রে হারিয়া করে দেব। তবু সুনাম নষ্ট হতে দেব না আমাদের।

    অমিয় ভয়ে ভয়ে আগেই উঠে গেছে। সে স্নান করেছে। স্নান করায় শরীরটা ভীষণ হাল্কা লাগছে। সে এখন আর ক্লান্তি বোধ করছে না। ছোটবাবুর জন্য মৈত্র এখনও চেঁচাচ্ছে। এবং সবাই জেগে গেছে। সবাই ফোকসাল ছেড়ে চলে এসেছে। সারেঙ বলছে, মৈত্রমশায়, আপনি ওর পেছনে কেন লেগেছেন?

    —কি বলছে শুনুন। এই যা বলছি। পেট খালি করে আয়। চা করে দিচ্ছি। তারপর ঘুমোবার চেষ্টা কর।

    সবাই যে যার ফোকসালে চলে গেল। নতুন জাহাজিদের নিয়ে এমন সব কত ঘটনা এই জাহাজের ইতিহাসে ছড়িয়ে আছে। রেড-সিতে একবার একজন নতুন জাহাজি স্টোকহোলডের গরম সহ্য করতে না পেরে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। অথবা একবার এক জাহাজির সি-সিকনেস এমন হল, সে স্কাই-হোলের ভেতর দিয়ে এনজিনে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। কেউ কেউ তো পাগল হয়ে যায়। এ-সব ব্যাপারে কারো কিছু বলার থাকে না।

    সারেঙ শুধু বললেন, ছেলে সাহস করে এয়েছিস যখন, সাহস করে একবার উঠে যা। দ্যাখ না কি হয়।

    এ-সবে ছোটবাবু ভীষণ লজ্জিত এবং অপমানিত। সে মুখ তুলে তাকাতে পারছে না পর্যন্ত। জাহাজে যখন সবাই নির্বিঘ্নে ঘুমোচ্ছে, খাচ্ছে দাচ্ছে, সে মনে মনে বলল, ‘মাগো আমি ঠিক পারব। দ্যাখো পারব। ওরা আমাকে সময় দিচ্ছে না। সে আর দাঁড়াল না। সে উঠতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। মৈত্র ধরতে গেলে বলল, ধরবে না মৈত্রদা। আমি দেখছি পারি কিনা। ভদ্রা জাহাজের সেকেণ্ড অফিসার, চ্যাটার্জির শেষদিনের বক্তৃতার সময়ের মুখ ভেসে উঠল চোখে। তিনি যেন বলছেন, আমার জাহাজি বন্ধুরা, আজ তোমাদের যাবার দিন। জাতীয় সঙ্গীত গাইবার পরই বিউগিল বেজে উঠেছিল। ডাইনিং হলে সব মাসতার দিলে তিনি বক্তৃতার মতো করে বলে যাচ্ছিলেন। বলতে বলতে ওঁর গলা ধরে এসেছিল। তিনি বলেছিলেন, জাহাজি বন্ধুরা, আমি তোমাদের নানাভাবে টরচার করেছি। তোমাদের সহ্যসীমা কতদূর দেখেছি। আমার বিশ্বাস তোমরা পারবে। এর চেয়েও অনেক অনেক কষ্ট তোমাদের জন্য জাহাজে অপেক্ষা করছে। হলিস্টোনে তোমাদের হাতের রক্তপাত আমাকেও ভীষণ ভাবে টরচার করত। সিনিয়ার রেটিঙসদের র‍্যাগিংয়ের কথাও তোমাদের মনে থাকবে। সবই জাহাজে একজন ভালো জাহাজি হবার জন্য! আমার বিশ্বাস যাবার দিনে নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করতে পারবে। এখন না পারলেও জাহাজে গেলে ঠিক পারবে। আমার তখন দুঃখ থাকবে না।

    আরও অনেক কথা। সব মনে পড়ছে না। এখন সব মনে পড়ার কথাও নয়। তবু সব কথার ভেতর এমনই বুঝি যন্ত্রণা ছিল তাঁর। ছোটবাবু সিঁড়ির রেলিং ধরে কোনরকমে এবার উঠে দাঁড়াল। সহজভাবে দাঁড়াতে চাইল। মাথা ঘুরছে। কিছু দেখতে পাচ্ছে না। তবু অন্ধের মতো ওপরে উঠে প্যান্ট খুলে সামনেই পেচ্ছাপ করে দিল। নেমে যাবার ক্ষমতা ক্রমে এভাবে হারিয়ে ফেললে কি যে হবে! অহঙ্কার শরীরে ফুলে ফুলে উঠছে। সে বলল, স্যার আপনি এত বড় জানতাম না। আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার। আমি যে কিছুতেই পারছি না। আমাকে তো সবাই নানাভাবে সাহায্য করে যাচ্ছে। আমাকে এখনও বাংকারে পাঠায় নি। জানি না পাঠালে আমার কি হবে!

    সে প্রায় চোখ বুজেই হাত ধরে ধরে নেমে এল। সমুদ্র থেকে প্রচণ্ড বাতাস উঠে আসছে। সমুদ্রে ঢেউ প্রবল। ঢেউ-এর জলকণা শরীরে এসে লাগছে। সে বুঝতে পারল, এখন মে-জুনের সময়। এখন এ-সমুদ্রে ঝড়-ঝন্‌ঝা লেগে থাকারই কথা। এ ক’দিন ঝড়-বৃষ্টি হয় নি সে কপাল ভাল বলে। নিচে নেমে গেলে মৈত্র সোজা দাঁড় করিয়ে রাখল ওকে কিছুক্ষণ। এখন শোবি না। আর যখন ঘুম আসবে না বসে থাক। চা করে আনছি।

    ছোটবাবু বলল, এত সকালে কিছু খাব না। খেলে আবার ফোকসাল পরিষ্কার করতে হবে।

    —সে দেখা যাবে। আমি না পারি টোপাস করে যাবে। টোপাস আছে কি করতে!

    —বেশ ভাল বলছ। বমি করে ভাসাই, আর ওরা ঐ কেবল করুক!

    —বাছা তোমার গলা থেকে তো এখনও রক্ত উগলে ওঠেনি। এতেই টোপাসের জন্য তোমার এত ভাবনা।

    ছোটবাবুর কাছে এর চেয়ে কষ্টের কি আছে জানা নেই। তবু সে চায় না এ-সব কথা আবার দু কান হোক। সে বলল, মৈত্রদা তুমি চেঁচামেচি না করলেই পারতে। বাড়িয়ালা শুনলে কি বলবে! কি ভাববে!

    —কিছু ভাববে না। জাহাজে সবারই প্রথম প্রথম এমন হয়। আমারও হয়েছে। সারেঙেরও হয়েছে। তবে ভেঙ্গে পড়বি না। মনে জোর রাখ। কাজ করতে এয়েছিস। বসে থাকতে তো আসিস নি। এখন না হয় মোটর ভেসেল, অয়েল এনজিন এসব হয়েছে, আগে তো এ-সব ছিল না। তোর মতো মানুষেরাই কোম্পানীর আমলে জাহাজ চালিয়ে নিয়ে গেছে। জাহাজ সমুদ্রে থেমে থাকে নি। সে লকার থেকে চা, চিনি কনডেন্সড মিল্কের টিন বের করে তরতর করে ওপরে উঠে গেল। জলটা গ্যালিতে বসিয়ে স্নান করে নেবে বাথরুমে। জল গরম হতে হতে ওর স্নান হয়ে যাবে। নানাভাবে অমিয় এবং মৈত্রদা ওকে সাহস দিয়ে যাচ্ছে। শেষের কথাগুলো মৈত্রদার ভারী মজার। যেন এতক্ষণ যে চেঁচামেচি করেছে তার জন্য লজ্জিত। এখন কি করে যে এদের একটু তোয়াজ করবে ভেবে পাচ্ছে না। ছোটবাবু মনে মনে হাসছিল।

    আসলে জাহাজে এভাবেই আত্মীয়তা গড়ে ওঠে। এভাবেই আবার বিদ্রোহ গড়ে ওঠে। এভাবেই জাহাজিরা কখনও কখনও আবার প্রতিপক্ষ হয়ে যায় যেমন কাপ্তানের ছেলেটা জাহাজে উঠেই ওর সঙ্গে কেমন শত্রুতা আরম্ভ করে দিয়েছে। সে তো কখনও তাকায় না। কিন্তু কি যে ভয়, সে না তাকিয়ে পারে না। তাকালেই দেখতে পায় বড় বড় চোখে ওকে দেখছে। সে তখন ভেবে পায় না এমন করে তাকাচ্ছে কেন। ভয়ে বুক গলা শুকিয়ে যায়। দুটো চোখ এভাবে ওকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তাকে বুঝি লক্ষ্য রেখে যাচ্ছে। সে ঠিকমতো কাজ করতে পারে কিনা, না সে কাজে ফাঁকি দেয়। সে এ জাহাজে একজন অক্ষম মানুষ এসব খবর পৌঁছে দেওয়া ওর স্বভাব হতে পারে।

    এভাবে সকাল হয়ে যায়। সে চা খেয়ে আজ বমি করে নি। শরীরটা হাল্কা লাগছে। সে আরও কিছুক্ষণ শুয়ে থাকল। পোর্ট-হোলের কাঁচটা বন্ধ ছিল, সেটা আবার খুলে দিয়েছে। পিচিঙ বাড়ছে বলে, জল পোর্ট-হোল দিয়ে মেঝেতে এসে পড়ছে। সে এবার নিজেই উঠে বসল, এবং বালকেডে একটা পা রেখে কাঁচটা বন্ধ করে দিল। ঢেউয়ের ঝাপটায় সব ভিজে যাচ্ছিল।

    সবাই ক্রমে সকাল হলে উঠে পড়ছে। সকালের দিকে সূর্যের লাল আলো এসে ফোকসালে পড়ছে। ওর ইচ্ছা হচ্ছিল, ওপরে উঠে বসে থাকে। কিন্তু, ওপরে বসতে পারবে না। কারণ জাহাজ সামনে পেছনে দুলছে। এখন সোজা হাঁটা যাচ্ছে না। পেছনে সামনে-ঝুঁকে হাঁটতে হচ্ছে। সারেঙ টাটু না বললে সে উঠছে না। যতক্ষণ পারে সে এভাবে শুয়ে থাকবে।

    এবং কাজের সময়ে সে ফাইবারের সঙ্গে কথায় কথায় হাসতে পারল না। অতিকায় সব ঢেউ চারপাশে। আকাশ আবার মেঘলা। বৃষ্টি হচ্ছে না। অথচ কি ভীষণ জোরে হাওয়া দিচ্ছে। মাঝে মাঝে ডেকের ওপর সমুদ্রের জল। উইনচের নীচে ছোটবাবু কাজ করছিল—ওর প্যান্ট-জামা জলের ঝাপটায় ভিজে যাচ্ছে। সারসপাখিগুলো জলের ঝাপটায় কোঁ কোঁ করে উঠছে। এখন আসছে আবার সেই ছেলেটা। ফাইবার বুঝতে পারছিল, ছোটবাবুকে সি-সিকনেসে খুব কাবু করেছে। ওকে আজ সে খাটাচ্ছে না। সে নিজেই কাজ করছে। ছোটবাবু পাশে বসে কেবল নাটবোল্ট, তেল এসব এগিয়ে দিচ্ছে। কখনও কখনও বা দু’পা ছড়িয়ে বসে থাকছে ডেকে। দূরের দিগন্তরেখায় সমুদ্রের অজস্র ঢেউ, ওপরে সমুদ্রপাখিদের বিচরণ, কখনও বা একঘেয়ে নিরিবিলি অশান্ত সমুদ্রের ভেতর থেকে জাহাজে এনজিনের শব্দ—আমি যাচ্ছি, যাচ্ছি, আমি যাচ্ছি, যাচ্ছি। এভাবে একটানা শব্দ করে চলেছে এনজিনটা। আর মাস্তুলে ডেক-জাহাজি ইমরান উঠে গেছে। ফলঞ্চা বাঁধতে সে ওপরে উঠে গেছে। এ ঝড়ের দরিয়ায় মাস্তুলে রঙ হবে ভাবতে ছোটবাবুর কেমন গা গুলিয়ে উঠল।

    এবং তখনই জ্যাক লাফিয়ে লাফিয়ে বোট-ডেক থেকে নেমে আসছে। সে অবলীলায় এ-ঝড়ের সমুদ্রে কেমন লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছে। সে বেশ ঝুঁকে ঝুঁকে হেঁটে যাচ্ছে। শরীরে ব্যালেন্স রেখে হেঁটে যাচ্ছে। কখনও লাফিয়ে ডেক পার হচ্ছে। সে পড়ে যাচ্ছে না। উইনচের ফাঁক দিয়ে ছোটবাবু এমন দেখে অবাক। কাপ্তানের ছেলেটা তো তার চেয়েও কমবয়সী। অথচ কি শক্ত সমর্থ। যখন ঢেউ এসে ডেক ভিজিয়ে দিচ্ছে, তখন এ কি খেলা তার! জল থৈ থৈ করছে ডেকে। সে জল নিয়ে খেলা করছে। সে পরেছে গামবুট। সে সারস পাখিগুলোকে ফল্কার কাঠে তুলে দিচ্ছে। সমুদ্রের জল ততটা এখনও উঠতে পারছে না। সে লম্বা একটা দড়ি দিয়ে কাঠের বাক্সগুলোকে মাস্তুলের সঙ্গে বেঁধে ফেলছে। এবং কাজ করে যাচ্ছে ঠিক একজন পাকা নাবিকের মতো। উইনচের ফাঁক দিয়ে এ-সব দেখতে দেখতে ছোটবাবুর মনে হল, জ্যাক কাউকে এরই ভিতর খুঁজছে। সে সঙ্গে সঙ্গে ও-পাশের ওয়ারপিনড্রামের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। না, আর এখান থেকে ওকে জ্যাক দেখতে পাবে না। তখন পঁচিশ টাকার খালাসী উঠে গেছে মাস্তুলের ডগায়। সে দুলে দুলে সার্কাসে ট্র্যাপিজের খেলা দেখানোর মতো রঙ লাগিয়ে যাচ্ছে।

    এখন ভাণ্ডারিরা ক্রুদের রসদ নিয়ে ফিরছে। চীফ কুক এপ্রন জড়িয়ে দরজার মুখে এসে দাঁড়াল। কার্পেন্টার লম্বা একটা সুতোয় বাঁধা গেজে জাহাজের সাউণ্ডিং নিচ্ছে। মার্কনি সাব রেলিঙে ভর করে সমুদ্র দেখছেন। মেজ-মালোম ব্রীজে দাঁড়িয়ে আছেন। ওর চোখ লাব্বাস লাইনের দিকে। কোয়ার্টার মাস্টার কম্পাসের কাঁটা মিলিয়ে স্টিয়ারিঙ সোজা করে রেখেছে। জাহাজ যতই কাত হোক, হেলতে- দুলতে থাকুক, সে কখনও কাঁটা থেকে নড়বে না। কাপ্তান তখনও ঘুমোচ্ছেন। কারণ দিনের বেলায় জাহাজের তেমন ভয় থাকে না। রাতটাই সব সময় সমুদ্রে নানাভাবে কষ্টদায়ক। কি যে গভীর অন্ধকার। তবু তিনি শৈশব থেকে এভাবে সমুদ্রে বিচরণ করে কি অন্ধকার, কি আলোতে, সমুদ্রের ক্ষমতা কতটুকু ধরে ফেলেছেন। যেন সমুদ্রেরও একটা খেলা আছে—এইসব অতি ছোট ছোট কাগজের নৌকার মতো জাহাজ এই সেদিন ওর বুকে ভেসে এল। এই সেদিন সমুদ্র দেখেছে, ক্রমে এক-দুই, তারপর শয়ে, হাজারে। কি যে তাদের রূপ! কোনটা সাদা, কোনটা কালো, কোনটা নীল রঙের। নানা রংয়ের বাহার। আর যখন সমুদ্রে সূর্য ওঠে, সূর্য অস্ত যায়, অথবা জ্যোৎস্নার কি যে মায়াবিনী এক খেলা। মাঝে মাঝে ঝড়ের ভিতর এই এক খেলায় অথবা নিচে কত সব প্রবালের দ্বীপ, বরফের পাহাড়, চোরা স্রোতে জাহাজ আটকে যেতে পারে—তবু এক খেলা, অসীমে এলে এই খেলার রহস্য ধরা যায়। কেবল লুকোচুরি খেলা। খেলায় কাপ্তান দেখেছেন, প্রায়ই জিতে গেছেন তিনি। কারণ সমুদ্রেরও বুঝি আছে অসীম ভালবাসা। মানুষের এই সব অতিকায় জাহাজ অতি ছোট কাগজের নৌকার মতো ভেসে বেড়ালে সমুদ্রের ছেলেমানুষী হাতগুলো আকাশের দিকে লাফিয়ে ওঠে। পোষা বেড়ালছানার মতো ধরতে চায়। আর জাহাজগুলোও বেশ জল কেটে ঢেউ কেটে ক্রমে সুদূরে চলে যায়। তখন আকাশের নিচে নীল রঙের ছায়ায় আশ্চর্য ছবি। কাপ্তানের ভারি মজা লাগে দেখতে। সমুদ্রের জন্য তখন মমতা তার বাড়ে। তিনি হোমে ফিরে বেশিদিন একা থাকতে পারেন না। সমুদ্র তাঁকে টানে।

    ছোট-টিণ্ডালের আজ ভারি খারাপ অবস্থা। টিণ্ডাল দেখছিল, ঝড়ে পড়ে বয়লারগুলো ভীষণ মারমুখো হয়ে উঠছে। স্টিম কিছুতেই রাখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে তিন নম্বর মিস্ত্রি ছুটে স্টোক হোলডে চলে আসছে। এনজিনের শব্দে কিছু শোনা যায় না বলে, দু’হাত ওপরে তুলে চিৎকার করছে স্টিম স্টিম; আর তখন স্টোক-হোলডে, তিনজন ফায়ারম্যান, দুজন কোলবয়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। ফার্নেস ডোর খুলে অনবরত কয়লা হাকড়াতে হচ্ছে। মুখে আগুনের আভা, দাঁড়ানো যাচ্ছে না। গতকালের চেয়ে পিচিঙ আরও বেড়েছে। সমুদ্রের অবস্থা ক্রমে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। ডেকে হিবিঙলাইন বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কেউ যেন এখন আর বোট-ডেক ধরে উঠে না যায়। দিনের বেলাতে গেলেও রাতের বেলাতে কেউ যেন না যায়। নিচে টানেল-পথ খুলে দেওয়া হয়েছে—সেখান থেকে একটা সোজা সিঁড়ি প্রপেলার স্যাফটের গোড়া দিয়ে ওপরে উঠে গেছে। এনজিন-জাহাজিরা যেন সেখান দিয়ে যাওয়া- আসা করে—সারেঙ এই বলে সবাইকে সাবধান করে দিয়েছেন।

    এখন টিণ্ডালের মুখেও ভীষণ দুশ্চিন্তার ছাপ। প্রত্যেকটা ফার্নেস ডোরে উঁকি দিয়ে দেখছে। এয়ার- বালব সব খুলে দিয়েছে। স্লাইস মেরে ফার্ণেসের ভিতর সব আগুন ঘেঁটে দিচ্ছে। ছাই ঝেড়ে দিচ্ছে। কয়লা ফায়ারম্যানদের অনবরত হাঁকড়াতে বলছে। সে হাত তুলে যাচ্ছে আর বলছে, জলদি জলদি, কয়লা হাঁকড়া। ফার্নেস জ্বালিয়ে দে। সব পুড়িয়ে দে। কসবীর কলজে উপড়ে আন। বলেই সে কখনও মনে ঐশীশক্তি পাবার লোভে, দু’হাত ওপরে তুলে চিৎকার করে ওঠে, আল্লা হু আকবর। অর্থাৎ যারা স্টোক-হোলডে আছে তাদের প্রত্যেকে তখন এই এক ধ্বনি মিলে একসঙ্গে যুস পেয়ে যায়। কেউ তখন ফার্নেস ডোর খুলে কয়লা হাঁকড়াচ্ছে, কেউ তখন ভীষণভাবে আগুনের জ্বলন্ত কঠিন চাঙগুলি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। কেউ তখন শ্বাস ফেলতে না পেরে উইণ্ডসেলের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। শাঁ-শাঁ করে জল নেমে আসছে ফানেলের গোড়া দিয়ে।

    এভাবে টিণ্ডাল বুঝতে পারে দরিয়া ক্ষেপে গেছে। দরিয়া ক্ষেপে গেলে মজা পায় বয়লারগুলো। ওদের তখন ভেতরে ভেতরে ফেলা। স্টিম গেজের কাঁটা তখন আর উঠতে চায় না। সব স্টিম হজম করে বসে থাকে। তখন লড়াই মানুষে আর এই বয়লারে। তখন এনজিনিয়ার ছুটে আসে বার বার। এবং যা কিছু গালাগাল আছে সব সে অনায়াসে বলে যেতে পারে। টিণ্ডাল তখন এ-সব গালাগাল শুনতে হবে ভেবে ফের হল্লা এবং ঐশীশক্তির ওপর নির্ভরশীল না হলে উপায় নেই। বিশাল সমুদ্রের বুকে খুবই অসহায় এই মানুষের তৈরী কল—এবং বোধ হয় সেজ-মিস্ত্রির ইতর কথাবার্তা না শোনার জন্যও ফের চিৎকার সকলে মিলে, আল্লা-হু-আকবর। আর সঙ্গে সঙ্গে যেন বেড়াল পালায় জানালা টপকে, সেজ-মিস্ত্রি, সুড়সুড় করে সরে পড়ে। কারণ জানা আছে অনেক ঘটনা এমন। ঝড়ের দরিয়ায় বয়লারের পেটে কত এনজিনিয়ার এভাবে হাপিজ হয়ে গেছে। ধর ধর শালোকে। আন ধরে, ক্ষিপ্ত লাল চোখ, এবং অমানুষের মতো মুখ-চোখ এই সব ফায়ারম্যানদের। তখন না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না, যেন ওরা মানুষ না, আসলে দানব, দানব হয়ে যায়। এবং ফার্নেস ডোর খুলে ঠেলে দেয়, যাও জাহান্নামে। মিস্ত্রি মানুষেরা সেজন্য ঝড়ের দরিয়ায় খুব একটা স্টোক-হোলাডের ভেতর ঢোকে না। গলা বাড়িয়েই যা যা বলার বলে চলে যায়—স্টিম মাংতা।

    তখন সমুদ্রের জল স্টোক-হোলডের ভেতর। জাহাজ ভীষণ কাত হয়ে যাচ্ছে। আবার উঠে যাচ্ছে, আবার ডানদিকে হেলে পড়ছে। সমুদ্রের ঢেউ বোট-ডেকে উঠে আসছে। মনে হচ্ছে ঝড় মাস্তুলের দড়িদড়া উড়িয়ে নিচ্ছে। আকাশে নক্ষত্র দেখা যাচ্ছে না। চারপাশে শুধু সমুদ্র, গভীর জল, নীল অন্ধকার আর ট্রেনের চাকায় যেমন শব্দ তেমনি এনজিনে শব্দ হচ্ছে, আর যাচ্ছি না আমি, যেতে পারছি না আমি। এনজিন এবং বয়লার ক্রমাগত যেন এমন বলে চলে যাচ্ছে।

    এবং এরই ভিতর সেই অমানুষের মতো দানবের চোখ-মুখ, হিংস্র ভয়াল। দেখলে বোঝাই যায় না, গনি, জব্বার, মান্নান এদের নাম। লম্বা উঁচু চেহারা। মাথায় ফেজ টুপি, কালো রঙ। বয়লারের ছাই টানায় মুখ সাদা ফ্যাকাশে। ওপরে বাংকারের অন্ধকারে কেউ নেই, শুধু লম্ফ জ্বলছে। নিচে কোলবয় দুজন জল খাচ্ছে। আর যে আগুন নিচে স্টোক-হোলডে টেনে নামানো হয়েছে, তা জ্বল দিয়ে তারা নেভাচ্ছে! ওরা মাত্র দুজন। তিনজন ফায়ারম্যান আয়াসে যা করছে, ওরা জীবন দিয়েও যেন সেটা নেভাতে পারছে না। কি প্রচণ্ড আগুনের তাপ। সারা স্টোক-হোলড লাল এবং মনে হয় আগুনের উত্তাপে সব গলে যাবে। ওরা দুজন, অর্থাৎ দুজন কোলবয় ক্রমান্বয়ে জল মেরে ছাই এস- রিজেকটারে হাপিজ করে যখন উঠে যাচ্ছে তখন ওদের মানুষ বলে চেনা যাচ্ছে না। যেন দুটো পোকা লোহার রেলিং ধরে উঠছে, উঠতে উঠতে একটু দাঁড়িয়ে পড়ছে, জাহাজ কাত হলে ওরা শক্ত হয়ে যাচ্ছে। জাহাজের ওপর দিয়ে জল গড়ালে ওরা রেলিঙের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। তারপর ক্রমে উঠতে উঠতে ওপরের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আর দেখা যাচ্ছে না।

    আর ঠিক সাতটার সময় পিছিলে হঠাৎ খবর এসে গেল, একজন পড়েছে।

    কে পড়েছে! সবার মুখ অধীর।

    পড়েছে। নাম, লতিফ। লতিফ মানে সেই বুড়ো রোগা লোকটা। সারেঙ যাকে ধরে এনেছিল। যে কান্নাকটি করেছে—যাবে না, এমন বলেছে, যে সিপিং অফিসে এ-জাহাজে আসতে হবে ভেবে নদীর পাড়ে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়েছিল, যাকে এনজিন সারেঙ প্রায় টানতে টানতে এনে দাঁড় করিয়েছিল।

    বড় নিরীহ মুখ। বয়সের ছাপ মুখে ভীষণ। বয়স নলিতে কি আছে ঈশ্বর জানে। কিন্তু মুখ চোখ দেখলেই মনে হয়, ভেতরে ভেতরে সে ভারি অসহায়। কয়লার জাহাজের নাম শুনলেই মুখ ফ্যাকাসে! সে যেতে চায় না। এস. এস. সিউল ব্যাঙ্ক আসছে শুনলে, সে লাথি থেকে বের হয় না। না খেয়ে থাকে, টাকা পয়সা শেষ হয়ে যায় তবু মানুষটা কয়লার জাহাজে যাবে না। সেই মানুষটাই পড়েছে।

    কেউ ডেক ধরে যেতে পারছেনা। ঝড় বৃষ্টিতে সমুদ্র আবছা মতো। জাহাজ কাত হয়ে জলের কাছাকাছি যাচ্ছে আবার ভেসে উঠছে। সব পাখিগুলোর খাঁচা বোট-ডেকে তুলে দেওয়া হয়েছে। মোটা দড়ি দড়ায় বাঁধা। একটা খাঁচা এর মধ্যে কখন যে ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে কেউ জানে না। উপরে ওঠা যাচ্ছে না। দুজন অতি প্রাচীন নাবিক খুব দরকারি কাজে ডেকের ওপর দিয়ে হিবিং লাইনে ঝুঁকে ঝুঁকে বোট-ডেকে উঠে যাচ্ছে। বেশ একটা খেলার মতো যেন ওরা ব্যালেন্সের খেলা দেখাচ্ছে। সমুদ্রের ঢেউ ওপর দিয়ে ভেসে গেলে ওরা হিবিং লাইন ধরে ডুবে যায় জলে। আবার ভেসে ওঠে।

    অর্থাৎ ওরা লম্বা হয়ে যায়। প্যারালাল বারে খেলা দেখাবার মতো। খুব অনায়াসে ওরা ঢেউ মাথার ওপর দিয়ে বের করে দিতে পারে। তারপর জলে ডুব দিয়ে ওঠার মতো অবস্থা। নোনাজলে শরীর তখন জবজবে ভেজা। এমন যখন জাহাজের অবস্থা তখন ছোটবাবু দেখল, কেউ নড়ছে না। গল্প গুজব করছে সবাই।

    ছোটবাবুর এখন ডেকে কাজ। সে আজ চপাটি কিছুটা খেতে পেরেছে। সে খুব দুর্বল ভেতর থেকে। তবু সে শক্তভাবে চলাফেরা করার চেষ্টা করছে। যখন মানুষটা বাংকারে পড়েছে তখন নিশ্চয় সবাই সেখানে এখন ছুটে যাবে।

    সে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় বুঝল, আসলে সে এখন কিছুই তাড়াতাড়ি করতে পারে না। কিন্তু আশ্চর্য কেউ পিছিলে কোন তাড়াহুড়ো করছে না, কেমন যেন এটা জাহাজে সব সময়ই হয় ভাব। কেউ বলছে, কে পড়ল রে! ট্যারা লতিফ না বুড়া লতিফ।

    জাহাজে দুজন জাহাজি, লতিফ নামে। একজন ফায়ারম্যান। অন্যজন কোলবয়।

    —বুড়া লতিফ।

    —বুড়া মানুষের হাড় শক্ত। এটা কি কামের কথা। বুড়া জানে জাহাজ চলে ভাল!

    আরও সব রসিকতা, কেউ বড় একটা লতিফকে নিয়ে ভাবছে না। মৈত্র এখন ঘুমোচ্ছে অমিয় ঘুমোচ্ছে। ওদের শরীর একবার ডাইনে আবার বাঁয়ে হেলে যাচ্ছে। তবু ওরা নির্বিঘ্নে ঘুমোচ্ছে। ওপরে ছাদের গ্যালিতে থালাবাসন পড়ার শব্দ। এবং ঝড় ঝঞ্ঝা হলে যা হয়, একটা চাপা গোঁ গোঁ আওয়াজ আর স্টিয়ারিং এনজিনের কক্ কক্ শব্দ। অতিকায় সব প্যানিয়ানের ভেতর কক্ কক্ আওয়াজ উঠলে ছোটবাবু ঘাবড়ে যায়। এটা যে কি হচ্ছে! বুড়ো লতিফের জন্য কেউ ভাবছে না। এবং যেতে যেতেই সে শুনল কে যেন বলছে, বেটা কুঁড়ের বাদশা। কতদিন থেকে সফর করে। সেই কয়লায়ালা। আর এক ধাপ এগোল না।

    যেন এটা ধারণা মানুষের বিশেষ করে এই সব জাহাজিদের, পড়ে যাওয়া মানে দুবলা লোক, দুবলা লোকের জায়গা জাহাজে নয়। সরমের কথা। এবং এদের জন্য মায়া মমতা দেখানো পাপ। যেন এটা ঠিকঠাক থাকে, সমুদ্রে সাইক্লোন টাইফুন অথবা কঠিন হিমবাহের পাশাপাশি জাহাজ চালিয়ে নেওয়া, কখনও কখনও কলকব্জার ভেতরও মারামারি লেগে যায় অথবা যদি ইণ্ডিয়ান কোল থাকে জাহাজে তবে তো একটা কঠিন মারামারি। এসব জয়ের ভেতর জাহাজি জীবনের হামেসা সুখী হওয়ার ব্যাপারটা থেকে যায়। এবং যারা এ-সব পারে না, তারা জাহাজিদের মুখে কালি দেয়। তাদের জন্য মায়া দ্যাখানো ঠিক না।

    একবার ইচ্ছা হল মৈত্রদাকে ডেকে তোলে। এখন মৈত্রদাই তার কাছে সব। সুখে-দুঃখে সব পরামর্শ সে দেয়। কিন্তু ওয়াচের পর ঘুম, ঘুম ভাঙ্গানো ঠিক না। এমন একটা যখন কঠিন মারামারি, মার মার কাট কাট বয়লারে, তখন ওদের ঘুমোতে দেওয়াই উচিত। ওপরে উঠতে পারলে ঝড়ের দরিয়াটা একবার দেখা যেত। সে একবার গ্যালির ওপরে উঠেও গিয়েছিল, কিন্তু সেই সমুদ্রের অতিকায় সব ঢেউ পাহাড় প্রমাণ ছুটে আসছে দেখলে কেমন মাথা ঘুরে যায়। এবং সেই চাপা আওয়াজ, লক্ষ লক্ষ দানবের হাহাকারের শব্দ। সে ভয়ে সিঁড়ি ধরে ওপরে না উঠে, নিচে সোজা টানেলপথে নেমে গেল! এবং ক্রমে সিঁড়ি ধরে নেমে যেতে যেতে, অনেক নিচে নেমে যেতে যেতে কিছুটা প্রায় পাতালে নেমে যাবার মতো, সে প্রপেলার স্যাটের পাশ কাটিয়ে নুয়ে নুয়ে এনজিনরুমে ঢুকে গেল। তারপর যেন দেখতে না পায় কেউ, কিছুটা চুপিচুপি সে যাচ্ছে। তার কাজ ফাইবারের সঙ্গে। কিন্তু ডেকের ওপর সমুদ্রের ঢেউ এসে ঝাপটা মারছে বলে হয়তো ফাইবার অন্য কোন কাজটাজ করছে। ফাইবারকে খুঁজতে স্টোক-হোলডে ঢুকে গেল। এখানে কাজকর্ম ঠিক চলছে। সে ছোট-টিণ্ডালকে দেখতে পেল না। আর সবাই কাজ করে যাচ্ছে। কে বলবে, এই জাহাজে একজন মানুষ বাংকারে পড়ে আছে। সে আবার সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠতে গিয়ে দেখল, সারেঙ বাংকার থেকে বেরিয়ে আসছেন। সারেঙকে দেখে ছোটবাবু না বলে পারল না, চাচা লতিফ পড়ে গেছে শোনলাম।

    —হুঁ!

    —পড়ে গেছে কেন?

    —তুই নিচে যা। এখন ওদিকে যাস না।

    —কেন!

    —না। বলছি, যাস না।

    —কে আছে ওর পাশে?

    —কেউ না।

    —আমি একটু দেখে আসছি চাচা।

    সহসা সারেঙ ওর হাত ধরে ফেললেন।—যাবে না। যাবে না বলছি। চোখ গরম করে বললেন, নিজের কাজ করগে।

    —কিন্তু …..।

    —কিন্তু টিন্তু জাহাজে না……।

    তবু মানুষের কি হয়ে যায়। সে বলল, না আমি যাব।

    সারেঙ বললেন, যাও। গেলে মরবে।

    মানুষের এমন হয়, এমন হয়ে থাকে, এটা মানুষের স্বভাব। ছোটবাবু ঠিক বোঝে না জাহাজে এলে মানুষেরা এমন নিষ্ঠুর হয়ে যায় কেন। সে বোঝে না মানুষের তো এটা স্বভাব না, মানুষ তো বিপদে আপদে ছুটে যাবেই। এমনভাবে সবকিছু এড়িয়ে যাওয়া ঠিক না। ভেতর ভেতর তার যে অসহায় ভাবটা ছিল কেন জানি সেটা ক্রমে ক্রমে কমে আসছে। কিন্তু ভেতরে ঢুকেই সে অবাক হয়ে গেল। বড়-মিস্ত্রি, মেজ মালোম অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। বাংকারে ভীষণ অন্ধকার। একটা মাত্র লম্ফ জ্বলছে বলে সে প্রথমে দেখল সাদা পোশাকে কারা ঘোরাফেরা করছে। ভূতের মতো যেন এবং কাছে গেলে সে আর ফিরে আসতে পারল না। দেখল, লতিফ লম্বা হয়ে পড়ে আছে। হাত- পা ছড়ানো। মুখ দিয়ে লালা গড়াচ্ছে। চোখ কেমন ওপরে উঠে গেছে। এবং মুখের রঙ কয়লার ধুলোতে কালো। পিছনে পাহাড়প্রমাণ কয়লার ঢিবি। ছাদ পর্যন্ত ঠেকে আছে। কয়লার গাড়িটা উল্টে গেছে। সুট থেকে কয়লা হড় হড় করে নেমে যাচ্ছে। এবং কয়লা টেনে ফায়ারম্যানরা সুর্ট একেবারে খালি করে ফেলেছে।

    তখনই যেন পেছন থেকে হাঁক। কারণ ছোটবাবু বুঝেছিল ওখানে ওর থাকা ঠিক না। সে পালাবে। কিন্তু তখনই শব্দ—হেই।

    সে ফিরে তাকাল। দেখল মেজ-মিস্ত্রি খুব শক্ত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

    মেজ মিস্ত্রি ফের চিৎকার করে বলছে, গো অন!

    সে ঠিক বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে আছে।

    এবং বোধ হয় মেজ-মিস্ত্রি জানে এও জাহাজি মানুষ, অক্ষরজ্ঞান নেই মূর্খ এবং কথা বোঝে না। মেজ-মিস্ত্রি নুয়ে বেলচাটা তুলে কয়লার ঢিবির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর এক দুই করে বেলচায় কিছু কয়লা তুলে দেখাল। এ-কাজটা ছোটবাবুর এখন করা দরকার। না হলে জাহাজ চলবে না। সুট খালি হয়ে গেছে। নিচে যমুনাবাজুর ফায়ারম্যানের কাছে কয়লা নেই।

    ছোটবাবুর অন্য কাজের কথা, তবু মেজ-মিস্ত্রি জাহাজে সব। ওদের অন্তত সব। ওর ওপরে ফায়ারম্যান, তার ওপরে গ্রীজার, তারপর টিণ্ডাল, সারেঙ, সারেঙের মা-বাপ জাহাজে মেজ-মিস্ত্রি। ছোটবাবুর কোন কিছু করার নেই। সে হাতে বেলচে নিয়ে প্রায় যেন ভূত দেখার মতো গাড়িটা কয়লার পাহাড়ের কাছে নিয়ে গেল। এবং সে জানে এই জাহাজে সে ঠিক এখন লতিফের মতো। অন্ধকার বাংকারে দিনের পর দিন তার কাজ। সে ঠিক বুঝতে পারল না, সে কি কাজ করছে। সে জানে পিছনে দাঁড়িয়ে আছে মহামহিম মেজ-মিস্ত্রি। প্রায় তার কাছে তিনি সেই প্রাচীনকালের ফারাওদের মতো। অসীম ক্ষমতা। ছোটবাবু গড় গড় করে গাড়িটা ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, আর ষাঁড়ের খেলার মতো অসীম উৎসাহ মানুষটার, যেন লাল রুমাল উড়িয়ে দেওয়া, সাবাস। জলদি। আরও জলদি। জোরে। দু’হাত ওপরে তুলে হারি আপ। ম্যান, হারি আপ। থামো মাত। চলো জলদি। কাম ঠিক মাংতা। এবং ছোটবাবুর হঁস ছিল না। সে একটা তাঁতের মাকুর মতো সুটের কাছে গাড়ি ভরে, আসছে যাচ্ছে। অন্ধকারে সে এখন কয়লার গুঁড়োর ভিতর অস্পষ্ট দেখছে সব। কয়লা হড়হড় করে নেমে আসছে নিচে। পায়ের কাছে। গাড়ি ভরে সে হাতল ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং ভেতরে রয়েছে জ্যাক। জ্যাক মাঝে মাঝে চোখ তুলে দেখছে ওকে। কখনও কখনও অপলক। তখন ছোটবাবুর ভেতর কি করে যে ভয়টা কেটে গেছে। সে মানুষের মতো ভাবছে নিজেকে। সে সত্যি ভয় পাচ্ছে না। আর তখনই মনে হল, মেজ-মিস্ত্রি লতিফের মুখের কাছে জুতোর টো নিয়ে আসছে। জুতোর টো দিয়ে দেখছে, মানুষটা কেমন আছে। অর্থাৎ মুখ নেড়ে দিতে যাচ্ছে। এবং তখনই ছোটবাবুর সেই সবদিনের কথা, কেউ যেন হাতি চড়ে যায়, রাজার মতো নিরুদ্দেশে যায় সব মনে পড়ে যায়। এবং বড় এক নদীর কথা মনে পড়ে। নদীর পাড়ে পাড়ে সেই সব প্রাচুর্যের দিনগুলো মনে পড়লেই ভেতরে সাহস বেড়ে যায়। সম্মানবোধ বেড়ে যায়। মানুষ হিসাবে সে কালো বলে কালো মানুষের ওপর তার প্রীতি বেড়ে যায়। এই যে মেজ-মিস্ত্রি মাঝে মাঝে টো দিয়ে মুখ নেড়ে দিচ্ছে, জ্ঞান ফিরে এসেছে কি না দেখছে এটা সারেঙ. সাব দেখেও কিছু বলতে পারছেন না। তিনি চুপচাপ। এবং দেখছেন, অর্থাৎ যা ভেবেছিলেন, ছোঁড়াটা নিজের দোষে মরল। এবং রাগে তিনি আর ছোটবাবুর দিকে তাকাচ্ছেন না।

    সারেঙের মাথায় এখন নানা ভাবনা। কি করে ওটাকে বোট-ডেকে তোলা যাবে। এখানে পড়ে থাকলে চলবে না। ওপরে তুলে নুন জল খাওয়াতে হবে। ভাল করে স্নান করিয়ে দিতে হবে। এবং মাঝে মাঝে সেই জুতোর টো এগিয়ে আসছে। সাহেব-মানুষেরা লতিফকে নিয়ে হাসি-তামাসা করছে। ছোটবাবু দেখছে সব। ভিতরে যে এমন একটা রক্তপ্রবাহ মানুষের মাঝে মাঝে থেকে যায় সে জানে না। মাথাটা কেন যে গরম হয়ে যাচ্ছে। সে কাজে কোন অবহেলা দেখাচ্ছে না। তবু আবার জুতোর টো মেজ-মিস্ত্রি লতিফের মুখের দিকে এগিয়ে আনলে সে গাড়ি উল্টে দিল, বেলচেটা দূরে ফেলে দিল, এবং কাছে এসে খুব আলতোভাবে যেন কত বিনয়ের সঙ্গে সে মেজ-মিস্ত্রির পায়ের কাছ থেকে করুণ ভিক্ষার মতো লতিফের মুখটা সরিয়ে নিল। তারপর চোখ তুলে তাকাল মেজ-মিস্ত্রির দিকে। ছোটবাবু লম্বা মানুষ। সে এই বেঁটে ছোটখাট মানুষটাকে কাঁধে ফেলে নিল এবার।

    সারেঙ কেমন ঘাবড়ে গেলেন। লতিফকে এভাবে তোলা যাবে না। তিনি তোলার জন্য দড়িদড়ার ব্যবস্থা করতে গিয়েছিলেন। আর ছোটবাবু ভোররাতের দিকে বমি করেছে। ওপরে উঠতে পারত না। কেমন নির্জীব মানুষ। সে কিনা এখন ঝড়ের সমুদ্রে এমন একটা ভয়াবহ কাজে জড়িয়ে পড়েছে। মেজ-মিস্ত্রি প্রথম ব্যাপারটা বুঝতে পারে নি। সে একটা নেটিভ ইণ্ডিয়ানের কাছে কি আশা করতে পারে, অথচ নেটিভ-ইণ্ডিয়ানটা অনায়াসে বের হয়ে যাচ্ছে টলতে টলতে। পড়ে গেলেই নিচে, স্টোক হোলডে দুটোই গুঁড়ো হয়ে যাবে। কিন্তু এমনভাবে কাঁধের ওপর ফেলে নিয়েছে যে এখন আর কিছু বলাও যায় না। সন্তর্পণে হেঁটে যাচ্ছে। ফানেলের গুঁড়ি ধরে সমুদ্রের ঢেউ, তখন থেকে উঠে আসছে। আর সে উঠে যাচ্ছে। সে উঠে যাচ্ছে লোহার সিঁড়ি ধরে। সে টলছে। সে কাঁপছে। কিন্তু ওর হাত পা ভীষণ শক্ত মজবুত। সে বোট-ডেকে উঠেই আর পারল না। বমির মতো উঠে আসছিল, সে চায় না বমিটা এখানে হোক। সে তাড়াতাড়ি লতিফকে বোট-ডেকে রেখে সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে যেতে থাকল এবং বাংকারে ঢুকে দেখল, কয়লা অনেক নিচে নেমে গেছে। যেন সে সারা মাস বৎসর কাজ করেও এই পাতালে নেমে যাওয়া সুটের ভেতরটা ভরতে পারবে না। বমিটা এবার সজোরে নাকমুখ দিয়ে বের হয়ে এল। এবং তাজা নোনতা স্বাদ। চ্যাট-চ্যাট করছে। কেমন কালো রঙ। অন্ধকার বাংকারে সে বুঝতে পারছে না, আসলে এটা কি। সে বেলচেটা আবার তুলে নিল। মুখটা মুছে ফেলল ভারি তোয়ালে দিয়ে। আসলে ওর মুখ এখন হিজিবিজি নিগ্রো দুঃখী মানুষদের মতো দেখতে হয়ে গেছে। তার যতসব স্বপ্ন, এখন হিজিবিজি খাঁজকাটা একটা মাকড়সার জালের মতো ছিঁড়ে যাচ্ছে। হাত দিলেই ছিঁড়ে যাচ্ছে।

    সে জানে সে থেমে গেলেই হেরে যাবে। সে জানে পাশে এক অজগর পাতালের দিকে নেমে গেছে, তার সঙ্গে এক লড়াই তার। না-হলে সেই হাসি ঠাট্টা! মসকরা করবে, সে করুণার পাত্র হয়ে যাবে। সে দাঁড়াতে পারছে না—এমন আর কখনও ভাববে না। সে বেশ আছে, ভালো আছে, মাগো আমি ভাল আছি। টাকা পেলে কিনা জানাবে। কম টাকা, তবু তোমাদের কিছু অন্তত হয়ে যাবে। আমি এখন যাচ্ছি কলম্বো, তারপর আমেরিকা, আমি যে কত বড় হব বলে নিরুদ্দেশে চলে এসেছি। আমার আকাঙ্ক্ষা অনেক, আমি সুন্দর এক পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে বাঁচতে চাই। আমি হেঁটে যাব মা, চারপাশে মানুষেরা বলবে, ঐ যে মানুষটা হেঁটে যাচ্ছে। আমি স্বপ্ন দেখব মা, হ্যাঁ স্বপ্ন, পাশে স্টাবোর্ড-সাইডের বাংকারে এখনও গাড়ির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। মনু কাজ করছে ওখানে। খুব পরিশ্রমী মনু, মৈনুল হক, তা তুমিও তো বেশ কাজ করে যাচ্ছ। আমার এমন ভাবে ওক উঠে আসছে কেন। বার বার। এই নিয়ে সাত বার। তুমি কি এখন একবার এ-বাংকারে আসবে! এসে খোঁজ নেবে আমি পারছি কিনা! সারেঙসাব বলে গেছেন দেখতে, মাঝে মাঝে দেখতে। তুমি আমাকে দেখবার আগে বলছি, ঠিক সুট ভরে দেব। তোমার আগে ভরে ফেলব।

    এ-ভাবে সে ক্রমান্বয়ে একটা মাকুর মতো বাংকারের অন্ধকারে কাজ করতে করতে এক সময় দেখল, কয়লার লুট ভরে গেছে। সে তাড়াতাড়ি গাড়িটা প্রায় ঠেলে ফেলে দিয়ে হাত তুলে হৈ হৈ করে উঠলেই ছুটে এসেছিল মনু। সে দেখতে পেয়েছিল, ছোটবাবু হাত দিয়ে সুটের কয়লা সাজিয়ে দিচ্ছে। সে কেমন একটা গন্ধ পেল বাংকারে। তাজা রক্তের গন্ধ যেন। এমন হয় সে জানে এবং মনু তাড়াতাড়ি ওর কাছে লম্ফ নিয়ে গেল। লম্ফ তুলে দেখল। মুখটা ভীষণ বীভৎস। চোখ লাল। কালো মুখে সাদা দাঁত বের করে হাসছে। হাসিটা ভারি কষ্টের। মনু বলল, তোর বাংকারে বাঁস কেন রে!

    —কোথায় বাঁস!

    —তাজা খুনের বাঁস।

    —যাঃ।

    —হ্যাঁ। পাচ্ছি! দ্যাখতো বলে সে লম্ফটা নিয়ে অস্পষ্ট আলোতে খুঁজতে থাকল। তারপর এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াল। বলল, এখানে তুই বমি করেছিস?

    ছোটবাবু বলল, হ্যাঁ।

    —এসে দেখ কি করেছিস।

    ছোটবাবু বলল, আমি আর উঠতে পারছি না! আমার ওয়াচ শেষ, আমিও শেষ।

    তবু মনু ওকে ধরে নিয়ে গেল। ছোটবাবু দেখল, লাল তাজা রক্তে ভেসে গেছে ডেক। সঙ্গে সঙ্গে আবার ওক ওঠে এল ভিতর থেকে। তারপর টলতে টলতে পড়ে গেল নিচে। ছোটবাবু যথার্থই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল। সমুদ্রে ঝড়ের ঝাপটা তখন আরওবেগে নামছে। জাহাজ উঠছে নামছে। ফুলছে। ক্ষেপা সমুদ্র। মেঘলা আকাশ। প্রচণ্ড ঝড়ে দানবের মতো নীল রঙের ঢেউ। মাথায় সাদা ফেনা। এ্যালবাট্রস পাখিদের আর্তনাদ কখনও ঢেউয়ের মাথায়—ওরা উড়ে উড়ে ভেসে যাচ্ছে। অস্পষ্ট এক কুয়াশার ছবি যেন চারপাশে।

    এবং খবর চারপাশে আবার ছড়িয়ে পড়ল। ছোটবাবু পড়েছে। মৈত্রের এখন ওয়াচ। সে নেমে যাবার মুখে এমন শুনল। মেজ-মিস্ত্রি আবার এসে নেমেছে! তার যা স্বভাব! জ্যাক এসে নেমেছে। সে পাশে দাঁড়িয়ে দেখল ছোটবাবু কাত হয়ে পড়ে আছে। সে পাশে বসবে ভাবল, কিন্তু মনে হচ্ছে সেকেণ্ড পা তুলে আছে। যারা ছোট কাজ করে তাদের মুখ হাত দিলে বড় অপমান। সম্মান থাকে না বুঝি। পা বাড়িয়ে মুখটা একটু নেড়ে চেড়ে দেখা। সত্যি পড়েছে না ভয় পেয়ে এমন করছে। মুখে রক্তের দাগ দেখেও মায়া হয় না। জ্যাক এবার উঠে দাঁড়াল। ঠিক পাশে। এবার পা তুলতে যাচ্ছে আর্চি। আর্চি স্নান সেরে নেমে এসেছে। পায়ে তার বাথরুম স্লিপার। বুড়ো আঙ্গুল বের হয়ে আছে। জ্যাক এখনও শক্ত বুটজুতো পরে আছে। পা-টা উঠে আসছে। ডান পা তুলে আর্চি ছোটবাবুর মুখের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। আর তখন ঠিক পাশে অর্চির বাঁ পা। পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের মাথায় জ্যাক তার গোড়ালির সর্বশক্তি দিয়ে চাপ দিতেই চিৎকার করে উঠল আর্চি।—এহো গেলাম! গেলাম!

    আর্চির বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলটা ভীষণভাবে থেঁতলে গেছে। না দেখে এমন একটা কাজ করে ফেলেছে জ্যাক। সে চোখ টেনে বলল, সরি মিঃ আর্চি। কোথায় লাগল। উপুড় হয়ে পায়ের কাছে বসতেই দেখল, আর্চি পাটা নিয়ে ঘুরে ঘুরে এক পায়ের ওপরে নাচছে। জ্যাকের ভীষণ হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু মৈত্র যখন ছোটবাবুকে কাঁধে ফেলে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন ফোঁটা ফোঁটা রক্ত দেখে জ্যাক ঘাবড়ে গেছে। মুখ থেকে ছোটবাবুর ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। জ্যাক কেবল নিশি পাওয়া মানুষের মতো ছোটবাবুর পেছনে হেঁটে যেতে লাগল। সে হাসতে পারল না, কাঁদতেও পারল না।

  • চার

    চার

    ।। চার।।

    সমুদ্র ক্রমে শান্ত হয়ে এল একসময়। বন্দর পেতে বেশি দেরি নেই। জাহাজিদের এ-সফরে প্রথম বন্দর। কাজেই অনেকে, সেই সকাল থেকেই কিনার দেখার চেষ্টা করছে। কিছুই তো দেখা যায় না। কেবল নীল আকাশ, নীল সমুদ্র, আর মাঝে মাঝে সমুদ্রপাখিদের ওড়াউড়ি। রাতের জ্যোৎস্নায়, নীল আকাশ, সবুজ নক্ষত্র এবং সমুদ্র থেকে ঠাণ্ডা বাতাস। একনাগাড়ে বসে থাকলে ডেকে মনে হয় কেমন এক গোলাকৃতি নীল বিরাট একটা টানেলের ভিতর দিয়ে জাহাজটা নিশিদিন ছুটে যাচ্ছে। যেন কোন অতিকায় এক স্পেস রকেট, অথবা আরও কিছু—তখন আর উঠতে ইচ্ছে হয় না। বসে থাকতে ভাল লাগে।

    ছোটবাবু এখন ভালোর দিকে। বমি করতে করতে গলা চিরে যায়। এবং গলা চিরে গলগল করে রক্ত উঠে আসে। তারপর নুনজল, এবং নুনজনই জাহাজে একমাত্র ওষুধ, জাহাজে বমি করলে, খেতে না পারলে, মাথা ঘুরলে একমাত্র এই জল। সমুদ্র থেকে বালতি করে জল তুলে খেয়ে ফেলা। তারপর অভ্যাস, অভ্যাসে সব কিছু সহা হয়ে যায়, মাথাও ঘোরে না, বমিও হয় না। কেবল তখন মনে হয় এই জাহাজের পিচিং ভারি আরামের। চোখ বুজে আসে। ঘুম চলে আসে। কিনারায় বেশিদিন থাকলে অসুবিধা!

    মেজ-মালোম আবার সেই ডেক-চেয়ারে বসে আছেন। চোখে বাইনোকুলার। কিনার কাছে নেই। তবু দেখার স্বভাব। জাহাজ বন্দরের কাছাকাছি এলে তিনি সময় পাবেন না। জাহাজের বাঁধাহাদা আছে। আগিলে, বড়-মালোম, পিছিলে, মেজ মালোম। দু’জন দু’দিকে! আর ডেক-জাহাজিরা আছে। ওরা হারিয়া বললে, দড়িদড়া হারিয়া করে দিচ্ছে, হাপিজ বললে, দড়ি টেনে ধরছে। ওয়ারপিন ড্রামে দড়িদড়া টানাটানি করে বাঁধাছাঁদা হয়ে গেলে ছুটি। মেজ-মালোম তখন আবার ডেক চেয়ারে বসে জুতসই বন্দরের বড় বড় গাছপালার ভেতর কিছু খুঁজে বেড়াবে। কারণ যা খবর, জাহাজ এখানে থামছে না। শুধু রসদ নেবে। রসদ নিতে কত আর সময়। সুতরাং ডেকে বসে থাকলে বাইনোকুলারটা একমাত্র তার সম্বল। জাহাজে সময় কাটানোর পক্ষে সে একটা বেশ কাজ পেয়ে যায় তখন।

    তখন নিচে মৈত্র ছোটবাবুর কাছে খবর নিয়ে এল, রাতে জাহাজ বন্দর ধরছে। মৈত্রের বারোটা- চারটা ওয়াচ শেষ। রাতে ওয়াচ নেই। জাহাজ বাঁধাছাঁদা হলে একটা বয়লার শুধু চলে। জাহাজের যে সামান্য কাজ, উইন্‌চ চালানো, জেনারেটর চালানো, এ-সব কাজে একটা বয়লার চালালেই হয়ে যায়। তখন ছুটি ছুটি ভাব। বেশ একটা উত্তেজনা, মৈত্রকে দেখলেই বোঝা যায়। সে শিষ দিয়ে নামছে। অমিয় একটা গান গাইছে। ওর গলা ভাল। বেশ গায়। সে যেন কি একটা আকাশ টাকাশ নিয়ে গান গাইছে! ডেক-সারেঙ, ডেক-জাহাজিরা ছুটি পাচ্ছে না। ওদের কাজ জাহাজের বাঁদাছাঁদা না হলে শেষ হচ্ছে না। তবু জাহাজ বাঁধাছাঁদা হবে ভেবে, বন্ধু, অনিমেষ, মনু সবাই একবার করে খবর দিয়ে গেছে, সারেঙও এসেছিলেন, ছেলে, জাহাজ বন্দরে ঢুকছে। উপরে উঠে না গেলে দেখবে কি!

    মৈত্র স্নান সেরে এসেছে। অমিয় লকার খুলে কি যেন খুঁজছে। বোধহয় খাম পোস্টকার্ড। কিন্তু অমিয় জানে না, দেশের খাম পোস্টকার্ডে চলবে না। মৈত্র একটা চিঠি লিখবে শেফালিকে, যা সময়, একটু সাবধানে না থাকলে চলবে না। মৈত্র বেশ আশায় আশায় আছে। সে জাহাজ বন্দরে ঢুকে গেলেই ঠিক খাম পোস্টকার্ড সংগ্রহ করে ফেলবে। এবং নানাভাবে সে ভেবে রেখেছে—শেফালির জন্য সে কি করতে পারে। বুনোসাইরিসে না যাওয়া পর্যন্ত সে কিছু করতে পারছে না। ওখানে জাহাজ বেশ কিছুদিন নোঙর ফেলে থাকবে। জাহাজ খালি হবে, জাহাজ বোঝাই হবে। বেশ কিছুদিন লেগে যাবে বোঝাই হতে। কোম্পানির ঘরে টাকা জমবে মন্দ না। সে এ বন্দর থেকে ভেবেছে কিছু কাঠের হাতি, ময়ূরের পালখ কিনে নেবে। ওগুলো বেশ দামে বিক্রি করা যাবে। এ ভাবে তার দু’পয়সা হবে। এবং এ-ভাবে সে শেফালিকে বেশ ভালো টাকা পাঠাতে পারবে।

    ছোটবাবুর দিকে মৈত্র তাকিয়েছিল। কিছু ভাবছিল। শেফালির কথা। ছোটবাবু বেশ শুয়ে আছে! মুখে একটু সাদাটে ভাব। রক্তপাতে এমনটা হয়েছে। শুয়ে আছে সাদা চাদর গায়ে। সে লম্বা পাতলুন পরেছে আর ডোরাকাটা পাঞ্জাবি। ওর চুল আরও বড় হয়েছে। জাহাজে উঠলে শরীরের রঙ আরও মনোরম হয়। ছোটবাবু এমনিতেই ভীষণ সুন্দর, সুপুরুষ, তার ওপর নোনা জল লেগে এক আশ্চর্য সুষমা মুখে। খুব ভালবাসতে ইচ্ছে হয়। আদর করতে ইচ্ছে হয়। ছোটবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ ফেরানো যায় না।

    মৈত্র বলল, ছোটবাবু তোমার কথা জ্যাক বলছিল।

    —কি বলছিল! ছোটবাবু কোন রকমে উঠে বসার চেষ্টা করল। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

    —তুমি কেমন আছ!

    ছোটবাবু বলল, যাঃ।

    —সত্যি! বললাম, ভালোর দিকে।

    —কেন বললে না, ভালো আছি। আমি আবার দু-একদিনের ভেতর বাংকারে নেমে যেতে পারব।

    –এটা তোমার ছোটবাবু বাড়াবাড়ি। তুমি পারবে না। তুমি বড্ড একগুঁয়ে।

    —সবাই পারলে আমি পারব না কেন! তাছাড়া সবাই কি ভাববে!

    —তুমিও পারবে। পারতে তোমার সময় লাগবে।

    —এখন তো আর মাথা ঘোরে না। বেশ সয়ে গেছে সব। খুব খিদেও পায়।

    —শরীর ভাল হলে পারবে। তোমাকে আমার ওয়াচে নেব ভাবছি। ফালতু থাকলে, আবার কখন কোন দরিয়ায় কিসে কে পড়বে, তখন হঠাৎ পারবে না। একবার অভ্যাস হয়ে গেলে, দেখবে সব কাজই মানুষ পারে, মানুষ পারে না, পৃথিবীতে এমন কাজ নেই

    ছোটবাবু কিছু বলল না। চুপ করে থাকল।

    মৈত্র বলল, আচ্ছা ছোটবাবু তুমি এমন চুপচাপ থাক কেন। কথা বল না!

    ছোটবাবু বাল্‌কেডে হেলান দিয়ে বসে আছে। সে মৈত্রের দিকে তাকিয়ে না হেসে পারল না। বলল—কথা বলি না কোথায়! বেশ কথা বলি।

    —আচ্ছা ছোটবাবু জাহাজে তুমি এমন ভাবে থাকো কেন?

    —কি ভাবে।

    —এই যে মনে হয় কেউ তোমার যেন নেই।

    —না না। তেমন ভাবে থাকি না তো।

    —তুমি ভাল ছেলের মতো জাহাজে থাকলে ভীষণ কষ্ট পাবে।

    —ভাল ছেলের মতো কোথায় থাকি!

    —তুমি ছোটবাবু যাই বল খুব চাপা স্বভাবের। আমরা ফোকসালে কত কথা বলি, তুমি তো তোমার বৌদির সব খবর প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছ।

    —তা বলতে পার। এত বেশি শেফালি বৌদির কথা বল, যে মনে হয়, পৃথিবীতে আর কেউ বাস করে না। একমাত্র শেফালি বৌদিই বাস করে।

    —তবে! আর তুমি তোমার দেশে কে আছে, কেন এমন একটা কাজে এলে, অমিয় বলল, কলেজের পড়াশোনা পর্যন্ত তোমার আছে, জাহাজের ট্রেনিং-এ সব লুকিয়ে গেছ—এত সব কেন? কিনারায় একটা চাকরি দেখে নিতে পারলে না!

    —তুমি তো জানো মৈত্রদা তোমার মতো, তোমার মতো কেন, আমাদের জাহাজে যারা আছে, একমাত্র ডেক-সারেঙ বাদে সবাই আমরা পাকিস্তানের, আমরা দেশ ছেড়ে চলে এসেছি। আমাদের তো কিছু একটা করে খেতে হবে। নাবিক বলতে আমরা জানি, সবাই সন্দীপ, নোয়াখালি, চিটাগাঙের লোক। এখন দেশ ভাগ হয়ে গেছে। ওরা কতদিন আর আমাদের জাহাজ চালাবে। আমাদের তো সমুদ্র-যাত্রায় বের হতেই হবে।

    —এসব বড় বড় কথা। এ-সব কথা তোমাদের ট্রেনিং-এ শেখায়। আসলে এমন একটা অমানুষিক কাজ, একঘেয়েমির কাজ করতে কেউ সখ করে আসে না। নানা কারণে অবশ্য আসে। কিন্তু তোমার মতো মানুষ কেন আসে বুঝি না!

    ছোটবাবু ফের হাসল। বলল, মৈত্রদা অভাবে সবাই আসে। আমিও এসেছি। তুমি আমার সম্পর্কে এর চেয়ে বেশি না ভাবলেও চলবে।

    বন্ধু এবং অনিমেষ পাশে বসেছিল। অমিয় ‘বিশুর’ ভাত ডাল সবজি গরম করে নিচ্ছে। একটু পরেই ওরা মেসরুমে খেতে বসবে। ছোটবাবু সকালে ওপরে উঠে গেছিল। মেসরুমে খেয়েছে। এখনও উঠতে চায়। নিচে বসে থাকতে ভাল লাগছে না। পোর্টহোল দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। এখন ওপরে ওঠে সমুদ্র দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে। সমুদ্র ভীষণ শান্ত ঠিক শিশু সরল মানুষের মতো। লতিফ ভাল আছে। সে আবার বাংকারে নেমে যেতে পারছে। ডেকে উঠে যাবার সময় সেও একবার খবর নিয়ে গেল, কেমন আছেন ছোটবাবু।

    ছোটবাবু হেসে বলল, ভাল। তুই কোথায় যাচ্ছিস!

    —ওপরে। নামাজের সময় পার হইয়া যায়।

    এনজিন-সারেঙ এসে বললেন, মৈত্র মশায়, ছোটবাবুকে ওপরে নিয়ে যান। কিনার দেখা যাচ্ছে।

    এই কিনার দেখার ব্যাপারটা জাহাজিদের কাছে আশ্চর্য অভিজ্ঞতার মতো। যেন জল শুধু জল, দেখে দেখে চিত্ত তার হয়েছে বিকল, পৃথিবীর কোথাও ডাঙ্গা আছে ভাবাই যায় না। সমুদ্রে জাহাজ চললে, নিশিদিন জাহাজ চলতে থাকলে ভাবাই যায় না, মানুষেরা ডাঙ্গায় থাকে। কোথাও মানুষ, গাছপালা, পাখি এবং মাটি আছে বিশ্বাসই করা যায় না। কিনারার নামে নতুন ডাঙ্গা দেখার জন্য সবাই পাগলের মতো ওপরে ছুটছে। যে-যার কাজ ফেলে এখন ওপরে উঠে যাচ্ছে। কেউ ফোকসালে নেই। বুড়ো ভাণ্ডারি পর্যন্ত গ্যালিতে হাতা-খুন্তি ফেলে রেলিঙে এসে দাঁড়িয়েছে।

    যারা নিচে কাজ করছিল, এনজিনরুমে, তারাও কেউ কেউ যেমন ছোট টিণ্ডাল উঠে এসেছে। কাপ্তান ব্রীজে, রেলিং-এ ভর করে দেখছেন! মেজ-মালোম ডেক-চেয়ারে বসে আছে। ওর চোখে বাইনোকুলার। জ্যাক বোট-ডেক থেকে লোয়ার-ডেকে নেমে এসেছে। জ্যাকের চলাফেরা অদ্ভুত। সে কখনও জাহাজে হাঁটে না। সে লাফিয়ে অথবা দৌড়ে দৌড়ে যায়। এক ফল্কা থেকে আর এক ফল্কায় যেতে সে নিচে নেমে ওপরে উঠে যায় না। সে লাফ মেরে ফল্কাটা ডিঙ্গিয়ে যায়। ছোটবাবু ওপরে উঠেই দেখল, জ্যাক মেজ-মালোমের পাশে বসে রয়েছে। চুপচাপ। চোখে তার বাইনোকুলার। জ্যাকের বড় চুল কেটে ফেলা হয়েছে। জ্যাককে ভীষণ নেড়া নেড়া লাগছে। এত খাটো চুলে জ্যাককে দেখতে ভালো লাগছে না।

    তখন যা হয়, চারপাশে সবাই তখন ডাঙ্গা খুঁজে বেড়ায়। ওরাও খুঁজতে গিয়ে দেখল, দিগন্ত রেখায় সমুদ্রের নীল জল পার হয়ে ছায়া ছায়া ভাব, মেঘের মতো এক টুকরো জমির ছবি। কি যে আছে, কিছুই দেখা যাচ্ছে না, তবু সবাই দাঁড়িয়ে আছে। কেউ নিচে নেমে যাচ্ছে না। যেন দেখা, কিভাবে কাছে যাওয়া যায়। জাহাজ চালিয়ে কাছে যাওয়া যায়। প্রপেলার তেমনি জলের নিচে অন্তহীন ঘুরে চলছে, সাদা ব্লেড নীল জলে ঘুরছে, কেবল ঘুরছে, সাদা ফেনা তুলে দিচ্ছে পেছনে, আর অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে একটা সরলরেখার মতো ভাসমান তিমি মাছের ছবি, ছবিটা ক্রমে যেন জাহাজের সঙ্গে এগিয়ে আসছে, মনে হয় একটা না, অনেক কটা, সারি সারি, একটা আর একটার পেছনে, ছুটে আসছে। সমুদ্রের জল উঁচু হয়ে যাচ্ছে সরলরেখার মতো। প্রপেলার জল ভেঙে ভেঙে এমন একটা দূরের ছবি তৈরি করে রাখলে মনে হয় জাহাজটার পেছনে তিমি মাছেরা স্রোতের মতো জলের নিচে উঠে আসছে। ছোটবাবুর বেশ ভালো লাগছিল—সে যত দূরে সম্ভব চোখ মেলে দিচ্ছে।

    আসলে এমন একটা সুন্দর দৃশ্য সে কবে দেখেছে জানে না। সে কেমন বিস্ময়ে নড়তে পারছে না। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সমুদ্র এখন ভীষণ লাল। আকাশ লাল হয়ে গেছে। আর সাদা জাহাজ। সাদা জাহাজটাকে সে কিছুতেই ভাবতে পারে না জাহাজ, আসলে সেই সৌরলোকের অন্তহীন যাত্রার মতো মনে হয়, যেন চারপাশে সব গ্রহ নক্ষত্র, উপগ্রহ আর এক সৌরলোক থেকে অন্য সৌরলোকে একটা যান অনবরত ছুটছে। তারা ক’জন জাহাজি তার ভেতর বসে রয়েছে। বিরাট এক স্পেসঅডিসির মতো এই যানে তাদের যাত্রা আরম্ভ হয়েছে।

    জাহাজে ক্রমে আলো জ্বলে উঠল। দূরের বন্দরে আলো জ্বলছে। জ্যোৎস্না রাতে সমুদ্রে আলো জ্বললে এক আশ্চর্য মায়ার খেলা। ডেকের মাস্তুলের মাথায় আলো, ব্রীজের উইংসে আলো, কেবিনে কেবিনে আলো, সামনে পেছনে সব জায়গায় আলো। ডগ-ওয়াচে যার ‘আগিলে’ পাহারা দেবার কথা তার ছুটি, জাহাজ বন্দর ধরলে, ফরোয়ার্ড পিকে পাহারা লাগে না। তাকে কোনও দূরের জাহাজ অথবা পাহাড় দেখে তখন ঘণ্টা বাজাতে হয় না। সেও শিস দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ডেকে

    এভাবে জাহাজ ক্রমে বন্দরের কাছাকাছি চলে আসছে। কেউ নেমে যায়নি। সূর্যাস্তে জাহাজিরা রাতের খাবার মেসরুমে খেয়ে নেয়। সবাই ভুলে গেছে খেতে হবে। ভাণ্ডারি ভীষণ গালাগাল করছে। জাহাজিদের খাইয়ে দিতে পারলেই ছুটি। সেও তখন তার বুড়ো চোখে বন্দরে, আলো, অস্পষ্ট ছায়া অথবা দুরের কোন জাহাজে ব্যাণ্ড বাজতে থাকলে সুদূরে সেইসব বিদেশিনীদের কথা মনে করে জীবন অন্তহীন এক সৌরযানের মত—কেবল নিয়ত চলা, এমনি ভাববে। নামাজের সময় মনের ভিতরে কত কথা বুড়ো বয়সে যে উঁকি দেয়।

    আসলে ছোটবাবুকে ওপরে ধরে তুলেছিল অমিয়। এখন এ-সব দেখে মনে হচ্ছে, সেও জাহাজের চারপাশে ধীরে ধীরে ঘুরে বেড়াতে পারে। তার শরীর দুর্বল, সে ভাল করে এখনও খেতে পারে না, গলায় খেতে লাগে, এসব মনে থাকে না। কাপ্তানের ছেলেটা তো মেজ-মালোমের পাশে একটু বসে আবার কোথায় দু-লাফে নেমে গেল। পিছিলে সে আসে না। এখানে নিচে ফোরক্যাসেলে খালাসিরা থাকে, তার হয়তো মানা আছে এদিকটাতে আসা। তবু আজ ছোটবাবু দেখল সব বাঁধা নিষেধ ভেঙে জ্যাক ছুটে ছুটে পিছিলের যমুনাবাজু দিয়ে ঢুকে গঙ্গাবাজুতে বের হয়ে গেল। সবাই তখন তটস্থ। সারেঙ দু’হাত দিয়ে পিছিলের সব জাহাজিদের সরিয়ে দিচ্ছে। কোন কারণে যেন গায়ে না লেগে যায়।

    আর ছোটবাবু তখন হাঁটছে। মৈত্র দেখছে না, ওর পাশে ছোটবাবু নেই। ছোটবাবু ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। বোট-ডেকে মেজ-মালোমের কাছে কী যে ওর আকর্ষণ। সে পাশে গিয়ে দাঁড়ালেই মেজ- মালোম বলল, ও-কে?

    সে বলল, ইয়েস ও-কে। তারপর সে বলল, এনি ওম্যান সেকেন্ড।

    —নো।

    ছোটবাবু চুপচাপ ওর চেয়ারের নিচে পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। সেই প্রথম দিন থেকেই মানুষটিকে কেমন পাগলাটে পাগলাটে লাগে। থুতনিতে ওর লাল দাড়ি। সেই একমাত্র অফিসার মানুষ, ফোকসালে গিয়ে যে রোজ দেখে আসছে তাকে। কেমন আছে ছোটবাবু, এখন কি খাওয়া দরকার, সামান্য অষুধ অন্য সব আরও যা কিছু দরকার, সে দিয়ে আসছে। মানুষটিকে ছোটবাবুর ভীষণ ভালো লাগে। সে ওর সঙ্গে খুব সহজে কথা বলতে পারে। কোন সংকোচ বোধ করে না। এই যে সে বলে ফেলল, এনি ওম্যান সেকেন্ড যেন এটা না বললে আর কিছু বলার থাকে না। এখনতো জ্যোৎস্না রাত, এখনতো দূরের বন্দরে নানাবর্ণের আলো, শুধু হাজার জোনাকির মতো জ্বলছে, আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। আর জাহাজ ইতস্ততঃ চারদিকে নোঙর ফেলে আছে, অথবা বয়াতে বাঁধা। তার ভেতর দিয়ে কিছু দেখা যেতে পারে না। এমন কি বাড়ি ঘর মন্দির সব অস্পষ্ট। তার ভেতর মেয়েমানুষের ছবি দেখা স্বপ্নের মতো।

    আসলে ছোটবাবুর মনে হল, মেজ-মালোম দূরবীনটা চোখে দিয়ে অন্য একটা জগতের সন্ধানে থাকে। সেখানে একটা বড় রাস্তা থাকে। দুধারে পাইনের গাছ থাকে, পাশে নীল জলের হ্রদ থাকে, সে একটা স্কুটারে বসে থাকে, পেছনে থাকে এক সুন্দরী যুবতী, যেন নিশিদিন সে স্কুটার চালাচ্ছে, আর পেছনে পিঠের কাছে যুবতী তাকে সাপ্টে বসে আছে। সে একা জাহাজে উঠে এলেও যুবতী তাকে বুঝি ছাড়ে না। তাছাড়া মানুষের কি যে আছে, কি যে আশা কুহকিনী, আশা কুহকিনী না হলে এমন ভাবে সমুদ্রের ভেতর একটি মানুষ দূরবীন চোখে বসে থাকতে পারে না।

    মেজ–মালোম বলল, তুমি ছোটবাবু এটা ধর।

    —আপনি স্যার!

    —আমার এখন জাহাজ বাঁধাছাঁদা আছে।

    —কিন্তু স্যার।

    —কিন্তু কি আবার!

    —এখানে একা বসে থাকব…

    মেজ-মালোম জানে ছোটবাবু জ্যাককে ভীষণ ভয় পায়। জ্যাক সম্পর্কে একটা কৃত্রিম ভয় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে জাহাজে। সবাই জ্যাককে ভীষণভাবে এজন্য এড়িয়ে চলে। কিন্তু মেজ-মালোম জানে জ্যাক, শান্ত, নিরীহ, সেও প্রথম প্রথম তার সম্পর্কে ভীষণ গুজব শুনেছে, এখন দেখছে উল্টো। জ্যাক আপন মনে থাকে, সে নিজের খুশিমতো কাজ করে। তার যেখানে খুশি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। সে কাউকে বিরক্ত করে না। অথচ চিফ-অফিসার কেন যে সবাইকে জ্যাক সম্পর্কে ভীষণ সাবধান করে দিয়েছে।

    মেজ-মালোম বলল, চলো তবে পিছিলে। আমার তো সেখানেই কাজ। তুমি দেখতে টেখতে পেলে সহজেই ডাকতে পারবে।

    ছোটবাবু বলল, সেই ভাল স্যার। এবং এ-ভাবে সে মেজ-মালোমের পেছনে হেঁটে গেল। খুব ধীরে ধীরে সিঁড়ি ধরে লোয়ার ডেকে নেমে গেল। নামার সময় মেজ-মালোম বলল, কি ধরতে হবে?

    ছোটবাবু বলল, না। আপনি এগোন আমি আস্তে আস্তে হাঁটছি। ছোটবাবু ডেকের ওপর ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। মাথার ওপর মাস্তুলের লাল আলো দুলছে। ছোটবাবুর ছায়াটা আলোর জন্য একবার বড় হচ্ছে আবার ছোট হচ্ছে।

    আর কি যে জাহাজটা নিরিবিলি মনে হয় এখন! জাহাজ থেমে আছে। খুব কাছেই বন্দর। তবু সে বুঝল, প্রায় মাইলের ওপর হবে। সমুদ্রের ভেতরে জাহাজ বয়াতে বাঁধাছাদা হচ্ছে। দূরবীন চোখে লাগিয়ে সে বসে রয়েছে। দূরবীন চোখে লাগালেই ডাঙ্গার সব ফাঁকফোকরগুলো কেমন চোখের ওপর ভীষণভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে বসে বসে চারপাশে খুঁজতে থাকল। সে কি খুঁজছে! তার তো এভাবে খোঁজার কথা নয়। সে তো এমনভাবে জাহাজে বাঁচবে বলে আসেনি। এভাবে সে খোঁজাকে কেমন অসভ্যতা মনে করে থাকে, তবু বুঝি জাহাজের আছে এক অতীব কঠিন অসুখ, ছোটবাবু জানে না, এই ন-দশদিনেই তার ভেতরে ভেতরে একটা অসুখের জন্ম হয়েছে। তারও লুকিয়ে ডাঙ্গায় মেয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়।

    মাঝে মাঝে হাঁক আসছে, হ্যালো ছোট, এনি ওম্যান।

    —নো স্যার।

    —একা দেখে ফেলবে না। ডাকবে।

    —ইয়েস স্যার, ডাকব।

    —এ ব্যাপারে মানুষেরা ভীষণ স্বার্থপর

    —ছোটবাবু বলল, একটা স্যার কুকুর! —কুকুর!

    —হ্যাঁ স্যার, কুকুরটা রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে।

    মেজ-মালোম বলল, অস্পষ্ট আলোতে কুকুর, মানুষ, মেয়ে দূরবীনে একরকমের দেখায়। ভালো করে দ্যাখো।

    —ঠিক বুঝতে পারছি না স্যার।

    মেজ-মালোম হাসিল ফেলে চলেও আসতে পারছে না। ডেক-জাহাজিরা এখন দড়িদড়া ঢিলা দিচ্ছে। উইন্‌চ চালাচ্ছে বংকু। ডেক-টিন্ডাল হাসান কেবল হারিয়া হারিয়া করছে। হাসিল ক্রমে নেমে যাচ্ছে জলে। দুটো ছোট নৌকা জাহাজের আগে এবং পিছনে। ওরা হাতের ইসারায় ঠিক বয়াতে হাসিল বেঁধে ফেলছে। অথচ মেজ-মালোম কি যে করে! সে আবার হাই করে ডাকল।

    —আছে এখনও?

    —আছে।

    —আর একটু। এই হয়ে গেল। এই বাস্টার্ড টিন্ডাল—শালা লোগ, জাহাজ জখম করে দেবে। তারপরই যেন ক্রিশ্চিয়ানিটির সারমর্ম বুঝে ফেলার মতো দু’হাত ওপরে তুলে ফাদারের কায়দায় বলে যাওয়া—আ…স… তে আ…স..তে। তারপরই ছুটে ছোটবাবুর কাছে ফল্কার ওপরে চলে এলে শুনল, স্যার রাস্তা পার হয়ে চলে গেল। আর দেখা যাচ্ছে না।

    মেজ-মালোম ছোটকে কিছুতেই বিশ্বাস করল না। সে প্রায় যেন জোরজার করে কেড়ে দূরবীনটা যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি চোখের ওপর রাখলে দেখল, শুধু অস্পষ্ট ঘর-বাড়ি, এলেবেলে রাস্তা। রাস্তা, সমুদ্রের বালিয়াড়ি, না জাহাজ, না কোন ব্রীজ-টিজ হবে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। আসলে এতদূর থেকে রাতে কিছু দেখা সম্ভব না। তবু নিরিবিলি দেখলে কখনও কখনও মনে হয় একটা বড় রাস্তা অনেক দূর, এই মিচিগান টান হবে তার দিকে চলে গেছে, সে একটা মোটর সাইকেলে বসে রয়েছে, তার শরীরে শীতের পোশাক পিছনে কেউ যেন সাপটে ধরে আছে। চুলের মেয়েলি গন্ধ নাকে লাগছে।

    এ-ভাবে সে যখনই দূরবীনে চোখ রাখে, এমন একটা গন্ধ পায়। এখন জাহাজে তার, সারা অবসর সময়ে এই একটা আশ্চর্য আলাদিনের আকাঙ্ক্ষা হাতে। এটা নিয়েই সে আছে, সে এখন এই ফল্কাতেই বসে থাকবে, কতক্ষণ বসে থাকবে সে নিজেও জানে না। তার আকাঙ্ক্ষা, কারণ কিছুদিন সমুদ্রে থাকলেই বুঝি তার মনে হয় ডাঙা কবে সে ফেলে এসেছে। বন্দরে নেমে যেতে না পারলে ফুল, ফল, পাখী, মেয়েদের হেঁটে যাওয়া সব অর্থহীন।

    ফল্কাতেই মেসরুম বয় এসে খবর দিয়ে গেল, রাতের খাবার দেওয়া হয়েছে। ডাইনিঙ হলে, কাপ্তান বসে রয়েছে। রাতের খাবারটা সবাই একসঙ্গে বসে খায়। ডাইনিঙ হলের লম্বা টেবিলের মাঝখানে কাপ্তান, পাশে জ্যাক, এ-পাশে চিফ-অফিসার, জ্যাকের পাশে সেকেন্ড। এভাবে থার্ড, মার্কনি সাব, ওপাশে চিফ এনজিনিয়ার, দু’পাশে সেকেন্ড থার্ড এবং এভাবে ফোর্থ ফিফথ্। স্টুয়ার্ড মেনু রেখে যায় প্রত্যেকের সমানে। টাইপ করা মেনুর কাগজটা হলদে রঙের থাকে। এবং ওপরে নানাবর্ণের আলো। ব্যান্ড বেজে উঠলেই কোন বড় হোটেলের একটা নাচের ঘর হয়ে যেতে পারে। জ্যাককে দেখা যায় তখন চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে।

    আর এটা কেন যে হয়, জ্যাক ভারি সুন্দর; ‘মেজ-মালোম এ জাহাজে উঠেই কেমন সেই মেয়েলি চুলের গন্ধটা জ্যাকের কাছে গেলে তখন পায়। তার তো সাহস হয় না,সে বলতে পারে না, জ্যাক তুমি কি কেবিনে কোন মেয়ে নিয়ে রাত্রিবাস কর। তোমার শরীরে এমন গন্ধ কেন। তুমি তো বালক, সাবালকের কোন চিহ্নই দেখা যাচ্ছে না। বরং তোমার কোমর ভীষণ সরু, তুমি বেশ মেয়েদের মতো মাঝে মাঝে হেঁটে যাও। এটা কি তোমার এ জাহাজে একটা ভীষণ নেশা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য করা। তোমার এটাকে কি বলব, এই পেছন টেছন বলতে পারি, বেশ ভারি হয়ে উঠছে। জাহাজিরা যে কি এখন করে! আসলে সেও জ্যাককে ভয় পায়। ভীষণ আদুরে ছেলে। কাপ্তান তো সেদিন দেখেও কিছু বলল না, মেজ-মিস্ত্রি আর্চি বলেছে ইচ্ছা করে জ্যাক পা তার মাড়িয়ে দিয়েছে। এখন মেজ-মিস্ত্রি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। একেবারে থেতলে দিয়েছে নখটা।

    ওর উঠতে ইচ্ছা হচ্ছিল না, সে তবু উঠে পড়ল। পাশে তার কেউ নেই। ছোটকে, এনজিন- বড়-টিন্ডাল ধরে ধরে নিয়ে গেছে। ছোট বেশ ছেলে। ভীষণ লম্বা। একটু রোগা মতো। চোখ ভারি, নাক উঁচু, কপাল বেশ বড়। চিবুক বেশ ডিমের মতো। এবং মুখে সব সময় এক আশ্চর্য সুষমা বয়ে বেড়ায়। মানুষের মুখে, বিশেষ করে ওর মুখে নরম নীল রঙের গোঁফ দাড়ি মিলে সে যেন সুদূর এক পর্বতের গুহাবাসী মানুষের মতো জীবের কেবল মঙ্গল কামনা করছে। আগে মেজ ভাল করে দেখেনি, বাংকারে পড়ে গেলেই তার কিছু কাজ পড়ে যায়। ওদের ওষুধপত্র দেওয়ার একটা কাজ তাকে করতে হয়। ওতেই আসা যাওয়া। ছোটর চোখ দুটো ফোর-ক্যাসেলে গেলেই কেমন ব্যাকুলভাবে তাকাতো। সে যেতে যেতে ভাবল, সুন্দর মুখে ছোটবাবু এ-জাহাজে ক্রমে সবার প্রিয় পাত্র হয়ে উঠছে। কেবল একটা রাগ, মেজ-মিস্ত্রি পুষে রেখেছে। সে যখন ডেকের ওপর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে তখন এটা বোঝা যায়।

    তবু সে নানাভাবে ভাবতে ভাবতে এলি-ওয়েতে ঢুকে গেল। এনজিনে কোন শব্দ নেই। সে যে হেঁটে যাচ্ছে, সে নিজের জুতোর শব্দ পাচ্ছে। কেবিনের ভেতর কেউ এখনও আছে। তার চলাফেরার শব্দ সে যেতে যেতে পাচ্ছে। ঠিকঠাক পোশাক না পরে গেলে, কাপ্তান ভীষণ ক্ষেপে যায়। এখন ওকে কেবিনে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে রাতের পোশাক পরে নিতে হবে। এবং সে যখন টিপটপ হয়ে বের হয়ে এল, বয় বাবুর্চিদের খুব দৌড়াদৌড়ি। আসলে কাপ্তান এসে অনেক আগেই বসে থাকেন। একটু গল্পগুজব করা, এই যে পৃথিবীর চারপাশটা সারাজীবন ধরে দেখে ফেলার পর নানারকমের গল্প মাথায় গিজ গিজ করছে, এ সব ঠিক বলতে না পারলে জাহাজি জীবনে মজা পাওয়া যায় না। জ্যাক কাছে থাকলে একরকমের গল্প, এই মাছ টাছের গল্প, তিমি মাছ, শুষোক মাছ, অথবা সিল মাছের গল্প, অথবা নানাবর্ণের সব যে দ্বীপ, তার গাছপালা পাখি এবং যেতে যেতে যে মনে হয় অনেক দ্বীপে একটা কাক পর্যন্ত নেই, কেবল, নিশিদিন সমুদ্রে একা থেকে থেকে কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে, এবং সেখানে যদি কেউ ভেড়ার পাল নিয়ে যায়, আর হাতে সুবর্ণ লাঠি থাকে, তবে কোন বাইবেলে বর্ণিত মেষপালকের মতো দেখাবে। আর জ্যাক না থাকলে অন্য রকমের গল্প। জ্যাক অনেক সময় তাড়াতাড়ি নিজের কেবিনেই খেয়ে নেয়। এতে কাপ্তান অমত করেন না। কেউ কিছু বললে, বলেন, ছেলেমানুষ সন্ধ্যা হলেই ঘুম পায়।

    অথচ মেজ-মালোম দেখেছে, জ্যাক বেশ রাত করে ঘুমোয়। ওর পাশের কেবিনে বড় বড় সব লকার। বিচিত্র সব বই। সে বই পড়তে ভালোবাসে। আর বিস্ময়ের ব্যাপার জ্যাক এমন সব বই পড়ে যাতে শুধু সমুদ্রের কথাই আছে। সে কিনারার কথা জানতে চায় না। তার মনে হয় না, বড় একঘেয়েমি এ ভাবে চলা। গত সফরের আগের সফরে সে জ্যাকের সঙ্গে এই জাহাজেই ছিল। সে দু-সফর দিয়েছে এই জাহাজে। জ্যাককে সে দুবার দেখেছে। এবার জ্যাকের শরীরে আরও বেশি ভালবাসার কথা লেখা আছে যেন। সে জ্যাক কাছে এলেই কেমন টের পায় মানুষেরা পৃথিবীর চারপাশে, বনে জঙ্গলে, কোন দ্বীপে, কোন নির্জন পরিত্যক্ত জাহাজে শুধু মেয়েদের কথাই কেবল ভাবে। জ্যাককে দেখতে বেশ মেয়েলি মেয়েলি। কিন্তু জ্যাকের কথাবর্তা পুরুষের চেয়েও কঠিন। জ্যাক খুব আস্তে আস্তে কথা বলে। খুব ওজন রেখে কথা বলে। সে বোঝে, সে জাহাজের সর্বময় কর্তার ছেলে। সে খুব একা একা থাকতে ভালোবাসে। বোধহয় জ্যাকের ভীষণ অহঙ্কার—সে, অহঙ্কারে ডেকের ওপর পা না ফেলে লাফিয়ে লাফিয়ে যায়। মনে হয় না, জ্যাকের ভিতর এই একাকীত্বের কোন দুঃখ আছে। তখন জ্যাক শান্ত, গম্ভীর, নিরীহ আবার চঞ্চল কখনও। জ্যাককে বোঝা মুস্কিল।অনলাইনে বেস্টসেলিং বই কিনুন

    মেজ-মালোম তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল। সে তার ড্রিংকস বোট-ডেকে পাঠিয়ে দিতে বলল। মেসরুম- বয়, একটা ইজিচেয়ার, একটা টিপয়, একটা গ্লাস, আর রেশনের মদ রেখে এলে বেশ যেমন একজন মানুষ, চার ফেলে বড়শিতে মাছ ধরার জন্য একটা সিগারেট খেতে খেতে বের হয়ে যায়, তেমনি মেজ-মালোম দূরবীন হাতে ওপরে উঠে গেল। কিন্তু কিছু দেখতে পেল না।

    তখন কেউ যেন বলে, এনি ওম্যান সেকেন্ড।

    —নো।

    —ইফ এনি ওম্যান?

    —ডাকব। তাবৎ মনুষ্যকুলকে ডেকে বলব, এস, দ্যাখো।

    জ্যাকও একবার বলে গেছে। এনি ওম্যান।

    —নো।

    —এনি ম্যান।

    —ম্যান।

    —ইয়েস ম্যান।

    মেজ-মালোম বলল, ম্যান দিয়ে কি হয়।

    জ্যাক বলল, ছোটকে কেমন দেখলে?

    —ভাল।

    মেজ-মালোম বুঝল এখানেই জ্যাকের অহঙ্কার। কোন প্রশ্ন শুনতে সে চায় না। কাপ্তানের সে ছেলে, এটা মনে হতেই সে বুঝিয়ে দিয়েছে, সব প্রশ্নের জবাব তাকে দিতে হবে এমন কথা নেই।

    —ছোট কি দেখছিল দূরবীনে?

    —ওকে পাহারায় রেখেছিলাম। যদি মেয়েটেয়ে চোখে পড়ে।

    —ন্যাস্টি।

    মেজ-মালোম বলল, ভীষণ ভালো, ভীষণ ভালো। বলে জিভে মেজ চুক চুক করতে থাকল। সে ড্রিংক করছে, চোখ বুজে ড্রিংক করছে। তার এখন দূরবীনে চোখ রাখতে ভাল লাগছে না।

    জ্যাক প্রায় দৌড়ে তার কেবিনে ঢুকে গেল। সে দরজা বন্ধ করে দিল। পোর্টহোল খোলা। ভীষণ গরম বলে পোর্টহোল খোলা রাখতে হয়। পাখা ঘর ঠান্ডা রাখতে পারে না। তবু জ্যাক পোর্টহোল বন্ধ করে দিল। কাচের ওপর পর্দা টেনে দিল। বড় আয়না সামনে। সঙ্গে এটাচড বাথরুম। সে এখন ভাবল ঠান্ডা জ্বলে ভাল করে হাত মুখ ধোবে। এইসব ইন্ডিয়ান নেটিভদের সেকেন্ড বাজে সব ব্যপার শেখাচ্ছে। সেকেন্ড অফিসারের দুরবীনে মেয়েমানুষ খোঁজা কেমন তার অহঙ্কারে লাগে।

    সে রাগেই হোক, দুঃখে হোক শরীর থেকে সার্ট খুলে ফেলল। একেবারে খালি গা। এও হতে পারে ভীষণ গরম বলে গায়ে জামা রাখা যাচ্ছে না। সারাদিন ডেকে পুরুষ সেজে থাকতে তার খারাপ লাগছে না। ডেকে যখন জাহাজিরা দুলে দুলে মাস্তুলে অথবা ফানেলে রঙ লাগায়, তখন তার মনে হয় সেও উঠে যাবে। কখনও কখনও উঠে যায়। নিচে তখন ডেক-সারেঙ ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। সে ভ্রূক্ষেপ করে না। তার ভাল লাগে এ-ভাবে দড়িদড়ায় লাফিয়ে লাফিয়ে যেতে। কিন্তু আজ এসেই কেন জানি ইচ্ছা হচ্ছে শরীরের যেখানে যে-ভাবে ভালবাসার আধারগুলো ক্রমে পুষ্ট হচ্ছে, সেগুলো দাঁড়িয়ে একটু দেখবে।

    সে আয়নায় দাঁড়ালে বুঝতে পারে বয়স অনুপাতে সে ভীষণ লম্বা। শরীর তার হালকা। খুব পরিমিত শরীর। মোটাও নয়, খুব রোগাও নয়। সে হাত লম্বা করে দিলে তাকে ব্যালাড সিংগারের মতো দেখায়। আশ্চর্যভাবে সে দাঁড়ালে দেখতে পায় আয়নায়, কি সুন্দর মসৃণ বুকের ভিতর ভালবাসার আধার সামান্য উঁচু হয়ে উঠছে, সে তখন হাত রাখে। এ-ভাবে হাত রাখলে ভাল লাগে সে যেন জানত না। আজ প্রথম তার এ-সব ভারি ভাল লাগছে।

    জ্যাক অন্যদিন পুরুষের মতো রাত্রির পোশাক পরে শুয়ে পরে। কিন্তু আজ সে তার নাইটি বের করে নিল। সিল্কের নাইটির রঙ একেবারে শরীরের রংয়ের সঙ্গে মিলে গেছে। সে যখন নাইটি পরে হেঁটে যায় তখন তার ইচ্ছা করে আলোগুলো কেবিনের জ্বালা থাক। সে যেদিকে তখন ঘুরছে তার চারপাশে একটা ছায়া ঘুরছে। মোমের পুতুলের মতো ছায়াটা চারপাশে ঘুরছে। এবং সে দেখতে পেল, তার পাতলা সিল্কের ভিতর দিয়ে আজানু স্ত্রীজাতির অহঙ্কার শরীরে ক্রমে দেখা দিচ্ছে। এখন যদিও অস্পষ্ট, এবং মাসকাল পার হলে সব স্পষ্ট হয়ে যাবে। সে এখনও ঢোলা জামাপ্যান্ট পরে না। এখনও তার তেমন সব পুষ্ট নয় বলে, প্রায় অঙ্কুরোদগমের মতো সারা শরীরে ব্যাপারটা নিয়ত ঘটছে বলে, সে বেশ হাল্কাভাবে চলাফেরা করতে পারে। তার কোন অসুবিধা হয় না।

    কিন্তু সে এভাবে কতক্ষণ যে বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। বাবা যত দিন যাবে তত ক্রমে চুল খাটো করে কেটে দেবে। চুল কাটবার সময় বাবার সঙ্গে ভীষণ ধ্বস্তাধ্বস্তি করেছে। কিন্তু সে যাই করে, কেউ কাছে না থাকলে করে। বাবার অপমান হোক সে সেটা চায় না।

    তবু কাপ্তান বলেছিল, বনি, চুল খাটো না করে দিলে তোমাকে ঠিক কেমন যেন দেখায়।

    —ভাল দেখায় না বাবা!

    —না।

    —ভাল না দেখাক, তুমি আমার চুল বেশি ছেঁটে দেবে না।

    —না বেশি ছাঁটছি না। দ্যাখ। বলে তিনি বনির চুল নেড়া করে দিতে দিতে বলতেন, আমি তখন জাহাজে তোর ডেক-এপ্রেন্টিস আছি! তখন ভাল চুল ছাঁটতে জানতাম না। ব্যাঙ্ক লাইনের লম্বা সফর। পোর্টে নেমে চুল কাটার সময় থাকে না। আমাদের চিফ-অফিসার বুঝলি, একটা ঘুঘু ছিল। সে আমাকে বলল, ওহে ছোকরা, জাহাজে উঠেছ, এ্যাপ্রেন্টিসগিরি করছ, চুল টুল কাটতে শিখেছ তো!

    —ওঃ ঘাড় ধরে গেছে!

    —এই হয়ে গেল, বলেই কাঁচি কচকচ করে চালাতে থাকলেন। —তারপর বুঝলি বনি, একখানা যা চুল ছেঁটে দিলাম না।

    —মানে!

    —মানে কাগে চুল ঠুকরে নিলে কেমন হয়। বড়র ঘাড় হেঁটে আমি প্রথম চুল কাটা শিখি। এখন তো সবারই ইচ্ছে চুল ছেঁটে দিই। আমার মতো জাহাজে কে এত ভাল চুল কাটে।

    এবং বন্দরে নেমে চুল ছাঁটা দায়। কারণ বেশ লম্বা পাড়ি। বুয়েনস-এয়ার্স না যাওয়া পর্যন্ত চুল ছাঁটার কথা ওঠে না। মাঝে যা সব বন্দর পাওয়া যাবে, সেখানে একদিন কি দুদিন হল্ট, কাপ্তান পর্যন্ত জানে না। এজেণ্ট অফিস বলতে পারবে ব্যাপারটা। এবং বেশ যখন চুল ছেঁটে কাপ্তান আয়নার কাছে গিয়ে বললেন, দ্যাখ কেমন সুন্দর চুল ছেঁটেছি, তখন বনির দু-পা ছড়িয়ে চিৎকার, চেঁচামেচি। সবাই ছুটেএসেছিল। পাশাপাশি যারা থাকে সবাই। স্টুয়ার্ড পর্যন্ত। কাপ্তান কেবল সবার সমর্থন চাইছেন, কি স্টুয়ার্ড, চুলটা সুন্দর দেখাচ্ছে না? এদিক থেকে দ্যাখো, হ্যাঁ ঠিক হেঁটেছি না? এই যে মেজ এসে গেছ, তুমি বল তো কেমন হয়েছে?

    —বা বেশ! সুন্দর! একেবারে বাটি ছাঁট।

    —বাটি ছাঁট মানে? কাপ্তান প্রশ্ন করলেন।

    —ইন্ডিয়ার রাজা মহারাজারা যেসব ছাঁট ফাটে চুল কাটে।

    —তবে! তুমি জ্যাক কেবল লাফাচ্ছ।

    অগত্যা জ্যাক কি করবে। সে সবার সামনে কাঁদতে পারে না। অহঙ্কারে লাগে। সে চুপচাপ উঠে যায়। এবং পরে ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ালে তার হু-হু করে গলা বেয়ে কান্না উঠে আসে। তার এমন সুন্দর চুল বাবা জাহাজে উঠেই ক্যাচ ক্যাচ করে ছেঁটে দিয়েছে। বাবার একবার হাত পর্যন্ত কাঁপল না।

    বনি এখন নিজের কেবিনে এ সব নিয়ে ভাবে না। বোধহয় বাবা খেয়ে-দেয়ে কেবিনে যাচ্ছেন। পাশের ল্যাডার দিয়ে ব্রীজে উঠে যাবার পথ। বোধহয় কোন কাজে কোয়ার্টার মাস্টার সিঁড়ি ধরে উঠছে। কেবিনে বসে সে সব টের পায়। জুতোর শব্দ প্রায় তার সব মুখস্থ, বাবা না সেকেন্ড অফিসার, না চিফ, না থার্ড অফিসার অথবা যদি কোয়ার্টার মাস্টার হয় তবু সে টের পায়। দরজা না খুলেও টের পায় কে যাচ্ছে। তার দরজা বন্ধ। দরজার সামনে দাঁড়াবার সাহস কারো নেই। সে এখন এ- কেবিনে সোজা লম্বা হয়ে শুয়ে পড়বে। তার টিপয়ে জল। সে শুলে পায়ের কাছে বড় আয়না, বেশ পালিশ করা দামী মেহগিনি কাঠের বাঙ্ক। একেবারে সাদা বিছানা। প্রতিদিন সকালে চাদর, বালিশের ওয়ার পাল্টে দিয়ে যায় কাপ্তানবয়। সে অন্যদিন আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। কিন্তু আজ তার কেন জানি ঘুমোতে ইচ্ছা করছে না।

    সে কেবিনের সবকটা আলো জ্বেলে দিল। দুটো আলো পাশাপাশি লাল নীল রঙের। একটা সাদা ডুম, কারুকার্য করা কাচের ঝালরে ঢাকা। আর ঠিক আয়নার সামনে কালো রঙের বাতিদানের ওপর হলুদ রঙের ডুম। ফুল স্পিডে সে পাখা ছেড়ে দিল। হাওয়া পাইপের মুখ ভাল করে ঘুরিয়ে দিল। তারপর সুন্দর প্রসাধন করে সে এসে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।

    তার শরীরে সোনালি গাউন। সিল্কের পাতলা গাউনের ভেতর ওর আশ্চর্য শরীর দেখা যাচ্ছে। খুব হাওয়া, প্রায় ঝড়ের মতো হাওয়ায় চুল, চাদর, পাতলা গাউন সব উড়ছে। সে আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে। আয়নায় তার প্রতিবিম্ব ভাসছে। আয়নায় সে নিজেকে এমনভাবে দেখে কেমন মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। যদিও সুন্দর চুলের জন্য ওর ভারি মায়া হচ্ছিল, তবু এমন একটা পোশাকে সে ভীষণ বিহ্বল হয়ে গেছে। ওর মনে হচ্ছিল, হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে। অথবা গভীর সমুদ্রে সে ডুবে যাচ্ছে। চারপাশে নীল জল, কারণ ঘরের আলোটা এক নীল জলের আভার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে কেবিনে, সে তার ভিতর শুয়ে আছে, চারপাশে এখন সমুদ্রের মাছেরা ঘোরাফেরা করছে যেন। কোনও মাছ ওর খুব কাছে। তেমন সুন্দর মনে হচ্ছে না। কেবল একটা রুপোলি মাছ অনেক দূরে। ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কাছে আসতে সাহস পাচ্ছে না।

    সহসা বনির মনে হল, সে এলিস ইন ওয়ান্ডার ল্যান্ড হয়ে গেছে। আবার সে যেন দেখতে পাচ্ছে আয়নায়, সেই ছোট্ট রাজকুমার যার একটা ছোট্ট গ্রহে বাস, যে সহসা পৃথিবীতে এসে আটকে পড়েছিল—যেতে পারছিল না, আর নানাভাবে প্রশ্ন পৃথিবীর সেই বিমানচালককে, অর্থাৎ বাওয়াব গাছের আগাছা ভীষণভাবে অনিষ্ট করে যাচ্ছে তার গ্রহে। একটাই গাছ সারা গ্রহে, এত ছোট্ট গ্রহ যে সেখানে এত বড় গাছ থাকা ঠিক না, ওর আগ্নেয়গিরি আছে একটা, যা অনায়াসে বাওয়াবের পাতায় ঢেকে রাখা যায়,

    নদী আছে, যা সে ইচ্ছা করলেই ইউকনের পাতায় ঢেকে দিতে পারে—এমন একজন ছোট্ট রাজপুত্র তার পায়ের কাছে কেন যে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। সে ভেবে পায় না, চোখে তার এমন সব স্বপ্ন জড়িয়ে আসছে কেন! কেমন তার ভিতরটা ভীষণ আবেগে কাঁপছে। সে বুঝতে পারছে শরীরে এক অতীব উত্তেজনা। সে পৃথিবীতে এমন একটা সুন্দর মানুষ আছে জানত না। ভারি আরামে তার ঘুম আসছে। ছোট্ট রাজপুত্র, তার পৃথিবীতে এসে আটকে গেছে। তার নিজের গ্রহে আর ফিরে যেতে পারছে না। বনি স্বপ্নের ভেতর কেবল হাসছে, হেসে চলেছে। সে আলোর ভেতর দু’হাত বুকের ওপর রেখে কেবল এক অসমতল অমসৃণ পাহাড়ের চারপাশে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর তার কি যে মনে হচ্ছিল না! ছোট্ট রাজপুত্রের জন্য ভেতরে ভেতরে একটা মায়া গড়ে উঠছে। সে নিজেও সেটা কিভাবে কখন হয়েছে জানে না।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    ।। পাঁচ।।

    ঠিক এ-সময়ে জাহাজে নানা জায়গায় নানা কাজ। যেমন, মৈত্র বৌকে চিঠি লিখছে, শেফালি আমরা কলম্বো বন্দরে আজ পৌঁছেছি। কাল আবার নোঙর তুলব। জাহাজে রসদ উঠলেই আমাদের কাজ শেষ। এখানে আশা করেছিলাম তোমার চিঠি পাব, কিন্তু কেন যে পেলাম না। চিঠি না পেলে ভীষণ খারাপ লাগে। ভাল লাগে না। আমরা লরেঞ্জু-মরকুইসে যাচ্ছি। ঠিকানা দেওয়া থাকল। গিয়ে যেন তোমার অন্ততঃ তিনটে চারটে…..তুমি তো বলতে, রোজ একটা করে আমাকে চিঠি লিখবে। কেন যে তুমি চিঠি লেখ না। কি করে যে চিঠি না লিখে থাকতে পার। তারপরই মৈত্র সেই এক কথায় চিঠি শেষ করবে—আমার ভাল লাগে না শেফালি। তোমাকে ছেড়ে আমার কোথাও থাকতে ভাল লাগে না।

    রাত বাড়ছে। সকালে এজেন্ট অফিসের লোক আসবে। যে যার চিঠি ফোকসালে লিখতে বসে গেছে। ছোটবাবুর কাছে লাইন দিয়েছে কেউ কেউ। ছোট-টিণ্ডাল দুবার ঘুরে গেছে। এখনও বেশ ভিড়। ভিড় না কমলে সে ঠিক ঠিক লেখাতে পারবে না। চিঠি লেখার সময় কেউ পাশে থাকুক সে চায় না। ছোট-টিণ্ডাল বাদশা মিঞার কপালে সেজন্য ঘাম। তাকে খুব উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। সে চিঠি এখন লিখিয়ে না রাখাতে পারলে সকালে আর সময় পাবে না। দরজার গোড়ায় খুব ভালো মানুষের মতো সে দাঁড়িয়ে আছে এখন।

    সবার হলে ছোটবাবু ডাকল, আসুন চাচা।

    বাদশা মিঞা ওকে হাতের ইসারায় ডাকল। ছোট বলল, কি ব্যাপার!

    —আস না!

    সে, ছোট-টিণ্ডালের পিছু পিছু উঠে গেল। টিণ্ডাল, ফোকসালে ঢুকে বলল, দরজাটা বন্ধ কইরা দেই।

    ছোটবাবু বলল, কেন? দরজা বন্ধ করার কি আছে।

    —তোমারে কই নাই, একটা কথা কমু, কেউ জানে না। তুমি জানবা কেবল। আমার বিবির কাছে একটা খত লিখা দেও।

    —সেটা তো সবাই জানে।

    –কেডা জানে?

    —সবাই জানে চাচা। আমি তো জানি, জাহাজে উঠেই জানি, তুমি তোমার চার নম্বর বিবির কাছে খতটত লেখাতে চাও।

    —এডা মনু মিঞার কাজ।

    —মনু কেন হবে!

    —না, ওডা আমার দ্যাশের লোক।

    —মনু বলে নি।

    —তবে কেডা কইছে কও। তারে একবার মোকাবেলা করি।

    —সে যেই বলুক। এতে লজ্জার কি আছে।

    —নারে বাজান, জাহাজে তুমি মানুষ চিন না। শালারা সব ইবলিশের বাচ্চা। কথা নাই বার্তা নাই, পিছনে লাগে।

    —কেউ লাগবে না।

    —তা তোমার শরীরডা ভাল না। দু’লাইনে লিখা দ্যাও। ভাল আছি। ডারবানের ঘাটে, বড় কইরা একটা খত লিখা দিয়। বিবির বড় খত না পাইলে মন ভরে না। আর শোন তুমি লিখা দিয়, তোমার শরীরটা ভাল না বইলা বেশি কিছু লিখতে পারলাম না।

    ছোটবাবু হেসে বলল, ঠিক আছে লিখে দেব। এবং খুব সংগোপনে প্রায় ফিস ফিস গলায় অজস্র কথা বলে গেল ছোট-টিণ্ডাল। মৈত্রকে ছোট-টিণ্ডাল ভীষণ ভয় পায়। এখনই হয়ত মৈত্র এসে ছোটবাবুকে ডেকে নিয়ে যাবে। এবং ধমক দেবে, তোমার আক্কেল নেই মিঞা। একটা অসুস্থ মানুষকে নিয়ে তুমি টানাটানি করছ।

    ছোটবাবু তাড়াতাড়ি খতটা লিখে দিতেই ছোট-টিণ্ডাল দাঁত বের করে হাসল। ছোটবাবু দেখল, দু’পাশের চার-চারটা দাঁত ওর সোনায় বাঁধানো। হাঁ করলে জিভটা বের হয়ে আসে। ওর মুখে নানা রকমের দাগ। এবং দেখলে বোঝাই যায়, সমুদ্রে সে ঘুরে ঘুরে নোনা জলের স্বাদ ঠিক ধরতে পেরেছে। সে একটার পর একটা নিকা করেছে। সে কাউকে তাড়ায় নি। সে চিঠিতে সবার খবর নিয়েছে।

    বাদশা মিঞাকে ছোটবাবুর খারাপ লাগল না। ছোটখাট মানুষ। চল খুব ছোট করে ছাঁটা। দাড়ি নেই, গোঁফ নেই। বোধ হয় এটা ওর এ-বয়েসেও ওঠে নি। বয়স ষাটের ওপর হবে। নলিতেও কারচুপি—বয়স কমিয়ে রেখেছে। সমুদ্রের ঝড়ে-জলে মানুষটা ভীষণ দক্ষ। ওর চার নম্বর বিবির বয়স খুব যে কম এবং প্রায় বালিকা, এটা চিঠির সব কথাবার্তা থেকে ছোটবাবু ধরে ফেলেছে। সে বলল, চার নম্বর চাচি আপনাকে খুব ভালোবাসে?

    বাদশা মিঞা কেমন ছেলেমানুষের মতো মুখ নীচু করে রাখল। যেন এটা বলে ছোটবাবু ওকে ভীষণ লজ্জা দিচ্ছে। ভালবাসার কথা মুখে বলে ছোট করতে চায় না বিবিকে।

    ছোটবাবু বলল, আমি ঠিক লিখে দেব। আপনার কোন ভাবনা নেই। এবং এই বলে সে বের হয়ে এসেই দেখল, ফোকসালে অমিয় নেই। কোথাও সে পালিয়ে সেই ছবিগুলো বোধ হয় দেখছে। এ সব ছবি কোথায় যে পাওয়া যায় ছোটবাবু জানে না। বীভৎস সব ছবি যোগাড় করেছে বন্ধু। সে একবার অমিয়কে দেখাবে বলে এসেও ছিল। ছোটবাবু কাছে ছিল বলে অমিয় আমতা আমতা করেছে। এবং যখন গিয়ে দেখল, অমিয় নেই তখন সে ঠিক ভেবে নিল, বন্ধু ওকে নিয়ে গেছে। ওরা একসঙ্গে লুকিয়ে সেই সব ছবি দেখছে। উলঙ্গ এবং নগ্ন সেই সব ছবির ভেতর অমিয় বেশ আছে। ছোটবাবু ফোকসালে ঢুকে এবার শুয়ে পড়ল। মৈত্র বলল, এলি।

    ছোটবাবু বলল, হ্যাঁ।

    —কি লিখাল রে বাদশা মিঞা।

    —জাহাজের খবর-টবর দিল।

    —ওর চার নম্বর বিবির কথা তোকে কিছু বলে নি!

    —বলেছে। ওকেই তো চিঠি।

    –তোকে বলে নি, কাউকে বলবে না।

    —তা বলেছে।

    —ওর এই কারবার। সবাইকে বলবে। এখন ওর দুটো কাজ এমন বলবে। একটা কাজ বড় বেটার সাদি, দু নম্বর কাজ, চার নম্বর বিবির পেটে একটা বাচ্চা—এই হলে তার হয়ে গেল।

    —সে আর কিছু চায় না!

    —না। বলেই বলবে, কাউকে বলবে না, অথচ ও নিজেই বলে বেড়ায়।

    —এমন স্বভাব কেন!

    —ওর ধারণা, এই বয়সে চার নম্বর বিবি ঘরে এনে একজন সাচ্চা মরদের মতো কাজ করে ফেলেছে। সেটা ও জাহির করতে চায়।

    —কিন্তু আমাকে যে বলল, জাহাজের সব শালা ইবলিশের বাচ্চা।

    —ও ওমনি বলে। আসলে একটা আস্ত শয়তান। না হলে কেউ এমন বয়সে তার নাতনির বয়সী একটা মেয়েকে সাদি করতে পারে!

    ছোটবাবুর হাই উঠছিল। ওর ঘুম পাচ্ছে। জলের ছলাত ছলাত শব্দ আসছে। জলের ঢেউ মাঝে মাঝে ধাক্কা মারছে বলে হালটা নড়ছে। এবং সেজন্য স্টিয়ারিং এনজিনের শব্দ আসছে। পাশাপাশি ফোকশালগুলোতে জাহাজিরা গল্প করছে। সবই দেশ-বাড়ির গল্প। মাছের গল্প। কেউ কেউ সময় পেয়ে গল্প করতে করতে জাল বুনছে। কেউ হয়তো এখন ওপরে কোরান শরিফের ব্যাখ্যা শুনছে, অথবা ইমানদার মানুষ হবার জন্য এ-সফরে কোরান শরিফ পড়াটা রপ্ত করে ফেলা ভাল। সময় পেলেই মাদুর বিছিয়ে ডেক-সারেঙের সামনে তারা বসে থাকছে।

    তখনই ছোটবাবুর মনে হল, মাকে সে একটা চিঠি লিখতে পারে। সে সবার মতো লিখল না, আমার ভাল লাগছে না, কবে যে দেশে ফিরব জানি না। সে লিখল, মা আমি ভালো আছি। আমার টাকা হয়তো পেয়েছ। ভাইদের পড়া বন্ধ করে দিও না। জ্যাঠিমাকে বলবে যেন আমার জন্য চিন্তা না করে। বড়দা মেজদার খবর দিও। আমি মা যাচ্ছি দক্ষিণ আমেরিকা। কলম্বো থেকে জাহাজ কাল ছাড়ছে। কত বড় সমুদ্র মা, কত বড়, সমুদ্রে না এলে বোঝা যায় না। বাবা করে বাড়ি এসেছিল জানিও। জ্যাঠামশাইর জন্য খুব খারাপ লাগে মা। জ্যাঠামশাইর শরীর কেমন আছে জানিও। জাহাজে আমার মৈত্রদা আছে। অমিয়, বন্ধু, সারেঙসাব, মেজ-মালোম সবাই আমাকে খুব ভালবাসে। আমার জন্য তুমি একেবারে চিন্তা করবে না। সফর শেষে যখন ফিরব ওঃ কি যে ভাল লাগবে না। শেষ করল এই বলে, মা আমি এখন জাহাজি।

    এ-ভাবেই জাহাজে জাহাজিরা চিঠি লিখে থাকে। সকালের দিকে নৌকায় সব কাঠের হাতি, ময়ূরের পালখ কিনার থেকে এল। মৈত্র ভেবেছিল নেবে, কিন্তু সে যে একটা সঙ্গে ভীষণ দরকারী জিনিস নিয়ে যাচ্ছে। এটা সে জাহাজে উঠলেই লুকিয়ে নিয়ে যায়। এবারও গোপনে নিয়েছে। কাঠের হাতি, ময়ূরের পালখ নিয়ে কি আর হবে! সে কিছু নিল না। অন্য জাহাজিরা সব নিতে গিয়ে দেখল, রসদ আসছে। রসদ উঠছে জাহাজ-ডেকে। মেজ-মালোম ছুটোছুটি করছে। ঠিক রোজকার ঘটনা, অর্থাৎ ডেক- টিণ্ডাল যাচ্ছে আগিলে। কশপ যাচ্ছে, হাতে রঙের টব নিয়ে। বন্ধুর কি কাজ জানে না। সে মেসরুমে বসে রঙের টব ঢোলের মতো বাজাচ্ছে।

    আর গান গাইছে অমিয়। যেন এখন ওদের এই জাহাজে এ-সব ঘটনা রোজ ঘটবে। নামাজ পড়ছে দু’নম্বর ‘পরী’র মানুষেরা। ওরা সকালে চাপাটি খেয়েই নামাজ পড়তে বসে গেছে।

    তখন দেখা যাবে নেমে আসছে জ্যাক। সে এদিকে পাখিগুলোর খাঁচায় মাংস দিয়ে যাচ্ছে। রসদ তোলা হলে, মেজ-মালোম বোট-ডেকে সেই দুরবীন চোখে বসে গেল। তারপর জাহাজ ছাড়লে এক নিত্য দিনের ঘটনা! কবেতক যে আবার জাহাজ বন্দর পাবে কেউ জানে না। জাহাজ সমুদ্রে চলছে তো চলছেই।

    তখন জাহাজ গভীর সমুদ্রে। দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। মৈত্র ওয়াচ শেষ করে ফিরেছে। অমিয় এসে চুপি চুপি ওর লকারে কি যেন রাখছে। আজকাল অমিয়র এটা হয়েছে। সে সবার সামনে লকার খোলে না। কিন্তু রবিবার ইন্সপেকসনের দিন থাকে। কাপ্তান, মেজ-মালোম, বড়-মালোম সবাই সার বেঁধে নেমে আসে। সব সাফসোফ আছে কিনা ঠিক আছে কি না দেখে। তাছাড়া কোথায় কি আবার ভাঙছে, ঘুরে ঘুরে এটাও কাপ্তান দেখতে চান। ইন্সপেকসনের সময় লকার খুলে রাখার নিয়ম। অমিয় লকার খুলতে চায় না। সে সারেঙকে বলেছে, চাবি পাচ্ছে না। আসলে চাবিটা ওর কাছেই ছিল। অমিয় যে কেন এমন একটা মিথ্যা কথা বলল সে ভেবে পায় না।

    ছোটবাবু দেখল, অমিয় কি সব ভিতরে রেখে দিচ্ছে। কি রাখছে সে টের পেল না। ছোটবাবু বলল, কি রাখলি অমিয়?

    —কৈ কিছু নাতো।

    ছোটবাবু আর কিছু বলল না। অমিয় পাশের ঘরে ওয়াচের নোংরা জামা প্যান্ট ছেড়ে স্নান করতে গেলে মৈত্রকে বলল, অমিয় কি নিয়ে আসে সঙ্গে?

    —কি আবার নিয়ে আসে! বাংকারে কি এমন আছে, শুধু তো কয়লা।

    —কিছু নিয়ে আসে।

    মৈত্র বলল, মরুক গে। জাহাজে উঠলেই নানারকম অসুখে ভোগে মানুষ। এ-নিয়ে তোমার মাথা ঘামাতে হবে না ছোটবাবু। ওপরে যাও। কাল থেকে তো তোমার আবার ওয়াচ।

    ছোটবাবু এবার ওপরে উঠে গেল। থালা-বাসন ধুয়ে ভাণ্ডারীর কাছ থেকে ‘বিশু’র মাংস নিয়ে নিল। কফি ভাজা, ডাল আর ভাত। মাংস নেবার সময় সে বলল, চাচা বিফ না মটন?

    ভাণ্ডারী গলা বাড়িয়ে দেখল ছোটবাবুকে। মেসরুমের সঙ্গে গ্যালির একটা জানলা থাকে। তার ফাঁকে গলা বাড়িয়ে বলল, বিফ। তারপর ফের কচ্ছপের মতো সে গলা ভেতরে নিলে ছোটবাবুর কেমন রাগ হল। রোজ রোজ বিফ। সে বলল, চাচা আমাদের জন্য মটন নিতে পার না। কি দিয়ে খাই বলতো!

    —দেয় না। ভাণ্ডারী সারেঙের চায়ের জল গরম করছে। পাশের উনুনে সে আর এক ডেকচি ভাত সেদ্ধ করছে। তামার বড় ডেকচি। ছোটবাবু কি বলছে, ঠিক মতো শুনতে পাচ্ছে না। সে ফের গলা বের করে বলল, কি বললে?

    —আমাদের জন্য মটন নিতে পার না?

    এবার ভাণ্ডারী কেমন রেগে গেল। বলল, আমারে কিছু কইবা না। সারেঙ-সাব কিছু করতে পারে না! তোমরা যাও, মাস্তার দ্যাও। কও, মটন না দিলে চলব না।

    —চলব না তো বলিনি। তুমি তো জানো বিফ আমি খেতে পারি না, অমিয় খায় না। কেবল মৈত্রদা খায়।

    —থাকতে থাকতে তুমিও খাবে। তারপর ভাণ্ডারী আর কোন কথা বলল না। সে এত রোগা মানুষ আর সে এত বেশি রগচটা যে কথা বলা দায়। এখনই হয়ত কিছু বললে ক্ষেপে যাবো, ছোটবাবু ভয়ে ভয়ে মাংসের ডেকচিটা নীচে রাখল। তিনটে থালায় সে ভাত নিল, ডাল নিল, কফি ভাজা নিল। সে কফি ভাজা ডাল এই দিয়ে ঠিক খেয়ে নেবে।

    মৈত্র এসে আজ আবার ক্ষেপে গেল ছোটবাবুর ওপর। আমাকে তোরা কি পেয়েছিস? ছোটবাবু বুঝতে না পারে তাকিয়ে থাকল।

    —আমি কি মানুষ না! এতটা গোস্ত আমার জন্য রেখেছিস।

    ছোটবাবু বলল, কে খাবে। তুমি না খেলে কে খাবে। আমি খাই না,অমিয় খায় না!

    —কেন অমিয় খায় না, কেন তুই খাবি না!

    —আমার ভাল লাগে না। এবং এখনই হয়তো ফের মৈত্র মেসরুমে হৈ-চৈ বাধিয়ে দিতে পারে। সারেঙের সাত পুরুষ উদ্ধার করতে পারে। এবং মৈত্র ক্ষেপে গেলে সারেঙসাব একবারে কোন রা করেন না। সারেঙসাব ইচ্ছে করলেই এদের জন্য আলাদা মটনের ব্যবস্থা করতে পারে। হিন্দু পোলাদের জাত মারতে চান তিনি। বিফ খাওয়াবার এমন একটা সুযোগ তিনি ছাড়তে চান না। অর্থাৎ এমন সব কথা মৈত্র তখন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলবে। সারেঙসাব রেলিংয়ে ভর করে তখন সমুদ্র দেখেন। তিনি মনে করেন, মৈত্র ভীষণ গোঁয়ার,ওর সঙ্গে কথায় পারা যাবে না। তিনি যে ভীষণভাবে চেষ্টা করেছেন, কলম্বোতে রসদ নেবার সময় বার বার বলেছেন, জাহাজে যখন হিন্দু নাবিক আছে, তখন কিছু অন্তত মটন নেওয়া হোক। একেবারে যে না নেওয়া হয়েছে তা না, তবু ডারবান পর্যন্ত এই রসদেই চালিয়ে নিতে হবে। বিফ সস্তা বলে, কোম্পানি রেশনে বেশি বিফ দেওয়া পছন্দ করে। সারেঙের কথায় কি হবে! আর্টিকেল বদলাতে না পারলে কিছু হবে না।

    সারেঙসাব এই নিয়ে মৈত্রের সঙ্গে ঝগড়া করতে পারেন। বয়স মানুষকে নানাভাবে ধার্মিক করে রাখে। অযথা চিল্লাচিল্লি তাঁর পছন্দ না। ছোটবাবু এ-সব বোঝে। বোঝে বলেই বলল, তুমি মৈত্রদা এ নিয়ে ঝামেলা কর না। তোমার অযথা ঝামেলা করার স্বভাব।

    —আমার অযথা ঝামেলা করার স্বভাব!

    —তাই তো।

    —আমার কচু। জাহাজে এয়েছিস, মরবি। বলে দিলাম, মরবি। কেউ রক্ষা করতে পারবে না।

    ছোটবাবু বুঝতে পারে না, এই কথায় এত উত্তেজনা হয় কি করে! মৈত্রদা এখন ভীষণ গোগ্রাসে খাচ্ছে। বড় বড় মাংসের টুকরো দিয়ে চটকে ভাত খাচ্ছে। সবটা মাংস সে খুব সহজেই খেয়ে বলল, এই ছোটবাবু, আমি হিন্দুর পোলা না। আমি বামুন না, আমার জাত নেই। সঙ্গে সঙ্গে এমন বিষম খেল যে মুখের সমস্ত ভাত চারপাশে ছড়াতে থাকল। অমিয় বলল, তোমার মৈত্রদা ব্লাড প্রেসার আছে। মাংসটা কম খাও।

    এত কাসছে, তবু কথা থামছে না মৈত্রের।—বিফ না খেলে জাহাজ চালানো যায় না। আমি, আমি হিন্দুর পোলা বলচি, বিফ না খেয়ে কয়লার জাহাজে কাজ করা যায় না। মটন, মটন চাই! কেন দেবে মটন! কেন দেবে। যখনকার যা, তোমাকে তাই খেতে হবে।

    এবার ছোটবাবু যেন না বলে পারল না, আচ্ছা খাব, কাল থেকে খাব। তুমি চোচমেচি করবে না তো। জলটা খাও। ছোটবাবু জল এগিয়ে দিল। তারপর মৈত্র একেবারে চুপ। সে আর কোন কথা বলতে পারল না। সে নিচেও গেল না। ছোটবাবু রেলিঙে ঝুঁকে আছে। আর সেই সমুদ্র, নীল আকাশ এবং যেমন মনে হয়ে থাকে অনেকদূর থেকে সারি সারি তিমি মাছের ঝাঁক জাহাজের পেছনে ছুটে আসছে, তেমনি সব ঠিকঠাক থাকলে ছোটবাবুর পাশে খোলা ডেকে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছা করে তার। মৈত্র ছোটবাবুর পাশে দাঁড়াতেই দেখতে পেল, অতিকায় সব সমুদ্রপাখি জাহাজটার পেছনে ছুটে আসছে। এ অঞ্চলে এদিক-ওদিক সব দ্বীপ,পাহাড় ছড়ানো। কি করে জাহাজের খবর পেয়েছে পাখিগুলো, খাবারের জন্য ওরা জাহাজটার পেছন নিয়েছে।

    সমুদ্র থেকে ঠাণ্ডা বাতাস উঠে আসছিল। চারপাশে সমুদ্র নীল জলের ভিতর যেন খেলা করে বেড়াচ্ছে। দূরে ওরা দেখতে পেল, ভেড়ার পালের মতো ডলফিন ভেসে বেড়াচ্ছে। ছোটবাবুর ইচ্ছা একটা তিমি মাছ যদি এ-সময় সমুদ্রে ভেসে ভেসে দিগন্তের দিকে চলে যেত, বেশ মজা হত তবে। এখন মনে হচ্ছে কোথাও কেউ রেকর্ড-প্লেয়ার বাজাচ্ছে। জ্যাক মাঝে মাঝে যখন একঘেয়েমি ঠেকে, বোট-ডেকে বসে বেহালা বাজায়। আসলে বেহালাটা কাপ্তানের। তিনি মাঝে মাঝে তাঁর ঘরে বসে বাজান। সবারই এই দূর সমুদ্র যাত্রায় কিছু না কিছু নেশা আছে। যেমন জ্যাক ভাল নাচতে পারে। একদিন জ্যাক বোট-ডেকে পায়ে খড়খড়ি লাগিয়ে নেচেছে। আজ জ্যাক, বোট ডেকে বসে আছে। জাহাজ জিরো ডিগ্রী পার হয়ে এসেছে। গরমটা এখন তেমন নেই। জ্যাক, একটা কালো রঙের প্যান্ট পরেছে। লতাপাতা আঁকা জামা গায়ে দিয়েছে। টাইটা বেশ লম্বা। জ্যাক এখন খুব সেজেগুজে থাকতে ভালবাসে। আর কেউ জানে না, জ্যাক বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে থাকতে ভীষণ ভালবাসে। সে সেখানে দাঁড়ালেই ছোটকে দেখতে পায়। সে ছোটকে আজকাল নানারকম ফরমাস করতে ভালবাসে।

    জ্যাক ডাকল, হাই।

    ছোট বুঝতে পারল, জ্যাক তাকে ডাকছে। সে দৌড়ে বোট-ডেকে উঠে গেল। বলল, জ্যাক আমাকে ডাকছ!

    —তুমি কি দেখছিলে?

    —কিচ্ছু না।

    —এটা ধরো বলে একটা রেকর্ড তার হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর জ্যাক নুয়ে কি একটা সুন্দর আই লাভ-টাব গোছের গান তুলে অন্য একটা রেকর্ড খুঁজে বেড়াল। তিন চারদিন আগেও এমনি হঠাৎ তাকে হাই করে ডেকেছিল। বলেছিল, তুমি দূরবীনে কি দেখেছিলে?

    —কিচ্ছু না।

    —কিচ্ছু দেখতে পাওনি?

    –না। একটা কুকুর দেখেছিলাম।

    —আর দেখবে না।

    —আমি ঠিক দেখতে চাই না। কিন্তু মেজ বললে…

    —মেজ বললেও দেখবে না।

    ছোট খুব ভাল ছেলের মতো ঘাড় কাৎ করে বলেছিল, আচ্ছা।

    আজ আবার কি জন্য ডেকেছে ছোট বুঝতে পারে না। বেশ শীত শীত করছে। সে হাতে একটা রেকর্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাপ্তান ব্রীজে পায়চারি করছেন। দুটো একটা নক্ষত্র আকাশে উঠছে। আকাশে বিন্দুমাত্র মেঘ নেই। এমন নির্মল আকাশ অনেকদিন দেখা যায়নি সমুদ্রে। এমন কি সমুদ্র এত শান্ত যে এখন ইচ্ছা করলে কাপ্তান, এক রবিবারে, ছোটখাটো একটা নাটক অভিনয় করিয়ে নিতে পারেন। ছোটখাটো স্ক্রীন টানিয়ে, ম্যাকবেথের কোন সিন, জ্যাক তো মুখস্থ বলতে পারে সবটা অথবা ও-নিলের কোন সমুদ্রবিষয়ক নাটক, তখন কাপ্তান বেহালা বাজাতে পারবেন, এটাই তাঁর লাভ। তিনি, উইংসের আড়ালে দাঁড়িয়ে বেহালা বাজাবেন এবং সমুদ্রের চারপাশের এক নীলাভ জ্যোতি তাঁকে কেমন গ্রাস করতে থাকবে তখন।

    জ্যাক আর একটা রেকর্ড পাল্টাল। খুব দ্রুত তালে বাজছে। গমগম করে উঠছে সারা জাহাজটা। নিচে এঞ্জিনের শব্দটা পর্যন্ত এমন একটা গানের সুরে ছন্দ মিলিয়ে চলছে। জ্যাক, পায়ে তাল দিচ্ছে। জ্যাক বলছে, গাও, গাও। জোরে। ছোটবাবু একেবারে হাঁ। সে বলল, আমি পারি না।

    —গাও,গাও না।

    ছোটবাবু বলল, আমি পারি না জ্যাক।

    —গাও, গাও না……..উই আর ইন দি সেম বোট, গাও, গাও না।

    ছোটবাবু বেশ গলা মিলিয়ে গাইবার চেষ্টা করল, উই আর ইন…

    জ্যাক বলল, বেশ সুন্দর হচ্ছে। আরও জোরে। গাও, আরও জোরে….।

    কাপ্তান আর থার্ড অফিসার তাড়াতাড়ি উঁকি দিল ব্রীজ থেকে। কাপ্তান বয় যেতে যেতে দেখল, জাহাজের সবচেয়ে কমবয়সী নাবিকটির সঙ্গে জ্যাকের ভারি বন্ধুত্ব। সে কফি আর আইসক্রীম রেখে গেছে।

    ছোটবাবু বলল, তুমি খেয়ে নাও জ্যাক।

    জ্যাক বলল, ছোটবাবু মনে থাকে যেন, আর কখনও স্যার-টার বলবে না।

    —না বলছি না।

    —আমার খারাপ লাগে স্যার শুনতে।

    ‘ছোটবাবু বলল, জ্যাক, তুমি মেয়েদের মতো দেখতে। বলেই জিভ কেটে ফেলল। সে ভুলে যায় সব। এটা ঠিক না। জ্যাকের অহংকারে লাগতে পারে। বেটাছেলেকে মেয়েছেলে বললে কার না রাগ হয়। সে তাড়াতাড়ি জ্যাককে অন্যমনস্ক করার জন্য বলল, জ্যাক ঐ দেখ কত বড় পাখি! কি বড় ডানায় যেন সমস্ত আকাশ ঢেকে দিয়েছে।

    জ্যাক দেখল ওদের মাথার ওপর, হাত দশেক ওপর হবে, পাখিটা প্রকাণ্ড ডানা মেলে স্থির হয়ে ভেসে যাচ্ছে। জাহাজের সঙ্গে চলছে।

    জ্যাক বলল, সর্বনাশ।

    —কি হল!

    —ওটা এখন ছোঁ মারবে!

    —তার মানে!

    —আমার সব খাবার ছোঁ মেরে নেবে।

    ছোটবাবু তাড়াতাড়ি খাবারটার ওপর ঝুঁকে দাঁড়াল।

    —তোমার চোখ তুলে নেবে ছোটবাবু। শিগগির বোটের নিচে চলে এস।

    ছোট আর দেরি করল না। সে কফির কাপ এবং আইসক্রিমের প্লেট নিয়ে ছুটে বোটের নিচে চলে গেল। তারপর সে দেখল, জ্যাক সুন্দর দু’পা বিছিয়ে দিয়েছে। বোট-ডেকের ভিতর দিয়ে, উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ছোটবাবু উবু হয়ে বসে আছে। খুব তাড়াতাড়ি খেতে কষ্ট। রেকর্ডটা শেষ হয়ে আসছে। যেন ওর’খাওয়াটা একটু দ্রুত সমাধান করার জন্য, সে কিছুটা ছোটকে দিয়েছে। ভাগ করে দিয়ে সে একটা কথাও ছোটকে বলতে দিল না। সে আবার রেকর্ড-প্লেয়ারের পাশে উবু হয়ে বসে পড়ল।

    ছোটবাবুর সাহস হল না বলে, আমি খাব না জ্যাক। ছোটবাবু খেয়ে জামায় মুখ মুছে ফেলল। যেন সে খায়নি। সে খেল কিনা তাও বলল না জ্যাককে। বেশ পরিপাটি করে দু’পা ছড়িয়ে সহজ হয়ে বসে পড়ল। জ্যাককে সে যে খুব ভয় পেত, এখন এমন বলতে ইচ্ছা হচ্ছে। কিন্তু জ্যাক একবারও তাকাচ্ছে না। সে রেকর্ডের গাদা থেকে একটা ভাল রেকর্ড খুঁজছে। যা শুনলে ছোটবাবু বুঝবে, জ্যাকের সংগ্রহে কত সুন্দর গান আছে।

    কাপ্তান ব্রীজে পায়চারি করতে করতে ভাবছিলেন যাক, জ্যাক সমুদ্রে একজন সমবয়সী সঙ্গী পেয়ে গেছে। ঠিক সমবয়সী নয়, তবু বয়সে ওরা কাছাকাছি। স্বাভাবিকভাবেই ওরা দুজন জাহাজে একটা টান বোধ করবে। আর নেটিভরা খুব বিনীত, ভদ্র, এবং ভীতু হয়। ছেলেটার ভিতর সব গুণগুলোই আছে। তিনি মনে মনে জ্যাকের জন্য যতটা উদ্বিগ্ন ছিলেন, এখন আর ততটা নেই। যেমন শিকারী তার দুষ্টু মেয়ের হাতে কখনও কখনও বাঘের ছানা দিয়ে দেয়, এবং তাকে ভুলিয়ে রাখে, অথবা পোষা বেড়াল, ছোটবাবু যেন জ্যাকের তাই। কাপ্তান বলল, বুঝলে থার্ড, জ্যাক আমার স্বভাব পেয়েছে। সমুদ্রে ঘুরে বেড়াতে ওর কখনও খারাপ লাগে না। স্কুলেটুলে কিছু হয় না। তার চেয়ে একজন মানুষ সমুদ্রে ঘুরে বেড়ালে বেশি শিখতে পারে। জ্যাক আমার কত কম বয়সে কত বেশি জানে। কেমন আত্ম-তৃপ্তিতে কাপ্তান চোখ বুজে ফেললেন।

    এভাবে জাহাজ আবার ক্রমে এগিয়ে চলে। কখনও কখনও ছোটবাবু জ্যাকের সঙ্গে পাখিদের মাংস খাওয়ায়। ডারবান পর্যন্ত ছোটবাবুর শেষ পর্যন্ত ওয়াচ থাকল না। সে ফালতু হয়ে থাকল। ফালতু মানে কাজ কম। ডেকের ওপর উইনচে শুধু কাজ করা। ডেকের ওপর মাঝে মাঝে পাখিদের মাংস দেবার সময় বড় বড় সব এ্যালবাট্রস পাখি ডানা মেলে মাথার ওপর ভেসে থাকে। জ্যাক আর সে মাঝে মাঝে মাংস ছুড়ে দেয়। বেশ একটা খেলা। ডেকে ওদের ভারি আশ্চর্য খেলা জমে ওঠে। একে একে অনেক পাখি, প্রায় সারাটা ডেক তখন ছেয়ে যায়, দলে দলে ওরা মাংস খাবার লোভে জাহাজের চারপাশ ঘিরে ফেলে—তারপর উড়তে উড়তে ভাসতে ভাসতে সমুদ্রযাত্রার সঙ্গী হয়। মাংস ছুড়ে দিলেই হাওয়ায় ক্লপ করে ধরে ফেলে। ডেকে পর্যন্ত পড়তে দেয় না। পাখিগুলো মাংস খাবার লোভে কোথায় যে ভেসে চলেছে নিজেরাও জানে না। কারণ ওরা এভাবে জাহাজের পিছু পিছু শুধু উড়তেই থাকবে। সামনে যতক্ষণ কোনও ডাঙ্গা না পাচ্ছে ওরা আর থামবে না।

    জাহাজিরা অবসর পেলেই পাখিদের স্নান, খাওয়া এসব দেখত। কখনও সবাই দেখত বেশ সামান্য ঢেউয়ের ওপর ওরা ভেসে রয়েছে। ডুবে ডুবে সাঁতার কাটছে। অথবা প্রপেলার যেখানে জল ভেঙ্গে চলে আসছে সেখানটায় ওরা ডুবে গভীর নীল জলে, সাদা ডানা মেলে মাছ খুঁজছে। প্রপেলারের ঝাপটায় কত সব ছোট মাছ, মরে যায়। ওগুলো জলে ভাসলে অথবা জলে ডুবে গেলে ওরা তুলে খায়। কখনও ভাণ্ডারিরা উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলে দেয় জলে। ওরা সে-সবও খায়। জাহাজিদের কাছে, সমুদ্রের মতো, আকাশের নক্ষত্রের মতো এই সব পাখিদেরও একটা দাম আছে। মাস্তুলে কোনও পাখি এসে বসলে ওরা তাড়িয়ে দেয় না। ওদের সময় ভাল যাচ্ছে, এমন ভেবে থাকে।

    বন্দরে ঢোকার মুখে মৈত্র ভাবল এ-বন্দরে শেফালির ঠিক চিঠি আসবে। এখানে শুধু বাংকার নেওয়া হবে। রাতে রাতে জাহাজ, দুটো পাহাড়ের ভিতর দিয়ে বন্দরে ঢুকে যাচ্ছে।

    শেফালী বন্দরে বন্দরে এক চিঠি লেখে। সেই এক অপেক্ষার কথা চিঠিতে। তুমি কবে ফিরবে। মৈত্রকে ছেড়ে শেফালীর এক দণ্ড ভাল লাগে না। লিখবে জাহাজ তারপর কোথায় যাচ্ছে। ঠিকানা স্পষ্ট করে লিখ। গতবার এজেন্ট অফিসের কি যে ঠিকানা দিলে কিছু বুঝতে পারিনি।

    বন্দরে ঢোকার মুখেই ঠিক চিঠি হাজির। পাইলট জাহাজে উঠে এসেছে। পাইলটের সঙ্গে সব চিঠি এসেছে। সারেঙ ডেকে ডেকে চিঠি দিচ্ছে সকলকে। মৈত্র চিঠি পেয়ে একটু গোপনে পড়বে বলে, বোট ডেকে উঠে গেছে। তা না হলে অমিয়টা গিদরের মতো করবে। কি লিখল দাদা। চুমুটুমু খাবার কথা লেখেনি! অমিয়র জিভ খুব আল্পা।

    এবারের চিঠিতে শেফালী নতুন একটা উপসর্গের কথা লিখেছে। মৈত্র নুয়ে দেখল, অস্পষ্ট অক্ষরে লেখা, তবু হাতের লেখা বুঝতে কষ্ট হয় না, এতবার এই লেখা পড়েছে যে সে শেফালীর সামান্য আঁচড়ে ধরে ফেলে সব। শেফালী লিখেছে, আমার বড় বমি পায়। তোমার জন্য রাতে আমার ঘুম আসে না। তারপর লিখেছে, শেফালীর ভাল থাকছে না শরীর। ক্রমশ বমি বাড়ছে। শরীর দুর্বল। কেবল দুঃস্বপ্ন দেখি। তারপর নিচের প্যারায় শেফালী- সে তার স্বপ্নের কথা লিখেছে।

    আচ্ছা তোমার জাহাজে লম্বা বড় একটা বাঁশ আছে? বাঁশের মাথায় কি কোন কঙ্কাল বাঁধা আছে? প্রায় একটা বড় তিমি মাছের ছবি সমুদ্রে ভেসে যেতে দেখি। প্রায়ই মনে হয় মাছটা তোমাকে গিলে ফেলার জন্য অপেক্ষায় আছে। তুমি সেটা বুঝতে পারছ না। তুমি ক্রমশ মাছটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছ। মাঝে মাঝে তোমাকে আমি সেই ঝোলানো কঙ্কালের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। ভয়ে তখন আমার মুখ শুকিয়ে যায়। মনে হয় আর সমুদ্রে গিয়ে কাজ নেই। বরং এবার এসে এই কলকাতা শহরে কিছু দেখে নাও। তুমি লক্ষ্মীটি আমার, দস্যুর মতো কোনও গোঁয়ার্তুমি কর না। ঝড়ের সময় ডেকের ওপর দিয়ে হাঁটবে না। মনে থাকে যেন লক্ষ্মীটি। জাহাজে উঠলেই এভাবে শেফালী ভীষণ সংশয়ে ভোগে।

    দস্যু কথাটা বলে শেফালী যেন অদ্ভুত এক সুখ পায়। দস্যু কথাটা ওর সম্পর্কে একটা ভীষণ উপমার মতো। দু’হাত তুলে মৈত্র এখন সেই সব দৃশ্যের ভিতর ডুবে যেতে চাইছে। দস্যুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়া, দস্যুর মতো সহবাস এসব হামেশা শেফালী তাকে বলে থাকে। মৈত্রের চিঠি পড়তে পড়তে ভীষণ জল তেষ্টা পাচ্ছে। সে আর ডেকে দাঁড়াতে পারছে না। নিচে নেমে সে ঢকঢক করে জল খেল।

    আজকাল অমিয়র সঙ্গে মৈত্রের তুই তুকারিতে এসে দাঁড়িয়েছে। অমিয় এখন জাহাজে বেশ সাবালক জাহাজি। সে দেখল মৈত্র জল খাচ্ছে। বেশ ঠাণ্ডা। শীত লাগছে ভীষণ। এই শীতে কি করে যে ওর তেষ্টা পায়! সে বলল, কার চিঠি?

    মৈত্র বলল, আর কার?

    —শেফালী বৌদির?

    মৈত্র বলল, তাইতো মনে হয়।

    মাঝে মাঝে ওরা যখন ওয়াচ শেষ করে বাথরুমে ঢুকে যায়, তখন স্নানের ভেতর ওরা কেমন নিজেদের উলঙ্গ ছবি দেখে ফেলে। ভারি মজা এই স্নানে। সাবানের ফেনা সারা শরীরে। মৈত্রের চেহারা তখন বড় ভয়ঙ্কর। ওর চুল কোঁকড়ানো। হাত-পায়ের পেশী ভীষণ শক্ত। সে হাতে একটা তামার বালা পরে থাকে। এমন একটা শক্ত মানুষের চেহারা দেখলেই অমিয়র কেন জানি মৈত্রের বৌর কথা মনে হয়। সে তখন বলতে থাকে, তোর বৌটাকে এবার দেশে গেলে দেখাস মৈত্র।

    —কেন কেন! এত লোভ কেন আমার বৌকে দেখার।

    —আমার লোভ না। লোভ তোমার। তোর এমন শরীর, বৌয়ের কষ্ট হয় না!

    –কষ্ট! কিসের কষ্ট! মৈত্রের মুখ একেবারে নাবালকের মতো। যেন সে কিছু বোঝেনি।

    -–কষ্ট, কষ্ট, এত ব্যাখ্যা করতে পারব না। আশেপাশে ছোটবাবু থাকতে পারে—ছোটবাবুর সামনে মৈত্র চায় না খিস্তিখেউড় করে। অমিয় একটা ধারি, সে যা কিছু বলতে পারে। ওরা এদিক ওদিক খুঁজে দেখলে ছোট নেই। হয়ত সে মেজ-মালোমের পাশে বসে আছে। ওকে খুঁজে দেখা দরকার। ওর চিঠি আসেনি। চিঠি না এলে জাহাজিরা খুব বেজার মুখে ঘুরে বেড়ায়। একা একা থাকে। এবং নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয়।

    মৈত্র ছোটবাবুকে বন্ধুর ফোকসালে শেষ পর্যন্ত পেল। বন্ধুর বাংকে চুপচাপ শুয়ে আছে। চারপাশে যখন বন্দরের আলো, পাহাড়ের মাথায় বাতিঘর তখন ছোট এভাবে নিচে বসে আছে ভাবতেই মৈত্রের কেমন খারাপ লাগল। সে কোন চিঠি পায়নি। সে নিজে সবার চিঠি লিখে দিয়েছে, সবার চিঠির জবাব এসেছে,তার চিঠি নেই।

    মৈত্র পাশের বাংকে বসে বলল, ঠিকানা ভুল লিখেছিস?

    —না, ঠিকানা ঠিকই লিখেছি। তবে আমার যা মনে হয় বাবা-মা, আগের জায়গায় নেই।

    —কোথায় গেছে?

    —কোথায় যাবে, তাও জানি না। বাবা বারবারই জায়গা বদল করতে চাইছেন। নবদ্বীপের দিকে থাকার খুব ইচ্ছে। ওখানে কিছু যজমানি পাবেন কথা আছে। তবে ওখানে যদি যান, চিঠি একদিন না একদিন পাবেন। আমি ঠিক বুয়েন্স এয়ার্সে মার চিঠি পাব আশা করছি।

    —তা হলে পেয়ে যাবি

    —নাও পেতে পারি। আমাদের পরিবার এখনও ঠিক করতে পারছে না কোথায় থাকবে।

    —কেন, কলকাতার দিকে চলে এলেই হয়।

    —কলকাতাকে বাবার ভীষণ ভয়। জ্যাঠামশাই তো কিছুতেই আসবেন না। গাঁয়ের দিকে বাড়িটাড়ি করে কিছু জমিজমা কিনে বাঁচার একটা চেষ্টা চলছিল। কিন্তু বাবা, জ্যাঠামশাই এত আনাড়ি শেষ পর্যন্ত কিছু ঠিক করে উঠতে পারেন না। একটা রেশনের দোকান জ্যাঠামশাই করলেন। টাকা কম ছিল বলে পার্টনার নিলেন। পরে কি করে যে সেই মালিক হয়ে গেল বুঝলাম না। জ্যাঠামশাই একদিন ক্ষোভে দুঃখে সব ছেড়ে চলে এলেন। তারপর কেমন খুব দুঃখ থেকে বলার মতো সে বলল আসলে আমাদের পরিবার জানে না, একবার ছিন্নমূল হলে ফের কিভাবে বাঁচতে হয়। সে যেন বেশ দামী কথা বলে ফেলেছে। এমনভাবে বললে, বড় কথা শোনাবে তবু এটাই ঠিক। বাবা কেমন হাল ছেড়ে দিয়েছেন।

    মৈত্র বলল, সব ঠিক হয়ে যাবে। একটু থেমে বলল, আসার সময় তুই জেনে আসিসনি সব।

    —সে তো আটমাস আগে, আটমাস আগে বাড়ি ছেড়েছি।

    —বাড়িতে আর যাসনি?

    –না।

    —জাহাজে ওঠার আগে একবার দেখা করে এলি না!

    —তাহলে আমার জাহাজে আসাই হত না। সে বলতে চাইল আপাতত আমি নামগোত্রহীন। বাবা মার সঙ্গে সম্পর্কহীন! কিন্তু বলতে পারল না। বুয়েন-এয়ার্সে যদি না আসে তবে ভাগ্যের সন্ধানে ওরাও বের হয়েছে ভেবে নিতে হবে। ভাগ্যের সন্ধানে মৈত্রদা আমিও বের হয়েছি। টাকা মা পাবে না। অফিসে আবার ফেরত চলে আসবে।

    মৈত্র এবার কেমন ঠাট্টা করে বলল, বাড়ি থেকে রাগ টাগ করে পালিয়েছিস বুঝি!

    —রাগ, না রাগ ঠিক না। তবে সবাইকে না জানিয়ে ভাগ্যের সন্ধানে বের হয়ে পড়েছি। কেউ জানত না, আমি কোথায়। আমার চিঠি পেলে মা যে কি খুশী হতেন।

    —তোর এটা ঠিক হয়নি ছোট। মাকে এভাবে চিন্তায় ফেলে দেওয়া তোর ঠিক হয়নি।

    ছোট এবার দেয়ালের দিকে মুখ ঘোরালো। ছোট কি মায়ের জন্য কাঁদছে। ছোট কিছুতেই এদিকে মুখ ঘোরাচ্ছে না। মৈত্র ভীষণ বিব্রত বোধ করছে। এ-ভাবে ছোটকে মুখ ঘুরিয়ে থাকতে দেখলে সে ভীষণ ক্ষেপে যায়। সে বলল, বুঝলি ছোট তোর বৌদি চিঠি লিখেছে।

    ছোট কোন আগ্রহ দেখাল না! তবু মৈত্র বলে চলেছে, বুঝলি তোর বৌদির কি ভয় রে! ও নাকি ডেকের মাস্তুলে একটা তিমি মাছ স্বপ্নে ঝুলতে দেখে। কখনও তিমি মাছের কঙ্কাল। এ আবার কি রকম স্বপ্ন রে বাবা!

    ছোট উঠে বসল এবার। সে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে এখনও। সে তেমনিভাবে বলল, সত্যি আজগুবি স্বপ্ন মৈত্রদা। না হলে শেফালী বৌদি হবে কেন। তোমরা দুজনেই দুজনকে ছেড়ে থাকতে পারছ না। বলে ছোট্ট রসিকতা করে নিজেই নিজেকে হাল্কা করে দিল। এবং বড্ড ছেলেমানুষী করে ফেলেছে ভেবে সে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি ধরে মৈত্রের নাগালের বাইরে চলে গেল।

    মৈত্র বলল, বেচারা!

  • ছয়

    ছয়

    ।। ছয়।।

    এ-বন্দরটা বেশ নিরিবিলি নির্জন। শহর খুব কাছে না হয়তো। বাতিঘর থেকে আলো এসে মাঝে মাঝে তাদের জাহাজে পড়ছে। ছোটবাবু একবার আলোর মুখোমুখি পড়ে চোখে অনেকক্ষণ ঝাপসা দেখেছে। সে ভেবেছিল চুপচাপ ফল্কাতে বসে থাকবে। কিছু পাখী জাহাজে আসতে আসতেই মরে গেছে। লোনা জলের ঝাপ্‌টা কিছু পাখির সহ্য হয়নি। ওরা সে-সব সমুদ্রেই ফেলে দিয়েছে। কোথাকার পাখি, রাজস্থানের কোন অঞ্চল থেকে পাখিগুলো ডারবান যাবে, কি কোথায় যাবে কেউ জানে না। চিড়িয়াখানা-টানায় হবে হয়তো। এটা ওরা আন্দাজে অনুমান করেছিল। পাখিগুলো জলে ভাসিয়ে দিলে ছোটবাবুর এমন মনে হত। কারণ, মরা পাখিরা জলে কিছুটা ভেসেছিল, জাহাজ একটু দূরে গেলেই বড় বড় হাঙর ছুটে আসবে। কত সুন্দর নরম মাংস, ভারতবর্ষের কোথায় এদের বাস ওরা জানে না, তবু সে টের পায় জলের নিচে সেইসব অতিকায় হাঙরের ঘোরাফেরা আর জাহাজ যায়, সেই একভাবে, নীল রঙের সাম্রাজ্যে জাহাজ, সাদা জাহাজ যায় আর যায়। পাখিগুলোর মরা শরীর অনেক দূর থেকেও ভাসতে দেখা গেছিল।

    কিছু পাখী মরে যাওয়ায় ফল্কার এদিকটা ফাঁকা। জাহাজ বেশ দ্রুত যাচ্ছে। কারণ জাহাজটাকে সমুদ্র-স্রোত কিছুটা দ্রুত যেতে হয়তো সাহায্য করছে। এখানে সে জানে একটা মৌসুমী স্রোত আছে, মৌসুমী স্রোতের জন্য হতে পারে, বা জাহাজ খুব নিরিবিলি সমুদ্র পেয়েছে বলে প্রায় একদিন আগে লরেঞ্জোমরকুইসে ঢুকে গেছে। আর হাওয়াটা জাহাজের সামনে। পেছনে সে জন্য ধোঁয়া যাচ্ছে। ফানেলের ধোঁয়ায় সারাটা আফটারপিক, ফলকা একেবারে কালো হয়ে গেছে। ছোটবাবু ফলকায় একটু বসবে ভেবেছিল, সকালে ডেক-টিণ্ডাল খুব ভালোভাবে জল মেরেছে, অথচ এখন হাত দিলে ফের কালো ছাপ। সে এখানে বসতে পারল না।

    বেশ অন্ধকার এদিকটাতে। যে-কোন কারণেই হোক, মাস্তুলের আলোটা জ্বলছে না। ঠিক বোট- ডেকে এখন মেজ-মালোম আছে। কিন্তু সে গিয়ে দেখল মেজ-মালোম নেই। কেবল বড়-মিস্ত্রি সেজেগুজে কোথাও নেমে যাবে বলে গ্যাঙওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে।

    প্রায় একমাস হতে চলল, ওর মনেই ছিল না, এ-জাহাজে বড়-মিস্ত্রি বলে একজন আছে। অথচ সে প্রথম দিন দেখেছে, মানুষটি ক্রাচে ভর করে ডেকে উঠে আসছে। কিনারায় ওর মেয়ে ঠিক করা থাকে। বন্দরে বন্দরে ঘুরে এটা হয়েছে। হয় জেনি, নয় লরা, নয় এলমা এমন কেউ না কেউ আছে। কলকাতা বন্দরে কে থাকে, তার নাম কি? মানুষটা এতদিন কোথায় ছিল! কেবিনে, নিজের ঘরে! সারাক্ষণ মানুষটা সে শুনেছে দাবা নিয়ে বসে থাকে। আর টিপয়ে মদ এবং সে একা দুজনের হয়ে সকাল সন্ধ্যা কখনও গভীর রাত পর্যন্ত দাবা খেলে যায়। মনে হয় সে ঘুমোতে জানে না। সারাক্ষণ জেগে জেগে জাহাজ পাহারা দেবার স্বভাব বুঝি। যখন ভালো লাগে না পোর্ট-হোলে দাঁড়ায়। সমুদ্র যেন পেছনে চলে যাচ্ছে এমন তার মনে হয়। সে সমুদ্রে একটু সময় তাকিয়ে থাকলেই সমস্ত গ্লানি খুব সহজে শরীর থেকে মুছে ফেলতে পারে।

    ছোটবাবুর মনে হল এ-মানুষটাই জাহাজে সবচেয়ে বেশী সুখী। বেশি লম্বা নয়, বেঁটেও নয়, গোলগাল মানুষ, গোলগাল বলে যতটা লম্বা দেখানো দরকার তা দেখায় না। মাথায় একটাও চুল নেই। টাকটা এত বেশি মসৃণ আর চকচকে যে কখনও কখনও একটা বরফের বলটল মনে হয়। বোধহয় জাহাজটা এখানে রাত কাটাবে! নয়তো বড়-মিস্ত্রি বের হত না। ওর তো কোন কাজ নেই, কেবল একটা কেবিন, দাবার ছক। ছকটা আবার সাধারণ ছকের মতো নয়, খাঁজকাটা। এতে দাবার বড়েরা পিচিং-এর সময় ছিটকে পড়ে যায় না।

    ওর একদিন বড়-মিস্ত্রির ঘরে পাইপ মেরামতের কাজ ছিল। সেদিন বড়-মিস্ত্রি সারাক্ষণ মুখ গুম করে বসেছিল। কি বিরক্ত! ছোটবাবু আর পাঁচ নম্বর মিস্ত্রি কোনরকমে, যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজটা সেরে বের হলে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়বার মতো। সেই থেকে সে আর মানুষটাকে দেখেনি। তার কোন ওয়াচ নেই। দিনের বেলা সবসময় বয়লার স্যুট পরে থাকে। পেছনের পকেটে একটা লম্বা টর্চ। এটা সে কখনও পকেট থেকে খুলে রাখে না। বড়-মিস্ত্রিকে একটা টর্চ বাদে কিছুতেই ভাবা যায় না।

    গ্যাঙওয়েতে সিঁড়ি পড়ে গেলেই খোঁড়াতে খোঁড়াতে মানুষটা নেমে যাবে। সামনে কি আছে, রাস্তার নাম কি, ট্যাকসি কোথায় পাবে, সব সে জানে। হয়তো এ বন্দরে এই নিয়ে বিশবার এসেছে। তার কাছে বন্দরের ছবি এত স্পষ্ট যে, জাহাজিরা মেয়ে ধরতে গেলে পর্যন্ত ওর কাছে শোনা যায় টিপস্ নিতে। কোন জায়গায় ভালো জিনিস আছে বড়-মিস্ত্রির মতো কেউ বলতে পারে না।

    সব শোনা ছোটবাবুর। মানুষটাকে দেখে আবার মনে পড়ে গেল। সে কোনরকমে অন্ধকারে গ্যঙওয়ে পার হবার সময় টের পেল না, আরও একজন দাঁড়িয়ে আছে। একটু দূরে। সে অমিয়। অমিয়, জাহাজ বন্দর ধরছে, আর নেমে যাবার তাল করছে। ছোটবাবুরও ইচ্ছে করছে একবার নিচে নেমে যেতে। যেন কতকাল মাটির স্পর্শ সে পায়নি। পায়ের নিচে মাটি পেলে, আফ্রিকা, আমেরিকা, ইণ্ডিয়া, মনে থাকে না। মাটি, মাটি। মাটি, জননী, এমন শুধু মনে হয়। মানুষের কাছে এর চেয়ে প্রিয় কিছু নেই।

    ছোটবাবু অস্পষ্ট অন্ধকারে দেখল, বড়-মিস্ত্রির পিছু পিছু আর একজন নেমে গেল। ক্রেনগুলোর পাশ দিয়ে ডকের বড় বড় লম্বা গুদাম, রেল-লাইন, লাইন পার হয়ে গেটের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। জাহাজ যখন বাঁধাছাঁদা হয়ে গেছে তখন যে যার মতো বন্দরে নেমে যাবেই। ফোকসালে এসে দেখল, মৈত্র উবু হয়ে চিঠি লিখছে। পাতার পর পাতা লিখছে, এবং একটা বাণ্ডিল বোধহয় করে ফেলবে। কেউ কেউ তাঁকে খুঁজে গেছে। চিঠি লেখাতে দল বেঁধে এসেছিল। সে ভয়ে আর জেগে থাকতে পারল না। যা সব চিঠি, মাঝে মাঝে সে না হেসে পারে না। হাসলে আবার ওরা রাগ করে। সে চিঠি লেখার ভয়ে তাড়াতাড়ি কম্বল গায়ে শুয়ে পড়লে মনে হল, ওপরে কেউ ওকে খুঁজছে। এবং সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। কেউ দ্রুত নেমে আসছে। মৈত্র দেখল, মেজ-মালোম উঁকি দিচ্ছে। তাড়াতাড়ি, মৈত্র লাফিয়ে দরজার কাছে গেলে ছোটবাবুর দিকে আঙ্গুল তুলে মেজ যেন কি বলছে।

    মৈত্র বলল, স্যার ও ঘুমোচ্ছে।

    ছোটবাবু ঘুমোয়নি। সে সব শুনছে। যদি মজার কোন ব্যাপার হয়, তবে বলবে, না স্যার ঘুমোইনি, আর না হলে এখন ঘুমের ভান করে পড়ে থাকতেই হবে। সে চুপচাপ কথাবার্তা শুনছে কেবল।

    সেকেণ্ড বলছে, এত তাড়াতাড়ি ছোট ঘুমিয়ে পড়েছে।

    —ওর মনটা ভাল নেই স্যার।

    —কেন কেন!

    —দেশ থেকে চিঠি আসেনি।

    —স্যাড!

    —খুব স্যাড। সবার চিঠি এসেছে, চিঠি না এলে কেমন লাগে বলুন!

    —খুব খারাপ! খুব খারাপ! তবে তার জন্য মন খারাপ করার কি আছে।

    —খুব মন খারাপ করে সন্ধ্যার দিকে চুপচাপ শুয়েছিল। কারো সঙ্গে কোন কথাবার্তা না। যখন খুঁজে বের করলাম তখন দেখি মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে কাঁদছে।

    ছোটবাবু এবার আর সাড়া না দিয়ে পারল না। মৈত্রদা ওকে সেকেণ্ডের কাছে একেবারে বালকের সামিল করে ফেলেছে। ওর খুব এতে অহঙ্কারে লাগে। সে উঠে বসল, কম্বল গা থেকে ফেলে বলল, না স্যার, আমি কাঁদিনি। ও বেশি বেশি আপনাকে বলছে।

    —তা ঠিক আছে, তুমি যখন কাঁদোনি, ভালো করেছ। জাহাজিরা চোখের জল ফেলে না। ওরা এত বেশি লোনা জল ঘাটে, চোখের জলে সেটা পোষায় না। তোমাকে যা বলছিলাম, তুমি যাবে ওপরে?

    —কোথায় স্যার?

    —এই জেটিতে একটু ঘুরে আসব।

    প্রস্তাবটা মন্দ না। সে বলল, চলুন।

    আসলে ছোটর গরম জামাকাপড় কিছু নেই। মৈত্র বলল, আমার সোয়েটারটা গায়ে দে। না হলে ঠাণ্ডা লেগে যাবে। মৈত্র ওর লকার খুলে বেশ ভাল সোয়েটার ঘি ঘি রঙের বের করে দিল। ভীষণ ঢোলা। এবং মৈত্রের প্যান্ট, আরও ঢোলা, তবু শীত মানবে ভেবে ছোটবাবু এসব পরে সেকেণ্ডের সঙ্গে জেটিতে নেমে গেল এবং সত্যি আরাম, আশ্চর্য আরাম। ওরা রেল-ইয়ার্ড পার হয়ে সামনের ইকাগে। রেস্তোরাঁতে বসে গেল—তুমি কি খাবে?

    —কিছু না স্যার।

    —আরে খাও। নতুন এয়েছ, দ্যাখো না খেয়ে! যাবে একদিন?

    —কোথায় স্যার?

    —কার্ণিভেলে।

    —সেটা কোথায়?

    —বুয়েনস এয়ার্সে। ও কি সব ব্যাপার। তোমার মনে হবে, সে একটা ব্যাপার। যাকগে, ড্রিঙ্কসের অর্ডার দিচ্ছি।

    ছোটবাবুর আশ্চর্য মনে হল মেজকে। সে এতটা কখনও প্রত্যাশা করে না। ওরা সাহেবসুবো মানুষ। সে সবচেয়ে নিম্নতম মজুরিতে কাজ করে—ওর সঙ্গে মেজ-মালোমের সহৃদয় ব্যবহার কেবল কষ্টদায়ক ঘটনা। মেজ-মালোমকে মনে হয় দার্শনিক, কখনও মনে হয় হিসেবী, আবার কখনও লুচ্চা। এখন কি মনে হচ্ছে সে ভেবে পাচ্ছে না। সে বয়সে ছোট বলে, মসৃণ গাল মসৃণ দাড়ির ভেতর আশ্চর্য একটা লোভ এই সব জাহাজিদের থেকে যেতে পারে। এবং সেটা কতদূর পর্যন্ত গড়াবে সে বুঝতে পারে না, সে অনেক ভেবে বলল, না স্যার। আমি ড্রিঙ্ক করি না।

    —তবে কফি খাও। খাবার কি খাবে?

    —কিছু না স্যার। এক কাপ কফিই যথেষ্ট!

    মেজ পর পর পেগ-পাঁচেক খেয়ে ফেলার সময় দূরে রেল-ইয়ার্ডের পাশে বড়-মিস্ত্রির গলা পাওয়া গেল। খুব বচসা করছে কারো সঙ্গে।

    —তুমি শালা ইণ্ডিয়ান, দালাল, কিচ্ছু জান না, এখানে আমাকে বাজারের মাগি চেনাতে এসেছ!

    কেউ তখন হেঁকে বলছে, আপনি স্যার ভুল করছেন, আমি দালাল নই। বাজারের সেরা মাগি খুঁজে বের করা আমার পেশা না।

    রেল ইয়ার্ডে আলো কম। বেশ দূরে দূরে বাতির থাম। গাড়ি সান্টিঙের শব্দ আসছে। কখনও জেটির পাশ দিয়ে টংলিং টংলিং শব্দ করতে করতে একটা মালগাড়ি যেন সমুদ্রে নেমে যাচ্ছে। অন্ধকারে ঠিক বোঝা যায় না। কেবল বোঝা যায়, আর একটু এগিয়ে গেলেই সমুদ্র। বড়-মিস্ত্রি খুব আজ বেকায়দায় পড়ে গেছে।

    আসলে ব্যাপারটা ছিল অন্য রকমের। অমিয় চুপি চুপি বের হয়ে যাচ্ছিল! ওর ইচ্ছা ছিল বড় মিস্ত্রি নেমে গেলেই সে নেমে যাবে। সে গ্যাঙওয়ে থেকে যখন দেখল বড়-মিস্ত্রি, রেল-ইয়ার্ডের ভিতর ঢুকে গেছে, তখন সে নিজেও নেমে গেল। সে এখানে একটু হেঁটে বেড়িয়ে দেখবে, এমন তার আশা। বড়-মিস্ত্রি খুঁড়িয়ে হাঁটে বলে সময় লাগে। অমিয় যেতে যেতে তখন দেখছে, কেউ অন্ধকারে তার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। যদিও এটাকে ঠিক অন্ধকার বলা যায় না, কম আলো, অস্পষ্ট আলোতে সে বুঝতে পারছে না, কে দাঁড়িয়ে আছে। সে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে ভাবছিল, কিন্তু কেউ তাকে ডাকছে। হাত তুলে ডাকছে।

    বড়-মিস্ত্রির মনে হয়েছিল, জাহাজ থেকে নামার পরই কেউ যেন তাকে অনুসরণ করছে। সে এসব দেশের দালালদের চেনে। ভীষণ টাকার খাঁকতি বেটাদের। জাহাজ এসে নোঙর ফেলেছে, এখন মৌকা, ওঁত পেতে আছে। কে নামছে, কেউ নামলেই সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া। আরে বাপু আমাকে শহরের পথঘাট চেনাবে, বাজারের কে কেমন আছে জানাবে। আমি তো সব জানি! মিলড্রেড কি চিঠি পায়নি তাহলে! চিঠি পেলে সে তো না এসে থাকার মেয়ে নয়! সে তো অন্য সময়ে ঠিক জাহাজ বাঁধার আগেই জাহাজঘাটায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে। যেন কত সে নিজের মানুষ! যেন বহুদিন সফর শেষে তার মানুষ ঘরে ফিরছে। বড়-মিস্ত্রি এ সব ভেবে সুখ পায়। মিলড্রেড যতই টাকা নিক, তাতে ওর কোন দুঃখ থাকে না।

    সে ভেবেছিল, ইণ্ডিয়ান মার্কেটের দিকে যাবে, না পর্তুগীজদের যে বড় গীর্জা আছে, সেখানে, এবং প্রতি রোববারে যে মেলার মতো বসে জায়গাটা, সেখানে যাবে। সেখানে গেলে সে অনেক দিন আগের এসিকে পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই গীর্জায় যাবার পথটা এতদিন পর ভুলে গেছে। ওর হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়েছিল, মিলড্রেড জাহাজঘাটায় না এসে অপমান করেছে। সে মিলড্রেডের সঙ্গে আর সম্পর্কে রাখবে না। সে আবার পুরোনো ঘরেই যাবে। পূরোনো জিনিস দামে সস্তা আর শরীরের পক্ষে উপকারী। প্রায় পুরোনো টনিকের মতো, অথবা পুরোনো মদের মতো।

    সে অনুসরণকারী লোকটার জন্য অপেক্ষা করল। দালাল মানুষেরা সব খবর রাখে। সে ওদের কাছে ঠিক খবরাখবর পেয়ে যাবে। সে ডাকল। কিন্তু লোকটা আসছে না দেখে, সে হাত তুলে ডাকতে ডাকতে ছুটে গেল।

    অমিয় কাছে এলে বুঝতে পেরেছিল বড়-মিস্ত্রি। সে খুব থতমত খেয়ে গেছে। সে বলল, আমি স্যার!

    বড়-মিস্ত্রি বলল, ঠিক, ঠিক আছে। তুমি যে দালাল নও বুঝি। দালাল হলেও তেমন লজ্জার কি আছে, তোমার সেজন্য ভয় নেই। বলছিলাম, একটু চার্চের দিকে যাব। তুমি আমার সঙ্গে আসতে

    পার।

    অমিয় বুঝতে পারল না এমন কেন বলছে! চার্চ কোথায়, কি ব্যাপার সে কিচ্ছু জানে না। সে বলল স্যার চার্চ!

    —হ্যাঁ বুঝেছি নেকা সাজতে চাও। তোমরা যারা ইণ্ডিয়ান এখানে থাক কেন যে পর্তুগীজ সরকার রেখেছে বুঝি না। ঠেঙ্গিয়ে সমুদ্রের ওপারে দিয়ে আসতে পারে না। এত মিথ্যা কথা তোমরা বলতে পার!

    অমিয় বুঝতে পারল, সে যে একই জাহাজের জাহাজি বড়-মিস্ত্রি স্বপ্নেও ভাবেনি। বড়-মিস্ত্রি কেবিন থেকে বের হয় না। তার সঙ্গে জাহাজের ক্রুদের কোন সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক মেজ-মিস্ত্রির সঙ্গে সারেঙের। সারেঙের আদেশ মতো সব কাজগুলো হয়। সুতরাং অমিয়র মাথায় দুষ্টবুদ্ধি খেলে গেল। সে বলল, স্যার আপনি মহামান্য।

    —তুমি মহামান্য আর প্রিন্স অফ ওয়েলস যাই বলে আমাকে সম্বোধন কর না কেন, তাতে একটা পয়সা বেশি পাবে না।

    অমিয় বলল, চলুন স্যার গীর্জার দিকে।

    —সেই ভাল।

    —স্যার আমি কিন্তু মেয়েদের পাড়ায় আপনাকে নিয়ে যেতে পারব না।

    —গুলি মার। এসির ঘর আমার জানা আছে। সেখানে আমি যাব। তুমি আমার সঙ্গে থাকবে।

    বড়-মিস্ত্রি মনে মনে খুব হাসল। বিদেশে কি করে চলতে হয় সে জানে। এদের কাছে কখনও অজ্ঞতা প্রকাশ করতে নেই। তাহলে এমন সব জায়গায় নিয়ে যাবে, যে আর জাহাজে সময় মতো ফেরা যাবে না। জলের মতো টাকা খরচ করিয়ে দেবে! সুতরাং যেন সেই নিয়ে যাচ্ছে দালাল মানুষটাকে কেবল যেন সঙ্গে একজন লোক থাকলে ভাল, লোক থাকলে সে ভয় পাবে না, মুখ দেখলে সে চিনতে পারে মাল কেমন, অমিয়কে বড়-মিস্ত্রি সেভাবে সঙ্গে নিয়েছে।

    বড়-মিস্ত্রি যেতে যেতে বলল, মিলড্রেড কেন যে এল না!

    কাল সকালে জাহাজ ছেড়ে দেবে। জাহাজ ছেড়ে দিলে, এ-জীবনে আর মিলড্রেডের সঙ্গে দেখা নাও হতে পারে। তাছাড়া ওকে দেখে বড়-মিস্ত্রি মনে রেখে দেবে না, হয়তো আট-দশ মাস সফরে কি বছরের ওপর হয়ে গেলেও একদিনও না দেখা হতে পারে—আবার দেখা হলেও, অন্ধকারে কাকে দেখেছিল মনে রাখতে পারবে না। সে খুব বিজ্ঞের মতো বলল, না স্যার মিলড্রেডের দোষ নেই। ওরা এখানকার বাস তুলে দিয়েছে।

    —তুলে দিয়েছে!

    —হ্যাঁ স্যার। আর টাকা-পয়সা হচ্ছিল না। ওরা আরও পশ্চিমে চলে গেছে।

    —আমাকে একবার খবর দিতে পারল না! ছিঃ ছিঃ, কি যে করে, তারপর সে দাঁড়াল। টুপিটা মাথা থেকে খুলে আবার ঠিক করে পরল। যেন সে মিলড্রেডকে আর দেখতে পাবে না ভেবে কাতর হয়ে পড়েছে।

    —না এটা মিলড্রেডের ভীষণ অন্যায়। ভীষণ। সে আমাকে চিঠিতে অন্তত টাকার কথা লিখতে পারত।

    —আমি স্যার দেখা হলে বলে দেব।

    —তোমার সঙ্গে দেখা হবে?

    —তা হবে না!

    —এখানে কত ইণ্ডিয়ান আছে?

    —তা বেশ, প্রায় চারভাগের একভাগ আমরা।

    —ওকে দেখা হলে বলবে তো, আমি ভীষণ দুঃখিত, কেন ও আমাকে চিঠি না দিয়ে পশ্চিমে চলে গেল। ওকে বলবে, কেন—কেন চলে গেল!

    অমিয় আড়ালে মুচকি হেসে বলল, বলব স্যার।

    ওরা হাঁটতে হাঁটতে বেশ শহরের ভিতরে ঢুকে গেছে। এদিকটায় কিছু ঘিঞ্জি বস্তির মতো। নিগ্রো বালক-বালিকার মুখ, যুবতীরা হেঁটে বেড়াচ্ছে, কোথাও সিংহের ছবি, কোথাও আদিবাসী রমণীর পোশাকে স্বল্পতা। আর বন্য লতায়-পাতায় ওরা শরীর ঢেকে কেউ কেউ হেঁটে চলে গেল। যেন একটা আদিমতা এ-অঞ্চলে এখনও আছে। বলতে কি নিগ্রো যুবতীদের দেখে অমিয়র ভীষণ ভয় করছিল। সে প্রায় বড়-মিস্ত্রির গা ঘেঁষে হাঁটছে। সে কিছুই চেনে না, আসলে বড়-মিস্ত্রি যেখানে যেখানে যাবে, সেও তার সঙ্গে সেখানে সেখানে যাবে বড়-মিস্ত্রি এমনই চাইছে। এবং বড় মিস্ত্রি হাঁটতে হাঁটতে কেমন একসময় বলল, এস একটু বসি কোথাও।

    —আপনি যে এসির ঘরে যাবেন বলেছিলেন?

    —ধুস্ এসি! মিলড্রেডের জন্য মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।

    অমিয় দেখল, বড় মিস্ত্রি হেলায়-ফেলায় টাকা খরচ করতে পারে। জাহাজ বেঁধে ফেলার আগেই কোথা থেকে সে যে এত পয়সা পেল বুঝতে পারছে না। বেশ খেয়ে কেমন ঝিম মেরে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর অমিয়র দিকে তাকিয়ে বলল, এই যে ইণ্ডিয়ান, তুমি ভালো, খুব ভালো। তুমি আমার জন্য যা করলে কোনদিন ভুলতে পারব না।

    অমিয় বলল, তবে চলুন স্যার জাহাজঘাটায় পৌঁছে দিয়ে আসি।

    —একটা ট্যাকসি দ্যাখো পাও কিনা!

    অমিয় ট্যাকসি ডেকে বড়কে বসিয়ে দিল। এবং রেল-ইয়ার্ডে ঢুকেই বলল এবারে আপনি যান স্যার। কাল আছেন তো। কাল আবার দেখা হবে।

    এখানেই গণ্ডগোলটা বেঁধে গেল। দুজনেই মাতাল। তবে অমিয় খায়নি বেশি। সে এ-ব্যাপারটা দেশে বেশ রপ্ত করেছিল, এবং এজন্য ওর দাদাদের সঙ্গে বনিবনা হত না। লেখাপড়া হল না। ওকে ওর বাবা মিশনারি স্কুলে পড়িয়েছিল, এখন একেবারে বেহেড মাতালের ভূমিকায় অভিনয় করা ঠিক না। সে তার মায়ের কাছে সব সময় নির্দোষ থাকতে চেয়েছে, কারণ তার মা তাকে শেষ পর্যন্ত ঘৃণা করত না। এমন কি আসার সময় শুকনো খাবার মুড়িমোয়া সব করে দিয়েছিল, সে এভাবে জানে কি করে মানুষের অন্তরে ঢুকে যেতে হয়। কেবল লীলাবৌদি, রমাবৌদির ভেতর সে ঢুকে যেতে পারেনি। ওদের তাড়নাতে সে শেষপর্যন্ত বাড়ি ছেড়েছে। বাড়িতে সে একদণ্ড থাকতে পারত না। সে এখন দাঁত-মুখ কেমন শক্ত করে ফেলল এবং বাজারে-মাগি মিলড্রেডকে মনে হয় না, নিজের বৌদিদের সম্পর্কে সে এই কটূক্তি করতে ভালবাসে! বাজারে-মাগিদের মুখ যেন এর চেয়ে বেশি ভাল হয়।

    বড়-মিস্ত্রি বলল, আমাকে তুমি কোথায় নিয়ে এসেছ?

    —এই তো স্যার, রেল-ইয়ার্ড, ডানদিকে কয়লার সুট। দেখুন না, কয়লা কেমন জাহাজের বাংকারে ঢুকে যাচ্ছে। সামনেই তো আপনার জাহাজ—এস-এস সিউল ব্যাঙ্ক লেখা।

    —এটা চেসটনের রাস্তা, না?

    —না স্যার। এটা বন্দরের রাস্তা। আপনার জাহাজে উঠে যাবার রাস্তা।

    বড় মিস্ত্রি ট্যাকসি থেকে নামছে না।—কিন্তু আমার যে মিলড্রেডের কাছে যাবার কথা।

    –সে তো নেই স্যার।

    –নেই? কেন নেই? এবার সাঁ করে দরজা খুলে বের হয়ে এল। আলবৎ সে থাকবে। তুমি অন্য মেয়েদের কাছে নিয়ে যাবার জান্য দালালি করছ।

    —তা না স্যার। সত্যি বলছি।

    —দালালেরা আবার সত্যি কথা বলে! বলে তিনি সামান্য হাসলেন। তারপর ক্রাচের ওপর ভর করে মাথাটা কেমন নুইয়ে দিলেন।—কি সুন্দর রাত! মিলড্রেড পশ্চিমে গেছে। আমি শালা কাল জাহাজ ছেড়ে পশ্চিমে চলে যাব।—তুমি শয়তান, আস্ত শয়তান। তোমার জন্য আমার মিলড্রেডের সঙ্গে দেখা হল না। বলে বড়-মিস্ত্রি ক্রাচে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে দুঃখী মানুষের মতো মুখ করে রাখল।

    অমিয় দেখল, খুব বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। এখন পালানো দরকার। অন্য কেউ নেমে এলেই ওকে চিনে ফেলবে। জাহাজ সামনে। ফার্লঙের মতো পথ। সে এখন অন্য পথে জাহাজে উঠে যাবে। আগে ওঠাই নিরাপদ। সে রেল-ইয়ার্ড ধরে হাঁটতে থাকল। এবং শোনা যাচ্ছে বড়-মিস্ত্রি এবার জোরে জোরে চিৎকার করছে—তুমি বাস্টার্ড ইণ্ডিয়ান, দালাল, কিচ্ছু জন না, এখানে আমাকে বাজারের মাগি চেনাতে এয়েছ!

    অমিয় তখন দূর থেকে হেঁকে বলছে, আপনি স্যার ভুল করছেন, আমি দালাল নই। বাজারে মাগি খুঁজে বের করা আমার পেশা না।

    —তুমি সৎ, তুমি ভালো, শুয়ারকা বাচ্চা। বেজন্মা, ইতর।

    মেজ-মালোম এবং ছোটবাবু তখন ফিরছিল জাহাজঘাটার দিকে। দেখল একা একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে বড়-মিস্ত্রি। আর টলছে। মুখ টুপিতে ঢাকা। মেজ-মালোম জানে বন্দর এলে বড়-মিস্ত্রি জাহাজে থাকে না। তার বাঁধা ঘর আছে। ওরা এসে ওকে নিয়ে যায়। সেই যৌবনের প্রথম থেকে কাজ করতে করতে এটা হয়েছে। অথচ বড় আজ এখানে একা। সে বলল, স্যার আপনি?

    —তুমি কে হে?

    —আমি সেকেণ্ড অফিসার ডেবিড় ম্যাকমবার

    —ডেবিড্‌!

    —হ্যাঁ স্যার।

    —তুমি জাহাজে ফিরছ?

    —হ্যাঁ স্যার।

    —সঙ্গে কে আছে?

    —আমাদের ছোটবাবু।

    —ছোটবাবু! সে ভ্রু কোঁচকালো।

    —জাহাজেই কাজ করে।

    বড়-মিস্ত্রি ভেবেছিল, মেজকে সব ভেঙে বলবে। এক শয়তান ইণ্ডিয়ানের পাল্লায় পড়ে সে আজ যথাসর্বস্ব খুইয়েছে। তার যা ছিল সঙ্গে ট্যাকসিতে টিপসে গেছে। বড়-মিস্ত্রি যে এক সময় খুশি হয়ে অমিয়কে জেব খালি করে দিয়েছিল সে-সব আর মনে নেই। তার কিছু নেই। একেবারে খালি। চোট্টা ইণ্ডিয়ানটারই কাজ। অথচ আর একজন ইণ্ডিয়ান সেকেণ্ডের পাশে রয়েছে। তাছাড়া রুচি টুচির বালাই বলতে সেকেণ্ডের কিছু নেই। বড়-মিস্ত্রি নানাদিক ভেবে সব চেপে গেল। তারপর ওদের সঙ্গে টলতে টলতে হাঁটতে থাকল। যেন সে জেটিতে নেমে এসেছিল একটু হাওয়া খেতে। ওকে দেখলে এখন তার চেয়ে বেশি কিছু মনে হয় না।

    বড়-মিস্ত্রি এবার গ্যাঙওয়ের নিচে এসে দাঁড়াল। সেকেণ্ডের মনে হল বড় উঠতে পারবে না। নিজেও তেমন শক্ত নয়। ছোট এখন সাহায্য করতে পারে। কিন্তু ছোট ওকে ধরতে গেলে অপমান বোধ করতে পারে। সেজন্যে সে নিজে উঠে গেল একা। কোয়ার্টার মাস্টারকে ইশারা করল হাতে এবং কাছে এলে বড়-মিস্ত্রিকে ধরে তুলে আনতে বলে কেবিনের দিকে হেঁটে গেল!

    বড়-মিস্ত্রি নিজের কেবিনের কাছে এসে দেখল দরজা বন্ধ। সে ভেবে পেল না ওর কেবিনে কে এখন থাকতে পারে। দরজায় সে টোকা মারল। কেউ দরজা খুলছে না। বেশ জোরে ধাক্কা মারতেই সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। আর ভেতরে একেবারে তাজা এক মেয়ে।

    সে প্রথমটায় ভূত দেখার মতো উঠে দাঁড়াল। ওর সামনে মিলড্রেড।

    —তুমি!

    —তোমার তো কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই রিচার্ড?

    রিচার্ড একটু ঘাবড়ে গেল। সে খোঁড়াচ্ছিল। সে তার স্বভাবে সেটা স্বীকার করবে না। মিলড্রেড ধরতে গেলে হাত সরিয়ে ঠিকঠাক হয়ে বসে বলল, বুঝতে পারছি না।

    —বুঝতে পারছো না মানে।

    —মানে, তুমি, কি করে তুমি!

    —আমি ঠিকই আমি। জাহাজ একদিন আগে আসবে কে জানত।

    —কি করে খবর পেলে।

    —সকালে কাগজে দেখলাম। তোমার জাহাজ ভিড়ছে। সাত তাড়াতাড়ি আসা যায় না। সিটি কোম্পানির থার্ড অফিসার এসেছে। ওর সঙ্গে এপয়েন্টমেন্ট। ওটা শেষ করে আসতে দেরি হল।

    —দাঁড়াও দাঁড়াও। হড়বড় করবে না। ভেবে দেখছি। সে ভাবতে থাকলে মিলড্রেড বলল, রাখো তোমার ভাবনা। এখন কি বের হবে?

    —শরীর ঠিক নেই মিলড্রেড। দরজা বন্ধ করে দাও। এবং এভাবে রিচার্ড কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকল। মিলড্রেড তাড়াতাড়ি তেমন সেজে আসতে পারেনি অথবা শরীরে ধকলের চিহ্ন, মিলড্রেডের পায়ে সাদা মোজা লতাপাতা আঁকা সিল্কের গাউন। সে বাঙ্কে শুয়ে পড়ল। যেন সেও আর পারছে না। পোর্টহোল দিয়ে নীল একটা আলো এসে পড়ছিল, পোর্টহোলের কাচ বন্ধ করে পর্দা টেনে দিল রিচার্ড। তারপর সংক্রামক ব্যাধির মতো একটার পর একটা ঘটনা। সেই ইন্ডিয়ানটাকে গালাগাল। সে আর কিছু বলছিল না মুখে। ওর জাহাজি খিস্তি যা জমা আছে একটার পর একটা এবং এভাবে একটা সে মজা পেয়ে যায়। ঘরের নীল আলো নিভে গেলে ওর মনে হয় একা হাঁটছে এবং এক বাগার ইন্ডিয়ান ওর পেছনে ছুটছে তাকে ধরার জন্য।

    সে মিলড্রেডকে বলল, আবার হাতের কাছে পেলে হয়। তারপর শুনতে পায় বাংকারে হড়হড় করে কয়লা নামছে। কি সাংঘাতিক শব্দ। জাহাজ কাল ছাড়ছে। রাতে রাতে বাংকার ভরে যাবে। সকালে জাহাজ ছেড়ে দিলে আবার কবে এই তাজা মেয়ের সঙ্গে শুতে পারবে জানে না। সে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাল প্রথমে ঈশ্বরকে, তারপর সেকেন্ডকে। সেকেন্ড ওকে না ডাকলে সে হয়ত আর একবার চেষ্টা করত এসির ঘরে যাওয়া যায় কিনা। তারপর ওর ধন্যবাদের পালা, সেই ইন্ডিয়ানটিকে। সে তার জেব সাফ না করে দিলে, ঠিক চলে যেত। যে-ভাবেই হোক এসির কাছে চলে যেত। এখন আর ইন্ডিয়ান দালালকে খচ্চর মনে হচ্ছে না, সে ভীষণ তার পক্ষে উপকারী। আবার দেখা হলে ধন্যবাদ না জানিয়ে তাকে পারবে না। খুব আপশোস এখন তার হাতের কাছে সে নেই।