Category: অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

  • সাত

    সাত

    ।। সাত।।

    রাত থাকতেই জাহাজ নোঙর তুলেছে। ডেবিডের ওয়াচ আটটা বারোটা। কিন্তু জাহাজ নোঙর তুলেছে বলে, শেষ রাতের দিকে পিছিলে হাড়িয়া হাফিজ করতে হয়েছে তাকে। জাহাজ নোঙর তুলে সমুদ্রে না পড়া পর্যন্ত সে ডেকে বসেছিল। কেবিনে ফিরে গিয়ে সে ঘুমোবার আর চেষ্টা করেনি।

    এটা ওর স্বভাব। কিনারায় জাহাজ ভিড়লেই তার আর ঘুম আসে না। যতক্ষণ সমুদ্রে জাহাজ ভেসে না যায়, সে বসে থাকে চুপচাপ। মাথার ওপর আকাশ থাকে। আকাশের অজস্র তারা ক্রমে কেমন অনুজ্জ্বল হয়ে যায়। চারপাশে এক আশ্চর্য নিস্তব্ধতা থাকে। এনজিনের শব্দ বাদে আর কিছু তখন কানে আসে না। স্টোক-হোলডে স্লাইস অথবা র‍্যাগের শব্দ। বেলচায় কয়লা মারার শব্দ। আর কিছু কানে আসে না। সমুদ্রের কিনারায় গাছপালাও ক্রমে চোখের ওপর থেকে সরে যায়। পৃথিবীর সব বন্দরে সে এ-ভাবে বসে থাকে। স্ত্রী এবির কথা মনে হয়। ছেলে-মেয়ের মুখ ভেসে ওঠে। ওরা ওকে প্রত্যেকে একটা করে চিঠি দেয়। চিঠিতে ওদের নানা বায়নাক্কা থাকে। বউ নানাভাবে লেখে তুমি চিন্তা কর না, আমরা ভাল আছি। তখন মনে হয় এবির চোখ দুটো তেমন সুন্দর নয়। চুল সোনালি, এবি ভারী সংসারী মেয়ে। এত ভাল যে মাঝে মাঝে এবিকে খুব একঘেয়ে লাগে। সে তার ছেলেপিলে সংসার বাদে আর কিছু জানে না।

    এবি নিজেও একটা কাজ করে। স্কুলে সে শিক্ষকতা করছে সেই কবে থেকে। দুজনের রোজগারে ওরা ডলফিনে বেশ সুন্দর ছিমছাম একটা বাড়ি করেছে। খুব শখ হে-ঘাসের ভেতর দিয়ে এবির হেঁটে যাবার। সূর্য উঠলে এবিকে সে কখনও দৌড়াতে দেখেনি। ওর ইচ্ছা হত, সূর্য উঠলে সে এবিকে নিয়ে হে-ঘাসের ভেতর দৌড়াবে।

    এবি সবসময় কাজকর্মে ব্যস্ত থাকতে চায়। সে বেশি হৈ-চৈ পছন্দ করে না। চার্চে প্রতি রবিবার তার যাওয়া চাই। খুব ধর্মভীরু এবি! এতটা ধর্মভীরু যে মাঝে মাঝে ডেবিডের এবির ঈশ্বর সম্পর্কে খুব ঠাট্টা করতে ইচ্ছে হয়। খুব রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে। ক্যাথলিক এবং আচার-আচরণে আন্তরিক। এমন আন্তরিকতাও ডেবিডের খুব পছন্দ না। বৌ একটু ছলনা করবে না, একটু চাতুরি খেলবে না, একেবারে সতীসাধ্বী হয়ে থাকবে ভাবতে তার ভারি খারাপ লাগে। সমুদ্র থেকে ঘুরে গেলে ওর মনে হয় সে এবির প্রতি নানাভাবে অবিশ্বাসের কাজ করেছে। এবি যদি সামান্য অবিশ্বাসের কাজ করত তবে বোধ হয় তার এতটা অনুতাপ থাকত না।

    কিনার সরে গেলেই সে ভাবে ধার্মিক হবে। স্ত্রীর প্রতি আন্তরিক হবে, কিন্তু কিনারায় গেলে কিচ্ছু তখন মনে থাকে না। কেবল একটা মুখ ভাসে, দূরবীনে সে এবির মুখ আর দেখতে পায় না। যেন এক পাখি নিরন্তর উড়ছে, সেটা যে কি, কেন ওড়ে, কেন সমুদ্রে ছায়া ফেলে যায়, দিগন্তরেখায় অদৃশ্য হয়ে গেলে কিছু ভাল লাগে না। সব গাছপালা দ্বীপ তখন কেন যে এত মনোরম লাগে সে বুঝতে পারে না। সে আজও বসেছিল, যতক্ষণ কিনার দেখা গেছে, চোখে দূরবীন। কাল তার ভারি ইচ্ছে ছিল কোথাও ঠিকানা খুঁজে যাবার, কিন্তু ছোটবাবুকে সঙ্গে নিয়ে সে যেন ভুল করে ফেলেছিল। আসলে সে চায় আন্তরিক থাকতে। একজন পাহারাদারের কাজ করবে ছোটবাবু। ছোকরা সে। ভেতরে এখনও রক্ত ততটা দামাল নয়। কিছুটা সত্ত মানুষের মতো লাগে। সে এখন ভাবছে ছোটকে সঙ্গে না নিয়ে বের হলেই ভাল হত। বড়-মিস্ত্রির মতো তবে একটা ঘরের খোঁজে যাওয়া যেত।

    আসলে, রাতে জাহাজে কেউ ছিল না। কাপ্তান, চিফ-অফিসার, জ্যাক বাদে সবাই নেমে গেছিল। ক্রুদের ভেতর থেকেও কেউ কেউ নেমে গেছে। শেষ পর্যন্ত বড়-মিস্ত্রি মিলড্রেডকে নিয়ে কেবিনেই রাত কাটিয়েছে। এতটা অবশ্য ওর ভাল লাগে না। নির্লজ্জের মতো সে এটা এখনও করতে পারে না। কিনার চলে গেলেই ওর মায়া হয় গাছপালার জন্য। এবার সে ভেবেছে সামনের বন্দরে ঠিক নামবে। যে-ভাবে হোক, কারণ এই প্রায় মাস দুই হল সে জাহাজে উঠে এসেছে, জাহাজটা পুরানো বলে বেশিদিন একনাগাড়ে কাজ করা যায় না। অনেকে অসুখে পড়ে যায়। সে সিঙ্গাপুরে উঠেছে। সে, বড়-মিস্ত্রি, মেজ মিস্ত্রি। জাহাজ হোমে গেলে সে নেমে যেতে পারবে না। ব্যাঙ্ক লাইনের সফরে বেশিদিন থাকার নিয়ম। পাঁচ-সাত মাসে নেমে গেলে, কোম্পানি সুনজরে দেখে না। যদিও সে যতটা জানে জাহাজ বুয়েন-এয়ার্স থেকে ব্রাজিলের ভিকটোরিয়া বন্দরে, তারপর সোজা কার্ডিফে। যদি জাহাজ ড্রাইডক হয় তবে বেশ কিছুদিন এবির সঙ্গে কাটাতে পারবে। ওর ভারি ইচ্ছে তখন এবিকে নিয়ে হে-ঘাসের ভেতর কেবল লুকোচুরি খেলবে। কিন্তু এবি যেন কেমন, সে এটাকে ভারি অসভ্যতা ভাবে। কখনও কোনও মাঠের ভেতর ঘাসেব ছায়ায় এবি দূরবীনে চোখ রাখতে চায় না। ওর ভারি লজ্জা। এই বয়সে এ-সব ওর এতটুকু ভাল লাগে না।

    অথচ এবি জানে না, দূরবীনে মেয়েদের ছবি আশ্চর্যভাবে বদলে যায়। সে দেখতে পায় একটা জীবন, হ্যাঁ জীবনই তো যেন সচল আন্তরিক আকাশ ওর কাছে মাথা পেতে রেখেছে। ছুঁয়ে দিলেই ঝর ঝর করে বৃষ্টিপাত হবে। এমনটা না হলে ডেবিডের মন ভরে না। মাঝে মাঝে ডেবিড তখন কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যায়। কোন দ্বীপে বন্যমেয়ের স্নান সে চুরি করে দেখতে ভালবাসে। মানুষের অদিমতা তাকে অত্যন্ত জীবন্ত করে রাখে।

    একা একা ডেকে বসে থাকলে কত কিছু এমন মনে হয়। রাতে জাহাজ বাংকার নিয়েছে বলে সারাটা ডেক কয়লার গুঁড়োতে ভরে গেছে। সারাটা ডেক হ্যাচ ডেরিক, বয় কেবিন, লাইফ বোট সব কয়লার ধুলোয় ঢেকে গেছে। হেঁটে গেলে জুতোর ছাপ পড়ছে ডেকে। তার হাঁটতেও ভাল লাগছে না।

    ক্যাপ্টেন হিগিনস্ তখন ব্রীজ থেকে বারবারই সমুদ্রে কি যেন উঁকি দিয়ে দেখছেন। কিছু খুলে টুলে গেল নাকি। যা একখানা লক্কড় মার্কা জাহাজ, কখন যে কি হয়! বে-অফ বেঙ্গলে বড় রকমের একটা ঝড়ে পড়েছিল—তারপর তো জাহাজ পাট-রাণীর মতো চলছে। হেলে-দুলে কেবল দক্ষিণ পশ্চিমে এবং ক্রমে দক্ষিণে, কখনও দক্ষিণ-পূর্বও করতে হচ্ছে। স্টিয়ারিং হুইলের সঙ্গে কম্পাসের কাঁটার হিসাব ঠিক রাখা এবং জাহাজ চালানো তেমন কঠিন না। কিন্তু মুশকিল নদীর মতো সমুদ্র কখনও কখনও দামাল হয়ে যায়। কোথাকার স্রোত, কি ভেঙে এনে কোথায় জমা করে এবং কিভাবে চড়া পড়ে যেতে পারে আর তার চড়ায় উঠে গেলে হয়ে গেল। যেতে যেতে এমন যে দুটো একটা ছবি এই যেমন জাহাজ চড়ায় আটকে আছে, অথবা একটা বয়াতে লাল, নীল আলো, অর্থাৎ নিচে অতলে একটা জাহাজ ডুবে আছে, সেখানে এখন সমুদ্র প্রাণীরা নানাবর্ণের লতার ভেতর জলজ ঘাসের ভেতর আস্তানা বানিয়েছে—এমন সব দৃশ্য দেখতে পাওয়া যে না যাবে তা নয়। এ সব দেখলেই পুরোনো জাহাজের ভয়। অবশ্য পুরোনো জাহাজ অনেক সময় পুরোনো টনিকের মতো কাজ করে। ঝড় জলে সে বেশি সময় যুঝতে পারে।

    হিগিন্‌স্‌ এখন চার্টরুমে ঢুকে যাবেন। ডেবিড এবার সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে গেল। ডেক-জাহাজিরা হোসপাইপে জল মেরে যাচ্ছে ডেকে। টিন্ডাল বোট-ডেকে উঠে সি-ওয়াটার ভালব ঘুরিয়ে দিচ্ছে। নানা জায়গায় নানাভাবে এইসব ভালব্ ছড়িয়ে আছে। যেখানে যেভাবে জলের দরকার ভালব ঘুরিয়ে দিলেই হল। হোসপাইপ লাগিয়ে দিলেই হল। জেনারেল সার্ভিস পাম্প থেকে নানাভাবে সব পাইপ জাহাজের চারপাশে ছড়িয়ে গেছে। এবং এ-জাহাজ পুরোনো বলে, স্টিমএঞ্জিন বলে, সবসময় জাহাজে জলের দরকার বেশি। লম্বা সফরে জল কখনও কখনও ফুরিয়ে যায়। তখন এভাপরেটিঙ করতে হয়। নোনা জল থেকে মিষ্টি জল করে নিতে হয়।

    ডেবিড বুঝতে পারে এভাবে এক বিচিত্র জীবন এ জাহাজে থাকলে গড়ে ওঠে। কিনারার প্রতি টান, পরিবারের জন্য মায়া, তারপর দীর্ঘদিন বাদে মনে হয়, সে একজন নিরালম্ব মানুষ, সে আছে এই জাহাজেই, জাহাজেই তার জন্ম, জাহাজেই তার শৈশব, যৌবন এবং বার্ধক্য এবং এভাবে সে মরে যাবে। তখন মনে হয় না, তার স্ত্রী আছে, ছেলেপুলে আছে, কেবল মনে হয় সে একটা যানে চড়ে ক্রমান্বয়ে সমুদ্র, দ্বীপ এবং পাহাড় অতিক্রম করে পৃথিবীর সব মানুষের ঘরে ঘরে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে। সাংসারিক জীবন, স্ত্রী-পুত্র সব অনেক দূরের মনে হয় তখন। বন্দরে নেমে তখন একটু বেলাল্লাপনা করতে না পারলে ভাল লাগে না। পুরোনো ছবির মতো মেয়েমানুষের শরীর একটা যাদুঘর হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে ঠান্ডা, অতি ঠান্ডা কোমরের নিচু অংশটা। কেন যে সেখানে ফুল ফোটার মতো উত্তাপ থাকে না।

    ডেবিড ভেবেছিল, এক বিকেলে ছোটবাবুকে নিয়ে বোট-ডেকে বসবে। একটা দ্বীপের পাশ দিয়ে তখন তারা যাবে। দ্বীপটা সোনালি। নানারকমের ক্যাকটাস। ক্যাকটাসগুলো এত বড় যে কখনও ওদের বড় গাছটাছ মনে হয়। এমন সব ক্যাকটাস পৃথিবীর অন্য কোথায় আছে তার জানা নেই। সে তো অন্তত দেখেনি। দূরবীনে এ-সব এত ভাল দেখা যায় যে, মনে হয় সমুদ্রের নীল জল যখন এ-ভাবে এমন একটা দ্বীপকে পৃথিবীর জন্ম থেকে ঘিরে রেখেছে, আর সেই ক্যাকটাস সব ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে তখন সেখানে কোন মানুষের পায়ের ছাপ থাকবে না হয় না। কিন্তু সে জানে, এ দ্বীপে মানুষেরা আসেনি। কি হবে, এইসব দ্বীপে শুধু ক্যাকটাস, এবং এত ছোট যে ফার্লঙের মতো বৃত্তাকারে ভেসে আছে। মাটির রঙ সে যতবার যে-ভাবেই দেখেছে, সোনালি এবং ক্যাকটাসগুলো অতি প্রাচীন বলে নীল রঙের। আর সূর্য উঠলে ওর মনে হত পৃথিবীতে প্রথম মানুষ আদম ইভ এখানে বোধ হয় শৈশবে বড় হয়েছে। আদম ইভের পক্ষে এর চেয়ে নির্জন জায়গা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সে দূরবীনে কোনও গিরগিটি দেখেনি, কোনও টিকটিকি দেখেনি। পিঁপড়ে টিপড়ে আছে কিনা, বুঝতে পারে না। কেবল দ্বীপটার চারপাশে নানারকমের শঙ্খের মরা খোল পড়ে আছে। হঠাৎ দেখলে মানুষের মাথার কঙ্কালের মতো মনে হয়। তখন গা’টা শিউরে ওঠে।

    কিন্তু সে দেখল, ছোটকে তখন ভীষণ ধমকাচ্ছে মেজ-মিস্ত্রি। ছোট কাজ করছিল ফাইভারের সঙ্গে। ফাইভারকেও খিস্তি করছে। এবং গালাগাল, মুখে যা আসে তাই বলছে। বড় বেশি হামবড়া ভাব এই মেজ-মিস্ত্রি আর্চির। সে জাহাজের এনজিনঘরের সব। দায়িত্ব সব তার। সে জোরে জোরে হাঁকছে—সারেঙ, সারেঙ! ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে হাঁকছে। এবং ওর চিৎকারে জ্যাক পর্যন্ত ছুটে এসেছিল। কাপ্তান চার্টরুমের পোর্টহোল দিয়ে দেখছে, আর্চি ভীষণ মেজাজে কথা বলছে সারেঙের সঙ্গে। সারেঙ আমতা আমতা করছে।

    ছোট চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

    আর্চি চেঁচিয়ে বলছে, এ ছোকরা এখানে কেন? এখানে কেন জবাব দাও।

    হঠাৎ মেজ-মিস্ত্রি ক্ষেপে যাবার কারণ সে বুঝতে পারছে না। সে বলল, সারেঙসাব বলেছেন ফাইভারকে একটু হেল্প করতে।

    —হেল্‌প, মানে তুমি ফাইভারকে হেল্প করবে! তোমার এত সাহস কোথা থেকে আসে হে ছোকরা! তুমি কি ভেবেছ!

    ছোট যথাযথ ইংরেজীতে বিনয়ের সঙ্গে জবাব দিল, আমি কিছু ভাবিনি স্যার।

    —মুখের ওপর কথা! কি সাহস! এইসব ছোকরাদের বেজায় সাহস। তুমি কাল কার পারমিশনে জাহাজ থেকে নেমে গেছ?

    —কারো না। যাবার সময় সারেঙসাবকে বলে গেছি।

    আর্চি বুঝল এখানে তার কিছু করার নেই। নিচে নেবে যাবার অনুমতি সারেঙ অনায়াসে দিতে পারে। সে আবার হেঁকে উঠল, ওহে ছোকরা, শুনে রাখো জাহাজের কাজে নবাবি চলে না।

    ছোট বলল, জানি স্যার।

    —তুমি জানো! কি জানো! কি জানো, যাও হতভাগা পাজি, নচ্ছার, নিচে যাও। ফাইভার, এই রাসকেল ফাইভার, তোমার মুখের চামড়া খুলে এবার দেখছি একজোড়া জুতো না বানালে চলছে না। আহম্মক, তুমি হেল্পার নিয়েছ কেন!

    —একা পারা যাচ্ছে না সেকেন্ড। দেখুন, কি পুরোনো জং ধরা, মনে হচ্ছে, জাহাজে যারা গত সফরে ছিল, তারা হাতই দেয়নি।

    —রাখো তোমার নোংরামো। পরের ঘাড়ে দোষ চাপাবে না। পুরোনো জাহাজে এমন হয়।

    —দেখুন স্ট্রেপারগুলো কেমন জ্যাম। দেখুন, বলে সে তেলকালিতে মাখামাখি হয়েও স্ট্রেপারের নাট আলগা করতে পারল না।

    আর্চি দেখল, বেশ লম্বা হয়ে ফাইভার ডেক বরাবর উইনচের নিচে ঢুকে গেছে। ওর পা থেকে কোমর পর্যন্ত বাইরে। আর বাকিটা ভেতরে। নাট টেনে জ্যাম ছাড়াতে পারছে না। এ-শীতেও সে ঘামছে। এবার আর্চি খুব জোরে ফাইভারের পায়ের ওপর চাপ দিল। –আঃ একটা চিৎকার। টানো। এবং সঙ্গে সঙ্গে নাট-বোল্ট আলগা হয়ে গেল। এমন একটা নির্যাতনের ভেতর আর্চির নিষ্ঠুরতার যেন শেষ থাকে না। জাহাজ ডারবান যাচ্ছে! সেখানে কিছু পাটের গাট নামানো হবে। কিছু চায়ের পেটি। ডেরিকগুলো ঠিকঠাক, এবং উইনচগুলো সব চালু করে নিতে না পারলে মেজ-মিস্ত্রি আর্চির বদনাম হয়ে যাবে।

    অথচ ছোটবাবু জানে মেজ মিস্ত্রি আগেও দেখেছে, সে ফাইভারের সঙ্গে কাজ করছে। কাল বড়- মিস্ত্রি ওকে মেজ-মালোমের সঙ্গে দেখেছে। সে জাহাজে কি কাজ করে হয়ত এমন খবর নিয়েছে। আর একটা রাগ তো পুষেই রেখেছে মেজ-মিস্ত্রি! এখন বড়-মিস্ত্রি পাশে থাকলে ঝাল মেটাতে সময় লাগবে না। সে মেজ-মিস্ত্রির এমন ব্যবহারে অবাক হল না। কেবল বলল, স্যার, আমি কোথায় কাজ করব।

    সামান্য কোলবয়ের সোজাসুজি মেজ-মিস্ত্রির সঙ্গে কথা বলার এক্তিয়ার নেই। এসব বেয়াদপী সে সহ্য করতে পারে না। সে গম্ভীর হয়ে যায়। সারেঙকে শুধু কি বলে দিল। মেজ-মিস্ত্রির দায় নেই ছোটকে সোজাসুজি কিছু বলার। এবং এই যে সোজাসুজি ছোট জিজ্ঞাসা করল, এতে অপমান, ভীষণ অহংকারে লাগে। আগে এসব জাহাজে ছিল না। আগে যারা আসত, ওরা সবাই প্রায় যেন ক্রীতদাসের সামিল। একটা কথাও বুঝত না। সারেঙ সব কাজ বুঝে নিত, তারপর সে সবাইকে দিয়ে কাজগুলো করাত। এখন এরা নতুন উঠে আসছে। কেউ কেউ বেশ সুন্দর ইংরাজিতে কথাবার্তাও বলতে পারে। আর কি যে এরা ভাবে, একটু ইংরেজিতে কথাবার্তা বলতে পারলেই, যথাযথ বলেছে ভেবে ফেলার চেষ্টা করে। আর্চি তখন মনে মনে না হেসে পারে না।

    আর্চির গালাগাল ছোটকে ভীষণ কাবু করে দিয়েছে। আবার জ্যাক মাথার ওপর বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে সব শুনছে। জ্যাক কাছে না থাকলে সে যেন এতটা অপমানিত বোধ করত না। সে জ্যাকের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারল না পর্যন্ত। চুপচাপ সারেঙের পিছু পিছু এনজিনরুমের দরজায় ঢুকে গেল। লোহার জালিতে হেঁটে গেলেই সামনে সোজা সিঁড়ি নেমে গেছে। সে সিঁড়ির দু’রডে হাত রেখে শরীর সোজা ছেড়ে দিয়ে নেমে গেল না আজ। ধীরে ধীরে কোন কারাগারে বন্দী মানুষের মতো হেঁটে গেল। আর্চি যেভাবে পেছনে লেগেছে, আজ হোক কাল হোক সে একটা হয়তো কিছু করে ফেলতে পারে। ছোটবাবু ভেতর ভেতর কেমন সহসা অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। তখন সারেঙ বললেন, ওদিকে না। এদিকে।

    ছোট, জেনারেটারের ডানদিকে হেঁটে গেল। তারপর বয়লার এবং ক্র্যাঙ্ক স্যাটের মাঝখানে ঢুকে সে ও-পাশের কনডেনসার বাঁয়ে ফেলে আরও ভেতরে ঢুকে গেল। এখানে সারেঙ একটা প্লেট তুলে বললেন, নিচে নাম। নিচটা ভীষণ অন্ধকার। কিছু দেখা যাচ্ছে না। ছোটর ভীষণ ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল। সে নিচে নেমে গেলে যদি সারেঙ প্লেট চাপা দিয়ে সরে যান। অন্ধকারে পর পর জলের খালি ট্যাঙ্ক নিচে। ভেতরে ঢুকে গেলে, একটা দিয়ে আর একটায় বের হয়ে যেতে পারবে, কিন্তু ওপরে উঠে আসার রাস্তাটা তার জানা থাকবে না। কেমন একটা গুম গুম শব্দ ভেতরে। সারেঙ একটা বাতির ব্যবস্থা করছে। নিচে কিছু দেখা যাচ্ছে না। একটা বালব জ্বলছে লম্বা রবারে মোড়া তারে। সে সেটা নিয়ে ভেতরে নেমে গেলে দেখল, ট্যাঙ্কগুলো থেকে জল পাম্প করে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ওর এখন কাজ বালতিতে সব ময়লা তোলা। লাল সবুজ নানারকমের শ্যাওলা জমেছে। ট্যাঙ্কের ছাদে, চারপাশে শ্যাওলার জট। এ-কাজ একা এক নাগাড়ে এক বছরেও শেষ করতে পারবে না। সে বুঝল, এটা শাস্তি দেবার কৌশল।

    ছোট চুপচাপ কাজ করে গেল। সে ক্রমে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। বালতির সঙ্গে দড়ি বাঁধা। এনজিনরুমের নিচে এই ট্যাঙ্ক ছড়ানো। এক একটা এপারটমেন্টের মতো। ভেতরে গোলগোল হোল। একটার ভেতর দিয়ে আর একটা ট্যাঙ্কে চলে যাওয়া যায়। সারেঙ বালতিটা ভরে গেলেই তুলে ফেলছেন। মেজ-মিস্ত্রি জেনারেটারের পাশে দাঁড়িয়ে স্টিম দেখছে জাহাজের। আর বেশ একটা যেন মজা পাচ্ছে। সে হাভানা চুরুটের ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার করে ফেলেছে।

    ছোট এভাবে কাজ করে যাচ্ছিল। সে বেশ ভেতরে ঢুকে গেছে। সে সব সময় সঙ্গে আলোটা রেখেছে, একটা এপারটমেন্ট থেকে অন্য এপারটমেন্টে ঢুকে যাবার সময় সে বাতিটা ছাড়ছে না। ভয়, সে একটা না গোলকধাঁধায় পড়ে যায়। এমন একটা জায়গা এই জাহাজে আছে যে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। ওপরে বিশাল প্লেটের ওপর বড় বড় কলামে সিলিন্ডার। বড় বড় তিনটে পিস্টন থামের মতো মোটা ঘুরে যাচ্ছে। অতিকায় প্রপেলার স্যাফট মাথার ওপর অনবরত ঘুরছে। আর তার তলায় সেই আলাদিনের দৈত্যের মতো সারেঙ গুহার মুখে। সে কোথায় যে ক্রমে চলে যাচ্ছে! সে বুঝতে পারছে তার পায়ের নিচে জাহাজের তলা, খোলের শেষ বিন্দ!

    ছোটবাবুর ঘাড় ধরে গেছে। কারণ, ভেতরে সোজা বসা যায় না। নুয়ে নুয়ে কাজ করছে সে। সে ট্যাঙ্কের জল সাদা কাপড়ে মুছে দিচ্ছে। ওর জামা প্যান্ট ভিজে গেছে। ভেতরটা এত ঠান্ডা যে শীতের গুহা যেন। ওর মনে হচ্ছিল হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে। সে বুঝতে পারছে আর কিছু সময় থাকলে সে এখানে ঠান্ডায় বরফ হয়ে যাবে।

    কিন্তু সে তো কাজকে ভয় পায় না। সে তো মরে গেলেও বলতে পারবে না, শীত করছে। যতক্ষণ না সারেঙ নিচে নেমে বলছেন, উঠে আয়, ততক্ষণ এখানেই তাকে থাকতে হবে।

    ছোট সেজন্য খুব দ্রুত কাজ করে যাচ্ছে! বসে বসে করলে শরীরের রক্ত গরম থাকে না, ঠান্ডা হয়ে যায়। সে কিছুটা হাঁটু গেঁড়ে কাজ করে যেতে থাকল। দাঁত, ঠকঠক করছে। তবু সে কাজ করে যাচ্ছে। যতটা সম্ভব সে হাত পা নেড়ে করে যাচ্ছে। ওর মুখ চোখে এখন নানাবর্ণের দাগ। কোথাও সবুজ, কোথাও খয়েরি। সে জানে না, ওর চোখ মুখ এখন একজন সারকাসের জোকারের মতো।

    ছোটকে সারেঙ কোথায় নিয়ে গেল! জ্যাক কাজের অছিলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছোটকে খুঁজে মরছে। আর্চি বেশ মজা করছে ছোটকে নিয়ে। জ্যাকের তাই মনে হল। আর্চি ভেবেছে, জ্যাক কিছু বোঝে না। জ্যাক লাফিয়ে লাফিয়ে নামছে। সে কাউকে কিছু বলছে না। সে চিমনির পাশে, বয়লার ঘরে নেমে যাবার সিঁড়িতে বেশ শিস দিতে দিতে নামছে। অথবা সেই গানটা যেন শিসের ভেতর—উই আর ইন দি সেম বোট….. অথবা মনে হয় জ্যাক ভীষণভাবে ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠছে। জ্যাককে এখন খুব চতুর মনে হচ্ছে। ছোটকে দিয়ে আর্চি কি করাচ্ছে, অথবা কি করাতে চায় সেটা না দেখতে পারলে ভেতরের অস্বস্তিটা যাচ্ছে না। সে লম্বা বয়লার স্যুটের ওপর একটা কালো সোয়েটার চাপিয়েছে। কারণ শীত ক্রমে বাড়ছে। যত ডারবানের দিকে যাচ্ছে তত ঠান্ডা বাড়ছে। এবং এভাবে ওরা এখন শীতের দেশে চলে যাবে। ছোট যে এখন কোথায়! সে বাংকারে উঁকি দিয়ে দেখল অন্ধকারে একজন কোলবয় বসে বসে বিড়ি খাচ্ছে। সে জ্যাককে দেখেই তাড়াতাড়ি বিড়িটা ফেলে বেলচে হাতে গাড়িটা টানতে টানতে কয়লার কাছে নিয়ে গেল। পাশের বাংকারের লোকটা মাঝ-বয়সী মানুষ অনবরত গাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে আর কয়লা ফেলছে।

    না, এখানেও নেই। সে সিঁড়ি ভেঙ্গে আরও নিচে ঠিক বয়লার ঘরে নেমে গেল। টিন্ডাল, ফায়ারম্যান, ওকে দেখেই ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। সারেঙের ওয়াচ। সবাই এখন দমাদম কয়লা হাকড়াচ্ছে চুল্লীতে। জ্যাক- এ-সব বুঝতে পারে, এটা ওরা ওর সম্মানে কাজ দেখাচ্ছে। এখন কয়লা ফার্ণেসে না দিলেও চলত। সে এখানেও ছোটকে দেখতে না পেয়ে হতাশ হল। মিঃ আর্চি ছোটকে কোথায় নিয়ে সেঁদিয়েছে।

    জ্যাক এবার গঙ্গাবাজুর বয়লার আর বালকেড বরাবর যে রাস্তাটা এনজিনরুমে চলে গেছে তার ভেতর ঢুকে গেল। এখানে এলে চারপাশের ছাই ঝুরঝুর করে মাথার ওপর পড়তে থাকে। সে যেতে যেতে বুঝতে পারল ওর মুখেও ছাই লেগেছে। রুমাল দিয়ে ভালভাবে ছাই মুছে ভেতরে ঢুকে দেখল মিঃ আর্টি সিঁড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে দেখছে না, জ্যাক সামনে। জ্যাক বলল, গুড মৰ্ণিং মিঃ আৰ্চি।

    —গুড মৰ্ণিং জ্যাক। হঠাৎ এখানে। তুমি তো কখনও আস না।

    —আপনার এনজিনঘর দেখতে এলাম।

    —তুমি আগে দ্যাখোনি।

    —কবে দেখলাম! খুব বিস্ময়ের সঙ্গে তাকাল।

    —বেশ, এস, দেখাচ্ছি।

    মিঃ আর্চির কথাবার্তা কি সুন্দর এখন। বড় ভাল মানুষ। যেন সে জ্যাকের জন্য যা কিছু দরকার সব করতে পারে। জ্যাককে নিয়ে সে প্রপেলার স্যাটের পাশে চলে গেল। কখনও কনডেনসারের পাশে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখালো। জ্যাক আসলে কিছুই দেখছে না। সে তো সব জানে, সে তো কতবার এসব দেখেছে। কিন্তু সারেঙ যে ছোটকে এদিকে নিয়ে এল তারপর কোথায়! সে বলল, মিঃ আর্চি আপনার এনজিনঘর খুব পরিষ্কার। এমন পরিষ্কার রাখেন কি করে! তারপর খস খস শব্দ। কেউ মনে হয় প্লেট তেল আর শিরিস কাগজে ঘসছে। মনে হল জ্যাকের, হয়তো ছোট হবে। ওরা নীল রঙের পোশাক পরে সবাই। কিন্তু কাছে গেলে দেখল, একজন বুড়ো মতো মানুষ কোলবয় টয় হবে, প্লেট ঘসছে। জ্যাক আর ভেতরে উত্তেজনা চেপে রাখতে পারছে না। সে তো, সারেঙ, ছোটবাবুকে নিয়ে এনজিনরুমে নেমে এলে অনেকক্ষণ বোট-ডেকের রেলিঙে দাঁড়িয়েছিল। এনজিনরুম থেকে উঠে যাবার দুটো পথ। একটা এনজিনরুম থেকে সোজা সিঁড়ি ধরে, অন্যটা বয়লারঘর দিয়ে চিমনির পাশে। সে বোট-ডেকে, বয়-কেবিনের পাশে ছিল বলে দুটো পথই চোখের ওপর। ছোট এবং সারেঙ এনজিনরুম থেকে উঠে গেলে ঠিক চোখে পড়ত।

    অথচ সে বলতে পারছে না, মেজ, তুমি ওকে কোথায় রাখলে। মিঃ আর্চি, ছোট তো সামান্য একজন নাবিক, তুমি কত বড় কাজ কর জাহাজে, একজন সামান্য নাবিককে এভাবে অকারণ কষ্ট দিয়ে কি লাভ! তুমি নিজেকে ছোট করছ আর্চি। এ সবই মনের কথা। সে আর না পেরে, শেষবারের মতো যমুনাবাজুর বয়লারের ফাঁকে উঁকি মারলেই দেখল, সারেঙ দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে দড়ি! তিনি টেনে টেনে বালতি তোলার সময় দেখলেন, একেবারে সামনে জ্যাক। তিনি খুব থতমত খেয়ে গেলেন। বললেন, গুড মৰ্ণিং সাব।

    জ্যাক বলল, গুড মর্ণিং! এখানে কি করছ সারেঙ?

    —টাংকি সাফ করছি সাব।

    —আমি টাংকিতে নামব!

    —না না সাব। নামলে সব ভিজে যাবে। জুতা ভিজে যাবে। ঠান্ডা লাগবে। ভীষণ ঠান্ডা।

    জ্যাক কিছু শুনল না। সে লাফিয়ে নিচে নেমে গেল। দেখল অনেক দূরে আলোর তারটা ভেতরের দিকে চলে গেছে! সে বলল, কি চমৎকার সারেঙ। সে ছোটকে দেখতে পাচ্ছে না।

    মাথার ওপর ট্যাঙ্ক-টপ প্রায় ছাদের মতো। নির্জন কারাগারের মতো জায়গা। কেবল এনজিনটা গর্জাচ্ছে বলে কঠিন একটা ধাতব শব্দ। ভেতরে জলের আধার। এবং শ্যাওলার গন্ধ। ঠান্ডা এক অতীব হিমশৈল ভেসে বেড়ালে সমুদ্রে যেমন লাগে ঠিক তেমনি। জ্যাক শীতের দেশের মানুষ, ওরও কেমন ভেতরটা শীত শীত করছে। কিছুক্ষণ থাকলে ওরও দাঁত ঠক ঠক করবে।

    এবং এ-সময়ে মনে হল, ঠিক ভূতের মতো অথবা ছায়া ছায়া অন্ধকারে কেউ হামাগুড়ি দিয়ে এদিকে আসছে! ক্রমে কাছে এলে বুঝতে পারল, ছোট। জলে ভিজে একেবারে সাদা হয়ে গেছে। মুখে নানাবর্ণের বর্ণমালা, সঠিক জোকার। চোখ তবু উজ্জ্বল। সে জ্যাককে দেখেই হাসল। জামাকাপড় জবজবে ভেজা। ভীষণ ক্লান্ত এবং দাঁত ঠক ঠক করে কাঁপছে।

    জ্যাক হাসতে পারল না। কিছু বলতেও পারল না। ছোট, প্লেটের মুখে এসে বালতিটা সারেঙের হাতে দেবার সময় বলল, একটু আগুন না হলে চাচা মারা যাব।

    জ্যাককে বলল, তুমি এখানে! দাঁত ঠক ঠক করে কাঁপছে বলে কথা স্পষ্ট হচ্ছে না। কেমন লম্বা হয়ে যাচ্ছে প্রতিটি শব্দ। যেন জলে ঠক ঠক শব্দ করে মাছ ধরার মতো এক পাখি। জ্যাক এবার ওপরে উঠে সোজা চলে গেল। একটা কথাও ছোটর সঙ্গে বলল না। সারেঙ কিছুটা এতে ঘাবড়ে গেছে। সে বলল, চল ওপরে। খাবার সময় হয়ে গেছে। পরে দেখা যাবে।

    সে ছুটি পেয়ে এক দৌড়ে ওপরে উঠে গেল। সে যে সাদা হয়ে গেছে এবং তাকে অকারণ মেজ-মিস্ত্রি টরচার করছে এটা মৈত্র পিছিলে সব জাহাজিদের বলে বেড়াচ্ছে। এটা কেন হবে! সারেঙের কি ইচ্ছা। ওর কি ইচ্ছা ছোটকে মেরে ফেলবে! মেজ-মিস্ত্রি কি ভাবেন! তাকে কি আমাদের মাথা নেবার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এবং ছোট, পিছিলে ঢুকে গেলেই বুঝতে পারল ভীষণ উত্তেজনা সৃষ্টি করছে মৈত্র, অমিয়, লতিফ, মনু, জব্বার। সারেঙকে ওরা এলেই ঝাঁপিয়ে পড়ল। —আপনি কি ভেবেছেন!

    —কি ভেবেছি!

    –মেজ-মিস্ত্রি যাই বলবে আপনাকে তাই করতে হবে! —তা ছাড়া কি!

    —আপনি নিজের বুদ্ধি বিবেচনা খাটাবেন না? এখনও আপনি ভেবেছেন, আমরা ওদের গোলাম আছি!

    —কিন্তু উনি অর্ডার দিলে আমি কি করব।

    —বলতে পারলেন না, ডারবানের ঘাটে হবে। সবাই নেমে যা পারা যায় করা যেত। ছোটর একার কি দায় কাজ করার।

    —কিছুটা কাজ এগিয়ে রাখা যাচ্ছে।

    —শুনুন, মৈত্র বলল, তোষামোদ আর করবেন না। আর না। জব্বার বলল, আর না। ওরা যা খুশী একসময় করতো, এখন আর না।

    সারেঙসাব পুরোনো মানুষ। তার কাজ করার স্বভাব। আদেশ তামিল করা তার কাজ! সে ভেবে পেল না কি অন্যায়টা মেজ-মিস্ত্রি করেছে। ওর বরং ছোটর ওপরই রাগ হল। একটুতেই কাহিল হয়ে যায়! এবং ছোটও ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেছে। সে গ্যালিতে আগুন পোহাবার সময় বলল, আরে মৈত্রদা কিছু তো করতে হবে।

    —যা জানিস না তা নিয়ে কথা বলিস না। ডারবানের ঘাটে আমরা সবাই মিলে করলে কি আর কাজ! এতো আর তকতকে ঝকঝকে করা হয় না। একটু মুছে পরিষ্কার করে দেওয়া। ঠিক পরিষ্কার করতে গেলে এক বছরে কেন, জাহাজের জীবনেও হবে না। এটা আবার জাহাজ নাকি! তাপ্পি মারা জাহাজ তায় মেজ-মিস্ত্রি তার আবার কত রোয়াব! শেষ পর্যন্ত মেজ সম্পর্কে মৈত্রদা কিছু উঁচুদরের খিস্তিও ঝেড়ে দিল।

    মাঝে মাঝে এটা দেখেছে ছোট, মৈত্রদা ঝগড়ার সময় কেমন ছেলেমানুষ হয়ে যায়। সে সারা সফরেই এভাবে জাহাজিদের পক্ষ নিয়ে কথা বলে। সে সেদিনও ঝগড়া করেছে। সারেঙসাব, মেজ- মিস্ত্রির কি রাইট আছে জুতো দিয়ে মুখ নেড়ে দেখার! কি রাইট আছে বলুন। আপনারা কিছু বলেন না বলে পেয়ে বসে। আপনারা বলবেন না, আমাদেরও যেতে দেবেন না।

    সারেঙসাব বললেন, আরে সাহেবদের সঙ্গে ঝগড়া করে পারা যায় না। ওরা আমাদের তো ওপরওয়ালা। ওরা আমাদের অনেক ক্ষতি করতে পারে।

    মৈত্রদা যেমন বলে থাকে বলে ফেলল, কচু করতে পারে। কই দু-দুবার তো ব্ল্যাক লিসটেড হয়েছি, জাহাজ পাই না এমন তো হয় না।

    ছোট কি করবে তখন ভেবে পায় না। সারেঙসাব এভাবেই সারাজীবন কাজ করে এসেছেন। সব কাজই জাহাজের কাজ, সবই করতে হবে, ভয় পেলে চলবে না। ছোট আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। ঠান্ডা লেগে যেতে পারে এই একটা ভয় থেকে গেল। জ্বরটর আসতে পারে। বুকে কফ বেঁধে একটা কেলেঙ্কারি হতে পারে। কারণ ভেতরে ভেতরে সে খুব আড়ষ্ট বোধ করছিল। খাবার খেয়ে আবার কি কাজ করতে হবে সে জানে না। যদি আবার ট্যাঙ্কের ভিতর নেমে যেতে হয়—ও কেমন অসহায় বোধ করতে থাকল।

    তবু বিকেলের দিকে কেউ জানে না, কেন মেজ-মিস্ত্রি সারেঙকে বলে পাঠাল, এখন ট্যাঙ্কটপের কাজ বন্ধ থাকবে। ছোট যেমন কাজ করছে, তেমনি করবে।

    ছোট কেবল বুঝতে পারল, এটা জ্যাকের কাজ। জ্যাক কিভাবে এটা করেছে সে জানে না। প্ৰথমে সে জ্যাকের ওপর ভীষণ খুশী। তারপরই জ্যাকের ওপর ওর কেমন একটা রাগ, অথবা জ্যাক কি ভেবে থাকে, আমি কোন কাজের উপযুক্ত নই, আমি কি কিছু পারি না! জ্যাক কি আমাকে খুব সাহসী মনে করে না? সে ভাবল, জ্যাককে একা পেলে দু-কথা শুনিয়ে দেবে। এবং তারপরই মনে হল, সত্যি সে সাহসী নয়। ভাবতেই ভেতরে কেমন হীনমন্যতা জন্মে গেল। এমন কি জ্যাকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলেও ভারি লজ্জার ব্যাপার। সে সারাটা বিকেল ফাইভারের সঙ্গে প্রায় ঠিক আগের মতো লুকিয়ে লুকিয়ে কাজ করল। জ্যাক যাতে দেখতে না পায়—সে জাহাজে সেঁধিয়ে গেল।

    এভাবে সেকেন্ড অফিসারও বিকেলে বসে থাকল, ছোটকে দেখতে পেল না। এভাবে জ্যাক চুপচাপ বয়কেবিন পর্যন্ত বার বার ঘুরে গেছে তবু ছোটকে দেখতে পেল না’। বেশ জাহাজ যাচ্ছে। এবং কিছু উডুক্কু মাছ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, আর নীল জলে ডুবে যাচ্ছে। সামনে জল কেটে যাচ্ছে জাহাজ, দু’পাশে অজস্র বিন্দু বিন্দু সাদা ফেনা। আর আকাশটাকে কখনও মনে হয় নীল চাঁদোয়ার মতো। এবং কতভাবে যে এ-আকাশ সুন্দরভাবে সেজে থাকতে ভালবাসে। কখনও কিছু মেঘ ভেসে গেলে, সমুদ্রে তাদের ছায়া, কখনও সাদা, কখনও লাল, অথবা হলুদ রঙের ছায়া। নীল জলে এইসব ছায়া খেলা করে বেড়ালে জ্যাকের মনে হয় পৃথিবীতে সে খুব ভালবাবে বেঁচে আছে। ঠিক সেই নদীর পারে কোন দুর্গের পাশে তার বাবার প্রাসাদের মতো বাড়িতে সে যখন হেঁটে যায়, চারপাশে ডেইজি ফুলেরা তখন ফুটে থাকে। এখানে ফুল নেই, কিন্তু ছোট আছে। ছোট আছে বলেই বোট- ডেকে তার বার বার হেঁটে বেড়াতে ভাল লাগে।

    এভাবে একদিন সেই ক্যাকটাসের দ্বীপটাও দূরে দেখা গেল। তখন বিকেল, সূর্য অস্ত যাবে আর কিছু সময় বাদে। ছোটকে সেকেন্ড অফিসার ডেবিড খুঁজে বেড়াচ্ছে। এ তিন-চারদিন কেউ ওকে দেখতে পায়নি। ডেবিড বুঝতে পারছে ছোটকে এভাবে মেজ-মিস্ত্রি গালাগাল করছে বলে তার খুব আত্মসম্মানে লেগেছে। এবং এভাবে ডেবিড মানুষের স্বভাব বুঝতে পারে—ছোট ঠিক দশটা জাহাজির মতো নয়। কোথায় যেন সে একটা প্রাচীন সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছবি তার ব্যবহারে সব সময় ঝুলিয়ে রাখে। তখন ছেলেটার জন্য ডেবিডের কেন জানি কষ্ট হয়।

    ছোটকে ডেবিড ফোকসাল থেকে ডেকে নিল। বলল, এস।

    ছোট এবং ডেবিড পাশাপাশি হাঁটছে। ছোট পরেছে একটা সাদা পাজামা, একটা ডুরে সার্ট। সে একটা ফুলহাতা সোয়েটার গায়ে দিয়েছে। সোয়েটারটা সেই আগের—মৈত্রদা দিয়েছে। কথা আছে ডারবানে গিয়ে মৈত্রদা সেকেন্ডহ্যান্ড মার্কেট থেকে ওকে সব গরম জামা-কাপড় কিনে দেবে। কারণ জাহাজ যত যাবে তত ক্রমশ শীত বাড়বে। অবশ্য একটা কালো রঙের ফুলহাতা সোয়েটার আর কম্বলের গরম প্যান্ট কোম্পানী তাকে দিয়েছে। সেটা এত ঢোলা যে পরা যায় না। আর শীত আরও না পড়লে পরা যাবে না। তা ছাড়া জাহাজি মানুষেরা ফিটফাট থাকবে, পরিচ্ছন্ন থাকবে, শহরে বের হবার সময় টিপটপ বের হতে হবে, কারণ বিদেশে ছোট একজন ভারতীয়, সে যেভাবে বাঁচবে, সেখানে তার দেশ সেভাবে বাঁচবে।

    ওরা এসে দুটো ক্যাপস্টানের পাশাপাশি প্রথমে বসল। এক নম্বর ফল্কার ঠিক পাশে। ওরা জাহাজের সামনে আছে এবং গঙ্গাবাজুতে আছে। ক্রমে দ্বীপটা দূরবীনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মেজ বলল, তুমি কি দেখতে পাও বলবে!

    ছোট দেখছে, সেই সোনালী রঙের দ্বীপ। বড় বড় ক্যাকটাস। কি যে বড়! শৈশবে সে একবার বনের ভেতর হারিয়ে গিয়েছিল। এবং মনে হয় সংসারে সবার জন্য এমন একটা প্রিয় বন অথবা তপোবন থাকা দরকার যেখানে মানুষ হেঁটে গেলে নিজেকে খুঁজে পায়। মেজ-মালোম এই দ্বীপের কাছে এলে কি যেন পেয়ে যায়, যা ওর মুখ না দেখলে ঠিক বিশ্বাস করা যাবে না।

    মেজ বলল, জানো ছোট, আমার মাঝে মাঝে এই সব দ্বীপে নেমে যেতে ইচ্ছে হয়।

    ছোট বলল, দু-একদিন ভাল লাগবে। তারপর আর ভাল লাগবে না।

    —না তুমি জান না। তারপর মেজ-মালোম কেমন সঙ্কোচ বোধ করল, যেন ছোটকে এ সব ঠিক বলা যায় না। আসলে এমন একটা দ্বীপ দেখবে বলে সে সব সময় বসে থাকে। যদি গভীর রাতে কথা থাকে দ্বীপটা পার হয়ে যাবে—যদি এমন হয় ওয়াচ শেষে আরও দু-তিন ঘন্টা, দরকার হলে চার-পাঁচ ঘন্টা জেগে থাকতে হবে, সে তাও করে। দ্বীপে সে এবং এক সুন্দরী দ্বীপবাসিনী, সে আর কিছু চায় না। কিছু পাতি লেবুর গাছ থাকবে, আর থাকবে—নীল জলের গভীরে, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আশ্চর্য সব ঝিনুক। শালতিতে দ্বীপের চারপাশে সোনালী রোদে ঝিনুক খোঁজা সে যে কি বিষ্ময়! সে ডুবে ডুবে ঝিনুক তুলে আনবে, ঝিনুকের খোল ভেঙ্গে শাঁস সে লেবুর রসে আর নুনে ভিজিয়ে খাবে। সে আর সেই যুবতী। যার শরীরে কোন পোশাক থাকবে না। সে মাথায় পাতার মুকুট পরতে ভালবাসবে আর সে রোদে অথবা বৃষ্টিপাতে মাঠের ছায়ায় ঘাসের ভেতর নিরন্তর ছুটে বেড়াবে। সে তার চিবুকে, তারপর স্তনে এবং নিচে নেমে যেতে যেতে ক্রমে গভীর সমুদ্রে ডুবে গেলে, মনে থাকবে না এবি তার স্ত্রী। মনে থাকবে না এবি আগামী বসন্তে ওর জন্য জন্মদিনের কেক বানাবে, এবং চার্চে সে সব কিছুর ভেতর তার স্বামী যে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার জন্য প্রার্থনা করবে।

  • আট

    আট

    ।। আট।।

    আবার ব্যস্ততা জাহাজে। বন্দর আসছে, বন্দর ধরছে জাহাজ। জাহাজিরা সবাই কাজ ফেলে ওপরে ছুটে যাচ্ছে। মেজ-মালোম ডেবিড দূরবীনে বন্দর দেখছে। এনজিন-সারেঙ মাঝে মাঝে উঠে আসছেন ডেকে। মৈত্র বার বার অমিয়কে সাবধান করছে, ঠিক ফাদার যেমন গীর্জায় ঈশ্বর সম্পর্কে বক্তৃতা করেন, তেমনি মৈত্র, ডাঙ্গার মেয়েরা কি ভয়াবহ তার বর্ণনা, জ্যান্ত ছবি এঁকে এঁকে সাবালক অমিয়কে বুঝিয়ে যাচ্ছে। বাংকে গল্পগুজব করার সবয় মৈত্র প্রাচীন নাবিকের মতো সব বন্দরের রহস্য ব্যাখ্যা করে যায়। অমিয়র যা স্বভাব দাঁড়াচ্ছে দিনকে দিন!

    ছোটবাবু বসে বসে সব শুনছিল। সে এমন সব আজগুবি কথা কখনও শোনে নি। ওর মাঝে মাঝে মৈত্রের কথা অবিশ্বাস করতে ইচ্ছা হত। এমন সব নক্কারজনক কথা, যা সে বিশ্বাসই করতে পারে না, সে কি করে বিশ্বাস করবে কেউ তার মার জন্য মানুষ সংগ্রহ করে নিতে পারে। সে কেমন শুনতে লজ্জা পায়। সে তখন না বলে পারে না, মৈত্রদা চুপ কর। এসব আগলি কথা না শোনাই ভাল।

    মৈত্র ভীষণ ক্ষেপে গেল এ-কথায়। দেখ ছোট, তোকেও বলে রাখি, বেশি বাড়াবাড়িও ভাল নয়। অত সোজা না দুনিয়াটা। বয়স এখনও হয় নি, বয়স ভাল করে হোক। আমার মতো ঝানু না হলে এ-সব বিশ্বাস করতে তোমার কষ্ট হবে। তুমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারবে না।

    —তা হোক তুমি অন্য কথা বল।

    —বন্দরে আবার অন্য কথা কি।

    মনু বসেছিল পাশের বাংকে। সে বলল, ঠিক, বন্দরে আবার অন্য কথা কি!

    —কেন কত কথা থাকতে পারে। আমরা ইচ্ছা করলে নেমে সব ঘুরে দেখতে পারি। বাসে চড়ে বেশ দূরে—এই সব আফ্রিকার জঙ্গলে ঘুরে আসতে পারি। এখানে যে ইন্ডিয়ানরা থাকে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারি। তারা কিভাবে আছে তা জেনে নিতে পারি। কি কি অসুবিধা, কালার-বার কি রকম ভয়াবহ এ-সব জেনে নিতে পারি।

    অমিয় বলল, জেনে লাভ! ঘোরাঘুরির পয়সা কোন বাবা দেবে?

    —লাভ আমরা জানলাম।

    —মৈত্র শোন, ছোটর কথা শোন। সে ফস করে সিগারেট জ্বেলে টানতে থাকল। তারপর চুপ। অমিয় এখন এমন ভাবে তাকাচ্ছে যে ছোট ভেবে পাচ্ছে না কি করবে। অমিয় এবার ঠিক খিস্তি করবে। তাড়াতাড়ি ছোট বলল, এই আমি আসিরে!

    —থাম, যাবি কোথায়! আমরা বুঝি অভিযানে এসেছি!

    —না, তা না।

    —তোর কথা শুনে তো এমনই মনে হয়।

    ছোট বলল, ধুস, আমি এমনি বললাম। না বললে মৈত্রদা যেভাবে আরম্ভ করেছিল………

    -–কি বললি, তুই ভাবলি আমি মিথ্যা বলছি?

    —মিথ্যা বলবে কেন। হয়তো হয়েছে।

    —হয়তো না, হয়েছে। হাসানকে ডাকব?

    মনু বলল, হাসানটা আবার কে! মনু ডেক-জাহাজিদের পাত্তা দিতে চায় না। করে কয়লায়ালার কাজ। এবং মুখের ওপর কথা বলতে পারে। ওকে ডেক-টিন্ডাল হাসান একদিন বলেছিল, বোঝলাৱে মিঞা, দ্যাশের চকিদার আর জাহাজের কয়লায়ালা কামে তফাৎ নাইরে মিঞা।

    —হ হ যান, মিঞা কইবেন না, খালাসির কাম করেন বড় বড় কথা কন!

    —তুমি মিঞা এনজিনিয়ার!

    —আরে আমার কাজ এনজিনের লগে। পানি মারা কাম না। ওড়া তো টোপাসের কাম!

    এভাবে জাহাজে ডেক-জাহাজিদের সঙ্গে এনজিন-জাহাজিদের বেশ একটা রেষারেষি থাকে। এবং মাঝে মাঝে বেশ মজার ব্যাপার স্যাপার ঘটে যায়। যেভাবে যাকে যে চটাতে পারে। হাসান খুব ইয়ার্কিবাজ মানুষ। জাহাজিদের পেছনে লাগা তার স্বভাব। তাকে ডাকার যে কি দরকার এখন, এলেই বলবে, আহা কি যে করেন! কয়লায়ালা বইসা আছে, আমার জাত মান আর থাকল না। এবং কখনও এক কথায় দু’কথায় কথা কাটাকাটি, ঝগড়া। মনু এটা পছন্দ করে না। সে বলল, আর ডাইকা কাম কি!

    —ছোট বিশ্বাস করছে না।

    —সেই পোলাডার কথা?

    —হ্যাঁরে, লেমো নাম ছিল। ভাল নাম ডেবিড এ্যালবার্টসন না কি যেন, শালা এসব ইংরেজি নামফাম আমার মনে থাকে না। নাম ওলটেপালটে যায়। আগেরটা পরে, পরেরটা আগে বলে ফেলি।

    —তা ঠিক ছোটবাবু। হাসানকে এ-বন্দরে এলেই ভালোমানুষের মতো দেখবে। সে ইয়ার্কি ফাজলামো করবে না। কেমন দুঃখী মানুষ। সে যেন তখন কি ভাবে! মাঝে মাঝে পয়েন্টস-রোড ধরে সামনের যে পাহাড়টা দেখছ সেখানে চলে যায়। আমার সঙ্গে চার-পাঁচ সাল আগে এক জাহাজে সফর ছিল। তখন দেখেছি।

    ছোট বলল, কেন যেত?

    —কেন আবার? জাহাজিরা যেখানে যায়, সেও যেত। ছেলেটা নিয়ে যেত। ওর মার কাছে নিয়ে যেত। আর ছেলেটার মার সঙ্গে ডেক-টিণ্ডাল কেমন তোমার মোহব্বতে পড়ে গেছিল। তারপর যা হয়—এখন আর ছেলেটা আসে না। পুরোনো ঠিকানায় বোধহয় আর ওরা নেই। তবু ডেক-টিণ্ডাল জাহাজ এখানে এলেই দাঁড়িয়ে থাকে। একদিন আবার হয়তো ছেলেটার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। তাকে নিয়ে যাবে।

    মৈত্র বলল, আশা কুহকিনী। ছেলেটা আসলে ওর নিজের ছেলে।

    ছোটবাবু বলল, মৈত্রদা তোমার মায়া-দয়া ভারি কম।

    —হবে। বলে সে বাংকে এলিয়ে পড়ল। শালা হাসান গত যুদ্ধে এখানে আটকা পড়েছিল। বুঝলে।

    ছোট, জাহাজ বাঁধা হলে সত্যি দেখল, ডেক-টিণ্ডাল হাসান খুব সেজেগুজে রেলিঙে দাঁড়িয়ে আছে। চুপচাপ। কেউ কিছু বললে জবাব দিচ্ছে না। সে নিচে নামার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।

    গল্পটা শোনার পর হাসানের জন্য ছোটর মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল। অথবা এক বালকের মুখ, যেন সে নিচে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ম্যাণ্ডোলিন, সে এই জেটিতে দাঁড়িয়ে বাংলা গান গাইছে। এমন একটা বন্দরে, সেই বালক, এখন তো সেই লেমো ওর বয়সিই হবে, কি তার বড়ও হতে পারে—আর আসে না। ডেক-টিণ্ডাল হাসান এখানে এলেই বার বার সারা শহরে হেঁটে যায়, যদি ছেলেটার সঙ্গে দেখা হয়। ওর মার সঙ্গে দেখা হয়।

    হাসান এ-ভাবে আজও বিকেলটা এখানেই বুঝি কাটিয়ে দেবে। সে যদি ফিরে আসে। এবং এ- ভাবে ঠিক আশা কুহকিনী, হাসানের আশা আছে একদিন না একদিন লেমোর সঙ্গে ওর ফের দেখা হবে। তখন আর হাসানকে শুধু ডেক-টিণ্ডাল মনে হয় না, যেন জাম-জামরুলের ছায়ায় হেঁটে যাওয়া বাংলার মানুষ। তাকে মনে হয় প্রাচীন নাবিক। সে অনেক সাগরে ঘুরেছে মনে হয়। তার বেদনা যেন সবার চেয়ে গভীর।

    এ-সব ভাবতে ভাবতে ছোটবাবু দেখল, মেজ-মালোম ঠিক আগের জায়গায়। ওর চোখে দূরবীন। সে ওদিকে আর যাবে না। গেলেই ডেবিড ওকে দূরবীনটা দিয়ে নিজে চুপচাপ বসে থাকবে।

    এবং এক কথা।

    এনি ওম্যান।

    —নো স্যার।

    —বন্দরে মেয়েরা কেন যে আসে না!

    —এখানে মালটাল নামানো হয়! এখানে কেন ওরা আসবে?

    –কেন বেড়াতে!

    তখন ছোট শুনল, কেউ ওকে ডাকছে। সে দেখল, বোট-ডেকে জ্যাক। সে তাকে ডাকছে। জ্যাক ডাকলে সে প্রায় দৌড়ে যায়। জ্যাককে সে সারাদিন দেখেনি। কোথায় যে থাকে। জ্যাক না ডাকলে সে যেতে পারে না। সে বলল—তুমি আমাকে ডাকছ?

    —তুমি এস না! —কি ব্যাপার?

    —আরে এস না।

    ও গেলেই জ্যাক বলল, বেশ শীত পড়েছে।

    —খুব।

    —তোমার শীতে ডেকে দাঁড়াতে ভাল লাগছে!

    —খুব।

    —কেন তোমার ভাল লাগছে!

    —কেন ভাল লাগে কি করে বলব।

    —তুমি কিন্তু রাতে মেজ-মালোমের সঙ্গে কিনারায় যাবে না।

    —গেলে কি হবে?

    —গেলে ভাল হবে না।

    —মেজ আমাকে যেতে বললে না গিয়ে থাকব কি করে! মেজ এ-জাহাজে সবচেয়ে ভাল লোক। -বাজে কথা।

    —বাজে কথা কি ভাল কথা আমি জানি না জ্যাক। তবু বলি মেজকে আমার খুব ভাল লাগে।

    –তোমাকে আজ বলেনি কিছু?

    —কি কলবে?

    —কিনারে যেতে।

    —না-তো।

    —ও ঠিক নেমে যাবে। যাবার সময় তোমাকে সঙ্গে নেবে।

    —ও তো এখন বাইনোকুলারে কিসব দেখছে।

    —কিছু দেখতে পাবে না, তবু দেখবে। তারপর একটু থেমে জ্যাক বলল, তুমি আমার কেবিনে একটু আসবে?

    —কেউ দেখলে খারাপ ভাববে।

    জ্যাকের মুখটা সহসা লাল হয়ে গেল। তারপর সামলে নিল।—কেউ খারাপ ভাববে না।

    —মিঃ আর্চি টের পেলে আবার জাহাজের তলায় পাঠাবে।

    —গুলি মারো। এসতো। বলে হাত ধরে টানতে থাকল।

    ছোট খুব বিব্রত বোধ করতে থাকল। জাহাজের সর্বময় তিনি—তাকে জাহাজের ‘লর্ড বলা যেতে পারে, মাস্টার তিনি জাহাজের, তাঁর একমাত্র ছেলে জ্যাক। ছোটকে যতই আসকারা দিক, এ-ব্যাপারে কাপ্তানও কিছু মনে করতে পারেন। সে খুব মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, জ্যাক আমাকে বিপাকে ফেলে তোমার কি লাভ?

    জ্যাক কেমন ঘাবড়ে গেল।—বিপাকে মানে!

    —আমার মতো মানুষ তোমার কেবিনে গেলে খুব খারাপ দেখাবে।

    —কিছু খারাপ দেখাবে না।

    —তোমাদের অন্য অফিসাররা কিছু মনে করতে পারেন।

    —তারা তো আমার গার্জিয়ান নয় ছোট। বলেই সে ছোটর হাত চেপে ধরল। খুব উষ্ণ হাত মনোরম। অদ্ভুত নেশার মতো এই হাত দুটো ছোটবাবুর। ছোট এখন এত কাছাকাছি যে সেই সুন্দর ঘ্রাণ, ছোট কি শরীরে কিছু মাখে! ছোটর কাছে দাঁড়িয়ে থাকলে জ্যাকের মনে হয় শরীরের ভার তার কেমন লাঘব হয়ে যায়। সে বলল, তুমি না এলে আমি ভীষণ দুঃখ পাব ছোটবাবু।

    —তোমার বাবা কোথায় জ্যাক?

    —তিনি কিনারায় গেছেন।

    —চিফ-অফিসার?

    —তিনিও নেই। এজেণ্ট অফিসে গেছেন চিঠিপত্র আনতে। ফিরতে দেরি হবে।

    —মেজ-মালোম!

    —সে তো ওর জায়গা থেকে উঠবে না।

    —কেউ দেখতে পাবে না তো?

    —আরে না। এস না।

    জ্যাক প্রায় ছোটকে টানতে টানতে ওর কেবিনে নিয়ে গেল। কি সুন্দর সাজানো কেবিন। পর- পর দুটো ঘর। একটা ঘরে নানারকম বই। সাদা দেয়ালে নীল রঙের ক্যালেণ্ডার। একটা সুন্দর ছেলে সমুদ্র-বেলায় দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় একরাশ চুল। জ্যাক কেবিনে নীল আলো জ্বেলে দিল।

    জ্যাক বলল, ঠিক তোমার মতো দেখতে।

    —আমার মতো! সে সন্তর্পণে দরজার দিকে তাকাতেই জ্যাক বলল, তুমি খুব ভীতু ছোটবাবু। বলে সে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর বলল, এখন ভয় করছে?

    —না। কিন্তু ক্যালেণ্ডারের পাতায় আমার মতো ছেলের মুখ কৈ দেখি। বলে সে উঁকি দিয়ে দেখল জ্যাক ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। জ্যাকের লম্বা হাতা সার্ট গায়, জামাটা আগের চেয়ে বেশ ঢোলা। ওর প্যান্টের কাট-ছাট অদ্ভুত রকমের। জ্যাকের চুল আবার সামান্য বড় হয়েছে। ওর নীল রঙের চোখে কি যে আকাঙ্ক্ষা সে বোঝে না। জ্যাক ওর এত ঘনিষ্ঠ যে সে জ্যাকের শরীরের আশ্চর্য ঘ্রাণ পাচ্ছে। কিছুটা ফুঁইফুলের মতো গন্ধ। অথবা বনের ভিতর হেঁটে গেলে বৃষ্টিপাতের সময় যে সবুজ গন্ধ পাওয়া যায় জ্যাক যেন তার চারপাশে তেমনি গন্ধ ছড়িয়ে রেখেছে। জ্যাক বলল, ছোট তুমি কাল আমার সঙ্গে বেড়াতে যাবে।

    —কাল!

    —হ্যাঁ কাল! এখানে আমরা একটা পাহাড়ের টিলায় উঠে যাব।

    —আমার তো কাল সেকেণ্ড-হ্যাণ্ড মার্কেটে যাবার কথা। গরম জামাকাপড় কিনতে হবে।

    জ্যাক কেন যে আর কিছু বলতে পারে না। সে চুপচাপ থাকল। তারপর কেমন ভুল হয়ে গেছে মতো বলল, তুমি বসো ছোটবাবু।

    ছোট খুব আস্তে আস্তে কথা বলছিল। এখন মৈত্র অথবা অন্য কেউ খুঁজে বেড়ালেই সে বিপদে পড়ে যাবে। সে বলল, এবারে যাই জ্যাক?

    —বারে এই তো এলে। আমি কতদিন থেকে ভাবছি, তোমাকে আমার কেবিনে নিয়ে আসবো।

    —মাস্টার জানতে পারলে ভীষণ খারাপ হবে। আমাকে এমন কি জাহাজ থেকে নামিয়েও দিতে পারে। তিনি এতটা বাড়াবাড়ি সহ্য করবেন কেন! শর্ত হলেও কয়লায়ালা। বলে, ছোট মুখ ভীষণ গম্ভীর করে ফেলল।

    জ্যাক এবার বলল, ছোট, বাবা আমাকে খুব বিশ্বাস করেন। তিনি জানেন আমি এমন কিছু করব না, যাতে তাঁর অপমান হয়। তিনি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারেন না। আমিও না। আসলে বাবা বাদে আমার আর কেউ নেই।

    ছোট জানে জ্যাকের মা ওর বাবার সঙ্গে থাকে না। জ্যাকের জন্য এ-ভাবেও ভেতরে ভেতরে কেমন একটা টান গড়ে উঠেছে। ওর এখন মনে হয় জাহাজে যারা কাজ করে তাদের ভীষণ একটা দুঃখ থাকে।

    জ্যাক বলল, তুমি হয়তো এবার চিঠি পাবে।

    —চিঠি! মায়ের!

    —হ্যাঁ।

    —না, পাব না। আমি জানি পাব না। মা আমার চিঠি পেলে তক্ষুনি উত্তর দিতেন। চিঠি কোনদিন ওদের কাছে পৌঁছবে না।

    জ্যাক ফের বলল, তুমি বসো। আমার কেবিন তোমার কেমন লাগছে?

    —খুব সুন্দর। মনেই হয় না জাহাজে আছি। সব রকমের ব্যবস্থা আছে। আমার খুব ইচ্ছে এমন একটা কেবিনে ঘুমোই।

    জ্যাক কিছু বলতে পারল না। শুধু বলল, তুমি জাহাজে কাজ করলে একদিন এমন একটা কেবিনে ঠিক থাকতে পাবে। বাবা মাঝে মাঝে তোমার কথা বলেন।

    —কি বলছ জ্যাক? আমার কথা বলেন!

    জ্যাক বলল, হ্যাঁ। তারপর বলল, তুমি আমার ফ্রেণ্ড; আমি তোমার কাছে তেমন ব্যবহার পেতে চাই।

    —জ্যাক!

    জ্যাকের মুখ বড় সরল দেখাচ্ছে। সে বলল, তুমি আমাকে কখনও ভয় পাবে না বল?

    ছোট চুপ করে থাকল।

    —বল, আমাকে তোমার সুবিধা অসুবিধার কথা সব বলবে।

    ছোট কিছু বলল না। সে কেমন অভিভূত। এত ভাল জ্যাক! অথচ এতদিন সে জ্যাককে এড়িয়ে গেছে।

    ছোট ধীরে ধীরে বলল, তুমি বসো। তুমি আমার অনেক ছোট জ্যাক। আমি তোমার বন্ধু হতে পারি না।

    জ্যাক কেমন অধীর গলায় বলল, কেন! কেন?

    তারপর ছোট আর কিছু বলতে পারল না। জ্যাক ওর কাঁধে পড়ে। জ্যাক শরীরে অতীব এক সুষমা বয়ে বেড়ায়। সে কেন যে নিজেকে এত অসম ভেবে থাকে। আসলে জ্যাক কখনও কখনও হয়তো আবেগে ভোগে। এটা একটা খেয়ালও হতে পারে। এবং নানাভাবে জ্যাক সম্পর্কে ছোট ভেবে বুঝল, সে কথা দিতে পারে না। সে পালিয়ে এসেছে। জ্যাক খুব ছেলেমানুষ। জ্যাক খুব আদূরে। জ্যাক ভীষণ খেয়ালি। নিজের ভাগ্য এত বেশি সুপ্রসন্ন ভাবতে সে পারে না। আসলে সে হয়তো আর একটা বিপদে জড়িয়ে পড়ছে। যেমন কাল সে মেজ-মালোমের সঙ্গে গিয়ে ঠিক করেনি। সে এবার বলল, জাহাজে তোমার সঙ্গে কথায় বলার কেউ নেই। তোমার সঙ্গে ঘুরে বেড়াবার কেউ নেই। তুমি খুব একা বুঝি? তোমার একজন কাছের মানুষ দরকার। যদি তিনি মনে করেন আমাকে দিয়ে হবে, তুমি যেখানে বলবে তখন যাব। তুমি যেমন আমার মনিবের মতো আছো তেমনি থাকো। যখন যা সার্ভিস চাইবে, পাবে।

    জ্যাক কেমন সহসা ক্ষিপ্ত হয়ে গেল। সে চিৎকার করতে থাকল,—ইউ গেট-আউট। আই সে ইউ গেট-আউট।

    ছোট বলল, যাচ্ছি স্যার।

    ছোট চলে গেলে জ্যাক দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর যেখানে যা আছে সব ছুঁড়ে ফেলতে লাগল। ওর দু-চোখ বেয়ে ভীষণ প্রবল বেগে কি যেন নেমে আসছে। সে নিজেই এই অসম্মানে যা কিছু আছে সব তছনছ করে দিচ্ছে। চিৎকার চেঁচামেচিতে বাটলার, কাপ্তান-বয়, ডেবিড ছুটে এসেছিল।

    —কি হয়েছে জ্যাক। কাপ্তান বয় বলল, কি হয়েছে সাব।

    জ্যাক কিছু বলছে না। কেবল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

    তখন ছোট দৌড়ে পালাচ্ছিল। পাশে মেজ-মালোমকে সে ফেলে চলে যাচ্ছে। মেজ-মালোম ডাকল, এই ছোট শোন, শোন।

    ছোট তখন ওর পাশে ঘাপটি মেরে বসল। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, এনি ওম্যান সেকেণ্ড!

    —নো।

    —তবে আমি যাই।

    —কোথাও গেছিলে?

    —কোথাও না সেকেণ্ড।

    —এত জোরে ছুটছ?

    ছোট বলল, বড়-মিস্ত্রি কিনারায় নামছে

    —এত ভয় বড়কে?

    ছোট মিথ্যা কথা বলে পার পেল। তারপর কেমন নিশ্চিন্ত গলায় বলল, দূরবীনে মেয়ে ধরা পড়লে আমাকে ডাকবে।

    —ঠিক ডাকব।

    —একা একা দেখে ফেলবে না।

    —আরে না না। একা আমি কিছু দেখি না। জাহাজিদের মতো এত স্বার্থপর নই।

    তখন বড়-মিস্ত্রি হেঁটে হেঁটে ঠিক রেলব্রীজের কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। ছায়া-ছায়া অন্ধকারে আবার একজন ইণ্ডিয়ান। সে একটু থেমে গেলেই বুঝল বেশ নেশা করে বাবু ব্রীজের থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বোধহয় হেঁটে বাড়ি ফেরার সাহসটুকু নেই। কিন্তু এ যে সেই ইণ্ডিয়ান। আরে ওকে তো ধন্যবাদ দেওয়া হয়নি। ওকে তো মনে মনে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

    সে ওর কাছে গিয়ে বলল, গুড ইভিনিং।

    অমিয় হাঁটতে পারছিল না। সে টলছিল। সে কোনো রকমে বলল, গুড ইভিনিং!

    —অনেক ধন্যবাদ। তোমাকে বন্ধু ধন্যবাদ দেওয়া হয়নি। দুজনেই বোঝা যাচ্ছে নেশা করেছে খুব। বড়-মিস্ত্রি নেশা করলেও ঠিক জায়গায় পৌঁছে যাবে। ওকে কেউ ফোন করেছিল। রেলব্রীজের ও-পাশে গাড়ি থাকবে। আর অমিয় বড়মিস্ত্রির কাছ থেকে যা খসিয়েছিল, এখানে ঠিক তা একজন দালালকে ধরে পাউণ্ডে বদলে নিয়েছে। এবং এ-পয়সায় এ-দেশের সস্তা মদ, চোলাই বলাই ভাল ঠিক ইণ্ডিয়ান মার্কেটের পাশে সবার সঙ্গে কাঠের মোড়াতে বসে হুস হাস পান করে, নেচে গেয়ে—সেই এক নাচ, বসে বসে, কখনও পিঠ উঁচু করে কখনও নুয়ে নুয়ে যখন একেবারে চোখ বুজে এসেছিল, একটি রিক্সা করে চলে এসেছে। আর কি চেহারা রিক্সায়ালার, একেবারে মা কালীর মতো। মাথায় পালকের টুপি, কোমরে পালক পাখির, মুখে নানারকম উল্কি আঁকা। প্রথম তো ভয়ে একেবারে ঠাণ্ডা। তারপর মনে হল তা অনেকেই, মেয়েরা পর্যন্ত উঠে বেশ এখানে সেখানে যাচ্ছে। সেও উঠে বসল। আর এখানে এসেই রিক্সা সে ছেড়ে দিয়েছে। পোর্টের ভিতরে ঢুকতে দেবে না। সে এখানে হাঁফ ছেড়ে তারপর যাবে—ভেবেছিল, তখনই কিনা ভূতের মতো বড়-মিস্ত্রি টলতে টলতে বলছে, বেশ আছো বাবা, তা তোমার কথামতো চলে গেলে দেখা হতো না। তুমি আমার বন্ধু। তুমি আমার সঙ্গে সঙ্গেই আছ দেখছি। ধন্যবাদ। আবার দেখা হবে।

    অমিয়র মুখ শুকিয়ে গেছে। ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। নেশা টেশা একেবারে গোল্লায়। সে বলল, না স্যার আমি…

    দাঁড়িয়ে কথা শোনার মতো সময় নেই বড় মিস্ত্রির। কি বলছে বিড় বিড় করে বোঝাও যাচ্ছে না! আসলে আমিয় নিজেও বুঝতে পারছে না কি বলছে। সে বাংলায় বলে যাচ্ছে। বাংলাকে সে ইংরেজি ভাষা মনে করছে। সে কলকাতার কোন খালাসী টোলা ভেবেছে এটা। সে যে এখানে, এই আফ্রিকার বন্দরে দাঁড়িয়ে আছে ক্ষণেকের জন্য ভুলে গেছে। তারপর সব খেয়াল হতেই কেমন সেও ছুটতে থাকল। সে এবার ক্রমে নিজের জালে নিজে জড়িয়ে পড়ছে। তাকে এখন এ-জাহাজে শেষ পর্যন্ত ভূতের অভিনয় না করতে হয়। বড়-মিস্ত্রি ওকে ছেড়ে দেবে না। কিভাবে যে কি করবে কিছুই, এখন মাথায় আসছে না। মৈত্রকে বলতে পারছে না। ছোট তো আরও সরল সে এমন শুনলে আরও ঘাবড়ে যাবে জাহাজে।

    অমিয় সব ভুলে যাবার জন্য আবার গান ধরেছে। আসলে সে গ্যাংওয়ে ধরে উঠে আসতে পারছে না। পড়ে যাবে, পড়ে গেলে একেবারে অতলে। ওর জড়ানো গলায় গান শুনলে যদি কোয়ার্টার- মাস্টার ফোকসালে খবর দেয়।

    শেষ পর্যন্ত মৈত্র নিচে নেমে দুমদাম পাছায় লাথি মারতে থাকল। জাহাজে কেন আসা। বেশ তো মা ভাইদের জ্বালাতন করছিলে, তাই করতে। আমাদের কেন। সে লতিফকে বলল, নে তোল। চ্যাঙদোলা করে তুলে নে। তারপর বাথরুমে ফেলে জল ঢাল।

    অমিয় সব বুঝছিল। জাহাজের ওপরে এসেই সে ঠেলেঠুলে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে বলল, আমাকে

    ছোঁবে না। আমি ঠিক হেঁটে যাব। ঠিক এক দুই সে তারপর পা মুড়ে বসে পড়ল। সে বলল, উঠব না।

    –কেন উঠবি না?

    —আমাকে তুমি অপমান করেছ।

    —অপমান মানে!

    —আলবৎ অপমান। তুমি আমার পাছায় লাথি মারলে কেন?

    —সবাই দেখছে। ওঠ প্লিজ, আর পাছায় লাথি মারব না!

    —দেখুক। সবাই তো বেশ মৌজ করছে। বন্দর এলেই সব শূয়োরের বাচ্চা নাগর সেজে বের হচ্ছে। যত দোষ নন্দ ঘোষ।

    মৈত্র বলল, অমিয় জাহাজ থেকে শালা তোমায় হারিয়া করে দেব।

    —দাও না, বারণ করেছি। শালা এ মনুষ্যজন্ম থাকা না থাকা সমান। তুমি আমার পাছায় লাথি মেরেছ। ছোটকে না বলেছি তো আমি কুত্তার বাচ্চা।

    এবং ছোট দেখল, পিছিলে কি যেন একটা গণ্ডগোল। সে বোট-ডেক থেকেই বুঝল, সবাই সেখানে জড় হয়েছে। সেও ছুটে গেলে দেখল অমিয় বেহুঁশ হয়ে আছে। কেউ এদিকে আসতে পারে, কিংবা কোনও অফিসার। এনজিন সারেঙ তাড়াতাড়ি ওকে নিচে নিয়ে যেতে বলছে। এবং ওকে ঠেলে ঠুলে নিচে নিয়ে গেলে মনে হল, অনেক দূরে একটা অতিকায় ট্রেন, কোন গভীর বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে ছুটছে। গাছ পালা পাখি সব ভয়ে উড়ে যাচ্ছে। এবং এক আশ্চর্য শব্দ জাহাজে উঠলে সবাই শুনতে পায়, শব্দটা, সেই ট্যানি টরেন্টো, ট্যানি টরেন্টো। গর্ভিণী তিমি শিকার করে ফিরে আসার সময় শিকারিরা এমন একটা শব্দে ডেকে দাঁড়িয়ে গান গাইতে ভালবাসে।

    .

    পরদিন সকাল সাতটা বাজতে না বাজতেই কিনারার সব মানুষেরা উঠে আসছে। ওরা অধিকাংশ নিগ্রো কুলি। ক্রেনগুলো সব এগিয়ে আসছে।

    ডেরিকগুলো তুলে দেওয়া হচ্ছে। উইনচের বল বিয়ারিঙে তেল দিচ্ছে গ্রিজার। মেজ-মালোম ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছে। ছোটকে দুবার দেখেও যেন চেনে না এমন ভাবে তাকিয়েছে। পাখিগুলো প্রথমে নেমে গেলো। ফল্কা একেবারে খালি। নিগ্রো কুলিরা এসে গ্যালিতে ভাত ভাত করছে। ওরা ভাত মুড়িমুড়কির মতো জ্যাবের ভিতর নিয়ে কাজ করছে আর খাচ্ছে। জাহাজিরা কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিগ্রো কুলিদের সঙ্গে ভাঙা ইংরেজিতে হাসি ঠাট্টা করছে। বাদশা মিঞা একজন নিগ্রো কুলির হাত পা দড়ি দিয়ে কত মোটা মাপছে। সে একটা বড় টুল টেনে এনেছে। তার ওপরে উঠে দৈত্যের মতো মানুষটার হাতের পেশী কি যে সবল, এমন মাপবার সময় খুব দুঃখ, সে এতটা দুর্বল কেন! আর নিগ্রো কুলিটা ফিক্‌ফিক করে হাসছে। মাপবার সময় যখন যা বলছে মানুষটা তাই করছে। বাদশা মিঞাকে ছোট একটা পুতুলের মতো লাগছে। কি কালো আর সবল শরীর। মাথায় রোঁয়া রোঁয়া কোঁকড়ানো চুল। বাদশা মিঞা হাসতে হাসতে ঠাট্টা করছে—তোমার কটা বিবি মিঞা?

    —তিন। সে আঙ্গুল দেখিয়ে এমন বলছে।

    বাদশা খুব যেন কাছের মানুষ পেয়ে গেছে, সে একেবারে দাঁত বের করে বলল, মি…সে বুকে আঙ্গুল ঠেকাল, যেন ‘মি’ দিয়ে ঠিক নিজেকে প্রকাশ করতে পারছে না, বুকে আঙ্গুল ঠেকিয়ে সেটা সে প্রমাণ করছে—মি বুঝলে সাব্ ফোর। ফোর বিবি।

    —ফোর! মাই গড। লিটল ম্যান। ভেরি লিট্ল।

    বাদশা মিঞা লিট্ল কথার অর্থ বোঝে। সে খুব চুপসে গেল। ওকে সোজা কথায় হালার হালা বলেছে। এ-হালার গতরে চার বিবিরে সামলানো দায়।

    —সাব, ফোর নো গুড?

    —ইয়েস, গুড। ওয়ান নো গুড, টু গুড, থ্রি ভেরি গুড। নাইস। সে জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটছে। ফোর! ও ভাবা যায় না।

    —তুমি নাস্তায় কি খাও সাহেব?

    —আণ্ডা।

    —কটা করে?

    —আটটা করে। কাঁচা। সরবৎ করে খাই।

    —আমার খেলে হবে!

    —জরুর হবে।

    বাদশা মিঞা বলল, ভাত নেবে? সে ওর দু জ্যাব ভরে ভাত দিয়ে দিল। নিগ্রো কুলিটা তারপর দুলাফে নেমে গেল। ফল্কায় সব ভারি ভারি কাঠ হাওয়ায় উড়িয়ে দেবার মতো টেনে ফেলে দিচ্ছে। এবং এ-ভাবে জাহাজে কাজ সুরু হলে মনে হয়, কেউ এখন আর নিজের দুঃখের কথা ভেবে বসে নেই। সবাই কাজ করছে। চার নম্বর মিস্ত্রি সামনের উইনচে আছে, পাঁচ নম্বর আছে এদিকের উইনচে। কাপ্তান পায়চারি করে সব দেখছেন। মেজ-মালোমের কাছে হিসাবপত্র আছে। কি নামবে সে জানে। জাহাজে কোন আলাদা ক্লার্ক নেই। চিফ-অফিসার সেকেণ্ড-অফিসার এ সব কাজ ভাগ করে নেয়। আর্চি নিচে রয়েছে। কিছু মেরামতের কাজ আছে। কিনার থেকে কন্‌ট্রাক্টর এসেছে মেরামত করতে। বড় বড় অক্সিজেন সিলেণ্ডার নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্লেট খুলে ফের মেরামত হচ্ছে। স্মোক-বকসে কাজ পড়েছে ছোটর। সকাল থেকে ওর দেখা নেই। দুজন দুজন করে তিনটে-স্মোক বকস ভাগ করে নিয়েছে। মৈত্র নিজে গেছে সঙ্গে। ছ’জন কোলবয় স্মোক-বক্স সাফ করার জন্য রয়েছে বলে, ছোটকে সকাল থেকে দেখা যাচ্ছে না।

    অনিমেষ, বন্ধু এবং অন্য ডেক-জাহাজিরা ফলঞ্চা বেঁধে রঙ লাগাচ্ছে। চিমনিতে রঙ লাগাচ্ছে পঁচিশ টাকার জাহাজিরা। তেইশ টাকার জাহাজিরা ফলঞ্চা বেঁধে জাহাজের খোল রঙ করছে। বন্দরে এলেই এ-সব কাজ ওদের বেড়ে যায়। সমুদ্রের ঢেউ এসে ক্রমান্বয়ে সব রঙ ধুয়ে নিতে চায়। আর ওরা যেখানে যেভাবে রঙ ধুয়ে যায় আবার বন্দরে এসেই রঙ করে ফেলে। যেন নিয়ত এক সংগ্রাম এই সমুদ্রের সঙ্গে।

    স্মোক-বকসের ভেতরে বসে তখন ছোট চেঁচামেচি করছিল, মৈত্রদা কিছু দেখতে পাচ্ছি না।

    —মার জোরে, জোরে মার। জোরে বুরুশ চালা। মাগীর কলিজাতে পাড় দে।

    এগুলো এমন সব কথা যা মৈত্রকে বলতে হয়। না বললে যারা কাজ করছে, মেজাজ পাবে না। এই যে এক মাসের ওপর ওরা জাহাজ চালিয়ে এসেছে, এই যে এক মাস ধরে স্মোক-বকসের পাইপগুলো ধোঁয়া গিলে গিলে জ্যাম হয়ে গেছে কালিতে, এগুলো ঠিক মতো বুরুশ না চালালে বয়লারে ঠিক স্টিম উঠবে না। ধোঁয়া বের হবার পাইপ জ্যাম থাকলে আগুন ভালো জ্বলবে না। আগুনের ভেতর আগুন, সে যে কি আগুন এই বয়লারে নিয়ত জ্বলে কেউ না দেখলে টের পাবে না। এ- ভাবে হাজার হাজার টন কয়লা পুড়বে বয়লারের পেটে। স্মোক-বকস সাফসোফ না থাকলে বয়লারের বদহজম হবে। এবং এটা মৈত্র ভাল বোঝে, সে সেই সকাল থেকে লেগেছে। চারপাশটা এখন ধোঁয়ার মতো, আসলে সব শুকনো ভুসো কালি, ফর্ ফর্ করে চারপাশে উড়ছে। এবং ওরা যে নীল জামা প্যান্ট পরে এসেছিল, তার ওপর পলেস্তারা পড়েছে ভুসো কালির। ভুসো কালিতে মুখ একেবারে মা-কালী। চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল। নাকে সবাই রুমাল বেঁধেও পার পাচ্ছে না। গলা থেকে থুতু উঠে আসলে কেবল মনে হয় দলা দলা কালো কফ। কেউ বেশিক্ষণ ভেতরে বসে থাকতে পারে না। পাইপের ভেতর বুরুশ ঠেলে বের করে ঘসে দুবার, তারপর বাইরে বের হয়ে আসে। আবার যখন যাচ্ছে ভেতরে সেই ঘূর্ণিঝড়ের মতো ভুসো কালির ঝড়টা কিছুটা থেমে গেছে তখন। বার বার গিয়ে তা প্রায় বিশ বাইশটা পাইপ, ঠিক গোনার মতো তখন অবস্থা থাকে না, এক এক করে সবাই সাফ করে যখন ঠিক বারোটায় উঠে গেল দল বেঁধে তখন মনে হচ্ছে একদল অভিযাত্রী সত্যি কোন দুর্গম কয়লা খনির ভেতর থেকে জীবন-মরণ লড়াই শেষে ক্লান্ত অবসন্ন পায়ে উঠে যাচ্ছে।

    মৈত্রের ভীষণ তখন গর্ব হয়। গতকালের অমিয়র এমন বেলাল্লাপনা ভুলে যায়। এমন একটা কাজের পর যদি এটুকু না করল তবে আর বাঁচা কেন। কিন্তু এইসব জাহাজিদের এত কম পারিশ্রমিক, আর্টিকেলে ওদের জন্য এত কম বরাদ্দ যে তখন তার মন খারাপ হয়ে যায়। মৈত্রের তখন এই সব হতভাগা জাহাজিদের জন্য আফশোস হয়।

    জ্যাক তখন খুট খুট করে জাহাজে চিপিঙ করছে। ঠিক দু নম্বর লাইফ-বোটের নিচে সে বসে আছে। এবং সে দেখতে পাচ্ছে কতজন অভিযাত্রী ক্রমে পিছিলের দিকে চলে যাচ্ছে। ওদের চেহারা এক রকমের। মাথায় কালো টুপি। জামা প্যান্ট ভুসো কালিতে ঢাকা। ওরা কে এবং ছোটবাবু কোনটা সে বুঝতে পারল না। কিন্তু সে জানে ছোটবাবু ওদের ভেতর সব চেয়ে লম্বা। ছোটকে যে যে- ভাবেই সাজিয়ে রাখুক সে ঠিক চিনে ফেলতে পারবে। দূর থেকে না পারলেও, কাছে গেলে চিনতে পারবে। ছোটর শরীরে আশ্চর্য একটা সৌরভ আছে যা কখনও উবে যায় না।

    সে কালকে রেগে গিয়ে যে কি করে ফেলল! ছোটকে এ-অবস্থায় দেখে সব রাগ-অভিমান সে ভুলে গেল। হঠাৎ এমন সরগোল এবং কাজকর্মের ভেতর সব ভুলে সে উঠে দাঁড়াল। তারপর চিৎকার করে ডাকল, ছো…ট। ছোট আমি এখানে! কেমন সরলভাবে বলে যাওয়া। ছোট যেতে যেতে হাত তুলে দিল। কিছু বলল না।

  • নয়

    নয়

    ॥ নয় ॥

    জাহাজ ছাড়ার আগে মৈত্র ছোটবাবুকে ওয়াচে নিয়ে নিল। সারেঙের ইচ্ছে ছিল না। কি দরকার, যখন চলে যাচ্ছে। এখন তো সমুদ্রে তেমন ঝড় উঠছে না। আর সামনে যে সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে, খুব ভয়াবহ হবে না। শীতের সমুদ্র। শান্ত নিরিবিলি। নানা বর্ণের সমুদ্র-পাখীরা ঘোরাফেরা করবে কেবল। এখন ছোট যেভাবে আছে সে-ভাবেই থাক না। ওকে আর কে ঘাটাচ্ছে।

    তবু মৈত্র বলল, না। ওর শক্ত হওয়ার দরকার আছে। সব জাহাজে আপনি আমি থাকব না।

    —ছোট কি বলে?

    —ওর আবার বলার কি আছে! ওর ইচ্ছায় তো আর কাজ হবে না।

    সারেঙ বললেন, ঠিক আছে, যা ভাল মনে করেন, করবেন

    সারেঙের এ নিয়ে কোনও দ্বিধা থাকল না। ছোটবাবুর জন্য মৈত্রমশায় ভেবে থাকেন। এটা সারেঙসাব নিজেও চান, ছোট শক্ত হোক। অনেকটা হয়েছে। জাহাজের স্মোক-বকসে খুব ভালভাবে কাজ করেছে। কয়লা লেভেলিং-এর দিন, সে তো সবচেয়ে বেশি খেটেছে। এভাবে একজন জাহাজি জাহাজে ঠিকঠাক কাজ করতে না পারলে পদে পদে অপদস্থ হতে হয়। সুতরাং ছোটবাবুর ফালতু থাকা আর হল না। এখন সেও অন্য জাহাজির মতো ‘পরিদার’। তার ‘পরি’ মৈত্রদার সঙ্গে। বারোটা- চারটা ওয়াচ। এক বাংকারে সে কাজ করবে, অন্য বাংকারে অমিয়। অমিয় ইতিমধ্যেই বেশ ‘পরি’ শেষে শিস দিতে দিতে উঠে আসে। একদিন ছোট দেখেছিল, অমিয় ‘পরি’ শেষ করে বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে কবিতা আবৃত্তি করছে। বোধ হয় কোন ইংরেজ কবির সমুদ্রবিষয়ক কবিতা। সে শুনতে পায় নি। ওর হাত পা নাড়া দেখে ভেবেছিল, অমিয় বোট-ডেকে পাগলামি করছে। সে ওপরে যেতে পারে নি। কারণ সে উইন্‌চে কাজ করছিল। ফাইবার ওকে দিয়ে কাজ করাচ্ছিল। ওকে সে জিজ্ঞাসা করলে বলেছিল, কবিতা আবৃত্তি করলাম। কি শান্ত আকাশ, কি অসীম সমুদ্র, ইচ্ছে হয় না হাত পা ছুঁড়ে কবিতা আবৃত্তি করতে! ইচ্ছে হয় না ধনধন্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা গানটা গেয়ে ফেলি!

    এ-ভাবে প্রথম যে জাহাজ মনে হয় নিদারুণ, সমুদ্র-যাত্রা মনে হয় কঠিন সফর, জীবনযাপনে বিশ্বস্ততা থাকে না, মনে হয় সবাই ভিন্ন ভিন্ন গ্রহ থেকে নেমে এসেছে, ক্রমে তা আর মনে হয় না। মনে হয় এরা সবাই মিলে একই গুষ্ঠিভুক্ত জীব। এখানে ঠিক সবাই একইভাবে, যেমন সারেঙ বলতে পারেন কবে বাড়িয়ালা মাসতার ডেকে বলবেন, নাটক, যাত্রা, কবিগান, যার যা খুশি কর। শান্ত সমুদ্রে ডেকের ওপর নাটক, আবৃত্তি গান-বাজনা লাগাও। বেশ তো বের হয়েছি সেই ডাঙ্গা ছেড়ে এভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে কেন। তখন মনেই হয় না কাপ্তান খুব বুড়ো, মনে হয় না অথর্ব, মনে হয় না খিটখিটে তাঁর মেজাজ, বরং মনে হয় মানুষটা জীবনের চারপাশটা যেন শেষদিন পর্যন্ত দ্যাখোরে বাহার। চুপি চুপি বলবেন, আমার জন্য কিন্তু একটা প্রোগ্রাম রাখবে। এখনও একেবারে খারাপ হাত না।

    সবাই তখন হেসে ফেলবে। এই যখন জাহাজের নিয়তি, অর্থাৎ যেখানেই জাহাজ যাক, জাহাজের একঘেয়েমি থাকবে, নিশিদিন তো শুধু নীল জল, নীল আকাশ, মাঝে মাঝে সমুদ্র পাখিদের ওড়া অথবা ডলফিনের ঝাঁক ভেড়ার পালের মতো সমুদ্রে দেখা আর তো বৈচিত্র্য বলতে কিছু নেই। যখন ঝড় সাইক্লোন দেখা দেয়, তখন বোধ হয় একটা বৈচিত্র্য আসে। একেবারে সব মানুষগুলোকে পাগলা করে দেয়। অথবা কুয়াশার ভেতর ঢুকে গেলে কিংবা কোন হিমশৈল, এটা সহজে ঘটে না। কাপ্তান সারাজীবনে দুবার সংকেত পেয়েছিলেন, নেমে আসছে, নেমে আসছে। পালাও পালাও। জাহাজের মুখ ঘুরিয়ে দাও। ভয়ঙ্কর সমুদ্রের অতলে মৃত্যুর বিভীষিকা। যেন এক অতিকায় সমুদ্র জুড়ে হিমশৈল এক প্রাগৈতিহাসিক জীব হয়ে যায়। আর তো কিছু নেই। কেবল কাজ, চার্ট দেখা, চার্ট মতো জাহাজ চলছে কিনা দেখা, সকাল-সন্ধ্যায় গ্রহ-নক্ষত্র দেখে জাহাজের অবস্থান বোঝা। কখনও কখনও দেখা, দিক ঠিক আছে কিনা, অথবা দিক নির্ণয়। অথবা মার্কনি সাব অর্থাৎ রেডিও অফিসার সকাল হলে জাহাজের খবর জানিয়ে দিচ্ছেন এরিয়া স্টেশনকে। প্রতি সকালে তার এটা কাজ!—হ্যাঁ হ্যাঁ, সিউল ব্যাঙ্ক। তারপর প্রায় মুখস্থ বলার মতো বলে যাওয়া, কত এন. আর. টি., কত জি. আর. টি., কোন কোর্সে জাহাজ যাচ্ছে এবং নেক্স্ট পোর্ট অফ কল কি! অথবা পজিশান জাহাজের ভুল হলে চেয়ে নেন রেডিও বিয়ারিঙ। তা হলেই সব ঠিকঠাক। আর ভয় থাকে না। এভাবে সব কাজের ভাগবাটোয়ারা করে বাকি সময়টা কাপ্তান হুইল ঘরে বসে থাকেন। অথবা খোলা ডেকে বসে এই যে, পৃথিবী, সমুদ্র এবং গ্রহ-নক্ষত্র এবং সৌরলোক সব মিলে ঈশ্বরের কি অপার মহিমা এমন ভাবেন। তখন কাপ্তানের চোখ বুজে আসে, তারপরই কেমন একটা দুঃস্বপ্ন ভেতরে নাড়া দেয়, যেন কেউ পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার গাউন এবং চুলের গন্ধ পর্যন্ত পাচ্ছেন তিনি! যত বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন তত সে পাশে দাঁড়িয়ে কেমন হা-হা করে পাগলের মতো হাসে। তারপরই এক পতনের শব্দ হয়। নিশীথে কেউ শুনতে পায় না, খোলা-ডেক থেকে কে কাকে যেন ঠেলে ফেলে দিচ্ছে। আর কোন শব্দ নেই। প্রপেলারটা ঝিক্ ঝিক্ শব্দ তুলে কেবল যাচ্ছে। তখন কেমন ভয়ে কাপ্তানের বুক গলা শুকিয়ে যায়। তিনি হাঁকতে থাকেন, জ্যাক, জ্যাক, দ্যাখ তো কেউ আমার ঘরে ঢুকেছে কিনা!

    —না তো। কে ঢুকবে।

    —মনে হল কেউ আমার ঘরে ঢুকেছে!

    জ্যাক এতে কিছু মনে করে না। সে এটা বাড়িতেও দেখেছে। বাবার হাতে কাজকর্ম না থাকলে এমন হয়। একা চুপচাপ বসে থাকলে, কেন জানি বাবা ভীষণ ঘাবড়ে যান। সে বাবাকে এ জন্যও ছেড়ে থাকতে পারে না।

    বাড়িটা ওদের পোর্টের কাছাকাছি। একদিকে বড় মাঠ, শহরের ভেতরে রাস্তা চলে গেছে। রাস্তা পার হলে, কিছু লোহা-লক্কড়ের কারখানা। তারপরই নির্জন গাছপালা, ঘেরা একটা ফোর্টের মতো বাড়ি। সামনে লাইটহাউস। অর্থাৎ রাস্তা সামনে, তারপর ড্রাই-ডকের জেটি। কিছু লম্বা ক্রেন। ড্রাই- ডক করা সব জাহাজের খোল ওদের বারান্দায় দাঁড়ালে চোখে পড়ে। আর আছে আরও দূরে সব যুদ্ধজাহাজের ঘাঁটি। সারি সারি ডেস্ট্রয়ার সমুদ্রের জলে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। বাবা বোধহয় বাড়িটা ইচ্ছে করেই এমন একটি জায়গায় করেছিলেন। সারাদিন ব্যালকনিতে বসে থাকলে সমুদ্রে সব ছোট ছোট জাহাজ, বড় জাহাজ, টাগ-বোট এবং যুদ্ধ জাহাজের নীল জলে ঘোরাফেরা ভাল লাগে দেখতে। আর বাড়িটা গাছপালায় ঘেরা। বেশ-জায়গা নিয়ে। নানাবর্ণের সব গাছ বাবা পৃথিবীর সব বন্দর থেকে সংগ্রহ করেছেন। কেউ বেঁচেছে, কেউ বাঁচেনি। তবু বাড়িটাকে দেখলে মনেই হয় না, ওয়েলসে এমন আর একটা বাড়ি আছে।

    মাঝে মাঝে বাবা ঠিক এমনি চিৎকার করে ওঠেন, দেখ তো ভেতরে কে গেল?

    —কে বাবা!

    —মনে হয় কেউ।

    —না তো।

    —ভালো করে দ্যাখ।

    জ্যাক ভিতরে ঢুকে ভাল করে দেখে আসে। পরিচারিকা মেয়েটিও ছুটে আসে। সফরে বের হলে একজন পাহারাদার থাকে বাড়িতে। মাঝে মাঝে পরিচারিকার সঙ্গে বাজারের হিসাবপত্র নিয়ে বসে। এমন শুনতে পেলে সেও ছুটে আসে। কি হয়েছে স্যার।

    —চোখ বুজে ছিলাম, মনে হল কেউ এসে দাঁড়াল, কি বলল, তারপর কোন তোয়াক্কা না করে ভেতরে ঢুকে গেল।

    এ নিয়ে প্রথম প্রথম সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ত। ওদের ভাবনা হত। সমুদ্রে ঘুরে বেড়ালে, এমন হওয়া স্বাভাবিক। সারাক্ষণ জল আর জল, কখনও ডাঙ্গা, মানুষের কাছে ডাঙ্গা যে কত মধুর, একজন নাবিকের চোখ দেখলে তা টের পাওয়া যায়। এবং বোধ হয় কাপ্তান আর সফরে যেতে চান না। কিন্তু পরে এত স্বাভাবিক হয়ে যান যে তখন আর কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না।—ও এটা আমার হয়। ওটা কিছু না, শোন তো বনি। কাছে গেলে বলবে, বেহালাটা আন তো একটু বাজাই।

    তখন হয়তো সমুদ্রে সূর্যাস্ত হচ্ছে অথবা জ্যোৎস্না রাত থাকলে এ ভাবে কতক্ষণ যে বাজান! যত বয়স হয়ে যাচ্ছে, তত বাবা বেহালা বাজাতে বেশি ভালবাসেন। বনি এটা দেখে বুঝেছে, বাবার ভেতরে অসীম দুঃখ। তাকে তিনি কিছুই বলতে চান না। তখন তার ভীষণ অভিমান। সে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে। কোন কথা বলে না। বাবা তাকে যেন দেখছে না। সেও বাবাকে দেখছে না। সামনের রাস্তায় কিছু গাড়ি-ঘোড়ার শব্দ। রাত হলে তাও থাকে না। বাড়িটা পোর্টের পিছন দিকে বলে খুব নির্জনতা আছে। ছাদে উঠলে, শহরের ভেতরে যে ক্যাসেল আছে তার চূড়ো দেখা যায়। আর এই যে লাইট-হাউস, এবং সব রঙ-বেরঙের বাড়ি, জাহাজের ভোঁ এ-সবের ভেতর বাবা এবং সে মাঝে মাঝে এমন নীরব হয়ে যায় যে কেউ বুঝতেই পারে না, বাড়িতে কেউ আছে।

    বনি সমুদ্রে এলে শরীর ওর ভাল হয়ে যায়। প্রায় নাবিকের জীবনেই এটা ঘটে। কিন্তু বনি যতটুকু বড় হয়েছে, যা কিছু শিখেছে, অথবা জীবনযাপনে সে যে মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখতে শিখে গেছে, সেটাও এই জাহাজে। এই রাতের বেলাতে বাবা হুইল ঘরে একটা ডেক-চেয়ারে বসে আছেন। এনজিন – ঘর থেকে ঝিক ঝিক শব্দটা উঠে আসছে। সমুদ্রের বাতাসে আর তেমন জলকণা নেই। বাতাস ক্ৰমশঃ শুকনো হয়ে উঠছে। বেশ ঠান্ডা বাতাস। বাবার মাথার চুল গত সফরেও দুটো একটা সে কালো দেখেছে। কিন্তু সে এ-সফরে দেখল, বাবা তার ভীষণ বুড়ো, চুলগুলো ভীষণ সাদা। বিশেষ করে বাবা যখন একা একা চুপচাপ উইংসে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন বাবাকে ভীষণ দুঃখী মনে হয়। উইংসের সবুজ আলো দুলতে থাকে। জাহাজ ক্রমাগত সমুদ্রে ভেসে যায়। জ্যোৎস্নায় কেমন চারপাশের সমুদ্র অলৌকিক এক জগৎ নিয়ে বেঁচে থাকে। সে শুনতে পায় বাবা সমুদ্রকে উদ্দেশ্য করে কি যেন বলছেন, অথবা মনে হয় কিছুটা গানের মতো, অর্থাৎ সারাটা জীবন বাবা সমুদ্রে কাটিয়েছেন, ওর বয়স যদিও কম, তবু সে সমুদ্রে এসেই বুঝতে পেরেছে, বাবা এই সমুদ্রেই থেকে যেতে চান। বাড়িটা যে তিনি সমুদ্রের ধারে করেছেন সেও তো মৃত্যুর আগে তিনি জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখতে পাবেন বলে।

    আসলে মানুষের এই হয়। যত বয়স বাড়ে, তত ঈশ্বর সম্পর্কে বিচিত্র অনুভূতি অথবা মৃত্যুচেতনা, এবং কখনও গভীরে কি যেন বাজে। বনি বাবাকে অবসর সময়ে এখন দুটো কাজ করতে দেখে। সে দেখে বাবা, ঈশ্বর সম্পর্কে সব রকমের বই, বিশেষ করে জেরুজালেমের প্রাচীন ইতিহাস পড়তে খুব ভালবাসেন। কখনও কখনও তিনি বালকের মতো পড়ে যান ট্রেজার আইল্যান্ড অথবা ফরাসী দেশের সেই ছোট্ট রাজপুত্রের গল্প। যে থাকত ছোট্ট একটা গ্রহাণুতে। বাবা আর এখন ডিকেন্সের বই পড়েন না। অথচ লাইব্রেরিতে তার সব বই আছে। তিনি এখন বেছে বেছে সব ছোটদের বই সঙ্গে নেন। অথবা কোনও বন্দরে গেলেই তিনি ছোটদের বই কি ভাল আছে খোঁজ করবেন। এ- সব দেখে মনে হত সব তিনি বনির জন্য কিনছেন। তার কোন এতে উৎসাহ নেই। কিন্তু বই কিনে কিছুতেই না পড়ে বনিকে দেবেন না। বনি তখন না হেসে পারে না। অথবা কখনও কখনও তাঁর যখন ঘুম আসে না, যখন সারা রাত্রি সাহসা খুব দীর্ঘ হয়ে যায়, তিনি-বোট-ডেকে একাকী বেহালা বাজান। রাতের জাহাজ এমনিতেই ভীষণ মায়াবী। নীল রঙের ভেতর সাদা জাহাজের চলা, কেবল ঢেউ ভেঙে অন্তহীন গভীর সমুদ্রে চলা, আর অন্তহীন নক্ষত্রের ছায়া সমুদ্রে, তখন বাবার ভীষণ আবিষ্ট হয়ে বেহালা বাজানো বনির কি যে খারাপ লাগে! সেও নেমে যায় বোট ডেকে। বাবাকে সে ডাকে, বাবা!

    —কে!

    —আমি বাবা।

    —অঃ। তোমার আবার এখানে আসার কি হল?

    —এমন ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকলে তোমার অসুখ হবে।

    —কোথায় ঠান্ডা!

    —ঠান্ডা নয়! আমার ভীষণ যে শীত করছে বাবা!

    —যা! তুমি ছেলেমানুষ, তোমার তো আরও গরম লাগার কথা! বলেই তিনি জামার নিচে বুকের কাছে বনির হাতটা নিয়ে যেতেন। দ্যাখো তো ঠান্ডা লাগছে?

    বনি দেখেছে, ঘামছেন বাবা। কেমন ভিজে ভিজে।

    বাবা না বলে যেন পারেন না, আমি যে বেহালা বাজাচ্ছি। কি যে ভাল লাগে না। মনেই হয় না, পৃথিবীতে শীত আছে।

    বনি টের পেত বাবার বুকটা কেমন ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছে। ঠিক সে এমন আর একটা বুকের কাছে হাত রাখলে টের পাবে, তাজা, গভীর। সে যেন বলতে পারত, বাবা, ছোটবাবুর বুকটা তোমার মত না। ওর বোধ হয় খুব চওড়া। তোমার মত বয়সে ওর বুকে হাত দিলেও বুঝি এমন ছোট মনে হবে।

    বনির এ-ভাবে কত যে ভাবনা! তার বয়স বাড়ে! বুঝতে পারে, সে নানাভাবে বুঝতে পারে, সে বয়স অনুযায়ী বেশী বুঝতে পারে। সে যখন এ-ভাবে ভাবে, তখনই কখনও দেখতে পায়, ছোটবাবু স্মোক-বকস পরিষ্কার করে পুপ-ডেকে ফিরে যাচ্ছে, কখনও দেখতে পায়, নীল রঙের পোশাক পরে বোট-ডেক পার হয়ে সোজা তরতর পরে ফানেলের গুঁড়িতে। তারপর সিঁড়ি ধরে স্টোক হোলডে নেমে যাচ্ছে। আবার কখনও সে দেখতে পায় পুপ-ডেকের রেলিঙে দাঁড়িয়ে চর্বি ভাজা রুটি খাচ্ছে, চা খাচ্ছে, আর অনবরত সমুদ্র দেখতে দেখতে কেমন তন্ময় হয়ে যাচ্ছে।

    তখন কেন যে বনি জোরে না ডেকে পারে না–ছো….ট….বা….বু।

    .

    সেদিনও পোর্ট এলিজাবেথ বন্দর ছেড়ে যাবার মুখে বনি ডেকেছিল, ছোটবাবু এভাবে কোথায় ছুটে যাচ্ছ।

    —সেকেন্ডের কাছে।

    —কি ব্যাপার!

    —মেয়ে। জাহাজে ওম্যান এসে গেছে।

    —যাঃ

    —হ্যাঁ। ওকে খবরটা দিতে হবে। বেচারা কাজের চাপে বন্দরে একবারও নামতে পারেনি। ফাঁক পেলেই বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে দেখেছে। অথচ ৭ত কাছে বন্দর, বার বার দেখেও তার-আশ মেটেনি। খবরটা দিয়ে আসছি।

    বনি লাল রঙের জাহাজী টুপি মাথায় পরেছে। পায়ে পরেছে কেড্স সাদা রঙের। চুল কাটা হয়নি অনেকদিন। চুল বড় হয়ে গেছে। চুল বড় হলেই ছোটবাবুর ইচ্ছে হয় আর একটু দাঁড়িয়ে থাকে জ্যাকের পাশে। জ্যাক সুন্দর একটা ডোরাকাটা পুল-ওভার পরেছে। পিছনে পকেট, সামনে পকেট, সবুজ রঙের প্যান্ট পরেছে। জ্যাকের কাছে এ শীতটা মনোরম। ছোটবাবুর কাছে শীতটা প্রচন্ড। সে সেকেন্ড-হ্যান্ড মার্কেট থেকে দুটো সস্তায় সোয়েটার কিনেছে, একটা ফুলহাতা, একটা হাতকাটা। সে লেদার জ্যাকেট কিনেছে একটা। মাথায় পরার জন্য উলের টুপি। একটা পুরোনো ওভারকোট কিনবে ভেবেছিল। কিন্তু মৈত্র বলেছে, বুনোসাইরিসে পুরোনো জিনিস খুব সস্তা। আর আমেরিকা অথবা ইউরোপের বন্দরে গেলে তো কথাই নেই। যা না হলে নয় এমন কিছু কিনে নিতে বলেছে।

    জ্যাক ছোটবাবুর পোশাক দেখে হেসে ফেলল। ছোটবাবুর পুরোনো পোশাক তার ওপর যা যা কিনেছে, শীতের জন্য সব পরে ফেলেছে। ছোটবাবু পোশাকের ভেতর আটকে গেছে। হাতে দস্তানা। একটু শীতকাতুরে ছোটবাবু। পেছনে পড়ে থাকছে বন্দর। একেবারে সমুদ্রের গায়ে সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে পাহাড়। তার কোলে ঘর বাড়ি, লাল, নীল কাঠের বাড়ি। পাহাড়ের ওপরে ট্রেন লাইন, জাহাজ থেকে পাহাড়ের মাথায় রাতে বনি আর ছোটবাবু গাড়ির এনজিন ছুটে যেতে দেখেছে। কেমন ঘুরে ঘুরে অদৃশ্য হয়ে যায়, এনজিনের আলো। পাহাড়ের গাছপালার ভেতর একটা এমন আলোর বন্যা দেখতে ওদের অনেকক্ষণ ভাল লাগছিল। ওটা গাড়ির এনজিনের মতো মনে হয়েছে। আসলে ছোটবাবু জানে না ওটা কি!

    এখন সকাল বলে, এবং শীতের মরসুমে সবাই জামাকাপড় সেঁটে বেশ হাহা হিহি করতে করতে এনজিন রুমে নেমে যাচ্ছে অথবা ডেকে জল মারছে অথবা ফলঞ্চা বেঁধে মাস্তুল রঙ করছে। ইন্ডিয়ানদের পোশাক একেবারে বেঢপ। ছোটবাবুকে কিছুতেই আর আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না। বনি বলল, ছোটবাবু যেভাবে তুমি ভাল্লুকের মতো ছুটছ—ঠিক উলটে পড়বে। একটু আস্তে যাও। ডেবিড অনেক মেয়ে দেখেছে, আলাদা করে তোমার না দেখালেও চলবে।

    আসলে বনি ছোটবাবুর সব পছন্দ করে। কিন্তু যখন দূরবীনে মেয়ে খুঁজে বেড়ায় বন্দরে তখন কেমন ক্ষেপে যায় বনি। সে কখনও কখনও ছোটবাবুকে এ নিয়ে ছোট বড় কথা বলে ফেলে। ছোটবাবু জানে ক্যাপ্টেনের আদুরে ছেলে—তার সঙ্গে ভাব করে থাকাই ভাল। তাকে রাগালে জাহাজে থাকা চলে না। তাছাড়া বড়মানুষের ছেলেরা একটু বাঁদর গোছের হয়, সে দিক থেকে তো জ্যাক ভীষণ ভালো। কোনও অহংকার নেই মনে হয়। আবার যখন মনে হয় জ্যাক ভীষণ অহংকারী তখন সে আর বোট-ডেক দিয়ে নিচে নামে না। ওর নামতে ভয় হয়।

    যেমন জ্যাক আর দাঁড়াল না। রাশভারি তার কথাবার্তা। গলার স্বর কিছুটা মেয়েলি। রাশভারি গলায় কথা বলতে চাইলে সেটা আরও বেশি মেয়েলি হয়। ছোটবাবু সেজন্য মাঝে মাঝে হেসে ফেলে। হেসে ফেললে জ্যাক আরও রেগে যায়। দুদিন তিনদিন তখন আর কথা বলে না। এ কদিনেই সে বুঝেছে, জ্যাক তাকে এ-জাহাজে নানাভাবে জ্বালাবে। এই যে সামনে পড়ে গেল, কেন যে বলতে যাওয়া, ওম্যান। না বললেই যেন ভাল ছিল, মেয়েদের কথা বলতে গেলে জ্যাকের চোখ মুখ কেমন হয়ে যায়। জ্যাক কি ওকে সাধুসন্ত বানিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। সে তো তা নয়। এভাবে সে শৈশবের কথা মনে করতে পারে—কবে কোথায় কে যেন প্রাচীন শ্যাওলাধরা একটা ইঁটের ঘরে তাকে নিয়ে কি করেছিল। সে সেই থেকে ভয় পায়। অবশ্য এখন সে আর তেমন ভয় পায় না। সে তো ডেবিডের সঙ্গে বের হয়ে ডারবানে শিস পর্যন্ত দিয়েছে। ডেবিড খুব খুশী সে জন্য।

    এবং কেন যে এমন হয়, জ্যাক তাকে ভাল্লুক বলেছে। এখন শীতের রোদ ডেকে। জাহাজ সোজা এবার আটলান্টিকে পড়বে। তেত্রিশ ডিগ্রি বরাবর জাহাজ যাচ্ছে। শহর বন্দর ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে। ফানেলের ধোঁয়া সমুদ্রের জলে যেন এক মহামায়ার মতো, অথবা মনে হয় কেউ মোহিনী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই বিশ্বে এবং তার চুলের বাহার, উড়ছে অনবরত, সমুদ্রে, বাতাসে উড়ে যাচ্ছে।

    ভাল্লুক কথাটা মোটামুটি খারাপ। এমন খারাপ কথা এই প্রথম বলেছে জ্যাক। ছোটবাবুর মনে হল, জ্যাকের সঙ্গে সে কোন সম্পর্কই রাখবে না। জ্যাক তো ওদের ফোকসালে আসে না। এলেও খুব কম। যেন না আসারই নিয়ম। রবিবারে সবাই যখন সাফাই দেখতে বের হয়, ঠিক তখনও জ্যাক বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে থাকে।

    তারপর মনে হল, ভাল্লুক কথাটা গালাগাল। ইংরেজিতে গালাগাল তেমন গায়ে লাগে না। একটা কথা অবশ্য ছেলেবেলা থেকেই সে শুনলে ক্ষেপে যায়। ব্লাডি কথাটা ওর কেন জানি সহ্য হয় না। সোয়াইন, বাস্টার, রাসকেল এসব কথা শালা শূয়োরের বাচ্চার মতো তত পাজি শব্দ নয়। সে ভাল্লুক কথাটাকে শালা শুয়োরের বাচ্চার মতো ভাবতে গিয়ে মুখ গোমড়া করে ফেলল। মুখ গোমড়া হলেই ভেতরে ভেতরে সে বেপরোয়া হয়ে যায়। সে তখন আর কিছু ভাবতে পারে না।

    সে ফের ছুটতে থাকল। তা না হলে ডেবিড হুইল-ঘরে চলে যেতে পারে। সে অফিসারস গ্যালি পার হয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর দরজায় কড়া নাড়ল, সেকেন্ড সেকন্ড প্লিজ।

    ডেবিড দরজা খুলে বলল, কি ব্যাপার?

    —ওম্যান।

    —কোথায়?

    —এনজিন-রুমে।

    –বলছ কি!

    আর তখনই ছোটবাবু দেখল ওর প্রতিবিম্ব দর্পণে। একেবারে চেনা যাচ্ছে না তাকে। সে পোশাকের ভেতর হারিয়ে গেছে। শুধু মুখটা দেখা যাচ্ছে। মাংকি ক্যাপের জন্য সে কেমন ভুতুড়ে হয়ে গেছে। এমন মুখ এবং চেহারা হয় পোশাকের ভেতর আটকা পড়লে সে জানত না। বেশ মজা লাগছে দেখতে নিজেকে। সে নিজেই হেসে ফেলল, বলল, ছোটবাবু তুমি ভাল্লুক নও, একেবারে জাম্বুবান বলেই সে হাঁকল।—ওম্যান স্যার।

    —ইয়েস স্যার ও–ম্যা…….ন।

    ডেবিড ছুটছে, ছোটবাবু ছুটছে। ছোট চিৎকার করে বলছে, জাহাজে ওম্যান। ওরা ছুটে এসে এনজিন ঘরে ঢুকে গেল। আর চিৎকার করে বলতে থাকল ওম্যান। ওম্যান।

    —কোথায়।

    —আসুন না। দেখাচ্ছি। ওরা সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে গেল।

    জাহাজে তখন খবর রটে গেল, যেমন খবর রটে যায় মৈত্রমশাই যাবেন সাগরসঙ্গমে, এণ্ড জাহাজিদের কাছে সাগরসঙ্গম, না হলে সামান্য দুটো চড়াই পাখির পাশে দাঁড়িয়ে ছোটবাবু বলবে কেন, স্যার মিসেস স্পেরো।

    —ইয়েস। ইয়েস।

    —স্যার, মিঃ স্পেরো।

    —ফাইন।

    ছোটবাবু বলল, স্যার নেমে যাচ্ছি, দেখছি, কিচ-কিচ করছে। কে কিচ কিচ করে! ওমা দুটো পাখি। ওদের আমি জানি, এই যে ছাই রঙের দেখছেন এটা মিসেস স্পেরো, আর এই যে দেখছেন, গলার কাছে সাদা রঙ ওটা মিঃ স্পেরো।

    তখন ডেবিড বলে উঠল, হ্যালো মিঃ এন্ড মিসেস হাউ ডু ইউ ডু।

    —খুব ভালো আছে সেকেন্ড। ছোটবাবু কখন যে কি বলে! সেকেন্ড, স্যার, যখন যা খুশি। আসলে সে খুব অন্তরঙ্গ হয়ে গেলে—সেকেন্ড বলে ফেলে। যখন অফিসার ভেবে ফেলে, তখন স্যার। সে বলল, শীতে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিল, এনজিনের গরমে বেশ আছে এখন। দেখছেন না কেমন পাখা ঝাড়ছে। আবার আমাকে আপনাকে দেখছে ঘাড় বাঁকিয়ে।

    —আমরা ওদের ডিস্টার্ব করছি না তো? সেকেন্ড বলল।

    —না, না। দেখছেন না আমাদের ভয় পাচ্ছে না।

    তারপর একে একে অনেকেই ছুটে এসেছিল। এসেই অবাক। দেখল মেজ-মালোম আর ছোটবাবু অতিকায় সার্কুলেটিঙ ফ্যানটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। তার নিচে মেন স্টিম-পাইপ, পাশে লম্বা রেলিঙ। রেলিঙে দুটো চড়ুই পাখি বসে পাখা ঝাড়ছে। উড়ছে। নাচছে গাইছে। মাঝে মাঝে কিচ কিচ করছে।

    পাগল যেমন ছোট তেমনি মেজ-মালোম। পাগল না হলে দুটো পাখি নিয়ে এরকম একটা হৈ- চৈ বাধিয়ে দিতে পারে! আর তখন মৈত্র ‘পরি’তে ছোটকে খুঁজছে। ওরা সারেঙকে বলে আটটা বারোটা ওয়াচ চেয়ে নিয়েছে। এটা সাধারণত সারেঙের ওয়াচ, কিন্তু সারেঙ মৈত্রের কথা ভেবেই হোক অথবা ছোটবাবুর কথা ভেবেই হোক ওয়াচ বদলে নিয়েছেন। আটটা বেজে গেছে। মৈত্র দেখল, ছোট নামেনি। সকালের চারটা-আটটার পরীদারেরা উঠে যাচ্ছে। মৈত্র এসেই স্টিম দেখে নিয়েছে। এখন স্টিম তর-তর করে নেমে যাবে। ফার্ণেসের ছাই ঝেড়ে দিতে হবে। র‍্যাগ মারতে হবে। অমিয় চুপচাপ উইন্ড-সেলের নিচে বালতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে, ওদিকে ছোটবাবুর দাঁড়িয়ে থাকার কথা। কিন্তু সে নেই। এ বেশ ঝামেলা। বেশ বাবুটি বের হয়ে কোথায় যে চলে গেল। কেউ তো দাঁড়িয়ে থাকবে না। আগয়ালারা তিনটে বয়লার থেকে একেবারে সোজা সব আগুন টেনে ফেলে দিচ্ছে, এবং পর পর সাত আট বেলচা কয়লা হাকড়ে বালব্ খুলে দিচ্ছে। পায়ের কাছে আগুন ধক্ ধক্ করে জুলছে। স্টোক-হোলড লাল হয়ে গেছে তাপে। কেউ নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। একা অমিয় জল মেরে আগুন আয়ত্তে আনতে পারছে না। মৈত্রকে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। সে এখন ছোটবাবুর হয়ে ক্রমান্বয়ে বালতি বালতি জল মেরে যাচ্ছে। ছাই টেনে জড় করছে। আর মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে রাগে। কোথায় যে গেল! সে যেতেও পারছিল না। মোটামুটি সব ঠিকঠাক না করে স্টোক-হোলড ছেড়ে যেতে পারছে না। তাহলে স্টিম তর তর করে নেমে যাবে। স্টিম নেমে গেলে কেলেঙ্কারী। সে কোনরকমে মাথা ঠান্ডা রেখে যখন দেখল বেশ হাওয়ায় ফার্নেসের আগুন একবারে লাল, স্টিম- গেজের কাঁটা লাল দাগটা বরাবর থর থর করে কাঁপছে, তখনই সে দু-লাফে এঞ্জিনরুমে ঢুকে গেল। ছোটবাবুকে যেখান থেকে হোক ঘাড় ধরে নামাতে হবে। না হলে লজ্জা হবে না।

    সে ওপরে উঠে অবাক। মেজ-মালোম আর ছোট দুই বন্ধুর মতো কথা বলছে। তিন নম্বর মিস্ত্রি নিচে দাঁড়িয়ে গজ গজ করছেন। হেল, এমন বলছেন। তিন নম্বর মিস্ত্রির কাছে টিন্ডালের বদনাম হবে। সে এটা দেখে আরও রেগে গিয়েছিল, কিন্তু কাছে গিয়ে মেজ-মালোমের সঙ্গে ওর এমন অন্তরঙ্গ কথাবার্তা শুনে আর ঘাড় ধরতে ইচ্ছে হল না। দুজন অসমবয়সী মানুষ জাহাজে এসে কেমন ছেলেমানুষ হয়ে গেছে।

    মৈত্র ডাকল, ছোট।

    ছোট পেছন ফিরে তাকিয়ে জিভ লম্বা করে দিল, একেবারে ভুলে গেছি। বলেই আর দাঁড়াল না। এক দৌড়ে সে ওপরে উঠে গেল, টুইন ডেক পার হয়ে গেল। কিনার অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শহর বন্দর দেখা যাচ্ছে না। সমুদ্র সামান্য ফের অশান্ত হয়ে উঠছে।

    মৈত্র ওকে একটাও চড়া কথা শোনাতে পারল না। সে নেমে এসে বলল, এই অমিয় হাত লাগা।

    —ছোটকে পেলি না?

    —পেয়েছি।

    —কি করছে?

    —বাবু ওম্যান, আবিষ্কার করে মেজ-মালোমের সঙ্গে ওম্যান সম্পর্কে একটা বড় লেকচার দিচ্ছে। স্টোক-হোলড, খোলের সব চেয়ে নিচুতে বলে, ওপরে কি ঘটে, খবর রাখা ঠিক হয়ে ওঠে না। এখন এই যে এত বড় একটা খবর জাহাজে রটে গেল, অমিয় তার বিন্দুবিসর্গ জানে না। সে কেমন অবাক হয়ে বলল, মৈত্র, বলিস্ কি!

    —ঠিকই বলছি, ওম্যান!

    —তার মানে মেয়েছেলে!

    —হ্যাঁরে বাবা, ওম্যানের বাংলা মানে মেয়েছেলে, শালা তোর বাবাতো তোকে ইংরেজি স্কুলে পড়িয়েছিল রে। সাহেব করার ইচ্ছা ছিল, তা এখন ওম্যানের বাংলা মানেটা গুলিয়ে ফেলছ! কয়লায়ালা আর কাকে বলে!

    —সত্যি বলছিস?

    —মিথ্যা বলতে যাব কেন।

    –কে ধরে এনেছে?

    —কেউ না। নিজেই জাহাজে উঠে এসেছে।

    —কোথায় নেমে যাবে?

    —সে জানি না।

    —মাইরি। আমি মরে যাব মৈত্র। বল, সব খুলে।

    আগয়ালারা এসে জড় হয়েছে। মৈত্র ওদের সঙ্গে একটু রাশভারি কথাবার্তা বলে থাকে। এই যে মিঞারা কাম কর, খাড়ইয়া থাইক না। স্টিমের অবস্থা ভাল না। ওরা স্টিম দেখতে সরে গেলে মৈত্র বলল, চালা, হাত চালা। সে অমিয়র কথারও জবাব দিল না। এ্যাস রিজেক্টারে সে বেলচে মেরে ছাই তুলতে থাকল।

    এবং তখনই দেখা গেল ছোটবাবু নেমে আসছে। নীল পোশাক সে পরেছে। যা পরে সে পরি দেয়, সেই পোশাক। মাথায় নীল রঙের টুপি। নিচে নেমে একটু যেন লজ্জায় পড়ে গেল। বেলচেটা নিতে গেলে মৈত্র বলল, যা, ওপরে যা। অমিয়, তুইও উঠে যা। কয়লা যা খাচ্ছে।

    বাকি কাজটা মৈত্র করবে। আগয়ালাদের নিয়ে সে ফাঁকে ফাঁকে হাতে হাতে কাজটা সেরে ফেলবে। আগয়ালারা এটা করে থাকে। কারণ মৈত্রর মুখের ওপর তারা কথা বলতে পারে না। আগে কয়লায়ালাদের কাজ ছিল, সব কাজ কামের পর তাদের চানের জল তোলা। এবারে সারেঙসাব তাও বন্ধ করে দিয়েছেন। এ ভাবে কয়লায়ালারা বেশ মজা পেয়ে যাচ্ছে। ওরা মৈত্রের সামনে কিছু না বললেও নিজেরা ভেতরে ভেতরে সমালোচনা করতে ছাড়ছে না। কখনও কখনও এটা যে সারেঙসাবের কানে না গেছে এমন না। তিনি তখন বলেছেন, কেন করবে? তোমাদের চানের জল কয়লায়ালারা কেন গরম করবে। আগে করত, তোমরা ওদের বয়লারে কয়লা মারা শেখাতে, অসুখে বিসুখে অথবা কেউ কোন বন্দরে, নেমে গেলে, কাজের লোক হয়ে যেত কয়লায়ালা। বাড়িয়ালা খুশি হয়ে লিখে দিতেন সফরে কে কি কাজ করেছে। এখন তো বাপজানেরা তা আর হচ্ছে না। একটা সফর সেরে যেতে পারলেই আগয়ালা। তারপর কাজ দেখানোর পালা। সেটা তোমাদের হাতে না, সেটা সাহেবদের হাতে।

    সুতরাং আর এ-নিয়ে বাড়াবাড়ি হয়নি। অমিয় বেলচে কাঁধে ওর, বাংকারে চলে যাচ্ছে। উঠে যাবার সময় সে লারে, লা লা বলে গান গাইছিল। অমিয়র চুল খাটো করে ছেঁটে দিয়েছে মৈত্র। চুল কাঁটার লোক না থাকলে যা হয়, মৈত্র ওদের চুল ছেঁটে দেয়। থ্যাবড়া ছাঁট। অমিয় মাথায় হাত দিয়ে মাঝে মাঝে বলতে ছাড়ে না, শালা চুল কাটতে কাটতে বউএর কথা ঠিক ভাবছিল।—দ্যাখ চুলটা পেছনে কি করে দিয়েছে!

    ছোটবাবু দেখল, সত্যি চুলটার ভীষণ বাজে ছাঁট হয়েছে। এ-নিয়ে অমিয় তিন চারবার বলেছে। এখন বলছে, এজন্য যে, সে ছোটর কাছে কিছু জানতে চায়। সে বলল, ছোটবাবু কে এসেছে রে জাহাজে।

    —কে আসবে!

    —খুব র‍্যালা মারছিস!

    —র‍্যালা মানে।

    —ঐ খুব মেয়েছেলে নিয়ে ড ডট্। আমার যে কি হবে না! মাথার চুলটা এমন বাজে হেঁটে দিল। কে জানত বল, জাহাজে মেয়েছেলে উঠে আসবে। তারপর একটু থেমে বলল, কোথায় যাবে, সেন্টিস, মন্টিভিডিও না বুনোসাইরিস!

    ছোটবাবু হেসে দিল। ধুস্, তুই যে কি না! তোকে কে বলেছে জাহাজে মেয়েছেলে প্যাসেঞ্জার যাচ্ছে! কেপটাউনে গেলে তবু হয়তো দেখা যেত মেয়েটেয়ে, পোর্ট এলিজাবেথ থেকে কে আর উঠবে! আমাদের নসিব খারাপ, জাহাজ সোজা আটলান্টিকে পড়ছে।

    এদিকে তখন সুট থেকে গড় গড় করে কয়লা আগয়ালারা টেনে নিচ্ছে তো নিচ্ছেই। মৈত্র খেয়াল করছে না। মাথার ওপরে বাবুরা দাঁড়িয়ে গল্প করছে। সে এ্যাস-রিজেকটারে ছাই ফেলে দিচ্ছে। হঠাৎ মনে হল, ঠিক মাথার ওপর প্রায় ফুট বিশেক উঁচুতে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে গল্প করছে তারা। এবার সে চিৎকার না করে পারল না, এই হারামজাদা, রাসকেল, তোরা ভেবেছিস কি! আর সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল সব ফাঁকা। সঙ্গে সঙ্গে দুটো ছায়া দু’দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

    মৈত্র ওপরে মুখ তুলে তখনও চিৎকার করে যাচ্ছে, আমি কিছু করতে পারব না। ভেবেছিসটা কি! সুট ভরতে না পারলে, ওয়াচের পর খেটে যেতে হবে। রোজ রোজ আমি পারব না। পরির বদনাম তোমাদের জন্য কেন নেব!

    ছোটবাবু ঢুকে দেখল, কয়লা একেবারে অতলে। সে লম্ফটা হাতে নিয়ে সুটের পাশে দাঁড়াল। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঠিক খাদের নিচে, মানুষ একা অন্ধকারে লম্ফ হাতে দাঁড়ালে যেমন দেখায়, তেমনি ভুতুড়ে। সে আর দাঁড়াল না। ডারবান থেকেও কিছু কয়লা নেওয়া হয়েছে। টুইন-ডেকের দু’দিকে কয়লার ডাই। এখন এক নাগাড়ে চব্বিশ-পঁচিশ দিন সমুদ্রে ভেসে যেতে হবে। যত ওরা দক্ষিণে নেমে যাবে তত শীত বাড়বে। ডেকের কয়লা মাঝ দরিয়ায় না গেলে ফেলা হবে না হয়তো নিচে। সে এবার বুঝতে পারল ঠিক এক নাগাড়ে ঘন্টা চারেকের মতো কয়লা ফেলতে না পারলে সুট সে ভরতে পারবে না।

    এবং এ-ভাবে এক সংগ্রামের মতো, কখনও কখনও ভয়ে রাতে ঘুম আসে না, সকাল হলেই ওয়াচ, অথবা রাত আটটা বাজলেই ওয়াচ। বাংকে শুয়ে থাকলেও মনে হয়, কেউ যেন অনেক দূরে হেঁকে যাচ্ছে, যোয়ানলোগ টান্টু। এই এক শব্দ, অনেকটা টেনি টরেন্টো শব্দের মতো। গর্ভিনী তিমি শিকার করে ফেরার সময়, সমুদ্রে এমন একটা শব্দ শিকারীরা শুনতে পায়। গর্ভিনী তিমিরা কত যে অবলীলায় ভেসে ভেসে বেড়ায় সমুদ্রে। ছোটবাবুও বাংকে শুয়ে থাকলে এমন সব শব্দ শুনতে পায়। বুক তার ধুকপুক করতে থাকে সে নিজের এই আতঙ্কের কথা কাউকে বলে না। যেন গ্রাহ্য করছে না, সে অন্য সবার মতো কাজ করতে পারছে এটা প্রমাণের জন্য আর এক মুহূর্ত নষ্ট করল না। দরজার কাছে সে লম্ফটা রেখে এল। মেডিসিন কারটা সে ঠেলে নিয়ে গেল সামনে। সুট থেকে কয়লা দূরে সরে যাচ্ছে ক্রমশ। সে নুয়ে দ্রুত বেলচা দিয়ে গাড়ি ভরে ফেলল। তারপর দু হাতে সামনে ঠেলে দিল গাড়িটা। এখন আর ভারি গাড়িটা মাঝে মাঝে কাত হয়ে পড়ে যায় না। সে ঠিক ঠিক সুটের মুখের কাছে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে, ঢেলে দিতে পারে, সে গাড়ি টানছে, কয়লা তুলছে, সুটে এনে ফেলছে। লম্ফটা দপ দপ করে জ্বলছে, আবার কখনও ঘন অন্ধকার, ওকে ছায়ার মতো মনে হয় তখন। সে ঘেমে নেয়ে যাচ্ছে। ওর জামা প্যান্ট ভিজে গেছে।

    বাংকারে বুটের শব্দ, ঝম ঝম কয়লা ভরার শব্দ, থপ থপ করে হেঁটে যাবার শব্দ, গড় গড় করে কয়লা সুটে ফেলে দেবার শব্দ। এ-ভাবে সব নানা রকমের অতিকায় শব্দ ক্রমে গড়াগড়ি খেতে থাকলে, একসময় মৈত্র এসে দেখল, ছোট এক মুহূর্ত বিশ্রাম নিচ্ছে না। মৈত্র বলল, আমি ভরছি, তুই ফেল।

    —না, তুমি যাও। আমি ঠিক পারব।

    —ওয়াচের লোকেরা নেমে গেছে।

    —আর ক’গাড়ি ফেললেই হয়ে যাবে। তুমি চলে যাও। পেটে আগুন জ্বলছে। খেতে বসে দেরী করতে পারব না।

    অমিয় এবং মৈত্র উঠে গেল। ছোটবাবু এখানেই ছোটবাবু। সে কারও সাহায্য না নিয়ে কখনও কখনও খুবই যে সে দায়িত্বশীল বুঝিয়ে দিতে চায়।

    মৈত্র এবং অমিয় সিঁড়িতে পা রাখার সময় শুনল, অনেকটা হিসাব রাখার মত, ছোটবাবু গাড়ি টেনে নিচ্ছে, আর হরে রাম বলছে, এক, দুই হরে রাম, হরে হরে এক দুই, গাড়ি ফেলে দিলে তিন, চার পাঁচ এবং শেষে একসময় যখন দেখল কয়লায় ভরে উঠছে সুটের মুখ সে একেবারে ছাদের দিকে বেলচে ছুঁড়ে দিয়ে, গাড়িটা কয়লার কাছে লাথি মেরে উল্টে সোজা দৌড়ে বোট-ডেক পার হয়ে গেল।

    আসলে রোজ রোজ সে এভাবেই কাজের শেষে যেন কিছু আবিষ্কারের মতো চিৎকার করে ওঠে, সাবাস ছোটবাবু, সুট ভরে মাথা কিনে নিলে!

    কারণ কাজটা তার কাছে প্রায় দুর্গম গিরি প্রান্তর পার হয়ে যাওয়ার মতো। সে রোজ রোজ এভাবে ভরে ফেলে সাংঘাতিক কিছু করে যাচ্ছে। সে জীবনের কাছে হেরে যাচ্ছে না। যত এমন ভাবে, তত বেঁচে থাকার আকাঙ্খা বাড়ে। সে ভাল করে স্নান করে। সে ওয়াচের জামা প্যান্ট পাল্টে বাথরুমে একেবারে উলঙ্গ হয়ে যায় এবং গরম জল ঢেলে সে যখন স্নান করে তখন মুখে শরীরে সাবানের ফেনা। সারা শরীরে অজস্র সাবানের ফেনা এবং বুদবুদ, সে মাঝে মাঝে হাত পা ঘসতে ঘসতে টের পায়, পেশী শক্ত হয়ে যাচ্ছে, সমুদ্রের বাতাসে শরীরের রঙ ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে যাচ্ছে। জল ঢেলে দিলে শরীরে বিন্দু বিন্দু ফোঁটা সারা শরীরে আর শরীরময় আকাঙ্খা। সে চুপচাপ তখন কেমন শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। তার কিছু ভাল লাগে না তখন। মার চিঠি এল না, কেউ তাকে চিঠি দেয় না। সে নিরুদ্দেশে, সবাই হয়তো ভেবেছে, ছেলেটা বেঁচে নেই।

    তখন অমিয় ডাকল, কিরে কতক্ষণ ধরে চান করছিস। তোর ক্ষিদে পায় না?

    সে সত্যি খুব ক্ষুধার্ত। সে এক মুহূর্ত আর দেরি করতে পারল না। এতক্ষণ যে শরীর অবশ অবশ মনে হচ্ছিল, সে যেন জোর করে তা অস্বীকার করতে চেয়েছে। সে আর দেরি করতে পারছে না। পাজামা পরে নিল। জামা, গরম পুল-ওভার পরে সে সোজা মেসরুমে ঢুকে বলল, দে।

    টেবিলে যে যার মতো খাচ্ছে। কেউ নিচে বসে খাচ্ছে, কেউ টেবিলে বসে খাচ্ছে। বড় টিনের ভেতর ডাল। কাঠের হাতা, ডেকচিতে ভাত। ডাল যে যার মতো তুলে নিচ্ছে। ‘বিশু’র সবাই গোল হয়ে বসে গেছে খেতে। যাদের খাওয়া হয়ে গেছে তারা এখন ডেকে মাদুর পেতে নামাজ পড়ার আগে দাঁত খুঁটছে। রুপোর খড়কে। গলায় ঝুলানো। ছোটবাবু এসব কিছুই দেখছিল না। সে আসলে মুখ বুজে খাচ্ছে। আলুভাজা, ডাল, মাংস হয়নি। মটন হলে সে খায়, না হলে খায় না। বাঁধাকপির সঙ্গে মাংসের ছোট ছোট টুকরো দিয়ে বেশ একটা সুস্বাদু খাবার ভান্ডারি তৈরি করেছে। খেতে ভাল হয়েছে বলে সে গলা পর্যন্ত খেয়ে যাচ্ছে। আর মাঝে মাঝে অমিয়, মৈত্র দেখছে, ছোটবাবুকে। কিছু বলছে না। বেশ খেয়ে গেল ছোটবাবু। খাওয়া হলে মৈত্র বললে, বাঁধাকপি দিয়ে গোস্ত হয়েছে। কেমন লাগল রে?

    —খুব ভাল হয়েছে। ভান্ডারি জ্যাঠা বেশ রেঁধেছে। জ্যাঠার হাত যা খোলে মাঝে মাঝে! ভান্ডারি তখন গ্যালি থেকে গলা বের করে হঠাৎ জিভে কামড় দিয়ে ফেলেছে।—তুমি খাইলা জ্যাঠা!

    —হ খাইলাম। ভান্ডারি বুড়ো মানুষ, রোগা রোঁয়া রোঁয়া চুল মাথায়। তাকে খেতে শুনে এমন জিভ বের করে দিয়েছে কেন সে তার কিছুই বুঝতে পারল না।

    সে বলল, না খাইলে পারতা।

    —ক্যান এমন কথা কন!

    ভান্ডারি কিছু না বললেও সে বুঝতে পারল, সে আজ বিফ খেয়েছে। সে তো কিছু বোঝেনি, সে তো বুঝতে পারেনি, বিফ কি মটন! তা ছাড়া ইদানিং ওদের জন্য ভান্ডারী আলাদা মটন বাটলারের কাছ থেকে বলে কয়ে নিত। কিন্তু আজকে নানা কারণে এটা হয়তো সম্ভব হয়নি। ভান্ডারিকে চারপাশ সামলাতে হয়। সব কিছু এক হাতে করতে হয় মানুষটাকে। খেয়াল না থাকার কথাই! তা ছাড়া ওর তো কিছু হচ্ছে না, বমি হচ্ছে না, না বমি একেবারেই পাচ্ছে না। তবে কি এটা জুজুর ভয়! সে যেন কেমন সাংঘাতিকভাবে বলে ফেলল, খেতে তো জ্যাঠা খারাপ লাগল না। বেশ লাগে খেতে।

    মৈত্র বলল, সহসা চিৎকার করে বলল, থ্রি চিয়ার্স ফর ছোটবাবু।

    ছোট উঠে পড়ল। তবু মনের ভেতর এক আশ্চর্য অহমিকা আছে, কিংবা দীর্ঘ দিনের সংস্কার, সে একেবারে তার সবকিছু উড়িয়ে দিতে পারে না। যত এমন ভাবছে, মনে হচ্ছে, না এটা ঠিক না, কাল আবার হয়তো আগে জানতে পারলে গা ঘিন ঘিন করবে। সে ভাবল, আর কখনও মাংসের ব্যাপারে কোন কথাবার্তা বলবে না। যেমন সবাই খায় মুখ বুজে খেয়ে উঠবে।

    তখন ভদ্রা জাহাজের স্মৃতি তাকে কেন যে তাড়া করে—কে যেন ডেকের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, আর কে যেন বলছে, বিফ খানে সাক্‌তা! তোমকো বিফ্ জরুর খানে হোগা।

    গোটা ব্যাপারটা তার কাছে এখন হাস্যকর। এমন সুন্দর দিন যেন হয় না। জাহাজ এখন কোথায়? বোধহয় ভারতবর্ষের শেষ সংযোগটুকু আজ মুছে যাবে। কথা আছে জাহাজ দুটোর ভেতর আটলান্টিকে পড়বে। ঠিক সময়টা কেউ জানে না। আবার আটটায় ওয়াচ। এখন আর গিয়ে ফোসকালে চিৎপাত হয়ে শুয়ে লাভ নেই। সেই যে দূরবর্তী এক উপকূলে তার বাসভূমি ফেলে এসেছে, সেই যে ক্ৰমান্বয়ে জাহাজের প্রপেলার কেবল ঘুরতে থাকল, সেই যে সে দিনরাত জাহাজ ডেকে পায়চারি করতে করতে দেখল, সমুদ্র উত্তাল, ভয়াবহ, ওর শেষ বাসভূমির গাছপালা ছায়া ছায়া হয়ে যাচ্ছে, ক্রমে সেটা মেঘের মতো দিগন্ত রেখায়, তারপর মিশে গেছে আকাশের সঙ্গে, তারপর সেই অসীম যাত্রা, সমুদ্রে সমুদ্রে ওরা ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে চলেছে, আজ ওরা শেষবারের মতো তাও পার হয়ে যাবে। সে এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। নিচে এখন নামবে না। ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে শুধু। দাঁড়িয়ে থাকতে তার ভাল লাগবে। রেলিঙে দাঁড়িয়ে মেজ-মালোমকে ডেকে বলবে, স্যার বলবেন, কখন জাহাজ আটলান্টিকে পড়ছে।

    সে এ-ভাবে যখন দাঁড়িয়েছিল, কেমন যেন একাকী, নিঃসঙ্গ। সে শীতের জন্য বেশ গরম পোশাক, পোশাক বলতে পুরোনো বাজার থেকে কেনা পোশাক। সে তাই সাদা প্যান্টের ওপর পরেছে। ঘন চুল সমুদ্রের হাওয়ায় নীল দেখাচ্ছে। আকাশ পরিচ্ছন্ন। তবু সমুদ্রে বেশ ঢেউ আছে। সে সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। জাহাজে সামান্য পিচিং, সে এখন আর এ-সব আমল দেয় না। এই পিচিং তার ভাল লাগে। ওর কেমন তখন চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে। দূরে, দিগন্তরেখায় সব পাখিরা যায়, কোথায় যে যায়, উড়ে উড়ে কোন মহাসমুদ্রে যায় সে জানে না। সে তখন কেবল ওদের অবাক হয়ে দেখে।

    মৈত্র ফোসকালে ছোটবাবুকে দেখতে না পেয়ে ওপরে উঠে এল। ওপরে উঠে দেখল, টুইনডেকে রেলিঙে দাঁড়িয়ে ছোটবাবু সমুদ্র দেখছে। ওর মনে হল বিফ খেয়ে বোধ হয় ছোটবাবুর মন ভাল নেই। কাছে গিয়ে সে দাঁড়াল। কিছু বলতে প্রথমে সে সংকোচ করল। তারপর যেন আর না বলে পারল না। কিরে বিফ খেয়েছিস বলে মন খারাপ!

    তখন মেজ-মালোম, ডেবিড চিৎকার করে ছোটকে বলচে, সামনে আটলান্টিক ছোট। ভালো করে দ্যাখো। আটলান্টিক কি বিশাল, মহান সমুদ্র। দ্যাখো। দেখলে তোমার আর দুঃখ থাকবে না।

  • দশ

    দশ

    ।। দশ।।

    সাগরের জল নীল, সব সাগরের জল নীল। যেখানে যখন সমুদ্র আলাদা নামে ভাগ হয়ে গেছে, ঠিক সেখানে তারা এমন কিছু দেখতে পায় না, যা দেখে সমুদ্রকে আলাদা নামে চেনা যায়। সেই নীল রঙ, সেই শান্ত নিরিবিলি আকাশ, সেই উড়ুক্কু মাছেদের উড়ে উড়ে জলের ওপর খেলা। তীরের মতো ওরা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে আবার জলে ডুবে যায়। এবং সমুদ্র-পাখীরা কখনও কখনও দেখা যায় পেছনে উড়ে আসছে। ঝড়ের সময়ও ঠিক তেমনি। যেন এক ভয়ঙ্কর সমুদ্রের ভেতরে, ভয়ঙ্কর সব ঢেউ আর মেঘলা আকাশের নিচে জাহাজ ছোট কাগজের নৌকার মতো। জাহাজের ওপর দিয়ে ঝড়ের দাপট, অথবা ঢেউগুলো কি আশ্চর্যভাবে যে ডেকের ওপর দিয়ে কখনও বোট ডেকের ওপর দিয়ে ভেসে চলে যায়। যেন সমুদ্র আর জাহাজের এক খেলা, মায়ার খেলা, অথবা লুকোচুরি খেলা। জাহাজ কখনও কখনও ঢেউয়ের ভেতর হারিয়ে গিয়ে বিশাল সমুদ্রের সঙ্গে তামাসা করে। আবার ভেসে উঠলে, প্রচন্ড রোষ সমুদ্রের, সে প্রবল বেগে আছড়ে পড়তে চায়। আর সামান্য জাহাজিরা তখন স্টোক-হোলডে বয়লারের সঙ্গে, আগুনের সঙ্গে লড়াই করতে করতে কত সহজে এইসব রোষ থেকে জাহাজকে যে রক্ষা করে থাকে। মানুষ এ-ভাবে সমুদ্রের সমস্ত অহঙ্কার ভেঙে দেয়। সে তার ঢেউ ফালা ফালা করে একদিন ঠিক শান্ত আকাশের নিচে চলে যায়। মনেই হয় না সমুদ্র সেদিনও জাহাজটাকে কি যে দুর্গতির ভেতর ফেলে দিয়েছিল। সমুদ্র ভালমানুষের মতো একেবারে সরল সহজ হয়ে গেলে, জাহাজিরা কাজের শেষে রেলিঙে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে। অবসর সময়ে ছোটবাবুর সমুদ্র দেখা বাদে যেন আর কাজ থাকে না তখন। অথবা বর্ণময় দ্বীপের অসংখ্য গাছপালা।

    এবং এভাবে ছোটবাবু কখনও ডেকে, কখনও ফল্কায় অথবা মধ্যরাতে ঘুম না হলে সে একাকী উঠে আসে। সবাই ঘুমোচ্ছে। কেবল ডগ-ওয়াচে ওয়াসিন কিংবা অন্য কোনও ডেক-জাহাজি পাহারায় আছে। আর ব্রীজে ছোট-মালোম। স্টোক-হোলডে ফায়ারম্যান, টিন্ডাল। ফানেলের গুঁড়িতে উঠে গেলেই দেখা যাবে যেন পাতালে ক’জন ক্ষুদ্রাকৃতি মানুষ, ফার্নেসের দরজা ঠেলে র‍্যাগ মেরে ওল্টে পাল্টে দিচ্ছে আগুন। ওদের মুখগুলো আগুনে ঝলসে উঠলে বোঝা যায় মধ্যরাত্রিতে কেউ জেগে থাকে না, শুধু ওরা জেগে আছে। এনজিনে জেগে আছেন তিন নম্বর মিস্ত্রি। সে চুরুট খাচ্ছে আর মাঝে মাঝে স্টিম ঠিক আছে কিনা দেখছে। জেনারেটর ঠিকমত কাজ করছে কিনা লক্ষ্য রাখছে। ব্লিজ পাম্প চালিয়ে দিচ্ছে মাঝে মাঝে। চারপাশটায় লক্ষ্য রেখে, যেমন সে মাঝে মাঝে সার্কুলেটিঙ পাম্পে হাত দিয়ে দেখছে খুব বেশী গরম হয়ে গেল কিনা জলটা—এভাবে শুধু জেগে থাকা। অনেক উপরে ঠিক স্কাই-লাইটের ফাঁকে দেখা যায় আকাশটা ক্রমে সরে যাচ্ছে। কখনও মনে হয় আকাশটা ভীষণ দুলছে। এ-ভাবে জাহাজ ক্রমাগত চলছে।

    ক্রমাগত দিনের পর দিন এ-ভাবে শুধু চলা। জাহাজের চেহারা ওয়াচে ওয়াচে পাল্টে যায়! সমুদ্রে মধ্য রাতের চেহারা যেন সবচেয়ে নিঝুম। এবং এ-সময় কাপ্তানের ঘরে কোন আলো জ্বালা থাকে না। পোর্টহোল দিয়ে উঁকি দিলে দেখা যায় বড়-মিস্ত্রি একজন অসহায় বালকের মতো কম্বলের নিচে পা মুড়ে শুয়ে আছে। এনজিনের শব্দ কেবল উঠে আসে ভেতর থেকে, আর সব আলো জ্বালা ডেকে, উইংসের আলোগুলো মায়াবী এক জগত তৈরী করে দেয়। গভীর নীল সমুদ্রে সাদা জ্যোৎস্নায়, সাদা জাহাজ গভীর রাতে যখন যায়, তখন এক ছোট্ট সচল নগরী অথবা যেন জাহাজের সুন্দর সুচারু গতি দেখলে ঈশ্বরের পৃথিবীকে ভীষণ ভালবাসতে ইচ্ছে করে।

    মধ্যরাতে ছোটবাবুর কখনও কখনও ডেকের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াতে ভাল লাগে। সহসা কেউ দেখলে ভূত টুত বলে চিৎকার পর্যন্ত করতে পারে। কারণ কোয়ার্টার মাস্টার মহসীনের বিশ্বাস জাহাজে যেমন সবাই আছে, তেমনি ভূতও আছে। জাহাজে মানুষ থাকবে, ভূত থাকবে না, সে বিশ্বাস করতে পারে না। সে তার সফরের কত এমন সব ভূতের যে গল্প করেছে। এবং এ-সব গল্প শুনলে, ডেকে একা ঘুরে বেড়াতে সত্যি ভয় লাগে। যেমন একটা ভূত ছিল, সিটি অফ পানামাতে। সে ডেকে মধ্য রাতে কোন জাহাজি পেলেই একেবারে ঠেলে সমুদ্রে হারিয়া করে দিত। যেমন একবার একটা ভূত একজন জাহাজির গলায় দড়ি লাগিয়ে একেবারে মাস্তুলের ডগায় ঝুলিয়ে দিয়েছিল। কাপ্তান নানাভাবে ভূতটাকে খুঁজে বেড়ালেন। তারপর দেখা গেল কাপ্তান নিজেই একেবারে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছেন ইনজিন ঘরে। জ্ঞান ফিরে এলে তিনি বলেছিলেন, কেউ তাকে যেন, একটা বাতাস টাতাস হবে, ঠেলে নিচে ফেলে দিয়েছে।

    এবং ছোটবাবু ঠিক দুপুর রাতে একা একা ঘুরে বেড়ালে—সেই সব ভূতের নানারকম কীর্তিকাহিনীর কথা মনে করতে পারে। ওর ভয় যে না হয়, তা নয়, তবু এই নিঃসঙ্গতায়, এবং সমুদ্রের গভীরে, অর্থাৎ হাজার হাজার মাইল এ ভাবে সমুদ্রের ভিতর দিয়ে যাওয়া এবং মধ্যযামিনীতে কখনও কখনও একা দাঁড়িয়ে থাকা এক ভীষণ রোমাঞ্চ সে বুঝতে পারে। এইসব মধ্যযামিনীতে সে কি যে প্রলোভনে পড়ে যায়! তার মনে হয় সে এ ভাবে একদিন ঠিক এই পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে ঘরে ফিরে যাবে। মানুষের কাছে এর চেয়ে বড় কি আছে! কারণ সে জানে ঘরে ফিরে গেলে, কত সব গল্প, মা চুপচাপ কুপি জ্বেলে বলবে, তারপর! ভাইবোনগুলো বলবে, তারপর

    তারপর কি, সে নিজেও জানে না। কারণ, কোনও চিঠি কোথাও থেকে না এলে সে বুঝতে পারবে না ওরা কোথায় আছে। তখন ডেকে দাঁড়িয়ে তার কেমন গলা ধরে আসে। তার এত অহংকারের উপার্জন কোনও কাজে এল না। মানি অর্ডারের টাকা কোম্পানীর ঘরে ফিরে গেছে।

    .

    ঠান্ডায় জাহাজিরা কাঁপছে, সমুদ্র থেকে ঠান্ডা বাতাস উঠে আসছে। গ্যালি থেকে কেউ যেতে চাইছে না। বুড়ো মানুষ ভান্ডারী, সবাই এসে গ্যালিতে ভিড় করলে ভীষণ বিরক্ত হয়। একে ছোট্ট জায়গা, সবাই হাত সেঁকলে, সে দাঁড়ায় কোথায়। তার যে কত কাজ! সে উনুনে বড় তামার ডেকচিতে ডাল, আর ভাত বসিয়েছে। একটা বড় কড়াইয়ে সে চর্বি দিয়ে রুটি ভাজছে। যে যার মতো তুলে নিচ্ছে, এবং রোদে দাঁড়িয়ে খাচ্ছে।

    এবং চড়ুই পাখি দুটো বসে আছে রেলিঙে। ওরাও শীতে কাঁপছে। এদের জন্য ছোটবাবু ভেবেছে একটা বাসা বানাবে। বাসাটাতে খড়কুটো দিয়ে এমন গরম জায়গা বানাবে, যাতে ওদের থাকতে কোন অসুবিধা না হয়। ছোটবাবু বুঝতে পারল না বোট-ডেকের রেলিঙে ওদের কি দরকার বসে থাকা। এখন এনজিন-ঘরে বেশ গরম। বয়লারের ওপর কোনও রেলিঙে-টেলিঙে বসে থাকলেই হয়ে যায়। না, তা না। সে ভেবেছিল, ওয়াচে নামার আগে ওদের তাড়িয়ে এনজিন ঘরে নিয়ে যাবে। অবসর সময়ে সে ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে থাকে। ওর সঙ্গে যখন কথাবার্তা হয়, তখন জ্যাক আসে, মেজ-মালোমও আসে। কখনও কখনও জ্যাক পাখি দুটোকে, বিশেষ করে মেয়ে-পাখিটাকে জাহাজ ছাড়া করতে চায়। কি দরকার, মেয়ে পাখি থাকার। যেন হেগে-মুতে জাহাজ নোংরা করছে। জ্যাকের ভীষণ রাগ এই মেয়ে পাখিটাকে নিয়ে। আর মেজ-মালোম এবং সে শুধু, সে কেন, এখন তো জাহাজে এত একঘেয়েমী, যে এ-দুটো পাখি জাহাজে ভীষণ বৈচিত্র্য বয়ে এনেছে।

    সবাই ভেবে ফেলেছে তাদের মতো, পাখি দুটোও জাহাজের যাত্রি। এদের জন্য কখনও কখনও জাহাজিরা খাবার রেখে দিতে ভালবাসে। খেতে খেতে মনে পড়ে গেল, আরে মিঃ স্পেরো, মিসেস স্পেরো! কোন দরকার নেই। কারণ ওরা খুঁটে খুঁটে খায়, ওতেই চলে যায়। গ্যালিতে আসতে ভয় পায়, এত লোক দেখলে ভয়, তবু বেঁচে থাকার মতো খাবারের ভাবনা ওদের নেই। তবু জাহাজিদের যে কি হয়, খেতে খেতে মনে পড়ে গেলে, কখনও আপেলের টুকরো, কখনও কুচি মাংস, কখনও রুটির ভগ্নাংশ রেখে দিয়ে যেন মনে করে থাকে, এটা ঠিক জাহাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো আর একটা কাজ। ওরা যেতে যেতে পাখি দুটোকে খুঁজে বেড়ায়। চারপাশে খুঁজে বেড়াতে বেড়াতে না দেখতে পেলে, ভাবে, কি হল, কোথায় গেল! যেন তখন তোলপাড় পড়ে যায়, কোথায় কোথায়! পাখি দুটোকে তো আর দেখা যাচ্ছে না।

    তখন হয়তো কাপ্তানের ছেলে পাখি দুটোকে নিয়ে ঠিক ব্রীজের নিচে বসে আছে। সে বসে রয়েছে একটা টিনের চেয়ারে। সে বোধ হয় পরে আছে লম্বা সাদা ট্রাউজার। সে পরে আছে লম্বা সার্টের ওপর ঢোলা পুল-ওভার, সে পরে আছে একটা ষোড়শ শতাব্দীর জলদস্যুসের টুপি, ওর পায়ে নীল রঙের জুতো, এবং কালো মোজা। ওর হাতে দস্তানা সাদা রঙের। চুল আরও বড় হয়ে গেছে। সে পা দুটো সামনের দিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। তার পায়ের চারপাশে পাখি দুটো উড়ে বেড়াচ্ছে। পাখি দুটোকে ওর আপেলের কিছু অংশ কখনও রুটির অংশ সে ছুড়ে দিচ্ছে। পাখিগুলো খেয়ে যাচ্ছে। এটা একটা এখন জ্যাকের খেলা হয়ে গেছে। সে যেন জাহাজে বেশ একটা কাজ পেয়ে গেছে। পুরুষ পাখিটাকে সে বেশি খাওয়াতে ভালবাসে।

    পাখিদের খাওয়ানোর সময় হাতের দস্তানা খুলে ফেলে। দস্তানা সে কোমরে বেল্টে গুঁজে রাখে। সে কেমন এক অতীব সুন্দর ছবি তৈরি করে ফেলে ডেকে। জাহাজে থাকলে চুল চোখ কি মানুষের ক্রমে’ নীল হয়ে যায়! ছোটবাবু পাশে গিয়ে দাঁড়ালে বুঝতে পারে না, চুলে এমন সুন্দর গন্ধ কি করে হয়। সে তো কিছু মাখে না। জ্যাকের শরীরে এই যে ঘ্রাণ, যেন সব জাহাজিদের চেয়ে আলাদা। কাছে গেলে নড়তে ইচ্ছে হয় না। জ্যাকের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে তার ভীষণ ভাল লাগে। পাখি দুটো চারপাশে তখন উড়ে বেড়ায়, আর কিচ কিচ করে ডাকে।

    জ্যাক একদিন দেখল, ছোটবাবু চুপচাপ গ্যালির পাশে কি করছে। ছোটবাবু ঠুক ঠুক করে কাঠে পেরেক মেরে যাচ্ছে। কি হবে, এই বাকসো দিয়ে সে বুঝতে পারছে না। ছোটবাবুও কিছু বলছে না। তারপর ডাকল, জ্যাক!

    এ-ডাক জ্যাক কেন যে অবহেলায় মাড়িয়ে যেতে পারে না। কেমন সরল অনাড়ম্বর ডাক। সে এলেই ছোটবাবু বলল, তুমি একটা কাজ করবে জ্যাক?

    জ্যাক বুঝতে পারে না কি কাজ!

    সে বলল, হাতুড়িটা বড়। একটা ছোট হাতুড়ি কশপের আছে। আমি চাইলাম, দিল না। তুমি যাবে? আমাকে এনে দেবে?

    জ্যাক লাফিয়ে চলে যাচ্ছিল, তখন আবার ছোটবাবু ডাকল, আর শোন তুমি কটা কাঠ, কিছু পেরেক আরও আনতে পার কিনা দেখবে। আমাকে দিল না। বলল, মেজ-মিস্ত্রি বকবে। তুমি যদি পারো।

    জ্যাক যখন ফিরে এল, ছোটবাবু অবাক। কশপের কাঁধে কোমরে, প্রায় কশপকে চেনা যায় না, কাঠ বোঝাই হয়ে কশপ চলে এসেছে। এক গাদা কাঠ জ্যাকের হাতে, এত দিয়ে কি হবে, সে বুঝতে পারছে না।

    ছোটবাবু বলল, আরে এটা করেছ কি!

    জ্যাক পাশে কাঠ রেখে বসল। বলল, বেশ বড় করে বানাবে।

    কশপ দাঁড়িয়ে আছে। সে জ্যাক না বললে নামাতে পারছে না। দাঁড়িয়েই আছে।

    ছোটবাবু বলল, চাচা ওগুলো নিয়ে যাও। লাগবে না। জ্যাক যা এনেছে ওতেই হয়ে যাবে।

    —তোমার পেরেক লাগবে না?

    —জ্যাক আনে নি!

    এনেছে। আমার কাছে ভাল পেরেক আছে। তিনটে হাতুড়ি এনেছি, কোনটা লাগবে বল।

    —লাগবে না। জ্যাকের হাতুড়ি হলেই হবে। তুমি বরং এটা নিয়ে যাও। বলে সে হাতের হাতুড়িটা দিতে গেলে দেখল, নেবার মতো ক্ষমতা ওর নেই। এই কাঠগুলো ফের বয়ে নিতেই কষ্ট হবে। সে উঠে দাঁড়াল। কাঠগুলো সব নামাল। বলল, তুমি হাতুড়িটা নিয়ে চলে যাও। কাঠগুলো যা লাগে নেব, বাকিটা আমি রেখে আসব।

    এখানেই কেন জানি ছোটবাবুর জন্য সবার মায়া। এটা সে জানে, মানুষের কোথায় সব নরম জায়গা থাকে, সে নিজেও একটা দুঃখের ভিতর পড়ে গেছে, সে জন্য কারু সঙ্গে ছোটবাবু খারাপ ব্যবহার করতে পারে না। শৈশব থেকেই সে এমন একটা স্বভাবের ভেতর মানুষ হয়েছে।

    এবং এ-ভাবে ছোটবাবু এক জাহাজি। আর কেউ জানে না, জ্যাক একটা মেয়ে, ছেলে সেজে বেশ চালিয়ে যাচ্ছে। কাপ্তান একদিন আবার জোর করে বনির চুল ছেঁটে দেবে বলে বনিকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। চুল ছেঁটে দেবার সময় জাহাজে এক দৃশ্য তৈরি হয়। বনিকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কাপ্তান, সারেঙ, বড়মালোম সবাই মিলে তখন কেবল খোঁজে। বনি কোথায় যে লুকিয়ে থাকে তখন!

    ছোটবাবু তখন বাংকারে কাজ করছিল। একটা লম্বা রাবারে মোড়া তারের মাথায় বাল্ব জ্বলছে। মাঝে মাঝেই টানাটানিতে নষ্ট হয়ে যায়। তখন থাকে একটা লম্ফ। লম্ফের আলোতে বাংকারটাকে কয়লার খাদ বাদে আর কিছু ভাবা যায় না। সে অন্ধকারে একা গাড়িতে কয়লা ভরে যাচ্ছে। শীতকাল, প্রচন্ড ঠান্ডায় সে ঘামছে। ওর মুখ কয়লায় কালো হয়ে গেছে। সে মাঝে মাঝে বেলচায় কয়লা ওপর থেকে টেনে নামাচ্ছে। বড় বড় পাথরের মতো কয়লার চাঙ এখন নেই। কয়লা কিছুটা ইংলিশ কোলের কাছাকাছি। খুব পরিশ্রম হবার কথা না। তবু সে তাড়াতাড়ি সুট ভরে ফেলতে পারলেই ছুটি পেয়ে যাবে। সে তাই এক নাগাড়ে কাজ করে যাচ্ছে। আর তখনই ফিস ফিস গলায় কে ডাকলে, ছোটবাবু আমি।

    মইসীন মিঞার ভূতের গল্প সারা জাহাজে একটা ভয় ছড়িয়ে রাখে। ছোটবাবু মাঝে মাঝে একা বাংকারে ঢুকতে ভয় পায়। জাহাজের ভেতর এটাই সবচেয়ে বোধহয় অন্ধকার জায়গা। মাল গুদাম ছাড়া এত অন্ধকার আর কোথাও নেই। সে ভয়ে সহসা সোজা হয়ে গেলে দেখল, জ্যাক ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলছে, প্লিজ ছোট।

    ছোটবাবু কিছুই বুঝতে পারে না। সে বলল, কি!

    —আমি এখানে লুকিয়ে থাকব।

    —কেন?

    —বাবা চুল কেটে দেবার জন্য খুঁজছে।

    —আমাকে তবে জাহাজ থেকে নামিয়ে দেবে না!

    —না। আমি বলছি তোমাকে কিছু বলবে না।

    এ-ছাড়া সেই অস্পষ্ট অন্ধকারে বনির মুখে ভীষণ কষ্টের ছাপ, ছোটবাবুকে কেমন কাতর করে ফেলে। সে বলল, ঠিক আছে। ওদিকে চলে যাও। আমি এলে বলব, এখানে কেউ নেই।

    —ওরা তবে খুঁজে বের করে ফেলবে!

    —তবে কি করতে চাও?

    —তুমি আমাকে বেলচাটা দাও। আমি কয়লা ফেলতে থাকি।

    —আমি কি করব?

    —তুমি স্টোক-হোলডে নেমে যাও।

    —কিন্তু……..।

    —কিন্তু না। তুমি শোন, একটা কাজ করবে, এই মানে…….। মনে হয় বনি কিছু বলতে লজ্জা পাচ্ছে। সে নিজের পোশাকের দিকে তাকাচ্ছে। খুব সাদা পোশাক। এমন সুন্দর পোশাকে কেউ বাংকারে ঢোকে না। ওরা দরজায় কেউ উঁকি দিলেই, বুঝতে পারবে এমন সাদা ধবধবে পোশাকে কেউ বাংকারে কয়লা ফেলতে আসে না। সে ঠিক ধরা পড়ে যাবে। তবু কি যে সংকোচ, কি যে সে বলতে চায় ছোটবাবু ঠিক বুঝতে পারে না। সে বলল, ছোট, তোমার পোশাকটা দেবে। আমি পরে নেব।

    —আমার……মানে আমার নোংরা পোশাক। কী বলছ! তোমার ভীষণ ঢোলা হবে।

    —তা হোক! তুমি দাও।

    —আরে না না, সে কি করে হয়। খুব নোংরা।

    —কিছু হবে না। এখানেই বোঝা যায় জ্যাক জেদি। সে বলল, তুমি দাও। আমারটা তুমি পরে নাও।

    —তুমি কি বলছ জ্যাক! তোমারটা আমার গায়ে কখনও লাগে! খাটো হবে না!

    —হোক খাটো। তুমি নাও। দেরী কর না। দেরী করলে ধরা পড়ে যাব।

    ছোটবাবু আর কিছু ভাবতে পারে না। ঘামে গেঞ্জি ভিজে গেছে। প্যান্টালুন তেমন ভেজে নি। সে বনির সামনেই জামা খুলে ফেলল প্যান্ট খুলে ফেলল। আর কী শীত! সে তো এখন কাজ করছে না, শীতটা আবার জাঁকিয়ে বসেছে। সে বলল, এই তাড়াতাড়ি খুলে দাও। আমার ভীষণ শীত করছে জ্যাক। ও-তুমি আবার ওদিকে কোথায় চললে! জ্যাক!

    —এদিকে এস না ছোট। প্লিজ।

    —আরে তাড়াতাড়ি করে ফেল। আমার ভীষণ শীত করছে।

    —প্লিজ, এদিকে এস না। আমার হয়ে গেছে। অস্পষ্ট অন্ধকার থেকে জ্যাকের গলা পাওয়া গেল।

    —জ্যাক তোমাকে দেখা যাচ্ছে না। খালি গায়ে আমি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব। জ্যাক, আমি শীতে মরে যাব। জ্যাক, তোমার এত লজ্জা কেন?

    মনে হয় অন্ধকারে জ্যাকও শীতে ভীষণ কাঁপছে। সে ছোটবাবুর কাছে যেতে ভয় পাচ্ছে। সে কেমন অধীর হয়ে পড়ছে। যেন সে ছোটর কাছে গেলেই নিজেকে ঠিক রাখতে পারবে না। কি সুন্দর, পবিত্র যীশুর মতো। সে যে কি করে ফেলতে পারে তখন! আশ্চর্য সুন্দর শরীর ছোটবাবুর। বাহুল্য নেই। সোজা সরল বৃক্ষের মতো ছোট দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপছে। বনি কেমন আবিষ্ট হয়ে যাচ্ছে দেখতে দেখতে।

    ছোটবাবু চিৎকার করে বলছে, কি হচ্ছে জ্যাক? বলে সে লম্বা বাংকারের মাথায় ছুটে গেলে বনি বলল,—এই যে আসছি। আমার হয়ে গেছে ছোট।

    গলা এত কাঁপছে কেন? ছোটবাবু বুঝতে পারছে না, জ্যাকের গলা কেমন ধরে আসছে।

    —আমি শীতে মরে যাচ্ছি ছোট। বলে, মাথার টুপি টেনে এগিয়ে আসছে জ্যাক। তারপর জ্যাক কাছে এসে বলল,—আর দাঁড়াবে না। একেবারে নিচে নেমে যাও। কোথাও গিয়ে লুকিয়ে বসে থাক।

    ছোটাবাবু বলল, জ্যাক, তুমি আশ্চর্যভাবে ছোটবাবু হয়ে গেলে। আর একটু লম্বা হলে কেউ এমনিতেও ধরতে পারত না!

    বনি কোন কথা না বলে গাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ছোটবাবু সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে গেল। আসলে এখন বনি ছোটবাবু বাদে আর কিছু জানে না। সে যে কি সুন্দর! যেন জীবনের এক আশ্চর্য মোহ অথবা ঘ্রাণ বলা যেতে পারে, অথবা রাজার রাজা ছোটবাবু, এবং শরীরের সর্বত্র মহিমময় ঈশ্বর কোন কৃপণতা রাখেন নি। নাভির নিচে সে এক আশ্চর্য বনরাজিলীলা। এক আশ্চর্য মোমের শরীর, অথবা পাথরের মূর্তি। ছোটবাবুর হাতের পেশী কোমরের ভাঁজ, উরুর দৃঢ়তা তাকে পাগল করে দিচ্ছে। সে যে কতক্ষণ এভাবে ছোটর সুন্দর শরীরের ভিতর ডুবে ছিল, জানে না। ঠিক বারোটা, বারোটা কেন, ঠিক এগারোটা পার করে দিতে পারলেই বাবা আর তাকে চুল ফেলতে জোরজার করবে না। বারোটা ত্রিশে ডাইনিং হলে লাঞ্চ। লাঞ্চ টাইম হয়ে গেলে বাবা চুল কাটার কথা ভুলে যাবেন।

    কাপ্তান-বয় সারা ডেক খুঁজে বেড়াচ্ছে। ছোট সাবকে কেউ দেখেছে কিনা বলতে পারছে না। ক্যাপ্টেন ব্রীজে কাঁচি নিয়ে অপেক্ষা করছেন। কাপ্তান-বয় একবার খবর দিয়ে গেছে, ডেকের ওপরে নেই ছোট সাব।

    ফোকসালে খুঁজলে হয়। তখন কাপ্তান-বয় ছুটেছে, ফোসকালে। না, সেখানেও কেউ দেখেনি। এই মেয়েটার মাঝে মাঝে কি যে হয়—কাপ্তান হিগিনস ভেবে পান না। নিচে নামতে হবে, সে কাপ্তান বয়কে এক কড়া ধমক লাগাল, কোথায় যাবে, ভাল করে খুঁজে দ্যাখো। এনজিন রুমে পালিয়ে থাকতে পারে। সে এবার থার্ডকে ডাকল। দ্যাখ তো জ্যাক কোথায় পালাল।

    —আবার!

    —চুল ফেলতে গেলেই পালিয়ে যায় কোথায়।

    সুতরাং থার্ড অফিসার আর কাপ্তান-বয় তন্ন তন্ন করে খুজে বেড়াল। এসে বলল—না নেই। কাপ্তানের রক্ত মাথায় উঠে গেল। সে বলল ওর কেবিনে দেখেছ? তারপরই মনে হল বনির কেবিনে ওদের ঢোকা ঠিক না। সে এবার বলল, দাঁড়াও দেখছি। কিন্তু আশ্চর্য বনি কেবিনেও নেই। কেবিনে থাকার কথা না। বনি এ-সময় ডেকে পাখি দুটোকে খাওয়ায়। সেখানে যদি থেকে যায়। কাপ্তান এবার বললেন, এনজিন রুমে দ্যাখো।

    —স্যার, সব জায়গা খুঁজেছি। কোথাও নেই।

    —বয়লারের ওপরে, স্মোক-বকসের পাশে?

    —সব দেখে এসেছি।

    —স্টুয়ার্ডের ঘরে, ওর বরফ-ঘরে?

    —দেখে এসেছি, নেই।

    তিনি এবার ডাকতে থাকলেন জ্যাক, ভালো হবে না। আমি তোমার চুল ফেলব না! কোথায় পালিয়ে আছ বল।

    দলবল নিয়ে এবার নিচে নেমে গেলেন কাপ্তান। বাংকারে উঁকি দিলে, কোলবয়েরা কয়লা ফেলে যাচ্ছে। কি যে হবে! কোথাও দেখা যাচ্ছে না। এবং জাহাজে ভীষণ উত্তেজনা। খবর রটে যেতে থাকল, জ্যাককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ছোটর বুক ভীষণ ঢিপ ঢিপ করছে। সে তার সাদা পোশাক পরে অমিয়র বাংকারে ঢুকে গল্প করছে। অমিয় এটা খেয়ালই করে নি ছোটবাবু বেশ ছিমছাম পোশাকে আছে। মুখে কালি। এও হতে পারে এ-ঘরে লম্ফ জ্বলছে। লম্ফের আলোতে সব স্পষ্ট নয় বলে সে খেয়াল করে নি। অমিয় বলল, শুনেছিস?

    —কি

    —জ্যাককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, ক্যাপ্টেন, বড়-মালোম সবাই ওকে খুঁজছে।

    —অঃ। এবং তারপর ছোটবাবু এক লাফে নিজের বাংকারে ঢুকে বলল, জ্যাক ভীষণ কান্ড। শিগগির উঠে যাও। ডেকের ওপর এবার কিন্তু কাপ্তান মাস্তার দিতে বলবে সবাইকে। সাইরেন বেজে উঠল বলে।

    এবং সে দেখল ঘড়িতে এগারোটা বেজে গেছে। সে বলল, তাড়াতাড়ি প্যান্ট জামা খুলে দাও ছোটবাবু। তারপর কি ভেবে বলল, ঠিক আছে। সে তাড়াতাড়ি কি যে করতে যাচ্ছে। তোমার প্যান্ট জামা পাঠিয়ে দেব।

    —আমার কি হবে?

    —কেন তুমি ওপরে চলে যাবে!

    —আরে বাংকারের অন্ধকারে কেউ টের পাবে না। ওপরে উঠলে সবাই টের পাবে।

    —অঃ।

    এবার যে যার পোশাক পাল্টে নিল। আগের মতোই জ্যাক চলে গেল অন্ধকারে। ছোটবাবুর এ-ব্যাপারে কোন লজ্জা নেই। সে আর অমিয় একসঙ্গে বাথরুমে স্নান করে থাকে। তাড়াতাড়ির সময় একটা বাথরুম বলে একই সঙ্গে স্নান করে নেয়। জাহাজে উঠে ছোটর লাজলজ্জা কিছুটা কমে গেছে। অথবা জাহাজে উঠলে বুঝি মানুষের ভিতর অনেক কৃত্রিমতা মুছে যায়। সব কেমন খোলামেলা। জামা প্যান্ট পাল্টে সে জ্যাককে দিয়ে দিল। যখন উঠে যাচ্ছে জ্যাক, তখন জ্যাক আবার যেন শীতে কাঁপছে! জ্যাকের মুখটা কেমন নীল হয়ে গেছে।

    আর ঠিক তখনই জাহাজে সেই ভয়ঙ্কর কঠিন শব্দ। দুবার লম্বা সাইরেনের মতো শব্দ।

    এবং যখন জাহাজে সবাই মাস্তার দিচ্ছে, কাপ্তানের চোখ মুখ সেই দুষ্টু মেয়েটির জন্য অধীর হয়ে আছে, কিছু বলতে পারছেন না, যেন তিনি ভেতরের সব দুঃখটা জোর করে চেপে রেখেছেন এবং হেঁটে যাচ্ছেন, বলতে সাহস পাচ্ছেন না, কোন রকমে যেন বড়-মালোম কাপ্তানের হয়ে বলছে তখন, জ্যাককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ তোমরা দেখেছ?

    ছোটবাবু মাস্তার থেকে বের হয়ে বলল, হ্যাঁ স্যার, এইতো দেখলাম। এনজিন রুম থেমে যখন উঠে আসছিলাম, দেখলাম।

    —কোথায়? কাপ্তান ছুটে কাছে চলে গেলেন।

    —একোমডেসান ল্যাডারের নিচ দিয়ে চলে গেল।

    —ঠিক তুমি দেখেছ? জ্যাককে!

    —হ্যাঁ স্যার।

    সঙ্গে সঙ্গে কাপ্তান ছুটে গেলেন। একোমডেসান ল্যাডারের নিচেই বনির কেবিন। কাপ্তান হিগিন্‌স্‌ ছুটে যেতে থাকলেন। তিনি নীল রঙের সুট পরেছেন। হাতে চারটা সোনালি স্ট্রাইপ, কাঁধেও চারটা। স্ট্রাইপগুলো ভীষণ চক্‌চক্‌ করছে। মাথায় এংকোরের ছবি আঁকা জাহাজি টুপি। তিনি ভেতরে ঢুকেই অবাক। একটা সাদা কম্বলের ভেতর বনি শুয়ে আছে।

    তিনি ধীরে ধীরে ডাকলেন, বনি!

    —বাবা!

    —তুমি কোথায় ছিলে!

    —এখানে বাবা।

    —আমি তোমাকে খুঁজে গেলাম যে!

    —আমি তখন বোধহয় চড়ুইদের বাসাটা তৈরী করছিলাম।

    —শুয়ে আছ কেন?

    তখন পেছন থেকে কে ডাকল স্যার, পেলেন!

    তিনি ভুলে গেছিলেন, সবাই বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি এবার দরজায় মুখ বার করে বললেন, যেতে বল। জ্যাককে পাওয়া গেছে।

    ওরা আর কিছু জানতে পারে না। এর চেয়ে বেশি জানার অধিকার তাদের নেই। ওরা বোট- ডেক থেকে নেমে গেল। জাহাজের ব্রাস্ট আবার বাজছে। এটা বোধহয় ক্লিয়ারিং সিগনাল। হিগিনস বনির কেবিনে বসেই শুনতে পেলেন সব। বড় উদ্বিগ্ন চোখে মুখে বললেন, তুমি অসময়ে শুয়ে আছ!

    —আমার খুব শীত করছে বাবা।

    —জ্বর আসবে মনে হয়? বলে তিনি বনির কপালে হাত রাখলেন।

    —আমার ভীষণ শীত করছে।

    —ডেবিডকে ডাকি। তোমাকে দেখুক। ওষুধপত্র যদি দিতে হয়!

    বনি বাবাকে কিছু বলল না। কেবল তাকিয়ে থাকল। হিগিনসের মনে হল, বনির বয়স বাড়ছে। বয়স বাড়লে কখনও কখনও ভীষণ শীত পায়। তিনি ডেবিডকে ডাকতে পাঠালেন না। শীতটা কিছুক্ষণ পর হয়তো কেটে যাবে। তবু মেয়েটার জন্য কি যে কষ্ট থাকে ভেতরে। তিনি পাশে কিছুক্ষণ বসে থাকলেন চুপচাপ। কেউ কোনও কথা বললেন না। ডেবিডকে ডেকে পাঠালে হয়তো বনির বয়স ধরা পড়ে যাবে। ওর ভেতরে কষ্টটাও ধরা পড়বে। কার জন্য বনি ভেতরে এমন কষ্ট পায়। তিনি বুঝতে পারলেন না।

    হিগিনস মেয়েটাকে কিছুতেই আর কিছু বলতে পারেন না। উঠে দাঁড়ান! ব্রীজে উঠে গেলে সমুদ্র চারপাশে। ব্রীজের উইংসে তিনি দাঁড়ান। অনবরত জাহাজটা জল কেটে যাচ্ছে। দু’পাশে সাদা ফেনা, অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। নীল পোশাক পরে কোয়ার্টার মাস্টার হুইলের হাতল ধরে রেখেছে।

    সন্ধ্যার সময় বনি ওপরে উঠে গেল। বনি বেশ কালো রঙের সুট পরেছে, নীল রঙের টাই, সে টুপি পরেনি। কাজের সময় সে কখনও কখনও সাদা দস্তানা হাতে পরে নেয়, এখন আর তাও নেই। শীতটা বেশ ক্রমে বাড়ছে। ঠান্ডা বাতাস সকালের দিকে ছিল, এখন নেই। জাহাজ ক্রমে আরও নিচে নেমে যাচ্ছে। জাহাজ ক্রমে গড়িয়ে গড়িয়ে একটা অতিকায় সাদা তিমি মাছের মতো জল কেটে ভেসে যাচ্ছে। এ-সময়ে তাকে বাবা ডাকেন না। সে এ-সময় আজকাল পাখি দুটোর পেছনে ঘুরে বেড়ায়। সে একা ঠিক না। মেজ-মালোম, ছোটবাবু আর সে। আরও কেউ কেউ আসে। তবে ওরা কেউ ঠিক এদের মতো পাখি দুটোকে নিয়ে মজা পায় না। যেন ওরা তিনজন তখন সমবয়সী বন্ধু। শীতের জন্য পাখি দুটিকে ওরা খড়কুটো বিছিয়ে দিয়েছে বাকসোটাতে। বাবা এ-সময়টাতে অন্যদিন একা একা চুপচাপ বসে আকাশের গ্রহ নক্ষত্র দেখেন, তাকে ডাকেন না, আজ কেন যে ডাকছেন!

    সে পাশে গিয়ে দাঁড়ালে হিগিনস বললেন, বোস।

    বাবার গলা খুব নরম। বাবার এমন গলা শুনলে ওর ভেতরটা গুড়গুড় করে ওঠে। কেমন বাবা ক্রমে ভীতু স্বভাবের হয়ে যাচ্ছেন। সে ভেবেছিল, বাবা তাকে আজ ভীষণ বকবে। বাবা ওকে একা পেতে চান। কিন্তু ব্রীজে, বাবা একা থাকতে পারেন না, সেখানে এখন কোয়ার্টার মাস্টার এবং থার্ড অফিসার আছে। ওদের ওয়াচ। বাবা সেখানে তাকে কোনা মন্দ কথা বলতে ডাকতে পারেন না। সে বসে পড়ল। চুলগুলো সে হাত দিয়ে দেখল, বেশ বড়, চুল বড় না থাকলে সে একেবারে ষোলআনা পুরুষের মতো হয়ে যায়। ছোটবাবু তখন ওর পাশে একেবারে ঘেসতে চায় না।

    বাবা অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকলেন। এনজিনের শব্দটা এখানে তেমন প্রবল নয়। আস্তে কথাবার্তা বললেও স্পষ্ট শোনা যায়। ওর ভাল লাগছে না। কেমন সে বসে উসখুস করছে। বাবা হয়তো টের পেয়েছেন। তিনি বললেন, বনি শান্ত হয়ে বোস।

    বনি চুপচাপ বসে থাকল।

    হিগিনস বললেন, তুমি নোয়ার নাম নিশ্চয়ই জানো?

    —হ্যাঁ বাবা।

    —নোয়ার আর্কই হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম জাহাজ। এর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে জাহাজ টাহাজের খবর আর পাওয়া যায় না। তখন সবে সভ্যতার উন্মেষ। এ-সব খবরও হয়তো রাখো।

    —হ্যাঁ বাবা।

    —কিন্তু তুমি কি জানো তোমার পূর্বপুরুষেরা কি ভাবে আগে সমুদ্র সফরে বের হত?

    —কারা বাবা?

    —এই আমাদের আগে যারা সমুদ্রে এসেছিলেন।

    —তোমাদের আগে, মানে ডাবলিউ ফোর্ডের কথা বলছ?

    —আরে না না। এই যেমন হোমারের বীর নায়কেরা সমুদ্র ঘুরে এসে কি সব বলত? —না বাবা।

    —তারা সব নানারকমের গল্প বলত। তখন যারাই সমুদ্রে গেছে, ফিরে এসে নানারকম গল্প বলতো। সে-সব গল্প বলে ঠাকুমারা পর্যন্ত ভয় দেখিয়ে আমাদের ঘুম পাড়াতো। তখন সমুদ্র আমাদের কাছে একেবারে অজানা। আমাদের কথাই ধর না, যারা ভূমধ্যসাগর এবং বে অফ বিসকের কাছাকাছি ছিল, অর্থাৎ যারা এ-সব অঞ্চলে বসবাস করত ওরা আটলান্টিক বলে যে একটা সাগর আছে জানতই না। ওদের কতরকমের বিশ্বাস ছিল। যেমন হোমারের বীর নায়কেরা ইথাকাতে ফিরে কত বিচিত্র গল্প যে বলেছিল! ওরা নাকি সমুদ্রে এক আশ্চর্য ধ্বনি শুনতে পেত—প্ৰায় সেটা অবিকল সাইরেন বাজানোর মতো। শুনতে পেতো সমুদ্রে কারা ক্রমান্বয়ে সুন্দর মিউজিক বাজিয়ে যাচ্ছে। আবার তারা নানারকম দৈত্য দানবের গল্প বলত, মায়াবিনীদের গল্প বলত। কুহকিনীরা, সমুদ্রের ওপর নৃত্য করে বেড়াচ্ছে। বড় বড় পাথর সমুদ্রের জলে ভেসে বেড়াচ্ছে। কুহকিনীরা তার ওপর নেচে বেড়াচ্ছে। নাবিকেরা জাহাজ নিয়ে কিছুতেই আর তখন এগুতে পারত না।

    —অথবা কিংবদন্তি ছিল, দক্ষিণ অঞ্চলে, অর্থাৎ সূর্যের দেশে, বিষুবরেখার দক্ষিণে জাহাজ যাবার নিয়মই নেই। সেখানে সমুদ্র বলে কিছু নেই। একরকম মানুষ সেখানে বাস করে-যারা কেবল পোকা মাকড়ের মতো লাফায়। ওদের আহার নিদ্রা বলে কিছু নেই। অথবা কেউ কেউ বলত, সেখানে বড় বড় ষাঁড় ঘুরে বেড়ায়। ওদের নিঃশ্বাসে আগুন লক লক করত।

    বনি বুঝতে পারছে না, বাবা হঠাৎ এমন সব প্রাচীনকালের গল্প বলে যাচ্ছেন কেন। বাবা অবশ্য যখন যেখানে গেছেন বনিকে নিয়ে, সমুদ্রের অভিজ্ঞতার কথা দ্বীপের কথা কখনও বলতেন। কখনও সমুদ্রের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে বাবার মাথাব্যথা ছিল না।

    তখনও হিগনিস বলে যাচ্ছেন, সমুদ্রে কিছুদূর গেলেই এক শয়তানের কালো হাত দেখা যেত। সেই হাত ওপরে ভেসে সাপের মতো দুলত। বলত, আর না। ফিরে যাও। অথবা একরকমের শামুকের খোল ভেসে বেড়াতো হাওয়ায়, তাদের ভিতর সব বিষাক্ত ধোঁয়া। জাহাজ আর এগুতে পারত না। সেখানে ঢুকলে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত জাহাজিদের। অবশ্য আমাদের প্রাচীন অভিজ্ঞতা সমুদ্র সম্পর্কে ক্রমে ভেঙে যায়। আমরা জানতে পারি সমুদ্র বিশাল, জানতে পারি আটলান্টিক বলে এক মহাসাগর আছে, আমাদের সব নাবিকেরা ক্রমে বের হয়ে যায়, পৃথিবীর কোন কোন জায়গায় সমুদ্র কি-ভাবে আত্মগোপন করে আছে দেখতে।

    কাপ্তান-বয় কফি রেখে গেল। দু কাপ। সামান্য ফল। কাপ্তান সামনের সমুদ্র দেখছেন। মাস্তুল পার হয়ে জাহাজের মাথা কেমন সোজা একটা টর্পেডো বোটের মতো, আর পেছনে আফটার-পিক পার হয়ে প্রপেলারের ক্রমাগত সাদা ফেনা এ-জ্যোৎস্নায়ও দেখা যায়। তখনই মনে হয়, সমুদ্র মনোহারিণী। তিনি বোধ হয় সমুদ্র-মনোহারিণী বলার জন্য, এতসব পুরানো কথা বনিকে বলে যাচ্ছেন। অথবা তিনি কি বলতে চান, বনি, জীবন হচ্ছে মনোহারিণী। তাকে অবহেলায় নষ্ট করে দিও না। তোমার ইচ্ছেটা যখন ভেতরে পাগলা ঘোড়ার মতো দামাল হয়ে যায়, তখন সমুদ্র দ্যাখো। সমুদ্র দেখলে ভেতরের কষ্ট একেবারে মুছে যাবে। কেননা, সমুদ্র সেই কবে থেকে, কেউ বলতে পারে না, পৃথিবীতে .অথবা সৌরজগতে বড় সে একা! একাকী সে, আছে তার মতো, সে কখনও উত্তাল তরঙ্গমালার ভেতর আকাশের নক্ষত্রদের ছুঁয়ে দিতে চায়, তার কি যে প্রলোভন তখন। সে কখনও চুপচাপ। নিরীহ শান্ত। আকাশের নক্ষত্রেরা তার বুকে প্রতিবিম্ব ফেলে সারারাত জেগে থাকে। অথবা দর্পণে নিজের মুখ দেখতে পায় বোধহয়! অথবা ভেবে দ্যাখো, কত গাছপালা পাখি, সমুদ্রের উপকূলে কত দীর্ঘকাল ধরে নির্জনে তাদের ছায়া ফেলে যাচ্ছে। একটা ফড়িঙ অথবা প্রজাপতির ছায়া পর্যন্ত বাদ পড়ে না। কত রঙীন দ্বীপমালা নিশীথে উত্তাল তরঙ্গের ভেতর ডুবে থাকে। পৃথিবীর সব সুন্দরীদের গলায় যে মহামূল্য মণিমাণিক্য ঝলমল করছে, সমুদ্রের কোন গহন অন্ধকারে তাদের জন্ম হচ্ছে, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এরা জন্মাচ্ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সমুদ্রের কিছু আসে যায় না। অথবা সেইসব মনস্টার, যারা এখনও সমুদ্রের ওপরে ভেসে ওঠেনি, যারা সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না—কে জানে, কত অতিকায় তারা। সীমিত অভিজ্ঞতায় তার কতটুকু খবর আমরা রাখি। সমুদ্রের শান্ত গভীর অন্ধকারে কি মহিমায় যে ওরা ঘুরে বেড়াচ্ছে কে জানে। অথবা বনি চারপাশে দ্যাখো, সমুদ্র তার বিশাল অস্তিত্ব নিয়ে জেগে আছে। সে পৃথিবীর এতটুকু ক্ষতি করে না। সে তো ইচ্ছে করলেই যা ডাঙা আছে নিমেষে গ্রাস করে ফেলতে পারে। কিন্তু কি মায়া দ্যাখো বনি, সে ডাঙার চারপাশে নিয়ত ফুঁসে বেড়াচ্ছে, কখনও অতীব শান্ত প্রায় করজোড়ে যেন বলছে, আমাকে নাও, চঞ্চলা হয়ে বলছে, আমার কি আছে, কেবল তুমি আছো।

    —অথবা বনি, আরো আশ্চর্য দ্যাখো, সমুদ্র তার নিজের অসীমতা নিয়ে জেগে আছে। তার অস্তিত্ব কখনও কমে না, বাড়ে না। জল বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, মেঘেরা ভেসে বেড়ায়, যেন বাদাম তুলে চঞ্চলা তরণীর মতো সে তখন নিজের বুকে নিজেই ভাসতে ভাসতে চলে যায়। চারপাশে যা কিছু ডাঙা আছে, সেখানে তার বৃষ্টিপাত ফসল ফলায়, যত আবর্জনা রয়েছে, সে-নদী উপনদী ধরে তাকে বুকে. বহন করে আনে। এর জন্য তার কোন দুঃখ নেই বনি। পৃথিবীর জন্য তার কি যে মায়া। সব কিছু সে দিয়ে পৃথিবীর হয়ে বেঁচে আছে। বলেই তিনি সহসা মুখ ফেরালেন। তোমার কোন কষ্ট আছে?

    —না বাবা।

    —কষ্ট থাকলে, এই সমুদ্র দেখবে। পৃথিবীতে এর চেয়ে উদার, মহৎ এবং নিরিবিলি স্বভাবের আর কিছু নেই। আর সমুদ্র যে-ভাবে পৃথিবীকে ভালবাসতে জানে, আর কে আছে তেমন। তোমার যদি কিছু ভাল লেগে থাকে, তুমি যদি মনে করে থাক, ঠিক করছ, আমার কোন অমত থাকবে না। তবে যাই করবে, ভেবে করবে, বুঝতে না পারলে, অনেকক্ষণ, যত বেশি সময় হয় ততই ভাল, দাঁড়িয়ে থাকবে রেলিঙে। দেখবে, কেমন সূর্যাস্তের সঙ্গে তোমার ছায়া লম্বা হয়ে সমুদ্রের অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। তখন একবার সমুদ্রকে জিজ্ঞাসা করতে পার, ঠিক করছ কিনা, সে কাউকে বনি, মিথ্যা বলে না।

    বনি বুঝতে পারল, সে বাবাকে মিথ্যা কথা বলেছে। বাবা টের পেয়েছেন। বাবা মনে মনে ওর ব্যবহারে হয়ত রুষ্ট হয়েছেন। সমুদ্রের কথা বলে, বাবা তাকে শাসন করছেন। বাবাকে সে কখনও ওর প্রতি কঠোর হতে দেখেনি। এ-জন্য বাবা তাকে ডেকে এনেছিলেন। সে কফি খেয়ে উঠে পড়ল। বেশ রাত হয়েছে। ডাইনিং হলে ডিনার সাজানো হচ্ছে। সাদা জ্যোৎস্না বাবার পায়ের কাছে পড়েছে। বাবাকে তখন খুব একা এবং নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছে। বাবাকে ফেলে কেন জানি তার যেতে ইচ্ছা হল না। সে বাবার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। সমুদ্র দেখতে দেখতে বলল, আমি কখনও কষ্ট দেব না বাবা। কাল আমার চুল কেটে দিও। আমি আর পালিয়ে বেড়াব না।

  • এগার

    এগার

    ॥ এগার ॥

    রাতে রাতে বন্দরে ঢুকেছিল জাহাজ। সেণ্টিসে রসদ, মন্টিভিডিওতে কয়লা, জল আর কিছু না—জাহাজিরা অন্ধকার রাতে বন্দর স্পষ্ট দেখতে পায়নি। কেমন পাহাড়ী ছায়ায় লাল-নীল আলোর মালা, কেউ জাহাজ থেকে নামতে পারেনি। সবাই অন্ধকারে বন্দরের দৃশ্য দেখছিল। অন্ধকারে বন্দর ঠিক চেনা যায় না। কেমন একরকমের মনে হয়। কোনটা সেণ্টিসে কোনটা মন্টিভিডিও বোঝা যায় না। জাহাজ অন্ধকারেই আবার সমুদ্রে নেমে এসেছিল। ভোর রাতে জাহাজ গভীর সমুদ্রে নেমে গেছে। খুব একটা গভীরে যায়নি, উপকূলের আশেপাশে জাহাজ সারাদিন চলেছিল। দু’দিনের বেশি জাহাজের মানুষেরা দেখেছে ছায়া ছায়া উপকূল ভাগ। কেমন মেঘের মতো সমুদ্রের দিগন্তে ঝুলে আছে। দক্ষিণ আমেরিকার এই সব পাহাড়ী উপকূল কেমন রুক্ষ। গাছপালা চোখে পড়ে না। পাথর আর পাহাড় দক্ষিণে, যত এগিয়ে যাচ্ছে, শীত তত আরও বাড়ছে। প্রায় হাড়-কাঁপুনি শীত। পোর্ট এলিজাবেথ থেকে সাতাশ দিনের মতো জাহাজ ছেড়েছে। ক্রমে দক্ষিণ আমেরিকার কেপহর্ণের দিকে যাচ্ছে। প্রায় একশো আশি ডিগ্রী বরাবর দক্ষিণে এখন জাহাজ নেমে যাচ্ছে। যেন এভাবে আর কিছুদূর গেলেই জাহাজ দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছে যাবে। মৈত্র শীতে ভীষণ কাঁপছে। সে মোটা কম্বল গায়ে পোর্ট-হোল দিয়ে কিছু দেখছে। গ্যাস-পাইপ ফোকসাল উষ্ণ রাখতে পারছে না।

    সামনের বন্দরে ওরা কিছুদিন থাকতে পারবে। এদের পক্ষে এটা আশার কথা। শুধু জল আর মাঝে মাঝে দ্বীপ, অথবা সমুদ্রে কেবল চলা নিশিদিন। এনজিনের ঝ্যাক ঝ্যাক শব্দ, স্টিয়ারিং এনজিনের কক্ কক্ শব্দ বিরক্তিকর। মাঝে মাঝে একেবারে অসহ্য। সুতরাং বন্দরে জাহাজ ঢুকে গেলে জাহাজিদের মনে হয়, পৃথিবীতে মানুষেরা ডাঙ্গায় বেঁচে থাকে। ডাঙ্গায় নেমে গেলেই মনে হয়, মাটির মতো প্রিয় আর কিছু নেই।

    জাহাজিরা বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠছে। বন্দর আসছে বন্দর দেখা যাচ্ছে। রাত এগারোটা পর্যন্ত অনেক জাহাজি জেগে ছিল, বন্দর দেখতে পাবে বলে। ডেক-সারেঙ বলে গেছে, বারোটার আগে দেখা যাবে না। তবু প্রত্যাশা, কখন যে কে দেখে ফেলবে, অনেক দূরে ছায়া ছায়া মেঘের মতো ডাঙ্গা, অথবা সেই সন্ধ্যা থেকে হল্লা করছে জাহাজিরা, ঐ দ্যাখো। সারেঙ হেসে বলেছে, আরে না, ওটা দ্বীপ টিপ কিছু হবে। সময় না হলে জাহাজ বন্দর পায় না। সময় না হলে যেমন ওঁর দেখা মেলে না, এও বাবুরা তেমনি।

    অমিয় বলল, তা চাচা যা বলেছেন।

    ডেক-সারেঙ তার দলবল নিয়ে জেগে আছে। একটা দেড়টায় জাহাজ বন্দরে ঢুকে যাবে, ওদের বাঁধা-ছাঁদার কাজ। ডেক-জাহাজিরা এখন ঘুমোচ্ছে। সারেঙ ঠিক ঘুমোতে পারছে না। যদি বেচাল কিছু হয়ে যায়। সে একেবারে জাহাজের বাঁধা-ছাঁদা শেষ করে ঘুমোতে যাবে।

    এবং এ-সময়ে ছোটবাবু খবর নিয়ে এল, দেখা যাচ্ছে।

    এখন বাথরুমে স্নান করা। মৈত্র একটু আগে উঠে এসেছে। সে স্নান করে নিচে পোর্ট-হোলে কেবল কিছু দেখছে। অমিয় ঢুকে বলল, মৈত্র তুই জেগে আছিস! বললি যে শরীরটা ভাল না।

    অমিয় এবং ছোটবাবু স্নান সেরে এসেও দেখল, মৈত্র পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে কি দেখছে! চোখ কেমন ঘোলা ঘোলা। ছোটবাবু কখনও মৈত্রকে এভাবে দ্যাখেনি। জাহাজে এ মানুষটাকে সে প্রায় সারেঙসাবের মতো ভেবে এসেছে। সেই মানুষ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে কেমন ভয় পাবার কথা।

    অমিয় বলল, ছোটবাবু, শুয়ে পড়। সে মৈত্রকে বলল, হ্যারে তুই কি দেখছিস।

    —কিছু না।

    এবার অমিয় বলল, ছোটবাবু কি মজা! কাল থেকে ওয়াচ থাকবে না। ও—ভাবতে কি ভাল লাগছে! কদিন থাকবে জাহাজ!

    মৈত্র পোর্ট-হোল থেকে নড়ছে না। নিচের বাংকে ছোটবাবু ওপরের বাংকে অমিয়, কখনও কখনও ওরা পাল্টে নেয় বাংক। এ-ফোকসাল ওদের তিনজনের। এ-ফোকসালে একটা বাংক বেশি। মৈত্রের ওপরের বাংক খালি। মৈত্র এখনও পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে আছে। মৈত্র কখনও কখনও ওপরের বাংকে শুয়ে থাকে।

    অমিয় স্নান করায় হি-হি করে কাঁপছে। সে লেপ, কম্বল, যা আছে সব নিয়ে একেবারে জাম্বুবানের মতো শুয়ে পড়েছে। মাথায় মাংকি ক্যাপ পরে শুয়েছে। সব একেবারে বরফ হয়ে থাকে। সে দেখল মৈত্র তখনও নড়ছে না। অমিয় বিরক্ত হয়ে বলল, ধুস শালা, কি যে দ্যাখে! এই মৈত্র, ঘুমালে ঘুমো না হয় ওপরে গিয়ে বন্দর দ্যাখ। আলো নিভিয়ে দেব।

    মৈত্র এবার তাকাল।

    অমিয় বালিস থেকে মাথা তুলে বলল, হ্যাঁরে তুই কি দেখছিস?

    —কিছু না।

    —কিছু দেখছিস ঠিক!

    —একটা তিমি মাছ!

    —হ্যাঁ, তিমি মাছ। বলে কি রে! আরে ছোটবাবু, অঃ ছোটবাবু তুমি ঘুমালে নাকি! শুনছ ছোটবাবু, সে লাফ দিয়ে সব লেপ কম্বল ফেলে দিয়ে একেবারে নিচে নেমে গেল। সে মৈত্রকে সরিয়ে এনে পোর্টহোলে মুখ এগিয়ে দিলে, দেখল সামনে শুধু অন্ধকার সমুদ্র। অনেক দূরে বন্দরের আলো দেখা যাচ্ছে। নীল অন্ধকারের ভেতর যেন আলোর অজস্র মালা। এবং দূরে লাইট-হাউসের আলো। ঘুরে ঘুরে লাইট-হাউস জাহাজগুলোকে পথ দেখিয়ে যাচ্ছে। এবং অন্ধকারের ভেতর কিছু জাহাজ সমুদ্রে ইতস্তত নোঙর ফেলে রেখেছে দেখতে পেল।

    অমিয় এবার পোর্ট-হোলে চিৎকার করতে থাকল, কোথায়, কোনদিকে! অন্ধকারে তুই তিমি মাছ দেখবি কি করে। বলে অমিয় সরে এল!

    মৈত্র আবার যথারীতি পোর্ট-হোলে মুখ রেখে দেখতে থাকল।

    অমিয় পাশে দাঁড়িয়ে বলল, দেখতে পাচ্ছিস?

    —হ্যাঁ।

    ছোটবাবু এখন কি করবে ভেবে পেল না। ঠাণ্ডায় পা গরম হচ্ছে না ছোটবাবুর। পা গরম না হলে ওর ঘুম আসে না। কিন্তু কি যে শীত! পায়ের হাঁটু পর্যন্ত একেবারে ঠাণ্ডা বরফ। সে স্নানের সময় গরম জল হাঁটু পর্যন্ত ঢালে। সে পায়ে গরম উলের মোজা পরে শোয়। জ্যাক ওকে দুটো দামী দস্তানা দিয়েছে উলের। শীতে হাত বরফের মতো। মাঝে মাঝে অসাড় লাগে। সে দস্তানা পরে থাকে। কাজ করার জন্য জ্যাক ওকে দুটো ভারি চামড়ার দস্তানা দিয়েছে। এবং পারলে যেন জ্যাক তাকে সব দিয়ে দেয়। সে এখন যা কিছু পরে আছে প্রায় সবই জ্যাকের দেওয়া। বেশ গরম! অমিয় অথবা মৈত্রের মতো সে শীতে তেমন কষ্ট পায় না। পা গরম হলেই ঘুম চলে আসবে। কিন্তু মৈত্র আর অমিয় পোর্ট-হোলে কি যে দেখছে বার বার!

    অমিয় ফের পোর্টহোল থেকে মুখ তুলে আনল।—সব বাজে কথা। গুল!

    মৈত্র বলল, তুমি হতভাগা কিছু দেখতে পাবে না। তুমি একটা আস্ত ষাঁড়।

    —আমি আর কি দেখতে পাব! কেবল অন্ধকার সামনে, কিছু জাহাজ নোঙর করা। জলে ফসফরাসের লাল ফুলকি। তুমি একটা মরুভূমির উট।

    —তা হলে তিমি মাছ দেখতে পেলি না!

    —না।

    —তা হলে বড় একটা বাঁশ দ্যাখ। ওতে একটা তিমি মাছের কঙ্কাল ঝোলানো আছে।

    —পাগল আর কি! বলে সে এক লাফে আবার ওপরের বাংকে উঠে গেল। আসলে মৈত্র ওর স্ত্রী শেফালীর চিঠির কথা বলছে। বন্দরে এলেই বোধ হয় ওর বৌর কথা বেশি মনে হয়। ওর ঘুম আসে না। অমিয় মুখে মাথায় লেপ কম্বল যা আছে সব দিয়ে ঢেকে দিল। শেফালি চিঠিতে সব সময় একটা তিমি মাছের কথা লেখে। বোধহয় মৈত্র জাহাজ নোঙর ফেললেই তিমি মাছটা দেখতে পায়।

    পরদিন সুবোধ বালকের মতো ঘুম থেকে উঠেই মৈত্র চা করে আনল। কাজ কাম সেরে বারোটায় স্নান করার জন্য বাথরুমে ঢুকে গেল। পোশাক খুলে ফেললেই আয়নায় নিজের শক্ত শরীর দেখার ইচ্ছে। কিন্তু শীতে সে দাঁড়াতে পারে না। সে তার পেশী দেখতে দেখতে কেমন শরীরে অনবরত গরম জল ঢালতে থাকে। হাতের পেশী দেখতে দেখতে সে শেফালির কথা মনে করতে পারে। শেফালি উঁচু লম্বা মেয়ে। সহবাসে শরীর বড় মনোরম। দস্যুর মতো তুমি, দস্যুর মতো আমাকে মেরে ফেলতে পার না–শেফালির এমন কথা কিনারায় এলেই তাকে পাগল করে দেয়। আমাকে তুমি মেরে ফেল আর পারছি না অথবা কেন যে এখন মৈত্রের মনে হয় শরীরের কষ্ট শেফালির বড় বেশি উগ্র। বাথরুমে অথবা কম্বল গায়ে চুপচাপ শুয়ে থাকলে শেফালির সব খালি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চোখে দেখতে পায়। তখন মৈত্রের শরীরে শীতটা বাড়ে।

    বস্তুত মৈত্র বন্দরে এলেই শেফালির কথা বেশি মনে করতে পারে। বন্দরের গাছপালা, পারসিমন লতার গুচ্ছ অথবা স্কাইলার্ক ফুলের হলুদ রঙ ওকে মাতাল করে ফেলে। মৈত্র, সুখী এবং সৎ মৈত্র যাতে থাকতে পারে, তার জন্য কি যে ওর চেষ্টা!

    স্নান সেরে বের হলে মৈত্র দেখল, অমিয়, ছোটবাবু, টেবিলে থালা সাজিয়ে বসে আছে।

    খাবার সময় মৈত্র অমিয়কে বলল, দেখ অমিয় তুই নতুন এয়েছিস। শহর বন্দর সম্পর্কে তোর কোনও ধারণা নেই। লরেঞ্জো মরকুইসে, ডারবানে যা সব করেছিস, এখানে যেন এ সব না হয়। সব কিছুর একটা সীমা আছে।

    —আমি কি করেছি!

    —যাকগে, বলে দিলাম, যদি সাবধানে চলাফেরা না কর তবে কে কাকে রক্ষে করে। তারপর কেমন যে সে সহসা উত্তেজিত হয়ে গেল, শালা তুই এটা কলকাতার মদ পেয়েছিস। ঢক ঢক করে এতটা খেয়ে ফেললি! বিদেশী মদে কত ঝাঁজ তুই জানিস!

    —না।

    মৈত্র মাংসের হাড় চিবুচ্ছিল। সে ছোটবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, কেমন লাগছে ছোটবাবু?

    —ভাল।

    —দেখেছ, কি সব পরীদের মতো মেয়েরা গাছের নিচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারপরই বলল, তোমাকে নিয়ে আমার ভয় নেই ছোটবাবু। যত ভয় অমিয়কে নিয়ে। একটু থেমে বলল, এখানে মেয়েদের কি বলে জানো?

    অমিয় ক্ষেপে যাচ্ছিল। মৈত্র তাকে আর একটা কথা বলছে না।

    ছোটবাবু মুখ তুলে তাকালে বলল, চেঙ্গেরিতা। শালা চেঙ্গেরিতাই বটে। যেমন রঙ, তেমনি বাহার। আর শালার কেবল খাই খাই! গাউনের নিচে কেবল…।

    অমিয় থালা নিয়ে উঠে যাবার সময় শুধু বলল, কেবল খাবলা খাবলা। ও হাত দিলে কি যে মজা! আমি যাব। তুমি যা করতে পার কর শালা। বলে সে মেসরুম থেকে বের হয়ে গেল।

    মৈত্র চিৎকার করে উঠল, মরবে! শালা মরবে।

    ছোট বাবু সকালে ঘুম থেকে উঠে, সত্যি অবাক হয়ে গেছিল। জেটির পাশেই নানা রকম ফল ফলের গাছ, বড় বড় গাছ সমুদ্রের ধারে। সমুদ্র এখানে লেগুনের মতো নয়, অথবা নদী ধরে ভেতরে ঢুকেও বন্দর নয়, একেবারে সমুদ্রের ধারে শহর। জেটি থেকে একটু এই ফার্লং-এর মতো হাঁটলে শহরের ভেতরে ঢুকে যাওয়া যায়; এবং পেছনে তাকালে বিশাল সমুদ্র, শান্ত, নীল রঙের ভেতর এই সব সারি সারি জাহাজ, এবং জাহাজের পাশে যে সব গাছেরা ফুলেরা ছড়িয়ে আছে তাদের ভেতর এমন সব সুন্দর সুন্দর যুবক-যুবতীদের ঘুরে বেড়াতে দেখে ছোটবাবু ভীষণ অবাক হয়ে গেছিল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় স্কাইস্ক্র্যাপার। সে জাহাজের বোট-ডেকে উঠে গেলে সব দেখতে পায়। এবং কালো এসফাল্টের পথ ধরে গোলাপী আভা মুখে মেয়েরা, ঠিক গোলাপী বললে ভুল হবে কিছুটা যেন নীল রং ফুটে বের হচ্ছে চোখের নিচ থেকে। সে ভেবেছিল দেবদেবীদের মুখ চোখ এমন হবার কথা, মানুষের মুখ চোখ এত সুন্দর হয় সে জানত না।

    সুতরাং মৈত্র বলল, খুব খারাপ জায়গা বাপু। খুব সাবধানে চলাফেরা করবে। একা একা বের হবে না। বের হলে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

    অমিয় এবং ছোটবাবু এই প্রথম সমুদ্রে বের হয়েছে, প্রথম প্রথম যতটা অবাক হবার কথা তার চেয়েও বেশি অবাক সব কিছু দেখে। মৈত্র স্পেনীশ মেয়েদের এমন সব গল্প বলেছে যে নেমে গেলে আর ফিরে আসা যায় না। কি যে মোহ থাকে। টাকা পয়সা সব রেখে একেবারে নাঙ্গা হয়ে ফিরতে হয়।

    ওরা দুজন আবার শিশুর মতো চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল।

    অমিয় তবু যেমন বলে থাকে, একটু বলে ফেলা যেন, যত বাজে কথা।

    মৈত্র বলল, একবার খপ্পরে পড়লে বুঝতে পারবে।

    অমিয় কি ভাবল, তারপর বলল, তুই বের হবি না?

    —পাগল! বের হয়ে সব টাকা গচ্ছা দিই আর কি! এখন আমার খুব টাকার দরকার। আমাকে বে-হিসেবী হলে চলে!

    ওরা তাড়াতাড়ি খেতে থাকল তারপর। কিছু জাহাজি রেলিঙে ভর করে গাছের ছায়ায় যুবক- যুবতীদের দেখছে। কিছু জাহাজি কলম্বো থেকে যে সব কাঠের হাতি, ময়ূরের পাখা কিনে নিয়েছিল বিক্রির জন্য—তারা ফোকসালে বসে সেই সব হাতী, পাখা সাফসোফ করছে। কারণ বিকেলে বন্দরে কত যে পাখী উড়বে। বন্দরে সব টিউলিপ গাছে কত ফুল ফুটে থাকবে। আর কত যুবক-যুবতী হেঁটে হেঁটে বন্দরে চলে আসবে হাওয়া খেতে। আশ্চর্য এই বন্দর। আসলে সব বড় বড় বার্চ জাতীয় গাছ চারপাশে। এবং গাছে সব হলুদ রঙের পাতা। নিচে লাল নীল স্কার্ট পরা যুবতী। হাতে কালো দস্তানা। মাথায় কালো টুপি। রঙ ওদের পাকা আপেলের মতো। মুখে ওদের সরল হাসি। আর কি অসামান্য রূপ। স্পেনীশ যুবতীদের চোখ কালো চুল কালো—সোনার হরিণের মতো পরম লোভের বস্তু। খেতে খেতে মৈত্র বন্দরের সব খবর দিয়ে যাচ্ছে।

    ছোটবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, খুব সাবধান! মারা পড়বে। রাম রাবণের যুদ্ধের কথা মনে আছে? সোনার হরিণের জন্য রাম যে রাম যে শালা পিতৃ আজ্ঞা পালনের নিমিত্ত বনে গিয়েছিল, যে শালা রাম মনুষ্য নয়, দেবতা, সে পর্যন্ত সোনার হরিণের লোভ সামলাতে পারে নি-রে অমিয়। আর ছোটবাবু তুমি তো মনুষ্য জাতির অপোগণ্ডো।

    অমিয় বলল, কোথাও একা যাচ্ছি না। তোর সঙ্গে যাব।

    ছোটবাবু বলল, আমিও।

    তখন গ্যালিতে ভাণ্ডারি, গলা বাড়িয়ে ওদের কথা শুনছে। বুড়ো মানুষ। রোগা। হাত পা কাঠির মতো। সে গলাটা কচ্ছপের মতো বের করে রেখেছে যেন। এটা শীতকাল, গ্যালীতে পর্যন্ত ঠাণ্ডা। ওর চোখ মুখ ঠাণ্ডায় সাদা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। মৈত্র বলল, কি শুনছ চাচা?

    —আপনেগ রসের কথা শুনছি।

    —আমি ঠিক বলিনি?

    —ঠিক বেঠিক জাহাজ না ছাড়লে বোঝা যাবে না। বলেই ভাণ্ডারি গলাটা টেনে নিল ভেতরে। ওরা তিনজনই শেষ পর্যন্ত ভয়ে জাহাজ থেকে নামে নি। ঠিক নামে নি বললে ভুল হবে ছোটবাবু মাটি দেখলে না নেমে থাকতে পারে না। সে একটু সমুদ্রের ধারে ধারে ঘুরে এসেছে। একটু ভেতরে ঢুকলে লেন্দ্রো-এলেন। সে ঠিক জানে না কতদুর গেলে লেন্দ্রো-এলেন, তবু সে কিছুদূর গিয়ে বুঝতে পেরেছিল এমন শীতে সে বেশিদূর হাঁটতে পারবে না। সমুদ্র থেকে কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস একেবারে সব হিম করে দিচ্ছে। অথচ এ-দেশের মেয়েরা ছেলেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে টেনিস খেলছে। ওদের শরীরে যেন শীত লাগছে না। সে ওদের দেখে অবাক না হয়ে পারছিল না।

    রাতের বেলা মনে হল ঠাণ্ডা আরও বেড়েছে। কেমন জ্যোৎস্নার মতো সারাদিন ঠাণ্ডা। শীতের রোদে দাঁড়ালে মনে হয় না রোদ। তবু যতক্ষণ রোদ ছিল জাহাজিরা ওপরে উঠে দাঁড়াতে পারছে, সন্ধ্যা হলে কেউ আর ওপরে থাকছে না। যারা বের হবার এ-শীতেও বের হয়ে যাচ্ছে। বড়-মিস্ত্রি সেই এক পোশাকে ক্রাচে ভর করে নেমে যাচ্ছে। মাঝ বয়সী মেমসাব ওকে ধরে ধরে গাড়িতে তুলে নিচ্ছে। জ্যাক বিকেলের দিকে ওর বাবার সঙ্গে এজেন্ট অফিসে গেছে। হয়তো কোথাও ওর বাবার পার্টি আছে। সেখান থেকে ফিরতে রাত হবে। চিঠি পত্র এসেছিল। ওর কোন চিঠি নেই। সে আর চিঠির আশাও করে না। আত্মীয়-স্বজন কিছু কলকাতায় আছে। ওদের ঠিক ঠিকানা ওর জানা নেই। সে মানুষ হিসেবে অগোছালো—তার কিছু ঠিকঠাক থাকে না। এমন কি জাহাজে ওঠার আগে যে দূর সম্পর্কের আত্মীয়টি ভীষণ সদাশয় ছিলেন, সে তাদের ঠিকানায় চিঠি দিতে পারত। কিন্তু সেটাও সে এখন খুঁজে পাচ্ছে না। কাজেই সে আর কিছু করতে পারে না। শেষ পর্যন্ত সে ঠিকানা লিখে বাসে রেখেছিল তো। এখন কিছুই মনে করতে পারছে না। আসলে এ-কাজটার সঙ্গে ওর মনের কোন সংযোগ নেই। যেন কোনরকমে সিঁড়ির ধাপ ভেঙ্গে ওপরে ওঠা। ঠিকমতো উঠতে পারবে কিনা জানে না। জাহাজে জ্যাক আছে, মৈত্র এবং অমিয়, সারেঙসাব, ইয়াসিন অনিমেষও আছে। ওরা আছে বলেই সে নিঃসঙ্গ নয়। সে এখন জ্যাকের কাছ থেকে নানারকম সমুদ্র বিষয়ক বই নিয়ে আসে। সমুদ্রের ওপর পড়াশোনা করতে ওর ভাল লাগে। এখন সে মার্কোর্পলোর ভ্রমণ কাহিনী পড়ছে। আসলে মানুষ এ-সব বই পড়লে মনে মনে সমুদ্রে না গিয়েও সমুদ্রে ভেসে চলতে পারে। অনেক সময় ওর ইচ্ছে হয় সেও লিখবে এমন একটা কাহিনী। কারণ মার্কোপলোর চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয় তার এই সমুদ্রযাত্রা।

    রাত এভাবে জাহাজে বেড়ে যায়। স্টিয়ারিং এনজিনে কোন শব্দ নেই। ওপরে সমুদ্রের হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। তার শব্দ এবং সমুদ্র থেকে ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। এ-বাদে কিছু শব্দ নেই। ক্রেনগুলো কাল থেকে এদিকে ঠিক ফল্কা বরাবর দাঁড়িয়ে যাবে। কাল থেকে মাল খালাস আরম্ভ হবে। ফল্কার কাঠ তোলা হবে কাল। কিনার থেকে মানুষ জন দলে দলে উঠে আসবে। এমন নিঃশব্দ, নির্জন তখন থাকবে না জাহাজ। দীর্ঘদিন পর জাহাজ বন্দরে এসে ভিড়লে কেমন সব চুপচাপ হয়ে যায়। সমুদ্রে পিচিঙের বিরাম থাকে না, কম বেশি, এনজিনের শব্দ সব সময়। সেটা সহসা বন্ধ হয়ে গেলে কেমন ভুতুড়ে মনে হয় জাহাজটাকে। কেমন একেবারে সব কিছু থেমে যায় যেন। কেউ সিঁড়ি ধরে নেমে এলে জুতোর শব্দ এত স্পষ্ট যে তখন ভীষণ অস্বস্তি লাগে।

    যারা হাতী এবং ময়ূরের পালক নিয়ে দোকানের মতো ওপরে সাজিয়েছিল, তারা পর্যন্ত নেমে এসেছে। কিনার থেকে তেমন কেউ আর ওপরে ওঠে আসে নি। কাল খবর রটে যাবে শহরে। ভারতবর্ষ থেকে জাহাজ এসেছে। ওরা প্রতিবারের মতো এবারে ময়ূরের পালক, কাঠের হাতী নিয়ে এসেছে। সুন্দর সুন্দর সব চাকচিক্যময় হাতী, কালো রঙের, আর ময়ূরের পালক ড্রইংরুম সাজাবার পক্ষে কি যে দরকারী। আর কি সস্তা! কেবল যমুনাবাজুর গ্যালিতে ডেক-ভাণ্ডারির গলা পাওয়া যাচ্ছে। সে বোধহয় উনুনের ছাই ঝাড়ছিল। সে বোধহয় উনুন পরিষ্কার করে রাখছে। অথবা এও হতে পারে—সে রাতে বন্দরে যাবে বলে সব ঠিকঠাক করে রাখছে। বেশি রাতে ফিরলে সকাল সকাল উঠতে কষ্ট হবে। হাতের কিছু কাজ সে সেরে রাখছে আগে থেকে।

    মৈত্র শুয়ে শুয়ে চিঠি পড়ছিল। ওর বৌ যথানিয়মে চিঠি লিখে থাকে। বন্দরে এলে সবাই চিঠি না পেলেও যেন কথা থাকে সে চিঠি পাবে। কি যে লেখা থাকে চিঠিতে! ছোটবাবু দেখেছে অনেক সময় মৈত্র পালিয়ে পালিয়ে বৌর চিঠি পড়ে। কেউ এলেই সে লুকিয়ে ফেলে। অথবা ধরা পড়ে গেছে মতো মুখ করে রাখে। ছোটবাবু জানে, সে ঘুমিয়ে পড়লেও মৈত্র চিঠি পড়ে। তখন অমিয় কিছু বলে না। সে একটা ক্রাইম নভেল পড়তে থাকে শুয়ে শুয়ে। কারণ সে হয়তো জানে চিঠি পড়া মৈত্রের সারা রাতেও শেষ হবে না। সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চিঠিটা পড়ে। তারপর চিঠি লিখতে বসে। শীতের জন্য সে মাঝে মাঝে চা করে আনে। চা খেতে খেতে কত কি যে ভেবে সে চিঠি লেখে।

    অমিয় মাঝে মাঝে ধুস্ শালা বলছে। কাকে ধুস্ শালা বলছে বোঝা যাচ্ছে না। মৈত্রকে না শীতের জন্য ধুস্ শালা বলছে ছোটবাবু বুঝতে পারছে না। মৈত্র আলো জ্বালিয়ে রেখেছে বলে অমিয়র ঘুম নাও আসতে পারে, অথবা শীতের জন্য, না কি সে ক্রাইম ফিকশানে কোনও এমন চরিত্র পেয়ে গেছে যাকে মাঝে মাঝেই ধুস্ শালা বলা যায়। ধুস্ শালা বললে, শীত কমে যায়, মৈত্রকেও বুঝিয়ে দেওয়া যায়, আলো জ্বালিয়ে রাখার জন্য ঘুম আসছে না।

    মৈত্র দেখল, তখন ছোটবাবু পাশ ফিরছে। ছোটবাবু ঘুমোবে এখন হয়ত। এক কাপের মতো চা করে এনেছিল, সে তবু বলল, কি রে খাবি, যা ঠাণ্ডা। চা খেলে ভাল লাগবে। আর সঙ্গে সঙ্গে দুজনেই লাফ দিয়ে উঠল। গলায় মাথায় মাফলার ঢেকে, কম্বল, লেপ মুড়ে একেবারে দুজন এসকিমোর মতো উঠে বসেছে। হাত বের করছে না পর্যন্ত। পারলে যেন মৈত্রকে এখন চা খাইয়ে দিতে হবে। আর উঁ হুঁ হুঁ এমন শব্দ, মুখ থেকে বাষ্প বের হচ্ছে গাদা গাদা।

    মৈত্র চা খেয়ে বাংকে উঠে গেল। এত তাড়াতাড়ি ওর ঘুম আসে না। তবু বাজি ধরার মতো সে বন্দরে না নেমে থেকেছে। ওর জন্য ছোটবাবু অমিয় নামে নি। ছোটবাবু একটু ঘুরেই উঠে এসেছে জাহাজে। কিন্তু বন্দরে এলে জাহাজ থেকে না নেমে থাকা ভীষণ কষ্টের। ওর চিঠি পড়তে পড়তেই মনে হল, কতকাল থেকে সেও মাটি না ছুঁয়ে আছে। সে তো মানুষ। সে কি করে ডাঙায় না নেমে থাকে। জাহাজে থাকলেই সে শেফালীর কথা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না। সে শেফালীর মুখ ভাবতে ভাবতে অথবা ওর চিঠি পড়তে পড়তে সত্যি একটা অসুখে পড়ে যায়। সে কম্বলের নিচে তখন হি হি করে শীতে কাঁপতে থাকে। আর তখন মনে হয় শেফালীর ভীষণ অবিশ্বাস মৈত্রকে। সে ফিরে গেলেই ভূতে পাওয়া রুগীর মতো ছিঁড়ে খেতে চায়, সে সমুদ্রে ভাল মানুষ থাকে কি করে।

    সময়-অসময় পর্যন্ত বোঝে না মানুষটা। পাগলের মতো ভালবাসার জায়গাগুলো নিয়ে পড়ে থাকে। তখন একেবারে সরল মানুষ। শেফালীকে ছেড়ে সে কোথাও যাবে না। দু’দণ্ড কোথাও দেরি করে না। যেন শেফালীর শরীর পেলে মৈত্রের আর কিছু লাগে না। আর কি আছে শেফালীর। লম্বা যুবতী শেফালী। শরীরের সর্বত্র মহিমময় ঈশ্বর সবকিছু ভরে দিয়েছেন। মনে হলেই মৈত্রের শেফালীর সবকিছু মনে পড়ে যায়। এবং এভাবেই মৈত্র জাহাজে তার সফর শেষ করে দেয় ভেবে ভেবে।

    অথচ সে আবার একনাগাড়ে বেশি দিন ঘরে থাকতে পারে না। এক সময় মনে হয় শেফালীকে আর তেমন ভাল লাগছে না। বরং শেফালীকেই মনে হয় ভীষণ বেপরোয়া। সে শেফালীর কাছে এতটা আশা করে না। তখন শেফালীকে ভীষণ ওর বাজে লাগে। আবার নোনা জল, সমুদ্রে সফর। জাহাজের জন্য উঠে পড়ে লাগা। টাকা কমে আসে, কতদিন বসে খাওয়া যায়, সে শেফালীকে নানাভাবে বোঝাতে থাকে, এবার সমুদ্রে বের হওয়া দরকার। বের হয়ে গেলেই যত মায়া ফের গড়ে ওঠে শেফালীর জন্য। সে শেফালীকে ছেড়ে সত্যি বেশিদিন সমুদ্রে থাকতে পারে না।

    কখনও শেফালী বলবে, তুমি থাকো কি করে? কষ্ট হয় না?

    মৈত্র হেসে বলত, তোমার কথা ভেবে ভেবে সফর শেষ করে দিই।

    শেফালীর তখন বলার ইচ্ছে হত, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। আমাকে সত্যি কথা বলছ না। অথচ শেফালীর বলার সাহস হত না। মানুষটি যা একগুয়ে, কখন কি করে বসবে কে জানে। তাই চিঠিতে সেই যেন মায়ের মতো লেখা, অথবা সেই জাহাজডুবির গল্প মনে করতে পারে মৈত্র, যেন শেফালী প্রত্যেক চিঠিতে লিখতে চায়, সাগরে জাহাজডুবি হয়েছে। সমুদ্রে সাঁতার কাটছে বাবা এবং ছেলে। ছেলে কিছুতেই আর পারছে না। মাঝে মাঝে ডুবে যাচ্ছে। তখন যেন বাবা বলছেন, তুমি নক্ষত্র দেখতে পাচ্ছ, ঐ যে দূরে আকাশে নক্ষত্র, ঠিক তার নিচে তোমার মা একটা ঘরে বসে রয়েছেন। আমাদের জন্য গরম খাবার টেবিলে সাজিয়ে বসে আছেন। অপেক্ষা করছেন কতক্ষণে আমরা যাব। তুমি তবু তলিয়ে যাচ্ছ কেন জলে! জলের নিচে সব বড় বড় হাঙর, জোরে হাত-পা নাড়তে পারছ না। আমরা এসে গেছি, ঐ তো সেই পাহাড়টা, তুমি কতদিন তার ওপর দাঁড়িয়ে দূরের জাহাজ দেখেছ। দেখতে পাচ্ছ পাহাড়ের মাথায় আলো জ্বলছে। আর একটু কষ্ট করলেই আমরা সেখানে আহার এবং উত্তাপ পাব জান। সামান্য ধৈর্য, অধৈর্য হলে আমরা উভয়ে তলিয়ে যাব।

    শেফালীর যেন এভাবে বলার ইচ্ছে আমরা উভয়ে তলিয়ে যাব শুভেন্দু। আমি তোমার জন্য আহার এবং উত্তাপ সবই সঞ্চয় করে রাখছি। ঘরে ফিরলে আহার এবং উত্তাপ যা খুশি তোমার, যতটুকু ইচ্ছা সব চেঁটেপুটে নিও। এই উত্তাপের জন্য অন্যত্র হেঁটে যাবে না কথা দাও। আমার কাছে এক বাতিঘর সম্বল। সমুদ্রে ডুব দেবার প্রলোভন জাগলে নিজের বাতিঘরটির কথা ভেবো। শেফালীর চিঠিতে এমন অজস্র কথা থাকে। যার উত্তর দেবার সময় মৈত্র ভীষণ ভাবনায় পড়ে যায়।

    মৈত্র ডাকল, অমিয়, রাত কত হয়েছে খেয়াল আছে?

    —তোর বৌকে চিঠি লেখা শেষ?

    —শেষ।

    —ছোটবাবু কি করছে?

    —ঘুমোচ্ছে।

    —তুই শুয়ে পড়। আর একটু বাকি আছে, ওটুকু হলেই শুয়ে পড়ব। তুই ঘুমিয়ে পড় না।

    —ঘুম আসবে না।

    —কেন, আলো জ্বালা বলে?

    —না। বৌটার বাচ্চা হবে। টাকা পাঠানো দরকার।

    —টাকা পাঠাতে লিখেছে?

    —হ্যাঁ।

    —তাহলে সারেঙসাবকে বলে টাকা তুলে নিবি। কাল তো শুনলাম, কে কত তুলতে চায় একটা লিস্ট চেয়েছে।

    মৈত্র আর কিছু বলল না। সে কম্বলের নিচে হাত রেখে, হাত-পা গরম করার চেষ্টা করল। কখনও হয়ত ঘসে ঘসে কানে হাত চেপে ধরেছে। কিছুটা এভাবে ওর শরীর গরম হয়। তারপর সে মুখে মাথায় কম্বল টেনে দেবার সময় দেখল, ছোটবাবুর লেপ কম্বল পা থেকে সরে গেছে। এই হয়েছে জ্বালা। ঘুমালে ছোটবাবুর কোন হুঁস থাকে না। সে উঠে লেপ-কম্বল টেনে দিল। ছোটবাবুকে দেখলেই বোঝা যায়, খুব ছেলেমানুষ। ঘুমিয়ে থাকলে ওকে আরও বেশি ছেলেমানুষ লাগে। ছোটবাবুকে নিয়ে ভয় আছে। এ-বয়সটা খুব ভয়ের। অতি সহজে কোন যুবতী ওকে সম্বল করে বনবাসে চলে যেতে পারে। পোর্টহোল বন্ধ। দরজা বন্ধ। ঘরে, বাইরের ঠাণ্ডা ঢুকতে পারছে না। আলো জ্বালা থাকলেই যেন ভাল। যতটুকু উত্তাপ পাওয়া যায়। ছোটবাবু পায়ে মোজা পরেই শুয়ে পড়েছে। হাতে দস্তানা। ছোটবাবু যে ভীষণ শীতকাতুরে এই থেকে বোঝা যায়।

    এমন সময় অমিয় দেখল, বড় টিণ্ডাল মৈত্রও নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। সে বইয়ের পাতা ভাঁজ করে শুয়ে পড়বে ভাবল। ঘুমিয়ে থাকলে মৈত্রের মুখ সে তার বাংক থেকে স্পষ্ট দেখতে পায়। সে ওপরের বাংকে থাকে। মাঝে মাঝে মৈত্র ঘুমের ভিতর হাসলে টের পায় অমিয়, মৈত্র স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্ন দেখলে সাধারণতঃ বৌকেই দেখতে পায়। ওরা একসঙ্গে সেই কলকাতা বন্দর থেকে আছে। নানাভাবে দেশের কথা উঠলে মৈত্র, ওর বৌ সম্পর্কে বলেছে। ওদের ভালবেসে বিয়ে। মৈত্রের স্ত্রী সুন্দরী, এ-কথাও মৈত্রের কাছ থেকে শোনা। এবং দেখতে ভালো। আর শেফালীর ভালবাসার জুড়ি নেই। সে প্রায় মাঝে মাঝে কেঁদে ফেলার মতো মুখ করে বসে থাকত, স্ত্রীর কথা মনে হলেই মৈত্র একেবারে চুপচাপ। কথা প্রসঙ্গে মৈত্র কত যেন কথা বলে—আর জাহাজে আসছে না, এমনও বলে মাঝে মাঝে। বয়স বেড়ে যাচ্ছে, এ-বয়সে একটা কাজ ডাঙায় খুঁজে না নিলে সারাটা জীবন সমুদ্রে কাটবে! সফরে সফরে সে টাকা জমাচ্ছে।

    মৈত্র এভাবে কত রকমের পরিকল্পনা করে থাকে। সে কতবার যে বলেছে টাকা সঞ্চয় করছি অমিয়। চিরটাদিন জাহাজে কাজ করতে ভাল লাগবে না। তুইও জমা। টাকা অযথা নষ্ট করবি না। জাহাজের একটা পয়সাও আমি নষ্ট করছি না। মদ খাচ্ছি না। কার্নিভেলে যাচ্ছি না। জুয়া খেলছি না। কিনারার এক খদ্দের ধরতে হবে শুধু। কথা আছে মানুষটা জাহাজেই আসবে। যদি জাহাজ থেকে নির্বিঘ্নে নামাতে পারি, তবে দু’পয়সা হয়ে যাবে। যা সামান্য আয় এতে বাড়ে। আমি এজন্য কাঠের হাতী আনিনি, ময়ূরের পালক আনিনি।

    অমিয় বলেছিল, একটা কেলেঙ্কারী না হয়।

    —কি আর হবে। ধরা পড়লে চুপ মেরে যেতে হবে। কার জিনিস কে খোঁজ রাখে।

    —আমার এসব ভাল লাগে না মৈত্র।

    মৈত্র বলল, আমারও কি ভাল লাগে! বউ সুন্দরী হলে অনেক খরচ।

    মৈত্রের ঐ অভ্যাস। দোষ ত্রুটির জন্য সে সবরকমের যুক্তি-তর্ক খাড়া রাখে। না পারলে চুপ। কোন কথা বলবে না। চুপচাপ কাজ করবে। তখন মনে হবে, ছোটবাবু এবং অমিয় জাহাজে সত্যি কয়লায়ালা, সে বড় টিণ্ডাল। আস্কারা দিয়ে মাথায় তুললে যা হয়। কথা না বলে সে মনে করিয়ে দেয় সে জাহাজের বড় টিণ্ডাল। অমিয় এবং ছোটবাবু তখন একেবারে ঠিক ঠিক কয়লায়ালার মতো ব্যবহার করতে থাকে। টিণ্ডাল সাব, খানা রেডি।

    মৈত্র আরও গম্ভীর হয়ে যায়।—খুব মজা, হারামজাদা, পঙ্গপালের দল। সে তেড়ে যায় ছোটবাবুকে। ছোটবাবু আর অমিয় তখন ডেকের ওপর ছুটে গিয়ে হা-হা করে হাসতে থাকে।

    রাত থাকতে অমিয়র ঘুম ভেঙ্গে গেল। বন্দর এলে ওয়াচ থাকে না। কাজের চাপ কম। সাতটা থেকে কাজ আরম্ভ। অমিয়র ইচ্ছে ছিল ছ’টা পর্যন্ত ঘুমাবে। একঘণ্টার ভেতর বাকি কাজ অর্থাৎ হাত-মুখ ধোয়া, বাথরুমের কাজ, এবং অন্যান্য, যেমন চর্বি ভাজা রুটি-চা এসব খাওয়ার কাজ সেরে ফেলতে পারবে। তারপর টান্টু বললেই লাফিয়ে কাজে বের হয়ে যাওয়া। অথচ ঘুম যে কেন রাত থাকতে ভেঙ্গে গেল। বেশ রাত। সকাল হতে হতে সাতটা বেজে যাবে। তবু তখন কিছুটা অন্ধকার থাকে। অন্ধকারে এনজিনরুমে নেমে যেতে হবে। সে ঘড়িতে দেখল পাঁচটা বাজেনি। সে ফের লেপ- কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমোবার চেষ্টা করল। কিন্তু ঘুম এল না। সে কম্বল গায়ে উঠে বসল। বাথরুমে যেতে হবে। শীতের সময় যতক্ষণ পারা যায় চেপেচুপে পড়ে থাকার স্বভাব। সে বুঝতে পারল এর জন্য ঘুম ওর ভেঙ্গে গেছে। সে নেমে ওপরে ওঠার সময় ভাবল, দরজাটা বন্ধ করে আসেনি। সিঁড়ির মুখে, আলোটা সবসময় জ্বালা থাকে। দরজা খোলা রাখলে ঘরে অন্ধকার থাকে না। সে নেমে গিয়ে দরজা ফের বন্ধ করে দিল।

    তারপর ধাপে ধাপে ওপরে উঠতেই মনে হল, পূবের দিকটা বেশ ফর্সা মতো। সে রাতে এটা লক্ষ্য করেনি। একটা দ্বীপ-টিপ থাকবে। সেখানে আলো থাকতে পারে। নানাভাবে চারপাশের আলো মিলে এমন দেখাতে পারে। নতুন বন্দর। সামনে জেটি পার হলে বড় বড় গাছ। আলো-অন্ধকারে গাছগুলোকে বড় রহস্যময় লাগছিল। মৈত্র বলেছে জেটি পার হলে শহরের পার্ক। সমুদ্রের বুক থেকে এই পার্ক উঠে এসেছে যেন। এই পার্কে টিউলিপের ফুল প্রচুর ফোটে। ফুলের লোভে শহরের সব উঠতি বয়সের মেয়েরা এখানে বিকেল হলেই চলে আসে।

    এইসব মেয়েরা স্বাভাবিকভাবেই জাহাজিদের ভীষণভাবে মাতাল করে দেয়। এবং এখানে এক কার্নিভেল আছে, কার্নিভেলে গুহাপথ আছে অথবা রিঙের খেলা, মোটর রেস আছে যা মৈত্র এবং নাবিকদের পক্ষে ভীষণ লোভের। মৈত্র বলেছে মাথা ঘোরাবার পক্ষে জুয়োখেলায় যে-কোন রমণীই যথেষ্ট।

    প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ওর ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে। খুব বেশি ঠাণ্ডা পড়লে ওর শীতে ঘুম ভেঙ্গে যায়। এখন সে কেবল চা খেয়ে কিছুটা শরীর গরম করতে পারে। সে গ্যালিতে ঢুকে দেখল, উনুনে আঁচ দেওয়া আছে কিনা। সে দেখল আছে। ছাই ঝেড়ে সামান্য কয়লা দিয়ে দিল। ভাণ্ডারির এখন ওঠার সময়। ভাণ্ডারি উঠে খুশিই হবে দেখে।

    সে চা নিয়ে এসে দেখল, মৈত্র আলো জ্বেলে ঘরে বসে আছে। মুখে-চোখে ভয়ঙ্কর বিরক্তিকর রেখা ফুটে উঠেছে। ওর হাতে চা দেখেও একটা কথা বলল না। ভয়ঙ্কর কিছু হলে এমন হয়। অমিয় বলল, কি রে, কি হয়েছে! শরীর খারাপ!

    সে কেমন আরও ক্ষেপে গেল। কথা বলল না। তোয়ালে মগ নিয়ে ওপরে উঠে গেলে অমিয় হেসে ফেলল, শালা আমার নীতিবাগীশ। মৈত্র নেমে এলে বলল, বন্দরে ভিড়তে না ভিড়তেই।

    —হ্যাঁ ভিড়তে না ভিড়তেই। সে একবার অমিয়র দিকে তাকাল না পর্যন্ত। শরীর সাফসোফ করে এসে শীতে আরও কাবু হয়ে গেছে। সে কোনরকমে কম্বলের নিচে ঢুকে যেতে পারলে যেন বাঁচে। সে আণ্ডার-ওয়ারটা লকারের মাথায় শুকোবার জন্য ছড়িয়ে দিল।

    —নীতিবাগীশদের এই হয়। অমিয় চা খেতে খেতে ব্যঙ্গ করল।

    মৈত্র জবাব দিল না।

    —সারাদিন বৌ বৌ। আর শালা মানুষ বিয়ে করে না বুঝি!

    —বিয়ে না করলে এসব কথা মানায় না। তুমি তো বাউণ্ডলে। বাপের খেয়েছ, বোনের মোষ তাড়িয়েছ। ইচ্ছে করেই মৈত্র বন না বলে বোন বলল।

    অমিয় ও-কথায় কান দিল না। বলল, আমার হলে বেশ ভাল লাগে। বলে সে বেশ জোরে জোরে কথা বলতে চাইলে মৈত্র বলল, আস্তে, ছোটবাবু ঘুমোচ্ছে। ওরও ঠিক হয়ে যাবে। যেভাবে ঘুমোচ্ছে!

    লেপের নিচে ঢুকে বলল, তুই কার মুখ দেখিস অমিয়?

    —কত মুখ। কেবল দেখতে পাই একটা ফ্রক-পরা মেয়ে দৌড়াচ্ছে। আমি তার পেছনে ছুটছি। তারপর কোনরকমে ছুঁয়ে দিলেই আমার হয়ে যায়। খুব বেশি দূর যেতে পারি না। তারপর আর মুখটা মনে পড়ে না। সে হেঁটে হেঁটে অনেক দূরে চলে যায়। আমার আর তখন কোনও মুখের কথা মনে থাকে না। সকালে উঠে কাকে দেখে রাতে কলিসানটা হল কিছুতেই মনে করতে পারি না।

    মৈত্র বলল, আমার সব মনে থাকে।

    —কি দেখলি আজকে।

    —দেখলাম…….এই দেখলাম।

    —বলতে চাস না?

    —না, তোর এই আর কি, শেফালীকে দেখলাম। না বললে কি আর হবে। তোমাদের তো সবই বলি। তবে তোরা পঙ্গপালের দল, বিয়ে করিসনি, তোদের বলা ঠিক না। তোরা তবে খারাপ হয়ে যাবি।

    —ধুস্ শালা। তুই খারাপ করার কে রে? বাদ দে! চা খাবি?

    —খাওয়াবি!

    —মুখ সাদা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। অনেকটা গেছে? চা খেলে আরাম পাবি।

    —অনেকটা। মৈত্র বলতে গিয়ে মুখ গোমড়া করে ফেলল।

    ওরা বসে বসে দুজন বেশ অনেকক্ষণ কথা বলল। এখন আর মনে হচ্ছে না, ওরা চার মাস আগেও ছিল অপরিচিত। কত সহজে সব কথা বলে ফেলতে পারে সবাই। মৈত্রের যা-কিছু কথাবার্তা সব এদের সঙ্গে। এরা মৈত্রের বন্ধু আবার সহকর্মী। আবার একেবারে অধস্তন মানুষের মতো ব্যবহার করতেও ছাড়ে না। তথাপি এই বাংকে অথবা ফোসকালে এলে ওরা বুঝতে পারে, যত দেশ ছেড়ে ক্রমে দূরে সরে যাবে, তত ওরা পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হবে। জাহাজ তো সবেমাত্র চলতে আরম্ভ করেছে। বলতেই বলে ব্যাঙ্ক লাইনের সফর। সহজে শেষ হয় না।

    সকাল হলে অমিয় পোর্ট-হোলের কাচ খুলে দিল। সাতটা কখন বেজে গেছে। অথচ সারেঙ টান্টু বলছে না! কাকে কোথায় কাজ করতে হবে বলছে না। অমিয় অবশ্য জানে তাকে কোথায় কাজ করতে হবে। কারণ, ছোট টিন্ডালের সঙ্গে স্মোক-বসে তার কাজ আছে। বন্দরে এলেই বয়লারের সব স্মোক-বক্স পরিষ্কার করে ফেলতে হয়। এবং এ-কাজটা একমাত্র কোলবয়দের দিয়ে করিয়ে নেওয়া হয়। ছোটবাবু হয়তো ডেকে কাজ করবে। ডেকে কাজ দিলে ছোটবাবু বেশ সব দেখে বেড়াতে পারবে।

    সিঁড়িতে এখন জাহাজিদের ওঠানামার শব্দ। জেটিতে লোকজনের ভিড়। বড় বড় ক্রেন সব এগিয়ে আসছে। ওরা ফোকসালে বসে দেখতে পাচ্ছে। সামনের পোর্ট-হোল খোলা। কিনারায় মানুষ জড় হচ্ছে। ওরা গ্যাঙওয়ে দিয়ে উঠে আসছে। কেউ কেউ দল বেঁধে, কাজের পোশাকে গাছের নিচে জটলা করছে। বেশ একটা উৎসবের মতো মনে হয়, যেন সাড়া পড়ে যাবার মতো। ডেক-জাহাজিরা ফল্কায় কাঠ খুলে দিচ্ছে। ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে কাঠ। আর হাজার হাজার পাখি উড়ছে মাথার ওপর, সমুদ্র পাখি। এদের ডানা তেমন বড় নয়। পাখিগুলো প্রায় কবুতরের সামিল। ওদের ডানার শব্দ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। অমিয় বসে বসে পোর্ট-হোলের ঘুলঘুলিতে বন্দরের দৃশ্য দেখতে থাকল। বড়-মিস্ত্রিকে খুব ভয়। সে খুব সাবধানে চলাফেরা করছে। এবং রক্ষে বড়মিস্ত্রি কোনদিন ডেকে বের হয় না। এতদিন পর দেখলে নাও চিনতে পারে। তবু আরও কিছুদিন সাবধানে থাকা ভালো।

    এভাবে কেন যে বন্দরের দৃশ্য দেখতে দেখতে কখনও বড়-মিস্ত্রির গোলগাল মুখ এবং অবয়ব চোখের ওপর ভেসে ওঠে। সে দৃশ্যটা ভুলে যেতে চায়। বরং ভাল লাগে, সেইসব বড় বড় গাছ, টিউলিপ ফুলের গাছ, গাছে সাদা অথবা মেরুণ রঙের ফুল—বন্দরে ফুলের ছবি, মেয়েরা সোনালী গাউনে ঢেকে চুপচাপ হেঁটে চলে আসবে, ওদের কালো চোখ, নীল চুল, সুষমায় ভরা মুখ, সে একটু ছুঁয়ে দেখবে তাদের—আর কিছু না। বন্দরে এর চেয়ে বেশি কিছু চায় না।

  • বার

    বার

    ।। বারো।।

    সেই জেটি সেই প্রশস্ত পথ সামনে। অদূরে ওরা শহরের ভিতর স্কাইস্ক্রেপার তেমনি দেখতে পাচ্ছে। ডেকে দাঁড়ালে চার পাশে অজস্র জাহাজ। জাহাজের চিমনি। সব চিমনি থেকে ধোঁয়া ওঠে না আজকাল। মোটর ভেসেলে কোন ধোঁয়া থাকে না। কিন্তু ওদের জাহাজে অথবা অন্য অনেক জাহাজ যেখানে ইনজিন কয়লায় অথবা তেলে চলে, সেখানে চিমনিগুলোর অল্প ধোঁয়া। বাকি চিমনিগুলো ঝক্‌ঝকে। মাস্তুলে সব নানা বর্ণের পাখি। ডেকে মানুষের ভিড়। সারি সারি ট্রাক, অথবা মালগাড়িতে ক্রেনে মাল নামানো হচ্ছে। এবং গাদাবোটগুলোকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ছোট ছোট মোটর বোট। নানা রকমের পতাকা উড়ছে চারপাশে। এবং জাহাজের সিটি……বাজছে……. কোথাও। সব জাহাজেই জাহাজিরা এখন সুখী’ পায়রার মতো উড়ছে। কখন সন্ধ্যা হবে, কখন ওরা ছুটি পাবে, ছুটি পেলেই সেজে-গুজে লারে লারে গান গলায়, অথবা শিস দিতে দিতে ওরা নেমে যাবে বন্দরে।

    অমিয় বলল, মৈত্র, এমন বন্দরে না নেমে থাকা যায়!

    —নামব না বলিনি তো, আমাকে একদিন নামতেই হবে।

    —সে তো তোর মালের জন্য। অমিয় ফিফিস্ গলায় বলল, আমার একা নামতে ভয় লাগে। ওর যেন বলার ইচ্ছে এবার ঠিক বড়-মিস্ত্রির সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। দেখা হয়ে গেলে ধরা পড়ে যাবে। সে যদি কোন রকমে মৈত্রের সঙ্গে যেতে পারে, তবে তার আড়ালে আবডালে ঠিক নেমে যাওয়া যাবে।

    মৈত্র বলল, নামব, কিন্তু খবরদার কোথাও যাবি না আমাকে ফেলে। আমি যা বলব তা করবি। কোথাও ঢুকতে পাবে না, কোনও কার্নিভালে ঢুকতে পাবে না!

    —তুই তো আচ্ছা লোক মৈত্র। তোর জন্য শেষ পর্যন্ত রাস্তায় হাঁটতে পারব না, কোনও রেস্তোরাঁতে ঢুকতে পারব না।

    —তা আমি বলছি না।

    —বলতে বাদ রেখেছিস কি! কার্নিভেলে ঢুকবি না। তবে খাব কি, দেখব কি! জাহাজে আসার মজাটা কোথায়।

    —ঘুরে দ্যাখো। পথ ধরে হেঁটে যাও। সুন্দরী মেয়েদের গন্ধ পাবে। পার্কে কত সব ফুল, বাড়িগুলোর সামনে কত যে ফুল! মেয়ে দ্যাখো ফুল দ্যাখো তবে ছুঁতে যাবে না। লোন্দ্রা এল্যান ধরে গেলে বিচ পাবি সমুদ্রের। বিচে ওরা নাঙ্গা হয়ে শুয়ে থাকে।

    —আর কি দেখব?

    —যদি তুই না বের হস, জাহাজেই যদি থাকিস, তবে দেখবি, সামনের পার্কটায় শহর থেকে কচিকাচা মেয়েরা এসে বিকেলে ভিড় করবে। রং-বেরঙের ফ্রক গায়ে, আর কি সুন্দর পা। পা দেখলেই মনে হবে সারা জীবন এই পা জড়িয়ে পড়ে থাকি। কোথাও আর যেতে ইচ্ছে হবে না।

    অমিয় ডেকের ওপর দু’ হাত ছুঁড়ে বলল, ফাইন। কবে যাবি?

    —তোর খুব লোভ অমিয়। তোকে নিয়ে যাওয়া যাবে না।

    —আমি ভালছেলে হয়ে থাকব মাইরি। তুই বিশ্বাস কর আমি হারামিপনা করব না।

    —তোর স্বভাব ভাল না।

    —গঙ্গার জলে মুখ ধুয়ে নেব। স্বভাব ভাল হয়ে যাবে।

    —নোনা জলে ভাসলে গঙ্গার জলে স্বভাব ভাল হয় না।

    —ধুস্ শালা। তোর সঙ্গে আমি বের হচ্ছি না। একাই বের হব।

    —আরে না না। আমি যাব তোর সঙ্গে।

    —ঠিক?

    —ঠিক।

    —কথা দিচ্ছিস তবে?

    —হ্যাঁ, যাব বলছি। সব চিনিয়ে দিতে হবে না! সব সফরে তো আমি আর তোর সঙ্গে যাচ্ছি না। কোথায় কে বেকুব বানিয়ে দেবে কে জানে।

    আর তখন জাহাজের ওপর ডেক-সারেঙ, এনজিন-সারেঙ যে যার দল নিয়ে নিচে ওপরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মৈত্র এনজিনে নামার আগে এসব গল্প করছিল। দুটো বয়লার নেভানো। একটা বয়লার সামান্য চালু রাখা হয়েছে। জেনারেটর চালু রাখার জন্য স্টিমের দরকার।

    ডেক-জাহাজিরা জল মারছে ডেকে। বড় বড় পাটের গাঁট নেমে যাচ্ছে এখন। ডেরিকে পাটের গাঁট নামানো হচ্ছে। ফল্কায় একটা ক্রেনও কাজে লেগে গেছে। যত তাড়াতাড়ি করা যায়। বিশ বাইশ দিনের আগে তবু জাহাজ খালাস হচ্ছে না। অন্ততঃ এরা বিশ বাইশ দিন এ-বন্দরে থাকতে পারবে, ঘুরে বেড়াতে পারবে। তারপর জাহাজে কি বোঝাই হবে জাহাজিরা বলতে পারে না। মাল বোঝাই হলে আরও ক’দিন। তারপর ফের সমুদ্রে ভেসে পড়া।

    বন্দরে প্রথম দিন বলে জাহাজিদের তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল। বারোটায় খানা খেতে এসে সবাই শুনল ছুটি। সবাই এখন হল্লা করছে বাথরুমে। একসঙ্গে স্নান করা যায় না। গরম জলের অভাব। যে যার গরম জলের টব টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সবাই মাজাঘষা করছে। এবং স্নান করার সময় কিছু অশ্লীল গান যা কানে শোনা যায় না। কে গাইছে। গাইছে অনিমেষ। ডেক-জাহাজি। সে ইয়াসিনের গলা জড়িয়ে নেচে নেচে গাইছে, ওলো সখি ললিতে যাচ্ছি আমি গলিতে। সে এটা ধুয়া দিচ্ছে নেচে নেচে। নেচে নেচে সে মেয়েদের মতো গাইছে। এবং কেউ হয়তো ওরই ভিতর অনিমেষের পাছা টিপে দিয়ে মজা লুটছে। অনিমেষের মুখ চোখ কিছুটা মেয়েলি ধরনের। শ্যামলা রং। জাহাজে থেকে আরও উজ্জ্বল হয়েছে। এবং ডেক-জাহাজিরা ওকে জড়িয়ে ধরে রঙ্গরস করে থাকে। মাঝে মাঝে অনিমেষ ক্ষেপে যায়। তখন সবাই হা-হা করে হাসে।

    মৈত্র, অমিয়, ছোটবাবু তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়েছে। ছোটবাবুর জন্য মৈত্র পোশাক বের করছে। ওর ভালো পোশাক সে দিচ্ছে ছোটবাবুকে পরতে। এবং ছোটবাবু পরেছে, সাদা কটনের ফুলসার্ট, চকলেট কালারের প্যান্ট, নীল রঙের কোট, সবুজ টাই। এবং সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশের যে ছবি ফুটে ওঠে, এই পোশাকের ভেতর ছোটবাবুকে তেমন মনোরম লাগছে দেখতে। এত ভাল লাগছে ছোটকে যে মৈত্র একেবারে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। বলল, তোকে ছুঁলে মনে কোন পাপ থাকে না। তোর সঙ্গে ঘুরে বেড়ালে, আমরা ভাল হয়ে যাব।

    অমিয় উদাস গলায় বলল, ছোটকে যে কেন নিয়ে যাওয়া। তুমি বাপু ক্যাপ্টেনের পোলাডার লগে যাও না ক্যান!

    ছোট বলল ওপরে যাচ্ছি। তোরা আয়। সেও ওকে বিদ্রূপ করতে পারত কিন্তু করল না।

    সে ওপরে উঠে গেল। মৈত্র, অমিয়, দ্রুত ওপরে উঠে গেল। আহা কতদিন পর এই মাটি! সে শহরের ভিতরে ঢুকে যাবে ওদের সঙ্গে। ওর সব কিছু মনে হচ্ছে মনোহারিণী। সে দেখল, তখন জ্যাক ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক বোধ হয় পাখি দুটোর জন্য বাকসে খাবার দিচ্ছে। পাখি দুটার জন্য এখন জ্যাক সবচেয়ে বেশি সময় দিচ্ছে। সে আরও কিছু লক্ষ্য রাখতে পারে। মাঝে মাঝে জ্যাক পিছিলের দিকে তাকাচ্ছে।

    ছোট জানে, ওখানে গেলে ওর দেরি হয়ে যাবে। সেদিকে একেবারে সে গেল না। শিস দিতে দিতে ওরা নেমে গেল। তিনটে বাজে। সূর্য হেলে গেছে। চারটা বাজলেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে। রোদে কোন উত্তাপ নেই। সোনালী রোদ, এবং চারপাশে যেন অতীব মায়াবি মানুষেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। দিনের বেলা এইসব ফুল-ফল পাখি আর আশ্চর্য রূপবান মানুষের রাজত্বে জ্যাক যে তাকে লক্ষ্য করছে ছোট দেখছে না।

    আকাশ স্বভাবতই পরিচ্ছন্ন। পার্ক থেকে ফুলের গন্ধ আসছে। সবুজ চারপাশে, মাঝখানে কালো এ্যাসফাল্টের রাস্তা শহরের দিকে গেছে। নানা বর্ণের গাড়ি চারপাশে। জেটিতে কিছু সৌখিন মেয়ে পুরুষ দাঁড়িয়ে জাহাজের মাল নামানো দেখছে। আশ্চর্য ওরা কোন কাস্টমসের ঝামেলা অথবা বেড়াজাল এখানে দেখতে পেল না। সামনের পার্কটা মেলার মতো হয়ে গেছে। মানুষের ভীষণ ভিড়। ছোট বড় ছেলে যুবা এবং বৃদ্ধারাও আছেন। মৈত্র এ সময় ওদের নিয়ে শহরের দিকে উঠে যেতে থাকল। মৈত্র খুব সাদাসিদে পোশাক পরেছে। ট্রাউজার, মোটা উলেন জামা, গলায় মাফলার, ওপরে লম্বা কোট। সে টাই লাল রঙের পরতে ভালবাসে। বড় রাস্তা, প্রশস্ত ফুটপাথ, মাঝে মাঝে এভিনিউ, ভিন্ন ভিন্ন গাছের সমারোহ। গাছের নিচে সুন্দরী যুবতীরা ঘোরাফেরা করছে।

    তখন আপেলয়ালা হাঁকল, আ…..পে…..ল!

    কেউ হাঁক দিল, এমিগা! কোমো ইস্তা ওস্তে।

    ওরা এদেশের মানুষদের কথাবার্তা বুঝতে পারছে না। ইংরেজি বললে কেমন এ-দেশের মানুষেরা হাবাকালা হয়ে থাকছে। সাধারণ মানুষ একেবারেই ইংরেজি জানে না। ওরা দুটো একটা স্পেনীশ কথাবার্তা শিখে নিয়েছে। ফলে ওরা প্রায় সময়ই এদেশের মানুষদের কাছে বাংলা বলছে। বাংলা- উর্দু এবং পৃথিবীর যে কোনও ভাষা ওরা বলে গেলেও কিছু বুঝবে না। ওরা সেজন্য নিজের খুশিমতো যা ইচ্ছা বলে যাচ্ছে। এবং অমিয়র যা স্বভাব। সে খুব খারাপ কথা মেয়েদের বলছে। ওরা অমিয়র কথা শুনে হাসছে। যেন মৈত্র, অমিয় বিদেশী মানুষ, ওদের কথা বুঝতে না পারলে ছোটবাবু বেশ মজা পায়।

    ছোটবাবু দেখল সামনে একটা টাওয়ার। মৈত্র ঘুরে ফিরে আগে দেখেছে বলে, সে জানে কোথায় কিভাবে যাওয়া যায়। ঠিক টাওয়ারের নিচে স্টেশন। ওরা আন্ডার গ্রাউন্ড ট্রেন ধরে ফ্লোরিদাতে যখন পৌঁছল, তখন রাত হয়ে গেছে। তখন শহরে সব আলো তারাবাতির মত জ্বলছে। আর সব কাচের শো-কেসে দামী শহরটা মনে হয় ঢুকে গেছে। বড় বেশি কৌতূহলী করে রাখে মানুষগুলোকে। সব স্বপ্নের দেশের মতো মানুষ মনে হয়। এমন সাজানো গোছানো শহর পৃথিবীতে আর কোথায় আছে ওরা জানে না। কোন চার্চ থেকে ধর্মীয় সঙ্গীত ভেসে আসছে। আর পথ জুড়ে তখন কোলাহল। ওরা হাঁটছে শিস দিচ্ছে, বাংলা গান গাইছে। কোথাও ঢুকে কফি খাচ্ছে। ঠাট্টা মসকরা করছে মেয়েদের সঙ্গে। মৈত্র মাঝে মাঝে অমিয়কে সাবধান করে দিচ্ছে। বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে অমিয়—এতটা ঠিক না। সে ভাবছে এখন সেই মানুষটার বাড়ি খুঁজে বের করতেই হবে। সেখানে গেলে সে দেশে টাকাটা পাঠিতে দিতে পারবে। এখানে সে সেই মানুষের নামে একটা একাউন্ট করে নেবে। সেই সব করে দেবে ওর হয়ে। কিন্তু মৈত্র সেই বাড়িটা ঠিক খুঁজে পেল না।

    মৈত্রকে খুব বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। টাকাটা খুব তাড়াতাড়ি পাঠানো দরকার। অথচ এখানেই সেই সাহেব লোকটা থাকত। সাহেব বিনিময়ে কিছু টাকা নেয়। আর একবার সে বাড়তি টাকা এভাবে পাঠিয়েছে। এবারেও বাড়তি টাকা তার হবে।

    অমিয় হাঁটতে হাঁটতে বলল, কত পাঠাচ্ছিস?

    —তা হাজার প্যাসু পাঠানো দরকার। আজ কিছু দিয়ে যেতাম। বলতাম, সে যেন আমার নামে পাঠিয়ে দেয়। বাকিটা কাল দেব।

    ছোটবাবু সব বালকের মত দেখে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে সে চিৎকার করে বলছে কি গ্রান্ড! কিন্তু মৈত্র লোকটার বাড়ি ঠিক হদিস না করতে পারায় কোনো কথা বলছে না। কেবল অমিয়কে পারে না বলে মৈত্র জবাব দিচ্ছে।

    —মোটামুটি বৌর কাছে খুব বড় মানুষ হয়ে বেঁচে থাকিস।

    —তাছাড়া কি। যা টাকা পাই ওতে শেফালীর মতো মেয়ে বিয়ে করা যায় না। কম পাঠালে আমার সম্মান থাকবে না।

    —তার মানে!

    —মানে, বৌ বলবে, আমি ছোট কাজ করি। ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারি না।

    —তার মানে তুই বৌকে বড় কাজটাজ করিস বলেছিস?

    —হ্যাঁ, তাই। শেফালী জানে জাহাজে আমি এনজিন রুমে ভাল কাজ করি। অনেক টাকা পাই।

    —এভাবে মিথ্যা বলে লাভ!

    —লাভ, শেফালীর মতো মেয়েকে কাছে পাওয়া। বলে, মৈত্র অমিয়কে একটু অন্যমনস্ক করার জন্য বলল সামনে শো-কেসটার পাশে দ্যাখ।

    —কিছু দেখছি না! একটা ওভারকোট ঝুলছে না!

    —হ্যাঁ।

    —নিচে কিছু দেখা যাচ্ছে?

    —ও মা। চারটা পা। বলেই অমিয় ছুটতে চাইল। মৈত্র হাত ধরে ফেলল, ধীরে অমিয়। ওদিকে চল। সে টেনে অমিয়কে অন্য রাস্তায় নিয়ে গেল।

    এবার মৈত্র বলল, সেবারে, এভাপেরুনকে নিয়ে কি একটা উৎসব চলছিল! ওঃ কি জাঁকজমক।

    ওরা তিনজনেই দেখল, এভাপেরুনের একটা বড় মূর্তি। এবং কিছুটা মা মেরীর মতো মুখ চোখ।

    ছোটবাবু বলল, এখানে একটু বসলে হয় না। হাঁটতে হাঁটতে পা ধরে গেছে। বেশ সুন্দর জায়গা। শীতটাও কম মনে হচ্ছে।

    মৈত্র তখন একটা গাছের পাতা ছিঁড়ে বলল, এ গাছটার নাম জানিস? সে পাতাটা দু আঙ্গুলে পিষে ওদের নাকের কাছে নিয়ে গেল, কেমন সুন্দর গন্ধ দ্যাখ। এটা বুনো মূস্কোদাইন।

    অমিয় বলল, সামান্য খাব।

    ছোটবাবু বলল, আমিও।

    মৈত্র বলল, পয়সা কে দেবে?

    —কেন তুমি! এত টাকা কামাবে, আর খাওয়াবে না!

    —ঢুকলে যে বের হতে চাইবে না। ভেতরে হাড়ের খেলা দেখাবে। সব বাঁদরের হাড়। আমার পকেটের সব ফাঁকা করে দেবে। তোমরা বাবা সুবোধ বালকের মতো হেঁটে এস তো। কোরিত্রম্বুজ হয়ে সোজা জাহাজে ফিরে যাব।

    অমিয় বলল, আসলে শালা তুমি চিপ্পুস। তারপরই সে চিৎকার করে উঠল, মৈত্র, দ্যাখ, দ্যাখ! মৈত্র তাকাল ডান দিকে। ঠিক মোড়ের মাথায় একটা স্টেশনারি দোকান। দোকানের সামনে একটা সেলস-গার্ল। খুব সরলভাবে অমিয়কে দেখে হাসছিল। অমিয় বলল, কি চমৎকার হাসে রে! মেয়েটার সঙ্গে একটু কথা বলে আসি!

    —যা দ্যাখ, কি বলে।

    অমিয় ফিরে এলে মৈত্র বলল, কিরে কিছু বলেছে?

    —না। আমার কথা কিছু বুঝতে পারছে না!

    —মাগীকে আচ্ছা খিস্তি লাগা।

    —খিস্তি করলে হাসছে। আর কিছু বলছে না। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে রে। তবু কিছু বলছে না।

    মৈত্র বলল, ছোটবাবু যাবে নাকি! মেয়ে মানুষের হাসি দেখে আসতে পার।

    ছোট বলল, তুমি বরং যাও। রেলিঙে একটু বসছি আমি। হাঁটতে হাঁটতে কোমর ধরে গেছে। একটা ট্যাকসি নিতে পারতে। বাসে উঠে যেতে পারতাম।

    —হাঁটাপথ সব চিনি। কিন্তু বাসগুলো কোথায় যায় জানি না। লেখা দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। হেঁটে হেঁটে আমি শহরটাকে ঘুরতে পারি, কিন্তু গাড়িতে উঠলে, কিছুতেই বোঝাতে পারি না কি করে জাহাজঘাটায় যাব। ওরা যে জাহাজটাকে কি বলে!

    অমিয়র মনে হল এটাও মৈত্রের ভুজং ভাজুং। ছোটবাবু আর অপেক্ষা না করে রেলিঙে বসে পড়ল। মৈত্র তখন বলছে, আমি যাচ্ছি। দেখি কি বলে। সে গিয়েই বলল, চেঙ্গেরিতা। আরও কি বলল, তারপর একটা ইটালিয়ান কম্বল দরদাম করে কিনে ফেলল। মৈত্র হ্যান্ডশেক পর্যন্ত করল। অমিয় ভীষণ রেগে যাচ্ছে। সেও হাত বাড়িয়ে দিল। ওর সঙ্গেও হ্যান্ডশেক করছে। বেশ মজা লাগছে। সে বলল মৈত্রকে, শালা তুমি ভোজবাজি জানো। তুমি আমাদের রাজা।

    মৈত্র এবার ঘড়ি দেখল। রাত খুব বেশি হয়নি। ওরা যদি ট্রেনে যায় তবে সামান্য পথ। এই ফালং-এর ‘মতো হবে। ইচ্ছা করলে হেঁটেও যাওয়া যায়। কিন্তু বেশি রাত করে জাহাজে ফেরা মৈত্রের পছন্দ নয়। একবার পাবে ঢুকে গেলে অমিয়কে তোলা যাবে না। বরং যাবার সময় ছোটবাবুকে একবার কার্নিভেলটা দেখিয়ে নিয়ে যাবে। সে ট্রেনে উঠে গেল। এক সময় ঠিক জায়গায় নেমে গেল। পাতাল রেলে চড়তে পেরে ছোটবাবু খুব খুশি। পাশেই বোধহয় কার্নিভেলের সদর দরজা। কোনটা কি সে বুঝতে পারে না। তার কাছে সব এক রকমের মনে হয়।

    ওরা কার্নিভেলের গেটে দেখল, উর্দিপরা দারোয়ান। মাথায় উটপাখির পালখ গোঁজা। গেটের ওপরে নিয়নের বড় হরফে লেখা নাম। বড় বড় সিংহ, বাঘের মুখোস ঝুলানো। পাশে ক্লাউনের কায়দায় নাচতে নাচতে একটা সাহেব ক্ল্যারিওনেট বাজাচ্ছে। পাশে সারি সারি চারটা টিকিট ঘর। খুব বড় লাইন নেই অথবা এখন রাতের বেলা বলে যে যার মতো আগেই ঢুকে গেছে। যারা গেছে তাদের অনেকে বের হয়ে আসছে। ওরা তাড়াতাড়ি টিকিট পেয়ে গেল। ওরা ভিতরে ঢুকে দেখল, বেশ হল্লা, মদ খেয়ে কেউ কেউ বেলল্লাপানা করছে। এখানে ইচ্ছা করলে দু পেগ মেরে নিলে মন্দ হয় না। খালি চোখে দেখার চয়ে, যেন সামান্য গোলাবী নেশা করে দেখলে জমে ভাল। এবং চারপাশে নীল আলো। ছোটবাবুকে এক পেগের বেশি দেবে না। কারণ ও বোধহয় খেলে জীবনে প্রথম খাবে। খেয়ে স্ট্যান্ড করতে পারবে কিনা কে জানে।

    ঢোকার মুখে দেখল একটা আলোর মুরগী ঘুরে ঘুরে ডিম পাড়ছে। নীচে এক বৃদ্ধা, হাতে ছোট বাসকেট। একটা করে মুরগিটা ডিম পাড়ছে, একটা করে বৃদ্ধা বাসকেটে রেখে দিচ্ছে। এটা হয়তো কোনও বিজ্ঞাপন। কিসের বিজ্ঞাপন ওরা বুঝতে পারল না। ওরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মুরগির ডিমপাড়া দেখল। দেখতে দেখতে মৈত্র বলল, হাফ পয়সা উসুল।

    অমিয় বলল, উসুল।

    মৈত্র ছোটবাবুকে বলল, এদিকটাতে একটা টানেল আছে। ভিতরে খুব অন্ধকার। গুহা, ঝর্ণা, বরফের পাহাড় আর মাঝে মাঝে নকল সাপ, বাঘ, হরিণ, মানুষের কঙ্কাল ঘোরাফেরা করছে! খেলনার রেলগাড়িতে উঠে গেলে বেশ আধঘন্টার মতো নিচে ঘুরিয়ে আনবে।

    ওরা টানেলের ভেতর ঢুকল না। দুটো মাঝারি তাঁবু পার হয়ে গেল। মৈত্র অথবা ছোটবাবু না বললে, সে কোনও পাবে ঢুকবে বলে আশা করে না। যে কোন সময় মৈত্র বলতে পারে।

    একটা তাঁবুতে তখন কে যেন সুর করে মেঠো গান গাইছে। এবং ওরা দেখতে পেল, ঠিক গানের সমের সঙ্গে একটা করে পুতুল ওপরে উঠে যাচ্ছে। তার ঠিক ফাঁকে মানুষেরা গোল চাকতি বসিয়ে দু এক বোতল মদ জিতে নেবার চেষ্টা করছে। অনেকে পারছে না, কেউ কেউ পারছে। এটা একটা জুয়া খেলার তাঁবু। কেউ কেউ তখুনি বোতল জিতে দাঁতে কামড়ে ছিপি খুলে ঢক ঢক করে খাচ্ছে। এরা কোনো জাহাজের জাহাজি হবে। মৈত্র খেলার মতো করে দশটা চাকতি সোজা তুলে নিল। মাত্র চার প্যাঁসুর বাজি। সে দশটা চাকতি ছুঁড়ে সহজেই তিনটে চাকতি পুতুল নামা-ওঠার ফাঁকে জায়গামতো বসিয়ে দিল। অমিয় দেখল, হাতের টিপ মৈত্রের অসামান্য। সে সহজেই তিনবার জিতে দু বোতল, এই আট আউন্সের মতো করে হবে, বেশ পেয়ে গেলে বললে, নে। খাব খাব করছিলি, বসে বসে খা। মাগনায় যখন পেয়ে গেলাম—বলে মৈত্র ওদের দুজনকে নিয়ে একটা বসার মতো জায়গা খুঁজে নিল। সামনেই গোল গম্বুজের মতো তাঁবু। এক প্যাসু দিলেই লাল নীল চেয়ার পাওয়া যায়। এক প্যাসু দিলে গ্লাস। ওরা সেখানে বসে গ্লাস নিল। ছোট বড় হলুদ রঙের টেবিল আর ছোট বড় মাঝারি মানুষের কোলাহল। মেয়েরা যেন বেশি মাতাল। কখনও খেতে খেতে গাইছে, কিসব এটটিন পেটটিন………..তারপর তোতালামিতে পেয়ে যায়। আর গাইতে পারে না। মৈত্র বলল, খাও বাপু। কিন্তু বেশ্যা মেয়েরা বেশ তক্কেতক্কে আছে। একেবারে বেহুঁশ হবে না। ছোট, তুমি কি খাবে দ্যাখো। এটুকু খাও। তোমার শীত থাকবে না। রাতে ভাল ঘুম হবে। সকালে বাউয়েলস্ একেবারে ক্লিয়ার। ও শালীর শালীরা যে কি গাইছে!

    এভাবে মৈত্র খেতে থাকল। সে একাই খেয়ে ফেলল পুরো একটা। অন্যটা ওরা দুজনে ভাগ করে খেয়েছে। বেশিটা অমিয়, কমটুকু ছোটবাবু। ছোটবাবু গলায় ঝাঁঝ পাচ্ছে। বড় বিদঘুটে ব্যাপার, কেন যে লোকে খায় সে বোঝে না। এটা যে মৈত্র কি করছে। সে টাকা দিয়ে আরও দু বোতল নিজে কিনে এনেছে। সেই খুব বেশি সাবধানী ছিল, একটুতেই কেমন যেন এখন একগুঁয়ে হয়ে গেছে। মৈত্রদা এত মদ খেতে পারে, জাহাজে ছোট একেবারে বুঝতে পারেনি।

    এভাবেই মৈত্র জাহাজি মৈত্র হয়ে যায়। এভাবেই সে তার সংসারের কথা ভুলে গেল। শেফালীর কথা ভুলে গেল। মৈত্র, জাহাজি মৈত্র, এখন ঘাসের ওপর দু-পা ছড়িয়ে মদ খাচ্ছে। সামনে সব নীল লাল স্কার্ট পরা মেয়েরা হেঁটে যাচ্ছে। ওদের উরু দেখা যাচ্ছিল। পুরুষ্ট উরু। কোথাও নাচ হচ্ছে। কোথাও থেকে ব্যান্ডের বাজনা ভেসে আসছে এবং ব্যান্ড বাজলেই মেয়েরা ওর চোখের ওপর ফুলের মত হয়ে যায়। যেন ঈশ্বরের বাগানে এরা সব সদ্য ফোটা ফুল। ওর কেন যে সব ফুল তুলে নিতে ইচ্ছে করে। এবং একটা একটা করে ফুলের পাপড়ি ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। পাপড়ি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে ইচ্ছে করে কেবল।

    জায়গাটা এখন প্রায় উৎসবের মতো। কচি কচি মেয়েরা গ্যাসের বেলুন বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছে। বালিকারা কোল্ড ড্রিঙ্কস খেয়ে মৈত্র এবং অমিয়কে দেখছে। ওরা দেখে তাজ্জব, এমন দু তিনটে দৈত্যের মতো মানুষ এখানে বসে হামেসা মদ খেয়ে যাচ্ছে কেন। ওদের মায়েরা তখন এত বেশি উরু খালি রেখেছে যে মৈত্র বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারছে না। অমিয় এবং ছোটকে ধাক্কা মেরে প্রায় যেন উঠে গেল। এবং বালিকাদের মায়ের সঙ্গে অশ্লীল কথা বলার চেষ্টা করল। শীতের ঠান্ডায় ছোটবাবুর কান লাল হয়ে উঠল মৈত্রের কথা শুনে।

    অমিয় রেগে গিয়ে নিজের পয়সায় আরও চার আউন্সের বোতল কিনে ফেলল। সে স্টুয়ার্ডের কাছে যে পয়সা পেয়েছে সবটাই পকেটে। মৈত্র কি ভেবেছে!

    যাতে মৈত্র না দেখে, একটু দূরে বসে অমিয় খাচ্ছিল। আর আকাশ দেখছিল। মনে হয় ওর কাছে আকাশটা খুব নিচে নেমে এসেছে। রাত বাড়ছিল। মৈত্র দেখল, অমিয় পাশে নেই। ছোট সামান্য খেয়েই শরীর ছেড়ে দিয়ে চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিয়েছে। সে দেখল, ভারি ঝামেলা। ওর নেশা কেটে যাবার মতো। সে তাড়াতাড়ি উঠে গেল ছোটর কাছে, কি বাবু ভাল লাগছে না। ছোট মাথা ঝাঁকাল। মৈত্র ভাবল, এখন জাহাজে ফেরা দরকার। কি যে মোহের ভিতরে পড়ে যায় সে।

    মৈত্র অমিয়কে বলল, এই কি হচ্ছে!

    —কি আবার হচ্ছে।

    মৈত্র দেখল, আধ বোতলের মতো এখনও বাকি। সে সেটা উপুড় করে দিল। তারপর অমিয়কে ভীষণ মাতলামি করতে দেখে বলল, এক থাপ্পড় মারব মাতলামি করলে। পা ঠিক রাখবি।

    কে কার পা ঠিক রাখে! অমিয়র ঠিক রাখতে গিয়ে নিজের পা ঠিক রাখতে পারছে না। অমিয় বলল, তুই আমার সঙ্গে এমন করিস কেনরে! আমি কি করেছি তোর সঙ্গে।

    —তুমি শালা মুখ উঁচু করে রেখেছ কেন! কি দেখছিস ওপরে।

    —কিছুই দেখছি না। কবে আমরা দেশে ফিরব মৈত্র?

    —আমি তার কি জানি!

    —তুই আমাকে একা ফেলে যাবি না?

    মৈত্র ওর হাত ধরে টেনে তুলে দিল। মৈত্র এবং ওরা দুজন প্রায় টলতে টলতে হাঁটছে, কেবল ছোটবাবু টলছে না। কিন্তু কেমন যেন বমি বমি পাচ্ছে। ভেতরে অস্বস্তি হচ্ছিল। এখন সে আর কোথাও যেতে চাইছে না, শুধু জাহাজে ফিরে যেতে চাইছে। তবু সে, মৈত্র অথবা অমিয়কে ফেলে যেতে পারে না। সে ওদের সঙ্গে হাঁটতে থাকল। ওরা সোজা ডেনছিগোর দিকে যাচ্ছে। ওরা নকল এরোপ্লেনে চড়ল না। নকল মোটরে উঠে দাপাদাপি করল না। সামনের একটা মঞ্চের দিকে ওরা হেঁটে গেল। সামনের মঞ্চটায় উঠে গেলে কেবল ঘুরতে থাকে, উড়তে থাকে, উপরে উঠলে বেশ একটা মেজাজ আসে। তখন মনে হয় এই সংসার, যুবক যুবতী সহবাস সব এই কার্নিভেলের মতো। নিছক খেলনা। গত সফরে ওখানে উঠে মৈত্র বমি করে দিয়েছিল।

    ফেরার পথে মৈত্র বলল, কিরে ফের যাবি? তুই ছোটবাবু?

    অমিয় বলল, আমি যাব না। গেলেই শুয়োরের বাচ্চার সঙ্গে ঠিক দেখা হয়ে যাবে।

    মৈত্র বুঝতে পারল না অমিয় কাকে গালাগাল করছে।

    —শুয়োরের বাচ্চা খুব জ্বালাচ্ছে।

    —কে শুয়োরের বাচ্চা?

    —আছে। ওকে শালা এমন শিক্ষা দেব না।

    মদ খেলে নানাভাবে ভেতরের দুঃখ উথলে ওঠে। এটাও এমন একটা কিছু হবে। মৈত্র কথাটার তেমন গুরুত্ব দিল না। সে ছোটবাবুকে বলল, চল, ওদিকটায় ঘুরে যাই। সর্টকাট হয়ে যাবে। জুয়ার আড্ডাগুলোর পাশ দিয়ে সামনের রাস্তায় পড়তে পারব।

    অমিয় ধরা গলায় বলল, কোনদিকে?

    মৈত্র বলল, ওদিকে। খেলতে পারবি না কিন্তু।

    অমিয় বলল, তুই না খেললে, আমি খেলছি না।

    —ছোটবাবু সাবধান।

    —আমার টাকাই নেই।

    অমিয় বলল, তুমি ছোটবাবু কিন্তু ভীষণ চালাক লোক। একটা প্যাসু তুললে না।

    মৈত্র বলল, কিছু তোমাকে তুলতে হবে ছোটবাবু। তোমার দুটো স্যুট কেনা দরকার। সেকেণ্ডহ্যাণ্ড মার্কেটে খুব সস্তায় পেয়ে যাবে।

    ছোট বলল, অনেকদিন এখানে আছি তো। কাল তুলব ভাবছি।

    —তোমার শরীর কেমন লাগছে?

    —খারাপ না। বেশ ভাল লাগছে। আগের মতো খারাপ লাগছে না।

    মৈত্র বলল, কেমন সস্তায় মদ খাইয়ে দিলাম।

    অমিয় বলল, অনেক ধন্যবাদ। বলে, অমিয় হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকল। যেন সে মৈত্রকে আশীর্বাদ করছে। ওর হাত শিথিল। হাওয়ায় যেন হাত টলছে। ছোটবাবু বলল, এভাবে হেঁটে যাওয়া যাবে না। বরং একটু বসে গেলে হয়। অমিয়র নেশাটা যদি কমে।

    —এখানে কোথায় বসবি! শালা সব সোনার ঈগলেরা উড়ছে। চল একটু ফাঁকা জায়গা দেখে বসি।

    সুন্দরী যুবতীদের ছেড়ে যেতে ইচ্ছা হচ্ছিল না অমিয়র। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে শিস মারছে। মৈত্র এবং ছোটবাবু এখন জাহাজে ফেরার জন্য আকুল। হয়তো গিয়ে দেখবে, শেফালীর চিঠি এসেছে আবার। বন্দরে সে তিনটে চারটে চিঠি পেতে পারে। শুধু এক খবর। টাকা, খরচ শেফালী দুহাতে করতে ভালবাসে। এখন তো শেফালীর দরকারেই লাগবে টাকাটা। শেফালীর সব চিঠিই নতুন মনে হয়, তাজা মনে হয়। যত পুরানো থাকুক, এত দূর দেশে এসে সে সব সময় চিঠিতে শেফালীর শরীরের ঘ্রাণ পায়। শেফালীর শরীরের গন্ধ চিঠিতে যেন লেগে থাকে।

    সে শেফালীর চিঠি পেলে সব ভুলে থাকতে পারে। বন্দরে নেমে এদিক-ওদিক ঘোরার আকর্ষণ বোধ করে না। কোন বারে, রেস্তোরাঁয়া বেশ্যালয়ে ঘোরার নিদারুণ অভ্যাস ওর মনের ভেতর থেকে মুছে যায়।

    মৈত্র এবার বলল, অমিয় তুই থাক, আমরা চলে যাই।

    —আমাকে ফেলে চলে যাবি! আমি একা যেতে পারব!

    —তবে চল। বেশ রাত হয়ে গেছে। সামনে অনেকগুলো জুয়ার আড্ডা পড়বে।

    —তুমি আমার জী-গুরু-দোস্ত। তোমার কথা না শুনলে চলে।

    তারপর ওরা সেই নকল মঞ্চ পার হয়ে গেল। ডানদিকে আর একটা বড় হলঘর। ভিতরে নাচ হচ্ছে। ক্যারিওনেট বাজছে। এবং একটা লোক ম্যাণ্ডোলিন বাজিয়ে ষাঁড়ের মতো চিৎকার করে গাইছে। এইসব চেঁচামেচি অথবা গান ভীষণ উত্তেজিত করে রেখেছে চারপাশটা। ডেনছিগোর বাইরে যেসব ফুলের গাছপালা অথবা সারি সারি পাম গাছের নকল জঙ্গল, বনের ভিতর মাঝে মাঝে লাল আলোর সংকেত, অর্থাৎ ওখানে কেউ কেউ যুবক যুবতীরা শুয়ে নীল আকাশ দেখছে, অথবা নতুন নক্ষত্রের জন্ম দিচ্ছে। লাল আলোর সংকেত, এদিকে না, এদিকের জায়গা দখল, অন্যদিকে, অন্যদিকে খুঁজে নাও। জায়গা পেয়ে যাবে। এখানে এসে মৈত্র বলল, ভালছেলের মতো চোখ বুজে থাক। তাকাবি না।

    —খুব মজা। হোঁচট খাই আর কি! তুই চোখ বুজে হাঁট না। অমিয় বরং লাল আলোর পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। যেন সে এর ভিতর একটা জায়গা খুঁজতে এসেছে। আসলে ওর দেখা চাই, কে, কিভাবে কিসব চালাচ্ছে। এটা যে কি শহর! সে বুঝতে পারে না, খোলা আকাশের নিচে এসব হয়! ও কেমন ক্রমে অধৈর্য হয়ে পড়ছে।

    ছোটবাবু বলল, আমার ভয় করছে মৈত্রদা, এর ভিতর দিয়ে আসা ঠিক হয়নি। কেউ কিছু বলতে পারে।

    —আরে আয়তো। এরা কেউ কিছু বলবে না।

    মায়াবিনী আলো চারপাশে, ছোটবাবুর মনে হচ্ছিল, সে একেবারে কেমন হাবাকালা হয়ে যাচ্ছে। সব এত স্পষ্ট! সে লজ্জায় তাকাতে পারছে না, কেমন এক অপরাধবোধ এবং ভেতর থেকে আবার শীত উঠে আসছে। খোলামেলা জায়গায় এসব এ-ভাবে হয় সে জানত না। চারপাশে সারি সারি নানা ভঙ্গীতে উলঙ্গ হয়ে শুয়ে আছে তারা। কেউ ওভারকোট পেতে নিয়েছে, কেউ কিছুই পেতে নেয়নি। দেখে মনে হয়, শীতটিত ওদের শরীরে লাগে না। সে প্রায় দু’লাফে জায়গাটা পার হয়ে গেল যেন। অমিয়কে টানতে টানতে নিয়ে আসছে মৈত্র। কলার ধরে টেনে আনছে।

    জুয়া খেলার মেলায় ঢুকে মৈত্র অমিয়র কলার ছেড়ে দিল। এবং মৈত্র এসব জায়গায় গত সফরে বেশ গচ্ছা দিয়ে গেছে। তখন মৈত্র একা ছিল, দায়-দায়িত্ব কম ছিল। জুয়া খেলার আসরটাই মৈত্রের কাছে কার্নিভেলের মজার জায়গা। দোকানগুলো ওর সব চেনা। সে মুখগুলো পর্যন্ত মনে করতে পারে। কিন্তু এখন সে দেখছে সব কেমন বদলে গেছে। নানাবর্ণের বেলুন, কাগজের ফুল উড়ছে হাওয়ায়। সে আগের কাউকে দেখছে না। দুজন বেশ বলবান মানুষ, ওদের কোমরে মোটা বেল্ট, পায়ে হাঁটু পর্যন্ত সু, এবং হাতে লম্বা চামড়ার দস্তানা, ওরা খেলছে। দুজন মেয়ে দুপাশে দাঁড়িয়ে ওদের রিভলবারে গুলি ভরে দিচ্ছে। ওদের দেখেই বুঝল, এরা ঠিক জাহাজি। ওরা আসলে পাশের মেয়েদুটোকে ধরার জন্য জুয়া খেলে পয়সা নষ্ট করছে। রাত বাড়লে, এরা ঠিক মেয়েদুটোকে কোথাও নিয়ে যাবে। মৈত্র এবার দেখে অবাক হল, আগের বয়সী যুবতীরা একজনও নেই। খুব অল্পবয়সের ফুলের মতো নরম মেয়েরা এখন দোকান আগলাচ্ছে। আর এভাবে কি যে হয়ে যায় মানুষের, মৈত্র যেতে যেতে নীল লাল রঙের, কাঠের বল, গড়িয়ে দিতে পারলেই বাজি মাত, এক প্যাসুতে একটা নতুন কোট মিলে যাবে… যেন এখন ইচ্ছে মৈত্রর একটা কোট এক প্যাসুতে মিলে গেলে মন্দ হয় না। মাত্র এক প্যাসু ওর হাত ভীষণ পাকা। সে পাকা জুয়াড়ীর মতো অল্পবয়সের মেয়েটির সামনে দাঁড়িয়ে গেল। এই শহর, এত বড় শহর, আর এখানে মেয়েরা এখন জুয়ার রিঙে বসে থাকে ভাবতেই শরীরের ভেতর কেমন শিহরণ খেলে গেল। সে এবার হামলে পড়ে দুটো কাঠের বল বাজীকরের মতো তুলে নিল। বল দুটো ওপরে ছুঁড়ে দিয়ে আরও তিনটে লাল নীল বল বাতাসে এক এক করে পাঁচটা বল খেলাতে থাকল। পাঁচটা ক্রমে আরও তিনটা তারপর চারটা টপাটপ তুলে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখল। দুটো হাতে বারোটা বলের খেলা। অমিয়, ছোটবাবু এমনকি রিঙের মেয়েটা পর্যন্ত তাজ্জব বনে গেল।

    অমিয় চিৎকার করে বলল, শুয়োরের বাচ্চা তুমি সার্কাসে তবে সিংহের খেলা দেখাতে!

    মৈত্রের ইচ্ছে হল, গালে ঠাস করে চড় বসিয়ে দেয়। কিন্তু মদ খেলে হুঁশ থাকে না। শিশুর মতো সরল কথাবার্তা। তাছাড়া এমন এক তাজা মেয়ে সামনে। এমন একটা আশ্চর্য খেলার সব তামাসা মাটি। সে খুব সহজভাবে বলল, সিংহের খেলা নয় রে। এটা রিঙের খেলা দেখাচ্ছি। এবং এভাবে সে কখনও বারোটা বল পেছনে হাতের ভিতর অদৃশ্য করে ফেলেছে, আবার কেমন সব এক এক করে হাত নামিয়ে ট্রেতে রেখে দিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি হাততালি দিয়ে উঠল এবং রূপোর স্টিকে একটা বল এগিয়ে দিল মৈত্রের কাছে।

    মৈত্র বলল, না। আজ না মেমসাব। অনেক রাত হয়ে গেছে। কাল খেলব। তারপর আঙ্গুল তুলে অমিয়কে দেখাল। যেন বলা, মাতাল। এক্কেবারে মাতাল।

    মেয়েটি কিছুই বুঝল না। শুধু রুপোর স্টিক দিয়ে আরও দুটো বল মৈত্রের দিকে এগিয়ে দিল। সেই সরল হাসি। এবং এখন আর এ-মেয়েটিকে কম বয়েসী মনে হচ্ছে না। খাটো স্কার্টের ভেতর উরু দেখে সে বুঝল, খুব সেয়ানা মেয়ে। ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়।

    —না মেমসাব। ঘরে আমার বিবি আছে। ও জানতে পারলে রাগ করবে।

    মেয়েটি কিছু বুঝতে পারছে না। বোকার মতো হাসছে। মেয়েটি বোধ হয় বুঝেছে মানুষটা জাহাজি। রাত হলে সব জাহাজিদের ভিড় এখানে। মৈত্রকে ভীষণ লোভী দেখাচ্ছে! মেয়েটি ওর দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। মৈত্রের যেন সাহস নেই এখন রিং ছেড়ে যায়। মাত্র এক প্যাসুর খেলা। সে না খেললে, মেয়েটার কাছে ছোট হয়ে যাবে। সে এবার প্যাসু ছুঁড়ে দিল। দুটো বল, রুপোর স্টিক হাতের কাছে। ট্রেতে এমন অনেক লাল নীল বল। সে বল গড়িয়ে দিল। বল গড়িয়ে অন্য দিকে চলে গেল! সে ঠিক জায়গার বল গড়িয়ে দিতে পারল না।

    মেয়েটি মৈত্রকে হেরে যেতে দেখেও হাততালি দিল। খুব খেলা দেখানো হচ্ছিল! এখন সব ভোজবাজি শেষ। মেয়েটি যেন এবার ওকে শেখাতে পারে। সে বাইরে বের হয়ে মৈত্রের পাশে দাঁড়াল। বোধ হয় বলল, এই দ্যাখ্যো সাঁইয়া। সে দুটো বল ঠিক ঠিক জায়গায় গড়িয়ে দিল। যেন খুব সহজ।

    মৈত্র এবার দু প্যাসু দিয়ে তিনটি বল নিল। কোন দিকে তাকাল না। ছোটবাবু একটা থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মৈত্রের টিপ দেখছে। মৈত্র এবার খুব সহজে একটা বল জায়গামতো পৌঁছে দিল। ছেলেবেলায় টিপ্পি খেলত। খেলাটা হুবহু একটা আধুনিক টিপ্পি খেলা। সে অনেকগুলো টিপ্পি বাঁচিয়ে সহজেই রাজা টিপ্পিটাকে গর্তে ফেলে দিতে পারত। সুতরাং মৈত্র একবার জিতেই ভেবেছে, মেয়েটার ঠিক জামা-কাপড় খুলে নিতে পারবে। কিন্তু পরে চার বার মেরে একবার। সে ফের প্যাসু দিয়ে দশটা। একটাও গেল না। মেয়েটা তেমনি ঠোঁট টিপে হাসছে। বড় সুস্বাদু খাদ্যের মতো হাসিটা ওকে প্রলোভনে ফেলে দিচ্ছে। সে ইতিমধ্যে দশ প্যাসুর মতো হেরে গেছে। অমিয় নাইটের মতো এগিয়ে এসে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল মৈত্রকে, খেল মেমসাব। তোমারে উলঙ্গ কইরা দিমু। অমিয় দেশের ভাষায় এবারে কথা বলতে লাগল।যা খেইল দেখামু, বোজবা কারে কয় বাঙ্গাল! বলে অমিয় আট প্যাসুতে ষোলটা কাঠের বল তুলে খেলতে গিয়ে দেখল সব কটা কাঠের ট্রেতে উঠে গেছে। সুতরাং এক ধাক্কায় ওকে সরিয়ে সামনে দাঁড়াল মৈত্র। হা-হা করে হাসল। সে এবার ষোল প্যাসুতে বত্রিশটা বল কিনে ফেলল।

    ষোল প্যাসু হেরে যেতেই শেফালীর মুখ মনে পড়ে গেল। হয়ত এতক্ষণে জাহাজে শেফালীর আর একটা চিঠি এসে গেছে। রোজ রোজ সে শেফালীর চিঠি পাবে আশা করে। সে তাড়াতাড়ি খেলা শেষ করে বুঝল জেতা যাবে না। কিন্তু মেয়েটা এমন অবজ্ঞার হাসি হাসছে যে পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যাচ্ছে। হাতে রুপোর স্টিক। যেন রিঙের ভেতর এখন মেয়েটা ইচ্ছে করলে সিংহের খেলা দেখিয়ে দিতে পারে। দু-একবার জিতে গেলে প্যাসু ডাবল ফিরিয়ে দিচ্ছে। সবই অবহেলাভরে। কেমন ঝর্ণার উৎস থেকে কল কল করে নেমে দু’পাড়ের সব ভাসিয়ে দেবার ইচ্ছে। যত এমন হচ্ছে তত মৈত্রের জেদ। সে এবার সব বলগুলো কোলের কাছে টেনে নিলে, মেয়েটি চোখের ইসারায় বলছে, আর কেন, এবার যাও। কাল, মাথা ঠাণ্ডা করে এস। খেলতে পারবে।

    মৈত্র খিস্তি করল এবার, ছেনালী হচ্ছে! খেলবে না! সে এলোমেলোভাবে এক গাদা প্যাঁসু পকেট থেকে তুলতেই, মেয়েটি দ্রুত স্টিক হাতের ওপর ঘোরাতে থাকল। যেন মেয়েটির ইচ্ছে না, মৈত্র আর খেলুক। রেগে গেলে খেলা ঠিক হয় না। লোকটা ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলছে। অথবা বলার ইচ্ছে যেন, লক্ষ্মী ছেলের মতো জাহাজে যেতে বললাম, তুমি বাপু ফের একগাদা নোট বের করেছ। কি করা। খেলা যাক। সে ট্রে এগিয়ে দিল।

    ছোটবাবু বলল, কি তুমি জাহাজে যাবে না!

    —দাঁড়া!

    মেয়েটি ততক্ষণে ওদের জন্য তিন কাপ কফি আনিয়ে দিয়েছে। ওরা দাঁড়িয়ে খাচ্ছে। অমিয় পাশে একটা টুলে বসে রয়েছে। সে দাঁড়াতে পারছে না। কফিটা খেলে নেশা মরে যাবে। মেয়েটির এমন সৌজন্যবোধ দেখে ছোটবাবু কেমন অবাক হয়ে গেল!

    মৈত্র কফি খেতে খেতে টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়েছে। কফি খেতে খেতে দাবার ছকের মতো কি যেন পরীক্ষা করছে। টেবিলের ওপর গোটা ছকটাতে কি যেন যাদু আছে। মেয়েটি যতবার বল গড়িয়েছে, প্রত্যেকবার ঠিক জায়গায় পৌঁছে গেছে। সে পারছে না কেন বুঝছে না। মৈত্র, শেফালীর মতো দুর্ধর্ষ মেয়েকে সামলায়, সে চাল-চলনে লড়নেওয়ালার মতো, তার কাছে এই মেমসাব সামান্য মেয়ে, তার কাছে সে বার বার হেরে যাচ্ছে।

    চারপাশে অনেকে দাঁড়িয়ে ওর খেলা দেখছে। ছোটবাবুর কফি শেষ। কেউ কেউ বল নিয়ে খেলবে ভাবছে, কিন্তু মৈত্রকে ও-ভাবে হেরে যেতে দেখে সাহস পাচ্ছে না। মনে হয় ওরা সবাই মেয়েটিকে চেনে। সে সবাইকে খেলার জন্য স্টিক দিয়ে বল ঠেলে দিচ্ছে। মৈত্র ওদের কথা বুঝতে পারছে না। সবাই স্প্যানীশ বলছে। তার জন্য মৈত্রের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। সব দেশে সাধারণ বাজার করবার মতো বিদ্যা তার আছে। কিছুটা দর কষার মতো, কিছুটা চিটাগাঙ এবং সন্দিপী নিরক্ষর জহাজিদের ইংরেজির মতো। দর-দামের কথা বললে, হাউ মুচ মেমসাব, অর্থাৎ হাউ মাচ মেমসাব! সুতরাং মৈত্র প্রায় বোবার সামিল। সে, সব রেখাগুলো টেবিলের পরীক্ষা করছে। সে যেন এই ছকের ভেতর মেয়েটির মুখ দেখতে পাচ্ছে। বড় কোমল মুখ। নাক লম্বা। চুল কালো নীল চোখ। আর গায়ের মাংস আপেলের পিঠের মতো। পরনে লাল স্কার্ট, আঁটা ফ্রক, কোট শাদা রঙের। গলায় নীল পাথরের মালা, মাথায় লাল টুপি। তাতে পাখির পালক গোঁজা। কপালের কিছুটা কালো মখমলের জাল দিয়ে ঢাকা। চোখের নিচে কেমন নীলাভ রঙের আবছা অন্ধকার। মৈত্র মেয়েটিকে বেশিক্ষণ ছকের ভিতর দেখতে পেল না, অমিয় এসে কলার চেপে ধরেছে, এই যাবি কিনা বল!

    —যাব, চল। মৈত্র এবার মেয়েটির দিকে তাকাল। মেয়েটি ওকে দু হাঁটু ভাঁজ করে বাউ করল। মৈত্র, মাথার টুপি খুলে ওর বাউকে সম্মান জানাল। তারপর কোনও দিকে তাকাল না। সে সোজা অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে থাকল। সে ছোটবাবু এবং অমিয়র সঙ্গে একটা কথাও বলল না। রাত গভীর। রাস্তায় লোক চলাচল কমে গেছে। কোথাও বোধ হয় এখন স্কাইলার্ক ফুল ফুটছে। ওরা ফুলের গন্ধ পাচ্ছে। টাওয়ারের বড় ঘড়িটাতে ঘণ্টা বাজছে এক দুই তিন…এভাবে অনেক। মৈত্র এমন সময়ে করুণ গলায় বলল, আমার জাহাজে যেতে ইচ্ছে করছে না রে। মেয়েটার পায়ের নিচে আমার পড়ে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে।

  • তের

    তের

    ।। তেরো।।

    ভোরবেলা মৈত্রের উঠতে একটু বেলা হয়ে গেল। বোধহয় মৈত্র রাতে সেই স্বপ্নটা দেখছিল। বোধহয় স্বপ্নটা এত দ্রুত মাথার ভেতর পাক খাচ্ছিল যে কখন ভোর হয়ে গেছে মৈত্র টের পায়নি। একটা মাছের কঙ্কাল, তিমি মাছের কঙ্কাল বড় পাইন গাছে কেউ ঝুলিয়ে রেখে গেছে। সে স্বপ্নে সব সময় গাছটার নিচে দাঁড়িয়েছিল। কাজে যাবার সময় বার বার স্বপ্নটার কথা তার মনে হচ্ছে।

    কাল মদ বেশী মাত্রায় হয়েছে। ঘুমও ভাল হয়নি। আর একটু ঘুমোলে বেশ ভাল হত। কিন্তু রাত থাকতেই সাতটার ঘণ্টা পড়ে গেছে। এখনও ডেকে আলো জ্বালা। সারেঙ ওপরে দাঁড়িয়ে টান্টু বলছেন। এনজিনরুমে অনেক কাজ। জাহাজের এসব কাজ বন্দরে না এলে করা যায় না। কিনার থেকে লোকজন উঠে এসেছে। এনজিনে ওয়েলডিং-এর কাজ। পুরানো জাহাজ় বলে, এটা থাকে তে ওটা খসে যায়। যতক্ষণ বন্দরে জাহাজ ততক্ষণ ওয়েলডিং।

    সকাল থেকেই মৈত্রের মেজাজ খারাপ। অমিয়র জন্য এটা হয়েছে। কাল মৈত্র অনেক প্যাসু হেরেছে। হেরে যাওয়ার মূলে অমিয়। সেই লোকটার একাউন্টে টাকা না পাঠাতে পারলে শেফালী তাড়াতাড়ি টাকা পাবে না। একটা ড্রাফট যাবে। তাছাড়া রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কিছু নিয়ম কানুন আছে, সব ঠিকঠাক করে পেতে পেতে এমনিতেই দেরি হয়ে যাবে। যদি মানুষটা আজ আসে, এলে দুপুরে আসবে, তখন জাহাজে কে না কে উঠে আসে ঠিক থাকে না। জাহাজ-ডেকে হাজার রকমের মানুষ। কেউ কাউকে চেনে বলে মনে হয় না। কনট্রাকটারদের লোকই বেশি। নানা জায়গায় মেরামত করছে ওরা। এ- সময়ে মালটা নামিয়ে দেওয়া খুব সহজ! সেই মানুষটি আসবে কনট্রাকটারের লোক হয়ে। কারো কোন সন্দেহ করার কারণ থাকবে না!

    সেই একঘেয়ে কাজ। বন্দরে একরকম, সমুদ্রে অন্যরকম। জেটিতে ভীষণ ব্যস্ততা। মাল কেবল নেমে যাচ্ছে। মেজ-মালোম ফল্কায় ছুটে যাচ্ছেন। বড়-মালোম হিসাব মেলাচ্ছেন। পাঁচটায় ছুটি হলে আবার স্নান। মেসরুমে বসে আহার। তারপর ফুরফুরে পাখির মতো বন্দরে নাইটিঙ্গল দেখতে নেমে যাওয়া।

    সিঁড়ির মুখে অমিয়র সঙ্গে দেখা। অমিয় মগে চা নিয়ে নিচে নামছে। সিঁড়িতে নামার সময় মৈত্র বলল, কাল তোর জন্য এসব হল।

    —বা বেশতো। খেললি তুই, আর দোষ আমার!

    —তোর জন্যই তো বের হওয়া।

    —ন্যাকামি করবি না।

    —আজ আর কোথাও যাচ্ছি না। সোজা ঠিক জায়গায় চলে যাব।

    —যাবি না তো যাবি না। আমাকে কি বলছিস!

    এবং অমিরর আর ইচ্ছা হল না কথা বলতে। ছোটবাবু ওদের কথা কাটাকাটিতে খুব মজা পায়। এবং সে জানে এটা খুব সাময়িক। আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।

    জাহাজ থেকে নেমে যাবার মুখে মৈত্রের মনে হল, কেউ ওকে ডাকছে। সে দাঁড়াল। ডেকবোসান এদিকে আসছে। ওর হাতে একটা চিঠি। শেফালীর চিঠি সে বুঝতে পারে। এখন সে নামতে পারে না, চিঠিটা পড়া দরকার। সে ফের ফোকসালে ফিরে গেল। আলো জ্বেলে বসল। ছোটবাবু অথবা অমিয়কে সে সঙ্গে নিচ্ছে না। একাই যাবে ভেবেছে। তারপর চিঠির ভাঁজ খোলার সময় অন্যবারের মতো তেমন সুগন্ধ পাচ্ছে না যেন। আর লেখাটা মনে হল বড় হিজিবিজি, এবং এখন সে বুঝতে পারল, আগের চিঠিটা অনেকদিন আগে শেফালী লিখেছিল। বুনো-এয়ার্সের ডাকঘরে অনেকদিন পড়েছিল হয়ত অথবা এজেণ্ট অফিসে। আর এ-চিঠি সদ্য লেখা। চিঠিটা পড়তে পড়তেই বুঝল, শেফালী ভয়ঙ্কর অসুস্থ। দুর্বলতার জন্য ভালভাবে চিঠিটা লিখতে পারেনি। চিঠিটা পড়তে পড়তেই সে কেমন বিচলিত বোধ করছে। হিজিবিজি লেখা স্পষ্ট বুঝতে পারছে না। সময় লাগছে পড়তে। লিখেছে ওর বমি ভয়ানক হচ্ছে। কিছু খেতে পারছে না। বিছানার সঙ্গে শরীর মিশে গেছে। শেষে লিখেছে, টাকার খুব দরকার। তুমি যে টাকা দিয়ে গিয়েছিলে সব শেষ। মাসে মাসে যে টাকা কোম্পানীর ঘর থেকে আসে ওতে কি হয় বল! ডাক্তার আর ওষুধে সব ফুরিয়ে গেছে। তুমি কবে ফিরছ, জাহাজ কবে ফিরবে। আবার কোথায় যাচ্ছ ঠিকানা দেবে।

    মাঝে মাঝে অনেক অস্পষ্ট কথা লেখা আছে। সে ঠিক তা এখনও উদ্ধার করতে পারেনি। যেন একটা নাম হ্যাঁ বিমল, ফের এসেছিল। শেফালী লাইনটা আবার নিজেই কেটে দিয়েছে। দুর্বল হাতে ভালভাবে কাটতে পারেনি। বিমলের স্ত্রী শেফালী, কথাটা মনে হলেই ভেতরে সে ভীষণ কষ্ট পায়। বিমল ওর বন্ধু, বিমল খুব জাহাজের গল্প শুনতে ভালবাসত। বিমল, সরকারী অফিসে কি একটা বড় চাকুরে। বিমলের কথা মনে হলেই মনে হয়, লোকটা আস্ত শয়তান!

    তখন মৈত্র সবে মাত্র কার্গো লাইনের জাহাজে কাজ নিয়েছে। সফর ঘুরে এসে কেমন শেয়ানা হয়ে গেল সে। পৃথিবীর অনেক দেশ সে দেখেছে। রয়েল নেভিতে সে সুযোগ তেমন ছিল না। সফর শেষে এভাবে বাড়ি ফিরলে সে রাজার মতো চলাফেরা করত। পৃথিবীর সব বন্দরের যাবতীয় সুখ যেন ওর দু’পকেটে। সে যেন সেইসব সুখের গল্প দু’পকেটে ভরে ফেরি করতে ভালোবাসে। সে, গল্প বলার সময় শেফালীকে একজোড়া ম্যানিলা হ্যাম্পের চটির গল্প শুনিয়েছিল। সে যে কি আগ্রহ! একজোড়া ম্যানিলা হ্যাম্পের চটি না পরতে পারলে শেফালী বুঝি ভাবল, বেঁচে থেকে সুখ নেই। বেঁচে সুখ নেই, বেড়িয়ে সুখ নেই। কি সুন্দর সুন্দর গল্প বলত শেফালীকে, মিয়ামি বিচের সুন্দরীদের প্রতিযোগিতার গল্প শুনলে শেফালী হাঁ করে থাকত। শেফালীকে সে কুহকে ফেলে দিয়েছিল। এবং যা হয়ে থাকে, সেই থেকে এমন সুন্দরী বৌটা বিমলের, ওর কাছে চলে আসতে চাইল। লাজ- লজ্জা সব সে হারিয়ে ফেলল।

    মৈত্র বলল, তাহলে তুমি শুভেন্দু মৈত্র, মনে মনে বিমলের নাম শুনলে কষ্ট পাও। বিমলের এখন কি ইচ্ছে সে এত দূর থেকে জানতে পারে না। সে চলে এলে বিমল সব লুটেপুটে খেতে পারে। বিমলের সুবিধা ওর চেয়ে অনেক বেশি। বিমল তো অন্য একটা মেয়েকে ঠিক মিয়ামি বিচে নিয়ে গেছে, তবে আর কেন! শেফালীর কি দরকার, বিমলের কথা লেখার! শেফালী কি বিমলকে এখনও ভুলতে পারেনি। শেফালী কি বিমলকে…কারণ মৈত্র নেই, মৈত্র জাহাজে চলে গেছে, তুমি এ-সময় আমার কাছে কাছে থাকো।

    সে চিঠিটা ভাঁজ করে পকেটে ভরে রাখল। অমিয় দুবার এসেছে, একটা কথাও বলেনি। মৈত্র কোথায় যাচ্ছে, জানতে চায়নি। যেন অমিয় অথবা মৈত্র কেউ কাউকে চেনে না। ছোটবাবু আজ বেশ সকাল সকাল মেজ-মালোমের সঙ্গে কিনারায় নেমে গেছে। বোধহয় এসব ছোটবাবুর ঠিক ভাল লাগেনি। ছোটবাবু চাপা স্বভাবের মানুষ। নানাভাবে চেষ্টা করেও ছোটবাবুর কিছু জানা যায় না। ওর চিঠি আসে না। চিঠি না এলে এখন সে আর দুঃখ করে না। মন ভার করে থাকে না। ছোটবাবু নিজের দুঃখ বোধহয় নিজের ভেতর সবসময় লুকিয়ে রাখে। ছোটবাবুকে ঠিক মৈত্র বুঝতে পারেনা।

    চারপাশটা দেখতে দেখতে নেমে গেল মৈত্র। চারপাশে তেমনি আলো জ্বলছে এবং আলোর বাহার। সে তার ভেতরে একাকী হেঁটে যাচ্ছে। দুপুরবেলা, সে ঠিক নামিয়ে দিয়েছিল মালটা। এখন সে রাজার মতো হাঁটতে পারে। কারণ টাকা পয়সার ভাবনা তার নেই। এখন শুধু পাঠানোর ভাবনা। সামনে সেইসব টিউলিপ ফুলের গাছ, সেইসব লাইটপোস্ট, সেইসব পাখিরা একরকমের, অথবা তেমনি নাইটিঙ্গেল পাখিরা উড়ছে।

    সেই টাওয়ারটা, সামনে। ঘড়িতে পাঁচটা বাজার শব্দ। লোকটার কাছে সে ঠিকানা ভালভাবে জেনে নিয়েছে। সে এখন শুধু সেদিকেই যাবে। অন্য কোথাও নয়। লাল নীল বলের কথা, মেয়ের বাও করা চোখের কথা দু-একবার মনে হয়েছে। সে একেবারে আমল দেয়নি। বাস, মানুষজন, নিচে ট্রেন ছুটে যাচ্ছে। বেশ ভিড়। এবং মানুষের শরীরে বিদেশী গন্ধ। সে ওদের পাশ কাটিয়ে গেলেই কেমন একটা আশ্চর্য গন্ধ পায়। ওর মনে হল তখন, না খেয়ে জাহাজ থেকে নেমে আসা ঠিক হয়নি। আসলে অমিয়কে সে এড়িয়ে থাকতে চেয়েছিল। একটু খেয়ে নিতে হয়। খুব খিদে পেয়ে গেছে। ফিরতে ফিরতে রাত হবে বেশ। কারণ যা বলেছে, তাতে ওকে কেরিয়েম্বুজ পার হয়ে যেতে হবে। সে রেস্তোঁরাতে ঢুকে খাবার চাইল। বড় রেস্তোঁরা। পাশে রেকর্ড-প্লেয়ারে নানারকম গান। কাউন্টারে দামী কাচের ভিতর মেমসাব, মুখে সেই সরল মিষ্টি হাসি। কি করে যে ওরা এমন সুন্দর হাসতে পারে। এতবার হাসতে ওদের কষ্ট হয় না! মেয়েরা এমনভাবে হাসলে সে শেফালীর কথা মনে না করে পারে না। আর মনে হলেই শির-শির করে শরীরে একটা শীতের মতো ঠাণ্ডা। চোখ মুখ জ্বালা করতে থাকে।

    সে ইচ্ছে করেই আর মেমসাবের দিকে তাকাল না। সে স্যাণ্ড-উইচ এবং কিছু গ্রীণ পিজ সেদ্ধ চেয়ে নিল।

    তখন অন্য এক যুবতী মেমসাব, সে এসে আর কি লাগবে জানতে চাইছে।

    সে বলল, আর কিছু চাই না।

    —একটু চা?

    —চা লাগবে না।

    —খুব ভাল আইসক্রিম কফি আছে।

    মৈত্র বলল, না।

    —অক্‌সটেল পরিজ আছে!

    মৈত্র বলল, না।

    —ড্রিংকস!

    —ইয়েস।

    এবং এ-ভাবে দামী মদ, সাদা টাওয়েল, অর্থাৎ টাওয়েল পাল্টে দিয়ে গেল মেয়েটা। অর্ডার নিচ্ছে যেসব মেয়েরা ওরা খদ্দেরদের খুব পাশাপাশি থাকছে। ঘুরছে ফিরছে। অনেক সময় কেউ কেউ পাশে বসে সঙ্গ দিচ্ছে। বোধহয় মৈত্রকে মেয়েটি পাশে বসে চিয়ার-আপ করছিল।

    মৈত্র বলল, দু পেগ।

    দু পেগ এলে, একটা নিজের কাছে টেনে নিল, অন্যটা মেয়েটিকে এগিয়ে দিল।

    —আমাকে! সব ইসারাতে কথাবার্তা।

    —ইয়েস।

    —নো।

    —খুব রাগ করব। হাত ঘুরিয়ে মুখ ভার করে বোঝাল, না খেলে সে দুঃখ পাবে।

    মেয়েটি এবার টেনে নিল গ্লাসটা। আর ঠিক তখনই অমিয় হাজির। ঠিক ওৎ পেতে আছে। মৈত্রের আবার পায়ের রক্ত মাথায়।

    —কিরে মেয়েছেলে নিয়ে মদ খাচ্ছিস! তুইতো আচ্ছা লোক। এই বৌকে টাকা পাঠানো! মৈত্র আরও দু পেগের অর্ডার দিল। তারপর সে খেল না। উঠে পড়ার সময় অমিয়র হাত ধরে

    বসিয়ে দিল। শালা খা, যত পারিস মদ মেয়েছেলে খা।

    —বা বেশ মৈত্র, তুই নিজে খেয়ে আমার নামে বিল রেখে যাচ্ছিস!

    মৈত্র অযথা কথা বাড়াল না। কাউন্টারের সামনে সে বিল মেটাবার জন্য দাঁড়াল।

    অমিয় প্রায় সরবত খাবার মতো চুমুক মেরে সবটা গলায়, মিনিটখানেক মুখ কুঁচকে রাখল। তারপর বলল দাঁড়া মৈত্র, আমি যাচ্ছি।

    —না। তুমি বরং আর একটু খাও শালা। বলে সে কাউন্টারে ইশারা করতেই আরও দু পেগ। অমিয় লোভ সামলাতে পারল না। পরের পয়সায় ইচ্ছে মতো মদ খেতে কি যে ভালো লাগে। মনে মনে সে মৈত্রকে জাহান্নামে পাঠালেও এখন খুব ভালবাসছে। মরুক গে, যেখানে খুশি যাক। সে এখানে বেশ আছে। বাকি দু পেগ, একটু সময় নিয়ে খাবে।

    মৈত্র ভাবল, যাক বাঁচা গেল! মেয়ে এবং মদ দিয়ে বসিয়ে দিতে পেরেছে। নতুবা সারাটা রাস্তা ভ্যানর ভ্যানর, এটা কি, ওটা কি—মেয়েটার প্রলোভনে অমিয় পড়ে গেছে। অমিয় মদ খেয়েই চলে যাবে সেখানে! তারপর খেলা আরম্ভ করবে। এবং সঙ্গে সঙ্গে মৈত্রের ফের কেন যে মদের নেশা পেয়ে গেল। ঠিক যেন জমেনি। তুমি অমিয় আমার ওপর টেক্কা দিতে চাইছ! সে ভাবল, খুব তাড়াতাড়ি যাওয়া দরকার! টাকাটা কাল পাঠালেও ক্ষতি হবে না শেফালীর। এবং মনে মনে ভাবল এক দুই করে কাঠের বল তুলে নেওয়া যাবে। চোখে যে ওর কি সব রঙীন ছবি ধরা পড়ছে এখন। এক দুই করে সব কাঠের রঙ্গীন বল ওর চোখের ওপর বেলুনের মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। সব বল সে যেন বাজীকরের মতো আকাশে এক দুই করে অদৃশ্য করে দিচ্ছে। এমন কি মেয়েটাকে পর্যন্ত। এমন

    সে দেখতে পাচ্ছে, চারপাশে বলগুলো নক্ষত্র হয়ে গেছে, এবং সে আর মেয়েটি আকাশের নিচে নক্ষত্রের পাশে দুটো মাছের মতো সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে। আহা, হরি ওঁম। বলে মৈত্র রাস্তাতেই একেবারে বেমালুম মাতালের মতো হাঁটতে হাঁটতে ঠিক জায়গায় পৌঁছে গেল। কখনও লাইনে দাঁড়িয়ে, কখনও রেলিঙে ভর দিয়ে, চুক চুক করে মদ খেল। সব নদ-নদীর জল মাথায় ছুঁইয়ে গেল যেন।

    মৈত্র বার বার পেছনের দিকে তাকাচ্ছে। না, অমিয় ওকে পেছনে ফলো করছে না। জিভ বেশ ভারি ভারি ঠেকছে। কিছু রোস্ট মাংস নিয়েছিল প্যাকেটে। সে প্যাকেট খুলে রোস্ট মাংস চিবুতে থাকল। নরম জিভে এক ধরনের স্বাদ, নরম মাংস কতদিন খাচ্ছে না। কত দীর্ঘদিন…সে ভয়ঙ্কর ভাবে নরম মাংসের জন্য দীর্ঘদিন পর এক…দুই…তিন, চার…পাঁচ…ছয়, সে দীর্ঘদিন পর ছয় থেকে বারোটা লাল নীল বল চোখের সামনে ভাসতে দেখল। কার্নিভেলের মেয়েটা যেন এখন ওর সামনে ফের বাউ করছে।

    তারপর ওর আর কিছুই মনে আসছিল না। শুধু লাল নীল বল, হলুদ রঙের কাঠের ট্রে, রুপোর স্টিক এবং মেয়েটির আশ্চর্য সরল হাসি অথবা দু হাঁটু ভাঁজ করে সামান্য নুয়ে বাউ, সে যেতে যেতে এসবই মনে করতে পারছে। সে রিঙের সামনে দাঁড়িয়ে গলায় টাই টেনে দিল। সে ভীষণ স্মার্ট হবার চেষ্টা করছে। সে মাথার টুপিটা আরও টেনে দিল মুখের কাছে। সব কাউন্টার থেকে সেই এক সরল হাসি, এখানে আসুন স্যার। আপনার জন্য আমরা নানারকম মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা রেখেছি। সে সব কিছু না শোনার চেষ্টা করছে। মাথার টুপিতে যতটা পারছে কপাল মুখ ঢেকে দিচ্ছে।

    তারপর সেই সরল অনাড়ম্বর হাসি। হাতে রুপোর স্টিক, এরেনার ভিতর হাতে চাবুকের মতো খেলা বেশ জমে উঠবে। মেয়েটি রুপোর স্টিক দিয়ে বল ঠেলে দিচ্ছে। মৈত্র সোজা বল তুলে নিল না। সে শুঁকে শুঁকে কি যেন টেবিলের চারপাশটা দেখছে। আসলে সে নুয়ে দেখছে। কোথায় কি রেখা অথবা ভাঁজ রয়েছে টেবিলের দাগগুলোর ভেতর সে যেন খুব ভালভাবে দেখছে। দেখলে মনে হবে, সে শুঁকে যাচ্ছে টেবিলের চারপাশটা।

    আর রূপোর স্টিকে মেয়েটি পায়চারি করতে করতে মাঝে মাঝে লাঠি ঘোরাচ্ছে। কেউ কেউ দোকানের সামনে পায়চারি করছে। ওরা তিন-চার দান হেরে যেতেই মুখ গোমড়া করে ফেলেছে। মেয়েটা পরেছে নীল রঙের ট্রাউজার। মনে হয় কোন নরম পাখির বুকের পালক দিয়ে সে তৈরি করেছে তার পোশাক। ওর পোশাকের ভেতর কি যে সব সুন্দর সব লতা-পাতা আঁকা ছবি। ওর পোশাকে আছে ভীষণ চাকচিক্য। মৈত্র এমন পোশাক জীবনেও যেন দেখেনি। হাতের কাছে ফুলের মতো গাউনের হাতা। ফুলে আছে। আর বুকের কাছে শরীরের সঙ্গে জামা সেঁটে আছে। স্তন এমন উঁচু করে রাখার কি যে দরকার! সে ভালভাবে তাকাতে পারছে না পর্যন্ত। মাথায় মেয়েটি আর টুপি পরেনি। চুলে বব্ ছাঁট। কোঁকড়ানো কালো চুলে নীল চোখে এক দুর্ধর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী। মৈত্র দান তুলে নিল।

    মেয়েটি ভেবেছিল সে খেলবে। কিন্তু আশ্চর্য, না খেলা না, প্যাসু গুনে গুনে দেওয়া। মৈত্র বরং বলগুলি নিয়ে তারের ওপর খেলা দেখানোর মতো বল হাওয়ায় ছুঁড়ে দিতে থাকল। আসলে মৈত্র জানে বেশি রাতে ওর খেলা জমবে। সে এখন যেন মেয়েটার বল ছুঁড়ে ছুঁড়ে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এখানে আসুন, খেলুন, খুব সহজ খেলা, আপনার যা দরকার লাগে নিয়ে যান। কেবল রিঙের মেয়েটি বাদে। এর জন্য আমি শেষ খেলা খেলব ভাবছি মশাইরা। সে ঘুরে ঘুরে বলের নানা ট্রিক্স—জ্যাবের ভিতর কানের ভাঁজে এবং মাথায় বল রেখে ব্যালেন্সের খেলা—এবং লোক জমে গেলেই, কিছু কিছু লোক খেলতে আরম্ভ করে দেয়। দিলে যা হয় নেশা লাগে। হারতে থাকে। টেবিলে প্যাসু গুনে শেষ করতে পারে না মেয়েটি।

    কে বলবে এখন মৈত্র এই রিঙের খদ্দের! সে কখনও মেয়েটাকে টাকা গুনে দিতে পর্যন্ত সাহায্য করছে! একা পেরে উঠছে না। সে মেয়েটার হয়ে রুপোর স্টিকে বল ঠেলে দিচ্ছে। ভিড় কমে গেলেই সে আবার রুপোর স্টিকের মাথায় বল রেখে ব্যালেন্সের খেলা আরম্ভ করে দেয় এবং এভাবে সে এই রিঙে একজন মজাদার মানুষ।

    মৈত্র থামের আড়াল থেকে কখনও কখনও মেয়েটিকে দেখছে। সে আর খেলা দেখাচ্ছে না। এই ভিড়টা কেটে গেলেই আরম্ভ করবে। কিন্তু মনে হল, কেউ যেতে চাইছে না। কেউ খেলছে, কেউ মজা দেখছে। এমন একটা রিং ছেড়ে কারো যেতে ইচ্ছে করছে না। অথচ অন্য রিঙগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে। কেবল এখানেই ভিড়। আচ্ছা মুশকিল হল। সে চারপাশে তাকিয়ে এবার এগিয়ে গেল। বল গড়িয়ে আসছে, আর সে ধরে ফেলছে। অর্থাৎ সে এবার খেলবে এবং ক্রমে ক্রমে বলগুলো ট্রে থেকে তুলে নিল। অর্থাৎ সে কাউকে আর খেলতে দিচ্ছে না। যাদের খেলে অভ্যাস যারা জানে মেয়েটির নানা রকমের বাহাদুরী, তারা মুচকি হাসছিল, বোকা জাহাজিটা মরবে। বেটা এক আজগুবী মানুষ।

    এবার মৈত্র এবং মেয়েটি। মৈত্র চুপচাপ খেলে যেতে থাকল। প্যাসগুলো ড্রয়ারে রেখে তালা মেরে দিল মেয়েটা। কারণ একা যখন এবং সামনে জাহাজি মানুষ, সে ঠিক ভরসা পাচ্ছে না। সে এখন রুপোর স্টিকে চিবুক রেখে মৈত্রের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে আছে। মানুষটা বিদেশী এবং জাহাজি মানুষ। জাঁহাজি মানুষকে পোশাকে ঠিক চেনা যায়। মানুষটা ভীষণ বেপরোয়া। একসঙ্গে অনেকগুলো প্যাসু বাজী রেখেছে। মরদের মতো খেলে যাচ্ছে। অথচ মুখে ভীষণ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ভাব মেয়েটির। যেন এমন সে কত খেলোয়াড়দের দেখে থাকে রোজ।

    রাত বাড়ছিল। ভেতরে ভেতরে মৈত্র মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর হেরে যাচ্ছে। এত হেরে গেলে রিঙেরও বদনাম। মেয়েটি জাহাজি মানুষটার ওপরে করুণা বশেও হয়তো রিঙের সব বল তুলে বড় একটা কাচের পাত্রে রেখে দিচ্ছে। কাচের পাত্রে তুলে দেওয়ার অর্থ আর না। একটু পর সব বন্ধ হয়ে যাবে। আর খেলা হবে না। এবার জাহাজে ফের।

    মৈত্র এবার ঝুঁকে দাঁড়াল। ইশারা করল। এবং হাতের পাঁচ আঙ্গুলে কিছু বোঝাতে চাইল।

    মেয়েটি বুঝল, পাঁচ প্যাসু! মেয়েটি ঠোঁট উল্টে দিল।

    মৈত্র আসলে আজও একগাদা প্যাসু হেরে গেছে। সে এই হেরে হেরে মেয়েটিকে জিতে নিতে চাইছে। সে পাঁচ আঙ্গুলে পঞ্চাশ প্যাসু বলতে চেয়েছে, মেয়েটি কি বুঝেছে কে জানে।

    মৈত্রের হাতে এখন আর কোনও বল নেই। সদরে যারা ব্যাণ্ড বাজাচ্ছে যারা ব্যাগ-পাইপ বাজাচ্ছিল এখন তারা পর্যন্ত বাজনা থামিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ এবার ছুটি। মেয়েটিও একসময় ওকে পাহারা রেখে বাক্সের সব প্যাসু ভেতরে কোথায় জমা দিয়ে এল। ঝাঁপ ফেলে দিচ্ছে। ডেনছিগোতে একজনও বসে এখন মদ খাচ্ছে না। কার্পেট তুলে ফেলা হচ্ছে। গোটা কার্নিভেল এখন ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেছে। কেমন নিঝুম। দু-একজন মাতাল পুরুষ অথবা রিঙের মেয়েরা বের হয়ে যাচ্ছে। ওদের দেখে মৈত্র আরও অস্থির হয়ে উঠছে।

    মৈত্র’ আর থাকতে পারল না। সে দশ আঙুলে, দেখাল, একশ। একশ প্যাসু দেব মেয়ে।

    মেয়েটি কোন কথা বলল না। সে মৈত্রের মুখের ওপর ঝাঁপ ফেলে দিল। এবং মৈত্রের দিকে সে আর ফিরে তাকাল না। হন হন করে সদর দরজার দিকে হাঁটতে থাকল। মৈত্র কেন জানি ডাকতে সাহস করল না। ওর চোখের ওপরে রাতের এমন সুন্দর নাইটিঙ্গেল পাখি অদৃশ্য হয়ে গেল। সে হায় হায় করে উঠল।

    .

    রবিবার সুতরাং সকলের ছুটি। ডেক এবং এনজিন জাহাজিদের কোন কাজ নেই। ডেক-ভাণ্ডারি এবং এনজিন-ভাণ্ডারির কেবল কাজ গ্যালিতে। মেসরুমবয় এবং মেটদেরও কাজ থাকে। স্টুয়ার্ড ইকবাল সাহেব ভোরে উঠেই চিফ কুক এবং ভাণ্ডারিদের রসদ দিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং তিনিও প্রায় ছুটি উপভোগ করছিলেন। অফিসার এনজিনিয়াররা ছুটির দিন বলে বেশ রাত করে জাহাজে ফিরেছে। ওরা এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি।

    ভোরের দিকে ছোটবাবু একবার উঠেছিল। কি ঘন কুয়াশা চারপাশে! কুয়াশার জন্য কিছু দেখা যাচ্ছে না। সে কুয়াশা এবং শীতের জন্য ফের এসে শুয়ে পড়েছে। মৈত্র জেগেছিল। সে খুটখাট শব্দ হতেই কম্বল সরাল মুখের। অমিয় এখনও ঘুমোচ্ছে। ওকে ডাকতে সাহস হচ্ছিল না। কাল কিনারায় সে শেষ পর্যন্ত কি কাণ্ড করে ফিরেছে কে জানে। ছোটবাবু হয়তো ফের নাক ডাকিয়ে ঘুমোবার জন্য কম্বলের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে।

    অথচ একটু চা না খেলে হচ্ছে না। কাজের কোন তাড়া নেই। যতক্ষণ পারা যায় শুয়ে থাকা। আলস্য সারা শরীরে। এবং এ জন্যই যত হিজিবিজি চিন্তা থেকে রক্ষা পাবার জন্য ডাকল, এই ছোটবাবু।

    কম্বলের ভেতর থেকে জবাব এল—হুঁ

    —একটু চা খাওয়াবি?

    —খুব ঠাণ্ডা ওপরে। কুয়াশা। কিছু দেখা যাচ্ছে না।

    মৈত্র বুঝতে পারল ছোটবাবু কিছুতেই এখন উঠতে চাইছে না। এত শীতে সহজে কেউ উঠতে চায় না। কিন্তু ওকে উঠতে হবে। সে আর শুয়ে থাকতে পারবে না। তাকে একবার বাথরুমে যেতে হবে। শেফালী নানাভাবে সারারাত বিব্রত করেছে। রাতে ওর ভাল ঘুম হয়নি। সকালে শেফালীর কথা ভেবে ভীষণ মায়া হচ্ছিল। শেফালীকে কাল বিকেলে একেবারে ভুলে গিয়েছিল। কাল রাতে এবং মধ্য রাতে, অন্তত স্বপ্নটার আগে পর্যন্ত শেফালীর কথা মনে করতে পারেনি। ভোর রাতে ঘুমের ভেতর প্রথম একটা অপরিচিত মুখ, ঠিক কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকলে যেমন লাগে, তেমনি শেফালী দাঁড়িয়েছিল। সে প্রথম বুঝতে পারেনি শেফালী। পরে যেন মনে হয়েছে চেনা চেনা। তারপরই যখন চোখ তুলে তাকাল, একেবারে শেফালী। বিমলবাবুর ভালবাসার স্ত্রী শেফালী। শুভেন্দু মৈত্রের কিডন্যাপ করা বৌ। বিমলবাবু যে বৌর ওপর অধিকার ছেড়ে দিয়ে ভেবেছিল, বাঁচা গেল। যা উত্তাপ মেয়ের বিমলবাবুর পক্ষে বোধ হয় সামলানো কঠিন ছিল বৌকে।

    ভেতর বাইরে কোথাও তেমন সোরগোল নেই। কাজের জন্য কোনো কিনারার লোক ডেকে উঠে আসেনি। ফল্কায় কাজ হচ্ছে না। কাঠের পাটাতনে ঢাকা। সকালে বড়-মালোম আর কাপ্তান নিচে নেমে গেছে। ওরা যাবে গীর্জায়। বাথরুম থেকে ফিরে এলে, শরীর খুব ঝরঝরে এবং হাল্কা মনে হচ্ছে। ওর ইচ্ছা হচ্ছিল, এখন চুপচাপ এক কাপ চা খায়। এ সময় সামান্য ধূপের গন্ধ থাকলে যেন ভাল হত। ফুলের গন্ধ অথবা চন্দনের সৌরভ হলে যেন মন্দ হয় না। রাতে সব পাপ কাজের কথা সে ভুলে যেতে পারত। রাতের শেষে জলের নিচে, নীল স্ফটিক জলে সে তবে হয়তো আর শেফালীকে বিশ্রীভাবে শুয়ে থাকতে দেখত না।

    সে নিজেই চা করে আনল। ছোটবাবু এবং অমিয়কে ডেকে চা দিল। ওদের জড়ানো চোখ। কোনরকমে চা খেয়েই আবার কম্বলের নিচে। যেন ওরা এমন সুখ সহজে হাতছাড়া করবে না। চা খেতে খেতে কেন যে গত সফরের সেই মেয়ে, এলসা দ্য কেলি, ওর মা স্যালেস দ্য কেলি, সেই মামাবাবু ক্যাপ্টেন ফ্রগের কথা মনে পড়ছে। দুপুরের দিকে কোথাও বের হয়ে পড়তে হবে। বের হতে না পারলেই সেই গোলকধাঁধা। সে বুঝতে পারছে, কিছুতেই আর জাহাজে সে থাকতে পারছে না।

    এবং এভাবে সে ভাবল, যদি বিকেলের দিকে ছোটবাবুকে নিয়ে বের হওয়া যায়। ছোটবাবুর ভেতর কেমন একটা সরল অনাড়ম্বর জীবনযাপন আছে, যা মুগ্ধ করে বিস্মিত করে। সে পাশে থাকলে বোধহয় সাহস পাবে। সুতরাং অমিয়কে সঙ্গে না নিয়ে বরং সে ছোটবাবুকে সঙ্গে নিয়ে বের হবে। ছোটবাবু মেজ-মালোমের সঙ্গে বের হতে পারে। সে চা খেতে খেতে বলল, আমার সঙ্গে এক জায়গায় যাবি ছোট!

    —কোথায়!

    —সে আছে, তোকে নিয়ে যাব। খারাপ জায়গা না। তোকে এলসা দ্যর কথা বলিনি! ওদের ওখানে যাব।

    কম্বলের নিচে অমিয় মিউ মিউ গলায় বলছে, আমিও যাব।

    —না, তোমাকে নেব না!

    —না নিলেও যাব। আমি যাব কিন্তু বলছি।

    —আচ্ছা ঝামেলা হল দেখছি!

    ছোটবাবু বলল, চলুক না মৈত্রদা। ও আবার একা ঘুরে বেড়াবে কোথায়!

    যেন মৈত্রকে রাগিয়ে দেবার জন্য কম্বলের ভেতর থেকেই জিজ্ঞাসা করল অমিয়—কিরে টাকা পাঠালি?

    —তোমাকে বলব কেন? আমার পার্সোনাল ব্যাপারে ঝুট ঝামেলা করবে না।

    এত শীতে ওরা আর ঘুমোতে পারছে না। দুজনই উঠে বসেছে। ছোটবাবু মুখটা শুধু বের করে রেখেছে। অমিয় তাও না। সে বসে আছে সব ঢেকে। এমন কি মুখে ঠান্ডা লাগার ভয়ে সে ঘোমটার মতো কম্বল মুখের ওপর ফেলে দিয়েছে। মৈত্রও বাংকে বসে পড়ল। টাকা পাঠাতে পারেনি, আজ ঠিক পাঠাবে। এলসা দ্য কেলির বাড়ি হয়ে বিকেলে চলে যাবে ঠিক জায়গায়। অমিয় থাকলে প্রলোভনে পড়ে যেতে পারে।

    ছোট বলল, তুমি তো সবই বল।

    —তা বলি।

    —তবে আর না বলে থাকছ কেন?

    —না, পাঠাই নি।

    অমিয় বলল, তাড়াতাড়ি পাঠা।

    —সে আমি বুঝব।

    এবং এভাবে ওরা ঠিক দুপুরে বের হয়ে গেল। ওরা জেটি ধরে হেঁটে গেল। এরা ভারতবর্ষের মানুষ, এদের দেখলেই কেউ কেউ ভারতবর্ষের মানুষ বলে চিনতে পারে। ওরা যে, শীত-কাতুরে ভীষণ, তাও বুঝতে পারে। কারণ সকালটা এত কুয়াশা আর ঠান্ডা ছিল হাত-পা কেউ গরম রাখতে পারে নি। দুপুরের দিকে কুয়াশা কেটে গেলে যা হয়, রোদ, মনোরম রোদ, রোদের ভেতর হেঁটে যাচ্ছে, হাল্কা মসলিনের মতো রোদ। ওরা তার ভেতরে হেঁটে যাচ্ছে অথচ শরীরে ওভারকোট, হাতে দস্তানা, মাথায় মাংকি ক্যাপ, যেন ওরা বরফের দেশে এসে গেছে। এখন তো এখানে শীত চলে যাবার সময়। বরং এদেশে এখন বসন্তকাল পড়বে। ওরা এমন ঢেকে-ঢুকে হেঁটে গেলে, কেউ কেউ হেসে ফেলে। আর তখনই বুঝতে পারে, ওরা ভারতবর্ষের মানুষ, একটু ওরা শীতকাতুরে। ওদের ক্ষমা করে দেওয়া চলে।

    কেউ হেসে ফেললে, মৈত্র হাতজোড় করে ক্ষমা চায়। তখন রাস্তার লোকজন ওদের দেখার জন্য ভিড় করতে থাকে। সে তাদেরও হাত জোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করছে। কেউ বুঝি ঠিক ঠিক বুঝতে পারে না। অমিয় তখন সুযোগ বুঝে আবোল-তাবোল অশ্লীল বাংলা কথাবার্তা যা মুখে আসে বলে যায়। ছোটবাবুর এসব শুনলে কান গরম হবার কথা। কিন্তু এখন কেমন সহ্য হয়ে গেছে। অমিয় অনেকের নামকরণ পর্যন্ত করে ফেলেছে। যেমন বড় মিস্ত্রির কথা উঠলেই অমিয় বলবে, শালা মগরবাজ আজও দেখলাম ঠিক নাগর সেজে চলে গেল রে মাইরি। মেয়েটার কি যে অল্প বয়স!

    সুতরাং এভাবে ছোটবাবু আনন্দই পায়। বিশেষ করে এই যে অচেনা শহর, মানুষজন, তাদের কথাবার্তায় সে নানাভাবে মজা পায়। সে জানে না তখন তার ভেতরে আছে এক প্রচন্ড দুঃখ। নিশিদিন সে দুঃখ সুপ্ত থাকে ভেতরে। ছোটবাবু সেজন্য কখনও খুব উচ্ছল হতে পারে না। ভেতরে উচ্ছাস থাকলে সেও বোধহয় গলা মিলিয়ে বাংলা অশ্লীল সব কথাবার্তা বলে মজা করতে পারত। কিন্তু সে পারে না।

    মৈত্র যেতে যেতে এক সময় বলল, এদেশের মেয়েরা দেখতে আশ্চর্য সুন্দর। অমিয় বলল, সে তো জাহাজেই টের পাচ্ছি।

    —বোধহয় পৃথিবীর আর কোথাও এমন সুন্দর যুবতী দেখতে পাবে না।

    —তা জানি না। ছোট বলল।

    —না পাবে না। এমন রঙ, এমন চোখ, এমন চুল পৃথিবীতে আর আছে বলে আমি জানি না।

    —হবে হয় ত।

    —এলসা ছিল, এদের ভেতর রাজকন্যা।

    —তাই বুঝি।

    —শালা ব্যানার্জী, এই ঠিক তোর স্বভাবের মতো ছিল রে, শালা কোথাকার এক অপোগন্ড, তাকে কিনা এদেশের এমন সুন্দর ‘মেয়েটা ভালবেসে ফেলল।

    —ভালবাসার কথা কেউ বলতে পারে না। কখন কিভাবে যে সব হয়ে যায়।

    —হেলেন অফ ট্রয়! মেয়েটাকে আমি পৃথিবীর ট্রয় নগরীর হেলেন ভেবে থাকি। সে প্রায় দু হাত তুলে বলে উঠল, হার মিরাকল ফেস চার্মস্ মি। .

    —তা হলে চল দেখা যাক তোমার হেলেনকে। অমিয় বলল, দ্যাখো আমার সঙ্গে ভিড়িয়ে দিতে পার কিনা। তবে আমি ঠিক এখানে থেকে যাব। পৃথিবীর আর কোথাও গিয়ে আমার কাজ নেই, ট্রয় নগরীর হেলেনকে নিয়ে শুধু ঘুরব। কাজ করতে আমার বয়ে গেছে!

    —কি আজেবাজে বকিস না।

    এই হচ্ছে মৈত্রের স্বভাব। কখন যে সে খুব ভালো মানুষ হয়ে যায় বোঝা যায় না। এলসাকে নিয়ে মৈত্র কোন ঠাট্টা পছন্দ করছে না। এলসা ওর আত্মীয়র কাছাকাছি যেন। সে শেষে বলল, আয়। লেন্দ্রো এলেন থাউজেন্ড টু। এই নম্বর। সে তার ডাইরি থেকে নম্বর টুকে এনেছিল। যেতে যেতে বাড়ির গায়ে নম্বর মিলিয়ে দেখছে। সে এই শহরের সব কেমন গোলমাল করে ফেলছে। এতবার এসেও ঠিক মনে রাখতে পারছে না। সব বাড়িঘর দেখতে এক রকমের, রাস্তা এক রকমের, সোজা একেবারে ছককাটা। একটা বাড়ির সঙ্গে অন্য বাড়ির কোন অমিল নেই এদিকটায়।

    মৈত্র জাহাজেই এলসার নানারকমের গল্প ছোটবাবুকে বলেছে। ছোটবাবুর তখন মনে হয় সব বন্দরের ছোটখাট ঘটনা মৈত্র জানে। এবং সে প্রায় ঐতিহাসিকের মতো। যা জানে বলে যায়, বন্দরের বিধি-নিষেধ সে সব জানে। ঘুরে বেড়াও ক্ষতি নেই, ফুল কেন ক্ষতি নেই কিন্তু আর বেশিদুর যাওয়া ঠিক না। আর যারা জাহাজি ওরা বলবে যদি বন্দরে মেয়েমানুষই না পেলে তবে কেন যে জাহাজি হওয়া। এমন সব নিয়মকানুন চলতি আছে জাহাজে। আর যেহেতু মৈত্র ওদের প্রায় গার্জিয়ানের মতো বন্ধুর মতো, তার কথা নানাকারণে রাখতে হয়। ওরা হাঁটতে হাঁটতে মৈত্রের কথামতো রাস্তাঘাট পার হয়ে যাচ্ছে।

    মৈত্র যেতে যেতে বলল, এই শোন তোরা আবার ওকে বলিস না, ব্যানার্জী বিয়ে করেছে। ব্যানার্জী শিক্ষকতা করছে। তোদের তো বলতে কিছু আটকায় না। আর দেখবি, এলসা কি সুন্দর ইংরেজি বলে। ও হল ইতালির মেয়ে। বাবা ওয়েলসের। ভদ্রলোক এখানে তেলের ব্যবসা করতে এসে কার- এ্যাকসিডেন্টে মারা যান। আর শোন, যাচ্ছি যখন, একটু কেনাকাটা দরকার।

    অমিয় সেই যে চুপ করেছে, আর একটি কথাও বলছে না। সামনের সেই টাওয়ারের ঘড়িতে দুটো বাজার শব্দ। মৈত্রের বুকটা ধ্বক করে উঠল। পাশেই যেন কেউ বিউগিল বাজাচ্ছে আর যেন ক্যারাভেন যায়, নানা রকমের উটের মুখ বোধ হয় সদর দরজায় টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। মৈত্র এসব ভুলে থাকার জন্য একটা ফুলের দোকানে ঢুকে কিছু ফুল কিনে ফেলল। সেলেস দ্যর জন্য কিছু ফল। আর সে জাহাজ থেকে নেমে আসার সময় দু-প্যাকেট ক্যাপস্টেন সিগারেট নিয়েছে। মামাবাবু এ- সিগারেট খুব পছন্দ করেন। এখানে ভালো টোবাকো পাওয়া যায় না। দু-প্যাকেট ক্যাপস্টেন পেলে কি যে খুশী হবে!

    মৈত্রের সব জানা বলে, সে যেতে যেতে বলল, এটাই ফ্লোরিদার সব চেয়ে বড় বাড়ি। তুই এখানে ঢুকলে আমাদের এমব্যাসি-হাউজ দেখতে পাবি। পাশে একটা বড় রেস্তোঁরা আছে। মাঝ ভাজা পাওয়া যায়। অলিভ-অয়েলে রান্না। খেতে খারাপ লাগবে না। কতদিন মাছ খাই না। ওরা তিনজন সময় কাটাবার জন্য বসে চা খেল। এখানে এসেই কেন জানি মৈত্রের মনে হয়েছে, ওরা খুব তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। একটু পরে না গেলে ঠিক হবে না। ওরা চা খেল, মাছ-ভাজা খেল। মেয়েদের সঙ্গে আড্ডা জমাতে চাইল। একটা কথাও বুঝছে না বলে, অমিয় ধুস্ শালা বলে ওঠে পড়ল।

    বের হতেই মনে হল শহরময় বড় গন্ডগোল আরম্ভ হয়ে গেছে। মানুষজন ছুটোছুটি করছে। যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে। কিছু স্টেনগানের শব্দ। পুলিশ এবং কিছু মিলিটারি ঘুরে গেল। ওরা এ- দেশের মানুষদের মতো ঠিক কোনও গলি-ঘুঁজি খুঁজে পেল না। দোকানের ভেতর ঢুকতে গিয়ে দেখল, সব ঝুপঝাপ সাটার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জানালা-দরজা সব বন্ধ। ওরা এবার এলোপাথারি ছুটতে গিয়ে বুঝতে পারল, ঠিক হবে না। ওরা একটা বড় ক্যামাও গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পড়ল। গাছটার চারপাশে নাবালকের মতো ঘুরে মরার সময় মনে হল, সব আবার ঠান্ডা। গাড়ি ঘোড়া চলছে, কেন এটা হল বুঝতে পারছে না। একটা মানুষের খোঁজে কারা এসে ফিরে গেছে। ধরতে পারেনি। পাশের এক বৃদ্ধা ওদের ক্যামাও গাছের চারপাশে ঘুরতে দেখে হেসে ফেলল। বলল, স্পষ্ট ইংরেজিতে বলল, তোমাদের কিছু হবে না বাছা। তোমরা ঘোরাফেরা কর, ময়ফেল কর। তারপর নিজে কেমন বিড় বিড় করে বকতে থাকল, পেরণ সরকারের পতনের পরই এমন আকছার ঘটনা ঘটছে।

    ওরা এখনও হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে কেরিয়েম্বুজ পার হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে আপেলের গাছ, চেরিফলের গাছ। কিছু আঙুরলতা দেয়ালের ওপর। আর সদর দরজায় তেমনি সেই বড় টিউলি প গাছটি আছে। ওরা সহসা গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে পড়ল।

    টিউলিপ গাছটায় তেমনি ফুল ফুটে আছে। পাশে পাথরে নানাবর্ণের অর্কিডের ছড়াছড়ি। কিছু ফুলের চাষ লনে, পাশে গোলাপের বাগান। বড় বড় বেগুনি রঙের লাল রঙের গোলাপ ফুটে আছে। আর লনে সব ডেইজি ফুল, ফুটে আছে। হলুদ রঙের ছোট ছোট ফুল, এবং কেউ যেন জানালায় এখন চাঁদমালার মতো গুচ্ছ গুচ্ছ সান-ফ্লাওয়ার টাঙিয়ে দিয়ে গেছে। এমন সুন্দর টিপটপ সাজানো বাড়ি, অথচ জানালা বন্ধ, দরজা বন্ধ, কেউ নেই। ওরা কি কোথাও শীতের ছুটিতে চলে গেছে? জানালায় পারসিমন লতা ঝুলছে। এতটুকু ধুলো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন নয়। যেন কেউ এখুনি দরজা বন্ধ করে বাইরে গেছে।

    মৈত্র বলল, রোজই এসে দেখতাম, ব্যানার্জী এবং এলসা এখানে বসে রয়েছে। ব্যানার্জী নানা রকমের গল্প বলছে। সবই আমাদের দেশের গল্প। ও যে কত জানত। ভাল ইংরেজি বলতে পারত ব্যানার্জী। কলেজে পড়েছে। তোর চেয়ে বয়সে বড় ছেলেটা। বেশ কিন্তু ছিল তবে খুব ভীতু। না হলে এলসাকে ফেলে এ-ভাবে কেউ চলে যায়! তারপর সে একটু হেসে বলল, আসলে ও হারামজাদা একটা অমানুষ। আমরা অমানুষ লেখাপড়া না শিখে, ও-শালা অমানুষ লেখাপড়া শিখে।

    একসময় মৈত্র বলল, চারপাশে নানারকমের ঘটনা ঘটছে, হয়তো সেজন্য দরজা-জানালা সব বন্ধ। সে এবার দরজায় দাঁড়িয়ে বেল টিপল। বেশ শব্দ হচ্ছে। বাজছে বেলটা। কিন্তু কেউ এসে দরজা খুলে দিচ্ছে না।

    কোন সাড়া পেল না মৈত্র। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ভেতরে ওরা কোন আলো জ্বলতে দেখল না। ওরা কি তবে শহর ছেড়ে চলে গেছে। সেলেস দ্য ক্যালি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপিকা। সেবারে ব্যানার্জি দরজাতেই পথ হারিয়ে অনেক রাত অবধি অপেক্ষা করেছিল। ভোর হলে পুলিশের শরণাপন্ন হবে, এমন একটা ভাবনা মনে মনে। সে সদর দরজার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল, যেমন একজন মাতাল মানুষ অথবা বাজ-পড়া মানুষ মরে যাবার পরও দাঁড়িয়ে থাকে, ঠিক তেমনি সে একজন প্রায় চেতনাহীন মানুষ, সকাল না হলে সে এখান থেকে নড়বে না ভেবেছিল। ঠায় দাঁড়িয়ে একটা লাঠিতে ভর করে রাত কাটাবে ভেবেছিল। শহর ঘুরতে বের হয়ে ওর এমন বিপাক। সে জানত না স্পেনীশ না জানলে, শহরে এমন বিপাকে পড়তে হয়।

    তারপর মৈত্র শার্শির ভেতর দিয়ে উঁকি দেবার চেষ্টা করল। না কিছু দেখা যাচ্ছে না। সে বলল, ভাগ্যিস এই দরজা দিয়ে সেলেস দ্য ক্যালী বাড়িতে ফিরছিলেন। দরজায় একজন মানুষ! কপালে টুপি নামানো। প্রথম তিনি ভেবেছিলেন মাতাল মানুষ। এ-ভাবে মানুষেরা শহরের রাস্তায় চুপ চাপ দাঁড়িয়ে থাকে কখনও! তিনি প্রথম ওকে স্পেনীশ ভাষায় কিছু জিজ্ঞাসা করেছিলেন। কিন্তু কোন উত্তর না পেলে ইংরেজিতে। ব্যানার্জী ইয়াংকি কিনা তাও।

    না এখনও কেউ আসছে না। এ-ভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকাও খারাপ দেখাচ্ছে। সে যেন কথা প্রসঙ্গে আবার সব বলে যেতে থাকল, সে-রাতে ব্যানার্জীকে সরষে ফুল দেখতে হত। সেলেস দ্য ক্যালীর এমন কথা তার কাছে প্রায় তখন ঈশ্বরের সামিল। সে বলেছিল, মাদাম আমি ইয়াংকি নই। মাদাম আমি মাতাল নই। আমাকে ভয় পাবার কিছু নেই। আমি জাহাজি, ভারতীয়। শহর দেখতে বের হয়ে পথ হারিয়েছি।

    অমিয় বলল, একেবারে নবকুমার দেখছি।

    —প্ৰায় তাই।

    এখন মনে হয় ঘরের ভিতরে কেউ পায়চারি করছে।

    দরজা খুললে মৈত্র বলল, গুড ইভিনিং মাদাম

    তিনি কিছু বললেন না। তারপর যেন কি ভেবে বললেন, গুড-ইভিনিং। আপনারা…….।

    —চিনতে পারলেন না মাদাম! আমি মৈত্র।

    —মৈত্র! অনেকক্ষণ পর যেন বুঝতে পারলেন। আবার এসেছ!

    —হ্যাঁ, মাদাম। আবার এসেছি।

    তারপর মৈত্র তাঁর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল, এ অমিয় আর এ ছোটবাবু। গত সফরের ব্যানার্জীর মতো এক ফোকসালে আমরা থাকি।

    এলসাকে দেখা যাচ্ছে না। এ-সময় সে বাড়ি নাও থাকতে পারে। তবু উঁকি ঝুঁকি মারল সে। সেলেস দ্য বুঝতে পেরে বললেন, সে নেই। তারপর বললেন, এস ভেতরে। আকাশ ক’দিন থেকে বেশ পরিষ্কার কি বল?

    –তা ঠিক।

    –তোমরা আসবে বলেই হয়ত, বলে তিনি সামান্য হাসলেন।

    মৈত্র লক্ষ্য করছে, সেলেস দ্য কেমন বুড়ি হয়ে গেছেন। মামাবাবু নেই। তার কুকুর নেই। এলসা মামাবাবুর সঙ্গে কোথাও যেতে পারে। যেন এখানে এলসা না থাকলে আসার কোন মানে হয় না। কিন্তু এলসা সম্পর্কে সেলেস দ্য আর কিছু বলছে না।

    মৈত্র এবার বসতে বসতে অন্য কথা পাড়ল। বলল, ক্যাপ্টেন সাবকে দেখছি না। ওর কুকুরটা। তিনি থাকলে দেখতে ছোটবাবু যুদ্ধের গল্প খুব জমে উঠত। মামাবাবু যুদ্ধ ছাড়া কিছু বোঝেন না।

    সে এখন এভিতাতে আছে। সমুদ্রের ধারে তাঁবু বানিয়ে নিয়েছে। বেশ আছে।

    —কি করছেন এখন?

    —কিছুই না। সারাদিন কুকুর মেজিকে নিয়ে সমুদ্রের ধারে ছুটে বেড়ায়। সারা দুপুর সমুদ্রের নিচে ডুবুরিদের সঙ্গে সাঁতার কাটে। হাতে ওর একটা বর্শা থাকে। ম্যাকরল মাছ মেরে খেতে খুব ভালবাসে। সে এখন কুকুর বাদে কিছু জানে না। মেজির জন্য সে এ-শহর ছেড়ে চলে গেছে।

    ছোটবাবু বলল, মেজির বুঝি শহর ভাল লাগছিল না?

    —না। শহরে সে ভালভাবে ছুটতে পারে না। ফাঁকা জায়গা না হলে আয়াস পায় না মেজি। তাছাড়া একটি লোককে মেজি কামড়ে দিয়েছিল। ফ্রক ফাইন দিয়েছে। তা ছাড়া সরকার পক্ষের উকিল গুলি করে মারার জন্য সওয়াল পর্যন্ত করেছিল।

    —তাই বুঝি। অমিয় খুব সহজভাবে বলল। আর অমিয় এবং মৈত্র কি ভদ্র এখন। অশ্লীল কথাবার্তা বলতে পারে মুখ দেখে এখন তা বিশ্বাসই হয় না।

    —ওর ভীষণ ভয়, মেজিকে কেউ একদিন না একদিন ঠিক গুলি করবে। সে শেষ পর্যন্ত সব ছেড়েছুড়ে চলে গেল।

    মৈত্র যাকে খুঁজছে, তাকে দেখতে পাচ্ছে না। সেলেস দ্যকে খুব বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। ফ্রক এখানে নেই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মানুষটা জার্মানির হয়ে লড়েছেন। কত রকমের নিষ্ঠুর মৃত্যুর গল্প যে করেছেন, করতে করতে হেসেছেন। মৃত্যুর জন্য, ধ্বংসের জন্য ওঁর কোন দুঃখ ছিল না। তিনি এখন একটা কুকুরের প্রাণ বাঁচাতে সমুদ্রতীরে বনবাসে চলে গেছেন। মানুষের মাঝে মাঝে কি যে হয়?

    ঘরে নীল রঙের কার্পেট পাতা। সবুজ, হলুদ, লাল সব কৃত্রিম ফুলের যেন ছড়াছড়ি কার্পেটে। দেয়ালে সাদা রঙ, কিছু ছবি। এলসার ছবি নেই। এ-ঘরে আগে মৈত্র এলে এলসার একটা বড় ছবি দেখতে পেত। এলসার হাতে টেনিস র‍্যাকেট। সে ছুটে গিয়ে বল মারছে এমন একটা ভঙ্গিতে তোলা ছিল ছবিটা। এত সুন্দর ছবিটাও এ ঘরে নেই। কেবল যীশুর একটা কাঠের মূর্তি। আর কোণে সবুজ বাতিদান। ফুলদানিতে কেউ ফুল তুলে রাখেনি। বোঝাই যায় এ-পরিবারে কোথাও একটা বড় রকমের ঝড় গেছে। সেলেস দ্য সেই ঝড় নিয়ে বেঁচে আছেন।

    সেলেস দ্য এক সময় এভিতাতে কি করে যাওয়া যায় তার সবরকমের পথঘাট বলে দিলেন মৈত্রকে।

    ছোটবাবু এলসার কথা ভাবছিল। ঘরের ভেতর কেমন একটা বিদেশী গন্ধ। অমিয় উসখুশ করছে। এমন একটা ছুটির দিনে, এ-ভাবে বসে থাকতে তার ভাল লাগে না। কেমন একটুতেই একঘেয়ে। কেন যে এ-ভাবে আসা! সেলেস দ্য ছোটবাবুকে বললেন, কেমন লাগছে আমাদের শহরটা।

    —খুব সুন্দর। ছিমছাম। আমার তো খুব ভাল লাগে হেঁটে বেড়াতে। কিন্তু কেউ এখানে ইংরেজি বোঝে না। পথ হারাব ভেবেই খুব বেশি দূর যেতে পারি না।

    এ-সব কথাও তেমন জমছে না। একটু কফি করতে সেলেস দ্য ভেতরে গেছেন। তখন অমিয় বলল, এই ওঠ। আমার ভাল লাগছে না।

    ছোটবাবু বলল, এলসা থাকলে আমাদের খুব ভাল লাগত।

    মৈত্র বলল, মনে হয় কোথাও গেছে। ঠিক এসে যাবে। এলসা মাকে বাদে থাকতে পারে না।

    অমিয় যেন কেমন ক্ষেপে গেল—দেখছিস বুড়ি খুব সেয়ানা। মেয়ের কথা কিছু বলছে না।

    —বেশি বললে ভাবতে পারে, এলসাকে আমাদের খুব দরকার। তিনি খারাপ ভাবতে পারেন।

    অমিয় বলল, এ-দেশের মেয়েরা ভাল কবে। ব্যানার্জী যাবার সময়, তুমি বিহনে প্রাণ বাঁচে না আমার, আর চলে গেলেই নটে গাছটি মুড়ল, আমার গল্প ফুরোল

    মৈত্র বলল, এই আসছে!

    অমিয় হেসে দিল, বলল, সেলেস দ্য বাংলা জানেন বুঝি।

    —এটা অসভ্যতা। তুই যখন ইংরেজি জানিস, যখন আমরাও মোটামুটি জানি, তখন ওঁর সামনে বাংলা বলা অভদ্রতা।

    এই প্রৌঢ়ার সঙ্গে গল্প করতে মৈত্রেরও খুব একটা ভাল লাগছে না। মৈত্র এ-সব দেশগুলোতে ঘুরে বেশ একটা নিজের মতো স্বভাব গড়ে তুলেছে। সে এখন সেলেস দ্যকে সাহায্য করছে কাজে। মৈত্রকে দেখে মনে হয় সে যেন এ-পরিপারের কেউ। তাকে কিছুতেই আর ভাবা যায় না, সে কখনও কোন জুয়ার রিঙে দাঁড়িয়ে আঙ্গুল ফাঁক করে বলতে পারে, পঞ্চাশ অথবা একশ।

    সেলেস দ্য বললেন, রাস্তায় গন্ডগোল দেখে দরজা জানালা বন্ধ করে রেখেছিলাম। একটা লোককে কারা খুঁজে বেড়াচ্ছে। কে যে সে! তার কি নাম আমরা জানি না। তার একটা নাম আইখম্যান। শোনা যায় ওটা নাকি মানুষটার ছদ্মনাম। আসল নাম কেউ জানে না।

    –সে কে!

    সে অনেক কিছু ছিল। তার নিষ্ঠুরতার শেষ ছিল না। সে এ-দেশে পালিয়ে আছে, কি করে যে এ-সব খবর রটে যায়! সে এখানে আসবেই বা কেন!

    —তা ঠিক।

    —কি করত?

    —যুদ্ধের সময় কনসেনট্রেশন ক্যামপে ইহুদীদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করত।

    —ভয়ঙ্কর!

    —হুঁ। ভয়ঙ্কর। বলেই সেলেস দ্য খ্রীষ্টের ছবিটা দেখলেন।

    ওরা প্রত্যেকেই এখন বেশ আগ্রহ নিয়ে শুনছিল। এবং মাঝে মাঝে জুতোর শব্দ অথবা কোন শব্দ শুনলে দরজার দিকে তাকাচ্ছে, না কেউ না। একটা পাতা পড়ার শব্দ, না কেউ না, বোধহয় ও-পাশের সিঁড়িতে কোন ভাড়াটে মানুষ উঠে যাচ্ছে। ছোটবাবু ঠিক বুঝতে পারে না, এলসাকে দেখার এমন আগ্রহ কেন। যেন ওরা ওকে দেখে না গেলে প্রায় ট্রয়ের হেলেনকে দেখার সুযোগ হারাবে। মৈত্র সুন্দরীদের সম্পর্কে বড় বেশি খুঁতখুঁতে স্বভাবের। তার মুখে এসব কথা, সুতরাং ওরা ভাবছিল, সেই মহিমময়ী এসে গেলে চারপাশের যত কিছু সহসা ফুলে ফলে ভরে যাবে। আর এমন একটা লোভে পড়ে গিয়ে কেউ উঠতে পারছে না।

    কফি অথবা খাবার, কিছুই ভাল লাগছে না। সেলেস দ্য ভীষণভাবে ওদের জাহাজ, ওরা তারপর কোথায় যাচ্ছে, ওরা বাড়িতে মাকে চিঠি লেখে কিনা, আর কে কে আছে, এ-সব জানতে চাইছেন। এবং এ-জন্য প্রশ্নের পর প্রশ্ন

    কিন্তু এ-সবের জন্য ওরা এখানে আসেনি। ওরা এসেছে এলসার জন্য। যে প্রতিদিন জাহাজঘাটায় ওর ছোট্ট বেবিমোটর নিয়ে অপেক্ষা করত। কি যে ছিল ব্যানার্জীর, কি যে ছিল ব্যানার্জীর চোখে! অনেক রাতে জাহাজে পৌঁছে দিয়েছিলেন সেলেস দ্য। পরদিন মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন খোঁজ নিতে, সে কেমন আছে। ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে শীতে অসুখে পড়ে যেতে পারে। বিকেলে ব্যানার্জী দেখেছিল একটি মেয়ে, চুল তার কবেকার……..কি যেন গাছের ছায়ায় দাঁড়ানো একটা মেয়ে, ভারি সুন্দর, ভারি লম্বা, ভারি হাসি-খুশি। তাকে সে খুঁজতে এসেছে। সে আছে, ভালই আছে, এবং সে নিচে নেমে গেলে বলেছিল, তুমি কোনদিকে যাবে? ব্যানার্জী বলেছিল, কোথাও না। আবার হারালে, কে আমাকে পৌঁছে দেবে।

    এলসা বলেছিল, আমি।

    এ-সব গল্প মৈত্র বলেছিল। অমিয় শুনে বলেছিল, কিছুটা গানের সুরে, এলসা আহা, আমরা হারিয়ে গেলে পৌঁছে দেবে না। আমি বার বার হারিয়ে যাব।

    সেলেস দ্য দুটো প্লেট আনতে গেলে অমিয় প্রায় গানের সুরে হাত তুলে গুনগুন করে গেয়েছিল—বার বার হারিয়ে যাব।

    —অমিয় তুই একটা জংলি

    —তা তুমি বলতে পার।

    —নমস্কার! একশবার নমস্কার। তোমাকে নিয়ে কোনও ভদ্র-পরিবারে যাওয়া ঠিক না।

    সে বলল, আচ্ছা নমস্কার। আমিও আর যাব না। কেবল দয়া করে এলসাকে এখন দেখিয়ে দাও। দেখাতে না পারলে জাহাজে ফিরে শালা তোমাকে পেঁদাব।

    মৈত্র ক্ষেপে গেল খুব। অথচ সে মুখ ভার করতে পারে না। এবং অমিয় এটা বুঝেই ফেলেছে। ঘন্টাখানেক সময় পার করে দিতে পারলেই মৈত্র সব ভুলে যাবে। সেলেস দ্য এলে সেও খুব গম্ভীর হয়ে গেল। একেবারে অসীম সমুদ্রে পাল তুলে দিয়েছে। মস্তো সিরিয়াস মুখ সবার।

    মৈত্র যেন নিজের মান সম্মান বাঁচানোর জন্য বলল, আজ উঠি মাদাম।

    —কেন! এতো সকাল সকাল। বোস না। গাড়িটা বেচে দিয়েছি। না হলে তোমার বন্ধুদের নিয়ে শহরটা ঘুরতে পারতাম। ওরা এখানকার সবকিছু দেখে গেলে আমার ভাল লাগত। এমন শহর, এমন সুন্দর জায়গা পৃথিবীতে আর নেই।

    মৈত্র যেন দুঃখ দিতে চায় না। সে বলল, আমরা আবার কাল আসব।

    অমিয় যেন নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচল। আর একটা চান্‌স।

    সেলেস দ্য বললেন, কাল এস কিন্তু! অনেকদিন একা একা আছি। কেউ এখন আসে না। রিটায়ার করেছি বছরের ওপর। সেলেস দ্যর গলা কেমন ভারী ভারী। তারপর কেমন সহজ গলায় বললেন, তোমাদের এখানে ভাল লাগছে না বুঝতে পারি। তোমরা এখন শুধু খাবে দাবে, ঘুরে বেড়াবে। আনন্দ করবে। বড় সুখের সময় এটা।

    —না না আপনি তা মনে করবেন না। আপনাকে আমাদের খুব ভাল লেগেছে। আমরা কাল ঠিক আসব। ছোটবাবু খুব আন্তরিক গলায় বলে অপলক সেলেস দ্যকে দেখল।

    অমিয় বলল, এলসাকে বলবেন, আমরা এসেছিলাম।

    সেলেস দ্য কালীকে মনে হচ্ছিল তিনি এবার দূরে হেঁটে যাবেন। এবং ছায়ার মতো গাছপালার ভেতর অদৃশ্য হয়ে যাবেন। তিনি কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। কিছু বললেন না।

    অমিয় বলল, বলবেন কিন্তু মনে করে আমরা এসেছিলাম বলবেন।

    সেলেস দ্য ওদের সঙ্গে সদর পর্যন্ত হেঁটে গেলেন। তারপর তিনি দাঁড়ালেন। বললেন, কাল এস। তারপর হেসে বললেন, এলসা বেঁচে নেই।

    মৈত্র সহসা কিছু বলতে পারল না।—এমন একটা ফুলের মতো মেয়ে মরে গেল।

    —হ্যাঁ মরে গেল মৈত্র। তোমাদের যাবার মাস তিনের ভেতর সেও চলে গেল।

    ওরা কেউ আর এক পা বাড়াতে পারছে না। অমিয় যে অমিয়, যার মুখে কিছু আটকায় না, সেও বড় কোনও নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে মনে হয়। মনে হয় নিঃসঙ্গ, বড় বেশি নিঃসঙ্গতা। নদীর বুকে ঢেউ উঠে শান্ত হয়ে গেল সব। সে চোখ তুলে সেলেস দ্যকে দেখার চেষ্টা করল না। ওর ভয় ধরে গেছে। মুখটা কেমন দেখাবে কে জানে! দুঃখী মুখ দেখতে তার ভাল লাগে না।

    মৈত্র বলল, কি হয়েছিল?

    –কি হয়েছিল জানি না। কেমন এক মেলাঙকোলিয়া। চুপচাপ থাকত, কথা বলত না। ক্ৰমে রোগা হয়ে গেল। চোখের ওপর আমার সুন্দর মেয়েটা পোড়া কাঠ হয়ে গেল। সে খেতে চাইতো না। কারো সঙ্গে কথা বলতে চাইত না।

    —কিন্তু ও যে একটা চিঠি লিখেছিল। পানামা ক্যানেলে আমাদের তখন জাহাজ। আমরা নিউজিল্যান্ড যাচ্ছি। ব্যানার্জী, চিঠির কথা আমাকে বলেছিল।

    —ওটা ওর শেষ চিঠি।

    —সামান্য একটা মাত্র লাইন। ডোন্ট ফরগেট মি। এমন কিছু বোধহয় লিখেছিল।

    —কি লিখেছিল আমি বলতে পারব না। তবে চিঠিটা যখন লেখে, তখন আমি ছিলাম। তখন ও বিছানা থেকে উঠতে পারে না, খুব দুর্বল। ওর কিছু লেখার আর তখন ক্ষমতাও ছিল না। ছোটবাবুর কেন যেন মনে হয় পৃথিবীতে মানুষের দুঃখটা এক রকমের। ভালবাসা এক রকমের মা-মাসীরা পৃথিবীর সব সময় এক রকমের হয়।

    এলসাকে সে দেখেনি, তবু কেন যে মনে হয়, এলসা পৃথিবীর এমন মেয়ে যার তুলনা নেই। সেও যেন এলসার জন্য এ-দেশে থেকে যেতে পারত। পৃথিবীর এমন সুন্দর মেয়েটা, ভালবাসতে গিয়ে মরে গেল।

    রাস্তায় নেমে হঠাৎ চেঁচিয়ে বলল, ব্যানার্জীটা কি অমানুষ!

    —অমানুষ কিনা জানি না। দুঃখটা ওর দিকেও ছিল। অথচ দ্যাখ ভেবে পাই না, ওর বাবা কেমন মানুষ। আমরা লিখেছিলাম, এমন একটি ঘটনাতে আপনার মত দেওয়া উচিত।

    —তিনি কি লিখেছিলেন?

    —জানি না। তবে উনি ব্যানার্জীকে ঠিক কিছু লিখেছিলেন। কি যে লিখেছিলন! সে অমানুষের মতো তারপরই কাজটা করে ফেলল। এলসাকে বলল, হয় না, আমি এখানে থেকে যেতে পারি না। থাকলে, খুব স্বার্থপরের মতো কাজটা হবে।

    ছোটবাবু বলল, এখানে থাকলে সেটা অবশ্য হত। আমাদের ভারতবর্ষের মানুষরা এমন ঠিকই ভাবতেন।

    অমিয় ধমক লাগাল, রাখ তোর কথা। আসলে ব্যানার্জী অমানুষ। না হলে এমন কাজ কেউ করে না। সে ভয় পেয়ে গেছিল শেষ পর্যন্ত।

    মৈত্র, আর একটু ব্যাখা করল, ওর বাবা সেকেলে মানুষ

    —সবার বাবারাই সেকেলে থাকে। ভালবাসার সে দাম দেবে না সেজন্য!

    ছোটবাবু বলল, কোথাকার একটা ছেলে, কোথাকার একটা মেয়ে, মেয়েটা কিনা, একটা ছেলেকে দেখেই প্রেমে পড়ে গেল। তারপর মরে গেল। ভাবা যায় না!

    মৈত্র বলল, মানুষের নিষ্ঠুরতা নানা রকমের থাকে। ব্যানার্জী পরে যা বলেছিল, জাহাজে মাঝে মাঝে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেলে বলত, বাবার চিঠিটাতে মায়ের সতীত্ব প্রমাণের কথা ছিল।

    —তার মানে!

    —মানে, আমার জাতক হলে তুমি এ কাজ করবে না, ওর বাবা লিখেছিল।

    —হায় ভারতবাসী, হাসতে হাসতে গলায় ফাঁসি। সত্যি এমন হয়!

    —ব্যানার্জীর বেলায় এটা হতে দেখেছি। সে আছে, বেশ আছে। বউ আছে। বউ জানেনা এ সব। আমরা এখানে মেয়েটার জন্য কষ্ট পাচ্ছি।

    অথচ ওরা হাঁটতে হাঁটতে দেখল, রাত হয়ে গেছে। শো-কেসগুলোতে আলোর বর্ণমালা। কত সব বিচিত্র বর্ণের ছবি। কত সব সাজগোজ, কত সব লোভের পাখী ডানা মেলে উড়ছে। এ-সব দেখলে তারপর বুঝি মনে থাকে না, কোথাকার কে এলসা, কে ব্যানার্জী, কে সেলেস দ্য অথবা কোনও ক্যাপ্টেনের সমুদ্রতীরে বনবাস, তার প্রিয় কুকুর মেজিকে নিয়ে সে আছে। কেবল মনে হয় উটের মতো মুখটি তুলে এক অতীব নিষ্ঠুর খেলা মানুষের ভেতর বেঁচে থাকে, বেড়ে ওঠে, অবহেলায় দূরে ঠেলে দেয়া যায় না। মানুষ তার অতীব এক দাস। তাল-বেতাল সে তার স্বভাবে।

    মৈত্র এখন প্রায় দৌড়ে দৌড়ে হাঁটছিল। দেরি হলে কার্ণিভেল ভেঙ্গে যাবে যেন। অথচ মুখে কিছু বলছে না। সে কেবল হেঁটে যাচ্ছে। ওরা ওকে অনুসরণ করে হাঁটছে। বাসে অথবা ট্যাকসিতে ওরা যাচ্ছে না। অথবা মনে হয়, ছেলেমানুষের মতো মৈত্র মেলায় যাচ্ছে, ঘোড়দৌড় হয়ে গেলে সব গেল। সে ঘোড়দৌড় দেখার জন্য জোরে হাঁটছে যেন। কোন দিকবিদিক জ্ঞান থাকছে না।

    এবং মনে হয় তিনজনেই ভুলে কার্ণিভেলে ঢুকে গেছে। কেউ একটা কথা বলছে না। মেলাটা ঘুরে চলে যাবে।

    সেই এক চারপাশে নানাবর্ণের দোকান। মদের বোতল, রিঙ, সুবেশা রমনী। পিস্তলের খেলা অথবা ম্যাগপাই। কৃত্রিম হ্রদ, কৃত্রিম পাহাড়। আর হাজার হাজার জুয়ারি ছুটছে। ছুটির দিন বলে হয়ত এমন হয়েছে। নিয়ন আলো। আলোর রঙে রিঙের যুবতীদের মুখ ঝলমল করছে। আর কেউ কেউ খেলছে, হাঁটছে। কেউ কেউ নাচছে এবং গাইছে। যুবক-যুবতীরা হাসি মসকরা করছে। ওরা ছুটছে, খেলছে। ওরা সামনের পাহাড়ের টানেলে ঢুকে যাচ্ছে। সব নকল পাহাড়, নকল টানেল। যেন এই যে মানুষেরা তোমরা ভারি নকলনবিশ, আসলে চেহারা তোমাদের এমন নয়—কি যে সব ভাবছে মৈত্র। গত সফরে মৈত্র এক জাহাজি বন্ধু ব্যানার্জীর সঙ্গে এই টানেলের ভেতর ঢুকে গিয়েছিল।

    অন্ধকার গুহামধ্যে মৈত্র বাঘ হরিণ থেকে আরম্ভ করে কতকালের ভয়ঙ্কর মুখ পর্যন্ত দেখেছে। সবই নকল। ভয় দেখানোর জন্য এমনভাবে সাজিয়ে রাখা। এবং কত সব মুখোশের ভেতর ভূতের হাত-পা নাড়া। ওরা ভয় পায়নি। এলসা ওদের সঙ্গে ছিল। হঠাৎ ঢুকলে ভয় পাবার কথা। কিন্তু এলসা ছিল ভারি ভাল মেয়ে। ব্যানার্জি ভয় পাবে বলে প্রথম সে ঢুকতেই চায়নি।

    এ-ভাবে এলসা মরে গেলে মনে হল, ফুল ফোটার সময় হলে মৌমাছিরা উড়ে আসে। ফুলের মতো মেয়ে এলসা। এলসা এখন নাগালের বাইরে। হায়, এলসা ভালবেসে মরে গেল! হায়, এলসার হাতের দস্তানা পর্যন্ত সাদা রঙের ছিল। এলসা পোশাক পরতে ভালবাসত সাদা রঙের। ওর চুল ছিল নীল রঙের, মুখে ছিল গোলাপী আভা, আর চোখে ছিল সুন্দর নীল রঙের সমুদ্র। তাকালে চোখ ফেরানো যেত না। মাথায় সোনালী টুপি, ময়ূরের পালক গোঁজা। সবুজ ঘাস মাড়িয়ে গেলে ওর পা খুব সুন্দর দেখাত।

    আর এ-ভাবে ফুল ফোটার সময় হলে, মৌমাছিরা সব উড়ে আসে। দু-পেগ গিলে ফেলতেই মৈত্রের এমন মনে হল। স্মৃতির ঘর থেকে কি সব উড়ে আসছে! সে যেন কেবল এলসার মুখ দেখতে পাচ্ছে। এলসার মুখ-চোখ এমন কি শেষদিন সে কি পোশাক পরেছিল, গাউনের রঙ কি, সব মনে করতে পারছে। তারপরই যেন মনে হয়—কি ফুল ফুটতে পারে এ সময়। গাছে গাছে কি ফুল থাকবে। ফুলের সৌরভের জন্য মানুষেরা এত উড়ে বেড়ায় কেন! এমন কি, কি রঙের জুতো পরতে ভালবাসত এলসা, সে এইসব চারপাশে লোকদের ভিড় দেখেও ভুলে যাচ্ছে না। আসলে ফুলের জন্য বড় লোভ মানুষের। এই লোভ মানুষকে খারাপ করে দেয়, নৃশংস করে তোলে। ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে খেতে ভালবাসে মানুষ।

    এবং এই লোভের জন্য এই যে এক লোভ, আমি আমার জন্য, আমার ভালবাসার জন্য আমি, আমি কোন বস্তুতে নেই, আমি আছি আমিতে। সুখ, আমার সুখ লোভ আমার নিজের। সুতরাং আমি যখন আমিতে, শেফালীর জন্য কি করতে পারি। এখন শেফালীর কথা মনে এলেই, ওর পুরু ঠোঁটের কথা মনে হয়। জংঘার কথা মনে হয় এবং এক সুরভিত অঞ্চলের কথা মনে হয়। সে তখন কেমন মানুষ থাকে না, লোভের পাখি হয়ে অদৃশ্য জায়গাগুলোতে বসতে চায়। এবং যেন কার্ণিভেলের সেই মেয়েটা ওকে এভাবে বসতে ডাকছে। সে পারছে না।

    যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে এখান থেকে চলে যাবে। এখানে থাকলেই একটা লোভের পাখি, পাখির কেবল উড়ে যাবার বাসনা, বসার বাসনা। কাল সব টাকা সে পাঠিয়ে দেবে। আজও নানা কারণে দেরি হয়ে গেল। এবং এ-ভাবে যখন সে প্রায় ড্রাইভ দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিল তখনই দেখল, কে যেন ওর সামনে একটা রুপোর স্টিক ঝুলিয়ে রেখেছে। সে চোখ তুলে তাকাতেই দেখল, ওকে দেখে মেয়েটি বাউ করছে। বাউ করতে গিয়ে হাঁটুর ওপর এতটা গাউন তুলে ফেলেছিল যে, একটু হলেই সে সব দেখে ফেলত।

    আর সঙ্গে সঙ্গে সে কেমন হয়ে গেল। ওর হাত-পা শিথিল। সে নড়তে পারল না। যেন কেউ সমুদ্র দেখাবে বলে, অথবা পাহাড় থেকে দূরবীনে অনেক দূরের নক্ষত্র দেখাবে বলে ওকে ডাকছে। সে প্রায় পাগলের মতো লাল নীল বলের পাশে দাঁড়িয়ে গেল। এবং সে সার্কাসের হাতি-ঘোড়া লুফে নেবার মতো বলগুলোকে হাওয়ায় ছুঁড়ে দিয়ে লুফে নিল।

    সদর দরজায় তখন লোকটা বেশ জোরে জোরে ব্যাগপাইপ বাজাচ্ছে। সে নাচছে কোমর দুলিয়ে, পা তুলে নাচছে। মানুষের এমনই স্বভাব, শুয়োরের বাচ্চারা আবার বড় বড় কথা বলে! সে সেজন্য পা তুলে পাছা দুলিয়ে ঘুরে ঘুরে নেচে যাচ্ছে। সে ঠিক জানে, মানুষের স্বভাব কি! তখন মৈত্র খেলতে থাকল। খেলতে খেলতে সে যে মৈত্র, সে-কথা একেবারে ভুলে গেল।

    অমিয় বলল, এটা কি হচ্ছে!

    মৈত্র কিছু বলছে না। অমিয় অথবা ছোটবাবুকে সে চেনে না মতো। ওরা চলে গেলে যেন ভাল হয়। আসলে সে ওদের নিয়ে এসেছিল সঙ্গে পাহারা দেবে বলে। এখন এরা থাকলেই অসুবিধা। ওরা চলে গেলে সে ভীষণ খুশী হবে! সে বলল তোরা জাহাজে যা। আমি পরে যাচ্ছি। ওরা হাঁটতে থাকলে সে বলল, চিনে যেতে পারবি তো?

    অমিয় বলল, খুব।

    ছোটও খুব বলে চলে গেল।

    আর যুবতী রুপোর স্টিক নিয়ে হাঁটছে। রিঙে বাঘের খেলা দেখাচ্ছে যেন। বল এগিয়ে দিচ্ছে। মৈত্র খুব একটা আজ হারছে না। সে খেলছিল আর চোখে চোখে কথা বলে যাচ্ছে। সে মাঝে মাঝে চোখ টিপে দিচ্ছিল। মেয়েটা এজন্য কিছু বলছে না। রিঙে বাঘের খেলায় বাঘটা একটু হাই তুলবে, হাউ করে উঠবে, কতটা কি করবে মেয়েটা যেন জানে।

    এবং এ-ভাবে সে আর মৈত্র এক ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেছে। এ-খেলা শেষ হতে সময় নেবে। অন্য যারা খেলছিল, তারা মৈত্রের সঙ্গে পেরে উঠছে না। কেউ কেউ মৈত্রের অসম্ভব রকমের মার দেখে হাততালি দিচ্ছিল পর্যন্ত। বড় রকমের মার দেখে কেউ কেউ আর খেলতে সাহস পাচ্ছে না! তখন সেই যুবতী আগুনের মতো জ্বলছে। মৈত্রের চোখ দেখলে টের পাওয়া যায়। মেয়েটি সাদা জ্যাকেট পরে আছে। ক্ষণে ক্ষণে যুবতী পোষাক পাল্টে আসছে, তাঁবুর পাশে নিজের ছোট্ট ঘরটায় গেলেই মৈত্র বুঝতে পারে কিছু একটা এবার হবে। কিন্তু কিছু হয় না। ব্যাগপাইপের সুর ক্রমে থেমে আসে। মৈত্র আরও রাত বাড়ার আশায় আছে।

    ওদিকে ক্রমে কার্ণিভেলের আলো নিভিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এবং ইতস্ততঃ অন্ধকার। ফিসফিস্ শব্দ কেউ জোরে জোরে গলা ছেড়ে গান গাইছে। মৈত্র গানের কোন কথা বুঝতে পারছে না। কোথাও ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে কেউ গাছের নিচে। সব অস্পষ্ট। জলের মতো শব্দ কোথাও। টুপটাপ শব্দের খেলা। যুবতী এবার সব বলগুলি তুলে নিচ্ছে। আর না। রাত অনেক হয়েছে।

    মৈত্র খেলতে না পেরে থামে হেলান দিল। সিগারেট খেল থামে হেলান দিয়ে তারপর ফের হাতের পাঁচ আঙ্গুলে মেয়েটার চোখে তিন-চারবার নাচাল। ইশারায় টাকার অঙ্ক বোঝবার জন্য পাঁচ আঙ্গুলে পাঁচ রকমের নোট গুঁজে দিল।

    যুবতী সামান্য হাসল। তারপর ভালমানুষের মতো দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে দিচ্ছে। বের হয়ে হাঁটতে থাকল। একবার তাকাল না। মৈত্রের এবার ওর ওপর লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছে হল। তারপর সে দৌড়ে আগে চলে গেল। দু-হাত তুলে আগলে দিল ওর পথ। মরিয়া হয়ে গেছে মৈত্র। কিন্তু মেয়েটি ওর হাতের নিচ দিয়ে গলে গেল। তারপর একটু দূরে গিয়ে ফের বাউ। আমার পেছনে এস না, তোমাকে গুডবাই। ওর চোখের ওপর দিয়ে মেয়েটা চলে গেল। বাস-স্ট্যান্ডে মানুষের ভিড়ের ভেতর ঢুকে দাঁড়িয়ে আছে। মৈত্র কিছু আর করতে পারছে না। হাওয়ায় ঘুসি মেরে কেবল হাঁটছে। একটুকুর জন্য ফসকে গেল।

    .

    সে জেটিতে কখন ঢুকে গেছে খেয়ালই করেনি। দুধারে বড় বড় ক্রেনের নিচ দিয়ে সে উঠে গেল। সিঁড়ি ধরে জাহাজে ওঠার সময়ই সে সমুদ্রের গর্জন শুনতে পেল। কেমন শোঁ শোঁ বাতাসের শব্দ। শরীর টলছে। সে একা! খালি ডেক। কেউ জেগে নেই বোধহয় জাহাজে। একটা বেড়াল থাকলে এই রাতে মিউ মিউ করে ডাকতে পারত। ফোসকালে ঢুকে সে আলো জ্বেলে জল খেল ঢকঢক করে। ওর ভীষণ তেষ্টা পেয়েছিল।

    পরদিন যথারীতি মৈত্র কাজ করল এনজিন রুমে। আজ তাকে বাকি টাকাটা পাঠাতেই হবে। একটার পর ছুটি হয়ে গেছে। এনজিন রুমে মেরামতের কাজ বেশি। ওদের হাতে কাজ কম। ছুটি হলে সে বাংকে শুয়ে ক’বার শেফালীর চিঠি পড়ল। চিঠি পড়লেই মনে হয় শেফালী ওর ভীষণ কাছে, যেন পাশে বসে রয়েছে। দূরের চিঠি কত যে কাছের মনে হয়, তখন ওর ভাল লাগে না। কেমন সে, বাড়ি ফেরার জন্য অধীর হয়ে পড়ে। চিঠি পড়লেই ওর ইচ্ছে হয় সমুদ্রের মাছ হয়ে সে যদি চলে যেতে পারত। জল কেটে নদীর মোহনায় উঠে যেতে ইচ্ছে হয়। তারপরই মনে হয় সে জানালায় দাঁড়িয়ে আছে। শেফালী তখন দাঁতে ফিতে কামড়ে চুল বাঁধছে। কপাল ভাল রাতে সে কোনও স্বপ্ন দেখেনি। যে-ভাবে সে গত রাতে মেয়েটার পেছনে ছুটেছিল, রাতে তার ঠিক স্বপ্ন দেখার কথা। যেন মানুষটা তিমি শিকারে বের হয়েছে, আর ফিরে আসছে না। সমুদ্রের ধারে তেমনি বৃদ্ধ পাইন গাছে, মাছের, বড় হাঙ্গর হবে হয়ত অথবা হিংস্র তিমি মাছের কঙ্কাল ঝুলছে। তার নিচে কেন যে মৈত্র দাঁড়িয়ে থাকে কেবল।

    অমিয় ভেতরে ঢুকে বলল, মৈত্র জানিস, কাল লোকটাকে শেষ পর্যন্ত ধরতে পারেনি। পালিয়েছে।

    —কোন লোকটা?

    —আরে খুব খারাপ লোক। গত যুদ্ধে ওর নাকি নিষ্ঠুরতার তুলনা নেই। লোকটার নাম আইখম্যান। এখানে লোকটা পালিয়ে আছে। এখানে ওর ছদ্মনাম। নাৎসি জার্মানীর ইহুদি নিধনের পান্ডা।

    —ইহুদি নিধন মানে?

    —তুই একটা আস্ত জাহাজি। গত যুদ্ধের খবর রাখিস না! কনসেন্ট্রাসন ক্যাম্প, গ্যাস-চেম্বার, এ-সবের নাম জানিস না!

    —লোকটার সঙ্গে তার কি সম্পর্ক?

    —সেই তো সব করিয়েছে।

    –ধ্যাৎ, ও করাবে কেন। অমন একটা ভাল কাজ পেলে তুইও করতিস।

    —কি নিষ্ঠুর কাজ বল!

    —ও তো সাক্ষাৎ মহাদেব।

    —বাজে কথা।

    —বাজে কথা কি?

    —লোকটাকে পুড়িয়ে মারা উচিত। আমাদের মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে শুনে।

    —ও-ভাই সব এক ব্যাপার। বলে আর দাঁড়াল না মৈত্র। পোশাক পাল্টে ওপরে উঠে গেল। সে জাহাজ থেকে নেমে পড়ল, কিছুতেই লোভে পড়ে যাবে না। লোভে পড়ে গেলেই রক্ত গরম হয়ে যায়। কিন্তু সে যত শহরের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে, তত শুনতে পাচ্ছে তার পাশে কারা নেচে নেচে ব্যাগ-পাইপ বাজাচ্ছে। সে কিছুতেই জায়গা মতো যেতে পারছে না। সবাই নেচে নেচে যাচ্ছে, সে তার ভেতর মিশে না গেলে কেমন একা পড়ে যাবে। ওর আসলে ইচ্ছা হচ্ছিল না কোথাও সে যায়। বরং সেই উটের মত মুখটি তুলে যারা ব্যাগ-পাইপ বাজায় সেখানে যেতে পারলে যেন ভালো হত। মেয়েটির সুন্দর চোখ সমুদ্রের মতো নিরীহ চোখ তাকে কিছুতেই আর কিছু আছে পৃথিবীতে, ভাবতে দিল না।

    এবং এ-ভাবে মৈত্র দেখল, সে ঘুরেফিরে কার্ণিভেলের দরজায়। আর ব্যাগ-পাইপ বাজিয়ে যাচ্ছে লোকটা। নতুন মনে হয়, একই লোক বাজায় না। সাজ পাল্টে পাল্টে যায়। লোকজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে গেটে। সে ভেতরে ঢুকলে অন্যদিনের মতো মেয়েটা বাউ করল। মেয়ে তুমি এভাবে কেন যে গাউন টেনে হাঁটু ভাঁজ করে দাও। এমনভাবে গাউন টেনে ওপরে তুললে আমি ঠিক থাকতে পারি না।

    সে খুবই হুঁশিয়ার। টাকা নষ্ট করলে তার চলবে না। যত রাতই হোক আজ যে-কোনভাবে যুবতীর পায়ে গড় হতে হবে। না হলে সে পাগল হয়ে যাবে। মৈত্র এ-জন্য খুব রয়েসয়ে খেলছে। কখন কার্ণিভেলের সব মানুষরা চলে যাবে, কখন ঝাপ বন্ধ করে মেয়েটি হাঁটবে, এখন সে সেই আশায় আছে।

    মেয়েটির হাতে তেমনি রুপোর স্টিক। সবার সঙ্গে সে প্রাণখুলে হাসছে। মৈত্রের এসব ভাল লাগছে না। ধমক দিতে ইচ্ছে ইচ্ছে, না এমন কর না। এমন করলে ঠিক ভালবাসা হয় না।

    যেন এই মেয়ে এবং সে রিঙের মালিক! এক বোতল মদ নিয়ে এল। দুটো গ্লাসে দু-জন ভাগ করে খাচ্ছে। মৈত্র মেয়েটির হয়ে খেলা পরিচালনা করছে। সে নিজে না খেলে অন্যদের বল এগিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু শেষের দিকে যারা এল, তাদের সে খেলতে দিল না। ওরা খেলতে আরম্ভ করলেই সহজে ঝাঁপ বন্ধ হবে না। ওরা রাত করে ফেলবে। মৈত্র তখন নিজে সব বল তুলে খেলতে থাকল। সে ওর সময় মতো তবে ঠিক ওকে কাছে পেয়ে যাবে।

    মৈত্রকে এখন দেখলে মনেই হয় না সে বিদেশে এসেছে। যেন এই মেয়ে এবং সে কতকাল একসঙ্গে আছে। কতকাল থেকে সে এবং এই মেয়ে সমুদ্রের ধারে বসে রয়েছে। ওদের মাথার ওপর অজস্র টিউলিপ ফুল ঝরছে। ওরা ফুলের নিচে কবরের মতো শুয়ে আছে। বোঝাই যায় কেউ কারো ভাষা জানে না। বরং শেফালীর কথা মনে হলে, কেন যে মনে হয় শেফালী এই মুহূর্তে তার কেউ না। সে বিমলবাবুর ভালবাসার স্ত্রী।

    এক সময় রাত গভীর হলে মৈত্র দেখল যুবতী দোকান বন্ধ করছে। সে টাকা গুনে কোথায় কাকে দিয়ে এল। মৈত্র ওর পাশে পাশে হাঁটছে এখন। সে বন্ধুর মতো হেঁটে যেতে থাকলে মেয়েটি গাউন টেনে বাউ করতে চাইল। গুড-নাইট বলতে চাইল। কিন্তু মৈত্র ছেড়ে দেবার পাত্র না। সে সোজা এবার ওর পকেট থেকে সব প্যাসগুলো তুলে ধরল নাকের কাছে। চকচক্ করছে। লোভে পড়ে যাক্ মেয়েটা, এত প্যাসুর লোভ মেয়েরা সামলাতে পারে না। কিন্তু কেমন নির্বিকার তবু মেয়েটি। মৈত্রের পায়ের রক্ত মাথায়। ঝাঁ-ঝাঁ করছে শরীর। এবার হাতের ঘড়ি, আংটি পারলে যেন পোশাক খুলে সব দিয়ে-থুয়ে সে পায়ে পড়ে থাকতে চায়। তখন মেয়েটি ওর হাতে হাত রাখল। এ-ভাবে রাস্তার ওপর এ-সব ঠিক না। সন্তানের মতো স্নেহের চোখে তাকাল। তারপর সবাই জেগে আছে, সে ইশারায় শহরের আলো ঘরবাড়ির দিকে আঙ্গুল তুলে এমন বলতে চাইল। এখনও পুলিশের টহল আছে মোড়ে মোড়ে। আর এই কার্ণিভেলে সব বাতি নিভে যায়নি। সব মানুষ চলে যায়নি। শিশুর মতো এত অধীর হলে চলে না।

    তারপর কি যেন জানে এই মেয়ে। সে শিস্ দিতেই একটা নতুন ঝকঝকে ট্যাক্সি সামনে হাজির। দরজা খুলতে না খুলতে মৈত্র ডাইভ মেরে একেবারে ভেতরে। মেয়েটিও ভেতরে। ওর কি যে মনে হচ্ছে এখন! মাথার ওপরে আকাশ আছে, নক্ষত্রেরা জ্বলছে সে বুঝতে পারছে না। চারপাশের বাড়ি ঘর আলো, গাছপালা ফেলে কোথায় যে যাচ্ছে গাড়িটা। সে কিছুই দেখছে না। সে পাশে বসে মেয়ের শরীরের মনোরম গন্ধ নিতে নিতে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল। তারপর একটা হাত পেছনে ফেলে দিল। অন্য হাতটা সে সামনে জড়িয়ে যেন সে শীতের রাতে মেয়েটাকে নিয়ে চাদরের নিচে ওম পোহাচ্ছে। যতক্ষণ এভাবে থাকা যায়। কিন্তু মৈত্র দেখছে, সে খুব বেশিদূর এগোতে পারছে না। মেয়েটা বাধা দিচ্ছে। কি যে করে! কামড়ে খামচে এখন যেন ফালা ফালা করে দিতে ইচ্ছা হচ্ছে। অথচ সে পারছে না। এমন নির্বিকার মেয়েরা থাকতে পারে তার বিশ্বাস হয় না।

    এবং এ-ভাবে সে ভেতরে খুব বেশি অস্থির হয়ে উঠলে দেখল, মেয়েটা তাকে হাত তুলে কি দেখাচ্ছে।

    সে দেখল, একটা গীর্জা। গীর্জার মাথায় ক্রস।

    মৈত্র এ সব মানতে চাইছে না। সে উপুড় হয়ে ট্যাকসিতেই…

    মেয়েটা সবলে যেন দু-হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে মৈত্রকে। এ-দেশের টাকসিওয়ালাদের এমন দৃশ্য দেখা হামেশা অভ্যাস, রাত হলেই ওরা এমন সব ঘটনা দেখতে পায়। অথচ মৈত্রকে তখন অধীর হতে দেখে, আশ্চর্য সুন্দর ইংরেজিতে বলছে, ওয়েট ম্যান। ওয়েট। সি উড ক্যারি ইউ টু হার হোম। আসলে ট্যাকসিওয়ালাদের নানারকম প্যাসেঞ্জার বইতে হয় বলে, ইংরেজিটা কিছু শিখে নিয়েছে। এবং সে ইংরেজি বুঝতে পারছে দেখে, মেয়েটাও ভাঙ্গা ভাঙ্গা একটা দুটো ইংরেজি বলতে চাইল। কিন্তু মৈত্র কিছু বুঝতে পারছে না। আকাশে বেশ মেঘ। সে শহর পার হচ্ছে এটা বুঝতে পারছে। এবং এক সময় এমন শীতে বেশ জোরে বৃষ্টি।

    এইসব বৃষ্টিপাতের ভেতর রাস্তার আলো ঝাপসা। কাচে জল পড়ে পড়ে সামনের সব কিছু ধূসর করে রেখেছে এবং আশ্চর্য উষ্ণতা ভেতরে। যেন কতকাল থেকে, মনে হয় আজন্ম এমন এক ভূখণ্ডের জন্য মৈত্র অপেক্ষা করে আছে। মেয়ের স্কার্ট হাঁটুর ওপরে উঠে গেছে। ওর বার বার নরম জায়গাগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখার কি যে ইচ্ছে! যেন ছুঁতে না পেলে মরে যাবে। আর নরম চুল, ফাঁপা এবং ফুরফুর করে সামান্য কাচের ফাঁকে বৃষ্টির ছাঁট, চুল উড়ছে ফুরফুর করে, সে সেই নরম চুলে মুখ ডুবিয়ে দেবার জন্য আকুল হতে গিয়ে দেখল, একটা পুরানো বাড়ির সামনে গাড়ি থেমেছে। দরজায় কেউ দাঁড়িয়ে। মেয়েটির হাতে সে একটা প্যাকেট দিল। সর্বেশা অর্থাৎ মদ, উগ্র মদের গন্ধ চারপাশে। মৈত্র এ-পাশে ও-পাশে ফ্লাটবাড়ির মতো সাহেব মেমদের মুখ দেখে ক্রমে দোতলার সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠে গেল। একটা ক্রাচ ঠিক দেয়ালে হেলান দেওয়া, কেউ ভেতরে আছে মনে হয়। দরজা খুলে গেলে দেখল, আধপোড়া একজন মানুষের মুখ। সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দরজার কাছে এল। দরজা খুলে দিয়ে যেন সে কাউকে চেনে না মতো এবং সঙ্গের লোকটি কে, তার সম্পর্কে পর্যন্ত কোন উৎসাহ নেই, লোকটা এমন কি একবার মৈত্রের দিকে তাকাল না পর্যন্ত। সে কেমন যেন সব সময় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে কিসে, হেঁটে হেঁটে ভেতরের দরজা দিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল। লোকটার মুখে ভীষণ ক্রুরতার ছাপ। মৈত্রের এ হেন দৃশ্যে ছুটে পালাবার কথা, কিন্তু আশ্চর্য সেই মায়াবিনী তাকে কিছুতেই যেতে দিচ্ছে না। এবং দরকার হলে মৈত্র দ্বন্দ্বযুদ্ধে লোকটাকে ডাকবে। পৃথিবীতে সে আর পাশের যুবতী, আর কিছু আছে এ-মুহূর্তে সে জানে না। সে বিশ্বাসও করে না। সে বলল, মেয়ে আর কতক্ষণ!

    যুবতী ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে কিছু বলে গেল। যেন বলা এমন অধীর হলে চলে না! তুমি কেমন জাহাজি হে! আমার মানুষকে দেখার পরও আছ, ভাবা যায় না।

    হায় যুবতী জানে না, মৈত্র আর এক পা নড়তে পারছে না। সে যুবতীর ওপর এবার যেমন বাঘে শিকার নিয়ে পালায় প্রায় তেমনি ছোট কচি হরিণশিশুর মতো ঘাড়ে গলায় চুমু খেতে থাকল আর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, মেয়েটার ভেতরে একটা দুর্গন্ধ। সে এতক্ষণ কেন যে পায়নি! সে বলল, মেয়ে তোমার পিঠে এগুলো কিসের দাগ!

    মেয়েটির শরীরে কোন পোশাক নেই। জঙ্ঘার পাশে আশ্চর্য নীল সুবর্ণ বাতিঘর। অথচ পিঠে লাল ছোট ছোট বিজবিজে ঘা। লোকটার মুখ আধপোড়া। চামড়া ওঠানো মুখ। কি যে ভয়ঙ্কর আর কুৎসিত। পাশের ঘরে লোকটির গোঙানি শোনা যাচ্ছে। মৈত্র মেয়েটির স্তনে হাত রাখল। মৈত্র জীবনে যেন যুবতী দেখেনি, সুবর্ণ বাতিঘরে আলো জ্বালায় নি, সে শরীরের সব অংশের ভেতর নিমজ্জমান এক নেমকহারাম। যেন সে কিছুই ছুঁতে চাইছে না। যেন এই শরীরে পৃথিবীর সব কিছু মেয়েটি জড় করে রেখেছে। কোথায় সামান্য বিজবিজে ঘা, অথবা এটা যে এক অতীব কঠিন অসুখের চিহ্ন তা সে বুঝতে চাইছে না। যুবতী নানাভাবে চাইছে ওকে ফিরিয়ে দিতে। এমন অসুখ নিয়ে আমার কিছু ভাল লাগে না। তুমি পাগলামি কর না। তুমি শুনতে পাচ্ছ না, দূরে কোনো গীর্জায় ধর্মীয় সংগীত বাজছে। তুমি কি জান না, সমুদ্র কি নীল আর গভীর! তোমার শরীর নষ্ট হয়ে যাবে ম্যান।

    ভাল কথা কে শোনে! পাশের ফ্ল্যাটে মিউজিক বাজছে। সমুদ্রে—ধীরে ধীরে অথবা, গভীর সমুদ্রে হাওয়ায় যেন বৃষ্টিপাতের শব্দ ধীরে ধীরে ঝম্ ঝম্ শব্দের মতো। যেন সহসা অতিদূর থেকে কোন সমুদ্রপাখির ডানার শব্দ ক্রমে এগিয়ে আসতে আসতে সহসা বাতাসে বৃষ্টিপাতের ভেজা গন্ধ পেয়ে ওপরে উঠে যাওয়া। অনেক ওপরে। আবার কখনও পাখিটা যেন পাখা বিস্তার করে প্রবহমান ধারায় নেমে আসছে। মেয়েটি মিউজিক শুনতে শুনতে কেমন অধীর গলায় বলল, ম্যান, আমাকে ক্ষমা কর। আমি পারব না। ভেবেছিলাম আমার সব দেখে তুমি ভয় পাবে। ঘাবড়ে যাবে।

    মৈত্র পায়ের কাছে মাথা নিচু করে বসে রয়েছে। সে অনুমতি চাইছে। সেও যেন সেই মিউজিকের ভেতর এই মেয়েকে কেমন সুগন্ধী হয়ে যেতে দেখছে। ওর হাত-পা কাঁপছে, কান গরম হয়ে গেছে, সে পায়ের কাছে পড়ে থেকে বলছে যেন, আমি মরে যাব মেয়ে। সব দিয়েছি। আরও দেব। মেয়েটির কষ্ট হচ্ছিল। সে জানে, ব্যবহারে, এই যুবক, ক্রমে তার পুরুষের মতো হয়ে যাবে। ওর ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। ভীষণ। সে এ-সব থেকে পরিত্রাণের জন্য এখন জুয়ার রিঙে কাজ নিয়েছে। এমন একজন আধপোড়া কঠিন অসুখের মানুষকে নিয়ে যখন শরীরের বিজবিজে ঘা ক্রমাগত পাগল করে দেয়, অস্থির করে তোলে তখন এক অপার্থিব চিৎকার এবং দেয়ালে ক্রমাগত মাথা ঠুকে মরা

    মৈত্র বলতে চাইল কিছু। বলতে পারছে না। ছেলেমানুষের মতো শরীরের সর্বত্র ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে। দেবীপ্রতিমার গায়ে হাত দেবার মতো। অথবা সন্তান মায়ের স্তন নিয়ে যে-ভাবে খেলা করে, তেমনি পুষ্ট স্তন হাতে নিয়ে বসে থাকা। যেন মৈত্র এখন এ-শরীর দিয়ে হলেও, সে নিঃশেষ হয়ে গেলেও পায়ের নিচে পড়ে থাকবে।

    মেয়েটির সত্যি কষ্ট হচ্ছিল। সে বলল, এস। মৈত্র একেবারে শিশু হয়ে গেল। যে-যেভাবে মৈত্র চাইল, ঠিক সেভাবে তাকে শুইয়ে রাখল পাশে। আর সব কিছু নিয়ে মৈত্র এমন ছেলেমানুষী করতে থাকল যে শুড়শুড়ি, কি যে শুড়শুড়ি, মেয়েটি ভীষণ জোরে হাসতে থাকল। সে ওর শরীর সরিয়ে নিতে থাকল। না না, ওটা কি করছ ম্যান! আমার ভীষণ শুড়শুড়ি লাগছে। এখানে না। এখানে না।

    কে শোনে কার কথা, সারাক্ষণ জাহাজি মানুষের প্রেম কি যে নিদারুণ! এক অতিকায় হাঙ্গরের সমুদ্রে ডুব দিয়ে আহার অন্বেষণের মতো। মেয়েটি বলল, ম্যান, তোমার ভীষণ কষ্ট?

    মৈত্র বলল, ভীষণ।

    —এখন ভাল লাগছে? —ভীষণ ভাল লাগছে।

    —তুমি কতদিন আছ?

    —কিছুদিন।

    তারপর মৈত্র সুন্দর বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ল। সারারাত ওপাশের ঘরে লোকটা চেঁচাচ্ছিল। মৈত্র কিছু শুনতে পায়নি। গভীর রাতে ঘুম ভাঙলে মনে হল মেয়েটি ওর পাশে নেই। সে দেখল ঘর অন্ধকার। পাশের ঘরে আলো জ্বলছে। যুবতী এখন ওর স্বামীর পাশে।

    মৈত্র আবার ঘুমিয়ে পড়ল। ওর কোন হিংসে হচ্ছিল না। বরং এক অতীব শান্তি শরীরে, কি যে মহিমময়ী মনে হচ্ছে যুবতীকে। ওর ভাল লাগছিল ঘুমিয়ে পড়তে।

    খুব সকালে সে শুনতে পেল। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে বলছে, ম্যান, বেলা হয়েছে। এবারে ওঠো। জাহাজে ফিরতে হবে।

    ঠিক যেন শেফালির মতো গলা। কি যে আপন আর সুন্দর এই বেঁচে থাকা! সে পাশ ফিরলে দেখল, চা। যুবতীর শরীরে কপালে পবিত্রতা। মৈত্র উঠতে পারছে না। ভীষণ লজ্জা করছে। আলনা থেকে মৈত্রকে ওর পোশাক এনে দিল। মৈত্রকে অবোধ বালকের চেয়ে বেশি কিছু মনে হচ্ছে না। যুবতী সামান্য হেসে বলল, ম্যান চা ঠাণ্ডা হচ্ছে।

    মৈত্র কম্বল কোমর পর্যন্ত জড়িয়ে নিল। সেন্ট্রাল হিটের জন্য বেশ আরাম বোধ হচ্ছে। সে চা খেতে খেতে বলল, কোথাও আর যাব না। থাকব। এখানেই থেকে যাব।

    —থাকলে মারব। ওঘরে গিয়ে একটু বোস। এত বেশি ভাঙ্গা ভাঙ্গা কথা যে মৈত্র কিছুই বোঝে নি। তারপর ইশারা করলে, বুঝল, এ-বাড়িতে এসে গৃহকর্তার সঙ্গে একটু আলাপ হবে না, এটা ঠিক না। মৈত্র বাথরুমে ঢুকে গেল, স্নান করল, পোশাক পাল্টাল, এবং সেই কঠিন পোড়া অসুস্থ মানুষটার সঙ্গে কথা বলার জন্য মাথার কাছে একটা চেয়ারে বসল।

    লোকটির কথা বলতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল, তবু বলল, সাহস আছে তোমার।

    মৈত্র কিছু বলল না।

    সে নিজের মনে মনে বিড়বিড় করে বলল, সাহস আমারও ছিল। এখন কিচ্ছু নেই। তারপর ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকল। একেবারে ভীষণ শূন্যতা চোখে। মৈত্র আর বসে থাকতে সাহস পেল না। ওর সত্যি এবার লোকটাকে ভয় করছে। সে বলল, আসি। সে উঠে প্রায় দৌড়ে পালাবার মতো সিঁড়ি ধরে নামতে থাকলে দেখল, যুবতী পেছনে পেছনে নেমে আসছে। সে বলল, তুমি চিনে যেতে পারবে না। আমার সঙ্গে যাবে।

    যেন সে কতদিন পর এক সুদীর্ঘ প্রবাস থেকে ফিরে এসেছে। মেয়েটিকে তার কিছুতেই মনে হচ্ছে না, দূরের, যেন সে-আছে, তার চারপাশেই আছে, কতকালের চেনা প্রিয়জনের মতো, ওর চোখ ভারি হয়ে আসছিল। মৈত্র বলল, আবার আসব।

    যুবতী ওকে জাহাজঘাটায় নামিয়ে বলল, না। আর আসবে না। সে একটু থেমে বলল, ডাক্তার দেখাবে।

    মৈত্র বলল, আমার কিছু হবে না।

    যুবতী তবু বলল, না হলেও দেখাবে। বলবে সব। পিঠে বিজবিজে ঘা, সব খুলে বলবে। না বললে আমি কষ্ট পাব।

    মৈত্র মেয়েটির কথাবার্তা এখন যেন মন দিয়ে শুনছে না। সে আর কি দিতে পারে। সব দিয়েছে, তার আরও কিছু থাকলে মেয়েটিকে এমুহূর্তে দিয়ে দিতে পারত। বড় বেশি ছোট মনে হচ্ছে নিজেকে। সে এত খাটো মাপের মানুষ। সে বলল, এসে গেছি।

    গুড বাই। মেয়েটি গাড়িতে বসে হাত নাড়ল। শিফনের ফ্রক গায়ে। মাথায় উলের টুপি। মুখটা সব দেখা যাচ্ছে না। মৈত্র নুয়ে হ্যাণ্ডসেক করল। আসলে নুয়ে ওর সুন্দর মুখটা আর একবার দেখতে চাইল। কি কোমল, আর নরম, আর বড় বেশি স্নিগ্ধতা চোখে মুখে! সে কিছুই বলতে পারল না। ধীরে ধীরে ক্রেনের লম্বা ছায়া অতিক্রম করে জাহাজে উঠে গেল।

  • চৌদ্দ

    চৌদ্দ

    ।। চৌদ্দ।।

    সকালে উঠেই মৈত্র দেখল, চব্বিশ ঘণ্টার ফ্ল্যাগ মাস্তুলে টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাহাজের মাল নামানো শেষ। ড্রিফটিঙ লাইন অনেক ওপরে উঠে গেছে জাহাজের। গ্যাঙওয়েতে সিঁড়ি খাড়া। খাড়া সিঁড়িতে উঠতে ভয়। ক্রমে জাহাজ জলের ওপর ভেসে উঠলে যা হয়। মেরামতের কাজ মোটামুটি শেষ। তবু মনে হয় বয়লার চক মেরামত করে নিলে হত। জাহাজ সরফাই-এর সময় এমন একটা রিপোর্ট যেন ছিল। তারপর কি করে যে কি হয়ে যায়। মৈত্র ঠিক বোঝে না, এ-ভাবে একটা ভাঙ্গা জাহাজ নিয়ে কাপ্তান দরিয়াতে ভেসে চলেছে কি করে! এবং চারপাশে এত নিয়মকানুন থাকা সত্ত্বেও এটা হয়। বুড়ো কাপ্তানের চোখ মুখ লাল। অথচ তিনি কিছু করতে পারেন না। কোম্পানী এজেণ্ট-অফিসের মারফত এ-সব করে থাকে। কিভাবে কোথায় কি পরিমাণ টাকা দিলে, বেশি পরিমাণ টাকা বেঁচে যায়, এবং রিপোর্টে লেখা থাকে তখন, দি সিপ মে সেইল, কাপ্তান যেন ঠিক জানেন না।

    সকালের দিকে ঘন কুয়াশা। কাজের ভেতর শুধু এখন এনজিন রুমে ঘুরে বেড়ানো। কোলবয়দের দিয়ে রেলিঙ, অথবা এনজিনরুমের পাটাতন ঝকঝকে করা। ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে শীতের পোশাকে এখন সব জাহাজিরা যে যার কাজে চলে যাচ্ছে। মৈত্র, জানে তার টাকা পাঠানো হল না। সে সব শেষ করে ফেলেছে। সামনের বন্দরে কিছু একটা করা যায় কিনা, শেফালীকে যে সে মাসোহারা দিয়ে এসেছে, ওতে ওর চলার কথা। তবু সে যেমন মুদিখানা, ডাক্তার এবং অন্য সব মানুষদের বলে আসে, আমি যাচ্ছি, ওর যা লাগে দিয়ে যাবেন। সবাই ঠিক ঠিক দিয়ে যায়। সফর শেষে বাড়ি ফিরে এলে সে কারো এক পয়সা বাকি রাখে না। শেফালীর স্বভাব বেশি খরচ করে আরামে বেঁচে থাকা। টাকার প্রতি ওর ভীষণ মায়া কম। এবং তখন এমন একটা সময়, যে সারা সফর ঘুরে শরীরে জমে থাকে এক ভয়ঙ্কর ক্ষুধা, শেফালী যতই আরামে থাকুক, পয়সা খোলামকুচির মতো খরচ করে থাকুক, তার রাগ থাকে না। শেফালী একেবারে সবকিছু এমন ভাবে খরচ করেছে বলেই খুশি। এতটুকু অসুবিধে করে বেঁচে থাকলে মৈত্র ভীষণ কষ্ট পেত যেন। কিন্তু জাহাজে ওঠার সময় মনে মনে সে ভীষণ ক্ষেপে যায়। শেফালী এভাবে খরচ না করলে আরও কিছুদিন কিনারায় থেকে যেতে পারত।

    গত রাতে সে ফেরেনি। কেন ফেরেনি, কোথায় ছিল কিছু বলছে না। সে এখন পুরোপুরি টিণ্ডাল। ছোটবাবু অমিয়কে কয়লায়ালা বাদে আর কিছু ভাবছে না।

    অমিয়, ছোটবাবু জানে অথবা বুঝতে পারে বাবু কোথায় রাত কাটিয়েছে। ওরাও এ-নিয়ে কোনও কথাবার্তা বলছে না। বললেই যেন টিণ্ডাল গরম দেখাবে।

    বিকেলের দিকে মৈত্র কোথাও বের হয়নি। কেবল একটু নিচে নেমে সে পায়চারি করছিল। কেউ কেউ কিনারায় আগুন জ্বেলে গরম পোহাচ্ছে। ওরা সবাই জাহাজে মেরামতের কাজ শেষ করে ফিরে যাচ্ছিল। ওদের বোসান হয়তো এখনও ফিরে আসেনি। ওরা আগুন পোহাচ্ছে। ডালপালা, গাছপাতা জড় করে আগুন জ্বেলে নিচ্ছে। মৈত্রের ভেতর কি যেন অস্থিরতা। সে বুঝতে পারে না। সে আর যেতে পারে না দূরে, সে জেটিতেই ঘুরে বেড়ায়। তার মনে হয় চারপাশে কি যেন ঘণ্টাধ্বনি, সেই যে কবে থেকে শুনে শুনে একেবারে পাগল হয়ে যাচ্ছে। সে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, যেন সমুদ্রের নিচে কেউ ঘণ্টাধ্বনি বাজাচ্ছে। সে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল। সামনে আগুন জ্বলছে। ভীষণ কুয়াশার ভেতর দিয়ে সে হাঁটছে। পৃথিবীর সব কিছু এখন অন্যরকমের মনে হয়। কাছের মানুষ ছায়া ছায়া, দূরের কিছু দেখা যায় না। পর্দায় ভেসে আসা একটা মানুষ যেন তার কাছাকাছি ভেসে এল। সে বলল,

    ছাঁইয়া। সে তার পাশে এসে বলল, এটা দ্যাখো। আমরা একজন মানুষকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। সে নিষ্ঠুরতার প্রতীক। সেদিন ধরা পড়েও কি করে যে পালিয়ে গেল। এটা ওর ছবি। কেমন ছায়া ছায়া হয়ে ভেসে এল মানুষটা, কুয়াশার মতো ভেসে এল, তারপর আবার মিলিয়ে গেল। মৈত্র দেখতে পেল, হাতে একটা ছবি। কুয়াশায় একেবারে স্পষ্ট নয়। সে ওপরে ওঠে ফোকসালে আলো জ্বেলে দেখল, ছবিটা যেন চেনা, খুব চেনা। নিচে একটা বড় টাকার ঘোষণা। খুব লোভের। সে ইচ্ছা করলেই ধরিয়ে দিতে পারে। হাতের কাছে এমন সুযোগ!

    অথচ তার ভাল লাগছে না কিছু। ক্যাপ্টেন ফ্রক, আইখম্যান হতে পারে, আইখম্যান মৈত্র নিজে ও হতে পারে, অথবা সেই সিফিলিস আক্রান্ত মানুষটি। কেউ যেন কম যায় না। বরং ক্যাপ্টেন ফ্রক এখন একটা কুকুরের প্রাণরক্ষার্থে বনবাসে চলে গেছে। সে যেই হোক, তার আর এ নিয়ে ইচ্ছা নেই কিছু করার। সে জানে, একটু রাত হলে অথবা গভীর রাতে জাহাজে মানুষটা উঠে আসতে পারে। কিংবা কাল, কাল ওরা থাকছে না। চলে যাচ্ছে। ওর ঘুম পাচ্ছিল। সে ওপরে উঠে ফোকসালে ঢুকে গেল। বাংকে শুয়ে পড়ল। অমিয়, ছোটবাবুর সঙ্গে একটা কথাও বলল না।

    রাত না পোহাতেই জাহাজ আবার চালু হয়ে গেল। এনজিনরুমে তিনটি বয়লারেই লক্ লক্ করে জ্বলে উঠল আগুন। ফায়ারম্যানদের মুখ লাল হয়ে গেল। ওপরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বলে এই স্টোক-হোলডে বেশ গরম এবং এক অনিবার্য সুখ। তখন ওপরে জাহাজের সামনে পেছনে বড় মালোম, মেজ মালোম। জাহাজের দড়ি দড়া সব খুলে দেওয়া হচ্ছে। নোঙর উঠে যাচ্ছে জাহাজের। মাস্তুল থেকে ফ্ল্যাগ নামানো হচ্ছে। কোয়ার্টার মাস্টার জাহাজের পেছনে ইউনিয়ান জ্যাক তুলে দিয়ে গেছে এবং এ-ভাবে ক্রমে জাহাজ জেটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, ক্রমে প্রপেলার বেশ জোরে ঘুরছে। বন্দর পেছনে ফেলে জাহাজ আবার দূর সমুদ্রগামী হয়ে যাচ্ছে।

    তখন সব জাহাজিদের ভীড় উপরে। কেউ নিচে নেই। যারা ওয়াচে নামার তারা নিচে এবং এনজিনরুমে এখন ঘড়ির কাঁটায় মাঝে মাঝে এ্যাস্টার্ণ-এ-হেড অথবা স্লো কখনও ফুল। বন্দর এলাকায় জাহাজটা এ-ভাবে পথ করে ক্রমে সমুদ্রে, গভীর সমুদ্রে নেমে গেলে মনে হয় এক রহস্যময় বন্দর ফেলে ওরা চলে যাচ্ছে। যত বাড়িঘর এবং জাহাজের মাস্তুল দূরবর্তী হয়ে যায় তত এই জাহাজিদের আপ্রাণ চুপচাপ ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা। আসলে এই হচ্ছে জাহাজ, জাহাজের মানুষ। তারা নিরন্তর বন্দর ফেলে চলে যায়। নিরন্তর এক বন্দর ফেলে গেলেই প্রত্যাশা আবার কবে বন্দর পাবে। এবং এই বুঝি নিয়ম জাহাজি মানুষের যা চলে যায়, তার জন্য মায়াও শেষ হয়ে যায়। আবার নতুন মায়া গড়ে ওঠে, এবং স্বপ্ন নানাভাবে, বন্দর এলে কিভাবে যে তাদের দিনগুলো কেটে যায়।

    ওরা আবার বন্দরের জন্য দিন গুনতে থাকে।

    যেমন ছোটবাবু কয়লায় একটা একটা করে দাগ কেটে রাখে কাঠের পাটাতনে। একটা দিন গেলেই সে দাগ কেটে রাখে—এভাবে তার হিসেব ঠিক থাকে। আবার কখনও ক্যালেণ্ডারের পাতায় কেউ দাগ কাটছে। জ্যাক এভাবে তার দিনের হিসেব রাখে। এবং সে বুঝতে পারে এই জাহাজে প্রায় চার মাসের ওপর তার সময় পার হয়ে গেল। সে যে বয়সে ছিল এখন যেন ঠিক সেই বয়সে নেই এবং স্নান করার সময় সে কি সব টের পায়, আশ্চর্য নরম এক রঙের বৃত্তের মতো বুকের দু’পাশে তার বয়স ক্রমে সজীব হয়ে উঠছে। সে নানাভাবে এইসব সজীবতা থেকে আত্মরক্ষা করতে চেষ্টা করছে। তখনই কেন যে শৈশবের স্বপ্নের মতো এক সুন্দর মুখ তার চারপাশে খেলা করে বেড়ায়। নিজের হাতে তৈরি সে ব্র্যাসিয়ারের ভেতর রুমাল গুঁজে দেয়। এক দুই তিন। এখন ঠিক সে তিনটে রুমাল পর পর ভাঁজ না করে দিলে বুক অসমান থেকে যায়। সে ধরা পড়ে যাবে। অথচ তার মুখে কষ্টের ছাপ। এই ভাঁজ করা রুমাল মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় ছুঁড়ে ফেলে দিতে। সে যেন পারলে ডেক ধরে ছুটে যেতে চায়। এবং বলার আকাঙ্ক্ষা, হে মানুষেরা, আমি মেয়ে। মি গার্ল এবং তখন সত্যি গভীর সমুদ্রে শুধু নক্ষত্রেরা জেগে থাকে এবং দূরে হয়তো কোথাও তিমি মাছের ঝাঁক, জ্যোৎস্না ওদের পিঠে পিছলে যাচ্ছে—কি যে মনোহারিণী এই সমুদ্র! জ্যাক একা ডেকে দাঁড়িয়ে থাকলে এটা টের পায়।

    সে এই বিষণ্নতায় বেশি সময় ডুবে থাকতে পারে না। ছোটবাবুর বোধ হয় পরি শেষ। সে ঘড়ি দেখলেই বুঝতে পারে এই ঠিক সময়, এখন ছোটবাবু সিঁড়ি ধরে ওপরে বোট-ডেকে উঠে আসবে। তখন তাঁর ইচ্ছে হয়, লুকোচুরি খেলা, মহামহিম এই ঈশ্বরের জগতে তার, নীরবে কোথাও আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। ছোটবাবুকে সে ভয় পাইয়ে দিতে পারলে মজা পায়। হয়তো ছোটবাবু ফানেলের গুঁড়ি ধরে ওঠে আসছে তখনও। বনির কি যে কৌতূহল! সে জালিতে মুখ রেখে দেখতে থাকে, উঠে আসছে, উঠে আসছে ছোটবাবু, ছোটবাবু মাথা নিচু করে রেখেছে। ওকে দেখতে পাচ্ছে না। ঠিক ফানেলের পাশ কাটিয়ে যেই না যাওয়া হঠাৎ চিৎকার, হেই। ছোটবাবু বুঝতে পারে জ্যাক। সে ভয় না পেলে জ্যাক আনন্দ পায় না। তখন ছোটবাবু আর কি করে। কেমন ভয়ের অভিনয় করে বলতে থাকে, জ্যাক তুমি! ওঃ কি না ভয় পেয়েছিলাম।

    আবার সমুদ্রে সূর্য অস্ত যায়। পিছিল আর আগিল থেকে ফ্ল্যাগ জড় করে ব্রীজে উঠে যায় কোয়ার্টার মাস্টার। রেডিও অফিসার মাংকি-আয়ল্যাণ্ডে দূরবর্তী স্টেশনের খবরের আশায় থাকে। সাদা ফুলশার্ট কালো প্যান্ট পরে জ্যাক একাকী রেলিঙে। চড়ুই পাখি দুটো ওর মাথার ওপর। সমুদ্রে এতটুকু ঢেউ নেই। জলে একটা ফুটকিরি উঠলে পর্যন্ত টের পাওয়া যাচ্ছে। ফ্লাইং ফিসেরা উড়ে উড়ে অদৃশ্য হচ্ছে যখন, অথবা জলে প্রপেলারের ভাঙ্গা শব্দ, অতিকায় জলে ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দ শুনলে মাছেরা ভয় পেয়ে যেতে পারে। জ্যাক তখনও দাঁড়িয়ে থাকে, ছোটবাবু হয়তো পাখি দুটোর টানে চলে আসবে। কারণ সে তো ইচ্ছে করলেই ছোটবাবুরা যে-দিকটায় থাকে যেতে পারে না। এদের জন্য জাহাজের পেছনটা। তাও ছোটবাবুরা থাকে ডেকের নিচে সিঁড়ি ধরে নেমে গেলে, বেশ অনেক নিচে, অর্থাৎ জাহাজ যখন ত্রিশ-বত্রিশ ড্রাফটে চলে তখন ছোটবাবুদের কেবিন প্রায় জলের নিচে থাকে। ছোটবাবুর কি যে মজা! তার পোর্ট-হোলে কেবল নীল জল চলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে নীল জল, সমুদ্রের নীল জল ক্রমাগত ওর পোর্ট-হোলের কাচের ওপরে ভেসে যাচ্ছে। জ্যাক শরীরে আশ্চর্য ঘ্রাণ মেখে এভাবে কখনও কখনও ছোটবাবুর জন্য বোট-ডেকে অপেক্ষা করতে ভালবাসে তখন বড়-মিস্ত্রি কেবিনের দরজা বন্ধ করে পৃথিবীর সব বই যেমন যাবতীয় ঘোস্টস্টোরির ভেতর ডুবে থাকে। সে দরজা খোলে না। ডিনারে খেতে যায় না। তার খাবার তার ঘরে দিয়ে যেতে হয়।

    কি যে একটা ভয় বড়-মিস্ত্রির। আগে তবু কখনও কখনও কেবিনের বাইরে বের হতেন। আফ্রিকার বন্দর পার হবার পর থেকে তাও নেই। একদিন কেবল ছোটবাবু দেখেছে, বড়-মিস্ত্রি প্রায় ছুটে এক পায়ে, রেলিঙে দু-হাতে ঝুলে অনেকটা গ্লাইড করে দ্রুত নেমে যাবার মতো, তখন মেজ-মিস্ত্রি ভীষণ হতবাক, চিফ নেমে আসছে। মেজ-মিস্ত্রি দ্রুত ছুটে তাঁর সামনে দাঁড়ালে একটা কথা না। চুপচাপ পকেট থেকে টর্চ বের করে হেঁটে গেছিলেন তারপর টর্চ মেরে ব্যালেস্ট পাম্পের গোড়ায় যে একটা নাট লুজ হয়ে গেছে, এবং এত শব্দের ভেতরও সেই লুজনাটের শব্দ কিভাবে যে তাঁর কানে পৌঁছেছিল তা ভেবে ছোটবাবু একেবারে মনমরা। এতদিনের একটা আপশোস, লোকটার কাজকর্ম নেই, কেবল কেবিনের দরজা বন্ধ করে সারাদিন আহার মদ্যপান বই পড়া, দাবা খেলা, পৃথিবীতে আর কিছু আছে তিনি যেন জানেন না এবং এনজিনের শব্দ ছন্দের মতো বোধ হয় তাঁর কানে বাজে। একটু বেসুরো হলেই টের পান, কোথায় কি গণ্ডগোল! এবং খবরটা মৈত্রকে দিলে বলেছিল, শালা সঙ্গীতজ্ঞ। সেই থেকে কেন জানি ছোটবাবু বড়-মিস্ত্রিকে বড় সঙ্গীতজ্ঞ বাদে কিছু ভাবতে পারে না।

    সঙ্গীতজ্ঞ সায়েবটিকে এক রাতে সে দেখেছে বুয়েন-এয়ার্স বন্দরে, চুপি চুপি বের হয়ে যাচ্ছেন। মাথার টাক এত বড় যে পূর্ণিমার চাঁদের মতো বিশাল মনে হয়েছিল, ক্রাচের চেয়ে দু-হাতের ওপর যেন বেশি উনি নির্ভরশীল। বেঁটেখাটো মানুষ, গোল মতো অথচ হাঁটা দেখলে মনে হবে ভীষণ ফিট- বড়ি। সারাদিন বসে বসে এমন ফিট বডি রাখে কি করে! কতবার ভেবেছে, এনজিনরুম থেকে উঠে যাবার সময় একবার পোর্ট-হোলে যা আছে কপালে, দেখবে—কি করছেন তিনি। এবং একবার সে যা দেখেছিল বিশ্বাসই হয় নি, সাহেব মানুষের এ-সব কি আবার। এবং সে দেখেছিল বড়-মিস্ত্রি চোখ বুজে যোগাসন করছেন।

    এ-সব কথা অবশ্য দু-কান করা চলে না। সে কেবল তার মৈত্রদাকে বলেছিল। তখন মৈত্ৰদা আবার মৈত্রদা হয়ে গেছে। আর গরম নেই। সে বলেছিল, ছোটবাবু, তুমি শেষ পর্যন্ত জাহাজে একটা কেলেঙ্কারি করবে।

    সে ভেবে পাচ্ছিল না, কি কেলেঙ্কারি সে করতে যাচ্ছে!

    মৈত্র বলেছিল, তোমার ওদিকে যাবার কথা না।

    ছোটবাবু বলেছিল, কেন

    —কোনদিন ধমক খাবে। সারেঙকে ডেকে বলবে, তোমারা আদমি ইধার কিউ ঘুমতা। অবশ্য ছোটবাবু পোর্ট-হালে উঁকি দিয়ে দেখেনি। আসলে দেখতে সাহস পায় নি। হলে কি হবে কৌতূহল মানুষকে ভীষণ বিপদে ফেলে দেয় কখনও কখনও। ছোটবাবুর বেলায়ও তাই। তখন সকালবেলা। রেডিও অফিসার এরিয়া স্টেশনকে বলে যাচ্ছে—জাহাজের নাম, যেমন প্রতিদিন সকালে করতে হয়, রেডিও-অফিসার সকালের ডিউটিতে যা যা করে থাকে, প্রতিদিন, ইয়েস এস এস সিউল ব্যাঙ্ক অথবা এক কথায় ডেনসিঙ গার্ল অর্থাৎ কি নাম জাহাজের, কোন কোম্পানীর জাহাজ, এসব বলতে হয় না। ডেনসিঙ গার্ল বললেই যেন বলে দেওয়া হয় এটা ব্যাঙ্ক লাইন কোম্পানী, ২১, বারি স্ট্রীট, লণ্ডনের একটি ভাঙ্গা জাহাজ—আর কিছু বলার দরকার হয় না। তারপর কোর্স-লে, নেকস্ট পোর্ট অফ কল, জাহাজের এন আর টি, জি আর টি, এরিয়া স্টেশনকে জানিয়ে দেওয়া এবং বোধ হয় জায়গাটা ছিল চোয়াল্লিশ পয়েণ্ট তিন ওয়েস্ট লঙ্গিচুড এবং বত্রিশ পয়েন্ট আট সাউথ ল্যাটিচুড।

    সমুদ্র শান্ত ছিল। জাহাজ খালি বলে তবু সামান্য পিচিঙ ছিল জাহাজে। শীত ছিল না। বরং কিছুটা গরমকালের মতো ব্যাপার! তবে সকালের সমুদ্র এমনিতেই ঠাণ্ডা থাকে। সামান্য ঠাণ্ডা হাওয়া সে-জন্য জাহাজের দড়িদড়া কাঁপিয়ে আমাজন নদীর মোহনায় অথবা গভীর বনাঞ্চলে চলে যাচ্ছে। জাহাজের গতি কিছুটা উত্তর পূর্বমুখী ছিল।

    ঘোস্ট-স্টোরি যাদের পড়ার বাতিক, তাদের একটা বিশ্বাস জন্মে যায়, ভূতেরা সর্বত্রই থাকে। এমন কি এই যে এখন জাহাজ গভীর সমুদ্রে, এখানেও ভূত অনায়াসে চলে আসতে পারে! অথবা এইসব জাহাজে, এত দীর্ঘদিনের জাহাজ যখন, যদি ধরা যায় এটা এক সময়ে যুদ্ধজাহাজই ছিল, তবে অসংখ্য মৃত্যু এই জাহাজে ঘটেছে। যাত্রীজাহাজ হলেও রেহাই নেই। ক্রুদের সমুদ্রে আত্মাহুতি তো লেগেই থাকে। সুতরাং যেমন মাছ বাদে জলাশয় হয় না, ভূত বাদে জাহাজ হয় না। আর এই যেন জাহাজ, জাহাজে কতদিন ধরে সব মরা গরু, ছাগল, শুয়োর বরফ ঘরে ঝুলে থাকে। এদেরও প্রাণ থাকে। একবার নর্দানসায়ারে তো একটা গাধা নিয়ে হৈ চৈ। গাধাটা থাকত চার্চের মাঠে। নানারকম পপলার গাছের ছায়ায় গাধাটা ঘুরে বেড়াতো। বে-ওয়ারিশ গাধা—কার গাধা কেউ জানে না। সবাই কখনও না কখনও ওটাকে দেখেছে গীর্জার মাঠে। জ্যোৎস্নায় বেশি দেখা গেছে। এটা যে কেবল ছেলেপুলেরাই দেখে থাকে তাই শুধু নয়, এটা আবাল-বৃদ্ধ-বনিতারা দেখেছে। এটা যে শুধু এ-সময়কার লোকেরাই দেখেছে তা নয়, গত শতাব্দীর লোকেরাও দেখেছে। গাধাটা সেণ্ট জনের গাধা। না দেখে উপায় নেই। কেলেঙ্কারি সেদিনই ঘটে গেল, কার আলু খেত খেয়ে শেষ করে দিচ্ছিল, মালিক তো তেড়ে মারতে যায়—ওমা গাধা হাওয়ায় বিলীন। এবং লোকজন সব চেঁচামেচিতে বের হয়ে এলে ক্ষেতের মালিক অবাক তার একবিন্দু শস্য নষ্ট হয় নি। এসব ঘটনা বড়-মিস্ত্রি হামেশাই শুনে আসছে। অথবা এ্যাশ-ট্রির সেই উইচ মাদারস্টোলের হত্যার হুকুম এবং এ-সব কারণে ভূতেরা অনেক সময় প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে থাকে।

    বড়-মিস্ত্রির কি হয়েছে কে জানে আর কেবিন থেকে বের হন না। দরজা বন্ধ করে বসে থাকেন সারাদিন। পোর্ট-হোল খোলা থাকে কেবল! এনজিনের গণ্ডগোল হলে কেবল এনজিনরুমে হপ্তাহে দু হপ্তাহে মুহূর্তের জন্য দেখা যায়। ছোটবাবু এ-হেন বড়-মিস্ত্রির কেবিনের পাশ দিয়ে যাবার সময় একটা কেলেঙ্কারি করে ফেলেছিল আর কি!

    ছোটবাবু ভেবেছিল কিছুতেই সে ওদিকে যাবে না। তবু কি যে আকর্ষণ থাকে। রাত্রে আজকাল অমিয় আপেল ডিম কোথা থেকে নিয়ে আসে। আপেল এবং ডিম ঠিক তিনজন মিলে সমানভাগে খায়। ধারণা ছিল ছোটবাবুর যে, এটা অমিয় স্টুয়ার্ডের কাছ থেকে চেয়ে নিচ্ছে। সুতরাং রহস্য তার জানার কথা না। দুপুররাতে সে যখন ওয়াচ শেষ করে উঠে আসছে তখন কি কপাল, কে বলবে, সোজা স্টোক-হোলডের সিঁড়ি ধরে না উঠে সে এনজিন-রুমের সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠে যাচ্ছে। এ-পথ ধরে সাধারণত ক্রুদের ওঠার নিয়ম নেই। সে, পথ সংক্ষেপ করার জন্য আগে মাঝে মাঝে উঠে যেত। সে-রাতে ওঠার মুখে দেখল, সামনের রাস্তা ব্লক করা। দরজা লক করে দেওয়া হয়েছে। আবার এনজিনরুমে নেমে বয়লাররুম পার হয়ে সিঁড়ি ধরতে হবে। অনেকটা পথ। ডাইনিঙ হলের পাশ দিয়ে একটা গুপ্তপথ আছে। সে ভাবল ওটা দিয়ে স্টাবোর্ডসাইডে নেমে যাবে। অন্ধকারে পথটা অস্পষ্ট। অমিয় সবসময়ই আজকাল একটু দেরি করে উঠে আসে বাঙ্কার থেকে। বোধহয় স্টুয়ার্ডের কাছ থেকে ডিম এবং আপেল চেয়ে নিতে দেরি হয়, অথবা কি অমিয়, গোপনে স্টোররুম থেকে চুরি করে থাকে। ও যা মানুষ সব পারে। জাহাজের একঘেয়েমী খাওয়া সহ্য হয় না। এ-জন্য অমিয়র এমন একটা দুর্ধর্ষ কাজ ওরা মনে মনে তারিফ করে থাকে। ওরা প্রশ্ন করলে, অমিয় ক্ষেপে যায়।

    তবে মুসকিল হচ্ছে ডাইনিং হলের ও-পাশের গুপ্তপথের লাগোয়া কেবিনে থাকে সেই বড় মিস্ত্রি। যাকে সে একদিন দেখেছিল শীর্ষাসনে আপেল খাচ্ছে। এখন হয়ত গেলে দেখতে পাবে বই পড়ছে। ওর ধারণা এসব লোকেরা কখনও ঘুমায় না। সারাক্ষণ জেগে থাকে। নাহলে সব এনজিনিয়াররা বড়-মিস্ত্রিকে দেখে ভয় পায় কেন। এনজিনের কোথায় কি গণ্ডগোল মানুষটা যা জানে, আর কেউ তেমন জানে না। অথবা ও বোধহয় জানে, কত তারিখে, কোন সময়ে এনজিনের কোন অংশে ব্রেক- ডাউন হবে। না হলে সঙ্গে সঙ্গে টের পায় কি করে! কি সকালে, কি বিকেলে, কি মধ্যযামিনীতে এ-পর্যন্ত যতবার ছোটবাবু দেখেছে, অবশ্য খুব কমই দেখেছে, কিন্তু সময়ের কোন ঠিক নেই। ওর কেবিনটা ঠিক এনজিনরুমের পাশে। এমন গোলযোগে থেকে থেকে, সারাক্ষণ থেকে থেকে—এই তো জাহাজ যতদিন চলবে, বিশ বাইশ মাস নাগাড়ে, চব্বিশ ঘণ্টা কেবল অতিকায় ঝ্যাকোর ঝ্যাকোর শব্দ। এভাবে একজন সারাক্ষণ শব্দ শুনতে শুনতে—কারণ সে তো দেখেছে এনজিনে এমন শব্দ যে, চিৎকার করে কথা না বললে শোনা যায় না। বেশির ভাগ সময় হাতের ইশারায় কথা বলতে হয়। চার ঘণ্টা ওয়াচ শেষ করে যখন উঠে যায় এনজিনিয়াররা তখন ওদের মানুষ বলে মনে হয় না। শব্দেই হয়তো মাথা ধরে যায়। অথবা মাথার ভেতরে শিরা-উপশিরা যা কিছু থাকে তার নাটবল্টু আম্মা হতে কতক্ষণ।

    ছোটবাবু এতসব ভাববার সময় পায় নি। সে এতরাতে এই জায়গায় এসে ফিরেও যেতে পারছে না! কারণ এতক্ষণে হয়তো মেজ-মিস্ত্রি নিচে নেমে গেছে। যে-করেই হোক তাকে এলিওয়ে ধরে আরও কিছুটা এগিয়ে যেতে হবে এবং গুপ্তপথটা আবিষ্কার করতে হবে। খুব একটা পরিচিত নয় পথটা। কেবল একদিন এদিকটায় সে জ্যাকের সঙ্গে এসেছিল। এখানে কেবিনের পাশে পাশে ঘুরে ঘুরে নিচে ওপরে পথ নেমে গেছে। কেবিনগুলো দেখতে সব একরকমের। বোট-ডেকে উঠে যেতে পারলে হত। পাশেই কোথাও একটা সিঁড়ি আছে। কিন্তু সে একটু এগিয়ে অন্ধকারের ভেতর পড়ে গেল। কেউ এখন এদিকটায় জেগে নেই। কেবল একটা ছায়ার মতো দেয়ালের পাশে কেউ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে যেন! বোধহয় এগুলো কাপ্তান-বয়, মেসরুম-বয়ের কেবিন। যাই হোক খুব তাড়াতাড়ি সে আবছা আলো অন্ধকারে দেখতে পেল অস্পষ্ট এক ছায়ার মতো, কেউ দাঁড়িয়ে আছে। এবং এমন একটা অন্ধকার এলিওয়ো তো কোন বাতি না থাকলে যা হয় কেবল এনজিনের ভৌতিক একটা শব্দে, ওর মাথা কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে অথচ সে সামনের সরুপথটা ধরে না গেলে জাহাজের স্টাবোর্ড-সাইডে পড়তে পারবে না। সেই ছায়াটা ক্রমে লম্বা হয়ে যেতে থাকল। আর ওর চোখ- মুখ শুকনো, ভৌতিক ব্যাপারটা একেবারে মিথ্যা নয়, সে দেখল সেই ছায়া ক্রমে লম্বা হতে হতে ওর পায়ের কাছে নেমে এসেছে এবং সে তখনই চিৎকার করে উঠবে ভাবল, আর মুখে কেউ তখন হাত চাপা দিয়ে প্রায় টানতে টানতে যখন স্টাবোর্ড-সাইডে নিয়ে গেল, তখন সে একেবারে অবাক, অমিয়। অমিয় সামনে দাঁড়িয়ে।

    অমিয় বলল, ওদিকে কেন গেছিলি!

    ছোটবাবু কিছু বলতে পারল না।

    —ও-রাস্তাাটা ভাল না। শালা সঙ্গীতজ্ঞ ভূতটুতের ব্যবসা করে।

    ছোটবাবু বলল, সত্যি!

    —সত্যি! কেউ যায় না।

    —কেন যায় না!

    —মাঝে মাঝে একটা লম্বা ছায়া দাঁড়িয়ে থাকে।

    ছোটবাবুর গা ছম ছম করতে থাকল। দুপুর রাতে এমনিতে জাহাজ ভীষণ ভয়াবহ। অনেকে একা তখন ওপরে উঠতে ভয় পায়। চারপাশে সমুদ্র। কিছু দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকারে শুধু কিছু নক্ষত্র। এবং কোনো কেবিনে অথবা ফোকসালে আলো জ্বালা নেই। কেবল ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে বড় বড় দুটো মাস্তুল। মাস্তুলের দু’পাশে দুটো আলো আর উইংসে আলো। এমন একটা ভয়াবহ ঘটনার সম্মুখীন হয়ে ছোটবাবু জাহাজটা যে সত্যি ভূতুড়ে বিশ্বাস না করে পারল না। এবং সে দেখল অমিয়র হাতে একটা আপেল দুটো ডিম। ছোটবাবু বলল, কোথায় পাস তুই এ-সব। এত রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন কোথা থেকে সব সংগ্রহ করিস!

    অমিয় বলল, এত সব জানবার তোমার কথা না! ভাগের ভাগ খাবে। কোন প্রশ্ন নয়।

    তারপর ছোটবাবু দেখল অমিয় জামার নিচ থেকে এক টুকরো চকচকে কি বের করছে। ওরা তখন ডেকের ওপর দিয়ে হাঁটছিল। অমিয়র কি যে বাতিক দিন দিন হচ্ছে, লকারটা সে কিছুতেই খুলছে না। যখন সাফাই দেখতে বের হন কাপ্তান তখন তিনি দু-একবার এই লকার বন্ধ করে রাখার রহস্য জানতে চেয়েছেন। অমিয় বলছে, সে চাবি হারিয়েছে। তা তিন-চার মাস হয়ে গেলে সন্দেহের কারণ দেখা দিতে পারে। এভাবে যে অমিয় কি গোপন করছে ছোটবাবু বুঝতে পারছে না। অবশ্য লকার খুলে মাঝে মাঝে অমিয় যে না দেখেছে তাও নয়। অমিয় বয়লার রুমে কয়লা পুড়ে গেলে তার ভেতর থেকে উজ্জ্বল সব ভারি ধাতুপিণ্ড সংগ্রহ করছে। ওর ধারণা যে কি! দেখতে মূল্যবান, কিন্তু এ-সব এত সহজে যদি মিলে যায় তবে, কোলবয় হয়ে পৃথিবীর সবাই গোল্ড-রাশে নেমে যেত। ছোটবাবু এবং মৈত্র এ-নিয়ে রসিকতা করেছে, কিন্তু মনে মনে কষ্ট পাবে ভেবে, চাবিটা পাওয়া যে ঠিকই যাচ্ছে না এমন সমর্থন জানিয়ে এসেছে। আসলে গোটা লকারটাতে সে রেখেছে সব পোড়া কয়লা থেকে কাল্পনিক অমূল্য সব ধাতু। সে এ-ভাবে একদিন ঠিক বড়লোক হয়ে যাবে। স্বপ্নে প্রায় রাজা হবার মতো। এবং ছোটবাবু দেখল আজও অমিয় কিছু সংগ্রহ করে এনেছে। দেখলে সত্যি অমিয়র জন্যে মায়া হয়। অমিয় যেন এ-জন্যই ছোটকে এত তোষামোদ করে থাকে। আপেল খাওয়ায়, ডিম এনে খাওয়ায়। এদের রেশনে যা নেই তা জীবন বাজী রেখে সংগ্রহ করে আনছে।

    ছোটবাবু আর কোন প্রশ্ন করল না। কেবল বলল, ঠিক আছে, আর ওদিকটাতে যাব না। সকালে ঘুম থেকে উঠলে ছোটবাবুর মনে হল ওপরে কেউ নাচছে। এবং ঢোল বাজাবার মতো টব বাজাচ্ছে কেউ। সুর ধরে কেউ গাইছে। সারেঙ দুবার খোঁজ নিয়ে গেছে ছোটবাবুর! ছোট তখনও ঘুমোচ্ছিল বলে ডাকে নি। ওপরে উঠে সে তাজ্জব। অনিমেষ মজুমদার একটা স্লিপিঙ-গাউন পরে মেয়ে সেজেছে। চুলে খোঁপা বেঁধেছে গামছা দিয়ে। আজ রবিবার। ছোটবাবুদের সমুদ্রে রবিবার শনিবার বলে কিছু নেই। ডেক-জাহাজিদের আছে।

    ডেক-ক্রুরা আয়াসে চলাফেরা করছে। তাড়াহুড়ো নেই। মেসরুমে ভীড়। বাথরুম থেকে ছোটবাবু বুঝতে পারল অমিয় টপ্পা গাইছে। এ-সব টপ্পা শোনা যায় না। অফিসারের নামে অশ্লীল পদ্য এবং সমে অমিয়, ছোটবাবু ভূত দেখেছে বলে শেষ করছে।

    অমিয় বেশ মিলিয়ে টপ্পা তৈরি করতে পারে। ছোটবাবু উঁকি দিলে দেখল, অমিয় বসে রয়েছে, পায়ের নিচে রঙের টব। জানালা দরজায় সব ক্রুদের মুখ। যারা বয়সে বুড়ো এদিকটায় আসছে না। গনি, ছোট টিণ্ডাল, বাদশা মিঞা নামাজ পড়তে এসে ফিরে গেছে। বেশ ময়ফেল জমেছে এবং রঙের টবে ঢোলের শব্দ আর পায়ের ঘুঙুর বেঁধে পুরানো এক স্লিপিং-গাউন মেমসাবের পরে ঘুরে ঘুরে মাথায় হাত তুলে পেছনে হাত রেখে অনিমেষ মজুমদার নাচছে। কেউ ওকে জড়িয়ে ধরে কামড়ে দিতে চাইছে। কেউ ওর হাত ধরে চুমু খাচ্ছে এবং পয়সা দিচ্ছে। সে তারপর ঘুরে ঘুরে ডেকে নেচে বেড়াল। এবং চারপাশে এই যে সমুদ্র, জাহাজ দিনরাত ভেসে চলেছে, তার ওপর অনিমেষ এ-ভাবে একটা মেয়ে সেজে তামাসা দেখাল, কে কত দেবে ঠিক হল। তার বিনিময়ে কেউ ঠেলে ঠেলে নিয়ে গেল ফোকসালে, নাও, এবারে লিখে নাও, বন্দরে এলে অনিমেষকে এ-টাকাটা দিতে হবে। একসঙ্গে যা টাকা জমবে, তা দিয়ে উৎসবের মতো জাহাজে, একেবারে কিনার থেকে তাজা মুরগি কিনে আনবে সারেঙ, তারপর পিকনিকের মতো ব্যাপার। অনিমেষ সং সেজে টাকা তুলে দিচ্ছে ডেক-সারেঙকে।

    আসলে এই সং সাজার ভেতর অনিমেষ কেমন আনন্দ পায়। সে আবিষ্কার করেছিল, ডেক- টিণ্ডাল বুনোসাইরিসের পুরানো বাজার থেকে বিবির জন্য একটা সেকেণ্ড-হ্যাণ্ড স্লিপিং-গাউন কিনে এনেছে। সবাই যা আনে বাজার থেকে, পাশাপাশি সবাইকে খুলে দেখায়। কিন্তু ডেক-টিণ্ডাল অন্য রকমের। সে গোপনে তুলে রাখার সময় ধরা পড়েছিল। অনিমেষ তারপর বেশ সং সেজে ফেলল রাতে। রাত নটায় সে ঘুরেছে মেয়ে সেজে। সকালেও মেসরুমে মেয়ে সেজে বেশ পয়সা কামিয়ে বেড়িয়েছে। কিন্তু ছোটবাবু ভূত দেখেছে এটাই ছিল বার বার এক কথা। ছোটবাবুকে সারেঙ ডেকে সাবধান করে দিয়েছেন, তোকে ছোট কত করে বলব, তুই যে কেন একা উঠে আসিস! এবং সারেঙ যেন ছোটকে কি বলতে গিয়েও বলতে পারেন না। কেবল একসময় না বললেও যেন নয়, এমন ভেবে মুখ কাছে এনে বললেন, জাহাজে কত সব অদ্ভূত ঘটনা ঘটে। তুই সবচেয়ে কম বয়সের জাহাজি। কখন কি ঘটবে বলা যায় না। রাত বারোটায় কে তোকে একা একা এনজিন রুম থেকে উঠে আসতে বলেছে। মৈত্র মশাই কোথায় থাকে! জব্বার, অমিয়? তুই একা একা আসবি না। দুপুররাতে কেউ জাহাজে একা ঘুরে বেড়ায় না।

    ছোটবাবুর খুবই বিশ্বাস সারেঙকে। তিনি তাকে হাতে ধরে জাহাজে নিয়ে এসেছেন। ওদের এখন ওয়াচের সময় হয়ে যাচ্ছে। জাহাজ কেমন নিরিবিলি যাচ্ছে। রোদ গ্যালিতে এসে পড়েছে। যত বেলা বাড়বে রোদ গ্যালি থেকে সরে যাবে। এবং কেউ কেউ রেলিঙের ধারে বেঞ্চিতে বসে সমুদ্র দেখছে, চর্বিভাজা রুটি খাচ্ছে। এবং ভূত নিয়ে ক্রুদের ভেতর কথাবার্তা। কোন কোন জাহাজে ভূতের উপদ্রব সত্যি ছিল ক্রমে তাও কথায় কথায় চলে আসছে। এবং একবার যে একটা জাহাজ-ভূত ছিল সাউথ-সিতে তার গল্প। এখন তো শোনা যাচ্ছে সে রাস্তায় আর কেউ জাহাজ চার্টার করে না। কোর্স- লে পাল্টে দিয়েছে। ছোটবাবু সারেঙের কথাবার্তা শুনে বুঝেছে, মধ্যরাতে একা ওর সত্যি ঘুরে বেড়ানো ঠিক না। গতকালের ঘটনার পেছনে সে কোনো কার্য-কারণ খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ চোখের ওপর ঘটনাটা দেখেছে। এবং হতবাক হয়ে গেছে।

    তখন কাপ্তান ফল আর এক-কাপ কফি খাচ্ছিলেন। তখন জ্যাক নিজের কেবিনে ফল, দু স্লাইস স্যাণ্ড-উইচ এবং কফি খাচ্ছে। জ্যাকের পায়ের কাছে পাখি দুটো। জ্যাক আজ কাজে বের হয় নি। দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছে। রাত হলে, যখন সত্যি গভীর রাত হয়, এবং ডগ-ওয়াচের ঘণ্টায় ওর ঘুম ভেঙ্গে যায়, তখন নিভৃতে খুব দামী দামী স্কার্ট এবং সুন্দর সব গাউন পরে নিভৃতে বসে থাকে। আয়নায় প্রতিবিম্ব ভাসে। চুল আরও বড় হলে ওর মুখ আরও সুন্দর দেখাত। যা আছে তাই দিয়ে চুলটাকে পেছনের দিকে সামান্য ফাঁপিয়ে রাখে। এবং হাত দিয়ে, দু-হাত দিয়ে চুলের চারপাশটা চেপে চেপে সে তার মায়ের মতো দু-পাশে দুটো ক্লিপ এঁটে দেয়। তারপর দু-হাত দু-দিকে ডানার মতো মেলে দেয়, উঠে দাঁড়ায়। রেকর্ডপ্লেয়ারে সুন্দর রিন-রিন্ করে বাজনা বাজে, কখনও স্লোভাক লোকসঙ্গীত অথবা এক অবিরাম সঙ্গীতের মতো যেন কোন গীর্জায় কেউ ঝম্ ঝম্ করে পিয়ানোর রিডে হাত চালাচ্ছে। সে নিজের মতো কোনও ব্যালেগার্লের ছবি শরীরে ফুটিয়ে ধীরে ধীরে একা একা নাচে। একা একা সে টো-এর ওপর ঘুরতে ঘুরতে কোনও দূরবর্তী সরোবরের নীলপদ্ম হয়ে যায়। ওর শরীরে থাকে তখন আশ্চর্য ঘ্রাণ। রাত বারোটায়, জাহাজে সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন সারা জাহাজে এক মূল্যবান সুগন্ধি ছড়িয়ে যায়। কেবিনে কেবিনে, ফোকসালে ফোকসালে গন্ধটা ভেসে বেড়ালে শরীরে আকাঙ্ক্ষা জন্মে। সমুদ্র আর ভাল লাগে না। কবে যে জাহাজ আবার বন্দর ধরবে!

    সকালে ঘুম ভাঙলেই জ্যাকের কাজ, সব পোশাক শরীর থেকে খুলে ফেলা। সে তার পোশাক খুলে বড় একটা ট্রাঙ্কে রেখে দেয়। সুন্দরভাবে রেখে দেয়। ভাঁজ করে, যেন ভাঁজ নষ্ট না হয়, কারণ বাবা তার পোশাক কিনে আনার সময় খুব গোপনীয়তা রক্ষা করেন। বনি রাতে নিজের পোশাকে সাদা চাদরের নিচে শুয়ে থাকতে ভালবাসে। তিনি তা বোঝেন। তবু খুব সতর্ক থাকতে হয়। বনিকে তিনি সব বলে দেন। তখন বনির কান্না পায়। সে আর এ ভাবে পুরুষ সেজে থাকতে পারছে না। ছোটবাবু কি যে, বোকা! কিছুতেই বোঝেনা সে মেয়ে। সে তো ছোটবাবুর পিঠে পিঠ লাগিয়ে এক দুপুরে বাংকারে বসে গল্প করেছিল। কি যে সুন্দর আর তরুণ সন্ন্যাসীর মতো অথবা মনে হয় মহান বৃক্ষের ছায়ায় সে তখন দাঁড়িয়ে। ওর ইচ্ছে, যেমন বাবা জানে সে মেয়ে, ছোটবাবুও জানুক সে মেয়ে। পৃথিবীতে আর কারো কাছে ধরা না দিলেও ক্ষতি নেই। যত জাহাজের দিন যাচ্ছে বনি তত পাগল হয়ে যাচ্ছে এবং যখন কিছু ভাল লাগে না, সাহসে কুলায় না, কিছু একটা করে ফেলতে, তখন রাতে মধ্যরাতে সে রেকর্ড-প্লেয়ারে সব মহান সঙ্গীতজ্ঞদের মিউজিক বাজিয়ে চলে। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী পোশাকে সে একা একা নাচে। তার সঙ্গে থাকে তখন ছোটবাবু। কল্পনায় সেই ছোটবাবুকে ← তার পাশে রাখে কোন যুবক ব্যালে-ড্যানসারের মতো। ছোটবাবুর চওড়া কাঁধ, সোনালী অথবা নীলরঙের দাড়ি গোঁফ এবং শক্ত হাতের ভাঁজে এক পা তুলে নিজের সব কিছু অর্পণ করে দেবার ভিতর কি যে আকুলতা! বনির এই অস্থিরতা ওর চোখ মুখে ভাসে। সে কখনও শুয়ে থাকে নরম বিছানায়। সাদা মোমের মতো পা, হাতে নীল শিরা উপশিরা, গোলাপী রঙের স্তনে হুল ফোটালে রোমকূপে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে এ-ভাবে আর পারে না।

    পারে না বলেই সকালে সে বার বার দরজা খুলে উঁকি দিয়েছে, কখন ছোটবাবু আসবে। সে তার বয়লার সুট পরে দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। তাকে সে আজ একটা কথা বলবে। বলবে, আমি মেয়ে, ছোট, মি গার্ল। এবং সে প্রতিদিন এটা ভেবেছে বলবে, তুমি কাউকে বল না, বললে, বাবা আমাকে জাহাজ থেকে নামিয়ে দেবে, দেশে পাঠিয়ে দেবে। পরিচারকদের হাতে আমায় নির্বাসন দেবে। তুমি কিন্তু বল না। কেবল তুমি জানবে, আমি মেয়ে। আর কেউ না। হ্যাঁ আর জানে চিফ অফিসার। তিনি আমার আংকল। তিনি এবং বাবা আমার কাছে সমান।

    ছোট যখন বোট-ডেকে উঠে এল, তখন জ্যাক ফানেলের গুঁড়িতে কিছু একটা করছে। আসলে এটা অজুহাত, ফানেলের গুঁড়ি ধরে ছোট সবার পরে এনজিন রুমে নেমে যাবে। এখনই ঠিক সময় এবং কি ভেবে জ্যাক ডাকল, ছোট!

    তখন জাহাজের চিমনির ছায়া বেশ লম্বা হয়ে সমুদ্রে ভেসে গেছে। ধোঁয়া ব্রীজের ওপর দিয়ে সামনে কিছুটা এগিয়ে আবার উত্তর-পূব মুখি ভেসে যাচ্ছে। নীল সমুদ্রে এই ধোঁয়া কিছুটা ছায়া ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে, এবং তাজা রোদ বলে সমুদ্রের নীল রঙ কেবল সোনালী বর্ণমালায় সেজে চারপাশের অসীমতায় ডুবে যাচ্ছে। এমন যখন জাহাজের চারপাশের বর্ণমালা তখন ছোট দেখল, চিমনির পাশে উইণ্ডসেলের নিচে জ্যাক দু-হাঁটুর ভেতর থেকে মুখ তুলে ওকে দেখছে! উইণ্ডসেলের ছায়ায় জ্যাকের মুখ ভীষণ দুঃখী অথবা ভীতু দেখাচ্ছে। সে ছোটকে কী বলতে গিয়ে বলতে পারল না। ছোট তখন ডাকল, জ্যাক।

    জ্যাক বলল, কাজে যাচ্ছ?

    ছোট মাথা হেলাল। এটা জ্যাক জানে, এখন ছোটবাবু বয়লার রুমে নেমে যাচ্ছে। জ্যাক যে কি করে বলবে, আমার কেবিনে তুমি এস! তার খুবই সংকোচ বলতে পারে না। সে বলল, বারোটার পর কি করছ?

    —স্নান করব। খাব। তারপর ঘুমোব

    —কখন উঠবে?

    —চারটে বাজতে পারে, পাঁচটাও বাজতে পারে।

    —পাঁচটায় আমার কেবিনে আসবে। তখন কেউ ওপরে থাকবে না।

    ছোট কেমন ঘাবড়ে গেল। জ্যাকের কেবিনে ও আর যেতে পারে না। ওদিকে ক্রুদের যাবার নিয়ম নেই। গেলে কথা উঠতে পারে। সে সহজেই বলে ফেলতে পারল না, যাব। একবার গিয়ে সে যা ফ্যাসাদে পড়ে গেছিল!

    জ্যাক বলল, কাউকে বলবে না তুমি আসছ। দরজার পাশে আমি দাঁড়িয়ে থাকব। তুমি এলেই দরজা বন্ধ করে দেব। কেউ টের পাবে না।

    ছোট বলল, কেউ দেখে ফেললে!

    —কে দেখবে! এদিকে তখন কেউ আসে না।

    এটা সত্যি, তখন এ-দিকটা খুবই ফাঁকা থাকে। ক্যাপ্টেন তখন ব্রীজে উঠে যান। কাপ্তান-বয়কে ডেকে না পাঠালে সে যেতে পারে না তখন। ডিউটিতে যে কোয়ার্টার মাস্টার থাকে সেও নামে না। কাপ্তান ব্রীজে থাকলে সবাই খুব মনোযোগী হয়ে যায় কাজে। ছোটবাবু টুপ করে নিচে ডুবে যাবার আগে কি ভেবে যে বলে ফেলল, যাব। তারপর আর দেখা গেল না। জ্যাক আবার উইণ্ডসেলে হেলান দিয়ে বসে থাকল। তার এখন আর উঠতে ইচ্ছে করছে না। বসে বসে কেবল সমুদ্র, দূরের কোথাও কোন সবুজ দ্বীপ ভেসে উঠবে এক্ষুনি, এ সব ভেবে বসে বসে অনেকটা সময় কাটিয়ে দিল। ওর চোখ আনন্দে এবং উত্তেজনায় চিকচিক করছে। ছোটবাবু তার কেবিনে আবার আসছে, আনন্দে ওর চোখে জল এসে গেছে।

  • পনের

    পনের

    ।। পনের।।

    জ্যাক অনেকক্ষণ এ-ভাবে বসে থাকল। সূর্য মাথার ওপরে উঠে আসছে। আকাশে কোন মেঘের আভাস নেই! জাহাজটা দুরন্তগতিতে জল কেটে যাচ্ছে। দু’পাশে জাহাজের জলকণা উড়ছে। জাহাজের দু’পাশে অজস্র বুদবুদ ওঠে ভেঙে যাচ্ছে। অনেক দূরে সে দেখতে পাচ্ছে জলের একটা সরল রেখা ক্রমে সমুদ্রের অতল থেকে উঠে আসছে এবং টগবগ করে যেন ফুটছে। প্রপেলারের ধাক্কায় জলরাশি ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে। দুটো একটা সামুদ্রিক মাছ মরে ভেসে উঠছে। কোথা থেকে কিছু ছোট ছোট পাখি আবার উড়ে এসে সে-সব খাচ্ছিল! জ্যাক কেমন আনমনা হয়ে গেছে সে-সব দেখতে দেখতে।

    এবং তখনই মনে হল পেছনে কেউ ডাকছে তাকে। দেখল, বাবা তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। একা একা সমুদ্রে এভাবে ঘুরে বেড়াতে বোধ হয় মেয়েটার ভাল লাগছে না। এখন স্নানের সময় জ্যাককে তিনি মাঝে মাঝে সব মনে করিয়ে দেন। জ্যাক কোন কারণেই একটু অগোছালো হতে পারে না। এ-কমাসে জ্যাক আরও বড় হয়ে গেছে। জ্যাকের চুল আবার বড় হয়ে গেছে। জ্যাকের চুল কাটার সময় তাঁরও মনের ভেতর তোলপাড় করে ওঠে। কি সুন্দর নীলাভ চুল। সারা মাথা ঢেকে রয়েছে। ঘাড় পর্যন্ত চুল এসে নেমেছে। মসৃণ নরম উলের মতো চুলে হাত দিলেই অনেক স্মৃতি এসে তাঁকে তোলপাড় করে দেয়।

    এবং তিনি যেন বুঝতে পারেন তাঁর যৌবনে প্রথমা স্ত্রীর চুলে ছিল এমনি সুন্দর সব বর্ণমালা। স্ত্রীর মুখ মনে হলেই কেন জানি মনে হয়, তিনি ওকে অবিশ্বাস করে ভুল করেছেন। আসলে যৌবনে মেয়েরা তো একটু চঞ্চল থাকবেই। চিরদিনই তাঁর মনে হয়েছে ভাঙা জাহাজের তিনি কাপ্তান। সব সময় উদ্বেগ, জাহাজ বন্দরে না পৌঁছানো পর্যন্ত। ভীষণ তিনি সজাগ। স্ত্রীর প্রতি তাঁর কর্তব্য রয়েছে সেটা তিনি ভুলে যেতেন। এই জাহাজ, তাঁর সব কিছু তখন। একটা পাগলা জেদি ঘোড়ার মতো জাহাজটা সমুদ্রের ঝড় সাইক্লোন কাটিয়ে যখন নিরিবিলি শান্ত আকাশের নিচে এসে দাঁড়াত তখন তাঁর মনে থাকত না যে কে তাঁর বেশি আপন। তাঁর স্ত্রী না এই জাহাজ! বোধ হয় তাঁর স্ত্রী এলিস এটা বুঝতে পারত। হিগিনস ওর জন্য একেবারেই সময় দিতে পারছেন না। সারাক্ষণ চার্ট-রুমে বড় টেবিলে ঝুঁকে অথবা কখনও সব ওসেনোগ্রাফিরর ভেতর এই জাহাজের নিরাপদ আশ্রয়ের কথা ভেবে বুঁদ হয়ে থাকতেন। মনে মনে এলিস এটা পছন্দ করত না। ভাবত বুঝি, তবে এত কষ্ট করে মানুষটার সঙ্গে সমুদ্রে আসা কেন।

    কখনও জ্যোৎস্না রাতে এলিস খুব সেজে ওঁর চার্ট-রুমে ঢুকে যেত।—কি হল! এই যাচ্ছি। এলিস কেবিনে অথবা বাইরের ডেকে একা একা পায়চারি করে ক্লান্ত হত। মানুষটার কাজ কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। এত কি যে কাজ! এমন অসীম নীল সমুদ্রে একটু পাশাপাশি বসে সামান্য মদ আর মাংসের রোস্ট। নক্ষত্রেরা মাথার ওপর দুলছে। এ-হেন সময়ে মানুষটার চার্ট-রুমে কেবল কাজ। কেবল বই ঘেঁটে ঘেঁটে দেখা। রিপোর্ট লেখা। জাহাজের হাল তবিয়ত কেমন যাচ্ছে তার একটা বিবরণ প্রতিদিন লগবুকে রাত জেগে লিখে রাখা। যেন জাহাজটাই মানুষটার কাছে সব, এলিস তাঁর কেউ নয়। তখন বোধহয় এলিসের ভীষণ অভিমান হত। চোখে জল আসত। সে যে এমন সুন্দর পোশাকে অপেক্ষা করছে মানুষটার জন্য তার দাম দিতেন না তিনি।

    স্যালি হিগিনস আরও সব মনে করতে পারেন এবং এ-সব মনে হলে তিনিও ভুলে যান বারোটায় লাঞ্চ সাজানো হচ্ছে ডাইনিং হলে। ভুলে যান, তাঁর পায়ের কাছে চুপচাপ বসে রয়েছে বনি। বনি এখন নানাভাবে স্বপ্ন দেখতে পারে সে-সবও ভুলে যান। যেমন ভুলে যেতেন, জাহাজে অন্য সুন্দর সব যুবকেরা যাদের কাজ এনজিনে অথবা ডেকে, যারা অফিসার জাহাজের, তাদের একঘেয়ে সমুদ্রযাত্রা ক্যাপ্টেনের সুন্দরী স্ত্রী অনেকটা লাঘব করে দিচ্ছে। ফাঁক পেলেই তারা এলিসের চারপাশে ঘুরঘুর করছে। দুটো একটা কথা বলার জন্য সারাদিন স্বপ্ন দেখছে। এখন যেন তিনি সব বুঝতে পারেন। বয়স হলে সবার সব দোষত্রুটি সহজেই ক্ষমা করে দেয়া যায়। এবং নিজেকেই সব কিছুর জন্য দায়ী ভাবতে বেশি ভাল লাগে।

    তিনি মেয়ের মাথায় আঙুল চালিয়ে বললেন, চুল আবার বেশ বড় হয়ে গেছে।

    বনি জবাব দিল না।

    —চুল কাটবে না?

    —না বাবা।

    কি করুণ সেই স্বর বনির!

    হিগিনস আবার বললেন, কেন?

    —চুল কাটতে আমার ভাল লাগে না বাবা।

    —কিন্তু জাহাজ যে খুব খারাপ জায়গা বনি!

    হিগিনস মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু আর বলতে পারলেন না।—ওঠো। বারোটা বাজবে এবার।

    —তুমি যাও আমি যাচ্ছি।

    আসলে বনি বসে আছে ছোটবাবুর জন্য। এখানে বসে থাকলে অনেক নিচে, সেই স্টোকহোলডে উঁকি দিলে ছোটবাবুকে দেখা যায়। ছোটবাবুকে দেখার একটা নেশা হয়ে গেছে বনির। বনি জানে ছোটবাবু এখন বাংকারে। খুব সন্তর্পণে কান সজাগ রাখলে শোনা যায় ছোটবাবুর গাড়ি টানার শব্দ। গাড়ি এনে সুটের মুখে উপুড় করে দিচ্ছে। ছোটবাবু উঠে এলে আর একবার মনে করিয়ে দিতে হবে।

    ছোটবাবু উঠে এলে সে ফের বলল, মনে আছে তো।

    —খুব।

    সে এবার আনন্দে শিস দিয়ে উঠল। ছেলেদের পোশাকে থেকে থেকে সে ছেলেদের মতো শিস দিতে শিখে গেছে। সে মাঝে মাঝে শিস দিয়ে গান গায়। পায়ে তাল ঠুকতে থাকে—অথবা কেবিনে পোশাক পাল্টানোর সময় সে পায়ে তাল দিয়ে গান গায়। তার মনের ভেতর থাকে অজস্র দুষ্টুমী বুদ্ধি। ছোটবাবু কেবিনে এলে সে কি কি করবে, এবং ছোটবাবুকে কি কি ভাবে হতবাক করে দেবে এ-সব ভাবতে ভাবতে সাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে যায়। নরম শরীরে, এবং কি যে কোমল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, সে নরম হাতে সারা শরীরে দামী সাবান বুলিয়ে দেবার সময় অজস্র ফেনা এবং নাভির নিচু অংশে সোনালি রেশমের মতো বিজবিজে এক আরামদায়ক ঘটনা। কি যে হচ্ছে সব শরীরে, যত এমন সব হচ্ছে তত ছোটবাবুর জন্য মায়া তার বেড়ে যাচ্ছে।

    ডাইনিং হলে সবাই দেখল জ্যাক ভীষণ চঞ্চল। ওর চোখ দুটো ভীষণ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে আজ। সে উত্তেজনায় ভালভাবে খেতে পর্যন্ত পারল না। দেখলেই মনে হয়, জ্যাকের জীবনে চরম কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। অথচ কি সেটা জ্যাক নিজেও বুঝি ভালভাবে জানে না।

    ঠিক চারটে ত্রিশে ঘুম থেকে উঠে মনে হল ছোটবাবুর, কোথাও আজ তার যাবার কথা! জ্যাক তাকে ডেকেছে। গোপনে যেতে বলেছে। কেন যে জ্যাক ডাকল! যত সময় এগিয়ে আসছে তত বুক কাঁপছে! সারেঙসাব বার বার বলেছেন, ছেলে, জাহাজ খারাপ জায়গা। সাবধানে চলাফেরা করবে। জ্যাক তাকে আবার কোনো বিপদে ফেলবে না তো! জ্যাকের দুষ্টুবুদ্ধি তাকে কোনো বিপদে ফেলবে না তো! এখন অবশ্য কিছু সে করতে পারে না। জ্যাককে কথা দিয়েছে, শুধু কথা কেন, জ্যাক তাকে আদেশ করতে পারে। জ্যাক যা যা বলবে সে তা করতে বাধ্য। ইচ্ছে করলে জ্যাক ওকে একটা ক্লাউন বানিয়ে ফেলতে পার। সে তখনও কিছু বলতে পারবে না।

    সে তার সবচেয়ে ভাল পোশাক বের করল। কিন্তু জ্যাক গোপনে যেতে বলেছে। ভাল পোশাকে গেলে জাহাজিদের মনে সংশয় দেখা দিতে পারে, জাহাজ সমুদ্রে, বন্দর কবে পাবে ঠিক নেই, এখন থেকেই সাজগোজ করে বসে থাকা! সুতরাং সে পরেছে একটা হাফ-হাতা সিল্কের গেঞ্জি। নানারকমের ছবি গেঞ্জিতে। যেমন কোথাও উট অথবা বাঘের ছবি আবার কোথাও জলের মাছ ডাঙায় লাফিয়ে পড়েছে। আবার কোনো বনাঞ্চলের ছবি, ছোট্ট একটা মেয়ে—হাতে তার খেলনা, সে বসে আছে গেঞ্জির নিচু দিকটায়। এবং এ-ভাবে সে তার গেঞ্জিতে পৃথিবীর যাবতীয় জীবজন্তু নিয়ে যখন সত্যি হাজির তখন ঠিক ঘড়ির কাঁটায় পাঁচটা বাজে। সে দেখল কেবিনের দরজা বন্ধ। সে পরেছে কালো রঙের প্যান্ট। কালো রঙের প্যান্ট পরলে ছোটবাবুকে কেমন বেশি লম্বা দেখায় বেশি সাহসী দেখায়। সে চারপাশে সতর্কভাবে তাকাচ্ছে। কেউ দেখছে কিনা। না কেউ নেই। সে ধীরে ধীরে দরজায় কানপেতে ডাকল, জ্যাক, আমি ছোটবাবু। তুমি আমাকে আসতে বলেছিলে।

    আর আশ্চর্য, দরজা সামান্য ঠেলে দিতেই খুলে গেল। ভিতরে কোন আলো জ্বালা নেই। চারপাশটা কেমন অন্ধকার লাগছে। সে বুঝতে পারছে না, ভেতরে সত্যি কেউ আছে কিনা। পোর্ট-হোলের কাচে পর্দা টানানো। বাইরের এতটুকু আলো কেবিনে আসতে পারছে না। জ্যাক কোথায়! সে ভয় পেয়ে গেল। সে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক কি তাকে ছেলেমানুষের মতো আড়ালে দাঁড়িয়ে হেই করে উঠতে চায়, ভয় দেখাতে চায়। দেয়ালে তেমনি নীল রঙের লাইফ বেল্ট, বাংকের মাথায় সোনালী লাইফ-জ্যাকেট দুলছে।

    সে আবার ডাকল, জ্যাক তুমি কোথায়!

    কোন উত্তর নেই।

    সে এবার বলল, জ্যাক আমাকে ভয় পাইয়ে তোমার কি লাভ!

    এবার মনে হল কেউ খুব ধীরে ধীরে বলছে, আমি এখানে ছোট।

    ছোট তবু বুঝতে পারল না জ্যাক কোথা থেকে কথা বলছে। কেবিন আর ততটা অন্ধকার মনে হচ্ছে না। দামী মেহগিনি কাঠের বাংক। বাংক না বলে দামী খাট বলাই ভাল। দু’জন অনায়াসে পাশাপাশি শুতে পারে। পাশে আর একটা বাংক—মোটা তোয়ালে বিছানো। ডানদিকে কাঠের বড় আলমারি। আলমারির ওদিকটায় সে আর একটা দরজা দেখতে পাচ্ছে। ওটা বোধ হয় বাথরুমের দরজা। সুন্দর ক্যালেণ্ডার দেয়ালে। তারিখের ওপর লাল দাগ। সব এখন স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জ্যাক তখন আবার ওকে বলছে, আমি এখানে।

    তারপর ছোট দেখল ক্রমে একটা আলো ফুটে উঠছে কেবিনের ভেতর। ক্রমে কেমন দিনের বেলার মতো, ঠিক ঠিক দিনের বেলা বললে ভুল হবে, পুজো মণ্ডপে যে রঙিন আলো থাকে তেমনি এবং এ-ভাবে এক মায়াবী জগৎ গড়ে তুলে কি যে লাভ জ্যাকের। সে এবার এক পা এগিয়ে গেলে দেখতে পেল, দেয়ালের নতুন ক্যালেণ্ডারে এক বালিকার ছবি। ঠিক বালিকা বলা যাচ্ছে না, কেমন ব্যালে-গার্লের মতো। বালিকা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দেখা যাচ্ছে না, নরম নীলাভ চুলে প্রজাপতি আঁটা ক্লিপ। সাদা রিবন। এবং গলায় মুক্তোর মালার মতো পবিত্রতা চারপাশে ঘিরে আছে। সে হতবাক। সে কি বলবে ভেবে পেল না। আসলে এই জ্যাক, না এটা কোন যাদুকরের ছবি, সে নিজেকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। বার বার চোখ মুছে বলছে, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তুমি কোথায় জ্যাক। দোহাই তুমি আমাকে ভয় পাইয়ে দিও না। আমি কিন্তু দৌড়ে পালাব।

    বনি নিজের ভেতর তন্ময় হয়ে আছে। সে কিছুতেই এমন পোশাকে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। সাদা সার্টিনের ফ্রক, হাঁটু পর্যন্ত ফ্রক নেমে গেছে, ফ্রকে নানা বর্ণমালা অথবা চাঁদমালা বলা যায়, এবং পায়ে সে পরেছে সাদা দামী হাবসী লেদারের সু এবং দামী মোজা ওর পায়ের চারপাশটা কি যে আশ্চর্য স্নিগ্ধ করে রেখেছে! সে বলল ছোট আমি এখানে।

    ছবিটা তবে কথা বলছে! সুন্দর ঘ্রাণ শরীরে। সেই যে মহার্ঘ ঘ্রাণ ওরা মাঝে মাঝে জাহাজে পায়, তেমনি এক ঘ্রাণ! সে বলল, তোমার মুখ দেখতে পাচ্ছি না জ্যাক। তুমি কোথায়!

    জ্যাক এবার দুপা এগিয়ে এল এবং মুখ তুলে দাঁড়াল। যেন, এই যেন আমি, আমি বনি, আমার কিছু আর ভাল লাগে না। সমুদ্রে আমি ভীষণ একা। এবং এ-সব কথা সে একটাও উচ্চারণ করতে পারল না। আর তখন কেমন নেশার মতো ছোটবাবু কাছে এগিয়ে যেতে যেতে সহসা হা-হা করে হেসে উঠল, জ্যাক তুমিও! জ্যাকের ট্রাপে সে কিছুতেই পা দিচ্ছে না। জ্যাক তাকে সত্যি ক্লাউন বানিয়ে দিতে চায়। সাধারণ কার্গো জাহাজে মেয়ে দেখা ভূত দেখার সামিল। সে বলল, তুমিও! অমিমেষের মতো মেয়ে সেজে মজা করছ জ্যাক। ঠিক না। সঙ্গে সঙ্গে সারেঙসাবের কথা মনে হল। বলল, আমি যাচ্ছি জ্যাক। তুমিও অনিমেষের মতো দেখছি ঠিক ফলস্ পরে…..দ্যাটস ভেরি আগলি।

    সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ। বনি প্রায় হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। যেন সে অনেক কষ্টে তার অসম্মান হজম করছে। এবং ধীরে ধীরে আঙুল তুলে দরজার দিকে দেখাল, প্লিজ ইউ গো

    এবং প্রায় দৌড়ে বের হয়ে যেতে দেখা গেল ছোটবাবুকে। ছোটবাবু হাঁপাতে হাঁপাতে পিছিলে এসে দাঁড়ালে সবাই ওকে ঘিরে দাঁড়াল। ভূত দেখলে যেমন মুখের চেহারা হয়, ঠিক তেমনি, শূন্য দৃষ্টি। সবাই নানাভাবে প্রশ্ন করলেও একটাও কথা বলতে পারছে না ছোটবাবু। সে এ-সব কাউকে বলতে পারে না। জ্যাক সত্যি এবার তবে ওর পেছনে লেগে গেল। সে এখন কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।

    আর তখনই জ্যাক নিজের পোশাকে বাইরে বের হয়ে এল। সে পরেছে আজ নীল রঙের ঢোলা সার্ট। সে পরেছে শিকারীর বেশ, এবং সে পাখি দুটোর পেছনে প্রায় ছোটখাটো অরণ্যদেব হয়ে গেছে! জাহাজের এ-দড়ি ঝুলে, কখনও বোট ডেক থেকে ফল্কায় নেমে আসছে। আবার লাফিয়ে উইনচে উঠে যাচ্ছে। আবার কখনও আরও ওপরে। সে যেন এখন পাখি দুটোকে না ধরতে পারলে বাঁচবে না। সে সিঁড়ি বেয়ে মাস্তুলের ডগায় উঠে গেল। যত ছোটবাবু এমন দেখছে তত তাজ্জব বনে যাচ্ছে। সে ভাবল এখন পালিয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। এবং তখনই হাঁক, হেই ছোট, কাম-অন।

    সে কাছে গেলে বলল, গেট দ্যাট বার্ড।

    ছোট দেখল, জ্যাক মিসেস প্যারোর দিকে হাত তুলে দেখাচ্ছে।

    ছোটবাবু দাঁড়িয়ে থাকল তেমনি। জ্যাক ভীষণ ক্ষেপে গেছে। পাখিটা হাতে পেলে হয়তো পাখা ছিঁড়ে দেবে, মুন্ডু ছিঁড়ে ফেলবে। জ্যাক সব পারে। জ্যাককে সে কেন যে এসব বলতে গেল!

    —আমি বলছি, আমি জ্যাক বলছি। এবং জ্যাকের সেই সুন্দর মুখ কি ভীষণ ক্ষিপ্ত! ওর এমন সুন্দর চোখে কি গভীর ক্ষত!

    ছোট বলল, প্লিজ!

    জ্যাক ফের বলল, ধরে দাও।

    তা ক্যাপ্টেনের জেদি ছেলে। মাথায় কি যে তার হয়, সে আর কি করে, সে কথা না শুনে জ্যাককে অবমাননা করতে পারে না। সে কাতর গলায় বলল, দিচ্ছি।

    কারণ সে জানে পাখি দুটো ওর পোষমানা, অবশ্য এখন এ মুহূর্তে ওরা কি করবে সে বুঝতে পারছে না। ধরা যত সহজ ভেবেছিল, আসলে তত সহজ নয়। কারণ ওরা বোধহয় টের পায় সব। তারপর ছোট লাফিয়ে ফল্কায় উঠে গেল। এবং তখন জ্যাক ছুঁড়ে দিল ওর হাতের দস্তানা। ছোট টেনেটুনে পড়ে নিল দস্তানা। এবং সে দেখতে পেল মিসেস স্প্যারো মাস্তুলের ডগায় বসে রয়েছে। সে খুব সন্তর্পণে মাস্তুলের ডগায় দড়ি ঝুলে উঠে গেল। পাখিদুটো আবার উড়ে গেল। ছোট তখন পাখিদুটোর নাম ধরে ডাকছিল। ফিরে আসতে বলছিল। যেমন মাথার ওপর ঘুরে বেড়ায় উড়ে বেড়ায়, ছোট যেন এখনও ওদের তেমনি কাছে চাইছে। কিন্তু পাখিরা বুঝি বুঝতে পারে ঠিক। ছোটর ডাকে কেউ আর কাছে আসছে না। ওরা গ্যালির ছাদে বসে নিশ্চিন্তে পাখা ঠোকরাচ্ছে।

    ছোট সেখান থেকে লোহার তার বেয়ে নেমে গেল। অনায়াসে সে যেখানে যখন খুশি উঠে যেতে পারছে। দেখলে মনে হবে পাকা জাহাজি। লম্বা সফরে ছোট, পাকা জাহাজি বনে গেছে এবং এই দুরন্তপনা এনজিন সারেঙের ভাল লাগছিল না। এত বেশি উড়ে বেড়ানো ভালো না। ছোটবাবুর কান্ড দেখে সারেঙ মাঝে মাঝে চোখ বুজে ফেলেছেন ভয়ে। যেন ছোট মজা করছে নিজের জীবন নিয়ে। রাগে শরীর কাঁপছে তাঁর। কি যে দরকার কাপ্তেনের ছেলেটার সঙ্গে ভাব করার। একেবারে কথা শোনে না ছোট। কান ধরে নামিয়ে আনলে এখন ঠিক হয়। কাপ্তানের ছেলেটার জন্য তাও করতে পারছেন না।

    তখন ছোট আবার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে ডেকে নেমে পাখি দুটোর পেছনে দৌড়াল। সেও যেন এ-জাহাজে আর একটা পাখি হয়ে গেছে। পাখির মতো ফল্কায় ডেকে মাস্তুলে মাংকি অ্যায়ল্যান্ডের ছাদে কখনও উইংসে ঝুলে সে বার বার পাখি দুটোকে ওর কাঁধে অথবা মাথায় এসে বসতে অনুরোধ করছে। কিছু করবে না। যেমন জাহাজে ছিল তেমনি থাকবে ওরা। আর নিচে তখন জ্যাক। সে দু হাত তুলে বেশ মনোরম এক রিঙের খেলোয়াড়ের মতো খেলা দেখাচ্ছে। কেবল ছোটবাবুকে উত্তেজিত করে যাচ্ছে—ওহো! পারলে না। ইউজলেস।

    বুঝি রক্তের ভেতর থেকে তেজী ঘোড়ারা। এ-সব বললে আরও তেজী স্বভাবের হয়ে যায়। -ওই ওদিকে চলে গেল। দ্যাখো ফওর-মাস্টে গিয়ে বসেছে। ছোট লাফিয়ে উঠে গেলে জ্যাক চিৎকার করতে থাকল উড়ে যাচ্ছে, তোমার কানের পাশ দিয়ে পালিয়ে গেল। এনজিন-রুমে ঢুকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ছোট দড়ি ঝুলে একেবারে মাংকি আয়ল্যান্ডের মাথায়। তারপর স্টেনসান ধরে নিচে সোজা ঝুলে পড়ল।

    ছোট এ-ভাবে স্কাইলাইটের সিঁড়িতে নেমে গেল। এনজিন-রুমের ভেতর ঢুকে গেল। প্রায় গ্লাইড করার মতো দু’রেলিঙে হাত রেখে নেমে যাচ্ছে। হাওয়ায় পা ভাসিয়ে দুহাতে ভর করে ক্রমে নিচে, নিচে নেমে যাচ্ছে। আর পেছনে জ্যাক তার চেয়ে যেন এককাঠি ওপরে।

    মৈত্রের ইচ্ছে হল একবার, ঘাড় ধরে তুলে নিয়ে আসে। চা করে বসে রয়েছে, চা ঠান্ডা হচ্ছে। পাখি দুটোর পেছনে লেগেছে। কিন্তু কাপ্তানের দুরন্ত ছেলেটা আছে সঙ্গে। আর সাহসে কুলাল না। অমিয় চা হাতে নিয়ে ওপরে উঠে গেলে দেখল, ছোটবাবু মেইন-মাস্টের ক্লোজ-নেস্টে দাঁড়িয়ে আছে। সে আকাশ দেখছে, কি সমুদ্র দেখছে না পাখি দুটোকে খুঁজছে অমিয় বুঝতে পারছে না। ডেকে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক। অমিয়র হাতে ছোটবাবুর চা। অমিয়, যে অমিয় জাহাজে ভয়ঙ্কর খেলায় মেতে উঠেছে এবং ঘোস্ট খেলা, বেশ জমে উঠেছে, যদিও সে জানে না শেষ পর্যন্ত কিভাবে শেষ হবে খেলা সেও জ্যাককে দেখে ট্যাসে গেল। ডেকে বলতে পারল না ছোট, তোর চা। চা ঠান্ডা হচ্ছে।

    আর ছোটও তখন ঠান্ডা একেবারে ঠান্ডা। ঠিক বুঝতে পারছে না, এমন নিরিবিলি সমুদ্রে দিগন্তরেখায় এটা কি দেখা যাচ্ছে! যেন এক অতিকায় মনস্টার আকাশ কালো করে এগিয়ে আসছে ক্রমশঃ। ক্রমশঃ ওটা বড় হয়ে যাচ্ছে এবং বিদ্যুতের তরঙ্গমালা ওর মাথায় খেলে গেলে সহসা সাইরেন বেজে উঠল। সারেঙ, ডেক সারেঙ কাপ্তান যে-যার মতো চোঙ মুখে ফুঁকে যাচ্ছে—নিচে নেমে যাও। নিচে।

    জ্যাক পাগলের মতো হাত ওপরে তুলে চিৎকার করে উঠল, দি ব্রেকার! ছোট তাড়াতাড়ি জলদি। ছোট, দাঁড়িয়ে থেকো না।

    বোধহয় কখনও কখনও এ-সব অতিকায় মহামায়া মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। ছোট কেমন ক্ৰমে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ওর শরীরে শক্তি নেই, হাত-পা শিথিল, নিচে কি করে নামতে হয় সে যেন জানে না। জ্যাক পাগলের মতো হাঁকছে, এবং একে একে এনজিন-সারেঙ, মৈত্র, মনু, জব্বার এবং সেকেন্ড অফিসার ছুটে এসেছে। জাহাজের মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ছোট তেমনি দাঁড়িয়ে—তারপর কেমন হাত তুলে দিল ওপরে। আকাশ ছুঁতে চাইল যেন।

    মৈত্র আর পারল না। ওটা মরবে। ও জানে না, ওটা কি আসছে। ভাসিয়ে নিয়ে যাবে কোথায় অপোগন্ডটা জানে না। সে উপরে উঠে গেল। ক্রোজ-নেস্টে উঠে চুল ধরে নামাবে ভাবল। তখন কাপ্তান চিৎকার করছে, জ্যাক! সেকেন্ড অফিসার জ্যাককে টানতে টানতে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ক্রমে এসে গেল, এসে গেল, ভেসে গেল—ছোটবাবু রব উঠে যাবার মুখে দড়ি ধরে, ঝুলে একেবারে আফট-পিকে। কিন্তু পারল না। শেষ রক্ষা করতে পারল না। সে উইন্ডসেলে আটকে গেল। এবং পড়ে গেল। অমিয় সারেঙ জব্বার সবাই ধরাধরি করে নিয়ে আসার আগেই—দি ব্রেকার। ওরা সিঁড়ির মুখে ঠেলে দিল ছোটকে। এবং অনেকটা উঁচুতে জাহাজ উঠে গেছে। ওদের ভাসিয়ে নিয়ে যেত, কিন্তু ওরা ব্রেকারের মুখে পড়লে কি করতে হয় জানে, এবং সারেঙ-সাব এই বুড়ো বয়সেও স্টেনসান ধরে ভেসে থাকলেন। জল জাহাজের ওপর দিয়ে নেমে গেল। দেখলেন তিনি একা। ডেকে কেউ নেই। তাকাতে না তাকাতেই আবার একটা ব্রেকার। আবার জলে ডুবে ডুবে মরণ খেলা! খেলার মতো খেলা। জাহাজ অনেক ওপরে উঠে নিচে নেমে গেল। তিনিও জলের ভেতর থেকে উঠে এলেন! এবং মনে হল, আবার ব্রেকার আসছে। অনেক দূরে। মেসরুমে এসে বুঝতে পারলেন তিনি পাগলের মতো জীবন বিপন্ন করে ছোটকে বাঁচিয়ে এনেছেন। ছোটকে ঠেলে ঢুকিয়ে না দিলে সে অসীম তরঙ্গ মালায় সমুদ্রের গভীরে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলেন ভাবতেই কেমন শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। নিচে নামার শক্তিটুকু পর্যন্ত নেই। সমুদ্রের এইসব সহসা জলোচ্ছাস বেশীক্ষণ থাকে না। কেউ সঠিক জানে না, কেন এমন হয়! কোন বেতার সংকেত পর্যন্ত পাওয়া যায় না। হয়তো বা কোনও টাইডল ওয়েভ হবে, যাই হোক ব্যাপারটা গুরুতর বোঝা গেল যখন আকাশ পরিষ্কার, সমুদ্র শান্ত যেন জাহাজ সমুদ্রে কিছুক্ষণ ডুব-সাঁতার কেটে আবার অবিরাম ভেসে চলেছে। তখন মৈত্র সারেঙের ঘরে উঁকি দিয়ে বলল, জলদি! সারেঙের ঘর তখন লোকজনে ঠাসা।

    —কেন কি হল!

    —শিগগির আসুন। ছোটর মাথায় কি ঢুকে আছে।

    —মানে! এবং সঙ্গে সঙ্গে ভেজা জামা কাপড়ে নেমে গেলেন। দেখলেন ঘাড়ের ওপরে একটা পেরেকের মতো। এতক্ষণ ছোট ভয়ে কিছু বলে নি। জামা রক্তপাতে ভিজে গেলে, অমিয় চিৎকার করে উঠেছিল, ছোট, রক্ত!

    ছোট কিছু বলেনি। অনেকক্ষণ থেকেই এটা হচ্ছে। মাঝে মাঝে গোপনে সে হাত দিয়েছে মাথায়, বুঝতে পারছে ভীষণ কিছু একটা হয়েছে কিন্তু সবাই ওর ওপর এমন ক্ষেপে আছে যে, বলতে সাহস পায়নি। সে অসহ্য কষ্ট ভোগ করছে। চোখ বুজে দাঁত চেপে সহ্য করছে। বসে আছে। কেমন হিতাহিত জ্ঞানশুন্য মানুষের মতো ওর চোখ মুখ দেখাচ্ছে।

    সারেঙ-সাব বললেন, আমি যাচ্ছি।

    ছোট বলল, কিছু হয়নি। কেটে গেছে একটু। এর জন্য লাফালাফি।

    সবাই ছোটর ফোকসালে ভিড় করেছে।

    ছোট কেমন বিব্রত বোধ করতে থাকল। সমস্ত শরীরে অসহ্য জ্বালা। কেমন ঘুম ঘুম এবং নেশার মতো মনে হচ্ছে। সে নিজেকে শক্ত রাখছে। জাহাজে আবার দুর্ঘটনা। সে নিজেকে ভীষণ অপয়া ভাবতে থাকল। ওর জন্য সবাই এভাবে বিব্রত হচ্ছে দেখেও একটা সংকোচ ভেতরে। সে আর পারছিল না। মৈত্র গরমজল করে এনে, ক্ষতস্থান ধুয়ে দিচ্ছে। সারেঙ সেকেন্ড অফিসারকে ডেকে আনলে বোঝা গেল দুর্ঘটনা অতীব—কারণ তখন বেতার সংকেত পাঠানো হচ্ছে। ক্যাপ্টেন নিজে এসেছেন ছুটে। চীফ-অফিসার এসেছে। জ্যাক খবর শুনে যখন এল, তখন ছোট লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। সাদা চাদরে শরীর ঢাকা। মাথায় ব্যান্ডেজ, মাথা কাত করা। চোখে কি ছোটবাবু দেখতে পাচ্ছে না। জ্যাকেেক দেখে ছোট এতটুকু চিনতে পারল না যেন। যেভাবে তাকিয়েছিল, তেমনি সাদা চোখে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক পড়ছে না।

    তখন রেডিও-অফিসার কাপ্তানের ঘরে। সেকেন্ড-অফিসার রিপোর্ট করেছেন। কাপ্তান দেখে সই করলেন। ডাকলেন, রেডিও-অফিসারকে। রেডিও রোমাকে জানাও, সিপ সিউল ব্যাঙ্ক। কোল-বয় ছোট- বাবু। অ্যাকসিডেন্ট। অ্যাকসিডেন্ট রিপোর্ট দাও।

    রেডিও-অফিসার বললেন, নিয়ারেস্ট স্টেশন ক্যালিফোর্ণিয়া।

    —তাকে জানাও।

    রেডিও অফিসার তাড়াতাড়ি রেডিও-মেডিকাল ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করে জানালেন, জাহাজ ঘুরিয়ে দিতে হবে। এক্ষুনি।

    —কোথায়?

    —জাহাজ ভিকটোরিয়া পোর্টে ভিড়িয়ে দিতে বলছে। রিস্ক নিতে রাজী হচ্ছে না।

    জাহাজের মুখ আবার ঘুরিয়ে দেওয়া হল। জাহাজের মুখ এখন পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম। জাহাজ এখন যত তাড়াতাড়ি ভিড়িয়ে দেওয়া যায়।

    এবং খবর এই ফোকসালে এসেও পৌঁছে গেল। খারাপ খবর। সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে আছে। সেকেন্ড- অফিসার শেষ রাতের দিকে কোরামিন দিয়েছেন ছোটকে। কেমন ধীরে ধীরে ছোটর চোখ বুজে আসছে। তেমন রক্তপাত হয়নি! একটা লোহার শক্ত মতো কিছু মাথার ভিতর ঢুকে আছে। মাঝে মাঝে মৈত্র স্থির থাকতে না পেরে ডেকেছে, ছোট! সারেঙ ডেকেছেন, ছেলে, কোনও ভয় নেই, আমরা তো আছি! জ্যাক নির্বাক। জ্যাক ডাকে নি। সে সারাক্ষণ এই ফোকসালে ছোটর শিয়রে বসে রয়েছে। কাপ্তানবয় খেতে ডেকেছিল, সে খেতে গেছে।

    খাওয়ার পর ব্রীজে বাবার পাশে কিছু সময় চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। কাপ্তান বলতে পারতেন, বনি তুমি বড় হয়ে যাচ্ছ। তুমি এ ভাবে ছোটকে বিপদের মুখে ফেলে না দিলেও পারতে। কিন্তু মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারেন নি। ভারী দুঃখী মুখ। বনি যেন এ জাহাজে এখন সবচেয়ে দুঃখী। এবং বড় তার অপরাধ। সে মাথা নিচু করে রেখেছিল। বনির বোধহয় এটা স্বভাব, অপরাধ করে ফেললে সে মাথা নিচু করে রাখে। তখন হিগিনস বলেছিলেন, যাও শুয়ে পড়গে।

    বনি যায় নি। সে তেমনি দাঁড়িয়েছিল।

    হিগিনস জানেন, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে বোঝা যায়, বনির কিছু বলার ইচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, আমাকে কিছু বলবে?

    —ছোটবাবুর ফোকসালে যাব।

    হিগিনসের মনে হল, মেয়েটা বুঝতে পেরেছে তার অপরাধের কথা। তিনি মেয়ের বোধবুদ্ধিতে খুশী হলেন। বলেছিলেন, না গেলেও কিছু কেউ ভাববে না।

    বনি তখন কিছু না বলে নেমে যাচ্ছিল। বনি যখন ভাল হয়ে যায় সত্যি ভাল হয়ে যায়। আসলে বনির বয়সে এমন একজন ছোট্ট নাবিকের মায়ায় পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। কেমন এক অমলিন ঘ্রাণ বনির শরীরে। বুড়ো বয়সে কিছুতেই মেয়েটাকে দুঃখ দিতে মন চায় না। তিনি ফের ডেকেছিলেন, বলেছিলেন, যাও। দুষ্টুমি কর না। ঘুম পেলে চলে এস। এবং সারেঙকে ডাকিয়ে জানিয়েছিলেন, জ্যাক যাচ্ছে, ছোটবাবুর ফোকসালে। লক্ষ্য রেখ। আসলে হিগিনস মেয়ের কথা ভেবে না নিজের কথা ভেবে বললেন, বুঝতে পারলেন না। সকালের রোদ জাহাজে, এত বড় একটা দুর্ঘটনা এই জাহাজে ঘটেছে বোঝাই যায় না। কাপ্তানের উৎকণ্ঠা দেখলে শুধু বোঝা যায়। কারণ তিনি এখন লগ-বুগে গত রাতের রিপোর্ট পড়তে পড়তে কেমন থমকে গেছেন। তিনি বনির কথা লেখেন নি। বনি যে ছোটবাবুকে পাখি ধরার জন্য ডেকেছিল, এবং ছোটবাবু বনির কথা মতো কারণ ছোটবাবু তো সামান্য জাহাজি, সে বনি কিছু বললে না করে থাকে কি করে—অথচ রিপোর্টে এ-সব কিছু নেই। তিনি লগ- বুকে আসলে লিখেছেন, ভয়ঙ্কর ব্রেকারের মুখে পড়ে গিয়ে ছোটবাবুর এই দুর্ঘটনা। বনিকে তিনি একেবারেই জড়ান নি।

    রিপোর্ট পড়তে পড়তে বয়সের কথা মনে হল। ধর্মাধর্মের কথা মনে হল। এই শেষ সমুদ্রসফর তাও মনে হল তাঁর। সারাজীবন চেষ্টা করেছেন জাহাজের সব রকমের কাজে সৎ থাকতে। এবং ভাঙ্গা জাহাজেই প্রায় সব সফর বলে তিনি জীবনে সৎ থাকা বাঞ্ছনীয় ভেবেছিলেন। যেন কোম্পানী তাঁকে ভাঙ্গা জাহাজ দিয়ে পরীক্ষা করেছিল, তুমি কেমন নাবিক দেখা যাক হে। তখন জাহাজ সাউথ সিতে, কাপ্তান ম্যানিলি অসুস্থ। তাকে কিঙস আয়াল্যান্ডে নামিয়ে দিলেই তার এসেছিল, হিগিনস জাহাজ হোমে নিয়ে যাবে। ডেক-অ্যাপ্রেন্টিস থেকে আজ পর্যন্ত যা যা উন্নতি, সব এ জাহাজেই।

    লগ-বুকের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নুয়ে নুয়ে কি দেখছেন। বয়সের জন্য চোখে কম দেখেন। কাছের জিনিস আরও কম। চশমায় যেন কুলোয় না এমন নুয়ে নুয়ে বার বার রিপোর্টটা পড়ছেন। ভীষণ সতর্ক হয়ে যাচ্ছেন। এই যে জাহাজ কোর্স পাল্টে অন্য পোর্টে ঢুকে যাচ্ছে সব ক্ষয়ক্ষতি দেবে বীমা কোম্পানী। এদিক-ওদিক হলে দেবে না। বনির কথা লেখা থাকলে তো আর কথাই নেই। এবং এ- সময়ে মেয়েটার ওপর তিনি কেমন বিরক্ত বিব্রত এবং তালা টেনে টেনে যখন দেখলেন খুব সুরক্ষিত, কেউ পড়তে পারবে না কি লেখা আছে, তখন চীফ অফিসার ছুটে এসেছিল, লগ-বুকে এটা লেখা দরকার। কাপ্তান বলেছিলেন, আমি লিখেছি। আমার খেয়াল আছে। তিনি বনিকে বাঁচিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রিপোর্ট লিখেছেন। এবং এ-সময় এত বেশি ধূর্ত মনে হল নিজেকে যে জাহাজে ঠিক কিছু অঘটন ঘটবে—যে-জাহাজ ওঁর জন্য এত করেছে, শেষ সফরে তিনি আবার তার লগ বুকে ঠিক কাপ্তানের মতো সাহসী কাজ করছেন না। দুর্বল কাপুরুষের মতো তিনি এটা কি যে করে ফেলেছেন বনির কথা ভেবে!

    আর তখনই বোধ হয় মনে হয় তিনি ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস। সোজা হয়ে দাঁড়াতে চান। দু হাত ওপরে তুলে বলতে চান, আমাকে রক্ষা করুন প্রভু। আপনি মঙ্গলময়। তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে করতে একেবারে তখন দাসানুদাস হয়ে যান। মনেই থাকে না একটা জাহাজের ওপর অপরিসীম ক্ষমতা তাঁর। তখন বনির কথা লিখলেও কিছু আসে যায় না। নিজের কথা লিখলেও আসে যায় না। তাঁর বয়স তাঁকে নিজের ওপর আরও বেশি যেন প্রভুত্ব দিয়েছে। তিনি অবহেলায় সব কেটেকুটে যা সত্য তাই লিখলেন। জবাবদিহি তিনি গ্রাহ্য করলেন না।

    আর তখনই দেখলেন জাহাজ বন্দরে ঢুকছে। জাহাজ বাঁধাছাদা হচ্ছে। এ্যাম্বুলেন্স রেডি। ছোটবাবুকে স্ট্রেচারে নামানো হচ্ছে। ভাবলেন সঙ্গে যাওয়া দরকার। বনি এবং সেকেন্ডকে সঙ্গে ডেকে নিলেন। সারেঙ, এনজিন-বড়-টিন্ডাল যাবে। এজেন্ট-অফিসের লোক এবং একজন ডাক্তার ওর সিঁড়িতে তখন উঠে আসছে।

    একটা লেগুনের মতো সরু খালবিল যেন এ-বন্দরে ঢুকে গেছে। সমুদ্র থেকে এই লেগুন ধরে এলে দু’পাশে সব পাহাড়, এবং গাছপালা। ওরা তখন এত বেশি সবাই চিন্তিত ছিল যে এমন সুন্দর দৃশ্য কারো চোখে পড়েনি। একটা লম্বা ব্রীজ চলে গেছে দু-পাড়ের শহরের ওপর দিয়ে। লেগুনের জলে জাহাজ এস এস সিউল ব্যাঙ্ক বাঁধা। লেগুনের নীল জল, এবং দুপাশের গাছ পালা পাহাড় মিলে এ-জাহাজ কটা দিন বন্দরে কাটিয়ে দিল। হিগিনস এখানে কিছু মেরামতের কাজ সেরে নিলেন। ছোটবাবুর মাথার খুলিতে জঙ-ধরা পেরেক সামান্য ঢুকে গেছিল এবং অপারেশনের পর তাড়াতাড়ি আরোগ্য লাভে সবাই খুশি। হাসপাতালে একমাত্র এনজিন-সারেঙ এবং সেকেন্ড অফিসার বাদে কেউ যেতে পারছে না। ওরা ছোটবাবু কেমন আছে দেখতে যায়। ওরা ফিরে এলে জ্যাকের কোনো আর অস্বস্তি থাকে না। সে কখনও এত বেশি অধীর থাকে যে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় ব্রীজের নিচে। এবং বাদামী রঙের মানুষ, চুল কোঁকড়ানো, ঠোঁট পুরু মানুষ দেখে দেখে যখন ক্লান্ত তখনই হয়তো দূরে ব্রীজের ওপর দিয়ে সে দেখতে পায় সেকেন্ড অফিসার ডেবিড আসছে।

    তখন জেটিগুলোতে কি সব অতিকায় শব্দ, আকরিক লোহা সব জাহাজে বোঝাই হচ্ছে। এবং এমন সব অতিকায় শব্দ যে জ্যাক যতই জোরে চিৎকার করুক, কাছে না এলে ডেবিড কিছু শুনতে পায় না, অথবা তখন হয়তো কোন মোটর-গাড়ি পেছনে দাঁড়িয়ে প্যাঁক প্যাঁক করছে, জ্যাকের কানেই যাচ্ছে না, পেছনে কোন মোটর-গাড়ি থাকতে পারে, পৃথিবীতে এখন একটা খবর বাদে অন্য কোন খবর আছে সে জানে না।

    জ্যাক বলল, আমরা কবে যেতে পারব?

    —কাল।

    —সত্যি!

    জ্যাক আনন্দে ডেবিডের পিঠে ঘুসি বসিয়ে দিল।

    —ও লাগছে।

  • ষোল

    ষোল

    সারেঙসাব জ্যাককে দেখে অন্য দিকে চোখ ফেরালেন। বড়লোকের ছেলে যা হয়, যা খুশি মনে আসে করে বেড়ায়। এখন জ্যাককে দেখলে কে বলবে, সেই ছোটবাবুকে এ-ভাবে জব্দ করেছে। আসলে, দুর্ঘটনার জন্য জ্যাক দায়ী ছিল না। সেই অতিকায় ব্রেকার, যার কার্যকারণ কেউ ব্যাখ্যা করতে পারে না কারণ কখন সমুদ্রে কি হয়, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণি এবং এমন সব ভূকম্পন, অগ্নুৎপাত হতে থাকে যে তার কার্যকারণের ব্যাখ্যা একমাত্র সেই মহামহিমের কাছেই থেকে যায়। কাপ্তান তখন বুকে ক্রস টেনে শুধু বলতে পারেন, হে মহামহিম আপনি মঙ্গলময়। কারণ কোনও বেতার সংকেত ছিল না। অটোএলার্ম ঠিক ছিল। ব্রীজে ডিউটি-অফিসার অটো-এলার্ম বাজলে ঠিক শুনতে পেতেন। যাই হোক, সারেঙ যেন ছোটর এই দুর্ঘটনায় জ্যাককে বাদে আর কাউকে দায়ি ভাবতে পারেন না। সেই জ্যাক যখন আনন্দে শিস্ দিতে দিতে হাঁটছে তখন কেন জানি তাঁর ভাল লাগল না। জ্যাক কাল যাবে, গেলেই যেন তার ছেলের আবার মন্দ কিছু হয়ে যাবে। সে ডেবিডকে ডেকে বলল, আপনি যান। আমি পরে যাচ্ছি। জ্যাক সঙ্গে গেলে যেন মাথা ঠিক রাখতে পারবেন না।

    তখন চুপি চুপি জ্যাক বলল, ছোট কি বলে?

    —বলে না কিছু।

    —কেন!

    —কথা বলতে দিচ্ছে না।

    —কাল গেলে আমরা কথা বলতে পারব না?

    —না।

    তারপর ডেবিড পাইপে ধোঁয়া উঠছে না দেখে বুড়ো আঙ্গুলে টিপে কি দেখল। তখন লম্বা ব্ৰীজ পার হয়ে সারেঙ অন্যদিকে চলে যাচ্ছেন। জ্যাকের ভারি ইচ্ছে হল, ব্রীজ পার হয়ে বড় পাহাড়ের মাথায় উঠে যায়। এবং ডেবিডকে বলার ইচ্ছে, আচ্ছা এখান থেকে কতদূর!

    —বেশি দূর না।

    —পাহাড়টার মাথায় উঠে গেলে ছোটবাবুর হাসপাতাল চোখে পড়বে?

    —পড়তে পারে।

    —উঠবে ওপরে?

    —পড়ে যাবে।

    —তুমি এস না। বলে সেই যেন ডেবিডকে নিয়ে সেই নিকটবর্তী পাহাড়ের গাছপালার ভেতর দিয়ে ওপরে উঠে গেল। তখন সূর্য অস্ত যাবার মুখে। লেগুনের জলে নানাবর্ণের শালতি। লম্বা কোনোটা সাদা রঙের, কোনোটা নীল রঙের। আর কোনোটার মাথায় পাল, ছোট ছোট এই সব শালতির পাটাতনে বসে রয়েছে যুবক যুবতীরা। ওরা নৌকা-বাইচ দিচ্ছে। এবং পাশাপাশি সব জাহাজ। পাহাড়ের ছায়া লেগুনের জলে। আলো জ্বলছে বড় গম্বুজের মাথায়। অনেক দূরে সেই হাসপাতালের মাঠে লাল গীর্জা। ডেভিড গীর্জার মাথায় ক্রস দেখিয়ে বলল, ওখানে ছোটবাবু থাকে।

    পরদিন জ্যাক, কাপ্তান, মেজ মালোম, সারেঙ, মৈত্র সবাই—এক দঙ্গল যেন। এ-সব জাহাজে একজন কোলবয়ের জন্য এটা বাড়াবাড়ি। কথা থাকে অসুস্থ হলে জাহাজ বন্দরে লাগলে নামিয়ে দেওয়া, কিন্তু বোধ হয় ছোটবাবুর জন্য বনির যেমন মায়া, তেমনি কাপ্তান থেকে সবাই। ছোট, বিনীত ভদ্র। অসহায় চোখ। কম বয়সে সবারই চোখ এমন থাকে, তাঁর নিজেরও এমন ছিল। আর তা ছাড়া কি যেন আছে ছোটর ভেতর। যখন সাদা এম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়া হয় কাপ্তান নিজের ভেতর কেমন অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। ছোটবাবুর মুখে নীল দাড়ি। শরীরের লাবণ্য কোনো দূরবর্তী এক বনভূমির কথা অথবা কোন মরুভূমিতে একজন মুসাফিরের নিত্য হেঁটে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। ছোটবাবুর মুখের ছবির সঙ্গে দূরবর্তী কোন মরুভূমির মহামহিমের কথা কেবল মনে পড়ে যায়। তখন কিছুতেই তাকে ফেলে তিনি জাহাজ সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে সাহস পান না।

    এবং এ জন্য কাপ্তান এখানে নানারকম মেরামতের কাজ বের করে যেমন, চক্ মেরামত, এনজিন রুমের বালকেড পাল্টে ফেলা, এবং ব্রীজে কিছু কাজকর্ম তাছাড়া স্মোক-পাইপ বসানের কাজ আছে এবং এসব কাজের ভিতর বন্দরে পড়ে থাকার প্রয়োজনীয়তা—যেন তিনি ছোটবাবুর জন্য অপেক্ষা করছেন না, অপেক্ষা করছেন, জাহাজের এইসব মেরামতের জন্য। মেরামত শেষ হলেই জাহাজ ছাড়া হবে।

    ওরা যখন নেমে যাচ্ছিল, মেজ-মিস্ত্রি অর্থাৎ সেকেন্ড-এনজিনিয়ার তখন দু-পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে ডেকে। সাদা বয়লার স্যুট পরেছে সে। ওর পাতলা চুল মাথায় এবং চোখে-মুখে কঠিন এক তাচ্ছিল্য, কোথাকার কে এক নেটিভ ইন্ডিয়ান তার জন্য এত সব। মুখে খুবই দাম্ভিকতার ছাপ। জ্যাকের জন্য সে মাঝে মাঝে আকুলতা বোধ করে থাকে। এমন নাবালকের মুখ এবং জাহাজে যা সব হয়ে থাকে, কখনও অধিক পানীয় পেটে পড়লে সে ঠিক থাকতে পারে না। জ্যাকের কেবিনের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় নরম পাখির মতো রোস্ট—জ্যাকের শরীর যেন সুস্বাদু খাদ্য—সেই জ্যাক পর্যন্ত এমন বিশ্রী একটা লোককে দেখতে যাচ্ছে। জ্যাক এ-জাহাজে ওকে মাঝে মাঝে পাগল করে দেয়। জ্যাকের যতদিন দাড়িগোঁফ না উঠবে ততদিন একটা মেয়ের শরীর বাদে তার কাছে আর কিছু না। সে কেবল ফাঁক খুঁজেছে। জ্যাককে দেখলেই গলে পড়ছে। কথা বলছে গদগদ গলায়। ওর কেবিনে কতদিন আসতে বলেছে চুপি চুপি। সে বন্দর থেকে যা কিছু দুর্লভ জ্যাকের জন্য নিয়ে আসতে চায়। বন্ধুত্ব অসীম বন্ধুত্ব, তারপর কখনও সবাই যখন কেবিনে ঘুম যাবে জ্যাকের শরীরে জোরজার করে একটা কিছু করে ফেলবে। জ্যাক সাহসই পাবে না। বাপকে এমন নোংরা ঘটনার কথা বলতে সাহস পাবে না। ও তারপর যে কি মজা হবে! জ্যাক যদি অভ্যস্ত হয়ে যায়, এ-জাহাজ নিরবধিকাল চললেও ভাববে না, দেশে ফেরা দরকার। সে জিভ্ দিয়ে ঠোঁট চাটছিল আর ভেতরে ভেতরে ফুঁসছিল।

    জ্যাক সবার পেছনে। হাসপাতালের ভেতর বড় রাস্তা এবং সুন্দর ফুলের বাগান, গোলাপ ফুলই বেশি। ওর ইচ্ছে হল একটা ফুল তুলে নেয় ছোটবাবুর জন্য। এবং সে সবার অলক্ষ্যে একটা গোলাপ ফুল তুলে ফেলল। তারপর রুমালে ঢেকে সে যখন ঢুকে গেল ভেতরে, দেখল সারি সারি বেড। এবং শেষ দিকে বাবা এবং সেই ওল্ড-ম্যান অর্থাৎ সারেঙ। সে দেখতে পেল ছোটবাবু শুয়ে আছে পাশ ফিরে। ওর মাথায় ব্যান্ডেজ এবং ও-পাশে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে আছে। জ্যাক কিছুতেই সাহস পেল না সামনে গিয়ে একবার দেখে। সে তার বাবার পেছনে প্রায় যেন লুকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। যেন ছোটবাবু দেখতে না পায়। সে দেখছিল ছোটবাবু বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। বাবাকে ছোটবাবু ভীষণ ভয় পায়। বাবা থাকলে ছোটবাবু ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে যায়। সারেঙ শিয়রের দিকে। এনজিন টিন্ডাল সামনে—ও পাশের বেডে ঠোঁট পুরু চুল কোঁকড়ানো বাদামী মানুষ। পা টানা দেওয়া। চেহারা দেখলে ড্রাইভার মনে হয়। এবং এ-ভাবে এখানে কত বিচিত্র ব্যান্ডেজে পড়ে থাকা মানুষ! ওষুধের গন্ধ ছোটবাবু এখানে এভাবে একা পড়ে রয়েছে। সে কিছু বলতে পারছে না। রিপোর্ট ঝুলছে। বাবা ডাক্তারের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাইছেন, কবেতক তুলে নেয়া যাবে এবং এ-ভাবে জ্যাক দেখল বাবা করিডোর দিয়ে যখন হেঁটে যাচ্ছেন ছোটবাবুর মুখে সুন্দর হাসি। সে ডেভিডকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকছে। ছোটবাবু ওকে চোখ তুলে একবার দেখেছে, কিন্তু যেন একেবারেই চিনতে পারেনি। জ্যাকের ভীষণ অভিমান। সে তেমনি পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে আছে। ছোটবাবু জানে না, সে ছোটবাবুর জন্য চুরি করে একটা গোলাপ ফুল নিয়ে এসেছে।

    ছোটবাবুর কথা শুনে সেকেন্ড হেসে ফেলল। বলল, ওরা ভাল আছে।

    জ্যাক আর থাকতে পারল না। বলল, কারা ভাল আছে সেকেন্ড?

    —মিস্টার য়্যান্ড মিসেস স্প্যারো।

    —ওর ঘুম হচ্ছিল না বুঝি!

    জ্যাকের কথা ছোটবাবু শুনতে পায়নি। মেজ-মালোম স্পষ্ট করে বললেন, ওদের জন্য তোমার ঘুম নেই চোখে?

    ছোটবাবু আস্তে আস্তে বলল, না। সে সারেঙের দিকে হাত তুলে বলল, ভাল আছি। ভাববেন না। মৈত্রকে বলল, মৈত্রদা বসো। দাঁড়িয়ে থাকলে কেন? আমাকে তোমরা কবে নিয়ে যাবে। আমার ভাল লাগছে না।

    মৈত্র বলল, ঠিক নিয়ে যাব।

    —আমাকে ফেলে কিন্তু চলে যেও না তোমরা। তবে একেবারে একা পড়ে যাব। জাহাজ ছাড়ছে কবে?

    জ্যাক কাছে এসে দাঁড়ালো। জ্যাক কাছে এলে মৈত্র এবং সারেঙ বেশ দূরে সরে দাঁড়াল। জ্যাক পাশে বসল। বলল, তোমাকে না নিয়ে আমরা যাব না ছোটবাবু।

    ছোটবাবুর সব রাগ দুঃখ কেমন নিমেষে উবে গেল। —সত্যি যাবে না।

    —না।

    ছোটবাবু বলল, তুমি ভাল হয়ে যাও জ্যাক। সবাই তোমাকে খারাপ বলে। আমার ভাল লাগে না।

    —আমি ভাল হয়ে যাব ছোটবাবু।

    —ঠিক!

    –ঠিক।

    জ্যাক এবার ওকে ফুলটা দিল। বলল, তোমার জন্য এনেছি। জ্যাককে তখন কি যে ভাল লাগে। ছোটবাবু বলল, কত বড় ফুল! এবং জ্যাক ইচ্ছে করলে আরও কত ফুল এনে দিতে পারে। কিন্তু সে যে একটা দুঃসাহসিক কাজের ভেতর ফুলটা ওর হাতে দিতে পেরেছে তার জন্য খুশী। সে বাজার থেকে অনেক ফুল এনে দিতে পারে। ইচ্ছে করলে ওর চারপাশে ফুলের সমারোহ গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু সে তো সে-সব কিছু আসার সময় একেবারেই ভাবেনি। সে এই হাসপাতালে ঢুকে আবিষ্কার করেছে হাসপাতালে সময়ে অসময়ে দুর্লভ সব ফুলেরা ফুটে থাকে। একটা ফুল ছোটবাবুকে দিতে পারলে কি যে ভাল লাগবে। এবং এমন মনে হতেই সে কাপ্তান স্যালি হিগিনসের মেয়ে একেবারে মনে থাকল না। মান-সম্ভ্রমের কথা মনে থাকল না। একটা ফুল চুরি করে ফেলল ছোটবাবুর জন্য ফুলটা ছোটবাবুকে দিতে পেরে শেষ পর্যন্ত একটা মহৎ কিছু করে ফেলেছে ভাবল।

    এবং এ-ভাবেই জীবন কখনও মধুময়, কখনও এক কঠিন বাস্তবতা অথবা জ্যাক হয়তো জানে না, জাহাজে একজন হিংস্র মানুষ ওর শরীরে মেয়েমানুষের ঘ্রাণ পাচ্ছে। ওর অভিসন্ধির শেষ নেই। অন্ধকার গুহার মতো কেবিনে একজন মানুষ স্থির দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেও ভাল ঘুম নেই।

    স্যালি হিগিনস ফিরে এসে সেকেন্ড অফিসারকে ডাকলেন। এবং পরামর্শ—অবশ্য জ্যাক, মৈত্র অথবা সারেঙ কিছুই শুনতে পেল না। তারপর দু-দিন যেতে না যেতেই আবার বন্দরে সেই সাদা এম্বুলেন্স। ছোটবাবু বসে রয়েছে। জ্যাক সাহায্য করছে তুলে আনতে। গ্যাঙ-ওয়ে ধরে ছোটবাবু উঠে আসছে। ব্রীজে দাঁড়িয়ে আছে সেই লোকটা। একজন নেটিভের সঙ্গে জ্যাকের মেলামেশা তার আদৌ পছন্দ না। সে দু-পা নিজের অজান্তেই ঠক ঠক করে নাচাচ্ছিল। বুড়ো বয়সে কাপ্তানের ভীমরতি ধরেছে।

    তবু উঠে এলে, জ্যাককে মেজ-মিস্ত্রি আর্চি বলল, কেমন আছে?

    জ্যাক বলল, ভাল।

    এবং জ্যাকের যেন এখন কাজের শেষ নেই। বোধ হয় জ্যাক নিজের একগুঁয়েমির কথা ভেবে বিনয়ী হয়ে গেছে। এভাবে ছোটকে পাখি দুটোর পেছনে লেলিয়ে সে ঠিক কাজ করেনি। এখন সে ছোটবাবুকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ওর ফোকসালে নিয়ে যাচ্ছে। জাহাজিরা ছোটবাবুকে ভীষণ ভাগ্যবান ভাবল। ছোটবাবুর সঙ্গে এমন যখন আচরণ তখন তারাও আর ছোটবাবুকে অবহেলা করতে পারে না। কেউ কেউ উদ্বিগ্ন চোখে মুখে কথাবর্তা বলল। শেষে এল অনিমেষ, বন্ধু। ওরা ফলঞ্চা ঝুলিয়ে জাহাজের বাইরে রঙ করছিল। শরীরে নীল পোশাক। মজুমদার এসেই হাত ঘুরিয়ে মেয়েদের মতো নাচতে থাকল আর গাইতে থাকল, ছোটবাবু ফিরে এসেছে, ছোটবাবু ভূত দেখেছে, আহা আমার কি যে মজা হয়েছে, রেতের বেলা বউ আমারে বাবা বলেছে। এবং এভাবে সবাই হো হো করে হেসে উঠল। জ্যাক এ সবের কিছু বোঝে না। তবু সে বুঝতে পারে ছোটবাবুকে ফিরে পেয়ে সবাই আনন্দ করছে। তারও ওদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আনন্দ করতে ইচ্ছে হল।

    আর এভাবে জাহাজ ভিকটোরিয়া পোর্টে মাসাধিকাল থেকে গেল। মাসাধিকাল এ-জাহাজের বর্ণনা দিতে গেলে দেখা যাবে প্রতিদিন একই ছবি—বড় বড় গ্যাস সিলেন্ডার অথবা অক্সিজেন-সিলেন্ডার ডেরিকে উঠেছে নেমেছে। বড় বড় লোহার পাত জড় হয়েছিল এবং জোড়া তালি দেবার জন্য ওয়েলডিঙের কঠিন ধাতব শব্দ, কানে তালা লেগে যাবার মতো। আর ঝুলে ঝুলে রং করা ডেক- জাহাজিদের। চারপাশে বোল্ট লোহায় মুড়ে নেওয়া হচ্ছে। যতটা পারা যায় পুরানো জং-ধরা ঝরঝরে বালকেড মেরামত করে নেওয়া। আর পাশে সরু লেগুনের নীল জল। দু’পাশে শহরের ইট কাঠ সেতু। বিকেলে নৌকা বাইচ। এবং লম্বা লম্বা সালতিগুলো যেন শয়ে শয়ে লেগুনের জলে ভেসে যাচ্ছে—তখন ছোটবাবুর জন্য আর কিছুদিন অপেক্ষা করলে কি ক্ষতি ছিল। বনি, বাবার কথা শুনে সত্যি ভয় পেয়ে গেছে। বেশি কথা বললে, ছোট হয়তো কখনও আর নিরাময় হবে না। সে যে এখন কি করে!

    তারপর আবার যা হয়ে থাকে, জাহাজ নোঙর তুলে ফেলছে। পাশের জেটিতে তেমনি জাহাজে আকরিক লোহা বোঝাই হচ্ছে। বোধ হয় কার্ডিফ অথবা হামবুর্গ যাবে জাহাজ। ওদের জাহাজ বাউন্ড ফর পোর্ট অফ সালফার। এখন আরও উত্তরে উঠে যাওয়া। জাহাজ সমুদ্রে পড়লে কার্সি ফ্ল্যাগ নামিয়ে ফেলা হল। জাহাজের সামনে শুধু কোম্পানীর ফ্ল্যাগ। পেছনে ইউনিয়ান জ্যাক। আবার সেই অসীম যাত্রা, নীল আলোময় অন্তহীন যাত্রা যেন। ঝ্যাক ঝ্যাক অবিরাম শব্দ এনজিনের। কেউ হয়তো অবসর সময়ে লম্বা তারের বঁড়শি ফেলে রেখেছে সমুদ্রে। তাজা মাছ উঠলে বেশ হয়। সুরমাই মাছ। বাসি খাবার খেয়ে মুখে রুচি নেই। একটু তাজা মাছের স্বাদ এবং যেদিন সত্যি বড় একটা মাছ, প্রায় ত্ৰিশ বত্রিশ সের ওজনের একটা মাছ উঠে আসে, তখন সবার কি যে হৈ-চৈ। তাজা মাছ। ডেক আর এনজিন ক্রু মিলে উৎসবের মতো দিনটা কাটিয়ে দেয়।

    এবং জাহাজ বলতে গেলে বেশ যাচ্ছে। দু-এক দিনের ভেতর ওরা ক্যারেবিয়ান-সি পাবে। তারপর মিসিসিপি নদী। নদীর মোহনা এবং নদীর ভেতর দিয়ে বোধ হয় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়া। সেখানে সালফার বোঝাই হবে। যখন এমন সব ঘটনা, তখন জ্যাকের মনে হল বাবার দিন রাত কি যেন দুশ্চিন্তা মাথায়। ঠিক সেই দুঃস্বপ্ন দেখার পরে যেমন বাবা বলতেন, চিৎকার করে পরিচারকদের ডেকে বলতেন, দ্যাখো দ্যাখো ঘরের ভেতরে কে ঢুকে গেল। আমার সব কিছু তছনছ করে দিচ্ছে। আমার কিছু ঠিক রাখছে না। ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে অথবা যখন তিনি শান্ত হয়ে আসেন তখন তাঁর কন্ঠস্বরে দুঃখী মানুষের আভাস। তিনি ধীরে ধীরে বলেন, বনি দ্যাখতো কে গেল! ঘরের ভেতর কে ঢুকে গেল। চোখে মুখে বাবার কি যে ভীতির ছাপ থাকত।

    —কৈ কাউকে তো দেখছি না! কে ঢুকল! ভেতরে কেউ নেই বাবা

    —মনে হল যেন কেউ ঢুকে গেল।

    আসলে বনি জানে বাবা মাঝে মাঝেই এমন করেন। বয়স যত বাড়ছে বাবার এটা বেশি হচ্ছে। যতক্ষণ সমুদ্রে ভেসে পড়তে না পারছেন, ততক্ষণ এটা থাকছে। কিন্তু এ সফরে বনি দেখছে, বাবা জাহাজেও মাঝে মাঝে সহসা বলে ওঠেন, দ্যাখতো চার্টরুমে কে ঢুকে গেল! বাকিটুকু বলতে যেন তিনি সাহস পান না। বনি মুখ দেখে বুঝতে পারে বাবা কথা সম্পূর্ণ শেষ না করেই ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। বনি আবার সব বুঝে ফেলছে নাতো এমন চোখ মুখ তখন তাঁর। বনি জবাব দিত, কেউ না। এই এস না, দ্যাখো কেউ না। কেবল বড় বড় চার্ট, ম্যাপ এবং সেকসটান, নানা রকমের বই। সব বইগুলো যেন বনি লকার থেকে নামিয়ে দেখাতে চায়, দ্যাখো কেউ কোথাও নেই। এমনকি জ্যোতির্বিজ্ঞানের সব বই, যার ভিতর বনি পর্যন্ত এই সৌরজগতের এক অসীমতার রহস্য খুঁজে পায়।

    বাড়ির পুরানো পরিচারকের কাছে বনি শুনেছে, বাবার প্রথম পক্ষের মায়ের মৃত্যুর পর এটা হয়েছে। বাবা এবং প্রথম পক্ষের মার সুন্দর একটা ছবি সে বাড়ির একটা অব্যবহৃত সিন্দুকে খুঁজে পেয়েছিল। আশ্চর্য, ছবিটা এত অযত্ন সত্ত্বেও এতটুকু মলিন হয়নি। বাবার প্রথম বয়সের ছবি। কি যে রূপবান ছিলেন এবং মা আরও। সে ওটা সুন্দর করে ঝেড়ে মুছে দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছিল। বাবা ছবিটা দেখে বেশি উৎসাহ পেতেন না। যেন, আর ও বয়সের মুখ দেয়ালে টানিয়ে কি হবে! তিনি স্মিত হাসতেন। মানুষ তার অহঙ্কার নিয়ে বেশি দিন বাঁচতে পারে না। এবং এ-ভাবে যখন পুরানো স্মৃতির ভেতর ডুবে যান তখনই এমন হয় অথবা কখনও অন্যমনস্ক হয়ে গেলে মনে হয় পাশ কাটিয়ে কেউ চলে গেল। কে? কে?

    পরে বুঝতে পারেন, কেউ না। বুঝতে পারলেই লজ্জা পান। বিষণ্ণ হয়ে যান তারপর ভীষণ সতর্ক নজর চারপাশে। আবার কি ভাবেন। এটা কি কোন ভৌতিক ব্যাপার, ভাবেন আর পায়চারি করেন। না না এটা তা হবে কেন। তিনি যে তখন এলিসের চুলের গন্ধ পান। চুলের গন্ধটা পাশ থেকে তখনও যেন ভেসে আসছে। তাড়াতাড়ি চুপি চুপি বড় সেই হলঘরে ঢুকে চারপাশে, যেমন লকার, সিন্দুক ওয়াড্রোব খাট বাতিদান সব টেনে টেনে হাঁটু মুড়ে কখনও হামাগুড়ি দিয়ে একেবারে ছেলেমানুষের মতো হারানো খেলনা খুঁজে বেড়াবার মতো অথবা দুষ্টু বালকের ঘুড়ি কেটে গেলে যে দুঃখ, ঘুড়িটা উড়ে চলে যাচ্ছে, ধরতে না পারলে যে দুঃখ, বাবার মুখে তেমনি দুঃখ ভেসে থাকত! মুখে হাতে ধুলো ময়লা লেগে বাবাকে শিশুর মতো লাগত। বনি তখন সহ্য করতে পারত না। কি এত খুঁজছ। আমাকে বলতে পার না।

    তিনি বলতে পারেন না আমি খুঁজছি, আমার হারানো স্মৃতিকে। চুপচাপ হাত পা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ান। মার কাছে শিশুর দুষ্টুমীর কথা লুকিয়ে যাবার মতো যেন বলা, লাঠিটা যে কোথায় রাখলাম বনি!

    —এই তো লাঠি।

    —দ্যাখো কি আশ্চর্য, সারা ঘর খুঁজছি। অথচ একেবারে সামনে লাঠিটা। ঠিক এই লুকোচুরি যেন ছোটবাবুকে নিয়ে। যেমন বাবা সময় পেলেই বলবে, বনি, ছোট কেমন আছে?

    —ভাল।

    —লাগে না আর?

    —না।

    —কথা ঠিক ঠিক বলে?

    —হ্যাঁ।

    —ঠিক ঠিক যে বলে বুঝতে পার?

    —বুঝতে পারি।

    সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠতে উঠতে কথা বলেন। পেছনে তাকান না তখন। নিচে দাঁড়িয়ে থাকে বনি। তিনি বলতে বলতে অদৃশ্য হয়ে যান।—ওকে বেশি কথা বলতে দেবে না। ওর মাথার আঘাত গুরুতর। ভাল হতে সময় লাগবে।

    বনি আরও প্রশ্ন করতে পারে ভেবে তিনি চার্টরুমে ঢুকে গেলেন। বনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বাবার ওপর রাগে দুঃখে ভীষণ কান্না পাচ্ছিল। কি দরকার ছিল তবে ওকে নিয়ে আসার। সে তো এখন পাখিদের খাবার দিতে ভালবাসে, সে তো এখন আবার কাজে নেমে যেতে চায়। সবাই কাজ করছে। ওর বসে থাকতে ভাল লাগবে কেন। অথচ বাবা এমন জেনেও ওকে পুরোপুরি নিরাময় করে তুললেন না কেন। কোম্পানীর টাকা বাঁচিয়েছেন। তাড়াতাড়ি জাহাজে তুলে এনে কোম্পানীর বিষয় বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তিনি এমন হয়তো প্রমাণ করেছেন।

    বন্ধু এখন রং করছে। জাহাজের খোলে রঙ লাগাচ্ছে। খালি বলে খুব ওপরে ভেসে উঠেছে জাহাজ। বন্দরে খোলের রং করা শেষ করে উঠতে পারে নি। বাকি যেটুকু আছে ফলঞ্চা বেঁধে বন্ধু রং করছে। সে ঝুলে আছে সমুদ্রের ওপর। ওর প্রতিবিম্ব জলে ভেসে চলে যাচ্ছে। দিন বড় বলে বেশ রোদ। ঘামে সে ভিজে গেছে। ক্রমে ইকুয়েডরে চলে আসছে জাহাজ। এবং রঙ্গিন ছবির মতো চারপাশের দৃশ্য। এসময়ে ছোটবাবু বন্ধুর একটা ছবি তুলে রাখছে। জ্যাকের ক্যামেরা দিয়ে সে পরপর ছবি তুলে যেতে ভালবাসে। এবং এভাবে একটা জাহাজ অসীম সমুদ্রে জল কেটে যাচ্ছে, শুধু যখন চারপাশে থাকে নির্জনতা আর এনজিনের একটানা যাই যাই শব্দ এবং দূরে দিগন্ত রেখায় মেঘের ছায়া। তখন হয়তো একটা শুশুকের অবিরাম জলে ভেসে থাকা ভীষণ বিস্ময়ের। ছোটবাবু খুব সন্তর্পণে তাও ক্যামেরায় ধরে রাখে।

    জ্যাকও এভাবে ছবি তুলতে ভালবাসে। যখন ছোটবাবু বসে থাকে চুপচাপ, যখন পাখি দুটো ওর পায়ের কাছে বসে থাকে অথবা মাথার ওপর উড়ে বেড়ায় তখন সে বোট-ডেক থেকে হাঁটু মুড়ে, জাহাজ, সমুদ্র ছোটবাবু পাখি দুটো মিলে একটা ছবি; আবার ছোটবাবু যখন বিকেলে ডেকে হেঁটে বেড়ায় তখনও ছবি এবং এভাবে অজস্র ছবি। জ্যাক যখন ফানেলের গুঁড়িতে চিপিং করতে বসে তখন ছোটবাবু ছবি তুলে রাখে জ্যাকের। জ্যাক যখন দূরবীণে সমুদ্র দেখে তখনও। ডেবিডের এভাবে অনেক ছবি উঠেছে। এভাবে ওরা কখনও বোট-ডেক থেকে, কখনও মাংকি আয়ল্যাণ্ড থেকে সমুদ্রের কখনও সমুদ্রে জেগে-ওঠা কোরাল আয়ল্যাণ্ডের যখন যেখানে ধরে রাখার মতো দৃশ্য থাকছে ক্যামেরায় ধরে রাখছে।

    এখন ওদের জাহাজ উইণ্ডওয়ার্ড দ্বীপের কাছাকাছি। কিছু কিছু বর্ণময় দ্বীপের পাশ দিয়ে জাহাজ যাচ্ছে। বোধহয় এভাবে ক্যারেবিয়ান সমুদ্রে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র দ্বীপপুঞ্জ। কোনটার রং সোনালী, কোনটা রুপোলী, কোনটা আবার সবুজ। নানা বর্ণের ফার্ণ গাছ চারপাশে। এমন কি ওরা কোথাও সমুদ্রের বালিয়াড়িতে বড় বড় শঙ্খ, কচ্ছপের খোল দেখতে পেল। নির্জন দ্বীপে সমুদ্রের বালিয়াড়িতে কতকাল অথবা আবহমানকাল ধরে এভাবে মরা কচ্ছপের খোল শামুকের হাড় শঙ্খ মাছের কঙ্কাল পড়ে আছে। রোদে শুকুচ্ছে, বৃষ্টিতে ভিজছে। কেবল ডেবিড সময় পেলেই বসে থাকছে দূরবীণ নিয়ে। কোনো মেয়েমানুষের প্রতিবিম্ব যদি সমুদ্রের জলে ভেসে বেড়ায়।

    জাহাজ পোর্ট অফ জামাইকাতে একদিনের জন্য থামবে। জল ও রসদ নিতে হবে। জ্যাক যখন এমন একটা খবর দিল তখন আবার সবার মাটিতে নেমে যাবার আকাঙ্ক্ষা।

    ডেবিড তেমনি বসেছিল বোট-ডেকে। ছোটবাবু পাশে বসে আছে। ডেবিড খুব নিবিষ্ট মনে দ্বীপের ভেতর চোখ চালিয়ে দিয়েছে। এবং ওর দূরবীণে গাছপালা ক্রমে সরে যাচ্ছে। ছোট বলল, এনি ওম্যান।

    —নো। সেকেণ্ড হতাশ গলায় বলল।

    —আমাকে দিন, আমি দেখছি।

    সেকেণ্ড বলল, তুমি খুঁজে পাবে না।

    ছোট বলল, কেন?

    —এত গাছপালা দেখতে দেখতে একসময় তন্ময় হয়ে যাবে। মেয়েমানুষের কথা তোমার মগজে থাকবে না।

    —কাল তো সকালে বন্দর ধরছে।

    —কেউ নামতে পারছে না।

    কেউ নামতে পারছে না যখন, তখন আর কি করা। ভোর রাতে জাহাজ বাঁদাছাঁদা হয়েছে। আসলে এটা যেন ঠিক বন্দর নয়। কারণ ওরা আর কোন জাহাজ দেখতে পেল না। সমুদ্র পাশে ছড়িয়ে আছে। খুব দূরে শহর। একটা ফিতের মতো কাঠের সাঁকো সমুদ্রের ওপর দিয়ে জাহাজের কাছাকাছি চলে এসেছে। একটা সাদা রঙের মোটরকার সকালের দিকে কেউ কেউ দেখতে পেল সেই কাঠের সাঁকোর ওপর দিয়ে আসছে। আর কিছু নেই চারাশে। কেবল কিছু সি-গাল এবং তাদের কলরব। দূরে বালিয়াড়ি দিগন্ত-বিস্তৃত। মাঝে মাঝে লাল নীল কাঠের ঘর ইতস্তত দেখা যাচ্ছে। সামান্য হাওয়া উঠলে সেই সব লাল নীল কাঠের ঘরের চারপাশে জলের ঢেউ চলে যাচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে। টাগ-বোটে রসদ আসছে। রসদ ওঠানো হচ্ছে। বাটলার হিসাব মিলিয়ে সব নিচ্ছে

    তখনই এনজিন সারেঙ এসে ছোটর ফোকসালে উঁকি দিলেন। দেখলেন, ছোট নেই। কোথায় ছোট! ওপরে উঠে দেখলেন, ছোট মনু জব্বার বন্ধু সমুদ্রের জলে ছিপ ফেলে মাছ ধরছে।

    —তুই এখানে! শিগগির নিচে যা।

    ছোট বলল, আমি যাব না চাচা, মাছ ধরছি। নিচে যেতে ভাল লাগছে না।

    সারেঙ বললেন, তোকে বাড়িয়ালা ডেকেছে। জামাকাপড় পরে বের হতে হবে।

    ছোটর মুখটা সহসা সাদা হয়ে গেল। সে কিছু বলতে পারল না! ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তাকে এ অসময়ে বাড়িয়ালা কেন ডাকবে! সে জাহাজের কাজে উপযুক্ত নয় তাকে নামিয়ে দিতে পারে এখানে। সে বলল, আমাকে কেন ডাকছে চাচা?

    —জানি না।

    —আমি আপনাকে বলেছি না পরিতে ঠিক কাজ করতে পারব। আপনি কিছুতেই দিলেন না, যেন সারেঙসাবই এজন্য দায়ী। সে বলল কাল থেকে কাজ করতে পারব। কাল থেকে কাজ করতে পারব বললে, নিশ্চয়ই বাড়িয়ালা এবারের মতো ক্ষমা করে দেবেন।

    সারেঙ বললেন, আমি কিছু জানি না, তোকে যেতে বলেছে, যা। ভাল জামা প্যান্ট পরে যাবি। বাড়িয়ালার সঙ্গে কিনারায় যেতে হবে তোকে।

    ছোট বোকার মতো তাকিয়ে থাকলে ফের সারেঙসাব বললেন, দেরি করিস না, বুড়ো মানুষ ক্ষেপে যাবে আবার। ওর কত কাজ।

    ছোট কেমন এবার বেয়াড়া হয়ে গেল। সে বলল, আমি যাব না। মৈত্রদা কোথায়। আঃ আমাকে কাজ দেবে না! বললাম, সব ঠিক, আমি ভাল আছি, ঠিক পরি করতে পারব, কিন্তু বাবুদের মাথাব্যথা। না, এখন না পরে। আমাকে ঠিক নামিয়ে দেবে এবার। আপনারা, সবাই এজন্য দায়ী হবেন।

    সারেঙসাব বললেন, মাথা গরম করিস না। তাড়াতাড়ি যা। কেন ডেকেছে, কেন তোকে কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে আমি জানি না।

    —সঙ্গে কিছু নিতে বলেনি!

    —নারে না।

    কিছুটা ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো, কারণ তাকে নেমে যেতে হলে সব নিয়ে এই যেমন, তার টিনের সুটকেস, বেডিং, পুরানো বুট জুতো এসব নিয়ে নেমে যাবার অর্ডার হত। সে বলল, আপনি যাবেন না?

    —না।

    —আমি ওর সঙ্গে একা যাব! ছোটর মুখ দেখে মনে হয় সে একা গেলে ভয়েই মরে যাবে। এত বড় মানুষের সঙ্গে যাবে কি করে!

    সারেঙসাব বললেন, ঠিক জানি না। তুই একা যাবি, না আর কেউ সঙ্গে যাবে বুঝতে পারছি না। আমাকে কিছু কিন্তু বলেনি। সারেঙসাব আর দাঁড়ালেন না। ওঁর নামাজের সময় হয়ে গেছে। তিনি এখন সামান্য জলখাবার খেয়ে নামাজ পড়তে বসবেন। তারপর নানা রকমের কাজ। লোক এমনিতেই কম। একজন মাত্র ফালতু ছিল, সেও দুর্ঘটনার পর থেকে কিছু করতে পারছে না। ওকে কাজের সব দিক নানাভাবে সামলাতে হচ্ছে।

    ছোটবাবু বের হবার মুখে দেখল, সবাই ভিড় করেছে ওর ফোকসালে। কাপ্তান ডেকে পাঠালে একটা সাংঘাতিক কিছু ঘটনা। ওরা যেন ছোটকে দেখে খুব বিষণ্ন হয়ে গেছে। কেন ডাকছে, কি ব্যাপার, নানারকম প্রশ্ন। ছোট কেবল বলছে, জানি না। সারেঙসাবও বলতে পারলেন না। সে একটা সাদা হাফ সার্ট, কালো রঙের প্যান্ট পরেছে। পায়ে সাদা কেডস্ জুতো! সে খুব সাফসোফ, এবং নীল রঙের সামান্য নরম অল্প অল্প দাঁড়ি এখন যেন আরও বেশি লাবণ্যময়। সবাই ছোটকে দেখতে দেখতে ভাবল ভারি বিড়ম্বনা ছেলেটার। ছোট রাগে এবং ক্ষোভে ভেতরে ভেতরে ফেটে পড়ছে। চোখ মুখ ভারি থমথম করছে। সে কিনারায় কেন যাচ্ছে জ্যাক বিন্দু বিসর্গ জানায় নি। সে কারো সঙ্গে একটা কথা বলল না। মৈত্রদা, অমিয়, বাদসা মিঞা, ছোটকে চিফ-কুকের গ্যালি পর্যন্ত এগিয়ে দিল। আর ভিতরে যাওয়ার সাহস তাদের নেই।

    ছোট একা একা হেঁটে গেল। এলিওয়ে দিয়ে হেঁটে গেল। পাশের কেবিন বাঙালী সাহেবের। জাহাজে উঠে সে সবার চেয়ে বেশি সাহেব। যখন ছোটবাবু সবার সঙ্গে বেশ জমিয়ে নিয়েছে, তখন বাঙালী সাহেব ফিফথ-এনজিনিয়ার ওদের সবাইকে বেশি নেটিভ ভেবে নিয়েছে। তারপর ফোর্থ এবং শেষেরটায় থাকে বড়-মিস্ত্রি। সেই রাস্তাটা, যেখানে সে এক রাতে লম্বাছায়া নড়ে উঠতে দেখেছিল। এখন সবই কেমন ফাঁকা। দু’পাশে কাঠের কারুকার্য করা দেয়াল। সে ডাইনিং হলের সামনে এসেই দেখল, সিঁড়ি ধরে দু’পাটি শাদা জুতো, তারপর ক্রমে হাঁটু পর্যন্ত এবং শেষে সে বুঝতে পারল, বাড়িয়ালা নেমে আসছেন। পুরো জাহাজী পোশাকে তিনি নেমে এলেন। চারটা লম্বা সোনালী স্ট্রাইপ এবং উজ্জ্বল এত বেশি সব যে, সে কেমন বিস্ময়ে মানুষটির দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, গুড মর্নিং স্যার।

    স্যালি হিগিনস বললেন, গুড মর্নিং। তারপর তিনি আরও কাছে এগিয়ে এলে ছোটবাবু যেন কি এক আশ্চর্য আকর্ষণে হাত বাড়িয়ে দিল। ভীষণ ভয় মনে মনে, এত বড় মানুষটা তার সঙ্গে হ্যাণ্ডসেক করবেন কিনা, সে নিজের মনুষ্যত্বের কাছে কেমন যেন তা না হলে অপমানিত হবে, যেই না ভেবে সে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, কি এক সাধারণ মানুষ তিনি, স্যালি হিগিনস সত্যি হাত বাড়িয়ে ওর সঙ্গে হ্যাণ্ডসেক করলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে ছোটর যত ভয়, যা কিছু আতঙ্ক নিমেষে উবে গেল। মানুষটা তাকে নামিয়ে দিতে চাইলে সব খুলে বলতে পারবে। বলবে, আমি ঠিক পারব। আমার কোন অসুখ নেই। আমাকে জাহাজ থেকে দয়া করে নামিয়ে দেবেন না।

    স্যালি হিগিনস বললেন, এস।

    সে বাড়িয়ালার পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকল। মেজ-মালোমের কেবিনের দরজায় হিগিনস স্টিকে দুবার ধীরে ধীরে টোকা মারলেন। বললেন সেকেণ্ড জলদি।

    ডেবিড ভাবতেই পারেনি এত তাড়াতাড়ি তিনি নেমে আসবেন। সে তাড়াতাড়ি মাথায় টুপি গলিয়ে বের হয়ে এল। সাদা জুতো ডেবিডের সাদা হাফ-প্যান্ট, সোনালী ব্রেড কাঁধে কলারে। ওরা দু’জন আগে আগে, সে পেছনে। গ্যাঙ-ওয়েতে ছোটবাবু আরও অবাক হয়ে গেল। জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক হাতে সোনার ব্যাণ্ড দেওয়া খুব বড় মাপের ঘড়ি পরেছে। গায়ে লতাপাতা ফুল-ফল আঁকা ঢোলা জামা, ঢোলা তসরের প্যান্ট সে পরেছে।

    তিনি নামতে নামতে কেমন নিজের মানুষের মতো বললেন, দেশে কে কে আছে তোমার ছোটবাবু?

    –সে সবার কথা বলল।

    —তুমি কি কিছু জানিয়েছ তাদের?

    ছোট ঠিক বুঝতে পারল না। সে দেখল সেই কাঠের সেতুর ওপর সাদা রঙের মোটরকার। বাড়িয়ালা তাকে প্রশ্ন করে গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসলেন।

    ডেবিড বলল, বাড়িতে জানিয়েছ, ক্রোজনেস্ট থেকে লাফাতে গিয়ে যে পড়ে গিয়েছিলে?

    ছোটবাবু বলল, না।

    —এতদিন হাসপাতালে ছিলে, জানাও নি?

    সে বলল, না।

    আশ্চর্য! তিনি আর কোন প্রশ্ন করলেন না। তিনি কি ভাবলেন, তারপর বললেন, একজন বড় ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করতে যাচ্ছি। দরকার হলে এখানে একরে নেওয়া হবে। এবার তিনি আরও ধীরে ধীরে যেন বলে যেতে থাকলেন, প্রায় গীর্জার ফাদারের মতো, ছোটবাবু তোমার মাথার খুলি সামান্য ড্যামেজ হয়েছিল। বয়স কম বলে বোধহয় তেমন ভয়ের নেই। সেরে যাবে। মাঝে মাঝে এক্সরে নিলে ঘাবড়ে যাবে না।

    ছোট খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে। মাস্টার তার মতো সামান্য মানুষের সঙ্গে সোজাসুজি কথা বলছেন! ওর মাথায় কোন জটিলতা থাকতে পারে সে বিশ্বাস করতে পারল না। এমন একজন বড় মানুষের এমন কথার পর সে মরে পর্যন্ত যেতে পারে। একটা সাদারঙের গাড়িতে তারা বসে রয়েছে। সবাই চুপচাপ, চারপাশে সমুদ্র, বালিয়াড়ি, লাল নীল কাঠের ঘর। এবং বহু দূরে শহরের সবকিছু কুয়াশার মতো অস্পষ্ট। সে কিছুই যেন দেখছিল না। বাড়িয়ালার সাদা চুল ঘাড়ের পেছনে এবং কোঁচকানো চামড়া সে শুধু দেখতে পাচ্ছে। এক পাশে জ্যাক একপাশে ডেবিড, এর চেয়ে জীবনে কি আর বেশি সৌভাগ্য থাকতে পারে সে বুঝতে পারছে না। ডেকের ওপর সবাই দাঁড়িয়ে দেখছে ওদের। সামান্য একজন কোলবয়ের এই গৌরবময় যাত্রা বোধহয় নানা কারণেই জাহাজি জীবনে বড় আনন্দের। সে হাত নাড়ল ওদের।

    কাঠের সেতু পার হয়ে গেলে, সামনে পিচের রাস্তা। সমুদ্রে ঢেউ এসে মাঝে মাঝে টায়ার ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। যেন জলের সঙ্গে গাড়িটার ছলাৎ ছলাৎ খেলা চলছে। জলকণা উড়ে এসে গাড়ির ভেতর ওদের মুখ ভিজিয়ে দিচ্ছে। জ্যাক ছোটবাবুকে আড়চোখে দেখছে। ছোটবাবু পাখি দেখছে আকাশের। জলকণার জন্য মাঝে মাঝে কাচ ভীষণ ঝাপসা হয়ে উঠছে। ছোটবাবু আকাশ দেখতে পাচ্ছে না, অস্পষ্ট সমুদ্রে ছোট ছোট ঢেউ দেখতে পাচ্ছে শুধু। জ্যাক কেবল তখন দেখতে পায় তার পাশে, ছোট, ছোটবাবু। কি যে তার সুষমামণ্ডিত মুখ! সমুদ্রের মতো গভীর চোখ। দু’পাশে ঝাপসা কাচে চোখ রেখে কেবল কি যেন খুঁজে বেড়ায়। তাকে দেখে না। ছোটবাবু কি তার মতো বয়সের কাউকে ফেলে এসেছে দেশে! জ্যাক তখন ভিতরে ঝড়ের খড়কুটোর মতো ছটফট করতে থাকে। তার কিছুই ভাল লাগে না।

    .

    আবার পাল তুলে দেবার মতো সমুদ্রে সন্ধ্যায় জাহাজ ভেসে গেল। গভীর সমুদ্রে জাহাজ। কিনার আর দেখা যাচ্ছে না। কেবল সেই ছলাৎ ছলাৎ শব্দ জলের। এবং যেসব পাখিরা উড়ে এসেছিল পেছনে, তারা আবার ডাঙ্গায় ফিরে গেছে। ছোটবাবু আর জ্যাক দাঁড়িয়েছিল রেলিঙে। সূর্য ক্যারেবিয়ান সিতে অস্ত যাচ্ছে। চারপাশে এক নীলাভ সোনালী আভা এবং একটা পাখি পর্যন্ত আকাশে নেই। শুধু সমুদ্রে দুজনের প্রতিবিম্ব ভাসছে। কেউ কোনও কথা বলছে না।

    জ্যাক একসময় আর থাকতে না পেরে বলল, ছোট তুমি কাউকে ভালোবাসো না?

    ছোট বলল, হ্যাঁ।

    —কে সে?

    —সে আমার লিটল গার্ল। মাই লিটল্‌ ডার্লিং। মাই প্রিন্সেস।

    জ্যাক কেমন গম্ভীর হয়ে গেল! সে যেন এক্ষুনি আবার পায়ে হান্টার সু পরে বের হয়ে আসবে। এবং বলবে, কিল দ্যাট বার্ড। কিন্তু জ্যাক ভীষণ দুঃখী গলায় বলল, ওর জন্য তুমি কিছু নিয়ে যাবে না। এমন কিছু আশ্চর্য জিনিস……

    ছোট বলল, হ্যাঁ, নিয়েছি তো।

    —কি নিলে?

    —একটা কম্বল নিয়েছি। শীতে বড় কষ্ট পেত। আর পাবে না। আমি বড় হয়ে গেছি। বলেই কেমন চোখ বুজে তার সেই ছোট রাজপুত্রীর কথা ভাবতে ভাবতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। শীতের রাতে কুপি জ্বেলে সে হয়তো গোপনে এখনও জেগে থাকে। কখন দরজায় ডাকবে, মা আমি এসেছি। দরজা খোল।

    জ্যাক আর দাঁড়াল না। অভিমানে ওর চোখ ফেটে জল আসছে। সে তার কেবিনে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

    এবং রাতে, যখন জ্যোৎস্না উঠেছে সমুদ্রে তখন সবাই শুনল, খুব জোরে জোরে জ্যাক রেকর্ড বাজাচ্ছে। যেন কোন দূরবর্তী গীর্জায় কেউ ধর্মীয় সঙ্গীত পিয়ানোতে বাজিয়ে যাচ্ছে। কখনও উঁচু লয়ে, কখনও খুব নিচু লয়ে, একেবারে বৃষ্টিপাতের মতো। যেন কখনও সেই বৃষ্টিপাত, সমুদ্রে ধীরে ধীরে আবার ঝম্ ঝম্ শব্দ, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে অনেক দূরে। বৃষ্টিপাতের অস্পষ্ট নীরবতার মতো চুপচাপ সব কিছু আবার। ছোটবাবু জানে না, জ্যাক এখন গানের সঙ্গে সুন্দর এক মিউজিক বাজিয়ে যাচ্ছে। যেন বলছে, আমি ফুটে উঠছি দ্যাখো। সে তার দু’হাত গোপনে, পৃথিবীর কেউ দেখতে পাচ্ছে না, তবু গোপনে কি যে ইচ্ছে থেকে যায়, সে দু-হাত ছড়িয়ে নিজের ছোট্ট ঘরটিতে আপনমনে নেচে যেতে থাকল। যেন নাচের মুদ্রায় শুধু এক আকাঙ্ক্ষা। লেট মি ন্যুম। আমাকে ফুটতে দাও। লেট মি ব্ল্যুম, ব্ল্যুম…… ব্ল্যুম………

  • সতের

    সতের

    ।। সতেরো।।

    এখন জাহাজ ইউকাটান প্রণালীতে ঢুকে গেছে। পোর্ট-অফ জ্যামাইকা ছেড়ে আসার তিন চার দিনের ভেতরই জাহাজ ম্যাকসিকো উপসাগর পেয়ে গেল। পেছনে পড়ে থাকল নানারকম দ্বীপমালা। যেমন কিউবা এবং তার পাশাপাশি অসংখ্য সব দ্বীপ। দ্বীপের ছড়াছড়ি এ-অঞ্চলটাতে। কত বিচিত্র সব নাম। ভূগোল বইয়ে এদের হয়তো কোনও উল্লেখ নেই। কোনো জরিপমালাতে হয়তো একটা বিন্দুর মতো রয়েছে এদের অবস্থান। তবু কি যে সুন্দর লাগে এদের পাশ দিয়ে যখন জাহাজ যায়। কিছুতেই বিশ্বাস হয় না পৃথিবীর মানচিত্রে এদের কোনও উল্লেখ নেই।

    এভাবে সমুদ্রের দু’পাশে জাহাজ ফেলে এসেছে নানারকম দেশ। পোর্টসাইডে রয়েছে বৃটিশ হণ্ডুরাস। অথবা গুয়াতেমালা, নিকারগুয়া এবং অন্যপাশে যেমন স্টারবোর্ডের কথাই ধরা যাক, আছে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের অসংখ্য নারকেল গাছ অথবা আনারস কিংবা আখের খেতের ছবিয়ালা দ্বীপ, কিংবা বড় বড় পিচের হ্রদ। কিউবার পাশ কাটিয়ে কিছুটা নাক উঁচিয়ে ঢুকে যাবার মতো জাহাজটা এল-কুইয়োর পাশাপাশি এসে গেছে। এখন সোজা নব্বই ডিগ্রি বরাবর ওপরে উঠে গেলেই নিউ- অর্লিয়নস্ বন্দর। মিসিসিপির মুখে এই বড় বন্দরে জাহাজ আপাতত যাচ্ছে।

    ব্রীজে পায়চারি করছে তিন নম্বর মালোম। রাত তখন এগারোটা বাজতে দশ মিনিট। আর পুরো এক ঘণ্টা দশ মিনিট ওর ওয়াচের সময়। সময়টা যথেষ্ট, সে এ-সময়টুকুর ভেতর তার হাতের যা কাজ সেরে ফেলতে পারবে। লুক-আউট ডিউটিতে আছে পাঁচ নম্বর জাহাজি মান্নান। অস্পষ্ট অন্ধকারে আফটার-পিকের মাথায় ওর ছায়াটা নড়ছে। অন্ধকার রাত। চারপাশে কিছুই চোখে পড়ছে না। তবু মাঝে মাঝে কাচের ভেতর দিয়ে দূরবর্তী নিহারীকাপুঞ্জ দেখতে ভীষণ ভাল লাগে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এটা তার হয়। মন মেজাজ ভাল না থাকলে এটা হয়। সে সারাক্ষণ আকাশে নক্ষত্রমালা দেখে রাত কাবার করে দিতে পারে কারণ, তার মন ভাল না থাকলে চোখে ঘুম আসে না। সে যতদূর জানত, জাহাজ ভিকটোরিয়া পোর্ট থেকে নেবে লৌহ আকরিক। তারপরই জাহাজ হোমের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দেবে কারণ কথা এমনই ছিল, কিন্তু জাহাজ বুয়েনএয়ার্স থেকে ছাড়বার সময়ই সে সব টের পেয়ে যায়। এবং সেই থেকে মন খারাপ।

    সে বাণ্টির চিঠি পেয়েছে। বাণ্টির সঙ্গে দু’বছরের পরিচয়। এবং কথা আছে সেকেণ্ড মেটের পরীক্ষায় বসে তারপর ভেবে ঠিক করা যাবে বিয়ের দিন। বাণ্টির চিঠি চারদিন আগে এসেছে। ওর বাবা তেলবাড়িতে চলে যাচ্ছে। ও এখন আপাতত একা আছে ব্রিমিংহামে। সে ভেবেছিল, থার্ড ফিরে গেলে কিছুদিনের জন্য ইউরোপের দেশগুলোতে ঘুরে বেড়াবে। যদিও পছন্দ করে না থার্ড, বরং সে যে-কদিন হোমে থাকে, অন্তত সে-কদিন কোথাও নড়তে চায় না। কোন বড় রাস্তা ধরে ওর হেঁটে যেতে ভাল লাগে। অথবা ওর বাবার খামারে আলু কিংবা বাঁধাকপির চাষ কেমন হল, সে বাবার সঙ্গে তখন খামারে খাটতে ভালবাসে। এবং এভাবে সে হোমে ফিরে গেলে কি কি করত মনে মনে ভাবছে। বাণ্টিকে সে যেখানে খুশি চুমো খেত অথবা কোন রেস্তোঁরাতে বসে হৈ-চৈ অথবা যদি কোন গীর্জা থাকে তার পাশে চুপচাপ নীরবে বসে থাকা, কিন্তু জাহাজ হোমে যাচ্ছে না বলে, সে কিছুটা কর্তব্যে শীথিল, কাজ করতে ভাল লাগছিল না। তবু তাকে কিছু কাজ সেরে ফেলতেই হবে। সময় পিছিয়ে দেওয়া একটা বড় কাজ। তাকে ওয়াচে ত্রিশ মিনিট ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দিতে হবে। এ-ভাবে ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দেওয়া এবং লগ-বুকে সব নোট করে রাখা তার কাজ। লুক-আউট- ডিউটির পাঁচ নম্বর জাহাজি তখন হঠাৎ দুম করে একটা বেল বাজিয়ে দিল।

    থার্ড অফিসার তাড়াতাড়ি স্টাবোর্ড-সাইডে ছুটে গেল। এবং ঝুঁকে দেখল—অন্ধকারে একটা জাহাজ উঠে আসছে। কিছু সিগনালিঙের কাজ থাকে তখন। হোয়াট সিপ, বাউণ্ড ফর দি পোর্ট, এ-সব জেনে নিতে হয়। কোথায় যাবে জাহাজ, কোন দেশের, কি লাইন। কোথা থেকে এল। এমন সব খবর নেওয়া দরকার। অথবা ওরা যে সমুদ্র পার হয়ে এসেছে, তার ওয়েদার রিপোর্ট—এবং এসব জেনে নেওয়া ভাল। অথচ মন খারাপ বলে সে কিছুই করল না। দুটো একটা সিগনালিঙ পাঠিয়ে যখন বুজতে পারল, না কোনোই জবাব পাওয়া যাচ্ছে না, জাহাজটা চলে যাচ্ছে, থার্ড মেট আর কোনও সিগনাল পাঠাল না। কাপ্তান বুড়ো মানুষ। এখন হয়ত তিনি জেগে থাকার নামে বেশ ঘুমোচ্ছেন। ওঁর কেবিনে সোজা তো ঢুকে যাওয়া যায় না। সে দু-একদিন দেখেছে, বেল বেজে উঠলে তিনি কেমন ফোলা ফোলা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে দরজা টেনে বলেন, কাম ইন। বারোটা-চারটায় ডিউটি দিতে আসছে সেকেণ্ড-মেট ডেবিড। যদি লগ-বুকে কিছু নাও লিখে রাখে ডেবিড হয়তো কিছু বলবে না। কেমন ছেলেমানুষ ডেবিড। ডেবিড বয়সে বড় এবং সোজাসুজি কথা বলতে ভালবাসে বলে, থার্ড ডেবিডকে সবার চেয়ে বেশি মান্য করে থাকে। যত ঝামেলা বুড়ো কাপ্তানকে নিয়ে। ডেবিডকে তার ওয়াচ বুঝিয়ে যেতে হবে এবং যেহেতু এটা কাপ্তানের ওয়াচ, সে কাপ্তানের হয়ে কাজটা করে থাকে, তাকে বেশি ঝামেলা পোহাতে হয়। ওয়াচের পর প্রায় অনেকক্ষণ তাকে কাপ্তানের ঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। যতক্ষণ তিনি সই না করে দিচ্ছেন, যতক্ষণ তিনি সবকিছু দেখে নিচে সই করে না দিচ্ছেন, ততক্ষণ সে যেতে পারে না।

    এবং এজন্য তাকে সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হয়। এত বার সে নির্ভুল করতে চেয়েছে রিপোর্ট, কিন্তু কেন যে সে দেখেছে, কোথাও না কোথাও তিনি ঠিক ভুল ধরে ফেলেন। আজ সে যেন একটু স্বাধীনভাবে দেখতে চাইল, কাপ্তান সত্যি ঘুমোন কিনা। বুড়ো হলে যা হয়ে থাকে, খুব খুঁতখুঁতে স্বভাবের, যেন সবদিকে ঠিক নজর আছে এমন দেখাতে চান। এবং সে জানে মাস্টার যতই বড় কথা বলুক এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন না; বরং তার পাশে ঘড়ি থাকে, ঠিক সময় হলে হয়তো তাঁকে জাগিয়ে দেয়। এবং এসব ভেবে যখন বেশ একটা মজা করা যাবে ভেবেছিল তখন কেন যে মনটা খচখচ করছে। কি জানি, যদি তিনি সত্যি জেগে থাকেন। সে তো বাণ্টির কথা ভাবতে ভাবতে কেমন অতলে ডুবে গেছিল। যেন লুক-আউট ডিউটির পাঁচ নম্বর জাহাজির সব দোষ। আরে বাবা সামনে পাহাড় কিংবা দ্বীপ-টিপ না পড়লেই হল। অন্ধকার। কিছু দেখা যায় না, চড়ায় জাহাজ আটকে গেলে ভয়াবহ ব্যাপার। দ্বীপ, পাহাড়, অথবা একেবারে নাক বরাবর জাহাজ এলে ভয়। কলিসান এড়াতে বেল বাজাও। কোথাও দূরে কি একটা জাহাজ নেমে যাচ্ছে—কি যে দরকার বুঝি না। আসলে ঘুম, এই মধ্যরাতে ভীষণ ঝিমুনি আসে এবং জেগে থাকার জন্যই কেবল যেন মাঝে মাঝে বেল বাজানো।

    মধ্যরাতে এভাবে মনটা খিচে গেলে সে দেখল ঘুম ঘুম চোখে ডেবিড এসে দাঁড়িয়েছে। কোয়ার্টার- মাস্টার মহসীন চলে যাচ্ছে। তিন নম্বর কোয়ার্টার মাস্টার এসেছে ওয়াচ বদল করতে।

    ডেবিড ঘুম ঘুম চোখেই বলল, কোনো খবর নেই?

    —কিসের খবর?

    —জাহাজ কোথায় যাচ্ছে।

    —নিউ অরলিনস্ যাচ্ছে।

    —সেটা আপাতত। তারপর কোথায়। পোর্ট অফ সালফার কথা ছিল, সেখানে যাচ্ছে না? সালফার বোঝাই হবে নিউ অরলিনসে। আবার শুনছি, জাহাজ আর চালাবে না কোম্পানী। জাহাজ এবার স্ক্র্যাপ করার অর্ডার হয়েছে।

    —স্ক্র্যাপ! বলছেন কি! এত রাতে এমন খবরে থার্ড কেমন হতবাক।

    —ভাঙ্গা জাহাজ! আর কতদিন চালাবে।

    —সেতো শুনেছি আরও ক’বার স্ক্র্যাপ করার কথা হয়েছিল।

    —হয়েছিল। এবারও হয়েছে। কিন্তু আমাদের কপাল যাবে কোথায়! শেষ পর্যন্ত হবে না। স্ক্র্যাপ করা যাবে না। অর্ডারে সই করবে কে!

    -কেন, কোম্পানীর যারা মালিক!

    —তুমি কিচ্ছু জান না। এ জাহাজে প্রথম সফর। জানবেই বা কি করে! পাইপে আগুন ধরাতে গিয়ে হাওয়ায় আগুন নিভে গেল ডেবিডের।

    —জানি কিছুটা, বলে ডেবিডের পাইপে আগুন ধরিয়ে দিল। বলল, একটা দুর্ঘটনা ঘটে যায়, আর কর্তৃপক্ষ স্ক্র্যাপ করতে সাহস পায় না।

    —তবে আবার কথা বলছ কেন! দেখে যাও। তবে যা অনুমান, সে যে অর্ডারই আসুক, আমরা বেঁচে থাকতে এর রহস্য উদ্ধার করতে পারব না। বেঁচে থাকতে এটা স্ক্র্যাপ করা হচ্ছে না।

    আসলে ওরা রহস্যের কথা বলতে গিয়ে এই জাহাজের এতদিন টিকে থাকার রহস্যের কথা বলছে। জাহাজের বয়সকাল নির্ণয় করা যাচ্ছে না। তবে এটা যে প্রথম মহাযুদ্ধের আমলের জাহাজ তার রেকর্ড কোম্পানীর ঘরে রয়েছে। কোম্পানীর ঘরে এর আগের নাম সিনারা, জার্মান সিপ এবং কোন এক সি-ডেভিল ছিল জাহাজের কাপ্তান। তার সব নানারকম কাহিনী আছে, এবং সেই সি-ডেভিল বার বার বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছে এমন সব ঘটনাও নাকি কোম্পানীর ঘরে লিপিবদ্ধ আছে। আর আছে ওর কনভয়ে ছিল, কিছু যুদ্ধে আহত মানুষ এবং জাহাজটাকে যখন ধরে আনা হয়েছিল, তখন দেখা যায় ক্যাপ্টেন লুকেনার নিহত। তিনি তাঁর কেবিনে মৃত অবস্থায় পড়েছিলেন। ধরা পড়ার আগে আত্মহত্যা করেছিলেন। এটা একরকমের ইতিহাস জাহাজ সম্পর্কে। লুকেনার ধরা পড়ার মুহূর্তে সব নেম প্লেট, এবং কবে কোথায় জাহাজের নির্মাণ হয়েছিল তার সব হদিশ মুছে দিতে আদেশ দিয়েছিলেন। সেই থেকে জাহাজটা নামগোত্রহীনের মতো, তবু যা হোক ব্যাঙ্ক লাইন খুব সস্তায় কিনে জাহাজটাকে ফের সমুদ্রগামী করে তুলেছিল।

    সুতরাং জাহাজিদের মুখে নানা গুজবে শোনা যায় মাঝে মাঝে। যে জন্মায় না, সে মরে না। সিউল ব্যাংকের কোন জন্মসালই নেই, সে আদতে মরবে কিনা, অর্থাৎ তার কোন শেষ আছে কিনা কেউ বলতে পারে না। যদি জাহাজ নিউ-অরলিসে গিয়ে আর না চলে, অর্থাৎ স্ক্র্যাপ করার পাকা অর্ডার পেয়ে যায়—তবে কি যে মজা! ডেবিড তবে ঠিক একমাসের ভেতরই এবির কাছে চলে যেতে পারছে। বোধ হয় ডেবিড এমন একটা স্বপ্ন এতক্ষণ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখছিল। সে বলল, অল রাইট! অল-ও-কে? সে একটা স্বপ্ন দেখছিল তার চোখ মুখ দেখে তা বোঝা যাচ্ছে। স্বপ্নটা স্বপ্নই। তবে জাহাজ স্ক্র্যাপ করার কথা এখন উঠছে না। তবে উঠতে কতক্ষণ! সে স্বপ্নে দেখেছিল জাহাজের সব প্লেট খুলে দেওয়া হয়েছে। একটা কঙ্কালের মতো জাহাজের সব রিবগুলো বন্দরে ঝুলছে। ক্যাপ্টেন হিগিনস মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন জেটিতে; পাশে সে দেখতে পেয়েছিল ছোটবাবুকে। ছোটবাবু পুরো পোশাকে এবং বোধহয় কালো রঙের সুট এবং গোলাপী নেকটাই আর কি সুমহান চেহারা ছোটবাবুর। আর কি যেন স্বপ্নে, হ্যাঁ একজন ব্যালাড সিংগারের মতো মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সাটিনের ফ্রক গায়, ছোটবাবুর পাশে সেও দাঁড়িয়ে আছে। আর একজন, সে কে? কিছুতেই মনে আসছে না। সাদা দাড়ি, সাদা চুল, লম্বা মানুষ, বেশ লম্বা, মাথায় সাদা টুপি এবং কিছুটা তীর্থযাত্রীর মতো দেখতে। ক্যাপ্টেন হিগিনসের পাশে সেও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এতক্ষণে সে ধরতে পারল তিনি এনজিন-সারেঙ। প্রায় গোটা স্বপ্নটাই চোখের ওপর সত্য হয়ে দেখা দিলে ডেবিড উইংসের একপাশে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে গেল। থার্ড অফিসার নেমে যাচ্ছে। অন্ধকার রাতে, জাহাজের এমন একটা নীরবতার ভেতরও বোঝা যাচ্ছে, পাঁচ ছ’মাসেই সবার ভেতর ভীষণ একঘেয়েমি এসে গেছে। থার্ড- মেট নেমে যাচ্ছে, যেন ঘুমে টলতে টলতে নামছে। বড় শ্লথগতিতে সে নামছে। সে কি হাঁটতে হাঁটতে অথবা সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে ঘুমুচ্ছে! সে কি কাপ্তানের ঘরে ঘুমের ঘোরে ঢুকে যাবে। ডেবিডের ইচ্ছে ছুটে গিয়ে থার্ড-মেটকে জাগিয়ে দেয়। কিন্তু তখনই মনে হল, দরজা খোলার শব্দ। থার্ড-মেট কাপ্তানের ঘরে পৌঁছে গেছে। তার আর নিচে নামার দরকার নেই।

    আসলে এটা হয় জাহাজিদের। সফরের সময় যত বাড়তে থাকে তত তিক্ততা বাড়ে। মেজমালোম ডেবিড যা জানত এখন তার উল্টো। সে ভেবেছিল জাহাজ যখন হোমে ফিরবে তখন, কিছুদিন হোমে থাকা, অন্তত ফের এই ভাঙা জাহাজে সফর করতে এক্ষুনি উঠতে হবে না। কিন্তু বুয়েনস্- এয়ার্সে চার্ট করতে গিয়ে বুঝতে পারল, জাহাজের গতি কাপ্তান পাল্টে দিচ্ছে। জাহাজ আপাতত আর হোমে ফিরছে না। কবে ফিরবে কেউ ঠিক বলতে পারবে না। স্বয়ং কাপ্তান নিজেও না। এমন এক কাজ নিয়ে জাহাজ ভেসে পড়বে যে, কেউ আর তখন হোমে ফেরার কথা ভাবতে পারবে না। এসব মনে হলেই মুখে ভয়ঙ্কর বিস্বাদ। আর তখন সারাটাক্ষণ সেই দূরবীণ, পোর্ট অথবা দ্বীপ দেখলেই যা হয়ে থাকে,একটু দেখে ফেলা এবং এসব দেখার ফলেই আজগুবি সব স্বপ্ন, না হলে জাহাজের নিচে কাপ্তান, এবং ছোটবাবু, অথবা ব্যালাড সিংগারের মতো মেয়ে এসব দেখার কি মানে! আর তারপরই যা হয়ে যায়, সে স্বপ্নে পাতলা কুয়াশার ভেতরে কি দেখতে পায়, এবং এভাবে তার রাতের পোষাক নষ্ট হয়ে গেলে মনে হয়, এক্ষুনি সে নিজে বড় একটা হাতুড়ি নিয়ে দমাদম ঘা মারবে জাহাজের বালকেডে। ভাঙ্গা জাহাজ সে একেবারে ভেঙ্গে দেবে।

    আর তখন কাপ্তান লগবুকে নুয়ে কী দেখছেন! কি যে এত দেখেন, থার্ড-মেট বুঝতে পারে না। প্রায় তো ঘুরেফিরে একইরকম রিপোর্ট। যতক্ষণ মাথা তুলে লগ-বুক ওকে ফিরিয়ে না দেবেন ততক্ষণ সে সোজা সরল বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে। এবং প্রায় এক নাগাড়ে বিড় বিড় করে পড়ে যাবার মতো, তিনি প্রতিটি কলামের ওপর অর্থাৎ যা যা আছে যেমন—সঠিক কি কোর্স জাহাজের, জাইরো কমপাসের কি কোর্স, জাহাজের যদি কিছু ভুলভ্রান্তি থাকে তারপর স্ট্যাণ্ডার্ড কমপাসের কি কোর্স এবং কি ডিভিয়েশন, বাতাসের গতিপ্রকৃতি, ওয়েদার এবং তার ভিজিবিলিটি, যদি সমুদ্রে ঝড় থাকে তার সি-হাইট, অবশ্য এখন ঝড় নেই বলে, কলামটা তার কাছে তেমন জরুরী নয়, বরং বাদ দিয়ে যাবার মতো পরের কলামে কি আছে দেখার সময় একবার কি ভেবে চোখ তুলে থার্ড-মেটকে দেখলেন, কিছু বললেন না। তারপর আবার টিক, এই শালা ভাঙ্গা জাহাজে কাপ্তানের নক্কিপক্কি বিরক্তিকর। থার্ড-মেটের ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। অথচ মুখে হাসি হাসি ভাব। কি খুশী দাঁড়িয়ে থাকতে পেরে! কাপ্তানের জন্য সে এভাবে যে কতকাল দাঁড়িয়ে থাকতে পারে!

    তখনই ট্যাংক এবং বিল সাউন্ডিং-এর ঘরে এসে পেনসিলটা কানে গুঁজে ডান পাটা বাঁ পায়ের ওপর রেখে, ঠিক অনেকদিন আগের মতো যেন যৌবনেই আছেন হিগিনস্ এমনভাবে থার্ড-মেটকে দেখলেন। জাহাজের ড্রাফট ভীষণ কমে গেছে। খালি জাহাজ। ডিপ ট্যাংক নাম্বার ওয়ান, টু, থ্রিতে জল নেই বললেই চলে। এবং এভাবে জাহাজ নিয়ে চলা ভীষণ রিস্ক। এক নম্বর হোল্ডে দু নম্বর হোল্ডে জল যতটা থাকা দরকার তার চেয়ে কম। তিন নম্বর চার নম্বরে যতটা থাকা দরকার তার চেয়ে বেশি। এখুনি বড় মিস্ত্রি রিচার্ডের ঘরে রিপোর্ট পাঠিয়ে দিতে হবে জল কোথায় কি আছে! ওরা ওদের লগবুকে একবার দেখে নিক। কোথাও ভুলভ্রান্তি হতে পারে। এতসব খুটিনাটি দেখার পরে তার মনে হল কোর্স মেড গুড। তারপর তিনি নাবালকের মতো পাখি সব করে রব পড়ে যাবার ঢঙে পড়ে গেলেন—টোটেল আওয়ার্স ইউজড রাডার পাঁচ, ডি. এফ. —দুই তারপর দেখলেন ক্লক কতটা পিছিয়ে দেওয়া হল এবং ইফ এনি এংকোর বিয়ারিঙ। এতসব দেখেও শেষ হয় না, জাহাজের পজিসান ল্যাটিচুড লংগিচুড দেখলেন এবং পাশে দেখলেন অবজার্ভিং অফিসারদের সাইন।

    এত কি যে দেখার আছে। থার্ড-মেটের চোখে কি যে ঘুম! সে তবু একেবারে সোজা। কোন কষ্ট হচ্ছে, বুঝতে দিচ্ছে না। জাহাজ ভাঙ্গা বলে কাপ্তান ভীষণ খুঁতখুঁতে স্বভাবের! না কি এই জাহাজই মানুষটার সব। জাহাজের হাল তবিয়ত সব ঠিক না থাকলে মানুষটারও বুঝি কিছু ঠিক থাকে না। তার তখনই বুকে কম্প দিয়ে জ্বর আসার মতো হৃৎপিণ্ডে ওর জ্বর এসে গেল। যা খুব সাহসী মানুষের মতো মনে হয়েছে, এখন তাকে তাই হৃৎপিণ্ডে ঝড় তুলে দিচ্ছে। সিগনালিঙ না করে যেন ভালো করেনি। কাপ্তান আটটা বারোটায় সত্যি ঘুমোন না। আদৌ তিনি ঘুমোন কিনা এ মুহূর্তে বিশ্বাস করতে কষ্ট হল। মানুষটা কবে থেকে যেন এ-জাহাজে জেগেই বসে রয়েছেন। সে এখন কিভাবে যে পালাবে।

    আর তখন তিনি চোখ না তুলেই বললেন, খারাপ লাগছে?

    থার্ড-মেট মাথা চুলকাল।

    তিনি বললেন, এ-কাজে আসা কেন!

    থার্ড-মেট ভীষণ ঘেমে যাচ্ছে।

    –শরীর ভাল নেই?

    থার্ড-মেটের হাঁটুতে কাঁপুনি ধরে যাওয়ার মতো। এবং যেন এক্ষুনি মাস্টার চিৎকার করে উঠবেন, গেট এলংগ দেয়ার ইউ লোফার! কিন্তু তিনি তা না বলে শুধু বললেন, খুব শান্তভাবে, এ সেলর উইল এনডিউর মেনি এ হার্ডসিপ! সিগনেলিঙ সম্পর্কে তিনি একটা কথাও বললেন না, বললেন, ইউ মে গো, তিনি সই করে ছেড়ে দিলেন।

    তারপর তিনি শুতে যাবার আগে একবার নিচে নামেন। ঠিক নিচেই বনি ঘুমোচ্ছে। বনিকে নিয়ে মাঝে মাঝে খুব অসহায় বোধ করেন। এখন হয়তো মেয়েটা পা মুড়ে শুয়ে আছে। হয়তো এমন গরমেও পাখা চালাতে ভুলে গেছে। এবং দরদর করে ঘামছে। নিচে নেমে তাঁর কিছু করার থাকে না। কারণ ভেতরের দিকে দরজা বন্ধ। দরজা না খুললে তিনি কিছু দেখতে পান না। তবু এটা অভ্যাসের মতো, শুতে যাবার আগে একবার নিচে নেমে দেখা। বনি যত বড় হচ্ছে এবং তিনি যত বুঝতে পারছেন বনি এই জাহাজে এখন মেয়ের মতো থাকতে চায়, তত যেন তিনি সতর্ক হয়ে যাচ্ছেন।

    এবং এ ভাবেই হিগিনস আবার সিঁড়ি ধরে ওঠার সময় দেখতে পান, চারপাশে শুধু অন্ধকার, কালো সমুদ্র, কালো আকাশ, গভীর উজ্জ্বল নক্ষত্র, এবং সমুদ্রের ঠাণ্ডা বাতাস এখন মাংকি-আয়ল্যাণ্ডের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। তিনি তখন বুঝতে পারেন শেষ রাতের দিকে সমুদ্রের বাতাস ঠাণ্ডা হতে আরম্ভ করেছে। এবং এখন গিয়ে শুধু শুয়ে পড়া। শোবার আগে একবার নাইট অর্ডার বুকটা চেয়ে নেবেন। সেকেণ্ড-মেটকে বলে দিতে হবে, রাত তিনটেয় একটা বাতিঘর দেখা যেতে পারে, তখন যেন তাকে ডেকে দেওয়া হয়। এসব ভেবে কেবিনের ভেতর যা যা তিনি এই মধ্য যামিনী অন্তে করে থাকেন হাঁটু মুড়ে বসা খৃষ্টের মূর্ত্তির সামনে এবং দেখলেই মনে হবে, মহামহিম ঈশ্বরের কাছে একজন রণক্লান্ত সৈনিকের আত্মনিবেদন—মাথাটা নুয়ে আছে, সাদা চুল মাথায় কদম ফুলের মতো ধবধবে, পাশেই জ্বলছে একটা স্তিমিত আলো, এবং নানারকম সব মোটা বই, কিছু মানচিত্র, যদিও একধারে ওগুলো সরানো, তথাপি মনে হয়’যে যী সাস নিরন্তর এই জাহাজের সীমাহীন নির্ভরতা, কারণ তাঁর মাথার ওপরে তিনি আছেন। এবং নিচে লেখা, ও দাই লর্ড, ইয়োর সি ইজ সো ভাস্ট, এণ্ড মাই বোট ইজ সো স্মল….এবং তখনই মনে হল, একটা চাপা গোংগানি কোথাও থেকে উঠে আসছে। মনে হচ্ছে একদল লোক ছুটে আসছে নিচে, কেউ দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে এবং অন্ধকারে এত রাতে এমন কোলাহল ভাবতেই দরজার সামনে চিৎকার, ঘোস্ট!!

    মিঃ হিগিনস কিছু বুঝতে পারছেন না! একেবারে হতভম্ব।

    বড়-মিস্ত্রি রিচার্ড এখন এলিওয়ের কার্পেটের ওপর সংজ্ঞাহীন। রিচার্ড কথা বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। চোখ গোল গোল, এবং লাল টকটকে। শরীরে কোন পোশাক নেই। আতঙ্কে বোধহয় ওর মাথা ঠিক ছিল না। সে বোধহয় কেবিন থেকে লাফিয়ে একদণ্ড দেরি করেনি। ছুটে আসার সময় বোধহয় চিৎকার করছিল ফলে কারো কারো ঘুম ভেঙ্গে গেছে। ওরা দরজা খুলে দেখছে এলি-ওয়ে ধরে বড়-মিস্ত্রি একপায়ে ছুটছে। উলঙ্গ হয়ে ছুটছে। গরমকাল, গায়ে পোশাক রাখা যায় না। যে-যার কেবিন থেকে দেখছিল। এবং ওদেরও খুব একটা শরীরে পোশাক ছিল না। তাড়াতাড়ি কিছু জড়িয়ে সবাই যখন কাপ্তানের দরজায় হাজির তখন সবাই দেখতে পাচ্ছে, কাপ্তান নিচে নেমে একটা পাতলা চাদরে বড়-মিস্ত্রির শরীর ঢেকে দিচ্ছেন। এবং সবাইকে বলছেন, ওকে ওর কেবিনে রেখে আসতে। ব্যাপার কিছু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।

    আর তখনই বড়-মিস্ত্রি ফের ধড়ফড় করে উঠে বসল। সে শুনেছে মিঃ হিগিনস তাকে তার কেবিনে রেখে আসতে বলেছেন। সে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল, নো, নো…..। সবাই ভাবল যাক জ্ঞান ফিরেছে। সবাই কিছুটা যেন আশ্বস্ত। এখন তবে সত্যি কেবিনে পাঠানো যায় না। কে যেন ছুটে বড়-মিস্ত্রির জন্য একটা হাফপ্যান্ট নিয়ে আসতে গেল। কেউ ওর মুখে মাথায় জলের ঝাপটা দিল। বনি পর্যন্ত চিৎকার চেঁচামেচিতে জেগে গেছে। সেও ভুল করে ফেলেছিল। তাড়াতাড়ি গাউন খুলে লম্বা ঢোলা জামা, আর পাজামা পরে ওপরে উঠে এলে, সে না হেসে পারল না। এমন ধাড়ি মানুষটা একেবারে খোকা! ভূতের ভয়ে কেবিন থেকে পালিয়ে এসেছে, আর এই নিয়ে ঠাট্টা সোরগোল যত এমন সব হচ্ছিল তত রেগে যাচ্ছে বড়-মিস্ত্রি। মেসরুম বয়কে দিয়ে এক কাপ গরম কফি এনে খাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এবং কাপ্তান এখন একটু ঘুমোবেন। জাহাজে বড়-মিস্ত্রির দায়িত্ব তাঁর চেয়ে কম নয়। অথচ এখন ছেলেমানুষের মতো ভয়ে ঘামছে। তিনি কিছুটা বিরক্ত না হয়ে পারছেন না। ঘোস্ট জাহাজে থাকে, এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে এ-বিশ্বাসটা তার যে না হয়েছে তা না। তার জন্য এভাবে উলঙ্গ হয়ে ছোটা এবং চিৎকার চেঁচামেচি করে সবার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেওয়া ঠিক না। সব কিছু জীবনে সহজভাবে মেনে নিতে না জানলে জাহাজে আসা এবং কাজ করা শক্ত। অবশ্য এতটা তিনি রিচার্ডকে বলতে পারেন না, বলতে পারেন শুধু, কি দেখেছো?

    রিচার্ডের মুখ চোখ এখনও কেমন আতঙ্কে ডুবে আছে। সে শুধু বলল, ঘোস্ট! সে আর কিছু বলতে পারছে না। সাদা চোখে চারপাশে কি খুঁজছে!

    —কোথায়? কাপ্তান প্রশ্ন করলেন।

    রিচার্ড কিছু বলছে না আর। ওর টাকমাথা, গোলগাল ফুটবলের মতো চেহারা সত্যি ভারি হাস্যকর! কিছুটা এখন মানুষ না ভেবে, মানুষের ডামি ভাবা ভাল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে থার্ড-মেট। ভেতরের দিকে চিফ-মেট। সেকেণ্ড-এনজিনিয়ার ওর ঘাম মুছিয়ে দিচ্ছে।

    কাপ্তান জোরে পাখা চালিয়ে দিলেন, দরজা ফাঁকা করে দিতে বললেন, এবং বয়বাবুর্চি যারা ভিড় করেছিল, তাদের চলে যেতে বললেন। স্টুয়ার্ডের এখন অনেক কাজ, কখন কি লাগবে, কাপ্তান তাকে যেতে না বললে যেতে পারে না সে। সেও বাইরে বোট-ডেকে পায়চারি করছে। সেকেণ্ড-মেট এসে, ফিস ফিস করে কি বলে গেল বনিকে। বনি এবার হা-হা করে হেসে উঠল। এটা কাপ্তানের নিজেরও ভাল লাগল না, সবাই হয়তো একটু বেয়াড়া ভাবল বনিকে। কাপ্তান বনির দিকে চেয়ে বললেন, তুমি জেগে থাকবে না বনি। নিচে যাও।

    সুতরাং বনি আর থাকতে পারে না, বনি এমনিতে রিচার্ডকে পছন্দ করে না, বন্দরে বনি দেখেছে, খোঁড়া লোকটা ভীষণ ধূর্ত। ধূর্ত না হলে সব বন্দরেই সে মেয়ে পাবে কি করে! কি সব সুন্দর সুন্দর মেয়েরা এই ধূর্ত লোকটার কাছে ধরা দেয়। সে টাকা দিয়ে ওদের পুষে রেখেছে। যেন লোকজন ঠিক করাই আছে, অথবা সে এই গোটা পৃথিবীর অধীশ্বর, যখন যে বন্দরে থাকবে, সেখানেই ভোগের নিমিত্ত উপাচার। উপাচার না হলে এই ধূর্ত মানুষটা আরও শয়তান হয়ে যায়। যত শয়তান হয়ে যায় তত বেশি দাবার ছকে ঝুঁকে থাকে। ভেতরের অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে সে কেমন নিজের প্রতিপক্ষ ভেবে খেলায় মেতে গিয়ে ভুলে থাকে! বনির এমনই মনে হয় খোঁড়া লোকটাকে দেখলে। ওর ইচ্ছে ছিল ক্রাচ দুটো বন্দরে ঢোকার আগে সমুদ্রে সবার অলক্ষ্যে ফেলে দেবে। এবং এভাবে যদি লোকটাকে অন্তত একটা বন্দরে অকর্মণ্য করে রাখা যায়। কিন্তু কি আশ্চর্য সে তার বাবার টেবিলের পাশে, এলি-ওয়েতে এমনকি বোট-ডেকে কোথাও ক্রাচ দেখতে পেল না। সে তাহলে একপায়ের ওপর ভর করে এতটা ওপরে উঠে এসেছে! সে নিজেই কেমন ভেবে ফেলল, রিচার্ড নিজেই একটা ভূত। ভূত না হলে সারাদিন সারামাস সমুদ্রে কারো সঙ্গে একটা কথা না বলে থাকা একেবারে অসম্ভব।

    তারপরই মনে হল, সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি। জাহাজে তবে এই রিচার্ডের চেয়েও বড় ভূত আছে। সে রিচার্ডকে খুব কাবু করে ফেলেছে। বনির খুব ইচ্ছে হল ফের জোরে হাসে। সেকেণ্ড- এনজিনিয়ার কর্তার মুখে আতঙ্ক দেখে কি ভালমানুষ! যেন কিছু জানে না কিছু বোঝে না! বনি দরজা বন্ধ করার সময় বলল, আর্চি তুমি আরও বড় ভূত। সব আমি বুঝি। আমাকে পুরুষ ভেবেই এত, মেয়ে জানতে পারলে না কি করতে!

    সকালবেলা খবরটা জাহাজে ফের রটে গেল। বড়-মিস্ত্রি জাহাজে ভূত দেখেছে। এবং ভূত দেখে বড়-মিস্ত্রি সোজা এক পায়ে লাফিয়ে কাপ্তানের কেবিনের সামনে মূর্ছা গেছে। কাপ্তান এটা ক্রুদের ভিতর রটে যাক চাননি। তিনি বয় বাবুর্চিদের বলতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। স্টুয়ার্ডকে ডেকে বলেছিলেন, এসব ভূত টুত সংক্ৰামধ ব্যাধি। একজন দেখলে সবাই একে একে দেখতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ভূতের ভয়েই জাহাজে বিদ্রোহ দেখা দেবে বিচিত্র কি! তিনি এই সব ভেবে শেষ পর্যন্ত স্টুয়ার্ডকে এমন বলেছিলেন। তাছাড়া রিচার্ড জাহাজে তার পরেই, এমন একজন মানুষের পক্ষে ভূত দেখা ঠিক না, দেখলেও আতঙ্কে হৈ-চৈ বাঁধিয়ে দেওয়া আরও বেঠিক। এবং তিনি নিজেও এ-বয়সে মাঝে মাঝে দেখতে পান এলিস তার পাশ কাটিয়ে কেবিনে ঢুকে যাচ্ছে, এমনকি মনে হয় গাউনের বাতাস শরীরে পর্যন্ত লাগছে! মাঝে মাঝে এলিসের শরীরে সঠিক আতরের গন্ধটা পর্যন্ত পান! কেবল মাঝে মাঝে খুব বেশি ভয় হলে বনিকে ডাকেন, তারপরই বুঝতে পারেন মনের ভুল। তিনি আগের মতো হয়ে যান। বনিকে বলেন, না কিছু না। আর কিনা রিচার্ড একটা আহাম্মকের মতো ভূতের ভয়ে মুর্ছা গেল!

    রিচার্ডের কেবিন পাল্টে দেওয়া হয়েছে। আর বিস্ময়কর ঘটনা, জাহাজে রিচার্ডের পেছনে পেছনে লরেনজো-মরকুইসের ঘাট থেকে উঠে এসেছে তাজা একজন ভূত। অথবা বলা যায় ঘাটে ঘাটে সেই এক মুখ, সে ভেবে পায় না এটা কি করে সম্ভব!

    রিচার্ড বলেছিল কাপ্তানকে, ডারবানে ওকে আমি ফের দেখি। শহরের একপাশে একটা অন্ধকার মতো জায়গায় সেই রেল ব্রীজ পার হয়ে, সেই এক মুখ, ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, ওর জন্য আমি জাহাজে ফিরে আসতে পেরেছিলাম, ও আমার জেব খালি না করে দিলে ঠিক কারো ঘরে চলে যেতাম। এসে দেখি মিলড্রেড আমার কেবিনে। ওকে ধন্যবাদ জানানো দরকার ভেবেছিলাম।

    হিগিনস আর্চি অথবা ডেবিড এমন শুনে প্রথমে ভেবেছিল পকেটমার-টার হবে। বড় বেশি নেশা করে পোর্টে নামলে এমনতো হবেই। কিন্তু পরে যা বলল রিচার্ড, তাতে ওরা বোকা বনে গেল।

    রিচার্ড বলেছিল, ধন্যবাদ জানাতেই দেখলাম অন্ধকারে মিশে গেল ছায়াটা। সঙ্গে সঙ্গে, বিশ্বাস করুন মিঃ হিগিনস ঈশ্বরের দোহাই, আমার কম্প দিয়ে জ্বর এসে গেল। কোথায় লরেনজোমরকুইস, কোথায় ডারবান, সেই লোকটা হুবহু এক রকমের দেখতে, আমি এতটুকু ভুল দেখিনি। মেয়েমানুষের দালালটা আমার পেছনে এভাবে কেন যে লাগল! কাকে আমি বোকার মতো ধন্যবাদ জানাতে গেলাম!

    সবাই চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল। রিচার্ড শুয়ে আছে তখন। ওর পাশে সবাই জেগে। ওর কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে বোঝা যাচ্ছিল। কাপ্তান সবটা না শুনে যেন নড়তে পারছিলেন না।

    —আমি কিন্তু কাউকে কিছু বলিনি। আমার সাহস তো কারো চেয়ে কম নয়, বলেই ফ্যাক ফ্যাক করে কেঁদে দিয়েছিল বড়-মিস্ত্রি। দোহাই আপনার মিঃ হিগিনস জাহাজ থেকে আমি নেমে যাব। আপনি অন্য কাউকে দেখুন।

    কাপ্তানের চোখ কপালে ওঠার দাখিল তখন। তিনি বলেছিলেন, তারপর?

    —তারপর ফের বুয়েনএয়ার্সে। বেশ কিছদিন ভাল ছিলাম। শহরে বেশ ক’দিন যাওয়া-আসা হচ্ছে। আর কিছু দেখছি না। বেশ ভাবলাম, ঘাড় থেকে ভূত নেমে গেছে। কিন্তু হায়, ঐ সেদিন, মানে যেদিন আপনার শহরে বেশ গণ্ডগোল, আইখম্যান পালিয়ে আছে, তাকে ধরার জন্য কারা ফাঁদ পেতেছে এবং গণ্ডগোল, সেদিন তো আপনি জানেন মিঃ হিগিনস্, কি কুয়াশা সারা শহরময়। বন্দরে আমাদের নামতে উঠতে পর্যন্ত অসুবিধা হচ্ছিল, সেদিন সন্ধ্যায় দেখি কুয়াশার ওপর দিয়ে ভেসে ভেসে এল, এসে ঠিক আমার মুখের ওপর ঝুঁকে, আমি কি করি বলুন, একেবারে মুখের ওপর দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। সেই মুখ, নীল পোশাক, কামানো দাড়ি গোঁফ দেখতে ইণ্ডিয়ানদের মতো। হুবহু এক, এক চেহারা। জাহাজে কখনও কোন বড়-মিস্ত্রি দালালদের পয়সা মেরেছে বলে জানি না। আপনি জানেন স্যার? পয়সা মারলে মরার পর শোধ নিতে পারে। আমি তো এক পেনি কাউকে ঠকাইনি! তবে আমার কেন এমন হল। আবার কান্না।

    কাপ্তান বিরক্ত হয়ে বললেন, মনের ভুল রিচার্ড। তুমি মনের ভুলে এ-সব দেখে যাচ্ছ। তারপর কাঁটার মতো ইণ্ডিয়ান কথাটায় খোঁচা খেলেন। তিনি তাকালেন চীফ-মেটের দিকে।—তুমি কিছু বুঝতে পারছ।

    চীফ-মেট বলল, নো স্যার।

    —তুমি? তিনি আর্চির দিকে তাকালেন।

    —নো স্যার।

    —আমাদের জাহাজের কেউ পিছু লাগেনি তো!

    আর্চি হাসল। এত সাহস তারা পাবে কোথায়?

    স্টুয়ার্ড ডাকল, স্যার।

    হিগিনস স্টুয়ার্ডের দিকে তাকালে সে কেমন আমতা আমতা করে বলল, কিছু একটা জাহাজে আছে স্যার। বলেই সে তার অভিজ্ঞতার কথা বলল। কারণ সে, রাতে কখনও কখনও সহসা জেগে যায়। তার মনে হয়, ঠাণ্ডা ঘরের দরজায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সে উঠে দরজা খুলে দেখেছে স্টোর- রুমের দরজা তেমনি লক করা। সে তবু ভেবেছে ভেতরে যদি কিছু হয়ে থাকে! দরজা খুলে আলো জ্বেলে দিতেই ওপরে তেমনি কাপ প্লেট ডিস, নানাবর্ণের ক্রোকারিজ, এবং পাশে সিঁড়ি, নিচে নেমে গেছে। ডানদিকে সব্জির পাহাড়। ফল এবং ডিমের ঝুড়ি থাকে থাকে সাজানো। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, আর সামনে কোল্ড স্টোরেজ, বড় বড় গরু ভেড়া মুরগীর মাংস আস্ত হুকে ঝুলছে। কেউ ভেতরে টেবিল টেনে বসে নেই। বাটলার তখন ভীষণ ঠাণ্ডা মেরে যেত। শাক-সব্জি এবং মরা মাংস মিলে একটা উৎকট গন্ধ থাকত, ভয়ে সে তাও টের পেত না।

    ডেবিডও একবার ঘুরে গেছে, কেমন আছে রিচার্ড দেখার জন্য। সে এসে বলেছিল, কিছু হয়তো আছে জাহাজে। সে বলল, ছোটবাবুও ভূত দেখেছে। এবং তার সমর্থন চারপাশ থেকে। কাপ্তান জানেন, যে কেবিনে, রিচার্ড থাকে, ঠিক সেই কেবিনে, লুকেনার আত্মঘাতী হয়েছিল। যদিও এ-সব তিনি বাজে কথা ভেবে থাকেন, যদিও মাঝে মাঝে আবার মনে হয় হয়তো কোথাও এর সত্যাসত্য আছে, কারণ, তিনি এই সমুদ্র অথবা সৌরজগতের কতটুকু জানেন। তখনই রিচার্ড ফের উঠে বসেছিল, আপনি বিশ্বাস করুন মিঃ হিগিনস, বন্দরে না হয় হল, কিন্তু জলে, বিশ্বাস করুন আমার জন্য একটা ডিম একটা আপেল, অবশ্য ডিম একটা নয়, সে স্টুয়ার্ডের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে একটার বদলে দুটো নেয়, দুটো নিতে পারে না, নেওয়ার নিয়ম নেই, সে সেজন্য একটা ডিমের কথা বলল।

    সে বলেছিল মিঃ হিগিনস আমার সঙ্গে রোজ মেসরুম-বয়ের ঝগড়া হত। সকালে আমি ডিমের অমলেট খাই। নিজেই করে নিই। একটা আপেল খাই, খুব সকালে। তখন কেউ ঘুম থেকে ওঠে না। কিন্তু ক’দিন থেকে দেখি টেবিল থেকে সব উধাও।

    হিগিনস মেসরুম-বয়কে ডেকে সব জেনে নিতে পারতেন। কিন্তু কি হবে! তিনি চুপচাপ শুনে যেতে থাকলেন।

    রিচার্ড বলেছিল ফের, প্রথম মনে হতো অধিক নেশার জন্য আমি ভুল দেখছি। একটা লম্বা কালো হাত, গলে পড়ছে পোর্ট-হোলে। কি কালো! তারপর কেমন শূন্যে ঝুলে থাকত আপেলটা কিছুক্ষণ। চোখের ওপর এমন ঘটলে কতদিন আমি মাথা ঠিক রাখি বলুন!

    রিচার্ড ফের বলেছিল, আজকে আমি কিছু খাইনি। মুখ শুঁকে দেখুন। সে প্রায় উঠে কাপ্তানের মুখের কাছে হা-হা করতে থাকল। কোনো গন্ধ আছে! নেই। তবে। আমি দেখলাম, পোর্টহোলে সেই মুখ, বীভৎস ভয়ঙ্কর। আমি নেমে যাব। আমি আর জাহাজে থাকব না। আপনি আমাকে কিছুতেই রাখতে পারবেন না মিঃ হিগিনস।

    হিগিনসের মনে হয়েছিল অকেদিন থেকে রিচার্ড একটা ভয়ের ভেতর পড়ে গেছে। ভয়ের ভেতর পড়ে গেলেই নানাভাবে মন দুর্বল থাকে। সে তখন কখনও লম্বা হাত, এবং বীভৎস মুখ দেখতে পায়। আপেল অথবা ডিম চুরি যাবার ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। বয়-বাবুর্চিদের স্বভাব খুব ভাল না। বড়-মিস্ত্রি যখন সব সময় মৌজে আছেন, তখন তারাও একটু মৌজে থাকার জন্য ছল চাতুরী খেলতে পারে। তিনি মেসরুম বয়কে ডেকে ধমকে দিয়েছিলেন। তারপর তিনি ঘড়ি দেখে বুঝতে পেরেছিলেন, সকাল হতে দেরি নেই। অন্ধকারে তিনি বোট-ডেকে উঠে গিয়েছিলেন। চারপাশের নিস্তব্ধ অন্ধকারে, আকাশের নক্ষত্রমালার ভেতর কি দেখতে দেখতে ভেবেছিলেন এভাবে এত সব মৃত আত্মা এই জাহাজে কবে থেকে রয়েছে! যেমন এলিস, তাঁর প্রথম পক্ষের স্ত্রী তিনি যেখানেই যান, এলিস তাঁকে ছেড়ে থাকে না। এলিস বোধহয় তাঁকে ছেড়ে থাকতে পারে না।

    সকালবেলাতে এটাও একটা খবর ছিল, কাপ্তান বোট-ডেকে ডেক-চেয়ারে ঘুমিয়ে আছেন। কেউ ডাকতে সাহস পায়নি। বনি এসে তাঁকে ডেকে তুলেছে এবং তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। এমন- ভাবে তিনি কখনও ঘুমোন না। বোধহয় স্বপ্নটপ্ন দেখেছেন, কী স্বপ্নে দেখেছেন মনে করতে পারছেন না। কেবল খুব দূরে যেন এক কুয়াশাজালে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে সব সময়। আর বলছে আমাকে চিনতে পারছ?

    সে আর কেউ না। তার প্রথম পক্ষের স্ত্রী এলিস। কি করুণ আর বিষণ্ণ মুখ। হিগিনস কেমন ধীরে ধীরে তখন হাঁটতে থাকেন। বনি পাশে না থাকলে তিনি যেন চিৎকার করে বলতেন, না, আমি তোমাকে কখনও কোথাও দেখিনি। তুমি আমাকে প্লিজ কষ্ট দেবে না। প্লিজ প্লিজ….!

  • আঠার

    আঠার

    ।। আঠার।।
    অমিয় চুপচাপ বাংকে শুয়ে আছে। খুব হৈ-চৈ চলছে ডেকে এবং সবাই বড়-মিস্ত্রির ভূত দেখার ব্যাপারে নানারকম মন্তব্য করছে। তখনও নির্বিকার অমিয়। সে শুয়ে শুয়ে কোত্থেকে একটা প্যান- আমেরিকান গাইড-বুক পেয়েছে তাই পড়ছে। পৃথিবীর কোন বন্দরে, অথবা কোন শহরে ভাল খাবার, ভাল দৃশ্যাবলী আছে, এখন এটা জানা যেন তার বেশি জরুরী। ছোটবাবু নিচে বসে রয়েছে, সেও বের হয়নি। মৈত্র মুখ গোমড়া করে রেখেছে। যেন এখুনি অমিয়র ওপর ফেটে পড়বে।

    মৈত্র নিচে বসে রয়েছে বলে অমিয়র মুখ দেখতে পাচ্ছে না। সকাল সাতটায় সবার চা চপাটি খেয়ে পরীর জন্য ঠিকঠাক থাকার কথা, তখন অমিয় বই পড়ছে মনোযোগ দিয়ে। এবং ছুটির দিনের মতো অমিয় কখন উঠবে, কখন চা চপাটি খাবে ওরা যেন ঠিক বলতে পারে না। এই যে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল, যে কোন সময় অমিয় ধরা পড়তে পারে, তার জন্য তার যেন কিছু আসে যায় না। মৈত্র এতে আরো ক্ষেপে যাচ্ছে। এখন তো ওর উচিত বসে কিছু একটা পরামর্শ করা। দুটো ডিম, একটা আপেল যদি অমিয় একা খেত, ওরা যদি সমান ভাগে ভাগ করে না খেত, তবে মৈত্রের কিছু আসত না। অমিয় একা হ্যাপা সামলাতো। এখন যে চুরির দায়ে ওরাও ধরা পড়েছে। আর কি সাহস পোর্ট-হোল দিয়ে হাত বাড়িয়ে বড়-মিস্ত্রির টেবিল থেকে ডিম আপেল চুরি করে আনা- না ভাবা যায় না। রাগও হচ্ছে আবার কোথায় যেন একটা মায়াও গড়ে উঠছে। অমিয়র সাহস আছে।

    কিন্তু তারপরই যখন মৈত্রের মনে হয়, সেও আছে সঙ্গে, ধরা পড়লে ছোটবাবুও রেহাই পাবে না তখনই চিৎকার করে চুল ধরে টেনে নামাতে ইচ্ছে হয়। নামিয়ে দু লাথি, এবং চড়-থাপ্পড়। অথচ সে জানে, কোন গণ্ডগোলই করা যাবে না। চুপচাপ এখন হজম করে যাওয়া বাদে তাদের উপায় নেই। ব্যাপারটা কত দূরে গড়াবে কেউ বলতে পারে না। শুধু লক্ষ্য করে যাওয়া। অমিয়কে কতবার বলেছে, কিভাবে ম্যানেজ করছিস অমিয়, সে কিছু বলত না। কেবল বলত, খা শালা। হারামে পেয়েছিস খেয়ে নে।

    জাহাজে বাসী গোস্ত আর ডাল, বাসী বাঁধাকপি ভাজা এবং খেতে খেতে মুখে এমন অরুচি যে এই দুটো ডিম এবং আপেল মধ্যরাত্রিতে ওদের কাছে ভীষণ লোভের। ছোটবাবু মাঝে মাঝে পরিজ অথবা কেক নিয়ে আসে, মৈত্র জানে, জ্যাক ছোটবাবুকে খুব পছন্দ করে। ওদের ভাল কিছু হলে জ্যাক ছোটবাবুর জন্য রেখে দেয়। কখনও কমলা, কলা আবার ফ্রাইড এগ যখন সে আনতে পারে, সবাই বসে ভাগ করে খায়। ডেকে যে দুজন আছে অর্থাৎ বন্ধু আর অনিমেষ মজুমদার ওরাও তখন বাদ যায় না। মনু অথবা মান্নানকে একদিন ডেকেছিল খেতে, ওরা খায়নি। সাহেবদের গ্যালিতে শুয়োর রান্না হয় বলে, কিছুই ওরা খেতে চায় না। যত ভাল খাবার হোক ওরা খাবে না। সুতরাং জ্যাক আলাদা করে ভাল কিছু দিলে এক সঙ্গে পাঁচজন, এবং তখন অনিমেষ গ্যালিতে নেচে টব বাজাবে, দু-এক দানা খাবে, আর জাহাজ এবং জাহাজিদের জীবন সম্পর্কে ইতর রসিকতা। এভাবেই যখন দিন যাচ্ছিল, তখন অমিয়টা ওদের কি যে ফ্যাসাদে ফেলে দিল।

    অমিয় এখনো উঠছে না। মৈত্র নিচে বসে রয়েছে। অমিয় ওপরের বাঙ্কে, রেলিঙে কম্বল বিছানো, কেবল অমিয়র দুটো হাত, এবং বইটা দেখা যাচ্ছে। ডান পাটা সে বাঁ পায়ের ওপর রেখে নাচাচ্ছে সেটা সে দেখতে পাচ্ছে। যত অমিয় পা নাচাচ্ছিল, তত মৈত্রের রক্ত টগবগ করে ফুটছিল। হারামজাদা কি বুঝতে পারছে না, তারা কতটা বিপাকে পড়ে গেছে। অমিয় কি ওদের বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে মজা দেখছে। সে আর তখন কি করে। সে ডাকল, অমিয়।

    ছোটবাবুর মুখ দেখলেই বোঝা যায় সে খুব উদ্বিগ্ন। এবং যা খবর তাতে বোঝাই যায় সব এই অমিয় করেছে। বড়-মিস্ত্রিকে উলঙ্গ করে ছেড়েছে।

    কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে যেন একান্ত সোহাগে ডাকা—অমিয় তোকে ডাকছি আমি।

    —আমাকে দাদা তুমি ডাকছ! বলে একেবারে সুবোধ বালকের মতো নেমে পড়ল।—বল।

    —এখন কি হবে!

    —কিছু হবে না।

    —ওরা কি বুঝতে পারবে না বলছিস?

    —বুঝতে পারলে কি হল!

    —মাসতার দিতে বলবে। দ্যাখো এদের কেউ তোমার ডিম, আপেল চুরি করেছে কিনা!

    —তা দিলে কি করা! বলেই সে আবার কিসব দৃশ্যাবলী দেখা যেন তার বাকি। সে এসব না দেখে ফালতু কথাবার্তা শুনতে রাজী না, সে ফের মনোযোগের সঙ্গে পাতা ওল্টাতে থাকলে মৈত্র আর ধৈর্য ধরতে পারল না। চিৎকার করে উঠল, রাসকেল তোমার জন্য আমরা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ি! সে উঠে গিয়ে হয়ত একটা ঘুঁসিই মেরে দিত। ছোটবাবু একটা কথাও এতক্ষণ বলেনি, এবার সে বলল, কি হচ্ছে মৈত্রদা! পাগলের মতো কি করতে যাচ্ছ!

    মৈত্রের সত্যি খেয়াল হল, এটা করা ঠিক না। যা অমিয়র গোঁয়ার্তুমি, সে হয়তো মারামারি লাগিয়ে দেবে। এবং চিৎকার চেঁচামেচিতে সবাই ছুটে এলে, কিছু একটা বলতে হবে। সব কথা বলে দিতে পারে অমিয়। ও কেমন মরিয়া। জাহাজে ওঠার পরই মৈত্র এটা লক্ষ্য করেছে। কেবল কি ভাবে, আর বড় বড় কথা। এবং স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে অমিয়। সে যে জাহাজে খালাসির কাজ নিয়ে এসেছে এটা একটা অজুহাত মাত্র। অমিয় জীবনে বড় কিছু করতে চায়। এমন একটা কিছু করে দেশে ফিরবে, যা দেখে ওর বাবা এবং ভাইয়েরা ভেবে ফেলবে, বাড়ির জাহান্নামে যাওয়া ছেলেটা রাজপুত্র হয়ে ফিরেছে।

    সুতরাং মৈত্র বাড়াবাড়ি কিছু করল না। চুপচাপ আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল।

    অমিয় বলল, কি দাদা চা ফা খাবে না। খিদে পায় না?

    মৈত্র কোন কথা বলল না। ছোটবাবু বলল, চাবি দাও।

    মৈত্র চাবি ছুঁড়ে ফেলে দিল।

    অমিয় সুড়সুড় করে উঠে গেল। লকার খুলে চা চিনি কনডেনস্ড মিল্ক বের করে সোজা ওপরে উঠে যেতে থাকলে, মৈত্র বলল, চা আমি খাব না।

    অমিয় সিঁড়ির মুখে থামল। সামান্য হাসল। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, কি আমার জাহাজিরে! ভয়ে টেসে গেছে! বড় বড় কথা যত!

    আসলে মৈত্র নৌ-বিদ্রোহের সময় কি কি করেছিল, এবং কি কি কারণে সে দুবার জাহাজে ব্ল্যাক- লিস্টেড হয়েছিল তার ফিরিস্তি দেবার সময় দেখাতে চায় সে কতবড় জাহাজি, আর এখন!

    চা, অমিয় তিনটে মগে আলাদা আলাদা করে এনেছে। মৈত্রের জন্য একটা বেশি চপাটি। মৈত্র চপাটি বেশি খেতে ভালবাসে। এখন তাকে যে করেই হোক মৈত্রের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। সে এসেই পায়ের কাছে বসল, এবং কিছুটা নিবেদনের ভঙ্গীতে চা-এর মগ আর চপাটি তুলে দিল হাতের কাছে।

    —খাব না বললাম!

    —খাও গুরু। তুমি শালা গুরু রাগ করলে আমাদের কি হবে! আর এমন করব না। এই দ্যাখো কানমলা নাকমলা খাচ্ছি। আচ্ছা তবু রাগ যাচ্ছে না, সে মৈত্রের পা টেনে একটা কল্পিত রেখা টেনে বলল, এই দ্যাখো নাকে খত দিচ্ছি, আর কি চাই বল!

    মৈত্র আর কি করে! তবু বুকটা ধুক্‌ধুক্ করতে থাকে, সিঁড়িতে কোনও পায়ের শব্দ দ্রুত নেমে এলে মনে হয়, এই বুঝি ফোকসালে ঢুকে সারেঙ বলবে, তোমরা বাপুরা বোট-ডেকে যাও। মাসতার দিতে হবে। অথবা ওপরে কেউ চিৎকার করে কথা বললেই বুকটা ধড়াস করে উঠছে। কেউ বুঝি এতক্ষণে টের পেয়ে গেছে, ডিম এবং আপেল, বড়-টিণ্ডালের ফোকসালে মাঝে মাঝে দেখা গেছে—সব কিছুর দায় বড়-টিণ্ডালের। আমাদের সারেঙ ঝুটঝামেলায় টানবেন না। এসব ভেবে মৈত্র খুব মুষড়ে পড়েছিল আর কিনা অমিয় এখন ঠাট্টা তামাসা করছে। তবু কেন যে মৈত্র অমিয়র ওপর রাগ করে থাকতে পারে না। ছোটবাবুও চা হাতে নিয়ে বসে রয়েছে, সে না খেলে কেউ খাচ্ছে না, তখন মৈত্র মাথা নিচু করে চা চপাটি খেতে থাকলে, অমিয় বলল, কেবল তুমি আমার দোষই দেখছ!

    ছোটবাবু বলল, এখন আর কথা না। যা বলার বাংকারে গিয়ে বলবি। জামাপ্যান্ট পাল্টে ওরা ওদের ওয়াচের পোশাকে তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে গেল। সোজা বোট-ডেকে উঠে, আবার ফানেলের গুঁড়ি ধরে নিচে নেমে গেল। পেছনে ছোট। ছোটকে দেখেই জ্যাক দৌড়ে এসেছিল। রাতের এমন মজার ঘটনা, ছোটবাবুকে গোপনে বলতে না পারলে যেন ওর খাবার হজম হচ্ছে না। এতক্ষণ বোধহয় চিপিং হাতে কখন ছোটবাবু ওয়াচে নামবে তার জন্য অপেক্ষা করছিল জ্যাক। আর জ্যাকের যে কি করে ধারণা জন্মেছে, যত গোপন খবর, সব একমাত্র ছোটবাবুকে সে দিতে পারে। ছোটবাবু তার কোন ক্ষতি করতে পারে না।

    যদিও জাহাজে এ-খবর গোপন থাক কাপ্তান চেয়েছিলেন, কিন্তু পৃথিবীতে কেন যে কোন খবরই নানা কারণে শেষপর্যন্ত গোপন থাকে না। স্টুয়ার্ড প্রথমে বলেছিল চিফ-কুককে, আর কাউকে কিন্তু বলবে না, বড় সাব উলঙ্গ হয়ে ভূতের ভয়ে ছুটেছে এটা ক্রুদের ভিতর জানাজানি হোক তিনি চান না। সাহেব মানুষ ভূতের ভয়ে উলঙ্গ হয়ে ছুটবে, ছিঃ কি যে প্রেস্টিজের ব্যাপার—এই প্রেস্টিজ কথাটা শেষ পর্যন্ত সবার কানে উঠে গেছে। সেকেণ্ড-কুক ধর্মভীরু মানুষ গোয়ানিজ, অল্প অল্প বাংলা জানে, সে সত্যিকথা গোপন রাখতে পারে না, এবং খবরটা যেহেতু ভারি মজার, সকাল হতে না হতেই সমস্ত ফোকসালে গুজবের মতো ছড়িয়ে পড়ল। ওরা ঘুম থেকে উঠেই তারপর শুনছিল, জাহাজে ভীষণ কাণ্ড, আবার ভূত। ছোটবাবু, আর বড় সাব দুজনেই তবে ভূত দেখেছে। ছোটকে কেউ কেউ প্রশ্ন করেছিল, তোর ভূত দেখতে কেমন।

    সে বলেছিল, কি জানি মনে নেই। একটা লম্বা ছায়ার মতো দেখেছিলাম। কেমন ভয় পেয়ে গেলাম। আসলে মহসীন চাচা এজন্য দায়ী। এমন সব ভূতের গল্প জাহাজের করেছেন যে গভীর রাতে অন্ধকারে জাহাজের কোন গলিঘুঁজিতে দাঁড়ালেই মনে হয়, এই বুঝি একটা লম্বা হাত এগিয়ে আসছে। গা কেমন ছমছম করতে থাকে। আসলে বুঝতে পারি, কিছু না। মনের ভুল সব। কিন্তু অন্ধকার রাতে কিছুতেই সেটা বিশ্বাস করতে পারি না।

    এবং দিনের বেলায় ছোটবাবু সব বুঝতে পারে। রাতের বেলা কত সব আলো চারপাশে। মাস্তুলে, ডেরিকে, সর্বত্র এ-ভাবে আলোর মালা দুলে দুলে জাহাজের সব ছায়া কখনও ছোট কখনও বড় করে দেয়। এবং নিজের ছায়াই সে কতবার দেখেছে, কখনও লম্বা হয়ে যায়, খাটো হয়ে যায়। কে কোথা দিয়ে হেঁটে বেড়ালে তার ছায়া নিচে সহজেই এসে পড়তে পারে, এবং অস্বাভাবিক কিছু ভেবে, ভূত ভূত বলে চিৎকার করে ওঠা অসম্ভবের কিছু না। জ্যাক তখন নামতে নামতে অজস্র কথা বলছে। ছোট আগে, জ্যাক পেছনে, সিঁড়ি ভেঙ্গে নামছে। জ্যাক সব ঘটনা কানে কানে বলছে, আর বলেই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে। কি যে উচ্ছ্বল! আর সহসা সে কেন যে বলে ফেলল, আর্চি আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে, আমার ভয় করে ছোট।

    ছোটবাবুর এ সব শোনার সময় নেই। সে জ্যাককে নিয়ে বাংকারে ঢুকে যেতে পারলে বাঁচে। জ্যাক আসল খবর দিতে পারবে। কাপ্তান এ ব্যাপারে কিছু ভাবছেন কিনা, অর্থাৎ কোনও ইনভেস্টিগেশনে যাবেন কিনা, যদি যান তবে সেটা কখন, অথবা সে কি গোটা ব্যাপারটা জ্যাককে বলবে, জ্যাক এ- ব্যাপারে যদি ওদের সহায় হয়, এভাবে নানা ভাবনা তাকে পেয়ে বসলে দেখল, অমিয়কে নিয়ে মৈত্র নিচে নেমে গেছে। ওরও নামার দরকার। অন্য সব আগওয়ালারা এসে গেছে। সে ইচ্ছে করলে এখন নাও নামতে পারে। বাংকারে ঢুকে কথাবার্তা বলতে পারে জ্যাকের সঙ্গে। সে গাড়ি গাড়ি কয়লা ফেলবে, জ্যাক পাশে দাঁড়িয়ে কত অজস্র কথা বলবে তখন, আসলে সে আজ চায় শুধু একটা কথা জানতে, তারপর কাপ্তান কি করছেন?

    সে বলল, জ্যাক, বড়সাব আসলে সত্যি ভূত দেখেছেন তো!

    —কি যে বল না! সারাক্ষণ…বলেই মুখের কাছে দুহাতে এমন অঙ্গভঙ্গী করল যে, বেহুঁস, মাতাল, কি দেখতে কি দেখে থাকে, বাবার খেয়েদেয়ে কাজ নেই, ঐ নিয়ে পড়ে থাকবে। পাজি নচ্ছার মেস- রুম-বয়ের কাজ সব। বাবা নাকি খুব ধমকে দিয়েছেন, এসব ডিম-আপেল যেন আর কেউ চুরি না করে। আবার হলে কেলেঙ্কারি হবে।

    কিছুটা ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো যেন সে এখন অজস্র কথা বলে যেতে পারে, জ্যাক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে ভালোবাসে। কখনও একটা বড় কয়লার চাঙের ওপর বসে কথা বলতে ভালোবাসে। আজ কথায় কথায় বার বার আর্চির কথা বলছে। আর্চিকে কি করে একটা বড় রকমের শিক্ষা দেওয়া যায়, সে তো এসব তার বাবাকে বলতে পারে না, বলতে গেলেই কাপ্তান ওর দিকে সংশয়ের দৃষ্টিতে তাকাবেন। তাহলে মেজ-মিস্ত্রি আর্চি কি টের পেয়েছে, বেঁটে-খাটো চৌকো মুখের লোকটা, কি টের পেয়েছে, জ্যাক আসলে মেয়ে। বনি, জ্যাক সেজে এ-জাহাজে ডঠে এসেছে। সুতরাং যা কিছু গোপন শলাপরামর্শ সে ছোটবাবুর সঙ্গে করতে পারে।

    ছোটবাবু বলল, হাঁ করে দেখছে তো কি হয়েছে!

    —না, এটা ভাল না ছোটবাব্!

    —কেন ভাল না।

    —সে তুমি বুঝবে না।

    সত্যি ছোটবাবু এসব বুঝবে কি করে! সাহেবদের ব্যাপার-স্যাপার আলাদা। সে এই প্রথম এদের ‘ দেখছে। মফস্বল শহরে সে একজন সাহেবকে দেখেছিল, তিনি পাদ্রী, গীর্জায় থাকেন। কলকাতা শহরে এসে সে দূর থেকে এদের চৌরঙ্গীপাড়ায় দেখেছে। কিন্তু এভাবে দৈনন্দিন জীবনে, কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে দেখা এই প্রথম। ওদের সব কিছুই সে সেজন্য ভীষণ সমীহ চোখে দেখে থাকে। সে বলল, তুমি খুব সুন্দর জ্যাক। তোমাকে সবাই দেখতে ভালবাসে।

    —তুমি ভালোবাসো না!

    সে বলল, হ্যাঁ। তোমাকে দেখতে আমার ভীষণ ভাল লাগে।

    —সত্যি!

    –সত্যি।

    জ্যাকের চোখ যে চকচক করছে ছোট টের পেল না। বাংকারে অন্ধকার। কয়লার ধূলো উড়ছে। এভাবে জ্যাকের এখানে বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক না। তাছাড়া এখন মৈত্রদা এবং অমিয় আসবে। জ্যাক থাকলে, খোলাখুলি কথা বলতে পারবে না। সে বলল, জ্যাক খুব ধুলো উড়ছে। তুমি যাও। আমি এখন কয়লা ফেলব। অনেক কাজ।

    যদিও ছোটবাবু জানে, জ্যাকের মর্জি হলে যাবে, মর্জি না হলে যাবে না। আবার এও দেখেছে, সেই দুর্ঘটনার পর থেকে জ্যাক আর ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে না। বরং জ্যাক আজকাল অতীব সুবোধ বালক যেন। ছোটবাবু যা পছন্দ করে না, জ্যাক তেমন কিছু করে না। জ্যাক এখন এ-বাংকারে থাকুক ছোটবাবু যখন চাইছে না, তখন জ্যাক কেমন মুখ ভার করে ওপরে উঠে যাবে ভাবল। দরজার মুখে এসে আবার ফিরে গেল। বলল, এই

    –কী! ছোটবাবু বেলচার ওপর ভর করে দাঁড়াল।

    —তোমার লিটল ডার্লিং তোমাকে চিঠি দেয় না?

    —না।

    —কেন?

    —সে অনেক কথা।

    —আমাকে বলবে না?

    —বলব না কেন?

    –কবে বলবে?

    —যে কোনো দিন।

    —তোমার লিট্ল ডার্লিংকে আমার ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করে।

    —দেখাব। আমার কাছে ওর ছবি আছে।

    —তোমার কাছে ওর ছবি আছে।

    —আছে।

    জ্যাকের ভেতরটা গুড় গুড় করছে। ছোটবাবুর লিট্ল ডার্লিং দেখতে কেমন, নিশ্চয়ই বিশ্রী হবে। ওর মতো সুন্দরী হবে না, হে ঈশ্বর, সে যেন আমার চেয়ে দেখতে খারাপ হয়। ওর আরও কাতর প্রার্থনা, পৃথিবীতে ছোটবাবুর লিট্ল ডার্লিং না থাকলে কি হত! জ্যাক ইচ্ছে করলে ছোটবাবুকে ফোকসালে পাঠিয়ে এখনই সেই ছবি দেখতে পারত, কিন্তু সে কথাবার্তা বলে বুঝেছে, ছোটবাবু ভীষণ ব্যস্ত। তবু কেন যে ওর যেতে ইচ্ছে করছে না। সে বলল, এই।

    –কী! আবার দাঁড়াল ছোটবাবু। সে কয়লার গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল। জ্যাক যাচ্ছে না। আবার কি বলবে। গাড়ি রেখে সে পাশে এসে দাঁড়াল। জ্যাক দেখছে, ছোটবাবুর চোখ লাল, কয়লার ধূলো পড়লে চোখ লাল হয়ে যায়, এবং চোখের ভিতর কালো মণি দুটোতে তার কোন প্রতিবিম্ব পড়ছে না। একেবারে নিস্পৃহ চোখ। এবং তখন ইচ্ছে করে জ্যাকের, ছোটবাবুর বুকের জামা রাগে দুঃখে ফালা ফালা করে দেয়। এমন নিস্পৃহ চোখ দেখলে, জ্যাকের মনে হয়, ছোটবাবু ভাল না। ছোটবাবু আর দশজনের মতো তার কাছে।

    এবং এভাবে জ্যাক বাংকারে এলে আর সহজে যেতে চায় না। কেবল কথা বলতে ভালবাসে। কত রকমের কথা, মাঝে মাঝে ছোটবাবু না বলে পারে না, জ্যাক তুমি ওপরে যাও। কাপ্তান দেখতে পেলে রাগ করবেন। জ্যাক তার কথায় কর্ণপাত করে না। সে তার মতো অনর্গল কথা বলে যায়, এবং বাড়িটা ওদের কোথায়, আর কি গাছ আছে, কতসব গাছ, এই যেমন ইউকন গাছের কথা প্রায়ই জ্যাক বলে থাকে। কত লম্বা, আর কত বড় এবং কি গভীর নীলবর্ণের পাতা, তুষারপাতের সময় কখনও কখনও পাইনের জঙ্গল মনে হয় বাড়িতে গজিয়ে গেছে। নীলবর্ণের পাতার ওপর সাদা তুষারদানা, এবং তুলোর মতো পেঁজা পেঁজা ভাব গাছপালার চারপাশে, অথবা রিনরিন করে যখন তুষারপাতের শব্দ হয় জানালার কাঁচে, এবং যখন, নির্মল আকাশ থাকে ওদের বাড়ির মাথায়, দূরে লাইট-হাউসের আলো, সমুদ্রে নানা বর্ণের জাহাজ এবং সি-গালদের কোলাহল সমস্ত বন্দর জুড়ে তখন যদি কোন জ্যোৎস্না রাতে ছোটবাবু তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত, তবে পৃথিবীর কোথাও বুঝি কোনও কষ্ট থাকত না। কেবলমাত্র ছোটবাবুর লিটল ডার্লিং তার সবকিছু কেমন বিষণ্ণ এবং দুঃখময় করে দিচ্ছে।

    তাছাড়া সে তো আর পারে না—সেইদিন থেকে সে ছোটবাবুর কাছে কেমন ছোট হয়ে গেছে। ছোটবাবুর কাছে সে খুব নিষ্ঠুর, অন্ততঃ সে আর একবার প্রমাণ করে দিতে চায় ছোট, আমি মেয়ে, তুমি বিশ্বাস কর আমি মেয়ে। আমাকে বাবা বনি বলে ডাকে। রাতে আমি সুন্দর পোশাকে শুয়ে থাকি। আমার মাথার ওপরে থাকে অল্প সবুজ আলোর ডুম। সিল্কের চাদরে আমার শরীর ঢাকা থাকে। তখন যদি তুমি আমাকে দেখতে ছোট, আমার ওপর তোমার কিছুতেই রাগ থাকত না।

    ছোট কখনও কখনও দেখত, জ্যাক নিরিবিলি চুপচাপ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলছে না। কেবল দেখে যাচ্ছে ছোটবাবুর কাজ। এবং ছোটবাবুর তখনই খারাপ লাগে, ওর সঙ্গে ওর মতো কথা বলার জাহাজে কেউ নেই। সে তখন আবার কাছে এসে বলে, জ্যাক, আমার লিট্ল ডার্লিংকে দেখলে তুমিও ভালবেসে ফেলবে। আমি যেখানে যাই, ওর ছবি আমার সঙ্গে থাকে।

    জ্যাক তখন বলত, আমি যাই ছোট।

    ছোটবাবু এভাবে বুঝতে পারত না, জ্যাক তখন আর দাঁড়াত না কেন, সোজা চলে যেত। দুদিন তিনদিন কোন কথা বলত না। ছোট তখন আবার ভয় পেতে শুরু করত জ্যাককে। জ্যাক কথা না বললে, জ্যাক ইচ্ছে করে বাংকারে নেমে না এলে, কখনও জ্যাকের সঙ্গে তার কথাবার্তা হত না। এবং এমনকি সে দেখেছে তখন কথাবার্তা হলেও, জ্যাক তার সেই ছোট্ট ছবির কথা একবারও বলত না। জ্যাক এমন ভাবে কথা বলত, যেন কখনও সে লিট্ল ডার্লিং-এর নামই শোনে নি। ছোটবাবু ও তখন একেবারে সব ভুলে অন্য কথা, জাহাজ নিউ-অরলিনসে যাচ্ছে, মিসিসিপি নদীর ভেতরে জাহাজ ঢুকে যাবে কি মজা! এবং আলাদা রোমাঞ্চ, সে ভূগোল বইয়ে পড়েছে, মিসিসিপি পৃথিবীর দ্বিতীয় বড় নদী। মিসোরি ধরলে, এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নদী। আর মিসিসিপি সম্পর্কে ওরা সবাই এখন থেকেই দুটো একটা কিংবদন্তী শুনতে শুরু করেছে, জাহাজ যত এগুবে, মিসিসিপি সম্পর্কে সবাই তত কৌতূহলী হয়ে উঠবে। নদীর মোহনাতে জাহাজ ঢুকলেই বোঝা যাবে এসে গেছে, মিসিসিপি এসে গেছে! তখন সমুদ্রের জল আর নীল থাকবে না। একেবারে হলুদ রঙ, অথবা গৈরিক রঙ বলা চলে। ঘোলা জল, যেদিকে তখন তাকানো যায়, কেবল অজস্র পাখি, দলে দলে ওরা আকাশের ওপর হাজার হাজার, তারও বেশি, কত যে পাখি—সি-গাল, মিউল হগস্‌, সি-পিজিয়নস এবং এ্যালবাট্রসও আছে মাঝে মাঝে কেবল অনবরত ঘুরে ঘুরে মোহনার ওপর যেন চক্রকারে সেই কবে থেকে ওরা উড়ছে। এবং নতুন জাহাজ দেখলেই ঘুরে ঘুরে ওড়া, অথবা নদী তার মোহনায় কত সব খাবার ভাসিয়ে নিয়ে আসছে তাদের জন্য। আর নিচে বোধহয় অজস্র মাছ, যেন এক বিস্তীর্ণ জলাশয়ে পাখি মাছ মানুষ মিলে এক আশ্চর্য মিউজিক তৈরী করে ফেলে! মাছেরা নিচে সব ছোট ছোট দ্বীপের চারপাশে সাদা পাখনা মেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ওপরে পাখিরা নীল নির্জনতার ভেতর, আর তার ভিতর এক সাদা জাহাজ যাচ্ছে, সাদা পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক, পাশে নীল রঙের পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে ছোটবাবু। এভাবে একদিন সত্যি ওরা নদীর মোহনায় দূরের ছায়া ছায়া মেঘের মতো ভেসে থাকা কিনারার ছবি দেখতে দেখতে মুগ্ধ হয়ে গেল।

    ছোটবাবু বলল, জ্যাক আমরা কাল বন্দর পাচ্ছি?

    জ্যাক বলল, হ্যাঁ।

    —আমরা ক’দিন থাকব?

    জ্যাক বলল, জানি না।

    —মাস্টার তোমাকে কিছু বলেন নি?

    —না।

    —তুমি বেড়াতে যাবে না?

    —কোথায়?

    —কিনারায়।

    —জ্যাক বলল, বাবার সঙ্গে আমার কিনারায় যেতে ভাল লাগে না ছোট।

    ছোট বুঝতে পারে, জ্যাকের দুঃখটা কোথায়। কাপ্তান বুড়ো মানুষ, বন্ধু-বান্ধব অথবা এজেন্ট অফিসের যারাই আসেন সবাই যেন প্রায় তার বাবার সমবয়সী, ওরা ওর বাবার সঙ্গেই বেশি কথা বলতে ভালবাসে! সে চুপচাপ তার বাবার পাশে বসে থাকে মাত্র। হয়তো তখন রাস্তায় শীতের বিকেলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা হৈ-চৈ করছে, কোনও বড় মাঠে, দেবদারু গাছের মতো দাঁড়িয়ে আছে অজস্র পাইন, অজস্র পাইনের জঙ্গল ভেদ করে একটা সরু রাস্তা অনেক দূরে সীমাহীন গভীরতায় ঢুকে গেছে, তখন সেই গাড়ি তার ড্রাইভার অথবা রিনরিন বাজনার মতো সেইসব পাহাড়ি রাস্তায় বোধহয় জ্যাকের ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগে। অথবা কোনও বড় কার্নিভালে হৈ-চৈ করা, মুখোশ মুখে লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো ভারি মজার—জ্যাক এসবই পছন্দ করে কিন্তু বুড়ো কাপ্তানের সঙ্গে গেলে জ্যাক বোধহয় সেসব পায় না। কেবল সব ভারি ভারি কথা। মজার কথা কেউ তার সঙ্গে বলে না। জ্যাকের তো ভীষণ একঘেয়ে লাগারই কথা তখন।

    সে বলল, জ্যাক, তুমি তবে আমাদের সঙ্গে যাবে?

    —কোথায়?

    —তুমি আমি আর ডেবিড একসঙ্গে বের হবো। বেশ মজা হবে।

    —কোথায় যাব আমরা?

    —ডেবিড আমাদের যেখানে নিয়ে যাবে।

    —সে কোথায় যাবে ছোট?

    —তা তো জানি না। বলেছে, নিউ-অরলিনসে আমরা বেশ ক’দিন থাকব। ইচ্ছে করলে নাকি আমরা গাড়িতে বেটন-রুজ পর্যন্ত ঘুরে আসতে পারি।

    —বাবাকে বলব।

    তখনই মিঃ স্প্যারো বয়-কেবিনের মাথায় বসে ওদের দেখছে। আর মিসেস স্প্যারো বেশ হাওয়ায় দুলে দুলে উড়ছে। কোথা থেকে তখন উড়ে আসছে বড় একটা সি-গাল। সঙ্গে সঙ্গে পাখিদুটো ভয় পেয়ে একেবারে জালির ভেতর দিয়ে উড়ে গেল। এবং সাঁ-সাঁ করে বের হয়ে যাচ্ছে বড় সি-গালটা। জ্যাক পাখিটাকে তাড়িয়ে দেবার জন্য হাতে একটা ভাঙা লোহার টুকরো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। বোধহয় জ্যাক অথবা ছোটবাবুর মারমুখো চেহারায় ভয় পেয়েছে পাখিটা। ওটা আর উড়ে এল না। এবং ছোটবাবু বুঝতে পারল, এই মোহনায় পাখি দুটো নিরাপদ নয়। ওরা এখন জালির ভেতর ঢুকে গেছে। নিরাপদে রয়েছে, ওরা বোধহয় মোহনা পার না হলে আর বের হবে না। এবং তখনই ছোটবাবু ফের বলল, আমরা ক্যারলটনে যেতে পারি, একটু দূরে গেলে বনেটকারে আরও দূরে গেলে কলেজ- পয়েন্ট। শেষ পর্যন্ত ডেবিড বলেছে, আর খুব দূরে গেলে বেটনরুজে। একদিন না হোক দুদিনে ফিরে আসা যেতে পারে। নদীর পারে আশ্চর্য সব জায়গা। মিসিসিপিকে যতটা পারি ভেতরে ঢুকে দেখে আসব।

    আর তখনই হৈ-চৈ-প্রিয় ডেবিড ছুটে আসছে। সেই দূরবীন গলায় ঝুলছে। যত জাহাজ এগুবে, এই দূরবীনে ডেবিডের চোখ তত বড় হয়ে যাবে। আর যত রাগ জ্যাকের এই দূরবীনটাকে নিয়ে। ছোটবাবুকে ডেবিড নষ্ট করে দিচ্ছে এবং সঙ্গে সঙ্গে সে বলল, আমি তোমাদের সঙ্গে কোথাও যাব না ছোটবাবু। তারপর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে গেল।

    এবং এখন বিকেল। চারটা বেজে গেছে বলেই ডেবিডের ছুটি। তার এখন শুধু আবার আগের মতো বসে থাকা। পশ্চিমে পাহাড়ের ওপাশে অথবা সানফ্রান্সিসকো কিংবা লস এঞ্জেলসের সমুদ্রে সূর্য অস্ত যাচ্ছে, কারণ যখনই সূর্য অস্ত যায় সে ভেবে থাকে, সমুদ্রে সূর্য ডুবে যায়। পৃথিবীর আহ্নিক গতি বার্ষিক গতির কথা তার ভাবতে ভাল লাগে না। সমুদ্রে সূর্য ডুবে গেছে না ভাবতে পারলে এমন একটা জাহাজের বোট-ডেকে দূরবীন চোখে বসে থাকার মানে হয় না। কারণ ওর কাছে পৃথিবীর সব যুবতীরাই তখন ভীষণ দামী। একবার দূরবীনে দেখে ফেলতে পারলে, তাদের সব কিছু যেন দেখে ফেলে, এবং তখন জিভ লালায় ওর মোটা হয়ে যায়। ঠোঁট সে জিভের লালায় ভিজিয়ে রাখতে ভালবাসে। স্ত্রী এবির কথা মনে থাকে না। ছোট্ট মেয়েটি ফোলা ফোলা মুখে জানালায় দাঁড়িয়ে হাত যে নেড়েছিল, এবং রাস্তাটা যেখানে বাঁক নিল, গাড়িটা যেখানে অদৃশ্য হয়ে গেল, দূরবর্তী বাড়ির জানালায় কেউ তখনও দাঁড়িয়ে আছে, চোখে জল, এসব মনে থাকে না। সে কেমন গাউন আর তার ভেতরে এক অহমিকাময় যুবতীর শরীরের সুন্দর সুদৃশ্য জায়গাগুলো ভেবে ভেবে স্ত্রীর মুখ একেবারে ভুলে থাকে। এবিকে পেলে সে বোধ হয় তখন বুকে মুখ লুকিয়ে বলত, জাহাজে গেলে আমি ভাল থাকি না। তুমি কেমন থাকো আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এবি চিঠিতে তাকে কখনও এ-সম্পর্কে কিছু লেখে না। ওর ভীষণ রাগ হয়, অভিমান হয়। কেবল চিঠিতে, ওর শরীর, ওর নাওয়া-খাওয়ার কথা থাকে। ছেলে-মেয়েদের কথা থাকে। কে কি দুষ্টুমি করেছে, অথবা স্কুল ক্রিকেটে বড় ছেলে ক্যাপ্টেন হয়েছে বলে বাড়িতে কে কে নিমন্ত্রিত হয়েছিল এসব লেখা থাকে। জমিতে এবার ক্যাবেজ কেমন হয়েছে লেখা থাকে। মটরশুঁটির চাষ মনে হয় ভালই হবে। টমেটো খুব হয়েছে। গরুগুলোর খবর থাকে। গম চাষ বোধহয় ভাল হবে না খুব, এসব লিখে জানায়। ওর যে একটা শরীর আছে, এবিও যে একটা শরীর বয়ে বেড়ায় চিঠিতে তা কিছুতেই বোঝা যায় না। ছোট দাঁড়িয়েছিল। ওর রাতে ওয়াচ। সে এখানে এখন অনায়াসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। ডেবিড একটু দূরে বসেছে। জ্যাককে দেখেই ডেবিড বোধহয় খুব আনন্দ প্রকাশ করেছিল, পোর্ট, আবার পোর্ট, কিন্তু জ্যাক চলে যাওয়ায় ডেবিড বোধহয় একটু আহত হয়েছে। সে চুপচাপ বসেছিল, পাশে ছোটবাবু রয়েছে এটা যেন সে দেখতেই পাচ্ছে না। সে নিজের মতো দূরবীনে নদীর মোহনায় পাখিদের ওড়া দেখছে। এবং পাখিগুলো যে খুব বড় আকারের হয়ে যায়, উড়তে উড়তে একেবারে মুখের ওপর মনে হয় হাওয়া কাটিয়ে ওপাশে চলে যায়, ছোটবাবু দূরবীন চোখে না দিয়েও এটা বুঝতে পারে।

    ছোট ডাকল, এনি ওম্যান?

    উত্তর এল, নো।

    ছোট ভাবল, এ সময় হয়তো কিছু বলা ঠিক হচ্ছে না। এই মোহনায় মেয়ে পাবে কোথায়। কেবল দূরে দু-তিনটে জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে। ওদেরও এবার দাঁড়িয়ে পড়তে হবে। পাইলট-বোট আসবে। পাইলট এবার ভার নেমে জাহাজের এবং জাহাজ নদীতে ঢুকে গেলে, দু’পাড়ে হয়তো গাছপালার ফাঁকে ওম্যান দেখে ফেললেও ফেলতে পারে। এখানে শুধু পাখি, ঘোলা জল, এটা হয়তো সেকেণ্ড রসিকতা ভেবে থাকতে পারে। ছোটবাবুর ভয়ে বুকটা গুড়-গুড় করে ওঠে। ওর মুখটা ভীষণ ফ্যাকাশে হয়ে গেল ফের।

    আর তখনই ওরা দেখল দূর থেকে পাইলট-সিপ বেগে চলে আসছে। কিনারার বার্তা বয়ে আনবে। চিঠি আনবে। সেকেণ্ড লাফিয়ে উঠে পড়ল। চিৎকার করে বলল, আসছে আসছে। ছোটবাবুকে দেখিয়ে বলল, ঐ দ্যাখো আসছে। ওটা আমাদের নিয়ে যাবে মিসিসিপির ভেতর। এখানে এলেই আমার মনে হয় ছোট, আমরা যেন মার্ক টোয়েনের জগতে এসে গেছি। তুমি পড়েছ লাইফ অন দি মিসিসিপি, পড়েছ?

    ছোট খুব সহজ গলায় বলল, নো স্যার।

    সেকেণ্ড পিটপিট করে তাকাল। বুঝতে চেষ্টা করল ছোটবাবু এত সম্মান দিয়ে কথা বলছে কেন। তারপরই কি বুঝতে পেরে হা হা করে হেসে ওর কাঁধে জোরে চাপড় দিল, কি জান ছোট, মনটা ভাল নেই। ভেবেছিলাম দেশে ফিরব। কিন্তু সব বাতিল। বাড়ির জন্য মনটা মাঝে মাঝে খারাপ হয়ে যায়। তারপর একটু থেমে সেই পাইলট-বোটের দিকে তাকিয়ে বলল, আমাদের মিসিসিপিতে নিয়ে যাবার জন্য সে আসছে। তুমি পড়বে। সেলরদের কাছে এটা ভীষণ পবিত্র গ্রন্থ। আমি যে কতবার পড়েছি বইটা। আমি কোথাও কোথাও মুখস্থ পর্যন্ত বলে যেতে পারি।

    তারপরই একটু থেমে দেখে নিল, পাইলট-সিপ আর কতদূর। যতক্ষণ জাহাজের কিনারায় এসে না ভিড়ছে ততক্ষণ বোধহয় কথা বলা যাবে—আর সব কথাই একমাত্র এখন এই মহামহিম নদী, তার প্রাচীনতা এবং তার নাব্যতা কতটুকু, প্রাচীন কালে, কে প্রথম এই নদী আবিষ্কার করেছিল, তার নাম, হ্যাঁ মনে পড়ছে ডি-সোটা।

    —ওহে ছোটবাবু, তুমি ভাবলে সেই লোকটি কিনা একটা মহৎ কাজ করে ফেলেছে। কিছুই না। প্রথম ডি-সোটা মিসিসিপি দেখতে পান। এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। নদীর পাড়ে পুরোহিত ও সৈনিকেরা তাঁকে সমাধি দেয়। এবং বুঝতেই পারছ তারপরই আশা করা যায় সৈনিক এবং পুরোহিতরা ফিরে এসে বিশাল মহাকায় নদীর কথা সাধারণ মানুষকে বলবে। তারা বলেওছিল। কেউ আর এ- নিয়ে মাথা ঘামায়নি। শোনা যায় ঐ লোকটির মৃত্যুর পঁচিশ বছর পর শেকসপিয়ারের জন্ম। এবং প্রায় পঞ্চাশ বছর বেঁচে রইলেন, তারপর তাঁর ও মৃত্যু হল। আরও পঞ্চাশ বছর যখন তিনি কবরে থাকলেন আরামে তখন দ্বিতীয় শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির মিসিসিপির পাড়ে আবির্ভাব ঘটল। অর্থাৎ তুমি বুঝতেই পারছ ডি-সোটার মৃত্যুর প্রায় একশ ত্রিশ বছর পর আর একজন, তার নাম বোধহয় লা-সালে এবং এমনই একটা নাম মনে হচ্ছে, তিনি আবার জাতিতে ফরাসী, প্রথম মিসিসিপি সম্পর্কে তাঁর অনুসন্ধান করবার একটা স্পৃহা জাগল।

    পাইলট-সিপটা বেশ ছুটে আসছে—সে আবার সেদিকে তাকাল। আরও কিছুক্ষণ ছোটবাবুর সঙ্গে এই নদী এবং তার প্রাচীনতা সম্পর্কে কথাবার্তা বলা চলে। এখন কোনও কাজ নেই, যে ভাবেই হোক এই সব চারপাশের নদী-নালার গুণকীর্তন করে সময়টা কেটে যাবে। সে বলল, যা বলছিলাম, আমাদের যুগে এমন একটা আশ্চর্য নদী দেখার পর দেড়শো বছর চুপচাপ কাটিয়ে দিতে পারি—ভাবা যায় না। কোথাও কোনও সমুদ্র উপকূলে এক খণ্ড ভাঙ্গা প্রাচীন শিলাস্তর খুঁজে পেলে অন্তত পনেরটি অভিযাত্রী দল ছুটে আসবে। একদল যাবে শিলাস্তরের রহস্যসন্ধানে। বাকি চোদ্দটি দল যাবে পরস্পরের সন্ধানে।

    ছোটবাবুর মনে হল, সেকেণ্ড এই নদী সম্পর্কে অনেক খবর রাখে। এবং প্রথম প্রথম কথা বুঝতে ছোটবাবুর অসুবিধা হত। এখন একেবারেই তা হয় না। এবং ছোটবাবুও প্রায় ওদের মতোই একসেন্টে কথাবার্তা বলতে পারে। আর এটাই বোধহয় ওর আশ্চর্য ক্ষমতা, কত সহজে, সেও সাবলীল। ইংরেজিতে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে পারে। সে বলল, সব নদীর মোহনাই কিন্তু এক রকমের।

    —মানে!

    —সেই পাইলট-সিপ, কিছু জাহাজের প্রতীক্ষা, আর অজস্র পাখি এবং দূরে এই ছায়া ছায়া পাহাড় অথবা বনাঞ্চলের ছায়া। ওর ইংরেজিতে এমন শব্দেরই বেশি সমাবেশ ছিল বলে, সেকেণ্ড মনোযোগ দিয়ে শুনছিল, এবং পরে মনে হল, ঠিকই বলেছে ছোট—টেমস, গঙ্গা অথবা এই মিসিসপি, যদি আমাজনে যাওয়া যায়, সেখানেও হয়তো কিংবা ইউফ্রেটিস নদীর তীরে নীল নদের অববাহিকায়।

    সেকেণ্ড বলল, যা বলছিলাম বুঝলে ছোট দেড়শো বছরের ওপর তখন এখানে সব সাদা মানুষেরা পাল তুলে তীরে বসতি গড়েছে। এদের সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসীদের যোগাযোগ হয়েছে, দক্ষিণ দেশগুলোতে স্পানিয়ার্ডরা নির্বিচারে লুঠতরাজ চালাচ্ছে। নরহত্যা নারীধর্ষণ রোজকার ঘটনা। ওদের যেনতেন প্রকারেণ ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। একটু ওপরের দিকে ইংরেজরা তাদের কাছে মালা কম্বল বিক্রি আরম্ভ করে দিয়েছে, হুইস্কি ধরিয়ে ওদের মগজে ফূর্তির বান ডাকিয়েছে, কানাডায় ফরাসীরা আর এক ধাপ এগিয়ে, ইস্কুল খুলে হাতেখড়ি দিচ্ছে, বিদ্যাদানের নামে সব আত্মসাত করার নয়া ফরমূলা। মনট্রিল এবং কুইবেকে পশম কেনাবেচার ভেতর দিয়েও বেশ যখন জানাজানি ভালভাবেই হয়ে গেছে তখনও কেউ জানে না, এই দেশের ভেতরে রয়েছে এত বড় একটা নদী। একেবারে জানে না বললে ভুল হবে, তারা ভাসাভাসা খবর শুনেছিল। নদীর আয়তন এবং অবস্থান সম্পর্কে কোন সঠিক ধারণা ছিল না। অথচ দ্যাখো, ওদের মগজে কোন দুঃসাহসিক ইচ্ছে ছিল না, কোথায় সেই নদী, তার উৎপত্তি কোথায়, কোনদিক থেকে নেমে কোথায় যাচ্ছে, একেবারে সোজাসুজি না ডাইনে বাঁয়ে ঘুরে ঘুরে অশ্বখুর তৈরি করে চলেছে—কিছুই জানার ইচ্ছে ছিল না তাদের। আসলে কি জানো ছোট, নদীটা যে ওদের কোন কাজে লাগবে ভাবতেই পারেনি। নদী তারা চায়নি। তাদের জীবনে নদীর কোন প্রয়োজন ছিল না। অথচ প্রায় দেড়শ বছর পর যখন লা-সালে এই নদী আবিষ্কার করলেন, তখন পড়িমরি করে কে আগে যাবে, কার আগে প্রাণ কে করিবে দান, আসলে কি জানো, তখন সবার মনে জেগেছিল, নদীটাকে কিভাবে যে কাজে লাগানো যায়! তখনকার দিনে কেউ কেউ বিশ্বাস করত, ওটা গিয়ে পড়েছে ক্যালিফোর্ণিয়া উপসাগরে, এবং এখান থেকেই চীনে যাবার একটা সংক্ষিপ্ত পথ খুঁজে পাওয়া যাবে। অথবা কেউ কেউ ভাবত, ওটা গিয়ে পড়েছে ভার্জিনিয়ার সমুদ্রে। যাই হোক সে অনেক ইতিহাস বুঝলে ছোট, ঐ দ্যাখো পাইলট উঠে আসছে। তোমার চিঠি এলে দিয়ে দেব। তুমি এস। তখন ছোটবাবু হাসল। ওর চিঠি কখনও আসে না হেসে যেন বলতে চাইল। মেজ-মালোম ডেবিড ওর দিকে তাকিয়ে থাকল। ভারি কোমল স্বভাবের ছেলেটা। একটা চিঠি না এলে কী যে খারাপ লাগে! এখানে ছোটবাবুকে একা রেখে যেন যাওয়া ঠিক না। সে ফের বলল, এস আমার সঙ্গে।

    সে বলল, সেকেণ্ড, আমার চিঠি আসে না, আমাকে কেউ চিঠি দেয় না। আমারও আর কাউকে চিঠি লিখতে ইচ্ছে হয় না। কাকে লিখব! যাঁকে লিখলে খুশি হতেন, তাঁকে জানাতেই পারছি না, জাহাজ মিসিসিপিতে ঢুকে যাচ্ছে। অবশ্য আমার মা জানেনও না পৃথিবীতে মিসিসিপি বলে একটা নদী আছে। তারপর বলার ইচ্ছে হল—তাঁর পৃথিবী ভীষণ ছোট। সেই ছোট পৃথিবীতে শুধু তাঁর আমরাই আছি। আর কি আছে না আছে তার জন্য তাঁর কিছু আসে যায় না।

  • উনিশ

    উনিশ

    ।। উনিশ।।

    হেই হেই আর গুম গুম একটা শব্দ। ওরা নদীর ভেতরে ঢুকে গেলে এমন সব শব্দের ভিতর পড়ে গেল। দু’পাড় দেখা যাচ্ছে। প্রায় মাইলের ওপর চওড়া নদী, প্রায় সাত-আট ফেদম জল আছে। এবং গভীর নদীর ওপরে রয়েছে বড় বড় স্টিম-বোট। ওরা কেউ উজানে যাচ্ছে, কেউ নেমে আসছে। মাছ ধরার ছোট ছোট জাহাজ—ওরা কেউ মাছ ধরতে যাচ্ছে, কেউ মাছ ধরে ফিরছে। আর কখনও নদীর পাড় ভীষণ খাড়া। পঞ্চাশ ষাট ফুট খাড়া পাড়। নদী যেন অবলীলায় গর্জন করতে করতে লাফিয়ে নামছে। জাহাজটা তার ভেতর দিয়ে একটা ছবির মতো উঠে যাচ্ছে। দূর থেকে কখনও মনে হচ্ছে নিশ্চল জাহাজ, কাছে এলেই বোঝা যায়, না, বেশ যাচ্ছে জাহাজ। পাইলট চোঙ মুখে মাঝে মাঝে নদীর টেক সম্পর্কে বোধ হয় ব্যাখ্যা করে যাচ্ছে। এবং এভাবে জাহাজ চললেই মনে হয় সেই যেন কোনো অভিযাত্রী দল নদীর ভেতর দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে। তখন দেখা যায় কেবল জাহাজিদের অহংকারী মুখ। ওরা ডেক ধরে হেঁটে গেলেই টের পায় নদী ভীষণ গর্জাচ্ছে, ফুঁসছে। তার সব কিছু অহংকার অবলীলায় ভেঙেচুরে জাহাজ ক্রমে দামাল হয়ে উঠছে। আর কি যেন তখন ভাল লাগে, নদীর পাড়ে কখনও বন, কখনও ছোট শহর, কখনও শুধু বার্চ আর দিওদর জাতীয় গাছ, অথবা বিরাট বাওবাব বৃক্ষের অন্তরালে দেখা যায় এক ফালি আকাশ, সেখানে চাঁদ উঠছে।

    এমন সব দৃশ্য দেখলে মনে হয়, পৃথিবীতে এভাবে জাহাজে জাহাজে ঘোরা ভারী রোমাঞ্চকর। তখন হয়তো যাদের ওয়াচ নেই তারা ফল্কার ওপর বসে তাস খেলছে। কেউ হয়তো রেলিঙে চুপচাপ দাঁড়িয়ে অনেক দূরে দেখতে পায় একটা দেশ, তার ছোট্ট একটা নদী, নদীর পাড়ে তার গ্রাম এবং মসজিদে যে লোকটা আজান দিতে যায় তার মুখ। গভীর রাতে বিবির অপেক্ষা, মানুষটার জাহাজ থেকে চিঠি আসার কথা, ঘুম নেই তার চোখে। আর সেই মানুষ এখন একাকী রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর অপর প্রান্তে নদীর মোহনায় এক ফালি চাঁদ দেখতে দেখতে অবাক হয়ে ভাবছে মসজিদের মাথায় চাঁপা ফুল গাছের ডালের ফাঁকে যখন চাঁদ ওঠে, ঠিক একরকম দেখতে। সব তেমনি ঠিক আছে, গাছপালা, বন, মাঠ, নদীর জল এবং জ্যোৎস্না। কেবল নেই সরল নোলক-পরা মেয়েটি যে পাশে থাকলে তার মনে হত, এটাও তার দেশ। আলাদা করে কিছু আর ভাবা যায় না।

    তখন ভাণ্ডারি খাবার এগিয়ে দিচ্ছে! তাজা মাছ। মাছের ঝোল। ম্যাকরল মাছ তুলে নিয়েছে কিনার থেকে। তাজা মাছ, মাছের ঝাল, ঝাল গন্ধ সারা ডেকময়। আর ভাত এবং কেউ কেউ আগে থেকেই বলেছে ভাত বেশি খাবে। মাছের বেশ বড় টুকরো, প্রায় ইলিশ মাছের মতো খেতে স্বাদ, দেখতেও কিছুটা কাছাকাছি, ওগুলো হেরিংও হতে পারে। তবে জাহাজিদের কাছে নামে কিছু আসে যায় না। এবং গুম গুম শব্দের ভেতর জাহাজের ক্রমে এগিয়ে যাওয়া বেশ আরামদায়ক। ছোটবাবু, মৈত্র আর অমিয় অথবা অন্য যারা এখন ওয়াচে রয়েছে—ওপরে উঠতে পারছে না। তবু ছোটবাবু এক ফাঁকে উঠে তীরের গাছপালা, এবং কখনও আলোর বিন্দু দেখে দূরে, কেমন মুগ্ধ হয়ে গেছিল। সে ভুলেই গেছিল নিচে তার কাজ, সুট খালি হয়ে যাচ্ছে। কাপ্তান নিজেও ঠিক নেই, কারণ তিনি লাফিয়ে লাফিয়ে বোট-ডেক পার হয়ে যাচ্ছেন। কোথাও ঠিকমত দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। চীফ- অফিসারের সারাদিন বেশ খাটুনি গেছে। সারেঙ সারা দিনমান ডেক-জাহাজিদের দিয়ে সব কটা ফল্কা সাফসোফ করছে। এখন কাপ্তান নিজে নিচে যাচ্ছেন। আলো ফেলে দেখছেন, কোথাও কোনও ফুটাফাটা রয়েছে কিনা।

    সকাল থেকেই জাহাজে মাল উঠতে শুরু করবে। ওয়াচ ভেঙ্গে দেওয়া হবে। এবং সবাই যে যার মতো বিকেলে নেমে যাবে বন্দরে। বন্দর এলেই এই এক উত্তেজনা। ঠিক তখনই খবরটা সবাই শুনেছিল। সারেঙ বলে যাচ্ছে, প্রায় ফুঁকে ফুঁকে বলে যাবার মতো, আমরা ভারতীয় নাবিকরা বন্দরে নামতে পারছি না। দাঙ্গা, কালো-সাদাতে দাঙ্গা। কোথাও লঙ-মার্চে কার বের হবার কথা, সারেঙ সে-সবও বলে গেল। এমন একটা সুন্দর রাতে, এ-ধরনের দাঙ্গার খবর! কেউ আর তখন মন দিতে পারছে না কাজে! যারা তাস খেলছিল, ওরা তাসফাস ছুঁড়ে দিল হাওয়ায়। যারা খেতে বসেছিল, তারা বিষম খেল খেতে খেতে। যাঁরা নামাজ পড়ছিল ডেকে, তারা কিছুক্ষণ আরও বেশি আল্লার কাছে প্রার্থনা করবে বলে চুপচাপ বসে থাকল যেন। জাহাজের সব কিছু তখন কেমন একেবারে চুপ মেরে গেল। যেন একটা মরা জাহাজ নিয়ে কিছু অদৃশ্য আত্মা নদীর জলে ভেসে যাচ্ছে। কেউ কোনও কথা বলতে পারছে না।

    বন্দরে নামতে না পারলে জাহাজিদের কি যে ব্যাজার মুখ—এখন এ-জাহাজটাকে না দেখলে বোঝা যাবে না।

    তখন ডেবিড দেখল মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন জাহাজি। অস্পষ্ট অন্ধকারে সে তাদের ঠিক চিনতে পারল না। জায়গাটা আফটার-পিকের চার নম্বর ফল্কার কাছে। ওরা যেন কি গুজ-গুজ- ফুস-ফুস করছিল। এদের ভিতর ছোটবাবু নেই। অবশ্য এখন আর ওয়াচ নেই তার। জাহাজ বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার দায়দায়িত্ব পাইলটের। কেবল তার একটা বড় কাজ রয়েছে, জাহাজ বাঁদা-ছাঁদার। সে তো ভোর রাতের দিকে। তবু যেন কিছু একটা অছিলায় চলে আসা। ছোটবাবুকে সে খুঁজছে এটা কাউকে বুঝতেই দিচ্ছে না। উইচের নিচে ঝুঁকে কি দেখছে! আসলে কিছুই দেখছে না। সে অহেতুক আফটার-পিকে আসতে পারে না, একটা কাজ চাই হাতে। জাহাজ বাঁধার আগে সব কিছু পরীক্ষা করে দেখা যেন। হাসিল ঠিক আছে কিনা, উইনচ কাজ করছে কিনা, হারিয়া হাপিজ ঠিক মতো বললে দড়িদড়া ঠিকমতো নেমে যাবে, উঠে আসবে কিনা, এ-সব দেখেই যেন চলে যেত। তবু একবার নিচে নেমে বাঁ পাশে ঢুকে গেল। দরজায় ঝুঁকে বল, হেই!

    কিন্তু কেউ নেই। ফোকসাল ফাঁকা। থাকা উচিত ছিল। ডেকে, মেসরুমে, গ্যালিতে কোথাও ছোটবাবু নেই। এবং মনে হল, সেই গুজগুজ যারা করছিল তাদের ভিতর যদি থাকে। সেখানেও নেই। ওরা বন্ধু, অনিমেষ, মান্নান, মনু এবং ডেক-টিণ্ডাল হাসান। যদিও ওদের একটা করে প্রত্যেকের নম্বর আছে, কিন্তু ডেবিডের স্বভাব অন্যরকম। সে নম্বরে চেনে না, সে নামে চেনে। অন্য সবাই জাহাজিদের নম্বরে চেনে,

    কি নাম, যদিও নাম মনে রাখা ভারী কষ্ট, তবু ওর মনে হয় মানুষের সম্মানের জন্য নামে চেনা ভাল। ওরা তো জেল-কয়েদী নয়, জেল-কয়েদী হলেই বা মানুষ মানুষকে নামে চিনবে না কেন সে বুঝতে পারে না। অবশ্য এ নিয়ে তার এখন দায় নেই। ছোটকে না পেলে চলছে না। একটা মজার ট্রিপ, আহা দিনের বেলা হলে কি যে ভারি মজা হত, তবু রাত জেগে দূরবীন নিয়ে বসে থাকা। একা ভাল লাগবে না বলে একমাত্র সে ছোটবাবুকে সঙ্গে নিতে পারে।

    লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে ওঠার মুখে দেখা মৈত্রের সঙ্গে। সে বলল, টিণ্ডাল, ছোটবাবু কোথায়?

    –সে তো ঘুমোচ্ছে।

    —ঘুমোচ্ছে?

    —হ্যাঁ। বলেই সে নেমে যেমন দেখে থাকে, ঠিক ছোটবাবু অমিয়র বাংকে শুয়ে আছে। ওপরের বাংকে বলে মেজ-মালোম ছোটকে দেখতে পায় নি। সে ডেকে বলল, এই ছোট তোকে মেজ-মালোম ডাকছে।

    ছোটবাবুর ঘুম ভীষণ। জাহাজের দুলকি চালে বেশ শরীরে আমেজ এসে যায়। খুব এখন নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে পারে। মৈত্র দু-তিন বার ডেকেও সাড়া পেল না। সেকেণ্ড এসে দেখল খুব জোরে জোরে নাড়ছে মৈত্র। কিন্তু ওঠবার নাম নেই।

    সেকেণ্ড বলল, থাক।

    —থাক মানে। আপনি দাঁড়ান। বলে সে ওপরে উঠে দু-হাতে টেনে তুলল, এই ছোট! ছোট শুনতে পাচ্ছিস! ছোট তখন চোখ মেলে তাকাবার চেষ্টা করল।—মেজ মালোম তোকে ডাকছে!

    –মেজ-মালোম কে?

    —কি হারামজাদা! মেজ-মালোমকে চেন না! সে বলল, মেজ-মালোম ডেবিড।

    –ডেবিড এখানে কেন?

    —আরে তুমি মেজাজ দেখাচ্ছ!

    সেকেণ্ড তখন বলল, ছোট কি বলছে!

    মৈত্র বলল, বলছে একটু বসতে। মেজ-মালোমকে একটু বসতে বল। তারপর আর কি করে—সেকেণ্ড কাছে এসে বলল, ওম্যান।

    ছোট বলল, ওম্যান! কোথায় সেকেণ্ড?

    —তাড়াতাড়ি এস।

    দু-লাফে নেমে গেল ছোট। ওর ঘুম একেবারে ভেঙ্গে গেল। মৈত্র এবং অন্য সবাই, পারলে যেন এই জাহাজের যত জাহাজি রয়েছে সবাই এখন এই ডেবিডের পেছনে পেছনে বোট-ডেকে উঠে যাবে।

    ডেবিড ঠিক সিঁড়ির মুখেই বলল, নো ওম্যান।

    ছোট বলল, তবে!

    —এস কথা আছে।

    —এত রাতে কি কথা!

    —অনেক কথা।

    —মানে!

    —মানে, দু’পাড়ের শহর ঘরবাড়ি তেলের পিপে, স্টিম-বোট, মোটর-বোট, লাল নীল রঙের আলো, কোথাও ব্যাণ্ড বাজবে, এস দেখবে। আমরা এক ফাঁকে ঠিক ওম্যান দেখে ফেলব কোথাও।

    সুতরাং আর কি করা। সকালে ওয়াচ থাকছে না। হাল্কা কাজ থাকবে। সুতরাং এমন একটা জাহাজে যখন ক্রমে উজানে উঠে যাচ্ছে, দু-পাড়ের গাছপালা ছায়া অন্তহীন ক্রমশ সরে সরে যাচ্ছে, অথবা এক ফালি চাঁদ জাহাজটার সঙ্গে সঙ্গে উজানে ভেসে চলেছে, তখন রাত জেগে অন্তহীন দৃশ্যমালায় ডুবে যেতে ভালই লাগবে।

    পাশেই জ্যাকের কেবিন। পোর্ট-হোলে এখনও আলো আছে। জ্যাক তবে ঘুমোয় নি? সেকেণ্ড আগেই ঠোটে আঙ্গুল ছুঁয়ে বলেছে, কিছু দেখে ফেললে খুব যেন হৈ-চৈ না করে ছোট। ওতে জ্যাকের জেগে যাবার সম্ভাবনা। চুপচাপ বসে থাকা ডেক চেয়ারে, আর ডেক খুব সাফ বলে ছোটবাবু ডেকে কাত হয়ে হাতে মাথা রেখে শুয়ে থাকতে পারে পর্যন্ত। এবং ছোট দেখল, মেজ চকোলেট কালারের বড় একটা বোতল এনেছে, দুটো গ্লাস। কেবিন-বয় ইলতুতমিস টিপয়ে কাঁচের প্লেটে রঙিন মাংস রেখেছে। ছোট ছোট টুকরো প্রায় স্যালাডের মতো করে রাখা।

    সেকেণ্ড বলল, চলুক।

    ছোটর ভীষণ ইচ্ছে হল। বেশ ঝাঁঝ। সে ঠিক সহ্য করতে পারে না। তবু বলল, কেউ দেখে ফেলবে নাতো!

    —দেখে ফেললে কি হবে!

    —খারাপ ভাববে।

    —যা, খারাপের কি! ওম্যান-ওয়াইন-ওরসিপ ভারি পবিত্র ব্যাপার মানুষের। খাও খাও। পবিত্র যা কিছু তার থেকে দূরে থাকার কোনো মানে হয় না। বলেই ছোটকে দূরবীনটা দিয়ে সে উঠে গেল। দূরবীনে সে কিছুই দেখতে পেল না। পাগল। রাতে, এই সামান্য চাঁদের আলোতে পাড়ের কিছুই স্পষ্ট নয়। বরং ভোঁ ভোঁ শব্দ করতে করতে যে সব স্টিম-বোট নেমে যাচ্ছে উঠে আসছে, অথবা যদি কোন জাহাজ উঠে যায়, পাশাপাশি এলে তাদের রঙীন ছবির মতো দেখায়। জাহাজে সে কোনো মেয়ে দেখতে পাচ্ছে না। তবু জেগে থাকা, এভাবে একটা রাত মিসিসিপি নদীর বুকে জেগে থাকা ভারি আনন্দের। সে তো আর কখনও আসছে না, আবার যদি আসেও, সে কবে আসবে বলতে পারবে না। তখন আজকের মতো সব কিছু তার ঠিকঠাক নাও থাকতে পারে।

    সে দু’টুকরো মাংস মুখে ফেলে দিল। ভাজা ভাজা মাংস। সেকেণ্ড এসে সামান্য মদ ওর গ্লাসে ঢেলে দিল, তারপর সোডা দিয়ে হাল্কা করে দিল, নিজে রাখল একেবারে নির্জলা, সে একেবারে সবটা গলায় ঢেলে দেবার মতো ঢেলে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল, হাই—বলে সে দু’হাত ওপরে তুলে, কি মজা, এমন একটা ভঙ্গী করলে ছোট বলল, এই জ্যাক জেগে যাবে।

    সেকেণ্ড বলল, জ্যাককে ‘ডাকো না! সেও এসে বসুক।

    —তুমি পাগল। জ্যাক আমাদের সন্ন্যাসী বালক। তোমার দূরবীণ দেখলেই চটে যাবে।

    —তা অবশ্য ঠিক। আচ্ছা কেমন ভাল লাগছে না! এত বড় নদীতে ভেসে যেতে ভাল লাগছে না!

    —খুব।

    —এখন তোমার নাচতে ইচ্ছে করছে না! ছোট বলল, নাতো।

    —বারে ভেতরে তোমার ডিং ডিং করে বাজনা বাজছে না!

    —নাতো।

    —বলছ কি, এ-সময়ে ডিং ডিং করে বাজনা বাজছে না!

    —নাতো।

    —বলছ কি, এ-সময়ে ডিং ডিং করে ভেতরে বাজনা না বাজলে আবার কবে বাজবে, নদীতে এলেই আমার বাজনা বাজতে থাকে। নদীতে ডিং ডিং বাজনা না বাজলে লা-সালে প্রাণ হাতে করে মিসিসিপিতে আসত না।

    —ডিং ডিং করে বাজনা বাজলেই প্রাণ হাতে করে আসা যায় না।

    —আরে সে খুব সেয়ানা মানুষ ছিল। তখন ফ্রান্সের সম্রাট চতুর্দশ লুই। তার ইলিয়ানের কেল্লা থেকে মনট্রিলে যেতে ভীষণ কষ্ট। ডাঙ্গায় প্রায়ই লুঠতরাজ হত। রাস্তা বলতে কিছু ছিল না। কেবল জঙ্গল, মাঠ, অকারণ বনানী পাহাড় আর সব রেড় ইণ্ডিয়ানদের ভয়াবহ আক্রমণ, কিন্তু নদী দেখেই বুকের ভিতর বাজনা বাজতে থাকল। চতুর্দশ লুইকে লিখে পাঠাল কিছু সুযোগ-সুবিধার জন্যে। এবং সেটা আদায় হলে বেশ নদীপথে সে মনট্রিলে পৌঁছে গেল। পয়সা কম, লাভ বেশী।

    —তুমি যে বললে ডিং ডিং করে বাজনা না বাজলে…..

    সেকেণ্ড কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকল। ভুলে গেছে মতো, তারপর বলল, আমার কখনও কখনও এটা মনে হয়। মানুষ যতই স্বার্থপর হোক ছোট, কিন্তু কিছু ভাল কাজ করে থাকে কি না বল! মোষের চামড়ার ব্যবসাটা লা-সালে আদায় করে নিলেন বটে, বিনিময়ে তিনি কেল্লা নির্মাণ, কেল্লা দখল, জায়গা জমি যা কিছু দখল করলেন, সব চতুর্দশ লুইয়ের নামে। কেবল তাঁর ব্যবসা নদীর পাড়ে অথবা বনভূমির ভেতর হাজার হাজার মোষের। মোষের চামড়ার। ইজারা নেওয়া দেওয়ার কারবার।—তুমি ঠিক দেখছ তো!

    ছোট বলল, দেখছি, ডান দিকে একটা স্টিম-বোট উঠে আসছে।

    —তোমাকে আর একটু দেব! ছোট তখন ওর দিকে তাকালে, সে ছোটর গ্লাস তুলে দেখল। ছোট এক সিপও খায় নি। এই খাচ্ছ না কেন!

    ছোট বলল, দেখি, সে প্রায় হাত বাড়িয়ে নিল, এবং ঠোঁটের কাছে নিয়ে খুব কষ্টে এক সিপ খেল, তারপর আর এক সিপ। এবং কিছুক্ষণ পর আরও এক সিপ। বেশ ঝিম-ঝিম্ করছে। সেকেণ্ড বলে চলেছে তখন। আর একটা দলে এসেছিলেন, জোলিয়েত এবং পুরোহিত মার্কুয়েট। তারা সারা দেশ পার হয়ে ঠিক এক সময় মিসিসিপির তীরে এসে পৌঁছাল। তারা ঠিক লা-সালের মতো যায় নি। ওরা বড় বড় হ্রদ পার হয়ে গিয়েছিল। ওরা হরিৎ উপসাগর থেকে ডিঙ্গি নৌকায় রওনা হয়েছিল। সঙ্গে ছিল মাত্র পাঁচজন লোক। ওরা উইসকনসিন এবং মিসিসিপি যেখানে মিশেছে ঠিক সেখানে পৌঁছে দেখল, সামনে শুধু অরণ্য—গভীর, যেন হাজার হাজার তিমি মাছ আকাশ থেকে অদৃশ্য সুতোয় কেউ ঝুলিয়ে রেখেছে। নদী পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বোঝাই যাচ্ছে না, আরও কত সব কিংবদন্তী রয়েছে, ওরা শুনতে পেয়েছিল, নদীতে একটা বিরাট দানব রয়েছে। মাঝে মাঝে তার গর্জন আরম্ভ, হয়। চারপাশের গাছ-পালা থেকে সব পাখিরা পালিয়ে যেত। বুনো মোষেরা লেজ তুলে দিক-বিদিক ছুটতে থাকত। সমস্ত চরাচর একেবারে কাঁপিয়ে দিত।

    সেকেণ্ড-এর মনে হল, ছোট ঝিমুচ্ছে। সেকেণ্ড কেমন ক্ষেপে গেল। সে ধাক্কা মরল ছোটকে। বলল, তুমি সেলর!

    —ইয়েস স্যার।

    —নো।

    —কেন নো স্যার?

    —তুমি ঝিমুচ্ছ আমি কি বলছি, শুনেছ?

    —ধুস! আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে সেকেণ্ড। আমি উঠব। তোমার বক্ বক্ আমার ভাল লাগছে না।

    —আরে শোন শোন, এই ছোট ঐ দ্যাখো। সত্যি ছোটর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একটা স্টীম- বোট যাত্রী বোঝাই—নিচে নেমে যাচ্ছে। আলোতে সাজানো। মার্দিগ্রাস উৎসব কি এখানে আরম্ভ হয়ে গেছে! সে বলল, দ্যাখো দ্যাখো কেমন নাচছে জোড়ায় জোড়ায়।

    দূরবীন না হলেও দেখা যায়। খুব কাছে এবং দ্রুত নেমে যাচ্ছে স্টিম-বোটটা। –আচ্ছা ছোট, ডেবিড ছোটকে ঠেলা দিয়ে বলল, ওরা আমাদের সঙ্গে ওপরে উঠে যায় না কেন! নিচে নেমে যাচ্ছে কেন!

    ছোট বলল, আমি আর খাব?

    সেকেণ্ড বলল, খাবে। একশবার খাবে। রাত এখনও অনেক জাগতে হবে।

    —কটা বাজে?

    —এগারোটা।

    —জ্যাক জেগে যাবে না তো!

    —জাগলে আমাদের কি! ডেবিড খুব উত্তেজনার মাথায় কথা বলছে। আহারে! এমন একটা সময়ে সুন্দর স্টিম-বোটে আমরা কেন থাকলাম না।

    ডেবিড কি এখন বসে বসে মরাকান্না জুড়ে দেবে! সে বলল, ডেবিড, তুমি মরাকান্না জুড়ে দিলে আমি এখানে থাকব না। আমি চলে যাব। বলেই ছোট হুড়মুড় করে উঠে বসল। জাহাজ যে যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছে, কারণ তীরের গাছাপালা যদিও এখন আর কিছুই তেমন স্পষ্ট নয়, ছায়া-ছায়া এবং নদী ক্রমে প্রশস্ত হয়ে যাচ্ছে, কেবল কলকল জলের শব্দ। ওর তখন দূরের কোথাও আর একটা নদী পাড়ের কথা মনে পড়ে যায়, ঠিক যেন সেখানে ড্যাং ড্যাং করে দুর্গাপুজোর বাজনা বাজছে, কবুতর উড়ছে আকাশে এবং অজস্র কাশফুল নদীর পাড়ে তুষারপাতের মতো বাতাসে উড়ছে। সে উঠেই যেতে পারল না। মাথাটা কেমন ঝিম্‌ঝিম্ করছে। সেকেণ্ড পুরোহিতের মতো নদী সম্পর্কে যা মাথায় আসছে বলে যাচ্ছে।

    সেকেণ্ড বলল, মার্কুয়েট ভীষণ চালাক লোক ছিল হে। রাতদিন নদীর জলে ডিঙ্গা ভাসিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, নদী কখনও বাঁক নিয়েছে। দ্বীপের মতো মাঝখানে ডাঙ্গা। এতদিন চালিয়েও ওরা একটা মানুষের পায়ের দাগ দেখতে পেল না, কেবল যেখানে মাঠ, মাঠে বড় বড় ঘাস সেখানে হাজার হাজার বুনো মোষ কি যে আনন্দে ঘোরাফেরা করছে!

    তারপর সেকেণ্ড কেমন মোহভঙ্গের মতো বলে ফেলল, প্রায় দু’হপ্তা চলার পর ওরা মানুষের পায়ের দাগ দেখতে পেয়েছিল, যেন সেই এক রবিনসন ক্রুশোর ব্যাপার। ওরা নদীর দু’পাড়ে কোথাও বড় বড় পাহাড় পর্যন্ত দেখেছিল। রবিনসন ক্রুশোর ব্যাপারটা ভয়াবহ, কেউ তখন আক্রমণ করে বসবে, ভয়ে বুক গলা শুকিয়ে তাদের কাঠ। কারণ তাদের নানাভাবে হুঁশিয়ারি ছিল, নদীর দু-পাড়ের আদিবাসীরা নদীর মতোই হিংস্র, নির্মম। তারা সব আগন্তুকদের মেরেই ফেলে। এক মুহূর্ত তারা অপেক্ষা করে না। মার্কুয়েট তাদের সহজেই খুঁজে পেয়েছিল। তাদের সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহারে মার্কুয়েট অবাক। সর্দার রেড ইণ্ডিয়ান ওর শেষ কম্বলখানি খুলে দিয়েছিলে মার্কুয়েটকে। পরম সমাদরে আদর অভ্যর্থনা, এবং কুকুর নিয়ে ঘাসের ওপর বড় বড় গাছের ছায়ায় খেলা পর্যন্ত দেখিয়েছিল। উপহার দিয়েছিল পর্যাপ্ত মাছ, জই-এর পায়েস। সকাল বেলায় নদীর পাড়ে সর্দার তার ছশো অনুচরসহ ওদের বিদায় জানিয়েছিল।

    সেকেণ্ড বলল, তুমি ঘুমোচ্ছ!

    —না।

    —তবে এভাবে চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়েছ কেন?

    —মাথাটা ঝিমঝিম করছে।

    সেকেণ্ড প্রায় কানের কাছে মুখ এনে চিৎকার করে বলল, এখন যেখানে আলটন শহর আছে না, সেখানে মেয়েদের কিছু নগ্ন মূর্তি তারা খুঁজে পেয়েছিল। তার নিচেই ওরা দেখেছিল নদীর জল ঘোলাটে কেমন হলুদ রঙ জলের। মিসিসিপির শান্ত নীল জলস্রোতকে কোথা থেকে প্রচণ্ড গতিতে জলের ঘূর্ণি এসে একেবারে হলদেটে করে দিচ্ছে। ওরা জানত না, ওটা মিসৌরি। মিসৌরি এসে এখানটায় মিলে নদীকে করেছে দুর্বার অশান্ত। পাগলা হাওয়ায় যেন নদীর জল অনেক ওপরে উঠে লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে যাচ্ছে। পাগলাচণ্ডীর মতো অশান্ত গর্জনে নদী ক্ষিপ্ত হয়ে গেছে।

    হঠাৎ তখন মনে হল পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সেকেণ্ড দেখল, জ্যাক। জ্যাক এসে গেছে ছোটবাবু।

    ছোটবাবু উঠে বসল না, এমন কি তাকিয়েও দেখল না। বলল, আঃ

    জ্যাক বলল, কি করছ তোমরা?

    সেকেণ্ড ওর দূরবীন বগল থেকে একেবারে নামিয়ে নিচে লুকিয়ে ফেলল। বলল, নদী দেখছি। ছোটবাবুকে নদীর কথা বলছি।

    –ছোট তো ঘুমোচ্ছে।

    –না ঘুমোচ্ছে না।

    জ্যাক উপুড় হয়ে বসল মাথার কাছে। দেখল চোখ বুজে আসছে। খেয়েছে! আজ আবার খেয়েছে! চোখ দুটো টেনে ফাঁক করলে আবার খুঁজে যাচ্ছে। জ্যাক বলল, কাকে বলছ।

    —কেন ছোটকে।

    —কিছু শুনতে পাচ্ছে না।

    —মানে!

    —দ্যাখো না।

    —এই ছোট তুমি কিছু শুনতে পাচ্ছ না?

    —আমি বাড়ি যাব ডেবিড।

    —এই তো কথা বলছে।

    —ঠিক বলছে? ওতো এখন স্বপ্ন দেখছে।

    —স্বপ্ন!

    —তা ছাড়া কি!

    সেকেণ্ড এবার উপুড় হয়ে পড়ল, এই ছোট তুমি স্বপ্ন দেখছ?

    জ্যাক বুঝল দুজনেই বেশ টেনেছে। ছোটর খাবার অভ্যাস নেই এটা সে জানে। এ-ব্যাপারে ছোটর ভয়ও আছে। ছোট খায় না! অথচ ডেবিড ওকে খাওয়া শেখাচ্ছে। সে এবার দু-হাতে জামা ধরে তুলে বলল, ছোটবাবু তুমি কোথায় যাবে?

    —বাড়ি যাব।

    সেকেণ্ড তখন চোখ বুজে বলছে, ছোট কি বলছে জ্যাক?

    —বাড়ি যাবে বলছে।

    —কাল সকালেই তো বাড়ি পৌঁছে যাব।

    জ্যাক আর সহ্য করতে পারল না। বলল, তুমি ওকে আর দেবে না।

    —পাগল! ক্ষেপেছ ওকে আর দি। আমার একটা ইজ্জত নেই।

    ছোট এবার কাউকে যেন গ্রাহ্য করছে না—আমারও ইজ্জত আছে সেকেণ্ড। আমাকে তোমরা যখন-তখন অপমান করতে চাও। আমি কিছু সহ্য করব না। আমি বাড়ি যাব। তুমি আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। ভীষণ জড়ানো কথা এবং অস্পষ্ট।

    —দেব। ওঠো।

    —কিন্তু —

    —না আর কিন্তু না।

    —আমি উঠতে পারছি না।

    জ্যাক বলল, নাও ধরো। ডেবিড বলল, ধর। দুজনেই টলছে। জ্যাক দেখল, সিঁড়ি ধরে নামার সময় দুজনেই হুড়মুড় করে পড়বে। সে এবার বলল, তুমি বস ডেবিড। ওকে আমি রেখে আসি।

    জ্যাক জানে এখন বাবা ঘুমোচ্ছে। রাত অনেক। ওর ঘুম আসছিল না। সেই কখন থেকে সে পোর্ট-হোল খুলে চুপচাপ গোপনে দেখে যাচ্ছিল। ওরা কিছু খাচ্ছে সে সেটা টের পাচ্ছিল। গোপনে ওরা চুরি করে মদ খাচ্ছে বুঝতে পারে নি। ওদের কথাবার্তা সেই কখন থেকে শুনছে। অস্পষ্ট বলে বুঝতে পারছিল না। সে কিছুতেই কেবিনে শুয়ে থাকতে পারে নি।

    সে ক্রমে বুঝতে পারল, ছোটর ভীষণ নেশা হয়েছে। আর কেউ নেই এখন জেগে। জেগে থাকলেও ঐ যেমন এরা আছে তেমনি, পোর্টের কাছাকাছি দায়-দায়িত্ব সব পাইলটের। একটু বেচাল হলে তেমন ক্ষতির কিছু নেই। তবু সকালে জাহাজ বাঁধাছাঁদা আছে। ডেবিডের অনেক কাজ। কেবিনে একটু চোখ বুজতে পারলেই ডেবিড একেবারে ঠিকঠাক। আর এখন এই ছোটবাবু—সে ছোটবাবুকে নিভৃতে দাঁড় করিয়ে বলল, আমার কাঁধে হাত রাখো, ছোট। আস্তে আস্তে পা ফেল। ভয় নেই। পড়বে না।

    ছোটবাবু বলল, তুমি খুব ভালো ডেবিড

    জ্যাক বলল, আমি ভাল না। আমি ভীষণ খারাপ। আস্তে। লম্বা পা ফেলবে না।

    —আমাকে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছ ডেবিড?

    —হ্যাঁ বাড়ি। একবার বলার ইচ্ছে হল, আমি জ্যাক, ডেবিট বোট-ডেকে শুয়ে আছে। কিন্তু কিছু বলল না।

    —জানো, আমার দুটো ভাই আছে। একটা বোন আছে।

    —জানি।

    —তুমি জানো আমরা এত গরীব ছিলাম না।

    —জানি।

    —আমরা দুর্গাপুজোতে মোষ বলি দেখতাম।

    মোষ বলি ব্যাপারটা জ্যাকের জানা নেই। সে বুঝতে পারল না। ছোটবাবু যাই বলুক সে হুঁ- হাঁ করে যাচ্ছে। খুব সন্তর্পণে সিঁড়ি ধরে নামানোর সময় কেমন হড়কে গিয়ে জ্যাককে ছোটবাবু পুরোপুরি জড়িয়ে ধরল। আহা ছোটবাবুর শরীর কী নরম! জ্যাক চোখ বুজে রয়েছে। মাতাল ছোটবাবু তার শরীরের ওপর ভর করে সোজা দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। জ্যাকও ছোটবাবুর কাঁধে মুখ লুকিয়ে একেবারে একটা লতার মতো জড়িয়ে থাকতে চাইল। যেন বলতে চাইল, ছোট তুমি কি টের পাচ্ছ না! তুমি কিছু বুঝতে পারছ না?

    আর তখনই ছোটবাবু বলল, আমাকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখলে কেন? আমি বাড়ি যাব না? জ্যাক বোধহয় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত। ছোটবাবু তুমি কি! তুমি কি ছোটবাবু? তুমি আমাকে একটু লতার মতো জড়িয়ে থাকতে দাও। কেউ নেই। ছোট, আমি বড় হয়ে গেছি। সত্যি বড় হয়ে গেছি।

    ছোটবাবু বলল, আমার দাঁড়াতে ভাল লাগে না।

    জ্যাক বলল, তুমি তো হাঁটতে পারছ না।

    —খুব পারছি।

    জ্যাকের ইচ্ছে, সে যতটা পারে দেরি করে নিয়ে যাবে। এই নীল দাড়ি এবং চুল বড় মহিমময়। আশ্চর্য ঘ্রাণের মতো এক সৌরভময় জগতে সে আছে। সে যেন এক সুন্দর পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে যায় তখন। কেউ জানে না, এই যে যুবক অথবা কাজ করে করে ছোটবাবুর ঋজু চেহারা, আর শরীরে কি উজ্জ্বল রঙ আর ঘাসের মতো নরম বাহুর ভেতরে হারিয়ে যাবার কি যে অশ্চর্য প্রলোভন কেউ তা বুঝতে পারবে না। জ্যাক যেন নিরবধিকাল এভাবে জড়িয়ে থাকবে ছোটবাবুর শরীরে। সে বারবার মিশে যেতে চাইছে অথবা ছোটবাবুর শরীরে সে হাত দিয়ে দেখার এমন সুযোগ আর পাবে কিনা জানে না। যেন জ্যাক এক পাথরের মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। অকারণ চারপাশে ওর নরম আঙুলগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে শরীর এবং কি ভেবে হাঁটু গেড়ে বসে ওর দু পায়ের ফাঁকে মুখ রেখে ফিস ফিস করে বলছে, ছোটবাবু আমি মেয়ে। তুমি বিশ্বাস কর আমি মেয়ে। আমি জ্যাক নই ছোটবাবু। আমি বনি।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল না, ডেবিড তাকে এভাবে কেন দাঁড় করিয়ে রেখেছে। সে তো কিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। সব কিছু সামনের ঝাপসা। ডেবিডের মুখ ঝাপসা। কখনও কুয়াশার ভেতরে মানুষের মুখ দেখলে যেমন লাগে তেমনি। সে বুঝতে পারছে না হাঁটুর ভেতর মাথা রেখে ডেবিড কি করছে? ওকে কী জুতো পরিয়ে দিচ্ছে? ঠোটে কি একটা পোকা উড়ে এসে বসেছে? সে কোনরকমে পোকাটা মুখ থেকে তাড়িয়ে দেবার জন্য হাত-পা ছুঁড়ে বলল, আমি বাড়ি যাব না? আর যা হবার, হাত-পা ছুঁড়তে গিয়ে প্রায় পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। কারণ জ্যাক বুঝল এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা খুব রিস্কি। সে আবার হাঁটতে থাকল। একটা কথাও বলল না। একেবারে হুঁস নেই ছোটবাবুর। চুরি করে সে ছোটবাবুর ঠোটে চুমো খেয়েছে। ছোটবাবুর গালে গাল লাগিয়ে রাখছে। কেউ চলে আসতে পারে! এবং সে চারপাশে যখন দেখছে কেউ নেই সামনের ডেকে দু-একজন জাহাজি মাদুর পেতে ঘুমুচ্ছে, এবং পাশে সেই ছোটবাবুর দুটো পাখি, ওরাও বাকসের ভেতর ছোটবাবুর তৈরি ঘরে বেশ আছে, তখন সে বলতে চাইল, আহা ছোটবাবু তুমি কি মিষ্টি আহা তুমি কি সুইট। তোমার ঠোঁট দুটো ভীষণ ভারী। ভীষণ আদুরে। আমাকে তুমি কেন বুঝতে পার না।

    ছোটবাবু বিড় বিড় করে বকছে, আমার মুখে তুমি থুথু মাখিয়ে দিচ্ছ কেন? একটা পোকা!

    —কৈ, পোকা কোথায় দেখছি না তো?

    —ভিজে ভিজে কেন? জোঁকের মতো কেন?

    জ্যাক বলল, আস্তে ছোট। তুমি নেশা করে জাহান্নামে গেছ। কি যে হচ্ছে না! যেমন ডেভিড! আমার কেবিনের পাশে এমন হলে কি করে ঘুমোই? বোধ হয় ছোট টিণ্ডাল বাদশা মিঞা, ওয়াচের ফাঁকে উঠে এসেছে। ওকে দেখেই একেবারে বিরক্তিকর মুখ জ্যাকের। এই দ্যাখো তোমাদের ছোটবাবুর কাণ্ড। নিয়ে যাও তো।

    টিণ্ডাল বলল, ছোটবাবু তুমি সোরাব খেয়েছ? তোবা তোবা!

    জ্যাক বলল, আচ্ছা তুমি যাও টিণ্ডাল। আমিই দিয়ে আসছি।

    —না সাব। আপনি যান। আমি নিয়ে যাচ্ছি। সে দু-হাত জোড় করে বলল, কাউকে বলবেন না। ছোটবাবুর কি যে হয় মাঝে মাঝে।

    —আরে না না, আমি বলব না।

    জ্যাক বলল, মদ খেতে বারণ করবে। আমি যে এখানে দিয়ে গেছি, কাউকে বলবে না।

    —জী সাব। কেউ জানবে না। জানলে ছোটবাবুর ক্ষতি হবে।

    জ্যাক তারপর লাফিয়ে লাফিয়ে ডেক পার হয়ে গেল। সে ঘুরে ঘুরে বোট-ডেকের ওপর দিয়ে হাঁটতে থাকল। সে চুলে হাত রেখে নক্ষত্রের ভেতর, অথবা এই নদীর জলে যে আবহমান কাল ধরে কলকল শব্দ সারা মাস কাল ধরে ক্রমান্বয়ে নেমে যাচ্ছে সমুদ্রে, তাদের কাছে সে যেন ছুঁড়ে দিচ্ছে তার আশ্চর্য অনুভূতির খবর। তার কিছুতেই ঘুমোতে ইচ্ছে হল না। সারা রাত সে জেগে থাকবে। যেন ঘুমিয়ে পড়লেই সকালের বাসি ফুল হয়ে যাবে সব। আহা! তাজা কি টাটকা আর কি মনোরম এই বেঁচে থাকা। সে কেবিনে ঢুকে তার প্রিয় গান, ইয়েস সেলর গো অন, মুভ অন, পা ফেলে পা তুলে, গো অন, মুভ অন। ইউ সি দি.সি, দি মুন, এ্যাণ্ড দি লিটল স্টার। তাজা টাটকা রক্তের ভেতরে সে নাচতে থাকল। গমগম করে বাজছে। তার রেকর্ডের বাজনা সমস্ত মিসিসিপির জলে তরঙ্গ তুলে ক্রমে কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে।

    আর তখনই মনে হল দুটো চোখ পোর্ট-হোলে। সঙ্গে সঙ্গে ওর শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। গোপনে ওকে কেউ এতক্ষণ দেখছিল। পোর্ট-হোলের কাঁচ বন্ধ করতে কখন ভুলে গেছে। উত্তেজনায় সে যখন অধীর, তখন গোপনে কেউ পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে দেখতে পারে তার মনেই ছিল না। চোখ দুটো ভীষণ জ্বলছিল লোকটার। অস্পষ্ট আলোতে সে বুঝতে পারেনি, কে, তবু যখন মনে করতে পারল, তখন তার শরীরে আর বিন্দুমাত্র সাহস থাকল না। আর এই নাচ দেখে কেউ ভেবে ফেলতে পারে সে মেয়ে, বুঝে ফেলবে, সে বনি। লোকটা আর্চি বাদে কেউ নয়। শয়তানের মতো জাহাজে উঠেই তাকে অনুসরণ করে চলেছে।

    সে পোর্ট-হোলের কাঁচ বন্ধ করে দিল। পর্দা ফেলে দিল। তারপর দাঁড়িয়ে থাকল—কি করবে বুঝতে পারল না।

    জাহাজটা তখনও যাচ্ছে। নদীতে নানারকম বয়ার লাল নীল বাতি জ্বলছে নিভছে।

  • বিশ

    বিশ

    ।। বিশ।।

    আর আশ্চর্য, সকালে সবাই দেখল বড়-মিস্ত্রি বাক্স-পেটারা নিয়ে জাহাজ থেকে নেমে যাচ্ছে। বড়- মিস্ত্রির চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। আর্চি এবং ফোর্থ এনজিনিয়ার ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। যেন একটা এম্বুলেন্স ডাকলেই ভাল হত। জাহাজ বাঁধাছাঁদার পর পরই বড়-মিস্ত্রি রিচার্ড নেমে গেল।

    সবাই অবাক। জাহাজে বিন্দুমাত্র খবর রটেনি। সত্যি সত্যি বন্দর এলে বড়-মিস্ত্রি নেমে যাবে। যেন গোপন রাখা হয়েছিল ব্যাপারটা। কাপ্তান নেমে যাবার আগে হ্যাণ্ডসেক করেছেন। ডেক-অফিসার, এনজিন-অফিসাররা মিলে ওকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এল।

    এনজিন-সারেঙ ওর চোখ মুখ দেখে ঘাবড়ে গেছেন। এমন শক্ত সমর্থ মানুষটা কি পাতলা হয়ে গেছে! ভেতরে কি এমন কঠিন অসুখ তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না। মাঝে একবার এই কদিন আগে ভূত দেখেছিলেন বড়-মিস্ত্রি। জাহাজে এ জন্য কেউ ভাবে না। পুরানো ভাঙা জাহাজে এ-সব সংস্কার থেকে থাকে। সাহসী মানুষও মধ্যরাতে ঠাণ্ডা ঘরের ভেতর ঢুকতে ভয় পায়। অথবা সেই এলি-ওয়ে ধরে গেলে গা ছমছম করতে থাকে! ভূতের ভয়ে বড়-মিস্ত্রি জাহাজ ছেড়ে চলেছেন বিশ্বাস হয় না! আরও বড় কিছু কারণ। লক্কড়মার্কা জাহাজ, জাহাজে থাকতে ভাল লাগার কথা না। অথবা বাড়িতে কোনও দুর্ঘটনা। তিনি যতটা জানেন বড়-মিস্ত্রির নিজের বলতে ছোট এক ভাই আছে। রাউদ- এনজিনিয়ারিং ডকে কি একটা বড় কাজ করে। এবং স্ত্রী বলতে তিনি জেনেছেন, বন্দরে বন্দরে যারা তাঁর সঙ্গে রাত কাটিয়েছে তারাই।

    সুতরাং কোনও খবর না দিয়েই বড়-মিস্ত্রি যেন নেমে গেল। দুটো একটা প্রশ্ন সবাই করেছে, কিন্তু কেউ কোনও উত্তর পায়নি। বোধ হয় গোপন রাখার কথা বলা হয়েছে, আসলে যে বড়-মিস্ত্রি সেই রাত থেকে আর ঘুমোতে পারেনি, বুকের ভেতর রাত বাড়লেই মনে হত, একটা কালো হাত ‘পোর্ট-হোল দিয়ে গলে পড়বে। এবং সেই ভয়ে মানুষটা সারারাত জেগে বসে থাকত। একটা আশ্চর্য ম্যানিয়া হয়ে গেল। কাপ্তান নিজে ওর কেবিনে এক রাতে দেখেছেন, পোর্ট-হোলের দিকে সবসময় চোখ বড়-মিস্ত্রির। হাত ঝুলে পড়ছে ভেবে মানুষটার ভেতরে এক ধরনের ক্রমে অসুস্থতা গড়ে উঠছে। সে জাহাজের সবাইকে অবিশ্বাস করছে। তাকে সবাই চক্রান্ত করে জাহাজে তুলে এনেছে এমন একটা ভাব যেন, এবং কি করে যে ওর কি হয়ে গেল! এ-জাহাজে থাকলে সে ভয়ে মরে যাবে। এমন মনে হলে, কাপ্তান বেতার সংকেতে জানিয়ে দিলেন বড়-মিস্ত্রি ভীষণ অসুস্থ। নিউ-অরলিনসের ঘাটে সে নেমে যাচ্ছে। যদিও ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখবার দরকার ছিল, কেন এমন হল, কিন্তু পরে মনে হয়েছে, জাহাজ থেকে নেমে গেলে যদি সে ভাল হয়ে যায়, তবে আর এতগুলো লোককে ঘাঁটিয়ে লাভ নেই।

    জাহাজে এরপর দুটো বিশেষ ব্যাপার দেখা গেল। যেমন মৈত্র কেন জানি অমিয়র সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিল। তাছাড়া জ্যাককে আর বেশি ডেকে দেখা যেত না। জ্যাক সারাটা দিন প্রায় কেবিনেই থাকত। কাপ্তানের সঙ্গে কখনও বের হয়ে যেত। নিজের কেবিনে দরজা বন্ধ করে বসে থাকত। আবার তিন চারদিন দেখা গেল, জ্যাক সব সময়ই কেবিনে। বেরই হচ্ছে না। কাপ্তান-বয়, গরম জল দিয়ে আসছে মাঝে মাঝে। একটা হট-ওয়াটার ব্যাগ নিয়েও দু-তিন দিন দেখেছে কাপ্তান ওপরে উঠে গেছেন। বোধহয় জ্যাক অসুস্থ। কিন্তু কি অসুখ কেউ বলতে পারল না। এবং জাহাজ সালফার বোঝাই হয়ে যখন ফের মিসিসিপি ধরে নেমে যাচ্ছিল, তখন আরও তাজ্জব খবরে জাহাজের সবাই অবাক হয়ে গেল।

    সারেঙ এসে বললেন, তোকে ছোটবাবু, কাপ্তান ডেকেছেন

    ছোটবাবুর হাঁটুতে কাঁপুনি লেগে যায়। কাপ্তান এ-ভাবে কেন যে বার বার অযথা ডেকে পাঠান। কি কারণ, সে জানতে চাইলে সারেঙসাব বললেন, তুই যা না। তোকে তিনি খারাপ কিছু বলবেন না। খারাপ বললে মনে রাখবি, আমাকে বলতেন। ভাল জামা কাপড় পরে যাবি। যা অগোছালো তুই।

    ছোটবাবু তখন কেমন মানুষটাকে জাহাজে বাপ-পিতামহের মতো না ভেবে পারে না। এবং যা হয়ে থাকে জাহাজে কাপ্তান ডেকে পাঠালেই খুব বড় খবর। আবার ছোটবাবু লকারের আয়নায় নিজের মুখ দেখে নেয়। গরম বলে সে সাদা ট্রাউজার পরেছে, আর নীল রঙের ঢোলা গেঞ্জি। চুল বড় বড় বলে মাথাটা বেশ বড় এবং নীল দাড়ি। সে টের পেল জাহাজে সে সত্যি ভীষণ সুপুরুষ। সে খুব সহজভাবে কাপ্তানের সঙ্গে কথা বলবে। যেমন সারেঙসাবকে নিজের ভালমন্দের অভিভাবক ভাবলেই তার আর ভয় থাকে না। শুধু শ্রদ্ধা, সমীহ থাকে। সে কাপ্তানের সঙ্গে ব্যবহারে শ্রদ্ধা এবং সমীহের ভাবটুকু বজায় রাখবে।

    বের হবার মুখে দেখল সবাই ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। বন্ধু, অনিমেষ ছুটে এসেছে। মনু, মান্নান সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কাপ্তানের ডেকে পাঠানো একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার তাদের কাছে। ওদের মুখ খুব শুকনো দেখাচ্ছে। প্রায় যেন ফাঁসির আসামীর মতো মুখ। ছোটবাবু বের হয়ে ওদের মুখ দেখেই হেসে ফেলল। বলল, কিরে কে মারা গেছে! সে ব্যবহারে বেশ সহজ স্বাভাবিক দেখাতে চাইল।

    —বাড়িয়ালা তোকে ডাকল কেন?

    —কি করে বলব।

    —তুই কিছু করেছিস?

    —কি করব! কেবল ডেবিডের সঙ্গে পালিয়ে মদ খেয়েছিলাম। আর তো কোন দোষ করেছি বলে মনে হচ্ছে না।

    —যখন তখন কেন যে ডেকে পাঠায়। এবং কথা বলতে বলতে সবাই গ্যালি পর্যন্ত এগিয়ে গেল। আর কেউ নামল না নিচে। সারেঙসাব আগে আগে যাচ্ছেন। পেছনে ছোটবাবু। পর পর দুটো ফল্কা তারপর চিফ-কুকের গ্যালি, পাশে এলি-ওয়ে, ভেতরে ঢুকলেই কার্পেট পাতা। কার্পেটের ওপর দিয়ে ছোটবাবু হেঁটে গেল। এবং দেখতে পেল, পাঁচ নম্বর মিস্ত্রির ঘর খালি। এ-ভাবে অন্য সব কেবিন বাইরে থেকে লক করা। সে হেঁটে গেল। সে দেখল, ডাইনিং-রুমে সবাই বসে রয়েছে। প্রায় সব অফিসারেরা।

    এনজিন-অফিসাররা একদিকে, ডেক-অফিসারেরা একদিকে। মাঝখানে কাপ্তান। এনজিনসারেঙ ছোটবাবুকে ডাইনিং-হল পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েই চলে গেলেন। সারেঙ চলে যেতেই সে ভীষণ ঘাবড়ে গেল। তবু কোনরকমে ডাইনিং হলে ঢুকেই বলল, গুড মর্নিং।

    সেকেন্ড অফিসার ডেবিড মুচকি হাসছে। সে তাকাল ডেবিডের দিকে। তারপর কাপ্তান, এবং শেষে একে একে সবাইকে দেখল। জ্যাককে আশা করেছিল। জ্যাক নেই। সবাই যে যার পুরু ইউনিফরম পরে বসে আছে। এবং সবাইকে মনে হচ্ছিল, ভীষণ জাঁকজমকের ভেতর রয়েছে তারা। সে এ- সব দেখে আরও ঘাবড়ে গেল। মুখে আবার সেই রক্ত চাপ, মাথাটা ঝিম-ঝিম করছে। সে বুঝতেই পারছে না এ-ভাবে সবার সামনে কাপ্তান তাকে ডেকে কি বলতে চান। অথবা এমন কি সে কিছু করেছে, যা সবার কাছে এখন বলা দরকার।

    কাপ্তান ওকে তখন বললেন, প্লিজ সিট দেয়ার মাই বয়। তিনি পাশের একটি চেয়ারে ওকে বসতে বললেন।

    ছোটবাবু সত্যি এত ভাবতে পারে না। তার পক্ষে এসব কথা খুব সম্মানের। সে জানে, চারপাশে ক্রুদের ভেতর এখন ভীষণ উত্তেজনা। এ-ভাবে ডেকে নেবার কি কারণ! ছোটবাবুর জন্য কি কোন দুঃসংবাদ আছে! ওর দেশ থেকে কি কোন মারাত্মক খবর এসেছে! কেন এ-ভাবে ডেকে আনা, এবং এমন একটা পরিবেশের ভেতর তাকে এ-ভাবে বসিয়ে রাখা! সে একেবারেই বুঝতে না পেরে হতবাক হয়ে গেল। নানাভাবে চেষ্টা করেও সে তার মুখ সহজ স্বাভাবিক রাখতে পারল না। মুখে চোখে ওর কেমন দুশ্চিন্তা ফুটে উঠেছে।

    কাপ্তান বললেন, মাই বয়, ভয়েজ কেমন লাগছে?

    —খুব ভালো স্যার।

    –একঘেয়ে লাগে না?

    —তা লাগে। মাঝে মাঝে লাগে।

    মাস্টার তার পাইপের ছাই টিপে টিপে আবার আগুন ধরাবার সময় বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। বলেই তিনি তাকালেন মেজ-মিস্ত্রি আর্চির দিকে। যেন আর্চিকেই এ-কথাগুলো বলা। তিনি বললেন, তোমাকে সব বলেছি মিঃ আর্চি। এখন থেকে তবে ছোটবাবু তোমাদের ছ’নম্বর

    আর্চি কোনোরকমে অষুধ গেলার মতো বলল, হ্যাঁ ছ’নম্বর।

    —ছোটবাবু ভাল কাজ জানে না। তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নাও।

    মেজ মিস্ত্রি বলল, তাই হবে।

    ছোট এ-সব কি শুনছে! সে কেন পারবে এমন সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অথচ সে কাপ্তান হিগিনসের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারছে না। মানুষটা সত্যি যেন অনেক বড়। তিনি যা বলবেন, সবাই মাথা পেতে নেবে, তাকে নিতে হবে। তবু যেন সে বুঝতে পারল, এনজিনে কাজ করার মতো বিদ্যা- বুদ্ধি তার নেই।

    তখনই আবার হিগিনস বললেন, উইনচ-রিপেয়ারের কাজগুলোতো তোমার মোটামুটি জানা?

    ছোটবাবু বলল, সামান্য স্যার।

    —আপাতত এভাবে চালিয়ে যেতে পারলেই হবে।

    ছোট্ট বলল, কিন্তু স্যার……। কিন্তু কাপ্তান ওকে কথা বলার সুযোগ দিলেন না। ডেবিড আগের মতোই ওর দিকে চেয়ে আছে। খুব খুশি ডেবিড। সবাই চেয়ে আছে। কেবল আর্চির গোমড়া মুখ চোখ তাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। আর্চি কিছুতেই নিজের এই অবমাননা যেন সহ্য করতে পারছে না। কোথাকার একটা অনভিজ্ঞ নেটিভ জাহাজে উঠেই সবার মন জয় করে ফেলল। এখন যেন ইচ্ছে করলে এই ছোটবাবু জাহাজে অনেক কিছু করতে পারে। আর্চি কিছুতেই কাপ্তানের বিরুদ্ধে যেতে পারছে না। চিফ জাহাজ থেকে নেমে যাওয়ায় ওরও একটা প্রমোশন কোম্পানীর ঘরে হয়তো হয়ে যাবে। কাপ্তান হিগিনিস বাদ সাধলে তার কিছুই হবে না। এবং তেতো ওষুধ গেলার মতো সে বলল, একবার পরীক্ষা করে নিলে হত না। ওর চেয় বেশি অভিজ্ঞ অনেকে আছে। কশপ ভাল কাজ জানে, ওকে দেখা যেতে পারত।

    কাপ্তান বললেন, জাহাজের অবস্থা ভাল না। বয়সী মানুষ দিয়ে হবে না। আমাদের এখন ইয়াং এনারজেটিক লোকের দরকার।

    মেজ-মিস্ত্রি আর্চি বুঝল, কাপ্তান নিজের সিদ্ধান্তে স্থির। সুতরাং সে চুপ করে থাকল।

    কাপ্তান বললেন, নাউ বয়, এখন থেকে তুমি ডাইরেকট মেজ-মিস্ত্রির আন্ডারে। তাঁকে তুমি ভক্তি শ্রদ্ধা করবে। তিনি এখন তোমার বস। তাঁর মর্জি মতো তোমাকে এখন থেকে চলতে হবে। তারপর থেমে বললেন, তুমি এমন কিছু করবে না যাতে তিনি এতটুকু দুঃখ পান।

    ছোটবাবুর এখন আবেগে গলা বুজে আসার মতো। সে ভাবতেই পারেনি এনজিন-রুমের ছ’নম্বর সে কখনও হতে পারবে। আজ থেকে সে জাহাজের একজন দায়িত্বশীল লোক।

    তার খাবারের মেনু আলাদা। সে ভাল পোশাক পরতে পাবে। স্যাবি পোশাক পরে থাকতে হবে না। মাইনে সে পাবে অনেক বেশি। কত পাবে এখনও ঠিক জানতে পারেনি, তবু এখন যা আছে তার চেয়ে কুড়ি গুণ বেশি। সে এখন থেকে ডাইনিং হলে খেতে আসবে। তার জন্য একটা কেবিন থাকবে। মেস-রুম-বয় তাকে দেখলেই সেলাম ঠুকবে। জাহাজিরা তাকে দেখলেই ছ’নম্বর বলবে। জাহাজে সে এ-খবরটা কতক্ষণে সবাইকে যে দিতে পারবে!

    আর তখনই কাপ্তান সবাইকে বললেন চলে যেতে। এবং সারেঙকে ডেকে পাঠাবার জন্য বললেন। বোধহয় এখন ওঠার দরকার এমন ভেবে ছোটবাবু উঠতে যাবে, কাপ্তান হিগিনস এসে ওর সামনে দাঁড়ালেন। বাঁধানো দাঁত জিভের ওপরে তুলে আবার মাড়িতে ফিট করে চারপাশে দেখলেন। কেউ নেই। তখন ধীরে ধীরে বললেন, মাই বয়, ফেস এনি হিউমিলেশান এ্যান্ড পানিশমেন্ট লাইক এ সেলর। ছোটবাবু বুঝতে পারল না এতে হিউমিলেশানের কি আছে! তারপরই যেন আর্চির চোখ তাকে অনুসরণ করতে থাকল। সে বলল, আই উইল ডু স্যার।

    তিনি ফের বললেন, মাই বয়, অলওয়েজ রিমেম্বার, ওয়ান হ্যান্ড ফর ইউরসেলফ, এ্যান্ড ওয়ান ফর দা শিপ।

    সে বলল, ইয়েস আই উইল।

    তারপর তিনি বললেন, সো দিস ইজ দা লাইফ এট সি। তুমি যেতে পার।

    কেমন কিছুটা টলতে টলতে ছোটবাবু বের হয়ে যেতে থাকল। পৃথিবীতে এ-কাজটা তাকে এমন অহংকারের চূড়োয় তুলে দিতে পারে সে কখনও ভাবে নি। সে যেন হেঁটে যাচ্ছে না, দৌড়ে যাচ্ছে, সে যেন দু-হাত ওপরে তুলে বলতে চায়, আমার কি হয়েছে দ্যাখো, আমি কত বড় দ্যাখো। কিন্তু কিছুটা এসেই সে থমকে দাঁড়াল। সব ক্রুদের জটলা একেবারে ভান্ডারি-গ্যালির সামনে। ওরা অপেক্ষা করছে। কি খবর! কোন দুঃসংবাদ। সে বলল ভীষণ ভীষণ দুঃসংবাদ, সে উঠেই প্রথম দেখল মনু সামনে, সে মনুর গলা জড়িয়ে ধরল, ভীষণ ভীষণ দুঃসংবাদ, সে বলল, মৈত্রদা কোথায়, চাচা কোথায় অমিয়, এই অমিয়—চাচা কোথায় গেল!

    সকলে অবাক। ভেবে পাচ্ছে না ছোটবাবু এমনভাবে সবাইকে খুঁজছে কেন!ওরা বলল, কি হয়েছে! মৈত্র ছুটে এসেছে নিচ থেকে। যেন বড় রকমের একটা দুঃসংবাদ বয়ে আনবে ছোটবাবু। ওরা নিচে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসেছিল। ছোটবাবুর হাঁকডাকে ওরা লাফিয়ে ওপরে ওঠে এল। আর সঙ্গে সঙ্গে মৈত্রের গলা জড়িয়ে ধরে বলতে বলতে কেঁদে ফেলল ছোটবাবু, আমাকে কাপ্তান এনজিনরুমের ছ’নম্বর করে দিয়েছে। আমি অফিসার হয়ে গেলাম দাদা। কাল থেকে তোমাদের সঙ্গে আর থাকতে পারব না।

    ততক্ষণে সারেঙও ফিরে এসেছেন। এসেই বললেন, বাড়িওয়ালা কালই ওর কেবিনে সব সামান রেখে আসতে বলেছে। ওর কেবিন দেখে এলাম। রঙ করতে হবে। আজই করতে হবে।

    মৈত্র বলল, এই অমিয়! এমন একটা খবরে মৈত্র গলে জল হয়ে গেছে। অমিয়র উপর রাগ নেই।

    অমিয় বলল, কি! মৈত্র ফের কথা বলায় সে খুব খুশি।

    —রঙ করতে হবে।

    মান্নান বলল, আমরা রঙ করব।

    মনু বলল, কি কন!

    মান্নান বলল, আমি আর ইয়াসিন রঙ করব।

    —ক্যান। আমরা কি করতে আছি। ছোটবাবু এনজিন রুমের। ছোটবাবু আমাদের লোক।

    এনজিন-সারেঙ বলল, মৈত্রমশাই ছোটবাবু আর আপনার হেপাজতে থাকল না। বলতে বলতে কেমন গলা ধরে এল তার।

    আসলে এনজিন-সারেঙ নিজের দুঃখটা এই বলে ঢাকা দিতে চাইছেন। ছোটবাবুর ওপর আজ থেকে তাঁর আর কোন দাবী থাকল না। ছোটবাবুর ভাল-মন্দের জন্য তার যা কিছু দায়িত্ব—বাড়িয়ালা এক কলমের খোঁচায় তা কেড়ে নিলেন। ছোটবাবুর জন্য ভেতরে কি যে মায়া! কারণ ছোটবাবুকে আর এদিকে বেশি আসতে দেখা যাবে না। আজ থেকে ছোটবাবুর জাত-মান বেড়ে গেল। অথচ সারেঙ-সাব খুব খুশি, ছোটবাবুকে এমন একটা কাজই মানায়। খুব-খাটুনির কাজ, আর মেজ-মিস্ত্রি আর্চির কথা মনে হলেই সারেঙ-সাব কেমন শক্ত হয়ে যান। ডেকের ওপর মেজ মিস্ত্রি যেভাবে পাঁচ নম্বরকে হেনস্থা করে থাকে, কিল চড় ঘুষি মেরে থাকে, পাঁচ নম্বর কাজে ভুল করলে, লাথি মেরে ফেলে দেয়, যদি ছোটবাবুকে এ-ভাবে এবং এভাবে যেন একটা কিছু হয়েও যাবে—ভয়ে সারেঙের বুকটা কেঁপে উঠল। যেন একটা হাঙ্গরের মুখে বাড়িওয়ালা ইচ্ছে করেই ছোটবাবুকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। এখন থেকে মেজ-মিস্ত্রি ছোটবাবুর সব। তিনি তার কেউ না, তিনি ফালতু।

    সারেঙ-সাব বললেন, আমার সঙ্গে মনু অমিয় আয়। অর্থাৎ সারেঙসাব আর দেরি করতে পারছেন না। বোধহয় বেশি কথা বললে, আবেগে চোখ ঝাপসা হয়ে যেতে পারে ভেবে অমিয় এবং মনুকে নিয়ে চলে গেলেন। নিজে দাঁড়িয়ে ছোটবাবুর কেবিনে রং করবেন। সাদা, নীল যেখানে যে-রং লাগালে মানায় এবং এমন চাকচিক্যময় করে তুলতে হবে, যেন ছোটবাবুর কেবিনের পাশে আর সব কেবিন ভীষণ ম্যাড়ম্যাড়ে, ছোটবাবুর কেবিনে অন্য অফিসাররা এলেই যেন বুঝতে পারে—এ কেবিন ছাড়া ছোটবাবুকে মানায় না।

    ছোটবাবু তারপর ফোকসালে নেমে গেল। সবাই এখন ছোটবাবুর চারপাশে। ওরাও নেমে গেল। কত বড় সম্মান! যেন এখন এই সাধারণ জাহাজিরা বলতে চায়, আমরাও কম কিসে, আমাদের আর এত ছোট ভেব না। আমাদের লোক ছোটবাবু। তোমাদের ধার দিচ্ছি। এবং এর ভেতরই সেজে এল মজুমদার। সে যা করে থাকে, ঘুরে ঘুরে নাচে, এবং পায়ে ঘুঙুর। কারণ, এছাড়া ছোটবাবুকে ওরা কি দিয়ে বিদায়বেলার উৎসবে বলতে পারে তুমি আমাদেরই লোক। ছোটবাবু আমাদের ভুলে যেও না।

    কেবল মৈত্র পাশে বসে ভাবছে। সে এই নাচ গান হল্লা শুনছে না। চা আসছে, চপাটি আসছে, এরই ভেতর চপাটি সবাই খাচ্ছে যেন ওরা ভেবে ফেলেছে রঙ-বেরঙের কাগজের মালা, ফুল এবং সব নানা রঙের ফেস্টুন ছোটবাবুর বিদায় উৎসবে উড়ছে, ঝুলছে। তার ভেতরই তারা চা খাচ্ছে। আসলে এটা চা নয়, যেন পানীয় এবং মাথার ওপরে ছাদ, সাদা রঙের। একটা মরা আলো ফোকসালে। এতে ওদের আসে যায় না। ওরা ভেবে ফেলেছে এখানে এখন জ্বলছে হাজার রকমের নীল বাতি, উজ্জ্বল বর্ণমালার ভেতর ওরা নেচে গেয়ে ছোটবাবুকে হেইল করছে।

    কেবল ছোটবাবু চুপচাপ। এবং মৈত্রদা ছোটবাবুকে দেখছিল। ওদের এখন থামা উচিত। মৈত্র ওদের বলল, এবার তোরা যা। ছোটকে একটু একা থাকতে দে।

    ছোটবাবু বলল, না, না। ওরা থাক না। জান মৈত্রদা, আমার ভাল লাগছে না। কেমন ভয় ভয় করছে। তোমাদের ছেড়ে যেতে আমার ভাল লাগছে না।

    —ভয়ের কি আছে!

    —আমি তো কিছু ঠিক জানি না। ট্রেনিঙে যা শিখেছি, আর এই পাঁচ ছ মাসে পাঁচ নম্বরের সঙ্গে কাজ করে করে যা বুঝেছি।

    মৈত্র বলল, কি বা কাজ, উইনচ ঠিকঠাক রাখা, ফিলটার পরিষ্কার করা, টিউবে বয়লারের জল রোজ একবার টেস্ট করা—আর কি, তবে তুই কিছু বইটিই কিনে ফেলবি। তোর কাজে অনেক সুবিধা হবে।

    মৈত্র অবশ্য জানে কিসের জন্য ছোটবাবুর মুখ ব্যাজার। এতদিন একসঙ্গে থাকলে একটা মায়া গড়ে ওঠে ওদের ছেড়ে থাকতে ছোটবাবুর ভাল লাগবে না। এবং ছোটবাবু বোধহয় মনে মনে টের পেয়েছে—মেজ-মিস্ত্রি আর্চির নিষ্ঠুরতার শেষ নেই। মৈত্র বলল, ভয় কি আমরা তো আছি।

    ফোকসাল এখন ফাঁকা। কেবল ছোটবাবু আর মৈত্র বসে রয়েছে। অন্য ফোকসালে সবাই এখন ছোটবাবুর গুণগান করছে। আসলে যখন জাহাজে ছোটবাবু উঠে এসেছিল, তখনই সবাই টের পেয়েছে, ওদের মতো এমন ছোট কাজ করার লোক ছোটবাবু নয়। বাদশা মিঞা বলেছে, জানো ছোটবাবু কত লেখাপড়া জানা ছেলে। আমাদের মতো সে কেন ডেকে এনজিনে পড়ে পড়ে মার খাবে। ঠিক লোক এবার থেকে ঠিক জায়গায় চলে গেল। এতদিন ছোটবাবু তাদের সঙ্গে কাজ করেছে এই যথেষ্ট। এমন যে হবে সেটা এখন কে বেশি টের পেয়েছিল তা নিয়ে কোথাও কোথাও ঝগড়া বচসা পর্যন্ত আরম্ভ হয়ে গেল। এবং তখন বারোটা বাজলে, ওয়াচে মৈত্র একবার নেমে দেখে এল, সব ঠিকঠাক আছে কিনা। জাহাজ ভীষণ আস্তে চলছে বলে, কয়লা কম হচ্ছে। আর আমেরিকান কোল, খুবই কম কয়লায় বয়লারে স্টীম উঠে যায়। ছাই একেবারেই হয় না। যেন তেলের মতো জ্বলতে থাকে। তখন কোলবয়ের তেমন কাজ থাকে না। দু-চার বেলচা কয়লা মারলেই হয়ে যায়। সুতরাং তিনজন ফায়ারম্যান নিচে ঠিকঠাক কাজ চালিয়ে নিচ্ছে। তবু একবার দেখা দরকার ভেবে বোটডেকে উঠে যাবার সময় দেখল, সারেঙ-সাব এলি-ওয়ে ধরে বের হয়ে আসছেন। আর অবাক, বিচিত্র রং- এ সারেঙ-সাবের সাদা বয়লার স্যুট অদ্ভুত দেখাচ্ছে। চুলে দাড়িতে রঙ লেগেছে। নাকে কিছুটা সাদা রঙ। সারেঙ-সাবকে একজন বুড়ো জোকারের মতো দেখাচ্ছে। ওর হাসি পাচ্ছিল। অনেক কষ্টে হাসি চেপে বলল, সারেঙ-সাব মুখটা মুছে ফেলুন।

    সারেঙ-সাব বললেন, বুড়ো হলে কি হবে, কাজ কাম হাতে অনেকদিন করি না বলৈ কি হবে, এখনও পারি, রং লাগাতে পারি। অমিয় মনু পারে না। যত বলি ঠিক হচ্ছে না, তত বলে আর কি হবে সারেঙ-সাব। তখন কি করি বলুন, বুরুশ হাতে নিলাম। বললাম, দ্যাখ, দেখছিস—বুরুশের দাগ কোথায় ভেসে উঠছে!

    মৈত্র বুঝতে পারল, ছেলের জন্য নিজে রঙ করে দিতে না পারলে সারেঙ সাবের মন ভরছে না। সারেঙ-সাবের কি এখন গর্ব। ছেলে তার মান-সম্মান যখেনি শুধু, সবার ইজ্জত বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি আবার ছেলেমানুষের মতো বললেন, আসুন না, দেখবেন কি রকম রঙ করলাম। কেমন দেখাচ্ছে। বলে প্রায় জোরজার করে মৈত্রকে ধরে নিয়ে গেল। মৈত্র এদিকে কখনও আসেনি। কার্পেটের ওপর দিয়ে সে কেন যেন দ্রুত হাঁটতে পারে না। সে তবু সারেঙ-সাবের সঙ্গে প্রায় দৌড়ে গেল। সারেঙ- সাব দরজা খুলে দিয়ে বললেন, দেখুন। ছাদে নীল রং, কশপকে বলেছি রং এক নম্বর দিতে হবে, দেয়ালে একটু ব্লু আর মেজেন্টা মিলিয়ে কি রং এনেছি দেখুন। কোথাও বুরুশের দাগ ভেসে উঠেছে? তবে!

    অমিয় মনু রং-এর টব আর বুরুশ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মৈত্র অমিয়কে বলল, তোরা কি! মনুকে বলল, সারেঙ-সাবকে তোরা রং করতে দিলি?

    —আমরা দিয়েছি!

    অমিয় বলল, সাবান জল দিয়ে যত ধুই তত বলেন, না সাফ হচ্ছে না। ঠিক হচ্ছে না। রং লাগালে চিৎকার করছেন, হচ্ছে না। বুরুশের দাগ ভেসে উঠছে। আমরা কি করব বল? একা একা সবটা করলেন।

    সারেঙ-সাব বললেন, কেমন হয়েছে বললেন না তো?

    —খুব ভাল!

    মৈত্র আর দাঁড়াল না। নিচে এক্ষুনি নেমে যেতে হবে। এবং যেতে যেতেই বুঝতে পারল, ছোটবাবু ফোকসাল ছেড়ে আসায় সবচেয়ে অসহায় যেন এই মানুষটা। এমনিতে তিনি কম কথা বলেন, কাজকামে ডুবে থাকেন। জাহাজের কোথায় কি করার দরকার, সবার আগে তিনি বোধহয় টের পান। ভীষণ সতর্ক নজর। এতদিন একবারও মনে হয়নি, জাহাজে মৈত্রের চেয়ে ছোটবাবুর জন্য কেউ বেশি ভেবে থাকে। ছোটবাবুর জন্য আরও একজন মানুষ এই জাহাজেই নিরন্তর মহামহিমের কাছে প্রার্থনা করে থাকেন সে জানত না। সে বলল, ছোটবাবু, তোমার কপাল দেখে আমার হিংসে হচ্ছে।

    আর এভাবেই পরদিন ছোটবাবু তার নিজের বলতে সবকিছু ছেড়ে অর্থাৎ ছোটবাবুর শরীরে এতদিন যে খোলস ছিল, এখন একেবারে ভিন্ন রকমের, এবং এভাবে স্বভাব পালটাতে সবারই কষ্ট হয়। ছোটবাবুরও হয়েছিল। ফোকসালটা এ-ক’মাসে এত প্রিয় হয়ে গেছল সে বুঝতে পারেনি। যেন কথা ছিল চিরদিন সে এখানেই থাকবে। মৈত্র এবং অমিয় অথবা অন্য জাহাজিরাই তার সব, আর কেউ আছে পৃথিবীতে ক্রমে যখন ভুলে যাচ্ছিল, ঠিক তখন জীবনে এই পরিবর্তন খুব হকচকিয়ে দিল।

    .

    প্রথম দিন সে কেবিনে ঘুমোতে পারেনি। পাঁচ নম্বর, ওয়াচে নেমে গেছে। চিফের কাজকর্ম মেজ- মিস্ত্রি চালাচ্ছে। মাঝে মাঝে মেজ-মিস্ত্রি ওয়াচেও নেমে যাচ্ছে। এবং উইনচের স্ট্রেপার বিয়ারিং, ওঠানামায় ক্ষয়ে গেছে। ভেতরে লাইনিং দিয়ে মেরামত করতে হবে। ফাইলের কাজ বেশি। পাঁচ নম্বর কুঁড়ে প্রকৃতির বলে, ফাইল সে ছোটবাবুকে দিয়ে অনেকবার করিয়েছে। এখন সে নিজে দু-দিকে সমান চাপ দিয়ে ঘসে ঘসে লোহার পাত, তামার পাত অথবা ব্রাশ ঘসে ঘসে ঠিক যত মিলিমিটার পাতলা দরকার করে ফেলতে পারে। এবং যখন ওপরে উঠে আসে, তখন দেখতে পায় নদী ক্রমশ আবার বিস্তৃর্ণ হয়ে যাচ্ছে। বিকেলের দিকে মোহনা পাবার কথা।

    তখন কাপ্তান বনির কেবিনে। জাহাজ মোহনা ছাড়িয়ে আবার সমুদ্রে ভেসে চলেছে। বনির শরীরে একটা রঙবেরঙের সিল্কের চাদর। বনি শুয়ে আছে। চোখ কনুই দিয়ে ঢেকে রেখেছে। তার কেবিনে যে হিগিনস এসেছেন সে যেন টের পায়নি। অথবা এমন এক অতলে ডুবে আছে যে মনে হচ্ছে বনি ঘুমোচ্ছে।

    হিগিনস মেয়ের মাথার কাছে একটা চেয়ার টেনে বসলেন। যেন তিনি তাঁর এই একমাত্র জাতকের কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছেন—এমন চোখ মুখ! অর্থাৎ বনির শরীরে সুহাস সুবর্ণ সব বাতিঘরেরা যে খেলে বেড়াচ্ছে তা তিনি বুঝতে পারছেন। এ-ভাবে পুরুষের মতো সেজে থাকতে বনির ভাল লাগছে না। অথচ উপায় নেই বলে থাকতে হচ্ছে। তবু ইচ্ছে করলেই হিগিনস সবাইকে বলে দিতে পারেন, আসলে বনি মেয়ে, সে জাহাজে মেয়ের মতোই থাকতে ভালবাসে—কিন্তু জাহাজের একঘেয়েমি এবং নিষ্ঠুরতা বনিকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিতে পারে। বনিকে তিনি মেয়ে বলে কিছুতেই জাহির করতে পারছেন না। এটা তাঁর ভয়। ভয় বলেই জোরজার করে তিনি সহজ সরল সত্যকে বিকৃত করছেন। মনে মনে বনির কাছে এখন খুব ছোট হয়ে যাচ্ছেন। যেন বলার ইচ্ছে, বনি আর কিছুদিন, এই যতদিন জাহাজ ফের হোমে না ফেরে ততদিন তারপর আর কখনও তোমাকে এভাবে থাকতে হবে না। তোমার জন্য আমি সুন্দর সুন্দর পোশাক কিনে দেব।

    তিনি ডাকলেন, বনি।

    বনি চোখ থেকে হাত সরাল না। বলল, এখন আমরা কোথায় বাবা?

    মোহনা ছাড়িয়ে গেছি। কিছু আর কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

    —বনি আর কিছু বলল না। সে যেমন চুপ করে জেগেছিল তেমনি আবার অতলে ডুবে গেল।

    —কাপ্তান বললেন, ব্যথাটা কেমন?

    —নেই।

    —ভাল লাগছে?

    —ঘুম পাচ্ছে বাবা।

    —তুমি ভয় পাওনি তো?

    —না বাবা।

    —এখন এ-সব তোমার হবে। তুমি হয়ে বড় যাচ্ছ বনি।

    বনি বলল, বাবা, আমার কেবল ঘুমোতে ইচ্ছে করছে।

    হিগিনস মেয়ের কপালে হাত রাখলেন, সুন্দর ছোট্ট কপাল বনির। চুল ঘন এবং নরম বলে ভারি মনোরম লাগছে হাত বুলাতে। তিনি কপাল থেকে বনির চুল সরিয়ে দিলেন। এবং ইচ্ছে হল আস্তে চুমু খেতে। বনির ঘুম আসছে, ঘুমোক। এই বিকেলে, সূর্য যখন সমুদ্রে নানা বর্ণমালার ভেতর অস্ত যাবে, তখন বনি, এই সাদা জাহাজের ভেতর ঘুমিয়ে পড়বে। তিনি বললেন, কিছু খাবে?

    —না বাবা।

    হিগিনস বললেন, আমরা নিউ-প্লাইমাউথ যাচ্ছি।

    —কোথায় বাবা?

    —আমরা পানামা খাল পার হয়ে যাব। তারপর পঁচিশ-ছাব্বিশ দিন জাহাজ একনাগাড়ে চলবে, একদিনের জন্য তাহিতিতে থামবে। রসদ এবং জল নেওয়া হবে। নিউ-প্লাইমাউথ, নিউজিল্যান্ডের ছোট্ট বন্দর।

    তাহিতি দ্বীপের কথা শুনেই—কবে যেন কার কাছে বনি দ্বীপের সব সুন্দর সুন্দর গল্প শুনেছিল। পৃথিবীর সব সুখী মানুষেরা তাহিতি দ্বীপে একবার যেন না গিয়ে পারে না। সে বলল, আমরা নামতে পারব বাবা?

    —তোমার খুব নামতে ইচ্ছে করে?

    বনি কি বলবে, সে এবার মুখ থেকে হাত সরিয়ে তাকাল। বড় বড় চোখে বাবাকে দেখছে। কী সুন্দর তার বাবা!

    কাপ্তান বনির চোখের দিকে তাকালে আর স্থির থাকতে পারেন না। বয়স হওয়ার জন্য এটা বোধহয় হয়েছে। তিনি না থাকলে বনির কেউ থাকবে না। বনি বড় হচ্ছে, আর কিছু বড় হলে ভাবনার থাকবে না। আর কিছুদিন তিনি পৃথিবীতে থাকতে চান। এই মেয়ে ঠিক ঠিক বড় হয়ে গেলে তিনি মরতে ভয় পাবেন না। কাজেই বনি এভাবে তাকিয়ে থাকলে, কারণ দেখতে পাচ্ছেন, বনির চোখ বড় অসহায়। কিসের একটা ভয় ওকে তাড়া করছে। চোখ দেখলেই টের পান সব। তিনি উঠে যাবেন ভাবছিলেন। কিন্তু চোখে যেন একটা আতঙ্ক বনির। তিনি বললেন, তুমি কি বনি কোন দুঃস্বপ্ন দেখেছ?

    —না বাবা।

    —মুখ চোখ দেখে মনে হয় কতদিন না ঘুমিয়ে আছ।

    বনি বলল, না তো।

    —তবে চোখ মুখ এত শুকনো কেন? একা থাকতে ভয় পাও?

    বনি হেসে দিল। বলল, ভয় পাব কেন?

    —তবু কেন যে তোমাকে দেখে ভাল লাগছে না!

    —শরীর ভাল না থাকলে এমন হবে না!

    যেন হিগিনস এবার স্বস্তি পেলেন। রিচার্ড জাহাজ থেকে নেমে গেছে। ওর কিছু ম্যানিয়া আছে। এসব ভারতীয়দের সঙ্গে কাজ করার অভ্যাস তার আগে ছিল না। প্রথম থেকেই সে খুব একটা খুশি ছিল না। কোম্পানী জোরজার করে ওঁকে পাঠিয়েছে। মনে হয় একটা অজুহাত দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত নেমে গেল।

    বনি উঠে বসল। বলল, তুমি খুব ভীতু বাবা।

    হিগিনস মেয়ের এমন কথায় সামান্য হাসলেন। তাঁকে কেউ কখনও এভাবে কথা বলতে পারে না। এই মেয়েটা তাঁর ভাল-মন্দ সব কিছু। এমন কি তিনি দেখেছেন, আজকাল বনি তাঁকে মাঝে মাঝে ঠিক শাসনের সুরে কথা বলে থাকে। বেশি খাটাখাটনি করলে রাগ করে খেতে যায় না। আচ্ছা আর হবে না, এই বলে অনেক বুঝিয়ে তবে বনিকে তখন খাওয়ানো যায়। আর বুঝতে পারছেন, ডাঙ্গার জন্য যা কিছু টান—এই ‘ছোট্ট সুন্দর ফুলের মতো মেয়েটার জন্য।

    হিগিনস বললেন, তুমি ঘুমোবে। ভুত-টুত জাহাজে, বাজে কথা

    বনি হেসে ফেলল। হেসে দিলে বনির ঝকঝকে দাঁত এত বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে চোখ দুটো এমন মায়াময় হয়ে যায়—যে মনেই থাকে না এই মেয়ে কিছুক্ষণ আগে মুখে অতিশয় আতঙ্কের ছবি এঁকে রেখেছিল। বনি বলল, আমি ভাল আছি বাবা। আমার জন্য ভাববে না। যেন বলতে চাইল ভয় আছে, আমি টের পাচ্ছি চারপাশে একটা ভয় ঘোরাফেরা করছে, কিন্তু যখন ছোটবাবুর কথা ভাবি তখন একেবারে ভয় থাকে না।

    সে বলল, বাবা, ছোটবাবু ঠিকমতো কাজ করছে তো।

    —পারছে না। আর্চি তো কাল বলল কি একটা পার্টস ভেঙে ফেলেছে ছোটবাবু।

    আর তক্ষুনি বিষন্ন হয়ে গেল বনির মুখ। আবার সেই আতঙ্ক ক্রমে সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল।

    হিগিনস মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কি যেন বুঝতে পারলেন। বললেন, প্রথম প্রথম একটু এমন হবেই।

    বনি বলতে পারল না, আর্চি তোমাকে ঠিক ঠিক রিপোর্ট করছে না বাবা। আমি আবার ডেকে বের হতে পারলে বুঝতে পারব। আর্চি তোমাকে বানিয়ে যত রাজ্যের রিপোর্ট করে যাবে।

    এবং বোধহয় এ-ভাবেই জাহাজে দুই প্রতিদ্বন্ধী এখন হেঁটে বেড়াচ্ছে। বনির কপালে হিগিনস যাবার সময় ধীরে চুমু খেলেন। বাবা চলে গেলে দরজা বন্ধ করে বনি আবার বসে থাকল ভেতরে। কিছু ভাল লাগছে না। ছোটবাবুর সঙ্গে যেন তার কতদিন দেখা হয়নি। এই তিন চারদিনেই মনে হয়েছে—কবে কোন দ্বীপে একবার যেন সেই মানুষটিকে সে দেখেছিল। তার শরীরে লম্বা আলখাল্লা। সমুদ্রের পাড়ে পাড়ে সে হেঁটে যাচ্ছে। শরীরে তার সুবর্ণ নদীর জলের ঘ্রাণ। সমুদ্রের নীল জল পায়ে তার আছড়ে পড়ছে। মানুষটাকে সে অনেকদিন ভেবেছে, সামনে দাঁড়িয়ে দেখবে। দেখতে পারেনি। যতবার সে হেঁটে আগে যাবার চেষ্টা করেছে ততবার মনে হয়েছে পারছে না। সে হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে। আলখাল্লায় পায়ের পাতা ঢাকা তার। সমুদ্রের নীল জলে তা ভিজে যাচ্ছে। এবং কোনো সম্রাটের মতো সে যখন হেঁটে যায় বনি যেন ছোট্ট মেয়ের মতো তাকে দেখতে ভালবাসে। এবং কতকাল থেকে, যেন সেই শিশুবয়েস থেকে, অথবা বলা যায় শৈশবের প্রারম্ভে কিংবা তারও পরে সে এমন একজন মানুষকেই ভেবে আসছে। নরম সবুজ নীল দাড়ি, মাথায় একরাশ নরম নীলাভ চুল আর বড় বড় চোখ, লম্বা, ঠিক সম্রাট সিজারের মতো অথবা মনে হয়, সে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, বনি পেছনে পেছনে ছুটেও তার নাগাল পাচ্ছে না। যেন সে তখন ডাকছে, হেই অহংকারী যুবক, তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছ না! আমি বনি!

  • একুশ

    একুশ

    ।। একুশ।।

    এ-সময়ে এ-সমুদ্রে কিছু ঝড়ঝঞ্ঝা থাকে। এবং চার পাঁচ দিন ধরে আকাশ গরম সিসের মতো, বিদ্যুতের ফালা ফালা আকাশফাটানো গুম গুম শব্দ। জাহাজ আবার কিছুদিন লাফিয়ে লাফিয়ে প্রায় দ্রুতবেগে কোন অশ্বারোহী পুরুষের দুর্গম বনভূমি পার হয়ে যাবার মতো ছুটে যাচ্ছে। হিগিনস তখনই ভেতরে ভীষণ পুলক বোধ করেন। তিনি ঝড়ের দরিয়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন। সিসের মতো আকাশের মেঘ এবং ঘন বৃষ্টিপাতের ভেতর নীল জলরাশির অজস্র সাদা ফেনা, এবং চারপাশে যেদিকে তখন চোখ যায় যেন, হাজার হাজার অতিকায় প্রাগৈতিহাসিক জীব জলের নিচে ফুঁসে বেড়াচ্ছে। জলের রঙ নীল থাকছে না। একেবারে সাদা। পঁচিশ ত্রিশ ফুট উঁচু ঢেউ সব ফুঁসে ফুঁসে ফুলে ফুলে যত জাহাজটার দিকে এগিয়ে আসে তত এক মজার খেলা, ওরা পারে না। তাঁর এমন বিশ্বস্ত জলযানের সঙ্গে পারে না। ঢেউ কাটিয়ে ছোট শশকের মতো ঘাসের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে যেন ছুটে যাচ্ছে জাহাজটা। তিনি বুঝতে পারেন, এ-ভাবেই এক আকর্ষণ, যেন এই জাহাজ তখন জাহাজ থাকে না। কোনো ইতিহাসের বিশ্বস্ত অশ্বের মতো। আর তিনি অশ্বারোহী পুরুষ। সেই অশ্বারোহী পুরুষটি লাগাম ধরে আছেন। সমুদ্রের এইসব ঝড়ঝঞ্ঝা, বিক্ষুব্ধ তরঙ্গমালার ভেতর দিয়ে বেগে চালিয়ে জাহাজ মুক্ত আকাশের নিচে চলে এলে তখন সমুদ্র বিজয়ের কি যে আনন্দ! আহা, আনন্দ, আনন্দ ধরে না প্রাণে। হিগিনস সারা দিনমান নিজের সেই প্রিয় ডেকচেয়ারে বসে জাহাজ আর সমুদ্রের খেলা দেখতে দেখতে চোখ বুজে ফেলেন।

    তখন কেউ পাশে এসে দাঁড়ালেও টের পান না, কেউ দাঁড়িয়ে আছে। যেন এই যে চলে আসা, এবং জাহাজ, ঝড়ঝঞ্ঝা সবই মহামহিমের ইচ্ছায় চলে, তবু কেন যেন সব কিছুর ভেতর নিজেকেই খুব বড় এবং সর্বময় ভাবতে ভাল লাগে। যত বয়স বাড়ছে, তত ভাবছেন, নিজেকে সর্বময় ভাবার ভেতর কি আর আছে! তত তিনি বুঝতে পারেন, যতই বয়স বাড়ক, নিজেকে সর্বময় ভাবতে না পারলে, বেঁচে থাকার আনন্দ কোথায় যেন হারিয়ে যায়। এবং এ ভাবে যখনই চিন্তা-ভাবনা ক্রমে মগজ কুরে খায়, তখন রাতের অজস্র নক্ষত্রমালার ভিতর দাঁড়িয়ে সমুদ্র এবং আকাশের মাঝামাঝি হাত তুলে বলতে ইচ্ছে করে তাঁর—ঈশ্বর, আপনার এই অসীম সমুদ্রে, আমার ছোট্ট জাহাজ সিউলব্যাংকে রক্ষা করুন। তিনি তাঁর অহংকারের জন্য ঈশ্বরের কাছে এ-ভাবে আবার কখনও ক্ষমা প্রার্থনার সময় নতজানু হয়ে নীরবে চোখের জল ফেলেন।

    ন’দিনের দিন সিউল-ব্যাঙ্ক লিমন উপসাগরে এ-ভাবে নেমে এল। সামনে দেখা যাচ্ছে পানামা ক্যানেল অঞ্চলের সব পাহাড় শ্রেণী। ক্রমে তা মেঘের মতো সমুদ্রে ভেসে উঠছে। বোঝাই যায় না পাহাড়ের মাথায় খাল কাটা আছে। পাহাড়ের এত কাছে এসেও জাহাজিরা কিছু বুঝতে পারছিল না। জাহাজের স্পীড কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাহাজ এগুচ্ছে কি সেই ছায়া ছায়া পাহাড়টা এগিয়ে আসছে বোঝা যাচ্ছে না। বিকেলের দিকে সিউল-ব্যাংক একেবারে পাহাড়ের নিচে এসে থেমে গেল। সমুদ্রের ঢেউ পাথর অথবা পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে। এবং সব সময় মনে হচ্ছে জলের গভীরে এ-ভাবে চারপাশে পাহাড় এবং পাথর ডুবে যাচ্ছে আবার ভেসে উঠছে।

    আর সামনে, জাহাজিরা দেখল, লাইন দিয়ে সব জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে ও-পারে যাবে বলে। ছোটবাবু, জ্যাক কিছুতেই বুঝতে পারছে না, খালটা কোথায়। ডেবিড এলে বোঝা যেত। কিন্তু ডেবিডের এখন চব্বিশ ঘন্টা সতর্ক থাকতে হবে। কিনার থেকে সব মেকসিকান কুলি উঠে এসেছে। হাসিল এবং লোহার তার লম্বা করে ফেলে দিয়ে যাচ্ছে। সামনে পাঁচ-সাতশো গজ দূরে দুটো জাহাজ। তিনটে ছিল, এইমাত্র একটা কি করে যে হারিয়ে গেল। ঠিক যেন লাইন দিয়ে টিকিট কেনার মতো এবং হলঘরে ঢুকে যাওয়া। কিছু সময় গেলে অমিয় দেখতে পেল সেই হারিয়ে যাওয়া জাহাজটা ক্রমে এক আশ্চর্য যাদুবলে ওপরে উঠে যাচ্ছে। পাহাড়ের মাথায় উঠে যাচ্ছে। এবং ওরা দেখতে পেল পাশে তেমনি আর একটা জাহাজ এভাবে পাহাড় থেকে নেমে আসছে। আর ওরা টের পাচ্ছে না, সেই সঙ্গে ওরাও যে এবার ধীরে ধীরে সেই বড় দুটো লোহার দরজা, প্রায় চিচিং ফাঁকের মতো, কোন এক যাদুবলে দরজা খুলে যাচ্ছে এবং সেই অতিকায় জাহাজ ঢুকে যাচ্ছে। দু’পাশে ট্রামলাইন বসানো। দু’পাশের ট্রাম জাহাজটাকে টেনে এক লক-গেট থেকে আর এক লগ-গেটে পৌঁছে দিচ্ছে। এবং এক সময় সূর্য অস্ত যাবার মুখে সিউল-ব্যাঙ্ক পাহাড়ের ওপর আশ্চর্যভাবে ঝুলতে থাকল। জলে ভেসে রয়েছে—সমুদ্র থেকে কিছুতেই বোঝা যায় না। যেন সহসা জাহাজটা পাখা গজিয়ে গেছে। এবং পাখায় ভর করে ভেসে রয়েছে ওপরে।

    জাহাজিরা দেখল, অনেক নিচে আবার তিন-চারটে জাহাজ, লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা যে জাহাজটাকে পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসতে দেখেছিল, সেই জাহাজ যেন খানিক সময় একটা বিপদের মুখে পড়ে চুপচাপ ছিল, পাহাড় থেকে নেমেই আবার তরতর করে সমুদ্রে ভেসে চলেছে। আর কি ছোট দেখাচ্ছে জাহাজগুলোকে। কাগজের নৌকার মতো ভাসতে ভাসতে সমুদ্রে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

    এখন দু’পাশে শহর। কোলেন শহর। খুব বেশি সময় ওরা শহর দেখতে পেল না। ওরা একটা হ্রদের মতো অঞ্চলে ঢুকে গেল। ছোটবাবুর মনে হল তখন পূর্ববঙ্গের বর্ষাকালের মতো পানামা উপত্যকার এ অঞ্চলটা। চারপাশে ছোট ছোট ঢিবি, ঘাস বনজঙ্গলে সবুজ হয়ে আছে, এবং নীল জল, অর্থাৎ পাহাড়ের উপত্যকায় মনে হয়, এক বর্ষাকাল, যেন জাহাজিরা উঁকি দিলে জলে পুঁটিমাছ ডারকিনা মাছ পর্যন্ত দেখে ফেলবে। আর সব গাছপালা দেখলে মনে হবে, সেই লক্ষ্মীপুজোর দিনে ছোটবাবু যেমন টুনি ফুল খুঁজতে যেত তার মায়ের জন্য, এও যেন এক পৃথিবী যেখানে সে এই বড় জাহাজ নিয়ে টুনি ফুল খুঁজতে বের হয়েছে। হাত দিলেই প্রায় যেন সেই সব নানা বর্ণের ফুল সে তুলে আনতে পারে। মনেই হয় না জীবনে এমন দৃশ্য সে কোথাও আর দেখতে পাবে।

    এভাবে কত কিছু মনে হয়। জাহাজিরা এখন সব রেলিঙে দাঁড়িয়ে আছে। এমন দৃশ্যাবলী কোথায় আর দেখা যাবে। সমুদ্র থেকে ওরা এখন অনেক উঁচুতে রয়েছে। ওরা যেন প্রায় বলতে গেলে ডাঙ্গার ওপর দিয়ে জাহাজ চালিয়ে নিচ্ছে। দু’পাশের কৃত্রিম হ্রদে সব জলাধার দেখলে বিশ্বাসই হবে না মানুষের তৈরী এমন একটা সমুদ্র পারাপারের ভেতর অজস্র গাছপালা আর তার ছায়ায় সিউল-ব্যাঙ্ক হেলে দুলে যেতে পারে। খুব ধীর গতি। বেশি স্পীডে চলতে পারছে না। এমন কি মনে হয় প্রপেলার খুব জোরে ঘুরলে নিচের ঘোলা জল উপরে উঠে আসবে। খুব ধীর গতিতে সুমহান জাহাজ সিউল-ব্যাঙ্ক যাচ্ছে। তার ভেতর রয়েছে কলকব্জার মতো জাহাজিরা। সে আছে বলেই যারা আছে, এবং রক্ত সঞ্চালনের কাজ যারা করে থাকে—সেই সব ছোট ছোট মানুষদের সুখ-দুঃখ এমন একটা গ্রাম গ্রাম জায়গায় না এলে টের পাওয়া যায় না। বোঝা যায় এখন, এরা সবাই প্রায় গ্রামের মানুষ, শাকান্ন এদের ভীষণ প্রিয়। এবং এই প্রথম জাহাজিরা দেখল সিউল-ব্যঙ্ক সার্চ লাইট জ্বালিয়েছে। রাতের বেলায়, ঠিক নদীতে স্টিমারের মতো দু-পাড়ের ঢিবি, বনজঙ্গল, আলো ফেলে দেখছে।

    রাত আটটা পর্যন্ত ছোটবাবু দাঁড়াতে পেরেছিল। ডাইনিং হলে খাবার সাজানো হচ্ছে। এখন রাতের পোশাক পরে খেতে যেতে হবে। ছোটবাবুর রাতের পোশাক বলতে কিছু নেই। কোলন বন্দরে জাহাজ থামেনি। বলবোয়া বন্দরেও জাহাজ থামবে না। নিউ-প্লাইমাউথ না যাওয়া পর্যন্ত কিছু হবে না। ডেবিড ছোটবাবুকে কিছু পোশাক দিতে চেয়েছিল, কিন্তু ছোটবাবু যেই পরে বের হল, সঙ্গে সঙ্গে জ্যাক হেঁসে বাঁচল না। একেবারে জোকারের মতো। ঢোলা খাট বেঢপ পোশাকে নিজেই কিঞ্চিৎ বিমূঢ় হয়ে গেছিল।

    খাবার টেবিলে ছোটবাবুর অসুবিধা হত। সে মাথা গুঁজে খেত। কেমন সঙ্কোচ হত। কাঁটা চামচের ব্যবহার সে জানত না। ডেবিড তাকে ভীষণ সাহায্য করে আসছে। এবং টেবিল ম্যানার্স বলতে যা কিছু জেনেছে সবই ডেবিডের সাহায্যে! এখন পোশাকের জন্য অথবা টেবিল ম্যানার্সের জন্য ততটা সঙ্কোচ বোধ করে না। কাপ্তান এখন প্রায় তার সঙ্গে কথা বলেনই না। জ্যাকও চুপচাপ খেয়ে উঠে যায়। খেতে বসলে মনে হয় না জ্যাক ছোটবাবুকে চেনে। আর এই যে ছোটবাবু জাহাজে ছ’নম্বর হয়ে গেল, তাতে জ্যাকের কিছু আসে যায় না। কেবল প্রথম দিন যখন ডেকে বের হয়ে জ্যাক হেঁটে যাচ্ছিল, কাকে যেন খুঁজছে চারপাশে এবং দেখে ফেলেই না দেখার মতো, কিছুটা সহজ স্বাভাবিক কথা বলার মতো, তুমি এখানে ছোটবাব!

    তাড়াতাড়ি ছোটবাবু উইনচের নিচে থেকে বের হয়ে বলেছিল, জ্যাক আমি এখন এনজিন রুমের ছ’নম্বর। দেখা হয়নি বলে খবরটা দিতে পারিনি। জ্যাক কোন কথা বলল না। সামান্য হাসল।

    —তোমার ঠিক নিচের কেবিনে আছি।

    —সত্যি!

    —সত্যি, তুমি জান না আমি যে নিচে রয়েছি?

    —না, তুমি কী ছোটবাবু! তারপর বলার ইচ্ছে হয়েছিল, আমি জানব না তুমি কোথায় আছ! তোমার কেবিনে কোথায় কি আছে, লকারে তোমার কি আছে তুমি দেয়ালে কি টানিয়েছ, আমি সব জানি। দেয়ালে তোমার মায়ের ছবি টানিয়ে রেখেছ ছোটবাবু। তোমার কেবিনের কোথায় কি আছে, আমি তোমার চেয়ে ভাল জানি।

    ছোটবাবু ডেকেছিল, জ্যাক

    জ্যাক বলেছিল, কেমন লাগছে?

    —বেশ ভাল লাগছে। আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।

    জ্যাক বলেছিল, কি বিশ্রী ওয়েদার।

    ছোটবাবু কেমন থতমত খেয়ে বলেছিল, তাই।

    জ্যাক বলেছিল, মনে হয় আকাশে আর কখনও সূর্য উঠবে?

    তখন বিশ্রী আকাশ, ঝড়-ঝঞ্ঝা, জলকণা সব বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। ছোটবাবুর পোশাক প্রায় ভিজে গেছিল।

    জ্যাক বলেছিল শুধু, এভাবে ভিজে জামা-প্যান্ট পরে থাকলে অসুখ করবে তো।

    —শুকোয় না। নিউ-প্লাইমাউথ থেকে কিনে নেব।

    —কেন তাহিতিতে কিনতে পারবে।

    —নামা যাবে?

    —খুব যাবে।

    ছোটবাবুর দুটো কাজের পোশাক। বয়লার সুট সে তাহিতি থেকে কিনে নেবে ভেবেছিল। কিন্তু নামতে পারবে কি পারবে না সে জানত না। মাঝরাতে জাহাজ আবার খাল ধরে লক-গেট ধরে প্রশান্ত মহাসাগরে নেমে যাবে কথা আছে। তখন ডেবিড একা বোট-ডেকে, সে সারাক্ষণ দূরবীন নিয়ে জেগে থাকবে। ছোটবাবু খুব ছেলেমানুষ বলে সকাল সকাল ঘুম পায়। বেশী রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে পারবে না। ডেবিড কত বলেছে, আবার কবে পানামা খালে আসবে, কখনও আসতে পারবে কিনা তাও ঠিক কি, দেখে নাও। আমি তো যেখানে যতবার যাই বসে থাকি। রাত জেগে বসে থাকতে আমার ভাল লাগে ছোটবাবু। খালের পাড়ে পাড়ে প্রশান্ত মহাসাগরে নেমে যাবার আগে আবার আমরা শহর পাব। তুমি একটা দারুণ চান্স মিস করবে জেগে না থাকলে।

    ছোটবাবু তবু ঘুমিয়ে পড়েছিল। যদিও ইচ্ছে হয়েছিল, ঘুমিয়ে পড়ার আগে একবার চুপি চুপি আফটার-পিকে যাবে। সেখানে গেলেই সে দুটো ভাত খেতে পায়। বাঁধাকপি ভাজা দিয়ে ভাত। কারণ অফিসার্স গ্যালিতে ইংলিশ মেনু। রাইস কারি সপ্তাহে মাত্র একদিন। সেদিন ছোটবাবুর উৎসবের মতো ভোজ। তাছাড়া ওর মনে হয় বাকি ছ’দিন প্রায় না খেয়ে আছে। ভাত না খেলে তার কিছুতেই পেট ভরে না। কখনও কখনও গোপনে মৈত্র একটা প্লেটে ভাত মাংস দিয়ে যায়। সে নিজের কেবিনে চুরি করে দরজা বন্ধ করে কোনরকমে খেয়ে হাত মুখ সাবানে ধুয়ে ফেলে। আর প্লেটটা কাজে যাবার আগে জামার নিচে ভরে নেয়। অমিয়, সারেঙসাব, মনু, মান্নান যেই আসুক, কথা বলার অছিলায় দিয়ে দেয়। প্লেট বের করে চার পাশে সতর্ক নজর রাখে—এই তাড়াতাড়ি নিয়ে যা। মৈত্ৰদাকে দিবি। দিয়েই আবার উইনচের তলায়। স্ট্রেপারগুলো খুলে মেরামত করার দরকার। এবং তখন মনে হয় জ্যাক কিংবা ডেবিড এবং এমন কি পাঁচ নম্বর পর্যন্ত ভাত না খেয়ে থাকে কি করে! সে তো পেট ভরে দুটো ভাত খাবে বলে জাহাজের এমন একটা কাজে চলে এসেছিল। অথচ নসিব এমন, শেষ পর্যন্ত, সেই ভাত রোজ কপালে জুটছে না। সে নিজের নসিবের কথা উইনচের তলায় শুয়ে শুয়ে এভাবে কখনও ভাবত। চিল্ড গ্রুেপ-ফ্রুট, ওটমিল-পরিজ, পরিজটা মন্দ লাগে না। এরা ঝাল-ঝোল একেবারে খায় না। খেতে কি যে বিস্বাদ। ব্রেক ফাস্টে ফ্রাইড-এগ খেতে তার ভাল লাগে। বেকন খাবার সময় তো প্রায় বমি আসার মতো। কি রকম সব গন্ধ—এত সুন্দর রং-বেরংয়ের খাবার খেতে এমন বিস্বাদ সে জানত না। পালিয়ে পালিয়ে ভাত, ভাত না খেলে রাতে ঘুম আসে না ছোটবাবুর। একটু রাত করে আজ অমিয় এক প্লেট ভাত, সারডিন মাঝের ঝোল, সরষে বাটা দিয়ে কি যে রেঁধেছে ভান্ডারী জ্যাঠা। সে এত খেয়েছে যে খাবার পরই চোখ জড়িয়ে আসছিল। ডেবিডের সঙ্গে কিছুতেই ডেকে জেগে থাকতে পারেনি। বড় বড় ঢেঁকুর তুলে জোরে পাখা চালিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ভীষণ গরমে এমন ঘুমটা মাটি হবার আশঙ্কাতে সে ফুল স্পীডে পাখা চালিয়ে শুয়েছে।

    বেশ গভীর রাতে মনে হল, কেউ তাকে ডাকছে। খুব ফিসফিস গলায়।

    —এই ছোটবাবু সে চোখ মেলে বুঝতে পারল না কে ডাকছে। দরজা লক করা। তার সুন্দর মেহগিনি কাঠের বাংক। রোজ সাদা দামী চাদর পাল্টে দিয়ে যায় মেস-রুম-বয়। মায়ের ছবিটা এ-ঘরে টানাতে পেরে সে ভীষণ খুশী। লকার কাঠের। বড় আয়না। শুয়ে থাকলে সবটা আয়নায় দেখা যায়। সে জেগে গেলে বুঝল, আলো জ্বালিয়ে সে ঘুমোচ্ছিল। আয়নায় সে দেখল তার পোশাক বলতে প্রায় খালি গা। ঘামে জবজবে ভেজা শরীর। সে উঠে বসল। কেউ ডেকেছে। দরজা বন্ধ। ভেতরেই কেউ আছে তার মনে হল, একেবারে যেন কানের কাছে কেউ এসে ডেকেছে, এই ছোটবাবু, তুমি ঘুমোচ্ছ!

    তারপরই সে দেখে অবাক, পোর্ট-হোলের কাঁচ খোলা, পর্দা সরিয়ে জ্যাক ওকে দেখছে। ও প্রথমে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিল এত রাতে জ্যাকের হঠাৎ এ-ভাবে ঝুঁকে থাকা পোর্ট-হোলে সত্যি ভয়ের। সে বলল, ওঃ তুমি!

    সে ওর তোয়ালে দিয়ে সারা শরীরের ঘাম মুছল। সে খুব কাছে গিয়ে বলল, কী ব্যাপার!

    —তুমি ঘুমোচ্ছ!

    —কেন কি হয়েছে!

    —আমি, ডেবিড বসে আছি। তুমি আসবে না?

    —খুব ঘুম পাচ্ছে জ্যাক।

    —সকালে তো আবার সমুদ্র। তোমার ডাঙা দেখতে ভাল লাগে না!

    সে কি করে বলবে, কিছুদিন পর পর ভাত খেলে নেশার মতো হয়। সে যে ওর কেবিনে আজ পেট ভরে ভাত খেয়েছে। দুবার ভাত চেয়ে পাঠিয়েছে। এত লোভ ভাল না ছোটবাবু একবার বন্ধু হেসে এমন বলেছে, তুমি আমাদের ভাতে কম ফেলে দেবে। আসলে সে আজ তিন চারদিন পর প্রায় ভাত খেয়েছে। আকন্ঠ খেয়ে কেবল ঘুমোতে ইচ্ছে করছে। ডাঙা সমুদ্র তার কাছে এখন সমান। সে বলল, কি আছে?

    —আবার আমরা খালের ভেতর ঢুকে গেছি। শহর দেখা যাচ্ছে।

    —আর কিছু না?

    —না।

    —তবে আর যাচ্ছিনে। বলেই সে লাফ দিয়ে ফের বাংকে শুয়ে পড়ল। বাংকে সে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল।

    জ্যাক বলল, দূরবীনে সেকেন্ড কি সব চুরি করে দেখছে!

    —তুমি দেখছ না!

    —চাইলে দিচ্ছে না।

    —ডেবিড তো ভারি স্বার্থপর।

    —ভীষণ। তুমি গেলে তোমাকে দিতে পারে।

    আর তখনই মনে হল জ্যাক তবে আর আগের মতো নেই। বড় হয়ে যাচ্ছে জ্যাক। তারও বুঝি মেয়ে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। এতদিনে যেন জ্যাক আরও লম্বা হয়ে গেছে। যত লম্বা হচ্ছে, তত সে তার পোশাক কিম্ভূত কিমাকার করে ফেলছে। জ্যাকের পোশাক দেখে তারও মাঝে মাঝে কম হাসি পায় না। সে বলল, দাঁড়াও ডেবিডকে একা একা দেখা বের করছি। বলেই সে বের হয়ে গেল। যেহেতু ওর কেবিনটা নিচে, ওকে সিঁড়ি ধরে বোট-ডেকে উঠে যেতে হল। জ্যাক আসছে ওপাশ দিয়ে। সে গ্যাঙ-ওয়ে ধরে সোজা ব্রীজের সামনে চলে যাবে। এবং জ্যাক ও-ভাবে সিঁড়ি ধরে উঠে আসার আগে সে ডেবিডের কাছে পৌঁছে যাবে। আর এটা ছোটবাবু দেখেছে, জ্যাক এলি-ওয়ে ধরে কখনও আসে না। জ্যাক তো ইচ্ছে করলেই ওর দরজায় নক্ করতে পারত। সে তা না করে, ও- পাশে, জাহাজের বাইরের দিকটায় সে দাঁড়িয়ে থাকে। এলি-ওয়েতে জ্যাক কেন যে আসে না! আসলে কি জ্যাক এলি-ওয়েতে ভয়ের কিছু দেখে ফেলেছে! সে যেমন দেখে ফেলে দৌড়েছিল!

    ছোটবাবু ডেবিডের ঠিক সামনে গিয়ে বসল। জ্যাক সিঁড়ি ভেঙে ছুটে আসছে। ছোটবাবু বলল, তুমি ভারি স্বার্থপর ডেবিড। জ্যাককে দেখতে দাওনি।

    —জ্যাক না দেখলে আমি কি করব।

    —কিছু দেখলে?

    —না।

    —আমাকে দাও। যদি পেয়ে যাই।

    সেকেন্ড বলল, দ্যাখো। এবং ওরা তিনজন পাশাপাশি বসে বলবোয়া বন্দরের শহর, ইট, কাঠ, গীর্জা, এবং গাছপালা, দূরের বিন্দু বিন্দু আলোর মালা, কখনও সামনে একেবারে সামনে ওরা দেখতে পাচ্ছে শহর ধরে একটা গাড়ি, ছায়া ছায়া অন্ধকারে ওরা কি করছে। ছোটবাবু বলল, আমি কিছু বুঝতে পারছি না। তুমি দ্যাখো।

    সেকেন্ড দূরবীনটা চোখে লাগিয়েই চিৎকার করে উঠল, ওম্যান।

    —যা!

    —হ্যাঁ দ্যাখো।

    ছোটবাবুর ইচ্ছে হল জ্যাক দেখুক। কারণ জ্যাক বড় হচ্ছে। সে বললে, তুমি দ্যাখো জ্যাক। জ্যাক বলল, না তুমি দ্যাখো।

    ছোটবাবু তখন দেখল—একটা গাড়ি। দু’জন মানুষের ছায়া, পুরুষ না মেয়ে, কি দুজনেই মেয়ে, কি দুজনেই পুরুষ, বোঝা যাচ্ছে না। এবং নিভৃতে পার্কের পাশে রাস্তায় ওরা দুজন। ওরা এই এমন গ্রহে বেঁচে আছে, তারা যাই হোক, পুরুষ রমণী হওয়াই ভাল, কারণ, সে বুঝতে পারছে, নারীজাতি মানুষের বড় প্রিয়। প্রিয় বলেই পুরুষ রমণী ভাবতে ভাল লাগছে। সে বলল, আর দেখা যাচ্ছে না। আসলে জাহাজ ক্রমাগত দু-তীর পেছনে ফেলে চলে যাচ্ছে।

    এবং এ-ভাবে জ্যাক যা চাইছিল, একটু ছোটবাবুর সান্নিধ্য। এটুকুর জন্য সে ওকে ডেকে এনেছে। ওর পাশে বসে থাকতে জ্যাকের ভাল লাগছে। কিছুক্ষণের ভেতর জাহাজ সমুদ্রে পড়বে। ডেক-জাহাজিরা জেগে রয়েছে। সেকেন্ড-অফিসার, ডেবিড এবং চিফ-অফিসার জাহাজিদের নিয়ে ছোটাছুটি করছে। এমন মধ্যরাতে জ্যাক দূরে সমুদ্রের গর্জন শুনতে পেল। সেই সব দ্বীপ, যেমন হনলুলু অথবা পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জমালা থেকে বাতাস দ্রুত ছুটে আসছে। বাতাসের সঙ্গে আসছে অজস্র সমুদ্রের ঢেউ, ওরা প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে কি যে সুহাস গতিতে ধীর গতিতে এগিয়ে আসছে। জ্যাকের মনে হল, প্রায় কাব্যগাঁথার মতো, নীল জলে ছোট একটা সাদা রঙের বোট, লাল রঙের পাল, একপাশে ওরা দুজন, এবং ক্রমে কি করে যে সে দেখতে পেল, বিন্দু বিন্দু হয়ে যাচ্ছে সব ঢেউ-এর জলকণা, তার ভেতর দিয়ে ছোটবাবু বোট এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এবং জ্যাক সহসা প্রায় আর্তনাদের মতো চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল—ছোটবাবু তুমি মরে যাবে। কিন্তু তখনই মনে হল ছোটবাবু তার বনবাস সহজেই স্বীকার করে নিয়েছে। কি নিশ্চন্ত মুখ চোখ। ঢেউয়ের ভেতর বোট ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রে আর সেই ভাঙা জাহাজটাও দেখা যাচ্ছে না। কেবল জ্যাক কেন যে দেখতে পেল, দূরে একটা পাখি আকাশের নিচে চক্রাকারে উড়তে উড়তে নেমে আসছে। সেই বড় পাখি, অতিকায় যার ডানা, যেন আকাশ জুড়ে সে নেমে আসছে। সাদা রঙের অতিকায় এ্যালবাট্রস বোটের একপাশে বসতেই বোটটা কেমন নড়ে উঠেছিল।

    যখন দূরবীনে ছোটবাবু শহর দেখছিল, তখন দু হাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজে দিয়েছিল জ্যাক। এবং মাথা গুঁজে সে কি আজগুবী দৃশ্য দেখে ফেলল। আর যা হয়, এমন কেন যে সব দৃশ্য সে চোখের ওপর ভাসতে দেখল! ছোটবাবুকে বললে, ছোটবাবু পর্যন্ত ভয় পেয়ে যাবে। সে জানে ছোটবাবু সহজ সরল মানুষ, সহজেই ভয় পায়। ছোটবাবুর মুখ দেখলেই এটা সে বুঝতে পারে। এবং ছোটবাবু ভয় পাবে বলেই যেন এমন একটা দৃশ্য সে দেখেছে বলা ঠিক হবে না। কেবল ডেবিডকে সে বলতে পারে।

    কিন্তু সকালে যখন সিউল-ব্যাংক সমুদ্রে ভেসে গেছে আবার, তীর দেখা যাচ্ছে না, ঝিকঝিক শব্দে সিউল-ব্যাংক আপন গতিবেগে নির্ভাবনায় বেশ চলেছে, জাহাজিরা শেষ ডাঙা দেখবে বলে দাঁড়িয়ে আছে, আর দেখা যাচ্ছে না কিছু, কেবল নীল জল, নীল আকাশ এবং সমুদ্রের প্রশান্ত চেহারা তখনই জ্যাক দেখল, অনেক দূরে, প্রায় দিগন্তের কাছাকাছি দুটো বিন্দুর মতো সাদা রঙের কিছু ভাসছে। এমন নীল আকাশে দুটো বিন্দুর মতো সাদা রঙ নড়ছে দেখে, দৌড়ে সে চার্টরুমে উঠে গেল। এবং এই প্রথম সে বাবার দূরবীনটা গলায় ঝুলিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে থাকল—হ্যাঁ নড়ছে। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না ও দুটো কি। তবু মনে হয় দুটো পাখির মতো। দুটো পাখি আকাশের গায়ে যেন ঢেউয়ের মতো কাঁপছে। আর উড়ে উড়ে ওরা এদিকে আসছে।

    ছোটবাবু তখন চড়ুই পাখি দুটোকে খাওয়াচ্ছিল। সকালের চা এসেছে। চা, একটা আপেল, দু’টুকরো স্যান্ড উইচ এবং কলা। উইনচের ভেতর থেকে বের হয়ে সে ময়লা হাত ঝেড়ে নিল, এবং কোনরকমে কিছুটা খেয়ে পাখি দুটোকে শিস দিয়ে ডাকল। শিস দিলেই ওরা চলে আসে। জ্যাক এখন খাওয়ায় তাদের। সেও। কিন্তু জ্যাক ব্রীজে দূরবীনে কি দেখছে। সেই কখন থেকে জাহাজের পেছনের দিকে সে তাকিয়ে আছে। এত কি দেখছে জ্যাক। জ্যাক পরেছে সুন্দর হলুদ রঙের বয়লার স্যুট। চোখে দূরবীন। সকালের সূর্য এই সমুদ্রে এবং জাহাজের চারপাশে ক্রমে ওপরে উঠে যাচ্ছে। বোট-ডেক থেকে জ্যাকের দূরবীনে এ-ভাবে দেখা সত্যি বিস্ময়ের। আগে হলে সে চিৎকার করে বলত, জ্যাক আমি এখানে। ইচ্ছে করলে ছুটে চলেও যেতে পারত বোট-ডেকে, কিন্তু এখন পারবে না। কারণ আর্চি ক্রমে ওর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। তার সব কিছু গোপনে যেন লক্ষ্য রাখছে আর্টি। এবং ক্রমে সে একটা ব্যাপার বুঝতে পেরেছে, সেকেন্ড এনজিনিয়ার আর্চিকে খুশি করতে না পারলে তার এই সমুদ্র সফর বৃথা। সে চেষ্টা করে যাচ্ছে। আপ্রাণ সে খেটে যাচ্ছে। তবু ঠিকমতো সে, দক্ষ কারিগরের মতো সব কাজ পারছে না বলে, আর্চি ভীষণ বিরক্ত। আর্চি কাছে এসে দাঁড়ালেই বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়।

    সে নড়তে পারল না। কেবল পাখি দুটোকে সকালের খাবার খাইয়ে সে ফের উইনচের ভেতর ঢুকে গেল। এখন ওর সারা হাতে মুখে কালি। একটা বলতিতে নানা সাইজের স্প্যানার। নাট বোল্ট। কেরোসিন তেল। সে নাট খুলে—কারণ দু’চারদিন যেতে না যেতে এই যেমন কোন উইনচের গিয়ার খারাপ, বিয়ারিং লুজ, একজস্ট স্টীম ঠিকমতো ক্লিয়ার হচ্ছে না অথবা হুইল জ্যাম হয়ে যাচ্ছে, এ- সব কাজ তাকে করতে হয় বলে বেশ সময় লেগে যায় একটা কাজ শেষ করে উঠতে। যখন সে নাট বোল্ট ভেতর থেকে খুলে আনে তখন একটা সে বড়রকমের কাজ করতে পারল বলে ভেবে থাকে। এবং সে কাজটা খুব খেটে মনোযোগের সঙ্গে শেষ করে যখন অপেক্ষা করে মেজ-মিস্ত্রি এসে দেখবে, তখন কেবল প্রার্থনা, হে ঈশ্বর হাতের কাজ দেখে তিনি যেন খুশী হন। কিন্তু হলে কি হবে, আর্চি এলেই, ওর মুখ শুকিয়ে যায়! এবং নির্ঘাত এসেই গিয়ার টেনে বালব ছেড়ে উইনচ চালিয়ে হঠাৎ ক্ষেপে যান। একেবারে জ্যাম। ঘুরছে না। ছোটবাবু কিছুতেই বোঝে না, কেন এমন হয়। সে নিজে বালব্ ঘুরিয়ে দেখেছে—সব ঠিকঠাক, লুজ নেই। টাইট ফিটিঙ, আর মেজ-মিস্ত্রি এসে ধরতেই সব কেমন গুবলেট হয়ে যায়। তার তখন ভয়ে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। আর অকথ্য গালিগালাজ দু’একদিন থেকে সবে শুরু করেছে। ছোটবাবু এ-সব একেবারে গ্রাহ্য করে না। কেবল মৈত্রদা অথবা অমিয় না শুনে ফেলে। শুনে ফেললেই মেজ-মিস্ত্রিকে অপমান করে বসতে পারে। তা হলে কি যে একটা কেলেঙ্কারী হবে! ভয়ে মুখ এ-জন্য আরও বেশি শুকিয়ে যায়।

    তখন জ্যাক দাঁড়িয়েই আছে। নড়ছে না। সিউল-ব্যাংক যাচ্ছে, ক্রমে জলে ভেসে যাচ্ছে। একটা প্রাচীন যান্ত্রিক দানবের মতো নীল জলরাশি ফালা ফালা করে ভেসে যাচ্ছে। এবং জ্যাকের পলক পড়ছে না। কাপ্তানবয় জ্যাকের আপেল কলা স্যান্ড-উইচ একটু বাদেই রেখে যাবে। এখন ওর চা খাবার সময়। আর একঘন্টা পরে ব্রেকফাস্ট। সে কেমন দূরবীনে চোখ লাগিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো কেবল পাখি দুটোর এগিয়ে আসা দেখছে। তার চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, কাপ্তান বয় দাঁড়িয়ে রয়েছে পাশে, কিছুই লক্ষ্য করছে না।

    জাহাজিরা যে যার কাজ করে যাচ্ছে, এই যেমন সারা ডেকে জল মারা। একদল জাহাজি কাঠের পাটাতনে হলিস্টোন মারছে। ডেক-টিন্ডাল হাঁকছে, মারো টান হাইয়, জোরে মারো হাইয়। ডেরিক মাস্তুলের কাছাকাছি ছিল, সব খুলে নিচে ফল্কার ওপর ফেলে রাখা হচ্ছে। এমনি সব টুকিটাকি কাজ সব চলছে। ডেক-ভান্ডারি এনজিন-ভান্ডারী খুব তাড়াহুড়ো করছে। ওয়াচের লোক উঠে আসবে। সকালের চপাটি এবং গোস্ত সেদ্ধ এ-সময়ের ভেতর করে না ফেলতে পারলে চিল্লাবে জাহাজিরা। চিফ-কুক লোহার গনগনে চুল্লিতে দুটো আস্ত মুরগী মাখন মাখিয়ে রোস্টের জন্য ভরে দিচ্ছে ভেতরে। লাঞ্চের মেনু দেখে দেখে সব ঠিক করতে হচ্ছে। স্টুয়ার্ড খাবারের স্টক—রেজিষ্ট্রার খুলে—কি আছে কি কমে আসছে, এখন জাহাজ হাজার মাইলের ওপরে এক নাগাড়ে চলবে, মোটামুটি তাহিতিতে পৌঁছবার আগে সব ঠিক ঠাক আছে কিনা দেখে নিচ্ছে। রেশন খুব সকালে বের করে দিয়েছে। জমাখরচ বসে বসে লিখছে। সমুদ্রের বুকে এখন এদের এ-সব কাজকর্ম দেখলে মনেই হয় না, দেশবাড়ি বলে কিছু আছে তাদের—এরা সবাই যেন সিউল-ব্যাংকের শিরা উপশিরা। এবং এ-ভাবে ওদের কাজকর্ম সিউল-ব্যাংকের রক্ত সঞ্চালনের মতো। নিচে আগয়ালাদের মুখ দেখলেই বুঝা যাবে কি কঠিন শ্রমে আপ্রাণ জাহাজের স্টীম ঠিক রাখার জন্য লড়ে যাচ্ছে।

    ছোট-টিণ্ডালের ওয়াচ এখন। এনজিন-রুমে আলি তেল যোগাচ্ছে। বড় বড় সব পিস্টন রড একেবারে রুপোর পাতে মনে হয় মোড়া, কি উজ্জ্বল এবং আর কি দানবের মতো ওঠানামা, এরই ফাঁকে প্রতিটি জয়েণ্টে ভীষণ মনোযোগের সঙ্গে তেল ঢেলে দিচ্ছে আলি। একটু অন্যমনস্ক হলেই হাত টেনে নিচে ফেলে দেবে—এবং হাড় মাংস অস্থি পিণ্ডাকারে পড়ে থাকবে ক্র্যাংক-ওয়েভের নিচে। গ্রিজার আলির চোখ ভীষণ সজাগ। তার অয়েল ক্যান ঠিক তালে তালে নিচে ওপরে নামছে উঠছে। একটু অন্যমনস্ক হলেই সব গেল।

    আর তখনই আসছে। সেই দুটো সাদা মতো পাখি ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওরা জাহাজের দিকে এগিয়ে আসছে। পাখি দুটো ক্রমে এত বড় হয়ে যাচ্ছে কেন! প্রায় আকাশ জুড়ে ডানা মেলে রেখেছে! যেন দুটো সি-প্লেন। তাড়াতাড়ি চোখ থেকে দূরবীন খুলে ফেলতেই দেখল, না এত বড় দেখাচ্ছে না। এখনও বেশ দূরে রয়েছে। এবং ওরা যে জাহাজের পেছনে উড়বে এটা বোঝাই যাচ্ছে। তবু মনে হয় পাখি দুটো ঠিক আর দশটা পাখির মতো নয়। এমন অতিকায় যে, জ্যাক সমুদ্রে কখনও এত বড় এ্যালবাট্রস দেখেনি। দূর থেকেই যা মনে হচ্ছে, কাছে এলে কি বড় না জানি মনে হবে! সে আবার চোখে দূরবীন লাগালেই কাপ্তান-বয় বলল, সাব টি।

    জ্যাক বুঝতে পারল, কাপ্তান-বয় আবার চা এনেছে। সে তাড়াতাড়ি যেন কোনরকমে চা খেয়ে আবার দেখতে থাকল। ওরা আসছে। এবং প্রায় সে ওদের ঠোট, চোখ দেখতে পাচ্ছে। চোখ নীল রংয়ের। থাবা বেশ বড়। অতিকায় ঈগল পাখির মতো। ওরা জাহাজের চার-পাশে চক্রাকারে ঘুরতে থাকল। ওদের পিঠের রং সোনালী। তারপর ওরা জাহাজের পেছনে জলের ওপর একবার বসল, কি তুলে নিল মুখে। দুটো ছোট মাছ। প্রপেলার জল ভেঙ্গে গেলে দুটো একটা মাছ মরে যায়, জলে ভেসে ওঠে। ওরা দুটো-একটা মাছের লোভে চলে এসেছে। এবং জ্যাক আশ্চর্য, এমন সুন্দর দুটো পাখি আবার কেন উড়তে থাকল, এবারে উড়ে আসছে ঠিক মাস্তুলের ডগায়, আর তখনই সে দেখল চিৎকার করতে করতে যাচ্ছে ডেবিড, ওহো—নো নো।। ছোটবাবু পাগলের মতো ছুটে আসছে—সেকেণ্ড দ্যাখো। সে হাত তুলে দেখাল সমুদ্রে।

    সেকেণ্ড দেখে কি করবে ভেবে পেল না।

    ছোটবাবু বলল, প্লিজ কিল দেম।

    এখন একমাত্র ওদের গুলি করে নামান যায়। সে ডাকল নিচ থেকে, জ্যাক—শিগগির।

    জ্যাক বুঝতে পারল না। আর সে ছুটে যাবার সময় আবার একটা ধূর্ত মুখ, সেই ধূর্ত চোখ, যেন আড়ালে ছুটে এসেছে ওপরে, টাংকির ওপাশ থেকে মুখ বাড়িয়ে বলছে, ইউ নটি গার্ল!

    সঙ্গে সঙ্গে জ্যাক চিৎকার করে উঠবে ভাবল, নো, মি বয়। কিন্তু যত জোরে বলবে ভেবেছিল, ঠিক ততটা গলা আস্তে হয়ে গেল। বলল, নো, মি বয় আর্চি।

    আর্চি দাঁড়িয়ে গেছে, একেবারে স্থবির। সে যেন আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না। ইউ নটি গার্ল। গার্ল। নো, মি বয়। মি বয়।

    জ্যাকের হাত-পা শক্ত হয়ে গেল। চোখ ঝাপসা। আতঙ্কে হাত-পা কাঁপছে। সে দেখতে পেল না, বড় এ্যালবাট্রসটা মরিয়া। মিসেস স্প্যারোকে থাবায় তুলে নেবে বলে নেমে আসছে। কি দ্রুত গতি! গ্লাইড করতে থাকলে, ছোটবাবু একটা বড় ঢিল নিয়ে ছুটছে পিছু পিছু। যেন মিসেস স্প্যারোকে ডানার ভেতর আটকে ফেলেছে। আর ডেবিড লাফ দিয়ে সেই পাখার নিচ থেকে ভাবল, চড়ুই পাখিটাকে ছিনিয়ে নেবে, সে নিলও, কিন্তু সে দেখতে পাচ্ছে, ওর পিঠের জামা ফালা ফালা করে কিছুটা মাংস তুলে নিয়ে গেছে। মুহূর্তের ভেতর এমন ঘটল। জাহাজিরা ছুটে এসেও কিছু করতে পারল না। সমস্ত শরীর রক্তাক্ত করে পাখিটা আবার কেমন নির্ভাবনায় উড়ে যাচ্ছে। চড়ুই পাখিটাকে কব্জা করতে পারল না বলে যেন আক্রোশে ডেবিডকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিয়ে গেল।

    ডেবিড হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়ল। চারপাশে জাহাজিরা ঘিরে ধরেছে। মিসেস স্প্যারো রক্ষা পেয়েই একেবারে জালির ভেতর। মিঃ স্প্যারো বের হচ্ছে না ভয়ে। ডেবিডের জামা ছোটবাবু খুলে দিচ্ছে। চীফ-অফিসার ছুটে এসেছে, এবং ডেবিডের এমন ছেলেমানুষী দেখে হাসবে কি ধমক দেবে বুঝতে পারল না। পিঠের ওপর নখের ক্ষত। বেনজিন দিয়ে সব পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং যন্ত্রণায় ডেবিডের মুখ বেঁকে যাচ্ছে।

    চীফ-অফিসার তবু রুষ্ট মুখে বলল, কি দরকার ছিল ওর মুখের খাবার কেড়ে নেবার!

    সেকেণ্ড মুখ বাঁকিয়ে রয়েছে তেমনি। ভীষণ জ্বলছে। সে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। সামান্য ব্যাণ্ডেজের দরকার। এবং কেবিনের ভেতর ডেবিডকে নিয়ে যেতে বললেন কাপ্তান।

    —ম্যান এ্যালব্রাটস!

    চীফ বলল, তাই মনে হচ্ছে।

    –লক্ষ্য করেছেন ওর পিঠ সোনালী রংয়ের!

    —না তো।

    জ্যাক সব দেখে-শুনে অবাক। সেই পাখি দুটো বেশ দূরে এখন। উড়ছে। কখনও সমুদ্রের জলে ভেসে বেড়াচ্ছে, কখনও ডুবে ডুবে প্রায় সাঁতার কাটার মতো। খাবার তুলে নিতে পারে নি বলে আক্রোশে যেন সমুদ্রের জলে পাখা ঝাপ্টাচ্ছে।

    জ্যাক বলল, আবার আসবে।

    ডেবিড বলল, আমারও মনে হয়, আবার আসবে।

    ছোটবাবু বলল, তা হলে কি হবে।

    —কিছু একটা করতে হবে। মৈত্র পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে আর অযথা কথা বলতে পারে না। তবু যেন বলে গেল।—কিছু একটা করতে হবে। এভাবে তো আর এমন একটা অসহায় পাখিকে ম্যান-এ্যালব্রাটসটার থাবার ভেতর ফেলে দেওয়া যায় না।

    কি এক দুয়ে সত্যাসত্য আবিষ্কার-এর মুখে কেউ তখন আর কথা বলতে পারল না। মৈত্র কেমন একটা দৈত্যের মতো হেলে দুলে নেমে গেল।

    আর আর্চি তখন নিজের কেবিনে হা-হা করে হাসছে। নো মি বয়! সে দরজা খুলেই হাসছে। এনজিনের বিরাট আওয়াজে ওর হাসির শব্দ কেউ শুনতে পাচ্ছে না—নো মি বয়! চার্মিং! কি সুন্দর মিষ্টি কথা। ওটা কে! আয়নায় সে যেন কি দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে গেল।

    সে কাছে গেল, আয়নার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি কে হে। ও হো বাছা তুমি! থু!

    নো মি বয়! নো, ইউ নটি গার্ল! গার্ল! সেকেণ্ড জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে বলল, ইউ নটি গার্ল। কোন ভয় নেই! আমি কিছু করব না। কাপ্তানের মেয়ে তুমি। তোমাকে আমি কিছু করতে পারি! সে আনন্দের চোটে শিস দিতে দিতে চান করল। পৃথিবীতে এমন একটা গোপন খবর সে আবিষ্কার করতে কখনও পারবে বুঝতে পারে নি। ওর সন্দেহ, সংশয় সব ঘুচে গেছে। ডেকে ছোটবাবু আর জ্যাক দু’জন জড়াজড়ি করছিল। নেশার ঘোরে সে এতটুকু ভুল দেখে নি তবে!

    আবার আয়নায় একটা সুন্দর মানুষ হেঁটে হেঁটে চলে আসছে। লকারের আয়নাটা মাথাসমান উঁচু। সে কাছে গিয়ে বলল, কে! না’ কিছুই নেই। সে ভাল জামা প্যান্ট পরে দেখল, না, পছন্দ হচ্ছে না। জ্যাকের পাশে সে বড় বেমানান। সবচেয়ে দামী নাইটি পরে দাঁড়াল, না কেমন সেকেলে সেকেলে। কিছুতেই সে রূপবান হতে পারছে না। বয়সের দাগ সমস্ত মুখে, হাতে পায়ে, আর ঠিক তেমনি কেউ অনেক দূর থেকে সে দেখতে পাচ্ছে হেঁটে হেঁটে আয়নার ভেতরে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। সে চিৎকার করে বলতে গেল, হেল! তুমি কেন? ঘুসি মেরে কাঁচ ভেঙ্গে দিতে পারলে যেন ভাল করত।

    নো, মি বয়,—ইয়েস ইউ বয় সে দেখল তখন সুন্দর পোশাকে কেউ হেঁটে আসছে। অ মাই গড। আবার তুমি!

    এখনও লাঞ্চের দেরি আছে। এমন একটা গোপন আনন্দের জন্য সে এখন মদ্যপান করতে পারে। থ্রি চিয়ার্স। থ্রি চিয়ার্স কাকে উদ্দেশ্য করে। –না, কেউ জানবে না। জ্যাক, কাউকে বলব না। বলে জাহাজে দাঙ্গা বাধিয়ে দিই আর কি। সব পবিত্রতা, ঈশ্বর চিন্তা একেবারে মুহূর্তে ভেসে যাবে। না কেউ জানবে না তুমি মেয়ে।

    আবার সেই কে যেন দূর থেকে হেঁটে আসছে। ওর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তুমি তো খুব জ্বালাচ্ছ হে! সে বেশ বড় করে এক সিপ খেয়ে বলল, আঃ ভারি মজা। তারপর কি করা যায়। দুটো উলঙ্গ মেয়ের ছবি, না দুটোতে হবে না, সে খেতে থাকল। পর পর সব উলঙ্গ মেয়েদের ছবি তাস খেলার মতো সামনে সাজিয়ে রাখল। দেখতে দেখতে আবার বলল, নো মি বয়। ইয়েস ইউ বয়, কেউ জানবে না, কেবল একজন জানবে, এ-জাহাজে অসামান্য এক সুন্দরী বালিকা ক্রমে যুবতী হয়ে উঠছে। বালিকা এখন নিজের সৌরভে বিভোর।

    তারপরই মনে হল, না, আর একজন আছে, ছ’নম্বর। তার আগেই সে টের পেয়েছে। নারীজাতি সুধা পারাবার। সে সুধা পারাবারে আগেই মুখ রেখেছে। সঙ্গে সঙ্গে মুখটা ভীষণ শক্ত হয়ে গেল। এবারে সে স্পষ্ট দেখল, আয়নায় ছোটবাবু দাঁড়িয়ে আছে। হাসি হাসি মুখ। আর্চি এবার গ্লাস ছুঁড়ে মারল আয়নায়। কাঁচটা ভেঙ্গে গেল। কেউ নেই। ফাঁকা। সে ভয় পেয়ে প্রাণপণ চিৎকার করে উঠল, বয়!

    মেস-রুম বয় এসে অবাক, অসময়ে মেজ-মিস্ত্রি মদ খেয়ে মাতলামি করছে। গ্লাস ছুঁড়ে আয়নার কাঁচ ভেঙ্গে ফেলেছে।

  • বাইশ

    বাইশ

    ।। বাইশ।।
    দিন যায় তবু পাখি দুটো উড়ে আসে। জাহাজের পেছনে পেছনে কেবল উড়ছে। দিগন্তে কখনও উড়ে যাচ্ছে। ঝড়ের সমুদ্র পেলে আনন্দের শেষ থাকে না। যখন জাহাজে কেউ বের হতে পারে না, বৃষ্টিপাত প্রবল, ঝড়ো হাওয়ায় অস্পষ্ট এক কালো ঝাপসা অন্ধকারে সিওল-ব্যাংক এগিয়ে যাচ্ছে তখনও সেই পাখি উড়ে উড়ে আসছে। অথবা কক কক করে ডাকছে। অনেক দূর থেকে সেই শব্দ কখনও ঝড়ের রাতে অথবা কুয়াশার রাতে শোনা যায়।

    অথবা যখন আকাশ নির্মল থাকে সমুদ্র শান্ত থাকে এবং আবহাওয়া সুন্দর থাকে তখনও পাখি দুটো উড়ে আসছে। সকালের রোদ ডানা থেকে পিছলে যাচ্ছে। আর কি যাদু জানে, মাস্তুলের ডগায় পাখি দুটো ঠিক বসে না, একেবারে উঁচুতে দুটো বাজ-পাখির মতো গ্লাইড করতে থাকলে সবার আগে জ্যাক ছুটে আসে ডেকে। সে দু’পা ফাঁক করে দাঁড়ায়। দেখে, চড়ুই দুটো ঠিক জালির ভেতর আছে কিনা। যদি না থাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। হাতে বড় একটা লোহার রড। ছোঁ মারলেই আঘাত হানবে। এবং আর যারা থাকে সে ডেবিড। ছোটবাবু সতর্ক নজর রাখে চারপাশে—না নেই। আর্চিকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সঙ্গে সঙ্গে দু’লাফে উইনচের তলা থেকে তেল কালি মুখে হাজির। সামনে যা পায় তুলে ঢিল ছুঁড়তে থাকে।

    পাখি দুটো ভয় পায় না। হাওয়ায় ভেসে থাকে। আসলে পাখি দুটো বুঝতে পারে ছোটবাবুর ঢিল অত উঁচুতে উঠবে না। ওরা, পাখায় ঢেকে রেখেছে যেন জাহাজকে। নিশ্চিন্তে ওরা উড়ে বেড়াচ্ছে। জ্যাকও ঢিল ছুঁড়ছে। ডেবিড, মৈত্র এবং ইয়াসিন পর্যন্ত দাঁড়িয়ে গেছে। যদি নেমে আসে, অথবা কাউকে আক্রমণ করে।

    কত বড় পাখি! ডেবিড ভেবে পায় না আসলে এ-দুটো এ্যালবাট্রস কিনা, না অন্য পাখি! প্ৰশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলোতে যে-সব এ্যালবাট্রসদের আস্তানা রয়েছে তাদের ভেতর এ-জাতীয় পাখিগুলো বিরল। প্রশান্ত মহাসাগরে অতিকায় এ্যালবাট্রসদের আস্তানা আছে সে শুনেছে। কখন দেখা দেবে কেউ বলতে পারে না। দেখা দিলে জাহাজের পক্ষে ভাল। কিন্তু বড় হিংস্র এদের স্বভাব। পুরুষগুলো বেশী মারমুখো হয়। এ-সব তথ্য ডেবিড পাখি সংক্রান্ত কোন বইয়ে পায় নি। প্রাচীন নাবিকের মুখে শুনেছে, এবং শুনেছে আশ্চর্য সব তথ্য।

    কাজেই ইচ্ছে করলেই সে কাপ্তানের কেবিন থেকে বন্দুকটা নিয়ে এসে এদের গুলি করে নামাতে পারে না। এদের হাত থেকে কোনরকমে তাহিতি পর্যন্ত চড়ুই দুটোকে রক্ষা করতে পারলেই হয়ে গেল। তাহিতি থেকে এরা প্রথম কিনবে একটা পাখির খাঁচা। চড়ুই দুটোকে খাঁচায় এবার ভরে ফেলবে। তারপর আর ভয় থাকবে না।

    তখন ছোটবাবু দেখেছে, এ্যালবাট্রসের তাড়া খেয়ে চড়ুই দুটো আর কাছে আসতে চায় না। এমন কি দেখেছে ওর বাকসোটাতে ঘুমোয় না। এনজিন-ঘরে থাকে। কিন্তু ভাল লাগবে কেন। একটু মুক্ত আকাশের নিচে উড়তে না পারলে ভাল লাগবে কেন। আর ভয় এই দুই বড় পাখির। কখন কি হবে কেউ বলতে পারছে না।

    জ্যাকের সেজন্য সব কিছুর ভেতর এই এক কাজ পাখি দুটোর দিকে লক্ষ্য রাখা। সে যখন দেখে এ্যালবাট্রস দুটো জাহাজের খুব কাছাকাছি, তখনই তার মাথা ঠিক থাকে না, লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে আসে, আর আর্চি তেমনি সেয়ানা, সেও কোথা থেকে বের হয়ে আসে, যেন আর্চি ঘুমোয় না, আর্চি সারারাত জেগে থাকে জ্যাক কোথায় কখন থাকে দেখার জন্য। দেখা হলেই জ্যাকের সব যেন গন্ডগোল হয়ে যায়। মাথায় কিছু থাকে না। সে সোজা হাঁটে না, ঠিক উল্টো মুখে নেমে গেলে মজা পায় আর্চি। আর আর্চি তার ছোটখাট চেহারা নিয়ে কিম্ভুতকিমাকার। জ্যাক তখন ছুটেও পার পায় না। পেছনে তাকিয়ে দেখে, না আসছে না। সে দম ফেলে দাঁড়ায়। আবার ডাকে, ডেবিড, আসছে, আসছে। ম্যান-এ্যালবাট্রসটা এগিয়ে আসছে।

    চড়ুই দুটো না থাকলে তার নিচে না নামলেও হত। চড়ুই দুটো না থাকলে, সে চুপচাপ’ কেবিনে কাটিয়ে দিতে পারে। সন্ধ্যার পর ছোটবাবু আর ডেবিড ওর কেবিনের পাশে চুপচাপ বসে থাকে। বারোটা-চারটা ডেবিডের ওয়াচ। সুতরাং চারটা থেকে আটটা পর্যন্ত ডেবিড আর ছোটবাবু বসে থাকে চুপচাপ। পোর্ট-হোল খুলে জ্যাক তখন সারাক্ষণ গল্প করতে পারে।

    কিন্তু ছোটবাবুর ভারী প্রিয় পাখি দুটো। এ-পাখি দুটো আসার পর ছোটবাবুর বিষণ্ণতা কেটে গেছে। ছোটবাবু পাখি দুটোর জন্য বিশেষ করে মিসেস স্প্যারোর জন্য কেমন এক মায়া অনুভব করে থাকে। জ্যাকের এ-সব আগে ভাল লাগত না। এগুলো অসভ্যতা। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তত মনে হচ্ছে ছোটবাবু যা ভালবাসে, সে তা ভালবাসে। এটা কেন হয় সে বুঝতে পারে না। পাখি দুটোকে রক্ষা করার কেমন একটা নৈতিক দায়িত্ব পেয়ে সে বেশ একটা ভাল কাজ করে যাচ্ছে জাহাজে—আর তখন সেই লোকটা, ও কি ভয়ঙ্কর, বাবাকে সে অনায়াসে বলে দিতে পারে, কিন্তু মনে হয় আবার নির্বাসনের দিনগুলি চলে আসবে! জাহাজিরা যদি টের পেয়ে যায় সে মেয়ে, তবে বাবা ঠিক পিসির কাছে পাঠিয়ে দেবেন। পিসির মুখ ভাবলেই ভয়ে তার রক্ত হিম হয়ে আসে—এবং সে বুঝতে পারে ভয় থেকে এক একটা আকস্মিক ঘটনা ঘটে যায়। সে রেগে গিয়ে পিসির সুন্দর চুল কেটে দিয়েছিল। পিসির পোশাকে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। জাহাজে এমন সব খবর খুব একটা মিথ্যা না—এতে আসে যায় না জ্যাকের। কেবল এখন নির্বাসনে যাবার আতঙ্কে আর্চির সব সহ্য করে যাচ্ছে। বাবাকে কিছু বলতে পারছে না। আর বাবা পাঠিয়ে দিলেই সে যাবে কি করে! ছোটবাবুকে ফেলে কোথাও গিয়ে সে থাকতে পারবে না। তার ভীষণ কান্না পাবে।

    সিউল-ব্যাঙ্ক যাচ্ছে তার সুহাস গতিতে। পাখি দুটো আকাশের ওপর সমান তালে ভেসে চলেছে। এবং এখন বেশ এই জাহাজ আর দুই বড় এ্যালবাট্রস ভেসে চলেছে। নীল জলধি বলা যায়, সাদা জাহাজ, সাদা পাখি আর বুদবুদ জলে, নীল জলে অসংখ্য প্রাচীন জীবেরা ঘোরাফেরা করছে। তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ কোথাও ভেসে উঠলে অসংখ্য বুদবুদ হয়ে যায়। সমুদ্রের বুকে জলরাশির ভেতর এই সব লক্ষ কোটি বুদবুদ দেখলে ছোটবাবুর এমনই মনে হয়। মনে হয় সমুদ্রেই তার নিবাস। এই সব অতিকায় হাঙ্গর অথবা তিমি কিংবা ধরা যাক যে সব সোর্ড ফিস ছুটে যাচ্ছে জলের নিচে এবং কখনও কখনও অতিকায় তিমিমাছকে গেঁথে ফেলছে—সেখানে যেমন এক যুদ্ধ রয়েছে ওপরেও তেমনি যুদ্ধ। পাখি দুটো উড়ছে, ওরা আহার খুঁজছে। চারপাশে সবাই আহারের জন্য নানাভাবে হত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। কেবল মানুষ আহার বাদেও হিংসা চরিতার্থ করতে চায়। এ-সব মনে হলেই ফিসফিস গলায় কেউ যেন ডাকে—জ্যাক, আমি এখানে।

    জ্যাক দেখতে পায়, এলি-ওয়ের মুখে, বড় একটা উইন্ডসেলের আড়ালে ছোটবাবু দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক অবাক। কি করে টের পেয়েছে ছোটবাবু, সে আসছে।

    —কোথায়?

    —এখানে।

    —এখানে কি!

    —দেখো না এসে।

    জ্যাক দেখল, চড়ুই পাখি দুটো পরস্পর ঠোঁট থেকে কি কেড়ে খাচ্ছে।

    —এখানে তোমরা! আর কত জায়গায় খুঁজে মরছি।

    ছোটবাবু বলল, জ্যাক তাহিতিতে নেমেই একটা খাঁচা কিনে ফেলব।

    —এ্যালবাট্রস জাহাজের পেছনে ততদিন উড়তে নাও পারে।

    ছোটবাবু বুঝল, তার আগেই ফিরে যেতে পারে পাখি দুটো।

    —তবে যাচ্ছে না কেন? জ্যাক বলল, কত বড় পাখি দুটো না!

    —ভীষণ! দেখলে চোখ ফেরানো যায় না।

    —কি নীল চোখ!

    ছোটবাবু বলল, এই, আমি যাচ্ছি, মেজ-মিস্ত্রির ওয়াচ থেকে উঠে আসার সময় হয়েছে।

    —মেজ মিস্ত্রি লোক ভাল না।

    —খুব বাজে। আমাকে অযথা গালাগাল করে!

    –ধরে থাপ্পড় লাগাতে পার না! ঘুষি, ঘুষি মারতে পার না।

    —ঠিক মারবো—কি বাজে দ্যাখো, সব ঠিকঠাক করে রাখি আর মেজ-মিস্ত্রি এসেই কি যে করে না! তারপরই কি যেন অন্যায় করে ফেলেছে ছোটবাবু, মুখে ভীতির ছাপ। সে ফের বলল, এই জ্যাক।

    —কী? সে চেয়ে থাকল। আর এমন সুন্দর চোখে সে যখন তাকিয়ে থাকে ছোটবাবু কেন যে বুঝতে পারে না।

    ছোটবাবু বলল, তুমি কিন্তু আবার কাপ্তানকে বলে দিও না।

    —কি বলব?

    —এই যে বললাম—ঠিক একদিন মেরে বসব।

    —বললে কি হবে?

    —আমাকে ডেকে পাঠাবেন। বকবেন।

    —জ্যাক বলল, তুমি কিছু করতে যেও না ছোটবাবু

    —আমাকে অযথা খাটায়। রাত সাতটার আগে আজকাল ছাড়ছে না।

    জ্যাক কি বলবে! জ্যাক জানে মেজ-মিস্ত্রি এখন থেকে অনেক অন্যায় কাজ করে যাবে। তবু সহ্য করা ছাড়া উপায় কি

    জ্যাক বলল, ছোটবাবু, একটা কথা বলব?

    —আমাকে?

    —হ্যাঁ তোমাকে। তুমি মেজ-মিস্ত্রিকে কিছু বলতে যেও না। প্লিজ!

    —আরে না না। আমার সাহসই হবে না। খুব রাগ হয়, জানো কাল আমাকে বয়লারের নিচে পাঠিয়েছে। স্কাম-বক্স ক্লিয়ার হচ্ছে না, কে করবে, ডাকো ছোটবাবুকে। কি যে দরকার বুঝি না, ওটা জ্যাম থাকলে এমন কি ক্ষতি বল!

    জ্যাক এনজিনের কলকব্জা সম্পর্কে কিছু বোঝে না। কিন্তু বয়লারের নিচে, জাহাজ চালু অবস্থায় কেউ ঢুকতে সাহস পায় না। তা ছাড়া শীতের সমুদ্রে জাহাজ নেই। গরম, ভীষণ গরম। দু-চার দিন না গেলে জাহাজ আরও নিচে নেমে না গেলে গরম কমবে না। ওপরে টন টন কয়লা পুড়ছে, নিচে ছোটবাবু! ভাবতে বুক শুকিয়ে যায়। সে বলল, নিচে ঢুকলে কি করে?

    ছোটবাবু হাসল। বলল, কি করব বল! বললাম, বড় একটা বস্তা দিতে। না হলে তো ঝলসে যাব। পিঠে মাথায় বস্তা চাপিয়ে ঢুকে গেলাম।

    —পারলে করতে!

    —হ্যাঁ। মেজ-মিস্ত্রি অবাক। ও ভেবেছিল, আমি রাজী হব না। খুব বোকা ভেবেছে আমাকে। দুঃখে চোখ ভার হয়ে এল জ্যাকের। কত সহজে বলে যাচ্ছে ছোটবাবু—যেন কিছুই না কাজটা। একটা মরণপণ কাজের ভেতর জীবন নিয়ে ছোটবাবু ছুটছে। সে মুখ ফিরিয়ে সমুদ্র দেখতে থাকল। ওর চোখে জল দেখলে ছোটবাবু ভাববে, জ্যাক খুব ছেলেমানুষ। সে সমুদ্র দেখতে দেখতেই বলল, কি দরকার ছিল ছোটবাবু তোমার ছ’নম্বর হওয়ার! কি দরকার ছিল তোমার জাহাজে আসার?

    জ্যাক বয়সী মানুষের মতো কথা বলছে। এখন জ্যাককে কিছুতেই মনে হয় না নাবালক। বরং জ্যাক তরুণ। বিচার-বুদ্ধিতে জ্যাক তার চেয়েও প্রাজ্ঞ। সে বলল, বা কত ভাগ্য আমার! আমি দেশে যখন ফিরব ও তুমি বুঝতে পারবে না, আমার মা আমাকে দেখে আকাশের চাঁদ হাতে পাবেন। আমি তো এমনি চেয়েছিলাম। জ্যাক আমি খুব বড় হতে চাই। সবাই বলবে, ছোটবাবু খুব বড় মানুষ। বাবা, আমার ছোট ভাই-বোনেরা, জ্যাঠামশাই আমার জ্যাঠিমা আমাকে যখন দেখবে, আমার গায়ে জাহাজি পোশাক, সাদা হাফ সার্ট প্যান্ট, মাথায় এংকোরের নীল টুপি, আমি তাদের কাছে কি যে হয়ে যাব না!

    জ্যাক মুখ ফেরাল না। সেই এক গ্রাম্য বালকের বড় হবার আশা। এই সামান্য কাজের ভেতরই ছোটবাবুর বড় হবার স্বপ্ন সার্থক হতে চলেছে। সে বলল, ছোটবাবু, আর কেউ খুশী হবে না?

    —আবার কে হবে?

    —বারে তুমি যে বলতে…….?

    –কি বলতাম!

    —তোমার লিটল প্রিন্সেস!

    ছোটবাবু ভুলেই গিয়েছিল, সে তার মাকে লিটল প্রিন্সেস বলেছে। বলল, অঃ আমার মার কথা বলছ!

    জ্যাক অবাক! সে ফিরে দাঁড়াল। দেখল, ছোটবাবুকে। ছোটবাবুর মুখে চোখে কি যে আশ্চর্য যাদু থাকে! সে ভাবল কিছু বলবে, কিন্তু কি বলবে, কিছু বলতে পারছে না। ঠোঁট কাঁপছে। এতদিন একটা ভীষণ চাপা অভিমান ছিল ছোটবাবুর ওপর। ছোটবাবু কি জানত না, জাহাজে বনি নামে একজন মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। সে কেন তার লিটল প্রিন্সেসের কথা ভাববে।

    ছোটবাবু বলল, এই জ্যাক কি হয়েছে?

    ছোটবাবু তুমিও ভাল না।

    —আমি ভাল না কেন? আমি তো কিছু করি নি।

    —তুমি ভীষণ ভীষণ…..

    ছোটবাবু তারপরই দেখল জ্যাক দৌড়ে যাচ্ছে। ডেকের ওপর দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। ছোটবাবু বুঝতে পারল না, জ্যাক এভাবে কেন দৌড়াচ্ছে।

    কারণ ছোটবাবু তো জানে না আনন্দে জ্যাকের চোখ দিয়ে অজস্র বারিধারা নেমে আসছে। জ্যাক এখন সোজা নিজের কেবিনে ঢুকে গেছে। এবং বালিসে মুখ গুঁজে দিয়েছে। ছোটবাবু তুমি আমাকে কি যে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে! আমি আর কাউকে ভয় পাই না।

    এবং পরদিনই সবাই ছুটে গেল মেজ-মিস্ত্রির কেবিনে। মেজ-মিস্ত্রি পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছে। সে হেঁটে আসছিল বোট-ডেক ধরে, মনে হল পায়ে কেউ কি দিয়ে হ্যাঁচকা মেরেছে! সঙ্গে সঙ্গে একেবারে উপুড় হয়ে পড়েছে ডেকে। নাক দিয়ে অনেকটা রক্ত পড়েছে। কিন্তু কিভাবে কি যে হল কেউ বুঝতে পারে নি।

    ব্যাপারটা কেউ বুঝতে পারল না। কেউ বলল, জাহাজের সেই অশুভ শক্তি। কেবল ছোটবাবু বুঝতে পেরে গুম হয়ে গেল। সে জ্যাকের সঙ্গে দু’দিন কথা বলল না।

    জ্যাক থাকতে না পেরে বলল এই, তুমি কথা বলছ না কেন?

    —কি বলব।

    —যা খুশী।

    ছোটবাবু বলল, জ্যাক তুমিও ভাল না

    —আমি তো খারাপ সবাই জানে। নতুন কি দেখলে?

    —তুমি কেন মেজ-মিস্ত্রিকে এভাবে ফেলে দিলে? যদি দেখতে পেত।

    —ও দেখবে! তা হলেই হয়েছে। ও এখন কি দেখে তুমি তো জান না। কি খুঁজে বেড়ায় তুমি তা বোঝ না। কেবল এদিক-ওদিক চেয়ে দেখে। নিচে কি আছে, কোথা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ওর মাথায় যদি থাকত…….

    ছোটবাবু বলল, কাউকে অহেতুক কষ্ট দিতে নেই।

    —তোমাকে দিচ্ছে কেন?

    ছোটবাবু আর কিছু বলতে পারল না। সে বুঝতে পারছে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠছে ওর সঙ্গে। জ্যাক তুমি আমার জন্য এটা করেছ?

    জ্যাক খুব সাদাসিধেভাবে বলল, হ্যাঁ।

    —জ্যাক তুমি কি? ওতে ওর রাগ তো বেড়ে যাবে।

    —টের পেলে তো। বলেই জ্যাক বলল, ঐ দ্যাখো আসছে। নেমে আসছে।

    ছোটবাবু দেখল, অতিকায় এ্যালবাট্রস দুটো জাহাজের দিকে উড়ে আসছে।—কোথায় আছে ওরা? —দাঁড়াও দেখছি। জ্যাক দৌড়ে চলে গেল। ছোট কাজ ফেলে যেতে পারে না! সে জ্যাককে দেখে যেমন টুপ করে ভেসে উঠেছিল উইনচের তলা থেকে, ফের সে উইনচের নিচে ডুবে গেল।

    এখন কে বলবে একটা মেয়ে জাহাজের সর্বত্র খুঁজে বেড়াচ্ছে পাখি দুটোকে। সে চিৎকার করছে, মিঃ স্প্যারো, মিসেস স্প্যারো তোরা কোথায়? ওরা উড়ে আসছে। ভেতরে ঢুকে যাও। কিন্তু কোথাও দেখতে পেল না। গেল কোথায়? কাপ্তান হুইলঘরে বসে দেখতে পাচ্ছেন, জ্যাক এংকোর ফেলার জিপসিতে উঠে পাখি দুটোকে খুঁজছে। বেশ আছে। জ্যাক, ছোটবাবু, ডেবিড বেশ আছে পাখি দুটোকে নিয়ে। এবং কাপ্তান নিজেও কতদিন দেখেছেন, চা-এর সঙ্গে সামান্য রুটি আপেল এলে উড়তে উড়তে চলে এসেছে তারা। তখন এই মহাসমুদ্রের শান্ত স্বভাবের ভেতর পাখি দুটো বড় বেশি ডাঙার খবর বয়ে আনে। পাখি দুটোকে খাবার ছুঁড়ে দিতে তারও কম ভাল লাগে না।

    তা ছাড়া মেয়েটা এভাবে বেশ দিন মাস কাল জাহাজে কাটিয়ে দিচ্ছে। কিছু তো নেই। সব সময় বই পড়তে ভাল লাগবে কেন, এখন বয়স বাড়ছে। চারপাশের গাছাপালার ভেতর বড় হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু কপাল মন্দ, সমুদ্রে সমুদ্রে ঘুরে মরছে। মেয়ের এই একাকীত্বের জন্য বেদনাবোধ যখন খুবই তীব্র হয়ে ওঠে, তখন আর বসে থাকতে পারেন না। একা একা পায়চারি করেন। মনে হয়, সেই ভয়ঙ্কর দিনে তিনি যেন শুনেছিলেন তুমি আমাকে এটা কি করলে! তোমার পাপ হবে না, তোমার শাস্তি হবে না, তোমার শাস্তি হবে না! আর বুড়োবয়সে মেয়েটার নির্জন একাকীত্বের ভেতর সেই শাস্তিকে তিনি অনুভব করতে পারেন। তাঁর তখন ঈশ্বর চিন্তা পর্যন্ত খারাপ লাগে।

    তখন ছোটবাবু দেখল, জ্যাক হাসি হাসি মুখে ওর পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। দু-হাত একসঙ্গে করে কি দেখাল ইশারায়। ছোটবাবু উইনচের তলায় নাট-বোল্ট খুলছে। চিত হয়ে আছে। কিছুটা দেখা যাচ্ছে। এবং জ্যাক ইশারা করলে সে আর শুয়ে থাকতে পারল না। বের হয়ে বলল, কি ব্যাপার!

    —তাড়াতাড়ি এস।

    জ্যাক কিছু বলছে না।—কী? বলবে তো?

    —এস। না দেখলে বিশ্বাস হবে না।

    জ্যাক লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ধরে উঠে যাচ্ছে। এখন বিকেল। সূর্য এবার পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জমালার ওপাশে নেমে যাবে, এবং সূর্যাস্তের রঙ যেমন মনোহারিণী থাকে তেমনি, চারপাশে উজ্জ্বল লাল নীল হলদে আভা, কখন সমুদ্রে মিলিয়ে যাচ্ছে আর কখন ভেসে উঠছে কেউ বুঝে উঠতে পারছে না। আর এভাবে ওদের শরীরের রঙ পাল্টে যাচ্ছে। কখনও বেগুণী কখনও মেরুন, কখনও ক্রিসেন্থিমাম। ছোপ ছোপ রঙের ভেতর ওরা যখন বাক্সোটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল তখন কে বলবে ওদের দুজনের কাছে পৃথিবীতে এর চেয়ে আর কিছু বিস্ময়ের আছে। পাখি দুটো হলদে নীল ছোট মারবেল গুলির মতো ডিম পেড়েছে। আর অহংকারে ওদের পা পড়ছে না। কেবল মাথার ওপর পাখি দুটো উড়ছে। আর কিচকিচ করছে।

    ছোটবাবু বলল, কী?

    জ্যাক বলল, কী?

    ওরা দুজনেই পাখি দুটোকে প্রশ্ন করল।

    তখন মৈত্র যাচ্ছে। সে বলল, কি করছিস রে ছোটবাবু?

    —এসে দ্যাখো না।

    মৈত্র এসে বলল, সাবাস!

    সারেঙসাবকে ছোট ডেকে আনল, চাচা দেখে যান কি হয়েছে!

    জ্যাক দু-লাফে একেবারে কোথায় চলে গেল। একটু পরে সবাই দেখছে, জ্যাক, তার বাবাকে টানতে টানতে নিয়ে আসছে।

    কাপ্তান এসেও উঁকি দিলেন। তিনি দেখলেন। দেখলেন ছোট্ট একটা কাঠের বাক্সের এক পাশে খড়কুটো দিয়ে বানানো ঘরে পাখি দুটো সুন্দর সুন্দর সব ডিম পেড়েছে। জ্যাকের দিকে তাকিয়ে বললেন, কে আবিষ্কার করেছে?

    জ্যাক বলল, আমি। বাবা আমি খুঁজতে এসে দেখি দুজনে চোরের মতো এখানে পালিয়ে আছে। ও মা কাছে যেতেই দেখি ওরা উড়ে গেল তারপরে না বাবা….। আহা জ্যাকের চোখ কি উজ্জ্বল! এভাবে প্রায় সকলেই এসে দেখে গেল। কাপ্তান নিজে এসে দেখে গেলেন যখন, তখন জাহাজিরা না দেখে থাকে কি করে। চড়ুই দুটো এ-জাহাজের যাত্রীর মতো। প্রায় সবাই পাখি দুটোর ভালমন্দ নিয়ে ভাবতে থাকল। কাপ্তান পাখি সম্পর্কে নানারকম কথা বলতে বলতে উঠে গেলেন। পাশে চীফ- অফিসার, রেডিও-অপারেটর। এই সব পাখি দীর্ঘদিন সমুদ্রযাত্রায় নানারকম বৈচিত্র্য নিয়ে আসে। এরা যে সত্যি ডিম পাড়ে, জাহাজিদের কথাবার্তা শুনে একেবারে মনে হবে না। যেন সিউল-ব্যাংক জাহাজে চড়ুই দুটো প্রসব করল।

    এই ডিম দেখার পর মৈত্রমশাই মুখ গোমড়া করে থাকল। সে টাকা পাঠাতে পারে নি বুয়েনএয়ার্স বন্দর থেকে। ভেবেছিল ভিকটোরিয়া থেকে মোটা টাকা পাঠাবে। কম্বল এবং কিছু উলেন জামা বিক্রি করে যা পেয়েছে পাঠিয়েছে। ওতে কি হবে। সন্তান হবার সময় কত কিছুর দরকার। সে লিখেছিল আমি ঠিক পাঠাচ্ছি। কাজ কারবার যা করেছে ওতো সব রেখে এসেছে বুয়েন-এয়ার্সে। এখনও মেয়েটির কথা ভাবলে চোখে ঘুম আসে না। বিজবিজে ঘা। ওর ক’দিন থেকে এই একটা ভাব, কুঁচকির নিচে বিজবিজে কি যে দেখা যাচ্ছে, জ্বলছে। বন্দর না এলে কিছু করতে পারছে না। পালিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আসবে। সে তো আর এ-সব কাউকে বলতে পারে না। কেবল টাকা টাকা। অমিয় কি সব এনে জড় করছে লকারে। অমিয় বলল, দাদা, আমি দ্যাখো ঠিক রাজা হয়ে বাড়ি ফিরব।

    মৈত্র বলল, কচু।

    —দেখ না। বলে লকার খুলে দেখাল।

    —কি করেছিস? সারেঙসাবকে বলেছিস চাবি পাচ্ছিস না! আর এ-সব হচ্ছে!

    —তুমি দেখ না। এই যে, বলে অমিয় একটা বড় তাল, প্রায় সোনার পিন্ডের মতো দেখতে, মৈত্রকে দেখাল। কয়লার ছাই থেকে এ-সব উজ্জ্বল ধাতুপিন্ড সংগ্রহ করেছে। এখন তেমন বেশি হচ্ছে না। ইন্ডিয়ান কোল পুড়লে চকচকে এমন সব ধাতুপিন্ড—আর সবই মনে হয় অমিয়র, কিছু রয়েছে এর ভেতর—সে কুড়িয়ে আনে। আর যা ভেবে থাকে, এই সব সঞ্চিত ধাতুপিন্ড নিয়ে সে কোন বড় দ্বীপে নেমে যাবে। কেউ টের পাবে না। আসলে কয়লার ছাই বলে কেউ বুঝতেই পারে না, এর ভেতর এমন অমূল্য কিছু পড়ে থাকতে পারে। সেই যেন প্রথম এটা আবিষ্কার করেছে। একবার শুধু যাওয়া। লকারের নিচের তাকটা ভরে গেছে। যদি সত্যি সোনা হয়ে যায়, অথবা এমন ধাতুপিন্ড, যা আরও অমূল্য, সে তো এভাবে গলে গলে কয়লা থেকে হীরক হয়ে যাওয়ার গল্প শুনেছে। শুনেছে, কোন এক কয়লাবালা এক পিন্ড হীরক পেয়েছিল। কয়লা টানতে টানতে বড় বড় চাঁই ভেঙ্গে ফেলতেই উজ্জ্বল রত্নরাজি। এবং সে সারেংকে দেখিয়েছিল। সারেং কাপ্তানকে। কাপ্তান বলেছিল, কিছু না, কাচ। তারপর বলেছিল, ফেলে দাও। কোলবয় ফেলছে না, নিয়ে যাচ্ছে। তিনি ফের ধমক দিলে, সে ফেলে দিয়েছিল। তারপর চলে গেলে কাপ্তান কুড়িয়ে নিয়েছিল সাত রাজার ধন এক মাণিক, এবং জাহজে কেউ জানল না কাপ্তান বোকা বানিয়ে সব কেড়ে নিল। সে এমন বোকামি করছে না। মৈত্রেরও এমন একটা চালাকি মনে মনে থাকতে পারে। অমিয় বেশ ভাল করে তালা মেরে টেনে দেখল। না, এত সহজ নয় খোলা। কেবল একটা ভয় রয়েছে, যে কোনো সময় কাপ্তান সাফাইয়ে এসে এটা খুলে দেখতে পারেন। যা শোলার উপদ্রব হয়েছে! ওর লকারটার ভিতরে এখন যত আরশোলার রাজত্ব। রাজ্যের সব আরশোলা ওর লকারে জড় হয়েছে। চাবি পাচ্ছে না বলে খোলা যাচ্ছে না। গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না। সব আরশোলা তাড়া খেয়ে ওর লকারে পালিয়ে আছে।

    এবং লকারটা খুললেই সারা ঘরময় সেই আরশোলা উড়তে থাকে। যেন একটা দুটো না, অজস্ৰ এবং বেলুনের মতো হয়ে যায়, রং-বেরংয়ের বেলুন। বেশি উড়তে থাকলে বিপদ, সবার ঘরে উড়ে যাবে। কেউ তো জানে না, সব এসে এখন এই একটা লকারে আশ্রয় নিয়েছে। এত গ্যাসেও কোন ফল হচ্ছে না। এবং যেমন লকার খুলে দেখার একটা কাজ আছে অমিয়র, মালপত্র ঠিক আছে কিনা, না কেউ গেঁড়া মেরেছে, সবচেয়ে ভয় মৈত্রকে। যেভাবে টাকা টাকা করছে যে কোনো সময় ঠিক ফাঁক করে দিতে পারে—সুতরাং মাঝে মাঝে খুলে ফেলতে হয়, খুলে দেখার সময় আরশোলা উড়ে বেড়ালে আবার তাদের ধরতে হয়। ধরে ধরে একটা একটা করে ভরে রাখতে হয়! এখন তো কারো কেবিনে আর ছেড়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আগে সে বড়-মিস্ত্রির কেবিনে এইসব আরশোলা মধ্যরাতে ছেড়ে দিত। আপেল ডিম তোলার সময় ওর হাত থেকে পাখির মতো একটা একটা করে আরশোলা উড়ে যেত, যেন অজস্র পাখি এবং বোধ হয় অজস্র চড়াই, ছোট ছোট পাখি, উড়ে উড়ে অল্প আলোতে নানাবিধ ছায়া ঘোরাফেরা করলে একটা হাত এবং ঝুলন্ত হাত, পাশে কি রয়েছে, নেশার ভেতর চোখের পলক পড়ত না—সে এভাবে একটা মহৎ কাজ করেছে জাহাজে উঠে। শালাকে ভাগিয়েছে। এমন ভাবে সুন্দরী মেয়েদের কাঁচা মাংস খেতে সে কাউকে দেখে নি। টাকার জোর থাকলে সব হয় না।

    সব হয় না বললে কি হবে, লাফিয়ে লাফিয়ে একটা একটা করে খপ করে ধরছে, আর লকারে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। খোঁয়াড়ে ছাগল ঢুকিয়ে দেবার মতো। সে ধরছে আর বলছে, টাকা! না টাকাই সব না। টাকা! টাকা আছে, সব আছে। প্রেমিকা আমার, মুক্তো আমার, আমি টাকা নিয়ে যাব। কত টাকার খাঁকতি দেখাব।

    মৈত্র এ-সব দু-একদিন লক্ষ করছে, ছোটবাবুও লক্ষ্য করত। অমিয় বিড়বিড় করেছ বকছে। এখন মৈত্র ওপরে থাকলে, গোপনে লকার খুলে দেখলে এটা বেশি হয়। এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে তার লড়াই। যতদিন লড়াইয়ে না জিতছে ততদিন অমিয়র যেন শান্তি নেই। এ-সব কারণে জীবনপণ করে সে সামনাসামনি সেই অদৃশ্য শত্রুর ডামি পেয়ে গেলে লোভ সামলাতে পারে না। কব্জা করে তবে ছাড়ল। ছোটবাবুরও উপকার হয়ে গেল। ছ-নম্বর হয়ে গেল। তাহিতিতে ছোটবাবুকে একটা ভোজ দিতে হবে। না হলে অমিয় ছোটবাবুর পিছনেও লাগবে।

    এ-সব মনে হলেই ওর মনে হয় অদৃশ্য সেই শত্রু মহান নায়কের মতো গোঁফ মুচড়ে মুচকি হাসছে। সে তখন স্থির থাকতে পারে না। জাহাজে উঠে এত দিন সে কাউকে বুঝতে দেয়নি, তার ভালবাসার মেয়েকে কেউ কেড়ে নিয়েছে। ঠিক কেড়ে নিয়েছে বললে ভুল হবে, যেন ইচ্ছে করেই সেই মেয়ে তাকে ছেড়ে চলে গেল। কারণ, অমিয়র কি আছে! শরীর বাদে ওর কিছু নেই। বাউন্ডুলে, চুল বড়, দাড়ি ঠিক মতো কামায় না, স্নান করে না, কেমন এলোমেলো, তারপর মদ্যপান, কোথায় যে টাকা পেত বাংলা মদের। এ-সব নানা অজুহাত দেখিয়ে ফুস করে উড়ে গেল।

    সে খপ করে আরশোলা ধরত আর বলত, টাকা! টাকা কামিয়ে একটা দ্বীপ কিনে ফেলব। তারপর চাষাবাদ। চারপাশে সমুদ্র দ্বীপের। দ্বীপের একপাশে উঁচু পাহাড়, পাহাড়ে একটা আমলকি গাছ থাকবে। তার নিচে ছোট্ট কুটির। নিচে বেলাভূমি, মৎস্য শিকারের অবাধ সুযোগ, পাশে ফুলের রাজত্ব, এক পাশে আঙুর ক্ষেত, পাশেই আঙুর পচিয়ে মদ, পাশেই আপেলের বাগান, পৃথিবীর যাবতীয় সুদৃশ্য গাছপালা এনে সে লাগাবে, তারপর সুন্দরী রূপবতী মেঘবরণ চুলের কন্যার হাতে ফুল দিয়ে বলবে, আমি পৃথিবী জয় করলাম।

    আসলে সে চায় প্রতিশোধ। সে যে কত বড় তা দেখাতে চায়। সে এভাবে চারপাশে নানারকম কারুকার্যময় জীবন দেখতে দেখতে মাঝে মাঝে ভীষণ উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। তাহিতিতেই সে প্ৰমাণ করবে, এগুলো কি। সে বলল, এই যাবি মৈত্ৰ!

    —কোথায়?

    —কি ভেবে বলল, না থাক। পরে বলব। মৈত্রকে অমিয় কিছু আর বলল না।

    —কিছু বলছিস না যে?

    —এই বলছিলাম ছোট নাই তো। খুব খালি খালি লাগছে।

    —তা আর ভেবে কি হবে।

    —ছোটর খারাপ লাগে না আমাদের ছেড়ে থাকতে?

    —জিজ্ঞেস করে দেখ না।

    —এখন তো কথাই বলতে পারি না। কোথায় যে থাকে!

    —উইনচের নিচে পড়ে থাকছে।

    এভাবেই জাহাজ যায়। আর ছোটবাবু উইনচের তলায় চিৎ হয়ে পড়ে থাকে। দুলে দুলে জাহাজ যায়। আসলে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলে মনে হয় আকাশটাই দুলছে। রাত হয়ে গেলে মনে হয় নক্ষত্র দুলছে। উইনচের নিচে শুয়ে তার মা-বাবার মুখ এবং সেই দূরদেশে রয়েছে জন্মভূমি, সব তরমুজের লতা, এবং বড় অশ্বত্থ গাছ এ-সবের ভেতর মনে পড়ে ছোট্ট এক মেয়ে—সে তো এখন ওর মতো বড় হয়ে গেছে। নাকে ওর নথ ছিল। ঠিক দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গে ওর মুখ এখন আকাশের গায়ে ভেসে উঠছে। কি বড় নথ, আর কি বড় চোখে ওকে দেখছে। সারা আকাশময় শুধু নক্ষত্র! এখন কি মাস, এ-মাসে কি তার আগে পুজো হয়ে গেছে! আকাশের গায়ে প্রতিবিম্ব ভেসে উঠলে সুদূরের সেই দুর্গাপুজোর কথা মনে হয়। চারপাশে ড্যাং ড্যাং বাজনা বাজছে। কি যে হয়, কিসের বাজনা, কেন এতদূর থেকেও সে স্পষ্ট শুনতে পায় বাজছে, দুর্গাপুজোর বাজনায় সারা শরীর ওর ফুলে ফুলে উঠছে।

    আসলে মায়ের কথা ভেবে ছোটবাবুর কান্না পাচ্ছিল। সে উইনচের নিচে শুয়ে গোপনে মায়ের জন্য কাঁদছে।

    রাত আটটায় ডাইনিং হলে খাবার সাজানো হচ্ছে। একে একে সবাই নেমে আসছে। ওভাল সাইজের টেবিল, ধবধবে সাদা চাদর বিছানো। টুপির মতো ন্যাপকিন সাজানো প্রত্যেক চেয়ারের সামনে। সুন্দর কারুকার্য করা দেয়াল। দেয়ালে বিখ্যাত সব কাপ্তানদের ছবি। নিচে নাম। ব্যাংকলাইনের সব দুর্দান্ত কাপ্তানদের বড় বড় ছবি। মাঝখানে হিগিনসের ছবি। আর চারপাশে আলোর ফুলঝুড়ি। বিচিত্র সব আলোর বাহার। খেতে বসলে রেকর্ড চালিয়ে দেওয়া হয় কোনো দিন। মিউজিক বাজতে থাকে। ওরা নিভৃতে খায়। অথবা দুটো-একটা পুরানো কিংবদন্তী। সমুদ্রগামী জাহাজে দূর অতীতে কত কি সব সংস্কার ছিল, সে সব কথাবার্তা কাপ্তান সারাজীবন ধরে যেন মুখস্থ করে রেখেছেন সব। জাহাজি ঐতিহ্য এভাবে খেতে বসে কথাবার্তায় ধরা পড়ে। ছোটবাবু খাবার সময় কথা বলে না। কেবল শুনে যায়।

    অথচ সবাই এসে দেখল, ছোটবাবু আসেনি। জ্যাকের খাবার এখন ওর কেবিনে যাচ্ছে। সে নিচে খেতে আসছে না। ডাইনিং হলে সে খেতে একেবারেই পছন্দ করছে না। জ্যাক যেভাবে পারছে মেজ- মিস্ত্রি আর্চিকে এড়িয়ে থাকতে চাইছে।

    তখন ডেবিড খুঁজে খুঁজে আবিষ্কার করল ছোট উইনচের তলায় ঘুমিয়ে পড়েছে। ছোটকে অহেতুক কাজ দিয়ে রাখে মেজ মিস্ত্রি। সে কিছু বলতে পারে না। ধীরে ধীরে ডাকল, এই ছোট। শিগগির ওঠ। তুমি ঘুমোচ্ছ!

    ছোট উঠেই কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। সে তাড়াতাড়ি আবার স্প্যানার বসিয়ে দিতে গেল নাটের ডগায়! খুব অন্যায় করে ফেলেছে। তাড়াতাড়ি নিজেকে সংশোধন করার সময় বুঝতে পারল না, ডেবিড এসেছে ওকে ডাকতে। সবাই ডাইনিং হলে ওর জন্য অপেক্ষা করছে। রাত আটটা বাজে।

    এবং যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব সে ছুটে গেল। তাড়াতাড়ি তো সব হয়ে ওঠে না। যতটা পারল হাত-পা পরিষ্কার করে হলঘরে ঢুকে দেখল, আর্চি বিরক্ত মুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সে ভীষণ কুণ্ঠার সঙ্গে বলল, আমার দেরি হয়ে গেছে। দুঃখিত।

    ডেবিড বলল, এত কাজ করছ, খেয়াল নেই!

    ছোটবাবু বুঝতে পারল, ডেবিড ওর দোষ ঢাকছে। সে কিছু আর বলতে পারল না।

    ছোটবাবু মেনু দেখল। ক্রিম ম্যাভি লোসে, ফিলেটস্ অফ হেক, ম্যাকসিকান রোস্ট, রিবস্ অফ বিফ্, রোফোর্ট, বয়েল প্যোটাটোজ, ফ্রেনচ্ বিনস, চকোলেট, পুডিং চিজ, কফি।

    ছোটবাবু সব খাবার খেতে পারে না। সে বেছে বেছে খায়। বয়েলড্ প্যোটাটোজ চাক চাক কেটে নিল। ফ্রেন্‌চ বিন্‌স খেল সবটা। রোস্ট খেতে ও পছন্দ করে। সবশেষে সে খেল পুডিং কফি। খাবার পরও মনে হল, সে খায়নি। একটু ঝালঝোল ভাত ডাল কি যে প্রিয় তার। সে খেয়ে উঠে গেল। সে যে ভালভাবে খেতে পারে না ডেবিড বুঝতে পারে। যে ছেলেটা শৈশব থেকে অথবা জন্মাবধি একভাবে মানুষ, তাকে হঠাৎ অন্য জীবনযাপনে ফেলে দিলে যা হয়, এবং প্রায়ই দেখা যায়, খাবার টেবিলে ছোটবাবুর কোনও উৎসাহ থাকে না। যখন সবাই স্যুপ অথবা অন্য খাবার হুস-হাস খায়, তখন নীরবে ছোটবাবু এটা-ওটা বেছে খায়। কিছুটা খেয়েই প্লেট সরিয়ে রাখে।

    এখন ছোটবাবুর কাজ একটু ভাতের ব্যবস্থা করা। ভাত-ডাল হলেই হবে। একটা শুকনো লংকা পুড়িয়ে নিলেও তার অমৃতের মতো মনে হবে। এবং যেটা স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে ছোটবাবুর ভাত না খেতে পেলে ঘুম আসতে চায় না। ভাল ঘুমোতে না পারলে, বেশি খাটতে পারে না। ভাঙা জাহাজে সারা দিনমান এটা-ওটা মেরামত লেগেই আছে। সাধারণ মেরামতের কাজগুলো সে-ই করে থাকে। কিছু কাজ আছে যেমন, বাল্ব ঘুরছে না, গ্যাস-পাইপ কাজ করছে না, উইনচের প্যানিয়ান জ্যাম, সেগুলো সহজ সাধারণ কাজ বলে সেই করে ফেলে। যত সহজ ভাবা যায়, পরিশ্রমের দিক থেকে তত সহজ নয়। সে সেই সকাল থেকে সারা দিনমান প্রায় ডেকে, বোটডেকে ছুটে ছুটে কাজ করে থাকে বলে, সব সময় মনে হয় পেট ক্ষুধায় জ্বলছে। আর ফাঁকে যদি আফ্‌ট-পিকে চলে আসতে পারে, তবে তো কথাই নেই, একেবারে চোরের মতো ভান্ডারিজ্যাঠার গ্যালিতে ঢুকে, জ্যাঠা তাড়াতাড়ি, একটু আলু ভাজা, ব্যাস, সে গোগ্রাসে খেয়ে প্যান্টেই হাত মুছে লাফিয়ে আবার কখন কাজে যায়, অফিসাররা বুঝতেই পারে না, ছোটবাবু আড়ালে খালাসিদের খাবার খেয়ে এসেছে।

    আর এভাবে খেতে পেলেই সে ভীষণ ছুটে ছুটে কাজ করতে পারে। খাটতে পারে বেশি। রাতে তাকে জেগে থাকতে হবে, যদি মৈত্রদা, অমিয়, মনু কেউ এদিকে আসে! সে এলি-ওয়ে ধরে হাঁটতে থাকল। কেউ আসছে না। ওরা হয়তো ভুলে গেছে, সে জেগে অছে দুটো ভাত খাবে বলে।

    তখনই অনিমেষ এল। একটা ছোট কলাই-করা বাটিতে ভাত। একটু মাংসের ঝোল। ছোটবাবু ঢাকনা খুলে শুঁকে দেখল—আহা কি সুন্দর ঘ্রাণ। ওর জিভে জল চলে এসেছে। এবং কেবিনে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল। সে যতক্ষণ ভাল করে স্নান না করবে, যতক্ষণ পরিপাটি করে না খাবে, এবং চোখ বুজে বুজে হাড় চিবোবে, ততক্ষণ সে জাহাজ ডুবে গেলেও কেবিন থেকে নড়বে না। উদ্বাস্তু জীবনের মতো ভাত-ডাল, ভেড়ার মাংস তার কাছে আবার ভীষণ মহার্ঘ হয়ে গেছে।

    সে কেবিনে ঢুকেই বেল টিপল। মেস-রুম বয় এসে ওকে সেলাম জানালে বলল, পানি। মেসরুম-বয় বড় কাচের জারে জল, গ্লাস, সব সাদা লতাপাতা আঁকা দামী তোয়ালে দিয়ে ঢাকা, টিপয়ে রাখল। বয় আসার আগে লকারে সে ভেড়ার মাংস আর ভাত লুকিয়ে রেখেছে। জলটাও চেয়ে নিল। নুন সে বেশি করে ছোট্ট একটা কাচের বোতলে রেখে দিয়েছে। ও, কি যে ভাল লাগছে! সে চারপাশে ভেড়ার মাংসের ঝাল-ঝাল গন্ধ পাচ্ছে। যেন এই কেবিনে অন্য ঘ্রাণ, কারণ সকালে স্প্রে করে দিয়ে যায় দামী সুগন্ধ, সব উবে গিয়ে শুধু মাংসের ঘ্রাণ, সে শিস দিতে থাকল। স্নান করল সাবান মেখে। জলের যখন যে-রকম দরকার, হট্, কোল্ড, সে শীত না পড়া পর্যন্ত ঠান্ডা জলের ট্যাপ খুলে স্নান করে। আয়নায় ওর শরীর, ওর স্বাস্থ্য ক্রমে ভীষণ মজবুত হয়ে যাচ্ছে। আয়নার সামনে দাঁড়ানোর অদ্ভুত স্বভাব হয়ে গেছে। কারণ, সে সব খুলে হাতের মাস, পায়ের মাল বিচিত্র অঙ্গভঙ্গীতে দেখতে দেখতে ভাবে, তুমি কি ছিলে ছোটবাবু কি হয়ে গেলে! ক্রমে দৈত্যের মতো হয়ে যাচ্ছ।

    কখনও কখনও এভাবে স্নান করার সময় ছোটবাবুর শরীর দেখার নেশায় পেয়ে যায়। সে খুব কম সময় খালি গায়ে থাকে আজকাল। গরমেও সে পাঞ্জাবী-পাজামা পরে থাকে। বোধহয় আর্টি জানে না, ছোটবাবু শুধু লম্বাই নয়, মজবুতও। আর্চিকে তুলে সে জোরে আছাড় মারলে গুঁড়ো হয়ে যাবে।

    সে এ-সব অবশ্য বুঝতে দেয় না। তোয়ালে দিয়ে চুল, ঘাড়, পিঠ, পেট এবং জংঘার জল ধীরে ধীরে শুষে নিল। পিঠে বুকে প্রায় নীলবর্ণের বনরাজিনীলা। ধীরে ধীরে প্রায় অঙ্কুর উদগমের মতো, নরম, বিন্দু বিন্দু জলকণা শরীরে লেগে থাকলে, সুন্দরী তরুণীদের কথা মনে হয়, পৃথিবীর কোথাও, সেই রূপবতী বালিকা বড় হয়ে উঠছে। চুল শ্যাম্পু-করা তার। লতাপাতা আঁকা ফ্রক গায়ে—এবং কোথাও হয়তো পাহাড়ের চড়াইয়ে সে সবুজ উপত্যকা দেখে থমকে দাঁড়িয়েছে। কেন জানি মেয়েটার তখন একা একা এমন সবুজ শস্যক্ষেত্র দেখতে ভাল লাগছে না। মা-বাবা-ভাই-বোন সব থাকতেও মনে হচ্ছে তার কি নেই। ছোটবাবু চোখ বুজে প্রায় খেয়ে যাচ্ছিল—আর এমন সব রঙীন এক পৃথিবী, যেন ইজেলে কেউ এসে ছবি এঁকে যাচ্ছে আর ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। জ্যাককে সে বলতে পারে এখন, জ্যাক, মাঝে মাঝে একজন ফ্রক-পরা মেয়েকে আমার ভালবাসতে ইচ্ছে করে। তোমার করে না!

    ভাত খেলেই ছোটবাবু জাহাজে সুখী মানুষ হয়ে যায়। সে আর দুঃখী রাজপুত্র থাকে না। সে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সুন্দর স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে।

    সে শুয়ে শুয়ে কখনও এভাবে সুখী রাজপুত্রের মতো স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে। জাহাজে ওঠার পর স্বপ্ন দেখলে—যা দেখত, কখনও সে হাতীতে চড়ে যাচ্ছে। একটা মরা নদী পার হয়ে যাচ্ছে। পেছনে একটা কুকুর আসছে, হাতীর সামনে কেউ বসে রয়েছে, যেমন দীর্ঘকায় তিনি, তেমনি চওড়া, তাকে নিয়ে তিনি কোথায় যেন চলে যাচ্ছেন। আবার সে দেখতে পেত, নদীর চরে অনেক উঁচুতে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, কিংবদন্তীর মতো মানুষ তিনি, কখনও মনে হতো, আসলে তিনিই সেই মোজেস, বাইবেলে বর্ণিত মানুষ। তিনি, যতদূরে নৌকা নদীতে ভেসে যাচ্ছে, ততদূরে যেন হাত তুলে দিতে পারছেন। যত দূরে চলে যাচ্ছে নৌকা, তত হাত ওপরে উঠতে উঠতে আকাশ ছুঁয়ে দিতে চাইছে। তত গাছ-পালা, বন-উপবন, এবং নদীর বাঁক পেরিয়ে ছোটবাবু স্বপ্নে দেখত, হাতটা অনেক দূরে অনেক উঁচুতে ঝুলে আছে। জ্যাঠামশাই চিৎকার করে বলছেন, এবারে ফিরে যাও। আর আসতে হবে না। অনেকটা সারেঙ-চাচার মতো তাঁর মুখ, সেই মানুষ ছিল ওদের পরিবারের একান্ত মানুষ। স্বপ্নে সে তাঁকেও কতবার যে দেখেছে!

    ভোর রাতের দিকে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখে আজও ছোটবাবুর ঘুম ভেঙে গেল। জেগে গিয়ে স্বপ্নটার মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছে না। আর কি যেন হয়ে গেল! শরীরে এক আশ্চর্য ঘ্রাণ আছে সে এই প্রথম টের পেল। সুন্দর শরীরে এসব নির্গত ধারা, শরীরের ভেতরে জেগে থাকে সে জানত না। আশ্চর্য উষ্ণতা সারা শরীরে রিন-রিন করে বাজছিল। তারপর মনে হয়, রঙের কোমল কণিকারা প্রায় ভূমিকম্পের মতো আলোড়ন তুলে বের হয়ে এসেছে। সে পাশ ফিরে শুতে গিয়ে জংঘার পাশে এবং উরুর কাছাকাছি জাঙ্গিয়ার ভেতরে কি সব এলোমেলো ব্যাপার, প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়ার সামিল- সে উঠে বসে—কেমন অবোধ বালকের মতো কি করবে ভেবে পায় না। মৈত্রদাকে দেখেছে, দেখে সাহস জন্মেছে। অমিয়কে দেখেছে, দেখে বুঝতে পেরেছে সত্যিকারের পুরুষ মানুষ হয়ে গেলে এটা হয়। কিছুতেই তাকে বাধা দেওয়া যায় না। নষ্ট হয়ে যাওয়ার কিছু নেই।

    কিন্তু ছোটবাবু ঠিক ঠিক মনে করতে পারছে না, কি দেখে স্বপ্নে সে প্রথম নষ্ট হয়ে গেল। যতদূর মনে করতে পারে, অস্পষ্ট কুয়াশার ভেতরে কোনো বালিকার মুখ সে দেখেছিল। সে দু’হাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজে আছে। স্বপ্নটা মনে করার চেষ্টা করছে। বালিকার কথা ভাবতে তার ভাল লাগছে। এবং খুব নিবিষ্ট হলে বুঝতে পারে প্রথমে এই জাহাজ কেমন ভাঙা পালবিহীন, এবং জাহাজটা ওর পূর্ববঙ্গের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছে। বর্ষাকাল, ধান গাছে কীট-পতঙ্গেরা উড়ছে। সে আর কাপ্তান লগি মারছেন। ঠিক গাদা-বোটের মতো অতিকায় জাহাজটাকে বর্ষার ধান-খেতের ওপর দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছে। ওর মা বাঁশঝাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাঠিমা জ্যাঠামশাই সবাই দাঁড়িয়ে আছেন। সে সেই পালবিহীন অতিকায় জাহাজ স্বপ্নে ঠেলতে ঠেলতে একটা খালের ভেতরে নিয়ে ফেললে, দুটো একটা ধান-পোকা, সোনা-পোকা এবং বর্ষায় কীটপতঙ্গ জাহাজের গলুইয়ে উঠে আসছে। আর কি হয়েছিল তখন, একটা সোনা-পোকা ধরতে গিয়েই কি যেন হয়ে গেল, আমারে দ্যান, আমারে দ্যান সেই বালিকার মুখ। ট্যাবার পুকুরপাড়ে জঙ্গলটা পর্যন্ত স্বপ্নে সে দেখে ফেলেছে। আর কি আশ্চর্য, দু-লাফে সোনা-পোকা নিয়ে সে দৌড়াচ্ছে। সেই আমারে দ্যান, আমারে দ্যান মেয়েটাও দৌড়াচ্ছে। দৌড়াতে দৌড়াতে কি যে হয়ে যায়, দৃশ্যাবলী পাল্টে যায়, সমুদ্রের ঢালু উপত্যকায় নেমে যাচ্ছে কেবল, কেবল গড়িয়ে সেই বালিকা আর সে পড়ে যাচ্ছে, আর তখনই স্বপ্নের ভেতর থেকে ফ্রক- পরা অন্য একটা মেয়ে উঠে আসছে। সাদা সার্টিনের ফ্রক, পায়ে স্কেটিং পরে একেবারে দ্রুতগতিতে ওকে লুফে নিয়ে চলে গেল। তারপর সেই সমুদ্রে তুষার-বৃষ্টি—সমুদ্রে তুষারপাত—রিন রিন করে বাজছে। নীল বরফের উপত্যকায়, তুষারপাতের ভেতরে সাদা পোশাকে মেয়েটা অনবরত ছোটবাবুকে নিয়ে নাচছে। ছুটছে। খেলছে। প্রায় মাতালের মতো পড়তে পড়তে ঠিক সোজা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আবার ঘুরে ঘুরে রিন রিন বাজনার মতো ধীরে, খুব ধীরে স্কেটিং করে যাচ্ছে। কখনও লাফিয়ে বরফের পাহাড় পার হয়ে, কখনও নীল জলের হ্রদ পার হয়ে সুন্দর একটা পাইন গাছের নিচে দাঁড়িয়ে গোপনে চুমো খাচ্ছে। ব্যাস সঙ্গে সঙ্গে মনে করতে পারছে ছোটবাবু, ভূমিকম্পে সেই কোমল সাদা কণিকারা লাভার মতো ছুটতে ছুটতে বের হয়ে এসেছে।

    কিন্তু ছোটবাবু বুঝতে পারছে না, সাদা সার্টিনের ফ্রক-পরা মেয়েটিকে কোথায় সে দেখেছে। চেনা, চেনা, খুবই চেনা মুখটা অথচ মেলাতে পারছে না। তারপরই সে ভয়ে গুটিয়ে গেল—সেই মেয়ে, সে মনে করতে পারছে, স্বপ্নে সেই মেয়ে সার্টিনের ফ্রক গায়ে পাইনের নিচে তাকে নষ্ট করে দিল। আর মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুন্দর স্বপ্নটা তার কাছে ভীষণ দুঃস্বপ্ন হয়ে গেল। সে মুখ ব্যাজার করে উঠে গেল বাথরুমে। বাথরুম থেকে পোশাক পাল্টে, পোর্ট-হোল খুলে দিল।

    তখনই সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা জাহাজে ঘটে গেছে। ছোটবাবু টেরও পায়নি। জ্যাক এসে ছোটবাবুর দরজায় মাথা কুটছে প্রায়।—শিগগির ছোটবাবু। শিগগির উপরে এস। সব আমাদের শেষ হয়ে গেল।

    ছোটবাবু পাগলের মতো ছুটে গেল দরজায়। তারপর দরজা খুলে দিলে শুনল, জ্যাক বলছে, মিসেস স্প্যারো ডেড। আর কিছু বলতে পারছে না। চোখ প্রায় স্থির। ছোটবাবুকে অবাক হয়ে দেখছে। ছোটবাবুর শরীরে নতুন ঘ্রাণ। আর সঙ্গে সঙ্গে চোখের ওপর থেকে সমস্ত কুয়াশা সরে যাবার মতো চেঁচিয়ে বলে উঠল, মিসেস স্প্যারো ডেড। তারপর কেমন ধীরে ধীরে বলে গেল জ্যাক, লেডি এ্যালবাট্রস ছোঁ মেরে তুলে নিল, আমরা কিছু করতে পারলাম না ছোটবাবু। সে বালকেডে হেলান দিয়ে মৃতপ্রায় দাঁড়িয়ে থাকল। আর কিছু বলতে পারছে না।

  • তেইশ

    তেইশ

    ।। তেইশ।।

    সেই এক দৃশ্য—চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু জল, নীল জলরাশি। ঠাণ্ডা বাতাস ক্রমে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। সমুদ্রে ছোট ছোট ঢেউ। বৃত্তের মতো ঘুরে ঘুরে ডুবে যাচ্ছে তারা। বেশি উঁচুতে উঠতে না পারলে, নিজের সামান্য বৃত্তে নিজেরা হারিয়ে যায়। আর কিছু থাকে না, আদিগন্ত শুধু সমুদ্রের এই জল নিয়ে খেলা।

    সিউল-ব্যাঙ্ক আপন গতিতে তেমনি চলছে। মনেই হবে না, জাহাজে কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে। মনে হবে না সেকেণ্ড মেট ডেবিড এখন বোট ডেকে হামাগুড়ি দিচ্ছে—হাতে বন্দুক, হামাগুড়ি দিয়ে ঠিক বোটের আড়ালে মরা সাপের মতো পড়ে রয়েছে। এ্যালবাট্রস পাখি দুটো এদিকে এলেই গুলি করে নামাবে।

    তার পাশে আরও দুজন—জ্যাক আর ছোটবাবু। ছোটবাবুর সাতটায় কাজে নেমে যেতে হবে। কিন্তু সেই পাখি দুটোর জন্য ভেতরে ভীষণ একটা দুঃখ। মুখ ভার। পুরুষ চড় ইটা ভয়ে ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। ওদের পায়ে পায়ে ঘুরছে। এবং জ্যাকের প্রায় কান্না পাচ্ছিল। ওরা এখনও কিছু করতে পারছে না। সেই থেকে ওরা নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে, গুলিতে ফেলে দিতে। ডেকের ওপর মাংস ফেলে রেখেছে, যদি লোভে উড়ে আসে। কিন্তু সেই যে চড়ুইটাকে তুলে নিয়ে গেল আর এল না। অনেক দূরে পাখি দুটো উড়ে উড়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে জলে আর্শিতে রোদ পড়ার মতো চোখ ভীষণ ঝলসে দিচ্ছে। পাখি দুটোকে তখন আর দেখাই যাচ্ছে না। চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছে।

    এভাবে ডেবিডের রাগ বেড়ে যাচ্ছে—যেন ক্রমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এভাবে বেড়ে যায়। পাখি দুটোর চাতুর্যের কাছে সে হেরে যাচ্ছে। ওর ভেতরে ক্রমে প্রতিশোধস্পৃহা এভাবে বেড়ে গেলে সে স্থির থাকতে পারছে না। পাখি দুটো সামান্য কাছে এলেই পর পর গুলি ছুঁড়ে যাচ্ছে। এসব ছেলেমানুষী—কাপ্তান ভেবে পান না, ডেবিড অথবা জ্যাক, জ্যাকের তবু মানে আছে, জ্যাক ছোটবাবু পাখি দুটোর জন্য অনেক করেছিল, আর বয়স কম বলে সবকিছুর জন্য তাদের মায়া, মিসেস স্প্যারোর জন্য জ্যাক ফুঁপিয়ে কেঁদেছে পর্যন্ত। ছোটবাবু আবার বুঝি বিষণ্ণ হয়ে গেল—ছোটবাবুকে দেখলেই বোঝা যায় মুখ থমথম করছে ছোটবাবুর।

    তারপরই কাপ্তান মনে করতে পারলেন আসলে ডেবিডকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছিল ম্যান অ্যালবাট্রসটা। ডেবিড সুযোগ বুঝে বন্দুক নিয়ে বোট-ডেকে ঠিক বোটের নিচে, কিছুটা আত্মরক্ষার মতো, কারণ ছোঁ মারলেই যেন মাংস খুবলে না নিতে পারে—বলা তো যায় না, ডেবিডের হাতের বন্দুক ওদের ভয় পাইয়ে দিয়েছে, যে কোন মুহূর্তে সাঁ-সাঁ করে নেমে এসে পিঠের মাংস তুলে নিতে পারে। বোটের নিচে আছে তারা। বোটের নিচে শুয়ে নির্ভয়ে বন্দুক চালাতে পারবে ডেবিড।

    ডেবিড সামান্য সুযোগটুকুও দিচ্ছে না। দেখলে মনে হবে, বোটের নিচে ওরা তিনজন পাশাপাশি শুয়ে। মুখ সমুদ্রের দিকে, পা পেছনের দিকে। কোথায় পাখি! পাখি দুটো দূর-সমুদ্রে ডুবে ডুবে স্নান করছে। ব্রিজে দাঁড়িয়ে পাখি এবং মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখছে চিফ-অফিসার, কাপ্তান, রেডিও-অফিসার। জ্যাক মাঝে মাঝে বের হয়ে দেখছে কোথায় গেল। যেন মরণপণ লড়াই—এবং কাপ্তান, চিফ-অফিসার বেশ মজা পাচ্ছিলেন। জ্যাক মাঝে মাঝে মাংকি আয়ল্যাণ্ডে উঠে গেছে—কতদূরে আছে ওরা—আবার জ্যাক চিৎকার করে উঠল, আসছে ডেবিড, রেডি। আসছে। বাবা, ঐ দ্যাখো কেমন বেগে ধেয়ে আসছে। কি লম্বা ডানা, কি বিরাট আকারের পাখি দুটো ঠিক জাহাজের ওপরে এসে গেল। কোথায় ডেবিড আর তার বন্দুক, যেন ডেবিডকে নিয়ে মজা করছে, কিছুতেই বন্দুকের পাল্লায় পাখি দুটোকে পাওয়া গেল না। অথচ এমনভাবে নেমে আসছিল, যেন একেবারে কাছে এসে সাঁ করে ওপরে নাচতে নাচতে উঠে গেল। পাখা কাঁপল তির-তির করে। উড়তে উড়তে ঘাড় কাত করে দেখল নিচের সিউল-ব্যাংক জাহাজটাকে আর তার মানুষগুলোকে। এবং ঠিক ছোঁ মেরে ডেকের ওপর থেকে মাংসের টুকরো নিয়ে গেল। চোখের নিমেষে ঘটে গেল। বন্দুকের নল ঘোরাবার সময় থাকল না, এত দ্রুত আর এমন ত্বরিতে ওরা উড়ে গেল। বোকার মতো বসে থাকল ডেবিড।

    ছোটবাবু চুপচাপ নেমে গেল এনজিন-রুমে। সে একবার ভেবেছিল বাকসোটার কাছে গিয়ে বসবে। ডিমগুলো নষ্ট হয়ে যাবে, এবং পুরুষ-চড়াইটাকে সে নিচে এনজিন-রুমে তাড়িয়ে নিয়ে এল। তারপর ওর মনে হল, কশপের কাছ থেকে স্প্যানার তেলজুট হাতুড়ি সব নিয়ে ওপরে উঠে গেলেও সারাদিন সে কাজ করতে পারবে না। সব সময় চোখ লেডি-এ্যালবাট্রস, তার উড়ে যাওয়া, তার গতিবিধি লক্ষ্য রাখাই কাজ হয়ে পড়বে। অথচ দিন যত যাচ্ছে, কাজ বাড়ছে। রেলিং ভেঙে পড়ছে, সিঁড়ি খসে পড়ছে। কার্পেন্টার এবং সে মিলে সে-সবও মেরামত করছে। কেবল জাহাজে ভেঙে পড়ার খবর। এবং মেন-জেনারেটার ক’দিন থেকে গণ্ডগোল করছে। সকালে তেমনি খবর গেছে, যেমন প্রতিদিন রেডিও-অফিসার খবর পাঠায় এরিয়া-স্টেশনকে—সিপ এস এস সিউল-ব্যাংক, বাউণ্ড ফর নিউ প্লাইমাউথ। হল্ট একদিনের জন্য তাহিতিতে। পনের হাজার টনের জাহাজ সিউল-ব্যাংক। ভাঙ্গা পুরোনো, স্পেয়ার পার্টসের একটা লিস্ট বেতার সংকেতে পাঠানো হচ্ছে। খাবার, জল, সব এভাবে যখন বেতার-সংকেতে দিকে দিকে ইথারে ভেসে চলেছে তখন এ্যালবাট্রস পাখি দুটোও ভেসে আসছে কেবল জাহাজের পেছনে। উড়ে উড়ে আসছে।

    যে যখন সময় পেয়েছে বোট-ডেকে পাহারায় থেকেছে—কখন কাছাকাছি দেখা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যা হলে সবাই দেখল, সমুদ্রে অন্ধকার নেমে আসছে। কিছু দেখা যাচ্ছে না।

    গভীর অন্ধকারে সমুদ্রটা একেবারে টুপ করে ডুবে গেল। চারপাশে কিছু দেখা যাচ্ছে না। কেবল আকাশের নক্ষত্রমালা বাদে তাদের দেখবার কিছু থাকে না। সারাটা দিন একটা ভয়ঙ্কর উত্তেজনার ভেতর গেছে! পাখিদের স্বভাব সম্পর্কে কথাবার্তা, কে কোথায় কবে কত বড় এ্যালবাট্রস দেখেছে তার গল্প। এত বড় এ্যালবাট্রস তারা এই প্রথম দেখেছে এটা প্রায় একবাক্যে স্বীকার করছে সবাই। যারা প্রাচীন নাবিক, যাদের সফর বিশ-বাইশ-চব্বিশ, তারাও এত বড় এ্যালবাট্রস কোনো সমুদ্রে কখনও দেখেছে বলতে পারল না।

    কাঠের বাকসোটা হাঁ করে পড়ে আছে। কাল হয়তো সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হবে। ডেক-জাহাজিরা জল মারার সময়, বাকসোটা রাখা অকারণ ভেবে ফেলে দিতে পারে। সন্ধ্যার সময় ডেবিড, ছোটবাবু পুরুষ পাখিটাকে খুঁজছে, পায়নি। ওটা যে কোথায় গেল! কখন ওটাকেও হয়তো ধরে নিয়ে গেছে। কেউ টের পায়নি। এসব ভাবলেই ছোটবাবুর কিছু ভাল লাগে না। দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। কবে জাহাজ দেশে ফিরবে কেউ বলতে পারে না।

    এবং এখন জাহাজের ফোকসালে অথবা কেবিনে সেই এক খবর। জাহাজটা স্ক্র্যাপ করার অর্ডার না আসা পর্যন্ত এভাবে উত্তেজনা প্রবল জাহাজে। যদিও সবাই জানে, এত পুরানো জাহাজ সমুদ্রে চলে না। এবং দু-দুবার স্ক্র্যাপ করার অর্ডার হয়েছিল। স্ক্র্যাপ করা হলে সিউল-ব্যাঙ্ক বলে একটা জাহাজ আছে, সমুদ্রে বিচরণ করছে, কখনও ছোটবাবু অথবা নতুন জাহাজিরা জানতেই পারত না।

    অথচ কি আশ্চর্য সেই পঁয়তাল্লিশে একবার, আটচল্লিশে একবার, সব ঠিকঠাক, জাহাজ আর চলছে না, জাহাজ পুরোনো লোহা লক্কড়ের দামে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। অথচ কি এক অজ্ঞাত কারণে সব ভেস্তে গেল। কি এক অজ্ঞাত অদৃশ্য শক্তি জাহাজটাকে আবার সমুদ্রে ভাসিয়ে আনে। বন্দরে বন্দরে যায়, খরচ বাড়ে, কোম্পানীর কর্তাব্যক্তিরা মুখ বুজে খরচের বহর সয়ে যাচ্ছে। তবু সিউল- ব্যাঙ্কের নাম ভাগাড়ে তুলে দিতে পারছে না।

    এটা আবার সংস্কারবশেও হতে পারে, যদিও কোম্পানীর প্রথম জাহাজ এটা না, তবু এর আসার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানীর দিন দিন শ্রীবৃদ্ধি প্রায় লক্ষ্মীর মতো, বড় পয়মন্ত এই সিউল-ব্যাঙ্ক। এবং যখন সারা পৃথিবী চষে কার্ডিফের রাউদ এনজিনিয়ারিং ডকে ফিরে যেত, কোম্পানীর কর্তাব্যক্তিরা ছুটে আসত, সিউল-ব্যাঙ্কের হাল তবিয়ত দেখতে। জাহাজটা ড্রাই-ডক করা হচ্ছে, অতিকায় জাহাজ নয়, মাঝারি জহাজ, তবু যখন হেঁটে যেত কর্তাব্যক্তিরা মনে হত সিউল-ব্যাঙ্ক অতিকায় জাহাজ হয়ে যাচ্ছে। রণক্লান্ত অশ্বের মতো দাঁড়িয়ে আছে। যেন ওরা মাঝে মাঝে দেখে ফেলত, অতিকায় সেই অশ্বের চোখে মুখে ক্লান্তি, চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে, মুখ দিয়ে লালা গড়াচ্ছে। এমন সব আধিভৌতিক দৃশ্য দেখে ফেললে তারা আর জাহাজটা স্ক্র্যাপ করার কথা ভাবতে পারত না। জাহাজটা সম্পর্কে সবার কেমন মায়া গড়ে উড়েছিল। তারপরে ড্রাই-ডকে, ফের যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার মতো, সব বড় বড় অক্সিজেন সিলেণ্ডার নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধের সাজে তৈরি করা হচ্ছে যেন যত খরচ লাগুক, অর্থাৎ এ যা খরচ হচ্ছে, তাতে আর একটা নতুন জাহাজ কেনা যেতে পারে, তবু খরচের বহরে কোম্পানী ভয় পায় না। কিন্তু হলে কি হবে কোম্পানী তো সব না, মেরিন বোর্ডের সার্ভেয়ার এসে শেষপর্যন্ত রায় দিলে, অচল জাহাজ সুতরাং আর এ চলবে না। তারপরই সেই এক দুর্ঘটনা, কোথায় বজ্রাঘাতে মৃত্যু, কেউ রাস্তায় যেতে যেতে দু-বার কি দেখে আঁৎকে উঠলে, কথা বলতে পারল না, ঘরে ফিরে যেতে পারল না, মৃত্যু। এবং এভাবে যখন সিউল-ব্যাঙ্ক জাহাজকে কেন্দ্ৰ করে নানাভাবে সংস্কার গড়ে উঠেছিল, তখন উনিশশো পঁয়তাল্লিশ সাল শেষ হচ্ছে। কোম্পানীর নতুন চেয়ারম্যান নিযুক্ত হলেন স্যার ম্যাথিউ দি সেকেণ্ড। পূর্বতন চেয়ারম্যান স্যার ম্যাথিউ ফেলের রহস্যজনক মৃত্যুর পরই তিনি যোগদান করলেন। তাঁর পুরো নাম রিচার্ড ফেল। বয়সে নবীন! লম্বা, ওয়েলসের লোক। স্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল স্বভাবের মানুষ। বাবার মৃত্যুর সঙ্গে সিউল-ব্যাঙ্ক জাহাজের স্ক্র্যাপ করার আদেশ পত্রের সঙ্গে কোনও সংযোগ রয়েছে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তিনি এসেই এস এস সিউল-ব্যাঙ্কের নিজস্ব লাভ-লোকসানের একটা হিসাব চেয়ে বসলেন।

    আশ্চর্য হিসেবটা ঘুরেফিরে হাতে আসতে তার দু’বছরের ওপর লেগে গেছিল। সংক্রামক ব্যাধির মতো ভয়। কোন অমঙ্গলের প্রতীক ভেবে সবাই সিউল-ব্যাঙ্কের কাজকর্মে এলেই কেমন ঢিলেঢালা ভাব দেখাত। মুখে কিছু বলতে সাহস পেত না। নতুন চেয়ারম্যান কেন এসব চাইছেন—বোর্ডের মেম্বারদের বছরে কত কড়ি গুনতে হচ্ছে জাহাজটার জন্য এবং জেটিতে ফেলে রাখার দরুন বন্দর কর্তৃপক্ষকে কত দিতে হয়েছে, অথবা জাহাজ চলতে চলতে ক’জন কাপ্তান কতবার অসুস্থ হয়ে ফিরে এসেছেন, কতবার কম্পাস রিডিং-এ ভুল হওয়ার দরুন কত হাজার হাজার মাইল জাহাজটা কাপ্তানকে নিশি-পাওয়া মানুষের মতো সমুদ্রে ঘুরিয়ে মেরেছে তার হিসাব এবং হিগনস্ই ছিলেন একমাত্র কাপ্তান যাঁর কাছে সিউল-ব্যাঙ্ক একেবারে শান্তশিষ্ট মেয়েটির মতো—হিগিনিস্ জাহাজ থেকে নেমে দু’মাস ও অবসর নিতে পারতেন না, আবার ডাক পড়ত। আর একজন ছিলেন ফোর্ড। বছর তিন আগে তিনি সমুদ্রেই মারা গেলেন।

    স্যার ম্যাথিউ দি সেকেণ্ড যেহেতু কোম্পানীর অধিকাংশ শেয়ারের অংশীদার, স্ক্র্যাপ করার আগে একবার জাহাজটাকে দেখে যাবেন ভেবেছিলেন। দুদিন বাদে এ্যানুয়েল জেনারেল মিটিং। সব প্রস্তাব টাইপ হয়ে পড়ে আছে। তার ভেতর সিউল-ব্যাঙ্কের স্ক্র্যাপ করার প্রস্তাব। তিনি চেম্বারে বসে সইসাবুদ করতে করতে হঠাৎ কি ভাবলেন, জাহাজটা কতদিনের জাহাজ, তাঁর বাবার আমলের জাহাজ, বাবা জাহাজটার কিছু কিছু ইতিহাস বলে গেছিলেন, বিশেষ করে সেই লুকেনার ব্যক্তিটি, তাঁর মৃত্যু, আত্মহত্যা, এক জার্মান কাউণ্ট পরিবারের মানুষ ছিলেন লুকেনার, এসব কথা বলতে বলতে হঠাৎ বলে ফেলেছিলেন, আমার মনে হয় রিচার্ড, লুকেনারের মৃত্যুর এতদিন পরেও তাঁর প্রভাব রয়ে গেছে। রিচার্ড হয়তো হেসেই ফেলত। কিন্তু তাঁর বাবাকে তিনি জানেন। খুব গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, হবে হয়তো।

    সুতরাং এসব ঘটনা যতটা ডেবিড জানে অথবা চিফ-অফিসার, আর কেউ তেমন জানে না। কাপ্তান বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবে চিফ-মেটকে কথাপ্রসঙ্গে বলতেন। চিফ-মেটও কথাপ্রসঙ্গে বলত ডেবিডকে। ডেবিড কাউকে বলত না। কিন্তু জাহাজটাতে এ-দুটো এ্যালবাট্রস আসার পরই কেবিনে জটলা হচ্ছিল। একটু যে পানীয় না খাওয়া হচ্ছে তাও নয়। ডেবিডের কেবিনে ছোটবাবু বসে রয়েছে। ডেবিডের কেবিনে ওর ফ্যামিলির একটা গ্রুপ ফটো আছে। এবং সবার নাম ছোটবাবু জানে। বড় ছেলেটি ডেবিডের প্রায় ছোটবাবুর বয়সীই হবে। কতক্ষণ আর চুপচাপ থাকা যায়। মিঃ স্প্যারো, মিসেস স্প্যারো না থাকায় জাহাজটা আবার একঘেয়ে লাগছে। ওদের দিন, আর কাটছে না যেন। জাহাজ কবে যাবে, কবে কখন হোমে সবাই ফিরবে এই নিয়ে কথাবার্তার সময় ডেবিড উঠে দাঁড়াল। এটা ডেবিডের স্বভাব, একটু উত্তেজিত হয়ে পড়লেই—সে দাঁড়িয়ে যায়। এবং পায়চারি করতে থাকে। তারপর যা হয়ে থাকে—গল্প বলার মতো বলা, আমরা আর ফিরব কিনা জানি না ছোটবাবু। আসলে জাহাজটা স্ক্র্যাপ না হলে বোধহয় ফিরতে পারছি না।

    —তার মানে?

    –সে অনেক কথা। কাপ্তান খুব সেয়ানা।

    —কবে হবে স্ক্র্যাপ?

    —কেউ বলতে পারে না।

    —আমাদের কি হবে?

    —এভাবে চলবে জাহাজ। আমরা সমুদ্রে ভেসে বেড়াব।

    —ইয়ার্কি। জাহাজিরা সবাই বিদ্রোহ করবে না?

    —তুমি জাহাজি নও। তোমার তো আর ওদের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। ওরা বিদ্রোহ করলে, ওদের নামিয়ে দেবে। কিন্তু তোমার কি হবে?

    —ওদের নামিয়ে দিলে জাহাজ চলবে না। আমরাও ফিরে যাব।

    —কলকাতা থেকে কোম্পানী উড়োজাহাজে ক্রু পাঠিয়ে দেবে।

    —এত খরচা করবে!

    —তাছাড়া কি। জাহাজটাকে এখন ওরা চাইছে যতদিন ইচ্ছে দক্ষিণ সমুদ্রে ঘুরে বেড়াক —বন্দর ধরবে না?

    –এই ধরবে। বড় বড় বন্দরে আর পাঠাবে না।

    —তার মানে?

    —মনে হচ্ছে বড় বন্দরের নিয়মকানুন অনেক! হয়তো দেখা যাবে, ভাঙা জাহাজ দেখে ওরা আঁৎকে উঠছে। কার পারমিশানে জাহাজটা চলছে। বলেই একটু থামল। পাইপের ধোঁয়া দেখল, মাথা চুলকাল। লকার খুলে দুটো ছবি বের করে দেখল। দুটোই বড় হাঙ্গরের ছবি। ছবি দেখলেই বোঝা যায় ডেবিডের ফটোগ্রাফিতে হাত ভাল। ডেবিড ছবি দুটো একটু কাত করে দেখল, বলল, এই হচ্ছে আমাদের কর্তৃপক্ষ বুঝলে। হাঙ্গরের মুখ থেকে পালানো খুব কঠিন।

    এমন একটা পরিবেশ কথাবার্তায় গড়ে তুলছে ডেবিড, যে ছোটবাবু কেমন হতাশ হয়ে গেছে। ভাঙা জাহাজ, জাহাজ চালানোর খরচ এত বেশি যে বছর বছর লাখ লাখ টাকা ক্ষতি স্বীকার করেও কেন যে জাহাজটাকে এভাবে দক্ষিণ সমুদ্রে ঠেলে দেওয়া, ভাঙ্গো তো, ভেঙ্গে ফেল, নতুন জাহাজ কেন, আমরা দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করে যাব। এত মেরামত জাহাজে থাকলে অবসর কখন, এখন তো কোনও কোনও দিন সন্ধ্যে সাতটা পর্যন্ত একনাগাড়ে কাজ।

    অথবা এই যে দক্ষিণ সমুদ্রে জাহাজটা ভাসিয়ে দেওয়া হল, এবং কবে ফিরবে, কাপ্তান হিগিন্‌স নিশ্চয় জানেন, কবে ফিরে যেতে পারছেন, একবার জ্যাককে বলতে হবে, আমরা দেশে কবে পৰ্যন্ত ফিরতে পারব জ্যাক, অথবা এও হতে পারে, কেউ জানে না কবে ফিরবে। সবটাই এখন এই সিউল- ব্যাঙ্কের মর্জির ওপর।

    তখনই বালকেডে হেলান দিয়ে ডেবিড অনেকক্ষণ ছোটবাবুকে দেখল। ছোটবাবু পাশের ব্যাঙ্কে সামান্য কাৎ হয়ে শুয়ে আছে। যত শুনছে তত সে বিমর্ষ হয়ে যাচ্ছে।

    ডেবিড এবার কাছে এসে প্রায় হাঁটু গেড়ে বসল ছোটবাবুর পাশে। বলল, খুব ফিসফিস গলায়- আসলে বুঝলে কতৃপক্ষ জাহাজটাকে ভয় পায়। ভীষণ ভয় পায়। কিছুতেই বে-অফ-বিসকে পার হতে দেবে না। জাহাজটাকে ইংলিশ চ্যানেলে ঢুকতে দেবে না। যেন জাহাজ ইংলিশ চ্যানেলে ঢুকছে শুনলেই ওদের জ্বর আসতে থাকে।

    ছোটবাবুর ভয়ে বোধহয় জ্বর আসছিল। আবার মনে হচ্ছিল, আসলে, জাহাজের সফর যত দীর্ঘ হবে, তত এভাবে জাহাজ সম্পর্কে নিন্দাবাদ চলবে। এটা বোধহয় তারই সূত্রপাত। সে, এসব জানে মৈত্রদার কাছ থেকে। জাহাজ তখন প্রতিদিন অসহ্য ঠেকবে। ডেবিডের প্রায় ন’মাস হতে চলেছে। সে এবং আরও দু-একজন অফিসার এ-জহাজে বেশি সফর দিয়েছে। সুতরাং এভাবে এখন থেকেই হয়তো ডেবিড ঘোঁট পাকাতে শুরু করেছে। সবার মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা সৃষ্টি করে দেওয়া, জাহাজ নিরুদ্দেশে ভেসে চলেছে। কাপ্তানও ঠিক জানেন না, কোথায় যাবে। সালফার বোঝাই হয়ে আপাতত নিউ-প্লাইমাউথ যাচ্ছে, কিন্তু তারপর। তারপর বললে, তিনি বলবেন, তারপর জাহাজ ফিজিতে। অস্ট্রেলিয়ায় নয় কেন? মেলবোর্ণ, সিডনিতে নয় কেন, নয় এজন্য, এসব বড় বন্দর এমন লক্কড়-মার্কা জাহাজ ঢুকতে দেখলেই ধেয়ে মারতে আসবে বন্দর-কর্তৃপক্ষ

    —যদি ফিজি না যায়, তবে নিউগিনি, অথবা কিংস আয়ল্যাণ্ড, টোংগা। দরকার হয় ফের উঠে যাবে হাওয়াই। হনলুলুতে কিছুদিন। সামোয়াতে ফেলে রাখা চলে কিছুদিন। কিছু একটা কার্গো পেলেই হল। মাটি, মাটিই সই। এই যে সমুদ্র দেখছ, এ-সমুদ্রেই আমাদের এখন ঘুরে মরতে হবে। একটু থেমে ডেবিড বলল, এর পর কাজ কি হবে জান?

    —কি?

    —মাটি টানবে জাহাজ। আমি তোমাকে বলে দিলাম, মাটি টানা বাদে এ-জাহাজে আর কেউ কোন কার্গো দিতে সাহস পাবে না।

    ছোটবাবুর বেশ মজা লাগছিল এমন সব কথা শুনতে। সে এ-জন্যেই এত সহজে এমন একটা দামী কাজ পেয়ে গেছে। জাহাজে এজন্য কেউ আসতে চায় না। একটু ভয় পেলেই বাড়িয়ে ভয়কে সাত কাহন করে ফেলে। তারপর খোঁড়াতে খোঁড়াতে নেমে যায়। দরকার হলে ছোটবাবুও খোঁড়াতে থাকবে। যখন মনোটনিতে আত্মহত্যার প্রবণতা জাগবে, তখনই বুঝতে হবে, যত সত্বর সম্ভব, কিছু একটা অজুহাত দেখিয়ে নেমে যাওয়া ভাল।

    ডেবিড ফিসফিস গলায় বলল, কাপ্তান হিগিনস্ আখের গোছাচ্ছে, বুঝলে!

    ছোটবাবু অতসব বুঝতে পারে না। সে চুপচাপ শুনে যায়। চুপচাপ বসে থাকে! সে তো সবই কেমন নতুন শুনছে। এখন মনে হয় জাহাজে এটাই শেষ সফর তাঁর।—বুঝলে ছোটবাবু যত বেশি এখন তিনি থাকতে পারেন, তাই চেষ্টা করছেন। কোম্পানীর এমন একটা ভাঙ্গা জাহাজকে নিয়ে দক্ষিণ সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আসলে ওর বলার ইচ্ছে ছিল, মতিচ্ছন্ন জাহাজ। পাগলা জাহাজ, না ঠিক পাগলা নয়, দুরন্ত দামাল, কিংবা সেই বেশি বয়সে শিশু সরল হয়ে যাবার মতো, লজেনচুস দিয়ে ভুলিয়ে রাখার মতো। হিগিনস এখন মাটি-ফাটি যা পাবেন ভরে নিয়ে সিউল-ব্যাঙ্ককে কার্গো দেবেন। লজেনচুস খাওয়াবেন। কর্তৃপক্ষ ভীষণ খুশি, গেলেই ঠিক বোর্ডের সদস্য করে নেবে। এডভাইস দাও, সুখে থাকো, গাড়ি চড়ো। হিগিনস এমনি এমনি করছে ভেবো না।

    ছোটবাবু বলল, ডেবিড, আমার কিন্তু অন্যরকম মনে হয়।

    ডেবিড কিছুই শুনতে চায় না। সেই সকাল থেকেই সে উত্তেজিত হয়ে আছে। সারাদিন কতভাবে চেষ্টা করেছে একটা পাখিকে অন্তত নামিয়ে আনা যায় কিনা, পারেনি। সে তারপর কি করেছে কে জানে। একটু রাত হলেই ছোটবাবুকে ডেকে এনেছে। সামান্য মদ দিয়েছে খেতে। সে নিজেও খাচ্ছে। চুক-চুক শব্দ হচ্ছে। এখন বেশ ছোটবাবু মজা পায়। ডাকলে সে না করতে পারে না। কিন্তু সে দু-চারদিন খেয়ে নিজের হিম্মত কতটুকু ধরে ফেলেছে। ডেবিড আর তাঁকে মাতাল বানিয়ে জব্দ করতে পারে না।

    ছোটবাবু বলল, তুমি কিচ্ছু না শুনতে চাইলে আমি কি করব?

    —কি শুনব? কি বলবে তুমি?

    —এই বলছিলাম, কাপ্তান জাহাজটাকে ভালবাসে।

    —হেল। কি যে বল না। জাহাজকে আবার ভালবাসাবাসি কি। আগলি। ননসেন্স। সব পরার্থ ভেবে করা নয় হে। সব স্বার্থে করা। আখের। আখের। বলেই আবার নুয়ে বলল, প্লিজ তুমি কিন্তু জ্যাককে কিছু বলবে না। বলে মদের গ্লাসটা ছুঁয়ে বলল, না। বলবে না, প্রমিস্ কেমন?

    ডেবিড খুব গোপনে যেন বলছে, সে দরজার কাছে গিয়ে উঁকি দিল, কি জানি কেউ যদি দেয়ালে কান পেতে রাখে। কে কিভাবে কাপ্তানের কাছে শেষপর্যন্ত লাগাবে আর কাপ্তান চোখ লাল করে ওকে দেখবেন তখন, ভয়ে তো বুক শুকিয়ে যাবে—সেই সব কারণে দরজাটা ভাল করে লক্ করে বলল, তোমাকে বলে দিলাম, জাহাজ মাটি টানার কাজ নেবে। জাহাজ ফিজি, নেরু, ওসেনিক, কাকাতিয়া আয়ল্যাণ্ডে যাচ্ছে। মাটি এনে অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে ঢেলে দেবে। এই কাজ হবে আমাদের। সব দ্বীপ, সব আদিবাসী দ্বীপের…বলেই সে গ্লাস নিয়ে কেমন ফ্রিজ হয়ে গেল।—ছোটবাবু, তোমার মুখ এত উজ্জ্বল দেখাচ্ছে কেন!

    —দ্বীপ। দ্বীপে নেমে যাব।

    —ছোটবাবু বুঝবে না, কষ্ট বুঝবে না। ভাল না। দ্বীপ ভাল না।

    ডেবিড বুঝতে পারল, কথা সামান্য জড়াচ্ছে। ওটা ঠিক না। জাহাজ চালু অবস্থায় এটা ঠিক না। ওর বারোটা-চারটা ওয়াচ। এখন ওর খেয়েদেয়ে ঘুমানো দরকার। আসলে মনের কোণে এই যে গ্রুপ- ফটো দেয়ালে রয়েছে, তাদের জন্য সে পাগল হয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে দেশে ফেরার জন্য মন ভীষণ আকুল হয়ে উঠেছে। সে এখন সেই ছোট্ট শিশুর মুখ, হাত নাড়া, সুন্দর হাসি, মনে করতে পারলেই পাগল হয়ে যায়। তখন সে আর দেশে ফিরতে পারবে না ভেবে ভীত হয়ে পড়ে। এবং সে বোধহয় টের পাচ্ছে, জাহাজ কোথায় যাচ্ছে। যেমন অন্যান্যবার করে থাকে, এবারেও তেমনি। ব্রিটিশ ফসফেট কোম্পানী সেই সব দূরবর্তী ভাসমান দ্বীপমালা সব, ইজারা নিয়ে বসে রয়েছে। মাটি তুলে নাও। খোলে ভর্তি করে মাটি চালান করার এমন অল্প পয়সায় আর ক’টা জাহাজ ভাড়া পাওয়া যায়। খবর রটে যায়, আসছে, আসছে—সেই প্রাচীন কালের আদিম রহস্যময় জাহাজটি মাস্তুলে লম্ফ জ্বালিয়ে অন্ধকার রাত্রির বুকে, সমুদ্রের ঢেউ ফালা ফালা করে চলে আসছে। মাটি কাটার কাজ তখন দ্বীপে বেড়ে যায়। উদ্দাম উন্মত্ত নৃত্যমালা। দ্বীপের অধিবাসীদের তখন মশাল জ্বেলে সারা রাত নৃত্যমালা—মেজ-মালোম ডেবিড এখন থেকেই বুঝি দেখতে পাচ্ছে সব। ডেবিড ভয়ে কেমন গুটিয়ে আসছে। সেই দ্বীপগুলোতে ডেবিড অনেকবার গেছে। পাঁচবার সাতবার। সেখানে জাহাজ যাবে ভাবতেই ডেবিড ভীষণ চঞ্চল হয়ে উঠছে।

    ছোটবাবু বলল, দ্বীপগুলো খুব বড়!

    —আরে না। কোনোটা এক মাইল, দু’মাইল, পাঁচমাইল তার বেশি না।

    ডেবিড ফের বলল, কিভাবে যে ওরা থাকে! ভয় পায় না। দ্বীপটা যদি ডুবে যায়। কি যে মজা হয় না! তারপরই কেমন প্রাণ পেয়ে গেল ডেবিড, যখনই রাতের জ্যোৎস্নায় হেঁটে বেড়াবে, মনে হবে সমুদ্র থেকে কারা স্নান করে ফিরছে। সুন্দরী মেয়েরা জ্যোৎস্নায় যখন সমুদ্র থেকে স্নান করে ফিরে যায়, চুলের ডগা বেয়ে টপ্‌প্ জল ঝরতে থাকে, এবং মনে হবে যেন ওরা সমুদ্রে নোনাজলের তলায় এতক্ষণ কি খুঁজে এসেছে, আসলে জানো ওরা পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে মুক্তো খুঁজতে যায়। এবং শরীরে কোন পোশাক থাকে না ছোটবাবু। গাছপালার ভেতর লুকিয়ে দেখতে কি যে ভাল লাগে না!

    —দেখে ফেললে?

    —দেখব কেন। দালাল থাকে। দেখানোর বদলে পয়সা নেয়। রাজার জন্য ওরা মুক্তো খুঁজে আনে। কেবল অন্যমনস্কভাবে বলে গেল—আরে বুঝলে না, আমাদেরই ইজারা নেওয়া জায়গা। এখানে ছোটবাবু বুঝল, আমাদের বলতে ডেবিড বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জের কথা বলতে চেয়েছে।—স্বজাতি আমার ভীষণ বুদ্ধিমান তো। দেশীয় নিয়মকানুন ঘাটায় না। যা আছে থাক, রাজার নিয়ম-কানুন মেনে চলার অভ্যাস ওদের হয়ে গেছে। আমাদের কেন হবে বল? জাহাজ থেকে নেমেই তুমি কোথাও কোনও রেস্তোরাঁতে চলে যাবে। দেখবে কার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দালাল লোক। কিভাবে নিয়ে গেলে, গোপনে দেখা যাবে ওরা ঠিক জানে। খুব পয়সা নেয়। রাজার জন্য মেয়েরা মুক্তা খুঁজতে যায়। কার না লোভ হবে দেখার। তুমি বলো, আমরা তো আর মহাপুরুষ নই।

    ছোটবাবু বলল, মহাপুরুষদের একবার ধরে নিয়ে গেলে হয়, দেখালে হয়। কি করে, তখন দেখা যেত। বলে দুজনেই হেসে ফেলল,—রাত অনেক হয়েছে ডেবিড। ভীষর ঘুম পাচ্ছে। আমি যাই। বলে ছোটবাবু দরজা খুলে সোজা বের হয়ে গেল।

    আর তখনই মনে হল ডেবিডের, মিসেস স্প্যারোর জন্য ছোটবাবুর মন খারাপ থাকতে পারে। তাকে একটু সান্ত্বনা দেবার জন্য ডেকে এনেছিল। কিন্তু এতক্ষণ কেউ মিসেস স্প্যারোর আকস্মিক মৃত্যু সম্পর্কে কোনও কথা বলে নি। ছোটবাবুর মন খারাপ বলে হয়তো কোনও কথা বলে নি। ছোটবাবুর এমনই স্বভাব। সব দুঃখ নিজের ভেতর লুকিয়ে রাখে। কাউকে বুঝতে দেয় না। সে তাড়াতাড়ি দরজা ঠেলে মুখ বাড়াল। ডাকল, ছোট।

    ছোট যেতে যেতে মুখ ফেরাল। এলি-ওয়েতে কার্পেট পাতা বলে কোন শব্দ হয় না হাঁটা চলায়। এনজিনের হাহাকার শব্দটা ভীষণভাবে শুধু সব এলোমেলো করে দেয়। সুতরাং সে প্রথম বুঝতে পারেনি কে ডাকছে। পেছন ফিরে তাকালে দেখল গলা বাড়িয়ে হাতে ইশারা করছে ডেবিড।

    সে ফের ফিরে গেলে বলল, এস। ভিতরে বোস। কথা আছে। স্বাভাবিক মানুষের মত কথা বলছে। মদ খেয়ে সামান্য কথা জড়িয়ে যাচ্ছে কিছুতেই বুঝতে দিচ্ছে না।

    ছোটাবাবু বসলে, বলল—তুমি দুঃখ করো না।

    কিসের দুঃখ সে প্রথমে বুঝতে পারল না।

    —ঠিক উচিত শিক্ষা দেব মনে রেখ। আই মাস্ট কিল দেম।

    ছোটবাবু হাসল সামান্য

    —ওরা ভেবেছে কি! নিজেদের সম্রাটের মতো ভাবছে? যেন সমুদ্রে ওদেরই থাকার কথা। সামান্য দুটো পাখি, কিছুতেই ওদের জন্য বাঁচানো গেল না। ওরা রাজ্য জয় করে ফিরে গেল। মর্মান্তিক।

    ছোটবাবু বলল, ওরা আর আমাদের জাহাজে উড়বে না, ভাবতে খারাপ লাগে।

    —কি করা বল। যা ঘটে গেল তাতে আমাদের কোনও হাত নেই। আমরা তো কম চেষ্টা করি নি।

    ডেবিডের পিঠের ঘা ভাল করে শুকোয় নি। বেশী বললে, জামা খুলে হয়তো ডেবিড ঘা বের করে দেখাবে। ছোটবাবু বলল, সকালে উঠেই দেখতাম পোর্ট-হোলে মিসেস স্প্যারো বসে রয়েছে। শিস দিলেই উড়ে এসে পায়ের কাছে বসত।

    ডেবিড বলল, মিসেস স্প্যারো ঠিক বুঝতে পেরেছিল, তুমি ওকে খুব ভালবাস।

    —এখন তাই মনে হচ্ছে। খিদে পেলে কি কিচকিচ করত। খাবার খুঁটে খেত না। ছড়িয়ে না দিলে বিবি মুখ গোমড়া করে রাখত।

    —হবেই তো। এটা আমরা ঠিক বুঝতে পারি না আসলে পৃথিবীটার সব কিছু তারা। তুমি যেখানে যাবে মনে হবে, ওদের জন্য তুমি যাচ্ছ। মনে হবে—এরা তোমার কতকালের চেনা। জেটিতে পার্কে মেয়েদের দেখলে কখনও মনে হয় না, তুমি ওদের দ্যাখো নি। মনে হয় কতকালের এরা পরিচিত। একটু হেসে কথা বললে জাহাজে আর উঠে যেতে ইচ্ছে হয় না। ঘরবাড়ি বানিয়ে বন্দরেই থেকে যেতে ইচ্ছে হয়। কি হবে এত বড় পৃথিবী দেখে। এমন সুন্দর একটা পৃথিবী কাছে থাকলে সমুদ্র, দ্বীপ, কত সামান্য মনে হয়।

    —সত্যি।

    —যাই হোক তুমি ভাল করে ঘুমোবে। সন্তানকে যেভাবে উৎসাহ দেয় তেমনি চোখ-মুখ ডেবিডের। সে যেন ছোটবাবুকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে। সে বলল, জাহাজে ঘুরতে ঘুরতে কত রকমের অভিজ্ঞতা হবে, পৃথিবীর কত বন্দরে মনে হবে তোমার ভালবাসার মেয়েরা সব হেঁটে বেড়াচ্ছে, জাহাজ ছাড়ার সময় দেখবে আশ্চর্য একটা কষ্ট বুক থেকে বেয়ে উঠছে—তুমি টেরই পাও নি দু-দিন কি চার-দিন কি দু-সপ্তাহ যে সেলস গার্লটি তোমাকে হেসে কথা বলেছে, আপেল আঙ্গুর বিক্রি করেছে, মনে মনে তুমি তাকে ভালবেসে ফেলেছ। মেয়েরা যে কি! একটু হেসে কথা বললেই কেমন আপনার হয়ে যায়।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল, আসলে ডেবিড ঘুরে-ফিরে নিজের দুঃখের কথাই বলে যাচ্ছে। ঘুম আসবে না ডেবিডের। এখন সে হয়তো পোর্ট-হোলে অন্ধকার সমুদ্র দেখবে—আসলে সমুদ্রে অন্ধকার থাকলে সারাক্ষণ তার সেই বাড়ি, গীর্জার চূড়ো, ছোট্ট নদী যদি থাকে অথবা গ্রীষ্মের সময় মনোরম রোদের ভেতর গাড়ি চালিয়ে কোন বড় শহরে চলে যাওয়া, হৈ-চৈ, ছেলে-মেয়েদের দুটো-একটা আবদারের কথা, স্ত্রীর বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকা—সবই মনে পড়বে। মনে পড়লেই তার সারারাত আর ঘুম আসবে না।

    ছোটবাবু বলল, যাচ্ছি।

    ডেবিড তাকিয়েই আছে পোর্ট-হোলে। কিছু বলছে না।

    —দরজাটা বন্ধ করে দাও।

    ডেবিড নড়ছে না দেখে সে দরজা টেনে দিল।

    তারপর ছোটবাবু ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকল। রাত দশটা বেজে গেছে, সে ওয়াচের ঘণ্টা শুনে বুঝতে পারল। যখন এভাবে সমুদ্রের বুকে কেউ ঘণ্টা বাজায় তখন তার ইন্চকেপ-রকের কথা মনে হয়, মঠের সেই সন্ন্যাসীর কথা মনে হয়। কোনো না কোনো ঘটনার সঙ্গে মানুষের স্মৃতি জড়িয়ে যায়। ছোটবাবুর স্মৃতি ভীষণ সতেজ বলে ঘণ্টা বাজলেই দেখতে পায় এক অতিকায় পাহাড় সমুদ্রের বুকে দাঁড়িয়ে আছে। ঝড়ের রাতে জাহাজ পথ ভুল করে ঠিক পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ভেঙ্গে যায়। জাহাজ ডুবির এমন অজস্র ঘটনা মনে হলেই কেবল সে দেখতে পায়, সেই…মঠাধ্যক্ষ একটা বড় ঘণ্টা ঝুলিয়ে দিচ্ছেন, ঝড় উঠলেই ঘণ্টা বাজতে থাকে। দূরবর্তী জাহাজের নাবিকেরা তখন সতর্ক হয়ে যায়।

    ছোটবাবুর এই এক খারাপ স্বভাব। কিছু মাথায় এলেই সহজে যেতে চায় না। সে ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটুতে সে টেরই পাচ্ছে না ওপাশের এলি-ওয়ের দরজায় ধ্বস্তাধ্বস্তি হচ্ছে। ওটা মেজ-মিস্ত্রি আর্চির দরজা। কেবিনের পাশে বড়-মিস্ত্রি ছিল, এখন নেই। নির্জন এলি-ওয়েতে মেজ- মিস্ত্রি একাই থাকেন। এবং ছোটবাবুর মনে হল, কেউ ডাকছে, জ্যাকের সেই মেয়েলী গলা। কাতর। কিন্তু কোথায়? সে কেবল শুনতে পাচ্ছে, নো। মি বয়। আর মনে হচ্ছিল, যদিও এনজিনের হাহাকার শব্দে শোনার উপায় নেই, খুব কাছেই কিছু ঘটছে। সে একটু পিছিয়ে ডান দিকের এলি-ওয়েতে তাকাতেই, মনে হল জ্যাক দৌড়ে পালাচ্ছে। আর শিকারী বেড়ালের মতো থাবা উঁচিয়ে আছে মেজ-মিস্ত্রি। যেন তার হাত থেকে পাখি পালিয়েছে। ছোটবাবুকে দেখে হাত ছেড়ে তাড়াতাড়ি যেন দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল না, জ্যাক এখানে এত রাতে কেন? আর্চিই বা দরজা খুলে খপ করে, ` ধরতে যাবার মতো হাত বাড়িয়েছিল কেন? ধ্বস্তাধ্বস্তি করে জ্যাকই বা ওদিকে ছুটে পালাচ্ছে কেন? সে তার কেবিনে ঢুকে যাবে ভাবল। নিচে এ সময় জ্যাকের নামার কথা না। জ্যাকের কেবিনে সিঁড়ি ধরে সে উপরে উঠে যেতে পারে। কিন্তু এত রাতে সে যেতে পারে না। তাছাড়া সেও ভাল নেই। ছোটবাবুকে দেখে মেজ-মিস্ত্রি আর্চি এমন হিংস্র হয়ে উঠল, যেন খেয়ে ফেলার মতো। এবং শীতল করে দিচ্ছিল তাকে। সে আর তাকাতে পারে নি। মাথা নীচু করে চলে এসেছে।

    যত দিন যাচ্ছে, ছোটবাবু রহস্যের ভেতর পড়ে যাচ্ছে। প্রথম মনে হয়েছিল জাহাজে শুধু পেটভরে খাওয়া আর দিনমান কাজ করা। আর কোনো দুঃখ নেই। বন্দর পাবে মাঝে মাঝে, পেলে নেমে যাবে বন্দরে। উৎফুল্ল হবে, বেড়াবে, এবং ফুলের গন্ধ নিতে নিতে কখনও ফুল ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে। কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে—জাহাজ অন্যরকম। কেমন অজ্ঞাত এক মঠাধ্যক্ষ মাঝে মাঝে তার মাথার ভেতর ঘণ্টা বাজিয়ে যাচ্ছে। ঝড়ের রাতে জাহাজ সতর্ক করে দেবার মতো তাকে সতর্ক করে দিচ্ছে কেউ।

  • চব্বিশ

    চব্বিশ

    ।। চব্বিশ।।

    জ্যাক যেন নেকড়ের মুখ থেকে পালিয়ে ছুটছে। সে এলোপাথাড়ি ছুটছে। সব কেমন গণ্ডগোল হয়ে গেছিল—ছোটবাবুকে এলি-ওয়েতে ঢুকতে দেখেই শয়তানটা হাত ছেড়ে দিয়েছে। কেন যে মরতে সে নিচে নেমে এসেছিল। এবং সে যখন ওপরে উঠে প্রায় দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেল তখন এত ঘামছে, যে মনে হয় বৃষ্টিপাতে সে ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে ভিজেছে। সে কিছু এখন আর ভাবতে পারছে না। দরজা লক করে সে চুপচাপ বসে থাকল কিছুক্ষণ। একবার পোর্ট-হোল খুলে দেখল, ও-পাশে ছোটবাবু দাঁড়িয়ে আছে কিনা। সতর্ক থাকল, যদি ছোটবাবু ভেবে অবাক হয়ে যায় এবং সংশয় দেখা দেয় মনে, তবে ওপরে ছুটে আসতে পারে। –কি ব্যাপার! তুমি এমনভাবে কেন ছুটে এলে। ভয়ংকর কিছু ঘটেছে ভেবে ছোটবাবু স্বাভাবিক কারণেই আসতে পারে। এলেও সে দরজা খুলবে না। কারণ সে এখন জানে তার মাথা ঠিক নেই। সে হয়তো ছোটবাবুর মুখের ওপর থুথু ছিটিয়ে দিতে পারে। আর্চির মুখের ওপর থুথু ছিটিয়ে দেবার মতো মনে হবে তবে।

    এসব কারণে জ্যাক এতটুকু স্থির হয়ে বসতে পারছে না। মাথা সমান উঁচু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখছে নিজেকে। সে যে মেয়ে এবং মেয়ের মতো। সে বলল, ছোটবাবু তুমি কেন বোঝ না জান না আমি বনি। শয়তানটা আমার সব টের পেয়ে গেছে। –আচ্ছা, ছোটবাবু আজ তোমরা এলে না কেন! কেমন কাতর গলায় সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে দেখতে বলল। আমি সেই আটটা থেকে পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে আছি, আসছ না তোমরা। নটা বেজে গেল। কতক্ষণ একা-একা থাকা যায়। রোজ আটটার পর বোট-ডেকে এসে বসো তোমরা অথচ আজ…!

    বনি এবার এক এক করে পুরুষের পোশাক শরীর থেকে খুলতে থাকল। আর্চি আমাকে ঘাটাবে না। বাবাকে বলে জাহাজ থেকে নামিয়ে দেব! তুমি ভাল করছ না। তুমি খারাপ। তুমি বদমাস। পোশাক খুলতে খুলতে, এমন অজস্র কথা। সে প্যান্ট খুলে ছুড়ে দিল, যেন পারলে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে যে কি করছে এখন! সে মেয়ে, এবং এই পুরুষের পোশাক তাকে কিছুতেই আর পুরুষ করে রাখতে পারছে না।—শয়তান অধার্মিক—আর ছোটবাবু তুমি তুমি…ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো পুনরাবৃত্তি…তুমি….তুমি এবং তখনই কি যে হয়ে যায়, সে তার প্যান্ট তুলে একটা ব্লেডে ফালা ফালা করে কেটে ফেলে। জাঙ্গিয়া খুলে দাঁতে ছিন্ন-ভিন্ন করে দেয়। লম্বা ঢোলা জামা খুলে দু-হাতে ছিঁড়ে উড়িয়ে দেয় সমুদ্রে। মোটা গেঞ্জি খুলে পোর্ট-হোলে ঝুলিয়ে দিল। তারপর দেশলাই কাঠি জ্বেলে আগুন ধরিয়ে ছুড়ে মারল আকাশের গায়ে। তারপর ব্রেসিয়ার। একটা একটা করে ভাঁজকরা তিনটে ছোট রুমাল খুলে ফেলতেই সে দেখল, দুটো স্তন রাবারের বলের মতো ফুলে উঠেছে। যেন পিন ফুটিয়ে দিলে স্তন থেকে রক্ত পিচকিরির মতো ছুটবে। সে দুহাতে দু-স্তন ধরে ব্যথায় গুমরে উঠল। টনটন করছে স্তনের চারপাশ। ক্রমে স্তনের চারপাশ থেকে শিরা-উপশিরা জেগে উঠলে সে দেখল, বেশ সুপুষ্টু স্তন, এবং চারপাশে মাখনের রং জেগে উঠছে আর শিরা-উপশিরাতে আশ্চর্য চঞ্চলতা সে টের পাচ্ছে। বিকেল থেকে সে এভাবে একই পোশাকে। আর ব্রেসিয়ারে আঁটা শক্ত স্তন এতক্ষণ খুবই মিইয়ে ছিল। সব খুলে ফেলতেই আবার সব সহজ স্বাভাবিক হয়ে গেল। ব্রেসিয়ারের দাগ শরীরের চারপাশে বসে গেছে। সে এখন ভীষণ হাল্কা বোধ করছে।

    এবং তখনই মনে হল, পোর্ট-হোলের কাচ সে বন্ধ করেনি। তাড়াতাড়ি রাতের পোশাকে স্তন এবং নাভিমুখ ঢেকে পোর্ট-হোলের কাচ বন্ধ করে দিল। ছোটবাবু এলেও সে দরজা খুলবে না। দরজা খুলতে হলে আবার সব তাকে পরে নিতে হবে। এবং সে কেমন অধীর হয়ে উঠল আয়নায়। সে বুঝতে পারছে তার শরীরে ভারী সুন্দর গঠন, যা সে মাঝে মাঝে হাত তুলে এবং নুয়ে নিচু অংশ দেখার সময় কাউকে ভেবে থাকে। ভাবতে ভাল লাগে।

    এই প্রতিবিম্ব তাকে কিছুক্ষণ মুহ্যমান করে রাখল। ছোটবাবু আসতে পারে, ডাকতে পারে মনে থাকল না। কাল সকালে সে ভেবেছে আর্চিকে সাবধান করে দেবে। আর্চি ওর দিকে এখন হিংস্র লোভী জন্তুর মতো তাকিয়ে থাকে। তখন আর্চির মুখে কিছু ছুড়ে মারার প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে স্থির থাকতে পারে না।

    বনি এমন সাত-পাঁচ ভেবে যাচ্ছিল। আলতো করে বেগুনি রঙের একটা নাইটি পরে নিল। সাদা চাদরে ঢাকা মখমলের মতো বিছানা। দুটো বালিশের একটাকে সে সব সময় পাশবালিশ করে নেয়। সবুজ রঙের আলো জ্বেলে শুয়ে পড়বে ভাবল। কিন্তু তেষ্টা গলায়। সে জল খেল এক গ্লাস। শুয়ে পড়বে ভেবে বাংকের কাছে গেল—কিন্তু কেন জানি ভেতরে এক অসহ্য জ্বালা। ছোটবাবুর ওপর আবার মন বিরূপ হয়ে উঠছে। আটটার পর ছোটবাবু এখানে এসে বসলে তাকে নিচে নেমে যেতে হত না। আটটার পর ছোটবাবু কি আজ শুয়ে পড়েছে! ওর শরীর ভাল নাও থাকতে পারে। পাখি দুটো না থাকায় ছোটবাবুর মন ভাল নাও থাকতে পারে। কখন কি যে হয়, মনের এই বিরূপতা কাটতে ওর সময় লাগেনি। সে আবার ছোটবাবুর জন্য কেমন এক কষ্টে ডুবে যাবার সময়, দরজা খুলে ফেলল। অন্ধকার রাত বলে উইংসের আলো দুলে দুলে জাহাজটাকে এক অলৌকিক জাহাজ বানিয়ে ফেলছে। এবং ভাবতে ভাল লাগল জাহাজে কেউ নেই। কেবল সে আর ছোটবাবু। নিরবধি কাল যেন জাহাজটা এভাবেই চলবে। থামবে না। সে বেগুনি রঙের নাইটি পরে ডেকচেয়ারে বসে থাকবে। পাশে ছোটবাবু, পৃথিবীর সব প্রাচীন ইতিহাস ছোটবাবুর মুখ থেকে শুনতে শুনতে সে ঘুমিয়ে পড়বে।

    বনি আশা করেছিল ছোটবাবু ওপরে উঠে আসবে। এমন একটা ঘটনার পর চুপচাপ থাকতে পারে না ছোটবাবু। এবং সে এত অধীর যে ছোটবাবু এলে সে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে দিতে বলবে, দ্যাখো আমি কে? আমার ঊরুমূল দ্যাখো, বাহু দ্যাখো, আমার সুন্দর স্তনের রূপলাবণ্যে তুমি ভালো হয়ে যাও।

    বনি দরজা ফাঁক করে রেখেছে। চুপিচুপি দেখছে কেউ নিচ থেকে উঠে আসছে কিনা। জুতোর শব্দ উঠছে কিনা। কান সজাগ। যদি ছোটবাবু আসে তবে সিঁড়ি ভাঙ্গার শব্দে সে ঠিক টের পাবে—সে উঠে আসছে। ছোটবাবু ওঠার সময় যেন কি ভাবতে ভাবতে উঠে আসে। ওর পায়ের শব্দে সব টের পাওয়া যায়। অথচ ছোটবাবু আসছে না। সিঁড়িতে কোনও শব্দ নেই। নিঝুম সমুদ্রে অনেক নিচ থেকে সেই এনজিনের এক শব্দ, ক্রমান্বয়ে চারপাশে পরিব্যাপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অন্ধকার সমুদ্র তখন আরও ভয়াবহ এবং গভীর মনে হয়। সমুদ্রের অতলে হাজার সেই প্রাগৈতিহাসিক জীবেরা সত্যি ঘোরাফেরা করছে মনে হয়। তারা এখনও তেমনি রয়েছে। তাদের স্বভাব পাল্টায় নি।

    বনি দরজা বন্ধ করে দিল। ওর জন্য ছোটবাবুর এতটুকু কষ্ট নেই। ছোটবাবুর ওপর চাপা অভিমান এবং মাঝে মাঝে মনে হয় সে ছোটবাবুর সঙ্গে আর কিছুতেই কথা বলবে না। সে এভাবে কতবার ভেবেছে, এই শেষ, এবং ছোটবাবু যেমন আছে তেমনি থাক, কিন্তু মনের ভেতরে কি যে থাকে, যেন সে শিশুবয়স থেকে ছোটবাবুকে দেখে এসেছে, একসঙ্গে বড় হয়ে উঠেছে, বড় মাঠে বিকেলে তুষারপাতের সময় একসঙ্গে স্কি খেলেছে, একসঙ্গে কোথাও দুজন কেবল নাচ ঘরে নেচে যাচ্ছে অথবা হৈ-হৈ করে কতকাল একজন সমুদ্রগামী মানুষের হাত ধরে সে হেঁটে যাচ্ছে। ছোটবাবু তার কেউ নয়, সে কিছুতেই আর এটা ভাবতে পারে না।

    বনি সত্যি শুয়ে পড়ল। সবুজ আলো জ্বেলে দু-পা ছড়িয়ে দিল। দু-হাতে মুখ ঢেকে রাখল। শরীরের সব পবিত্রতা আর্চি হরণ করে নিতে চাইছে। ছোটবাবু তুমি জান না, এ পবিত্রতা আমার সব। সহজে সে ঘুমোতে পারল না। পাশ ফিরে শুল। ঘুম আসছে না, কেবল হিজবিজি ভাবনা তার, যেন সেই আশৈশব ক্যাসেলের পাশে ভ্রমণ—বাবার হাত ধরে ভ্রমণ। এখন বাবার হাত ধরে কোথাও আর যেতে ভাল লাগে না তার। মনে মনে কার্ডিফ-ক্যাসেলের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে কেবল ছোটবাবুর মুখ সে দেখতে পায়। বাবার মুখ আর কিছুতেই মনে করতে পারে না।

    বনি আরও ভেবে অবাক হয়ে যায়, সে কত সহজে যে এই জাহাজে বড় হয়ে যাচ্ছে। তার চিন্তা ভাবনা কেমন পরিণত মানুষের মতো। সে আর ছেলেমানুষের মতো অকারণ ছোটবাবুর কেবিনে ছুটে যেতে পারছে না। পারলে যেন ভাল হত। অভিমানে সে এমন ভেঙ্গে পড়ত না। শুয়ে শুয়ে ফুলে ফুলে কাঁদতে হত না।

    ছোটবাবু তখনও জেগে আছে নিচে। সে চুপচাপ একাকী বসে রয়েছে। আর্চির মুখ অতিকায় হয়ে যাচ্ছে। কখনও মনে হচ্ছে সে নিজে সমুদ্রের নিচে ছোট রুপোলী মাছ, বেশ নেচে নেচে বেড়াচ্ছে। জলের ভেতরে কি আছে জানত না। কিন্তু সেই জলে এক ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ মুখ, হাঙ্গরের মতো লেজ নেড়ে নেড়ে ক্রমাগত তাকে অন্ধকারে লক্ষ্য করে যাচ্ছে যেন। আর্চিকে খুশী করার জন্য সে যা নয় প্রমাণ করতে চাইছে। সে নিজে বার বার মনে মনে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে, কিন্তু ব্যবহারে ভালমানুষ, মুখ বুজে কাজ করে যাওয়া স্বভাব। যখন আর পারে না, তখন কাপ্তানের কথা মনে হয়। মনে হয়, তাকে এভাবেই জীবনে বড় হতে হবে। সে তার ক্ষোভ অথবা উত্তেজনা ভুলে থাকার চেষ্টা করছে।

    জ্যাকের কথা ভেবে আরও অবাক। এত রাতে জ্যাক নিচে নামে না। জ্যাক রাত হলে নিজের কেবিনে বসে থাকে। কখনও জ্যাক এবং সে আর ডেবিড বোট-ডেকে বসে থাকে। একটু রাত হলেই জ্যাক কেবিনে চলে যায়। দুটো-একটা কথা পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে জ্যাক বলতে ভালবাসে। সে ভেবেছিল, জ্যাক ওর দিকেই ছুটে আসবে। কিন্তু জ্যাক গঙ্গাবাজুর দিকে ছুটে গেল কেন বুঝতে পারল না। কেবিনেই বা জ্যাক ঢুকে গেল কেন—তাও বুঝছে না। কাল দেখা হলে আর্চির কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে। এবারে সে ঘুম যাবে ভাবল।

    কাপ্তান তখন নিজের কেবিনে বসে আছেন। সাদা জিন কাপড়ের ফুল প্যান্ট, সাদা হাফ-সার্ট এবং পায়ে সাদা জুতো। যতক্ষণ ডিউটি থাকবে, ততক্ষণ একেবারে পুরো ইউনিফরমে বসে থাকবেন। পোর্ট-হোল দিয়ে সামনের সমুদ্র দেখার স্বভাব। সালফার বোঝাই বলে জাহাজের ড্রাফট আটাশ। এর চেয়ে বেশি জাহাজে মাল তোলা যায় না। সামান্য ঢেউ উঠলেই জল উঠে আসে। খুব সতর্ক তিনি। এমন কি এখন যে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলেন তাও যেন ঠিক না। জাহাজ আবার সেই একই রাস্তা ধরে যাচ্ছে। সেই মাস্তুলে লম্ফ জ্বালিয়ে জাহাজ আবার যাচ্ছে সেই দ্বীপগুলিতে—কোম্পানী থেকে যে-যে ভাবে জাহাজের কার্গো দেওয়া হচ্ছে তাতে করে কতমাস এই সব দ্বীপপুঞ্জে ঘুরে বেড়াতে হবে তিনি বুঝতে পারছেন না।

    অথচ তিনি এই প্রশান্ত মহাসাগরে পড়ার পরই হঠাৎ অনুভব করলেন, বনি আর আগের মতো নেই। সে লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ভাঙ্গে না। সে রেলিঙ থেকে রেলিঙ-এ ঝুলে চলে যায় না। অথবা সে যে একটা দোল খাবার মতো ব্যবস্থা করে নিয়েছিল চিমনির পাশে সেখানে সে বসে না। বসলেও চুপচাপ, নিজের ভেতরে সে নেই, চোখে-মুখে কেমন এক আশ্চর্য উদাসীনতা। লাজুক, নম্র স্বভাবের হয়ে যাচ্ছে। বনির কথা ভেবেই তিনি অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। এবং তখনই মনে হল, তাকে দরজার বাইরে কেউ ডাকছে। বনির মতো গলা। দরজা খুলে বের হয়ে দেখলেন কেউ নেই। অবাক। তিনি স্পষ্ট শুনতে পেয়েছেন বনির মতো কেউ ডেকে বলছে, দরজা খোল। ভিতরে ঢুকতে পারছি না।

    হিগিনস সামান্য সময় দরজায় দাঁড়ালেন। বনি, না অন্য কেউ। অন্ধকার রাত বলে চারপাশে স্পষ্ট কিছু দেখা যায় না। চিমনির নিচে মনে হল গাউন পরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কুয়াশার মতো, ছায়া ছায়া! কি আশ্চর্য বনি এ-পোশাকে বের হয়েছে! কি সাহস মেয়ের! রাত গভীর। কেউ বোট- ডেকে এ সময়ে থাকবে না বলে, বনির এমন সাহস তিনি একেবারেই পছন্দ করছেন না। তিনি প্রায় দ্রুত নেমে যাচ্ছিলেন সিঁড়ি ভেঙ্গে। জোরে ডাকতেও পারছেন না বনি বলে। জ্যাক বলে ডাকলে, ব্রীজে যাদের ডিউটি তারা সতর্ক হয়ে যেতে পারে। অসময়ে কাপ্তান নিচে নেমে যাচ্ছেন কেন! আর যদি চিমনির ও-পাশে ছায়া ছায়া অন্ধকারে বনিকে আবিষ্কার করে ফেলেন, তবে কেলেঙ্কারি। তিনি যেন মরিয়া হয়ে ছুটছেন, এবং নেমে যাবার সময় পাইপে হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়ালেন। আর দাঁড়াতেই অবাক, রেলিঙ ফাঁকা। অস্পষ্ট ছায়া ছায়া অন্ধকারে বনি কিংবা গাউনপরা কেউ নেই। যত দ্রুত নেমে যাচ্ছিলেন, ঠিক তত দ্রুত তিনি বনির কেবিনে গিয়ে জোরে ডাকলেন, জ্যাক জ্যাক।

    বনি বাবার গলা শুনে ধড়ফড় করে উঠে বসল। সে ঘুমোয়নি। তার কিছুতেই ঘুম আসছিল না। সে লাফিয়ে নিজের পোশাক পরে দরজা খুলে বলল, বাবা তুমি!

    —বনি তুমি আমাকে ডেকেছিলে?

    —নাতো বাবা।

    —এই এক্ষুনি—মানে মিনিট চার-পাঁচ আগে।

    —নাতো বাবা। কেন কি হয়েছে!

    —কিছু না। তুমি ঘুমোও। সাবধানে ঘুমোবে। বনি তুমি ভয় পাও না তো?

    —না বাবা। ভয় পাব কেন!

    —ছেলেমানুষ তুমি।

    বনি বলল, ভিতরে এস! তুমি এত ঘামছ কেন বাবা? বোস।

    —ঘামছি! তিনি বসতে বসতে বললেন।

    —হ্যাঁ। বলে বনি তোয়ালে দিয়ে বাবার কপাল মুখ মুছিয়ে দিতে থাকল। তারপর হেসে ফেলল, তুমি না বাবা যত বয়স বাড়ছে তত ছেলেমানুষ হয়ে যাচ্ছ। আমার কথা ভেবে তোমার ঘুম আসে না।

    কাপ্তান কিছু বললেন না। বসে থাকলেন। দেখলেন, মেয়ের কিছু পোশাক ছেঁড়া। প্যান্ট, ঢোলা জামা, ব্রেসিয়ার একপাশে পড়ে আছে।

    কাপ্তান দেখলেন সব। কিছু বলতে পারলেন না। এই বোট-ডেকে এলিস এইমাত্র তবে এসেছিল, তার গলা। এলিসই বনির গলা নকল করে ডেকেছে। তারপর ভাবলেন, হয়তো তিনি বনির কথা ভাবতে ভাবতে খুব বেশি অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলেন। এবং মনে হয়েছিল, বনি তাঁকে ডাকছে। কিন্তু পরক্ষণেই আর একটা চিন্তায় তিনি ভীত হয়ে পড়লেন। দীর্ঘ বিশ বছর আগে এলিসকে নিয়ে এ জাহাজে উঠেছিলেন। ঠিক সেই এলিসের গাউন অন্ধকার রাতেও রেলিঙে ঝলমল করছিল! তিনি এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। মেয়ের দিকে তাকাতে পর্যন্ত সাহস পেলেন না। কেবল বললেন, দরজাটা বন্ধ করে দাও। ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকলেন।

    তারপর তিনি ঠিক সেই রেলিঙের কাছে গিয়ে বললেন, এলিস, আমি ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস. বলছি।

    শুধু ওপরে অজস্র নক্ষত্রমালা, অন্ধকার সমুদ্রে একটা গুমগুম আওয়াজ, প্রপেলারের একটানা জল- ভাঙ্গার শব্দ, আর কিছু না। না, মনে হল, সেই এ্যালবাট্রস পাখি দুটো এখনও উড়ছে। দূরে কোথাও তিনি তাদের কক্ কক্ শব্দ শুনতে পেলেন।

    এ-সব কিছুই তিনি এখন শুনতে চান না! তিনি ফের বললেন, আমি স্যালি হিগিনিস ক্যাপ্টেন এস-এস সিউল-ব্যাঙ্ক, বলছি। তুমি শুনতে পাচ্ছ।

    না কোন জবাব নেই। পাখি দুটো জাহাজের মাথায়, বোধ হয় মাস্তুলের ডগায় বসার জন্য আবার এসেছে। তাদের অতিকায় ছায়া, তাঁকে মুহূর্তের জন্য ঢেকে দিয়ে চলে গেল।

    তিনি বললেন, এলিস, আমি সব সহ্য করব। যে কোন শাস্তি। দোহাই তুমি বনির ছদ্মবেশে এসো না। বনির গলায় আমাকে ডেকো না। বনির কোন দোষ নেই। তারপর তিনি নিজেই অবাক হয়ে ভাবলেন, অদৃশ্য আত্মার সঙ্গে তিনি কথা বলে চলেছেন। ভয়ে তাঁর শরীর ফুলে উঠছে। একাকী নিশীথ অন্ধকারে দেখলেন, দূরে একটা নক্ষত্র এইমাত্র খসে পড়ল। তিনি ফিরে এসে কেবিনে ঢুকতে সাহস পেলেন না। ব্রীজে একটা ডেক-চেয়ারে চুপচাপ অন্ধকারে বসে থাকলেন। সামনে থার্ড-মেট, হুইলের সামনে কোয়ার্টার-মাস্টার। ওদের দুজনেরই চোখ সামনের দিকে। পেছনে কেউ বসে আছে তারা টের পেল না।

    আবার কোন নক্ষত্র যদি সমুদ্রের অতল থেকে ভেসে ওঠে এবং ভাসতে ভাসতে আকাশের গায়ে টুপ করে লেগে যায় বুঝতে পারবেন, এই নক্ষত্র বেয়ে কেউ কখনও এ-জাহাজে নেমে আসে। বোধহয় এলিসও তাই করছে। জাহাজ থেকে আকাশে, আকাশ থেকে সমুদ্রের গভীরে ডুবে যায়। এভাবে জাহাজের পিছু পিছু অথবা যেখানে তিনি থাকছেন, এলিস সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে। এমন মনে হতেই ফের স্বাভাবিক হয়ে গেলেন। উঠে থার্ড-মেটের কাঁধে হাত রাখলেন। সেদিন থার্ড-মেটকে গালাগালি করেছেন। আজ কেন জানি মনে হল থার্ড-মেট সত্যি খুব কর্তব্যপরায়ণ অফিসার। তিনি বললেন, থার্ড-মেট, তোমার কি মনে হয়?

    —কী স্যার?

    —ওই ভূতটুতের ব্যাপার সম্পর্কে!

    —আমার এতে বিশ্বাস নেই স্যার!

    —অথচ দ্যাখো রিচার্ড নেমে গেল। চোখ-মুখের কি অবস্থা হয়েছিল!

    —আমি তো জাহাজে কিছু কখনও দেখি না।

    —আমিও না। বলেই তিনি লগ-বুকের পাতা উল্টাতে থাকলেন। তারপর বললেন, কম্পাস রিডিং ঠিক দিচ্ছে তো।

    —সামান্য গণ্ডগোল করছে।

    সামান্য বলতে কতটুকু তিনি তাড়াতাড়ি অঙ্ক কষে সেই হিসেবটা বের করলেন। জাইরো কম্পাসের সঙ্গে হিসেব মিলিয়ে দেখলেন, ঠিকই আছে। একটু এদিক-ওদিক সব জাহাজেই হয়। তিনি এবার যেন তার পুরানো সাহস ফিরে পেয়েছেন। বললেন, তবু কখনও কখনও এমন হয়। কি হয়, কিছু বললেন না। থার্ড-মেট প্রশ্ন করে, কি হয় জানতে পারল না। কাপ্তান তাঁর কেবিনের দিকে চলে যাচ্ছেন। কাপ্তান যে ঘুমোন না, জেগে থাকেন এটা বোধহয় দেখিয়ে গেলেন। কাপ্তানের দরজা বন্ধ হলেও থার্ড-মেট তেমনি সামনে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে থাকল। দুরের দুটো একটা আলো দেখে মনে হল অন্ধকারে একটা দ্বীপটিপ এগিয়ে আসছে সামনে। র‍্যাডারে সে দেখতে পেল—ওটা দ্বীপই। সঙ্গে সঙ্গে টেলিগ্রাম পাঠাল নিচে, স্লো। জাহাজের গতি কমিয়ে দিন। সামনে একটা দ্বীপ দেখা যাচ্ছে। এবং দ্বীপের পাশ কাটিয়ে জাহাজ ফের নেমে গেলে সে টেলিগ্রাম পাঠাল ফের—ফুল। পুরোদমে চালান। নিচে ডিউটি এনজিনিয়ার চার নম্বর, টেলিগ্রামে ঘণ্টা বাজতেই জাহাজের গতি বাড়িয়ে দিল। তারপর টুলের ওপর একটা পা রেখে সামান্য ঝুঁকে থাকল নিচে। কখনও পায়চারি করল। কখনও ব্যালেস্ট পাম্প চালিয়ে ময়লা জল বের করে দিতে থাকল। বয়লারের ওপাশে তিনজন ফায়ারম্যান, টিণ্ডাল। ওরা উইণ্ডসেলের নিচে দাঁড়িয়ে গেজে স্টিম দেখছে। এবং নানারকমের সব বালব, কক, গেজ। কক থেকে ফ্যাচ ফ্যাচ শব্দে স্টিম এবং জল একসঙ্গে বের হয়ে আসছে। আবার কোথাও হিসহিস শব্দ এবং নিচে ওরা প্রায় সমুদ্রের সারফেস থেকে আটাশ ফুট নিচে। ওরা কয়লা মেরে যাচ্ছে, ফার্নেস-ডোর খুলে আগুন ঘেঁটে দিচ্ছে। বড় বড় স্লাইশ, র‍্যাগ টানছে তুলছে এবং ভেতরে প্রায় সমস্ত শক্তি দিয়ে ঠেলে দিচ্ছে—এবং এভাবে শরীরে ওদের আগুনের হলকা এসে প্রায় সারা শরীর ঝলসে দেবার মতো। তখনই এয়ার বালব না টেনে পারা যায় না। না হলে আগুন লেগে পুড়ে মরার কথা।

    আর এই হচ্ছে নিশীথের জাহাজ। সমুদ্রে নিশীথে জাহাজ এভাবেই চলে। আফট্-পিকে যে জাহাজি ডিউটিতে থাকে এখন সে কেন বেল বাজাল না! থার্ড-মেট ভেবে পেল না এটা। সবাই যখন সতর্ক, সজাগ প্রায় শরীরের শিরা-উপশিরার মতো সিউল-ব্যাংককে সচল রাখছে, তখন আফট্-পিকে দ্বীপ দেখে ঘণ্টা বাজল না, ভারি বিস্ময়ের। জাহাজে একটা বড় রকমের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত, চড়ায় উঠে পড়তে পারত জাহাজ—তাছাড়া এত কাছাকাছি কোনও দ্বীপ তো থাকার কথা না। সহসা এমন মনে হতেই চার্টের ওপর ঝুঁকে বুঝতে পারল, অন্তত দুশো মাইলের ভেতর কোনও দ্বীপ নেই। তবে এটা সে কি দেখল! সে যে টেলিগ্রাম পাঠাল, এবং মনে হল সামনেই একটা দ্বীপ, এমন কি র‍্যাডারে মনে হল দ্বীপ। এত সব হবার পর সে কেমন ঘাবড়ে গেল। ঘণ্টাখানেকও হয়নি কাপ্তান এসে নিজে কম্পাস রিডিং-এর ডিভিয়েসান দেখে গেছেন—জাহাজ দ্রাঘিমা অক্ষাংশ ঠিক রেখে এগিয়ে যাচ্ছে, অথচ সে একটা দ্বীপের পাশ কাটিয়ে জাহাজ নামিয়ে আনল।

    সে বলল, কোয়ার্টার-মাস্টার, তুমি কি স্টার-বোর্ডে একটা দ্বীপ দেখতে পাও নি?

    –না তো স্যার।

    —না তো স্যার! তবে আমি টেলিগ্রাম পাঠালাম কেন নিচে!

    —সে তো জানি না স্যার!

    —তুমি ঘুমোচ্ছিলে?

    —না স্যার।

    থার্ড-মেট ভাবল, এ দুনম্বর ঠিক নেশাভাঙ করে। সে হয়তো কিছুই খেয়াল করেনি। কেবল হুইল ঘুরিয়ে যাচ্ছে কম্পাস দেখে। আর কাকে সে সাক্ষী রাখতে পারে। লগ-বুকে লিখতে হবে সব। এনজিন- রুমের লগ-বুকে এতক্ষণে লেখা হয়ে গেছে। কতটা সময় জাহাজ স্লো চলেছে—কার ডিউটি, ফোর্থ এনজিনিয়ারের! না ওকে ফের নতুন করে কিছু লেখানো যাবে না। সে তাড়াতাড়ি কাপ্তানের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, থার্ড-মেট স্যার।

    —কাম-ইন।

    থার্ড-মেট দেখল কাপ্তান টেবিলে বড় একটা চার্ট ফেলে কি মাপ-জোক করছেন। এবং ভীষণ নিবিষ্ট। বললেন, বোস।

    —স্যার!

    —তুমি ভুল করেছ ভাবছ!

    —হ্যাঁ স্যার।

    —না। ঠিকই দেখেছ।

    —কিন্তু স্যার কোর্সে কোন দ্বীপের উল্লেখ নেই। দুশো মাইলের ভেতর নেই।

    তিনি বললেন, চার্ট সেকেণ্ড-মেট ভুল করেছে। চার্ট অনুযায়ী জাহাজ চললে আমাদের ভীষণ ভুগতে হত।

    থার্ড-মেট মাথা চুলকে বলল, তবে চার্ট অনুযায়ী জাহাজ চলছে না!

    —না।

    —কিন্তু স্যার, আমরা তো সাধ্যমতো করে যাচ্ছি। চার্ট অনুযায়ী জাহাজ চালাচ্ছি।

    কাপ্তান বুঝতে পারলেন, থার্ড-মেট কিছু ভুল করেছে ভেবে ভীত। তিনি বললেন, ভয় পাবার কিছু নেই। ঠিকই যাচ্ছে জাহাজ। যেন বলতে চাইলেন, আমরা ভুল করলেও সিউল-ব্যাঙ্ক ভুল করে না। আর হবেই বা না কেন, কতবার সিউল-ব্যাঙ্ক পানামা ক্রশ করে ঠিক এই পথে তাহিতি হয়ে নিউ-জিল্যাণ্ড এবং শেষে সে এই সব দক্ষিণ সমুদ্রের দ্বীপে ঘুরতে ঘুরতে প্রত্যেকটা দ্বীপকে চিনে ফেলেছে। ভুল কোর্সে চালিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া কঠিন। অবশ্য কেউ এ-সব বিশ্বাস করবে না, থার্ড-মেটও না, তিনি শুধু থার্ড-মেটকে বলে দিলেন, জাহাজ ঠিক যাচ্ছে। ভয় পাবার কিছু নেই। সেকেণ্ড-মেট এলে দেখা করতে বলবে।

    সেকেণ্ড-মেট বারোটায় এলে কাপ্তান দেয়ালে একটা স্টিক তুলে ধরলেন। বললেন, কত দ্রাঘিমা অক্ষাংশ?

    ডেবিড বলল, হানড্রেড এ্যাণ্ড ফাইভ ওয়েস্ট, ফিফটিন সাউথ।

    কাপ্তান বললেন, ঠিক আছে?

    ডেবিড দেখল, সে যে চার্ট করেছে, ওটা সোজা নিউ-প্লাইমাউথে যাবার কোর্স-লে। তাহিতিতে যেতে হলে আরও কয়েক ডিগ্রি সাউথ-সাউথ-ওয়েস্টে বেড়ে যাবার কথা। এবং আশ্চর্য জাহাজের এত বড় ভুলটা কারো নজরে আসেনি। আর ডেবিড অবাক, জাহাজ ঠিক পথেই চলেছে। চার্ট অনুযায়ী না চলে—কোথায় কম্পাস রিডিং-এ ভুল থেকে গেছে কেউ ধরতে পারেনি। তাহিতিতে যাবার পথে ওরা যে পরিচিত একটা ছোট্ট দ্বীপ দেখে থাকে সিউল-ব্যাঙ্ক তাও ভুল করেনি। এবং এমন সব হলেই ওরা কেমন বিমূঢ় হয়ে যায়। তখন কাপ্তান হিগিনস সহ গোটা জাহাজটা একটা শয়তানের আস্ত নিবাস তারা ভেবে থাকে। কাজেই ডেবিড আর কিছু বলতে পারল না। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। এত বড় একটা ভুলের জন্য সে দায়ী, যদিও জাহাজ ছাড়ার আগে সব অফিসাররাই চার্ট দেখে থাকে, অথচ দেখেও এমন একটা সহজ ভুল কেউ ধরতে পারল না—সুতরাং কাপ্তান ওকে অদায়িত্বশীল ভেবে তিরস্কার করবেন। এসব মনে হওয়ার দরুন সে যেতে পারছিল না।

    হিগিনস খুব খুশি। যেন এটা তিনি আরও দেখেছেন। ভীষণ একটা প্লেজার, আনন্দে আর তিনি স্থির থাকতে পারছেন না। বলছেন, বুঝলে ডেবিড, জাহাজ আমাদের খুব বিশ্বস্ত। আমরা ভুল করলেও সে করে না। কেমন দেখলে তো! নিজের চোখে দেখলে।

    ডেবিড কি বলবে? সে বলল, হ্যাঁ স্যার। এবার আমি তাহলে যেতে পারি?

    —যাবে? যাও।

    ডেবিড তাড়াতাড়ি বের হয়ে পড়ল। জাহাজটা সামান্য দুলছে। সমুদ্রে ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। শেষ রাতের দিকে সামান্য শীতও বেড়েছে। ডেবিড সেজন্য একটা মোটা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে এসেছে। জাহাজি পোশাক। মাথায় এংকোরের টুপি। সে প্রায় গটগট করে ব্রীজে ঢুকে গেলে থার্ড-মেট বলল, কি আশ্চর্য কাণ্ড!

    ডেবিড বলল, বাজে। বাজে কথা।

    —তার মানে!

    —মানে কাপ্তান ভুলটা ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন। প্রথমেই ধরতে পেরেছিলেন। তিনি তলে তলে কোথায় কিভাবে কি করেছেন কে জানে!

    থার্ড-মেট বুঝল, ডেবিড এসবে পাত্তা দিতে চায় না। না দেওয়া স্বাভাবিক। একটা জাহাজ নিজের খুশিমতো চলে ভাবতে গেলেই শরীর শিউরে ওঠে। আর সত্যি সে যখন চোখের ওপর দেখতে পায়, একটা জাহাজ নিজের খুশিমতো পথ ঠিকঠাক করে নির্দিষ্ট বন্দরে ঢুকে যাচ্ছে তখন মাথা ঠিক রাখা যায় না। জাহাজটা তাদের নিয়ে তবে যা খুশি তাই করতে পারে। জাহাজটাকে তারা নিয়ে যাচ্ছে না, জাহাজটা তাদের নিয়ে যাচ্ছে। এ-সব মনে হলেই মাথায় প্রায় বাজ পড়ার মতো। মুখে ডেবিড বাজে বলে উড়িয়ে দিলেও মনে মনে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে। এবং এ-জাহাজটা যে খুশিমতো আর স্ক্র্যাপ করা যাবে না জাহাজের মর্জি না হলে স্ক্র্যাপ করার হুকুম যে দেবে সেই ভোগে যাবে এ-সব যখন ভাবছিল, তখ, চোখ ওর গোল গোল হয়ে যাচ্ছে। কখন থার্ড-মেট চলে গেছে, কখন আর একজন কোয়ার্টার-মাস্টার এসে হুইলের দায়িত্ব নিয়েছে সে যেন টের পায় নি। ওর কেন জানি মনে হল, জাহাজ থেকে নেমে যেতে না পারলে কারো রক্ষা থাকবে না। খুশিমতো চড়ায় উঠে বসে থাকবে, খুশিমতো সমুদ্রের অতলে ডুবে নিরুদ্দিষ্ট করে দেবে তাদের। কোন বেতার সংকেত কোথাও ওরা পৌঁছে দিতে পারবে না। সমস্ত এস-ও-এস ইথারে ভেসে ভেসে মহাকাশে বিলীন হয়ে যাবে। পৃথিবীর কোনো ট্রেনসমিটারে সিউল-ব্যাংকের এস-ও-এস ধরা পড়বে না। সে চিৎকার করে বলতে চাইল, নো নো। নেভার। কিন্তু পারল না। কোয়ার্টার-মাস্টার একটা মোমের পুতুলের মতো হয়ে গেছে। স্থির। চোখ এবং হাত-পা কোনো এক অদৃশ্য আত্মার প্রভাবে যেন চলছে।

    সে কাছে গিয়ে নাড়া দিল—এই

    কোয়ার্টার-মাস্টার ডেবিডের দিকে তাকাল।

    —চোখ এমন করে রেখেছ কেন?

    -–কি করে রেখেছি সাব?

    –একেবারে স্থির। চোখের পলক পড়ছে না।

    —না সাব।

    এমন নিশীথে, অর্থাৎ এত রাতে, কারণ এখন রাতদুপুর, সমুদ্রে কেউ জেগে নেই, পাখি দুটোও না, দ্বীপে হয়তো থেকে গেছে—তখন মোমের পুতুলের মতো কোয়ার্টার-মাস্টারের মুখ তাকে সীমাহীন অসহায়তার ভেতর টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বার বার নাড়তে থাকে, না, না—তুমি ঠিক নেই তিন নম্বর। তুমি কারো প্রভাবে চোখ এমন করে রেখেছ। তুমি নিজের ভেতরে নিজে নেই।

    কোয়ার্টার-মাস্টার বলল, সাব ঠিক থাকা যায় না।

    –কেন কেন?

    —শরীরে কেমন রোমাঞ্চ হয়। কি যে হয় বুঝি না। কম্পাসের কাঁটা, হুইল যেন সব নিজের ইচ্ছায় চলে। আমার কিছু করার থাকে না।

    ডেবিড হয়তো এবার সত্যি চিৎকার করে উঠতে পারলে বাঁচত—সব গাঁজাখোরি। সব মিথ্যা। সিউল-ব্যাংক সম্পর্কে সব শুনে শুনে এমন হয়েছে। তোমরা ভীরু, কাপুরুষ। বলে সে নিজে হুইল ধরলে থরথর করে কাঁপতে থাকল। হুইলের সঙ্গে সে কেমন বিদ্যুৎপৃষ্ঠের মতো সেঁটে গেল। হাত দুটো শক্ত হয়ে যাচ্ছে। আর হুইলটা যখন যেমন দরকার নড়ছে। কম্পাসের কাঁটার সঙ্গে ঠিক মিল রেখে একবার ডাইনে বাঁয়ে ঘুরছে।

    সে প্রায় ছিটকে বের হয়ে এসে বলল, কি ব্যাপার। কখনও তোমরা বলনি তো!

    —কোন ক্ষতি করে না সাব।

    তারপরই কেমন তাকে এক অহংকারে পেয়ে বসে। সে, সব মিথ্যা অহমিকা জাহাজ-এর ভেবে জাহাজের মুখ উল্টোমুখে ঘুরিয়ে দিতে যায়। ঠিক ঘুরে যায়, কিন্তু পরে আবার নিজের মতো জাহাজ পথ করে নেয়। ডেবিড যা করতে চায় করে। সে যেভাবে চালাতে চায় চলে, কিন্তু পরক্ষণে কেমন সেই এক গতি, জাহাজ যাচ্ছে তাহিতিতে।

    কোয়ার্টার-মাস্টার বলল, আপনি সাব ভয় পেয়েছেন।

    ডেবিড বলল, না। তবু এটা কি যে হল!

    —কী সাব?

    —এই যে হুইল ধরলে হাত শক্ত হয়ে গেল।

    —ভয় পেয়েছেন বলে।

    —তুমি?

    —আমরা জাহাজকে মান্য করি। লেখা-পড়া জানি না, সারেং-সাব যা বলেন তাই করে থাকি। এত বড় জাহাজটা যাবে, তার খুশি মোতাবেক যাবে। ভয়ের কি আছে। সে তো আমাদের ঠিক ঠিক নিয়ে যায়। হিগিনস থাকলে আমাদের কোন ভয় থাকে না সাব।

    ডেবিড আর এ-নিয়ে ভাবল না। ভাবলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে। জাহাজে উঠে সে অজস্রবার হুইল ঠিক ঠিক বেঁধে দিয়েছে, আজকের মতো অবস্থা তার হয়নি। মনে মনে সে ভীত হয়ে পড়ছে। সকাল হলে সব কেটে যাবে। এ-সব অনুভূতি থাকবে না। সে যতটা পারল হুইল থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকল। ব্রিজের ভেতর থেকে আকাশ এবং সমুদ্রকে আশ্চর্য রহস্যময় মনে হয়। সে নক্ষত্র এবং অন্ধকার সমুদ্র দেখতে দেখতে বুঝল চারটে বাজতে দেরি নেই। একটু বাদেই সূর্য উঠবে। ঠিক পেরুর পর্বতমালার এপাশে সূর্য সে দেখতে পাবে। সমুদ্র থেকে সহসা ভেসে ওঠার মতো, এবং সূর্য ওঠার আগে সেই সব রং-বেরংয়ের আভা পরিবর্তনশীল আকাশ এবং সমুদ্রের রং, আর যদি কোনও ছোট ফ্লাইং ফিস সে-সময় উড়ে উড়ে আসে, তখন তার এই জাহাজের অস্থিরতার কথা মনে থাকবে না। মনে হবে, জাহাজ তারা ঠিকই চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোন ভুল নেই। কাপ্তান জাহাজের নাম করে একটু বেশি বাহবা নিতে চাইছে। আর কিছু না।

    সকালে সমুদ্রে সূর্য উঠছিল। সূর্য ওঠার সময় মনে হয় এই সামনে একেবারে সামনে সূর্য সমুদ্রের অতল থেকে ভেসে উঠল। ডেবিড বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে দাঁত ব্রাস করছিল। কোর্স এতটা কি করে ভুল হল সে কিছুতেই বুঝতে পারল না। জাহাজের আজগুবি বিশ্বাস অবিশ্বাসে সে কেমন মনমরা হয়ে আছে। এবং এভাবেই সে এখন ভেবে থাকে সমুদ্রে সূর্য উঠলেই এখন পেরুর পর্বতমালার নিচে উঠবে। যদিও তারা হাজার মাইলের ওপর দূরে রয়েছে। এবং কাছাকাছি কোথাও স্থলভাগ নেই বলে সূর্য পেরুর পর্বতমালার নিচে উঠছে ভাবতে ভাল লাগে তার। এও তেমনি মনে হয়, কাপ্তান হয়তো জানেন হিসেবে কোথাও ভুল করে জাহাজ ঠিক কোর্স-লে পেয়ে গেছে। ঠিক কোর্স-লে পেয়ে গেছে কথাটা কাপ্তান বেমালুম অস্বীকার করতে চাইছেন।

    এ-নিয়ে সকালে কথাবার্তা হতে পারে, সবাই জানবে, ডেবিড মারাত্মক ভুল করেছে। কোর্স লে ঠিক করতে পারেনি। সে এজন্যও কিছুটা মনমরা ছিল। তখনই সে দেখলো এ্যালবাট্রস দুটো মাস্তুলে বসে রয়েছে। মাস্তুলের ডগায় এত বড় পাখি দুটো কেউ খেয়ালই করেনি। এবং সঙ্গে সঙ্গে সে আর স্থির থাকতে পারল না। মনমরা ভাবটা একেবারে কেটে গেল। দু-লাফে কেবিনে ঢুকে বন্দুক হাতে নিয়ে হামাগুড়ি দিতে থাকল। তারপর সেই বড় পাখিটাকে, বড়-পাখিটাই ওর মাংস খুবলে নিয়েছে। এমন সুযোগ আর সে পাবে না। পাখি দুটোর বোধ হয় চোখে এখনও ঘুম জড়িয়ে আছে। ওদের ঠোট ডানার ভেতরে। সে সন্তর্পণে এগিয়ে যাচ্ছে। বুঝতেই দিচ্ছে না বোটের নিচে হামাগুড়ি দিয়ে কেউ এগিয়ে যাচ্ছে।

    সকালে তখন ছোটবাবু মাত্র বাথরুম থেকে বের হয়েছে। এক কাপ চা রেখে গেছে মেস-রুম- বয়। একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছিল। শীত শীত করছে। একটা চাদর গায়ে চড়িয়ে চা খেল। পোর্ট-হোলের কাচ খুলে দিল। আর্চির কাছে প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। তার এখন কিছু আর করণীয় নেই। নতুবা কাপ্তানের কাছে কি আবার মিথ্যা রিপোর্ট করবে, ভাবতেই সে বিষণ্ণ হয়ে গেল।

    আর জ্যাক সারারাত অসহ্য জ্বালায় একেবারে ঘুমোতে পারেনি! আর্চি ওকে ভয় দেখিয়েছে। আর্চি সব জেনে এখন ওকে নানাভাবে খেলাবে। সে যে ছোটবাবুকে চুমু খেয়েছিল, আর্টি তাও দেখেছে। আর্চি ভয় দেখাচ্ছে, কাপ্তানের কানে কথাটা তুলবে। জ্যাক সহজভাবে সব মেনে না নিলে আর্চি তাকে সহজে রেহাই দিচ্ছে না। সারারাত ভেবেছে কি করবে! ছোটবাবুকে সব খুলে বলবে কিনা, না চুপচাপ সব হজম করে যাবে। বাবাকে বললে, সে যে বনি, বাবার একমাত্র আশ্রয় এবং বাবার আশা-ভরসা —এমন শুনলে বাবা আরও ভেঙ্গে পড়বেন। ওর বয়েস কম হলে কি হয়, গত রাতে বাবার মুখ দেখে টের পেয়েছিল, তিনি মাঝে মাঝে ভীষণ ভয় পেয়ে যান। এবং ছেলেমানুষের মতো মুখ করে বনির দিকে তাকিয়ে থাকেন। বাবাকে তখন ওর ছোট্ট শিশুসন্তানের মতো লাগে। সে, সব এখন থেকে সহ্য করতে পারবে, কিন্তু বাবাকে কষ্টের ভেতর কিছুতেই ফেলে দিতে পারবে না। এ-সব ভাবতে ভাবতে ওর চোখ ভোররাতের দিকে জড়িয়ে এসেছিল, তখনই এক ভয়ঙ্কর শব্দে সে চমকে উঠল। জাহাজে ফায়ারিং হচ্ছে। সে ছুটে বের হবার আগে পোশাক তাড়াতাড়ি পাল্টে নিল। বোট-ডেকে নেমে যা দেখল, তাতে সে হিম হয়ে গেছে। বড় পাখিটা অতিকায় ডানা মেলে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। পাখা ঝাপটাচ্ছে। গল গল করে রক্তে ডেক ভেসে যাচ্ছে। আর লেডি এ্যালবট্রস জাহাজটার চারপাশে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। জাহাজটাকে ছেড়ে সে কিছুতেই দূরে চলে যাচ্ছে না। কেমন কান্নার মতো এক আর্ত বেদনা পাখিটার গলায়।

    পাখিটা রক্ত ওগলাতে ওগলাতে মরে যাচ্ছে এবং এক ভীষণ অমঙ্গলের আশঙ্কায় বনি স্তব্ধ হয়ে গেল। পাখিটা মরে গেলে সে এতটা ভেঙ্গে পড়বে কখনও বুঝতে পারে নি। মনে হল মৃত্যুর আগে পাখিটার অসহায় চোখ তার ভারি চেনা। যখন মনে হল তখন আর স্থির থাকতে পারল না। ছোটবাবুর কেবিনে দৌড়ে গেল। –ছোটবাবু, ম্যান এ্যালবাট্রস ডেড।

    ছোটবাবু ভারি খুশি। বলল, সত্যি! সে দরজা খুলে বলল, সত্যি। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই বাচ্চা ছেলের মতো মরা-পাখি জাহাজ ডেকে দেখার জন্য ছুটতে থাকল। এলি-ওয়েতে জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে। অমঙ্গল ভেবে মুখ ক্লিষ্ট। এবং ছোটবাবুকে অপলক দেখতে দেখতে চোখ ভারি হয়ে আসছে জ্যাকের। তখন কেমন নিজের আনন্দে আছে ছোটবাবু। রাতের ঘটনা বেমালুম ভুলে গেছে। ভুলে না গেলে সে এভাবে দৌড়াতে পারে না।

    আর তখনই একটা ভয়ঙ্কর অহংকারী স্বর এদিকে ভেসে আসছিল।-–ম্যান, ম্যান এদিকে এস।

    ছোটবাবু একেবারে ফ্রিজ হয়ে গেছে। মুখোমুখি সেকেণ্ড-এনজিনিয়ার আর্চি। সে ছুটে যেতে পারল না। আর্চি তাকে এনজিনরুমে নেমে যেতে বলছে।

    তখনও দূরে ঠিক ছোটবাবুর কেবিনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক। সে দেখছে, আর্চি ছোটবাবুকে নিয়ে নেমে যাচ্ছে। কোথায় নিয়ে যাবে সে জানে। কত নিচে নামিয়ে তাকে টর্চার করবে তাও জানে। সে এখন কি করবে বুঝতে পারছে না। নিচে নামবে, না পাখিটার কাছে যাবে বুঝতে পারছে না।

  • পঁচিশ

    পঁচিশ

    ।। পঁচিশ।।

    —ম্যান, দৌড়ে কোথায় যাচ্ছিলে?

    —টুইন ডেকে স্যার।

    –ডেবিড পাখিটাকে একেবারে মেরে ফেলেছে?

    —হ্যাঁ স্যার।

    —ভাল করে নি।

    —না স্যার, ডেবিড ভাল করে নি।

    —ম্যান, জ্যাক তোমাকে কিছু বলেছে?

    —না স্যার।

    —ম্যান, তুমি জ্যাকের সঙ্গে মিশবে না।

    ছোটবাবু কিছু বলল না। সে নামছে। সিঁড়ি ধরে নিচে নামছে। ক্রমে নিচে নেমে যাচ্ছে। সিলেণ্ডারের কাছে এসে নিচে নেমে আর্চি হিপ-পকেট থেকে দু-ব্যাটারীর একটা টর্চ বের করছে। ওয়াচের সময় আর্চির হিপ-পকেটে টর্চটা থাকে। ওয়াচের এনজিনিয়াররা টর্চটা না থাকলে কাজ করতে পারে না। আর্চিও পারে না।

    টর্চ বের করতেই বুঝল, আর্চি তাকে ট্যাঙ্ক টপের নিচে ফের নামাবে। ওর কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছিল, আর্চি ওর সঙ্গে বেশ ভাল ব্যবহার করছে। আর্চি আজ পর্যন্ত তার সঙ্গে এতগুলো কথা একসঙ্গে কখনও বলে নি। যদিও আর্চি ওকে নাম ধরে ডাকে না, অথবা ছ’ নম্বর বলতেও তার বাধে—এক ধরনের অবজ্ঞা ওর কথাবার্তায়, এবং এই যে ম্যান বলে ওকে সম্বোধন করছে, এটা ভীষণ অপমানের। এ-সব অবজ্ঞা ছোটবাবু গায়ে মাখে না। সে জানে, সেকেণ্ড এনজিনিয়ার এ-জাহাজে না থাকলে কাপ্তান অসহায় বোধ করবেন। কেউ এ-জাহাজে আসতে চায় না। ইচ্ছে থাকলেও কাপ্তান, একজন চিফ-এনজিনিয়ার জাহাজে এখন আর তুলে আনতে পারবেন না। টুয়েন্টি-ওয়ান বারি স্ট্রীট লণ্ডনে খবর গেলেও কিছু করা যাবে না। জাহাজের নাম শুনলেই সবাই সিক-লিভ নিয়ে বসে থাকবে। নামতে নামতে ছোটবাবুর এ-সব মনে হচ্ছিল। যত নিচে নেমে যাচ্ছিল তত দেখতে পাচ্ছে আর্চি টর্চটা হাতে দোলাচ্ছে। জ্যাকের সঙ্গে মিশতে বারণ করছে আর্চি। সে উত্তর দেয় নি। ওর হাতের টর্চ দুলছে তেমনি। সেই ঘণ্টা বাজানোর মতো। যেন ঘণ্টা দুলছে। আর্চিকে সেই জলদস্যুর মতো দেখাচ্ছে। ঘণ্টার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে তরবারী। ঠিক ঠিক জবাব না দিলেই ঘণ্টা তরবারির আঘাতে নামিয়ে দেবে। পাহাড় থেকে ঘণ্টাটা ছিটকে সমুদ্রের জলে পড়ে যাবে।

    ছোটবাবু শুধু অনুসরণ করছে। আর্চির পেছনে পেছনে যাচ্ছে। ওর নাকের কাছে আর্চির মাথা। গায়ে আর্চির সাদা বয়লার স্যুট, গলা থেকে পা পর্যন্ত একটাই পোশাক। ঢোলা। গত রাত্রে জ্যাকের সঙ্গে কিছু একটা মনোমালিন্য হতে পারে। আর্চি হয়তো ওকে পক্ষে টানতে চায়। আর্চিকে বলতে পারত, জ্যাক বুঝি এবার আপনার পেছনে লেগেছে! সে বলতে পারল না কারণ এত বড় কথা সে আর্চির মুখের ওপর বলতে সাহস পায় না। আর এত লম্বা কথা সে বলতে গেলে তোতলাতে থাকবে। সেজন্য সে কিছু না বলে চুপচাপ নেমে যেতে থাকল।

    আর্চি নিচে নেমে লগ-বুক খুলে কি দেখল। বোধ হয় ওকে সময় দিচ্ছে। ম্যান তুমি ভেবে দ্যাখো কার পক্ষ নেবে। ছোটবাবুর এমন মনে হতেই বলল, আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার। কাল রাতে আমি ঠিক না বুঝে ছুটে গেছিলাম।

    আর্চি বুঝতে পারল না, এই নেটিভ-ইণ্ডিয়ানটি তাকে যথার্থ কি বলতে চায়। ছুটে গিয়ে তুমি ঠিক কর নি, সে বলতে পারত। কিন্তু এখন আর্চি বুঝতে পারছে, এ-সবের কোন দাম নেই। ম্যানের প্রতি জ্যাকের অনুরাগ—তাকে পাগলা করে দিচ্ছে। আর্চি আয়নায় দেখেছিল—তার যৌবন অটুট। সে এ-বয়সের মেয়েদের খেতে বেশী পছন্দ করে। এবং জ্যাকের বয়সের কিছু মেয়ে, যেমন জেনি, যেমন ওয়ালা মাত্র ফুটে ওঠা ফুলের কিছু মুখ পরপর চোখের ওপর ভেসে উঠতেই বুঝতে পারল, জ্যাককে তার ভীষণ দরকার। সমুদ্রে এখন জাহাজ ডুবি হলেও কিছু আসে যায় না। কাল হাতাহাতি করতে গিয়ে জ্যাকের আধ ফোটা স্তনে হাত লেগে গেছে। যতই শক্ত করে বেঁধে রাখুক, সে একেবারে নিশ্চিত হয়ে গেছে—জ্যাক মেয়ে। কাপ্তান এতগুলো ক্ষুধার্ত বাঘের মুখ থেকে তাঁর মেয়েকে রক্ষা করার একমাত্র এটাই উপায় ভেবেছেন।

    ছোটবাবু দেখল, ঠিক স্টাবোর্ড-সাইডের বয়লারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আর্চি। সে তার পেছনে দাঁড়িয়ে। যা বলবে, এখন তাকে তাই করতে হবে। কি করবে, সে বুঝতে পারছে না। ওপর থেকে ঝুরঝুর করে ছাই মাথায় মুখে পড়ছে। আর্চির মাথায় একটা গোলমতো টুপি। সে সাধারণত এ- ধরনের টুপি পরে না। কোথাও কোনো গোলমেলে কাজ থাকলে এটা পরে নেয় সে। সুতরাং ছোটবাবু বুঝতে পারছে, তাকে একেবারে খোলের নিচে নামিয়ে কিছু করাবে। নিচে নামতে সবার ভয়। জাহাজের জং-ধরা পাইপ, জং-ধরা স্কাম বকস জলের নিচে হয়তো বুক-সমান জলের নিচে রয়েছে। খুঁজে বের করতে হবে স্কাম-বকস। জলের নিচে ডুবে নাট-বোল্ট খুলে আনতে হবে। নতুবা এখানে আর্চির দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানে হয় না।

    আর্চি টর্চ মেরে চারপাশটা দেখছে। ছোটবাবু এতদিন জাহাজে কাজ করেছে জানেই না, জাহাজের এমন একটা জায়গা স্টাবোর্ড-সাইডের বয়লারটা তার পেটের নিচে লুকিয়ে রেখেছে। সে দেখল, অনেক উঁচুতে বয়লারের পেট, গড়িয়ে ওপরে উঠে গেছে। ছাই জমে জমে বয়লারের প্লেটে একটা পলেস্তারা পড়ে গেছে। একটু নড়লেই কুয়াশার মতো ছাই—চারপাশে শুধু ছাই, কিছু ভাঙ্গা র‍্যাগ স্লাইস, ব্যালচে ডাঁই মারা এবং মনে হয় এখন এটা একটা বিরাট উই-এর ঢিবি।

    আর্চি তখন টর্চের আলো ঘুরিয়ে এনে ঢিবিটার ওপরে ফেলল। গলার স্বর ভীষণ ঠাণ্ডা। সে বলল, এগুলো স্টোক-হোলডে নিয়ে যাবে।

    ছোটবাবু হাত ঢুকিয়ে দিতেই ফুল-ঝুরির মত ছাই চারপাশে ফুর ফুর করে উড়তে থাকল। অর্থাৎ ছোটবাবু আর্চিকে যাবার পর্যন্ত সময় দেয় নি। সে হামলে প্রায় ফুটখানেক নিচ থেকে একটা ভাঙা ব্যালচে তুলে আনল। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের ছাই উড়ে উড়ে একেবারে জায়গাটা অন্ধকার হয়ে গেল। পেছনের দিকে দরজা ঠেলে দিতেই সে দেখল সারেঙ স্টোক-হোলডে দাঁড়িয়ে আছেন।

    সারেঙ সাব বুঝতে পারলেন ছেলেকে তার আর্চি অনর্থক অত্যাচার করছে। স্টিমের খুব একটা মারামারি নেই। দুজন ফায়ারম্যান নিয়ে সারেঙ নিজে এগিয়ে গেলেন—বললেন, তুই বেরিয়ে আয়। আমরা করে দিচ্ছি।

    ছোটবাবু বলল, না চাচা। এটা ঠিক হবে না। সে এসে যদি দেখে তোমরা আমার সঙ্গে হাত লাগিয়েছ তবে আরও ক্ষেপে যাবে। বলে সে নাকে মুখে রুমাল বেঁধে নিল। কেউ কিছু দেখতে পাচ্ছে না। সেই কুয়াশার মতো অন্ধকার কারো কথা কানেও যাচ্ছে না। কারণ এনজিনের অতিকায় ঝমঝম শব্দের সঙ্গে সে চিৎকার করে কথা বলছিল, আর ফুরফুর করে ছাই অনবরত শ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকছে বের হয়ে আসছে—সারেঙ বুঝতে পারলেন—এভাবে আর কিছুক্ষণ ভেতরে থাকলে শ্বাস বন্ধ হয়ে মরে যাবে ছেলেটা। তিনি তাড়াতাড়ি বালতি বালতি জল সেখানে ঢেলে দিলেন। দেখলেন, গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টির মতো ছাই ক্রমে হাওয়ায় থিতিয়ে আসছে। তখন এনজিনের দিক থেকে মাইজলা মিস্ত্রি এগিয়ে আসছে। রাগী চোখ। সারেঙ নিজেও এ-চোখকে সমীহ করেন। কারণ নলিতে মাইজলা মিস্ত্রি ভাল-মন্দ লিখবে—তারপর কেন জানি মনে হয় বয়েস হয়ে গেছে। সিউল-ব্যাঙ্ক জাহাজ থাকলে তিনি থাকবেন, না থাকলে তাঁকেও আর দশজন সারেঙের মতো মাথা নিচু করে রাখতে হবে—তিনি একেবারে পরোয়া না করে ছোটবাবুর সঙ্গে হাত লাগিয়ে কাজটা করে ফেললেন। এ-কাজগুলো সাধারণ কোলবয়দের কাজ। জল মেরে সারেঙ ঠিকঠাক করে দিলে তবে এ-সব টেনে বের করা যায়।

    আর্চির চোখ দুটো শয়তানের মতো ঘুরছে। ছোটবাবুকে জব্দ করার জন্য যেন পাষাণ ভার চাপিয়ে দেখা, কতটা সহ্য করার ক্ষমতা। ছোটবাবু কাজ সেরে যখন বের হতে যাবে, তখন ওকে আর চেনা যায় না। মুখে শরীরে শুধু ছাই আর ছাই, এরই ভেতরে চোখ দুটো লাল রক্তবর্ণ, তখনই ফের সেই ঠাণ্ডা গলা, ম্যান তুমি ভীষণ সাহসী। তুমি পারবে।

    তারপর ছোটবাবু দেখল সেই টর্চ ফের দুলছে। ঝড় উঠলে যেমন ঘণ্টাটা পাহাড়ের ওপর দুলে দুলে সতর্ক করে দিত, সামনে মৃত্যুর বিভীষিকা, এখনও সময় আছে কোর্স পাল্টে দাও, তেমনি টর্চ দোলাচ্ছে আর্চি।

    ছোটবাবু দাঁড়িয়ে থাকল। এই অকারণ টর্চার কেন যে করছে আৰ্চি!

    আর্চি কাছে এসে মুখ উঁচু করে দেখল ছোটবাবুকে। তারপর দু’ পাটির দাঁত শক্ত করে বলল, জ্যাক কিছু বলে নি!

    —না, বলে নি।

    আর্চি বিশ্বাস করতে পারল না। ম্যানের মুখে চুমো খেয়েছে জ্যাক। সে পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে দেখেছে। না, ঠিক পোর্ট-হোল থেকে বললে ঠিক হবে না, আসলে সেও নেশার ঘোরে চুপি চুপি ডেকে বের হয়ে গেছিল এবং উইণ্ড-সেলের আড়াল থেকে দেখেছে, জ্যাক পাগলের মতো চুমো খাচ্ছে।

    সুতরাং ছোটবাবুর মুখ দেখেও আর্চি বিশ্বাস করতে পারল না, জ্যাক গত রাতের ঘটনা না বলে থাকবে। জ্যাক তার বাবাকে বলতে সাহস পাবে না, কারণ সে তাকে ভয় দেখিয়ে রেখেছে—কিন্তু ছোটবাবু। এবং যখন সে জ্যাককে টেনে নেবার চেষ্টা করেছিল কেবিনের ভেতরে তখন একমাত্র জ্যাক আর্ত গলায় ছোটবাবু, ছোটবাবু বলে চেঁচাচ্ছিল। এ-সব কারণে আর্চির ভেতরে রক্ত টগবগ করে ফুটছে। ক্রমশ এক বিদ্বেষ, ঈর্ষা ছোটবাবুর প্রতি। ছোটবাবুর চোখ রক্তবর্ণ, এবং এটা আর্চির কাছে শয়তানের চোখের মতো। সে না পেরে আবার টর্চ দোলাতে দোলাতে এক জায়গায় থামিয়ে দিল।—ওখানে। ওখানে নেমে যাও। হেল!

    ছোটবাবু ঠিক টর্চের আলোতে পায়ে পায়ে যেখানে গিয়ে দাঁড়াল সেটা সেই ঢিবির নিচে ভাঙ্গা লোহার একটা পাটাতন। একটা রোগা মানুষ ঢোকার মত ফাঁক রয়েছে। আর্চি আলো দুলিয়ে নিচে নামতে বলছে ছোটবাবুকে।

    ছোটবাবু প্রথম দুটো পা নামিয়ে দিল। সে ধীরে ধীরে দু’পা, তারপর ভাঙ্গা প্লেট বলে, ধারালো অংশে পা লেগে সামান্য কেটে যাচ্ছে—খুব সাবধানে সে জানে গোটা শরীরটা এই হোলের ভেতর দিয়ে নামিয়ে দিতে হবে। নিচে কি অন্ধকার! ঠিক হাতের কাছে একটা রবারের তারে মোড়া ল্যাম্প। সেটা নিয়ে ঠিক খাদের অতলে নেমে যাবার মতো। এবং কাপ্তানের কথা মনে হচ্ছে তার। উত্তেজিত হলে চলবে না। মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করে যেতে হবে—কারণ এ-দিকটায় আর বাতিল ব্যালেস্ট পাম্প জল তুলে ফেলতে পারছে না—ব্যালেস্ট-পাম্পের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তবু স্কাম- বকস যেন কত পুরাকালে এখানে কেউ এটা ফিট করে রেখে গেছে, তারপর আর মেরামত হয় নি। জাহাজের সব তেলকালি জল, পচা দুর্গন্ধ সব একাকার হয়ে জায়গাটা কৃমির বাসস্থানের মতো হয়ে আছে। ছোটবাবু কিছুটা নেমেই গলার কাছে আটকে গেল। প্রায় বঁড়শিতে ঝোলার মতো—ওর পা হাটু কোমর জলে ডুবে আছে। মুখটা কিছুতেই টেনে নামাতে পারছে না। গলার কাছে প্লেটে আটকে গেছে। আর্চির পায়ের ডগা ওর নাকের কাছে। মনে হচ্ছে ছোটবাবুর মাথা ভেতরে না ঢুকলে, মাথায় দু পা জড়ো করে উঠে দাঁড়াবে আর্চি। এবং তা হলেই হড়হড় করে নিচে ঢুকে যাবে মাথাটা।

    আবার নাকের ডগায় টর্চ দোলাতে থাকল। সেই এ্যাবট অফ এ্যাবটব্রথকের ঘণ্টা এবারে একেবারেই কেটে দেবে। তরবারীর মতো টর্চটা চোখের সামনে দুলছে। দুলতে দুলতে থেমে যাচ্ছে। তারপর চিৎকার, স্কাউন্ডেল।

    ছোটবাবু বুঝতে পারছে না, অকারণ ওকে স্কাউড্রেল বলছে কেন! সে তো অনেক চেষ্টা করেও মাথাটা গলাতে পারছে না। সে তো ইচ্ছে করে মাথা বের করে রাখেনি। মাথাটা ঢুকিয়ে নিতে পারলেই সে ডুবে ডুবে সেই স্কাম বকসটা খুঁজে বের করতে পারবে। তারপর ডুবে ডুবে নাট-বোল্ট খুলে স্কাম বকস খুলে ফেলবে। ভেতরটা পরিষ্কার করে ফেললেই ব্যালেস্ট পাম্প এদিকে এই বুকসমান উঁচু জলটা সমুদ্রে ফেলে দিতে পারবে। বন্দরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। কিন্তু আর্চি যেভাবে গোয়ার্তুমি করছে সে যে এখন কি করে!

    তখনই আর্চি প্রায় নাকের ডগায় পা রেখে বলল, কি বলছি শুনতে পাচ্ছ?

    —না স্যার! আসলে তো ওকে কিছুই বলেনি এখনও।

    —জ্যাকের সঙ্গে মিশবে না।

    —মিশব না স্যার।

    —কথা বলবে না।

    —বলব না স্যার।

    —যা বলব ঠিক ঠিক তাই করবে।

    —করব স্যার।

    আর তখনই মাথাটা ঠিক কি করে যে হড়কে গেল। কানের নিচে সামান্য কেটে গেছে। জ্বলছে। পায়ের খানিকটা অংশ ছুলে গেছে। নোনা জল থাকায় ভীষণ জ্বলছে। সে এবার হাত বাড়িয়ে বলল, স্প্যানার হাতুড়ি দিন।

    আর্চি বলল, উঠে এস।

    কিন্তু স্যার? ছোটবাবু বাকিটা বলতে পারছে না। ঠিক আলাদিনের দৈত্যের মতো ওপরে বসে রয়েছে আর্চি। সে নিচে। তারের বাতিটা আর্চির হাতে। ওটা ধরে রাখলে, আর স্প্যানার দিলে সে ঠিক স্কামবকসটা খুঁজে বের করতে পারবে। যখন তখন নামা যাবে না। যখন নামা গেছে তখন কাজটা করে ফেলা দরকার। সে হাত দিয়ে জলে ঢেউ দিল। অন্ধকারে খোলের গায়ে জলের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। সে উঠে দাঁড়ালে ঝুপ ঝুপ জলের শব্দ এবং জলে সাঁতার কাটলে যেমন জলের তরঙ্গ চারপাশে ঘুরে ঘুরে ছড়িয়ে যায়, এও ঠিক তেমনি। ছোটবাবু বুঝতেই পারছে না,, স্প্যানার হাতুড়ি আর্চি দিচ্ছে না। কেন। ওকে উঠে আসতে বলছে। ছোটবাবু ভাবল আর্চি আসলে মাথা খারাপ লোক। সিউলি-ব্যাংক জাহাজে যখন সে ছ’ নম্বর তখন সেকেণ্ড এনজিনিয়ারের নাট-বোল্ট একটু লুজ থাকবে সে আর বেশী কি। কথামতো সে না উঠলে আবার হয়তো মা-মাসী তুলে খিস্তি জুড়ে দেবে। সুতরাং সে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে মাথাটা কোন রকমে ওপরে গড়িয়ে দিল। তারপর একটা হাত, তারপর কাত হয়ে আর একটা হাত, এবং বুকসমান ওপরে উঠে এল প্রায়। সে তার শরীর এবার নিচে থেকে ওপরে তুলে অনতে পারল। জামা-প্যান্ট জবজবে ভিজে, নোংরা তেলকালি এবং জলে দুর্গন্ধময় শরীর। এখন সে ইচ্ছে করলেই ওপরে উঠে যেতে পারে না। আর্চি তারপর ফের কি বলবে, কে জানে!

    আর্চি বলল, ম্যান তোমার ছুটি!

    ছুটি! তাকে কি বলছে আর্চি! আর্চি সামান্য হাসল পর্যন্ত। আর্চির চোয়াল চৌকো এবং হাসলে দাবার ছকের মতো মুখটা মনে হয়—কোন ঘরে কি চাল আছে পাকা দাবাড় না হলে বোঝা মুশকিল। ছোটবাবু তো কিছুই বুঝছে না। সে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ ছুটি বললেই ছুটি হয়ে যায় না, আসলে সে আবার একটা র‍্যাগিং-এর ভেতরে পড়ে গেছে। সেই টি এস ভদ্রা জাহাজে যেমন সিনিয়ার ট্রেনিজরা জুনিয়রদের ওপর অকারণ টরচার করত—এখানেও এই মেজ-মিস্ত্রি আর্চি তাকে নিয়ে যা খুশী করছে। সে জানত, কোনো নালিশ চলবে না।

    এবং সে এজন্যই ছুটি কথাটা বুঝতে পারেনি। ছুটি কথাটার যথার্থ মানে কি সে যেন ভুলে গেছে! এবং ওর মনে হচ্ছিল ছুটি বললেই সে দৌড়ে উঠে যাবে, আর তখন ধাঁই করে পাছায় লাথি মারবে আর্চি। সে উপুড়ে হয়ে পড়তে পারে ভয়ে, ছুটি বলা সত্ত্বেও দাঁড়িয়ে থাকল। মেজ-মিস্ত্রি ওর সামনে থেকে সরে না যাওয়া পর্যন্ত সে যাচ্ছে না। অথবা সে যখন দেখল মেজ-মিস্ত্রি কিছুতেই নড়ছে না, তখন পাশ কাটিয়ে, একেবারে এক দৌড়। এবং ঠিক ওপরে সিলেণ্ডারের সিঁড়িতে এসে থামল। একটু তেলজুট চেয়ে নিতে হবে। মুখে হাতে পিঠে সব কাদার মতো তেল-কালি। সে এই শরীরে এখন কারপেটের ওপর হেঁটে গেলে সব নোংরা হয়ে যাবে। সে কশপের কাছ থেকে বেশি করে তেলজুট নিয়ে নিল।

    তারপর যা হয়, সিলেণ্ডারে পাশে লম্বা লোহার জালি, জালিতে বসে ঘসে পা হাত মুখ সাফ করে ফেলল। নিচে বোধহয় আর্চির ওয়াচ শেষ। ফোর্থ নেমে আসছে। ফোর্থ নেমে এলেই আৰ্চি উঠে যাবে। আর্চির সঙ্গে আবার দেখা হবে ভাবতেই সে আর সেখানেও বসল না। একেবারে দু- লাফে ওপরে উঠে গেল। ওপরে উঠেই অবাক! পোর্ট-সাইডে ঠিক তিন নম্বর ফল্কার পাশে বড় বড় কাঠ এনে ফেলছে ডেক জাহাজিরা। লম্বা কাঠ চিরে ফেলা হচ্ছে। কেন এসব হচ্ছে ছোটবাবু বুঝতে পারছে না। মৈত্রদা অমিয় নেই। ওদের হয়তো এখন ওয়াচ। সে একটু এগিয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি মরা পাখিটাকে দেখবে বলে দু-লাফে ফল্কায় উঠে গেল। এবং পাখিটার পাশে দেখল, জ্যাক দাঁড়িয়ে। সে আর জ্যাকের সঙ্গে কথা বলতে পারে না। জ্যাক তবু ছোটবাবুকে দেখছে। আর্চি ছোটবাবুকে খোলের ভেতর ফের ঢুকিয়ে দিয়েছিল। কষ্টে জ্যাক তাকাতে আর সাহস পাচ্ছিল না। সে মাথা নিচু করে রেখেছে। পাখিটার পাশে দাঁড়িয়ে। সব কাজের যেন তদারক করার ভার তার ওপর – ছোটবাবুর দিকে তাকালেই সে নড়তে পারবে না। আর্চির কথা মনে হলে চোখে আগুন জ্বলতে থাকে—এখন সে সেজন্য হাই করে ডাকল, কার্পেন্টার

    কার্পেন্টার ছুটে আসছে।

    সে আবার ডাকছে, কশপ।

    ডেক-কশপ ছুটে আসছে।

    সে ডাকছে, সারেঙ।

    ডেক সারেঙ ছুটে এসে সালাম জানাচ্ছে।

    সে এমন কি তার বাবাকে টানতে টানতে নিয়ে এল। ডেবিড এবং রেডিও-অফিসার আরও যারা আছে তাদেরও ডেকে নিলে হয়—কারণ এখন একটা কফিন তৈরি হচ্ছে জাহাজে। বড় বড় ফালা কাঠে হাতুড়ি ঠুকছে, পেরেক মারছে কার্পেন্টার। আর সেই লেডি এ্যালবাট্রস উড়ছে। উড়ে উড়ে আসছে। জ্যাক সবাইকে ডাকছে। সে এই পাখির মায়ায় এবং এটা তো ঠিক, সবাই যদিও এখন আর প্রাচীন নাবিকের মতো সংস্কারে ভোগে না তবু কেন যে এটা ওদের বিশ্বাস করতে ভাল লাগে পৃথিবীতে সব নাবিকেরা মরে গিয়ে এ্যালবাট্রস পাখি হয়ে যায়। মরার পরেও সমুদ্রকে ওরা ভুলতে পারে না। সমুদ্রের জন্য তাদের ভীষণ মায়া। তখন তারা পৃথিবীতে আবার এ্যালবাট্রস হয়ে ফিরে আসে। সমুদ্রে উড়ে উড়ে বেড়ায়। তাদের কোন অনিষ্ট করা জাহাজি মানুষের পক্ষে ঠিক না।

    কেউ কেউ সামনে না হলেও গোপনে মেজ-মালোম ডেবিডকে যে ধিক্কার না দিচ্ছে তা নয়। আর এটা হয়তো কাপ্তানের ছেলেটা বুঝতে পেরে ঠিক সুমদ্রে একজন মৃত নাবিকের প্রতি যেমন সম্মান দেখানো হয়,—তেমনি সম্মান—আর কত বড় পাখি—প্রায় দশ বারো ফুটের ডানা মেলে সে চিৎ হয়ে পড়ে আছে। জ্যাক ঠোঁট দিয়ে রক্ত ওগলাতে দেখেছে। তারপর চোখ দুটো অসহায়, কি যে অসহায়, পাখিটা জ্যাকের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল মরে যাবার আগে। জ্যাকের মনে হয়েছিল তেষ্টা পেয়েছে। যেমন মানুষ মৃত্যুর আগে ভীষণ তৃষ্ণার্ত বোধ করে। পাখিটাও হয়তো ওর দিকে করুণ চোখে একটু জলপানের নিমিত্ত তাকিয়ে আছে—সে ছুটে গিয়ে জল এনেছিল। জল খেতে দিয়েছিল। আশ্চর্য পাখিটা প্রায় বুক ভরে জল তেষ্টা নিবারণ করতে করতে চোখ বুজে ফেলেছিল।

    জ্যাক শুধু ছোটবাবুকে বলেছিল, তুমি স্নান করে এস ছোটবাবু। ভাল প্যান্ট-জামা পরবে। ছোটবাবু কিছু বলল না। সে কথা না বললেই হ’ল। জ্যাক যা বলেছে এখন তাকে তাই করতে হবে। সে কেবিনে চলে গেল স্নান করবে বলে। তারপর সারাদিন ছুটি। অন্য সময় হলে সে জ্যাককে বলত, আমার সারাদিন ছুটি। আর্চি ভীষণ খুশি আমার কাজে। আমাকে সে ছুটি দিয়েছে জ্যাক। কিন্তু সে যখন কথা দিয়েছে আর্চিকে, তখন আর কিছু বলা যায় না। না হলে যেন বলা যেত, তোমার দুটো একটা বই জ্যাক আমাকে দেবে। সারাদিন বাংকে শুয়ে আজ শুধু বই পড়ব।

    পাখিটার মৃত্যুর পর ডেবিডেরও খারাপ লাগছিল। যত না এই পাখিটার জন্য তার চেয়ে বেশি লেডি এ্যালবাট্রসের জন্য। কারণ লেডি এ্যালবাট্রস এখন সমুদ্রে একা। এবির মতো নিঃসঙ্গ। এবির কাতর চোখমুখ এখন যেন তাড়া করছে। সে একেবারে পাটভাঙ্গা ইউনিফরম পরে এসেছে।

    এবং এভাবে প্রায় সব নাবিকেরা এখন গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে পাখিটার চারপাশে। কাপ্তান কি ভেবে বাইবেল এনেছেন সঙ্গে। এনজিন-সারেঙ কোরাণশরিফ। বাইবেল থেকে কাপ্তান বেশ সুর করে দুটো একটা স্তবক—অর্থাৎ মৃত্যু জীব মাত্রেই শেষ কথা নয়, ঈশ্বরের দুটো একটা বাণী এমনভাবে পড়ে শুনিয়ে গেলেন। কোরাণশরিফ থেকে দুটো সুরা পড়ে গেলেন সারেঙ এবং সবই মৃত্যু সম্পর্কিত কথাবার্তা। দেখলে মনে হবে এই বিশাল সমুদ্রে তারা সত্যি সত্যি একজন মৃত নাবিককে সুমদ্রে সমাধিস্থ করছে। আর্চি দু-বার এদিকটায় এসেছিল, সে এসব দেখে ভীষণ ছেলেমানুষী ভেবেছে। জ্যাকের শরীরের প্রতি তার লোভ ভীষণ। সেও বেশ সেজে-গুজে মাথায় তার জাহাজি টুপি, পায়ে সাদা জুতো, সাদা মোজা একেবারে সব সাদা ইউনিফরমে জ্যাকের পাশে দাঁড়িয়ে গেল।

    জ্যাক এত নিবিষ্ট যে কে তার পাশে কিভাবে দাঁড়িয়েছে খেয়াল নেই। সবার সঙ্গে সে পাখির ডানা ধরে কাঠের বাকসোতে শুইয়ে দিল। পেরেক মেরে সে নিজেই ঢাকনা বন্ধ করে দিল। কাপ্তান ঘুরে-ফিরে তদারক করার মতো কাজটা দেখছেন। কাঠ একটু বেশি বের হয়ে থাকলে কার্পেন্টারকে ডেকে কাঠ কেটে দিতে বলছেন।

    এনজিন-সারেঙ কেমন মুহ্যমান পাখিটার মৃত্যুতে। তিনি পর পর সব বেছে বেছে সুরা আবৃত্তি করে যাচ্ছেন। যেমন বলছেন—যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তবে এমন কেউ নেই যে তোমাদের পরাভূত করতে পারে; আর তিনি যদি তোমাদের পরিত্যাগ করেন তবে কে আছে যে তোমাদের সাহায্য করতে পারে। আর আল্লার ওপরেই বিশ্বাসীদের নির্ভর করা উচিত।

    এনজিন-সারেঙ নিবিষ্ট মনে সুর ধরে পড়ে যাচ্ছেন। জাহাজ চলছে না এখন। জাহাজ সমুদ্রে থেমে আছে। সবকিছু কেমন স্থির অবিচল, কেবল পাখিটা বাদে। ঘুরে ঘুরে কখনও একেবারে মাথার ওপর উড়ে আসছে সে। সে দেখছে তার সঙ্গী পুরুষ পাখিটা আর ডেকে নেই। নাবিকেরা তাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে। তবু সে মাথার ওপর এই ত্রিশ চল্লিশ ফুট ওপরে উড়ছে। উড়ে উড়ে অনেক নিচে নেমে আসছে। এবং পাখিটাই এখন শোকার্ত মানুষের মতো মৃত্যুর আবাহাওয়া তৈরি করছে। তখন সারেঙ বলে যাচ্ছেন। সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলছেন, প্রত্যেক প্রাণ মৃত্যু আস্বাদন করবে। আর তোমাদের প্রাপ্য যা তাই তোমাদের দেওয়া হবে পুনরুত্থানের দিনে। তখন বহুদূর যে অবস্থান করবে আগুন থেকে আর প্রবিষ্ট হবে উদ্যানে নিঃসন্দেহে সে সফলকাম।

    তারপর তিনি বললেন, হে আমাদের পালনকর্তা সন্দেহ নেই যাকে তুমি আগুনে প্রবিষ্ট করাও তাকে তুমি প্রকৃতই লাঞ্ছিত করেছ। আর যারা অন্যায়কারী তাদের সহায় কেউ থাকে না।

    আর্চি আড়চোখে দেখছে জ্যাকেেক। এখন বুঝতে অসুবিধা হয় না জ্যাকের স্তন উঁচু বলেই বুকের কাছটা বেমানান। শরীর জ্যাকের ঠিক রোগা বলা যায় না, যা আছে সবই ঠিক ঠিক মতো! সে এসবের ভেতরও জ্যাকের শরীর দেখতে দেখতে কেমন লোভী চতুর হয়ে যাচ্ছে। সারেঙ-এর শেষ কথা, সে যেন শুনতে পাচ্ছে না–আর যারা অন্যায়কারী তাদের সহায় কেউ থাকে না—সারেঙ এত সব কি বিড় বিড় করে কথা বলছেন বলে আর্চি কিছুটা বিরক্ত। সে এ-সময় একটা চুরুট ধরাতে পারলে বেঁচে যেত।

    চিফ-অফিসার, রেডিও-অফিসার পাঁচ নম্বর এনজিনিয়ার মাথার দিকটায়। নিচের দিকে কাপ্তান, জ্যাক। আর্চি এনজিন-সারেঙ দু’পাশে আর সব জাহাজিরা। ছোটবাবু একপাশে সবার ভেতরে। সে একটু সবার আড়ালে পড়ে গেছে।

    এবার কাপ্তান পড়ে শোনালেন—যীশুখৃষ্টের জন্ম এইভাবে হইয়াছিল। তাঁহার মতা মরিয়ম যোসেফের প্রতি বাগদত্তা হইলে তাঁহাদের সহবাসের পূর্বে জানা গেল তাঁহার গর্ভ হইয়াছে—পবিত্র আত্মা হইতে। আর তাঁহার স্বামী যোসেফ ধার্মিক হওয়াতে ও তাঁহাকে সাধারণের কাছে নিন্দার পাত্র করিতে ইচ্ছা না করাতে, গোপনে ত্যাগ করিবার মানস করিলেন। তিনি এই সকল ভাবিতেছেন, এমন সময় দেখ, প্রভুর এক দূত স্বপ্নে তাঁহাকে দর্শন দিয়া কহিলেন, তোমার স্ত্রী মরিয়মকে গ্রহণ করিতে ভয় করিও না। কেননা তাহার গর্ভে যাহা জন্মিয়াছে, তাহা পবিত্র আত্মা হইতে আসিয়াছে। আর তিনি পুত্র প্রসব করিবেন, কারণ তিনিই আপন প্রজাদিগকে তাহাদের পাপ হইতে ত্রাণ করিবেন। আর তাঁহার না রাখা যাইবে ইম্মানুয়েল। অনুবাদ করিলে ইহার অর্থ দাঁড়াল আমাদের সহিত ঈশ্বর।

    জ্যাক তখনই কেন জানি ছোটবাবুর জন্য মনে মনে অধীর হয়ে উঠল। ছোটবাবু এখনও আসছে না। আসলে ছোটবাবু জাহাজিদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক বুঝতে পারেনি। সে বলল, সবাই এসেছে বাবা?

    কাপ্তান বের হয়ে এলেন ভিড়ের ভেতর থেকে। সঙ্গে এনজিন-সারেঙ। চিফ-অফিসার ঘুরে ঘুরে দেখলেন। সবাই এসেছে। জ্যাক নিজে বের হয়ে যখন দেখল ছোটবাবু আছে, তখন আর কে এল না এল যেন আসে যায় না। এবারে ওরা একজন নাবিকের সলিলসমাধির মতো কফিনটাকে সবাই ধরে জলে ফেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের প্রপেলার ঘুরে গেল। তিনবার সমুদ্রের বুকে চিমনি থেকে সাইরেনের আওয়াজ—ক্রমে সেই কফিন বড় বড় পাথর সহ সমুদ্রের অতলে ডুবে গেল।

    জ্যাক রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকল।

    যতদূর দেখা যায় জ্যাক রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দেখল।

    এখন বোঝাই যায় না কোথায় সেই পাখির মৃতদেহ ফেলে দেওয়া হয়েছে। সমুদ্র আবার আগের মতো নিরিবিলি। একটা অতীব পাপের কথা মনে হল জ্যাকের। চারপাশের কত কিছু ঘটনা জাহাজটাকে যে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! সে চোখ তুলে ছোটবাবুকে খোঁজার সময় দেখল, বোট-ডেক খালি। আর্চি এখন বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে। যেখানে ছোটবাবু দাঁড়াত, ডেবিড ছোটবাবুর সঙ্গে বসে গল্প করত, আর্চি সেখানে দাঁড়িয়ে দূরবীনে লেডি-এ্যালবাট্রসকে দেখছে। ডেকে কজন জাহাজি। ওরা কাজ করছে। দড়িদড়া গোছাচ্ছে। আর কেউ নেই। বোট-ডেকে আর্চিকে দেখে সে সিঁড়ি ধরে উঠে গেল না। নিচে এলি- ওয়ে ধরে ছোটবাবুর কেবিনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। সে ডাকল, ছোটবাবু।

    কোন জবাব নেই।

    সে সন্তর্পণে ডাকল, ছোটবাবু, আমি জ্যাক

    ছোটবাবু ভেতরে পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে আছে।

    জ্যাক ডাকল, ছোটবাবু তুমি ঘুমোচ্ছ?

    ছোটবাবু দরজা খুলে দিচ্ছে না। ছোটবাবু বোধহয় অসময়ে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু আর্চি ওকে ঘুমোতে দেখলে ভীষণ একটা কেলেঙ্কারী করবে। সে দৌড়ে বাইরে বের হয়ে পোর্টহোলে উঁকি মারল। ছোটবাবু ঘুমোয়নি। পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ

    জ্যাক বলল, তুমি সাড়া দিচ্ছ না কেন?

    ছোটবাবু বলল, আর্চি বারণ করেছে।

    —বারণ করেছে মানে!

    —তোমার সঙ্গে কথা বলতে বারণ করেছে। কথা বললেই খোলের ভেতর টেনে নিয়ে যাবে বলেছে।

    জ্যাক মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছিল।

    ছোটবাবু জ্যাককে এভাবে চলে যেতে দেখে কেমন ঘাবড়ে গেল। জ্যাক রেগে গেলেও সে মুশকিলে পড়ে যাবে। এমন একটা অসহায় অবস্থা কি করে বোঝাবে জ্যাককে! সে ডাকল, জ্যাক শোন!

    জ্যাক ফিরে এসে বলল, আমাকে কিছু বলবে?

    ছোটবাবু বলল, জ্যাক চুল বড় রাখলে তোমাকে দেখতে ভাল লাগে।

    জ্যাক বলল, তাই বুঝি

    —তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।

    জ্যাক পরেছে খয়েরী রঙের ট্রাউজার। নানাবর্ণের কারুকার্যময় মীনাকরা সাদা জ্যাকেট। ওর চুল ঘাড়ের কাছে বেশ লম্বা হয়ে গেছে। বোধহয় আবার জাহাজে কাপ্তানকে দেখা যাবে খুঁজে বেড়াচ্ছেন জ্যাককে। হাতে কাঁচি। জ্যাকের চুল এভাবে ক্রমে গভীর নীল রঙের হয়ে গেলেই বুড়ো কাপ্তান কেন যে চিন্তায় পড়ে যান! এমন সুন্দর চুল কেটে ফেললে, জ্যাককে ভীষণ বাজে লাগে দেখতে। এবং এই যে জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে, কেমন মেয়েলি ধরনের চোখ-মুখ, দুবার চোখ তুলে ছোটবাবুকে দেখেই আবার বলছে, আমি যাই ছোটবাবু। চোখ নামিয়ে নিতে পারলে যেন বাঁচে।

    ছোটবাবু ভাবল, রাগ পড়েনি হয়তো। সে দেখেছে, জ্যাককে সুন্দর বললে ভীষণ খুশি হয়! এখন সে জ্যাককে খোসামোদ করছে। আর কিভাবে কি করা যায় সে বুঝতে পারছে না। সে বলল, আমরা পালিয়ে কথা বলব জ্যাক। আর্চিকে দেখলেই আমরা কেউ কাউকে চিনতে পারব না, কেমন

    জ্যাক হেসে দিল। বড় কাতর হাসি। দু’গালে সেই হাসি একটা হাল্কা করুণ বিষণ্ণতা ছড়িয়ে দিয়ে গেল! সে বলল, তাই হবে ছোটবাবু। হয়তো জ্যাক আরও কিছু বলতে পারত, কি বলতে পারত অবশ্য জানে না। তবু জ্যাক নিজেকে ছোটবাবুর চেয়ে বেশি চালাক ভেবে থাকে। সে বলল, ছোটবাবু জাহাজে কাউকে বল না আর্চি কথা বলতে বারণ করেছে।

    —কি দরকার বলার!

    —তুমি যদি ডেবিডকে বলে দাও আবার…।

    —আরে না! তারপর একটু থেমে বলল, আচ্ছা জ্যাক, আর্চি কি টের পেয়েছে তুমি ওকে ফেলে দিয়েছিলে!

    —নাতো।

    —গত রাতে আর্চির পেছনে লাগতে গেছিলে কেন?

    —আর্চির পেছনে! বলে জ্যাক দু-হাতে এমন ভঙ্গী করল যে ছোটবাবুর মনে হল, আর্চিকে দেখলে এক্ষুনি কপালে ঢিল ছুঁড়ে মারবে জ্যাক। সে শেষে বলল, আমার ইচ্ছে। পোর্ট-হোলে সে আর এক দণ্ড দেরি করল না।

    তখনই আবার জ্যাকের কি যেন হয়ে যায়!

    আসলে জ্যাক, পুরুষ পাখিটার মৃত্যুতে ভারি কষ্টের ভেতর পড়ে গিয়েছে। ছোটবাবুর অসহায় মুখ দেখলে কষ্টটা আরও বাড়ে।

    সে ঘড়িতে দেখল দশটা বাজে। কেবিনে ঢুকে চুপচাপ বসে থাকবে ভাবল। জাহাজে সে ভীষণ বিপদের মুখে পড়ে গেছে। আর্চি তাকে ক্ষিপ্ত নেকড়ের মতো চোখে চোখে রাখছে। এবং তাকে কখনও কাছে সুযোগ মতো পেলেই হল! শিকার নিয়ে খেলার মতো বাঘটা তাকে নিয়ে খেলতে চাইবে।

    এবং এভাবেই সে সব বুঝতে পারে। অভিজ্ঞতা ক্রমে তাকে অনেক বেশি পরিণত করে দিয়েছে। বাবার কাছে বসে থাকলে সে নিরাপদ ভাবে। বাবার কাছে না থাকলে মনে হয় ফিকির খুঁজছে আর্চি আর এভাবে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। সে কেবিনে না ঢুকে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠতে থাকল। চার্টরুমের পাশ দিয়ে যাবার সময় নিচে দেখল না, কে আছে। আর্চি যে আছে সে না দেখেও বুঝতে পারে। লেডি এ্যালবাট্রসের ডানা ভেঙ্গে দেবার জন্য ওঁৎ পেতে বসে আছে।

    তখন ডেবিড কিছু ভেবে পাচ্ছিল না। চোখে ঘুম ঘুম ভাব। সকাল থেকে সে দু-চোখ এক করতে পারেনি। কোর্স-লে ভুল হওয়ায় মনটা ভাল ছিল না। এ্যালবাট্রসের মৃত্যুর পর মনটা আরও খারাপ ছিল। এবং যখন বাইবেল থেকে তিনি পড়ে শোনাচ্ছিলেন, তখন ডেবিড ভেবে পেল না, কাপ্তান মৃত্যু সম্পর্কিত দুটো একটা কথা বলেই খৃষ্টের জন্ম সম্পর্কে এতটা বিস্তারিত বক্তৃতা ঝাড়লেন কেন! আর বার বার বলছিলেন, ইম্মানুয়েল, আমাদের সহিত ঈশ্বর। আমাদের সহিত ঈশ্বর আছেন। তিনি আছেন বেশ, তাকে ফলাও করে এত বলার কি দরকার! অহেতুক এমন একটা শোকার্ত সময়ে আমাদের সহিত ঈশ্বর, বার বার বলার কি যে দরকার। কাপ্তান হিগিনস কি ঈশ্বরের ভরসায় এবার সমুদ্র সফরে বের হয়েছেন! ওরা জাহাজ ঠিকঠাক চালাতে না পারলেও তার ঈশ্বর অর্থাৎ আমাদের সহিত ঈশ্বর চালিয়ে নেবেন!

    যত এমন হচ্ছে তত ডেবিড সংশয়ের ভেতর পড়ে যাচ্ছিল। কাপ্তানের নিজের সাহসও ক্রমে কমে আসছে। অথচ জাহাজে তিনিই সবার ঈশ্বরের মতো। এবং এই প্রথম জাহাজে বোট-ড্রিল শুরু হয়েছে। প্রতি পনেরো দিন অন্তর নিজেদের সেফটির জন্য একবার অন্ততঃ বোট-ড্রিল যেখানে করার দরকার, সেখানে কাপ্তান মাসে দু’মাসে একবার করাতেন। আবার ছ’মাসও বন্ধ থাকত একনাগাড়ে। জাহাজ প্রশান্ত মহাসাগরে নেমে আসার পর কাপ্তান থার্ড-মেটকে ডেকে পাঠিয়েছেন। বলে দিয়েছেন, নিয়মিত বোট-ড্রিল হবে জাহাজে। সেফটির জন্য সব বোট তিনি নিজে দেখা-শোনা করেছেন। মাত্ৰ চারটা লাইফ-বোট। লাইফ-বয়া প্রতি তিনজনের জন্য একটা। আর প্রত্যেকের আছে একটা করে লাইফ- জ্যাকেট। জাহাজ ডুবি হলে এ-চারটা বোটই তাদের একমাত্র সম্বল।

    কাপ্তান বিশ্বাসই করতেন না, জাহাজ সিউল-ব্যাংক সমুদ্রে কখনও ডুবে যেতে পারে! না হলে ডেবিড যতবার জাহাজে এসেছে এই জাহাজে ততবার সে দেখেছে স্যালি হিগিনস এসব বোট-ফোটের পরোয়া করতেন না। রাজার মতো জাহাজ বন্দরে চালিয়ে নিতেন। সিউল-ব্যাংকের কিছু হতে পারে তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না।

    তাই স্যালি হিগিনসের এসব নির্দেশ ডেবিডকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। গত রাতে যা সব ঘটল। এবং কোর্স-লে রহস্য নিয়ে কেউ ভাববার সময় পায়নি। এ্যালবাট্রসের মৃত্যু এবং জাহাজের ওপর একটা বিষণ্ণতা ঝুলেছিল বলে কেউ কিছু বলাবলি করেনি। আর জ্যাককে তো মোটামুটি সবাই সমীহ করে থাকে। সে যখন চায় এ্যালবাট্রস পাখিটার সমাধি হোক, তখন তারা এ-নিয়ে আর কথা বলতে পারে না। এ্যালবাট্রস হত্যার সময় কিছুই মনে হয়নি। কিন্তু সেই গোল হয়ে দাঁড়ানো, কফিনের ভেতর পুরে দেওয়া, ঠুকঠুক করে পেরেক মেরে দেওয়া, এ-সবের ভেতর প্রত্যেকের বোধহয় কোন প্রিয় স্মৃতি জড়িয়ে থাকে। এ্যালবাট্রসের সমুদ্রে সমাধি প্রকৃত একজন জাহাজির সমুদ্রে সমাধি হচ্ছে এমন মনে হয়েছিল সবার। তারা একটা মৃত পাখির চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে মনেই হয়নি। যেন কোন প্রিয়জনের কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে তারা ঈশ্বরের কাছে মৃত আত্মার শান্তি কামনা করছিল।

    ডেবিড এসব ভেবে পাশ ফিরে শুল। বারোটায় লাঞ্চ। সে এখন একটু গড়িয়ে নিতে চায়। বিকেলে বারোটা-চারটায় তার ফের ওয়াচ। জাহাজ বন্দরে না যাওয়া পর্যন্ত এভাবে চলবে। সামান্য গড়িয়ে নিতে পারলেই সব ফের ঠিক হয়ে যাবে ভেবেছিল। কিন্তু ঘুম কিছুতেই আসছে না। কাপ্তানের কাজ- কর্ম সবই কেমন ক্রমে সংশয়ের ভেতর ফেলে দিচ্ছে তাকে।

    আর তখন চুপি চুপি অমিয় পা টিপে টিপে ছোটবাবুর কেবিনের পাশে এসে সন্তর্পণে ডাকল, ছোট দরজা খোল।

    ছোটবাবু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে পড়ল ব্যাংক থেকে। দরজা খুলে তাড়াতাড়ি ওকে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। কে কোথায় দেখে ফেলবে! সে বলল, কি ব্যাপার!

    —বলছি। বলে অমিয় ছোটর কেবিনটা দেখল। ভারি মনোরম লাগছে। কি ঝকঝকে সব কিছু। নিচে কার্পেট পাতা। দুটো দু’পাশে বড় বড় কাঠের বাংক। সে রং করে যাবার পর আর আসেনি। ছোটবাবুর বিছানা ধবধবে সাদা। একটু গড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করছে। দেয়ালে ওর মায়ের ছবি। একটা ক্যালেণ্ডার। তার পাতায় তারিখের ওপর ক্রস টানা। একটা করে দিন যাচ্ছে, ছোটবাবু দিনটার ওপর ক্রস টেনে দিচ্ছে। সে সব দেখতে দেখতে বলল, তোকে একবার ফোকসালে যেতে হবে ছোটবাবু।

    ছোটবাবু বলল, কেন কি হয়েছে?

    অমিয় বলল, মৈত্রকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না।

    —ঝগড়া বাঁধিয়েছিস ফের?

    —ধুস, ঝগড়া করতে যাব কেন। ও বেটা মরবে।

    —কি বলছিস যা তা!

    অমিয় ফিসফিস করে বলল, সত্যি বলছি। এভাবে থাকলে ও ঠিক মরবে। বললাম মেজ-মালোমের কাছে যেতে। কিছুতেই যাচ্ছে না। দিনরাত যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছে। জ্বর ভীষণ। এই নিয়েই ওয়াচ করছে। চোখ মুখ লাল! কেবল পালিয়ে থাকছে। আলোতে বের হচ্ছে না। নিচে স্টক-হোলডে জবুথবু হয়ে বসে থাকে। কথা বলে না।

    —কি হয়েছে বলবি তো!

    —আর কি হবে? বললাম ছোটকে অন্তত বলি। তেড়ে এল। ছোটকে বলে কি হবে! ও হারামজাদা মানুষ নাকি। ওতো নিজেই অমানুষ। ওকে মেজ-মিস্ত্রি যা না তা করাচ্ছে। মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছে। বোধ বাস্যি থাকলে কেউ এভাবে সহ্য করতে পারে না!

    ছোটবাবু হাসল। বলল, আমার জন্য মৈত্রদাকে মাথা গরম করতে বারণ করবি। কিন্তু কি হয়েছে বলবি তো!

    অমিয়, পৃথিবীর কেউ যেন আর শুনতে না পায়, এত আস্তে কি যে সব বলল। তারপর বলল, আমাকে শাসিয়েছে। বলেছে, যদি দু-কান হয় তবে সে আমাকে খুন করবে।

    ছোটবাবুর মুখ ভীষণ চিন্তিত দেখাল। সে বুঝতে পারল, এসব দু-কান হলে মৈত্রদাকে জাহাজ থেকে নামিয়ে দেবে। নামিয়ে দিলেই খুব অর্থাভাবে পড়ে যাবে। শেফালী বৌদির জন্য ওর অনেক টাকার দরকার। কফিনটাকে যখন সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয় তখন মৈত্রদা ছিল না। সে বোধহয় আসেনি। এলে ভাল করে দেখা যেত। ছোটবাবু কি ভেবে বলল, গিয়ে কিছু বললেই তো খেপে যাবে।

    —তুই ওর কপালে হাত দিয়ে দেখবি। তুই ওর চোখ মুখ দেখেই টের পেয়েছিস এমনভাবে বলবি—ওর গোঁয়ার্তুমি ভাল লাগছে না। এক ফোকসালে থাকি, আমার ভয় করছে।

    ছোটবাবু বলল, মেয়েটা ওকে কতভাবে বারণ করেছে। শুনল না।

    —নে, এখন মর। বলছে, তাহিতিতে নেমে ডাক্তার দেখাবে। পেনিসিলিন নেবে। নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। আর কটা দিন তো।

    ছোটবাবু বলল, লাঞ্চের পর যাব। আর্চি তখন খেয়ে ঘুমোয়।

    অমিয় দরজা খুলে মুখ বার করল সামান্য! কোনো অফিসার এনজিনিয়ার এদিকে আসছে কিনা দেখল। না কেউ আসছে না। সে বের হয়েই পোর্ট-সাইডের গ্যাংওয়ের দিকে চলে গেল। দেখলে মনে হবে, সে এনজিন-রুম থেকে উঠে ডেকে হেঁটে যাচ্ছে। ছোটবাবুর কেবিন থেকে বের হয়ে আসছে সে কাউকে বুঝতেই দিল না।

    বিকেলে ছোটবাবুও এভাবে গোপনে মৈত্রদার ফোকসাল থেকে বের হয়ে এসেছিল। যেন সে স্টিয়ারিং এনজিনের পেনিয়ান মেরামত করে উঠে আসছে। সে ভাণ্ডারিজ্যাঠাকে বলল, জ্যাঠা তোমাদের ছেড়ে থাকতে ভাল লাগছে না। আর তখনই এনজিন-সারেঙ ডেক-সারেঙ ডেকের ওপর চিৎকার চেঁচামেচি লাগিয়েছে। সবাই যে যার ফোকসাল থেকে বের হয়ে আসছে। অনেক দূরে দিগন্তে কি দেখে সবাই আঁৎকে উঠছে। কি যে আসছে সব মেঘের মতো! কুণ্ডলি পাকিয়ে ক্রমে কখনও সারা আকাশ জুড়ে পঙ্গপালের মতো অজস্র কালো বিন্দু বিন্দু। আবার এক হয়ে যেন ঝড় অথবা বনের হরিৎবর্ণ পাতারা উড়ে উড়ে এদিকে চলে আসছে। ব্রীজে সব অফিসাররা দূরবীন চোখে দেখছে। লেডি এ্যালবাট্রসকে জাহাজের চারপাশে অথবা দিগন্তের কাছাকাছি কোথাও দেখা যাচ্ছে না! এখন যা দেখা যাচ্ছে নির্মল আকাশের নিচে সেই অদ্ভুত এক চিরহরিৎবর্ণের গাছের শাখা-প্রশাখা একত্র ডাই মেরে যেন উড়ে আসছে। অথবা কখনও ভয়ংকর ক্রুব্ধ। মেঘের মতো তাদের ধাবমান শব্দ এবং ডেকের, ব্রীজে যে যেখানে ছিল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সূর্য তখন আকাশের নিচে হেলে পড়েছে। সূর্যকে ঢেকে দিয়ে জাহাজের পেছনে পেছনে কালো ক্রুব্ধ অতিকায় কিছু এগিয়ে আসছে।

    এ-সবের ভেতর কেউ লক্ষ্য করছে না ফোর-মাস্টের নিচে জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে। ওর পকেটে ছোট ছোট পাথর, লোহার টুকরো। সে দূর থেকে পাগলের মতো একের পর এক পাথর ছুঁড়ে যাচ্ছে! কোনোটা মাস্তুলের ডগায় লাগছে। কোনোটা লাগছে না। লাগলে ঠুং করে আওয়াজ হচ্ছে! এমন একটা ভয়ংকর বিপদের সামনে জাহাজ অথচ সে এতটুকু বিচলিত হচ্ছে না। সে ক্রমাগত পাথর ছুঁড়ে যাচ্ছে।

    আর ছোটবাবুর যেন এসবে আসে যায় না কিছু। সে কেবিনে ঢুকে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল।

  • ছাব্বিশ

    ছাব্বিশ

    ।। ছাব্বিশ।।

    ওরা এভাবে সবাই ডেকের ওপর দাঁড়িয়েছিল!

    মাংকি-আয়ল্যাণ্ডে কাপ্তান, রেডিও-অফিসার, সেকেণ্ড-মেট। ব্রীজে চিফ-মেট, কোয়ার্টার-মাস্টার, থার্ড-মেট। কাপ্তান চোখ থেকে কিছুতেই দূরবীন নামাচ্ছেন না।

    সেকেণ্ড-মেট কিছু বুঝতে পারছে না। জাহাজের পেছনে অনেক দূরে, কত দূরে হবে বুঝতে পারছে না, প্রায় যেন দিগন্তের কাছাকাছি ভলকানিক ইরাপসান অথবা কালো ধোঁয়া ক্রমান্বয়ে কুণ্ডলি পাকিয়ে ওপরে উঠে আসছে।

    কাপ্তান বললেন, কি যে এগিয়ে আসছে?

    —দেখেছেন স্যার, কেমন ওটা এখন একেবেঁকে দিগন্তে সার সার সমান্তরাল রেখা হয়ে গেল! রেডিও-অফিসার বলল, ঠিক যেন কোন চিত্রকরের ছবি

    এবং এভাবে ওরা সেই দিগন্তে দেখতে পেল নানারকমের সব ছবি হয়ে যাচ্ছে। অতিকায় সব ছবি। কখনও একেবেঁকে ফুল লতা-পাতার মতো, কখনও ঘুরে ঘুরে জলস্তম্ভের মতো, কখনও উড়ে উড়ে বিন্দু বিন্দু আঙ্গুরগুচ্ছের মতো আকাশে ঝুলে পড়তে লাগল। তারপর ফের ছড়িয়ে পড়ল পেছনের আকাশে। এত দূরে যে দূরবীনে আসছে না। তবু ওরা যে এদিকে এগিয়ে আসছে এটা বোঝা যাচ্ছে। কারণ ক্রমশ ওদের এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আবার শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার ভেতর মনে হচ্ছিল, মেঘেরা সজীব হয়ে গেছে। এবং যেমন খুশি আকাশের গায়ে চিত্রকরের মতো অতিকায় সব বর্ণাঢ্য ছবি এঁকে দিচ্ছে। আবার মনে হচ্ছিল, বড় মাঠে সেই সুন্দর বালিকারা যেমন দ্রুত প্যারেড করার সময় হাত-পা কখনও উঁচুতে কখনও নিচুতে আবার রাইট টার্ন, আবার লেফ্‌ট টার্ন, আবার ঝুঁকে বসে পড়া একসঙ্গে এবং একসঙ্গে উঠে দাঁড়ানো, অথবা দু’হাত ছড়িয়ে ডানা মেলে দেবার মতো ঘুরে ঘুরে ছবি হয়ে যাওয়ার মতো কোনো বড় মাঠে প্যারেড হচ্ছে। এত বড় আকাশটা ওদের যেন হাঁটা চলার জন্য। ঘুরে বেড়ানোর জন্য, কখনও পোশাক সবুজ বর্ণের মনে হয়, অথবা ঘন নীল রং-এর সমুদ্রে এসব দৃশ্য সবাইকে ক্রমে অস্থির করে তুলছে।

    তখনই সেকেন্ড-মেট বলল, স্যার বিন্দু বিন্দু কিছু একসঙ্গে জড় হয়ে এদিকে আসছে।

    —বিন্দু বিন্দু! কাপ্তান দূরবীন নামিয়ে চশমা রুমাল দিয়ে খুব করে মুছে নিলেন।

    —মনে হচ্ছে পাখির মতো।

    —পাখি! কাপ্তান অতীব আতঙ্কে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন।

    তারপর কাপ্তানের মনে হল, তিনি জাহাজের রক্ষাকারী এবং সর্বময়, সুতরাং পাখির কথায় এভাবে ভেঙ্গে পড়া ঠিক না। এবং তিনি যে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠেছিলেন ওটাও ভাল ভুল হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা বলা দরকার। তিনি বললেন, তবে ওরা আসছে?

    —হ্যাঁ, মনে হয় আসছে।

    —আসতে দাও।

    সেকেন্ড-মেট বলল, ওরা কেন আসছে?

    –বোধ হয় খাবারের সন্ধানে।

    সেকেন্ড-মেট এমন কথায় আশ্বস্ত হতে পারল না। এবং দেখল প্রায় দীর্ঘ এক অজগর সাপের মতো একটা গগনচুম্বী আঁকাবাঁকা কালো কিছু আকাশের গায়ে ঝুলে পড়ছে। মনে হচ্ছে বিশাল জলরাশির অতল থেকে ওরা দলে দলে একসঙ্গে ঝাঁকঝাঁক পাখি, একসঙ্গে জড় হয়ে ক্রমশ সমুদ্রে ছায়া বিস্তার করে উড়ে আসছে।

    ওরা দেখতে পেল ওটা ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে সাপের ফণার মতো। অথবা ছাতার মতো অনেক ওপরে জাহাজটাকে ঢেকে দিচ্ছে।

    তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। অন্ধকার সমুদ্র তারপর। রাতে ওরা কোথায় কি করবে কেউ বুঝতে পারছে না। পাখিগুলো যে ধূসর বর্ণ এটা টের পাচ্ছে তারা। দূরবীনে ওদের এখন পঙ্গপালের মতো লাগছে দেখতে। ওরা বুঝল, পাখিগুলো আকারে খুব ছোট। একসঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে এই সব পাখিরা দল বেঁধে উড়তে ভালবাসে। সুতরাং এরা জাহাজের ওপর প্রায় একটা প্রকান্ড ছাতার সামিল। শুধু ধূসরবর্ণ, আর একসঙ্গে ওরা কলরব করছে বলে, ঝমঝম বৃষ্টিপাতের মতো শব্দ। ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে, ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক দূরে দিগন্তের কাছাকাছি সরু লম্বা লেজের মতো হয়ে গেছে ওদের শেষ প্রান্ত। একটা গোপন মৃত আগ্নেয়গিরির মুখ থেকে উঠে আসার মতো যখন গোটা ব্যাপারটা তখন কি করা যায়! জাহাজিরা কিছুই বুঝতে পারছে না। যে যার ফোকসাল থেকে উঠে এসে পিছিলে জড় হয়েছে। ওদের তীক্ষ্ণ শিস দেবার মতো শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছে। জাহাজিরা পাগলের মতো ছোটাছুটি করছে। ডেক-সারেঙ বার বার ব্রীজের নিচে দাঁড়িয়ে এখন কি করণীয় নির্দেশ চাইছে। কিন্তু ব্রীজ থেকে কেউ নামছে না। কিছু তাকে বলছে না। এমন একটা দৃশ্যে সবাই কেমন হতবাক হয়ে গেছে।

    তখন একজন মাস্তুলের নিচে বলে উঠল, আমাদের পাপে এটা হয়েছে।

    —কে এভাবে চিৎকার করে! এনজিন-সারেঙ দৌড়ে গেল।

    –এটা কি এটা কি! বলেই সে তার হাত বাড়িয়ে দিল। সারেঙ দেখল, সামান্য মলমূত্র পাখির সে বলল, ভীষণ জ্বালা করছে সারেঙ-সাব।

    সঙ্গে সঙ্গে এই দু-এক ফোঁটা যারা ডেকে দাঁড়িয়েছিল তাদের শরীরে এসে পড়তে থাকল। প্ৰায় ফোসকা পড়ার মতো জ্বালা। এবং যারাই দাঁড়িয়েছিল তাদের শরীরে এক আধ ফোঁটা পড়ছে, পড়ছে তো পড়ছেই। আগুনে ছ্যাঁকা লাগলে যেমন শরীর জ্বালা করে তেমনি ছটফট করতে করতে সবাই সিঁড়ির নিচে দৌড়ে যেতে থাকল। চিফ-মেট ব্রীজ থেকে চোঙে জোর গলায় বলে যাচ্ছেন, জাহাজিরা ভেতরে ঢুকে পড়। কেউ বাইরে বের হবে না। আমাদের জাহাজে সেই সব বিষাক্ত পাখিরা উড়ে এসেছে। আমরা জানি না এদের হাত থেকে কি করে রেহাই পাব।

    দুটো একটা পাখি ততক্ষণে খুব নিচে নেমে এসেছে। এইসব হাজার হাজার পাখিদের এমন বীভৎস হাঁকডাক ভাবা যায় না। নিচে নেমে এলে জাহাজিরা দেখেছিল ওদরে চোখ রক্তবর্ণ। ঠোঁট সাদা, ডানা সবুজ রঙের, পেটের দিকটা একেবারে ধূসরবর্ণ। মলমূত্রে যাদের মুখ হাত-পা সামান্য বিবর্ণ হয়ে গেছে তারা বিছুটি শরীরে লাগালে যেমন দৌড়ে দৌড়ে জ্বালা নিবারণ করে, সেভাবে দৌড়ে দৌড়ে জ্বালা নিবারণ করছে।

    আর্চি বাহবা নেবার জন্যে বাইরে এসে যেই না দাঁড়িয়েছিল আর অমনি ওর মুখে সেই সব তরল পদার্থ এবং সে পাগল প্রায় এখন ছুটছে। জ্যাক ছিল চিফ-কুকের গ্যালির ছাদের নিচে। সে তখন ছুটছে ওপরে—চিফ-মেটের তখন সতর্ক কথাবার্তা, নিচে যে যেখানে আছে সবাইকে বলে দাও, ডেক ধরে কেউ যেন হেঁটে না যায়। এনজিন-জাহাজিদের জন্য টানেল পথ খুলে দেওয়া হোক।

    জাহাজে এখন অন্ধকার ক্রমে বসে যাচ্ছে, আর ব্রীজ থেকে চীফ-মেটের অসহায় গলা ভেসে আসছে। সেকেন্ড-মেট কোনরকমে হুমড়ি খেয়ে গড়িয়ে পড়ল নিচে, তারপর দু’হাত মুখের ওপর রেখে ভীতু কাপুরুষের মতো দৌড়ে পালাতে থাকল। কে কোথায় কিভাবে আছে দেখার সময় নেই।

    কেবল জ্যাক কিছুটা ছুটে এলি-ওয়েতে ঢুকেই ভাবল, ছোটবাবু-কোথায়!

    সে ফের ছোটবাবুর কেবিনের দিকে ছুটতে থাকল। ছোটবাবুর দরজা লক করা। আর্চি পাগলের মতো কেবিনে চিৎকার করছে। জ্বলে গেল বলছে, এবং যে যেখানে এভাবে মলমূত্রের ভেতর পড়ে গেছে তারা জ্বলে গেল বলছিল। অমিয়র হাতে, মজুমদারের কানের ওপর, ইয়াসিনের পায়ে, ডেক- কশপের বুকে, ডেক-সারেঙের গলায় এবং প্রায় সবাই এইসব ধূসরবর্ণ বিষাক্ত পাখিদের আক্রমণের ভেতর পড়ে গেছিল। কেবল বেঁচেছে যারা এনজিন রুমে তখন কয়লা মারছিল, যারা এনজিন রুমে ডিউটি দিচ্ছিল, আর যারা ব্রীজে কিংবা মাংকি-আয়ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে দেখছিল, ওরা আসছে।

    আগেই সতর্ক করে দেওয়া দরকার ছিল। এইসব বিষাক্ত পাখিদের আক্রমণের ভেতর কোনো কোনো জাহাজ পড়ে থাকে, কাপ্তানের কাছে এমন খবর রয়েছে। ওরা কোথায় থাকে কোথায় কি ভাবে বসবাস করে কেউ হদিস করতে পারে না। প্রশান্ত মহাসাগরে এভাবে কোনো কোনো সময় দেখা গেছে, খুব ক্বচিৎ এটা ঘটে থাকে এবং অবিশ্বাস্য মনে হয়, তবু ঘটনা। যদিও এখন এটা ভেতরে ভেতরে সবার ধারণা ম্যান-এ্যালটাব্রসের মৃত্যু তাদের ভীষণ পাপের ভেতর ফেলে দিয়েছে। আর তাছাড়া তো প্রাচীন নাবিকদের মতো তাদের এখন তেমন সংস্কার নেই। তবু রাইম অফ দি এনসিয়েন্ট ম্যারিনারের কথা মনে হওয়া স্বাভাবিক। সে সময় এসব পাপবোধ ভীষণ কাজ করত। তখন জাহাজিরা সমুদ্র সম্পর্কে তেমন অভিজ্ঞ ছিল না। সমুদ্রের দ্রাঘিমা অক্ষাংশের খবর ছিল সামান্য। কোর্স-লে তৈরি করার ব্যাপারে ছিল অনভিজ্ঞ। ওরা সমুদ্রে সহজেই হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ওসেনোগ্রাফি এখন একটা যদিও কঠিন বিষয় তবু প্রায় হাতের কব্জায় আছে সব কিছু। ওরা ম্যান এ্যালবাট্রসের মৃত্যুর জন্য এমন ঘটেছে জোর গলায় কেউ বলতে পারল না। কেবল কাপ্তান স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। ব্রীজের কাছে তিনি দেখতে পাচ্ছেন, পাখিদের ডানা লেপ্টে যাচ্ছে। ওরা কাচের ওপর ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছে। একটা পাখি কি করে ভেতরে ঢুকে ডানা মেলে পড়ে গেল। আলো একদম সহ্য করতে পারছে না। প্রায় বাদুড়ের মতো দেখতে ওরা। ওদের ধরা ঠিক না। একটা স্টিক দিয়ে পাখিটাকে ঠেলে নিচে ফেলে দিতেই আর একটা এবং এভাবে ওরা ভীষণ আলোর ভেতর পড়ে কেমন দাপাতে থাকল। বেশি আলোতে ওরা দেখতে পায় না তবে! এবং সকালে সূর্য ওঠা পর্যন্ত জাহাজের এখন এভাবে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

    আর তখন জ্যাক প্রায় দরজা ভেঙ্গে ফেলার মতো অবস্থা করে ফেলেছে। ছোটবাবু ছুটি পেয়ে ঘুমোচ্ছিল। ওর ঘুম ভাঙলে মনে হল জাহাজে আগুন লাগলে যে যে শব্দ হাওয়ায় নাচতে থাকে সমস্ত জাহাজের চারপাশে তেমন সব বীভৎস শব্দ। আর দরজায় জ্যাকের গলা। এমন একটা দুঃসময়ে সে যে কেবিনে কি করে ঘুমিয়েছিল!

    সে দরজা খুলে ফেললে হুমড়ি খেয়ে ভেতরে এসে ছিটকে পড়ল জ্যাক। সে দেখল, জ্যাকের চোখ মুখ শুকনো।

    সে বলল, জ্যাক কি হয়েছে!

    শুকনো মুখে জ্যাক বলল, বিষাক্ত সব পাখিরা এসে জাহাজটাকে ঘিরে ফেলেছে। বাইরে একদম যাবে না।

    জ্যাক এখন ওপরে উঠতে পারছে না। এনজিন রুমে দ্রুত কয়লা হাঁকড়াচ্ছে জাহাজিরা। যত দ্রুত পারা যায়, এ সমুদ্র থেকে জাহাজ নিয়ে পালাতে চাইছে সবাই।

    জ্যাক ওপরে উঠলেই সেই বৃষ্টিপাতের মতো মলমূত্র এসে ওর মুখে শরীরে পড়তে পারে। সে একটা চাদর চেয়ে নিল ছোটবাবুর কাছ থেকে। সেটা মাথায় মুখে জড়িয়ে নিল। প্রায় যেন বোরখার মতো চাপিয়ে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে যাচ্ছে। যাবার আগে ফের সাবধান করে দিল, সব জাহাজটাকে বিষাক্ত পাখিরা ঘিরে ফেলেছে। সমুদ্র দেখা যাচ্ছে না। আকাশ দেখা যাচ্ছে না। কুয়াশার ভেতর জাহাজ পড়ে গেলে যা হয়। সামনে পেছনে কেবল ওরা হাজার লক্ষ উড়ছে। আর জাহাজটা নোংরা করছে।

    এটা যে কি হয়ে গেল! সে একটু এগিয়ে গেল সামনে। ওদিকের এলি-ওয়েতে আলো জ্বলছে না। চারপাশে সব দরজা লক করে দেওয়া হয়েছে। এলি-ওয়েতে এখন কোনও পাখি আর ঢুকে পড়তে পারবে না। পাঁচ-নম্বর, তিন-নম্বর, ছোটবাবু, ডেবিড একসঙ্গে জটলা করছে। পাঁচ-নম্বর এতক্ষণ আর্চির ঘরে ছিল। সমস্ত মুখে আর্চির সে মলম লাগিয়ে দিয়েছে। ওপর থেকে কেউ আর নামতে পারছে না। ওর একবার আর্চিকে দেখে আসা দরকার। সে, ডেভিড, তিন নম্বর সবাই আর্চির কেবিনে ঢুকে গেল। ছোটবাবু বসল না। ওকে বসতে না বললে সে বসতে পারে না। জ্বালাটা বোধ হয় কমেছে। আর তখন ওপরে রেডিও-ট্রানসমিশান রুমে একের পর এক খবর ট্রানসমিট করে যাচ্ছে—জাহাজ সিউল-ব্যাঙ্ক কঠিন দুর্বিপাকে পড়ে গেছে। রেসকু আস, বলতে পারছে না। কাপ্তানের তেমন নির্দেশ নেই। তবু যা সব ঘটনা সে কাচের ভেতর দাঁড়িয়ে দেখেছে, ভাবতে পারে না, অজস্র পাখি জাহাজের মাস্তুলে দড়াদড়িতে জড়িয়ে একেবারে নিচে পড়ে যাচ্ছে এবং এভাবে যদি তিন-চার দিন চলে, দেখা যাবে সব মৃত পাখিদের ডাঁই এবং দুর্গন্ধ জাহাজে—ভীষণ অসুখে পড়ে যাবে সবাই অথবা মৃত পাখিরা এবং জীবিত পাখিরা মিলে কঠিন অসুখে ফেলে দেবে। ওরা কেউ নিস্তার পাবে না।

    তবুও যা ঘটনা তাই জানানো হল। বিষাক্ত পাখিদের মলমূত্রের ছিটেফোঁটা যাদের শরীরে পড়েছে, জ্বালা করছে ভীষণ। এবং জাহাজ ভিড়লে বোধ হয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা দরকার। কাল কি হবে আমরা বলতে পারছি না। পাখিগুলো এখনও জাহাজের চারপাশে রয়েছে। যেখানে যেভাবে পারছে ঠোকরাচ্ছে। আমরা কি করব বুঝে উঠতে পারছি না।

    কাপ্তান নিজেও চুপচাপ বসে নেই। তিনি চিফ-মেটকে নিয়ে সিঁড়ি ধরে নামছেন। শরীর মুখ ঢাকা। বনির কেবিন বন্ধ। তিনি ডাকলেন, বনি

    বনি বলল, ভেতরে বাবা।

    —বাইরে বের হবে না।

    –বের হচ্ছি না।

    তিনি তারপর আরও নিচে নেমে গেলেন। আর ভাবছিলেন, এরা কোত্থেকে এল! এমন পাখিদের আক্রমণে জাহাজ পড়বে ভাবতেও পারেন নি। গল্প গাঁথার মতো এসব খবর সমুদ্রে শুনেছেন। মনে হয়েছিল, যেমন সব জাহাজি গল্পে দিনকে রাত বানিয়ে ফেলতে পারে এও তেমনি। কিন্তু নিজে এমন ঘটনার সম্মুখীন হবেন, স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি। নিচে নেমে আর্চির কেবিনেই প্রথম ঢুকে দেখলেন, আর্চি শুয়ে আছে। কাঠপিঁপড়ের কামড়ের মতো মুখের দু-একটা জায়গা ফুলে গেছে। আসলে এটা এক ধরনের চুলকানি। ভীষণ, এবং জ্বালার মতো মনে হয়। অভয় দিয়ে বললেন, সকালে ঠিক হয়ে যাবে। আরও এভাবে সব ঘুরে ঘুরে দেখা। তারপর এনজিন রুমে নেমে টানেল-পথে ঢুকে গেলেন। প্রপেলার স্যাফটের গা ঘেঁষেঘেঁষে হেঁটে গেলেন। তারপর লম্বা খাড়া লোহার সিঁড়ি ওপরে উঠে গেছে। দু’পাশের দেয়াল থেকে কিছুটা হামাগুড়ি দিয়ে ওঠার মতো তিনি দ্রুত উঠে যেতে থাকলেন। মনেই হয় না বয়েস হয়েছে মানুষটার। লাফিয়ে লাফিয়ে এখন সিঁড়ি ভাঙছেন। স্টোররুমের পাশে এসে সিঁড়িটা থেমেছে। ঢাকনা খুলে খোলের ভেতর থেকে উঠে আসার মতো গলা বাড়ালেন ওপরে। চিফ-মেট একটা হাত ধরে প্রায় টেনে তুলে নিলে তিনি দেখলেন, সবাই ছুটে এসেছে। ডেক-সারেঙ সামনে দাঁড়িয়ে সালাম জানাচ্ছে। সবার ঘরে ঘরে উঁকি দিলেন। যেখানে যার ছিটেফোঁটা পড়েছে হাতে, পায়ে, তা দেখে বললেন, মাস্টার অয়েল লাগিয়ে দাও। ভয়ের কিছু নেই।

    তিনি অবশ্য জানেন না সত্যি কিসে কি নিরাময় হতে পারে। তবু একজন অভিজ্ঞ মানুষের মতো কথা বলে সবার সাহস ফিরিয়ে আনছেন। পাখিদের আর্ত চিৎকার চারপাশে। কান পাতা যাচ্ছিল না। সমুদ্রে শুধু অন্ধকার। জাহাজের আলো সব নিভিয়ে একবার দেখা যেতে পারে, ওরা কেবল আলোর দিকে ছুটে আসে কিনা। হাঁটতে হাঁটতে নানাভাবে উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কিভাবে এদের সঙ্গে মোকাবিলা করে যাবেন। ফোকসাল থেকে নেমে যাবার আগে কি কি দরকার, সকাল না হলে যে কিছু ভাবা যাচ্ছে না—এসব মোটামুটি চিফ-মেটকে বুঝিয়ে ফের সেই ঢাকনার পাশে এসে দাঁড়ালেন। চিফ-মেট ডেক-সারেঙকে সব বুঝিয়ে দিল। এনজিন সারেঙ ঢাকনা খুলে দিয়েছে। কাপ্তান আবার নেমে যাচ্ছেন। টর্চ মেরে মেরে নামছেন

    সারা রাত জাহাজিদের মনে হল, আগুন লেগেছে জাহাজটাতে। এমন শব্দ চারপাশে। এইসব হাজার হাজার পাখির ডানায় কোনো বনাঞ্চলে অগ্নিকান্ডের মতো—সাঁই সাঁই আওয়াজ। ডানায় অজস্র ঝটপট শব্দ, এবং এক করুণ কলরব। এ-সবের ভেতর মনে হল, লেডি-এ্যালবাট্রস সমুদ্রে তোলপাড় করে বেড়াচ্ছে।

    ওরা পোর্ট-হোলে মুখ রেখে দেখল, এখানে-সেখানে সব পাখি। পাখিরা জাহাজের মাস্তুলে এবং দড়িদড়াতে আছড়ে পড়ছে, পাখির এমন নরম ডানা যখন, তখন এই জাহাজের চারপাশে উড়ে বেড়াবার কি যে অর্থ কেউ বুঝতে পারছে না। যত রাত বাড়ছে তত মনে হচ্ছে, অসহ্য। এভাবে চারপাশে পাখিরা মশার মতো বনবন করে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়তে থাকলে ওরা নিশ্চিন্তে ঘুমায় কি করে! সবাই ডেবিডের ওপর ক্ষেপে যাচ্ছে। মৈত্র নিজের জ্বালায় বাঁচছে না। তার ওপর এই সব পাখিদের শিস দেওয়া ডাক, যেন হাজার লক্ষ শুশুক মাছ সমুদ্রে ডেকে বেড়াচ্ছে। ওরা ডাঙ্গার মানুষ, সমুদ্রে ওরা চিরদিন থাকে না, সবাই ভুলতে বসেছে।

    এবং এই নিয়েই মৈত্র, জব্বার এবং ইয়াসিন পিছিলে একটা দারুণ বিদ্রোহ গড়ে তুলতে পারে। আর ডেবিড বোধ হয় এটা আঁচও করেছিল মনে মনে ম্যান-এ্যালবাট্রসের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে—অর্থাৎ এক রাতও পার হয় নি, তখন কিনা এমন কঠিন সঙ্কট জাহাজের সামনে। বিষাক্ত পাখিরা এসে জাহাজে উপদ্রব আরম্ভ করে দিয়েছে। কাপ্তান ওকে যে-কোনো সময় ডেকে পাঠাতে পারেন—তাকে কৈফিয়ৎ দিতে হতে পারে। ম্যান-এ্যালবাট্রসের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জাহাজে যখন একটা সত্যি অপরাধ ঘটে গেল—এবং তার প্রায়শ্চিত্ত পর্যন্ত আরম্ভ হয়ে গেছে তখন ডেবিডের কসুর কাপ্তান ক্ষমা করবেন না।

    ডেবিড ঐ সব ভাবছিল আর কেবিনে পায়চারি করছিল। সে এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে পারছে না। প্রথম প্রথম সে অপরাধের গুরুত্ব বুঝতে পারে নি। যত রাত বাড়ছে নিশীথে যত পাখিদের আক্রমণ বাড়ছে তত সে অস্থির হয়ে উঠছে। বিশেষ করে এদের ভেতর অসন্তোষ দেখা দিলে মারাত্মক কিছু একটা হয়ে যাবে। সে দরজা খুলে এলি-ওয়েতে প্রায় ছুটতে থাকল, ছোট, ছোট—ঘুমোলে!

    ছোট দরজা ফাঁক করে বলল, ঘুম আসে?

    —তা আসে না। কিন্তু! কেমন ভীত চোখ মুখ ডেবিডের।

    ছোট বলল, বোস।

    ডেবিড় ভীষণ ঘামছিল। সে বলল, ডেবিড কি হয়েছে?

    ডেবিড বলল, আমাকে কাপ্তান ঠিক এবারে ডাকবেন!

    —কেন ডাকবেন? কি করেছ?

    —ম্যান-এ্যালবাট্রস…সে বলতে পারল না আর।

    ছোটবাবু বুঝতে পারছে না। ম্যান-এ্যালবাট্রসের কথা বলছে কেন ডেবিড। সে বুঝতে না পারলে কোন প্রশ্ন করে না। তাকিয়ে থাকে শুধু।

    ডেবিড বলল, আমি মেরেছি!

    ছোটবাবু এবারে নিঃশ্বাস ফেলল স্বাভাবিকভাবে। বলল, তার জন্য কি হয়েছে।

    —যদি এ-জন্য হয়ে থাকে?

    —তুমি কি! কেউ আজকাল এ-সব বিশ্বাস করে?

    —কাপ্তান বুড়ো মানুষ তিনি…

    ছোটবাবু এখানেই ছোটবাবু! সে বলল, এ যুগে এ-সব অচল ডেবিড। তোমরা পুরোনো নাবিক, আমি নতুন। আমার তো কিছুই মনে হচ্ছে না।

    —নতুন বলেই হচ্ছে না। পুরোনো হলে তোমারও হত।

    —না, হত না। তুমি ডেবিড এত বুদ্ধিমান, তুমি ডেবিড কাপ্তানের সিউল-ব্যাংকে কাজ নিয়ে কতবার এসেছ, সিউল-ব্যাংকের ভবিষ্যত সম্পর্কে তুমি এতো জানো—আর তুমি এতে ঘাবড়ে গেলে!

    —যদি এরা বিদ্রোহ করে?

    —কারা তারা?

    –এই জব্বার, মৈত্র, এনজিন-সারেঙ…।

    —কেউ করবে না।

    —তুমি ঠিক বলছ?

    —ঠিক। বলে সে বলল, এস। ওরা বাইরে বের হয়ে গেল। ছোটবাবু নিজের কেবিনের দরজা লক করে দিল! সে এবং ডেবিড একসঙ্গে বের হয়ে দেখল, সবার দরজা লক করা ভেতর থেকে। কেউ বাইরে বের হচ্ছে না। ওরা দুজন ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকল। আর বাইরে তেমনি পাখিদের ডানার শব্দ, যেন লকলক করে আগুন জ্বলছে—যেন বড় একটা গঞ্জ পুড়ে যাচ্ছে। বাতাসের সাঁই সাঁই শব্দ, এমন শব্দে মাথা সত্যি ঠিক রাখা যায় না। ছোটবাবুও পারত না। কিন্তু ছোটবাবু জানে সমুদ্র সফরে বের হলে এমন হামেশা হবে। এনজিন-সারেঙ তাকে এ-জন্য বার বার সিউল-ব্যাংকে কাজ নিতে বারণ করেছিলেন। যেন সিউল-ব্যাংকে কাজ নিয়ে উঠলেই সমুদ্রে জাহাজডুবির আশঙ্কা থাকে। সে এতটা ভেবে জাহাজে এসেছে। সুতরাং সে পাখিদের আক্রমণের ভেতর পড়ে ঘাবড়ে যাবার ছেলে নয়। অন্তত ডেবিডের সঙ্গে কথাবার্তায় এটাই এখন প্রমাণ করতে চাইছে।

    তা ছাড়া এমনই স্বভাব ছোটবাবুর। ডেবিড যখন ভয়ে কাহিল তখন সে একেবারে সোজা সরল, এবং যতটা সোজা সরল অথবা নির্ভয় মনে মনে, তার চেয়ে বেশি দেখানোর চেষ্টা। সে এমন কি লকার থেকে গ্লাস এবং বোতল বের করে নিজে সামান্য খেল, ডেবিডকে খেতে দিল। দেখে মনে হবে, ছোটবাবু এখন এ-জাহাজের সব চেয়ে সাহসী নাবিক

    ডেবিড গ্লাস নিয়ে প্রায় সবটা একসঙ্গে গলায় ঢেলে দিল। ওর এটা অনেক আগেই করা উচিত ছিল। তবে সে এতটা ভেঙ্গে পড়ত না। সে খুব ছেলেমানুষী করে ফেলেছে। সে আরও কিছুটা গলায় ঢেলে বলল, চল।

    —কোথায়?

    –ক্রুদের আস্তানায়।

    —এখন?

    —হ্যাঁ এক্ষুনি। তুমি একবার ওদের হাবভাব দেখে আঁচ করে আসবে।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল ডেবিড এখনও নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। সে বলল, চল।

    আর ছোটবাবুকে ফোকসালে এ-সময় ওরা পেয়ে কি যে করবে ভেবে পেল না। ওরা কেমন আছে জানতে এসেছে ছোটবাবু। মনু চা পর্যন্ত করে নিয়ে এল। সে বলতে পারল না ঢাকনার নিচে মেজ-মালোম বসে রয়েছে, বললে, ডেবিডকে অপমান করা হবে। কথা প্রসঙ্গে শেষ পর্যন্ত পাখিদের কথা উঠল। এবং অমিয় বলল, শালা শুঁয়োপোকার মত জ্বলছিল রে?

    ছোটবাবু বলল, মৈত্রদা চুপচাপ এত?

    —কিছু ভাল লাগছে না।

    —তাহিতিতে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

    —আমাকে কিছু টাকা ধার দিবি ছোট?

    এত লোকের সামনে মৈত্রদার টাকা চাইতে এতটুকু সংকোচ হল না। ফের বলল, তুই তো অনেক টাকা পাবি। আমার কোম্পানীর ঘরে সামান্য পাওনা আছে।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল মৈত্রদা আর সে মৈত্রদা নেই। কেমন ভীরু কাপুরুষ হয়ে গেছে। অসুখটার জন্য এমন হয়েছে হয়তো। ভালো হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আজকাল এ-অসুখের তেমন ভয় নেই সে শুনেছে। সে বলল, বাইরে এস।

    বাইরে এসে বলল, দেব। কাউকে বলবে না। যখন পারবে দেবে। তারপর ছোটবাবু বলল, যাচ্ছি। ওরা সঙ্গে আসতে চাইলে বলল, তোমরা যাও। নিচে ডেবিড বসে রয়েছে। তোমাদের দেখলে খুব অপ্রস্তুত হয়ে যাবে।

    এনজিন-সারেঙ বলল, মেজ-মালোমকে ডাকলি না কেন?

    ছোটবাবু বলল, ওই তো নিয়ে এল। তোমরা কেমন আছ আমাকে পাঠিয়ে খবর নিচ্ছে।

    ওরা সবাই মেজ-মালোমের তারিফ করল। দু-একজনের মনে যা-ও একটু আতঙ্ক ছিল, ম্যান- এ্যালবাট্রসের হত্যার জন্য তারা পাখিদের ক্ষোভে পড়ে গেছে, ডেবিড নিজে এসেছে শুনে তাও ভুলে গেল। বলল, ডাক না একবার।

    ছোটবাবু ঢাকনা খুলে ডাকল ডেবিডকে। বলল, ওপরে উঠে এস। কিছু ভাবনার নেই। সব ঠিক আছে।

    সে উঠে এসেই দেখল, সবাই খুব প্রীত এবং কথাবার্তায় একেবারে নিজের মানুষের মতো। ওদের কথাবার্তা সে বুঝতে পারে না। কিন্তু মুখ দেখে বুঝতে পারছে, পরিণামে জাহাজের যাই হোক তাকে দায়ী করে ওরা জাহাজে বিদ্রোহ করবে না। ওরা বন্দর-পেলে জাহাজ থেকে নেমে পড়বে না। ছোটবাবু ওদের কাছে যাদুকাঠির মতো। এবং সে-রাতেই, কারণ রাতে কেউ ঘুমোতে পারবে না জানত, ডেবিড আর একবার আর্চি কেমন আছে দেখতে গিয়ে সব বলে ফেলল। বলল, আর্চি, তুমি ছোটবাবুকে আর র‍্যাগিং করবে না। তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি। আজ যা দেখাল ছোটবাবু। এবং সে কথাপ্রসঙ্গে ছোটবাবু এদের কতো নিজের মানুষ, সে ইচ্ছে করলে আর্চিকে নাকের জলে চোখের জলে এক করে ফেলতে পারে তাও বলল।

    এবং ডেবিডের এভাবে যে কি হয়ে যায়। এখন সে খুব বেশি নিশ্চিন্ত। সারাটা দিন তার ভাল কাটেনি। মাথার ভেতর দুশ্চিন্তা। দুটো-একটা কথা, পাখিটা মেরে ফেলার পর যে কানে না এসেছে তাও নয়। এবং এভাবে সে সারাদিন ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিল। ভাল করে রাতে খেতে পারেনি। এবং সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে যখন পাখিরা এসে জাহাজটাকে ঘিরে ফেলেছিল, চোখে তার সর্ষে ফুল—যদিও সে কথায়-বার্তায় সব সময় ড্যাম-ডেয়ারিং গোছের, কিন্তু মনে মনে মরমে মরে যাচ্ছিল—তখন ছোটবাবু তাকে সব দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচিয়েছে।

    সে ফিস ফিস গলায় বলল, বুঝলে না সব অশিক্ষিত নাবিক। সংস্কার ভীষণ। ম্যান-অ্যালবাট্রসের জন্য এমন হয়েছে ওরা ভাবতে শুরু করেছিল।

    আর্চি শুয়ে আছে। বালিশ উঁচু করা। মাথাটা ওপরের দিকে। জ্বালা-যন্ত্রণা একেবারেই নেই। সে কেমন দু-পাটির দাঁত শক্ত করে বলল তাই বুঝি!

    —ছোটবাবুকে দিয়ে সব মিটমাট করা গেল। বাবাঃ এখন ঘুমোতে যাব।

    এবং সকালে সবাই দেখল গোটা জাহাজে ভীষণ দুর্গন্ধ। মল-মূত্রে জাহাজের ডেক, বোট-ডেক, মাংকি-আয়ল্যান্ডের ছাদ,গ্যালির ছাদ, সামনে-পেছনে ঢাকা। কেউ বের হচ্ছে না। আর আশ্চর্য একটা পাখিও নেই। যাদের মনে হয়েছিল, ডানা ভেঙে ডেকে পড়ে আছে, একটাও তেমন পাখির সন্ধান পাওয়া গেল না। কেবল দুর্গন্ধে টেকা যাচ্ছে না। কাদার মত প্যাঁচ প্যাঁচ করছে—নাবিকেরা গামবুট পরে, হাতে দস্তানা লাগিয়ে নিয়েছে। এবং খুব সতর্কতার সঙ্গে সবাই কাজ করছে। ওপরে কাপ্তান দূরবীন লাগিয়ে চারপাশে যতদূর চোখ যায় দেখছেন। ডেবিডও দেখছে। সে কিছু দেখতে পেল না। না, একেবারে কিছু দেখতে পায়নি ঠিক না, অনেক দূরে সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় লেডি-এ্যালবাট্রস বসে রয়েছে। দূর থেকে জাহাজটাকে অপলক দেখছে।

    জ্যাক কেবিন থেকে বের হতে পারছে না। বোট-ডেকে জল মারা হচ্ছে। হোস পাইপে জল মারছে এবং এমন ভাবে মারা হচ্ছে যাতে ছিটে-ফোঁটাও কারো চোখে-মুখে গিয়ে না পড়ে। স্টিক ব্রুম ডেক জাহাজিদের হাতে। ওরা জল মেরে ব্রাশ চালাচ্ছে। এবং বোট-ডেকের কাজ সারতেই সকাল কেটে যাবে তাদের। ওরা প্রথমে একেবারে মাংকি-আয়ল্যাণ্ড থেকে কাজ আরম্ভ করেছে। ক্রমে নিচে নেমে আসবে। বোট-ডেকে পা মাড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এমন একটা দুঃস্বপ্ন এত সহজে কেটে যাবে জ্যাক বুঝতেই পারেনি। প্রায় জাহাজ ডুবতে ডুবতে যেন বেঁচে গেল। মেজ-মালোমকে সে দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকছে। আর চেঁচাচ্ছে—কি দেখছ? ওরা কি দুরে কোথাও আছে?

    ডেবিড ইশারায় বলছে—না। না নেই। কেবল লেডি-অ্যালবাট্রসকে দেখা যাচ্ছে। আর কিছু নেই।

    কাপ্তান চিফ-মেট ভাল করে দেখে প্রায় যখন নিশ্চিন্ত, রেডিও-অফিসার তখন বেতার সংকেত পাঠাচ্ছে। অল ক্লিয়ার—বেতার সংকেতে সে এরিয়া-স্টেশনকে জানিয়ে দিচ্ছে।

    যখন রেডিও-অফিসার অল-ক্লিয়ার জানাচ্ছে তখন একমাত্র একজন কেবিনে বসে অল-ক্লিয়ার ভাবতে পারছে না! সে তার মাথা সমান উঁচু আয়নায় দাঁড়িয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ ঘসছে। কালো দাগ। যেন কেউ সারা মুখে উল্কি পরিয়ে দিয়েছে। জ্বালা-যন্ত্রণা শেষ হয়ে গিয়ে ও-সব উল্কির মত কি ফুটে উঠছে! হাত দিলে জায়গাগুলো সামান্য অসাড় লাগছিল শুধু। সে বার বার বাথরুমে যাচ্ছে, সাবানে মুখ ঘষছে এবং কেবিনে এসে লকারের আয়নায় মুখ দেখতে দেখতে উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠতে চাইছে। এটা কি হল? ঠিক উইচদের মতো মুখ? সাদা রঙের পাশে কালো কালো উল্কি পরানো? কোনোটা ইয়ারিংয়ের মতো, কোনোটা সমান্তরাল, অথবা ডিম ভেঙে চড়াৎ করে এসে পড়লে যেমন হয়ে যায়, যেখানে-সেখানে মুখে তারাবাতির মতো বিন্দু বিন্দু কালো ফুটকরি। সারা মুখে বিচিত্র সব ছবিতে একেবারে একটা সে মন্ত্রপুত মানুষ হয়ে গেছে। যেন এখন কোমরে সিংহের চামড়া থাকলে উট-পাখির পালক গুঁজে দিলে এবং নানারকমের পাথরের মালা গলায় পরলে হাতে বর্শা থাকলে সে আফ্রিকার কোন অরণ্যসর্দারের ভূমিকা নিতে পারে।

    সে নিজেকে ভয় পাচ্ছিল। তার হাত-পা ঘামছে। সে ছুটে এলি-ওয়েতে বের হয়ে এল। মুখে এটা আমার কি হয়ে গেল! সে ছুটে ছুটে ডেবিডের কেবিনে ঢুকে বলল, ডেবিড সি, এই যে দেখছ! দ্যাখো দ্যাখো সারা মুখে কি আমার! কোন ব্যথা বেদনা নেই। একটু অসাড় লাগছে। সারা সকাল ধরে চেষ্টা করেছি এসব দাগ তুলে ফেলতে পারছি না। বলেই সে বাংকে দু-হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল।

    আর্চিকে ডেবিড চিনতেই পারছিল না। সে প্রথম ভেবেছিল আর্চি ওকে ভয় দেখাবার জন্য মুখে রং কালি মেখে অথবা তামাসা করার জন্য ছুটে এসেছে। সে প্রথম খুব হকচকিয়ে গেছিল। তারপর মুখটা আর্চির এটা সে বুঝতে পেরেছিল। তারপর এই সাত সকালে এসব তামাশার কি মানে সে যখন বুঝতে পারছিল না, তখনই আর্চি বলতে বলতে ভীষণ ছটফট করছিল। অধৈর্য এবং প্রতিশোধের স্পৃহা সারা মুখে। সে বসতে পারছিল না, সে দাঁড়াতে পারছিল না—কেবল কি করা যায় ভাবছে। সে বিড় বিড় করে বলে যাচ্ছিল, তখন রাত দুটো, দুটোর পর মনে নেই কিছু, তার মানে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলামে। ঘুমোবার আগে মুখটা দেখেছি। ফোলা জায়গাগুলো তখন বসে যাচ্ছে। সব ঠিক হয়ে যাবে ভেবে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে উঠে ডেবিড বিশ্বাস কর, বলে দু-হাত ঝাঁকাতে থাকল, আমি আয়নায় নিজেকে দেখে আঁতকে উঠলাম। আমার মুখটা…বলে সে থেমে থাকল। হাঁ-করা মুখ। মুখের দিকে তাকাতে ভয় করছে।

    ডেবিড, আর্চির মুখের চামড়া দু-আঙুলে টেনে টেনে দেখল। পোর্ট-হোলের কাচ খলে ভালো করে আলোতে দেখে বুঝল, ভেতরে চামড়ার ভাঁজের অনেক গভীরে দাগ ঢুকে গেছে। এখন ভালো ডাক্তার না দেখালে হবে না। সে এ-সবের কিছু বুঝতে পারছে না। তবু ভালো জাতের ক্রিম অথবা হয়তো কিছুই না, সময় পার হলে আপনি নিরাময় হয়ে যাবে—এজন্য এমন মুষড়ে পড়তে বারণ করল ডেবিড। বলল, আসলে পাখিগুলোর মলমূত্রে ভীষণ এসিডিটির ব্যাপার রয়েছে! তোমার কি মনে হয়

    আর্চির মুখে কঠিন বিরক্তি। সে এসব শুনতে চাইছে না। এ-মুখ নিয়ে বের হয়ে যাওয়া, এবং যদি দেখা যায়, জ্যাক দেখে ফেললে ভীষণ মজা পাবে। ছোটবাবু দেখলে, মুখ ব্যাজার করে ফেলবে। সে আরও বেশি এবার থেকে ছোটবাবুকে ভয় দেখাতে পারবে। ছোটবাবু ওর মুখের এই অমানুষসুলভ অবয়বে ঘাবড়ে যাবে!

    আর্চির চোখ এভাবে লাল হয়ে যাচ্ছে ভীষণ। সে কাপ্তানের কাছে যেতে পারত। নিচে পাঁচ- নম্বর ওর হয়ে ডিউটি করছে। পাঁচ-নম্বর ওর এখন বিশ্বাসী লোক। ছোটবাবুকে সে পছন্দ করে না। কে কে এখন এই ছোটবাবুটিকে জাহাজে পছন্দ করে না তার একটা হিসাব হাতের আঙুলে গুনে দেখল, মাত্র তিনজন। সে নিজে, পাঁচ-নম্বর আর এনজিন-রুম-কশপ। ডেবিড এবং অন্যান্য সবাই তার পক্ষে। সে ডেবিডকে কিছু বুঝতে না দিয়ে দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে এল। স্লিপিং গাউন ওর হাঁটু পর্যন্ত ঝুলছে। দু-পাশের বেল্ট খুলে আছে। মাতালের মতো সে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। সে এখন শুধু কেবিনে দরজা বন্ধ করে পড়ে থাকবে। মুখ দেখাতে—বিশেষ করে বন্দর এলে সে আর সুন্দরী মেয়েদের কাছে যেতে পারবে না, এমন একটা অমানুষের মতো মুখ জেব্রা অথবা ওরাং- ওটাং সে হয়ে গেল তাদের কাছে। অথবা হীন ব্যক্তি, মুখে উল্কি পরা থাকলে হীন শয়তান মনে করে ফেলবে সবাই। এবং কতদিন পর তার মনে হল—সে তার স্ত্রীর কাছে একমাত্র ফিরে গেলে সে তাকে ফিরিয়ে দেবে না। জাহাজে তার স্ত্রীর কথা আজ সে প্রথম মনে করতে পারল। স্ত্রী লরা একটা স্টেশনারী দোকানের মালিক। জাহাজ আসার খবরে লরা সেজেগুজে জেটিতে দাঁড়িয়ে থাকে। লরা দেখতে পায় জাহাজ থেকে আর্চি নামছে। আর্চি লরার সঙ্গে কথা বলে না। লরা কেবল দেখতে পায় তার সামনে আর একটি মেয়ে হাত নাড়ছে। লরা বুঝতে পারে এবার আর্চি এ মেয়েটির সঙ্গে যতদিন দেশে থাকবে রাত কাটাবে। সে যেসব ফুল নিয়ে এসেছিল সব নিয়ে ফিরে যেত। চার- পাঁচ বছর ধরে এমন চলছে। আর্চি জানে সফর শেষে হোমে ফিরে গেলে এবারেও সে জেটিতে ওর জন্য অপেক্ষা করবে। হয়তো সে তার ইয়ার বন্ধুদের, বান্ধবীদের কারো খোঁজ পাবে না এবার। লরাকে কেবল দেখতে পাবে একা দাঁড়িয়ে আছে।

    লরার কথা ভেবে এতটা দুর্বল হয়ে পড়া ঠিক না। সে মনে মনে লরাকে ভুলে যাবার চেষ্টা করছে। লরা নিজের মতো থাকুক সে চায়। লরা এত ঢ্যাঙা আর এত পাতলা যে তার একেবারে ভাল লাগে না। ওর কিছু নেই। শুধু হাত-পা এবং আর যা আছে তাতে ওর মন একেবারে ভরে না।

    তবু বার বার লরার কথা স্মৃতিতে এলে সে নিজে আর স্থির থাকতে পারছিল না। এতদিন পর আবার কেন। বিয়ে-টিয়ের ব্যাপারে তার বিশ্বাস-টিশ্বাস একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। বিশেষ করে তাদের মতো জাহাজি জীবন যাদের—বিয়ে করা একেবারে উচিত না। লরাকে সেজন্য আইন মোতাবেক পরিত্যাগ করেনি। আছে যখন থাক। ওর জীবন-যাপনে যখন লরা প্রতিবন্ধক নয় তখন লরা বৌ হিসেবে থেকে গেলে একদিকে মন্দ না। জাহাজি মানুষের বৌ অসুখে-বিসুখে টনিকের মতো। একজন অন্তত তখন পাশে রয়েছে ভাবতে ভাল লাগে।

    এ সব কথা মনে হওয়া ঠিক না—সে এবার জোরে ডাকল, বয়। বয় ভেতরে ঢুকে বিস্মিত হল। চা কফি কি দেবে ঠিক করতে পারল না। আর্চি শুধু বলল, ছোটবাবুকে আসতে বল। বয় বুঝতে পারল না, মুখটা জেব্রার মতো দেখতে হয়ে গেছে কেন?

    ছোটবাবু তখন এনজিন-রুমে কাজ করছে। অনেকগুলো লোহার রড তাকে কাটতে দিয়েছে। কিছু লোহার পাত। বাইশ টেবিলে সে রড বেঁধে কাটছে। হ্যাকসো বার বার টেনে টেনে দু-হাতের পেশী ফুলে গেছে। পেশী এত শক্ত যে প্রায় লোহার মতো। সে প্রায় দু-লাফে ওপরে উঠে এসেছে এবং বাইরে দাঁড়িয়ে বলেছে, মে আই কাম ইন স্যার। কাম-ইন। গম্ভীর গলা। ছোটবাবু ভিতরে ঢুকলে আর্চি দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। আর্চিকে সে সকালের দিকে এমন পোশাকে দেখেনি। বোধ হয় মুখের যন্ত্রণায় এখনও আর্চি কষ্ট পাচ্ছে।

    ছোটবাবু কিছু বলতে পারল না। সে পরেছে সাদা প্যান্ট, সাদা সার্ট, পায়ে কেডস, মোজা সবুজ রঙের। সে পিছনে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় সৈনিকের মতো আজ্ঞাবহনকারী মানুষ মাত্র। আয়নায় ওর অবয়ব এত স্পষ্ট যে, সে এত সতর্কতার ভেতরও একবার নিজের মুখ, নীল রঙের দাড়ি, এবং কোথায় যেন এক পবিত্রতা মুখে, নিজেই যখন এসব টের পেয়ে যায় তখন নিজেকে নিজে দেখলে আজকাল ভীষণ সাহসী হয়ে যায়। কোন কিছুতেই ভয় পাবে না সে বিশ্বাস করতে ভালবাসে।

    আর তখনই বাঘের মতো হালুম করে যেন আর্চি ডেকে উঠল। ফিরে দাঁড়াতেই ছোটবাবু আর্চির মুখে কদর্য সব উল্কি দেখল। যেন এ-সব উল্কি পরে আর্চি তাকে ভয় দেখাবে বলে এতক্ষণ এভাবে দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিল।—ম্যান কোথায় কাজ করছ?

    ছোটবাবু মুখ দেখবে না কথার জবাব দেবে। সে কোনরকমে বলল, এনজিন-রুমে

    —নো। ইউ ম্যান, হোপলেস। তুমি ম্যান খুব ফাঁকিবাজ আছ। পুরো বাংলায় বলতে চেষ্টা করল আর্চি। তারপর যা বলল, তা আরও মারাত্মক। এক্ষুনি ছোটবাবুকে ডেকে কাজ করতে যেতে হবে। চার-নম্বর উইনচের পিস্টন রড খুলতে হবে। খুলে, এনজিন-রুমে নিয়ে যেতে হবে। ফাইলে মাজাঘসা আছে।

    ছোটবাবু বলল, স্যার ডেকে এখন যাওয়া ঠিক না। স্যার আপনার মুখে এসব কি? খুব সহজভাবে বলে ফেলেই বুঝতে পারল মহামান্য সেকেণ্ড এনজিনিয়ার আর্চিকে সে অবান্তর প্রশ্ন করতে পারে না। কিন্তু স্বভাব যাবে কোথায় ছোটবাবুর। আর্চি দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে তেমনি দাঁড়িয়ে আছে। কথার জবাব দিচ্ছে না। যত এমন হচ্ছে, ভেতরটা ছোটবাবুর গুড়গুড় করছে। মরতে কেন যে এসব বলতে গেল। অথবা আর্চি এভাবে রাতে সেজে শুয়ে থাকতে হয়তো ভালবাসে। আর্চির ভেতর একটা শয়তান আছে এই প্রথম সে যেন টের পেল। সে আর থাকতে না পেরে বলল, যাচ্ছি স্যার।

    আর তখনই কঠিন এক অবজ্ঞার হাসি, ইয়েস ইউ গো।

    ছোটবাবু জানত, এই মলমূত্রের ভেতর পড়ে গেলে সে জ্বলেপুড়ে যাবে। তবু সে যাবে। সে হাঁটতে থাকল। স্বভাবেই তার এটা আছে। তার এখন থেকে ভীষণ সতর্ক থাকা দরকার। অশরীরী আত্মার মতো অতিকায় হিংস্র আর্চি যে কোনো সময় তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। কিন্তু কেন যে এ সব হয়, সে তা বুঝতে পারে না, সে তো আর্চিকে মান্য করে থাকে। তবু শয়তানের মতো মুখ মানুষটার, ওর এ-সব ভেবে কষ্ট হতে লাগল। মানুষের মুখ শয়তানের মতো হয়ে গেলে ভারি দুঃখের।

    জাহাজ এভাবে চলছে। নিরন্তর চলছে এমনই মনে হয়। চলতে থাকলে মনে হয় না জাহাজটা আর কখনও বন্দর পাবে। জাহাজের ভেতর মানুষগুলো নিরন্তর কাজ করে চলেছে, বিরাম বিশ্রাম বলতে সামান্য, কেবল তাদের ভাবনা জাহাজটাকে ঠিক ঠিক বন্দরে পৌঁছে দেওয়া। দিতে পারলেই কাজ শেষ। তখন যা খুশি করো, যেখানে খুশি যাও, দিনে হাজির থাকলেই হয়ে যায়। কাজে কর্মে তেমন তাড়া থাকে না।

    সিউল-ব্যাংক জাহাজ একটু অন্যরকমের। এর কাজ লেগেই রয়েছে। কত সব উটকো কাজ। এবং সন্তর্পণে সবাই এখন জল মারছে। দুটো হোস পাইপে একসঙ্গে জল মারা হচ্ছে। জল মেরে দিলে সরে যাচ্ছে—চুনগোলা জলের মতো পাখিদের মলমূত্র। এবং জাহাজের সর্বত্র টক টক দুর্গন্ধ। আর জাহাজে যারা রয়েছে তারা পোর্ট-হোল খুলতে পারছে না। এলি-ওয়ের দরজাগুলো সব বন্ধ করে রেখেছে। কোনো কারণে দরজা খুললেই গন্ধে যখন টেকা যাচ্ছে না তখন ছোটবাবু ডেবিডের কাছ থেকে তার গামবুট দুটো চেয়ে নিল। গামবুটের ব্যবহার ডেক জাহাজিদের নিরন্তর —ঝড়-বৃষ্টিতে, তুষারপাতের সময় বরফ জমে গেলে ডেকে জাহাজিরা পায়ে গামবুট পরে চলাফেরা করে। আর ডেক, ফল্কা, মাস্তুলের নোংরা জল মেরে তুলে ফেলার সময় গামবুট পরে না নিলে, প্যান্ট জলে ভিজে যায়। এনজিন-রুম জাহাজিদের এসব দরকার হয় না। ছোটবাবুর গামবুট ছিল না সেজন্য। সে ডেবিডের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছে।

    সে বালতিতে হাতুড়ি, চিজেল নিয়েছে নানা সাইজের। একটা ছোট টবে কেরোসিন তেল। এবং এই বালতি টব তাকে দেখলেই দেখা যাবে। কাজে ছোটবাবু আছে বালতিটা নেই টবটা নেই ভাবা যায় না। ছোটবাবু এলিওয়ে ধরে দরজা খুলে ফেললে, দেখতে পেল ডেকটার সাদা রং। ডেবিডের কাছে মনে হয়েছে তুষারপাত হয়েছে। ছোটবাবুর তুষারপাত সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতা হয়নি। সে দরজা খুলতেই নাকে এসে ঝাঁঝ লেগেছে। এবং বমি আসছিল। সব যেন ভেতর থেকে উঠে আসছে। সে সন্তর্পণে হেঁটে যাচ্ছিল। হাতে চামড়ার মোটা দস্তানা। মাথায় ছেঁড়া টুপি, কেবল মুখে কিছু নেই। সে গন্ধ থেকে বাঁচার জন্য ইউকেলিপটাস তেল নাকে তুলোয় গুঁজে নিতে পারত। কিন্তু দেরি হয়ে যাবে। রুমাল চার-পাঁচ ভাঁজ করে মুখে বেঁধে নিয়েছে। এবং এখন ওর দুটো চোখ কেবল দেখা যাচ্ছে। নাকে কেরোসিন তেল সামান্য লাগিয়ে রেখেছে। গন্ধটা সে আর তেমন টের পাচ্ছিল না।

    তখন মান্নান বোট-ডেকে হোস পাইপে জল মারছে। ডেক-টিন্ডাল আর একটা হোস পাইপে জল মারছে। সূর্য বেশ ওপরে উঠে যাচ্ছে। মান্নানই প্রথম দেখতে পেয়েছিল ডেক ধরে কেউ হেঁটে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারল না কে এমন মলমূত্র মাড়িয়ে যাচ্ছে। সাহস আছে মানুষটার। ডেকে যখন কেউ বের হচ্ছে না ভয়ে, জ্বালা যন্ত্রণার ভয়ে তাছাড়া সে তো শুনছে, কালো কালো দাগ হয়েছে হাতে পায়ে, তখন এমন কার দুঃসাহস! সে তখনই ভাবল হেই করে ডাকবে। কিন্তু অফিসারদের ভেতর যদি কেউ হয়। এই ভেবে সে যখন সামান্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল, তখনই মনে হল আরে এ তো ছোটবাবু। ওর হাতে বালতি টব দেখেই সে চিনে ফেলেছে। আর তখুনি সে চেঁচিয়ে উঠল ওপর থেকে—হারে এডা যে ছোটবাবু।

    ছোটবাবু পিছন ফিরে তাকাল। চার্ট-রুমের পাশে জ্যাকের কেবিন। তার ছাদে দাঁড়িয়ে মান্নান হা হা করছে—কোনে যাচ্ছ!

    —পিস্টন খুলতে। চার নম্বর উইনচে যাচ্ছি।

    —মরণের ওষুধ কানে বানতে চাও চঁইয়া।

    ছোটবাবু হাসল। মান্নানের স্বভাব এভাবে কথা বলা। চঁইয়া কথার সঠিক মানে সে জানে না। তবু এটা কিছুটা কাঁচা খিস্তি জাতীয়। এবং মান্নানের এভাবে কথা বলার স্বভাব। সে বলল, দ্যাখেন টিন্ডাল, ছোটবাবুর কান্ড দ্যাখেন। মরণের ওষুধ কানে বানদনের লাইগা যাইতাছে।

    সবাই এটা দেখে ঘাবড়ে গেল। ছোটবাবু সন্তর্পণে হেঁটে যাচ্ছে। পিছলে পড়ে যেতে পারে। তার চেয়েও ভয়াবহ পড়ে গেলে হাতে পায়ে কিছু হবে না, মুখে লেগে গেলে ভীষণ কষ্ট পাবে ছোটবাবু। ওরা বুঝতে পারছে এটা সেই আর্চির কাজ। ছোটবাবুকে আর্চি একদম সহ্য করতে পারছে না। ওরা ওখানে আর দাঁড়াল না। হোস পাইপ খুলে ফেলল। এবং নেমে যেখানে ছোটবাবু কাজ করবে দুটো হোস-পাইপে জল মেরে একেবারে সাফসোফ করে ফেলছে। ছোটবাবু দেখল, নিশ্চিন্তে নির্ভয়ে সে এখন কাজ করে যেতে পারবে। তবু চারপাশের মলমূত্রের ভেতর কাজ করা অসহ্য রকমের কষ্ট। সকাল থেকে দুর্গন্ধে কেউ কিছু খেতে পারছে না। সকালে খবর এসেছে, জ্যাক কেবিনেই বমি করেছে।

    বিকেলের দিকে জাহাজ একদম পরিষ্কার। কেবল দুটো মাস্টের ওপরে ওরা উঠতে পারে নি। মাস্তুলের রঙ চেনা যায় না। সাদা হয়ে গেছে। ওগুলো চিপিং না করলে উঠবে না। এবং কড়া রোদ সারাদিন, সুতরাং বিকেলের দিকে গন্ধটা একদম থাকল না। কেবিনে কেবিনে ইউকলিপটাস তেল স্প্রে করা হয়েছে। জাহাজের সর্বত্র। কেবল আশংকা আবার বিকেলে তেমনি, অর্থাৎ সূর্য অস্ত যাবার আগে ওরা যদি উড়তে থাকে। কারণ ওরা সমুদ্রের কোথাও যদি পালিয়ে থাকে, অথবা দিগন্তের নিচে অথবা সামনে যে-সব দ্বীপ রয়েছে, দ্রুত উড়ে গিয়ে জাহাজটাকে আবার আক্রমণের জন্য যদি ওৎ পেতে থাকে।

    ব্রীজে একজন, চার্ট-রুমের রেলিঙে একজন। জ্যাকের কেবিনের ছাদে কাপ্তান নিজে দাঁড়িয়ে আছেন। আর ব্রীজের উইংসে চিফ-মেট। ওরা চারজন চারদিকে দূরবীন চোখে দাঁড়িয়ে আছে। যদি কিছু আবার দেখা যায়। ওরা যদি আবার কোথাও থেকে উড়তে আরম্ভ করে। সামান্য এক টুকরো মেঘ ভেসে উঠলে আতঙ্কে সবার চোখ কেমন সাদা হয়ে যাচ্ছে। যখন চারজন মিলে রায় দিতে পারছে, না ওটা একখন্ড মেঘ তখন সবাই নিশ্চিন্ত হতে পারছে।

    কেবল লেডী-এ্যালবাট্রস জাহাজের পেছন ছাড়ছে না। এটা কাপ্তানের ভাল লাগছিল না। এবং যেন যতদিন এই পাখিটা জাহাজকে অনুসরণ করবে ততদিন একটা না একটা দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকবে। কাপ্তানের এমন বয়েস যে, তিনি পাখিটা সম্পর্কে বেশি কিছু ভাবতে পারছেন না। এই যে এমন একটা ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মতো রাত কাটল সমুদ্রে এটা যে এই পাখিটার জন্য হয় নি কে বলতে পারে! এ্যালবাট্রস পাখি সমুদ্রে মেরে ফেলা ভারি অমঙ্গলের ব্যাপার। যদিও আজকাল এ-সব মানা হয় না। জাহাজ যত বেশি নিপুণ হয়ে যাচ্ছে চলা-ফেরায় তত সংস্কার জাহাজিদের মন থেকে মুছে যাচ্ছে। কিন্তু এরা ভাবে না কেন সিউল-ব্যাংক জাহাজ আজকালকার দশটা জাহাজের মতো নয়। সে তার পুরনো সংস্কার নিয়ে বেঁচে আছে। পাখিটাকে তাড়িয়ে দেবার ব্যাপারেও হাতে কিছু এমন উপায় নেই। মাস্তুলে বসতে না দিলেও ওর আসবে যাবে না, কারণ সমুদ্রে সে খুশিমত বিশ্রাম নিতে পারে। লেডি-এ্যালবাট্রস হিগিনসকে সত্যি খুব দুর্ভাবনায় ফেলে দিল।

    সূর্যাস্ত পর্যন্ত ওরা এভাবে দাঁড়িয়েছিল। চারজন পুরো জাহাজি ইউনিফরমে, প্রায় যেন একটা যুদ্ধ জাহাজ চালিয়ে নিচ্ছে। যে কোন সময় আক্রমণ হতে পারে, বিশেষ করে এই সূর্যাস্তের সময়। এ- সব দেখলে মনেই হবে না জাহাজ সিউল-ব্যাংক যাচ্ছে তাহিতিতে। ওখানে জল, বাংকার, রসদ নেবে জাহাজটা। জাহাজের ড্রাফট আটাশ ফুট, গ্রস-ড্রাফট বত্রিশ। জল, বাংকার নিলে জাহাজটা পুরো লোডেড। এবং মাল বলতে জাহাজে আছে সালফার। সেই মাটি। সালফার, ফসফেট, সবই মাটির সামিল। অথবা আয়রণ-ওর। এ-বাদে জাহাজে বেশি কিছু কার্গো দিতে এজেন্ট-অফিস ভরসা পায় না। একমাত্র ভারতবর্ষের বন্দরে গেলে কিছু ভাল মাল, যেমন জুট, চা এ-সবের পেটি তুলে নিতে পারে। ভারতবর্ষের বন্দরে সস্তা মালবাহী জাহাজের ভীষণ কদর। দু-দিকেই টাকা পয়সার লেনদেন চলে। কলকাতা বন্দরের মতো জাহাজটাও দুবলা বলে, বন্দরের সঙ্গে জাহাজটার বেশ ভালবাসাবাসি আছে। কলকাতা বন্দরে একবার ঢুকলে জাহাজ আর বের হতে চায় না। যত দিন যায় তত কর্তৃপক্ষ কাপ্তানের ওপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ে

    হিগিনস লেডি-এ্যালবাট্রসকে দূরবীনে দেখতে দেখতে কেবল এমন সব ভেবে চলেছেন। জ্যাক সারাদিন কিছু খেতে পারে নি। রাতে হয়তো পারবে। জাহাজ-ডেক খুবই পরিচ্ছন্ন। রাতে জ্যোৎস্না ওঠার কথা আছে। জ্যোৎস্না উঠলে, তিনি জ্যাককে নিয়ে বোট-ডেকে কিছুক্ষণ আজ চুপচাপ বসে থাকবেন।

    কাপ্তান-বয় আটটায় নালিশ জানাল, ছোটসাব খাচ্ছে না।

    খাচ্ছে না অনেকে। গন্ধটা সবার নাকে লেগে রয়েছে। আর্চির খাবার কেবিনে গেছে। সে সারাদিন কেবিন থেকে বের হয় নি। ওর মুখে কালো কালো সব দাগ হয়েছে। এমন বিচিত্র ব্যাপার পৃথিবীতে সত্যি তবে ঘটে, ওর মুখটা দেখতে জেব্রার মতো হয়ে গেছে। জ্যাক তো শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ছিল। কাপ্তান জ্যাককে এ-সব বলে কিছুটা যেন ভুলিয়ে-ভালিয়ে খাওয়াচ্ছিলেন। জ্যাক ভাবল, কি করে আর্চির মুখটা দেখা যায়।

    এবং আর্চি বিকেলে ছোটবাবুকে ডেকে পাঠিয়েছিল। ছোটবাবু সুবোধ বালকের মতো দাঁড়িয়ে কথা বলেছে। কোথাও কিছু ঘটেছে ছোটবাবুকে দেখে মনেই হয় না। পিস্টন খুলে মেরামত করে ঠিক ঠিক লাগিয়েছে পাঁচ-নম্বর এসে খবর দিয়ে গেছিল আর্চিকে। সুতরাং আর্চি আর কিছু করতে পারে না। ছোটবাবু চলে গেলে আয়নার সামনে বসে কেবল মুখ দেখা ওর কাজ। এবং বন্দর পেতে আরও চার-পাঁচ দিন। এর ভেতর সে বের হতে পারবে না। ডাক্তার দেখালে ঠিক একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

    এভাবে ঠিক খবর রটে গেল, একমাত্র আর্চির মুখ জেব্রার মতো। সে এখন কেবিন থেকে বের হচ্ছে না। অফিসারদের সবাই আর্চির ঘরে গিয়ে দেখে এসেছে। কাপ্তানের সঙ্গে জ্যাকও গিয়েছিল। জ্যাক তারপর বের হয়ে হা হা করে হাসতে হাসতে ছুটেছে। জ্যাক কেবিন থেকে বের হয়েই হাসতে পারে নি, সে দু-হাতে মুখ চেপে রেখেছিল, তারপর ছোটবাবুর কেবিনে ঢুকে কেবল হাসছে। কেবল হাসছে। ছোটবাবু ওকে এভাবে হাসতে দেখে ভয় পেয়ে গেল। কাপ্তানের ছেলেটার কি যে হয় মাঝে মাঝে। অকারণ কি হাসছে দ্যাখো! সে বলল, এই যে কি হয়েছে! এত হাসছ কেন?

    —সে। কেমন অবাক চোখে দেখল ছোটবাবুকে।

    —এত হাসছ কেন?

    আবার হাসি! হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবার জো। অথচ জ্যাক হাসছেই।

    ছোট বলল, ইস তুমি না জ্যাক একেবারে ছেলেমানুষ।

    জ্যাক বলল, হুঁ! আবার অবাক চোখে ছোটবাবুর মুখ দেখতে থাকল। বড় বড় চোখ ছোটবাবুর। কপাল কি সুন্দর। ঠোঁট দুটো ভারী, চিবুক ছোট, আপেলের মতো। নাক লম্বা, মনোরম চোয়াল।

    ছোটবাবু বলল, এত হাসছিলে কেন?

    —জেব্রা, জেব্রা।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল জ্যাক কি বলতে চায়। সে বলল, দেখলে?

    —দেখলাম।

    —ভাবতে কেমন লাগে সত্যি।

    —কি?

    —এই যে কোথা থেকে পাখিরা এল, কোথায় উড়ে চলে গেল। কেন এল, কেন এভাবে সারারাত উড়ে গেল, ডেক ফল্কা নোংরা করে গেল, তাজ্জব লাগে ভাবতে। আর আরও তাজ্জব, ওদের মলমূত্রে মানুষের কি হয়ে যায়। এমন পাখি পৃথিবীতে আছে আমি শুনি নি জ্যাক।

    —জ্যাক বলল, তুমি দেখেছ?

    –কী!

    —বারে, জেব্রা।

    ছোটবাবু চাইছে এ-ধরনের রসিকতা জ্যাক না করুক। আর্চি আর যাই হোক ওর বস। জ্যাক ওকে ছোট করলে সেও কিছুটা ছোট হয়ে যাবে। আর তাছাড়া বোধ হয় ছোটবাবুর এমনই স্বভাব, মানুষকে খাটো ভাবতে তার খারাপ লাগে। জ্যাক খুব ছেলেমানুষ। আর্চির কষ্টের কথা না ভেবে, তার মুখের কথা ভাবছে। এটা ঠিক না। তা ছাড়া জ্যাক ওর কেবিনে আছে আর্চি দেখলে ক্ষেপে যাবে। সে জ্যাককে বলতে পারছে না, আস্তে। বলতে পারছে না, জ্যাক তুমি এখন যাও।

    জ্যাক বলল, কি তুমি জেব্রা দেখেছ?

    —দেখেছি।

    –কেমন শয়তান শয়তান লাগছে মুখটা।

    ছোটবাবুর মনে হল, সেও আর্চিকে আজ সকালে দেখতে দেখতে শয়তান ভেবেছে। মানুষকে শয়তান ভাবা ঠিক না। আসলে ওর তখন মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল। মাথা ঠান্ডা ছিল না। অথচ নাবিকের সবচেয়ে বড় পবিত্র কাজ মাথা ঠান্ডা রেখে জাহাজে কাজ করা। সে বলল, এমন বলতে নেই।

    জ্যাক বলল, কেন?

    –না বলতে নেই।

    জ্যাক দেখল, ছোটবাবু ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেছে। ছোটবাবুর এমন মুখ সে কখনও দেখে নি। যেন এ-মুখটা দেখলে সমীহ করতে ইচ্ছে হয়। সহজেই আর বলা যায় না, না বলব। বললে তুমি কি করতে পার।

    জ্যাক বলল, ওপরে যাবে?

    ছোটবাবু বলল, না।

    —আর্চি দেখবে না। সে বের হচ্ছে না কেবিন থেকে।

    —ভাল লাগছে না। আমি ঘুমোব।

    এবার জ্যাক কেমন ভেতরে ভেতরে ক্ষেপে গেল। বলল, বাবা তোমাকে ডেকেছেন।

    —আবার আমাকে!

    জ্যাক উঠে দাঁড়িয়েছিল। বের হবার মুখে বলল, আমার কেবিনে।

    ছোটবাবু যখন সেজেগুজে উঠে গেল, তখন নটা বাজে। সে জ্যাকের কেবিনে ঢোকার মুখে দেখতে পেল, জ্যাক ওকে ডাকছে। বোট-ডেকে জ্যাক বসে রয়েছে। পাশে ডেক-চেয়ারে কেউ আছে। এবং অস্পষ্ট আলোতে সে ঠিক বুঝতে পারল না কে তিনি। কাছে গেলে বুঝতে পারল স্যালি হিগিনস জ্যাকের সঙ্গে গল্প করছেন।

    জ্যাক, ছোটবাবুকে দেখেই বলল, এই যে ছোটবাবু।

    স্যালি হিগিনস কাছে গেলে বললেন, বোস।

    ছোটবাবু জ্যাকের পাশে বসে পড়ল।

    স্যালি হিগিনস বললেন, কেমন লাগছে কাজকর্ম?

    —ভাল লাগছে স্যার।

    —কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো?

    —অসুবিধা হচ্ছে না।

    —এভাবে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানোর একটা অনন্দ আছে।

    —তা আছে স্যার।

    —আমরা তাহিতি যাচ্ছি। বড় সুন্দর দ্বীপ। আচ্ছা জ্যাক বলতো তাহিতির রাজধানী কোথায়?

    এই হয়েছে মুশকিল। জ্যাকের মুখ ব্যাজার হয়ে গেল। কবে কখন কি বলেছেন, এখন ঠিক তা ঝালিয়ে নিচ্ছেন, জ্যাক বলল, তুমি বলবে না। বলছি। ইস কি যে হয় না বাবা, সব কেমন ভুলে যাই।

    —ছোটবাবু বলতে পার?

    ছোটবাবুর এ-ব্যাপারে কোনো সঙ্কোচ নেই। এত খবর তার রাখার কথা না। না রাখলেও কিছু আসে যায় না। সে সোজাসুজি না বলল।

    —মনে রাখবে। সব দেশের একটা ইতিহাস আছে। সব না জানলেও কিছুটা যে কোন নাবিকের পক্ষে জেনে রাখা ভাল। দেশে ফিরে গেলে, তোমাকে কত লোক কতভাবে জিজ্ঞাসা করবে, বলতে না পারলে ভারী অসম্মানের। তিনি বললেন, পিপিতি। পিপিতিতে জাহাজ যাচ্ছে। তারপর কেমন তিনি প্রাচীন গাঁথার মতো বলে যেতে ভালবাসেন—এই সব পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কার করেন একজন এশিয়াবাসী। এবং যেমন ফোনেশিয়ান এবং গ্রীকরা খৃষ্টজন্মের ছ’শ বছর আগে পূর্ব আটলান্টিক আর ভূমধ্যসাগরের সব খবরাখবর সংগ্রহ করেছিল, ফোনেশিয়ানরা পূর্ব-আফ্রিকার উপকূল আবিষ্কার করেছিল, তেমনি একজন এশিয়াবাসী সামান্য কাঠের জাহাজে ভেসে চলে এসেছিলেন তাহিতিতে।

    তারপর তিনি বললেন, বলতো জ্যাক আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল কত সালে কে আবিষ্কার করেন?

    জ্যাকের এটা মনে ছিল। সে বলল, খৃষ্টের জন্মের প্রায় চারশ বছর আগে হানো আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল আবিষ্কার করেন।

    এভাবে কাপ্তেন আবার বলে যান ন’শ চুরাশী খৃষ্টাব্দে এরিক দি রেড আবিষ্কার করেছিলেন, গ্রীনল্যান্ড। চোদ্দশো ছিয়াশীতে ডিয়াজ, কেপ অফ গুড হোপ। চোদ্দশো সাতান্নব্বুইতে ভাস্কো-ডা-গামা ভারতবর্ষে যান। পনেরশো বিশে মেগালান সমস্ত পৃথিবী পরিভ্রমণে বের হন। টাসমান প্রথম অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করেন। কাপ্তান কুকের প্রথম সমুদ্রযাত্রা সতেরোশ আটষট্টি থেকে একাত্তর। এভাবে তিনি আমুন্ডসেন পর্যন্ত বলে থামলেন।

    ছোটবাবুর শুনতে বেশ ভাল লাগছিল। জ্যাকের পড়াশোনা বোধ হয় জাহাজে এভাবে হয়ে থাকে।

    তারপর তিনি বললেন, পিপিতি ভারি সুন্দর ছোট্ট ছিমছাম শহর। আজকাল আর টিয়ারী হোটেলের চার পাশের ঘিঞ্জি বাড়ি-ঘর দেখতে পাবে না।

    মনেই হবে না, এখানে এখনও দেড়শ-দুশো বছর আগে আদিবাসীদের সঙ্গে ফরাসীদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছিল। ভ্রমণকারীরা শহরে ঢুকেই প্রথম চলে যায় গোগাঁর আর্ট গ্যালারী দেখতে। সুন্দর বন্দর রয়েছে। এবং বালিয়াড়ি, ছোট ছোট নৌকা দেখতে পাবে। শহরটাতে প্রায় ত্রিশ হাজার লোক বসবাস করে থাকে। প্রতিদিন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছে ভ্রমণকারীরা। নেমেই ওরা তাহিতিদের প্রিয় খাবার পিসান ক্রু খেতে ভারি ভালোবাসে। এদের প্রিয় ফিস্টের নাম ট্যামারা। গরম পাথরের ওপর লোবস্টার, চিকেন, মেরিল্ড ফিস উল্টে-পাল্টে নানারকম মসলাপাতি দিয়ে ভাজা হয়। খেজুর গাছের ছায়ায় সমুদ্র দেখতে দেখতে যখন কেউ খায় তখন জীবন বড় সুন্দর মনে হয়।

    তিনি বললেন, পাহাড়ের ওপর তাহাড়া হোটেল। কতরকমের গাছপালার ফাঁকে ওপরে উঠে যেতে হয়। অধিকাংশ গাছ বলতে খেজুর তাল। ছোট ছোট এক রকমের ঝোপ রয়েছে, বন্য ফুলে ভরা। আর পাহাড়ের মাথা থেকে দেখতে পাবে অনেক দূরে একটা দ্বীপ, দ্বীপের নাম মুরিয়া। প্রায় বারো মাইল দূরে এই দ্বীপ। আসলে দ্বীপটাতে রয়েছে নানা বর্ণের পাহাড়। আর নীল রঙের লতাপাতা। পাহাড়ের চূড়ো একটা দুটো নয়, অনেক। প্রায় মনে হয় অসংখ্য ছোট ছোট পিরামিড—কোন প্রাচীন ফারাও নিজের জন্য এমন একটা নির্জন দ্বীপ যেন গড়ে রেখেছেন। পিপিতি থেকে মোটরবোটে গেলে নাইনটি মিনিটস লাগবে। ছোট ছোট বোট ভাড়া পাওয়া যায়। ইচ্ছে করলেই ঘুরে আসা যেতে পারে। তাহিতির উত্তর-পশ্চিমে প্রায় এক’শ চল্লিশ মাইল দূরে রয়েছে বোরা দ্বীপ। দু’হাজার লোকের বাস সেখানে। দ্বীপটা তার লেগুনের জন্য বিখ্যাত। সরু লম্বা লেগুন একেবারে দ্বীপের ভেতর ঢুকে গেছে। গ্লাস আঁটা মোটরবোটে অসংখ্য ভ্রমণকারী লেগুনে ঘুরে বেড়ায়। রাত কাটায়। জ্যোৎস্না রাতে জলের ধারে ছোট ছোট হোটেলে তারা থাকে। মাছ ধরে। সমুদ্র থেকে ঠান্ডা বাতাস চলে আসে। মাছ ধরার সময় ওদের খুব নিবিষ্ট লাগে দেখতে। গলদা চিংড়ি, হেরিং আর ম্যাকরোল মাছের জন্য জায়গাটা খুব বিখ্যাত

    তারপর তিনি ছোটবাবুর দিকে তাকালেন—কেমন মনে হয় ছোটবাবু, কেবল দু’পাশে উঁচু পাহাড়, নিচে নীল জল, ছোট ছোট উপত্যকা পাহাড়ের কিনারায়। সেখানে ছোট ছোট কাঁচের ঘর, বাতিদান, লাল-নীল চেয়ার, এবং পানীয় বলতে প্রিয় মদ হিনা, মানুই। বেশ গরম পাথরের বাটিতে চিংড়ি মাছ ভাজা আস্ত।

    ছোটবাবুর ভাজা চিংড়ি মাছ আস্ত শুনে প্রায় জিভে জল এসে গেল। বাবা হাট থেকে বড় গলদা চিংড়ি আনলে চিংড়ি মাছের মুড়ো ভাজা, নরম আতপ চালের গোলাতে ভিজিয়ে এবং মাথার ভেতরের অংশটা কি লাল, মুড়ো ভেঙ্গে ভাত মেখে নিলে ভাতটা একেবারে লাল হয়ে যেত। কতদিন সে ভাত এবং চিংড়ি মাছের মুড়ো ভাজা না খেয়ে আছে। যেন দেশে ফিরে গেলে সে প্রথমেই হাট থেকে বড় গলদা চিংড়ি কিনে আনবে।

    আর তখনই কাপ্তান হিগিনস পাইপ ঝেড়ে ফেলে দিচ্ছেন। দামী টোবাকো বোধ হয় খান। বেশ গন্ধ টোবাকোর। টাকা-পয়সা জমলে সেও একটা লম্বা পাইপ কিনবে, লম্বা গোঁফ রাখবে, এবং পাইপে টোবাকো টানবে। জ্যাক কিছুই বলছে না। সে এ-সব শুনছে কিনা তাও বোঝা যাচ্ছে না। জাহাজটা চলছে—আকাশের নক্ষত্র সব পেছনে পড়ে থাকছে, কখনও কখনও মনে হয়—না কেউ পেছনে পড়ে থাকছে না। জাহাজটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারাও সবাই তাহিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নক্ষত্র, সমুদ্র, আকাশ, এ্যালবাট্রস পাখি, জাহাজ, জাহাজের নাবিকেরা সবাই যেন তাহিতির এমন সব সুন্দর দৃশ্যাবলীর কথা শুনে স্থির থাকতে পারছে না। একসঙ্গে সবাই তাহিতি দর্শনে যাচ্ছে।

    ছোটবাবু বলল, আমরা তো মাত্র একদিন থাকব স্যার?

    —একদিন থাকবে, আর এক রাত। সেদিন সবার ছুটি থাকবে। তোমরা যতটা পার দেখে নিও।

    ছোটবাবুর ভীষণ আশ্চর্য লাগছে—আগে হিগিনসকে মনে হত অন্য গ্রহের মানুষ। তিনি গঙ্গাবাজু ধরে আসছেন শুনলে সে হাঁটত যমুনাবাজু ধরে। যেন সামান্যতম বেয়াদপি দেখলেই তিনি সমুদ্রে তাঁকে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন। জাহাজে কিসে কি বেয়াদপির সামিল সে জানত না। এখন এই জাহাজে চলতে চলতে তিনি কি যে আপন হয়ে যান কখনও কখনও। ঠিক পিতা, পিতামহের মতো মনে হয়। পৃথিবীতে সব পিতা-পিতামহেরা বোধ হয় এভাবে বেঁচে থাকে। সে বলল, আপনি কিনারায় নামবেন না? বলেই ভাবল, এটা কি বলা ঠিক হল। এটা অবান্তর কথা। একজন কাপ্তানের কিনারায় নামা না নামা সম্পর্কে সে কোনই প্রশ্ন করতে পারে না। সে প্রায় মরমে মরেই যেত।

    তখন হিগিনস খুবই অবাক হয়ে বললেন, নামব না! তাহিতি আমার খুব প্রিয় জায়গা। এইটুকু বলে তিনি অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। মনে হচ্ছে সবই সেদিনের কথা। এলিস তাহিতিতে নেমে ছেলেমানুষের মতো হৈ-চৈ বাঁধিয়ে দিয়েছিল। সমুদ্রের ধারে ধারে পিচের রাস্তা কত রকমের রং-বেরংয়ের গাড়ি, এবং আশ্চর্য বাজনা—গাড়ি চালাতে চালাতে সেই অদৃশ্য মিউজিক চারপাশে বেজে উঠেছিল।