Author: তাহের আলমাহদী

  • উনবিংশ কল্প : কোথাকার পাপ কোথায়?

    উনবিংশ কল্প : কোথাকার পাপ কোথায়?

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    উনবিংশ কল্প : কোথাকার পাপ কোথায়?

    বড়বাবু প্রতি রবিবার বৈকালে বেড়াতে যান, সন্ধ্যার পর ফিরে আসেন। আজ রবিবার। বেলা পাঁচটা বাজবার পূর্ব্বেই তিনি বেরিয়ে গিয়েছেন, বৈঠকখানায় আমি একাকী আছি। মেজোবাবু আর বাড়ী আসেন না, ছোটবাবুও দু-তিনদিন আসেন নাই, বাড়ীতে তখন আমি একাকী। রবিবার হোলেই আমার ইংরেজী আলোচনার অবসর হয়, একখানি ইংরেজী পুস্তক পাঠ কোত্তে আরম্ভ কোরেছি, মন কিন্তু উতলা; কত রকমের কত কথাই মনে আসছে, ক্ষণে ক্ষণে অন্যমনস্ক হোচ্ছি, পুস্তকপাঠে একাগ্র হোতে পাচ্ছি না, অর্থবোধের সমন্বয় থাকছে না, এক একবার অক্ষরগুলিও যেন ছেড়ে ছেড়ে যাচ্ছি, এত অন্যমনস্ক। কিছুই ভাল লাগছে না। পুস্তকখানি মুড়ে রাখলেম, উঠে একবার বারান্দায় এলেম; আবার ঘরের ভিতর প্রবেশ কোল্লেম, কি জানি, কেমন এক প্রকার অস্থিরতা আমাকে আক্রমণ কোল্লে; যজ্ঞেশ্বরকে ডাকলেম; যজ্ঞেশ্বর এলো; আমার কাছে এসে বোসলো। খানিকক্ষণ নীরবে আমি তার মুখপানে চেয়ে থাকলেম, কি কথা বোলবো, যজ্ঞেশ্বর কিছুই অনুমান কোতে পাল্পে না। আরও খানিকক্ষণ চুপ কোরে থেকে মৃদুস্বরে আমি বোল্লেম, “যজ্ঞেশ্বর। আজ কদিন আমি তোমাকে একটী কথা বোলবো বোলবো মনে কোচ্ছি, বোলতে পাচ্ছি না, কথাটী তুমি রাখবে কি? কথাটী তুমি শুনবে কি? কারো কাছে কিন্তু এখন সে কথাটী প্রকাশ কোরো না; নিতান্ত গোপনীয়কথা নয়, তবু যেন ভয় করে! তুমি ভালমানুষ, তোমার মুখে বেশী কথা নাই, পরের কথা পরকে বলা তোমার স্বভাব নয়, বেশ আমি জানতে পেরেছি, সেই জন্যই তোমাকে বলা। কারো কাছে কিছু, এখন প্রকাশ কোরো না।”

    বুঝতে না পেরে অল্প অল্প হেসে, যজ্ঞেশ্বর তখন বোল্লে, “কথা তো তোমার কিছুই নয়, কেবল গৌর-চন্দ্রিমাই শুনচি, কেবল বার বার আমাকে সাবধানই কোচ্চো; প্রকাশ কোরো না, প্রকাশ কোরো না, এই কথাই তো বোলচো, আসলকথাটা কি, ভেঙে চুরে খোলস কোরেই বল, আমার মুখে কেহই কিছু শুনতে পাবে না, ভয় নাই, তুমি বল।”

    পুনৰ্ব্বার সাবধান কোরে চুপি চুপি আমি বোল্লেম, “জানোই তো, সে দিন আমি ছাদে উঠেছিলেম, যা যা দেখেছি, তোমার সাক্ষাতে বোলেছি, তুমিও কতদিন দেখেছো, কে তারা, ভদ্রলোকের মেয়ে, লজ্জা-সরম নাই, এমন কোরে ছাদে ছাদে চেয়ে চেয়ে কেন বেড়ায়, কেন সে অঙ্গভঙ্গী কোরে রুমাল ঘুরায়, সন্ধানটা একবার নিতে পার?”

    ভ্রূ কুঞ্চিত কোরে হাসতে হাসতে যজ্ঞেশ্বর বোল্লে, “ও বাপ! তোমার পেটে এত বিদ্দে! কাদের মেয়ে, কেন বেড়ায়, কেন ভঙ্গী করে, সে সব খবর নিয়ে তুমি কি কোরবে? বাড়ীর সকলে তোমায় ভাল বলে, আমরাও দেখি, কোন দিকে তোমার উঁচু দৃষ্টি নাই, স্বভাব ঠাণ্ডা, ও সব খোঁজখবর তুমি কেন রাখতে চাও? ছি! লোকে জানতে পাল্লে নিন্দে হবে, বড়বাবু রাগ কোরবেন, মেয়েরা সব হাসবে, অমন কর্ম্ম কোরো না; ও সব কথা আমায় বোলো না; কাশীজায়গা, তীর্থস্থান, কত আসে, কত যায়, কে কোথায় থাকে, কে তার খবর রাখে? আমার মুখে প্রকাশ হবে না বটে, কিন্তু কোন রকমে লোকে যদি কিছু জানতে পারে, তা হোলে ভারী একটা গোলমাল বেধে যাবে?”

    একটু অপ্রতিভ হয়ে, সন্দিগ্ধ বক্তার মুখের দিকে চেয়ে, অসঙ্কোচে আমি বোল্লেম, “না না, সে কথা বোলছি না, আমার কথার ভাবটা তুমি বুঝতে পাচ্ছো না, আগে শোনো, তার পর ভালমন্দ বিচার কোরো। সেই যে বুড়ী আছে, তাকে যেন আমি চিনি চিনি মনে হয়; কলিকাতায় তাকে যেন আমি দেখেছি। তুমিও সে দিন বোলেছে, কলিকাতার এক বাবু, সম্প্রতি ঐ বাড়ী ভাড়া নিয়েছে, এই কথা শুনেই আমি মনে কোরেছি, ঐ বুড়ী তবে সেই বুড়ী। দেখ যজ্ঞেশ্বর! মন্দকাজ আমি জানি না, মন্দকথাও আমি শিখি নাই, মন্দভাবও আমার মনে আসে না; তা যদি হতো, তবে আমি তোমার কাছে এ সব কথা বোলতেম না। কথাটা হোচ্ছে এই যে, কোন কৌশলে সেই বুড়ীর সঙ্গে যদি তুমি একবার আমার দেখা কোরিয়ে দিতে পার, তা হোলে আমি বৃত্তান্তটা জেনে নিই। আর কিছুই না। ঐ বুড়ী যদি সেই বুড়ী হয়, তবে আমার একটা গুহ্যকথা জানা হোতে পারে। বুড়ীটা সেখানে যে বাড়ীতে থাকতো, সেই বাড়ীর সম্বন্ধে আমার মনে একটা সন্দেহ আছে, বিষম সন্দেহ! বুড়ীকে একবার নির্জ্জনে পেলে সেই সন্দেহভঞ্জনের চেষ্টা পাই। আরো শোনো। এ বাড়ীতেও না, ও বাড়ীতেও না, তফাতে একটা বিজনস্থানে,—কোন দেবালয়ের নিকটে দেখাসাক্ষাৎ হোলেই ভাল হয়। তুমি না হোলে সুবিধা হবে না, সেই জন্যই তোমাকে বলা। বুড়ী যদি সহজে তোমার সঙ্গে যেতে না চায়, লোভ দেখিও, বুড়ীদের লোভ বেশী, টাকার লোভ পেলেই তখনি রাজী হবে।”

    পূৰ্ব্বভাব পরিত্যাগ কোরে যজ্ঞেশ্বর তখন বোল্লে, “এই তোমার কথা? সে কাজ আমি বেশ পারবো। বুড়ী তো ঘরের ভিতর আটক থাকে না, রাস্তায় যায়, বাজারে যায়, গঙ্গাস্নান করে, ঠাকুরদর্শনে যায়, সব জায়গায় বেড়ায়; এইবার দেখা পেলেই আমি ধোরবো; আমাদের বাড়ীর একটী ছোট ছেলে তোমার সঙ্গে দেখা কোত্তে চায়, এই কথা বোলবো। যেখানে দেখা হবে, জায়গা ঠিক কোরে তোমাকে সংবাদ দিব।”

    আমি সন্তুষ্ট হোলেম। “অন্যদিন সময় হবে না, রবিবার বৈকালে দেখা কোরবো, এই কথাই বলে রেখো, আমাকে সঙ্গে নিয়ে সেই সময়ে সেইখানে তুমি যাবে, বুড়ীও সেইখানে থাকবে, তা হোলেই ঠিক হবে।”—যজ্ঞেশ্বরকে এই কথা বলে আবার আমি পুস্তক নিয়ে বোসলেম; যজ্ঞেশ্বর বেরিয়ে গেল। সন্ধ্যার পর বড়বাবু এলেন, আমাকে যা কিছু বলা তাঁর প্রয়োজন ছিল, সেই সব কথা বল্লেন; আমিও দুটী একটী কথা বোল্লেম, অন্যমনে আমার কথাগুলি শুনে বাবু হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কদিনের ঝঞ্চাটে একটা কথা আমার মনে হয় নাই, রসিকবাবুর বাড়ীতে উৎসবটা তুমি কেমন দেখেছ? মাঝে মাঝে তুমি বীরভূমের নাম কর, কানাইবাবুটীকে তুমি কি চিনতে পেরেছ?”

    প্রথম কেনই বা মিথ্যাকথা বোলবো, সাফ সাফ সত্যকথাই বোল্লেম। প্রশ্নের উত্তর দিলেম, “উৎসব বেশ হয়েছিল, কিন্তু কুমারীগুলি আমার চক্ষে যেন সত্য সত্য কুমারী ঠেকলো না। আমাদের দেশে অত বড় বড় কুমারী হয় না, বিশেষতঃ হিন্দুর গৃহে।”—উচ্চ হাস্য কোরে বড়বাবু বোল্লেন, “কাশীর কুমারী ঐ রকম! কেবল কাশীই বা কেন, অনেক তীর্থে গর্ভবতী, পুত্রবতী কুমারী অনেক দেখা যায়!”

    মাথা নীচু কোরে আমিও একটু হাসলেম। তার পর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর। সেই উত্তরে নিয়ে আমি বোল্লেম, “কানাইবাবুকে বীরভূমে আমি দেখি নাই, কলিকাতায় একদিন দেখেছিলেম। তাঁকে আমি চিনতে পেরেছি, তিনি আমাকে চিনতে পারেন নাই। বেশীকথা আপনাকে আমি আর কি বোলবো, বাবুটী বড় সহজবাবু নন। কাশীতে যদি কিছু, বেশী দিন থাকেন, বিশেষ পরিচয় প্রকাশ পাবে। একটুখানি আমি বলে রাখি। কানাইবাবু জমীদার নন; মাতুল জমীদার; মাতুলের নাম বাণেশ্বরবাবু। আর—আর—আর—”

    শীঘ্র বোলতে পাল্লেম না, বোলতে বোলতে থেমে গেলেম। চকিতনেত্রে আমার মুখপানে চেয়ে ত্বরিতস্বরে বড়বাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “আর কি হরিদাস? থামলে কেন? বল না,—কানাইবাবু আর কি?”

    মাথা হেঁট কোরে তখন আমি বোল্লেম, “আর—কানাইবাবুর পরিবারটী বিয়েকরা পরিবার নয়, নিঃসম্পকীয়া নায়িকাও নয়,—ঐ পরিবারটী কানাইবার মাতুল-কন্যা!”

    স্কন্ধ কম্পিত কোরে, বিস্ময়ে শিউরে উঠে, বড়বাবু বলে উঠলেন, “রাম। রাম! রাম! বল কি হরিদাস? এটা কি তুমি ঠিক জানো?”

    বোলেছি সত্যকথা, জেরার মুখে আরো সত্য প্রকাশ কোত্তে হলো; কানাইবাবু, যে প্রকৃতির লোক, তাঁর গুণের কথা স্পষ্ট কোরে ব্যাখ্যা করাই ভাল। মনে মনে এই রূপ স্থির কোরে স্পষ্ট স্পষ্ট আমি বোল্লেম, “আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিক আমি জানি। মাতুলের আশ্রিত অন্নদাস, মাতুল-কন্যাকে হরণ কোরে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলেন, নিজে সাধু সেজে বাড়ীর ভিতর গলাবাজী কোচ্ছিলেন, সেই সময় আমি কিরূপে সে বাড়ীতে উপস্থিত হই, সে কথা পূর্ব্বে আপনাকে বোলেছি। সে রাত্রে সেখানে কানাইবাবুকে আমি দেখি নাই, কলিকাতায় একবার দেখা, তখন বোধ হয়, মাতুল কন্যাটীকে অন্য বাড়ীতে রেখেছিলেন, তার পর এখন জমীদার সেজে, সেই কন্যাটীকে পরিবার সাজিয়ে নিয়ে কাশীধামে এসেছেন। রসিকবাবুর বাড়ীতে যে কন্যাটী ভক্তিমতী হয়ে কুমারী-পূজা কোল্লেন, সেই কন্যাটীই কানাইবাবুর মাতুল-কন্যা, আমার এইরূপ বিশ্বাস। পরিচয়ে জমীদার, উৎসবের খরচপত্রও জমীদারের মত, টাকাগুলিও বোধ হয় মাতুলের; দাতার অসাক্ষাতে দানপ্রাপ্তি। অধিক আর আমি কি বোলবো, সময়ে প্রকাশ পাবে।”

    পুনরায় তিনবার রামনাম উচ্চারণ কোরে বড়বাবু বোল্লেন, “তাই ত! কানাইবাবু তবে তো সাধারণ লোক নয়! ধর্ম্মশীল জমীদার বটে! অন্নপূর্ণা-বিশ্বেশ্বর মাথায় থাকুন, কাশী বড় ভয়ানক স্থান! কাশীতে ঐ রকমের জমীদার, ঐ রকমের পরিবার অনেক পাওয়া যায়! পাঁচ সাতটা আমি জানি, মাতুলকন্যা, পিতৃব্য-কন্যা, মাসী-পিসী, বিমাতৃকন্যা, এমন কি, যুবতী বিমাতা পর্য্যন্ত এখানে অনেক বাবুর পরিবার। এখানকার সমাজে তাঁর প্রকাশ্যরূপে বেশ চোলে যাচ্ছেন। তাঁরা এখানে মান্যগণ্য সামাজিক ভদ্রলোক! তুমি বালক, তোমার কাছে বেশী বলা লজ্জার কথা, সে সব তোমার শুনেও কাজ নাই, পূর্ব্বে তোমাকে সাবধান কোরে রেখেছি, আবার সাবধান কোরে দিচ্ছি, এখানকার অজানা লোকের সঙ্গে কদাচ তুমি কোন সংস্রব রেখো না। ঐ রকমের অনেক কানাইবাবু কাশীর মাঝে মাথা উঁচু কোরে বুক ফুলিয়ে চোলে বেড়ায়! সাবধান!”

    কানাই-নাটকের যবনিকা এইখানে পতিত হলো, পুনর্ব্বার পট-উত্তোলনের আবশ্যক হবে কি না, সেটা এখন ভবিষ্যতের গর্ভগত। যজ্ঞেশ্বরের কাছে আজ আমি যে নাটকের নান্দীপাঠ কোরে রেখেছি, সে অভিনয়টা কি রকম দাঁড়ায়, সাতদিন পরেই জানতে পারা যাবে। অমরকুমারীকে নিয়ে নাটক হবে না, অমরকুমারী আমার বিস্তর উপকার কোরেছেন, সাধারণ উপকার নয়, অমরকুমারী আমার জীবনদায়িনী। অমরকুমারী কাশীতে; এটাই বা কিরুপ সঙ্ঘটন? অমরকুমারী এসেছেন, একাকিনী আসেন নাই, মোহনবাবুও এসেছেন; কিন্তু আছেন কোথায়? একবার দর্শন পেলে ভাল হোতো।

    আমারে অন্যমনস্ক দেখে বড়বাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “ভাবছো কি হরিদাস? তীর্থস্থানের মহিমা জানবার তোমার অনেক বাকী। ও সব কিছু মনে কোরো না, এখানকার কাণ্ডই প্রায় ঐ প্রকার।”

    এই সব কথা বোলে বড়বাবু দুটী দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ কোল্লেন। দেখলেম, তাঁর মুখখানি যেন বিবর্ণ, যেন চিন্তাযুক্ত। সে রকম চিন্তাযুক্ত তাঁকে আমি আর একদিনও দেখি নাই। পুনরায় এক নিশ্বাস ফেলে তিনি বোল্লেন, “এখনকার কালে নিরুদ্বেগে সংসারধর্ম্ম করা প্রায় কারো ভাগ্যে ঘোটে উঠছে; হিংসা, দ্বেষ, বাদাবাদি, কলহ, নিন্দা, আত্মবিচ্ছেদ, একটা না একটা যেন লেগেই আছে। ঐ সব উৎপাত থেকে তফাৎ হবার আশায় দেশ ছেড়ে আমি এখানে এসেছি, এখানেও সুখ পাচ্ছি না। তিনটী ভাই একসঙ্গে মিলে মিশে ছিলেম, সে সুখেও বঞ্চিত হোতে হলো। রামশঙ্কর সেই সেদিন মিছামিছি বচসা কোরে বাড়ী থেকে বেরিয়ে গিয়েছে, তদবধি আর বাড়ী এলো না; লোক দিয়ে বোলে পাঠাচ্ছে, সে আর আমার সঙ্গে এক সংসারে থাকবে না, মুখদেখাদেখি পর্য্যন্ত রাখবে না, বাড়ীর অংশের মূল্য নিয়ে, রামনগরে নূতন বাড়ী বানাবে, পরিবার নিয়ে সেইখানেই বাস কোরবে। কথাটা শুনে মন আমার বড়ই খারাপ হয়ে গিয়েছে। ভাই-দুটীর সঙ্গে কখনো আমি অসদ্ব্যবহার করি নাই, দোষ কোল্লেও কটু কথা বলি নাই, তবু এই বিচ্ছেদটা ঘোটলো। মন্ত্রী জুটেছে। জানতে পেরেছি, সেই মন্ত্রীটী আমাদের দেশের লোক। সম্পর্কে আমাদের মামা হন, মহাভারতের শকুনিমামা! বৃদ্ধ হয়েছেন, তথাপি এখনো মনের ভিতর ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর মার-পেঁচ খেলে! হিংসায় হিংসায় অন্তরটা জরজর! কারো ভাল দেখতে পারেন না; ঘর ভাঙবার গুরুমশাই! তাঁরই মন্ত্রণায় রামশঙ্করটা আজকাল উঠছে বোসছে। আমাদের বাঙলাদেশটা ইদানীং অনেক রকমে অধঃপাতে গিয়েছে। আচারব্যবহার উড়ে উড়ে যাচ্ছে, লোকের কথায় সেটা যেন কালের ধর্ম্ম, কিন্তু ভাই ভাই পৃথক হবার উপদ্রবটা বেজায় বেড়ে উঠেছে। ভাই ভাই বিরোধে এক একটা সংসার ছারখার হয়ে যাচ্ছে, কেহ যেন সেটা গ্রাহ্যই করে না। গতিক যে রকম দেখছি, আমরা যদি দেশে থাকতেম, কুমন্ত্রীর কুমন্ত্রণায় এতদিনে কবে ঘরবাড়ী সব বাঁটোয়ারা হয়ে যেতো। দেশে আজকাল বাঁটোয়ারার ভারী ধূম! “ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই, এই কথাটার বড় আদর! ঠাঁই ঠাঁই হবার ঘোর তুফানে কত কত বোনেদী সংসার ডুবে ডুবে যাচ্ছে, স্নেহমমতা ভেসে ভেসে যাচ্ছে, দিন দিন এক এক পরিবারের বলয় হোচ্ছে, হাতে হাতে ফলাফল দেখেও লোকের হুঁস হোচ্ছে না। দশজন একত্রে এক সংসারে থাকলে সব রকমে সুখে থাকা যায়, এখনকার লোকে বলে, সেটা বিষম ভুল! বিবাহিতা স্ত্রী এখন পরিবার, সেই পরিবারকে নিয়ে স্বতন্ত্র থাকাই পরম সুখ। ভাই ত ভাই, অনেক দূরের কথা, জন্মদাতা পিতা আর গর্ভধারিণী মাতাকেও পরিবারের সংসারে স্থান দিতে অনেকে নারাজ! সেই সকল কুলক্ষণ দেখে আমি কাশীতে সোরে এলেম,—আনন্দকাননে জুড়াবার ঠাঁই, বড় আশায় অন্নদার ক্রোড়ে জুড়াতে এলেম, এখানেও সেই বিপত্তি! হাঁ, এমন হোতে পারে, ভাই-দুটীর রোজগারের টাকা আমি গ্রহণ করি, আমার খরচ বেশী, তাঁদের খরচ কম, টাকা তাঁদের জমে না, একসঙ্গে থাকলে ক্ষতি হয়, কাজে কাজে পৃথক হবার ইচ্ছা বলবতী হয়ে উঠে। এখানে তো তা নয়, কোন ভায়ের রোজগারের একটী পয়সাও আমি গ্রহণ করি না, অথচ সকলকে আমি সমানচক্ষে দর্শন করি। তবু কেন এমনটা ঘোটলো? রামশঙ্কর পৃথক হবে! দুদিন পরে হয় তো মতিলালটীও বেঁকে দাঁড়াবে। হায় হায়! আমার ধর্ম্মের সংসারে এমন প্রতিকূল ঘটনা কেন হয়?”

    এই সব কথা বোলে বড়বাবু আর একটী বিশাল দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ কোল্লেন। আমারও হৃদয়ে বেদনা লাগলো। সে রাত্রে আর অন্য কাৰ্য্য কিছুই হলো না, আহারাতে চঞ্চলা নিদ্রায় রজনী অবসান।

    সোমবার। যথাসময়ে আহারান্তে আমরা আদালতে গেলেম; গিয়ে শুনলেম, সেই দিন গঙ্গাস্নানের কি একটা যোগ, আদালত বন্ধ। একটী বাবু, মির্জাপুর থেকে সেই আদালতে চাকরী কোত্তে আসেন। কাশীতে তাঁর বাসা আছে, পাঁচ সাত দিন ছুটী পেলে মির্জাপুরে যান। মির্জাপুরে বিন্ধ্যাচল। অনেক দিন অবধি বিন্ধ্যাচল-দর্শনে আমার অভিলাষ ছিল, সেই দিন সেই বাবুটী মির্জাপুরে যাবেন, সেই কথা শুনে আমিও তাঁর সঙ্গে যাবার অভিপ্রায় জানালেম। বাবুটী বোল্লেন, “কল্য তোমাকে আদালতে আসতে হবে, এক দিনে বিন্ধ্যাচলে যাওয়া আসা হয় না, অতি কম পাঁচদিনের ছুটী না পেলে তোমার মনোরথ সিদ্ধ হবে না। আমি একমাসের বিদায় নিয়েছি, শনিবার দুটী মঞ্জুর হয়েছে, আজ আমি চোলে যাব, একমাস আসবো না।”

    বিন্ধ্যাচল-দর্শনের অভিলাষ আমার আরো বেড়ে উঠলো, বড়বাবুকে সেই অভিলাষ জানিয়ে সাত দিনের ছুটী চাইলেম। বড়বাবুই সেরেস্তার কৰ্ত্তা, তিনি আমাকে ছুটী দিলেন, মির্জাপুরের বাবুর সঙ্গে আমি নৌকাযোগে বিন্ধ্যাচল দেখতে চোল্লেম। সেদিন গেল, রাত্রি গেল, পরদিন সন্ধ্যার পূর্ব্বে মির্জাপুরে পৌঁছিলেম। রাত্রী সেই বাবুর বাড়ীতেই থাকা হলো, পরদিন বিন্ধ্যাচল-দর্শন। সঙ্গী সেই বাবুটী আর একটী পাণ্ডা। বিন্ধ্যাচল অনেক দূর পর্য্যন্ত বিস্তৃত; অধিক উচ্চ নয়, কিন্তু খুব লম্বা। পুরাণে বর্ণিত আছে, বিন্ধ্যাচল ক্রমে ক্রমে কলেবর বৃদ্ধি কোরে গগনস্পর্শী হোতে যাচ্ছিল, অগস্ত্যমনি উপস্থিত হয়ে পৰ্ব্বতের সেই উচ্চাভিলাষ ব্যর্থ কোরে দিয়েছেন। পৰ্ব্বত নতশিরে শায়িতভাবে অগস্ত্যকে প্রণাম করে। অগস্ত্য বলেন, “যতদিন আমি ফিরে না আসি, ততদিন এই ভাবেই থাকো, উঠো না।” বিন্ধ্যাচল তদবধি সেই অবস্থাতেই শুয়ে আছে। অগস্ত্য আর সেখানে ফিরে এলেন না, বিন্ধ্যগিরিও আর মস্তক উন্নত কোত্তে পাল্লেন না। যে দিন এই ঘটনা হয়, সেদিন একটী মাসের প্রথম দিবস। ঐ ঘটনার স্মরণার্থ মানুষেরা আজিও মাসের প্রথম দিবসে কোথাও যাত্রা করে না; ঐ দিনের যাত্রাকে অগস্ত্যযাত্রা বলা হয়। যাত্ৰানিষেধের হেতু এই যে, অগস্ত্য যেমন গেলেন, আর এলেন না, অগস্ত্যদিবসে অর্থাৎ মাসের প্রথমদিবসে যারা কোথাও যাত্রা করে, সেইরূপে তারাও আর ফিরে আসে না।

    বিন্ধ্যাচলে অনেক দেবদেবীর প্রতিমূর্তি আছে, তন্মধ্যে তিনটা প্রধান;— বিন্ধ্যবাসিনী, যোগমায়া আর ভোগমায়া। ত্রিকোণাকারে এই তিনটী পীঠস্থান, সেই কারণে এই স্থানকে ত্রিকোণমণ্ডল বলা হয়। বিন্ধ্যবাসিনীর মন্দির উপরিভাগে, যোগমায়া ভোগমায়া গহ্বরমধ্যে। যোগমায়ার এক নাম মহাকালী। মূর্ত্তি অতি ভয়ঙ্করী! অবয়ব দেখা যায় না, কেবল একখানা পাথরের প্রকাণ্ড মূখ হাঁকরা, মুখে সিঁদুর মাখা, চক্ষের দুটী গহ্বনমাত্র দৃষ্ট হয়, আর কিছু না। যাত্রীলোকেরা সেই মুখে দুগ্ধ-গঙ্গাজল প্রভৃতি প্রদান করে, সে সকল বস্তু কোথায় যায়, কিছুই দেখা যায় না। পৰ্ব্বতের নিম্নে এক কালীমূর্ত্তি আছে, লোকে বলে, পূর্ব্বে পূর্ব্বে সেই কালীর কাছে নরবলি হোতো, এখন হয় না। দেবদেবীগুলিকে আমি প্রণাম কোল্লেম, পাণ্ডারা কিছু কিছু দর্শনী নিলে। পাণ্ডা ব্যতীত অনেক যোগী-সন্ন্যাসী স্থানে স্থানে চক্ষু মুদে বোসে আছেন, তাঁদের কাছে দর্শনী দিতে হয় না। পৰ্ব্বতের পার্শ্বে বহুদূরবিস্তৃত একটা প্রান্তর, একধারে একটা ঝরণা, সেই ঝরণার জল অতি নির্ম্মল। স্থানে স্থানে নিবিড় জঙ্গল, স্থানে স্থানে পুষ্পকানন; নানা জাতি পুষ্প প্ৰস্ফুটিত হয়ে স্থানটীকে আমোদিত করে।

    বিন্ধ্যাচল দর্শন করা হলো, দুদিন আমি মির্জাপুরে থাকলেম। সাত দিনের ছুটী, তথাপি আমি বিলম্ব কোল্লেম না, নৌকাযোগে শনিবার বৈকালে কাশীতে ফিরে এলেম। যজ্ঞেশ্বরের সঙ্গে কথা ছিল, রবিবার বৈকালে সেই বুড়ীর সঙ্গে দেখা করা হবে, সেই জন্যই শীঘ্র শীঘ্র ফিরে আসা।

    অগ্রেই আমি বাড়ী এলেম। সন্ধ্যার পর বড়বাবু এলেন; এসেই আমাকে সহাস্যবদনে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “এসেছ হরিদাস? বেশ হয়েছে। বিন্ধ্যাচল কেমন দেখলে?”

    যা যা আমি দেখেছিলেম, সংক্ষেপে সংক্ষেপে বর্ণনা কোল্লেম; বড়বাবু খুসী হোলেন। তার পর বাড়ীর ভিতর থেকে ফিরে এসে বৈঠকখানায় বোসে, বাক্স থেকে একখানি চিঠি বাহির কোরে, আবার তিনি হাসতে হাসতে আমাকে বোল্লেন, “আমার একটী বন্ধু আসছেন, এই চিঠি লিখেছেন, বন্ধুটীর নাম মোহনলাল ঘোষ, বর্দ্ধমানজেলায় নিবাস, খুব ভাললোক, খুব বড়মানুষ, তাঁর সঙ্গে আলাপ হোলে তুমি সুখী হবে। এই সেই চিঠি, এই লও, চিঠিখানি পড়।”

    মনে তখন আমার কি ভাবের উদয় হলো, আমিই জানতে পাল্লেম, কিছুই প্রকাশ কোল্লেম না, বাবুর হাত থেকে নিয়ে চিঠিখানি আমি পাঠ কোল্লেম। চিঠিতে লেখা ছিল:—

    প্রিয় রমেন্দুবাবু।

    আমি সপরিবার প্রয়াগধামে আসিয়াছি। ইতিমধ্যে একদিন কোন কাৰ্য্যোপলক্ষে কাশীতে গিয়াছিলাম, ব্যস্ততা প্রযুক্ত তোমার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া আসিতে পারি নাই, এই সপ্তাহের মধ্যেই পুনরায় বিশ্বেশ্বর-দর্শনে যাইব, একমাস কাশীতে থাকিবার ইচ্ছা আছে, এইবার তোমার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া সন্তোষ লাভ করিব। তোমার বাড়ীর পরিবারগণকে আমার প্রিয়সম্ভাষণ জানাইও, ঈশ্বরের নিকটে আমি তোমাদের সকলের কুশল প্রার্থনা করি। আমার শরীর এখন একপ্রকার ভাল আছে, সাক্ষাতে সকল কথা কহিব ও শুনিব ইতি সন ১২৫৮ সাল, ১৩ই ফাল্গুন।

    বশম্বদ 

    শ্রীমোহনলাল ঘোষ।”

    পত্রখানি আমি পাঠ কোল্লেম। অকস্মাৎ মনে কেমন একটা সংশয় এলো। দুই তিনবার সেই চিঠির অক্ষরগুলি ভাল কোরে দেখলেম; ক্রমশই সংশয়টা প্রবল। আমার সংশয়ভাব বড়বাবু যাতে বুঝতে না পারেন, সেইরূপে সাবধান হয়ে থাকলেম। হঠাৎ কি একটা কার্য্যে বড়বাবু শশব্যস্তে বাড়ী থেকে একবার বেরিয়ে গেলেন, সেই অবসরে আমি অন্দরমহলে প্রবেশ কোরে, আমার শয়নঘর থেকে একখানি পত্রিকাখণ্ড হাতে কোরে নিয়ে আবার বৈঠকখানায় এসে বোসলেম। মোহনলালবাবুর চিঠিখানি সেইখানেই খোলা পোড়ে ছিল, আমি যেখানি আনলেম, সেখানিও সেইখানে খুলে রাখলেম; পাশাপাশি দুখানি চিঠি।

    ঠিক তাই! সংশয়ে সংশয়ে ইতিপূৰ্ব্ব যা আমি ভেবেছিলেম, ঠিক তাই!

    অক্ষরে অক্ষরে ঠিক মিলন; দুখানি চিঠিই এক হস্তের লেখা। এ কি আশ্চর্য্য সম্মিলন! মোহনলালবাবুর চিঠির সঙ্গে আমার রক্ষিত চিঠিখানির অক্ষরে অক্ষরে ঠিক মিলন, এ কি আশ্চর্য্য সঙ্ঘটন! আমার রক্ষিত চিঠিখানি কোন চিঠি, সে কথাও পাঠকমহাশয়কে জানাই। আদালতের সিঁড়ির উপর রক্তদন্তের বগল থেকে যে কখানা কাগজ পোড়ে গিয়েছিল, সেই সকল কাগজের ভিতর যে ক্ষুদ্র পত্রিকা আমি পেয়েছিলেম, যে পত্রিকায় দস্তখতের জায়গাটা ছিঁড়ে গিয়েছিল, যে পত্রিকা সাবধানে যত্ন কোরে আমি রেখেছিলেম, সেই পত্রিকা। দুই পত্রিকার অক্ষর ঠিক একরকম! কেমন হলো! মোহনলালবাবুই কি তবে রক্তদন্তকে সেই চিঠি লিখেছিলেন? আমার উপর রক্তদন্ত অর উপদ্রব না করে, সেই চিঠিতে এইরুপ উপদেশ। রক্তদন্ত আমার উপর দৌরাত্ম্য করে, মোহনবাবু কি সেটা জানতেন? না জানলেই বা নিষেধ করবার মানে কি? রক্তদন্তের সঙ্গে কি মোহনবাবুর পূর্ব্বাবধি যোগাযোগ ছিল? তাঁর উপদেশেই কি রক্তদন্ত আমাকে ধোরে নিয়ে গিয়েছিল? তাই তো সম্ভব বোধ হোচ্ছে! মোহনবাবুর কাছে রক্তদন্ত বেতন পায়; রক্তদন্তটা মোহনবাবুর চাকর! কি কার্য্যের জন্য চাকর? আমাকে নষ্ট করবার জন্যই কি? রক্তদন্ত আমাকে প্রাণে মারবার চেষ্টা পেয়েছিল, সে চেষ্টাটাও কি মোহনবাবুর উপদেশে? কেমন উপদেশ? তাঁর কাছে আমি কোন অপরাধে অপরাধী? কোন কালে কবে আমি তাঁর কি অনিষ্ট কোরেছি? আমি বেঁচে থাকলে মোহনবাবুর কোন অভীষ্টসিদ্ধির ব্যাঘাত হোতো? কিছুই তো বুঝতে পাচ্ছি না। আচ্ছা, তাই যদি হয়, তবে আবার আমার প্রতি তিনি সদয় হলেন, রক্তদন্তকে নিবারণ কোল্লেন, ইহারই বা ভাব কি? একটা কারণ আমার মনে আসছে। অমরকুমারীকে অগ্নিকুণ্ড থেকে আমি উদ্ধার কোরেছিলেম, মোহনবাবুর বাক্য প্রমাণে অমরকুমারী তাঁর নববিবাহিতা পত্নী; আমি অমরকুমারীর প্রাণরক্ষা কোরেছি, সেই উপকারের বিনিময়ে মোহনবাবু আমাকে হাজার টাকা পুরস্কার দিয়েছিলেন, সেই উপকার স্মরণ কোরেই হয় তো রক্তদন্তকে ঐ ভাবে পত্র লেখা। স্থির কোল্লেম এই রকম, কিন্তু আমার প্রতি মোহনবাবুর বৈরভাব কেন জন্মেছিল, অনেক ভেবে চিন্তে সেটা কিছুই স্থির কোত্তে পাল্লেম না।

    বড়বাবু এখনি ফিরে আসবেন, এই দস্তখৎশূন্য পত্রিকা তাঁকে আমি এখন দেখাবো না, এই সঙ্কল্পে সেখানি তখন আমি গোপন কোরে রাখলেম। একটু পরে বড়বাবু ফিরে এলেন, এসেই আমারে বোল্লেন, “হরিদাস! মোহনলালবাবু আসছেন, তাঁর সঙ্গে আমি তোমার পরিচয় কোরিয়ে দিব, তিনি অমায়িক ভদ্রলোক, আলাপ থাকলে তোমার অনেক উপকার হবে।”

    মনোভাব আমি গোপন কোরে রাখতে পাল্লেম না। পত্রের কথা গোপন কোরে সাদাকথায় কেবল এইটুকু বোল্লেম, “মোহনলালবাবুকে আমি চিনি। কাশীতে আসবার পূর্ব্বে আমার বাল্যজীবনে যে যে ঘটনা হয়েছিল, আপনার অনুগ্রহপ্রাপ্তির সময় যে সব কথা অতি সংক্ষেপে আপনাকে আমি বোলেছি, সে সব কথা বোধ হয়, আপনার স্মরণ থাকতে পারে। বর্দ্ধমানে একটা জুয়াচোরের হাত থেকে পরিত্রাণ পেয়ে, যে বাড়ীতে আমি আশ্রয় প্রাপ্ত হই, সে বাড়ীর কর্ত্তার নাম আপনাকে আমি বলি নাই; সেই কৰ্ত্তার একটী জামাই আছেন, তিনি অপব্যয় করেন, দফায় দফায় শ্বশুরের কাছে টাকা চান, সে সব কথা বোলেছি, জামাইবাবুটীরও নাম করি নাই। সেই জামাই ঐ মোহনবাবু। সেই বাড়ীতেই মোহনবাবুর সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাৎ হয়েছিল, তার পরেও একবার পথের চটীতে দেখা হয়েছিল; অনেকপ্রকার কথা হয়েছিল। তিনিও আমাকে জানেন, আমিও তাঁকে চিনি।

    প্রফুল্লবদনে বড়বাবু বোল্লেন, “তবে তো আরো ভালই হলো। পূর্ব্বে জানাশুনা আছে, তার উপর আমার অনুরোধ হবে, পরিচয়টা পাকা হয়ে দাঁড়াবে। তিনি আমার বন্ধুলোক, বড়মানুষ, তুমিও সুশীল, সচ্চরিত্র, ঘনিষ্ঠতা হোলে তুমি তাঁর প্রসন্নতা লাভ কোত্তে পারবে, সকল দিকে ভালই হবে।”

    ভয়, সন্দেহ, ঘৃণা, এই তিন একত্র হয়ে আমার চিত্তকে তখন অত্যন্ত আকুল কোরে তুল্লে; বড়বাবুর কথাগুলি শুনলেম, কিন্তু কোন উত্তর দিলেম না। মন যেন আমারে বোল্লে, “মোহনবাবু ভয়ানক লোক, তাঁর সঙ্গে বেশী ঘনিষ্ঠতা কোরো না, ভাল হবে না। মনের উপদেশে বড়বাবুর আহ্লাদের কথায় উত্তরদান কোত্তে আমি সঙ্কুচিত হোলেম।

    শনিবার রাত্রে এই পর্য্যন্ত আমাদের নির্জ্জন কথোপকথন। প্রকাশযোগ্য অন্য কোন নূতন ঘটনা সে রাত্রে সঙ্ঘটিত হয় নাই।

    রবিবার বৈকাল। বড়বাবু যেমন বন্ধুর বাড়ী যান, সেইরূপে বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলেন, যজ্ঞেশ্বর আমার কাছে এলো। চেয়ে দেখলেম, যজ্ঞেশ্বরের মুখে মৃদু মৃদু হাস্য খেলা কোচ্ছে, আমিও মৃদু মৃদু হাস্য কোল্লেম। যজ্ঞেশ্বর বোল্পে, “সব ঠিক; প্রস্তুত হও; বিলম্ব করা হবে না, সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসতে হবে।”

    প্রস্তুতই আমি ছিলেম, বৈঠকখানার দরজা বন্ধ কোরে যজ্ঞেশ্বরের সঙ্গে আমি বাড়ী থেকে বেরুলেম। কোথায় যাচ্ছি, কেহ কিছু জানতে পাল্লে না। ছোট ছোট গলী পার হয়ে যজ্ঞেশ্বর আমাকে একটা পল্লীর দিকে নিয়ে চোল্লো। সে পল্লীতে পূর্ব্বে একদিনও আমি যাই নাই। দিবাশেষে বসন্তের শীতল বাতাস ধীরে ধীরে প্রবাহিত হোচ্ছিল, বায়ুস্পর্শে আমি সুখানুভব কোচ্ছি, পল্লীর দুই ধারে নূতন নূতন দৃশ্য দর্শন কোচ্ছি, নয়ন পুলকিত হোচ্ছে। নূতন দৃশ্যাবলীর মধ্যে এক দৃশ্য আমার চক্ষে খুব নৃতন।

    সারি সারি দোতালা বাড়ী, রাস্তার দিকে বারান্দা; সুসজ্জিতা সুন্দরী সুন্দরী অনেকগুলি কামিনী সেই সকল বারান্দা আলো কোরে বোসে আছে; বারান্দায় এক একখানি চৌকি পাতা, চৌকির উপর গদীপাতা বিছানা, গদীর উপর তাকিয়া, তাকিয়ার কোলে কামিনী। পার্শ্বে দীর্ঘ দীর্ঘ নলশোভিত রূপার আলবোলা। কামিনীরা পেশোয়াজ পরা, বক্ষে কাঁচুলি, কারো কারো বিচিত্র আস্তিনযুক্ত আংরাখা, তার উপর বিচিত্রবর্ণের ওড়না, জামার উপর উজ্জ্বল উজ্জ্বল অলঙ্কার, নাসিকায় মুক্তার নোলক দোদুল্যমান, কর্ণে বিবিধকার কর্ণভূষা, কপালে সিঁথির সঙ্গে গাঁথা সোণার ঝাঁপা, কোলে কোলে মুক্তার ঝালোর, মস্তকের কেশপাশ ললাটের অর্দ্ধাংশ পর্য্যন্ত পেটেপাড়া, পৃষ্ঠভাগে বৃহৎ চক্রাকার খোঁপাবাঁধা, এক একটী কবরী মনোহর পুষ্পমাল্য বিজড়িত; নয়নে অঞ্জন, ওষ্ঠে মিসি, হস্তে আতরমাখা এক একখান রুমাল, আলতাপরা পায়ে মোটা মোটা গোল মল; অপরুপ খোলতা। অধিকাংশই হিন্দুস্থানী, কতক কতক বাঙ্গালী, বসন-ভূষণে শীঘ্র প্রভেদ করা যায় না। সকলেই হিন্দুস্থানী বেশভূষা, সকলেরই একপ্রকারে কেশবিন্যাস; চমৎকার শোভা! বর্ণ বিবিধ;—কতক গৌরাঙ্গী, কতক শ্যামাঙ্গী, কতক কৃষ্ণাঙ্গী। যেগুলি গৌরাঙ্গী, সেগুলিকে যেন চিত্রকরা পরীবালা অথবা সুরবালা বোলে ভ্রম হয়। যজ্ঞেশ্বরকে জিজ্ঞাসা কোরে পরিচয় পেলেম, ঐ সকল বিলাসিনী কামিনীদের সাধারণ উপাধি বাইজী। হিন্দুস্থানীও বাইজী, বাঙ্গালীও বাইজী; কেবল উপাধিতে বাইজী নহে, সকলেই সুনিপুণা নৰ্ত্তকী। বাইজীরা সৰ্ব্বপ্রকার যন্ত্রসঙ্গীতে ও কণ্ঠসঙ্গীতে সুশিক্ষিতা। এ মহলে যবনী বারাঙ্গনারা স্থান পায় না; সিক্রোলের পথে যবনী গণিকাদের একচেটে বাহার। তারাও নৃত্য-গীত-বাদ্যে যশস্বিনী।

    সিক্রোলের দিকে আমরা গেলেম না। হিন্দুস্থানী বাইমহলের একপ্রান্তে একটী শিবালয়; মন্দিরের ধারে খানিক দূর পর্য্যন্ত সরু সরু রেল দেওয়া;; রেলের ভিতর দরোয়ানের ঘরের ন্যায় একটী ক্ষুদ্র কক্ষ, সেই কক্ষমধ্যে আমরা প্রবেশ কোল্লেম। সেই বুড়ী; যার সঙ্গে সাক্ষাৎ কোত্তে আমার যাওয়া, সেই কক্ষে সেই বুড়ী মৌনভাবে উপবিষ্টা। নিকটে উপবিষ্ট হয়ে, বুড়ীর দুহাতে দুটী টাকা দিলেম, মুখপানে চেয়ে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “তুমি কি আমাকে চিনতে পাচ্ছে?”—সটান আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে, বুড়ী একটু ইতস্ততঃ কোরে বোল্লে, “চিনতে?—তোমাকে?—আমি?—হ্যাঁ হ্যাঁ, চিনেচি বটে! সেই বাড়ীতেই বুঝি তুমি থাকো? একদিন তুমি ছাতে উঠেছিলে, আমি তোমাকে দেখেছিলেম।”

    কথা ঘুরিয়ে আবার আমি প্রশ্ন কোল্লেম, “এখানে একদিন দেখেছে, পূর্ব্বে আর কোথাও আমাকে দেখেছ কি না, মনে হয়?”

    আবার আমার মুখপানে তাকিয়ে তাকিয়ে, কি যেন পূর্ব্বকথা স্মরণ কোরে, ঘাড় নেড়ে নেড়ে, গুঞ্জনস্বরে বুড়ী উত্তর কোল্লে, “হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক ঠিক, মনে পোড়েচে; কলিকাতায় দেখেচি। তুমি বুঝি সেই হরিদাস? তুমি বুঝি জোড়াসাঁকো-পাড়ার প্রতাপবাবুদের বাড়ীতে থাকতে? এখানে কবে এসেচো?”

    একটু হেসে আমি বোল্লেম, “হ্যাঁ গো কামিনীর মা, আমিই সেই হরিদাস, তিনমাস হলো কাশীতে এসেছি। তোমাকে আজ আমি একটী কথা জিজ্ঞাসা কোত্তে চাই। ঠিক ঠিক উত্তর দিও, ভয় নাই কিছু, কারো কাছে কোন কথা প্রকাশ হবে না, নির্ভয়ে তুমি সত্যকথা বল। সেই সুন্দরী মেয়েটী সেই বাড়ীর ছাদে রুমাল হাতে কোরে বেড়াচ্ছিল, সে মেয়েটী কে?”—শঙ্কিত-সন্দিগ্ধ নয়নে বুড়ী তখন যজ্ঞেশ্বরের দিকে চাইলে। মনের ভাব বুঝতে পেরে, যজ্ঞেশ্বরকে আমি একবার বাইরে যেতে বোল্লেম। ঘর থেকে যজ্ঞেশ্বর বেরিয়ে গেল। আবার আমি প্রশ্ন কোল্লেম, “সে মেয়েটী কে?”

    হাতে টাকা পেয়েছিল, মনে উল্লাস হয়েছিল, আমিও ছেলেমানুষ, লজ্জা অকারণ, বুড়ী তখন চুপি চুপি বোল্লে, “কেন?—তুমি কি তারে জানো না? আমার মনিববাড়ীতে কতবার তুমি গিয়েচো এসেচো, তারে কি তুমি দেখ নাই? বাবুর ছোটমেয়ে,—সৌদামিনী। সৌদামিনীকে তুমি কি সে বাড়ীতে দেখ নাই?”

    আমি সুযোগ পেলেম। আসলকথা বেরিয়ে পোড়েছে। সৌদামিনীকে চিনি আর না-ই চিনি, নাম শুনা ছিল, চেনা-অচেনা আমার দরকার ছিল না, যেটা আমার মনের কথা, সেইটী জানাই দরকার, তৎক্ষণাৎ আমি উত্তর কোল্লেম, “সে বাড়ীর অন্দরে তো আমি যেতেম না, মেয়েদের চিনে রাখবো কিরূপে? আচ্ছা, কামিনীর মা, সৌদামিনী এখানে কার সঙ্গে এসেছে? কর্ত্তাবাবু এসেছেন কি?”

    একটু যেন কেঁপে কেঁপে কম্পিতকণ্ঠে কামিনীর মা বোল্লে, “সে কথা আমি বোলতে পারবো না, সে কথা তুমি কেন জিজ্ঞাসা কর?”

    আমি। আমার দরকার আছে। আরো দুটী টাকা আমি তোমাকে দিচ্ছি, সত্য বল, কার সঙ্গে তোমরা এসেছ?

    কামি।—(টাকা গ্রহণ করিয়া) জয়হরিবাবুর সঙ্গে।

    আমি।—জয়হরিবাবু কে?

    কামি।—তা আমি বোলবো না।

    আমি।—কেন বোলবে না? ভয় কি? তীর্থে এসেছো, এখানে মিথ্যাকথা বোলতে নাই, সত্যকথা বল। সত্যকথায় দোষ কি?

    কামি।—আবার তুমি কোলকেতায় যাবে, বাবুদের সঙ্গে দেখা হবে, ছেলেবুদ্ধিতে গল্প কোরবে, আমার চাকরী থাকবে না। বুড়বয়েসে আমি কোথায় যাবো?

    আমি।—চাকরীর ভাবনা কি? আমি তোমাকে চাকরী দিব। চাকরী কোত্তে না হয়, তারো উপায় কোরে দিতে পারবো; তুমি সত্যকথা কও। জয়হরিবাবু কে?

    কামি।—দেখো বাছা, যেন প্রকাশ হয় না, আমার মাথাটী যেন খেয়ো না; জয়হরিবাবু সেই পাড়ার একটী লোক; বেণের ছেলে, বাপের অনেক টাকা আছে, সাধ কোত্তে তীর্থদর্শনে এসেছে।

    আমি।—বেণের ছেলের সঙ্গে সৌদামিনী কেন এলো? ব্রাহ্মণের ঘরের যুবতী মেয়ে কি বেণের ছেলের সঙ্গে তীর্থে আসে?

    কামি।—এই আমার মাথা খেলে! অতো কথা আমি বোলতে পারবো না।

    আমি।—বোলতেই হবে। যদি না বল, তবে আমি আজ বিশ্বেশ্বরবাবুর নামে চিঠি লিখে সব কথা জানাবো; ঢাকে কাঠী পোড়ে যাবে!

    কামি।—(অপোবদনে নীরব)।

    আমি।—আচ্ছা, কামিনীর মা, সে কথা এখন থাক, আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। সেই যে সন্ন্যাসীটা তোমাদের বাড়ীতে কাটা পোড়েছিল, সেই যে যার নাম রমাই-সন্ন্যাসী, সেই সন্ন্যাসীটাকে খুন কোরেছে কে?

    কামি। (সভয়ে) আমি তার কি জানি? আমি চাকরাণী, ঘরসংসারের কাজকৰ্ম্ম করি, খুনোখুনির খবর আমি কি কোরে জানবো? অতগুলো পুলিশের লোক এলো, তারা কিছু কিনারা কোত্তে পাল্লে না, আমি কেমন কোরে জানবো?

    আমি।— কেমন কোরে জানবে?— বোলবো? বলি? বলি তবে?—ও কামিনীর মা! তুমি বুঝি মনে কোচ্ছো, কিছুই আমি জানি না? খুনের পর তুমি আমাদের বাড়ীতে গিয়ে গিন্নীর কাছে যে সব কথা বলে এসেছে, তার অর্দ্ধেক কথা আমি শুনেছি। যখন তুমি বল, আমি তখন পাশের ঘরের দরজার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেম, তোমরা আমাকে দেখতে পাও নাই, তোমার অনেক কথা আমি শুনেছি। এখন গোপন কোল্লে চোলবে না; মিথ্যা ঢাকবে না; সত্যকথা বল। সত্যের বিনাশ নাই;—মিথ্যা বোল্লেই বিপদ হবে! বল, কে খুন কোরেছে?

    অনেক তত্ত্ব আমি জানতে পেরেছি, অনেক কথা আমি শুনেছি, তাই শুনে কামিনীর মা যেন একটু ভয় পেলে; ভয়ের সঙ্গে যেন কিছু বিস্ময়ভাব, সেটাও আমি বুঝতে পাল্লেম। হেঁটমুখে মাথা চুলকে চুলকে বুড়ী তখন বোলতে লাগলো, “ও বাবা! এই একরত্তি ছেলে তুমি, তোমার ফিকিরফন্দী এতো? এতো বুদ্ধি তুমি ধরো? লুকিয়ে লুকিয়ে গেরস্থবাড়ীর মেয়েদের কথা তুমি শোনো। ও বাবা! সাবাস ছেলে তুমি?”

    অধিকক্ষণ ধৈর্য্য রাখতে না পেরে, চঞ্চলস্বরে আমি বোল্লেম, “তোমার মুখে আমি সাবাসি শুনতে চাই না! বুদ্ধির দৌড়, ফিকিরফন্দী, এ সকল কথাও তোমার মুখে শোনবার ইচ্ছা নাই; যে কথাটা জিজ্ঞাসা কোচ্ছি, বাজেকথা ছেড়ে দিয়ে সেই কথারই উত্তর দাও;—সন্ন্যাসীকে খুন কোরেছে কে?”

    কামিনীর মা তখন ভেবে চিন্তে, গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে, আমতা আমতা কোরে বোলতে লাগলো, “তা—তা—তা—শুনেছ যখন, তখন আর—তা—বোলো বাছা কারু কাছে,—বোলবো কি, সৌদামিনীর স্বভাব ভাল নয়। সন্নিসীর সঙ্গে—”

    এই পর্য্যন্ত বোলতে বোলতে বুড়ীটা থেমে গেল। আমি বিরক্ত হোলেম। রাগ প্রকাশ কোত্তেও পারি না, রাগের সময় নয়, রাগ কোল্লে কাজ হবে না, তথাচ একটু উগ্রস্বরে বোল্লেম, “তাতে আমি কি বুঝবো? আমি জিজ্ঞাসা কোচ্ছি, সন্ন্যাসীকে খুন কোরেছে কে? তুমি আরম্ভ কোল্লে, সন্ন্যাসীর সঙ্গে সৌদামিনী! ওটা তো একরকম বাজেকথা। ও কথায় আমি কি বুঝবো? যেটা কাজের কথা, যেটা আসলকথা, সেইটে আমি শুনতে চাই, সেই কথাই বল।”

    আবার মাথা চুলকে চুলকে একটু থেমে থেমে বুড়ী আরম্ভ কোল্লে, “সেই কথাই তো বোলচি। সৌদামিনীর স্বভাব ভাল নয়; সন্নিসীর সঙ্গে সৌদামিনীর গলা গলা ভাব হয়েছিল; সন্নিসী তারে ছেলে হবার ওষুধ দেবে, ভাতার-সোয়াগী কোরে দেবে, এই রকম লোভ দেখায়; যাগ-যজ্ঞি কোরে দেবে, মাদুলী পরাবে, এই রকম অনেক কথা বলে; রেতের বেলায় যাগ-যজ্ঞিও আরম্ভ হয়।”

    আমি।— তা তো হয়, তা তো শুনেছি; ছেলেকরা সন্ন্যাসীরা যুবতী মেয়েদের কাছে ঐ ভাবের নানা কথা বলে, তা আমি জানি; তার ভিতর খুনোখুনি কাণ্ড কেন এলো? সৌদামিনীই কি তবে সেই সন্ন্যাসীকে কেটে ফেলেছে?

    কামি।—(দন্তে রসনা কর্ত্তন করিয়া) ও মা! এ কি কথা গো! না না, সৌদামিনী কাটবে কেন? আর একজন। সেই—

    আমি।—বল, বল, থামো কেন? আর একজন কি? কে সে আর একজন?

    কামি।—ও বাবা! তাও বোলতে হবে?

    আমি।—তাই তো আমি শুনতে চাই। খুনের তদারকের দিন থেকে সেই রকম সন্দেহই আমার মনে মনে গাঁথা রয়েছে। কে সেই আর একজন?

    কামি।—আর একজন সেই রাত্রে অন্ধকারে সৌদামিনীর ঘরের ভিতরে আসে। রাতে আমার ভালরকম ঘুম হয় না, পাঁচ সাত বছর আমি প্রায় অর্দ্ধেক রাত জেগে কাটাই; একটা লোক এলো, আমি জানতে পাল্লেম; সন্নিসী যেখানে যজ্ঞি কোত্তে বোসেছিল, সৌদামিনী সেইখানে ছিল; সেখানে আলো ছিল; যে লোক এলো, চুপি চুপি ঘর থেকে বেরিয়ে, সেই লোকটা একখানা বটী হাতে কোরে তাদের দুজনের পেছনে এসে দাঁড়ালো; তখন আমি তারে চিনতে পাল্লেম। একটু পরেই সন্নিসীর গলায় এক কোপ! রক্তগঙ্গা! সৌদামিনী অকস্মাৎ ভয় পেয়ে একবার চেঁচিয়ে উঠেছিল, লোকটার দিকে মুখ ফিরিয়ে তখনি আবার থেমে গেল; কাঁপতে লাগলো। লোকটী কিন্তু সেখানে আর দাঁড়ালো না, রক্তমাখা বটীখানা ফেলে রেখে দেখতে দেখতে ছুটে পালালো।

    আমি।—ও কামিনীর মা! ফিকিরফন্দীর কথা তুলে তুমি আমারে সাবাসি দিচ্ছেলে, তুমি যে দেখছি, ফিকিরফন্দীতে তোমার মাথার চুলের চেয়েও বেশী পাকা! চুলগলি ছোট ছোট মল্লিকাফুলের মতন ধপধপে সাদা হয়ে গিয়েছে, ফন্দী-ফিকিরের বুদ্ধিটুকু তার চেয়েও বেশী পেকে-জবাফুলের মতন লাল হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন এড়াবার ফিকির তুমি বেশ জানো! কিন্তু কামিনীর মা! মনে রেখো, বজ্ৰবাঁধনে ফস্কা গেরো! নাচতেছ ভালো, পাক দিচ্ছ এলো এলো! যতই ফিকির খাটাও, আমাকে তুমি ভুলাতে পারবে না। বোলছো সব কথা, আসলনামটা চেপে চেপে যাচ্ছো। ‘আর একজন, একটী লোক, সেই লোকটী’ এই রকম ছাঁটা ছাঁটা ছাড়া ছাড়া কথা ‘রাত্রে তোমার ঘুম হয় না, দিনের বেলা হয়!’ এইমাত্র ঘুমের ঘোরে একেবারে বোলে ফেলেছ, লোকটাকে তুমি চিনতে পেরেছিলে। তবে আর ঢাক ঢাক গুড় গুড় কেন রাখো দিদি! নামটা বোলে ফেলো! আমিও নিশ্চিন্ত হই, তুমিও বাঁচো!—বলে ফেলো!

    আর কামিনীর মা চেপে রাখতে পাল্লে না; নিজের কথাতেই নিজেই ধরা পোড়লে; সামলাতে না পেরে শেষকালে বোলে ফেল্লে, “সব কথাই যখন বোলেছি, তখন আর ঢাক ঢাক গুড় গুড় কি? কে সেই লোক, এত কথা শুনে তা কি তুমি বুঝতে পারি নি? পোড়াকপালী সৌদামিনী যার সঙ্গে কাশীতে এসেছে, সেই লোক!—আমাদের বাড়ীর পাশের বাড়ীর সেই জয়হরি বড়াল!”

    আমি চমকালেম না; বুড়ীর মুখে যখন শুনেছি, বাড়ীর লোকজন কেহই আসেন নাই, সৌদামিনী একটা বেণের ছেলের সঙ্গে কাশীদর্শনে এসেছে কিম্বা কাশীবাসিনী হোতে এসেছে, তখনি বুঝেছি, সেই বেণের ছেলেটাই সৌদামিনীর পরকালের কালভৈরব; তাই আমি বুড়ীর কথায় চমকালেম না; বেশ ঠাণ্ডা থেকেই বুড়ীকে আবার জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “জয়হরি বড়াল রাত্রিকালে কেমন কোরে গৃহস্থ ভদ্রলোকের অন্দরমহলে ঢুকেছিল? কোন পথ দিয়ে গিয়েছিল?”

    বুড়ী অম্লানবদনেই বোল্লে, “রোজ রাত্রে যাওয়া-আসা কোত্তো, পথ, ঘাট, অন্ধিসন্ধি সব তার জানা ছিল। বাড়ীর পাশেই তাদের বাড়ী, মাঝখানে ছোট গলী; বড় জোর তিনহাত তফাৎ; ছাতে ছাতে সমান, ছাতে ছাতে বড় একখানা তক্তা ফেলে পার হয়ে আসতে; সারারাত সৌদামিনীর ঘরে মদ খেতো, রঙ্গভঙ্গ কোত্তো, ভোরবেলা চোলে যেতো; আপনাদের ছাতে গিয়ে, সেই তত্তাখানা আর একদিকে সোরিয়ে রেখে দিতো। তক্তা তো তক্তা, কিসের তক্তা, তাদের বাড়ীর লোকেরা সেটা কিছু মনে কোত্তো না, সন্দেহও রাখতো না।”

    আমি।—ভাল, বুঝলেম। আচ্ছা, সৌদামিনীকে জয়হরি ভালবাসে, তা পথে যাওয়া-আসা কোতো, মন্দকথা নয়; সন্ন্যাসীটীকে কাটলে কেন? সৌদামিনীর মঙ্গলের জন্যই যজ্ঞ কোচ্ছিল, সৌদামিনীর ছেলে হবার সুবিধা হোচ্ছিল, জয়হরি তারে কেটে ফেল্লে কেন?

    কামি।—কেটে ফেল্পে গায়ের জ্বালায়!

    আমি।—কি রকম?

    কামি।—রকম ভাল। ছেলেমানুষ তুমি, সে সব রকমসকম কি বুঝবে? ছেলে হবার যজ্ঞি, জয়হরি সেটা ভাবলে না; জয়হরি মনে কোল্লে, ছেলে করবার জন্যই হয় তো যজ্ঞি হোচ্চে, অম্নি গায়ের জ্বালা ধোরে গেল, সেই জ্বালাতেই বটীর কোপ!

    আমি।—সম্ভব বটে। আচ্ছা, সৌদামিনী কাশী এলো, কৰ্ত্তা কিছুই বোল্লেন না?

    কামি।—পালিয়ে এসেছে। সন্নিসীখুন, রোজ রোজ বাড়ীতে পুলিশের লোকের আমদানী, পাড়ার লোকেরাও নানা রকম হৈ চৈ লাগালে, জয়হরি সৌদামিনীকে মন্তন্না দিলে, রাত্তিরযোগে দুজনে পালিয়ে এসেছে।

    আমি।— তুমি তাদের সঙ্গে এলে কেন?

    কামি।—ছাড়লে না। সৌদামিনী যা যা কোত্তো, সব আমি জানতেম। জয়হরির সঙ্গেও যা, সন্নিসীর সঙ্গেও যা, সব আমি জানতেম; খুনটাও আমি দেখেছিলেম; সৌদামিনী তা জানতে পেরেছিল, সেইজন্য আমাকে শুদ্ধ সোরিয়ে ফেলা ইচ্ছা হলো। এই গেল এক কথা, আরো একটা ঘরোয়া কথা। ছেলেবেলা থেকে পোড়াকপালীকে আমি বড় ভালবাসতেম, পোড়াকপাল আমার, ঐ সব কাণ্ড-কারখানা দেখেও ভালবাসার মায়াটা কাটাতে পারি নি, পালাবার সময় সৰ্ব্বনাশী যখন আমার হাতে ধোরে কাঁদতে লাগলো, “তুই না গেলে আমি সেখানে থাকতে পারবো না, তোরে না দেখলে একমাসও আমি বাঁচবো না,” এই সব কথা যখন বোলতে লাগলো, তখন আর আমি মায়ার দায়ে কথা এড়াতে পাল্লেম না, কিছুতেই ওরা ছাড়লো না, কাজেই আসতে হলো।

    আমি।—আচ্ছা, সৌদামিনী আবার কি বাড়ী ফিরে যাবে?

    কামি।—মরণ দশা! আর কি ফিরে যেতে পারে? কোন লজ্জায় আবার লোকের কাছে ঐ কালামুখ দেখাবে? আর যাবে না। যে কদিন বাঁচে, এইখানেই থাকবে।

    আমি।—আচ্ছা, সৌদামিনী এখানে জয়হরির সঙ্গে কি সম্পর্কে আছে? লোকের কাছে কি রকম পরিচয় দেয়?

    কামি।—বিয়েকরা সোয়ামী।

    আমি।—উত্তম পরিচয়! সোয়ামীকে ঘরে রেখে সৌদামিনী আবার কুমারী সেজে অন্য বাড়ীতে পূজাভোগের নিমন্ত্রণেও যায়! কাশীধামের মাহাত্ম বেশ! আচ্ছা কামিনীর মা, তুমি কি চিরদিন ওদের কাছেই থাকবে?

    কামি।—না থেকে আর কোথায় যাবো? আমার কেউ নেই, কোথাও যাবার জায়গাও নাই। যে কদিন বাঁচি, ওদের কাছেই থাকবো, যা করেন বাবা বিশ্বেশ্বর।

    আমি।—আচ্ছা কামিনীর মা, আমি যদি তোমারে কোন ভাল জায়গায় রেখে দিতে পারি, সেখানে তুমি যেতে রাজী আছ? বৃদ্ধবয়সে পাপের সংসর্গে আর কেন থাকবে? পাপের অন্ন কেন খাবে? কি বল?

    কামি—আঃ! তা হোলে তো বেঁচে যাই! প্রাতঃপাক্কে চিরজীবী হও, রাজা হও, কোথায় তুমি আমারে নিয়ে যেতে চাও?

    আমি।—নিয়ে যেতে চাই না কোথাও, কাশীতেই থাকতে পাবে, ভদ্রলোকের বাড়ীতেই থাকবে, কিছুই কষ্ট হবে না। যে বাড়ীতে আমি আছি, সেই বাড়ীতেই রাখতে পাত্তেম, কিন্তু সৌদামিনী জানতে পারবে; সে বাড়ীতে রাখা হোতে পারে না। সে বাড়ীর বড়বাবুর সঙ্গে কাশীর অনেক বড় বড় লোকের আলাপ, তাঁরে অনুরোধ কোরে তোমার জন্য আমি একটা উত্তম আশ্রয় ঠিক কোরে দিব।

    কামিনীর মা সম্মত হলো। আমিও শুনে সন্তুষ্ট হোলেম। ইতিমধ্যে আর একদিন অন্য কোন স্থানে তার সঙ্গে আমার দেখা হবে, সেই দিন সমস্ত বন্দোবস্ত ঠিকঠাক করা যাবে, এইরুপ স্থির হয়ে থাকলো।

    সন্ধ্যা হবার অতি অল্প বিলম্ব। কামিনীর মা বেরিয়ে গেল, আমিও যজ্ঞেশ্বরের সঙ্গে রাস্তায় বেরুলাম। সে সময় পূৰ্ব্বকথিত বাইজীগুলির আরো অধিক নয়নমোহিনী শোভা। এক এক বারান্দায় সেতার-বেহালাযোগে সমধুরকণ্ঠে সুরলহরী হিল্লোলিত হোচ্ছি, শ্রবণে শ্রবণ-মন বিমুগ্ধ হয়, অল্পক্ষণ একপাশে দাঁড়িয়ে একটী গীতের অর্দ্ধেকটুকু আমি শুনলেম, শেষ পর্য্যন্ত শোনবার অবকাশ হলো না। বড়বাবু সন্ধ্যার পরেই ফিরে আসেন, সন্ধ্যার পূর্ব্বেই বাড়ী যাওয়া আবশ্যক, সঙ্গীতশ্রবণের আশাকে মনোমধ্যে গুপ্ত রেখে যজ্ঞেশ্বরের সঙ্গে আমি বাড়ীর দিকে চোলে এলেম।

    বস! এই পর্য্যন্ত আমার সে দিনের দৌত্যকাৰ্য্য সমাধান। পাঠকমহাশয় জিজ্ঞাসা কোত্তে পারেন, দৌত্যকাৰ্য্য সমাধা কোল্লেম, আমি কাহার দূত?— কোন মনুষের দূত আমি নই, এ ক্ষেত্রে এ কার্য্যে আমি ধর্ম্মদেবের দূত।

    এ দৌত্যকার্য্যের পরিণাম কি হবে? আমিও তাই ভাবছি। অজ্ঞাত খুনের আসামীটা কে, সন্ধানটী জানা হলো, কি উপলক্ষে কি রকমে খুন, সেটাও একপ্রকার জানা হলো, তার পর? মনে মনে ভাবলেম, তার পর আমি কি কোরবো? পুলিশে সংবাদ দিয়ে আসামীকে ধরিয়ে দেওয়া, তাই বা কি প্রকারে হয়? সাক্ষী কোথায়? সাক্ষীর মধ্যে একটা স্ত্রীলোক আবার সামান্য চাকরাণীমাত্র; একটা চাকরাণীর সাক্ষ্যবাক্যে একটা লোকের প্রাণ যাওয়া বিচারকেরও বিবেচনায় কখনও যুক্তিযুক্ত বোধ হবে না। আরো একটা সন্দেহ আছে। কামিনীর মা আমার কাছে যে সব কথা বোল্লে, জজের কাছে সেই সব কথা বোলবে কি না? না বলাই অধিক সম্ভব। সংবাদ দিয়ে আমিই তখন ফ্যাসাদে পোড়বো। সন্ন্যাসী আমার কেউ ছিল না, জয়হরিও আমার শত্রু নয়, জয়হরির ফাঁসী হোলে রমাই সন্ন্যাসী বেঁচে উঠবে না, কাজ কি তবে বৃথা ফ্যাঁসাদ ডেকে আনা? বড় বড় বদমাসলোককে শাস্তি দেওয়া ধর্ম্মানুসারে কর্ত্তব্য বটে, কিন্তু ইংরেজী আইনের কূট-চক্রের গতি যে প্রকার, সে গতিতে একাধিক প্রত্যক্ষ সাক্ষীর মুখে ঠিকঠিক প্রমাণ না হলে সত্য অপরাধীরাও বেকার খালাস পায়, উলটে আবার সত্যসংবাদদাতার বিপদ পড়ে। দূর হোক, এখন আর সে উৎপাতে কাজ নাই। এর পর যদি অন্য কোন সূত্র প্রকাশ পায়, তখনকার কর্ত্তব্য তখন স্থির করা যাবে। এইরূপ স্থির কোরে মনের ভাব মনেই চেপে রাখলেম, যজ্ঞেশ্বরকেও কিছু জানতে দিলেম না।

    ঠিক সন্ধ্যার সময় আমরা বাড়ীতে পৌঁছিলেম, বড়বাবু তখনো ফিরে আসেন নি। মেজোবাবু পৃথক হবেন, যাতে কোরে সেই অপ্রিয় ঘটনা না ঘটে, সেই বিষয়ের উপায়নির্দ্ধারণের জন্য মধ্যস্থ নির্ব্বাচনে তিনি ব্যস্ত, ফিরে আসতে রাত্রি প্রায় দশটা বেজে গেল। সে রাত্রে তাঁর সঙ্গে আমার আর অন্য কথা কিছুই হলো না।

    সেই সপ্তাহের শুক্রবার সন্ধ্যার পর আমাদের বাড়ীর দরজার সম্মুখে একখানা গাড়ী লাগলো; একটী ভদ্রলোক সেই গাড়ী থেকে নেমে সরাসর বৈঠকখানায় উঠে এলেন। সম্মুখেই আমি ছিলেম, দেখেই চিনলেম, মোহনলালবাবু। আমারে সেইখানে দেখে, বিস্ময় প্রকাশ কোরে তিনি জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “হরিদাস! তুমি এখানে?” নম্রভাবে আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা হাঁ, এই বাড়ীতেই আমি আছি, বড়বাবু যথেষ্ট স্নেহ করেন, এখানকার আদালতে তিনি আমার একটী চাকরী কোরে দিয়েছেন, কুড়িটাকা বেতন হয়েছে, এখানে আমি বেশ আছি।”

    আমার কথাগুলি শুনে মোহনবাবু একটু আহ্লাদ প্রকাশ কোরে বোল্লেন, “বেশ হয়েছে! শুনে আমি তুষ্ট হোলেম। রমেন্দ্রবাবু আমার পরম বন্ধু, তোমার জন্য তাঁকে আমি বিশেষ কোরে বোলে দিব। এইখানেই তুমি থাকো, ছেলেবুদ্ধিতে আর কোথাও চোলে যেয়ো না, থাকতে থাকতে আরো ভাল হবে।”

    আমি নমস্কার কোল্লেম। বড়বাবু তখন সেখানে ছিলেন না, একটু পরেই বাড়ীর ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন; এসেই মোহনবাবুকে দেখে প্রফুল্লবদনে কুশলবার্ত্তা জিজ্ঞাসা কোল্লেন, যথাসময়ে পত্র প্রাপ্ত হওয়া গিয়েছে, সে কথাও বোল্লন। আনুষঙ্গিক বিশ্রম্ভালাপে কিয়ৎক্ষণ অতিবাহিত হলো, তাঁরা উভয়ে পাশাপাশি হয়ে বোসলেন, আমি একটু তফাতে বোসে থাকলেম।

    মোহনলালবাবুর বদন বিষন্ন। প্রথমাবধি সেই বিষন্নতা আমি লক্ষ্য কোরেছিলেম, কারণ কিছু অনুভব কোত্তে পারি নাই। মুখপানে চেয়ে বড়বাবু তাঁরে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, আপনাকে এমন চিন্তাযুক্ত দেখছি কেন? এ রকম বিমর্ষভাব কখন তো দেখি নাই? সৰ্ব্বক্ষণ হাসিখুসী, সৰ্ব্বক্ষণ প্রসন্নতা, সৰ্ব্বক্ষণ আমোদ-আহ্লাদ, আজ কেন এমন ম্রিয়মাণ? হয়েছে কি? শরীরে কি কোন অসুখ আছে?”

    অম্লানবদনে মোহনবাবু উত্তর কোল্লেন, “আমার নিজের শরীরে কোন অসুখে হয় নাই, আমার পরিবারটী অত্যন্ত পীড়িত। আজ তিনদিন হলো, আমরা কাশীতে এসেছি, এসে অবধি তিনি শয্যাগত; ভয়ানক জ্বর; ঘোর বিকার সেই জন্য এই তিনদিন আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ কোত্তে পারি নাই, আজ একটু ভাল আছেন, চিকিৎসকেরা বোলছেন, এই রূপ যদি থাকে, আর কোন উপসর্গ না হয়, তা হলে আরাম হোতে পারেন; তথাপি একুশ দিনের কমে সম্পূর্ণ ভরসা করা যায় না।

    বড়বাবু দুঃখ প্রকাশ কোল্লেন, আরাম হবেন বোলে প্রবোধ দিলেন; মোহনবাবু নিশ্বাসত্যাগ কোল্লেন। মোহনবাবুর নূতন বিবাহের কথা বড়বাবু জানতেন না, মোহনবাবুও ভাঙলেন না, আমি কিন্তু বুঝতে পাল্লেম, নূতন পরিবার। আমার চিত্ত বিচলিত হলো, আহা! আহা! অমরকুমারীর শক্ত পীড়া! ভয়ঙ্কর জ্বর-বিকার! আমার একবার দেখা করা অবশ্য কর্ত্তব্য। এরূপ আমি ভাবলেম, কিন্তু উপযাচক হয়ে মোহনবাবুর কাছে সে ভাবটা ব্যক্ত কোত্তে পাল্লেম না। অমরকুমারী আমার কত বড় উপকারিণী, মোহনবাবু জানেন না, আমি যদি হঠাৎ তাঁর সাক্ষাতে বলি, আপনার পরিবারকে আমি দেখতে যাব, সেটা একটু দোষের কথা হয়; তাই ভেবেই কিছু বোলতে পাল্লেম না, প্রাণ কিন্তু ব্যাকুল হলো; আপন মনে ইতস্ততঃ কোত্তে লাগলেম।

    মানুষের মনের ব্যাকুলতা মানুষে বুঝতে পারে না, অন্তর্যামী জানতে পারেন। আমার প্রতি তখন অন্তর্যামী যেন সদয় হোলেন; আশা পূর্ণ হবার সুযোগ উপস্থিত হলো। বিদায়কালে মোহনলালবাবু আমার দিকে চেয়ে কি একটু চিন্তা কোরে বোল্লেন, “চল হরিদাস, তুমিও আমার সঙ্গে চল; যে বাড়ীতে আমি রয়েছি, সেই বাড়ীখানি দেখে আসবে, আবশ্যক হোলে একাকীও যেতে পারবে, আবশ্যক হবে, মাঝে মাঝে তোমাকে যেতে হবে, তাও আমি জানতে পাচ্ছি, চল।”

    মন আমার যা চায়, তাই আমি পেলেম; বড়বাবুর অনুমতি নিয়ে, পূৰ্ব্বকথিত শকটারোহণে মোহনবাবুর বাসাবাড়ীতে আমি গেলেম। যে ঘরে রোগী, সে ঘরে আমারে নিয়ে যেতে মোহনবাবু কোন প্রকার দ্বিধা রাখলেন না; ঘরে আগুন লাগার কথাটা তাঁর মনে ছিল, সেই কারণেই আমি অমরকুমারীর রুগ্ণ-শয্যাপার্শ্বে অবাধে যেতে পেলেম।

    অমরকুমারী শয্যাশায়িনী! পদতলে ধাত্রীরূপিণী একটী দাসী। অমরকুমারীর সেই পদ্মফুলের মত মুখখানি মলিন হয়ে গিয়েছে, স্থানে স্থানে যেন কালিমারেখা অঙ্কিত হয়েছে, সেই কুরঙ্গ-নেত্ৰ-দুটী যেন জলভরে ছলছল কোচ্ছে, পূরন্ত কপোলে চক্ষের কোল বোসে গিয়েছে, মুখখানি বিশুদ্ধ; পার্শ্বে উপবেশন কোরে, ললাটে করস্পর্শে জানলেম, গাত্রে বিষম উত্তাপ! খানিকক্ষণ মুখপানে চেয়ে চেয়ে, একটু হেঁট হয়ে, ধীরে ধীরে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “অমরকুমারি এখন তোমার কি রকম যাতনা হোচ্ছে?”

    দুই তিনবার জিজ্ঞাসা কোল্লেম, একটীও উত্তর পেলেম না। অমরকুমারীর চক্ষু যেন চিত্রিত চক্ষের ন্যায় আমার মুখের দিকে স্থির, মুখে কিন্তু কথা নাই; কোনদিন যে পরিচয় ছিল, সেই সুস্থির-নয়নে সে প্রকার কোন লক্ষণই অনুভূত হলো। পুনরায় কথা কইলেম, অমরকুমারী কথা কইলেন না। পুনরায় আমি তাঁর উত্তপ্ত ললাটে হস্তস্পর্শ কোল্লেম, ধীরে ধীরে একখানি হস্ত উত্তোলন কোরে অমরকুমারী আমার হাতখানি সোরিয়ে দিলেন, কেমন যেন উদাসীনভাবে মুখখানি অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন। আমি অপ্রতিভ হোলেম, প্রাণে কেমন বেদনা লাগলো। মনে কোল্লেম, মিথ্যা মায়ায় অমরকুমারী আমারে ভুলে গিয়েছেন। আগুনের মুখ থেকে যখন উদ্ধার করি, তখন চিনতে পারেন নাই, এখনও চিনতে পাল্লেন না। এই রকম ভাবছি, সেই সময় অমরকুমারী বামহস্তের অঙ্গলিগুলি অল্পে অল্পে সঞ্চালন কোরে, সঙ্কেতে আমারে সেখান থেকে উঠে যেতে বোল্লেন। নিতান্ত ক্ষুণ্ণমনে শয্যার উপর থেকে আমি নেমে এলেম। মোহনলালবাবু একটু দূরে একখানি চেয়ারে বসে ঐ সব কার্য্য দেখলেন, কিছুই বোল্লেন না। তার পর অন্য ঘরে নিয়ে গিয়ে তিনি আমারে কিছু জল খেতে দিলেন। আর আমার জলখাওয়া! অমরকুমারী আমারে চিনতে পাল্লেন না, বিষাদের বহ্নি হৃদয়ে প্রজ্বলিত, মোহনবাবুর মনস্তুষ্টির নিমিত্ত একখানি গজা মুখে দিয়ে, এক গ্লাস জল খেয়েই আমি উঠে পোড়লেম। রাত্রে সেইখানে থাকবার জন্য মোহনবাবু আমারে অনুরোধ কোল্লেন, বড়বাবু উদ্বিগ্ন হবেন, এইরুপ ওজর কোরে, সে অনুরোধে আমি উপেক্ষা কোল্লেম; কাজে কাজেই আর একখানা ভাড়াটে গাড়ী ডাকিয়ে এনে, গাড়োয়ানকে ঠিকানা বোলে দিয়ে, রাত্রি এক প্রহরের পর মোহনবাবু আমারে যথাস্থানে পাঠিয়ে দিলেন।

    আমার অপেক্ষায় বড়বাবু বাস্তবিক তখনো বৈঠকখানায় ছিলেন, বিমর্ষবদনে নিকটস্থ হয়ে তাঁরে আমি বোল্লেম, “সত্য সত্য মোহনবাবুর পরিবারের পীড়া বড় শক্ত! তিনদিনের মধ্যে স্বর্ণবর্ণ যেন কালী হয়ে গিয়েছে, চক্ষু বোসে গিয়েছে, চক্ষে ঝাপসা ধোরেছে, চাউনিও যেন ফ্যালফেলে! আহা! গতিক বড় ভাল বোধ হলো না! এত অল্পবয়সে—”

    শুনতে শুনতে অন্যমনস্কভাবে আমাকে থামিয়ে দিয়ে, সবিস্ময়ে বড়বাবু বোলে উঠলেন, “মোহনবাবুর সঙ্গে পূর্ব্বে কি তোমার দেখাশুনা ছিল? তাঁর পরিবারকে পূর্ব্বে কি তুমি দেখেছিলে? স্বর্ণবর্ণ, কালীবর্ণ, এত অল্পবয়সে, এ সব তোমার কি রকম কথা? মোহনবাবুর পরিবারের বর্ণ স্বর্ণবর্ণ নয়, তিনি শ্যামাঙ্গী, তাঁর বয়সও অল্প নয়, ত্রিশ বত্রিশ বৎসরের কম হবে না; তুমি এ সব নূতনকথা কোথা থেকে এনেছ?”

    তৎক্ষণাৎ আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা না, নূতনকথা নয়, সত্যকথাই আমি বোলছি। মোহনবাবুর বড় পরিবারটী সঙ্গে আসেন নাই, এটী নূতন পরিবার। বাবুর মুখেই আমি শুনেছি, তিনি দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ কোরেছেন; বীরভূমজেলায় নূতন পরিবারের পিত্রালয়। এ পরিবারটীর বয়েস অল্প, দিব্য গৌরাঙ্গী, চমৎকার সুন্দরী। মোহনবাবুর সঙ্গে আমার জানাশুনা আছে। প্রথম-দর্শন বর্দ্ধমানে, তার পর ভেলুয়াচটীতে। নূতন পরিবারটীকে সেই চটীতেই আমি দেখেছিলেম। আহা! অঙ্গে সবে যৌবনের অঙ্কুর, চমৎকার রূপ। বিশ্বেশ্বর করুন, আরাম হোন; সেটীর কিছু ভালমন্দ হোলে মোহনলালবাবুর প্রাণে বিষম আঘাত লাগবে!”

    বড়বাবু একটা দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ কোল্লেন; আকাশপানে চেয়ে মৃদুমন্দবচনে বল্লেন, “না না, অমঙ্গল আশঙ্কা কোত্তে নাই; অবশ্যই; আরাম হবেন। মোহনলালবাবু ধৰ্ম্মপরায়ণ, পরোপকারী, বন্ধুবৎসল, অমায়িক ভদ্রলোক; কখনো তিনি কারো কোন অনিষ্ট করেন নাই, তাঁর মন্দ কেন হবে? ধৰ্ম্মই ধার্ম্মিককে রক্ষা করেন; পরিবারটী অবশই আরাম হবেন। তাঁদের সঙ্গে তোমার জানাশুনা আছে, শুনে আমি সন্তুষ্ট হোলেম। তুমি তাঁদের মঙ্গল চাও, তাঁদের কষ্টে তুমি কাতর হও, এতো অল্পবয়সে এরূপ মহত্ত্ব তোমার, এ লক্ষণেও তোমার প্রতি আমি পরিতুষ্ট।”

    কথাগুলি শুনলেম, ভালমন্দ কিছুই বোল্লেম না। বড়বাবুর মুখের প্রশংসাগীত একপ্রকার, আমার প্রাণের নবসঙ্গীতের সুর অন্যপ্রকার। সে রাত্রে আহারান্তে যখন শয্যায় শয়ন কোল্লেম, তখন আমার হৃদয়তন্ত্রীতে সেই সুর বেজে উঠলো। মোহনবাবু ধার্ম্মিক, পরোপকারী, অমায়িক, কখনো তিনি কারো মন্দ করেন নাই, সে সুরের সঙ্গে আমার প্রাণের সুরের মিলন হলো না। কেন হলো না, সে হেতুবাদ সময়তরে প্রকাশ হবে, এখন আমার অন্যচিন্তা প্রবলা। অমরকুমারী বাঁচবেন না! বড়বাবুকে বোল্লম বিকারের লক্ষণ, চক্ষে ঝাপসা; সেই কথাই ঠিক। অগ্নিকাণ্ডের সময় আগুনভেল্কীতে আমারে চিনতে না পারা ততটা আশ্চর্য্যবোধ হয় নাই, এখন যে অমরকুমারী আমারে চিনতে পাল্লেন না, ইহাই বড় তাজ্জব ব্যাপার। বিছানার উপর পাশ ঘেঁসে বোসলেম, মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেলেম, স্পষ্ট স্পষ্ট কথা কোইলেম, তবু অমরকুমারী আমারে চিনলেন না! অমরকুমারী কি এতই নিষ্ঠুরা?—না—না—না, অমরকুমারীকে নিষ্ঠুরা মনে করাও আমার অকৃতজ্ঞতা! অমরকুমারী দয়ার প্রতিমা! অমরকুমারী আমার জীবনদায়িনী! সেই দয়াময়ী অমরকুমারী কখনই নিষ্ঠুরা হোতে পারেন না। বিকারের ধর্ম্ম। ঘোর-বিকারাচ্ছন্ন রোগীরা মানুষ চিনতে পারে না,—মাতাপিতা, পুত্রকন্যা প্রভৃতি স্বজনবর্গকেও চিনতে পারে না, আসন্নকালে এই লক্ষণ দেখা দেয়। চক্ষে জল পড়ে! অমরকুমারীর সেই লক্ষণ! অমরকুমারীর সেই অবস্থা! অমরকুমারীর আসন্নকাল! ঘোর বিকার। অমরকুমারী বাঁচবেন না! এই চিন্তায় সমস্ত রজনী আমি ছটফট কোল্লেম, একটীবারও চক্ষের পাতা বুজতে পাল্লেম না!

    প্রভাতে গাত্রোত্থান কোরে অগ্রেই আমি অমরকুমারীকে দেখতে গেলেম। তখনো সেই ভাব! অমরকুমারী আমারে চিনতে পাল্লেন না! চক্ষের জল মুছতে মুছতে আমি ফিরে এলেম। উপযুপরি তিনদিন সকাল বিকাল দুটী বেলা অমরকুমারীকে আমি দেখতে যাই, কেঁদে কেঁদে ফিরে আসি। দিন দিন বিকারের বৃদ্ধি! বড়বাবু নিত্য নিত্য সংবাদ লন, আমার মুখে অবস্থা শুনে শুনে অত্যন্ত কাতর হন, নিত্য নিত্য আমি অফিসে যাই, কাজকর্ম্ম করি, কিন্তু কাজের দিকে মন থাকে না। আফিসের লোকেরা বুঝতে পারে, বড় বাবুর নিজের লোক আমি, সেই জন্য কেহ কিছু বলে না।

    একদিন সন্ধ্যার পর বৈঠকখানায় কেবল আমি আর বড়বাবু। আমারে সৰ্ব্বক্ষণ অন্যমনস্ক দেখে, মোহনবাবুর পরিবারের জন্য আমি কতির, সেই ভাবটা বুঝতে পেরে, বড়বাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “হরিদাস। মোহনবাবুর বিপদে যে রকম কাতরতা তুমি দেখাও, তাতে কোরে বোধ হয়, তাঁদের সঙ্গে তোমার অতি নিকট-সম্বন্ধ। আচ্ছা, বল দেখি, কি সূত্রে মোহনবাবুর সঙ্গে তোমার মিলন হয়েছিল?”

    প্রকাশ কোরবো না, মনে কোরে রেখেছিলেম, কিন্তু সে সঙ্কল্প রক্ষা কোত্তে পাল্লেম না; বাবুর প্রশ্নে যখন সূত্র পর্য্যন্ত টান পোড়লো, তখন আর কি প্রকারে চেপে রাখি? পাল্লেম না; পাঁজী-পুথি খুলে সূত্ৰগ্ৰন্ধি শিথিল করবার মন্ত্র আওড়াতে বাধ্য হোলেম। প্রথমেই বোল্লেম, “বর্দ্ধমানে প্রথম দেখা। এই কাশীধামে আপনার সঙ্গে যেদিন আমার প্রথম সাক্ষাৎ, সেই দিন আমার বাল্যজীবনের ঘটনাবলীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়েছিলেম, সেই পরিচয়ের মধ্যে কতকগুলি গুহ্যকথা আমি গোপনে রেখেছিলেম; আজ আপনি সূত্র পরিজ্ঞাত হবার ইচ্ছা প্রকাশ কোল্লেন, তখন সেই গুপ্তকথাগুলি কাজেই আমারে প্রকাশ কোত্তে হলো। যদি কিছু অপ্রিয় বোধ হয়, দয়া কোরে আমার অপরাধ আপনি মার্জ্জনা কোরবেন। মোহনবাবুর গুণকীৰ্ত্তন করবার সময় সেদিন আপনি বোলেছেন, মোহনবাবু ধার্ম্মিক, অমায়িক, পরোপকারী ভদ্রলোক; হোতে পারে, কথায় বার্ত্তায় বন্ধুলোকের কাছে সে সকল গুণের পরিচয় তিনি দিতে পারেন, কিন্তু আমি যতদূর জানতে পাচ্ছি, সেই প্রমাণে বোলতে পারি, ব্যবহারে বিপরীত। পূর্ব্বে আপনারে আমি বোলেছি, বর্দ্ধমানে ঘোরবিপদে যিনি আমারে আশ্রয় দেন, তাঁর একটী জামাই আছেন; জামাইটী অত্যন্ত অপব্যয়ী, আমার আশ্রয়দাতা সেই জামাইকে সৎপথে আনবার জন্য স্বকৃত উইলে বিষয়ের অংশের কথা ব্যক্ত করেন, জামাই যদি ক্রমাগত বেশী টাকা নষ্ট করেন, উইলের ক্রোড়পত্রে তিনি সেগুলি বাদ দিয়ে যাবেন, এ কথাও বলেন, যে সিন্দুকে উইল ছিল, সেই জামাইকে সেই সিন্দুকটীও দেখান; কিছু দিন পরে একরাত্রে বিছানার উপর কর্ত্তা কাটা পড়েন। এ সব কথা আপনাকে বোলেছি, কিন্তু সেই জামাইটীর নাম বলি নাই। সেই জামাই এই মোহনবাবু। শ্বশুরের খুনের পর সেই উইলের পাঠ আমি নূতনরকম শ্রবণ করি। সেই বাড়ীতেই মোহনবাবুকে আমি চিনি। তাঁর শ্বশুরের মৃত্যুর পর তাঁরই কাছে আমি আশ্রয় চাই, সেই সময় একটা লোক আমার মামা সেজে গিয়ে মোহনবাবুর সম্মুখ থেকেই আমারে ধোরে নিয়ে যায়। সেই লোকের ডাকনাম রক্তদন্ত, আসল নাম জটাধর। লোকটা বড় ভয়ঙ্কর। শৈশবাবধি যত কষ্ট আমি পেয়েছি, এখন জানতে পেরেছি, সেই জটাধর ওরফে রক্তদন্তই সেই সকল কষ্টের মূল। রক্তদন্তের সঙ্গে মোহনবাবুর যোগাযোগ ছিল, সেটাও আমি এখন বুঝতে পেরেছি। মোহনলালবাবু ধার্ম্মিক, কি রকম ধার্ম্মিক?—নিরামিষাশী বক যেমন ধার্ম্মিক, হিতোপদেশের বিড়াল যেমন ধার্ম্মিক, স্বর্ণকঙ্কণহস্ত পঙ্কপতিত ব্যাঘ্র যেমন ধার্ম্মিক, আমার এখনকার বিশ্বাসে ঐ মোহনবাবুটীও সেইরকম ধার্ম্মিক!”

    দুই কর্ণে অঙ্গুলি দিয়ে বড়বাবু বলে উঠলেন, “এ কি হরিদাস, পাগলের মত এ সব কথা তুমি কি বোলছ? ওটা তোমার ভুলবিশ্বাস। মোহনলালবাবু যথার্থই ধার্ম্মিকলোক, আমি তার প্রমাণ পেয়েছি।”

    একটু উচ্চকণ্ঠে তৎক্ষণাৎ আমি বোলে উঠলেম, “আমিও বিশেষ প্রমাণ দিতে পারি। এই দেখুন!”—ত্বরিতস্বরে এই কটী কথা বোলেই আমি উঠে দাঁড়ালেম; একটা আলমারী খুলে, একখানা কেতাব বাহির কোরে নিয়ে বাবুর কাছে এসে বোসলেম। আদালতের সিঁড়িতে যে চিঠিখানা আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলেম, সেইখানা আর প্রয়াগ থেকে মোহনলালবাবু আমাদের বড়বাবুকে সম্প্রতি যে চিঠিখানা লিখেছেন, সেইখানা, ঐ দু-খানা চিঠিই আমি ঐ কেতাবের ভিতর যত্ন কোরে রেখে দিয়েছিলেম; বাহির কোরে দেখিয়ে সাগ্রহবচনে বোল্লেম, “দেখুন, এ দুখানা চিঠি এক হাতের লেখা কি না?”

    চিঠি দুখানা হাতে কোরে নিয়ে, অক্ষরগুলি মিলিয়ে মিলিয়ে ভাল কোরে দেখে বড়বাবু বোল্লেন, “হাঁ, এক হাতের লেখা; কিন্তু কি তা?”

    “কি তা?”—বিস্ফারিতনেত্রে বড়বাবুর মুখের দিকে চেয়ে তৎক্ষণাৎ আমি পুনরক্তি কোল্লেম, “কি তা? এই দেখুন, একখানাতে দস্তখৎ আছে, একখানার দস্তখৎ ছেঁড়া। দুখানাই মোহনবাবুর হাতের লেখা। ছোট চিঠিখানা তিনি জটাধরকে লিখেছিলেন। জটাধর আর আমার উপর কোন দৌরাত্ম্য না করে, ঐ চিঠিতে সেইরূপ উপদেশ। মোহনবাবুর উপদেশে জটাধর আমার উপর অশেষবিধ দৌরাত্ম্য কোরেছে, তা না হোলে এত দিনের পর ঐ চিঠি লিখে জটাধরকে তিনি নিষেধ কোরবেন কেন? সেই জন্যই বোলছি, বক, বিড়াল, ব্যাঘ্র যেমন ধার্ম্মিক, ঐ মোহনলালবাবুটীও সেইরকম ধার্ম্মিক!”

    সৰ্ব্বনাশ! সবেমাত্র ঐ কথাগুলি আমি বলেছি, তখনি তখনি রক্তমুখে গর্জ্জন কোত্তে কোত্তে মোহনলালবাবু সেই ঘরের ভিতরে এসে উপস্থিত? কখন এসে ঘরের বাহিরে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, আড়াল থেকে আমার ঐ সব কথা শুনেছেন, কথা শেষ হবামাত্র ক্রোধে অগ্নিশর্ম্মা হয়ে দর্শন দিলেন! আমি কাঁপতে লাগলেম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আরক্তনেত্রে আমার দিকে চেয়ে, ভীষণগর্জ্জনে তিনি বোলতে লাগলেন, “কি হে ছোকরা! বড়ই যে শাস্ত্রজ্ঞানের পরিচয় দিচ্ছ? বক, বিড়াল, ব্যাঘ্রের মত ধাৰ্মিক আমি? ছেলেমুখে বুড়োকথা? যতদূর মুখ না, ততদূর কথা? জ্যাঠা ছেলের এত বড় স্পর্দ্ধা! আচ্ছা, আচ্ছা! থাকো তুমি! কি বোলবো, আমার বন্ধুর কাছে রয়েছিস, তা না হোলে এখনি আমি তোকে এক লাথিতে যমের বাড়ীর পথ দেখিয়ে দিতেম!”

    জোড়াবাতীর আলোতেও আমি তখন চতুর্দ্দিক অন্ধকার দেখলেম! সৰ্ব্বাঙ্গে থরহরি কম্প! ভয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বড়বাবুর পশ্চাতে গিয়ে লুকালেম। চিঠি দু-খানা বালিশের কাছেই পোড়ে থাকলো।

    সান্ত্বনাবাক্যে মোহনবাবুকে ঠাণ্ডা করবার জন্য বড়বাবু মধ্যবর্ত্তী হয়ে বোলতে লাগলেন, “বামুন মহাশয়! থামুন, ছেলেমানুষ, বুঝতে পারে নাই, কি কথা বোলতে কি কথা বোলতেছিল, আপনার মত বিজ্ঞলোকের অতটা রাগ করা উচিত হয় না; আমার অনুরোধে হরিদাসকে আপনি ক্ষমা করুন। আপনি মহৎলোক, আপনার স্বভাব-চরিত্র এ বালক বিশেষ জানে না, বালকের কথা মনে কোরে, ক্ষমা করাই সাধুলোকের কর্ত্তব্য।”

    একটু যেন শান্ত হয়ে, অল্পগর্জ্জনে মোহনবাবু বোল্লেন, “দেখুন না, আস্পর্ধাটা একবার দেখুন না! অসাক্ষাতে নিন্দা করা কত বড় দুষ্টবুদ্ধির কাজ, একবার ভাবুন না! গরিব বোলে দয়া করি, দেখা হোলে ভালকথা বলি, আপনার আশ্রয়ে রয়েছে, দেখে আমি তুষ্ট হয়েছিলেম, আপনাকে অনরোধ কোরবো ভেবেছিলেম, নিমখারামীটা একবার দেখুন না! হাতের লেখা মিলাতে বোসেছিল! হাতের লেখা কি দু-তিনজনের একরকম হোতে পারে? দেখি—দেখি, কি রকম অক্ষর?—বোলতে বোলতে ব্যস্তহস্তে সেই চিঠি-দুখানি তিনি তুলে নিলেন, দুখানা চিঠিতেই তাচ্ছীল্যভঙ্গীতে একবার চক্ষু দিলেন, দিয়েই অম্নি তাসখেলার মজলীসের চীৎকারের মত চীৎকার কোরে বোলে উঠলেন, “এখানা তো দেখছি জালচিঠি;—দস্তখৎ-ছেঁড়া বজ্জাতী জালচিঠি!” বলেই তৎক্ষণাৎ মোমবাতীর উজ্জ্বল শিখার উপরে ধোরে সেই ছোট চিঠিখানা তিনি জ্বালিয়ে দিলেন, ফরফর কোরে জ্বোলে উঠে চক্ষের নিমেষে সে কাগজখানা ভস্ম হয়ে গেল! বড়বাবুও অবাক, আমিও অবাক।

    চিঠিখানা ভস্ম হলো, তখনো মোহনবাবুর রাগ থামিল না; আড়ে আড়ে আরক্তচক্ষে আমার দিকে চেয়ে বড়বাবুকে তিনি বোল্লেন, “কোথাকার একখানা ছেঁড়া চিঠি রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে, আমার চিঠির সঙ্গে মিলিয়ে, আমাকে বকধার্ম্মিক বোলে বাহাদুরী দেখাচ্ছিল! এই বয়সে এত ফিসলেমী বুদ্ধি ধরে, বয়স হোলে না জানি কি হবে! হয় হবে, আপনিই মারা যাবে, আমার তাতে কি?”

    মিষ্টবাক্যে বড়বাবু বোল্লেন, “ও সব কথায় আর কাজ নাই; বালক, না বুঝে দৈবাৎ একটা কথা বোলে ফেলেছে, কথাটা আপনি ভুলে যান। তুচ্ছকথার আন্দোলনে কোন ফল নাই। আপনার পরিবারটী কেমন আছেন?”

    “আজ একটু ভাল আছে।”—উগ্রস্বর একটু নরম কোরে মোহনবাবু বোল্লেন, “আজ একটু ভাল আছে। চিকিৎসক বোলে গিয়েছেন, আজ রাত্রেই জ্বরত্যাগ হবে; ভয় নাই। আমার বড় দুর্ভাবনা হয়েছিল, এই আশ্বাসবচনে মনটা একটু সুস্থ হোচ্ছিল, কোথাকার পাপ কোথায়! মিছামিছি একটা বাজেকথা নিয়ে, বাজেকথা তুলে, ছোঁড়াটা অনর্থক আমাকে ক্ষেপিয়ে তুল্লে!”

    শেষের কথায় কর্ণপাত না কোরে সময়মত উল্লাসে বড়বাবু বোল্লেন, “আহা, বিশ্বেশ্বর তাই করুন, বৌমাটী আরাম হোন! আপনি দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ কোরেছেন, এটা আমি জানতেম না, হরিদাসের মুখেই শুনলেম। তা একরকম মন্দ হয় নাই, বিষয়ী লোক আপনি, বিষয়বিভব বিস্তর, বংশও বড়, পুত্র-সন্তান না থাকাটা ক্ষোভের বিষয় বটে। প্রথমা স্ত্রীর সন্তান হবার সময় অতীত হয়ে গেলে দ্বিতীয় স্ত্রীর পাণিগ্রহণ করা শাস্ত্রের অভিপ্রেত।”

    এই কথার পর বড়বাবুকে ডেকে নিয়ে, মোহনলালবাবু পাশের একটী ঘরে প্রবেশ কোল্লেন, আমি জড়সড় হয়ে পূৰ্ব্বস্থানেই বোসে থাকলেম। বোধ হয়, তাঁদের কি গোপনীয়কথা ছিল, নির্জ্জনে সেই সকল কথা বলাকওয়া হয়ে গেল, বড়বাবু বৈঠকখানায় ফিরে এলেন, মোহনবাবু আর সেদিকে এলেন না, অন্যদিকের বারান্দা পার হয়ে, উপর থেকে নেমে গেলেন; দরজায় গাড়ী ছিল, চক্রঘর্ষণের শব্দে বুঝতে পাল্লেম, তিনি চোলে গেলেন। যখন এসেছিলেন, তখন আমরা নানাকথায় অন্যমনস্ক ছিলেম, গাড়ীর শব্দ শুনতে পাই নাই।

    কবিরা আর দার্শনিক পণ্ডিতেরা রজনীকে গর্ভবতী বলেন। রজনীর গর্ভে কি কি নিহিত থাকে, প্রভাতে কি কি প্রসূত হয়, পূর্ব্বে তাহা কিছুই অনুমানে আনা যায় না। শুভ অশুভ, দুই পক্ষেই একধারা। যে রজনীতে মোহনবাবুর মুখের ঝড়ে আমি উড়ে যাচ্ছিলেম, সেই রজনীপ্রভাতে এক নির্ঘাত সমাচার আমাদের কর্ণে প্রবিষ্ট হলো। মোহনবাবুর পরিবারটী রাত্রি আড়াই প্রহরের সময় ইহ-সংসার পরিত্যাগ কোরে গিয়েছেন। চিকিৎসকের একটী কথা সত্য, একটী কথা মিথ্যা। “ভয় নেই” কথাটী সত্য হলো না, সত্য হলো জ্বরত্যাগ। সেই জ্বরত্যাগের সঙ্গে সঙ্গেই প্রাণত্যাগ!

    বাবু মোহনলালের প্রাণে অবশ্য আঘাত লেগেছিল, যাঁদের সঙ্গে মোহনলালের জানাশুনা, এই অশুভ সংবাদে তাঁরাও অবশ্য শোকাকুল হয়েছিলেন, কিন্তু আমার প্রাণে সেই ভীষণ শোকবজ্র যতটা বাজলো, তাঁদের মধ্যে কারো হৃদয়ে বোধ হয়, ততটা বাজলো না। বীরভূমের অমরকুমারীর সঙ্গে দু-দিন আলাপ কোরে আমি সুখী হয়েছিলম, অমরকুমারী আমারে ভালবেসেছিলেন, সেই জন্যই কি সৰ্ব্বাপেক্ষা আমার হৃদয়ে বেশী শোক?—না, সে জন্য নয়। রক্তদন্ত আমারে প্রাণে মারবার জন্য গুণ্ডা যোগাড় কোরেছিল, দয়াবতী অমরকুমারী সেই সন্ধান জানতে পেরে, মেয়েমানুষ সাজিয়ে, আমারে গোপনে বাড়ী থেকে বাহির কোরে দিয়েছিলেন, নারীবেশেই আমি পলায়ন কোরেছিলেম, পলায়নেই পরিত্রাণ পেয়েছিলেম, আপন প্রাণকে সঙ্কটাপন্ন কোরে স্নেহময়ী অমরকুমারী আমার প্রাণরক্ষা কোরেছিলেন, সেই অমরকুমারী এখন আর পৃথিবীতে নাই! এই কারণেই আমার বেশী শোক। আর একটা প্রাণে আমার অপেক্ষাও বেশী শোক। সেই শোকাতুরা দুঃখিনী অমরকুমারীর অভাগিনী জননী! নিদারুণ রোগযন্ত্রণায় কাতরা, দুরন্ত রক্তদন্তের নিষ্ঠর পীড়নে প্রপীড়িতা সেই অভাগিনী যখন দূরদেশে এই নিদারুণ সংবাদ শ্রবণ কোরবেন, তখন তাঁর যন্ত্রণাদগ্ধ ক্ষীণদেহে জীবনবায়ু আর অধিকক্ষণ প্রবাহিত হবে, কিছুতেই তো আমার এমন বিশ্বাস হয় না। অমরকুমারী নাই! এ শোক আমার অসহ্য। একটী প্রবোধ, অমরকুমারীর কাশীপ্রাপ্তি; অল্পদিনে মায়াসংসার পরিত্যাগ কোরে, মায়াময় ক্ষুদ্রকলেবর পরিত্যাগ কোরে, মায়াময়ী অমরকুমারী অমরবাঞ্ছিত শিবপ্রাপ্ত হোলেন!

    সংসারে শোকের বেগ দিন দিন কমে, দিন দিন পুরাতন হয়, বাবু মোহনলাল এক সপ্তাহের মধ্যেই অমরকুমারীকে ভুলে গেলেন। লোকের মুখে শুনলেম, কাশীর বাইজীমহলের একটী সুন্দরী নর্ত্তকীকে সঙ্গিনী কোরে মনের আনন্দে তিনি কাশীধাম পরিত্যাগ কোরে গিয়েছেন। সে সংবাদে আমার আনন্দ হলো। সত্যঘটনা জেনে, সত্যকথা বোলে, অকারণে আমি তাঁর বিষনয়নে পোড়েছি, কাশীতে তিনি থাকলে সৰ্ব্বদা আমার প্রাণে ভয় থাকতো, সে ভয়টা কিছু দিনের জন্য দূর হয়ে গেল। সে অংশে মনে আমি একটু শান্তি পেলেম, কিন্তু অমরকুমারীকে ভুলতে পাল্লেম না।

    এই ঘটনার পর একমাস অতীত। আমি চাকরী করি, নূতন নূতন বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আলাপ করি, একরকমে দিন কেটে যায়। একরাত্রে এক বন্ধুর বাড়ীতে বাইনাচ। বন্ধু আমারে নিমন্ত্রণ কোরেছিলেন। বড়বাবুর অনুমতি নিয়ে আমি নাচ দেখতে গিয়েছিলেম। বড়বাবু যান নাই। নাচের মজলীসে বেশী লোক ছিল না, যাঁর বাড়ীতে নাচ, তাঁর নিজের বিশেষ পরিচিত বিশ-পঁচিশটী বন্ধু নিয়েই মজলীস। বাবুটীর বাড়ী কলিকাতায়। সাত আট মাস পূর্ব্বে তিনি কাশীতে এসেছেন, পরিবার সঙ্গে নাই, টাকা আছে, বাইমহলে কিছু বেশী প্রতিপত্তি। একঘণ্টা মাত্র নাচ, রাত্রি দশটার মধ্যেই মজলীসভঙ্গ। বাবুর নাম নীরেন্দ্রবাবু, জাতিতে সদ্গোপ, বয়স অল্প, চেহারা ভাল। যে ঘরে তিনি বসেন, সেই ঘরে আমারে নিয়ে গেলেন, আর তিনটী বন্ধু সেইখানে ছিলেন, তাঁদের সঙ্গেও আমার আলাপ হলো। নূতন আলাপ। নীরেন্দ্রবাবু তাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় কোরে দিলেন। সেই তিনটী নূতন বন্ধুর মধ্যে একটী দিব্য সুশ্রী, ফুট গৌরবর্ণ, গঠন মাঝারি, বক্ষঃস্থল পূরন্ত, হস্তপদ মোলায়েম, গলাটী কিছু খাটো, চিবুক একটু সরু, কপাল চওড়া, চিবুকের আর কপালের পরিমাণে মুখখানি যেন ত্রিকোণ দেখায়; চক্ষু দুটী বড় বড়, নাসিকা দীর্ঘ, দিব্য গোঁফ; বয়স অনুমান ২৫/২৬ বৎসর।

    বাবুটীর সঙ্গে আলাপ কোরে আমি নিতান্ত অসুখী হোলেম না, কিন্তু তাঁর চাউনির ভঙ্গীতে কেমন এক প্রকার বিরুপ লক্ষণ অনুভূত হলো। কথা কন, হাসেন, সকল কথায় তর্ক ধরেন, মাঝে মাঝে স্ত্রীলোকের কটাক্ষের ন্যায় ইতস্ততঃ দৃষ্টিনিক্ষেপ করেন। ক্ষুদ্র মজলীসে রসিকতাও বেশ চোল্লো। ঐ বাবুটীর সঙ্গে আমার ভাসা ভাসা আলাপ হলো বটে, কিন্তু তাঁর নামটী আমি জানতে পাল্লেম না।

    জলযোগের আোজন হলো। ঘরে আমরা পাঁচজন। চারিজনে আঁখিঠারাঠারি, আমার দিকে ইঙ্গিত। চারিজনে একবার উচ্চ হাস্য কোরে উঠলেন; আমি হাসলেম না। হাস্যের কোন কারণ উপস্থিত ছিল না, হাসি এলো না। চারিজনে একসঙ্গে সেখান থেকে একবার উঠে গেলেন, আমি একাকী বোসে রইলেম; একটু পরেই তাঁরা ফিরে এলেন; চারিজনেরই মুখ-চক্ষু লাল। তাঁরা যখন আমার কাছে এসে বোসলেন, তখন আমি কেমন এক প্রকার তীব্র গন্ধ অনুভব কোল্লেম। কারণ অনুমান কোত্তে অক্ষম হোলেম না, কিন্তু যেন কিছুই জানলেম না, কিছুই বুঝলেম না, এই ভাবে চুপ কোরে থাকলেম। যে বাবুটীকে আমি সৰ্ব্বাপেক্ষা সুশ্রী দেখেছিলেম, যে বাবুটীর চাউনি বাঁকা বাঁকা, সেই বাবুটী আমারে নিতান্ত পাড়াগেয়ে স্থির কোরে, ঠেস দিয়ে দিয়ে বিদ্রূপ আরম্ভ কোল্লেন, পরস্পর নানা প্রকার ঠাট্টা-তামাসা চোল্লো। আমি বুঝতে পাল্লেম, সেই বাবুটীই কিছু বেশী রসিক, মজলীসী ভাষায় ইয়ারলোক।

    সেই বাবুটীকে লক্ষ্য কোরে নীরেন্দ্রবাবু আমারে বোল্লেন, “দেখ হরিদাস, আমাদের এই বন্ধুটী দিব্য সদ্বক্তা; কথায় কথায় সকলকে হাসান, মাতান, আমোদিত করেন। বেশ আমদে লোক। কলিকাতার ছেলে কি না, এই রকম হওয়াই চাই; বাবুটীর সঙ্গে তুমি আলাপ রেখো, মাঝে মাঝে দেখা কোরো, কথা শুনে সুখী হবে; দিনকতক ঘনিষ্ঠতা হোলে তুমিও বেশ চালাক-চতুর হয়ে উঠবে। বাবুটীর নাম তুমি মনে কোরে রেখো; ইনি হোচ্ছেন, জয়হরি; বাবু সৰ্ব্বত্রই জয় জয়কার!”

    আমার মনটা ঝাঁৎ কোরে উঠলো। মনের সন্দেহ গোপন কোরে রেখে অম্লানমুখে আমি বোল্লেম, “কথাবার্ত্তা শুনে আমিও সন্তুষ্ট হয়েছি, বাবুটী চমৎকার লোক। আলাপ কোরে আমি তুষ্ট হোলেম; বাবুর উপাধিটী কি?”

    যিনি পরিচয় দিয়ে দিচ্ছেলেন, তিনি বোল্লেন, “উপাধি বটব্যাল;— শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণ; জাত্যংশে শ্রেষ্ঠ না হোলে কি স্বভাবচরিত্র এত ভাল হয়?”

    আর আমি অন্য পরিচয় জিজ্ঞাসা কোল্লেম না, মনে মনে ভাবলেম, কথাই ত বটে! জাত্যংশে শ্রেষ্ঠ না হোলে এমন ঘটনা কেন হবে? ধোরেছি ঠিক, বটব্যালেরা চলিত কথায় বড়াল; এই সেই জোড়াসাঁকোর জয়হরি বড়াল। কামিনীর মা এখানে থাকলে ঠিক সনাক্ত কোরে দিতে পাত্তো, তদ্ভাবে আমার মন এখন নামের উপর সনাক্ত কোল্লে। সময় উপস্থিত হোলে ফলাফল জানা হবে।

    জলযোগের আয়োজন হয়েছিল, বাবুদের মদ খাবার হুজগে দেরী পোড়ে গিয়েছিল, সকলে এই সময় পাশের ঘর থেকে ফিরে এসে লুচি-মাংস ইত্যাদি চৰ্ব্বচোষ্য ভক্ষণ কোল্লেন, আমি কেবল অক্ষুধার ছল কোরে দুটী সন্দেশ খেয়ে জল খেলেম। রাত্রি দুই প্রহর অতীত। একজন লোক সঙ্গে দিয়ে নীরেন্দ্রবাবু আমারে বাড়ীতে পাঠিয়ে দিলেন। বাড়ীর সম্মুখে গিয়েই দেখি, সদরদরজা খোলা, বাড়ীর ভিতর ভারী গোলমাল, সকলেই জেগে আছে, বড়বাবুও জেগে আছেন, চাকরেরা ছুটাছুটি কোরে বেড়াচ্ছে। ব্যাপার কি, তত রাত্রি পর্য্যন্ত কেনই বা দরজা খোলা, কেনই বা গোলমাল, প্রথমে কিছুই বুঝতে পাল্লেম না; তার পর শুনলেম, বাবুর পিসীমার ছোট-মেয়েটী সন্ধ্যার পর থেকে অদৃশ্য। কে একজন লোক বাবুর পিসীমার ডান-হাতের পাঁচটী আঙ্গুল কেটে দিয়ে, মেজো-বৌমার গায়ের অলঙ্কারগুলি খুলে নিয়ে, তাঁর গলাতেও রক্তপাত কোরে পালিয়ে গিয়েছে; সেই ঘটনার পর থেকেই নবীনকালীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাবুর পিসীমার ছোটমেয়েটীর নাম নবীনকালী। অনুসন্ধানের জন্য চারিদিকে লোক বেরিয়েছে, কেহই কোন সন্ধান কোত্তে পাচ্ছে না।

    বাড়ীতে চোর এসেছিল, গহনা চুরি কোরেছে, দুটী স্ত্রীলোককে আঘাত কোরেছে, কেহ কেহ এইরূপ অনুমান কোচ্ছে; সে অনুমান যদি ঠিক হয়, মেয়েটী তবে কোথায় গেল? কাশীর চোরেরা কি গৃহস্থলোকের বাড়ীর মেয়েছেলে চুরি করে?

    রাত্রের মধ্যে কিছুই সন্ধান পাওয়া গেল না, বাবুর পিসীমা সারারাত্রি রোদন কোল্লেন; মেজো-বৌমা কাঁদতে কাঁদতে কত রকম কথা বল্লেন, বৃথা কথা, বৃথা রোদন, নবীনকালী ফিরে এলো না। নবীনকালী বিধবা, নবীনকালী যুবতী, রাত্রিকালে নবীনকালীর পলায়ন, কলঙ্কের কথা, সেইজন্য বড়বাবু চেপে গেলেন, কেহ কিছু প্রকাশ না করে, ভয় দেখিয়ে সাবধান কোরে সকলকে নিষেধ কোরে দিলেন।

    আবার একটা রবিবার এলো। আমার মনের ভিতর জয়হরি বড়াল ক্রীড়া কোচ্ছিল; স্বর্ণবণিক জয়হরি বড়াল কাশীতে ব্রাহ্মণ সেজে আছে, সে কথাটাও স্থির বুঝেছিলেম। নানা সন্দেহে ব্যাকুলিত হয়ে অপরাহ্ণকালে আমি একবার ছাদে উঠলেম। সে দিনও সেই সুন্দরী যুবতী সেই রুমাল হাতে কোরে ছাদে ছাদে চরণবিহার কোচ্ছিল। সেদিন আর সে মূৰ্ত্তি আমার পক্ষে নূতন নয়, পরিচয়েও অচেনা নয়, সেই সৌদামিনী। চক্ষে চক্ষে যখন মিলন হলো, তখনো চক্ষু ফিরিয়ে নিলে না, একটু লজ্জার লক্ষণও বুঝা গেল না, বরং নিনিমেষে একদৃষ্টে আমার মুখপানে চেয়ে রইলো, ওষ্ঠপ্রান্তে অল্প অল্প হাস্যরেখাও দেখা দিলে। আমি চক্ষু ফিরিয়ে নিলেম।

    স্ত্রীলোকের লজ্জা হলো না, আমি লজ্জা পেলেম; অন্যদিকে চাইতে চাইতে শীঘ্র শীঘ্র নেমে এলেম। জয়হরিকে বিচারের হস্তে সমর্পণ করা আমার ইচ্ছা। শুনেছিলেম, রমাই সন্ন্যাসীর হত্যাকাণ্ডের তদন্তাবসানে এক ইস্তাহার প্রকাশ হয়েছিল, সেই খুন সম্বন্ধে যে কেহ কোন সংবাদ দিতে পারবে, যাতে যাতে খুনী আসামীর সন্ধান হয়, উপযুক্ত পুলিশ-কর্ম্মচারীর নিকটে তেমন সংবাদ জানাতে পারবে কিম্বা সন্তোষকর প্রমাণ সহ খুনী আসামীকে ধোরিয়ে দিতে পারবে, হুজুর হোতে তাকে একহাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে, সেই ইস্তাহারের এইরুপ মৰ্ম্ম।

    যতদূর আমার জানা-শুনা হলো, তাতে কোরে আমি সন্ধানটা বোলে দিতে পারি, কিন্তু সন্তোষকর প্রমাণ দুষ্প্রাপ্য। কোন গতিকে সৌদামিনীকে যদি বশীভূত কোত্তে পারা যায়, তা হোলে বোধ হয়, একরকম কিনারা হোতে পারে; কিন্তু সৌদামিনীকে বশীভূত করবার উপায় কি? নিমন্ত্রণ কোরে বাড়ীতে আনা, সেটা ঠিক উপায় নয়; বিশেষতঃ নবীনকালীর নিরুদ্দেশে বাড়ীর সকলে মহা উদ্বিগ্ন, এ সময় একটা দুশ্চরিত্রা কামিনীকে বাড়ীতে আনবার অনুরোধ করা কোনমতেই হোতে পারে না। কি করা যায়? একটা দুরাচার খুনেলোক বিনা দণ্ডে অব্যাহতি পায়, জেনে শুনে চুপ কোরে থাকাও ভাল হয় না। দুষ্টলোকে খোলসা থাকলে তার দ্বারা আরো অনেক লোকের প্রাণ-মান সঙ্কটাপন্ন হবার সম্ভাবনা, বোরিয়ে দেওয়াই উচিত; কি উপায়ে ধরা হয়, নিত্য নিত্য সেইপ্রকারের উপায়ই আমি চিন্তা কোতে লাগলেম।

    কোথাকার পাপ কোথায়? সংসারে নিঃসম্পর্ক সামান্য একজন বালক আমি, আমার চক্ষেই বা সে সকল পাপ কেন পতিত হয়? বীরভূমের পাপ রক্তদন্ত, সে পাপ গেল কলিকাতায়; কলিকাতা থেকে আমি পালিয়ে এলেম, সে পাপ এলো কাশীতে! আমার সম্বন্ধে মোহনলালবাবুও এক পাপ; অমরকুমারীকে বিসর্জ্জন দিবার জন্য সে পাপ এসেছিল কাশীতে! কলিকাতার পাপ সৌদামিনী, খুনে-পাপী জয়হরি বড়াল, আমার অশান্ত চিত্তকে আরো অশান্ত করবার জন্য সে পাপ এলো কাশীতে! কাশীধাম কি ইদানী নানা পাপের আশ্রয়খান হয়ে পোড়েছে? লোকের মুখে যে রকম শুনতে পাওয়া যায়, সে প্রমাণে ঐরুপ কলঙ্কই যেন সত্য বোধ হয়। বাঙ্গালীদলের বেশী কলঙ্ক। জাতিতে জাতিতে, জাতিতে বিজাতিতে, সম্পর্কে সম্পর্কে, সম্পর্কে নিঃসম্পর্কে, বাঙ্গালী নর-নারী পাপলিপ্ত হোলেই নিরাপদের আশাতে কাশীতে পালিয়ে আসে; মাতুলের ঔরসে ভগিনী-পুত্রী, পিতৃব্যের ঔরসে ভ্রাতৃকুমারী, ভ্রাতার ঔরসে বিমাতৃকুমারী, ভাগিনেয়ের ঔরসে মাতুলানী, জামাতার ঔরসে শ্বশ্রুঠাকরাণী, শ্বশরের ঔরসে যুবতী পুত্রবধু গর্ভবতী হলেই কাশীধামে পালিয়ে আসে! গর্ভগুলি নষ্ট কোত্তে হয় না, কাশীর পবনের প্রসাদে বংশরক্ষা হয়! কেহ কেহ জোড়া জোড়া আছে, কেহ কেহ ছাড়া ছাড়া! সামান্য একটা প্রবাদ আছে, কাশীপুরী পৃথিবী-ছাড়া; মহাদেবের ত্ৰিশূলের উপর কাশী। পৃথিবীর পাপ কাশী স্পর্শ করে না। এই প্রবাদে যাদের বিশ্বাস, পৃথিবীর সেই সকল পাপী কাশীধামে পালিয়ে এসে মনের সাধে নূতন নূতন পাপ করে। শাস্ত্রকথা তারা মনের কোণেও স্থান দেয় না। বেদব্যাসের শাপ আছে, অন্যস্থানে যে সকল পাপ অনুষ্ঠিত হয়, কাশীবাসী হোলে সে সকল পাপ ধংস হয়ে যায়। কিন্তু কাশীতে যারা পাপ করে, তাদের পাপ অবিনাশী; মহাপ্রলয়কাল পর্য্যন্ত সে পাপের ক্ষয় হয় না; কাশীর পাপে অনন্তকাল নরকভোগ! ঋষিবাক্যানুসারে জ্ঞানের পাপ আর তীর্থের পাপ অক্ষয় হয়ে থাকে; তীর্থের পাপীরা এই সকল শাস্ত্রবাক্যে আদৌ ভ্রূক্ষেপ রাখে না, সাধুবাক্যে বধির হয়ে নিরন্তর নূতনপাপে রত হয়! অনেক দেখে শুনে এই কারণেই আমি বোলছি, কোথাকার পাপ কোথায়!

    আবার রবিবার। অপরাহ্নে যজ্ঞেশ্বরকে নির্জ্জনে পেয়ে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “বাড়ীর ভিতর সে সব কাণ্ডকারখানা কি? গহনা চুরি, আঙ্গুল কাটা, মেজোবৌমার গলায় অস্ত্রাঘাত, নবীনকালীর পলায়ন, ব্যাপারখানা কি?”

    যজ্ঞেশ্বর উত্তর কোল্লে, “ব্যাপার আমার মাথা আর মণ্ডু! আর একদণ্ডও এ বাড়ীতে থাকতে আমার ইচ্ছে নেই। কেবল বড়বাবুটীর মুখ চেয়ে আছি, কিন্তু আর সহ্য হয় না! পূণ্যের সংসারে পাপ প্রবেশ কোরেচে, আর মঙ্গল নেই!”

    ভাবার্থ কিছুই বুঝতে না পেরে আবার আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “চোর প্রবেশ কোরেছিল, দৌরাত্ম কোরে গিয়েছে, সংসারের অপরাধ কি?”

    কপালে এক চাপড় মেরে যজ্ঞেশ্বর বোল্লে, “চোর এসেছিল না হাতী এসেছিল! ঘরের চোরেই সৰ্ব্বনাশ কোল্লে! সে সব কথা তোমার শুনে কাজ নেই! মেয়েটা যে কোথায় গেল, সেই কথাটাই বড় শক্ত!”

    জানবার জন্য আমার আগ্রহ হয়েছিল, যজ্ঞেশ্বরের পরিতাপবাক্যে সেই আগ্রহের সঙ্গে সন্দেহ বেড়ে গেল; বিশেষ নিৰ্ব্বন্ধ জানিয়ে বার বার জিজ্ঞাসা কোতে লাগলেম। চক্ষে জল এনে যজ্ঞেশ্বর শেষকালে বল্লে, “পিসীমাকে কাটতে গিয়েছিল, তিনি হাত তুলে কাটারিখানা ধোত্তে গিয়েছিলেন, গলাটী বেঁচে গিয়েছে, প্রাণ বেঁচে গিয়েছে, আঙ্গুল পাঁচটী কেটে গিয়েছে মেজোবৌকে কাটতে গিয়েছিল, ধর্ম্মে ধর্ম্মে রক্ষা হয়েছে, গহনার উপর দিয়েই আপদ চুকেচে। সে সব যা হোক, ছুঁড়ীটা এ কি কোল্লে!”

    আবার আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “লোকটা কে মেয়েদের উপর আক্রোশ কেন? কার উপর তুমি সন্দেহ কর?”

    পুনরায় মস্তকে করাঘাত কোরে যজ্ঞেশ্বর উত্তর কোল্লে, “সন্দেহ আবার কিসের? লোকটা আবার কে? ঘরের শত্রুই ঘর মজালে! প্রকাশ কোরো না এ কথা, এ সংসারে ভদ্রস্থ নেই! পথৃক হবি পৃথক হ, এ সব কেলেঙ্কার করা কেন বাপু? দেশ ছেড়ে বিদেশে এসে এই সব ঢলাঢলি, একে কি আর জাত-কুল রক্ষা হবে? ঘরের ঢেঁকি কুমীর হয়েছে। প্রাণ পর্য্যন্ত টানাটানি!”

    সাপে যেমন গর্জ্জন করে, সেই রকমে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে যজ্ঞেশ্বর আমার কাছ থেকে উঠে গেল; ভিতরের কথা কিছুই ভাঙলে না। আভাষেই আমি বুঝলেম, মেজোবাবুরই ঐ কৰ্ম্ম! নবীনকালীর নিরুদ্দেশের মূলেও মেজোবাবু! বাপের সহোদরা ভগ্নীর কন্যা! কি ভয়ানক লোক।

    মন বড় অস্থির হলো। রামশঙ্করের উপর বিজাতীয় ঘৃণা জন্মিল। আর আমার এ বাড়ীতে থাকা হয় না; কোন দিন কি ঘটে, কোন দিন আমারে কে কি বলে, আমার উপরে মেজোবাবুর রাগ, কোন দিন আমার নামেই বা কি কলঙ্ক রটায়, মানে মানে এই বেলা প্রস্থান করাই ভাল।

    কাশীর নাম পূণ্যক্ষেত্র, কাশীক্ষেত্রে এত পাপ! বাবা বিশ্বেশ্বর এ পাপের ভার কেমন কোরে সহ্য করেন? অনেক বাড়ীতেই অনেক গোল! রসিকবাবুটীকে প্রথম প্রথম ভাল বোলে বোধ হয়েছিল, ক্রমে ক্রমে জানতে পাল্লেম, তিনিও কম পাত্র নন। তাঁর স্ত্রীটীকে আমি দেখেছি, রসিকের চেয়ে তিনি বয়সে বড় ভেবেছিলেম, মেয়েমানুষ বেশী মোটা হোলে অল্পবয়সেও বড় দেখায়, সেইজন্যই বুঝি ঐ রকম, তাই আমি ভেবেছিলেম, কিন্তু তা নয়, কাণাঘূষায় শুনেছি, সেই মোটা গৃহিণীটী রসিকবাবুর মাতুলানী! জননীর কনিষ্ঠ সহোদরের কুললক্ষ্মী! সে রকম রসিকবাবু কাশীধামে কত আছে, ঠিক করা যায় না। যার মুখে শুনেছিলেম, স্বদেশে যারা ছাগল ছিল, কাশীতে তারা বাবু সেই লোকের কথাই ঠিক। সবগুলি ছাগল না হোক অনেকগুলি তাই-ই বটে!

    কিছুই ভাল লাগলো না; তখন বেলা ছিল, মনের চাঞ্চল্যে একবার ছাদে গিয়ে উঠলেম। বেড়াচ্ছি, যে বাড়ীর ছাদে সৌদামিনী বেড়ায়, এক একবার সেই দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছি, কেহই নাই। অন্য অন্য ছাদেও দুটী পাঁচটী রঙ্গিনী হাওয়া খাচ্ছিলো, দুবার আমি তাদের দিকে চাইলেম না, একবার চেয়েই অন্যদিকে মুখ ফিরালেম। আর একবার উত্তরদিকে চেয়ে দেখি, সেই ছাদে সৌদামিনী। সে দিন সৌদামিনীর হাতে রুমাল ছিল না, রুমালের বদলে মস্ত একটা ফুলের তোড়া। আমি বেড়াচ্ছি, মাথা হেঁট কোরেই বেড়াচ্ছি, হঠাৎ আমার মাথার উপর কি একটা জিনিস এসে উড়ে পোড়লো, মাথায় ঠেঁকেই আমার পশ্চাদ্ভাগে পায়ের কাছে পোড়ে গেল, চেয়ে দেখি ফুলের তোড়া! সৌদামিনীর হাতে যে তোড়াটা ছিল, সেই তোড়ই আমার পদতলে!

    একবার মনে কোল্লেম, ছোঁবো না; আবার ভাবলেম, ফুলের তোড়ার কি দোষ? কটাক্ষে একবার সৌদামিনীর দিকে চাইলেম। সৌদামিনী তখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের ছাদের দিকে চেয়ে মৃদু মৃদু হাসছিল। ভাবভঙ্গী ভাল নয়, আর তখন ছাদে থাকা ভাল নয়, তাই ভেবে, ফুলের তোড়াটী হাতে কোরে নিয়ে, দ্রুতগতিতে ছাদ থেকে আমি নেমে এলেম। অন্তঃকরণ অস্থির হলো।

    বৈঠকখানা নির্জ্জন, একধারে বোসে তোড়াটী আমি ভাল কোরে দেখতে লাগলেম। তিন বর্ণের ফুল; শ্বেতবর্ণ, পীতবর্ণ, রক্তবর্ণ; ফুলগুলির নীচে নীচে সবুজবর্ণের ছোট ছোট পাতা। ফুলগলি সুগন্ধ; স্তবকে স্তবকে সজ্জাও সুন্দর। নাসিকাগ্রে ধীরে ধীরে সঞ্চালন কোরে কোরে ফুলগুলির সুগন্ধ আমি আঘ্রাণ কোচ্ছি, ফুলের ভিতর থেকে একখানি কাগজ বিছানার উপর সোরে পেড়িলো; কাগজখানা মণ্ডলাকারে মোড়ককরা।

    অন্তরে কৌতূহল প্রদীপ্ত হয়ে উঠলো। মোড়কটী আমি খুল্লেম; দেখলেম, মণ্ডলাকারে লেখা একখানি পত্রিকা; অক্ষরগুলি গোলাপী;—আলতার জলে সুচিত্রিত। স্বাক্ষর ছিল না;—বেনামী পত্রিকা।

    অনিচ্ছায় সেই পত্রিকাখানি আমি পাঠ কোল্লেম। সম্বোধন নাই। কে কারে লিখছে, দুই-ই অপ্রকাশ। প্রথমেই লেখা আছে, “তুমি কে?”—তার পর লেখা আছে, “তোমারে আমি তিরস্কার করিতে পারি।” তিরস্কার করিতে পারে, এমন কথা যে লেখে, যাকেই লিখুক, যেই লিখুক, যে পত্রিকার আরম্ভে তিরস্কার, সে পত্রিকা কোন প্রকার মন্দ অভিপ্রায়ে লিখিত নয়, সে লেখক অথবা লেখিকা মন্দভাব মনে রাখে না, এইটকু আমার অনুমানে এলো; কেবল অনুমান নয়, সিদ্ধান্তও সেই রকম দাঁড়ালো। পত্রিকাখানি আমি আদ্যোপান্ত পাঠ কোল্লেম। লজ্জাকে অন্তরে রেখে আমি অনুরোধ করি, পাঠকমহাশয়ও পাঠ করুন।

    “তুমি কে? তোমারে আমি তিরস্কার করিতে পারি। কেন তুমি আমারে দেখা দাও? আমার নয়নের পিপাসা পরিতৃপ্ত হইতে না হইতে কেন তুমি আমার নয়নপথ হইতে অন্তর হইয়া যাও? তোমার চক্ষু আমারে কেন দগ্ধ করে? আমি তোমার কাছে কি অপরাধ করিয়াছি? কেন আমারে যন্ত্রণা দাও? তুমি চোর! কেন তুমি আমার হৃদয়গৃহে সিঁধ কাটিয়া প্রাণ চুরি করিয়াছ? উত্তর দাও; নতুবা আমি তোমারে উচিতমত শাস্তি দিব।”

    আমার হাত কেঁপে উঠলো; পত্ৰখানা আর আমি হাতে কোরে রাখতে পাল্লেম না বড়বাবুর বড় তাকিয়াটার উপরে ছুড়ে ফেলে দিলেম। আমারেই লিখেছে, সৌদামিনীই লিখেছে, তাতে আর সন্দেহ রাখতে পাল্লেম না। উত্তর চায়; উত্তর না দিলে শাস্তি দিবে, এই ভয় দেখিয়ে রেখেছে। কথা বড় ভয়ানক! করা যায় কি? স্বাক্ষর নাই কার নামে কার কাছে উত্তর পাঠাই? চিন্তা কোচ্ছি, কোথা থেকে বাতাসের সঙ্গে যেন একটা কণ্ঠস্বর এসে আমার কাণের কাছে উপদেশ দিলে, “উত্তর দাও, স্বাক্ষর চাও; সে স্বাক্ষর তোমার একটা বিশেষ অভীষ্ট সিদ্ধ হবে।”

    উপস্থিত বুদ্ধির সহায়তায় সেই বাতাসবাণীর মর্ম্ম আমি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পাল্লেম। স্বাক্ষর যদি আসে, সেই স্বাক্ষরের আখ্যা হবে একটী সুশাণিত বাণ। সেই বাণে জয়হরি পক্ষী বিদ্ধ হবে;—একবাণেই বিঁধে ফেলবো।

    উত্তর দিব। কি উত্তর দিব? প্রেম-পত্রিকা। কখনো আমি প্রেম-পত্রিকা দেখি নাই; প্রেম-পত্রিকার কি রকম উত্তর দিতে হয়, তাও আমি শিখি নাই, তবু আমি উত্তর দিব। উত্তরে লিখবো কি?—কবি যেমন কল্পনার উপদেশে অনেক মিথ্যাকথাকে সত্য-সাজে সাজান, আমার কবিত্বশক্তি নাই, কল্পনা আমার কাছে আসবেন না, দয়া কোরে সদুপদেশ দিবেন না, তবু আমি অভীষ্টসিদ্ধির বাসনায় গুটীকতক মিথ্যাকথাকে সত্য-সাজে সাজাবো।

    তখনো বেলা ছিল। বড়বাবু তখন আসবেন না, কুৎসিত কাব্যরচনায় আমার তখন বাধা হবে না, সেই ভরসায় তৎক্ষণাৎ কাগজ-কলম নিয়ে আমি বোসলেম। আলতার উত্তরে আলতা হোলেই হোতো ভাল, কিন্তু আলতা তখন দুর্লভ, সুতরাং কালীই আমার অবলম্বন; কালী দিয়েই আলতার উত্তর দিব। যা করেন মা কালী।

    সুশিক্ষা নাই, কল্পনা নাই, প্ৰেমশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য নাই, সাদাকথায় উত্তর লিখলেম। দোষাংশ বিস্মৃত হয়ে, মিথ্যারচনার অপরাধ মার্জ্জনা কোরে, পাঠকমহাশয় আমার এই পত্রিকাখানিও একবার পাঠ করুন।

    ‘আকাশের দেবতা অকস্মাৎ আমার হস্তে একটী ফলের তোড়া প্রদান করিয়াছেন। ফুলের তোড়া আমার হস্তে একখানি প্রেম-পত্রিকা অৰ্পণ করিল। পত্রিকা পাঠ করিতে করিতে আমার সৰ্ব্বশরীর শিহরিল, প্রেম-পুলকে ক্ষুদ্রকলেবর রোমাঞ্চিত হইল, আজ আমি অকস্মাৎ প্রেমানন্দ-সাগরে ভাসিলাম। তুমি আমারে তিরস্কার করিয়াছ, সে তিরস্কার আমার ভাগ্যে পুরস্কার। তোমারে আমি দর্শন করি, জ্ঞান হয়, যেন নয়নপটে পূর্ণচন্দ্র। চন্দ্র যখন অদৃশ্য হন, আমার নয়নপথে তখন মেঘোদয় হয়; সেই মেঘে আমি দেখিতে পাই, একটী সৌদামিনী।—হাঁ, সৌদামিনী! তুমিই কি সেই সৌদামিনী? তাহা যদি হও, তবে তো তোমার মিথ্যা তিরস্কার। তোমার প্রাণ আমি চুরি করি নাই। চাঁদের প্রাণ চুরি করা যায় না, সৌদামিনীর প্রাণও চুরি করা যায়। সৌদামিনী। আমার নাম তুমি জান না, আমার নাম হরিদাস; হরিযুক্ত আর একটী নাম তোমার প্রিয়; সৰ্ব্বদা সেই হরির জয় তুমি গাও। সন্ন্যাসীরা সেই জয়কে পরাজয় করিতে পারেন না। জয়কে যদি তুমি বিসৰ্জ্জন করিতে পার, পূর্ণাক্ষরে তোমার নিজের স্বাক্ষর করিয়া, জয়-পরাজয়ের সকল কথা যদি তুমি আমারে লিখিয়া জানাইতে পার, তাহা হইলে বিশ্বেশ্বর তোমার মনের অভিলাষ পূর্ণ করিবেন। দোহাই বিশ্বেশ্বর, সত্যকথা একটীও গোপন করিও না, গোপন করিলে গোপন থাকিবে না; বিশ্বের অন্তর্যামী, সমস্ত তিনি জানিতে পারিতেছেন। কোন কথা যদি তুমি গোপন কর, তাহা হইলে ফুলের তোড়ার সেই পত্রখানি আমি তোমার বর্ত্তমান বণিক-স্বামীকে দেখাইব, বিশ্বেশ্বরের সন্ন্যাসিগণের হস্ত হইতে কোন ক্রমেই পরিত্রাণ পাইতে পারিবে না। সাবধান! এই পত্রের উত্তর লেখা হইলে এই পত্রখানি ভস্ম করিয়া ফেলিও। অদ্য অধিক লিখিলাম না, তোমার উত্তর প্রাপ্ত হইলে মনের কথা জানাই।” পত্রখানি আমি দুই তিনবার পাঠ কোল্লেম, মনে মনে হাসলেম, ‘মনস্কামনা পণ কর’ বোলে বিশ্বেশ্বরের উদ্দেশে প্রণিপাত কোল্লেম। পত্রিকা তো প্রস্তুত হলো, পাঠাই কিরূপে? এখনো যদি সৌদামিনী সেইখানে থাকে, নিজেই দৌত্য নির্ব্বাহ কোরবো, এইরুপ স্থির কোরে, পত্রখানি সেই ফুলের তোড়ার মধ্যে রেখে, তোড়াটী হাতে কোরে নিয়ে, সুর্য্যাস্তের পূর্ব্বেই আবার আমি ছাদে উঠলেম।

    সবাই জানে, সৌদামিনী চপলা, সৌদামিনী ক্ষণপ্রভা, সৌদামিনী অস্থিরা, কিন্তু আমি দেখলেম, সুস্থিরা সৌদামিনী। যেখানকার সৌদামিনী, চিত্রপ্রতিমার ন্যায় ঠিক সেইখানেই দাঁড়িয়ে আছে। মুখের দিকে না চেয়েই, ফুলের তোড়াটা সৌদামিনীর মস্তক লক্ষ্য কোরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, সৌদামিনীগতিতে আমি ছুটে পালালেম, বৈঠকখানার দরজায় এসে নিশ্বাস ফেল্লেম।

    পূর্ব্বে একটী কথা বোলতে ভুল হয়েছে। মির্জাপুরের যে বাবুটীর সঙ্গে আমি বিন্ধ্যাচল দর্শনে গিয়েছিলেম, বড়বাবুর দ্বারা অনুরোধ কোরিয়ে প্রাচীন কামিনীর মাকে আমি সেই বাবুর বাড়ীতে রাখিয়ে দিয়েছি, তার জায়গায় সৌদামিনী আর একজন নূতন দাই1 নিযুক্ত কোরেছে। জয়হরির সঙ্গে সৌদামিনীর এখন কি প্রকার ভাব, সেটা আমি জানতে পারি না, কুলকলঙ্কিনীদের ভাবভক্তি জানবারও কোন আবশ্যক ছিল না, বিধাতার বিধানসূত্রে, পাপীলোকের দণ্ডবিধানের কল্পনায় অগত্যা আমি আজকাল সেই আবশ্যকতা অনুভব কোচ্ছি। প্রতীক্ষা—পরিণাম।

    নূতন দাই আমার কাছে অপরিচিতা, চেহারা পর্য্যন্ত অচেনা, তার দ্বারা কোন প্রকার সন্ধান পাওয়া অসম্ভব। জয়হরিকে আমি দেখেছি; যে বাড়ীতে সৌদামিনী সে বাড়ীতে দেখি নাই, যে বাড়ীতে দেখা, পাঠকমহাশয় ইতিপূর্ব্বে সেটী জানতে পেরেছেন। জয়হরিকে এখন আমার প্রয়োজনও হোচ্ছে না; জয়হরির সঙ্গে সৌদামিনীর পূর্ব্বসম্বন্ধ ঠিক আছে কি না, সেইটকু জানাই এখন আমার দরকার। সৌদামিনীর পত্রের উত্তর দিয়েছি, তদুত্তরে নূতনকথা কি কি জানতে পারি, সে উত্তরে জয়হরির নামের কোন উল্লেখ থাকে কি না, সে উল্লেখে জ্ঞাতব্য তত্ত্ব আমি কিছু বুঝতে পারি কি না, এইবার জানা যাবে। সৌদামিনী আমার পত্রের উত্তর দিবে কি না, সেটাও একটা সংশয়ের কথা। প্রথমপত্রের আভাষ যে প্রকার, তাতে বোধ হয়, নিশ্চয়ই উত্তর পাওয়া যাবে। উদ্বিগ্নচিত্তে আমি সেই উত্তরের প্রতীক্ষায় থাকলেম।

    কাশীর বাসীন্দা কত, উপনিবেশী কত, সাময়িক যাত্রীসংখ্যাই বা কত, সেগুলি নিরুপণ করা আমার মত বালকের অসাধ্য। অনেক দেশের লোক কাশীতে আসে, কাশীতে থাকে, কাশীতে আছে, এ কথা আমি শুনেছি, রকম রকম লোক স্বচক্ষেও আমি দেখেছি, দর্শনে মনে হয়, খোট্টাই বেশী; কিন্তু বাঙ্গালীর সংখ্যা যে নিতান্তই অল্প, এমনটী মনে করা যায় না; দিন দিন আরো বাঙ্গালীর সংখ্যা বৃদ্ধি হয়ে আসছে; সংখ্যায় অধিক না হোলে বাঙ্গালীটোলা নামে স্বতন্ত্র একটা স্থান থাকতো না। হায় হায়! আমি বাঙ্গালী, কাশীধামের আমদানী বাঙ্গালীপরিবারের কলঙ্কের কথা শুনে আমার প্রাণে বেদনা হয়। কাশীতে যাঁরা ভাল আছেন, বিশ্বেশ্বরের কৃপায় তাঁরা সুখে থাকুন, যারা যারা ভ্রষ্টাচার হয়ে পড়েছে অথবা স্বদেশে ভ্রষ্টাচার হয়ে বিশ্বেশ্বরধামে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের ভাগ্যে যে কি আছে, তাদের দশা যে কি হবে, সেই ভাবনা আমার মনে নিরন্তর।

    রবিবার না হলে ছাদে উঠতে আমার ইচ্ছা হয় না, অবসর হয় না, ভরসাও হয় না। সৌদামিনীর পত্রের উত্তর প্রদান কোরে সাতদিন আমারে চিন্তাযুক্ত থাকতে হলো। এই সাতদিনের মধ্যে আরো কত কি নূতন নূতন কাণ্ড আমি দেখলেম, কত কি শুনলেম, সংস্রবশূন্য বিবেচনায় সে সকল কথা প্রকাশ করা নিষ্প্রয়োজন মনে কোল্লেম। মোহনলালবাবু কাশী থেকে চোলে গিয়েছেন, এই কথাই আমি জানতেম, কিন্তু এই সাতদিনের মধ্যে একদিন তাঁরে আমি মণিকর্ণিকার ঘাটের কাছে দেখেছি। ভ্রূপর্য্যন্ত পাগড়ীবাঁধা জমাট কৃষ্ণবর্ণ গুণ্ডাধরণের একটা লোকের সঙ্গে গঙ্গাতীরে তিনি বেড়াচ্ছিলেন; দেখে আমার ভয় হয়েছে। কেবল তাঁরে দেখে ভয় নয়, ভয়ের কারণ আরো আছে। তিনি যখন কাশীতে আছেন, তখন বোধ হয়, রক্তদন্তটাও কাশীছাড়া হয় নাই। চিঠিখানা ভস্ম হয়ে গিয়েছে, মোহনবাবু আমার উপর জাতক্রোধ হয়েছেন, মোহনবাবুর বেতনভোগী গণ্ডা সেই রক্তদন্ত; যদিও ইতিমধ্যে রক্তদন্তকে আর আমি দেখি নাই, কিন্তু হয় তো রক্তদন্ত কাশীতেই আছে; আমারে দেখতে পেলে সে আর আমার প্রতি দয়া প্রকাশ কোরবে না; যে পত্রের ভরসায় সেই রাক্ষসের হাতে আমি একটু দয়ার আশা কোরেছিলেম, আগুনে দগ্ধ হয়ে সেই পত্র এখন বিপরীত ফল প্রসব কোচ্ছে! একজন সন্ন্যাসী আমাকে বোলেছিলেন, পৰ্ব্বতারণ্যে এমন একপ্রকার ফল আছে, সে ফল ভক্ষণ কোল্লে সপ্তাহকাল ক্ষুধা-তৃষ্ণা থাকে না, কিন্তু অগ্নি-সংস্পর্শে সেই ফল বিষতুল্য হয়। মোহনবাবুর লিখিত সেই স্বাক্ষরশূন্য পত্রখানি আমার পক্ষে অনুকূল হয়েছিল, অগ্নি-সংস্পর্শে বিষতুল্য হয়ে উঠেছে! আর আমার বেশীদিন কাশীধামে থাকা হবে না। একস্থানে নিরাপদে বাস আমার ভাগ্যলিপির মর্ম্ম নয়; সংসারে নানাস্থানী করবার অভিপ্রায়েই যেন বিধাতা আমারে সৃজন কোরেছেন, ঘটনাচক্রের আবর্ত্তনে আবর্ত্তনে এইরূপ সিদ্ধান্তই যেন আমার মনে আসে। কাশী ছেড়ে আমাকে পালাতে হলো। পালাবো, কিন্তু জয়হরির মহাপাপের একটা হেস্তনেস্ত করবার উপায় না কোরে পালাতে আমার মন চায় না। দেখি, সৌদামিনী কিরূপ উত্তর দেয়।

    আর কোন নূতনলোকের সঙ্গে আমি আলাপ করি না, কার্য্যালয় ছাড়া আর কোন স্থানে আমি যাই না; বড়বাবুর সঙ্গে যাই, বড়বাবুর সঙ্গেই ঘরে আসি, ভয়ে ভয়ে পথের চারিদিকে চোমকে চোমকে চাইতে চাইতে যাই আসি। এই ভাবেই দিন যায়। বাড়ীতেও নির্ভয়ে থাকি না; মেজোবাবু যে রকম কাণ্ড আরম্ভ কোরেছেন, কখন কি ঘটে, কখন কি বিপদ উপস্থিত হয়, সেই ভয়ে আমি কাঁপি। আমার উপর মেজোবাবুর বড় রাগ, কোন দিন কোন কৌশলে আমারে তিনি কোন বিপদে ফেলেন, সৰ্ব্বক্ষণ সে ভয়টাও আমার মনে জাগে। এ বাড়ীতেও আমি আর নিরাপদ নই।

    সাতদিন অতীত। রবিবার আগত। সুর্য্যদেব আকাশে থাকতে থাকতেই আমি ছাদে। সৌদামিনীর স্থানে সৌদামিনী নাই। অন্যমনস্ক হয়ে ছাদের উপর আমি বেড়াচ্ছি, এক একবার সেই দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছি, সৌদামিনী এলো না। মনে কোল্লেম, আমার চিঠি পেয়ে রাগ কোরেছে, আসবে না, পত্রের উত্তরও দিবে না।

    ভাবছি, এমন সময় দেখি, আমাদের ছাদের সিঁড়ির কাছে একটী গোলক; বেশ চিত্রবিচিত্র করা, সুডৌল অতিসুন্দর একটী গোলক। দ্রূত সেই দিকে অগ্রসর হয়ে, কৌতুহল-কৌতুকে সেই গোলকটী আমি হাতে কোরে নিয়েই দ্রুত গতিতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেম; বৈঠকখানায় এসে বোসলেম। কেহ কোথাও নাই। দিব্য সুবিধা। সাবধানে-সন্তর্পণে গোলকটীর মাঝামাঝি দুখানা কোরে ভাঙলেম। ঠিক তাই। গোলকের গর্ভেই গুপ্তলিপি। বঙ্গ-মহিলারা যেমন গুপ্তধনের ব্রত করে, সন্দেশের মধ্যে, চন্দ্রপুলির গর্ভে যেমন সিকি, আধলি, টাকা রেখে ব্রাহ্মণকে দান করে, এ কৌশলটীও ঠিক সেই রূপ;—গোলকের গর্ভে গুপ্তলিপি। রক্তবর্ণ পত্রিকা, কৃষ্ণবর্ণ অক্ষর। মোড়ক খুলে সেই গুপ্তলিপি আমি পাঠ কোল্লেম। মূলপত্রিকা আর উত্তরপত্রিকা পাঠকমহাশয় দর্শন কোরেছেন, তৃতীয়বারের এই প্রত্যুত্তরপত্রিকাখানিও দর্শন করুন।

    “হরিদাস! তোমার নাম হরিদাস? হা হা, নামটী বড়ই মিষ্ট লাগিল, বড়ই তুষ্ট করিল। তোমার সুললিত পত্রখানি আমি পাঠ করিলাম। তিনবার পাঠ করিয়াছি। তিনবার সেই পত্রের উপর অশ্রুপাত করিয়াছি। তুমি বুঝি মনে করিতেছ, পত্র পাঠ করিয়া আমি কাঁদিয়াছি? না হরিদাস! আমি কাঁদি নাই, আমার সে অশ্রু; রোদনের অশ্রু নয়,—আনন্দের অশ্রু, প্রেমানন্দের অশ্রুধারা!

    হরিদাস! তুমি কেবল রবিবারে একটীবার মাত্র আমারে দেখা দাও। রবিদেব শীঘ্র শীঘ্র অস্তাচলে চলিয়া যান, আর আমি তোমারে দেখিতে পাই না। কেন হরিদাস, অন্যদিন কি তুমি আমারে দেখা দিতে পার না? কেন পার? দিও,—এখন অবধি সকল বারেই এক একবার তুমি আমারে দেখা দিও।

    দিও দেখা, প্রাণসখা, এ মম মিনতি।

    হরিদাস! বড় আশ্চর্য্য কথা! তুমি আমার নাম জান! বিধাতার অনুগ্রহ। বড় আশ্চর্য্য কথা! আমার ভাগ্যের অনেক কথাই তুমি জান! বয়স তোমার অল্প, কিন্তু কাব্যালঙ্কারে তুমি অলঙ্কৃত। পিতৃগৃহে অনেকদিন আমি রামেশ্বর বিদ্যালঙ্কারের নিকটে কাব্যশাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়াছি, কি বলিব, কাব্যশাস্ত্রে তোমার যেমন অধিকার, বিদ্যালঙ্কার মহাশয়েরও ততদূর অধিকার ছিল না। রূপকে রূপকে জয়পরাজয়ের ধুয়া ধরিয়া আমার উপর তুমি যেরূপ শ্লেষবাণ সন্ধান করিয়াছ, তাহা পাঠ করিয়া আমি চমৎকৃত হইয়াছি! ভয় নাই হরিদাস, ভয় নাই! সে পাপ আমি বিদায় করিয়া দিয়াছি। অজ্ঞানে আমি সেই পাপিষ্ঠের প্রতি অনুরাগিণী হইয়াছিলাম, তাহার স্বভাবচরিত্র অগ্রে আমি জানিতে পারি নাই। তুমি সন্ন্যাসীর কথা তুলিয়াছ, সন্ন্যাসীরা অনুসন্ধান করিয়া বেড়াইতেছে, পুলিশের সঙ্গে তাহাদের যোগাযোগ হইয়াছে, এ কথা আমিও শুনিয়াছি। আমার প্রাণে ভয় হইয়াছে। জয়হরি যখন আমারে কাশীতে লইয়া আসিবার মন্ত্রণা করে, তখন শীঘ্র আমি সম্মত হই নাই; শেষকালে জয়হরি আমারে ভয় দেখায়। আমার ঘরে সন্ন্যাসীর মাথা কাটা, আমি কলিকাতায় থাকিলে পুলিশের হাতে ধরা পড়িব, মহা বিপদ ঘটিবে, এই প্রকার নানা কথা। সে সকল কথা আমি পত্রে লিখিয়া জানাইতে ভয় করি; তোমার সহিত সাক্ষাৎ হইলে সকল কথা বলিব।

    জয়হরির কথায় ভয় পাইয়া তাহার সঙ্গে আমি কাশীতে আসিয়াছিলাম। এখানে আনিয়া জয়হরি আমাকে অবজ্ঞা করিতে আরম্ভ করিল, প্রতারণা খেলিতে লাগিল। এখানে না কি অনেক রকম বাইজী থাকে, তাহাদের পাঁচজনের সঙ্গে জয়হরি মিলিয়া গেল; সকল দিন তাহারে আমি দেখিতে পাইতাম না; এক একরাত্রে মদ খাইয়া আসিয়া আমাকে প্রহার করিত; ‘তুই সেই সন্ন্যাসীটাকে কাটিয়া ফেলিয়াছিস, পুলিশ তোরে ধরিতে আসিতেছে,’ এই সব কথা বলিয়া কতই হাঙ্গামা করিত। আমার বাপের বাড়ীর এক দাসী আমার সঙ্গে ছিল, আমার আদেশে সন্ধানে সন্ধানে থাকিয়া সেই দাসী জানিয়া আসিয়াছিল, একটা বাইজীর নাম চন্দ্রকলা। আমি সেই চন্দ্রকলাকে একদিন বাড়ীতে আনাইয়াছিলাম, চন্দ্রকলা আমার সাক্ষাতে অনেক কথা বলিয়া গিয়াছে, দেখা হইলে সে সব কথাও আমি তোমাকে বলিব। রমাইসন্ন্যাসীকে খুন করিয়াছে কে? সে কথা কেবল আমি জানি আর আমার সেই দাসীটী জানে; আর কেহ জানে না। সেই দাসী এখন এখান হইতে পলাইয়া গিয়াছে; কোথায় গিয়াছে, তাহা আমি জানি না। তুমি এখন জানিয়া রাখ, খুন করিয়াছে, জয়হরি বড়াল। নিজে খুন করিয়া আমাকে ফাঁসাইতে চায়, বড় ভয়ানক লোক, ক্রমে ক্রমে বুঝিতে পারিয়া তাহাকে আমি তাড়াইয়া দিয়াছি। পাপকর্ম্মের কি ফল, তাহা এখন আমি বুঝিতে পারিয়াছি।

    বাবা বিশ্বেশ্বরকে প্রণাম করি, মা অন্নপূর্ণাকে প্রণাম করি, দিনপতি সূর্য্যদেবকে প্রণাম করি, মনের কপাট খুলিয়া অকপটে আমি বলিতেছি, আর আমার পাপকর্ম্মে মতি নাই। প্রথম পত্রে তোমারে আমি যে সব কথা লিখিয়াছিলাম, সে সব কেবল তোমার মন-পরীক্ষার জন্য; বাস্তবিক একজন পুরষমানুষের সহায়তা না পাইলে, দুষ্টলোককে দমন করিবার উপায় করা যায় না, সেইজন্য তোমার সঙ্গে দেখা করতে আমার অভিলাষ। বিদেশে আসিয়াছি, অপরপুরুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা দোষের কথা; অনুতাপ আসিয়াছে বালক-বুদ্ধিতে লোভে পড়িয়া যদি তুমি দেখা দাও, সেই জন্যই সেই সব কথা আমার লেখা। কোন সন্দেহ করিও না, সত্য বলিতেছি হরিদাস! পাপকর্ম্মে আমার আর মতি নাই; কোন সন্দেহ করিও না; একটীবার দেখা দিও। পাপের ফল আমি বিলক্ষণ ভোগ করিয়াছি; জয়হরি বড়াল আপনার পাপের ফল ভোগ করে, এখন কেবল আমার এই ইচ্ছা। তুমি বুঝিয়াছিলে, আমার প্রথম-পত্ৰখানি প্রেম-পত্রিকা; সত্যই সেই রকম ভাব। আমার হাসি পায়। তোমার মুখ দেখিয়া আমি বেশ বুঝিতে পারিয়াছিলাম, তোমার চরিত্র নির্ম্মল, কোন প্রকার ছলের কুহকে তুমি ভুলিবে না, তাহাও আমি বুঝিয়াছিলাম, কেবল পরীক্ষার জন্যই প্রেম-ভাবের কথাগুলি রচনা করিয়াছিলাম। সে সব কিছুই নহে, সে সব তুমি ভুলিয়া যাও; একটীবার দেখা দিও, দুষ্টশাসনের পরামর্শ করিব। আবার আমি বলিতেছি, পাপকর্ম্মে আমার আর মতি নাই; মায়ের পেটের ভাই যেমন স্নেহের সামগ্রী, সেই ভাবে তোমাকে আমি বিশুদ্ধ দৃষ্টিতে দর্শন করি। আর বেশী কি লিখিব? এ কথার উপর আর কি কোন সন্দেহের কথা আছে? আর কি আমার উপর তোমার কোন প্রকার সন্দেহ আসিতে পারে? কোন সন্দেহ রাখিও না, একটীবার দেখা দিও। এই বাড়ীতে আসিতে যদি ইচ্ছা কর, যখন ইচ্ছা, স্বচ্ছন্দে আসিও; এ বাড়ীতে আসিতে যদি সাহস না হয়, কোথায় দেখা হইবে, লিখিয়া জানাইও, দাসী সঙ্গে করিয়া আমি সেইখানেই যাইব।

    শ্ৰীমতী সৌদামিনী দেবী।”

    বাহবা বাহবা! চমৎকার দলীল আমার হস্তে! সর্ব্ববিধির বিধাতা, সর্ব্বনিয়মের নিয়ন্তা, সৰ্ব্বকার্য্যের ফলদাতা, সৰ্ব্বপাপের সাক্ষী-শাস্তা, সর্ব্বময় মহাপুরুষ যিনি, তাঁহারে নমস্কার, জয়হরি বড়ালের দণ্ডবিধানের চমৎকার দলীল আমার হস্তে!

    সৌদামিনী দেখা কোত্তে চায়। আছে কি দেখা করার প্রয়োজন?—হানিই বা কি? পত্রিকা বলে, পাপকর্ম্মে আর মতি নাই। অনুতাপিনী পাপিনীর সঙ্গে দেখা করাতে দোষ কি? দেখা না কোল্লেও আসল কাজের কোন বিঘ্ন হবার সম্ভাবনা দেখছি না। দুটী সাক্ষী মিলে গেল। দুজনেই প্রত্যক্ষ সাক্ষী। এক সাক্ষী কামিনীর মা, এক সাক্ষী সৌদামিনী। উত্তম জোগাড় হয়েছে। যত্ন কোরে পত্রখানি আমি আপনার কাছেই রাখলেম, গবাক্ষপথ দিয়ে ভগ্নগোলকের খণ্ড-দুখানি রাস্তায় ফেলে দিলেম; ঘরে আর কোন চিহ্নই থাকলো না। আমি একপ্রকার নিশ্চিন্ত হোলেম।

    দুদিন গেল। সৌদামিনীর সঙ্গে দেখা কোল্লেম না, পত্রের উত্তরও দিলেম না। এদিকে আমাদের মেজোবাবুটী অকস্মাৎ নিরুদ্দেশ। চারি পাঁচদিন মেজোবাবু বাসাছাড়া; কর্ম্মস্থলেও থাকেন না, বাসাতেও না। কেহই আর তাঁর দেখা পান না। কোথায় গিয়েছেন, কেহই কিছুই জানে না, কেহই কিছু, বলে না।

    বড়বাবু মহা উদ্বিগ্ন। এ উদ্বেগের অপেক্ষা নবীনকালীর নিরুদ্দেশের উদ্বেগটা আরও অধিক। নবীনকালী যুবতী, নবীনকালী বিধবা, রাত্রিকালে অদৃশ্য, উদ্বেগটা অধিক হবারই কথা। বাড়ীর সকলেই ভাবনায় ব্যাকুল। সকলেরই বদন বিষন্ন, কারো মুখে হাসি নাই, দুই একটা কথা ভিন্ন কারো মুখে বেশীকথা নাই, কারো মনে ফূৰ্ত্তি নাই, বাড়ী যেন বিষাদ-মেঘে সমাছন্ন। বড়বাবুর আফিসে যাওয়া বন্ধ হয় না, আমিও তাঁর সঙ্গে দস্তুরমত আফিসে যাই, নামমাত্র কাজকৰ্ম্ম করি, মন কিন্তু সৰ্ব্বদাই চঞ্চল। একদিন বড়বাবু সকাল সকাল কাজকর্ম্ম সমাধা কোরে চোলে এসেছেন, বাড়ী আসবার সময় আমি একা। আসছি, রাস্তার ধারে সারি সারি গোটাকতক গাছ। তখনো রৌদ্র ছিল, গাছের ছায়ায় ছায়ায় মৃদুগতিতে আমি চোলে আসছি, অন্য কোন দিকেই দৃষ্টি রাখছি না। দিনকতক আমি অত্যন্ত অন্যমনস্ক। কেন অন্যমনস্ক, এ প্রশ্নের কৈফিয়ৎ দিতে হবে না; সাংসারিক ঘটনাবলী যাঁরা জানেন, তাঁরা সকলেই আমার মনের ভাব বুঝতে পাচ্ছেন। আসছি, অনেক দূর এসেছি, এক জায়গায় হঠাৎ আট দশজন লোক কি একটা পদার্থকে বেষ্টন কোরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে হা-হুতাশ কোচ্ছে, একটু তফাৎ থেকে আমি দেখলেম। মনের ভিতর আতঙ্কই থাকুক, দুর্ভাবনাই থাকুক অথবা এক ফূর্ত্তিই থাকুক, ঘটনার তত্ত্ব অন্বেষণ করবার ইচ্ছাটা আমার সৰ্ব্বদাই বলবতী থাকে;—লোকেরা কেন সে রকম হা-হতাশ কোচ্ছিল, জানবার জন্য পায়ে পায়ে সেই দিকে আমি অগ্রসর হলেম; নিকটে গিয়ে দেখলেম, পদার্থটা নির্জীব নয়, একটা মানুষ;—ঘাসের উপর চিৎপাৎ হয়ে শুয়ে পোড়ে আছে, দুজন লোক দুপাশে বোসে শুশ্রূষা কোচ্ছে;—একজন বাতাস দিচ্ছে, আর একজন জল ঢালছে। মানুষটা অজ্ঞান। তখনো পর্য্যন্ত আমি তার চেহারাটা ভাল কোরে দেখতে পাই নাই, একজনকে জিজ্ঞাসা কোরে জানলেম, পথে চোলতে চোলতে অকস্মাৎ পোড়ে গিয়েছে, পোড়েই মূর্চ্ছা গিয়েছে, মুখ দিয়ে গাঁজা ভাঙছে, অস্পন্দ, অসাড়;—জ্ঞান নাই, কিন্তু প্রাণ আছে। কেহ বোলছে মৃগীরোগ, কেহ বোলছে সর্পাঘাত, কেহ বোলছে সর্দ্দিগর্ম্মি। সম্মুখের দুজন লোকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে আমি দেখলেম, কি ব্যাপার। দেখেই অম্নি পেছিয়ে দাঁড়ালেম, আতঙ্কে শিউরে উঠলেম, আর সেখানে দাঁড়ালেম না;—ধীরে ধীরে চোলছিলেম, ছুট দিলেম; ছুটে ছুটে হাঁপিয়ে উঠলেম;—শীত এলো;—শীতে আমার সর্ব্বাঙ্গ কাঁপতে লাগলো;—তথাপি ছুটছি; কাঁপছি আর ছুটছি;—পশ্চাদ্দিকে আর চেয়ে দেখছি না। কেন এত ভয়? মানুষটা অজ্ঞান হয়ে পোড়ে আছে, তাই দেখেই কি আমি ভয় পেলেম?—তা নয়; মুখ দিয়ে গাঁজা ভাঙছে! মোরবে না কি?—মরে তো ভাল হয়। এখনি যদি মরে, মরার ভয়ে কি ভয় পেলেম?—তাও নয়। তবে কি? লোকটা কে?—লোকটা সেই আমার বিভীষিকা রক্তদন্ত!—এ পাপটা এখনো কাশীতে আছে! তবে তো আমার রক্ষা নাই, মোহনবাবুর নূতন রাগ,—এ লোক যদি বাঁচে, এবারে আর কোনো প্রকারেই রক্ষা নাই। তাই ভেবেই আমার ভয়, তাই ভেবেই আমি ছুটে পালাচ্ছি;—অস্পন্দ অসাড়, এখনি ছুটে এসে আমাকে ধোত্তে পারবে না, তবুও আমি ভয় পেয়ে ছুটে পালাচ্ছি। দৌড়ে দৌড়ে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বাড়ীতে এসে পৌছিলেম।

    বড়বাবু তখনো বাড়ীতে আসেন নাই। বৈঠকখানায় প্রবেশ কোরে, খানিকক্ষণ পাখার বাতাস খেয়ে, একটু সুস্থ হয়ে, কাপড় ছেড়ে, ভিতরদিকের বারান্দায় গিয়ে আমি দাঁড়ালেম; আবার তখনি তখনি ঘরে ফিরে এলেম; আবার বারান্দায় গেলেম, আবার ফিরে এসে ঘরের ভিতর প্রবেশ কোল্লেম। বুকের ভিতর ভয়ের সঙ্গে চিন্তাতরঙ্গের খেলা। রক্তদন্ত কাশীতে আছে! হয় তো চোলে গিয়েছিল, মোহনবাবু হয় তো চিঠি লিখে আবার ওটাকে এখানে আনিয়েছেন। মরে তো ভালই হয়; বাঁচে যদি, তবে আর এবার আমার নিস্তার থাকবে না। মরুক, বাঁচুক, যা-ই হোক, আমি আর কাশীতে থাকবো না। বড়বাবুর সঙ্গে দেখা না হোলেও আজিই আমি পালাবো!

    সঙ্কল্প স্থির। দোয়াত, কলম, কাগজ সম্মুখে এনে ব্যগ্রহস্তে দুখানা চিঠি লিখলেম; একখানা পুলিশের নামে, একখানা বড়বাবুর নামে। পুলিশের চিঠিখানা আমার কাছেই থাকলো, বড়বাবুর চিঠিখানা বিছানার উপর তাকিয়ার নীচে রাখলেম। পুলিশে লিখলেম, কলিকাতার বিশ্বেশ্বরবাবুর বাড়ীর সন্ন্যাসী-হত্যার কথা, হত্যাকারী জয়হরি বড়ালের সন্ধানের কথা, সৌদামিনীর ঠিকানার কথা, কামিনীর মার মনিববাড়ীর কথা। এই সকল কথার আনুসঙ্গিক যে যে কথা লেখা আবশ্যক, সংক্ষেপে সংক্ষেপে সে কথাগুলিও লিখলেম; সৌদামিনীর দ্বিতীয় চিঠিখানার নকলও পুলিশের চিঠির খামের মধ্যে রেখে দিলেম। বড়বাবুর চিঠিতে লিখলেম:

    ‘মহাশয়!

    আপনার দয়ার আশ্রয়ে আমি পরমসুখে ছিলাম, বিধাতা বাদ সাধিলেন। আর আমি কাশীতে থাকিতে পারিলাম না। অকারণে আমার কতকগুলা শত্রু কাশীতে আসিয়াছে, রাস্তার ধারে অদ্য আমি একজনকে দেখিয়া আসিয়াছি, সে লোক অতি ভয়ঙ্কর, তাহার কবলে পড়িলেই আমার প্রাণ যাইবে; অতএব আমি অদ্যই কাশীধাম পরিত্যাগ করিলাম, মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য অপেক্ষা করিতে পারিলাম না, এ অপরাধ ক্ষমা করিবেন। ভগবান বিশ্বেশ্বর আপনার পরিবারবর্গের মঙ্গলবিধান করুন। আমার শুভদিন সমাগত হইলে পুনরায় মহাশয়ের চরণ দর্শন করিয়া কৃতজ্ঞতা জানাই। অদ্য বিদায় হইলাম।

    আশ্রিত শ্রীহরিদাস।”

    চিঠি-দুখানি লেখা হোলে একবার আমি অন্দরমহলে প্রবেশ কোল্লেম। রমেন্দ্রবাবুর জ্যেষ্ঠা পত্নীকে বোল্লেম, মা! আপনার কাছে আমার যে টাকাগুলি গচ্ছিত আছে, হঠাৎ বিশেষ প্রয়োজন, দয়া কোরে সেইগুলি আমারে প্রদান করুন। কি প্রয়োজন, কি বৃত্তান্ত, কিছুই জিজ্ঞাসা না কোরে স্নেহময়ী দয়াবতী তৎক্ষণাৎ আপনার বাক্স খুলে আমার টাকাগুলি আমার হাতে দিলেন, তাঁরে প্রণাম কোরে আমি বাহির হয়ে এলেম। এইখানে বলা উচিত, আমার বেতনের টাকাগুলি মাসে মাসে গৃহিণীর কাছেই আমি জমা রাখতেম, আমি চাইতেম না, তথাপি মাসে মাসে আমার নিজ খরচের নাম কোরে কিছু, কিছু, তিনি আমারে দিতেন, সেইগুলি আমি নিজের কাছে রাখতেম।

    বন্দোবস্ত ঠিকঠাক। কাৰ্য্যান্তরে যজ্ঞেশ্বরও সে সময়ে কোথায় গিয়েছিল, যজ্ঞেশ্বরের কাছেও বিদায় লওয়া হলো না, ঠিক গোধূলিলগ্নে সজলনয়নে সেই সখাশ্রম থেকে আমি বেরুলেম। পুলিশের চিঠিখানি কাশী-পুলিশের ঠিকানায় নিজেই আমি ডাকঘরের ডাকবাক্সে দিলেম। চিঠিতে আমি নাম স্বাক্ষর করি নাই, সৌদামিনীর চিঠির স্থানে স্থানে আমার নাম লেখা ছিল, নকলে সেগুলি আমি বাদ দিয়েছিলেম। সৌদামিনীর আসল চিঠি আমার কাছেই থাকলো। পুলিশের চিঠিখানি বেনামী।

    উদ্দেশে অন্নপূর্ণা-বিশ্বেশ্বরকে প্রণাম কোরে কাশীর গঙ্গায় আমি নৌকা আরোহণ কোল্লেম। কাশীতে আমার স্থান হলো না। কত লোক কাশীতে আছে, ‘অন্নপর্ণা সকল লোককেই অন্ন দেন, সকলেই নিরাপদে থাকে, আমি নিরাপদে কাশীধামে স্থান পেলেম না। কালভৈরব আমারে তাড়ালেন না, কৰ্ম্মদোষে যারা পাতকী, কালভৈরব সেই সকল পাতকীলোককেই তাড়ান; আমার কর্ম্মদোষ ছিল না, কালভৈরব আমাকে তাড়ালেন না, দুরাচার, নিষ্ঠুর, পিশাচ রক্তদন্তই আমার ভাগ্যে কালভৈরব!

  • বিংশ কল্প : নূতন বন্ধু;—কামরূপদর্শন

    বিংশ কল্প : নূতন বন্ধু;—কামরূপদর্শন

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    বিংশ কল্প : নূতন বন্ধু;—কামরূপদর্শন

    নৌকায় আরোহণ কোল্লেম। ভাগীরথী আপন মনে উত্তরমুখে ছুটেছেন, মহাবিপদে আমি নিপতিত, কাতর-হৃদয়ে আমার অবস্থার কথা তাঁরে আমি জানালেম। ভাগীরথীর দ্রব-হৃদয় আমার দুঃখে আর অধিক দ্রবীভূত হলো না, আমার কাতরবচনে দ্রবময়ী দেবী কিছুই উত্তর দিলেন না, আপন বেগে আপনিই নেচে নেচে আপন পথে চোলে যেতে লাগলেন। আমি এখন যাই কোথা? মাঝীকে বোলেছিলেম, প্রয়াগে যাব। নৌকায় বোসে বোসে ভাবলেম, প্রয়াগে হয় তো মোহনলালবাবু আছেন, সেখানে গেলে হয় তো আমি তাঁর চক্ষে পোড়বো, আবার একটা নূতন বিপদ উপস্থিত হবে। বাতাস তখন উত্তরদিকে ফিরেছিল; মলয়পর্ব্বতের বাতাস, সুখীজনের সুস্থ শরীরকে সুশীতল করে, আমার পক্ষে মলয়ানিল সুখপ্রদ বোধ হলো না; কেন না, আমি অসুখী। বাতাসের দয়া আছে। আমি অসুখী হোলেও পবন যেন আমার কাণে কাণে পরামর্শ দিলেন, “তুমি প্রয়াগতীর্থে যাও; যে লোকের ভয়ে তোমার মন বিচলিত হচ্ছে, সে লোক এখন প্রয়াগে নাই, বাঙলাদেশে চোলে গিয়েছে।”

    বাতাসের কথায় আমি ভরসা পেলেম; মনেও প্রত্যয় জন্মিল, ঐ কথাই ঠিক। কাশীর বাইজীকে সহচরী কোরে মোহনলালবাবু দেশেই ফিরে গিয়েছেন; যদিও নিজদেশে নিজবাড়ীতে না গিয়ে থাকেন, সহচরী-সঙ্গে সখের রাজধানী কলিকাতায় গিয়েছেন, এইটীই সম্ভব; প্রয়াগে নাই। তবে আমি প্রয়াগেই যাব। কর্ণধারকে পূর্ব্বে সেইরূপ উপদেশ দেওয়াই ছিল, যথাসময়ে প্রয়াগের ঘাটে নৌকা পৌঁছিল, আমি অবতীর্ণ হোলেম। প্রয়াগ একটী পূণ্যতীর্থ; গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী সঙ্গম। গঙ্গাজল শ্বেতবর্ণ, যমুনার জল নীলবর্ণ। গঙ্গায় জোয়ারভাটা নাই, শুদ্ধ সময়ে সময়ে জলের হ্রাস-বৃদ্ধি আছে। যমুনা সৰ্ব্বদা সমভাব। যমুনাতীরে কেল্লা। একজন পাণ্ডা আমারে অধিকার কোরেছিল, তার সঙ্গে আমি দর্শনীয় পদার্থগুলি দর্শন কোল্লেম। মন্দির অনেক। মন্দিরগুলি স্তম্ভে স্তম্ভে খিলানকরা, দেখতে অতি সুন্দর। কেল্লার নিকটে প্রকাণ্ড মহাবীরের প্রতিমূর্ত্তি; স্কন্ধে রাম-লক্ষ্মণ, করতলে দুটী পৰ্ব্বত। কেল্লার ভিতর গহ্বরমধ্যে অক্ষয়বট। অন্ধকার গহ্বরে আমি অক্ষয়বট দর্শন কোল্লেম। পত্ৰগুলি শ্বেতবর্ণ। তার পর অপরাপর দেবদেবী-দর্শনে। সঙ্গমের প্রায় দুই ক্রোশ দূরে অনন্তনাগের প্রতিমূর্ত্তি; অনন্ত-নাগের সহস্র ফণা। নিকটে ভরদ্বাজমুনির আশ্রম; আশ্রমের অদূরে বড় বড় উদ্যানমধ্যে অনেক সাধুপুরুষে বাস করেন। প্রয়াগধাম অতি পবিত্র। মুসলমান-রাজার আমলে প্রয়াগের নাম হয়েছে এলাহাবাদ।

    আমার সঙ্গে অতি অল্পই টাকা ছিল, সামান্য একখানি ঘর ভাড়া নিয়ে তিনদিন তিনরাত্রি আমি প্রয়াগবাস কোল্লেম। প্রয়াগে অনেকে মস্তকমুণ্ডন করে, আমি কিন্তু কোন নাপিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ কোল্লেম না। আমার শুনা ছিল, তীর্থে তীর্থে বিস্তর বদমাসলোক থাকে; একটা জুয়াচোরের পাল্লায় আমি পোড়েছিলেম, সঙ্গে অধিক টাকা ছিল না, সেইটা জানতে পেরে জুয়াচোরটা আমারে অল্পে অল্পে ছেড়ে দিয়েছিল।

    টাকার অভাব, সঙ্গে কেহ নাই, প্রয়াগ থেকে কোথা যাব, সেই তিনদিন কেবল আমি সেই চিন্তাই কোরেছিলেম। চিন্তায় কোন ফল হয় নাই, দৈবানুগ্রহে একটী শুভসংযোগ সংঘটিত। তৃতীয়রজনী-অবসানে চতুর্থ দিবসের প্রাতঃকালে আমি সঙ্গমঘাটে স্নান কোত্তে গিয়েছি, অনেক লোক সেই ঘাটে স্নান কোচ্ছিলেন, সকলেই আমার চক্ষে নূতন। আমি যখন স্নান কোরে উঠলেম, সেই সময় একটী ভদ্রলোক আমার দিকে চাইতে চাইতে নিকটে এসে উপস্থিত হোলেন। বাঙালী ভদ্রলোক; লোকটীর চেহারা দিব্য সুন্দর; উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, গঠন কিছু দীর্ঘ, বেশী মোটাও নয়, নিতান্ত কাহিলও নয়, মুখখানি প্রসন্ন; কণ্ঠদেশে সোণার তারে গাঁথা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রুদ্রাক্ষমালা, দক্ষিণবাহুতে স্বর্ণ নির্ম্মিত একখানি ইষ্টকবচ; বয়স অনুমান পঞ্চাশ বৎসর। সঙ্গে একটী লোক; চেহারায় আর পরিচ্ছদে বোধ হলো চাকর।

    ভদ্রলোকটী খানিকক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে, কি জানি কি ভেবে, মিষ্টবচনে আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “প্রয়াগেই কি তুমি থাকো?”

    ভয়ই থাক, ভাবনাই থাক, কিম্বা একটু স্ফূর্ত্তিই থাক, ভদ্রলোকের কাছে সৰ্ব্বক্ষণ আমি সপ্রতিভ। প্রশ্ন শ্রবণমাত্রই প্রশান্তনয়নে প্রশ্নকর্ত্তার মুখপানে চেয়ে সুস্থিরকণ্ঠে আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা না, এখানে আমি থাকি না, কোথাও আমি থাকি না, আমার থাকবার স্থান নাই।”

    উত্তরশ্রবণে বিস্ময় প্রকাশ কোরে সেই ভদ্রলোকটী একবার ভ্রূ কুঞ্চিত কোল্লেন, গম্ভীরবদনে বোল্লেন, “বড় আশ্চর্য্য কথা! কোথাও তুমি থাকো না? কোথাও তোমার থাকবার স্থান নাই? এটা তোমার কি প্রকার কথা?”

    তাঁর মুখের ভাব দেখে আমি যেন বুঝলেম, লোকটী আমারে পাগল মনে কোল্লেন, যা-ই মনে করুন, চুপ কোরে না থেকে সত্য সত্য গুটীকতক আত্মপরিচয় তাঁরে আমি জানালেম, জানিয়েই বিনা জিজ্ঞাসায় শীঘ্র শীঘ্র বোল্লেম, “বাঙলাদেশে আমি থাকতেম আমার নাম হরিদাস।”

    এইবার সেই লোকটীর মুখের ভাব পরিবর্ত্তিত হলো। ভাব দেখে আমি বুঝলেম, পূৰ্ব্বসংশয়টা, পূর্ব্ববিস্ময়টা অথবা পূর্ব্ববিশ্বাসটা দূর হয়ে গেল; আমার প্রতি যেন তাঁর একটু দয়া জন্মিল। সদয়বচনে তিনি আমায় বোল্লেন, “আচ্ছা, তুমি আমার সঙ্গে এসো, নিকটেই আমার বাসা, সেইখানে গিয়ে সকল কথা আমি শুনবো।”

    আমি বোল্লেম, “তিনদিন হলো, আমি এখানে এসেছি, ছোট একটী বাসা নিয়েছি, সে বাসায় আমার কিছু কিছু জিনিসপত্র আছে, সেখানে ফিরে না গেলে—”

    বোলছিলেম, বাধা দিয়ে তিনি বোল্লেন, “সে ব্যবস্থা পরে হবে, এখন তুমি আমার সঙ্গে আমার বাসায় চল।”—আর আমি দ্বিরুক্তি কোল্লেম না, তিনি দক্ষিণমুখে অগ্রসর হোলেন, কতক উল্লাসে, কতক সন্দেহে আমি অনুগামী; আমাদের পশ্চাতে চাকরটী।

    অদূরেই তাঁর বাসা। সেই বাসায় আমরা উপস্থিত হোলেম। বাড়ীখানি দোতালা, দিব্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, একমহল। উপরের একটী ঘরে আমারে তিনি নিয়ে গেলেন; স্নান কোরে সিক্তবস্ত্রে আমি গিয়েছিলেম, চাকরকে বোলে আমার জন্য একখানি শুষ্কবস্ত্র আনিয়ে দিলেন। আমি কাপড় ছাড়লেম। চাকর আমারে কিছু মিঠাই এনে দিলে, জল খেয়ে, বাবুর আদেশে বাবুর কাছে বিছানার উপর আমি বোসলেম। বেলা অধিক হয় নাই, বাবু আমারে উপর্য্যুপরি অনেকগুলি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা কোল্লেন। যে কথাগুলি বলবার নয়, যেগুলি বলবার দরকার ছিল না, সেইগুলি ছাড়া তাঁর সকল প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর আমি প্রদান কোল্লেম; বিনা প্রশ্নেও নিজের অবস্থাকাহিনী অল্প অল্প জানালেম; শুনে তিনি খানিকক্ষণ চুপ কোরে থাকলেন, তার পর বোল্লেন, “অদ্ভুত ঘটনা বটে! তোমার মত বালকের এমন ঘটনা হয়, এমন আমি কোথাও শুনি নাই; উপকথায় লেখা থাকতে পারে, কিন্তু সত্যজীবনে বাঙালী বালকের এমন অবস্থা ঘটে, তোমার মুখে এই আমি নূতন শুনলেম। আচ্ছা, থাকো,—আমার কাছেই তুমি থাকো, আমি তোমার ভরণপোষণের সুব্যবস্থা কোরে দিব, যেখানে আমি যাব, তুমি আমার সঙ্গে থাকবে, তার পর আমি তোমারে আমার স্বদেশে নিয়ে যাব। বেশ ছোকরা তুমি, তোমার উপর আমি বিশেষ সন্তুষ্ট হয়েছি, আমার কাছেই তুমি থাকো।”

    যিনি অনাথবন্ধু, সংসারে তিনি চিরদিন অনাথের সহায়, নিরুপায়ের উপায়। আমি একটী আশ্রয় অন্বেষণ কোচ্ছিলেম, একটী আশ্রয় পাবার প্রত্যাশায় লালায়িত হোচ্ছিলেম, সেই অন্তর্যামী অনাথবন্ধু আমার প্রতি কৃপা কোরে এই নূতন আশ্রয়টী মিলিয়ে দিলেন। বাবুর আশ্বাসবাক্যে আশ্বস্ত হয়ে তাঁর কাছেই আমি থাকলেম।

    বাবুটী ব্রাহ্মণ, নাম দীনবন্ধু চট্টোপাধ্যায়, নিবাস মুর্শিদাবাদ, সেখানকার এক বনিয়াদী-বংশে তাঁর জন্ম, ধনসম্পত্তিও প্রচুর, অল্পক্ষণের মধ্যে এই তত্ত্বগুলি আমার জানা হলো। আমি আনন্দিত হোলেম।

    বেলা প্রায় দেড়প্রহর অতীত। বাসায় রসুইব্রাহ্মণ ছিল, রন্ধনাদি সমাপ্ত হোলে বাবুর অনুরোধে সেইখানে আমি আহার কোল্লেম। বৈকালে সেই চাকরটীকে সঙ্গে দিয়ে বাবু আমারে বাসায় পাঠালেন, তিন দিনের ভাড়া শোধ কোরে দিয়ে, জিনিসপত্রগুলি নিয়ে, সন্ধ্যার পর্ব্বে বাবুর বাসায় আমি ফিরে এলেম।

    পাঁচদিন সেই বাবুর বাসায় আমার থাকা হলো। পাঁচদিনে বাবু আমার চরিত্রের পরিচয় পেলেন, লেখাপড়ার পরিচয় পেলেন, দেশভ্রমণের কতক কতক পরিচয়ও পেলেন; পেলেন না কেবল বংশপরিচয়। ধর্ম্মানুরাগে আর বিদ্যানুরাগে বাবুটী বঞ্চিত ছিলেন না, পাঁচদিনে সে পরিচয়টীও আমি পেলেম। আমার প্রতি তাঁর স্নেহ জন্মিল, আমিও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবান হোলেম।

    পাঁচদিনের পর বাবু আমারে বোল্লেন, “অনেকগুলি তীর্থ আমি দর্শন কোরেছি, সম্প্রতি কামরূপদর্শনের অভিলাষ হয়েছে, কামাখ্যাদেবী সেখানকার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। আসামপ্রদেশে কামরূপতীর্থ-সম্বন্ধে অনেক আশ্চর্য্য কথা শুনা যায়; সেই তীর্থদর্শনে শীঘ্রই আমি যাব। তুমি কি আমার সঙ্গে সেখানে যেতে ইচ্ছা কর? তোমারে সঙ্গে লওয়া আমার ইচ্ছা। কামরূপ কিন্তু এখান থেকে অনেক দূর।”

    অনেক দূর, এই কথা শুনে আমার ইচ্ছা বলবতী হলো। যতদূরে যেতে পারি, ততই আমি নিরাপদে থাকবো, শত্রুরা শীঘ্র আমার সন্ধান পাবে না, সেই জন্যই ইচ্ছা বলবতী। ইচ্ছাকে পুরোবৰ্ত্তিনী কোরে, উল্লাসে উল্লাসে বাবুকে আমি বোল্লেম, “নূতন নূতন তীর্থদর্শনে আমার বড় সাধ, আপনি যদি অনুগ্রহ কোরে সঙ্গে নিয়ে যান, আমি চরিতার্থ হব।”

    বাবু সন্তুষ্ট হলেন। তিন দিন পরে কামরূপযাত্রার আয়োজন। নৌকাযোগেই আমরা যাত্রা কোল্লেম। বাবুর সেই চাকরটী আমাদের সঙ্গে থাকলো; পাচক ব্রাহ্মণ ঠিকালোক, সে আমাদের সঙ্গে থাকলো না। ক্রমাগত জলপথে স্থলপথে কত দিনে আসামে আমরা পৌঁছিলেম, ঠিক মনে হয় না।

    কামরূপে আমরা উপস্থিত হোলেম। আসামের একটী প্রধান নগর গৌহাটী। গৌহাটীর তিনমাইল দূরে কামরূপ। কামাখ্যাদেবী এখানে বিরাজিতা, এই কারণে কামরূপের দ্বিতীয় নাম কামাখ্যা। দেবীর অধিষ্ঠানের একটী পৌরাণিক প্রবাদ যে, দক্ষযজ্ঞে দক্ষমূখে শিবনিন্দা-শ্রবণে দক্ষকুমারী সতী-দেবী প্রাণত্যাগ করেন, দক্ষযজ্ঞভঙ্গের পর মহাদেব সতী-দেহ মস্তকে ধারণ কোরে উন্মত্তের ন্যায় নানাস্থানে পরিভ্রমণ করেন, বিষ্ণুচক্রে সেই দেহ একান্ন খণ্ডে বিখণ্ডিত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে পতিত হয়; যেখানে যেখানে সতী-অঙ্গ নিপতিত, সেই সেই স্থানে এক এক নামে এক একটী দেবী আছেন, মহাকাল মহেশ্বর ভিন্ন ভিন্ন মুর্ত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন নামে সেই সেই স্থানে ভৈরবরূপে বিরাজমান; সেই একান্ন স্থান একান্নপীষ্ঠ। সতীর একাঙ্গ কামরূপে পতিত হয়েছিল, এই পীঠের দেবীর নাম কামাখ্যা। অম্বুবাচীর সময় সেখানে খুব ঘটা হয়।

    কামরূপ একটী প্রাচীন তীর্থ। কি কারণে এই তীর্থের নাম কামরূপ, সে সম্বন্ধেও একটী প্রবাদ প্রচলিত আছে। হরকোপানলে কামদেব ভস্ম হয়েছিলেন, এই স্থানে পুনরায় স্বরুপ প্রাপ্ত হন, সেই জন্যই এই স্থানের নাম কামরূপ! এ প্রবাদের সত্যাসত্যতা ভূতকালের গর্ভগত।

    এখানকার সকলের মুখেই শুনা যায়, অন্যান্য দেশেও বলে, কামরূপকামাখ্যায় মায়াবিদ্যার বড়ই প্রাদুর্ভাব ছিল; কামাখ্যার ডাকিনীরা আশ্চর্য্য মায়াবিনী; মন্ত্রবলে তারা অন্যস্থানের স্থাবরপদার্থ কামাখ্যায় নিয়ে যেতে পাত্তো। গাছচালা ডাকিনী একটা প্রসিদ্ধ কথা। অন্যদেশের পুরষ কামাখ্যায় এলে আর স্বদেশে ফিরে যেতে পাত্তো না; এখানকার মায়াবিনীরা সেই সকল পুরষকে ভেড়া বানিয়ে রাখতো। ভেড়া বানিয়ে রাখা এ কথাটার তাৎপর্য্য বোধ হয়, জাদুমন্ত্রে ভুলিয়ে ভুলিয়ে বশীভূত কোরে রাখা। এখানকার লোকের মুখে আরো শুনা যায়, মায়াবিনীরা স্বেচ্ছাক্রমে পশুপক্ষীর রূপধারণ কোত্তে পাত্তো। এখনো পারে কি না, অপরাপর মায়ার খেলা এখনো চলে কি না, তার কোন প্রমাণ পাওয়া গেল না; কিন্তু ঐ সকল কথা যে একেবারেই মিথ্যা, এমনও বোধ হয়। কারণ, বঙ্গদেশের বাজীকরেরা,—ভানুমতীরূপিণী বেদিনীরা যেমন ভোজরাজার দোহাই দেয়, আত্মারাম সরকারের দোহাই দেয়, সেইরূপ কামরূপকামাখ্যার আজ্ঞার দোহাই দিয়ে অনেক আশ্চর্য্য আশ্চর্য্য ইন্দ্রজাল প্রদর্শন করে। জাদুবিদ্যার প্রাদুর্ভাব কামাখ্যায় ছিল, এ কথা অস্বীকার করা যায় না; যতটা গুজোব, ততটা সত্য নয়, এইরূপ অনুমান হয়।

    কামাখ্যাদেবীর মন্দিরটী অতি সুন্দর। একটা পৰ্ব্বতের উপর মন্দিরটী সংস্থাপিত। মন্দিরের প্রথম-নিৰ্মাণ-সম্বন্ধে একটা অলৌকিক কিম্বদন্তী আছে। বিষ্ণু যখন বরাহমূর্ত্তি ধারণ করেন, সেই সময় সেই বরাহের ঔরসে পৃথিবীর গর্ভে এক অসুরের জন্ম হয়, সেই অসুরের নাম নরকাসুর। এখানকার প্রাচীন রাজবংশ বিলুপ্ত হবার পর নরকাসুর রাজা হয়। নরকাসুর স্বভাবতঃ অত্যন্ত রিপুপরায়ণ ছিল; কথিত আছে, ষোড়শ সহস্র সুন্দরী কন্যাকে বলপূৰ্ব্বক হরণ কোরে এখানকার কর্ম্মনাশা নামে একটা ক্ষুদ্র পৰ্ব্বতের গহ্বরমধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল। সেই নরকাসুর একদা মূর্ত্তিমতী কামাখ্যাদেবীকে দর্শন কোরে, কামমোহিত হয়ে, তাঁরে বিবাহ কোত্তে চায়। দেবী তারে বলেন, “তুমি যদি একরাত্রের মধ্যে আমার মন্দির, নাটমন্দির, সরোবর, পুষ্পেদ্যান, প্রশস্ত বত্ম প্রস্তুত কোরে দিতে পার, তা হোলে আমি তোমাকে পতিত্বে বরণ কোত্তে সম্মত আছি; তোমার কার্য্য সমাপ্ত হবার অগ্রে, যদি রজনীপ্রভাত, হয়, তা হলে তোমার অস্তিত্বলোপ হবে।

    নরকাসুর মহা প্রতাপশালী নরপতি ছিল, সে তৎক্ষণাৎ বিশ্বকর্ম্মাকে স্মরণ কোল্পে, বিশ্বকর্ম্মা হাজির হলেন। অসুর তাঁরে দেবীকথিত প্রাসাদাদি-নির্ম্মাণের আজ্ঞা দিল; বিশ্বকর্ম্মা আজ্ঞাপ্রাপ্তি মাত্র কার্য্য আরম্ভ কোরে দিলেন। দেবী দেখলেন, বিপত্তি। বিশ্বকর্ম্মার কার্য্য, রজনীপ্রভাত হোতে হোতেই সে কাৰ্য্য সমাপ্ত হয়ে যাবে, অসুরবিনাশ হবে না। যাতে ব্যাঘাত ঘটে, দেবী তখন সেই উপায় অবলম্বন কোল্লেন; যে সকল ঊষাপক্ষীর কলরবে প্রভাত সূচিত হয়, রাত্রি অবশিষ্ট থাকতে থাকতে সেই সকল পক্ষীকে তিনি কলরব করবার আদেশ দিলেন; পক্ষীগণ কলরব কোরে উঠলো। রজনী প্রভাত বিবেচনা কোরে, বিশ্বকৰ্মা সেই সময় অন্তরে অন্তরে হেসে, কাৰ্য্য বন্ধ রেখে স্বস্থানে প্রস্থান কোল্লেন; অসুরের ইষ্টসিদ্ধি হলো না, দুরাচার সেইখানেই দেবীর রোষানলে ভস্ম হয়ে গেল।

    এখানকার লোকেরা বলে, বর্ত্তমান মন্দিরের নিম্নাংশ বিশ্বকর্ম্মানির্ম্মিত। দেবদ্বেষী কালাপাহাড় এই মন্দিরের কিয়দংশ নষ্ট কোরে দেয়, অনন্তর কোচবিহার-রাজবংশের আদিপুরুষ মহারাজ নরনারায়ণ ঐ মন্দিরের উপরাংশ নির্ম্মাণ কোরিয়ে দেন, সেই মন্দির এখনো বৰ্ত্তমান আছে। যে পৰ্ব্বতের উপর মন্দির, সেই পৰ্ব্বতে আরোহণ করবার চারিটী পথ। চারি পথের চারি ফল। উত্তরের পথ দিয়া অরোহণ কোলে যাত্রীলোকের মুক্তিলাভ হয়, পশ্চিমের পথে রাজ্যলাভ হয়, পূৰ্ব্বদিকের পথে ধনলাভ হয়, দক্ষিণের পথে মত্যুলাভ হয়। এই কারণে গৃহস্থলোকেরা দক্ষিণের পথে পদার্পণ করেন না; সাধু-সন্ন্যাসীরা দক্ষিণপথের এই নিষেধ অমান্য করেন।

    এখানকার পাণ্ডারা অতি ভদ্রলোক। যাত্রীলোকের উপর তারা কোন প্রকার পীড়ন করে না, ইচ্ছাপূর্ব্বক যে যা দেয়, তাতেই তারা সন্তুষ্ট। যাত্রীলোকের প্রতি পাণ্ডাদের উত্তম যত্ন; যাত্রীগণকে যত্নপূৰ্ব্বক দেবদেবী দর্শন করায়, যত্নপূৰ্ব্বক আপনাদের বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে রাখে, পাণ্ডাদের প্রসাদে যাত্রীলোকের কোন প্রকার কষ্ট হয় না। আমরা একটী পাণ্ডার বাড়ীতে আশ্রয় লয়েছিলেম। পাণ্ডাদের বাড়ীগুলি দিব্য পরিষ্কার।

    এখানে অনেকগুলি কুণ্ড আছে। প্রধান কুণ্ডের নাম সৌভাগ্যকুণ্ড। মন্দিরের প্রবেশ করবার পূর্ব্বে সৌভাগ্যকুণ্ডে স্নান কোত্তে হয়। লোকে বলে, দেবরাজ ইন্দু আপন বজ্ৰাস্ত্র দ্বারা এই কুণ্ডটী খনন কোরে দিয়েছেন। কুণ্ডস্নানের ফলশ্রুতি পারলৌকিক মঙ্গলে পরিকীৰ্ত্তিত; সৌভাগ্যকুণ্ডে স্নান কোল্লে উর্দ্ধ-নিম্ন দশ দশ পুরুষ উদ্ধার প্রাপ্ত হয়; পাণ্ডাদের মুখে নূতন ফলশ্রুতি, স্নানফলে ভাগ্যহীন লোকের সৌভাগ্যের উদয় হয়ে থাকে; এটী ইহকালের ফল। সৌভাগ্যকুণ্ডের অদূরে গঙ্গাকুণ্ড, বরাহকুণ্ড, অনন্তকুণ্ড, অগ্নিকুণ্ড আর লোহিত্যকুণ্ড।

    প্রথমতঃ সৌভাগ্যকুণ্ডে স্নান কোরে সমীপবর্ত্তী গণেশমূর্ত্তির পুজো করা আবশ্যক; গণেশ-পূজার পর মন্দিরে প্রবেশ। সম্মুখেই কামাখ্যাদেবীর প্রতি মূর্ত্তি। পাণ্ডারা বলেন, এই মূর্ত্তির নাম ভোগমূর্ত্তি। প্রকাশ্যরূপে সেই মূর্ত্তির পুজা হয়। সেই মুত্তির পূৰ্ব্বদিকে একটী গহ্বর; পাথরের সিঁড়ি দিয়ে সেই গহ্বরে প্রবেশ কোত্তে হয়; সেই গহ্বরে পীঠস্থান। সে স্থান ঘোর অন্ধকারে আবৃত্ত; দিবারাত্রি সেখানে ঘৃত-প্রদীপ জ্বলে। দুই স্থানেই পূজা হয়। পীঠস্থানে গঙ্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, বটুকভৈরব, নরনারায়ণ, অন্নপূর্ণা ও চামুণ্ডাদেবী আছেন। পূজা সমাপ্ত হবার পর মন্দিরপ্রদক্ষিণের নিয়ম আছে। মন্দিরের প্রবেশদ্বারের সম্মুখে একটা বৃহৎ জয়ঘণ্টা ঝুলছে; বাহিরে আসবার সময় সেই জয়ঘণ্টা বাজাতে হয়। আমরা দর্শন কোল্লেম, পুজো দিলেম, প্রণাম কোল্লেম, ঘণ্টা বাজালেম, শেষকালে মন্দিরপ্রদক্ষিণ কোরে বাহিরে এসে দাঁড়ালেম।

    এখানে কুমারীর ভিড়। “বাবু একটী পয়সা, বাবা একটী পয়সা, মা একটী পয়সা,” এই রকম প্রার্থনা। সহজপ্রার্থনাও নয়, টানাটানিও আছে। কুমারী কম নয়; আমরা দেখলম, প্রায় অর্দ্ধ সহস্র। সকলকেই একটী একটী পয়সা দিয়ে আমরা বেরুলেম। যাত্রীরা পূণ্যকামনায় কুমারীভোজন করায়। কাশীতে দণ্ডী-ভোজনের যেরুপ ফল, কামাখ্যায় কুমারীভোজনেও সেইরুপ ফল, শুনা গেল।

    কামাখ্যার অতি নিকটে একটা পৰ্ব্বতের উপর ভুবনেশ্বরীদেবীর মন্দির। এই স্থানে প্রকৃতির বিচিত্ৰশোভা নয়নগোচর হয়। এই স্থানে একজন ব্রহ্মচারী আছেন, কত দিন আছেন, কেহ বোলতে পারে না। ভুবনেশ্বরীর পাণ্ডারাও দিব্য শান্ত। অন্যান্য তীর্থের পণ্ডাদের যেরুপ দৌরাত্ম শুনা যায়, কামাখ্যার পাণ্ডাদের সেরপ দৌরাত্ম কিছুই নাই।

    একদিন আমরা কামরূপ থেকে গৌহাটীতে বেড়াতে এলেম। গৌহাটীতেও অনেক দেবদেবীর মূর্ত্তি আছে। ব্রহ্মপুত্ৰতীরে স্বয়ম্ভু উমানন্দের মন্দির। শিবরাত্রির সময় এখানে একটা মহা মেলা হয়। সহরের মধ্যে শুক্রেশ্বর, উগ্রতারা, মঙ্গলচণ্ডী ও নবগ্রহের প্রতিমূর্ত্তি বিদ্যমান। সহরের প্রায় তিন ক্রোশ দূরে বশিষ্ঠদেবের আশ্রম। লোকের মুখে শুনা গেল, বশিষ্ঠাশ্রমে ব্রাহ্মণেরা ত্রিকালীন সন্ধ্যাবন্দনা কোল্লে আর তাঁদের নিত্য সন্ধ্যাবন্দনাদি কোত্তে হয় না, কোটিজন্ম সন্ধ্যাবন্দনা না করার পাপও এই ফলে ক্ষয় হয়ে যায়। আর একটী আশ্চৰ্য্য দেখা গেল। সন্ধ্যা, ললিতা ও কান্তা, এই তিন নামে তিনটী স্রোত এখানে ক্রমাগত অবিরাম প্রবাহিত; কোথা থেকে এই স্রোত চোলে আসছে, এ পর্য্যন্ত কেহ কিছু নির্ণয় কোত্তে পারে নাই।

    একদিন আমরা গৌহাটীতে থাকলেম, তার পর আবার কামরূপে ফিরে গেলেম। দীনবন্ধুবাবুর চাকরটীর নাম যুধিষ্ঠির। বয়সে প্রায় বৃদ্ধ, কিন্তু বেশ বলিষ্ঠ, কাজকর্ম্মে সবিশেষ নিপুণ, কথাবার্ত্তাও ভদ্রলোকের মত, এদিকে আবার ধর্ম্মভীরু; কিন্তু ভূত-প্রেত-দানা-দৈত্যের গল্পে তার বড় আমোদ। যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে আমার বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল; যখন কোন কাজকর্ম্ম না থাকতো, বাবু যখন নিকটে না থাকতেন, সেই সময় যুধিষ্ঠির আমার কাছে বোসে বোসে অনেক রকম পুরাতন রূপকথা বোলতো; ভূতের গল্প, রাক্ষসের গল্প, যক্ষের গল্প, পরীর গল্প, তালপত্রের খাঁড়া, পক্ষীরাজ ঘোড়া, ছাঁদন-বাঁধনের দড়ী ইত্যাদি অনেক রকম নূতন নূতন কথা তার মুখে আমি শুনতেম; শুনতেম আর হাসতেম; হাসির কথাই বেশী, সেই জন্যই হাস্য।

    বাবু একদিন একাকী কামাখ্যা-মন্দিরে সন্ধ্যাকালে আরতি দেখতে গিয়েছিলেন, পাণ্ডার বাড়ীতেই আমাদের বাসা, বাসার একটী ঘরে আমি আর যুধিষ্ঠির। কোন গল্পের ভূমিকা না কোরে, যুধিষ্ঠির আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “কামরূপে আমরা কি কোত্তে এসেচি? এটা তো ডাকিনীর দেশ। এখানকার মাগীরা সকলেই ডাকিনী, দেশে আমরা ঐ কথাই শুনি, কিন্তু একটাও ডাকিনী তো এখানে চক্ষে দেখতে পেলেম না; ডাকিনীরা তবে থাকে কোথায়? অন্যদেশের পুরুষমানুষ কামিখ্যেয় এলে ভেড়া হয়, সে সব ভেড়াই বা কোথায় থাকে? যে সকল ভেড়া মাঠে চরে, পূর্ব্বে তারা মানুষ ছিল, এমন কোন চিহ্ন দেখা যায় না, সে সব মানুষ-ভেড়া তবে কোথায় চরে?”

    প্রত্যয় অপ্রত্যয়, এই দুইটী সংশয়ের কথা। আমি বিশ্বাস করি না, অনেক লোকে বিশ্বাস করে, এ সমস্যার মীমাংসা কি প্রকারে হয়? যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নে অনেকক্ষণ আমি চুপ কোরে থাকলেম। কামরূপের স্ত্রীলোকেরা মায়াজালে বিদেশী পুরুষগণকে বিমুগ্ধ কোরে রাখে, মায়ায় যারা বদ্ধ হয়, তারা আর দেশে ফিরে যায় না, যেতেও পায় না, এই কথাটা কতক পরিমাণে বিশ্বাসযোগ্য। পূর্ব্বে যেমন ছিল, এখন তেমন নাই, পাণ্ডারা এই কথা বলে। তারা আরো বলে, এখনো যে সকল বিদেশী পুরুষ একান্ত কামমোহিত, কামরূপের সুন্দরী সুন্দরী মেয়েমানুষ দেখে, লোভে পোড়ে তারাই বাঁধা পোড়ে যায়। মনে মনে এই সব আলোচনা কোচ্ছি, হঠাৎ একটা শ্লোক আমার মনে পোড়ে গেল। কাশীর আদালতে একজন কেরাণীর মুখে একদিন আমি সেই শ্লোকটা শুনেছিলেম। লোকটা প্রাচীন কি আধুনিক, সত্যচরিত্রদর্শী কোন কবির রচনা কিম্বা কোন রহস্যপ্রিয় নিন্দাকারী লোকের কুবুদ্ধি-রচনা, সে কথা আমি বোলতে পারি না, কিন্তু শ্লোক শুনে শুনে অনেক লোকে আমোদ করে। শ্লোকটা এই :—

    “সধবা বিধবা নাস্তি, নাস্তি নারী পতিব্রতা।

    হংসা পারাবতা ভক্তা, কামরূপনিবাসিনা॥”

    এই শ্লোকের উপর আশুপ্রত্যয় রেখে, যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নে আমি উত্তর কোল্লেম, “গল্প-কথা অনেক রকম হয়। ভেল্কীবাজী চক্ষে দেখা যায়, দেখে দেখে আশ্চর্য্যজ্ঞান হয়, কিন্তু কিছুই সত্য হয় না। কামরুপের স্ত্রীলোকেরা মায়াবিদ্যা জানে, এটা সত্য হোতে পারে, মায়ার কুহকে কামুক পুরুষগণকে ভুলিয়ে ভুলিয়ে রাখা, এটাও সত্য হোতে পারে, কিন্তু দ্বিপদ মনুষ্যকে চতুষ্পদ মেষরূপে পরিণত করা কখনই সত্য হোতে পারে না। কোন কোন লোকের মুখে আমি শুনেছি, কামরূপে ব্যভিচার কিছু প্রবল, এখানে পতিব্রতা সতী কম; সধবাও ব্যভিচারে রত হয়, বিধবারাও ব্যভিচারে রত হয়। তীর্থযাত্রীদলের ভিতর সুপুরুষ দর্শন কোল্লে এখানকার দুশ্চারিণীরা সেই সকল পুরুষকে হস্তগত করবার চেষ্টা করে, সম্ভবতঃ এই কথাই সত্য; সত্যডাকিনী কিম্বা সত্যভেড়া অসম্ভব কথা। মানুষেরা পশু হয়, পাখী হয়, বৃক্ষ হয়, পশুরা মানুষের মত কথা কয়, এ সকল অলৌকিক ব্যাপারে আমার বিশ্বাস হয় না।”

    যুধিষ্ঠিরের মুখখানি একটু শুষ্ক শুষ্ক বোধ হোতে লাগলো; তার কথায় আমি যদি সায় দিতে পাত্তেম, রং দিয়ে দিয়ে তার মনের কথা যদি আমি বোলতে পাত্তেম, তা হোলে যুধিষ্ঠির আমোদ পেতো, এইরূপ ভাব আমি বুঝতে পাল্লেম। আমোদ পেলে না বোলে বেচারা ক্ষুণ্ণ না হয়, এই ভেবে শেষকালে আমি বোল্লেম, “দেখ যুধিষ্ঠির, আমরা এখানে অল্পদিন এসেছি, ডাকিনীরা কোথায় থাকে, সন্ধান জানতে পারি নাই, বাবু যদি আর মাসখানেক এখানে থাকেন, তা হোলে চেষ্টা কোরে কোরে একদিন একটা মায়াডাকিনী আমি তোমারে দেখাব।”

    আহ্লাদে বদন বিকাশ কোরে, আহ্লাদের স্বরে যুধিষ্ঠির বোলে উঠলো, “দেখিও দাদা, দেখিও! ডাকিনী দেখতে আমার বড় সাধ! ডাকিনী দেখবার আশাতেই এখানে আমার আসা। সে আশা যদি না থাকতো, তা হোলে এই বৃদ্ধবয়সে কখনই আমি বাবুর সঙ্গে এ দেশে আসতে রাজী হোতেম না। দেখিও দাদা, দেখিও; বেশী না পারো, একটা ডাকিনী তুমি আমাকে দেখিও! কামরূপ-কামিখ্যায় এসে ডাকিনী না দেখে যদি অমনি অমনি ফিরে যাই, দেশে গিয়ে তবে গল্প কোরবো কি? দেশের লোকে আমাকে বোলবেই বা কি? তারা হয়তো মনে কোরবে, মানুষের আকারে আমি ভেড়া হয়ে রোয়েছি, সেইজন্য কিছু বোলতে পাল্লেম না। বড়ই লজ্জা পাব। দাদা, সে লজ্জা আমি রাখবার জায়গা পাব না। দেখিও তুমি, তোমার সোণার দোত-কলম হবে, পঞ্চাশ টাকা মাইনে হবে, তুমি রাজা হবে, দয়া কোরে একটা ডাকিনী আমাকে দেখিও তুমি!”

    মনে মনে হেসে তারে আমি কিছু বোলবো বোলবো মনে কোচ্ছি, এমন সময় গম্ভীরবদনে সে আবার তাড়াতাড়ি বোলতে লাগলো, “কি বোলছিলে তুমি? বাবুর কথা? বাবু যদি এখানে বেশীদিন থাকেন, সেই কথা? সে জন্য ভাবনা নাই। বাবু আমার আশুতোষ; যা যখন আমি বলি, দুই ঠোঁট একত্র না কোরে, বাবু আমার তাই শুনেন, তাই করেন; আমার উপর বাবুর খুব অনুগ্রহ। তুমি বোলচো মাসখানেক, আমি তাঁকে ছমাস এখানে রাখতে পারবো, কোন ভাবনা নাই। তুমি যদি—”

    বাবু এসে উপস্থিত। ব্যস্তসমস্ত হয়ে যুধিষ্ঠির আমার কাছ থেকে উঠে পালালো। সহাস্যবদনে বাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “পাগল এখানে কি কোচ্ছিল? রুপকথা বোলছিল বুঝি? কেবল রুপকথা! কেবল রুপকথা! একজন শুনিবার লোক পেলেই যুধিষ্ঠির অমনি রূপকথার জাহাজ খুলে দেয়। তাই বুঝি হোচ্ছিল?”

    বাবু বোসলেন। অবকাশ পেয়ে আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা না, রুপকথা হেচ্ছিল না; যুধিষ্ঠির এখানে একটা ডাকিনী দেখতে চায়!”

    উচ্চহাস্য কোরে বাবু বোল্লেন, “ভারী পাগল! যেটা যখন খেয়াল ধরে, অল্পে ছাড়ে না! তুমি কি বোলেছ? ক্ষেপিয়ে দিয়েছ বুঝি?”

    নতমস্তকে আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা না, ক্ষেপাই নাই, স্তোক দিয়ে রেখেছি; একদিন একটা ডাকিনী দেখাবো, এইরুপ আশ্বাস দিয়ে ঠাণ্ডা কোরেছি। বোলেছি, শীঘ্র দেখা যায় না, একমাস এখানে থাকলে একটা ডাকিনী ধরা যেতে পারে।”

    “মনসার কাছে ধূনার গন্ধ!”—পূৰ্ব্ববৎ হাস্য কোরে বাবু বোল্লেন, “মনসার কাছে ধূনার গন্ধ!—সত্যই তবে তুমি ক্ষেপাকে ক্ষেপিয়ে দিয়েছ!”—এই কথা বোলেই বাবু সহসা গম্ভীরভাব ধারণ কোল্লেন; গম্ভীরবদনে একটু একটু গুর্জ্জন কোরে বোল্লেন, “কথা বড় মিথ্যা নয়; ডাকিনী এখানে আছে! পাঁচ সাতটা ডাকিনী এই মাত্র আমাকে পেয়ে বোসেছিল! আরতি দেখে মন্দির থেকে আমি বেরিয়ে আসছি, বাহিরে যেখানে কুমারীরা দাঁড়ায়, সেইখানে পাঁচ সাতজন যুবতী পয়সা পয়সা কোরে আমার পথ আগলেছিল। পয়সা আমি দিতে গেলেম তারা খিলখিল কোরে হেসে আমার দিকে চক্ষু ঘুরাতে আরম্ভ কোল্লে! ঠাট-ঠমক, ভাব-ভঙ্গী, বক্রকটাক্ষ নূতন প্রকার! যতই এগিয়ে এগিয়ে আসি, চারিদিক বেষ্টন কোরে তারাও আমার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে ছুটে আসে। বিপাকে ঠেকলেম! সাতজন;—সম্মুখে দুজন, দুপাশে দুজন দুজন চারজন, পশ্চাতে একজন। সকলেই যুবতী, সকলেই রূপবতী, সকলের চক্ষেই অনেক দূর পর্য্যন্ত কাজলের রেখা টানা, সকলের মাথায় এক প্রকার নূতন ধরণের খোঁপাবাঁধা, অঙ্গে বিচিত্র বসন, খোঁপাঘেরা ফুলের মালা, গায়ে কিছু কিছু গহনাও আছে; মনের ভাব ভাল নয়। পথে আমি একা ছিলেম না, আরো আট দশজন যাত্রীও আরতি দেখে বেরিয়েছিলেন। সকলের অগ্রেই আমি ছিলেম, তাঁরা কিছু পশ্চাতে ছিলেন, ডাকিনীরা আমারে ঘিরে ফেলেছে, আমাকে ধীরে ধীরে চোলতে হোচ্ছিল, যাত্রীরা পাশ কাটিয়ে চোলে যাবার পথ পাচ্ছিলেন না, পেলেও হয়তো তামাসা দেখবার জন্য ধীরে ধীরে আসছিলেন, আমি এক রকম সঙ্কটাপন্ন! পয়সা দিতে চাই, গ্রহণ করে না, সিকি দিতে চাইলেম, তবুও না; কেবল ফিক ফিক কোরে হাসে, কটাক্ষ হানে, আমার পথ আটকায়! কি যে তাদের মতলব, স্পষ্ট আমি বুঝতে পাল্লেম না। এই সময় সম্মুখদিক থেকে দুজন পাণ্ডা আমাদের নিকটে এসে উপস্থিত হোলেন। সে দুটী পাণ্ডা দিব্য সুশ্রী, দিব্য স্থূলাকার, দিব্য শান্ত। আমাকে তদবস্থ দর্শন কোরে তাঁদের মধ্যে একজন আসামের চলিতভাষায় উগ্রস্বরে কি গোটাকতক কথা বোল্লেন, ডাকিনীরা তখন কেমন এক রকম ভয় পেয়ে, আমাকে ছেড়ে অন্যদিকে ছুটে পালালো;—পয়সাও নিলে না, আমার দিকে আর ফিরেও চাইলে না। আমি পরিত্রাণ পেলেম।”

    বাবুর কথা শুনে আমি হাসতে পাল্লেম না, তাঁর মুখের দিকেও ভাল কোরে চাইতে পাল্লেম না, কিন্তু তিনি রহস্যচ্ছলে গণিকাদলকেই ডাকিনী বোল্লেন, সেটা আমি বেশ বুঝতে পাল্লেম। ডাইনী, ডাকিনী, রাক্ষসী, পেত্নী ইত্যাদি যে সকল কুৎসিত কুৎসিত উপাধি আছে, চক্ষে না দেখলেও সে সকল উপাধিধারিণীকে ভয়ঙ্করী মনে হয়। রাক্ষসী পেত্নী কি রকম, এখনকার দিনে সে দুই মূর্ত্তি দেখা যায় না; ডাইনী ডাকিনীর আকৃতি বিভিন্ন নয়; সাধারণ স্ত্রীলোকেরা যেমন, তাদের আকৃতিও সেই প্রকার; কেবল কাৰ্য্য দ্বারা তাদের পরিচয় হয় মাত্র; কার্য্যশ্রবণে ভয়ের সঞ্চার হয়ে থাকে। বাবুর কথায় আমি কোন উত্তর দিলেম না, বাবুও আর সে প্রসঙ্গ তুল্লেন না।

    সত্য সত্য একমাস আমাদের কামরুপে থাকা হলো। যুধিষ্ঠির মাঝে মাঝে আমারে উস্কে উস্কে দেয়, ডাকিনীদর্শনের একান্ত আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে, অন্যপ্রকার কথায় আমি তাকে প্রবোধ দিয়ে রাখি। একদিন বোল্লেম, “ডাকিনী আছে, ডাকলে তারা আসে না, যেখানে সেখানে বেড়ায়ও না, তাদের সব স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র আড্ডা আছে; যখন তাদের ইচ্ছা হয়, তখন তারা লোকালয়ে দেখা দেয়।” আড্ডার নাম শুনে যুধিষ্ঠির পলকশূন্যনয়নে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলো, বোধ হলো যেন একটু একটু কাঁপলো।

    একদিন বৈকালে আমাদের বাসাঘরে বাবুর কাছে আমি বসে আছি, যুধিষ্ঠির অন্যান্য কাজে এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন সময় ঝম ঝম শব্দে দুজন স্ত্রীলোক হাসতে হাসতে আমাদের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। পাঁচরঙা ঘাগরা পরা, বুকে কাঁচুলি, গলায় মালা, নাকে কাণে সাদা সাদা গহনা, কপালে টীপুলি, চক্ষে কাজল, এলোকেশী; সম্মুখদিকের দীর্ঘ দীর্ঘ কেশ কাণের দুপাশ দিয়ে বুকের নীচে পর্য্যন্ত ঝুলছে, মুখের আধখানা সেই চলে ঢাকা পোড়ে গিয়েছে, দেখতে মন্দ নয়।

    ভাষাশিক্ষায় আমার বড় অনুরাগ। বাঙলাদেশে বাঙলাশিক্ষা, টোলবাড়ীতে কিছু কিছু সংস্কৃতশিক্ষা, বর্দ্ধমানে সর্ব্বানন্দবাবুর বাড়ীতে কতক কতক ইংরেজীশিক্ষা, কাশীতে চলনসই হিন্দিশিক্ষা, কামরূপে এসে কামরূপীদের কথা শুনে, এক একজন বাঙালী কামরূপীর উমেদারী কোরে ব্যাখ্যা শুনে, আসামী ভাষা কিছু কিছু আমি শিক্ষা কোরেছি। অনেক কথা বুঝতে পারি, ছোট ছোট দু-পাঁচটা কথা বোলতেও পারি, বাঙলা অক্ষরে পুঁথিলেখা কিছু কষ্টে ছত্র ছত্র পাঠ কোত্তেও পারি। বস্তুতঃ একমাসে যতটুকু হোতে পারে, তার চেয়ে বরং কিছু বেশী আমি শিখতে পেরেছি। যে দুটী স্ত্রীলোক আমাদের বাসায় এলো, চোক-মুখ ঘুরিয়ে মৃদু মৃদু হেসে, তাদের মধ্যে একজন আপনাদের জাতি ভাষায় বোল্লে, “খেলা দেখবে বাবু?”

    সাজগোজ দেখে আমি মনে কোরেছিলেম, নর্ত্তকী, কথা শুনে মনে কোল্লেম, খেলা দেখাবে। কি রকম খেলা? না দেখলে বলা যায় না। কৌতুকে, আগ্রহে, কৌতুহলে, নীরবে বাবুর মুখপানে আমি চাইলেম। বাঙলাদেশের বাজীকরী বেদিনীদের যেমন সাজ, ঐ দুটী স্ত্রীলোকের সজ্জাতে তার কতক কতক ছায়া ছিল; তাই দেখে আমি মনে কোল্লেম, ইন্দ্রজালের খেলা; এরা কোন প্রকার আশ্চৰ্য্য আশ্চর্য্য ইন্দ্রজাল আমাদের দেখাবে। ইতিপূর্ব্বে যুধিষ্ঠিরকে যে কথা আমি বলেছিলেম, দৈবগতিকে সেই কথা যেন দৈববাণীর মত ফোলে গেল। ডাকলে ডাকিনী আসে না, ইচ্ছা হোলে আপনা হোতেই আসে, সেই স্তোকের কথাটাই ঠিক হলো; আপনা হোতেই একজোড়া ডাকিনী হঠাৎ এসে উপস্থিত।

    দুজনেই দীর্ঘাকার, কিছু রোগা, মুখে লম্বা, নাক চ্যাপ্টা, কপাল চওড়া, দাঁত সাদা, একটু বড় বড়, বর্ণ শ্যামোজ্জ্বল, মুখে হাসি হাসি। দেখলে ভয় হয় না, কিন্তু আকারের দীর্ঘতায় ডাকিনী বোলেই বোধ হয়। বাবু তাদের দিকে চেয়ে বাঙলাকথায় জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি খেলা তোমরা জানো? কি খেলা তোমরা দেখতে চাও?”

    বাঙালী-সংসর্গে কামরুপের স্ত্রী-পুরষেরা অনেকটা বাঙলাকথা শিখেছিল, সেই দুটী স্ত্রীলোক বাঙলাতেই উত্তর কোল্লে, “ভেল্কী খেলা; অনেক রকম তামাসা।”—আমার অনুমান সত্য। খেলা দেখাও উপরপড়া হয়ে আমার এ কথাটা বলা ভাল দেখায় না, সতৃষ্ণনয়নে ঘন ঘন আমি বাবুর গম্ভীরবদন নিরীক্ষণ কোত্তে লাগলেম। বাবু তাদের হকুম দিলেন, “আচ্ছা খেলো; কি খেলা দেখাতে চাও, দেখাও।” খোটা খেমটাওয়ালীরা যেমন নাচে, প্রথমে তারা হেলে-দুলে নানা ভঙ্গীতে সেইরকম নাচ আরম্ভ কোল্লে; ঘুরে ঘুরে ঘাগরা তুলে তুলে খঞ্জনের মত নৃত্য কোত্তে লাগলো; একবার বসে, একবার দাঁড়ায়, একবার পশ্চাদ্দিক মাথা নীচু কোরে, শরীরখানা বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে, আধশোয়া হয়ে তালে তালে বক্ষঃস্থল উঁচু কোত্তে লাগলো। হস্তপদ ভূমিলগ্ন, পৃষ্ঠদেশ শুন্যে অবস্থিত; আলুলায়িত দীর্ঘকুন্তল ভূমিস্পর্শী; সেই কেশপাশ বাতাসে উড়ে উড়ে মুখে চক্ষে বক্ষে ক্ষণে ক্ষণে নিক্ষিপ্ত হোতে লাগলো; কুম্ভকারের চক্র যেমন ঘোরে, এই নর্ত্তকীদের অষ্টাঙ্গ সেইরূপ বন বন শব্দে ঘুরতে লাগলো! আশ্চর্য্য শিক্ষা, আশ্চর্য্য নৈপুণ্যে! দেখে দেখে আমি মনে কোল্লেম, তাদের সৰ্ব্বাঙ্গের অস্থিগুলি, সংযোগস্থলগুলি যেন ভেঙে ভেঙে শিথিল হয়ে গিয়েছে, যে অঙ্গ যে দিকে ঘুরাতে ইচ্ছা করে, সেই অঙ্গ সেই দিকে ঘোরে, কোথাও বাধন আছে, এমন মনে হয় না। একরূপ নাচের নাম, পায়রা-লোটন। লক্কা-পায়রা যেমন পক্ষবিস্তার কোরে, গলা ফুলিয়ে, ঘুরে ঘুরে নৃত্য করে, এই নর্ত্তকীরা একবার সেই রকমের পায়রালোটন দেখালে। সত্যই যেন লোটন-পায়রা। চক্রবৎ ঘুর্ণনে সেই দুটী সুন্দরী নারীমূর্ত্তি তখন আমাদের চক্ষে যথার্থই যেন পক্ষীমূর্ত্তি বোধ হোতে লাগলো! চমৎকার অভ্যাস!

    যুধিষ্ঠির কোথায় গেল? এমন সময় যুধিষ্ঠির উপস্থিত নাই, এমন নূতন রঙ্গটা যুধিষ্ঠির দেখতে পেলে না, আমার মনে আপশোষ উপস্থিত হলো। নৃত্য-অবসানে নর্ত্তকীদের কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম। কপালে, নাসাগ্রে, ওষ্ঠপটে, বিন্দু বিন্দু ঘর্ম্ম। বড় একখানা পাথরের উপরে তারা দুজনে বোসলো। তাদের বিরামকালে, বাবুর মুখের দিকে চেয়ে আমি একবার যুধিষ্ঠিরের অন্বেষণে উঠে গেলেম।

    যুধিষ্ঠির তখন বাসায় ছিল না। কোথায় গিয়েছে, জানবার জন্য বাহির দরজার কাছ পর্য্যন্ত আমি গিয়েছি, দেখি, একখানা চিত্রপট হাতে কোরে যুধিষ্ঠির ছুটে ছুটে বাড়ীর দিকে আসছে। দরজাতেই দেখা হলো! আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “এ কি যুধিষ্ঠির! হাঁপাচ্ছ কেন? ছুটছিলে কেন? এখানি কিসের ছবি?” হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে যুধিষ্ঠির বল্লে, “কা—কা—কা—কামিখ্যের ছবি ডা—ডা—ডা—ডাকিনীর ছবি।”

    তালে তালে মিলে গেল। উৎসাহ জাগাবার উত্তম সুযোগ পেলেম। ছবিখানা তার হাত থেকে টেনে নিয়ে, একবারমাত্র চক্ষু দিয়ে, শীঘ্র শীঘ্র আমি বোল্লম, এ সব তোমার আঁকা ডাকিনী; জয়ন্তী ডাকিনী একজোড়া এসেছে। একটা দেখবে বলেছিলে, একেবারে একজোড়া! কতকরকম রঙ্গ কোচ্ছে, কেমন ভঙ্গীতে কত রকমের নাচ দেখাচ্ছে, আমি তোমাকে খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছি। চল, চল, শীঘ্র চল, বাবুর কাছে তারা বসে আছে, দেখবে এসো।”

    যুধিষ্ঠিরকে সঙ্গে নিয়ে নাচের আসরে আমি উপস্থিত হোলেম। নর্ত্তকীরা বেশ ঠাণ্ডা হয়ে বোসে বোসে বাবুর সঙ্গে কি সব কথা কোচ্ছিল। আমারে দেখে একটু হেসে বাবু বোল্লেন, “কোথা গিয়েছিলে হরিদাস? তোমার নাচওয়ালীরা ধৈর্য্য রাখতে পাচ্ছে না, এইবার খেলা দেখাবে বোসো।”—আড়চক্ষে একবার যুধিষ্ঠিরের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে চুপি চুপি বাবু আবার বল্লেন, “এই যে পাগলটীকে ধোরে এনেছ, বেশ হয়েছে। বোসো।”

    আমি বোসলেম। নর্ত্তকীদের দিকে চেয়ে, যুধিষ্ঠির ফুল্লবদনে চুপটী কোরে একধারে দাঁড়িয়ে থাকলো; ছবিখানি আমি আমার নিজের কাছেই রেখে দিলেম। নর্ত্তকীরা এখন আর নর্ত্তকী নয়, নিজমূর্ত্তি ধারণ কোল্লে। সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র ছিল না, করতালিতেই তালে তালে সঙ্গত কোরে মনের মত গীত ধোল্লে; রাগিণীযুক্ত সঙ্গীত নয়, সুরে সুরে মন্ত্রপাঠ। প্রথম ক্রীড়া ক্ষুদ্র একটী সিংহশাবক। একজনের ঘাগরার ভিতর সেই শাবকটী লুকানো ছিল, মন্ত্রের আকর্ষণে সেই শাবক আমাদের সম্মুখে এসে নেচে নেচে খেলা কোত্তে আরম্ভ কোল্লে; ভাল ভাল কাবুলী বেড়াল যত বড় হয়, এই সিংহশাবক ঠিক তত বড়। এক একবার বাজীকরীর দিকে ছুটে ছুটে যায়, লাফ দিয়ে দিয়ে বুকে উঠে, কাঁধে উঠে, মাথায় চড়ে, মাথার উপর থেকে হেঁট হয়ে বাজীকরীর কাণে কাণে মানুষের মত কথা কয়, আবার লাফিয়ে এসে আমাদের সম্মুখে নাচে। সকৌতুকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “বাজীকরি! তোমার এ সিংহশিশু, তোমারে কামড়ায় না?”—ফিক কোরে হেসে বাজীকরী বোল্লে, “কামিখ্যেদেবীর আজ্ঞায় এখানকার সিংহ-ব্যাঘ্রেরা কাকেও কামড়ায় না। দেখবে তুমি, নেবে তুমি, খেলবে তুমি?—এই লও!”—এই কথা বোলেই বাজীকরী দুই হাতে সেই সিংহশিশু ধোরে আমার কোলে দিতে এলো। আমি একটু পেছিয়ে বোসলেম। কৌতুকের সঙ্গে একটু ভয়। নয়ন ঠেরে হাসতে হাসতে কি সব মন্ত্র বোলে নৰ্তকী সেই ক্ষুদ্র সিংহশাবককে আমার গায়ে ফেলে দিলে, আতঙ্কে আমি লাফিয়ে উঠলেম। আশ্চর্য্য ব্যাপার! কোথায় বা সিংহশাবক, কোথায় বা সেই যুগল নর্ত্তকী! কোথাও কিছু নাই; দিব্য একটী ময়ূর আমার স্কন্ধের উপর প্যাকম ধোরে বোসে আছে, এইরূপে দেখা গেল! বাবুর কোলেও সেই রকম একটী, যুধিষ্ঠিরের মাথার উপরেও সেই রকম একটী! বাবুর কোলের ময়ুরীকে হস্ত দ্বারা বাবু একবার স্পর্শ কোল্লেন, ময়ুর উড়ে গেল! একসঙ্গে তিনটীই উড়ে গেল! হতবুদ্ধি হয়ে আমরা চেয়ে থাকলেম!

    তখনি তখনি সেই সহাস্যবদনা নর্ত্তকীরা হাসতে হাসতে আমাদের কাছে এসে, দুখানি দুখানি হাত পেতে, সুমিষ্টবচনে বোল্লে, “বাবু আমাদের ময়ূর দাও! আমাদের সিংহ দাও। তারা আমাদের খেলার জিনিস।”

    আমি তো কথা কোইতে পাল্লেমই না, অল্পক্ষণ ইতস্ততঃ কোরে বাবু বোল্লেন, “তোমাদের সিংহ পালিয়ে গিয়েছে, ময়ূরেরা উড়ে গিয়েছে।” কটাক্ষ ঘুরিয়ে, ফিক ফিক কোরে হেসে, করতালি দিয়ে, একজন বাজীকরী বোল্লে, “সে কি কথা বাবু! তোমার কোলে ময়ূর, ছেলেবাবুর স্কন্ধে ময়ূর, বুড়ার মাথায় ময়ূর, তুমি বল উড়ে গিয়েছে?”

    তাজ্জব ব্যাপার! সত্যই দেখি তাই, একটু পূর্ব্বে ছিল না, এখন আবার কোথা থেকে এসে সেই তিন ময়ূর সেই সেই জায়গায় প্যাকম ধোরে বোসে আছে! ময়ূর এলো, সিংহশিশু এলো না।

    বাজীকরীরা এই সময় উভয়েই অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে, জোরে জোরে করতালি দিলে, জোরে জোরে মন্ত্রপাঠ কোল্লে; সেই দিকে আমরা চেয়ে দেখি, নানাবর্ণের বৃক্ষলতা-শোভিত ছোট একটী বাগান গড় গড় কোরে আমাদের সম্মুখদিকে চোলে আসছে। বাগান এলো। অনেক রকম গাছ, অনেক রকম লতা, অনেক রকম ফল, অনেক রকম ফুল সেই বাগানের সম্পত্তি। গাছে গাছে কত প্রকার পক্ষী, বাজীকরীদের ইঙ্গিতে সেই সকল পক্ষী মধুরস্বরে গান ধোল্লে; নরকণ্ঠের সঙ্গীতে যে প্রকার স্পষ্ট স্পষ্ট বাক্য, সেই সকল মায়াতরুর শাখায় শাখায় পক্ষীকণ্ঠেও সেইরুপ স্পষ্টবাক্য আমরা শ্রবণ কোল্লেম। আমাদের অঙ্গের ময়ূরেরা সেই বাগানে উড়ে গেল। ময়ূরের কেকারব কর্কশ, কিন্তু আমরা শুনলেম, ময়ূরকণ্ঠে সুস্বর, মধুর সঙ্গীত!

    ক্রমশই আমার মোহ উপস্থিত হোতে লাগলো। সত্য দেখছি কি ভেল্কী দেখছি সে ভাবটা মনেই এলো না। ডাকিনী-দর্শনাকাঙ্ক্ষী যুধিষ্ঠির গালে হাত দিয়ে স্থিরনয়নে এককালে নিৰ্ব্বাক। বাবু কেবল মায়ার প্রভাব বিবেচনা কোরে নয়ন দ্বারা আশ্চর্য্য বিজ্ঞাপন কোচ্ছিলেন, আমার মত তাঁর মোহ জন্মে নাই।

    আবার এ কি! কোথায় গেল বাগান, কোথায় গেল তরুলতা, কোথায় গেল ফুলকুল, কোথায় গেল পক্ষিকুলের সুরলহরী! কিছুই নাই! কিছুই নাই! সম্মুখে এক পদ্মসরোবর! প্রস্ফুটিত পদ্মফুলে সমস্ত জল ঢাকা; ভিতরের জল-হিল্লোলে পদ্মফুলগলি কাঁপছে, কম্পিত পদ্মে পদ্মে চঞ্চল মধুকরেরা উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে, চতুর্দ্দিক সহসা সুগন্ধে আমোদিত। বাজীকরীরা আমাদের দৃষ্টিপথের অগোচর। সরোবরের যে কূলে আমরা, সেই কূলে শ্বেতপাথরের বাঁধা একটী মনোহর ঘাট; সেই ঘাটের চাতালে অপরূপ-রূপ-যৌবনসম্পন্ন যুগলমূৰ্ত্তি;—একটী যুবাপুরুষ, একটী যুবতী। সরোবরের দিকে আমরা চেয়ে আছি, সরোবরের জল পদ্মফুলে ঢাকা, দেখতে দেখতে অনেকগুলি পদ্মফুল ঘাটের সম্মুখ থেকে সোরে সোরে গেল, প্রায় পাঁচ হাত পরিমাণ স্থানে নির্ম্মল জল দেখা গেল; সেই যুগলমূৰ্ত্তি সেই নিৰ্ম্মলজলে অবগাহন কোল্লে। যখন তারা উঠলো, তখন দেখলেম, তারা নয়। আর একটী সুন্দর কামিনী; সেই কামিনীর এক হস্তে একগাছা নিম্বকাষ্ঠের যষ্টি, অন্য হস্তে একগাছা রজ্জু; সেই রজ্জুপ্রান্তে মস্ত একটা ভেড়া বাঁধা।

    কামরূপের কামিনীরা বিদেশী পুরুষকে ভেড়া করে, মায়ার কৌশলে কামরূপের কামিনীরা তাই-ই আমাদের দেখালে। যারা দেখালে, তারা কোথায় গেল, অনেকক্ষণ দেখতে পেলেম না; সরোবরের দিকে চেয়ে থাকলেম। সরোবর-সোপানে সেই সুন্দরী আর সেই রজ্জবদ্ধ ভেড়াটা। ঘাটের নিকট থেকে যে পদ্মফুলগুলি সোরে গিয়েছিল সেগুলি আবার ফিরে এসে অনাবৃত জলাংশ সমাবৃত কোরে দিলে। আর একটী আশ্চৰ্য্য দেখলেম। পদ্মপুকুরে পদ্মফুল আছে, পদ্মপত্র একটীও নাই! জলের উপর কেবল ফুলে ফুলে যেন মালাগাঁথা! অতি চমৎকার ইন্দ্রজাল।

    আর নাই! সরোবর নাই! পদ্ম নাই! মধুকর নাই! সুন্দরী নাই! সুন্দরীর হাতে রজ্জুতে নিবন্ধ ভেড়াটাও নাই! সব ফাঁক! সব শূন্য! মনে মনে আমি অনেক রকম বিতর্ক কোচ্ছি, এমন সময় আর একদিক থেকে সেই দুই বাজীকরী হাসতে হাসতে সম্মুখে এসে দেখা দিলে। বাবুকে নমস্কার কোরে তারা একবার করযোড়ে উর্দ্ধদৃষ্টিতে আকাশপথ নিরীক্ষণ কোল্লে। একজন বোল্লে, “আমাদের আর একটী খেলা আছে; সে খেলার নাম ‘আপনাদের ভবের খেলা।’ যদি আজ্ঞা হয়, ভবের খেলটা খেলিয়ে যাই।”

    ভবধামে মানুষেরা যে সব খেলা করে, সেই খেলাই তো ভবের খেলা; সেই খেলাই তো ভেল্কীখেলা। পেশাদার ভেল্কীওয়ালীরা কোন ভাবে আবার ভবের খেলা দেখাতে চায়, ভাবটা সংগ্রহ কোত্তে আমার বড় কৌতুক জন্মিল; বাবুও এই খেলায় ভবের খেলা দেখবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ কোরে বাজীকরীদের আজ্ঞা দিলেন।

    খেলা আরম্ভ। পাঠকমহাশয়েরা ছায়াবাজী দর্শন কোরেছেন, ছায়াবাজীর কৌশল বুঝতে পারা যায়, কিন্তু এই বাজীকরীরা যে রকমে ভবের খেলা দেখাল, সে খেলার কোন কৌশল বুঝতে পারা গেল না। তারা দুজনে লুকিয়ে গেল। আমাদের সম্মুখে কি যেন স্বচ্ছ আবরণ লম্বে লম্বে স্থাপিত হলো;— দর্পণের ন্যায় স্বচ্ছ সেই আবরণের ভিতরদিকে সারি সারি নরনারী। পদাঙ্কুলী থেকে কণ্ঠদেশ পর্য্যন্ত দর্শন কোরে আর যদি উর্দ্ধদিকে নেত্র উত্তোলন করা না যায়, তা হোলে ঠিক দেখা যায়, নরনারী, কিন্তু মুখগুলি দেখলে ভয়ে বিস্ময়ে গাত্র রোমাঞ্চিত হয়। বাঘের মুখ, সাপের মুখ, শেয়ালের মুখ, বানরের মুখ, ভল্লকের মুখ, রাক্ষসের মুখ, কাকের মুখ, শকুনির মুখ, হাড়গিলার মুখ, পেঁচার মুখ ইত্যাদি নানাপ্রকার পশু-পক্ষীর মুখ সেই সকল নরনারীর স্কন্ধের উপর সংলগ্ন। হাতী, ঘোড়া, গাধা, উট, বৃষ—তা ছাড়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইঁদুর, চুঁচো, কাঠবিড়াল প্রভৃতির মুখেও এক একটা অবয়বের উপর দেখা গেল। অচল পতুল নয়, সকলগুলোই যেন সজীব-সচল। অত মুখের ভিতর সিংহের মুখে আর কুকুরের মুখ দেখা গেল না। ভূত আমরা কখনো দেখি নাই, খানকতক মুখ কালো কালো বিকটাকার; কিসের মুখে, আমরা চিনতে পাল্লেম না। যুধিষ্ঠির বোল্লে ভূত। যা-ই হোক, সেই সকল মূৰ্ত্তি এক একবার হাঁ করে, এক একবার কলহ করে, এক একবার নাচে, এক একবার লাফায়, এক একবার হাসে, এক একবার কাঁদে, এক একবার কথা কয়;— মানুষের মতন কথা। একটু পরে দেখলেম, মূর্ত্তিরা সারিবন্দী ছিল, ছড়িভঙ্গ হয়ে গেল। এক একটা পুরষ এক একটা মেয়েমানুষ ধোরে টানাটানি আরম্ভ কোল্লে; মেয়েমানুষগুলো এক একবার চেঁচিয়ে উঠলো, পরক্ষণেই আবার হাসি-তামাসা জুড়ে দিলো! দুই তিনজন একত্র হয়ে একজনের কাপড়ের গাঁঠরী চুরি কোরে নিয়ে ছুটলো, পুলিশের মত পোষাকপরা দুই মূর্ত্তি এসে তাদের বেঁধে ফেল্লে, তার পর কাণে কাণে কি পরামর্শ কোরে তখনি আবার ছেড়ে দিলে! সংসারী মানুষেরা সচরাচর যে সকল কাজ করে, খেলার ভিতর সবরকম আমরা দেখলেম; চোর, ডাকাত, জুয়াচোর, গাঁটকাটা, যারা যারা সংসারের শত্রু, তাদেরও লীলাখেলা দেখলেম, হাসিখুসী দেখলেম, কি মন্ত্রে তারা পুলিসের লোককে বল করে, তাও তাদের মুখে শুনলেম। যা যা দেখি, যা যা শুনি, সকলই যেন সত্য সত্য মনে হয়। রাজা দেখলেম, রাজমন্ত্রী দেখলেম, রাজার পোষাক দেখলেম, অলঙ্কার দেখলেম, মন্ত্রীর মন্ত্রণা শুনলেম। রাজার মুখখানা বাঘের মুখ, মন্ত্রীর মুখখানা শিয়ালের। দুই একবার ঘুরে এসে সেই রাজা আর একরকম হয়ে গেল। রাজবেশ কোথায় গেল, কটিতটে মলিন কৌপীন, অঙ্গে খড়ি, তৈলাভাবে রুক্ষচুল, ক্ষৌরাভাবে শুষ্কমুখ, কদাকার; হস্তে ভিক্ষাপাত্র! শৃগালমন্ত্রী রাজবেশে সমুজ্জ্বল!

    প্রায় দুইঘণ্টা এইরকম খেলা। সকল মূর্ত্তি চোলে চোলে বেড়াচ্ছিল, পর পর পাঁচ সাতটা মুর্ত্তি শুয়ে পোড়লো, একটা বাঁশী বেজে উঠলো, বাঁশী গাইলে, “এই সব লোকের ভবের খেলা ফুরিয়ে গেল!” মত্যু!—ভবধামে মত্যু অহরহ ঘুরে বেড়ায়, জীবের কেশাকর্ষণ কোল্লেই জীবের ভবের খেলা ফুরিয়ে যায়।

    ভবের খেলা সাঙ্গ হলো। খেলা আমি দেখলেম, সব খেলাতে কিন্তু সমান মনোযোগ থাকলো না। সংসারে কারে আমি বেশী ভয় করি, বাজীকরীরা সে তত্ত্ব জানতো না, কিন্তু আশ্চর্য্য! যে মূর্ত্তির মুখখানা বানরের মত, সেই মূর্ত্তি দর্শন কোরেই আমার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল;—মুখখানা ঠিক যেন সেই রক্তদন্তের মুখ! অপরাপর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রক্তদন্তের মত নয়, তবুও সেই মুখখানা দেখে আমার ভয় হয়েছিল। খেলা যখন সাঙ্গ হয়ে গেল, তখন আমি সেই দিকে চাইলেম। কোথাও কিছু নাই, যেমন ফাঁকা জায়গা, সেই রকম পরিষ্কার। কেবল সেই দুটী বাজীকরী হাত-ধরাধরি কোরে নাচতে নাচতে হাসতে হাসতে আমাদের সম্মুখে এসে, নতমস্তকে অভিবাদন কোল্লে। একজন বল্লে, “সংসার ফক্কিকার! ভবের খেলা এই প্রকার। ভবক্ষেত্রে যারা চরে, দেখতে মানুষের মতন গঠন হোলেও সকলে তারা মানুষ নয়। আমাদের ভবের খেলায় যার যে রকম মুখ দেখলেন, তারা সব সেই রকমের স্বভাব ধরে। সত্য যাঁরা সত্যমানুষ, তাঁদের নাম সাধু-মানুষ; আমাদের মায়ার ঘরে আমরা তাঁদের আনতে পারি না!”—এই কথা বোলেই দুজনে আবার নতমস্তকে বক্ষঃস্থলে অঞ্জলি বদ্ধ কোরে আমাদের উভয়কে—বাবুকে আর আমাকে হাসতে হাসতে নমস্কার কোল্লে। বাবু তাদের বিস্তর তারিফ দিয়ে প্রত্যেককে পাঁচ পাঁচটী টাকা বকসীস দিলেন। পুনরায় নমস্কার কোরে তারা বিদায় হয়ে গেল।

    কি যেন বোলবে বোলবে মনে কোরে যুধিষ্ঠির ঘন ঘন আমার দিকে চাইতে লাগলো, বাবু নিকটে ছিলেন বোলে কিছু বোলতে পাল্লে না। একটু পরেই সন্ধ্যা হলো। জামা-চাদর গায়ে দিয়ে একগাছি ছড়ী হাতে কোরে বাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লন, “যাবে হরিদাস?”—আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা না, আজ আর আমি কোথাও যাব না। খেলাটা দেখে মন কেমন বিচলিত হয়েছে, কেন জানি না, কিছুই যেন ভাল লাগছে না।” বাবু আর কিছু বোল্লেন না, ধীরে ধীরে বাড়ী থেকে বেরিয়ে, একাকী কামাখ্যাদেবীর আরতি দেখতে চোলে গেলেন।

    বাবুর সঙ্গে আমি গেলেম না, তার একটা কারণ ছিল। যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে একটু রঙ্গ করা যাবে, সেইটীই আমার ইচ্ছা, সেই জন্যই গেলেম না। সন্ধ্যাকালের কাজকর্ম্ম সমাপন কোরে, যুধিষ্ঠির এসে আমার কাছে বোসলো। যুধিষ্ঠির বড় আমুদেলোক; সেদিন আমি কিন্তু তার স্বভাবে কিছু ভাবান্তর দেখলেম। অন্য অন্য দিন তার বদন যেমন প্রফুল্ল থাকে, সেদিন তখন তেমন নয়; মুখখানি কিছু, বিমর্ষ। বিনা আহ্বানে আপনা হোতে যখন এসে বোসেছে, তখন অবশ্যই কিছু বোলবে, এইটী স্থির বুঝে প্রথমে কোন কথা আমি উত্থাপন কোল্লেম না; কিয়ৎক্ষণ ইতস্ততঃ কোরে যুধিষ্ঠির বল্লে, “ডাকিনী তো বেশ সুন্দর হয়। দেশে আমি যখন ডাকিনীর গল্প শুনতেম, তখন ভাবতেম, ডাকিনী বুঝি রাক্ষসীদের মতন ভয়ঙ্করী; তা তো নয়, কামিখ্যার ডাকিনী, যে দুটী এখানে এসেছিল, তারা তো খুব ভাল! কেমন হাসলে কেমন নাচলে, কেমন নমস্কার কোল্লে, বেশ ডাকিনী! খেলাগুলিও খুব চমৎকার দেখিয়ে গেল। মানুষের শরীরে কতরকম জানোয়ারের মুখ! ওরা সব পারে! গাছচালা ডাকিনী, ভেড়া-করা ডাকিনী, ভূতধরা ডাকিনী, সব তবে ঠিক কথা! তুমি যদি আর একটু বড় হোতে, তা হোলে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে, বাজনাবাদ্দি কোরে, ঐ রকমের একটা সুন্দরী ডাকিনীকে আমি দেশে নিয়ে যেতেম।”

    যদি হাসি, যুধিষ্ঠির কি মনে কোরবে, অথচ না হেসেও থাকা যায় না, মাথা নীচু কোরে একটু হেসে, মুখ তুলে প্রশান্তস্বরে আমি বোল্লেম, “তুমি তো আমার চেয়ে অনেক বড়, তুমি কেন একটী ডাকিনীকে বিয়ে কোরে, সঙ্গে নিয়ে দেশে চল না? সত্য যুধিষ্ঠির তাই তুমি কর;—তুমিই একটা ডাকিনীকে বিয়ে কোরে ফেলো।”

    অঙ্গসঞ্চালন কোরে শঙ্কিতবদনে যুধিষ্ঠির বোলে উঠলো, “বাপরে! সে কর্ম্ম ছিল আমার? রাম রাম রাম! ডাকিনীরা ভূত নামায়, ভূত চালে, আমি বুড়োমানুষ, কোন দিন একটা ভূত চেলে নিয়ে গিয়ে আমার ঘাড় ভেঙে ফেলবে, আমার ছেলেপুলে অনাথ হয়ে পোড়বে! আমি পারবো না! তুমি নবীন ছোকরা, দিব্য সুন্দর, কার্ত্তিকের মতন রূপ, তোমার রূপে রূপসী ডাকিনী মোহিত হয়ে যাবে, তোমার কাছে আর ভূত চেলে আনবে না। তুমিই বিয়ে কর! যে দুটী এসেছিল, সে দুটী কিছু ডাগোর ডাগোর, তাদের চেয়ে একটু ছোট দেখে, আরো কিছু সুন্দরী দেখে, তুমি একটী ডাকিনীকে বিয়ে কর। বলো যদি, বাবুকেও আমি সুপারিস কোত্তে পারি।”

    এইবার আমি যুধিষ্ঠিরের মুখের উপর হাস্য কোল্লেম; তখনি আবার গম্ভীরভাব ধারণ কোরে ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আচ্ছা যুধিষ্ঠির, বার বার তুমি ভূতের কথা আনছো, ভূতের ভয়ে কাঁপছো, বাজীকরদের খেলার সময়েও ভূতের মুখ দেখতে পেয়েছিলে; আচ্ছা যুধিষ্ঠির, ভূত কি তুমি দেখেছ?”

    একখানা হাত উঁচ কোরে তুলে, মুখখানি একটু বিকৃত কোরে, কম্পিতকণ্ঠে যুধিষ্ঠির বোলে উঠলো, “রাম রাম রাম! তা আর আমি দেখিনি? একবার কি কতবার!–বেলগাছে ভূত থাকে, নিমগাছে ভূত থাকে, চাঁপাফুলের গাছে ভূত থাকে, শ্মশানঘাটের আশে পাশে ভূত থাকে, মুসলমানের গোরস্থানে বড় বড় মামদো থাকে, কতবার আমি দেখেছি! রাম—রাম—রাম! —একটা গল্প বলি শোনো!—একদিন ভোরবেলা আমি বাবুদের বাগানে ফুল তুলতে গিয়েছিলেম।—বাগানে একটা পুকুর আছে,—শাণবাঁধানো ঘাট;—ঘাটের দুপাশে দুটো চাঁপাফুলের গাছ। যাচ্ছি, আর দশ-পা এগুলেই চাঁপাতলায় যেতে পারি, —রাম—রাম—রাম! এমন সময় দেখি, একটা চাঁপাগাছে থেকে একজন নামলো;—বাপ রে!—মনে কোল্লে এখনো গা কাঁপে! রাম—রাম—রাম! —চাঁপাগাছ থেকে নামলো;—পায়ে খড়ম, দিব্যি কোঁচানো তসর-কাপড় পরা, গলায় ধপধপে সাদা গোচ্ছা পৈতে, হাতে একটা গাড়ু;—বেম্মদত্তিভূত! রাম—রাম—রাম!—দিব্য গৌরবর্ণ, নাদুস-নুদস ভুড়ি, ঘাড়ের দিকে খোঁপা কোরে চুলবাঁধা, গোঁফ-দাড়ী কমানো। বেম্মদত্তিরা নাপতে কোথায় পায়, তা আমি বোলতে পারি না, কিন্তু কামানো!—খট খট কোরে খড়মের শব্দ হোতে লাগলো, বেম্মদত্তিঠাকুর বাঁধাঘাটের সিঁড়ি দিয়ে জলের ধারে নামলো, খড়মজোড়াটা খুলে রাখলে না, খড়ম পায়ে দিয়েই একবুক জলে বারকতক ডুব দিলে। তফাৎ থেকে আমি দেখছি, গুর গুর কোরে বুক কাঁপচে, একটা কাঁঠালগাছের আড়ালে লুকিয়ে আছি, এক একবার উঁকি মেরে দেখছি;—বেম্মদত্তি উঠলে; তসরকাপড় একটুও ভিজলো না, মাথার চুলেও জল দেখা গেল না, হাতে সেই গাড়ু। তখনো ভোর;—একটু একটু ফর্শা;—বেশ দেখা যাচ্ছে।— বেম্মদত্তি একটা ধাপের উপর যোগাসনে বোসলো, হাতমুখ নেড়ে নেড়ে সন্ধ্যা-আহ্নিক কোল্লে, তার পর আবার খট খট কোরে চোলে এসে চাপাগাছে উঠে গেল। আর আমি দেখতে পেলেম না; গাছের সঙ্গে যেন মিলিয়ে গেল! আর আমার ফুলতোলা! ভয়েই আমি আড়ষ্ট! সাজিটী হাতে কোরে কাঁপতে কাঁপতে ছুটে পালালেম। ধর্ম্মে ধর্ম্মে রক্ষা পেলেন! বেম্মদত্তি ভূতেরা ভালমানুষ হয়, না দোষে মানুষকে কিছু বলে না, অন্যভূত হোলে আমাকে আর! ঘরে ফিরে আসতে হতো না; ঘাড় ভেঙে সেইখানেই আমার দফা নিকেশ কোরে দিতো।

    মূর্ত্তিমান ব্ৰহ্মদৈত্যের গল্পে কৌতুকী হয়ে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আর কোথাও আর কোন রকম ভূত তুমি দেখেছ?”

    হাঁ কোরে আমার মুখের দিকে চেয়ে ভয়াতুর ভূতবক্তা বোলে উঠলো, “ও বাবা! আবার বলে ভূতের কথা! কি ডাকাবুকো ছেলে বাপ! বোল্লেম তো, কতবার কত জায়গায় কত ভূত আমি দেখেছি, একটা বেম্মদত্তির কথা শুনিয়ে দিলেম, তাতেও কি ভয় হলো না? রাম— রাম— রাম! —ভূতের কথা কেন তোলো? হচ্ছিল বিয়ের কথা, ভূতের কথা কেন এলো? আর আমি বোলতে পারবো না। আর বোল্লে রাত্রে আমার আর ঘুম হবে না! বিয়ের কথা বলো। যা আমি বোলছিলেম, তাতেই রাজী হও;—ভাল দেখে ছোটরকম একটা ডাকিনীকে তুমি বিয়ে কোরে ফেলো।”

    ঘেঁটিয়ে ঘেঁটিয়ে আরো কিছু আমি শুনবো, এই রকম ইচ্ছা ছিল, আর শুনা হলো না; বাবু এসে পোড়লেন, যুধিষ্ঠির উঠে গেল।

    জামা-চাদর খুলে রেখে, একটু স্থির হয়ে বোসে, বাবু হাসতে হাসতে আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “আজ আবার কিসের গল্প জুড়েছিল?”—আমি উত্তর কোল্লেম, ভূতের গল্প, ডাকিনীর গল্প আর বিয়ের গল্প। ডাকিনী দেখে যুধিষ্ঠির বড় খুসী হয়েছে, যারা এখানে নেচে গেল, ভেল্কী দেখিয়ে গেল, যুধিষ্ঠির তাদের ডাকিনী স্থির কোরেছে। একটু রঙ্গ করবার জন্য আমি তারে বোলেছিলেম, “তুমি একটা ডাকিনী বিয়ে কোরে দেশে নিয়ে চল। যুধিষ্ঠির বোল্লে, “আমি বুড়োমানুষ, ডাকিনী আমাকে ভেড়া বানিয়ে ফেলবে, আর আমি দেশে যেতে পাব না, ছেলেপিলে অনাথ হবেন।”

    বাবু একটু হাস্য কোরে বোল্লেন, “পাগলকে তুমি ও রকমে ক্ষেপাও কেন? একটা কিছু সূত্ৰ পেলেই পাগলেরা অনেক কথা এনে ফেলে। ভূতের গল্প যুধিষ্ঠির অনেক জানে আমরা তার মুখে অনেক রকম ভূতের গল্প শুনেছি। আমাদের দেশে এমন অনেক লোক আছে, একজনের মুখে ভূতের কথা, বাঘের কথা, রোগের কথা কিম্বা সর্পাঘাতের কথা শুনলেই তারা সকলেই মুখে মুখে অনেক আজগুবী আজগুবী গল্প আরম্ভ করে। সকলেই যেন সৰ্ব্বজ্ঞ, সকলেই যেন ভূত দেখেছে, সকলেই যেন বাঘের মুখ থেকে মানুষ ছাড়িয়ে নিয়েছে, সকলেই যেন ধম্মাকাসযুক্ত রোগীকে চব্বিশঘণ্টায় আরাম কোরেছে, সকলেই যেন সর্পাঘাতে মরা মানুষকে বেঁচে উঠতে দেখেছে, এই রকম ভাব জানায়; আমার যুধিষ্ঠিরটী সেই দলের একজন। তুমি আর তার কাছে ভূতের কথা তুলো না।”—এই পর্য্যন্ত বোলে, কি যেন ভেবে, বাবু আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “আচ্ছা হরিদাস, ভূতের কথায় তোমার কি বিশ্বাস হয়?”

    বিনা চিন্তায় আমি উত্তর “কথায় বিশ্বাস হয় না, কিন্তু খানকতক পুস্তক পাঠে জানতে পেরেছি, পৃথিবীর সকল দেশেই ভূতের নাম, ভূতের অস্তিত্ব, ভূতের গল্প চিরদিন প্রচলিত আছে। গল্প আছে, কিন্তু ভূতেরা আকার ধারণ কোরে মানুষকে পায় কিম্বা মানুষের ঘাড় ভাঙে, এরূপ গল্পে আমার বিশ্বাস হয় না।”

    বাবু হাস্য কোল্লেন; আবার কিয়ৎক্ষণ চুপ কোরে থেকে আবার জিজ্ঞাসা কোল্লেন “ডাকিনী?—ডাকিনীতে তোমার বিশ্বাস আছে?”

    কেন এ প্রকার প্রশ্ন, ভাব বুঝতে পাল্লেম না; তথাপি উত্তর কোল্লেম, “কামাখ্যার ডাকিনীর কথা অনেক লোকেই বলে, আমিও কামাখ্যা দর্শন কোল্লেম, মূর্ত্তিমতী ডাকিনী— যাদের মুক্তি দেখলে ভয় হয়, তেমন ডাকিনী একটাও দেখা গেল না, বোধ করি, সে রকম ডাকিনী এখন এখানে নাই; পূর্ব্বে হয় তো ছিল, এখন হয় তো তাদের বংশলোপ হয়ে গিয়েছে। এখন যারা আশ্চর্য্য আশ্চর্য্য ইন্দ্রজাল দেখায়, লোকের মুখে তারাই হয় তো ডাকিনী।”

    বাবুকে এই কথাগুলি বল্লেম; যুধিষ্ঠির আমারে ডাকিনী বিয়ে কোত্তে অনুরোধ কোরেছিল, সে কথাটা বাবুর কাছে ভাঙলেম না; কেমন লজ্জা হলো। সে ভাবের যে সকল কথা হোচ্ছিল, সে সকল প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে বাবুকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আর কতদিন আমাদের এখানে থাকা হবে?”

    বাবু উত্তর কোল্লেন, “আর কেন? তীর্থস্থান দর্শন করাই কাৰ্য্য, সে কাৰ্য্য সমাপ্ত হয়েছে, আসামের প্রধান সহর গৌহাটী, সে সহরটীও দেখা হয়েছে, ডাকিনীদের খেলা দেখবার কৌতূহল ছিল, সে কৌতূহলও আজ মিটে গেল, আর কেন? আর এখানে বিলম্ব করবার কোন প্রয়োজন দেখছি না; যত শীঘ্র যেতে পারি, ততই ভাল; একটা ভালদিন দেখে এখান থেকে প্রস্থান করা যাবে।”

    নূতন কৌতূহলে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “অন্য কোন তীর্থদর্শনের অভিলাষ আছে কি?”—আলস্যে একটী হাই তুলে প্রশান্তবদনে বাবু বোল্লেন, ছিল অভিলাষ, কিন্তু এ যাত্রা আর সে অভিলাষ পূর্ণ হলো না; অনেকদিন বেরিয়েছি, নানা স্থানের নানা প্রকার জল-হাওয়াতে শরীর মধ্যে মধ্যে অসুস্থ হোচ্ছে, এ যাত্রা আর অন্যতীর্থে যাব না। দক্ষিণে শ্রীক্ষেত্র আর গঙ্গাসাগর দূর্গম তীর্থ, ঐ দুটী বাকী থাকলো; গয়া, কাশী, প্রয়াগ, বিন্ধ্যাটবী দর্শন করা হয়েছে, কামাখ্যাদেবীর পীঠস্থানটীও দর্শন করা হলো, এবার এই পর্য্যন্তই ভাল; মথুরা, বৃন্দাবন, হরিদ্বার আর পুষ্করতীর্থ-দর্শনের আশা থাকলো, যদি বেঁচে থাকি, ভগবানের যদি মনে থাকে, বারান্তরে সে আশা চরিতার্থ করবার চেষ্টা পাব; এ যাত্রা এই স্থান থেকেই স্বদেশে যাত্রা করবার ইচ্ছা।”

    বাবুর সঙ্গে পঞ্জিকা ছিল, সেই রাত্রেই পঞ্জিকা উদ্ঘাটন কোরে শুভদিন অন্বেষণ করা হলো, দশদিনের মধ্যে শুভদিন পাওয়া গেল না, দশদিন পরে শুক্লা ত্রয়োদশী পুষ্যানক্ষত্র, শুভযোগ, সেই দিনেই যাত্রা করা হবে, স্থির হয়ে থাকলো।

    আমার গন্তব্যস্থান নির্ণীত ছিল না। প্রয়াগে দীনবন্ধুবাবু আমারে বোলেছিলেন, কামরূপদর্শনের পর তিনি আমারে তাঁর স্বদেশে নিয়ে যাবেন, সেই অঙ্গীকার স্মরণ কোরে আমি মনে কোল্লেম, সেইটাই এখন আমার গন্তব্যস্থান। একটা নূতন জায়গায় যাওয়ার সঙ্কল্প থাকলে উল্লাসে উৎসাহে শীঘ্র শীঘ্র দিন কেটে যায়, আমাদের সেই দশটী দিন শীঘ্র শীঘ্র অতিবাহিত হয়ে গেল; শ্রাবণমাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে তরণী আরোহণ, আমরা কামরূপ থেকে যাত্রা কোল্লেম।

  • একবিংশ কল্প : নূতন চাকরী

    একবিংশ কল্প : নূতন চাকরী

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    একবিংশ কল্প : নূতন চাকরী

    বাবু দীনবন্ধু চট্টোপাধ্যায়ের নিবাস মুর্শিদাবাদ, এ কথা পূর্ব্বেই উল্লেখ করা গিয়াছে, যথাসময়ে আমরা মুর্শিদাবাদে উপনীত হোলেম। রক্তদন্তের ভয়ে এ অঞ্চলে শীঘ্র ফিরে আসবার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু বিধাতার ইচ্ছায়, দীনবন্ধবাবুর যত্নে, অনুগ্রহে, অনুরোধে কাজে কাজেই মুর্শিদাবাদে আসতে হয়েছিল। দীনবন্ধুবাবুর বাড়ীখানি অতি সুন্দর; যেমন প্রশস্ত, তেমনি সুদৃশ্য। সদরবাড়ী দু-মহল। সম্মুখের মহলে তিনটী দেউড়ী, তাহার পরে প্রাঙ্গণ; প্রাঙ্গণের মধ্যস্থলে তালগাছের খুটী-দেওয়া বৃহৎ এক আটচালা; আটচালার বাহিরে ঈশানকোণে একটী বিল্ববৃক্ষ; চারিধারে ইষ্টকের বেদীগাঁথা; আটচালার পূর্ব্ব-পশ্চিম-দক্ষিণে সারি সারি অনেকগুলি ঘর; আটচালার উত্তরাংশে পুজোর দালান;—প্রাচীনপ্রণালীর বিবিধ কারুকর্ম্ম খচিত সাতফুকুরে দালান। সেই দালানের মাথার সঙ্গে রুজু রুজু অপর তিনদিকে দ্বিতল বৈঠকখানা। এটী পূজার মহল। এই মহলের পশ্চাতে দপ্তরমহল, এ মহলেও চকবন্দীকরা উপরনীচে অনেকগুলি ঘর; সেই সকল ঘরে দেওয়ান, নায়েব, তোঞ্জী, কারকুন, পেস্কার, মুন্সী, মুহুরী, সরকার প্রভৃতি আমলাবর্গ বাস করেন। নীচের ঘরগুলিতে দপ্তরখানা, উপরের ঘরগুলিতে আমলাদের বাসস্থান। তিন দেউড়ীতে ভিত্তিতে ভিত্তিতে বড় বড় ঢাল, তলোয়ার, কিরীচ সংলগ্ন; প্রত্যেক দেউড়ীতেই খাটিয়া পাতা, মোট দশজন দারোয়ান সেই সকল খাটিয়ায় বিরাজ করে, দেউড়ীর কোণে কোণে লাঠী, বর্শা, মালকাৎ, মুগুর দণ্ডায়মান। দেউড়ীর মাথায় নাচঘর; সম্মুখে প্রায় শতহস্ত দীর্ঘ বারান্দা; বারান্দার ধারে ধারে জোড়া জোড়া গোল-থামের মাথায় সবুজবৰ্ণ ঝিলিমিলি; নিম্নভাগে ফোকরে ফোকরে লোহার রেল, তাতেও সবুজ রং দেওয়া; বারান্দার সম্মুখে ঠিক মধ্যস্থলে সমচতুষ্কোণ গাড়ী-বারান্দা;—বিংশতি হস্ত দীর্ঘ, বিংশতি হত প্রশস্ত; নীচের চারি কোণে তিন তিনটী মোটা মোটা গোলথাম দণ্ডায়মান হয়ে সেই গাড়ীবারান্দাটী মাথায় কোরে রোয়েছে। বাড়ীর সম্মুখে প্রশস্ত ময়দান, চারিধার কাষ্ঠের রেল দিয়ে ঘেরা, চারিদিকেই রাস্তা; রাস্তার দুধারে রেল দেওয়া; রাস্তার পাশে পাশে ঢেউখেলানো প্রাচীরঘেরা মণ্ডলাকার পুষ্পবাটিকা। প্রায় পঞ্চাশ হাত তফাতে বড় বড় থামদেওয়া সুবহৎ রঙ্গীন-কপাটযুক্ত ফটক; ফটকের পশ্চিমধারে বৃহৎ এক সরোবর; চারি ধারে, বড় বড় বাঁধা ঘাট; চারিটী ঘাটের দুই দুই ধারে আটটী শিবের মন্দির। সরোবরের দক্ষিণধারে সদর-রাস্তা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে উত্তরদিকে চেয়ে দেখলে বাড়ীর শোভা অতি চমৎকার দেখায়। ফটকের দুধারে দুটী উচ্চ নহবৎখানা।

    বাড়ীর আয়তন দেখে বোধ হলো, বাবুরা সেখানকার বুনিয়াদী বড়মানুষ; বাড়ীখানি বহুদিনের প্রাচীন; বাহিরদিকে এলামাটীর রং দেওয়া ভিতরের ঘরগুলিতে শ্বেতপাথরের কাজ করা। নাচঘরটী প্রায় ষাট হাত দীর্ঘ প্রায় ত্রিশ হাত প্রশস্ত; মেজে কার্পেটমোড়া, দেয়ালে বড় বড় ছবি, ছবির মাথায় জোড়া দেয়ালগিরী, কড়িকাঠে বড় বড় বেলোয়ারী ঝাড় দোদুল্যমান; কার্পেটের উপর সারি সারি অনেকগুলি তাকিয়া বালিশ, রক্তবর্ণ আবরণে সেই বালিশগুলি সমাবৃত; আবরণবস্ত্রের উপর নানাপ্রকার ঝাড়বুটো কাটা; আসবাবসজ্জায় বিশেষ-সমৃদ্ধির পরিচয় হয়।

    বাবুদের জমীদারী অনেকগুলি; নিজের বাসগ্রামখানিও তাঁদের জমীদারীর অন্তর্গত। শুনা গেল, গৃহবিবাদে কতকগুলি জমীদারী নষ্ট হয়ে গিয়েছে, কতকগুলি ভাগ হয়ে গিয়েছে, বংশবৃদ্ধি হওয়াতে বংশের কেহ কেহ পৈতৃক বাড়ী পরিত্যাগ কোরে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে গিয়ে বাস কোরেছেন।

    দীনবন্ধবাবুর নিজাংশে যে কয়েকখানি জমীদারী আছে, তার বার্ষিক আয় সদর মালগুজারী বাদে প্রায় সত্তর আশী হাজার টাকা। দুঃখের বিষয়, দীনবন্ধবাবুর পুত্র সন্তান নাই; পিতার জ্যেষ্ঠপুত্র তিনি; পিতা বর্ত্তমান নাই, তিনিই এখন কৰ্ত্তা। পাঁচটী সহোদর ছিলেন, দেশব্যাপী মহামারীতে অপরাপর পরিবারের সহিত চারিটী সহোদর অকালে কালগ্রাসে পতিত হয়েছেন। একটী কনিষ্ঠ সহোদর বর্ত্তমান, তাঁর নাম পশুপতি, বয়স অনুমান পঁচিশ ছাব্বিশ বৎসর। দীনবন্ধুবাবু অপুত্রক, ভ্রাতৃবিয়োগী, মনের দুঃখে তিনি বিষয়কার্য্যে উদাসীন, ছোটবাবুই সমস্ত বিষয়কৰ্ম্ম দেখেন। যে সকল দলীলপত্রে দস্তখৎ না কোল্লে নয়, বড়বাবু কেবল সেইগুলিতে স্বাক্ষর মোহর কোরে দেন। জমীদারী-সম্বন্ধে এইমাত্র তাঁর কার্য্য; তাঁর অধিকাংশ সময় ঠাকুরপূজাতে আর ইষ্টমন্ত্রজপে অতিবাহিত হয়। ভদ্রাসনবাড়ী থেকে প্রায় অর্দ্ধ মাইল দূরে একটা প্রশস্ত উদ্যানে বাবুদের পৈতৃক ব্রহ্মময়ী দেবী প্রতিষ্ঠিতা আছেন, ব্রহ্মময়ীর মন্দিরেই বেলা প্রায় আড়াইপ্রহর পর্য্যন্ত বড়বাবু প্রতিদিন উপস্থিত থাকেন, সেইখানেই পূজা-অর্চ্চনা হয়, সন্ধ্যাকালেও সেই মন্দিরে গিয়ে আরতি দেখেন। বিষয়কার্য্যে ঔদাস্য জমেছে বোলেই তীর্থদর্শনে তাঁর অনুরাগ। তিনি আড়ম্বর ভালবাসেন না; তীর্থভ্রমণকালেও কোন প্রকার আড়ম্বর থাকে না; অত বড় একজন জমীদার কেবল একজন বৃদ্ধ চাকর সঙ্গে নিয়ে তীর্থভ্রমণে বহির্গত হয়েছিলেন, এই পরিচয়েই পাঠকমহাশয় দীনবন্ধুবাবুর আড়ম্বরশূন্যতার উত্তম প্রমাণ প্রাপ্ত হয়েছেন। নিজের পোষাক-পরিচ্ছদেও বাবুগিরী নাই, প্রবাসে তাঁরে দর্শন কোল্লেও সামান্য একজন মধ্যবিত্ত গৃহস্থ বোলে মনে হয়। প্রয়াগসঙ্গমে তাঁরে দর্শন কোরে আমিও বাস্তবিক সেইরুপ মনে কোরেছিলেম। তার নিজগ্রামে উপস্থিত হয়ে জানতে পাল্লেম, ধনসম্পদে ও মানগৌরবে তিনি একজন রাজাবিশেষ; বাড়ীখানিও যেন রাজবাড়ী।

    গ্রামখানির নাম যদুপুর। গ্রামবাসীরা দীনবন্ধুবাবুর একান্ত ভক্ত। নাচঘরের পাশে একটা ছোটঘর, সজ্জা পরিষ্কার, কিন্তু আড়ম্বরশূন্য; সেই ঘরে বড়বাবু বসেন। গ্রামের ভদ্রলোকেরা দেখা কোত্তে এলে সেইখানেই দেখা-সাক্ষাৎ হয়, বাবু তাঁদের সঙ্গে দিব্য অন্তরঙ্গভাবে আলাপ করেন, যাঁর যেমন মর্য্যাদা তদপেক্ষা বেশী সম্মান দেখান, এই কারণে সকল লোকেই তাঁর গুণগান করেন, যশোগান করেন, মঙ্গলকামনা করেন; সকলেই তাঁর বাধ্য। কেবল এই কারণেই নয়, গ্রামের কেহ বিপদাপন্ন হোলে অর্থে সামর্থে তিনি সাহায্যদান করেন, নিরুপায় দরিদ্র গৃহস্থের ভরণপোষণের ব্যবস্থা কোরে দেন, পিতৃদায়, মাতৃদায়, কন্যাদায় প্রভৃতিতে দায়গ্রস্থ হয়ে কেহ তাঁর শরণাপন্ন হোলে, তিনি মুক্তহস্ত হয়ে সেই সকল কার্য্যের পূর্ণব্যয়ভার একাকী বহন করেন। গুণের অধিকারী সেই মহানুভব দীনবন্ধু চট্টোপাধ্যায়।

    সদরবাড়ীর যৎকিঞ্চিৎ পরিচয় আমি দিয়েছি, অন্দরমহলের কিছুই আমার দেখা হয় নাই। একমাস আমি সেই বাড়ীতে থাকলেম, অনেকের সঙ্গেই আলাপ হলো; বড়বাবু আদর করেন, তাই দেখে আর আমার স্বভাবচরিত্র বুঝতে পেরে, ছোটবাবুও দিন দিন আমারে ভালবাসতে লাগলেন। সেই বাড়ীতে আমার চাকরী হলো। মাসিক বেতন কুড়ি টাকা। সেরেস্তায় বোসে লেখাপড়া করা আর বড়বাবুর নিজ খরচপত্রের হিসাব রাখা, কেবল এই পর্য্যন্তই আমার কার্য্য; সময় অনেক পাই, সংস্কৃত আর ইংরেজী ভাষার চর্চ্চার কোন ব্যাঘাত হয় না।

    বাড়ীর আমলারা দুই বেলা ব্রহ্মময়ীর বাড়ীতে গিয়ে ভোগের প্রসাদ পান, প্রথম প্রথম দিন পাঁচ ছয় আমারেও সেই দেবালয়ে আহার কোত্তে যেতে হয়েছিল, তার পর ছোটবাবুর আদেশে বাড়ীর মধ্যেই আমার আহারের ব্যবস্থা হয়। বাড়ীতেও নিত্য নিত্য ব্রহ্মময়ীর প্রসাদ আসে, ভোগের প্রসাদ পেতে আমিও বঞ্চিত থাকি না।

    হাঁ, অন্দরমহলের কোন কথাই আমি বোলতে পারি নাই। যখন অন্দরে প্রবেশ করবার অনুমতি পেলেম, তখন দেখলেম, সদরমহল অপেক্ষাও অন্দরমহল বড়। রন্ধনমহল, ভাণ্ডারমহল, ঘাটমহল, শয়নমহল, সমস্তই ভিন্ন ভিন্ন। ঘাটমহল ব্যতীত আর তিনটী মহলে সুন্দর সুন্দর অনেক ঘর। সেই সকল ঘর বহুসামগ্রী-পরিপূর্ণ; শয়নমহলের ঘরগুলি সুসজ্জিত। সব দেখলেম ভাল, কেবল একটী দৃশ্য আমার চক্ষে বড় শোচনীয় বোধ হলো। বাড়ীতে বিধবা রমণী অনেকগুলি। বড়-বৌঠাকুরাণী, ছোট-বৌঠাকুরাণী আর বাবুর একটী ভাইঝি ব্যতীত যাঁর দিকে চাই, তাঁরেই দেখি ম্রিয়মাণা;—অলঙ্কারশূন্য, সিঁদরশূন্য, মণ্ডিতমস্তক, থানবস্ত্রপরিহিতা। স্ত্রীলোকেরা কেহই আমারে দেখে ঘোমটা দেন না, লজ্জা করেন না, সকলগুলির মুখ আমি দেখতে পাই; বিধবাগুলির ম্লানমুখ দেখে আমার বড় কষ্ট হয়। গৃহিণী পরম সুন্দরী, বয়স অনুমান ত্রিশ বৎসর; পুত্র হয় নাই, শুনলেম, একটী কন্যা হয়েছিল, জন্মের এক বৎসর পরেই সেটী মারা গিয়েছে; সেই দুঃখে এক একবার তিনি ম্লানমুখী হন, নতুবা সৰ্ব্বক্ষণ তাঁরে প্রসন্নমুখী দেখা যায়। ছোট-বৌটীও সুন্দরী; বয়স অনুমান ১৮/১৯ বৎসর। তিনিও সৰ্ব্বক্ষণ প্রফুল্লবদনে সংসারের কাজকর্ম্ম করেন, মিষ্টবচনে সকলকেই তুষ্ট রাখেন, আবশ্যক হোলে আমার সঙ্গেও অসঙ্কোচে ফুল্লবদনে কথা কন। বাবুর ভাইঝিটীর নাম নয়নতারা; গত বৎসর বিবাহ হয়েছে; বয়স অনুমান দ্বাদশবর্ষ; বর্ণ শ্যামোজ্জ্বল, লাবণ্য চমৎকার; নয়নতারার নয়ন দুটী পলকে পলকে যেন হাস্য করে। নয়নতারা আমার সঙ্গে হেসে হেসে কথা কন; হাসিও মিষ্ট, কণ্ঠস্বর সুমিষ্ট। বিধবাগুলির রপে বর্ণনা কোত্তে ক্লেশবোধ হয়, সুতরাং সে বর্ণনায় ক্ষান্ত থাকলেম। বাড়ীতে দাসী-চাকর অনেক; পাচক-পাচিকা নাই, বাড়ীর স্ত্রীলোকেরাই রন্ধনকার্য্য নিৰ্ব্বাহ করেন; স্বয়ং গৃহিণীই রন্ধনশালার অধিক কাৰ্য্য স্বহস্তে সম্পন্ন কোরে থাকেন। ছোট-বোটীর প্রতি তাঁর যথেষ্ট স্নেহ। চক্ষেও দেখলেম, লোকের মুখেও শুনলেম, বড়-বৌঠাকুরাণী এ সংসারের লক্ষ্মী।

    আমি চাকরী করি। মুর্শিদাবাদ প্রাচীন সহর, অবকাশকালে প্রকৃতিদর্শনে আমি বহির্গত হই। ভাগীরথীর পুৰ্ব্বকূলে মুর্শিদাবাদ সহর, পশ্চিমকূলেও অনেকগুলি নগর ছিল, ক্রমে ক্রমে সমৃদ্ধিশূন্যে হয়ে এসেছে। মুর্শিদাবাদের প্রাচীন নাম ছিল মুখশুধাবাদ, বঙ্গের নবাব মুর্শিদকুলীখান আপন নামে এই মুখশুধাবাদের নূতন নাম দেন মুর্শিদাবাদ। তদবধি সেই নামটীই চোলে আসছে।

    পূর্ব্বেই বলেছি, ভাগীরথীর উভয়কূলে মুর্শিদাবাদ। পূর্ব্বকূলে সহর, আদালতযুক্ত বহরমপুর, কাশীমবাজার, খাগড়া ইত্যাদি; পশ্চিমকূলে আজিমগঞ্জ, কাণসোণা, কিরীটেশ্বরী ও রাঙামাটী প্রভৃতি অনেক স্থান আছে। আমি গরিব, কিন্তু যেখানে যখন যাই, সেখানকার প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ স্থানগুলি দর্শন করবার ইচ্ছা বলবতী হয়ে থাকে। মুর্শিদাবাদে কিরীটেশ্বরী নামে এক দেবী আছেন। লোকের মুখে শুনা গেল, এই দেবী ভগবতীর পীঠমালার একটী পীঠের অধিষ্ঠাত্রী। ভগবতীর মস্তকের কিরীট বিষ্ণুচক্রে ছিন্ন হয়ে এইখানে পতিত হয়, তাতেই কিরীটেশ্বরী নাম; ভৈরব এখানে সম্বৰ্ত্তদেব। কিরীটেশ্বরীকে কেহ কেহ মুকুটেশ্বরী বলে, কেহ কেহ বিমলাও বলে; বস্তুতঃ কিরীটপাতের পীঠেরী সাধারণতঃ কিরীটেশ্বরী নামেই প্রসিদ্ধ। পূর্ব্বে অনেক বড় বড় লোক এই তীর্থে সমাগত হোতেন, দেবীর সেবার ব্যবস্থা খুব ভালই ছিল, অনেক লোক এই তীর্থপ্রসাদে প্রতিপালিত হতো, সমারোহের সীমা ছিল না। ডাহাপাড়া গ্রামের দেড়ক্রোশ পশ্চিমে কিরীটেশ্বরী-পীঠ। কিরীটেশ্বরীর মন্দির অতি সুন্দর ছিল, এখন ভগ্নাবশেষ; কালাপাহাড় সে মন্দিরে কোন অপকার করে নাই। আদিমন্দির ভগ্নস্তুপ, দ্বিতীয়বার আর একটী মন্দির নির্ম্মিত হয়, সংস্কারাভাবে সেটাও জীর্ণ প্রায়। আপনাদের সুবিধার জন্য পূজকেরা এখন গ্রামের মধ্যে একটী স্বতন্ত্র মন্দির নির্ম্মাণ কোরে সেইখানে কিরীটেশ্বরী স্থাপন কোরেছেন, সেইখানেই পুজো হয়। “কিরীটেশ্বরীর মেলা” নামে পৌষ মাসে মহাসমারোহে একটী মেলা হতো, আজিও হয়, কিন্তু এখন কেবল নাম মাত্র। মুর্শিদাবাদ যখন বঙ্গ বিহার উড়িষ্যার রাজধানী হয়, মুসলমান-নবারেরা সেই সময় কিরীটেশ্বরীর মহিমা স্বীকার কোত্তেন। কথিত আছে, মহারাজ নন্দকুমার যখন নবাবসরকারের দেওয়ান ছিলেন, সেই সময় নবাব মীরজাফর আপন জীবনের অন্তকালে মহারাজের অনুরোধে কিরীটেশ্বরী-দেবীর চরণামৃত পান কোরেছিলেন।

    মুর্শিদাবাদের রাঙামাটী একটী প্রসিদ্ধ স্থান। এখন সেই রাঙামাটী কেবল প্রস্তর আর রক্তবর্ণ মৃর্ত্তিকার স্তূপে পরিণত; অধিকাংশ স্থান ভাগীরথীগর্ভে প্রবেশ কোরেছে! রাঙামাটীর প্রাচীন নাম কর্ণসুবর্ণ,—অপভ্রংশে কাণসোণা। প্রবাদ এইরুপ যে, ঐ স্থানে দাতাকর্ণের রাজধানী ছিল। কর্ণসুবর্ণ পূরাণপ্রসিদ্ধ অঙ্গরাজ্যের অন্তর্গত। মহাভারতের উদযোগপর্ব্বে বর্ণিত আছে, রাজা দুর্যোধন কর্ণকে অঙ্গরাজ্যের রাজপদে বরণ কোরে ভারতযুদ্ধে সেনাপতিত্ব প্রদান কোরেছিলেন, সেই অঙ্গরাজ্যের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ। স্থানের নাম রাঙামাটী কেন হয়েছিল, সে প্রসঙ্গেও একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে। কর্ণপুত্র বৃষকেতুর অন্নপ্রাশনের সময় লঙ্কেশ্বর বিভীষণের নিমন্ত্রণ হয়েছিল, রাজা বিভীষণ নিমন্ত্রণস্থলে উপস্থিত হয়ে স্বর্ণবৃষ্টি কোরেছিলেন, সেই স্বর্ণপ্রভায় কর্ণসুবর্ণের সমস্ত মূর্ত্তিকা স্বর্ণবর্ণ ধারণ কোরেছিল; স্বর্ণবর্ণ রক্তবর্ণ নয়, তথাপি লোকমুখে সেই স্থানের নূতন নাম হয় রাঙামাটী। বহুলোকের মুখেই এই কথা শুনা যায়। বস্তুতঃ কর্ণসুবর্ণ একজন বড়রাজার রাজধানী ছিল, তার অনেক চিহ্ন দেখা যায়; শোভাসমৃন্ধি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, তথাপি এখনো রাজডাঙ্গা, ঠাকুরডাঙ্গা, ব্রাহ্মণডাঙ্গা, ভাণ্ডারডাঙ্গা প্রভৃতি কতকগুলি উচ্চ উচ্চ স্থান বিদ্যমান আছে। কর্ণসুবর্ণে অনেক অট্টালিকা ও অনেক দেবালয় ছিল, ইষ্টকপ্রস্তরাদি-স্তূপের ভগ্নাবশেষ দৃষ্ট হয়। কিরীটেশ্বরীতেও অনেক মন্দির ও অনেক দেব-মূর্ত্তির ভগ্নাবশেষ দৃষ্ট হয়ে থাকে।

    কিরীটেশ্বরীর ভৈরব প্রকৃতপক্ষে মহাদেবের ন্যায় মূর্ত্তিবিশিষ্ট কি না, এ বিষয়ে অনেকে সন্দেহ করেন। মূর্ত্তি পদ্মাসনে উপবিষ্ট, বাম হস্তখানি ক্রোড়সংলগ্ন, দক্ষিণ-হস্তখানি পাদসংলগ্ন, মস্তকে টোপর, গলদেশে যজ্ঞোপবীত। এই মূর্ত্তি দর্শন কোরে অনেকে অনুমান করেন, ভৈরবরূপী বুদ্ধমূর্ত্তি। বুদ্ধদেবের পাঁচ প্রকার মূর্ত্তি; ধ্যানী বুদ্ধ, সমাধিস্থ বুদ্ধ, প্রচারক বুদ্ধ, যাত্রী বুদ্ধ, মুমূর্ষ বুদ্ধ। ঐ মূর্ত্তি ধ্যানী বুদ্ধমূর্ত্তি বোলে অনুমিত হয়। ঐ মূর্ত্তি প্রাচীনকালাবধি ঐ স্থানে আছে কিম্বা কোন বুদ্ধতীর্থ থেকে ঐ বুদ্ধমূর্ত্তি কিরীটেশ্বরীতে কেহ আনয়ন কোরেছেন, এখানকার লোকেরা সে কথা বোলতে পারেন না। বিজ্ঞলোকেরা বলেন, ভৈরবেরা ত্রিনেত্র, এ মূর্ত্তিতে ত্রিনয়ন নাই, অতএব ধ্যানীবুদ্ধমূর্ত্তি বোলেই সিদ্ধান্ত করা করা হয়।

    এখানে মহীপাল নামে একটী স্থান আছে। স্থানটী গঙ্গাতীরে। রাজা মহীপাল এই স্থানের নাম দিয়েছিলেন মহীপাল নগর। অধুনা সেই নগরের ধ্বংসাবশেষ বিদ্যামান। রাজা মহীপালের প্রাসাদ এখন ভগ্নস্তূপে পরিণত। রাজা মহীপাল এখানে একটী দীর্ঘিকা খনন করান, সেই দীর্ঘিকার নাম সাগরদীঘী। প্রাচীনলোকের মুখে শুনা গেল, প্রায় একাদশ শতবর্ষ পূর্ব্বে এই দীঘী খনিত হয়। এই দীঘীর নাম কেন সাগরদীঘী, তৎসম্বন্ধে এখানে একটা গল্প আছে। খননকার্য্য সমাপ্ত হয়ে গেলেও দীঘীতে জল হয় নাই, রাজা মহীপালদেব স্বপ্নযোগে এইরূপে একটী দেবাদেশ প্রাপ্ত হন যে, “মহীপালনগরে সাগরপাল নামে এক কুম্ভকার বাস করে, সে যদি দীঘীর নিম্নভাগে এক কোদাল মাটী কেটে দেয়, তা হোলেই তৎক্ষণাৎ জল উঠবে।”

    সেই প্রত্যাদেশে রাজা তৎপরদিবস সাগরপালকে ডাকান, সাগরপাল মাটী কাটে, দীঘী জলপূর্ণ হয়। এ গল্প কতদূর বিশ্বাস্য, সে কথা বলা যায় না। লোকে বলে, সাগরপালের নামেই দীঘীর নাম সাগরদীঘী। এই দীঘী পূৰ্ব্বপশ্চিমে অর্দ্ধক্রোশ দীর্ঘ, উত্তরদক্ষিণে প্রায় সহস্র হস্ত প্রশস্ত। দীঘীর উভয় তীরে দশটী বাঁধাঘাট ছিল; ঘাটগুলির এখন ভগ্নাবস্থা, কেবল কিছু কিছু চিহ্ন দেখা যায় মাত্র। ঘাটের ধারে ধারে কতকগুলি পান্থাশ্রম ছিল, সে সকল আশ্রম এখন কেবল ইষ্টকস্তূপে পরিণত। একটা স্তূপের বর্ত্তমান নাম “বুড়ো পীরের দরগা।” রাজা মহীপালদেব ৭৪০ শকে এই দীঘী খনন করান। বঙ্গেশ্বর লক্ষণসেনের সময়ে গৌড়ে এই প্রকার একটা দীঘী খনিত হয়, সে দীঘীর নামও সাগরদীঘী। দিনাজপুরে রাজা মহীপালের কীর্ত্তিখাতস্বরুপ একটী দীঘী আছে, সে দীঘীর নাম মহীপালদীঘী।

    লোকের মুখেও কতক কতক শুনলেম, চক্ষেও কতক কতক আমি দেখলেম। ভাগীরথীর উভয়তীরে মুর্শিদাবাদের যে যে স্থান দর্শনযোগ্য, কতিপয় বিশেষজ্ঞ লোকের সঙ্গে এক একদিন বেড়িয়ে বেড়িয়ে সেগুলিও আমি দর্শন কোল্লেম। পূৰ্ব্বতীরে নবাব নাজীমের বাড়ী, বাগান, চিত্রশালা, তোপখানা ইত্যাদি দিব্য সুন্দর; কাশীমবাজারের রাজবাড়ী খুব প্রশস্ত, কিন্তু প্রাচীন ধরণের। বহরমপুরের আদালতগুলি বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। খাগড়ার পিত্তল-কাঁসার জিনিস বঙ্গদেশে প্রসিদ্ধ। একে একে এই সব আমি দেখলেম। আমার চক্ষে সুন্দর বোধ হলো, কিন্তু এখানকার ভদ্রলোকেরা বলেন, মুর্শিদাবাদের পূর্ব্বশ্রী এখন কিছুই নাই। মুর্শিদাবাদ যখন বাঙলার রাজধানী ছিল, তখন এ স্থানের শোভাসমৃদ্ধির সীমা ছিল না। চীন-পরিব্রাজক হিউয়েনশিয়াং ভারতভ্রমণ সময়ে মুর্শিদাবাদে এসেছিল, সেই দূরদর্শী ভ্রমণকারীর লিখিত বিবরণীতে মুর্শিদাবাদের উচ্চপ্রশংসা পরিকীর্ত্তিত আছে, এ কথাও আমি এখানকার পণ্ডিতলোকের মুখে শ্রবণ কোল্লেম।

    তিনমাস আমি দীনবন্ধুবাবুর বাড়ীতে অবস্থান কোল্লেম, চাকরী করি আর ভ্রমণ করি, এই আমার কাৰ্য্য। বাবুর পরিবারবর্গের কাছে দিন দিন আমার আদর-যত্ন বাড়তে লাগলো; বাবুর যথেষ্ট আদর-যত্ন তো ছিলই, বাবুর কনিষ্ঠ ভ্রাতা পশুপতিবাবুও আমারে খুব ভালবাসলেন। পশুপতিবাবুর স্বভাবচরিত্র নির্ম্মল, অল্পবয়সে বিষয়বুদ্ধিও বেশ পরিপক্ক, নীতিশাস্ত্রজ্ঞানেও তিনি বঞ্চিত ছিলেন না, তাঁর কথাবার্ত্তায় আর সদয়ব্যবহারে দিন দিন তাঁর প্রতি আমার বিশেষ শ্রদ্ধা জন্মিল। তিনি আমার সঙ্গে সখ্যভাবে কথা কন, ধর্ম্মশাস্ত্রের ইতিহাস বলেন, বিষয়কর্ম্মের জটিলতা বুঝিয়ে দেন, এক একদিন সন্ধ্যাকালে তাঁর মুখে আমি আমোদপ্রমোদের খোসগল্প শুনে বড় সুখী হই। গল্পগুলি দোষাংশপরিশূন্য, তার উপর নীতিশাস্ত্রের অনুগত। আমলাবর্গের সঙ্গেও আমার বেশ আলাপ হলো, বাবুদের আদর-যত্ন দেখে বাড়ীর চাকরেরাও আমার আজ্ঞাকারী হয়ে থাকলো, পল্লীবাসী ভদ্রসন্তানেরাও ক্রমে ক্রমে আমারে চিনলেন, তাঁদের কাছেও আমি স্নেহ-ভালবাসালাভে হতাশ হোলেম না।

    যে বৎসরের কথা আমি বোলছি, সে বৎসর কার্ত্তিকমাসে দুর্গাপুজো হয়। বাবুর বাড়ীতে মহা সমারোহে মহামায়ার পূজা হলো। বৃহৎ প্রতিমা, চমৎকার গঠন, চমৎকার সজ্জা, সমস্তই চমৎকার। পূজার তিনদিন বিস্তর লোকের সমাগম, ভোজের ব্যাপার সমৃদ্ধিসম্পন্ন, নিমন্ত্রিতগণের আদর-অভ্যর্থনাও অনুপম। কলিকাতায় প্রতিমার নিকটে প্রণামী দিবার রীতি আছে, এখানে সে রীতি নাই। দিবারাত্রি উৎসব। বৈকালে চণ্ডীর গান, রাত্রিকালে যাত্রা। এই গ্রামের অনেক বাড়ীতেই পূজা হয়, অনেক বাড়ীতেই ঘটা হয়, কিন্তু চণ্ডীর গান আর যাত্রা ছাড়া কোন বাড়ীতেই খেমটানাচ কিম্বা বাইনাচের মজলীস দেখা গেল না। সকলেই ভাবেন, মহামায়ার আগমন-উৎসবে বাড়ীতে বেশ্যানর্ত্তন দূষণীয়।

    দশমীতে ভাগীরথীগর্ভে মা দুর্গার নিরঞ্জন। অনেক লোকের সঙ্গে আমি নিরঞ্জন দেখতে গেলেম। ছোট বড় অনেকগুলি প্রতিমা এক জায়গায় জমা হলো, দুর্গামঙ্গলের গায়ক-সম্প্রদায় করুণরাগিণীতে গঙ্গাতীরে বিজয়া গাইলেন, অনেক ভক্তের চক্ষে অশ্রুবিন্দু দেখা গেল, তার পর বিসর্জ্জন। স্বর্ণপ্রতিমার ন্যায় মহামায়ার মৃন্ময়ী প্রতিমাগুলি একে একে হেলে হেলে গঙ্গাজলে ডুবলেন, ভাগীরথীবক্ষে নৌকার উপর ৫/৭ খানি প্রতিমার বাচখেলা হলো, সন্ধ্যার পূর্ব্বেই নিরঞ্জন সমাপ্ত। কলিকাতা বিজয়োৎসবে যে যে অঙ্গ পালিত হয়, শান্তিজলগ্রহণ, দুর্গানাম লেখা, সিদ্ধিপান, পরস্পর আলিঙ্গন-সম্ভাষণ ইত্যাদি সেই সেই অঙ্গগুলি সমভাবেই প্রতিপালিত হলো। এখানে কেবল দুটী প্রথা আমি নূতন দেখলেম। সুর্য্যাস্তের পূর্ব্বেই প্রতিমা বিসর্জ্জন হয়ে গেল, কিন্তু যতক্ষণ আকাশে নক্ষত্রোদয় না হলো, ততক্ষণ পূজাবাড়ীর কর্ত্তারা কেহই ঘরে ফিরে এলেন না, সন্ধ্যার সময় পূর্ণঘট সঙ্গে কোরে, নক্ষত্র দেখে দলবলসহ বাড়ী এলেন, এই একটী প্রথা; আর,— যাঁরা বনিয়াদী লোক, পুরুষানুক্রমে যাঁদের বাড়ীতে দুর্গোৎসব হয়, তাঁরা বাড়ীতে প্রবেশ করবার অগ্রে একটী লক্ষণ পরীক্ষা করেন। বাড়ীর কৰ্ত্তা সদরদরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে এক একটী নীলকণ্ঠপাখী উড়িয়ে দেন, পাখী যদি উড়ে উড়ে বাড়ীর ভিতর যায়, তবেই মঙ্গল, নতুবা পাখী যদি বাহিরদিকে উড়ে যায়, তবেই অমঙ্গল লক্ষণ বুঝায়; সেই অমঙ্গলের প্রতিবিধানার্থ আগামী বৎসরে মা দুর্গার উদ্দেশে স্বতন্ত্র মানসিক পূজার মানস কোত্তে হয়। দীনবন্ধবাবুও তদনুসারে নীলকণ্ঠপাখী উড়ালেন, পাখীটী ফর ফর কোরে উড়ে পুজার দালানে গিয়ে বোসলো, উচ্চকণ্ঠে “জয় মা দুর্গা!” উচ্চারণ কোরে প্রহৃষ্টবদনে সকলে বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ কোল্লেন। বাবুদের কাছে কাছে আমি। দালানের যে চৌকীতে প্রতিমাস্থাপন হয়েছিল, সেই চৌকীর উপর দুটী বালিকা গৌরীকুমারী বোসেছিলেন, পার্শ্বে একটী ঘৃতপ্রদীপ জ্বোলছিল, সম্মুখে সেই নীলকণ্ঠ; চৌকীর উপর পূর্ণঘটস্থাপন কোরে সকলে সেইখানে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম কোল্লেন, আমিও প্রণাম কোল্লেম। তার পর বিজয়াকৃত্যের অপরাপর অঙ্গসমাধান। সে রাত্রে আর যাত্রাদি কোন প্রকার উৎসব হলো না, ঘটের কাছে আরতি হলো, আবার আমরা প্রণাম কোল্লেম। রাবণবধের অগ্রে সমদ্রতীরে রামচন্দ্র অকালে শরৎকালে দুর্গাপুজা কোরেছিলেন, রামচন্দ্রের বিজয়োৎসবের অনুকরণে এই বিজয়োৎসবের প্রবর্ত্তন; কিন্তু বিজয়ার অনেকগুলি অঙ্গ অধুনা নূতন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। রামচন্দ্র সেকালে বানর-ভল্লুকাদির সঙ্গে কোলাকুলি কোরেছিলেন, একালে এখন মানুষে মানুষে মেলা।

    বিজয়া-রজনী প্রভাত হলো, বাদ্যকরের মধুরতালে নানাপ্রকার রং বাজিয়ে বকসীস নিয়ে বিদায় হয়ে গেল, দক্ষিণা পেয়ে আশীর্ব্বাদ কোরে পুরোহিতেরাও বিদায় হোলেন, সংবৎসরের মত দুর্গোৎসবের আমোদ ফুরালো।

    দিনে দিনে ক্রমে ক্রমে গোলমাল থেমে গেল, পুজোর পূর্ব্বাবধি শেষের পাঁচ সাত দিন পর্য্যন্ত দপ্তরখানার কাজকর্ম্ম বন্ধ ছিল, বন্ধের অবসানে পুনরায় আমরা স্ব কর্ত্তব্যকার্যে মনোনিবেশ কোল্লেম।

  • দ্বাবিংশ কল্প : কৃষ্ণকামিনী

    দ্বাবিংশ কল্প : কৃষ্ণকামিনী

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    দ্বাবিংশ কল্প : কৃষ্ণকামিনী

    পুজার মঙ্গলাচরণে পুজার পূর্ব্বে আগমনীগীত হয়; পূজাবাড়ীতেও আগমনী আনন্দ বর্দ্ধিত হয়ে থাকে; সম্পর্কীয় নানাস্থান থেকে কুটম্বসাক্ষাতের আগমন হয়। সচরাচর নারী-কুটুম্বিকাই অধিক। দীনবন্দুবাবুর বাড়ীতে প্রায় ২০/২৫টী কুটুম্বিকা এসেছিলেন, পুর্ণিমার পূর্ব্বেই কতকগুলি বিদায় হয়ে গিয়েছেন, কতকগুলি আছেন, শ্যামাপূজার পর শুক্লপক্ষে বিদায় হবেন, এইরূপ অবধারিত। কুটম্বিকাগণের মধ্যে একটী আমাদের বড়বধূঠাকুরাণীর কনিষ্ঠা ভগিনী। সৰ্ব্বদা আমি বাড়ীর ভিতর যাওয়া-আসা করি, পরিবারেরা আমারে দেখে লজ্জা করেন না, নবাগতা কুটুম্বিকারাও অনাবৃতবদনে আমার সাক্ষাতে দেখা দিতেন, আমার মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখতেন, আবশ্যক হোলে দুটী একটী কথাও বোলতেন; আবশ্যক হোলে আমিও তাঁদের দুই একজনকে দুটী একটা কথা জিজ্ঞাসা কোত্তেম। যাঁরা চোলে গিয়েছেন, তাঁদের তো কথাই নাই, যাঁরা আছেন, তাঁদের সঙ্গে আমার সেইরকম ভাব। যিনি আমাদের গৃহলক্ষ্মীর সহোদরা, কি জানি কেমন ঘটনা, সেইটীর সঙ্গে আমার কিছু বেশী ঘনিষ্ঠতা। সেটা দেখতে দিব্য সুন্দরী, বর্ণ যেন দুধে আলতা মাখা, মুখখানি যেন পদ্মফুল, চক্ষুদুটী যেন মৃগচক্ষু, ভ্রূযুগল যেন তুলী দিয়ে আঁকা, নাসিকাটী সরল, ঠোঁট-দুখানি যেন বিম্বফলের মত লাল টুকটুকে, গালদুটী পুরন্ত, কাণদুটী ছোট ছোট, কপালখানিও ছোট, মস্তকের কেশ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, পশ্চাতে গুচ্ছে গুচ্ছে আজানুলম্বিত; সম্মুখের কেশাগ্র ঈষৎ কুঞ্চিত, কর্ণের উভয়পার্শ্বে কুঞ্চিত অলক দোদুল্যমান; বাতাসে উড়ে উড়ে সেই কুঞ্চিত কেশগুলি যখন কপালের উপরে এসে পড়ে, কপালখানি তখন প্রায় দেখা যায় না, সে সময় মুখখানি বড় সুন্দর দেখায়; হস্তপদ মোলায়েম, গঠন অতি সুন্দর, কিঞ্চিৎ দীর্ঘাকার, সদা রঞ্জিতবস্ত্র পরিধান করা অভ্যাস; অঙ্গে বিস্তর অলঙ্কার নাই; নাসাগ্রে একটী বড়মুক্তার নোলক, দুকাণে দুটী দুল, গলায় একছড়া দু-নরকরা চিকণ হার, দুহাতে দু-গাছি বালা, পায়ে পাইজোর;—এই পর্য্যন্ত। কণ্ঠস্বর অতি মধুর, কথা কবার সময় চক্ষের পাতাগুলি যেন নেচে নেচে খেলা করে, বয়স অনুমান পঞ্চদশবর্ষ; নাম কৃষ্ণকামিনী।

    কৃষ্ণকামিনী অবিবাহিতা কুমারী। বাঙালীর ঘরে পঞ্চদশবর্ষীয়া কন্যা অবিবাহিতা থাকে, এটা একটা অসম্ভব কথা; আশ্চর্য্য বোল্লেও বলা যায়। কারণজিজ্ঞাসু হয়ে কারো কাছে সেই কথা আমি বোলবো, কারণটা কি, সেইটী জানবো, একবার এরূপ ইচ্ছা হয়েছিল, সেরূপ জিজ্ঞাসায় যদি কোন দোষ ঘটে, তাই ভেবে সে ইচ্ছাকে আমি দমন কোরে রেখেছিলেম। দৈবাৎ একদিন একটা কাজের জন্য গিন্নীর ঘরে আমি প্রবেশ কোরেছি, সেদিন ভূতচতুর্দ্দশী শ্যামাপূজার পূর্ব্বদিন। গিন্নীর ঘরে তখন তিনটী প্রতিবাসিনী প্রৌঢ়া রমণী উপস্থিত ছিলেন, একধারে কৃষ্ণকামিনীও চুপটী কোরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রতিবাসিনীদের সঙ্গে গিন্নীর তখন কি সব কথাবার্ত্তা হোচ্ছিল, আমি গিয়ে দাঁড়ালেম, কথায় ভঙ্গ দিয়ে গিন্নী আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি হরিদাস? আমারে কি তুমি কিছু বোলতে চাও?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “বোলতে কিছু চাই না, বাবু পাঠিয়ে দিলেন, কোথায় তিনি যাবেন, আসতে রাত হবে, নীলরঙের শালের চাদরখানি—”

    আর আমারে কিছু বোলতে হলো না; ঠাকুরাণী আমার দিকে চেয়ে একটু হেসে স্বভাবসিদ্ধ মিষ্টবচনে বোল্লেন, “আর বুঝি তিনি লোক পেলেন না? সকল কাজেই হরিদাস;—বড় বড় কাজেও হরিদাস, সামান্য সামান্য ছোটকাজেও হরিদাস; আচ্ছা দাঁড়াও, দিচ্চি।”—আমারে দাঁড়াতে বোলে, একজন প্রতিবাসিনীর দিকে ফিরে, তিনি বোলতে লাগলেন, “ও কথা আর কেন জিজ্ঞাসা কর? আরা কুলীনের মেয়ে, কুল কুল কোরেই দেশের লোকেরা সারা হন,—কি অশুভক্ষণেই যে আমাদের দেশে কুল এসে ঢুকেছে, কুলের কর্ত্তারাই তা বোলতে পারেন। ঘর-বর পাওয়া যায় না; এই আমি,—আমার কথাই বলছি, এই আমি এখন একটা সংসার মাথায় কোরে গিন্নীপনা কোত্তে বোসেছি, আমারই বিয়ে হয়েছিল যোল বছর উতরে গেলে; সে হিসাবে কৃষ্ণা তো এখনো ছেলেমানুষ, ষেটের কোলে এই সবে চোন্দ উৎরে পোনেরোতে পা দিয়েছে, কোথায় যে বিধাতা বর গোড়ে রেখেছেন, বিধাতাই জানেন। কুলের দেবতারা স্কুলের মেয়েদের মুখের দিকে তাকান না, পচা-বসা ফসলের দিকেই তাঁদের ষোলআনা নজর। সময়ে বিয়ে হোলে কৃষ্ণা এতদিনে ছেলে কোলে কোরে ঘর আলো কোত্তো। কোথায় যে বর, কবে যে ফুল ফুটবে, প্রজাপতিই তা জানেন!” বোলতে বলতে আমার দিকে চেয়ে বোল্লেন, “দাঁড়াও হরিদাস, আমি আসছি।”

    বোলেই ঠাকুরাণী তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন, ঘরের ভিতরে একটা দরজা খুলে অন্য ঘরে প্রবেশ কোল্লেন। এদিকে আর এক রঙ্গ। দিনের বেলা পদ্মফুল মুদিত হয়ে গেল! দিদির কথাগুলি শুনে শুনে লজ্জাবতী কৃষ্ণকামিনী মুদিতনয়নে অধোমুখী হোলেন, সুন্দর কপোলযুগল সহসা আরক্তবর্ণ ধারণ কোল্লে। কুমারীর সলজ্জ বদনকমলে আমি যেন তখন এক অপরূপ সৌন্দর্য্য দর্শন কোল্লেম। কুলীনের মেয়ের বিবাহের কথাগুলি যাঁরা শুনছিলেন, তাঁরাও কৃষ্ণকামিনীর মুখের দিকে চেয়ে একসঙ্গে একনিশ্বাসে বোলে উঠলেন, “আহা! তা আর হবে না গা, হবেই তো! বয়েস হয়েছে, সব তো বুঝতে পারে, হবেই তো! আহা! বাছার মুখখানি শুকিয়ে গেল! চক্ষুদুটী ছল ছল কোরে এলো! দেখে দেখে আমাদেরই বুক যেন ফেটে যাচ্ছে! কুলীনের কুলের মুখে ছাই!”

    আমি দেখলেম, কৃষ্ণকামিনীর মুখখানি আরক্ত, অবনত; নয়ন নিমীলিত; নারীগণ দেখলেন, কৃষ্ণকামিনীর মুখ শুষ্ক, চক্ষ ছলছল! নারীজাতির এইরূপ রঞ্জিত মিথ্যা কথায় বড় আমোদ। কেবল একস্থানেও নয়, এক বিষয়েও নয়, সকল স্থানে সকল বিষয়েই সমভাব। ঐরূপ রঞ্জিতবাক্যে সহানুভূতি আসে না, ফল বরং বিপরীত দাঁড়ায়, রঞ্জনপ্রিয়া রমণীরা সেটা আসলেই বিবেচনা কোত্তে পারেন না।

    ঠাকুরাণী ফিরে এলেন, রুমালবাঁধা শালের চাদরখানি আমার হাতে দিলেন। কটাক্ষে কৃষ্ণকামিনীর দিকে চাইতে চাইতে ঘর থেকে আমি বেরুলেম; কটাক্ষনিক্ষেপের সময় অনুভব কোল্লেম, কৃষ্ণকামিনীও বক্রনয়নে দুবার আড়ে আড়ে আমার দিকে চাইলেন।

    বেলা প্রায় অবসান। বেশপরিবর্ত্তন কোরে বড়বাবু একটী ভদ্রলোকের সঙ্গে বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলেন। সেইদিন আমি জানতে পাল্লেম, কৃষ্ণকামিনী কি কারণে অত বয়স পর্য্যন্ত অবিবাহিতা। স্ত্রীলোকেরা কৌলীন্যের দোষ দিলেন, আমি তখন কৌলীন্যের ইতিহাস জানতেম না, যথার্থ কৌলীন্যপ্রথা কিরূপ, সে প্রথায় বাস্তবিক দোষ ঘোটতে পারে কি না, বিবাহের যোগ্যবয়সে এ দেশে কন্যাবিবাহে কৌলীন্যপ্রথা বাস্তবিক বাধা দেয় কি না, সে বিচারে আমি এখন অক্ষম। ঘর-বর পাওয়া যায় না, সমস্ত কুলীনের ঘরে যদি এইরূপে গোলযোগ ঘটে, তা হোলে তো কুলীনের মেয়েরা চিরজীবন অনূঢ়া থাকতে পারে, এমন সম্ভাবনা হয়ে দাঁড়ায়, এই বিতর্কটা তখন আমার মনোমধ্যে সমূদিত হলো।

    সে বিতর্ক তখন অনর্থক, সুতরাং অন্যকথা আমার মনে আসতে লাগলো। বাড়ীর মেয়েরা সকলেই আমার সঙ্গে কথা কয়, কুটুম্বিকারাও আমারে দেখে লজ্জা করেন না, সকলের কাছেই আমি সপ্রতিভ; কিন্তু কৃষ্ণকামিনীর চক্ষু সর্ব্বক্ষণ যেন আমার দিকে ঘোরে। সৰ্ব্বক্ষণ আমি অন্তঃপুরে থাকি না; যতক্ষণ থাকি, যতক্ষণ দেখাশুনা হয়, ততক্ষণকেই আমি সৰ্ব্বক্ষণ বোলছি। কৃষ্ণকামিনীতে কেমন একরকম যেন নূতনভাব! কৃষ্ণকামিনী লজ্জাশীলা, আমার সঙ্গে যখন দেখা হয়, কথা হয়, তখনো লজ্জা থাকে। লজ্জাশীলা কামিনীদের লজ্জাপ্রকাশের সময় মুখমণ্ডল ঈষৎ আরক্ত হয়, যাদের সঙ্গে লজ্জার সম্পর্ক, হঠাৎ তাঁদের সঙ্গে দেখা হোলে লজ্জাবতীরা ঘোমটা দিয়ে মুখ ঢাকেন, ঘোমটা দিবার অগ্রে শীঘ্র শীঘ্র চক্ষের পাতা দিয়ে চক্ষুদুটী ঢেকে ফেলেন, এই তো লজ্জার লক্ষণ। কৃষ্ণকামিনীর সে প্রকার লজ্জা নয়; আমারে দেখে লজ্জা করবার সম্পর্কও নয়; তাঁর দিদিকে আমি মা বলি; সে সম্পর্কে কৃষ্ণকামিনী আমার মাসী হন; লজ্জা অনাবশ্যক; তথাপি একটু একটু লজ্জা দেখা যায়। কৃষ্ণকামিনী যখন আমার সঙ্গে কথা কন, অধরে তখন অল্প অল্প হাসি থাকে, কিন্তু দৃষ্টি থাকে নীচদিকে; সরাসর আমার মুখের দিকে চক্ষু থাকে না; এই এক প্রকার লজ্জা। আবার দেখি, আমি যখন অন্যদিকে চাই, কৃষ্ণকামিনী তখন সেই বিশালনেত্র বিস্ফারিত কোরে আমার দিকে চেয়ে থাকেন। আড়ে আড়ে সেই ভাবটী আমি দেখতে পাই, জানতেও পারি, অল্প অল্প বুঝতেও পারি। কটাক্ষসন্ধানে কুমারী কৃষ্ণকামিনী একেবারেই অনভ্যস্ত, এমনটীও বোধ হয় না; মাঝে মাঝে এক একবার সেই সুন্দর নয়নে বক্রকটাক্ষও আমি দর্শন করি। কেন তেমন ভাব, ঠিক ঠিক স্থির কোত্তে না পেরে আমারই বরং লজ্জা আসে। আশ্বিন কার্ত্তিক দু-মাস আমি কৃষ্ণকামিনীকে দেখছি, পূজার পূর্ব্বেও দেখেছি, পূজার পরেও প্রায় মাসাবধি দেখে দেখে আসছি; পূৰ্ব্বাপেক্ষা ক্রমশই যেন সে নয়নের বেশী আকর্ষণ অনুভব হোচ্ছে। ভাবটা বড় ভাল নয়; ইদানীং ঐ ভাব দেখে দেখে দিন দিন আমি সতর্ক হোতে শিক্ষা কোচ্ছি;— তফাৎ তফাৎ থাকাই ভাল, মনে মনে এইরূপ সিদ্ধান্ত কোচ্ছি। নিতান্ত আবশ্যক না হোলে কৃষ্ণকামিনীর কাছে আমি যাই না। কৃষ্ণকামিনী যখন একাকিনী থাকেন, তখন আমি সেখানে যেতে সঙ্কুচিত হই, তথাপি অদুরে আমারে দেখলেই কিঞ্চিৎ অধোবদনে, ঈষৎসলজ্জ নয়নে, শান্ত মৃদুগতিতে কৃষ্ণকামিনী আমার কাছে এগিয়ে এগিয়ে আসেন, আমারে একটু অন্যমনস্ক দেখলেই অলক্ষিতে কটাক্ষপাত করেন, বিশেষ কোন কাজের কথা না থাকলেও সুমিষ্টস্বরে দুটী একটী কথা কন, আমার মুখের কোন প্রকার নূতনকথা শুনলেই, হাসির কথা না হলেও, ঈষৎ অবনতমস্তকে মৃদু মৃদু হাস্য করেন। দেখায় ভাল, কিন্তু আমার মনে কেমন একরকম সন্দেহ আসে, অঙ্গ যেন শিউরে শিউরে উঠে; ইচ্ছা কোরেই সেখান থেকে আমি সোরে যাই।

    পূর্ব্বে বোলেছি, অজি ভূতচতুর্দ্দশী। আগামী কল্য শ্যামাপূজা। দীনবন্ধুবাবুর বাড়ীতে শ্যামাপূজা হয় না, ব্রহ্মময়ীর মন্দিরেই মহোৎসব হয়। ব্রহ্মময়ীপ্রতিমা প্রস্তরময়ী চতুর্ভুজা কালীমূর্ত্তি; স্বতন্ত্র মৃন্ময়ীমূর্ত্তি নির্ম্মাণ করা হয় না, ব্রহ্মময়ীর নিকটেই পূজা, হোম, বলিদান, ভোগ প্রভৃতি কালীপূজার সমস্ত অঙ্গ সংসাধিত হয়ে থাকে। চতুর্দ্দশীর রজনীপ্রভাতে ব্রহ্মময়ীর মন্দিরে অনেক লোক সমবেত, সকলেই পূজার আয়োজনে ব্যস্ত।

    মন্দিরের দুই ধারে সারিবন্দী অনেকগুলি ঘর, বাড়ীর স্ত্রীলোকেরা, প্রতিবাসিনী স্ত্রীলোকেরা বিশেষ বিশেষ উৎসবে সেই সকল ঘরে উপস্থিত থাকেন। ঐ দিন অপরাহ্ণসময়ে তাঁরা সকলেই সেখানে একত্র হয়েছেন। পূজার আয়োজনে, নৈবেদ্যের আয়োজনে, ভোগের আয়োজনে দিনমান কেটে গেল, সন্ধ্যাকালে সহস্র সহস্র দীপমালায় সমস্ত উদ্যান সমুজ্জ্বল করা হলো। দেবীর মন্দির, বাবুদের বৈঠকখানা, অবরোধবাসিনীদের গৃহশ্রেণী, উজ্জ্বল আলোকপ্রভায় সমস্তই যেন রত্নখচিত-স্বর্ণমণ্ডিত দেখাতে লাগলো। বৃক্ষে বৃক্ষেও দীপমালা। অমাবস্যা-রজনী; জোনাকী-পোকার আধিপত্য, অসংখ্য দীপপ্রভায় একটীও জোনাকী তখন দেখা গেল না, বোধ হলো, যেন দীপমালার কাছে পরাস্ত হবার ভয়ে জোনাকীপোকারা তখন সেই বাগান ছেড়ে পালিয়ে গেল।

    বাগানে দীপমালা, দেবালয়ে দীপমালা, গ্রামের গৃহস্থালয়ে দীপমালা, মাথার উপর অনন্তনীলাম্বরে অনন্ত দীপমালা; শোভা অপরূপ!

    বাবুদের সঙ্গে আমিও দেবালয়ে গিয়েছি, স্ত্রীলোকেরাও গিয়েছেন, দাসীচাকরেরাও গিয়েছে, ক্রমে ক্রমে একে একে নিমন্ত্রিত লোকেরাও দেখা দিচ্ছেন। ঢোল, ঢক্কা, জগঝম্প, সানাই প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের বিমিশ্রধ্বনিতে দেবালয় প্রতিধ্বনি হোচ্ছে, মহা সমারোহ ব্যাপার। রাত্রি দশদণ্ড। গুরু-পুরোহিতেরা দেবীপ্রতিমার সম্মুখভাগে বিচিত্র বিচিত্র আসনে উপবিষ্ট হয়ে, তান্ত্রিকমন্ত্রে সঙ্কল্প কোরে, পূজায় বোসলেন; এই সময় আর একবার ঘোরনিনাদে বাদ্যযন্ত্রগুলি বেজে উঠলো, সঙ্গে সঙ্গে শঙ্খধনি হোতে লাগলো।

    দশজনের সঙ্গে আলোকমালার শোভা দেখে দেখে উদ্যানের চারিধারে আমি ভ্রমণ কোচ্ছিলেম, প্রকৃতির শোভা অপেক্ষা তখনকার কৃত্রিম শোভা অনেক লোকের চক্ষে মনোমোহিনী বোধ হোচ্ছিল, অকস্মাৎ একটা হাওয়া উঠে উদ্যানের সমস্ত প্রদীপ্ত দীপমালা নির্ব্বাপিত কোরে দিলে! তাদৃশ শোভাময় উদ্যান অকস্মাৎ ঘোর অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন! সেই অন্ধকারে আকাশপানে আমি চেয়ে দেখলেম, অকস্মাৎ উৎফুল্ল মানসে মহাতঙ্কের সঞ্চার। অহো! কোথায় সেই নীলাম্বর? নক্ষত্ৰভূষিত সন্ধ্যাকালের সেই নির্ম্মল নীলাকাশ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ ঘনঘটায় অন্ধকার,—নিবিড় অন্ধকার! সন্ধ্যাকালের সেই উজ্জ্বল নক্ষত্রমালা সেই নিবিড় অন্ধকারের অন্ধকারগুহায় লুক্কায়িত। মেঘাবৃত অন্ধকার আকাশে ঘন ঘন চঞ্চলা চপলার বিচিত্র খেলা! হাস্যমুখী প্রকৃতিদেবীর বিভীষণ মূর্ত্তি! দুর্জ্জয় বাতাসে উদ্যানের বড় বড় বৃক্ষেরা যেন মাতালের মত মাথা ঘুরিয়ে টোলতে টোলতে বিপর্য্যস্ত হয়ে গেল! গাছের উপর গাছ, ছাদের উপর গাছ, মন্দিরের উপর গাছ, ভয়ঙ্কর দুর্যোগ! লোকেরা কোলাহলশব্দে চীৎকার কোরে অন্ধকারে ইতস্ততঃ ধাবিত হোতে লাগলো! ভয়ানক ঝড়! একটু পরেই মুষলধারে বৃষ্টি! যাঁরা ঘরের ভিতর ছিলেন, ভয়ঙ্কর ঝড়বৃষ্টিতে তাঁরাও অঙ্গকম্পনে জড়সড় হয়ে আর্ত্তস্বরে চীৎকার কোত্তে লাগলেন। সকলের মুখেই দুর্গতিনাশিনী দুর্গানাম। পুরোহিতেরা কম্পিতহস্তে পৈতা জোড়িয়ে ঘন ঘন দূর্গানামজপে প্রবৃত্ত হোলেন। হুলস্থূল ব্যাপার!

    “মনি-অমাবস্যা!”—বঙ্গের ইতরশ্রেণীর লোকেরা শ্যামাপূজার অমাবস্যাকে মনি-অমাবস্যা বলে। সেই সকল লোক উন্মত্তের ন্যায় ছুটতে ছুটতে বোলতে লাগলো, “মনি-অমাবস্যার রাত্রে খণ্ডপ্রলয় হয়, আজ তাই হবে! আজ আর কারো নিস্তার নাই! পালা—পালা—পালা!”—সকলেই পলায়নতৎপর। পালিয়েই বা যায় কোথায়? দেবালয়ের মধ্যে যতগুলি ঘর, সবগুলিই জনপূর্ণ, ভোগের ঘরে সকল লোক প্রবেশ কোত্তে পারে না, ক্রমশই ঝড়বৃষ্টির বেগবৃদ্ধি, প্রকৃতির মহাকোপ, বাহিরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে কোপের বেগ সহ্য করা অতি বলবান পুরুষেরও অসাধ্য; যায় কোথা? বাগানে বাগানেই আরো ঝড়ের দৌরাত্ম্য বেশী। মড়মড় শব্দে ডাল ভেঙে পোড়ছে, গাছের গায়ে গাছ ভেঙে পোড়ছে, গাছে গাছে ডালে ডালে পাতায় পাতায় পথ দুর্গম হয়ে আছে, পথের উপর এক হাঁটু জল দাঁড়িয়ে গিয়েছে, লোকেরা সব যায় কোথায়? ঠিক নাই, তথাপি অনেক লোক ছুটে ছুটে পালাচ্ছে। হুড়াহুড়িতে অন্ধকারে কে কার গায়ে পোড়ছে, কে কারে মাড়িয়ে যাচ্ছে, কে কোথায় আছাড় খাচ্ছে, কেহই কিছু দেখছে না। গাছে গাছে কারো কারো মাথা ঠুকে যাচ্ছে, কেহই ভ্রুক্ষেপ কোচ্ছে না, প্রাণ হাতে কোরে সকলেই ছুটেছে! ভোলা পথে আরো বেশী বিপদ, বেশী ভয়, সেটা যেন তারা ভুলে ভুলে যাচ্ছে। অনেক লোক পালালো, ভিড় অনেকটা পাতলা হয়ে এলো; দীনবন্ধবাবুর গুরুবল, বাগান থেকে যারা পালালো, ঝড়ে তাদের কারো প্রাণহানি হলো না।

    ঝাড়া দুই ঘণ্টা ঝড়-বৃষ্টি! রাত্রি দুইপ্রহর অতীত। ক্রমে ক্রমে ঝড়ের বেগ মন্দীভূত, বৃষ্টিও কম হয়ে এলো। রাত্রি দশ দণ্ডের পর পূজা আরম্ভ হয়েছিল, রাত্রি আড়াই প্রহরের পর সাঙ্গ। তিনপ্রহরের সময় ভোগ। যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, শেষরাত্রে তাঁরা কিছু কিছু প্রসাদ পেলেন। সকলেই বাবুর বাড়ীর পাল্কী-বেহারা উপস্থিত হলো, প্রায় ঊষাকালে নারীবর্গ সঙ্গে নিয়ে আমরা বাড়ীতে ফিরে এলেম।

    এইখানে আমার একটা কথা বলা আবশ্যক। না বোল্লেও চোলতো, কিন্তু অদৃষ্ট ঘটনার সামঞ্জস্য রাখবার জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও বোলতে হলো। প্রকৃতির যখন মহাকোপ, ঝড়-বৃষ্টির যখন নবযৌবন, সেই সময় ভোগঘরের পাশের একটী ছোটঘরে আমি আশ্রয় নিয়েছিলেম। সে ঘরের সঙ্গে ভোগঘরের কোন সংশ্রব ছিল না; ঘরের একটীমাত্র দ্বার, সেই দ্বারটী ভিন্ন কোনদিকে একটীও গবাক্ষ অথবা ছিদ্র ছিল না। দ্বারে শিকল দেওয়া ছিল, ধীরে ধীরে শিকল খুলে সেই ঘরে আমি প্রবেশ করি। খুব জোর জোর দমকা, ঘরে প্রবেশ কোরেই ভিতরদিকে আমি অর্গল বন্ধ কোরে দিই। একটী কুলঙ্গীতে ছোট একটী লণ্ঠনে মোমবাতী জ্বলছিল, কিন্তু মানুষ ছিল না। আলোটী তবে কেন ছিল, তা তখন আমি জানতে পাল্লেম না; দেয়ালে ঠেস দিয়ে একধারে আমি বোসে থাকলেম। সে রকম ঘরে ঝড়বৃষ্টির শব্দ কিছু কম শুনা যায়, বাহিরে পবনের সঙ্গে প্রকৃতির কি রকম যুদ্ধ হচ্ছিল, সেখান থেকে তা আমি দেখতে পেলেম না, বড় একটা জানতেও পাল্লেম না।

    চুপটী কোরে বসে আছি, এমন সময়ে কে একজন এসে দরজার কপাটের বাহিরের দিকে ধীরে ধীরে ঠক ঠক কোরে দুই তিনবার টোকা মাল্লে। আমি সাড়া দিলেম না; মনে কোল্লেম, কে? এই দুর্যোগের সময় এমন নির্জ্জন ঘরের দিকে কে আসবে? কি কোত্তেই বা আসবে? চপ কোরে থাকলেম। আবার টোকা;—সেইরকম সতর্ক-হস্তে ধীরে ধীরে তিনবার টোকা। তথাপি আমি সাড়া দিলেম না। তৃতীয়বার সেইরকম শব্দ। তখন আমি ভাবলেম, যে-ই হোক, ঐ লোক হয় তো ইতিপূর্ব্বে এই ঘরে ছিল, আলো রেখে গিয়েছে, দ্বারে শিকল লাগিয়ে আর কোথাও গিয়েছিল, এখন ফিরে এসেছে; শিকল খোলা, ভিতর বন্ধ, তাই দেখে অবশ্যই ভেবেছে, ভিতরে কেহ আছে। ভোগঘরের সামিলঘর, স্ত্রীলোক ভিন্ন আর কেহ এ ঘরে আসবে, সেটা অসম্ভব, তাই ভেবেই বার বার টোকা দিলে। ভাবতে ভাবতে আমি উঠে দাঁড়ালেম, কপাটের কাছে গিয়ে চুপ কোরে কাণ পেতে থাকলেম; তখন আর ঢোকার আওয়াজ পেলেম না, একটু পরেই আবার টোকা। তখনি আমি ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “কে?”

    অতি কোমলকণ্ঠে ধীরে ধীরে উত্তর হলো, “খুলে দাও; আমি।”

    স্বরে বুঝলেম, বামাস্বর। বাড়ীর কোন স্ত্রীলোক ভিন্ন আর কেহ এখানে আসবে, এমন ভরসা হবে; নিশ্চয়ই বাড়ীর লোক; তা না হোলে অত চুপি চুপি কথা কবে কেন? মনে এইরূপ স্থির কোরে আস্তে আস্তে দ্বার উদ্ঘাটন কোল্লেম। একটী অবগুণ্ঠনবতী বালিকা। প্রবেশ কোল্লেন;—প্রবেশ কোরেই তৎক্ষণাৎ চঞ্চল-হস্তে দরজাটা বন্ধ কোরে দিলেন। কে এই অবগুণ্ঠনবতী?—প্রথমে বুঝতে পাল্লেম না। চঞ্চল-হস্তে অবগুণ্ঠন উন্মোচন কোরে, একটু হেসে, কোমল মৃদুস্বরে বালিকা বোল্লেন, “হরিদাস! ভারী ঝড়! তুমি এই ঘরে এসেচো, আমি দেখতে পেয়েছিলেম।”

    কথা শুনে, মুখপানে চেয়ে, আমি শিউরে উঠলেম, নির্জ্জন ঘরে আমার চক্ষের সম্মুখে কৃষ্ণকামিনী! ক্ষণকাল আমি কথা কোইতে পাল্লেম না; মনে কোল্লেম, দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ি। মনে কোরেই দরজার দিকে অগ্রসর হোচ্ছি, আবার একটু হেসে কৃষ্ণকামিনী আমার একটী হাত ধোরে ফেল্লেন; সেইরুপ কোমলস্বরে চুপি চুপি বোল্লেন, “কি কর হরিদাস? কোথা যাও? ভয় পাচ্চো নাকি? ভয় তো বাহিরে, ঘরের ভিতর ভয় কি? বোসো!” দুজনে রয়েচি, কিসের ভয়?—বোসো।”

    বালিকার করস্পর্শে আমার সৰ্ব্বশরীর কাঁপছিল, হাত ছাড়িয়ে যদি পালাই, দোষের কথা হবে; এই ভেবে কাঁপতে কাঁপতে পূর্ব্ববৎ দেয়ালের ধারে আমি বোসে পোড়লেম; কৃষ্ণকামিনীও হাসতে হাসতে ঠিক সেইখানে এসে আমার গা ঘেঁসে বোসলেন। সঙ্কুচিত হয়ে আমি একটু সোরে বোসলেম। আবার একটু হেসে আমার মুখের দিকে একটু ঝুকে কুমারী বোল্লেন, “শীত পোড়েছে হরিদাস, বারান্দায় খুব শীত; তাই জন্যে আমি সৰ্ব্বাঙ্গে কাপড় জড়িয়ে ঘোমটা দিয়ে এসেছিলেম।”

    আমি নিরুত্তর। আবার একটু সোরে এসে, যেন একটু ভয়ে ভয়ে কুমারী বোল্লেন, “বাপ রে, কি দুষণ! ঝাপটায় ঝাপটায় কাঁপুনি ধোরেছিল! এখনো শীত কোচ্চে। এই দেখ না আমার গায়ে হাত দিয়ে, এখনো আমি কাঁপচি!”

    আবার একটু তফাতে আমি সোরে বোসলেম। কুমারীও আবার আমার কাছে সোরে এলেন। আমি যতই সোরে সোরে যাই, কৃষ্ণকামিনী ততই এগিয়ে এগিয়ে আসেন। বড় বিপাকেই ঠেকলেম। একবার আলোর দিকে চেয়ে, আমার মুখের দিকে ফিরে, যেন একটু চমকিতভাবে কুমারী বোল্লেন, “আচ্ছা হরিদাস, তুমি তখন সেখান থেকে পালিয়ে এলে কেন? বলিদানের উয্যুগ হোচ্ছিল, আমরা মন্দিরের ভিতর দাঁড়িয়ে ছিলেম, তুমি এইদিকে ছুটে পালিয়ে এলে, আমি বেশ দেখতে পেলেম। তেমন কোরে পালালে কেন?”

    আমি।—বলিদান আমি দেখতে পারি না; ভয়ও হয়, মায়াও হয়।

    কৃষ্ণ।—আমারো হয়। সকলে সেখানে ছিলেন, সেই জন্যই ছিলেম, কিন্তু সে দিকে চাইতে পারিনি, ঠাকুরের দিকেই চেয়ে ছিলেম। হাঁ, ভাল কথা। তুমি কি রোজ রোজ সন্ধ্যাকালে এখানে আরতি দেখতে আসো?

    আমি।—রোজ পারি না, কাজের ঝঞ্চাটে এক এক দিন ফাঁক যায়।

    কৃষ্ণ।—আমি রোজ আসি। যে দিন আমি এসেছি, তার পরদিন থেকে রোজ রোজ আমি দিদির সঙ্গে এসে আরতি দেখে যাই; কেবল চারটী দিন আসা হয় নাই;—পূজার তিন দিন আর বিজয়ার দিন। আরতির সময় মহামায়ার প্রতিমাখানি যেন সজীব সজীব দেখায়, সত্য সত্যই মা যেন জিভ বার কোরে হাসেন। এখন অবধি তুমি রোজ রোজ এসো, বেশ হবে,—দুজনে এখানে আরতি দেখবো, গল্প কোরবো, এক জায়গায় দেখা-শুনা হবে, বেশ থাকবো; রোজ রোজ তুমি এসো।

    আমি।—এখানে না এলে কি তোমার সঙ্গে আমার দেখা-শুনা হয় না? বাড়ীতে কি আমার সঙ্গে তোমার কথাবার্ত্তা চলে না?

    কৃষ্ণ।—তা চোলবে না কেন? সে কথা বোলচি না; দুটীতে নির্জ্জনে মনের কথা বলাবলি করাতে যতটা আমোদ হয়, বাড়ীর ভিতর পাঁচজনের সামনে ততটা হয় না; মনের সকল কথা খুলে বলা যায় না; কেমন বাধো বাধো ঠেকে, লজ্জা করে।

    আমি।— লজ্জা করাই তো ভাল, লজ্জা তোমাদের নারী-জাতির ভূষণ।

    কৃষ্ণ।—(কিয়ৎক্ষণ মৌন থাকিয়া) আচ্ছা হরিদাস! একটী কথা তোমারে জিজ্ঞাসা করি, ঠিক বোলো; মা কালী সাক্ষী,—তুমি কি আমারে ভালবাস?

    আমি।—তা কি তুমি বুঝতে পার না? তোমারে দেখে অবধি, তোমার মধুর মধুর কথাগুলি শুনে অবধি, তোমার সঙ্গে কথা কোইতে আমি ভালবাসি, তোমারে দেখতে আমি ভালবাসি, তা কি তুমি বুঝতে পার না?

    কৃষ্ণ।—বুঝতে আমি সব পারি।

    আমি।—তবে জিজ্ঞাসা কোচ্ছো কেন?

    কৃষ্ণ।—মানে আছে। ভালবাসা অনেক রকম। আমি তোমারে যেমন ভালবাসি, তুমি আমারে সেইরকম ভালবাস কি না, তোমার মুখে সেইটকু আমি শুনতে চাই।

    আমি।—ভালবাসার আবার রকম কি?—এ রকম, ও রকম, সে রকম, অত শত আমি বুঝি না, ভালবাসার বস্তু দেখলেই ভালবাসতে হয়, সোজাসুজি এই তো আমি বুঝি, তার ভিতরে আবার রকম-সকম কি?

    কৃষ্ণ।—(মৃদু হাস্য করিয়া) ঐ কথাই তো কথা! আচ্ছা, রোজ রোজ সন্ধ্যাকালে তুমি এইখানে এসো, আমি তোমারে বুঝিয়ে দিব।

    আমি।—আচ্ছা কৃষ্ণ, এ গ্রামে তুমি আর কতদিন থাকবে?

    কৃষ্ণ।—দিদি যত দিন থাকতে বোলবেন, বাবু যত দিন যেতে না দিবেন, ততদিন আমি থাকবো। আমার এক পিসী এসেচেন, তিনি বলেন, রাসপূর্ণিমার মধ্যেই আমারে নিয়ে যাবেন, আমি কিন্তু যাবো না। এখানে শ্রীপঞ্চমীতে খুব ঘটা হয়, এইখানেই আমি সরস্বতীপূজা দেখবো।

    আমি।—(সচকিতে) ঝড়বৃষ্টি হয় তো থেমে গিয়েছে, লোকেরা সব গোলমাল কোচ্ছে; চল আমরা মন্দিরে যাই। আগে তুমি যাও, একটু পরেই আমি যাচ্ছি; দুজনে একসঙ্গে গেলে অন্যলোকে অন্য কিছু সন্দেহ কোত্তে পারে।

    কৃষ্ণ।—তা আর কোত্তে হয় না! আমি তো অনেকক্ষণ একাকিনী এই ঘরেই ছিলেম, বাড়ীর মেয়েরা সকলেই তা জানেন। তোমার সঙ্গে যদি আমি বেরিয়ে যাই, কে কি মনে কোরবে?—কে কি মন্দ ভাববে? দরজাটা একটু খুলে আগে একবার দেখ, দুয্যুগটা থেমেছে কি না; যদি থেমে থাকে, একসঙ্গেই দুজনে যাবো।

    আমি উঠলেম; ধীরে ধীরে দরজা খুলে দেখলেম, প্রকৃতি অনেকপরিমাণে শান্ত; ঝড়েরও তত বেগ নাই, বৃষ্টির তত জোর নাই; হস্তসঙ্কেতে কৃষ্ণকামিনীকে ডাকলেম। বাহিরের লোকেরা গোলমাল কোরে গৃহগমনের উপক্ৰম কোচ্ছিলেন, অগ্রেই আমি চৌকাঠের বাহিরে পদার্পণ কোল্লেম। শশব্যন্তে আমার একখানি হাত ধরে, আমার মুখের কাছে মুখ এনে সেই সময় কৃষ্ণ কামিনী আমার কাণে কাণে বোল্লেন, “দেখো, ভুলো না, মাথা খাও, রোজ রোজ, কাল সন্ধ্যাবেলা—”

    শেষের কথা আর আমি শুনলেম না, দ্রুতপদে মন্দিরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেম। কৃষ্ণকামিনী গজগামিনী হয়ে ভোগঘরে প্রবেশ কোল্লেন। যে প্রকারে এই অভিনয়ের উপসংহার হলো, পাঠকমহাশয়কে পূর্ব্বেই সেটা বিজ্ঞাপন করা হয়েছে।

    আমরা বাড়ী এলেম। রাত্রি ছিল না, শয্যার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা নিষ্প্রয়োজন বোধ হলো; ভাগীরথীসলিলে প্রাতঃস্নান সমাধা কোরে, সকলেই স্ব স্ব কার্য্যে ব্যাপত হোলেন; এই দিন প্রতিপদ। গ্রামের অনেক বাড়ীতে মৃন্ময়ী কালীপ্রতিমার পূজা হয়েছিল, বৈকালে সেই প্রতিমাগুলির বিসৰ্জ্জন। ব্রহ্মময়ীর বিসর্জ্জন নাই, আমরা নিশ্চিন্ত। পরদিন ভ্রাতৃদ্বিতীয়া। পূর্ব্বে বলা হয় নাই, বাবুদের একটী ভগ্নী আছেন, বৎসরের দশমাস তিনি শ্বশুরালয়েই থাকেন, পুজোর পূর্ব্বে পিত্রালয়ে আসেন, ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার পরেই চোলে যান। এ বৎসরেও তিনি এসেছেন, পঞ্জিকার নির্দ্দিষ্ট শুভক্ষণে ভাই-দুটীর কপালে তিলকদান কোরে গণ্ডুষমন্ত্রে তিনি গণ্ডুষ দিলেন। বড়বাবু প্রথামত আশীর্ব্বাদ কোল্লেন, ছোটবাবু তাঁর চরণবন্দনা কোরে দস্তুরমত প্রণামী দিলেন। এই উপলক্ষে বাড়ীতে সেদিন দ্বাদশটী ব্রাহ্মণ, দ্বাদশটী সধবা আর দশটী কুমারীকে ভোজন করানো হলো। বলা বাহুল্য, সেই ভগ্নীটী বড়বাবুর অনুজা, ছোটবাবুর অগ্রজা।

    প্রতিপদ, দ্বিতীয়া, দুইদিন দুইরাত্রি অতিবাহিত হয়ে গেল। ব্রহ্মময়ীর মন্দিরে এ দুদিন আমি আরতি দেখতে গেলেম না। অঙ্গীকার করি নাই, সুতরাং কৃষ্ণকামিনীর অনুরোধ রক্ষা হলো না বোলে অনুতাপ এলো না। তৃতীয়ার দিন বৈকালে বাবুদের ভগ্নীর শয়নকক্ষে কৃষ্ণকামিনীর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ। ভগ্নীর দুটী পুত্ত্র, একটী কন্যা। জ্যেষ্ঠ পুত্রটী বয়ঃপ্রাপ্ত, সেটী সঙ্গে আসে নাই; কনিষ্ঠ পুত্রটী পঞ্চমবর্ষীয়; সে একখানি ছবি কোলে কোরে ছবির মুখে চুমো খাচ্ছিল আর ছবির সঙ্গে কথা কোচ্ছিল। কন্যাটী খুব ছোট, ঠোঁটের উপর-নীচে পাঁচটী দাঁত উঠেছে, সেই দাঁতগুলি দেখিয়ে হেসে “হাঁটি হাঁটি পা পা” করে, আধো আধো কথা কয়, নিরবলম্বনে সোজা হয়ে বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। কৃষ্ণকামিনী তখন সেই মেয়েটীকে কাছে কোরে নিয়ে, হেসে হেসে খেলা দিচ্ছিলেন, আমারে সেইখানে দেখেই সেই হাসি-মুখখানি হঠাৎ ম্লান হয়ে গেল; একবারমাত্র আমার মুখের দিকে চেয়েই ম্লানমুখী বালিকা তৎক্ষণাৎ অধোমুখী হোলেন; বাষ্পবেগে চক্ষুদুটী ছল ছল কোরে এলো। দেখে আমার কিছু কষ্ট হলো। ছোটমেয়েটীর মা তখন সে ঘরে ছিলেন না, তাঁর কাছে আমার দরকার ছিল, ইচ্ছা হোলে কৃষ্ণকামিনীর সঙ্গে দুটী একটী কথা কোইতে পাত্তেম, কিন্তু পাল্লেম না;—নীরবেই প্রবেশ কোরেছিলেম, নীরবেই বেরিয়ে এলেম।

    মন কেমন চঞ্চল। কেন এমন চঞ্চল হয়?—কৃষ্ণকামিনীর জন্য?—না, কৃষ্ণকামিনীর জন্য আমার চাঞ্চল্যের বিশেষ কারণ কিছুই ছিল না। তবে কেন?—কৃষ্ণকামিনীর অনুরোধবাক্য রক্ষা কোত্তে পারি নাই, সেইজন্যই কি চাঞ্চল্য? না, সেজন্যও নয়। তবে কি?—আমারে দেখে কৃষ্ণকামিনীর ফুল্ল-মুখখানি ম্লান হলো, পদ্মনেত্ৰ-দুটী বাষ্পপূর্ণ হয়ে এলো, সেইজন্যই আমার চাঞ্চল্য। দুদিন সন্ধ্যাকালে আমি দেবালয়ে যাই নাই, গেলেই কৃষ্ণকামিনীর সঙ্গে দেখা হোতো, তুষ্ট হোতেন;—আমি যাই নাই, কৃষ্ণকামিনীর অভিমান। পূর্ণ চতুর্দ্দশবর্ষীয়া বালিকা, বালিকা-স্বভাবে এরপ অভিমান আসতেই পারে। মনে মনে সঙ্কল্প কোল্লেম, বালিকার সে অভিমান স্থায়ী হোতে দেওয়া ভাল নয়। দোষ কি?—আমার মনে তো কোন প্রকার পাপপ্রবৃত্তি আসছে না,— বাড়ীতে দেখা-শুনা হয়, কথাবার্ত্তা হয়, সকলেই দেখেন, সকলেই শুনেন, কারো মনে মন্দ সন্দেহ আসে না, দোষ কি?—দেবালয়ে দেখা-সাক্ষাতে দোষ কি? অবিবাহিতা নিৰ্ম্মলা বালিকা, মনের ভিতর কোন প্রকার মন্দ মতলব থাকা এ বয়সের ধর্ম্ম নয়। দেবতার মন্দিরে দেখা দিলে বালিকাটী যদি তুষ্ট থাকে, তাতে আমি কেনই বা কৃপণ হই? অকারণে অমন সরলা বালিকার মনে ব্যথা দেওয়াতে বরং পাপ আছে। না, কৃষ্ণকামিনীর প্রাণে আমি ব্যথা দিব না; আজ সন্ধ্যাকালে আমি ব্রহ্মময়ীদেবীর আরতি দেখতে যাব, কৃষ্ণকামিনীর অভিমানটী ঘুচে যায় কি না, দেখবো; যদি কিছু, বদ-মতলবের আভাষ পাই, তৎক্ষণাৎ সোরে দাঁড়াবো। যাওয়াটা আজ অবশ্যই কর্ত্তব্য।

    এই আমার তখনকার সঙ্কল্প। দিবাকর অস্তাচলে গেলেন, আকাশে একটী নক্ষত্র দেখা দিল, নক্ষত্রের মাথার উপর তৃতীয়ার তৃতীয়কলা ক্ষুদ্রচন্দ্রমা বক্রাবয়বে উদিত হোলেন, দুর্গানাম স্মরণ কোরে আমি আরতি-দর্শনবাসনায় ব্রহ্মময়ীর মন্দিরে চোল্লেম।

    অমাবস্যা-রজনীর মহা ঝটিকার উপদ্রবচিহ্ন উদ্যানভূমিতে—উদ্যানপন্থায় কিছুই দেখলেম না, কিন্তু উদ্যানটী শ্রীশূন্য হয়ে গিয়েছে;—বড় বড় প্রাচীন বৃক্ষেরা শাখাপত্ৰ পরিশুন্য হয়ে শুককাষ্ঠের ন্যায় স্তম্ভকারে দাঁড়িয়ে আছে, ফুলগাছগুলি ভগ্নশাখ হয়ে কুসুমসজ্জাহারা হয়েছে, পতিত বৃক্ষপত্রে সরোবরের জল প্রায় ঢাকা পোড়ে গিয়েছে, মন্দিরের চূড়ার প্রতিষ্ঠিত চক্ৰফলকটী স্থানচ্যুত হয়ে পোড়েছে। শ্রীহীনতার এই সকল চিহ্ন-দর্শনে ঝড়ের নামেও আমি নমস্কার কোল্লেম। কত লোকের ঘর-বাড়ী পোড়ে গিয়েছে, কত লোকের বাগান বৃক্ষশূন্য হয়েছে, রাত্রিকালের ঝড়, কত গরিবলোক নিদ্রিতাবস্থায় ঘরচাপা পোড়ে প্রাণ হারিয়েছে, কত গৃহপালিত অবলাজীব বন্ধনাবস্থায় মারা গিয়েছে, দেবালয়ে দাঁড়িয়ে সেই সব চিন্তা কোরে ঝড়ের নামে আমি নমস্কার কোল্লেম; যে সকল পণ্ডিত প্রকৃতিজ্ঞানপ্রভাবে ঝটিকার মঙ্গলফল কীৰ্ত্তন করেন, উদ্দেশে তাঁদের চরণেও নমস্কার কোল্লেম।

    উদ্যানের মধ্যে দুখখানি পাল্কী এলো। কলিকাতায় যেমন দেখেছি, একখানা পাল্কীর ভেতর গুড়ের কলসীর মত পাঁচ সাতটী স্ত্রীলোক, দুটী তিনটী ছেলেমেয়ে নিয়ে গাদাগাদি কোরে বসে সে রকম দস্তুর এখানে নাই; এখানকার বেহারারা একখানি পাল্কীতে দুটীর অধিক স্ত্রীলোক লয় না, স্থূলাঙ্গী হোলে একটীমাত্র গ্রহণ করে। যে দুখানি পাল্কী এলো, এর একখানিতে বাড়ীর গৃহিণী আর ছোট-বৌ, দ্বিতীয়খানিতে বাবুর ভগ্নী আর কামিনী। উৎসবদিনে অনেকেই আসেন, কিন্তু অন্যদিন সকলে আসেন না।

    এই দেবালয়ে ঠিক সন্ধ্যাকালে আরতি হয় না, ন্যূনকল্পে রাত্রি চারি দণ্ডের পর আরতি আরম্ভ হয়; স্থিতিও প্রায় চারি দণ্ড। ব্রহ্মময়ীর আরতি দুই দণ্ড, মহাদেবের মন্দিরের আরতি একদণ্ড, আর একটা ক্ষুদ্রমন্দিরে একটী গণেশ আছেন, সেই গণপতির আরতিতেও একদণ্ড সময় লাগে; সৰ্ব্বশুদ্ধ তিন মন্দিরে চারি দণ্ড।

    লোকের ভিড় খুব কম। পুরোহিতেরা তিনজন, চাকর দুজন, দাসী একজন, দর্শক পুরুষ আট দশজন, স্ত্রীলোকও আট দশজন। সে রাত্রে আমি যতগুলি দর্শক দেখলেম, তাদেরই সংখ্যা এই।

    বাড়ীর মেয়েরা মহাদেবীর মন্দিরে প্রবেশ কোল্লেন, আমিও অল্পক্ষণ মন্দিরের বারান্দায় বেড়ালেম, একটু পরে কৃষ্ণকামিনী একাকিনী বাহির হয়ে এলেন, কেহই তাঁকে নিষেধ কোল্লেন না।

    ভোগঘরের শ্রেণীর দক্ষিণধারে সেই ক্ষুদ্র কামরা। সেই কামরার সম্মুখে গিয়ে কৃষ্ণকামিনী দাঁড়ালেন। মন্দিরের সম্মুখে পাঁচ সাতজন স্ত্রী-পুরুষ সময়-প্রতীক্ষায় ঘরে ফিরে বেড়াচ্ছিল, কৃষ্ণকামিনী তাদের দিকে চাইতে চাইতে সেই ক্ষুদ্র কক্ষমধ্যে প্রবেশ কোল্লেন। লোকেরা তাঁরে দেখতে পেলে কি না, আমি সেটা জানতে পাল্লেম না। মন্দিরের বারান্দায় আমি বেড়াচ্ছিলেম, এদিক ওদিক চাইতে চাইতে মৃদুগতিতে নেমে এলেম, কিছুই যেন লক্ষ্য নাই, সেই ভাবে কিয়ৎক্ষণ ইতস্ততঃ কোরে ধীরে ধীরে সেই কক্ষসমীপে গিয়ে উপস্থিত হোলেম। দ্বার অনাবৃত, ঘরে আলো; দেবসেবার বন্দোবস্তর মধ্যে নিত্যনিয়মিত ব্যবস্থা এইরূপ যে, প্রতিদিন সন্ধ্যাকালে দেবালয়ে সমস্ত গৃহে এক একটী আলো দেওয়া হয়, আরতি-অবসানে চাকরেরা সেই আলোগুলি নিৰ্ব্বাণ কোরে দ্বারে দ্বারে চাবী লাগায়।

    কক্ষমধ্যে আমি প্রবেশ কোল্লেম। একধারে কৃষ্ণকামিনী জড়সড়। দ্বার অনাবৃত রাখা উচিত বোধ কোল্লেম না, অর্গলবদ্ধও কোল্লেম না, ভেজিয়ে রাখলেম। কৃষ্ণকামিনীর মুখে কথা নাই; সৰ্ব্বক্ষণ যে মুখে মৃদু মৃদু হাস্যরেখা দৃষ্ট হয়, সে মুখে তখন হাসিও নাই। ভাব আমি বুঝতে পাল্লেম। অগ্রেই আমারে কথা কোইতে হলো। দুজনেই আমরা দাঁড়িয়ে আছি। যেখানে আমি, তার তিন হাত তফাতে কৃষ্ণকামিনী। সম্মুখে একটু অগ্রসর হয়ে, কুণ্ঠিতভাবে মৃদুবচনে আমি বোল্লেম, “কৃষ্ণ! আমি তোমার অনুরোধ রক্ষা কোত্তে পারি নাই, তোমার অভিমান হয়েছে, তা আমি বুঝতে পেরেছি।”

    মৃদুস্বরে কৃষ্ণকামিনী বল্লেন, “পেরেছ, ভালই হয়েছে, সে কথা শুনে আমি কি কোরবো? কার উপর আমার অভিমান? নিজের উপরেই আমি অভিমান করি, নিজের সঙ্গেই মনের কথা কোই, নিজের সঙ্গেই আমি নিজে বেড়াই, নিজের সঙ্গেই আমি হাসি খেলি, নিজের সঙ্গেই আমার সব!”

    আমি।—ওঃ! এখন আমি বুঝেছি! তোমার মত বয়সে বাঙালীর মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়, সকলেই প্রজাপতির অনুগ্রহে এক একটী অন্তরঙ্গ সহচর পায়, তুমি আজিও একাকিনী আছ, অন্তরের সেই দুঃখেই ঐ সব কথা তুমি বোলছো; মনের দুঃখেই তোমার মনে হয়, নিজের সঙ্গেই তোমার সব! কেমন, এই কথা নয়?

    কৃষ্ণ।—(অন্যমনস্ক হইয়া) কোন কথা?

    আমি।—আমি বোলছি, তোমার বিয়ের কথা! মা সে দিন বোলছিলেন,— তোমার দিদিকে আমি মা বলি, তা তুমি জানো,—মা সে দিন বোলছিলেন, “ঘরবর পাওয়া যায় না, কবে যে ফল ফুটবে, প্রজাপতিই জানেন।” কথাগুলি আমি শুনেছিলেম; তার পর কি শুনেছি, মন দিয়ে শুন; শুনে তোমার আহ্লাদ হবে।

    কৃষ্ণ।—(ম্লানবদনে) আর আমার আহ্লাদে কাজ নাই! সেই সব কথা শুনেই আমার আহ্লাদ হয়েছে, আবার আমার কিসের আহ্লাদ?

    আমি।—না না, সে রকম নয়; সত্যই আহ্লাদের কথা। কুঁড়ি ধোরেছে, শীঘ্রই ফুল ফুটবে, হয় তো এই অগ্রহায়ণ মাসেই ফুটে যাবে। প্রজাপতি প্রসন্ন হয়েছেন! শীঘ্রই তোমার বিয়ে হবে।

    কৃষ্ণ।—(আরক্তবদনে) বিয়ের মুখে আগুন! তোমাদের প্রজাপতিরও মুখে আগুন! একটা কথা রক্ষা কোত্তে পার না তুমি, তুমি আবার প্রজাপতির দোহাই দিতে এসেচ! বিয়ে—বিয়ে—বিয়ে। এ রকম তামাসা কোত্তে তোমায় কে বলে?

    আমি।—না না, তামাসা নয়; সত্য সত্যই তোমার বিয়ে। সম্বন্ধ স্থির হোচ্ছে। পিসীমার—বুঝতে পেরেছে?—তোমার দিদির ঠাকুরঝিকে আমি পিসী বলি, পিসীমার বড়ছেলের সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে। যাঁদের ঘরে পিসীমার বিয়ে হয়েছে, তাঁরা মস্ত কুলীন, তোমাদের ঘরের মেয়েরা সেই ঘরের ঘরণী হয়, এই কথাই আমি শুনেছি। এ দুদিন তোমার সঙ্গে এখানে আমি দেখা কোত্তে পারি নাই, কার্য্যগতিকে আটকা পোড়েছিলেম, এইমাত্র সে কথা তোমাকে আমি বোলেছি; কাৰ্য্যগতিকটা আর কিছুই নয়, তোমারই শুভবিবাহের সম্বন্ধের মজলীস, ইচ্ছা কোরেই সে মজলীসে আমি উপস্থিত ছিলেম। একরকম ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছে, বাবুও রাজী হয়েছেন; একমাসের মধ্যেই—

    কৃষ্ণ।—(তাড়াতাড়ি বাধা দিয়া চঞ্চলস্বরে) না ভাই,—না হরিদাস! ও সব কথা তুমি আমার কাছে বোলো না। সত্য যদি তুমি আমার ভাল চাও, মাথা খাও, সত্য কোরে বল, তুমি আমাকে ভালবাস কি না, দেখো ভাই, ছলনা কোরো না, মনের ভাব গোপন রেখো না, আমিও আমার প্রাণের কথা তোমার কাছে খুলে বোলচি, আমি তোমাকে বড্ড ভালবাসি! তুমি ভাই আমার প্রাণের চেয়েও—

    আমি।—(বিস্ময়ে চমকিয়া) এ কি কর কৃষ্ণ! তুমি আমারে ভাই বোলছো? তোমার দিদিকে আমি মা বলি, সে কথাটা কি তুমি ভুলে যাচ্ছ? সে সম্পর্কে তুমি আমার মাসী হও; মাসী কি কখনো—

    কৃষ্ণ।—(চঞ্চলা ভঙ্গীতে হস্তসঞ্চালন করিয়া) না ভাই না, ও সব সম্পর্কের কথা তুমি ছেড়ে দাও; কাজের কথা বল। বার বার যে কথা আমি জিজ্ঞাসা কোচ্ছি, মন খুলে সেই আসলকথার উত্তর কর। সত্য সত্য তুমি আমাকে আমার মতন ভালবাস কি না?—আমার মনের মতন ভালবাসতে তুমি ইচ্ছা কর কি না? বল ভাই বল, মা কালীগঙ্গার দিব্যি, অকপটে সত্য বল ভাই! তুমি আমারে—

    বিস্ময়ে-আতঙ্কে দারুণ সংশয়ে আমি তখন অসাবধান ছিলেম, অন্যমনস্ক হয়ে ঘন ঘন দরজার দিকে চাইতেছিলেম, অবসর বুঝে কৃষ্ণকামিনী ঐ সব কথা বোলতে বোলতে শীঘ্র শীঘ্র এগিয়ে এসে আমার গলা জড়িয়ে আমার দুই কপোল দুই চুম্বন কোল্লেন! আতঙ্কে আমার সৰ্ব্বশরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলো! চঞ্চলহস্তে বন্ধন ছাড়িয়ে দ্রুতপদে আমি দরজার কাছে ছুটে আসছি, এমন সময় মন্দিরমধ্যে শখ-ঘণ্টা বেজে উঠলো, সম্মুখের প্রাঙ্গণে ডঙ্কা বাজতে লাগলো, শশব্যস্তে দরজা খুলে সে ঘর থেকে আমি ছুটে বেরুলেম। আরতি হোচ্ছিল, সমাপ্তি পর্য্যন্ত অপেক্ষা কোত্তে না পেরে, মন্দিরের নীচে থেকে ব্রহ্মময়ীকে প্রণাম কোরে, কোন দিকে না চেয়েই, দৌড়;— এক দৌড়ে বাগান থেকে আমি বেরিয়ে পোড়লেম। কৃষ্ণকামিনী সেখান থেকে কখন বেরিয়ে এলেন, কি কোল্লেন, কিছুই আমি জানতে পাল্লেম না।

    রজনীযোগে একাকী আমি একটী গৃহে শয়ন করি। মানুষ একাকী হোলেই চিন্তা করবার উত্তম অবকাশ পায়। এ রাত্রে কৃষ্ণকামিনী আমার চিন্তার সামগ্রী। সন্ধ্যাকালে সেই কাণ্ড হয়ে গিয়েছে, রাত্রি প্রায় দুই প্রহর হোতে যায়, তখনো পর্য্যন্ত আমি সেই কথা মনে কোরে থেকে থেকে এক একবার কেঁপে কেঁপে উঠছি! হলো কি!—ভাবলেম, গতিক দেখছি আর একরকম! কৃষ্ণকামিনী উচক্কা বয়সের লক্ষণ দেখাতে অভিলাষিণী, প্রকৃতি চঞ্চলা দেখায় না, ধীরা—সুধীরা দেখায়; অবিবাহিতা কুমারী, নির্দ্দোষ, নিষ্কলঙ্ক, নির্ম্মল—কুমারীভাবে এই বিশেষণগুলি ঠিক থাকাই ভাল; কৃষ্ণকামিনী কুমারীস্বভাবের সে পবিত্রতাটুকু রাখতে পাচ্ছেন না। সরলা নির্ম্মলা বোলেই আমি ততটা ঘনিষ্ঠতা কোচ্ছিলেম, এখন দেখছি, বিপরীত দাঁড়ায়!—এ সব কথা কিছুই ভাঙবো না, শীঘ্র শীঘ্র মেয়েটার বিয়ে দেওয়া কৰ্ত্তব্য, বড়বাবুকে আমি এই কথা বোলবো।

    এইরুপ আমার চিন্তা। সে চিন্তা ভবিষ্যৎ; আমি এখন করি কি? অন্তঃপুরে যাব না, কৃষ্ণকামিনীর সঙ্গে কথা কব না, কৃষ্ণকামিনীকে দেখা দিব না, সেটাও তো ভাল কথা নয়; হঠাৎ সে রকম ভাবান্তর দেখালেই দোষ হবে; সকলেই এক এক প্রকার সন্দেহ কোরবেন। সেইরূপ সম্ভাবিত সন্দেহক্ষেত্রে যদি আমি বড়বাবুর কাছে কৃষ্ণকামিনীর বিয়ের কথা তুলি, তা হোলে সে সন্দেহটা আরো বাড়বে না, ভাবান্তর দেখানো হবে না, যেমন আছি, তেমনই থাকবো; সকলের সঙ্গে যেমন মুখের কথায় সদ্ভাব রেখে আসছি, কৃষ্ণকামিনীর সঙ্গেও সেইরুপ মৌখিক সদ্ভাব রাখবো; ভাবান্তর দেখানো হবে না। দেখাতে গেলেই হয় তো আর একখানা দেখাবে। স্ত্রী-চরিত্র দেবতারাও বুঝে উঠতে পারেন না; কৃষ্ণকামিনী বালিকা হোলেও স্ত্রী-চরিত্রের সীমা-বহির্ভূতা হোতে পারেন না। চতুরতার সঙ্গে খলতার যোগাযোগ আছে; চতুরা স্ত্রীলোক নিজে দুষী হয়েও, আশাভঙ্গে নির্দ্দোষ পুরুষের নামেও কলঙ্ক রটায়। আশাভঙ্গে কৃষ্ণকামিনী যদি সেই পন্থা অবলম্বন করেন, তা হোলে আমি আর এখানে লোকের কাছে মুখ দেখাতে পারব না;—ধর্ম্মের কাছে অপরাধী হব না, কিন্তু মানুষের কাছে মুখ তুলে কথা কোইতে আমার ভয় হবে; লজ্জা তো হবেই, ধরা কথা, মানুষেরা আমাকে ঘৃণা কোরবে। কাজ নাই, সে রকম স্বতন্ত্রতা দেখিয়ে কাজ নাই; যেমন আছি, যেমন বেড়াচ্ছি, সদরে অন্দরে সকলের কাছে যেমন ভাব দেখাচ্ছি, ঠিক ঠিক সেই ভাব বজায় রাখবো; আমার মনের ভাব কেহই কিছু জানতে পারবে না, কাহাকেও কিছু জানতে দিব না। কৃষ্ণকামিনীকে প্রশ্রয় দিব! দেখি— দেখি, বালিকাবুদ্ধি আমার বুদ্ধির উপর জয়লাভ কোত্তে পারে কি না।

    নৈশ-চিন্তার উপদেশে এই সঙ্কল্পই আমার পাকা। রজনীপ্রভাত হলো, কৰ্ত্তব্যকার্য্যে মনোনিবেশ কোল্লেম, সময়মত অন্দরমহলে গেলেম, যার সঙ্গে যে রকম কথা আবশ্যক, সেরকম কথাবার্ত্তা কোইলেম। কৃষ্ণকামিনীর সঙ্গে দেখা হলো।

    নিত্য নিত্য যেরুপ ভাব, সেই ভাবে একটু হেসে, কৃষ্ণকামিনী একটা ঘরের দিকে চোলে গেলেন। আমি মনে কোল্লেম, ও হাসিটা লজ্জার হাসি; গত রাত্রে মনের চাঞ্চল্যে একটা অন্যায় কাজ কোরে ফেলেছেন, তার পর সেটা বুঝতে পেরেছেন, সেইজন্যই লজ্জা এসেছে, ঐ হাসিতে সেই লজ্জার পরিচয় দিলেন, সেইজন্যই আমার সম্মুখে অধিকক্ষণ দাঁড়াতে পাল্লেন না, অন্যঘরে চোলে গেলেন।

    ও পরমেশ্বর! তা নয়! আমার সিদ্ধান্ত অমূলক! সেই ঘরে প্রবেশ কোরে, কপাটের আড়াল থেকে মুখ বাড়িয়ে, হাতছানি দিয়ে কৃষ্ণকামিনী আমাকে ডাকলেন। স্ব স্ব কার্য্যে ব্যস্ত হয়ে মেয়েরা সকলেই তাড়াতাড়ি এঘর ওঘর কোচ্ছিলেন, দিনের বেলা, আমার প্রতি কেহই কোনরুপ সন্দেহ রাখেন না, আমিই বা তখন ইতস্ততঃ কেন কোরবো, কৃষ্ণকামিনীর সঙ্কেতে সেই ঘরের দিকে আমি চোলে গেলেম, ঘরের ভিতর প্রবেশ কোল্লেম। কপাটের কাছ থেকে সোরে এসে ঘরের একধারে দাঁড়িয়ে, করতালি দিয়ে খিলখিল কোরে হেসে, কামিনী যেন উন্মাদিনীর ন্যায় বোলে উঠলেন, “কেমন হরিদাস! কেমন! দেখলে তো! কেমন ভালবেসেচি! তুমি কি আমাকে ঐ রকম ভালবাসতে পার?”

    কৃষ্ণকামিনীর মুখে হাত চাপা দিয়ে চঞ্চলস্বরে চুপি চুপি আমি বোল্লেম, “চুপ কর মাসি, চুপ কর! সকলে ওখানে রোয়েছেন, শুনতে পাবেন, তোমার মনে মন্দভাব নাই, তা হয়তো তাঁরা বুঝবেন না, কত কি গালাগালি কোরবেন, সেটা কি ভাল? আমাদের সরল প্রাণ, তুমি আমারে ভালবাস, আমি তোমারে ভালবাসি, সকলেই দেখতে পান, মুখে ততটা পরিচয় দেওয়া কেন? বয়সে সমান হোলেও তুমি আমার মাসী, আমি তোমার ছেলের মতন; ছেলের মুখে হামু খেয়েছ, বেশ কোরেছ। ছেলের মুখে কে না হামু খায়? বেশ কোরেছ! সে পরিচয় আবার লোকে শুনবে কি? এখন সদরবাড়ীতে একটী কাজ আছে, আমি এখন চোল্লেম, আবার সময়মত দেখা হবে।”

    দরজা পর্য্যন্ত এসে, আবার ফিরে গিয়ে পূৰ্ব্ববৎ চুপি চুপি আমি বোল্লেম, “দেখ কৃষ্ণ, রোজ রোজ সন্ধ্যাকালে ঠাকুরবাড়ীতে দেখা করা সেটা বড় ভাল নয়। কেন, ঠাকুরবাড়ী না হোলে কি তোমাতে আমাতে দেখা-সাক্ষাতের আর স্থান নাই? সৰ্ব্বক্ষণ আমি বাড়ীতে আছি, তুমিও আছ, যখন ইচ্ছা, তখনি আমি দেখা কোত্তে পারি, যা যা তুমি বল, তারও ব্যবস্থা কোত্তে পারি, কি আমি না পারি? যেদিন সুবিধা হবে, সকলে যেদিন যাবেন, সেই দিন হয় ঠাকুরবাড়ীতে দেখা করা যাবে, রোজ রোজ ঠাকুরবাড়ীতে সুবিধা হবে না, সুবিধা হোলেও সেটা ভাল দেখাবে না; বুঝলে কি না? মনে মনে বা তুমি ভাবো, যা তুমি আমারে বোলবে বোলবে মনে কর, তা আমি বুঝতে পেরেছি, কাল সন্ধ্যার পর তার একটু আভাষও তোমারে আমি দিয়ে রেখেছি, আজ আবার বড়বাবুকে সেই কথাটী বিশেষ কোরে বোলবো ভেবে রেখেছি। তুমি ভেবো না; এক মাসের মধ্যেই তোমার বিয়ে হয়ে যাবে।”

    শেষকথাটী বোলেই দ্রুতপদে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেম। কৃষ্ণকামিনীর মুখে উত্তর শুনবার প্রতীক্ষা কোল্লেম না।

    তদবধি আমি রক্ষাকবচ ধারণ কোল্লেম। কৃষ্ণকামিনীর সঙ্গে সময়ে সময়ে আমি দেখা করি, হাসি খেলা করি, সমানভাবে ভালবাসা জানাই, কৃষ্ণকামিনী মুখ ফুটে যা যা বলেন, সমানভাবে তাতেই আমি সায় দিয়ে যাই, কিছুতেই কিছু ব্যতিক্রম ঘটে না। সমস্তই কিন্তু ছাড়া ছাড়া ভাব। ঠাকুরবাড়ীতেও দেখা হয়, বাড়ীতেও দেখা হয়, কৃষ্ণকামিনীর আদর-বিলাসে এক একবার আমি হাস্য করি, এক একবার মুখ বুজে থাকি, কৃষ্ণকুমারী খুসী থাকেন। পূর্ণিমা পর্য্যন্ত এইরূপ ভাব চোলতে লাগলো।

  • ত্রয়োবিংশ কল্প : আমার ভূতের ভয়

    ত্রয়োবিংশ কল্প : আমার ভূতের ভয়

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    ত্রয়োবিংশ কল্প : আমার ভূতের ভয়

    কার্ত্তিকমাসে দুর্গাপূজা হয়ে গিয়েছে, সুতরাং অগ্রহায়ণমাসে রাসযাত্রা। মাঝের রাসের দিন বৈকালে পশুপতিবাবু আমারে বোল্লেন, “হরিদাস, রাস দেখতে যাবে?” রাস কখনো আমি দেখি নাই; কি রকম রাস, রাসে কি কি দেখা যায়, কেহ কখনো আমারে সে কথা বলেন নাই, ছোটবাবুর প্রশ্ন শুনে কৌতূহলে আমি উত্তর কোল্লেম, “যাব।”

    মুর্শিদাবাদজেলায় বোরাকুলী নামে একখানি গ্রাম আছে, সেই গ্রামে সর্ব্বেশ্বর চৌধুরী নামে একজন ধনাঢ্য কায়স্থের বাড়ীতে রাসযাত্রা। খুব ঘটা হয়, বাজার বসে, অনেক লোক জমা হয়, অনেক রকম নাচ-তামাসা হয়, রাত্রিকালে আতসবাজী হয়, মহাসমারোহ ব্যাপার। এই সব পরিচয় পেয়ে, বাবুর মত পোষাক পোরে, ছোটবাবুর সঙ্গে অমি রাস দেখতে চোল্লেম। বোরাকুলী গ্রাম যদুপুর গ্রাম থেকে অনেকটা দূরে। উপযুক্ত যানবাহনে রাত্রি প্রায় চারিদণ্ডের সময় সেই গ্রামে আমরা উপস্থিত হোলেম। সৰ্বেশ্বরবাবুর বাড়ীখানি প্রাচীনধরণে বিনির্ম্মিত। রাসোৎসবে বাড়ীখানি মেরামত করা হয়েছে, ফটকে ফটকে রং দেওয়া হয়েছে, ফটকের দু-ধারে মণ্ডলাকারে অনেকগুলি স্তম্ভগাঁথা; মধ্যস্থলে কেয়ারীকরা ফলবাগান; স্তম্ভের মাথায় মাথায় রকম রকম পুতুল বোসেছে, নৃত্যভঙ্গীতে সারি সারি পাথরের পরী দাঁড়িয়েছে, পরীদের দুই হাতে দুটী দুটী কাচের ফানুস, কাচের ফানুসের ভিতর বাতী জ্বোলছে, বাড়ীর বাহিরের বারান্দাতেও নানা বর্ণের বেল-লণ্ঠন সমুজ্জ্বল বাতী; ফটকের পশ্চিমদিকে রাসমঞ্চ; চতুষ্কোণ বেদী, চারিধারে উচ্চ উচ্চ গোলথাম, থামে থামে নানা বর্ণের লতাপাতা কাটা, থামের মাথায় চতুষ্কোণ ছাদ, ছাদের নীচে রক্তবর্ণ চন্দ্রাতপ, সবুজবর্ণের ঝালর; চন্দ্রাতপে হাতী, ঘোড়া, পক্ষী, পদ্মফল আর অনেকগুলি দেবমূর্ত্তি চিত্রকরা। মঞ্চের থামের খাটালে খাটালে ছোট ছোট বেলোয়ারি ঝাড়, ঝাড়ের ফানুস কতকগুলি নীলবর্ণ, কতকগুলি সবুজবৰ্ণ, কতকগুলি গোলাপীবর্ণ, কতকগুলি শ্বেতবর্ণ। সকল ফানুসেই বাতী জ্বোলছে; থামের গায়ে গায়ে জোড়া জোড়া দেয়ালগিরী; মঞ্চের নিম্নভাগে বেদীর উপর বড় বড় পরী, তাদের হস্তেও জোড়া জোড়া লণ্ঠন; অপরুপ শোভা! রাসমঞ্চের দক্ষিণাংশে নহবৎখানা; নহবৎখানার সম্মুখে প্রায় একবিঘা জমীতে বাজার। নানাদেশের নানাদ্রব্য সেই বাজারে বিক্রীত হোচ্ছে; সহস্র সহস্র লোক চতুর্দ্দিকে ভিড় কোরে বেড়াচ্ছে, কোলাহলে চতুর্দ্দিক প্রতিধ্বনিত; দেখতে দেখতে রাত্রি এক প্রহর।

    যাদের বাড়ীতে রাস, তাঁদের সঙ্গে পশুপতিবার বেশ সম্ভব। দুই একজনের কাছে তিনি আমার পরিচয় দিয়ে দিলেন, তাঁরাও মিষ্টবচনে আমার সঙ্গে সম্ভাষণ কোল্লেন; আমি তাঁদের নমস্কার কোল্লেম।

    রাত্রি দেড় প্রহরের কিছু পূর্ব্বে ঠাকুরের বার। ঘোরঘটায় বিবিধ বাদ্যোদ্যম, সঙ্গে সঙ্গে সঙ্কীৰ্ত্তন, দুধারি রঙমশালের রোসনাই সৰ্ব্বপশ্চাতে ঠাকুরের সিংহাসন;—সিংহাসনের পশ্চাতে ঢালতলোয়ারধারী প্রহরীশ্রেণী।

    রাধামূর্ত্তিসহ রাসবিহারীবিগ্রহ শ্রীকৃষ্ণ রাসমঞ্চে এসে বার দিলেন; মঙ্গল উপচারে শীতলসামগ্রী নিবেদনের পর আরতি হয়ে গেল। ভট্টাচার্য্য সবেমাত্র বাম-হস্তের ঘণ্টাটী আসনের কাছে নামিয়েছেন, ঠিক তৎক্ষণাৎ অমনি গড়ম গড়ম শব্দে শত শত ব্যোমবাজীর আওয়াজ আমাদের শ্রুতিগোচর হলো। বাজীক্ষেত্রটা রাসমঞ্চ থেকে শতাধিক হস্ত দূরে। রাসমঞ্চের উপর থেকে আমরা আতসবাজী দর্শন কোত্তে লাগলেম। আকাশমার্গগামী সুন্দর সুন্দর হাউইবাজী, উল্কাবাজী, তারাবাজী, ফুলকাটা বিমানবাজী, মধ্যে মধ্যে বোমধ্বনি;—তা ছাড়া, হাতীবাজী, ঘোড়াবাজী, রাক্ষসবাজী, মল্লবাজী, লড়াইবাজী, তুবড়ীবাজী, চোরকাবাজী, বক্ষে বক্ষে পক্ষীবাজী ইত্যাদি কতরকম বাজী আমি দেখলেম, দেখে দেখে আশ্চর্য্যজ্ঞান হোতে লাগলো; তাদৃশ অগ্নিক্রীড়া পূর্ব্বে কখনো আমি দেখি নাই।

    আরো অনেকরকম বাজী আছে, লোকের মুখে সেই কথা আমি শুনলেম, কিন্তু ছোটবাবু আমারে আর বেশীক্ষণ সেখানে রাখলেন না; বেশী রাত জাগলে অসুখ হবে, এই কথা বোলে রাসমঞ্চ থেকে নামিয়ে নিয়ে এলেন। রাসবাড়ীতে অসম্ভব ভিড়, সারারাত গোলমাল, সেখানে নিদ্রা হবার সম্ভাবনা নাই, অতএব তিনি আমারে সঙ্গে কোরে, খানিক তফাতে আর একখানি বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। সেই বাড়ীর একটী ছেলের সঙ্গে পশুপতিবাবুর পূর্ব্বাবধি আলাপ ছিল, সেই খাতিরেই সেই বাড়ীতে যাওয়া। সেই বাবুটীও আমাদের সঙ্গে। রাত্রি দুই প্রহর।

    বাড়ীখানি একতালা, একমহল, চারিদিকে প্রাচীর, বাড়ীর ভিতর সাত আটটী কুঠরী। রাসবাড়ী থেকে একজন ব্রাহ্মণ সেইখানে আমার জলখাবার দিয়ে গেল, ঠাকুরের প্রসাদ, বিবিধ মিষ্টসামগ্রী ভোজন কোরে একটী কুঠরীতে আমি বোসলেম।

    কায়স্থের বাড়ী। বাড়ীর কর্ত্তার নাম শান্তিরাম দত্ত। কর্ত্তার অনেক বয়স হয়েছে, মস্তকের কেশ, ভ্রূ, কর্ণলোম, বক্ষলোম সমস্তই শ্বেতবর্ণ, কিন্তু চলৎশক্তি আছে; ছেলেমেয়ে আট দশটী হয়েছিল, যৌবনে শৈশবে প্রায় সকলগুলি দুরন্ত কালকবলে কবলিত, কেবল একটী পুত্র আর দুটী বিধবা কন্যা বর্ত্তমান। পুত্রটীর নাম মণিভূষণ। সেই মণিভূষণের সঙ্গেই আমাদের পশুপতিবাবুর আলাপ। মণিভূষণ পশুপতিবাবুর সমবয়স্ক, পরিচয় পেয়ে মণিভূষণ আমারে বেশ আদর-যত্ন কোল্লেন। রাত্রে সেই বাড়ীতে আমার শয়নের ব্যবস্থা। আমার আহারের অবসরেই একটী কুঠরীতে শয্যা প্রস্তুত হয়েছিল, বাড়ীতে দাসদাসী নাই, বাড়ীর মেয়েরাই শয্যা রচনা কোরেছিলেন, সেইখানে আমায় শয়ন কোত্তে বোলে, মণিভূষণের সঙ্গে ছোটবাবু; আবার রাসবাড়ীতে ফিরে গেলেন।

    গৃহিণীও লোকান্তরগতা। কৰ্ত্তার কন্যারাই সংসারের কাজকর্ম্ম করেন। আমি শয়ন কোল্লেম। শুনেছিলেম, কর্ত্তার বিধবা কন্যা দুটী, কিন্তু আমি যখন আহার করি, তখন একখানি কপাটের আড়ালে তিনখানি মুখ আমি দেখেছি; একখানি হস্তও একবার আমার নয়নপথে পতিত হয়েছিল; সে হস্তে অলঙ্কার আছে। একবার মাত্র দেখা ছায়ামাত্র বোল্লেও চলে; কেন না, একবার ভিন্ন দুবার আমি সেদিকে চাই নাই; নূতন জায়গায় সে রকম চাওয়াও আমার অভ্যাস নয়; কিন্তু হাতখানিতে গহনাও আমি দেখেছি। বিধবার অলঙ্কার থাকে না, তবে সে হাতখানি কার? তৃতীয়া কন্যাটীই বা কে? শয্যায় শয়ন কোরে মনে মনে আমার সেই বিতর্ক।

    অগ্রহায়ণ মাস; আমার শয়নঘরের গবাক্ষগুলি বন্ধ। ঘরের ভিতর দিয়ে ঘরে ঘরে যাওয়া আসার পথ, সুতরাং দরজাটী খোলা থাকলো, ঘরে আলো জ্বোলতে লাগলো। আলো জ্বেলে নিদ্রা যাওয়া অভ্যাস নয়, জ্বোলছে তো জ্বোলছে, সে আলো আমি নিৰ্ব্বাণ কোল্লেম না।

    একখানি তক্তপোষের উপরে আমার শয্যা; শয্যাতে সরুকাপড়ের মশারিফেলা। আমি শুয়ে আছি। রাত্রি অনেক হয়েছিল, শীঘ্র শীঘ্র নিদ্রা আসাই সম্ভব ছিল, কিন্তু শীঘ্র নিদ্রা এলো না। এক একবার অল্প অল্প তন্দ্রা আসে, আবার তখনি তখনি জেগে উঠি। কেন এমন হয়? ঘরে আলো আছে বোলেই কি নিদ্রা হোচ্ছে না? মনে কোল্লেম, আলোটা তবে নিবিয়ে দিয়ে আসি। মনে কোল্লেম, কিন্তু কেমন আলস্য হলো, উঠলেম না, উঠতে পাল্লেম না, চুপটী কোরে শুয়ে থাকলেম। এক একবার চক্ষু বুজি, এক একবার যেন তন্দ্রা আসে, কি যেন দেখছি, কি হোচ্ছে, কে যেন আসছে, তন্দ্রাবশে এই রকম ভেবে ভেবে আবার চেয়ে চেয়ে দেখি।

    অগ্রহায়ণ মাসের রাত্রি, দুই প্রহরের পর অনেক রাত্রি থাকে; আমি যখন শয়ন কোরেছি, তখন রাত্রি প্রায় ইংরেজীমতে একটা; বড়রাত্রি কি না; উষা আসবার তখন অনেক বাকী। ঘুম হচ্ছে না; এক একবার চক্ষু বুজে থাকছি, এক একবার চেয়ে চেয়ে দেখছি। এই ভাবে আরো একঘণ্টা। হঠাৎ একবার চেয়ে দেখি, অর্দ্ধ-অবগুণ্ঠিত একটী স্ত্রীলোক যেন টিপি টিপি সেই ঘরের ভিতর প্রবেশ কোল্লে। মশারির ভিতর ছিলেম কি না, অবয়বটী ঠিক দেখতে পেলেম না,—তন্দ্রাঘোরও অল্প অল্প ছিল, তন্দ্রাঘোরেই স্বপ্ন আসে; মনে কোল্লেম, স্বপ্ন। নেত্রমার্জ্জন কোরে ভাল কোরে চেয়ে দেখলেম, সত্যই একটী নারীমূর্ত্তি নিঃশব্দপদসঞ্চারে অতি মৃদুগতিতে আমার বিছানার দিকে এগিয়ে এগিয়ে আসতে লাগলো; আমার মশারির ধারে এসে দাঁড়ালো; আমি ঘুমিয়ে আছি কি না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাই যেন অল্পক্ষণ পরীক্ষা কোল্লে; তার পর অল্পে অল্পে সোরে সোরে আমার শিয়রের দিকে তক্তপোষের ধারে এসে আবার দাঁড়ালো। তখনো আমি ভালরকম দেখতে পেলেম না। মূর্ত্তি তখন ক্রমে ক্রমে পায়ে পায়ে তক্তপোষখানা প্রদক্ষিণ কোরে এলো; ঘুরে এসে আবার ঠিক আমার চক্ষের সম্মুখে দাঁড়ালো, সেইবার আমি তার মুখখানি স্পষ্ট দেখতে পেলেম; দেখেই অন্তরে অন্তরে কেঁপে উঠলেম। গাটা যেন ডুলি দিয়ে উঠলো; অকস্মাৎ ভয় পেয়ে, চক্ষু বুজে, দুই হতে দুটী চক্ষু আবরণ কোল্লেম। মনের ভিতর ভয়ের সঙ্গে কতরকম তর্ক-বিতর্ক উপস্থিত হোতে লাগলো, আমার অন্তরাত্মাই তা জানতে পাল্লেন। যদিও সে মুক্তি মশারির বাহিরে, তথাপি বোধ হোতে লাগলো যেন, মশারির ভিতর হাত বাড়িয়ে সে আমারে ধোত্তে আসছে! এইবার তাড়াবো। সাহসে ভর কোরে সেই সময় আবার আমি মুখ থেকে হাত সোরিয়ে সটান নয়ন উন্মীলন কোল্লেম। সে মূর্ত্তি আর তখন সেখানে নাই! তখন আমার প্রাণে যেন কত ভয়। অহো! এই ভবসংসারের কি এই গতি! নিশ্চয়ই ভূত! নিশ্চয়ই অমরকুমারি! অমরকুমারি! আহা! কাশীধামে দেহত্যাগ কোরে, শিবত্ব প্রাপ্ত হয়েও কি তুমি আমারে ভুলতে পাচ্ছো না? পুনরায় ভৌতিক দেহ পরিগ্রহ কোরে এই মুর্শিদাবাদে এই নিশাকালে তুমি আমারে দেখা দিতে এসেছ? কোথায় গেলে? ভয় দেখাতে এসেছিলে? অমরকুমারি! ভূতের ভয় আমি রাখি না, তোমারে দেখে কেন তবে আমার প্রাণে এত ভয়? হায় হায়! অমরকুমারি! তুমি আমারে কত ভালই বেসেছিলে, আমি তোমারে কত ভালই বেসেছিলেম, হায় হায়! সেই ভালবাসা কি এখন ভূতের ভয়ে পরিণত? না না, ভয় আমি কোরবো না, অমরকুমারীকে দেখে ভয় করা, এ কথাটা মনে কোল্লেও আমার চক্ষে জল আসে! অমরকুমারি! তুমি ভূতই হও, প্রেতই হও, পিশাচীই হও, এসো, তোমারে দেখে আমি ভয় পাব না; সাক্ষাৎ দর্শনে অদর্শনে দেবীমূর্ত্তিরূপেই আমি ভাবনা কোরবো। এসো, এসেছিলে যদি, লুকালে কেন? একটীবার দেখা দিয়ে অলক্ষিতে আবার পালালে কেন? চিনেছি আমি তোমারে! অমরকুমারি! অল্পক্ষণ চক্ষের কাছে খেলা কোরে অকস্মাৎ তুমি কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেলে? সেইরূপে আর একবার এসে দেখা দাও!

    উদ্দেশে মনে মনে অমরকুমারীকে আমি এই রকম অনেক কথা বোল্লেম, অনেকবার ডাকলেম, অমরকুমারী এলেন না। বিছানার উপর উঠে বিছানা থেকে নামি, ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে অন্বেষণ কোরে দেখি, এইরুপ মনে কোল্লেম, কিন্তু উঠতে পাল্লেম না। ভূতের ভয় অমূলক, আশৈশব এই বিশ্বাস থাকলেও একটা অজ্ঞাত ভয়ে আমি অভিভূত হোলেম। যুধিষ্ঠিরের কথা মনে পোড়লো। কামরুপে যুধিষ্ঠির বোলেছিল, এই মুর্শিদাবাদের এক বাগানের চাঁপাতলায় মূর্ত্তিমান ব্রহ্মচারীরূপী ব্রহ্মদৈত্য দর্শন কোরেছে, আমিও এই মুর্শিদাবাদের এক বাড়ীর একটী ঘরের ভিতর মূর্ত্তিমতী কুলকন্যারূপিণী অমরকুমারীর প্রেতমূর্ত্তি দর্শন কোল্লেম!

    সে মূর্ত্তি আর এলো না। শুয়ে শুয়ে প্রায় আধ ঘণ্টা আমি প্রতীক্ষা কোল্লেম, সে মূর্ত্তি দেখতে পেলেম না। ভয়কে হৃদয়ে ধারণ কোরে, মনে মনে আবার আমি ডাকলেম, অমরকুমারি! কোথায় তুমি গিয়েছ? এসো, আর একটীবার দেখা দাও! আমারে সঙ্গে কোরে নিয়ে চল! যেখানে তুমি গিয়েছ, সেইখানেই আমি যাব! বীরভূমের রাক্ষসকুটীরে তোমাতে আমাতে কদিন যেমন সুখে ছিলেম, চিরদিন চির-শান্তিধামে দুজনে আমরা সেইরকম সুখে থাকবো। এসো, দেখা দাও! দেখা দাও! নিয়ে চল! নিয়ে চল! তুমি আমারে শান্তিধামে নিয়ে চল!

    দরজার দিকেই আমি চেয়ে আছি। চক্ষের পলক পোড়ছে না, বিলম্বে একটী একটী নিশ্বাস পোড়ছে, সটান চেয়ে আছি। সেই মূর্ত্তি পুনৰ্ব্বার! এবার দেখলে ভয় পাব না মনে কোচ্ছিলেম, কি জানি, সংসারের ভয়-প্রবাহের কেমন গতি, মূর্ত্তির পুনরাবির্ভাব মাত্রেই আতঙ্কে আমার সৰ্ব্বশরীর রোমাঞ্চিত! মূর্ত্তির গতি এবারে আর মৃদু নয়, হংসগতিতে নিঃশব্দে দ্রুত দ্রুত; মূর্ত্তি এবার আর সতর্কভাবে দাঁড়িয়ে শয্যাসমীপে প্রতীক্ষা কোল্লে না, শয়নাসনটী প্রদক্ষিণও কোল্লে না, সরাসর নিকটে এসে, ধীরে ধীরে মশারিটী একটু তুলে, ভিতরদিকে মুখ বাড়িয়ে, আমারে সম্বোধন কোরে চুপি চুপি বোল্লে, “ঘুমিয়েচো হরিদাস?” চোমকে উঠে, এত হাত তফাতে সোরে গিয়ে চক্ষু বুজে আমি কাঁপতে লাগলেম। মুর্ত্তি আমারে পুনরায় জিজ্ঞাসা কোল্লে, “আমারে দেখে তুমি কি ভয় পেয়েছ? আর একবার আমি এসেছিলেম, তা কি তুমি জানতে পেরেছিলে? ও কি। তুমি কাঁপচো কেন?” এই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে আমার বক্ষঃস্থলে করষ্পর্শ অনুভব কোরে, সহসা আমি বিস্ময়সাগরে নিমজ্জিত হোলেম। এ কি! ভূতের স্পর্শ এমন কোমল, ভূতের কণ্ঠস্বর এমন সুমিষ্ট, এটা তো কল্পনাতেও আসতে পারে না; বিশেষতঃ অমরকুমারী যখন বেঁচে ছিলেন, অমরকুমারীর কণ্ঠস্বর তখন যেমন মধুমাখা ছিল, এ যে শুনি ঠিক তাই। তবে কি অমরকুমারী বেঁচে আছেন? কাশীধামে অমরকুমারীর শিবত্বপ্রাপ্তির কথাটা তবে কি মিথ্যা? মিথ্যা হওয়াই সম্ভব! মোহনলালের একটা কথাও যেন সত্য বোলে বোধ হয় না। অমরকুমারীর অমঙ্গল-সংবাদটা নিশ্চয়ই মিথ্যা। আমার পাশ্ববৰ্ত্তিনী সুন্দরীই সত্য সত্য সজীব অমরকুমারী! আনন্দের সঙ্গে, বিস্ময়ের সঙ্গে, সাহসের সঙ্গে, অন্তরে আমার পূর্ণ-শান্তির উদয় হলো, আনন্দাশ্রুতে বক্ষঃস্বল অভিষিক্ত হয়ে গেল, বোধ হলো যেন, আমি তখন শান্তিজলে স্নান কোল্লেম; পূর্ণানন্দে পর্ণ-উৎসাহে শয্যার উপর তখন উঠে বোসলেম। অমরকুমারীর মুখখানি তখন আমার অতি নিকটেই ছিল, সাশ্রুনয়নে চেয়ে দেখলেম, অমরকুমারীর পদ্মনেত্ৰদুটীও অূশ্রুপূর্ণ। কম্পিতকণ্ঠে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “অমর! সত্যই কি তুমি অমর?”

    নেত্রমার্জ্জন কোরে, একটু মদৃ হেসে, অমরকুমারী বোল্লেন, “হাসালে হরিদাস, হাসালে! বড় দুঃখে আজ তুমি আমারে হাসালে! অমর কি মিথ্যা হয়?”

    কথাগুলি বোলতে বোলতে অমরকুমারী অতি অনুপমভঙ্গীতে বিছানার উপর উঠে বোসলেন; বিকসিতনেত্রে আমার মুখপানে চাইতে চাইতে ঠিক আমার মুখের কাছে এসেই বোসলেন; মুখখানি আরো নিকটে এনে, অন্ধমৃদু হাস্যে সুরঞ্জিত কোরে, স্বভাবসিদ্ধ মধুরকণ্ঠে বল্লেন, “দেখ দেখি ভাল কোরে, সত্য অমর কি মিথ্যা অমর?”

    আমিও বিকসিতনেত্রে দর্শন কোল্লেম, ঠিক সেই! কিছুমাত্র রুপান্তর হয় নাই! বিস্ময়ের উপর আমার মনে তখন আরো অধিক বিস্ময়। ভেলুয়াচটীতে অগ্নিকুণ্ড থেকে উদ্ধার, মোহনবাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ, মোহনবাবুর বাক্য, মোহনবাবুর সঙ্গে বিবাহ, প্রয়াগধামে যাত্রা, কাশীর রসিক পিতুড়ীর বাড়ীতে কুমারী-ভোজনোৎসবে দর্শন, তার পর মোহনবাবুর সঙ্গে কাশীতে আগমন, জ্বরবিকার, শিবত্বপ্রাপ্তি, আগা-গোড়া সেই সব কথা একে একে অমরকুমারীকে আমি শুনালেম। শুনে শুনে অমরকুমারী কিয়ৎক্ষণ অচলা প্রতিমার ন্যায় নিস্পন্দ নিৰ্ব্বাক হয়ে থাকলেন; অগ্রহায়ণমাসের শেষরাত্রের শীতেও কপালে দরদরধারে ঘাম ঝোরতে লাগলো। স্তম্ভিতবদনে খানিকক্ষণ সামলে, বসনাঞ্চলে ঘর্ম্ম মাৰ্জ্জন কোরে, সুশীলা বালিকা তখন চমকিতকণ্ঠে বোল্লেন, “এ কি হরিদাস! তোমার কি রকম কথা? এ সব কথার বাষ্পও তো আমি জানি না! নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে তুমি কি পাগল হয়ে গিয়েছ? আচ্ছা, তুমি বোসো, আসছি; বাড়ীর সকলে ঘুমচ্চে কি জেগে আছে, দেখে আসি; বিলম্ব হবে না, এখনি ফিরে আসবো; তুমি বোসা,—শয়ো না।”

    অমরকুমারী অন্যঘরে গেলেন, একটু পরেই ফিরে এলেন; এসেই উদাসনয়নে আমার দিকে চেয়ে, বিছানায় উঠতে উঠতে চকিতস্বরে বোল্লেন, “না হরিদাস! সে আমি নই!”—এই দুটী কথা বলতে বোলতেই বালিকার নয়নকমলের জলে বদন-কমল ভেসে গেল! বিস্ময়ে অবাক হয়ে, শুষ্কনয়নে আমি সেই অশ্রুসিক্ত মুখপানে অনিমেষে চেয়ে থাকলেম। নেত্র মার্জ্জন কোরে পদ্মমুখী আবার বোলতে লাগলেন, “না হরিদাস, সে আমি নই! তোমারে পূর্ব্বে আমি বোলেছিলেম, হয় তো তোমার মনে থাকতে পারে, আমার একটী দিদি ছিল। যাঁরে আমরা এতদিন বাবা বোলে জানতেম, সেই হতভাগা লোকটা আমার দিদিকে ঝাঁটাপেটা কোরে, একখানা ন্যাকড়া পোরিয়ে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। দিদি আমার ভিকারিণীর মতন পথে পথে কেঁদে কেঁদে বেড়াচ্ছিল, কোথাকার এক মুখপোড়া মোহনবাবু এক জায়গায় তারে ধোরে দেশে দেশে নিয়ে বেড়ায়; শেষকালে কাশীতে নিয়ে গিয়েছিল বিয়েও নয়, সত্য ভালবাসাও নয়, সেরকমের কিছুই নয়;—তোমার কাছে সে দুঃখের কথাটা বলতে এখন আমার বাধাই বা কি, মুখপোড়াটা আমার দিদির কুমারীধর্ম্ম নষ্ট কোরেছিল? দিদি আমার মনের দুঃখে একরকম বিষ খায়,—বিষ খেলেই মানুষ মরে, কিন্তু সেটা সে রকম বিষ ছিল না; বিষ খাবার পর জ্বরের লক্ষণ দেখা দেয়। সেই সময় মুখপোড়ার অগোচরে আমার নামে দিদি ডাকযোগে একখানা পত্র পাঠায়। যারে আমি বাবা বোলতেম, পত্ৰখানা সেই লোকের হাতে পড়ে;—মাতাল মানুষ কি না, এক জায়গায় ফেলে রেখেছিল, আমারে দেয় নাই। একদিন আমি আমাদের বাইরের ঘরের একটা কোণে জঞ্জালের ভিতর সেই পত্ৰখানা কুড়িয়ে পাই; সেই পত্রে দিদির দুর্দ্দশার আগাগোড়া সব কথা লেখা ছিল; নির্জ্জনে গিয়ে পোড়ে দেখি, সৰ্ব্বনাশ!”

    এই পর্য্যন্ত বোলে, অমরকুমারী দুই হাতে মুখখানি ঢেকে, হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন, বড় বড় নিশ্বাস পোড়তে লাগলো। বিষাদ-বিস্ময় চেপে রেখে, অনেক রকম সান্ত্বনা কোরে, বুঝিয়ে বুঝিয়ে একটু শান্ত কোরে, করুণবচনে আমি বোল্লেম, শেষের ঘটনা সব আমি জানি। আমিও তখন কাশীতে ছিলেম; মোহনবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তাঁরই মুখে শুনেছিলেন, তার পরিবারের জ্বরবিকার। আমি দেখতে গিয়েছিলেম; পূর্ব্বেও দেখা ছিল, রুগ্ন-শয্যাতেও সেই চেহারা আমি দেখি। চেহারা দেখে আমার ধারণা হয়েছিল, তুমি। যে দিন মত্যুসংবাদ পাই, সে দিন আমার দুঃখের অন্ত ছিল না; কি করা যায়, ঈশ্বরাধীন কাৰ্য্য, আপনা আপনি কতকটা প্রবোধ পেয়েছিলেম গতস্য শোচনা নাস্তি। এখন আর তুমি কেঁদো না; শেষকথাগুলি আমারে বল। পত্ৰখানা পাঠ কোরে তার পর তুমি কি কোল্লে?”

    নিশ্বাস ফেলে, চক্ষের জল মুছে, বিষাদিনী বল্লেন, “তার পর? সেই সময় আমার মায়ের সেই রোগটা অতিশয় বেড়ে উঠেছিল; মনে কোরেছিলেম, একজন লোক সঙ্গে কোরে কাশীতে আমি চোলে যাব, মায়ের পীড়ার জন্য যেতে পারি নাই। হায় হায়! সেই রোগে মা আমার মায়া-মমতায় জলাঞ্জলি দিয়ে, আমারে অকুলপাথারে ভাসিয়ে, জন্মের মত পাপসংসার পরিত্যাগ কোরে চোলে যান! মাতৃহারা হয়ে তিনদিন আমি অন্ন-জল ত্যাগ কোরে অজ্ঞান ছিলেম। তার পর কি হলো, বলি শুন। মায়ের শেষ অবস্থায় যিনি চিকিৎসা কোরেছিলেন, তাঁর পায়ে ধোরে কেঁদে কেঁদে কাশী যাবার জন্য ব্যগ্রতা জানাই, দয়া কোরে তিনি আমাকে কাশীতে নিয়ে যান; অনেক অনুসন্ধানের পর ঠিকানাটা জানতে পেরে সেই সৰ্ব্বনাশের কথা আমি শুনি; জগৎ-সংসার অন্ধকার দেখি; দেশে ফিরে আসবো না, অন্নপূর্ণা-বিশ্বেশ্বরের নাম কোরে কাশীর গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে দুঃখের জীবনের অবসান কোরবো, এই তখন আমার সংকল্প হয়; দেশে ফিরে আসবে না, কার কাছেই বা আসবো? প্রাণবিসর্জ্জন করাই তখন একমাত্র গতি, এইটীই আমি স্থির ভাবলেম। ভাবলেম বটে, কিন্তু সিদ্ধ হলো না; যিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন, নানা প্রকার প্রবোধ দিয়ে তিনি আমকে এই দেশে নিয়ে এসেছেন। যে বাড়ীতে এখন আমি আছি, তাঁরই এই বাড়ী; তাঁরে আমি পিতা বলি, তিনি আময়ে কন্যার মত স্নেহ করেন, তদবধি এইখানেই আমি রয়েছি। জাতিতে তিনি কায়স্থ, কিন্তু চিকিৎসাবিদ্যা জানেন, বীরভূমে কবিরাজী কোত্তেন, সেই সূত্রেই মায়ের চিকিৎসার জন্য তাঁরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।”

    এই সব পরিচয় দিয়ে অমরকুমারী পুনৰ্ব্বার হা-হুতাশে অবিরল অশ্রুবর্ষণ কোতে লাগলেন। আবার নানা প্রকারে সান্ত্বনা কোরে, কথার কৌশলে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আজ রাত্রে প্রথমে তোমারে এখানে দেখে, প্রেতমূর্ত্তি মনে কোরে আমি ভয় পেয়েছিলেম, সেটা কি তুমি আশ্চর্য্য মনে কর?”

    পুনরায় নেত্রমার্জ্জন কোরে অমরকুমারী বোল্লেন, “কিছুই আশ্চর্য্য নয়।— কেন? সে কথা কি তুমি ভুলে গিয়েছ? তোমারে আমি বোলেছিলেম, দিদি আর আমি, দুজনেই আমরা রূপে অভেদ। গঠনে, বর্ণে, অবয়বে কিছুই ভেদ ছিল না। দিদি আমার চেয়ে প্রায় দু-বছরের বড় ছিল, কিন্তু আমার গঠন কিছু দীর্ঘ, দিদি একটু বেঁটে, সেইজন্য মাথায় মাথায় সমান দেখাতো। দিদির নাম ছিল সমরকুমারী, সে কথাও তোমাকে আমি বোলেছি;—দুজনে আমরা এক জায়গায় দাঁড়ালে, কে সমর, কে অমর, চেনা যেতো না; একটীকে রেখে তার বদলে আর একটীকে এনে দিলে কেহই কিছু প্রভেদ বুঝতে পাত্তো না। অভেদ রূপ। গায়ের ছোট ছোট লোমগুলি পর্য্যন্ত, মাথার চুলগুলি পর্য্যন্ত ঠিক একসমান। হায় হায় হায়! দিদি আমার কোথায় গেল!”

    পাশকথা পেড়ে তখন আমি কুমারীকে অন্যমনস্ক করবার চেষ্টা কোত্তে লাগলেম। আমার একটা বিষম ভ্রম, বিষম সন্দেহ এত দিনের পর দূর হয়ে গেল। দূরপথে সমরকুমারীকে দেখে বার বার আমি অমরকুমারী মনে কোরেছিলেম, এখানে—এই মুর্শিদাবাদে সজীব অমরকুমারীকে দেখে ভূত মনে কোরেছিলেম, সে দুর্জ্জয় ভ্রমটা আর থাকলে না; ভ্রমের পরিবর্ত্তে, সন্দেহের পরিবর্ত্তে অভাবনীয় আনন্দের উদয়। আনন্দোদয় হলো বটে, কিন্তু অমরের জননীর মত্যু-সংবাদে প্রাণে বড় ব্যথা লাগলো; দুষ্টলোকের চক্রে সমরকুমারী কুলকলঙ্কিনী হয়েছিল, তথাপি সেই অভাগিনীর শোচনীয় মৃত্যু-স্মরণে মন কেমন কাতর হলো। উঃ! মোহনবাবু কি ভয়ঙ্কর লোক! তাঁর গতি-ক্রিয়া দেখে যেরুপ আমি অনুমান কোরেছিলেম, কাশীধামে রমেন্দুবাবুর কাছে যে ভাবে তাঁর চিত্র এঁকেছিলেম, সমস্তই ঠিক! সব আমি বুঝলেম।

    রাত্রি প্রায় শেষ হয়ে এলো। গ্রামের মধ্যে মহাসমারোহে রাসযাত্রা, বাড়ীর লোকেরা নিশ্চয়ই সকাল সকাল গাত্রোত্থান কোরবেন। অমরকুমারীর সঙ্গে নির্জ্জনে আর অধিকক্ষণ একগৃহে থাকা ভাল হয় না, অতএব চাঞ্চল্য জানিয়ে আমি বোল্লেম, “অমর! তুমি এখন অন্যঘরে যাও, বাড়ীর লোকেরা যদি আমাদের দুজনকে এক জায়গায় দেখতে পান, আসল তত্ত্ব না বুঝে, অন্য প্রকার সন্দেহ কোত্তে পারেন। ঊষাকাল উপস্থিত, এখন তুমি তোমার আপনার শষ্যায় গিয়ে একটু শুয়ে থাকো।” অমরকুমারী বল্লেন, “সন্দেহ করবার কোন কারণ থাকবে না, এখানে এসে অবধি এ বাড়ীর সকলের কাছে কতবার আমি তোমার গল্প কোরেছি, পরিচয় পেলে সন্দেহ করা দূরে থাকুক, সকলেই বরং তুষ্ট হবেন। আচ্ছা, তুমি বোলচো, আমি এখন যাই, কিন্তু আজ তোমার এখান থেকে যাওয়া হবে না; তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।”

    অমরকুমারী গেলেন, শয্যার উপর আমি বসে থাকলেম। আমার সঙ্গে অমরকুমারীর অনেক কথা আছে, অমরকুমারীর মুখে এই কথা আমি শুনেলেম; আমার মুখে যদি কেহ শুনে, আমি বোলবো, অমরকুমারীর সঙ্গে আমারও অনেক কথা আছে। অমরকুমারীর কথা অপেক্ষা আমার কথার জোর বেশী। অমরকুমারী বল্লেন, আজ তোমার যাওয়া হবে না। সে অনুরোধটা কি কোরে রক্ষা হয়? আমি তো এখানে স্বাধীন নই, পশুপতিবাবু যদি বলেন, “চল হরিদাস!” দ্বিরুক্তি কোত্তে না পেরে হরিদাস তখনি তখনি পালিত মেষশাবকের ন্যায় তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চোলে যেতে বাধ্য হবে। থাকাটা কিরূপে হয়? না থাকলেও তো কথাগুলি শুনা হয় না, আমার কথাগুলিও বলা হয় না।

    আমার ভাবনার অবসর না দিয়েই ঊষাসতী চোলে গেলেন; কাননের বৃক্ষে বৃক্ষে সুগায়ক বিহগকুল নানাবিধ রাগিণীতে ঊষাকে বন্দনা কোরে, প্রভাতী গীত আরম্ভ কোল্লেন। যে ঘরে আমি শুয়েছিলেম, সেই ঘরের বাহিরদিকে যত্ন-রোপিত গুটীকতক মল্লিকাফুলের গাছ ছিল, ঊষার শিশিরে পরিষিক্ত হয়ে, সেই গাছগুলি নব-প্রস্ফুটিত মল্লিকাভার মাথায় কোরে, প্রভাত-সমীরণকে মনোহর সুগন্ধ উপহার দিতে লাগলো; গবাক্ষদ্বারগুলি উন্মুক্ত কোরে সেই সুবাস আঘ্রাণে স্বচ্ছন্দমনে আমি সেই নিশা-জাগরণের ক্লান্তি দূর কোত্তে লাগলেম; কাকেরা কা কা রবে চতুর্দ্দিকে আহার অন্বেষণে উড়ে যেতে লাগলো। প্রভাতকাল সমাগত; শিশিরাচ্ছন্ন প্রভাত। যতক্ষণ পূর্ব্বাকাশে নব-প্রভাকর সমুদিত হোলেন, ততক্ষণ পর্য্যন্ত ঘর থেকে আমি বেরুলেম না। গবাক্ষপথে প্রভাতআলোক সন্দর্শনে আমার হাসি এলো। ভূতের ভয়! আমার ভূতের ভয় ভূতকালের গর্ভে নিহিত হয়ে গেল; মনে মনে আমি হাস্য কোল্লেম। সূৰ্য্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দুটী যুবাপুরুষ গৃহ-প্রাঙ্গণে দণ্ডায়মান;—মণিভূষণ আর পশুপতি।

  • চতুর্ব্বিংশ কল্প : নূতন আনন্দ;—নূতন ভয়।

    চতুর্ব্বিংশ কল্প : নূতন আনন্দ;—নূতন ভয়।

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    চতুর্ব্বিংশ কল্প : নূতন আনন্দ;—নূতন ভয়।

    ঘর থেকে বেরিয়ে ছোটবাবুর সম্মুখে গিয়ে আমি দাঁড়ালেম। যে ঘরখানি আমার শয়নের জন্য নির্দ্দিষ্ট হয়েছিল, সে ঘরে প্রবেশ না কোরে, মণিভূষণের সঙ্গে তিনি আর একটী ঘরে গিয়ে বোসলেন, আমিও তাদের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘরে গেলেম। ছোটবাবু আমারে প্রথমে কোন কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেন না, দু-তিনবার আমার মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে কেবল একটু হাস্য কোল্লেন মাত্র। অকারণে অকস্মাৎ কেন সেপ্রকার হাস্য, ভাবটা আমি বুঝতে পাল্লেম না; হাস্যের দিকে চেয়ে আছি, সস্মিতবদনে মণিভূষণ আমাকে সম্বোধন কোরে বোল্লেন, “পশুপতিবাবুর মুখে তোমার সম্ভবমত পরিচয় আমি শুনেছি, কিন্তু এ পরিচয় পাবার অগ্রে তোমার সম্বন্ধে অনেক কথা আমার শুনা হয়েছিল, তোমাকে দেখে আমরা সকলেই সন্তুষ্ট হয়েছি।” এই কথাগুলি বোলে শেষে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “রাত্রে এখানে তোমার কোন কষ্ট হয় নাই তো?”

    বিনীতবদনে উত্তরদান কোরে ছোটবাবুর মুখের দিকে আবার আমি চাইলেম। বাবুর মুখে হাসি মিলায় নাই। উপস্থিতবুদ্ধি অনেক সময়ে চপলতার হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করে, উপস্থিতবুদ্ধিতে আমি বুঝলেম, অমরকুমারীর মুখে মণিভূষণ আমার কথা শুনেছিলেন, তাঁদের বাড়ীর পরিবারেরাও শুনেছিলেন, মণিভূষণ হয় তো ছোটবাবুর কাছে সেই গল্প কোরেছেন, তাতেই আমার পানে চেয়ে ছোটবাবুর হাস্য, সেই অনুমান ঠিক; সুতরাং হাস্যের কারণ জিজ্ঞাসা কোরে আমারে আর চপলতা প্রকাশ কোত্তে হলো না; প্রথমবারের হাস্য দেখে মনে যেমন একটা ধোঁকা লেগেছিল, সে ধোঁকাও আর থাকলে না।

    তাঁদের দুজনের কাছে আমি চুপ কোরে বেসে আছি, তাঁরা দুজনে পরস্পর এ কথা সে কথা পাঁচ কথা বলাবলি কোচ্ছেন, হঠাৎ আমার দিকে চেয়ে ছোটবাবু বোল্লেন, “আজ আর যাওয়া হবে না হরিদাস, বাবুরা বিস্তর অনুরোধ কোরে ধোরে বোসেছেন, আজ শেষরাস। অনেকরকম নূতন তামাসা হবে, না দেখে যাওয়া হবে না এইকথাই তাঁরা বোলেছেন। আমিও রাজী হয়েছি। দিনের বেলা তুমি এইখানেই থাকো, ব্রাহ্মণ এসে তোমাদের খাবার সামগ্রী দিয়ে যাবে, এইখানেই থাকো।” এই পর্য্যন্ত বোলে আবার একটু হেসে তিনি আরো বোল্লেন, “এ বাড়ী তোমার নিতান্ত পরের বাড়ী নয়, অনেক কথা আমি শুনেছি, স্বচ্ছন্দে তুমি এখানে থাকতে পারবে; তাই তুমি থাকো; কল্য প্রাতঃকালে বাড়ী যাওয়া যাবে।”

    মাথা হেঁট কোরে ঐ কথাগুলি আমি শুনলেম। মনে বড়ই উল্লাস। ধন্য জগদীশ! নিজে আমি মুখ ফুটে যে কথাটী বোলতে পাত্তেম না, ছোটবাবু নিজেই সেই কথা বোলে আমার আশা পূর্ণ কোল্লেন। অমরকুমারীর অনুরোধ রক্ষা করবার পন্থাটী পরিষ্কার হোলো। মণিভূষণও ছোটবাবুর বাক্যে অনুমোদন কোল্লেন।

    খানিকক্ষণ সেইখানে থেকে, নিকটস্থ সরোবরে স্নান-আহ্নিক সেরে, তাঁরা উভয়ে পুনরায় রাসবাড়ীতে চোলে গেলেন, আমি থাকলেম। বাড়ীর যিনি কৰ্ত্তা, যাঁর নাম শান্তিরাম দত্ত, যিনি অমরকুমারীর জননীর চিকিৎসা কোরেছিলেন, যিনি যত্ন কোরে অমরকুমারীকে আপন বাড়ীতে এনে রেখেছেন, তিনি আমারে যেন পত্রতুল্য স্নেহ কোত্তে লাগলেন; তাঁর বিধবা কন্যা-দুটীও আমারে যেন মায়ের পেটের ভাই মনে কোল্লেন। আমার সকল সন্দেহ দূর হয়ে গেল।

    রাত্রে যে ঘরে আমি শয়ন কোরেছিলেম, এই দিন বৈকালে সেই ঘরে নির্জ্জনে আমি আর অমরকুমারী। আমার মুখে প্রথমসংবাদ—“আজ আমার থাকা হবে, থাকবার জন্য তুমি আমারে অনুরোধ কোরেছিলে, হয় কি না হয় ভেবে আমি উদ্বিগ্ন হোচ্ছিল্লেম, সে উদ্বেগের শান্তি হয়েছে, রাসবাড়ীর বাবুদের অনুরোধে পশুপতিবাবু আজ সেইখানে থাকবেন, আমি এই বাড়ীতেই থাকবো। দেখ অমর। তোমার দিদির সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ ছিল না, তীর্থপথের চটীতে আগুনের মুখ থেকে যখন তাঁরে আমি উদ্ধার করি, তখন ভেবেছিলেম তুমি;— নাম ধরে ডেকেছিলেম, মুখের কাছে বোসেছিলেম, নৌকা পর্য্যন্ত গিয়েছিলেম, তোমার দিদি আমারে চিনতে পারেন নাই। তার পর কাশীধামে জ্বরবিকারে তোমার দিদি যখন শয্যাশায়িনী, তখনো আমি ভেবেছিলেম তুমি; তখনো তোমার দিদি আমারে চিনতে পারেন নাই; কত কথা জিজ্ঞাসা কোরেছিলেম, একটী কথারও উত্তর দেন নাই। বিস্ময়ে, সন্দেহে, অভিমানে আমি স্থির কোরেছিলেম, তুমি আমারে ভুলে গিয়েছ! সত্যই আমার অভিমান হয়েছিল! সে অভিমান আজ দূর হলো।”

    যতক্ষণ আমি ঐ কথাগুলি বোল্লেম, ততক্ষণ অমরকুমারীর মুখখানি ক্রমে ক্রমে মলিন হয়ে আসছিল, আমার কথা শেষ হবা-মাত্র অশ্রু-প্রবাহে সেই মুখখানি অভিষিক্ত হলো। দুই হস্তে অশ্রু- মার্জ্জন কোরে গদগদস্বরে অমরকুমারী বোল্লেন, অভিমান তো আসতেই পারে!—অভেদরূপের প্রতারণা ঐ রকম! হরিদাস নয়, অথচ ঠিক হরিদাসের মতন আর একখানি মূর্ত্তি দৈবাৎ কোথাও যদি আমি দেখি, হরিদাস ভেবে তার সঙ্গে যদি আমি কথা কোই; সে যদি কথা না কয়, তারে যদি আমি কোন কথা জিজ্ঞাসা করি, সে যদি উত্তর না দেয়, তা হোলে আমারও ঐ রকম অভিমান আসে! অভেদরূপের প্রতারণা ঐ রকম!—থাক, ও সব কথা যেতে দাও; যতই মনে করা যায়, শৈশবস্মৃতির জাগরণে বুক ততই ভারী হয়। দুঃখী আমরা চিরদিন,—তবু—তবুও দুঃখের কথা মনে কোত্তে গেলে নূতন নূতন দুঃখের আগুনে মন-প্রাণ যেন দগ্ধ হয়ে যায়!—দুঃখের কথা এখন ছেড়ে দাও, এখনকার বক্তব্য কি, সেইটী স্থির কর। তুমি তো এই মুর্শিদাবাদে এক বাড়ীতে চাকরী কোচ্চো, আমি তো এই বাড়ীতে একরকম মেয়ের মতন রয়েছি, এইরকমেই কি চিরদিন যাবে? চাকরী, —কখন আছে, কখন নাই; চাকরীটা হয় তো ছুটেও যেতে পারে, ইচ্ছা হোলে তুমি নিজেই হয় তো চাকরী ছেড়ে অন্যদেশে চোলে যেতে পার। আমারও প্রায় সেইরকম; যদিও চাকরী নয়, কিন্তু চিরদিন যে এই বাড়ীতে থাকবো কিম্বা থাকতে পাবো, এমন কথা কে বোলতে পারে? সেইজন্যই বোলচি, এখনকার কর্ত্তব্য কি, সেইটী স্থির কর।”

    আমার মনের ভিতর তখন যে কিসের খেলা হোচ্ছিল, অমরকুমারী সেটা জানতেন না। অনেকরকমের অনেকগুলি কথা অমরকুমারীর মধুর রসনায় উদ্গীরিত হলো, গুটীকতক আমার কাণে গেল, কতকগুলি গেলই না! কথাই তো ঠিক, একটাও তখন কাজের কথা বোধ হলো না। উষাকাল থেকে মন আমার বড়ই চঞ্চল। কোন কথার উত্তর না দিয়ে, উদাসভাবে চেয়ে, অতি সাবধানে চুপি চুপি আমি বোল্লেম, “আচ্ছা অমর। কর্ত্তব্য স্থির করাটা তো পরের কথা, এখন স্পষ্ট কোরে বল দেখি, ব্যাপারখানা কি? রাত্রে তুমি বোলেছ, যে লোকটাকে তুমি এতদিন বাবা বোলে জানতে, সেই লোকটা—ব্যাপারখানা কি? সত্য কি সে লোকটা তোমার বাবা নয়? কে সে? তার বাড়ীতে তবে তোমরা কেন ছিলে?”

    “পোড়কপাল আমাদের!”—মাথাটী উঁচু কোরে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে অমরকুমারী বোল্লেন, “পোড়াকপাল আমাদের। কেন যে তার বাড়ীতে আমরা ছিলেম, আমাদের পোড়াকপালের লিখন লেখবার বিধাতা যিনি, তিনিই তা বোলতে পারেন! লোকটার চেহারা যেমন, দেখেচোই তুমি, ঠিক যেন একটা হনুমান, তেমন হনুমান কি ভাল-মানুষের ঘরে জন্মে?—তেমন হনুমান কি আমাদের বাবা হেতে পারে? ছোটবেলা থেকে ঐ রকম দেখে দেখে আসছিলেম, এক একবার বাবা বোলেও ডাকতেম, একটুখানি জ্ঞান হয়ে অবধি কেমন একটা ঘৃণা এসেছিল, দুরন্ত দুরন্ত সন্দেহ এসেছিল, সেটাকে বাবা বলে ডাকতে আসলে প্রবৃত্তিই হোতো না! আহা! মা আমার দেবকন্যা, দেবলোকে প্রস্থান কোরেছেন, সেই স্বর্গবাসিনীর মুখে আমি শুনেছিলেম, বেশীদিন আমরা সেই হনুমানের বাড়ীতে ছিলেম না;—দিদি যখন দুবছরের, আমি যখন একমাসের, সেই সময় হনুমানটা আমাদের কোথা থেকে ধোরে এনে নিজের বাড়ীতে কয়েদ রেখেছিল! রাত্রে একদিনও বাড়ীতে থাকতো না, আমার মায়ের সঙ্গে একটাও ভালকথা হোতো না, মা আমার আমাদের দুটী বোনকে নিয়ে একখানা ছেড়ামাদুরে শুয়ে থাকতেন, তাঁর চক্ষের জলে রোজ রাত্রে সেই মাদুরখানা ভিজে যেতো! হনুমানটার আক্কেল যেমন, তাড়ন-পীড়ন যেমন, সব কথা তোমারে বোলেছি, কতক কতক চক্ষেও তুমি দেখেচো, মানুষে কি সেরকম পিশাচের কাজ কোত্তে পারে? মুণ্ডুটা ছাড়া হাত-পাগুলোর গড়ন কতকটা মানুষের মতন, কোন দেশের মানুষ, ঠিক পাওয়া যায় না! “আহা! মা যখন আমার শেষদশায় শয্যাগত হন, বেগতিক বুঝে হনুমানটা তখন কোথায় পালিয়ে গেল, উদ্দেশ হলো না। পাড়ার একটী লোকের হাতে পায়ে ধরে আমিই কবিরাজ ডাকাই, পাড়ার লোকেরাই দয়া কোরে শেষের কাজগুলি নিৰ্ব্বাহ কোরে দেন। যিনি কবিরাজ, তিনি এই বাড়ীর কর্ত্তা, তিনি আমার কত উপকার কোরেছেন, এখনো কোচ্চেন, সে সব তুমি শুনেচ। আর—” এইখানে একবার থেমে, চকিতা-কুরঙ্গিনীর ন্যায় চক্ষু ঘুরিয়ে চারিদিকে চেয়ে, আতঙ্কে সর্ব্বাঙ্গ কাঁপিয়ে, শঙ্কিতকণ্ঠে অমরকুমারী বল্লেন, “ও হরিদাস! বোলতে তোমারে ভুলে গিয়েছি। এখানেও আমি নিরাপদ নই! এখানেও সেই পাপ পিশাচটা আমার সন্ধানে সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোন দেশে উধাও হয়ে উড়ে গিয়েছিল, মাসখানেক হলো, কে জানে, কি রকমে কোথা থেকে কি জানতে পেরে এই গ্রামে এসেছে। দিনের বেলা এদিকে আসে না কিম্বা হয় তো আসে, আমি দেখতে পাই না, লুকিয়ে লুকিয়ে ঘুরে বেড়ায়। একদিন সন্ধ্যাকালে ঘরে ঘরে আমি প্রদীপ জ্বালচি, একটা জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছি, দেখি, সেই বিকটমূর্ত্তি সেই জানলার বাইরে হাত পাঁচেক তফাতে একটা তেতুলগাছে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার কাছেও একটা মানুষ! দুজনেই তখন অন্যদিকে চেয়ে ছিল, আমারে দেখতে পেলে না। আমি তাদের দেখতে পেলেম;—ভাল কোরে না দেখে আগে ভেবেছিলেম, বুঝি চোর, তেঁতুলতলায় তেঁতুল চুরি কোত্তে এসেছে, তার পর যখন ঠাউরে ঠাউরে দেখলেম, তখন আমার সৰ্ব্বশরীর কেঁপে উঠলো। ঠিক সেই হনুমান!—দেখেই অমনি প্রদীপটা নিবিয়ে ফেলে, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘর থেকে আমি বেরিয়ে পোড়লেম। তারা সেখানে কতক্ষণ ছিল, কি কোরেছিল, তার পর কোথায় গেল, আর কেহ তাদের দেখেছিল কি না, তা আমি জানি না। আর একদিন—না হরিদাস, আর আমি বোলতে পারবো না। এখানেও আমি নিরাপদ নই! সেই অবধি আর আমি বাড়ীর বাহির হই না! কখন আসে, কখন দেখে, কখন ধরে, সৰ্ব্বদাই আমার প্রাণে সেই ভয়; ঘরের ভিতর বোসেও আমি ভয়ে কাঁপি।”

    এত কথা হোচ্ছিল, স্থির হয়ে নূতন কৌতুকে আমি শ্রবণ কোচ্ছিলেম, অমরকুমারীর শেষের কথায় আমি এককালে স্তম্ভিত হয়ে গেলেম। রক্তদন্ত মুর্শিদাবাদে—সত্যই কি এ লোকটা সৰ্ব্বব্যাপী?—তাই তো দেখছি। এ পাপ যেমন সঙ্গে সঙ্গে ফিরছে, বিপদও তেমনি পদে পদে আমার সঙ্গে সাথী হয়ে রয়েছে। এবারে আবার অমরকুমারীকে ধরবার চেষ্টা। অনেকক্ষণ আমি অমরকুমারীর কথায় কোন উত্তর কোত্তে পাল্লেম না। সন্ধ্যা হয়ে গেল, মণিভূষণ একবার বাড়ীতে এলেন, অল্পক্ষণ থেকে আমারে সঙ্গে কোরে নিয়ে আবার রাসবাড়ীতে গেলেন। সেখানে পশুপতিবাবুর সঙ্গে দেখা হলো, রাসোৎসবের দুটী পাঁচটী নূতন তামাসাও দেখলেম, আতসবাজী দেখবার জন্য আর উৎসুক থাকলো না, অমরকুমারীর সঙ্গে আরো অনেক কথা বাকী ছিল, ছোটবাবুকে বোলে শীঘ্র শীঘ্র আমি চোলে এলেম। রাস্তায় অনেক লোক যাওয়া-আসা কোচ্ছিল, দূরও বেশী নয়, জ্যোৎস্নারাত্রি, তথাপি আমি বাবুদের বাড়ীর একজন দরোয়ানকে সঙ্গে নিতে বাধ্য হোলেম। রক্তদন্তের ভয়ে একা আসতে সাহস হলো না।

    বাড়ীতে এসে পৌঁছেই প্রথমে কৰ্ত্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ। ওতে ঘাতে রক্তদন্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে, কৰ্ত্তা সেটা শুনেছিলেন কি না, অমরের মুখে সে কথা আমি শুনি নাই, অমর হয় তো সে কথা তাঁদের বলেন নাই; তথাপি কর্ত্তা আমারে কাছে বোসিয়ে, অনেকরকম আদরের কথা বোলে, শেষকালে বোল্লেন, “তোমাকে দেখে আমি বড় তুষ্ট হয়েছি। তুমি যখন বীরভূমে গিয়েছিলে, তখনো আমি বীরভূমে ছিলেম, চিকিৎসা কোত্তেম, শিউড়ীতেই আমার বাসা ছিল, আমার সঙ্গে তোমার সে সময় দেখা-সাক্ষাতের কোন সুযোগ ঘটে নাই; সম্প্রতি অমরকুমারীর মুখে তোমার অনেক কথা আমি শুনেছি। জননীর সঙ্গে অমরকুমারী সেখানে যে লোকটার বাড়ীতে ছিলেন, সে লোকটা বড় ভয়ঙ্কর; কোথাকার লোক, কি জাতি, কোথা থেকে এসে বীরভূমে আড্ডা কোরেছিল, সেখানকার লোকেও সে সংবাদ জানেন না; কি তার কার্য্য, তাও কেহ বোলতে পারেন না। অমরের মুখে শুনলেম, সেই লোক তোমার উপর বিষম দৌরাত্ম কোরেছিল, অমরকুমারীর কৌশলে তুমি পালিয়ে গিয়েছিলে। সাবধানে থেকো, সে লোকের খপরে পোড়লে সহজে নিষ্কৃতি পাবে না। আমি শুনতে পাচ্ছি, সে লোক এই গ্রামে এসেছে; নামটা শুনতে পাচ্ছি না,—নামটা এখানে জানবেই বা কে, কিন্তু দুই একজন তাকে দেখেছে, চেহারাটাও বোলেছে। কেহ বলে বাঁদর, কেহ বলে রাক্ষস। তুমি সাবধান থেকো, অমরকুমারীকেও আমি খুব সাবধান কোরে রেখেছি; লোকটা এ গ্রামে এসেছে, অমরকে আমি সে কথা বলি নাই, তোমাকে বোল্লম; খবরদার—খবরদার! কদাপি তুমি রাত্রিকালে একাকী পথে বেরিয়ো না!”

    কথাগুলি আমি শুনলেম, নূতন বোধ হলো না, কিন্তু কৰ্ত্তার কথায় সাবধানে থাকবো, এইরূপে উত্তর দিলেম। কৰ্ত্তা আমাকে আরো অনেক কথা বোল্লেন, সে সকল কথার সঙ্গে পাঠক-মহাশয়ের তাদৃশ কোন সম্বন্ধ নাই, সুতরাং বাগ্‌বিস্তার করা অনাবশ্যক বিবেচনা কোল্লেম। এ সময় কাজের কথা অনেক।

    গত রাত্রে যে ঘরে আমি শয়ন কোরেছিলেন, সেই ঘরে গিয়ে বোসলেম। মনের ভিতর আনন্দ আর ভয়। অমরকুমারী বেঁচে আছেন, মোহনলালের কাছে যারে আমি দেখেছিলেম, কাশীতে যার মৃত্যু হয়েছে, সে মেয়েটী অমরকুমারী নয়, অমরকুমারীর দিদি, অমরকুমারীর মুখে এত দিনের পর সেই রহস্যের মৰ্ম্ম আমি অবগত হোলেম; অমরকুমারীর সঙ্গে আবার আমার দেখা হলো; বিধাতা যদি অপ্রসন্ন না হন, কোন না কোন স্থানে আবার আমি অমরকুমারীর দেখা পাব, এই আমার আনন্দ;—নূতন আনন্দ। ভয় তবে কিসের? রক্তদন্ত মুর্শিদাবাদে এসেছে, অমরকুমারী মুর্শিদাবাদে, আমিও মুর্শিদাবাদে আছি, কখন কি ঘটে, দুরন্ত চক্ৰী লোকটা কখন কি সূত্রে আমাদের উভয়কে কোন বিপদে ফেলে, সেই ভয়;—এই আমার নূতন ভয়!

    মনে মনে এই সব কথা ভাবছি, অমরকুমারী এলেন। মনে কোন প্রকার ভয় আছে, মুখ দেখে তেমন লক্ষণ আমি কিছুই বুঝলেম না। বেশ প্রফুল্লবদনে অমরকুমারী আমার কাছে এসে বোসলেন। কথা আরম্ভ হলো। প্রাসঙ্গিক অপ্রাসঙ্গিক পাঁচ প্রকার কথার পর সন্দেহ-কৌতূহলে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আচ্ছা অমর, সেই জটাধর—যার নাম আমি রক্তদন্ত রেখেছি, সেই লোকটা তোমাদের কেহই নয়, তা তো শুনেছি। শুনাটা নূতন বটে, কিন্তু প্রথমদিন যখন তোমাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়, তখনি আমার মনে খটকা লেগেছিল, বিধাতার এটা কেমন সংঘটন! তেমন সুরসুন্দরী দয়াময়ী রমণী রাক্ষসতুল্য রক্তদন্তের স্ত্রী, এমন সুরবালা পদ্মমুখী বালিকা সেই রক্তদন্তের কন্যা, কিছুতেই আমার বিশ্বাস হয় না। সেই স্বভাবসিদ্ধ অনুমানটী এখন সত্য হয়ে দাঁড়ালো। আচ্ছা, রক্তদন্ত তোমাদের কেহই নয়;—আচ্ছা, তবে তোমরা সত্যপরিচয়ে কে, তোমার সত্য-পিতাই বা কে, কোথায় তোমার জন্ম, তোমার জননীই বা কোন দেশে ছিলেন, তা কি তুমি জানতে পেরেছ?”

    আমার মুখপানে চেয়ে অমরকুমারী উত্তর কোল্লেন, “কিছুই আমি জানি না। মা আমারে সে সব কথা একদিনও বলেন নাই;—মরণকালে কেবল চক্ষের জলে ভেসে চুপি চুপি আমারে বোলেছিলেন, ‘ঐ লোকটা আমাদের কেহই নয়, অন্যদেশ থেকে ধোরে এনে বীরভূমে আমাদের রেখেছিল।’ কেবল এইটুকু মাত্র;—এইটুকু মাত্রই আমি শুনেছি। মা যখন ঐ কথা আমায় বলে, কবিরাজমহাশয় তখন কাছে ছিলেন, তিনিও ঐটুকু শুনেছেন। সেই কবিরাজমহাশয় এই বাড়ীর কর্ত্তা তুমি জানতে পেরেচো।”

    গত রাত্রে যেমন একজন ব্রাহ্মণ এসে রাসবাড়ীর রাধাকৃষ্ণের প্রসাদ এনে দিয়ে গিয়েছিল, এ রাত্রেও সেই রকমে দিয়ে গেল, আমরা আহার কোল্লেম। রাত্রি দ্বিপ্রহরের পূর্ব্বে অমরকুমারী যখন শয়ন কোত্তে যান, সেই সময় ছলছলচক্ষে অর্দ্ধবদ্ধঘরে আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “হরিদাস! তবে কি তুমি কল্য প্রভাতেই চোলে যাবে? না হরিদাস, যেয়ো না! যতদিন আমি এখানে থাকি, ততদিন তুমিও থাকো। আচ্ছা হরিদাস, আমি এখানে কতদিন থাকবো, তা কি তুমি বলতে পার?”

    বাষ্পবেগে আমারো চক্ষু ছল ছল কোরে এলো। অর্দ্ধরুদ্ধ-কণ্ঠে আমি উত্তর কোল্লেম, কতদিন তুমি এখানে থাকবে, বিধাতার ইচ্ছা, বিধাতাই সে কথা বোলতে পারেন; আমি কেমন কোরে বোলবো? আমায় তুমি এখানে থাকতে বোলছো, তাই বা কি কোরে হয়? আমি একজন বড়লোকের বাড়ীতে চাকরী কোচ্ছি, তাঁর ছোটভাই আমারে সঙ্গে কোরে এনেছেন, তিনি আমারে রেখে যাবেন কেন? যদিই বা বোলে কোয়ে আর দুই একদিন এখানে থাকবার অনুমতি নিতে পারি, তাতেই বা কি উপকার হবে? কল্যই আমি যাব। তুমি ভেবো না। যেখানে আমি থাকি, এখান থেকে সে স্থান বেশী দূর নয়; মাঝে মাঝে এসে তোমারে আমি দেখে যাব। কৰ্ত্তা তোমারে খুব ভালবাসেন, মণিভূষণটীও দিব্য সৎ, পরিবারেরাও তোমারে ভালবাসেন, এখানে তোমার কোন প্রকার অযত্ন হবে না। ভয় কেবল রক্তদন্তের;—সাবধানে থাকলে সে লোকটাও কিছু কোত্তে পারবে না। রক্তদন্ত যদি এখানে রাস দেখতে এসে থাকে, দুদিন পরেই চোলে যাবে, তা হোলেই তুমি নিরাপদ হবে। মাঝে মাঝে এসে আমি তোমারে দেখে যাব। বিধাতার যদি মনে থাকে, সময় যদি শুভ হয়, আমাদের ভাগ্য যদি ভাল হয়, কতবার দেখা হবে; হয় তো চিরজীবন আমরা একবাড়ীতেই মনের সুখে থাকতে পারবো। চিন্তা কি?—ভেবো না, আশার আশ্বাসে অনেকেই ভবিষ্যৎ শুভদিনের মুখ চেয়ে থাকে, আশার আশ্বাসেই অনেক লোক প্রাণধারণ করে। চিন্তা কি?—এখন যাও, শয়ন কর গে।”

    অঞ্চলে নেত্ৰমাৰ্জ্জন কোরে, ধীরে ধীরে উঠে, আমার দিকে চাইতে চাইতে, অমরকুমারী মৃদুগতিতে গৃহান্তরে প্রবেশ কোল্লেন; নেত্রমার্জ্জন কোরে আমিও শয়ন কোল্লেম। প্রভাতে সূর্য্যোদয়ের পর ছোটবাবু এলেন, মণিভূষণ এলেন, আহারান্তে আমরা সেখান থেকে রওনা হব, এইরুপ স্থির হয়ে থাকলো। সে দিন আর রাসবাড়ীর প্রসাদের অপেক্ষা কোত্তে হলো না, একটী প্রতিবাসিনী ব্রাহ্মণকন্যা সেই বাড়ীতেই রন্ধনাদি কোরে যত্নপূৰ্ব্বক পরিবেশন কোল্লেন, পরিতোষরূপে আমরা আহার কোল্লেম। আহারের পর স্বতন্ত্রগৃহে অমরকুমারীর সঙ্গে একবার দেখা কোরে, পূৰ্ব্ববৎ আশ্বাস দিয়ে, আমি বিদায় চাইলেম। অমরকুমারীর চক্ষের জল নীরবে নির্গত হয়ে বক্ষঃস্থল প্লাবিত কোল্লে। আমি সে সময় আর বেশী কথা বোলতে পাল্লেম না, অবেগ সংবরণ কোত্তেও অক্ষম হোলেম, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে সংক্ষেপে কেবল চুপি চুপি বোল্লেম, “কেঁদো না!”

    অমরকুমারীকে বোল্লেম কেঁদো না, আমি নিজে কিন্তু অধোবদনে নীরবে না কেঁদে থাকতে পাল্লেম না; অনেক কষ্টে মনোযোগ সংবরণ কোরে শুষ্কনয়নে সে ঘর থেকে বেরুলেম; তার পর বাড়ীর সকলের কাছে বিদায় নিয়ে পশুপতিবাবুর সঙ্গে রাসবাড়ীতে গেলেম; মণিভূষণটীও আমাদের সঙ্গে থাকলেন। বেলা আড়াইপ্রহরের পর বাবুদের নিজের শকটানোহণে আমরা দুজনে যদুপুর গ্রামে ফিরে এলেম।

    রাধাকৃষ্ণের রাস; রাসাবসানে বোরাকুলীর রাধাকৃষ্ণ আপনাদের বারোমেসে মন্দিরে নিয়মিত নিত্যপূজায় পরিতুষ্ট থাকতে লাগলেন, আমি কিন্তু নিত্য নিয়মিত কার্য্যকলাপে পরিতুষ্ট থাকতে পাল্লেম না। আমার মনোমন্দিরে অভীষ্টদেবীরূপিণী অমরকুমারী অনুক্ষণ বিরাজ কোত্তে লাগলেন। সকল ভাবনা অপেক্ষা অমরকুমারীর ভাবনা আমার বেশী হয়ে উঠলো। সেই ভাবনার সঙ্গে রক্তদন্তের ভয়। সাঁ সাঁ কোরে হেমন্তের প্রথমমাস মার্গশীর্ষ বিদায় হয়ে গেল। ক্রমশই আমার চিত্ত অস্থির;—মাস বিদায় হলো আমার চিত্তের চিন্তা বিদায় হলো না। এইখানে একটা কথা বোলে রাখি। দীনবন্ধুবাবুর বাড়ীতে অনেক গুলি দরোয়ান, অনেকগুলি পালোয়ান। তারা সকলেই অস্ত্রশিক্ষায় নিপুণ, মল্লযুদ্ধে নিপুণ, পাঁচজন পালোয়ান বিলক্ষণ কুস্তিগীর। লাঠিখেলা, তলোয়ারখেলা, মুগুরভাঁজা, বন্দুকছোড়া, ধনুৰ্ব্বাণখেলা, এই সকল কার্যে অনেকেই দক্ষ। অবকাশকালে আমি বাবুদের অজ্ঞাতে ব্রহ্মময়ীর বাড়ীতে দুজন দরোয়ানের কাছে তলোয়ার, বন্দুক আর তীর ধনুকের ক্রীড়াকৌশল শিক্ষা কোরেছিলেম। অশ্বারোহণে পশুপতিবাবুর বড় সখ, তিনি আমার জন্য একটা ক্ষুদ্র টাট্টু নিৰ্ব্বাচন কোরে দিয়েছিলেন, ক্রমে ক্রমে অভ্যাস কোরে অশ্বারোহণে আমি একরকম পটু হয়েছিলেম। পশুপতিবাবুর সঙ্গে প্রতি রবিবার সকাল বিকাল দুইবেলা অশ্বারোহণে দূরস্থ ময়দানে ভ্রমণ কোত্তে যেতেম। আমার ঘোড়া প্রথম প্রথম কদমে কদমে চোলতো; ক্রমশঃ উৎসাহ, ক্ৰমশঃ সাহস, ক্ৰমশঃ গতিবেগশিক্ষা; ঘোড়াদৌড়ে ক্রমশই আমি পাকা হলেম। ছোটবাবুর ঘোড়ার সঙ্গে আমার ঘোড়ার সমান দৌড়। এক একবার বরং দ্রুতধাবনে আমার ঘোড়ার জিত হয়, ছোটবাবুর ঘোড়া আট দশ হাত পেছিয়ে পড়ে। আহ্লাদ কোরে ছোটবাবু আমার উপাধি দিয়েছিলেন, “খোকা ঘোড়সওয়ার!”—দীনবন্ধুবাবুর পত্নী সময়ে সময়ে আমারে খোকা বোলে ডাকতেন, সেই আদরে ব্যাকরণের কিঞ্চিৎ অবমাননা হোলেও, ঘোড়সওয়ার শব্দের পূর্ব্বে আমার “খোকা” বিশেষণ।

    চিত্ত কেমন সৰ্ব্বদাই অস্থির। অমরকুমারীকে দর্শন করবার ইচ্ছা নিত্য নিত্য নূতনবেগে বলবতী। অমরকুমারী কে, সে পরিচয়টী অজানা থাকলেও, পশুপতিবাবু শুনে এসেছেন, অমরকুমারীর সঙ্গে আমার বিশেষরূপে জানাশুনা, পরষ্পর মমতাবন্ধনও বিলক্ষণ;—পশুপতিবাবু সেটা জেনেছিলেন, কিন্তু বড়বাবু কিছু জানতেন না। পৌষমাসের পঞ্চম দিবসের প্রাতঃকালে বড়বাবুকে আমি বোল্লেম, “বোরাকুলী গ্রামে শান্তিরাম দত্তের বাড়ীতে একটী বালিকা এসেছে, সেই বালিকাটীকে আমি চিনি; সমান বয়স, সেইজন্য তার সঙ্গে আমার বেশ ভাব। বালিকার মা-বাপ নাই, বড় দুঃখিনী বালিকা। রাস দেখতে গিয়ে সেই বালিকাটাকে আমি দেখে এসেছি, আর একবার তারে দেখবার জন্য আমার মন কেমন করে। আপনি যদি অনুমতি করেন, আজ আমি সেই বালিকাটীকে একবার দেখে আসি।”

    ঈষৎ হাস্য কোরে বড়বাবু তৎক্ষণাৎ অনুমতি দিলেন। ছোটবাবুকে সেই কথা জানিয়ে আমি একজন দরোয়ান সঙ্গী চাইলেম; রাসের সময় সেই গ্রামে আমার একটা কালান্তক বৈরী এসেছিল, সেই কথাও তখন তারে জানালেম। সেই অকারণ বৈরীটা এখনো পর্য্যন্ত যদি সেখানে থাকে, একাকী যেতে ভয় হয়, সেইজন্যই একজন দরোয়ান মোতায়েন চাই, এ কথাটাও তাঁরে বোল্লেম। তিনিও ঈষৎ হাস্য কোরে আমার সঙ্গে একজন দরোয়ান দিলেন! বেলা দুই প্রহরের পূর্ব্বে আমরা বোরাকুলী গ্রামে যাত্রা কোল্লেম। দুজনেই আমরা ঘোড়সওয়ার। আমার সঙ্গে একজোড়া গুলীভরা পিস্তল, দরোয়ানের স্কন্ধে বন্দুক, কটিবন্ধে তরবারি।

    যথাসময়ে বোরাকুলীতে আমরা উপস্থিত হোলেম, শান্তিরাম দত্তের বাড়ীতে গিয়ে পৌঁছিলেম। শুনলেম কি?—ভীম নির্ঘাত বজ্রবাণী! অমরকুমারী নাই! আমারে দেখে বাড়ীর সকলে কেঁদে উঠলেন। অমরকুমারী নাই! আমার মাথায় যেন বিনা মেঘে অকস্মাৎ বজ্রাঘাত! বজ্রাহত হয়েই যেন বাড়ীর উঠানে আমি আছাড় খেয়ে পোড়লেম;—ক্ষুদ্র বালকের মত কেঁদে ভাসিয়ে দিলেম! কৰ্ত্তা আর মণিভূষণ আমারে ধরাধরি কোরে তুলে বোসিয়ে, নানা প্রকারে সান্ত্বনা কোল্লেন। সান্ত্বনাবচনে কর্ত্তামহাশয় বোলতে লাগলেন, “এত ব্যাকুল হবার কোন কারণ নাই, কথাটা শুনেই অত অধীর হয়ে অমঙ্গল আশঙ্কা কোত্তে নাই; অমরকুমারী বেঁচে আছেন, চোরে তাঁরে চুরি কোরে নিয়ে গিয়েছে! একটু ঠাণ্ডা হও, সকল কথা তোমাকে বিশেষ কোরে বোলছি। এককালে হতাশ হয়ে অমঙ্গল আশঙ্কা কোরো না।”

    প্রথমে আমি যতটা অধীর হয়ে পোড়েছিলেম, কৰ্ত্তার কথা শুনে ততটা অধীরতা থাকলো না, চোরে চুরি করার তাৎপৰ্য্যটা কি, সেটাও তখনি বুঝতে পাল্লেম। মণিভূষণ আমার হাত ধরে একটী ঘরে নিয়ে বসালেন, কৰ্ত্তাও সঙ্গে গেলেন, বাড়ীর মেয়েরাও সেইখানে এলেন। প্রথমে তাঁরা আমারে কিছু জল খেতে দিলেন। জল খাওয়ার কথা তখন আমার মনেই ছিল না, কিছুই ভাল লাগলো না, অস্থিরকণ্ঠে বল্লেম, “এখন আমি কিছুই খাব না; বৃত্তান্তটা কি, আগে শুনি, তার পর—”

    আমারে আর কথা কোইতে না দিয়েই কর্ত্তামহাশয় বোলতে আরম্ভ কোল্লেন, “তোমার মনে থাকতে পারে, রাসের সময় তোমাকে আমি বোলেছিলেম, বীরভূমে যে লোকের বাড়ীতে অমরকুমারী ছিলেন, সেই চেহারার একটা লোক আমাদের গাঁয়ে এসেছিল, গ্রামের কেহ কেহ তাকে দেখেছিল, আমার কাছে গল্প কোরেছিল, আমিও বুঝেছিলেম, সেই লোক,—সেই জটাধর তরফদার। সেই লোক একদিন—”

    ঘৃণায়-ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে, কৰ্ত্তার কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে, তৎক্ষণাৎ আমি বোলে উঠলেম, “আমি সেই লোকের নাম রেখেছি রক্তদন্ত! জটাধর তরফদার, সে নামটা হয় তো জালনাম! তাদৃশ নরাধমেরা কোথাও সত্যনামে পরিচয় দেয় না। মুখের চেহারা দেখেই নাম রেখেছি রক্তদন্ত!”

    যারা সেই ঘরে উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের মুখের ভাব দেখে আমি বুঝলেম, আমার কথা শুনে তাঁদের সকলেরই যেন হাসি পেয়েছিল, কেহই কিন্তু হাসলেন না। কর্ত্তা বোলতে লাগলেন, “ঠিক নাম দিয়েছ বাবা! সে রকম লোকের ঐ রকম নামটাই ঠিক। সেই লোক একদিন আমাদের একটা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে অমরকুমারীকে দেখেছিল; যে দিন দেখে, সে দিন আমি জানতে পারি নাই, তার পর পাঁচ সাত দিন গৌণে অমরকুমারীর মুখে শুনেছিলেম। তদবধি অমরকে আমি চক্ষে চক্ষে রাখতেম, একদিনও বাহির হোতে দিতেম না; তদবধি সে লোকের আর কোন খোঁজখবর ছিল না। সংক্রান্তির দুদিন পূর্ব্বে সর্ব্বেশ্বরবাবুর বাড়ীতে দুজন অতিথি আসে; একজন ব্রাহ্মণ, একজন কায়স্থ। ব্রাহ্মণের নাম কুঞ্জবিহারী সান্ন্যাল, কায়স্থের নাম জনার্দন মজুমদার; সেইখানে আহারাদি কোরে, সন্ধান জেনে বৈকালে আমাদের বাড়ীতে আসে। দুজনেরই লম্বা লম্বা চুল, লম্বা লম্বা গোঁফদাঁড়ি। তারা বলে, অমরকুমারী নামে একটা মেয়ে এই বাড়ীতে আছে, আমরা তার বিবাহের সম্বন্ধ কোত্তে এসেছি। যার নাম কুঞ্জবিহারী, সেই লোকটী ঘটক, যার নাম জনার্দ্দন, সেই লোকটী বরের কাকা। আমি তাদের—”

    আমার মনের ভিতর যেন একটা ঝড় এলো; কত দিনের একটা পূৰ্ব্বকথা মনে পোড়ে গেল; কর্ত্তার কথার উপর কথা ফেলে আমি তখন বোলে উঠলেম, “রসুন মহাশয় রসুন, নাম-দুটো যেন আমার জানা জানা বোধ হচ্ছে। যদিও তাদের চেহারা আমি দেখি নাই, কিন্তু নাম শুনে বুঝতে পাচ্ছি, দুরাচার রক্তদন্তের সঙ্গে তাদের বিলক্ষণ যোগাযোগ! তারাই বুঝি অমরকুমারীকে—”

    শুনেই শান্তিরাম কবিরাজ হস্তসঞ্চালন কোরে বল্লেন, “না না, তারা অমরকুমারীকে হরণ করে নাই; বিবাহের সম্বন্ধ কোত্তে এসেছে, এই কথাই তারা বোলেছিল, পাত্রটী ভাল, বিষয়-আশয় আছে, বংশ বুনিয়াদী, কন্যাপক্ষে কিছুই খরচপত্র লাগবে না, কন্যার গা-ঢাকা সমস্ত সোণার গহনা দেওয়া হবে, কন্যাটী চিরদিন রাজরাণীর মত সুখে থাকবে, এই সব কথাই তারা বোলেছে। আমি তাদের আড়ঘরবাক্যের উত্তরে বলেছিলেম, ‘সম্প্রতি কন্যাটীর মাতৃবিয়োগ হয়েছে, কন্যা বলেন, পিতার সমাচার জানেন না, সে সমাচার না পাওয়া গেলে বিবাহের কোন কথাই স্থির হোতে পারে না, কন্যার জাতি পর্য্যন্ত এখন আমাদের অজ্ঞাত।’ আমার এই সব শুনে, যার নাম জনার্দ্দন, সে লোকটী হাসতে হাসতে বোল্লে, ‘সে কি মশাই, কি কথা কন? পিতার সমাচার নাই, সে কি কথা? কন্যার পিতার সঙ্গে আমাদের অতি নিকট-সম্বন্ধ, মাসখানেক পূর্ব্বে তাঁর সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছে, কন্যা এইখানে আছে, তাঁরই মুখে এই খবর আমরা পেয়েছি। তিনি এখন বড় কাজে ব্যস্ত, আমাদের সঙ্গে আসতে পাল্লেন না, আমাদেরই দুজনকে মেয়ে দেখতে পাঠালেন। বাপ জানেন না, জাতি জানেন না, কি কথা কন আপনি? করণীয় ঘর, কন্যার পিতার বংশের সঙ্গে আমাদের তিনপুরুষের কুটুম্বিতা, কি কন আপনি?”—কিছুতেই আমি বিশ্বাস কোল্লেম না, ‘কন্যার পিতাকে হাজির কর, তা না হোলে কোন কথাই হবে না, এ বিবাহের কর্ত্তা আমি নই’, কাটা কাটা এই সব কথা বলেই আমি তাদের বিদায় কোরে দিই।”

    ক্রমশই আমি উত্তেজিত হোতে লাগলেম। বৃদ্ধ শান্তিরাম শেষকালে যে সকল কথা বোলবেন, অগ্রেই তা আমি বেশ বুঝতে পেরেছিলেম, তথাপি চঞ্চলকণ্ঠে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “বিদায় কোরে দিলেন, তার পর কি হলো?”

    নিশ্বাস ফেলে কর্ত্তা বোলতে লাগলেন, “সে দিন তারা চোলে যায়; অমরকুমারী ভয় পান। আমি তখন ততটা বুঝে উঠতে পারি নাই, সম্বন্ধটা হয় তো সত্য হলেও হোতে পারে, অমরকুমারীর পিতাকে হয় তো তারা জানলেও জানতে পারে, এইরুপ তখন আমি ভেবেছিলেম। দুই তিন দিন গেল, তারা এলো না; তার পর আর একজন লোক এসে পরিচয় দিলে, সে লোকটাও ব্রাহ্মণ, খুব রোগা, অস্থি-পঞ্জর সার, মাথাটী ন্যাড়া, মাথার মাঝখানে এক হাত লম্বা একটা টীকী, কপালে রক্তচন্দনের দীর্ঘ ফোঁটা, কর্ণে, কণ্ঠে, বক্ষে শ্বেতচন্দনের ছাপকাটা, পরিধানে একখানা আধময়লা তসরের ধুতি, স্কন্ধে তসরের দোব্জা কোচানো; নাম বোল্লে, নফরচন্দ্র ঘোষাল। সেই লোকের মুখেও অমরকুমারীর বিবাহের সম্বন্ধের কথা। সেই লোক বরং আরো জোরে জোরে কথা কোইলো। সে বোল্লে ‘অমরকুমারীর পিতা বহরমপুরের আদালতের একটা মোকদ্দমার তদ্বিরে অত্যন্ত ব্যস্ত আছেন, আমি তাঁদের কুল-পুরোহিত, আমারে তিনি পাঠালেন, আমার সঙ্গে তাঁর কন্যাটীকে তুমি পাঠিয়ে দাও। ঘটক এসেছিল, তাকে তোমরা তাড়িয়ে দিয়েছ, শুনে তিনি ভারী চোটেছেন; আমি তাঁর প্রতিনিধি, বাড়ীর পুরোহিত, বংশের পুরোহিত, আমার সঙ্গে মেয়েটীকে তুমি পাঠিয়ে দাও; মেয়েটীকে তুমি বাপের বাড়ী থেকে চুরি কোরে এনেছ, ভালোয় ভালোয় আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দাও; আজিই আমি নিয়ে যাবো;—না যদি পাঠাও, তিনি তোমাদের নামে পুলিশকেস আনবেন।’—মণিভূষণ তখন বাড়ী ছিল না, আমি একবার উঠে গিয়ে অমরকুমারীকে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, পুরোহিত বলে পরিচয় দিচ্ছে, ঐ লোকটীকে তুমি কি চিনতে পার?”—অমরকুমারী বলেন, ‘জানালার ফাঁক দিয়ে আমি দেখেছি, ও রকম চেহারার লোক আর কখনো কোথাও আমার চক্ষে পড়ে নাই।’—অমরের কথা শুনে ফিরে এসে ঘোষালকে আমি বোল্লেম, “তোমার সঙ্গে সে মেয়ে আমি কখনই পাঠাব না; পুলিশকেস কোরে যে যা কোত্তে পারে, কোত্তে বলে গে।’—ঘোষালই হোক কিম্বা পুরোহিতই হোক, যেই হোক, ভাঙাগলায় চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে, অনেক রকম শাসিয়ে শাসিয়ে, সে লোক তখন বিদায় হয়ে গেল। দু-দিন পরে অমরকুমারী অদৃশ্য। আমার একটা মেয়ের সঙ্গে খিড়কীর ঘাটে অমরকুমারী স্নান কোত্তে গিয়েছিলেন, কাঁচাবুদ্ধিতে আমার মেয়েটী ঘাটে তাঁরে একাকিনী রেখে এক বার বাড়ীর ভিতর এসেছিল, তার পর ফিরে গিয়ে দেখে, অমরকুমারী সেখানে নাই। কোথায় গেল? জলে ডুবে যাওয়া অসম্ভব; সে পুকুরে পাঁচবছরের মেয়েরাও ডুবে যেতে পারে না, এত কম জল; তবে অমরকুমারী কোথায় গেল? বিস্তর অন্বেষণ করা হয়েছিল, কোথাও পাওয়া গেল না। সন্ধ্যাকালে গ্রামের একজন বালক এসে খবর দিলে, বেলা প্রায় দেড়প্রহরের সময় তিনজন লোক একখানা গাড়ী কোরে অমরকুমারীকে নিয়ে যাচ্ছে; অমরকুমারীর মুখে কাপড়বাঁধা, কথা কোইতে পাচ্ছিল না, দুই চক্ষু দিয়ে জল পোড়ছিল, ফ্যাল ফ্যাল কোরে চেয়ে রয়েছিল, দুপাশে দুজন লোক তার দুই হাত ধোরে বোসেছিল; বালক যদি সময়ে খবর দিতো, তা হোলে বোধ হয় সন্ধান হোতে পাত্তো, দিনের বেলায় গ্রামের ভিতর থেকে মেয়েচুরি, চোরেরা অল্পে অল্পে পার পেতো না। বালক আরো বোল্লে, সে যখন দেখে, তখন গাড়ীর একটা দরজা খোলা ছিল, তাকে দেখেই লোকেরা সে দরজাটা বন্ধ কোরে দিলে; গাড়ীখানা ছুটেছে, প্রথমে অমরকুমারীকে সে ঠিক চিনতে পারে নাই, গাড়ীখানা অনেক দূর চোলে গেলে, চেহারা স্মরণ কোরে সে বুঝতে পারে, অমরকুমারী। দিনমানের মধ্যে খবর দেওয়া সে বালক আবশ্যক মনে করে নাই, অমরকুমারী হারিয়ে গিয়েছে, চারিদিকে খোঁজ পোড়েছে, সেই কথা শুনে সন্ধ্যাকালে খবর দিতে এসেছিল। তখন আর কি হয়, কোথাকার গাড়ী কোথায় গেল, কে আর তার সন্ধান পায়, কাজেই আমরা কেবল হা-হুতাশ সার কোরে—”

    হা-হুতাশ সার করা অপরের পক্ষে সঙ্গত হোতে পারে, আমার পক্ষে কেবল তাই নয়, সব যেন আমি অন্ধকার দেখতে লাগলেম। কর্ত্তার কথা সমাপ্ত হবার অগ্রেই অস্থির হয়ে আমি বোল্লেম, “চোর ধরা দুঃসাধ্য হবে না। অমরকুমারী একদিন রক্তদন্তকে দেখেছিলেন, রক্তদন্তের সঙ্গেও সে দিন একটা লোক ছিল; তার পর তিনজন লোক এই বাড়ীতে আসে। সমস্তই রক্তদন্তের চক্র, সমস্তই আমি বুঝতে পাল্লেম, আর আমি এখানে বিলম্ব কোরবো না, আমি চোল্লেম; যে বাড়ীতে আমি থাকি, সে বাড়ীর বাবুদের প্রতিপত্তি খুব, বিস্তর লোক বাধ্য, সত্য যদি রক্তদন্ত বহরমপুরে থাকে, শীঘ্রই ধরা পোড়বে; পুলিশের সাহায্যে আদালতের ওয়ারীন বাহির কোরে অমরকুমারীকে আমি উদ্ধার কোরবোই কোরবো;—এখন আমি চোল্লেম, ফলাফল শীঘ্রই আপনি জানতে পারবেন।”

    দরোয়ানের সঙ্গে অশ্বারোহণে আমি পথে বেরুলেম। তলোয়ার, বন্দুক, পিস্তল, এ সকল অস্ত্র সে দিন কোন কাজেই এলো না। পাপাত্মারা যে দিন সেই পবিত্র কুমারীকে হরণ করে, সে দিন যদি আমি এ গ্রামে এই ভাবে সজ্জিত থাকতেম, পরিণাম চিন্তা না কোরে নিশ্চয়ই আমি দুই একটা মণ্ডু এইখানে গড়াগড়ি যেতে দেখতেম! সে সময় অতীত হয়ে গিয়েছে, সে দিন আমি ছিলেম না, এখন সে আক্ষেপ বৃথা। আমরা চোল্লেম। আমার প্রাণের ভিতর তখন যে প্রকার বিষাদ-বেগ প্রবাহিত, ভুক্তভোগী পাঠকমহাশয়ের অনুভবেই সেটা বুঝতে পারবেন, অক্ষরে লিখে ব্যক্ত করা যায় না। বাড়ীতে এসে উপস্থিত হোলেম। ছোটবাবু অমরকুমারীকে দেখেছিলেন, অগ্রেই ছোটবাবুকে সেই দুঃখের কথা বোল্লেম, শেষকালে বড়বাবুও সেই বিষাদ-সমাচার শুনলেন। সেই দিনেই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দ্বাদশজন মল্ল বড়বাবুর আদেশে বহরমপুরে চোলে গেল, আমিও তাদের সঙ্গে থাকলেম। কোথায় আছে রক্তদন্ত। প্রথমে আদালতে অন্বেষণ করা হলো, জটাধর তরফদার নামে কোন লোক সেখানে কোন মোকদ্দমা জোগাড় কোত্তে আসে কি না, জিজ্ঞাসা করা গেল, কেহই কিছু বোলতে পাল্লে না, তার পর উকীলদের বাসায় বাসায় অনুসন্ধান করা হলো, কিছুই সন্ধান পাওয়া গেল না; বিদেশী লোকেরা যে সব জায়গায় বাসা কোরে থাকে, সে সব জায়গাতেও অন্বেষণ কোল্লেম, বিফল অবেষণ! রক্তদন্ত বহরমপুরে নাই। না থাকাই তো সম্ভব। এ রকম চক্রান্তকারীরা কদাচ সত্যকথা বলে না, এটা তাদের স্বভাবসিদ্ধ। চিত্তের আবেগে আমি অন্বেষণে গিয়েছিলেম, চিত্ত কিন্তু জেনেছিল, রক্তদন্তকে সেখানে পাওয়া যাবে না; মুর্শিদাবাদজেলার মধ্যেই পাওয়া যাবে কি না, তাতেও সম্পূর্ণ সন্দেহ। বিফল অন্বেষণ! ইষ্টসিদ্ধ কোরে কোথায় তারা পালিয়ে গিয়েছে, ভগবান বোলে না দিলে, কে আর সে সন্ধান বোলে দিবে? আশায় হতাশ হয়ে আমরা ফিরে এলেম।

    প্রবল হতাশের ভিতর আমার মনে আর একটা কূটতর্ক। ঘটক, বরের কাকা, পুরোহিত, সে তিনটে লোক কে?—কারা তারা?—কুঞ্জবিহারী সান্ন্যাল, জনার্দ্দন মজুমদার, নফরচন্দ্র ঘোষাল, কারা তারা? সেই সেই নামের কোন লোকের সঙ্গে কখনো কোথাও আমার দেখা হয়েছে, এমন তো মনে কোত্তে পালেম না। কারা তারা?—নাম-তিনটে যেন পূর্ব্বে কোথাও আমি শুনেছি, শান্তিরামের মুখে শুনা নয়, অনেক পূর্ব্বে কোথায় যেন শুনেছি, এইরূপ মনে হোতে লাগলো, ঠিক স্মরণ কোত্তে পাল্লেম না। বাড়ীতে ফিরে এলেম। বিফল অন্বেষণের কথা ম্লানবদনে বাবুদের কাছে আমি বোল্লেম। সমবেদনা জানিয়ে তাঁরাও আমার দুঃখে দুঃখিত হোলেন।

    রাত্রি এলো। রাত্রিকালেই চিন্তার পরাক্রম অধিক হয়। নামমাত্র ভোজনাবসানে আমি শয়ন কোল্লেম। কি নিমিত্ত শয়ন?—সুখীর সুখদায়িনী নিদ্রাদেবী দুঃখীর কাছে আসেন না, আমার কাছে আসবেন না, জানতেম, তথাপি শয়ন কোল্লেম। শয়নমাত্রেই চিন্তা আমাকে আক্রমণ কোল্লে।

    ঘটক, পুরোহিত, বরের কাকা, এই তিনজন। নাম-তিনটী কোথায় আমি শুনেছি, অনেকক্ষণ মনে কোত্তে পাল্লেম না, কিন্তু শুনেছি কিম্বা কোথায় লেখা আছে, নিজের চক্ষে দেখেছি; মানুষ দেখি নাই, নাম দেখেছি, এটী স্থির; কিন্তু কোথায়?—অনেকক্ষণের পর স্মরণ হলো। কুঞ্জবিহারী সান্ন্যাল, নফরচন্দ্র ঘোষাল, জনার্দ্দন মজুমদার, এই তিন নাম। বর্দ্ধমানে সর্ব্বানন্দবাবুর খুনের পর যেদিন উইল পড়া হয়, সেই দিন ঐ তিনটী নাম সেই উইলের সাক্ষীর স্থলে স্বাক্ষরিত আমি দেখেছি। ঠিক তাই! উঃ! ভয়ানক চক্রান্ত! রক্তদন্তের সঙ্গে ঐ তিনজনের জানা-শুনা! সর্ব্বানন্দবাবুর বাড়ীতে ঐ তিনজনকে একদিনও আমি দেখি নাই। অকস্মাৎ মুর্শিদাবাদে দুইদিনে সেই তিনজন উপস্থিত। একদিন দুজন, একদিন একজন। অমরকুমারী যেদিন সন্ধ্যাকালে তেঁতুলতলায় রক্তদন্তকে দেখেন, রক্তদন্তের সঙ্গে সেদিনও একটা লোক ছিল। সে লোকটা কে? ঐ তিনজনের একজন কি আর কেহ সেটা আমি অনুমান কোত্তে পাল্লেম না।

    যেখানে চক্রান্ত হয়, চক্রান্ত যেখানে অনেকদিন চলে, সেখানে দুই একটা লোক থাকে না, অনেক লোক থাকাই সম্ভব। ষড়যন্ত্রের মূল অধিনায়ক যে ব্যক্তি, সেই লোকের একটা দল থাকে; কোথাকার কত লোক সেই দলভুক্ত, সহজে নির্ণয় করা যায় না, কিছুই আমি নির্ণয় কোত্তে পাল্লেম না। যে লোকটার নাম ঘনশ্যাম বিশ্বাস, ওরফে ঘনশ্যাম সরস্বতী, সে লোকটার সঙ্গে রক্তদন্তের যোগ আছে, তা আমি জানতে পেরেছি; শেষের তিনজন সেই দলের লোক, সেটাও এখন বুঝতে পাল্লেম;—পেরেই বা করি কি? কোথায় তারা অমরকুমারীকে নিয়ে গিয়েছে, সে সন্ধান কেই বা বোলে দিবে?

    ভাবনায় যন্ত্রণায় সমস্ত রজনী জাগরণ কোল্লেম। তার পর পাঁচদিন পাঁচরাত্রি কি অসুখেই যে আমি কাটালেম, ভগবান জানেন। ১১ই পৌষ। খৃষ্টান লোকগুলির বড় দিন;—প্রভু যীশুখৃষ্টের জন্মদিন। যে গ্রামে আমি আছি, সেই গ্রামে খৃষ্টানের উপাসনামন্দির ছিল না, খৃষ্টভক্ত ধার্ম্মিকলোকেরও অস্তিত্ব ছিল না, সুতরাং বড়দিনের উৎসব সেখানে আমি কিছুই দেখলেম না। কৃষ্ণকামিনীর সঙ্গে দস্তুরমত দেখা-সাক্ষাৎ হয়, কৃষ্ণকামিনী দিন দিন হাস্যপরিহাসের নূতন নূতন অভিনয় দেখান, মনে আমার সুখ নাই, কুলকন্যার সে সকল রঙ্গভঙ্গ কিছুই আমার ভাল লাগে না।

    বেলা প্রায় অবসান। বড়দিনের বেলা, কত বড় দিন, সকলেই জানেন; পৌষমাসের বেলা খুব ছোট, দুর্ভাবনায় আমি কাতর, সে ছোট বেলা আমার পক্ষে অনেক বড় বোধ হয়েছিল। বেলা প্রায় অবসান। বড়বাবু ছোটবাবু দুজনেই বাড়ী নাই, সেরেস্তায় লোকজন আছে, আমি কিন্তু সেদিন সেরেস্তায় বসি নাই; শেষবেলায় ব্রহ্মময়ীর বাড়ীতে বেড়াতে গিয়েছি। যে কোন রকমেই হোক, একটু অন্যমনস্ক থাকাই আমার চেষ্টা। পূৰ্ব্বে বলা হয় নাই, ব্ৰহ্মময়ীর বাড়ীর ফটকের ধারে দারোয়ানদের ঘর। দরোয়ান পালোয়ান সেই সকল ঘরেই বেশী; দেউড়ীর দরোয়ানেরাও মাঝে মাঝে সেইখানে গিয়ে সিদ্ধি খায়, গীত গায়, মাদোল বাজায়, মালকাট ঘুরায়, আমোদ করে। সেইখানে গিয়ে আমি তাদের খেলার কৌশল দেখছি, গানবাজনাও শুনেছি, ঘরে প্রবেশ করি নাই, বাহিরেই দাঁড়িয়ে আছি, এক একবার রাস্তার দিকে চেয়ে দেখছি, হঠাৎ দেখি মণিভূষণ সেইখানে উপস্থিত;—বোরাকুলীর শান্তিরাম দত্তের পুত্র মণিভূষণ।

    আমারে দেখেই মণিভূষণ বোল্লেন, “বাড়ীতে আমি গিয়েছিলেম, শুনলেম, তুমি ঠাকুরবাড়ীতে এসেছ, শুনেই তাড়াতাড়ি এখানে আমি আসছি। শীঘ্র তুমি আমার সঙ্গে এসো। একটা সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।”

    কিসের সন্ধান, কি বৃত্তান্ত, কিছুই বুঝতে না পেরে, চকিতনেত্রে মণিভূষণের মুখের দিকে আমি চেয়ে থাকলেম। মণিভূষণ বোল্লেন, “আমি কাশিমবাজারে গিয়েছিলেম, যেখানে নিমনাথের মন্দির, পরেশনাথের মন্দির, সেইখানে একটা লোককে আমি দেখতে পেয়েছি। সেই অস্থিসার, দীর্ঘকায়, নাড়ামাথা, টিকীওয়ালা,—যে লোকটা অমরকুমারীর বাপের পুরোহিত বেলে পরিচয় দিয়েছিল, অমরকুমারীকে নিয়ে যাবার জন্য আমাদের বাড়ীতে গিয়েছিল, সেই লোক। আমাকে দেখে সে হয় তো চিনতে পাল্লে না, একবারমাত্র চেয়েই আপন কাজে মন দিলে। কাজটা কি জানো?—হাঁস কিনছিল। একটা লোক গোটাকতক হাঁস বেঁচতে এসেছে, হাঁস আর হাঁসী, দর কম, তাদের ভিতর যেগুলো খুব মোটা মোটা, খুব বড় বড়, টিকীওয়ালা ভট্টাচার্য্য সেই রকম বেছে বেছে দরদস্তুর কোচ্ছিল। হাঁসেদের পা বাঁধা, পালক বাঁধা লম্বা একটা বাঁশের লাঠীতে ঝোলানো। আমার কেমন আশ্চর্য্য মনে হলো। জৈন-মন্দিরের কাছে নিরীহ পক্ষিজাতির প্রতি সেইরুপ নিষ্ঠুরতা; ক্রয়-বিক্রয়ের অবসানে সেই সকল পক্ষীর প্রাণান্ত হবে, জৈনধর্ম্মের পাণ্ডারা কিছুই বলছে না, তাই ভেবেই আমার আশ্চর্য্যজ্ঞান; তেমন একজন তিলকধারী, টিকীধারী ভট্টাচার্য্য হাঁস মেরে খাবে, তাই ভেবেই আমার আশ্চর্য্যজ্ঞান!”

    মণিভূষণের গৌরচন্দ্রিকার আড়ম্বরে তাচ্ছল্যভাবে আমি বোল্লেম, “পরেশনাথদেবের মহিমা হয় তো কোমে গিয়েছে, সেই জন্যই মন্দিরের কাছে হাঁসব্যাপারীর নিষ্ঠুরতা, হাঁসখোর লোকের হর্ষবর্দ্ধন। ও কথা ছেড়ে দাও, সন্ধানের কথাটা কি বোলছিলে?”

    হাতে একগাছা ছড়ি ছিল, সেই ছড়িগাছটা জোরে জোরে মাটীতে ঠুকে ঠুকে মণিভূষণ বোল্লেন, “ঐ তো সন্ধান। সেই লোকটা—সেই নফর ঘোষালটা যখন কাশিমবাজারে আছে, তখন হয়তো সেই ঘটক আর সেই বরের কাকাও সেখানে থাকতে পারে, তারাই অমরকুমারীকে চুরি কোরেছে, অমরকুমারীও সেইখানে আছেন, আমার যেন এই রকম মনে হোচ্ছে।”

    অনিশ্চিত সন্ধান। তথাপি মনে কোল্লেম, তত্ত্ব লওয়ায় দোষ কি? আবার মনে হলো, তারা যদি থাকে, তবে হয় তো রক্তদন্তও সেখানে আছে। থাকে থাকুক অমরকুমারীর জন্য প্রাণ দিতেও আমার ভয় হয় না। কতক সংশয়ে কতক উল্লাসে চঞ্চলস্বরে আমি বলে উঠলেম, “আমারে তুমি কাশিমবাজারে নিয়ে চলো! ভাল কোরে সেই সন্ধানটা একবার জানতে হয়েছে। অমরকুমারীকে যদি উদ্ধার কোত্তে পারি, তবেই আমার মনস্কামনা পূর্ণ হবে। তুমি আমারে নিয়ে চলো!”

    মণিভূষণের সঙ্গে বাবুদের বাড়ীতে আমি উপস্থিত হলেম। সময় ঠিক গোধুলি। ছোটবাবু তখন ফিরে এসেছেন। তাঁরে আমি ঐ কথা বোল্লেম; তখনি আমি কাশিমবাজারে যাব, বিশেষ আগ্রহে সেই ইচ্ছা জানালেম। তিনি বেল্লেন, “রাত্রে কোথায় যাবে? রাত্রে গিয়েই বা কি ফল হবে? কল্য প্রাতঃকালে বরং যেয়ো।”

    আরো অধিক আগ্রহ জানিয়ে আমি বোল্লেম, “আজ্ঞে না, দেরী করা হবে না; লোকেরা কখন কোথায় থাকে, ঠিক পাওয়া যায় না, রাত্রেই আমি যা।

    আমার ব্যগ্রতা দেখে ছোটবাবু তখন বোল্লেন, “আচ্ছা, একান্তই যদি যেতে চাও, আমি একখানা চিঠি দিচ্ছি, বহরমপুরের এক উকীলের বাসায় রাত্রিযাপন কোরে প্রাতঃকালেই কাশিমবাজারে যেয়ো, তা হোলেই সুবিধা হোতে পারবে।”

    উকীলের নামে ছোটবাবু একখানা চিঠি লিখে দিলেন, সঙ্গে দুজন দরোয়ান দিলেন, তৎক্ষণাৎ নৌকা স্থির হলো, মণিভূষণের সঙ্গে সন্ধ্যার পরেই আমি যাত্রা কোল্লেম। সঙ্গে দুজন অস্ত্রধারী দরোয়ান; আমার সঙ্গেও একজোড়া পিস্তল। নৌকারোহণের পূর্ব্বে আমার মনে একটা বিতর্ক। অমরকুমারীকে ধোরেছে, এইবার আমার পালা, আমারে দেখতে পেলেই রক্তদন্ত আমারে ধোরে ফেলবে। সত্যি যদি রক্তদন্ত কাশিমবাজারে থাকে, নিশ্চয়ই আমি ধরা পোড়বো। মনে মনে এইরূপ আতঙ্ক সন্দেহ কোরে একটা বুদ্ধি স্থির কোল্লেম। ছোটবাবু মধ্যে মধ্যে সখের খাতিরে কৌতুকের জন্য রকম রকম বেশ পরিবর্ত্তন করেন। অনেক রকম মুখোস আছে, পরচুল আছে, পোষাক আছে; আমিও ছদ্মবেশধারণের সঙ্কল্প কোল্লেম; মুখোস চাইলেম না, একপ্রস্থ পরচুল গোঁফ-দাড়ী চেয়ে নিলেম। ছোটবাবু হাস্য কোল্লেন।

    সন্ধ্যার পরেই নৌকায় আরোহণ কোরেছিলেম, অতি অল্প দূরে এসেই পাড়ী; এপার ওপার। সময় অধিক লাগলো না, রাত্রি চারিদণ্ডের পরেই বহরমপুরের স্নানের ঘাটে আমাদের নৌকা লাগলো।

    যে উকীলের নামে পশুপতিবাবুর চিঠি, সেই উকীলের বাসার ঠিকানা মণিভূষণের জানা ছিল, অল্পক্ষণেই সেই ঠিকানায় গিয়ে আমরা পৌঁছিলেম। পশুপতিবাবুর চিঠি পেয়ে উকীলটী আমাদের সবিশেষ আদর-যত্ন কোল্লেন। উকীলের নাম রজনীকান্ত রুদ্র; তাঁর সদ্ব্যবহার-দর্শনে আমরা বিশেষ পরিতুষ্ট হোলেম। স্বচ্ছন্দে সেই বাসাতেই রাত্রিযাপন করা হলো। শয়নের অগ্রে রজনীবাবু আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, কাশিমবাজারে যাবার উদ্দেশ্য কি? সংক্ষেপে তাঁর প্রশ্নের আমি উত্তর দিলেম। গম্ভীরবদনে তিনি বোল্লেন, “অমন কর্ম্ম কোরো না। যদি সন্ধান পাও, চুপি চুপি ফিরে এসে আমাকে জানিও। আইন অনুসারে গ্রেপ্তার করবার বন্দোবস্ত আমি কোরে দিব। তা না হোলে, তুমি যেমন বোলছে, খামোকা একটা লোককে ধোরে বেঁধে নিয়ে যাওয়া বে-আইনী কাজ; লোকের পশ্চাতে যদি কোন জবরদস্ত লোক থাকে, তুমি বালক, বিপদগ্রস্ত হবে। তেমন কর্ম্ম কোত্তে নাই। এখনকার আইন-কানুন বড় শক্ত; কথাটাও বড় শক্ত; সাক্ষী নাই, সাবুদ নাই, দলীল নাই, কেবল একটা মুখের কথা; লোক যদি শান্তিরামের বাড়ীতে যাওয়া অস্বীকার করে, মেয়েচুবির কথা অস্বীকার করে, তবেই মোকন্দমা বাধবে। মেয়েচুরি,—গুরুতর অভিযোগ, সে অভিযোগ প্রমাণ কোত্তে না পাল্লে বড়ই গোলযোগ। অমন কর্ম্ম কোরো না, সন্ধান পেলে আমাকে এসে খবর দিও, যে ক্ষেত্রে যেমন কোত্তে হয়, আমিই তা ব্যবস্থা কোরবো।”

    আমি সম্মত হোলেম। রজনীপ্রভাতে আমার ছদ্মবেশধারণ। শীতকাল, জামাজোড়া পরিধান কোল্লেম, পরচুলে গোঁফ-দাড়ী সাজালেম, মাথায় একটী বড়রকম টুপী দিলেম, দুদিকের দুই পকেটে দুটী পিস্তল থাকলো। এই রুপ আমার ছদ্মবেশ। উকীলবাবুর ঘরের দেয়ালে বড় একখানা দর্পণ ছিল, সেই দর্পণে আমি মুখ দেখলেম। হাসি পেলো। আপনার মুখে আপনি দেখে আপনাকে আমি চিনতে পাল্লেম না। রক্তদন্ত যদি সেখানে থাকে, আমি সেই হরিদাস, কিছুতেই চিনে উঠতে পারবে না।

    সে পক্ষে নিশ্চিন্ত হোলেম। বাজারে একখানা গাড়ী ভাড়া কোরে আমরা চারিজনে কাশিমবাজারে যাত্রা কোল্লেম। এখন যাওয়া যায় কোথায়? নিমনাথের মন্দিরের কাছে মণিভূষণ সেই ব্রাহ্মণকে দেখেছিলেন, ব্রাহ্মণ যে সেইখানে থাকে, সেইখানে গেলেই যে তাকে দেখতে পাওয়া যাবে, এমন কিছু ঠিক করা যায় না, তথাপি সেই মন্দিরের কাছে অগ্রেই যাওয়া গেল। মন্দির দর্শন করা তখনকার কাৰ্য্য নয়, ঘোষালের অন্বেষণ করাই প্রধান কাৰ্য্য। কিরূপে অন্বেষণ করা যায়? মণিভূষণ যেখানে তারে দেখেছিলেন, গাড়ী থেকে নেমে সেইখানে আমরা গেলেম। কাছেই একখানা দোকান ছিল, দোকানীকে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, চেহারাটাও বোল্লেম। দোকানী উত্তর কোল্লে, “এসেছিল বটে, হাঁস কিনতে এসেছিল, একজোড়া হাঁস কিনে নিয়ে দক্ষিণদিকে চোলে গেল; কোথায় গেল, কোথায় থাকে, তা আমি জানি না। পাঁচ সাতদিনের মধ্যে দুদিন তাকে আমি দেখেছি, বোধ হয়, নিকটেই কোথাও বাসা কোরে আছে।”

    নিশ্চিত ঠিকানা পাওয়া গেল না, অনুমানের উপর নির্ভর কোরে দক্ষিণদিকে খানিক দুর আমরা চোলে গেলেম। ছোট একটা পল্লীতে এলেম। খানকতক ঘর, খানকতক বাড়ী। ঘরগুলি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল না, বাড়ীগুলি ঘেরা। লোকজন যাওয়া-আসা কোচ্ছিল, দুই একজন মেয়েমানুষও দেখলেম, বোধ হলো গৃহস্থ-পল্লী। একটি লোককে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, এই রকম চেহারার এক ব্রাহ্মণ এই পাড়ায় থাকে কি না? লোক উত্তর কোল্লে, “এ পাড়ায় যারা থাকে, সকলকেই আমি চিনি, বাসাড়ে লোক এ পাড়ায় থাকে না, তবে যে রকম চেহারা তুমি বোলচো, সেই রকম চেহারার একটা লোক মাঝে মাঝে এই পথে যাওয়া-আসা করে, সম্প্রতি এসেছে, পূর্ব্বে দেখি নাই, পাড়ার দিকে চাইতে চাইতে বনের দিকে চোলে যায়। সন্ন্যাসীরাই বনে থাকে, বোধ হয় সন্ন্যাসী হবে, বনের ভিতর হয় তো তপস্যা করে।”

    মনে মনে হেসে আমি ভাবলেন, তপস্যাই করে বটে! তপস্বীরা হাঁস খায়, মেয়েচুরির মন্ত্রণা করে, মেয়েচোরের পুরোহিত সাজে, এ তামাসা মন্দ নয়! তপস্বীকে ধোত্তে হবে; বনের ভিতরই ধোরবো; বনের ভিতরেই থাকে; তেমন স্বভাবের লোক লোকালয়ে থাকতে পারে না; বনেই লুকিয়ে আছে, এই কথাই ঠিক। লোকটীকে আর কোন কথা জিজ্ঞাসা না কোরে বনের দিকেই আমরা চোল্লেম। অদূরে একটী শিবের মন্দির দেখা গেল; মন্দিরের পরেই বন। মণিভূষণকে সেই মন্দিরের কাছে রেখে দরোয়ান-দুজনকে সঙ্গে নিয়ে বনপথে আমি তপস্বীর অন্বেষণে অগ্রসর হোলেম। দরোয়ানদের অস্ত্রশস্ত্র আর মাথার পাগড়ী-দুটি মণিভূষণের কাছেই থাকলো।

    মণিভূষণকে সঙ্গে রাখলেম না, কারণ এই যে, সে লোক যে দিন পুরোহিত সেজে যায়, সে দিন মণিভূষণকে দেখেছিল, মণিভূষণও তাকে দেখেছিলেন, হাঁস কেনার সময়েও হয় তো মণিভূষণ তার চক্ষে পোড়ে থাকবেন; এখন সে যদি বনের ভিতর মণিভূষণকে দেখে, ধূৰ্ত্তলোক কি না, পাপীলোকের মনে সৰ্ব্বদাই ভয়, মণিভূষণকে যদি দেখে, তা হোলে সে নিশ্চয়ই গা-ঢাকা হয়ে পোড়বে, না হয় তো পালিয়ে যাবে, আমার কাৰ্য্য-সিদ্ধ হবে না। তাই ভেবেই মণিভূষণকে মন্দিরের কাছে রাখা।

    বনমধ্যে অমি প্রবেশ কোল্লেম। আমার দেহরক্ষক সেই দুজন নিরস্ত্র দরোয়ান উজ্জ্বল দিনমান। বনে বনচর হিংস্র জন্তু একটাও দেখা গেল না। আমি নির্ভয়। বন পৌরাণিক তপোবনের ন্যায় পরিষ্কার নয়, কিন্তু মধ্যে মধ্যে মুনি-ঋষির আশ্রমের ন্যায় ছোট ছোট খানকতক কুটীর দেখতে পেলেম। সত্য হয় তো সেই সকল কুটীরে সন্ন্যাসী তপস্বী বাস করে, প্রথমে সেই ভাবটা আমার মনে উদয় হয়েছিল, একে একে আট দশখানি কুটীরের সমীপবর্ত্তী হয়ে দর্শন কোল্লেম, জনমানবের সঞ্চার নাই; কুটীর মধ্যে আছে কেবল শুষ্ক শুষ্ক বৃক্ষপত্র, অর্দ্ধদগ্ধ কাষ্ঠখণ্ড, এক একখানা খেজুরপাতার চেটাই এক একটা গুড়ের নাগরীর মত ছোট ছোট জলের কলসী; দুই একখানা কুটীরে কেবল অঙ্গার আর ভস্মরাশি;—ভস্মের সঙ্গে এক একটা গেঁটে কোলকে আর তামাকপোড়া গুল। এই সকল আসবাব দেখে কিছুই আমি স্থির কোত্তে পাল্লেম না; কারা সেই সকল কুটীরে থাকে, কখন থাকে, সেটাও আমার অনুমানে এলো না। যে দুজন দরোয়ান আমার সঙ্গে ছিল, তাদের মধ্যে একজন (নাম তার ভল্লু সিং) অনেকদিন মুর্শিদাবাদে আছে, মুর্শিদাবাদের অনেক বৃত্তান্ত সে জানতো। আমার তখনকার মুখের ভাব দেখে বিস্ময়ের কারণ অনুমান কোরে, ভল্লু সিং বোল্লে, “এই সকল ঘরে রেতের বেলা শীকারী লোকেরা লুকিয়ে থাকে, বনজন্তু শীকার করে। দিনের বেলাও গরিবলোকেরা কাঠ কাটে, পাতা কুড়ায়, বনফল সংগ্রহ করে, তারাও মাঝে মাঝে ঐ সকল ঘরে আশ্রয় নিয়ে তামাক খেয়ে, গাঁজা খেয়ে, ক্লান্তি দূর করে।”

    তখন আমার বিস্ময়ের কারণটা দূর হয়ে গেল। বনটা অনেকদূর পর্য্যন্ত বিস্তৃত। অনেক দূর অন্বেষণ কোল্লেম, যার অন্বেষণ, তার কোন চিহ্নই পাওয়া গেল না!

    বেলা প্রায় দেড় প্রহর অতীত। অন্তরে হতাশ, এ দিকে ক্ষুধা-তৃষ্ণার উদ্রেক। হতাশে ফিরে আসি আসি মনে কোচ্ছি, এমন সময় এক অদ্ভুত কাণ্ড। ঘন ঘন বৃক্ষে ঘন ঘন কণ্টকীলতা, এক একটা স্থান অল্প অল্প অন্ধকার; নিবিড় বৃক্ষপত্র ভেদ কোরে সূর্য্যকিরণ সে সব জায়গায় সতেজে প্রবেশ কোত্তে পারে না, সেই জন্যই অন্ধকার। ফিরে আসি আসি মনে কোচ্ছি, হঠাৎ দেখি, সেই রকম অন্ধকার স্থানে একটা মুণ্ডু! ঠিক যেন মাটী ফুঁড়ে সেই মুণ্ডুটা উপরদিকে উঠছে! গলা পর্য্যন্ত উঠেছে! ঝাউপাতার মত ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া অনেক চুল, মুখের বর্ণটা জোঁদাকালো; বোধ হলো যেন আলকাতরামাখা। মুণ্ডুটা আমাদের দিকে ঘুরে একবার চাইলো; চক্ষু দুটো গোল গোল, ছোট ছোট; ভ্রূ নাই;—চেয়েই অমনি তৎক্ষণাৎ মাটীর ভিতর ডুবে গেল!

    মুণ্ডু অদশ্য! মাটী ফুঁড়ে উঠছিল, মাটীর ভিতর লুকিয়ে গেল! এই বনে সুড়ঙ্গ আছে। বদমাসলোকেরা প্রচ্ছন্নভাবে ভূগর্ভে বাস করে। নিশ্চয় ডাকাত। কেবল ডাকাত কেন, যাবতীয় কুক্ৰিয়ার নায়ক-নায়িকারা এই প্রকার গহ্বরে লুকিয়ে থাকবার সুবিধা পেলে আর কোথাও থাকতে চায় না। যে লোকটার সন্ধানে আমরা বেরিয়েছি, এই গহ্বরমধ্যেই হয় তো সেই লোককে পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এ গহ্বরে কত লোক আছে, জানা যাচ্ছে না। সংখ্যায় যদি বেশী হয়, তা হোলে এখন ঘাঁটা দেওয়া একটা নূতন বিপদের হেতু হয়ে দাঁড়াবে। পূর্ব্বাপর বিবেচনা কোরেই কাজ করা কর্ত্তব্য।

    কন্তব্যস্থির কোরে পায়ে পায়ে আমরা অগ্রসর হোলেম। যেখানে সেই মুণ্ডুটা উঠেছিল, সাবধানে সেইখানে গিয়ে দেখলেম, কোন চিহ্ন পাওয়া গেল না, কোথায় সুড়ঙ্গের বার, বাহ্যদর্শনে স্থির করা দুরূহ। বনের অপরাপর স্থান যেমন সমতল, সে স্থলটাও সেইরূপ। ভিতরদিক থেকে কোন কৌশলে দ্বারপথ মুক্ত করা হয়, তার পর আবার সমভাবে ঢাকা দেওয়া হয়, এইরূপ আমি অবধারণ কোল্লেম। নিকটে অনেকগুলি বৃক্ষ। স্থাননিরূপণের সুবিধার জন্য একখণ্ড পাথর কুড়িয়ে নিয়ে একটা বৃক্ষগাত্রে আমি দাগ দিয়ে রাখলেম; সেই নিদর্শনে অক্লেশে সুড়ঙ্গস্থান নির্ণীত হোতে পারবে, সেই জন্যই দাগ দেওয়া। আরব্য উপন্যাসের সঙ্কেত।

    বনে আর প্রতীক্ষা কোল্লেম না, শীঘ্র শীঘ্র বেরিয়ে এলেম; পূৰ্ব্বকথিত মন্দিরের নিকটে উপস্থিত হয়ে মণিভূষণকে সঙ্গে নিলেম। দরোয়ানেরা সেইখানে পূৰ্ব্ববৎ সজ্জিত হলো। পল্লী পার হয়ে নিমনাথের মন্দির। এইবার সেই মন্দিরটী ভাল কোরে দর্শন কোল্লেম। স্থপতিকাৰ্য্য অতি সুন্দর। মন্দিরমধ্যে জৈন-সম্প্রদায়ের চতুর্ব্বিংশতি দেব-মূর্ত্তি; প্রধান মূর্ত্তি নিমনাথ। নিমনাথ-বিগ্রহ প্রস্তর-নির্ম্মিত, পরেশনাথ অষ্টধাতুনির্ম্মিত। মূর্ত্তিগুলি দর্শন কোরে দেবালয় থেকে আমরা বেরুলেম। সেখানকার লোকের মুখে শুনেলেম, নিমনাথের মন্দিরের নীচেও এক সুড়ঙ্গ আছে। মুর্শিদাবাদ বহু প্রাচীন; বিশেষতঃ কাশিমবাজারে পূর্ব্বে পূর্ব্বে বিস্তর অট্টালিকা ছিল, বড় বড় কুঠী ছিল, রেশমের কুঠী সৰ্ব্বপ্ৰধান। ইংরেজ, ফরাসী, মার্কিণ, ওলন্দাজ, দিনেমার, পত্তুগীজ, আরমানী প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন বৈদেশিক জাতি এই কাশিমবাজারে বিবিধ বাণিজ্যকার্য্যোপলক্ষে বাস কোত্তেন; কে কোথায় কি অভিপ্রায়ে কত সুড়ঙ্গ প্রস্তুত কোরেছিলেন, স্থির করা যায় না। বনমধ্যে যে সুড়ঙ্গের সন্ধান পাওয়া গেল, সেইটীই আমাদের লক্ষ্য; অন্য সুড়ঙ্গের তত্ত্বান্বেষণ করা আমাদের তখনকার কাৰ্য্য নয়।

    বহরমপুরে ফিরে এসে আমরা স্নানাহার কোল্লেম। রবিবার ছিল, উকীলবাবু আদালতে যান নাই, অনুসন্ধানের ফলাফল তাঁকে জানালেম। সেদিন সেখানে থাকতে হবে, সোমবার আদালতে দরখাস্ত কোরে পুলিশের নামে পরোয়ানা বাহির কোত্তে হবে, রজনীবাবু এই কথা আমারে বোল্লেন।

    রবিবার বহরমপুরেই আমাদের অবস্থান করা হলো। রাত্রিকালে কাশিমবাজারের পূৰ্ব্বসমৃদ্ধির অনেক কথা রজনীবাবুর মুখে আমি শুনলেম। কাশিমবাজারের রাজবাড়ী ইতিপূর্ব্বে আমি দর্শন কোরেছি, সেই রাজবংশ কতদিনের, এই কথাটা আমি রজনীবাবুকে জিজ্ঞাসা কোল্লেম। রজনীবাবু বোল্লেন, “বংশ খুব বুনিয়াদী নয়, কিন্তু একটী লোকের সৌভাগ্যের চমৎকার ইতিহাস আছে।” রজনীবাবুর মুখে সেই ইতিহাস আমি শুনি। মৰ্ম্ম এইরুপ যে, কাশিমবাজার যখন খুব গুলজার, কাশিমবাজার যখন বঙ্গদেশের মধ্যে একটী প্রধান বাণিজ্যস্থান বোলে গণ্য ছিল, সেই সময় তিলিজাতীয় কালী নন্দী নামে একটী কারবারী লোক বর্দ্ধমানজেলা থেকে কাশিমবাজারে কারবার কোত্তে আসেন। রেশমের কারবার আর সুপারির কারবার তাঁর অবলম্বন হয়। কারবার খুব ফ্যালাও ছিল না, সামান্যরকম দোকানেই কাজকর্ম্ম চোলতো। কালী নন্দীর পুত্র সীতারাম নন্দী ক্রমে ক্রমে কাজকর্ম্ম বৃদ্ধি করেন; সীতারামের পুত্র রাধাকৃষ্ণ; রাধাকৃষ্ণের পুত্র কৃষ্ণকান্ত। এই কৃষ্ণকান্ত নন্দী পৈতৃক কারবারেই লিপ্ত ছিলেন। নবাবের হকুমে জনকতক ইংরেজ যখন বন্দী হয়ে মুর্শিদাবাদে প্রেরিত হয়, সেই বন্দীদের ভিতর একটী সাহেব ছিলেন, তাঁর নাম হেষ্টিং। কোন প্রকারে পলায়ন কোরে সেই হেষ্টিং ঐ কৃষ্ণকান্ত নন্দীর দোকানে আশ্রয় লন। নবাবের প্রতাপে আপন জীবনকে সঙ্কটাপন্ন জেনেও কৃষ্ণকান্ত সেই সাহেবটীকে আশ্রয় দিয়ে, পান্তাভাত খাইয়ে, গুপ্তভাবে নিরাপদে কলিকাতায় পাঠান। হেষ্টিং সাহেব কৃষ্ণকান্তের সেই উপকার স্মরণ কোরে রেখেছিলেন; তিনি যখন সৌভাগ্যক্রমে বাঙ্গালার গবর্ণর জেনারেল হন, মহামান্য ওয়ারেন হেষ্টিং যখন তাঁর পদবী হয়, সেই সময় তিনি কৃষ্ণকান্তকে স্মরণ করেন; ওয়ারেন হেস্টিঙের কৃপায় কৃষ্ণকান্ত নন্দী ভাগ্যবন্ত হয়ে উঠেন; সাহেবের মুখে তখন তাঁর নাম হয় কান্তবাবু। গবর্ণরী-পদ পাইবার পূর্ব্বেও হেষ্টিংসাহেব কান্তবাবুর উপকার কোরেছিলেন। হেষ্টিং যখন মুর্শিদাবাদের রেসিডেণ্ট, তৎকালে প্রথা অনুসারে তখন তিনি নিজের একটা স্বতন্ত্র কারবারী কুঠী খোলেন; কান্তবাবুকে তিনি সেই কারবারে মুচ্ছুদ্দী নিযুক্ত করেন। তার পর হেষ্টিং সাহেব দেশে যান। দেশে গিয়ে তিনি এ দেশের উপার্জ্জিত টাকাগলি নানাকার্য্যে খরচ কোরে নিঃসম্বল হন; সেই অবস্থায় পতিত হয়ে কান্তবাবুর কাছে ১১ হাজার টাকা ধার চেয়ে পাঠান। কান্তবাবু তাদৃশ ধনী ছিলেন না, সুতরাং সাহেবের সে প্রাথনা পূর্ণ কোত্তে তিনি সমর্থ হন নাই; তথাপি তাঁর প্রতি হেষ্টিং সাহেবের সমান অনুগ্রহ ছিল। আবার তিনি এ দেশে এসে কান্তবাবুকে আপন কারবারে মুচ্ছদ্দীপদে বরণ করেন। সে সময় কোম্পানীর পদস্থ কর্ম্মচারীরা আপনাদের নিজ নামে কোন ব্যবসা চালাতে পারবেন না, এইরুপ শক্ত নিয়ম হয়েছিল; বেনামীতে মুচ্ছদ্দীর নামেই কারবার চোলতো, জমীদারী ইজারা লওয়া হোতো, নিমক-পোক্তানের কর্তৃত্বও আয়ত্ত থাকতো। হেষ্টিং সাহেবের মুচ্ছদ্দী কান্তবাবু; তিনিও ঐরুপ ক্ষমতা প্রাপ্ত হন; সেই সময় তিনি অনেক টাকা উপার্জ্জন করেন, অনেক ভূমি-সম্পত্তিও তাঁর অধিকৃত হয়।

    মুচ্ছদ্দীদের উপাধি ছিল দেওয়ান। ওয়ারেন হেষ্টিং তাঁর দেওয়ান কান্তবাবুকে কতকগুলি ভাল ভাল জমীদারী ইজারা লওয়ান। কান্তবাবু সেই সময় কলিকাতায় এসে বাস করেন। বড়বাজারে আর জোড়াসাঁকোতে তাঁর বাড়ী হয়।

    কান্তবাবুর উপকারকল্পে ওয়ারেন হেষ্টিং বঙ্গের কতকগুলি নিরীহ জমীদারের উপর বিষম দৌরাত্ম কোরেছিলেন; একজনের জমীদারী কেড়ে নিয়ে আর একজনকে দান করা, এটা যেমন সৎকাৰ্য্য, প্রত্যুপকারে সেরূপ কৃতজ্ঞতা দেখানো তদনুরূপ সৎকার্য্য।

    রজনীবাবুর মুখে আমি শুনলেম, কান্তবাবুর উপকারার্থ হেষ্টিংসাহেব সেইরূপ সৎকার্য্যের অনুষ্ঠানে উৎসাহিত হয়েছিলেন। যতগুলি জমীদারী তিনি কান্তবাবুকে দেন, তন্মধ্যে রংপুরজেলার বাহারবন্দ পরগণাটী সৰ্ব্বপ্রধান। বাহারবন্দ পরগণা পূর্ব্বে রাণী সত্যবতীর সম্পত্তি ছিল, তিনি যখন কাশীবাসিনী হন, সেই সময় ঐ জমীদারীটী আপন ভগ্নী কুমারী বঙ্গগৌরবিণী রাণীভবানীকে দান কোরে যান। গবর্ণরী ক্ষমতায় ওয়ারেন হেষ্টিং সেই বিশাল জমীদারীটী বলপূর্ব্বক রাণীভবানীর অধিকার থেকে আকর্ষণ কোরে কান্তবাবুর নাবালক পুত্র লোকনাথ নন্দীকে প্রদান করেন। লোকনাথের বয়ঃক্রম তখন দ্বাদশবর্ষ পূর্ণ হয় না। হেষ্টিং সাহেবের হেতুবাদ ছিল, রাণীভবানী স্ত্রীলোক, তিনি অত বড় জমীদারী শাসন কোত্তে অক্ষম, অতএব যোগ্যপাত্রে সমর্পণ করা গেল। পাঠকমহাশয় বুঝলেন, যোগ্যপাত্র একটী নাবালক!

    ওয়ারেন হেষ্টিং প্রত্যুপকার কোল্লেন, মহত্ত্ব প্রকাশ পেলে, কিন্তু সত্যধর্ম্মানুসারে প্রত্যুপকার কোত্তে পাল্লে সে মহত্ত্ব শতগুণে উজ্জ্বল হোতো। যা-ই হোক, কান্তবাবুর ভাগ্য সুপ্রসন্ন, সাহেবের অনুগ্রহে তিনি বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন। বাহারবন্দ পরগণা রাণীভবানীর হস্তচ্যুত হওয়াতে সেখানকার প্রজারা বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল, বহুকষ্টে সে বিদ্রোহ উপশমিত হয়।

    কান্তবাবুর পুত্রের নাম লোকনাথ। অতি অল্পবয়সে লোকনাথের মৃত্যু হয়। কান্তবাবু রাজা উপাধি পান নাই, লোকনাথ রাজা হয়েছিলেন। কান্তবাবুর মৃত্যুর পর রাজা লোকনাথ অল্পদিন জীবিত ছিলেন। লোকনাথের পত্নীর নাম সুসারমোহিনী। দ্বাদশমাসবয়স্ক একটী শিশু-পুত্র নিয়ে সুসারমোহিনী বিধবা হন। পুত্রের নাম হরিনাথ বাহাদুর। হরিনাথের পুত্র কৃষ্ণনাথ। হরিনাথও রাজা, কৃষ্ণনাথও রাজা। হরিনাথের পত্নী হরসুন্দরী, কন্যা গোবিন্দসুন্দরী। রাজা হরিনাথের মৃত্যুর পর রাজ-সম্পত্তি ওয়ার্ডকোরে যায়, কুমার কৃষ্ণনাথ বয়ঃপ্রাপ্ত হবার পর রাজা উপাধি প্রাপ্ত হয়ে স্বয়ং রাজ্যভার গ্রহণ করেন। রাজা হরিনাথের ন্যায় রাজা কৃষ্ণনাথেরও অনেক সদ্গুণ ছিল। একটী মোকদ্দমায় আদালতে হাজির হবার অপমানের ভয়ে রাজা কৃষ্ণনাথ ১৮৪৪ খৃষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে আত্মহত্যা করেন। কৃষ্ণনাথের মহিষী পুণ্যবতী রাণী স্বর্ণময়ী কাশিমবাজার রাজ্যের অধীশ্বরী হন। নফর ঘোষালের অনুসন্ধানে যখন আমি কাশিমবাজারে যাই, তখন কাশিমবাজারের রাজলক্ষ্মী সেই যশস্বিনী রাণী স্বর্ণময়ী।

    রাত্রের গল্প এই পর্য্যন্ত। রাত্রিপ্রভাতে নিয়মিত কার্য্য সমাপন কোরে যথাসময়ে আমাদের সঙ্গে নিয়ে রজনীবাবু আদালতে গেলেন। প্রথম কার্য্য আমারে দরখাস্ত। দরখাস্তে আমি দস্তখৎ কোল্লেম না, দস্তখৎ কোল্লেন মণিভূষণ দত্ত। সেইটীই পরামশসিদ্ধ। কেন না, তাঁদের বাড়ীতেই অমরকুমারী ছিলেন, তাঁদের বাড়ী থেকেই চুরি হয়েছে, মণিভূষণের দরখাস্ত করাই ঠিক। দরখাস্তের বয়ানে স্থূল স্থূল বিবরণগুলি লেখা থাকলো, কাশিমবাজারের কাননমধ্যে সুড়ঙ্গ, সম্ভবতঃ সে সঙ্গে মেয়ে-চোরেরা থাকতে পারে, এই হেতুবাদে পুলিশের দ্বারা তদন্তের প্রার্থনা থাকলো, রজনীবাবু আমাদের পক্ষে পূর্ণক্ষমতাপ্রাপ্ত উকীল থাকলেন।

    দরখাস্ত পেশ হবার পর মাজিস্ট্রেটসাহেব আমাদের প্রার্থনামত পুলিশতদন্তের হুকুম দিলেন। কালবিলম্ব না কোরে কথিত বনমধ্যে আমরা উপস্থিত হোলেম; সঙ্গে থাকলে পুলিশের দ্বাদশজন চাপরাসী; থানার নায়েবদারোগা থাকলেন সর্দ্দার।

    একমুখো সুড়ঙ্গ থাকা সম্ভব; কিন্তু যে সকল সুড়ঙ্গে বদমাসলোক বাস করে কিম্বা সময়ে সময়ে প্রচ্ছন্নভাবে ওৎ কোরে থাকে, সে সকল সুড়ঙ্গের একটা মুখ থাকে না; দুই মুখ, তিন মুখ, কোন কোন স্থলে আগম-নিগমের বহু মুখ থাকে, পুলিশের লোকের সে সন্ধানটা জানা ছিল। পুলিশ-প্রহরীরা আমার নির্দ্দিষ্ট স্থলে উপস্থিত হয়ে নায়েবদারোগার আদেশে ছড়িভঙ্গ হয়ে দাঁড়ালো; দূরে দূরে ঘাঁটী; সেই রকমের আটটা ঘাঁটীতে আটজন চাপরাসী সকলের স্কন্ধেই এক এক বন্দুক। সুড়ঙ্গের যে মুখটা আমরা দেখেছিলেম, যে মুখে মুণ্ডু উঠেছিল, সেই মুখের কাছে আমরা;—আমি, মণিভূষণ, নায়েবদারোগা আর চারিজন চাপরাসী। এইখানে বলা উচিত, পূৰ্ব্বদিবসের ন্যায় আমার তখন ছদ্মবেশ; দুই পকেটে দুই পিস্তল।

    পূর্ব্বে বলা আছে, ধূৰ্ত্তলোকেরা সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখটা সাবধানে সমতল কোরে রাখে, ছিলও সমতল, অপরাপর মুখেও সেইরূপ সাবধানতা অবলম্বিত হয়, এ কথা বলাই বাহুল্য। আমার মুখে বৃত্তান্ত শুনে নায়েব-দারোগা মহাশয় মৃর্ত্তিকাখননের খন্তা, কোদালী সঙ্গে এনেছিলেন। যে বৃক্ষগাত্রে পূর্ব্বদিন আমি চিহ্ন দিয়ে রেখেছিলেম, সেই বৃক্ষতলের ভূমিখননে একজন চাপরাসী নিযুক্ত। ভূমিখনন হোচ্ছে, সেই সময় একটু হেসে নায়েবদারোগা আমারে বোল্লেন, “একটা মজা কোল্লৈ হয়। সুড়ঙ্গ-মুখে বৃক্ষপত্র জমা কোরে আগুন ধেরিয়ে দেওয়া যাক, খুব ধোঁয়া হবে, সুড়ঙ্গে যারাই থাকুক, ধোঁয়া খেয়ে, অধিকক্ষণ গর্ত্তমধ্যে তিষ্ঠিতে পারবে না, ছটফট কোরে বেরিয়ে পোড়বে।”

    হাস্য কোরে আমি বোল্লেম, “উত্তম পরামর্শ। সুড়ঙ্গে একজন থাকুক, দশজন থাকুক অথবা বেশীই থাকুক, পুলিশের লোক সুড়ঙ্গে প্রবেশ কোলে, নিশ্চয়ই তারা মোরিয়া হবে হাতাহাতি যুদ্ধ বাধাবে, রক্তারক্তি সম্ভব; সেটা ভাল নয়; ধোঁয়া দেওয়াই ভাল।”

    পরামর্শ ঠিকঠাক। খন্তা-কোদালীরা গহ্বরমুখ প্রকাশ কোরে দিলে; উঁকি মেরে দেখা গেল, অন্ধকার গহ্বর। নায়েব দারোগার নির্দ্দেশমতে চাপরাসীরা বনভূমির শুষ্কপত্র সংগ্রহ কোরে সুড়ঙ্গ-মুখে নিক্ষেপ কোল্লে, আগুন ধোরিয়ে দেওয়া হলো। শীতকাল রাত্রে শিশির পড়ে, পতিত বৃক্ষপত্র শিশিরজলে সিক্ত থাকে, বিশেষতঃ নিবিড় তরুপল্লবাকীর্ণস্থলে পৌষমাসের সূৰ্য্যরশ্মি প্রায়ই প্রবেশ কোত্তে পারে না;—পত্ৰস্তূপে আগুন ধোরিয়ে দেওয়া হলো, জ্বলে উঠলো না; ধোঁয়ায় ধোঁয়াকার! সুড়ঙ্গের ভিতরেও ধোঁয়া, বাহিরেও ধোঁয়া।

    ধোঁয়াতেই উদ্দেশ্যসিদ্ধি। পাতাগুলি জ্বলে জ্বলে বিধূমে ভস্ম হয়ে গেলে তাদৃশ ফল কিছুই হোতো না, সুড়ঙ্গমধ্যে ধোঁয়া প্রবেশ করাতে সুড়ঙ্গবাসী অবশ্যই বেরিয়ে পোড়বে, এইটী স্থির কোরে, সকলেই তখন সতর্ক-নয়নে চতুর্দ্দিক নিরীক্ষণ কোত্তে লাগলো। যে মুখে আগুন, সুড়ঙ্গবাসীরা সেই মুখে বাহির হয় কিম্বা অন্য মুখ দিয়ে পালাবার চেষ্টা করে, সেইটী দেখবার নিমিত্তই সকলে সতর্ক। সড়ঙ্গমুখের চাপরাসীর দীর্ঘ দীর্ঘ লাঠীর সাহায্যে ক্রমাগতই পাতা সংগ্রহ কোরে গহ্বরমধ্যে ঠেসে ঠেসে দিচ্ছে, ক্রমাগতই কুণ্ডলাকারে ধূম্রচক্র আবর্ত্তিত হোচ্ছে। কেহই বাহির হয় না। আমি চিন্তাযুক্ত হোলেম; ভাবলেম, আজ কি তবে এ সড়ঙ্গে কেহই নাই?

    দরখাস্তখানা তবে কি মিথ্যা হয়ে দাঁড়াবে? মিথ্যা দরখাস্ত, পুলিশ হায়রাণ, এই দুই অভিযোগে মণিভূষণ কি তবে বিপদগ্রস্ত হবেন? বোধ হয়, গহ্বরে কেহ নাই! যদি থাকতো, এত ধোঁয়া কখনই সহ্য কোত্তে পাত্তো না, অবশ্যই বেরিয়ে পোড়তো। বোধ হয়, কেহ নাই! কল্য সেই মুণ্ডুটা উঠছিল, আমাদের দেখতে পেয়ে লুকিয়ে গিয়েছিল, পাছে ধরা পড়ে, পাছে আমরা সন্ধান বোলে দিই, মুণ্ডুটা তাই ভেবেই হয় তো দলের লোকগুলোকে পালাবার পরামর্শ দিয়েছিল, রাতারাতি হয় তো পালিয়ে গিয়েছে। অনেক দেশের বনদুর্গের দস্যু-তস্করেরা এই রকম করে; একজায়গায় তারা বেশীদিন থাকে না; একটু কিছু সন্দেহ বুঝতে পাল্লেই সোরে সোরে পালায়। এ সুড়ঙ্গের তস্করেরাও হয় তো তাই কোরেছে। হায় হায়! আদালত সত্যকথা জানিয়ে আমার উপকারী বন্ধু মণিভূষণ অকারণে বিপদে পড়বেন, সেই ভাবনাই আমার।

    ভাবছি, এমন সময় পূৰ্ব্বদিকের ঘাঁটীর দুজন চাপরাসী হল্লা কোরে চেঁচিয়ে উঠলো; উত্তরদিকেও সেইরূপ চীৎকার! ধন্য জগদীশ্বর! দুই মুখের দুই দিকে দুটো লোক ধরা পোড়েছে। যে মুখের কাছে আমরা ছিলেম, সেটা দক্ষিণের মুখে;—সেই মুখে আগুন দেওয়া হয়েছিল, সে মুখে কেহই আসবে না, নিশ্চয় এইটী অবধারণ কোরে আমরা সকলেই উত্তরদিকে ছুটে গেলেম। নায়েব-দারোগা পূৰ্ব্বমুখের কাছে দাঁড়ালেন। সে মুখে যেটা ধরা পোড়েছিল, সেটা পূৰ্ব্বদিনের মুণ্ডুওয়ালা; সেটাকে আমার তত আবশ্যক ছিল না, সেই জন্য আমি সেখানে দাঁড়ালেম না। উত্তরমুখে যেটা ধরা পোড়েছিল, শান্তিরাম দত্তের বর্ণিত চেহারার মিলনে সেই লোকটাই নফর ঘোষাল, সেই অস্থিচর্ম্মসার দীর্ঘকার টিকীওয়ালা ব্রাহ্মণ, তাই দেখেই উল্লাসে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে দিতে সেই দিকেই আমি ধাবিত হোলেম। একটু পরেই জানা গেল, সড়ঙ্গটার ঐ তিন মুখ; উত্তরদিকে একমুখ, পূৰ্ব্বদিকে একমুখ, দক্ষিণদিকে একমুখ; এই তিন মুখ ছাড়া আর মুখ ছিল না। পূর্ব্বমুখের লোকটাকে বন্ধন করবার হুকুম দিয়ে, তিনজন প্রহরীকে সেইখানে মোতায়েন রেখে, নায়েবদারোগাও আমাদের কাছে উত্তরমুখে উপস্থিত হোলেন; অপরাপর প্রহরীরাও সেইখানে এসে জমা হলো। ঘোষাল মহাশয় অবিলম্বেই পুলিশের প্রদত্ত লৌহ-বলয়ে সজ্জিত হোলেন।

    সুড়ঙ্গমধ্যে আর কে কে আছে, তোরা এখানে ক-জন থাকিস, ক-জন ছিলি, ঐ দুজন বন্দীকে বার বার এই প্রশ্ন করাতে একজন বোল্লে, ষোলজন, একজন বোল্লে পাঁচজন। বাকী লোকেরা রাত্রিকালে শীকাবে বেরিয়ে গিয়েছে, দিনমানে ফিরে আসবে না, দিনমানে তারা কেবল দুজনেই ছিল, আর কেহ নাই।

    আটজন প্রহরী বনমধ্যে পাহারা থাকলো। নায়েব-দারোগা তাদের বৃক্ষারোহণ প্রচ্ছন্ন থাকবার হকুম দিলেন, সন্ধ্যার সময় তারা ছুটী পাবে, আর আটজন বদলী এসে তাদের জায়গায় ভর্ত্তি হবে, এইরূপ কথা থাকলো।

    দুজন বন্দীকে সঙ্গে নিয়ে নায়েব-দারোগা মহাশয় থানায় ফিরে এলেন। তাঁর গাড়ীতে আমরা উঠলেম না, আমি আর মণিভূষণ স্বতন্ত্র গাড়ীতে এলেম। নায়েব-দারোগার গাড়ীর কোচবাক্সে দুজন, আমাদের গাড়ীর কোচবাক্সে দুজন চাপরাসী থাকলো।

    সন্ধ্যার পূর্ব্বেই আমরা থানায় গিয়ে পৌঁছিলেম। যে আটজন প্রহরী বনের সুড়ঙ্গসমীপে মোতায়েন ছিল, তাদের বদলে রাত্রিকালে আর আটজন যাবে, সেই বন্দবস্ত ঠিক কোরে নায়েব-দারোগা মহাশয় থানার বারান্দায় বার দিলেন। আমি আর মণিভূষণ দখোনি চেয়ারে উপবেশন কোল্লেম। তখন আর আমার ছদ্মবেশ থাকলো না। বন্দীদ্বয়কে প্রাঙ্গণে দাঁড় কোরিয়ে নায়েবদারোগামহাশয় আমারে উপলক্ষ্য কোরে দস্তুরমত সওয়াল আরম্ভ কোল্লেন। বন্দীদের কাছে দুজন দণ্ডহস্ত প্রহরী দণ্ডায়মান থাকলো।

    সুড়ঙ্গপথে যে লোকটার মুণ্ডু আমি দেখেছিলেম, সেই লোকটার প্রতিই প্রথম সওয়াল। দারোগারাই পুলিশ থানার কর্ত্তা। এখানে দারোগার পরিবর্ত্তে নায়েব-দারোগা এই সকল কার্য্য কোচ্ছেন কারণ কি? কারণ, একটা খুনী মামলার তদারকের ভারপ্রাপ্ত হয়ে প্রধান দারোগা মফস্বলে গিয়েছেন, নায়েবদারোগার উপরেই এখন থানার সমস্ত কার্য্যভার সমর্পিত; অতএব নায়েবদারোগাই সওয়াল কোত্তে লাগলেন।

    সওয়াল।—তোর নাম কি?

    জবাব।—লবীনচাঁদ লাগ।

    সওয়াল।—বাড়ী কোথায়?

    জবাব।—মেদনীপুর।

    সওয়াল।—পেশা কি?

    জবাব।— চাষবাস করা।

    সওয়াল।—কাশিমবাজারের বনের সুড়ঙ্গের ভিতর কি রকম চাষবাস করিস?

    জবাব।—তা—তা—তা—

    সওয়াল।—তা—তা—তা—দা—দা—দা—এ রকম এন্তাহাম দিবার জায়গা এ নয়, ঠিক কথা বল, সুড়ঙ্গের ভিতর তুই কি করিস?

    জবাব।—তা বাবা—আমি বাবা—আমি—

    সওয়াল। তা তো বুঝেছি! আমি বাবা, তুই বাবা, সে বাবা, সকলেই তোর বাবা, তা তো বুঝেছি! কালাচাঁদের গুঁতো জানিস? (একজন প্রহরীর প্রতি ইঙ্গিত, প্রহরীর দ্বারা নবীনচাঁদের উরুদেশে দুই দণ্ডাঘাত।)

    জবাব।—(কাঁদিয়া নাচিয়া) ও বাবা!—ও বাবা!—বলি বাবা! বোলছি বাবা! সুড়ঙ্গে আমার—(নিস্তব্ধ।)

    সওয়াল—হাঁ হাঁ, সুড়ঙ্গে তোর কি?

    জবাব।—সুড়ঙ্গে আমার দাদাঠাকুর আমাকে যা যা বলে, আমি তাই করি।

    সওয়াল।—কে তোর দাদাঠাকুর? তোর দাদাঠাকুর তোকে কি কি বলে? কি কি কাজ তুই করিস?

    জবাব।—দাদাঠাকুরের নাম আমি বোলতে পারবো না; মানা আছে।

    সওয়াল।—মানা আছে? আচ্ছা কালাচাঁদ মানাবে। তোর দাদাঠাকুরকে আমি জানি। তোর দাদাঠাকুর ডাকাতী করে, মানুষ মারে, রাহাজানী করে, মেয়ে চুরি করে, নৌকা মারে। দাদাঠাকুরের হুকুমে তুইও কি সেই সব কাজ করিস?

    জবাব।—অতো কথা আমি বোলতে পারবো না। মানুষমারা, লৌকামারা, মেয়ে চুরি, ডাকা—না না, ও সব কথা আমি বোলতে পারবো না। আমি— (নিস্তব্ধ)

    নায়েব-দারোগা দেখলেন, লোকটা পাকা, সহজে তাকে বাগে আনা যাবে না। এইরুপ স্থির কোরে তিনি প্রহরীদের হুকুম দিলেন, “ঠাণ্ডা গারদে নিয়ে যাও, দস্তুমত ঠাণ্ডা কর! একঘণ্টা বাদে ফের হাজির কোরো!”

    আদেশমাত্র প্রহরীরা জোরে জোরে ধাক্কা দিতে দিতে নবীনচাঁদকে ঠাণ্ডাগারদে নিয়ে গেল! ঠাণ্ডগারদ কি রকম জায়গা, ঠাণ্ডাগারদে কি হয়, দণ্ডধারীরা কি রকমে আসামীলোককে ঠাণ্ডা করে, পুলিশের প্রতাপ আর পুলিশের কার্য্যকলাপ যাঁরা জ্ঞাত আছেন, তাঁদের কাছে সে বিষয়ের বিশেষ পরিচয় দেওয়া অনাবশ্যক।

    নবীনচাঁদ নাগ ঠাণ্ডাগারদে গেল। দ্বিতীয় বন্দী পূৰ্ব্ববৎ দণ্ডায়মান। নামধাম জিজ্ঞাসা কোরে নায়েবদারোগা তারে আমার উপদেশমত প্রশ্ন কোত্তে আরম্ভ কোলেন। নামধামের পরিচয়ে আমি বুঝতে পাল্লেম লোকটা নিতান্ত বোকাধরণের নয়; টিকীওয়ালা ভট্টাচার্যের ন্যায় কতকটা ভ্যাবাগঙ্গারাম। নামধাম ঠিক বোল্লে; ভাঁড়ালেও না, গোপনও কোল্লে না। নাম নফরচন্দ্র ঘোষাল, নিবাস বর্দ্ধমান। আমার দিকে একবার চেয়ে নায়েবদারোগা মহাশয় গভীরভাব ধারণ কোল্লেন। সে ক্ষেত্রে যেরূপ অনুষ্ঠান আবশ্যক, ইঙ্গিতে ইঙ্গিতে আমিও তাঁরে জানিয়ে দিলেম। তার পর কার্য্যারম্ভ।

    সওয়াল।—কি গো ঠাকুর! কি তোমার কার্য্য?

    জবাব।—পু—পু—পু—পুরোহিত। ঠা—ঠা—ঠা—ঠাকুরপুজো করি।

    সওয়াল।—কি ঠাকুর? নবীনচাঁদ যেমন দাদাঠাকুরের হুকুমবরদার, তুমি যে ঠাকুরের পুজো কর, তোমার সে ঠাকুরটী কি সেইরকম দাদাঠাকুর? দেখো, খবরদার! মিথ্যা বোলো না, কালাচাঁদের কথা যেন মনে থাকে, ঠাণ্ডাগারদের নামটা যেন ভুলো না! বলো এখন, কি ঠাকুরের পূজা কর?

    জবাব।—কা—কা—কাকালীঠাকুর।

    সওয়াল।—(আমার ইঙ্গিতে) আচ্ছা, বোরাকুলীগ্রামের শান্তিরাম দত্তের বাড়ী থেকে একটী মেয়ে চুরি গিয়েছে, সে খবর তুমি কিছু জানো?

    জবাব।—মে—মে—মে—মেয়েচুরি? শা—শা—শা—শান্তিরাম?

    সওয়াল।—ঠাকুর যে দেখছি আমার উপরেও টেক্কা দেন! আমি দিচ্ছি সওয়াল, আমার উপরেই ঠাকুরের সওয়াল! হাঁ গো ঠাকুর, হাঁ হাঁ হাঁ, মেয়েচুরি,—শান্তিরাম দত্তের বাড়ী থেকে মেয়েচুরি! মেয়ের নাম অমরকুমারী। খবর কিছু রাখো?

    জবাব।—আ—আ—আ—আমি তো কিছু—

    সওয়াল।—জানো না? তাই বুঝি তুমি বোলছো? তুমি কিছু জানো না?—না গো ঠাকুর, ও কথা নয়, আমি বেশ বুঝতে পাচ্ছি, কিছু কিছু তুমি জানো। মেয়ের বাপের পুরোহিত হয়ে অগ্রহায়ণমাসের একদিন তুমি সেই মেয়েটিকে আনতে গিয়েছিলে, শান্তিরাম দত্তের বাড়ীতেই গিয়েছিলে; মনে পড়ে। (মণিভূষণকে দেখাইয়া) এই বাবুটীকে তুমি চিনতে পারো?

    জবাব।—(মণিভূষণকে দেখিয়া) বা—বা—বা—বাবু? আ—আ—আ—আমি? শা—শা—শা—শান্তি?

    সওয়াল। (আমার ইঙ্গিতে) আচ্ছা, বাবুর কথা এখন থাক, অমরকুমারীর পিতার পুরোহিত তুমি,—একপুরুষের নয়, তিনপুরুষের কুলপুরোহিত, আচ্ছা, অমরকুমারীর পিতার নামটী কি, বল দেখি ঠাকুর?

    জবাব।—(যেন আত্মবিস্মৃত হইয়া) জ—জ—জ—জটাধর তরফদার।

    সওয়াল।—বাঃ! এইবার ঠিক হয়েছে। কুলপরোহিত কি কখনো মিথ্যাকথা কয়? ঠিক হয়েছে! সব কথা সত্য বল, মিথ্যা বোল্লে কি হয়, জানো তো?

    জবাব।—মি—মি—মি—মিথ্যাকথা আমি জানি না।

    সওয়াল।—আমিও তো সেই কথা বোলছি। মিথ্যা তুমি জানো না। আচ্ছা, সেই জটাধর এখন কোথায়? যে সুড়ঙ্গের ভিতর তোমরা ছিলে, জটাধর তরফদার কি সেই গহ্বরে থাকে?

    জবাব।—থা—থা—থা থাকে না।

    সওয়াল।—তবে কোথায়?

    জবাব।—গু—গু—গু—গুজরাটে।

    সওয়াল।—রে বাপ্পা! একচোটে মুর্শিদাবাদ থেকে গুজরাটে? একেবারেই দেশছাড়া? আচ্ছা, অমরকুমারী কোথায়?

    জবাব।—তা—তা—তা—তা আমি কি কোরে জানবো?

    সওয়াল।—হাঁ হাঁ, তাও তো বটে! তা তুমি কেমন কোরে জানবে! আচ্ছা, শান্তিরামের বাড়ী থেকে অমরকুমারীকে যারা চুরি কোরে আনে, তাদের নাম জানো?

    জবাব।— চু—চু—চু—চুরি করা?

    সওয়াল।—হাঁ হাঁ, সওয়ালটা হয় তো আমার ভুল হয়েছে,—চুরি নয়, ভুলিয়ে ভালিয়ে গাড়ী কোরে নিয়ে এসেছে। যারা এনেছে তাদের তুমি চেনো?

    জবাব।—জ—জ—জ—জনার্দ্দন।

    সওয়াল।—হাঁ, সে তো একজন, আর দুজন?

    জবাব।—ম—ম—ম—মুর্শিদাবাদে তারা—

    সওয়াল। তাদের সঙ্গে কি তুমি ছিলে? মুর্শিদাবাদে তুমি কত দিন এসেছ?

    জবাব।—বা—বা—বা—বাপের কথা বোলছিলে,—

    সওয়াল।—বোলছিলেম, এখন আর সে কথা বোলছি না, এখন তোমাকে জিজ্ঞাসা কোচ্ছি, ভুলিয়ে ভালিয়ে মেয়েটিকে যারা নিয়ে এসেছে, তাদের সঙ্গে তুমি ছিলে?

    জবাব।—তা—তা—তা—তারা আমাকে—

    সওয়াল।—হাঁ, আমিও সেই রকম বুঝতে পাচ্ছি। তারা তোমাকে সঙ্গে কোরে নিয়ে গিয়েছিল, তাই তুমি গিয়েছিলে, আপন ইচ্ছায় যাও নাই। ভালমানুষ তুমি বাপের বাড়ীর পুরোহিত, লোকেরা জোর কোরে তোমাকে না নিয়ে গেলে কখনই তুমি যেতে না। কেমন,—এই কথা নয়?

    জবাব।—হিঁ গো।

    সওয়াল।—হাঁ, তুমি গিয়েছিলে। চুরিকরা তোমার কাজ নয়, তারাই চুরি কোরেছে তুমি কেবল তাদের সঙ্গে ছিলে মাত্র। কেমন?

    জবাব।—চু—চু—চু—চুরি—

    সওয়াল।—আর কেন বাবা ঢাকা দিবার চেষ্টা পাও? খুলে ফেলো। চুরি করা যদি নয়, তবে মেয়েটির মুখে চোকে কাপড় বেঁধে এনেছিলে কেন?

    জবাব।—কা—কা—কা—কাপড় আমি—

    সওয়াল।—হাঁ, তা হোতে পারে। পুরোহিত তুমি, যজমানের মেয়েটির মুখে কাপড় বাঁধতে তুমি বল নাই, তারাই বেঁধেছিল, এ কথা ঠিক হোতে পারে, কিন্তু তারা কে কে? তিনজন;—একজন জনার্দ্দন, একজন তুমি, আর একজন কে? ঠিক বোলো ঠাকুর! ভয় নাই! ইচ্ছা কোরে তুমি যাও নাই, তোমার ভয় কি? সব সত্যকথা বোল্লেই আমি তোমাকে ছেড়ে দিব, হাকিমের মুখ পর্য্যন্ত তোমাকে দেখতে হবে না। মিথ্যা যদি বল, রাত্ৰিপ্ৰভাতেই তোমাকে আমি হুজুরে চালান কোরবো। খবরদার! মিথ্যা বোলো না। সত্য কোরে বোলে ফেলো, আর একটা লোক কে?

    জবাব।—(খালাস পাইবার আহ্লাদে) কু—কু—কু—কুঞ্জবিহারী।

    সওয়াল।—কুঞ্জবিহারী সাণ্ডেল?

    জবাব।—হিঁ গো।

    সওয়াল।—কুঞ্জবিহারী কোথায়?

    জবাব।—জানি না।

    সওয়াল।—তুমি বোলছে, জটাধর তরফদার গুজরাটে গিয়েছে। অকস্মাৎ গুজরাটে গেল কেন? গুজরাটে তার কি দরকার?

    জবাব। জানি না।

    সওয়াল।—অমরকুমারীকে কি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে?

    জবাব।—জানি না।

    সওয়াল।—ব্রাহ্মণ তুমি, পুরোহিত তুমি, সকল কথাই তুমি সত্য বোলছো, এইরূপে আমি বিবেচনা কোচ্ছি; উত্তম, সত্যকথা বোল্লেই বেকসুর খালাস পাবে। আচ্ছা, সত্য কোরে বল দেখি, অমরকুমারী—

    বাধা পোড়ে গেল। থানার বাহিরে একটা গোলমাল উঠলো। কি সংবাদ, কি সংবাদ, জিজ্ঞাসা কোত্তে নায়েব-দারোগামহাশয় আসন ছেড়ে উঠছিলেন, উঠতে হলো না, সংবাদ জানবার জন্য লোক পাঠাতেও হলো না, প্রহরীবেষ্টিত তিনজন নূতন বন্দী পুলিশ-প্রাঙ্গণে উপস্থিত।

    রাত্রি ৯টা। কে এই তিনজন বন্দী, অগ্রে একটু পরিচয় আবশ্যক। ঘোষালকে আর নবীনচাঁদ নাগকে বন্দী কোরে অনিবার সময় বনমধ্যে আটজন প্রহরী রেখে আসা হয়েছিল, প্রহরীরা আপনাদের বুদ্ধি খাটিয়ে সুড়ঙ্গের তিনটি দ্বার যথাপ্রাপ্ত উপকরণে বন্ধ কোরে দিয়েছিল। ভূতলে পরিভ্রমণ না কোরে বৃক্ষারোহণে প্রচ্ছন্ন থাকে, তাদের প্রতি নায়েব-দারোগার এরূপ আদেশ ছিল, সে আদেশ তারা অমান্য করে নাই। সন্ধ্যার অন্ধকার বনভূমিকে সমাচ্ছন্ন করবার একটু পরেই সেই প্রহরীদের বদলী আর আটজন নূতন প্রহরী থানা থেকে প্রেরিত হয়; সেই আটজন বনস্থলীতে উপস্থিত হবার অগ্রে পাঁচ সাতজন ছদ্মবেশী লোক সেই সুড়ঙ্গের পথে আসে, সুড়ঙ্গ-মুখ অন্বেষণ করে, সেই সময় গাছের উপর থেকে গুড়ম গুড়ম শব্দে দু-তিনবার বন্দুকের আওয়াজ হয়। বৃক্ষারূঢ় প্রহরীরা লম্ফে লম্ফে নেমে পড়ে, পুনরায় বন্দুকের আওয়াজ। যারা সুড়ঙ্গ-পথ অন্বেষণ কোচ্ছিল, তারাও বন্দুকধারী; কিন্তু হঠাৎ বন্দুকের আওয়াজ শুনে তারা যেন হতবুদ্ধি হয়ে যায়, বন্দুকে বন্দুকে যুদ্ধ হওয়া সম্ভব ছিল, চোরেরা সে চেষ্টা পরিত্যাগ কোরে ইতস্ততঃ পলায়নের উপক্রম করে; পাকড়ো পাকড়ো বোলতে বোলতে প্রহরীরা তাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবিত হয়। চোরেরা অন্ধকারে পলায়ন কোত্তে পাত্তো; কিন্তু সেই সময় বদলী আটজন উপস্থিত হওয়াতে পলায়নের ব্যাঘাত ঘটে। প্রহরী ষোলজন, আসামী সাতজন। প্রহরীরা তাদের সাতজনকেই ঘিরে ফেলেছিল, তখন তারা পশ্চাতে হোটে হোটে বন্দুকের আওয়াজ কোতে কোত্তে খানিকদুর এগিয়ে যায়; চারিজন পালিয়ে গিয়েছে, তিনজন ধরা পোড়েছে; সেই তিনজন এই। গ্রেপ্তারকারী সমাগত প্রহরীদের মুখেই এই সকল বৃত্তান্ত আমরা জানতে পাল্লেম।

    এই তিনজনের মধ্যেই একজন কুঞ্জবিহারী সান্ন্যাল। বাকী দুজনকেই আমি চিনতে পাল্লেম না; কুঞ্জবিহারীকেও চিনলেম না, কেবল নাম শুনেই বুঝতে পাল্লেম। ঘোষালের মুখে যতদূর ব্যক্ত হবার, ততদূর ব্যক্ত হয়েছে, যে সকল কথা ঘোষাল বোলতে চায় না, পুলিশের প্রহারে সে সকল কথা পাওয়া যাবে কি না, তাতেও আমার সন্দেহ থাকলো।

    নায়েব-দারোগার অনুমতি নিয়ে, কুঞ্জবিহারীকে আমি নিজেই সওয়াল কোত্তে লাগলেম। যে উপলক্ষ্যে এই সকল লোককে ধরা, সেই উপলক্ষ্যটি একটু অন্তরে রেখে, অগ্রেই আমি কুঞ্জবিহারীকে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, তুমি বর্দ্ধমানে ছিলে, বর্দ্ধমানেই আমি সে সংবাদ শুনেছিলেম, মুর্শিদাবাদে কেন এসেছ?

    কুঞ্জবিহারী উত্তর কোল্লে, “কার্য্যগতিকে কত দেশের কত লোক কত দেশে যায়, সে নিকাশ আমি কি দিব?”

    সওয়াল।—নিকাশ তোমাকে দিতেই হবে, আমার কাছে না দাও, যাঁদের কাছে এসেছ, একদিন পরে অথবা দুদিন পরে তাঁদের কাছে সব নিকাশ দিতেই হবে। আজ আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা কোচ্ছি, বর্দ্ধমানের সর্ব্বানন্দবাবুকে তুমি চিনতে কি না? সর্ব্বানন্দবাবুর উইলে তুমি সাক্ষী ছিলে কি না?

    জবাব।—ছিলেম। তুমি কেন সে কথা জিজ্ঞাসা কর?

    সওয়াল।—জিজ্ঞাসা না কোলে উপস্থিত মোকদ্দমার গোড়া ধরা যাবে না, সেই জন্যই ঐ কথাটা আমি আগে জানতে চাই। সাক্ষী তুমি ছিলে। আচ্ছা, উইলখানি তোমার নিজের হাতে লেখা কি না?

    জবাব।—সে কথা আমার মনে পড়ে না!

    সওয়াল।—উইলের ইসাদী স্থলে যেখানে তুমি নিজ নাম দস্তখৎ কোরেছ, সেখানে তোমার নামের নীচে নবিসিন্দা কথাটা লেখা আছে কি না, তা তোমার মনে পড়ে?

    জবাব।—তা যদি মনে পড়ে, তবে উইলখানা আমারই হাতের লেখা, সে কথাও তো মনে পোড়তে পারে। আমিই হয় তো লিখেছিলেম।

    সওয়াল।—আচ্ছা, সে উইলে আর কে কে সাক্ষী ছিল?

    জবাব।—অতো আমার মনে নাই।

    সওয়াল।—আচ্ছা, (ঘোষালকে দেখাইয়া) এ লোকটীকে তুমি চেনো?

    জবাব।—চিনি। এই লোকটীও সেই উইলের একজন সাক্ষী।

    সওয়াল।—আচ্ছা, উইল যখন লেখা হয়, তখন সর্ব্বানন্দবাবু কোথায় ছিলেন?

    জবাব।—কোথায় ছিলেন, আমি কিরূপে জানবো? মোহনবাবু—না না, সর্ব্বানন্দবাবুর জামাইবাবু আমাকে যেমন যেমন লিখতে বলেন, তাই আমি লিখেছিলেম।

    নায়েব-দাবোগার সওয়াল, আসামীদের জবাব, আমার সওয়াল, কুঞ্জবিহারীর জবাব, এই সকল জবাবের প্রত্যেক কথাই থানার একজন মুহুরী লিখে নিচ্ছেলেন, কুঞ্জবিহারীর শেষকথাগুলি লেখা হবার পর আর আমি কোন সওয়াল কোল্লেম না। নায়েব-দারোগা সেই সময়-অমরকুমারীর কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেন। কুঞ্জবিহারী বোল্লে, “অমরকুমারীর পিতা অমরকুমারীকে কলিকাতায় নিয়ে গিয়েছেন, এই কথা আমি শুনেছি।”

    সওয়াল।—কোথা থেকে নিয়ে গিয়েছে, তা তুমি কিছু শুনেছো?

    জবাব।—সে কথা শুনবার দরকার ছিল না। বাপের সঙ্গে মেয়ে যায়, কোথা থেকে কোথায় যায়, অপরলোকে সেটা কিরুপেই বা জানবে?

    সওয়াল। (আমার ইঙ্গিতে) অমরকুমারীর বিবাহের সম্বন্ধ করবার জন্য বোরাকুলীগ্রামে শান্তিরাম দত্তের বাড়ীতে কখনো তুমি গিয়েছিলে?

    জবাব।—আমি?—বিবাহের সম্বন্ধ কোত্তে আমি যাব? আমি হোলেম ব্রাহ্মণ, তারা হলো শুদ্র, তাদের বিবাহের সম্বন্ধে আমি কেন যাব?

    সওয়াল।—ঘটক হয়ে গিয়েছিলে, তোমার সঙ্গে আর একজন ছিল, তার নাম জনার্দ্দন মজুমদার, সে জনার্দনকে তুমি চেনো?

    জবাব।—পূর্ব্বে জানাশুনা ছিল, এখন আর তার সঙ্গে আমার দেখা হয়।

    সওয়াল।—কাশিমবাজারে সুড়ঙ্গের ভিতরে তোমরা কি কর? (অপর দুইজন আসামীকে দেখাইয়া) এরা তোমার কে হয়?

    জবাব।—এরা আমাদের সঙ্গে থাকে। আমাদের যিনি কৰ্ত্তা, তিনি আমাদের কাছে যে সকল লোককে এনে দেন, তারাই আমাদের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ায়।

    সওয়াল।—(ঘোষালকে দেখাইয়া) তোমার এই সঙ্গী লোকটী বোলছিল, অমরকুমারীর পিতা জটাধর তরফদার গুজরাটে চোলে গিয়েছে, তুমি বোলছে কলিকাতায়, কোন কথাটা সত্য?

    জবাব।—জটাধরের মুখে যেমন আমি শুনেছি, তাই আমি বোলছি, সত্যমিথ্যার বিচার আমি করি নাই।

    সওয়াল।—আচ্ছা, জটাধর যখন কলিকাতায় যায়, তখন সেখানে কোথায় কোন বাড়ীতে থাকে, অমরকুমারীকে কোথায় কোন বাড়ীতে নিয়ে রেখেছে, কোথায় গেলে তাদের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে, সে ঠিকানাটা তুমি বোলতে পার?

    জবাব।—কলিকাতায় জটাধরের নিজের বাড়ী নাই, যখন যায়, তখন যেখানে সুবিধা পায়, সেইখানেই বাসা করে, মেয়ে নিয়ে গিয়ে কোথায় রেখেছে, সে খবর আমি বলতে পারি না। কি রকমেই বা জানবো?

    নায়েব-দারোগা আসন থেকে গাত্রোত্থান কোরে, চাপরাসীদের দিকে চেয়ে গর্জ্জনস্বরে বোল্লেন, “পাকা ডাকাত! একটাকে ঠাণ্ডা-গারদে দেওয়া গিয়েছে, এই নূতন তিন বেটাকেও ঠাণ্ডা-গারদ দেখাও; আর এই নফরচন্দ্র ঘোষালটাকে হাজত-গারদে নিয়ে রাখ।”

    রাত্রি প্রায় ১১টা। আর আমরা সেখানে অধিকক্ষণ অপেক্ষা কোল্লেম না, পাঁচজন আসামী থানার গারদে আটক থাকলো, পরদিন আদালতে চালান হবে, আমরাও আদালতে উপস্থিত থাকবো, এইরূপে অবধারণ কোরে, নায়েবদারোগার কাছে আমরা বিদায় চাইলেম। থানার মুহুরী যে সকল কাগজে সওয়াল-জবাবগুলি লিখে নিয়েছিলেন, নায়েব-দারোগা মহাশয় সেই সকল কাগজে আমাদের দুজনের দস্তখৎ কেরিয়ে নিলেন, আমাদের মোকাবেলায় সওয়াল-জবাব হয়েছিল, সেইটী জানাবার নিমিত্তই আমার আর মণিভূষণের দস্তখৎ দলীলস্বরুপ তিনি রাখলেন। আমরা বিদায় হোলেম।

    রাত্রি দুই প্রহরের সময় রজনীবাবুর বাসায় আমরা পৌঁছিলেম। বাসার চাকরদের বলা ছিল, চাকরেরা সজাগ ছিল, আমরা প্রবেশ কোল্লেম। বাবুর সঙ্গে তখন দেখা হলো না, আহারাদি কোরে আমরা শয়ন কোল্লেম। প্রভাতে রজনীবাবুর কাছে সুড়ঙ্গ-সন্ধানের ফলাফল বিজ্ঞাপন কোরে বেলা ১১টার পর আমরা আদালতে উপস্থিত হোলেম। থানার চালানী আসামীরা উপযুক্ত সময়ে হাজির হলো, দস্তুরমত তাদের জবাব লওয়া হলো, কতক কতক কথা থানার কাগজের সঙ্গে মিল্লো, কতক কতক মিল্লো না। মেয়েচুরির এজেহারটা যথার্থ, আদালতের এই বিশ্বাস হলো; বাকী আসামীদের নামে গ্রেপ্তারী পরোয়ানাজারী, মণিভূষণের মানিত সাক্ষীগণের নামে শমনজারী, আসামীদের হাজতবাসের হকুম, সে দিন এই পর্য্যন্ত হয়ে থাকলো। পশুপতিবাবুর নামে চিঠি লিখে, লোক পাঠিয়ে শনিবার পর্য্যন্ত আমরা বহরমপুরেই থাকলেম।

    দিন দিন আদালতে যাই, দিন দিন আমরা নূতন নূতন তত্ত্ব জানতে পারি, কিন্তু অমরকুমারী কোথায় আছেন, ঠিক সন্ধান জানতে পারি না। মন বড় অস্থির। অমরকুমারীর সন্ধানের জন্য থানায় থানায় পরোয়ানা গেল, কলিকাতাপুলিশেও সংবাদ দেওয়া হলো, জটাধরের নামে ওয়ারীন বেরলো, মোকদ্দমা ক্রমশই মলতুবী।

  • পঞ্চবিংশ কল্প : নূতন তীর্থ

    পঞ্চবিংশ কল্প : নূতন তীর্থ

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    পঞ্চবিংশ কল্প : নূতন তীর্থ

    বহরমপুরের আদালতে মোকদ্দমা। কতদিনে সে মোকদ্দমা শেষ হবে, কতদিনে অমরকুমারীকে পাওয়া যাবে, কতদিনে আমি আবার অমরকুমারীর দর্শন পাবো, দর্শনের আশা কতদিনে আমারে শান্তি দান কোরবে, সমস্তই ভবিষ্যতের গর্ভগত। নিষ্কর্ম্মা হয়ে বহরমপুরে বোসে থাকা আমি আর উচিত বিবেচনা কোল্লেম না, এক সপ্তাহ পরেই বাবুদের বাড়ীতে ফিরে এলেম।

    পৌষমাসের শেষ। যে দিন আমি এলেম, তার পরদিন দীনবন্ধুবাবু আমাকে বোল্লেন, “ইংরেজী আদালতের মোকদ্দমা নিষ্পত্তি হোতে অনেক বিলম্ব হয়। আমি একবার দ্বারকাতীর্থে যাত্রা করবার অভিলাষ কোরেছি, তুমি দেশভ্রমণ ভালবাস, যাবে কি আমার সঙ্গে? পৌষমাসে যাব না, মাঘমাস পূণ্যমাস, মাঘমাসের ১০ই ১২ই একটী দিন দেখে যাত্রা করাই আমার ইচ্ছা। যাবে কি তুমি?”

    দ্বারকাতীর্থ। গুর্জ্জরদেশে দ্বারকাপুরী। শ্রীকৃষ্ণের রাজধানী। দ্বারকাদর্শনে আমার কৌতুহল জন্মিল, বড়বাবুর প্রশ্নে সম্মতিসূচক উত্তর দিয়ে, মনে মনে আমি বিবেচনা কোল্লেম, মোকদ্দমার কোন পক্ষেই সাক্ষাৎসম্বন্ধে আমার সংস্রব নাই; বুদ্ধির কাজ হয়েছে; দরখাস্তকারী ফরিয়াদী মণিভূষণ দত্ত; সাক্ষী-সাবুদ ঠিক পাওয়া যাবে। আমি একজন সাক্ষী হোতে পারি, কিন্তু চোরেরা অমরকুমারীকে চুরি কোরেছে, চক্ষে আমি দেখি নাই; লোকের মুখে শুনা কথা; আমার সাক্ষ্যবাক্যের উপর বেশী জোর দাঁড়াবে না, হাকিমও আমারে হাজির করবার জন্য পীড়াপীড়ি কোরবেন না; যা কিছু আমার বক্তব্য, রজনীবাবুকে সমস্তই আমি বোলেছি, নায়েব-দারোগাকেও বোলেছি, উপস্থিত ক্ষেত্রে তাঁরাই যথাকৰ্ত্তব্য বিবেচনা কোরবেন; আমি গুজরাট-দর্শনে যাব। নফর ঘোষাল বোলেছে, রক্তদন্ত গুজরাটে; কথাটা বোধ হয় ঠিক নয়; কুঞ্জবিহারীর জবাবে সে কথাটার মিল নাই। যদিই সত্য হয়, সত্যই যদি রক্তদন্ত গুজরাটে গিয়ে থাকে, তা হোলে তো একরকম ভালই হবে। বঙ্গদেশের আদালতে মোকদ্দমা দায়ের, সর্দ্দার আসামী রক্তদন্ত, তারে যদি আমি সেখানে দেখতে পাই, সেখানকার আদালতে সংবাদ দিয়ে বহরমপুরে সংবাদ পাঠিয়ে অচিরেই তারে আমি ধরিয়ে দিতে পারবো। রক্তদন্ত এখন আমার হাতের ভিতর; এতদিন তারে আমি ভয় কোরে চোলেছি, এখন অবধি সে আমারে ভয় কোরে চলুক। গুজরাটে তারে দেখতে পেলেই আমি ধোরিয়ে দিব, তাতে আর কিছুমাত্র ভুল নাই। ভালই হবে। আমি গুজরাটে যাব।

    পৌষমাসের ৭ দিন বাকী; মাঘমাসের ১০ই ১২ই যাত্রা করবার কথা; প্রায় কুড়ি দিন মুর্শিদাবাদে আমার থাকা হবে। মুর্শিদাবাদের একটী প্রসিদ্ধ স্থান পলাশী-ক্ষেত্র। এই অবকাশে পলাশীক্ষেত্রটি আমি একবার দর্শন কোরে আসবো, এই আমার নূতন সঙ্কল্প।

    সঙ্কল্পের কথা পশুপতিবাবুকে জানালেম। একা আমি যাব কিম্বা অন্য কোন লোক আমার সঙ্গে যাবে, ছোটবাবু আমাকে এই কথা জিজ্ঞাসা করেন; আমি সে কথার কোন উত্তর দিতে পারি না। শেষকালে ছোটবাবু নিজেই আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন, এইরূপ স্থির হয়। দুদিন পরেই আমরা বেরুলেম। আমাদের সঙ্গে আরো ৮/১০ জন লোক থাকলো। বেশীর ভাগ দরোয়ান।

    মুর্শিদাবাদ শহরের ১৫ ক্রোশ দক্ষিণে পলাশী-প্রান্তর। নিকটে পলাশীগ্রাম। সেই গ্রামের নামেই প্রান্তরের নামকরণ। প্রবাদ এইরুপ যে, পূর্ব্বে এই স্থানে বিস্তর পলাশবৃক্ষ ছিল, সেই সকল বৃক্ষের নামেই স্থানের নাম পলাশী। প্রান্তরের পশ্চিমপার্শ্বে ভাগীরথী। মুর্শিদাবাদ থেকে কৃষ্ণনগর পর্য্যন্ত যে একটী রাস্তা আছে, সেই রাস্তা ঐ প্রান্তরের মধ্য দিয়া চোলে গিয়েছে।

    পলাশী-প্রান্তর দীর্ঘে দুই ক্রোশ, প্রস্থে এক ক্রোশ, এইরূপ সীমা ছিল, এখন স্থানে নূতন নূতন গ্রাম বোসেছে, কতক স্থান ভাগীরথীগর্ভে প্রবেশ কোরেছে, সুতরাং প্রান্তরের পূর্ব্ববিস্তৃতি অনেকটা কম হয়ে এসেছে। যে যে অংশ ভাগীরথী-গর্ভে প্রবিষ্ট, সেই সেই অংশের এক এক স্থানে অধুনা এক একটা চর দেখা যায়; বর্ষাকালে সেই সকল ভূমি জলমগ্ন হয়, ভাগীরথীর সঙ্গে মিলিত হয়ে বায়ু-হিল্লোলে তরঙ্গ খেলায়।

    ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের জুনমাসে এই পলাশীক্ষেত্রে বঙ্গের রাজলক্ষ্মী ব্রিটিশ প্রতাপের অঙ্কশায়িনী হন। নবাব সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে ইংরেজ-সৈন্যের যুদ্ধ। বঙ্গের ইতিহাসে এই যুদ্ধই পলাশীযুদ্ধ নামে প্রসিদ্ধ। ছোটবাবুর সঙ্গে যে সকল লোক ছিলেন, তাঁদের মধ্যে যাঁরা বয়ঃপ্রবীণ এবং ইতিহাস-তত্ত্বে অভিজ্ঞ, তাঁদের মুখে শুনলেম, ইংরেজরা যতই গৌরব করুন, পলাশী বাস্তবিক ন্যায়যুদ্ধ অথবা মহাযুদ্ধ নামে কদাচ গণ্য হাতে পারে না; ফাঁকা আওয়াজে বিজয়ঘোষণা।

    মীর জাফর প্রভৃতি মন্ত্রিগণের বিশ্বাসঘাতকতাই ইংরেজ-বিজয়ের প্রধান হেতু। ইতিহাসে আছে, পলাশীর আম্রকাননে জগৎশেঠ প্রভৃতির পরামর্শ হয়েছিল, আম্রকাননে কর্ণেল ক্লাইব শিবির স্থাপন কোরেছিলেন, আম্রকাননের শীকারমঞ্চে দণ্ডায়মান থেকে নবাব-সৈন্যের বিক্রম-দর্শনে ক্লাইব প্রথমে ভয় পেয়েছিলেন, সৈন্যগণকে প্রতিনিবৃত্ত হোতে আদেশ দিয়েছিলেন। পরিশেষে ভাগ্যবলে ক্লাইবের পক্ষে জয়লাভ, গুপ্তহন্তার হাতে সিরাজদ্দৌলার মৃত্যু, মুসলমানের বলক্ষয়, ইংরেজের বঙ্গাধিকার। পলাশী-বিজয়ের অগ্রে জাহাজের কেরাণী ক্লাইব কর্ণেল ক্লাইব হয়েছিলেন, পলাশী-বিজয়ের পর কর্ণেল ক্লাইব বারণ ক্লাইব হন। সেই ক্লাইব আমাদের ইতিহাসের লড ক্লাইব।

    হাঁ, বোলছিলেম আম্রকাননের কথা। মুর্শিদাবাদের আম্রকাননগুলি আম্রকুঞ্জ নামে বিখ্যাত ছিল। এক একটী কুঞ্জে একলক্ষ আম্রবৃক্ষ বিদ্যমান থাকতো, সেই কারণে তাদৃশ উদ্যানের নাম লক্ষবাগ। এখন আর সে প্রকার আম্রকুঞ্জও দেখা যায় না, লাখবাগও দেখা যায় না, নামমাত্র অবশিষ্ট। শুনা গেল, পলাশীকুঞ্জের একটী প্রাচীন আমবৃক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রের নিক্ষিপ্ত গুলীর আঘাতে বিদীর্ণগাত্র হয়েছিল, শাখাপত্র-পরিভ্রষ্ট হয়ে শুষ্ক অবস্থায় যুদ্ধের সাক্ষীস্বরুপ দণ্ডায়মান ছিল, ইংরেজেরা সেই শেষবৃক্ষটী সমূল উৎপাটন কোরে বিলাতে প্রেরণ কোরেছেন। পলাশী-যুদ্ধের আর একটী নিদর্শন এখানে মধ্যে মধ্যে পাওয়া যায় শুনা গেল। প্রান্তরের পূর্ব্বে বৃক্ষলতা অথবা তৃণাদি কিছুই জন্মিত না, এখন এক একদিকে চাষ হয়; ভূমি-কর্ষণের সময় লাঙ্গলমুখে কখন কখন গোলাগুলী উত্থিত হয়ে থাকে। ভাগীরথীর চরেও ঐরূপ।

    পলাশীক্ষেত্রে যা কিছু দেখা গেল, তদপেক্ষা অধিক কথা শুনা গেল। তাদৃশ দর্শনযোগ্য আর কিছুই নাই। দুই একটী সমাধিস্তম্ভ দুই একজন বীর-পুরুষের নামের স্মৃতি ঘোষণা করিতেছে, এই মাত্র। পলাশী-দর্শনের আশা পরিতৃপ্ত, কৌতূহল নিবৃত্ত, কৌতুক প্রশমিত; আর আমরা সেখানে বিলম্ব কোল্লেম না, স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারণ কোরে ছোটবাবুর সঙ্গে দলবলসহ ফিরে এলেম। পথে আসতে আসতে আমাদের সঙ্গীগণের মধ্যে একজন ইংরেজীনবীস ভদ্রলোক বোল্লেন, “বিলাতে সাহেব-বিবিরা এ পথে যখন আসে, জলপথেই আসুক আর স্থলপথেই আসুক, পলাশীপ্রান্তরে উত্তীর্ণ হয়, পলাশীকে তারা তীর্থস্থান বলে, পলাশী-তীর্থে পদার্পণ কোরে উচ্চকণ্ঠে তারা জয়ধ্বনি করে; অদেয় চীৎকারধ্বনি-শ্রবণে কাননের পাখীরা আতঙ্কে কলরব কোত্তে কোত্তে উড়ে উড়ে পালায়। এই পরিচয় শ্রবণে আমি হাস্য কোল্লেম।

    আমরা বাড়ী এলেম। পূর্ব্বেই বোলেছি, পৌষমাস সমাপ্তপ্রায়। নিত্য নিত্য আমি বহরমপুরে যাই, মোকদ্দমা কোন দিন কতটুকু অগ্রসর, সংবাদ রাখি, রজনীবাবুকে সকল কথা জিজ্ঞাসা করি, যেগুলি তাঁর জানা দরকার, পূর্ব্বে যা আমি বলি নাই, সেগুলি জানিয়ে জানিয়ে দিই, এক একরাত্রি তাঁর বাসাতেও আমি থাকি, এই রকমে দিন যায়।

    থানার চালানী আসামীদের মধ্যে নফর ঘোষাল আর কুঞ্জ সান্ন্যাল আমার জানা; নাম জানা ছিল, চেহারাতেও এখন জানা। অমরকুমারীর সন্ধান তারাই জানে, তাদের মুখেই ব্যক্ত হবে, নিত্য নিত্য এই আশা আমি পোষণ করি। নবীন নাগ আর সেই দুজন নূতন বন্দী অন্য যে খবর বোলতে পারে, সে খবরে কেবল পুলিশের দরকার, আমার সঙ্গে কোন সংস্রব নাই, নফরের আর কুঞ্জবিহারীর মুখে নূতনকথা আর কি কি প্রকাশ পেয়েছে, রজনীবাবুকে জিজ্ঞাসা করি, রজনীবাবু বলেন, “সব গোলমাল।” তিনি আরো বলেন, “মূল আসামী আছে। মূল আসামী গ্রেপ্তার না হোলে, এ মোকদ্দমার কোন কিনারা হবে না। অমরকুমারী মুর্শিদাবাদে নাই, সেটা একরকম বুঝতে পারা গিয়েছে। যেখানে মূল আসামী, সেইখানেই অমরকুমারী অথবা সেই জটাধর অন্য উপায়ে অমরকুমারীকে আর কোথাও সোরিয়ে ফেলেছে, সেটা এখনো ঠিক হোচ্ছে না; জটাধরকে ধোত্তে পাল্লেই সব কথা জানা যাবে। জটাধরটাই এ মোকদ্দমার গোড়া।”

    যে রাত্রে আমাদের এই সব কথা, তার পরদিন আমি একবার আদালতে উপস্থিত হোলেম। মণিভূষণ ইতিপূর্ব্বে পূর্ণক্ষমতা প্রদান কোরে রজনীবাবুর নামে ওকালৎনামা দিয়ে রেখেছেন, নিত্য নিত্য মণিভূষণের হাজির হওয়া আবশ্যক হয় না, আমার তো হয়ই না, তবু আমি আসি। যার যেখানে ব্যথা, তার সেখানে হাত। আমারও তাই। অমরকুমারীর অদর্শনে আমি কাতর, সেইজন্যই আদালতে আমি আসি।

    একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে সেই মোকন্দমা সেদিন উঠেছে। পুলিশে যেমন যেমন জবাব দিয়েছিল, চালানী আসামীরা হাকিমের কাছে সে রকম বলে নাই, অনেক কথার উলোট-পালোট হয়ে যায়। ইতিমধ্যে একদিন নফর ঘোষাল বোলেছিল, “প্যাম্‌চাঁদ মিত্তি, হ্যামচাঁদ পালুই, বজো ভশ্চাজ্জি, এই তিনজন মুরুব্বী আমাদের দলপতির কন্যাকে কলিকাতায় নিয়ে রেখেছে।”

    সুড়ঙ্গে যারা যারা থাকে, তাদের সঙ্গে ঐ তিনজনের কি সম্বন্ধ, তারাও সুড়ঙ্গবাসী কি না, সরকারের পক্ষ থেকে এইরুপ জেরা হয়েছিল, নফর ঘোষাল সে জেরার সন্তোষকর উত্তর দিতে পারে নাই। সুড়ঙ্গে যারা থাকে, তাদের পেশা চুরি, ডাকাত, রাহাজানী, হাকিমের সম্মুখে নফরের মুখে এই কথা প্রকাশ পেয়েছে, ঐ তিনজন মুরুব্বীর বিশেষ পরিচয় প্রকাশ পায় নাই। প্রেমচাঁদ মিত্র, হেমচন্দ্র পালধি, ব্রজনাথ ভট্টাচার্য্য, তিনটে নামই আমার কর্ণে নূতন। তারা কলিকাতায় থাকে, কিন্তু কে? অমরকুমারীকে তারা কেন নিয়ে যাবে? তবে কি রক্তদন্তের সঙ্গে—মোহনলালের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে? তাই থাকাই হয় তো সম্ভব। তা না হোলে নফর ঘোষাল তাদের নাম কোরবে কেন? নফর ঘোষালেরা মোহনলালের লোক, তবেই অবশ্য রক্তদন্তের পেটাও লোক, কুঞ্জবিহারীর জবাবে উইলে সাক্ষী হওয়া প্রসঙ্গে সেই তত্ত্ব প্রকাশ পেয়েছে। ক্রমে ক্রমে একে একে কত তত্ত্ব প্রকাশ পাবে, একসঙ্গে কতলোক জড়াবে, কাণ্ডটা কতদূর গড়াবে, এক দড়ীতে কত লোক বাঁধা যাবে, অনুমানে কিছুই আমি স্থির কোত্তে পাল্লেম না।

    আমি আদালতে উপস্থিত। একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাস। কুঞ্জবিহারী সান্যালের সঙ্গে যে দুজন নূতন ডাকাত রাত্রিকালে বনমধ্যে ধরা পড়ে, হাতকড়ী-বাঁধা সেই দুজন সেই সময় হুজুরে হাজির। একজনের নাম ধুন্দুরাম, নিবাস ফরিদপুর; দ্বিতীয়জনের নাম কেফায়ৎ, নিবাস চট্টগ্রাম। দুজনেই খৰ্ব্বাকার, কৃষ্ণবর্ণ, মাথা ছোট, চক্ষু গোল, দুজনেরই সৰ্ব্বাঙ্গে দাদ। গাঁট গাঁট গড়নে খুব বলবান বোলেই বোধ হয়। ভিন্ন ভিন্ন জেলায় দুই তিনবার তারা ডাকাতী মোকদ্দমায় ধরা পোড়েছে, দুই তিনবার জেল খেটে এসেছে, কাশিমবাজারের সুড়ঙ্গে বাস করা অস্বীকার করে বাজারে কুঞ্জবিহারীর সঙ্গে পূর্ব্বের জানাশুনা হয়েছিল, সেই জন্যই বনের ভিতর এসেছিল, এসেই ধরা পোড়েছে। তারা ছ-জন, চারিজন পালিয়েছে, তারা দুজনে পালাতে পারে নাই। কুঞ্জবিহারীটা পালাবার চেষ্টা কোরেছিল, পারে নাই।

    আসামীরা আবার হাজতে প্রেরিত হলো, আমিও আদালত থেকে বেরিয়ে এলেম; সন্ধ্যাকালে উকীলের বাসায় গিয়ে, আপন মনে পূর্ব্বাপর অনেক ঘটনা আলোচনা কোল্লেম। সে রাত্রেও আমারে বহরমপুরে থাকতে হোলো।

    রাত্রিকালে রজনীবাবুকে আমি বোল্লেম, “মোকদ্দমা নিষ্পত্তি হবার অনেক বিলম্ব; এখনো পর্য্যন্ত মূল আসামীর কোন সন্ধান হলো না; দীনবন্ধু বাবুর সঙ্গে শীঘ্রই আমারে দ্বারকাতীর্থে যেতে হোচ্ছে। আপনি থাকলেন, মণিভূষণ থাকলেন, সকল ভার আপনার উপর। মোকদ্দমার আসামীরা সাজা পায়, সেটা অবশ্য বাঞ্ছনীয়, কিন্তু অমরকুমারীকে উদ্ধার করাই আমার প্রধান কার্য্য। ইতিমধ্যে যদি—গুজরাট থেকে আমার ফিরে আসবার পূর্ব্বেই যদি অমরকুমারীর সন্ধান হয়, অমরকুমারীকে যদি পাওয়া যায়, অনুগ্রহ কোরে মণিভূষণের হস্তে তাঁরে আপনি সমপর্ণ কোরবেন।”

    রজনীবাবু সম্মত হলেন। পরদিন প্রভাতে আমি যদুপুরে ফিরে গেলেম। তিন চারিদিন অতীত হয়ে গেল। উত্তরায়ণ-সংক্রান্তি; সূর্য্যের মকররাশিসঞ্চার। মাঘমাসের ১০ই ১২ই দ্বারকাযাত্রা করা বড়বাবুর ইচ্ছা ছিল, ১০ই ১২ই শুভদিন পাওয়া গেল না, ৫ই মাঘ শুভদিন, সেই দিনেই যাত্রা করা স্থির। আর দিন নাই। ছোটবাবুকে আমি বোল্লেম, “মোকদ্দমা থাকলো, আপনি থাকলেন, রজনীবাবু থাকলেন, মণিভূষণ থাকলেন, অমরকুমারীকে যদি পাওয়া যায়, এবারে আর মণিভূষণের বাড়ীতে না রেখে, আপনি দয়া কোরে এই বাড়ীতেই আশ্রয় দিবেন, তা হোলেই নিরাপদ হবে। দুষ্টলোকে এখানে আর কোন প্রকার উপদ্রব কোত্তে পারবে না, সকলদিকেই ভাল হবে।”

    ছোটবাবু আহ্লাদ পূৰ্ব্বক আমার প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ কোল্লেন। সেই দিন মণিভূষণকে আনয়ন করা হলো, তাঁকেও আমি ঐ কথা বোল্লেম, তিনিও সম্মত হলেন।

    ৫ই মাঘ সমাগত। বড়বাবুর যেমন অভ্যাস, তদনুসারে বিনা আড়ম্বরে তিনি প্রস্তুত হলেন, একজনের পরিবর্ত্তে দুজন চাকর আর একজন পাচকব্রাহ্মণ সঙ্গে থাকলো, দুর্গানাম স্মরণ কোরে আমরা যাত্রা কোল্লেম। দ্বারে মঙ্গলঘট, কদলীতরু, আম্রশাখা; সেইগুলিকে প্রণাম কোরে উপযুক্ত যানারোহণে আমরা তীর্থভ্রমণে চোল্লেম। সে সময় এ দেশে কলের গাড়ী ছিল না, ভিন্ন ভিন্ন যানে যত সময়ে গুজরাটে উপস্থিত হওয়া যায়, ততদিনে আমরা গুজরাটে গিয়ে পৌঁছিলেম।

    প্রথমে আহমদনগর। নগরটি দিব্য পরিপাটি, দেবালয়ও অনেকগুলি, তন্মধ্যে ভদ্রকালী প্রধান। আমরা ভদ্রকালী দর্শন কোল্লেম, পূজা দিলেম, তিন রাত্রি সেখানে বাস কোরে দ্বারকায় উপনীত হোলেম। দ্বারকায় শ্রীকৃষ্ণের রাজধানী ছিল, চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট আছে, মন্দিরে বিগ্রহ আছেন, বিগ্রহগুলি আমরা দর্শন কোল্লেম, শরীর পুলকিত হলো। লোকের মুখে শুনলেম, দ্বারকার পূৰ্ব্ব-শ্রী এক্ষণে কিছুই নাই।

    ব্যাধবীর কালকেতু মঙ্গলচণ্ডীর কৃপায় গুজরাটের বন কেটে নগর পত্তন কোরেছিলেন, সেই গুজরাট এখন আর একপ্রকার শ্ৰীসম্পন্ন। সৌরাষ্ট্র প্রদেশ পরিভ্রমণ কোরে আমরা বরদারাজ্যে উপনীত হোলেম। বরদা হিন্দুরাজত্ব। বরদার মহারাজ স্বাধীন। তিনি স্বয়ং সমস্ত রাজকার্য্য নির্ব্বাহ করেন, তাঁর নিজের ব্যবস্থানুসারে রাজ্য শাসিত হয়, প্রজাপুঞ্জ সুখে বাস করে। বরদায় ভবানীদেবীর একটি মন্দির আছে। ভবানী-মন্দিরে সাময়িক উৎসব হয়, নূতন প্রণালীতে নৃত্যগীত হয়, কুলকামিনীরাও উজ্জ্বল বেশভূষা পরিধান কোরে নৃত্যগীত করেন, দর্শনে শ্রবণে মনের প্রীতি জন্মে। যে সময় আমরা গিয়েছিলেম, সে সময় একটি উৎসব ছিল, উৎসবস্থলে মহারাজ উপস্থিত ছিলেন, দেবীদর্শন উপলক্ষে মহারাজকেও আমরা দর্শন কোল্লেম। সপ্তাহ কাল বেশ আমোদ-আহ্লাদে অতিবাহিত হলো।

    নগরের একপ্রান্তে আমাদের বাসা হয়েছিল। ভ্রমণে আমার বেশী অনুরাগ, যেখানে যখন যাই, স্থানগুলি মনোযোগ পূৰ্ব্বক দর্শন করি। সেই অনুরাগে বরদারাজ্যের অনেক স্থান আমি দর্শন কোল্লেম; একাকী বেরুতেম না, সঙ্গে ললাকজন থাকতো, নির্ব্বিঘ্নে বাসায় ফিরে আসতেম।

  • ষড়্‌বিংশ কল্প : নূতন বিপত্তি!

    ষড়্‌বিংশ কল্প : নূতন বিপত্তি!

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    ষড়্‌বিংশ কল্প : নূতন বিপত্তি!

    বরদায় জঙ্গল অনেক। বুদ্ধির ভ্রমে একদিন আমি একাকী সন্ধ্যার পূর্ব্বে ভ্রমণে বহির্গত হই, পথেই সন্ধ্যা হয়, পথ ভুলে আমি বনের দিকে গিয়ে পড়ি। বরদা বাস্তবিক তীর্থস্থান নয়, কিন্তু অনেক দেশের অনেক লোক নানা কার্য্যে এই রাজ্যে অবস্থান করে। আমি যেন বরদাকে নূতন তীর্থ মনে কোল্লেম। স্বাধীন হিন্দুরাজ্য ভারতে তখন অতি কম, এই হিন্দুরাজ্যকে পবিত্র তীর্থস্থান মনে করা আমার পক্ষে বিচিত্র বোধ হয় নাই। সাহেব-বিবিরা মুর্শিদাবাদের পলাশী-প্রান্তরকে তীর্থস্থান জ্ঞান করেন, হিন্দুরা বিপরীত ভাবেন। কথিত আছে, পলাশীযুদ্ধের শেষদিন আকাশে মেঘ ছিল, সমস্ত দিন বৃষ্টি হয়েছিল, যুদ্ধের পরিণাম দর্শন করা কষ্টকর বিবেচনা কোরেই যেন সূর্য্যদেব সেদিন একবারও আকাশে দেখা দেন নাই। চারিযুগের সাক্ষী চন্দ্র-সূর্য্য, পলাশীযুদ্ধের শেষদিন সূর্য্যদেব সাক্ষী ছিলেন না, বরদার জঙ্গলের দিকে আমি যখন পথ-ভ্রান্ত হয়ে বিপাকে পড়ি, তখন আকাশে সূর্য্য ছিলেন না। সন্ধ্যা হয়ে গয়েছিল, চতুর্দ্দিক অন্ধকার, কোন দিকে পথ, কোন দিকে আমাদের বাসা, অন্ধকারে কিছুই আমি ঠিক কোত্তে পাল্লেম না, নিত্য নিত্য যেমন অন্ধকার হয়, সে দিনের অন্ধকার তদপেক্ষা গাঢ়-প্রগাঢ়;—নিবিড় অন্ধকার।

    কি কারণে নৈশ অন্ধকার প্রগাঢ়, সে কথাও বলা আবশ্যক। সমস্ত দিন সূর্য্য ছিলেন, আকাশে বিন্দুমাত্র মেঘ ছিল না। সন্ধ্যার পরেই মেঘাড়ম্বর, অল্প অল্প বৃষ্টি, নক্ষত্রমালা অদৃশ্য, সেই কারণেই ঘোর অন্ধকার। আমার ভাগ্যচক্রের আবৰ্ত্তন অনেক প্রকারেই পরীক্ষিত, এ রাত্রে আবার কিরুপ পরীক্ষা হয়, অন্তরে সেই ভাবনাই প্রবল। বিদেশে অজানা পথে আমি একাকী; যে দিকে গিয়ে পোড়েছি, সে দিকে জনমানবের চলাচল নাই, নিরবচ্ছিন্ন আমি একাকী।

    বনপথ। বনমধ্যেই আমি প্রবেশ কোরেছি। নিবিড় বন, বনের নিবিড়তায় অন্ধকারের নিবিড়তাও অধিক। যে দিকে অগ্রসর হই, সেই দিকেই বন, সেই দিকেই অন্ধকার। এক একবার মনে কোচ্ছি, এই দিকে গেলেই হয় তো পথ পাব, মনে করাই ভুল, পলকে পলকে ধাঁধাঁ লাগতে লাগলো; যে দিকে মুখ ফিরাই, যে দিকে পদচালনা করি, সেই দিকেই অরণ্য। ভ্রান্তিবশে বনের ভিতর আমি ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, যদি কোন বিপদ ঘটে, যদি কোন বন্যজন্তুর সম্মুখে পড়ি, প্রাণ যাবে, মনোমধ্যে কেবল সেই ভয়; অন্য কোন ভয় তখন আমার কল্পনায় আসে নাই। রক্ষক কে?—সজীব রক্ষক কেহই না, নির্জীব রক্ষক দুটি পিতল। ব্যাঘ্রাভল্লুকাদি সম্মুখে এলে, সে অন্ধকারে কিছুই লক্ষ্য হবে না, পিস্তল তখন কোন কাজে আসবে না, সেটাও মনে মনে ভাবছি; ভয় ক্রমশই বেশী হয়ে আসছে।

    কতদূরে গিয়ে পোড়েছি, কিছুই ঠিক পাচ্ছি না। হঠাৎ বনমধ্যে যেন অশ্বপদধ্বনি শুনতে পেলেম। বনের ভিতর রাত্রিকালে ঘোড় বেড়ায়, এটাই বা কি? এ রাজ্যে কি নিশাকালে বন্য অশ্ব বিচরণ করে?—মনে মনে তর্ক আসছে, কিন্তু অশ্বের পদধ্বনি বন্য অশ্বের পদধ্বনির মত নয়; খুরে নালবাঁধা থাকলে যে প্রকার শব্দ হয়, সেই প্রকার শব্দ; বন্য অশ্ব নয়, সওয়ারের অশ্ব। মেঘাবৃত অন্ধকার রাত্রে এ রকম নিবিড় বনে ঘোড়সওয়ার কি কোত্তে এসেছে?—একবার ভাবলেম, হয় তো শীকারী, অন্ধকারে শীকারীরাই বা কি রকমে শীকার লক্ষ কোরবে, তাও বুঝতে পাচ্ছি না। ক্রমাগতই চোলেছি; ভাবছি আর চোলছি, পদে পদেই গতিরোধ হোচ্ছে; গাছে গাছে এক একবার মাথা ঠুকে যাচ্ছে, অতি সাবধানে খুব ধীরে ধীরেই চেলেছি।

    অকস্মাৎ ঘোর বিপদ! দু-দিক থেকে দু-জন লোক ছুটে এসে, আমার দুখানা হাত ধোরে ফেল্লে, ধোরেই অমনি শুন্যে শূন্যে আমাকে যেন উড়িয়ে নিয়ে চোল্লো, বোধ হলো যেন, মাটির নীচে মানুষ ছিল, মাটি ফুঁড়ে উঠেছে, উঠেই আমাকে ধোরেছে! ভুইফোঁড় মানুষ! কেন আমাকে ধোল্লে। অন্ধকারে নিঃশব্দে আমি যাচ্ছি, কেমন কোরেই বা দেখতে পেলে? কেমন কোরেই বা জানতে পাল্লে? কারা এরা? নিশ্চয়ই ডাকাত! বনের মাঝে ডাকাতের হাতে আমি পোড়েছি।

    অশ্বের পদধ্বনি আর শুনা যায় না। লোকেরা আমাকে শুন্যে শুন্যে নিয়ে চোলেছে, ভয়ে আমার সৰ্ব্বশরীর কাঁপছে, কোন কথা জিজ্ঞাসা কোরবো, কথা ফুটছে না। মনে হোচ্ছে, এরাই হয় তো ঘোড়া ছুটিয়ে আসছিল, বনপথ এদের জানা আছে, বনের ভিতর হয়তো ফাঁকা জায়গা আছে, সেই জায়গাতেই ঘোড়ার পায়ের শব্দ হোচ্ছিল, সেইখানেই ঘোড়া থেকে নেমে, এরা হয় তো আমাকে ধোরে ফেলেছে। কারে হয় তো খুঁজছিল, কে হয় তো এদের হাত থেকে পালিয়ে গিয়েছে, বাঘ-বিড়ালের মত অন্ধকারে হয় তো এদের চক্ষু জ্বলে, তফাৎ থেকে আমাকে দেখতে পেয়েই ধোরেছে।

    অতি অল্পক্ষণের মধ্যেই এই সকল ভাবনা আমার মনে এলো, বেশীক্ষণ ভাবতে হলো না, লোকেরা আমাকে এক জায়গায় নামিয়ে দিলে, দাঁড় করালে, কিন্তু হাত ছেড়ে দিলে না, তখনি আবার শুন্যে তুলে একটা ঘোড়ার উপর বোসিয়ে দিলে, আমার কোমরে একগাছা দড়ি বেঁধে ঘোড়ার সঙ্গে বেঁধে দিলে, আমার হাত দুখখানিও বেঁধে ফেল্লে। একটা লোক লাফ দিয়ে সেই ঘোড়ার উপর আমার ঠিক সম্মুখে বোসলো, আর একটা লোক সেই ঘোড়ার লাগাম ধোরে দাঁড়িয়ে রইলো।

    বড় বড় কথা; জড়ান জড়ান অনেক রকম অস্ফালনের কথা; তখন আমি বুঝলেম, দুটো একটা লোক নয়, অনেক লোক। পিস্তল সঙ্গে আছে, কিন্তু আমি নিশ্চেষ্ট, হাত-পা বাঁধা, কোন উপায় ছিল না। চতিকমাত্র একটা মশাল জ্বোলে উঠলো, মশালের আলোতে দেখলেম, দশ জন লোক, সকলের মুখেই যেন মুখোস ঢাকা, কালো কালো মুখোস। বনের ভিতর সে রকম ছদ্মবেশ কেন, তারাই জানে, আমি কিন্তু অনুমান কোত্তে পাল্লেম না। পূর্ব্বে যেটা অনুমান কোরেছিলেম, সে অনুমান ঠিক। খানিকটা ফাঁকা জায়গা, চারিদিকে বন, মধ্যস্থলে সেই জায়গা। সেইখানেই আমাকে ঘোড়ার উপর তুলেছে, আরো আট দশটা ঘোড়া সেইখানে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে আমার প্রায় বাকরোধ হয়ে গিয়ে ছিল, এতক্ষণ একটি কথাও আমার রসনা থেকে নির্গত হোচ্ছিল না, এই সময় সাহসে ভর কোরে, আমার সম্মুখের সওয়ারটাকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “কেন তোমরা আমাকে ধরেছ? আমি পথিক, আমি বিদেশী, আমার সঙ্গে টাকা নাই, পথ ভুলে অন্ধকারে বনের ভিতর এসে পোড়েছিলেম, কেন তোমরা আমাকে ধোরেছ?”

    বজ্রগর্জ্জনে লোকটা উত্তর কোল্লে, “চোপরাও! ফের যদি কথা কবি, এক গুলীতে তোর মাথার খুলী উড়িয়ে দিব!” সমান গর্জ্জনে আর একটা লোক বোলে উঠলো, “মুখ বেধে ফেল, দম বন্ধ কোরে দে!”

    যেমন হকুম, তেমনি কাৰ্য্য। আমার উত্তরীয়বস্ত্রে আমার সম্মুখবর্ত্তী সওয়ার তৎক্ষণাৎ আমার মুখ-চক্ষু বেঁধে ফেল্লে, আর আমি কিছু দেখতেও পেলেম না, একটি কথা বোলতেও পাল্লেম না; অনুভবে বুঝতে পাল্লেম, লম্ফে লম্ফে লোকেরা এক একটি ঘোড়ার উপর সওয়ার হলো। যে ঘোড়াতে আমি ছিলেম, সেই ঘোড়া অগ্রে, পশ্চাতে সওয়ারেরা সারিবন্দী হয়ে দাঁড়ালো; দুপাশে দুজন মোতায়েন থাকলো, মৃদুকদমে ঘোড়ারা চোলতে আরম্ভ কোল্লে। প্রায় দুই শত হস্ত দূরে ঘোড়া থেকে নামিয়ে লোকেরা আমাকে একটা গহ্বরের মধ্যে নিয়ে গেল, বাকী সওয়ারেরাও ঘোড়া থেকে নেমে নেমে আমাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে চোল্লো। ডাকাতের হাতে আমি বন্দী।

    গহ্বরের মধ্যে ঘর, ঠিক যেন ছোট রকম কেল্লা। একটা ঘরের ভিতর নিয়ে গিয়ে তারা আমার মুখের বাঁধন খুলে দিলে, হাত-পা যেমন বাঁধা, তেমনি থাকলো। আমার মুখের কাছে তলোয়ার নাচিয়ে নাচিয়ে একজন বোলতে লাগলো, “মুখ বুজে চুপ কোরে থাক; এখানে তোর রক্ষাকর্ত্তা কেহ নাই। চেঁচিয়ে মোরে গেলেও কেহ উত্তর দিবে না, যদি চেঁচাস, এক কোপে টপ কোরে তোর মাথাটা কেটে ফেলবো!”

    মাথা যাবে, তা আমি বুঝলেম, চীৎকার করাও বিফল, সেটাও আমি বুঝলেম, তবু কিন্তু চুপ কোরে থাকতে পাল্লেম না। যমদূতের মত দশজন ডাকাত আমার সম্মুখে দাঁড়িয়ে, কাহার হতে বন্দুক, কাহার হাতে তলোয়ার; মূর্ত্তি দেখেই আমার প্রাণ উড়ে গেল। ঘরময় মশালের আলো, কথা কোইলেই প্রাণ যাবে, বুঝতে পেরেও মৃদুস্বরে মিনতি কোরে আমি বোল্লেম, “অকারণে তোমরা আমাকে ধোরেছ, আমার সঙ্গে টাকা নাই, দয়া কর, বন্ধন খুলে দাও, আমি পালাবো না, এই অন্ধকারে কোথায় বা আমি পালাতে পারবো? খুলে দাও। রাত্রে আর কোথাও আমি যাব না, আমার সঙ্গে টাকা নাই, তোমরা বরং আমার অঙ্গবস্ত্র অন্বেষণ কর; দেখ—” অঙ্গবস্ত্র অন্বেষণের কথা আমি বোল্লেম বটে, কিন্তু ভয় হলো। সত্য যদি তারা অন্বেষণ করে, পিস্তল পাবে, তা হোলেই বিপদ বাড়বে; সেই ভয়েই কথা বোলতে বোলতে থেমে গেলেম। লোকগুলো হো হো কোরে হেসে উঠলো, “ছোঁড়াটা ভারী ধড়ীবাজ, ঐ কথাই তো বার বার বোলছে। টাকা নাই, ঐ কথাই তো কথা! টাকার জন্যই আমরা ধোরেছি! লেখ চিঠি, দেখতে এমন ফটফটে দামী দামী কাপড়পরা, মুখেও বেশ টগরা, বার বার বোলছে টাকা নাই। লেখ চিঠি! কারা তোর মুরুব্বী, কাদের কাছে তুই থাকিস, তাদের নামে তুই চিঠি লেখ? খালাসীপণ দশ হাজার টাকা, তোর মুরুব্বীরা আমাদের লোকের হাতে যদি নগদ দশ হাজার টাকা দিতে পারে, তা হোলেই খালাস পাবি, তা না হোলে—হুঁ—হুঁ—হুঁ—”

    এই সব কথা বোলতে বোলতে সকলেই এককালে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তলোয়র নাচালে, বন্দুক নাচালে, রণবেশে যেন ধেই ধেই কোরে নাচতে লাগলো।

    ভয়েই আমি আড়ষ্ট। খালাসীপণ দশ হাজার টাকা! হায় হায়! নিশ্চয় প্রাণ গেল! দশ হাজার টাকা! এ টাকা কোথা থেকে সংগ্রহ হবে? আমার প্রাণের জন্য দশ হাজার টাকা কে দিবে? টাকা না পেলেই ডাকাতেরা আমাকে মেরে ফেলবে! জীবনে হতাশ হয়ে মুখটি বুজে সেইখানেই আমি বোসে থাকলেম, থর থর কোরে কাঁপতে লাগলেম, আর একটিও বাঙ্‌নিষ্পত্তি কোল্লেম না; দারুণ পিপাসায় কণ্ঠ-তালু বিশুষ্ক, একবিন্দু জল চাইতেও সাহস হলো না।

    ডাকাতেরা আমাকে ঘিরে আছে; মাঝে মাঝে ধমক দিচ্ছে, দশ হাজার টাকার জন্য চিঠি লিখে দিতে বোলছে, কোন কথারই আমি উত্তর দিচ্ছি না। লোকেরা আপনাদের ভাষায় কাঁই-মাঁই কোরে কত কথা বলাবলি কোল্লে, মাঝে মাঝে হো হো রবে হেসে উঠলো। ভয়ে আমি আড়ষ্ট, শরীরে ঘন ঘন কম্প, কল্পের সঙ্গে ঘর্ম্ম।

    এইভাবে আমিই আছি, হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল। লোকেরাও গোলমাল কোত্তে কোত্তে একে একে বেরিয়ে পোড়লো। আমার হাত-পা বাঁধা, পালাতে পারবো না, তবু তারা ঘরের দরজায় চাবী বন্ধ কোরে দিয়ে গেল। সেই অন্ধকারে সেই ঘরের ভিতর আমি কয়েদ থাকলেম! সঙ্গী কেবল ভয় আর হতাশ।

    প্রাণ যাবে! বিদেশে বেঘোরে ডাকাতের হাতে আমার প্রাণ যাবে! খালাসীপণ দশ হাজার টাকা। সে টাকা সংগ্রহ করা আমার অসাধ্য! আর উপায় নাই! কোথায় আমি এসেছি, কোথায় গেলেম, কোথায় আমি থাকলেম, দীনবন্ধবাবু কিছুই জানতে পাল্লেন না। কতই যে তিনি উতলা হোচ্ছেন, কতই যে অন্বেষণ কোচ্ছেন, কিছুই ঠিক নাই। আকাশ-পাতাল চিন্তা! আমার হৃদয়ের দেবীপ্রতিমা অমরকুমারী! হায় হায়! চোরেরা অমরকুমারীকে চুরি কোরেছে, বহরমপুরে মোকদ্দমা হোচ্ছে, এতদিনে সে মোকদ্দমা কতদূর হলো, কিছুই জানতে পাল্লেম না। গুজরাটের জঙ্গলে ডাকাতের অন্ধকূপে আমি বন্দী, অন্ধকূপে আমার প্রাণ যায়, অমরকুমারী কিছুই জানতে পাচ্ছেন না? এ জীবনে আর দেখা হবে কি না, তারো কোন নিশ্চয়তা নাই। এই রাত্রের মধ্যে যদি আমার মরণ হয়, তা হোলেও এ যন্ত্রণার হাত আমি এড়িয়ে যাই। মত্যুকামনায় পাপ হয় জানি, কিন্তু যন্ত্রণা অসহ্য! এ যন্ত্রণা থেকে নিস্তার পাব না, সৰ্ব্বক্ষণ সেইরুপ হতাশ আমার মনে আসছিল। উদ্দেশে বিপদভঞ্জন মধুসূদনের নাম স্মরণ কোল্লেম, সেই নামের সঙ্গে অমরকুমারীর নাম একবার আমার রসনা থেকে পরিস্ফুট উচ্চারিত হলো।

    আশ্চর্য্য! ভগবানের নামের কি চমৎকার মহিমা! প্রাণে যারে ভালবাসা যায়, হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপে যারে বরণ করা যায়, তার পবিত্র নামেরই বা কি আশ্চর্য্য সঞ্জীবনীশক্তি! ভগবানের নামে আর অমরকুমারীর নামে অকস্মাৎ আমার সেই তাপিত অন্তরে তৎকালে মঙ্গলময়ী শান্তির আবির্ভাব হলো। সে অন্ধকার কারাকূপে আমি যেন তখন মূর্ত্তিমতী শান্তির অপরূপ প্রতিমা-দর্শন কোল্লেম। প্রতিমা জ্যোতির্ম্ময়ী! ঠিক যেন দেখলেম, একটি জ্যোতির্ম্ময়ী দেবীপ্রতিমা আমার চক্ষের সম্মুখে বিরাজিতা। দেবী যেন করপদ্ম-সঞ্চালনে আমাকে অভয় দিলেন। সভয় অন্তরে আমি যেন সাহস পেলেম। অন্ধকার গৃহ অকস্মাৎ যেন জ্যোতির্ম্ময়! গৃহ যেন পদ্মগন্ধে আমোদিত।

    কি আশ্চর্য্য! পুরাণশাস্ত্রে আমি পাঠ কোরেছি, সরল অন্তরে সেই মঙ্গলময়কে স্মরণ কোল্লে, আপদ-বিপদ দূর হয়ে যায়, ঘোর বিপদেও নির্ভয় হওয়া যায়। সত্যই সে কথা। জন্মাবধি আমি কখনো কারো কোন অনিষ্ট করি নাই, উপকার করবার ইচ্ছায় যথাশক্তি নিঃসম্পর্কীয় লোকেরো উপকারের চেষ্টা পেয়েছি; সর্ব্বান্তর্যামী জগদীশ্বর আমার অন্তঃকরণ জানেন, বিপদে পোড়ে আমি ডাকলেম, তিনি শ্রবণ কোল্লেন, আমাকে অভয় দিবার জন্য এই অভয়ামূৰ্ত্তিকে কারাকূপে পাঠালেন! তবে বোধ হয়, আমি রক্ষা পাব! তবে বোধ হয়, এ বিপদ আমার থাকবে না। হতাশ-প্রাণে আশার সঞ্চার! ভক্তিভাবে মনে মনে সেই ভক্তবৎসল ভগবানকে আমি প্রণিপাত কোল্লেম।

    জ্যোতির্ম্ময়ী প্রতিমা-দর্শনে আমি নয়ন মূদিত কোরেছিলেম, এই সময় চেয়ে দেখি কোথাও কিছু নাই! ডাকাতের সেই অন্ধকূপ! যে অন্ধকার, সেই অন্ধকার! সেই ঘোর অন্ধকারের মধ্যে আমি সেই শৃঙ্খলাবদ্ধ হরিদাস! সে চিরদরিদ্র—চিরনিঃসহায়—জগতের অপরিচিত—নিৰ্ব্বান্ধব সেই অভাগা হরিদাস!

    অনুমানে বুঝলেম, রাত্রি দুই প্রহর। সেই সময় কটকটশব্দে দরজার চাবী খুলে কে একজন আমার কারাকূপে প্রবেশ কোল্লে। তার এক হাতে একটা জ্বলন্ত মশাল, এক হাতে একটা আধার। চেয়ে দেখলেম, স্ত্রীলোক; ডাকাতের আড্ডায় স্ত্রীলোক থাকে, ডাকাতেরা স্ত্রীলোক সঙ্গে কোরে ঘর-সংসার করে, এটাও আমি নূতন বুঝলেম। স্ত্রীলোকটি দরজা ভেজিয়ে ধীরে ধীরে আমার কাছে এসে মশালটা একধারে রেখে দিলে, হস্তখিত আধারটাও আমার সম্মুখে রাখলে; রেখে, ফিক ফিক কোরে হেসে আমার কাছে এসে বসলো। একবার মাত্র তার মুখের দিকে চেয়ে, আমি মস্তক অবনত কোল্লেম। স্ত্রীলোকের মুখের চেহারা যেন কুলকন্যার মুখের ন্যায়, দুরন্ত ডাকাতের ঘরে এমন সুন্দরী কন্যা থাকে, এটাও অতি আশ্চর্য্য ব্যাপার। স্ত্রীলোক কৃশাঙ্গী, গাত্র অলঙ্কার-বর্জ্জিত, মস্তকের কেশ রুক্ষ রুক্ষ, তথাপি সেই অবয়বে দিব্য লাবণ্য বিদ্যমান। মুখ বিশুষ্ক নয়, একটু হাসি হাসি; সেই হাসি দেখেই আমার মস্তক অবনত।

    স্ত্রীলোকটি চুপি চুপি আমাকে বোল্লে, “এই তোমার খাবার সামগ্রী এনেছি, এইগুলি খাও; ডাকাতের আড্ডা, এই রকম খাবার এখানে পাওয়া যায়।”

    কথাগুলি বেশ মিষ্ট মিষ্ট। মুখখানি উঁচু কোরে আবার আমি সেই স্ত্রীলোকের মুখ দর্শন কোল্লেম! এইবার ভাবান্তর। সে মুখে আর সে হাসি নাই, বড় বড় চক্ষু—দুটি অশ্রুপূর্ণ। ক্ষণেকের মধ্যেই কেন এরুপ ভাবান্তর, শীঘ্র বুঝতে পাল্লেম না; কারণ জিজ্ঞাসা না কোরে, আপন অবস্থা-স্মরণে তারে আমি বোল্লেম, এ রকম ছলনা কিসের জন্য? দেখতেই পাচ্ছ, আমার হাত-দুখানি শৃঙ্খলাবদ্ধ, আমার সম্মুখে খাদ্যসামগ্রী, এ ছলনা কিসের জন্য?”

    স্ত্রীলোক বোল্লে “শিকল আমি খুলে দিচ্ছি, খুলে দিবার হুকুম আছে, তোমার খাওয়া হোলে আবার—”

    এই সময় আবার আমি সেই স্ত্রীলোকের মুখের দিকে চাইলেম; চেয়েই একবার সেই আধারের দিকে নয়ন ফিরালেম। আধারে আছে কি? দু-খানি আধপোড়া রুটি আর একটি মাটির ভাঁড়ে আধভাঁড় জল। দেখেই আমার ক্ষুধা উড়ে গেল। অত্যন্ত পিপাসা হয়েছিল, স্ত্রীলোকটিকে বোল্লেম, “আবার যদি বেঁধে রেখে যাবে, তবে আর শিকল খুলে কাজ নাই, কিছুই আমি খাব না, দয়া কোরে ঐ ভাঁড়টি তুমি আমার মুখের কাছে ধর, আমি একটু জল খাই।”

    “খাও, খাও” বোলে স্ত্রীলোকটি দু-তিনবার অনুরোধ কোল্লে, অনুরোধ বিফল হলো। অগত্যা সে আমার মুখের কাছে সেই জলের ভাঁড়টি তুলে ধোল্লে, আমি একচুমক জল খেলেম; তাতেই যেন কত তৃপ্তি। জল খেয়ে একটি নিশ্বাস ফেলে সেই স্ত্রীলোককে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “তুমি এখানে কতক্ষণ থাকবে?”

    স্ত্রী।—যতক্ষণ তুমি বলো।

    আমি।—সে কি কথা? আমি যতক্ষণ বোলবো; ততক্ষণ থাকবে, এ কথার অর্থ কি? তুমি কে? এইখানেই কি তুমি থাকো?

    স্ত্রী।—আমি কে?—তুমি আমারে জিজ্ঞাসা কোচ্চ আমি কে?—হা অদৃষ্ট! দেখেও কি কিছু বুঝতে পাচ্চো না? তোমারে যে দশা, আমারো সেই দশা!

    আমি।— (সবিস্ময়ে) ভাল বুঝলেম না, স্পষ্ট কোরে বল।

    স্ত্রী।—আরো স্পষ্ট শুনতে চাও?—(কপাটের দিকে চাহিয়া অতি মৃদুস্বরে) আমি এদের শীকার। বনের ভিতর তোমারে যেমন ধোরেচে, আমারেও তেমনি কোরে ধেরে রেখেছে! আমার সঙ্গে লোক ছিল, পাল্কী ছিল, বনের ভিতর ধরে নাই, বনের বাইরে রাস্তা দিয়ে আমরা যাচ্ছিলেম, সন্ধ্যা হয়েছিল, আমার সঙ্গের লোকগুলিকে মেরে ধোরে তাড়িয়ে দিয়ে কেবল আমারেই এরা কয়েদ কোরে রেখেছে। আটমাস আমি এখানে আছি। হাজার টাকা চায়। হাজার টাকা পেলে ছেড়ে দিবে বলে। আমার গায়ে অলঙ্কার ছিল, তার দাম হাজর টাকার বেশী। তা এরা সব খুলে নিয়েছে, তা বলে, হাজার টাকা চাই। কোথায় আমি পাবো? কাজেকাজেই কয়েদ আছি! এরা আমারে দাসী কোরে রেখেচে! এদের সর্দ্দার আমার—আমার—ধর্ম্ম—

    আমি।—(শিহরিয়া) উঃ! কি নরাধম। সে সর্দ্দার এখন কোথায়?

    স্ত্রী।—সর্দ্দার এখানে নাই, শীকারে গিয়েছে। শীকার বুঝতে পারো?—লোকের যেটা সৰ্ব্বনাশ, সেইটিই এদের শীকার।

    আমি।—সর্দ্দারটা আসবে কখন?

    স্ত্রী।—সকল দিন যায় না, যেদিন যেদিন যায়, শেষরাত্রে ফিরে আসে। সর্দ্দার এখানে থাকলে—ডাকাতেরা যে সব কথা বোলছিল, সে সব আমি শুনেচি। চিঠি লিখতে বলছিল। সর্দ্দার এখানে থাকলে চিঠিখানা লিখিয়ে নিয়ে তবে ছাড়তো। দশ হাজার টাকা দিতে পারে, সত্য কি তেমন কোন বন্ধ লোক এখানে আছেন?

    আমি।—আমার বন্ধু জগদীশ্বর! জগতের বন্ধু যিনি, তিনি ভিন্ন আমার জীবনের বন্ধু আর কেহই নাই।

    স্ত্রী।—(নিশ্বাস ফেলিয়া) তবেই তো! আহা! তোমার মতন কতজনকে এরা ধরে, এক একজন টাকা দিয়ে খালাস পায়, এক একজন চাকর হয়ে দলে মিশে যায়, দলে যারা না মেশে কিবা টাকা দিতে না পারে, তাদের বেঁধে রাখে, কুকুর দিয়ে খাওয়ায়, না হয় তো প্রাণে মেরে রাতারাতি দরিয়ার জলে ভাসিয়ে দেয়! সত্য কি তোমার উদ্ধার করবার কেহই নাই?

    আমি।—কেন থাকবে না? ঐ যে বোল্লেম, জগতের বন্ধু যিনি, তিনিই আমার উদ্ধারকর্ত্তা।—দীনবন্ধু, অনাথবন্ধু, জগবন্ধু!

    স্ত্রী।—(সচকিতে) আর একটি লোক—তিনি—না বাপু! আর আমি এখানে দেরী কোরবো না, চোল্লেম, জগবন্ধু তোমারে রক্ষা কোরবেন!

    স্ত্রীলোকটি আর থাকলো না, মশালটা হাতে কোরে নিয়ে, ঘর থেকে বেরিয়ে, পূৰ্ব্ববৎ দ্বারে চাবী দিয়ে চোলে গেল। পোড়া রুটি দুখানা আমার কাছেই পোড়ে থাকলো। আমি আবার অন্ধকারে ডুবে থাকলেম।

    স্ত্রীলোক তবে ডাকাতের মেয়ে নয়। আপন মুখেই বোলে গেল, ‘তোমারো যে দশা, আমারো সেই দশা!’ কথা ঠিক! ভদ্রলোকের কন্যা; প্রাণে দয়া আছে; আমার কল্যাণকামনা কোরে গেল। উঃ! পিশাচের পুরী! সর্দ্দার ডাকাতটা এই কন্যাটির ধর্ম্ম নষ্ট কোরেছে! টাকা না পেলে নরহত্যা করে। এ সকল লোকের এই সকল মহাপাতকের কি প্রায়শ্চিত্ত আছে?

    এই সকল আমি ভাবছি, প্রায় চারিদণ্ডকাল ভাবনাসাগরে ডুবে অন্ধকূপে বোসে আছি, এমন সময়ে আবার দ্বারের বাহিরে কটকট কোরে চাবী খোলার শব্দ। ভয়ে আমার সৰ্ব্বাঙ্গ কেঁপে উঠলো। এবার আর স্ত্রীলোক নয়, এবার নিশ্চয়ই ডাকাত! হয় তো সর্দ্দারটাই স্বয়ং! এইবার হয় তো আমার ভাগ্যফলের শেষপরীক্ষা।

    নিঃশব্দে একটি লোক প্রবেশ কোল্লে; আলো নাই, অন্ধকারেই প্রবেশ কোল্লে। শব্দে বুঝলেম, দরজাটা ভিতরদিকে বন্ধ কোরে দিলে। আন্দাজে আন্দাজে চুপি চুপি আমার দিকে এগিয়ে এলো। অনুভবে বুঝলেম, বোসলে;—সাবধানে মৃদস্বরে আমারে উদ্দেশ কোরে বোলে, “ভয় পেয়ো না, যেমন আছ, ঠিক ঐ ভাবে চুপ কোরে থাকো—কোন ভয় নাই!”

    বেশ স্পষ্ট কথাগুলি আমি শুনলেম। স্বরে বুঝলেম, দয়ামিশ্রিত কোমলস্বর। ডাকাত নয়। ডাকাতের কণ্ঠস্বর এরকম হয় না। স্বর আমারে অভয় দিচ্ছে। ধন্য জগদীশ্বর! কোন মহাপুরুষ আমারে অভয় দান করবার নিমিত্ত ডাকাতের অন্ধকূপে উপস্থিত? চুপ কোরে থাকবার আদেশ—চুপ কোরেই তো আছি, আছি তো সত্য, কিন্তু একটি কথা জিজ্ঞাসা না কোরেও তো স্থির থাকা যায় না, প্রাণ হাঁইফাঁই কোত্তে লাগলো, মনে মনে অনেক রকম তোলাপড়া কোরে, যা থাকে ভাগ্যে, এইরুপ ভেবে, পূর্ণসাহসে একনিশ্বাসে চুপি চুপি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আপনি কে?”

    পূৰ্ব্ববৎ সতর্কবাক্যে সেই সদয় স্বর আমারে আদেশ কোলে, “চুপ! নিস্তব্ধ থাকাই নিরাপদ। কোন ভয় নাই!—আমি—এখানকার ডাকাতেরা যে সকল লোককে ধরে, আমি তাদের উদ্ধার করবার চেষ্টা করি, ডাকাতের সঙ্গে ছদ্মবেশে বেড়াই। একটা নিগূঢ় বিষয়ের অনুসন্ধানে আমি আছি, যত দিন সে কাৰ্য্য সিদ্ধ না হয়, তত দিন ডাকাতের দলকে ধরিয়ে দিতে পাচ্ছি না। যে সকল নিরীহ লোক এদের কবলে ধরা পড়ে, সঙ্গোপনে আমি তাদের বন্ধুর কাজ করি, ডাকাতেরা কিছুই জানতে পারে না। তুমি যেই হও, মনে কর, মনে রাখ, তোমারো বন্ধু আমি।”

    কথাগুলি আমার কর্ণে যেন অমৃতবর্ষণ বোধ হলো। সত্য সত্য শঠতা কি কপটতা, নিঃসংশয়ে সেটি তখন স্থির কোত্তে না পাল্লেও, ঈশ্বরকে স্মরণ কোরে আমি আশ্বস্ত হোলেম। আশ্বাসের ধৰ্ম্ম শান্তভাব, আমি তখন শান্তভাবকে হৃদয়ে ধারণ কোরেও কিঞ্চিৎ চাঞ্চল্য দেখালেম; দুর্ণিবার আগ্রহে ধীরস্বরে পুনরায় জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “কোন মহাপুরুষের অভয়বাক্য আমি—”

    অন্ধকারে অঙ্গস্পর্শে বাধা দিয়ে সেই স্বর উত্তর কোল্লে, “পরিচয়ের সময় আছে। উতলা হয়ো না। ডাকাতেরা যা তোমারে বোলবে, উত্তর দিয়ো না, ভয় পেয়ো না, সময়োচিত ব্যবস্থা করা আমার ভার, এখন আমি চোল্লেম। পুনরায় তোমাকে আমি নিশ্চয় কোরে বলে যাচ্ছি, কোন ভয় নাই! কোন ভয় নাই!”

    মূর্ত্তি বোসে ছিলেন, উঠে দাঁড়ালেন। অনুমানে আমি বুঝলেম, দ্বারে নিকটে গিয়ে ধীরহস্তে অর্গল মুক্ত কোরে ঘর থেকে বেরুলেন, তার পর দ্বারে চাবী বন্ধ কোরে গন্তব্য স্থানে প্রস্থান কোল্লেন।

    ইনি কে? যে সব কথা বলে গেলেন, সেগুলি কি সত্য? কপটতা কোরে আমারে স্তোক দিবার জন্য ঐ সব কথার রচনা, এমনও তো বোধ হোচ্ছে না। কথাগুলি সত্য ডাকাতের দলে কেন আছেন, তিনি নিজেই একটু আভাষ দিয়ে গিয়েছেন। দেবতারা যদি আমার প্রতি সদয় হন, ঐ ছদ্মবেশী লোকটির দ্বারাই আমার উদ্ধার হোতে পারবে, মনে এইরূপ আশা জন্মিল; উদ্দেশে ঈশ্বরকে নমস্কার কোল্লেম।

    রজনী প্রভাত। কারাকূপ অন্ধকার। কোন দিকের দেয়ালে একটিও গবাক্ষ ছিল না, দ্বারে পাষাণবৎ সুদৃঢ় সুবৃহৎ কপাট, ছিদ্রপথপরিশূন্য, কোন দিকেই আলো দেখা গেল না। মানুষের কলরবে আর কাননের পক্ষীকুলের ঝঙ্কারে আমি অনুভব কোল্লেম, রজনী প্রভাত। আমার আর প্রভাত-সন্ধ্যায় প্রভেদ কি? প্রভাতে কেহই সে কারাগারে প্রবেশ কোল্লে না, আমি একাকী বোসে বোসে আপন অদৃষ্টের ভাবনা ভাবতে লাগলেম। অনেক বিলম্বে একজন লোক এলো। রাত্রিকালে যে সকল লোকের মুখে মুখোস দেখেছিলেম, তাদের মধ্যে কেহ কি না, বুঝতে পাল্লেম না। লোকটার মুখোস মুখে ছিল না, বড় বড় গোঁফদাড়ীযুক্ত ভীষণ বিকট মুখ, মাথার চুলে পৃষ্ঠদেশের অর্দ্ধেকটা পর্য্যন্ত ঢাকা; চুলগুলো ঝাঁকড়া ফাঁকড়া, তাম্রবর্ণ; দেখলেই ভয় হয়।

    ভয় আমার সহচর; ভয় আমারে বেশী ভয় দেখাতে পারে না; ভয়কে আমি একরকম ঘরপোষা ভেবে নিয়েছি। লোকটাকে দেখে ভয় হলো, কিন্তু সেই লোক আমাকে একটি কথাও বোল্লে না, ইসারায় মুখভঙ্গী কোরে ডাকলে। শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় যে ভাবে চলা যায়, সেই ভাবে আমি তার সঙ্গে সঙ্গে চোল্লেম। কোন দিকে কি দেখছি, কোন দিকে বাহিরে যাবার পথ, কিছুই জানতে পাচ্ছি না। ইতস্তত আরো জনকত লোক ঠাঁই ঠাঁই বোসে আপনাদের কাজে অন্যমনস্ক ছিল, আমি যখন বেরুলেম, তারা সেইসময় এক একবার ঘূর্ণিতনয়নে আমার দিকে চেয়ে দেখলে, চেয়েই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলে। দিনের বেলায় এরা মুখোস পরে না, খোলামুখে থাকে; তাদেরো মুখে তখন মুখোস ছিল না। রেতের বেলা মুখোস পরে, এটাইবা কি রকম? বোধ হয়, আপনাদের আড্ডা বোলেই নির্ভয়। সবগুলো খোলামুখ আমি দেখলেম।

    যে লোক আমারে সঙ্গে কোরে এনেছিল, তার ইঙ্গিতে আমি একটা অন্যঘরে প্রবেশ কোল্লেম। লোক আমার হাতের হাতকড়ী খুলে দিলে। একটু স্বাধীনভাবে সেইখানে আমি নিত্যক্রিয়াদি সমাপ্ত কোল্লেম, ঘরের একধারে বড় বড় গামলায় জল ছিল, স্নান কোল্লেম; শরীর একটু স্নিদ্ধ হলো। বন্দীর আবার স্নান! গায়ের জল গায়ে থাকলো, মাথার জল দরদরধারে গায়ে পোড়তে লাগলো, ভিজে কাপড়েই আমি কাঁপতে লাগলেম। স্নানের অগ্রে গায়ের জামাগুলি খুলে রেখেছিলেম, সিক্তবস্ত্রের উপর সিক্তগাত্রে সে জামাগুলি গায়ে দিলেম। লোক আমারে সঙ্গে কোরে আর একটা ঘরে নিয়ে গেল। কোনদিকেই রৌদ্র দেখতে পেলেম না, ভূগর্ভ-গহ্বরে রবির প্রবেশ করে না, কেবল অল্প অল্প আলো হয়, এইমাত্র বুঝা যায়। বেলা কত, নির্ণয় করবার উপায় ছিল না, লোক আমারে সেই ঘরে রেখে, দ্বারে চাবী দিয়ে অন্যদিকে চোলে গেল। অনুগ্রহের মধ্যে কেবল এই থাকলো, আমার হাত-দুখানি বেঁধে রেখে গেল না। আর একটি অনুগ্রহের কথা বলি। বার বার আমি বোলেছিলেম, আমার সঙ্গে টাকা নাই; কথায় তাদের বিশ্বাস হয়েছিল কি না হয়েছিল, বোলতে পারি না, কিন্তু তারা আমার অঙ্গবস্ত্র অন্বেষণ করে নাই। পকেটে দুটি পিস্তল ছিল, তাও তারা জানতে পারে নাই।

    ক্ষণকাল পরেই দ্বার উদ্ঘাটিত। সেই স্ত্রীলোক। রাত্রে যে স্ত্রীলোকটি আমারে রুটী দিয়ে গিয়েছিল, কতক কতক আত্মপরিচয় প্রকাশ কোরেছিল, সেই স্ত্রীলোক।

    সেই রকম আধপোড়া রুটি, সেইরকম জলের ভাঁড় সেই স্ত্রীলোকের হস্তে ছিল, “খাও খাও” বোলে আমার সম্মুখে ধোরে দিলে। বিগ্রহের কাছে ভোগ দেওয়া যে প্রকার, ডাকাতের আড্ডায় আমার সম্মুখে খাদ্যসামগ্রী ধরাও সেইপ্রকার। একবার চেয়ে দেখলোম মাত্র, খেলেমও না, স্পর্শও কোল্লেম না। স্নানের পূর্ব্বে পিপাসা ছিল, স্নানান্তে সে পিপাসারও শান্তি হয়েছিল, জলের ভাঁড়ের দিকে একবার চাইলেম, ছুঁলেম না; ভাঁড়ের জল, ভাঁড়েই থাকলো।

    রাত্রে মশালের আলো থাকলেও স্ত্রীলোকের মুখখানি আমার ভাল কোরে দেখা হয় নাই, এই সময় দেখলেম; অনেকক্ষণ চেয়ে চেয়ে ভাল কোরে দেখলেম। হঠাৎ আমার সর্ব্বশরীর রোমাঞ্চিত হলো! এই স্ত্রীলোককে কোথায় যেন আমি দেখেছি, এই ভাব মনে পোড়লো। বেশীদিন দেখি নাই, দূরে থেকে একবারমাত্র দেখা, এইরুপ যেন অনুমান কোল্লেম। এ স্ত্রীলোক গুজরাটে কেমন কোরে এলো, কেনই বা এসেছে, অনুমান কোত্তে পাল্লেম না। রাত্রে শুনেছি, স্ত্রীলোক বোলেছে, সঙ্গে লোকজন ছিল, পাল্কী ছিল, গায়ে গহনা ছিল, কথাগুলি মিথ্যা বোধ হয় না, কিন্তু কারা সেই সব লোকজন?

    স্বপ্নের ন্যায় একটু একটু মনে কোত্তে লাগলেম, নিঃসংশয় হোতে পাল্লেম। পরিচয় দিতে দিতে অর্দ্ধোক্তিতে স্ত্রীলোক একবার বোলেছিল, “ডাকাতের সর্দ্দার আমার—ধর্ম্ম” স্ত্রীলোকের মুখে দেখে দেখে, সেই অর্দ্ধসমাপ্ত বাক্যই আমার মনের উপর তখন যেন বেশী আধিপত্য কোত্তে লাগলো।

    মনের ভাব মনের ভিতর গোপন কোরে স্ত্রীলোককে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “তোমাদের সেই সর্দ্দারটি কত রাত্রে ফিরে এসেছে?”

    স্ত্রী।—আসে নাই। মাঝে মাঝে তার এইরকম হয়। যে রাত্রে শীকার ধোত্তে পারে না, সে রাত্রে ফিরে আসে না। চেষ্টা নিষ্ফল হলে দু-তিন রাত্রি আসে না। আরো কোথায় কি তার কাজ আছে, পরমেশ্বর জানেন, সেই সব কাজেই মাঝে মাঝে তার অনেক সময় যায়।

    আমি।—আটমাস তুমি এখানে আছ, এই আটমাসের মধ্যে তার অপরাপর কার্য্যের কোন সূত্ৰই কি তুমি জানতে পার নাই?

    স্ত্রী।—তা আমি কেমন কোরে জানবো? ডাকাতের কাজ ডাকাতী করা। এখানকার ডাকাতেরা কেবল দল বেঁধে বেঁধে লোকের বাড়ী বাড়ী ডাকাতী কোরে বেড়ায় না; বনের ধারে রাস্তার ধারে ওৎ কোরে থেকে, সুবিধামত শীকার পেলেই ধোরে ফেলে। এই,—আমারে যেমন ধোরেচে, তোমারে যেমন ধোরেছে, সেইরকমই শীকার ধরে। তা ছাড়া আরো কতরকম শীকারধরা ফন্দী আছে, কে বোলবে?

    আমি।—আচ্ছা, সর্দ্দার তোমারে এখানে আটক কোরে রেখেছে, সে যখন উপস্থিত থাকে না, তখন অন্য ডাকাতেরা তোমার সঙ্গে কি রকম ব্যবহার করে?

    স্ত্রী। (লজ্জায় নতমুখী হইয়া) ও কথা কেন তুমি জিজ্ঞাসা কোচ্চো? ডাকাতদের ধর্ম্ম-কর্ম্ম ডাকাতেরাই জানে, আমার সঙ্গে অন্য ডাকাতের কথাবার্ত্তা হয়, এক একজন ডাকাত হাসি-তামাসাও জোড়ে, সর্দ্দারের ভয়ে—ধর্ম্মের ভয়ে নয়, সর্দ্দারের ভয়ে কেহ কিছু বোলতে পারে না।

    আমি!—হাঁ, বুঝলেম, ডাকাতের আড্ডায় তুমি আছ, আটমাস আছ, যাদের সঙ্গে তুমি এসেছিলে, ডাকাতেরা সকলকেই কি মেরে ফেলেছে? একজনও কি বেঁচে নাই?

    স্ত্রী।—তা হয় তো থাকতে পারে। পথে যখন যুদ্ধ হয়, তখন দুই একজন পালিয়ে গিয়েছে, তা আমি দেখেচি।

    আমি। তবে? তারা কি তোমার অন্বেষণ করে না? এই আটমাসের মধ্যে তারা কি তোমার উদ্ধারের জন্য কোন চেষ্টা করে নাই?

    স্ত্রী।—প্রাণের ভয় সকলেরই আছে। বাঘের ঘরে আমি রোয়েচি, ক্ষুদ্রপ্রাণে বাঘের ঘরে প্রবেশ কোত্তে কার তেমন সাহস হবে?

    আমি।—হাঁ, সে কথা সত্য, কিন্তু দেশ তো অরাজক নয়, কোন উপায়ে কোন কৌশলে রাজ-দরবারের সংবাদ দিলেও তো—

    স্ত্রী।—রাজ-দরবার? রাজাকে এরা গ্রাহ্য করে না! রাজাও এদের নামে ভয় পান! একটি লোক—না বাপ!—সেই কথাই বার বার আমার মনে পড়ে, সে কথা আমি বোলবো না; বলি বলি মনে করি, ভয় হয়।

    আমি।—(চিন্তা করিয়া) আচ্ছা, দেখতে পাচ্ছি, তুমি তো গুজরাটি মেয়ে নও, চেহারাতেও দেখছি, কথা শুনেও জানতে পাচ্ছি, তুমি বাঙালী। আচ্ছা, বোলতে যদি কোন বাধা না থাকে, সত্য কোরে আমাকে বল দেখি, কোন দেশে তোমাদের বাড়ি?

    স্ত্রীলোকটি বোসে ছিল, আমার ঐ প্রশ্ন শুনেই অস্থির হয়ে উঠে দাঁড়ালো; তাড়াতাড়ি বোল্লে, “খাও তো খাও, আর আমারে বোসিয়ে রেখো না; ও সব কথার উত্তর দিতে আমি পারবো না! বাড়ী কোথায়, ঘর কোথায়, জন্মো কোথায়, সে সব খবর আর কেন? সে সব কথা শুনলে আমার কেবল কান্না পায়! ধর্ম্মকর্ম্ম যখন জলাঞ্জলি হয়ে গিয়েছে, তখন আর ও সকল খবরে কি ফল? খাও তো খাও, আমি চোল্লেম।”

    ঊর্দ্ধমুখে আমি চেয়ে দেখলেম, সত্যই অভাগিনীর চক্ষে জল এসেছে। সে প্রসঙ্গ আর আমি উত্থাপন কোল্লেম না, আর তার মুখের দিকে না চেয়েই মৃদুস্বরে বোল্লেম, “কিছুই আমি খাব না, এ সকল তুমি নিয়ে যাও।”

    সজলনয়নে আমার মুখপানে চেয়ে স্ত্রীলোকটি বোল্লে, “না খেয়ে কি রকমে বাঁচবে; কত দিন যে এখানে কষ্টভোগ কোত্তে হবে, তাই বা কে বোলতে পারে? কিছু খাও। রাত্রে বরং আমি খানকতক ভাল রুটি এনে দিব, এখন দু-একখানি এই রুটি খেয়ে একটু জল খাও; না খেলে বাঁচবে কেন?”

    সে সব কথা আমি শুনলেম না, কিছুই খেলেম না, জল-রুটি সেইখানে ফেলে রেখে স্ত্রীলোকটি বেরিয়ে গেল, দস্তুরমত কপাটে চাবী পোড়ালো।

    যে ঘরে এখন আমি আছি, এটা নূতন ঘর; দেয়ালের দুই ধারে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দুই তিনটি ছিদ্র, সেই সকল ছিদ্রে অল্প অল্প আলো আসে, অল্প অল্প হাওয়া আসে, একটু আরামে নিশ্বাস ফেলা যায়। ছিদ্রগুলি কিছু উচ্চে উচ্চে অবস্থিত; সার্দ্ধ ত্রিহস্ত পরিমিত মানবদেহ বাহু উত্তোলন কোরে সেই সকল ছিদ্রপথ স্পর্শ কোত্তে পারে না, তথাপি একটু আরাম পায়। সেই ঘরে আমি বোসে আছি, ডাকাতেরা কেহই আসছে না। খালাসী টাকার জন্য চিঠি লিখে দিতে হবে, টাকা না পেলে তারা আমাকে ছেড়ে দিবে। কার নামেই বা চিঠি লিখবো? কারেই বা আমি চিনি? দীনবন্ধুবাবু দয়া কোরে আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন, আমার খালাসের জন্য ডাকাতকে তিনি দশ হাজার টাকা দিবেন, এমন তো কিছুতেই সম্ভব বোলে বোধ হয় না, তেমন আশাও করা যায় না; তাঁরে আমি এ কথা লিখতেই পারবো না। পরমেশ্বর; যদি রক্ষা করেন, তবেই রক্ষা হবে, না হয় তো এইখানেই প্রাণ যাবে। ডাকাতেরা যদি মারে, তা হোলেও প্রাণ যাবে, তারা যদি না মারে, অনাহারেই মারা যাব, এই আমার তখনকার সিদ্ধান্ত।

    বেলা হোচ্ছে, বেলা যাচ্ছে, সংস্কারবশে বুঝতে পাচ্ছি, কিন্তু বাস্তবিক কত বেলা, সেটা ঠিক জানতে পাচ্ছি না। নিষ্কর্ম্মা বোসে বোসে ছিদ্রপথে চেয়ে আছি, মন কিন্তু চিন্তাশূন্য নয়। চিন্তা অনেক প্রকার, তার উপর নিজের প্রাণরক্ষার চিন্তা। সকল চিন্তাকে অতিক্রম কোরে আড্ডার ঐ স্ত্রীলোকটির চিন্তা তখন আমারে কিছু অধিক চঞ্চল কোরে তুল্লে। কে এই স্ত্রীলোক? কোথাকার স্ত্রীলোক?

    কে ঐ স্ত্রীলোক? পূর্ব্বে কোথায় তারে আমি দেখেছি?—দেখেছি নিশ্চয়, কিন্তু কোথায়? যে কয়েকটি স্ত্রীলোকের সঙ্গে এ জীবনে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে, তাদের কথা মনে আছে। তাদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠভাবে কথাবার্ত্তা চোলেছে, তাদের চেহারা যেন, নিত্য সৰ্ব্বক্ষণ আমার চক্ষের কাছে উপস্থিত হয়। এ স্ত্রীলোকটিকে সে ভাবে আমি দেখি নাই, কেমন যেন নূতন নূতন মনে হয়। এখানে দেখলেম নূতন, গত রাত্রে ভেবেছিলেম নূতন, আজ মনে হচ্ছে, পূর্ব্বের দেখা; কিন্তু কোথায়?

    দিনমানের মধ্যে মনে আনতে পাল্লেম না। সন্ধ্যা সমাগত। দেয়ালের ছিদ্রপথে একটু একটু আলো আসছিল, সে আলো তিরোহিত; সেই লক্ষণেই জানতে পাল্লেম, সন্ধ্যাকাল। আমি কয়েদী। ডাকাতেরা আমার উপকারের জন্য ঘরে আলো জ্বেলে দিবে না, আলো আমি চাইও না, ভাগ্য যখন অন্ধকার, তখন এ জায়গায় অন্ধকারে থাকাই ভাল; অন্ধকারেই আমি থাকলেম। চঞ্চলা চিন্তা অন্ধকারে একটু যেন শান্তভাব ধারণ করে। স্ত্রীলোকটি কে, সেই চিন্তা সেদিন আমার প্রধান হয়েছিল, স্থির কোত্তে পাল্লে তাদৃশ ফল কিছুই হবে না, তাও বুঝতে পেরেছিলেম, তবু কিন্তু সেই চিন্তা প্রধান।

    অনেক ভাবলেম। অন্ধকারকে জিজ্ঞাসা করি, কে ঐ স্ত্রীলোক? অন্ধকার উত্তর দেয় না; শূন্যকে জিজ্ঞাসা করি, কে ঐ স্ত্রীলোক? শুন্য উত্তর দেয়; বাতাসকে জিজ্ঞাসা করি, কে ঐ স্ত্রীলোক? বাতাস উত্তর করে না। তাদের কাছে উত্তর পাওয়া গেল না। মনের প্রতিই বারম্বার প্রশ্ন। মন আমার প্রাণের সঙ্গে কথা কয়। মনের কাছেই উত্তর পেলেম। ঠিক—ঠিক—ঠিক! কাশীরাম!

    এই বটে সেই! এই সেই কুল-কলঙ্কিনী। কাশীর রসিক পিতুড়ীর বাড়ীতে কুমারী-ভোজন হোতে যে যুবতী ব্রতবতী হয়েছিল, এই সেই ব্রতবতী! বীরভূমের কানাইবাবুর পরিবার! কি সম্পর্কে পরিবার, পাঠকমহাশয় সে তত্ত্ব অবগত আছেন। পরিবারটি কানাইবাবুর মাতুল-কন্যা! এই কলঙ্কিনী অম্লানমুখে আমার কাছে বোলে গেল, ডাকাতের সর্দ্দার তারে দাসী কোরে রেখেছে, একটু লজ্জা জানিয়ে ধর্ম্ম-কথাটাও প্রকাশ কোচ্ছিল, স্পষ্ট আভাষও দিয়েছিল, বোলতে বোলতে থেমে গেল। যাদের ইহকাল নাই, পরকাল নাই, তাদের এই রকম দশা হওয়াই ধর্ম্মের ইচ্ছা। কিন্তু এ কলঙ্কিনী গুজরাটে কেন এসেছিল? প্রেমের নায়ক কানাইবাবু। বীরভূমে সুবিধা হলো না, কলিকাতায় নিরাপদ হোলেন না, কাশীর তুল্য পতিতপাবন পীঠস্থানেও বোধ হয় ধরা পড়বার ভয় হয়েছিল, সেই জন্যই কি কানাইবাবু এই পরিবারটিকে নিয়ে গুজরাটে এসেছিলেন? তাই বোধ হয় সত্য। এত দূরদেশে এসেও কানাইবাবু এই পরিবারটিকে রক্ষা কোত্তে পাল্লেন না; ডাকাতেরা কেড়ে নিলে! কানাইবাবু গেলেন কোথা? ডাকাতেরা কি তাঁকে খুন কোরেছে? তা যদি হয়, প্রায়শ্চিত্ত ঠিক হয় নাই। তাদৃশ পাপে এ প্রকার প্রায়শ্চিত্ত জনসাধারণের শিক্ষাস্থল হয়। দীর্ঘকাল বেঁচে থেকে সেই প্রকারের পাপীরা যদি ইহ-সংসারে নিরন্তর কষ্টভোগ করে অথবা ভীষণ যন্ত্রণা পেয়ে প্রাণ হারায়, তা হলেই ঠিক হয়।

    মনে মনে এইগুলিই আমি ভাবলেম। সত্য নির্ণয় কোত্তে পেরেছি কি না, সেই স্ত্রীলোক যদি আবার আজ রাত্রে আমার খাবার দিতে আসে, ইঙ্গিতে কৌশলে জিজ্ঞাসা কোরে জানবো, এইটি তখন স্থির কোরে রাখলেম।

    ডাকাতের সর্দ্দার ফিরে আসে নাই। গত রাত্রে অভাবনীয়রূপে যিনি আমার কারাকূপে প্রবেশ কোরেছিলেন, বন্ধুভাবে কথা কোরেছিলেন, আজ যদি তিনি আসেন, তা হোলে তাঁরে আমি রক্ষাকর্ত্তা পিতা বোলে তাঁর কাছে কৃপা ভিক্ষা কোরবো।

    ইংরেজী বড়দিনের পর একটু একটু দিন বাড়ে, চৈত্রমাসে দিবা-রাত্রি সমান হয়, তার পর ক্রমশঃ দিন দীর্ঘ, রাত্রি খৰ্ব্ব। আমি গুজরাটের ডাকাতের অন্ধকার কারাগারে। কখন দিন হয়, কখন রাত হয়, দিন বড়, কি রাত বড়, সেটা স্থির করবার উপায় নাই; রাত-দিন আমার পক্ষে সমান। অন্ধের যেমন দিবারাত্রিজ্ঞান থাকা অসম্ভব, আমারও প্রায় সেইরুপ। কয়েদ থাকা যে কি যন্ত্রণা, কয়েদীরাই তা জানে। তার মধ্যেও—আমার অবস্থার সঙ্গে মিলনে, তার মধ্যেও অনেকটা প্রভেদ। রাজ-কারাগারের কয়েদীরা অপরাধী, তাদের কারা-যন্ত্রণা অনিবার্য্য, সেটা তারা বুঝে; আমি নিরপরাধ, রাজ-কারাগারের পরিবর্ত্তে ডাকাতের কারাগারে আমি বন্দী; সাধারণ কয়েদীর যন্ত্রণা অপেক্ষা আমার যন্ত্রণা সহস্রগুণে অধিক। সময়টা দীর্ঘ বোধ হয়, কিন্তু রাত-দিন কোথা দিয়ে চোলে যায়, কখন যায়, কখন আসে, সেটা আমি কিছুই জানতে পারি না।

    যখন আমি এই সকল ভাবছি, তখন রাত্রি কত, তাও আমি জানি না। বাহিরে দরজাখোলার শব্দ হলো; মশালহস্তা পাত্রহস্তা সেই স্ত্রীলোকটি প্রবেশ কোল্লে। বেশ সাবধান। মশালটি যথাস্থানে রেখে, সাবধানে সেই স্ত্রীলোক এক হস্তে দরজাটা খুব চেপে ভেজিয়ে দিলে, তার পর হস্তের পাত্রটি আমার সম্মুখে নামিয়ে ধীরে ধীরে আমার কাছে এসে বোসলো। আমি তখন দেখলেম, তার বদন দিব্য গম্ভীর! পূর্ব্বে দুইবার প্রকৃতিতে যেমন একটু একটু চাঞ্চল্য দেখা গিয়েছিল, এ রাত্রে সে চাঞ্চল্য ছিল না। বারাণসী শাড়ীপরা, গললগ্নবসনা, কাশীর কুমারী-পুজায় ব্রতবতী অবস্থায় মুখের যেরূপ শান্তভাব ছিল, আজ রাত্রেও যেন সেই ভাব; তফাতের মধ্যে মুখখানি কিছু কাহিল, কিছু, শুষ্ক শুষ্ক।

    অগ্রে আমি কথা কোইলেম না। অল্পক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে, ধীরস্বরে স্ত্রীলোক বোল্লে, “আজ আমি তোমার জন্যে ভাল ভাল রুটি এনেছি, গুড় এনেছি, খাও। দুদিন কিছু খাও নাই, না খেয়ে বাঁচবে কিরূপে?—খাও!”

    আমি।—(নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া) বাঁচবো?—বাঁচিয়ে রাখবার জন্যই কি এরা আমাকে ধোরেছে? বাঁচায় আর আমার দরকার নাই।

    স্ত্রী।—(বিস্ময়ে) ও কি কথা বলো? এই ছেলেমানুষ তুমি, এই কোমল শরীর, তোমার মনে এতো নিরাশা? বাঁচার দরকার নাই! অমন কথা কি বোলতে আছে? এই দেখো না কেন, আমারেও তো এরা ধোরে এনেচে, ধোরে এনে আটক কোরে রেখেচে, কষ্ট অনেক পাচ্চি বটে, তবু তো আমি খাচ্চি, শুচ্চি, বেড়াচ্চি, বেঁচে রোয়েচি, অমন কথা তো আমার মুখ দিয়ে বেরোয় না!

    আমি।—(চিন্তা করিয়া) তুমি বেঁচে রয়েছ, খাচ্ছ, শুচ্ছ, বেড়াচ্ছ, তোমার মনে একটু সুখ আছে; আমার মনে বিন্দুমাত্র সুখ নাই। যারা কয়েদ থাকে, তারা চোর-ডাকাত, খুনে বদমাস। কোন দোষে দোষী আমি নই, বিনা দোষে আমার ভাগ্যে এই কারাযন্ত্রণা! এ যন্ত্রণা থেকে নিস্তার পাব কি না, তাও আমি জানি না; তবেই ভাব দেখি, এই নিদারুণ যন্ত্রণা সহ্য কোরে বেঁচে থাকতে কি ইচ্ছা হয়? জগতের জীবের জীবনদাতা যিনি, তাঁর সেই পবিত্র নাম স্মরণ কোরে অনাহারে তাঁর দত্ত জীবন তাঁরেই আমি ফিরিয়ে দিব; কিছুই আমি খাব না!

    স্ত্রী।—(নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া) তোমার কথা শুনে আমার প্রাণ বড় অস্থির হোচ্চে! দোষ তুমি কর নাই, দোষী লোকেরাই বিনা দোষে তোমারে ধারেচে, এটাও এক রকম প্রবোধ বোলে মনে হয়, তাই কেন তুমি ভাবো না! পরমেশ্বরের বিচারে দোষীলোকের সাজা হয়, নির্দ্দোষীর সাজা হয় না; আমার মনে নিচ্চে, শীঘ্র তুমি খালাস পাবে; পরমেশ্বর তোমারে রক্ষা কোরবেন।

    আমি।—(চমকিত হইয়া) আমিও ইচ্ছা করি, পরমেশ্বর তোমার মঙ্গল করুন! পরমেশ্বরে তোমার ভক্তি আছে, শুনেও আমি তুষ্ট হোলেম। (পূৰ্ব্বকথা স্মরণ করিয়া) আচ্ছা, একটি কথা তোমারে আমি জিজ্ঞাসা কোত্তে চাই। আজ দিনের বেলা যখন তুমি এসেছিলে, তখনি জিজ্ঞাসা করবার ইচ্ছা হয়েছিল, সন্দেহ ভেবে চুপ কোরে ছিলেম। কিছু মনে কোরো না তুমি, দোষের কথা কিছুই নয়, জিজ্ঞাসা কোরবো; ঠিক উত্তর পাব কি?

    স্ত্রী।—(ম্লানমুখে শান্তনয়নে চাহিয়া) কি জিজ্ঞাসা কোত্তে চাও, কর, যদি আমার জানা থাকে, যদি উত্তর দিবার হয়, অবশ্যই উত্তর দিব। কি কথা তোমার?

    আমি।—(পূর্ব্বাপর বিবেচনা না করিয়াই) বীরভূমে কি তুমি কখনো ছিলে?

    ওঃ হরি!—অকস্মাৎ এ কি মূর্ত্তি! প্রশ্ন শ্রবণমাত্রেই সেই স্ত্রীলোক অকস্মাৎ চমকিয়া বিস্তৃত-নয়নে আমার মুখের দিকে স্থির হয়ে চেয়ে রোইলো! পলক পড়ে না। একে সেই চক্ষুদুটি খুব বড় বড়, এই সময় আমার চক্ষে যেন আরো বড় বড় বোধ হোতে লাগলো! স্ত্রীলাক যেন পাষাণমূৰ্ত্তির ন্যায় নিশ্চলা! ভাব দেখে যেন আমি মনে কোল্লেম, ঠিক—ঠিক—ঠিক!—আমার অনুমান তবে নিশ্চয়ই ঠিক!—সত্য না হোলে এ মূর্ত্তির এ ভাব কেন হবে? এমন কোরে চোমকেই বা কেন যাবে? মনে এইরুপ ঠিক অবধারণ কোরে, দুই কথায় আমি পুনঃ প্রশ্ন কোল্লেম, “কৈ, উত্তর দিলে না?”

    স্ত্রী—(সেই রকমে চাহিয়া) কোন কথার উত্তর দিব? বীরভূম?—বীরভূমের কথা তুমি কেন জিজ্ঞাসা কোচ্চো?

    আমি।—বীরভূমে আমি একবার গিয়েছিলেম। সেইখানে—

    কথা বোলতে বোলতে চেয়ে দেখলেম, স্ত্রীলোকর মুখের চক্ষের সে ভাব আর নাই! শুষ্কমুখ অকস্মাৎ রক্তবর্ণ, বিশালনয়নে অকস্মাৎ কপোলবাহিনী জলধারা! অবধারণের উপায় অবধারণ যদি স্বভাবসঙ্গত হয়, সেই দ্বিগুণ অবধারণ আমার চিত্তকে প্রদীপ্ত কোরে তুল্লে। আমি জিজ্ঞাসা কোচ্ছিলেম, “বীরভূমের নাম শুনে, তোমার চক্ষে—”

    আর জিজ্ঞাসা করা হলো না। সহসা কারাদ্বার উদ্ঘাটিত; একমূর্ত্তির দ্রুত প্রবেশ। মুখে মুখোস, কিন্তু চক্ষু বেশ দেখা যায়। দ্বারে চাবী বন্ধ ছিল না, তা দেখেই সেই মূর্ত্তির সন্দেহ বিস্ময় একত্র হয়েছিল, চক্ষের ভাব দেখে সেইটিই আমি অগ্রে স্থির কোল্লেম; দ্বার আবৃত কোরে দিয়ে সেই নবপ্রবিষ্ট মূর্ত্তি মুখোস ঢাকা মুখখানা ইতস্তত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরের চতুর্দ্দিকে দৃষ্টিসঞ্চালন কোত্তে লাগলো। আমার সমীপবর্ত্তিনী স্ত্রীলোকের উপর সেই দৃষ্টি নিপতিত হলো; বিস্ময় প্রকাশ কোরে মূর্ত্তিটি সেই লোককে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “কি রে রঙ্গিণি! এখানে বোসে বোসে তুই কিসের গল্প কোচ্ছিস? শীকারের সঙ্গে গল্প? রুপের চটক দেখে ভুলে গিয়েছিস বুঝি? আসুক তোর সর্দ্দার আগে, সব ভুর আমি ভেঙ্গে দিব!”

    রঙ্গিণী আর বোসে থাকতে পাল্লে না, চক্ষের জল মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত জোড় কোরে কাতরস্বরে বোলতে লাগলো, “দোহাই তোমার! দোহাই তোমার ভূষণলাল, সে সব কথা কিছুই নয়, ছেলেটি দুদিন কিছুই খায় না, তাই জন্যে ত তুমি এখন এসেচো, তোমার তলোয়ারখানা চকমক কোচ্চে, তলোয়ার দেখেই ভয়ে ভয়ে খাবে এখন! আমি তবে—তবে—”

    বোলতে বোলতে মূর্ত্তির দিকে একবার চেয়ে চক্ষু ঘুরিয়ে আমার দিকে চাইতে চাইতে স্ত্রীলোকটি তাড়াতাড়ি কপাট খুলে বেরিয়ে গেল; দ্বারে চাবী দিবার প্রয়োজন হলো না; পূর্ব্ববৎ ভেজিয়ে রেখেই চোলে গেল। ঘরে তখন সেই মূর্ত্তি আর আমি।

    মশাল জ্বোলছিল। ঘরে বেশ আলো। মূর্ত্তি আমার সম্মুখে দণ্ডায়মান। ডাকাত এসেছে, অন্তরে অন্তরে আমার কাঁপনী ধোরেছে; রঙ্গিণী বোলে গেল, তলোয়ার চকমক। সত্যই সেই মূর্ত্তির হস্তে খাপখোলা সুশোণিত সুদীর্ঘ তলোয়ার। রঙ্গিণী তো পালালো এইবার আমার পালা! না জানি, আমার কপালে কি ঘটে!

    খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই মূর্ত্তি সেই তলোয়ারখানি কোষবদ্ধ কোরে দেয়ালের গায়ে ঝুলিয়ে রাখলে, মশালটা যেখানে জ্বোলছিল, সেইদিকে একটু একটু এগিয়ে এগিয়ে চোল্লো। ঠিক আমি সেইদিকে চেয়ে আছি। মুক্তি চোলেছে; চোলতে চোলতে আপনার মুখে একবার হাত দিলে; দৈবের কর্ম্ম, সেই সময় তার মুখের মুখোসটা হঠাৎ অসাবধানে খোসে পোড়ছিল, বুক পর্য্যন্ত আসতে আসতেই অধিকারী ব্যস্তভাবে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে চঞ্চল-হস্তে পুনৰ্ব্বার সেই মুখোসে মুখখানা ঢেকে ফেল্লে, বড় বড় ফুৎকার দিয়ে জলন্ত মশালটা নিবিয়ে দিলে। ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। তখন আমি বুঝলেম, মুখে মুখোস থাকলে ফুৎকার দেওয়া যায় না, সেই জন্যই মুখোসধারী হয় তো মুখোসটা একটু সোরিয়ে দিবার চেষ্টা কোচ্ছিল, সেই চেষ্টাতেই মুখোসটা খুলে যায়, আসল মূর্ত্তি প্রকাশ পায়; দীর্ঘ মূর্ত্তি সুপ্রকাশ।

    এই লোকটি কি ডাকাত? কি আশ্চর্য্য! আহা! কি চমৎকার রূপ! মুখখানি আমি দেখেছি; যদিও অতি অল্পক্ষণ মাত্র দেখা, তবু কিন্তু দেখেছি, বেশ পরিষ্কার দেখেছি; কি চমৎকার মুখ! যেমন সুন্দর গৌরবর্ণ, তেমনি সুন্দর মনোহর লাবণ্য, দিব্য দীর্ঘ দীর্ঘ সমুজ্জ্বল চক্ষু, দিব্য লোমযুক্ত টানা ভ্রূ, ললাট প্রশস্ত, নিটোল; সেই ললাটের উভয়পার্শ্বে কুঞ্চিত কুঞ্চিত সুচিক্কণ কেশ, কর্ণমূলে সুশোভন জুলপী; সুদীর্ঘ নাসিকা, নাসিকার নিম্নভাগে ওষ্ঠের উপর নবীন গোঁফের রেখা; ওষ্ঠাধর তরুণ অরুণের ন্যায় আলোহিত; চিবুকখানি কিছু, খৰ্ব্ব; পরম সুন্দর মুখমণ্ডল; মুখে যেন গাম্ভীর্য্যের সঙ্গে বীরগৰ্ব্ব সুপ্রকাশ! এমন সুপুরুষ কি ডাকাত হয়?—না না, ডাকাত নয়! তবে কে? তবে কি? ডাকাতের দলে এ মূর্ত্তি কেন?

    মনে এই রকম তোলাপাড়া কোচ্ছি, সেই লোকটি সেই অন্ধকারে আমার কাছে এসে বোসলো। না না, ইতরজ্ঞানে সম্ভাষণ করা হবে না, ডাকাত নয়; লোকটি আমার কাছে এসে বোসলেন। পূৰ্ব্বে আমার যতটা ভয় হয়েছিল, চেহারা মনে কোরে ততটা ভয় আর থাকলো না। কে ইনি, মনে মনে কেবল সেই তর্ক। রঙ্গিণী বোলে গেছে, ভূষণলাল; এই লোকটির নাম তবে ভূষণলাল। নামটিও দিব্য-সুন্দর। গুজরাটি নাম; বুঝতে পাচ্ছি, ইনি গুজরাট নিবাসী। ইনি আমারে ভয় দেখাবেন না, মনে মনে এইরূপ বিশ্বাস আসতে লাগলো।

    ভূষণলাল আমার কাছে বোসে সতর্কস্বরে প্রথমেই জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি হে ছোকরা! তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ?”—প্রশ্ন শুনেই আমি ভাবলেম, মুখোসখোলা মুখখানি আমি দেখেছি, সেটি হয় তো ইনি জানতে পেরেছেন, সেইজন্যই হয় তো ঐরূপ প্রশ্ন। আবার ভাবলেম, তাই বা কিরূপে সম্ভবে? আর তো কখনো সে চেহারা আমি দেখি নাই, মুখখানি আমার পরে চেনা নয়, চিনতে পারার প্রশ্নটা তবে কিরূপে সঙ্গত হোতে পারে? মুখখানি আমি দেখেছি, তা হয় তো ইনি জানতে পারেন নাই, ডাকাত মনে কোরেই আমি বোসে আছি; দশজন ডাকাত কাল রাত্রে একত্র হয়েছিল, ইনিও তাদের মধ্যে একজন, তাই হয় তো আমি ভেবে নিয়েছি, এইরূপ মনে কোরেই হয় তো ঐরূপ প্রশ্ন। মনের ভিতর আমার এই প্রকার তর্ক-বিতর্ক; উত্তর দিবার আমার ইচ্ছা হলো না, কাজেই আমি নিরুত্তর।

    আমাকে নিরুত্তর দেখে, ভূষণলাল পুনরায় জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “চুপ কোরে রইলে কেন? কথা কও; চুপি চুপি কথা কও। তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ? গত রাত্রে আমি এসেছিলেম, ভয় নাই বোলে অভয় দিয়েছিলেম, মনে হয়? এখনো বোলছি, ভয় নাই। কথা কও। নির্ভয়ে মনের কথা বল। যা তুমি আমাকে দেখছো, তা আমি নই। আমি তোমার বন্ধুলোক।”

    ধন্যবাদ দিয়ে সাগ্রহ আনন্দে আমি বোল্লেম, “আপনি মহাপুরুষ, আমি বুঝতে পেরেছি। ডাকাতের দলে আপনি আছেন, আপনার কোন প্রকার সদভিসন্ধি আছে, গত রজনীতে ইঙ্গিতে সেই কথা আপনি আমাকে বোলেছিলেন, ইঙ্গিতটি অতি জটিল, সেটি আমি বুঝতে পারি নাই। পরমেশ্বর করুন আপনার অভিপ্রায় সিদ্ধ হোক। আপনি আমার মনের কথা জিজ্ঞাসা কোচ্ছেন, এখানে আর আমার মনের কথা কি থাকতে পারে? আশা কেবল মুক্তিলাভ। আপনি আমাকে অভয়দান কোচ্ছেন, তাতেই আমি চরিতার্থ হয়েছি; আপনার প্রসাদে আমি এই নরককুণ্ড থেকে মুক্ত হোতে পারবো; আশা আমাকে এইরূপ উল্লাস বিতরণ কোচ্ছে।”

    আমার উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে ছদ্মবেশী ভূষণলাল পুনর্ব্বার আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লে, গুজরাটে তুমি কবে এসেছ? কেন এসেছ? দেখছি, তুমি বাঙালীর সন্তান, বালক, কার সঙ্গে তুমি এসেছ? তোমার সঙ্গে কে কে আছে?”

    আমি।—আমার দুঃখের কথা শুনলে পাষাণও দ্রব হয়! নিতান্ত শিশুকাল থেকে আমি নিরাশ্রয় নির্ব্বান্ধব; মাতা-পিতাও আমার অপরিজ্ঞাত। এই বালক-জীবনেই যত কষ্ট আমি ভোগ কোরেছি, যত বিপদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, পরম শত্রুও যেন তত কষ্টে—তত বিপদে কখনো না পড়ে। স্বপ্নেও আমি কোন লোকের কোন মন্দ ভাবনা করি নাই, তথাপি আমার অনেক শত্রু হয়েছে; যেমন তেমন শত্রু নয়, প্রাণঘাতক শত্রু। সেই সকল শত্রুর ভয়ে দেশে বিদেশে আমি ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি!”

    ভূষণ।—তোমার শত্র,? চেহারা দেখে আমার মনে হোচ্ছে, জগৎ-সংসার তোমাকে মিত্রভাবে আলিঙ্গন কোত্তে আনন্দ বোধ করে। তোমার আবার শত্রু? দেশে বিদেশে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছ, শুনে আমি বড় দুঃখিত হোলেম। এখানে কি কেহই তোমার সঙ্গে নাই? গুজরাটে তবে কি তুমি একাই এসেছ?”

    আমি।—আজ্ঞা না, একাকী আসি নাই; বঙ্গের মুর্শিদাবাদজেলার একটি ভদ্রলোক দ্বারকা-দর্শনে এসেছেন, তাঁর সঙ্গেই আমি এসেছি; বেশী দিন আসি নাই, অল্পদিনের মধ্যেই আমার এই বিপদ!

    ভূষণ।—এ বিপদ তোমার থাকবে না; পরমেশ্বরের কৃপায় আমি তোমাকে এই প্রেত-পুরী থেকে উদ্ধার করবার সহায় হোতে পারবো। চিন্তা কোরো না, কোন ভয় নাই। উপবাসী থেকো না, কিছু কিছু আহার কোরো। রঙ্গিণীকে আমি বোলে দিব, সে তোমাকে ভাল ভাল খাদ্যসামগ্রী এনে দিবে। রঙ্গিণী বাঙালী-ব্রাক্ষণের মেয়ে, অন্য পরিচয় জানি না, তার মুখে কেবল এইটকু আমি শুনেছি। রঙ্গিণী স্বহস্তে খাদ্য-সামগ্রী প্রস্তুত করে, আহারে তাদৃশ দোষ হবে না; যে অবস্থায় সে এখন আছে, তার হস্তে অন্ন গ্রহণে দোষ হোতে পারে, রুটিতে দোষ নাই। কিছু কিছু আহার কোরো।”

    আমি।—আহারে আমার প্রবৃত্তি হয় না; ক্ষুধা যেন আমারে পরিত্যাগ কোরে গিয়েছে, কিছুতেই আর রুচি নাই। মন বড় উতলা। যাঁর সঙ্গে আমি এসেছি, তিনি একজন জমীদার, টাকা দিয়ে তিনি আমাকে খালাস কোত্তে পাত্তেন, যদি কম টাকা হোতো, তা হলে নিশ্চয়ই তিনি দিতেন, তিনি আমাকে বড় ভালবাসেন, নিশ্চয়ই দিতেন, কিন্তু ডাকাতেরা দশ হাজার টাকা চায়, তত টাকার জন্য তাঁকে অনুরোধ করা আমার মত আশ্রিত গরিবের উচিত হয় না, বিশেষতঃ কেই বা তাঁকে সংবাদ দিবে? আমি এখানে কয়েদ আছি, কিরূপেই বা তিনি জানবেন?

    ভূষণ।—টাকা তোমার প্রয়োজন হবে না, আমি বরং তোমাকে এখান থেকে উদ্ধার কোরে প্রচুর অর্থ দান কোরবো, এখানকার রাজবংশের সঙ্গে আমার অতি নিকট সম্বন্ধ; সময় যখন আসবে, সে পরিচয় তখন তুমি জানতে পারবে। যে বাবুটির সঙ্গে তুমি এসেছ, তোমার জন্য অবশ্যই তিনি উদ্বিগ্ন হোচ্ছেন; নাম বোলে দাও, ঠিকানা বোলে দাও, কালই তাঁর কাছে আমি তোমার নিরাপদের সংবাদ পাঠাব।

    আমি।—আপনাকে শত সহস্র ধন্যবাদ! গরিবের প্রতি আপনার এত দয়া, ভগবান আপনার এই দয়ার কার্য্যের উচিত পুরস্কার প্রদান কোরবেন। যাঁর সঙ্গে আমি এসেছি, তাঁর নাম দীনবন্ধুবাবু শ্রীশ্রীভবানীদেবীর মন্দিরের পশ্চিমাংশে অদূরে একখানি দোতালা বাড়ীতে তাঁর বাসা, তিনি আমার জন্য মহা উদ্বিগ্ন, এটি আপনি নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন, দীনবন্ধুবাবুর উদ্বেগশান্তির নিমিত্ত শীঘ্র মুক্তিলাভে আমি অভিলাষী।

    ভূষণ।—অশীঘ্র যাতে না হয়, সে চেষ্টায় আমি থাকলেম; উর্দ্ধসংখ্যা এক সপ্তাহ। ডাকাতেরা এখন প্রায়ই দূরে দূরে ডাকাতী কোত্তে যায়; সর্দ্দার ডাকাত বীরমল্ল অনেক দূরে গিয়ে পোড়েছে, এখানে এখন প্রায় সকল কাজেই আমার হকুম চলে; ডাকাতের বিশ্বাসে আমিও একজন তাদের মত ডাকাত, সুতরাং এখানকার প্রহরীরা—চাকরেরা সকলেই আমার বাধ্য। অবসর উপস্থিত হোলেই আমি তোমাকে নিরাপদে দীনবন্ধুবাবুর বাসায় পৌঁছে দিব। বড় জোর এক সপ্তাহ।

    আমি।—(নমস্কার করিয়া) ভগবান আপনাকে সংসারে সৰ্ব্বপ্রকারে সুখে রাখুন। যত শীঘ্র আপনি আমাকে খোলা বাতাসে ছেড়ে দিতে পারেন, তত শীঘ্রই আমি স্বদেশে প্রস্থান করবার জন্য প্রস্তুত হব। কেবল দীনবন্ধুবাবুর উদ্বেগ দূর করা আমার আশু মুক্তিলাভের উদ্দেশ্য নয়, আরো একটি গুরুতর কৰ্ত্তব্য আমার মাথার উপর বিলম্বিত। মহা বিপদে একটি দয়াবতী বালিকা আমার প্রাণরক্ষা করেছিলেন, আমার শত্রুপক্ষের দস্যুতস্করেরা সেই বালিকাটিকে হরণ কোরে কোথায় নিয়ে গিয়েছে, সন্ধান নাই। মুর্শিদাবাদের আদালতে আমি মোকদ্দমা দায়ের কোরেছি, প্রাণদায়িনীর উদ্ধারসাধন আমার ধর্ম্মনগত কর্ত্তব্য; মোকদ্দমা-স্থলে আমার উপস্থিত থাকা প্রয়োজন।

    ভূষণ।—হাঁ, তোমার হৃদয়ের ধর্ম্মভাব তোমার বদনেই প্রকাশ পায়। সব আমি বুঝতে পাচ্ছি; শীঘ্রই আমি তোমাকে মুক্ত কোরে দিব; নিশ্চিন্ত হয়ে সপ্তাহকাল এইখানে তুমি অপেক্ষা কর। হাঁ, জিজ্ঞাসা কোত্তে ভুল হয়েছে, তোমার নামটি কি?

    আমি।—আমার নাম হরিদাস। যাঁদের সঙ্গে আমার দেখা হয়, আলাপ হয়, যাঁদের কাছে আমি আশ্রয় পাই, তাঁরা সকলেই আমারে হরিদাস বোলে জানেন; যারা আমার প্রতি বৈরী, তারাও জানে, আমার নাম হরিদাস।

    ভূষণ।—আচ্ছা, দেখ হরিদাস, বোলেছি আমি তোমাকে, ডাকাতের সর্দ্দারের নাম বীরমল্ল; যে ঘরে তুমি এখন রয়েছ, এটা সেই বীরমল্পের ভাঁড়ার-ঘর।  এ ঘরে অনেক রকম আশ্চর্য্য আশ্চর্য্য কলা-কৌশল আছে। বীরমল্লের যত সব মণি-মুক্তাদি মহামূল্য পদার্থ, যত সব গুপ্তক্ৰীড়ার গুপ্ত উপকরণ, এই ঘরের স্থানে স্থানে এক এক প্রকার কল-সংযোগে তৎসমস্ত লুক্কায়িত আছে; কতক কতক পোতা আছে, কতক কতক দেয়ালে গাঁথা আছে। ঘরে প্রবেশ কোল্লে কোন চিহ্নই জানতে পারা যায় না। এই ঘরটায় সৰ্ব্বক্ষণ চাবি বন্ধ থাকে। সর্দ্দার ছাড়া অপরাপর ডাকাতেরা কেহই সে সকল গুপ্ত-সন্ধান জানে না। ঘরের বাহিরেও আর এক প্রকার কল। সে কল যারা জানে, তারাই কাজে এ ঘরে প্রবেশ কোত্তে পারে, ইচ্ছামাত্রেই বেরিয়ে যেতে পারে; নূতন লোকে পারে না। স্থানটা এক প্রকার নূতন ধরণের গোলকধাঁধা। দরজা দিয়ে বেরিয়ে যে দিকেই যাও, ঘুরে ঘুরে এই ঘরে এসেই উপস্থিত হোতে হবে। যাদের হাতে তুমি ধরা পোড়েছ, উচিত বিবেচনা কোরেই তারা এই গোলকধাঁধার ভিতরে তোমাকে এনে আটক রেখেছে। তোমার হস্ত-পদের বন্ধন না থাকলেও—দ্বারে চাবীবন্ধ না থাকলেও গোলকধাঁধা ভেদ কোরে তুমি পালাতে পারবে না, এটা তারা বেশ জানে; সেইজন্য এ ঘরের দ্বারে অথবা নিকটে নিকটে পাহারা থাকে না।

    আমি।—বীরমল্লের দলে সৰ্ব্বশুদ্ধ কত লোক আছে?

    ভূষণ।—সহস্র অপেক্ষাও অধিক। সব লোক এক জায়গায় থাকে না। ঠাঁই ঠাঁই এইরকমের আরো অনেক বনদুর্গ আছে। সব জায়গায় সমান কায়দা। মানুষ ছাড়া বীরমল্লের দলে শতাধিক পাহাড়ী কুকুর আছে, বীরমল্লের পছন্দ মন্দ নয়, সব কুকুরগুলোই কালো কালো।

    আমি।—অত কুকুর আছে, ডাক শুনা যায় না, এটাও তো বড় আশ্চর্য্য!

    ভূষণ।—সর্দ্দার যখন শীকারে যায়, কুকুরেরা তখন তার সঙ্গে থাকে, এখন এ দুর্গে একটাও কুকুর নাই, সেইজন্যই ডাক শুনতে পাও না। ডাক শুনলে নূতন লোকের অর্দ্ধেক প্রাণ উড়ে যায়। সব মানুষ যেমন এক দুর্গে থাকে না, ডাকাতের কুকুরেরাও সেইরুপ এক দুর্গে বাস করে না। ও সব কথা এখন থাক, আমি একটা আলো জ্বেলে দিচ্ছি, তুমি কিঞ্চিৎ আহার কর।

    নূতন কৌশলে ভূষণলাল একটি আলো জ্বালিলেন, অনুরোধ এড়াতে না পেরে নিতান্ত অনিচ্ছায় একখানি রুটি আমি ভক্ষণ কোল্লেম, মাটির ভাঁড়ে জল খেয়ে দেয়াল ঠেস দিয়া আমি বোসলেম। ভূষণলাল সেই সময় আমার বন্ধনমোচন কোরে আদেশ কোল্লেন, “শয়ন কর, স্বচ্ছন্দে নিদ্রা যাও, কোন ভয় নাই, কোন চিন্তা নাই, কল্য রাত্রে আবার আমি আসবো, কল্য আবার দেখা হবে।”

    আমি শয়ন কোল্লেম, আলোটি নিৰ্ব্বাণ কোরে ভিত্তিলম্বিত তলোয়ারখানি নিয়ে, দ্বারে চাবী দিয়ে ভূষণলাল অন্য স্থানে চোলে গেলেন।

    পাঁচদিন পাঁচরাত্রি অতিবাহিত। ভূষণলাল বোলে রেখেছেন, সপ্তাহ; আর দুটি দিন অতীত হোলেই সপ্তাহ পূর্ণ হয়। নিত্য রজনীতে তিনি আসেন, রঙ্গিণীও দিবা-রাত্রের মধ্যে দুবার আমার খাবার দিয়ে যায়। রঙ্গিণীর সঙ্গে আমার অনেক রকম কথাবার্ত্তা হয়, ভূষণলালও নূতন নূতন অনেক কথা বলেন, সে আলাপে আমি একরকম থাকি ভাল। ছয়দিনের দিন সন্ধ্যার পর আমার অনেকগুলি ভাবনা একত্র।

  • সপ্তবিংশ কল্প : এ সকল কি ব্যাপার?

    সপ্তবিংশ কল্প : এ সকল কি ব্যাপার?

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    সপ্তবিংশ কল্প : এ সকল কি ব্যাপার?

    ডাকাতের আড্ডায় একটি দয়াময় সাধপুরষ। তিনি ডাকাত নন, সে কথা ঠিক। ডাকাতের চেহারা ভয়ঙ্কর হয়, ডাকাতেরা কালো হয়, এটা যেন একরকম বাঁধাকথার মধ্যেই গণ্য। যে সকল মূর্ত্তি আমরা দেখতে পাই না, অথচ যাদের নাম শুনলে, কাৰ্য্য ভাবলে, প্রাণের ভিতর মহাতঙ্কের উদয় হয়, কল্পনাতে সকলেই বলেন, সে সকল মূর্ত্তি ভয়ঙ্কর কৃষ্ণবর্ণ। অসুরেরা কালো; সেই অসুর অনেক প্রকারের বুঝায়; দানব, দৈত্য, রাক্ষস, দস্যু ইত্যাদি। এগুলি পৌরাণিক সংবাদ। যিনি আমাদের ধর্ম্মরাজ, কালে-অকালে সকালে বিকালে যিনি জগতের জীবকুলের জীবন হরণ করেন, আমাদের দেশে যিনি যম নামে বিখ্যাত, তাঁরে কেহ দেখে নাই, কিন্তু চিত্রপটে দেখা যায়, ভীষণাকার যমমূর্ত্তি কৃষ্ণবর্ণ। লৌকিক প্রবাদ ভূত; সকলেই বলে, ভূতেরা সকলেই কালো! মানুষের ছেলে যদি কালো হয়, দৃষ্টান্ত দিয়ে লোকেরা বলে, কালো ভূত! এই প্রকারে দুষ্কৰ্ম্মকারী দস্যুগণকেও কালো বলা যায়। দানব কালো, যম কালো, ভূত কালো, ডাকাত কালো, এই প্রকার সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তে বর্জ্জিত আছেন করালবদনা মা কালী আর বৃন্দাবনের গোপিনীমোহন শ্রীকৃষ্ণ।

    বিদ্যুতের গতির মত এই সকল কথা আমার মনে হলো। মনে হবার সূত্র ডাকাতের দল। সব ডাকাত কালো না হোলেও ডাকাতী করবার সময় তেলকালী মেখে কালো হয়; কালো সাজে। যিনি আমারে রাত্রিকালে অভয় দিতে আসেন, ডাকাতের দলে তিনি ডাকাত নামে পরিচিত; মুখোসটা কিন্তু ঘোর কৃষ্ণ। সত্য তিনি ডাকাত নন, একবারমাত্র চেহারা দেখে সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। রাজপুত্রের মত চেহারা। বাস্তবিক কে তিনি, এ প্রেতপুরী থেকে মুক্তি না পেলে সে নিগুঢ় রহস্য প্রকাশ পাবে না, সেটাও আমি জানতে পাচ্ছি। গোলকধাঁধায় গোলকধাঁধার ঘোর অন্ধকারে আমি কয়েদ; এই গোলকধাঁধার ঘরে অনেকরকম কল-কৌশল আছে, বিশ্বাস কোরে সেই গুপ্তকথা তিনি আমারে বেলে গিয়েছেন, কি যে সেই কল-কৌশল, শেষকালে তাও হয় তো আমি জানতে পারবো। তিনি আমার বন্ধু, আমার মুক্তির জন্য আমার বন্ধুর কাজ কোরবেন, এইরুপ অঙ্গীকার। যদি আমার ভাগ্যে থাকে, যদি আমি খালাস পাই, সংসারে তাঁরে আমি বন্ধু পাব, এই আমার আশা।

    মেয়েটার নাম রঙ্গিণী। সত্যনাম রঙ্গিণী নয়, ডাকাতেরা রঙ্গিণী নাম দিয়ে রেখেছে। রঙ্গিণী বেলেছে, আমার ঐ বন্ধুর নাম ভূষণলাল। নামটি শুনতে ভাল, কিন্তু এ নামটিও বোধ হয় সত্য নয়। ডাকাতেরা যে নাম জেনে রেখেছে, সে নাম যদি সত্য হোতো, তা হোলে তিনি কদাচ নির্ব্বিঘ্নে ডাকাতের দলে থাকতে পাত্তেন না। সমস্তই রহস্যপূর্ণ। যেটা ভাবি, সেইটাই ঘোর অন্ধকার-রহস্যে ঢাকা; আমার এই কয়েদঘর যেমন অন্ধকার, এই সকল রহস্যেও সেই রকম ঘোর অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন। কতদিনে যে অন্ধকার দূর হবে, সৃষ্টিসংসারের বিধাতা যিনি, একমাত্র তিনিই সে তত্ত্ব পরিজ্ঞাত। মেয়েটির নাম রঙ্গিণী। আমার মনে হোছে রঙ্গিণী দুবার বোলেছিল কিম্বা হয় তো বলবার ইচ্ছা কোরেছিল, “ডাকাতের দলের একটি লোক”—বোলতে বোলতে থেমে গিয়েছিল। বোধ হয়, যিনি আমার উপকারী বন্ধু, তাঁর কথাই রঙ্গিণী কিছু বোলতে চায়; বোলতে পারে না। আজ একবার জিজ্ঞাসা কোরে দেখবো। রঙ্গিণীর সত্যপরিচয় কিছুই প্রকাশ পাচ্ছে না, আমি যেটা মনে মনে স্থির কোরেছি, সত্যই তাই, কিন্তু রঙ্গিণী মুখ ফুটে কিছুই বলে না। বীরভূমের নাম শুনেই রঙ্গিণী কাল চোমকে গিয়েছিল; তাতেই একরকম ধরা পোড়েছে, আজ আবার একবার সেই সুরটা আমি তুলবো।

    বনের ভিতর শেয়াল ডেকে উঠলো। এককালে বহু শগালের কলরব। সন্ধ্যা হয়েছে অনেকক্ষণ; এতক্ষণের পর শেয়ালের ডাক, এটাও একপ্রকার প্রকৃতির খেলা। এ দেশে যাঁদের স্বধর্ম্মে বিশ্বাস, তাঁরা সকলেই সন্ধ্যাবন্দনা করেন। শেয়ালেরা যেমন সন্ধ্যাবন্দনা জানে, মানুষ তেমন জানে না। হুয়া হুয়া, ক্যা হুয়া, সন্ধ্যা হুয়া, রাত্রি হুয়া, উয়া হুয়া এই রবে তারা প্রকৃতির স্তব করে। যে সময়ে যে ভাবে স্তব কোত্তে হয়, সেই সময় সেই সেই রব তারা মানুষের কর্ণে শুনায়; আমারেও শুনালে। শৃগালের রব শ্রবণ কোরে করযোড়ে প্রকৃতিদেবীকে আমি নমস্কার কোল্লেম।

    শেয়ালেরা নিস্তব্ধ হলো, আমার কারাগারের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেল, রঙ্গিণীর প্রবেশ। অন্ধকার ঘরে আলো হলো। মশালটা নামিয়ে রেখে, পাত্রখানি আমার সম্মুখে ধোরে দিয়ে, অভ্যাসমত সাবধানে রঙ্গিণী আমার নিকটে বোসলো। অন্য অন্য দিন রঙ্গিণী আগে কথা কয়, সেদিন আমি ততক্ষণ অপেক্ষা কোত্তে না পেরে অগ্রেই জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আজ যে তুমি এত সকাল সকাল? সে রাত্রের সেই কথা শুনে বুঝি তোমার ভয় হয়েছে? যিনি তোমারে তিরস্কার কোরেছিলেন, করপুটে যার কাছে তুমি দয়া প্রার্থনা কোরেছিলে, যাঁরে তুমি ভূষণলাল বোলে সম্বোধন কোরেছিলে, তিনি এখানে আসবেন, তাই বুঝি তুমি তাঁর আসবার আগেই এসে উপস্থিত হয়েছ?

    উদাসভাবে একটু হেসে রঙ্গিণী উত্তর কোল্লে, “না না, সে জন্য নয়; আজ আমাদের সর্দ্দারের ফিরে আসবার কথা, সেই জন্যই—

    আমি।—আচ্ছা, রঙ্গিণী! সর্দ্দার তো আসবে, আসুক, তোমাকে আমি একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। সেই ভূষণলাল, যিনি তোমারে সর্দ্দারের নামে ভয় দেখিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে কি তোমার ঘরসংসারেরূ কথাবার্ত্তা চলে?

    রঙ্গিণী।—ঘরসংসারের কথা এখানে কারো সঙ্গে আমার চলে না, সে সব কথা কেহই কিছু আমারে জিজ্ঞাসাও করে না।

    আমি।—করে না যদি, ঘরসংসারের কথা চলে না যদি, তবে সেই ভূষণলাল কি কোরে তোমার পরিচয় জানতে পাল্লেন?

    রঙ্গিণী।—কি পরিচয় তিনি জানতে পেরেছেন?

    আমি।—তুমি বাঙালীর মেয়ে, ব্রাহ্মণের কন্যা।

    রঙ্গিণী।—ওঃ! এইটুকু?—এটকু এখানকার অনেক লোকেই জেনেছে। যে রাত্রে আমারে এরা ধোরে আনে, সেই রাত্রে আমি তো কেঁদে কেঁদে সারা, আমার গহনাগুলি এরা খুলে নিয়ে, কত রকম ভয় দেখিয়ে জোরে জোরে ধমক দিলে, সেই সময় আমি বোলেছিলেন, আমি গরিব, বাঙলাদেশে আমার বাড়ী, ব্রাহ্মণের মেয়ে আমি, আমারে তোমরা বে-ইজ্জৎ কোরো না, দয়া কোরে ছেড়ে দাও। যত কথা আমি বোলেছিলেম, সমস্তই ভেসে গিয়েছিল, এখন আমার এই দশা! যে দুর্দশায় আমি আছি, সমস্তই তোমার কাছে বোলেছি।

    আমি।—তবে ঐ পরিচয়টুকু তুমি দিয়েছিলে, এখন আমি বুঝলেম। আচ্ছা, আর একটি কথা। দুদিন দুবার তুমি একটু একটু ইঙ্গিতে আমার কাছে বোলেছিলে, এখানকার একটি লোক—একটি লোক—সেটি তোমার কি কথা? কোন লোকটিকে লক্ষ্য কোরে তুমি সেইরূপ আভাষ দিবার ইচ্ছা কোরেছিলে, আমার বড় কৌতূহল জন্মেছে, কথাটি আমি শুনতে চাই; কেন লোকটি?

    রঙ্গিণী।—(একটু কি ভাবিয়া) কেন? সে কথা শুনে তোমার কি হবে? সেই কথা তুমি মনে কোরে রেখেছ? আমি ভেবেছিলেম, ভুলে গিয়েছ। সে লোকটির কথায় তোমার প্রয়োজন কি?

    আমি।—আছে কিছু প্রয়োজন। বিনা প্রয়োজনে কেন আমি তোমাকে ও কথা জিজ্ঞাসা কোরবো? প্রয়োজন আছে। স্পষ্ট কোরে বল দেখি, কে সেই লোকটি?

    রঙ্গিণী।—তাঁরে ত তুমি দেখেছ, তবে আর কেন জিজ্ঞাসা কর? তিনি ত তোমার কাছে এসেছিলেন; রোজ রাত্রেই হয় ত আসেন, তাঁরে তুমি দেখেছ, তাঁর কথাবার্ত্তাও শুনেছ, তাঁর সঙ্গে কথাও তুমি কোয়েছ, তবে আবার কেন জিজ্ঞাসা?

    আমি।—(সত্য গোপনের ছলে) কার কথা বোলছো? কারে আমি দেখেছি? কোন লোকটি?

    রঙ্গিণী।—আহা হা! কিছুই যেন জানেন না! সেই যে,—সেই—যাঁরে আমি ভূষণলাল বোলে—

    আমি।—ও হো হো। তিনি? তাঁরই কথা তুমি বোলবে মনে কোরেছিলে? ডাকাতের দলে এত লোক থাকতে কেবল সেই লোকটির কথা আমার কাছে বোলতে কেন তোমার ইচ্ছা হয়েছিল, তাই আমি জানতে চাই।

    রঙ্গিণী।—চাও? জানতে কি পার নাই? দেখেছ, কথা শুনেছ, কথা কোয়েছ, এখনো কি জানতে বাকী আছে?

    আমি।—দেখ রঙ্গিণি, ও সব ঘোরফের ছেড়ে দাও, তর্কবিতর্কে কথা কাটাকাটি কর আমি ভালবাসি না। সোজা কথা কও। কি কারণে সেই লোকটির কথা আমার কাছে বলবার জন্য তুমি ইচ্ছা কোরেছিলে, সেই কারণটি আমারে জানিয়ে দাও।

    রঙ্গিণী।—কারণটি তুমি জানবে? তবে জানো। লোকটির শরীরে খুব দয়া। কথা শুনে মনে হয়, তাঁর সমস্ত শরীর যেন দয়ামায়া-মাখা; বুকের ভিতর-প্রাণের ভিতর যেন দয়ার নদী! কেন, তুমি কি তাঁর দয়ার পরিচয় পাও নাই? যে রাত্রে আমি এখানে ছিলেম, তিনি এলেন, তার পরদিন আমারে তিনি বোলে দিলেন, সেই দিন তাঁর মুখে আমি তোমার নামটি পর্য্যন্ত শুনলেম;—তিনি আমারে বোলে দিলেন, হরিদাসের জন্য ভাল ভাল খাবার সামগ্রী—

    আমি।—হাঁ হাঁ, সে কথা আমি শুনেছি, তিনি আমাকে সে কথা বোলেছেন; দয়ার পরিচয়ও আমি পেয়েছি। তিনি আমাকে এখান থেকে মুক্ত কোরে—না না, সে কথা তোমাকে বলা হবে না, তুমি তোমার সর্দ্দারের কাছে লাগাবে, দয়াল, লোকটি বিপদে পোড়বেন, আমিও চিরকাল এখানে বন্দী থাকবো, কিম্বা হয় ত মাথা হারাবো। সে কথা থাক। আচ্ছা, তাঁর শরীরে দয়া আছে, সেই কথাটি বলবার জন্য তোমার ততটা আগ্রহ হয়েছিল কি কারণে?

    রঙ্গিণী।—কেবল সেই কথাটি নয়, আরো আছে। ডাকাত-মানুষ ও রকম হয়, ডাকাতের প্রাণে ও রকম দয়া থাকে, কখনো আমি কারো মুখে এমন কথা শুনি নাই। ডাকাতেরা মশালের আগুনে মানুষ পোড়ায়, মেয়েদের নাক-কান ছিঁড়ে গহনা খুলে নেয়, খাটের খুরোতে মেয়েমানুষকে বেঁধে রাখে, তলোয়ার দিয়ে মানুষ কাটে, বন্দুকের গুলি মেরে মানুষ মারে, এই সব কথাই ত শুনে এসেছি, মানুষের উপর ডাকাতেরা দয়া করে, এটা কি আশ্চর্য্য কথা নয়? তুমি ছেলেমানুষ, হও ছেলেমানুষ, তবু ত এ সব কথা বুঝতে পারো; সেই জন্যই তোমার কাছে ঐ আশ্চর্য্য কথা বলবার ইচ্ছা হয়েছিল।

    আমি। ইচ্ছা তোমার হোতে পারে বটে, কিন্তু তোমার প্রতি কি রকম দয়া তিনি দেখিয়েছিলেন? বিপদে পোড়ে ডাকাতের হাতে তুমি বন্দিনী হয়ে আছো, একটা ডাকাত তোমার ধর্ম্ম নষ্ট কোরেছে বোলেছ, ততটা অত্যাচার। জানতে পেরেও যে সেই দয়ালু ডাকাতটি তোমার প্রতি দয়া প্রকাশ করেন নাই, এটা তুমি কি রকম ভাবো?

    রঙ্গিণী। (সজলনয়নে) দয়া প্রকাশ? আমার প্রতি? আমার তুল্য অভাগিনীর প্রতি তাঁর দয়া? বিধাতা তার প্রতি নির্দ্দয়, মানুষে কি তার প্রতি দয়া কোরে কোন উপকার কোত্তে পারে? বিশেষতঃ যে লোকটা আমার উপর দৌরাত্ম করে, সে হোচ্ছে এখানকার সর্দ্দার, এখানকার সব ডাকাত সেই সর্দ্দারের অধীন; সকলেই সর্দ্দারের ভয় করে, সকলেই সর্দ্দারের হুকুমে চলে, সর্দ্দারের যাতে মনোরঞ্জন হয়, সমস্ত ডাকাত সেই চেষ্টা কোরে থাকে, তা কি তুমি বুঝতে পাচ্ছ না? কপালের লিখন কে খণ্ডায়? আমার কপালে ছিল, আমি ডাকাতের—(হাঁপাইয়া হাঁপাইয়া অশ্রুপাত)

    আমি। বুঝেছি বুঝেছি। তুমি চুপ কর! কেঁদো না! কপালের লিখন খণ্ডন করা যায় না, তা আমি বুঝতে পারি; বেশ পারি; আমি নিজেই তার একজন বিলক্ষণ ভুক্তভোগী সাক্ষী। তুমি কেঁদো না; যে সব কৃপায় দুঃখের আগুনে আহুতি হয়, সে সব কথায় দরকার নাই, চুপ কর, ও সব কথা ছেড়ে দাও; আমি আর ও সব কথা তুলবো না। আচ্ছা রঙ্গিণী, তুমি কি কাশীতে গিয়েছিলে?

    রঙ্গিণী। (অশ্রুমার্জ্জন করিতে করিতে চকিতনেত্রে আমার মুখপানে চাহিয়া) কাশীতে? কি সব কথা তুমি বলো? সেদিন বোলছিলে বীরভূম, আজ আবার বোলছ কাশী, এ সব তোমার কি রকম কথা? ডাকাতেরা যাদের ধরে, তাদের মাথার ঠিক থাকে না, তারা যেন সব জেগে জেগে স্বপ্ন দেখে, খেয়াল দেখে; তোমারও কি সব কথা সেই রকমের খেয়াল না কি?

    আমি। না রঙ্গিণী, খেয়াল নয়; স্বপ্নও নয়; সত্যকথা। আমি যেন দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি, তুমি কাশীতে। অষ্টালঙ্কারভূষিতা বারাণসী শাড়ীপরা এই তুমি—ঠিক যেন এই তুমি সেই কাশীধামে রসিকালাল পিতুড়ীর বাড়ীতে কুমারী-পুজায় ব্রতবতী হয়ে আছ; ডাকাতের এই কারাকূপে তোমার আগমনে আমি যেন সেই রসিকের বাড়ীর বারাণ্ডাগুলি সম্মুখে দেখতে পাচ্ছি! কেন ভাঁড়াও? কেন মিথ্যাকথা কও? ভাগ্যে যা ঘটবার, ঘোটে গেছে, আর কেন মিথ্যাকথা বোলে পাপ বাড়াও? কাশীপুরী পুণ্যক্ষেত্র, সেই পুণ্যক্ষেত্রে তুমি বড় বড় কুমারী-পূজায় পণ্যসঞ্চয় কোরে এসেছ, সেই কুমারীগুলিকেও আমি যেন এই কূপের মধ্যে দর্শন কোচ্ছি; ভাল ভাল কুমারী পুত্রবতী-কুমারী, গর্ভবতী-কুমারী, পণ্যবতী-বিধবা-সতীলক্ষ্মী-কুমারী, কত রকম কুমারী যে আমি এইখানে দেখছি, একমুখে ব্যাখ্যা কোত্তে পাচ্ছি না। আচ্ছা, রঙ্গিণী, যিনি তখন তোমার স্বামীরূপে বারাণসীধাম উজ্জ্বল কোরেছিলেন, যখন তুমি গুজরাটে আসো, তখন কি সেই কানাই বাবু তোমার সঙ্গে এসেছিলেন?

    রঙ্গিণী আর বোসে থাকতে পাল্লে না; সাপের ন্যাজে পদার্পণ কোল্লে সাপ যেমন তিরবির কোরে ফণা তুলে খাড়া হয়ে দাঁড়ায়, সেই রকমে দাঁড়িয়ে উঠে, শঙ্কনয়নে আমার দিকে চেয়ে জড়িতস্বরে বোল্লে, “খাও তুমি, খাও তুমি! কোথাকার পাগল! ভালোর জন্য আমি এখানে আসি, পাগলের মুখে পাপকথা শুনতে হবে, এমন জানলে কখনই আমি আসতেম না! কোথাকার ছোঁড়া গো! খেতে হয় খাও, না হয় তো মরো! আর আমি আসবো না;—চোল্লেম!”

    রেগে রেগে আমারে গালাগালি দিতে দিতে, রঙ্গিণী চঞ্চলপদে দরজার দিকে অগ্রসর হোতে লাগলো; বোসে বোসেই আমি একটু উচ্চকণ্ঠে ডেকে ডেকে বোলতে লাগলেম, “দাঁড়াও, রঙ্গিণী, দাঁড়াও, যেয়ো না, দুটো কথা শুনে যাও—সতীলক্ষ্মী পূণ্যবতী তুমি, রাগ কোরো না; দুটো কথা শুনে যাও। কানাইবাবু তোমার সঙ্গে গুজরাটে এসেছিলেন, এখনকার প্রবলপ্রতাপ দস্যুচক্রের সর্দ্দার ডাকাত মহারাজ বীরমল্লের মহিষী তুমি,—কানাইবাবু গুজরাটে এসেছিলেন, এখন তিনি বেঁচে আছেন কিম্বা ডাকাতের হাতে প্রাণ দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত কোরেছেন, সেই কথাটি আমারে বোলে যাও;—আমি তাঁর মাতুলকে—কে তাঁর মাতুল, তা হয় ত তোমার মনে হয়,—কানাইবাবুর মাতুল তোমার জন্মদাতা পিতা,—বীরভূমে তোমার পিতাকে পত্র লিখে কানাইবাবুর ভাগ্যের কথা জানাবো, তোমার এই দুর্দশার কথা জানাবো, এ পাপের যদি কোন প্রায়শ্চিত্ত থাকে, তোমারে সেই প্রায়শ্চিত্ত আমি করাবো, কানাইবাবুর জন্যও আমি একবার কাঁদবো! দাঁড়াও, দাঁড়াও,—বোলে যাও, কানাইবাবু—”

    রঙ্গিণী আর দাঁড়ালো না, যতগুলি কথা আমি বোল্লেম, শুনলে কি না শুনলে, বলতে পারি না, আমার শেষ কথাগুলিও বলা হলো না, ঝনাৎ, ঝনাৎ শব্দে দরজা খুলে, দরজা বন্ধ কোরে, চাবী দিয়ে পলায়ন কোল্লে।

    অত্যন্ত উত্তেজিত হয়েছিলেম, রঙ্গিণীর পলায়নের পর একটু ঠাণ্ডা হয়ে আমি বিবেচনা কোল্লেম, কাজটা ভালো হলো না। রঙ্গিণীকে চটিয়ে দিয়ে ভাল কোল্লেম না; আমার মুক্তিলাভ নিশ্চিত কি অনিশ্চিত, কিছুই জানি না; সেই ছদ্মবেশী বন্ধুটি তাঁর অঙ্গীকারপালনে শীঘ্র কৃতকার্য্য হবেন কি না, পরমেশ্বর জানেন; শীঘ্র যদি কৃতকাৰ্য্য না হন, এই অবস্থায় আর আমারে কতদিন এখানে থাকতে হবে, কে বোলতে পারে? রঙ্গিণী চোটে গেল, বীরমল্ল আজ রাত্রে ফিরে আসবে, পাপীয়সী আমার নামে তার কাছে কত রকম চুকলি গাইবে, বীরমল্ল আমারে এখানে নূতন দেখবে, আরো কত রকম যন্ত্রণা বাড়াবে ভাবতে ভাবতে প্রাণ কেমন আকুল হলো।

    রাগের তেজে রঙ্গিণী সেই মশালটা নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিল, ঘরে আলো ছিল, আমি তখন কিছু আহার কোল্লেম না, অস্থিরমনে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের ইতস্ততঃ পরিভ্রমণ কোত্তে লাগলেম। কি যেন দুকর্ম্ম কোরেছি, মনের ভিতর এই রকম সন্দিগ্ধ ভাব; কিছুতেই চিত্তস্থির হোচ্ছে না; ঘরের ভিতর বেড়াচ্ছি, গতি ঠিক রাখতে পাচ্ছি না, মাতালের মত পা যেন টোলে টোলে আসছে, মাথা যেন ভোঁ ভোঁ কোরে ঘুরছে, চক্ষেও যেন ক্ষণে ক্ষণে ধাঁধা লাগছে। কেন এমন হয়? দুশ্চারিণী পাপিনীর মুখের উপর গোটাকতক সত্যকথা বোলেছি, সেটা কিছু অসৎকার্য্য নয়, তবে কেন এমন হয়? বিনা অবলম্বনে বেড়াতে পাল্লেম না, দেয়াল ধোরে ধোরে, এক এক জায়গায় থেমে থেমে, অন্যমনস্কভাবেই পাইচারী কোত্তে লাগলেম। দেয়ালের সৰ্ব্বত্রই মসৃণ, এক জায়গায় হাত ঠিক রাখতে পাচ্ছি না, পিছলে পিছলে সোরে সোরে পোড়ছে; এক জায়গায় কি যেন একটা হাতে ঠেকলো। জায়গাটা উত্তরদিকের একটা কেন্দ্র। সেইখানে আমি থোমকে দাঁড়ালেম। তাদৃশ মসৃণ ভিত্তিগাত্রে কি এমন পদার্থ আছে, ঘর অন্ধকার থাকলে সেটা আমি নিশ্চয় কোত্তে পাত্তেম না, আলো ছিল, বিশেষরূপে নিরীক্ষণ কোরে দেখলেম, দেয়ালের বর্ণের সঙ্গে সমবর্ণের একটা সরু তার আমার নয়নগোচর হলো। কিসের তার? দেয়ালের গায়ে তার বসানো; এ তারে কি কাজ হয়? ভূষণলালের সঙ্কেতকথা মনে পোড়লো। ঘরে অনেক রকম কল-কৌশল আছে; এটা হয় ত তারি কোন রকম কলের তার।

    দুইবার তিনবার সূক্ষ্মরূপে নিরীক্ষণ কোল্লেম। খুব সরু তার। প্রাচীন ইমারতের গায়ে নবীন নবীন তরু উৎপন্ন হোলে যেমন তার ন্যায় শ্বেতবর্ণ সরু সরু শিকড় দৃষ্ট হয়, যেটা দেখলেম, যেটাকে “তার” অনুমান কোল্লেম, সেটাও ঠিক সেই রকম। একবার মনে হলো, হয় ত দ্বার, বেমালুম দ্বার; অঙ্গলি-স্পর্শে একটু একটু সন্দেহ জন্মিল। কি এ? সন্দেহভঞ্জনের ইচ্ছায় মশালটা তুলে নিকটে নিয়ে গিয়ে আরো ভাল কোরে পরীক্ষা কোল্লেম; দ্বার নয়, সত্য সত্যই একগাছি সূক্ষ্ম তার। কিসের তার, এমন পরিষ্কার দেয়ালে এত সরু তার কি জন্য? এ তারে কি কার্য্য হয়?

    মশালটা যেখানে ছিল, সেইখানে রেখে এলেম; আবার সেই তারগাছটি আস্তে আস্তে খুটে খুটে দেখলেম; একটু যেন সোরে এলো; কৌতুকে কৌতুকে আবার খুটতে আরম্ভ কোল্লেম; তারগাছটি যতদূর দেখা যাচ্ছিল, ঐ রকমে ততদূর পর্য্যন্ত নখদ্বারা স্পর্শ কোল্লেম; যেখানে শেষ, অঙ্গুলির অগ্রভাগ দ্বারা সেই জায়গাটা একটু টিপে দিলেম।

    আশ্চর্য্য! যেমন টিপেছি, অমনি ক্ষুদ্র ঘটিকা-যন্ত্রের চকু-ঘর্ষণের শব্দের ন্যায় খর খর শব্দে তারগাছটি কেঁপে উঠলো, দেয়ালের গায়ে একটু ফাঁক হলো। আর আমারে কিছুই কোত্তে হলো না; ভিত্তিগাত্রের গুপ্ততাক যত বড় হয়, ঠিক যেন একখানি শ্বেত পাথরের পাতলা টালি, তত বড় একটি তাক প্রকাশ পেলে; উঁকি মেরে দেখলেম, তাকটা শূন্যগর্ভ নয়, বিবরমধ্যে কি একটা শ্বেতবর্ণের পদার্থ। হন্তদ্বারা সেই পদার্থটা স্পর্শ কোল্লেম, গাঁথা নয়, সন্তর্পণে বসানো। একবার স্পর্শ করি, একবার হাতখানি সরিয়ে নিই; হাত কাঁপে; কি কোত্তে কি হবে, মনে যেন কেমন একপ্রকার ভয় আসে। কেনই বা ভয় পাই, বুঝতে পারি না। ভয়ের অগ্রে সাহস থাকে, ভয়ের পরেও একটু একটু সাহস আসে; আমার হৃদয়ে তখন অল্পে অল্পে সেইরপ সাহসের সঞ্চার; ভয়ের সঙ্গে সাহস; সেই সাহসকে সহায় কোরে পদার্থটি আমি হাতে কোরে তুল্লেম, বাহির কোরে অনলেম। ক্ষুদ্র একটি বাক্স; রজতনির্ম্মিত দিব্য একটি চিত্র করা বাক্স; চিত্রের মধ্যে মধ্যে কতকগুলি অক্ষর খোদা; দেবনাগরের ন্যায় আকার, কিন্তু ঠিক দেবনাগর অক্ষর নয়; পোড়তে পাল্লেম না; বাক্সে চাবী বন্ধ; গা-চাবী নয়, তালা-চাবী। তালাটিও রৌপ্যনির্ম্মিত। কি এ?—কিসের বাক্স? এমন কোরে লুকিয়ে রেখেছে কেন? একে ত এই জীবনসঙ্কট, তার উপর এ সব উৎপাতে কাজ নাই; অনধিকারচর্চ্চা না করাই ভাল। এইরূপ স্থির কোরে, যেখানকার বাক্স, সেইখানেই রেখে দিলেম দেয়ালের আবরণটা বন্ধ করবার চেষ্টা কোল্লেম, পাল্লেম না। খোলাই থাকলো। নূতন ভয়! মন কেমন ধুকপুক কোত্তে লাগলো। আর সেখানে দাঁড়ালেম না, সেখান থেকে সেরে এসে মহাসন্দিগ্ধ অন্তরে আপনার পূৰ্ব্বস্থানে চুপটি কোরে বোসলেম।

    কত চিন্তায় প্রাণ আকুল, তার উপর আবার এই এক অভাবনীয় চিন্তা। কল-কৌশল; এ ঘরে অনেক প্রকার কল-কৌশল আছে, একটা কল আমি ধোরে ফেল্লেম; আশ্চর্য্য কল! এমন চমৎকার কল কখন কোথাও আমি দেখি নাই, ঘরের ভিতর এমন সক্ষম কল থাকতে পারে, লোকের মুখেও কখন শুনি নাই। নানাখানা ভাবছি, রাত্রি কত, অনুভব কোত্তে পাচ্ছি না, দ্বারে চাবি খোলা শব্দ। অবিলম্বেই দরজা খুলে গেল, আমার সম্মুখে ভূষণলাল।

    প্রবেশ কোরেই এদিক ওদিক চেয়ে, যেন একটু চমকিতস্বরে ভূষণলাল আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন “এ কি হরিদাস? ঘরে আলো কেন? কে দিয়ে গেল?”

    ক্ষণেকের জন্য ভাবনাটা চেপে রেখে সসম্ভ্রমে আমি উত্তর কোল্লেম, রঙ্গিণী রেখে গিয়েছে। তারে আমি গোটা দুই গুপ্তকথা জিজ্ঞাসা কোরেছিলেম, তাই শুনে আমার উপর রাগ কোরে, রাগ কোরে কি ভয় পেয়ে রঙ্গিণীটা তাড়াতাড়ি ছুটে পালিয়েছে, মশালটা নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছে।

    হাস্য কোরে ভূষণলাল পুনরায় জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “এমন কথা কি তারে তুমি জিজ্ঞাসা কোরেছিলে, যাতে সে রাগ করে, ভয় পায়, এখানকার নিয়ম অমান্য কোরে, মশাল নিয়ে যেতে ভুলে যায়, এমন গুপ্তকথা কি তোমার?”

    শশব্যস্তে আমি বোল্লেম, “সে কথা পরে বোলছি, আগে একটা আশ্চর্য্য কথা বলি। এই ঘরের ভিতর আমি একটা আশ্চর্য্য পদার্থ দৰ্শন কোরেছি। আপনি বোলেছিলেন, এ ঘরে অনেক প্রকার কল-কৌ—”

    কথা সমাপ্ত করবার অবসর না দিয়েই মহা আগ্রহে চঞ্চলকণ্ঠে ভূষণলাল আবার আমারে জিজ্ঞাসা কোলেন, “কি—কি—কি, আশ্চর্য্য পদার্থ? কি পদার্থ তুমি এখানে দেখেছ? শীঘ্র বল, শীঘ্র বল! আশ্চর্য্য পদার্থের অন্বেষণেই আমি ডাকাতের সঙ্গে ডাকাত হয়ে বেড়াচ্ছি, শীঘ্র বল, কি আশ্চার্য্য পদার্থ?”

    আমি দাঁড়ালেম যে খোপের ভিতর সেই রজত-বাক্স সেই খোপের কাছে ছুটে গিয়ে সেই বাক্সটি হাতে কোরে আনলেম; শীকার দেখে বাজপক্ষীরা যেমন ছোঁ মারে, সেই রকমে ছোঁ মেরে ভূষণলাল সেই বাক্সটি আমার হাত থেকে আকর্ষণ কোরে নিলেন; তাঁর বদনমণ্ডল অকস্মাৎ রক্তবর্ণ হয়ে এলো; উলটে পালটে বাক্সটি ভাল কোরে দেখে, আহ্লাদে আমার মস্তকে হস্তার্পণ কোরে, তিনি গদগদরে বোলে উঠলেন, “আশ্চর্য্য আবিষ্ক্রিয়া! তুমি দীর্ঘজীবী হও! বোলেছিলেম, আমি তোমার বন্ধু; এখন জানতে পাল্লেম, তুমি হরিদাস, তুমিই আমার পরম প্রিয়তম মহোপকারী বন্ধু! এই বস্তুর নিমিত্তই আমি এই ভয়ঙ্কর স্থানে বহুদিন আত্মগোপন কোরে আছি।”

    আহ্লাদে এই সকল কথা বোলতে বোলতে দুই বাহু, প্রসারণ কোরে সস্নেহে ভূষণলাল আমারে আলিঙ্গন কোল্লেন। আলিঙ্গন করবার সময় বাক্সটি তিনি ভূতলে রেখেছিলেন, ভূতলেই থাকলো, অগ্রে তিনি সে কলের কাছে গিয়ে সূক্ষ্মরূপে পরীক্ষা কোরে কোরে সেই কলটি যথাস্থানে সংলগ্ন কোল্লেন। যেমন দেয়াল, তেমনি হলো। অতঃপর তিনি ভিতরদিক থেকে কারাদ্বার অবরুদ্ধে কোরে দিলেন, মশালটা নিৰ্ব্বাণ কোল্লেন না, বক্সটি হাতে কোরে নিয়ে প্রফুল্লবদনে উপবেশন কোল্লেন, আমিও তাঁর সম্মুখে গিয়ে বোসলেম।

    বাক্সটি কোলের উপর রেখে, ফুল্লনয়নে আমার মুখপানে চেয়ে, ভূষণলাল বোলতে লাগলেন, “আশ্চর্য্য আবিষ্ক্রিয়া! এই কার্য্য হবে বোলেই ভগবান তোমাকে ডাকাতের কবলে নিক্ষেপ কোরেছিলেন! ধন্য ভগবান!”

    আমিও তৎক্ষণাৎ প্রতিধনি কোল্লেম, “ধন্য ভগবান! ভগবানের ইচ্ছায় বিশ্বসংসার বিঘূর্ণিত হোচ্ছে। ভগবান স্বয়ং মঙ্গলময়, তাঁর সমস্ত ইচ্ছাও মঙ্গলময়ী। আমি ডাকাতের হাতে পোড়েছি, এটিও তাঁর ইচ্ছা ছিল। ডাকাতের গুহামধ্যে আপনার তুল্য মহাপুরষকে আমি বন্ধুরূপে প্রাপ্ত হব, এটিও সেই মঙ্গলময়ের ইচ্ছা; তিনিই আপনাকে আমার রক্ষাকর্ত্তারূপে এই বিপদক্ষেত্রে এনে দিয়েছেন! আপনি যদি—”

    আমার কথা সমাপ্ত হবার অগ্রেই প্রসন্নবদনে প্রশান্তস্বরে ভূষণলাল বোল্লেন, “তার আর সন্দেহ কি? সমস্তই সেই মঙ্গলময়ের ইচ্ছা। এই যে রজতাধারটি তুমি আবিষ্কার কোরেছ, এটি যে আমার পক্ষে কত মুল্যবান, কত উপকারসূচক, তা তুমি এখন জানতে পাচ্ছ না; একটু পরেই জানতে পারবে। এখনো আমাদের অনেক কাজ বাকী। এখন একবার আমাকে স্থানান্তরে যেতে হবে, শীঘ্রই ফিরে আসবো, অল্পক্ষণ তুমি নিশ্চিন্তমনে এইখানেই বোসে থাকো; আজ রাত্রেই আমি তোমাকে উদ্ধার কোরে দিব। তোমার হয় ত মনে আছে, আজ রাত্রে বীরমল্লের ফিরে আসবার কথা; দলবল সমস্তই তার সঙ্গে ফিরবে,—মানুষ, কুকুর, লাঠি, সড়কি, ঢাল, তলোয়ার, সমস্তই তার সঙ্গে থাকবে; তারা ফিরে আসবার অগ্রেই আমি বেরিয়ে যাব, তারা এসে উপস্থিত হবার পর আমি ফিরে এসে তাদের সঙ্গে দেখা কোরবো। দেখ হরিদাস, মানুষের মন যে কেবল বিপদেই অস্থির হয়, তা নয়, আনন্দেও মানবচিত্ত অস্থির হয়ে থাকে। আমার হৃদয়ে এখন পূর্ণানন্দের আবির্ভাব, সেই আনন্দে আমার মন এখন বড় অস্থির। মশাল ফেলে রঙ্গিণীটা পালিয়ে গিয়েছে, কি গুপ্তকথা তারে তুমি জিজ্ঞাসা কোরেছিলে, সেটি জানবার জন্য আমার বড় কৌতুহল, আবিষ্ক্রিয়ার আনন্দে সেই রহস্য-শ্রবণে একটু বাধা জন্মিল, কিছু বিলম্ব হলো, তা হোক, মশালটা ফেলে গিয়ে ছুড়িটা আমাদের বিশেষ উপকার কোরেছে; মশালটা না থাকলে তুমি ঐ আশ্চর্য্য আবিষ্কারে সমর্থ হোতে না। আচ্ছা, সে সব কথা পরে হবে, এখন আমি চোল্লেম, অল্পক্ষণের জন্যই চোল্লেম; তুমি থাকো, নির্ভয়ে বসে থাকো, কোন ভয় নাই!”

    এইবার মশলটা নিবিয়ে দিয়ে, অঙ্গবস্ত্রমধ্যে বাক্সটি লুকিয়ে নিয়ে, ভূষণলাল বেরিয়ে গেলেন, দ্বারে দস্তুরমত চাবি পোড়লো। আমি অন্ধকারে একাকী বোসে রইলেম। ভূষণলালের আনন্দের হেতু অনুভব কোত্তে পাল্লেম না, কিন্তু ঐ বাক্সটি যে তাঁর উপকারে আসবে, তাঁর কথা শুনে সেটি আমি বেশ বুঝতে পাল্লেম। কি উপকার, যদিও সেটি আমার অজ্ঞাত, তথাপি আমার উদ্ধারের পথে সেই নির্জীব বাক্স অনুকূল, সে অংশে আমার কোন সংশয় থাকলো না; কারাকূপে আনন্দ আমি ভুলে গিয়েছিলেম, নিভাঁজ আনন্দ কোন কালেই বা আমি উপভোগ কোরেছি, সে কথা নয়, তবুও মুক্ত বাতাসে নিষ্পাপ অন্তরে যে একটু একটু আনন্দের উদয় হোতো, ডাকাতের গহ্বরে সে আনন্দটুকুও আমি ভুলে গিয়েছিলেন, এই রাত্রে সেই আনন্দের অল্প অল্প আলো আমার হৃদয়ে বিভাসিত হলো। ভূষণলাল আমার বন্ধু—নিজ মুখেই তিনি বোলেছেন, তিনি আমার বন্ধু; বন্ধুর আনন্দেই আনন্দ সম্ভোগ করা যায়, এটি মানুষের স্বভাবসঙ্গত; ভূষণলালের আনন্দেই আজ আমার আনন্দ। ফল এখনো অনিশ্চিত, তথাপি বন্ধুর আনন্দেই আমার আনন্দ।

    দুশ্চিন্তার রঙ্গভূমিতে আনন্দের স্থান অতি অল্প হয়। আমার অন্তরে সে সময় আনন্দসঞ্চার হোলেও দুশ্চিন্তা দূরে গেল না। সর্দ্দার ডাকাত ফিরে আসছে, সে আমাকে দেখে নাই, এই রাত্রে নিশ্চয়ই দেখবে, দশহাজার টাকা দিতে আমি অক্ষম, এই কথাও শুনবে, কোন লোকের নামে টাকার জন্য চিঠি লিখতেও আমি নারাজ, দলের লোকেরা সে কথাও তাহাকে বোলবে, এই সব তত্ত্ব জানতে পেরে দোর্দণ্ডপ্রতাপ বীরমল নিশ্চয়ই আমার উপর দৌরাত্ম্য কোত্তে আসবে, তখন আমি কি কোরবো? বিশেষতঃ সেই রঙ্গিণী; সেই রঙ্গিণী আমার উপর রেগে আছে, সর্দ্দার বীরমল্ল সেই রঙ্গিণীর প্রণয়-পাশে বাঁধা, রঙ্গিণী অবশ্যই তার কাছে আমার নিন্দা কোরবে, মনগড়া অপরাধের কথা জানাবে, রঙ্গিণীর উত্তেজনায় রঙ্গলাল বীরমল্ল আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে, সে সময় আমার রক্ষাকর্ত্তা কে হবে? ভূষণলাল ফিরে আসবার অগ্রেই বীরমল্ল আসবে, ভূষণলাল নিজেই সে কথা আমাকে বোলে গিয়েছেন। বীরমল্ল যখন আমাকে তাড়না কোরবে, ভূষণলাল—তিনি যিনিই হউন, ভূষণলাল যদি তখন এখানে উপস্থিত থাকেন, সর্দ্দারের অধীন তিনি, তিনিই বা তখন আমার কি উপকার কোত্তে পারবেন। সেই ভাবনায় আমি অধীর হোলেম। এই সময় আর একটা চিন্তা এলো। বিদেশে একজন পথিক আমি, অপরিচিত পথিক বালক; পথ ভুলে বনের ভিতর এসে পোড়েছিলেম, বনের ডাকাত অতর্কিতে আমাকে ধোরে ফেলেছিল, এটাও যেন মনে লয় না। বোধ হয়, বনপথে আমি আসছি, এই সংবাদটা কোন লোক ডাকাতের দলে বহন কোরে থাকবে। তেমন লোকই বা কে? এখানে তেমন শত্রুই বা আমার কে আছে? ঠিক! রক্তদন্ত! নফর ঘোষাল বলেছিল, রক্তদন্ত গুজরাটে এসেছে। সেই কথাই হয় ত ঠিক! তা না হোলে ততদূর শত্রুতা করে, তেমন লোক গুজরাটে থাকা অসম্ভব। রক্তদন্ত গুজরাটে এসেছে। তার সঙ্গেও হয় ত আরো লোক থাকতে পারে; সেই সকল লোকও হয় ত এই ডাকাতের দলে ভর্ত্তি হয়ে আছে। রক্তদন্ত আমার জাতশত্রু! রক্তদন্ত আমার জীবনদায়িনী কোমলাঙ্গী নির্ম্মলকুমারী অমরকুমারীকে চুরি কোরেছে, আমাকেও ডাকাতের দলে ধোরিয়ে দিয়েছে, বিবিধ দুশ্চিন্তার সঙ্গে এই ভাবটাও তখন আমার মনের ভিতর উদয় হলো। বিপত্তিকাণ্ডারী হরি শ্রীমধুসূদন! তিনিই আমার আশা, তিনিই ভরসা তিনিই সম্বল, তিনিই আমার সৰ্ব্বস্ব। ঘোর বিপত্তিকালে সেই শ্রীমধুসূদনের নাম স্মরণ কোরে ঘোর অন্ধকারে আমি নয়ন মুদে বসে থাকলেম। ভূষণলাল এলেন না।

  • অষ্টাবিংশ কল্প : গ্রহ সুপ্রসন্ন

    অষ্টাবিংশ কল্প : গ্রহ সুপ্রসন্ন

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    অষ্টাবিংশ কল্প : গ্রহ সুপ্রসন্ন

    গভীর নিশীথকালেও বনবাসী শৃগালেরা রব করে। নিশাকালে প্রহরে প্রহরে শৃগালের রব শুনা যায়। আমাদের সঙ্গীত-শাস্ত্রের গুরুমহাশয়েরা দিবা-রজনীর কালভেদে ভিন্ন ভিন্ন রাগরাগিণীর ভেদ নির্দ্ধারণ কোরে রেখেছেন, শৃগালের রবেও সেইরূপ কালভেদ স্বরভেদ বুঝা যায়; কিঞ্চিৎ অভিনিবেশ পূর্ব্বক শ্রবণ কোল্লে, ভাবুকলোক মাত্রেই সেই ভেদাভেদ অনুভব কোত্তে পারেন। বোসে বোসে নিস্তব্ধ হয়ে আমি ভাবছি, দূরে দূরে শেয়াল ডেকে উঠলো। স্বরে বুঝলেম, রাত্রি শেষ; ঊষা আগমনের অতি অপমাত্র বিলম্ব।

    শৃগালেরা নীরব হোতে না হোতেই ডাকাতের দুর্গমধ্যে মহা কোলাহলধ্বনি সমুত্থিত। এককালে বহুলোকের কণ্ঠমিশ্রিত চীৎকারধ্বনি! গর্জ্জন, আস্ফালন, হুহুঙ্কার, বিভীষণ চীৎকারমিশ্র চীৎকারের সঙ্গে সঙ্গে এক একবার সভয় চীৎকারও শ্রুতিগোচর হোতে লাগলো। এই বুঝি সর্দ্দার এসেছে, এই বুঝি সব দলবল এসেছে, এই বুঝি দলের লোকেরা সর্দ্দারের কাছে আমার কথা বোলে দিচ্ছে, এইবার বুঝি আমার উপরেই বজ্রবর্ষণ হবে, এই সকল ভাবনা উপর্য্যুপরি আমার শঙ্কাকুল হৃদয়ে সমুদিত। বোসে ছিলেম, থাকতে পাল্লেম না, ভয়ঙ্কর কলরব শুনে চঞ্চল হয়ে উঠে দাঁড়ালেম; ভয়ঙ্কর জলদ-গর্জ্জনের ন্যায় ক্রমশই সেই ভীষণ চীৎকারের প্রবলতা! দূরবনে ব্যাঘ্রগর্জ্জন শ্রবণ কোরে বনবাসী নিরীহ কুরঙ্গ যেমন প্রাণভয়ে ব্যাকুল হয়, ঘরের বাহিরে দস্যুদলের ভীষণ গর্জ্জন-শ্রবণে, প্রাণের ভয়ে আমিও সেইরূপ ব্যাকুল হোলেম।

    ঘেউ ঘেউ রবে অনেকগুলো কুকুর ডেকে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে গুড়ুম গুড়ুম শব্দে গোটাকতক বন্দুকের আওয়াজ। কুকুরের ডাক সেই সকল বন্দুকের আওয়াজের উপর দিয়ে ছাপিয়ে ছাপিয়ে যেতে লাগলো। সে রকম কুকুরের ডাক অন্য কোন স্থানে আমার কর্ণে প্রবেশ করে নাই; ভীষণ জলদ-গম্ভীর নিনাদ! নিরেট ঘর, প্রকাণ্ড কপাটে চাবি বন্ধ, সেই ঘরের ভিতর থেকে সেই ভীষণরব শ্রবণ কোরে সত্যই যেন আমার অর্দ্ধেক প্রাণ উড়ে গেল। পুনর্ব্বার বন্দুকের আওয়াজ। উভয় গর্জ্জনে যেন খণ্ড-প্রলয় বোধ হোতে লাগলো! অনেকদূর পর্য্যন্ত প্রতিধ্বনি। এক একটা আওয়াজে আমি থর থর কোরে কাঁপতে লাগলেম, ঘর পর্য্যন্ত যেন কাঁপতে লাগলো। প্রবল ভূমিকম্পে ধরণী যেমন কাঁপে, ঘন ঘন সেই প্রকার কম্প! সঙ্গে সঙ্গে বহুলোকের কলরব। বিভীষণ চীৎকার! উভয়দলে যুদ্ধ উপস্থিত হোলে যে প্রকার হুহুঙ্কার শুনা যায়, সেই প্রকার বিমিশ্র চীৎকার। অবিরাম বন্দুকের ধ্বনি। মনুষ্যের চীৎকার, কুকুরের চীৎকার, বন্দুকের চীৎকার, প্রলয়কাণ্ড!

    ব্যাপার কি! সর্দ্দার ডাকাত ফিরে এসেছে, কুকুরের দল ফিরে এসেছে, সেই কারণেই কি ঐরূপ জয়ধ্বনি হোচ্ছে? পরদ্রব্য লুণ্ঠনে পূণমনরথ হয়ে ডাকাতেরাই কি ঘন ঘন তোপধ্বনি কোরে আনন্দ প্রকাশ কোচ্ছে? অব্যক্ত চীৎকারে কুকুরেরাও কি প্রভুবর্গের আনন্দে উৎসাহিত হয়ে উঠেছে?—না, সে রকম কলরব নয়; জয়ধ্বনির সঙ্গে যেন ভয়ঙ্কর আর্ত্তনাদ এক একবার মিশিয়ে মিশিয়ে যাচ্ছে! ব্যাপার কি?

    প্রায় আধঘণ্টাকাল আমি ঐ প্রকার প্রলয়-কলরব শ্রবণ কোল্লেম। তার পর উচ্চধ্বনি নিস্তব্ধ, দূর থেকে বহুজনপূর্ণ মেলাস্থলের মিশ্রকলরব যেমন শুনা যায়, কথা বুঝা যায় না, অর্থবোধ হয় না, কেবল যেন মহাঝড়ের অথবা দূরস্থ সমুদ্রগর্জ্জনের হুঙ্কারশব্দের ন্যায় গাত্র-কম্পন ভীমরব শ্রবণ কোত্তে লাগলেম। অকস্মাৎ আমার কারাগারের রুদ্ধদ্বার বিমুক্ত হয়ে গেল, প্রভাতের অল্প অল্প আলো গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লে, সমুজ্জ্বল উষ্ণীষধারী একটি দিব্যমূর্ত্তি আমার সম্মুখে দণ্ডায়মান। যুগল হস্তে যুগল অসি, বদনমণ্ডল দিব্য প্রফুল্ল, দিব্য মহাবীর-মূর্ত্তি!

    অসি-দুখানি ভূতলে সংস্থাপন কোরে সেই মূর্ত্তি পরমানন্দে আমারে আলিঙ্গন কোল্লেন; আনন্দবদ্ধন, সুমধুর গম্ভীরস্বরে শীঘ্র শীঘ্র বোল্লেন, “হরিদাস! হরিদাস! গ্রহদেবতা সুপ্রসন্ন! আর তুমি এখানকার বন্দী নও, মুক্ত পুরুষ! তোমার আবিষ্কৃত সেই ক্ষুদ্র বাক্সটির কল্যাণে বহুদিনের পর আজ আমি সিদ্ধমনোরথ হয়েছি। সব ডাকাত ধরা পোড়েছে! এসো, এসো, শীঘ্র এসো, দেখবে, গড়া গড়া পোড়ে আছে। দেখবে এসো!”

    এই কথাগুলি তিনি বোল্লেন; যতক্ষণ বোল্লন, ততক্ষণ আমি তার মুখেপানে অনিমেষে চেয়ে থাকলেম। মহারোগে বাকরোধ হয়, মহাশোকে বাকরোধ হয়, মহা আনন্দেও বাকরোধ হয়ে যায়; ক্ষণেকের জন্য মহানন্দে আমার বাকরোধ! যে মুখে ঐ আনন্দবার্ত্তা বিঘোষিত, সেই মুখখানি একরাত্রে অল্পক্ষণের জন্য আমার দেখা হয়েছিল। পাঠকমহাশয় স্মরণ কোত্তে পারবেন। অসাবধানে মুখোসটি খোসে পড়বার উপক্রমে পলকমাত্র যে মুখ আমি দেখি, সেই মুখ! সে রাত্রে কেবল মুখখানি মাত্র দর্শন কোরেছিলেম, এই প্রাতঃকালে—এই সুপ্রভাতে সেই মুখের অধিকারীর পূর্ণ অবয়ব আমি দর্শন কোল্লেম। দর্শনে নয়ন চরিতার্থ, হৃদয় পুলকিত, অন্তরানন্দে মন-প্রাণ প্রফুল্ল; সম্মুখে আমার পরমোপকারী প্রিয়বন্ধু ভূষণলাল।

    আমি তখন কথা কইতে পাল্লেম না, আনন্দ-প্রমোদিত ভূষণলাল, সস্নেহে আমার হস্ত আকর্ষণ কোরে ঘরের বাহিরে নিয়ে চোল্লেন। আকর্ষণ বোল্লেম কেন, যথার্থই আকর্ষণ। আনন্দে আমার অঙ্গ অবশ, রসনা নিৰ্ব্বাক, গতিশক্তি স্থিত। ভূষণলাল আমারে যথার্থই টেনে টেনে নিয়ে চোল্লৈন; কলের ঘর থেকে বেরিয়ে আমি যেন তখন কলে কলেই চোলে যেতে লাগলেম।

    পূর্ব্বে শুনে রেখেছি, শুনে শুনে বলে রেখেছি, ডাকাতের বনদূর্গ। সেই দূর্গমধ্যে এক সুপ্রশস্ত প্রাঙ্গণ। সেই প্রাঙ্গণে বিকট বিকট চেহারার শতাধিক লোক শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে পোড়ে আছে। হস্ত-পদে শৃঙ্খল, কটিদেশে শৃঙ্খল, গলদেশে শৃঙ্খল; নড়ন-চড়নের শক্তি নাই। রণবেশধারী প্রায় দুইশত সিপাহী চারিদিকে শ্রেণীবদ্ধ দণ্ডায়মান; অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত; বদন গম্ভীর, নিৰ্ব্বাক; হঠাৎ দর্শনে হৃদয়ে আশঙ্কার সঞ্চার হয়। একটু দূরে দেখলেম, একপাল কুকুর বাঁধা। জনকতক সিপাহী সেই সকল কুকুরের মুখে জাল বেধে বৃহৎ একটা শৃঙ্খলে সবগুলোকে একত্র বন্ধন কোরে আটকে রেখেছে। শৃখলবদ্ধ ডাকাতেরা মিট মিট কোরে চেয়ে দেখছে, রাগে রাগে ফুলছে, এক একটা লোক মুখ খিঁচিয়ে দাঁত কড়মড় কোরে আস্ফালন দেখাচ্ছে, বাক্য নাই। কোনটা তাদের মধ্যে বীরমল্ল, অনেকক্ষণের পর বাকশক্তি প্রাপ্ত হয়ে ভূষণলালকে আমি সেই কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেম। হাস্য কোরে ভূষণলাল বোল্লেন, “সে একটা রাজা লোক, নিজের দলের ভিতর তার মহারাজ খেতাব, তার কি এই রকম খোলা জায়গায় এমন অযত্নে রাখা যায়। তার বিলাসঘরেই সুকোমল শয্যার উপর তারে রক্ষা করা হয়েছে। তার বিলাসিনী রঙ্গিণীটিও সেইখানে আছে; চল, দেখবে চল!”

    ডাকাতের বিলাসগৃহে আমরা প্রবেশ কোল্লেম। বিলাসগৃহে বিলাস-শয্যা। সেই শয্যার উপর বীরমল্ল উপবিষ্ট। স্বেচ্ছায় উপবিষ্ট নয়, চতুর্ব্বিধ বন্ধনের কায়দায় কাজেই তারে বোসে থাকতে হয়েছিল। গলার সঙ্গে, কোমরের সঙ্গে, হাতের কব্জীর সঙ্গে, পায়ের সঙ্গে এক শৃঙ্খলের যোগ, শয়নের কথা দূরে থাকুক, হাত-পা ছড়িয়ে একটু আরামে নিঃশ্বাস ফেলাও অসাধ্য। আমি সেই ডাকাতের আপাদ-মস্তক নিরীক্ষণ কোল্লেম। আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা আছে, তথাপি সেই শয্যার নিকটবর্ত্তী হোতে আমার সাহস হলো না। ভয়ঙ্কর চেহারা। বেঁটে, ঘাড়ে-গর্দ্দানে এক, বুক চওড়া, কোমর মোটা, উরুদেশ যেন শালকাঠের মত প্রকাণ্ড, হাতের গুল ঘুরাণো ঘুরাণো, পায়ের গোছ খুব মোটা, নাকটা লম্বা, আগার দিকটা চ্যাপ্টা, চোখ খুব ছোট ছোট, কিন্তু তারা-দুটো বড় বড়, ভাল কোরে দেখলে বোধ হয় যেন জ্বোলছে, জ্বোলছে আর ঘুরছে, চক্ষের পাতায় লোম নাই, ভ্রুতেও অতি অল্প লোম; আছে কি না মালুম হয় না, কপালখানা প্রকাণ্ড, মাথার সম্মুখদিকে কপাল পর্য্যন্ত টাক, তাতে কোরেই কপালখানা আরো প্রকাণ্ড দেখায়; টাকের ধারে ধারে পাতলা পাতলা লম্বা লম্বা চুল; গোঁপ চোমরা, দাড়ি কামানো; গায়ের রং আধপোড়া ইটের মত, রোদ-পোড়া শুষ্ক বেল যে রকম, মুখের বর্ণটা সেই প্রকার। আমাদের দেখে সেই ক্ষুদ্র চক্ষু রক্তবর্ণ কোরে ডাকাতটা তখন বড় বড় দন্তদ্বারা ওষ্ঠ দংশন কোত্তে লাগলো। দশভুজা মা দুর্গার পদতলে সিংহাক্রান্ত নাগপাশবদ্ধ মহিষাসুরের যেরূপে গঠন, যেরূপ ভয়ঙ্কর আকৃতি লৌহশৃঙ্খলবদ্ধ বীরমল্পকে আমি তখন সেইরূপ দেখলেম। ঘরের কোণে করযোড়ে রঙ্গিণীরও হাত-পা বাঁধা, বিশেষের মধ্যে শৃঙ্খলের পরিবর্ত্তে দড়ি দিয়ে বাঁধা;—দুখানা পা বাঁধা ছিল না, একখানা পায়ে দড়ি বেঁধে একটা জানালার গরাদের সঙ্গে টানা দেওয়া। আমাদের দেখে রঙ্গিণী কাঁদতে লাগলো।

    সে ঘর থেকে আমরা বেরিয়ে এলেম। চাতালের ডাকাতগুলোকে প্রথমে যে অবস্থায় দেখে গিয়েছিলেম, ঠিক সেই অবস্থায় তারা পোড়ে আছে; চারিধারে সিপাহী পাহারা। এক একবার সকলের দিকে চাইতে চাইতে গহ্বর থেকে আমরা বাহিরে আসছি, সেই সময় দেখি, প্রবেশ পথের দুই পাশে দুটো আস্তাবল; প্রায় ৪০/৫০টা বড় বড় ঘোড়া সেই দুই আস্তাবলে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মাঝে মাঝে নাসাগর্জ্জন কোচ্ছে আর খট খট কোরে পা ঠুকছে।

    আমরা বেরিয়ে এলেম। সম্মুখে সেই কানন-বেষ্টিত প্রান্তর; ডাকাতেরা প্রথম রাত্রে সেই প্রান্তরমধ্যে আমারে ঘোড়ার উপর তুলে বন্ধন কোরেছিল, সেই কথা তখন স্মরণ হলো। দেখতে দেখতে আমরা উভয়ে পদব্রজে সেই নিবিড় বনভূমি অতিক্রম কোল্লেম। প্রাণে তখন আমার কতদূর আনন্দ, আমার মুখে শুনলেও সকলেই সেটি অনুভব কোত্তে পারবেন।

    আমি খালাস পেলেম। পাপ ডাকাতের পাপ-নিবাসের দুর্গন্ধময় বাতাস আর আমারে যন্ত্রণা দিতে পাচ্ছে না, নির্ম্মল পবিত্ৰবায়ু সেবনে সুস্থ হয়ে আমি তখন স্বাধীনতাসুখ উপভোগ কোত্তে লাগলেম। অরণ্যসীমা পার হয়ে প্রশস্ত রাজপথে আমরা উপস্থিত। দুজন লোক দুটি সুসজ্জিত অশ্ব নিয়ে সেইখানে হাজির ছিল, ভূষণলাল আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “ঘোড়ায় চড়া তোমার অভ্যাস আছে?” মুখে উত্তর না দিয়ে, একলম্ফে একটি ঘোড়ার উপর আমি সওয়ার হয়ে বোসলেম; বোসেই মনে মনে মুর্শিদাবাদের পশুপতিবাবুকে ধন্যবাদ দিলেম; তিনিই আমার অশ্বারোহণবিদ্যার গুরু। আমি সওয়ার হোলেম, ভূষণলাল একলম্ফে দ্বিতীয় অশ্বে আরোহণ কোল্লেন, ঘোড়ারা কদমে কদমে চলতে লাগলো। দুটি ঘোড়া পাশাপাশি। মুখ বুজে আমরা আসছি না, ভূষণলাল অনেক কথা আমারে জিজ্ঞাসা কোচ্ছেন, অনেক কথার আমি উত্তর দিচ্ছি। আমার তখন দিব্য স্ফূর্ত্তি, ভূষণলাল ও নূতন আনন্দে স্ফূর্ত্তিপ্রাপ্ত, কথোপকথনে সেই একরকম নূতন আমোদ।

    কথার অবসরে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “স্ত্রীলোকটা বন্ধনদশায় কেন? স্ত্রীলোক ডাকাতী করে না, ডাকাতেরা তারে ধরে রেখেছিল, তার অপরাধ কি? সে পালাবে না তার পালিয়ে যাবার স্থান নাই, তারে বন্ধন করা হয়েছে কি জন্য?”

    ঈষৎ হাস্য কোরে ভূষণলাল উত্তর দিলেন, “রঙ্গিণীকে আমার দরকার আছে। বীরমল্লের সঙ্গে এই রাজ্য-সংক্রান্ত তার কি কি কথা হয়েছিল, সেইগুলি আমি শুনবো আরো, বাঙ্গালীর মেয়ে গুজরাটে এসেছিল কেন, তার জীবনের সে পরিচয়টিও আমার অবগত হবার ইচ্ছা আছে।”

    ভূষণলালের ইচ্ছার কথা শুনেই চমকিতভাবে আমি বোল্লেম, “রঙ্গিণীর জীবনের কথা? জীবনের পরিচয়? রঙ্গিণী আমার উপর ভারী রেগে আছে। তার জীবনের দুটি একটি কথা আমি জানি, দুটি একটি জিজ্ঞাসা করেছিলেম, তাতেই তার রাগ।”

    যতক্ষণ আমরা এই সকল কথা বলাবলি কোল্লেম, ততক্ষণে আমাদের অশ্বেরা নগরের একখানি সুরম্য অট্টালিকার নিকটে এসে পৌঁছিল। স্নিগ্ধস্বরে ভূষণলাল বোল্লেন, “আচ্ছা আচ্ছা, সে সব কথা আমি শুনবো; এই বাড়ীতেই আমি এখন থাকি, আমার সঙ্গে এই বাড়ীতেই তুমি এখন চল, এইখানেই তোমার আহারাদি হবে, অপরাহ্ণে লোক সঙ্গে দিয়ে দীনবন্ধুবাবুর বাসাতে তোমাকে পাঠিয়ে দিব। তুমি নিরাপদে আছ, তিনি সংবাদ পেয়েছেন, তাদৃশ উদ্বেগের কোন কারণ নাই।”

    আমরা উভয়ে ঘোড়া থেকে নামলেম, বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ কোল্লেম, অশ্বপালেরা অশ্বদুটিকে যথাস্থানে নিয়ে রাখলেন। বাড়িখানি ছোট, কিন্তু দিব্য পরিপাটী। দূর থেকে দেখায় যেন ছবিখানি। গৃহের সজ্জাগুলিও সুন্দর সুন্দর, দাস-দাসী আছে, কিন্তু সংখ্যায় অল্প। সেই স্থানে আমি স্নান আহার কোল্লেম। অপরাহ্ণে আমার দীনবন্ধুবাবুর বাসায় যাবার কথা। অপরাহ্ণ আগমনের অগ্রে ভূষণলাল আমারে একটি সুসজ্জিত ঘরে আহ্বান কোল্লেন, সেই ঘরে আমি গেলেম। দেখলেম, তিনি একাকী; মুখে মৃদু মৃদু হাস্য।

    হাস্যের কারণ উপস্থিত ছিল না, তাদৃশ গম্ভীর প্রকৃতির লোক একাকী আপন মনে আপনা আপনি হাস্য করেন, বোধ হয়, কোন নিগূঢ় কারণ থাকতে পারে। কারণ জিজ্ঞাসা করা আমি আবিশ্যক বিবেচনা কোল্লেম না, তিনি আমারে বোসতে বোল্লেন, একধারে আমি উপবেশন কোল্লেম।

    পূৰ্ব্ববৎ মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে ভূষণলাল আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কেমন হরিদাস, ডাকাতের দলের পরিণামটা দর্শন কোল্লে? পরিণামের পরিনাম এখনো বাকী কিন্তু তুমি আমার যতদূর উপকার কোরেছ, সেটি আমার বহুদিনের বহুশ্রমের উচ্চ পুরস্কার!”

    একটু কুণ্ঠিত হয়ে বিনীতবচনে আমি বোল্লেম, “সে কি মহাশয়। ও কি কথা আপনি বলেন? ডাকাতের অন্ধকূপে আমি মারা যাচ্ছিলেম, আপনি সদয় হয়ে পরিত্রাণ কোল্লেন, চিরজীবনের জন্য আমিই আপনার কাছে উপকৃত; আপনি বলছেন, আমি আপনার উপকার কোরেছি, এটি কি প্রকার কথা?”

    ভূষণ।—যে উপকারটি তুমি আমার কোরেছ, সেটি তুমি জান না। মহা উপকার! পূর্ব্বে তোমারে আমি বোলেছি, যা তুমি দেখেছো, বাস্তবিক তা আমি নই, আমার সত্য পরিচয় অবগত হও। এখানকার মহারাজ আমার পিতৃব্য, আমার নাম ভূষণলাল নয়, ছদ্মবেশ ধারণ কোরে ঐ নামে আমি ডাকাতের দলে মিশে ছিলেম।

    আমি।—ছদ্মবেশ ধারণ কোরে ডাকাতের দলে আপনি মিশেছিলেন, আমার তুল্য অনেক অভাগকে আপনি উদ্ধার কোরেছেন, আমারেও উদ্ধার কোল্লেন, আপনার বীরত্ব-প্রভাবেই ভয়ঙ্কর ডাকাতের দল ধরা পোড়লো, এ সকল কার্য্যে আমি আপনার কি উপকার কোল্লেম?

    যারে আমি ভূষণলাল বোলে জানছিলেম, অট্ট হাস্য কোরে তিনি বোল্লেন, “আমার প্রকৃত নাম রণেন্দ্র রাও, আমি এখানকার মহারাজের ভ্রাতুষ্পুত্র; দস্যুদলপতি বীরমল্ল আমাদের এই রাজ্যটিকে বিপদগ্রস্ত কোরে তুলেছিল, দলটাকে গ্রেপ্তার করার নিমিত্ত অনেক দিন আমি অশেষ-বিশেষ চেষ্টা কোচ্ছিলেম, কৃতকার্য্য হোতে পারি নাই, আমার পক্ষে যেটা অসাধ্য বোধ হয়েছিল, সেই গুরুতর কার্য্য তোমার দ্বারাই সুসিদ্ধ হলো!”

    সাগ্রহে আমি বলে উঠলেন, “আমার দ্বারা সুসিদ্ধ, আমি ত এ কথার কিছুই তাৎপর্য্য হৃদয়ঙ্গম কোত্তে পাল্লেম না। মহত্ত্বগুণে আপনি আমারে ভালবেসেছেন, পৃথিবীর আমি কেহই নই, আমারে বন্ধু বোলে আপনি আমার গৌরব বাড়িয়েছেন, মহাবিপদ থেকে আপনি আমারে রক্ষা কোল্লেন, আপনার অনুগ্রহেই আমি প্রাণ পেলেম, আপনারে শত নমস্কার, শত ধন্যবাদ।

    এখন আর এই মহাপুরুষকে ভূষণলাল বলবার আবশ্যক নাই, আমার ঐরূপ উক্তি শ্রবণ কোরে গম্ভীরবদনে রাজপুত্র বোল্লেন, “কি প্রকারে তোমার দ্বারা কার্য্যসিদ্ধ, সে সব অনেক কথা, এখন তুমি তোমার সেই আশ্রয়দাতার সঙ্গে সাক্ষাৎ কোত্তে যাবে, সন্ধ্যার পর আবার এখানে এসো, সেই সময় সমস্ত ব্যাপার তুমি জানতে পারবে।”

    অপরাহ্ণে দুটি অশ্ব সজ্জিত হলো, রাজপুত্র একজন বিশ্বস্ত কর্ম্মচারীকে আমার সঙ্গে দিলেন, আমরা উভয়ে অশ্বারোহণে ভবানীদেবীর মন্দিরাভিমুখে চোল্লেম। দীনবন্ধুবাবুর বাসায় উপস্থিত হোলেম। তাঁর চরণে প্রণিপাত কোরে আদ্যোপান্ত সমস্ত ঘটনা তাঁর কাছে আমি নিবেদন কোল্লেম। শুনে তিনি বিস্তর দুঃখ প্রকাশ কোরে শেষকালে বিস্ময় সহকারে আনন্দ প্রকাশ কোল্লেন। যিনি আমার সঙ্গে এসেছিলেন, তাঁর পরিচয় পেয়ে দীনবন্ধুবাবু তাঁরে যথেষ্ট সমাদর কোল্লেন। সে সময় আমাদের যে কত আনন্দ, লেখনীমুখে সে আনন্দ ব্যক্ত করা যায় না। কথায় কথায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। রাজপুত্রের আমন্ত্রণ, দীনবন্ধুবাবুকে সেই কথা জানিয়ে রাত্রের মত আমি বিদায় চাইলেম। বাবু বোল্লেন, “ভয় হয়! আবার তুমি অন্ধকারে রাস্তায় বাহির হবে, কোথা থেকে কারা এসে আবার তোমারে ধরে ফেলবে, আবার কত কষ্ট পাবে, রাত্রিকালে তোমারে ছেড়ে দিতে আমার প্রাণ চায় না।”

    প্রাণের উৎসাহে পূর্ণ সাহসে আমি বোল্লেম, এখন আর এখানে কাহাকেও আমি ভয় করি না। অকারণে যারা আমার ভয়ের কারণ হয়েছিল, তাদের বিষদাঁত ভেঙে গিয়েছে, লৌহ-শৃঙ্খল পরিধান কোরে তারা এখন জীবনের আশা পরিত্যাগ কোরেছে, আমার আর কোন ভয় নাই। আমি বিপদের মুখে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেম, তথাপি অতি নিরাপদে আছি, আপনার কাছে এইরূপ সংবাদ পাঠিয়ে যিনি আপনার উদ্বেগ শান্তির চেষ্টা কোরেছিলেন, তিনিই আমার অভয়দাতা, তিনিই আমার রক্ষাকর্ত্তা। তাঁরই আমন্ত্রণে তাঁরই কাছে আমারে যেতে হোচ্ছে। আপনি চিন্তিত হবেন না, কোন ভয় নাই, নিরাপদেই আমি ফিরে আসবো?”

    রাজপুত্রের প্রেরিত লোকটি আমার সঙ্গেই ছিলেন, তিনিও আমার বাক্যের পোষকতা কোল্লেন। দীনবন্ধুবাবু আর কোন আপত্তি উত্থাপন কোল্লেন না; আমরা উভয়ে উপর থেকে নেমে এসে পূৰ্ব্ববৎ অশ্বারোহণে কুমার রণেন্দ্র বাহাদুরের নিকেতনাভিমুখে যাত্রা কোল্লেম।

  • ঊনত্রিংশ কল্প : রহস্য প্রকাশ

    ঊনত্রিংশ কল্প : রহস্য প্রকাশ

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    ঊনত্রিংশ কল্প : রহস্য প্রকাশ

    রাজপুত্রের নিকেতনে আমি উপস্থিত। যে ঘরে গিয়ে আমি প্রবেশ কোল্লেম, কুমার বাহাদুর তখন সে ঘরে ছিলেন না। দেখলেম, একটি নূতন লোক। সেই লোক আমারে অভ্যর্থনা কোরে সেইখানে বসালেন। আমি হরিদাস, আমার অসাক্ষাতে সে কথা তিনি শুনেছিলেন, আমার মুখে নামটি আর একবার শ্রবণ কোরে ঘনিষ্ঠভাবে বোল্লেন, “রাজকুমার এখনি আসবেন। ডাকাতেরা চালান হয়ে এসেছে, বিচারের অগ্রে হাজতী আসামীরা যে বাড়ীতে থাকে, সেই বাড়ীতেই তাদের রাখা হয়েছে। পাহারার সুবন্দোবস্তের জন্য রাজপুত্র সেখানেই গিয়েছেন। আপনি কিয়ৎক্ষণ এইখানে অপেক্ষা করুন, অবিলম্বেই তিনি আসবেন।”

    কথাগুলি যিনি বোল্লেন, তিনি ভদ্রলোক। নাম শুনলেম, মঙ্গলচাঁদ। রাজসংসারের তিনি কর্ম্ম করেন, রাজকুমারের সঙ্গে তাঁর সখ্যভাব। মঙ্গলচাঁদের সঙ্গে আমার অনেক রকম কথাবার্ত্তা হোতে লাগলো। ডাকাত ধরার কথাও তিনি কতক কতক বোল্লেন। প্রধান দুর্গে বীরমল্ল থাকতো, তার অধীনস্থ অপরাপর দুর্গে অপরাপর ডাকাতেরা থাকতো, বীরমল্ল বন্দী হবার পর সেই সকল দুর্গেও সিপাহী প্রেরিত হয়েছিল, কোতোয়ালীর লোকেরাও সিপাহীদের সঙ্গে ছিল, সে সকল দুর্গের ডাকাতেরাও ধরা পোড়েছে। শুনলেম, জনকত পালিয়ে গিয়েছে! দুর্গমধ্যে যারা ছিল না, তারা এখনও নিরাপদে আছে। অবসর-প্রতীক্ষায় কোতোয়ালীর লোকেরা সেই সকল পলাতকের অনুসন্ধানে নিযুক্ত আছে।

    এই সকল কথা হোচ্ছে, এমন সময় রাজপুত্র এলেন। উঠে দাঁড়িয়ে করপুটে আমি তাঁরে অভিবাদন কোল্লেম। স্মিতবদনে রাজপুত্র বোল্লেন, “বেশী রাত্রি কর নাই, শীঘ্র শীঘ্র এসেছ, ভালই হয়েছে। এদিকে অনেক কাজ ফর্সা হয়ে এসেছে! ডাকাতের কেল্লা পরিষ্কার। কেল্লার সজ্জিত ধন-রত্ন, অস্ত্র-শস্ত্র, গুপ্তযন্ত্র ইত্যাদি যতক্ষণ স্থানান্তরিত করা না হয়, ততক্ষণের জন্য কেল্লার মুখে পাহারা রাখা হয়েছে। অশ্বগুলোকে আর কুকুরগুলোকে আমাদের বাগান বাড়িতে এনে রাখা হয়েছে। সব একরকম পরিষ্কার। হাঁ, তুমি বোলছিলে, তোমার দ্বারা আমার কি মহোপকার সাধিত হয়েছে, সেটি তুমি বুঝতে পাচ্ছো না। যাতে কোরে বুঝতে পার, তাই আমি তোমাকে শুনাবো।”

    নবীন আগ্রহে আমি বোল্লেম, “হাঁ রাজকুমার! কিছুই আমি বুঝতে পাচ্ছি না। আমি গরিব, নিরাশ্রয়, নিৰ্ব্বান্ধব, বিদেশী, ডাকাতের হাতে বন্দী, আমি একজন মহা প্রতাপশালী রাজপুত্রের উপকারে আসবো, ভেবে চিন্তে কিছুই ত ঠিক কোত্তে পাচ্ছি না। পরিহাসের সম্পর্ক নয়; পরিহাসের সম্পর্ক যদি হতো, তা হোলে আমি মনে কোত্তেম, পরিহাস।

    হাস্য কোরে রাজপুত্র বোল্লেন, “না হরিদাস, পরিহাস নয়; যথার্থই তুমি আমার মহোপকার সাধন কোরেছ; তোমার কল্যাণে আমাদের এই সবিস্তৃত রাজ্যটি নিষ্কণ্টক হয়েছে। ঐ বীরমল্ল রাজসংসারে চাকরী কোত্তো; পূর্ব্বে একটা ছোট চাকরী ছিল, মহারাজের অনুগ্রহে শেষকালে ঐ বীরমল্ল রাজসেনাদলের হাবিলদার হয়। মহারাজ তাকে অকপটে বিশ্বাস কোত্তেন, বিশ্বাসঘাতক সেই বিশ্বাসের অহঙ্কারে নানা প্রকার দুষ্কার্য্য করে, গৃহবিবাদের ষড়যন্ত্রের সহায় হয়, প্রজামণ্ডলীকে বিদ্রোহোম্মদে মাতিয়ে তোলবার চেষ্টা করে। গোপনে গোপনে এই সকল কার্য্য চোলতে থাকে। সরকারী মালখানায় বীরমল্লের প্রবেশাধিকার ছিল, রাজ্যের কতকগুলি বিশেষ প্রয়োজনীয় দলীলপত্র সঙ্গোপনে সেই মালখানায় থাকত, বীরমল্ল সে সন্ধান জানতো; সেনাদলের হাবিলদার, যখন ইচ্ছা তখনই সে ব্যক্তি মালখানায় যাওয়া আসা কোত্তে পাত্তো, মহারাজের বিশ্বাস পাত্র, কেহই তার প্রবেশে বাধা দিত না, ঘর যখন জনশুন্য থাকত, কেহই যখন সেখানে উপস্থিত থাকতো না, প্রহরীরা পর্য্যন্ত দূরে দূরে বেড়াতে, কিবা নিদ্রাসুখ উপভোগ কোত্তো, সে সময়ও বীরমল্ল সেই ঘরে যেতো। কতদিন ঐ ভাব চোলেছিল, কেহই আমরা জানতেম না। হঠাৎ একদিন শুনা গেল, বীরমল্ল নিরুদ্দেশ! অনুসন্ধানে প্রকাশ পেলে, রাজ্যের সেই সকল প্রয়োজনীয় দলীলপত্র যে বাক্সটিতে ছিল, সেই বাক্সটিও অদৃশ্য!”

    এই পর্য্যন্ত শ্রবণ কোরে বিস্ময়ে রোমাঞ্চিত কলেবরে নিৰ্ণিমেষ নয়নে রাজপুত্রের মুখের দিকে আমি চাইলেম। রাজপুত্র বোলতে লাগলেন, “বীরমল্ল নিরুদ্দেশ! কতস্থানে কত অন্বেষণ করা গেল, কতদিকে কতস্থানে কতলোক প্রেরিত হলো, কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। তার পর দেশ বিদেশের দুরাচার দুর্দ্দান্তলোক সংগ্রহ কোরে, বীরমল্ল একটা ডাকাতের দল বাঁধলে, বনের ভিতর কোথায় কত গুপ্তদর্গ ভূগর্ভমধ্যে অবস্থিত, বীরমল্লের সে সকল সন্ধান জানা ছিল; সেই সকল দুর্গেই ডাকাতেরা আড্ডা কোল্লে। প্রায় প্রতি রজনীতেই প্রজালোকের গৃহাদি লুণ্ঠন কোত্তে আরম্ভ কোল্লে; রাজপুরী আক্রমণেরও দুরভিসন্ধি তাদের ছিল, পেরে উঠে নাই। যে দলীলগুলি বীরমল্লের হস্তগত, সেইগুলির উপর রাজসিংহাসনের নিরাপদ নির্ভর করে; সেগুলির অভাবে মহারাজকেও সৰ্ব্বক্ষণ শঙ্কিত থাকতে হয়েছিল; সিংহাসনের জন্য জ্ঞাতিবিরোধের সম্ভাবনা হয়ে উঠেছিল; সকলেই শঙ্কিত। আমি সেই সময় নানা প্রকার উপায় অবলম্বনে অভীষ্টসিদ্ধিতে বিফলচেষ্ট হয়ে ডাকাতের মত ছদ্মবেশ ধারণ কোরে, বীরমল্পের সঙ্গে বিশ্বস্তভাবে আলাপ কোরে, তাদের দলের সঙ্গে মিশি; লুটপাটের সময় দস্যুদলের সঙ্গী হই নাই, দুগমধ্যেই সৰ্ব্বদা অবস্থান কোত্তেম; রাহাজানীসূত্রে ডাকাতেরা যে সকল পথিক লোককে ধরে নিয়ে যেতো, ডাকাতেরা যেমন করে, সেই রকমে আমিও সেই সকল নিরীহ পথিক লোককে জোরে জোরে ধমক দিতেম, মুখের কাছে সঙ্গীন ধোরে ধোরে, তলোয়ার নাচিয়ে নাচিয়ে, গর্জ্জন কোরে ভয় দেখাতেম; ডাকাতের যেমন ধৰ্ম্ম, মুখে মুখে সেই রকম ধৰ্ম্মই আমি পালন কোত্তেম, সমস্তই আমার মুখে মুখে; তর্জ্জন, গর্জ্জন, আস্ফালন, ভয়-প্রদর্শন, সমস্তই আমার মুখের কথায়, একটি লোকের উপরেও কাজে আমি কোন প্রকার নিষ্ঠুরতা দেখাই নাই, দুর্গমধ্যে আমার জ্ঞাতসারে ডাকাতেরাও কোন নিরীহ শীকারের কেশস্পর্শ কোত্তে পারে নাই; মুখোসে মুখাবৃত কোরে বিপন্নের উপকারের জন্য, ডাকাতের মনস্তুষ্টির জন্য ঐরূপ কার্য্যই আমি কোত্তেম; আর কি কি কোত্তেম, সে কথা সেই কারাকুপের মধ্যেই আমি তোমাকে বলেছি, একটু চিন্তা কোল্লেই সে সব কথা তোমার স্মরণ হোতে পারবে।”

    চিন্তার প্রয়োজন হলো না, কুমারের মহত্ত্বের কথাগুলি স্পষ্টই আমার মনে ছিল, ভক্তিভাবে অভিবাদন কোরে ত্বরিতস্বরেই আমি বোল্লেম, দেবচরিত্রের সঙ্গে আপনার চরিত্রের তুলনা করা যায়! আপনার কৃপায় অনেক নিরীহ লোক দুরন্ত ডাকাতের কবল থেকে নিষ্কৃতি লাভ কোরেছে, সে সব আমি শুনেছি, রাজভোগলালিত সুখের শরীর আপনি কেবল পরোপকারে ক্লিষ্ট কোরেছেন, পরোপকারের জন্য ডাকাতের বেশ ধরেছেন, এটি সাধারণ ঔদার্যের কার্য্য নয়।

    প্রফুল্ল নয়নে আমার মুখের দিকে চেয়ে রাজপুত্র বোল্লেন, “হাঁ, শরীর আমি ক্লিষ্ট কোরেছি, কিন্তু কাজ কিছুই কোত্তে পারি নাই; তোমার কল্যাণেই কার্য্যসিদ্ধি। রাজার মালখানা থেকে বীরমল্ল যে বাক্সটা চুরি কোরেছিল, তোমার আবিষ্কৃত রজত-বাক্সটিই সেই দুর্লভ বাক্স। ঐ বাক্স যতদিন বীরমল্লের দখলে ছিল, বীরমল্ল ততদিন আমাদের মহারাজের উপরেও আধিপত্য কোত্তে সমর্থ ছিল, ইচ্ছা কোল্লেই রাজাকে রাজ্যচ্যূত কোরে অন্য একজন রাজাকে রাজসিংহাসনে বসাতে পাত্তো, কিম্বা হয়ত বীরমল্ল নিজেই সিংহাসন অধিকার কোরে স্বাধীন রাজক্ষমতা পরিচালন কোরবে, মনে মনে তাঁর এই ইচ্ছা ছিল। এই সকল কারণেই মহারাজ এতদিন ভীমরুলের চাকে লোষ্ট্র নিক্ষেপ করেন নাই। তোমার কল্যাণে,—সাধু হরিদাস, তোমার কল্যাণে আমরা সকলেই নিঃশঙ্ক হোলেম, প্রজাগণ নিরাপদ হলো, রাজ্য নিরুপদ্রব হলো, কুচক্রী দস্যুদল ধরা পোড়লো। এই মহোপকারের জন্য তোমার কাছে আমি চিরজীবনের জন্য কৃতজ্ঞ থাকলেম। জীবনকালের মধ্যে এ উপকার কদাচ আমি বিস্মৃত হব না। যাতে তুমি চিরজীবন পরমসুখে অতিবাহিত কোত্তে পার, অবশ্যই আমি উপায় কোরবো। যাতে কোরে তুমি বহু মান—বহু সম্পদের অধিকারী হও, অঙ্গীকার কোচ্ছি, ঈশ্বরের নামে শপথ কোরে বোলছি, অবশ্য আমি সে চেষ্টা কোরবোই কোরবো।”

    করযোড়ে আমি তাঁরে নমস্কার কোল্লেম। কিয়ৎক্ষণ আমার মুখের দিকে অনিমেষে চেয়ে থেকে, অল্প অল্প হাস্য কোরে রাজপুত্র বোল্লেন, “এসো হরিদাস, একটা মজা দেখবে এসো!”

    এই দুটি কথা বোলেই তিনি দাঁড়ালেন। ঘরের উত্তরদিকে একটা দরজা খোলা ছিল, আমাকে অনুগামী হবার ইঙ্গিত কোরে সেই দরজার দিকে তিনি অগ্রসর হতে লাগলেন, সকৌতুকে আমিও অনুগামী। মজা দেখতে চোলেছি, রাজপুত্র আমাকে কি মজা দেখাবেন, অনুমানে কিছু ভেবে পেলেম না। জাদুঘর নয়, চিত্রশালা নয়, পশুশালা নয়, একজন রাজপুত্রের বাসভবন, এর মধ্যে মজার জিনিস কি থাকতে পারে, ভাবতে ভাবতে আমার কৌতুহল বেড়ে উঠলো।

    আমরা চোলেছি, অগ্রে অগ্রে রাজকুমার, পশ্চাতে আমি। দরজাটা পার হয়ে আর একটা ঘর। সে ঘরে জিনিষপত্র ছিল, মানুষ ছিল না; জিনিষের মধ্যে মজার জিনিষও কিছু নয়নগোচর হলো না; রাজপুত্রও কোন দিকে চাইলেন না; সম্মুখদিকে চক্ষু রেখে সমান চোলে যেতে লাগলেন। পর পর ঐ রকমের তিনটি ঘর আমরা অতিক্রম কোল্লেম। চতুর্থ গৃহে প্রবেশ। সকল ঘরেই আলো ছিল, এ ঘরেও বেশ আলো। ঘরের মধ্যস্থলে উপস্থিত হয়ে রাজপুত্র একবার স্থির হয়ে দাঁড়ালেন, ফল্লুনয়নে আমার দিকে চাইলেন। দৃষ্টির ভাবে আমি অনুমান কোল্লেম, এই ঘরেই হয় ত কোন রকম মজা থাকতে পারে।

    ঘরের তিনদিকে তিনটি দরজা; দরজার ধারে ধারে বড় বড় গবাক্ষ; রাজপুত্র একে একে সেই সকল দ্বার গবাক্ষ বন্ধ কোরে দিলেন। আমি দেখলেম, ঘরের পূর্ব্বধারে একটা যবনিকা ফেলা;—নাট্যশালার রঙ্গমঞ্চে অভিনয় আরম্ভ হবার পূর্ব্বে যেমন যবনিকা ফেলা থাকে, সেই রকম যবনিকা;—তিন হত দীর্ঘ ও প্রশস্ত একটি স্থান সেই যবনিকায় ঢাকা।

    রাজপুত্র ধীরে ধীরে যবনিকার নিকটবর্ত্তী হয়ে যুগলহস্তে একবারের একগাছি রজ্জু আকর্ষণ কোল্লেন, খড়খড় শব্দে যবনিকা উত্তোলিত হলো। একটু পাশ কাটিয়ে দাঁড়িয়ে আমার দিকে ফিরে হাসতে হাসতে তিনি বোলেন, “দেখ!”

    কি আমি দেখলেম?—ক্ষুদ্র একখানি চৌকী, সেই চৌকীর উপর একটি স্ত্রীলোক। স্ত্রীলোকটি আপনার হাত দুখানি কোলের উপর রেখে পা ঝুলিয়ে বোসে আছে। মুখখানি স্পষ্ট দেখতে পেলেম না, নাসাগ্র পর্য্যন্ত ঘোমটাটাকা।

    এইটিতেই তবে মজা আছে, এইরূপ অনুমান কোরে সতৃষ্ণ-নয়নে রাজপুত্রের মুখপানে আমি চাইলেম; রাজপুত্র মৃদু হাস্য কোল্লেন। স্ত্রীলোকটি যেন একখানি গঠিত প্রতিমা; নড়েও না, চড়েও না, কোল থেকে হাত দুখানিও সরায় না, অচলা।

    গম্ভীর-বদনে রাজপুত্র আমাকে বোল্লেন, “এই পুত্তলিকার সঙ্গে তুমি আলাপ কর!” পুত্তলিকাকে সম্বোধন কোরে তিনি বোল্লেন, “পুত্তলিকে! ঘোমটা খোলো!”

    পুত্তলিকা সমভাব নিশ্চলা। রাজপুত্রের মুখপানে আমি চেয়ে আছি, আমার মুখপানে রাজপুত্র চেয়ে আছেন; এই সময় আমাদের নিৰ্ব্বাক অভিনয়। পুত্তলিকা নড়ে না, রাজকুমার আরো দুই তিন পদ অগ্রসর হয়ে, ধীর হস্তে তার মুখের ঘোমটা খুলে দিলেন, মূর্ত্তি তখন যেন লজ্জা পেয়ে উজ্জ্বল নয়ন-দুটি নিমীলিত কোরে ফেল্লে। তখন আমি বুঝলেম, পুতুল নয়, প্রতিমা নয়, মূর্ত্তি সজীব।

    হঠাৎ বিস্ময়ে আমার সৰ্ব্বশরীরে রোমাঞ্চ। কে এ? আমার বিস্ময়ের সঙ্গে পাঠকমহাশয়কে বিস্মিত হোতে হবে না, এ মূর্ত্তি পাঠকমহাশয়ের চক্ষে নূতন নয়, পূর্ব্বের পরিচিতা। মূর্ত্তি সেই রঙ্গিণী!

    পুনৰ্ব্বার মৃদু হাস্য কোরে রাজপুত্র আমাকে বোল্লেন, “আলাপ কর হরিদাস, আলাপ কর! বীরমল্লের মহিষী রঙ্গিণীর সঙ্গে মন খুলে তুমি আলাপ কর!”

    আমি একটু লজ্জা পেলেম। আমার লজ্জা অপেক্ষা রঙ্গিণীর লজ্জা যেন অনেক বেশী বোধ হলো। রাজপুত্র তার ঘোমটা খুলে দিলেন, হাত তুলে সে আর সে ঘোমটা টেনে মুখখানি ঢাকলে না, চক্ষু মুদে মৌনবতী হয়ে বোসে থাকলো, মস্তক ঈষৎ অবনত আমি দেখছি, রঙ্গকুশলা রঙ্গিণীর লজ্জাটার রঙ্গ কেমন, তাই আমি চেয়ে চেয়ে দেখছি।

    অকস্মাৎ যেন মেঘোদয়। সেই মেঘে অকস্মাৎ বৃষ্টি! রঙ্গিণীর নয়নে মেঘ নয়ন নিমীলিত, অথচ সেই নিমীলিত নেত্রের প্রান্ত ভেদ কোরে অশ্রুধারা প্রবাহিত।

    রঙ্গিণী কাঁদছে। বীরমল্লের সঙ্গছাড়া হয়ে বিরহের ক্ৰন্দন কিম্বা পূর্ব্বাবস্থা স্মরণ কোরে অনুতাপের ক্রন্দন, তখন সেটা বুঝতে পারা গেল না। যাই কেন হোক না, যেই কেন হোক না, লোকের চক্ষে জল দেখলে আমার চক্ষে জল আসে, এটি যেন আমার স্বভাবসিদ্ধ সংস্কার; নিজের দুঃখে নিজের বিপদে শৈশবাবধি অনেকবার আমি কেঁদেছি, নির্জ্জন হোলে এখনো আমি গুমরে গুমরে কাঁদি; আমি যত কেঁদেছি, সংসারে কেহই হয় ত তত কাঁদে নাই; আমি যত কাঁদি, কেহই হয় ত তত কাঁদে না, তথাপি পরের চক্ষে জল দেখলে আমার প্রাণে অতিশয় বেদনা অনুভূত হয়। “কেদো না রঙ্গিণী, কেঁদো না! চিত্তের আবেগে সে রাত্রে গোটাকতক কথা বোলে, আমি বড় অন্যায় কোরেছি, তোমার প্রাণে ব্যথা দিয়েছি, তুমি আমারে ক্ষমা কর!”

    রাজপুত্র স্থিরভাবে দণ্ডায়মান, রঙ্গিণীকে যে কথা আমি বোল্লেম, রাজপুত্রের কর্ণে সে কথাগুলি নূতন; রঙ্গিণীকে কি কথা আমি বোলেছিলেম, রাজপুত্র তার কিছুই জানতেন না, এখনো জানেন না, আমার মুখে ঐ কটি কথা শুনে, চকিত-নেত্রে আমার পানে চেয়ে, ক্ষণকাল তিনি অবাক হয়ে থাকলেন। অনন্তর মৌনভঙ্গ কোরে তিনিও রঙ্গিণীকে বোল্লেন, “কেঁদো না রঙ্গিণী, কেঁদো না; চুপ কর; শান্ত হয়ে হরিদাসের সঙ্গে মনের কথা কও; মন খুলে আলাপ কর।”

    রঙ্গিণী কথা কয় না;—নীরবে কেবল কাঁদে আর ফোঁস ফোঁস কোরে নিশ্বাস ফেলে। মনে মনে কি অনুধাবন কোরে রাজপুত্র তখন আমারে বোল্লেন, “আচ্ছা থাক হরিদাস, আমার সাক্ষাতে তোমার সঙ্গে কথা কোইতে রঙ্গিণী বোধ হয় লজ্জা পাচ্ছে, আমি এখন এখান থেকে চোল্লেম, রঙ্গিণীর মনের কথাগুলি তুমি শ্রবণ কর।”

    যে দিকের দরজা দিয়ে সে ঘরে আমরা প্রবেশ কোরেছিলেম, সেই দিকের দরজাটি খুলে রাজকুমার বেরিয়ে গেলেন; শব্দে বুঝলেম, বাহিরদিকে শিকল দিলেন। তখন সেই অবরুদ্ধগৃহে কেবল আমি আর রঙ্গিণী।

    কি কথা প্রথমে আমি জিজ্ঞাসা কোরবো, অনেকক্ষণ পর্য্যন্ত স্থির কোত্তেই পাল্লেম না। রাজপুত্রকে দেখে রঙ্গিণীর লজ্জা হোচ্ছিল, তিনি ত তাই ভেবেই সোরে গেলেন, কিন্তু লজ্জা আর রোদন সচরাচর একসঙ্গে আসে না। রঙ্গিণী কাঁদে কেন? আমারি হয় ত ভুল হয়েছে। এ রঙ্গিণী হয় ত বীরভূমের সে রঙ্গিণী নয়;—ঠিক হয় ত আমি চিনতে পারি নাই, অল্পক্ষণ একবার মাত্র দেখা, ঠিক চিনতে না পারাই সম্ভব; সেই রঙ্গিণী মনে করে সে রাত্রে যতগুলি কথা আমি বোলেছি, যত তিরস্কার কোরেছি, রঙ্গিণীর বুকে শেলসম সে সব কথা বেজেছে; কথাগুলো বোলে আমি ভাল করি নাই। আমার অনুমান হয় ত ভুল। চেহারার মিলনে অনেক সময় অনেক অনর্থ ঘটে। অমরকুমারী মনে কোরে সমরকুমারীর কার্য্যকলাপে আমি অভিমান কোরেছিলেম, অমরকুমারী মনে কোরে সমরকুমারীর মরণে আমি শোক পেয়েছিলেম, চেহারার মিলনে শান্তিরাম দত্তের বাড়ীতে সজীব অমরকুমারীকে ভূত ভেবে আমি ভয় পেয়েছিলেম; শেষকালে সত্য তত্ত্ব প্রকাশ পায়। এই রঙ্গিণী সম্বন্ধেও হয় ত আমার সেই রকম ভ্রম ঘোটেছে; এ রঙ্গিণী আর বীরভূমের সে রঙ্গিণী হয় ত এক নয়।

    অনুতাপের সঙ্গে মনে মনে এই সব আলোচনা কোরে, আমি স্বহস্তে রঙ্গিণীর চক্ষের জল মুছিয়ে দিলেম, ক্ষমা প্রার্থনা কোরে পুনরায় বোল্লেম, “সে কথাগুলো বলা আমার ভাল হয় নাই, কিছু মনে কোরো না তুমি, আমার ভুল হয়েছিল। তোমার মত চেহারার একটি স্ত্রীলোককে আমি একদিন একবার মাত্র কাশীধামে দেখেছিলেম, তাই ভেবে মনে কোরেছিলেম, হয় ত তুমিই সেই। এখন যেন বুঝতে পাচ্ছি, তুমি নও। আর কোঁদো না, শান্ত হও, সে সব কথা ভুলে যাও। আমার সাক্ষাতে তোমার কি কথা বলবার আছে, যদি কিছু থাকে, স্বচ্ছন্দে বল। বিপাকে পোড়ে ধৰ্ম্ম হারিয়েছ, তোমার দোষ কি? পাপাচার দস্যু বলপূৰ্ব্বক তোমার জাতিকুল নষ্ট কোরেছে, তোমার দোষ কি? যা কিছু তোমার বলবার থাকে, নির্ভয়ে বল, রাজপুত্রকে অনুরোধ কোরে আমি তোমার ভাল করবার চেষ্টা পাব। রাজপুত্রটি পরম দয়ালু।”

    আবার রঙ্গিণীর চক্ষে জলধারা। আবার আমি নানাপ্রকারে সান্ত্বনা প্রদান কোল্লেম। অবশেষে নেত্রমার্জ্জনা কোরে স্তম্ভিতস্বরে রঙ্গিণী বোলতে লাগলো, “না হরিদাস, তা নয়, তোমার ভুল নয়; আমিই সেই পাপীয়সী! আমিই সেই অভাগিনী কুলকলঙ্কিনী! তোমার ভুল নয়; ঠিক তুমি ধোরেছ! মতিভ্রমে কুৎসিত প্রলোভনে ভুলে আমি কুলের বাহির হয়েছিলেম! কপালের লিখন, কপালে যা ছিল, ঘোটে গেল! পাষণ্ড ডাকাতের ঘরণী হয়ে পরকালের পথে কাঁটা দিলেম! আমি মহাপাতকী! এ মহাপাতকে আর কি আমার নিস্তার আছে? ইহকাল পরকাল কিছুই আমার নাই। আমি যদি—”

    বোলতে বোলতে অভাগিনী আবার চক্ষের জলে ভেসে গেল। বসনাঞ্চলে অশ্রুমার্জ্জন কোরে দিয়ে বিবিধ প্রবোধবাক্যে আমি বোল্লম, “অত কাতরা হোচ্ছ কেন? ভাগ্যফল মানো, ভাগ্যলিপি খণ্ডন হয় না জানো, তবে কেন অধীরা হও? সকল পাপেরই প্রায়শ্চিত্ত আছে, প্রায়শ্চিত্তে সৰ্ব্বপাপ-বিমোচন হয়। স্বেচ্ছায় তুমি পাপপথে পদার্পণ কর নাই; একবার দুষ্টের প্রলোভনে, দ্বিতীয়বার পিশাচের আক্রমণে তুমি স্বপথ ভ্রষ্ট হোয়েছিলে, অবশ্যই সে পাপের খণ্ডন আছে। অনুতাপ এসেছে, শান্তি পাবে; অনুতাপ এক মহা প্রায়শ্চিত্ত। কাতরতা পরিত্যাগ কর। যে সব কথার আন্দোলনে প্রাণে ব্যথা লাগে, সে প্রসঙ্গ ছেড়ে দাও; মন যাতে অন্যদিকে ফেরে, সেই সব কথা বল। সে সব গত কথা ছেড়ে দাও!”

    “কি কোরে ছেড়ে দিব হরিদাস?”—দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে, অনুতাপিনী বোলতে লাগলো, “সে সব কথা কি কোরে ছেড়ে দিব হরিদাস?—কেমন কোরে ভুলে যাবো? প্রাণ যে কেমন হু হু করে! বুক যেন পুড়ে পুড়ে খাক হয়ে যায়! উঃ! পাপের আগুনের এত তেজ! কানাই! উঃ—সেই সৰ্ব্বনেশে কানাই আমার পরকালের পথে বিষবৃক্ষ রোপণ কোরেছে!—মোলো না!—ডাকাতে ধোরেছিল, মশাল জ্বেলে জ্বেলে মুখে আগুন দিয়েছিল, কান কেটে নিয়েছিল, তবুও মোলো না! পালিয়ে গেল! ভোঁ ভোঁ কোরে ছুটে পালালো!—অত বড় পাপীর কি শীঘ্র মরণ আছে? আমার মরণ কবে হবে হরিদাস?—মরণটা হোলেই জুড়িয়ে যাই!—ইচ্ছা হয়, জলে অনলে ঝাঁপ দিয়ে এ পাপ-প্রাণ বিসর্জ্জন করি।”

    তীব্রস্বরে আমি বল্লেম, “আবার ঐ সব কথা? আত্মহত্যা মহাপাপ! আত্মহত্যার ইচ্ছা করাও অনন্ত নরকবাসের হেতু। ও সব কথা ভুলে যাও! আমি যে সব কথা জিজ্ঞাসা করি, শান্ত হয়ে সেই সব কথার উত্তর কর। আচ্ছা রঙ্গিণী, ডাকাতের আড্ডায় রাত্রে দুবার তুমি কি একটি কথা বলবার উপক্রম কোরেছিলে,—একটি লোক—কিন্তু একটি লোক—এই রকম চাপা চাপা কথা। সে কথাটি কি এখন তুমি স্মরণ কোত্তে পার? কার কথা সেটি? কোন লোকটি?—স্মরণ হয় কি?”

    রঙ্গিণী। স্মরণ?—ও হোঃ!—স্মরণ আমার সব হয়। তবে কি না—তবে কি না—কোন রাত্রে—

    আমি।—যে যে রাত্রে দস্যুদলের ভয়ানক ভয়ানক নিষ্ঠুরতার কথা বোলতে বোলতে—একটি লোক—একটি লোক—

    রঙ্গিণী।—ওঃ হোঃ সেই কথা?—সে কথা আর এখন কেন? সে দিন তো ফুরিয়ে গিয়েছে! ডাকাতেরা যখন ধর পোড়েছে, তখন আর—

    আমি।—কার কথা তুমি বোলবে মনে কোরেছিলে, সেই কথাই আমি জিজ্ঞাসা কোচ্ছি। সে লোকটিও কি ধরা পোড়েছে? নাম কর দেখি, বুঝি আমি, কোন লোকটিকে।

    রঙ্গিণী।—আহা হা!—তা কি আর তুমি জানো না?—সে লোকটির সঙ্গে তোমার কত কথা, কত ভাব, তাকে আর তুমি জানো না?

    আমি।—তবু?—তবু?—নামটি একবার শুনতে পেলে—

    রঙ্গিণী।—(চুপি চুপি) সেই ভূষণলাল—ভূষণলাল!—আহা!—ডাকাতের দলে থাকতো, ডাকাত নিশ্চয়, কিন্তু—এদিকে কিন্তু দয়ার সাগর! দত্তকুলের পেল্লাদ!

    আমি।—(মনোবেগ সংবরণ করিয়া) হাঁ, দৈত্যকুলের প্রহ্লাদ, সে কথা সত্য, নিকেষি কুলের কথা তুমি বোলছ, সে কুলে তাঁর উম্ভব নয়, দৈত্যকুলের যম তিনি! তথায় পদতলে বহু দৈত্য বিমর্দ্দিত।

    রঙ্গিণী।—(সবিস্ময়ে) অ্যাঁ!—অ্যাঁ—তাই না কি? জানো তুমি? জানো? বলো,—বলো,—আহা! বলো হরিদাস,—কে তিনি? কোন কুলে—

    আমি।—কুলের পরিচয় শীঘ্রই তুমি জানতে পারবে। আমার মুখে এখনকার কথায়, দৈত্যকুলে তাঁর জন্ম নয়। যেমন তুমি বুঝেছ, যেমন তুমি দেখেছ, বাস্তবিক তাই তিনি,—গরিবের বন্ধু, দয়ার সাগর!

    রঙ্গিণী।—(সজলনয়নে চাহিয়া) আহা! তিনিও কি তবে ধরা পোড়েছেন?

    আমি।—তা আমি এখন কেমন কোরে বোলব? দলের ভিতরের সকলকেই কি আমি চিনে রেখেছি? সকলেরই কি আমি মুখ দেখেছি?

    রঙ্গিণী।—তবে এই যে তুমি বোলছিলে, দত্তকুলের যম তিনি। যম কি কখনো ধরা পড়ে?

    আমি।—(অধোমুখে হাস্য করিয়া) তবে হয় ত পড়েন নাই?

    রঙ্গিণী—(আহ্লাদে হস্ত তুলিয়া) আহা! বেঁচে থাকো হরিদাস, বেঁচে থাকো। তোমার মুখে ফল-চন্নন পড়ুক! তুমি রাজা হও!

    রঙ্গিণীর মুখে ঐ আশীৰ্ব্বচন বিনির্গত হবামাত্র দ্বারের শৃঙ্খল উদ্ঘাটিত হয়ে গেল, সেই দিব্যমূর্ত্তি প্রবেশ কোল্লেন;—প্রবেশ কোরেই প্রসন্নবদনে সমুধরস্বরে তিনি জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি হরিদাস, তোমার রঙ্গিণীটির লজ্জা এখন ভেঙ্গেছে?”

    সমস্বরেই আমি উত্তর দিলেম, “পরীক্ষাকর্ত্তা আমি নই, আপনি পরীক্ষা করুন। রঙ্গিণী আমাকে জিজ্ঞাসা কোচ্ছিল, ডাকাতের দলে যে একটি ভূষণলাল ছিল, দলের সঙ্গে সেই ভূষণলালটি কি ধরা পোড়েছে?”

    গম্ভীরবদনে রাজপুত্র পুনঃ প্রশ্ন কোল্লেন, “সে প্রশ্নে তুমি কিরূপ উত্তর দিয়েছ?”

    আমি বোল্লেম, “সব তত্ত্ব আমার জানা নাই, রঙ্গিণীর প্রশ্নের ঠিক উত্তর আমি দিতে পারি নাই, আপনি যদি জানেন, রঙ্গিণীর সংশয় দূর করুন। অনুমানে আমি বলেছি, ভূষণলাল হয় ত ধরা পড়েন নাই; অনুমানের জোরেই রঙ্গিণীর মুখে আমি বড় বড় আশীর্ব্বাদ পেয়েছি। আপনি যদি নিঃসংশয়ে উত্তর দিতে পারেন, তা হোলে আমার অপেক্ষা সহস্রগুণে বড় বড় আশীৰ্ব্বাদ প্রাপ্ত হবেন।”

    রঙ্গিণী এই সময় বিস্ফারিত-নেত্রে রাজপুত্রের মুখের দিকে চেয়ে থাকলো। রাজপুত্র বোল্লেন, “বীরমল্লের মহিষী ব্রাহ্মণের কন্যা, ব্রাহ্মণের কন্যার আশীৰ্ব্বাদ, আমি মস্তকে ধারণ কোত্তে প্রস্তুত; কিন্তু দস্যুদলের বিচারের অগ্রে আশীৰ্ব্বাদপ্রাপ্তির হেতুবাদটি আমি প্রকাশ কোত্তে সঙ্কুচিত হোচ্ছি। তুমি সেই ভূষণলালের একটি নূতন আখ্যা দিয়েছ, দৈত্যকুলের যম; সত্য যদি ভূষণলালের ঐ আখ্যা হয়, তবে ত ডাকাতের সঙ্গে ধরা না পড়াই সম্ভব।”

    আমি চমকিত হোলেম; মনে কোল্লেম, রাজকুমারের বাহিরে যাওয়া কেবল ছলনা। দ্বারে শৃঙ্খলাবন্ধ কোরে দ্বারের নিকটেই তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, রঙ্গিণীর সঙ্গে আমার যতগুলি কথা হয়েছে, সমস্তই তিনি শ্রবণ কোরেছেন। একপ্রকার ভালই হয়েছে। তাঁর প্রতি আমার মনোভাব, ভূষণলালের প্রতি রঙ্গিণীর মনোভাব, উত্তমরুপেই তিনি জানতে পেরেছেন। আরো একটা কষ্টকর কৈফিয়তের দায় থেকে আমি অব্যাহতি পেয়েছি। বীরমল্লের দ্বারা সৰ্ব্বপ্রথম রঙ্গিণীর ধর্ম্মনষ্ট হয় নাই, ধরা পড়বার পূর্ব্বে রঙ্গিণীর সতীত্বধর্ম্ম ছিল না, সেটুকু রঙ্গিণীর নিজের মুখেই ব্যক্ত হয়ে গেল। গোপনে দাঁড়িয়ে রাজকুমার আপন কর্ণে ঐ পাপিনীর পাপস্বীকারবাক্যগুলি শ্রবণ কোল্লেন; কিঞ্চিৎ বিস্তৃত বর্ণনা যদি আবশ্যক হয়,–আছেও কিছু আবশ্যক, কেবল সেইটকু আমার বর্ণনার জন্য অবশিষ্ট থাকলো।

    রঙ্গিণী মৌনবতী। যিনিই সেই ভূষণলাল, তিনিই এই রাজকুমার, রঙ্গিণী সেটি বুঝতে পাল্লে না। ডাকাতের দুর্গে ভূষণলালের খোলামুখ রঙ্গিণী একবারও দেখে নাই, সুতরাং রাজপুত্রকে চিনতে পারা অবশ্যই তার পক্ষে অসম্ভব। রঙ্গিণী সেই ঘরেই থাকলো, রাজপুত্রের সঙ্গে আমি অন্য ঘরে চোলে এলেম। অন্য প্রসঙ্গ উত্থাপিত হবার অগ্রে রাজপুত্র আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “পাপের জন্য রঙ্গিণী অনুতাপ কোচ্ছিল, ডাকাতের হাতে পোড়েছিল, ডাকাত তার ধর্ম্ম নষ্ট কোরেছিল, সেই পাপের জন্য অনুতাপ এটাই বা কি রকম কথা? একবার বোলেছিল কানাই; কানায়ের নামে গালাগালি দিয়েছিল; কানাইটা কে? রঙ্গিণীর পাপের সঙ্গে কানাইয়ের কি সম্বন্ধ? সাধারণ স্ত্রীলোকের মনে পাপের জন্য অনুতাপ আসে, সেটা কি প্রকার পাপ?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “পুরুষ যতপ্রকার পাপকর্ম্ম কোত্তে পারে, সম্ভবতঃ স্ত্রীলোকেও তাই পারে; রঙ্গিণী অন্য পাপে পাপিনী নয়, রঙ্গিণীর পাপ কেবল ব্যভিচার।” এই পর্য্যন্ত বোলে, রঙ্গিণীর সংক্ষিপ্ত জীবনী রাজপুত্রের কাছে আমি বিবৃত কোল্লেম। কর্ণে অঙ্গুলী দিয়ে, সৰ্ব্বাঙ্গ সঞ্চালন কোরে রাজপুত্র শিউরে উঠলেন। অল্পক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে উদাসনয়নে আমার দিকে চেয়ে, প্রশান্তস্বরে তিনি বোল্লেন, “সে কার্য্যে রঙ্গিণীর তাদৃশ দোষ দুষ্ট হোচ্ছে না; প্রথম-পাপের মূলে ছলনা আর প্রলোভন, দ্বিতীয় ঘটনায় প্রবল পক্ষের বলপ্রকাশ; এ দুটি আমি বেশ বুঝতে পাল্লেম। রঙ্গিণী স্বেচ্ছাপূর্ব্বক ব্যভিচার-পাপে লিপ্ত , প্রকাশ্যে বেশ্যাবৃত্তিও অবলম্বন করে নাই, রঙ্গিণীর সে পাপের ক্ষমা আছে;—এখানেও আছে, উপরেও আছে। রঙ্গিণী দুঃখিনী, পাপের জন্য রঙ্গিণী অনুতাপিনী, রঙ্গিণীকে আমি আশ্রয় দিব। বুদ্ধির দোষে কুলোকের সঙ্গে কুলের বাহির হয়ে এসেছে, কলঙ্কিনী আর স্বদেশে মা-বাপের কাছে ফিরে যেতে পারবে না, পথে পথে কেঁদে কেঁদে ভিখারিণী হয়ে বেড়াবে, সেটাও বড় কষ্টের কথা; আমার যখন জ্ঞাতসার হয়েছে, পাপিনীর যখন অনুতাপ এসেছে, তখন আর বাজারের সাধারণ বেশ্যাবৃত্তির পথ মুক্ত থাকছে না, রঙ্গিণীকে আমি আশ্রয় দিব। সামান্য দাসী হয়ে থাকতে হবে না, নূতন পাপেও লিপ্ত হোতে পাবে না, আমার আশ্রয়ে রঙ্গিণী এখন একপ্রকার সম্ভবমত সুখে এখানে অবস্থান কোত্তে পারবে। রঙ্গিণীকে তুমি এই কথা বোলো, অভিপ্রায় জিজ্ঞাসা কোরো, যে রকম উত্তর পাও, আমাকে জানিও।”

    সন্তুষ্ট হয়ে রাজকুমারকে আমি অভিবাদন কোল্লেম। সে রাত্রে রাজকুমারের নিকেতনেই আমারে থাকতে হলো, পরদিন প্রভাতে কুমারদত্ত অশ্বারোহণে দীনবন্ধুবাবুর বাসায় গেলেম। পূৰ্ব্বদিন সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়েছিলেম, এই দিন দীনবন্ধুবাবুকে আগাগোড়া সকল কথা বিশেষরূপে জানালেম। আমার প্রতি একজন সদাশয় স্বাধীন রাজকুমারের অনুগ্রহ, এই পরিচয় পেয়ে তিনি বিশেষ আনন্দ প্রকাশ কোল্লেন। তিন দিন পরে রাজপুত্রের এক চিঠি নিয়ে একজন অশ্বারোহী বার্ত্তাবহ দূত আমাদের বাসায় এলো। তার সঙ্গে আমি পুনৰ্ব্বার রাজপুত্রের আবাসে উপস্থিত হলেম। সেই দিন শুনলেম, রাজদরবারে দস্যুদলের বিচার আরম্ভ হয়েছে, তাদের সব বনদূর্গ সমূলে ধ্বংস কোরে সমভূমি করা হয়েছে, দস্যুভাণ্ডারের সমস্ত ধনরত্ন, পশুপক্ষী, অস্ত্রশস্ত্র রাজবাড়ীতে আনয়ন করা হয়েছে, পলাতক ডাকাতেরা সে রাজ্যের সীমা ত্যাগ কোরে পালিয়ে গিয়েছে, রাজ্য এক প্রকার নিষ্কণ্টক।

    ক্রমে ক্রমে আরো আমি শুনলেম, ডাকাতের দলে অনেক দেশের লোক আছে। হিন্দু, মুসলমান, ফিরিঙ্গী, পর্তুগীজ, পাহাড়ী, ভীল, পাঞ্জাবী, তিব্বতী, ভুটিয়া, পেশোয়ারী, এই প্রকার নানা দেশের নানা জাতি একসঙ্গে মিলিত; বীরমল্লের কুমন্ত্রণায় রাজ্যের যে সকল প্রজা রাজবিদ্রোহী হয়েছিল, তারাও ঐ দলভুক্ত। এই সব আমি শুনলেম। মনের ভিতর একটা সংশয় উপস্থিত হলো। যে সংশয়টা পূর্ব্বে একবার এসেছিল, সেই সংশয় আবার। অত দেশের অত লোক দস্যুচক্রে সম্মিলিত, তাদের ভিতর বাঙ্গালী কেহ আছে কি না, সেই সংশয়। রাজপুত্রকে আমি বোল্লেম, “ডাকাতেরা যখন সকলে দলবদ্ধ হয়ে বিচারাসনের সম্মুখে দাঁড়ায়, তাদের প্রতি সওয়াল হয়, সেই সময় আমি একবার তাদের সকলকার মুখ দেখবো।”

    রাজপুত্র হাস্য কোল্লেন। ছেলেমানুষ আমি, সং-তামাসা দেখতে ছেলেমানুষের বড় আমোদ, সেইটি বিবেচনা কোরেই হয় ত রাজপুত্রের হাস্য, এই ভেবে আমি একটু লজ্জিত হোলেম। রাজপুত্র বোল্লেন, “ডাকাতের মুখ দেখা কি তোমার বাকি আছে? কেল্লার ভিতর কয়েদ ছিলে, খালাস পেয়ে বন্ধনগ্রস্ত ডাকাতের দলকে নিশ্চেষ্ট দর্শন কোরেছ, তবুও কি সে তোমার সাধ মিটে নাই?”

    কি উত্তর করি, মনে মনে খানিকক্ষণ ভাবলেম;—ভেবে চিনতে শেষে বোল্লেম, “সাধ মিটাবার ইচ্ছায় নয়, কৌতূহল মিটাবার ইচ্ছা। বন্ধনদশায় যাদের আমি দেখেছি, তারা এক জায়গায় ছিল, আপনি বোলেছিলেন, ভিন্ন ভিন্ন দূর্গে ভিন্ন ভিন্ন দল; বিচারস্থলে সব দলের সবগুলা একত্র, এই সময় সব মুখ আমি এক জায়গায় দর্শন কোত্তে ইচ্ছা করি। কেন করি, সে কথাও আমি আপনার কাছে অপ্রকাশ রাখবো না। গুজরাটের জঙ্গলে অন্ধকারের ভিতর ডাকাতেরা আমারে ধোরেছিল, সে দিন সেই সময় সেই পথে আমি যাব, ডাকাতেরা সে সংবাদটা কিরূপে জানতে পেরেছিল, প্রথম রাত্রি থেকেই সেই তক আমার মনে মনে জাগছিল, এখনো জাগছে। আপনার বোধ হয় স্মরণ থাকতে পারে, একরাত্রে আপনারে আমি বোলেছি, অকারণে স্বদেশে আমার অনেক শত্রু হয়েছে, বিদেশে আমি পথে পথে ঘুরে বেড়াই, সে সব জায়গাতেও সেই সব শত্রুপক্ষের এক একটা মূর্ত্তি আমার চক্ষে পড়ে; এখানে—এই দস্যুদলের মধ্যে সেই দলের কোন গুপ্তচর আছে কি না, মুখ দেখে দেখে তাই আমি পরীক্ষা কোরবো, চিনতে পারি ত চিনবো, এই আমার ইচ্ছা।”

    গম্ভীরবদনে রাজপুত্র বোল্লেন, “কোন বাধা নাই। বিচারস্থল অবারিত বিশেষতঃ বড় বড় মোকদ্দমার বিচার যেখানে হয়, বহুলোক সেইখানে উপস্থিত থেকে আসামীদের মূর্ত্তি দর্শন করে, বাক্য শ্রবণ করে, দণ্ডাজ্ঞা অবগত হয়; প্রজাহিতৈষী নিরপেক্ষ বিচারপতিগণের বাস্তবিক সেটি অভিপ্রেত। কল্যই আমি তোমারে সঙ্গে কোরে ডাকাতগণের মুখ দেখাবো; কেবল ডাকাতের মুখ দেখিয়েই আমি তোমারে ফিরিয়ে আনবো না, দরবারের কার্য্যাবসানে মহারাজের মুখখানিও তোমারে দেখাবো। তুমি আমাদের যে উপকার কোরেছ, মহারাজকে আমি সে সব কথা বোলেছি, মহারাজ বিশেষ আহ্লাদ প্রকাশ কোরে তোমারে দেখতে চেয়েছেন।”

    মহানন্দে আমার অতঃকরণ পরিপ্লুত। কল্য আমি ডাকাত দেখবো, দেশের গৌরব আর্য্যবংশের স্বাধীন রাজা, সেই রাজমুখ আমি দর্শন কোরবো, অন্তরসাগরে বিপুল আনন্দের প্রবল তরঙ্গ। ভবানীদেবীর মন্দিরে উৎসবস্থলে মহারাজকে একবার আমি দর্শন কোরেছি, সে দর্শনে তাদৃশী তৃপ্তিলাভ হয় নাই, নিকটে গিয়ে দর্শন কোরবো, শ্রীমুখের দুই একটি বাক্যও হয় ত শ্রবণ কোরবো, এই আমার আশা, এই আমার আনন্দ পরম সৌভাগ্য আমার!

    দিন গেল, রাত্রি গেল, পরদিন প্রভাতের নব-প্রভাকর সুপ্রকাশ; আমার আশাগগনেও নবসূর্য্য সমুদিত। অগ্রেই প্রস্তুত হয়ে থাকলেম, যথাসময়ে কুমার রণেন্দ্র বাহাদুর আমারে সঙ্গে নিয়ে রাজদরবারে উপস্থিত হোলেন। বিচারালয় লোকারণ্য। বিচারাসনের সম্মুখে সপরিচ্ছদধারী সুন্দর সুন্দর পাত্র, মিত্র, অমাত্য প্রভৃতি পরিষদবর্গ, তিনদিকে নানাবর্ণের পরিচ্ছদ-পরিহিত অগণিত দর্শকবর্গ, মধ্যস্থলে সদৃঢ় লৌহনিগড়বদ্ধ হ্রস্বদীর্ঘ বিকটবদন দস্যুবর্গ। রাজপুত্র আমারে রাজকায়দায় সুসজিত সভাসমীপে নিয়ে গেলেন, রাজকায়দায় সদস্য-পরিবেষ্টিত, রাজমুকুটশোভিত মহারাজের সিংহাসনতলে সসম্ভ্রমে আমি প্রণিপাত কোল্লেম। তার পর দস্যু-দর্শন।

    পরমেশ্বরের সৃষ্টিতে সকল মনুষ্যের গঠনে হস্তপদাদি সমান অবয়ব দৃষ্ট হয়ে থাকে; তথাপি স্বাতন্ত্র্যের কেমন একপ্রকার সুন্দর নিদর্শন, বিশেষরূপে মুখদর্শন কোল্লেই কোন দেশের কোন লোক, অনুভবে বেশ বুঝা যায়। সকল দেশের সকল লোককে আমি দর্শন করি নাই, তথাপি যে দেশের যত লোক আমি দেখেছি, মুখের গঠনে সে সকল লোককে পৃথক পৃথকরূপে আমি চিনতে পারি; বিশেষতঃ বাঙ্গালী চিনতে আমার কিছুমাত্র বিলম্ব হয় না, সন্দেহ আসে না, চক্ষে একটু ধাঁধাও লাগে না। একে একে শ্রেণীবদ্ধ সমস্ত ডাকাতকে আমি দর্শন কোল্লেম, প্রত্যেকের সম্মুখে গিয়ে গিয়ে বিশেষরূপে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সকলের মুখগুলি আমি নিরীক্ষণ কোল্লেম; অন্তরে অবশ্য ভয় হোতে লাগলো, বিকটাকার দুরন্ত লোকের মুখ দেখলেই স্বভাবতঃ হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার হয়,—ভয় হোতে লাগলো; চতুর্দ্দিকে তত লোক, তত লোকের ভিতর আমি ঐ সব ডাকাত দেখছি, তবুও মনে মনে ভয়। বাঁধা ডাকাত, নিরস্ত্র, তারা আমারে ধোরে ফেলতে পারবে না, ভয়কে একটু পশ্চাতে রেখে সাহসে সাহসে সকলগুলার মুখ আমি দেখতে লাগলেম। খানকতক মুখ আমারে দেখে যেন ফুলে ফুলে উঠলো, দন্তে দন্তে ঘর্ঘণ কোল্লে, চক্ষুগুলো পাকল কোরে বিকটদৃষ্টিতে আমার দিকে চাইলে, তাতে আমি ভ্রূক্ষেপ কোল্লেম না; একে একে সব মুখগুলো আমি দেখলেম, দেখে দেখে স্থির কোল্লেম, দুখানা বাঙালীর মুখ; দলের ভিতর দুজনমাত্র বঙ্গবাসী।

    বিচারস্থলে ডাকাতের সঙ্গে যাঁদের কথা হয়, ডাকাতকে যারা কথা জিজ্ঞাসা করেন, কুমার রণেন্দ্র বাহাদুরের দ্বারা অনুরোধ কোরিয়ে তাঁদের মধ্যে এক জনকে আমি আমার মনের কথা জানালেম। বাঙালী বোলে যে দুজনকে আমি চিনলেম, তাদের বাড়ী কোথায়, নাম কি, এই দুটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা কোত্তে অনুরোধ কোল্লেম; প্রশ্নকর্ত্তা আমার অনুরোধ রাখলেন। জিজ্ঞাসায় জানা হলো, একজনের নাম ব্রজনাথ ভট্টাচার্য্য, একজনের নাম হেমচন্দ্র পালধি।

    বাহবা বাহবা! বঙ্গদেশের ভট্টাচার্য্য একজন ডাকাত। বহরমপুরের আদালতের মেদিনীপুরের নূতন আসামীটা যে তিনজন লোকের নাম কোরেছিল, তাদের মধ্যেই এই দুজন। হ্যামচাঁদ পালুই, বজো ভাজ্জি, এই দুই নামে হেমচন্দ্র পালধি আর ব্রজনাথ ভট্টাচার্য্য পাওয়া যাচ্ছে। নামেই কেবল পাওয়া যাচ্ছে, তাদের চেহারা আমি পূর্ব্বে দেখি নাই, আমার জানত পক্ষে কোথাও তারা ধরাও পড়ে নাই, আমারে তারা কোথাও দেখেছিল কি না, তাও আমি জানি না;—বোধ হয় দেখে থাকবে; অন্ধকারে পথ ভুলে গুজরাটের জঙ্গলে আমি প্রবেশ কোরেছিলেম, তারাই হয় ত বীরমল্লের দলে সংবাদ দিয়েছিল; পূর্ব্বে দেখা না থাকলে তারা আমারে চিনতে পাত্তো না; বোধ হয় পূর্ব্বে কোথায় দেখে থাকবে। নিশ্চয়ই তারা রক্তদন্তের দলের লোক। বাহাদুর রক্তদন্ত! বলিহারি প্রতাপ! অভিশপ্ত য়িহুদীর বংশনাশের মতলবে ফরাসী যে শুত পাদরী-মহাশয়েরা যে প্ৰকারে পৃথিবীর সৰ্ব্বস্থলে গুপ্তচরের বাজার বেসিয়েছিলেন, রক্তদন্তও যেন সেইরূপ ক্ষমতা ধরে বোধ হয়! বাহাদুর রক্তদন্ত। রক্তদন্ত বাহাদর অথবা মোহনলালবাবু বাহাদুর, আমার ভাগ্যনাটকের যবনিকাপতনের পূর্ব্বে হয় ত সেটি নির্ণয় করবার উপায় হবে না!

    হেমচন্দ্র পালধি আর ব্রজনাথ ভট্টাচার্য্য, এই দুটি নাম পূর্ব্বে আমার শুনা হয়েছিল, মানুষদুটি এখন দেখা হলো। কে তারা, কোথায় থাকে, কি করে, রক্তদন্ত ওরফে জটাধর-নামধারী কোন লোককে তারা চিনে কি না, সে সব কথা জিজ্ঞাসা করবার স্থান নয়; গুজরাটের ডাকাতী মোকদ্দমার সঙ্গে সে সব কথার কিছুমাত্র সংস্রব নাই, কাজে কাজেই নাম-দুটি জেনে আর মানুষ-দুটি দেখেই সে ক্ষেত্রে আমাকে তুষ্ট থাকতে হলো।

    কুমার রণেন্দ্র বাহাদুর আমার মুখপানে চাইলেন, আমিও তাঁর মুখপানে চাইলেম; সসসম্ভ্রমে আমি অভিবাদন কোল্লেম। দরবার-স্থল থেকে কুমার বাহাদুর আমাকে রাজপ্রাসাদের একটি বহিকক্ষে নিয়ে বসালেন।

    রাজকার্য্যাবসানে মহারাজ যখন আপন বিরামকক্ষে নির্জ্জনে উপবিষ্ট, কুমার বাহাদুর সেই সময় আমাকে মহারাজ-সমীপে পেস কোরে দিলেন; বিনম্রবদনে বিনীতস্বরে বোল্লেন, “মহারাজ! যে বালকের কথা আমি নিবেদন কোরেছিলেম, বিশ্বাসঘাতক বীরমল্লের গুপ্তগৃহে যে বালক সেই অপহৃত বাক্সটির উদ্ধার কোরেছে, এই সেই বালক; এই বালকের নাম হরিদাস, বঙ্গদেশে নিবাস, শৈশবাবধি নিরাশ্রয়।”

    প্রসন্নদৃষ্টিতে মহারাজ অমাব মুখের দিকে নেত্রপাত কোল্লেন; আমি অভিবাদন কোল্লেম। করযোড়ে মহারাজের অনুমতিক্রমে আমি যখন ভূজানুহয়ে রাজাসনের সন্নিকটে নতমস্তকে উপবিষ্ট হোলেম, মহারাজ তখন আমার মন্তকে করার্পণ কোরে প্রশংসাসূচক, আশীৰ্ব্বাদসূচক, আশ্বাসসূচক গুটিকতক অনুকলবাক্যে উচ্চারণ কোল্লেন; চরিতার্থ জ্ঞান কোরে পুনরায় আমি অভিবাদন কোল্লেম।

    সে দিন আমার এই পর্য্যন্ত রাজদর্শন। ভ্রাতুষ্পুত্রের কর্ণে মহারাজ সেই সময় চুপি চুপি কি উপদেশ দিলেন, শুনতে পেলেম না। অতঃপর রাজপুত্র গাত্রোত্থান কোরে সদয়নয়নে আমার দিকে চাইলেন, তৃতীয়বার মহারাজকে অভিবাদন কোরে রাজপুত্রের সঙ্গে সে ঘর থেকে আমি বেরুলেম; এক অভিনব উল্লাসে আমার কলেবর রোমাঞ্চিত।

    রাজপুত্রের নিকেতনে আমরা উপস্থিত। সে রাত্রেও সেই স্থানে আমার অবস্থান। পরদিন রাজকুমার আমাকে রাজদত্ত সম্মানের নিদর্শনস্বরুপ মুল্যবান শিরোপা প্রদান কোল্লেন। জন্মে কখনো যেরুপ চমৎকার পরিচ্ছদ আমার নয়নগোচর হয় নাই, সেই পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে দীনবন্ধুবাবুর বাসায় আমি এলেম; রাজদরবারে, রাজগৃহে যা যা আমি দর্শন কোরেছি, যে সব কথা শ্রবণ কোরেছি, মহারাজের নিকটে যেরুপ সমাদর প্রাপ্ত হয়েছি, দীনবন্ধুবাবুকে সেই সব কথা বোল্লেম; বিস্মিতনয়নে আমার মুখপানে চেয়ে দীনবন্ধুবাবু; পরমানন্দ প্রকাশ কোল্লেন।

    সাতদিন অতিবাহিত। রাজভবনে আমি যাই, বাসাতেও আসি, উভয়স্থানেই আমার সমান আদর, সমান যত্ন। মনের ভিতর নানা উদ্বেগের যন্ত্রণা থাকলেও আমি যেন তখন নির্ভয়হৃদয়ে নিত্য নিত্য নূতন আনন্দ উপভোগ কোত্তে লাগলেম। কুমার বাহাদুরের সাগ্রহ অনুরোধে একদিন আমি দীনবন্ধুকে রাজভবনে নিয়ে যাই, মহারাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় না, রাজপুত্রের সঙ্গেই কথোপকথন, রাজপুত্রের পরম সতোষ, কুমার বাহাদুরের অমায়িক ব্যবহারে দীনবন্ধুবাবুও আপ্যায়িত। মর্য্যাদাপন্ন লোকের সামাজিক ব্যবহার সৰ্ব্ব-সমাজের আদর্শ; সে ব্যবহারে দম্ভ থাকে না, অভিমান থাকে না, ছোট-বড় বিচার থাকে না, সেই এক অপূৰ্ব্ব ভাব। কুমার বাহাদুর একদিন অপরাহ্ণকালে একখানি শোভন যানে আরোহণ কোরে আমাদের বাসায় উপস্থিত হন, আমরা নিতান্ত সংকুচিত হয়ে যথাসম্ভব সমাদরে তাঁর অভ্যর্থনা করি। প্রায় একঘণ্টা থেকে, সখ্যভাবে দীনবন্ধুবাবুর সঙ্গে আলাপ কোরে রাজপুত্র বিদায় হোলেন। আমি কে, সেটি যদি তখন আমার জানা থাকতো, আমার মন তখন যদি নিশ্চিত থাকতো, অজ্ঞাত বৈরীদলের ভয়ে আমার অন্তঃকরণ যদি সৰ্ব্বক্ষণ অভিভূত না থাকতো, তা হোলো আমি তখন ঐ সকল আনন্দকে স্বর্গসুখ বিবেচনা কোত্তেম।

    আরো এক সপ্তাহ। রাজদরবারে দস্যুদলের বিচারকার্য্য সমাপ্ত। সাক্ষীসাবুদের প্রয়োজন ছিল না, জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণ, সুবিচারেই দণ্ডাজ্ঞা। দলপতি বীরমল্ল। এই ব্যক্তি রাজসংসারের চাকর, বিশ্বাসঘাতক, দলীল-অপহারক, রাজবিদ্রোহী, বিদ্রোহ-উত্তেজক, তাহার উপর প্রজালোকের ধনপ্রাণ-হরণকারী সাংঘাতিক ডাকাত; এই সকল অপরাধে বীরমল্লের প্রাণদণ্ডের আদেশ হয়। জল্লাদের খড়্গে মন্তকচ্ছেদন কিম্বা ফাঁসরজ্জুতে বন্ধন, তাদৃশ অপরাধীর পক্ষে উপযুক্ত বোধ হয় নাই, মত্তহস্তীর পদতলে নিক্ষেপ কোরে সেই পাপাত্মার পাপজীবনের অবসান করা হয়; অবশিষ্ট ডাকাতেরা চিরজীবনের জন্য রাজকারাগারে অবরুদ্ধ থাকবার দণ্ডাজ্ঞা প্রাপ্ত হয়; এই বিচারে রাজ্যের সমস্ত লোক পরিতুষ্ট—সমস্ত লোক নিরাপদ।

    আমিও পরিতুষ্ট; সে রাজ্যে আমিও তখন নিরাপদ; কিন্তু পরিতোষের একাংশ যেন কিছু শূন্য শূন্য। ব্রজনাথ ভট্টাচার্য্য আর হেমচন্দ্র পালধি এই দস্যুদলে ছিল; পূর্ব্বে যদি ঐ দুটো নাম আমার শুনা না থাকত, তা হোলে আমি অন্য কোন কথাই ভাবতেম না, যারা আমার শত্রুদলের সহচর, তাদের মধ্যে একজনের মুখেই ঐ নাম আমার শুনা। বিচারস্থলে আমার মনের কথা জিজ্ঞাসা করবার সুবিধা ঘটে নাই এখন যদি কোন রকমে সুযোগ পাই, কারাগারে প্রবেশ কোরে লোকদুটোকে জিজ্ঞাসা করি, জটাধর তরফদার নামে কোন লোককে তারা জানে কি না, চিনে কি না, জটাধরের সঙ্গে তাদের কোন সংস্রব আছে কি না, অমরকুমারী নামে একটি কুমারী কুলবালাকে জটাধরের লোকেরা চুরি কোরেছে, সে সংবাদ তারা কিছু রাখে কি না, অমরকুমারীর সংবাদ তারা কিছু জানে কি না?

    যদি সুযোগ পাই, সেই দুটো লোককে ঐ কথাগুলি আমি জিজ্ঞাসা করি, এইরুপ আমার ইচ্ছা। সে সুযোগ কি প্রকারে ঘটে, অনেক চিন্তা কোল্লেম; শেষকালে কুমার রণেন্দ্র বাহাদুরকে মনের ইচ্ছা জানালেম। ইচ্ছা যদি একাগ্র হয়, ইচ্ছাময়ের ইচ্ছায় সেই ইচ্ছা ফলবতী হয়ে থাকে, কোন কোন লোকের মুখে এই কথা আমি শুনেছি। কুমার রণেন্দ্র বাহাদুর আমার ইচ্ছায় অনুমোদন কোল্লেন। সময় অবধারিত হলো। কারাগারের অধ্যক্ষকে অগ্রে উপদেশ দিয়ে, কুমার বাহাদুর আমারে একদিন প্রাতঃকালে কারাগারের মধ্যে নিয়ে গেলেন; বহুলোকের ভিতর চিনে চিনে সেই দুটো লোককে আমি ধোল্লেম। আমার বামদিকে কারাধ্যক্ষ, দক্ষিণে রাজকুমার, মধ্যস্থলে আমি। তিনজনেই আমরা সশস্ত্র। হেমচন্দ্র পালধি, ব্রজনাথ ভট্টাচার্য্য। দুজনে অবশ্যই এক জায়গায় ছিল না, ভিন্ন ভিন্ন স্থানে পৃথক পৃথকরূপে আমার প্রশ্নগুলি আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, কিছুই ফল হলো না; আমার দিকে চেয়ে চেয়ে তারা কেবল চক্ষু ঘুরালে, দাঁত খিচলে, হাতকড়ী-বাঁধা হাতগুলো জোরে জোরে নাচালে, একটিও কথা কোইলে না, কোন প্রশ্নেরই উত্তর দিলে না। কেবল আমার প্রশ্ন নয়, কারাধ্যক্ষও আমার প্রশ্নের প্রতিধ্বনি কোরে সেই সব কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেন। সমান ফল;—একটিমাত্র উত্তরও প্রাপ্ত হওয়া গেল না; অগত্যা আমরা হতাশ হয়ে ফিরে এলেম।

    হতাশে আমরা ফিরে এলেম, কিন্তু মনে মনে বুঝা গেল, অনেক কথা তারা জানে; পাকা ডাকাত! রক্তদন্তের বন্ধুলোক! প্রশ্ন শুনে শুনে মুখচক্ষের ভাব যে রকম তারা দেখালে, তাতে কোরেই বুঝতে পারা গেল, দলের লোক। সত্য সত্য জানা-শুনা না থাকলে ওরকম তারা কোত্তো না; চুপ কোরেও থাকতো না; একটা না একটা সোজা সোজা উত্তর দিতো। তা যখন দিলে না, তখন কি আর নিশ্চয় কোত্তে কিছু বাকী থাকে? নিশ্চয় আমি স্থির কোল্লেম। স্থির করাই সার।

    দেশে আসবার জন্য দীনবন্ধুবাবু ব্যস্ত হোলেন, বহরমপুরের মোকদ্দমার ফলাফল জানবার জন্য আমারও অত্যন্ত উদ্বেগ, কুমার বাহাদুরের কাছে বিদায় চাইলেম। প্রার্থনা শীঘ্র মঞ্জুর হলো না। হোচ্ছে হবে, যাচ্ছে যাবে, এই রকম গতরজমায় ক্রমশই দিন কেটে যেতে লাগলো। একদিন আমি বিশেষ আগ্রহ জানিয়ে, বিশেষ ব্যাকুলতা প্রকাশ কোরে রাজপুত্রকে বোল্লেম, “আপনার অজ্ঞাত কিছুই নাই, আমার জীবনের সব কথা আপনাকে আমি বোলেছি। বিপদে আমার প্রাণদায়িনী সেই বালিকাটি,—অমরকুমারী নামে সেই স্নেহময়ী কুলকন্যাটি চুরি গিয়েছে, মোকদ্দমা হোচ্ছে, সন্ধান হলো কি না, কিছুই জানতে পাচ্ছি না, চিত্ত বড় অস্থির হয়েছে; অনুমতি করুন, আমরা দেশে যাই। আপনার অনুগ্রহ, আপনার দয়া, চিরজীবনে আমি বিস্মৃত হব না, উর্দ্দিষ্ট বিষয়ে কৃতকার্য্য হয়ে আবার আমি এই রাজ্যে আসবো; ভগবান করুন, আপনারা সুখে থাকুন, রাজলক্ষ্মী চিরস্থায়িনী হোন, আবার আমি আপনাদের দর্শন কোরে চরিতার্থ হব; এখন অনুগ্রহ কোরে কিছু দিনের জন্য বিদায় প্রদান করুন, এই আমার প্রার্থনা।”

    তথাপি বিলম্ব। আজকাল কোরে কোরে রাজপুত্রের অনুরোধে আর এক মাসকাল বরদায় থাকতে আমরা বাধ্য হোলেম। একমাস পরে অনুমতিপ্রাপ্তি। রাজপুত্র আমারে একসহস্র স্বর্ণমুদ্রা পাথেয়স্বরূপ প্রদান কোল্লেন, মিষ্টবচনে বোল্লেন, “এটা তোমার পক্ষে কিছুই নয়; যে উপকার তুমি কোরেছ, তার সঙ্গে তুলনায় সহস্র স্বর্ণমুদ্রা কিছুই নয়; অন্তরের কৃতজ্ঞতার যৎসামান্য নিদর্শন মাত্র; ঈশ্বরেচ্ছায় স্বদেশে পূর্ণমনোরথ হয়ে এখানে তুমি ফিরে এসো, মহারাজের ইচ্ছামত পুরস্কারদানে আমি তোমার সম্মানবন্ধন কোরবো।”

    কি করি, গ্রহণ কোত্তেও সঙ্কোচ আসে, গ্রহণ না কোল্লেও রাজপুত্র ক্ষুণ্ণ হন, কাজে কাজেই নিতান্ত কুণ্ঠিত হয়ে, কথাগুলি শুনে লজ্জা পেয়ে, সেই সহস্র স্বর্ণমুদ্রা আমারে গ্রহণ কোত্তে হলো। রাজদত্ত পুরস্কার গ্রহণ কোরে, ধন্যবাদ দিয়ে, রাজপুত্রকে আমি নমস্কার কোল্লেম।

    স্বদেশযাত্রার দিনস্থির। দীনবন্ধুবাবু প্রস্তুত। যে দিন আসা হবে, তার পূৰ্ব্বদিন আমি একবার রঙ্গিণীর সঙ্গে সাক্ষাৎ কোল্লেম; রঙ্গিণীকে বোল্লেম, “পাপকর্ম্ম কোরেছিলে, ফলভোগ হয়েছে, সে সব কথা আর মনে কোরো না, পাপের দিকে আর মন দিও না, ধর্ম্মের দিকে দৃষ্টি রেখে এই রাজ্যেই তুমি থাকো। ডাকাতের দুর্গে যাঁরে তুমি ভূষণলাল বোলে জানতে, তিনিই এই রাজ্যের মহারাজের প্রিয়তম ভ্রাতুপুত্র, রাজকুমার রণেন্দ্র রাও। রাজকুমার তোমারে আশ্রয় দিবেন অঙ্গীকার কোরেছেন, এখানে তুমি স্বচ্ছন্দে নিরুদ্বেগে সুখে থাকতে পারবে। অনেক দিন হলো এ রাজ্যে আমি এসেছি, দেশে চোল্লেম, পুনৰ্ব্বার ফিরে এসে তোমার সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ কোরবো।”

    রঙ্গিণী কাঁদতে লাগলো। আমি তারে নানা প্রকার প্রবোধ দিয়ে সান্ত্বনা কোরে বোল্লেম, “তোমার অপেক্ষা অনেক বেশী বেশী বিপদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, পাপকর্ম্ম কোরে তুমি বিপদে পোড়েছ, নিষ্পাপশরীরে নানা বিপদে আমি বহুকষ্ট ভোগ কোরেছি, কিন্তু একদিনের জন্যও বিচলিত হই নাই। মনকে তুমি বিচলিত কোরো না, শান্ত হয়ে এইখানেই থাক, মহৎলোকের আশ্রয়ে সুখী হোতে পারবে, সে বিষয়ে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। পাপিষ্ঠ বীরমল্ল হস্তীপদতলে বিদলিত হয়ে স্বকৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত কোরেছে, ইহলোকে পাপকর্ম্মের স্মৃতি ভিন্ন আর তার অস্তিত্বের কোন চিহ্নই থাকলো না। সেই কানকাটা কানাই এখন কোথায় কি অবস্থায় আছে, আমি দেশে যাচ্ছি, সে যদি দেশে গিয়ে থাকে, তাকেও আমি উপযুক্ত বিচারালয়ে হাজির করবার চেষ্টা পাবো। যারা তোমার সরল প্রাণে আঘাত কোরেছে, ধর্ম্মের বিচারে কেহই তারা নিষ্কৃতি পাবে না, এটি তুমি নিশ্চয় জেনে রেখো। কেঁদো না; রাজপুত্রের আশ্রয়ে ক্রমে ক্রমে তুমি পুনরায় পবিত্র ধর্ম্মভাব অভ্যাস কোত্তে পারবে; পরমেশ্বর তোমারে সুমতি প্রদান করুন; ধর্ম্মপথে তোমার মতি হোক।”

    কি যেন বোলবে বোলবে মনে কোরে চঞ্চলনয়নে রঙ্গিণী বারম্বার আমার মুখের দিকে চাইতে লাগলো, আর আমি সেখানে দাঁড়ালেম না, আর তার কোন কথা শুনবার ইচ্ছাও হলো না, মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ঈশ্বরের নাম কোত্তে কোত্তে সে ঘর থেকে আমি বেরিয়ে পোড়লেম। শীতল বায়ু আমার অঙ্গ স্পর্শকোল্লে।

    দিন সমাগত। শুভদিনে শুভক্ষণে সুসজ্জিত শকটারোহণে আমরা বরদারাজ্য পরিত্যাগ কোল্লেম। রাজকুমার রণেন্দ্র বাহাদুর আমাদের যাত্রাকালে শকটসমীপে উপস্থিত থেকে আমাদের মঙ্গলকামনা কোল্লেন; নমস্কার-বিনিময়ের পর শকটের অশ্বেরা দ্রতধাবনে আমাদিগকে রাজকুমারের নয়নের অগোচর কোরে শটখানা যেন উড়িয়ে নিয়ে চোল্লো।

  • প্রথম কল্প : বঙ্গে প্রত্যাগমন

    প্রথম কল্প : বঙ্গে প্রত্যাগমন

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    প্রথম কল্প : বঙ্গে প্রত্যাগমন

    পথে কোন বিঘ্ন উপস্থিত হলো না, যথাযোগ্য যানবাহনে আমরা যথাসময়ে মুর্শিদাবাদে উপস্থিত হোলেম। বাড়ীর কর্ত্তার অদর্শনে সকলেই উদ্বিগ্ন ছিলেন, যদিও মধ্যে মধ্যে ডাকবাহকেরা উদ্বেগশান্তির দৌত্যকার্য্য কোরেছিল, তথাপি প্রভু সশরীরে উপস্থিত না থাকলে পরিবারবর্গের আকাঙ্ক্ষিত শান্তি পূর্ণাংশে মূর্ত্তিমতী হয় না। দীনবন্ধুবাবুর প্রত্যাগমনে সকলেই সুখী হোলেন, সকলের মনের উদ্বেগ দূর হলো; আমারে যাঁরা যাঁরা ভালবেসেছিলেন, আমারে দেখে তাঁরাও তুষ্ট হোলেন।

    দেশভ্রমণের পরিচয় দিবার ভূমিকা আনয়নের অগ্রে পশুপতিবাবুকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আমার মোকদ্দমা কতদুর? অমরকুমারীর সন্ধান হয়েছে কি না?”

    পশুপতিবাবু উত্তর কোল্লেন, “বিশেষ সংবাদ আমি কিছু বোলতে পারবো না, আদালতে আমি যাই না, মণিভূষণের মুখে কেবল এইমাত্র শুনেছি, যে সকল ডাকাত ধরা পোড়েছিল, তাদের মধ্যে যে দুজন অমরকুমারীর চুরিমামলায় সংশ্লিষ্ট, তারা এখনো হাজতে আছে, বাকী লোকগুলোর ডাকাতী অপরাধে সাজা হয়ে গিয়েছে। তোমরা এখান থেকে চোলে যাবার পর আরো জনকতক ডাকাত ধরা পোড়েছিল, বমাল গ্রেপ্তার। তারাও যথাবিধি দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছে। আর একজন—”

    ধৈর্য্য রাখতে না পেরে কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে চঞ্চলস্বরে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “ও সব আইন-আদালতের কথা এখন আমি শুনতে চাচ্ছি না, অমরকুমারীর সংবাদ কি, সেইটি আপনি আগে বলুন, তার পর অন্য কথা।”

    আমারে নিতান্ত অস্থির দেখে ছোটবাবু বোল্লেন, “শুনেছি না কি অমরকুমারীর সন্ধান হয়েছে, কিন্তু তাঁরে এখনো উদ্ধার করা হয় নাই। অমরকুমারী কোথায় আছেন, সেই সন্ধানটি জানা হয়েছে, যারা তারে সেইখানে রেখে দিয়েছে, তারা উপস্থিত না হলে নূতন আশ্রয়ের অধিকারীরা অমরকুমারীকে ছেড়ে দিতে চায় না, এই পর্য্যন্ত আমি শুনেছি।”

    জলময় ব্যক্তি সম্মুখে একগাছি তৃণ দেখতে পেলে সেই তৃণ অবলম্বনে যেমন প্রাণে বাঁচবার আশা করে, অর্দ্ধ উল্লাসে আমার হতাশময় চিত্তে সেই প্রকার আশার সঞ্চার। ছোটবাবুর সঙ্গে যখন আমার কথা হয়, তখন রাত্রিকাল, কতক্ষণে রাত্রিপ্রভাত হবে, কতক্ষণে আমি বহরমপুরে যাব, সেই ভাবনায় অধীর হোলেম, একবারও নিদ্রা হলো না, জেগে জেগেই রাত্রি প্রভাত কোল্লেম।

    প্রভাতে স্নানাহার না কোরেই তরণী আরোহণে আমার বহরমপুর-যাত্রা। উকীলবাবুর বাসায় গিয়ে স্নানাহার কোল্লেম, মোকদ্দমার স্থূল স্থূল বিবরণ শুনলেম, মনে তখন অনেকদূর আশ্বাসের উদয় হলো।

    রক্তদন্তের সন্ধান হয় নাই। গ্রেপ্তারী পরোয়ানা আছে, পরোয়ানাতে হুলিয়া লেখা আছে, পুলিশের লোকেরাও স্থানে স্থানে সন্ধানে সন্ধানে ফিরছে, গ্রেপ্তার করবার সুবিধা হোচ্ছে না। নফর ঘোষাল পূর্ব্বে বোলেছিল, জটাধর গুজরাটে; জেরার মুখে অনেক তর্কবিতর্কের পর শেষকালে বোলেছে কলিকাতায়। জেরার মুখে কুঞ্জবিহারীও খেলাপ। কুঞ্জবিহারী প্রথমেই বোলেছিল কলিকাতা, জেরায় বোলেছে ঢাকা। ঢাকার পুলিশে পরোয়ানা গিয়েছে, ঢাকার মাজিষ্ট্রেট দস্তখৎ কোরেছেন, ঢাকার পুলিশ সেই আসামীটাকে খুঁজে খুঁজে হয়রাণ হয়েছে, সমস্ত যত্ন বিফল। রক্তদন্ত ঢাকায় নাই। সম্ভবতঃ অমরকুমারীর ঢাকায় থাকা সত্য হোতে পারে, কিন্তু ঢাকা একটি ক্ষুদ্রস্থান নয়, মুখের কথায় ঢাকা বোল্লেই অত বড় একটা জেলার ভিতর একটা লোককে খুঁজে বাহির করা সহজসাধ্য হয় না। নগরে কি উপনগরে, মহকুমায় কি পল্লীগ্রামে, তার একটা নিশ্চিত ঠিকানা চাই। সে ঠিকানা কে দিবে? হাজতী আসামীরা যদি জানে, জানে কি জানে, ঠিক নাই—যদি জানে, কখনই সত্যকথা বলবে না, কাজেকাজেই পুলিশের যত্ন বিফল।

    আমার আর আদালতে যাওয়া আবশ্যক হলো না। মোকদ্দমা দায়ের আছে, মূল আসামী হাজির নাই, দরখাস্ত, রিপোর্ট, কৈফিয়ৎ, ইতিমধ্যে যা কিছু, আদালতে দাখিল হোচ্ছে, সমস্তই নথীর সামীল হয়ে যাচ্ছে; নথীর সঙ্গে পেস হবে, দস্তুরমত এই হুকুম। মোকদ্দমা কেবল দায়ের আছে মাত্র। সে অবস্থায় আমার এখন আদালতে উপস্থিত হওয়া নিষ্প্রয়োজন। হাজতী আসামীরা চুপচাপ; এখন আর তারা নূতন কথা কিছুই বলে না। সন্ধ্যার পূর্ব্বক্ষণ পর্য্যন্ত বহরমপুরে আমি থাকলেম, রজনীবাবু বাসায় এলে তাঁর কাছে পরামর্শ চাইলেম। কি করা কর্ত্তব্য? আমি যদি ঢাকায় যাই, কোথায় যাব? কোথায় অন্বেষণ কোরবো?—সহরে কি মফস্বলে অমরকুমারী আছেন, চোরেরা তাঁরে কোথায় নিয়ে লুকিয়ে রেখেছে, নিশ্চয় করা অসম্ভব; চেষ্টা কেবল পণ্ডশ্রম মাত্র। আমার এখন কি করা কর্ত্তব্য?

    রাত্রেও আমি রজনীবাবুর বাসায় থাকলেম। রজনীবাবু, একটি পরামর্শ বোল্লেন। ঢাকাজেলার অনেকগুলি লোক বহরমপুরে থাকেন, মধ্যে মধ্যে তাঁরা বাড়ী যান, দুই একমাস বাড়ীতে বাস করেন, তার পর আবার অসেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচ সাতজন প্রতিপত্তিশালী ভদ্রলোক। রক্তদন্তের চেহারাটা তাঁদের কাছে যদি বিশেষ কোরে বলা যায়, সে চেহারার কোন লোককে ঢাকার কোন স্থানে তাঁরা দেখেছেন কি না, এ কথা যদি জিজ্ঞাসা করা যায়, তা হোলে হয় তো কিছু না কিছু সূত্র প্রাপ্ত হওয়া যেতে পারে।

    প্রভাতে আমি সেই পরামর্শ অনুসারে কার্য্য কোল্লেম। রজনীবাবু নিজেও আমার সহায় হোলেন। যেখানে যেখানে সেই সকল ঢাকাই বাবুর বাসা, সেই সেই স্থানে উপস্থিত হয়ে, প্রত্যেককে আমরা রক্তদন্তের উদ্দেশের কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেম; কেহই কিছু ঠিক বোলতে পাল্লেন না; কেবল একটি লোক বোল্লেন, অনেক দিন হলো, মাণিকগঞ্জ মহকুমায় ঐরূপ চেহারার একটা লোককে তিনি একদিন দেখেছিলেন। কে তো কে, খবরেই আনেন নাই, এখনো পর্য্যন্ত সে লোক সেখানে আছে কি না, সে কথাও তিনি বোলতে পাল্লেন না।

    এ সংবাদটাও অনিশ্চিত। শুনে রাখলেম, মাণিকগঞ্জ। যা হোক, তবু একটা সীমা পাওয়া গেল। উকীলের সঙ্গে উকীলের বাসায় আমি ফিরে এলেম। আহারান্তে রজনীবাবু আদালতে গেলেন, গঙ্গাপার হয়ে আমি আপনার মনিববাড়ীতে উপস্থিত হোলেম; যে যে কথা শুনে এলেম, বড়বাবুকে আর ছোটবাবুকে সেই সব কথা বোল্লেম। শুনে তাঁরা উভয়েই বিষন্নবদনে বোল্লেন, “তাই তো!”

    তাঁরা বোল্লেন, তাই তো! আমিও ভাবলেম, তাই তো! কেবল “তাই তো” শুনেই, “তাই তো” ভেবেই নিশ্চিন্ত থাকতে পারা গেল না; বৈকালে আমি বোরাকুলি গ্রামে শান্তিরাম দত্তের বাড়ীতে গেলেম, মণিভূষণের সঙ্গে সাক্ষাৎ কোল্লেম, তীর্থদর্শন কোরে আমি ফিরে এসেছি, দেখে তাঁরা সন্তুষ্ট হোলেন। আমি তাঁদের সন্তোষ বিতরণ কোত্তে যাই নাই, যেটি আমার বলবার কথা, দুজনের সাক্ষাতেই সেটি আমি বোল্লেম। বন্ধু শান্তিরাম পরিণামদর্শী বিজ্ঞলোক, অনেকক্ষণ চিন্তা কোরে তিনি বলিলেন, “ওটা যেন বাতাসের কথা মনে হোচ্ছে, কবে কোন দিন সেই চেহারার একটা লোককে মাণিকগঞ্জে দেখেছিলেন, এই কথা শুনে মাণিকগঞ্জে ছুটে যাওয়া পরামর্শসিদ্ধ বিবেচনা হয়। তবে হাঁ, এমনটি যদি নিশ্চয় জানা যায় যে, অমরকুমারী মাণিকগঞ্জে আছেন, রক্তদন্ত এখন সেখানে থাকুক আর না থাকুক, তাতে আমাদের এখন কিছু আসে যায় না, পরোয়ানা আছে, যখন হোক, যতদিনে হোক, যেখানেই হোক, পুলিশের হাতে রক্তদন্তটা ধরা পোড়বেই পোড়বে। এখন তারে আমরা চাই না। অমরকুমারী মাণিকগঞ্জে আছেন, এ কথা যদি নিশ্চয় হয়, তা হোলে তো তোমরা কেন, আমি পর্য্যন্ত পুলিশের সঙ্গে সেখানে যেতে প্রস্তুত।”

    আমি বিবেচনা কোল্লেম, বৃদ্ধের এই পরামর্শই যুক্তিযুক্ত। খানিকক্ষণ সেখানে থেকে মণিভূষণের সঙ্গে আমি ফিরে এলেম। সেই রাত্রেই শুনলেম, কৃষ্ণকামিনীর বিবাহ। যে পাত্রের সঙ্গে সম্বন্ধের কথা শুনে গিয়েছিলেম, সেই পাত্রের সঙ্গেই বিবাহ। বিবাহের আর দশদিন বাকী। সেই দশদিনের মধ্যে কৃষ্ণকামিনীর সঙ্গে আটদিন আমার এক একবার দেখা হয়েছিল। হর্ষ প্রকাশ কোরে আমি বোলেছিলেন, “প্রজাপতি সুপ্রসন্ন; তোমার বিবাহের নিমিত্ত সকলেই উদ্বিগ্ন ছিলেন, তুমিও ছিলে, আমিও ছিলেম; শুভদিন স্থির হয়েছে, শুনে আমি সখী হোলেম।”

    আমি তো বল্লেম, সুখী হোলেম, কৃষ্ণকামিনী কিন্তু সে কথায় একটিও উত্তর দিলেন না; ম্লানবদনে ম্লাননয়নে খানিকক্ষণ কেবল আমার মুখপানে চেয়ে থাকলেন মাত্র। দুটি পাঁচটি অন্যকথা হলো, সে সব কথায় কুমারীকে বেশ সপ্রতিভ দেখলেম; কেবল বিবাহের কথায় কৃষ্ণকামিনী মৌনবতী; লজ্জায় মৌনবতী, তেমন লক্ষণ কিছু বুঝা গেল না, যেন কোন অন্যভাবে অন্যমনস্ক; বদন বিবর্ণ,—বিষণ্ন।

    কথা আমি বাড়ালেম না, কুমারীর ঐ ভাব দেখেই শীঘ্র শীঘ্র সোরে এলেম। গাত্রে হরিদ্রা, আইবড়ো ভাত, অধিবাস যথারীতি সুসম্পন্ন; বিবাহরজনী সমাগত। বাবুদের উপরের নাচঘর সুসজ্জিত;—চিত্রপটে, পুষ্পমাল্যে, সুন্দর সুন্দর আলোকমালায় বিভূষিত, অনেকগুলি বরযাত্র সমাগত; বরযাত্রে কন্যাযাত্রে সে সময় বিদ্যার বিচারের প্রচলন ছিল, রহস্যে রহস্যে—গাম্ভীর্যে গাম্ভীর্যে সে সব পরীক্ষা হয়ে গেল। শুভলগ্নে কন্যাসম্প্রদান, তার পর বাসর-কৌতুক। কৃষ্ণকামিনীর বাসরবর্ণনা করা আমার কার্য্য নয়, এ বর্ণনায় আমি ক্ষান্ত থাকলেম।

    কৃষ্ণকামিনী সুখে থাকুন, কৃষ্ণকামিনীর বিবাহোৎসবে আমার একটি বিশেষ মনস্কামনা পূর্ণ হলো। বরকর্তা-মহাশয় ঢাকা মাণিকগঞ্জে একটা বড়রকম চাকরী করেন। মাণিকগঞ্জ থেকেই তিনি পুত্রের বিবাহ দিতে মুর্শিদাবাদে এসেছেন, সেখানকার পাঁচসাতটি বন্ধুকেও সমভিব্যাহারে এনেছেন। পরিচয় পেয়ে বিবাহের পরদিন উপযুক্ত অবসরে বরকর্তার চরণে আমি গিয়ে প্রণাম কোল্লেম। পাঠকমহাশয় শুনে রেখেছেন, এই বরকর্তাটি দীনবন্ধুবাবুর ভগ্নীপতি, নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায়। দিব্য মিষ্টভাষী, সদালাপী, বদন সৰ্ব্বক্ষণ প্রফুল্ল, অমায়িক ভদ্রলোক। কৃষ্ণকামিনীর পিতাও কন্যাসম্প্রদানের নিমিত্ত এই বাড়ীতে এসেছিলেন; বিবাহের অগ্রে তাঁদের উভয়ের কাছেই দীনবন্ধুবাবু, আমার পরিচয় দিয়েছিলেন; পরিচয় শ্রবণ কোরে তাঁরা উভয়েই ক্ষণেক আশ্চর্য্যজ্ঞান কোরে আমার প্রতি সস্নেহ-ভাব জানিয়েছিলেন।

    বিবাহের পরদিন হরিহরবাবুর সঙ্গে যখন আমি সাক্ষাৎ করি, একটি ঘরে তখন তিনি একাকী ছিলেন, প্রণাম কোরে একটু তফাতে গিয়ে আমি বোসলেম। প্রসন্নবদনে তিনি আমার সঙ্গে কথোপকথন আরম্ভ কোল্লেন। এ কথা, সে কথা, পাঁচ কথার পর ঠিক অবসর বুঝে আমি আমার মনের কথা তুল্লেম। বিনীতবদনে ধীরে ধীরে আমি বোল্লেম, “শুনেছি আপনি মাণিকগঞ্জে থাকেন; আমি একবার মাণিকগঞ্জে যাব।” বাবু, জিজ্ঞাসা কোপ্লেন, “কি নিমিত্ত?”

    নিমিত্তটা আমি কি প্রকারে ব্যাখ্যা করি, কিয়ৎক্ষণ নীরব থেকে একটু চিন্তা কোল্লেম; শেষে বোল্লেম, “বিশেষ প্রয়োজন। একটা বানরমুখো কুব্জাকার লোক—নাম তার জটাধর তরফদার;—সৰ্ব্বাঙ্গে ভল্লুকের মত অনেক লোম; সেই লোকটা মাণিকগঞ্জে গিয়েছিল; সম্প্রতি এই তত্ত্ব আমি জানতে পেরেছি; আপনি কি সেই লোককে সেখানে দেখেছেন?”

    চমকিত-নয়নে আমার দিকে চেয়ে গভীর-বদনে হরিহরবাবু বোল্লেন, “লোম? বানরের মত মুখ?—কুব্জাঙ্গ?—জটাধর?—কেন গা?—সে লোকের সঙ্গে তোমার কি?—মাণিকগঞ্জে একটা আড়ৎ-জায়গা; কত লোক যায়, কত লোক আসে,—হোতেও পারে,—হয় তো দেখে থাকবো, ঠিক স্মরণ কোতে পাচ্ছি , কিন্তু কেন গা; সে লোকটিকে কি তোমার দরকার আছে?”

    “আমার দরকার নাই, আদালতের দরকার, তারে এখন আমি অন্বেষণ কোচ্ছি না, অন্বেষণ কোচ্ছি একটি বালিকাকে। সেই বানরমুখো লোকটা একটি কুমারী বালিকাকে এই মুর্শিদাবাদ থেকে চুরি কোরে নিয়ে পালিয়েছে; শুনতে পাচ্ছি, মাণিকগঞ্জে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রেখেছে; বালিকাটির নাম অমরকুমারী। আপনি কি সে সংবাদ—”

    একনিশ্বাসে তাড়াতাড়ি আমি ঐ সব কথা বোলছিলেম, ঐ পর্য্যন্ত শুনেই— যেন কি পূর্ব্বকথা স্মরণ কোরে, বিস্মিত-বদনে হরিহরবাবু বোল্লেন, “ও হো হো! বটে-বটে! একটি বিদেশিনী বালিকা আমাদের বাসার নিকটেই এক ব্রাহ্মণের বাড়ীতেই আছে বটে। মেয়েটিকে আমি দেখি নাই, লোকে কাণাকাণি করে, কোথা থেকে এসেছে, কে সেটিকে সেইখানে এনে লুকিয়ে রেখেছে, বাড়ীর বাহির হোতে দেয় না, দেখতে দিব্য সুন্দরী, যারা দেখেছে, তারা বলে, মেয়েটি কেবল কাঁদে আর ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে। কি নামটি তুমি বোল্লে হাঁ হাঁ,—অমরকুমারী। আমিও শুনেছি, সেই মেয়েটির নাম অমরকুমারী। কেন গা?—সে মেয়েটি তোমার কে হয়?”

    “কে হয়, সে কথা আমি এখন ঠিক বোলতে পারবো না; সকল পরিচয়ই আমার গোলমাল;—সে সব গোলমাল যদি আপনি শুনেন, অবাক হবেন; সে সব কথা বলবার এখন সময় নয়; সেই অমরকুমারী এক মহাসঙ্কটে একবার আমার প্রাণরক্ষা কোরেছিলেন। চোরেরা সেটিকে চুরি কোরে নিয়ে গিয়েছে, আমি সেটিকে উদ্ধার কোরে আদালতে উপস্থিত কোরবো, এই আমার পণ, এই আমার সঙ্কল্প, এই আমার অভিলাষ।”

    অত্যন্ত উৎসাহে, অত্যন্ত উল্লাসে, অত্যন্ত আগ্রহে এইগুলি আমার উত্তর। আমার কণ্ঠস্বরের কম্পন অনুভব কোরে হরিহরবাবু বেশ বুঝতে পাল্লেন, যথার্থই অমরকুমারীর জন্য আমার প্রাণ কাঁদে। তিনিও বুঝতে পাল্লেন, আমিও সেই সময় উত্তেজিত-স্বরে বোলে উঠলেম, “অমরকুমারীর অন্বেষণে আমি মাণিকগঞ্জে যাব।”

    আমার কাতরতা দেখে, অধীরতা দেখে, সদয়-বচনে বাবু, বোল্লেন, “আচ্ছা, আমি দেখছি। আমার আর বেশীদিন ছুটি নাই, সপ্তাহ পরেই আমি যাব, যদি তোমার ইচ্ছা হয়, আমার সঙ্গেই তুমি যেতে পার।”

    আনন্দে আমার অন্তরাত্মা যেন নেচে উঠলো, অন্তরের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে, দুই হাতে বাবুর পদধুলি গ্রহণ কোরে মস্তকে ধারণ কোল্লেম। আমার উভয় নেত্রে আনন্দাশ্রু প্রবাহিত হোতে লাগলো। কে একজন এসে সেই সময় বড়বাবুর নাম কোরে হরিহরবাবুকে ডাকলে, আমারে সেইখানে বোসতে বোলে, সেই লোকের সঙ্গে হরিহরবাবু শীঘ্র শীঘ্র বেরিয়ে গেলেন। প্রায় আধ ঘণ্টা সেইখানে আমি অপেক্ষা কোল্লেম, তিনি এলেন না, ক্রমশই বিলম্ব হোতে লাগলো, ধৈর্য্য রেখে আমি আর বেশীক্ষণ সেখানে একাকী বোসে থাকতে পাল্লেম না, আমিও সেখান থেকে উঠে এলেম। আনন্দের এক প্রকার উচ্ছ্বাস আছে, সেই উচ্ছ্বাসের সময় নাসাগ্রে বিন্দু বিন্দু ঘর্ম্ম দেখা দেয়; বক্ষঃস্থল কম্পিত হয়। খোলা বাতাসে ভ্রমণ করবার ইচ্ছা আছে; খোলা বাতাসে আমি বাহির হোলেম। অনেক দিনের পর অন্তরে আমার বিমল আনন্দ।

    আমি মাণিকগঞ্জে যাব, মাণিকগঞ্জে আমি অমরকুমারীকে দেখতে পাব, অমরকুমারীকে আমি উদ্ধার কোরে আনবো, আমার অন্তর-সাগরে এই সকল উল্লাস-তরঙ্গের ঘন ঘন ক্রীড়া। কি আছে আমার মনে, কি কারণে আমার উল্লাস, কি সব কথা আমি শুনেছি, জনপ্রাণীর কাছেও তখন সে সব কথা আমি প্রকাশ কোল্লেম না; আপনার আনন্দে আপনিই আমি বিভোর হয়ে থাকলেম।

    বিবাহের পরদিন বর-কন্যা বিদায় হয়, কুলাচারে অনেক পরিবারের এই প্রকার প্রথা; কিন্তু দীনবন্ধুবাবুর যত্নে হরিহরবাবুর সম্মতিক্রমে এই বাড়িতেই কুশণ্ডিকা, ফুলশয্যা সম্পাদিত হবে, বরকন্যা তিন দিন তিন রাত্রি এইখানেই থাকবেন, বরযাত্রীরাও সেই উৎসবে সাক্ষী হবেন, এইরূপ স্থির হলো। সে তিন দিন সকলেই ব্যস্ত, চোলে যেতে যেতে হরিহরবাবু, যখন আমারে দেখতে পান, প্রসন্ন-নয়নে চেয়ে চেয়ে একটু একটু হাসেন, আমিও নতবদনে একটু একটু হাস্য করি, এই প্রকার ভাব। ফুলশয্যার দিন সন্ধ্যাকালে একটা কাজের অছিলায় আমি একবার অন্দরমহলে প্রবেশ কোরেছি; পাড়ার স্ত্রীলোকেরা, বাড়ীর স্ত্রীলোকেরা, এক একটা ঘরের ভিতর মজলীস কোরে নানা রকম গোলমাল কোচ্ছেন, কেহ কেহ করতালি দিয়ে হাস্য-কৌতুক আরম্ভ কোরেছেন, চক্ষুকর্ণকে সে দিক থেকে ফিরিয়ে নিয়ে বড়বৌমার ঘরেই আমি প্রবেশ কোল্লেম। সে ঘরে তখন কেহই ছিলেন না; শূন্যঘরে প্রবেশ কোরে সন্দেহের আতঙ্কে তাড়াতাড়ি আমি বেরিয়ে আসছি, একদিক থেকে ছুটে এসে কৃষ্ণকামিনী আমার পথ আগলালেন : হাত ধোরে ঘরের ভিতর আমারে টেনে নিয়ে গিয়ে, সজোরে ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন; দুই হাতে আমার দুখানি হাত ধোরে সম্মুখে দাঁড়িয়ে, সুন্দর মুখখানির সঙ্গে সুন্দর চক্ষুদুটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, নববিবাহিতা নবসুন্দরী কেমন এক প্রকার নূতন সুরে বোল্লেন, “আর কি হরিদাস! আমার বিয়ে হয়ে গেল! মনে আছে তোমার? কি তোমারে আমি বোলেছিলেম, সে কথা তোমার মনে পড়ে? বিবাহে আমি সুখী হব না, তোমারে ভালবাসা দিয়েছিলেম, তুমি আমারে দিলে না, এ বিবাহে আমি সুখী হব না! মনে হয় যেন বেশী দিন আমি আর এ পৃথিবীতে খেলা করবার জন্য বেঁচে থাকবো না! এসো ভাই এইবার!–এসো ভাই! এই লও এই আমার সাধের ভালবাসার শেষ চুম্বন! সানুরাগে এই সব কথা বোলেই চপলা কৃষ্ণকামিনী আমার উভয় কপোলে চারিবার উষ্ণচুম্বন কোল্লেন! হরিদ্রা, চন্দন, চম্পক আর আতর গোলাপের মিশ্র সুবাস আমার নাসারন্তে যেন অগ্নিবর্ষণ কোত্তে লাগলো! কৃষ্ণকামিনী আপনার সুকোমল বাহুযুগলে আমার কণ্ঠ বেষ্টন কোরে, খানিকক্ষণ আমারে গাঢ় আলিঙ্গনপাশে আবদ্ধ রাখলেন। জোরে হস্তবন্ধন ছাড়িয়ে, চঞ্চল হস্তে দরজা খুলে, রুদ্ধশ্বাসে আমি চম্পট দিলেম; বাইরে এসে নিশ্বাস ফেল্লেম!

    কৃষ্ণকামিনী ফুলশয্যার সুখযামিনী অবসান। চতুর্থদিবসের প্রাতঃকালে বরকন্যা বিদায় হোলেন, বরযাত্রেরা আপনাদের বংশানরূপ মর্য্যাদা প্রাপ্ত হয়ে বিদায় গ্রহণ কোল্লেন, বাবুদের সদরবাড়ী তখন যেন জনশূন্য হয়ে গেল। বাহিরের লোকের মধ্যে থাকলেন কেবল হরিহরবাবু আর তাঁর সমভিব্যাহারী বন্ধু সাতটি। বরের সঙ্গে বরকর্তা নিজবাড়িতে গেলেন না, কর্ম্মস্থলে ছুটি কম, মুর্শিদাবাদ থেকেই সরাসরি মাণিকগঞ্জে চোলে যাওয়া তাঁর পক্ষে সুবিধা, সেই কারণেই তিনি মুর্শিদাবাদে থাকলেন। আর তিন দিন পরেই তিনি রওনা হবেন, এইরূপ কথাবার্ত্তা স্থির।

  • দ্বিতীয় কল্প : কুমারী-অন্বেষণ

    দ্বিতীয় কল্প : কুমারী-অন্বেষণ

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    দ্বিতীয় কল্প : কুমারী-অন্বেষণ

    আমি মাণিকগঞ্জে যাব। হেতু কি, দীনবন্ধুবাবুকে আর পশুপতিবাবুকে সেটি জানালেম; নিশ্চয় অমরকুমারীকে সেখানে পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে তাঁদের প্রতীতি জন্মিল না, তথাপি অন্বেষণ করা কর্ত্তব্য, এই বিবেচনায় তাঁরা আমারে অনুমতি দিলেন। মণিভূষণকে সংবাদ দেওয়া গেল, মণিভূষণ এলেন; তাঁরে সঙ্গে কোরে একবার আমি বহরমপুরের আদালতে গেলেম। ম্যাজিস্ট্রেটের নিকটে এই মর্ম্মে এক দরখাস্ত করা হলো যে, অপহৃতা অমরকুমারীর কিঞ্চিৎ অনুসন্ধান পাওয়া যাচ্ছে, ঢাকাজেলার এলাকায় অমরকুমারী আছেন, কোন বিশ্বস্তসূত্রে এই সংবাদটি শুনা হয়েছে, সন্ধানের জন্য আমি ঢাকায় চোল্লেম, সন্ধান যদি ঠিক হয়, ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশে ঢাকার পুলিশ তদ্বিষয়ে আমার সহায়তা করেন, এইরূপ হুকুম প্রার্থনা।

    আমি দরখাস্ত কোল্লেম না, মণিভূষণ দরখাস্ত কোল্লেন; আমাদের উকীল রজনীবাবু সেই দরখাস্তে তাঁর নিজের নামটিও দস্তখৎ কোরে দিলেন। পেস হবার পর দরখাতে এই হকুম হলো যে, “দরখাস্তের মৰ্ম্মানুসারে ঢাকাজেলার ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের হুজুরে অত্রাদালতে রূবকারি প্রেরণ করা যায় ইতি।”

    ঢাকায় রূবকারি যাবে, মুর্শিদাবাদ পুলিশের কোন লোককে সঙ্গে লওয়া আবশ্যক হবে না। ম্যাজিস্ট্রেটকে সেলাম দিয়ে, রজনীবাবুর কাছে বিদায় নিয়ে, সন্ধ্যার পূর্ব্বে আমরা গঙ্গা পার হোলেম। নিরুপিত দিবস উপস্থিত হলো, হরিহরবাবু প্রস্তুত, দুর্গানাম স্মরণ কোরে আমরা তরণী-আরোহণ কোল্লেম। হরিহরবাবুর সঙ্গে তাঁর বন্ধু লোকেরা, আমার সঙ্গে মণিভূষণ দত্ত। ভিন্ন ভিন্ন যানবাহনে পথে যত দিন যায়, তত দিন গেল, আমরা মাণিকগঞ্জে উপস্থিত হোলেম।

    আমি অদৃষ্টবাদী; ভাগ্যে আমার অখণ্ড বিশ্বাস; ভাগ্য আমার মন্দ, শৈশবাবধি পদে পদে তার প্রমাণ আমি প্রাপ্ত হয়ে আসছি, কিন্তু একটি বিষয়ে আমার কিছু শ্রদ্ধা আছে। যেখানে যখন যে কোন ভদ্রলোকের কাছে আমি আশ্রয় পাই, সেইখানেই তখন আমার আদর হয়। কেন জানি না, সত্য পরিচয় পেয়েও, বংশপরিচয় না জেনেও ভদ্রলোকেরা আমারে যত্ন করেন। হরিহরবাবুর বাসাবাড়ীতে আমরা আশ্রয় পেলেম, আদর পেলেম, যত্ন পেলেম, সম্পূর্ণ মনের সুখে না হোক, কায়িক সুখে সেইখানে আমরা থাকলেম। আমি আর মণিভূষণ।

    বরদার রাজকুমার রণেন্দ্র রায় বাহাদুর আমাকে সহস্র স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দিয়েছিলেন। সেই টাকাগুলি আমি দীনবন্ধুবাবুর কাছে গচ্ছিত রাখি মাণিকগঞ্জে আসার সময় প্রয়োজনমত খরচপত্রের জন্য সেই টাকার মধ্যে দুইশত রজতমুদ্রা আমি সঙ্গে রেখেছিলেম; এই দূরপথে সেই টাকাগুলি আমার সম্বল। অন্বেষণ আরম্ভ কোল্লেম। হরিহরবাবুর মুখে শুনা হয়েছিল, মাণিকগঞ্জে একজনের বাড়িতে অমরকুমারী নামে একটি সুন্দরী বালিকা আছে, কোন কোন লোকের কাণাঘুষায় এই তত্ত্বটুকু তিনি অবগত হন; অজ্ঞাতকুলশীলা একটি বিদেশিনী কুমারী এই স্থানে একজনের বাড়িতে আছেন, কে সেই একজন, কোথায় তার বাড়ি, ঘর ঘর জিজ্ঞাসা কোরে সে সন্ধানটি ঠিক প্রাপ্ত হওয়া সহজ নয়; যে সকল লোকের কাণাকাণিতে হরিহরবাবু সেই কথা শুনেছিলেন, সেই সকল লোকের নামগুলিও তিনি মনে কোরে রাখেন নাই; রাখবার কোন আবশ্যকও ছিল না। কে অমরকুমারী, কোথা থেকে কার বাড়িতে এসেছে, কেন এসেছে, কে এনেছে, একজন নিঃসম্পর্কীয় ভদ্রলোক ততদূর বিশেষ কথা পরিজ্ঞাত হবার নিমিত্ত আগ্রহ প্রকাশ কোরবেন, এটাও সম্ভব নয়। ফল কথা, অমরকুমারীর ঠিক ঠিকানা শীঘ্র জানা গেল না। মোটামুটি অন্বেষণ কোল্লেম, কেহ কেহ হাস্য কোল্লে, কেহ কেহ চক্ষ পাকালে, কেহ কেহ মুখ বাঁকালে, কেহ কেহ যেন রঙ্গ করবার অভিলাষে “আয় গো নবীন বিদেশিনী, ডাকচে মোদের কমলিনী,” এই রকম গান গেয়ে আমাদের মুখের কাছে হাত নেড়ে নেড়ে চোলে গেল।

    সমস্তই যেন তামাসা। আমার প্রাণের কতদূর উদ্বেগ, কেহই সেটা অনভব কোল্লে না। অনুভবের আশা করাও দুরাশা। এ অবস্থায় হয় কি? একপক্ষ অতীত। ঢাকার ফৌজদারী কাছারীতে অবশ্যই বহরমপুরের রূবকারি এসেছে, হাকিমের হুকুম, আইনসিদ্ধ সরাসরি কার্য্য, হুকুম তামিলে আমলারা বিলম্ব কোত্তে পারে নাই, এ কথা ঠিক, কিন্তু সে রূবকারির তত্ত্ব লওয়াতে এখন আমার ফল কি? একবার মনে কোরেছিলেম, ঢাকার সদর আদালতে যাব, রূবকারির খবরটা জানবো, নিষ্ফল বিবেচনা কোরে সে সঙ্কল্প ছেড়ে দিতে হয়েছিল।

    মুখে মুখে লোকের কাছে কথা ফেলি, কেহ কিছু জানে কি না, জিজ্ঞাসা করি, যথাসম্ভব যথাশক্তি অন্বেষণ করি, সমস্তই বিফল হয়। যে দিন যেখানে যে রকম ফল হয়, রোজ রোজ হরিহরবাবুকে সেই সব কথা বলি, গম্ভীরভাবে তিনি চুপ কোরে থাকেন। মুখের ভাব দেখে আমার মনে হয়, তিনি যেন ভাবেন, তাঁর পূর্ব্বের কথাগুলি হয় তো মিথ্যা রটনা। হরিহরবাবুর ভাবনার সঙ্গে আমার ভাবনার সম্বন্ধ কি? যে ভাবনা আমার হৃদয়-পোষিত, সেই ভাবনাই আমি ভাবি। সে ভাবনার অংশী নাই;—একটি ভগ্নাংশের অংশী মণিভূষণ দত্ত।

    একমাস পূর্ণ হতে যায়, কোন সন্ধান পাওয়া গেল না; এক প্রকার নিরাশ হয়ে মনে আমি স্থির কোল্লেম, অমরকুমারী মাণিকগঞ্জে নাই। বৃথা শ্রম, বৃথা কষ্ট, বৃথা ব্যয়, বৃথা একজন ভদ্রলোকের গলগ্রহ হওয়া, বৃথা কতকগুলি অচেনা লোকের কাছে উপহাসাস্পদ হওয়া। সন্ধান পাওয়া গেল না ভেবে মুর্শিদাবাদে যদি ফিরে যাই, সেখানে গিয়েও যদি ঐরুপ ভাবি, তাতেই বা কি হবে?

    অনেক রকম আমি ভাবলেম; সে সকল ভাবনার কথা মণিভূষণকেও জানতে দিলেম না। একরাত্রে একটি নির্জ্জন ঘরে শয়ন কোরে পর পর নানা ঘটনা আমি স্মরণ কোচ্ছি, হঠাৎ মনে হলো, মাণিকগঞ্জ কতটুকু স্থান? সদরে মফঃস্বলে এমন অনেক স্থান আছে, একটা কোন প্রসিদ্ধ স্থানের নামে নিকটস্থ অনেকদূর পর্য্যন্ত বুঝায়; সেই ভাবটাই হঠাৎ আমার মনে উদয়; সেই গভীর রজনীতে কে যেন আমার কাণে কাণে বোলে দিলো “ঐ কথাই ঠিক; মানসিক ভূগোলের মানসিক মানচিত্রের ঐরূপ মনঃকল্পিত অঙ্করেখা প্রমাণে তুমি সেই পন্থা অবলম্বন কর!”

    আমি ঘুমাই নাই, জাগিয়া জাগিয়া যেন ঐরুপ স্বপ্ন দর্শন কোল্লেম; স্বপ্নে যেন ঐরূপ দৈববাণী শ্রবণ কোল্লেম। পরীক্ষা করা আবশ্যক। প্রভাতে গাত্রোত্থান কোরে নিয়মিত নিত্যকর্ম্মসমাপনান্তে বাসা থেকে আমি বেরুলেম; একাকীই বেরুলেম; মণিভূষণকেও সঙ্গে নিলেম না। মানসিক ভূগোলের মানসিক মানচিত্র! হাঁ, মুদিতনয়নে সেই মানচিত্র আমি দর্শন কোরবো।

    প্রতিজ্ঞা; প্রতিজ্ঞা-পালনে আমি সৰ্ব্বদাই তৎপর। মাণিকগঞ্জের লোকেরা যে স্থানটিকে মাণিকগঞ্জ বলে, যে পর্য্যন্ত মাণিকগঞ্জ সীমা দেয়, অনন্যমনে পরিমাণ কোত্তে কোত্তে পূৰ্ব্বদিকের সেই সীমা আমি অতিক্রম কোল্লেম; চোলেছি;—আপন মনেই চোলেছি;—পথের লোকেরাও চোলেছে, কোন লোককেই কোন কথা আমি জিজ্ঞাসা কোচ্ছি না, লোকেরাও কেহ কোন কথা আমারে জিজ্ঞাসা কোচ্ছে না; এক একজন কেবল আমার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছে, আমি তাদের দেখছি, সেটাও জানতে দিচ্ছি না; আড়ে আড়ে একটু একটু কটাক্ষপাত কোচ্ছি মাত্র। ঘর-বাড়ী দেখছি, বৃক্ষলতা দেখছি, ছোট বড় উদ্যান দেখছি, ছোট বড় সরোবর দেখছি, রকমারি মনুষ্য দর্শন কোচ্ছি, গরু, বাছর, ছাগল, কুকুর, বিড়াল ইত্যাদি নানাপ্রকার জীবজন্তুও দর্শন কোচ্ছি, মনে কোন প্রকার নূতন ভাবের উদয় হোচ্ছে না। অনেকদূর গিয়ে একটি লোককে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “এ গ্রামের নাম কি?” লোক উত্তর কোল্লে, “মাণিকগঞ্জ।” তখন আমি মনে কোল্লেম, এই বটে সেই কথা। মানসিক ভূগোলের মানসিক মানচিত্র। এই বটে সেই কথা।

    বেলা দুই প্রহরের পূর্ব্বে বাসায় ফিরে এলেম। কোথায় গিয়েছিলেম, কাহাকেও বোল্লেম না;—মণিভূষণকেও না। ক্লান্ত হয়েছিলেম, বৈকালে আর কোথাও গেলেম না; রাত্রে আমার কোথাও যাওয়া ছিল না, বাবুদের সঙ্গে খানিকক্ষণ খোসগল্প কোরে নির্দ্দিষ্ট স্থানে শয়ন কোল্লেম।

    দ্বিতীয় প্রভাতে স্থানের দক্ষিণসীমায় পরিভ্রমণ। পূৰ্ব্বদিনের যে ভাব, এ দিনেও সেইরূপ। তৃতীয় দিবসে পশ্চিমসীমা, চতুর্থ দিবসে উত্তরসীমা উলঙ্ঘন। ডাকের কথায় যতদূরে যাই, ততদূর মাণিকগঞ্জ। মানসিক ভূগোলের মানসিক মানচিত্র।

  • তৃতীয় কল্প : আর এক আবর্তন

    তৃতীয় কল্প : আর এক আবর্তন

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    তৃতীয় কল্প : আর এক আবর্তন

    ভারতবর্ষের উত্তরে গিরিরাজ হিমালয়; পুরাণে পাওয়া যায়, হিমালয়ের উপর দিয়ে স্বর্গে যাবার পথ। আমি মাণিকগঞ্জের উত্তরে এসেছি; এখানে স্বর্গের পথ নাই; এখানে যদি আমি অমরকুমারীর সন্ধান পাই, এখানে যদি আমি অমরকুমারীর দর্শন পাই, তা হোলে এই স্থানকেই আমি স্বর্গধাম বিবেচনা কোরবো। যেখানে অমরকুমারী আছেন, সেই স্থানটি আমার পক্ষে স্বর্গ। কেন না, অমরকুমারী আমার হৃদয়-মন্দিরের দেবী। যেখানে দেবীর অধিষ্ঠান, সেই স্থানটিই সুপবিত্র ধর্গধাম।

    মাণিকগঞ্জের উত্তরসীমা অতিক্রম কোরে অনেকদূর আমি এসেছি; সীমা অতিক্রম হয়ে গেছে, তথাচ আমি মাণিকগঞ্জে। উত্তরদিকের এই অংশে পথের ধারে ধারে বড় বড় প্রাচীন বৃক্ষ, স্থানে স্থানে বড় বড় বাগান; এক একটা বাগানের মাটি আচোট; বোধ হয়, সে মাটিতে হল-লাঙ্গল বিদ্ধ হয় না; বৃক্ষগুলিও নিস্তেজ; প্রায় সমস্ত বৃক্ষের পত্রগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র,— রৌদ্রপক্ক,— অধিকাংশ পীতবর্ণ। এক একটি বৃক্ষ এককালে পত্রশুন্য; সর্ব্বাঙ্গে অর্দ্ধশুষ্ক মোটা মোটা গুলঞ্চলতা পরিবেষ্টিত; হঠাৎ দেখলে বোধ হয় যেন দীর্ঘবাহু দীর্ঘকায় দৈত্যকলেবরে বড় বড় অজাগর সর্প বেষ্টন কোরে রয়েছে। বৃক্ষরাজির তলভাগ অপরিষ্কার নয়; কেবল এক এক স্থানে বায়ুপ্রেরিত অর্দ্ধ-শুষ্ক পক্কপত্রের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্তূপ, অন্য কোনপ্রকার তৃণকণ্টকাদি সেখানে দৃষ্ট হয় না। স্থানে স্থানে বড় বড় পুষ্করিণী; অবস্থাদর্শনে বোধ হয়, বহুদিন বিনা সংস্কারে অল্পতোয়া, ঠাঁই ঠাঁই চড়া পড়া, ঠাঁই ঠাঁই হেলঞ্চকলম্বী দল জমাটবাঁধা; চড়ার উপর গরু চরে, ছাগল চরে, মৎস্যশীকারী দীর্ঘচঞ্চু সতর্ক সতর্ক বিহঙ্গেরা দামের ঝোপে গা-ঢাকা হয়ে একটু দূরস্থ নির্ম্মল জলে শীকার লক্ষ্য করে; অনেকগুলি দীর্ঘ সরোবরের এইরূপ অবস্থা। সময়ে দুই তিন দিক দিয়ে ভাল ভাল ঘাট বাঁধা ছিল, সে সকল ঘাট এখন ভগ্নদশা প্রাপ্ত হয়ে বৃহৎ বৃহৎ কুম্ভীরের চর্ম্মশূন্য দন্তপাতির ন্যায় বিকটদর্শন হয়ে আছে; এক এক সরোবর তীরে ভগ্নচূড়, ভগ্নগাত্র, ভগ্নসোপান বড় বড় শিবমন্দির, মন্দিরের নিকটে নিকটে ছোট ছোট পুষ্পকুঞ্জ,—কেবল কুঞ্জগুলিই ছোট ছোট, তাই নয়, কুঞ্জতরুগুলিতে যে সকল ফুল ফুটে আছে, সেই সকল ফুলগুলিও ছোট ছোট, বঙ্গের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালিকা-বিধবার ম্লানমুখের প্রায় অর্দ্ধশুষ্ক মলিন মলিন। একটু দূরে থেকে সে সকল ফুলের আঘ্রাণও পথিকলোকের নাসারন্ধে প্রবেশ করে না। মাণিকগঞ্জের এই অংশে প্রকৃতির এইরূপ মলিনমতি দর্শনে মনে হয়, স্থানের পূৰ্ব্বসমৃদ্ধির পরিচয় দিবার জন্যই ঐ নিদর্শনগুলি এখনো জেগে আছে, পূর্ব্বস্মৃতি জাগিয়ে রেখেছে। দেখলেই কষ্ট হয়।

    গ্রামের মধ্যে আমি প্রবেশ কোল্লেম। গ্রাম নিতান্ত ক্ষুদ্র নয়। অনেকগুলি বড় বড় বাড়ী জনশূন্য হয়ে খাঁ খাঁ কোচ্ছে। ইমারতের উপর বৃক্ষলতার সঙ্গে বনজন্তু বাসা কোরেছে। দেয়াল, খিলান, প্রাচীর ঠাঁই ঠাঁই ভেঙে ভেঙে পোড়েছে; এক একখানি বাড়ীতে দুটি পাঁচটি নরনারী দৃষ্ট হয়, সে সকল বাড়ীর পূৰ্ব্বাবস্থা নাই, দেখলেই বোধ হয়, ভূতের বাসা; কিন্তু অধিকারীরা সজীব। স্থানে স্থানে তৃণাচ্ছাদিত কুটীর। সে সকল কুটীরে গৃহস্থ আছে, কিন্তু সকলেই ম্রিয়মাণ, গ্রাম্য কোলাহল শ্রুতিগোচর হয় না, বালক-বালিকার আনন্দধ্বনি শুনা যায় না, যদি কিছু শুনা যায়, সে কেবল সায়ং-শৃগালের চীৎকারধ্বনির ন্যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিশুর ক্রন্দনধনি।

    বিষণ্ণনয়নে ইতস্ততঃ দৃষ্টিসঞ্চালন কোত্তে কোত্তে বিষণ্ণবদনে বিষণ্ণহৃদয়ে মন্থরগতিতে আমি অগ্রসর হোতে লাগলেম। পথে এতক্ষণ একটিও মনুষ্য দৃষ্ট হয় নাই, এই সময় আমার সম্মুখে দুটি লোক। গ্রামের যেরুপ দুরবস্থা দর্শন কোল্লেম, লোক-দুটির পরিচ্ছদে, চেহারায়, কথোপকথনে সে অবস্থার প্রতিরূপ দৃষ্ট হলো না। লোকেরা পরষ্পর বলাবলি কোচ্ছে, শুষ্কমালঞ্চে এমন সুন্দর ফুল কেমন কোরে ফুটেছে? একজন বোল্লে, “প্রকৃতির খেলা। এক একটি ফুলগাছে যখন ফুল হয়, তখন সে সকল গাছে একটিও পাতা থাকে না; শুঙ্কবৃক্ষে সুবাসিত সুন্দর পুষ্প প্রস্ফুটিত হয়ে সুগন্ধে দশদিক আমোদিত করে। অমন যে দেবদুর্ল্লভ পদ্মফুল, ঘৃণাকর কর্দর্য পঙ্কে সেই পদ্মফুলের জন্ম!” যে মুখের এই কথা, বিস্মিত নয়নে সেই মুখের দিকে চেয়ে দ্বিতীয় ব্যক্তি বোল্লে, “তাই ত ভাই! তুমি ঠিক কথা বোলেছে! শুষ্কবৃক্ষে সুন্দর ফুল! পঙ্কহ্রদে পদ্মফুল! তেমন সুন্দরী মেয়েটি এমন জায়গায় কেমন কোরে এলো? যারা এনেছে, তারা কম লোক নয়! যেমন জায়গায় শোভা পায়, তেমন জায়গায় রাখলে দশজনের চক্ষে পোড়বে, দশজনের চক্ষে পড়ে, সেটা তাদের মতলব নয়, নিশ্চয়ই দুষ্ট মতলব!”

    প্রথম ব্যক্তি একটু দম্ভ কোরে বোল্লে, “সে কথা আর বোলতে? ভয়ানক দুষ্ট মতলব! জান না বুঝি তুমি? শুনেনি বুঝি কিছু? মেয়েটিকে তারা বেচে ফেলবে! দাম ধার্য্য হয়েছে দু হাজার টাকা! ও পাড়ার সেই বংশী পোদ্দার দু হাজার টাকা পণ দিয়ে সেই মেয়েটিকে কিনে নিবে। কথাবার্ত্তা সব ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছে, কেবল লেখাপড়া বাকী। লোকে যেমন দলীল লিখে দিয়ে জমি-জায়গা বিক্রী করে, সেই মেয়েটিও সেই রকমে খোস-কওলায় বিক্ৰী হবে! বংশী পোদ্দারের বড়ই কপালজোর! দু হাজার টাকায় সাক্ষাৎ লক্ষ্মী নিয়ে ঘরে বাঁধবে!”

    এই সব কথা বলাবলি কোত্তে কোত্তে সেই দুটি লোক সরাসর পশ্চিমদিকে চোলে গেল। আমি বোলেছি, দুটি লোক আমার সম্মুখে। ঠিক সম্মুখে নয়, তারা যখন আসে, আমি তখন একটা প্রকাণ্ড বৃক্ষের অন্তরালে দাঁড়িয়ে ছিলেম, লোক-দুটিকে দেখে আরও একটু সাবধান হয়ে লুকিয়ে ছিলেম; তারা আমারে দেখতে পায় নাই, আমি কিন্তু তাদের ঐ কথাগুলি স্পষ্ট শুনে রেখেছি। আমার চক্ষু বরং সকলদিকে ঘোরে না, কর্ণ কিন্তু সকলদিকেই থাকে। একটু নিকটে দু-তিনজনে ফুসফুস কোরে কথা বোল্লে আমি শুনতে পাই; তাদের সব কথা আমি শুনতে পেয়েছি। তারা চোলে গেল; কথা বলাবলি কোত্তে কোত্তে অনেকদূর এগিয়ে গেল; শেষে তারা আর কি কি কথা বোল্লে, সেগুলি শুনতে পেলেম না।

    পঙ্কজলে পদ্মফুল! কোন পদ্মের কথা এরা বোলে গেল?—বোধ হোচ্ছে যেন আমারি হৃদয়-সরোবরের পদ্মফুল! আমি যেন জানতে পাচ্ছি, এইখানেই আমার ইষ্টসিদ্ধির সম্ভাবনা আছে; আমার মন যেন আমারে বোলছে, এই গ্রামেই অমরকুমারী আছেন। একবার মনে হলো, পশ্চাতে ছুটে গিয়ে লোকদুটিকে জিজ্ঞাসা করি, কোথায় সেই পদ্মফুল;—কতদিন হলো সে পদ্ম এখানে ফুটেছে, বাহিরের লোকে যদি একবার সেই পুষ্পটি দর্শন কোত্তে অভিলাষী হয়, অভিলাষ পূর্ণ হোতে পারে কি না?

    মনে হলো এই রকম, কিন্তু তাড়াতাড়ি কার্য্য করা ভাল নয়, এই বিবেচনায় লোক দুটির সঙ্গ আমি নিলেম না; গ্রামে যখন এসেছি, একটু সূত্র যখন পেয়েছি, তখন অবশ্যই অন্য কোন সূত্রে বিশেষ বৃত্তান্ত জানতে পারা যাবে, এইরূপ স্থির কোরে, বৃক্ষান্তরাল থেকে বেরিয়ে গ্রামের দিকে আরো খানিকদূর অগ্রসর হোলেম। সেদিকে ভাঙাবাড়ী কম, খানকতক ছোট ছোট নূতন বাড়ী কতক কতক ইষ্টকালয়, কতক কতক তৃণপত্রালয়। রাস্তার বামদিকে পূৰ্ব্ব-পশ্চিমে লম্বা একখানা বৃহৎ বাড়ী দেখতে পেলেম, সেই বাড়ীখানা বহুদিনের পুরাতন, অর্দ্ধেকের অধিকাংশ অব্যবহার্য্য, পূৰ্ব্বদিকের অল্পাংশ মাত্র। নূতন মেরামত করা হয়েছে, কপাট-জানালা বদল করা হয় নাই, এক একটা জানালা গরাদে-শূন্য, কীট-জীর্ণ, ভগ্নকপাটে ঢাকা। বোধ হলো, সেই অংশে মানুষ আছে। ছাদের উপর থেকে লম্বিতভাবে খানকতক ধুতিশাড়ী রবিতাপে বিস্তৃত ছিল, সেই নিদর্শনেই আমি বুঝলেম, সেই অংশে মানুষ আছে। একটু তফাতে দাঁড়িয়ে সেই বাড়ীখানার দিকে আমি চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলেম। দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় দেখি একজন অর্দ্ধবৃদ্ধ ব্রাহ্মণ একটি গাভীর বন্ধনরঞ্জু ধারণ কোরে সেই পথ দিয়ে চোলে আসছে, আমার নিকটবর্ত্তী হোলে কথা কবার ইচ্ছায় সেই ব্রাহ্মণকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “এ বাড়ীখানি কার?”

    ব্রাহ্মণ খানিকক্ষণ নীরবে আমার মুখপানে চেয়ে থাকলেন, পূর্ব্বেবঙ্গের ভাষা, পূৰ্ব্ববঙ্গের সুর সৰ্ব্বদা শ্রবণ করা আমার অভ্যাস ছিল না, অনুকরণ করাও আমার পক্ষে কঠিন ছিল, সুতরাং সেই ব্রাহ্মণ আমারে হয় তো পশ্চিমদেশী বোলে অবধারণ কোল্লেন; আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। তার পর যখন আমি দ্বিতীয়বার সেই ভাবে সেই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা কোল্লেম, তখন তিনি দেশীয় সুরে একটু শীঘ্র শীঘ্র বোল্লেন, “বাবুদের বাড়ী। বাবুরা পূর্ব্বে এখানকার বিখ্যাত জমিদার ছিলেন, প্রজা-লোকেরা এই বাড়ীর কর্ত্তাকে রাজা বোলে গৌরব কোত্তো, বাড়ীখানারও নাম ছিল রাজবাড়ী। বাবুদের বহু গোষ্ঠী, ক্রমে ক্রমে যমদণ্ডে বংশ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, জমিদারীও বিক্রি হয়ে গিয়েছে, এখন আছে কেবল তিনটি বাবু আর গুটিকতক বিধবা। অতি কষ্টে দিন চলে। বাবু তিনটির মধ্যে দুটি এখনো নাবালক, যিনি এখন কৰ্ত্তা, তিনিই ঐ নাবালক ভাইদুটির অভিভাবক। কর্ত্তার নাম রমণীবল্লভ ভৌমিক।” ঐ পর্য্যন্ত পরিচয় শ্রবণ কোরে, ব্রাহ্মণের হাত থেকে গরুর দড়িগাছটি গ্রহণ কোরে, পথের ধারের একটা গাছের ডালে আমি বেঁধে রাখলেম; মনে কেমন এক প্রকার নূতন রকম উৎসাহ এলো। ব্রাহ্মণকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “বংশী পোদ্দারের বাড়ী এখান থেকে কত দূর?”

    আমার প্রথম প্রশ্ন শ্রবণে ব্রাহ্মণ যেমন চকিতনেত্রে আমার বদন নিরীক্ষণ কোরেছিলেন, এবারেও সেই ভাব। ব্রাহ্মণ নিরুত্তর। ভাবের ভাব শীঘ্র আমি বুঝতে পাল্লেম না। সেই পুরাতন বাড়ীর ছাদের কাপড়গুলি বাতাসে উড়ে উড়ে নৌকার পালের মত ফুলে ফুলে উঠছিল, অন্যমনে সেই দিকে চেয়ে চেয়ে, জোরে একটি নিশ্বাস ফেলে ব্রাহ্মণ আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “তুমি বুঝি হুগলীজেলার ছেলে?”

    আমার প্রতি এই প্রকার অদ্ভুত প্রশ্ন হবে, ঐরুপ উদ্ভট প্রশ্নের উত্তর আমারে দিতে হবে, সে জন্য আমি প্রস্তুত ছিলেম না; কাজেই ছাড়া ছাড়া উত্তর দিলেম, “কোন জেলার ছেলে আমি, তা আমি বোলতে জানি না; থাকি এখন মুর্শিদাবাদজেলায়; বহরমপুর থেকে এসেছি, মাণিকগঞ্জের বংশী পোদ্দারের বাড়ী এখান থেকে কতদূর—”

    দুই তিনবার মস্তকসঞ্চালন কোরে ব্রাহ্মণঠাকুর বল্লেন “হুঁ—হুঁ—হুঁ! বংশী পোদ্দারকে এখন অনেক ছেলেই খুঁজবে! বংশী পোদ্দারের এখন জোরকপাল!”

    আমি।—কেন মহাশয়? বংশী পোদ্দারের জোরকপাল কি জন্য?

    ব্রাহ্মণ।—জন্যটা আমি এ জায়গায় বোলতে ইচ্ছা করি না। পথের মাঝখানে সব কথা গল্প করা ভাল নয়। তুমি দেখছি বংশীর একজন কুটম্বের ছেলে হবে, তোমার কাছে বোলতে পারি, কিন্তু এখানে পারি না। ঐ বাগানের ভিতর একখানি আটচালা ঘর আছে, সেইখানে চল। গরুটি আমার এইখানেই বাঁধা থাক।

    আমি।—(ব্রাহ্মণের সঙ্গে বাগানের আটচালার বারান্দায় গিয়া) কি মহাশয়, বংশীর কপালের কথা কি রকম?

    ব্রাহ্মণ।—কে জানে বাপ, কপালের কথা কেহই বোলতে পারে না। বংশী পোদ্দার যতদিন সোণা-রুপা বিক্রি কোত্তো, চোরেদের কাছে চোরামাল কিনে কিনে রাখতো, সেই বংশী এবার একটি মা-লক্ষ্মী কিনে ফেলবে।

    আমি।—মা-লক্ষ্মী কেনা কি রকম?

    ব্রাহ্মণ।—কে জানে বাপ! কোথাকার কারা আমাদের এই গ্রামে একটি মা-লক্ষ্মী এনে রেখেছে, মা-লক্ষ্মীর হাতে পায়ে পদ্মফুল থাকে, এ লক্ষ্মীটির আপাদমস্তক সর্ব্বাঙ্গ পদ্মফুলে গড়া!

    আমি।—বংশী পোন্দার সেই পদ্মফুলের লক্ষ্মীটিকে কার কাছে কিনলে?

    ব্রাহ্মণ।—কে জানে বাপু! কারা সব এসেছিল, তারা সব লক্ষ্ম-ব্যাপারী দরদস্তুর হয়ে গিয়েছে, দু হাজার টাকা পণ!

    আমি।— ব্যাপারীরা এখন আছে কোথা?

    ব্রাহ্মণ।— কে জানে বাপু! কোথা তারা চোলে গিয়েছে, এই মাসের শেষাশেষি এসে কাজটা নির্ব্বাহ কোরে দিয়ে যাবে, এই রকম আমি শুনেছি।

    আমি।—লক্ষ্মীটি এখন আছেন কোথায়?

    ব্রাহ্মণ।—তা আমি তোমায় বোলবো না।

    আমি।—লক্ষ্মীটির নাম কি?

    ব্রাহ্মণ।—তাও আমি বোলতে পারবো না। আমি একজন সাক্ষী আছি। কেনা-বেচার কথা যখন স্থির হয়, বাড়ীর লোকেরা সেই সময় আমায় ডেকেছিল, আমি একজন ঘটক ব্রাহ্মণ, ঐ রকম কাজ আমার, তাই জন্য আমায় ডেকেছিল, ব্যাপারীরা আমাকে দুটি টাকা প্রণামী দিয়ে গিয়েছে, কথা প্রকাশ করা নিষেধ।

    আমি।—(প্রণাম করিয়া) ঘটকঠাকুর আপনি? আপনাকে দণ্ডবৎ! দুটি টাকা তারা দিয়ে গিয়েছে, আমি আপনাকে পাঁচটি টাকা দিচ্ছি, দয়া কোরে সেই লক্ষ্মীর নামটি আমাকে বলুন।

    ব্রাহ্মণ।—নাম আমি কিছুতেই বোলবো না। শেষব্যাপারের দিন ব্যাপারীরা আমাকে আরও দশ টাকা দিয়ে যাবে, অঙ্গীকার আছে।

    আমি।—আচ্ছা, দশ টাকাই আমি দিচ্ছি, নামটি আপনি বলুন।

    ব্রাহ্মণ।—বাপুরে! তাও কি হয়? ঘটক আমি হোতে পারি, বিশ্বাসঘাতক হোতে পারি না।

    আমি।—আচ্ছা, লক্ষ্মীটি কোথায় আছেন, সে কথা আপনি বোলতে পারেন। তাতে আপনার কোন আপত্তি নাই? নাম দিলেও আপনি দশটাকা পাবেন, ঠিকানা দিলেও আপনি দশটাকা পাবেন, এখনি হাতে হাতে নগদ পাবেন; দুদিকেই আপনার লাভ; ঠিকানাটি আপনি বলুন।

    ব্রাহ্মণ।—(হস্ত বিস্তার করিয়া) অগ্রে দক্ষিণা দাও, তার পর—

    ক্রমশই বেলা বাড়তে লাগলো, ব্রাহ্মণের সঙ্গে বৃথা আর কথা-কাটাকাটি কোত্তে ইচ্ছা হলো না; টাকা আমার সঙ্গেই ছিল, ব্রাহ্মণের হস্তে তৎক্ষণাৎ আমি দশটি টাকা প্রদান কোল্লেম, প্রদান কোরেই ঠিকানাটি আবার জানতে চাইলেম।

    টাকাগুলি খুব শক্ত কোরে কোঁচার কাপড়ে বেধে রেখে, প্রফুল্লবদনে ব্রাহ্মণ বোল্লেন, “ঠিকানাটি তুমি তো জানতে পেরেছ; তবে আর আমার মুখে নূতন শুনবার আকিঞ্চন কেন? বর্ণ অপেক্ষা চক্ষের গুণ বেশী।”

    সবিস্ময়ে আমি মনে কোল্লেম, ঠকালে! ঠকালে! —ব্রাহ্মণ আমারে ঠকালে! ভারী ধূর্ত্ত! টাকাগুলি আগে হস্তগত কোরে এখন উলটো কথা বলে! বিস্ময় প্রকাশ কোরে তৎক্ষণাৎ তাঁরে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “সে কি মহাশয়! ঠিকানা আমি জানতে পেরেছি, এটা আপনি কি রকম কথা বলেন? কি আমি জানতে পেরেছি? বংশী পোদ্দারের বাড়ী?”

    ব্রাহ্মণ বোল্লেন “তা কেন? বংশী পোদ্দারের বাড়ী এ পাড়ায় নয়, সে বাড়ী এইখান থেকে দু তিন রশী দক্ষিণে। মা লক্ষ্মী এখন তত দূরে কেন যাবেন? নিকটেই আছেন।”

    অধিক আগ্রহে তৎক্ষণাৎ আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “নিকটে কোথায় মহাশয়?”

    ব্রাহ্মণ তখন যেন চঞ্চল হয়ে উত্তর কোল্লেন, “কেন? যে বাড়ীর সম্মুখে তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে, যে বাড়ীর ছাদে সেই সকল কাপড় শুকুচ্ছে, সেই বাড়ী, সেই বাড়ীতেই এখন মা-লক্ষ্মীর অধিষ্ঠান। যাই আমি,—আমার মা-লক্ষ্মীর হয় তো জলতৃষ্ণা পেয়েছে, অনেকক্ষণ জল দেখানো হয় নাই, দু-বেলা দুসের দুধ হয়, তৃষ্ণার সময় জল খেতে না পেলে, দুধ কম হবে। আমি একটু একটু আফিং সেবা করি, দুগ্ধ বিহনে দম ফেটে মারা যাব! চোল্লেম।”

    চঞ্চল হয়ে বাধা দিয়ে আমি বোল্লেম, “কিঞ্চিৎ অপেক্ষা করুন, একটু থাকুন, আমার আর একটি জিজ্ঞাস্য আছে, একটি মাত্র কথা। আপনার নামটি আমি জেনে রাখতে ইচ্ছা করি। যদি কোন বিশেষ আপত্তি না থাকে, অনুগ্রহ কোরে বলন, আপনার নামটি কি?”

    “শ্রীধনঞ্জয় ঘটক ন্যায়ভূষণ।”—সংক্ষেপে এইমাত্র উত্তর দিয়েই ঘটকমহাশয় বাগান থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এলেন, বৃক্ষশাখা থেকে দড়িগাছটি খুলে, গাভীটি নিয়ে অন্যদিকে চোলে গেলেন। ঐ গাভীটি তাঁর মা-লক্ষ্মী। আফিংখোর গোস্বামীদের কাছে দুগ্ধবতী গাভীগুলির যথেষ্ট আদর। আমি সন্তুষ্ট হোলেম। আশার অতিরিক্ত ফল আমি লাভ কোল্লেম। বংশী পোদ্দারের বাড়ীর তত্ত্ব লওয়া তখন আর অবশ্যক বিবেচনা কোল্লেম না; বেলা অধিক হয়েছিল, বাসায় ফিরে চোল্লেম।

    বাসায় আমি পৌঁছিলেম। নিত্যই আমি বেড়াতে যাই। কোথায় গিয়েছিলেম, কি কি কাজ কোরে এলেম, কেহই কিছু জিজ্ঞাসা কোল্লেন না, কাহারও কাছে আমারে কিছু কৈফিয়ৎ দিতে হলো না, অধিক বেলায় স্নান আহার কোরে কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম কোল্লেম, বৈকালে আর কোথাও বেড়াতে বেরুলেম না, সামান্য সামান্য কার্যে দিনমান কেটে গেল।

    রাত্রে আমার দৈনিক কার্যের আলোচনা। পতিতপ্রায় গ্রামে দুটি গ্রাম্যলোকের কথোপকথন। “কদর্য্য পঙ্কে পদ্মফুল,” এই কথা যখন তাঁরা বলেন, আক্ষেপ কোরে যখন তাঁরা সেই কথাটির একটু একটু ব্যাখ্যা করেন, তখনি আমি বুঝেছিলেম, আমার পদ্মমুখী অমরকুমারীই তাঁদের সেই রূপক-বর্ণিত পদ্মফুল। কোথায় সেই পদ্মফুল, সে ক্ষেত্রে সেটি আমি নির্ণয় কোত্তে পারি নাই। গ্রামের মধ্যে ফুটেছে, পূর্ব্বে ফুটে নাই, নূতন ফুটেছে, এইটুকু মাত্র বুঝেছিলেম; বিধাতার অনুগ্রহ, গো-স্বামী-ঘটকের সঙ্গে সাক্ষাৎ। পরে দুটি ভদ্রলোকের বাক্যসঙ্কেতে বংশী পোদ্দারের নাম পাওয়া গিয়েছিল, বংশী পোদ্দারের নামের উল্লেখ ধনঞ্জয় ঘটকের বাক্যঝুলীর গ্রন্থি শিথিল। অনেক তত্ত্ব অবগত হওয়া গেল। এখন যদি—কল্যই যদি আমি ঢাকায় চোলে যাই বহরমপুরের রূবকারি অবশ্যই এসেছে,—এখন যদি আমি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দাম কোরে মণিভূষণের দ্বারা পুলিস মোতায়েনের প্রার্থনা করি, মঞ্জুর হোতে পারে, অবশ্যই সে প্রার্থনা মঞ্জুর হবে, কিন্তু এখনো আমার সব অনুমানের উপর নির্ভর; আনুসঙ্গিক কতকগুলি তত্ত্ব যদিও এখন আমার পরিজ্ঞাত, তথাপি নামটি পাওয়া গেল না। পুলিশ মোতায়েন নিয়ে যদি আমি এখন সেই অন্ধভগ্ন বাড়ীতে রমণীবল্লভের অন্দরমহলে অমরকুমারীর অন্বেষণে যাই, সেই পদ্মফুলটি—ঘটকমহাশয়ের সেই লক্ষ্মীদেবীটি সত্য যদি অমরকুমারী না হন, তা হোলে পরিণাম কি দাঁড়াবে! পুলিসের লোকেরা ফিরে যাবে, ম্যাজিষ্ট্রেটের হুজুরে রিপোর্ট দিবে, দরখাস্তকারী মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন হবে, চক্রঘূর্ণনে শুভকল্পনা পেষিত হয়ে যাবে!—না, সে কাৰ্য ভাল নয়। সূক্ষ্মানুসূক্ষ্মরূপে মূলতত্ত্বটি জানা উচিত। রমণীবল্লভের বাড়ীর সেই পদ্মফুলটি সত্য সত্য আমাদের অমরকুমারী কি না, সৰ্ব্বত্র সৰ্ব্বপ্রযত্নে সেই তত্ত্বটি নিঃসন্দেহে নির্ণয় করা আবশ্যক।

    নির্ণয় করবার উপায় কি?—হয় স্বচক্ষে অমরকুমারীকে দর্শন করা, না হয় অন্য কোন উপায়ে অন্য কাহার দ্বারা সেই বিদেশিনী কন্যার নামটি অবগত হওয়া। এই দুটি উপায় আছে; কিন্তু আপাততঃ ঐ দুইটি আমার পক্ষে অসম্ভব হোচ্ছে। আমি একজন অপরিচিত, নূতনলোকের বাড়ীর অন্দরে প্রবেশ কোরে একটি বিদেশিনী কুমারীকে দেখে আসবো, এ কথা মনে করাও পাগলামী; আমার হয়ে আর একজন সেই নামটি জেনে এসে আমারে জানাবে, এমন আশাই বা কি প্রকারে করা যায়? এ অঞ্চলে কেহই আমারে জানে না, কেহই আমারে চিনে না, কারেই বা আমি অনুরোধ কোরবো? কেই বা আমার কথা রাখবে? কেনই বা রাখবে? বড়ই গোলমালে ঠেকলেম। একগাছি সূক্ষ্ম সূতার উপর আমার তখনকার আশা-ভরসা ঝুলতে থাকলো।

    আদালতের সাহায্য নিয়ে অমরকুমারীর অনুসন্ধানে আমি এসেছি, ক্রমশই দিন গত হোচ্ছে, আসল কাজ কিছুই হোচ্ছে না। মনে মনে আমি জানতে পেরেছি, তিনটি লোকের মুখে অবস্থাগত-প্রমাণে মনে মনে আমি বুঝতে পেরেছি, অমরকুমারী এইখানে আছেন; কিন্তু আমার মনের সঙ্গে আইন-আদালতের সম্পর্ক নাই। আইনের মানরক্ষা, আদালতের সন্তোষবিধান আর আমার অন্তরের শান্তিবিধান, এই তিনটি একত্র না হোলে কার্য্য সিদ্ধ হবে না, সকলেই এটি বুঝতে পাচ্ছেন। সে সিদ্ধি কত দূর?

    আর তিন দিন অতিবাহিত। সে তিন দিন আমি কেবল উপায় অবধারণে ব্যাপৃত থাকলেম; বাসা থেকে কোথায়ও বাহির হোলেম না; যা কিছু জানতে পাচ্ছি, আপনার মনে মনেই রাখছি; হরিহরবাবুকেও জানাচ্ছি না, মণিভূষণকেও কিছু বোলছি না। এ ভাবটাও ভাল নয়। একজনের বুদ্ধিতে সকল যুক্তি যোগায় না, তন্নিমিত্তই অপরের পরামর্শগ্রহণ আবশ্যক হয়। আমি মনে কোল্লেম, যতটুকু জেনেছি, হরিহরবাবুকে বলি। আবার ভাবলেম, কাঁচাকথার উপর জোর দাঁড়াবে না, হরিহরবাবু আমার কথার উপর বিশ্বাসস্থাপন কোরবেন না, আমার কেবল কাঁচাবুদ্ধির পরিচয় দেওয়া হবে মাত্র; আর একটু অগ্রসর হওয়া ভাল; কি ভাবে অগ্রসর হওয়া যায়, সেটিও মনে মনে অবধারণ কোল্লেম।

    মুর্শিদাবাদ থেকে যখন আমরা আসি, তখন তিন প্রস্থ ছদ্মবেশ, দুই যোড়া পিস্তল, আর গুলীবারুদ আমার সঙ্গে ছিল, এইবার ছদ্মবেশধারণের প্রয়োজন উপস্থিত। চতুর্থদিবসে অপরাহ্নে বাসা থেকে আমি বেরুলেম, একপ্রস্থ ছদ্মবেশ আমার সঙ্গে থাকলো। যে বাগানের আটচালায় ধনঞ্জয় ঘটকের সঙ্গে আমার কথাবার্ত্তা হয়েছিল, সন্ধ্যা হয় হয়, এমন সময় সেই বাগানে গিয়ে আমি পৌঁছিলেম। আটচালায় উঠলেম না, যে দিকে সারি সারি অনেকগুলি আম্রবৃক্ষ, সেই দিকে গিয়ে অতি সাবধানে বসন-পরিবর্ত্তন কোল্লেম। স্ত্রীলোকের বেশ। বক্ষ-আবরণের যোগ্য কাঁচলিধরনের ছোট একটি জামা; যেন অনেকদিনের ব্যবহার করা, একটু একটু মলিন, ঠাঁই ঠাঁই একটু একটু দাগ; পরিধান একখানি আধময়লা শাড়ী; মাথায় পরচূলকবরী; অলঙ্কারের মধ্যে কেবল দুহাতে দুগাছি পিতলের বালা।

    বেশ পরিবর্তন বেশ হলো, রূপ পরিবর্তনে কতদর কৃতকার্য হোলেম, সেটি আমি নিজে জানতে পাল্লেম না। সন্ধ্যার পরেই আকাশে চন্দ্রোদয় হলো, আমার পুরুষবেশের সজ্জাগুলি একখণ্ড ক্ষুদ্রবস্ত্রে বন্ধন কোরে একটি পুটলি প্রস্তুত কোল্লেম; সেই পুটলিটি কক্ষে রেখে, বাগান থেকে বেরিয়ে, বাগানের ফটকের ধারে এসে দাঁড়ালেম। সম্মুখেই রাস্তা; রাস্তার পরেই একটা পুষ্করিণী। সবে মাত্র সন্ধ্যা অতীত হয়েছে, রাত্রি হয় নাই, দিব্য জ্যোৎস্না, গ্রামের দুটি একটি স্ত্রীলোক সেই সময় সেই পুষ্করিণীতে জল নিতে এলো, তফাৎ থেকে আমি দেখলেম; পায়ে পায়ে এগিয়ে এগিয়ে ঘাটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেম। ঘাটে তখন একটি মাত্র স্ত্রীলোক; গাত্রপ্রক্ষালন কোরে জলকুম্ভ-কক্ষে সিক্তবদনে সেই স্ত্রীলোকটি ঘাটের চাতালে এসে উঠলো; ঠিক চাতালের ধারেই আমি; আমারে দেখে সেই স্ত্রীলোক আমার মুখের কাছে একটু হেঁট হয়ে কেমন একরকম নূতন সুরে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “কে গা তুমি?”

    মুখে আমার ঘোমটা ছিল না, বুকে আমার কাঁচুলি ছিল, মুখের কথা না শুনে, চেহারা দেখে, পরিচ্ছদ দেখে, হঠাৎ কাহারো মনে হোতে পারে খোট্টার মেয়ে। সেই স্ত্রীলোক আমারে বাস্তবিক খোট্টার মেয়ে বিবেচনা কোরেছিল কি না, তা আমি বোলতে পারি না; বাংলা কথাতেই আমি উত্তর দিলেম, “আমি বিদেশিনী, এই গ্রামে নূতন এসেছি, আশ্রয় পাচ্ছি না, পথে শুনলেম, এইখানে একখানি রাজবাড়ী আছে, বিদেশী গরিব-দুঃখী দৈবাৎ এখানে এসে উপস্থিত হোলে সেই বাড়ীতে আশ্রয় পায়। তাই শুনেই আমি এদিকে আসছি, কোথায় সেই রাজবাড়ী, কোন দিকে যেতে হবে, তুমি যদি বোলে দাও, তবেই—”

    স্ত্রীলোকটি অর্দ্ধবয়সী। আমার কথা শুনে সে যেন একটু কাতরভাবে বোল্লে, “আর বাছা রাজবাড়ী। রাজাদের কি আর সে কাল আছে? যমদণ্ডে সব গিয়েছে, সব গিয়েছে। বিধাতা সব কোত্তে পারেন! রাজলক্ষ্মীও ছেড়ে গিয়েছেন! তা তুমি এসেচো, থাকতে পাবে, এসো আমার সঙ্গে। সেই বাড়ীতেই আমি থাকি, কাজকর্ম্ম করি, বড়-বৌমা ভালবাসেন, সেই খাতিরেই থাকি; অনেক দিন আছি, ছেড়ে যেতেও মন চায় না। এসো তুমি আমার সঙ্গে।”

    আমি বুঝতে পাল্লেম, ঐ স্ত্রীলোক সেই রাজবাড়ীর দাসী। সে দিন আমি যে বাড়ীখানা দেখে গিয়েছিলেম, আধখানা ভাগা, আধখানা নূতন মেরামত করা, দাসী আমারে সঙ্গে কোরে সেই বাড়ীর ভিতর নিয়ে গেল, প্রথমেই বৌমার কাছে নিয়ে হাজির কোল্লে।

    ধনঞ্জয় ঘটকের মুখে শুনেছিলেম, তিনটি ভাই এখন এই বাড়ীর মালিক। ছোট দুটি নাবালক, বড়টি এখন কৰ্ত্তা। সেই কৰ্ত্তাটির গৃহলক্ষ্মী ঐ বৌমা। দাসীর মুখে আমার সংক্ষিপ্ত পরিচয় শুনে বৌমা আমারে কত কথাই জিজ্ঞাসা কোল্লেন, দুঃখিনী দেখে কতই দয়ার কথা বোল্লেন, মুখটি বুজে চুপটি কোরে সব কথাগুলি আমি শুনলেম; প্রত্যয় জন্মিল, যথার্থই এটি গৃহলক্ষ্মী; কথাগুলিও যেমন মিষ্ট, ব্যবহারও সেইরূপ কোমল। বৌমা আমারে নিশাকালে সেই বাড়ীতে আশ্রয় দিতে সম্মত হোলেন, মনে মনে আনন্দ অনুভব কোরে আমি আশ্বাস প্রাপ্ত হোলেম।

    শুনেছিলেম ভৌমিক; ভৌমিকেরা ব্রাহ্মণ হয়, সে কথাও শুনেছিলেম; আহারাদি সম্বন্ধে মনে কোন দ্বিধা রাখলেম না, বৌমার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্প কোরে একটি শূন্য ঘরের মধ্যে খানিক আমি বিশ্রাম কোত্তে লাগলেম; বৌমা সেই সময় কার্য্যান্তরে অন্য ঘরে চোলে গেলেন।

    ব্যাকরণ ভুল হবে না, সেই শূন্য ঘরে আমি একাকী। যাঁরা ব্যাকরণ জানেন “একাকিনী” কেন বোল্লেম না, সেই তর্ক উপস্থিত কোরে তাঁরা আমারে তিরস্কার করুন, সেই শূন্যঘরে আমি একাকী। বৌমার আদেশে সেই দাসী আমারে কিছু জলখাবার এনে দিলে, আমি জল খেলেম। পাত্রগুলি নিয়ে দাসী যখন চোলে যায়, তখন আমি মনে কোল্লেম তারে কিছু জিজ্ঞাসা করি, জিজ্ঞাসা করবার উপক্ৰম কোচ্ছিলেম, দুটি একটি কথা মুখে এনেও ছিলেম, আমার মুখের দিকে চেয়ে দাসী বোলে গেল, “বোসো বাছা! বোসো বাছা! আমি আসছি।”

    দাসীটির নাম রেবতী। কথাবার্ত্তায় রেবতীকে নিতান্ত ছোটলোকের মেয়ে বোলে বোধ হয় না। রেবতীর সততার কথা মনে মনে আমি ভাবছি, বৌমার দয়ার কথা মনে আমি আলোচনা কোচ্ছি, দশটাকা দিয়ে ধনঞ্জয় ঘটকের কাছে যে কথাটি আমি কিনে নিয়েছি, সেই কথাটি সত্য কি না, সেই ব্যাপারে আমি ঠোকেছি কি না, সন্দেহে সন্দেহে তাই তোলাপাড়া কোচ্ছি, রেবতী এলো। ইসারায় আমি তারে দরজাটা ভেজিয়ে দিতে বোল্লেম, ইসারা অনুসারে কার্য্য কোরে রেবতী আমার কাছে এসে বোসলে।

    আমি চাই রেবতীর মুখপানে, রেবতী চায় আমার মুখপানে, কথা হয় না। অগ্রে কি আমি বোলবো, চিন্তা কোরে অবধারণ কোচ্ছি, মনের আসল কথাটি প্রথমেই প্রকাশ করা উচিত কি না, ভাবছি, মৌনভঙ্গ কোরে রেবতী জিজ্ঞাসা কোল্লে, “কি তুমি আমারে তখন বোলবে বোলছিলে? বল দেখি শুনি কথাটি কি?”

    আমি ভাবলেম, তাই ত! কি বলি? নূতন এসেছি, আশ্রয় চেয়েছি, আশ্রয় পেয়েছি, হঠাৎ যদি আমার সেই মনের কথা ভেঙে দিই, আমার কৌশলটিও হয় তো ভেঙে যাবে! বলি কি?—ভেবে চিন্তে সহসা জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “বাবু কোথায়?”

    রেবতী।— ছোট বাবুদুটি তাঁদের ঘরেই আছেন, বড়বাবু বাড়ী নাই।

    আমি।— কোথায় তিনি?

    রেবতী।—তিন দিন হলো, সহরে বেরিয়েছেন, নূতন একটা কারবার করবার ইচ্ছা আছে, সেই চেষ্টাতেই ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

    আমি।—রাজপুত্র তিনি, কারবারের জন্য ঘুরে ঘুরে বেড়াতে হয়, এতই কি হীনাবল হয়েছে?

    রেবতী।—অবস্থার শেষ নাই। তিনি তো তিনি, আমি—আমি তো একজন চাকরানী আমি যখন এই বাড়ীর অবস্থার কথা মনে করি চক্ষের জলে ভেসে যাই!

    আমি।—অকস্মাৎ এত দুরবস্থা হবার কারণ কি?

    রেবতী।—অকস্মাৎ নয়, ক্ৰমে ক্ৰমে দুর্দশা দাঁড়িয়েছে। মারীভয়ে বংশশেষ, বংশের সঙ্গে বিষয় শেষ। কৰ্ত্তা যখন মারা পড়েন, ছোট ছেলে-দুটি তখন খুব ছোট ছোট; বড়টির বয়স তখন বড় জোর ১৬/১৭ বছর; কর্ত্তাবাবুর শত্রুপক্ষ অনেক ছিল, সুযোগ পেয়ে বিষয়-আশয় সব তারা ফাঁকি দিয়ে নিয়েছিল, পরের হাতে মামলা, তাতেই অনেক টাকা বৃথা নষ্ট হয়ে গিয়েছে, কেবল মা-গিন্নীর নামে ছোট একখানি তালুক ছিল, সেইখানি আছে, তাতেই একরকম চলে, ক্রিয়া-কৰ্ম্ম চলে না, খাওয়া-পরা চলে, কাজে কাজেই এক আধটা নূতন নূতন কারবার না কোল্লে ঠাঁট বজায় রাখা ভার হয়।

    আমি।—তা তো বটেই! তা তো বটেই! কিন্তু লক্ষ্মীর সংসারে ততটা কষ্ট হয় না। যদিও কিছু কিছু হয়, লোকে সেটা টের পায় না। বিশেষ, এই বৌমাটি দেখছি সাক্ষাৎ লক্ষ্মী; ঐ লক্ষ্মীর দয়াগুণে দুঃখিনী বিদেশিনীরা আজিও এ সংসারে আশ্রয় পায়।

    রেবতী।—(বিস্ময়ে চাহিয়া) কেন তুমি এমন কথা বোল্লে? তুমি বিদেশিনী, তুমি আজ রাত্রে এই বাড়ীতে আশ্রয় পেয়েচো, সেই জন্যই কি?

    আমি।—না না না, শুধু সেই জন্যই নয়। আমি একটা দুঃখিনী বিদেশিনী, এমন দুঃখিনী বিদেশিনী কোথায় কত আছে, কে জানে? এ রকম অবস্থায় যে বিদেশিনী এখানে আসে, অক্লেশে এই বাড়ীতে আশ্রয় পায়।

    রেবতী।—এ সব তুমি কি কথা বোলছো? নাম আছে পদ্মপুকুর, পদ্মফুল নাই। এ বাড়ীতে এখন বিদেশিনীর অক্লেশে আশ্রয় পাওয়া, এটা তোমার কি রকম অনুমান?

    আমি।—অনুমান বল কেন, তোমাদের মা-লক্ষ্মী সুখে থাকুন, ঠিক কথাই আমি বোলছি; পদ্মপুকুরে পদ্মফুল আছে; সম্প্রতি একটি বিদেশিনী কুমারীও—

    রেবতী।—(বিস্ময়ে) ও মা গো! সেই কথা বুঝি তুমি বোলচো? সে কথা তুমি কেমন কোরে জানলে?

    আমি।—(অজ্ঞানতা জানাইয়া) কোন কথা? পদ্মফুলের কথা?

    রেবতী।—বল যদি, পদ্মফল বোলতে পারো, বটেও একটি পদ্মফুল,—পদ্মর মত একটি বিদেশিনী সম্প্রতি এই বাড়ীতে এসেছে।

    আমি।—আমি ত তবে ঠিক কথা ধোরেছি। পদ্মমফুলটি কি রকমে এসেছে?

    রেবতী।—পশ্চিমদেশের তিনজন লোক একটি সুন্দরী মেয়েকে এই বাড়ীতে রেখে গিয়েছে।

    আমি।—রেখে তারা কোথায় গিয়েছে, সে কথা তুমি কিছু শুনেছো?

    রেবতী।—বাবু হয় তো শুনে থাকবেন, আমি কেমন কোরে শুনবো? দাসীর সঙ্গে তাদের সে সব কথা কেন হবে?

    আমি।—তবে সেই বিদেশীনা মেয়েটি এখানে কি অবস্থায় আছে?

    রেবতী।—আহা হা! বাছা কেবল বোসে বোসে রাতদিন কাঁদে, খায় না, ঘুমায় না, কথা কয় না, কেবল কাঁদে, কেবল কাঁদে!

    আমি।—আহা হা! আমি তোমাদের সেই বিদেশিনী মেয়েটিকে একবার দেখতে পাই না?

    রেবতী।—কেন পাবে না? মেয়েমানুষ তুমি, বিদেশিনী তুমি, বিদেশিনী মেয়েমানুষে দেখতে পাবে না কেন?

    আমি।—দেখাও মা, একবার তবে দেখাও, কেবল কাঁদে? আহা হা! সেই দুঃখিনীটিকে দেখবার জন্য আমার প্রাণ কেমন আকুল হয়ে উঠছে।

    রেবতী।—দেখে তুমি কি কোরবে?

    আমি।—কে কার কি করে তা তো তুমি জান। সেটাও বিদেশিনী, আমিও বিদেশিনী; সেটিও দুঃখিনী, আমিও দুঃখিনী, দুটিতে এক ঠাঁই মুখোমুখি কোরে বোসবো, দুঃখের দুঃখিনী। সমান সমান কষ্টভাগিনী একটি সঙ্গিনী হব, একরাত্রের জন্যও তোমাদের সেই বিদেশিনীটিকে একটু সান্ত্বনা দিব।

    রেবতী।—তা তুমি পারবে। তোমার যে রকম মধুরবচন, তোমার যে রকম দয়ার প্রাণ, তোমার যে রকম দুঃখের দশা, তাতে কোরে তুমি সেই দুঃখিনীর সঙ্গিনী হোতেও পারবে, মিষ্টকথায় সান্ত্বনা দিতেও পারবে। আনবো তারে এইখানে না তুমি সেই ঘরে যাবে?

    আমি।—হঠাৎ সেখানে আমার যাওয়াটা ভাল দেখাবে না, সেই বিদেশিনী যদি আমার কাছে আসতে ইচ্ছা করে, তারে বরং একবার এইখানেই এনে দাও, পার যদি এনে দিতে, তা হোলে তোমার কাছে আমি চিরজীবনের মত কেনা হয়ে থাকবো।

    রেবতী গেল। আমি তখন মনে মনে কত রকমের কত কথা আন্দোলন কোত্তে লাগলেম। নারীবেশে এসেছি, কণ্ঠস্বরে ধরা পড়বার ভয় ছিল। বিধাতা আমার প্রতি সদয় হয়ে আমার কণ্ঠে যেরূপ বর দিয়েছেন, বেশীবয়সে কি রকম হয় বলা যায় না, কিন্তু এই পঞ্চদশ বর্ষ বয়স পর্য্যন্ত স্বদেশের অল্পবয়স্ক বালিকাদের স্বরের সঙ্গে সেই স্বরে—আমার এই কণ্ঠস্বরের সুন্দর মিলন হয়, হরিদাস কথা কোচ্ছে, কিম্বা হরিদাসী কথা কোচ্ছে, প্রভেদ বুঝে কেহই কিছু ধোত্তে পারে না। অমরকুমারী আসছেন, এইবার জানা যাবে; আমার কণ্ঠস্বর শুনে অমরকুমারী আমারে হরিদাস বোলে চিনতে পারেন কি না, এইবার পরীক্ষা হবে। আগে আমি মুখ দেখাব না; স্থির কোরে রাখলেন, আগে আমি অমরকুমারীকে আমার মুখ দেখতে দিব না;—পরীক্ষা কোরে দেখবো, আজ রাত্রে অমরকুমারী আমারে চিনতে পারেন কিনা। এই সঙ্কল্পে চিত্ত দৃঢ় কোরে, চিবুকদেশ পর্য্যন্ত আমি ঘোমটা দিয়ে ঢেকে রাখলেম।

    বৌ সেজে আমি বসে আছি, পুঁটুলীটি আমার সামনেই ধরা আছে, ঘরের দেয়াল আমার পৃষ্ঠের অবলম্বন। সে বাড়ীতে আমি নূতন গিয়েছি, বৌমা ছাড়া আর আর যাঁরা যাঁরা বাড়ীতে আছেন, তাঁরা সকলেই বিধবা, সে কথা আমার শুনা হয়েছে; কিন্তু বৌমা ছাড়া আর কাহারো সঙ্গে আমার দেখা হলো না; কেহই আমারে দেখতে এলেন না। বঙ্গদেশের বিধাবাদের নারীজন্মের সমস্ত সাধ আহ্লাদ ফুরায়; সেই সঙ্গে হৃদয়ের কৌতুহলপ্রবৃত্তিও বিলুপ্ত হয়; ইহাই কি ঠিক? আমি নূতন গিয়েছি, কি রকম আমি, কৌতুহলবশে স্ত্রীলোকেরা অবশ্যই একবার দেখতে ইচ্ছা করেন; বাড়ীতে নূতন মানুষ গেলেই নারীমহলে সেই রকম হয়; আমি কিন্তু সেখানে সে রকম লক্ষণ কিছুই দেখলেম না, কেহই আমারে দেখতে এলেন না। আমাতে নূতনত্ব কিছুই নাই, বিদেশিনী তো বিদেশিনী, হয় তো ভিখারিণী হলেও হোতে পারি, এই ভেবেই হয় তো কেহ এলেন না। আমি যদি বহুমূল্য বসনভূষণে সজ্জিত হয়ে সে বাড়ীতে প্রবেশ কোত্তেম, উৎকলী বেহারারা যদি বিচিত্র পাল্কীর উপর বসাইয়া সেখানে আমারে নিয়ে যেতো, পাল্কীর আগে আগে যদি ঢালতলোয়ারধারী দুজন ব্রজবাসী দরেয়ান ছুটতো, ঘর্ম্মাক্তকলেবরা, গাছকোমর-বাঁধা দুজন দাসী যদি পাল্কীর পাছু পাছু দৌড়িত, তা হোলে বাড়ীর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা ছুটাছটি কোরে আমারে দেখতে আসতো; কেবল বাড়ীর লোক কেন, পাড়া-প্রতিবাসিনীরাও কৌতুকে কৌতুকে আমার কাছে এসে জমা হতো; সে জিনিস আমি নই, একজন দুঃখিনী বিদেশিনী মাত্র, কাজেই কেহ আমারে দেখতে এলো না; এলো না তো এলো না; না আসাই বরং আমার পক্ষে ভাল।

    বোসে আছি, ঘরের একধারে একটি প্রদীপ জ্বোলছে, আর একটি বিদেশিনী আসবেন, সেই আশায় ঘোমটা তুলে দরজার দিকে এক একবার চেয়ে দেখছি, বিদেশিনী এলেন; সঙ্গে সঙ্গে রেবতী।

    আমি অবগুণ্ঠনবতী। প্রবেশ কোরেই রেবতী যেন একটু চোমকে উঠে থোমকে দাঁড়ালো; চিবুকে অঙ্গুলীস্পর্শ কোরে বিস্ময়োক্তিতে সহসা বোলে উঠলো, “ও মা! এ কি গো! মেয়েমানুষকে দেখে মেয়েমানুষের লজ্জা! কি রকম বিদেশিনী। ঘোমটা-ঢাকা কলা-বৌ।”

    আমার মুখাবরণ বস্ত্রখানি তাদৃশ স্থূল ছিল না, দীপালোকে অবগুণ্ঠনের ভিতর দিয়ে বাহিরের বস্তু আমি দেখতে পাচ্ছিলেম, বিদেশিনী এলেন। বিদেশিনীর মুখখানি আমি দেখলেম; রেবতীকে পূর্ব্বে দেখা ছিল, রেবতীর; বিস্ময়-প্রকাশক মুখখানিও আমি দেখলেম, আমার দিকে চাইতে চাইতে বিদেশিনী আমার কাছে বোসলেন; হাতখানেক তফাতে রেবতীও চুপটি কোরে বসলো। প্রায় পাঁচ মিনিটকাল তিনজনেই আমরা নিস্তব্ধ।

    বিদেশিনীর বিস্ময়, রেবতীর বিস্ময়, আমার আনন্দ। বিদেশিনীর মুখখানি আমি দেখেছি, অন্তরানন্দে অন্তরে অন্তরে আমি আশার আনন্দময়ী মূর্তি আমি সন্দর্শন কোচ্ছি, বিদেশিনী আমার মুখ দেখতে পাচ্ছেন না। রেবতী দুই তিনবার আমার অবগুণ্ঠন-মোচনের জন্য অনুরোধ কোল্লে, সে অনুরোধে আমি বধির থাকলেম, রেবতী পাছে নিজেই খুলে দেয়, তাই ভেবে দুই হাতে অবগুণ্ঠনের অঞ্চলভাগ আমি টেনে টেনে চেপে রাখলেম। সুবিধা হলো। চাপামুখের কণ্ঠস্বর নিশ্চয়ই কিছু গম্ভীর হবে, কণ্ঠস্বর যাদের পরিচিত, কথা শুনে তারাও ঠিক বুঝে উঠতে পারবে না, সেইটি অবধারণ কোরে ধীরে ধীরে আমি বোল্লেম, “বিদেশিনী! আমি গণনা জানি; তুমি এখানে আছ, তাও জানি; তুমি আমার কাছে আসবে, তাও জেনেছিলেম; কেমন কোরে তুমি এখানে এসেছে, কারা তোমারে এখানে এনেছে, গণনা কোরে তাও আমি জানতে পেরেছি।”

    বিদেশিনীর মুখে এতক্ষণ কথা ছিল না, আমার কথাগুলি শুনে, সমধুরস্বরে, সমধুর মৃদ-কম্পিতস্বরে বোল্লেন, “আমার দুর্ভাগ্যের কথা তুমি জানতে পেরেছো, আমি তোমারে জানতে পাচ্ছি না, তোমার মুখখানিও দেখতে পাচ্ছি না; মুখখানি একবার খোলো, তোমার মুখখানি একবার আমি দেখি, তার পর তোমার সঙ্গে আমার কথা হবে।”

    অন্তরের ভাব অন্তরে রেখে পূৰ্ব্ববৎ মৃদুস্বরে আমি বোল্লেম, “যে সকল স্ত্রীলোক গণনা-বিদ্যা জানে, গণনার শেষফল পর্য্যন্ত সুসিদ্ধ না হোলে স্ত্রীলোকের কাছেও তারা মুখের কাপড় খোলে না; আমিও এখন মুখের কাপড় খুলবো না। আমার সঙ্গে তোমার কথা হবে। বিদেশিনী! কি কথা জানতে আমার বাকী আছে? এখানে এসে অবধি রাত-দিন তুমি কেবল কাঁদো; যারা এনেছে, এইখানে তোমারে রেখে তারা সোরে গিয়েছে, আবার তারা আসবে, সেইবার তোমার ভাগ্যের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ হবে। কেমন, এই সব কথাই ত তুমি বোলতে চাও?”

    উর্দ্ধ্বদৃষ্টিতে চেয়ে বিদেশিনী বোল্লেন, “পরমেশ্বর সাক্ষী, ঐ সব কথা আমি বোলবো না। আমার ভাগ্যের সঙ্গে সেই সকল লোকের কি রকম যুদ্ধ হবে, কেন আমি রাত-দিন কাঁদি, তোমার গণনা এই দুই প্রশ্নের কি রকম উত্তর দিতে পারে?”

    আর আমি বাগাড়ম্বর কোল্লেম না; দুই প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্টই আমি বোলে দিলেম, “তারা তিনজন। তারা তোমারে বেচে ফেলবার মন্ত্রণা কোরেছে। দু হাজার টাকা পণ ধার্য্য হয়েছে। খরিদ্দার এখানকার একজন বংশী পোদ্দার। সেই খরিদ-বিক্রয় উপলক্ষেই তোমার ভাগ্যযুদ্ধ। এই গেল এক কথা, দ্বিতীয়তঃ কোথায় তুমি ছিলে, কোথায় তুমি এসেছ, কারে তুমি হারিয়েছ, আর তার সঙ্গে দেখা হবে কি না, এর পর তোমার কি হবে, এই সব ভেবে ভেবেই রাতদিন তুমি কাঁদো। কেমন, এই সব কথার সঙ্গে তোমার মনের কথার মিলন হয়? এই সব কথাতেই তো তোমার ঐ দুই প্রশ্নের উত্তর হয়? আমার গণনা এই সব কথা বলে।”

    অবাক হয়ে রেবতী আমার ঐ সব গণনার কথা শুনছিল, আমি চুপ করবামাত্র অকস্মাৎ একটু উচ্চকণ্ঠে রেবতী বোলে উঠলো, “ও বাপু! এ মেয়ে তো কম মেয়ে নয়। এ সময়ে তো কম গণনা জানে না! যা যা বোলে দিলে, সব ঠিক! সব ঠিক! সব যেন রেবতীর কথাগুলি বিদেশিনীর কর্ণে গেল কি না, ঠিক আমি বুঝতে পাল্লেম না; রেবতীর মন্তব্য পূর্ণমাত্রায় প্রকাশ হতে না হতেই আমার মুখের অবগুণ্ঠনের দিকে চেয়ে বিদেশিনী আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “তোমার গণনা ঐ সব কথা বলে? বেশ গণনা তোমার! তোমার গণনা আর কি কথা বলে?”

    “আর কি বলে, শুনবে?” ঠিক আমার মনের কথাই বিদেশিনীর প্রশ্নে ব্যক্ত হলো, তাই বুঝেই মহোল্লাসে আমি প্রশ্ন কোল্লেম, “আমার গণনা আর কি বলে, শুনবে? আমার গণনা আরো বলে, তুমি মুক্ত হবে। বন্দিনী আছ, এ অবস্থায় তোমারে আর বেশীদিন এখানে থাকতে হবে না। তোমার ভাগ্যের সঙ্গে যারা যুদ্ধ কোত্তে চায়, যুদ্ধ তাদের হবে, কিন্তু এখানে হবে না; শীঘ্রই তুমি এখানকার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে।”

    রেবতীর মুখের দিকে বিদেশিনী চাইলেন, বিদেশিনীর মুখের দিকে অনিমেষে রেবতী চেয়ে রইল; রেবতীর চক্ষের কোণে দুই বিন্দু অশ্রু দেখা দিয়ে, মুখ বেয়ে বুকের উপর গোড়িয়ে পোড়লো; রেবতী বোলছিল, “আজ আমাদের বাবু এখানে থাকলে—”

    বৌমা এসে দেখা দিলেন। রেবতীর মুখের কথা মুখেই থেকে গেল। ঘরের এধার ওধার নেত্ৰ-সঞ্চালন কোরে ঈষৎ প্রফুল্লবদনে বৌমা বোল্লেন, “এই যে বেশ হয়েছে। দুটি বিদেশিনীই একঠাঁই! রেবতী আমাদের যোগাযোগটা জানে ভাল! নূতন বিদেশিনীর মুখখানি কেমন ঘোমটা-ঢাকা! বাঃ—ঘোমটাতে ঐ রূপখানি বেশ মানিয়েছে! কি গো বিদেশিনী!—তোমাদের দুটি বিদেশিনীকেই জিজ্ঞাসা কোচ্ছি, তোমাদের আলাপ-পরিচয় কেমন হলো?”

    দুটি বিদেশিনীই নিরুত্তর। বিস্ময়বিহ্বলা রেবতীর মুখেই ঐ প্রশ্নের উত্তর। বিস্ময়চমকে চেয়ে রেবতী বোল্লে, “মা গো মা! এমন বিদেশিনী দেখি নাই! এই নূতন বিদেশিনী চমৎকার গণনা জানে! এই ব্রজকিশোরীর আগাগোড়া সকল কথা এই নূতন বিদেশিনী একে একে গণনা কোরে বোলে দিলে! কজন এসেছিল, কত দাম হলো, কে খরিদ্দার হলো, এখানে থাকা হবে কি না হবে, সব কথাই নূতন বিদেশিনীর গণনায় উঠেছে। মেয়েটি দেখতে ছোট, কিন্তু গণনা বড় আশ্চর্য্য! আশ্চর্য্য গণৎকার!”

    বৌমা খানিকক্ষণ সুস্থির-দষ্টিতে আমাদের দিকে চেয়ে থাকলেন, চেয়ে চেয়ে আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “সত্যই কি তুমি গণনা শিখেচ? বল দেখি, আমাদের সংসারের এ দশা আর কতদিন থাকবে?”

    বিবেচনা না কোরেই আমি উত্তর দিলেম, “যে দিনে এই ব্রজকিশোরীর ভাগ্যযুদ্ধের অবসান হবে, সেইদিন আমি এই বাড়ীতে আর একবার আসবো, রাজলক্ষ্মীর কৃপাদৃষ্টি দর্শন কোরবো। গণনায় আমি জানতে পেরেছি, বাবু যদি পূৰ্ব্বপুরুষগণের ধর্ম্মপথ পরিহার না করেন, যারা বিপদে পড়ে, তাদের যদি সহায় হন, অবস্থাচক্রে মানুষের যেমন কুমতি ঘটে, বাবু যদি সেরূপ কুমতির দাসত্ব না করেন, তা হোলেই আপনার এই ধর্ম্মের সংসারে এ দুর্দিন কখনই স্থায়ী হবে না। আপনার তুল্য দয়াময়ী যে সংসারের লক্ষ্মী, সে সংসার অবশ্যই সৰ্ব্বসৌভাগ্যে সমুজ্জ্বল হবে।”

    কি যেন পূর্ব্বকথা স্মরণ কোরে বৌমা একটু বিস্ময় ভাব প্রকাশ কোল্লেন, মুখের ভাবেই সেই ভাবটি প্রকাশ পেলে, বাক্যদ্বারা কিছুই প্রকাশ হলো না। অনুমানে আমি বুঝলেম, ব্রজকিশোরীর ভাগ্যযুদ্ধের উদযোগপর্ব্বে হয় তো বাবু রমণীবল্লভ ভৌমিকের অপর পক্ষে সেনাপতিত্ব গ্রহণের উৎসাহ আছে, সেটা অধর্ম্ম, সেই কথাটা হয় তো সেই সময় বৌমার স্মরণ হলো, সেই স্মরণেই তাঁর বদনমণ্ডলে ঐরূপ বিস্ময়ভাব চিহ্নিত।

    প্রসঙ্গ চাপা পোড়ে গেল। রেবতীকে গৃহান্তরে প্রেরণ কোরে বৌমা আমাদের দুজনকে দুটি একটি কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেন, ব্রজকিশোরীর মুখে একটিও তো উত্তর পেলেন না, অবগুণ্ঠনের ভিতর থেকে আমি তাঁর জটিল প্রশ্নের অস্পষ্ট উত্তর দান কোল্লেম। তার পর আহারের আয়োজন। আহারান্তে শয়নের ব্যবস্থা। স্বতন্ত্র গৃহে আমি একাকী স্বতন্ত্র আহার কোল্লেম, স্বতন্ত্র গৃহে স্বতন্ত্র শয্যায় আমি একাকী স্বতন্ত্র শয়ন কোল্লেম। ব্রজকিশোরীর সঙ্গে সে রাত্রে আর আমার সাক্ষাৎ হলো না। মনে মনে যা আমি জেনে রাখলেম, তাই আমার ইষ্টমন্ত্র হয়ে থাকলো।

    কি?—পাঠকমহাশয় জিজ্ঞাসা কোত্তে পারেন, ইষ্টমন্ত্র হয়ে থাকলে কি? দেশের প্রথানুসারে লোকেরা লোকের কাছে ইষ্টমন্ত্র প্রকাশ করে না, আমিও প্রকাশ কোরবো না। ঠারে ঠারে এইটুকু মাত্র প্রকাশ থাকুক, যে পদ্মফুলটির অনুসন্ধানে এই ভগ্ন বাড়ীতে আমি প্রবেশ কোরেছি, এখানে সেই পদ্মফুলের নাম ব্রজকিশোরী। কারা দিয়েছে এই নাম, তা আমি জানতে পাল্লেম না। লোকেরা দিয়েছে কিম্বা পদ্মফুলটি নিজেই ঐ নামে পরিচয় দিয়েছেন, সে কথা কাহাকে জিজ্ঞাসাও কোল্লেম না; শুনে রাখলেম ব্রজকিশোরী। সে রাত্রে আমারে যদি কেহ আমার নাম জিজ্ঞাসা কোত্তেন, ঐ রকমে আমিও বোলতেম, আমার নাম সূর্যকিশোরী। পল্লীগ্রামে সকলেই প্রায় সূর্যোদয়ের সঙ্গে শয্যাত্যাগ করে, নিতান্ত শিশুকাল থেকে আমার চির-অভ্যাস উষাকালে গাত্রোত্থান করা। ঊষাআগমনের অগ্রেই আমার নিদ্রাভঙ্গ হয়। বাড়ীর কেহই যখন জাগরণ করেন নাই, সেই সময় আমি আমার কাপড়ের পুঁটুলীটি কক্ষে লয়ে উপর থেকে নেমে এলেম। রেবতী উঠেছিল, নীচের প্রাঙ্গণে রেবতীর সঙ্গে দেখা হলো; রেবতীকে বোল্লেম, “দেবতারা এ সংসারের মঙ্গল করুন, এই আশ্রমে নিরাপদে এক রাত্রি আমি আশ্রয় পেলেম, কৃতজ্ঞতা বিস্মৃত হব না; এখন বিদায় হোলেম। ভাগ্যে যদি থাকে, পুনরায় আর একবার সাক্ষাৎ হবে, বৌমাকে এই কথাগুলি তুমি বোলে রেখো। সূর্যোদয়ের পর রাস্তায় আমি বাহির হব না, ঊষার আবরণ থাকতে থাকতেই অন্য আশ্রয়ে আমি চোলে যাব। চোল্লেম।”

    খানিকক্ষণ থাকবার জন্য রেবতী আমারে বিস্তর অনুরোধ কোল্লে, সে অনুরোধ আমি শুনলেম না, রাজবাড়ীকে নমস্কার কোরে রাস্তায় বেরুলেম। তখন ঘোমটা ছিল না, ঊষা আমারে ঢাকা দিয়ে নিয়ে চোল্লো। যে বাগানে নারীবেশ ধারণ কোরেছিলেম, সেই বাগানে গিয়ে বেশপরিবর্তন কোল্লেম। আর তখন প্রচ্ছন্ন থাকার প্রয়োজন হলো না, গন্তব্যপথে যাত্রা কোল্লেম। তখনও উষা পূর্ব্বদিকে অল্প অল্প আরক্তপ্রভা। মনে আমার নূতন উৎসাহ, নূতন আশা, নূতন আনন্দ।

  • উপমহাদেশ

    উপমহাদেশ

    আল মাহমুদ

    [book-name]

    গ্রন্থকথা

    ‘উপমহাদেশ’ কবি আল মাহমুদ রচিত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার জীবনচিত্রকে আশ্রয় করে লেখা উপন্যাসটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা না গেলেও যুদ্ধের ভয়াবহতা, হিংস্রতা, যুদ্ধের মাঝে প্রেম, দেশপ্রেম সব কিছুরই প্রতিচ্ছবি সত্যনিষ্ঠ ভাবে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন লেখক। এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হিসেবেই বিবেচিত।

    মুক্তিযুদ্ধের এমন একটি দিক এ উপন্যাসে উঠে এসেছে যেদিকটা নিয়ে সাধারণত আলোচনা হয় না। ইতিহাসের প্রধান স্রোতের অনালোচিত এই দিকটি তুলে ধরাই এই উপন্যাসের একমাত্র সার্থকতা।

    কবি হাদী মীর। ঢাকায় পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলের লাইব্রেরিয়ান তিনি। ঢাকা যখন পুরোপুরিভাবে পাকিস্তানিদের দখলে চলে গেছে, চারিদিকে পাকিস্তানিদের অমানবিক অত্যাচার ও লুটপাটের কারণে লোকেরা ঢাকা ছেড়ে প্রথমে গ্রামে এবং গ্রামেও না টিকতে পেরে ভারতে পাড়ি দেন। সেই দলের একজন কবি সাহেব। তিনি তার স্ত্রীর থেকে বিছিন্ন হয়ে তার জন্য বেশ কিছু দিন অপেক্ষা করে থেকে ভারতে যাবার সিদ্দান্ত নেন। কবির বোন ও ভগ্নিপতি একজন মুক্তি যোদ্ধাকে দিয়ে চিঠি লিখে দিয়ে কবিকে খুব শীঘ্র ভারতে চলে যেতে বলেন। তিনি অন্য এক মুক্তিযোদ্ধার মাধ্যমে জানতে পারেন যে কবির স্ত্রী হামিদা নিরাপদে কলকাতায় পৌঁছে গেছে।

    ভৈরব ও আশুগঞ্জে যখন পাক হানাদরেরা এসে অত্যচার শুরু করলে সেখানকার সকলে নবাবপুরে এসে পালিয়ে বাঁচে এবং সেখান থেকেই নৌকায় করে ভারতে যাবার জন্য রওয়া দেয়। এদেরই সাথে কবি আছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা আনিস এদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। নৌকায় মোট ৩০জন লোক যেতে পারে কিন্তু সেখানে ৩২ জন্য ওঠার পরেও দুটি মেয়ে সীমা ও নন্দিনী এসে কান্না কাটি শুরু করে। সীমার স্বামী ঢাকায় গিয়ে আর ফিরতে পারে নি। সীমা একটা স্কুলের শিক্ষিকা। হিন্দুদের বাড়ীতে থাকাটা এখন খুব কঠিন হয়ে যাওয়াতে স্বামীর ফেরার অপেক্ষা না করে বোন নন্দিনীকে নিয়ে সে পথে বের হয়েছে। দুই বোন এসে অনেক কান্না কাটি করার পর কবি জোর করে আনিসকে বলে তাদেরও নৌকায় তুলে নেয়।

    কিছু দূর যাবার পর গুলির শব্দ শুনে সবাই খুব ভয় পেয়ে যায়। পাকিস্তান টহলদারের তাদের নৌকাটা অন্ধকারে দেখতে না পারলেও অনুমান করতে পেরেছে। অনেক সাবধানে তারা একটা ঘাটে এসে নৌকা ভিড়িয়ে উপরে উঠলে চারিদিক থেকে কিছু লোক তাদের ঘিরে ধরে। সবার হাতে অস্ত্র থাকলেও তারা মুক্তি বাহিনীর লোক নয়। নকশাল বাহিনীর লোক। অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধা সাথে আছে জানলে বিপদ হতে পারে ভেবে আনিস পানিতে ডুব দিয়ে পালিয়ে চলে যায়। নন্দিনীকে স্ত্রী বলে পরিচয় দিয়ে এবং কাছাকাছি কোন গ্রামে কবির পরিচিত আত্মীয়ের কথা বলে তাদের হাত থেকে বেঁচে যায় তারা।

    অন্ধকারের মাঝে লাইন ধরে একজন আর একজনের কাপড় ধরে পথ চলতে চলতে সকলে একটা মাঠের কাছে এসে পৌঁছায়। কিন্তু এখানে এসে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে যায়।

    সাথে যে কয়জন মহিলা ছিল তার সবাই নিম্ন শ্রেণীর কৃষক পরিবারে। এর মাঝে সীমা ও নন্দিনী সম্ভ্রান্ত পরিবারের,  তার উপর দেখতে সুন্দরী। রাজাকারদের সাথে কবির তর্কাতর্কির ফলে সবাইকে ছেড়ে দিয়ে কবি, সীমা ও নন্দিনীকে আটকে রাখে। সীমা ও নন্দিনীর পরনের শাড়ী খুলে কবিকে খুব শক্ত করে বেঁধে নির্জন গ্রামের একটি বাড়ীর ঘরে আটকে রাখে তাদের। কবির পাশের ঘরে সীমা ও নন্দিনীকে।

    কবিকে অনেক শারীরিক অত্যচার সহ্য করতে হয় ফলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। হঠাৎ করে কবির কানে ভেসে আসে কোন নারীর আর্ত চিৎকার ও গোংরানি। এটা কি সীমা ও নন্দিনীর রাজাকারদের হাত থেকে সম্মান বাঁচানোর জন্য প্রতিবাদ না কি কবির স্বপ্ন…?

    মুক্তিযুদ্ধকে ভিত্তি করে রচিত হয়েছে অনেক উপন্যাস, সেগুলোর প্রতিটি নিজস্ব স্বকীয়তা উদ্ভাসিত। বিষয়বস্তু এক হলেও অনুভূতি সবসময় নতুন। লেখকের বর্ণনাতে চোখের সামনে চলে এসেছে সেই সময়টা। তবে লেখক ‘উপমহাদেশ’ উপন্যাসটিতে মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি দেশের সংখ্যালঘু রাজনৈতিক দলের আর্দশ ও উদ্দেশ্যকে সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। একই সাথে সেই সময় তাদের অবস্থা ও সরকার পক্ষের সাথে তাদের সম্পর্কটাও।

    আরও একটা নাড়া দেবার মত একটা বিষয় লেখক তুলে ধরেছেন, সেই সময়ের ভারতীয় কবি সাহিত্যিকদের মানসিক অবস্থা ও আমাদের দেশের পরিস্থিতি নিয়ে তাদের উদ্বেগ ও সহযোগিতা।

    পাঠক উপন্যাসটিকে প্রশংসা যেমন করেছেন তেমনি নিন্দাও করেছেন কেউ কেউ—কৃত্রিম সংলাপ, এলোমেলো বাক্য বিন্যাস, উদ্ভট ও অন্তঃসারশূন্য কাহিনী, সর্বোপরি কাঁচা হাতে জোরপূর্বক লেখা। কারও মতে ‘বাস্তবতা বহির্ভূত একেকটা ঘটনার অবতারণা’! মাত্র কয়েকদিন আগে রাজাকারদের হাতে সারারাত ধরে নির্যাতিতা নন্দিনী কী করে হাদী মীর বা তার পরিবারের সাথে এতো স্বচ্ছন্দ মেলামেশা করে অথবা হাদী মীরের স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও কী করে তাঁর সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে এত আগ্রহী হয় ‘একজন বীরাঙ্গানা’? যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন বা যারা নীলিমা ইব্রাহিমের “আমি বীরাঙ্গনা বলছি” বা শাহীন আখতারের “তালাশ” পড়েছেন, তাদের কাছে ‘উপমহাদেশে’র কাহিনী উদ্ভট এবং বাস্তবতা বহির্ভূত মনে হওয়াই স্বাভাবিক।

    অপরদিকে হাদী মীর এমন একজন দুর্বল চরিত্রের মানুষ, বোন-দুলাভাইয়ের বাসায় একটা বিবাহিত মানুষ পরনারীকে নিয়ে তাদের সামনে শুয়ে থাকছে! আদব লেহাজ বলে যদি এদের কিছু থাকে! যুদ্ধের দোহাই দিয়ে কত কিছুই না দেখালেন এই বইতে আল মাহমুদ! আর শেষটায় তো দুই নারীকে নিয়ে হাদী মীরের সংসারকেও জায়েজ করে দিলেন ধর্মের দোহাই দিয়ে। হামিদা নারী মুক্তিযোদ্ধা বলে যতটা না সম্মান আদায় করে নিয়েছিল, শেষটায় এসে ওর এই ব্যাপারটা একদমই ভাল লাগল না। বইয়ের সমাপ্তির প্রয়োজনে কত কীই না করেছেন লেখক!

    সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা কবি আল মাহমুদ, যুদ্ধের সময় কলিকাতাতে তাঁর কবিতা চর্চা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। এমন সমালোচনা একেবারে অমূলক নয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি বর্তমান থাকলেও যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। এর প্রমাণ রয়েছে ‘উপমহাদেশ’ উপন্যাসের পরতে পরতে।

    গল্পে যুদ্ধের আবহ তৈরি করতে লেখক ব্যর্থ, হয়ত সেই চেষ্টাও করেননি তিনি! বইয়ের দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে অদ্ভুত, অবাস্তব, যুক্তিহীন এক প্রেমকাহিনী। পাশাপাশি লম্বা লম্বা অসংলগ্ন সংলাপ অপ্রাসঙ্গিক লেগেছে অনেকাংশেই। মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থী নেতাকর্মীদের অবদানের যে চিত্র আল মাহমুদ ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন সেটাও ফিকে হয়ে গেছে প্রেমকাহিনীকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে!

    ‘উপমহাদেশ’ থেকে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করছি—

    ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাথে নীতিগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু স্বতন্ত্র দলের অংশগ্রহণের কথা আমরা জানি। বামপন্থী এরকম একটি দলের (সম্ভবত কাল্পনিক) কার্যক্রমের কথা উঠে এসেছে এই বইতে। ভারতের নকশাল পন্থীদের সাথে যোগাযোগ থেকে শুরু করে তাদের কিছু অপারেশনেরও কথা বইতে এসেছে। বিষয়টি একেবারে অনৈতিহাসিক।

    বইয়ের শুরুতেই একটা জায়গায় দেখা যায় জিঘাংসা বশত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা একজন রাজাকারের কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণ করছে। এটা আসলে সম্ভব ছিল? অথবা এমন ঘটনার কল্পনা করে তিনি কি মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারদের একই সারীতে দাঁড় করালেন?

    উপন্যাসের শেষের দিকে এসে— নন্দিনী যে ক্যাম্পে ট্রেইনিং নিতে যায় ওখানেও দেখা যায় ‘মেয়ে মুক্তিযোদ্ধা মানেই পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের দেহ দান করলেই কর্তব্য শেষ’ এইরকম একটা অনাচার। এই ব্যাপারগুলো কতটুকু সত্যি বলে বিশ্বাস করা যায়? এই ঘটনার কথা ইতিপূর্বে কেউ বলেছেন বা লিখেছেন কিনা আমার জানা নেই। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে এমন ঘটনার উল্লেখ আর কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই। তবে আল মাহমুদ যে খানিকটা “Devil’s Advocacy” করেছেন এদিক থেকে ব্যাপারটা ভালই লেগেছে।

    এখানে লক্ষ্য করার মত আরেকটা ব্যাপার হল, ইমাম আর পারুলের পরিবারের অবস্থা—যারা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয় নিয়েও দেখা যায় সরকারের বড় পদে চাকরী করার দরুন রাজার হালে দিনাতিপাত করছেন—তাদের টেবিলে রুটি-মাখন, মুরগী, কলের বিশুদ্ধ পানি এবং তাদের মেয়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে। এই ব্যাপারটা বেশ চোখে লাগে। তবে এই পরিবারটিতে সম্ভবত সেই পরিবারের ছায়া পড়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় আল মাহমুদ যে পরিবারে আশ্রয় পেয়ে বাবুগিরি করে কলকাতায় সময় কাটিয়েছিলেন—

    আল মাহমুদ মূলত একজন কবি। কবি হলেও কথাসাহিত্যে পারদর্শীতা কম নয়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে। তবে যতগুলো পড়েছি এই বইটা ভিন্ন মনে হয়েছে। একটা যুদ্ধ ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পর্কে কতখানি প্রভাব ফেলে তা বোঝাতে চেয়েছেন লেখক। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং তাদের সংঘাতের যে ইঙ্গিত দিয়েছেন তা বোধকরি খুব কম ঔপন্যাসিকই লিখেছেন। তবে যে জিনিসটা অন্য কোথাও পাইনি তা হ’ল মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক প্রতিশোধ স্বরূপ রাজাকার পরিবারের উপর পাশবিক অত্যাচার। এমন ঘটনা যুদ্ধের সময় ঘটেছিল কিনা জানা নেই।

    সৈয়দ হাদী মীরকে খুবই দূর্বল চিত্তের মানুষ মনে হয়েছে, যখন তিনি দুইটি নারীর দিকেই ঝুঁকেছেন তবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তবে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের বেলায় সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। হামিদা বানু ও নন্দিনী ভট্টাচার্য দুইজনই স্বাধীনচেতা নারী হলেও স্বভাবে বৈপরীত্য রয়েছে। কবির ভগ্নিপতি ও ভগ্নি— তৌফিক ইমাম ও পারুলের আরাম আয়েশের জীবন যুদ্ধকালীন কলকাতায় অবস্থানরত উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গের জীবনযাপনের চিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

    ‘উপমহাদেশ’ উপন্যাসটি উৎসর্গ করা হয়েছে “মিলন ইসলাম”কে।

    এই উপন্যাস সম্পর্কে লেখকের বক্তব্য হুবহু তুলে দিচ্ছি— “এ বইয়ের সকল চরিত্রই কাল্পনিক। তবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন কবি সাহিত্যিক, আমলা, বুদ্ধিজীবীর নাম উপন্যাসে ব্যবহৃত হয়েছে কেবল মুক্তিযুদ্ধে তাদের সম্পৃক্ততাকে সম্মানিত করতে। তারা সর্বস্ব ত্যাগ করে এই সংগ্রামে সামিল হয়েছিলেন বলেই। প্রকৃতপক্ষে উপন্যাসের কাহিনীর সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। উপন্যাস তো উপন্যাসই। —লেখক।

    আমরাও কবি আল মাহমুদের ‘উপন্যাস তো উপন্যাসই’ কথাটাকে গুরুত্ব দিয়ে মেনে নিচ্ছে, ‘উপমহাদেশ’ উপন্যাসই, এতে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা বা ইতিহাসের ছিঁটেফোটা খুঁজে দেখার প্রয়োজন নেই।

  • কর্নেল সমগ্র

    কর্নেল সমগ্র

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book]

    প্রসঙ্গত

    শুরুটা ছিল আকস্মিক এবং চটজলদি। সত্তরের দশকের গোড়ার দিকের কথা। শ্রদ্ধেয় কবি মণীন্দ্র রায় তখন সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকার সম্পাদক। একদিন ডাক দিয়ে বললেন, শিগগির একটা উপন্যাস চাই। ধারাবাহিক বেরুবে। ফিরে গিয়েই লিখতে বসো।

    তৎকালে রুজির ধান্দায় সাধ্যাতীত লিখে-লিখে মগজ খালি। অসহায় দৃষ্টে স্মৃতির দিকে তাকালাম। তারপর দেখতে পেলাম একটি মানুষকে।

    মুখে সান্টা ক্লোসের মতো সাদা গোঁফদাড়ি। টকটকে ফর্সা রঙ। পরনে প্যান্টশার্ট। পিঠে আঁটা একটা কিটব্যাগ। বাইনোকুলারে দূরের কিছু দেখছিলেন। মুখ তুলতে গিয়ে টুপি খসে পড়ল এবং রোদে চকচক করে উঠল চওড়া টাক। টুপিটা কুড়িয়ে টাক ঢেকে এগিয়ে গেলেন একটা ধ্বংসস্তূপের কাছে। সেখানে ফুলে ভরা ঝোপ। গুঁড়ি মেরে হাঁটু ভাঁজ করে তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ব্যাপারটা রহস্যজনক।

    তবে ভেবেছিলাম সায়েব-ট্যুরিস্ট। কারণ ঘটনাস্থল লালবাগের (মুর্শিদাবাদ) প্রখ্যাত নবাবি প্রাসাদ হাজারদুয়ারি। ১৯৫৬ সালের শীতকাল। আনাচে-কানাচে ‘গাইড’-রা ওত পেতে থাকে। মওকা বুঝে একজন ‘গাইড’ তাঁকে ভুলভাল ইংরিজিতে ধ্বংসস্তূপটার ইতিহাস শোনাতে গেল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তিনি মুচকি হেসে সাদামাটা বাংলায় বলে উঠলেন, এই প্রজাপতিগুলো বড্ড সেয়ানা!

    ‘গাইড’ বেচারা হকচকিয়ে গেল। আমিও।

    তো কেন জানি না মানুষটিকে ভুলতে পারিনি। এ-ও জানি না কেন তাঁকে অবসরপ্রাপ্ত কোন সামরিক অফিসার বলে মনে হয়েছিল।

    উপন্যাস লিখতে গিয়ে অতবছর পরে আমার মধ্যে তাঁর ছায়া পড়ল! পটভূমি এক ঐতিহাসিক ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু অদ্ভুতভাবে এসে গেল অন্ধকার বিশাল ঘরের মধ্যে সারবদ্ধ কবর। পাথরে বাঁধানো সব কবর। আসলে স্মৃতির ওপর স্মৃতির ছায়া। ষাটের দশকের শেষাশেষি দিল্লিতে আলাপ হয়েছিল এক সাংবাদিক এবং লেখকের সঙ্গে। ‘দরবেশ’ ছদ্মনামে তিনি লিখতেন। আলাপ থেকে বন্ধুতা। দুজনে মিলে টো টো করে ঘুরে বেড়াতাম। কুতুবমিনার যাওয়ার পথে সফদরজঙ্গ বিমানঘাঁটির কাছে তিনি আমাকে সেই ভুতুড়ে গা-ছমছম করা কবরখানায় ঢুকিয়েছিলেন।

    শুধু এটুকু মনে পড়ছে, একটা অন্ধকার কবর প্রাসাদের মধ্যে একটা টাটকা লাশ ফেলে রেখে সেই ফাদার ক্রিসমাসকে ঢুকিয়ে দুষ্টুমি করার মতলব ছিল। এবং লাশটা হবে কোনও এক যুবতীর।

    কিন্তু তখনও জানতাম না আমি ‘Whodunit’-এর ফাঁদে পড়তে যাচ্ছি। কিছুটা এগিয়েই টের পেলাম। তারপর সম্পাদককে কাঁচুমাচু মুখে জানালাম কী সাংঘাতিক কাণ্ড বাধিয়ে বসে আছি। তিনি বললেন, ঠিক আছে। এটা একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নাও।

    এভাবেই আমার প্রথম রহস্যউপন্যাস ‘ছায়া পড়ে’ ধারাবাহিক বেরিয়েছিল সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকায়। ১৯৫৬ সালের শীতকালে মুর্শিদাবাদ শহরের খণ্ডহরে দেখা সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক হয়ে উঠেছিলেন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। তাঁর সায়েবি হাবভাব বহুবছর ধরে আমার মনে একজন খ্রিস্টানের আদর্শ বহাল রেখেছিল। ক্রমশ আমার মনে হয়, তাঁর বিশেষ কোনও ধর্মপরিচয়ের দরকারটা কী? তিনি একজন প্রকৃতিবিদ এবং রহস্যভেদী, এই তো যথেষ্ট। ক্রমে ক্রমে বুঝেছিলাম, কোনও-কোনও ক্ষেত্রে রহস্যভেদীর একজন সহকারী বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দরকার হয়, যাঁর মুখ দিয়ে কাহিনীটি বর্ণনার সুবিধা আছে। তাই আনলাম সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরিকে। কর্নেলের মতো চরিত্রের আর একটা বড় সমস্যা ছিল। সেটা অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থাসংক্রান্ত সমস্যা। কর্নেলের মতো চরিত্রের মধ্যে বিশেষ করে এটি নৈতিক এবং অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাই সরকার এবং পুলিশের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে দিতে হল। বাস্তব অবস্থা যা-ই হোক, এই সম্পর্ক আমার কাছে একটি মডেল। আবার, রহস্যের জটকে আপাতদৃষ্টে জটিলতর করার জন্য পরবর্তীকালে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ কৃতান্ত কুমার হালদারের আবির্ভাব ঠেকাতে পারিনি, যিনি কে. কে হালদার ওরফে হালদারমশাই নামে পরিচিত। আসলে রহস্যের জট জটিলতর করতে গিয়ে এঁকে দিয়ে অদ্ভুত-অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়ে মজা পেয়েছি এবং উল্টে রহস্যের সব জটিলতা খুলেই গেছে। হালদারমশাই আমার রিলিফ।

    সব রহস্যভেদীরই আচরণগত কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। কর্নেলের মধ্যে আমার আগোচরে সেগুলি এসে গেছে। কফি ও চুরুটের প্রতি মাত্রাধিক আসক্তি, স্নেহভাজনদের ডার্লিং বলা, বিচিত্র উদ্ভিদ নিয়ে বাগান করা, কীটপতঙ্গ নিয়ে গবেষণা এবং বিদেশি পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখা, চোখ বুজে দাড়ি বা টাকে হাত বুলানো ইত্যাদি। আবার বলছি, আগে থেকে ভেবেচিন্তে তাঁকে তৈরি করিনি। কিন্তু তাঁর অতীত সামরিক জীবনকে কাজে লাগানোর সুবিধা পেয়েছি। তাই ছোটদের জন্য রহস্য-রোমাঞ্চ-অ্যাডভেঞ্চার লিখতে গিয়েও কর্নেলকেই ব্যবহার করেছি। ছোটদের কাছে কর্নেলের আদর কত বেশি, তার প্রমাণ এখনও পাই। একবার একটি কাহিনীতে আমার নিজের ফোন নম্বর কর্নেলের করে দেওয়ার দুর্ভোগে এখনও মাঝে মাঝে ভুগি। হঠাৎ কচি গলায় ফোন আসে, কর্নেল আছেন? দারুণ রহস্য।…

    হিতৈষী বন্ধুরা আমাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, কর্নেল তোমাকে ডোবাবে। সিরিয়াস সাহিত্য-টাহিত্য তোমার কাছে আর কেউ নেবে না।

    কে জানে! আমার কাছে রহস্যকাহিনী আসলে তাস নিয়ে পেশেন্স খেলা। গাজোয়ারি তথাকথিত সিরিয়াস সাহিত্যরচনা একটা অপচেষ্টা। তার চেয়ে বরং স্রেফ বিনোদনদান নিরাপদ এবং এতে মগজ তাজা থাকে। জটিল একটা অঙ্ক কষে ফেলতে পারলে মগজে যেমন একটা তরতাজা ভাব এসে যায়। তাই বাঘা বাঘা পণ্ডিতজনেরা রহস্যকাহিনীর গোঁড়া ভক্ত। অবাক লাগে ভাবতে, তলস্তয়ের মতো বিরাট লেখকও সম্ভবত নিজের অজ্ঞাতসারে একটি রহস্যকাহিনী লিখে ফেলেছিলেন। তবে নিজেও বুঝি, রহস্যকাহিনী (যা প্রকৃতপক্ষে গোয়েন্দাকাহিনী) লেখাটা তত সোজা নয়।

    এর সাফল্য নির্ভর করে বুদ্ধির প্রাচুর্যের ওপর। এ ব্যাপারে হৃদয় বা ভাবাবেগ একেবারে অপ্রাসঙ্গিক। অঙ্কের উপমা দিয়েছি। কিন্তু উপমা উপমাই। তা নিজে সত্য নয়, সত্যকে বোঝানোর একটা চেষ্টা মাত্র। রহস্যকাহিনীর মূল অপরাধী এবং তার অপরাধের চতুর পদ্ধতি বা Modus Operandi আগে থেকে লেখক ঠিক করে রেখে এগোলে বিপর্যয় ঘটতে পারে। কারণ যে কোনও কাহিনীর মতো রহস্যকাহিনীরও নিজস্ব গতিপথ এবং লজিক আছে, যা লেখকের ইচ্ছানিরপেক্ষ। লেখককে অসহায় হয়ে সেই পথে এগিয়ে যেতে হয়। এর ফলে, অন্তত আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, লেখক এবং রহস্যভেদী ‘whodunit’-এর গোলকধাঁধায় একাত্ম হয়ে ঘুরে বেড়ান। লেখকও গলদঘর্ম হয়ে সূত্র খোঁজেন। যুক্তি দিয়ে সূত্ৰলব্ধ তথ্যকে সাজানো ছাড়া উপায় থাকে না। সেই বিচারে রহস্যভেদী এবং লেখক মূলত একই ব্যক্তি।

    সম্ভবত এই সমস্যার জন্যই ১৯২৮ সালে S. S. Van Dine নামে এক বিখ্যাত গোয়েন্দাকাহিনীকার কুড়িটি নিয়ম বেঁধে দিয়েছিলেন। সবগুলি নিয়ম কেউ যে মানতে চাননি, তা বলা নিষ্প্রয়োজন। আমার মনে হয়েছে, অন্তত তাঁর একটি নিয়ম অংশত সর্বগ্রাহ্য : রহস্যভেদী নিজে কদাচ অপরাধী হবেন না। হওয়া উচিত নয়। হলে তাঁকে আর দ্বিতীয়বার রহস্যভেদী করা যায় না। এই মডেলটিই ক্লাসিক। কোনও লেখক প্রয়োজনবোধে একাধিক রহস্যভেদী চরিত্র সৃষ্টি করতে পারেন (যেমন আগাথা ক্রিস্টির এরকুলে পোয়ারো, মিস্ মার্পল, পার্কার পাইন)। কিন্তু তাঁদের একমাত্র কাজ অপরাধীকে সনাক্ত করা।

    রহস্যকাহিনীতে সাফল্যের দাবি আমি কদাচ করি না এবং সেই অধিকারও আমার নেই। শুধু এটুকু বলতে পারি, কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে আমি কিছুতেই ত্যাগ করতে পারব না। তিনি আমারই দ্বিতীয় সত্তা।

    একটা কথা বলা উচিত। কর্নেল চরিত্রে আমি সতর্কভাবে সব জনপ্রিয় এবং বিখ্যাত রহস্যভেদীর চরিত্রের ছায়া এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করেছি। তা সত্বেও কেউ যদি কারও ছায়া কখনও আবিষ্কার করে ফেলেন, সেটা নেহাত সমাপতন। আমি বিশ্বের সব রহস্যকাহিনী তো পড়িনি।

    এতবছর ধরে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে নিয়ে যত ছোট-মাঝারি-বড় কাহিনী লিখেছি, তা ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে ছিল নানা জায়গায়। এতদিনে তা একত্র করে খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশের দায়িত্ব নিলেন দে’জ পাবলিশিং-এর কর্ণধার স্নেহভাজন শ্রী সুধাংশু দে। এ একটা বড় রকমের ঝুঁকি। তবু তিনি দুঃসাহসী। তাঁর এই প্রকাশন সংস্থায় উন্মেষের কাল থেকেই বুড়ো বজ্জাতের মতো আমি তাঁর কাঁধে বসে আছি। দেখা যাক্।

    এই সুযোগে ধন্যবাদ জানাই সেইসব চেনা-অচেনা পাঠকদের, যাঁরা এতদিন ধরে কর্নেলের তারিফ করেছেন এবং আমাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। তাঁরা এবার কর্নেলের সবকিছু ক্রিয়াকাণ্ড একই মঞ্চে অবলোকন এবং বিচারের সুযোগ পাবেন।

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

  • পরগাছা

    পরগাছা

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book]

    পরগাছা : প্রথম স্তর

    কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের সঙ্গে অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের মঞ্চে গ্রুপ থিয়েটারের একটা নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। নাটকের নাম পরগাছা।

    পরগাছার প্রতি আমার খেয়ালি প্রকৃতিবিদ বন্ধুর আসক্তিকে প্রায় পাগলামি বলা চলে। এই বৃদ্ধ বয়সেও বিরল প্রজাতির পরগাছার খোঁজে দুর্গম বনজঙ্গল পাহাড়ে হন্যে হয়ে ঘোরা ওঁর স্বভাব। কিন্তু এক্ষেত্রে ওঁর সেই প্রিয় উদ্ভিদটি তো নিছক একটি নাটকের নাম! নামটিই কি ওঁকে টেনেছিল?

    প্রশ্নটি অবশ্য নাটক দেখে বেরিয়ে আসার পর তুলেছিলাম। তবে তার আগে নাটকটির বিষয়বস্তু সংক্ষেপে বলা উচিত।

    মঞ্চের মাঝখানে একটি ক্ষয়াখর্বুটে গাছ, যার অল্প কিছু বিবর্ণ পাতা বোঁটায় টিকে আছে মাত্র। গাছটার তলায় হাত-পা ছড়িয়ে বসে থাকে একটা আধপাগলা লোক। সে মাঝে মাঝে বেসুরো গলায় অদ্ভুত কী সব গান গায়। মঞ্চের ডানদিকে কয়েকটি কুঁড়েঘরের অংশ দেখে বোঝা যায় একটি ছোট্ট গ্রাম। গ্রামের লোকের জীবনের সঙ্গে গাছটার সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। কাজকর্মের শেষে তারা গাছটার তলায় এসে ভিড় জমায়। আড্ডা দেয়। রসিকতা করে। আধপাগলা লোকটাকে নিয়েও তাদের হাসি-তামাশা চলে।

    এভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলি। হঠাৎ একদিন গ্রামের লোকের তুমুল কৌতুক আর হাসিতে অতিষ্ঠ সেই আধপাগলা বুড়ো চেরা গলায় ঘোষণা করে, সাবধান! এ গাছই তোদের জীবন। এর একটি করে পাতা তোদের একেক জনের জীবনের পরমায়ু। একটি করে পাতা ঝরবে। তোরা একজন করে মারা পড়বি।

    অবিশ্বাসের হা হা হা হা অট্টহাসির মধ্যে দেখা যায় একটা পাতা খসে পড়ল এবং আচম্বিতে একটা লোক বুক চেপে ধরে আর্তনাদ করে পড়ে গেল।

    এবার নাটকের গতি হয়ে উঠল জোরালো। প্রথমে সন্দেহ এবং দ্বিধা, তারপর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল প্রচণ্ড আতঙ্ক। আবার একটা পাতা খসে পড়ে। একটা মৃত্যু আসে। বিভীষিকার প্রতীক হতে থাকে জীর্ণ প্রাচীন সেই গাছ। একটার পর একটা পাতা ঝরে যায়। একের পর এক জীবনের পতন ঘটে। আধপাগলী লোকটা বারবার গলায় ঘোষণা করে, সাবধান! সাবধান!

    রাগী যুবকরা কুড়ুল হাতে ছুটে আসে। আধপাগলা লোকটা বলে, খবর্দার! গাছটা কেটে ফেললে একসঙ্গে তোরা সবাই মারা পড়বি।

    যুবতীরা ঘটে জল নিয়ে এস বলে, তাহলে আমরা একে বাঁচিয়ে তুলি। তারা গাছের গোড়ায় জল ঢালে। গাছটিকে ঘিরে তারা নেচেনেচে গান গায়। আধপাগলা লোকটা বলে, ভুল! ভুল! তোদের জলে গাছটায় নতুন পাতা গজাবে, আর তোদের। গর্ভে আসবে সন্তান। কিন্তু তারাও বাঁচবে না। পাতা ঝরবে। তারা মরবে।

    তা হলে উপায়?

    এবার নাটকের ক্লাইম্যাক্স। লোকটা আঙুল তুলে বলে, ওই দ্যাখ সবাই। গাছের ডালে একটা বিষাক্ত পরগাছা গজিয়ে আছে। গাছের সব রস শুষে নিয়ে ডাগর হয়ে ফুল ফোঁটাচ্ছে। ওই পরগাছা ওপড়াতে হবে। তবেই তোরা বাঁচবি।

    যাই হোক, আরও কয়েকটি মৃত্যু এবং প্রবল হাঙ্গামার পর পরগাছাটা ওপড়ানো হলো। হাততালির মধ্যে নাটকও শেষ হলো। পাশের এক দর্শককে বলতে শুনলাম, সর্বহারা শোষিতশ্রেণী এবং পরগাছারূপী শোষক শ্রেণীর সংগ্রাম হে কালীপদ! বুঝলে তো?

    কালীপদ কী বলল শুনতে পেলাম না। কর্নেল আমার কাঁধে হাত রেখে ভিড় ঠেলে আমাকে বাইরে নিয়ে এলেন। ওঁর মুখটা রীতিমতো গম্ভীর।

    অক্টোবর মাসের রাত সাড়ে আটটায় টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছিল সবে। গাড়িতে উঠে কর্নেল চুরুট ধরালেন। স্টার্ট দিয়ে বললাম, বোগাস! একেবারে প্রচারধর্মী। তবে নাচগান অভিনয় দিয়ে জমিয়েছে বেশ।

    কর্নেল সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, হঁ, নাটক মানে তো তাই। কিন্তু আমার অবাক লাগছে। পরগাছা আপনার প্রিয়, তা জানি। তাই বলে পরগাছা নামের রদ্দি তত্ত্বে ঠাসা নাটক দেখতে আপনার এত উৎসাহ রহস্যময়।

    কর্নেল তেমনই গম্ভীরমুখে বললেন, রহস্যময় বলতেও পারো। তবে বিষয়টি সত্যি সিরিয়াস।

    অবাক হয়ে বললাম, তার মানে?

    নাটকটার অন্য একটা মাত্রা আছে। আমার প্রাজ্ঞ বন্ধু হেলান দিয়ে চোখ বুজে বললেন, ওই মাত্রাটা অত্যন্ত বাস্তব এবং সত্যি ভয়ঙ্কর। বিষাক্ত পরগাছা! হ্যাঁ, জয়ন্ত। কোনও কোনও পরগাছায় লাক্ষা জাতীয় কীটের জীবাণু থাকে। আমি দেখেছি, লাক্ষার লোভে ওই অর্কিড জাতীয় পরগাছা এনে বিশাল গাছের ডালে আটকে দেওয়া হয়। কালক্রমে গাছটা শুকিয়ে মারা পড়ে। শুধু তা-ই নয়, ক্রমশ পাশের গাছগুলোতেও সেই বিষাক্ত অর্কিড় ছড়িয়ে পড়ে। কী ভাবে বলি। একটা অর্কিডের ফুলের রেণু থেকে প্রায় ৪৭ লক্ষ বীজকণিকা বাতাসে ছড়িয়ে যায়। গাছ থেকে গাছে এভাবে অর্কিড ছড়ায়। তো আমি দেখেছি, এক অসাধু লাক্ষা ব্যবসায়ী লাক্ষার লোভে একটা রাস্তার ধারে অসংখ্য গাছ ওই বিষাক্ত অর্কিডের সাহায্যে মেরে ফেলেছে। লাক্ষাটা তার লাভ। শুকনো গাছগুলো কাঠের ব্যবসায়ীর লাভ। তুমি যদি তোমার খবরের কাগজের কাজে কখনও মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর থেকে সড়ক ধরে কান্দি যাও, লক্ষ্য কোরো সারবন্দি গাছের কঙ্কাল …

    এক্সকিউজ মি।

    চমকে উঠে বাঁদিকে তাকালাম। আমাদের গাড়ি থিয়েটার রোডে পৌঁছে একটা রাস্তার মোড়ে ঈষৎ জ্যামের দরুন থেমে গিয়েছিল। বৃষ্টিটা বেড়ে গেছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি। এক সিক্তবসনা যুবতী কর্নেলের কাছে ঝুঁকে কথাটি উচ্চারণ করেছিল। কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসে বললেন, বলুন কী করতে পারি আপনার জন্য।

    একটাও ট্যাক্সি পাচ্ছি না। ভিজে যাচ্ছি কিন্তু সেজন্যও না। যুবতীর কণ্ঠস্বরে ছটফটানি ছিল এবং সে বারবার ভয়-পাওয়া চোখে ফুটপাতের দিকে তাকাচ্ছিল। প্লিজ যদি আমাকে একটু লিফট দেন। দুটো মস্তান মতো লোক আমার পিছু নিয়েছে।

    কর্নেল ঘুরে পেছনকার দরজার লক খুলে দিলেন। যুবতীটি তক্ষুণি গাড়িতে ঢুকে পড়ল। বুঝলাম, কর্নেলের সৌম্যকান্তি এবং ঋষিসুলভ দাড়িই তাকে সাহায্যপ্রার্থিনী করেছে। না হলে এমন অবস্থায় কোনও অচেনা লোকের গাড়িতে কোনও একলা যুবতী এভাবে ঢুকে পড়ত না।

    কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথায় যেতে চান?

    ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে।

    অসুবিধে হবে না। আমরা এলিয়ট রোডে যাচ্ছি। জয়ন্ত, সামনের মোড়ে ঘুরে পার্ক স্ট্রিট পেরিয়ে যাওয়া যাবে। কী বলো?

    মনে মনে বিরক্ত হলেও বললাম, ঠিক আছে।

    জ্যাম ততক্ষণে ছেড়ে গেছে। কর্নেল আবার অর্কিড নিয়ে পড়লেন। আমার মন ব্যাকসিটে। মেয়েটি মোটামুটি সুন্দরী বলা চলে এবং কথাবার্তাও যেটুকু শুনলাম, মার্জিত উচ্চারণ–ভদ্ৰপরিবারের বলেই মনে হচ্ছে। স্বভাবত আগ্রহ ছিল, কী তার নাম, কোথায় একা গিয়েছিল এবং কী ভাবে দুটো লোক তার পিছু নিল। কিন্তু আমার বাতিকগ্রস্ত বন্ধুটি কোনও প্রশ্ন করার সুযোগই দিলেন না। পার্ক স্ট্রিট পেরিয়ে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে ঢুকে বললাম, কোথায় নামবেন বলবেন।

    বেশি দূরে নয়। বলে সে জানালার বাইরে দৃষ্টি রাখল। কিন্তু ফ্রি স্কুল স্ট্রিট প্রায় অন্ধকার। বড় দোকানপাট আজ রবিবারে বন্ধ। শুধু পান-সিগারেটের দোকানে মোম জ্বলছে। লোডশেডিং এবং ঝিরঝিরে বৃষ্টি।

    কিছুক্ষণ পরে সে বলে উঠল, এখানে। তারপর গাড়ি থেকে নেমে শুধু অসংখ্য ধন্যবাদ বলে অন্ধকারে বাঁদিকের ফুটপাতে অদৃশ্য হলো।

    কর্নেল বললেন, তা হলে দেখ জয়ন্ত, যা বলছিলাম–

    ঠিকই বলছিলেন। জীবনের সর্বত্র নাটক। রাস্তাঘাটেও নাটক। হাসতে হাসতে এলাম। জানি না এটা একই নাটকের দ্বিতীয় অঙ্ক কিনা বলে গাড়ি ডাইনে ঘুরিয়ে সংকীর্ণ রাস্তায় ঢুকলাম। দূরে আলোকিত বড় রাস্তা দেখা যাচ্ছিল।

    ডার্লিং?

    ঝটপট বললাম, প্লিজ কর্নেল। আর কখনও ডার্লিং বলবেন না। আপনার ডার্লিং শুনে আমাদের কাগজের জনৈক সমালোচক বেজায় খাপ্পা হয়ে গেছেন। তা ছাড়া আপনি কথায় কথায় বড্ড বেশি ইংরেজি বলেন। এও নাকি ওঁর পক্ষে বিরক্তিকর।

    কর্নেল কান করলেন না আমার কথায়। বললেন, ডার্লিং! অর্কিড বা পরগাছা গাছপালার জগতে যেমন, মানুষের জীবনেও তেমনই স্বাভাবিক একটা জিনিস। আসলে মানুষের সভ্যতার একটা অদ্ভুত লক্ষণও কিন্তু এই অর্কিড জাতীয় পরজীবী সম্প্রদায়। হয়তো বা আমরা প্রত্যেকেই কোনও-না-কোনও সময় অর্কিডের ভূমিকা নিয়ে বেঁচে থাকি।

    আহ্ কর্নেল! দার্শনিক তত্ত্ব থাক। ওই মেয়েটি সম্পর্কে কী মনে হলো, বলুন।

    ওকেও তুমি অর্কিড বলতে পারে।

    কী মুশকিল! আপনার মাথায় অর্কিডের ভূত ঢুকে গেছে দেখছি।

    জয়ন্ত! মেয়েটি পরজীবী শ্রেণীর।

    তার মানে?

    আমরা একজন কলগার্লকে লিফট দিলাম।

    গাড়ির গতি কমিয়ে বললাম, বলেন কী!

    যে বাড়িতে ও ঢুকে গেল, সেই বাড়িতে কিছুদিন আগেই পুলিশ হানা দিয়েছিল। তুমি সাংবাদিক। তোমার মনে পড়া উচিত, এক ডজন কলগার্লকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছিল। ওদের কেউ কেউ নার্কোটিকসের কারবার করত। সেদিনকার খবর।

    একটু হেসে বললাম, বাড়িটা আপনার চেনা দেখছি।

    কর্নেল এতক্ষণে হাসলেন। শুধু বাড়িটা নয়, মালিকও আমার চেনা। ভদ্রলোক একজন অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান। হ্যারি ওলসন নাম। গোবেচারা নিরীহ মানুষ। বয়স প্রায় আশির ওপরে। আসলে কলগার্ল বা নার্কোটিকসের ব্যাপারটা ওঁর এক্তিয়ারের বাইরে। তো যা বলছিলাম–সেই অর্কিড, বিষাক্ত অর্কিড শরীরে গজিয়েছে হ্যারি ওলসনেরও। ফলে তার অবস্থা কল্পনা করো।

    কল্পনা করছি এখন সবখানে সবকিছুই অর্কিডে ঢাকা। আমার ভয় হচ্ছে কর্নেল, শেষে আপনি না আপনার প্রিয় ষষ্ঠীচরণকেও অর্কিড ভেবে বসেন। তা হলে কিন্তু এই বৃষ্টির রাতে কফির আশা বৃথা।

    কর্নেল কোনও মন্তব্য করলেন না। লক্ষ্য করলাম, আবার চোখ বুজে হেলান দিয়েছেন। দাঁতে কামড়ানো জ্বলন্ত চুরুট।

    কিছুক্ষণ পরে এলিয়ট রোডে কর্নেলের সানি ভিলার প্রাঙ্গণে ঢুকে গাড়ি পোর্টিকোর তলায় দাঁড় করালাম। আমার আর সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় ওঠার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু কর্নেল আমাকে যেতে দিলেন না। অগত্যা গাড়ি পার্ক করে রেখে ওঁর সঙ্গ ধরতে হলো।

    ষষ্ঠীচরণ দরজা খুলে চাপাস্বরে বলল, এক বুড়োবাবু এয়েছেন। বললাম, বাবামশাই বেইরেছেন। ফিরতে রাত্তির হবে। উনি বললেন, যত রাত্তির হোক, রোয়েট করব। তা–

    তিনি কি রোয়েট করছেন?

    আজ্ঞে। ষষ্ঠী বেজার মুখে বলল, জোর করে ঢুকে বললেন, আমি তোমার বাবামশাইয়ের বন্ধু।

    কর্নেল তার দিকে চোখ কটমটিয়ে বললেন, শীগগির কফি।

    ছোট্ট ওয়েটিং রুম পেরিয়ে ড্রয়িংরুমের পর্দা তুলে ঢুকে উনি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, হ্যাল্লো রায়সায়েব?

    ঢুকে দেখি, প্রায় কর্নেলের বয়সী এবং তাঁর মতোই দশাসই চেহারার এক ভদ্রলোক সোফায় বসে আছেন। কিন্তু তাকে কেন কর্নেল রায়সায়েব বলে সম্ভাষণ করলেন বোঝা গেল না। ভদ্রলোকের পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। পাশে একটা কাপড়ের ব্যাগ। চেহারায় অবশ্য বনেদী আভিজাত্যের ছাপ আছে। দেখনসই পাকা গোঁফ এবং চুলও সাদা। তবে কর্নেলের মতো টাক নেই।

    ভদ্রলোক বললেন, বিকেলে হাওড়া পৌঁছেছি। স্টেশন থেকে ফোনে লাইন পেলাম না। তার ওপর আজকাল আপনাদের কলকাতার কী অবস্থা হয়েছে! ট্যাক্সি, পেতে সে এক হাঙ্গামা। সারা রাস্তা জ্যাম। ব্যস। তারপর শুরু হয়ে গেল বৃষ্টি। অবশেষে যদি বা এসে পৌঁছুলাম, শুনি আপনি নেই।

    কর্নেল আলাপ করিয়ে দিলেন। ইনি অমরেন্দ্র সিংহরায়। জয়ন্ত, তুমি কি কখনও রাঙাটুলি গেছ? ধানবাদ খনি এরিয়া থেকে সামান্য দূরে এক অসাধারণ জায়গা। শহর বলতে পারো, আবার গ্রামও বলতে পারো। টিলাপাহাড়, জঙ্গল, ঝর্ণা আর নদী–তো রায়সায়েব! এর নাম আমার কাছে শুনে থাকবেন। জয়ন্ত চৌধুরী। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার সাংবাদিক।

    আমরা নমস্কার বিনিময় করলাম। অমরেন্দ্র বললেন, নামটা শুনে থাকব। আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে ভাল লাগল জয়ন্তবাবু। আপনি কাগজের লোক! নিশ্চয় বটুক চোধুরীকে চিনতেন। আমাদের এলাকার ট্রেড ইউনিয়ন নেতা বটুক চৌধুরী। হঠাৎ রাতারাতি নিখোঁজ হয়ে যায়। সেই নিয়ে কত তোলপাড়। পরে ওর বডি পাওয়া যায় ড্যামের জলে।

    বললাম, নাহ্। চিনি না তাকে।

    কর্নেল একটু হেসে বললেন, চৌধুরীসায়েবের ভূত কি এখনও রায়সায়েবের পিছু ছাড়েনি?

    অমরেন্দ্র অমনই গম্ভীর হয়ে গেলেন। চাপাস্বরে বললেন, এবারকার ব্যাপারটা একবারে অন্যরকম। গত বছর তো আপনি গিয়ে রহস্যটা ফাঁস করলেন। যোগেনকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু এবার উড়ো চিঠি নয়। আপনি ভূত বললেন–কতকটা তা-ই।

    যেমন?

    প্রায় প্রতি রাত্রেই এটা হচ্ছে। অদ্ভুত সব শব্দ। বুঝলেন? হলঘরের কাঠের সিঁড়িতে, কখনও ছাদে, আবার কখনও দোতলায় আমার ঘরের বারান্দায় হাঁটাচলার শব্দ। ফিসফিস কথাবার্তা। অমরেন্দ্র সিংহরায়ের মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। অথচ দেখুন, আলশেসিয়ানটা ছাড়া থাকে। সে-হারামজাদার কোনও সাড়া পাওয়া যায় না। তাই প্রথমে ভেবেছিলাম, যোগেনের মতো বেচুও আমাকে ভয় দেখাচ্ছে। বেচুকে রাত্রে ঘরে তালা আটকে রাখলাম। কিন্তু তবু সেই ভুতুড়ে কারবার। টর্চ বন্দুক নিয়ে বেরোই। সুনন্দা, সতু আমার সঙ্গে থাকে। ছাদে উঠে দেখি কেউ নেই। তারপর গত পরশু রাত্রে নিচের হলঘরে আর্তনাদ শুনলাম। সুনন্দা, সতু, বেচু সবাই। শুনেছিল। আলো জ্বালাই থাকে সারারাত্রি। কিন্ত সেরাত্রে তখন লোডশেডিং ছিল। হলঘরে সবাই দেখলাম কেউ নেই, কিন্তু কার্পেটে খানিকটা রক্ত পড়ে আছে।

    কুকুরটা তখন কোথায় ছিল।

    বাইরে। সতু হলঘরের দরজা খুলতেই লেজ গুটিয়ে ঘরে ঢুকল।

    অবাক হয়ে শুনছিলাম। বিশ্বাস করা শক্ত। কিন্তু কর্নেল তুষো মুখে শুনছেন এবং গুরুত্ব দিচ্ছেন না বলে পারলাম না, রক্ত না রঙ, পরীক্ষা করা হয়েছে?

    অমরেন্দ্র সিংহরায় হাসবার চেষ্টা করে বললেন, জয়ন্তবাবু! রক্ত আর রঙের তফাত বোঝার মতো বুদ্ধি আমার আছে। তা ছাড়া সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা হলো, কুকুরটাকে আবার বাইরে বের করে দিয়ে হলঘরের দরজা আটকে আমরা সিঁড়িতে উঠে যাচ্ছি, বেচু মানে আমাদের বাড়ির সারভ্যান্ট চেঁচিয়ে উঠল হঠাৎ} ও নিচের একটা ঘরে থাকে। সতু টর্চের আলো ফেলে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে। বেচু বলল, ওই দেখুন। একটা কালো বেড়াল রক্ত খাচ্ছে। সত্যি তা-ই! তাড়া করতেই বেড়ালটা বেচুর ঘরে ঢুকল। সেখানে তাড়া খেয়ে খোলা জানালা গলিয়ে পালাল।

    বললাম, তবু কুকুরটার কোনও সাড়া পেলেন না?

    নাহ।

    ষষ্ঠী ট্রে-তে কফি আর স্ন্যাক্স দিয়ে গেল এতক্ষণে। বাইরে বৃষ্টিটা সমানে ঝরছে। ভূতের গল্প শোনার মতো পরিবেশ বলা চলে। ভদ্রলোকের মুখ দেখে বুঝতেই পারছিলাম না উনি বানিয়ে বলছেন কিংবা তিলকে তাল করছেন, নাকি সত্যিই এই ভূতুড়ে রহস্য ফাঁস করার জন্য আমার এই প্রখ্যাত রহস্যভেদী বৃদ্ধ বন্ধুর কাছে ছুটে এসেছেন?

    কর্নেল বললেন, কফি খান রায়সায়েব। কফি নার্ভকে চাঙ্গা করে।

    কফিতে চুমুক দিয়ে অমরেন্দ্র বললেন, গতরাত্রে তেমন কিছু ঘটেনি। কিন্তু ভোরবেলা আমার ঘরের দরজা খুলে দেখি, একটা দলাপাকানো কাগজ পড়ে আছে। যা অবস্থা চলেছে, স্বভাবত কৌতূহল জাগল। কাগজটার ভাঁজ ঠিকঠাক করে দেখলাম কী সব ইংরেজিতে লেখা আছে। একবর্ণ বুঝলাম না সুনন্দা আর সতুকে দেখালাম। ওরাও বুঝতে পারল না। তখন তিনজনে মিলে ঠিক করলাম, আবার আপনার শরণাপন্ন হওয়া দরকার। এই দেখুন।

    অমরেন্দ্র পাঞ্জাবির ভেতরপকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে কর্নেলকে দিলেন। কাগজটার অবস্থা দেখে বোঝা গেল, ওটা সত্যি দলপাকানো ছিল। টেনে ঠিকঠাক করা হয়েছে। কর্নেল ভাঁজ খুলে টেবিলের ড্রয়ার থেকে আতশ কাচ বের করলেন। পড়ার পর শুধু বললেন, হুঁ। কিছু বোঝা যাচ্ছে না।

    অমরেন্দ্র বললেন, যোগেনের হাতের লেখা নয়, এটুকু আমি বুঝতে পেরেছি। আপনিই সেবার যোগেনের হাতের লেখা সনাক্ত করেছিলেন।

    কর্নেল সায় দিলেন। বললাম, দেখতে পারি? কর্নেল কাগজটা আমাকে দিলেন। লাল ডটপেনে লেখা আছে :

    CHAICHICHINGFANK

    বার কতক পড়ার পর বললাম, দেখুন, আমার মনে হচ্ছে এতে লেখা আছে চাই চিচিং ফাঁক।

    কর্নেল হাসলেন। হুঁ, ঠিক ধরেছ। চাই চিচিং ফাঁক।

    অমরেন্দ্র হাসলেন না। রুষ্ট মুখে বললেন, সেটাই তো অদ্ভুত। আমার বোনপো সতুও তা-ই পড়ল। কিন্তু মানেটা কী এর? আরব্য উপন্যাসের আলিবাবা ও চল্লিশ চোরের গল্পে চিচিং ফাঁক বললে নাকি লুঠের মালরাখা ঘরের দরজা খুলে যেত। আমি আলিবাবা না চোরদের সর্দার?

    কর্নেল সকৌতুকে বললেন, তা ছাড়া আপনি আলিবাবার ভাই কাশেমও নন। কক্ষনো নই। সমস্তটাই দুর্বোধ্য আমার কাছে। অমরেন্দ্র কফিতে চুমুক দিয়ে ফের বললেন, আপনি বলছিলেন বটুক চৌধুরীর ভূত আমার পিছু ছাড়েনি। আপনি জ্ঞানী মানুষ। ঠিক ধরেছেন। বটুকের লাশ সন্দেহ করে ড্যামের জলে পাওয়া বডিটা পুলিশ ওর চেলাদের হাতে তুলে দিয়েছিল। ঘটা করে দাহও করেছিল ওরা। কিন্তু আমার সন্দেহ, বটুক মারা পড়েনি। কোনও কারণে গা-ঢাকা দিয়ে আছে। গতবার আমার কর্মচারী যোগেনকে দিয়ে সে-ই আড়াল থেকে অদ্ভুত সব উড়ো চিঠি লিখত। এখন নিশ্চয় কোনও তান্ত্রিক সাধুর সাহায্যে আমাকে ভয় দেখাচ্ছে। কেন তা আপনিই বিশদ জানেন।

    কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে বললেন, এ যুগে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ব্যাপারটাই হয়তো এমন যে পরস্পরের প্রতি রাগ মরে গিয়েও পড়ে না।

    হাসি চেপে বললাম, আমাদের নিউজ ব্যুরোর চিফ নগেনদা রাজনৈতিক রাগ বলে একটা টার্ম ব্যবহার করেন।

    অমরেন্দ্র কফির পেয়ালা শেষ করে বললেন, কিন্তু আমি তো কবে রাজনীতি থেকে সরে এসেছি। গত ভোটে আমি তো বটুকের সুবিধে করে দিতেই শেষ মুহূর্তে নমিনেশন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলাম। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো আমার পোষাল না। বটুকের অবশ্য অন্য ব্যাপার। এরিয়ার মাফিয়া ডন ওর হাতে ছিল। যাইহোক, কর্নেল! প্লিজ বটুকের ভূতের হাত থেকে আমাকে বাঁচান।

    বলে রায়সায়েব উঠে দাঁড়ালেন। একটা ফোন করব। অলরেডি আপনার অসাক্ষাতে একটা করেছি–আপনার ওই লোকটিকে বলেই করেছি অবশ্য। হেমেনকে খবর দিয়ে গাড়ি পাঠাতে বলেছিলাম। দশটা বাজতে চলল। এখনও গাড়ি এল না। অদ্ভুত ছেলে তো।

    কর্নেল বললেন, রাস্তায় জল জমে গেছে হয়তো। আপনি ফোন করুন।

    অমরেন্দ্র রিং করে সাড়া পেলেন। বউমা নাকি? আমি বলছি–হ্যাঁ। হেমেন– আচ্ছা। ঠিক আছে। ফোন রেখে বললেন, বেরিয়েছে এক ঘণ্টা আগে। আপনি ঠিকই বলেছেন। রাস্তায় জল জমে নিশ্চয় কোথাও আটকে গেছে। বৃষ্টি থেমেছে মনে হচ্ছে। আমি বরং আর অপেক্ষা না করে বাসে বা মিনিবাসে চলে যাই। আপনাকে সব জানালাম। আমি কালই দুপুরের ট্রেনে ফিরে যাব। আপনি কবে যাচ্ছেন বলুন?

    কর্নেল বললেন, চেষ্টা করব শীগগির যেতে। রাঙাটুলির ওদিকে জঙ্গলে একরকম অর্কিড দেখেছিলাম। তখন তত মনোযোগ দিইনি। সম্প্রতি একটা বইয়ে ওই অর্কিডের ছবি দেখলাম। আশ্চর্য ব্যাপার। এই অর্কিড–

    প্লিজ কর্নেল! অর্কিড পরে হবে। সঙ্গে তোক দেব। যত খুশি কালেক্ট করবেন। আগে বটুকের ভূতটাকে শায়েস্তা করুন। অমরেন্দ্র সিংহরায় আমার দিকে ঘুরে নমস্কার করলেন। জয়ন্তবাবুকেও আমন্ত্রণ রইল। আচ্ছা, চলি।

    ব্যস্তভাবে বেরিয়ে গেলেন কর্নেলের রায়সাহেব। কর্নেল সেই কাগজটা আর আতশ কাচ টেবিলের ড্রয়ারে ঢোকালেন। এতক্ষণে হাসির সুযোগ পেলাম। হাসতে হাসতে বলালম, আপনার বরাতে সব অদ্ভুত মক্কেল জোটে। এই রহস্যটাও কম অদ্ভুত নয়। চিচিং ফাঁক রহস্য।

    কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, ব্যাপারটা সম্ভবত হাস্যকর নয়, ডার্লিং। রাঙাটুলিতে গেলে তুমি খানিকটা আঁচ করতে পারবে। বটুক চৌধুরী রায়সায়েবের শ্যালক। হেমেনের কথা শুনলে একটু আগে। হেমেন্দ্র ওঁর একমাত্র ছেলে এবং একজন মস্ত ব্যবসায়ী। আমদানী রফতানির কারবার আছে। যতটা জানি, বাবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চান না। রায়সায়েবের কাছে থাকেন ওঁর একমাত্র মেয়ে সুনন্দা। ভদ্রমহিলা বিধবা। সতুর কথা শুনেছসত্যকাম। সুনন্দা দেবীর ছেলে। মাইনিং এঞ্জিনিয়ার। দাদামশাই তাকে মানুষ করেছেন। যাইহোক, রাত বাড়ছে। তোমাকে সল্ট লেকে ফিরতে হবে। ইস্টার্ন বাইপাস ধরে যাও।

    উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, হেমেনবাবু কোথায় থাকেন?

    বেহালায়। কাজেই তোমাকে কখনই বলা যেত না রায়সায়েবকে একটা লিফট দাও।

    হাসলাম। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মেয়েটির মতো কোনও মেয়ে হলে আমি বেহালা কেন, কাকদ্বীপে পৌঁছে দিয়ে আসতে রাজী।

    কর্নেল জিভ কেটে বললেন, আশ্চর্য জয়ন্ত তুমি একজন কলগার্লকে ভুলতে পারোনি দেখছি।

    আমার কিন্তু ওকে মোটেই কলগার্ল বলে মনে হয়নি। আপনি সম্ভবত ভুল করছেন। মেয়েটি সত্যি ভয় পেয়ে আমাদের গাড়ির কাছে ছুটে এসেছিল। ওর কথাবার্তা, তা ছাড়া চুপচাপ বসে থাকা–সব মিলিয়ে একজন বিপন্ন মেয়েরই হাবভাব লক্ষ্য করেছি।

    কথাগুলো জোর দিয়ে বললাম। শোনার পর কর্নেল একটু হাসলেন। বিপন্ন হতেই পারে। কলগার্লদের জীবন তো সবসময় বিপন্ন।….

    কর্নেলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পার্ক সার্কাস হয়ে ইস্টার্ন বাইপাস ধরে যেতে যেতে সারাপথ ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মেয়েটির কথাই ভাবছিলাম। এ যাবৎ কখনও রাস্তাঘাটে দিনে বা রাতে কোনও একলা, মেয়েকে গাড়িতে লিফট দেওয়ার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য হয়নি, যদিও গপ্পে এসব অনেক পড়েছি। সৌভাগ্য মানে, গল্পে এসব ক্ষেত্রে প্রেমের সুযোগ এসে যায়। দুর্ভাগ্য মানে, অনেক সময় নাকি লিফট দিতে গিয়ে সাংঘাতিক ব্ল্যাকমেলের পাল্লায় পড়তে হয়।

    কিন্তু মেয়েটিকে কর্নেল কলগার্ল বলে সনাক্ত করেছে, এমন কি বাড়িটাও চেনেন। এজন্যই কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল। গাড়ির আলোয় কয়েক মুহূর্তের জন্যে ওর যে মুখ দেখেছি সেই মুখে সৌন্দর্য ও বিপন্নতার ছাপ ছিল। সুন্দরী মেয়েরা কেন নষ্ট হয়ে যায়, এ ধরনের সামাজিক-নৈতিক প্রশ্নও আমাকে উত্ত্যক্ত করছিল।

    গাড়ি গ্যারাজে ঢুকিয়ে পেছনের জানালার কাচ তুলছিলাম। সেই সময় গ্যারাজের আলোর ছটায় চোখে পড়ল ব্যাকসিটে একটা ছোট্ট পার্স পড়ে আছে। একটু চমকে উঠেছিলাম দেখামাত্র। পার্সটা তুলে নিলাম। আমার হাত কাঁপছিল এ কথা অস্বীকার করছি না। পার্সটা নিশ্চয়ই সে ইচ্ছে করে ফেলে যায়নি। মানসিক চাঞ্চল্য, আর বৃষ্টিও এই ভুলের কারণ হতে পারে।

    বাদামি রঙের হাল্কা পার্সটা নিয়ে আমার দোতলার ফ্ল্যাটে ঢুকলাম, তখন আমার অন্য প্রচণ্ড উত্তেজনা টগবগ করছিল। মেয়েদের পার্স আমার কাছে সবসময় কৌতূহলের বস্তু। সেই কৌতূহলে রোমান্টিকতা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু এক্ষেত্রে উত্তেজনাই আমাকে ক্রমশ নার্ভাস করল।

    পার্স খুলতেই প্রথমে চোখে পড়ল একটা নেমকার্ড। তারপর তিনটে চাবির একটা রিং। কিছু খুচরো পয়সা। পার্সের ভেতরে একপাশের খোঁদলে, শ দেড়েক টাকার নোট। অন্যপাশের খোঁদলে খুদে আয়না, লিপস্টিক, এইসব টুকিটাকি প্রসাধনী।

    জিনিসগুলো টেবিলে রাখছিলাম। আমার এই কাজটা অশালীন বলা চলে। কিন্তু অস্বস্তিকর উত্তেজনাটা আমাকে ভূতগ্রস্ত করেছিল। আরও খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম তলার দিকে ইঞ্চি তিনেক লম্বা জিপ। জিপ টেনে খুলে দেখি, ভেতরে একটা পুরনো হলদেটে কাগজের চিরকুট। তাতে লেখা আছে :

    TL-2. R-3. L-1. R-4

    পরপর কয়েকটা সিগারেট টানার পর প্রথমেই মাথায় এল, পার্সে চাবি থাকায় মেয়েটি তার ফ্ল্যাটে ঢুকতে পারছে না।

    এত রাতে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে গিয়ে পার্স ফেরত দিতে আমার আপত্তি ছিল না, কিন্তু কর্নেলের মুখে ওই বাড়ির কথা শোনার পর সেটা সম্ভব নয়।

    নেমকার্ডটা তুলে নিলাম। পুরনো কার্ড। ওতে একজন অ্যাডভোকেটের নামঠিকানা ছাপানো আছে। অলক সেনগুপ্ত। ঠিকানা শ্যামবাজার এলাকারই কোনও গলির। মেয়েটি কি কখনও কোনও মামলায় ফেঁসেছিল? কর্নেল বলছিলেন, সম্প্রতি ওই বাড়িতে পুলিশ হানা দিয়ে কলগার্লদের গ্রেফতার করেছিল। এই মেয়েটি যদি কলগার্ল হয়, সে গ্রেফতার হয়ে থাকলেও ছাড়া পেয়েছে। তার আইনজীবীর কার্ড হতেও পারে। কার্ডটা জরাজীর্ণ হওয়ায় অনেক ব্যাখ্যা সম্ভব। তবে এ নিয়ে এখন মাথা ঘামানোর মানে হয় না।

    রাঙাটুলির রায়সায়েবের সেই চিচিং ফাঁক চিরকুটের মতো এই অদ্ভুত চিরকুটটা নিয়ে মাথা ঘামানোর দায় বরং বৃদ্ধ রহস্যভেদীর ওপর চাপানো যেতে পারে। আপাতত আমার দুশ্চিন্তা, মেয়েটি তার ফ্ল্যাটে ঢুকতে পারছে না। আমার এখন কী করা উচিত।

    অতএব অগতির গতি আমার ফ্রেন্ড-ফিলসফার-গাইডকেই রিং করলাম। কয়েকবার চেষ্টার পর সাড়া পেলাম। সংক্ষেপে ব্যাপারটা বললাম। কর্নেল বললেন, ওর ফ্ল্যাট খুলে দেওয়ার লোক ওবাড়িতে আছে। তুমি খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়া। ঘুম না এলে পালের ভেড়া গুনতে শুরু করবে। পুরনো এবং অব্যর্থ ওষুধ। আর শোনো, তুমি পার্স ফেরত দিতে যেও না। আমাকে সকালে দিয়ে যেও। আমিই দিয়ে আসব। তোমারও আমার সঙ্গে যেতে ইচ্ছে করবে। ঠিক আছে। যাবে। গুড নাইট!…

    পালের ভেড়া গোনার চেষ্টা করিনি। ঘুম না এলে আমার অভ্যাস দুর্বোধ্য বিষয়ের বই পড়া এবং বোঝবার চেষ্টা করা। এই চেষ্টা থেকেই ঘুম অনিবার্যভাবে এসে যায়। তবে এদিন ঘুম ভেঙেছিল প্রায় নটায়। তাড়াহুড়ো করে ব্রেকফাস্ট সেরে কর্নেলের বাড়ি পৌঁছুতে সাড়ে নটা বেজে গেল।

    আকাশ ঝকঝকে নীল। রাস্তাঘাট শুকনো। বৃষ্টির পর বাতাসে শেষ শরতের স্বাভাবিক স্নিগ্ধতা ফিরে এসেছে। কর্নেল পার্সটা হাতে নিয়ে ঠিক এভাবেই মার্জিত ভাষায় কিছুক্ষণ ঋতুবন্দনা করে গেলেন। কলকাতায় যদিও সঠিক ঋতু পরিবর্তন টের পেতে সময় লাগে, কর্নেলের ছাদের বাগানে দাঁড়ালে নাকি কিছু লক্ষণ থেকে অবস্থা আঁচ করা যায়। কাজেই রাঙাটুলি আজ ভোরবেলা থেকেই তাঁকে খুব টানছে।

    চুপচাপ সিগারেট টানছিলাম। বিরক্ত হয়ে বললাম, পার্সটা খুলে দেখবেন না কি?

    কর্নেল হঠাৎ চাপাস্বরে বলে উঠলেন, চেপে যাও ডার্লিং! ভুলে যাও গতরাতে কোনও মেয়েকে লিফট দিয়েছ। এক মিনিট। পার্সটা আমি লুকিয়ে রেখে আসি।

    অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। কর্নেল পার্সটা সত্যি পাশের ঘরে কোথাও রেখে এলেন। ষষ্ঠী কফি দিয়ে গেল। কর্নেল বললেন, কফি খাও। নার্ভ চাঙ্গা করো। তারপর বলছি।

    কিছু বুঝছি না। আপনার সবসময় শুধু হেঁয়ালি।

    এই সময় ফোন বাজল। কর্নেল সাড়া দিয়ে বললেন, হালদারমশাই নাকি?…. বলেন কী! আপনার কাছে গিয়েছিল? আপনি সিওর? ….. বুঝেছি। …হাঁ চলে আসুন। জয়ন্ত এখানে আছে। …… হ্যাঁ, ঠিক আছে। রাখছি। চলে আসুন।

    বললাম, প্রাইভেট ডিটেকটিভ ভদ্রলোক নিশ্চয় কোনও কেস হাতে পেয়েছেন? কর্নেল হাসলেন। পেয়েছিলেন। কিন্তু পা বাড়িয়ে পুলিশের ধমক খেয়ে হটে আসেন। এখন সেই পুলিশই ওঁকে সাধছে। একটু অপেক্ষা করো। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের প্রিয় গোয়েন্দা ভদ্রলোক পুলিশের গাড়িতেই এসে পড়বেন।

    প্লিজ কর্নেল। আর হেঁয়ালি করবেন না।

    কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, গত রাতে সেই কলগার্ল চন্দ্রিকা রায় খুন হয়েছে।

    প্রচণ্ড চমকে উঠলাম। সে কী! কোথায়? কী ভাবে?

    নিজের ফ্ল্যাটের ভেতরে। কর্নেল নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন। ভোর ছটায় হ্যারি ওলসন ফোন করে আমাকে জানান, চারতলার ফ্ল্যাটে একটি মেয়ে খুন হয়েছে। সেজন্য পুলিশ তাঁর ওপর ঝামেলা করছে। আমি যেন ওঁকে সাহায্য করতে ছুটে যাই।

    আপনি গিয়েছিলেন?

    হ্যাঁ। আমার জানার ইচ্ছে ছিল গতরাতের সেই মেয়েটিই কিনা। যদি সে না হয়, তা হলে আমার কিছু করার নেই। তো গিয়ে দেখি, সে-ই। মুখটা মনে ছিল। তুমি তো জানো, মানুষের মুখ সম্পর্কে আমার নিজস্ব কিছু তত্ত্ব আছে। চন্দ্রিকা রায়ের মুখে বিপন্নতা লেখা ছিল। কিন্তু সেটা এতদুর গড়াবে ভাবতে পারিনি।

    ওর ফ্ল্যাটের চাবি তো পার্সে।

    নো পার্স। চেপে যাও।

    ফ্ল্যাটে ঢুকল কী করে চন্দ্রিকা?

    যে ভাবেই হোক, ঢুকেছিল। তারপর খুনী ওকে জবাই করেছে। হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থেই জবাই। কর্নেল তেমনই নির্বিকার মুখে বললেন। তোমাকে বলেছিলাম, কলগার্লদের জীবন সবসময়ই বিপন্ন। কেন বিপন্ন সেটা একটু চেষ্টা করলেই বুঝতে পারবে। এক্ষেত্রে পুলিশের বক্তব্য অবশ্য একটু অন্যরকম। চন্দ্রিকাকে খুন করা হয়েছে ডাকাতির উদ্দেশ্যে। আজকাল নাকি ফ্ল্যাটে ডাকাতি এবং খুন যে ভাবে হচ্ছে, সেভাবেই। কারণ ওলসনের বাড়ির কলগার্লদের গার্জেন ডিস্কোর কাছে চন্দ্রিকা ছিল এক দুর্মূল্য সম্পদ।

    ডিস্কো কে?

    এখনও তাকে দেখিনি। জানি না কে সে। জানতেও চাই না। ডিস্কো ইজ ডিস্কো। দ্যাটস অল।

    চন্দ্রিকার পার্সের ভেতর শেই কাগজটা—

    নো পার্স! কর্নেলের চোখে ভর্ৎসনা ফুটে উঠল। কথাটা বলে উঠে গেলেন জানালার কাছে। পর্দা তুলে উঁকি দিয়ে নিচের রাস্তা দেখতে থাকলেন।

    কিছুক্ষণ পরে সরে এসে ইজিচেয়ারে বসলেন কর্নেল। সহাস্যে বললেন, পুলিশের জিপে হালদারমশাই আসছেন। ভাবা যায়? চিন্তা করো ডার্লিং! ভদ্রলোক নিজেই চৌত্রিশ বছর পুলিশে চাকরি করেছেন। রিটায়ার করে ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন। অথচ পুলিশ ওঁকে সহ্য করতে পারে না এবং উনিও পুলিশকে সহ্য করতে পারেন না। সম্পর্কটা প্রায় সাপে-নেউলে বলা চলে। অথচ এতদিন পরে এই একটা ঘটনায় সাপ-নেউলের চমৎকার গলাগলি। দেখা যাক, এই গলাগালি থেকে চন্দ্রিকা হত্যার কোনও সূত্র বেরিয়ে আসে নাকি!

    ঘণ্টা বাজলে ষষ্ঠীচরণ গিয়ে দরজা খুলে দিল। তারপর প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদার নস্যির কৌটো হাতে হাসিমুখে ঘরে ঢুকলেন। তাঁর পিছনে এক পুলিশ অফিসার। হালদারমশাই ধপাস করে বসে এক টিপ নস্যি নিয়ে বললেন, গুপ্তসায়েবরে জিগান, কী কইছিলাম?

    পুলিশ অফিসার গম্ভীরমুখে বললেন, কর্নেলসায়েব কি ডি সি ডি ডি লাহিড়িসায়েবের ফোন পেয়েছেন?

    কর্নেল বললেন, অরিজিৎ বলছিল, আপনি যোগাযোগ করবেন। জয়ন্ত, আলাপ করিয়ে দিই। ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ অশোক গুপ্ত। আমার স্নেহভাজন বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরী। দৈনিক সত্যসবেক পত্রিকার সাংবাদিক।

    অশোক গুপ্ত নমস্কার করে বললেন, কাগজে নামটা দেখেছি। একটা অনুরোধ জয়ন্তবাবু। যদি কাগজে কিছু লেখেন, এমন কিছু লিখবেন না যাতে আমাদের তদন্তে ব্যাঘাত ঘটে।

    বললাম, কিছুই লিখব না। আমাদের কাগজের ক্রাইম-রিপোর্টার আছে। সে আপনাদের ভার্সানই লেখে। কাজেই যা লেখার সে-ই লিখবে। …

    আবার একদফা কফি এল। হালদারমশাইয়ের জন্য তিন ভাগ দুধ মেশানো কফি আনতে ষষ্ঠী ভোলেনি। চুমুক দিয়ে হালদারমশাই সন্তোষ প্রকাশ করে বললেন, ফার্স্ট ক্লাস! এবার অশোকবাবু কইবেন, নাকি আমি স্টার্ট করব? কর্নেলস্যার কী কন?

    কর্নেল বললেন, আপনারটা আগে শুনে নিই।

    প্রাইভেট ডিটেকটিভ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ মিশ্র ভাষায় যা শুরু করলেন, তার সারমর্ম এই:

    হালদারমশাই মাঝে মাঝে কাগজে তাঁর এজেন্সির বিজ্ঞাপন দেন। গত সপ্তাহে দিয়েছিলেন। কদিন আগে চন্দ্রিকা রায় তাঁর অফিসে গিয়েছিল। তাকে নাকি প্রায়ই একটা অচেনা লোক টেলিফোন করে জ্বালাতন করছে। কী একটা অদ্ভুত কথা বলছে, যার মাথামুণ্ডু বোঝা যায় না। আগের দিন চন্দ্রিকা নিউ মার্কেটে গিয়েছিল। ভিড়ের ভেতরে কেউ তাকে ফিসফিস করে একই কথা বলে ওঠে। কে বলল, চন্দ্রিকা খুঁজে পায়নি। কিন্তু ভীষণ ভয় পেয়ে চলে আসে। হালদারমশাই চন্দ্রিকার কেসটি যথারীতি গুরুত্বসহকারে হাতে নেন। চন্দ্রিকার বাসস্থানের কাছে অর্থাৎ ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ওই বাড়ির সামনে ফুটপাতে পুরো একটা দিন ওত পেতে থাকেন এবং নিজস্ব গোয়েন্দা-পদ্ধতিতে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন, বাড়িটা কলগার্লদের খাঁটি। চন্দ্রিকাও একজন কলগার্ল। তবে সেটা কোনও ব্যাপার নয়। চন্দ্রিকা তাঁর ক্লায়েন্ট।

    উল্লেখ করা দরকার, হালদারমশাই কেস পেলে যা করেন, অর্থাৎ ছদ্মবেশ ধরেই ওত পাততে গিয়েছিলেন। ভবঘুরে ফুটপাতবাসীর ছদ্মবেশ। গত পরশু শুক্রবার বিকেলে ফের যান উনি। সেই সময় সেজেগুঁজে চন্দ্রিকা বেরুচ্ছিল। তার পিছু নেন। চন্দ্রিকা পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে গিয়ে দাঁড়ায়। হালদারমশাই ভেবেছিলেন, সে খদ্দের ধরার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে একটা সাদা গাড়ি এসে থামে এবং চন্দ্রিকা তাতে চাপে। ভবঘুরে টাইপ নোংরা পোশাকপরা লোককে কোনও ট্যাক্সি ড্রাইভারই নেবে না। কাজেই গাড়ির নাম্বার টুকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় গোয়েন্দাকে। পরদিন শনিবার মোটর ভেহিকলস ডিপার্টমেন্টে চেনা লোকের সাহায্যে গাড়ির মালিকের নাম-ঠিকানা যোগাড় করেন। তারপর সেই ঠিকানায় চলে যান। গিয়েই একটু অবাক হন।

    এ পর্যন্ত শুনেই কর্নেল হঠাৎ বলে উঠলেন, ইন্দ্রজিৎ ব্যানার্জির বাড়ি?

    হালদারমশাই চমকানো গলায় বললেন, অ্যাঁ? আপনি জানেন?

    সৌরভ নাট্যগোষ্ঠীর ইন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি। গতকাল সন্ধ্যায় তাঁরই নাটক পরগাছা দেখতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে জয়ন্তকে নিয়ে গিয়েছিলাম? চন্দ্রিকা গ্রাম্য যুবতীদের দলে অভিনয় করছিল।

    আমি কর্নেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমিও হালদারমশাইয়ের মতো বলে উঠলাম, অ্যাঁ!

    কর্নেল একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ। যাই হোক, তারপর কী হলো বলুন হালদারমশাই?

    ঝটপট বললাম, কিন্তু থিয়েটার শেষ হওয়ার পর আমরা আসছিলাম গাড়িতে। অতদুরে থিয়েটার রোডের ওই মোড়ে মেয়েটি কী করে অত শীগগির এসে পড়ল?

    কর্নেল একই ভঙ্গিতে বললেন, তোমাকে বরাবর বলেছি জয়ন্ত! তোমার পেশার লোকেদের জন্য একটা জিনিস খুব জরুরি। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ–সবসময়, সবকিছুর প্রতি। তুমি লক্ষ্য করোনি, নাটকে নাচতে নাচতে একটি মেয়ের চুলে গাছের একটা পাতা পড়ল আর সে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে বেরিয়ে গেল। নাটকের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম একটি মেয়ের মৃত্যু। তার মুখটা মনে ছিল। কাজেই তার আগেই চলে আসায় অস্বাভাবিক কিছু নেই।

    তা হলে আপনি ওকে চিনতে পেরেছিলেন। কিন্তু গাড়িতে আসার সময় চুপচাপ রইলেন। পরে আমাকে বললেন না কিছু। কেন?

    বলেছিলাম।

    কলগার্ল মনে হচ্ছে বলেছিলেন শুধু।

    পুলিশের গোয়েন্দা বললেন, হাতে সময় কম কর্নেলসায়েব! আমাকে উঠতে হবে। ডি সি ডি ডি সায়েব আমাকে বলেছে–

    তাঁকে থামিয়ে কর্নেল বললেন, জাস্ট আ মিনিট! হালদারমশাইয়ের কথা আগে শুনে নিই।

    হালদারমশাই দুঃখিত মুখে বললেন, অহন আর কী কমু কর্নেলস্যার? ইন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি কইলেন, কী চাই? যেই ওনারে কইছি, কাইল আপনি কলগার্লেরে গাড়িতে উঠাইয়া লইয়া কই গেলেন জানতে চাই–আই অ্যাম এ প্রাইভেট ডিটেকটিভ, অমনি উনি দরজা আটকাইয়া পুলিশে ফোন করলেন। পুলিশ আইয়া আমারে ধমক দিয়া–ওঃ! ক্কী কারবার! কিছুতেই বুঝবে না। যত কই, কেসটা শোনেন–তত ধমক দেয়, শাট আপ! আর কক্ষনো ঝামেলা করবেন না।

    অশোকবাবু একটু হেসে বললেন, আসলে মিঃ হালদারের অ্যাপ্রোচে গণ্ডগোল ছিল। তাই থেকে একটু ভুল বোঝাবুঝি আর কী! চন্দ্রিকা মার্ডারের পর ওর ফ্ল্যাটে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে মিঃ হালদারের কার্ড পেয়ে আমরা অবাক হয়েছিলাম। তারপর ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলাম।

    হালদারমশাই বললেন, হঃ! একখান কার্ড দিছিলাম অরে। ভেরি স্যাড!

    কর্নেল বললেন, ইন্দ্রজিৎবাবুকে কি জানানো হয়েছে খবরটা?

    অশোকবাবু বললেন, ফোনে আমরা জানিয়েছি। মিঃ হালদারের কাছে ব্যাপারটা শোনার পর জানাতে হলো। তারপর লাহিড়িসায়েব আমাদের থানায় রিং করে খোঁজ নিলেন। তখন বুঝলাম, ইন্দ্রজিৎবাবুর সঙ্গে ওঁর জানাশোনা আছে। আমাদের ফোন পেয়েই ভদ্রলোক ডি সি ডি ড-কে অ্যাপোচ করেছেন সম্ভবত। যাই হোক, ডি সি ডি ডি আপনার কাছে আসতে বললেন। এখন মনে হচ্ছে, আপনি ব্যাকগ্রাউন্ডটা মোটামুটি জানেন।

    শুধু এটুকু জানি, ইন্দ্রজিৎবাবুকে কিছুদিন আগে কেউ ফোনে হুমকি দিয়েছিল, ঐ স্কুল স্ট্রিটের ওলসন হাউসের ছায়া মাড়ালে তাঁর বিপদ ঘটবে। স্বভাবত উনি অরিজিৎ লাহিড়িকে ব্যাপারটা জানিয়েছিলেন। তখন অরিজিৎ ওঁকে আমার নাম ঠিকানা দেন।

    শুনলাম আপনি গিয়েছিলেন ওবাড়িতে। ডেডবডি দেখে এসেছেন।

    হ্যাঁ। আপনাদের অফিসারদের ধারণা স্রেফ ডাকাতি এবং খুন।

    ঠিক তা-ই মনে হয়েছিল আপাতদৃষ্টে। অশোকবাবু হাসলেন। কিন্তু এবার আর তা মনে হচ্ছে না। ডি সি ডি ডি সায়েব বললেন, আপনার সঙ্গে যেন যোগাযোগ রেখে চলি।

    কর্নেল একটু চুপ করে থেকে বললেন, কতকগুলো ঘটনা এ মুহূর্তে আমাদের নানা আছে, যেগুলোর মধ্যে কোনও স্পষ্ট যোগসূত্র নেই। ঠিক আছে মিঃ গুপ্ত! আপনি প্রয়োজন হলে পরে যোগাযোগ করবেন। আমার ফোন নাম্বার আপনার নিশ্চয় জানা?

    হ্যাঁ। লাহিড়িসায়েব দিয়েছেন।

    একটা কথা। ডিস্কো কে আপনি জানেন?

    অশোকবাবু গুম হয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর বললেন, লোকটি কে আমি অন্তত জানি না। তবে কানাঘুষো শুনেছি, হি ইজ আ বিগ গাই। ওপরতলায় প্রচণ্ড প্রভাব আছে, এটুকু বুঝতে পারি।

    কিন্তু সম্প্রতি ওলসন হাউসে আপনারা হানা দিয়েছিলেন?

    পুলিশের গোয়েন্দা মুচকি হেসে বললেন, জাস্ট আ শো বিজনেস বলতে পারেন। এগুলো আমাদের মতো চুনোপুঁটিদের মাঝে মাঝে করতে হয়। আচ্ছা, আমি চলি।….

    অশোক গুপ্ত চলে যাওয়ার পর হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন, সব ফ্যাক্ট আমি পুলিশেরে দেই নাই কর্নেলস্যার। আপনারে দিমু। আগে দিলেই ভাল করতাম। মাইয়াডা তা হলে হয়তো মারা পড়ত না। ব্যাড লাক।

    কর্নেল বললেন, আপনি এখনও খুব উত্তেজিত হালদারমশাই! আমার মনে, আগে উত্তেজনাটা কাটিয়ে ওঠা দরকার।

    ক্যান? প্রাইভেট ডিটেকটিভ ভুরু কুঁচকে তাকালেন।

    কর্নেল হাসলেন। আপনার ভাষা। লক্ষ্য করেছি, উত্তেজনার সময় আপনি স্টান্ডার্ড বাংলায় কথা বলেন না।

    হালদারমশাই বিব্রতভাবে একটু হাসলেন। তারপর বললেন, হঃ। ঠিক কইছেন—সরি। ইউ আর রাইট কর্নেলস্যার। আমার ভীষণ খারাপ লাগছে। মেয়েটিকে বাঁচাতে পারলাম না। অশোকবাবুকে অত করে বললাম, ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ওই বাড়িটা হয়েই কর্নেল স্যারের কাছে যাওয়া যাক। উনি বললেন, ও-বাড়িতে গিয়ে আর লাভ নেই। বডি চালান গেছে। তবে বর্ণনা শুনলাম, হরিবল! গলা কাটছে। ওঃ!

    হালদারমশাই চোখ বুঝে শিউরে ওঠার ভঙ্গি করলেন। কর্নেল বললেন, কী ফ্যাক্ট দিতে চেয়েছেন বলছিলেন হালদারমশাই।

    হঃ! চোখ খুলে কে কে হালদার চাপা স্বরে বললেন, চন্দ্রিকা রায় কইছিল, যে লোকটা তারে টেলিফোন করে, সম্ভবত সে একজন চীনাম্যান। নিউ মার্কেটে ভিড়ের মধ্যেও চন্দ্রিকার মনে হয়েছিল লোকটা চীনাম্যান। না কর্নেল স্যার। চন্দ্রিকা তারে দ্যাখে নাই। কথা শুনিয়াই–

    কর্নেল ওঁর কথার ওপর বলে উঠলেন,! তার মানে, লোকটার যে সব কথা অদ্ভুত মনে হয়েছিল চন্দ্রিকার, সেটা কী চীনা ভাষার মতো?

    হঃ! হালদারমশাই সোজা হয়ে বসলেন। কতকটা তা-ই মনে হয়েছিল চন্দ্রিকার।

    আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, চাই চিচিং ফাঁক নয় তো?

    প্রাইভেট ডিটেকটিভ নড়ে উঠলেন। কী কইলেন? কী কইলেন?

    কর্নেল চোখ কটমটিয়ে তাকালেন আমার দিকে। বললাম, চাই চিচিং ফাঁক কথাটা কেউ আচমকা বলে উঠলে চীনে ভাষা মনে হতেও পারে, কর্নেল!

    হালদারমশাই বারকতক বিড়বিড় করে কথাটা আওড়ে খি-খি করে একচোট হাসলেন। তারপর একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন, চন্দ্রিকা কইছিল চ্যাংচুংচিংচাঁ করে কী যেন বলে লোকটা। তো জয়ন্তবাবু কী কইলেন য্যান? চিচিং ফাঁক? ফের খি খি করে হাসতে লাগলেন উনি।

    কর্নেল হাসছিলেন না। গম্ভীরমুখে বললেন, আর কোনও ফ্যাক্ট আছে কি আপনার হাতে?

    হালদারমশাই গম্ভীর হয়ে চাপাস্বরে বললেন, চন্দ্রিকা কইছিল, সে একটা অফিসে চাকরি করে। পরে জানলাম, এটা মিথ্যা কথা। তবে আমারে একটা অ্যাড্রেস দিছিল। যদি হঠাৎ তার কোনও বিপদ হয় হয়, সেই অ্যাড্রেসে আমারে যোগাযোগ করতে হইব। করুম এবার। তার আগে অ্যাড্রেসটা দেখাই।

    প্যান্টের পকেট থেকে ছোট্ট নোটবই বের করে উনি পাতাটা খুঁজে বের করলেন। তারপর কর্নেলকে দিলেন নোটবইটা। আমি কর্নেলের দিকে ঝুঁকে গিয়ে ঠিকানাটা দেখে খুব অবাক হয়ে গেলাম।

    ঠিকানাটা রাঙাটুলির!

    নামটা আমার অপরিচিত। হরনাথ সিংহ। তবে ঠিকানা দেখেই আমি উত্তেজিতভাবে বলে উঠলাম, কর্নেল! চিচিং ফাঁক রহস্যের সঙ্গে চন্দ্রিকার খুনের একটা লিংক পাওয়া যাচ্ছে যেন?

    কর্নেল আমার কথায় কান দিলেন না। হালদারমশাইকে নোটবইটা ফেরত দিয়ে বললেন, আপনি রাঙাটুলি যাবেন তাহলে?

    হালদারমশাই বললেন, হঃ! আই মাস্ট গো। আমার ক্লায়েন্ট। টাকা খাইছি তার থনে। দিস ইজ মাই মর‍্যাল ডিউটি কর্নেলস্যার!

    ফি দিয়েছিল চন্দ্রিকা? কত?

    ফাইভ হান্ড্রেড।

    বলেন কী!

    হালদারমশাই অবাক হয়ে বললেন, ক্যান? আমার মিনিমাম ফি কর্নেলস্যার। তবে আমি অরে ইনসিস্ট করি নাই। নিজেই জিগাইল ফিয়ের কথা। দিয়াও দিল।

    আপনার হাতে আর কোনও ফ্যাক্ট আছে হালদারমশাই?

    মাথা জোরে নেড়ে হালদারমশাই বললেন, নাহ। কিন্তু একটা কথা। আপনি অশোকবাবুরে ডিস্কোর কথা জিগাইলেন। হু ইজ দ্যাট ম্যান কর্নেল স্যার?

    জানি না। তার নাম শুনেছি। সে-ই নাকি ওলসন হাউসের কলগার্লদের গার্জেন।

    ডিস্কো। গোয়েন্দা ভদ্রলোক আবার একচোট হাসলেন। তারপর আর একটিপ নস্যি নিয়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন, আমার নেক্সট আইটেম ডিস্কো।

    কর্নেল বললেন, সাবধান হালদারমশাই! ডিস্কোকে আপনার লিস্টে রাখবেন না। বরং আপাতত আপনি রাঙাটুলির কোনও হরনাথ সিংহকে নিয়েই থাকুন।

    হালদারমশাই তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর অভ্যাসমতো যাই গিয়া বলে হন্তদন্ত বেরিয়ে গেলেন।

    বললাম, একটা কথা মাথায় ঢুকছে না। ডিস্কোর মতো লোক যার গার্ডেন, সে কেন প্রাইভেট ডিটেকটিভের সাহায্য নিতে গিয়েছিল?

    কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, সেটা আমারও মাথায় ঢুকছে না জয়ন্ত!

    বলে উনি পাশের ঘরে চলে গেলেন। একটু পরে পোশাক বদলে কাঁধে একটা কিটব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে এলেন। চলো জয়ন্ত! হালদারমশাইয়ের কথা শোনার পর আবার একবার ওলসন হাউসে যাওয়ার দরকার বোধ করছি। এক মিনিট! ইন্দ্রজিৎবাবুকে ফোনে পাই নাকি দেখি।

    কর্নেল ফোন ডায়াল করে সাড়া পেয়ে বললেন, ইন্দ্রজিৎ ব্যানার্জির সঙ্গে কথা বলতে চাই।…বেরিয়েছেন? কখন? … কিছু বলে যাননি? …ঠিক আছে। ফিরলে বলবেন কর্নেল সরকার ফোন করেছিলেন….

    গাড়িতে যেতে যেতে বললাম, চন্দ্রিকার পার্সটা আপনি খুলে দেখলেন না। ওর ভেতর একটুকরো কাগজে কোড ল্যাংগুয়েজে কী সব লেখা আছে। ফোনে আপনাকে বলেছিলাম।

    কর্নেল একটু হেসে বললেন, পার্সটা নিয়েই যাচ্ছি।

    সে কি?

    ও নিয়ে চিন্তা কোরো না ডার্লিং। মেয়েদের পার্স সম্পর্কে বেশি চিন্তা করা ঠিক নয়।

    বিরক্ত হলেও কিছু বললাম না। কিছুক্ষণ পরে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে একটা বাড়ির সামনে কর্নেলের নির্দেশে গাড়ি থামালাম। বাড়ির সামনে একটা পুলিশভ্যান দাঁড়িয়েছিল। বাড়ির দরজাটা পাশের একটা সংকীর্ণ গলির দিকে। সামনের অংশটায় কয়েকটা দোকান। সেগুলো এখন খুলে গেছে। টিভি ইলেকট্রনিক গ্যাজেট এবং পুরনো গ্রামোফোন রেকর্ডের দোকান, টেলারিং শপ ইত্যাদি।

    গলিতে ঢুকলে বাড়ির দরজা থেকে এক পুলিশ অফিসার এসে কর্নেলকে অভ্যর্থনা জানালেন। সহাস্যে বললেন, আপনি চলে যাওয়ার পরই বডি মর্গে চলে গেছে।

    কর্নেল বললেন, আর একবার চন্দ্রিকার ফ্ল্যাটটা আমি দেখতে চাই মিঃ দাশ।

    অবশ্যই। আসুন। পুলিশ অফিসার বাড়ি ঢুকে সামনে সিঁড়ির মুখে একটু থেমে চাপাস্বরে ফের বললেন, লাহিড়িসায়েব রেডিও মেসেজে জানতে চাইছিলেন, ওঁকে আপনি আবার আসবেন বলছেন, এসেছিলেন নাকি।

    বাড়ির সামনে একটুখানি লন মতো। সেখানে যথেচ্ছ দিশি-বিদেশি ফুলের গাছ এবং পাতাবাহার জঙ্গল করে ফেলেছে। বাঁদিকে নিচের তলার ঘরের জানালা থেকে একজন বুড়োসায়েব ফিসফিসিয়ে ডাকলেন, কর্নেল সরকার।

    কর্নেল তাকে বললেন, প্লিজ ওয়েট আ বিট মিঃ ওলসন।

    বাট দিস ইজ আর্জেন্ট, য়ু নো?

    ওক্যে! ওকে! জাস্ট ওয়েট আ বিট।

    বাড়ির বাইরের চেহারা জীর্ণ। কিন্তু সিঁড়িতে উঠতে উঠতে টের পাচ্ছিলাম ভেতরটা সুন্দর সাজানো-গোছানো। নেহাত কলগার্লদের ডেরা বলা হলেও এটা যে আসলে অভিজাত পতিতালয় তাতে কোনও ভুল নেই। তবে এ-ও ঠিক, সব ফ্লোরের ফ্ল্যাটগুলোর দরজা বন্ধ। সুনসান স্তব্ধতা ঘিরে আছে। চারতলায় দুটো ফ্ল্যাট এবং একপাশে ফাঁকা ছাদ অজস্র ফুলের টবে সাজানো।

    দুজন কনস্টেবল বেতের চেয়ারে বসেছিল। উঠে দাঁড়াল আমাদের দেখে। পুলিশ অফিসার পকেট থেকে চাবি বের করে একটা ফ্ল্যাটের তালা খুলে দিলেন। লক্ষ্য করলাম, হাঁসকলে আরেকটা তালা ঝুলছে। ওটাই তাহলে ফ্ল্যাটের নিজস্ব তালা। এই বাড়তি তালাটা নিশ্চয় পুলিশের।

    পুলিশ অফিসার বললেন, আপনি আবার আসবেন বলে ফ্ল্যাটের সবকিছু অ্যাজ ইট ইজ রাখা হয়েছে।

    থ্যাংস্। বলে কর্নেল ঢুকলেন।

    এটা ড্রয়িং রুম বলা চলে। কিন্তু আসবাবপত্র ওলটপালট ছত্রখান। কারা যেন প্রচণ্ড ধস্তাধস্তি মারামারি করেছে এ ঘরে। ওল্টানো সেন্টার টেবিলের পাশে কাচের গ্লাস ভেঙে পড়ে আছে। একটা মদের বোতল কার্পেটের ওপর গড়াগড়ি খেতে খেতে দেয়ালের কোণায় আটকে গেছে।

    বেডরুমের পর্দা ফর্দাফাই। কর্নেলের সঙ্গে ঢুকে শিউরে উঠলাম। মেঝের কাপের্ট এবং বিছানা রক্তে মাখামাখি। তবে এ ঘরেও একই ধস্তাধস্তি ওলটপালট হয়েছে।

    কর্নেল আমার দিকে ঘুরে বললেন, কী বুঝছ বলো?

    ধস্তাধস্তি মারামারির পর খুনটা হয়েছে?

    হা চন্দ্রিকা যথাসাধ্য লড়েছিল এটুকু বলা চলে। বসার ঘরের কার্পেটে রক্তের ছিটে আছে। সেটা সম্ভবত খুনীর হাতের রক্ত। সে কিছু তন্নতন্ন খুঁজেছে খুন করার পরে।

    পার্সের—

    কর্নেল দ্রুত বললেন, এ ঘরে কোনও পার্স পাওয়া যায়নি জয়ন্ত।

    ওঁর চোখের ভঙ্গিতে বুঝলাম, পার্স সম্পর্কে আমাকে চুপচাপ থাকতেই হবে। বললাম, পাশের ফ্ল্যাটে কেউ থাকে না? তার তো টের পাওয়া উচিত।

    পুলিশ অফিসার বললেন, কেটি বলে একজন অ্যাংলো মেয়ে থাকত। সে কদিন আগে বোম্বেতে তার মায়ের কাছে চলে গেছে। আমরা চেক করেছি। একটা টেলিগ্রাম পাওয়া গেছে, মায়ের অসুখ। চাবি দিয়ে গেছে ওঁর কাছে।

    কর্নেল ঘরের ভেতর এখানে ওখানে হুমড়ি খেয়ে বসে, কখনও দাঁড়িয়ে কী সব পরীক্ষা করছিলেন, তা উনিই জানেম। বললাম, কিন্তু ধস্তাধস্তির শব্দ নিচের ফ্ল্যাটের লোকেদের টের পাওয়া উচিত।

    পুলিশ অফিসার মুচকি হেসে বললেন, এ বাড়িতে কোন ঘরে কী হচ্ছে, তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। বুঝতেই পারছেন, বাড়িতে কারা থাকে। সারাদিন মদের ফোয়ারা ছোটে। আর হুল্লোড়।

    কর্নেল বললেন, বেরুনো যাক এবার। নতুন কিছু দেখার মতো নেই মিঃ দাশ। আপনি দরজায় তালা এঁটে দিন। আমরা মিঃ ওলসনের ঘরে একটু আড্ডা দিয়ে চলে যাব। আপনি আপনার ডিউটি করুন।

    নীচে ওলসন কর্নেলের অপেক্ষা করছিলেন। কর্নেল আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ওলসন আমাদের ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। তারপর জানালায় উঁকি মেরে বাইরেটা দেখে গদিআঁটা পুরনো একটা চেয়ারে ধপাস করে বসলেন। ওঁর চোখে উত্তেজনা জ্বলজ্বল করছিল। ফিসফিসিয়ে ইংরেজিতে বললেন, কর্নেল সরকার! আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ আগে মনে পড়ল কথাটা। তবে ফোনে বলতেও ভরসা পাইনি। বলা যায় না, আমার ফোন ট্যাপ করা আছে কি না।

    এবার স্বচ্ছন্দে বলুন মিঃ ওলসন।

    আপনাকে বলেছি, চন্দ্রিকা ওর পার্স কোথায় হারিয়ে আমার কাছে ওর ফ্ল্যাটের তালা খোলার জন্য সাহায্য চাইতে এসেছিল। আমি ওকে বললাম, তুমি ডিস্কোসায়েবকে ফোন করো। তার কাছে সব ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি থাকে। বলেছিলাম তো?

    বলেছিলেন।

    তখন আমার এখান থেকে চন্দ্রিকা ডিস্কো শয়তানটাকে ফোন করেছিল।

    এ-ও বলেছে আমাকে।

    ওলসন ঝুঁকে এলেন কর্নেলের দিকে। যেটা বলতে ভুলেছি, বলছি। ডিস্কোর ফোন নাম্বার আমি এতকাল জানতাম না। আমার বাড়ির কোনও খানকিই আমাকে সেটা জানাতে চায় না। চন্দ্রিকাও না। কিন্তু চন্দ্রিকা যখন ফোনে ডায়াল করছিল, নাম্বারগুলো– আমি দেখে নিয়েছিলাম। ভুলে যাব বলে একটু পরেই তা লিখে রেখেছিলাম। এখন নাম্বারটা আপনাকে দিতে পারি।

    বলে হ্যারি ওলসন পকেট থেকে একটা চিরকুট দিলেন কর্নেলকে। কর্নেল সেটা দেখে পকেটে ভরলেন। তারপর বললেন, ডিস্কোকে আপনি কখনও দেখেননি বলছিলেন। তো–

    হ্যাঁ। ওর লোকেদের দেখেছি। নচ্ছার গুণ্ডা তারা।

    তো তারপর চন্দ্রিকা ওপরে চলে যায়, বলেছিলেন।

    ঠিক। তারপর আর কিছু জানি না। ওলসন বিমর্ষ মুখে বললেন। কিন্তু ডিস্কো হারামজাদা চন্দ্রিকাকে যার হাত দিয়ে চাবি পাঠিয়েছিল, সেই খুন করেনি তো?

    খুনের কী মোটিভ থাকতে পারে তার?

    ওলসন একটু ভেবে বললেন, এমনও হতে পারে ডিস্কোশয়তানটার হুকুমেই সে চন্দ্রিকাকে খুন করে গেছে। সম্ভবত চন্দ্রিকা ওকে ব্ল্যাকমেল শুরু করেছিল।

    এ কথা কেন আপনার মনে হচ্ছে মিঃ ওলসন?

    ওলসন আবার একটু ভেবে নিয়ে বললেন, চন্দ্রিকা শুধু নয়, অন্য মেয়েরাও আমার ঘরে ফোন করতে আসে। অনেক সময় তারা ফোনে ডিস্কোর সঙ্গেও কথা বলেছে। আবার কখনও ডিস্কো আমাকে ফোন করে বলেছে, আমি ডিস্কো বলছি। অমুককে ডেকে দাও। লোকটার গলা আমার চেনা হয়ে গেছে। খুব ভদ্র, মার্জিত কণ্ঠস্বর। মনে হবে যেন কোনো অমায়িক সজ্জন ভদ্রলোক।

    আপনি এসব কথা আগেও বলেছেন আমাকে।

    হ্যাঁ। ওলসন ভারি শ্বাস ছাড়লেন। ইদানিং চন্দ্রিকা যে কণ্ঠস্বরে ডিস্কোর সঙ্গে কথা বলত, আমার মনে হতো মেয়েটা ওকে হুমকি দিচ্ছে। গতকাল রাত্রেও যে ভাবে চাবি হারানোর কথা বলে শীগগির ডুপ্লিকেট চাবি পাঠাতে বলছিল, আমার মনে হচ্ছিল যেন ধমকাচ্ছে। আমার এটা কিন্তু অবাক লেগেছে। চন্দ্রিকার আগের কণ্ঠস্বর এবং ইদানিংকার কণ্ঠস্বর এক ছিল না কর্নেল সরকার।

    কর্নেল একটা চুরুট ধরিয়ে বললেন, সম্ভবত আপনার কথা ঠিক। কিন্তু ডিস্কো কী এতই বোকা যে সে চন্দ্রিকাকে তার ঘরে খুন করতে লোক পাঠাবে? ইচ্ছে করলে সে বাইরে যে-কোনও জায়গায় চন্দ্রিকাকে খতম করতে পারত।

    ওলসন শুধু বললেন, তা ঠিক।

    কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, চলি মিঃ ওলসন। আশা করি, আর পুলিশ আপনাকে জেরা করছে না?

    ওলসন হাসবার চেষ্টা করে বললেন, নাহ্। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। কে

    উ ফোন করে চন্দ্রিকা সম্পর্কে খবর নিয়েছিল কি মিঃ ওলসন?

    ওলসন নড়ে উঠলেন। হ্যাঁ, হ্যাঁ। একটু আগে কে ফোন করে জিজ্ঞেস করছিল, চন্দ্রিকা খুন হয়েছে সত্যি কি না?

    নাম বলেনি?

    নাহ। ওর কোনও প্রেমিক হবে। এ বাড়ির খানকিদের প্রেমিকরাও এই ফোনে ওদের খবর নেয়। নরকে পড়ে আছি কর্নেল সরকার। আমার মৃত্যু যত শীগগির হয়, বেঁচে যাই। এ বয়সে যাবই বা কোথায়?

    কর্নেল হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, দুঃখিত মিঃ ওলসন। ভুলে গিয়েছিলাম। কোনও প্রশ্ন করবেন না এখন। চন্দ্রিকার হারানো পার্সটা আমি উদ্ধার করেছি। এটা আপনি রাখুন। ডিস্কো ফোন করলে তাকে এটার কথা জানাবেন। এটা ফেরত নিতে বলবেন। তারপর ওর লোকের হাতে দিয়ে দেবেন। কিন্তু আমার কথা বলবেন না যেন।

    আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কর্নেল তার কিটব্যাগ থেকে পার্সটা বের করে ওলসনের হাতে গুঁজে দিলেন। চাপাস্বরে ফের বললেন, পুলিশকেও জানাবেন না যেন। আপনার নিরাপত্তার জন্যই বলছি।…..

    গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বললাম, পার্সটার ভেতরে সেই অদ্ভুত চিরকুটটা–

    কর্নেল হাসলেন। ওটা আমি বের করে রেখেছি, ডার্লিং! এই দেখ।

    চিরকুটটা দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল আমার। বললাম, এটা কিসের কোড বলে মনে হচ্ছে আপনার?

    এখনও কিছু ভাবিনি এ সম্পর্কে।

    চন্দ্রিকা রায়ের সঙ্গে রাঙাটুলির সম্পর্ক আছে। এ ব্যাপারে কী ভাবছেন বলতে আপত্তি আছে?

    কর্নেল বললেন, শুরুতেই রহস্য এত বেশি জট পাকালেই সমস্যা। বোধবুদ্ধি ঘুলিয়ে যাবে। কাজেই একটা করে সূত্র ধরে এগোনোই ভাল। হুঁ, তুমি সঠিক রাস্তা দিয়েই চলেছ। আমার ঘরে না বসলে আমার মাথা খোলে না।

    সানি ভিলার তিনতলার ড্রয়িং রুমে ঢুকেই কর্নেল টেলিফোন তুললেন। ডায়াল করে সাড়া এলে বললেন, মিঃ ডিস্কো?….সে কী! রং নাম্বার?…জাস্ট আ মিনিট। জাস্ট আ মিনিট! রাঙাটুলির হরনাথ সিংহ এই নাম্বারটা আমাকে দিয়ে বলেছেন… বলেছেন, চন্দ্রিকা রায়ের কলকাতার গার্জেনকে এই নাম্বারে পাওয়া যাবে।…বুঝতে পারছেন না? আপনার নামটা প্লিজ…সরি মিঃ ডিস্কো…ডিস্কো নন আপনি? কিন্তু গ্রুপ থিয়েটারের ইন্দ্রজিৎ ব্যানার্জিও তো…না, না। আমি পুলিশ নই।…রং নাম্বার? সত্যি বলছেন? ঠিক আছে। তা হলে ছাড়ছি। কিন্তু হরনাথবাবু, ইন্দ্রজিৎবাবু দুজনেই তো…হ্যাঁ, হ্যাঁ। ভুল হতেই পারে। ধন্যবাদ। রাখছি। তবে আমার নাম্বারটা নিয়ে রাখুন প্লিজ।…।

    কর্নেল নাম্বার বলে ফোন রেখে হাসতে হাসতে বললেন, ডিস্কোই বটে। কথাগুলো শুনতেও চায়। কিন্তু রং নাম্বার বলতে ছাড়ছে না। যাক্ গে, বোতাম টিপে দিলাম। খেলাটা শুরু হয়ে যাক।

    বললাম, একটা ব্যাপার ভাবতে আমার খারাপ লাগছে।

    কী সেটা?

    চন্দ্রিকা আমাদের গাড়িতে পার্সটা ফেলে না গেলে হয়তো খুন হতো না। নিশ্চয় বাইরের লোককে দরজা খুলত না। কিংবা ডিস্কোর লোকের পাল্লায় পড়ত না।

    কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে বললেন, সে কী করত বলা কঠিন জয়ন্ত! কিন্তু আপাতদৃষ্টে ওলসনের ধারণার ফেসভ্যালু আছে। তার মানে, ডিস্কো ডুপ্লিকেট চাবি নিশ্চয় পাঠিয়েছিল। যার হাতে পাঠিয়েছিল, তার খোঁজ যতক্ষণ না পাচ্ছি কীভাবে চন্দ্রিকা খুন হয়েছে বলা যাবে না। শুধু একটা বিষয় স্পষ্ট। খুনী চন্দ্রিকার ফ্ল্যাটে ঢুকে চন্দ্রিকার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করেছে। এটা চন্দ্রিকার আত্মরক্ষার লড়াই ছাড়া কিছু নয়। তবে খুন করার পর সে চন্দ্রিকার আসবাবপত্র তন্নতন্ন খুঁজেছে। সবখানে রক্তের ছাপ সেটা বলে দিচ্ছে।

    এই চিরকুটটাই খুঁজেছে সম্ভবত।

    সম্ভবত। বলে কর্নেল চোখ বুজে দাড়িতে আঁচড় কাটতে থাকলেন।

    কর্নেল! একটা ভাইটাল প্রশ্নে আপনি মন দিচ্ছেন না এখনও।

    বলো!

    কী এমন ঘটেছিল যে আমাদের গাড়িতে পার্স ফেলে গিয়েছিল চন্দ্রিকা? এমন একটা ভুল কী করে হতে পারে? হ্যাঁ, মানসিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত আপনি দিয়েছেন। কাজেই–

    কর্নেল চোখ খুলে বললেন, সে বলছিল, পথে দুটো মস্তান ওর পেছনে লেগেছে।

    তারা যারাই হোক, নিশ্চয় জানত চন্দ্রিকার পার্সে ওই চিরকুটটা আছে।

    কর্নেল হাসলেন। অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে লাভ নেই, ডার্লিং। আপাতত আমি ইন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি এবং ডিস্কোর দিকে তাকিয়ে আছি। সূত্র তাদেরই কাছে আছে। ওয়েট অ্যান্ড সি।…

    এ বেলা কর্নেল আমাকে বাড়ি ফিরতে দিলেন না। তাঁর সঙ্গেই লাঞ্চ খেতে হলো। তার কথামতো আমার কাগজের অফিসে জানিয়ে দিতে হলো, একটা মার্ডারকেসের রোমাঞ্চকর এবং এক্সক্লসিভ স্টোরির পেছনে লড়ে যাচ্ছি। কাজেই অফিসে যেতে দেরি হতে পারে।

    লাঞ্চের পর সোফায় লম্বা হয়ে গড়াচ্ছিলাম। কর্নেল একটা অর্কিডসংক্রান্ত বইয়ে বুঁদ হয়ে আছেন। কিছুক্ষণ পরে ডোরবেল বাজল। তারপর ষষ্ঠী এসে বলল, বাবামশাই! এক ভদ্রলোক এয়েছেন।

    কর্নেল বইয়ের পাতায় চোখ রেখে বললেন, নিয়ে আয়।

    যিনি এলেন, তাঁর বয়স চল্লিশের মধ্যেই। পরনে আলিগড়ি চুস্ত পাঞ্জাবি। একমাথা ঝাকড়া চুল। সুন্দর বুদ্ধিদীপ্ত চেহারায় বিপর্যস্ত ভাব। তাকে দেখে কর্নেল বলে উঠলেন, আসুন ইন্দ্রজিৎবাবু! আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। সাড়ে তিনটে অব্দি দেখে বেরোতাম এক জায়গায়।

    ইনিই সেই ইন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি? পরগাছা নাটকের পরিচালক? তারপরই মনে পড়ে গেল, মঞ্চের গাছের তলায় আধপাগলা লোকটির চরিত্রে এঁকেই তো দেখেছিলাম।

    কর্নেল আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। একটু চুপ করে থাকার পর ইন্দ্রজিৎবাবুআস্তে বললেন, আমার নিজেকে অপরাধী লাগছে কর্নেল সরকার। খালি মনে হচ্ছে, আমারই বুদ্ধির দোষে চন্দ্রিকা মারা পড়ল। আপনাকে আমি আগে যদি সব কথা খুলে বলতাম।

    কী কথা ইন্দ্রজিৎবাবু?

    গতকাল সন্ধ্যায় আপনাকে আমার নাটক দেখার আমন্ত্রণ করেছিলাম। এর উদ্দেশ্য ছিল। চন্দ্রিকা বলেছিল, আমার দলে শয়তান ডিস্কোর চর ঢুকেছে। কিন্তু চন্দ্রিকা জানত না কে সেই চর। তাই ওকে আপনার কথা বলেছিলাম। আপনার চেহারার বিবরণও দিয়েছিলাম। তখন ও বলল, ওদের বাড়িতে ওলসনসায়েবের কাছে আপনি যান। তার মানে, আপনাকে সে চেনে। তবে আপনাকে শুধু কর্নেলসায়েব বলেই চেনে। যাই হোক, গতরাতে ভাবলাম, থিয়েটার শেষ হলে আপনি গ্রিনরুমে আসবেন। কিন্তু এলেন না।

    যাইনি আপনার স্বার্থে। আপনিও বলেছিলেন, প্রকাশ্যে আপনার সঙ্গে যেন না মিশি।

    হ্যাঁ। তবু ভেবেছিলাম, আরও সব আমন্ত্রিত মানুষের ভিড়ে আপনিও আসবেন।

    ঠিক আছে। তারপর কী হয়েছিল বলুন। সেটাই আমার জানা দরকার।

    আশ্চর্য ব্যাপার। থিয়েটার শেষ হওয়ার পর চন্দ্রিকাকে আর খুঁজে পেলাম না। গেস্টদের সঙ্গে গ্রিনরুমে কথাবার্তা না বলে তখনই বাইরে বেরিয়ে গিয়ে দেখি, চন্দ্রিকা সবে একটা ট্যাক্সিতে চাপছে। দৌড়ে গিয়ে বললাম, কী ব্যাপার? চলে যাচ্ছ যে? চন্দ্রিকা বলল, কর্নেলসায়েবের গাড়ি ফলো করছি। তুমি চিন্তা করো না। ওঁকে আমার এখনই মিট করা দরকার। বুঝলাম, প্রকাশ্যে আপনার সঙ্গে মিট করতে সেও যায়নি।

    কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে বললেন, এখন বুঝতে পারছি, সে ট্যাক্সি নিয়ে আমাদের গাড়ির পেছনে আসছিল। তারপর থিয়েটার রোডের একটা মোড়ে সম্ভবত যামে আমাদের গাড়ি হারিয়ে ফেলে। তখন ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে আমাদের খুঁজতে শুরু করে। হ্যাঁ ইন্দ্রজিৎবাবু! সে আমাকে খুঁজেও পেয়েছিল। সে লিফট চাইল। তখন বৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া তার পেছনে নাকি দুটো মস্তান লেগেছে।

    মস্তান লাগার ব্যাপারটা হয়তো ঠিক নয়। আসলে সে আপনার সঙ্গে কথা বলতেই চেয়েছিল।

    কিন্তু কিছুই বলেনি চন্দ্রিকা। আলাপ করার কোনও হাবভাব তার মধ্যে লক্ষ্য করিনি। বরং তাকে খুব বিপর্যস্ত দেখাচ্ছিল।

    ইন্দ্রজিৎবাবু অবাক হয়ে বললেন, আশ্চর্য তো!

    আরও আশ্চর্য, সে তার পার্স গাড়িতে ফেলে ওলসন হাউসে ঢুকে গিয়েছিল। তখনও অবশ্য জোর বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু পার্সটা–কর্নেল চোখ বুজে দাড়িতে হাত বুলিয়ে একটু পরে ফের বললেন, হ্যাঁ। আসলে সে আমার জিম্মায় পার্সটা রাখতে চেয়েছিল।

    পার্স? ইন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি চমকে উঠে আবার বললেন, পার্স?

    হ্যাঁ। ছোট্ট একটা পার্স। পার্সে ওর ফ্ল্যাটের চাবি ছিল। আরও চাবি ছিল দুটো। ফ্ল্যাটের চাবির ডুপ্লিকেট সে ডিস্কোর কাছে পাবে জানত। অন্য চাবি দুটোর ডুপ্লিকেট তার ফ্ল্যাটে থাকা উচিত। কাজেই চাবি খোয়া গেলেও তার অসুবিধা ছিল না।

    তা হলে পার্সে এমন কী ছিল যে সেটা আপনার জিম্মায় রাখতে চেয়েছিল?

    কর্নেল চোখ খুলে বললেন, আপনি বুদ্ধিমান ইন্দ্রজিৎবাবু।

    পার্সটা আপনি হাতড়ে দেখেছেন নিশ্চয়?

    দেখেছি।

    কিছু সন্দেহজনক জিনিস নেই ওটার মধ্যে?

    কর্নেল হাসলেন। সন্দেহজনক? নাহ্। কিছু টাকা, একজন, উঁকিলের একটা কার্ড, আর–

    আর কী?

    চাবি।

    প্লিজ পার্সটা একটু দেখাবেন?

    ওটা ওলসনসায়েবকে দিয়েছি। ডিস্কোকে উনি ফেরত দেবেন।

    ইন্দ্রজিৎবাবু ভুরু কুঁচকে তাকালেন। একটু পরে বললেন, পার্সটা হাতছাড়া করা ঠিক হয়নি আপনার।

    কেন বলুন তো?

    ওটার মধ্যে এমন কিছু সন্দেহজনক জিনিস থাকতে পারে, যা আপনার চোখ এড়িয়ে গেছে।

    তাই বুঝি?

    হ্যাঁ। কারণ আপনারই মতে, পার্সটা আপনার জিম্মায় রাখাই চন্দ্রিকার উদ্দেশ্য ছিল। তার ওই একটাই অর্থ হয়।

    আবার বলছি, আপনি বুদ্ধিমান ইন্দ্রজিৎবাবু।

    আমি বললাম, কিন্তু স্টেজে অভিনয়ের সময় চন্দ্রিকা পার্স কারুর কাছে রেখেছিল নিশ্চয়?

    কর্নেল তুম্বো মুখে বললেন, ছোট্ট একটা পার্স সে পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেও অভিনয় করতে পারে স্টেজে। তা-ই না ইন্দ্রজিৎবাবু?

    ইন্দ্রজিৎবাবুসায় দিলেন। তারপর লম্বা শ্বাস ছেড়ে বললেন, আমার দ্বিতীয় ভুল, ডিস্কো ফোনে আমাকে চন্দ্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করতেই হুমকি দিত, সেই কথাটা খুলে আপনাকে বলিনি। শুধু বলেছিলাম, ওলসন হাউসে যেতে কেউ মকি দিচ্ছে। আমার জানানো উচিত ছিল, চন্দ্রিকার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক। জনাইনি।

    আপনার গ্রুপে অভিনয় করে একজন কলগার্ল। আপনি এটুকু অবশ্য বলেছিলেন।

    ইন্দ্রজিৎবাবু আস্তে বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু বলিনি–আসলে লজ্জাবশতই বলতে পারিনি, চন্দ্রিকা অভিজাত ঘরের মেয়ে। নিজের স্বামীকে খুন করে প্রাণ বাঁচানোর জন্যই শয়তান ডিস্কোর আশ্রয় নিয়েছিল। কর্নেল সরকার! চন্দ্রিকা লাংঘাতিক মেয়ে ছিল, এটা যেমন সত্য, তেমনি এ-ও সত্য, তার স্বামী রথীন চৌধুরীও ছিল একজন নরপিশাচ। হৃদয়হীন, স্বার্থপর, বর্বর। চন্দ্রিকাকে রথীনই প্রথম পাপের পথে ঠেলে দেয়। তার জীবনের এই শোচনীয় পরিণতির জন্য সে-ই দায়ী।

    ডিস্কো কে?

    ইন্দ্রজিৎবাবু তাকালেন। দৃষ্টিটা ক্রুর মনে হলো। বললেন, জানি না। আপনি এবার তাকে খুঁজে বের করুন। আমি নিজের হাতে তাকে শাস্তি দেব।

    চন্দ্রিকা তার কোনও পরিচয় দেয়নি?

    না। কারণ চন্দ্রিকা কখনও তাকে দেখেনি। ডিস্কো আড়ালে থেকে সব চালায়।

    আপনি হরনাথ সিংহকে চেনেন?

    হ-র-না-থ সিংহ? ইন্দ্রজিৎবাবু আস্তে উচ্চারণ করলেন কথাটা।

    হ্যাঁ। রাঙাটুলির হরনাথ সিংহ।

    মাই গুডনেস! নড়ে বসলেন ইন্দ্রজিৎবাবু। চন্দ্রিকার স্বামী ছিল রাঙাটুলির লোক। চন্দ্রিকাঁদের বাড়িও তো সেখানে। চন্দ্রিকা আমাকে বলেছিল।

    চন্দ্রিকার সঙ্গে কোথায় কী করে আপনার পরিচয় হয়েছিল?

    পার্ক স্ট্রিটের একটা বারে। মুনলাইট বার। বারের একজন অ্যাংলো ওয়েটার চ্যাংকো আমার সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেয়। ওই বারে কলগার্লরা যায়। তো প্রথম আলাপেই চন্দ্রিকা থিয়েটারে অভিনয়ের সুযোগ দিতে অনুরোধ করেছিল।

    কর্নেল ষষ্ঠীচরণকে ডেকে কফি আনতে বললেন। তারপর বললেন, হরনাথ সিংহের কথা চন্দ্রিকা আপনাকে বলেনি কখনও। মনে করে দেখুন।

    নাহ। মনে পড়ছে না।

    একটু পরে কর্নেল বললেন, চন্দ্রিকার পার্সে অ্যাডভোকেটের কার্ড পাওয়ার অর্থ বোঝা গেল সম্ভবত। মার্ডার চার্জ ছিল চন্দ্রিকার নামে।

    হ্যাঁ। সে প্রায় বছর সাত-আট আগের কেস। তবে ডিস্কো প্রভাবশালী লোক। কেস থেকে তাকে বাঁচায়।

    ডিস্কোর সঙ্গে চন্দ্রিকার কীভাবে পরিচয় হয় আপনি জানেন?

    জানি না। চন্দ্রিকা খুলে কিছু বলেনি।

    আপনি কি জানেন, চন্দ্রিকা ইদানিং ডিস্কোকে ব্ল্যাকমেল করত কি না?

    বলেনি আমাকে। ওই যে বললাম, ওর হাত থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল।

    এই সময় ফোন বাজল। কর্নেলের ইশারায় ফোন তুলে সাড়া দিলাম। কোনও মেয়ে জানতে চাইছে, ফোনের নাম্বার এই কি না। বললাম, হ্যাঁ। বলুন, কাকে চাই?

    জবাব এল, এখানে কথা বলুন। তারপর পুরুষকণ্ঠে কেউ বলল, হ্যালো!

    কাকে চাই বলুন?

    কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে।

    কে বলছেন আপনি?

    ডিস্কো।

    ঝটপট ফোনের মাউথপিসে হাত চাপা দিয়ে কর্নেলকে বললাম, ডিস্কো।

    কর্নেল ফোন নিয়ে বললেন, বলুন মিঃ ডিস্কো! …আমাকে চেনেন তাহলে? কিন্তু দুপুরে তখন তো…ও। পরে খোঁজ নিয়ে পরিচয় পেলেন? ধন্যবাদ।.বলেন কী! ওলসনসায়েব…ঠিক আছে। প্রাণের ভয়ে বুড়োমানুষ আমার নাম করেছেন। পার্স পেয়েছেন তো?..না, না। ধন্যবাদ দেওয়ার কী আছে?…..হ্যাঁ মিঃ ডিস্কো! চন্দ্রিকার খুনী আপনি নন।… নিশ্চয়! আই মাস্ট ফাইন্ড আউট…..জাস্ট আ মিনিট! কালরাত্রে আপনি কার হাত দিয়ে ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি……ও মাই গড! সে কী! কোথায়?…ঠিক আছে। …হ্যাঁ, বুঝতে পারছি। হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো!

    বুঝলাম, লাইন কেটে গেল। কর্নেল ফোন রেখে গম্ভীর মুখে বললেন, যাই হোক, ডিস্কোর সঙ্গে এতক্ষণে যোগাযোগ হলো। তখন ফোনে ওর ডামি নাকি কথা বলেছিল। বুঝলে জয়ন্ত? অবশ্য এ-ও ডিস্কোর ডামি কি না বলা কঠিন। তবে অদ্ভুত ঘটনা, যে লোকটিকে দিয়ে ডিস্কো ডুপ্লিকেট চাবি পাঠিয়েছিল, তার ডেডবডি পাওয়া গেছে বেলেঘাটার কাছে ক্যানেলে। শট ডেড।

    চমকে উঠে বললাম, তা হলে ওলসনসায়েবের ধারণাই পরোক্ষে সত্যি। যে চাবি এনেছিল, সেই…

    ইন্দ্রজিৎবাবু ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠলেন, ফোনটা আমাকে দেওয়া উচিত ছিল কর্নেল সরকার।

    ষষ্ঠী কফি নিয়ে এল। কর্নেল বললেন, কফি খান ইন্দ্রজিৎবাবু! উত্তেজিত হয়ে লাভ নেই।

    কফি খেতে খেতে ইন্দ্রজিৎবাবু বললেন, চন্দ্রিকার পার্সটা শয়তান ডিস্কোকে ফেরত দেওয়া ঠিক হয়নি। তারপর ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ ঘরে স্তব্ধতা ঘনিয়ে এল। কর্নেল চোখ বুজে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়েছিলেন। ওই অবস্থায় কফিতে দিব্যি চুমুক দিচ্ছিলেন। ইন্দ্রজিৎবাবু কফি শেষ করে ঘড়ি দেখে বললেন, উঠি। আবার যোগাযোগ করব। ডি সি ডি ডি অরিজিৎ লাহিড়ির সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। কর্নেল সরকার! আপনি ডিস্কোকে আমার মুখোমুখি দাঁড় লাতে পারলে আমি খুশি হব।

    কর্নেল শুধু বললেন, দেখা যাক।

    ইন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। আমার কেন যেন মনে হলো, ভদ্রলোক নিছক নাটকের লোক নন।…

  • ফাঁদ

    ফাঁদ

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book-name]

    ফাঁদ

    এ সমুদ্রে অ্যাল্‌বাট্রস পাখি নেই। তবু একটা রেস্তোঁরা-কাম-বারের নাম অ্যাল্‌বাট্রস। ভারতের পূর্ব-উপকূলে এমন চমৎকার মিষ্টি স্বভাবের টাউনশিপই বা কটা আছে? সমুদ্রও এখানে বেশ শান্ত। মার্চের দক্ষিণবায়ু দুপুরেরর দিকে দাপাদাপি করলেও বিকেলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ঢেউগুলো খুব আড়ষ্ট হয়ে বালির বীচে শুয়ে পড়তে চাইছে। আমার জুতোর তলা একটুখানি ভিজে যাচ্ছিল। এটাই আমাকে সমুদ্রস্নানের আনন্দ দিল। আমার বৃদ্ধ সঙ্গী বলেন, অনেকের অনেকরকম আতঙ্ক থাকে। যেমন বেড়ালের জলাতঙ্ক। জানি, উনি আমাকেই ঠাট্টা করেন। কিন্তু স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, সমুদ্র যতই শান্ত হোক, সমুদ্র হচ্ছে সমুদ্রই। তার জল লোনা, বিশ্রী রকমের স্বাদ তার। আত্মহত্যার দরকার না হলে কখনও আমি সমুদ্রে নামব না।

    যতক্ষণ বীচে জলের ধার ছুঁয়ে ছুঁয়ে হেঁটে বেড়ালুম, আড়চোখে লক্ষ্য করে গেলুম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার টুপি খুলে অ্যাল্‌বাট্রসের লনে বসে আছেন। তাঁর টাকের ওপর নারকেল গাছের ছায়ার ফাঁক দিয়ে রোদের চিরুনি চলছে—অবশ্য বৃথাই। উনি খুবই আলাপী, সদালাপী এবং গায়েপড়া—তা সত্ত্বেও এখনও কোনও আগন্তুক ওঁর পাশে বসে নেই। এতদিন বাদে ওঁকে দারুণ একলা দেখাচ্ছিল। আমার মায়া জাগছিল।

    পিছনে পাহাড়ের আড়ালে সূর্য নেমে গেলে সমুদ্রে এতক্ষণে রঙের খেলা শুরু হলো। এই দৃশ্যের বর্ণনা ভাষায় দেওয়া যায় না, ছবি এঁকে খানিকটা যা অনুসরণ করা যায়। আমি না লেখক, না ছবি আঁকিয়ে নিতান্ত সাংবাদিক। এই ব্যাপারটার রিপোর্টাজ লিখতে হলে আমার চাকরি রাখা কঠিনই হতো। আমি রিপোর্টার। আমার চিফ বলেন, জয়ন্তের মেটিরিয়াল থাকে—কলম থাকে না এবং এটাই হচ্ছে ট্রাজেডি।

    মিনিট পাঁচেক ওই রঙের খেলা দেখে চোখ ব্যথা করতে থাকল। তখন ঘুরে দাঁড়ালুম এবং সঙ্গে সঙ্গে কিছুক্ষণের জন্য উপকূলনগরীকে রহস্যময় অন্ধকারে ডুবে থাকতে দেখলুম। চোখ পিটপিট করে সেই অন্ধকারকে তাড়াতে চাইছি, এমন সময় পাশ থেকে কে বলে উঠল—কিছু মনে করবেন না, আপনি কি বাঙালী?

    বাঙালী ব্যারাম আমারও একটু-আধটু আছে। তবে সেজন্য নয়, যাঁর প্রশ্ন তিনি এক মহিলা। এটাই আমাকে অসাধারণ ভব্য করে তুলল। রঙচমকানো চোখের অস্বচ্ছতায় একটা শাড়িপরা মূর্তি ভেসে উঠল। বললুম— আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনি……

    —নমস্কার। আমি……আমি কলকাতা থেকে এসেছি। আমি একটু বিপদে পড়েছি—একটু সাহায্য পেতে পারি কি?

    চোখের স্বচ্ছতা তখনও ফেরে নি। তাই মুহূর্তে মাথায় এল, নির্ঘাৎ কিছু ভিক্ষেটিক্ষে চাইবার ব্যাপার ঘটছে। তক্ষুণি গম্ভীর হয়ে বললুম—বিপদ! কী বিপদ?

    —আমার স্বামীকে দুপুর থেকে খুঁজে পাচ্ছি না।

    হাসি চেপে বললুম—খুঁজে পাচ্ছেন না? আপনার স্বামীকে? তার মানে?……

    —হ্যাঁ। আমরা এখানে এসেছি গতকাল সন্ধ্যায়। তারপরেই এমন কতকগুলো ব্যাপার ঘটল, খুব ভয় পেয়ে গেলুম। উনি অবশ্য গ্রাহ্য করলেন না। আজ দুপুরে খাওয়ার পর উনি আসছি বলে বেরিয়ে গেলেন। তখন প্রায় একটা বাজে। এখন পাঁচটা। দেরি দেখে সম্ভবপর সব জায়গায় খুঁজলুম, কিন্তু কোন খোঁজ পেলুম না। আমার বড় ভয় হচ্ছে……

    বলেই ভদ্রমহিলা যেন কান্নার আবেগ সামলাতে থেমে গেলেন। ততক্ষণে আমার চোখ থেকে রঙের ভেলকি ফুরিয়ে গেছে। দৃষ্টি স্পষ্ট হয়েছে। দেখলুম, মহিলার বয়স তেইশ-চব্বিশের বেশি হতেই পারে না, মোটামুটি ফর্সা রঙ, হাল্কা গড়ন কিন্তু চেহারা মন্দ না, চোখ দুটো টানাটানা এবং দুটো শক্তিশালী ভুরুর প্রশ্রয়ে একটু প্রগলভও বটে। বড়লোকের বউ বলে মনে হলো না। আবার গরীব বা নিম্নমধ্যবিত্তও নয়। ব্যক্তিত্ব আছে এবং তাই তাঁর বিবরণে কোনও ফাঁকি থাকতে পারে না।

    রহস্যের গন্ধে চঞ্চল হয়ে উঠলুম। আড়চোখে দূরে অ্যাল্‌বাট্রসের লনে কর্নেলকে দেখে নিলুম। উনি যেন চোখ বুজে ঝিমুচ্ছেন।

    বললুম—খুব অদ্ভুত ব্যাপার তো! কিন্তু আপনার স্বামী তো মাত্র চার ঘণ্টা আগে বেরিয়েছেন—কোথাও নিশ্চয় কোনও জরুরী কাজে আটকে পড়েছেন। এতে ভাববার কারণ আছে বলে তো মনে হয় না। আরও কিছুক্ষণ দেখুন না—নিশ্চয় ফিরে আসবেন। আর…ইয়ে, আপনার স্বামীর নামটা জানতে পারি?

    —পুলকেশ মৈত্র। আমি তৃণা মৈত্র।

    —আমি জয়ন্ত চৌধুরী।…একটু ইতস্তত করে কেন কে জানে বলে ফেললুম— আপনি প্রখ্যাত দৈনিক সত্যসেবকের নাম নিশ্চয় জানেন। আমি ওই কাগজের রিপোর্টার।

    শুনে তৃণা মৈত্র উজ্জ্বল মুখে বলল—আপনি রিপোর্টার? জয়ন্তবাবু, প্লীজ, এ বিপদে আমাকে সাহায্য করুন একটু। এখানে এসে একজনও বাঙালী দেখতে পেলুম না। তাই বিশ্বাস করে কাউকেও কথাটা বলতে পারিনি। হঠাৎ দূর থেকে আপনাকে দেখে কেন যেন মনে হলো…

    বাধা দিয়ে বললুম—আপনার স্বামীর বিপদ হয়েছে, একথা ভাবছেন কেন? তৃণা বলল—ভাবতে বাধ্য হচ্ছি জয়ন্তবাবু। বললুম না, গতকাল সন্ধ্যা থেকে এমন কতকগুলো ব্যাপার ঘটল যাতে খুব অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিলুম। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, কোনও বিপদ ঘটবে। ওকে বারবার বললুম, চলো—আমরা ফিরে যাই। ও শুনল না।

    —আপনারা কি এই প্রথম নীলাপুরমে এলেন? উঠেছেন কোথায়?

    —হ্যাঁ। এই প্রথম। আমরা উঠেছি সি ভিউ হোটেলে।

    —কোন বিশেষ কাজে, নাকি বেড়াতে?

    —বেড়াতে।…বলে তৃণা ব্যস্ততার ভাব দেখাল। — জয়ন্তবাবু, আপনাকে আমি সবই বলব। এখন ওকে খুঁজে বের করতে আমায় একটু সাহায্য করুন।

    চিন্তিত মুখে বললুম—তাহলে একটা কাজ করা যেতে পারে। থানায় যাওয়া যাক। কী বলেন? পুলিশকে সবটা জানানো দরকার। তারপর…

    তৃণা বাধা দিয়ে বলল—না। প্লীজ! পুলিশকে আগেভাগে সব জানাতে গেলে অনেক গোলমালে পড়ে যাব।

    —কিন্তু পুলিশের সাহায্য ছাড়া আমরা কতটুকু কী করতে পারি বলুন? আমিও তো এখানে নতুন এসেছি।

    তৃণা আবার ব্যস্ত হয়ে উঠল। বলল—নীলাপুরম জায়গাটা তো ছোট্ট। আমি একা খুঁজে বেড়াতে সাহস পাচ্ছি না। পেতুম—যদি কাল রাতে ওই ব্যাপারগুলো না ঘটত! আপনি আমার সঙ্গে থাকলে আমার একটুও ভয় করবে না। প্লীজ, জয়ন্তবাবু!

    এ একটা বিচিত্র ব্যাপার সন্দেহ নেই। একলা হলে নিশ্চয় এমন সহজ শান্ত স্বরে কথা বলতে পারতুম না। উদ্বেগে অস্বস্তিতে আড়ষ্ট হয়ে পড়তুম। কিন্তু হাতে আমার তুরুপের তাস আছে—রহস্যভেদী বৃদ্ধ বন্ধু। ওঁর সঙ্গেই বেড়াতে এসেছি নীলাপুরমে। অমন ধুরন্ধর সাহসী প্রাজ্ঞের ব্যাকগ্রাউণ্ডে থেকে আমি অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারি।

    কিন্তু উনি আপাতত বাইরে থাকুন। দৈনিক সত্যসেবকের প্রখ্যাত ও দুদে রিপোর্টার জয়ন্ত চৌধুরী কি এত নাবালক যে এক ভদ্রমহিলার হারানো স্বামীর খোঁজে বেরিয়ে পড়তে পারবে না? অবশ্য, এমনও হতে পারে যে পথেই পুলকেশ মৈত্রের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ব্যাপারটা চুকেও গেল।

    পা বাড়িয়ে পর মুহূর্তে একটু আড়ষ্ট হলুম। কী ঘটেছিল গতরাতে? এক্ষুণি পথে যেতে যেতে নিশ্চয় জেনে নেব। সেটা কতটা বিপজ্জনক হবে কে জানে! যদি সত্যি সত্যি তেমন কিছু হয়, তাহলে পরিণামে কর্নেলকে ডাকতেই হবে।

    বীচের উপরে পাথরের চাঙড়! তার উপরে বাঁধ। বাঁধের পরে একটা পাহাড়ের ঢালু গায়ে ‘অ্যাল্‌বাট্রস।’ তার পাশ দিয়ে একফালি পিচের পথ পাহাড়ের কাঁধ বরাবর এগিয়ে ওদিকে নেমে গেছে বড় রাস্তায়। পিচের সরু পথের দুধারে বড় বড় পাথর আর ঝোপঝাড়। সাবধানে ডানদিকে তাকাতে তাকাতে চলে গেলুম। কর্নেল আমাকে দেখতে পেলেন বলে মনে হল না। যতক্ষণ পাহাড়টা না পেরোলুম দুজনে কোনও কথা হলো না। বড় রাস্তার দুধারে সমতল জমিতে টাউনশিপ ও ছোট্ট বাজার। সেখানে পা দিয়ে মুখ খুললুম— দেখুন মিসেস মৈত্র, সবার আগে আমাদের একটা প্ল্যান করে নেওয়া দরকার। খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার কোনও মানে হয় না। মিঃ মৈত্রের কি এখানে পরিচিত কেউ আছে? মানে—ওঁর মুখে তেমন কিছু কি শুনেছিলেন?

    তৃণা মাথা নেড়ে বলল না।

    —তাহলে খুঁজবটা কী ভাবে?

    তৃণার মুখটা করুণ দেখাল। সে বলল— চলুন না, ওইসব লোককে জিগ্যেস করে দেখি। কারো না কারো সঙ্গে নিশ্চয় দেখা হয়েছে ওর। ছোট্ট জায়গা। বাঙালী তো নেই-ই।

    হাসি পেল। হাসিটা চেপে বললুম—আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে উনি এতক্ষণ হোটেলে ফিরেছেন! চলুন না— হোটেলে আপনাদের রুমটা আগে দেখে আসি।

    তৃণা একটু চঞ্চল হলো। বলল—ঠিক বলেছেন! আমার মাথা ঘুরছে—সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। কিচ্ছু ভাবতে পারছিনে। চলুন, চলুন! কথাটা সত্যি আমার মাথায় আসেনি।

    সে ব্যস্ত হয়ে বড় রাস্তা ধরে এগোল। ‘সী ভিউ’ হোটেল পাহাড়ের উত্তর দিকে । ‘অ্যাল্‌বাট্রস’ পূর্বে। ‘অ্যাল্‌বাট্রস’ থেকে ওখানে যাওয়ার পথ নেই, যদিও বাড়ির মাথা নজরে পড়ে। আমরা অবশ্য উঠেছি সরকারী ডাক বাংলোয়। সেটা সমুদ্রের ধারে আরও খানিকটা উত্তরে সমতল জমির ওপর। তার পিছনে সরকারী জঙ্গল আছে।

    বাজারের মাঝামাঝি গিয়ে ডানদিকে, অর্থাৎ পূর্বে ঘুরে আগেরটার মতো সরু পিচের পথে উঠলুম। কিছু দূরে চড়াই ভেঙে উঠতে হলো। এখানে ওখানে সুদৃশ্য কিছু বাড়ি আছে। মাঝেমাঝে গাড়ি আসছে যাচ্ছে। লোকজনের ভিড় আছে। বীচের দিকে চলেছে বা ফিরে আসছে। বছরের এসময়টা সমুদ্র-বিলাসীদের ভিড় থাকে এখানে।

    সী ভিউয়ের লাউঞ্জে ঢুকে তৃণা হন্তদন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল রিসেপশনিস্ট মহিলাকে—গুড ইভনিং মিস আয়ার। আমার স্বামী মিঃ মৈত্র ফিরেছেন?

    গোমড়ামুখী দক্ষিণভারতীয় কৃষ্ণাঙ্গী ঘাড় নাড়ল মাত্র। তারপর কি-বোর্ড থেকে চাবিটা দিলো। তৃণা চাবি নিয়ে ব্যস্তভাবে পা ফেলল। কার্পেটমোড়া সিঁড়ি। দোতালায় তের নম্বর ঘরের দরজার সামনে সে একটু দাঁড়াল। হতাশভাবে মাথাটা দোলাল। মুখে ঘামের বিন্দু লক্ষ্য করলুম। নিঃশব্দে আমার দিকে তাকাল একবার। যেন বলল—দেখলেন তো ও ফেরেনি।

    দরজা বাইরে থেকে বন্ধ আছে। অতএব ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু কী যেন ভাবল তৃণা। অস্ফুটস্বরে বলল—এক মিনিটের জন্যে আসবেন? সমস্ত ব্যাকগ্রাউণ্ডটা আপনাকে আগে বলা দরকার।

    সে দরজা খুলল। ঢুকে আবার বলল— আসুন!

    ভিতরে ঢুকে তাজ্জব বনে গেলুম। সী ভিউ হোটেলের খ্যাতির কথা জানা ছিল। কিন্তু এই ছোট্ট নীলাপুরমের সমুদ্রতীরে কখনও পাঁচতারা মার্কা বড় হোটেলের ব্যবস্থা আশা করিনি। মৈত্র দম্পতির এই সুইটের মাঝে সবটা নকশি কার্পেটে মোড়া এবং জুতো কয়েক ইঞ্চি দেবে যায়। ড্রয়িং রুম আর বেডরুম নিয়ে রীতিমতো অ্যাপার্টমেন্ট। দেয়ালে দেশী-বিদেশী আর্ট, কোণায় কোণায় অপূর্ব সব ফুলদানি এবং দামী আসবাবপত্র। আমার এই ভাবটা আঁচ করেই হয়তো তৃণা বলল—আমার স্বামী একটু বিলাসী-প্রকৃতির মানুষ। আপনি বসুন না প্লীজ।

    সে পুবের ব্যালকনির দিকে দরজা খুলে দিতেই সারা সমুদ্র ভেসে উঠল। কাছাকাছি একটা সোফায় বসে পড়লুম। সেই সময় হঠাৎ মনে হল, এখনই যদি মিঃ মৈত্র ফিরে আসেন, তৃণার উদ্বেগ ঘুচবে—কিন্তু আমি পড়ে যাব অস্বস্তিতে। কোনও স্বামীই এই অবস্থায় স্ত্রীর সঙ্গে অচেনা পুরুষকে দেখে খুশি হবে না। বিশেষ করে ঘরে যখন আর কেউ নেই এবং দরজাটা বন্ধ।

    তাই, এই সান্নিধ্য যতই ভাল লাগুক—কিংবা পরিবেশ যত প্রীতিপদ হোক, শীগগির কেটে পড়া উচিত। বললুম—যাক্ গে। এবার সংক্ষেপে বলুন তো গতরাতে কী হয়েছে?

    তৃণার কপালে ভাঁজ দেখা দিলো। তাকে অবশ্য চঞ্চল দেখাচ্ছিল বরাবর। সে বলল—হ্যাঁ, বলছি। গত সন্ধ্যায় আমরা এখানে এসে উঠলুম। ঘরেই ডিনার সার্ভ করার ব্যবস্থা আছে—সে তো দেখতেই পাচ্ছেন। কিন্তু ও বলল—নিচের ডাইনিং হলে যাবে। চেনাজানা কেউ আছে নাকি দেখবে। ওর স্বভাবই এ রকম। সব সময় হুল্লোড় পছন্দ করে। ড্রিংক করার অভ্যেসও আছে।

    তৃণা এই কথাগুলো বলার সময় পুবে সমুদ্রের দিকে তাকিয়েছিল। নীচে পাহাড়টা ঢালু হয়ে নেমে আবার বেমক্কা ঢেউয়ের মতো উঁচু হয়ে গেছে। ওই অংশটা পাথরের চাতালের মতো। তার নীচে খাড়া দেয়াল, দেয়াল ছুঁয়ে বালির বীচ। সে কথা থামিয়ে হঠাৎ সেদিকে কী যেন দেখতে থাকল।

    হেসে বললুম— কী? মিঃ মৈত্রকে দেখতে পাচ্ছেন নিশ্চয়?

    তৃণার মুখে কিন্তু অন্য ভাব। কেমন ভয়ার্ত চাহনি। ঠোঁট কাঁপছে মনে হল। সে ঘুরে চাপাস্বরে বলল—সেই লোকটা। বাইনোকুলার চোখে দিয়ে এদিকে কী দেখছিল। এইমাত্র সরে গেল।

    চমকে উঠেছিলুম। বললুম— কে? কোন লোকটা?

    তারপর ব্যালকনিতে গিয়ে বাইনোকুলারওয়ালা কোন বদমাশকে দেখব বলে উঠতেই তৃণা সেদিককার দরজা বন্ধ করে দিলো। কাঁপতে কাঁপতে বলল— না, না! আমার বড্ড ভয় করছে। আপনাকে মিঃ মৈত্র ভেবে যদি গুলি ছুঁড়ে বসে!

    উত্তেজিত হয়ে বললুম—কেন গুলি ছুঁড়বে? ব্যাপারটা কি?

    তৃণা বলল—বলছি, সব বলছি। আপনি বসুন প্লীজ। একটু…একটু স্থির হতে দিন!

    তার চেহারা লক্ষ্য করে ঘাবড়ে গেলুম। সে কাঁপছে, মুখটা সাদা হয়ে গেছে। টলতে টলতে সোফার কাছে এসে দাঁড়ালে বললুম—মিসেস মৈত্র! আপনি একটুও ভয় পাবেন না, অন্তত আমি থাকতে ভয় পাবার কিছু নেই। আপনি বসুন। বসে সব বলুন।

    তৃণা বসল না। ভয়ার্ত মুখে আমার দিকে তাকাল শুধু।

    বললুম—আপনি নিশ্চিত্ত থাকতে পারেন। কারণ, শুধু আমি নই—আমার সঙ্গে নীলাপুরমে যিনি এসেছেন, তাঁর নাম আপনি শুনে থাকবেন— কর্নেল নীলাদ্রি সরকার—প্রখ্যাত প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার।

    তৃণা বলে উঠল—তার মানে, গোয়েন্দা?

    —হ্যাঁ। অ্যাল্‌বাট্রসের লনে নিশ্চয় কোনও টাকমাথা বুড়ো ভদ্রলোককে দেখে থাকবেন! মুখে সাদা দাড়ি আছে। ইউরোপীয়ান বলে ভুল হতে পারে কিন্তু।

    —যেন দেখেছিলুম!…হ্যাঁ, হ্যাঁ—দেখেছি।

    —উনিই আমার ফ্রেণ্ড ফিলসফার অ্যাণ্ড গাইড বলতে পারেন। আপনার ভয়ের কোনও কারণ নেই। এক্ষুণি ওঁকে আমি খবর দিতে পারি। দেব?

    তৃণা একটু ভেবে বলল—দেখুন, আমার মনে হচ্ছে—ব্যাপারটা নিয়ে এত শীগগির হইচই করলে নিশ্চয় আমাদের কোনও ক্ষতি হবে। আপনি আগে সবটা শুনুন। তারপর যদি মনে হয়, তাঁকে জানানো দরকার—জানাব।

    —বেশ, বলুন।

    তৃণা নড়ে উঠল হঠাৎ। করুণ ধরনের হাসল।—ওই দেখুন! আমি কী ভীষণ অভদ্র! আমার ঘরে গেস্ট—আর আমি সব ভদ্রতা ভুলে বসেছি! এক মিনিট!

    বলে সে কোণার টেবিল থেকে ফোনটা তুলল। তারপর আমার দিকে ঘুরল। মুখটা আবার ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে।

    একটু বিস্মিত হয়ে বললুম—কী ব্যাপার?

    ফোনটা রেখে সে ব্যস্তভাবে বলল—আশ্চর্য তো! ফোনটা ডেড।

    —ডেড?

    —হ্যাঁ। এক মিনিট…আমি দেখছি করিডরে বেয়ারারা কেউ আছে নাকি!

    সে দরজার দিকে যাচ্ছে দেখে বললুম—কলিং বেল নেই?

    —তাই তো! সরি! …বলে তৃণা কাছেই দেয়ালে সুইচ টিপল।

    কোনও শব্দ শোনা গেল না। আরও কয়েকবার টিপল, তবুও না। সে আমার দিকে ফ্যাকাশে মুখে তাকাল। আমি ততক্ষণে বেশ ঘাবড়ে গেছি। বললুম—আশ্চর্য তো! আচ্ছা দেখছি!

    উঠে আলোর সুইচ টিপলুম। জ্বলল না। সেই সময় চোখে পড়ল সুইটে এয়ার- কনডিশানের ব্যবস্থা আছে। হস্তদন্ত হয়ে যন্ত্রটার চাবি ঘোরাতে শুরু করলুম। কোনও সাড়া নেই। তখন ঘুরে বললুম—লোডশেডিং চলছে না তো?

    তারপর দেখলুম তৃণা দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।

    বাইরে রোদ মুছে গেছে ততক্ষণে। ঘরের ভিতরটা ধূসর হয়ে উঠেছে। ব্যালকনির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখতে দেখতে তৃণার অপেক্ষা করতে থাকলুম। একটা রহস্যময় ঘটনার মধ্যে এসে পড়েছি, তাতে কোনও ভুল নেই। মনে মনে কর্নেলের উদ্দেশে বললুম—ওহে বৃদ্ধ ঘুঘু, তুমি সব সময় আমাকে অতি বুদ্ধিমান বলে ঠাট্টা করো। আমি গোয়েন্দা হলে নাকি বিস্তর ওলট-পালট কাণ্ড ঘটবে! হুঁ—এবার তুমি বসে-বসে দেখবে, গোয়েন্দা হবার এবং রহস্যের পর্দা ফাঁস করবার মতো বুদ্ধি জয়ন্তের ঘিলুতে প্রচুর পরিমাণেই আছে। মাননীয় গোয়েন্দামহোদয়! অপেক্ষা করো এবং দেখ!

    কিন্তু তৃণা ফিরছে না। পাঁচ মিনিটের বেশি অপেক্ষা করেও তার কোনও পাত্তা নেই। তখন উদ্বিগ্ন হয়ে পায়চারি শুরু করলুম। সেই সময় একটা আইডিয়া মাথায় এল। এখন তো তদন্তের চমৎকার সুযোগ হাতে পাওয়া গেছে! এই দম্পতির ব্যাকগ্রাউণ্ডটা জানার মতো কোনও জিনিস কি সুইটে নেই?

    যেমন কথাটা মাথায় আসা, অমনি বেডরুমে ঢুকে পড়লুম। চমৎকার আধুনিক উপকরণে সাজানো ঘর। সঙ্গে টয়লেট। তার দরজাটা একটু ফাঁক হয়ে আছে। আলো খুব কম। কিন্তু ওই ফাঁকে স্পষ্ট একজোড়া জুতো-পরা পা দেখতে পেলুম। পাদুটো মেঝেয় শুয়ে থাকা মানুষের।

    বুকের মধ্যে রক্ত শিসিয়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। এক লাফে এগিয়ে দরজাটা পুরো ফাঁক করতেই, যা দেখলুম, তাতে কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল।

    স্যুটপরা এক ভদ্রলোক চিত হয়ে পড়ে আছেন। কপালে দুটো রক্তাক্ত ক্ষত। একপাশে একটা রিভলভার পড়ে আছে।

    ওটা মৃতদেহ তাতে কোনও ভুল নেই। প্রথমে ঝোঁকের বশে রিভলভারটা তুলে নিলুম। আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলুম সেটার দিকে। কেন এমন করলুম, জানি না।…

    অ্যাল্‌বাট্রসের লনে বেঞ্চে বসে শেষ বেলায় দরদর করে ঘামছি আর কর্নেল আমাকে প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। যন্ত্রের মতো জবাব দিচ্ছি। গোড়ায় উনি হাসছিলেন। ক্রমশ দেখলুম, ওঁর হাসিটা মিলিয়ে গেল। গম্ভীর মুখে বললেন—তাহলে রিভলভার তুমি হাতে নিয়েছিলে?

    —হ্যাঁ।

    —কেন?

    —এমনি। হঠাৎ যেন পরীক্ষা করতে ইচ্ছে হল।

    —বোকার মতো কাজ করেছ ডার্লিং।

    —সে তো এখন বেশ বুঝতে পারছি।

    —আসার সময় করিডরে কেউ তোমাকে বেরিয়ে আসতে দেখেনি?

    —সম্ভবত না।

    —সম্ভবত কেন?

    —তখন তো আমি ভীষণ ভয় পেয়ে পালিয়ে আসছি। খুঁটিয়ে দেখার মতো মনের অবস্থা ছিল না।

    —সিঁড়িতে কারও সঙ্গে দেখা হয়েছে?

    —হ্যাঁ। একজন বেয়ারার সঙ্গে। সে চায়ের ট্রে নিয়ে উঠছিল। আমার সঙ্গে তার একটু ধাক্কা লাগে।

    কর্নেল আরও গম্ভীর হয়ে বললেন—রিসেপশনে মিসেস মৈত্রের সঙ্গে হয়নি বলছ। রিসেপশনিস্ট মেয়েটিকে ওঁর কথা জিজ্ঞেস করেছিলে?

    —না। তখন আমার মনের অবস্থা তো বুঝতেই পারছেন।

    কর্নেল আপনমনে মাথা দোলালেন। তারপর বলেলেন—খুব বোকার মতো কাজ করেছ, জয়ন্ত। তুমি এমন বোকামি করবে, তা ভাবাই যায় না। পারিপার্শ্বিক এভিডেন্সে তোমাকেই খুনী সাব্যস্ত করা এখন খুবই সহজ।

    শিউরে উঠে বললুম—সর্বনাশ!

    —রিভলভারে তোমার আঙুলের ছাপ রয়েছে। কাজেই জজসাহেব তোমাকে অনায়াসে ফাঁসিতে ঝোলাতে পারেন।

    এই অব্দি শুনেই আঁতকে উঠে বললুম—ওরে বাবা! তাই তো!

    কর্নেল এবার উঠে দাঁড়ালেন। পা বাড়িয়ে বললেন – দেখা যাক কী করতে পারি!

    দুজনে অ্যাল্‌বাট্রসের লাউঞ্জে ঢুকে সোজা রিসেপশনে গেলুম। তারপর কর্নেল ফোন তুলে ডায়াল করতে থাকলেন। আমি উদ্বিগ্ন মুখে কাচের দেয়ালের বাইরে সমুদ্র দেখতে থাকলুম। হঠাৎ চোখে পড়ল, বাঁদিকে দূরে সমুদ্রের খাড়ির উপর পাথরের চাতালে কে একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার চোখে বাইনোকুলার। সমুদ্রের দিকে পিছু ফিরে দাঁড়িয়ে সে কী যেন দেখছে। তৃণা যাকে সী ভিউ থেকে দেখেছিল, নিশ্চয় ওই লোকটা সেই। ওখানেই তো পাহাড়ের পিঠে সী ভিউ হোটেলটা রয়েছে—এখান থেকে যদিও সেটা দেখা যাচ্ছে না। তৃণা বলেছিল— লোকটা গুলি ছুঁড়তে পারে। কিন্তু তৃণাই বা হঠাৎ উধাও হলো কেন?…

    কর্নেলের ডাকে সংবিত ফিরল। চাপাস্বরে বললুম—কর্নেল। এই দেখুন সেই লোকটা!

    কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন— জয়ন্ত, থাক্। আর গোয়েন্দাগিরি, করতে যেও না। কেউ বাইনোকুলার দিয়ে কী দেখছে, তাতে আপাতত তোমার কিছু সুবিধে হবে না। এখন চলো, আমরা সী ভিউতে যাই। পুলিশ অফিসাররা এখনই সেখানে এসে পড়বেন।

    ইতস্তত করে বললুম—কিন্তু আমার যাওয়া কি ঠিক হবে?

    —হ্যাঁ। তোমার গ্রেফতার হবার সম্ভাবনাটা তো আছেই।

    বুক টিপটিপ করতে থাকল। বললুম—তাহলে আমি বরং ঘরে গিয়ে থাকি।

    —মোটেও না।…বলে কর্নেল আমার ডানহাতের কবজি চেপে ধরলেন এবং বলির পাঁঠার মতো আমাকে টানতে টানতে বেরোলেন।

    আগের রাস্তা দিয়ে ঘুরে আমরা সী ভিউ পৌঁছলুম। কিন্তু এখন সেখানে অন্য দৃশ্য। ছোটখাটো একটা ভিড় জমে আছে। ভিড়টা চাপাগলায় কী সব আলোচনা করছে। মাদ্রাজী রিসেপশনিস্ট মিস আয়ার শুকনো মুখে ফোন ধরে কার সঙ্গে কথা বলছে। বেয়ারারা সিঁড়িতে হন্তদন্ত হয়ে উঠছে আর নামছে। কর্নেল মিস আয়ারকে কিছু বলার জন্যে ঠোঁট ফাঁক করছেন, এমন সময় একজন বেয়ারা আমার দিকে আঙুল তুলে চেঁচিয়ে উঠল—এই লোকটা! এই লোকটা! মিস আয়ারও আমাকে দেখেই বলে উঠল—মাই গড! এই তো সেই লোক!

    অমনি বেয়ারার দল তুমুল হইচই করে আমাকে ঘিরে ফেলল। দারোয়ানকেও দেখলুম এগিয়ে আসতে। আমি বিকট চেঁচিয়ে বললুম—আমি নই, আমি নই!

    ভিড়সুদ্ধ পাল্‌টা চেঁচালো—পাকড়ো! পাকড়ো! শালা খুনীকো পাকড়ো!

    ভয়ে চোখ বুজে ফেললুম। মুখের সামনে অনেকগুলো হাতের মুঠো নড়ছিল। প্রচণ্ড মার আমাকে দেবেই—এই ভয়েই চোখ বুজে ফেললুম। অমনি শুনি কর্নেল তাঁর সামরিক গর্জনে সী ভিউকে যেন ফাটিয়ে দুভাগ করে ফেললেন—খবর্দার! যে যেখানে আছেন, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকুন। যা করার, পুলিশকে করতে দিন।

    মারমুখী ভিড়টা হকচকিয়ে গেল। তারপর দেখি, লন থেকে কয়েকজন পুলিশ অফিসার আর কনেস্টবল হন হন করে এগিয়ে আসছে। একজন অফিসার কর্নেলের সামনে এসেই হাত বাড়ালেন—হ্যাল্লো ওল্ড বস! এবারও দেখছি, আসামাত্র খুন খারাপি করে ফেলেছেন!

    কর্নেল একটু হেসে করমর্দন করে বললেন—হ্যাঁ, মিঃ বেঙ্কটেশ! এই আমার ভাগ্য। যেখানে যাই, সেখানেই এক ইটার্নাল মার্ডারার আড়াল থেকে একটা ডেডবড়ি সামনে ফেলে দিয়ে তামাশা করে।

    বেঙ্কটেশ বললেন—তাই বটে! চলুন, দেখি।…

    বেয়ারারা আগে আগে উঠতে থাকল। তিনজন পুলিশ অফিসার, কর্নেল আর আমি তৃণা মৈত্রদের ঘরে চললুম। নীচে দুজন অফিসার আর কনেস্টবলরা রয়ে গেল। আর কাউকেও উঠতে দেওয়া হলো না।

    সেই ভয়ঙ্কর ঘরে ঢুকতেই আমার দম আটকে এল। তবে একদিক থেকে আশ্বস্ত বোধ করছিলুম যে বেয়ারাদের করিডরে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওরা আমাকে ধরিয়ে দেবার জন্যে এখনও খুব ছটফট করছে নিশ্চয়। ভাগ্যিস, কর্নেল সঙ্গে আছেন।

    বাথরুমে লাশটা তেমনি পড়ে আছে। কিন্তু এবার নতুন দৃশ্য চোখে পড়ল। লাশের ওপর মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে পড়ে আছে সেই তৃণা মৈত্র। বেঙ্কটেশ ঝুঁকে ওর নাড়ি দেখে নিয়ে বললেন—শক খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। মিঃ আচারিয়া! আপনি দেখুন—ডাক্তার এলেন নাকি।

    একজন অফিসার তক্ষুণি চলে গেলেন। কর্নেল ও বেঙ্কটেশ তৃণাকে সাবধানে তুলে সংলগ্ন বেডরুমের খাটে শুইয়ে দিলেন। কর্নেল বললেন—জয়ন্ত। ওই গ্লাসে জল ঢালো।

    কর্নেলের হুকুম তামিল করছি, সেই সময় বাথরুমে বেঙ্কটেশের কথা শুনে চমকে উঠলুম।—কী আশ্চর্য। এটা দেখছি একটা খেলনা রিভলভার।

    কর্নেল বললেন— টয় রিভলভার? মাই গুডনেস!

    —হ্যাঁ, কর্নেল সরকার।

    —ভারি অদ্ভুত ব্যাপার তো।…বলে কর্নেল আমার হাত থেকে জলের গ্লাস নিয়ে তৃণার মুখে জলের ঝাপটা দিলেন।

    একটু পরেই তৃণা চোখ খুলল। অস্বাভাবিক লাল চোখ। নিষ্পলক তাকিয়ে সে কর্নেলকে দেখল। তারপর আমাকে দেখেই আর্তনাদ করে উঠল—ওই, ওই লোকটা ওকে খুন করেছে। পুলিশ! পুলিশ!

    আঁতকে উঠে বললুম—ছি ছি! কী সব যা-তা বলছেন। আপনিই তো আমাকে……

    বেঙ্কটেশ ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়েছেন। কর্নেল চোখ টিপে আমাকে থামতে ইশারা করলে আমি থেমে গেছি। তৃণা দুহাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কাঁদতে থাকল। কান্নার মধ্যে যা বলছে, তা একটু একটু বুঝতে পারছি। এখনও কেন আমাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না, এই অভিযোগ করছে সে। এতক্ষণ ভয় পাচ্ছিলুম, কিন্তু এবার রাগ এসে সাহস বাড়াল। মনে মনে বললুম— শয়ত্বানী, এ সবই তোমার ষড়যন্ত্র। নিজের স্বামীকে এভাবে খুন করিয়ে কারও কাঁধে চাপাবার মতলব করেছিলে। সেই মতলবে তুমি সী বীচে গিয়ে উপযুক্ত লোক খুঁজছিলে। আমিও বোকার মতো তোমার ফাঁদে ধরা দিতে এসেছিলুম। রোস, তোমার মজা দেখাচ্ছি। কর্নেল বললেন—মিঃ বেঙ্কটেশ, একটু পরেই ব্যাকগ্রাউণ্ডটা আপনাকে জানাব । আপাতত আপনি আপনার কর্তব্য করতে থাকুন।……

    সী ভিউয়ের গ্রাউণ্ড ফ্লোরে রিসেপশনের পিছনে ম্যানেজারের ঘর। ম্যানেজার ভদ্রলোক বাইরে গিয়েছিলেন। এসে সব দেখে শুনে অনবরত ঠক ঠক করে কাঁপছেন। ওঁর ঘরেই জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আমার স্টেটমেন্ট ও জেরাপর্ব চুকে যাবার পর তৃণা মৈত্রকে ডাকা হলো। তখন সাড়ে ছটা। বাইরে সমুদ্র অন্ধকারে গর্জন করছে। হোটেলের সবগুলো আলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। তৃণা আস্তে আস্তে মিস আয়ারের কাঁধে হাত রেখে ঘরে ঢুকল। মিস আয়ার চলে গেলে বেঙ্কটেশ বললেন—বসুন মিসেস মৈত্র। খুব দুঃখিত আমি—আপনার মনের অবস্থা জেনেও আপনাকে বিব্রত করা হচ্ছে। কিন্তু এটা কর্তব্য। তাই ক্ষমা করবেন।

    তৃণা বসে বলল—বলুন, কী জানতে চান?

    —আপনারা কবে এসেছেন এখানে?

    —সে তো হোটেলের রেজিস্টারে পাবেন। গতকাল সন্ধ্যা ছটা নাগাদ।

    —আপনি জয়ন্তবাবুকে বলেছিলেন, আপনার আসার পর কী সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। কী ঘটনা?

    তৃণা একটু ভেবে নিল যেন। তারপর বলল—কাল রাতে দুবার আমাদের দরজায় কে নক করেছিল। উনি দুবারই দরজা খুললেন, কিন্তু কাকেও দেখতে পেলেন না। প্রথমবার রাত ন’টায়, দ্বিতীয়বার সাড়ে দশটায়। আজ সকালে ব্যালকনিতে দুজনে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ আমার চোখে পড়ল একটা লোক খাড়ির উপরে পাথরের চাতাল থেকে বন্দুক তাক করছে। উনিই দেখতে পেলেন । অমনি আমাকে টেনে বসে পড়লেন। সেই অবস্থায় গুঁড়ি মেরে আমরা ঘরে ঢুকলুম। উনি ভীষণ কাঁপছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করেও কোনও জবাব পেলুম না।

    —বেশ। তারপর? আর কী ঘটনা ঘটল, বলুন।

    —নীচের ডাইনিংয়ে আজ দুজনে লাঞ্চ খেতে এসেছি, একজন বয় ওঁর হাতে একটা চিঠি গুঁজে দিল। লাউঞ্জে কে একজন তাকে নাকি দিয়েছে চিঠিটা! চিঠি পড়ে ওঁর মুখ শুকিয়ে গেল যেন। জিজ্ঞেস করলুম—কিন্তু এবারও কোনও জবাব দিলেন না। শুধু বললেন—পরে সব বলব। তারপর খুব তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে নিলেন। লাউঞ্জে গিয়ে দেখলুম—সত্যি, এক ভদ্রলোক বসে আছেন। মিঃ মৈত্র আমাকে ঘরে যেতে বলে ওই ভদ্রলোকের কাছে গেলেন। আমি আমার স্বামীর কোনও ব্যাপারে কখনও কৌতূহল প্রকাশ করিনি। কিন্তু এবার খুব উদ্বিগ্ন বোধ করছিলুম। আধঘণ্টা পরে উনি ফিরলেন। তারপর বললেন—একটু কাজে বাইরে যাচ্ছি। শীগ্‌গির ফিরব। ভেবো না। তখন প্রায় দুটো। পাঁচটা পর্যন্ত যখন ফিরলেন না, তখন উদ্বিগ্ন হয়ে বেরিয়ে পড়লুম। তারপর ওই ভদ্রলোক —জয়ন্তবাবুর সঙ্গে দেখা হলো।…

    বেঙ্কটেশ হাত তুলে বললেন—এবার, আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিন। জয়ন্তবাবুকে ঘরে বসিয়ে রেখে আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?

    তৃণা মুখ তুলে নিষ্পলক তাকাল। বলল—আমাদের রুমের ইলেকট্রিক কানেকশান কাটা দেখে নীচে বলতে এসেছিলুম। কিন্তু লাউঞ্জে নেমেই চোখে পড়ল, সেই পাথরের চাতালে সকালের বন্দুকঅলা লোকটা আর কে একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার চেহারা অবিকল মিঃ মৈত্রের মতো—পোশাক একই রকম। বেশ খানিকটা দূর বলে স্পষ্ট চেনা যাচ্ছিল না। তাই তক্ষুণি দৌড়ে সেদিকে গেলুম। কিন্তু আমি যেতে যেতে ওরা পাথরের আড়ালে চলে গেল। তখন কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে হোটেলে ফিরে এলুম। এসেই দেখি…

    সে দুহাতে মুখ গুঁজে হু হু করে কেঁদে উঠল। বেঙ্কটেশ বললেন—প্লীজ মিসেস মৈত্র। আমাদের আরও অনেক কিছু জানবার আছে। আপনার স্বামীর হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে আপনার সাহায্য খুবই দরকার।

    তৃণা ভেজা চোখ তুলে বলল— বলুন, আর কী জানতে চান?

    —আপনার স্বামীর পেশা কী ছিল?

    —স্থায়ী কিছু ছিল না। খুব খেয়ালী মানুষ। নানারকম ট্রেডিং এজেন্সি নিয়ে থাকতেন। সম্প্রতি নতুন কোনও ব্যবসা করা কথা ভাবছিলেন।

    এবার কর্নেল বললেন—মিসেস মৈত্র, আপনার স্বামী নীলাপুরমে কেন এলেন, আপনি নিশ্চয় জানেন।

    তৃণা ঘাড় নাড়ল।—জানি না। আমি কখনও ওকে প্রশ্ন করতুম না। এটা আমার স্বভাবও বটে—তাছাড়া প্রশ্ন করলেই উনি বলতেন— পরে বলব ’খন। এবার হঠাৎ নীলাপুরমে আসবেন বললেন, তখন আমি কোনও প্রশ্ন করিনি।

    —আপনার স্বামীর কি কোনও শত্রু ছিল জানেন?

    —না। থাকলেও আমাকে বলেননি।

    —আপনার স্বামীর নিশ্চয় বন্ধুবান্ধব ছিলেন?

    —হ্যাঁ, তা ছিলেন বই কি। তবে উনি খুব ব্যস্ত মানুষ ছিলেন। আড্ডা দিতে ভালবাসতেন।

    —খুব ঘনিষ্ঠ এমন কারও-কারও নাম নিশ্চয় বলতে পারবেন?

    —পুরো নাম আমি বলতে পারব না। যেমন এক ভদ্রলোক মাঝে মাঝে আমাদের কলকাতার বাসায় আসতেন। অবনীবাবু নাম। আরেকজন আসতেন— তাঁর নাম মিঃ রক্ষিত।

    —আপনারা কোন ট্রেনে এসেছেন হাওড়া থেকে?

    তৃণা একবার ওঁর দিকে তাকিয়ে বলল—কেন?

    —এমনি জিজ্ঞেস করছি।

    —হাওড়া থেকে ডিরেক্ট আসা যায় না কোনও ট্রেনে।

    —সরি! বলে কর্নেল একটু হাসলেন।— বিন্ধ্যাচল অব্দি আসা যায়। বিন্ধ্যাচলে কখন নেমেছিলেন?

    —গতকাল তিনটে পাঁচ-টাচ হবে।

    —আপনার স্বামীর সঙ্গে কারও দেখা হয়েছিল ওখানে?

    তৃণা নড়ে উঠল।—হ্যাঁ, হ্যাঁ। হয়েছিল। আমি ভুলে গেছি বলতে—মানে, ওই খাড়ির উপরকার চাতালে যে লোকটাকে দেখেছি, তারই সঙ্গে। বিন্ধ্যাচল স্টেশনে ওকে দেখেই উনি এগিয়ে গেলেন। আমাকে বললেন—তুমি এখানে একটু দাঁড়াও। আমি আসছি। পনের কুড়ি মিনিট লোকটার সঙ্গে কথা বলে ফিরে এলেন। তখন ওঁকে কেমন উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল।

    কর্নেল শুধু বললেন—আমার আর কোনও প্রশ্ন নেই। মিঃ বেঙ্কটেশ, ইউ প্রসিড।

    বেঙ্কটেশ ঘড়ি দেখে বললেন—মিসেস মৈত্র, আপাতত এই। আপনি ওখানে গিয়ে বসুন। মিঃ আচারিয়া, এবার ডাকুন বয় রণদীপকে।

    রণদীপ বয়সে তরুণ। ঘরে ঢুকে সেলাম করার পরই তার চোখ গেল আমার দিকে। অমনি ওর ঠোঁটে বাঁকা হাসি উঠল। নির্ঘাৎ ও ব্যাটা আমাকে তখন বেরিয়ে আসতে দেখেছিল ঘর থেকে। সে দাঁড়িয়ে রইল। বেঙ্কটেশ তাকে বসতে বললেও সে বসল না। তখন একটু হেসে বেঙ্কটেশ বললেন—তুমি রণদীপ সিং?

    —জী হাঁ।

    —কতদিন সী ভিউতে এসেছ?

    —তা বছর খানেক হয়ে গেল স্যার।

    —গতকাল তোমার ডিউটি ছিল কখন?

    —ছটা থেকে রাত একটা।

    —ওই সময়ের মধ্যে মিঃ মৈত্র ছাড়া নতুন কেউ এসেছিলেন হেটেলে?

    —দুজন সাহেব এসেছিলেন, ওনারা এখনও আছেন। তবে রেজিস্টার দেখলেই সব মালুম হবে, স্যার।

    —ঠিক বলেছ। আচ্ছা রণদীপ, ওই সময়ের মধ্যে মিঃ মৈত্রের ঘরে—মানে তের নম্বর ঘরে কাউকেও নক করতে বা ঢুকতে দেখেছিলে?

    —না স্যার। আমি তো হরদম করিডরেই ঘুরি।

    —আজ কখন ডিউটি তোমার?

    —দুপুর দুটো থেকে রাত নটা অব্দি আছে, স্যার।

    —এই সময়ের মধ্যে কাউকে তের নম্বরে…

    বাধা দিয়ে রণদীপ আমার দিকে আঙুল তুলল।—ওই যে স্যার…

    —না। উনি ছাড়া আর কেউ ঢোকেনি?

    —ঢুকেছিলেন। কিন্তু…

    ওকে থামতে দেখে কর্নেল ঝুঁকে পড়লেন। জিজ্ঞেস করলেন—যিনি ঢুকেছিলেন, তাকে আর নিশ্চয় বেরোতে দেখনি? তাই না?

    রণদীপের ঠোঁট কাঁপছে। সে কী বলেত চায়, অথচ পারছে না—খুব অবাক আর হতভম্ব যেন।

    কর্নেল বললেন—এবং যাকে ঢুকতে দেখেছিলে, তারই লাশ বাথরুমে দেখা গেল। তাই তো রণদীপ?

    রণদীপ লাফিয়ে উঠল—হ্যাঁ স্যার। তাই বটে স্যার। এতক্ষণে সেটা খেয়াল হয়নি স্যার!

    ঘরে সবাই নড়ে উঠেছিল—তারপর ভীষণ স্তব্ধতা। কর্নেল শুধু বললেন—মাই গুডনেস!

    তারপর শুনলুম তৃণা মৈত্র চিৎকার করে উঠল—মিথ্যা! একেবারে মিথ্যা! যে খুন হয়েছে, সেই আমার স্বামী!

    তারপর দেখলুম সে অজ্ঞান হয়ে কোণার সোফা থেকে মেঝেয় পড়ে গেল। কর্নেল আমাকে ডেকে বললেন—এস জয়ন্ত। বাইরে যাই। মিঃ বেঙ্কটেশ, দরকার হলে রিং করবেন—কিংবা আসতেও পারেন। ইউ আর অলওয়েজ ওয়েলকাম। অ্যাল্‌বাট্রস—রুম নম্বর থ্রি। অ রিভোয়া!

    রাস্তায় পৌঁছে কর্নেল বললেন—জয়ন্ত, কী ভাবছ?

    —ভাবছি, লাশটা তবে পুলকেশ মৈত্রের নয়?

    —না। তৃণার স্বামীর নয়।

    —কিন্তু এর মানেটা কী?

    —মানে এখনও বোঝা যাচ্ছে না। মাথাটা পরিষ্কার করা দরকার। তাই ডার্লি, চলো—আমরা একবার ওই খাড়ির উপর পাথরের চাতালে গিয়ে কিছুক্ষণ বসি। জায়গাটা ভারি চমৎকার।

    একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। বললুম—বন্দুক আর বাইনোকুলারধারী কারো পাল্লায় পড়ব না তো?

    কর্নেল হেসে বললেন—তোমার দৃষ্টিবিভ্রম নয় তো জয়ন্ত?

    —মোটেও না। স্পষ্ট দেখেছি একজন নীল শার্ট পরা লোক চোখে বাইনোকুলার রেখে দাঁড়িয়ে আছে। অবশ্য, তার হাতে বন্দুক দেখিনি।

    পাহাড়ের ঢালুতে নামতে গিয়ে হঠাৎ কর্নেল বললেন—বরং তার আগে একবার ওই দি সোয়ান নামে হোটেলটা থেকে ঘুরে আসি।

    ——হঠাৎ ওখানে কেন?

    —নিছক বিয়ার খেতে। বিয়ার মদ নয়। অন্তত এ বেলা খাওয়া যাক।

    দুজনে সোজা এগিয়ে সেই খাড়ির খানিকটা উত্তরে দি সোয়ান নামে ছোট্ট হোটেলের দিকে এগোলুম।

    হোটেলটা বাংলোবাড়ির মতো। লাউঞ্জে তেমন ভিড় নেই। একপাশে বার। বারে ঢুকে দেখলুম যা ভিড় তা এখানেই। নীল আলোয় মৌমাছির মতো একঝাঁক মাতাল গুঞ্জন করছে। চাপা সুরে বিলিতি অর্কেস্ট্রা বাজছে। আমরা খালি টেবিল খুঁজতে খুঁজতে কোণায় চলে গেলুম। একটা টেবিলে একজন লোক একা বসে আছে। টেবিলের গ্লাসে রঙিন মদ। কর্নেল ভদ্রতা করে বললেন—বসতে পারি?

    লোকটা ঘাড় নাড়ল মাত্র। তারপর গেলাসটা তুলে নিয়ে চুমুক দিল।

    আমরা বসে পড়লুম। ওয়েটার আমাদের পেছন পেছন এসে দাঁড়িয়ে ছিল। কর্নেল বিয়ার দিতে বললেন। এই সময় আমার চোখে পড়ল তৃতীয় চেয়ারের ওই লোকটার কোমরের কাছে একটা বাইনোকুলার ঝুলছে। অমনি শিউরে উঠে কর্নেলের ঊরুতে চিমটি কাটলুম। কর্নেল কিন্তু গ্রাহ্যই করলেন না। নির্বিকারভাবে দাড়িতে হাত বুলোতে থাকলেন। তখন আমি লোকটাকে আরও ভাল করে লক্ষ্য করতে থাকলুম। দূর থেকে কম আলোয় দেখেছি, ভুল হতেও পারে। কিন্তু এর পোশাকও স্পষ্ট বলে দিচ্ছে পাথরের চাতালে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিই বটে। বয়স আন্দাজ পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ হবে ওর। বেশ বলিষ্ঠ চেহারা। মুখের চামড়ায় পোড়খাওয়া ভাব আছে। খাড়া নাক আর চৌকো চোয়াল দেখে সহজেই বোঝা যায় লোকটা ডানপিটে না হয়ে পারে না।

    বিয়ার এসে গেল। কর্নেল বোতল থেকে গ্লাসে খানিকটা বিয়ার ঢেলে বললেন—জয়ন্ত নিশ্চয়ই এই নিরামিষ পানীয়ে সন্তুষ্ট হবে না?

    কর্নেল আমার চিমটিতে সাড়া দেননি বলে ক্ষুব্ধ ছিলুম। তাই গম্ভীর হয়ে মাথাটা দোলালুম মাত্র—তার মানে হ্যাঁ এবং না দুই-ই হতে পারে। কর্নেল একটু হেসে গ্লাসটা তুলে ‘চিয়ার্স’ বলে চুমুক দিলেন।

    এই সময় তৃতীয় চেয়ারের লোকটা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। তারপর বেরিয়ে গেল। তখন ব্যস্ত হয়ে চাপা গলায় বললুম—যাঃ। চলে গেল যে!

    কর্নেল গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বললেন—কে গেল, ডার্লিং?

    ক্ষেপে গিয়ে বললুম—ন্যাকামি করবেন না। সেই বাইনোকুলারঅলা লোকটা এতক্ষণ দিব্যি আপনার সামনে জলজ্যান্ত বসে রইল—আমি চিমটি কাটলুম, অথচ গ্রাহ্য করলেন না।

    কর্নেল একটু হেসে বললেন—তুমি কি ভাবছ বাইনোকুলার সঙ্গে থাকলেই তাকে খুনী বলে সন্দেহ করতে হবে।

    —নিশ্চয়। ওই লোকটাই তো তখন খাড়ির ধারে দাঁড়িয়ে…

    কর্নেল হঠাৎ আমার হাত চেপে ধরে বললেন—চুপ। তারপর অদ্ভুত ভঙ্গিতে চোখের তারা ঘুরিয়ে ওঁর ডান-দিকটা নির্দেশ করলেন। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি ওই টেবিলে তিনজন লোক বসে আছে। দুজন সর্দারজী, অন্য একজন ধুতিপাঞ্জাবি পরা বাঙালী ভদ্রলোক। বাঙালী ভদ্রলোকটি যে সর্দারজীদের সঙ্গে আসেননি, তা দেখামাত্র বোঝা যায়। উনি আপনমনে একটা পেন দিয়ে একটুকরো কাগজে কাটাকুটি করছেন। পাশের গ্লাসে মদ। মুখের ভাবভঙ্গি দেখেই বুঝলুম, প্রচণ্ড নেশা হয়ে গেছে। কাগজের টুকরোটা বারেরই বিল মনে হলো। তার উপরে যেভাবে কলম চালাচ্ছেন, বাঙালী যে জাত কেরানী তা নির্দ্বিধায় প্রমাণ করা যায়। আমি আর হাসি চাপতে পারলাম না।

    হাসি শুনেই ভদ্রলোক মুখ তুলে তাকালেন। দেখি, উনিও গদগদ হয়ে হাসছেন। মাতালের এমন হাসি আমার পরিচিত। আমি ওঁর কাজে সায় দেবার ভঙ্গিতে মাথা দোলালুম। ভদ্রলোক শুধু মাতাল নন, রসিকও বটে। আমনি দ্বিগুণ উৎসাহে কলম চালনা শুরু করলেন এবং মাঝেমাঝে মাথা তুলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। এমন মজা পেলে ছাড়তে ইচ্ছে করে না।

    ব্যাপারটা সর্দারজীদের চোখে পড়ল এতক্ষণে। একজন ভুরু কুঁচকে অস্পষ্ট কিছু বলল। মুখে বিরক্তির চিহ্ন।

    হঠাৎ কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন।—আমি একবার বেরুচ্ছি, জয়ন্ত। তুমি আমার জন্যে এখানেই অপেক্ষা করো। বার দশটা অব্দি খোলা। আমি সড়ে নটার মধ্যেই ফিরব।

    আমাকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বেরিয়ে গেলেন উনি। আমার ক্ষোভ হলো ওঁর ওপর। কিন্তু কী আর করা যাবে? ওঁর কথামতো না চললে উনিও বড্ড বিরক্ত হবেন। বিশেষ করে খুনখারাপির তদন্তের ব্যাপারে উনি তখন অন্যমানুষ। তাই বসে থাকতে হলো।

    এই অবস্থায় ভদ্রলোকের সঙ্গে ভাব না জমিয়ে উপায় নেই। নিঃসঙ্কোচে বললুম—চলে আসুন না এখানে!

    ভদ্রলোক যেন সেটাই চাইছিলেন। টলতে টলতে কলম কাগজ আর গেলাস নিয়ে আমাদের টেবিলে এলেন। তারপর নমস্কার করে বললেন—বাঁচলুম। আমার নাম পরিতোষ কারফর্মা। টালিগঞ্জে কাঠগোলা আছে। মশাই যে বাঙালী, তা আঁচ করেছিলুম। কিন্তু বুঝলেন? ওই দুই সর্দারজীর ভয়ে টেবিল ছেড়ে উঠতে পারছিলুম না।

    —কেন বলুন তো?

    —ওদের আমি মশাই ভীষণ ভয় করি। টেবিল থেকে উঠলেই যদি মেরে বসে!

    হো হো করে হেসে উঠলুম। বলুলম—একা এসেছেন নীলাপুরমে?

    পরিতোষবাবু বললেন—হ্যাঁ। আমি মশাই ব্যাচেলার মানুষ। দোকা-টোকা ভালবাসিনে। আপনি?

    —আমিও তাই।

    বাচ্চা ছেলের মতো হি হি হেসে পরিতোষবাবু বললেন—খুব ভাল। খুব ভাল! খবর্দার স্ত্রীলোকের ছায়া মাড়াবেন না। মাড়িয়েছেন না মরেছেন। তা ব্রাদারের নামধাম?

    পরিচয় দিতেই লাফিয়ে উঠে বললেন—ওরে বাবা কী আনন্দ, কী আনন্দ। তারপর হাস্যকরভঙ্গিতে শিস দিয়ে বেয়ারাকে ডাকলেন। আমার আপত্তি সত্ত্বেও হুইস্কির অর্ডার দিলেন। বললেন—আপনার মতো সঙ্গী যখন পেয়ে গেছি, আজ মশাই বারসুদ্ধু শুষে খাব।

    বলুলম—উঠেছেন কোথায়?

    পরিতোষবাবু ছাদ দেখিয়ে বললেন— মাথার ওপরে। এই ‘সোয়ানেই’। আপনি?

    —অ্যাল্‌বাট্রসে।

    —খুব ভাল, খুব ভাল।…বলে একটু ঝুঁকে চোখ নাচিয়ে জিগ্যেস করলেন— ওই বুড়ো সায়েবটি কে? এখানে এসেই আলাপ হয়েছে বুঝি? আমেরিকান নয় তো? দেখবেন ব্রাদার— সি. আই. এ. ঘুরঘুর করছে সবখানে। খুব সাবধান। দেশের কোনও কথা ফাঁস করবেন না। আপনারা জার্নালিস্ট। আপনারা দেশের সব গুহ্যখবর রাখেন কি না। তাই বলছি।…

    বাধা দিয়ে বললুম— না, না। উনি ভারতীয়। শুধু ভারতীয় নয়, বাঙালী।

    পরিতোষবাবুর চোখের ঢেলা বেরিয়ে গেল।—অ্যাঁ? উনি বাঙালী? ওরে বাবা! কী আনন্দ! কী আনন্দ! ওয়েটার। ইধার আও!

    এই আনন্দে আবার হুইস্কি এসে গেল। এমন আমুদে লোক খুব কমই দেখেছি। মেজাজ ভাল হয়ে গেল ক্রমশ। বিয়ারের পর দু পেগ হুইস্কি পেটে পড়ার ফলে নেশাও ধরে যাচ্ছিল। এর পর কীভাবে সময় কেটেছে, বলা কঠিন। যখন কর্নেল ফিরে এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন, তখন আমার চোখে নানারঙের খেলা ভাসছে।…

    রাত কীভাবে কেটেছে, মনে নেই। সকালে উঠে দেখি পাশের বেড়ে কর্নেল নেই। মাথা ভোঁ ভোঁ করছিল। তাই স্নান করলুম। বয় এসে ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেল। ব্রেকফাস্ট সেরে সিগারেট ধরিয়ে ব্যালকনিতে গেলুম। সকালের শান্ত সমুদ্র রোদে ঝকমক করছে। সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে কর্নেল এসে গেলেন।—হ্যাল্লো ডার্লিং! উঠে পড়েছ দেখছি!

    একটু হেসে বললুম—-মদে আমার তেমন নেশা হয় না কর্নেল!

    —তাই বটে! কর্নেল মৃদু হেসে বললেন। আশা করি, তাহলে গতরাতে কীসব ঘটেছে তোমার সামনে—সব মনে আছে?

    —নিশ্চয় আছে।

    —বলে যাও, ডার্লিং।

    —পরিতোষবাবু আর আমি জমিয়ে খাচ্ছিলুম। তখন আপনি এলেন। তারপর আমরা দুজনে অ্যাল্‌বাট্রসে চলে এলুম।

    কর্নেল আবার হেসে উঠলেন।

    —হাসছেন যে?

    —হাসছি। কারণ, গতরাতে তোমার প্রচণ্ড নেশা হয়েছিল।

    —প্রমাণ অনেক। তোমাকে নিয়ে সাইকেল রিকশো করে ফিরে আসছি, পথে ঝোপঝাড় আর পাথরের আড়াল থেকে একটা লোক রিভলভার থেকে গুলি ছুঁড়ল। আমাদের সৌভাগ্য, রিকশোটা জোরে যাচ্ছিল তাই লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো।

    আঁতকে উঠে বললুম—সর্বনাশ!

    কর্নেল বললেন—যাই হোক, আমি তৈরি ছিলাম। পাল্টা গুলি ছুঁড়ে ওর রিভলভারটা ফেলে দিলুম। হাত চেপে ধরে সে পালালো। তখন রিকশাঅলাকে বললুম তোমাকে পৌঁছে দিতে। আর আমি সেই রিভলভারটা খুঁজে নিয়ে মিঃ বেঙ্কটেশের কাছে গেলুম। ফোরেন্সিক টেস্টে নিশ্চয় ধরা পড়ছে—ওটাই মার্ডার উয়েপন।

    —এত কাণ্ড! অথচ কিচ্ছু টের পাইনি!

    —পাবে কীভাবে? পরিতোষবাবু তোমাকে মাতাল করে দিতেই চেয়েছিলেন যে!

    —কেন? ওঁর কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে?

    —তুমি মদে বেহুঁশ থাকলে ফেরার পথে আমাকে একা খতম করাটা খুব সহজ হবে ভেবেছিলেন।

    —কর্নেল, খুলে বলুন।

    কর্নেল পা ছড়িয়ে বসে বললেন—জয়ন্ত, এই কেসটা ইন্সিওরেন্স-ঘটিত।

    —বুঝলুম না।

    —পুলকেশ মৈত্রের তিনটে ইন্সিওরেন্স করা আছে তিন দেড়ে সাড়ে চার লাখ টাকার। সে মরলে টাকাটা তৃণা পায়। অতএব পুলকেশ ঠিক করেছিল, সে মরবে। আত্মহত্যার কেসে আজকাল ইন্সিওরেন্স অনেক ঝামেলা করে। কিন্তু কোথাও বেড়াতে গিয়ে খুন হলে ঝামেলা নেই। পুলকেশ ও তৃণা ঠিক করল যে নীলাপুরমে গিয়ে পুলকেশ খুন হবে। হলোও। তার মানে স্ত্রী যদি কোনও ডেড বডিকে স্বামীর বলে চালায়, অসুবিধে নেই। এবার তৃণাকে বাকিটা করতে হবে। ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে ইন্সিওরেন্সে স্বামীর টাকা ক্লেম করবে। টাকা পেয়ে যাবে। তখন পুলকেশ অজ্ঞাতবাস বেরিয়ে তৃণার সঙ্গে কোনও নতুন এলাকায় পাড়ি জমাবে। আবার সে অন্য নামে ইন্সিওর করবে। আবার খুন হবে। আবার তৃণা টাকা ক্লেম করবে—তখন সেও অবশ্য আর তৃণা নয়, অন্য নাম তাকেও নিতে হয়েছে। এটা হলো ওদের তিন নম্বর কেস। এর আগে পুলকেশ আর তৃণা ছিল অরুণ আর মাধবী।

    তার আগের নাম ছিল পরিমল আর কেতকী। প্রত্যেকবারই তৃণার নির্বোধ প্রেমিকরা খুন হয়।

    —বাঃ! বেড়ে বুদ্ধি তো! কিন্তু এবারকার ডেড বডিটা কার?

    —তৃণার আরেক নির্বোধ প্রেমিক অবনী রায়ের। হাওড়াতে পুলকেশ একটা মারাত্মক ভুল করে। এ ভুল সব বুদ্ধিমান শয়তানের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। না হলে তাদের ধরা যেত না। পুলকেশ তিনটি বার্থ রিজার্ভ করেছিল একই শিপে। কিন্তু এখানে পৌঁছে সে অবনীকে নিয়ে যায় দি সোয়ানে। ওখানে অবনীর নামে কিন্তু রুম বুক করা নেই। আছে পরিতোষ কারফর্মার নামে। পুলকেশ অবনীকে বলেছিল—ওর এক বন্ধু পরিতোষ কারফর্মার নামে দি সোয়ানে একটা ডাবল রুম বুক করা আছে। পরিতোষ হঠাৎ অন্য কাজে আটকে গেছে। তাই আসছে না। অতএব ওই রুমে সে থাকতে পারে। কোনও অসুবিধে হবে না। কিন্তু পরিতোষ তো একজন চাই। তা না হলে দি সোয়ান অবনীকে থাকতে দেবে কেন? অতএব পুলকেশ অবনীকে বলে—সে নিজেই বরং পরিতোষ হয়ে পরিচয় দেবে। রসিদ তো তার কাছেই আছে। এতে ব্যাপারটা দাঁড়াল বেশ মজার। পুলকেশ ধুতি-পাঞ্জাবি পরে খাঁটি বাঙালী বেশে পরিতোষ নামে দি সোয়ানে অবনীর সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটায়। আবার সী ভিউতে সাহেব সেজে পুলকেশ নামে স্ত্রীর কাছেও থাকে। অবনী নির্বোধ এবং তৃণার প্রেমে অন্ধ না হলে ফাঁদটা টের পেত। দি সোয়ানে তদন্ত করার পর ব্যাপারটা আমরা টের পেয়ে গেলুম।

    —পুলকেশকে অ্যারেস্ট করতে পেরেছে তো পুলিশ?

    —হুঁউ। গতরাতেই। দি সোয়ানে সেই ঘরটায় ব্যাটা শুয়ে কাতরাচ্ছিল। হাতে জখম। রুমাল বেঁধেও রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না। বেসিনে ডেটলের ছড়াছড়ি। তাকে অবশ্য তক্ষুণি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল।

    —সব তো বুঝলুম। কিন্তু ওদের ব্যাকগ্রাউণ্ড এত শীগগির পেলেন কোথায়? কর্নেল অন্যমনস্কভাবে জবাব দিলেন তৃণা সব কবুল করেছে।

    একটু পরে বললুম—বাইনোকুলার চোখে রেখে খাড়ির ওপর যে লোকটা সী ভিউয়ের দিকে লক্ষ্য রেখেছিল, সে নিশ্চয় পুলকেশ। কিন্তু লক্ষ্য রাখত কেন?

    তৃণার কাছে সংকেত পাবার জন্যে। গ্রিন সিগন্যাল পেলেই সে, কাছে যেত।…বলে কর্নেল হেসে উঠলেন।— তবেই দেখ জয়ন্ত, তোমাকে বলেছিলুম—আমার খুনের কপাল। সত্যি ডার্লিং, কোথাও বেড়াতে গিয়ে আরামে কাটাব, তার উপায় নেই। দা ইটার্নাল মার্ডারার সবসময় আমাকে অনুসরণ করে বেড়াচ্ছে।…

  • জিরো জিরো জিরো

    জিরো জিরো জিরো

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book-name]

    জিরো জিরো জিরো

    আমার বৃদ্ধ বন্ধু প্রকৃতিবিজ্ঞানী কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ঘরে ঢুকেই আমি হতবাক। তিনি চাঁদের হাট বসিয়ে মৌজ করছেন। এ যে  জলে শিলা ভেসে যায়, বানরে সঙ্গীত গায়, দেখিলেও না হয় প্রত্যয়!

    না, কর্নেল মোটেও বদমেজাজী মানুষ নন। কিংবা প্রেমে ব্যর্থ, তাই নারী বিদ্বেষী গোঁয়ার গোবিন্দও নন। বরং সুরসিক বলে খ্যাতি আছে ওঁর। বিশেষ করে সুন্দরী যুবতীদের প্রতি ওঁর পক্ষপাতদুষ্ট স্নেহ সুপ্রচুর। কিন্তু, আমার বিস্ময়ের কারণ অন্য। ইলিয়ট রোডের এই অ্যাপার্টমেন্টে অনেকদিন ধরে যাতায়াত করছি, কখনও কোনও সুন্দরী যুবতীকে এখানে পদার্পণ করতে দেখিনি, তা নয়। সচরাচর বেশি যাঁরা আসেন, তাঁরা রাশভারি মানুষ সব। বিষয়ী এবং কেজো প্রকৃতির লোক। কোনও না কোনও গূঢ় মতলব নিয়েই তারা আসেন।

    আজ যাদের দেখছি, এরা একেবারে উল্টো প্রকৃতির। এক পলকেই আন্দাজ করেছি—খবরের কাগজের রিপোর্টারের অভ্যাসলব্ধ চাতুর্যেই, এরা সংখ্যায় তিন এবং আঠারো থেকে বাইশটি বসন্ত ঋতু দেখেছে। প্রত্যেকেরই চেহারায় উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর চিকণ মেদ ও শ্রী পরিস্ফুট। এরা কথায় কথায় প্রচুর হাসছে। প্রচুর কথা বলার চেষ্টা করছে। এবং কর্নেল হংস মধ্যে বক যথা বসে আছেন।

    আমাকে দেখেই অবশ্য কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধতা জাগল। তারপর কর্নেল খুব খুশি দেখিয়ে বলে উঠলন—হ্যাল্লো ডার্লিং! এসো, এসো তোমার কথাই ভাবছিলুম।

    নিছক মিথ্যা, তাতে ভুল নেই। গম্ভীর হয়ে সামান্য দূরে একটা গদীআঁটা চেয়ারে বসে পড়লুম। তারপর বললুম—আমার কথা ভাববার ফুরসৎ পাচ্ছিলেন এতে সন্দেহ আছে।

    কর্নেল হাততালি দিয়ে উচ্চহাসি হাসলেন। ব্র্যাভো জয়ন্ত! ঠিকই বলেছ।

    যুবতী তিনটি আমাকে দেখছিল। আমি সামনের টেবিলে চোখ রাখলুম। তারপর কর্নেলকে বলতে শুনলুম—মাই ডিয়ার লেডিস অ্যাণ্ড জেন্টলমেন……

    একজন মেয়ে বলে উঠল— কর্নেল কর্নেল! এখানে জেন্টলম্যান কিন্তু একজনই।

    অন্য একজন বলল—সোনালী, তুই কিছু বুঝিস না। কর্নেল নিজেকেও কাউন্ট করছেন যে!

    আবার প্রচুর হাসিতে ঘর ভরে গেল। কর্নেল গলা ঝেড়ে শুরু করলেন—যাই হোক, পরিচয় করিয়ে দেওয়া গৃহকর্তা হিসেবে আমার কর্তব্য ইনি হচ্ছেন, দৈনিক সত্যসেবকের স্বনামধন্য জয়ন্ত চৌধুরী।

    আমার চোখের ভুল হতেও পারে, হয়তো ইচ্ছাকৃত চিন্তা বা উইশফুল থিংকিং গোছের কিছু মনে হলো ওদের চোখে বিস্ময় মেশানো শ্রদ্ধা ফুটে উঠল।

    —আর জয়ন্ত, ইনি সোনালী ব্যানার্জি, ইনি রত্না চ্যাটার্জি—সোনালীর মাসতুতো বোন। আর ইনি দীপ্তি চক্রবর্তী। দুজনের বন্ধু, সহপাঠিনী। এঁরা কিন্তু কেউ  কলকাতার বাসিন্দা নন। রানীডিহি নামে প্রখ্যাত পার্বত্য শিল্পাঞ্চলে সম্প্রতি একটি তৈলশোধনাগারও গড়ে তোলা হয়েছে। শ্রীমতি সোনালীর বাবা শ্ৰীঅনিরুদ্ধ ব্যানার্জি তার ডিরেক্টর। আমার বিশেষ স্নেহভাজন বন্ধু। এবং…‥।

    সোনালী হাত তুলে হাসতে হাসতে বলল—কর্নেল, যথেষ্ট হয়েছে। আমরা কেউই জয়ন্তবাবুর মতো খ্যাতিমান নই। অত বলার কিছু নেই।

    কর্নেল হতাশ ভঙ্গিতে বসে পড়লেন এবং চুরুট ধরালেন। কর্নেলের ভাষণের মধ্যেই আমরা পরস্পর নমস্কার পর্ব সেরে নিয়েছি। এবার আমিও সিগারেট ধরালুম। এই সময় চোখে পড়ল, ওরা মহিলাসুলভ সতর্ক ভঙ্গিতে কিছু বলাবলি করছে—সেটা চোখের ভাষাতেই, এবং তাদের লক্ষ্য যে আমি, তাতে কোনও ভুল নেই। তারপর সোনালী কর্নেলের দিকে তাকাল, ঠোঁটে চাপা কুণ্ঠিত হাসি কর্নেল! জয়ন্তবাবু যদি কিছু মনে না করেন…।

    ধুরন্ধর বৃদ্ধ খুশি হয়ে বলে উঠলেন—কিচ্ছু মনে করবে না ও। সোনালী, তুমি ওকে স্বচ্ছন্দে তোমার জন্মদিনের নেমন্তন্নটা করতে পারো। বরং জয়ন্তের মতো একজন প্রাণবন্ত যুবক থাকলে তোমাদের অনুষ্ঠানের ষোলোকলা পূর্ণ হবে।

    আবার হাসির ধূম পড়ল। সোনালী তার ব্যাগ থেকে একটা সুদৃশ্য কার্ড এবং খাম বের করে সযত্নে আমার নাম লিখল। লিখে আমার কাছে এসে বিনয় দেখিয়ে বলল—হয়তো অডাসিটি হচ্ছে, তবু আপনাকে পেলে আমি—আমরা সবাই খুব খুশি হবো। প্লীজ, আসতে ভুলবেন না।

    একটু দ্বিধা দেখিয়ে বললুম—কিন্তু মুশকিল কি যানেন? রিপোর্টারের চাকরি করি। কখন কোথায় কোন অ্যাসাইনমেন্ট এসে কাঁধে চাপে বলা যায় না!

    কর্নেল প্রায় ধমক দিয়ে বলে উঠলেন—জয়ন্ত, বাজে বকো না! রানীডিহি এবং আমার কন্যাবৎ এই মেয়ে দুটোই মর্ত্যের এক দুর্লভ বস্তু। সুতরাং কোনওরকম বাচালতা না করে কার্ডটি পকেটেস্থ করো। এবং তোমার ক্ষুদে রিপোর্টিং বহিটি বের করে তারিখটা লিখে রাখো। লেখ, ১৭ সেপ্টেম্বর, সকাল সাড়ে সাতটায় হাওড়ায় ট্রেন। দশ নম্বর প্লাটফর্ম। আমার বাসায় আসার দরকার নেই। কারণ, তাহলে তুমি ট্রেন ফেল করবেই। তারও কারণ, তুমি লেটরাইজার।…‥

    আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ওরা চলে গেল। তখন কর্নেলের কাছে গিয়ে বসলুম। বললুম—হ্যালো ওল্ড ম্যান! এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কী?

    —কিসের?

    —এই নিছক একটি মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানের তিনশো কিলোমিটার ভ্রমণের?

    কর্নেল চোখে মুগ্ধতা ফুটিয়ে বললেন—জয়ন্ত, ডার্লিং! রানীডিহির সৌন্দর্য তুলনাহীন। মর্ত্যের স্বর্গ।

    —হাতি! আমি শুনেছি, রানীডিহি শিল্পনগরী। আকাশ বাতাস কুচ্ছিত ধোঁয়া আর গ্যাসে ভরা। নরক বিশেষ।

    কর্নেল মৃদু হেসে বললেন—হ্যাঁ। কিন্তু সোনালীদের কোয়ার্টার যেখানে অবস্থিত, সেখানে গেলে পৃথিবীর যাবতীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নমুনা তুমি পাবে। নদী, পর্বতমালা, অরণ্য…

    —এবং দুর্লভ প্রজাপতি পাখি কীটপতঙ্গ!

    —ডার্লিং, আমি কথা দিচ্ছি, এবার আমি প্রকৃতিবিদ হিসাবে রানীডিহি যাবো না। যাবো…

    ওঁকে থামতে দেখে বললুম—হুঁ, বলুন।

    —যাবো আমার আসল মূর্তিটা পোশাকের তলায় লুকিয়ে নিয়ে।

    —তার মানে?

    —প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার হিসেবেই।

    চমকে উঠে বললুম—সে কী! কেন?

    কর্নেল চোখ বুজে দুলতে দুলতে বললেন—একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে জয়ন্ত। এটা না ঘটলে শ্রীমতী সোনালীর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আমি অতদূরে কিছুতেই যেতুম না। স্বীকার করছি, জায়গাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের খ্যাতি আছে। কিন্তু তার চেয়েও একটা জরুরী বিষয় সম্প্রতি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তোমাকে আগাগোড়া সবটা বলছি। ভাল করে শোনো।

    কর্নেল আমাকে যা শোনালেন, তা সংক্ষেপে এই: এক সপ্তাহ আগে অর্থাৎ ৩রা সেপ্টেম্বর সোনালীর বাবা অনিরুদ্ধবাবু কর্নেলের সঙ্গে দেখা করেন। তারও দুদিন আগে রানীডিহিতে ওঁর কোয়ার্টারে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে, তাই কর্নেলের পরামর্শ চাইতে আসেন। সেদিন ছিল রবিবার। বেলা একটায় লাঞ্চের পর উনি অভ্যাস মতো গড়াচ্ছেন, পরিচারিকা এসে খবর দেয় যে এক ভদ্রলোক জরুরী ব্যাপারে দেখা করতে এসেছেন। অনিরুদ্ধবাবু বিরক্ত হন। এটা দেখা করার সময় নয়। তাছাড়া উনি কোয়ার্টারে অপরিচিত লোকের সঙ্গে দেখা করেন না। অফিসেই যেতে বলেন। পরিচারিকা সব জানে এবং বুঝিয়ে বলা সত্ত্বেও সেই লোকটি শোনেনি। বলেছে, দেখা না করলেই চলবে না। এবং এই দেখা করার পিছনে নাকি অনিরুদ্ধবাবুরই বিশেষ স্বার্থ আছে। অনিরুদ্ধবাবু বিরক্ত হলেও কৌতূহল দমন করতে পারেননি। তাই বলেন—ঠিক আছে, তুমি আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলল। এই আধঘণ্টা ভাতঘুম বাঙালীর মজ্জাগত এবং অনিরুদ্ধবাবু মনে মনে ভীষণ বাঙালী। যাইহোক, পরিচারিকা গিয়ে তাকে অপেক্ষা করতে বললে সে ততক্ষণ সময় কাটানোর জন্যে একটা বই চায়। এটাই অদ্ভুত যে সে অন্য কোনও বই পছন্দ করেনি। আলমারিতে পশ্চিম এশিয়ার অর্থনীতি নামে প্রকাণ্ড ইংরেজি বই ছিল, সেটাই চায়। তারপর পরিচারিকা বইটি তাকে দিয়ে চলে আসে। আধঘণ্টা পরে অনিরুদ্ধবাবু ড্রয়িং রুমে যান। কিন্তু লোকটিকে দেখতে পান না। টেবিলে সেই বইটি পড়ে থাকতে দেখেন। বইটি রাখতে গিয়ে হঠাৎ লক্ষ্য করেন, একটা ভাঁজ করা কাগজ উঁকি মারছে ফাঁকে। কাগজটা খুলে পড়ার পর হতভম্ব হয়ে যান উনি। তাতে ডটপেনে ইংরেজিতে লেখা আছে : যা বলতে এসেছিলুম, বলা হলো না। ওরা আমাকে ফলো করে এসেছে টের পেলুম। তাই চলে যাচ্ছি। আজ রাত এগারোটায় আপনি  জলের ট্যাংকের পিছনে আমার সঙ্গে দেখা করুন। আমি সেখানে থাকব। আপনি কাকেও দেখামাত্র বলবেন—জিরো নাম্বার? সে যদি বলে—জিরো জিরো জিরো, তাহলে জানবেন সে আমিই। অন্য কিছু ঘটলে তখুনি পালিয়ে আসবেন। জিরো জিরো জিরো। ভুলবেন না।

    নামের বদলে তিনটে শূন্য বসানো। বলা বাহুল্য, অনিরুদ্ধ এই অদ্ভুত চিঠি পেয়ে খুব উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। ভাবেন, পুলিশের কাছে যাবেন। কিন্তু শেষ অব্দি কৌতূহল তার সব মতলব দাবিয়ে রাখে। যথাসময়ে সেই জলের ট্যাংকের কাছে যান। জায়গাটা খেলার মাঠ ও বড় রাস্তার সঙ্গমে রয়েছে। কিছু ঝোপঝাড় ও পাথরও আছে। উনি গিয়ে একটা লাশ দেখতে পান। পিঠে ছুরিমারা হয়েছে। তখনও রক্ত তাজা। সুতরাং ভীষণ ভয় পেয়ে পালিয়ে আসেন।

    সকালে লাশটার খবর পেয়ে পুলিশ আসে। অনিরুদ্ধবাবু নিজেকে এ ব্যাপারে জড়াতে চাননি। লোকটাকে সনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। যাইহোক, অনিরুদ্ধবাবুর মনে পড়ে যায় কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের কথা। পরদিনই  কলকাতা এসে দেখা করেন। সেই চিঠিটাও নিয়ে আসেন।

    কর্নেল এই সাতটা দিন কি সব করেছেন, আমাকে কোনওরকম আভাস দিলেন না। শুধু বুঝলাম, হঠাৎ এই প্রখ্যাত ব্যক্তিটি রানীডিহি হাজির হলে পুলিশমহলে ঔৎসুক্য জাগতে পারে এবং সম্ভাব্য শত্রুপক্ষ—যারা সেই অজ্ঞাতনামা লোকটিকে খুন করেছে, তারাও সতর্ক হয়ে যায়—তাই সোনালীর জন্মদিনের অছিলা। অবশ্য, সোনালী এসব ব্যাপার জানেই না। সে তার জন্মদিনে আর সবাইকে নেমতন্ন করার জন্য কলকাতা এসে বাবার কথামতো কর্নেলকেও নেমতন্ন করে গেল।…‥

    কর্নেল চুপ করলে বললুম—ব্যাপারটা রহস্যময়। আমার মনে হচ্ছে, সেই সঙ্গে বিপজ্জনকও বটে। সচরাচর আপনি যে সব ব্যাপারে নাক গলান এবং কৃতিত্ব অর্জন করেন, এটা তত সহজ মোটেও নয়। আপনার লাইফ রিক্সের কথা ভেবেছেন তো?

    কর্নেল একটু হাসলেন। কিছু বললেন না।

    বললুম—এসব ব্যাপারে নাক না গলানোই উত্তম, আমার মতো সরকারী লোকেরা যা পারে, করুক! আপনি গোয়েন্দাবিদ্যায় যত ধুরন্ধরই হোন, ভুলে যাবেন না যে এই কেসে খুনী কোনও ব্যক্তিবিশেষ নয়, সম্ভবত একটা দল এবং এতে কোনও ব্যক্তিগত অভিসন্ধি কাজ করছে না। কে বলতে পারে, কুখ্যাত মাফিয়া দলের মতো কোনও আন্তর্জাতিক গুপ্তদল এর পেছনে আছে কি না? তাদের কী উদ্দেশ্য, তাও তো আপাতত আপনার জানা নেই।

    কর্নেল টাকে হাত বুলিয়ে বললেন—তোমার পরামর্শ খুব উৎকৃষ্ট জয়ন্ত। যুক্তি আছে। তোমার অনুমানও সম্ভবত ঠিক।

    উৎসাহে বললুম—আলবাৎ ঠিক। একটা ব্যাপার তো পরিষ্কার বোঝা যায়, লোকটা সেই দলেরই লোক। কোনও কথা ফাঁস করে দিতে চেয়েছিল অনিরুদ্ধবাবুকে। তা টের পেয়ে তাকে মেরে ফেলল ওরা। তাছাড়া…‥

    কর্নেল সায় দিয়ে বললেন—বলে যাও ডার্লিং!

    —অনিরুদ্ধবাবু কে? না—উনি এক তৈল শোধনাগারের ডিরেক্টর। দ্বিতীয় পয়েন্ট লক্ষ্য করুন: লোকটা যে বই বেছে নিয়ে চিঠি রেখেছিল, সেটা পশ্চিম এশিয়ার অর্থনীতি। এবং পশ্চিম এশিয়ার অর্থনীতি একান্তভাবে তৈলশিল্পকেন্দ্রিক। এই যোগাযোগ কি আপনি আকস্মিক মনে করছেন?

    কর্নেল সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন—অপূর্ব জয়ন্ত! এজন্যেই সব কেসে আজকাল তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাই। ব্রিলিয়ান্ট! বলে যাও ডার্লিং!

    সবার আগে সেই বইটা আপনার পরীক্ষা করা দরকার!

    —হ্যাঁ!

    —অনিরুদ্ধবাবুর উচিত ছিল, রিফাইনারিতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা।

    —কারণ?

    —আমার ধারণা, ওখানে কোনও অন্তর্ঘাত ঘটাবার ষড়যন্ত্র চলেছে। সে কথাটাই লোকটা বলতে এসেছিল। সুযোগ পায়নি। তাই দেখা করতে বলে ওইভাবে। এবং খুন হয়ে যায়।

    —রিফাইনারিতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা তখনই করেছেন অনিরুদ্ধবাবু।

    —আমার আরও ধারণা, রিফাইনারির অফিসার ও কর্মীদের মধ্যে ওই দলের লোক আছে।

    —অসম্ভব নয়, জয়ন্ত।

    আমি আরও কিছু তত্ত্ব খুঁজছি, দেখি কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন এবং মেঝেয় কয়েকপা হেঁটে আমার দিকে হঠাৎ ঘুরে হো হো করে হেসে উঠলেন। বললুম— আমাকে তাচ্ছিল্য করতে পারেন, কিন্তু আমি বাজী রেখে বলতে পারি—একচুলও অযৌক্তিক কথা বলিনি।

    কর্নেল বললেন—তাহলে জয়ন্ত, সব রহস্য ফাঁস হয়ে গেছে বলা যায়। কিন্তু একটা পয়েন্ট তুমি আমল দিচ্ছ না যে যদি কোনও অন্তর্ঘাত সম্পর্কে অনিরুদ্ধবাবুকে কেউ সতর্কই করতে চাইত, তাহলে চিঠি বা ফোনেই জানাতে পারত! দেখা করতে আসা, ওই বিশেষ বইটা চেয়ে নেওয়া এবং…জয়ন্ত, শুধু তাই নয়, যে পাতায় চিঠিটা ছিল, তার পেজমার্ক কত জানো? থ্রি জিরো—মানে তিরিশ!

    —বলেন কী!

    —ওই পাতায় কী আছে, তাও জেনে নিয়েছি। চ্যাপ্টারটা পুরো লেখা হয়েছে সেই সুবিখ্যাত টি. ই. লরেন্স সাহেবকে নিয়ে। অর্থাৎ লরেন্স অফ অ্যারাবিয়ার কার্যকলাপ। আশা করি, লরেন্স সম্পর্কে তুমি বিশদ জানো। এমনকি সিনেমাতেও তার ক্রিয়াকলাপ দেখে থাকবে।

    হাত তুলে বললুম—দেখেছি। আশ্চর্য ছবি!