Author: তাহের আলমাহদী

  • সিভিলিয়ান হিট

    সিভিলিয়ান হিট

    মলয় রায় চৌধুরী

    [book]

    সিভিলিয়ান হিট : এক

    জওয়ান : স্যার, দুজন সিভিলিয়ান হিট হয়ে খাদে পড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে; কানে ইয়ারপ্লাগ লাগিয়ে গান শুনছিল মনে হয়, ট্র্যানসেন্ড বা মোবাইল থেকে, তাই আমাদের আর শত্রুদের ফায়ারিঙের আওয়াজ শুনতে পায়নি।

    অ্যাসিস্ট্যান্ট কমাণ্ডান্ট : মোবাইল? এখানে মোবাইলের কোনো টাওয়ার একশ কিলোমিটারের মধ্যে নেই। যাকগে, যেতে দাও, অমন আনুষঙ্গিক দুর্ঘটনার জন্য আমরা দায়ি নই। বাস্টার্ডগুলো এই অঞ্চলে এসেছিলই বা কেন! ডিসগাস্টিং।

    জওয়ান : ওদের বডি কি রিকভার করা হবে? উওমেন না মেন বুঝতে পারছি না।

    অ্যাসিস্ট্যান্ট কমাণ্ডান্ট : তোমার কি মাথা খারাপ? থাকুক যেখানে পড়ে আছে। আমাদের অপারেশান ক্লোজ হলে স্থানীয় প্রসাশন বা বনবিভাগ গতি করবে।

    জওয়ান : গ্রাম তো কাছে পিঠে নেই স্যার; দুজনেই জীবিত বলে সন্দেহ হচ্ছে।

    অ্যাসিস্ট্যান্ট কমাংণ্ডান্ট : বাজে ব্যাপারে মাথা ঘামিও না। ওটা সিভিল প্রশাসনের মাথাব্যথা।

  • স্মৃতির জার

    স্মৃতির জার

    মলয় রায় চৌধুরী

    [book]

    স্মৃতির জার : ছয়

    বাবা-মার জন্য স্মৃতির জারকে আচ্ছন্ন সুশান্তর মন কেমন করে মাঝেসাঝে, তখন গ্যাঁজানো তরমুজের চোলাই-করা সোমরস নিয়ে বসেন, সঙ্গে শুয়োরের মাংসের বড়া, আদা-রসুন-পেঁয়াজবাটা আর বেসন মাখা, হামান দিস্তায় থেঁতো করা মাংসের বড়া, সাদা তেলে যা রাঁধতে ওনার বেবি নামের মেঠোগন্ধা বউয়ের ভারিভরকম মায়ের জুড়ি নেই। ওনার ছেলে অপু, যদিও বাংলা বলতে পারে, কিন্তু মাকে শুনিয়ে হিন্দিতেই বলে, হাঁ পিজিয়ে পিজিয়ে অওর গম গলত কিজিয়ে; আরে অগর আপকা দিল নহিঁ লগতা থা তো ভাগ কেঁও নহিঁ গয়ে থে? য়ঁহাসে নিকলকে ভাগলপুর স্টেশন, অওর ওঁয়াহাসে সিধে পটনা, স্টেশন ভি ঘর কে নজদিক। পর আপ নহিঁ ভাগে। লগতা হ্যায় আপকো অপনে বিবি সে জ্যাদা প্যার অপনে সসুর সে হ্যায়। বিবি কহিঁ ভি মিল জাতি, মগর তারিণী মণ্ডলকে তরহ মকখনভরা পহাড় নহিঁ মিলতা, য়হি হ্যায় না আপকা গম?

    তারিণী মণ্ডলের হাঁটু-ডিংডং স্ত্রী, ফোকলা গুটকাদেঁতো হাসি হেসে নিজের মহিষ-কালো বরকে খুসুরফুসুর কন্ঠে বলেন, দোগলা হ্যায় না আপকা পোতা, ইসিলিয়ে বহুত দিমাগ রখতা হ্যায়। সাধারণ জারজ নয়, বাঙালি-বিহারি, উঁচুজাত-নিচুজাত, পড়াশোনাঅলা- মুখ্খু, শহুরে-গাঁইয়া, গরিব-মালদার, কানুনি-গয়েরকানুনি, কলমচি-খেতিহর, কত রকমের মিশেল।

    —আরে মাথা তো খাটিয়েছিলুম আমি ছোঁড়াটাকে বন্ধক বানিয়ে, ঘরজামাইও পেলুম, আবার নসলও ভালো হয়ে গেল। এখন কয়েক পুরুষ চকচকে ফর্সা বাচ্চা পাবি; অপুর মেয়েদের বিয়ে দিতে বেশি অসুবিধা হবে না। জামাইবাবার মেয়ে না হওয়াই ভালো, কী বল? বলল তারিণী মণ্ডল, ডান চোখে হাসি মেলে। যখন সুশান্ত ঘোষকে কিডন্যাপ করেছিল, তখন অবশ্য দুটো চোখই ছিল,বাঁ চোখটা নষ্ট হয়নি রামধারী ধানুকের হামলায়।

    —সে কথা ঠিক। আমি তি ভেবেছিলুম ছোঁড়াটা পালিয়ে যাবে।

    —আমার মেয়ের সঙ্গে রাত কাটিয়ে পালিয়ে গেলেই হল? ধরে এনে কেটে টুকরো করে দিয়ারার বালিতে পুঁতে দিতুম।

    —ছোঁড়াটা ভালোবেসে ফেলেছে ওর গালফোলা বউকে। শোবার সময় রোজ রাতে খুশবুর টিন থেকে গ্যাস মারে তোমার মেয়ের গায়ে, দ্যাখো না কেমন গন্ধ ভুরভুর করে বেবির গা থেকে, মনে হয় চবুতরা জুড়ে ফুলের গাছ? ভৌঁরাভৌঁরি জোড়ি।

    —তাজ্জব ব্যাপার, না? বকের সঙ্গে কোকিলের বিয়ে!

    —তাজ্জবের কি আছে। এরকম কচি কুচুরমুচুর মেয়ের সঙ্গে কি ওর বিয়ে হতো ওদের নিজেদের সমাজে? কোনো দরকচা হেলাফেলা টিড্ডিছাপ বউ পেতো।

    —কি যা তা বকছিস নিজের মেয়ের সম্পর্কে।

    —সত্যি কথাটাই বলছি। নিজের বিয়ের কথা মনে করে দ্যাখো। তুমিও কচি কুচুরমুচুরই পেয়েছিলে। ওই কুচুরমুচুর জিনিসটাই হল মেয়েদের দুসরা দিল, যা মরদদের থাকে না। দ্বিতীয় হৃদয়ে রক্ত থাকে না, থাকে রসালো মাদকের ফাঁদ, যে ফাঁদে একবার পড়লে রোজ-রোজ পড়ার নেশায় মরদরা ভোগে, যতদিন সে মরদ থাকে ততদিন তো ভোগেই।সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বই অনলাইনে কিনুন

    —তা ঠিক, ছিলিস ছাপ্পানছুরি-ছইলছবিলি। এটা কোনো টিভি সিরিয়ালের সংলাপ বললি নাকি? ছোঁড়াটা নাকি প্রথম রাতেই রক্তারক্তি করে ফেলেছিল?

    —হ্যাঁ। বেচারা। গলার শেকল খুলে-দেয়া শহুরে রামছাগল। কত দিনের বদবুদার তবিয়ত।

    —ওদের বিয়ে দিতে এত দেরি করে কেন জানি না। কম বয়সের টাটকাতাজা রস সব বেকার বয়ে চলে যায়।

    —দেরি করে বলেই তো পেলে ছোঁড়াটাকে।

    তা নয়; কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক সুশান্ত ঘোষ হয়ে গেছেন দিয়ারাচরিত্রের উন্মূল মানুষ। যখন নোট গোণার চাকরি করতেন, তখন বিহারি জোতদার পরিবারের যুবকদের মতন, রাজপুত ভূমিহার কুরমি যারা, কিংবা ব্রাহ্মণ কায়স্থ বিহারি আমলার শহুরে ছেলেদের ধাঁচে, অফিসে প্রতি ঋতুতে হালফ্যাশান আনতেন। ব্র্যাণ্ডেড জ্যাকেট জিন্স টিশার্ট উইন্ডচিটার। দপতরের গৃহবধু কর্মীদের চোখে সুশান্ত ঘোষ ছিলেন অবিনশ্বর জাদুখোকোন, লিচুকুসুম, মাগ-ভাতারের অচলায়তনের ফাটল দিয়ে দেখা মুক্ত দুনিয়ার লালটুশ। গেঁজিয়ে যেতে পারতেন, চোখে চোখ রেখে, ননস্টপ, যেন বাজে বকার মধ্যেই পালটে যাচ্ছেন পৌরাণিক কিন্নরে, সবায়ের অজান্তে। গায়কের ইশারায় যেভাবে ধ্বনিপরম্পরা টের পায় তবলাবাদকের আঙুলের ছান্দসিক অস্থিরতা, তেমনই, নৈশভোজে বেরোনো শীতঘুম-ভাঙা টিকটিকি যুবকের মতন, মহিলা সহকর্মীদের অবান্তর কথাবার্তা, ভোজপুরি বা হিন্দি বা বাংলায় বা ইংরেজিতে, বলার জন্যই বলা, শ্বাসছোঁয়া দূরত্বে দাঁড়িয়ে গিলতেন সুশান্ত ঘোষ।

    এখন আর ওনার, সুশান্ত ঘোষের সম্পর্কে, আগাম বলা যায় না কিছু। চাকরি করতেন পচা টাকার নোট জ্বালিয়ে নষ্ট করার। এখন কাঁচা টাকার করকরে আরামে ঠ্যাং তুলে খালি গায়ে, ভুঁড়ির তলায় চেককাটা লুঙ্গি পরে, লুঙ্গির গেঁজেতে সেমিঅটোমেটিক পিস্তল, যা জীবনে কখনও চালাননি, শাশুড়ির পরানো কালো কাপড়ের ছোট্ট তাবিজ গলায়, নিজেকে অন্যমানুষে পালটে ফেলার আনন্দে তরমুজ-সোমরসের হেঁচকি তোলেন। যা একখানা চেহারা করেছেন, ওনার স্তাবকরা নিজেদের মধ্যে আলোচনার সময়ে ওনাকে বলে গেণ্ডা-মরদ অর্থাৎ আলফা গণ্ডার।

    প্রতি রাতে শোবার আগে বিবসনা বউয়ের আগাপাশতলা বডি ডেওডোরেন্ট স্প্রে করেন সুশান্ত ঘোষ বা গেণ্ডা-মরদ, মানে আলফা গণ্ডার। এমন নয় যে বেবি নামের মেঠোগন্ধা বউয়ের গায়ে দুর্গন্ধ; প্রথম রাতেই সুশান্ত ঘোষ একটা স্যান্ডালউড সাবান কিনে বলে দিয়েছিলেন যে রোজ এই সাবান মেখে স্নান করতে হবে, সপ্তাহে একদিন শাম্পু করতে হবে। বউই আসক্ত হয়ে গেছে ডেওডোরেণ্টের, শ্যাম্পুর, লিপগ্লসের, লিপস্টিকের, ফেয়ার অ্যাণ্ড লাভলির, কমপ্যাক্ট পাউডারের, ওলে টোটাল এফেক্টের, নখপালিশের, পিচ-মিল্ক ময়েশ্চারাইজার আর নানা আঙ্গিকের শিশি-বোতল-কৌটোর-ডিবের সুগন্ধের নেশায়।

    শহুরে দশলাখিয়া বরকে বশ করার জন্য, টিভিসুন্দরীরা যা মাখে, তা মেখে কৃষ্ণাঙ্গী-অপ্সরা হবার প্রয়াস করে বেবি, সুশান্ত ঘোষের মেঠোগন্ধা নিরক্ষর শ্যামলিমা চির-তুলতুলে বউ, আর সুশান্তর শাশুড়ি বশ করার মন্ত্রপূত তাবিজ পরিয়ে জামাইকে বেঁধে রেখেছেন বেবির আপাত-বেবিত্বে।

    কোনো রাতে মাতাল অবস্থায় সুশান্ত ঘুমিয়ে পড়লে, মাঝরাতে বউ ওনাকে ঠেলে জাগিয়ে দিয়ে বলে, উঠিয়ে না, নিন্দ নহিঁ আ রহল, জরা গ্যাস মার দিজিয়ে না। হাত বাড়িয়ে মাথার কাছে রাখা একাধিক ডেওডোরেন্টের স্প্রে থেকে যেটা হাতে পান বউয়ের পোশাকহীন গায়ে সুগন্ধী বর্ষা ছিটিয়ে এক খেপ দ্রূত-প্রেম সেরে ফেলে দুজনে দুপাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন। অনেক সময়ে বেবি নামের মেঠোগন্ধা নিরক্ষর বউ আগেই হুশিয়ারি দিয়ে রাখে, জল্দিবাজি মত কিজিয়ে, ধিরজ সে কিজিয়ে, বুডঢি নহিঁ না হো গয়ে হ্যাঁয় হম।

    ডেস্কটপের মনিটারে, বেবি নামের মেঠোগন্ধা শ্যামলিমা বউকে, পর্নো ফিল্ম দেখিয়ে আরো বিপদ ডেকে এনেছেন নিজের। বেবি বলে, ফিলিম মেঁ জইসন কর রহা হ্যায় ওইসন কিজিয়ে না, উঠাইয়ে, লেটাইয়ে, গিরাইয়ে, গিরিয়ে, পটক দিজিয়ে, সাঁস ফুলাইয়ে, মুহ সে প্যার কিজিয়ে, হমকো ভি মৌকা দিজিয়ে। কেতনা দের তক ভোগ করতা হ্যায়, অওর আপ হ্যাঁয় কি কবুতরকে তরহ ঝপট লিয়ে বস সো গয়ে। শুন রহেঁ হ্যাঁয় নাআআআআআ। তারপর বলে, দেখেছেন তো ওরা কেউ পৈতে পরে না; আপনি যদি পৈতে পরতেন তাহলে সুতোর লচ্ছা সামলাতেই আমাদের সময় চলে যেত, ভালো করেছেন পৈতে পরা বন্ধ করে।

    ঘুমনেশার ঘোরে সুশান্ত বলেন, আরে ওরা সব সাহেব-মেম কিংবা হাবশি, কুমিরের মাংস, বনমানুষের মাংস, ঘোড়ার মাংস, হাতির মাংস খায়, গাধার মাংস খায়।

    —হাঁ, সে-কথা ঠিক, হাতিদের মতন; হাতিরা কেমন নিজেদের গোমোরের জিনিসকে লটকিয়ে হাঁটে, মাটিতে ছুঁয়ে যায়। আপনি অপুকে বিলেতে পড়াশুনা করতে পাঠাতে চাইছেন; সেখানে গিয়ে ও যদি মেম বিয়ে করে তাহলে তো সঙ্গত দিতে-দিতে হালকান হয়ে যাবে! বিয়ে দিয়ে পাঠাতে পারতেন; ওর বউ থাকত দিয়ারায় আমাদের সঙ্গে।

    —ওখানে বিয়ে করার দরকার হয় না; না করেই একসঙ্গে থাকা যায়। সঙ্গত মনের মতন না হলে আরেকজনের কাছে চলে যাওয়া যায়, বুঝলি?

    —তাহলে তো ভালোই, মন ভরে গেলে বাড়ি ফিরে আসবে; তখন ওর বিয়ে দেবেন।

    অপুর মা, সুশান্তর মেঠোগন্ধা নিরক্ষর বউ, পর-পর কয়েকদিন মাঝ রাতে ঘুম ভাঙাবার পর বলে ফ্যালে, চাহিয়ে তো এক বংগালন বিবি শাদি করকে লাইয়ে না পটনা য়া কলকত্তা সে, সাহব-মেম খেলিয়েগা দোনো মিলকর, জইসন নঙ্গা-ফিলিম মেঁ দিখাতা হ্যায়, কেতনা মছলি পকড়া যাতা হ্যায় অপনে হি নদী মেঁ, বড়কা-বড়কা রোহু। ঘরকা বনা মিঠাই খাতে হম লোগ সব। আপ চখতে বংগালন বিবি কি মিঠি চুচি। হমরে বিছওনে মেঁ হি, লগাকে মচ্ছরদানি, পিলাসটিকবালা গুলাবি মচ্ছরদানি। নহিঁ তো কলকত্তা যাইয়ে না, বংগালন রণ্ডিলোগন কা বাজার নহিঁ হ্যায় ওয়াহাঁ কাআআআআআআ? কমর হিলাকে আইয়ে, অইসন দুখি-দুখি মত রহিয়ে, অওর দারু মে মত ডুবে রহিয়ে রাত ভর; দারু পিকে আপ একদম সঠিয়া যাতে হ্যাঁয়। দিন মেঁ পিজিয়ে দারু, কৌনো মনা কিয়া হ্যায় কাআআআআ? রতিয়া কে বখত বদনওয়া ফিরি রখিয়ে জি।

    বারবার শুনে বিরক্ত সুশান্ত একদিন বলেছিলেন, ঠিক আছে, নিয়ে আসবো একজন লেখাপড়া-শেখা বাঙালি মেয়ে বিয়ে করে। নাছোড়বান্দা বেবি, যাকে বলা যায় তৎক্ষণাত, প্রত্যুত্তর দিয়েছিল, নিয়ে এসে দেখুন না, আপনার আর আপনার বাঙালি বউয়ের মাথা, সেই দিনই হাসুয়া দিয়ে ধড় থেকে নামিয়ে দেবো; জানেন তো আমি তারিণী মণ্ডলের মেয়ে।

    —হ্যাঁ, জানি, তুই প্রথমে তারিণী মন্ডলের মেয়ে, তারপর আমার বউ। ধড়টা তো তোকে দিয়েই দিয়েছি, আর আলাদা করে নিয়ে কী করবি? আর মুণ্ডুও অনেকসময়ে তোর উরুর ঝক্কি সামলায়।

    —খারাপ লাগল শুনে? তাহলে মাফ করে দিন। আমি বেবি ঘোষ, আপনিও জানেন, আমিও জানি, ভোটার লিস্টে দেখে নেবেন, আমি তো লিখাপড়হি জানি না, কিন্তু বেবি ঘোষই লেখা আছে আমার ফোটুর পাশে, ভোট দিতে গিয়ে জানতে পেরেছি। আমি বেবি মণ্ডল নই। আমার ছেলেও মণ্ডল নয়। আর বলব না, মাফ করেছেন কি না? আঁয়?

    —করে দিলুম। এখন যা। দরকার হলে ডেকে নেবো।

    —দাঁড়ান চান করে আসি, তারপর। ভিজে-ভিজে শরীরে আপনি যখন ফোঁটায় ফোঁটায় গুটিপোকা ফ্যালেন তবিয়ত এতো মগন হয়, গুটিপোকাগুলো সব ভেতরে গিয়ে নানা রঙের প্রজাপতি হয়ে উড়ে বেড়ায়।

    —এই জন্যই তো থেকে গেলুম; যখন বলি তখনই তুই তৈরি, ঘুম থেকে উঠে হোক, দুপুর হোক, সন্ধ্যা হোক, মাঝ রাত হোক।

    —রান্না চাপিয়ে গ্যাস নিভিয়েও তো কতবার এসেছি আপনার গুটিপোকাদের ফোঁটা নিয়ে প্রজাপতি ওড়াবো বলে। ভাগ্যিস আপনাকে পেয়েছি, কোনো গংগোতা বর হলে তো যৌবন নষ্ট হয়ে যেত বছর-বছর বাচ্চা পয়দা করে।

    দিয়ারা, দ্বীপের মতন চর, জেগে ওঠে, জলপ্রবাহকে জড়িয়ে শুয়ে থাকে বছরের পর বছর, জামাইবাবার মতন, বেগুসরায় মুঙ্গের থেকে গঙ্গা নদীর কিনার বরাবর, ভাগলপুর কাটিহার অব্দি; এক জায়গায় ডুবে আরেক জায়গায় কুমিরের মতন জেগে ওঠে, খেলা করে অজস্র মানুষের সুখ-শান্তি নিয়ে, তাদের দুর্ধর্ষ ক্রুর মমতাহীন আতঙ্কিত উদ্বিগ্ন করে রাখে আজীবন, ভালা বরছি গাঁড়াসা ভোজালি পাইপগান কাট্টা তামাঞ্চা একনল্লা দুনল্লা একে-সানতালিস একে-ছপ্পন দিয়ে।

    আচমকা যদি কখনও ওনার, সুশান্ত ঘোষের, মগজে ঘুমিয়ে থাকা লোকটা ধড়মড় করে উঠে বসে জানতে চায় যে, ওহে খোকা, তুমি কি ছিলে আর কি হয়ে গেলে, তখন ছিপি খুলে গুড়ে চোলাইকরা তরমুজের সোমরসের বোতল নিয়ে বসেন, আর নিজেকে বলেন, ইতু জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে চলেছে, আমার উদ্দেশ্য আমাকে খুঁজতে হয়নি। উদ্দেশ্যই আমাকে খুঁজে নিয়েছে। আমারও কী আত্মপরিচয় আছে? কী? আমি তারিণী মণ্ডলের জামাই, বেবির স্বামী, গংগোতা ক্ল্যানের ডনের অভিনেতা! আমি কে? আমি, যার নাম সুশান্ত ঘোষ? আই অ্যাম নাথিং।

    ল্যাপটপে বা স্মার্টফোনে লোডকরা ওনার প্রিয় গান শোনেন, বারবার, বারবার, দিল ঢুণ্ডতা হ্যায় ফির ওয়হি ফুরসতকে রাতদিন, ব্যায়ঠে রহে তসব্বুর-এ-জানা কিয়ে হুয়ে, দিল ঢুণ্ডতা হ্যায় ফির ওয়হি ফুরসতকে রাতদিন…। শুনতে পান, বেবি বলছে, এরকম দুখি-দুখি গান শুনছেন কেন, অন্য গানটা শুনুন না, দো দিওয়ানে শহর মেঁ, রাত মেঁ য়া দোপহর মেঁ…। ঠিক আছে, শোন, জিন্দগি ক্যায়সি হ্যায় পহেলি হায়, কভি ইয়ে রুলায়ে, কভি ইয়ে হাসায়ে…।

    বেবি : কী-ই বা করবেন, আমাদের দুজনের অদৃষ্ট, আর সেই শুশুকটার ইশারা, আপনি রামচন্দ্রজীর মতন দরজায় এসে যেদিন দাঁড়ালেন, তার আগের দিন গঙ্গায় শুশুক দেখে সবাই বলেছিল যে আমার জন্য গঙ্গা মাইয়া একজন রাজপুত্রকে পাঠাচ্ছেন। হ্যায় নাআআআআআ।

    দুপুরের প্যাচপেচে গরমে একা বসে-বসে স্বস্তি না পেলে ল্যাপটপে বা ডেস্কটপে ট্রিপল এক্স। তাতেও স্বস্তি না পেলে বেবি বলে হাঁক পাড়েন, আর বেবি ঘরে ঢুকলে, বলেন, দরোজা বন্ধ করে দে, এই নে, দেখে একটু শরীর টাটকা-তাজা করে নে, তারপর তুই শুশুক ধরিস, আমি চুচুক ধরব, তাড়াহুড়ো করব না। বেবি উত্তর দ্যায়, তাড়াহুড়ো করলে আপনার গুটিপোকাগুলো থেকে তরমুজের গন্ধ বেরোতে থাকে, ভাল্লাগে না, গ্যাসের টিন বরবাদ।

    জমিন, জল, জবরদস্তি— এই তিনটের মালিকানা, একদা লালটুশ এখন ভুঁড়োকার্তিক সুশান্ত ঘোষকে করে তুলেছে বহু ফেরারির আশ্রয়দাতা। নর্থ বিহার লিবারেশান আর্মির নেতা শংকরদয়াল সিং, ফাইজান পার্টির অওধেশ মণ্ডল আর হোয়াইট অ্যান্ট পার্টির বিকরা পাসওয়ানদের পোঁদে বেয়নেট ঠেকিয়ে পুলিশ যখন তাড়িয়ে বেড়াবার খেলা খেলছিল, তখন সুশান্ত ওদের লুকিয়ে রেখেছিলেন দুষ্প্রবেশ্য নামহীন এক দিয়ারায়, গঙ্গামাটির প্রলেপ-দেয়া, ডিজেল ইনভার্টারে চালানো রুমকুলারে ঠাণ্ডাখড় আরামঘরে। ভাড়া সেভেনস্টার হোটেলের। রুম সার্ভিস চাইলে ওনার শশুর ডান্সবারের নাচিয়েদের আনান নৌকোয় চাপিয়ে, সার্ভিস হয়ে গেলে ডান্সগার্লদের ফেরত পাঠান ভোর রাতের নৌকোয় চাপিয়ে।

    সুশান্ত ঘোষের পারিবারিক কিংবদন্ধি অনুযায়ী, ঠাকুর্দার ঠাকুর্দা ছিল ঠগি; গুড়ে চোলাই করা তরমুজের মদ টেনে সুশান্ত ঘোষ ভেবে ফ্যালেন যে হয়ত তাই তিনিও শশুরের দেয়া সুপারঠগির সিংহাসন দখল করলেন।

    পুলিশ যায় না অপরিচিত কোনো দিয়ারায়; গুজব যে ভাগলপুর শহর থেকে চান করার মার্বেল-বাথটব এনে দিয়ারার বালিতে বসিয়ে রেখে গেছেন তারিণী মণ্ডলের বাবা। তাইতে নাইট্রিক অ্যাসিড ভরে একজন পুলিশের মুখবির বা ইনফরমারকে চুবিয়ে গলিয়ে ফ্যালা হয়েছিল।

  • দণ্ডকারণ্যে যাবো

    দণ্ডকারণ্যে যাবো

    মলয় রায় চৌধুরী

    [book]

    দণ্ডকারণ্যে যাবো : এগার

    দণ্ডকারণ্যে যাবো আপনার বাড়ি, যদি নিয়ে যান কখনও। আর হ্যাঁ, আমি কয়েকদিনের জন্য বাড়ি যাবো, আপনি আমার অ্যাবসেন্সটা ম্যানেজ করে দেবেন। আপনি তো পি এইচ ডি করছেন, অসুবিধা হবার কথা নয়। অপু বলল সনাতন সরকারকে।

    —চলিস আমার সঙ্গে, একা তুই রাস্তা গোলমাল করে ফেলবি। নারায়ণপুর জেলাসদর হলেও, এখনও ডেভেলাপ করেনি।

    —আমার বাবার পদবি ঘোষ হলেও, আমার মা বিহারি গংগোতা পরিবারের মেয়ে, ভাগলপুর শহরে নয়, আমাদের বাড়ি গঙ্গার চরে, দিয়ারায়। দিয়ারা শুনেছেন তো? মলম লাগাবার মতো করে কথাগুলো বলল অপু, ক্যান্টিনে বসে মসালা দোসা খেতে-খেতে, সনাতনকে।

    —গংগোতা? কাস্ট? তোর পাঞ্জাবি গার্লফ্রেণ্ড সে-কথা জানে, যে মেয়েটা সব সময় তোর সঙ্গে চিপকে থাকে?

    —হ্যাঁ, বিহারের লোয়েস্ট নিম্নবর্ণ। হ্যাঃ, নিকিতা মাখিজা পাঞ্জাবি নয়, ও সিন্ধি। ওকে আমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড জানিয়েছি, বিশ্বাস করে না, ভাবে কাটিয়ে দেবার জন্য গুল মারছি। বলেছি প্রায়ভেট ডিটেকটিভ দিয়ে ইনভেসটিগেট করাতে, সে-প্রস্তাবকেও মনে করে ওকে ছেড়ে দেবার আরেক চাল। দিল্লির নাইটলাইফ এনজয় করা-মেয়ে, প্রায়ই ডিসকোয় গিয়ে টাল্লি হয়ে যায়, আর বাড়ি পৌঁছে দিতে হয় আমাকে। ওর বাবা-মা কেন যে অমন ছুট দিয়ে রেখেছেন, জানি না। ওকে আমাদের দিয়ারায় নিয়ে গেলে ওর হার্টফেল করবে।

    —নিম্নবর্ণের আবার হাই-লো আছে নাকি রে, বওড়া? এনিওয়ে, তোর বাবার প্রেম তো স্যালুট করার মতন অসমসাহসী ঘটনা রে। তোর বাপ পারলেন, তোর গার্লফ্রেণ্ডও পারবে, সিন্ধিরা বেশ সহজে অ্যাডজাস্ট করে নিতে পারে, ওরাও উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিল, কিন্তু সরকার ওদের ধরে-ধরে আদিবাসীদের মাঝখানে পোঁতেনি, যেমন আমাদের পুঁতেছে। তবে টাকাকড়িকে ওরা মানুষের চেয়ে বেশি ভালোবাসে; চেক করে দেখেনিস তোর কাঁচা টাকা ওড়ানো দেখে তোকে ফাঁসিয়েছে কি না। সেক্স-টেক্স করলে কনডোম পরে করিস, মনে রাখিস এটা ইনডিয়ার রাজধানি, এখানে মানুষের মুখের লালায় যত সায়েনাইড, তার চেয়ে বেশি সায়েনাইড তাদের চুতে আর লাঁড়ে।

    —প্রেম নয়, আমার মায়ের বাবা আমার বাবাকে কিডন্যাপ করে আমার মায়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। মায়ের বয়স তখন চোদ্দ বছর আর বাবার একুশ। মা লেখাপড়া শেখেননি, স্কুলের কোনো বিল্ডিংও দেখেননি আজ পর্যন্ত; বাবা কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক। সেই থেকে বাবা শশুরবাড়িতে আমার নানা, মানে দাদুর সঙ্গে থাকেন, দিয়ারায় চাষবাসের উন্নতির কাজ দেখেন। বাবা আমার মাকে নিজের বাবা-মার কাছে নিয়ে যাননি, একাই গিয়েছিলেন বিয়ের পরে। গিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে মাকে ওই বাড়িতে অ্যাকসেপ্ট করা হবে না। তারপরে আমাকেও নিয়ে গিয়েছিলেন, আমাকেও অ্যাকসেপ্ট করা হয়নি।

    —স্ট্রেঞ্জ। আমি ভাবছিলাম আমার জীবনের ঘটনাটাই ইউনিক। তুই তো নিজেই একটা ইউনিক সোশিওলজিকাল প্রডাক্ট। তো তুই বাংলা শিখলি কী করে?

    —বাবার কাছে। আমি বলতে, পড়তে, লিখতে পারি।

    —বাবা বাঙালি হলে না শেখার কারণ নেই, যদিও আমরা মাতৃভাষার, মানে মায়ের ভাষার কথা বলি, আদপে কিন্তু বাবার ভাষাটাই শিখি সবাই। তুই তো গ্রেট।

    —আপনার জামাইবাবুর বাড়ির ঠিকানাটা দেবেন আমায়। নিকিতাকে প্রথমেই দিয়ারায় আমাদের বাড়ি নিয়ে গেলে ওর মাথা খারাপ হয়ে যাবে। আমার তো বাঙালি আত্মীয়স্বজন নেই, আপনার বাড়িতে নিয়ে যাবো ওকে। যদি আপনার ফ্যামিলিকে দেখে অ্যাডজাস্ট করতে পারে, তাহলে নিয়ে যাব দিয়ারার গংগোতা পাড়ায়।

    —লিখে নে না। আমি বরং জামাইবাবুকে একটা চিঠি লিখে তোকে দিয়ে রাখছি, যখনই তোর গার্লফ্রেণ্ডকে নিয়ে যাবি চিঠিটা সঙ্গে নিয়ে যাস। তোর নাম জানিয়ে ফোন করে দেব। আমরা মালকানগিরি থেকে চলে গেছি ছত্তিশগড়ে, আমার ভাগ্নের হিউমিলিয়েশান এড়াবার জন্য। দিদি-জামাইবাবু নারায়ণপুরে বাড়ি করেছেন, এখন তো নারায়ণপুর জেলা শহর, আগে যাতায়াতে বেশ অসুবিধা হতো। সরি ফর দ্য অ্যাবিউজেস। সামলাতে পারি না, বুঝলি। এত ছোটো ছিলাম যে মা-বাবার মুখও মনে নেই। ওনাদের মৃতদেহও পাওয়া যায়নি। পুলিশের লোকেরা লোপাট করার জন্য শব তুলে-তুলে জলে ফেলে দিয়েছিল।

    —ভাগ্নের হিউমিলিয়েশান? অসুবিধা না থাকলে বলতে পারেন।

    —১৯৭১-এ ঢাকায় আমার দিদিকে চারজন রাজাকার রেপ করেছিল, জামাইবাবু অ্যাবর্ট করাতে দেননি। ইন ফ্যাক্ট, জামাইবাবু দিদিকে মালকানগিরিতে বিয়ে করেছিলেন, দিদি যখন প্রেগন্যান্ট, বিষ খেয়ে সুইসাইড করতে গিয়েছিলেন দিদি। তখন মালাকানগিরিতে ডাক্তার-ফাক্তার ছিল না, জঙ্গল এলাকা, নব্বুই বছরের একজন বুড়ি ওকে জড়িবুটি খাইয়ে বিষ বের করে দিলে, জামাইবাবু দিদিকে ইমোশানাল সাপোর্ট দ্যান, বাচ্চা হবার কয়েকমাস আগে বিয়ে করেন।

    —আমি তাই ভাবতুম যে আপনি দলিতদের এক্সট্রিম লেফটিস্ট ইউনিয়ানে কেন ঢুকেছেন। আপনার পারসোনাল ব্যাকগ্রাউণ্ড তো জানা ছিল না।

    —এক্সট্রিম লেফটিস্ট? স্ট্রেঞ্জ ওয়র্ড। দিল্লির সংসদবাজ লেফটিস্টদের দেখছিস তো? অনেকে জে এন ইউতে এসে কলকাঠি নেড়ে যাচ্ছে মাঝে-সাঝে, হোয়াট ফর?

    —দণ্ডকারণ্য তো এখন শুনি আলট্রা লেফটিস্টদের ঘাঁটি।

    —এই লেফটিস্ট ওয়র্ডটা কাইন্ডলি বারবার উচ্চারণ করিসনি। পোঁদ জ্বালা করে। আই হেট দেম।

    —অলটারনেটিভ ওয়র্ড কী?

    —প্রতিশব্দ নেই। মাওওয়াদকে প্রতিশব্দ বলা যায় না। মাওওয়াদ ইজ এ সেল্ফকনফিউজড ডগমা।

    —কেন? আমি যদিও মাওওয়াদ সম্পর্কে বিশেষ জানি না, কাগজে পড়ি, ব্যাস ওইটুকু। সিলেবাসে্ও নেই।

    —ওদের লক্ষ্য হল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক জবরদস্ত গণআন্দোলন, ইংরেজি মাইটিকে বাংলায় জবরদস্ত বলা ছাড়া অন্য ওয়র্ড আছে কিনা জানি না।

    —আমার বাংলা নলেজ আপনার চেয়ে খারাপ, হাফ বেকড। ইন ফ্যাক্ট সাম্রাজ্যবাদ ব্যাপারটাই যে কী তা ঠিকমতন বুঝি না। সবকটা রাজনীতিককেই তো মনে হয় সাম্রাজ্যবাদী, যে যার নিজের এমপায়ার খাড়া করে চলেছে।

    —কী করে তুই স্নাতক হলি রে? টুকলি? না তোর হয়ে অন্য কেউ পরীক্ষায় বসেছিল? মওকাপরস্ত তেঁদুয়া কহিঁকা। হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট ক্ষমতাকে বিধ্বস্ত করতে চায় মাওওয়াদিরা, গড়ে তুলতে চায় পাওয়ারফুল আর্বান মুভমেন্ট, বিশেষ করে শ্রমিকশ্রেণির সাহায্যে, কেননা কেতাবি মার্কসবাদ মেনে সশস্ত্র কৃষকদের সংঘর্ষ এদেশের কৃষিকাঠামোয় দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। ভারতীয় বহুত্বওয়াদি বাস্তবতার ক্ষেত্রে ওগুলো কোনোটাই লাগু হয় না; তাছাড়া পৃথিবীতে কী ঘটছে সেদিকেও তো তাকাতে হবে। পৃথিবী তো রামচন্দ্রের বনবাসের দণ্ডকারণ্যে আটকে নেই, রামচন্দ্রের নির্বাসনের পথটাই নাকি রেড করিডর।

    —রিয়্যালি? এই ফ্যাসিস্ট ক্ষমতা জিনিসটাও বুঝলুম না।

    —যা যতটা বুঝেছিস, তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাক। জে এন ইউতে কয়েকজন নেপালি ছাত্র আছে, ওই তুই যাদের বলছিস একস্ট্রিম বা আলট্রা লেফটিস্ট। তাদের একজন, চিনিস বোধহয়, জনক বহুছা, ওর মতে রেড করিডর হল যে পথে গৌতম বুদ্ধ নেপাল থেকে বেরিয়ে তাঁর বাণী বিলিয়েছিলেন ভারতবর্ষের গ্রাম-গঞ্জ-বনপথে।

    —বলুন না, থামলেন কেন? ইনটারেসটিং।

    —দণ্ডকারণ্যে ওরা বৌদ্ধবিহার বানায় না, যা বানায় তার নাম দলম। দলমরা বানায় জনতম সরকার। দলম, জনতম এটসেটরা শব্দ থেকে বুঝতে পারছিস যে ডিসকোর্সটা তেলুগু ডমিনেটেড। ডিসকোর্স বুঝিস তো, না তাতেও গাড্ডুস? এর আগে মানুষের ইতিহাসে শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতরা সন্ত্রাসের সাহায্য নেয়নি। ওদের মতে শোষিতদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় এখন সন্ত্রাস।

    অপু নিজেকে নিঃশব্দে বলতে শুনল, সনাতন বোধহয় মায়াবতীর দলের ভাবুক, আর এগোনো উচিত হবে না। বলল, আপনার পিসতুতো দিদির কথা বলছিলেন, যিনি আপনার অভিভাবক, তাঁর গল্প বলুন না, আপনার ভাগ্নের হিউমিলিয়েশানের, যদি অসুবিধা না থাকে।

    —বললাম বোধহয় একটু আগে, দিদি বাচ্চাটাকে অ্যাবর্ট করায়নি, জামাইবাবু করাতে দেননি। ভাগ্নেটা জানতে পেরে দু-দুবার আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল। ভাগ্নের বয়স অবভিয়াসলি আমার চেয়ে বেশি, সেভেন্টিটুতে জন্মেছিল, আর আমি জন্মেছি ওর পাঁচ বছর পর, ভাগ্নেদা বলে ডাকি। ওকে ওর বাবার নাম জিগ্যেস করলে ও আনকনট্রোলেবলি উন্মত্ত হয়ে যায়, বলে, আমার বাবা একজন নয় চারজন, বাবাদের নাম জানি না। দিদি-জামাইবাবুর চোখাচোখি বড় একটা হতে চায় না কার্তিক, বাড়ির বাইরে সময় কাটায়। আমার ভাগ্নের নাম কার্তিক সরকার। ওকে একটা মোটরসাইকেল কিনে দেয়া হয়েছিল, নারায়ণপুর থেকে রায়পুর, কিংবা অন্যা নন-মোটোরেবল জায়গায় যাত্রীদের নিয়ে যায়; সব জায়গায় তো বাস যায় না, মোটোরেবল রোডও বিশেষ নেই নারায়ণপুর জেলার ফরেস্ট এরিয়ায়। আগে তো রেসট্রিকশান ছিল ফরেস্ট এরিয়ায় যাবার, মুরিয়া, মাড়িয়া আর গোঁড় উপজাতির লোকেরা থাকে ওখানে, ষাট বছরে কোনো ডেভেলপমেন্ট হয়নি, সার্ভে হয়নি, সেনসাস হয়নি।

    —সরকারি অফিসাররা যেতে চায় না, না? সব রাজ্যে একই ব্যাপার।

    —যেটুকু কাজ তা রামকৃষ্ণ মিশন করে, এমন কি রেশনের দোকান আর স্কুলও মিশনই চালায়। বিজলি নেই, পানীয় জল নেই, মাসে এক-আধ লিটার কেরোসিন, ব্যাস।

    —ফরেস্ট এরিয়ায় গেছেন?

    —না তেমন করে যাইনি, রেসট্রিকশান ছিল এতদিন। নদীর জল নিয়ে, জঙ্গলের গাছ নিয়ে নানা কেলেঙ্কারি হয়েছে। তারপর গোপনীয় সৈনিক, স্পেশাল পুলিশ অফিসার, অগজিলিয়ারি ফোর্স আর সালওয়া জুড়ুমের নামে উপজাতিদের নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি করানো হল। ভারতের সংবিধান ওই অঞ্চলে অস্তিত্বহীন। সালওয়া জুড়ুম আর আধামিলিট্রির সাহায্যে জঙ্গলে শান্তি ফেরানোর চেষ্টা হল জাস্ট নাইটমেয়ার। কতকাল যে চলবে লড়াইটা, কেউই জানে না। ইনডিয়ার আকরিক খনিজের মানচিত্র আর ট্রাইবাল ডেনসিটির মানচিত্র একই, বুঝলি? যারা আকরিক খনিজ চায় তারা আদিবাসিদের উৎখাত করতে উঠেপড়ে লেগেছে; তাদের চাই-ই চাই। প্রতিরোধ করার জন্য যা-যা করা দরকার তা আদিবাসীরা করে চলেছে, এসপার নয়তো ওসপার। ইয়াতো করনা হ্যায়, নহিঁতো মরনা হ্যায়।

    অপু চুপ করে রইল, যে বিষয়ে কিছুই জানে না সে ব্যাপারে বেফাঁস কিছু যাতে না বলে ফ্যালে। প্রসঙ্গের খোঁচা ভোঁতা করার জন্য বলল, কী-কী গাছ হয় জঙ্গলে?

    —সব তো আর জানি না, তবে প্রচুর পলাশ, মহুয়া, আমড়া গাছ দেখেছি। আর আছে চিকরাসি, জিলন, শিমুল, উলি, বডুলা, কড়ুয়া পাঙার, পিছলা, জারুল, জংলি বাদাম, ছাতিম এইসব।

    শুনে, বুঝতে পারল অপু, ওর বাংলা জ্ঞান দিয়ে গাছের নাম চিনতে পারছে না। দিয়ারায় বসবাস করে গাছের নাম জানতে চাওয়া বোকামি হয়ে গেছে। কেবল মাথা দুলিয়ে সায় দিল, বোঝার ভান করে।

    —মালিক মকবুজা শুনেছিস?

    —না, কার লেখা?

    —তুই তো পুরো চুতিয়াছাপ মূর্খ থেকে গেছিস রে, পিওর অ্যাণ্ড সিম্পল গাণ্ডু। মালিক মকবুজা হল একটা স্ক্যাণ্ডালের নাম।

    —না শুনিনি। বিহারে রোজ এতো স্ক্যাণ্ডাল হয় যে অন্য রাজ্যের স্ক্যাণ্ডাল পড়ার দরকার হয় না।

    —ট্রাইবালদের ওনারশিপের নাম মালিক মকবুজা। দণ্ডকারণ্যের জঙ্গলে প্রচুর সেগুনকাঠের গাছ ছিল আর সেসবের মালিক ছিল স্থানীয় আদিবাসীরা। টিমবার মাফিয়ারা প্রশাসন আর রাজনীতিকদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে আদিবাসীদের ঠকিয়ে সেগুনের গাছগুলো কেটে পাচার করে দিত, ইসকি…। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে লোকায়ুক্ত একটা কমিটি গড়ে রিপোর্ট চেয়েছিল। রিপোর্টে প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল যে নিচেতলা থেকে ওপরতলা পর্যন্ত প্রশাসন সেগুনগাছ কাটায় আর ট্রাইবালদের ঠকানোয় ইনভলভড। সেসময়ের বস্তারের কমিশনার নারায়ণ সিং আর সালওয়া জুড়ুমের জন্মদাতা মহেন্দর করমার বিরুদ্ধে ছিল প্রধান অভিযোগ। কিন্তু অ্যাজ ইউজুয়াল সে রিপোর্ট ধামা চাপা পড়ে গেল, কারোর কিছু হল না, মাঝখান থেকে আদিবাসীগুলো জমিও হারালো আর জমির ওপরের সেগুনকাঠের গাছগুলোও, ইসকি…। রিপোর্টে দেখানো হয়েছিল যে আদিবাসীদের শহরে নিয়ে গিয়ে সিনেমা দেখিয়ে বা ধমক দিয়ে বা চকচকে বোতলের মদ খাইয়ে চুক্তিতে টিপছাপ করিয়ে নেয়া হয়েছিল। যখন হইচই হয়েছিল তখন সেগুনগাছের গুঁড়িগুলোর চালান বন্ধ ছিল, তারপর সংবাদ মাধ্যম ভুলে গেল, পাবলিকও ভুলে গেল। সংবাদ মাধ্যম যে কাদের, তুই তো জানিস, ইসকি…।

    —কিছুদিন আগে মারা গেছে, সেই লোকটাই মহেন্দর করমা, না?

    —হ্যাঁ, মাওওয়াদিদের অনেকদিনের পেয়ারা সনম ছিল। সালওয়া জুড়ুমের ভয়ে প্রচুর আদিবাসী ছত্তিশগড় থেকে পালিয়েছে অন্ধ্র আর মহারাষ্ট্রে; ওদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হতো, ফসল কেটে নেয়া হতো। সরকারি অফিসাররা বলে যে মাওওয়াদিদের ভয়ে ওরা ছত্তিশগড় থেকে পালিয়েছে। দাঁতেওয়াড়ায় হাই টেনশান লাইন উড়িয়ে দশদিন অন্ধকার করে দিয়েছিল মাওওয়াদিরা। সত্যি-মিথ্যে একাকার হয়ে গেছে আমাদের দণ্ডকারণ্যে। নিম্নবর্ণের বাঙালি উদ্বাস্তুদের অভিশাপ থেকে রাঘব বোয়ালের বংশই মুক্তি পেলো না, এরা তো সব চিতি-কাঁকড়া, ইসকি…।

    —এ তো দেখছি কিছুটা আমাদের দিয়ারার মতন ব্যাপার। উঁচু জাত আর উঁচু চাকরির মতলবখোরি!

    —আদিবাসীদের জমিজমার কোনো রেকর্ডও সরকারি দপতরে পাওয়া যায় না, ইসকি…। একবার ছানবিন করে জানা গিয়েছিল যে দুজন মুখিয়ার পাঁচশ একর করে জমির মালিকানার পাট্টা আছে, আর কারোর নামে কোনো প্রমাণ নেই। জমি নেই তো কিষাণ ক্রেডিট কার্ড হবে না। অনেকে ভোটার কার্ড কাকে বলে জানে না, বি পি এল কাকে বলে জানে না।

    —ওফ, বড় বেশি কমপ্লিকেটেড আপনার এনভিরন। যাকগে, রায়পুর থেকে নারায়ণপুর যেতে কোন কোন শহর পড়ে বলুন? আপনার দিদিকে দেখতে ইচ্ছে করছে। সেলাম জানাতে ইচ্ছে করছে।

    —কথাটা সেলাম নয়, প্রণাম।

    —হ্যাঁ, হ্যাঁ, কারেক্ট, সরি।

    —ভিলাই, দুর্গ, দাল্লি রাজহরা, ভানুপ্রতাপপুর, তারপর নারায়ণপুর। তবে রায়পুর থেকে মোটোরেবল রোডও আছে। কোন রাস্তায় যাবি তার ওপর নির্ভর করে দূরত্ব, ২২৫ থেকে ২৭৫ কিলোমিটার খানেক হবে। শর্টকাট রাস্তা হল রাওঘাট হয়ে। এখন অবশ্য বয়লাডিলার খনির জন্যে এলাকাটায় চহলপহল দেখা দিয়েছে। আগে মাওওয়াদিরা কালভার্ট উড়িয়ে দিয়েছিল, এখনও ওড়ায় মাঝে-মধ্যে, রাস্তার মাঝখানে লাশ পড়ে থাকে, পুলিশ ভয়ে সরায় না, সরাতে গেলেই বোমা ফাটার সম্ভাবনা; মরেওছে অনেক সিপাহি জওয়ান। আসাম থেকে, হরিয়ানা থেকে, তামিলনাডু থেকে, চাকরি করতে এসে বেচারাদের কি বিপত্তি।

    অপুর জ্ঞান সীমিত, টের পেল অপু, দিয়ারাও তো প্রায় আদিনিবাসীদের অঞ্চল।

  • বনবিভাগের বিট মার্শাল

    বনবিভাগের বিট মার্শাল

    মলয় রায় চৌধুরী

    [book]

    বনবিভাগের বিট মার্শাল : ষোল

    বনবিভাগের বিট মার্শাল : দুজন পোচারের বডি পড়ে আছে স্যার।

    বনবিভাগের রেঞ্জ অ্যাসিস্ট্যান্ট : দেখে তো পোচার মনে হচ্ছে না। টিম্বার মাফিয়ার এজেন্ট শালারা, নিশ্চই।

    বনবিভাগের বিট মার্শাল : টিম্বার মাফিয়ার এজেন্টদের আমি চিনি স্যার। এরা বাইরের লোক। কী করে ওখানে গিয়ে পড়ল? বেঁচে আছে না মরে গেছে!

    বনবিভাগের রেঞ্জ অ্যাসিস্ট্যান্ট : কেন মিছিমিছি নিজের বিপদ ডেকে আনছ। যা রেগুলার রিপোর্টিং তাই রেকর্ড করে দিও।

    বনবিভাগের বিট মার্শাল : ব্যাস স্যার, কুরুসনার ছেড়ে অনেকটা চলে এসেছি, আর ভেতরে যাওয়া সুবিধার নয়।

    বনবিভাগের রেঞ্জ অ্যাসিস্ট্যান্ট : চলো।

  • মানুক দেওতার রহস্য সন্ধানে

    মানুক দেওতার রহস্য সন্ধানে

    অজেয় রায়

    [book]

    এক

    সে কীরে, ব্যাংকক! তপনের বন্ধুরা শুনে আঁতকে উঠল।

    কেন, তাতে কী? তপন দৃঢ়স্বরে জানায়, লোকে ইউরোপ—আমেরিকায় যাচ্ছে না? পড়তে যাচ্ছে, চাকরি করতে যাচ্ছে। এ—তো ঢের কাছে। ব্যাংকক চমৎকার শহর। আর। সুনীলদা বলেছে চাকরিটাও ভালো। এক পাঞ্জাবি ব্যবসাদার ও—দেশ থেকে মশলা নিয়ে। ভারতে চালান দেয়। ওর ব্যাংকক অফিসের জন্য একজন বিশ্বাসী লোক চাই। ভালো মাইনে দেবে। অনেক বাঙালি থাকে ওখানে। সাউথ—ইস্ট—এশিয়ার সঙ্গে ভারতের কদ্দিনের যোগাযোগ জানিস?

    সব শুনে বন্ধুরা ঘাড় নাড়ল, তা বটে, তা বটে। ঠিক আছে, যা দেখ কেমন লাগে। ছুটি—টুটি দেবে তো?

    অত দূরে? মা খবরটা শুনে তপনের মুখের দিকে চেয়ে বললেন। তপনের বাবা নেই। মা একটা স্কুলে পড়ান।

    তপন বলল, কিছু দূরে নয়। তুমি ভেবো না। সুনীলদা অ্যাদ্দিন রয়েছেন।

    বেশ, যা তবে। সাবধানে থাকবি। তোর বাবা থাকলেও বারণ করতেন না। খুশিই হতেন।

    বি. এ. পাস করে দু—বছর ধরে চাকরি খুঁজছিল তপন। হঠাৎ বন্ধু গুরুপদর পিসতুতো দাদা সুনীল ব্যানার্জির সঙ্গে আলাপ। সুনীলদা মালয়েশিয়ায় থাকেন। সেখানে স্কুলে পড়ান। ছুটিতে কলকাতায় এসেছেন। সুনীলদা কথায় কথায় বললেন, আমার বিশেষ পরিচিত ব্যাংককের ব্যবসায়ী গোবিন্দ সিং একজন লোক খুঁজছে। যাবে ব্যাংকক? তাহলে তোমার জন্য লিখি।

    তপন রাজি হয়ে গেছে।

    তপনের ভাই—বোন তিলু মিলু খবরটা শুনেই লাফাতে লাগল। তিলু তক্ষুনি ম্যাপ নিয়ে বসে গেল, থাইল্যান্ডের রাজধানী, তাই না? এই তো ব্যাংকক। কীসে যাবে দাদা? প্লেন, না জাহাজে?

    মিলু বলল, দাদা, ওঙ্কারভাট দেখতে যাবে না?

    তপন বলল, ইচ্ছে আছে। ব্যাংককের কাছেই তো।

    উঃ, কী লাক তোমার! গভীর বনের মধ্যে বিরাট ধ্বংসাবশেষ নগর। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মন্দির। আমি বইয়ে ছবি দেখেছি। প্রায় হাজার বছর আগে হিন্দু—রাজত্ব ছিল ওখানে। আর জানো দাদা, ওদেশের বাটিকের কাজ খুব সুন্দর। ছুটিতে আসার সময়—আমার জন্যে একটা…

    বাইরে বেপরোয়া ভাব দেখালেও প্রথমটা ভিতরে ভিতরে বেশ ঘাবড়াচ্ছিল তপন। কলকাতার বাইরে বড় একটা যায়নি সে। দিনে দিনে মনটা তার অস্থির হয়ে ওঠে। ভ্রমণ কাহিনি বা অ্যাডভেঞ্চারের গল্প পড়তে পড়তে মনে মনে বইয়ের চরিত্রদের পাশে নিজেকে কল্পনা করেছে। ওইসব অজানা দেশে বিচিত্র সব ঘটনার মধ্যে নিজেও যেন জড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই কল্পনার জগৎ যে খানিকটা বাস্তবে ফলে যেতে পারে তা কোনো আশা করেনি। এই কলকাতা, এই ভবানীপুরের এত দিনের জীবন ছেড়ে কোথায় যেতে হবে?

    মনে সে সাহস আনে। কেন, এই তো সুনীলদা গিয়েছেন? বাবা নাকি পাস করেই বর্মায় গিয়েছিলেন চাকরি নিয়ে। চার বছর ছিলেন। ওঁরা শহরের লোক ছিলেন না। আর সে খাস কলকাতায় মানুষ। কত বেশি জানে—শোনে। তার অত ভয় কী?

    ভালো মাইনে। বাড়িতে বেশ কিছু টাকা পাঠানো যাবে। সে কী কম আনন্দের কথা? তাতেই সব কষ্ট সয়ে যাবে।

    মাসখানেকের ভিতর গোবিন্দ সিং—এর চিঠি এল। চাকরি মঞ্জুর। তপনের পাসপোর্ট ভিসা ইত্যাদি হয়ে গেল। সিং ব্রাদার্সের কলকাতায় বড়বাজারের অফিস থেকে তপনকে দেওয়া হল ব্যাংকক যাবার একখানি প্লেনের টিকিট। যাওয়ার দিনও এসে পড়ল।

    মায়ের চোখ ছলছল। বন্ধুরা ঘটা করে একটা বিদায় সংবর্ধনা দিয়ে ফেলল তপনকে। তারপর সত্যি একদিন তপন রওনা দিল দমদম থেকে ব্যাংককের পথে।

    ব্যাংকক। থাইল্যান্ড বা শ্যামদেশের রাজধানী।

    তপন এক মাস হল ব্যাংককে এসে কাজে যোগ দিয়েছে।

    সিং ব্রাদার্সের মালিক গোবিন্দ সিং—এর বয়স প্রায় ষাট। শক্ত সমর্থ সর্দারজি। বহু দেশে ঘুরেছেন, অনেকগুলো ভাষা জানেন, দিলদরিয়া লোক। তপনের সঙ্গে কথা বলেন ইংরেজি বা হিন্দিতে। মেনাম নদীর কাছে রাজাবংশী রোডে সিং ব্রাদার্সের মস্ত গুদাম। দক্ষিণ—পূর্ব এশিয়ায় অগুনতি ছোট—বড় দ্বীপ। অনেক দ্বীপেই নানারকম মশলার গাছ জন্মায়। তাই ইউরোপীয়ানরা এইসব দ্বীপকে বলত স্পাইস—আইল্যান্ডস। সিং ব্রাদার্স এই অঞ্চলের নানা জায়গা থেকে লবঙ্গ, গোলমরিচ, জায়ফল, এলাচ ইত্যাদি আমদানি করে। বড় বড় নৌকো আর লঞ্চে করে নদীপথে ব্যাংককে আনে। সেগুলো জমা হয় গুদামে, তারপর চালান যায় ভারতবর্ষে। আবার ভারত থেকে সিং ব্রাদার্স আনে রেশম ও চা। মালের হিসেব রাখা, নদীর ঘাট থেকে জিনিস ছাড়িয়ে আনা। সব কাজই করতে হয় তপনকে। এসব ব্যাপারে তার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে মন দিয়ে শেখে, মশলার রকমফের চেনে।

    গোবিন্দ সিং থাকেন নিউ রোডে। গুদাম থেকে বেশি দূরে নয়। তপনের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে মহারাজ রোডে, গোবিন্দ সিং—এর বাড়ির কাছেই। খায় একটা পাঞ্জাবি হোটেলে—ভাত রুটি সবজি ডাল তরকারি। দইও মেলে।

    তপন সপ্তাহে একখানা চিঠি দেয় বাড়িতে। মাকে লেখে—কিছু ভেবো না। দিব্যি আছি। তিলু মিলুকে লেখে ওই দেশের খবর—

    ব্যাংকক বিরাট শহর, মেনাম নদীর দু—ধারে ছড়ানো। পুব পাশেই শহর বেশি জমজমাট। নদী থেকে অনেকগুলো খাল বেরিয়ে ঢুকে গেছে শহরের ভিতর। খালগুলোর ওপর দিয়ে অজস্র সাঁকো। থাইরা খালকে বলে কেলাং। বইয়ে পড়েছিস তো, ইটালির ভেনিস শহরে যেমন খাল আছে তেমনি। এই খালগুলোকে রাস্তাও বলা চলে, কারণ তাহই দিয়ে চলে অসংখ্য ছোট ছোট নৌকো, লোজন জিনিসপত্র নিয়ে। নৌকোর ওপর রীতিমতো বাজার বসে। নাম দিয়েছে—ফ্লোটিং মার্কেট। মাসখানেকে এত বড় শহরের কতটুকুই বা দেখেছি।

    কলকাতার মতোই এর কোনো অংশে আধুনিক বাড়িঘর হোটেল, চওড়া ঝকঝকে রাস্তা, আবার কোনো কোনো অংশে গলিঘঁজি বস্তি, পুরনো নোংরা ঘুপচি বাড়ি, দোকানপাট। মেনাম নদীতে নৌকো, বজরা, স্টিমার গিজগিজ করে। শ্যাম উপসাগরে পড়েছে মেনাম। বড় জাহাজ মোহনার বেশি ঢুকতে পারে না।

    এদেশে বেশিরভাগ লোকই বৌদ্ধ। সাত—আটশো বছর আগে এখানে ভারতীয় হিন্দু সভ্যতার বিস্তার হয়েছিল। তাই শহরে ছড়িয়ে আছে এই দুই ধর্মের নিদর্শন। পথের ধারে কত যে বৌদ্ধ মন্দির বা ওয়াট। ঢালু ছাদ, ছুঁচালো মাথা, প্যাগোডা চেহারার মন্দিরগুলি। মন্দিরের গায়ে কেবল বুদ্ধমূর্তি—নানান আকার, নানান ছাঁদ দেখে দেখে একঘেয়ে লাগছে।

    পথের নাম দেখে ভারি মজা লাগে। মহারাজ রোড, রাম এক, রাম দুই, এমনি সব নাম। আগে এখানকার রাজাদের নাম ছিল নাকি রাম দিয়ে। প্রাচীন রাজধানীর নাম অযোধ্যা। ঘুরতে ফিরতে বিদেশ বলে মনে হয় না।

    কত দেশের লোকের বাস। বিদেশিদের মধ্যে চিনারাই সবচেয়ে বেশি। বেশিরভাগ লোক বাইরে প্যান্ট—শার্ট পরে। তাছাড়া পাজামা লুঙ্গি কুর্তা এমনকি ধুতি—পরা লোকও দেখেছি। পথেঘাটে ঘঘারে প্রচুর হলুদ আলখাল্লা—পরা পুরুষ। এরা নাকি শ্ৰমণ অর্থাৎ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। শুনেছি প্রত্যেক বৌদ্ধ থাই অন্তত কিছু দিনের জন্য সন্ন্যাস নেয়, শ্রমণ হয়। থাইরা বেশ আমুদে। চিনা প্যাটার্নের চেহারা। জানিস, এ—দেশের টাকার নাম ভাট। প্রায় চল্লিশ পয়সার সমান এক ভাট।

    শান্ত ভদ্র তপনকে গোবিন্দ সিং—এর পছন্দ হয়েছে। গোবিন্দ সিং—এর সঙ্গে থাকেন তার। স্ত্রী এবং ছোট ছেলে। ছেলের বয়স বছর পঁচিশ। বাবার ব্যবসা দেখে। বড় ছেলে গেছে। কানাডা, কাগজ তৈরি শিখতে। ফিরে এসে এখানে কাগজের কল বানাবে।

    সময় পেলে গোবিন্দ সিং গল্প করেন। তিনি তপনকে কখনো ডাকেন তপনবাব, কখনো শুধু বাবু। বলেন, কত দেশ দেখলাম, কত কী শিখলাম, বড় ছেলে ফিরে এলে আমার ছুটি। আর দু—তিন বছর। তারপর দেশে চলে যাব, লুধিয়ানা। খেত—খামার করব। তখন ইচ্ছে হলে তুমি চলে যেও আমার কলকাতার অফিসে। ওখানে ভালো লোক দরকার।

    তিলু মিলুকে লিখল তপন—

    কয়েকটা নামকরা বৌদ্ধমন্দির দেখে ফেলেছি। যেমন ওয়াট পো, ওয়াট অরুণ ওয়াট ফ্রা—কিও। ফ্রা—কিওতে আছে বিখ্যাত এমারেল্ড বুদ্ধ। মন্দিরগুলোয় বিষ্ণু, গরুড়, কিন্নর, ড্রাগন ইত্যাদির মূর্তি। বড় বড় মন্দির সোনা আর মণি—মাণিক্যের ছড়াছডি। আর দেখেছি রাজপ্রাসাদ ও মিউজিয়াম। একটা ছুটির দিনে প্রাচীন রাজধানী অযোধ্যা দেখতে যাব। ঘোরার সময় তেমন পাই না। এত রাস্তা, ভয় হয় পথ না হারাই। পকেটে ব্যাংককের একটা ম্যাপ রাখি। হ্যাঁ, মিল ঠিক বলেছিলি, এখানে কাপড়ের ওপর বাটিকের কাজ চমৎকার। থাইরা ঘরে ঘরে বাটিক করে। নিয়ে যাব তোর জন্যে।

    এই অযোধ্যা দেখতে গিয়েই এক রবিবার তপনের সঙ্গে আলাপ হল ডক্টর ইন্দ দত্তর, ফলে তার জীবনে আর একটা চমকপ্রদ মোড় ফিরল।

    ব্যাংককের উত্তরে অযোধ্যা। সকালে ট্রেনে চড়ে রওনা দিল তপন। ঘণ্টা দুই লাগল পৌঁছতে। মেনাম নদীর ভিতর কয়েকটি দ্বীপ এবং নদীর দুই তীরে ছড়িয়ে আছে এই রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ। প্রায় দুশো বছর আগে বর্মীদের আক্রমণে এই নগর ধ্বংস হয়।

    তপন ঘুরে ঘুরে দেখছিল। আরও অনেক টুরিস্ট এসেছিল। একটি লোককে তার বিশেষ ভাবে নজরে পড়ল।

    ভদ্রলোক অন্তত ছ—ফুট লম্বা। শক্ত গড়ন, ফর্সা রং, সুশ্রী ধারাল মুখ। জুলপি ও রগের চুলে সামান্য পাক ধরেছে। পরনে ট্রাউজার্স ও ফুলশার্ট, মাথায় সাদা পানামা টুপি।

    ভদ্রলোক মোটেই পুরনো মন্দির বা প্রাসাদ দেখছিলেন না। দূরবিন চোখে লাগিয়ে গাছে গাছে পাখি দেখে বেড়াচ্ছিলেন। চারপাশের লোকজন সম্বন্ধে ভ্রূক্ষেপ নেই।

    তপনের কৌতূহল হয়। সে ভদ্রলোকের পিছু পিছু ঘুরতে থাকে। এইরকম দূরবিন দিয়ে পাখি দেখার ব্যাপারটায় তার আগ্রহ ছিল। তার এক মামার ছিল এই শখ। উনি আসামে। থাকেন। একবার কলকাতায় এসে তপনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন ঢাকুরিয়ায় পাখি। দেখতে। ইনিও বোধহয় পক্ষিবিদ।

    জায়গাটা নিরালা। ভদ্রলোক চোখ থেকে দূরবিন নামিয়ে ফিরলেন। তপন হাত কুড়ি পিছনে। তপনকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত দেখে তিনি পরিষ্কার বাংলায় বললেন, বাঙালি?

    তপন চমকে থতমত খেয়ে ঘাড় নাড়ল।

    বেড়াতে এসেছেন?

    না। মানে আমি ব্যাংককে থাকি, জবাব দিল তপন।

    ও! কী করেন?

    চাকরি।

    হুঁ। ঠিক চিনেছি বাঙালি। ভদ্রলোক হাসিমুখে এগিয়ে এলেন।

    কী করে বুঝলেন? খানিকটা চেহারায়, আর খানিকটা কথা শুনে। তখন নিজের মনে বিড়বিড় করছিলেন যে বাংলায়।

    আপনিও কি বাঙালি? তপন জিজ্ঞেস করল।

    না, তা ঠিক নয়। আমি থাই, বলেই ভদ্রলোক হো—হো করে হেসে উঠলেন।

    মানে! তপন ভ্যাবাচ্যাকা খায়।

    মানে জন্মসূত্রে বাঙালি বটে কিন্তু এই দেশের নাগরিক, এই দেশেই মানুষ হয়েছি। আমার নাম ইন্দ্র দত্ত।

    আমি তপন রায়। কলকাতায় থাকতাম।

    পাখির শখ আছে নাকি?

    নাঃ, তেমন কিছু নয়। আপনাকে দেখেই বেশি কৌতূহল হচ্ছিল।

    কফি চলবে?

    ভদ্রলোক কাঁধে ঝোলানো কফির ফ্লাস্ক নামিয়ে ঘাসে বসলেন। তপন বসল পাশে। একটু একটু করে আলাপ জমে উঠল।

    ডক্টর ইন্দ্র দত্ত ব্যাংকক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিতত্ত্বের অধ্যাপক। এই দেশেই জন্মেছেন। এদেশেই পড়াশোনা। অবশ্য ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সেও পড়েছেন কিছুকাল। বাবা বিষ্ণু দত্ত ছিলেন ডাক্তার। কলকাতায় থাকতেন। ভারতের স্বদেশি আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ফলে ইংরেজ সরকারের বিষনজরে পড়েন। জেল খাটা এড়াতে তিনি ভারত ছেড়ে পালান। বর্মা ঘরে আসেন শ্যামদেশে। ব্যাংককে বাস করতে থাকেন। ডক্টর ইন্দ্র দত্তর মা ছিলেন কা—প্রবাসী বাঙালি। ভদ্রলোকের বাংলা উচ্চারণ একটু বাঁকা বাঁকা। এদেশে মানুষ হয়েও বাংলা চর্চা করেছেন এই আশ্চর্য।

    ইন্দ্র দত্ত দিলখোলা মানুষ। তপনের সব খবর নিলেন। চট করে আপনি থেকে তুমিতে নেমে এলেন—তোমাকে আবার আপনি বলব কী হে।

    কথায় কথায় ডক্টর দত্ত বললেন, আমার বাবা বিদেশে থেকে গেলেও মনেপ্রাণে ছিলেন ভারতীয়। পুরো বাঙালি। বাংলা বই আনতেন, বাংলায় কথা বলতেন ঘরে। বাবার মনে বড় দুঃখ ছিল ভারতবর্ষ পরাধীন। তাই যেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এদেশে এলেন, আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন নিয়ে বাবা একেবারে মেতে উঠলেন। কোন্ সাল হবে সেটা? বোধহয় ১৯৪৩। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ দিকে। আমিও যোগ দিয়েছিলাম নেতাজির বাল—সেনায়। তখন আমার সাত—আট বছর বয়স।

    ভারত স্বাধীন হবার পর বাবা দুবার ওদেশে যান। আমি গেছি সঙ্গে। কলকাতায় আমার কিছু আত্মীয়—স্বজন থাকে। তবে যোগাযোগ তেমন নেই। বড় হয়ে আমি তিনবার ইন্ডিয়ায়। গেছি। সুন্দরবন আর জলদাপাড়া রিজার্ভ—ফরেস্ট দেখে এসেছি। বাংলাটা প্রায় ভুলেই গেছিলাম। আমার স্ত্রীর কল্যাণে ফের চর্চা। ও কলকাতার মেয়ে। কেমব্রিজে পড়তে গেছিল। সেখানেই আমাদের আলাপ, তারপর বিয়ে। চলো আজই তোমাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যাব। মণিকা ভীষণ খুশি হবে দেশের ছেলে দেখলে।

    দুপুরে ইন্দ্র দত্তর সঙ্গে ব্যাংককে ফিরল তপন।

    ডক্টর ইন্দ্র দত্তর সঙ্গে আলাপ হয়ে তপন বিদেশে একা থাকার দুঃখ অনেকখানি ভলে গেল। ব্যাংককে আরও কয়েকজন বাঙালির সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল বটে, তবে এমন ঘনিষ্ঠতা হয়নি।

    ডক্টর দত্তর স্ত্রীও খুব ভালো। ভারি গোপ্লে। ওঁরা থাকেন সাদার্ন রোডে। নিজেদের বাড়ি। পরিষ্কার—পরিচ্ছন্ন এলাকা। একতলা বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি, সামনে টকরো জমিতে ফুলের বাগান। তপন সপ্তাহে দু—তিনবার সাইকেলে চেপে হাজির হতে লাগল ডক্টর দত্তর বাড়ি। ওকে বাড়ির ছেলের মতনই আপন করে নিয়েছিলেন তারা। ডক্টর দত্তর ছেলেঙ্গলে নেহা একটি থাই ছেলেকে দত্তক নিয়েছেন। তার বয়স বছর পাঁচ—ছয়। ফুটফুটে দেন। নাম রেখেছেন রবি।

    ডক্টর দত্ত সন্ধের সময় সাধারণত বাড়িতেই থাকতেন। তপনের সঙ্গে নানা বিষয়ে গল্প করতেন—তার নানা দেশের অভিজ্ঞতা, নানান জীবজন্তুর কথা। কত জায়গায় ঘুরেছেন যে ঠিক নেই। জীবজন্তু সম্বন্ধে তপনের আগ্রহ ছিল। ডক্টর দত্তর সঙ্গে আলাপ হয়ে তার নতুন করে চোখ ফোটে। ডক্টর দত্তর কাছ থেকে সে জীবজন্তু ও ভ্রমণ কাহিনির বই নিত পড়তে।

    ইন্দ্র দত্তকে প্রথমে তপন ডক্টর দত্ত বলে ডাকত। ওঁর স্ত্রী আপত্তি জানালেন, তা হবে না। আমায় যখন বউদি বলেছ, ওকেও দাদা বলতে হবে।

    অতএব ডক্টর দত্তকে তপন দত্তদা বলে ডাকতে শুরু করল।

    চার মাস কেটেছে। গোবিন্দ সিং একদিন বললেন, তপনবাবু, আমার এক বন্ধুলোক ব্যাংককে বেড়াতে আসছে। ওর জন্য একটা কিউরিও কিনে এনে দিও। এই আট ডলারের মধ্যে। তোমার পছন্দ ভালো।

    রাজাবংশী রোডের গায়ে একটা রাস্তায় অনেকগুলো কিউরিও—শপ দেখেছিল তপন। বিকেলে সেখানে গেল।

    সরু গলিতে ছোট্ট দোকান। কাঁচের দরজা। ভিতরে কতরকম জিনিস সাজানো। নীলাভ আলোয় রহস্যময় লাগছে। দোকানদার কাউকে দেখা যাচ্ছে না। এটা কিউরিও—শপ। অর্থাৎ দুর্লভ জিনিসের দোকান। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল তপন।

    কাউন্টারে একটি মুখ আবির্ভূত হল। শুকনো হর্তুকির মতো মুখখানা। অজস্র ভাজ। তর্পনের দিকে চেয়ে হাসল সে। চোখ সরু হয়ে গেল। খুদে খুদে দাঁতের মাঝে একটি সোনা—বাঁধানো দাঁত ঝিলিক দিল।

    বৃদ্ধাটিকে মনে হল চিনা রমণী। চুল টান করে ঘাড়ের কাছে গিট দেওয়া। গায়ে নীল রঙের ঢোলা জামা ও পাজামা। একগাল হেসে সে দোকানের শো—কেসের দিকে আঙল। দেখিয়ে বলল—সী।

    তপন এ ধরনের দোকানে কখনো ঢোকেনি আগে। কত অদ্ভুত অদ্ভুত যে জিনিস, কতরকম মূর্তি, ছুরি, পাত্র, ছবি।

    হঠাৎ একটা শো—কেসের ওপর তার চোখ আটকে গেল। সেখানে কয়েকটা পাখি সাজানো রয়েছে। জ্যান্ত নয়, স্টাফ করা। যেমন মিউজিয়ামে থাকে। তপন শুনেছে, গোটা পাখির পালকসুন্ধু চামড়ার মধ্যে কাঠের গুঁড়ো পুরে সেলাই করে দেওয়া হয়। দেখতে মনে হয় স্বাভাবিক পাখি। স্থির অবস্থায় বসা বা দাঁড়ানো।

    শো—কেসের ওপর রয়েছে একটা বাজপাখি, একটা মস্ত কালো কাকাতুয়া, আর একটা অদ্ভুত দেখতে পাখি। কোনো পাখির পালকের এমন বাহার তপন কখনো দেখেনি, কল্পনাও করেনি। একখণ্ড কাঠের ওপর স্ট্যান্ড দিয়ে আটকে দাঁড় করানো রয়েছে পাখিটা। উঃ কী রং! গাঢ় লাল, কমলা, নীল, সবুজ, সাদা, কালো—রেশমের মতো নরম চকচকে পালকে আলো ঠিকরোচ্ছে। লাল আর নীল রঙের পালকই বেশি।

    পাখিটা ছোট। সাত—আট ইঞ্চির বেশি লম্বা নয়। খাটো ল্যাজ। সবচাইতে সুন্দর হচ্ছে তার ল্যাজ থেকে বেরনো দুটি লম্বা পালক। ঠিক যেন দুটি সরু লোহার তার লম্বা হয়ে ডগায় গিয়ে পাকিয়ে গেছে। আর তারের ডগায় সবুজ পালকের গুচ্ছ। ছোট মাথাটি উঁচু করা, ডানা ছড়ানো, যেন এখুনি উড়বে। চোখের মণির জায়গায় দুটি টুকটুকে লাল পুঁতি বসানো। বাঃ! ওই পাখি যখন উড়ে বেড়াত! তপন কল্পনা করে। ঠিক একটুকরো রামধনু যদি উড়ে বেড়ায় তেমনি দেখতে লাগত নিশ্চয়ই।

    সেয়ানা দোকানি তপনের দৃষ্টি অনুসরণ করে অমনি পাখিটাকে নামিয়ে এনে সামনে রেখে বলল, বুরং রাজা।

    তপন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। তখন দোকানি বদ্ধা আধো আধো ইংরেজিতে বলল, প্যারাদাইজ বার্ড।

    ও, এই হচ্ছে বার্ড অফ প্যারাডাইস! এ পাখির কথা পড়েছিল তপন। শুধু নিউগিনি অস্ট্রেলিয়ায় নাকি এই পাখি মেলে। পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর পাখি। এ পাখিটায় কিন্তু বেশ খুত আছে। দূর থেকে বোঝা যায় না এমনভাবে রেখেছিল। পাখির একটা ডানার পালন প্রায় উঠে গেছে, আর একটি পায়ের আধখানা কাটা।

    হঠাৎ তপনের মাথায় এল এটা দত্তদাকে প্রেজেন্ট করলে কেমন হয়? ওর বাড়িতে এমনি স্টাফ করা একটা কাঠঠোকরা পাখি আছে। এটা পেলে উনি খুশি হবেন নিশ্চয়। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে দরদস্তুর শুরু হল।

    কত দাম?

    বুড়ি মাথা নেড়ে, দাঁতের ঝিলিক দেখিয়ে দু—হাতের দশ দশ আঙুল ছড়িয়ে জানান— টুয়েন্টি ডলার।

    বাপরে থাক, অত পয়সা নেই। তাছাড়া অনেক খুঁত রয়েছে।

    অমনি দাম নেমে এল—ফিফটিন।

    নাঃ।

    কত দেবে?

    টেন।

    থার্টিন।

    নো নো টেন। তপন মাথা নাড়ল।

    বুড়ি মিটিমিটি করে দেখল খানিক। বুঝল তপন আর উঠবে না কিছুতেই। সে একটু হতাশভাবে বলল, অলরাইট, তে।

    তপন হিসেব করে দাম দিল ভাট—এ।

    দোকানি বুড়ি স্ট্যান্ড থেকে পাখিটা খুলে তার পাখা মুড়ে ছোট্ট করে ফেলল। তারপর প্লাস্টিকের থলিতে পুরে বেঁধে দিল। স্ট্যান্ডটা আলাদা দিল। আবার ইচ্ছেমতো এটাকে সাজিয়ে রাখা যাবে।

    গোবিন্দ সিং—এর বন্ধুর জন্য তপন নিল একটা কাগজ—কাটার ছুরি—পিতলের হাতলে রঙচঙে পাথর বসানো।

  • রক্তচোষা

    রক্তচোষা

    অজেয় রায়

    [book]

    রক্তচোষা

    গ্রীষ্মের ছুটির শেষ দিক। আমি আর সুনন্দ বেড়াতে গেলাম ঘাটশিলায়।

    সুনন্দর মামার একটা বাড়ি আছে ঘাটশিলায়। কেউ বড় যায়—টায় না। বন্ধই থাকে। বারোমাস। একজন মালি বাড়ি আগলায়। সুতরাং ইচ্ছে ছিল নির্বিঘ্নে আড্ডা মারব। এ বেড়াব। আমরা দুজনে কলেজে পড়ি। বেজায় বন্ধ। কলকাতার ভিড় আর হট্টগোল ছেড়ে এমন খোলামেলা প্রকৃতিরাজ্যে এসে মন আমাদের উড়তে লাগল।

    ঘাটশিলা শহরটি তকতকে পরিষ্কার। বাড়িঘর লোকজনের ঘেঁষাঘেষি নেই। শহরের বাইরে চারপাশে ধু—ধু পাথুরে মাঠ। কোথাও শাল বন। একধারে পরপর কতগুলো জঙ্গলে ঢাকা ছোট ছোট পাহাড়। শহরের পাশ দিয়ে গেছে সুবর্ণরেখা নদী। চওড়া নদীখাতের ভিতর প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পাথরের চাইয়ের ফাঁকে হু—হুঁ করে জল ছুটে চলেছে। সুবর্ণরেখা ছাড়াও কয়েকটি ছোট ছোট পাহাড়ি নদী আছে ধারে কাছে।

    সুনন্দর মামার বাড়িটা শহরের প্রায় বাইরে একটু নির্জন অংশে। ধলভূমগড় যাবার পিচ বাঁধানো চওড়া রাস্তাটা আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে গেছে। এই পথ শহর ছাড়িয়ে, প্রান্তর ভেদ করে, শালবনের গা ছুঁয়ে দূর দিগন্তে গিয়ে মিশেছে। তখন একটু একটু বর্ষা নেমেছে। গরম কমেছে। যদিও দিনের বেলা চড়া রোদ ওঠে, আমাদের কিন্তু পরোয়া নেই। দুটো সাইকেল জোগাড় করে দিনের বেলা টো—টো করে ঘুরে বেড়াই। রাতে বিছানায় শুয়ে শুনতে পাই হায়নার এ্যাক—খ্যাক হাসি। মালির বউ লছমি রান্না করে দেয়। ভাত—ডাল—তরকারি সে মোটামুটি রাঁধে। কিন্তু মাছ—মাংস নিজেরাই বানাই।

    ভোরবেলা প্রায়ই হাজির হয় বুধন মাঝি। কোনোদিন সে আনে তাজা ফলমূল, মাছ। মুরগি বা ডিম। কোনোদিন মধু। কখনও বা কলসি ভরা টাটকা খেজুর রস।

    বুধন মাঝি সাঁওতাল। মাঝবয়সী। আমাদের সঙ্গে তার বেশ ভাব হয়ে গেছে। ও থাকে মাইল তিন—চার দূরে এক গ্রামে। গ্রামের নাম মহুয়াডাঙা। বুধন ঘাটশিলার বাজারে জিনিস বিক্রি করতে যায়। পথে আমাদের বাড়িতে বসে প্রায়ই খানিক গল্প করে নেয়। লোকটি চায়ের ভক্ত। চায়ের সময় এলে আমরা ওকে চা অফার করি। বুধন লাজুক লাজক মখে চক্ষ মুদে চায়ের কাপে চুমুক দেয়।

    মোটামুটি একই ছাঁদে কাটছিল দিনগুলো। হঠাৎ ঘটনার মোড় গেল ঘরে।

    একদিন বর্ধন এল ভোরে। কয়েকটা ডিম এনেছে বিক্রি করতে। লক্ষ করলাম, তার ভারি বিষণ্ণ। সুনন্দ ঠাট্টা করল,—কি বুধন, মুখ ব্যাজার কেন, বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। বুঝি?

    বুধন মাথা নাড়ল। তারপর কেমন ঝিম মেরে বসে রইল।

    বুঝলাম, ব্যাপার কিছু গুরুতর। হয়তো ওর বাড়িতে কারো অসুখ—বিসুখ করেছে। আমি সহানুভূতি দেখাই—বুধন, বলো শুনি হয়েছেটা কী!

    বুধন মুখ তুলে করুণ সুরে বলল, বাবু, আমার ভাইটারে মেরে ফেলবে। ঠিক মেরে ফেলবে।

    সে কি! বুধনের এক ছোটভাই আছে শুনেছিলাম। তার বেশি কিছু জানতাম না। কিন্তু তাকে মারবে কে? কেন?

    একটু একটু করে বুধনের কাছ থেকে উদ্ধার করলাম সমস্ত ঘটনা। এক আশ্চর্য অবিশ্বাস্য কাহিনি। মহুয়াডাঙায় নাকি রক্তচোষার আবির্ভাব ঘটেছে। মানুষের রক্তলোভী কোনো নিশাচর প্রাণী। আর গ্রামের লোকের সন্দেহ, বুধনের ভাই হচ্ছে এই রক্তচোষা।

    ঘটনার শুরু চারদিন আগে। মহুয়াডাঙায় এক উৎসব ছিল। রাত করে সবাই নাচ গান। করেছে। তারপর যে যেখানে পারে শুয়ে পড়েছে। হঠাৎ নারী—কণ্ঠের আর্তনাদ। অনেকে ছুটে আসে। বোকামাঝির বউ জামফুল চেঁচাচ্ছে। কোলে তার চার বছরের ছেলে। সবাই .দেখল, বাচ্চাটির গলার পাশ দিয়ে টপটপ করে রক্ত পড়ছে। গলায় ক্ষতচিহ্ন। এক চিলতে চামড়া যেন গোল করে কেটে নেওয়া হয়েছে। আর তলায় মাংসের মধ্যে ছোট্ট গর্তের মত ফুটো। ক্রমাগত রক্ত বেরিয়ে আসছে ওই ক্ষত থেকে।

    জামফুল বলল যে, সে আর তার ছেলে ঘুমোচ্ছিল ঘরের দাওয়ায়। হঠাৎ ছেলের কান্না শুনে উঠে দেখে এই কাণ্ড।

    এ কীসের কামড়? সবাই পরামর্শ করল। ইঁদুর? ছুঁচো? সাপ—টাপ? উঁহু, ওসব নয়। অভিজ্ঞ লোকেরা কাটা জায়গা পরীক্ষা করে জানাল। তবে কি কোনো পোকা—মাকড়? কেউ সঠিক বুঝতে পারে না। যাহোক ন্যাকড়াপোড়া চাপা দিতে রক্ত বন্ধ হল।

    জামফুল আর একটা খবর দিয়েছিল। সে নাকি ছেলের কান্নায় ঘুম ভেঙেই দেখে বুনো। সামনে দিয়ে হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে।

    সেদিন কেউ বুনোকে নিয়ে মাথা ঘামায় নি। বুনো সম্বন্ধে গ্রামের লোকের সন্দেহ জাগল আরও দুদিন পরে। অর্থাৎ গত পরশু রাতে।

    ঢেঙ্গা মাঝি বুনোর প্রতিবেশী। ঢেঙ্গা ঘুমিয়েছিল তার খড়ের চালার নিচে খাঁটিয়া পেতে। একসময় ঘুম ভেঙে ঘাড়ে হাত দিয়ে বোঝে চটচটে কী যেন! দেশলাই জ্বেলে দেখে, রক্ত বেরোচ্ছে। গায়েও শুকনো রক্ত লেগে আছে। সেই একই রকম ক্ষতচিহ্ন। রক্ত যেন থামতে চায় না।

    গ্রামের লোক আর ব্যাপারটাকে তুচ্ছ করে উড়িয়ে দিতে পারল না। কোনো চেনা জীব—জন্তুর দাঁত বা নখের দাগ নয়। তাদের ধারণা হয়েছে এ নিশ্চয়ই কোনো পিশাচ বা দানোর কীর্তি। সে ঘুমন্ত মানুষের দেহ ফুটো করে রক্ত চুষে নিচ্ছে। কে করতে পারে একাজ? একটা বিশেষ কারণে সবার বুনোর ওপর নজর পড়ল।

    বুধনের ভাই নামে বুনো, স্বভাবেও বুনো। সে ছোটবেলা থেকে বাউণ্ডুলে। একরোখা দুর্ধর্ষ প্রকৃতির। কতবার বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। মাসের পর মাস পাহাড়ে—জঙ্গলে ঘুরেছে। কাজকর্ম চাষবাসে মন নেই। যত অদ্ভুত বিদ্যে শেখার ঝোঁক। ওঝাদের কাছে সাকরেদি করে মন্ত্র—তন্ত্র তুকতাক শিখেছে অনেক। অতি বদরাগী। কারোর সঙ্গে সদ্ভাব নেই। বুধনের সঙ্গেও নয়। ঢেঙ্গার সঙ্গে বুনোর কদিন আগে ঝগড়া হয়েছিল। দুজনের বাড়ির সীমানায় একটা কলগাছের দখল নিয়ে বুনো ঢেঙ্গাকে শাসিয়েছিল। ঢেঙ্গা বলেছে, যখন তার বউ ঢেঙ্গার ঘাড়ের রক্ত বন্ধ করতে ব্যস্ত, তখন সে দেখেছে, তার উঠোনে বুনো দাঁড়িয়ে। তার বাড়িতে এত রাতে বুনো এসেছিল কী করতে?

    গ্রামের লোক আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, রাতের বেলা বুনো নিশ্চয়ই দানো হয়ে মানুষের রক্ত চুষে খায়। গ্রামের মোড়ল বুনোকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে, সে দারুণ চটে যায়। বলে মিছিমিছি সবাই তার পিছনে লাগছে। এ ব্যাপারে তার কোনো হাত নেই। ঢেঙ্গার চিৎকার শুনে সে দেখতে গিয়েছিল ব্যাপারটা কী। কিন্তু গ্রামের লোকের বিশ্বাস হয়নি বুনোর কথা।

    ফুসফাস গুজগাজ আরম্ভ হয়েছে। বুনোই দায়ী। এ বুনোর কাজ। মহুয়াডাঙর মানুষগুলোকে সে এবার মেরে ফেলবে। ও আর মানুষ নেই। দানো হয়ে গেছে। কেউ বলছে, তাড়িয়ে দে গাঁ থেকে। কেউ বলছে মেরে ফেল, পিটিয়ে।

    গল্প শুনে আমরা থ। এমন কাণ্ড সম্ভব!

    আমি প্রশ্ন করলাম, সত্যি বুনো এরকম কাজ করতে পারে নাকি? তুই জানিস?

    বুধন বলল, আমি আড়ালে জিজ্ঞেস করেছিলাম ওকে। বুনো বলেছে, আমি করি নি। মনে হল ও মিছে কথা বলছে না।

    সুনন্দ বলল, বুধন তোর ভাইকে কিছু দিনের জন্যে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বল। একবার যখন সন্দেহ ঢুকেছে মাথায়, বারবার এরকম হলে, হয়তো মরিয়া হয়ে গ্রামের লোক বুনোকে খুন করে বসবে।

    বুধন হতাশভাবে বলল, বলেছিলাম তাই। বুনো যাবে না।

    —কেন?

    —ওই মেয়েটার জন্যে।

    —কে মেয়ে?

    বুধন বলল, বুনো বিয়ে করেছিল। বউ মরে গেছে। কিন্তু পাঁচ বছরের একটি মেয়ে আছে তার। মেয়েটি হতভাগ্য পঙ্গু। বছর দেড়েক আগে পড়ে গিয়ে তার ডান পায়ে চোট লাগে। তারপর পাটা ক্রমশ শুকিয়ে সরু হয়ে যাচ্ছে। জোর নেই পায়ে। প্রায় সব সময়। শুয়ে থাকে। বসে—বসে হাতে ভর দিয়ে হিচঁড়ে—হিঁচড়ে কোনোরকমে একটু—আধটু নড়াচড়া করে। ওকে নাইয়ে খাইয়ে দিতে হয়। এক বুড়ি তার দেখাশোনা করে।

    মেয়ের ওপর বুনোর প্রচণ্ড টান। মেয়ের জন্যই সে আজকাল বাড়ি ছেড়ে দুরে যায় না। দুনিয়ায় একমাত্র এই মানুষটিকেই সে ভালবাসে। বুনোর ভয়, সে গ্রাম ছেড়ে চলে গেলে। তার মেয়েকে মেরে ফেলবে লোকে। বুধনকেও তার বিশ্বাস নেই। আবার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে কোথাও গেলে, খোঁড়া মেয়েকে রাখবে কোথায়? সে সারাদিন মজরি খাটতে গেলে, মেয়ের যত্ন করবে কে? সুতরাং সে জেদ ধরেছে, গ্রামেই থাকবে। তাতে যা চা হোক।

    আমি ও সুনন্দ মাথা ঘামাতে শুরু করলাম।

    বুনো যতই একগুঁয়ে বা রাগী হোক, স্রেফ সন্দেহের শিকার হয়ে, তাকে মারা পড়তে দেওয়া যায় না। ওই অসহায় মেয়েটার ভাগ্যে তখন কী ঘটবে? এ কাজ কার? সত্যি কোনো মানুষ পিশাচের? না কোনো জন্তু জানোয়ারের? গ্রামের অন্য কোনো শয়তান কি এই কীর্তি করে বুনোর ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে? কেউ তো স্বচক্ষে দেখে নি বুনোকে রক্তপান করতে। এখন বুনোকে, তার মেয়েকে, বাঁচাই কী করে! দুই বন্ধু প্রাণপণে বুদ্ধি হাতড়াতে থাকি।

    আমি বললাম, পুলিশে খবর দিলে কেমন হয়?

    সুনন্দ বলল, কোনো লাভ নেই। গ্রামের ঘরোয়া ব্যাপারে পুলিশ নাক গলাবে না।

    বললাম, তবু চেষ্টা করি। যদি যায় পুলিশ, একটু ভয় দেখিয়ে আসে। তাহলে চট করে বুনোর ক্ষতি করতে অন্যেরা হয়তো সাহস পাবে না। ইতিমধ্যে রক্তচোষার ব্যাপারটা থেমে যেতে পারে।

    সুনন্দ ঘাড় নাড়ল—যাবে না পুলিশ। স্রেফ গুজব শুনে তিন—চার মাইল পথ ঠেঙিয়ে যেতে রাজী হবে না। উলটে আমাদের ঠাট্টা করবে। হ্যাঁ যাবে, যদি খুনখারাবি কিছু হয়, তারপর।

    তখন গিয়ে লাভটা কী হবে ঘোড়ার ডিম!—আমি রেগে বললাম।

    তিনজনে চুপচাপ বসে আছি। বুনোকে বাঁচাবার কোনো উপায় আমাদের মাথায় আসছে না। সুনন্দ বলে উঠল, ঠিক আছে, পুলিশ না যাক, আমরা যাব। মাঝেমাঝে ঘুরে আসব ওই গ্রামে। বুনোর খোঁজখবর করব। তাহলে গ্রামের লোক সাবধান হয়ে যাবে। কিন্তু একটা ছুতো চাই। হ্যাঁ, মুরগি। মুরগির খোঁজে যাওয়া যেতে পারে। বুধন, বুনোর মুরগি আছে?

    আছে—জানাল বুধন।

    —বেশ। আমরা দুজনে কাল মুরগি কিনতে যাব বুনোর কাছে। ওকে বলে রাখিস। আমাদের যেন আবার হাঁকিয়ে না দেয়। ওর ভালোর জন্যেই যাচ্ছি। বাইরের লোক বারবার বুনোর খোঁজে আসছে দেখলে, এখন কেউ ওকে মারবার সাহস পাবে না। কারণ জানে, বুনোর কিছু ঘটলে আমাদের তা নজরে পড়বে এবং ঘটনাটা অস্বাভাবিক মনে হলে পুলিশে খবর যাবে।

    আমাদের যুক্তি বুধনের পছন্দ হল। সে খুশিমনে বিদায় নিল।

    সুনন্দ মহা উত্তেজিত। এক রহস্যময় রোমাঞ্চের গন্ধ পেয়ে সে উৎসাহে টগবগ করতে লাগল। আমার মনেও লাগল তার ছোঁয়াচ। আর তার ফল—কী বিচিত্র এক অভিজ্ঞতা!

    দুপুরবেলা। আমি ও সুনন্দ সাইকেলে চেপে মহুয়াডাঙা গ্রামের দিকে চললাম।

    আমাদের বাড়ি থেকে শহর ছাড়িয়ে মাইল খানেক গিয়ে ধলভূমগড় যাওয়ার বড় রাস্তা থেকে ডান পাশে এক সরু মেঠো রাস্তা বেরিয়ে গেছে। ওই পথ মাইল দুই দূরে মহুয়াডাঙায় শেষ হয়েছে। পথের দু—পাশে প্রান্তরে বড় বড় পাথর পড়ে আছে। মাঠে গাছপালা খুব কম। মাঝেমাঝে কয়েকটা শুধু খেজুর তাল বা বাবলা গাছ। আর এক নিঃসঙ্গ প্রাচীন বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে অনেকখানি জায়গা জুড়ে। দূর থেকে মহুয়াডাঙা গ্রাম দেখা যায়। গ্রামে অবশ্য বেশ গাছপালা। একটা পুকুর রয়েছে। এমন অসময়ে দুই শহুরে যুবকের আবির্ভাবে গ্রামের লোক অবাক হয়ে গেল।

    বুনো মাঝির বাড়ি কোনটা?—জিজ্ঞেস করতেই একজন দেখিয়ে দিল আঙুল বাড়িয়ে। কিন্তু তার চোখের অদ্ভুত চাউনিটা আমাদের নজর এড়াল না।

    গ্রামে ঢোকার মুখেই বুনোর বাড়ি। একখানি মাত্র ছোট্ট মাটির ঘর। তাতে খড়ের চাল। তকতকে একফালি উঠোন। একটা প্রকাণ্ড শুয়োর বাড়ির সামনে মাটিতে গড়াচ্ছে। তার গায়ের ওপর চার—পাঁচটা ছানা। ঘরের বাইরে তেতুঁল গাছের ছায়ায় দড়ির খাঁটিয়াতে বুনো বসে ছিল। পাশে তার মেয়ে শুয়ে। সাইকেলটা একটা গাছে ঠেস দিয়ে রেখে আমরা কাছে যেতে বুনো উঠে দাঁড়াল। শুয়োরটা ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে পালাল। পিছনে পিছনে ছুটল তার বাচ্চারা।

    বুনোকে প্রথম দর্শনে ছ্যাঁৎ করে উঠল বুক। কী দুশমনের মতো চেহারা! রীতিমতো লম্বা। গিঁট পাকানো দেহ। মুখে অজস্র ভাঁজ। কাঁধ অবধি কালো কুচকুচে বাবরি চুল। ছোটছোট চোখ দুটো করমচার মতো লালচে। সে ঘাড় কাত করে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল আমাদের দিকে।

    আমি বললাম, তোমার নাম বুনো?

    —হ।

    সুনন্দ বলল, আমাদের বুধন পাঠিয়েছে। আমরা মুরগি কিনতে এসেছি।

    মুরগি মাঠে চরছে। এখন ধরা যাবে না।—বুনোর কণ্ঠস্বর ফাঁসফ্যাসে। ওর ভাবভঙ্গি দেখে বুঝলাম, আমাদের আগমনে মোটেই খুশি হয়নি। নেহাৎ যেন ঠেকায় পড়ে আমাদের উপস্থিতি সহ্য করছে। ওর দাঁতগুলো বড় বড়। চওড়া হাঁ। দেখলেই মনে হয়, লোকটা রাগী বেপরোয়া।

    আমি বেশ চটলাম মনে মনে। এমন খুনি চেহারার বেয়াদপ লোকটার নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত হতে ভারি দায় পড়েছে আমাদের। ফিরে যাই। ওর বরাতে যা হবার তোক। আমাদের বয়ে গেছে। কষ্ট করে এলাম এতদূর, এই ঢের। সত্যি কথা বলতে কি, লোকটাকে দেখে অবধি আমার মন বলছিল, এর দ্বারা যে কোনো ভয়ঙ্কর কাজ সম্ভব। হয়তো গ্রামের লোকের ধারণা ঠিকই। বুধন তার ভাই সম্পর্কে দুর্বল। তাই অন্যদের কথা মানতে চাইছে না।

    সুনন্দ কিন্তু বুনোর ব্যবহারে দমল না। দিব্যি খোশমেজাজে বলল, বেশ আমরা আবার পরশুদিন আসব। একটা মুরগি ধরে রাখিস। এখন একটু জল খাওয়া দিকি। বড্ড তেষ্টা পেয়েছে।

    বুনো নিঃশব্দে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। আমাদের দৃষ্টি পড়ল খাঁটিয়ায় শোওয়া ছোট্ট মেয়েটির দিকে। আহা, মুখখানি কী মিষ্টি! করুণ চোখে অবাক হয়ে দেখছে। একটি পা। তার সরু। অক্ষম। শরীরও খুব রোগা। বড় মায়া হল।

    সুনন্দ চাপা স্বরে বলল, অসিত, দেখ, অনেকে লক্ষ করছে আমাদের।

    কথাটা ঠিক। আড়াল—আবডাল থেকে অনেকে মেয়ে—পুরুষ উঁকিঝুঁকি মারছিল। তাদের চোখে কৌতূহল।

    বুনো জল আনল ঝকঝকে পিতলের ঘটিতে। খেলাম জল। যাবার সময় সুনন্দ চেঁচিয়ে বলে গেল বুনো, আমরা পরশুদিন আবার আসব।

    প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে ফিরে চলেছি। গ্রাম ছাড়িয়ে খানিক গিয়ে এক দৃশ্য দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। আসার সময় মহুয়াডাঙা থেকে প্রায় মাইল খানেক দূরে মাঠের মধ্যে প্রকাণ্ড একটা বটগাছ দেখেছিলাম। সেই গাছের নীচে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ আকৃতি। পরনে গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি ও সাদা পায়জামা। চোখে দূরবিন লাগিয়ে গাছের ডালে না জানি কী দেখছে।

    সুনন্দ বলল, প্রতাপ রুদ্র। ঝাউবাংলোতে থাকেন।

    আমাদের পাড়ার একেবারে শেষ বাড়িটা হল ঝাউবাংলো। এই নাম স্থানীয় লোকদের দেওয়া। ঝাউবাংলো অন্য বাড়িগুলোর থেকে বেশ খানিক তফাতে। বিরাট কমপাউন্ডওলা বাড়ি। উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। ভিতরে প্রচুর গাছপালা। মস্ত লোহার ফটক থেকে বসত বাডি অবধি কাঁকর—ফেলা চওড়া রাস্তা। তার দুধারে আছে দুসারি ঝাউগাছ। বোধহয় এই জন্যেই ঝাউবাংলো নামের উৎপত্তি। ও বাড়ির বাসিন্দাদের চিনিনা। শুধু জেনেছি প্রতাপ রুদ্র ওই বাড়ির মালিক। ঘাটশিলার স্থানীয় কাউকে বা কোনো চেঞ্জারকে ঝাউবাংলোয় কখনো বেড়াতে যেতে দেখিনি।

    প্রতাপ বাবুকে কয়েকবার মাত্র দেখেছি। খুব ভোরে কালো রঙের থ্যাবড়ামুখো বিশাল এক কুকুর নিয়ে মাঠে বেড়াচ্ছেন। ভদ্রলোকের নিজের চেহারাও চোখে পড়ার মতো। ছ ফুটের ওপর খাড়া শরীর। দোহারা শক্ত গড়ন। রোদে পোড়া ফর্সা রঙ। মাংসহীন লম্বাটে মুখ। চাপা পাতলা ঠোঁট। টিয়া পাখির মতো বাঁকানো নাকের নীচে পাকানো গোঁফ আর চিবুকে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। মাথায় কাঁচা—পাকা ঘন চুল। পরনে থাকে হাঁটু অবধি ঝুলের। পাঞ্জাবি ও পায়জামা। তার গম্ভীর ধরন দেখলে নিজে থেকে আলাপ করার উৎসাহ জাগে না। শুনেছি, ভদ্রলোক দু বছর হল বাড়িখানা কিনে এখানে বাস করছেন। তবে ঘাটশিলায় থাকেন না প্রায়ই। ওই বাড়িটা আগে ছিল এক জমিদারের সম্পত্তি।

    আরও শুনেছি, বাড়িটায় নাকি ছোটখাটো এক চিড়িয়াখানা আছে। কারণ প্রতাপ রুদ্রের পশু পাখির বেজায় শখ। অনেক বিচিত্র জীবজন্তুর ডাক ভেসে আসে বাড়ির ভেতর থেকে। কিন্তু কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়না ভিতরে। প্রতাপ রুদ্র সম্পর্কে আমাদের কৌতূহল জেগেছিল। কিন্তু মেটাবার সুযোগ পাইনি।

    এখানে কী করছেন ভদ্রলোক?—আমি জানতে চাইলাম।

    সুনন্দ বলল, মনে হচ্ছে বার্ড—ওয়াচার। পাখি দেখছে। যাদের এই নেশা থাকে, যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায় পাখির খোঁজে।

    —ভদ্রলোক শুনেছি নানারকম জীবজন্তু পোষেন।

    হ্যাঁ।—বলল সুনন্দ—ওর সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছে আছে। ইন্টারেস্টিং লোক।

    প্রতাপ রুদ্র একবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখলেন আমাদের, তারপর আবার দূরবিন চোখে লাগালেন।

    সাইকেলে পাশাপাশি চলেছি। বললাম, হারে সুনন্দ, বুনো লোকটাকে কেমন লাগল? নিরীহ, মানে সত্যি নির্দোষ, মনে হয় কি?

    নিরীহ মোটেই না।—সুনন্দ জবাব দিল—তবে দোষী না নির্দোষ এখুনি বলা শক্ত।

    অর্থাৎ বুনোর হাবভাবে সুনন্দরও ধোঁকা লেগেছে।

    বিকেলে খরস্রোতা নদী ধরে অনেক দূর বেড়াতে গেলাম দুজনে। ধলভূমগড়ের রাস্তাকে আড়াআড়িভাবে কেটে খরস্রোতা বয়ে চলেছে। রাস্তা গেছে নদীর ওপর সাঁকো দিয়ে।

    ক্ষীণকায় নদীর টলটলে জলে বড়জোর হাঁটু ডোবে। স্ফটিক স্বচ্ছ জলের তলায় নুড়ি—পাথর, বালি, ঝিনুক পরিষ্কার দেখা যায়। কখনো নদীর পারে পারে, কখনো বা ঠাণ্ডা জলের স্রোতে পা ডুবিয়ে অনেকটা হাঁটলাম। ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল।

    সাঁকোর কাছাকাছি পৌঁছেছি, একটি লোক দ্রুত পায়ে সাঁকো পেরিয়ে চলে গেল। প্রতাপ রুদ্র। আমাদের তিনি দেখতে পেলেন না।

    আমরা লক্ষ করলাম, প্রতাপ বাবু কিছুটা এগিয়ে ধলভূমগড়ের রাস্তা ছেড়ে মাঠে নামলেন। ওই তো মহুয়াডাঙা গ্রামে যাবার পথ। শর ঝোঁপের আড়াল থেকে দেখলাম সেই দীর্ঘকায় ঋজু দেহ ক্রমে ছোট হয়ে যাচ্ছে। কখনো বা উঁচু ঢিবির আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আলো কমে আসায় তাকে বেশি দূর অবধি নজর করতে পারলাম না।

    সুনন্দ প্রথমে কথা বলল—কী ব্যাপার! এই সময় ওই দিকে ভদ্রলোক চললেন কোথায়?

    ঠাট্টা করলাম—হয়তো নিশাচর পাখির খোঁজে যাচ্ছে। কিংবা সাঁওতাল গ্রামে হাড়িয়া খাবার অভ্যাস আছে।

    সাঁকোর রেলিংয়ে আমরা আরও ঘণ্টাখানেক বসে রইলাম। একটার পর একটা গান গাইলাম হেঁড়ে গলায়। শেষে গলা ধরে যেতে চায়ের তাগিদে উঠলাম। প্রতাপ রুদ্র কিন্তু তখনও ফিরলেন না।

    পরদিন ভোরে বুধন এল। বুধন জানাল, গতরাতে নাকি আবার রক্তচোষার আবির্ভাব ঘটেছিল মহুয়াডাঙায়। এবার সে হানা দিয়েছে ঘরের মধ্যে। তার শিকার এক যুবক। শেষ রাতে ঘুম ভেঙে দেখে বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলে অবিকল ওই রকম ক্ষত। তা থেকে রক্ত ঝরছে।

    ঘরের দরজা খোলা ছিল?—সুনন্দ প্রশ্ন করে।

    —না।

    —আর জানলা?

    —হ্যাঁ। একটা জানলা খোলা ছিল বটে।

    বুনোকে কেউ দেখেছে নাকি কাছে—পিঠে?—আমি জানতে চাইলাম।

    —উহুঁ। তবে ঢেঙা বলছে, বুনো কাল রাত অবধি জেগে বসেছিল তার উঠোনে। গাঁয়ের লোক ওকেই সন্দেহ করছে।

    বুধন বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে বসে রইল। বেচারা ভাইয়ের বিপদের আশঙ্কায় বড় মুষড়ে পড়েছে।

    সুনন্দ বুধনকে জিজ্ঞেস করল, ওই যে ঝাউবাংলো, ওর মালিককে চিনিস?

    —হুঁ। চিনি। লম্বা পারা মানুষ। কুকুর নিয়ে ঘোরে।

    —আচ্ছা, ওই বাবু কাল রাতে তোদের গ্রামে গিয়েছিল?

    —কই না তো!

    —উনি মহুয়াডাঙায় গিয়েছেন কখনো?

    —হ্যাঁ। গেছে অনেকবার।

    —কী করতে যায়?

    —চোখে নল লাগিয়ে পাখি দেখে।

    —রক্তচোষার ব্যাপারে কিছু জানেন নাকি?

    —তা তো জানিনা বাব। তবে একদিন দূর থেকে দেখেছি, ঢেঙামাঝির সঙ্গে কী সব কথা বলছিল।

    বুধন চলে যেতে সুনন্দ বলল, প্রতাপ রুদ্র কাল রাতে মহুয়াডাঙার দিকে গিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রামে ঢোকেন নি। কোথায় গিয়েছিলেন তবে? আশ্চর্য!

    আমি উত্তর দিলাম—হয়তো মাঠে মাঠে পায়চারি করেছেন। লোকটি বেশ রহস্যময়।

    হুঁ।—সুনন্দ একটু মাথা নাড়ে।

    তখনও রোদের তেজ বাড়েনি। দুজনে বেড়াতে বের হলাম। ঝাউবাংলোর সামনে দেখি, প্রতাপ রুদ্র প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফিরছেন। হাতে চেনে বাঁধা সেই বিরাট কুকুর।

    সুনন্দ সোজা এগিয়ে গেল ভদ্রলোকের দিকে। অমনি বাঘের মতো কুকুরটা গরগর করে উঠে চেনে টান দিল। থমকে দাঁড়াল সুনন্দ। প্রতাপ রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বলল, নমস্কার। আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি। আপনাকে প্রায়ই দেখি। এটা কী জাতের কুকুর জিজ্ঞেস করব ভাবি।

    রুদ্ৰ স্থির চোখে কয়েক মুহূর্ত সুনন্দের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি! আবার একটু কৌতুকের আভাস রয়েছে যেন। সুনদর অবস্থা দেখে মজা পেয়েছেন। সুনন্দ কাঠের মতো দাঁড়িয়ে। বারবার আড় চোখে কুকুরটাকে দেখছে।

    আপনি কুকুর ভালবাসেন?—ভরাট কণ্ঠস্বর।

    —আজ্ঞে হ্যাঁ।

    —এটা ম্যাস্টিফ।

    ওঃ, দারুণ কুকুর! আচ্ছা আপনি তো অনেক জন্তু—জানোয়ার পুষেছেন, দেখাবেন আমাদের? সুনন্দ আলাপ জমাবার চেষ্টা করল।

    প্রতাপ রুদ্রের মুখে কিন্তু কোনো আগ্রহ ফোটে না। আমাদের আর এক প্রস্থ আপাদমস্তক দেখলেন। তারপর বললেন, দেখাতে পারি এক শর্তে।

    —কী?

    —মাত্র একবার দেখাব এবং আর কাউকে জুটিয়ে আনা চলবে না। কাউকে এ খবর বলাও চলবে না। লোকজন এলে আমার কাজের ক্ষতি হয়।

    বেশ তাই হবে।—সুনন্দ তৎক্ষণাৎ রাজি।

    আসুন।—প্রতাপ বাবু আহ্বান জানালেন।

    নেপালি দরোয়ান গেট খুলে দিল। আমরা ভিতরে ঢুকলাম। একজন পরিচারক এসে। নীরবে প্রতাপবাবুর কাছ থেকে কুকুরটা নিয়ে বাড়ির দিকে চলে গেল। পরিচারকটি এ দেশীয় নয়। দারুণ যণ্ডামার্কা জোয়ান। কাকর—বিছানো পথ ধরে চলতে চলতে রুদ্র জেনে নিলেন আমাদের পরিচয়।

    প্রতাপবার একটু ঠাট্টার সুরে বললেন, আমাদের কালেকশনে কিন্তু বাঘ—সিংহ নেই। সবই ছোট জীবজন্তু। সাধারণত যে সব পশু—পাখি কেউ পোযে না, আমি তাদের পোষ মানাবার চেষ্টা করি। ওদের চরিত্রের খুঁটিনাটি স্টাডি করি।

    আমরা বাগানের ভিতরে চললাম। বাগানের এক জায়গায় পর পর পনেরো—ষোলটা বড় বড় খাঁচা। খাঁচাগুলো তারের জালে ঘেরা। মাথায় খড়ের চাল। কোনোটাতে রয়েছে। জন্তু, কোনোটায় পাখি। ঠিক কলকাতা চিড়িয়াখানায় যেমন দেখেছি, তেমনি করে রাখা। হয়েছে জীবজন্তু।

    প্রতাপ রুদ্র একটার পর একটা খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে চিনিয়ে দিতে লাগলেন। লোকটির চেহারা ও কথাবলার ভঙ্গিতে জোরালো ব্যক্তিত্বের ছাপ।

    এক ফাঁকে তিনি বললেন, আমি বয়সে অনেক বড়। আশা করি তুমি বললে আপত্তি নেই।

    আমরা সরবে জানালাম—না না আপত্তির কী আছে?

    প্রতাপ রুদ্র দেখাতে থাকেন, এই এক জোড়া ডিঙ্গো। অস্ট্রেলিয়ার বুনো কুকুর। কিছুতেই পোষ মানে না। তবে আমি কিছুটা বাগ মানাতে পেরেছি।

    তিনি পকেট থেকে বিস্কুট বের করে খাঁচার ভিতর ছুঁড়ে দিলেন। অনেকটা আমাদের দেশি কুকুরের মতো চেহারা। মেটে লাল রঙের ডিঙ্গো দুটো বিস্কুট খেয়ে লেজ নাড়তে লাগল। তারপর রুদ্র দেখালেন, এই হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার কোয়ালা।

    প্রাণীটি ঠিক যেন ক্ষুদে ভালুক। রুদ্র বললেন, এ ভাল্লুক নয়। ভাল্লুক স্তন্যপায়ী। এরা মারসিউপিয়ান। অর্থাৎ পেটের তলায় থলিতে বাচ্চা বয়ে বেড়ায়। যেমন ক্যাঙ্গারু।

    একটা খাঁচার সামনে দাঁড়াতেই কালো—সাদা নোমওলা বেঁজি জাতীয় দুটো জন্তু দাঁত খিঁচিয়ে উঠল। রুদ্র বললেন, উদ্ভারিন। উত্তর আমেরিকার বেঁজি। খুব হিংস্র।

    এরপর দেখলাম, মাদাগাস্কারের লেমুর ও শ্লথ। আফ্রিকার বনবিড়াল। দক্ষিণ আমেরিকার ধেড়ে ইঁদুর এগুটি ইত্যাদি নানা অদ্ভুত জন্তু।

    তারপর পাখি। কতরকম রঙবেরঙের পাখি। বেশির ভাগেরই নাম শুনিনি। কোনোটা ভারি সুন্দর শিস দিচ্ছে। গাছের ছায়ায় দাঁড়ের ওপর সরু চেন পা বাঁধা এক কাকাতুয়া বসে ছিল। তার গায়ের পালক ধবধবে সাদা মাথায় হলদে ঝুঁটি। কালো বাঁকা ঠোঁট। আমরা কাছে যেতে চোখ পাকিয়ে তড়বড় করে পরিষ্কার গলায় বলতে লাগল গুড মর্নিং, গুড মর্নিং। নমস্কার, নমস্কার।

    রুদ্র বললেন, ও তাক বুঝে মানুষের ভাষা ব্যবহার করতে শিখেছে।

    রুদ্র হাত নাড়তে কাকাতুয়া বলে উঠল, বাই বাই!

    সুনন্দ প্রশ্ন করল, মিস্টার রুদ্র, এসব পশু—পাখি আপনি যোগাড় করেন কীভাবে?

    —কিনে আনি নানা দেশ থেকে। দু—একটা নিজেও ধরেছি।

    আমাদের মাথার ওপর ছোট্ট অদ্ভুতদর্শন একটা কালো রঙের বাঁদর গাছের ডালে লেজ, পাকিয়ে মাথা নিচু করে দোল খাচ্ছিল। তার ভাঁটার মতো চোখ। মস্ত লেজ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কোন দেশি বাঁদর?

    —বাঁদর নয়। একরকম ভাম। ব্রাজিল থেকে এনেছি। নাম কিংকাজু। এমনি লেজে ঝোলার অভ্যাস একমাত্র সাউথ আমেরিকার প্রাণীদের মধ্যে দেখা যায়।

    রুদ্র একবার শিস দিতে কিংকাজুটি তড়াক করে নেমে এসে তার পিঠে চড়ে বসল। পরক্ষণেই লম্বা লাফে গাছে উঠে গেল।

    রুদ্র বললেন, আমি দু মাস আগে সাউথ আমেরিকা থেকে ফেরার সময় কতগুলো স্পেসিমেন এনেছিলাম। তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে ভাল পোষ মেনেছে।

    সুনন্দ উসখুস করছিল। এবার কথাটা পাড়ল—মিস্টার রুদ্র, সেদিন আপনাকে মহুয়াডাঙা গ্রামের কাছে দেখলাম; বায়নাকুলার দিয়ে কী যেন দেখছিলেন—

    রুদ্র জবাব দিলেন, পাখি দেখছিলাম।

    সুনন্দ বলল, জানেন, ওই গ্রামে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছে।

    কী? রুদ্র ভুরু কোঁচকালেন।

    —রাত্তির বেলা ঘুমন্ত লোককে কীসে যেন কামড়াচ্ছে। কী কামড়ায়, যখন কামড়ায়, কেউ টের পায় না ঘুম ভেঙে দেখে ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়ছে। গ্রামের লোক খুব ভয় পেয়ে গেছে।

    —কেন?

    —ওদের ধারণা অলৌকিক কাণ্ড। মানে কোনো রক্তচোষা পিশাচ বা দানোর কীর্তি।

    ও।—সংক্ষিপ্ত উত্তর। প্রতাপ বাবু বেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর অন্য কথা কয় করলেন। অর্থাৎ এ বিষয়ে আর আলোচনা করতে চান না।

    সুনন্দ উৎল্পভাবে বলল, আপনি বুঝি অনেক দেশ ঘুরেছেন?

    —হ্যাঁ, তা ঘুরেছি।

    —কোথায় কোথায়?

    —ইউরোপের সব জায়গায়। তাছাড়া মিডল—ইস্ট।

    —আপনার কাছে গল্প শুনতে আসব কিন্তু।

    সরি, এখন নয়। আপাতত কদিন আমি ব্যস্ত আছি।—অত্যন্ত ঠাণ্ডা গলায় প্রতাপ বাবু। সুনন্দর আগ্রহকে থামিয়ে দিলেন।

    প্রতাপবাবুর ব্যবহার শেষ দিকে বেশ রূঢ় মনে হল। আমাদের বসতেও বললেন না। চিড়িয়াখানা দেখা হয়ে যেতে আবার সোজা গেট অবধি আমাদের এগিয়ে দিলেন।

    ফেরার সময় জিজ্ঞেস করলাম, সুনন্দ কী বুঝলি?

    —বুঝলাম যে প্রতাপ বাবু মহুয়াডাঙার ঘটনা জানেন। কিন্তু অন্যদের কাছে ফঁস করতে রাজি নন।

    দ্বিতীয়ত উনি এখন ব্যস্ত।—আমি মন্তব্য করলাম।

    পরদিন বাজার থেকে এসে সুনন্দ বলল, বুঝলি অসিত, প্রতাপবাবু সম্পর্কে একটু খোঁজ—খবর করলাম। লোকটির অতীত সম্বন্ধে কেউ কিছু জানে না। শুধু জানলাম, উনি একজন প্রাণিতত্ত্ববিদ এবং অনেক দেশ—বিদেশে ঘুরেছেন। এখানকার লোকেদের সঙ্গে পরিচয় সামান্য। বিচিত্র স্বভাব। আগের বছর একদল বেদে এসে আস্তানা গেড়েছিল মাঠে। তারা সাপ খেলা দেখাত। নাচগান করত। জড়িবুটি ওষুধ বিক্রি করত। প্রতাপ বাবুর সঙ্গে তাদের বেশ দহরম মহরম হয়। আবার মাস ছয় আগে এক তান্ত্রিক সাধু এসে শালবনের ভিতর কিছুদিন ছিল। তার কাছেও প্রতাপ বাবুকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। তবে লোকটা নাকি পশু—পাখির বিষয়ে একজন এক্সপার্ট। কলকাতা চিড়িয়াখানার সুপারিন্টেন্ডেন্ট একবার ওর সঙ্গে কয়েকটা জন্তু নিয়ে আলোচনা করতে এসেছিলেন।

    সেদিন সন্ধ্যার ঝোঁকে দেখলাম প্রতাপবাবু ঝাউবাংলো থেকে বেরিয়ে খরস্রোতা নদীর দিকে চলে গেলেন। সঙ্গে কুকুরটা নেই। আমরা নদীর ব্রিজে গিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলাম। রাত হল। কিন্তু প্রতাপবাবু ফিরলেন না।

    সুনন্দ উঠল—চল তো একবার মাঠে।

    —প্রতাপ রুদ্রের খোঁজে?

    হুঁ—সুনন্দ মহুয়াডাঙার পথে পা চালাল। কিছুটা গিয়েই থমকে দাঁড়ালাম দুজনে। জনমানবহীন সেই বিশাল আঁধার মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে কেমন গা ছমছম করতে লাগল। চারদিক নিঝুম। থেকে থেকে কোনো রাতজাগা পাখির ক্ষীণ তীক্ষ্ণ ডাক শোনা যাচ্ছে। মাথার ওপর অগণিত তারা হিরের কুচির মতো ঝিকমিক করছে। আচমকা কতগুলো শিয়াল সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল—হুয়া—হুয়া—হুয়া।

    প্রান্তরে কোথাও আলোর চিহ্ন দেখতে পেলাম না। খানিক পরে সুনন্দকে ঠেলা মেরে বললাম, চল ফিরি।

    সুনন্দ নীরবে ফিরে চলল।

    বুধন এল তিনদিন পরে। মহুয়াডাঙায় গতকাল আবার সেই রক্তলোভী নিশাচরের উপদ্রব ঘটেছে। আবার আক্রমণ হয়েছে ঢেঙা মাঝির ওপর।

    ঢেঙা এবার শুয়েছিল ঘরের ভিতর। পাশে ছিল তার বউ। বউ—ই আবিষ্কার করে, ঢেঙার গলায় একটা কাটা জায়গা থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। ঢেঙা কিন্তু তখন অঘোরে ঘুমচ্ছে। মেঝেয় অনেক রক্ত পড়ে শুকিয়ে গেছে। বেশ অবসন্ন হয়ে পড়েছে ঢেঙা। রক্তপাতের। চেয়ে ভয়েই কাতর হয়েছে বেশি।

    বুধন জানাল যে, গ্রামের লোক ক্ষেপে উঠেছে। তাদের মতে, এ নিশ্চয়ই বুনোর প্রতিশোধ। কারণ ঢেঙা ওর নামে মোড়লের কাছে লাগিয়েছিল। বুনোকে খুন করার শলা—পরামর্শ হচ্ছে। বুধন শুনেছে। বুনোর আর নিস্তার নেই।

    সুনন্দ জিজ্ঞেস করল, ঝাউবাংলোর বাবু মহুয়াডাঙায় গিয়েছিল নাকি এর মধ্যে?

    —হ্যাঁ গিয়েছিল। তবে গাঁয়ে ঢোকেনি। মাঠে ঘুরছিল পাখি দেখতে। পাখি ধরার ফাঁদ পাতছিল গাছে।

    —রাতের বেলা গ্রামের ভিতর কোনো বাইরের লোককে দেখা গেছে? সুনন্দ জানতে চাইল।

    উঁহু।—বুধন মাথা নাড়ল।

    আমরা দুজনে সেদিন সকালে মহুয়াডাঙায় এক রাউন্ড টহল দিয়ে এলাম। বুনোর হাবভাব আরও অস্বাভাবিক মনে হল। দুর্দান্ত লোকটা কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে। আড়চোখে কেবল তাকাচ্ছে চারধারে। ছটফট করছে। বারবার তার দৃষ্টি আটকে যাচ্ছে বারন্দায় চাটাইয়ে শোওয়া তার রুগণ মেয়ের দিকে। সে মুরগি দিল। পয়সা নিল। কিন্তু কথাবার্তা বলল না। ঠিক যাবার আগে সুনন্দ তাকে বলল, বুনো তোর মেয়েকে হাসপাতালে দে। ও ভালো হয়ে যাবে।

    অমনি বুনোর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল—হবে? বেশ। আজই দিয়ে দি হাসপাতালে। তুই ঠিক করে দে বাবু।

    সুমন্দ বলল, এত তাড়াতাড়ি হবে নারে। আমি ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলে তোকে জানাব।

    বুনো যেন দমে গেল। মনে হল, মেয়েকে কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে ফেলতে পারলে ও নিশ্চিন্ত হয়।

    মহুয়াডাঙা ছেড়ে চলে আসবার সময় সুনন্দ বলল, লক্ষ করলি, বুনো ভয় পেয়েছে?

    উত্তর দিলাম, হ্যাঁ। হয়তো মেয়ের জন্যেই ওর ভাবনা বেশি। কিন্তু লোকটা সত্যি দে দোষী না  নির্দোষ আমি এখনো ঠিক বুঝছি না।

    সুনন্দ চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে বা নিরপরাধ। তবে

    সুনন্দ আর কিছু বলে না।

    বিকালে সুনন্দ বলল, মামার চেনা এক ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করে আসি। স্টেশনের কাছে থাকেন।

    আমি গেলাম না। জমাট এক ডিটেকটিভ বই শুরু করেছি। বললাম, আমি মুরগিটা বেঁধে রাখব। তুই ঘুরে আয়।

    সুনন্দর ফিরতে রাত আটটা হল। রাতে খাওয়ার পর বারান্দায় বসে গল্প করতে লাগলাম। শুক্লপক্ষ চলছে। কিন্তু একট মেঘ জমেছে। তাই চাঁদের আলো তেমন ফোটেনি। কেমন ঘোলাটে ভাব। অনেক দূরে দূরে। কয়েকটা বৈদ্যুতিক আলো ঝকঝক করছে। আকাশে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে দু—চারটে মিটমিটে তারা। এমন নিস্তব্ধ রাত কলকাতায় টের পাওয়া যায় না।

    আমি বললাম, জানিস সুনন্দ, মহুয়াডাঙার এই রহস্য নিয়ে আমার মাথায় একটা থিওরি এসেছে।

    —কী?

    —ড্রাকুলা ফিল্মটা দেখেছিস?

    —না।

    —গল্পটা শুনেছিস?

    —হ্যাঁ, শুনেছিলাম। কিন্তু—

    বললাম, আমি ড্রাকুলা ফিল্মটা দেখেছি। বইটাও পড়েছি। মনে আছে, রুমেনিয়ার এক জমিদার কাউন্ট ড্রাকুলা ছিল ভ্যাম্পায়ার। অর্থাৎ মানুষরূপী রক্তশোষক প্রেত। সে ঘুমন্ত মানুষের বা মানুষকে সম্মোহন করে তার রক্ত শুষে খেত। মহুয়াডাঙার কেসটা অনেকটা যেন সেই রকম।

    সুনন্দ ঝাঁপিয়ে উঠল, দূর—যতসব বাজে সংস্কার। তাছাড়া ড্রাকুলা—ফ্রাকুলা বিদেশি ব্যাপার। এদেশে ড্রাকুলার কথা কখনো শোনা যায়নি।

    আমি বললাম, মনে রাখিস, প্রতাপ রুদ্র বহুদিন বিদেশে কাটিয়েছে। ওর ব্যাকগ্রাউন্ড কেউ জানে না। অবশ্য ওই বুনোও ভ্যাম্পায়ার হতে পারে।

    সুনন্দ আমার দিকে তাকিয়ে গলা দিয়ে শুধু শব্দ করল, হুম্।

    আশ্চর্য ব্যাপার। এর পর সুন্দর কথাটথা কমে গেল। কিছু জিজ্ঞেস করলে হুঁ—হ্যাঁ করে দায়সারা গোছের জবাব দেয়। অন্যমনস্কভাবে মাথার চুল টানছে কেবল। ও লক্ষণ চিনি। সুনন্দর মস্তিষ্কে কোনো চিন্তা ঘুরঘুর করছে। নিশ্চয়ই আমার ডাকুলার আইডিয়াখানা লেগে গেছে। মনে মনে হাসলাম। আমি মোটেই সিরিয়াসলি ডাকুলার কথা ভাবিনি। রহস্য করেছিলাম মাত্র।

    পরদিন সকালে চা এবং কিঞ্চিৎ টা গলাধঃকরণ করেই সন হুট করে কোথায় বেরিয়ে  ফিরে এল, মিনিট পনের বাদে। জানতে চাইলাম, কোথায় গিয়েছিলি?

    —ঝাউবাংলোয়?

    —কেন?

    —প্রতাপ বাবুর সঙ্গে দেখা করতে।

    —হল দেখা?

    —না। দরোয়ান বলল, বাবু ব্যস্ত আছেন। এখন দেখা হবে না।

    কী জন্যে গিয়েছিলি?—আমার মনে একটা সন্দেহ উঁকি দেয়।

    ছিল দরকার।—সুনন্দ এর বেশি কিছু বলে না।

    —হুঁ, বুঝেছি। প্রতাপ রুদ্র সত্যি সত্যি ড্রাকুলা জাতীয় জীব কিনা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলি। ঠিক আছে, একটা বুদ্ধি দিচ্ছি। শোন এরপর যেদিন দেখা হবে, প্রতাপবাবুকে একটা চকলেট বা বিস্কুট অফার করবি। যদি খেয়ে ফেলে, তবে আমাদের থিওরি টিকল না। আর যদি না খায়, তাহলে ও নির্ঘাৎ রক্তচোষা। কারণ কাউন্ট ড্রাকুলা টাটকা রক্ত ছাড়া কিছু খেত না।

    আমার রসিকতায় সুনন্দ কিন্তু একটুও হাসল না। গোমড়া মুখে বসে রইল।

    দুপুরে খাবার পর সুনন্দ বলল, অসিত, টেনে ঘুমিয়ে নে। আজ রাতে আর ঘুম নেই বরাতে।

    কেন?—আমি চমকালাম।

    —কারণ আজ রাতে আমরা প্রতাপ রুদ্রকে ফলো করব।

    —অর্থাৎ তোর বিশ্বাস, প্রতাপ রুদ্রই হচ্ছে মহুয়াডাঙার নিশাচর আততায়ী। লোকটা পিশাচ। মানুষের রক্ত চুষে খায়। ধেৎ এই বিজ্ঞানের যুগে এসব ধারণা স্রেফ অচল। আমি তখন তামাশা করছিলাম।

    সুনন্দ গম্ভীরভাবে বলল, প্রতাপ রুদ্রের আসল পরিচয় আমি জানি না। প্রমাণ না পেয়ে। আমি কোনো সিদ্ধান্তে আসব না। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস মহুয়াডাঙার রহস্যের পিছনে ওর হাত আছে। কেন উনি প্রায়ই রাতে গ্রামের দিকে যান?

    আমি বললাম, যদি আজ রাতে উনি মহুয়াডাঙার দিকে না যান?

    —আজ নয়তো কাল যেদিনই যাবে, আমরা প্রতাপ রুদ্রকে ফলো করার জন্যে তৈরি থাকব।

    —অর্থাৎ এখন থেকে আমাদের রাতে ঘুমের দফা গয়া। আমার মেজাজ একদম বিগড়ে গেল। কিন্তু সুনন্দ যখন জেদ ধরেছে, ও ঠিক যাবেই। ও যা একরোখা আর ডানপিটে, আমি যেতে না চাইলে একাই যাবে। অথচ ওকে একা ছেড়ে দেওয়াও চলে না।

    বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। নির্জন নদীতটে কতরকম পাখির কাকলি। ঝিরঝিরে বাতাসে ঠাণ্ডা আমেজ। ভারি আরামদায়ক। আমার ও সুনন্দর কিন্তু এসব উপভোগ করার মতো মনের অবস্থা নয়। ঝোঁপের পিছনে লুকিয়ে অস্থির ভাবে অপেক্ষা করছি—কখন আসবে প্রতাপ রুদ্র।

    সহসা দেখলাম সেই দীর্ঘ ঋজু দেহ ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে এই পথে। তার গায়ে কালচে রঙের পাঞ্জাবি ও হালকা হলুদ রঙা পায়জামা।

    প্রতাপ রুদ্র ব্রিজ ছাড়ালেন। তারপর খানিক এগিয়ে মাঠে নামলেন। অর্থাৎ আজও তাঁর লক্ষ্য মহুয়াডাঙা। নজর করলাম প্রতাপ বাবুর কাঁধে ঝুলছে একটা ক্যাম্বিসের ব্যাগ।

    সুনন্দ বলল, এগিয়ে যাক। বেশ দূর থেকে ফলো করব। নইলে দেখে ফেলতে পারে।

    প্রতাপ রুদ্রের চলমান মূর্তি ক্রমে মাঠের মধ্য দিয়ে দূরে সরে যায়। তারপর ঢাল জটি নেমে চোখের বাইরে চলে গেল। তখন আমরা বেরিয়ে এলাম।

    পা টিপে টিপে এগোচ্ছি। কখনও ঢিবি বা পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে দেখে নিচ্ছি। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সমস্ত পশ্চিম দিগন্তে সিঁদুর—বরন হয়ে উঠল। অপরূপ সেই দৃশ্য। প্রতাপবাবুকে শেষবারের মতো দেখলাম মাঠের মধ্যে সেই যে বিরাট বটগাছটা, তার নীচে। তারপর অদৃশ্য হলেন।

    বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। বসে রইলাম পাথরের আড়ালে। আবার দেখলাম প্রতাপবাবু আবির্ভূত হয়েছেন।

    গাছের কাছে একটা বড় চ্যাটালো পাথর পড়েছিল। বেদির মতো দেখতে। প্রতাপবাবু তার ওপর বসলেন। তার পিঠ আমাদের দিকে। গাছের দিকে মুখ। স্থিরভাবে বসে আছেন। আমরা খানিক কাছে এগিয়ে গেলাম।

    অবাক হয়ে দেখলাম প্রতাপবাবু পাথরের ওপর সটান চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন। চুপচাপ শুয়ে রয়েছেন নিথর হয়ে। আমরা আর একটু এগোলাম। প্রায় পঞ্চাশ হাত দূরে একটা পাথরের স্কুপের পিছনে ঘাপটি মেরে বসে খাঁজের ফাঁক দিয়ে লক্ষ রাখলাম প্রতাপ রুদ্রকে।

    ক্রমে দিনের আলো একেবারে নিভে গেল। একটির পর একটি তারা জ্বলে উঠল আকাশপটে। ফিকে একটু চাঁদের আলো ফুটল। আবছা দেখা যাচ্ছে চারপাশ। সামনে বটগাছটাকে যেন ঘোর কালো পাথরে তৈরি একটা পাহাড়ের মতো দেখাচ্ছে। তার গায়ে অজস্র জোনাকি পোকার মিটিমিটে আলো ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। বাঁ পাশে দূরে মহুয়াডাঙা গ্রামখানির গাছপালার সীমারেখা আকাশের গায়ে ফুটে উঠেছে। গ্রামে কোনো আলো নেই। ভেসে আসছে না মাদলের আওয়াজ। মানুষের কণ্ঠধ্বনি বা কুকুরের ডাক। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে এক অজানা বিভীষিকায় গোটা গ্রাম যেন বোবা হয়ে গেছে। পাথরের ওপর শায়িত প্রতাপ রুদ্রকে শুধু অস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি। ঠিক একই ভাবে তিনি শুয়ে আছেন। কদের মতলব কী? বোধহয় রাত আরও গম্ভীর হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

    ঝিঁঝির একঘেয়ে রব ছাড়া অন্য কোনো শব্দ নেই। আমরা দুজনে কাঠের মতো বসে থাকি। প্রবল উত্তেজনায় বুকের ভিতর যেন হাতুড়ির ঘা পড়ছে, এবার কী ঘটবে? কী হবে এবার?

    বেশিক্ষণ কাটেনি। হঠাৎ এক চিৎকার শুনলাম। মানুষের গলা। কিন্তু অদ্ভুত আওয়াজ। বুঝি রূদ্ধ আক্রোশ এবং আর্তনাদ মিশে আছে সেই স্বরে। তারপরই চ্যাঁ চ্যাঁ করে এক অপার্থিব টানা তীক্ষ্ণ শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে গেল। মনে হল, আমাদের উলটো দিকে প্রতাপবাবুর কাছ থেকে প্রায় পঁচিশ—ত্রিশ হাত দূরে সেই শব্দের উৎপিত্তস্থ

    সঙ্গে সঙ্গে প্রতাপবাবু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে শব্দ লক্ষ্য করে বেগে ছুটে গেলেন। সুনন্দ আমার হাত ধরে টানল—আয় কুইক।

    প্রতাপ রুদ্রের হাতের জোরালো টর্চ জ্বলে উঠল। সেই আলোতে দেখলাম, একটা বড় পাথরের চাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে দানবের মতো একটা মূর্তি। কেশরের মতো ফাঁপানো চুলের রাশি তার মুখের অনেকটা ঢেকে ফেলেছে। ধড়াস করে উঠল হৃৎপিণ্ড। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। তারপর চিনতে পারলাম—বুনো। তার হাতে একটা বল্লম। বুনো মাত্র। দিকে তাকিয়ে আছে।

    প্রতাপবাবুও মুহূর্তের জন্য থেমেছিলেন। তারপরই দৌড়ে গিয়ে বুনোর সামনে বসে পড়লেন। আমরাও হোঁচটা খেতে খেতে এগোলাম।

    ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখি প্রতাপবাবু মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছেন আর তার ডান হাতের মুঠোয় ছটফট করছে কী একটা জীব। প্রতাপবাবুর বাঁ হাতের টর্চ আর ডান হাতের ওপর আলো ফেলল। আমি ভীষণ আশ্চর্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, আরে, এ যে একটা বাদুড়!

    বাদুড়টা ছোট্ট। শিয়ালের মুখের মতো দেখতে তার মুখ। দুটো চকচকে ড্যাবড্যাবে চোখ। খাড়া খাড়া কান। ছুঁচোলো কয়েকটা দাঁত হিংস্রভাবে বেরিয়ে আছে।

    প্রতাপবাবু তার ডানা দুটো চেপে ধরেছেন। সে ক্রমাগত মুণ্ডু ঘুরিয়ে কামড়াবার চেষ্টা। করছে। আমাদের দেখে বুনো কর্কশ গলায় বলে উঠল, বাদুড়টো আমার গায়ে বসেছিল।

    প্রতাপবাবু চমকে ফিরলেন। তাঁর টর্চের আলো পড়ল আমাদের মুখে—এ কী, তোমরা এখানে!

    সুনন্দ উত্তর দিল, হ্যাঁ, আমরা। আশা করি চিনতে পারছেন। একটু অসময়ে দেখা হয়ে গেল।

    তারপর প্রতাপবাবুর স্তম্ভিত দৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করে সুনন্দ বলল, অসিত, এটা কিন্তু সাধারণ বাদুড় নয়, ভ্যাম্পায়ার ব্যাট। মিস্টার রুদ্র এবার আপনি

    সুনন্দ আরও কী যেন বলতে যাচ্ছিল। রুদ্রের চাবুকের মতো প্রশ্ন তাকে থামিয়ে দিল।

    —এটা ভ্যাম্পায়ার ব্যাটু তুমি জানলে কী করে? কে বলেছে?

    —অনুমান, মিঃ রুদ্র, অনুমান। কাল অসিত আমায় ড্রাকুলার গল্প শোনাল। বলল। ড্রাকুলার মতো কোনো ভ্যাম্পায়ার নিশ্চয়ই মহুয়াডাঙার লোকের রক্ত শুষে খাচ্ছে। অমনি একটা সম্ভাবনার উদয় হল আমার মনে। ওসব ভুতুড়ে গল্প আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু একটা নতুন ক্ল মাথায় এল। ভূতপ্রেতপিশাচ নয়—বাদুড়। রক্তপায়ী বাদুড়। ভ্যামপায়ার ব্যাট। ভ্যামপায়ার ব্যাটের রক্ত পানের বর্ণনা আমি একটা বইয়ে পড়েছিলাম। মহুয়াডাঙার ঘটনাগুলোর সঙ্গে তা অদ্ভুতভাবে মিলে গেল। স্রেফ দুইয়ে—দুইয়ে চার।

    আমি বললাম যাঃ, এখানে ভ্যাম্পায়ার ব্যাটু আসবে কোথা থেকে? ইমপসিবল।

    সুনন্দ উত্তর দেয়—জানি, ভারতবর্ষে ভ্যাম্পায়ার ব্যাট নেই। একমাত্র দক্ষিণ আমেরিকার আমাজনের জঙ্গলে ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও নেই। তবে প্রতাপবাবু মাত্র দু মাস আগে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কিছু পশু—পাখি নিয়ে এসেছেন। অতএব এ প্রাণীটি নিশ্চয়ই তাঁর আমদানি। কী, ঠিক বলিনি, মিস্টার রুদ্র?

    প্রতাপবাবু স্তব্ধ হয়ে সুন্দর কথা শুনছিলেন। এবার শান্ত কণ্ঠে বললেন, কারেক্ট। তোমার অনুমানের প্রশংসা করি। এর নাম ডেসমোডাস। এক জাতীয় ভ্যাম্পায়ার ব্যাট। আমি সাউথ আমেরিকা থেকে আনিয়েছিলাম এদের ধরন—ধারণ রিসার্চ করতে।

    এরপর সুন্দর মুখ থেকে যে কথাগুলি উচ্চারিত হল, তা শুনে আমি হকচকিয়ে গেলাম।

    —মিঃ রুদ্র, আপনি কিন্তু ধরা পড়ে গেছেন। এবার আপনার নিষ্ঠুর খেলা বন্ধ করতে। হবে।

    খেলা! নিষ্ঠুর! কী বলছ যা তা?—প্রতাপবাবু রীতিমতো ধমকে উঠলেন।

    নির্বিকারভাবে সুনন্দ বলল, কেন না বোঝার কী আছে? অতি সরল বাক্য। আপনি আপনার ওই পোষা জীবটিকে রাতের পর রাত মহুয়াডাঙার নিরীহ লোকদের ওপর লেলিয়ে দিয়েছেন তার রক্ত—পিপাসা মেটাতে। খেলাটা নিষ্ঠুর বৈকি!

    রুদ্রের ঠোঁটে বক্র হাসি জেগে উঠল। ধীর স্বরে বললেন, এবার তোমার অনুমান ফেল করেছেন সুনন্দবাবু। এ বাদুড় আমার পোষ মানেনি আর আমি একে মহুয়াডাঙার মানুষদের ওপর লেলিয়ে দিইনি।

    তাহলে রাতে এখানে আসতেন কেন?—সুনন্দর কণ্ঠে অবিশ্বাস।

    —আসতাম এই পলাতক জীবটিকে ধরবার উদ্দেশ্যে। একজোড়া ডেসমোডাস এনেছিলাম। একটা মরে গেল, আর একটা খাঁচা থেকে পালাল। কয়েকদিন পরেই মহুয়াডাঙার ঘটনা কানে এল। বুঝলাম ডেস্মোডাসটি এই গ্রামের কাছে আস্তানা গেড়েছে। জায়গাটা পরীক্ষা করে ধারণা হল, এই বটগাছের কোটরে ও আশ্রয় নিয়েছে। গাছের গায়ে জাল খাটালাম। সারা রাত জেগে থাকতাম গাছের কাছে, যদি ফাঁদে পড়ে এই আশায়। অন্য বাদুড়ের মতোই ভ্যাম্পায়ার ব্যাটু সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না। দিনের বেলা অন্ধকার গুহায়, ঘন পাতার ছায়ায় বা গাছের কোটরে লুকিয়ে থাকে। কেবল রাতে বেরোয়। চারদিন আগে বুঝলাম আমার ধারণা সঠিক। কারণ সেদিন সন্ধ্যায় আমি যখন ওই পাথরে বসেছিলাম, বাদুড়টা আমার মাথার ওপর দিয়ে কয়েকবার পাক খেয়ে উড়ে গেল। বোধহয় আমার রক্ত পানের মতলবে ছিল। টর্চের আলোয় তাকে চিনতে অসুবিধা হয়নি। তারপর থেকে একটা হাতে—ছোঁড়া জাল আনতাম সঙ্গে। চুপচাপ পাথরের ওপর শুয়ে টোপ ফেলতাম।

    প্রতাপবাবু একটু দম নিলেন। আবার গম্ভীর স্বরে বলতে লাগলেন, কাল ছুঁড়েছিলাম জাল। একটুর জন্যে ফস্কে গেল। নাউ, আমার মিস্টিরিয়াস মুভমেন্টের কারণ ক্লিয়ার। ওঃ গুডলাক! স্পেসিমেনটা জীবন্ত ধরতে পেরেছি। শুধু একটা ডানা জখম হয়েছে। এই লোকটা কিছু দিয়ে মেরেছে বোধহয়।

    প্রতাপবাবু পকেট থেকে একটা ছোট জালের থলি বের করে বাদুডটাকে তার মধ্যে পুরে বন্দি করে ফেললেন ও থলির মুখ চেন টেনে বন্ধ করে দিলেন।

    সুনন্দ অপ্রস্তুত সুরে বলল, সরি, প্রতাপবাবু। কিন্তু এই বাদুডের কথা মহুয়াডাঙার লোকদের বলেননি কেন? ওরা কী ভীষণ আতঙ্কের মধ্যে আছে জানেন।

    প্রতাপবাবু বললেন, জানাইনি ভয়ে। জানলে ওরা হয়তো ক্ষেপে গিয়ে হাঙ্গামা বাঁধাত। তার চেয়ে ভয় ছিল, ওরা বাগে পেলে আমার দুর্লভ স্পেসিমেনটিকে মেরে ফেলবে। দিনের বেলা এই বিরাট বটগাছের অগুণতি কোটর হাতডে খুঁজে বাদুড়টা ধরা অসম্ভব ছিল। ওঁ বিষধর সাপ থাকতে পারে। তবে গ্রামের লোক বাদুড়কে মারতে চাইলে কোটরে টেরে বাইরে থেকে ফুটন্ত গরম জল ঢেলে দিলেই খতম। তাই চেষ্টায় ছিলাম, নিজেই। গবে কৌশলে। ও যখন রাতে বেরোবে তখন।

    —প্রতাপবাবু আপনার ওই মহামূল্যবান স্পেসিমেনটির জন্যে গ্রামের একজন লোক যে প্রাণ হারাতে বসেছে, সে খবর রাখেন? আমি বলে ফেললাম।

    সে কী! কে? কেন?—প্রতাপবাবুর চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে।

    বুনোর দিকে আঙুল দেখায় সুনন্দ—এই লোকটির বিপদ। গ্রামের লোকের সন্দেহ, ও—ই দানো হয়ে রাত্তিরে মানুষের রক্ত শুষে খাচ্ছে। ওকে খুন করার প্ল্যান হচ্ছে।

    বুনো এতক্ষণ স্থিরভাবে দাঁড়িয়েছিল। উদগ্রীব হয়ে আমাদের উত্তেজিত কথাবার্তার মর্ম গ্রহণের চেষ্টা করছিল। সে বলে উঠল, বাদুড়টো আমার গায়ে বসেছিল। এক ঝাপ্পড় দিলাম।

    আমার মনে এক প্রশ্ন জাগে। জিজ্ঞেস করি, বুনো, এখানে কী করছিলি তুই?

    বুনো বলল, পাহারা দিচ্ছিলেম। সেই রক্তখেকো দানোটাকে ধরব বলে। দেখলেম তোরা তিনজনা মাঠের মধ্যে ঘুরছিস। তাই লুকিয়ে নজর রাখছিলেম পাথরের পিছনে শুয়ে।

    সুনন্দ বলল, বুনো, দানোটাকে তুই ধরে ফেলেছিস। আসলে দানো পিশাচ নয়। এই বাদুড়টাই আসামি। ও—ই ঘুমন্ত লোকের রক্ত শুষে খায়।

    বাদুড় রক্ত খায়?—কথাটা যেন বুনোর বিশ্বাস হল না।

    সুনন্দ বলল, দেশি বাদুড় খায় না। এটা বিদেশি বাদুড়। ফল—পাকুড় খায় না। শুধু রক্ত খায়। মানুষ বা পশু—পাখির তাজা রক্ত। মানুষের চামড়া নরম। তাই এরা মানুষের গায়ে দাঁত ফোঁটাতে বেশি পছন্দ করে।

    বুনো বিস্ফারিত নেত্রে কয়েক মুহূর্ত দেখল বন্দি বাদুড়টাকে। তার সমস্ত শরীর ফলে ফুলে উঠল। বিকৃত মুখে উন্মত্তের মতো চিৎকার করে ওঠে বুনো, ওটা বাদুড় নয়, শয়তান। শয়তান। ওটাকে আমি মেরে ফেলব। শেষ করে দেব। দে, দে, ওটা দে আমায়।

    হাতের বল্লম ফেলে দিয়ে বুনো একলাফে প্রতাপ বাবুর দিকে এগিয়ে গেল। প্রতাপবাবর ডান হাতে বন্দি বাদুড়। তিনি বাঁ হাতে বুনোকে ঠেকালেন। আমি আর সুনন্দও তৎক্ষণাৎ জাপটে ধরলাম বুনোকে।

    উঃ, কী প্রচণ্ড জোর লোকটার গায়ে! ঝট্কা দিয়ে আমাদের দুজনকে প্রায় ছাড়িয়ে ফেলে সে বারবার প্রতাপবাবর হাত থেকে বাদুড়টা ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করতে লাগল। আমরা দুজন না আটকালে ও নির্ঘাৎ বাদুড়টা কেড়ে নিয়ে মেরে ফেলত। ধাক্কা খেয়ে প্রতাপবাবুর হাত থেকে টর্চ খসে পড়ে গেল। আমি তাড়াতাড়ি কুড়িয়ে নিলাম টর্চটা।

    বুনোর গলা দিয়ে গোঙানির মতো আওয়াজ বের হচ্ছে। অনেকদিনের জমা হওয়া শঙ্কা ও ক্ষোভ যেন ক্রোধের রূপ নিয়ে ফেটে পড়তে চাইছে। আমরা প্রাণপণে বোঝাই—বুনো, শোন শোন, এই বাদুড়টা আর কোনো উৎপাত করবে না। ওকে খাঁচায় আটকে রাখা হবে। ইত্যাদি।…

    তবু বুনোর রাগ পড়ে না। সে কেবলই ফুঁসছে। একটা ধস্তাধস্তি চলতে থাকে। সুনন্দ হঠাৎ বলে উঠল, বুনো শোন, ডাক্তারবাবু বলেছেন তোর মেয়ের চিকিৎসা করবেন। তোর মেয়েকে হাতপাতালে ভর্তি করে নেবেন।

    বুনোর বজ্র—কঠিন পেশীগুলি অমনি কেমন শিথিল হয়ে গেল। সব ভুলে গভীর আগ সুনন্দর দিকে চেয়ে সে বলল, আমার মেয়ে ভালো হয়ে যাবে? ডাক্তারবাবু বলেছে?

    যাবে বৈকি। নিশ্চয়ই ভাল হয়ে যাবে।—সুনন্দ আশ্বাস দিল।

    কার অসুখ?—প্রতাপবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

    —বুনোর মেয়ের। মেয়েটির একটা পা আঘাত লেগে খোঁড়া হয়ে গেছে।

    —হুঁ আমি দেখেছি মেয়েটিকে। ভেরি স্যাড কেস।

    সুনন্দ বলল, আমার মামার বন্ধু ডাক্তার চ্যাটার্জী বলেছেন, মেয়েটির ট্রিটমেন্ট করবেন। তবে হাসপাতালে রাখতে হবে। তার খরচ আছে। দেখি কী ব্যবস্থা করা যায়।

    রুদ্র বললেন, বুনোর মেয়ের চিকিৎসার সব খরচ আমি দেব। এ আমার ঋণ শোধ। তুমি বুনোকে বলে দাও।

    সুনন্দ বুনোকে বলল—শুনলি, বাবু কী বললেন?

    বুনো প্রতাপবাবুর দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এরপর সে জ্বলন্ত চোখে নিরীক্ষণ করল জালে বদ্ধ বাদুড়টিকে। বিড়বিড় কি যেন বকতে লাগল নিজের মনে। বোঝা গেল। ওই বাদুড়ের ওপর তার রাগ ও বিদ্বেষ কিছুমাত্র কমেনি। বাদুড়ের মালিক সম্বন্ধেও তার মন রীতিমতো সন্দিগ্ধ।

    আমি বললাম, বুনো, এই রক্তচোষা বাদুড়ের কথা তুই বলিস নি কাউকে। বরং গ্রামের লোককে জানিয়ে দে, তুই মন্ত্রের জোরে দানোটাকে তাড়িয়ে দিয়েছিস। তোর খুব খাতির হবে গাঁয়ে।

    হুঁ।—বুনো তার আঁকড়া চুলো মাথাখানা কঁকালো অর্থাৎ আমার পরামর্শ তার মনে ধরেছে। সে একবার ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাল গ্রামের দিকে। বলে উঠল, যাই মেয়েটা একা রইছে।

    মাটি থেকে বল্লমটা কুড়িয়ে নিয়ে বুনো সহসা দৌড়তে শুরু করল।

    ম্লান জ্যোৎস্নালোকে উন্মুক্ত প্রান্তরের বুক ছুঁয়ে বুনোর সুদীর্ঘ ছায়ামূর্তি যেন উড়ে চলল। ক্রমে সে হারিয়ে গেল দূর অন্ধকারে।

    চ্যাঁ—এ! একটা বিশ্রী চেরা আওয়াজে আমাদের চমক ভাঙল। মহুয়াডাঙার রক্তচোষা তার বন্দিদশার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

  • বাস্তেন দ্বীপে অভিযান

    বাস্তেন দ্বীপে অভিযান

    অজেয় রায়

    [book]

    এক

    সুনন্দ হঠাৎ খপ করে আমার হাতটা চেপে ধরে বলল, দাঁড়া। সামনে একটা ছিনতাই কেল মনে হচ্ছে। দেখি ব্যাপারটা? দুজনে স্তব্ধ হয়ে যাই। একটু সরে গেলাম পাশে গাছের ছায়ার আড়ালে। চুপচাপ দেখতে থাকি।

     কলকাতা শহর। রাত দশটা বাজে প্রায়। আমি আর বন্ধু সুনন্দ গিয়েছিলাম গঙ্গার ধারে বেড়াতে বেড়াতে এবং আড্ডা মারতে। ওখানে আরও কয়েকজন বন্ধু প্রায়ই জমা হই সন্ধে থেকে।

    হেঁটে ফিরছিলাম রাজভবনের গা ঘেঁষে। এসপ্ল্যানেড় অবধি হেঁটে গিয়ে বাস ধরব। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ। গরম কমেছে কলকাতায়। তবে শীত পড়েনি তেমন। ভালোই লাগছিল হাঁটতে। ফুটপাতে তখন পথচারীর সংখ্যা বেশ কম। রাস্তায় গাড়ি ছুটছে। হু হু করে মাঝে মাঝে। রাজভবনের পাঁচিলের ধারে ধারে গাছগুলোর লম্বা লম্বা ছায়া পড়েছে ফুটপাতে। এক ফালি চাঁদ আবছা আলো ছড়াচ্ছে আকাশে। স্ট্রিট লাইটগুলো অবশ্য জ্বলছে। আলো—আঁধারি মিশেল বেশ রহস্যময় পরিবেশ।

    আমাদের আগে ষাট—সত্তর ফুট দূরে একটি লোকও এগোচ্ছিল ওই ফুটপাত ধরে। গঙ্গার কাছ থেকেই সে আমাদের সামনে সামনে যাচ্ছিল। বেঁটেখাটো প্যান্টসার্ট পরা মানুষটি ধীরে সুস্থে হাঁটছিল আমাদের মতোই। দেখলাম, হঠাৎ যেন অন্ধকার যুঁড়ে দুটো লোক সামনে খাটো লোকটির পথ আগলে দাঁড়াল। মনে হয় পাচিলের ধারে লোক দুটো গাছের ছায়ায় মিশে ঘাপটি মেরে ছিল শিকারের আশায়।

    দুটো লোকের একজন বেঁটে মানুষটিকে মুঠো পাকিয়ে নিচু স্বরে বলছে কিছু। তার ভাবভঙ্গি সুবিধের নয়। দ্বিতীয় জন পাশের দিকে সরে গেল। দেখলাম যে পথ আগলানো আগন্তুক বেঁটে মানুষটির প্যান্টের পকেটে স্রেফ হাত ঢুকিয়ে দিল। হয়তো মানিব্যাগের আশায়।

    পথচারী বেঁটে মানুষটি এতক্ষণ কিছু বলছিল মৃদুস্বরে আর কেবলই ঘাড় নাড়ছিল। এবার সে তড়িৎগতিতে হাত চালাল। সঙ্গে সঙ্গে তার সামনের লোকটি উলটে পড়ল ফুটপাতে। কিন্তু পাশে থাকা দ্বিতীয়জন কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করল বেঁটে পথচারীটিকে। লোকটি বসে পড়ে মাথা চেপে। ভূপতিত ছিনতাইকারী এই সুযোগে উঠে দাঁড়িয়েছে।

    সুনন্দ বলল, ছোট। আটকাতে হবে।

    সুনন্দ দৌড়ল। পিছু পিছু আমি।

    যে লোকটা মেরেছিল সে ঝুঁকে তার শিকারের পকেট হাতড়াচ্ছে। দ্বিতীয় ছিনতাইকারীও কাছে এসে দেখছে। আমাদের পায়ের শব্দে লোক দুটো ঘাড় ফিরিয়ে দেখতে না দেখতেই সুনন্দ ঝুঁকে পড়ার পশ্চাদদেশে কষাল ভারী জুতোর প্রচণ্ড এক লাথি। লোকটা ছিটকে উলটে পড়ল ফুটপাতে। আমি দ্বিতীয় ছিনতাইকারীর মুখে মারলাম এক মোক্ষম ঘুষি। আক শব্দ করে সে মুখ চেপে টলমলিয়ে পিছিয়ে গেল।

    সুনন্দর লাথি খাওয়া লোকটা কিঞ্চিৎ সামলে উঠে দাঁড়াচ্ছে, দেখি তার হাতে একখানা ছুরি। চকচক করে ওঠে স্ট্রিট লাইটের আলোয় ছুরির সরু লম্বা ফলা। কিন্তু সুনন্দ তাকে আক্রমণের সুযোগই দেয় না। ফের এক লাথি কষায় লোকটার ছুরি ধরা হাতে কনইয়ের কাছে। ছুরি খসে পড়ে হাত থেকে। ব্যথায় কাতরে ওঠে লোকটা। তারপর ঘুরে মারল। টেনে দৌড়। তার ছিনতাইয়ের সাধ উবে গেছে। দ্বিতীয় লোকটাও প্রাণপণে অনুসরণ করল সঙ্গীকে। দুজনে রাস্তা পেরিয়ে মিলিয়ে গেল ময়দানের অন্ধকারে।

    সুনন্দ ছুরিটা কুড়িয়ে নেয়। ফলাটা আট ইঞ্চি হবে। দারুণ ধার। ইস, লাভের বদলে ব্যাটাদের লোকসানই হয়ে গেল। আমরা এবার সেই বেঁটে মানুষটির দিকে নজর দিই।

    লোকটি তখনো ফুটপাতে বসে। হতভম্ভ দৃষ্টি। এক হাতে চেপে আছে নিজের মাথার এক পাশ। লোকটিকে তুলে ল্যাম্প পোস্টের আলোয় পরীক্ষা করি। নাঃ রক্ত গড়াচ্ছে না। তবে লেগেছে খুব। ওর যন্ত্রণাকাতর মুখ দেখেই মালুম হচ্ছে। লোকটির মাথায় পরা কাউন্টি—ক্যাপ জাতীয় মোটা কাপড়ের টুপি তার মাথাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে এযাত্রা।

    পথচারীকে দেখে আমরা অবাক। লোকটি বাঙালি নয়। মনে হল ভারতীয়ই নয়। মঙ্গোলীয় ধাঁচের মুখ। চিনা, বর্মী বা মালয়িদের মতন দেখতে। গড়ন ছোটখাটো হলেও মজবুত। লোকটি খানিক সামলিয়ে বলল, থাঙ্কু মিস্তার। ইউ ছেভ মি। ওঃ। সে নিজের মাথায় হাত বোলায় টুপিটা খুলে।

    আমরা দেখলাম, কাটেনি বটে কিন্তু মাথার এক জায়গায় বেশ ফুলে উঠেছে।

    কয়েকজন পথচারী ইতিমধ্যে জুটে গেছে চারপাশে। প্রশ্ন হয়—

    —কী হয়েছে দাদা?

    —কেসটা কী?

    —ছিনতাই করছিল। জবাব দেয় সুনন্দ।

    —নিয়েছে কিছু?

    —মেরেছে বুঝি? লোকটা তো মনে হচ্ছে চিনেম্যান।

    —হুঁ বিদেশি। তাই মনে হচ্ছে। জানাই আমি।—তবে নিতে পারেনি কিছু। আমরা কয়েক ঘা লাগাতেই পালাল লোক দুটো। আমরা একটু দূরে পিছনে ছিলাম ভাগ্যিস। তবে মেরেছে মাথায়। দেখি জিজ্ঞেস করে কোথায় যাবে? পরিচয় কী? কিছু একটা ব্যবসা তো। করতে হবে।

    —হ্যাঁ হ্যাঁ তা তো বটেই। থানায় নিয়ে যান। ডায়ারি করে দিন। পুলিশই যা করবার করবে।

    —সঙ্গে টাকাকড়ি বেশ আছে বোধহয়। তাই ফলো করছিল। এই লোকগুলোও সুবিধের হয় না। থানায় জমা করে দিন।

    অন্য পথচারী কেউ কিন্তু ওই লোকটিকে থানায় নিয়ে যেতে সাহায্য করতে এগোল না। তারা সুটসাট কেটে পড়ল উপদেশ ঝেড়ে। ফের আমরা তিনজন। চারপাশ মোটামুটি ফাঁকা।

    আক্রান্ত লোকটি এতক্ষণ চুপচাপ অন্যদের কথা শুনছিল। বোধহয় বুঝতে পারছিল। বাকিরা চলে যেতে সে মাথা নেড়ে বলল, নো পুলিশ। নো পুলিশ।

    কে জানে, পুলিশে ছুঁলে আঠারো—ঘা আপ্তবাক্যটি এর জানা আছে হয়তো। যাহোক সুনন্দ তাকে ইংরেজিতে আশ্বাস দেয়, ঠিক আছে, পুলিশে রিপোর্ট করা দরকার নেই। তবে তোমার মাথায় লেগেছে রেশ। ফাস্ট—এড দেওয়া উচিত। হাঁটতে পারবে খানিকটা?

    লোকটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

    ধীরে ধীরে হেঁটে এসপ্ল্যানেডের দিকে যেতে যেতে আমরা লোকটির পরিচয় জানার চেষ্টা করি। ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করি, তুমি কয়রা কী? মানে প্রফেশন?

    উত্তর হয়, সেলার।

    জাহাজের নাবিক! বাঃ।

    —দেশ কোথায়? ইন্ডিয়ান?

    —নো। ইন্দোনেশিয়ান।

    আমি ও সুনন্দ চোখাচোখি করি। দারুণ ইন্টারেস্টিং লোক। সুনন্দ আমায় ফিসফিসিয়ে বলে বাংলায়, লোকটাকে সহজে ছাড়ছি না। ওর গল্প শুনতে হবে।

    বটেই তো। আমারও তাই হচ্ছে। সাত—সমুদ্রে ঘোরা জাহাজের নাবিকদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার হয় বিচিত্র। আমরা ডাঙার মানুষরা তার কতটুকু জানি বা দেখেছি। সব বিদ্যে বই পড়ে ঠিক জানা যায় না। এসব মানুষ তাদের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা লেখেও কদাচিৎ। তবে আগ্রহ দেখালে বলে শুনেছি।

    লোকটি দেখলাম ইংরেজিটা মোটামুটি বলতে ও বুঝতে পারে। কিছু বাংলা হিন্দিও জানে। তবে তেমন সড়গড় নয় কথায়, বোঝে বেশ। আরও নিশ্চয় অনেক ভাষাই কিছুটা জানে। যারা বন্দরে বন্দরে ঘোরে, তারা নানান দেশের ভাষা কাজ চালানোর মতো শিখে ফ্যালে। ইংরেজিতে চিনাদের মতো ট উচ্চারণটা করে ত এবং কিঞ্চিৎ আধো আধো সরে উচ্চারণ। জানলাম যে লোকটির নাম মিকি। মিকি হরতানো। থাকে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায়। বছর কুড়ি জাহাজে কাজ করছে। ওদের গ্রামের অনেকেই জাহাজি নাবিক। মিকি ধর্মে বৌদ্ধ। মিকি মালবাহী জাহাজের কাজ করে। ভারতবর্ষের নানা বন্দরে এবং  কলকাতা বন্দরে কয়েকবার এসেছে আগে। ঘুরেছে কলকাতায়। কলকাতার পথঘাট চেনে কিছুটা। ওর জাহাজ খিদিরপুর ডকে ভিড়ে আছে। মাল খালাস চলছে। দিন তিনেক বাদে ফের গান করবে। ছেড়ে যাবে কলকাতা। কয়েকদিন মিকি কলকাতাতেই রয়েছে জাহাজি মাল্লাদের এক আস্তানায়। ওয়েলিংটন স্কোয়ারের কাছে আস্তানাটা। ওখানে অনেক চেনা জানা মাল্লা জোটে। আড্ডা হয়। আজ গিয়েছিল জাহাজি অফিসে একজন এদেশি লোকের সঙ্গে দেখা করতে। গল্প করতে করতে রাত হয়ে গেল। হেঁটেই ফিরছিল ওয়েলিংটনে। রাস্তা চেনে। হাঁটতে তার খুব ভালো লাগে। জাহাজে তো বন্দি জীবন। কোনো বন্দরে নামলেই তার শখ শহরটা হেঁটে দেখে বেড়ানো। আজকের মতো উটকো ঝামেলায় আগে পড়েনি কলকাতায়। তবে অন্য দেশে পড়েছে কয়েকবার। ভাগ্যিস আজ তার পার্সটা খ— না। অনেক টাকা ছিল। আমাদের সে অনেক ধন্যবাদ জানাল এযাত্রা সেভ করার জন্য। দেশে মিকির পরিবার থাকে। স্ত্রী এবং সাত ও পাঁচ বছরের দুটি ছেলে।

    কথা বলতে বলতে এসপ্ল্যানেডে হাজির হলাম। একটা দোকান থেকে বরফ নিয়ে মিকির মাথায় আঘাতের জায়গায় লাগানো হল। বরফ লাগাতে ব্যথা কিছু কমল।

    এরপর সুনন্দ অনুরোধ করল মিকিকে, আজ তোমার জাহাজি আস্তানায় না গেলে। বরং চলো আমাদের বাড়িতে রাতটা কাটাবে। তোমার গল্প শুনব। কত দেশে ঘুরেছ। নিশ্চয় কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে।

    মিকি ইতস্তত করছে দেখে সুনন্দ জোর দেয়, আমাদের কোনো অসুবিধে নেই। আমাদের বাড়িতে থাকি শুধু আমি আর আমার এক মামা। তিনি সায়ান্টিস্ট প্রফেসর হলেও মাই ডিয়ার মানুষ। তোমার সঙ্গে আলাপ হলে খুশি হবেন। বাড়িতে শোবার জায়গা যথেষ্ট। কী খাবে বলো রাতে। দোকান থেকে কিনে নিয়ে যাই। যা যা তোমার পছন্দ।

    —অলরাইত। মিকি রাজি হয়ে যায়।

    সুনন্দ বলে, বুঝলে মিকি, শহুরে লোকের সঙ্গে তো একঘেয়ে দিন কাটাই। তোমার মতো ইন্টারেস্টিং লোকের দেখা পাই খুব কম। তুমি গেলে আমাদের সৌভাগ্য। জানো আমরা খুব বেড়াতে ভালোবাসি। অনেক বেড়িয়েছি দেশে বিদেশে। দুর্গম অঞ্চলে। অচেনা দেশ, সমুদ্র, প্রাণী, গাছপালা আমাদের ভীষণ টানে। তাই তোমায় ছাড়তে ইচ্ছে করছে না।

    সুনন্দ আমায় বলল, আজ রাতে তুই আমাদের বাড়িতে থাকবি। বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দে।

    আমি তো তক্ষুনি রাজি।

    এই ঘটনার ফলেই মিকির সঙ্গে সুনন্দর মামাবাবু প্রফেসর প্রাণিবিজ্ঞানী নবগোপাল ঘোষের যোগাযোগ হয়। আর তার ফলেই আমাদের এক নতুন রোমাঞ্চকর অভিযান ও অ্যাডভেঞ্চারের সূত্রপাত। এখন আমাদের নিজেদের পরিচয়টা কিছু জানিয়ে রাখি।

    আমি—অসিত রায়। সুনন্দ মানে সুনন্দ বোস আমার বাল্যবন্ধু। সুনন্দর মামাবাবু শুধু প্রাণিবিজ্ঞানী নয়, জ্ঞান—বিজ্ঞানের নানা শাখায় তার প্রবল আগ্রহ। সুনন্দও প্রাণিবিজ্ঞানের ছাত্র। এম. এস. সি পাস করে এখন রিসার্চ করছে। আপাতত সে কিছু দিন রয়েছে নবগোপালবাবুর বাড়িতে। তার রিসার্চের কাজে মামাবাবুর সাহায্য নিতে।

    নবগোপাল ঘোষ বিয়ে থা করেননি। একা থাকেন। সুনন্দকে পুত্রবৎ স্নেহ করেন। সুনন্দর বন্ধু হিসেবে ছোট থেকেই আমি তাকে চিনি।

    আপাতগম্ভীর দর্শন, মাঝারি স্বাস্থ্য, মাঝারি হাইট, মামাবাবুকে দেখলে আর পাঁচটা সাধারণ ছাপোষা বাঙালি গেরস্থ অধ্যাপকের থেকে আলাদা করা যায় না। কিন্তু ওই মানুষটি প্রচণ্ড অ্যাডভেঞ্চার—প্রিয়।  বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের নেশায় কত দুর্গম অঞ্চলে যে পাড়ি দিয়েছেন। অনেক সময় সুনন্দ এবং কখনো কখনো আমিও তার সঙ্গী হয়েছি।

    আমার বিষয় অবশ্য ইতিহাস। এম. এ. পাস করে গবেষণা করছি। তবে সুনন্দ ও মামাবাবর সঙ্গ পেয়ে বিজ্ঞানেও যথেষ্ট আগ্রহ জন্মেছে। নতুন দেশ দেখার সুযোগ পেলে আমিও ছাড়ি না।

    মিকিকে নিয়ে গেলাম মামাবাবুর কাছে, ভবানীপুর অঞ্চলে মামাবাবুর বাড়িতে। মামাবাবু মিকির পরিচয় জেনে খুব খুশি হলেন।

    রাতে খাবার আগে ও পরে জমিয়ে গল্প হল। প্রধানত এশিয়া মহাদেশের বন্দরগুলিতেই মিকির যাতায়াত। বন্দরে বন্দরে তার কত আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কাহিনি। কত অজানা দ্বীপ। সে দেখেছে। কত অজানা প্রাণী ও মানুষ। গাছপালা। কত বিপদে যে পড়েছে। প্রথমে কিঞ্চিৎ আড়ষ্ট থাকলেও পরে দেখলাম মিকি দিব্যি হাসিখুশি মানুষ। তার গল্প বলার ঢংও চমৎকার।

    ভালো ভালো খাবার একপেট খেয়ে মিকি মহাখুশি। জানাল যে অনেক দিন বাদে এমন খাসা ভোজ জুটল তার কপালে। জাহাজের খাদ্য তো বেজায় নীরস। কলকাতায় তার আস্তানার খাবার অতি বাজে। হোটেল রেস্তরাঁয় বেশি খরচ করে ভালো খাওয়া তার সাধ্যের বাইরে। মাইনে তো বেশি নয়। বাড়িতেও টাকা পাঠাতে হয়।

    পরদিন ভোরে উঠেছে মিকি। চা জলখাবার খেয়েছে। খানিক বাদে বিদায় নেবে। মামাবাবু তখন তার বাড়ির বাগানে গাছপালার তদারকি করছেন। মিকি বাগানে গিয়ে দাঁড়ায়। আমরাও সঙ্গ ধরি।

    ইদানীং মামাবাবুর এক নতুন শখ হয়েছে বাগান করা। মামাবাবুর বাড়ির পিছনে কাঠা দুই বাগান করার মতন জমি আছে। সেখানেই তার উদ্যানচর্চা। একটা ছোট গ্রিনহাউসও বানিয়েছেন।

    প্রথামতো চেনা ফুল—ফলের গাছ করায় মামাবাবুর উৎসাহ নেই। নানান বিচিত্র গাছ। লাগাচ্ছেন। নিজের ফর্মুলা অনুযায়ী তাদের সার দিচ্ছেন, যত্ন করছেন। ফলাফলের নোট রাখছেন। অর্থাৎ ওই গাছপালা নিয়ে গবেষণা চলছে। হয়তো সেটাই আসল উদ্দেশ্য।

    আমরা তার বাগান নিয়ে কিছু মন্তব্য করলে মোটেই আমল দেন না। নিজের তালেই। আছেন।

    মিকি ঘুরে ঘুরে বাগান দেখতে দেখতে কয়েকটি গাছের সামনে এসে বলল, এই গাছ দেখেছি একটা দ্বীপে। প্রচুর। তবে সাইজে ঢের বড় বড়। আর পাতার ঝাড় অনেক বেশি।

    —এগুলো কী গাছ জানো? প্রশ্ন করেন মামাবাবু।

    —না। মিকি মাথা নাড়ে।

    —এগুলো পোস্ত গাছ। পপি প্ল্যান্ট। যা থেকে আফিং হয়। ওপিয়াম।

    —ইজ ইত? মিকি বেশ আগ্রহ দেখায়, আপনি ওপিয়াম তৈরি করেন নাকি?

    —না বাবা। মামাবাবু হাসেন, তাহলে পুলিশে ধরবে। কয়েকটা মাত্র গাছ করেছি একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে।

    —আফিং হয় কী ভাবে? প্রশ্ন মিকির।

    —এর ফলের গা চিরে দিলে রস বেরায়। তাই শুকিয়ে আফিং হয়। আর ক্ষমত ভিতরের বিচি হল পোস্ত। বাঙালিদের প্রিয় খাদ্য। আচ্ছা তুমি কোন দ্বীপে এ গাছ প্রচুর দেখেছিলে বড় বড়? দ্বীপের লোক চাষ করে বুঝি?

    —ও দ্বীপে লোকই থাকে না কেউ। শুধু বাস্তেন সাহেব ছিল। সেই বোধহয় লাগিয়েছিল।

    —দ্বীপটা কোথায়?

    —জাভা সি—তে। ছোট্ট দ্বীপ। বনজঙ্গলে ভরা।

    —তুমি ওখানে গিছলে কেন?

    —গিয়েছিলাম বাধ্য হয়ে, প্রাণ বাঁচাতে। সাধ করে কি ও দ্বীপে যায় কেউ?

    —কী রকম? আমরা সবাই কৌতূহলী।

    —তাহলে একটা লম্বা গল্প ফাঁদতে হয়, জানায় মিকি। বোঝা গেল যে গল্পটা বলতে তার অনিচ্ছা নেই, তবে আমরা শুনব কিনা বুঝতে পারছে না।

    —বলো বলো কী হয়েছিল? আমরা তাড়া লাগাই। বাগানের বেঞ্চিতে আর বেদিতে বসি সবাই।

    মিকি বলতে শুরু করে, সে প্রায় দশ বছর আগের ঘটনা। আমাদের জাহাজ ফিলিপিনস সেলিবিস লম্বক মাদুরা হয়ে যাচ্ছিল জাকার্তায়। মাদুরা ছেড়ে যাবার কিছু পরেই হঠাৎ উঠল। ঝড়। প্রচণ্ড ঝড়। তখন শীতকাল। তখন ওখানে ঝড় কমই হয়। তবে বৃষ্টি হয় প্রায়ই। ঝড়ের দাপটে ডুবোপাহাড়ে ধাক্কা লেগে আমাদের জাহাজের তলা ফুটো হয়ে ডুবতে লাগল। সবাই প্রাণ বাঁচাতে জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল কাছাকাছি কোনো দ্বীপে আশ্রয় নেবার আশায়। একটা লাইফ—বেল্ট জোগাড় করে আমিও ঝাপালাম জলে। ওখানে ছোট বড় প্রচুর দ্বীপ। স্রোত আর বাতাসের টানে ভাসতে ভাসতে প্রথমে উঠলাম এক ছোট্ট ন্যাড়া দ্বীপে। সেখানে মানুষজনের বাস তো নেই—ই। গাছপালাও খুব কম। শুধু অজস্র সামুদ্রিক পাখির আস্তানা। পাখির ডিম খেয়ে কোনোমতে সেখানে দুটো দিন কাটালাম। জোর বৃষ্টি পড়ছে থেকে থেকে। কোনোরকমে পাথরের খাঁজের তলায় মাথা গুঁজে রইলাম। বুঝলাম যে এখানে থাকলে স্রেফ না খেয়ে বা ভিজে অসুখ করে মরব। মাইল দুই দূরে আর একটা দ্বীপ দেখা যাচ্ছিল, একটু যেন বড়। লাইফবেল্ট আঁকড়ে ফের জলে নামলাম। সাঁতরে হাজির হলাম ওই দ্বীপে। ওই দ্বীপেই দেখেছিলাম ওপিয়াম গাছের ঝাড়।

    —সে দ্বীপে মানুষ ছিল না?

    —না। ছোট্ট দ্বীপ। তবে দ্বীপে গাছপালা প্রচুর। ঝরনা রয়েছে একটা। কয়েকটা ছোট পুকুর। বড় উঁচুনিচু। সমতল জায়গা কম। মাঝখানে এক ছোট পাহাড়। গুহাও রয়েছে কয়েকটা। ঘরে দেখে আমি অবাক। কত রকম যে গাছপালা দ্বীপটায়। দেশি বিদেশি। এমন দ্বীপ জন্মে দেখিনি। রীতিমতো গা ছমছম করতে লাগল। রবার গাছ, তাল আনারস আম জাম কাঁঠাল ডুরিয়ান কফি চা পেয়ারা বাঁশ কলা তেঁতুল, আরও কত কী! কত রকম যে ফুল ফুটেছে। অনেক ফুল চোখেই দেখিনি আগে। সেখানেই এই ওপিয়াম গাছ। দেখেছিলাম।

    —পাহাড়ের গায়ে একটু সমতল জায়গায় একটা ভাঙাচোরা কাঠের বাড়ি দেখলাম। কাঠ আর বাঁশ দিয়ে তৈরি। বেশ বড়ই ছিল একসময়। বুঝলাম, মানুষের বাস ছিল সেখানে। কিন্তু তখন জনমনিয্যি নেই।

    —তবে খাবার সমস্যাটা মিটল। খাবার মতো প্রচুর ফল গাছে গাছে। মুরগি আর ছাগল চরছে। বুনো। সামুদ্রিক পাখি আর তাদের ডিমও পাওয়া গেল প্রচুর। বড় একটা ডোবায় সাঁতার কাটছে পাতি হাঁস। ওই ডোবার পাশেই দেখি মস্ত মস্ত ওপিয়াম গাছের ঝাড়।

    আমার সঙ্গে আগুন জ্বালাবার ব্যবস্থা ছিল। ওয়াটারপ্রুফ কেসের মধ্যে রাখা লাইটার। একটা গুহা খুঁজে আশ্রয় নিলাম। আগুন জ্বালালাম। ফল ও ঝলসানো মাংস খেয়ে কাটাতে লাগলাম। নজর রাখছি কোনো নৌকো বা জাহাজের দেখা যদি পাই। চারদিন বাদে দেখি দুটো বড় বড় নৌকো যাচ্ছে দ্বীপের কাছ দিয়ে। কাপড় নাড়িয়ে নানান ইঙ্গিতে ডাকলাম তাদের। ওরা সিঙ্গাপুর যাচ্ছিল। আমার তুলে নিল। নামিয়ে দিল জাকার্তায়। বেঁচে গেলাম সেযাত্রা।

    —ওই দ্বীপটা সম্বন্ধে খোঁজখবর করেছিলে? প্রশ্ন করেন মামাবাবু।

    —করেছিলাম বইকি। ওখানকার লোক ওই দ্বীপটাকে বলে—বাস্তেন সাহেবের দ্বীপ। বাস্তেন আইল্যান্ড। ফন বাস্তেন নামে এক ডাচ ওই দ্বীপটায় ছিল অনেক বছর। প্রায় পনেরো বছর। বাস্তেনই নাকি দ্বীপে অত গাছপালা লাগিয়েছিল। তার আগে দ্বীপটায় তেমন গাছপালা ছিল না। তবে নারকেল গাছ ছিল। আর বুনো ঝোঁপঝাড়।

    —বাস্তেন সাহেব ওখানে কী করত? মামাবাবু জানতে চান।

    —অদ্ভুত লোক ছিল নাকি বাস্তেন। খেয়ালি প্রকৃতির। ওখানকার লোকদের মুখে যা শুনেছি। যৌবনে এসেছিল ইন্দোনেশিয়ায়। রবার বাগানে ম্যানেজারি করতে। চার—পাঁচ বছর ছিল আন্দালুস আর জাভায়। এই সময় দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড—ওয়ার বাধল। বাস্তেন কালিমাস্তান মানে বোর্নিও গিয়েছিল কাজে। স্টিমারে জাকার্তায় ফিরতে ফিরতে খবর পায় যে জাপানিরা জাভা অধিকার করে নিয়েছে। সাউথ—ইস্ট এশিয়া আক্রমণ করেছে জাপানিরা। হুড়হুড় করে এগোচ্ছে তাদের ফোর্স। জাপদের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে বাস্তেন আর জাকার্তায় ফেরে না। জাভা সি—তে ওই একরত্তি জনমানবহীন দ্বীপে নেমে যায়। সেখানে লুকিয়ে থাকে মাসখানেক। এরপর দেশি জেলেদের নৌকায় চেপে ছদ্মবেশে হাজির হয় আন্দালাসের তীরে। তারপর স্রেফ জঙ্গলে গিয়ে লুকোয়। গভীর অরণ্যে।

    —আন্দালাস কোথায়? সুনন্দ প্রশ্ন করে।

    ইতিহাসের ছাত্র আমি পাণ্ডিত্য ফলাবার সুযোগ হারাই না।

    গম্ভীরভাবে জানাই, আমরা যাকে বলি সুমাত্রা, তারই লোকাল নেম।

    মামাবাবু ও মিকি মাথা নেড়ে সায় দেয়। বুঝি মিকি সুমাত্রা নামটা জানে।

    মিকি বলে চলে, বাস্তেন সাহেব আন্দালাসের পাহাড়—জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল বছর দই। কী করে যে বেঁচে ছিল কে জানে? জঙ্গল যা ঘন। যা বৃষ্টি। বিষাক্ত সাপখোপ। ডিম জানোয়ারও আছে। অবশ্য জঙ্গলের আদিবাসীদের ধরনধারণ ভাষা কিছুটা জানত বাজে,

    —যুদ্ধ থেমে গেলে বাস্তেন বেরিয়ে আসে শহরে। জাপানিরা হেরে গেছে তাই ভয় নেই আর। এরপর বাস্তেন চলে যায় নিজের দেশ হলান্ডে। কিন্তু ফিরে আসে আবার। জার্মানির আক্রমণে ওর অনেক নিকট আত্মীয় নাকি মারা গিয়েছিল। দেশে ওর ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দেশে ওর আর মন টিকছিল না।

    অনেকক্ষণ কথা বলেছে মিকি। মামাবাবু তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, এক কাপ কফি খাবে নাকি?

    —তা বেশ। মিকি রাজি।

    কফিতে চুমুক দিতে দিতে ফের শুরু করে মিকি, বাস্তেন বছর খানেক নানা কাজ করে। ইন্দোনেশিয়ার কয়েক জায়গায়। তারপর নাকি ওই দ্বীপে গিয়ে আস্তানা গাড়ে। চাকরি আর করেনি। বাস্তেনের গাছপালার খুব শখ ছিল। জানতও বেশ গাছপালা সম্বন্ধে। ওই দ্বীপে বাঝেন খুশিমতো গাছ পুঁততে থাকে। দেশ—বিদেশের গাছের চারা বিচি জোগাড় করে, ফুল। ফল অনেক রকম। তাই নিয়েই মেতে থাকত। সমুদ্র পেরিয়ে বড় দ্বীপের শহরে যেত। অবশ্য, তবে খুব কম। দরকার না হলে যেত না শহরে।

    —স্রেফ একা গিয়েছিল? জিজ্ঞেস করি আমি।

    —না। এক মালয়ি যুবককে সঙ্গে নিয়ে যায়। ওর খুব অনুগত ও বিশ্বাসী। দ্বীপে নিজের বাড়ি বানাতে কিছু দেশি মজুরকে নিয়ে গিয়েছিল কয়েকবার অল্প দিনের জন্য। পরেও মজুর নিয়ে গেছে গাছ কাটতে, জমি কোপাতে, এমনি নানা কাজে। তবে তারা বেশিদিন থাকেনি দ্বীপে।

    —বাস্তেন জাভায় যাওয়া—আসা করত কীভাবে? মামাবাবু জানতে চান।

    —ওদের একটা ছোট মোটর বোট ছিল তাতে। বাস্তেন এবং ওর অনুচর পো দুজনেই বোট চালাতে পারত। কখনো কখনো পো একাই ঘুরে আসত জাভায় সুমাত্রায় বোট চালিয়ে। মাঝে মাঝে জাভা থেকে নৌকা যেত ওই দ্বীপে, দরকারি খাবার—দাবার জিনিসপত্র নিয়ে। বাইরের লোক বেশি আসা পছন্দ করত না বাস্তেন। মাঝিরা যারা যেত দরকারে তাদের মুখেই লোকে শুনত বাস্তেনের নানা কথা। বাস্তেন গাছের চারা আর বীজের খোঁজে যেত জাভা সুমাত্রা আর কাছাকাছি দ্বীপে। অর্ডার দিয়ে আনাত চারা ও বীজ। দ্বীপটা তখন নাকি রীতিমতো রহস্যময় ছিল বাইরের লোকের কাছে।

    —পনেরো বছর পর বাস্তেন কোথায় যায়? প্রশ্ন করেন মামাবাবু।

    —যায়নি কোথাও। ওখানেই হঠাৎ সে মারা যায় অ্যাকসিডেন্টে। পাহাড় থেকে পিছলে পড়ে মাথায় চোট পায়। তখন কয়েকজন মাঝি গিয়েছিল ওই দ্বীপে,তারাই এসে প্রথম খবরটা দেয় জাকার্তায়। ওই দ্বীপেই বাস্তেনকে কবর দেওয়া হয়। ওর অনুচর পো বেশি দিন আর থাকেনি ওই দ্বীপে। বাস্তেনের মোটরবোট চালিয়ে, বাস্তেনের বন্দুকটা আর কিছু দামি জিনিসপত্র নিয়ে চলে যায় মালয়। আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। তারপর থেকেই দ্বীপটা জনশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। মাঝে মাঝে দেশি মাঝিরা গিয়েছে ওই দ্বীপে ফলটলের সন্ধানে। কিন্তু বাস করেনি কেউ স্থায়ীভাবে।

    —তুমি বাস্তেন দ্বীপের কথা জানতে না আগে? মামাবাবুর প্রশ্ন।

    —না। আসলে আমাদের দেশটা তো অজস্র দ্বীপের রাজত্ব। জাভা সি, ফ্লোরেস সি, বান্দা সি, চায়না সি, সুলু সি—এমনি কত সাগরে হাজার হাজার ছোট বড় দ্বীপ ছড়িয়ে আছে। বড় দ্বীপগুলোর মোটামুটি খবর রাখলেও খুব ছোটগুলো আমাদের প্রায় অচেনা। বিশেষত আমার। আমি যে কটা জাহাজ কোম্পানিতে কাজ করেছি তাদের জাহাজ যায় বেশির ভাগ পশ্চিমে বা উত্তরে। বড় পোর্টগুলোয় জাহাজ থামে। সেগুলো চিনি। বাস্তেন দ্বীপের গল্প করে শুধু জাকার্তার জেলেরা আর নৌকার মাঝিরা। তাদের সঙ্গে আমার তত মেলামেশা নেই। জাকার্তায় গেছি অনেকবার। তবে সেখানে জাহাজি নাবিকদের সঙ্গেই মিশেছি বেশি। তাই আগে জানতেম না বাস্তেন দ্বীপের কথা।

    —তুমি অনেক পোর্টে ঘুরেছ তাই না? সুনন্দ বলে।

    —ঘুরেছি বইকি। জাকার্তা, সিঙ্গাপুর, পেনাং, রেঙ্গুন, ব্যাংকক, ক্যালকাতা, কলম্বো, করাচি কতবার গেছি। এদেন ডার্বানও গেছি। ফিলিপাইনসে ম্যানিলা গেছি। ব্রিসবেন গেছি। কালিমাস্তান মানে বোর্নিওতে ম্যাকাসার পোর্টে গেছি অনেকবার। ওই সব পোর্টটাউনে ঘুরেছি। সগর্বে ঘোষণা করে মিকি। বলে, তবে বেকায়দায় পড়ে খুব ছোট বা নির্জন বসতিহীন দ্বীপেও জাহাজ নোঙর ফেলেছে কয়েকবার।

    আমরা হাঁ করে শুনি। ওঃ লোকটার জীবন বটে। কত ঘুরেছে। কত কী দেখেছে!

    মামাবাবুর পিছু পিছু মিকি বাগানে গ্রিনহাউসে ঢোকে। খড়ের চাল, দরমার দেয়াল, ছোট লম্বাটে ঘরটায় নানান অর্কিড় ঝুলছে। ঘরটা বেশ ঠাণ্ডা। তবে রোদ ঢোকে দরমার বেডা সরিয়ে দিলে। ঘরের মেঝেতে লম্বা লম্বা কয়েকটা টবে কিছু পপি গাছ দেখে মিিক বলল, এই গাছ আমি ওই দ্বীপে দেখেছি। এর চেয়ে অনেক বড় বড় সাইজের।

    —এগুলো কী ফুলের গাছ জানো? মামাবাবু প্রশ্ন করেন।

    —না।

    —এগুলোর নাম ক্যালিফোর্নিয়ান পপি। সত্যি তুমি এই গাছ দেখেছ বাস্তেন দ্বীপে? মিকি পপি গাছগুলোর পাতায় হাত দিয়ে দেখে বলল, আলবৎ এই গাছ। তবে সাইজে প্রায় ডবল। ফুল ছিল না মোটে। মাত্র দু—একটা ছোট্ট ছোট্ট ফুল ফুটেছিল এইরকম, এই রং—এর। হুঁ এই গাছই। এই পাতা। আমি তো ভেবেছিলাম লম্বা মোটা পাতার ঘাস। কী নাম বলছেন? পপি।

    —কোথায় দেখলে? মামাবাবু জানতে চান।

    —এক জায়গায় ঝরনার গা থেকে সরু নালা বেরিয়েছে, তার ধারে ধারে ছিল এই পপি গাছ। প্রচুর।

    মিকি তার সমুদ্র ভ্রমণের অ্যাডভেঞ্চার আরও বলে। এমন শহুরে শিক্ষিত শ্রোতা মুগ্ধ হয়ে তার গল্প শুনছে এ অভিজ্ঞতা তার জীবনে এই প্রথম।

    মামাবাবু কিঞ্চিৎ অন্যমনস্ক। কিছু ভাবছেন যেন? তিনি হঠাৎ বললেন, আচ্ছা মিকি ওই বাস্তেন সাহেবের চলত কীভাবে শুনেছ? মানে দ্বীপে থাকার সময় চাকরি তো করতেন না। খরচাপাতি চালাত কী করে খোঁজ পেয়েছিলে?

    মিকি থমকে গিয়ে একটু ভেবে বলে, হঁ আমিও ভেবেছি ব্যাপারটা। মাঝিদের মখে শুনে যা মনে হয়েছিল বাস্তেনের অনেক জমানো টাকা ছিল জাকার্তার কোনো বাংকে। মোটা মাইনের চাকরি করেছে তো আগে। হয়তো দেশ থেকে কিছু টাকা নিয়ে এসেছিল।

    তবে ওই দ্বীপে থাকার সময়েও বাস্তেনের অন্য রোজগারের পথ ছিল। লোকটি নাকি চমৎকার ছবি আঁকতে পারত। হাতের কাজ ছিল দারুণ। চামড়া আর কাগজের মুখোশ, নকশা আঁকা বাঁশের পাত্র, নানান ডিজাইনের বাতিকের কাজ করা কাপড়—এই সব বানিয়ে এনে কয়েক মাস অন্তর অন্তর বিক্রি করত জাভায়। ভালো ডিমান্দ ছিল ওর হাতের কাজের, শিল্প—দ্রব্যের। এই ভাবেই চালাত খরচ, আমার তাই মনে হয়। জাকার্তার মাঝিদেরও তাই ধারণা।

    —হুম। মামাবাবু ফের আনমনা হয়ে ভাবেন কিছু। এরপর একসময় জিজ্ঞেস করেন মিকিকে, তুমি দেশে ফিরছ কবে?

    —এই পনেরো—কুড়ি দিন বাদে।

    —তারপর থাকবে কিছুদিন দেশে।

    —থাকব। অন্তত মাস তিনেক। বাড়িঘর সারানো, চাষবাসের কাজ আছে।

    মামাবাবু বললেন, শোনো মিকি, মাসখানেক বাদে আমি সিঙ্গাপুর যাব একটা কাজে। আমরা তিনজনেই যেতে পারি। গেলে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই। তুমি সুমাত্রা মানে আন্দালাসে থাকো কোথায়?

    —সুমাত্রার দক্ষিণ—পুবে পালেমবাং নামে একটা ছোট শহরের কাছে আমার গ্রাম।

    —সিঙ্গাপুর থেকে তোমার সঙ্গে যোগাযযাগ করব কীভাবে? টেলিফোন বা টেলিগ্রাম করলে?

    মিকি বলে টেলিফোন তো নেই আমার বাসায়। তবে গ্রামের পোস্ট অফিসে টেলিফোন করে আমায় কোনো খবর দিতে বললে জানিয়ে দেবে আমায়। হা টেলিগ্রাম করলে পাব।

    জানতাম যে সিঙ্গাপুরে মামাবাবুর একটা কনফারেন্স আছে ডিসেম্বরের শেষে। সঙ্গে সুনন্দও যাচ্ছে। কথার ভাবে মনে হল আমাকেও হয়তো সঙ্গে নেবেন। মনে মনে আমি পুলকিত। কিন্তু এরপরেই মামাবাবুর কথা শুনে আমি ও সুনন্দ চমকাই।

    —বুঝলে মিকি, আমি ওই বাস্তেন দ্বীপে একবার যেতে চাই। দেখব ওখানকার গাছপালা। তুমি পারবে না আমাদের গাইড হয়ে নিয়ে যেতে? সেই কদিনের জন্য তোমার যা প্রাপ্য আমি দেব। কিন্তু তোমার হেল্প চাই। আমরা তো চিনি না ওদেশ। তুমিই নৌকা ভাড়ার ব্যবস্থা করবে। খাওয়া থাকা ইত্যাদি সব খরচ আমার। দ্বীপটার গাছপালা আমার দারুণ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। অত কাছে গিয়েও স্বচক্ষে ওই দ্বীপ না দেখে এলে ভারি আপশোস হবে।

    সুনন্দ চিড়বিড়িয়ে ওঠে, সিঙ্গাপুর থেকে ফিরেই যে আপনাকে গোয়ায় যেতে হবে অল ইন্ডিয়া জুওলজিকাল সোসাইটির কনফারেন্সে। একটা সেশনে আপনি প্রিসাইড করবেন। কথা দিয়েছেন।

    —যাব না গোয়া। ওদের জানিয়ে দেব। মামাবাবু নির্বিকার।

    শুনে সুনন্দ থ। আমিও। মামাবাবু তো এমন কথার খেলাপ করেন না। আমার মনে হল যে বাস্তেন আইল্যান্ড যাবার প্ল্যান মোটেই গাছগাছড়া দেখার লোভে নিছক শখের ভ্রমণ নয়। মামাবাবুর স্বভাব জানি। অন্য কোনো গোপন উদ্দেশ্য আছে। এই নিয়ে এখন প্রশ্ন করলে আসল কারণ ভাঙবেন না। পরে হয়তো নিজেই বলবেন কারণটা।

    —কি মিকি যাবে নিয়ে? মামাবাবু ফের অনুরোধ করেন সাগ্রহে।

    প্রস্তাব শুনে মিকি কেমন মিইয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলে, দশ বছরেরও আগে গিয়েছিলাম ওই দ্বীপে। আর যাইনি ওর কাছ দিয়ে। ওখানকার ছোট দ্বীপগুলো তেমন চিনি না আমি।

    মামাবার মিকির দ্বিধা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, তা লাগুক সময় খুঁজতে। দু—চার দিন নষ্ট হলে আমার ক্ষতি নেই। দ্বীপটায় পা দিলে চিনতে পারবে?

    —তা পারব। দ্বীপের কয়েকটা চিহ্ন মনে আছে।

    —ব্যস ব্যস তাহলেই হল।

    মিকি বলে, পালেমবাংয়ে আমার চেনা একজনের নৌকা আছে। লামপুং বন্দরে তার নৌকা থাকে। ভাড়া খাটে। তাকে বললে সে ঠিক রাজি হয়ে যাবে তার নৌকা ভাড়া দিতে।

  • কেল্লাপাহাড়ের গুপ্তধন

    কেল্লাপাহাড়ের গুপ্তধন

    অজেয় রায়

    [book]

    এক

    চৈত্র মাস। রতন এসে প্রস্তাব দিল, চল, কেওঞ্ঝরগড় বেড়িয়ে আসি। ছোটকাকার বাড়ি।

    রতন ও আমি ছেলেবেলার বন্ধ। ও ভতত্তের ছাত্র, আপাতত গবেষণা করছে। আমার বিষয় প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস। আমিও গবেষণা করছি একটি ফেলোশিপ পেয়ে—প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে।

    কেওঞ্ঝর উড়িষ্যার শহর এইটুকুই জানতাম, তার বেশি কিছু না। তাই প্রথমটা একটু গাঁইগুঁই করছিলাম। রতন তাড়া দিয়ে বলল, চ চ, প্রাগৈতিহাসিক! শুনেছি জায়গাটা দারুণ। যাসনি তো কখনও। দুজনেরই খোরাক মিলবে। ওখানে প্রচুর পাহাড়—জঙ্গল। ছোট বড় পুরনো মন্দির আর মূর্তির ছড়াছড়ি। আমিও ধারে—কাছের খনিগুলো দেখে নেব। আর কাকা কাকিমা দুজনেই গ্র্যান্ড লোক, বুঝলি।

    দিন কয়েকের মধ্যেই কেওঞ্ঝরগড় গিয়ে হাজির হলাম। রতনের কাকা মিস্টার দত্তকে দেখে প্রথমে একটু ঘাবড়েছিলাম। বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছর, লম্বা ভারিক্কি সুপুরুষ চেহারা, রঙ টকটকে ফরসা। মাথায় কাঁচাপাকা চুল, খুব কম কথা বলেন। নাম করা এনজিনিয়ার।

    প্রথম দিন পরিচয় হবার পর আমায় বলেছিলেন, প্রতাপাদিত্য চৌধুরী। বাঃ, বেশ নাম তো তোমার।

    কেমন ইতিহাসের গন্ধ আছে, তাই না?রতন পাশ থেকে টিপ্পনী কাটে। মিঃ দত্ত একটু হাসেন। ব্যস, আর কথাবার্তা হয়নি তাঁর সঙ্গে। খুব ব্যস্ত মানুষ, তবে সাদাসিধে।

    কাকিমা অবশ্য ভারি আমুদে। আমাদের পেয়ে মহা হৈ—চৈ জুড়ে দিলেন। চট করে জেনে নিলেন, আমি কী কী খেতে ভালবাসি। তিনি খানিক আমাদের সঙ্গে আড্ডা দেন, আর খানিক রান্নাঘরে ঢোকেন। এই চলল তার রুটিন।

    আসলে রতনকে এঁরা ভীষণ ভালবাসেন। এঁদের ছেলেপুলে নেই। রতনকে দেখেন ছেলের মতন। রতন সুযোগ পেলেই কাকার কাছে বেড়াতে আসে। তবে এবার এসেছে। অনেক দিন পরে। তাই খাতির—যত্নটা কিঞ্চিৎ বেশি।

    কেওঞ্ঝরগড় আসার পর দ্বিতীয় দিন সকালে কাকাবাবুর কোয়ার্টারের সামনে লনে পায়চারি করছি আমি ও রতন, এমন সময় হঠাৎ এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন সামনে। শ্যামবর্ণ, নাদুসনুদুস মাঝারি হাইট। গোলগাল হাসি হাসি মুখ, মাথার সামনের দিকে একট টাক। নীল সার্ট ও সাদা ফুলপ্যান্ট পরা। ঝুঁকে পড়ে রতনের হাত আঁকডে ঝাঁকিয়ে বললেন—গ্ল্যাড টু মিট ইউ। এরপরই আমার সঙ্গে একদফা হ্যান্ডশেক।

    —বস মানে দত্ত সাহেব বললেন, আপনাদের একটু ঘুরিয়ে—টুরিয়ে দেখাতে, হেল্প করতে। তারপর রতনের মুখের পানে তাকিয়ে—আপনি বুঝি দত্ত সাহেবের ভাইপো?, হুঁ ঠিক। চেহারায় ভারি মিল।

    এমন হুড়মুড়িয়ে কথা বলছিলেন ভদ্রলোক যে রতন থতমত খেয়ে বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনি?

    আমি? আমি নন্দদুলাল বোস।

    ভদ্রলোক আমাদের তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে জরিপ করতে করতে বেশ সজোরে বিড়বিড় করে চললেন—হুঁ, পঁচিশ ছাব্বিশের বেশি নয়…এ্যাট লিস্ট দশ বছরের সিনিয়ার হব…অতএব ব্রাদার এবং তুমি! কি, আপত্তি আছে?

    খানিকক্ষণ সময় লাগল হেঁয়ালি বোধগম্য হতে। তারপর বলে উঠলাম, না, না, আপত্তির কি? নিশ্চয় তুমি বলবেন। ভদ্রলোক খুশিতে উজ্জ্বল হন। রতন মিটমিটিয়ে দুষ্টু হেসে বলল, আর আমরা যদি ডাকি বোসদা, আপত্তি আছে?

    সার্টেনলি নট।

    বোসদার সঙ্গে দারুণ জমে গেল। পরে জেনেছিলাম উনি কেওঞ্ঝরগড়ে এসেছেন মাত্র দু—বছর। বিয়ে করেছেন বছর তিনেক, তবে ফ্যামিলি, মানে স্ত্রী, থাকেন দেশের বাড়ি বর্ধমানে। বোসদা এখানে থাকেন একা।

    জায়গাটা সত্যি সুন্দর। পুরনো আমলের ছোট্ট শহর। দেশীয় রাজার রাজধানী ছিল। শহরের চারপাশ পাহাড় ও জঙ্গলে ঘেরা। কলকাতা থেকে এসে ভারি আরাম লাগে।

    মিস্টার দত্তর গল্প করার ধাত নয়, তবে নজর ঠিক আছে। একদিন চা খাচ্ছি, এমন সময় সামনে এসে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কেমন বেড়াচ্ছ? বোস সব দেখাচ্ছে তো?

    বললাম, নতুন আর পুরনো দুটো রাজপ্রাসাদ দেখেছি। এবার জগন্নাথ মন্দির দেখতে যাব। ধারে—কাছে নাকি অনেক প্রাচীন মন্দির আছে?

    মিস্টার দত্ত বললেন, আছে বৈকি। উড়িষ্যা হচ্ছে মন্দির আর মূর্তির দেশ। পুরী, কোনারক, ভুবনেশ্বরের কথা ছেড়ে দিলেও আমি ঘুরতে ঘুরতে দেখেছি কত অজানা ছোট্ট গ্রামে কী সুন্দর মন্দির আর বিগ্রহ। মাঠে—ঘাটে পাওয়া যায় কত মূর্তি। বিশেষ করে পাথরে তৈরি! সামান্য দামে লোকে সে সব বেচে দেয়। আমার ড্রইংরুমে যে পাথরের যক্ষমূর্তিটা রয়েছে ওটা এক ওভারসিয়ার আমায় প্রেজেন্ট করেছে। কী সুন্দর না?

    সেই দিনই গেলাম জগন্নাথ মন্দির দেখতে। কে জানত সেখানে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে আছে এক চমক।

    আমি ও রতন মন্দির দেখছি। দেওয়ালের গায়ে মূর্তি দেখতে দেখতে ঊর্ধ্ব মুখে মন্দিরকে পাক দিচ্ছি। ঠিক একই ভাবে আর একজন ঘাড় উঁচু করে এলো উলটো দিক থেকে। তার মুখ দেখতে পাচ্ছি না। রঙ কালো। বেশ লম্বা। কেঁকড়া চুল, সার্ট ও ফুলপ্যান্ট পরনে, জোয়ান চেহারা।

    সে মখ ফেরাতেই চমকে রতনকে খোঁচা মারলাম—দেখ, ডাকু।

    আগন্তুকের কানে আমার কথা গিয়েছিল। সে পিটপিটিয়ে আমাদের দিকে চেয়ে দেখল কয়েক সেকেন্ড। তারপর লাফাতে লাফাতে এসে—অ্যাঁ, তোরা? বলে জাপটে ধরল দুজনকে।

    উঃ কী গায়ে জোর। দম বন্ধ হবার যোগাড। বলি—ছাড় ছাড। তুই এখানে কোত্থেকে?

    ডাকুর সঙ্গে এমন যোগাযোগ হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি। ওর সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার আশাই মুছে গিয়েছিল মন থেকে। ও ছিল ইস্কলে একটানা পাঁচ বছর ধরে আমাদের দুজনের সহপাঠী। পড়াশুনায় মাঝারি, কিন্তু দারুণ ফুটবল খেলত, আর ডানপিটেমিতে ছিল এক নম্বর ওস্তাদ। ক্লাস নাইনে পড়তে পড়তে ও স্কুল ছেড়ে দেয়। কারণ ওর বাবার আকস্মিক মৃত্যু। তখন ডাকুরা সব ভাইবোন মা—র সঙ্গে কলকাতা ছেড়ে ওদের দেশের বাড়ি মেদিনীপুরে চলে যায়। আর দেখা হয়নি। প্রথমে কয়েকবার চিঠিপত্র লেখালেখি হয়েছে। ক্রমে তাও বন্ধ হয়ে গেছে।

    রতন বলল, হ্যাঁ রে তুই আছিস কেমন? এখানে কী করছিস?

    ডাকু ম্লানমুখে বলল, আছি এক রকম। টিকে আছি। এখানে এসেছি চাকরি করতে।

    কী চাকরি? কদিন হল?

    সামান্য চাকরি ভাই। কেরানিগিরি। দুমাস কেওঞ্ঝরগড়ে এসেছি। উড়িষ্যায় আছি পাঁচ বছর। আগে ছিলাম জাজপুরে। এখানে কোম্পানি একটা নতুন ব্রাঞ্চ খুলেছে, তাই ট্রান্সফার হয়ে এসেছি। বুঝলি, স্কুল ফাইনালের পর আর তো লেখাপড়া এগুল না। আমার গাঁয়ের কাছে কলেজ নেই। শহরে হোস্টেলে থেকে পড়া সম্ভব নয়। তাই দেশেই ছিলাম। যা। সামান্য জমিজায়গা আছে, চাষ—বাস দেখতাম। কিন্তু তাতে কি সংসার চলে? তখন আমার এক আত্মীয় এই চাকরিটা জুটিয়ে দিল। মাইনে কম বলে দুঃখ নেই, কিন্তু বসে বসে একঘেয়ে হিসেব কষতে অসহ্য লাগে। ছোটবেলায় ভাবতাম বড় ফুটবলার হব, হল না। ভাগ্যে। স্কুল ফাইনাল পাস করে নেভিতে ঢুকতে চাইলাম, বাড়িতে কান্নাকাটি করে দিলে আটকে। এখন এই করছি।—

    বড় কষ্ট হল। জানি তো কী ছটফটে প্রাণশক্তি ভরা দুরন্ত ছেলে ছিল ডাকু। বেচারা।

    ডাকু একটু হেসে বলল, তবে একদম ঘেঁতিয়ে যাইনি। সুযোগ পেলেই শিকার করি। বাবার বন্দুকটা আছে। কয়েকটা বড় জানোয়ারও মেরেছি।

    তিনজনে ফিরলাম। বোসদা ডাকুর আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বললেন, ব্রাদার ইটি

    রতন বলল, শ্রীযুক্ত শান্তসুবোধ শাসমল ওরফে ডাকু। আমাদের ইস্কুলের বন্ধ। এখানে চাকরি করে।

    ডাকু কেন? বোসদা জানতে চাইল।

    অসম্ভব ডানপিটে ছিল কিনা, তাই স্কুলে ওই খেতাব পায়। বলল রতন।

    বোসদা ডাকুর দিকে চেয়ে বললেন, হুঁ, চেহারাটা কিঞ্চিৎ গুণ্ডে গুণ্ডো বটে। কিন্তু ব্রাদার, এ ব্যক্তি লোক খারাপ নয়। হাসিটি ভারি মিষ্টি।

    আরও দুটো দিন ডাকু আমি আর রতন প্রাণভরে আড্ডা দিলাম। মাঝে মাঝে বোসদাও যোগ দেন। পুরনো দিনের কত গল্প হয়। কত মজার ঘটনা, দুষ্টুমির কথা। কাছাকাছি কী কী দেখতে যাব প্ল্যান করি। এমনি করেই হয়ত আমাদের বাকি দিনকটা কেটে যেত, যদি না রতনের কাকা দেব—বাড়ির মিউজিয়ামের কথা শোনাতেন। কারণ সেই মিউজিয়াম দেখতে গিয়েই আবিষ্কার হল এক রহস্যের সূত্র, যার ফলে জড়িয়ে পড়লাম এক দারুণ রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারে।

    জাজপুরের কাছে দেবদের প্যালেস। লোকে বলে রাজবাড়ি, তবে ঠিক রাজা নয়—খুব বড় জমিদার, আর খুব পুরনো ফ্যামিলি। এই বাড়িতে দুটো দেখবার জিনিস আছে। এক হল অষ্টধাতুর বিগ্রহ, আরেক হল অস্ত্রশস্ত্রের এক বিরাট সংগ্রহশালা। ছোটকাকা দেবমশাইকে খবর দেওয়াতে তিনি আমাদের সাদর আমন্ত্রণ জানালেন। বলা বাহুল্য, ডাকুকেও আমরা সঙ্গে নিলাম। বোসদারও ইচ্ছে ছিল মিউজিয়াম দেখার, কিন্তু গাড়িতে জায়গা কম; তাছাড়া ব—এর সঙ্গে যাওয়াটাও একটু অস্বস্তিকর, তাই তিনি চেপে গেলেন।

    খুব ভোরে আমরা রওনা হলাম।

    জাজপুর—কেওঞ্ঝর রোড রাস্তাটি ভারি সুন্দর। পিচ বাঁধানো প্রশস্ত সড়ক। আমাদের মোটর চলেছে হু—হুঁ করে। পথের দুপাশে কখনো বিস্তীর্ণ প্রান্তর, কখনো ঝোঁপঝাড়, হালকা জঙ্গল, কখনও বা উঁচু—নিচু বনময় পাহাড়।

    ডাকু এ পথে যাতায়াত করেছে। চিনিয়ে দিল—ডানদিকে দূরে ওই যে উঁচু পাহাড়, ওর নাম টোমকা। এরপরে আসবে মহাগিরি রেঞ্জ।

    মাঝে মাঝে গ্রাম বা ছোট লোকালয় চোখে পড়ে। পথে রামচন্দ্রপুরে একবার থেমেছিলাম আড়মোড়া ভাঙতে। রামচন্দ্রপুর নাকি পুলিশ স্টেশন। কিন্তু ছোট্ট লোকালয়। দেব—বাড়ি পৌঁছলাম বেলা দশটা নাগাদ।

    জাজপুর—কেওর স্টেশন রোড ছাড়িয়ে, পিচ রাস্তা থেকে বেরিয়ে যাওয়া একটা চওডা মেঠো রাস্তা ধরে মাইল দুই ঢুকে এক গ্রামে পৌঁছলাম। দেখে মনে হয় এককালে বেশ বর্ধিষ্ণ ছিল এই গ্রাম। গাছপালার আড়াল থেকে সহসা জেগে উঠল উঁচু পাঁচিলে ঘেরা এক প্রকাণ্ড দোতলা অট্টালিকা। লক্ষ করলাম, অট্টালিকার কয়েকটি অংশ খুবই জীর্ণ। বাড়ির চার পাশে পরিখা কাটা ছিল, এখন বুজে গেছে।

    ভিতরে খবর পাঠানো হল।

    বাব খগেশ্বর দেব মহাশয় স্বয়ং বেরিয়ে এলেন আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে। সৌম্যকান্তি দীর্ঘকায় বৃদ্ধ। গায়ের রঙ টক্টকে, মাথা জোড়া টাক, নাকটি টিয়াপাখির মতন। বয়সের ভারে শরীর সামান্য নুইয়ে পড়েছে সামনে।

    কাকাবাবু বললেন একদম সময় পাই না বলে আসা হয়নি অ্যাদ্দিন। তবে মিউজিয়াম দেখার ইচ্ছে ছিল খুবই। এবার এরা ধরল, তাই এসে পড়লাম।

    কাকাবাবু আমাদের পরিচয় দিলেন। বৃদ্ধ হাসিমুখে বললেন, আপনারা এসেছেন, আমার সৌভাগ্য। চলুন ভিতরে।

    বৈঠকখানায় বসে একপ্রস্থ চা—জলখাবার হল। তারপর আমরা খগেশ্বর বাবুর পিছনে পিছনে চললাম মিউজিয়াম দেখতে। আমাদের পিছনে আসছে একজন ভৃত্য। তার হাতে একটা জ্বলন্ত পেট্রোম্যাক্স আলো। দেবমশাইয়ের হাতে এক পেল্লায় চাবি।

    বারান্দার প্রান্তে এক দরজার সামনে থামলেন খগেশ্বরবাবু। দরজায় বিশাল এক তাল ঝলছে। ঝনাৎ করে তালা খুললেন দেবমশাই তারপর ধাক্কা মেরে দরজা ফাঁক করে দিলেন। এবার তিনি পেট্রোম্যাক্সটা চাকরের কাছ থেকে নিজের হাতে নিয়ে ধীর পায়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন। পিছনে আমরা চারজন। ভৃত্যটি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

    লম্বা হলঘর, উঁচু ছাদ, ভিতরে ভ্যাপসা অন্ধকার। বোধহয় অনেক দিন খোলা হয়ান ঘর। পেট্রোম্যাক্সের তীব্র আলোয় চমকে গিয়ে কয়েকটা চামচিকে আমাদের মাথার ওপর ঘুরপাক খেতে লাগল।

    চতুর্দিকে দেওয়াল জুড়ে টাঙানো অজস্র অস্ত্র আর অস্ত্র। দেওয়াল ঘেঁষে লম্বা লম্বা কাঠের টেবিল পাতা। টেবিলগুলোর ওপরেও সাজানো বিচিত্র অস্ত্রের সম্ভার। ছুরি, ছোরা, তরবারি, ঢাল, বর্শা, বল্লম, টাঙ্গি, দাও, কুঠার, গদা, তীর—ধনুক, শিরস্ত্রাণ, বর্ম…। কত কী। ধাতু, কাঠ, হাড় প্রভৃতিতে তৈরি। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট কামান মখ উচ করে বসানো।

    এ সবই পুরনো আমলের অস্ত্রশস্ত্র। এমন বিপুল সংগ্রহ দেখব ভাবতে পারিনি। আলো পড়ে ধাতুর অংশগুলি চকচক করে উঠল।

    খগেশ্বরবাবু একটা টুলের ওপর আলোটা রাখলেন। বৃদ্ধের শরীর টান টান হয়ে উঠল। চক্ষু উজ্জ্বল। গম্ভীরস্বরে বললেন, আমার পূর্বপুরুষ ক্ষাত্রধর্মের চর্চা করতেন। যুদ্ধ ও শিকার। বাহুবলের সাহায্যে তাঁরা ধনসম্পত্তি উপার্জন করেছিলেন। এই সব অস্ত্রের অধিকাংশই আমাদের বংশের কেউ না কেউ ব্যবহার করেছেন। সবই কিন্তু সেই অতীতে। বহু স্মৃতি ও ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই অস্ত্রগুলির সঙ্গে। দেব বংশে অস্ত্রচর্চা আর হয় না, জমিদারিও আর নেই। আমার ছেলে নাতিরা বন্দুক টলুক বিশেষ পছন্দ করেন না। আসেও খুব কম। আমি বুড়ো মানুষ এই শূন্যপুরী আগলাচ্ছি। জানি না আমার পরে এ বাড়ির কী হাল হবে।

    তার কণ্ঠে সাময়িকভাবে একটা বিষণ্ণতার সুর ধরা পড়ে। কিন্তু পরমুহূর্তেই আবার স্বাভাবিক সুর ফিরে আসে, আর উৎসাহ ভরে তিনি আমাদের সব কিছু দেখাতে থাকেন।

    চমৎকার বর্ণনা দেওয়ার ক্ষমতা ভদ্রলোকের। আমরা মাঝে মাঝে প্রশ্ন করি, কখনো বা কোনো জিনিস হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখি।

    হঠাৎ ডাকু একটা ছুরি তুলে নিয়ে মন দিয়ে দেখতে লাগল। ব্যাপারটা খগেশ্বরবাবু লক্ষ করেছিলেন। বললেন, ওটা হানটিং নাইফ। দেশি কারিগরের তৈরি। খুব মজবুত জিনিস।

    এটা কতদিন আছে এখানে? ডাকু প্রশ্ন করল।

    তা অনেক দিন। আমার বাবা ছোটবেলা থেকে এটা দেখেছেন। কে এটা এনেছিল জানি না।

    এই পদ্মফুলটা কেন খোদাই করেছে বাঁটে? জিজ্ঞেস করল ডাক।

    কি পদ্মফুল? আমি ও রতন এবার কাছে গিয়ে ছুরিটা দেখি।

    বাঁটসুদ্ধ প্রায় এক ফুট লম্বা ছুরিখানা। চওড়া ফলা। হাতির দাঁতের বাঁট। বাঁটের ওপর একটা সুন্দর ছোট পদ্মফুলের নকশা খোদাই করা।

    দেবমশাই ডাকুর হাত থেকে ছুরিটা নিয়ে কারুকার্যটি দেখলেন। তারপর বললেন, খেয়াল—খুশিমতো নকশা করেছে হয়তো। কিংবা কারিগরের নিজস্ব ছাপ হতে পারে, মানে ট্রেডমার্ক।

    ও। ডাকু ছুরি রেখে দিল একটু অন্যমনস্কভাবে।

    ওই সামান্য ছুরি সম্বন্ধে আমাদের বিশেষ আগ্রহ ছিল না। কত বড় বড় অদ্ভুত আকৃতির অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে, সেগুলোর ওপরই আমাদের বেশি নজর।

    ঘণ্টা দুই পর আমাদের মিউজিয়াম দেখা শেষ হল। ঘর থেকে বেরিয়ে আসছি, এমন সময় কাকাবাবু বললেন, দেবমশাই আপনাদের মন্দিরের বিগ্রহটি একবার দেখাবেন? খুব নাম শুনেছি।

    দেবমশাই থমকে দাঁড়ালেন। তার মুখ বিমর্ষ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে বললেন, খবরটা বোধহয় আপনাদের ওদিকে পৌঁছায়নি এখনো। সমস্ত অলংকার সমেত আমাদের বিগ্রহটি চুরি গেছে।

    সে কী? কবে? কাকা বলে উঠলেন। আমরাও অবাক।

    মাত্র দ—দিন আগে। চুরি নয়, ডাকাতি। চার—পাঁচজন লোক এসেছিল রাতে। মিন্দরের প্রহরীকে অতর্কিতে আঘাত করে বেঁধে ফেলে, মন্দিরের দরজা ভেঙে ঢুকে ভিতরের যাবতীয় দামি জিনিস লট করেছে। গৃহ—দেবতা বিগ্রহ হারিয়েই বেশি কষ্ট পেয়েছি। পুলিশ অনুসন্ধান করছে। তিন হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছি শুধু বিগ্রহের জন্যে। এখন ভাগ্য।

    তিন হাজার টাকা, শুধু বিগ্রহের জন্যে? ডাকু চোখ বড় বড় করে বলে।

    হ্যাঁ। যদি কেউ উদ্ধার করে দেয়। গৃহ—দেবতাকে ফিরে পাওয়াই আমার সবচেয়ে বং কামনা।

    আমরা মনে মনে লজ্জিত হলাম। সত্যি, ভদ্রলোক একবারও বুঝতে দেনান যে এত মন খারাপ। দিব্যি হাসিমুখে সব দেখালেন।

    মিস্টার দত্ত বললেন, ছি ছি, এখন আপনাকে বিরক্ত করা উচিত হয়নি। জানতাম না কিছু।

    ভদ্রলোক যদিও কথাটা উড়িয়ে দিলেন, আমরা তার মনের আসল ভাবটা আন্দাজ করে তাঁকে আর বিরক্ত না করে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম।

  • ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়

    ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়

    জসীম উদ্‌দীন

    [book]

    ‘ঠাকুরবাড়ির আঙ্গিনায়’ পল্লীকবি জসিম উদ্দীনের স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ। গ্রন্থটির প্রকাশিকা নন্দিতা বসু; গ্রন্থপ্রকাশ, ৬-১ রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট, কলিকাতা -৯। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন কানাই পাল। মুদ্রাকর কার্তিকচন্দ্র পাণ্ডা; মুদ্রণী, ৭১ নং কৈলাসবোস ষ্ট্রীট, কলিকাতা ৬। গ্রন্থটির উৎসর্গপত্রে কবি লিখেছেলেন—

    আমার ছাত্রজীবনের বন্ধু—

    বিনয়েন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

    বীরেন ঘোষ

    বীরেন ভঞ্জের

    করকমলে

    জসীম উদ্‌দীন

    ‘ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়’ ফুটে উঠেছে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের চোখে তিন মহীরূহের চিত্র— বটবৃক্ষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তুলিতাত্ত্বিক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম, ঝর্ণার মত চঞ্চল কাজী নজরুল ইসলাম। আলোচনায় উঠে এসেছেন আরও অনেকে, এবং কবি জসিম উদ্দীনের স্ট্রাগলিং সময়ের গল্পও।

    কলিকাতায় পড়াশোনা করছিলেন জসীম উদ্দীন। এমনসময় তার সাথে পরিচয় হয় ঠাকুরবাড়ির অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র মোহনলালের। এই পরমসুহৃদ মোহনলালই তাকে নিয়ে যান রবীন্দ্রনাথেরর কাছে, পরিচয় করিয়ে দেন তাকে।

    যে কবির কবিতা, গল্প আর উপন্যাস এতকাল পড়ে এসেছেন এবার তারঁ সান্নিধ্য পাচ্ছেন তা তরুণ জসীম উদ্দীনকে আন্দোলিত করে, অনুপ্রাণিত করে সাহিত্য চর্চায়। রবিঠাকুরের শান্তিনিকেতন আর ঠাকুরবাড়িতে যাতায়াত যেন অনেকটা নিয়মিত হয়ে যায় তরুণ কবি জসীম উদ্দীনের জন্য। ঠাকুরবাড়িতে ঘরভাড়া নিয়ে দীর্ঘকাল কাটান তিনি।

    রবীন্দ্রনাথ জসীম উদ্দীনকে কাব্য রচনায় কিভাবে প্রভাবিত করেছেন তার সহজ-সরল অথচ অতিমুগ্ধকর বর্ণনা রয়েছে এই বইতে।

    ঠাকুরবাড়ির আরেক জিনিয়াস অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথেও জসীম উদ্দীনের বেশভাল সস্পর্ক গড়ে ওঠে। কবি তার সংগৃহীত পল্লীগীতি, পালাগান প্রায়শই অবনীন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ আর গগনেন্দ্রনাথকে শোনাতেন। আর তাঁরাও এই তরুণটিকে স্নেহের চোখে দেখতেন। “নকশিকাঁথার মাঠ” রচনায় অবনীন্দ্রনাথের প্রভাব জসীম উদ্দীন অবলীলায় কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন। অবন ঠাকুরের সাহচর্য জসীম উদ্দীনের অভিজ্ঞতার ঝুলিকে সুসমৃদ্ধ করেছে।

    জসীম উদ্দীন রাতারাতি কবি হিসেবে খ্যাতি পাননি। তাকেও অনেক সংগ্রাম করে নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়েছে। স্কুল ছাত্র থাকাকালে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলিকাতায় চলে এলেন জসীম উদ্দীন। উদ্দেশ্য ছিল কবি হবেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে হলেন হকার। অচেনা, অজানা কলিকাতায় পত্রিকা ফেরি করে দিন কেটেছে কবির। সেই কাব্যচর্চা, গদ্যচর্চার সংগ্রামকে জসীম উদ্দীন কখনই ভুলতে পারেননি—যার প্রমাণ সেইসব দিনগুলোর কথা অনেকবার তিনি লিখেছেন বইতে।

    ১৯৩১-১৯৩৭ সাল দীর্ঘ ৬ বছর। এই সময়ে পুরোটা বেকার ছিলেন জসীম উদ্দীন। দিনরাত এখানে সেখানে চাকরির আবেদন করে যাচ্ছেন অথচ কাজ হচ্ছে না। কলিকাতার রিপন কলেজ বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে বাংলার শিক্ষক পদে আবেদন করলেন। কিন্তু কাজ হ’ল না লবিং নেই বলে। উপায়ন্তর না দেখে গেলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। রবিঠাকুর মৃদু সুপারিশনামা লিখে দিলেও কাজ হ’ল না, কেননা যাকে জসীম উদ্দীনের বদলে নেয়া হ’ল তার পক্ষে আগেই কবিগুরু সুপারিশ করেছিলেন। যাইহোক, রবীন্দ্রনাথের সুপারিশেই তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-গবেষকের পদটা পেলেন বলা চলে।

    আমরা জানি, জসীম উদ্দীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। কিন্তু কিভাবে পেলেন সেই চাকরি?

    তখন ঢাবির ভিসি স্যার এফ রহমান। তার কাছে গেলে তিনি সরাসরি জসীম উদ্দীনকে বললেন, জসীম উদ্দীন যদি স্বনামধন্য সাহিত্যিক অধ্যাপক বা রবীন্দ্রনাথের সুপারিশ আনতে পারেন তবে কাজ হতে পারে।

    প্রথমেই, খুশি মনে তিনি গেলেন তার নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় কলিকাতায়। যে দুই নামী অধ্যাপক তাকে পছন্দ করতেন তারা তার হয়ে সুপারিশ করতে রাজি হলেন না কারণ, তাতে হিন্দু চাকরিপ্রার্থীরা ক্ষেপে যেতে পারে বলে তাদের বিশ্বাস! এবার তিনি গেলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। রবিঠাকুর সাথে সাথে সুপারিশনামা লিখে দিলেন আর তাতেই ঢাবিতে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে পারলেন জসীম উদ্দীন—রবীন্দ্রনাথ ও ঠাকুরবাড়ি কেন্দ্রীক এমনই নানা ঘটনাকে উপজীব্য করে একেবারে সাদামাটা ভাষায় অথচ অতিসুখপাঠ্য করে জসীম উদ্দীন লিখেছেন ‘ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়’।

    এবার বলি বইতে নজরুলের প্রসঙ্গে,

    জসীম উদ্দীন যখন কলিকাতায় পত্রিকা ফেরি করতেন, তখন তার সাথে পরিচয় হয় স্বভাবে চিরশিশু নজরুলের সাথে। তার ‘কবিভাই’ নজরুলকে অনেক কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল জসীম উদ্দীনের। আমৃত্যু তিনি স্বভাবে চিরশিশু নজরুলের সাহচর্যে থাকার চেষ্টা করেছেন।

    এবার আসি লেখনী প্রসঙ্গে,

    জসীম উদ্দীনের কী গদ্য, কী পদ্য সবেতেই এক সহজিয়া মনোমুগ্ধকর ছন্দে লেখা আবর্তিত হয়—তার ব্যতিক্রম ‘ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়’ও হয়নি।

    বেশ সুখপাঠ্য গ্রন্থটির প্রথম অধ্যায়ের নাম ‘রবি তীর্থে’। এই অধ্যায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লেখা। ‘রবি তীর্থে’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন, কাজ, ও ব্যক্তিত্বকে এক নতুন আলোকে দেখতে পাবেন। বিশ্বকবি কোন লেখা মনোমত হওয়ার আগে পর্যন্ত বারবার সংশোধন ও পরিবর্তন করেন, নাটক মঞ্চায়নের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সংলাপ আর কাহিনীতে পরিবর্তন করতে থাকেন সবচেয়ে ভালভাবে কাজটি করার জন্য, ভোরে উঠে সারাদিন লেখায় মশগুল থাকেন, আবার তাঁর দর্শন না পেয়ে কোনও দর্শনার্থী ফিরে গেলে মনঃক্ষুণ্ণ হন, সকলের সাথে দেখা এবং কথা বলেন, সাধ্যমত সকলের জন্য করেন, আবার কেউ উপকার পেয়ে কৃতজ্ঞতা জানাতে এলে অবাক হয়ে যান। সাহিত্যের এত দিকে তাঁর বিস্তর পদচারণা, অথচ বিশ্বভারতী আর শান্তিনিকেতনের মত বড় দুটো প্রতিষ্ঠান চালিয়ে গিয়েছেন সফলভাবে। এই বই থেকে জানা যাবে এতরকম কাজ করতে গিয়ে ঠাকুরবাড়ির বাকি সকলের এবং আরও কতজনের কত নীরব ত্যাগ এবং অবদান ইন্ধন জুগিয়েছে।

    বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের নাম ‘অবন ঠাকুরের দরবারে’ এবং তৃতীয় অধ্যায়ের নাম ‘নজরুল’।

    জানলাম অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এবং তাঁর আরও দুই ভাইয়ের সাধনার কথা; ছবি আঁকা নিয়ে তাঁদের দিন রাত পার করে দেয়ার গল্প।

    পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের লেখায় গ্রামবাংলার যে মায়াভরা রূপটা দেখতে পাই, তাঁর লেখায় যে মাটির গন্ধ পাই, সেইরকম মায়া রয়েছে এই বইটা জুড়েও। মিষ্টি সব উপমা, সহজ সরল মুগ্ধতার ভাষা, আর লেখাজুড়ে আপনজনকে নিয়ে লেখার মায়া যে মনের ভেতর থেকে আসা ভালবাসা আর শ্রদ্ধা মিলেই গড়ে উঠেছে— তাতে সন্দেহ হবার অবকাশ নেই।

    পল্লীকবি জসীম উদ্দীন এমন দরদ দিয়ে বইটা লিখেছেন যে কবির লেখনীর জোরে চোখের সামনে ভেসে উঠে শান্তিনিকেতন, রবিঠাকুর আর অবনঠাকুরের বাসভবন, তাদের সৃষ্টিকর্ম। অবনীন্দ্রনাথের জীবনের শেষদিকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির করুণ অবস্থাও কিছুটা উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। তবুও পাঠকের ভাল লাগবে অবন ঠাকুরের একাকীত্বের গল্প।

    শেষে এলেন ‘হাবিলদার কবি’ — নুরু — নজরুল ইসলাম। তাঁর সম্পর্কে জসিম উদ্দীন লিখেছেন পর্বতসম দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে রেখে, আক্ষেপ ঢেকে। বোঝা যায়, শুরুতে নজরুলের চাঞ্চল্যমাখা সব কাহিনীর সাথে বড্ড বেখাপ্পা লাগে তার জীবন্মৃত সমাপ্তি।

    ধুমকেতুর মূল শরীর যদি হয় তিরিশ কিলো লম্বা, তাহলে তার ল্যাজ নাকি বড় হয় সূর্যের ব্যাসের সমান। আমাদের বাংলা সাহিত্যের ধুমকেতু —নজরুলের ক্ষেত্রেও কথাটা খাটে বোধহয়। যা দিয়েছেন, তার তৃপ্তি অপেক্ষা; যা দিতে পারতেন, সেই সম্ভাবনার অকাল মৃত্যুর আপসোসটা অনেক অনেক বেশি। গ্রিক ট্রাজেডির নায়ক।

  • রবীন্দ্র-তীর্থে

    রবীন্দ্র-তীর্থে

    জসীম উদ্‌দীন

    [book]

    রবীন্দ্র-তীর্থে

    এতদিন পরে কিছুতেই ভালমত মনে করিতে পারিতেছি না, কোন সময়ে প্রথম রবীন্দ্রনাথের নাম শুনি। আবছা একটু মনে পড়িতেছে, আমাদের গ্রামের নদীর ধারে দুইটি ভদ্রলোক কথা বলিতেছিলেন।

    একজন বলিলেন, “অমুক কবি কবিতা লিখে এক লক্ষ টাকা পেয়েছেন।” সেই এক লক্ষ টাকার বিরাট অঙ্কের পিছনে কবির নামটি ঢাকা পড়িয়াছিল। তারপর কবির সঙ্গে মনের পরিচয় হইল ‘প্রবাসী’তে তাহার জীবন-স্মৃতি পড়িয়া। অল্প বয়সের সেই কিশোর বেলায় আর একজন কিশোর কবির প্রথম জীবনের কাহিনীর ভিতর দিয়া সেদিন যে মিলন-লতাটি রচিত হইল, তাহাতে ফুল ফুটিয়া গন্ধ ছড়াইয়া আমার সমস্ত জীবন অমোদিত করিয়াছে। কবি কোথায় রেলগাড়িতে বেড়াইতে গিয়াছিলেন, জানালার পথে দৃষ্টি মেলিয়া পথের পাশের প্রতিটি দৃশ্যকে কি ভাবে তিনি সমস্ত অন্তর দিয়া অনুভব করিয়াছিলেন, কোথায় অবস্থান কালে সকাল হইতে দুপুর— দুপুর হইতে সন্ধ্যা সেখানকার প্রতিটি গাছ লতা পাতার দিকে কবি চাহিয়া থাকিতেন, পদ্মানদীতে বোটে বসিয়া মাত্র একবাটি দুধ পান করিয়া সারাদিন তিনি লিখিয়া যাইতেন, এই সব কত যে একনিষ্ঠ ভাবে অনুকরণ করিতাম সে কথা ভাবিলে আজ হাসি পায়।

    তারপর বুঝিয়া না বুঝিয়া কবির বইগুলি যেখান যেখানে পাইয়াছি পড়িয়া গিয়াছি। সব বুঝিতে পারি নাই, কিন্তু ভাল লাগিয়াছে। হয়ত কবির রচনায় যে অপূর্ব সুরের মাদক আছে, তাহারই পরশ আমার অবচেতন মনে প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। এখন রবীন্দ্রনাথের কবিতা পূর্বাপেক্ষা অধিক বুঝিতে পারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হইয়া কয়েক বৎসর কবির কবিতা ছাত্রদের পড়াইলাম, কিন্তু আগের মত কবিতার মাদকতার স্বাদ এখন পাই না। কিছু বোঝা যায় কিছু বোঝা যায় না—যে সব কবিতায় এই আলো-আঁধারীর ছায়ামায়া থাকে—বোধ হয় সেগুলিতে রসউপভোগের একটি অপূর্ব আস্বাদ থাকিয়া যায়।

    তারপর বহুদিন কাটিয়া গিয়াছে। আমার বন্ধুরা কলিকাতায় রবীন্দ্রনাথের ‘ফাল্গুনী’ ‘অচলায়তন’ প্রভৃতির অভিনয় দেখিয়া আসিয়া আমার কাছে গল্প করিয়াছেন। আমি : একান্ত মনে সেই সব গল্প শুনিয়াছি। কতবার যে কবিকে স্বপ্নে দেখিয়াছি তাহার ইয়ত্তা নাই। এই ভাবে বহুদিন কাটিয়া গিয়াছে।

    পল্লীগ্রাম ছাড়িয়া একবার কলিকাতা আসিয়াছি। পল্লী-বালকের কল্পনাও সেই কলিকাতা অপূর্ব রহস্যে জীবন্ত হইয়া রহিয়াছে। শুনিতে পাইলাম, ঠাকুরবাড়িতে ‘শেষ বর্ষণ’ অভিনয় হইবে। আমি আট আনা দিয়া সর্বনিম্নের একখানা টিকিট কিনিয়া নির্দিষ্ট আসনে গিয়া উপবেশন করিলাম। তখনও অভিনয় আরম্ভ হয় নাই।

    অভিনয়-মঞ্চটি একটি কালো পর্দায় ঘেরা। তাহার সামনে প্রকাণ্ড হলঘরে দর্শকেরা বসিয়াছে। এই গৃহের সব কিছুই আমার কাছে অপূর্ব রহস্যময় বলিয়া মনে হইল। সামনে পিছনে, এধারে ওধারে, যে দিকে চাহি, আমার মনে হয়, আমি যেন কোন অপূর্ব স্বর্গরাজ্যে আসিয়াছি। আমার সামনের আসনগুলিতে নানা সাজ সজ্জায় সজ্জিত হইয়া চারিদিক নানা গন্ধচুর্ণে আমোদিত করিয়া কলিকাতার অভিজাত শ্রেণীর মেয়েরা যে কলগুঞ্জন করিতেছিল—আমার মনে হইল, ইহার চাইতে আকর্ষণীয় কিছু আমি আর কোথাও দেখি নাই। সকলের পিছনে বসিয়াছিলাম বলিয়া আমার আরও ভাল লাগিতেছিল। পিছন হইতে আমি সকলকেই দেখিতে পাইতেছিলাম। যদি বেশী দামের টিকিট কিনিয়া সামনের আসনে বসিতাম, সেদিন হয়ত আমি কিছুতেই এত খুশী হইতাম না।

    বহুক্ষণ পরে সামনের মঞ্চের পর্দা উঠিয়া গেল। বর্ষাকালের যত রকমের ফুল সমস্ত আনিয়া মঞ্চটিকে অপূর্বভাবে সাজান হইয়াছে। সেই মঞ্চের উপর গায়ক-গায়িকা পরিবৃত হইয়া রবীন্দ্রনাথ আসিয়া যখন উপবেশন করিলেন, তখন আমার সামনে উপবিষ্টা সেই রহস্যময়ীরা চাদের আলোতে জোনাকীদের মতো একেবারে ম্লান হইয়া গেল। গানের পরে গান চলিতে লাগিল। সে কী গান! পুরুষকণ্ঠে মেয়ে কণ্ঠে, কখনও উচ্চগ্রামে উঠিয়া কখনো একেবারে অস্পষ্ট হইয়া সুরের উপরে সুর বর্ষণ হইতে লাগিল। মাঝে মাঝে গানের বিষয়বস্তু অনুসরণ করিয়া মূক অভিনেতারা মঞ্চের উপর দিয়া চলিয়া যাইতেছিল। সুর ছবি আর পুষ্পগন্ধের অপূর্ব সমন্বয়। শ্রবণ-নয়ন-মন মুগ্ধকর অপূর্ব অভিনয়। তখনও ভদ্রঘরের মেয়েরা মঞ্চে দাঁড়াইয়া নৃত্য করিতে অভ্যস্ত হয় নাই। দুটি মেয়ে মাঝে মাঝে দাঁড়াইয়া হাত নাড়িয়া গানের বিষয়বস্তুটি জীবন্ত করিয়া তুলিতেছিল।

    শেষবারের মত একটি মেয়ে শুকতারা হইয়া মঞ্চে আসিয়া দাঁড়াইল। কী অপূর্ব তাহার চেহারা! গানের সুর বাজিয়া উঠিল, “শুকতারা ঐ উঠিল আকাশে।” তারপর ধীরে ধীরে শুকতারা মঞ্চ হইতে চলিয়া গেল। একটি মনোমুগ্ধকর স্বপ্ন-জগৎ যেন আমার সামনে দিয়া চলিয়া গেল।

    এই ভাবে অভিনয় শেষ হইল। দর্শকেরা কেহই হাতে তালি দিল না। যে যাহার এত নীরবে আসন হইতে উঠিয়া চলিয়া গেল। কবি মঞ্চের উপর দাঁড়াইলেন। অনেকে আগাইয়া গিয়া কবিকে প্রণাম করিল। আমিও তাহাদের সঙ্গে এক পাশে আসিয়া দাঁড়াইলাম। কিন্তু কবিকে প্রণাম করিলাম না। এই রবীন্দ্রনাথ— আমারই রবীন্দ্রনাথ। আর দশজনের মত তাঁহাকে প্রণাম জানাইয়া পথের দশজনের মধ্যেই আবার মিশিয়া যাইব, কবির সঙ্গে আমার সম্পর্ক তো এমন নয়। আমি শুধু বদ্ধদৃষ্টিতে কবির মুখের দিকে চাহিয়া রহিলাম। কবি সমাগত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়দের সঙ্গে দু-চারিটি কথা বলিতেছিলেন, কিন্তু তাহার মন যেন কোন সুদূর ধ্যানলোকে মগ্ন। এই দৃশ্য ভাবিতে ভাবিতে আমি আমার আশ্রয়স্থানে ফিরিয়া আসিলাম।

    ইহার পরে কি করিয়া কবির ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমার পরিচয় হইল, তাহা পরে বলিব। আমি এম. এ. পড়িতে কলিকাতা আসিয়া ওয়াই, এম,-সি এ. হোস্টেলে আশ্রয় লইলাম। আমার ‘রাখালী’ আর ‘নক্‌সীকাঁথার মাঠ’ বই দুইখানি ইহার বহু পূর্বেই প্রকাশিত হইয়াছে। কিছু কিছু কবিখ্যাতিও লাভ করিয়াছি। মাঝে মাঝে আমি অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করিতে জোড়াসাঁকো যাই। এই উপলক্ষে ঠাকুর পরিবারের প্রায় সকলের সঙ্গেই আমার পরিচয় হইয়াছে। অবনীন্দ্রনাথের পাশের বাড়ি রবীন্দ্রনাথের। তিনি এখানে আসিয়া মাঝে মাঝে অবস্থান করেন। শান্তিনিকেতন হইতে গানের দল আসে। তাঁহাদের গানে অভিনয়ে সমস্ত কলিকাতা সরগরম হইয়া উঠে। আমার জানা-অজানা কতলোক আসিয়া কবির সঙ্গে দেখা করিয়া যায়। আমি কিন্তু একদিনও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করি না। আমার কবিতার বই দুইখানি বহু অখ্যাত বিখ্যাত সাহিত্যিককে উপহার দিয়াছি। মতামত জানিবার জন্য কতজনের দ্বারস্থ হইয়াছি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে বই পাঠাই নাই।

    তখনকার দিনে রবীন্দ্রনাথ বাংলা দেশের তরুণ সাহিত্যিকদের সমালোচনা করিয়া একটি প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন। তাহাদের পক্ষ লইয়া শরৎচন্দ্র ইহার উত্তর দিয়াছিলেন। নজরুল হইতে আরম্ভ করিয়া বহু সাহিত্যিক নানা প্রবন্ধ লিখিয়া নিজেদের সদম্ভ আবির্ভাব ঘোষণা করিয়াছিলেন। বন্ধুবর অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত কবিতা করিয়া লিখিলেন, সামনে যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পথ রুধিয়া দাঁড়ান তবু আমরা আগাইয়া যাইব। এই আন্দোলনের মাঝখানে রবীন্দ্রনাথ শৈলজানন্দ প্রভৃতি কয়েকজন লেখককে প্রতিভাবান বলিয়া স্বীকৃতি দান করিলেন।

    ইহার কিছুদিন পরে দিলীপকুমার, বুদ্ধদেব বসু রচিত কয়েকটি কবিতা কাঁচি-কাটা করিয়া রবীন্দ্রনাথকে পাঠাইলেন। রবীন্দ্রনাথ সেগুলির প্রশংসা করিলেন। আমি যদিও কল্লোল-দলের একজন, আমার লেখা লইয়া কেহই উচ্চবাচ্য করিলেন না। মনে অভিমান ছিল, আমার সাহিত্যের যদি কোন মূল্য থাকে তবে রবীন্দ্রনাথ একদিন ডাকিয়া আমাকে আদর করিবেন। ইতিমধ্যেই আমি রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুস্পুত্র অবনীন্দ্রনাথের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হইয়াছি। রবীন্দ্রনাথের সামনে উপস্থিত হওয়া এখন আমার পক্ষে সব চাইতে সহজ, তবু ইচ্ছা করিয়াই তাঁহার সামনে উপযাচক হইয়া উপস্থিত হই নাই। কিন্তু আড়াল হইতে যতদূর সম্ভব তাহার খবর লইতেছি।

    সেবার রবীন্দ্রনাথের খুব অসুখ হইল। সারা দেশ কবিব জন্য উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিল। শঙ্কাকুল দেশবাসী অতি আগ্রহের সহিত প্রতিদিন খবরের কাগজে কবির স্বাস্থ্যের খবর লক্ষ্য করিতে লাগিল। জাতির সৌভাগ্য, কবি রোগমুক্ত হইলেন। আরোগ্য লাভ করিয়া কবি কলিকাতা ফিরিয়া আসিলেন। সেটা বোধ হয় ১৯৩০ সন।

    তখন আমার মনে হইল, বয়োবৃদ্ধ এই কবির সম্পর্কে অভিমান করিয়া দূরে থাকিলে জীবনে হয়তো তাঁহার সঙ্গে পরিচয় হইবে না। ক্ষণকালের অতিথি কখন যে ওপারের ডাক পাইয়া আমাদের এই পৃথিবী ছাড়িয়া চলিয়া যাইবেন তাহা কেহ জানে না।

    অবনীন্দ্রনাথের দৌহিত্র মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় আমার বন্ধু। দুই জনে অনেক জল্পনা-কল্পনা করিয়া একদিন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করিতে রওনা হইলাম।

    অবনীন্দ্রনাথের বাড়ি হইতে রবীন্দ্রনাথের ঘর তিন মিনিটের পথও নয়। এই এতটুকু পথ অতিক্রম করিতে মনে হইল যেন কত দূরের পথ যাইতেছি। আমার বুক অতি-আনন্দে দুরুদুরু করিতেছিল। ঘরের সামনে আসিয়া আমাকে অপেক্ষা করিতে বলিয়া মোহনলাল ভিতরে প্রবেশ করিল। আমি দরজার সামনে দাঁড়াইয়া কত কথা ভাবিতে লাগিলাম। আমি যেন কোন অতীত যুগের তীর্থযাত্রী। জীবনের কত বন্ধুর পথ অতিক্রম করিয়া আজ আমার চির-বাঞ্ছিত মহামানবের মন্দিরপ্রান্তে আগমন করিয়াছি। ছবির উপরে ছবি মনে ভাসিয়া আসিতেছিল। এতদিন এই কবির বিষয়ে যাহা ভাবিয়াছি, যাহা পড়িয়াছি, যাহা শুনিয়াছি সব যেন আমার মনে জীবন্ত হইয়া কথা কহিতেছিল। অনেকক্ষণ পরে মোহনলাল আসিয়া আমাকে ভিতরে লইয়া গেল। স্বপ্নাবিষ্টের ন্যায় আমি যেন কোন কল্পনার জগতে প্রবেশ করিলাম। সুন্দর কয়েকখানি ছবি দেওয়ালে টাঙানো। এখানে সেখানে সুন্দর সুপরিকল্পিত চৌকোণা আসন। তাহার উপরে নানা রঙের ডোরাকাটা বস্ত্র-আবরণ। সেগুলি বসিবার জন্য না দেখিয়া চোখের তৃপ্তি লাভের জন্য কে বলিয়া দিবে! এ যেন বৈদিক যুগের কোন ঋষির আশ্রমে আসিয়াছি।

    তখন বর্ষাকাল। কদমফুলের গুচ্ছ গুচ্ছ তোড়া নানা রকমের ফুলদানীতে সাজান। আধ-ফোটা মোটা মোটা কেয়াফুলের গুচ্ছ কবির সামনে দুইটি ফুলদানী হইতে গন্ধ ছড়াইতেছিল। বেলীফুলের দু-গাছি মালা কবির পাশে পড়িয়া রহিয়াছে। মনে হইতেছিল, বাংলা দেশের বর্ষাঋতুর খানিকটা যেন ধরিয়া আনিয়া এই গৃহের মধ্যে জীবন্ত করিয়া রাখা হইয়াছে। চারিধার হইতে সব কিছুই মূক ভাষায় আমার সঙ্গে কথা বলিতেছিল। কবি যদি আমার সঙ্গে কোন কথাই না বলিতেন তবু আমি অনুতাপ করিতাম না। এই গৈরিক বসন পরিহিত মহামানবের সামনে আসিয়া আজ আমার সমস্ত অন্তর ভরিয়া গিয়াছে। সালাম জানাইয়া কম্পিত হস্তে আমি ‘নক্‌সীকাঁথার মাঠ’ আর ‘রাখালী’ পুস্তক দুইখানি কবিকে উপহার দিলাম। কবি বই দুইখানি একটু নাড়িয়া চাড়িয়া আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন, “আমার মনে হচ্ছে তুমি বাংলা দেশের চাষী মুসলমানদের বিষয়ে লিখেছ। তোমার বই আমি পড়ব।”

    প্রথম পরিচয়ের উত্তেজনায় সেদিন কবির সঙ্গে আর কি কি আলাপ হইয়াছিল, আজ ভাল করিয়া মনে নাই।

    ইহার দুই-তিন দিন পরে দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ের মধ্যম ছেলে অধ্যাপক অরুণ সেন আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, “তুমি কবিকে বই দিয়ে এসেছিলে। আজ দুপুরে আমাদের সামনে কবি অনেকক্ষণ ধরে তোমার কবিতার প্রশংসা করলেন। এমন উচ্ছ্বসিতভাবে কারো প্রশংসা করতে কবিকে কমই দেখা যায়। কবি অভিপ্রায় প্রকাশ করেছেন, তিনি তোমাকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যাবেন।”

    পরদিন সকালে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে আসিয়া আমি কবির সঙ্গে দেখা করিলাম। কবি আমার বই দুইখানির প্রশংসা করিলেন। বলিলেন, “আমি শান্তিনিকেতনে গিয়েই তোমার বই দু’খানার উপর বিস্তৃত সমালোচনা লিখে পাঠাব। তুমি শান্তিনিকেতনে এসে থাক। ওখানে আমি তোমার একটা বন্দোবস্ত করে দেব।”

    আমি বিনীতভাবে উত্তর করিলাম “এখানে আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম, এ, পড়ছি। শান্তিনিকেতনে গেলে তো পড়া হবে না।”

    কবি বলিলেন, “ওখান থেকে ইচ্ছে করলে তুমি প্রাইভেটে এম, এ, পরীক্ষা দিতে পারবে। আমি সে বন্দোবস্ত করে দেব।”

    আমি উত্তরে বলিলাম “ভাল করে ভেবে দেখে আমি আপনাকে পরে জানাব।”

    কলিকাতায় আমার সব চাইতে আপনার জন দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করিলাম। তিনি আমাকে কলিকাতা ছাড়িয়া শান্তিনিকেতনে যাইতে নিষেধ করিলেন। তিনি বলিলেন, “কবি যদি এত বৃদ্ধ না হতেন তবে আমি ওখানে যেতে বলতাম। কিন্তু কবি কতকাল বেঁচে থাকবেন, বলা যায় না। এখান থেকে এম, এ, পাশ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা কর। ওখানকার আশ্রয় পাওয়ার সৌভাগ্য দীর্ঘ কাল তোমার না-ও হতে পারে।”

    আমার শান্তিনিকেতন যাওয়া হইল না। ইহার পর কবি আরও বার বৎসর বাঁচিয়াছিলেন। আজ অনুতাপ হইতেছে, এই সুদীর্ঘ বার বৎসর যদি কবির সান্নিধ্য লাভ করিতে পারিতাম, তবে জীবনে কত কি শিখিতে পারিতাম।

    কবি শান্তিনিকেতনে চলিয়া গেলেন। প্রায়-দুই মাস চলিয়া গেল। কবি আমার বই-এর সমালোচনা পাঠাইলেন না। কিন্তু কি ভাষাতেই বা কবিকে তাগিদ দিয়া পত্র লিখিব। বহু চেষ্টা করিয়াও কবিকে লিখিবার মত ভাষা খুঁজিয়া পাই না। মোহনলালকে দিয়া কবিকে পত্র পাঠাইলাম। তখন কবি শান্তিনিকেতনে কি-একটা অভিনয় লইয়া ব্যস্ত। কবি একটা ছোট্ট চিঠিতে মোহনলালকে লিখিয়া পাঠাইলেন, “জসীমউদ্দীনের কবিতার ভাব ভাষা ও রস সম্পূর্ণ নতুন ধরনের। প্রকৃত হৃদয় এই লেখকের আছে। অতি সহজে যাদের লেখবার শক্তি নেই, এমনতর খাঁটি জিনিস তারা লিখতে পারে না।”

    কবির এই কথাগুলি বই-এর বিজ্ঞাপনে ছাপাইয়া সেই সময় মনে মনে খুবই বাহাদুরী অনুভব করিয়াছিলাম। নক্‌সীকাঁথার মাঠ ছাপা হইলে বাংলা দেশের বহু সাহিত্যিক ইহার প্রশংসা করিয়াছিলেন। যাঁহারা বিরুদ্ধ সমালোচনা করিতে প্রস্তুত হইতে ছিলেন, রবীন্দ্রনাথের এই প্রসংসার পরে তাঁহারা আর সে বিষয়ে সাহসী হইলেন না। সাপ্তাহিক সম্মেলনীতে একজন প্রবীণ সাহিত্যিক ‘নক্‌সীকাঁথার মাঠ’-এর সমালোচনার মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রতি কিছু কটাক্ষপাত করিয়াছিলেন, কিন্তু বইখানি যে খারাপ এ কথা বলিতে সাহস পান নাই।

    ইহার পরে রবীন্দ্রনাথ যখনই কলিকাতা আসিয়াছেন, অবসর পাইলেই আমি গিয়া দেখা করিয়াছি। আমাকে দেখিলে কবি তাঁর বিগত কালের পদ্মাচরের জীবন লইয়া আলোচনা করিতেন।

    তখন আমি ‘বালুচর’ বইয়ের কবিতাগুলি লিখিতেছি। ইহার অধিকাংশ কবিতাই ত্রিপদী ছন্দে লিখিত। মাসিকপত্রে ইহার অধিকাংশ কবিতা ছাপা হয়। সমালোচকেরা বলিতে লাগিলেন, “তোমার কবিতা একঘেয়ে হইয়া যাইতেছে। ছন্দ পরিবর্তন কর।”

    একদিন কবিকে এই কথা বলিলাম। কবি বলিলেন, “ওসব বাজে লোকের কথা শুনো না। যে ছন্দ সহজে এসে তোমার লেখায় ধরা দেয়, তাই ব্যবহার কর। ইচ্ছে করে নানা ছন্দ ব্যবহার করলে তোমার লেখা হবে তোতাপাখির বোলের মত। তাতে কোন প্রাণের স্পর্শ থাকবে না।”

    ‘বালুচর’ বইখানা ছাপা হইলে কবিকে একখানি পাঠাইয়া দিলাম। সঙ্গে পত্র লিখিয়া অনুরোধ করিলাম, পড়িয়া আপনার কেমন লাগে অনুগ্রহ করিয়া লিখিয়া জানাইবেন। কবি এ পত্রের কোনও উত্তর দিলেন না। তিনি কলিকাতা আসিলে দেখা করিলাম। কবি বলিলেন, “তোমার বালুচর’ পড়তে গিয়ে বড়ই ঠকেছি হে। ‘বালুচর’ বলতে তোমাদের দেশের সুদূর পদ্মাতীরের চরগুলির সুন্দর কবিত্বপূর্ণ বর্ণনা আশা করেছিলাম। কেমন চখাচখি উড়ে বেড়ায়, কাশফুলের গুচ্ছগুলি বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু কতকগুলি প্রেমের কবিতা দিয়ে তুমি বইখানাকে ভরে তুলেছ। পত্রে এ কথা লিখলে পাছে রূঢ় শোনায় সে জন্য এ বিষয়ে কিছু লিখি নি। মুখেই বললাম।”

    ইহার পরে রবীন্দ্রনাথ যখন বাংলা কবিতার সংকলন বাহির করেন, তখন এই ‘বালুচর’ বই হইতেই ‘উড়ানীর চর’ নামক কবিতাটি চয়ন করিয়াছিলেন।

    ‘রাজারানী’ নাটকখানি নূতন করিয়া লিখিয়া রবীন্দ্রনাথ ইহার ‘তপতী’ নামকরণ করিলেন। একদিন সাহিত্যিকদের ডাকিয়া তাহা পড়িয়া শোনাইলেন। সেই সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। একই অধিবেশনে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরিয়া কবি সমানে নাটকখানা পড়িয়া গেলেন। বিভিন্ন চরিত্রের মুখে বিভিন্ন সংলাপগুলি কবির কণ্ঠে যেন জীবন্ত হইয়া উঠিতেছিল। এই নাটক মহাসমারোহে কবি কলিকাতায় অভিনয় করিলেন। কবি রাজার ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন। সত্তর বৎসর বয়সের বৃদ্ধ কি করিয়া প্রেমের অভিনয় করিবেন, তাঁহার সাদা দাড়িরই বা কি হইবে, অভিনয়ের পূর্বে এই সব ভাবিয়া কিছুই কূলকিনারা পাইলাম না। কিন্তু অভিনয়ের সময় দেখা গেল, দাড়িতে কালো রঙ মাখাইয়া মুখের দুই পাশে গালপাট্টা তুলিয়া দিয়া কবি এক তরুণ যুবকের বেশে মঞ্চে আসিয়া দাঁড়াইলেন। ‘তপতী’ নাটকে রাজার ব্যর্থ প্রেমের সেই মর্মান্তিক হাহাকার কবির কণ্ঠমাধুর্যে আর আন্তরিক অভিনয়নৈপুণ্যে মঞ্চের উপর জীবন্ত হইয়া উঠিয়াছিল। এই নাটকে রাজার ভূমিকাটি বড়ই ঘোরালো। নাটকের সবগুলি চরিত্র রাজার বিপক্ষে। সেই সঙ্গে সাধারণ দর্শক-শ্রোতার মনও বাহির হইতে দেখিতে গেলে রাজার উপর বিতৃষ্ণ। রাজা যে রানীর ভালবাসা পাইল না, তারই জন্য যে রাজার সব কাজ নিয়ন্ত্রিত হইতেছিল, একথা সাধারণ দর্শক শ্রোতা সহজে বুঝিতে পারে না। হয়ত সেইজন্য ইহা বাংলার সাধারণ রঙ্গমঞ্চে বেশীদিন টিকিল না। কিন্তু যাঁহারা গভীরভাবে এই নাটকটি আলোচনা করিয়াছেন, তাঁহারা লক্ষ্য করিবেন, রাজার ব্যর্থ জীবনের হাহাকারের মধ্যে নাটকলেখকের দরদী অন্তর ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। এই ব্যাপারটি কবির অভিনয়ে জীবন্ত হইয়া উঠিয়াছিল।

    এই নাটক অভিনয়ের সাত-আট দিন আগে কবি দলবল লইয়া শান্তিনিকেতন হইতে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে আগমন করিলেন। প্রতিদিন মহাসমারোহে নাটকের মহড়া চলিল। বন্ধু মোহনলালের সঙ্গে লুকাইয়া আমি এই নাটকের মহড়া দেখিতে যাইতাম। তাহাতে লক্ষ্য করিতাম, নাটকটি অভিনয়ের উপযোগী করিতে কবি বিভিন্ন ভূমিকাগুলিকে কেবলই বদলাইয়া চলিয়াছেন। কবির নাটকে যাঁহারা অভিনয় করিতেন তাহাদিগকে বড়ই বিপদে পড়িতে হইত। যে পর্যন্ত অভিনেতা মঞ্চে গিয়া না দাঁড়াইতেন, সে পর্যন্ত ভুমিকার পরিবর্তন হইতে থাকিত। মোহনলালের নিকট শুনিয়াছি, কোন অভিনেত্রী তাহার নির্দিষ্ট ভূমিকা বলিতে মঞ্চে প্রবেশ করিতেছেন, এমন সময় কবি তাহাকে ডাকিয়া বলিয়া দিলেন, “দেখ, এইখানটিতে এই কথাটি না বলে ওই কথাটি বলবে।”

    ‘তপতী’ নাটক পরে শিশিরকুমার ভাদুড়ী মহাশয় সাধারণ রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করেন। এই অভিনয়ের চার-পাঁচ দিন আগে কবি শিশির কুমারকে টেলিগ্রামে শান্তিনিকেতনে ডাকাইয়া লইয়া গিয়া নাটকের কয়েকটি অংশ বদলাইয়া দিলেন। কবির সৃজনীশক্তি কিছুতেই পরিতৃপ্ত হইতে জানিত না। বিধাতা যেমন তাহারা অপুর্ব-সৃষ্টিকাব্য ধরণীর উপর আলো ছড়াছয়া আঁধার ছড়াইয়া নানা ঋতুর বর্ণসুষমা মাখাইয়া উহাকে নব নব রূপে রূপায়িত করেন, তেমনি কবি তাঁর রচিত কাব্য উপন্যাস ও নাটকগুলিকে বারম্বার নানাভাবে নানা পরিবর্তনে উৎকর্ষিত করিয়া আমাদের জন্য রাখিয়া গিয়াছেন। ‘রাজারানী’ নাটকের ‘তপতী’-সংস্করণ কবির এই সৃষ্টিধর্মীমনের অসন্তুষ্টির অবদান।

    রবীন্দ্র-জয়ন্তীর সময় ছাত্র-ছাত্রীদের তরফ হইতে রবীন্দ্রনাথের ‘নটীর পূজা’ নাটকের অভিনয় হয়। শান্তিনিকেতনের ছেলেমেয়েরা অনুষ্ঠান সাফল্যমণ্ডিত করিয়া তোলেন। আমার যতদূর মনে পড়ে, এই অভিনয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রম্পট করিয়াছিলেন। শেষ দৃশ্যে যেখানে নটীর মৃত্যুর পর ড্রপসিন পড়ার কথা–অর্ধেক ড্রপসিন পড়িয়া গিয়াছে, হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ গায়ে একটা মোটা কম্বল জড়াইয়া মঞ্চে আসিয়া নটীর মৃতদেহের উপর দুই হাত শূন্যে তুলিয়া ‘ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি’ এই মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া গেলেন। তখন হইতে নটীর পূজা শেষ দৃশ্যে এই পাঠটি প্রবর্তিত হইয়া আসিতেছে। রবীন্দ্রনাথের কবিতার খাতা দেখিয়াছি। তাহাতে এত পরিবর্তন ও এত কাটাকুটি যে দেখিয়া অবাক হইতে হয়। রবীন্দ্রনাথের সৃজনীশক্তি কিছুতেই যেন তৃপ্ত হইতে জানিত না। আজীবন তিনি গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন, তাহার প্রত্যেকখানিতে তাহার মনের একান্ত যত্নের ছাপ লাগিয়া রহিয়াছে। লিখিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি অপরকে দিয়া নকল করান নাই। যতবার নকল করিতে হয় নিজেই করিয়াছেন এবং প্রত্যেক বারেই সেই রচনার ভিতর তাঁহার সূজনী-শক্তির অপূর্ব কারুকার্য রাখিয়া গিয়াছেন।

    ‘তপতী’র পরে নাটক রচনার নেশা রবীন্দ্রনাথকে পাইয়া বসিয়াছিল। তাঁহার সঙ্গে দেখা করিতে গিয়া আমি পাড়াগাঁয়ের লোকনাট্য আসমান সিংহের পালার উল্লেখ করিলাম। কবি আমাকে বলিলেন, “তুমি লেখ না একটা গ্রাম্য নাটক।” আমি বলিলাম, “নাটক আমি একটা লিখেছি। কিন্তু অবনীন্দ্রনাথ পড়ে বললেন, নাটক লেখার শক্তি তোমার নেই।” কবি জোরের সঙ্গে বলিলেন, “অবন নাটকের কি বোঝে? তুমি লেখ একটা নাটক তোমাদের গ্রাম দেশের কাহিনী নিয়ে। আমি শান্তিনিকেতনের ছেলে মেয়েদের দিয়ে অভিনয় করাব।”

    আমি বলিলাম, “একটা প্লট যদি দেন তবে আর একবার চেষ্টা করে দেখি।”

    কবি বলিলেন, “আজ নয়। কাল সকালে এসো।”

    পরদিন কবির সামনে গিয়া উপস্থিত হইলাম। একথা-সেকথার পরে আমার নাটকের প্লট দেওয়ার কথা কবিকে মনে করাইয়া দিলাম।

    কবি হাসিয়া বলিলেন, “তুমি দেখছি, ছাড়বার পাত্র নও। চোরের মন বোচকার দিকে।” নিকটে আরও দু-একজন ভদ্রলোক ছিলেন। তাঁহারা হাসিয়া উঠিলেন। কবি প্লট বলিতে লাগিলেন—

    “ধর, তোমাদের পাড়াগাঁয়ের মুসলমান মোড়লের ছেলে কলকাতায় এম, এ, পড়তে এসেছে। বহু বৎসর বাড়ি যায় না। এম, এ, পাশ করে সে বাড়ি এসেছে। বাবা মা সবাই তাদের পুরনো গ্রাম্য রীতিনীতিতে তাকে আদর যত্ন করলেন। কিন্তু ছেলের এসব পছন্দ হয় না। সে বলে, তোমরা যদি আমাকে এমন করে আদরঅভ্যর্থনা না করতে তবেই ভাল হত। আদর করেই তোমরা আমাকে অপমান করছ।

    “ছেলেটির সঙ্গে গ্রামের অন্য একজন মোড়লের মেয়ের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। বিয়ের কথা বাপ বলতেই ছেলে রেগে অস্থির। অমুকের মেয়ে অমুক—সেই ছোট্ট এতটুকু মেয়ে তাকে সে কিছুতেই বিয়ে করবে না। গ্রাম্য চাষী হবে তার শ্বশুর!

    “মেয়েটির তখন অন্যত্র বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেল। পাকাদেখার দিন ছেলেটা মেয়ের বাড়িতে কি উপলক্ষে গিয়ে তাকে দেখে এলো। ছেলেবেলায় যাকে সে একরত্তি এতটুকু দেখেছিল আজ সে পরিপূর্ণ যুবতী। ছেলের মনে হল, এমন রূপ যেন সে আর কোথাও দেখেনি।

    “বাপ ছেলেকে বড়ই ভালবাসেন। বাপ দেখলেন কিছুতেই ছেলের মন টিকছে না, তখন তিনি ছেলেকে গিয়ে বললেন, “দেখ, অনেক ভেবে দেখলাম, দেশে থাকা তোর পক্ষে মুশকিল। তুই কলকাতায় চলে যা। এখানকার জলবায়ু ভাল না। কখন অসুখ করবে কে জানে। মাসে মাসে তোর যা টাকা লাগে, আমি পাঠিয়ে দেব। তুই কলকাতায় চলে যা।

    “তখন ছেলে এক মস্ত বক্তৃতা দিল। কে বলে, এ গ্রাম আমার ভাল লাগে না? ছেলেবেলা থেকে আমি এখানে মানুষ। এ গাঁয়ের গাছপালা লতাপাতা সব আমার বালককালের খেলার সঙ্গী।

    “বাপ তো অবাক। হঠাৎ ছেলের মন ঘুরে গেল কি করে? ছেলের কোন বন্ধুর মারফৎ বাপ জানতে পারলেন, যে-মেয়েটির সঙ্গে তার বিয়ের কথা স্থির হয়েছিল তাকে দেখেই সে পাগল। তখন বাপ ছুটলেন মেয়ের বাপের উদ্দেশে। কিন্তু মেয়েটির অন্য জায়গায় বিয়ের কথা পাকা। মেয়ের বাপ কথা বদ্‌লাতে রাজি নয়।

    “এবার গল্পটিকে ট্রাজেডিও করতে পার, কমেডিও করতে পার। যদি ট্রাজেডি করতে চাও,—লেখ, বিয়ের পরে মেয়েটির সঙ্গে আবার একদিন ছেলেটির দেখা। মেয়েটি ছেলেকে বলল, আমাদের যা-কিছু কথা রইল মনে মনে। বাইরের মিলন আমাদের হল না কিন্তু মনের মিলন থেকে কেউ আমাদের বঞ্চিত করতে পারবে না।”

    কবির এই প্লট অবলম্বন করিয়া আমি নাটক রচনা করিয়াছিলাম দুই-তিনবার অদলবদল না করিয়া কোন লেখা আমি প্রকাশ করি না। কবি জীবিত থাকিতে তাহাকে তাই নাটক দেখাইতে পারি নাই। ‘পল্লীবধূ’ নাম দিয়া নাটকটি কয়েক বৎসর পূর্বে প্রকাশিত হইয়াছে। ঢাকা বেতারে এই নাটক অভিনীত হইয়া শত শত শ্রোতার মনোরঞ্জন করিয়াছে। আজ যদি রবীন্দ্রনাথ বাঁচিয়া থাকিতেন, এই নাটক তাহাকে উপহার দিয়া মনে মনে কতই না আনন্দ পাইতাম।

    অবনীন্দ্রনাথের বাড়িতে মাঝে মাঝে নন্দলাল বসু আসিতেন গুরুর সঙ্গে দেখা করিতে। সেই উপলক্ষে শিল্পী নন্দলালের সঙ্গে আমার পরিচয়। নন্দলাল শুধুমাত্র তুলি দিয়া মনের কথা বলেন, গুরুর মত কলমের আগায় ভাষার আতসবাজী ফুটাইতে পারেন না। কিন্তু তার সঙ্গে আলাপ করিতে আমার খুব ভাল লাগত। আর্টের বিষয়ে ছবির বিষয়ে তিনি এত সুন্দর সুন্দর কথা বলিতেন যা লিখিয়া রাখিলে সাহিত্যের অপূর্ব সম্পদ হইত।

    কয়েকটি কথা মনে আছে। এখানে লিখিয়া রাখিল। “গাছের এক এক সময়ে এক এক রূপ। সকাল সন্ধ্যা দুপুর রাত্রি কত ভাবেই গাছ রূপ-পরিবর্তন করছে। শান্তিনিকেতনে আমার ছাত্রেরা গভীর রাত্রিকালে জেগে উঠে গাছের এই রূপ-পরিবর্তন লক্ষ্য করে।”

    সুদূর মাদ্রাজ হইতে আসিয়াছিল নন্দলালের এক ছাত্র। আর্ট ইস্কুলে পাঁচ-ছয় বৎসর ছবি আঁকা শিখিয়া বাড়ি ফিরিবার সময় দুঃখ করিয়া নন্দলালকে বলিল, “আমি চলেছি আমাদের পাড়াগাঁয়ে, সেখানে আমার আর্ট কেউ বুঝবে না। বাকি জীবনটা আমাকে নির্বাসনে কাটাতে হবে।” নন্দলাল ছাত্রকে আদর করিয়া কাছে ডাকিয়া বলিলেন, “তুমি গ্রামে গিয়ে দেখতে পাবে এক রাখাল-বালক হাতে ছুরি নিয়ে তার লাঠির উপরে ফুলের নক্সা করছে। তার গরু হয়তো তখন পরের ক্ষেতে ধান খাচ্ছে, এজন্য তাকে বকুনি শুনতে হবে। কিন্তু সেদিকে তার কোন খেয়াল নেই। সে একান্ত মনে তার লাঠিতে ফুল তুলছে। আরও দেখবে, কোন এক গাঁয়ের মেয়ে হয়ত কাঁথা সেলাই করছে কিম্বা রঙ-বেরঙের সুতো নিয়ে সিকা বুনছে। তার উনুনের উপর তরকারি পুড়ে যাচ্ছে, কিম্বা কোলের ছেলেটি মাটিতে পড়ে আছাড়িপিছাড়ি কান্না কাঁদছে। কোন দিকে তার খেয়াল নেই। সে সুতোর পর সুতো লাগিয়ে কাঁথার উপর নতুন নক্‌সা বুনট করছে। সেই রাখাল ছেলে সেই গ্রামের মেয়ে এরাই হবে তোমার সত্যিকার শিল্পীবন্ধু। এদের সঙ্গে যদি মিতালি করতে পার তবে তোমার গ্রাম্য জীবন একঘেয়ে হবে না। চাই কি, তাদের সৃজন-প্রণালী যদি তোমার ছবিতে প্রভাব বিস্তার করে, তুমি শিক্ষিত সমাজের শিল্পে নতুন কিছু দান করতে পারবে।”

    খেলনা-পুতুলের বিষয়ে তিনি বলিতেন, “কৃষ্ণনগরের খেলনা পুতুল রিয়ালিটিক। এক অংশ ভেঙে গেলে সেগুলো দিয়ে আর খেলা করা যায় না। আমাদের গ্রামদেশী পুতুল আইডিয়ালিটিক, এক অংশ ভেঙে গেলেও তা দিয়ে খেলা করা যায়।” এমনি বহু সুন্দর সুন্দর কথা শুনিতাম নন্দলালের কাছে। আজ নন্দলাল অসুস্থ হইয়া শান্তিনিকেতনে অবস্থান করিতেছেন। কোন ছাত্র যদি তার সঙ্গে তার শিল্পী-জীবনের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করিয়া তাহা লিপিবদ্ধ করেন, তবে উহা সমস্ত বাঙালীর সম্পদ হবে। নন্দলাল আমার ‘বালুচর’ পুস্তকের জন্য একখানা সুন্দর প্রচ্ছদপট আঁকিয়া দিয়াছিলেন। ‘রাখালী’র বর্তমান সংস্করণ নন্দলালের আঁকা একটি প্রচ্ছদপটে শোভা পাইতেছে।

    সেবার নন্দলালের সঙ্গে শান্তিনিকেতন গেলাম। যে কয়দিন ছিলাম শিল্পীর পত্নী অতি যত্নের সঙ্গে আমার আহারাদির ব্যবস্থা করিলেন। পান্থনিবাসে আমার থাকার ব্যবস্থা হইল। পান্থনিবাসের ঘরের ছাতের উপর নন্দলাল কতকগুলি মাছের ছবি আঁকিয়া রাখিয়াছেন। সেগুলির দিকে চাহিয়া পথিকের মনে জলের শীতলতা আনিয়া দেয়। নন্দলাল গর্বের সঙ্গে বলিতেন, সাঁওতালেরা পথ দিয়া যাইতে যাইতে মাঝে মাঝে তাঁহার আঁকা ছবিগুলির দিকে চাহিয়া দেখে। এই ব্যাপারটি তার শিল্পী-জীবনের একটি বড় সার্থকতা বলিয়া তিনি মনে করিতেন।

    পান্থনিবাসে আসিয়া দেখা হইল পাগলা নিশিকান্তের সঙ্গে। নিশিকান্ত ছবি আঁকে। সে ছবির সঙ্গে অন্য কারো ছবির মিল নাই। নিশিকান্ত কবিতা লেখে, সে কবিতার সঙ্গে কারো কবিতার মিল নাই। এমন অদ্ভুত ভাব-পাগল। অবনীন্দ্রনাথের বাড়ীতে আগেই তাহার সঙ্গে পরিচয় হইয়াছিল। এবার সে পরিচয় আরও নিবিড় হইল। নিশিকান্তের বন্ধু সান্ত্বনা গুহ। সুতরাং সে আমারও বন্ধু হইল। অনেক রাত পর্যন্ত তিন বন্ধুতে গল্পগুজব করিলাম। শেষরাত্রে শান্তিনিকেতনের বৈতালিকদল, ‘আমার বসন্ত যে এলো’ গানটি গাহিয়া সমস্ত আশ্রম পরিক্রমা করিতেছিল। সুমধুর কণ্ঠস্বর শুনিয়া ঘুম ভাঙিয়া গেল। যেন এক স্বপ্ন-জগতে জাগিয়া উঠিলাম। তখন ভোরের আলোকে চারিদিক পরিষ্কার হয় নাই। আলো-আঁধারী ভোরের বাতাসে পাখির সঙ্গে বৈতালিকদের গান আম্র তরুর শাখায় শাখায় আনন্দের শিহরণ তুলিতেছিল। বসন্ত যে আসিয়াছে তাহা এখানে আসিয়াই বুঝিতে পারিলাম।

    সকালে নিশিকান্ত, সান্ত্বনা আর তাদেরই মত যত পাগলাটে ছেলেদের আশ্রয়স্থল শান্তিনিকেতনের গ্রন্থাগারিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি আসিয়া হাজির হইলাম। সেখানে প্রভাত কুমারের স্ত্রী সুধা-দিদি হাসিমুখে আমাদিগকে গ্রহণ করিলেন। তাঁর ছোট ছোট দুই ছেলে, সুপ্রিয় দেবপ্রিয় আব প্রভাত কুমারের ভাইঝি হাসু আসিয়া আমাদের সামনে দাঁড়াইল। সুতরাং আমাকে আর পায় কে! গল্পের উপরে গল্প চলিল। কবিতার উপরে কবিতা আবৃত্তি হইতে লাগিল। আমি আর নিশিকান্ত, নিশিকান্ত আর আমি— দুইজনে পালা করিয়া মনের সাধ মিটাইয়া গল্প বলিয়া চলিলাম। পাশের ঘরে বইপুস্তক লইয়া প্রভাতদা মশগুল হইয়াছিলেন। আমাদের এই হৈ-হুল্লোড় যখন চরমে উঠিতেছিল তিনি মাঝে মাঝে আমাদের দিকে চাহিয়া মৃদু হাসিতেছিলেন।

    সুধা-দি আমাকে বিকালে চায়ের নিমন্ত্রণ করিলেন। সকালে আমরা গল্প বলিয়া, কবিতা আবৃত্তি করিয়া ছোটদের আকর্ষণ করিয়াছি। এইবার তাদের পালা। হাসু, হাসুর বন্ধু মমতা, হাসুর দিদি অনু আরও ছোট ছোট কয়েকটি ছেলেমেয়ে হাত ধরাধরি করিয়া এমন সুন্দর নাচ দেখাইল! সুধাদি তাঁর এস্রাজ বাজাইয়া সেই নাচের আবহসংগীত পরিবেশন করিলেন। মনে হইল এইসব ছেলেমেয়েরা যেন কতকাল আমার পরিচিত। তখনও আমার ছেলেমেয়ে হয় নাই। মনের বাৎসল্যসুধা তাই পরের ছেলেমেয়ে দেখিলে উৎসারিত হইয়া উঠিত।

    প্রভাতদার ভাইঝি হাসুর বয়স তখন পাঁচ-ছয় বছর। তার মুখখানা এমন করুণ মমতা মাখানো! কাছে ডাকিয়া আদর করিলে আদর করিতে দেয়। আমার হৃদয়ের সুপ্ত বাৎসল্য-স্নেহ এই ছোট্ট মেয়েটিকে ঘিরিয়া গুঞ্জন করিয়া উঠিল। হাসুকে কাছে ডাকিয়া বলিলাম, “তোমার সঙ্গে আমার খুব ভাব। না দিদি?” ডাগর ডাগর চোখ দুটি মেলিয়া হাসু চাহিয়া রহিল। বিদায়ের দিন তাকে ডাকিয়া বলিলাম, “হাসু! কলকাতা গিয়ে আমি তোমাকে চিঠি লিখবো। তুমি উত্তর দেবে তো? হাসু ঘাড় নাড়িয়া সম্মতি জানাইল। এই ভাবে সারাদিন এখানে ওখানে ঘুরিয়া শান্তিনিকেতনের ছেলেদের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করিয়া সন্ধ্যার আগে প্রভাতদার বাসায় আসিলাম। বার-তের বছরের ছোট একটি মেয়ে প্রভাতদার বাড়িতে আসিয়া আমার সঙ্গে দেখা করিল। তার কবিতার খাতাটি আমাকে দেখাইল। ছন্দের হাতটি তখনো পাকা হয় নাই। আমি তাহাকে খুব উৎসাহ দিলাম। সুধাদি বলিলেন, ‘মেয়েটি ভাল গান করে, ওর গান শুনবে?’

    মেয়েটি অনেক কষ্টে লজ্জা কাটাইয়া অতুলপ্রসাদের রচিত একটি গান গাহিল। ‘ওগো, সাথী, মম সাথী, আমি সেই পথে যাব তব সাথে।’ সে কি গান, না দূর-দূরান্তর হইতে ভাসিয়া-আসা কোন নাম-না-জানা পাখীর কণ্ঠস্বর! গান শেষ-করিয়া মেয়েটি সুন্দর হাত দুইটি তুলিয়া আমাকে নমস্কার করিয়া চলিয়া গেল। পাতলা একহারা চেহারা, গায়ের বর্ণ উজ্জ্বল শ্যাম। নতুন ধানের পাতার সমস্ত বর্ণসুষমা কে যেন তাহার সমস্ত গায়ে মাখাইয়া দিয়াছে। মনে হইল, এমন গান কোনদিন শুনি নাই। এমন রূপও বুঝি আর কোথাও দেখি নাই। আজও তার গানের রেশ আমার কানে লাগিয়া আছে। আমার ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ পুস্তকে নায়িকার রূপ বর্ণনা করিতে আমি এই মেয়েটিকে মনে মনে কল্পনা করিয়াছিলাম। পুস্তকের দুইটি অংশ প্রত্যেক অংশের আগে অতুলপ্রসাদের এই গানটি আমি উদ্ধৃত করিয়া দিয়াছিলাম। মেয়েটি আজ কোথায় আছে জানি না। হয়ত কোন সুন্দর স্বামীর ঘরণী হইয়া ছেলেমেয়ে লইয়া সুখে আছে। সে কোনদিনই জানিতে পারিবে না যে তার সেই ক্ষণিকের দর্শন আর সুমধুর গান আমাকে সুদীর্ঘ ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটের’ কাহিনী লিখিতে সাহায্য করিয়াছিল। আমার এই পুস্তক সে হয়ত অপর দশজনের মতই বাজার হইতে কিনিয়া পড়িয়াছে, অথবা পড়ে নাই। নিজে তাহাকে এই বই উপহার দিয়া তাহার মতামত জানিবার সুযোগ কোনদিনই হইবে না। লেখকজীবনে এমনি বেদনার ঘটনা প্রায়ই ঘটিয়া থাকে।

    চার-পাঁচ দিন শান্তিনিকেতনে থাকিয়া কলিকাতা চলিয়া আসিলাম। বিদায়ের দিন হাসুকে কাছে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘হাসু, তোমাকে আমি চিঠি লিখব—কবিতা করে ছড়া কেটে চিঠিতে চিঠিতে তোমার সঙ্গে কথা বলব। তুমি উত্তর দেবে তো?’ ঘাড় নাড়িয়া হাসু জানাইল, সে উত্তর দিবে।

    এর আগে আমি ছোটদের জন্য কবিতা লিখি নাই। কলিকাতা আসিয়া হাসুকে খুসি করিবার জন্য ছোটদের উপযোগী কবিতা লেখায় হাত দিলাম। আমার যেন দিনরাত্রের তপস্যা হইল, ওই একরত্তি ছোট্ট মেয়েটিকে খুসি করা। ছড়া কাটিয়া নানা ছন্দে ভরিয়া হাসুকে পত্র লিখিতে লাগিলাম। ছোট্ট মেয়ে। তার সমবয়সীদের সঙ্গে খেলাধুলায় সময় কাটায়। আমার এই অসংখ্য পত্রের উত্তর দেওয়ার সময় কোথায়? তবু মাঝে মাঝে আকাবাঁকা হাতের ছোট্ট এক একখানা চিঠি সে আমাকে পাঠাইত। সেই সব পত্র পাইয়া আমি যেন সাত রাজার ধন হাতে পাইতাম। চিঠি অবলম্বন করিয়া মনে মনে কল্পনার রথকে উধাও ছুটাইতাম। ইহাতেও মনের আশা মিটিত না। অবসর পাইলেই শান্তিনিকেতনে গিয়া উপস্থিত হইতাম। যাইবার আগে কোন্ কোন্ গল্প বলিয়া হাসু আর তার বন্ধুদের খুসি করিব, বারবার মনে আওড়াইয়া লইতাম। সেখানে গিয়া সুধাদির বাড়িতে পূর্বের মতই আমার গল্পের আসর বসিত। মাঝে মাঝে কলিকাতা হইতে ছোটদের জন্য লেখা বই কিনিয়া হাসুকে পাঠাইতাম। উপহার-পৃষ্ঠায় গবাদাকে দিয়া অথবা প্রশান্তকে দিয়া রঙ-বেরঙের ছবি আঁকাইয়া লইতাম।

    একবার হাসু বেড়াইতে আসিয়াছিল যাদবপুরে তাদের আত্মীয় ডা. হীরালাল রায়ের বাড়িতে। সেখানে গিয়া হাসুর সঙ্গে দেখা করিলাম। শ্রীমতি রায় আদর করিয়া আমাকে গ্রহণ করিলেন। তার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা হাসুরই মত আমার আপন হইয়া উঠিল। তাদের সঙ্গে নিয়া গল্প গুজব করিয়া সারাদিন কাটাইয়া আসিলাম।

    এইভাবে দিনের পর দিন বছরের পর বছর ঘুরিয়া চলিল। ছয় মাস পরে, এক বছর পরে, সুযোগ পাইলেই আমি শান্তিনিকেতনে আসি। হাসুর সঙ্গে দেখা হয়।

    সেবার সিভিল-ডিস্‌ওবিডিয়েন্স আন্দোলনে ইস্কুল-কলেজ বন্ধ হইয়া গেল। আমি মাসখানেকের জন্য শান্তিনিকেতনে গিয়া উপস্থিত হইলাম। হাসু বড় হইয়াছে। ডাকিলে কাছে আসিতে চায় না। সে যে বড় হইয়াছে, একথা আমি যেন ভাবিতেই পারি না। রবীন্দ্রনাথের কাবুলীওয়ালা’র মত আজ আমার মনের অবস্থা। বুঝিলাম বীণা-যন্ত্রের কোন অজ্ঞাত ‘তার’ যেন ছিড়িয়া গিয়াছে। সুধাদি কত ডাকিলেন হাসুর মা সুন্দরদি কত ডাকিলেন। অনেক ডাকাডাকির পর হাসু আসিয়া সামনে দাঁড়াইল। সেই মমতা-মাখানো মুখখানি তেমনি আছে। আজ আদর করিয়া তাহাকে কাছে ডাকিতে পারি না। ছড়ার ঝুমঝুমি বাজাইয়া তাহাকে খুশি করিতে পারি না। হাসুর বন্ধুরা সকলেই আসিল। মমতা আসিল—অনু, মিনু আসিল, কিন্তু গল্পের আসর যেন তেমন করিয়া জমিল না। নিজের আস্তানায় আসিয়া কোন্ সাত সাগরের কান্নায় চোখ ভাসিয়া যাইতে লাগিল। কেন ও বড় হইল? কেন ও আগের মত ছোটটি হইয়া রহিল না? এমনি প্রশ্নমালায় সমস্ত অন্তর মথিত হইতে লাগিল। এই মেয়েটি যদি আসিল—আমার বোনটি হইয়া আসিল না কেন! আমার কোলের মেয়েটি হইয়া আসিল না কেন! যে কার অভিশাপে চিরজন্মের মত পর হইয়া গেল।

    কলিকাতা আসিয়া ‘পলাতকা’ নামে একটি কবিতা লিখিলাম। হাসু নামে ছোট্ট একটি খুকু আজ যে কোথায় পলাইয়া গিয়াছে! খেলাঘরের খেলনাগুলি তেমনি পড়িয়া রহিয়াছে। এখানে সে আর খেলা করিতে আসিবে না। সে যে পলাইয়া গিয়াছে তা তার বাপ জানে না, মা জানে না, তার খেলার সাথীরা জানে না, সে নিজেও জানে না। কোন সুদূর তেপান্তরের বয়স তাহাকে আজ কোথায় লইয়া গিয়াছে। কোনদিনই সে আর খেলাঘরে ফিরিয়া আসিবে না। কবিতাটি শেষ করিয়াছিলাম একটি গ্রাম্য ছড়া দিয়া—

    এখানটিতে খেলেছিলাম ভাঁড়-কাটি সঙ্গে নিয়ে

    এখানটি রুধে দে ভাই ময়নাকাঁটা পুতে দিয়ে।

    কবিতাটি ‘আহেরিয়া’ নামে একটি বার্ষিক কাগজে ছাপা হইলে হাসুকে একখানি বই পাঠাইয়াছিলাম। হাসু একটি সংক্ষিপ্ত পত্রে উত্তর দিয়াছিল—‘জুসীদা, তোমার কথা আমি ভুলি নাই। আমার শিশুকালে তুমি গল্প-কবিতা শুনিয়েছ, ছোট বয়সের স্মৃতির সঙ্গে তোমার কথাও আমি কোনদিন ভুলব না।’

    হাসুকে লেখা কবিতাগুলি দিয়া আমার ‘হাসু’ পুস্তকখানি সাজাইলাম। ভাবিয়াছিলাম, এই পুস্তক রবীন্দ্রনাথের নামে উৎসর্গ করিব। কারণ তাঁহারই আশ্রমকন্যা হাসুর উপরে কবিতাগুলি লিখিয়াছি। পরে ভাবিয়া দেখিলাম, রবীন্দ্রনাথকে তো কত লেখকই বই উৎসর্গ করে। এ বই পড়িয়া সব চাইতে খুশি হইবেন আমার জননীসম সুধাদি আর হাসুর মা সুন্দরদি। বইখানি ইহাদের নামে উৎসর্গ করিলাম। সুধাদির কথা ভাবিলে আজও আমার নয়ন অশ্রুভারাক্রান্ত হইয়া আসে। এই সর্বংসহা দেবীপ্রতিমা কত আধপাগলা, ক্ষ্যাপা, স্নেহপিপাসু ভাইদের ডাকিয়া আনিয়া তাঁর গৃহের স্নেহ-ছায়াতলে যে আশ্রয় দিয়াছেন,তাহার ইয়ত্তা নাই।

    আমি হাসুকে বেশী আদর করিতাম। তার জন্য কলিকাতা হইতে বই-পুস্তক পাঠাইতাম; সুধাদির ছোট ছোট ছেলেদের জন্য কিছুই পাঠাইতাম না। ছেলেরা কিন্তু হিংসা করিত না, সুধাদিও বিরক্ত হইতেন না। সুধাদি ছাড়া যে কোন ছেলের মা এমন অবস্থায় আমার জন্য গৃহ দ্বার বদ্ধ করিতেন। সুধাদি—আমার এমন সুধাদির কথা বলিয়া ফুরাইতে চাহে না। কতদিন তাঁহাদের সহিত জানাশুনা নাই। সুধাদি এখন কেমন আছেন জানি না। কিন্তু আমার মনের জগতে সুধাদি প্রভাতদা তাঁদের দুই ছেলে সুপ্রিয় দেবপ্রিয়, আর হাসু হাত ধরাধরি করিয়া ঘুরিয়া বেড়ায়।

    প্রভাতদার মত অত বড় পণ্ডিত ব্যক্তি সামান্য বেতনে শান্তিনিকেতনের আশ্রমে গ্রন্থাগারিকের কাজ করিতেন। সংসারের অবস্থা স্বচ্ছল ছিল না। তাই সুধাদিকেও শিক্ষকতার কাজ করিতে হইত। ঘরসংসারের কাজ করিয়া ছেলেদের দেখাশুনা করিয়া শিক্ষকতার কাজ করিয়া তার উপরেও দিদি হাসিমুখে আমাদের মত ভাইদের নানা স্নেহের আবদার সহ্য করিতেন। ডাকিয়া এটা-ওটা খাওয়াইতেন। তাঁর হাসিমুখের ‘ভাই’ ডাকটি শুনিয়া পরাণ ভরিয়া যাইত। প্রভাতদা অন্যত্র এখানকার বহুগুণ বেতনে চাকুরীর ‘অফার’ পাইয়াছিলেন, কিন্তু কবিগুরুর আদর্শকে রূপায়িত করিতে সাহায্য করিতেছেন বলিয়া তিনি অন্যত্র যান নাই।

    শান্তিনিকেতনে আরও কয়েকজন প্রতিভাবান ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের আদর্শবাদের রূপায়ণে তিলে তিলে নিজেদের দান করিয়া গিয়াছেন। একজন জগদানন্দ রায়—গ্রহ-নক্ষত্রের কথা, বিজ্ঞানের কথা এমন সুন্দর করিয়া সহজ করিয়া লিখিবার লোক আজও বাঙালীর মধ্যে হইল না। তার বইগুলি বাজারে দুষ্প্রাপ্য। বাঙালীর ছেলেমেয়েদের এর চাইতে দুর্ভাগ্যের আর কিছু নাই। চেহারায় ব্যবহারে একেবারে কাঠখোটা মানুষটি, কিন্তু দুরূহ বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলিকে তিনি জলের মত সহজ করিয়া লিখিতে পারিতেন। আরও একজনের নাম করিব—স্বর্গীয় ক্ষিতিমোহন সেন। এমন মধুর কথকতা করিতে বুঝি আর কোথাও কাহাকে পাওয়া যাইবে না। তার গবেষণা বিষয়ে আমার মতানৈক্য আছে, কিন্তু তাঁর ব্যবহারে কথায় বার্তায় যেন শ্বেতচন্দন মাখানো ছিল। তাঁর সঙ্গে ক্ষণিক আলাপ করিলেও সেই চন্দনের সুবাস সারাজীবন লাগিয়া থাকিত।

    একবার রংপুরে গিয়াছি গ্রাম্য-গান সংগ্রহ করিতে। শুনিলাম ক্ষিতিমোহন আসিয়াছেন সেখানে বক্তৃতা করিতে। গিয়া দেখা করিলাম। তিনি সস্নেহে আমাকে গ্রহণ করিলেন। গ্রাম্য-গান সংগ্রহের বিষয়ে তাঁর কাছে উপদেশ চাহিলাম। তিনি সাধক রজবের একটি শ্লোক উদ্ধৃত করিয়া তার ব্যাখ্যা করিলেন। সাধনের কথা সেই যেন জিজ্ঞাসা করে যে নিজের হাতে নিজের ছের কেটে এসেছে। তোমার আত্মীয়স্বজন বলবে, এইভাবে তুমি কাজ কর যাতে তোমার খ্যাতি হয়। অর্থাগম হয়। তোমার দেশবাসী বলবেন, এইভাবে কাজ কর—আমরা তোমাকে যশে উচ্চ শিখরে নিয়ে যাব। তোমার লৌকিক ধর্ম বলবে, এইভাবে কাজ কর—তোমাকে স্বর্গে নিয়ে যাব। তোমার দৈহিক অভাব-অভিযোগ বলবে, এইভাবে কাজ করলে তোমার অর্থাগম হবে—কোন দুঃখ-দরিদ্র থাকবে না। এই সমস্তকে অতিক্রম করে তুমি তোমার আত্মার যে ধর্ম তারই পথ অনুসরণ করে চলবে। মনে মনে ভাববে, কি তোমার করণীয় কি করতে তুমি এসেছ। রাজভয়, লোকভয়, আত্মপরিতৃপ্তি কিছুই যেন তোমাকে তোমার পথ হতে বিভ্রান্ত করতে পারে না। ছের কেটে দিয়ে তবে তোমার সাধনের পথে অগ্রসর হতে হবে।

    ক্ষিতিমোহনের এই উপদেশ আজও আমার অন্তরে ধ্বনিতপ্রতিধ্বনিত হইতেছে।

    শান্তিনিকেতনে থাকিয়া এখানে ওখানে ঘুরিয়া সময় কাটাই। পরিচয় হইল শান্তিদেব ঘোষের সঙ্গে। তখন তার কৈশোরকাল। এমন মধুর কণ্ঠ! তাকে ডাকিয়া লইয়া খোয়াই নদীর ধারে বসি। আকাশের শূন্য পথে দু-একটি পাখী উড়িয়া যায়। নদীর ওপারে সাঁওতালদের গ্রামে দিনের আলো ম্লান হইয়া আসে। শান্তি গানের পর গান গাহিয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের গান কলিকাতায় বহু লোকে মুখে শুনিয়াছি। কিন্তু শান্তির কণ্ঠে রবীন্দ্র-সংগীতের যে ঢংটি ফুটিয়া ওঠে, এমন আর কোথাও পাই না। সে গানের সুরকে কণ্ঠের ভিতর লইয়া ঘষিয়া ঘষিয়া কেমন যেন পেলব করিয়া দেয়। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ণ সুরের বুনোট-কার্য শূন্য বাতাসের উপর মেলিয়া ধরিয়া শান্তি গান গাহিয়া চলে। গানের কথা-সুরের অপূর্ব কারুকারিতা যেন রামধনুকের রেখা লইয়া মনের উপর রঙের দাগ কাটতে থাকে মনে হয়, জীবনে যা-কিছু পাই নাই—যার জন্য দুঃখের আর জ্বালাইয়া সুদীর্ঘ বেঘুম রজনী জাগিয়া কাটাইয়াছি, সেই বেদনা কাহিনী বুঝি সুরের উপর মেলিয়া, ধরিয়া ক্ষণিকের তৃপ্তিলাভ বলা যায়। দুই চোখ বহিয়া ধারার পর ধারা বহিতে থাকে। শান্তি অবাক হইয়া গান বন্ধ করে। আবার তাহাকে সাধ্যসাধন করিয়া গান গাওয়াই। বহুকাল পরে এবার বোম্বাই রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীতে শান্তি আসিয়াছিল গান গাহিতে। কণ্ঠস্বরটি তার আগের মতই সুন্দর আছে। দুই বন্ধুতে মিলিয়া একদিন প্রায় সারারাত্রি নানা রকমের গানের সুর-বিস্তারের উপর আলোচনা করিলাম। শুধু কি তাই—মাঝে মাঝে আমাদের বিগত জীবনের সেই খোয়াই নদী তীরের কাহিনী কি আসিয়া মনকে দোলা দিল না?

    সেবার শান্তিনিকেতনে আরও দুইটি মেয়ের গান শুনিলাম। খুকু আর নুটুদির গান। মলিন চেহারার মেয়ে খুকু। গান গাহিতে বলিলেই গান গাহে, সাধ্যসাধনা করিতে হয় না। ওর হৃদয়ে যেন কোন ক্রন্দন লুকাইয়া ছিল। গান গাহিতে বলিলেই সেই ক্রন্দন শ্রোতার মনে ঢালিয়া দিয়া সে হয়ত তৃপ্তি পাইত। খুকু আর ইহজগতে নাই। অতি অল্প বয়সে সে তার শ্রোতাদের নিকট হইতে চিরবিদায় গ্রহণ করিয়া হয়ত কোন দেবসভায় মরধামের গান বিতরণ করিতেছে।

    নুটুদির গান শুনিলাম বর্ষামঙ্গলের মহড়ায়। গানের মহড়ায় বাইরের লোক যাওয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু দিনুদাকে (দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর) বলিতেই তিনি সহাস্যে অনুমতি দিলেন। নুটুদির মুখে যাহারা রবীন্দ্রসংগীত না শুনিয়াছেন, তাহাদের দুর্ভাগ্য। গানের কোন কোন স্থানে সুরকে তিনি এমন সরু করিয়া লইতেন যেন তা বোঝা যায় কি যায় না। রবীন্দ্র-জয়ন্তীর সময় ‘কখনো দিলে পরায়ে গোপনে ব্যথার মালা—বিরহ মালা’ গানটি তিনি বড় সুন্দর করিয়া গাহিয়াছিলেন, তেমন আর কোথাও শুনি নাই। নুটুদির বিবাহ হইল বন্ধুবর সুরেন করের সঙ্গে। তাঁর আঁকা ‘সাথী’ ছবিটি জগৎ-বিখ্যাত। সেই ছবি তিনি হাসিমুখে আমার ‘রাখালী’ পুস্তকের কভারে ব্যবহার করিবার অনুমতি দিয়াছিলেন। শুনিলাম সন্তান-সম্ভাবনার সময় নুটুদি মারা গিয়াছেন। সে কালের রবীন্দ্রসংগীত গাহিবার জন্য বোধ হয় এক শান্তিদেব ঘোষই আছে। একদিন রবীন্দ্রনাথ দিনুদাকে বলিতেছেন, শুনিয়াছিলাম, শান্তির উপর একটু বেশি নজর দিস। আমাদের পরে ওই ত আমার গানের ভাণ্ডারী হবে।

    এইভাবে গান শুনি–নিশিকান্ত আর সান্ত্বনার সঙ্গে আড্ডা জমাই সেই বয়সটায় কথার অভাব হয় না। ঘরের কথা, পরের কথা, হাটের কথা, ঘাটের কথা—সমস্ত কথা মিলাইয়া কথার সরিৎসাগর জমাই। শান্তিনিকেতনের শিক্ষকেরা দেখা হইলে হাতজোড় করিয়া অভিবাদন জানান, কুশলপ্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন। সবাই আমার উপর তুষ্ট। কোথাও কোন আবিলতা নাই। নিশিকান্ত বলে, ‘জসীম তুমি এখানে একটা মাস্টারি নিয়ে থেকে যাও।’ আমিও কতকটা নিমরাজি হই। ইস্কুল-কলেজ বন্ধ। কবে বিশ্ববিদ্যালয় খুলিবে কে জানে। মন্দ কি! কিছুদিন মাস্টারি করিলে ক্ষতি কি। দুই বন্ধু আমার জন্য দরবার করে।

    রবীন্দ্র-জয়ন্তীর পরে কবি কিছুদিন জোড়াসাঁকোর বাড়িতে অবস্থান করেন। এই সময় আমি প্রায়ই কবির সঙ্গে দেখা করিতে যাইতাম। একদিন কবিকে গিয়া বলিলাম, “আমরা আপনাকে মনে মনে কি ভাবে কল্পনা করি তা হয়ত আপনার জানতে ইচ্ছা করে। আপনার উপর নতুন ছন্দে একটি কবিতা লিখেছি। যদি বলেন তো পড়ে শুনাই।”

    কবি বলিলেন, ‘কবিতাটি আমাকে দাও। আমি নিজেই পড়ি।’

    আমি বলিলাম, ‘আমার হাতের লেখা আপনি পড়তে পারবেন না।’

    কবি বলিলেন, ‘তুমি দাও, আমি ঠিক পড়ব।’

    কম্পিত হস্তে তাঁকে কবিতাটি দিলাম। কবি মনে মনে কবিতাটি পড়িতে লাগিলেন। আমার মনে হইল, পড়ায় বিশুদ্ধ উচ্চারণ হইবে না মনে করিয়াই তিনি আমাকে পড়িতে দিলেন না। কারণ, তিনি এতটুকু উচ্চারণ-দোষ সহ্য করিতে পারিতেন না। কবির নিজের নাটকে যাহার পাঠ লইতেন, কবির নিকট সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম উচ্চারণ শিখিতে তাহাদের প্রাণান্ত হইত। কবিতাটি পড়া শেষ হইলে তিনি বলিলেন, ‘বেশ হয়েছে।’

    আমি বলিলাম, ‘কবিতাটিতে ত্রিপদী ছন্দ একটু নতুন ধ্বনিতে রূপান্তরিত করতে চেষ্টা করেছি।’

    তিনি লেখাটিতে কিছুক্ষণ চোখ বুলাইয়া উত্তর করিলেন, ‘তা এটিকে নতুন ছন্দ তুমি বলতে পার।’

    রবীন্দ্রনাথ আমাকে দেখিলেই হিন্দু-মুসলমান সমস্যা লইয়া আলোচনা করিতেন। তিনি বলিতেন, দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে দিলেই যে ঘরে আগুন লাগে, তার কারণ সেই ঘরের মধ্যে বহুকাল আগুন সঞ্চিত ছিল। যাঁরা বলতে চান, আমরা সবাই মিলমিশ হয়ে ছিলুম ভাল, ইংরেজ এসেই আমাদের মধ্যে আগুন ধরিয়ে দিল—তাঁরা সমস্যাটিকে এড়িয়ে যেতে চান।

    একদিন বন্দেমাতরম্ গানটি লইয়া কবির সঙ্গে আলোচনা হইল। কবি বলিলেন, বন্দেমাতরম্ গানটি যে ভাবে আছে, তোমরা মুসলমানেরা তার জন্য আপত্তি করতে পার। এ গানে তোমাদের ধর্মমত ক্ষুণ্ণ হওয়ার কারণ আছে।

    এর পরে ‘বন্দেমাতরম্’ গান লইয়া হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে খুব বিরোধ চলিতেছিল। কলিকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউটে ‘বন্দেমাতরম্’ গান লইয়া মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে এক প্রতিবাদসভা বসে। সেই সভার কথা শুনিয়া শ্রীমতী হেমপ্রভা মজুমদার সাম্প্রদায়িক মিলনের উপর এক সুন্দর বক্তৃতা করেন। মুসলমান ছাত্রেরা শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁহার বক্তৃতা শোনে এবং তাহাদের প্রতিবাদের বিষয়টিও তাহাকে বুঝাইয়া বলে। সেই সভায় আমি খুব অভিমানের সঙ্গেই বলিয়াছিলাম, আজ ‘বন্দেমাতরম্’ গান নিয়ে আমাদের দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রকাণ্ড বিরোধের উপক্রম হয়েছে। কখন যে এই বিরোধ অগ্নি-দাহনে জ্বলে ওঠে, কেউ বলতে পারে না। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এই গান নিয়ে আমার দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। কবি এ কথা স্বীকার করেছিলেন, ‘বন্দেমাতরম্’ গানে আপত্তি করবার মুসলমানদের কারণ আছে। কিন্তু আজ জাতি যখন এই ব্যাপার নিয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে, তখন কবি কেন নীরব আছেন? তিনি কেন তার মতামত ব্যক্ত করছেন না?

    আমার বক্তৃতার এই অংশটি কোন পত্রিকায় উদ্ধৃত করিয়া উহার সম্পাদক আমাকে সাম্প্রদায়িক বলিয়া প্রমাণ করিতে ও রবীন্দ্রনাথের বিরাগ উৎপাদন করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন।

    ইহার অল্প দিন পরে কলিকাতায় সর্বভারতীয় জাতীয় মহাসভার কার্যকরী সমিতির অধিবেশন বসে; তখন ‘বন্দেমাতরম্’ গান লইয়া তুমুল আন্দোলন হয়। সেই সময়ে একদিন বন্ধুবর সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বলিলাম, রবীন্দ্রনাথ নিজে স্বীকার করেছেন, বন্দেমাতরম গানে মুসলমানদের আপত্তির কারণ আছে। আজ সারা দেশ এই গান নিয়ে বিরাট সাম্প্রদায়িক কলহের সম্মুখীন হচ্ছে। এখন তো কবি একটি কথাও বলছেন না।’

    সৌম্যেন্দ্রনাথ বলিলেন, “জহরলাল নেহেরু গানটি রবীন্দ্রনাথের কাছে পাঠিয়েছিলেন। কবির পরামর্শের ফলে এ গানে তোমাদের আপত্তিজনক অংশটি কংগ্রেসের কোন অনুষ্ঠানে আর গীত হবে না”।

    রবীন্দ্র-জয়ন্তীর পর কবি কিছুদিন অসুস্থ হইয়া পড়েন। এই অসুস্থ অবস্থার মধ্যে কবি শিল্পীদলের অভিনন্দন গ্রহণ করেন। অভিনন্দন-সভা ঠাকুরবাড়ির হলঘরে বসিয়াছিল। ‘নন্দলাল প্রমুখ শিল্পীরা প্রত্যেকে কবিকে এক একখানা করিয়া চিত্র উপহার দিয়াছিলেন। উহার পর কিছুদিনের জন্য কবি আর কোন অনুষ্ঠানে যোগদান করেন নাই। এই সময়ে আমি প্রায়ই কবির সঙ্গে দেখ করিতে যাইতাম। আমাকে দেখিলেই কবি সাম্প্রদায়িক ব্যাপার লইয়া আলোচনা করিতেন। বলিতেন কেন যে মানুষ একের অপরাধের জন্যে অপরকে মারে! ও-দেশের মুসলমানেরা হিন্দুদের মারল, তাই এদেশের হিন্দুরা এখানকার নিরীহ মুসলমানদের মেরে প্রতিবাদ জানাবে এই বর্বর মনোবৃত্তির হাত থেকে দেশ কি ভাবে উদ্ধার পাবে বলতে পার? কী সামান্য ব্যাপার নিয়ে মারামারি হয়—গরু-কোরবানী নিয়ে, মসজিদের সামনে বাজনা নিয়ে। একটা পশুকে রক্ষা করতে মানুষ মানুষকে হত্যা করেছে।”

    এই সব আলোচনা করিতে কবি মাঝে মাঝে বড়ই উত্তেজিত হইয়া উঠিতেন। একদিন আমি কবির সঙ্গে দেখা করিতে যাইতেছি, কবির পুত্র রথীন্দ্রনাথ আমাকে একান্তে ডাকিয়া বলিলেন, এখন বাবার শরীর অসুস্থ। আপনাকে দেখলেই তিনি হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। মাঝে মাঝে তাতে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। অসুস্থ শরীরে এই উত্তেজনা খুবই ক্ষতিকর। আপনি কিছুদিন বাবার সঙ্গে দেখা করবেন না।

    তখনকার মত আমি কবির সঙ্গে দেখা করিলাম না।

    মুসলমানদের প্রতি কবির মনে কিছু ভুল ধারণা ছিল। তিনি সাধারণত হিন্দু পত্রিকাগুলিই পড়িতেন। মুসলমানি পত্রিকার একআধ টুকরা মাঝে মাঝে কবির হাতে পড়িত।

    কবির ভুল ধারণার প্রতিবাদ করিয়া উপযুক্ত কারণ দেখাইলেই কবি তাঁহার ভুল সংশোধন করিয়া লইতেন। কবির মনে একদেশদর্শী হিন্দুত্বের স্থান ছিল না। মুসলমানদের মধ্যে যাঁহারা স্বাধীন মতবাদ লইয়া ধর্ম ও সমাজ-ব্যবস্থার সমালোচনা করিতেন, তাহাদের প্রতি কবির মনে প্রগাঢ় অনুরাগ ছিল। কিন্তু কবির নিকটে যাঁহারা আসিতেন, কবি শুধু তাহাদিগকেই জানিতেন। এই বয়সে ইহার বেশি খবরাখবর লওয়া কবির পক্ষে সম্ভবও ছিল না।

    একদিন কবি বলিতে লাগিলেন, দেখ, জমিদারির তদারক করতে সাজাদপুরে যেতাম। আমাদের একজন বুড়ো প্রজা ছিল। যৌবনকালে সে অনেক ডাকাতি করেছে। বুড়ো বয়সে সে আর ডাকাতি করতে যেত না। কিন্তু ডাকাতরা তাকে বড়ই মানত। একবার আমাদের এক প্রজা অন্য দেশে নৌকা করে ব্যবসা করতে যায়। ডাকাতের দল এসে নৌকা ঘিরে ধরল। তখন সে আমাদের জমিদারির সেই বুড়ো প্রজার নাম করল। তারা নৌকা ছেড়ে চলে গেল। এই বলে চলে গেল, ও তোমরা অমুক দেশের অমুকের গাঁয়ের লোক—যাও, তোমাদের কোন ভয় নেই। সেই বৃদ্ধ মুসলমান আমাকে বড়ই ভালবাসত। তখন নতুন বয়স। আমি জমিদারির তদারক করতে এসেছি। বুড়ো প্রায় পাঁচশ প্রজা কাছারির সামনে ডেকে নিয়ে এসেছে। আমি বললাম, এত লোক ডেকে এনেছ কেন? সে উত্তর করল, ওরা আপনাকে দেখতে এসেছে। ওরে তোরা দেখ। একবার প্রাণভরে সোনার চাঁদ দেখে নে। আমি দাঁড়িয়ে হাসতে লাগলাম।

    কবি বাংলা কবিতার একটি সংকলন বাহির করিবেন। আমাকে বলিলেন, তোমার সংগ্রহ থেকে কিছু গ্রাম্য গান আমাকে দিও। আমার বইয়ে ছাপাব।

    আমি কতকগুলি গ্রাম্য গান কবিকে দিয়ে আসিলাম। তাহার চার-পাঁচ দিন পর প্রশান্ত মহলানবীশের গৃহে কবির সঙ্গে দেখা করিলাম। শ্রীযুক্ত ও শ্রীমতী মহলানবীশ তখন কবির কাছে ছিলেন। কবি আমাকে দেখিয়া বলিলেন, ‘ওহে, তোমার সংগ্রহ করা গানগুলি পড়লাম। আমাদের দেশের রসপিপাসুরা ওগুলোর আদর করবে। কিন্তু আমি বইটি সংকলন করছি বিদেশী সাহিত্যিকদের জন্যে। অনুবাদে এগুলির কিছুই থাকবে না। ময়মনসিংহগীতিকা থেকে কিছু নিলাম, আর ক্ষিতিমোহনের সংগ্রহ থেকেও কিছু নেওয়া গেল?’

    আমি বলিলাম, ‘ময়মনসিংহ-গীতিকার’ গানগুলি শুধুমাত্র কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বইয়ে পাওয়া যায়। ময়মনসিংহে সাত আট বৎসর গ্রাম হতে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছি, কোথাও এই ধরনের মাজাঘষা সংস্করণের গীতিকা পাওয়া যায় না। গ্রাম-গাঁথার একটা কাঠামো সংগ্রহ করে চন্দ্রকুমার দে তার উপর নানা রচনা-কার্যের বুনট পরিয়ে দীনেশবাবুকে দিয়েছেন। তাই পল্লীর অশিক্ষিত কবিদের নামে চলে যাচ্ছে।

    কবি বলিলেন, কিন্তু ময়মনসিংহ-গীতিকায় কোন কোন জায়গায় এমন সব অংশ আছে যা চন্দ্রকুমার দে’র রচিত বলে মনে হয় না।

    আমি উত্তর করিলাম, এ কথা সত্য। এই অংশগুলি প্রচলিত ছোট ছোট গ্রাম্য গান। চন্দ্রকুমারবাবু এগুলি সংগ্রহ করে সেই প্রচলিত পল্লীগীতিকার কাঠামোর মধ্যে ভরে দিয়েছেন। ময়মনসিংহগীতিকার সেই অংশগুলিই দেশ-বিদেশের সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তা ছাড়া পল্লীগীতিকার কাহিনীর যে কাঠামোর উপরে এই ধরনের বুনট-কার্য হয়েছে, সেই গল্পাংশেরও একটা মূল্য আছে।

    কবি বলিলেন, আমাদের ক্ষিতিমোহনের সংগ্রহগুলি তো চমৎকার।

    আমি উত্তর করিলাম, ক্ষিতিমোহনবাবুর সংগ্রহগুলি আমি দেখি নাই। প্রবাসীতে ‘বাউল’ নামক প্রবন্ধে চারুবাবু কতকগুলি গ্রাম্য গান প্রকাশ করেছেন। সেগুলি নাকি ক্ষিতিমোহনবাবুর সংগ্রহ হতে নেওয়া। তার থেকে কয়েকটি লাইন আপনাকে শুনাই—

    কমল মেলে কি আঁখি, তার সঙ্গে না দেখি

    তারে অরুণ এসে দিল দোলা রাতের শয়নে,

    আমি মেলুম্ না, মেলুম না নয়ন

    যদি না দেখি তার প্রথম চাওনে।

    আপনি কি বলবেন, এসব লাইন কোন অশিক্ষিত গ্রাম্য বাউলের রচিত হতে পারে। আপনার কবিতার ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিমার সঙ্গে যাদের পরিচয় নেই, এমন লাইন তারা রচনা করতে পারে? ক্ষিতিমোহনবাবুর আরও একটি গানের পদ শুনুন–

    ও আমার নিঠুর গরজী,

    তুই মানস-মুকুল ভাজবি আগুনে।

    এই মানস-মুকুল কথাটি কি কোন অশিক্ষিত গ্রাম্য লোক জানে? এই গানটি কি আপনার ‘তোর কেউ পারবি না রে পারবি না ফুল ফোটাতে’ মনে করিয়ে দেয় না?

    কবি খানিকক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন। তারপর উত্তর করিলেন, তাইত ভাবি, এঁরা যদি আগেই এরূপ লিখে গেলেন, তবে আমাদের পরে আসার কি সার্থকতা থাকল?

    আমি কবিকে বলিলাম, আপনি কি কোন প্রবন্ধে এইসব তথাকথিত গ্রাম-গানগুলির বিষয়ে আপনার অভিমত লিখবেন? আপনি যদি লেখেন, তবে দেশের বড় উপকার হবে। যারা খাঁটি গ্রাম্য-গান সংগ্রহ করেন, তাদের সংগ্রহের আদর হবে।

    কবি উত্তর করিলেন, ‘দেখ, ক্ষিতিমোহন আমার ওখানে আছে, তার সংগ্রহ-বিষয়ে আমি কিছু বিরুদ্ধ মত দিয়ে তার মনে আঘাত দিতে চাই নে।’

    প্রশান্তবাবু আমাকে বলিলেন, আপনি এ বিষয়ে প্রবন্ধ লেখেন না কেন? আমি বলিলাম, দীনেশবাবু আমার জীবনের সব চাইতে উপকারী বন্ধু। কত ভাবে যে তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন তার ইয়ত্তা নাই। আমি যদি এ বিষয়ে প্রবন্ধ লিখি, তিনি বড়ই ব্যথা পাবেন। পূর্বের কথাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমি কবিকে বলিলাম, আপনার সংকলন-পুস্তকে যদি এই সব গান গ্রাম্য-সাহিত্যের নামে চলে যায়, তবে এর পরে যারা খাঁটি গ্রাম-গান সংগ্রহ করবেন, তাদের বড়ই বেগ পেতে হবে। কারণ এই সব সংগ্রহের সঙ্গে প্রচলিত আধুনিক সাহিত্যের মিশ্রণ আছে বলে সাধারণ পাঠকের দৃষ্টি এদিকে আকৃষ্ট হয়। তারা এগুলি পড়ে বলে, দেখ দেখ, অশিক্ষিত গ্রাম্য কবিরা কেমন আধুনিক কবিদের মত লিখেছে। যারা বহু পরিশ্রম করে খাঁটি গ্রাম্য-গান সংগ্রহ করেন, তাদের সংগ্রহ পড়ে বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত বলেন, অমুকের সংগ্রহের চাইতে তোমার সংগ্রহ অনেক নিম্নস্তরের।

    এই সময়ে প্রশান্তবাবু বলিলেন, আচ্ছা, এক কাজ করলে হয় না। আপনি তথাকথিত গ্রাম-গানগুলির বিষয়ে বিস্তৃত প্রবন্ধ লিখে গুরুদেবের নিকট দাখিল করুন। গুরুদেব ওর উপরে মন্তব্য লিখে দিলে লেখাটি গুরুদেবের মন্তব্য সহ সীল করে রাখা হবে। এর পর বহু বৎসর পরে প্রয়োজন হলে গুরুদেবের মন্তব্য সহ প্রবন্ধটি সাধারণের দরবারে হাজির করা যাবে।

    এই প্রস্তাবে কবি রাজি হইলেন। ইহার পর নানা কাজের ঝাটে আমি প্রবন্ধটি লিখিয়া কবিকে পাঠাইতে পারি নাই।

    কবির সংকলন-পুস্তক ইহার কিছুদিন পরেই বাহির হয়। এই সংকলনে কবি ময়মনসিংহ-গীতিকা হইতে অংশবিশেষ গ্রহণ করিয়াছেন। ক্ষিতিমোহনবাবুর সংগ্রহ হইতেও কিছু কিছু লইয়াছেন।

    রিপন কলেজে বাংলা ভাষার অধ্যাপকের পদ খালি হইল। এই পদের জন্য আমি দরখাস্ত করি। তখন রিপন কলেজের কার্য-পরিষদের সভাপতি ছিলেন শ্রীযুক্ত জে, চৌধুরী। শুনিতে পাইলাম, রবীন্দ্রনাথ এই পদের জন্য একজনকে সমর্থন করিয়া জে, চৌধুরীর নিকট সুপারিশ পত্র দিয়াছেন। চৌধুরী মহাশয় কলিকাতা ল-রিপোর্টর সম্পাদক ছিলেন। হাইকোর্টের বিদায়ী প্রধান বিচারক শ্রদ্ধেয় শ্রীফণিভূষণ চক্রবর্তী মহাশয় তখন তরুণ এডভোকেট, শ্রীযুক্ত চৌধুরীর সহকারী। তিনি আমাকে বড়ই ভালবাসিতেন। আমার সঙ্গে মাঝে মাঝে গ্রাম্য-গান লইয়া আলোচনা করিতেন। রিপন কলেজের এই কাজটি যাহাতে আমার হয়, সেজন্য তিনি অশেষ চেষ্টা করিয়াছিলেন। আমি এম. এ. পাশ করিলাম ১৯৩১ সনে, কিন্তু ১৯৩৭ সন পর্যন্ত কোথাও কোন চাকুরী পাইলাম না। কোনও বাংলার ভাল পদ খালি হইলে সেই পদের সঙ্গে কিছু সংস্কৃত পড়ানোর কাজও জুড়িয়া দেওয়া হইত। সুতরাং কোন গভর্নমেন্ট-কলেজে চাকুরী পাইবার দরখাস্ত করার সুযোগ মিলিত না। বেসরকারী কলেজে বাংলা পড়ানোর পদ খালি হইলে তাহারা অভিজ্ঞ শিক্ষকের জন্য বিজ্ঞাপন দিতেন। শিক্ষাকার্যে অভিজ্ঞতা অর্জন করারও আমি কোন সুযোগ পাইলাম না। তা ছাড়া কোন কলেজের চাকুরীর তদ্বির করার মত আমার কোন অভিভাবকও ছিল না। কিন্তু রিপন কলেজের চাকুরীর জন্য ফণীবাবু ও ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আমার জন্য বহুভাবে তদ্বির করিয়াছিলেন। একদিন ফণীবাবু আমাকে বলিয়াদিলেন, তুমি যদি রবীন্দ্রনাথের নিকট হইতে শ্রীযুক্ত চৌধুরীর নামে কোন সুপারিশ-পত্র আনিতে পার, তবে এখানে তোমার চাকুরী হইতে পারে। এই বিষয়ে আমি ধূর্জটিবাবুর সঙ্গে আলাপ করিলাম। তিনি আমাকে বলিলেন, তুমি শান্তিনিকেতনে গিয়া রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা কর। নিশ্চয় তিনি তোমাকে সুপারিশ পত্র দিবেন। আমি শান্তিনিকেতনে রওনা হইলাম।

    রবীন্দ্রনাথ তখন শ্যামলী নামক গৃহে অবস্থান করিতেছিলেন। শিল্পী নন্দলাল মাটি দিয়া কবির জন্য এই সুদৃশ্য গৃহটি নির্মাণ করিয়া দিয়াছিলেন।

    কবি অনেকগুলি কাগজপত্র বিছাইয়া লেখাপড়ার কাজে নিমগ্ন ছিলেন। হাসিয়া সস্নেহে আমাকে গ্রহণ করিলেন। কুশলপ্রশ্নের পর আমি কবিকে আমার আগমনের কারণ বলিলাম। কবি উত্তর করিলেন, দেখ, আমার চিঠিতে কারো কোন কাজ হয় না। তুমি মিছামিছি কেন আমার চিঠির জন্য এতদূর এসেছ? আমি সবিনয়ে উত্তর করিলাম, এই কাজের জন্য আপনি অপরকে সুপারিশপত্র দিয়েছেন। আমার যদি এখানে কাজ না হয় তবে মনে করব, আপনার চিঠির জন্যই এখানে আমার কাজটি হল না।

    কবি আমার কথার কোনই উত্তর দিলেন না। তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষার জন্য কতকগুলি ইংরেজী শব্দের বাংলা তর্জমা করিতেছিলেন। তাহা হইতে দুই একটি শব্দের বাংলা আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন। সৌভাগ্যক্রমে আমি তাহার সঠিক উত্তর দিতে পারিলাম। তখন কৌশলে আমি আবার সেই ব্যক্তিগত পত্রের কথা উল্লেখ করিলাম। কবিকে বলিলাম, ‘অতদূর থেকে আপনার কাছে এসেছি। আপনি সমুদ্র। এখানে এসে আমি শূন্য হাতে ফিরে যাব, এ দুঃখ আমার চির-জীবন থাকবে।’ কবি একটু হাসিয়া তাঁহার প্রাইভেট সেক্রেটারী অনিল চন্দকে ডাকিয়া বলিলেন, দেখ, মাইল্ড গোছের একটি চিঠি লিখে এনে দাও। ও কিছুতেই ছাড়বে না।

    অনিলবাবু ইংরেজীতে একটি চিঠি লিখিয়া আনিলেন, তাহাতে আমার গুণপনার পরিচয় দিয়া লিখিলেন, আমার উপর যেন সুবিচার করা হয়। যদিও ঐটি ব্যক্তিগত পত্র, তবু এখানে আমার জন্য বিশেষ কোন সুপারিশ করা হইল না। তাই কবিকে ধরিলাম, এখানে বাংলা করে লিখে দিন, জসীমউদ্দীনের যদি এখানে কাজ হয় আমি সুখী হব। কবি হাসিতে হাসিতে তাহাই লিখিয়া দিলেন। রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথও আমার জন্য সুপারিশ করিয়া শ্রীযুক্ত চৌধুরীর নামে একটি ব্যক্তিগত পত্র লিখিয়া দিলেন। সেই পত্র আনিয়া শ্রীযুক্ত চৌধুরী মহাশয়কে দিলাম।

    রিপন কলেজে সেবার আমার চাকুরী হইল না। রবীন্দ্রনাথ আগে যাহাকে ব্যক্তিগত পত্র দিয়াছিলেন, তাহার চাকুরী হইল। শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের পত্রের জন্য তাহার চাকুরী হয় নাই। তাহার চাকুরী হইল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় তাহার স্থান আমার উপরে ছিল বলিয়া। তবে আমার মত সাহিত্যিক খ্যাতি তাহার তখনও হয় নাই। ধুর্জটিপ্রসাদ এবং ফণীবাবুর চেষ্টায় এবং রবীন্দ্রনাথের পত্রের গুণে রিপন কলেজের কর্তৃপক্ষ আমার প্রতি খুবই আকৃষ্ট হইয়াছিলেন। তাঁহারা আমাকে আপাতত রিপন ইস্কুলের একটি মাস্টারী দিতে চাহিলেন এবং বলিলেন, এর পরে নতুন কোন পদ খালি হইলে আপনাকে আমরা কলেজের সামিল করিয়া লইব। আমি তাহা গ্রহণ করি নাই।

    কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে সেবার গবেষক নিয়োগ করা হয়। সেটা বোধ হয় ১৯৩২ সন। তখন রবীন্দ্রনাথ বাংলা বিভাগের প্রধান কর্তা। শুনিলাম, পাঁচজনকে নিয়োগ-পত্র দেওয়া হইবে। রবীন্দ্রনাথ তাহার শান্তিনিকেতনের দুইজন ছাত্রের জন্য সুপারিশ করিবেন। বাকি তিনজনের মধ্যে অন্যান্য কর্তাব্যক্তিদের নিজস্ব লোক রহিয়াছে।

    সুতরাং আমার সেখানে সূচ্যগ্র-প্রবেশেরও আশা নাই। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মুকুটহীন রাজা। আমি গিয়া রবীন্দ্রনাথকে ধরিলাম। গ্রাম্য-গান নিয়ে আমি কিছু কাজ করেছি। গবেষকের কাজটি যদি পাই, আমার সেই অসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করিতে পারি।

    কবি হাসিমুখে আমার জন্য শ্যামাপ্রসাদকে একখানা সুপারিশ-পত্র লিখিয়া দিলেন।

    রবীন্দ্রনাথের পত্রের গুণে এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহৎপ্রাণ মিণ্টো-প্রফেসার ডা. প্রমথনাথ ব্যানার্জী ও স্যার হাসান সারওয়ার্দীর চেষ্টায় আমি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-গবেষক নিযুক্ত হইলাম। নিয়োগপত্র পাইয়াই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করিয়া বলিলাম, “আপনার পত্রের জন্যে আমি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ পেয়েছি।”

    কবি বলিলেন, ‘তুমি আমাকে বড়ই আশ্চর্য করে দিলে হে। আমার কাছে কেউ কোন উপকার পেয়ে কোন দিন তা স্বীকার করে না।’

    তখনকার দিনে দেশের সর্বত্র সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াইয়া ছিল। রবীন্দ্রনাথের মধ্যে তার এতটুকুও প্রভাব বিস্তার করিতে পারে নাই। যখনই যেজন্য তাহার নিকটে গিয়াছি, তিনি হাসিমুখে তাহা করিয়া দিয়াছেন। মুসলমান বলিয়া তিনি আমাকে দূরে সরাইয়া রাখেন নাই। এখানে একটি দৃষ্টান্ত দিব।

    স্যার এফ রহমান সাহেব তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলার। তিনি আমাকে বলিলেন, রবীন্দ্রনাথ অথবা অন্য কোন নামকরা লোকের কাছ থেকে যদি কোন ব্যক্তিগত পত্র আনতে পার, তবে এখানে বাংলা-বিভাগে তোমার জন্য কাজের চেষ্টা করতে পারি। এম, এ, পাশ করিয়া তখন বহুদিন বেকার অবস্থায় চাকুরীর জন্য ঘুরিয়া বেড়াইতেছি। আমি তৎক্ষণাৎ কলিকাতা চলিয়া আসিলাম।

    কলিকাতা আসিয়া বাংলা-সাহিত্যের দুইজন দিকপালের সঙ্গে দেখা করিলাম। তাঁহারা কেহই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার নিয়োগ সমর্থন করিয়া কোন পত্র দিতে চাহিলেন না। একজন তো স্পষ্ট করিয়া বলিয়া দিলেন, ‘দেখ, আজকাল সাম্প্রদায়িকতার দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শত্রুর অভাব নাই। হয়ত কোন হিন্দু এই কাজের জন্য চেষ্টা করছে। তোমাকে ব্যক্তিগত পত্র দিলে হিন্দু কাগজগুলি আমাকে গাল দিয়ে আস্ত রাখবে না।’

    আমার তখন দুঃখে ক্ষোভে কাঁদিতে ইচ্ছা হইল। এরা আমাকে এত ভালবাসেন। আমি বেকার হইয়া চাকরীর জন্য কত ঘুরিয়া বেড়াইতেছি এরা একটা চিঠি দিলেই আমার কাজ হইয়া যাইত। অথচ যে হিন্দু প্রার্থীকে এরা চেনেন না, তারই সমর্থনে আমার ব্যক্তিগত পত্র দিলেন না। একবার ভাবিলাম, রবীন্দ্রনাথের কাছে যাই। তিনি হয়ত আমাকে ব্যক্তিগত পত্র দিবেন। আবার ভাবিলাম, হয়ত তিনিও এদেরই মত আমাকে প্রত্যাখ্যান করিবেন। কী কাজ তাঁহার নিকটে গিয়া!

    স্রোতে-পড়া লোক তৃণের আশাও ছাড়িতে চাহে না। আশার ক্ষীণ সূত্রটি কিছুতেই মন হইতে টুটিতে চাহে না। কে যেন আমাকে ঠেলিয়া শান্তিনিকেতনে লইয়া চলিল।

    সকালবেলা। কবি বারান্দায় বসিয়াছিলেন। পূর্ব গগনে রঙ্গিলা ভোর মেঘে মেঘে তার নক্‌সার কাজ তখনও বুনট করিয়া চলিয়াছে। সামনের বাগানে পাখির গানে ফুলের রঙে আর সুবাসে আড়াআড়ি চলিয়াছে। সালাম জানাইয়া কবির সামনে গিয়া দাঁড়াইলাম। কুশলপ্রশ্নের উত্তর দিয়া কবিকে আমার আগমনের কথা বলিলাম। কবি তৎক্ষণাৎ তার প্রাইভেট-সেক্রেটারী অমিয় চক্রবর্তী মহাশয়কে আমার জন্য একখানা সুপারিশপত্র লিখিয়া আনিতে নির্দেশ দিলেন। তখন আমি কবিকে সমস্ত কথা খুলিয়া বলিলাম। কলিকাতার দুইজন সাহিত্যের দিকপাল শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িক কারণে আমাকে যে সুপারিশ-পত্র দেন নাই, এ কথাও বলিলাম। সমস্ত শুনিয়া কবি মনঃক্ষুণ্ণ হইলেন।

    বন্ধুবর অজিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিচের তলায় কয়েকখানি কুঠরী ভাড়া লইয়া আমি প্রায় বৎসর খানেক ঠাকুরবাড়িতে ছিলাম। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ কলিকাতা আসিলে প্রায়ই তাঁহার সঙ্গে দেখা করিতে যাইতাম। তখন কোন দিন কবির সঙ্গে কী আলাপ হইয়াছিল, স্পষ্ট মনে নাই। কয়েকটি টুকরো কথা উজ্জ্বল উপলখণ্ডের মত মনের নদীতে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। তাহা এখানে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখি।

    একদিন কথা প্রসঙ্গে কবি বলিলেন, দেখ, আমার বিষয়ে লোকে যখন তখন যা-কিছু লিখতে পারে। কেউ কোন উচ্চবাচ্য করে না।

    আমি বলিলাম, ‘আপনি কবি, সাহিত্যিক,—আপনাকে নিন্দা করেও সাহিত্য তৈরী হয়। তাই আপনার নিন্দা করা সহজ। কিন্তু একথা নিশ্চয় জানবেন, দেশের শতসহস্র লোক আপনার কবিতা পড়ে আনন্দ পায়—আপনাকে শ্রদ্ধা করে। শ্রদ্ধা অন্তরে অনুভব কববার বস্তু। নিন্দার মত শ্রদ্ধা বাহিরে তত মুখর নয়। আপনাকে যারা শ্রদ্ধা করে আপনি তাদের দেখেন নি।’

    কবি অনেকক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন, পরে উত্তর করিলেন, দেখ মহাত্মা গান্ধীকে ত কেউ নিন্দা করতে সাহস করে না।

    আমি বিনীতভাবে উত্তর করিলাম, ‘মহাত্মা গান্ধী বিশিষ্ট ব্যক্তি হলেও তাঁকে নিন্দা করলে সাহিত্য তৈরী হয় না। আপনার সঙ্গে আপনার নিন্দুকেরাও কিছুদিন বেঁচে থাকতে চায়। ছুছুন্দরী কাব্যের লেখকের নাম আজ কে মনে রাখত যদি মাইকেলের অমর কাব্যের সঙ্গে এই কাব্য জড়িত না থাকত?’

    এই আলোচনার পরে দেশে এমন দিনও আসিয়াছিল, যে জনতা গান্ধীজীকে মহাত্মা না বলিলে ক্ষেপিয়া যাইত, তাহারাই তাঁহার গায়ে ইষ্টক নিক্ষেপ করিয়াছে—তাহার গাড়ি আক্রমণ করিয়াছে। পরিশেষে সেই জনতার একজনের হাতেই গান্ধীজীকে জীবন পর্যন্ত দিতে হইল।

    ঠাকুর-বাড়িতে থাকিলে এপ্রিল মাসের প্রথম তারিখে আমরা অনেক আজব কাণ্ড করিতাম। এই সুখী পরিবার কোন-কিছু উপলক্ষ করিয়া হাসিতামাসার সুযোগ পাইলে তাহা ছাড়িত না। আমার কোন কবিবন্ধুকে ঠাট্টা করিয়া কবিতায় একটি পত্র লিখিয়াছিলাম। ভাবিয়াছিলাম, কোন কৌশলে তাহা বন্ধুবরের পকেটে রাখিয়া আসিব। ঠাকুরবাড়ির একটি ছোট ছেলে ছো মারিয়া সেটা লইয়া গিয়া এনভেলপে ভরিয়া রবীন্দ্রনাথের ঠিকানা লিখিয়া কবিকে দিয়া আসিল। আমি ত ভয়ে বাঁচি না। একে কবিতাটি রচনা হিসেবে একেবারে কাঁচা, তাহা ছাড়া বন্ধুকে লইয়া যে বিদ্রুপ করিয়াছি শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে লইয়া তাহা পারা যায় না। কবি না জানি আমাকে কি বলিবেন? আমার শিল্পীবন্ধু ব্রতীন্দ্রনাথ ঠাকুর গিয়া কবিকে সকল কথা খুলিয়া বলিলেন। কবি আমাকে ডাকাইয়া লইয়া বলিলেন, এতে তুমি এত মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছ কেন? আমি কিছু মনে করি নি, বরঞ্চ বেশ আনন্দ পেয়েছি। তারপর যাহাতে এজন্য আমার মনে লেশমাত্র অনুতাপ না থাকে—কবি সস্নেহে আমার সঙ্গে অনেক গল্প করিলেন। অতি-আধুনিক কবিদের বিষয়ে আলোচনা হইল। আমি বলিলাম, আজকাল একদল অতি-আধুনিক কবির উদয় হয়েছে। এরা বলে, সেই মান্ধাতার আমলের চাঁদ, জোছনা ও মৃগনয়নের উপমা আর চলবে না; নতুন করে উপমা-অলঙ্কার গড়ে নিতে হবে। গদ্যকে এরা কবিতার মত করে সাজায়। তাতে মিল আর ছন্দের আরোপ বাহুল্যমাত্র। এলিয়টের আর এজরা পাউণ্ডের মত করে এরা লিখতে চায়। বলুন ত একজনের মতন করে লিখলে তা কবিতা হবে কেন? কবির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য যদি না থাকল তার প্রকাশে, তাকে কবি বলে স্বীকার করব কেন? দিনে দিনে এদের দল বেড়ে যাচ্ছে। এরা অনেকেই বেশ পড়াশুনো করে। বিশেষ করে ইংরেজী-সাহিত্য। তারই দৌলতে এরা নিজের দলের স্বপক্ষে বেশ জোরাল প্রবন্ধ লেখে।

    কবি বলিলেন, ‘এজন্য চিন্তা করো না। এটা সাময়িক ঘটনা। মেকির আদর বেশী দিন চলে না। একথা জেনো, ভাল লেখকদের সংখ্যা সকল কালেই খুব কম। আর মন্দ লেখকেরা সংখ্যায় যেমন বেশী, শক্তির দাপটে তেমনি অজেয়। কিন্তু কালের মহাপুরুষ চিরকালই সেই অল্পসংখ্যক দুর্বল লেখকদের হাতে জয়পতাকা তুলে দিয়েছেন।’

    আজ বহুদিন পরে মনের অস্পষ্ট স্মৃতি হইতে এইসব কথা লিখিতেছি। উপরের কথাগুলি কবি ঠিক এইভাবেই যে বলিয়াছিলেন, তাহা হলপ করিয়া বলিতে পারি না।

    তখনকার দিনে রবীন্দ্রনাথের গানের তেমন আদর হয় নাই। রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড হইলে দুই-শ আড়াই-শর বেশি বিক্রয় হইত না। একদিন কবির সঙ্গে তার গানের সুরের বিষয়ে আলোচনা হইল। আমি বলিলাম, ‘আজকাল আধুনিক গায়কেরা আপনার গান গাইতে চায় না। আপনার গানের ভিতরে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কারুকার্য আছে, তা আমাদের অবচেতন মনে প্রভাব বিস্তার করে। সাধারণ গায়কেরা সেই সূক্ষ্ম কারুকার্যের আদর করিতে জানে না। তারা গানের সুরে স্থূল ধরনের কারুকার্য চায়। যা হলে শ্রোতারা বাহবা দিতে পারে। তাই দেখতে পাই, আপনার গানের ভাষার অনুকরণে যারা গান লেখে, সেই সব গানে স্থূল ধরনের সুর লাগিয়ে তারা আসর সরগরম করতে চায়। কবি অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন, ‘এটাও একটা সাময়িক ব্যাপার। এগুলোর আদর বেশী দিন টিকবে না।’

    একবার কথাপ্রসঙ্গে কবিকে বলিলাম, ‘আপনার কবিতার ভাষায় এমন অপূর্ব ধ্বনিতরঙ্গ তোলে—কোথাও এমন একটি শব্দ আপনি ব্যবহার করেন নি, যেটাকে বদলিয়ে আর একটি বসান যায়। এত লিখেছেন, কোন লেখার একটি শব্দও মনে হয় না অস্থানে পড়েছে। আপনার ঐ যে গান–

    গ্রামছাড়া ওই রাঙ্গামাটির পথ

    ওরে, আমার মন ভুলায় রে—

    কী সুন্দর রহস্যলোকে মন উধাও হয়ে যায় শব্দের আর সুরের পাখায়। কিন্তু যেখানটিতে আপনি লিখেছেন,

    সে যে আমায় নিয়ে যায় রে

    নিয়ে যায় কোন চুলায় রে—

    এখানে চুলায় কথাটি শুনতে কল্পনার আকাশখানি যেন মাটিতে পড়ে যায়।’

    কবি কৃত্রিম কোপ প্রকাশ করিয়া বলিলেন, ‘তা চুলোয় বলছি তো হয়েছে কি? কথাটি তোদের বাঙাল দেশে হয়ত তেমন চলে না। অথবা অন্য ভাবে আছে।’

    কবির সঙ্গে তাঁর আরও কোন কোন কবিতার আলোচনা করিতে চাহিয়াছিলাম। কবি আমাকে বলিলেন, ‘যা, এখন যা। আমার অনেক কাজ আছে। আগে তুই প্রফেসর হ, তখন এসব তোকে বলব।’

    ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ ছাপা হইলে কবিকে পড়িতে দিলাম।

    পড়িয়া তিনি খুব প্রশংসা করিলেন। আমি বলিলাম, “আপনি যদি এই বই-এর বিষয় কিছু লিখে দেন, আমি ধন্য হব”।

    শান্তিনিকেতনে গিয়া কবি পত্র লিখিলেন—‘তোমার সোজন বাদিয়ার ঘাট অতীব প্রশংসার যোগ্য। এ বই যে বাংলার পাঠকসমাজে আদৃত হবে সে বিষয়ে আমার লেশমাত্র সন্দেহ নাই।’

    কবির ঐ ভবিষ্যৎবাণী সার্থক হইয়াছে। বই খুব জনপ্রিয় হইয়াছে। ইউনেস্কো হইতে ইংরাজি অনুবাদও শীঘ্র বাহির হইবে।

    আমার পাশ্ববর্তী গ্রামের একটি মুসলমান চাষী ভাল বাঁশী বাজাইতে জানিত। কতদিন তাকে ডাকিয়া আনিয়া আমাদের পদ্মাতীরের বাড়িরধারে বাঁশঝাড়ে সারারাত জাগিয়া বাঁশী শুনিয়াছি। ঝাড়ের বাঁশ কাটিয়া নিজের ইচ্ছামত ছিদ্র তৈরি করিয়া সে তার হাতের বাঁশী তৈরি করিয়াছিল। হারমোনিয়ামের সা-রে-গা-মা-র সঙ্গে বাঁশীর ছিদ্রগুলির কোনই মিল ছিল না। কিন্তু বিচ্ছেদ, বারমাসী ও রাখালী সুরের সবখানি মধু বাঁশীতে সে ঢালিয়া দিতে পারিত। গভীর রাত্রিকালে সে যখন বেহুলাসুন্দরীর গান ধরিত, তখন যেন স্পষ্ট দেখিতে পাইতাম, আমাদেরই পদ্মা নদী দিয়া কলার মান্দাসে অভাগিনী বেহুলা লক্ষ্মীন্দরকে লইয়া ভাসিয়া চলিয়াছে।

    নিজের বাড়িতে সে বাঁশী বাজাইতে পারিত না। বাড়ির মেয়েরা বাঁশীর সুরে উদাসী হইয়া যাইবে বলিয়া গ্রামবাসীরা তাহাকে ধরিয়া মার দিত। গভীর রাতে যখন সকলে ঘুমাইয়া পড়িত, তখন সে গ্রাম হইতে বাহিরে আসিয়া মাঠের মধ্যস্থলে বসিয়া বাঁশী বাজাইত। তাহার বাঁশীতে ‘জল ভর সুন্দরী কন্যা’ গানটি শুনিয়া কোন যুবতী নারী নাকি একদিন ঘরের বাহির হইয়া আসিয়াছিল।

    এই গুণী লোকটি ছিল আমার আত্মার আত্মীয়। দেশে গিয়া প্রায়ই তাহাকে ডাকিয়া তাহার বাঁশী শুনিতাম। মনে হইল, এমন গুণী লোককে কলিকাতা লইয়া গেলে সেখানকার লোকে নিশ্চয় উহার বাঁশী শুনিয়া তারিফ করিবে।

    কালা মিয়াকে কলিকাতা আনিয়া গ্রামোফোন কোম্পানিগুলিতে অনেক ঘোরাঘুরি করিলাম। কেউ তার বাঁশী রেকর্ড করিতে চাহিল না। নাট্ট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ীকে একদিন তার বাঁশী শুনাইলাম। গুণীজনের সমাদর করিতে তাঁর মত আর কেহ জানিত না। বাঁশী শুনিয়া তিনি মুগ্ধ হইলেন। তার অর্কেস্ট্রাতে কালা মিয়াকে বাজাইবার হুকুম দিলেন। কিন্তু দিলে কি হইবে? অর্কেস্ট্রার বাজিয়েদের সুরের সঙ্গে বাঁশীর সুরের পর্দা মেলে না। কারণ অর্কেস্ট্রার একটি পদ খালি হইলেই বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনকে আনিয়া বসাইতে পারে, তাই তারা আপদবিদায় হইলে বাঁচে। যদি তারা সময় দিত, এই গ্রাম্য যুবকটিকে স্নেহমমতার সঙ্গে তাহাদের যন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত করাইত, সে হয়ত পরিণামে তাহাদের সুরের সঙ্গে সুর মিলাইয়া বাঁশী বাজাইতে পারিত। বাঁশী বাজিয়েরা অভিযোগ করিতে লাগিল। শিশিরবাবু বিরক্ত হইয়া তাহাকে ছাড়াইয়া দিলেন।

    অবনীন্দ্রনাথকে এই বাঁশী আগেই শুনাইয়াছি। তিনি খুব তারিফ করিয়াছেন। কিন্তু তাহাদের জমিদারী তখন কোর্ট অফ ওয়ার্ডসে যাইতেছে। টাকা-পয়সার দিক দিয়া তিনি কোনই সাহায্য করিতে পারিবেন না। আগেকার দিন হইলে এককথায় হাজার ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিতেন। ভাবিলাম, রবীন্দ্রনাথকে বাঁশী শুনাইব। যদি তাহার ভাল লাগে, হয়ত তিনি তাকে শান্তিনিকেতনে লইয়া যাইবেন।

    আমার সকল নাট্যের কাণ্ডারী মোহনলালের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া কবিকে এই বাঁশী শুনাইবার এক অভিনব পন্থা আবিষ্কার করিলাম। রবীন্দ্রনাথ তখন থাকিতেন পূবের দোতলায়। অবনীন্দ্রনাথের বাড়ির উত্তরের গাড়ি-বারান্দার দোতালায় কালা মিয়াকে বসাইয়া বাঁশী বাজাইতে বলিলাম। কালা মিয়া বাঁশীতে সুর দিয়া বাজাইয়া চলিল—‘রাধা বলে ভাইরে সুবল আমি আর কত বাজাব বাঁশী।’ আমরা নিচে দাঁড়াইয়া রবীন্দ্রনাথের আনাগোনা লক্ষ্য করিতে লাগিলাম। বাঁশী শুনিয়া কবির ভাবান্তর জানিবার জন্য মোহনলালের দাদামশাই সমরেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আগেই রবীন্দ্রনাথের কাছে পাঠাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। কালা মিয়া আবার বাঁশীতে গান ধরিল :

    জাইত গেল বাইদার সাথে

    জাইত গেল কুল গেল ভাঙল সুখের আশা

    ওরে, রজনী পরভাতের কালে পাখী ছাড়ল বাসা রে—

    বিলম্বিত সুরের মুর্ছনা আকাশ-বাতাস আছড়াইয়া কাঁদিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে রবীন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে আসিয়া বারান্দার উপর দাঁড়াইলেন। কয়েক মিনিট থাকিয়া ঘরে ফিরিয়া গেলেন। সমরেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের ঘর হইতে ফিরিয়া আসিলেন। আমরা জানিতাম, এই বাঁশী শুনিয়া কবি খুবই খুশি হইবেন। সেই কথা শুনিবার জন্য তাঁহাকে ঘিরিয়া দাঁড়াইলাম। সমরেন্দ্রনাথের কাছে শুনিলাম, রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন, দেখ ত কে আমাকে এই সকালবেলা এমন একঘেয়ে করুণ সুরের বাঁশী শুনায়। সকালবেলা কি এই সুর শোনার সময়? এই কথা শুনিয়া মনে মনে খুবই ব্যথা পাইলাম। বুঝিলাম এই বাঁশী শোনার মনোভাব কবির তখন ছিল না। অন্য সময় যদি শুনাইতে পারিতাম, কবি হয়ত বাঁশী পছন্দ করিতেন। কালু মিয়া দেশে ফিরিয়া গেল। কলিকাতার কোন গুণগ্রাহী এই মহাগুণীর আদর করিল না। দেশে গিয়া সে রিক্সাচালকের কাজ করিত। অমানুষিক পরিশ্রম ও অল্প আহারে যক্ষ্মা-রোগগ্রস্ত হইয়া সে চিরকালের মত ঘুমাইয়াছে। তাহার মত অমন মধুর বাঁশীর রব আর কোথাও শুনিতে পাইব না।

    আজ পরিণত বয়সে বুঝিতেছি যে, কবি কোন দিনই এই বাঁশী শুনিয়া আমাদের মতন মুগ্ধ হইতেন না। কবি যখন সাহিত্য আরম্ভ করেন, তখন সমস্ত দেশ পল্লীগানে মুখর ছিল। কালা মিয়ার চাইতে সহস্রগুণের ভাল বাঁশী-বাজিয়ের সুর তিনি শুনিয়াছিলেন। লোক-সাহিত্যের উপর কয়েকটি প্রবন্ধ লেখা ছাড়া তাহাদের সুর বা কৃষ্টি রক্ষা করিতে তিনি বিশেষ কিছুই করেন নাই। ইংরেজ-আগমনের সময় আমাদের বাংলা সাহিত্য ছিল জনসাধারণের। বিদেশি সাহিত্যের ভাবধারা আর প্রকাশ-ভঙ্গিমার উপর পল্লব মেলিয়া নব্য বাঙালিরা যে সাহিত্য তৈরি করিলেন, রবীন্দ্রনাথের হাতে পড়িয়া সে সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যে পরিণত হইল। পরলোকগত চিত্তরঞ্জনের অনুগামীরা ছাড়া সমস্ত দেশ বিস্ময়ে এই মহাস্রষ্টার পায়ে প্রণামাঞ্জলি রচনা করিল। সমস্ত কথা বলিবার সময় এখনো আসে নাই। আর ধান ভানিতে শিবের গীত গাহিয়াই বা কি হইবে। আমি রবীন্দ্রস্মৃতিকথা লিখিতেছি। একবার গ্রাম-গানের বিষয়ে কবির সঙ্গে আলাপ হইল। কবি বলিলেন, ‘দেখ, তোমাদের গ্রাম্যগানের সুর হুবহু শেখার সুযোগ আমার হয় নি। যা একটু সুরের কাঠামো পেয়েছি, তার সঙ্গে আমার সুর মিশে অন্য একটা কিছু তৈরি হয়েছে।’

    আমি বলিলাম, ‘সেই জন্যই আপনার বাউল-সুরের গানগুলির অনুরূপ সুর আমি কোথাও খুঁজে পাইনে।’

    কবি বলিলেন, ‘তুমি কিছু খাঁটি গ্রাম্য সুর আমার শান্তিনিকেতনের মেয়েদের শিখিয়ে দিও। তাদের কাছ থেকে আমি শুনব।’

    তখন আমার মনে হইয়াছিল, পাছে আমি নিজেই আমার হেড়ে গলায় কবিকে গান শুনাইতে চাহি সেইজন্য কবি আগেভাগে আমাকে সতর্ক করিয়া দিলেন। অভিনয়ে সংগীতে আবৃত্তিতে তিনি সর্বসুন্দর ছিলেন। আর্টের এতটুকু দুর্গতি তিনি সহ্য করিতে পারিতেন না। আজ মনে হইতেছে, তিনি হয়ত সত্যসত্যই গ্রাম্যগানের একটি ক্ষুদ্র দল তাঁর গায়িকাদের নিয়ে পড়তেন। যেমন তিনি ওস্তাদি গান নিয়ে পড়েছিলেন।

    কবি যখন আমার সঙ্গে কথা বলিতেন, মনে হইত, তিনি যেন কোন শিশুর সঙ্গে কথা বলিতেছেন। কখনো তুমি বলিতেন, কখনো তুই বলিতেন। কবির কাছ হইতে যখন ফিরিয়া আসিতাম, মনে হইত কোন মহাকাব্য পাঠ করিয়া এই ক্ষণে উঠিয়া আসিতেছি। সেই মহাকাব্যের সুরলহরী বহুদিন অন্তরকে সুখস্বপ্নে ভরিয়া রাখিত। তার নিকট হইতে আসিলেই মনে হইত, কী যেন অমূল্য সম্পদ পাইয়া ফিরিয়া আসিয়াছি। আপন-পরের জ্ঞান তার থাকিত না। তাঁর ভক্তেরা দিন-রজনী পাহারা দিয়াও কবির নিকটে পর-মানুষের আসা ঠেকাইয়া রাখিতে পারি না। কেহ দেখা করিতে আসিয়া ফিরিয়া গিয়াছে জানিলে কবি বড়ই মনঃক্ষুণ্ণ হইতেন। সেইজন্য তাঁহার ভক্তগোষ্ঠী দিনে দিনে বাড়িত। পুরাতনেরা নূতনকে বাধা দিতে পারিত না। কবির অসুখবিসুখ হইলে তাহার শুভানুধ্যায়ীরা সর্বদা সন্ত্রস্ত থাকিতেন, অভ্যাগত কেহ আসিলে পাছে কবি তাহা জানিয়া ফেলেন। কারণ ডাক্তারের নিষেধ কবির সঙ্গে যেন কেহ দেখা না করে। এত যে ব্যস্ত থাকিতেন তিনি, কিন্তু প্রত্যেকখানা পত্রের উত্তর দিতেন। আমাদের বিবাহের আগে কবিকে নিমন্ত্রণ করিলাম। কবি একটি সুন্দর আশীর্বাদপত্র রচনা করিয়া পাঠাইলেন।

    অনেক সময় কবির কাব্য আর কবিকে ভাবি। আমার মনে হয়, কবির জীবনে কিছু শক্তি আর অর্থের অপচয় ঘটিয়াছে তার শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী পরিগঠনে। এ কাজ কবি না করিলেও অপরে করিতে পারিত। এই দুটো প্রতিষ্ঠান না থাকিলে কবি হয়ত আরও অনেক সাহিত্যিক দান রাখিয়া যাইতেন। সারা পাকভারতে আজ রবীন্দ্রনাথের কোন উত্তরাধিকারী নাই। এমন সাহিত্যপ্রতিভা কোথাও দেখি না যে রবীন্দ্রনাথের ধারেকাছেও যাইতে পারে। বিশ্বভারতী আর শান্তিনিকেতনের কাজে কবির বহু সময় ব্যয় হইয়াছে। সেই সময় হয়ত তিনি তার সমধর্মী সাহিত্যিকদের জন্য দিতে পারিতেন। সমালোচনা করিয়া ভুলত্রুটি দেখাইয়া সংশোধন করিয়া তাহাদিগকে তিনি বড় সাহিত্যিক রূপে গড়িয়া তুলিতে পারিতেন। যেমন করিয়াছিলেন তিনি তাহার প্রথম যৌবনে।

    যাহা হয় নাই, তাহার জন্য দুঃখ করিয়া লাভ নাই।

    কবি চলিয়া গিয়াছেন সুদীর্ঘকাল। বহু ব্যক্তি বহুভাবে কবির সাহচর্য লাভ করিয়াছেন। কবির মৃত্যু নাই একথা সত্য কিন্তু কবির সংস্পর্শে আসার সুযোগ যাহাদের হইয়াছে, তাহাদের মনের শুন্যতা কেহ কোনদিন পূরণ করিতে পারিবে না।

  • অবন ঠাকুরের দরবারে

    অবন ঠাকুরের দরবারে

    জসীম উদ্‌দীন

    [book]

    অবন ঠাকুরের দরবারে

    কলিকাতা গেলেই আমি কল্লোল-আফিসে গিয়া উঠিতাম। সেবার কলিকাতা গেলে কল্লোলের সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাশ আমাদের সকলকার দীনেশদা বলিলেন অবনীন্দ্রনাথ তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চান। কাল তোমাকে তার কাছে নিয়ে যাব। কল্লোলে প্রকাশিত তোমার মুর্শিদা-গান প্রবন্ধটি পড়ে তিনি খুশি হয়েছেন।–

    পরদিন সকালে আমরা ঠাকুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলাম। ঠাকুরবাড়ির দরজায় আসিয়া দীনেশদা কার্ডে নাম লিখিয়া দরওয়ানের হাতে উপরে পাঠাইয়া দিলেন। আমি উপরে ওঠার সিঁড়ির সামনে দাঁড়াইয়া নানা কথা ভাবিতে লাগিলাম। এই সেই অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি—প্রবাসীতে যার ‘শেষ বোঝা’ চিত্র দেখিয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাইয়া দিয়াছি। সীমাহীন মোহময় মরুপ্রান্তরে একটি উট বোঝার ভারে নুইয়া পড়িয়া আছে। সেই করুণ গোধুলির আসমানের রঙ আমার মনে কেমন যেন এক বিরহের উদাসীনতা আঁকিয়া দিত। রঙের আর রেখার জাদুকর সেই অবন ঠাকুরের সঙ্গে আজ আমার দেখা হইবে। উপরে ওঠার কাঠের সিঁড়ির দুই ধারে রেলিংয়ের উপর কেমন সুন্দর কারুকার্য। নানা রকমের ছবি। একপাশে একটি ঈগলপাখি। এরা যেন আমার সেই কল্পনাকে আরও বাড়াইয়া দিল।

    কিছুক্ষণ পরে চাকর আসিয়া আমাদিগকে সেই সিঁড়ি-পথ দিয়া উপরে লইয়া গেল। সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিয়া একখানা ঘর পার হইয়া দক্ষিণ ধারের বারান্দা। সেখানে তিনটি বৃদ্ধলোক ডান ধারের তিনটি জায়গায় আরামকেদারায় বসিয়া আছেন। কাহারও মুখে কোন কথা নাই। কোথাও টু-শব্দটি নাই। দুই জন ছবি আঁকিতেছেন, আর একজন বই পড়িতেছেন। প্রত্যেকের সামনে একটি করিয়া আলবোলা। খাম্বিরা তামাকের সুবাসে সমস্ত বারান্দা ভরপুর। ডানধারে উপবিষ্ট শেষ বৃদ্ধ লোকটির কাছে আমাকে লইয়া গিয়া দীনেশদা বলিলেন, ‘এই যে জসীম উদ্‌দীন। আপনি এর সঙ্গে আলাপ করতে চেয়েছিলেন।’

    ছবি আঁকা রাখিয়া ভদ্রলোকটি বলিলেন, ‘এসো, এসো, সামনের মোড়টা টেনে নিয়ে বস।’

    আমরা বসিলাম। দীনেশা আমার কানে কানে বলিলেন, ইনিই অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর; আর ওপাশে বসে ছবি আঁকছেন, উনি গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। যিনি বই পড়ছেন, উনি সমরেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এরা তিনজনে সহোদর ভাই।

    হুঁকোর নল হইতে মুখ বাহির করিয়া অবন ঠাকুর বলিলেন, ‘তোমার সংগৃহীত গানগুলি পড়ে আমার খুব ভাল লেগেছে। আমার প্রবন্ধে এর একটা গান উদ্ধৃত করেছি, এই যে–

    এক কালা দতের কালি

    যাদ্যা কলম লিখি,

    আরো কাল চক্ষের মণি

    যাদ্যা দৈনা দেখি—

    এ গুলি ভাল, আরও সংগ্রহ কর। এক সময় আমি এর কতকগুলি সংগ্রহ করিয়েছিলাম।’

    এই বলিয়া তিনি তার বইপত্র খুলিয়া একখানা নোট বই বাহির করিলেন। আমি দেখিয়া আশ্চর্য হইলাম, কত আগে অবনবাবু তার কোন ছাত্রের সাহায্যে যশোর ও নদীয়া জেলা হইতে অনেকগুলি মুর্শিদা-গান সংগ্রহ করাইয়াছেন।

    দীনেশদা অবনবাবুকে, বলিলেন, ‘জসীমের মুর্শিদা-গানের সংগ্রহ আমার কাগজে ছাপিয়েছি। অনেকে বলে, এগুলো ছাপিয়ে কি হবে?’

    অবনবাবু বলিলেন, ‘মশাই, ও সব লোকের কথা শুনবেন না। যত পারেন, এগুলো ছেপে যান। এর পরে এগুলো আর পাওয়া যাবে না।’

    তারপর নানা রকমের গ্রাম-গানের বিষয়ে আলাপ হইল। কবিগান যাত্রাগান জারীগান কোথায় কি ভাবে গাওয়া হয়, কাহারা গায়, কোথায় কোন গাজীর গানের দল ভাল রূপকথা বলে, শিশুর আগ্রহ লইয়া তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। উত্তর দিতে আমার এমনই ভাল লাগিল!

    কিশোর বয়স্ক একটি ছেলে আমার কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। এক বৎসর আগে এর সঙ্গে আমার আলাপ হইয়াছিল। দীনেশদা প্রেসিডেন্সী কলেজে রবীন্দ্রনাথের “মুক্তধারা” বইখানার অভিনয় পরিচালনা করিয়াছিলেন। সেই উপলক্ষে আমি প্রেসিডেন্সী কলেজে গিয়া অভিনয় দেখি। আমার পাশে একটি ছোট্ট খোকা আসিয়া বসিল। অপরের সঙ্গে আলাপ করিবার তাহার কী আগ্রহ! সে-ই আমার সঙ্গে প্রথম কথা বলিল। আমি কোথা হইতে আসিয়াছি, কি করি ইত্যাদি। হয়ত সেই আলাপে নিজের পরিচয়ও দিয়াছিল। তার কথা একদম ভুলিয়া গিয়াছিলাম। খোকা আসিয়া আমার সঙ্গে আলাপ করিয়া সেই পরিচয়ের সূত্রটি ধরাইয়া দিল। অবনবাবুর নিকট হইতে বিদায় লইয়া কল্লোল-অফিসে ফিরিয়া আসিলাম।

    অবনবাবুর বাড়িতে যে গল্পটি বলিব ঠিক করিয়াছিলাম, সারাদিন মনে মনে তাহা আওড়াইতে লাগিলাম। এই গল্প আমি কতবার কত জায়গায় বলিয়াছি। সুতরাং গল্পের কোন কোন জায়গা শুনিয়া ঠাকুরবাড়ির শ্রোতারা একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া যাইবেন, তাহা ভাবিয়া মনে মনে রোমাঞ্চিত হইতে লাগিলাম।

    বিকালবেলা দীনেশদার জরুরী কাজ ছিল। আমাকে সঙ্গে লইয়া অবনবাবুর বাড়ি চলিলেন পবিত্রদা। সুপ্রসিদ্ধ সাহিত্যিক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়। অবনবাবুর বাড়ি আসিয়া দেখি—সে কী বিরাট কাণ্ড! রবীন্দ্রনাথের বিচিত্রা-ঘরের হলে গল্পের আসর বসান হইয়াছে। বাড়ির যত ছেলেমেয়ে, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যুবক-যুবতী সকলে আসিয়া সমবেত হইয়াছে গল্প শুনিতে। অবনবাবুর দুই ভাই গগনেন্দ্রনাথ আর সমরেন্দ্রনাথ আগেই আসিয়া আসন গ্রহণ করিয়াছেন। আরও আসিয়াছেন রবীন্দ্রনাথের সকল সুরের কাণ্ডারী আর সকল গানের ভাণ্ডারী দিনেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথ। গল্পের আসরের উপলক্ষ করিয়া হলটিকে একটু সাজান হইয়াছে। কথক ঠাকুরদের মত সুন্দর একটি আসনও রচিত হইয়াছে আমার জন্য।

    এসব দেখিয়া আমার চোখ ত চড়কগাছ! সুদূর গ্রামদেশের লোক আমি। জীবনে দুই-এক বারের বেশী  কলিকাতা আসি নাই। শহরে হাঁটিতে চলিতে  কথা কহিতে জড়তায় জড়াইয়া যাই। আজ এই আসরে আমি গল্প বলিব কেমন করিয়া? আমার বুকের ভিতরে ঢিপঢিপ করিতে লাগিল। আমার ভয়ের কথা পবিত্রদাকে বলিলাম। তিনি বলিলেন, “তুই কোন চিন্তা করিসনে। যা জানিস বলে যাবি। এঁরা খুব ভাল শ্রোতা।”

    পবিত্রদা সাহস দিলেন। কিন্তু আমার ভয় আরও বাড়িয়া গেল। সভা-স্থলে অবনবাবু আসিলেন। তিনি সহাস্যে বলিলেন, “দেখ, তোমার গল্প শোনার জন্য কত লোক এনে জড় করেছি। রবিকাকেও ধরে আনতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তিনি একটি কাজে অন্যত্র চলে গেলেন। এবারে তবে তুমি আরম্ভ কর।”

    বলির পাঁঠার মত আমি সেই আসনে গিয়া বসিলাম। পবিত্রদা আমার পাশে। কিন্তু থাকিলে কি হইবে? সামনের দিকে চাহিয়া দেখি—রঙিন শাড়ীর ঝকমকি, সুগন্ধি গুঁড়ো আর সেণ্টের গন্ধ। আমার বুকের দুরুদুরু আরও বাড়িয়া গেল।

    অবনবাবু তাড়া দিলেন, “এবার তবে আরম্ভ হোক রূপকথা।”

    আমার তখনও কলিকাতার বুলি অভ্যস্ত হয় নাই। কিছুটা কলিকাতার কথ্য ভাষায়, আর কিছুটা আমার ফরিদপুরের ভাষায় গল্প বলিতে আরম্ভ করিলাম।

    উত্তরে বন্দনা করলাম হিমালয় পর্বত,

    যাহার হাওয়ায় কাঁপে সকল গাছের পাত।

    পুবেতে বন্দনা করলাম পুবে ভানুশ্বর,

    একদিকে উদয় গো ভানু চৌদিকে পশর।

    পশ্চিমে বন্দনা করলাম মক্কা-মদিস্থান,

    উদ্দেশ্যে জানায় গো সালাম মমিন মুসলমান।

    দক্ষিণে বন্দনা করলাম ক্ষীরনদীর সাগর,

    যেখানে বাণিজ্য করে চান্দ সওদাগর।

    চার কোণা বন্দনা কইরা মধ্যে করলাম স্থিতি,

    এখানে গাব আমি ওতলা সুন্দরীর গীতি।

    গল্প বলিতে বলিতে গল্পের খেই হারাইয়া ফেলি। পরের কথা। আগে বলিয়া আবার সেই ছাড়িয়া-আসা কথার অবতারণা করি। দশ-পনের মিনিট পরে দিনুবাবু উঠিয়া গেলেন। সামনে শাড়ীর ঝকমকিতে দোলায়া কৌতুকমতীরা একে অপরের কানে কানে কথা বলিতে লাগিলেন। কেউ কেউ উঠিয়া গেলেন। সেই সঙ্গে সঙ্গে আমার ভিতরেও পরিবর্তন হইতে লাগিল। কোন রকমে ঘামে নাহিয়া বুকের সমস্ত টিপটিপানি উপেক্ষা করিয়া গল্প শেষ করিলাম।

    অবনবাবু বলিলেন, “বেশ হয়েছে।” কিন্তু কথাটা যে আমাকে শুধু সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলিলেন, তাহা আর বুঝিতে বাকী রহিল না।

    দেশে ফিরিয়া মোহনলালের কাছে পত্র লিখিলাম। আবার আমি তোমাদের বড়ি গিয়া গল্প বলিব। যতদিন খুব ভাল গল্প বলা না শিখিতে পারি, ততদিন কলিকাতা আসিব না।

    গ্রামে গ্রামে ঘুরিয়া যেখানে যে যত ভাল গল্প বলিতে পারে, তাহাদের গল্প বলার ভঙ্গি লক্ষ্য করিতে লাগিলাম। ফরিদপুর ঢাকা তাহাদের ময়মনসিংহ জেলার যেখানে যে ভাল গল্প বলিতে পারে খবর পাইলাম, সেখানেই গিয়া উপস্থিত হইতাম। তারপর সেইসব গল্প বলার ভঙ্গি অনুকরণ করিয়া ছোট ছোট ছেলেদের মধ্যে বসিয়া গল্প বলিবার অভ্যাস করিতে লাগিলাম। ছেলেদের খেলার মাঠের একধারে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় আমার গল্পের আসর বসিত। অধুনা কবিখ্যাত আবু নইম বজলুর রশীদ আমার গল্পের আসরের একজন অনুরক্ত শ্রোতা ছিল। এইভাবে গল্পের মহড়া চলিতে লাগিল। দিনের পর দিন মাসের পর মাস। গল্প শুনিবার জন্য তখন কত জায়গায়ই না গিয়াছি। সুদূর ময়মনসিংহে ধনা গায়েনের বাড়ি গেলাম। কালীগঞ্জের মোজাফর গায়েনের বাড়ি গেলাম। টাকা খরচ করিয়া একদিন কালীগঞ্জের বাজারে তার গাজীর গানের আসর আহ্বান করিলাম।

    মোজাফর গায়েনের গল্প বলার ভঙ্গিটি ছিল বড়ই চমৎকার। এক হাতে আশাসোটা আর একহাতে চামর লইয়া সে গল্পের গানের গোন গাইয়া দোহারদের ছাড়িয়া দিত। দোহারেরা সেই সুর লইয়া সমবেত কণ্ঠে সুরের-ধ্বনি বিস্তার করিত। তারপর ছড়ার মতো কাটাকাটা সুরে গল্পের কাহিনীগুলি বলিয়া যাইত। সুরে যে কথা বলিতে পারিত না, নানা অঙ্গভঙ্গী করিয়া চামর ঘুরাইয়া তাহা সে প্রকাশ করিত। দীনেশচন্দ্র সেন-সংকলিত ময়মনসিংহ-গীতিকায় সংগীত-রত সদলবলে মোজাফর গায়েনের একটি ফটো প্রকাশিত হইয়াছে। তাহা আমি কোন ব্যবসায়িক ফটোগ্রাফারকে দিয়া তোলাইয়া লইয়াছিল। এই ফটোতে তখনকার বয়সের আমারও একটি ছবি আছে।

  • একটু পরে রোদ উঠবে

    একটু পরে রোদ উঠবে

    প্রচেত গুপ্ত

    [book]

    গ্রন্থপরিচয়

    প্রচেত গুপ্ত রচিত উপন্যাস ‘একটু পরে রোদ উঠবে’ প্রথম প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১৭; প্রকাশক পত্রভারতী। প্রচ্ছদ এঁকেছেন সৌজন্য চক্রবর্তী। উপন্যাসটির উৎসর্গ পাতায় লেখা আছে—

    পৌলোমী বসু

    ব্রাত্য বসু

    সুজনেষু

    লেখকের কথা

    এক শীত শীত সকালে ঘুম ভেঙে দেখলাম, আকাশ মেঘলা। চারপাশ ধূসর, ঘোলাটে। কেমন একটা থম মারা বিষণ্ণ ভাব। মন খারাপ হয়ে গেল। সেই মন খারাপ কাটাতে নিজেকে বোঝালাম, চিন্তা নেই, একটু পরে রোদ উঠবে। আবার চারপাশ ঝলমল করবে। কোন রূপক নয়, সরাসরি মেঘ কেটে রোদ ওঠবার কথাই ভেবেছিলাম। এই কাহিনিও তাই। আড়ালে অন্য জটিলতা কিছু নেই।

    ভেবেছিলাম, অনেক ভাবনাচিন্তা করে লিখব। পেন চিবোব, মাথার চুল ছিঁড়ব। মোটা মোটা বই থেকে উদ্ধৃতি দেব। ধারাবাহিক উপন্যাস বলে কথা। কাহিনি, চরিত্র, সবাই আমার কাছে তটস্থ হয়ে থাকবে। একটু এদিক-ওদিক করলেই ধমক খাবে। বলা বাহুল্য লেখা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সব আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে লাগল। এক সময় দেখলাম, চরিত্র থেকে গল্প পর্যন্ত সবাই হাতের বাইরে! তারা নিজেদের খেয়ালখুশি মতো চলছে, কথা বলছে, ভাবছে। শাসন করবার চেষ্টা করলাম। লাভ হল না। লেখক হিসেবে নিজেকে অসহায় লাগল। হাল ছেড়ে দিলাম। যা হয় হোক।

    মজার কথা হল, একটা সময়ের পর বুঝতে পারলাম, হাতের বাইরে চলে যাওয়ার কারণে কাহিনি, চরিত্র, গল্প বলবার ভঙ্গি নিয়ে লেখক হিসেবে অনেক বেশি আনন্দ পাচ্ছি। তারাও খুব খুশি। ফলে এই কাহিনির ভালো-মন্দর দায় আমার নয়। কাহিনির নিজের।

    কাহিনিতে মজা আরও আছে। কাহিনির নাম ‘একটু পরে রোদ উঠবে’ হলে কী হবে, মূল চরিত্রের নাম বারিধারা। এই উলটো কম্মটি আমি ভেবেচিন্তে করিনি। এটিও নিজের মতো হয়ে গেছে। লেখা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে যা হয় আর কী। ঝকঝকে এই তরুণীটির বুদ্ধি, আধুনিক চিন্তা, প্রতিবাদ, মূল্যবোধ, ভালোবাসা বারিধারার মতোই কাহিনির বিভিন্ন জায়গায় ঝরে ঝরে পড়েছে।

    একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে এই সময়ের কথা বলতে চেয়েছি। কাহিনির বিস্তার অনেকটাই। চরিত্র, ঘটনা অজস্র। চরিত্রদের বয়স একানব্বই থেকে চব্বিশ। ঘটনা ছড়িয়েছে কলকাতা থেকে সুন্দরবনের গ্রাম পর্যন্ত। এই সময়ের প্রেম, রাজনীতি, জাদু বাস্তবতা, লোভ, হিংসা, অপরাধ, মায়া-মমতা, বিশ্বাস ভঙ্গ আর বিশ্বাস গড়া নিয়ে একটা দলিল তৈরির চেষ্টা করেছি। একই সঙ্গে চেষ্টা করেছি, কাহিনিকে সময়োত্তীর্ণ করতে। কতটা পারলাম জানি না।

    অনেকের কাছে কৃতজ্ঞ। আজকাল পত্রিকার সম্পাদক অশোক দাশগুপ্ত চাপ না দিলে লেখাটা শুরুই হত না। শৌনক লাহিড়ি উৎসাহ না দিলে লেখাটা আজকাল পত্রিকার রবিবাসরের পাতায় ছিয়াত্তর সপ্তাহ ধরে চালাতেই পারতাম না। ঋণী দেবাশিস চন্দর কাছে। প্রতি সপ্তাহে ঠেলা দিয়ে লেখা বের করে নিয়েছে। কৃতজ্ঞ প্রিয় শিল্পী দেবব্রত ঘোষের কাছে।

    বই আকারে প্রকাশ করবার আগে কিছু পরিমার্জনা করলাম। জানি না, তাতে কাহিনি আরও ভালো হল কিনা।

    পত্রভারতী সংস্থার কর্ণধার ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় একটা বিস্ময়কর কাজ করতেন। রবিবার রাতে লেখা পড়ে আমাকে ফোন করতেন। একবারও বাদ যায়নি (উনি দেশের বাইরে না থাকলে)। তাঁর প্রতিক্রিয়া শুনে অবাক হতাম। মনে হত, কাহিনির বহু চরিত্রকেই উনি আমার থেকে অনেক বেশি ভালোবাসেন, অনেক বেশি চেনেন। তাদের প্রতি কোনও অবিচার সহ্য করবেন না। প্রয়োজনে আমার সঙ্গে হাতাহাতি পর্যন্ত যাবেন। এই বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পী সৌজন্যকে ধন্যবাদ। ভারী চমৎকার কাজ করেছেন। ধন্যবাদ পত্রভারতী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত সবাইকে। তারা বহু বছর ধরে আমার জ্বালাতন সহ্য করে চলেছেন। এবারও করলেন।

    দীর্ঘদিন ধরে একটা লেখা চালাতে হলে বাড়ির জোরদার সমর্থন দরকার হয়। সেই জোরদার সমর্থন আমার স্ত্রী মিত্রা, পুত্র সমুদ্র এবং আমার পিসিমার কাছ থেকে। আমার বউদি শ্রাবণী গুপ্ত অপেক্ষা করে আছেন কবে বই প্রকাশ হবে আর কবে তিনি সংগ্রহে রাখবেন। আর আমার দাদা পূষণ গুপ্তর কড়া সমালোচনা শোনবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছি আমি। আড়াল থেকে আমার ভাই পুষ্কর নিশ্চয়ই আমার লেখা-লিখির ওপর নজর রাখছে।

    সবথেকে বেশি কৃতজ্ঞ আমি আমার পাঠকদের কাছে। ধারাবাহিক প্রকাশের সময় তারা কখনও রাগ করে, কখনও প্রংশসা করে, কখনও অনুযোগ করে, কখনও ভালোবেসে আমার লেখার সঙ্গে থেকেছেন। আমার বিশ্বাস, তারা এই বইয়ের সঙ্গেও থাকবেন।

    ৩১ অক্টোবর, ২০১৬
    সল্টলেক
    প্রচেত গুপ্ত

  • প্রথম কিস্তি

    প্রথম কিস্তি

    প্রচেত গুপ্ত

    [book]

    এক

    খুব বেশি হলে পনেরো সেকেন্ড। তার থেকেও কম হতে পারে। গুনে গুনে ক’টা কথা। একবার পেটের কাছে চুলকুনি আর একটু চোঁয়া ঢেকুর। তাও পুরো ঢেকুর নয়, আধখানা ঢেকুর। সেই ঢেকুর গলার কাছ পর্যন্ত এসে থমকে গেছে। এই কর্মকাণ্ডে সব মিলিয়ে কত সময় লাগবার কথা? তারপরেই আবার নরমাল। যে কে সেই। যেমন ছিলেন তেমন।

    বিমলকান্তি সেন ভুরু কোঁচকালেন। এটা কী ঘটল! আদৌ কি কিছু ঘটল? নিশ্চয় নয়। একটা ভুল মাত্র। সাধারণ ভুল নয়, হাবিজাবি ভুল। বিমলকান্তি সেনের ভুরু আরও কুঁচকে গেল। তিনি একজন সিরিয়াস মানুষ। জীবনে হাবিজাবি ভুল তিনি বরদাস্ত করেন না। পনেরো সেকেন্ডের জন্য হলেও নয়। তিনি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলেন।

    ‘প্রহ্লাদ, টাকা কবে লাগবে?’

    প্রহ্লাদ গদগদ গলায় বলল, ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্যার।’

    ‘কত তাড়াতাড়ি?’

    প্রহ্লাদ হাত কচলে বলল, ‘ওই তো স্যার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।’

    প্রহ্লাদ ‘সেন এন্ড অ্যাসোসিয়েটস’ কোম্পানির একজন কর্মচারী। গোড়াতে বিমলকান্তিবাবু তার এই মাঝবয়সি কর্মচারীটির মুখ চিনতে পারলেও, নাম মনে করতে পারেননি। আজকাল এটা হচ্ছে। বয়েসের লক্ষণ। বাষট্টি বছর কম বয়স নয়।  বিজ্ঞান নানা ধরনের ওষুধবিষুধ আবিষ্কার করায় মানুষের আয়ু বেড়ে গেছে। সকলেই বলে, বাষট্টি বছর এখন কিছু নয়। বাষট্টি কেন? বাহাত্তর, বিরাশিও কিছু নয়। বিমলকান্তিবাবু তা মনে করেন না। তিনি মনে করেন, বেশি বয়স অবশ্যই ‘কিছু’। ওষুধবিষুধ হল চাবুকের মতো। হাঁপিয়ে পড়া ঘোড়াকেও ছোটায়। ঘোড়া যত জোরেই ছুটুক, আসলে সে ক্লান্ত। ছোটায় তার কোনও আনন্দ নেই। একটা সময় নিজের কোম্পানির একশো কুড়িজন কর্মীকেই নামে চিনতেন বিমলকান্তিবাবু। শুধু নামে নয়, কে কোন পোস্টে আছে তাও বলে দিতে পারতেন। এখন পারেন না। কাজে কি আনন্দ কমে যাচ্ছে? চাবুকের শাসনে ছুটতে হয় তাই ছুটছেন? কে জানে!

    খানিক আগে প্রহ্লাদ যখন ঘরে ঢোকে, তখনও একই ব্যাপার হয়েছে। মুখটুকু শুধু চিনতে পেরেছিলেন। এই লোককে অফিসে দেখেছেন। কিন্তু কোথায় মনে পড়েনি। প্রহ্লাদ নিজেই নাম, ডিপার্টমেন্ট আর পোস্ট বলল।

    ‘স্যার, এবার কি আমাকে চিনতে পেরেছেন?’

    বিমলকান্তিবাবু বিরক্ত হলেন, এ আবার কেমন প্রশ্ন? এই লোক কি তার পরীক্ষা নিচ্ছে? প্রশ্নের জবাব দিলেন না। কঠিন গলায় বললেন, ‘যা বলবার দ্রুত বলবে। আমার হাতে সময় নেই।’

    খানিকটা রাগের কারণেই লোকটার ডিপার্টমেন্ট, পোস্ট পরক্ষণেই ভুলে গেলেন বিমলকান্তি। শুধু মনে রাখলেন আহামরি কিছু নয়, ছোটখাটো কোনও একটা কাজ করে। ক্লার্ক, টাইপিস্ট ধরনের। লোকটার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে একধরনের কুঁজো ভাব। বিমলকান্তি দ্রুত মনে করবার চেষ্টা করলেন, তার এই কর্মচারীটি কি সবসময়ই কুঁজো? নাকি অনুগ্রহ নিতে এসেছে বলে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়েছে? দ্বিতীয়টাই হবে। মাঝে মাঝে হাতও কচলাচ্ছে। এক বগলে ছাতা, অন্য বগলে ব্যাগ নিয়ে হাত কচলানো কঠিন কাজ। যারা ছোটখাটো কাজ করে, তাদের এই ধরনের নানা কঠিন কাজ সামলাতে হয়।

    ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বলে কোনও দিন হয় না। কত তাড়াতাড়ি দরকার সেটা বলো।’

    মালিকের কথায় উৎসাহ ডবল হয়ে যায় প্রহ্লাদের। সে বলে, ‘এই সপ্তাহের মধ্যে পেলে সবথেকে ভালো হয় স্যার। ইতিমধ্যেই দশদিন দেরি করে ফেলেছি। পরের ইনস্টলমেন্ট দু’মাস পর। তিন নম্বরটা নেবে পুজোর মুখে মুখে। তার মধ্যে স্যার আমি অবশ্যই একটা ব্যবস্থা করে ফেলব। দেশের জমিটা বিক্রিবাটা হয়ে যাবে। জ্ঞাতিদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করে দিয়েছি। অনেকটা ব্যবস্থা হয়ে গেছে। কেবল ছোটকাকা গোল পাকাচ্ছে। তাও স্যার আপন ছোটকাকা নয়। বাবার খুড়তুতো ভাই। মামলাবাজ লোক।’

    বিমলকান্তিবাবু চোখের সামনে থেকে খবরের কাগজ সরালেন। ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘এত কথা বলছ কেন? আমি কি এসব জানতে চেয়েছি?’

    প্রহ্লাদ আরও জোরে হাত কচলে বলল, ‘ভুল হয়ে গেছে স্যার। আর বলব না।’

    বিমলকান্তিবাবু একটু চুপ করে থাকলেন। কিছু ভাবলেন। বললেন, ‘এত দেরি করে টাকা জোগাড়ে নেমেছ কেন?’

    বগলে ছাতা ধরা অবস্থাতেই প্রহ্লাদ ডান হাত দিয়ে পেটের পাশটা খসখস করে একপ্রস্থ চুলকে নিল। বলল, ‘আগেই ব্যবস্থা করে ফেলেছিলাম স্যার। আমার ভায়রাভাই দেবে ঠিক ছিল। পাকা কথা হয়েছিল। দুদিন আগে টাকা আনতে গেলাম, বললে এখন হবে না। ব্যবসায় লস যাচ্ছে। অর্ডার ক্যানসেল হয়েছে। মিছে কথা। ওর অর্ডারের কাজকারবারই নেই স্যার। দুটো লরি, তিনটে ম্যাটাডর আছে। ভাড়া খাটায়। তার অর্ডার কী হবে? আমিও বলে ফেললাম। তোমার আবার অর্ডার কীসের হে? গাড়ি ভাড়া দাও। মিছে কথা বলছ কেন? ভায়রাভাই বলল, ওই একই হল। ভাড়ার বাজার ডাউন যাচ্ছে। আমার ভায়রাভাই স্যার মানুষ খারাপ নয়। শালিটাই যত গণ্ডগোলের। স্বামীকে আটকেছে। বোন হলেও আমার বউকে হিংসে করে। মেয়েতে মেয়েতে হিংসে বেশি।’

    বিমলকান্তিবাবু হাত তুলে বললেন, ‘আঃ, আবার বেশি কথা বলছ।’

    প্রহ্লাদ আরও খানিকটা কুঁজো হয়ে বাঁ-হাতে কান ছুঁয়ে বলল, ‘ভুল হয়ে গেছে। আর বলব না।’

    কথাটা বলে একটা ঢেঁকুরের মতো তুলল প্রহ্লাদ। ঢেঁকুর না হেঁচকি? মাঝপথে কেমন থমকে গেল। সে যাক গে। বিমলকান্তিবাবু বিরক্তির সঙ্গে অবাক হচ্ছেন। অফিসে কাজ করে, অথচ এই লোক মালিকের স্বভাবচরিত্রের খবর রাখে না? তিনি অতিরিক্ত কথা পছন্দ করেন না, একজন সিরিয়াস মানুষ সে বিষয়ে কি এই লোকের কিছু জানা নেই! এই লোকের ডিপার্টমেন্টের মাথায় কে?

    বিমলকান্তিবাবু বুঝতে পারলেন, তার বিরক্তি বাড়ছে। সকালবেলা বিরক্তি বাড়া ভালো কথা নয়।

    সিরিয়াস মানুষ হয় দু’প্রকার। ভক্ত সিরিয়াস এবং বিরক্ত সিরিয়াস। ভক্ত সিরিয়াস মানুষরা সিরিয়াস ভাবের ভক্ত হয়। ভাবে বিভোরও বলা যায়। সিরিয়াস ধর্মে মেতে থাকে। চারপাশে কে কী করল, তা নিয়ে মোটে মাথা ঘামায় না। নিজের মতো করে কাজ করে। জটিল ক্যালকুলাস সলভ করা এবং ঘর ঝাঁট দেওয়া, দুটোতেই সমান মনোযোগ দেয়। এতে কাজ যে সবসময় ঠিক হয়, এমন নয়। অতিরিক্ত ক্যাজুয়াল ভঙ্গি যেমন খারাপ, অতিরিক্ত সিরিয়াস ভঙ্গিও গোলমাল করে। কাজের সূক্ষ্ম গুণাবলি নষ্ট হয়ে যায়। তা হোক। ভক্ত সিরিয়াসরা সে কথা মানে না। কাজ সূক্ষ্ম না মোটা এটা তাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। সিরিয়াস ভাবের প্রতি ভক্তিটাই আসল। অন্যদিকে, দ্বিতীয় ধরনের সিরিয়াস মানুষে ঝামেলা বেশি। এরা বিরক্ত সিরিয়াস। নিজে সদা বিরক্ত। আবার অন্যকেও বিরক্ত করে। এদের বিশ্বাস, শুধু নিজে সিরিয়াস হলে চলবে না, চারপাশের সবাইকে সিরিয়াস হতে হবে। সিরিয়াস নয় বলেই মানবজাতির এই দুর্দশা। হাসি-ঠাট্টা, তরল কথা, লঘু আচরণ এই মানুষরা মোটে সহ্য করতে পারে না। তাদের কাছে এসব ‘ছ্যাবলামি’ ছাড়া কিছুই নয়। মানুষের জন্ম ছ্যাবলামি করবার জন্য হয়নি। মানুষের জন্ম হয়েছে দায়িত্ব পালন করবার জন্য। জীবনে অবাস্তবতা এবং কল্পনার কোনও স্থান নেই। ও সব অলস ও ফাঁকিবাজদের বিষয়। দায়িত্ব এড়ানোর ফন্দি।

    লক্ষ করবার মতো বিষয় হল, দু’ধরনের সিরিয়াস মানুষের ভঙ্গিও দু’ধরনের। ভক্ত সিরিয়াসদের ভঙ্গি গদগদ। ‘আমি সব কাজ কত সিরিয়াসভাবে করছি’ তার জন্য গদগদ। আর বিরক্ত সিরিয়াসরা হল গোমড়ামুখো। সবাই কেন তার ইচ্ছেমতো ‘সিরিয়াস’ নয়, সেই কারণে গোমড়ামুখো।

    বিমলকান্তিবাবু একজন বিরক্ত সিরিয়াস মানুষ। যত বয়স বাড়ছে, তার এই ভাব বাড়ছে। তিনি গম্ভীর থাকা পছন্দ করেন। ঠান্ডা গলায় ধমক দেন। কারণে দেন, অকারণেও দেন। অকারণ ধমক বেশি কাজের বলে মনে করেন। এতে আগাম সতর্ক করবার সুযোগ থাকে। গৃহকর্তার এই উদ্ভট স্বভাবে বাড়ির সদস্যদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। তারা বিরক্ত। শুধু তার একানব্বই বছরের পিতা কমলকান্তি সেন এবং বাইশ বছরের ছোট মেয়ে বারিধারা তার স্বভাব এবং মেজাজকে আমল দেয় না।

    কর্মক্ষেত্রেও তাই। বিমলকান্তিবাবুর এই সিরিয়াস বাই কর্মচারীদের তটস্থ করে রেখেছে। অফিসে, ওয়ার্কশপে কোনওরকম আলগা ভাব তিনি বরদাস্ত করেন না। তার মত হল, কাজ ভুল না ঠিক সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা, কাজে সিরিয়াস ভাব আছে কিনা। কেউ যদি মন দিয়ে ভুল কাজ করে, তিনি রাগ করেন না। তার বিশ্বাস জন্মায়, এই লোক নিজেকে সংশোধন করতে পারবে। কিন্তু হেলাফেলায় করা ঠিক কাজে কোনও ভরসা নেই। যে-কোনও সময় গোলমাল করবে। একমাস পরে ফাইলে গোলমাল বা তিনমাস পরে প্রাোডাকশনে খুঁত ধরা পড়বে। শুধু কাজে নয়, ছুটিতেও ‘সেন এন্ড অ্যাসোসিয়েটস’-এর মালিক সিরিয়াস। একবার অ্যাকাউন্টসের ঋত্বিক বিরাট বিপদে পড়েছিল। সে বারোদিনের ছুটি নিয়ে, দশদিনের মাথায় কাজে জয়েন করে। খবর পেয়ে বিমলকান্তিবাবু তাকে ঘরে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। বিপদের কথা কেউ আঁচ করতে পারেনি। বরং উলটো ভেবেছিল। ভেবেছিল ঋত্বিক মালিকের পিঠ চাপড়ানি পাবে।

    ঋত্বিক ঘরে ঢোকবার পর বিমলকান্তি সহজ গলায় জিগ্যেস করেছিলেন, ‘বেড়াতে গিয়েছিলে?’

    ঋত্বিক গদগদভাবে বলে, ‘হ্যাঁ, স্যার। ফ্যামিলি নিয়ে সিমলা, মানালি গিয়েছিলাম।’

    বিমলকান্তিবাবু আরও সহজভাবে বললেন, ‘কেমন বেড়ালে? ওয়েদার ভালো পেয়েছ?’

    গম্ভীর বসের হালকা ভঙ্গিতে ঋত্বিক উত্তেজিত বোধ করেছিল।

    ‘ওয়েদার ভালো পেয়েছি স্যার। একদিন বরফও পেয়েছি। আমার মেয়ে তো বরফ দেখে পাগল।’

    বিমলকান্তিবাবু বললেন, ‘এই সময় তো ওদিকটায় বরফ পাওয়ার কথা নয়। তোমার আইস লাক ভালো দেখছি ঋত্বিক।’

    ঋত্বিক দাঁত বের করে হাসে। বলে, ‘আপনার আশীর্বাদ স্যার।’

    বিমলকান্তিবাবু বললেন, ‘তুমি তো বারোদিন ছুটি নিয়েছিলে।’

    ঋত্বিক সাহস পেল। বলল, ‘দশদিনের ট্যুর ছিল স্যার। তারপরেও দুটো দিন এক্সট্রা রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, বাড়ি ফিরে রেস্ট নেব। জার্নির তো একটা ধকল থাকে। তাছাড়া চেনা-পরিচিতদের সঙ্গে বেড়ানোর গল্প করব। ফটো দেখাব। বেড়ানোর এটাও একটা পার্ট। সেই কারণে দুদিন।’

    ‘ভালো করেছিলে, ঠিক করেছিলে। তাহলে আজ এলে কেন?’

    ঋত্বিক বুঝতে পারল, পিঠ চাপড়ানির সময় এসেছে। বলল, ‘স্যার, সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হল, অহেতুক বাড়িতে শুয়ে-বসে ছুটি কাটিয়ে লাভ কী? তার থেকে অফিসে দুদিন আগেই জয়েন করে ফেলি। কাজ অনেকটা জমে গেছে…।’

    এরপর বিমলকান্তি সোজা হয়ে বসলেন। একটু চুপ করে, টেবিলে রাখা পেনসিল তুলে নাড়াচাড়া করতে করতে ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘ভালো করেছ। কিন্তু তোমার সামনে এখন দুটো অপশন ঋত্বিক। এক, তুমি এখনই বাড়ি চলে যেতে পারো। জার্নির ধকল সারিয়ে, আত্মীয়-বন্ধুদের বেড়ানোর গল্প করে, বরফের ফটো দেখিয়ে দুদিন ছুটি কাটিয়ে তারপর ফিরে আসবে। প্রমাণ করবে, তুমি যে ছুটি নিয়েছিলে সে ব্যাপারে তুমি সিরিয়াস। দুটো ছুটির দিন কোনও হেলাফেলার বিষয় নয়। আর দু’নম্বর অপশন হল, তুমি টেবিলে গিয়ে কাজ করো, কিন্তু তোমার বারোদিনের ছুটি আমি আমার বিশেষ ক্ষমতাবলে বাতিল করে দিচ্ছি। এতে তোমার পাওনা ছুটি নষ্ট হবে। মাইনে পর্যন্ত কাটা যেতে পারে।

    ঋত্বিকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে কি ঠিক শুনল? এই মানুষটা কি পাগল?

    বিমলকান্তিবাবু নীচু গলায় বললেন, ‘আমার কাছে কাজটা যেমন সিরিয়াস, ছুটিটাও তেমন। আশা করি, আমার কর্মচারীদের কাছেও তাই হবে। এখন যাও। যে অপশনটা তোমার পছন্দ, সেটা বেছে নাও।’

    শুকনো মুখে ঋত্বিক ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল।

    বিমলকান্তিবাবু একতলার ড্রইংরুমে বসে আছেন। হাতে খবরের কাগজ। কাগজটা তুলে মুখ ঢাকলেন। তার বিস্ময় ভাব যেন বাইরে থেকে বোঝা না যায়। এখন সকাল আটটা বেজে কুড়ি মিনিট। পুবদিকের জানলা দিয়ে ঘরে আলো আসছে। তবে আলোর জোর কম। আকাশে সম্ভবত মেঘ রয়েছে। বাড়িতে অফিস বা ওয়ার্কশপের কারও সঙ্গে দেখা করা বিমলকান্তি পছন্দ করেন না। তারপরেও করতে হয়। বাধ্য হয়ে করতে হয়। কোম্পানির ট্র্যাডিশন বজায় রাখতে হয়। একসময় ঠাকুরদা করতেন। তার থিওরি ছিল, ‘ব্যবসার বাইরেও কর্মচারীদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন-অপ্রয়োজন থাকতে পারে। সেসব কাজের জায়গায় না শোনাই ভালো।’ বিমলকান্তি এই থিওরি মানেন না। তার বাবাও মানতেন না। কিন্তু তিনিও দেখা করেছেন। তবে দিন কমেছে। ঠাকুরদা সপ্তাহে তিন করতেন। বাবা সেটা নামিয়ে দুদিনে আনেন। বিমলকান্তিবাবু দেখা করেন মাত্র একদিন। বুধবার। সকালে একঘণ্টা। আজ বুধবার নয়, বৃহস্পতিবার। তবু প্রহ্লাদ এসেছে। ভবানী গেট থেকে এসে খবর দিল।

    ‘বললাম, দেখা হবে না। পরের বুধবার এসো। তারপরেও যেতে চায় না। বলছে, খুব দরকার। পরের বুধবার পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাবে না।’

    বিমলকান্তিবাবু একবার ভাবলেন, তাড়িয়ে দিতে বলবেন। ভবানী ভালো দারোয়ান। লোক কীভাবে তাড়াতে হয় সে জানে। তারপরেও থমকে গেলেন। বললেন, ‘ঠিক আছে, পাঠিয়ে দাও।’ সম্ভবত এটা বয়েস বাড়বার লক্ষণ। সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা। ভবানী চলে যাওয়ায় বিমলকান্তি নিজের ওপরই বিরক্ত হলেন। এটা ঠিক নয়। সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা মানে কাজ ভালো লাগছে না। তিনি কি ক্লান্ত?

    খাটো ধুতি, কলার দেওয়া হাফহাতা শার্ট পরা প্রহ্লাদ এসে হাজির হল মিনিট দুয়েকের মধ্যে। নিজের পরিচয় দিতে বিমলকান্তিবাবু রাগী গলায় বললেন, ‘যা বলবার দ্রুত বলবে। আমার হাতে সময় নেই।’

    এর অল্প কিছু পরেই ঘটনাটা ঘটল। যা হয়তো আদৌ ঘটেনি। হয়তো কেন? অবশ্যই ঘটেনি। এরকম কিছু কখনও ঘটতে পারে না। একটা ভুল। মনের ভুল। বিমলকান্তি সেনের খচখচানি যাচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে, ভুলটা ভয়ঙ্কর! সত্যি তাই। ভয়ঙ্কর।

    বিমলকান্তিবাবু মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।

    গণ্ডারদের মধ্যে সঙ্গীতপ্রেমের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে গানের মধ্যে বাদ্যযন্ত্রের প্রতি তাদের আকর্ষণ বেশি। তানজানিয়ার ওকারু হুনাই গণ্ডার গবেষণাকেন্দ্রে দীর্ঘ বাইশ বছর পরীক্ষার পর পশুবিজ্ঞানীরা এই চমকপ্রদ তথ্যটি জানতে পেরেছেন। পরীক্ষা বলছে, বাদ্যযন্ত্র যদি বাঁশি জাতীয় কিছু হয়, তাহলে সবথেকে ভালো। বাঁশির সুর শুনলে গণ্ডাররা থমকে দাঁড়াচ্ছে। কান খাড়া করছে। অল্প অল্প লেজও নাড়ছে। গণ্ডারের লেজ অতি সংক্ষিপ্ত, তবু নাড়ছে। কোনও কোনও সময় তারিফ করবার ভঙ্গিতে তাদের মাথা দোলাতেও দেখা গেছে। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। মাঝপথে বাঁশি থেমে গেলে গণ্ডাররা বিরক্ত হচ্ছে। রেগে যাচ্ছে। একখানা শিং বাগিয়ে পা দিয়ে মাটি খোঁড়ে। ফোঁস ফোঁস আওয়াজে নিঃশ্বাস ফেলে। তখন ফের বাজনা শুনিয়ে শান্ত করতে হয়।

    তানজানিয়া সরকার বিরাট খুশি। গবেষণার পিছনে অর্থ বরাদ্দ দ্বিগুণ করে দিয়েছে। প্রজেক্টের নাম হয়েছে, ‘রাইনো মিউজিক’। ‘রাইনো মিউজিক’ প্রজেক্টে এবার বাঁশি ছাড়া অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের প্রতি গণ্ডারদের অনুরাগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে তারের বাজনা। প্রাথমিকভাবে লক্ষ করা গেছে, জগঝম্প সঙ্গীতের থেকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি গণ্ডারদের ঝোঁক বেশি। প্রজেক্টের মাথায় আছেন পশু বিজ্ঞানী হার্ড কিমোলাই। গণ্ডারেরর সঙ্গীতপ্রেম আবিষ্কারের কারণে তিনি নাকি যে-কোনও সময় নোবেল পুরস্কার পেয়ে যেতে পারেন। তিনি বলেছেন, গণ্ডারের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে এখনই কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না। গণ্ডারকে নিয়ে যাবতীয় গবেষণা ধৈর্যের বিষয়। বিভিন্ন স্তরের চামড়া এবং চর্বি ভেদ করে অনুভূতিকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোতে হয়। সময় লাগাটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে, এই গবেষণার প্রতিবাদে তানজানিয়ায় বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, যে দেশের মানুষ না খেতে পেয়ে দুর্ভিক্ষে মারা যায়, সেই দেশে গণ্ডারের সঙ্গীতপ্রেমের পিছনে সরকারের অর্থ ব্যয় অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। এ জিনিস মানা যায় না। আশার কথা, সরকার কড়া হাতে বিক্ষোভ দমন করছে।হেডফোনের সেরা অফার

    প্রহ্লাদ আসবার আগে বিমলকান্তিবাবু গণ্ডার বিষয়ক এই খবর পড়ছিলেন। ইন্টারেস্টিং খবর। যদিও খবরের কাগজে ছাপা হয়েছে ভিতরের পাতায়, কোণের দিকে। চট করে চোখে পড়ে না। বিমলকান্তিবাবু খেয়াল করে দেখেছেন, খবরের কাগজগুলো আজকাল ইন্টারেস্টিং খবর গুরুত্বহীনভাবে প্রকাশ করে। এটা সিরিয়াস ভাবের অভাব। মানুষ এতদিন দাবি করে এসেছে, প্রাণীজগতে শুধু তারাই সূক্ষ্ম বোধবুদ্ধি, অনুভূতির অধিকারী। গণ্ডারের বাঁশিপ্রেম সেই দাবি নস্যাৎ করবে। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়?

    খবরটা দ্বিতীয়বার পড়বার জন্য বিমলকান্তিবাবু তৈরি হচ্ছিলেন। এই ধরনের খবর একবার পড়লে হয় না, দুবার পড়তে হয়।

    দু’বার পড়া হল না। তখনই ভবানী গেট থেকে প্রহ্লাদকে নিয়ে এসেছে।

    ‘স্যার, মাপ করবেন, আজ আপনি দেখা করেন না, কিন্তু আমার বিষয়টা আর্জেন্ট।’

    বিমলকান্তিবাবু আবার বিরক্ত হলেন। এই লোক তো সবদিকে গোলমাল করে। এক নম্বর, বুধবারের বদলে আজ এসেছে। দু’নম্বর, তাকে চেনা গেছে কিনা তাই নিয়ে প্রায় কৈফিয়ত তলব করেছে। এখন আবার বলেছে, তার ব্যাপারটা আর্জেন্ট। যেন বাকি যারা তার সঙ্গে দেখা করে তাদের ব্যাপার এখন হলেও হয়, না হলেও হয়। এই লোককে কি জোর ধমক দেওয়া উচিত নয়? নিজেকে সামলালেন বিমলকান্তি। সকালবেলা মেজাজ গরম করে লাভ নেই। মেজাজ গরমের জন্য সারাদিন পড়ে আছে। তিনি খবরের কাগজের পাতা উলটোতে উলটোতে ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘কেন আর্জেন্ট?’

    ‘স্যার, আমার কিছু টাকা চাই।’

    বিমলকান্তিবাবু চমকালেন না। ব্যক্তিগতভাবে যারা তার কাছে আসে, তারা মূলত দুটো কারণে আসে। চাকরি এবং টাকা। অফিসে-ওয়ার্কশপে ভাগ্নে, শালাকে ঢুকিয়ে দিতে হবে। অথবা মেয়ের বিয়ে, বাবার চিকিৎসা, ছেলের লেখাপড়ার জন্য টাকা লাগবে। অফিস থেকে লোন পাওয়ার ব্যবস্থা আছে। এমনকী এমারজেন্সি ফান্ডও রয়েছে। সেখানে অ্যাপ্লাই করলে হঠাৎ প্রয়োজনে সাহায্য মেলে। তার পরেও লোক আসে। যাদের নিয়মকানুনের বাইরে টাকার প্রয়োজন অথবা যারা নিয়মকানুনের জালে জড়াতে চায় না তারা এসে কাঁদুনি গায়। এখন আবার নতুন ফ্যাচাং শুরু হয়েছে। সেন অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, এমন লোকজনও আসতে শুরু করেছে। প্রথম প্রথম ভবানীকে দিয়ে গেট থেকেই তাড়িয়ে দিতেন বিমলকান্তি।

    ভবানী কড়া গলায় বলত, ‘হবে না। স্যার শুধু কোম্পানির লোকেদের সঙ্গে দেখা করেন।’

    ‘ওদের ফাঁকে একবার ঢুকিয়ে দেওয়া যায় না?’

    ভবানী তেড়েফুঁড়ে উঠত, ‘বলছি তো হয় না। নিয়ম নেই।’

    ‘তুমি ইচ্ছে করলেই নিয়ম ভাঙতে পারো ভাই। পৃথিবীর সব দারোয়ানই নিয়ম ভেঙে লোক ঢোকাতে পারে। তার জন্য আলাদা সিস্টেম থাকে।’

    ভবানী কাজে কড়া হলেও বোকার দিকে মানুষ। তাকে বাড়ির দারোয়ান পদে বহাল করবার আগে বিমলকান্তি কথা বলে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন যে সে বোকা। পাহারাদার, দারোয়ানের বুদ্ধি বেশি হলে সমস্যা। বোকা এবং গোঁয়াড় প্রকৃতি তাদের প্রধান যোগ্যতা হওয়া উচিত। ‘অর্ডার নেই’ বলে বহু ‘উচিত কাজ’ তারা করবে না। চোখের সামনে যদি কেউ জলে ডুবে মারাও যায়, তারা হাত বাড়াবে না। অর্ডার নেই। বিমলকান্তিবাবু এই কারণে বোকা লোক খুঁজে বের করেছেন। ভবানী নিয়ম ভেঙে লোক ঢোকানোর সিস্টেম ধরতে পারেনি। অবাক হয়ে জানতে চায়, ‘সিস্টেম! কীসের সিস্টেম?’

    ‘আহা, উত্তেজিত হচ্ছ কেন? তুমি চা খেয়েছ? নাকি সকাল থেকে টুল পেতে বসে আছ? নাও ভাই, এই দশ টাকাটা রাখো। যাও, চা-কচুরি খেয়ে এসো। ততক্ষণে চট করে তোমার স্যারের সঙ্গে কথা সেরে আসি।’

    দশ টাকার লোভ দেখিয়েও ভবানীকে টপকানো যায়নি। তবে শেষ পর্যন্ত বাইরের লোক আসা পুরোপুরি ঠেকাতেও পারেননি বিমলকান্তি সেন। বড়-মেজো-সেজো নানা ধরনের রেকমেন্ডেশন নিয়ে তারা হাজির হয়। গরিব দেশে রেকমেন্ডেশন হল সবথেকে ঝামেলার বিষয়। সাপের ছুঁচো গেলার মতো। না গেলা যাবে, না উগরানো যাবে। তার ওপর কোনও কোনও ছুঁচো হুমকি-ধমকিও দেয়।

    ‘দাদা চিঠি দিয়েছে।’

    ‘কারও নাম বলতে হবে না, স্যারকে গিয়ে শুধু বলো কবিরাজ বাই লেন থেকে এসেছি। ব্যস, তাহলেই হবে। কবিরাজ বাই লেনের কথা শুনলে আজও অনেকের প্যান্টে ইয়ে হয়ে যায়। দেখবে তোমার স্যার আমাকে রিসিভ করতে ছুটে না আসেন।’

    ব্যবসা করতে হয়। বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখলে চলে না। পছন্দ হোক না হোক। তাছাড়া শুধু ব্যবসার কারণে নয়, সামাজিকতা বলেও একটা ব্যাপার আছে। সেটাও মানতে হয়। মণিকুন্তলাও সে কথা বলেছে। স্ত্রীর সঙ্গে তার এই বিষয়ে তর্ক হয়েছে।

    ‘সিরিয়াস মানুষরা সমাজেই বাস করে। জঙ্গলে করে না। জঙ্গলে যেমন অসুবিধে আছে, সমাজেও কিছু অসুবিধে থাকে। সেই অসুবিধে নিয়েই থাকতে হয়।’

    বিমলকান্তিবাবু বলেছেন, ‘এর মধ্যে সমাজ বা জঙ্গলের কী প্রশ্ন ওঠে! বুধবার সকালে তো আমার সবার সঙ্গে দেখা করবার কথা নয়। আমি শুধু আমার অফিসের কারখানার লোকদের সঙ্গে দেখা করি। অন্যদিন আসুক। অফিসে আসুক।’

    ‘সবাই তোমার এত নিয়ম জানবে কী করে? কেউ এলে তাকে ফিরিয়ে দিতে পারো না।’

    বিমলকান্তিবাবু রেগে গিয়ে বলেন, ‘অবশ্যই পারি। আমার অধিকার আছে।’

    মণিকুন্তলাদেবী বলেন, ‘সমাজে বাস করতে গেলে নিজের অধিকার, ক্ষমতা নিয়ে সবসময় থাকা যায় না।’

    বিমলকান্তিবাবু থামকে যান। বলেন, ‘মণিকুন্তলা, তুমি কি আমাকে জ্ঞান দিচ্ছ?’

    ‘জ্ঞান নয়, যেটা উচিত সেটা মনে করিয়ে দিচ্ছি। তুমি শুধু ”সেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়টস”-এর মালিক নও, তার বাইরেও তোমার একটা পরিচয় আছে।’

    বিমলকান্তিবাবু ভুরু কুঁচকে বলেন, ‘তার বাইরে আবার কী পরিচয়!’

    মণিকুন্তলা শান্ত গলায় বলেন, ‘তুমি বিমলকান্তি সেন এটাই তোমার আসলে পরিচয়। সেখানে তোমার ক্ষমতা নয়, ব্যবহার, আচরণটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

    বিমলকান্তিবাবুর রাগ বাড়ে। দাঁত কিড়মিড়িয়ে চাপা গলায় বলেন, ‘আমাকে কি একটু বেশি ছেলেমানুষ ভাবছ না মণিকুন্তলা? উপদেশ, শিক্ষা নেওয়ার মতো বয়স কি আমার এখনও আছে বলে তোমার মনে হয়? নাকি মনে হয়, ব্যবহার, আচরণ সম্পর্কে এখনও আমি কিছু শিখিনি?’

    মণিকুন্তলাদেবী বললেন, ‘উপদেশ-টুপদেশ নয়, আমি যা মনে করি সেটাই বললাম। বাড়িতে সময়মতো এলে সবার সঙ্গে দেখা করাটাই উচিত।’

    বিমলকান্তি রাগ সামলালেন। বললেন, ‘তা বলছি না। সে তোমার কাজ তুমি বুঝবে আমি শুধু সামাজিকতার কথাটুকু বললাম। তোমার মাঝে মাঝে গুলিয়ে যায়।’

    বিমলকান্তিবাবু জীবনে যে অল্প কয়েকজনের তর্ক অ্যালাও করেন, নিজের স্ত্রী তাদের একজন। মণিকুন্তলার বুদ্ধি ও যুক্তির ওপর তার ভরসা রয়েছে। যদিও সেই ভরসা-কথা বিবাহিত জীবনের বত্রিশ বছরে কখনও তিনি প্রকাশ করেননি। স্ত্রীর কাছেও নয়। মণিকুন্তলার কলেজ শুরুতেই বিয়ে হয়ে গেছে। তারপর সংসার। সেই চাপ সামলে আর পড়া হয়নি। তার পরেও এত বোঝেন কী করে! রাগ এবং বিরক্তির প্রকাশ করেও তিনি স্ত্রীর যুক্তি শোনেন এবং কিছু ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্ত বদলও করেন। মুখে কিছু বলেন না। মণিকুন্তলাদেবীও কিছু বলেন না। তার যুক্তিতে পরাস্ত হয়ে বা মেনে নিয়ে বিমলকান্তি সেন যে সিদ্ধান্ত বদলেছেন, সেটা যেন তিনি বুঝতেও পারেননি। প্রকাশ্যে স্বামীর দাপটের সামনে চুপ করে থাকেন। তার ইচ্ছেমতো নিজে চলতে এবং সংসার চালাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু আড়ালে তর্ক করতে ছাড়েন না। বিমলকান্তি এবং মণিকুন্তলার ধারণা, তাদের তর্কের কথা বাড়ির কেউ জানে না। ঘটনা ঠিক নয়। সকলেই জানে। একজন মানুষের জীবনে এটাও একটা রহস্য। সে নানারকম ভুল জেনে নিশ্চিন্তে থাকে।

    টাকার কথা বলে প্রহ্লাদ হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। যেন টাকা চাওয়াটা কোনও আনন্দের ঘটনা। বিমলকান্তিবাবুর মনে হল, এই লোকের অন্য দোষ আছে, কিন্তু ভণিতা নেই। এটা ভালো।

    ‘টাকা কেন লাগবে?’

    প্রহ্লাদ এবার লজ্জা পেল। বলল, ‘স্যার, একটা ফ্ল্যাট নিচ্ছি। নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই। অনেকদিনের স্বপ্ন। বুড়ো বয়েসে এসে মেটাতে যাচ্ছি। বারুইপুর স্টেশন থেকে ভ্যানরিকশায় চল্লিশ মিনিট যেতে হবে স্যার। এখনও মাটি। মাটি থেকে বুকিং করছি বলে সস্তা। ওদিকটায় স্যার হুড়দুড় করে শহর বাড়ছে। শুনছি কয়েক বছর পর মেট্রো রেলও যাবে। তখন তো স্যার জমির দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। আমার মতো মানুষ ঝুপড়িতেও ঘর পাবে না।’

    বিমলকান্তি বিরক্ত গলায় বললেন, ‘এত কথা বলছ কেন! ফ্ল্যাটের টাকার জন্য আমার কাছে এসেছ কেন? অফিসে লোনের ব্যবস্থা নেই? ব্যাঙ্কে যাও।’

    প্রহ্লাদ বগলের ছাতা এবং ব্যাগ সামলেই ডান হাত দিয়ে মাথা চুলকাল।

    ‘স্যার, পুরো টাকা চাই না। শুধু বুকিংয়ের টাকাটুকু পেলেই এখনকার মতো হয়ে যাবে। তারপর ম্যানেজ করব। গত বছর মেয়ের বিয়ের জন্য অফিসের লোন নিয়ে ফেলেছি। মাইনে কাটছে। এখন হাতে যা পাই তাতে সংসার চলা মুশকিল। আবার যদি ব্যাঙ্কে গিয়ে গাদাখানেক টাকা কাটাই, খাব কী? তাই বলছিলাম, আপনি যদি ব্যবস্থা করে দেন…একটা বছর পর খানিকটা সামলে নিয়ে শোধ দিতে শুরু করব।’

    এই লোকের আবদার বিরাট! এক বছর টাকা ফেরত দেবে না বলছে! আবদারের বহরে বিমলকান্তিবাবু হালকা মজা পেলেন। বললেন, ‘কত টাকা?’

    প্রহ্লাদ একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘লাগবে এক লাখ বিশ হাজার। আপনি স্যার এক লাখ দিলেই হবে। বিশ হাজার স্যার বউয়ের গয়না বেচে হয়ে যাবে। বুকিং মানি নিয়েই ঝামেলায় পড়েছি। পরেরগুলো জোগাড় হয়ে যাবে। আপনি চিন্তা করবেন না।’

    চিন্তা করবেন না! এই লোকের কথাবার্তা তো একেবারে ঠিক নেই। তার টাকা জোগাড় নিয়ে বিমলকান্তি সেন কেন খামোকা চিন্তা করতে যাবেন! না, অনেক হয়েছে। এবার ভবানীকে ডেকে গর্দভকে বের করে দেওয়াই ভালো। নইলে সত্যি সত্যি সকালেই মেজাজ গোলমাল হয়ে যাবে। লোকটার মাথায় হালকা গোলমাল আছে মনে হচ্ছে। ভারী পাগল ভালো। চিনতে সুবিধে হয়। হালকা পাগল নিয়েই সমস্যা। বিমলকান্তিবাবুর ইজি চেয়ারের পাশে ছোট টেবিলে ইন্টারকম রয়েছে। গেটে যোগাযোগ করা যায়। বিমলকান্তিবাবু হাত বাড়ালেন।

    আর তখনই সব উলটে গেল। মুহূর্তের জন্য যেন চারপাশ দুলে উঠল। ভূমিকম্প হলে যেমন হয় অনেকটা সেরকম।

    বিমলকান্তি সেনের মনে হল, তিনি বিমলকান্তি সেন নন। তিনি অন্য কেউ। আরেকটা মানুষ। যিনি সেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের মালিক নন, একজন কর্মচারী মাত্র। অতি সামান্য কর্মচারী। বারুইপুরের কাছে ফ্ল্যাট কিনবেন। বহুদিনের স্বপ্ন স্যার নিজের বাড়ি হবে। জায়গা দেখেছে, কিন্তু ফ্ল্যাট বুকিং করবার টাকা জোগাড় হয়নি। ঘুরছেন টাকার চেষ্টায়। তার এক বগলে ছাতা, এক বগলে সস্তার ব্যাগ। তাতে টিফিন কৌটো। ‘স্যার’-এর সামনে একটু কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। পেটের কাছটা চুলকে উঠল। একটা চোঁয়া ঢেঁকুর গলার কাছ পর্যন্ত এসে থমকে গেল। ঠিক যেন প্রহ্লাদ! তিনি কি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহ্লাদ হয়ে যাচ্ছেন! ভয়ঙ্কর! একটা ঠান্ডা স্রোত বিমলকান্তির শিরদাঁড়া দিয়ে সরসর করে নেমে গেল। তার মাথায় কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। নিজের কথা নয়, অন্য মানুষের কথা।

    বিমলকান্তি কি তাকে টাকা দেবে? সবাই বলেছে, দেবে না। আমার মনে হচ্ছে, দেবে। কড়া মানুষটার ভিতরে একটা নরম মানুষ আছে। সে অন্যের স্বপ্নকে সম্মান করবে। উনি নিশ্চিত বুঝতে পারছেন আমার স্বপ্নটা সিরিয়াস।

    বুকের ভিতরটা ধুকপুক করে উঠল বিমলকান্তিবাবুর। কী হচ্ছে এসব! তিনি কি প্রহ্লাদ হয়ে গেলেন? তার মতো করে ভাবছেন!

    হতে পারে না। ভুল হচ্ছে। ভয়ঙ্কর একটা ভুল হচ্ছে।

    ভাবতে ভাবতেই নিমেষে সব ঠিক হয়ে গেল। খুব বেশি হলে পনেরো সেকেন্ড। যেমন দ্রুত এসেছিল, তেমন দ্রুতই চলে গেল সব। মনের ভিতর থেকে মুছে গেল। এমনকী পেট চুলকোনো, হাফ ঢেঁকুরও ভ্যানিশ! সব নরমাল। বিমলকান্তি সেন যেমন ছিলেন তেমন হয়ে গেলেন।

    এর পরে আরও দু-চারটে কথা চালালেন বিমলকান্তি। ইচ্ছে করছে না। কেমন একটা অস্বস্তি। ভিতরে খচখচ করছে। এটা কেমন ভুল? একটা মানুষ আরেকটা মানুষ হয়ে যাবে কেন! যত কম সময়ের জন্যই হোক, কেন হবে? জেগে জেগে স্বপ্ন দেখলেন না তো? দুঃস্বপ্ন?

    বিমলকান্তিবাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘প্রহ্লাদ, তুমি অফিসে গিয়ে অ্যাপ্লিকেশন জমা দেবে। আমি বলে রাখব। দুদিন পরে টাকা পেয়ে যাবে। এখন যাও।’

    প্রহ্লাদ চলে যাওয়ার পর, অনেকটা সময় চুপ করে বসে রইলেন বিমলকান্তিবাবু।

  • দ্বিতীয় কিস্তি

    দ্বিতীয় কিস্তি

    প্রচেত গুপ্ত

    [book]

    এগার

    অপকারীর বিপদ আসে যেচে, পরোপকারীর বিপদ আসে নেচে।

    এই প্রবাদ কোনও সত্যি প্রবাদ নয়, মেঘবতীর বানানো। বরের জন্য বানিয়েছে। এর মানে হল, কারও অপকার করলে বিপদ নিজে থেকেই ডেকে আনা হয়, কিন্তু কারও উপকার করলে উপকারীর কাছে বিপদ আসে নাচতে নাচতে।

    বিপদ কেমন নাচতে নাচতে আসে সেদিন হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল মেঘবতী। বরের পাগলামির জন্য আর একটু হলে পুলিশ ধরে থানায় নিয়ে যাচ্ছিল। অহেতুক কারণে কাঁদতে ভালোবাসলেও, কঠিন পরিস্থিতিতে মেঘবতী কখনও কান্নাকাটি করে না। নার্ভাস হয় না। অন্য যে-কোনও মেয়ে এই ঝামেলায় পড়লে আগে ‘ভ্যাঁ’ করে কেঁদে ফেলত। মেঘবতী সেদিন ঠাণ্ডা মাথায় ঝামেলা সামলেছে।

    ঘটনা ছিল এরকম—

    রাস্তায় ঢাউস সুটকেস হাতে ‘অসহায়’ বৃদ্ধ মানুষকে দেখে ‘প্রাণ কেঁদে উঠেছিল’ জ্যোতিষ্কর। আহারে, মানুষটা নিশ্চয় সমস্যায় পড়েছে! হয়তো ট্যাক্সির ভাড়া পকেটে নেই। এদিকে অতবড় সুটকেস নিয়ে বাসেও উঠতে পারছেন না। অন্তত খানিকটা পথ গাড়িতে এগিয়ে দিলে উপকার হবে। এই ভেবে রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে হাসি হাসি মুখে এগিয়ে গিয়েছিল জ্যোতিষ্ক। বুঝতে পারেনি, একটু পরে গাড়ি থেকে মেঘবতীও নেমে এসেছে। পিছনে চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখছে। সম্ভবত, তার স্বামী ভদ্রলোকটি বাড়াবাড়ি কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন, সেটা আরও একবার নতুন করে জানবার কৌতূহল হয়েছিল।

    ‘নমস্কার, আপনাকে আমি অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করছি।’

    বৃদ্ধ থমকে দাঁড়ান। জ্যোতিষ্কর দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বলেন, ‘কে আপনি?’

    জ্যোতিষ্ক নাটকীয়ভাবে বলে, ‘কেউ নই। একজন পাসারবাই। পথচলতি মানুষ বলতে পারেন।’

    বৃদ্ধ সন্দেহ ভরা গলায় বলেন, ‘আমাকে লক্ষ করছেন মানে!’

    জ্যোতিষ্ক হেসে হাত তুলে বলল, ‘টেনশনের কিছু নেই মেসোমশাই। আপনাকে আমি আর আমার স্ত্রী গাড়ি থেকে লক্ষ করছিলাম। মনে হল, নিশ্চয় আপনি কোনও সমস্যায় পড়েছেন। তাই গাড়ি থেকে নেমে আপনার কাছে এসেছি। মে আই হেল্প ইউ?’

    বৃদ্ধ এবার অবাক হয়ে, চোখ বড় করে বললেন, ‘আমি সমস্যায় পড়েছি! কীসের সমস্যা?’

    জ্যোতিষ্ক বলল, ‘মেসোমশাই, আপনি লজ্জা পাবেন না। এত বড় একটা সুটকেস নিয়ে ট্যাক্সির জন্য ছোটাছুটি করছেন, এটা একটা সমস্যা নয়?’

    বৃদ্ধ চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘ট্যাক্সি! ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করতে যাব কেন!’

    এবার জ্যোতিষ্কর অবাক হওয়ার পালা।

    ‘তবে কি বাস? এই সুটকেস নিয়ে বাসে উঠবেন কী করে? রাতের দিকে বাস কমে যায়। তাই ভিড় থাকে খুব।’

    বৃদ্ধ তেড়েফুঁড়ে বললেন, ‘বাসে উঠব, কে বলল আপনাকে?’

    জ্যোতিষ্ক থতমত খেয়ে বলল, ‘ট্যাক্সি, বাস কিছুই নয়! রিকশা খুঁজছেন? রিকশায় বাড়ি ফিরবেন? এই বড় রাস্তায় কি রিকশা পাবেন? তাও আবার এত রাতে… গলিটলিতে ঢুকে যদি…।’

    বৃদ্ধ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ট্যাক্সি, বাস, রিকশা আমার কিছুই লাগবে না। আমার ছেলে এখনই গাড়ি নিয়ে আসছে। আমি এগিয়ে গিয়ে সেটাই দেখছি। ছোটাছুটি কিছু করিনি। আপনি ভুল বুঝেছেন।’

    জ্যোতিষ্ক থমকে যায়। তাহলে সমস্যা নয়! স্মার্ট হাসবার চেষ্টা করে সে। মাথা চুলকে, আমতা আমতা করে বলল, ‘ও হো, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম, আপনি প্রবলেমে পড়েছেন। সরি মেসোমশাই।’

    বৃদ্ধ হাত নেড়ে তাড়াবার ভঙ্গিতে বললেন, ‘এবার তো বুঝেছেন, তাহলে যান। নিজের কাজ করুন গিয়ে। আর আমাকে মেসোমশাই ডাকছেন কেন? আমি তো আপনার মেসোমশাই নই।’

    জ্যোতিষ্ক দু পা এগিয়ে গিয়ে গদগদ ভঙ্গিতে বলল, ‘সরি স্যার… আপনি বরং সুটকেসটা আমাকে দিন। অত ভারী জিনিস…যতক্ষণ না আপনার ছেলের গাড়ি আসে আমি ওটা ক্যারি করছি। নো প্রবলেম। দিন আমাকে।’

    কথা শেষে জ্যোতিষ্ক হাত বাড়ায়। বৃদ্ধ চমকে ওঠেন। আঁতকে ওঠেন বলা যায়। লাফ দিয়ে পিছিয়ে যান কয়েক পা। ধড়ফড় করে বলে ওঠেন, ‘না না, আপনি আমার সুটকেসে হাত দেবেন না। মোটে হাত দেবেন না। খুব খারাপ হয়ে যাবে।’

    জ্যোতিষ্ক অবাক হয়ে বলে, ‘কেন স্যার, এনি প্রবলেম?’

    বৃদ্ধ চিৎকার করে বলেন, ‘এ কী কথা। আপনি আমার সুটকেস চাইছেন কেন? আমি পুলিশ ডাকব…।’

    জ্যোতিষ্ক বলে, ‘পুলিশ! পুলিশ ডাকবেন কেন? সমস্যা কী?’

    কথার ফাঁকেই একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায়। জানলার কাচ নামিয়ে কেউ একজন ডাকল, ‘বাবা, চলে এসো।’

    বৃদ্ধ যেন হাতে স্বর্গ পেলেন। বাসস্টপ থেকে লাফ মেরে রাস্তায় নামেন। হাঁপাতে হাঁপাতে বলেন, ‘ভলু…ভলু…তাড়াতাড়ি দরজা খোল ভলু…লোকটা আমার সুটকেস কেড়ে নিতে চাইছে…ছিনতাই…।’

    ‘ভলু’র দামি, বিদেশি গাড়ির দরজা খুলে যায়। আতঙ্কিত বৃদ্ধ নিমেষে সুটকেস সমেত সেঁধিয়ে যান ভিতরে। হতভম্ব জ্যোতিষ্ককে ফেলে গাড়ি চলে যায় ভুস করে। মেঘবতী এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার স্বামীর পাশে এসে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, ‘হল তো?’

    বউয়ের গলা শুনে জ্যোতিষ্ক একটু চমকে যায়। নিজেকে সামলে, পাশ ফিরে বলে, ‘তুমি! কী হল মেঘ?’

    মেঘবতী চাপা গলায় বলল, ‘শিক্ষা হল না? আমি তো সেই কারণেই গাড়ি থেকে নেমে এসেছি। পরোপকরের লেসন তোমার কেমন হয় দেখব বলে।’

    জ্যোতিষ্ক অবাক হয়ে বলল, ‘কীসের শিক্ষা!’

    মেঘবতী ক্রোধ ও বিস্ময় মেশানো গলায় বলল, ‘এর পরেও বলছ কীসের শিক্ষা! রাস্তার একজন অপরিচিত কে না কে, একটা বুড়ো, তোমাকে ছিনতাইবাজ বলে চলে গেল। তার পরেও বলছ কীসের শিক্ষা! তোমার লজ্জা করছে না? পরোপকার করতে গেলে কীভাবে অপমানিত হতে হয়, এখনও বুঝতে পারছ না?’

    জ্যোতিষ্ক হেসে বলল, ‘দুর এসব ছোটখাটো মান-অপমান গায়ে মাখলে চলে? বৃদ্ধ মানুষটি যে আসলে কোনও সমস্যায় পড়েননি, এটাই তো আনন্দের কথা মেঘ। আমরা ভুল ভেবেছিলাম জেনে ভালো লাগছে। আমি আশা করব, এভাবে বার বার আমাদের ভুল ভাঙুক। চলো এবার ফেরা যাক। রাত হতে চলল। খিদে পাচ্ছে। আজ ডিনারে স্পেশাল আইটেম কী?’

    মেঘবতী বলল, ‘আচ্ছা মানুষ তো তুমি? এতবড় অপমানের পর নির্বিকারভাবে বলছ ডিনার কী!’

    জ্যোতিষ্ক ‘হো হো’ আওয়াজে হেসে উঠল। মেঘবতী বলল, ‘চুপ করো। একদম চুপ করো। এরপর থেকে তুমি যখন মাঝরাস্তায় গাড়ি থামিয়ে কাউকে উপকার করতে যাবে, দয়া করে আমাকে একটু আগে জানাবে।’

    জ্যোতিষ্ক মুচকি হেসে বলল, ‘কেন? তুমি কী করবে?’

    মেঘবতী বলল, ‘গাড়ি থেকে নেমে একটা ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি চলে যাব। কেউ আমার হাজবেন্ডকে ছিনতাইবাজ বলবে আর আমি দাঁড়িয়ে থেকে সেটা শুনব, এটা টু মাচ। আমি মেনে নিতে পারছি না। আজ ছিনতাইবাজ বলছে, কাল চোর বলবে, পরশু ডাকাত বলবে।’

    জ্যোতিষ্ক হাসতে হাসতে গাড়ির দরজা খুলল। আর তখনই সামনে পথ আটকে একটা পুলিশ জিপ এসে থামে। টহলদার পুলিশের জিপ। টক করে একজন উর্দি পরা অফিসার ধরনের যুবক এগিয়ে এল।

    ‘এই যে মিস্টার এক মিনিট দাঁড়াবেন।’

    জ্যোতিষ্ক ভুরু কুঁচকে বলল, ‘আমাকে বলছেন! কী হয়েছে?’

    পুলিশ অফিসার বলল, ‘হয়নি কিছু। আপনাদের নামে একটা কমপ্লেইন পেলাম, সেটাই ভেরিভাই করতে এসেছি।’

    মেঘবতী বিড়বিড় করে বলল, ‘কমপ্লেইন! আমাদের নামে!’

    ততক্ষণে অফিসার গাড়ির পাশে চলে এসেছে। হেসে বলল, ‘হ্যাঁ ম্যাডাম। সিরিয়াস কমপ্লেইন। মোড়ে ডিউটি দিচ্ছিলাম, এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক আর তার ছেলে গাড়ি থামিয়ে বলে গেল আপনারা নাকি তাদের সুটকেস কেড়ে নিতে গিয়েছিলেন।’

    মেঘবতীর কান, মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। তারা ছিনতাই করছে! এ কী কথা! মনে হল, শরীর কাঁপছে। গাড়ির দরজা ধরে কোনও রকমে নিজেকে সামলাল সে। বলল, ‘আপনি এসব কী বলছেন অফিসার! আমরা কেন সুটকেস কেড়ে নিতে যাব।’

    অফিসার ছেলেটি বলল, ‘আমরা কিছু বলিনি। বৃদ্ধ ভদ্রলোক বলেছেন। এবার বলুন, আপনারা কারা এবং এত রাতে এখানে গাড়ি থামিয়ে কী করছেন?’

    জ্যোতিষ্ক রাগ সামলে চাপা গলায় বলল, ‘রাতে রাস্তায় বেরোনো বারণ নাকি?’

    অফিসার ঠোঁটের কোণায় মিচকে হেসে বলল, ‘না নিষেধ নয়, তবে সময়টা ভালো নয়। কদিন ধরে শহরের এদিকটায় ফ্লাইং ছিনতাই হচ্ছে। একটা গ্যাং গাড়ি নিয়ে ঘুরছে আর সুযোগ বুঝলেই এর-তার ব্যাগ, গয়নাগাঁটি কেড়ে নিয়ে চম্পট দিচ্ছে। আমরা গ্যাংটাকে ধরবার চেষ্টায় আছি।’

    মেঘবতী কঠিন গলায় বলল, ‘আপনারা ভুল করছেন অফিসার। হ্যারাস করছেন।’

     অফিসার ছেলেটি আর একটু এগিয়ে এসে বলল, ‘সেটা হলেই খুশি হব ম্যাডাম। আপনাদের দেখে এবং কথাবার্তা শুনে ভদ্রলোক মনে হচ্ছে। ছিনতাইয়ের ব্যাপারটা ভুল প্রমাণিত হলে খুশি হব। যাক, সরুন, গাড়ি সার্চ করব।’

    ততক্ষণে একটু একটু করে ভিড় জমতে শুরু করেছে। জ্যোতিষ্ক তেড়ে যেতে গেল। মেঘবতী দ্রুত হাতে তাকে আটকে পুলিশ অফিসারের কাছে এগিয়ে যায়। নীচু গলায় আসল ঘটনা বোঝাতে চেষ্টা করে। তাতে খুব লাভ হয় না, কিন্তু জ্যোতিষ্ক সরকারের কত বড় পদে কাজ করে সেই পরিচয় পাওয়ার পর তরুণ অফিসার থতমত খেয়ে যায়। এটাই মজা। এ দেশে পদ, অর্থাৎ চেয়ারের মহিমা অতি গুরুত্বপূর্ণ। একমাত্রও বলা যায়। ঘটনার থেকে চেয়ারের ওজন সবসময় বেশি। কী ঘটল, কেন ঘটল সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, ঘটনা যে ঘটিয়েছে সে কোন চেয়ারে বসে? তার স্ট্যটাস কী? নড়বড়ে টুলে বসলে নেংটি ইঁদুর, সিংহাসনে বসলে সিংহ। আরও মজা হল, সিংহাসন ত্যাগ করলে সিংহ হয়ে যায় নেংটি ইঁদুর। বেচারি! যাই হোক, জ্যোতিষ্কর চাকরির কথা শুনে অফিসারের টনক নড়ল। স্যালুট ট্যালুট করে একসা কাণ্ড।

    ‘সরি স্যার…ভেরি সরি স্যার…আমরা ঠিক বুঝতে পারিনি…আসলে স্যার কমপ্লেইন পেলাম…আপনার মতো অন্যের সমস্যায় ব্যস্ত হয়ে ওঠা মানুষ তো আজকাল দেখা যায় না…মানুষ ভুল বোঝে…কিছু মনে করবেন না স্যার…আজকের দিনে আপনার মতো মানুষ অতি বিরল…আমি স্যার ওই বুড়োর ফোন নম্বর নিয়ে রেখেছি…থানায় গিয়েই ধরব…মিথ্যে অভিযোগের ধমক কাকে বলে দেখবে…হারামজাদা…সরি স্যর…।’

    বাড়ি ফিরেই মেঘবতী ঘোষণা করেছিল, পরদিনই সে তার বাবা-মায়ের কাছে চলে যাবে। খুব বেশি হলে একদিন অপেক্ষা করতে পারে। তারপর আর নয়। জ্যোতিষ্কের এই পাগলামি সে কিছুতেই মেনে নেবে না। তাকে যদি পাগলামি করতেই হয়, তাহলে একা করুক, বউ নিয়ে নয়। অন্যদিকে জ্যোতিষ্কও ঘোষণা করল, মানুষ যতই সমস্যায় পড়ুক, সে আর কখনও এভাবে রাস্তায় গাড়ি থামাবে না। মেঘবতীকে পুলিশের বিড়ম্বনায় ফেলার জন্য সে ‘সরি’। মেঘবতীর উচিত তার এই ঘোষণাকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে বাবা-মায়ের কাছে চলে যাওয়ার কথা একবার বিবেচনা করে দেখা। ঠাণ্ডা মাথায় বিবেচনা প্রয়োজন। জ্যোতিষ্ক বলল, যা ঘটেছে তার জন্য সে দায়ী নয়। বৃদ্ধ এবং পুলিশের বোঝাবুঝির দায় তার ঘাড়ে ফেলা অনুচিত। মুখে যাই বলুক এবং যতই ঝামেলা ঘাড়ে এসে পড়ুক, মেঘবতী আসলে তার স্বামীর পক্ষে। এই যুক্তি সে ফেলতে পারল না। ফলে বাবা-মায়ের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে স্থগিত রাখল। কিন্তু দুদিন পরেই আবার এমন ঘটনা ঘটল যে, মেঘবতী সত্যি সত্যি সুটকেস গুছিয়ে চলে যায়।

    সেদিন পুলিশ নয়, ঝামেলার কেন্দ্রে ছিল নারকোল। খান বারো নারকোল। তার আবার বেশিরভাগই শুকনো।

    দিনটা ছিল রবিবার। টিপটিপ করে সকাল থেকে বৃষ্টি। ছুটির দিনে জ্যোতিষ্ক আস্তে ধীরে বাজারে বেরোয়। আলিস্যি লাগে। অন্যদিনের তুলনায় একটু বেলাই করে ফেলে। তার ওপর সেদিন ছিল স্যাঁতস্যাঁতে একটা দিন। বাজারে ঢোকবার অনেক আগেই দেখল, এক বালিকা প্লাস্টিক পেতে কতগুলো নারকোল নিয়ে বেজার মুখে বসে আছে। বালিকার বয়স কিছুতেই দশ-এগারোর বেশি হবে না। মাথায় একটা গামছা। গামছা দিয়ে বৃষ্টির জল আটকাতে চেষ্টা হয়েছে, লাভ হচ্ছে না। মলিন ফ্রক ভিজছে। প্রতিটা ক্রেতার দিকে বালিকা তাকিয়ে আছে অতি আগ্রহ নিয়ে। বোঝাই যাচ্ছে, তার নারকোল বিক্রি নেই। বিক্রি নেই বলে উঠতেও পারছে না। বৃষ্টিতে ভিজছে। কে জানে, হয়তো বেচারিকে তার বাড়ির লোক হুমকি দিয়ে বসিয়ে রেখেছে। জ্যোতিষ্ক সামনে দিয়ে যেতে মেয়েটি নীচু গলায় বলল, ‘নারকোল লাগবে?’

    জ্যোতিষ্ক থমকে দাঁড়াল। মায়াভরা গলায় বলল, ‘নারে মা, আজ আর নারকোল লাগবে না। অন্যদিন নেব।’

    মেয়েটি এবার ঝাঁঝিয়ে উঠল।

    ‘সবাই যদি অন্যদিন কয় আমার কী হবে? আমি এগুলান নিয়ে কী করব?’

    ছাতা হাতে জ্যোতিষ্ক থমকে দাঁড়ায়। মেয়েটি বলল, ‘দাঁড়ায়ে দেখেন কী? আমি জলে ভিজি এইডা দেখেন?’

    নিমেষের জন্য জ্যোতিষ্কর মনে হল, মেয়েটির চোখে জল। কান্না? নাকি দুনিয়ার প্রতি রাগ? ঘেন্না?

    জ্যোতিষ্ক বারোটা নারকোল কিনে হাসিমুখে বাড়ি ফিরেছিল সেদিন। বারোটাই তাকে কিনতে হয়নি। মলিন ফ্রকের মেয়ে তাকে একটা বিনি পয়সায় দিয়েছে।

    ‘এইডা আপনারে ফিরি কইর‌্যা দিলাম, টাকা লাগব না।’

    মেঘবতী দুপুরের একটু পরেই বাপের বাড়ি চলে গেল। নারকোল-যন্ত্রণা সে মেনে নিতে পারল না।

  • তৃতীয় কিস্তি

    তৃতীয় কিস্তি

    প্রচেত গুপ্ত

    [book]

    একুশ

    কমলকান্তি শান্তভাবে বললেন, ‘কী করবি?’

    বারিধারা বলল, ‘দাদু, তুমি জানো, আমি কী করব।’

    কমলকান্তি বললেন, ‘আন্দাজ করতে পারছি। মোস্ট ইনটেলিজেন্ট লিস্টে এক নম্বরে যে বোকার নাম রয়েছে, এই ধরনের সিচুয়েশনে সে কী করতে পারে, তার একটা আন্দাজ হচ্ছে। তার পরেও বল। তোর মুখ থেকেই সরাসরি শুনি। অনেক সময় বোকার মুখ থেকে বোকামি শুনতে ভালো লাগে।’

    বারিধারা বলল, ‘আমি মধুজা রায়কে গিয়ে বলব, সরি ম্যাডাম, আমি আপনার আদেশ মানতে পারলাম না। আমি যা করেছি, ঠিক করেছি। ক্ষমা চাইবার কোনও প্রশ্ন ওঠে না।’

    কমলকান্তি একটু ভাবলেন। তার পর হালকা করে ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘আমি আঁচ করছিলাম এই ধরনের কোনও কথাই তুই বলবি। আমি এখনকার সিস্টেমটা জানি না। আমাদের সময় স্কুল-কলেজে স্বদেশী করে অনেক দীপান্তরিত হত। এখন সম্মান বাঁচাতে গিয়ে কোন ধরনের সাজা হতে পারে, আমার জানা নেই। তুই তো জানিস বৃষ্টি খবরের কাগজ, টিভির সঙ্গে আমি নেই। ইন ফ্যাক্ট ওরাই আমার সঙ্গে নেই বলতে পারিস। এই ডিশিশনের কারণে তোর কী কী বিপদ হতে পারে আমি কি জানতে পারি?’

    বারিধারা চুপ করে রইল। বিপদ যে অনেক রকম হতে পারে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। মুখে যতই সাহস দেখাক, আজ সকাল থেকে তার নার্ভাস লাগছে। নার্ভাস লাগাটাই স্বাভাবিক। যত সময় যাচ্ছে সে বুঝতে পারছে, সত্যি বড় ধরনের ঝামেলার মধ্যে সে জড়িয়ে পড়তে চলেছে। মধুজা রায় তাকে এমনি হুমকি দেয়নি। নিজের ক্ষমতা বুঝেই দিয়েছে। সব থেকে মুশকিল হয়েছে, ঘটনা কাউকে না বলায়। এতে বেশি অস্বস্তি হচ্ছে। বাড়িতে বলবার তো কোনও প্রশ্নই ওঠে না। কাকে বলবে? কে বুঝবে? এক দিদিকে বলা যেতে পারত। ক্রাইসিস সত্যি হলে দিদির মাথা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। কিন্তু এই মুহূর্তে সে বংশীবাদককে নিয়ে নাজেহাল। বংশীবাদক বাঁশির অংশ বাদ দিয়ে নানাবিধ জ্বালাতন করছে। আজ নাকি ভোর চারটেতে উঠে বাঁশি বাজাতে শুরু করেছিল। জামাইবাবু ঘুম ভেঙে উঠে বলেছে, ‘রোমাঞ্চকর’! অ্যালার্মের বদলে বাঁশি শুনে ঘুম ভাঙা রোমাঞ্চকর ঠিকই, কিন্তু সেটা একদিনের জন্য। রোজ ভোর রাতে যদি এই কাণ্ড হয়, তাহলে বিপদ। বাঁশি তখন বাঁশি থাকবে না। গুঁতো হয়ে যাবে। সবথেকে যেটা বিপজ্জনক সেটা হল, জামাইবাবু আজ ব্রেকফাস্ট টেবিলে ঘোষণা করেছেন, বাঁশি শিখবেন। দরকার হলে অফিস থেকে লম্বা ছুটি নেবেন। বাঁশি শিক্ষা ঠিকমতো হলে, চাকরিবাকরি ছেড়েও দিতে পারেন। তারপর বিবাগী হয়ে বংশীবাদকের মতো পথে পথে বাঁশি বাজিয়ে ঘুরবেন। জামাইবাবুর এই সিদ্ধান্ত দিদি মেনে নিতে পারছে না। বাঁশি শেখা খুবই সুন্দর একটা ব্যাপার, কিন্তু তা বলে ঘরসংসার ছেড়ে পথে বেরিয়ে পড়বার ইচ্ছা ভয়ঙ্কর। সকালে বোনকে এই বিষয়ে টেলিফোন করে একপ্রস্থ বলা হয়েছে।

    ‘আমার কী হবে বৃষ্টি?’

    ‘কী আর হবে, তুইও জ্যোতিষ্কদার সঙ্গে পথে বেরিয়ে পড়বি। বাউলানির মতো তুই হবি বাঁশিয়ানী।’

    দিদি কঠিন গলায় বলল, ‘ফাজলামি করছিস? বাড়িঘর, সংসার ফেলে আমি তোর জামাইবাবুর সঙ্গে পথে ঘুরব?’

    বারিধারা সামান্য হেসে বলেছে, ‘বাড়িঘর, সংসার ফেলে ঘুরবি কেন! সঙ্গে নিয়ে ঘুরবি। বাউল ফকিরের ঘরসংসার তো তাদের পথ, তাদের মুক্তি। তারা ইটকাঠের ঘর সংসারের মায়ায় আটকে থাকে না। তুই এটা জানিস না?’

    দিদি কান্নাভেজা গলায় বলছে, ‘তোর জ্যোতিষ্কদাকে তুই তো জানিস বৃষ্টি। একবার যখন মাথায় পাগলামি ঢোকে, তখন সেটা কিছুতেই বেরোতে চায় না। চেপে বসে। সত্যি যদি এখন অফিস-টফিস ছুটি নিয়ে সে বাড়িতে বাঁশি শিখতে বসে, তাহলে কী হবে? আমার কান্না পাচ্ছে।’

    বারিধারা বলল, ‘জ্যোতিষ্কদার বাঁশি শেখাটা কোনও ব্যাপার নয় দিদি, বাঁশি বাজিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়াটাই চিন্তার। বংশীবাদককে তো এখন আমার আরও ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে রে দিদি। ঠিক যেন হ্যামলিনের বাঁশিওলা। জ্যোতিষ্কদা, তুই, তোদের রান্নার মাসি, গাড়ির ড্রাইভার সবাইকে বাঁশি শুনিয়ে, মেসমারাইসড করে টেনে নিয়ে চলে যাবে।’

    ‘চড় খাবি বৃষ্টি। আমি আর তোর সঙ্গে একটা কথা বলব না।’

    দিদি রেগেমেগে ফোন কেটে দেয়। সম্ভবত কাঁদতে চলে যায়। এই মানুষকে এখন ইউনিভার্সিটির ঝামেলার কথা বলে কী হবে? মাথা কাজ করবে না। বারিধারা একবার ভেবেছিল, তিথিকে ফোন করে জানাবে। নিজেই পিছিয়ে গেল। তিথি ভীতু মেয়ে। ঘাবড়ে যাবে। হয়তো কাঁপা গলায় বলবে, ‘কী হবে বারিধারা?’

    ‘কী আবার হবে, যা হওয়ার তাই হবে।’

    ‘ম্যাম তো মারাত্মক খেপে যাবেন।’

    ‘গেলে কী করব? ওই নোংরা ছেলের পা ধরে ক্ষমা চাইব?’

    ‘আমার খুব ভয় করছে বারিধারা।’

    ‘তোর কেন ভয় করবে? তোকে তো কোনও ঝামেলায় পড়তে হয়নি। হবেও না। চড় মেরেছি আমি, মধুজা ম্যাডামের কথা আমি অমান্য করব। উনি কোনও অ্যাকশন নিলে আমার বিরুদ্ধে নেবেন। তুই এর মধ্যে কোথা থেকে আসছিস? ঘটনাটা তোকে নিয়ে শুরু, তাই জানিয়ে রাখলাম।’

    তিথি ঢোক গিলে হয়তো বলবে, ‘সেই জন্যই তো আমার বেশি ভয় করছে। ইস আমার খুব খারাপ লাগছে।’

    ‘তুই ফালতু চাপ নিচ্ছিস তিথি। আমি ঠিক সামলে নেব।’

    তিথি বলবে, ‘তোকে ঘটনাটা না বললেই হত। সবাই আমার ওপর রাগ করবে। বলবে, তোর জন্য মেয়েটা মাথা গরম করে বিপদে পড়ল।’

    ‘মাথা গরম করাটাই বড় হল তিথি! অপমানটা কিছু নয়? অতগুলো ছেলেমেয়ের সামনে ওই বাস্টার্ড তোকে অমন একটা নোংরা কথা বলল…সেটা কিছু নয়?’

    তিথি হয়তো আমতা আমতা করে বলবে, ‘সে তো কত লোকেই নোংরা হয় বারিধারা। পথেঘাটে, বাসে-ট্রামে দেখিসনি? ছুতোনাতায় মেয়েদের গায়ে হাত দেয়। খারাপ কথা বলে।’

    ‘পথেঘাটে, বাসে-ট্রামের নোংরা লোক আর সহপাঠী, সহকর্মী, চেনা লোকের নোংরামি এক হবে?’

    তিথি নিশ্চিত এসব যুক্তি কানে নিত না। বলত, ‘ইস, কেন যে মরতে তোকে বলতে গেলাম। আমারই দোষ। ওসব কথা গায়ে না মাখলেই হত। তোকে যদি আমি না বলতাম, তুইও চড় মারতিস না। মধুজা রায় খুব পাওয়ারফুল….তোর কেরিয়ারের সমস্যা করে দিতে পারে।’

    ‘শুধু মধুজা রায় কেন? তার সঙ্গে ছেলেটার এক রিলেটিভও জুটেছে। তার নাকি আরও বেশি পাওয়ার। দুই পাওয়ার মিলে সুপারপাওয়ার আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে।’

    তিথি এসব শুনলে আরও ঘাবড়ে যাবে। অবশ্যই কাঁদো কাঁদো গলায় বলবে, ‘এখনও ঠাট্টা করছিস বারিধারা! আমার তো হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।’

    ‘তুই একটা কাজ কর তিথি। হট ওয়াটার ব্যাগে গরম  জল নিয়ে বসে হাত-পা গরম কর। আমি আমার কাজ করি।’

    শ্রবণের ব্যাপারও তাই। সে তিথির মতো ঘাবড়ে না গেলেও চিন্তিত হবে। ওর নিজের কাজকর্ম আছে। বেশিটাই ভাবনা-চিন্তার কাজ। মাথায় এসব ঢুকলে সেই কাজে গোলমাল হবে। প্রেমের ব্যাপারে যতই ক্যাবলা হোক না কেন, ছেলেটা যে গুণী, সে বিষয়ে তো কোনও সন্দেহ নেই। বাঁধাধরা নিয়ম নয়, নিজের গুণ দিয়ে উপার্জন করতে চায়। বিজ্ঞাপনের কনসেপ্ট তৈরি এখন ইন থিঙ্ক। গোটা দুনিয়াই বিজ্ঞাপনের ওপর চলছে। আবার এই লাইনে ভিড়ও খুব হচ্ছে। ইনোভেটিভ, ইমাজিনেটিভ ছেলেমেয়েরা আসছে। কেউ গাইতে পারে, কেউ আঁকতে পারে, কেউ ফটো তুলতে পারে, কেউ ভাবতে পারে। কেউ আবার মার্কেট অ্যানালিস্ট, প্রাোডাক্ট এক্সপার্ট, ম্যানেজমেন্ট এফিসিয়েন্ট। প্রতিযোগিতাও খুব। তবে এখানে তেমন কাজ নেই। এখানে ছোটখাটো কাজ করতে করতে হাত পাকিয়ে চলে যেতে হবে মুম্বাই। শ্রবণও হয়তো তাই যাবে। এখন খুব খাটছে। কাল বিকেলে শাম্বদের চিলেকোঠার ঘর থেকে বেরিয়ে দুজনে ট্যাক্সি নিয়েছিল। সোজা নন্দন চত্বর। কলকাতায় এখন প্রেম করবার জন্য নানারকম জায়গা হয়েছে। সুন্দর সুন্দর পার্ক। গঙ্গার ঘাটটাও চমৎকার হয়েছে। বসবার জায়গা, হাঁটবার বাঁধানো পথ, আলো। শপিং মলে ঢুকে গেলেও হয়। এক কাপ চা বা কফি নিয়ে যে-কোনও জায়গায় বসে যাও। নিউ টাউনের ইকো পার্ক তো খুবই সুন্দর। আর পকেটে পয়সা থাকলে তো কথাই নেই। সিসিডি, বারিস্তা তো এখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে। তবে প্রেম করবার জন্য বারিধারার সবথেকে বেশি পছন্দ নন্দন, নয়তো হন্টন। হয় নন্দন চত্বরে বসো, নয় পথে হেঁটে হেঁটে গল্প, ঝগড়া ভাব-ভালোবাসা করো। নন্দনের ওপর বারিধারা দুর্বল। সেখানেই শ্রবণের সঙ্গে তার আলাপ হয়েছিল। আলাপের ইস্যু ছিল আছাড়। কোনও প্রেম হয় দর্শনে, কোনও প্রেম হয় আকর্ষণে, কোনও প্রেম হয় শাসনে। এই প্রেম হয়েছিল আছাড়ে।

    সেদিনটা চিরকাল মনে থাকবে বারিধারার। সকাল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। আকাদেমির পাশ দিয়ে নন্দন চত্বরে ঢোকবার মুখটা ছিল কাদা কাদা। মাথায় ছাতা নিয়ে বারিধারা ঢুকছিল। নন্দনে সিনেমা দেখবে। পা টিপে হাঁটছিল বারিধারা। পিছলে না যায়। হঠাৎই ধপাস আওয়াজে মুখ ফিরিয়ে দেখে, পাশে পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের একটা ছেলে চিৎপটাং হয়ে পড়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে, তাড়াহুড়োর কারণে পা হড়কেছে। ছেলেটির কাঁধের ব্যাগ ছিটকে পড়েছে। ব্যাগ থেকে কাগজের বান্ডিল, রংতুলি, প্যালেট উঁকি মারছে। আর্টিস্ট। নন্দন চত্বরে আর্টিস্ট কোনও বড় বিষয় নয়। আর পাঁচজন পা হড়কে পড়লে যেমন বোকার মতো হাসে, এই ছেলেও হাসছিল। বারিধারার তাড়া ছিল, তার পরেও থমকে দাঁড়াল। সহজভাবে হাত বাড়িয়ে দিল। ছেলেটি লজ্জা লজ্জাভাবে হাত ধরে বলল, ‘ধন্যবাদ। এত কাদা…।’

    বারিধারা বলল, ‘ইটস ওকে। সাবধানে উঠুন।’

    ছেলেটি বলল, ‘সাবধানেই উঠছি… আপনাকে ধন্যবাদ…।’

    আধখানা উঠে ছেলেটি আবার পা হড়কাল এবং আছাড় খেল।

    একটা কাদামাখা মানুষকে ছেড়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া কঠিন। তার ওপর মানুষটি একজন শিল্পী। ছোট হোক, বড় হোক, মেজো হোক শিল্পী তো বটে। বারিধারা নীচু হয়ে বসে মাটিতে ছড়িয়ে পড়া আঁকার সরঞ্জাম তুলতে থাকে। নিজের রুমাল দিয়ে কিছু কিছু মুছেও দেয়। শ্রবণ খুবই লজ্জা পেয়েছিল।

    ‘আমি করে নিচ্ছি। আপনি কাজে যান।’

    বারিধারা সে কথায় পাত্তা দেয় না। উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে বলে, ‘হাতদুটো পাতুন।’

    শ্রবণ বলে, ‘না না, ঠিক আছে।’

    বারিধারা কঠিন গলায় বলে, ‘হাত না ধুলে আপনি যেটাই ধরবেন কাদা লেগে যাবে। কাগজ, ছবি, রং, তুলিতে কাদা লাগলে ভালো হবে? নিন, হাতটা এগিয়ে দিন। দেরি করবেন না। আমার তাড়া আছে।’

    হাত ধোওয়ার পর শ্রবণ নিজেকে অনেকটাই সামলে নেয়। বারিধারা বিদায় নিয়ে দ্রুত পা চালায়। সিনেমার দেরি হয়ে গেল। সে আরও দ্রুত হাঁটে। কয়েক পা এগিয়ে ছোট লাফ দিয়ে খানিকটা  জল টপকাতে যায় এবং এবার সে আছাড় খেয়ে পড়ে।

    শ্রবণ প্রায় ছুটে এসে তাকে তুলতে যায়। বারিধারা কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারে, সে দাঁড়াতে পারছে না। তার বাঁ পা মচকেছে। তার যাবতীয় রাগ গিয়ে পড়ে অচেনা তরুণটির ওপর। তার জন্যই দেরি, তার জন্যই তাড়াহুড়ো, তার জন্যই আছাড়, তার জন্যই পা মচকানো। তারপর…।

    তারপর যাই ঘটুক, এই হল আছাড় প্রেম। আর এই কারণেই নন্দন চত্তরের প্রতি বারিধারা দুর্বল। বিশেষ করে যেখানে দুজনে আছাড় খেয়েছিল, সেদিকটা। কালও শ্রবণকে নিয়ে সেখানে গিয়েছিল। রবীন্দ্র সদনের টিকিট কাউন্টারের সিঁড়িতে বসে চা খেল। চা খেতে খেতে বুঝল, তার ঠোঁটটা একটু ছড়ে গেছে। জ্বালা জ্বালা করছে। নিশ্চয় চুমু খাবার সময় শ্রবণের দাঁতে লেগেছে। জ্বালাটা ভালো লাগছে।

    শ্রবণ বলল, আমাকে একটু হেল্প করবে বারি?’

    বারিধারা বলল, ‘কী হেল্প? বাড়ি পৌঁছে দেব?’

    শ্রবণ হেসে বলল, ‘না ধারা, তুমি আমাকে একটা অ্যাড কনসেপ্ট বলে দাও।’

    বারিধারা বলল, ‘কীসের অ্যাড?’

    ‘ছাতা।’

    বারিধারা হেসে বলল, ‘ছাতা!’

    শ্রবণ চিন্তিত হয়ে বলল, ‘আমি দু-একটা বানিয়েছি, কিন্তু জমছে না। চেনা চেনা হয়ে যাচ্ছে। সেই রোদ, বৃষ্টি, সুইমিং পুল। ধ্যুস। এদিকে টাফ কম্পিটিশন।’

    এই ছেলেকে মধুজা রায়ের ঝামেলা বলে লাভ কী?

    তার পরেও মনে হল, কারও সঙ্গে শেয়ার করা দরকার। সে ঘটনাটা গোপন রাখবে। আবার পরামর্শও দেবে। এই কাজটা একমাত্র পারে ওই বুড়ো মানুষটা। কমলকান্তি সেন। একানব্বুই বছর বয়সেও চিন্তাভাবনা কী পরিষ্কার! নিজের দাদু না হলে বিশ্বাস হত না। মনে হত, মিথ্যে বলছে। বারিধারা তাই তিনতলায় দাদুর কাছে এসেছে।

    তখনও সে জানত না, কমলকান্তি সেন তাকে একটা মারাত্মক কাজ করতে বলবেন। বারিধারা চমকে উঠল।

  • চতুর্থ কিস্তি

    চতুর্থ কিস্তি

    প্রচেত গুপ্ত

    [book]

    একত্রিশ

    ‘দ্য ক্যালকাটা’ হোটেলের ঘরে ঢুকে বৈশাখী সান্যাল অবাক হলেন।

    এই দুনিয়ায় ঠকবাজ, জালিয়াত, দু’নম্বরী লোকদের দেখতে বেশি ভদ্রলোকের মতো হয়। অরিজিনালের থেকে বেশি। পোশাক-আশাক ফিটফাট। কথাবার্তা, চালচলন, জুতো পালিশের মতো চকচকে। হয় শুদ্ধ বাংলা, নয় চাপা গলায় ইংরেজিতে কথা বলে। মনে হবে শিক্ষা, রুচি, ভদ্রতায় এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। সেই সঙ্গে সততার পূজারি। দরিদ্র অসহায় মানুষের জন্য মন আকুল। গত পনেরো বছরে বহু চিটিং কারবারির সঙ্গে বৈশাখীর দেখা হয়েছে। তাদের মধ্যে কারও কারওকে দেখলে বিস্মিত হতে হয়। দু’নম্বরী কাজকে এরা ভারী সুন্দর মোড়কে ঢেকে রেখেছে। ভদ্রতার মোড়ক। গোটা বিষয়টাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। অফিসে, স্কুলে, কলেজে, পথেঘাটে, ট্রামেবাসে, কলকাতার নন্দন চত্তরে এদের দেখলে মানুষ ভক্তি শ্রদ্ধা দেখায়। ছেলেমেয়েকে ফিসফিস করে বলে, ‘বাবু, বড় হয়ে তোমাকে এনার মতো হতে হবে। যাও পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করো।’

    ঘরে ঢুকে বৈশাখী এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালেন। ঠিক ঘরে এসেছেন তো? নীচের রিসেপশন থেকে তো এই ঘরের কথাই বলল। রিসেপশনের লোকটা ভিখিরি মার্কা স্যুট পরেছে। অনেকদিন কাচা হয়নি। ডানহাতের বগলের কাছটা কুঁচকে আছে। বুকের কাছে একটা বোতাম নেই। তবে দ্যা ক্যাটকাটা হোটেলের সঙ্গে মানানসই। ঢোকবার সময়েই বৈশাখীর মনে হচ্ছিল, এই বাড়িটাও যেন অনেকদিন কাচা হয়নি।

    ‘আপনিই মিসেস সান্যাল?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘কার কাছে এসেছেন?’

    বৈশাখী একটু থমকে থেকে বললেন, ‘এডি’।

    রিসেপশনের লোকটা টেবিলের একপাশে রাখা ইন্টারকম কানে দিয়ে চোখমুখ কুঁচকে ফেলল। রিসিভারের দিকে তাকাল। ফোনে গোলমাল হলে সবাই রিসিভারের দিকে তাকায়। লোকটা নম্বর টিপে কয়েকবার ঘটঘট করল। দু’বার রিসিভারে চড় মারল। লাভ হল না, ফোন রেখে দিয়ে বিরক্ত গলায় বলল, ‘থার্ড ফ্লোরে চলে যান। একশো পাঁচ নম্বর রুম।’

    ‘সিঁড়ি কোনদিকে?’

    ‘ওইদিকে লিফট।’

    ‘লিফটে নয়। সিঁড়িতে যাব।’

    লোকটা মুখ তুলে চাপা গলায় বলল, ‘অতটা হেঁটে উঠবেন কেন? লিফটে যান?’

    ‘বৈশাখী বলল, আমি সিঁড়িতেই যাব। সিঁড়ি কোনদিকে?’

    এই কায়দাটা শিখিয়ে গেছে অর্চিনের বাবা।

    ‘অচেনা বাড়িতে কাজে গেলে চট করে লিফটে ওঠানামা করবে না। করলেও সিঁড়িটা চিনে রাখবে। কোনওরকম গোলমাল হলে পালানোর অপশন জানতে হয়। লিফট সব সময় নিজের হাতে থাকে না। যখন দরকার তখন হয়তো দেখবে দশতলার ওপর উঠে বসে আছে। নামতে নামতেই বিপদে পড়ে যাবে।’

    নোংরা কোট পরা রিসেপশনিস্ট সিঁড়ির পথ দেখিয়ে আবার ভাঙা ইন্টারকমে মন দিল। এবার তার ধরে টানাটানি করছে। বৈশাখী মনে মনে বললেন, যেমন হোটেল, তেমন তার রিসেপশনিস্ট, তেমন তার ইন্টারকম। নিশ্চয় লিফটে উঠলে কোনও একটা বিপত্তি ঘটত।

    তিনতলায় উঠে ডানদিকের করিডর দিয়ে খানিকটা গেলে একশো পাঁচ নম্বর রুম। বৈশাখী করিডরে যেতে যেতেই হাত দিয়ে চুল ঠিক করলেন। আঁচল দিয়ে মুখ মুছলেন। একশো পাঁচ নম্বর ঘরের দরজা আধখানা খোলা। একসময়ে এইসব জায়গায় একা আসা-যাওয়া করতে ভয় করত। কে কোথায় ফাঁদ পেতে আছে কে জানে! হয়তো পুলিশ বসে আছে ঘাপটি মেরে। তার ওপর মহিলা। চিটিংবাজ, চোর, স্মাগলার, ছ্যাঁচোড় নিয়ে কাজ। খারাপ কিছু করে বসতে পারে। অর্চিনের বাবা ভরসা দিয়েছিল।

    ‘এই চিন্তা করবে না। চোর-ছ্যাঁচোড়রা প্রফেশনাল হয়। তারা যাকে দিয়ে কাজ করায় তার সঙ্গে কখনও খারাপ ব্যবহার করে না। তারা যখন খারাপ কাজ করে সেটাও প্রফেশনালভাবে করে। খুব বেশি হলে তোমাকে প্রস্তাব দিতে পারে। জোরজুলুম করবে না।’

    বৈশাখী রেগে গিয়ে বলেছিলেন, ‘প্রস্তাব দেবেন মানে! আমার সঙ্গে নোংরামি করবে কিনা তার প্রস্তাব দেবে!’

    অর্চিনের বাবা শুয়ে শুয়েই হেসেছিল। বলেছিল, ‘আমরা যেটাকে নোংরামি বলি, সবাই সেটাকে নোংরামি বলে না বৈশাখী। আবার উলটোটাও তাই। কোনটা পরিষ্কার, কোনটা নোংরা কে বলবে?’

    অর্চিনের বাবা সাত বছর হল মারা গেছে। এখন আর কায়দা শেখানোর কেউ নেই। বৈশাখী নিজেই সাবধান হতে শিখেছে। খারাপ কাজ যারা করে তারা নিজেদের লোকদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে না, এটা ঠিক নয়। তার একাধিক অভিজ্ঞতা আছে। অর্চিনের বাবাকে সবটা বলা হয়নি। ইচ্ছে করেই হয়নি। তখন বয়স কম ছিল। এখন বয়স বেড়েছে। এই শরীর দেখে পুরুষমানুষের বাসনা জাগবে না। তারপরেও বিশ্বাস নেই। সেরকম কিছু হলে যাতে নিজেকে বাঁচানো যায় তার ব্যবস্থা আছে। শুধু তাই নয়, পেশাগত কোনও ঝামেলার হাত থেকে হঠাৎ বাঁচতে হলেও ব্যবস্থা লাগে। বৈশাখী সান্যাল কাঁধের ভ্যানিটি ব্যাগে রিভলভার রাখেন। তাতে ছ’টা বুলেট ভরা আছে। জিনিস কেনবার পর ফাঁকা জায়গায় গিয়ে চালানো শিখেও এসেছেন। যারা বেচেছে, তারাই শেখানোর ব্যবস্থা করেছিল। দুটো বুলেট ফ্রি দিয়েছে। তারপরেও আরও তিনটে বুলেট কিনে গুলি ছুড়েছিলেন বৈশাখী। খুব আরাম হয়েছিল।

    হাত বাড়িয়ে একশো পাঁচ নম্বর ঘরের দরজায় টোকা দিলেন বৈশাখী।

    ভিতর থেকে ফিনফিনে গলায় কেউ কথা বলে উঠল।

    ‘ভিতরে আসুন মিসেস সান্যাল।’

    পার্টি জানল কী করে? রিসেপশনের ফোন ঠিক হয়েছে? নাকি লিফটে করে এসে খবর দিয়ে গেছে?

    বৈশাখী সান্যাল ঘরে পা দিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। ঘরের একপাশে চেয়ার-টেবিল। লোকটা টেবিলের পাশে চেয়ারে বসে আছে। টেবিলে চায়ের কাপ। এ কেমন পোশাক! মলিন শার্ট, প্যান্ট। উস্কোখুস্কো চুল। একমুখ দাড়ি। চিমসে মার্কা চেহারা। চোখে এক ধরনের চোর চোর ভাব। শুধু চোখ কোন, গোটা চেহারাটার মধ্যেই এক ধরনের চোর-ছ্যাঁচোড় ভাব। যে দেখবে তারই সন্দেহ হবে। এই পোশাক, এই চেহারা দিয়ে কখনও চুরি-চামারির কাজ করা যায়? কাজ করতে হয় ভদ্রলোকের পোশাকে।

    অর্চিনের বাবা প্রথম যে দু’নম্বরী লোকটার কাছে তাকে নিয়ে গিয়েছিল, তার কথা আজও বৈশাখী ভুলতে পারেননি।

    অর্চিনের বাবা বলেছিল, ‘আজ তোমাকে একজন বিরাট মানুষের কাছে নিয়ে যাব।’

    ‘কার কাছে?’

    অর্চিনের বাবা বলল, ‘অবনী সমাজপতি।’

    বৈশাখী ভুরু কুঁচকে বলেছিলেন, ‘নামটা চেনা মনে হচ্ছে। কোথায় যেন শুনেছি।’

    অর্চিনের বাবা হেসে বলেছিল, ‘স্বাভাবিক। শুধু শোনওনি, দেখেওছ। খবরের কাগজে মাঝে মাঝে অবনী সমাজপতির ছবি বের হয়।’

    বৈশাখী বললেন, ‘তাই হবে। উনি নেতা-মন্ত্রী নাকি?’

    অর্চিনের বাবা বলল, ‘না, উনি সমাজসেবী। সমাজের দরিদ্র, দুঃখী মানুষের সেবা করেন।’

    বৈশাখী বললেন, ‘বাঃ। ভালোমানুষ তাহলে।’

    অর্চিনের বাবা মুচকি হেসে বলল, ‘ঠিকই বলেছ। ভালোমানুষ। অমন ভালোমানুষ না থাকলে আমাকে না খেয়ে মরতে হত।’

    বৈশাখী অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘না খেয়ে মরতে হত! মানে?’

    অর্চিনের বাবা বলল, ‘মানে আর কী, এই যে কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কাজকর্ম নেই, ধেড়ে বয়েসে বেকার, এদিকে বিয়ে করে বসে আছি, এরকম মানুষ না থাকলে সংসার চলত কীভাবে?’

    বৈশাখী বলেছিলেন, ‘এসব কী বলছ! বুঝতে পারছি না।’

    ‘বুঝে কাজ নেই। গেলেই বুঝতে পারবে।’

    বৈশাখী চুপ করে গিয়েছিলেন। অর্চিনের বাবার অবস্থা তখন ভয়ঙ্কর। কাজ চলে গেছে। হাতে টাকাপয়সা নেই। এদিকে পেটে তখন অর্চিন এসে গেছে। লোকটা কাজের জন্য পাগলের মতো ঘুরছে। কিন্তু কাজ পাওয়া যাচ্ছে না।

    কারখানায় কাজ করলে কী হবে, অর্চিনের বাবা না ছিল লেখাপড়া জানা ইঞ্জিনিয়ার, না ছিল মেকানিক। এমনকী লেবারও নয়। মাঝারি ধরনের ম্যানেজারের কাজ করত। মাঝারি ধরনের কর্মীর কাজকর্ম চলে গেলে বিপদ। এদের বিশেষ কোনও যোগ্যতা থাকে না। আবার প্রেস্টিজের কারণে যে-কোনও কাজ চট করে করতেও পারে না। বন্ধ কারখানায় ইঞ্জিনিয়ার, ক্যাশিয়াররা কেউ কেউ এদিক-ওদিক কাজ পেয়ে গেল। অনেক লেবার এখানে-সেখানে মুটে-মজুরের কাজ শুরু করে দিল। কেউ কেউ ঠেলাও চালাতে শুরু করল। অর্চিনের বাবার জন্য কোনওটাই সম্ভব হল না। বয়স হয়ে গেছে। বেশি খাটাখাটনি সম্ভব ছিল না। একটা চাকরি ছেড়ে দিতে হল। ন’ঘণ্টা, দশ ঘণ্টার কাজ ছিল। বেতনও কম। তার ওপর লোকটার মেজাজ ছিল অদ্ভুত। সহজে রাগত না। কিন্তু রাগলে হিতাহিত জ্ঞান থাকত না। ঠিক এই কারণে বৈশাখীর বাবা-মায়ের সঙ্গে তুলকালাম করে এসেছিল। বড় মেয়ে বিয়ে করে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যাওয়ার পর বৈশাখীর মা সতর্ক হয়েছিলেন। মণিকুন্তলা সেনের খুড়তুতো বোন। তিনি মেয়েকে চোখে চোখে রাখতেন। যাতে বড় মেয়ের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। মেয়ে যেন কিছুতেই প্রেম না করে। ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা তো দূরের কথা, কিশোরী বৈশাখীকে ছেলেদের মুখোমুখিও হতে দিতেন না সেই মহিলা। স্কুলে যাতায়াতে পাহারা। ছাদে পাহারা। বিয়েবাড়িতে পাহারা। আত্মীয়দের বাড়িতে থাকা বন্ধ। বন্ধুদের বাড়িতে একা যাওয়া নয়। এমনকী সকাল-বিকেল মেয়ের খাতাপত্র ঘেঁটে দেখা হত। প্রেমপত্র নেই তো? এই নজরদারি মেয়ে বড় হওয়ার পরও চলল। তারপরেও মেয়ে কলেজে ঢুকেই প্রেমে পড়ল। নরমাল প্রেম নয়। পাগলের মতো প্রেম। নিজের ভালোমন্দর জ্ঞান ছিল না। বাড়িতে এত কড়াকড়ির জন্যই প্রেমের তীব্রতা ছিল ভয়ংকর। সেকেন্ড ইয়ারে বিয়ে করে এসে মাকে খুব শান্তভাবে খবর দিয়েছিল।

    ‘আমি বিয়ে করেছি মা। আজ আমাদের রেজিস্ট্রি হয়েছে।’

    ‘বিয়ে! রেজিস্ট্রি! কী বলছিস হাবিজাবি কথা?’

    ‘কথাটা হাবিজাবি নয়, তবে বিয়েটা হাবিজাবি হয়েছে। আমার বর এখনও কোনও চাকরিবাকরি করে না। এটা একটা সমস্যা।’

    ‘বৈশাখী কী বলছিস এসব কথা! কী বলছিস তুই! আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছিস?’

    ‘না মা, ঠাট্টা করছি না। ছেলে ভালো কিনা জানি না। লেখাপড়া বিশেষ করেনি। প্রেমে পড়বার কারণে অতসব বিচার করিনি। করবও না। আমাকে খুব ভালোবাসে শুধু এইটুকু বুঝেছি। তবে সেটাও এখন পর্যন্ত। পরে কী হবে জানি না।’

    ‘কেন এরকম করলি?’

    ‘কী বলছ মা! কেন প্রেমে পড়লাম কেউ বলতে পারে?’

    ‘তুইও দিদির মতো আমাদের মুখে চুনকালি দিলি?’

    ‘আমাদের প্রেম যদি তোমাদের মুখে চুনকালি হয়, সেটা তোমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের। দিদির সঙ্গে তোমরা যে ব্যবহার করছ, সেটা অন্যায়। দিদির বিয়ে তোমরা মানওনি। পরবর্তী জীবনে আমার সঙ্গে যে আচরণ করেছ, সেটা অত্যাচার। ক্লাস নাইনে লেটার বক্সে ছেলেদের চিঠি পেয়ে বাবা আমাকে রাতে বেল্ট দিয়ে মেরেছিল। অথচ সেই চিঠির বিন্দুবিসর্গ আমি জানতাম না। সেদিন রাতে গায়ে বেল্টের জ্বালা নিয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যদি কোনওদিন সুযোগ হয়, ওই চিঠি যে লিখেছে, তার সঙ্গে প্রেম করব। তাকে বিয়ে করব। সে যে-ই হোক। তুমি শুনলে খুশি হবে মা, আমি সেই ছেলেকে খুঁজে পেয়েছি। তাকে আমি বিয়েও করেছি। আনন্দের কারণে যাচাই করে দেখতে পারিনি, ছেলে আমাদের পরিবারের যোগ্য কিনা।’

    ‘আমি এ বিয়ে মানি না।’

    ‘কিছু এসে যায় না। আমি দিদির মতো চলে যাব।’

    বৈশাখীর বাবা পরদিন অফিস গেলেন না। সারাদিন বাড়িতে থম মেরে বসে রইলেন। বিকেলে মেয়েকে বললেন, ‘ছেলেটিকে বাড়িতে একবার ডাকতে পারবে? নাকি তার এ বাড়িতে আসবার সাহস নেই?’

    বৈশাখী ভয়ে ভয়ে বলেছিলেন, ‘পারব।’

    ‘তাহলে ডাকো।’

    বৈশাখী নীচু গলায় বলল, ‘তুমি কি চিন্ময়কে বকাবকি করবে? অপরাধ যদি কিছু হয়ে থাকে, সেটা কিন্তু তার একার নয়। বিয়ের জন্য আমিই তাকে চাপ দিয়েছিলাম।’

    বৈশাখীর বাবা অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘তুমি ছেলেটিকে খবর দাও। তার সঙ্গে আজ বিকেলে আমি চা খাব।’

    বৈশাখীর বর চিন্ময় এল সন্ধেবেলা। তখন চেহারা ছিল রোগা-পাতলা। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল। হাবভাবে এক ধরনের ডোন্ট কেয়ার ভঙ্গি। চোখমুখ বলছে, রণক্ষেত্রে প্রবেশের আগে মনে মনে তৈরি হয়েই এসেছে।

    বৈশাখীর বাবাকে নীচু হয়ে প্রণাম করতে গেলে তিনি বাধা দিলেন। ‘থাক, ওসব লাগবে না। বসো।’

    ভিতর থেকে চা এল। শুধু চা-ই এল। বৈশাখীর যতদূর মনে পড়ে, বাবা সেরকমটা আদেশ করেছিলেন।

    ‘শুধু চা দেবে। আর কিছু নয়।’

    সেই চা আসবার পর বৈশাখীর বাবা বললেন, ‘নাও, চা খাও।’

    চিন্ময় বলে, ‘থাক, ও সব লাগবে না। কেন ডেকেছেন বলুন।’

    বৈশাখীর বাবা এই উত্তরে খানিকটা থমকে যান। সম্ভবত বুঝতে পারেন, এই ছেলে কঠিন। লড়াই করবার জন্য তৈরি হয়ে এসেছে। একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমার মেয়েকে ডিভোর্স দিতে হবে।’

    চিন্ময় বলল, ‘কেন?’

    বৈশাখীর বাবা বললেন, ‘আমি আমার বড় মেয়েকে হারিয়েছি। ছোট মেয়ের জীবন নষ্ট হতে দেব না।’

    চিন্ময় চেয়ারে হেলান দিয়ে, মৃদু হেসে বলল, ‘আমাকে বিয়ে করায় আপনার মেয়ের জীবন নষ্ট হবে ভাবছেন কেন?’

    বৈশাখীর বাবা বললেন, ‘যদি নষ্ট না হয়, সে যদি রাজরানি হয়, তাতেও কিছু আসে যায় না আমার। মেয়েকে আমি আমার পছন্দমতো বিয়ে দেব। তাতে তার ক্ষতি হলে হবে। আমি তার জন্ম দিয়েছি, আমি তার জীবন তৈরি করব। যাই হোক, কথা বাড়াতে চাই না। যা হওয়ার হয়ে গেছে। তুমি ডিভোর্স দেবে। কালই আমি উকিল ডেকে কাগজপত্র তৈরি করে ফেলব। তুমি এসে সই করে দেবে। এই সময় আসবে।’ একটু থামলেন, তারপর অবহেলায় বললেন, ‘আর হ্যাঁ। আমি তোমায় কিছু টাকা দেব। এইসব করতে তোমার নিশ্চয় খরচাপাতি হয়েছে। কত লাগবে বলো? বিশ হাজার?’

    চিন্ময় চুপ করে রইল। বৈশাখীর বাবা বললেন, ‘কী হল, চুপ করে গেলে কেন? বিশে হবে না? পঁচিশ?’

    চিন্ময় নীচু গলায় বলল, ‘আমি যদি রাজি না হই?’

    বৈশাখীর বাবা কড়া চোখে তাকালেন। দাঁত ঘষে বললেন, ‘রাজি না হলে বিপদ হবে।’

    ‘কার?’

    বৈশাখীর বাবা ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ‘তুমি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছ?’

    চিন্ময় এবার হেসে বলল, ‘আপনি যদি আমার সঙ্গে রসিকতা করতে পারেন, আমি পারব না কেন? বিয়ের পরদিন যদি কাউকে ডেকে ডিভোর্স করতে বলা হয়, সেটা রসিকতা ছাড়া কী?’

    বৈশাখীর বাবা এবার চিৎকার করে উঠলেন।

    ‘শট আপ। সান অফ আ বিচ। পুলিশ ডেকে লকআপে ঢুকিয়ে দেব। মেরে হাড় ভেঙে দেব শুয়োরের বাচ্চা।’

    চিন্ময় উঠে দাঁড়াল। ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘আপনি আমাকে যা বললেন, তার জন্য আপনার আমার কাছে একটা চড় প্রাপ্য। কিন্তু আমি আপনাকে মারলাম না। সম্পর্কে আপনি আমার শ্বশুরমশাই হন। শ্বশুরমশাইয়ের গায়ে হাত তোলা ঠিক নয়। ভেবেছিলাম, ক’দিন পরে, একটা কাজকর্ম জোগাড় করে বৈশাখীকে নিয়ে যাব। কিন্তু এখন সিদ্ধান্ত বদল করলাম। আজই আপনার মেয়েকে এখান থেকে নিয়ে যাব। অবশ্য যদি সে যেতে চায়।’

    বাবার চিৎকার শুনে আড়াল থেকে বৈশাখী এবং তার মা ছুটে এসেছিলেন। বৈশাখীর দিকে তাকিয়ে ছেলে বলল, ‘তুমি কি আজ আমার সঙ্গে যাবে বৈশাখী?’

    বৈশাখী একটু চুপ করে থেকে বলেছিলেন, ‘চলো, আমি ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছি।’

    মেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাবা বলেছিলেন, ‘আর কোনওদিন এ বাড়িতে ঢুকবে না।’

    বৈশাখী মলিন হেসে বলেছিলেন, ‘আমি জানি বাবা। আমাকে আর এ বাড়িতে আসতে হবে না।’

    না, বৈশাখী জানতেন না। তাকে এ বাড়িতে আবার আসতে হল। তখন বড় দুঃসময়।

    অর্চিনের বয়স তখন আট মাস। চিন্ময় জেলে। সোনার দোকানে হাতসাফাই করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। পুলিশ বেদম মারধর করেছে। বৈশাখীর নামও পেয়েছে। সোনার দোকানে অপারেশনের সময় চিন্ময়ের সঙ্গে বৈশাখীও ছিল। দুজনে মিলে গয়না কেনবার ভান করছিল। এটা-সেটা নেড়েচেড়ে দেখছিল। এক ফাঁকে বৈশাখী গলায় পরা নকল চেইন খুলে দোকানের আসল চেইনের সঙ্গে বদলে দেন। হাতের আংটিও বদল করে। তখনকার দিনে এত সি সি টিভির নজরদারি ছিল না। তার পরেও দুদিনের মধ্যে চিন্ময়কে পুলিশ ধরে ফেলে। তারা বৈশাখীর খবরও পায়। পুলিশ তাকে যে-কোনও সময় ধরবে ধরবে অবস্থায় বৈশাখী আট মাসের অর্চিনকে কোলে নিয়ে বাড়িতে পালিয়ে আসেন। বাবা-মা দুজনেই মুখ ফিরিয়ে নেয়। চোর মেয়েকে তারা বাড়িতে কিছুতেই আশ্রয় দেবেন না। ইতিমধ্যে তারা কানাঘুষোয় খবর পেয়েছিলেন, চিন্ময় কাজকর্ম হারিয়ে চুরিচামারি, চিটিংবাজি, স্মাগলিং-এর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তাদের মেয়েও হাত মিলিয়েছে। দুজনেই মনকে বুঝিয়েছিলেন, তাদের কোনও সন্তান নেই। এই মেয়েকে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তার ওপর পুলিশের তাড়া খেয়ে এসেছে। ছিঃ। ছিঃ।

    বৈশাখী বলেছিলেন, ‘আমাকে রাখতে হবে না। আমার ছেলেটাকে তোমরা রেখে দাও। আমাকে পুলিশ ধরলে, ছেলেটা ভেসে যাবে।’

    কঠোর বাবা-মা প্রথমে তাতেও রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত নাতির মুখ দেখে মায়া হয়। মেয়েকে বলেন, নাতিকে তিনি রাখতে পারেন। কিন্তু শর্ত মানতে হবে। ভবিষ্যতে কোনওদিন ফিরে এসে ছেলের দাবি করা যাবে না। সে জানবে, শিশু বয়েসেই তার মা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। শুধু মুখে বললে হবে না। লিখে দিয়ে যেতে হবে। যতদিন ছেলে নাবালক থাকবে, তার ওপর কোনও দাবি করা যাবে না। বৈশাখী আগুপিছু ভাবেননি। ছেলেকে বাঁচাতে বাবার শর্তে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। হাতে সময় নেই। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পারলে, পরে আবার দেখা যাবে। বাবা-মা তো। কতটাই বা কঠিন হতে পারবে। নিজের চোর-চিটিংবাজ বাবা-মায়ের থেকে দাদু-দিদার কাছে থাকলে সে মানুষ হবে।

    সেদিন রাতেই বাড়িতে পুলিশ এল। বৈশাখীর সুটকেসে চুরি করা সোনার চেইন পাওয়া গেল। বৈশাখীকে ধরে নিয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই সাজা হয়। জেল থেকে বেরিয়ে দুজনেই ঠিক করে, ছেলের থেকে তারা দূরে থাকবে। জেলখাটা বাবা-মার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক না থাকাই ঠিক।

    অর্চিন দাদু-দিদার কাছে থেকে বড় হয়। লেখাপড়ায় মন বসে। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে থাকে। ক্লাসে ফার্স্ট হয়। বৈশাখী বাবাকে লুকিয়ে মাকে মাঝে মাঝে ফোন করতেন। মা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদতেন। ‘কেন তুই ফোন করেছিস?’

    ‘অর্চির খবরটুকু শুধু দাও মা।’

    ‘কী করবি খবর নিয়ে? ছেলেকে নিয়ে যাবি?’

    ‘না না, শুধু খবরটুকু জানব। সে ভালো আছে?’

    ‘ওকে বিরক্ত করিস না। ওইটুকু ছেলে সারাদিন বই পড়ে। ক্লাসে এবারও ফার্স্ট হয়েছে।’

    বৈশাখী ফোনের ওপাশে কেঁদে ফেলে।

    ‘বাঃ, তোমরা ওকে মানুষ করেছ।’

    ‘তুই ওকে বিরক্ত করিস না। ওর সামনে আসিস না। জেলখাটা বাবা-মার কথা জানলে ছেলেটার সর্বনাশ হয়ে যাবে। মা হয়ে তুই এই সর্বনাশ করিস না।’

    ‘কখনও করব না। কোনও দিনও করব না। অর্চি কি আমার কথা জিগ্যেস করে?’

    ‘না করে না। আমরা তাকে বুঝিয়েছি। কতজনেরই তো বাবা-মা থাকে না। অন্য লোকে দত্তক নেয়। তাদের কাছে মানুষ হয়। আমরা তো ওর নিজের দাদু-দিদা। তুই ওকে নিয়ে যাস না বৈশাখী। নিজের যে সর্বনাশ করেছিস, ওর করিস না।’

    ‘করব না মা।’

    বৈশাখী মনকে শক্ত করে নিয়েছিলেন। চিন্ময়ও বুঝিয়েছিল।

    ‘ছেলেটাকে মানুষ হতে দাও বৈশাখী।’

    বৈশাখী বলেছিলেন, ‘আমরা কি এইসব অপরাধের কাজ ছেড়ে দিতে পারি না?’

    চিন্ময় বলেছিল, ‘পারব না কেন? পারি বই কী। এই কাজ ছেড়ে দিয়ে ভিক্ষে করে থাকতে পারি। না খেয়ে মরতে পারি।’

    ‘যারা চুরি-চামারি করে না, তারা কি সবাই না খেয়ে মরে? আমরা না হয় কম খেয়ে থাকব।’

    চিন্ময় বলল, ‘কোথায় থাকব? বস্তিতে?’

    বৈশাখী বললেন, ‘দরকার হলে তাই থাকব।’

    ‘পারবে?’

    বৈশাখী হেসে বলেছিলেন, ‘জেলে থাকতে পেরেছি, আর বস্তিতে থাকতে পারব না?’

    চিন্ময় হেসে বলল, ‘তাতে গা থেকে জেলের গন্ধ যাবে?’

    বৈশাখী বললেন, ‘না যাক। আমরা চেষ্টা করি।’

    চিন্ময় মৃদু হাসল। বলল, ‘পুরোনো কথা ভুলে গেলে বৈশাখী? তখনও তো চেষ্টা করেছিলাম। লাভ হয়েছিল কোনও?’ কথাটা ঠিক। কারখানার কাজ চলে যাওয়ার পর চিন্ময় নতুন করে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করেছিল। পাকাপাকি কাজ জোটেনি কোনও। ঠুকরে চলছিল। এখানে একমাস, সেখানে দশদিন। এইভাবে চলতে চলতে কাঞ্চন রক্ষিতের সঙ্গে যোগাযোগ। কাঞ্চন ছিল নামকরা চিটিংবাজ। অপরাধ জগতে তার নাম ছিল চিটকাঞ্চন। বাড়ি-জমি নিয়ে কারবার করত। একই সম্পত্তি তিন জায়গায় বেচত। জাল দলিল থেকে জাল রেজিস্ট্রেশন—সবের ব্যবস্থা ছিল। চিটকাঞ্চন একদিন চিন্ময়কে ডেকে পাঠাল।

    ‘আমার সঙ্গে কাজ করবে?’

    চিন্ময় লোকটার নাম শুনেছিল। সাবধানে বলল, ‘কী কাজ?’

    ‘কী কাজ সে পরে বলব। আগে বলো করবে কিনা।’

    চিন্ময় অবাক হয়ে বলল, ‘কী কাজ না জেনে হ্যাঁ-না বলব কী করে?’

    চিটিকাঞ্চন বলল, ‘এই লাইনে এটাই নিয়ম। আগে হ্যাঁ-না, তারপর কাজের কথা।’

    চিন্ময় চুপ করে থেকে বলল, ‘আপনার কাজ মানে তো ঝামেলা।’

    চিটিকাঞ্চন সহজভাবে বলল, ‘ঝামেলা তো বটেই। চিটিংয়ের কারবার করি, ঝামেলা থাকবে না? ঝামেলা বেশি বলে টাকাও বেশি। দোকানে ম্যানেজারি করে কত টাকা পাও? আমার কাছে তার তিনগুণ পাবে। রাজি কিনা বলো?’

    চিন্ময় বলল, ‘হঠাৎ করে আমাকে ধরলেন কেন? আপনার কি মনে হয় আমি দু’নম্বরি কাজ ভালো পারব?’

    চিটিংকাঞ্চন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘মনে হচ্ছে। তোমার চেহারার মধ্যে একধরনের শিক্ষিত, সৎ-সৎ ভাব আছে। আমি এই ধরনের চেহারা খুঁজছিলাম। তুমি যে দোকানে কাজ করো, সেখানকার লোক আমাকে খবর দিয়েছে।’

    চিন্ময় হেসে ফেলল। নিজের চেহারা নিয়ে এরকম কথা সে কখনও শোনেনি।

    ‘কী করতে হবে?’

    চিটিংকাঞ্চন বলল, ‘তাহলে রাজি তো?’

    ‘পুলিশ ধরবে না তো?’

    চিটিংকাঞ্চন সহজভাবে বলল, ‘ধরতে পারে। চান্স আছে। তবে ধরলেও বেশিদিন ভিতরে রাখতে পারবে না। আমাদের ব্যবস্থা আছে। কেস লাইট করে দেওয়া হয়।’

    চিন্ময় এই অকপট ভঙ্গিতে মজা পেল। বলল, ‘কাজটা বলুন।’

  • পঞ্চম কিস্তি

    পঞ্চম কিস্তি

    প্রচেত গুপ্ত

    [book]

    একচল্লিশ

    তমসা আরেক হাত ভাত তুলে দিল অর্চিনের প্লেটে। অন্য কোনও সময় হলে অর্চিন বারণ করত, আজ করল না। তার খিদে পেয়েছে। থানা থেকে বেরিয়ে ইউনিভার্সিটিতে চলে যাচ্ছিল অর্চিন। শেখর আটকাল।

    ‘আমার বাড়িতে চল। খেয়ে নিবি।’

    অর্চিন বলেছিল, ‘থাক শেখরদা।’

    শেখর বলল, ‘কেন? থাকবে কেন? খিদে পায়নি?’

    অর্চিন শুকনো হেসে বলল, ‘তা পেয়েছে। ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে কিছু খেয়ে নেব। তোমার বাড়িতে গিয়ে আবার ঝামেলা পাকাব না।’

    শেখর সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘ঝামেলার কী আছে? আমি খাব, তুইও খাবি। চল। তমসাকে একটা ফোন করে দিচ্ছি। ও আজ বাড়িতে আছে।’

    মুখে বললেও স্ত্রীকে ফোন করতে ভুলে গেল শেখর। গোটা পথই সে কথা বলতে বলতে এল।

    আগে থেকে না জানালেও তমসা ব্যবস্থা করে ফেলেছে। শেখরও বসেছে। খাওয়া খুবই সাধারণ। ভাত, ডাল, একটা তরকারি। তমসা দুজনকে ডিম ভেজে দিল। অর্চিন বাধা দিয়েছিল।

    ‘কিছু লাগবে না তমসাদি।’

    হিসেবমতো শেখরের স্ত্রীকে অর্চিনের ‘বউদি’ সম্বোধন করা উচিত। ডাকে না। বিয়ের আগে থেকেই পরিচয়। তখন ‘তমসাদি’ ডাকত, এখনও তাই ডাকে। অনেকেই তাই করে। পার্টির সঙ্গে যাদের  যোগাযোগ, তারা আগে যেমনভাবে তমসাকে চিনত, এখনও সেরকমভাবে চেনে। ফলে নতুন করে সম্বোধন বদলের প্রশ্ন ওঠে না।

    তমসা সঙ্কুচিত হয়ে বলল, ‘আজ মাছ-টাছ কিছু নেই। থানায় যাবে বলে তোমার দাদা বাজারে গেল না। ইস, তুমি যে কী করে খাবে অর্চিন?’

    অর্চিন বলল, ‘কী বলছ তমসাদি, আমি তো বেশিরভাগ দিন দুপুরে ভাতই খাই না। ইউনিভার্সিটিতে এটা-সেটা খেয়ে কাটিয়ে দিই। বাড়িতে মাসি রাগ করে। কী করব? লেট করে ফেলি। খেতে বসবার সময় কই? আজ যে ভাত পেলাম, এটাই অনেক। আর কিছু লাগবে না।’

    তমসা কথা শোনেনি। সে ডিম ভেজে এনেছে। মনে মনে রাগও হয়েছে। শেখর কি কোনও দিন অভ্যেস বদলাবে না? চিরকাল আগে কিছু না বলে লোক এনে বলে, ‘তমসা ভাত হবে নাকি? আজ আমার সঙ্গে সোমনাথ খাবে। আমারটাই দাও, ভাগ করে নিই।’

    তমসা পরে রাগ করে, ‘কেউ খেতে এলে আগে একটু জানাবে তো। তার সামনে ভাগ করে দাও কথাটা শুনতেও খারাপ লাগে।’

    শেখর অবাক হয়ে বলে, ‘ভাগ করে খাব বলবার মধ্যে খারাপ লাগবার কী আছে?’

    তমসা থমথমে গলায় বলে, ‘এটা পার্টির কমিউন নয় শেখর। সংসার। এখানে তোমার স্ত্রী, ছেলেও থাকে। সংসারের একটা নিয়ম আছে। বাইরের কাউকে খেতে বললে, তাকে আলাদা যত্ন করতে হয়। পার্টি কমিউনে কেউ বাইরের নয়। আলাদা যত্ন লাগে না।’

    শেখর কাঁচুমাচুভাবে বলে, ‘বুঝেছি। কিন্তু কী করব? আমি নিজেও তো জানতাম না সোমনাথ ভাত খায়নি। এইমাত্র জানলাম। বললাম তো, আমারটাই দুজনকে ভাগ করে দাও।’

    তমসা আরও রেগে যায়। বলে, ‘আবার এক কথা। একজনের ভাত ভাগ করা যায় নাকি? আর শুধু ভাত? ভাতের সঙ্গে ডাল-তরকারি, মাছ দিতে হবে না? সেটাও কি ভাগ করে হবে?’

    শেখর মাথা চুলকে বলে, ‘সরি, তোমাকে সমস্যায় ফেললাম।’

    তমসা গম্ভীর গলায় বলে, ‘সরি বলছ কেন? দুদিন অন্তরই তো ফেলো। আমি তো কাউকে আনতে বারণ করিনি। একটু আগে জানাতে সমস্যা কোথায়? মোবাইল থেকে একটা টেক্সট করে দিতে তো পারো। ভাতটা অন্তত বসিয়ে দিতে পারি।’

    শেখর জিভ কেটে বলে, ‘ইস, একদম মাথায় ছিল না। এরপর কাউকে খেতে ডাকলে তোমাকে আগে জানিয়ে দেব।’

    পরের বারও একই কাজ করে শেখর। সে আবার কোনও রবিবার কাউকে না কাউকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে ঢোকে বেলা তিনটের সময়। ঢুকেই বলে, ‘তমসা আমাকে আর সামন্তককে ভাত দাও। তাড়াতাড়ি দাও। খিদেতে পেট জ্বলছে দুজনের।’

    তমসা রাগ করতে গিয়ে হেসে ফেলে। এই মানুষটার ওপর রাগ করে কী লাভ। তমসা অবশ্য এক্সট্রা লোক খাওয়ার বিষয়টা ছোটবেলা থেকেই দেখেছে। একাত্তর-বাহাত্তর সাল তখন। সরকারি স্কুলের শিক্ষক বাবা পরিবার নিয়ে বারাসাতে। সরকারি বাধানিষেধ অমান্য করে পুরোদমে রাজনীতি করছে। তবে বেশিটাই করতে হচ্ছে গোপনে। সর্বত্র খুনোখুনি, পাড়াছাড়া, পুলিশের ধড়পাকড় চলছে। সেই সময় পার্টির অনেকেই লুকিয়ে খেতে আসত। কেউ আগে বলে আসত, কেউ আসত বিনা নোটিসে। চুপচাপ খেয়ে চলে যেত। প্রথম দিকে মা সমস্যায় পড়ত। পরে রোজই দু-তিনজনের জন্য বেশি করে ভাত বসানো হত। অনেকটা ডাল আর বড় করে একটা তরকারি। পালিয়ে বেড়ানো, না-খাওয়াদের জন্য ভাত-ডালই তখন বিরাট ব্যাপার।

    আজ তমসার স্কুলে হাফছুটি হয়ে গেছে। স্কুল যে এলাকায়, সেখানকার কে একজন মারা গেছে। ছোটখাটো কোনও নেতা। গতকাল সেকেন্ড পিরিয়ডের পর ক’টা ছেলে এসে একরকম জোর করে বড়দির ঘরে ঢুকল। স্কুল ছুটি দিতে হবে। এলাকায় ‘জনদরদি নেতা’ মারা গেছে, পাড়ায় লেখাপড়া চলে কী করে? বড়দি তাদের বোঝাল, মেয়েদের স্কুলে এরকম হুটপাট ছুটি দেওয়া যায় না। অনেক মেয়ের বাড়ি থেকেই গার্জেনরা নিতে আসে। তারা একা বাড়ি ফেরে না। ফলে ছুটির পরও মেয়েদের স্কুলে আটকে রাখতে হয়। টিচারদেরও থাকতে হয়। প্রথম দিকে ছেলেগুলো বুঝতে চাইছিল না। শেষ পর্যন্ত বুঝেছে। কাল ছেড়ে দিয়েছে, তবে তার বদলে আজ হাফ ছুটি দিতে হল। এই বিষয়টা নিয়ে কাল টিচাররুমে মালিনী আর অন্তরাদির মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছে। মালিনীদি রাগ করছিল।

    ‘কোথা কার কে দু-পয়সার নেতা মারা গেছে বলে স্কুল ছুটি দিতে হবে। এ কেমন কথা? এ তো গুণ্ডামি। বড়দিই বা মেনে নিলেন কেন?’

    অন্তরাদি বলল, ‘এমন করে বলছ যেন আজই এমন প্রথম ঘটল। আগেও হয়েছে। আমি অন্তত দশটা ইনস্টান্স দেখাতে পারি। পলিটিক্যাল প্রেসার দিয়ে ছুটি।’

    মালিনী বলল, ‘তারা কেউ এরকম ফুটো নেতা ছিল না।’

    অন্তরাদি বলল, ‘ফুটো নেতা না আস্ত নেতা, তা বলতে পারব না, তবে সেটাও এক ধরনের গুণ্ডামি ছিল।’

    মালিনী তেড়েফুঁড়ে বলল, ‘গুণ্ডামি! তখন গুণ্ডামি ছিল! কী বাজে বকছ? একটা উদাহরণ দেখাও অন্তরাদি, কবে গুণ্ডামি করে স্কুল-কলেজ বন্ধ করা হয়েছে। এইভাবে মস্তানরা এসে হেডমিস্ট্রেসের ঘরে ঢুকতে পারত?’

    অন্তরাদি বলল, ‘মালিনী, বিষয়টা ছোটবড় নয়, পলিটিক্যাল পার্টির নেতা মারা গেলে স্কুল-কলেজ, দোকান-বাজার বন্ধ করে দেওয়াটা আমাদের এখানকার একটা কালচার হয়ে গেছে। পাড়ার নেতা আর এমপি, এমএলএ-তে তোমার কাছে পার্থক্য থাকতে পারে লেখাপড়ার কাছে কী পার্থক্য? তা ছাড়া একটা সময় জোর করে বড়দির ঘরে ঢুকতে হত না। ফোন চলে আসত। তাতেই কাজ হত। সেটাও এক ধরনের গুণ্ডামি ছিল।’

    তমসা ইচ্ছে করেই চুপ করে ছিল। এই ঝগড়ায় ঢুকলেই সবাই ভাবত, রাজনীতি করছে। স্কুলের সকলেই তার পলিটিক্যাল আইডেন্টিটির কথা জানে। আবার এটাও জানে, এই পরিচিতি নিয়ে সে কখনও কোনও সুবিধে নেয়নি। এখন তো প্রশ্নই ওঠে না, পার্টি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনও স্কুলের প্রশাসনিক বিষয়ে কখনও নাক গলায়নি। তখন বড়দি মাঝে মাঝে ডাকতেন। রুটিন, পরীক্ষা, রেজাল্ট এসব নিয়ে মিটিং করতে চাইতেন। তমসা কোনওদিন একা যায়নি। আর পাঁচজন সিনিয়র টিচারকে নিয়ে ঘরে ঢুকত। বড়দি অসন্তুষ্ট হতেন। সে জানত, বড়দির এই একা ডাকার পিছনে ‘ক্ষমতা’-কে খুশি করবার চেষ্টা থাকত।

    ‘তোমার সঙ্গে আলাদা কথা বলতে চাই তমসা। সবাইকে জুটিয়ে আসবে না।’

    তমসা বলত, ‘এটা হয় না। সিনিয়র কলিগদের বাদ দিয়ে আমি এইসব বিষয়ে একটা কথাও বলতে পারি না। বলবও না।’

    বড়দি একটু থতমত খেয়ে বললেন, ‘রুটিন তৈরির সময় তো তোমার সঙ্গে আলাদা বসাই উচিত। তোমার অবস্থা তো আর পাঁচজনের মতো নয়। স্কুলের বাইরেও তোমাকে আর পাঁচটা কাজ করতে হবে। তোমার পলিটিক্যাল রেসপন্সিবিলিটি আছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তোমাকে স্কুলে আটকে থাকলে চলবে কেন?’

    তমসা হেসে বলত, ‘স্কুলে ঠিকমতো কাজ করাটাও আমার কাছে এক ধরনের পলিটিক্যাল রেসপন্সিবিলিটির মধ্যে পড়ে বড়দি। মেয়েদের পড়ানোটা মিটিং, মিছিলের মতো আমি কম গুরুত্ব দিয়ে দেখি না। আপনি চিন্তা করবেন না, আমি সবার মতোই রুটিন মেনে চলব।’

    তারপর থেকে আর বড়দি এই বিষয়ে তমসাকে ঘাঁটাতেন না। বিষয়টা স্কুলের অন্য টিচাররা জানতেন। তমসার প্রতি তাদের মনোভাব অন্যরকম ছিল। কেউ কেউ বলত, ‘তমসা তোমাদের দলে যদি তোমার মতো মানুষ আরও বেশি থাকত, তা হলে ভালো হত।’ তমসা উত্তর দিত না। হাসত। মনে মনে দুঃখ পেত। পার্টি সম্পর্কে মানুষের মনে খারাপ ধারণা!

    আজ তমসার ছুটি না থাকলে মুশকিল হত। অর্চিনের খাবার নিয়ে মুশকিল।

    শেখর গুপ্ত চাপা গলায় বলল, ‘ক’টা দিন আণ্ডারগ্রাউন্ডে থেকে কাজ করো অর্চিন।’

    অর্চিন চুপ করে রইল। এই কথা থানা থেকে বেরিয়েও বলেছে শেখরদা। এখন আরও ঠাণ্ডা মাথায় বলছে।

    ‘নিজের পড়াশোনাটা শেষ করো। তার মধ্যে টুকটাক যেটুকু কাজ করবার করবি। সিচুয়েশন যখন বদলাবে, তখন দেখা যাবে।’

    অর্চিন মুখ তুলে বলল, ‘পুলিশের হুমকিতে রাজনীতি ছেড়ে দিতে বলছ শেখরদা?’

    শেখর বলল, ‘তা বলিনি, বলেছি কৌশল করে চলতে। পলিটিক্সে কৌশলও মানতে হয়। এখন তোমার চুপচাপ থাকবার সময়। পুলিশ তোমার ওপর নজর রাখছে অর্চিন। এটা বোঝবার চেষ্টা করো। কোনও একটা কেস দিয়ে পুলিশ তোমায় ধরে রাখলে সেটা সুবিধের হবে?’

    তমসা টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে। বলল, ‘ঠিকই, অর্চিন এখন ক’টা দিন পলিটিক্সের মধ্যে তোমার না থাকাই ভালো।’

    অর্চিন বলল, ‘তোমরা তো আছো তমসাদি। তোমরা কি ভয় পেয়ে সব ছেড়েছুড়ে দিয়েছ?’

    শেখর বলল, ‘আমাদের অবস্থানের সঙ্গে তোর অবস্থানের তুলনা চলে না। আমরা কীভাবে পার্টি করি, সবাই জানে। আমাদের দৌড় কতদূর তাও জানে। তোরা ফ্রেশ, আনপ্রেডিক্টেবল। ভয়ঙ্কর গোলমালে কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারিস। নিজেদের নিয়ে চিন্তাভাবনা তোদের কম। পলিটিক্যাল মুভমেন্টে যুক্তির থেকে আবেগকে তোরা বেশি পছন্দ করিস। স্বাভাবিকভাবেই তোদের নিয়ে মাথাব্যথা। সব যুগেই আগে ইয়ংদের ওপর নজর পড়েছে অর্চিন। এটা নতুন কিছু নয়। ছাত্রছাত্রী, যুবকদের নিয়ে রাষ্ট্র সবসময়ই উৎকণ্ঠিত থাকে।’

    তমসা বলল, ‘ক’টা দিন চুপচাপ থাকাই ভালো।’

    পুলিশ সেরকমই বলেছে। বলেছে, এখনকার মতো কিছু করা হচ্ছে না, কিন্তু নজর রাখা হবে। দ্বিতীয়বার সন্দেহ হলে অ্যারেস্ট করা হবে। ক’দিন আগে পুলিশ যখন সেনবাড়িতে গিয়ে অর্চিনের খোঁজখবর নিয়েছিল, সেদিনই অর্চিন সোজা চলে আসে শেখর গুপ্তর কাছে।

    শেখর বলে, ‘দাঁড়া, থানায় আমার একজন চেনা অফিসার আছে। একসময় আমি ওর ঝামেলার বদলি সামলেছিলাম। ভদ্রলোক আমাকে মনে রেখেছেন। তাকে একবার ফোন করি। তোকে কেন খুঁজছে, আগে সেটা বুঝে নিই।’

    শেখর গুপ্তকে সেই পরিচিত অফিসার বললেন, সুপর্ণ ভট্টাচার্যর কাছ থেকে খবর নিয়ে জানাবেন। উনিই অর্চিনের বাড়িতে গিয়েছিলেন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে অফিসার শেখরকে ফোন করেন। অর্চিনের বিরুদ্ধে আর্মস পাচারের অভিযোগ এসেছে। মাসখানেক আগে কৃষ্ণনগরে একটা রেইডে কয়েকটা রিভলভার, কিছু গুলি উদ্ধার করেছে পুলিশ। দুজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তারা অর্চিনের পার্টির অ্যাক্টিভিস্ট। মারদাঙ্গায় থাকে। পার্টি সরকারি ক্ষমতা থেকে সরে গেলেও তারা পার্টি থেকে সরেনি। এদেরই একজন জেরায় জানিয়েছে, কলকাতা থেকে আর্মস পাঠানো হয়। এই সূত্রে বেশ কয়েকজনের নাম তারা বলেছে। তার মধ্যে একজন অর্চিন। সুপর্ণ ভট্টাচার্য কেসটার একটা পার্ট তদন্ত করছে।

    শেখর সুপর্ণ ভট্টাচার্যকে বললেন, ‘অর্চিনকে নিয়ে আমি থানায় যাচ্ছি।’

    অফিসার বলে, ‘আজ আসতে হবে না। আমি সুপর্ণর সঙ্গে কথা বলেছি। আপনি কাল সকালে ছেলেটাকে পাঠিয়ে দেবেন শেখরবাবু। আমি কথা বলে রাখব।’

    শেখর উদ্বিগ্ন গলায় বলে, ‘না, আমিও যাব।’

    কমলকান্তি সেনের মৃত্যুর কারণে পরের দুদিন থানায় যাওয়া হয়নি। আজ গিয়েছিল।

    সুপর্ণ ভট্টাচার্যই সেনবাড়িতে অর্চিনের খোঁজে গিয়েছিলেন। ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। সম্ভবত কলিগের পরিচিত হওয়ার কারণে বেশি ঠাণ্ডা ভাব দেখালেন। তবে ঠাণ্ডা ভাবেই কড়া কথা বলতে ছাড়লেন না।

    শেখর গুপ্ত বললেন, ‘আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে। অর্চিন রাজনীতি করে ঠিকই, তবে সে একজন ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষায় সে ফার্স্ট হয়। সে আর্মস পাচারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে না।’

    সুপর্ণ ভট্টাচার্য বলেন, ‘সেটাই তো আমাদের কাছে আশ্চর্যের ব্যাপার। এত ভালো ছেলে এরকম একটা কাজে কীভাবে ইনভলভড হল?’

    কেসটা সিআইডি-র। আমাদের ক্রশচেক করবার জন্য পাঠিয়েছে। সেই খোঁজে আমি সরাসরি ওর বাড়িতে চলে যাই।’

    অর্চিন বলল, ‘আমি এ সবের কিছুই জানি না।’

    সুপর্ণ ভট্টাচার্য বললেন, ‘তুমি জানো না, কিন্তু যাদের কাছ থেকে অস্ত্রগুলো পাওয়া গেছে, তারা তোমাকে চেনে।’

    অর্চিন বলল, ‘রাজনীতি করতে গেলে তো অনেককেই চিনতে হয়। আমি কখনও কৃষ্ণনগরে যাইনি।’

    সুপর্ণ ভট্টাচার্য বললেন, ‘ওরা কলকাতা থেকে গেছে। যাওয়ার সময় আর্মস নিয়ে গেছে।’

    এইভাবে আরও খানিকক্ষণ জেরা চলে। শেখর গুপ্ত দু-একবার কথার মাঝখানে ঢোকবার চেষ্টা করলে অফিসার তাকে চুপ করিয়ে দেন। একটা সময় অর্চিনকে বলেন, ‘রাজনীতি-টাজনীতি বাদ দিয়ে লেখাপড়ায় মন দাও। তোমার সামনে ব্রাইট কেরিয়ার। আর্মস কেসে যদি একবার আটকে দিই, গোটা জীবনটাই তো বরবাদ হয়ে যাবে। অত বড় ঘরের ছেলে তুমি। নিজের ভালো-মন্দটা বোঝার চেষ্টা করো। এবারের মতো তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি, কিন্তু তোমার ওপর আমাদের নজর রইল। দ্বিতীয়বার সুযোগ পাবে না। অভিযোগ মিথ্যে প্রমাণ করতে করতে তোমার অনেকটা ক্ষতি হয়ে যাবে।’ তারপর শেখর গুপ্তর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি বোঝান। আমি খবর নিয়ে দেখেছি, আপনার এই শিষ্যটি কিন্তু ক্রমশ উগ্র রাজনীতির দিকে যাচ্ছে। আটকান। হাতে খুব প্রমাণ না থাকলেও আর্মস কেসে আটকে রাখা যায়। শুধু সন্দেহের বশেই আটকে রাখা যায়। আপনার মুখ চেয়ে আর ছেলেটির কেরিয়ারের জন্য করলাম না। আপনারা ভেটেরান পার্টিকর্মী। পার্টি পলিটিক্স নিয়েই থাকবেন। আপনাদের পলিটিক্স ছাড়বার কথা বলে লাভ নেই। এদের বারণ করুন।’

    শেখরদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে অর্চিন বুঝতে পারল, তার মুখ তেতো। সে একটা সিগারেট ধরাল। ভালো লাগছে না। কিচ্ছু ভালো লাগছে না। হতাশ লাগছে। অস্থির লাগছে। ঋষার সঙ্গে দেখা করবে? তাতে কি মন খানিকটা শান্ত হবে? বড় রাস্তা পর্যন্ত এসে অর্চিন ঠিক করল সে সল্টলেক যাবে। ঋষা ওখানে পেয়িং গেস্ট থাকে।

  • ষষ্ঠ কিস্তি

    ষষ্ঠ কিস্তি

    প্রচেত গুপ্ত

    [book]

    একান্ন

    কর্ণিকা বাড়িতে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল।

    ড্রইংরুমে দুজন মহিলা বসে। এদের মধ্যে একজনকে কর্ণিকা চেনে। মায়ের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। করবী মাসি। টালিগঞ্জের দিকে কোথায় যেন থাকে। অন্যজনকে চিনতে পারছে না। করবী মাসি সোফায় বসে আছেন, অচেনা মহিলার জন্য ভিতর থেকে কাঠের চেয়ারটা এনে দেওয়া হয়েছে। হাঁটু, কোমরে ব্যথা থাকলে অনেক সময় সোফায় বসতে কষ্ট হয়। তখন ভেতর থেকে কাঠের চেয়ারটা এনে দেওয়া হয়। মা-ও সোফায় বসে আছে। মুখে হাত কচলানো ভাব। কোনও বিষয়ে খুব গদগদ হলে মানুষের মুখে হাত কচলানো ভাব আসে। এটা একটা ভয়ের ব্যাপার। কর্ণিকা সতর্ক হল।

    ‘ওই তো কনি, ওই তো এসেছে। আয় কনি, আয়।’

    কর্ণিকা অবাক হল। মা এমন ভাব করছে যেন কনির বাড়িতে আসবার কথা ছিল না। অথচ সে রোজ কমবেশি এই সময়েই অফিস থেকে বাড়ি ফেরে। এক সময় ফেরবার পথে দোকান-বাজার করে ফিরত। মায়ের জন্য আনাজপাতি, বাবার জন্য মুড়ি, চানাচুর, ভাইয়ের জন্য চিপস, মোবাইল রিচার্জ কার্ড, নিজের জন্য তেল, শ্যাম্পু। যখন যেমন লাগে। আজকাল সমস্যা হয়। প্রাোমোশনের পর অফিসের গাড়ি দিয়ে যায়। গাড়ি থামিয়ে কীভাবে কেনাকেটা করবে? তারপরেও মাঝে মাঝে নামে। বাজারের কাছে গাড়ি ছেড়ে দেয়। কেনাটাকা করে রিকশা নেয় অথবা হেঁটে ফেরে। আজও তাই করেছে। হাতে একগাদা প্যাকেট। মা উদগ্রীব হয়ে উঠল।

    ‘কীরে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছিস নাকি? উফ তোকে কতবার বলেছি, গাড়ি ছাড়বি না। সারাদিন খেটেখুটে আসিস, তারপর আর দোকান বাজারে নামবার দরকার নেই।’

    কর্ণিকা বুঝতে পারল, দোকান বাজারে আপত্তি নয়, মা আসলে অতিথিদের শোনাচ্ছে মেয়ে গাড়ি করে ফেরে। সে হতভম্ব ভাব কাটাতে মা এক মুখ হেসে বলল, ‘কনি, করবীকে তো তুই জানিসই, আর ইনি হলেন মিসেস বোস। রানী বোস। লেডি ম্যাকলিন কলেজের প্রিন্সিপাল।’

    ববকাট এবং মূলত সাদা চুলের অচেনা মহিলা অভিজাত হেসে বললেন, ‘প্রিন্সিপাল নয়, এক্স প্রিন্সিপাল।’

    মল্লিকাদেবী হাত কচলে হেসে বললেন, ‘ওই একই হল মিসেস বোস। টিচার চিরকাল টিচারই থাকে। কখনও এক্স হয় না। এই তো এখনও ছোটবেলার কোনও দিদিমণিকে দেখলে আগে প্রণাম করি।’

    মিসেস বোস অহঙ্কারের হাসি হাসলেন।

    কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ, দু-হাতে প্যাকেট নিয়ে কর্ণিকা বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে। শুধু প্যাকেট নয়, হাতে একটা বেগুনও আছে। বাবা ক’দিন ধরে বেগুনপোড়া খাওয়ার বায়না করছে। মেয়েকেও বলেছে।

    ‘বুঝলি কনি, বেগুনপোড়া একটা ওয়াণ্ডারফুল প্লেট। ঠিক মতো তৈরি করতে পারলে জবাব নেই। এক থালা ভাত খেয়ে ফেলা যায়।’

    কর্ণিকা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তুমি আবার বেগুনপোড়া নিয়ে পড়লে কেন বাবা?’

    সুখময়বাবু এক গাল হেসে বললেন, ‘সেদিন টিভিতে দেখাচ্ছিল।’

    কর্ণিকা ভুরু কুঁচকে বলল, ‘টিভিতে বেগুনপোড়াও দেখায় নাকি!’

    সুখময়বাবু মেয়ের বিরক্তিতে পাত্তা না দিয়ে বললেন, ‘আরে, ওই যে রান্নাবান্নার অনুষ্ঠান হয় না? ওখানে দেখাচ্ছিল। কী যেন নাম প্রাোগ্রামটা…আহা। কী যেন নাম…খাচ্ছি খাব? না না, খাব খাচ্ছি…না না তাও নয়…। যাক গে, যে নামই হোক রান্নাবান্না ভালো দেখায়।’

    কর্ণিকা রেগে গিয়ে বলল, ‘উফ বাবা, তুমি টিভি দেখা বন্ধ করো। একটা সুস্থ সবল লোক বাড়িতে বসে টিভিতে রান্নার শো দেখছো! এই কারণে বলি কাজ না করে তোমার মাথাটাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’

    মেয়ের ধমকেও পাত্তা দিলেন না সুখময়বাবু।

    ‘বুঝলি কনি, একেক দিন একেক রকম রান্না। কোনও দিন ঝাল, কোনও দিন ঝোল, কোনও দিন কষা, কোনও দিন অম্বল। সেদিন ছিল তোর পোড়া। বেগুন পুড়িয়ে পেঁয়াজ কুঁচি, লঙ্কা, অল্প লেবু, তার ওপর কাসুন্দি, আহা। এই দেখো জিভে জল এসে গেছে। কতদিন যে বেগুনপোড়া খাইনি। আহা! যাক টিভিতে দেখেই সুখ। এদের উচিত এই ধরনের প্রাোগ্রাম আরও বাড়িয়ে দেওয়া!’

    কর্ণিকা আরও রাগ দেখাতে গিয়ে থেমে গিয়েছিল। এই মানুষকে রাগ দেখিয়ে কী লাভ? জীবনটাকে সহজ সরল করতে করতে একেবারে বেগুনপোড়ায় নিয়ে গিয়ে ঠেকিয়েছে। কাজকর্ম ছাড়া ঘরে বসে থাকলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। মায়াও হয়।

    আজ বাজারে বেগুন দেখে কর্ণিকার বাবার কথা পড়ে গেল। একটা বড় দেখে কিনেও ফেলেছে। নিজেই গ্যাসে পুড়িয়ে দেবে। যতই হোক, বাবা তো।

    সেই বেগুনই এখন হাতে।

    মল্লিকাদেবী ব্যস্তসমস্ত হয়ে বলল, ‘প্রণাম কর কনি’।

    করবী মাসি বলল, ‘আহা, মেয়েটাকে হাতের জিনিসপত্র তো রাখতে দেবে মল্লিকাদি।’

    মল্লিকাদেবী বললেন, ‘ঠিক আছে, রেখে আয় চট করে। মিসেস বোস আবার বেরিয়ে যাবেন। ওঁর আবার কোথায় মিটিং আছে।’

    মায়ের এত অর্ডারে কর্ণিকার রাগ হল। মিসেস বোসের মিটিং আছে তো কী! উনি কে? যার জন্য ছুটে গিয়ে তাঁকে প্রণাম করতে হবে?

    মিসেস বোস দাঁত চেপে বললেন, ‘মিটিং নয়, সেমিনার। বাংলা আকাদেমিতে যাব। ভাষা নিয়ে একটা আলোচনা আছে। ভাষার বিবর্তন। আমি এসবে মোটে যেতে চাই না। ওরা এমন জোর করে। যাক, মা তুমি হাতের জিনিসগুলো রেখে এসো। দুটো কথা বলে চলে যাই।’

    ভিতরে যেতে মানার সঙ্গে দেখা। দিদিকে দেখে ফিচ করে হাসল।

    ‘মানা, এরা কারা? কেন এসেছে? মা অমন গদগদ ভাব করছে কেন?’

    মানা চোখ নাচিয়ে বলল, ‘তোর শাশুড়ি। আমি মিষ্টি আনতে যাচ্ছি। সঙ্গে ইয়া বড় বড় শিঙাড়া।’ মানা হাত ঘুরিয়ে শিঙাড়ার সাইজ দেখাল।

    কর্ণিকা অবাক হয়ে বলল, ‘শাশুড়ি! কী বলছিস?’

    মানা বলল, ‘ঠিকই বলছি। তোকে দেখতে এসেছে। তোর উড বি শাশুড়ি। গিয়ে দেখ।’

    মানা ডান হাতের বুড়ো আঙুল মুখে দিয়ে সানাই বাজানোর ঢঙে বলল, ‘প্যাঁ প্যাঁ…প্যাঁ প্যাঁ।’

    কর্ণিকার মনে হল, ভাইকে একটা চড় লাগায়। কিন্তু সে এতটাই হতভম্ভ হয়ে পড়ল যে চড় লাগানোর কথা ভুলেই গেল। পাকা ছেলেটা কী বলছে এ সব!

    ঠিক বলছে। কর্ণিকা কোনওরকমে চোখে মুখে জল দিয়ে আবার ড্রইংরুমে যেতেই ব্যাপারটা আঁচ করল।

    মিসেস বোস সরাসরি তাঁর সঙ্গে কথা বললেন।

    ‘প্রথমে করবী, তারপর তোমার মায়ের কাছ থেকে তোমার কথা শুনলাম। তুমি তো লেখাপড়ায় ভালো ছাত্রী। আরও পড়লে না কেন?’

    কর্ণিকা কী বলবে বুঝতে পারল না। চেনা নেই, জানা নেই, এই মহিলার প্রশ্নের উত্তর সে দেবে কেন? আবার উপায়ও নেই। বাড়ি বয়ে এসেছে। অপমানও করা যায় না। ইচ্ছে থাক বা না থাক, কিছু একটা তো বলতেই হবে।

    ‘চাকরি করাটা দরকার ছিল।’

    মিসেস বোস একটু চুপ করে বসে বললেন, ‘আরও পড়তে ইচ্ছে করে না?’

    কর্ণিকা বলল, ‘উপায় নেই।’

    মিসেস বোস বললেন, ‘উপায় থাকলে পড়বে?’

    কর্ণিকা ইতস্তত করে বলল, ‘এখনই ভাবছি না।’

    মল্লিকাদেবী গলে যাওয়া গলায় বললেন, ‘ও তো অফিসে বড় প্রাোমোশন পেয়েছে। অনেক দায়িত্ব। বড় অফিসার হয়েছে।’

    কর্ণিকার এত রাগ হল যে ইচ্ছে করল মায়ের মুখ চেপে ধরে।

    করবী মাসি এক গাল হেসে বলল, ‘মিসেস বোস সব জানেন। উনি তোমার মেয়ে সম্পর্কে সব খবর নিয়েই আজ এসেছেন।’

    মিসেস বোস ঠোঁটের কোনায় হেসে বললেন, ‘কর্ণিকা, শুনেছি, তুমি অফিসে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করো। কথাটা ঠিক?’

    ‘ঠিক না ভুল সে তো আমার অফিস বলতে পারবে।’

    মিসেস বোস চোখ সরু করে বললেন, ‘সে তো জানি। তোমার নিজের ধারণা কী? সেলফ অ্যাসেসমেন্টটাই আসল।’

    কর্ণিকা মুখ তুলে বলল, ‘আমার ধারণা আমি আমার ডিউটি সিরিয়াসলি করি।’

    মিসেস বোস হেসে বললেন, ‘ভেরি গুড। কর্ণিকা তোমার হাতে দেখলাম তুমি কি বেগুন দিয়ে কোনও রান্না করবে?’

    কর্ণিকার মনে হল, এবার একটা ধাক্কা দেওয়া দরকার। বলল, ‘হ্যাঁ, করব। বেগুনপোড়া বানাব। আমার বাবা খেতে চেয়েছেন।’

    মল্লিকাদেবী তাড়তাড়ি বললেন, ‘আমার মেয়ের রান্নার হাত কিন্তু অতি ভালো। আজ না বলে চলে এলেন তাই, নইলে হাতের রান্না খাওয়াতাম। আর একদিন আসুন না।’

    মিসেস বোস খানিকটা মুখ ঘুরিয়ে বললেন, ‘ভালো রান্না খাবার জন্য রেস্টুরেন্টে যাব। এখানে আসব কেন?’

    কর্ণিকা হেসে বলল, ‘মা কিন্তু বাড়িয়ে বলছে। আমি রান্নার কিছুই পারি না।’

    মিসেস বোস সুন্দর করে হেসে বললেন, ‘মায়েরা অমন বাড়িয়ে বলেই, আমাকে যখন ছেলের বাড়ি থেকে দেখতে এসেছিল, আমার মা বলেছিল, আমি নাকি খুব ভালো গান করি। এদিকে আমার তো গলায় সুর বলে কিছু নেই। আমি তখন কী বলব বুঝতে পারলাম না। তোমাদের মতো তো আমরা স্মার্ট ছিলাম না। ছেলের মামি বললেন, একটা গান শোনাও তো মেয়ে। আমি তো দর দর করে ঘামতে শুরু করলাম। তারপর…।’ কথা থামিয়ে মহিলা হাসতে লাগলেন। কর্ণিকার এবার বেশ লাগল। মানুষটার মধ্যে একটা সোজাসাপটা ভঙ্গি আছে তো। কিন্তু হঠাৎ এসব কী হচ্ছে! এই ভদ্রমহিলা কোথা থেকে এলেন!

    মিসেস বোস হাত ঘুরিয়ে ঘড়ি দেখলেন। মহিলার পোশাক-পরিচ্ছদ, হাবভাবের মধ্যে এক ধরনের শিক্ষিত, রুচিশীল ব্যাপার আছে। কর্ণিকার মনে হচ্ছে, প্রথম দর্শনে মহিলার প্রতি যে অনীহা, বিরক্তি, রাগ তৈরি হয়েছিল, এখন যেন খানিকটা কমছে।

    মিসেস বোস মল্লিকাদেবীর দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, ‘ম্যাডাম, এবার যে আমাকে উঠতে হবে।’

    মল্লিকাদেবী হা হা করে উঠলেন। নিজেও উঠে দাঁড়ালেন।

    ‘কিছুতেই না দিদি। চা না খাইয়ে আপনাকে ছাড়বই না। এখনই মানা আসবে। একটু মিষ্টি আনতে গেছে।’

    মিসেস বোস হাত বাড়িয়ে মল্লিকার হাত ধরলেন। নরম গলায় বললেন, ‘আজ থাক। আপনাকে না জানিয়ে এসেছি। আমি ইচ্ছে করেই বলিনি। করবীকে বললাম, আজই যাব। উইদাউট এনি প্রিপারেশন আমি মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে চাই। করবী তো আকাশ থেকে পড়ল। সে গাইগুঁই করছিল। আমি শুনিনি। ঘটা করে মেয়ে দেখতে আসা আমি পছন্দ করি না। খুব খারাপ সিস্টেম। গত মাসে কোনও একটা অফিসিয়াল পার্টিতে আপনার মেয়ের সঙ্গে সুস্নাতর আলাপ হয়। আলাপ না বলে ঝগড়াই বলা যেতে পারে। ঝগড়ার বিষয় ছিল কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট। সেই ঝগড়ার কথা সুস্নাত আমাকে গল্প করে। শুধু তাই নয়, সে আমাকে বার বার বলে মেয়েটির সঙ্গে তার মতে মেলেনি, কিন্তু মেয়েটিকে তার বিশেষ পছন্দ হয়েছে। বাঙালি মেয়ের মধ্যে এই ধরনের কর্পোরেট লজিক নাকি খুব একটা দেখা যায় না। ছেলে আমাকে মেয়েটির নাম বলে। কর্ণিকা। অফিসের নামটাও বলতে পারে। সে নিশ্চয় আপনার মেয়ের কাছে থেকে শুনে মনে রেখেছিল। সেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস। এতটা মনে রাখায় আমার কেমন সন্দেহ হয়। মায়ের মন তো। এদিকে সুস্নাত তো আমেরিকায় ফিরে যায়। আপনাকে তো বললাম, ছেলে নিজের বিজনেস কনসালটেন্সি ফার্ম করেছে। কলকাতায় অফিসের কাজেই এসেছিল। তার মধ্যে কয়েকটা পার্টিও অ্যাটেন্ড করতে হয়।’

    মিসেস বোস কথা থামিয়ে কর্ণিকার দিকে ঘাড় ঘোরালেন। হেসে বললেন, ‘কী কর্ণিকা, আমার এখানে আসবার কারণ স্পষ্ট হচ্ছে? দাঁড়াও আর একটু আছে। আমি তো অথৈ জলে পড়ি। ছেলে তো আমাকে বিরাট বিপদে ফেলল। সে এমন একটা মেয়েকে পছন্দ করে গেল, যার শুধু নাম জানি, অফিস জানি, আর কিছুই জানি না! এমনকী মেয়েটি বিবাহিত কিনা তা-ও নয়। একদিন করবীকে দুঃখ করে গল্প করেছিল। করবী লাফিয়ে উঠল। মেয়ে তার আত্মীয়। একেই বলে কোইনসিডেন্স। আসলে জীবনে বড় বড় বাঁকগুলো সব আকস্মিকই পাওয়া যায়। আমি করবীকে বলি, এখনই কিছু বলবার দরকার নেই। আগে, ছেলের পারমিশন নিই। খোঁজখবর নিই। তারপর।’

    কর্ণিকার মাথা ঝমঝম করছে। সে সুস্নাত নামে যুবকটির মুখ মনে করবার চেষ্টা করছে। অফিসের কারণে ন’মাসে ছ’মাসে তাকে একটা-আধটা পার্টিতে যেতে হয়। স্যর বা অন্য কেউ যেতে না পারলে তার ঘাড়েই চাপ পড়ে। নেমন্তন্ন করলে কোম্পানির একজন প্রতিনিধির যাওয়া উচিত। সাধারণত অ্যাটেন করেই সে পালিয়ে আসে। খাওয়া-দাওয়াও করে না। এর মধ্যে একেবারে ঝগড়া! হতে পারে। কাজকর্ম নিয়ে তার এক ধরনের বিশ্বাস আছে। অন্যকে সেই বিশ্বাস জানাতে তার দ্বিধা নেই। অচেনা হলেও নয়। তবে ছেলেটাকে মনে পড়ছে না কেন? গোটা ঘটনাটা তো গল্পের বইয়ের মতো!

    মিসেস বোস বললেন, ‘কর্ণিকা, আমার তোমাকে খুব পছন্দ হয়েছে। সরাসরি কথা বলতে পারো। আজকের দিনে মেয়েদের এরকম হওয়াই উচিত। যে কাজই করো দায়িত্ব নিয়ে করাটাই আসল। আমার বিশ্বাস সংসারও তুমি দায়িত্ব নিয়ে করতে পারবে। তবে মনে রেখো বিদেশে কিন্তু সংসার করবার অনেক ঝামেলা। সব নিজেদের করতে হয়। কোনও হেলপিং হাত থাকে না। তাছাড়া…সব যদি ঠিকঠাক হয়…তাহলে তো তোমাকে সুস্নাতর ফার্মও সামলাতে হবে।’

    রাগের সঙ্গে কর্ণিকার এবার লজ্জাও করল। মেয়েদের হল এই একটা মুশকিল। যতই নিজেদের তালেবর ভাবুক, কোনও কোনও সময় লজ্জা করে বসে। কর্ণিকা মাথা নামিয়ে বলল, ‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আপনি কী বলছেন।’

    মল্লিকাদেবী তাড়াতাড়ি বললেন, ‘আমাদের কত বড় সৌভাগ্য।’

    মিসেস বোস হেসে বললেন, ‘সৌভাগ্য আমার। এই বিয়ে হোক না হোক, ছেলের মা হিসেবে আমি একটা ভেলকি দেখালাম। পছন্দর মেয়েকে খুঁজে দিলাম। কর্ণিকা এই নাও, এটা আমার ছেলের ফোন নম্বর। আমি তাকে আজই সব জানাব। যদি অসুবিধে না হয় তোমার ফোন নম্বরটা আমাকে দাও। সে তোমাকে কল করবে। তুমি যদি চাও, তার সঙ্গে কথা না-ও বলতে পারো। তোমার কি আমাকে কিছু বলবার আছে?

    মল্লিকাদেবী বললেন, ‘না না, ওর আর কী বলবার আছে? ওর তো পরম ভাগ্য। ওর বাবা এলে…?’

    মিসেস বোস মল্লিকাদেবীর কথায় পাত্তা না দিয়ে গলা নামিয়ে বললেন, ‘বলো তোমার কী বলবার আছে?’

    কর্ণিকা মাথা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘আমি এখন বিয়ে করব না। এখানে আমার অনেক রেসপনসিবিলিটি আছে। অফিসে, ঘরে…। সরি, আপনি কিছু মনে করবেন না।’

    মিসেস বোস কর্ণিকার কাঁধে হাত রেখে হেসে বললেন, ‘ভেরি গুড। বিদেশে থাকা ভালো পাত্র দেখে নিজের যাবতীয় দায়িত্ব কর্তব্য ভুলে ঝাঁপিয়ে পড়বার মতো মেয়ে যে তুমি নও, আমি বুঝতে পেরেছি। আমার ভেবে ভালো লাগছে যে আমার ছেলে মানুষ চিনতে ভুল করে না। আমার একটাই অনুরোধ, তুমি এই কথাটা সুস্নাতকে বলে দাও। বলে দাও, তুমি এখন বিয়ে করবে না। সে অন্তত জানুক তার মা চেষ্টা করেছে। এইটুকু অনুরোধ রাখবে কি?’

    কর্ণিকা মাথা নাড়ল। মিসেস বোস চলে যাওয়ার পর, মল্লিকা মেয়ের সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিলেন।

    বেশি রাতে কর্ণিকার মোবাইলে বিদেশের নম্বর ভেসে এল। কর্ণিকা প্রথমে ভেবেছিল ধরবে না। তারপর মিসেস বোসের সুন্দর ব্যবহারের কথা মনে পড়ে গেল। তার ওপর সে কথা দিয়েছে। সে কথা রাখা উচিত। এক মিনিটের কম সময়েই ছেড়ে দেবে। কর্ণিকা ফোন কানে নিল।

    সেই ফোন ছাড়তে কর্ণিকা রাত কাবার করে ফেলল। এই জন্যই বলে, মানবমন অতি রহস্যময়! এক মুহূর্ত আগেও সেই মনের খবর কেউ বুঝতে পারে না।

  • সপ্তম কিস্তি

    সপ্তম কিস্তি

    প্রচেত গুপ্ত

    [book]

    একষট্টি

    ‘ওই কে এলে আকাশ পরে দিক-ললনার প্রিয়/ চিত্তে আমার লাগল তোমার ছায়ার উত্তরীয়…’

    মণিকুন্তলা গান করছেন। গলা খুলে নয়, গুনগুন করে। তিনি ছোট মেয়ের ঘর গোছাতে এসেছেন। বাসি জামা, বিছানার চাদর,  বালিশের ওয়াড় আলাদা করেছেন, এদিক-সেদিক ছুড়ে ফেলে রাখা জামাকাপড় ভাঁজ করে ওয়ার্ডরোবে রাখছেন, খোলা বই তাকে গুছিয়ে তুলছেন। কম্পিউটারের ঢাকা দিলেম। জানলার নীচে জল। নিশ্চয় জানলা খোলা ছিল। কাপড় এনে সেই জল মোছবার সময় মণিকুন্তলা মনে মনে মেয়েকে ধমকও দিচ্ছেন। এই মেয়ে বৃষ্টি-বাদলায় জানলা আটকাতে কবে শিখবে? শুধু ছোট মেয়ের ঘরের কাজ নয়, একই সঙ্গে বাড়ির অন্যদিকেও খেয়াল দিতে হচ্ছে মণিকুন্তলাকে। সকালবেলায় সংসারে অনেক কাজ। যতই কাজের লোক থাকুন না কেন, বাড়ির গিন্নিকে নজর রাখতে হয়। এর সঙ্গে গুনগুন করে গান। কাজ করতে করতে যখন মেয়ের ঘরে আসছেন, গানের ভলিউম বাড়ছে। যখন ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা বা পাশের ঘরে যাচ্ছেন গান হয়ে যাচ্ছে আবছা।হেডফোনের সেরা অফার

    এখন যেমন মণিকুন্তলা এই ঘরে। তাই গান স্পষ্ট।

    ‘মেঘের মাঝে মৃদঙ্গ তোমার বাজিয়ে দিলে কি ও

    ও তালেতে মাতিয়ে আমায় নাচিয়ে দিয়ো দিয়ো…’

    বারিধারা বিছানায় শুয়ে আছে। গলা পর্যন্ত চাদর। পাশবালিশ জড়িয়ে গুটিশুটি মেরে আছে। খানিক আগে তার ঘুম ভেঙেছে। কিন্তু এখনও সে ঘুম থেকে ওঠেনি। ঘুম ভাঙা আর ঘুম থেকে ওঠার মধ্যে বিস্তর ফরাক। এমনকী খাট থেকে নেমে ব্রাশ করলেও অনেক সময় ঘুম থেকে ওঠা হয় না। বারিধারা দেখেছে, বহুবার ব্রেকফাস্ট করতে করতেও সে ঘুমের মধ্যে থেকেছে। এখন যেমন ঘুম ভেঙে এবং ঘুম থেকে না উঠে মায়ের গান শুনছে। খুব ভালো লাগছে। লাগবারই কথা। এই মহিলার গানের গলা যতটা না ভালো, গান করবার ধরনটা বেশি ভালো। খুব স্বতঃস্ফূর্ত। এত সহজভাবে গাইতে পারে যে মনে হয় গানটা আর পাঁচটা কাজের মতোই। কোনও আয়োজন লাগে না। কোনও জোরজার লাগে না। প্রাণে গান এলেই গাওয়া যায়। মহিলার ওপর বারিধারার হালকা হিংসেও হল। ইস সে যদি মায়ের গলার খানিকটা পেত। নিমেষে আবার হিংসে চলেও গেল। গান গাইতে পারবার থেকে গান শুনতে পাওয়াও কম আনন্দের নয়।

    মণিকুন্তলা গান থামিয়ে, মেয়ের দিকে তাকালেন। কড়া গলায় বললেন, ‘কী রে, কখন উঠবি?’

    বারিধারা চাদরটা মাথার ওপর টেনে নিয়ে বলল, ‘উঃ গান থামিও না। তোমার পরীক্ষা হচ্ছে।’

    মণিকুন্তলা হাতে মেয়ের জামা নিয়ে থমকে গেলেন।

    ‘কীসের পরীক্ষা?’

    বারিধারা চাদরের নীচ থেকে বলল, ‘এই গানটা তুমি ভালো গাও না শ্রাবণী সেন ভালো গায়। আবার মুখড়াটা ধরো।’

    মণিকুন্তলা কটমট করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। চাদর মুড়ি দেওয়া মেয়ের চুলের ঝুঁটিটা ঠিক কোনদিকে বোঝবার চেষ্টা করলেন। বুঝতে পারলেই ধরে নাড়িয়ে দেবেন। সাতসকাল থেকেই রসিকতা করা বেরিয়ে যাবে।

    বারিধারা বলল, ‘মা, ঘাবড়িও না। পরীক্ষার ফার্স্ট রাউন্ডে এগিয়ে আছ।’

    মণিকুন্তলা বললেন, ‘একটা চড় মারব।’

    বারিধারা খিলখিল করে হেসে চাদর সরিয়ে উঠে বসল। ডান হাত বাড়িয়ে নাটকীয় ঢঙে বলল, ‘মণিকুন্তলা ম্যাডাম, রাগ করবেন না। সত্যি আপনি একজন সুকণ্ঠের অধিকারিণী। সংসার নামক হারমোনিয়ামের মধ্যে ঢুকে পড়ে প্যাঁ পো করে মরছেন। অধিকাংশ গুণী মহিলার জীবনে এমনটাই ঘটে। রান্নাঘরের দোরগোড়ায় প্রতিভা মাথা কুটে মরে। আপনি যদি সঙ্গীতের চর্চা নিয়মিত করতেন তা হলে শ্রাবণী সেন না হোন মণিকুন্তলা সেন হিসেবেই শ্রোতাদের কাছে পরিচিত এবং সমাদৃত হতেন। তবে দুঃখ করবেন না ম্যাডাম, আপনি আপনার এই কন্যার কাছে কোনও বড় গায়িকার থেকে কম নন।’

    মণিকুন্তলা বুঝলেন, এই মেয়ের সঙ্গে কথা বলা ঝকমারি ছাড়া আর কিছুই নয়। সকাল মেয়ের সঙ্গে ঝকমারি করার জন্য নয়, সকাল সংসারের কাজ করবার জন্য। চটি ফটফটিয়ে রাগের শব্দ করে তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। যাক, মেয়ের ঘুমের মধ্যে ঘরটা তাও খানিকটা সাফসুতরো করা গেছে।

    বারিধারা জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। আকাশ মেঘ ভরা। কালো মেঘ নয়, কাজল লেপটানো মেঘ। কাল সারারাত ধরে বৃষ্টি পড়েছে। তবে খুব জোরে নয়। সকালের দিকে খানিকটা ধরেছে। আকাশ বলছে, আবার যে-কোনও সময় ঝমঝমিয়ে নামবে। সব মিলিয়ে চমৎকার একটা বৃষ্টির দিন।

    বারিধারা আড়মোড়া ভাঙল। তার মন ভালো লাগছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে মন ভালো লাগা একটা সুলক্ষণ। বৃষ্টির দিনের কতগুলো নিজস্ব নিয়ম আছে। একে বলে ‘বৃষ্টির দিনের নিয়ম’। এই নিয়ম না মানলে, বৃষ্টি রাগ করে। সেই রাগ যদি বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায় তখন বিপদ ঘটে। বৃষ্টি অভিমান করে এবং বেশ ক’দিন এ মুখো হয় না। বারিধারা মনে মনে নিয়মগুলো ঝালিয়ে নিল। সারারাত বৃষ্টি পড়লে এবং পরদিন সকালেও আকাশ মেঘে ভরা থাকলে সহজে বিছানা ছাড়তে নেই। সেদিনের যাবতীয় রুটিন কাজ বাতিল করতে হয়। গোটা সকালে বারবার গরম চা চাই। সঙ্গে ডিমের পকৌড়া। পিছনে গাঁক গাঁক করে রবীন্দ্রসঙ্গীত চলবে। দুপুরে খিচুড়ি। তারপর উপুড় হয়ে শুয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনন্দীর ‘মরীরা দুপুর’ বা অরহান কামুকের উপন্যাস ‘দ্য মিউজিয়ম অফ ইনসেন্স’ পড়তে হবে। বিকেলে পুরোনো বন্ধুদের খুঁজে খুঁজে ফোন বা ফেসবুকে আড্ডা। সন্ধেবেলা খাটে আধশোয়া হয়ে ল্যাপটপে সিনেমা দেখতে হবে। কোরিয়ান মুভি ‘আ বিটার সুইট লাইফ’ অথবা বাংলায় ‘সোনার কেল্লা’। এর মাঝখানে প্রেমিক বা প্রেমিকা ফোন করবে। সেই ফোন ধরা চলবে না। তাকে টেনশনে রাখতে হবে। এতে এক ধরনের বিরহও তৈরি হবে। স্বেচ্ছাবিরহ। বৃষ্টিতে মিলনের চেয়ে বিরহ বেশি ইন্টারেস্টিং।

    বারিধারা ঠিক করল, সে আজ বৃষ্টি দিনের নিয়ম মেনে চলবে। সে আবার চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়বার তোড়জোড় শুরু করল।

    মণিকুন্তলা আবার ঘরে ঢুকলেন।

    ‘বৃষ্টি, জরুরি কথা আছে। মুখ ধুয়ে নীচে এসো। চা খেতে খেতে কথা বলব।’

    বারিধারা শোবার প্ল্যান ত্যাগ করে বলল, ‘আজ তো জরুরি কথা শোনা যাবে না মা।’

    মণিকুন্তলা চোখ পাকিয়ে বলল, ‘কেন? আজ তোমার কী?’

    বারিধারা গায়ের চাদর সরিয়ে এগিয়ে গিয়ে মায়ের হাত ধরল। হাসিমুখে বলল, ‘আজ বৃষ্টির দিন। আজ জরুরি কথা বলা বারণ।’

    মণিকুন্তলা হাসতে গিয়ে নিজেকে সামলালেন। তার এই মেয়েটা ছেলেমানুষ বয়স থেকেই বৃষ্টি পাগলা। বৃষ্টি পড়লে চোখে চোখে রাখতে হত। ছুতোনাতা পেলেই বারান্দা, উঠোন, ছাদে ভিজতে চলে যেত। মণিকুন্তলা একবার পিটুনি দিলেন। নাতনি ফোঁপাতে ফোঁপাতে দাদুর কাছে গেল। কমলকান্তি সেন পুত্রবধুকে ডেকে পাঠালেন। মণিকুন্তলা ঝগড়া করবেন বলেই প্রস্তুত হয়ে শ্বশুরমশাইয়ের কাছে গেলেন।

    ‘বাবা আপনি আর আশকারা দেবেন না। এই সেদিন জ্বর থেকে উঠল মেয়ে। বারণ শুনছে না।’

    কমলকান্তি সেন গম্ভীর ভাব বললেন, ‘তুমি শাসন করে ঠিক করেছ। অবাধ্য ছেলেমেয়েকে দু-ঘা দেওয়াটাই উচিত। আমি তোমাকে এই কারণে ডাকিনি।’

    মণিকুন্তলা গজগজ করতে করতে বললেন, ‘তা হলে কী কারণে ডেকেছেন?’

    কমলকান্তি অপরাধীর ঢঙে বললেন, ‘নাতনির এই বৃষ্টি ভেজা স্বভাবের জন্য আমিই দায়ী সেকথাটাই বলতে ডেকেছি।’

    মণিকুন্তলা বললেন, ‘আপনি কী বলতে চাইছেন আমি বুঝতে পারছি না। তবে ওই মেয়ে যদি আবার বৃষ্টিতে ভিজতে যায়, আবার আমার হাতে মার খাবে।’

    কমলকান্তি বললেন, ‘আর ভিজবে না। আমি ব্যবস্থা করছি।’

    মণিকুন্তলা বললেন, ‘সে আপনার ব্যাপার। আমি ছাড়ব না।’

    কমলকান্তি বললেন, ‘তুমি ঠাণ্ডা হও। যার ভালো নাম বারিধারা, ডাকনাম বৃষ্টি সে তো বৃষ্টিতে ভিজবেই। না চাইলেও ভিজতে হবে। তার কোনও অপরাধ নেই। ছোট নাতনির নাম আমি বদলে দিচ্ছি। সেই ব্যাপারে আলোচনার জন্য আমি তোমাকে ডেকেছি। আচ্ছা, মেয়ের নাম যদি রোদ্দুর দিই? কেমন হবে? তবে তাতেও চিন্তা আছে। তখন হয়তো রোদে টইটই করে ঘুরবে। তাই না? সবথেকে ভালো হয়, এইমেয়ের নাম আমি দিই ঘর। তা হলে নিশ্চয়ই চুপটি করে ঘরে বসে থাকবে।’

    মণিকুন্তলা আর পারেননি। শ্বশুরমশাইয়ের সামনেই ফিক করে হেসে ফেলেছিলেন। বারিধারার সেই বৃষ্টি পাগলামি যায়নি। এখনও ভেজে। বড় হয়েছে বলে লুকিয়ে-চুরিয়ে ভেজে। টুক করে ছাদে চলে যায়।

    মণিকুন্তলা হাত সরিয়ে নিয়ে মেয়েকে বললেন, ‘বাজে কথা পরে বলবে। তোমার দিদিকে আনতে গাড়ি গেছে। সে এলে আমরা তোমার দাদুর প্রাোজেক্ট নিয়ে মিটিং করব।’

    বারিধারা এবার প্রায় লাফিয়ে উঠল।

    ‘খুব ভালো হবে।  একটু পরে রোদ উঠবে, প্রাোজেক্টের জন্য কাজ করাটা কোনও কাজ নয়। এটা আনন্দ। মিটিংয়ে আর কে কে থাকবে? বাবা?’

    মণিকুন্তলা বললেন, ‘না, আজ আমরা শুধু তিনজনে একটু কথা বলে নেব। সবাইকে নিয়ে কবে বসা হবে, তাই ঠিক করব। তোমার বাবার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে।’

    ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে তিনজনে কথা হল। সাতদিন বাদে মিটিংয়ের একটা দিন ঠিক হল। সবাইকে থাকতে হবে। ওই সময় কোর্টের কাজে অর্চিনের কলকাতায় আসবার কথা। সেও থাকবে। বারিধারার দায়িত্ব পড়ল, সবাইকে খবর দেওয়ার।

    প্রথম কাজ হবে, একটা ট্রাস্ট তৈরি করা। ঝাড়গ্রামের জমিটা একদিন সরজমিনে দেখে আসা হবে। পাঁচিল দিয়ে সেই জমি ঘিরে ফেলা দরকার। ভিতরে আপাতত একটা ঘর বানানোর বন্দোবস্ত করলেই চলবে। ওটা হবে সাইট অফিস। আপাতত সেনবাড়িতে বসে কাজ শুরু হবে। বাকি কাজ সেদিন মিটিংয়ে আলোচনা করে ঠিক হবে।

    বারিধারা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ব্যস, তাহলে আজকের মতো জরুরি কথা শেষ। এবার রেনি ডে উদযাপন হবে।’ মেঘবতী বলল, ‘দাঁড়াও, আমার একটা কথা আছে।’

    বারিধারা মুখ ভেটকে বলল, ‘আবার কী কথা দিদি? চল ছাদে গিয়ে ভিজি। দেখ কেমন জোরে বৃষ্টি নেমেছে।’

    মেঘবতী বোনের কথায় পাত্তা না দিয়ে থমথমে গলায় বলল, ‘বাবা আমাকে সেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসে জয়েন করতে বলছে। বলছে, এখন থেকে অফিসে গিয়ে কাজকর্ম শিখতে।’

    বারিধারা মায়ের মুখের দিকে তাকাল।

    ‘কী ব্যাপার মা? দিদি, যা বলছে সত্যি?

    মণিকুন্তলা চায়ের কাপ মুখ থেকে নামিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, সত্যি। তোদের বাবা আমাকে বলেছে, কোম্পানির দায়িত্ব তো এবার কাউকে বুঝে নিতে হবে। সেটা বাড়ির কাউকেই নিতে হবে। তোর বাবার তো বয়স হচ্ছে। বাড়ির কেউ দায়িত্ব না নিলে কীভাবে চলবে?’

    বারিধারা উৎসাহ নিয়ে বলল, ‘এটা তো খুব ভালো কথা। সেন অ্যাসোসিয়েটস তো তুলে দেওয়া যায় না। বাইরের লোক দিয়ে ব্যবসা চলেও না। দিদি যদি দায়িত্ব নেয় তার মতো ভালো আর কিছু হবে না। তোর কি আপত্তি আছে দিদি?’

    মেঘবতী একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘আগে ছিল। বলেছিলাম, এ সবের মধ্যে আমি নেই। এখন বাবা বুঝিয়ে বলবার পর কেমন যেন গুলিয়ে গেছে। বাবা বলল, আমার তো ছেলে নেই। দুই মেয়ে। ছেলে থাকলে সে ব্যবসা চালাত। মেয়ে আছে বলে কি ব্যবসা তুলে দিতে হবে? বাবার কথাটায় ধাক্কা খেলাম। সত্যি তো মেয়েরা ব্যবসা চালাতে পারে না? বড় বড় কোম্পানির মাথায় মেয়েরা রয়েছে। অনেক ব্যবসায় মালিকও মেয়ে। তা হলে আমরা কেন বাবাকে হেল্প করতে পারব না? বাবার বয়স বাড়ছে। বাবার ওপর চাপ পড়ছে। জ্যোতিষ্ককে বলেছিলাম। সে বলল, অবশ্যই তোমার দায়িত্ব নেওয়া উচিত। জটিল কাজে তোমার মাথা পরিষ্কার। বাবাকে কিছু বলিনি। আগে তোমাদের বললাম। আমি কী করব বুঝতে পারছি না। তোমরা বলে দাও।’

    বারিধারা মেঘবতীকে জড়িয়ে ধরে ফটাস করে গালে একটা চুমু খেল। মেঘবতী বোনকে ঠেলা মেরে সরিয়ে দিল। বারিধারা একগাল হেসে বলল, ‘ভেরি গুড। এই না হলে তুই বারিধারা সেনের দিদি? অবশ্যই রাজি হবি। তোর কড়া হাতে বাপ-ঠাকুরদার কোম্পানির আরও ভালো হবে। তুই যদি রাজি না হতিস তোকে ত্যাজ্য দিদি করতাম।’

    মেঘবতী কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘আমি কি পারব? অত বড় অফিস। অত কাজ। আমি তো কখনও এরকম কঠিন কাজ করিনি।’

    বারিধারা হেসে বলল, ‘তুই অফিসে জয়েন করেই একটা ছিঁচকাঁদুনে রুম বানাবি। যখন দেখবি কাজ সামলাতে পারছিস না, নাকানি-চোবানি খাচ্ছিস, তখন ওই ছিঁচকাঁদুনে রুমে গিয়ে খানিকক্ষণ কেঁদে নিবি। বাইরে বোর্ড ঝোলানো থাকবে বস ইস নাউ ক্রাইং, ডোন্ট ডিসটার্ব।’

    মেঘবতী হাত বাড়িয়ে বোনের কান ধরবার চেষ্টা করল। মণিকুন্তলা মেয়েদের ধমক দিয়ে বললেন, ‘তোরা থামবি? এরকম একটা সিরিয়াস সময়ে বাচ্চাদের মতো মারামারি করছিস?’

    তারপর বড় মেয়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে তুই পারবি মেঘ। তোর বাবা জেনেশুনেই তোর কথা ভেবেছে। বলেছে, সহজ কাজে কেঁদে ফেললেও, কঠিন কাজে আমার বড় মেয়ের খুবই ঠাণ্ডা মাথা।’

    মেঘবতী কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘আর একটু পরে রোদ উঠলে প্রাোজেক্টের কী হবে?’

    মণিকুন্তলা হেসে বললেন, ‘তার জন্য তো আমরা সবাই আছি। তুইও থাকবি।’

    মেঘবতী কান্নার ভাব ঝেরে ফেলে বলল, ‘আমি থাকব তো?’

    মণিকুন্তলা বললেন, ‘এ মা! কেন থাকবি না? অফিসের কাজের পর যতটা পারবি সময় দিবি।’

    বারিধারা হুকুমের ঢঙে বলল, ‘শনি, রবি আর অন্যান্য ছুটির দিন আপনি প্রাোজেক্টে যাবেন। কিন্তু মনে রাখবেন সেখানে আপনি বস নন, সেখানে বস আমি। আমি যা অর্ডার করব সেই মতো কাজ করবেন।’

    মেঘবতী এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে বোনকে তাড়া করল। বারিধারা হাসতে হাসতে সিঁড়ি দিয়ে ছুটল। মেঘবতী হাসতে হাসতে গেল পিছনে। দুই মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন মণিকুন্তলা। খুশিতে তাঁর বুক ভরে গেল। কিন্তু এই খুশি একটু পরেই মণিকুন্তলার মাথায় আগুন ধরিয়ে দিল।

    বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে। খানিকক্ষণ মেয়েদের সাড়াশব্দ না পেয়ে খানিকটা চিন্তিত হয়েই মণিকুন্তলা ছাদ পর্যন্ত চলে যান এবং সেখানে যা দেখলেন তাতে রাগে মাথায় আগুন ধরবারই কথা। ধেড়ে মেয়েরা এ কী কাণ্ড করছে! বৃষ্টিতে হাত ধরাধরি করে পাগলের মতো ভিজছে যে! ছি-ছি, এদের কি কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই?

    বারিধারা আর মেঘবতী ভিজতে ভিজতে তাদের মাকে দেখতে পায় এবং হাত ধরে জোর করে টেনে ছাদে নামায়।

    ‘ওরে আমায় ছাড়, ওরে আমায় ছাড়’ বলতে বলতে মণিকন্তলাও ভিজতে থাকেন। মাথায় রাগের আগুন নিয়ে বৃষ্টিতে ভেজার এমন আনন্দ তিনি আগে কখনও পাননি।

    মা-মেয়ের এই আনন্দস্নানে সব থেকে খুশি হল খোদ বৃষ্টি। সে আরও ঝেঁপে নামল।

  • অদ্ভূতুড়ে সিরিজ

    অদ্ভূতুড়ে সিরিজ

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যয়ের অদ্ভুতুড়ে চমৎকার একটা সিরিজ। ছোটদের জন্য রচিত প্রায় চল্লিশের বেশি গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘অদ্ভুতুড়ে সিরিজ’। শিশু-কিশোরদের জন্য এই লেখাগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সহজ সরল সরস বর্ণনা। প্রচুর হাস্যরস ও রহস্য মেশানো এই সিরিজের বইগুলোতে গল্পের সঙ্গে সাসপেন্সও রয়েছে। হাস্যরস ভূতের ভয় আর অলৌকিক সব ঘটনার সমন্বয়ে গল্পের প্লটগুলো শিশু মনে আলাদা দোলা দেয়। তার রচনা কৌশলে অভিভূত শিশুরা বিশ্বাস করতে শেখে, ভূত তো খারাপ হতেই পারে না, তারা থেকে থাকলে শুধু আমাদের সঙ্গে লুডো খেলার জন্যই আছে, বা আমাদের হোম টাক্স করে দেয়ার জন্য। মজার মজার ভূত, আধপাগলা সব অঙ্ক স্যার, শুচিবাই পিসিমা দিয়ে তৈরি, অদ্ভুতুড়ে সিরিজের ছোট্ট শহরগুলি শিশু মনের বড্ড কাছের এবং প্রিয়।

    শিশু কিশোরদের জন্য লেখা হলেও সিরিজটি সব বয়সী পাঠকই পড়ে বেশ আনন্দ পায়। সিরিজের গল্প গুলোর বিশেষত হচ্ছে একটা সাথে আরেকটা তেমন কোন যোগসাজ নেই। ফলে আপনি যেকোনো একটি গল্প দিয়েই পড়তে শুরু করতে পারেন। এই সিরিজের প্রতিটি বইয়ের চরিত্রগুলো বেশ অদ্ভুত ও মজার। কোন কোন বইয়ে ভিন গ্রহের এলিয়েনদের কথাও আছে।

    এডুলিচার পাঠশালায় প্রকাশিত অদ্ভুতুড়ে সিরিজের বইগুলো হচ্ছে—