Author: তাহের আলমাহদী

  • ভারতের একমাত্র সুলতানা

    ভারতের একমাত্র সুলতানা

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    ভারতের একমাত্র সুলতানা

    যেখানে থাকে বজ্র-আগুন সেখানেই ফোটে চন্দ্রের চন্দন-ধারা। তাই তো আকাশ এমন বিচিত্র, এত সুন্দর!

    পৃথিবীতেও মাঝে মাঝে এক-একজন মানুষ দেখা যায় যার মনের ভিতরে থাকে ফুলের কোমলতা আর বজ্রের কাঠিন্য। ভগবান তাদের জীবনের রাজপথে পাঠিয়ে দেন অসাধারণ হবার জন্যেই।

    ইতিহাসে এমনই অসাধারণ কয়েকজন পুরুষের নাম পড়ি। না, কেবল পুরুষ নয়, এমন অসাধারণ কয়েকজন নারীও পৃথিবীর ইতিহাসে বিখ্যাত ও অমর হয়ে আছেন।

    আজ এমনই এক বিচিত্র নারীর কথাই বলব। বাংলাদেশে তাঁকে ‘রিজিয়া’ বলে ডাকে, কিন্তু আসলে তাঁকে আমরা ডাকতে পারি ‘রাজিয়া’ নামে। বাংলাভাষায় ‘রিজিয়া’ বলে একখানি নাটক আছে, তার আগাগোড়াই কাল্পনিক প্রলাপে পরিপূর্ণ। সত্যিকার রাজিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই বললেও চলে।

    যেসব দাস-রাজা দিল্লির সিংহাসন অধিকার করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য বলে বিখ্যাত হয়েছে সুলতান ইলতুতমিস। অধিকাংশ পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকরা ভুল করে তাঁকে ডেকেছেন ‘আলতুমাস’নামে।

    রাজিয়া ছিলেন ইলতুতমিসেরই কন্যা। পৃথিবীর সব দেশেই রাজকন্যা বললে মনে জাগে এক সুন্দরীর ছবি। সুতরাং আশা করা যায়—রাজিয়াও ছিলেন সুন্দরী; এবং শিক্ষায়-দীক্ষায় ও চরিত্রের নানা গুণে তিনি যে যথেষ্ট উন্নত ছিলেন, এরও অনেক প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর পরবর্তী জীবনে; এবং কুসুমকোমলা নারীরূপে জন্মালেও রাজিয়ার চরিত্রে ছিল যে পুরুষোচিত দৃঢ়তা, এর প্রমাণ পাই আমরা তাঁর পিতার মুখেই।

    ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দ। সুলতান ইলতুতমিস শুয়েছেন মৃত্যু-শয্যায়।

    সুলতানের নানা মহিষীর কয়েকটি সন্তান ছিল। তাঁদের মধ্যে সিংহাসনে বসবার যোগ্যপাত্র ছিলেন কেবল জ্যেষ্ঠ রাজপুত্র—বঙ্গদেশের শাসনকর্তা মামুদ। কিন্তু তিনি অকালেই মারা পড়েছেন। তাই মন্ত্রী ও সভাসদদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই।

    তাঁরা বললেন, ‘সুলতান, আপনার অবর্তমানে সিংহাসনে বসবে কে?’

    ইলতুতমিস বললেন, ‘আমার মেয়ে রাজিয়া।’

    বিপুল বিস্ময়ে সকলে স্তম্ভিত! কোনও মুসলমান রাজ্যে কে কবে শুনেছে রাজ-সিংহাসনে বসেছে পুত্রের বদলে কন্যা?

    মন্ত্রীরা বললেন, ‘সুলতান, রাজিয়া যে পুরুষ নন!’

    ইলতুতমিস বললেন, ‘তোমরা লক্ষ করলেই বুঝবে, আমার সব ছেলের চেয়ে রাজিয়ার মধ্যেই আছে বেশি পুরুষত্ব।’ এই বলেই তনি অন্যদিকে পাশ ফিরে শুলেন। তাঁর মৃত্যু হল।

    যা কখনও হয়নি, তা হয় কেমন করে? মন্ত্রীদের সেই পুরাতন যুক্তি?

    ইলতুতমিসের শেষ-ইচ্ছা পূর্ণ হল না। আমির-ওমরাওরা সুলতানের এক ছেলেকেই দিল্লি-সাম্রাজ্যের অধিকারী বলে স্থির করলেন। তাঁর নাম ফিরুজ। তিনি রাজিয়ার সৎমা, শা তুর্কানের পুত্র।

    শা তুর্কান প্রথমে ছিলেন রাজবাড়ির দাসী, তারপর সুলতানের সুনজরে পড়ে হন রানি। অন্য অন্য রানিরা ছিলেন বড়ঘরের মেয়ে, তাঁরা কোনওদিনই শা তুর্কানকে রানির মর্যাদা দিতে পারেননি। শা তুর্কান এতকাল ধরে সেই অপমান পুষে রেখেছিলেন মনে মনে।

    ফিরুজের রাজা হবার কোনও যোগ্যতাই ছিল না। মুকুট পরে তিনি দিন-রাত মেতে রইলেন বাজে আমোদ-প্রমোদে। রাজকার্যের ভার গ্রহণ করলেন তাঁর মা। হাতে ক্ষমতা পেয়ে তাঁর প্রথম কাজ হল, অন্যান্য সতীনদের বধ করা। যাঁরা বেঁচে রইলেন, তাঁদের উপরেও অত্যাচার অপমানের সীমা রইল না। সুলতানের অন্য এক রানির এক শিশুপুত্রেরও দুই চক্ষু উপড়ে নেওয়া হল।

    ব্যাপার দেখে সকলেই বিরক্ত। রাজ্যে দিকে দিকে মাথা তুলে দাঁড়াল বিদ্রোহীরা। নানা প্রদেশের শাসনকর্তা প্রকাশ্যে স্বাধীনতা ঘোষণা করে পরস্পরের সঙ্গে মিত্রতা-সূত্রে আবদ্ধ হলেন। সৈন্য-সামন্ত নিয়ে ফিরুজ গেলেন তাঁদের দমন করতে, কিন্তু পারলেন না।

    এদিকে শা তুর্কানের বিষদৃষ্টি পড়েছে তখন রাজিয়ার উপরে। সুলতানের এই বুদ্ধিমতী ও গুণবতী মেয়েটিকে রাজ্যসুদ্ধ সবাই ভালোবাসে, এতটা শা তুর্কানের সইল না। তিনি রাজিয়াকে পৃথিবী থেকে সরাবার ষড়যন্ত্রে প্রবৃত্ত।

    শুনেই দিল্লির প্রজারা খেপে উঠল। বিদ্রোহীদের দলে অনেক আমির-ওমরাও পর্যন্ত যোগ দিলেন। দুষ্টা শা তুর্কান হলেন বন্দিনী; এবং ফিরুজ পালালেন রাজধানী ছেড়ে, কিন্তু আত্মরক্ষা করতে পারলেন না। বিদ্রোহীদের তরবারিতে তাঁর মুণ্ড গেল উড়ে। ফিরুজের ছয় মাস আর সাত দিনের রাজত্ব ভোগ শেষ হল। সে যেন আবু হোসেনের বাদশাগিরি!

    প্রজারা একবাক্যে বললে, ‘আমাদের রানি হবেন রাজিয়া!’

    মন্ত্রী ও আমির-ওমরাওরা প্রজাদের কথা ঠেলতে পারলেন না। সেই প্রথম ও শেষবারের জন্য দিল্লির রাজতন্ত্রের একমাত্র অধিকারিণী হলেন একজন নারী। এ এক কল্পনাতীত ব্যাপার! সুলতানা রাজিয়া! (১২৩৬ খ্রিস্টাব্দ)।

    কিন্তু সাম্রাজ্যের চতুর্দিকে বিপদের মেঘ তখনও পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে।

    মিত্রপক্ষ—অর্থাৎ মুলতান, হান্সি, লাহোর ও বুদায়ুনের বিদ্রোহী শাসনকর্তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ফিরুজের মন্ত্রী জুনাইদি তখন দিল্লি আক্রমণ করতে আসছেন—তাঁরা সবাই চান সুলতানা রাজিয়ার মুকুট কেড়ে নিতে। বিদ্রোহীরা দিল্লি অবরোধ করলে।

    রাজিয়া বুঝলেন তিনি দুর্বল ও বিদ্রোহীরা প্রবল। সম্মুখ-যুদ্ধে নামলে তাঁর পরাজয় নিশ্চিত। তখন কৌশলে কার্যসিদ্ধি করবার জন্যে তিনি দিল্লি থেকে বেরিয়ে পড়ে ছাউনি ফেললেন যমুনার তীরে।

    আমরা বলি—‘নারী-বুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী’। সুলতানা রাজিয়া দেখালেন তারই এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত। তবে প্রলয়টা হল এখানে কেবল বিদ্রোহীদেরই পক্ষে!

    তিনি গোপনে মুলতানের দুইজন প্রবল বিদ্রোহী নেতাকে আহ্বান করে মিষ্ট কথায় ও নানা লোভ দেখিয়ে তাঁদের পক্ষে আনলেন। তারপর তারা যখন তাঁর প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে বিদ্রোহীদের দলে গিয়ে হাজির হল, সুচতুরা সুলতানা রাজিয়া তখন সেই চক্রান্তের কাহিনি অন্যান্য বিদ্রোহী নেতাদের কাছে প্রকাশ করে দিলেন।

    বিদ্রোহীদের দলে পড়ে গেল মহা হইচই! সবাই ভীত, সবাই তটস্থ! কেউ কারুকে বিশ্বাস করতে পারে না—প্রত্যেকেই প্রত্যেককে ভাবে শত্রু বলে। তাদের দল গেল ভেঙে। এক-একজন নেতা আপন আপন দল নিয়ে সরে পড়বার চেষ্টা করেন-আর রাজিয়ার সৈন্যরা প্রধান দল ছাড়া সেইসব নেতাকে করে আক্রমণ ও বন্দি। এইভাবে বিদ্রোহীদের অনেকে মারা পড়ল। বাকি সবাই পালিয়ে গেল। জয় হল রাজিয়ার তীক্ষ্ণবুদ্ধির! সমগ্র হিন্দুস্থান হল তাঁর অধিকারভুক্ত। এমনকী, সুদূর বঙ্গদেশ ও সিন্ধুদেশও তাঁর বশীভূত না হয়ে পারলে না বিনাযুদ্ধেই কেল্লা ফতে!

    সাম্রাজ্য নিষ্কণ্টক! সুলতানা রাজিয়া তখন আমাদের পৌরাণিক চিত্রাঙ্গদার মতন নবমূর্তি ধারণ করলেন!

    অর্থাৎ তিনি ছুড়ে ফেলে দিলেন নারীর পোশাক, ত্যাগ করলেন নারীর ভাবভঙ্গি, ভুলে গেলেন মুসলমানি পরদা-প্রথা। সিংহাসনে বসেন পুরুষের সাজে, রণক্ষেত্রে যান সশস্ত্র যোদ্ধার বেশে। এই তেজীয়ান নারীর চিত্তের মধ্যে যথার্থ পুরুষত্বের আশ্চর্য বিকাশ দেখে, গোঁড়া মুসলমানরাও নীরব হয়ে রইলেন,—কোনওরকম আপত্তি প্রকাশ করলেন না।

    কিন্তু গোলমাল শুরু হল আর-এক কারণে।

    বুদ্ধিমতী রাজিয়া মানুষ চিনতেন। যোগ্যতা দেখে তিনি আফ্রিকা থেকে আগত জালালুদ্দিন ইয়াকুত নামক এক ব্যক্তিকে নিজের গার্হস্থ্য বিভাগের একটি উচ্চপদ প্রদান করলেন।

    রাজসভায় তখন তুর্কি আমির-ওমরাওদের বিশেষ প্রভাব,—আফ্রিকার লোকদের তাঁরা সুনজরে দেখতেন না, ঘৃণা করতেন। ইয়াকুতকে সুলতানার অনুগ্রহভাজন হতে দেখে তাঁরা হাড়ে হাড়ে জ্বলে উঠলেন; এবং নারীর প্রভুত্ব যাঁদের পক্ষে একেবারেই অসহনীয়, দেশে তখনও এমন সব লোকেরও অভাব ছিল না। তাঁরাও রাজিয়ার বিরুদ্ধে তুর্কি চক্রান্তকারীদের সঙ্গে যোগদান করলেন।

    আয়াজ ছিলেন একজন প্রধান চক্রী—রাজিয়ারই অনুগ্রহে তিনি হয়েছিলেন পাঞ্জাবের শাসনকর্তা। রাজিয়া প্রথমেই সসৈন্যে তাঁকে আক্রমণ ও পরাজিত করলেন। আয়াজ প্রাণ বাঁচালেন পালিয়ে!

    কিন্তু অন্যান্য চক্রীদের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে উঠতে লাগল। ইকতিরুয়াদ্দিন আলতুনিয়া ভাতিন্দার শাসনকর্তা, ক্ষমতাশালী ও যোদ্ধা বলে তাঁর অল্প প্রতিপত্তি ছিল না। চক্রীদের প্ররোচনায় ভুলে তিনিও বিদ্রোহী হলেন।

    রাজিয়া আলতুনিয়াকে দমন করবার জন্যে আবার যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন। তাঁর ফৌজের মধ্যে কেবল বিশ্বাসী ইয়াকুতই ছিলেন না, তুর্কি চক্রান্তকারীদের দলও ছিল রীতিমতো ভারী।

    বীর নারী রাজিয়া ভাতিন্দায় পৌঁছে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন, এমন সময়ে হঠাৎ তুর্কি চক্রীরা মুখোশ খুলে ফেললেন।

    শত্রুর সৃষ্টি হয় যখন ঘরে-বাইরে তখন তাদের আর ঠেকানো যায় না। বিশ্বাসঘাতক তুর্কি-আমির-ওমরাওরা প্রথমেই ইয়াকুতকে হত্যা করলেন, তারপর বন্দি করলেন সুলতানা রাজিয়াকে। তারপর আলতুনিয়াকে ডেকে বন্দিনি সুলতানাকে তাঁরই হাতে সঁপে দিলেন।

    রাজিয়ার এক বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন, তাঁর নাম মুইজুদ্দিন বারাম। চক্রীদের অনুগ্রহে দিল্লির সিংহাসন লাভ করলেন তিনিই (১২৪০ খ্রিস্টাব্দ)।

    চক্রীদের মনের বাসনা পূর্ণ। দিল্লির সিংহাসন থেকে নারীর প্রভুত্ব বিলুপ্ত। রাজিয়া শত্রুর হস্তে বন্দিনি।

    কিন্তু কারাগারের অন্ধকারে বসে রাজিয়া এখন কী করছেন? নিশ্চয়ই চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছেন না! তিনি সিংহাসনে বসে সাম্রাজ্যচালনা ও অশ্বপৃষ্ঠে বসে অস্ত্রচালনা করেছেন, তাঁর চোখে অশ্রু সাজে না।

    সিংহাসন বসেই একদিন তিনি বিনা যুদ্ধেই প্রবল শত্রুপক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছেন। আজ আবার তিনি কৌশলে শত্রুজয় করে নিজের গত গৌরবকে ফিরিয়ে আনতে চাইলেন।

    রাজিয়া আহ্বান করলেন আলতুনিয়াকে।

    বিস্মিত আলতুনিয়া কারাগারে এসে দাঁড়ালেন।

    রাজিয়া সহাস্যে তাঁকে অভ্যর্থনা করে বললেন, ‘বীরবর, আরও কতদিন আমি তোমার কারাগারে আতিথ্য স্বীকার করব? আমাকে বন্দিনী করে রেখে তোমার কী লাভ?’

    আলতুনিয়া তিক্ত স্বরে বললেন, ‘লাভ? কোনওই লাভ নেই। বোকার মতন আমি হয়েছি চক্রীদের হাতের খেলার পুতুল। তারা সবাই নিজের নিজের কাজ গুছিয়েছে—কেউ করেছে তোমার বোনকে বিয়ে, কেউ হয়েছে মন্ত্রী। আর আমাকে করে রেখেছে কেবল তোমার ভারবাহী গর্দভ!’

    রাজিয়া বললেন, ‘এ ভার ত্যাগ করতে পারবে?’

    —‘তাতেই বা আমার কী লাভ?’

    —‘লাভ?…জানো বীর, একদিন যে দিল্লির সিংহাসনে বসেছে, আবার সে সেই সিংহাসনে আরোহণ করতে পারে!’

    —‘কেমন করে?’

    —‘তুমি যোদ্ধা, তোমার নিজের সৈন্য আছে। ইচ্ছা করলে তুমি আরও অনেক নতুন সৈন্য সংগ্রহ করতে পারো। তারপর তোমার সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করে আবার আমি দিল্লি অধিকার করব।’

    আলতুনিয়া খানিকক্ষণ ভেবে বললেন, ‘সুলতানা, ধরো, যুদ্ধে আমরাই জয়ী হলুম। কিন্তু সিংহাসনে আবার বসে তুমি কি আর আমার কথা মনে রাখবে?’

    —‘বীর, তোমার কি সন্দেহ হচ্ছে?’

    —‘হচ্ছে। রাজনীতি বড়োই কুটিল।’

    —‘কী করলে তোমার সন্দেহ দূর হবে?’

    —‘সুলতানা, তুমি যদি আমাকে বিবাহ করো, তবেই আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি।’

    রাজিয়া নতনেত্রে বললেন, ‘বেশ, আমি রাজি।’

    শত্রু হলেন স্বামী!

    সুলতানা রাজিয়া আবার শত্রুজয় করলেন।

    কিন্তু তারপর আর বেশি কিছু বলবার নেই। এবার ভাগ্যদেবী দাঁড়ালেন তাঁর বিপক্ষে।

    স্বামীর সঙ্গে সৈন্য নিয়ে আবার তিনি দিল্লির পথ ধরলেন, পথিমধ্যে দেখা হল তাঁর ভাই বারামের সঙ্গে—দিল্লির যিনি নতুন সুলতান।

    যুদ্ধ হল। ভাই দিলেন বোনকে হারিয়ে।

    তার পরদিনই স্ব-পক্ষীর ঘাতকের হস্তে সুলতানা রাজিয়া ও তাঁর স্বামী আলতুনিয়া ইহলোক ত্যাগ করলেন।

    দিল্লি এবং পৃথিবীর আর কোনও মুসলমান সাম্রাজ্যে আর কোনও নারী মাথায় সম্রাজ্ঞীর মুকুট পরবার সৌভাগ্য অর্জন করেননি।

  • ব্যাঘ্রভূমির বঙ্গবীর

    ব্যাঘ্রভূমির বঙ্গবীর

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    ব্যাঘ্রভূমির বঙ্গবীর

    ললিতাদিত্য তখন কাশ্মীরের রাজা। তিনি সিংহাসন অধিকার করে ছিলেন ৭৩৩ থেকে ৭৬৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।

    তিনি ছিলেন শক্তিশালী দিগবিজয়ী। তিব্বতিদের, ভুটিয়াদের ও সিন্ধুতীরবর্তী তুর্কিদের দমন করে তিনি নাম কিনেছিলেন। ভারতের দেশে দেশেও উড়েছিল তাঁর জয়পতাকা। কাশ্মীরের বিখ্যাত মার্তণ্ড-মন্দির তাঁর দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আজও বিদ্যমান আছে ওই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ।

    সেই সময়ে কনোজ বা কান্যকুব্জে রাজত্ব করতেন আর এক পরাক্রান্ত রাজা, নাম তাঁর যশোবর্মা। তাঁর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মগধ ও বঙ্গদেশের রাজারা পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হন। মগধের রাজা ছিলেন দ্বিতীয় জীবিতগুপ্ত। কিন্তু বঙ্গ বা গৌড়ের সিংহাসন ছিল কোনও রাজার অধিকারে, ঐতিহাসিকরা আজও তাঁর নাম খুঁজে পাননি। তবে তিনি ছিলেন নাকি অসংখ্য হস্তীর অধিকারী।

    চিরকালই এক রাজার উন্নতি আর এক রাজা দেখতে পারেন না। পৃথিবীতে এই নিয়েই যত অশান্তি, যত যুদ্ধবিগ্রহ। রাজা যশোবর্মার যশ ললিতাদিত্য সহ্য করতে পারলেন না। সসৈন্যে তিনি করলেন যশোবর্মাকে আক্রমণ। যশোবর্মা হলেন পরাজিত ও সিংহাসনচ্যুত।

    তখন বঙ্গেশ্বর কতকগুলি হস্তী উপঢৌকন স্বরূপ পাঠিয়ে দিলেন লতিতাদিত্যের কাছে। এর দুটি কারণ থাকতে পারে। যশোবর্মার দ্বারা বিজিত বঙ্গেশ্বর শত্রুর পতনে খুশি হয়েই হয়তো ললিতাদিত্যের কাছে উপহার পাঠিয়ে মনের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। কিংবা এও হতে পারে, ললিতাদিত্য পাছে বঙ্গদেশও আক্রমণ করেন, সেই ভয়েই তিনি তাঁকে তুষ্ট করতে চেয়েছিলেন।

    তারপর বঙ্গেশ্বরের কাছে কাশ্মীর থেকে এল আমন্ত্রণ, তাঁকে ললিতাদিত্যের আতিথ্য স্বীকার করতে হবে।

    তখন অষ্টম শতাব্দী চলছে। সে সময়ে বাংলা থেকে কাশ্মীরে যাওয়া বড় যে-সে কথা ছিল না। তারপর এই আমন্ত্রণের উদ্দেশ্য এবং ললিতাদিত্যের মনের কথা কেউ জানে না। বঙ্গেশ্বর যথেষ্ট ভীত হলেন বটে, কিন্তু উপায় কী? দিগবিজয়ী ললিতাদিত্যের আমন্ত্রণ ও আদেশ একই কথা।

    সুদীর্ঘ, দুর্গম পথ পার হয়ে কয়েক মাস পরে বঙ্গেশ্বর কাশ্মীরে গিয়ে উপস্থিত হলেন।

    কাশ্মীরে ললিতাদিত্য একটি নতুন নগর স্থাপন করে তার নাম রেখেছিলেন, ‘পরিহাসপুর’, এখন তাকে ‘পরসপোর’ বলে ডাকা হয়। সেখানে ছিল তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘পরিহাসকেশব’ নামে দেবতার বিগ্রহ ও মন্দির।

    অবশেষে পরিহাসপুরে হল দুই রাজার সাক্ষাৎকার।

    বঙ্গেশ্বরের মুখ বিষণ্ণ, তখনও তাঁর মনের ভয় ভাঙেনি।

    আসল ব্যাপারটা উপলব্ধি করে ললিতাদিত্য বললেন, ‘রাজন, আশ্বস্ত হন। আপনি আমার অতিথি। এই আমি ভগবান পরিহাসকেশবকে মধ্যস্থ রেখে প্রতিজ্ঞা করছি, আমার দ্বারা আপনার কোনও অনিষ্ট হবে না।’

    বঙ্গেশ্বর হয়তো আশ্বস্ত হলেন।

    তার পরের ব্যাপারটা ভালো করে বোঝা যায় না। বঙ্গেশ্বর যখন ত্রিগামী নামে একটি স্থানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন, ললিতাদিত্য তাঁকে হত্যা করে নিজের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করলেন। হাতের মুঠোর মধ্যে পেয়ে এক অসহায় অতিথিকে এমন নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করার কারণ কী? ইতিহাস সে সম্বন্ধে নীরব! এমন অহেতুকী বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনি পৃথিবীর ইতিহাস খুঁজলেও আর পাওয়া যায় কি না সন্দেহ।

    যথাসময়ে এই দারুণ দুঃসংবাদ এসে পৌঁছোল বাংলাদেশে।

    সারা দেশ শোকাচ্ছন্ন, রাজপ্রাসাদে হাহাকার।

    কিন্তু নারীর মতো হায় হায় করে কেঁদে নিজেদের কর্তব্য সমাপ্ত করল না বঙ্গেশ্বরের প্রিয় পরিচারকবৃন্দ। বাঘের মুলুক বাংলাদেশে কোনওদিনই দৃপ্তমনের অভাব হয়নি। একালে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যেই ফিরিঙ্গি বণিকরা বাঙালি কাপুরুষ বলে মিথ্যা অপবাদ রটাবার চেষ্টা করেছে। আসলে তারাও বাঙালিদের ভয় করত মনে মনে।

    পরিচারকদের সরদার ক্রোধকম্পিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, ‘প্রতিশোধ চাই, প্রতিশোধ চাই!’

    কেউ প্রশ্ন করল, ‘কেমন করে প্রতিশোধ নেবে?’

    —‘আমরা কাশ্মীরে যাত্রা করব।’

    —‘কোথায় কাশ্মীর, আর কোথায় বাংলা!’

    —‘দরকার হলে আমরা পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও যেতে ছাড়ব না। হাত গুটিয়ে বসে থেকে এ অপমান মাথা পেতে সহ্য করব? ভাইসব, আমরা কি বাঙালি নই?’

    —‘আমরা হচ্ছি মুষ্টিমেয় বিদেশি, সেই সুদূর অজানা দেশে অসংখ্য শত্রুর সামনে গিয়ে আমরা কি দাঁড়াতে পারব? এ অসাধ্যসাধন কি সম্ভবপর?’

    —‘আমাদের অন্নদাতা প্রভু বিশ্বাসঘাতকের হাতে নিহত। যে তাঁর অন্নগ্রহণ করেছে, সেই-ই আজ একাই হবে একশোজন—সেই-ই আজ করতে পারবে অসাধ্যসাধন। আজ কোনও কথা নয়—কাশ্মীরে চলো, কাশ্মীরে চলো!’

    পরিচারকের দল সমস্বরে গর্জন করে উঠল, ‘কাশ্মীরে চলো, কাশ্মীরে চলো!’

    দিনের পর দিন যায়, রাতের পর রাত। সূর্য ওঠে, চাঁদ ওঠে, উদয়ের পরে অস্ত, মাসের পরে হয় মাসকাবার। নদ, নদী, প্রান্তর, দুর্গম কান্তার, দূরারোহ গিরিদরি। ক্রোশের পর ক্রোশ—তবু যেন পথের শেষ নেই। ঋতুর পর ঋতু চলে যায়—কখনও অগ্নিবাণ হেনে, কখনও তুষার-বৃষ্টি করে—তবু পথিকরা শ্রান্ত নয়, তারা চলছে, চলছে চলছে। একটু শিথিল হয়নি তাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।

    অবশেষে পথের শেষ। এই তো কাশ্মীরের সীমান্ত!

    কাশ্মীরি রক্ষী সবিস্ময়ে দেখল, অদ্ভুত পোশাক-পরা একদল বিদেশিকে। শুধোল, ‘কে তোমরা?’

    —‘আমরা গৌড়বাসী।’

    —‘এদেশে এসেছ কেন?’

    —‘তীর্থ করতে।’

    —‘কোথায় যাবে?’

    —‘কাশ্মীরে সারদা দেবীর মন্দিরে পূজা দিতে।’ রক্ষী পথ ছেড়ে দিল।

    সরদার পরিচারক বলল, ‘আমরা পরিহাসপুরেও গিয়ে পরিহাসকেশবের মন্দির দেখব। সেখানে যাবার পথ কোন দিকে?’

    রক্ষী পথ বাতলে দিল।

    —‘মহারাজ ললিতাদিত্য এখন কোথায়?’

    —‘রাজ্যের বাইরে।’

    মনে-মনে হতাশ হয়েও সরদার মুখে কোনও ভাবই প্রকাশ করল না।

    তারা প্রবেশ করল পরিহাসপুরে।

    সরদার গম্ভীর স্বরে বলল, ‘সবাই ছদ্মবেশ খুলে ফ্যালো। অস্ত্র ধরো!’

    —‘তারপর আমরা কী করব?’

    —‘পরিহাসকেশবকে আক্রমণ করব।’

    —‘পরিহাসকেশব যে দেবতা!’

    —‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বিশ্বাসঘাতকের উপাস্য দেবতা! পরিহাসকেশবকেই মধ্যস্থ রেখে ললিতাদিত্য প্রতিজ্ঞা করেছিল, বঙ্গেশ্বরের গায়ে সে হাত দেবে না। তারপর সে যখন প্রতিজ্ঞা করতে উদ্যত হয়, পরিহাসকেশব কি তাকে নিরস্ত করতে পেরেছিলেন? ললিতাদিত্য রাজ্যের বাইরে, এত দূরে এসে আমরা কি ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাব? তার বদলে চাই আমরা পরিহাসকেশবকেই! যে দেবতাকে উপাসনা করে মানুষ এমন হীন, এমন বিশ্বাসঘাতক হতে পারে, আমরা সকলে মিলে আজ চূর্ণবিচূর্ণ করব সেই পঙ্গু, অপদার্থ দেবতাকে! ভাইসব! অস্ত্র ধরো, অস্ত্র ধরো!’

    পরিহাসকেশবের মন্দিরের পূজারিরা সভয়ে ও সবিস্ময়ে দেখলেন, একদল ভৈরব মূর্তি শূন্যে তরবারি নাচাতে নাচাতে ও বিকট স্বরে চিৎকার করতে করতে বেগে ছুটে আসছে—‘চূর্ণ করো, চূর্ণ করো, চূর্ণ করো পরিহাসকেশব!’

    প্রমাদ গুনে পুরোহিতরা মন্দিরের প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিলেন।

    বাঙালিরা তখন পর্যন্ত জানত না, কোনটি পরিহাসকেশবের মন্দির।

    সামনে পেলে তারা আর একটি জমকালো মন্দির, তার ভিতরে ছিল রামস্বামীর রৌপ্যনির্মিত বিগ্রহ। তাকেই পরিহাসকেশবের মূর্তি মনে করে তারা হইহই করে তার উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ল ক্রুদ্ধ শার্দূলের মতো। যারা বাধা দিতে এল, তারা হল হত কি আহত। তারপর খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে ধুলোয় লুটোতে লাগল রুপোয় গড়া মূর্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। রাজধানী থেকে খবর পেয়ে ছুটে এল কাতারে কাতারে কাশ্মীরি সৈনিক।

    সরদার পরিচারক নির্ভীক কণ্ঠে বলল, ‘আমরা বাংলার বীর। কারুর দয়া চাইব না, কারুকে দয়া করব না! আমরা অস্ত্র নিয়ে শত্রুসংহার করতে করতে সম্মুখ-যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন করব! ভাইসব, মারো আর মরো!’ নগণ্য বাঙালির দল, অগণ্য শত্রু-সৈন্য। এক-এক বাঙালি চেষ্টা করল একশো জনের মতো হতে, মরিয়া হয়ে সবাই লড়তে লাগল—বধ করল বহু শত্রুকে। তারপর শত্রুরক্তে প্লাবিত মৃত্তিকার উপর লুটিয়ে পড়ে একে একে করল শেষ নিশ্বাস ত্যাগ। কেউ পালিয়েও গেল না, কেউ প্রাণেও বাঁচল না।

    প্রায় চার শতাব্দী পরেও কল্হন দেখেছিলেন রামস্বামীর বিগ্রহহীন মন্দির এবং তখনও সারা কাশ্মীরে কথিত হত বঙ্গবীরদের অপূর্ব বীরত্ব।

  • উপন্যাসের চেয়ে আশ্চর্য

    উপন্যাসের চেয়ে আশ্চর্য

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    উপন্যাসের চেয়ে আশ্চর্য

    বন্দিনী রাজশ্রী! থানেশ্বরের রাজকন্যা রাজশ্রী,—সৌন্দর্যে অনুপমা, বিদ্যায় মূর্তিমতী সরস্বতী, স্বামী ছিলেন তাঁর রাজা গ্রহবর্মন! কিন্তু নিষ্ঠুর মালবরাজের হাতে আজ তাঁর স্বামী নিহত এবং তিনিও হয়েছেন বন্দিনী, তাঁর দুই কমল-চরণে কনক-নূপুরের পরিবর্তে বেজে উঠছে আজ লোহার শৃঙ্খল!

    এই দুঃখের খবর নিয়ে দূত এল ছুটে থানেশ্বরের রাজা রাজ্যবর্ধনের রাজসভায়।

    ভগ্নী রাজশ্রীকে কেবল রাজা রাজ্যবর্ধনই ভালোবাসতেন না, রাজকন্যা ছিলেন রাজ্যের সমস্ত প্রজার প্রাণের পুতলি। তখনই প্রস্তুত হল দশ হাজার অশ্বারোহী। তাদের পুরোভাগে রাজ্যবর্ধন ছুটলেন বন্দিনী রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে।

    কিছুদিন যায়। থানেশ্বরের সমস্ত প্রজা যখন তাদের রাজা ও রাজকন্যার প্রত্যাগমনের আশায় সাগ্রহে অপেক্ষা করছে, আবার এল তখন এক চরম দুঃখের খবর!

    রাজা রাজ্যবর্ধন মালবরাজকে যুদ্ধে পরাজিত করেছেন বটে, কিন্তু নিজেই নিহত হয়েছেন মালবরাজের বন্ধু ও বাংলার রাজা শশাঙ্কের হস্তে। এবং রাজকন্যা রাজশ্রী নিজের মান ও প্রাণ বাঁচাবার জন্যে পালিয়ে গিয়েছেন সুদূর বিন্ধ্য পাহাড়ের বিজন বনে।

    আজ থেকে প্রায় সাড়ে তেরো শত বৎসর আগে ভারতবর্ষে যখন এই বিচিত্র নাটকের অভিনয় চলছিল, তখন এদেশে মুসলমান দিগবিজয়ীরা দেখা দেননি; বিখ্যাত দিল্লি নগরের প্রতিষ্ঠা হয়নি; এমনকী আজ সূর্য-চন্দ্র-বংশধর খাঁটি ক্ষত্রিয় বলে যাঁরা মিথ্যা গর্ব করেন, সেই রাজপুতদের নাম পর্যন্ত কেউ শোনেনি।

    ভারতবর্ষের তখন অত্যন্ত দুর্দশা। কাব্যে বর্ণিত পৌরাণিক কুরুপাণ্ডবের কাহিনি তখনও লোকের মুখে মুখে ফিরছে, কিন্তু মহাভারত তখন অসভ্য হুনদের কবলে হয়ে পড়েছিল শক্তিহীন ও স্বাধীনতা-হারা! দক্ষিণ-ভারত তখনও তার নিজস্ব ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পেরেছিল বটে, কিন্তু সত্যিকার আর্যাবর্ত বলতে বোঝাত তখন বিন্ধ্য-গিরিশ্রেণির উপর অংশকে। এ-অংশে তখনও বহু ছোট ছোট হিন্দু রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল! কিন্তু সেসব স্থানে এমন কোনও মহাবীর ছিলেন না, সমগ্র আর্যাবর্তে যিনি একচ্ছত্র সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখতে পারেন!

    পৌরাণিক যুগের কথা ছেড়ে দি, কারণ কেউ তখন ভারতের ইতিহাস লেখেনি। তবে ভারতের প্রথম ঐতিহাসিক যুগে দেখতে পাই, পারসিক ও গ্রিকরা এসে তার বুক মাড়িয়ে চলছে আর এক চরম দুর্ভাগ্যের দিনে। তখন ভারতকে উদ্ধার করেছিলেন মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত এবং স্থাপন করেছিলেন এমন এক মহাসাম্রাজ্য, যার মাথার মুকুট ছিল হিন্দুকুশের শিখর এবং চরণের নূপুর ছিল মহাসাগরের নীল তরঙ্গদল। তারপর তাঁরই পৌত্র সম্রাট অশোকের সময়ে ভারতবর্ষ সভ্যতায়, একতায় ও মানব-ধর্মে উচ্চে উঠেছিল, আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোনও সাম্রাজ্যই তা ধারণায় আনতে পারেনি।

    কিন্তু তারপরেই এল আবার এক বিষম অন্ধ যুগ। মৌর্য সিংহাসনের দুর্বল অধিকারীদের হাত থেকে খসে পড়ল রাজদণ্ড এবং সেই অবসরে ভারতে প্রবেশ করল বর্বর শক দিগবিজয়ীরা। কিন্তু কিছুকাল পরে ভারতীয় সভ্যতা ও ধর্মের প্রভাবে এসে, শকরাও ভারতবাসীদের মধ্যে গণ্য হল এবং শক সম্রাট কনিষ্কও গ্রহণ করলেন অশোকের আদর্শ। তারপর রঙ্গমঞ্চ থেকে হল শকদের প্রস্থান এবং নানা জাতের যবন দিগবিজয়ীরা নানা দিক থেকে ভারতে ঢুকে আর্যাবর্তকে করে তুললে আর্যদের অযোগ্য। সেই সময়েই হল সমুদ্রগুপ্তের আবির্ভাব—ঐতিহাসিকদের কাছে যিনি ভারতের নেপোলিয়ন নামে বিখ্যাত। ভারতের উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমে জয়ধ্বজা তুলে আবার এক বিপুল সাম্রাজ্য স্থাপন করে হিন্দু সমুদ্রগুপ্ত অপূর্ব এক স্বর্ণযুগকে ফিরিয়ে আনলেন। সেই স্বর্ণযুগের পরমায়ু হয়েছিল প্রায় দুই শতাব্দী ব্যাপী। স্থাপত্যে, চিত্রে, ভাস্কর্যে; বিজ্ঞানে ও কাব্য-নাটকে হিন্দুর যা কিছু গর্বের ও গৌরবের, তার অধিকাংশেরই উত্তরাধিকারী হয়েছি আমরা গুপ্ত সম্রাটদের প্রসাদে! তারপর আবার হল ভারতের পতন।

    ভারত দু বার পড়েছে, দু বার উঠেছে। কিন্তু এবার তাকে তুলবে কে? হুনদের আক্রমণে ও অত্যাচারে জর্জরিত ও জীবন্মৃত ভারত এখন তারই পদধ্বনি শোনার আশায় দিন গুনছে।

    চলো, আবার থানেশ্বরে ফিরে যাই। এ হচ্ছে সেই থানেশ্বর যেখানে উঠেছিল কুরু-পাণ্ডবের মহাযুদ্ধে অস্ত্রে অস্ত্রে ঝঞ্ঝনা! কিন্তু থানেশ্বরের আজ বড়োই দুর্দিন। তার রাজা নিহত, রাজকন্যা বনবাসিনী, সিংহাসন শূন্য! মৃত রাজা বয়সে এমন নবীন ছিলেন যে, খুব সম্ভব পুত্রের পিতা হতে পারেননি। তাঁর এক ছোট ভাই আছেন নাম হর্ষবর্ধন, বয়স ষোলোর ভিতরে। কিন্তু তখনও অস্ত্রের চেয়ে শাস্ত্রের দিকে তাঁর প্রাণের টান এত বেশি ছিল যে, এই তরুণ বয়সেই রাজসভা ছেড়ে তিনি এক বৌদ্ধ মঠে আশ্রয় নেবার ব্যবস্থা করেছিলেন।

    এমন সময়ে এল দেশের ডাক, মন্ত্রীদের ডাক, প্রজাদের ডাক—ফিরে এসো রাজকুমার, ফিরে এসো! আমরা তোমাকে চাই, সিংহাসন তোমাকে চায়!

    হর্ষবর্ধন কিন্তু সহজে ফিরতে রাজি হলেন না, তাঁর মনে অঙ্কুরিত হয়েছে তখন বৈরাগ্যের বীজ। কিন্তু সকলের উপরোধ শেষ পর্যন্ত তিনি ঠেলতে পারলেন না। কথিত আছে, এই সময়ে তাঁর ধ্যানে আবির্ভূত হয়ে বুদ্ধদেব স্বয়ং তাঁকে প্রত্যাদেশ দিয়েছিলেন, ‘বৎস, তোমার জন্ম রাজধর্ম পালন করার জন্য। তুমি রাজ্য রক্ষা, রাজ্য বিস্তার করো, আমার আশীর্বাদে তুমি হবে ধরণীতে শ্রেষ্ঠ।’

    রাজ্যের ভার নিয়ে হর্ষবর্ধনের প্রথম কর্তব্য হল ভ্রাতৃহত্যাকারীকে শাস্তি দেওয়া ও ভগ্নী রাজশ্রীকে উদ্ধার করা। হত্যাকারী রাজা শশাঙ্ক কী শাস্তি পেয়েছিলেন, ইতিহাস সে সম্বন্ধে নীরব; তবে তিনি যে নিজের রাজ্য বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন, এমন প্রমাণ আছে—এবং কিছুকাল পরে তাঁর রাজ্যও হর্ষবর্ধনের হস্তগত হয়।

    কিন্তু রাজশ্রী কোথায়? বোনের খোঁজে হর্ষবর্ধন ঘুরে বেড়াতে লাগলেন বনে বনে। শেষে বনবাসী অসভ্যদের কাছ থেকে খোঁজখবর নিয়ে অনেক চেষ্টার পর তিনি যখন যথাস্থানে গিয়ে হাজির হলেন, সকল আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে রাজশ্রী তখন প্রস্তুত হচ্ছিলেন চিতায় উঠে আত্মহত্যা করবার জন্যে!

    রাজধর্মের এমনি গুণ, শান্তিপ্রিয় সন্ন্যাসীকে দু দিনেই সে করে তুললে দিগবিজয়ী ক্ষত্রিয়! প্রথমে হর্ষবর্ধনের অধীনে ছিল পাঁচ হাজার রণহস্তী, বিশ হাজার অশ্বারোহী ও পঞ্চাশ হাজার পদাতিক। এই ফৌজ নিয়েই তিনি বিরাট আর্যাবর্তকে একচ্ছত্রাধীন করবার জন্যে বেরিয়ে এলেন অসীম সাহসে! কোথাও ছোট বা বড় হিন্দু বা বৌদ্ধ রাজা, কোথাও যবন শক হুন রাজা, কোথাও অসভ্য বর্বর রাজা—তাঁর উদ্যত তরবারির তলায় সকলেই মাথা নোয়াতে বাধ্য হল একে একে! কেউ যুদ্ধ করে হেরে গেল, কেউ প্রাণ দিলে, কেউ পলায়ন করলে, কেউ মানে মানে বশ মানলে। কখনও পাঞ্জাবে, কখনও বিহারে, কখনও বাংলায় এবং কখনও উৎকলে রুদ্রমূর্তিধারী হর্ষবর্ধন ছুটে বেড়াতে লাগলেন, সসৈন্যে, বিদ্রোহীদের রক্তস্রোতে পৃথিবীকে রাঙা করে! প্রায় ছয় বৎসরের মধ্যে উত্তর, পশ্চিম ও পূর্ব-ভারতের অধিকাংশ রাজ্য হল তাঁর করতলগত—আর্যাবর্তে হল শেষ হিন্দু সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা! তখন তাঁর সৈন্যবাহিনীও এমন বিপুল হয়ে উঠেছে যে, ইচ্ছা করলেই তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে ডেকে আনতে পারেন ষাট হাজার রণহস্তী ও এক লক্ষ অশ্বারোহীকে!

    তারপর হর্ষবর্ধন খুলে ফেললেন তাঁর যুদ্ধবেশ এবং সিংহাসনে গিয়ে বসলেন রাজ্যশাসন ও প্রজাপালন করবার জন্যে। সে-সময়ে তাঁর প্রধান পরামর্শদাত্রী হলেন বিদুষী রাজকন্যা রাজশ্রী। যথার্থ হিন্দু ভারতবর্ষে বিধবা হলেও যে নারীর জীবন ব্যর্থ হয়ে যেত না এবং কঠিন রাজনীতিতেও যে পুরুষের পাশে ছিল নারীর স্থান, এইটেই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

    দিগবিজয়ের পরে সম্রাট হর্ষবর্ধন সুদীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বৎসরকাল রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর রাজত্বের বড় বড় সব কথাই প্রায় জানা গিয়েছে প্রধানত দুটি কারণে। তাঁরই শাসনকালে বিখ্যাত চৈনিক ভ্রমণকারী হিউয়েন-সাঙ ভারত-ভ্রমণে এসেছিলেন। একটানা পনেরো বৎসরকাল ভারতে থেকে, তিনি এখানকার রাজ্য, সমাজ, ধর্ম ও আচার-ব্যবহার সম্পর্কীয় সমস্ত বিবরণ লিখে রেখে গিয়েছেন। তার উপরে হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণ-রচিত ‘হর্ষ-চরিত’ ও হচ্ছে ঐতিহাসিকের আর একটি বড় অবলম্বন।

    শেষ পর্যন্ত হর্ষবর্ধন তাঁর সাম্রাজ্য অধিকতর বিস্তৃত করতে ক্ষান্ত হননি। মালব, নেপাল, গুজরাট ও সুরাষ্ট্রও হয়েছিল তাঁর হস্তগত, আসাম বা কামরূপের শাসনকর্তা ছিলেন তাঁর করদ রাজা। কেবল আর্যাবর্তের বাইরে দাক্ষিণাত্যের উপরে তাঁর প্রভাব ছিল না। ওদিকে রাজ্যবিস্তার করতে গিয়ে তিনি চালুক্য-বংশীয় রাজা দ্বিতীয় পুলকেসিনের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। তারপর থেকে নর্মদা নদীই হয় উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের সীমা।

    হিউয়েন-সাঙ এর কাহিনি থেকে জানা যায়, হর্ষের রাজত্বে অপরাধীর সংখ্যা বেশি ছিল না। কিন্তু সেকালে ছেলে বাপের বাধ্য না হলে, কোনও লোক অসাধুতা বা নীতিহীন ব্যবহার করলে, তাদের নাক-কান কেটে নিয়ে শহরের বাইরে বনে-জঙ্গলে তাড়িয়ে দিয়ে আসা হত এবং অন্য কেহও তাদের আশ্রয় দিত না।

    সাধারণ প্রজারা সুখে-স্বচ্ছন্দে কালযাপন করত। ব্যবসা-বাণিজ্যে তারা লোক ঠকাত না, বিশ্বাসঘাতকতা করত না এবং অঙ্গীকার রক্ষা করত। তাদের ব্যবহারও ছিল বিনীত, মিষ্টি ও ভদ্র। ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণরা ছিলেন খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। প্রজাদের অধিকাংশই খালি পায়ে হাঁটত, অনেকে আবার পায়ে পরত ‘স্যান্ডাল’।

    শহরে ও মফসসলে পথিক, রোগী ও দরিদ্রদের জন্যে বহু ধর্মশালা ছিল। সেখানে আশ্রয় নিলে পথশ্রান্তরা পেত বিশ্রামের সুযোগ, ক্ষুধার্তরা পেত বিনামূল্যে আহার্য, রোগীরা পেত ঔষধ-পথ্য ও চিকিৎসকের সাহায্য। সাম্রাজ্যের সর্বত্রই ছিল সুশিক্ষার জন্যে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা।

    সম্রাট হর্ষ বিশেষরূপে কোনও ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায় না। তবে তিনি সূর্য, শিব ও বুদ্ধদেবের উপাসনা করতেন এবং তাঁর প্রত্যেক উপাস্যের জন্যে সাম্রাজ্যের নানাস্থানে বহু মন্দির বা মঠ স্থাপন করেছিলেন। শেষ বয়সে বৌদ্ধধর্মের উপরে তাঁর টান এত বেড়ে ওঠে যে, ব্রাহ্মণরা গুপ্তঘাতক পাঠিয়ে তাঁকে হত্যা করবার চেষ্টা করে।

    কিন্তু কেবল দিগবিজয়ী, সম্রাট, সুশাসক ও ধার্মিক রূপেই হর্ষবর্ধন পৃথিবীর বিস্মিত দৃষ্টি আকর্ষণ করেন না, সংস্কৃত সাহিত্যে তিনি একজন অমর গ্রন্থকাররূপেও সুপরিচিত। তোমরা নিশ্চয়ই ‘রত্নাবলী’, ‘নাগানন্দ’ ও ‘প্রিয়দর্শিকা’র বিখ্যাত নাট্যকার কবি শ্রীহর্ষের নাম শুনেছ? কবি শ্রীহর্ষ ও সম্রাট হর্ষবর্ধন একই ব্যক্তি। এক কথায় বলতে গেলে, সম্রাট হর্ষবর্ধন কেবল স্বাধীন হিন্দু সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। তাঁর মতো গুণী লোক পৃথিবীর রাজকুলে দুর্লভ।

    একবার হত্যাকারীর ছুরি থেকে বেঁচে গিয়েও শেষ পর্যন্ত হর্ষবর্ধন আত্মরক্ষা করতে পারলেন না। বৌদ্ধধর্মের প্রতি অতি-ভক্তি দেখাবার জন্যে তিনি হিন্দু প্রজাদের অনেক দাবিই অগ্রাহ্য করতে লাগলেন। ফলে হিন্দুরা যে খুশি হল না, সে কথা বলাই বাহুল্য।

    হর্ষের এক মন্ত্রী ছিল, তার নাম অর্জুন বা অরুণাশ্ব। ভারতবর্ষের গৌরবের যুগেও যে এখানে প্রথম শ্রেণির দুরাত্মার অভাব হয়নি, ওই অর্জুনই তার প্রমাণ। প্রজাদের বিরক্তির সুযোগ নিয়ে একদিন সে ভারতের হিন্দু-সাম্রাজ্যের শেষ প্রতিষ্ঠাতা এবং কবি ও কলাবিদ সম্রাট হর্ষকে হত্যা করলে (৬৪৬ বা ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে)।

    মুকুট দাবি করতে পারে রাজবংশের এমন কেউ নেই, কারণ, সম্রাট হর্ষ পুত্রহীন। পাপী অর্জুন এ সুযোগ ছাড়লে না, নিজেই সিংহাসনের উপরে গিয়ে জাঁকিয়ে বসল।

    কিন্তু এই বিরাট সাম্রাজ্যের কর্ণধার হবার মতন যোগ্যতা ছিল না অর্জুনের। দুদিন যেতে-না-যেতেই অর্জুনের অত্যাচারে চারিদিকে উঠল মহা হাহাকার, রাজ্য প্রায় অরাজক! সম্রাট হর্ষবর্ধনের তরবারি ধারণ করতে পারে এমন সবল বাহুর অভাব, রাজ-ভাণ্ডার লুণ্ঠিত। কর্মচারীরা মাহিনা পায় না, শ্রেষ্ঠ সৈন্যরা পলাতক, সাম্রাজ্য খণ্ড-বিখণ্ড, অনেক সামন্ত রাজা করলেন বিদ্রোহ ঘোষণা! প্রজারা বুঝলেন—অর্জুন রক্ষক নয়, ভক্ষক! কিন্তু বুঝেও তখন আর অনুতাপ করা ছাড়া উপায়ান্তর ছিল না।

  • মরণ বিজয়ীর দল

    মরণ বিজয়ীর দল

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    মরণ বিজয়ীর দল

    রবীন্দ্রনাথের মুখে তোমরা বন্দিবীর বান্দার অপূর্ব কাহিনি শ্রবণ করেছ। চিত্তোত্তেজক গল্পের দিক দিয়ে ধরলে, ও গাথাটির তুলনা নেই।

    কিন্তু এখানে সাধারণ পাঠকের কথা ছেড়ে দিচ্ছি। কারণ আমরা বলব ইতিহাসের কথা এবং রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটি পাঠ করলে ঐতিহাসিকেরা খুব বেশি বোধ করি অভিভূত হবেন না।

    বান্দা যে জাতির জন্যে, ধর্মের জন্যে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন, সে কথা কেহই অস্বীকার করতে পারবেন না। কিন্তু মোগল সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে মুসলমান নরনারী—এমনকী অজাত শিশুর উপরে তিনি যেসব অকথ্য, অমানুষিক ও পৈশাচিক অত্যাচার করেছিলেন, ইতিহাসে তা স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে। অধিকন্তু বান্দার অনুচরদের কবল থেকে বহু হিন্দুও মুক্তিলাভ করতে পারেননি। এইসব কথা মনে করলে বান্দার প্রতি আমাদের সহানুভূতি যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বলতে ইচ্ছা হয় যে, বান্দা একজন সাধারণ অপরাধী ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না।

    রবীন্দ্রনাথের কবিতায় উজ্জ্বল ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে, বান্দা কেমন করে স্বহস্তে নিজের পুত্রকে বধ করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, বান্দা স্বহস্তে পুত্রহত্যা করেননি। ব্যাপারটা হয়েছিল আরও মর্মন্তুদ, আরও ভয়ানক।

    বধ্যভূমিতে (দিল্লির কুতুব মিনারের সামনে) বন্দি বান্দার কোলে তার তিন বছরের ছেলেকে তুলে দিয়ে বলা হল, ‘একে হত্যা কর।’

    বান্দা হুকুম গ্রাহ্য করলেন না। এমন হুকুম তামিল করতে পারে না কোনও পিতাই।

    ঘাতক তখন এক সুদীর্ঘ ছুরিকার আঘাতে শিশুকে হত্যা করলে এবং তার উদরের ভিতর থেকে যকৃৎ টেনে বের করে বান্দার মুখের ভিতরে ঢুকিয়ে দিলে।

    তারপর বিষম যন্ত্রণা দিয়ে একে-একে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নিয়ে বান্দাকেও হত্যা করা হল।

    কয়েক বৎসর ধরে পাঞ্জাবের দিকে-দিকে বিদ্রোহের ধ্বজা তুলে রাজশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের পর যুদ্ধ করে বান্দা শেষটা সদলবলে বন্দি হলেন গুরুদাসপুর গড়ে (১৭১৫ খ্রিঃ)। দীর্ঘ ছয় বৎসর ধরে যে বিদ্রোহী মোগল সম্রাটের বিপুল জনবল ও অর্থবল ব্যর্থ করে এসেছিলেন, তাঁর ভাণ্ডার লুণ্ঠন করে পাওয়া গেল মাত্র ১,০০০ তরবারি, ২৭৮ ঢাল, ১৭৩ ধনুক, ১৮০ বন্দুক, ১১৪ ছোরা, ২১৭ লম্বা ছুরি, খানকয় সোনার গহনা, ২৩টি মোহর ও কিছুবেশি ৬০০ টাকা। গুরদাসপুর গড়ও মোগলরা গায়ের জোরে কেড়ে নিতে পারেনি, কেবল নির্জল উপবাসের যন্ত্রণা সইতে না পেরেই শিখেরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল। কোনও কোনও ঐতিহাসিক বলেন, দুর্গের মধ্যে অবরুদ্ধ শিখদের দুর্দশা এমন চরমে উঠেছিল যে, অনেকে নাকি অন্য খাদ্যের অভাবে আপন-আপন উরু থেকে মাংস কেটে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে তারই সাহায্যে করেছিল উদরপূর্তি।

    গুরুদাসপুর গড়ের পতনের পর যে নাটকীয় দৃশ্যের অভিনয় হয় এবং শিখদের যে অলৌকিক বীরত্বের পরিচয় পাওয়া যায়, তা নিয়ে একাধিক বিচিত্র কাব্য রচনা করা যেতে পারে। কিন্তু আমি এখানে কবিতা কিংবা অত্যুক্তির আশ্রয় গ্রহণ করব না। সাদাসিধে ভাষায় সোজাসুজি মূল ঘটনাগুলি বর্ণনা করে যাব। দেখবেন তার ভিতরেই অসাধারণ রূপ ফুটে উঠে হৃদয়কে অভিভূত করে দেবে।

    অগুনতি শিখকে হত্যা করা হল। সাতশত চল্লিশ জন শিখ হল বন্দি। দিল্লির রাজদরবার থেকে হুকুম এল—ছত্রপতি শিবাজীর পুত্র রাজা শম্ভুজীকে বন্দি করে যেভাবে রাজধানীতে নিয়ে আসা হয়েছিল, বান্দা ও তাঁর অনুচরদেরও সেইভাবে দিল্লিতে নিয়ে আসতে হবে।

    নির্দিষ্ট দিনে দিল্লি দুর্গের লাহোরী ফটক থেকে আমারাহাদ পর্যন্ত কয়েক মাইল-ব্যাপী পথের দুইধার জুড়ে দাঁড়াল অস্ত্রধারী সৈনিক। এবং পথের উপর ভেঙে পড়ল বিপুল জনতা-সাগরের তরঙ্গের পর তরঙ্গ।

    প্রথমেই দেখা গেল, হাতির উপরে লোহার খাঁচা এবং তার ভিতরে বন্দি বান্দা। অঙ্গে তাঁর স্বর্ণখচিত সমুজ্জ্বল ও বহুমূল্য পোশাক। পিছনে দাঁড়িয়ে লৌহবর্মধারী মোগল সেনানী, হাতে তার নগ্ন তরবারি। বান্দার হাতির সুমুখে দেখা যাচ্ছে শত-শত বংশদণ্ডের উপরে নিহত শিখ যোদ্ধাদের ছিন্ন মুণ্ড তাদের লম্বা চুলগুলো মুখের উপরে পড়ে দুলছে ঝালরের মত।

    বান্দার হাতির পিছনে পিছনে আসছে দলে দলে উট। প্রত্যেক উটের উপরে বসে আছে দুজন করে শিখ বন্দি। তাদের পরিয়ে দেওয়া হয়েছে বিসদৃশ পোশাক, অনেককে দেখতে হয়েছে পশুর মতো।

    জনতার মধ্যে জাগল ঘন ঘন জয়ধ্বনি। বন্দিদের লক্ষ্য করে অনেকে টিটকারি দিতে লাগল। কিন্তু বন্দিরা তা শুনে বিচলিত হল না। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তারা কেউ ভীত-ভাব প্রকাশ করলে না, বরং অনেকের মুখ দেখলে মনে হয় যেন তারা সানন্দে চলেছে কোন উৎসব-সভার দিকে।

    কেউ ঠাট্টা করলে তারা নির্ভয়ে পালটা জবাব দিতেও ছাড়লে না। কেউ তাদের ‘খুন করব’ বলে ভয় দেখালে তারা বলে, ‘মারো, আমাদের মেরে ফেল, মৃত্যুকে আমরা ভয় করব কেন? কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণা সইতে না পেরেই আমরা তোমাদের হাতে ধরা দিয়েছি। আমাদের সাহস আর বীরত্ব কি তোমরা জান না?’

    স্থির হল প্রতিদিন একশো জন করে বন্দিকে বধ করা হবে।

    বধ্যভূমিতে দর্শকদের দলে উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন ইউরোপীয় ভদ্রলোকও। সকলেই বলেন, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও শিখ বন্দিরা যে ধীরতা, দৃঢ়তা ও বীরত্বের পরিচয় দিলে, তা বিস্ময়কর!

    বন্দিদের বলা হল, ‘জীবন ভিক্ষা চাও তো মুসলমান হও!’

    প্রত্যেক বন্দি এককণ্ঠে বললে, ‘মুণ্ড দেব, ধর্ম দেব না।’

    তাদের কারোর এতটুকু মৃত্যুভয় নেই, ঘাতককে ডাকতে লাগল ‘মুক্তিদাতা’ বলে। সকলে মহা আনন্দে ঘাতকের সামনে ছুটে গিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘মুক্তিদাতা, আগে আমাকে হত্যা কর!’

    সাড়ে সাতশত শিখ বন্দি। প্রতিদিন নিয়মিতভাবে তরবারি শূন্যে ওঠে চকমকিয়ে এবং পরমুহূর্তে নীচে নেমে উড়িয়ে দেয় এক এক বীরের মুণ্ড। কাটতে কাটতে তরবারি ভোঁতা হয়ে যায়, আবার তাকে শানিয়ে নিতে হয়। সাতশত চল্লিশজন বন্দির ভিতর থেকে একজনও মৃত্যুভীত কাপুরুষকে পাওয়া গেল না। সাতশত চল্লিশ মহাবীর একে একে মুণ্ড দিলে, ধর্ম দিলে না। সাতশত চল্লিশ মহাবীরের রক্ত শোষণ করে বধ্যভূমি হয়ে উঠল বীরভূমি।

    বান্দা তো দলের নেতা, সব দিক বুঝে প্রস্তুত হয়েই তিনি ধারণ করেছিলেন বিদ্রোহের পতাকা। কিন্তু এই সাতশত চল্লিশ জন শিখ, এদের অধিকাংশই সাধারণ লোক—অনেকেই হয়তো নিরক্ষর ও চাষাভুষো শ্রেণির। তবু ওদের কেউ ধর্মের বিনিময়ে জীবন ভিক্ষা করলে না। বান্দার মৃত্যুর চেয়েও তাদের আত্মদান অধিকতর গৌরবময়।

    প্রতিদিনই উচ্চ হয়ে ওঠে মৃতদেহের স্তূপ। মৃত্যুর পরেও বীরদেহগুলির স্তূপ নগরের বাইরে চালান করা হল। তারপর প্রত্যেক দেহকে ঝুলিয়ে দেওয়া হল গাছের ডালে।

    কিন্তু এর চেয়েও স্মরণীয় ঘটনা আছে। আমরা মরণের ভয়ের কথাই জানি, মরণের আনন্দের কথা বড় একটা শোনা যায় না। আজীবন প্রাণ বাঁচাতে বাঁচাতেই আমাদের প্রাণান্ত হয়, জীবনকে ঘৃণা করবার ও মরণকে ভালোবাসবার আশ্চর্য সুযোগ হয় কয়জনের?

    কুতব-উল-মুল্ক ছিলেন তখন ভারত সম্রাটের উজির। তিনি হচ্ছেন সেই ইতিহাস-বিখ্যাত সৈয়দ ভ্রাতৃযুগলের অন্যতম—যাদের প্রভাবে বা কৃপা কটাক্ষে ময়ূর সিংহাসনের উপর বসেছেন সম্রাটের পর সম্রাট। কুতব-উল-মুল্কের হিন্দু দেওয়ানের নাম রতনচাঁদ। তিনি উজিরের বিশেষ প্রিয়পাত্র।

    এক নারী রতনচাঁদের কাছে গিয়ে ধরনা দিয়ে পড়ল।

    নারী বললে, ‘হুজুর, আমি অসহায় বিধবা। আমাকে দয়া করুন।’

    রতনচাঁদ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে তুমি?’

    ‘আমি এক বালক শিখ-বন্দির মা।’

    ‘আমার কাছে এসেছ কেন?’

    ‘আমার বালক পুত্রের উপর প্রাণদণ্ডের হুকুম হয়েছে। ওই ছেলেটি ছাড়া এই দুনিয়ায় আমাকে আর দেখবার লোক কেউ নেই। সে মারা পড়লে আমার কী গতি হবে হুজুর!’

    ‘তোমার ছেলেকে বাঁচাবার ক্ষমতা আমার নেই। সে বালক হতে পারে, কিন্তু রাজবিদ্রোহী।’

    ‘হুজুর, আমার ছেলে রাজবিদ্রোহী নয়। এমনকী সে গুরু বান্দার শিষ্যও নয়। তার বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ মিথ্যা। তাকে ভুল করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হুজুর, তাকে রক্ষা করে এই অনাথাকে রক্ষা করুন!’

    অবশেষে মায়ের সেই করুণ ক্রন্দন আর সহ্য করতে না পেরে দেওয়ান রতনচাঁদ তার আরজি নিয়ে গেলেন উজিরের কাছে। প্রিয় পাত্রের অনুরোধ এড়াতে না পেরে কুতব-উল-মুল্ক সেই বিধবা নারীর বালক-পুত্রকে জীবন ভিক্ষা দিলেন।

    বেচারা মা আনন্দের অশ্রুজল ফেলতে ফেলতে উজিরের আদেশপত্র নিয়ে ছুটল কোতোয়ালের কাছে।

    বন্দিকে কারাগারের বাইরে এনে কোতোয়াল বললে, ‘তুমি মুক্ত।’

    বালক সবিস্ময়ে বললে, ‘আমি মুক্ত? না না, এ অসম্ভব।’

    তার মা কাছে এগিয়ে এসে বললে, ‘হ্যাঁ বাছা, তুমি মুক্ত। তুমি তো বিদ্রোহী গুরুর শিষ্য নও, তাই আমার কথা শুনে উজিরমশাই তোমায় ছেড়ে দিয়েছেন?’

    ভয়াবহ মৃত্যুকে পিছনে রেখে সামনে এসে দাঁড়াল নবযৌবনের উদ্দাম জীবন। নতুন আশায় উচ্ছ্বসিত জননীর স্নেহ-হাসিমাখা মুখ। কিন্তু সেদিকে না তাকিয়ে প্রাণপণে হৃদয়ের আবেগ দমন করে বালক কঠিনস্বরে কোতোয়ালকে জিজ্ঞাসা করলে, ‘কে এই নারী?’

    কোনও জননীর সামনে কোনও পুত্রের মুখে এমন নিষ্ঠুর কথা বোধহয় কখনও উচ্চারিত হয়নি। মা তো একেবারে অবাক! হয়ত ভাবলেন, জেলখানায় গিয়ে মৃত্যুভয়ে ছেলের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে।

    কোতোয়াল বিস্মিত কণ্ঠে বললে, ‘সেকী, ইনি যে তোমার মা!’

    বালক অবিচলিত কণ্ঠে বললে, ‘না, এই নারীকে আমি চিনি না।’

    ‘ইনি তোমার মা নন?’

    ‘ইনি কী চান তাও আমি জানি না। এঁর কথা সত্যি নয়। আমি বিদ্রোহী, আমি গুরুজির শিষ্য। গুরুজির সঙ্গে আমিও প্রাণ দিতে চাই। জয়, গুরুজির জয়।’

    বালক জীবন-ভিক্ষা নিলে না, জীবন দান করলে।

    পৃথিবীর কোনও দেশের ইতিহাসে আছে এর চেয়ে অদ্ভুত কাহিনি?

  • ছত্রপতির ছত্রভঙ্গ

    ছত্রপতির ছত্রভঙ্গ

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    ছত্রপতির ছত্রভঙ্গ : পূর্বাভাষ

    ছত্রপতি কে? যিনি সম্রাট, বা রাজ চক্রবর্তী, বা মহারাজাধিরাজ।

    সম্রাট হর্ষবর্ধন যে নিজেকে ‘মহারাজাধিরাজ’ বলে মনে করতেন, তার প্রমাণস্বরূপ তাঁর স্বাক্ষর অদ্যাবধি বর্তমান আছে।

    ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, তবু নিধিরাম নিজেকে ‘সর্দার’ মনে করত বলে একটা ঠাট্টার কথা শুনি। ওই নিধিরামের মতো একালের কোনও কোনও খেতাবি ধনীও নিজেকে ‘মহারাজাধিরাজ’ বলে প্রচার করতে লজ্জিত হন না। অভিধানকেও ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে চান।

    ভারতের প্রথম ছত্রপতি কে?

    প্রশ্নের উত্তর খোঁজবার জন্যে কেউ যেন রামায়ণ বা মহাভারতের দিকে দৃষ্টিপাত না করেন। রামায়ণ ও মহাভারত মহাকাব্য হলেও ইতিহাস নয়। তাদের মধ্যে ইতিহাসের মাল-মশলা থাকতে পারে, কিন্তু সেগুলির সাহায্যে প্রামাণিক ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হতে পারে না।

    সাল ও তারিখ না পেলে এবং সত্য ও প্রামাণিক তথ্যের দ্বারা বিশেষজ্ঞরা বিচার না করলে ইতিহাস রচিত হয় না। প্রাচীন হিন্দুরা সাল-তারিখ নিয়ে মাথা ঘামায়নি আদৌ। নিরঙ্কুশ কবির কল্পনাও তাদের কাছে ইতিহাস বলে স্বীকৃত হয়েছিল।

    খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীকেই সাধারণত ঐতিহাসিক যুগের আরম্ভ বলে ধরা হয়। ওই সময়ের অল্পস্বল্প যা জানা গেছে তার উপর নির্ভর করে বলা চলে যে, ষোলোটি রাজ্য নিয়ে আর্যাবর্ত বা উত্তর ভারতবর্ষ গঠিত হয়েছিল।

    দাক্ষিণাত্যে নয়, আর্যাবর্তে যিনি প্রধান হতে পারতেন, তাঁকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বা সম্রাট বা ছত্রপতি বলে স্বীকার করা হত। দাক্ষিণাত্য ও আর্যাবর্তকে আলাদা করে রেখেছিল প্রধানত বিন্ধ্য শৈলশ্রেণি।

    কিন্তু তখনও ভারতে কেউ ছত্রপতি বা সম্রাট বলে পরিচিত হননি।

    বুদ্ধদেবের জীবনচরিতে বা বৌদ্ধ জাতকে আর্যাবর্তের একাধিক শক্তিশালী নরপতির সঙ্গে পরিচয় হয়। তাঁদের কেউ ‘ছত্রপতি’ বলে মানত না। প্রাদেশিক রাজার দল পরস্পরের সঙ্গে মারামারি কাটাকাটি নিয়েই ব্যস্ত হয়ে থাকতেন, ছত্রপতি হওয়ার শক্তি বা অবসর তাঁদের ছিল না।

    সত্যিকথা বলতে কী, তখনও ভারতে যথার্থ ঐতিহাসিক যুগ আসেনি।

    গ্রিক দিগবিজয়ী আলোকজান্ডার দি গ্রেট-এর ভারত আক্রমণের ফলেই খুলে যায় এখানে ইতিহাসের বদ্ধ দ্বার। এ হচ্ছে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর কথা। পঞ্চনদের সৈন্যরা রণক্ষেত্রে পরাজিত হল বটে, কিন্তু আর একদিক দিয়ে ভারতের হল পরম লাভ। সে নিজেকে খুঁজে পেলে ইতিহাসের আলোকে।

    ভারতের প্রত্যন্ত দেশে আলেকজান্ডারের শিবিরে যখন যুদ্ধের উদ্যোগপর্ব চলছে, সেই সময়ে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন এক পঁচিশ বৎসর বয়স্ক তরুণ ভারতীয় যুবক—তিনি গ্রিক নরপতির সঙ্গে দেখা করতে চান।

    যথাসময়ে দেখা হল। আলেকজান্ডার শুধোলেন, ‘কে তুমি?’

    উত্তর হল, ‘আমি মৌর্যবংশীয় এক রাজপুত্র, নাম চন্দ্রগুপ্ত।’

    ‘আমার কাছে কী দরকার?’

    ‘আপনাকে সাহায্য করতে চাই।’

    ‘কীরকম সাহায্য?’

    ‘ভারতের প্রধান নরপতি হচ্ছেন মগধের অধীশ্বর মহাপদ্ম নন্দ। তাঁকে জয় করতে না পারলে ভারত জয় করা অসম্ভব। তিনি ভীষণ অত্যাচারী, তাঁরই জন্যে আমি আজ নির্বাসন দণ্ড ভোগ করছি। প্রজারাও তাঁকে ঘৃণা করে, তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে চায়। আমি, সেখানে আপনাকে নিয়ে যেতে, তাঁকে আক্রমণ করবার সমস্ত অন্ধিসন্ধি বলে দিতে এসেছি।’

    বুদ্ধিমান আলেকজান্ডার বুঝলেন, এই সুচতুর যুবক তাঁর সাহায্যে মগধ রাজ্য জয় করতে চায়। তিনি বললেন, ‘আপনার সাহায্য আমার দরকার হবে না। আমি নিজেই মগধ রাজ্য জয় করতে পারব।’

    হতাশ হয়ে চন্দ্রগুপ্ত ফিরে এলেন বটে, কিন্তু ইতিমধ্যেই তাঁর সন্ধানী দৃষ্টি গ্রিক ফৌজের অনেক বিশেষত্ব আবিষ্কার করতে ভুললে না।

  • জগন্নাথদেবের গুপ্তকথা

    জগন্নাথদেবের গুপ্তকথা

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    জগন্নাথদেবের গুপ্তকথা

    কলিঙ্গ, উৎকল, উড়িষ্যা—একই দেশের তিনটি নাম।

    কলিঙ্গ অতি প্রাচীন ও ইতিহাস-প্রসিদ্ধ স্থান এবং বিশেষ করে সম্রাট অশোকের জন্যে তার নাম হয়ে থাকবে চিরস্মরণীয়। কলিঙ্গ নিজের বুকের রক্ত ঢেলে সম্রাট অশোকের রক্তপিপাসা দূর করেছিল। কলিঙ্গের রণক্ষেত্রে রক্তসাগরের ঢেউ দেখে অশোকের মনে এমন তীব্র অনুতাপের উদয় হয়েছিল যে, জীবনে আর কোনওদিন তিনি অস্ত্রধারণ করেননি। বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়ে গ্রহণ করেন তিনি অহিংসামন্ত্র এবং তাঁর বিপুল সাম্রাজ্যে নিষিদ্ধ হয় জীবহত্যা। বিলাতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক এইচ. জি. ওয়েলস সাহেব বলেন, সারা পৃথিবীর ইতিহাস খুঁজলেও এমন আর একটি দৃষ্টান্তও সংগ্রহ করা অসম্ভব।

    উড়িষ্যার পুরী শহরের নাম তোমরা সকলেই শুনেছ। এরও আর দুটি নাম আছে—নীলাচল ও শ্রীক্ষেত্র। লোকে এখানে দুটি জিনিস সঞ্চয় করতে আসে—পুণ্য ও স্বাস্থ্য। এখানকার প্রধান দ্রষ্টব্যও হচ্ছে দুটি—প্রকৃতির হাতেগড়া সমুদ্র এবং মানুষের হাতেগড়া জগন্নাথদেবের মন্দির। এই দুটি দ্রষ্টব্যই তাদের বিশালতায় ও সৌন্দর্য্যের ঐশ্বর্যে মনকে একেবারে অভিভূত করে দেয়। অধিকাংশ বাঙালির মতো আমিও জীবনে প্রথম সমুদ্র দেখেছিলুম পুরীধামে গিয়ে। সে এক আশ্চর্য অনুভূতি! জগন্নাদেবের মন্দির দেখেও কম বিস্মিত হইনি, কারণ তার আগে আর কখনও দেখিনি অমন মেঘচুম্বী মন্দির!

    জগন্নাথের মন্দির ও সমুদ্রের মাঝখানে শহরের অসংখ্য ঘরবাড়ির ব্যবধান। কিন্তু মন্দির সর্বদাই দেখতে পায় নীলসাগরকে এবং সমুদ্রের সামনেও সর্বদাই বিরাজ করছে ওই মহামন্দির, তার নীলাব্জনীল স্বচ্ছ জলে নৌকা ভাসালে তোমরাও স্বচক্ষে তা দেখতে পাবে! সে এক বিচিত্র দৃশ্য! প্রকৃতির সৃষ্টি ও মানুষের সৃষ্টি যেন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে সবিস্ময়ে।

    গঙ্গাবংশীয় অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গা সুদীর্ঘ একাত্তর বৎসর কাল রাজত্ব করেছিলেন—অর্থাৎ ১০৭৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এতদিন রাজত্ব করবার সৌভাগ্য পৃথিবীর আর কোনও রাজার হয়েছে কিনা জানি না। এই অনন্তবর্মণ ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাশালী নৃপতি, তাঁর বিশাল রাজ্য বিস্তৃত ছিল গঙ্গাতীর থেকে গোদাবরীর তীর পর্যন্ত। তাঁরই আদেশে জগন্নাথের মন্দির নির্মিত হয়।

    স্থাপত্যের জন্যে বিখ্যাত হলেও এই মন্দির ভাস্কর্যের জন্যে খ্যাতি অর্জন করতে পারেনি। অথচ শুনতে পাই, জগন্নাথের মন্দিরের গায়েও ভাস্করের হাতে খোদা কারুকার্য আছে, কিন্তু বিশেষ কোনও কারণে সে সব নাকি চূর্ণ-বালির প্রলেপ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। পুরীর মন্দির তোমরা অনেকেই দেখেছ, সুতরাং এখানে তার বর্ণনা না দিলেও চলবে।

    জগন্নাথদেবের মহিমায় পুরী আজ সমগ্র হিন্দু-জাতির তীর্থ হয়ে উঠেছে বটে, কিন্তু আসলে তিনি যে খাঁটি হিন্দু দেবতা, ঐতিহাসিকরা তা স্বীকার করেন না।

    জগন্নাথদেবের গুপ্তকথা

    সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক হওয়ার পর থেকেই ভারতবর্ষে ওই ধর্মের প্রভাব ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। শকজাতীয় সম্রাট কণিষ্কও বৌদ্ধধর্মাবলম্বী হয়ে বৌদ্ধদের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে তোলেন।

    সম্রাট অশোকের সময়ে বুদ্ধদেবকে একজন মহাপুরুষ বা মহামানবরূপে দেখা হত, কিন্তু সম্রাট কণিষ্ক প্রদান করেন তাঁকে দেবতার আসন। তারপর গুপ্তবংশীয় হিন্দু সম্রাটদের শাসনকালে হিন্দুদের প্রতিপত্তি আবার বাড়তে থাকে বটে, কিন্তু বৌদ্ধরা তখন পর্যন্ত কম প্রবল ছিল না, কারণ গুপ্ত-সম্রাটরা ভিন্ন ধর্মের উপরে হস্তক্ষেপ করতেন না।

    সপ্তম শতাব্দীতেও দেখি, আর্যাবর্তের শেষ হিন্দু সম্রাট হর্ষবর্ধন ছিলেন বৌদ্ধধর্মেরও পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু এই সময়েই ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্ম-বিরোধী রাজাদেরও নাম শুনি—যেমন উত্তর-পূর্ব ভারতের (বর্তমান বিহার, ভাগলপুর ও উত্তরবঙ্গ) অধিপতি শশাঙ্ক। চিনদেশীয় পর্যটক হিউয়েন সাঙ বলেছেন, শশাঙ্ক বুদ্ধদেবের পাথরের পদচিহ্ন গঙ্গাজলে ফেলে দিয়েছিলেন এবং বুদ্ধগয়ার পবিত্র বটগাছ বা বোধিদ্রুম কেটে ফেলেছিলেন। তিনি বৌদ্ধদের উপরে অত্যন্ত অত্যাচার করতেন।

    প্রত্নতাত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, রমাপ্রসাদ চন্দ্র প্রমুখ শশাঙ্কের দোষক্ষালনের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সে সব কথা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার দরকার নেই। তবে এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, মহারাজাধিরাজ শশাঙ্কের মৃত্যুর পরেও বৌদ্ধধর্ম নিতান্ত নির্জীব হয়ে পড়েনি।

    এই বৌদ্ধধর্মের প্রভাবের সময়ে পুরী বা শ্রীক্ষেত্র হিন্দুদের তীর্থরূপে বিখ্যাত ছিল না,—পুরী ছিল তখন বৌদ্ধদেরই মহাতীর্থ। জগন্নাথের মন্দিরের বদলে তখন সেখানে ছিল বৌদ্ধদের এক মন্দির এবং তার মধ্যে ছিল বুদ্ধদেবের পবিত্র দন্ত। ভক্তরা খুব ঘটা করে সেই দন্তকে পূজা করত এবং বৎসরের এক নির্দিষ্ট সময়ে (সম্ভবত আষাঢ় মাসেই) পবিত্র দন্তকে রথের উপরে স্থাপন করে রীতিমতো সমারোহের সঙ্গে নগরের পথে পথে ঘুরিয়ে আনা হত! সেই উৎসবের নাম ছিল ‘দন্তযাত্রা’।

    ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন : হিন্দুধর্ম যখন আবার প্রবলতর হয়ে ওঠে, তখন নানা অত্যাচারে নিস্তেজ হয়ে পড়লেও উড়িষ্যায় বৌদ্ধধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বড় অল্প ছিল না। হিন্দুরা তাদের দলে টানবার জন্যে চমৎকার এক উপায় অবলম্বন করলেন।

    বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের তিনটি প্রতীকচিহ্নকে বৌদ্ধরা ‘ত্রিরত্ন’ বলে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। এই ত্রিচিহ্নের আদর্শে হিন্দুরা এমন তিনটি মূর্তি গড়ল যা কতকটা মানুষের মতো দেখতে হলেও প্রতীক বলেও গ্রহণ করা যায়। এই তিনটি মূর্তির নাম দেওয়া হল জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা।

    তারপর দন্তমন্দির থেকে বুদ্ধদেবের দন্ত সরিয়ে বেদির উপরে স্থাপন করা হল সেই তিন মূর্তিকে। দন্তযাত্রা পরিণত হল রথযাত্রায় এবং দন্তহীন রথের উপরে চড়ে বসলেন ভাই-বোনকে নিয়ে জগন্নাথ ঠাকুরই। বৌদ্ধরা জাতিভেদ মানে না, অতএব মন্দিরের ভিতর থেকেও তুলে দেওয়া হল জাতিভেদপ্রথা, ওখানে চণ্ডালের পাশে বসেও প্রসাদী অন্ন ভক্ষণ করতে পারে নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ।

    এই অনুমানের স্বপক্ষে কী কী যুক্তি আছে, অতঃপর তাও দেখা যাক। প্রথমত: জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি কেবল হস্তপদহীন নয়, তাদের মুখে-চোখেও মানুষী ভাব নেই বললেও চলে। দেখলেই মনে সন্দেহ হয়, কয়েকটি চিহ্নকে যেন জোর করে মানুষের আকার দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এমন সন্দেহ যে অমূলক নয়, তা ভালো করে বোঝাবার জন্যে রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র তাঁর উড়িষ্যা-সম্পর্কীয় বিখ্যাত ইংরেজি গ্রন্থে বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের তিনটি চিহ্নের সঙ্গে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার ছবি প্রকাশ করে দেখিয়েছেন, ত্রিচিহ্নের সঙ্গে ত্রিমূর্তির সাদৃশ্য আছে কতখানি! সত্যসত্যই সেই সাদৃশ্য বিস্ময়কর।

    দ্বিতীয়ত পুরীতে জগন্নাথদেবের পূজা প্রচলিত হওয়ার আগে রথযাত্রার মত উৎসব হিন্দুদের আর কোনও পর্বে দেখা যায়নি। দন্ত নিয়ে রথযাত্রা বৌদ্ধদেরই নিজস্ব উৎসব।

    তৃতীয়ত জাতিভেদহীনতা। হাড়ি-মুচি-ডোমের সঙ্গে পাত পেতে বসে বামুনরা ভাত খাচ্ছে, এমন অদ্ভুত দৃশ্য শ্রীক্ষেত্র ছাড়া আর কোনও হিন্দু তীর্থক্ষেত্রেই দেখা যায় না।

    বৌদ্ধদের কৌশল করে দলে টানবার জন্যে হিন্দুরা যে চেষ্টার কোনও ত্রুটি করেননি, তার আর একটা বড় প্রমাণ, অহিন্দু বুদ্ধদেবও পরিণত হয়েছেন হিন্দুদের দশমাবতারে।

    যারা পুরীর মন্দিরে জগন্নাথ ঠাকুরকে পূজা দিতে যায়, তাদের ভিতরে খুব কম লোকেই জানে যে আজও ওখানকার সঙ্গে বুদ্ধদেবের সম্পর্ক একেবারে লোপ পায়নি! আজও পুরীর মন্দিরের ভিতরে বুদ্ধমূর্তির অস্তিত্ব আছে, তবে লোকচক্ষুর অগোচরে। পান্ডারা সেই মূর্তিটিকে একটি ঘরের ভিতরে লুকিয়ে রেখেছে। যাঁদের কৌতূহল হবে, তাঁরা কিছু ঘুষ দিলেই পান্ডারা গোপনে সেই মূর্তি দেখাতে পারে।

    পুরীর মন্দির এক অদ্ভুত ঠাঁই। এখানে কেবল বৌদ্ধদের ত্রিরত্নই জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রায় পরিণত হয়নি, এখানে কেবল বুদ্ধমূর্তিই অজ্ঞাতবাস করছে না, এখানে অহিংস বৈষ্ণবদের দেবালয়েও উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন শাক্তদের বিমলা দেবী এবং তাঁর খাতিরে জগন্নাথদেব কেবল ‘ভৈরব’ বলে আত্মপরিচয়ই দেন না, কেউ পাঁঠা বলি দিলেও আপত্তি করেন না! আবার ওই মন্দিরের ভিতরেই গোপনে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে একটি সূর্যমূর্তিও। কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, একসময়ে ওই সূর্যমূর্তিটিই কোনারকের মন্দিরের ভিতরে প্রতিষ্ঠিত ছিল। কোনারকের পরমসুন্দর অরুণ স্তম্ভটিও আজ পুরীর মন্দিরের প্রবেশ পথের শোভাবর্ধন করছে।

    পুরোনো দিল্লি না দেখলে যেমন দিল্লি দেখা সার্থক হয় না, সারনাথ না দেখলে যেমন কাশী দেখা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তেমনি কোনারকের মন্দির না দেখলে পুরী জেলার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত হতে হয়। কোনারকের সূর্যমন্দির কেবল পুরীর নয়, সমগ্র ভারতের একটি অপূর্ব সম্পদ। কোনও কোনও কারণে তাকে সারা পৃথিবীতেই অতুলনীয় বলা চলে।

    একদিকে জগন্নাথের মন্দির, আর একদিকে কোনারকের মন্দির, মাঝখানে ধূ-ধূ করছে আঠারো মাইল ব্যাপী বৃক্ষশূন্য মরু-প্রান্তর। বালি আর বালি আর বালি, মাঝে মাঝে দেখা যায়, বড় বড় বালির পাহাড়। এই দিগন্তবিস্তৃত বালুকারাজ্যের অপরিসীম শুষ্কতাকে সরস করবার চেষ্টা করে ছোট একটি নদী। আগে এখানে ধ্রুপদ গান গাইত বঙ্গোপসাগরের তরঙ্গদল, এখন তারা দূরে সরে গিয়ে পৃথিবীর উপরে নিজেদের স্মৃতির মতো রেখে গিয়েছে এই রাশি রাশি বালি।

    মরুপ্রান্তরের প্রান্তে দেখা যায় কবির মনোরম স্বপ্নদৃশ্যের মতো একটি তরুশ্যামল কুঞ্জবন। তারই ভিতরে দাঁড়িয়ে আছে কোনারকের দেবতাহীন ভাঙা মন্দির। ভাঙা বটে, কিন্তু কত সুন্দর!

    তেরো শতাব্দীর মন্দির। শোনা যায়, এই মন্দির গড়তে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল উড়িষ্যার দ্বাদশ বর্ষের রাজস্ব! এ অঞ্চলের অনেক দেবালয়ের মতো এটিও ছিল তিন ভাগে বিভক্ত। প্রধান মন্দিরের অধিকাংশ ভূমিসাৎ হয়েছে, নাটমন্দিরের নীচের দিকটা বর্তমান। অটুট আছে কেবল একটি অংশ। সেটিকে দেখতে ঠিক একটি রথের মতো-এমনকি চাকাগুলি পর্যন্ত বাদ যায়নি! আকার ধারণ করেছে যেন শিল্পীর অপূর্ব মনোরথ!

    ভাঙা-অভাঙা যে অংশেই চোখ পড়ে, সেখানেই দেখা যায় অতি সূক্ষ্ম কারুকার্য। এমন সুচাগ্র পরিমাণ জায়গা নেই, যা শিল্পীর হাতের স্পর্শ পায়নি। এই আগাগোড়া অলঙ্কৃত মন্দিরের দিকে দিকে দৃষ্টিগোচর হয় কত পুরুষ, কত নারী, কত জীবজন্তু। মোহনীয় গঠন, বিচিত্র ভঙ্গিমা, কল্পনাতীত পরিকল্পনা। হুনুরির শক্তির কাছে হার মেনে কঠিন পাথরও যেন হয়ে পড়েছে ফুলের মতো কোমল!

    জগন্নাথের মন্দিরের বিশেষত্ব তার বিশালতায়, এ কথা আগেই বলেছি। কোনারকের সূর্যমন্দিরের বিশেষত্ব—ভাস্কর্য এখানে যেন স্থাপত্যের সঙ্গে এক হয়ে মিশে যেতে চেয়েছে। শ্রীমতী স্টেলা ক্র্যামরিস বলেন, উড়িষ্যায় স্থাপত্য বলতে বুঝায় বিশাল আকারে ভাস্কর্য! স্বর্গীয় কুমারস্বামী বলেছেন, কোনারক ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও ভাস্কর্যের সঙ্গে স্থাপত্যের এমন অঙ্গাঙ্গি যোগ দেখা যায় কিনা সন্দেহ। মন্দিরের কাঠামোর ভিতর থেকে মূর্তিগুলিকে কোথাও বিচ্ছিন্ন করা চলে না।

    কোনারকের পরিকল্পক নিশ্চয়ই ছিলেন কবিমনের অধিকারী। মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এমন জায়গায়, যেখানে অসীম সাগর তার বিপুল তরঙ্গবাহু তুলে অহরহ ঝাঁপিয়ে পড়ে, আর ঝাঁপিয়ে পড়ে নতি নিবেদন করতে আসত সূর্যদেবতার চরণে। কিন্তু পরিকল্পকের সেই ভাবপ্রবণতা উপভোগ্য হলেও মন্দিরের পক্ষে শুভঙ্কর হয়নি। মহাসাগরের গভীর উচ্ছ্বাসই হয়েছিল অকালে মন্দিরের পতনের কারণ।

    নিরালায় পড়ে থাকে মন্দিরের ভগ্নাবশেষ। সূর্যদেবতা নির্বাসিত। আজও রোজ সূর্য ওঠে, কিন্তু দেউলের ভিতরে আর খুঁজে পায় না নিজের প্রতিমা। আজও দূর থেকে ভেসে আসে মহাসাগরের স্তোত্রপাঠ! কিন্তু দেবতার বেদির সামনে আর জ্বলে না পূজার প্রদীপ।

  • নতুন বাংলার প্রথম কবি

    নতুন বাংলার প্রথম কবি

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    নতুন বাংলার প্রথম কবি

    তোমরা কবি ঈশ্বর গুপ্তের কবিতা পড়েছ? পুরোনো বাংলার শেষ কবি ভারতচন্দ্র আর রামপ্রসাদ। নূতন বাংলার প্রথম কবি ঈশ্বর গুপ্ত। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন কিছু কম দেড়শো বছর আগে (১২১৮ সালে)।

    যে যুগে পলাশির যুদ্ধ হয়, ভারতচন্দ্র ও রামপ্রসাদ ছিলেন সেই যুগের কবি। এ-দেশে ইংরেজ তখন সবে শিকড় গেড়ে কায়েমি হয়ে বসবার চেষ্টা করছে, কিন্তু ব্রিটিশ রাজ্যের বনিয়াদ তখনও শক্ত হয়নি এবং ইংরেজিয়ানা বলতে কী বুঝায়, বাঙালি তাও জানত না। তাই ভারতচন্দ্র ও রামপ্রসাদের সমস্ত কবিতা তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও এতটুকু ফিরিঙ্গি গন্ধ আবিষ্কার করা যাবে না। এই জন্যেই বলতে হয় খাঁটি বাংলার শেষ কবি ভারতচন্দ্র আর রামপ্রসাদ।

    কিন্তু ঈশ্বর গুপ্তের যুগে এ দেশে বইতে শুরু করেছে দস্তুরমতো বিলাতি হাওয়া। বাঙালি ইংরেজি বলতে, কোট-পেন্টুলুন পরতে, খানার টেবিলে বসে ছুরি-কাঁটা ধরতে, রামপাখি খেতে এবং সভায় গিয়ে রাজনীতি নিয়ে বক্তৃতা করতে শিখেছে। ঈশ্বর গুপ্তের বহু ব্যঙ্গ-কবিতার ভিতরে সেই সব ইঙ্গ-বঙ্গ উপসর্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর পূর্ববর্তী কোনও বাঙালি কবির কাব্যে ওই সব বিষয় স্থান পায়নি। এই জন্যেই তাঁকে বলি নূতন বাংলার প্রথম কবি।

    দেশের হালচাল দেখে গুপ্তকবি দুঃখ করে বলছেন :

    ‘একদিকে দ্বিজ তুষ্ট গোল্লাভোগ দিয়া,

    আরদিকে মোল্লা ব’সে মুর্গি মাস নিয়া।

    একদিকে কোশকুশী আয়োজন নানা,

    আরদিকে টেবিলে ডেবিলে খায় খানা।

    পিতা দেয় গলে সূত্র, পুত্র ফেলে কেটে,

    বাপ পুজে ভগবতী, বেটা দেয় পেটে।’

    মেয়েদের ইংরেজিয়ানার দিকে সত্যদ্রষ্টা কবি যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আজ তা প্রায় অক্ষরে অক্ষরে সফল হয়েছে :

    তখন, ‘এ-বি’ শিখে, বিবি সেজে

    বিলাতী বোল কবেই কবে।

    এখন, আর কি তারা সাজি নিয়ে

    সাঁজ-সেঁজোতির ব্রত গাবে?

    সব, কাঁটা-চামচে ধরবে শেষে

    পিঁড়ি পেতে আর কি খাবে?

    ও ভাই, আর কিছুদিন বেঁচে থাকলে

    পাবেই পাবেই দেখতে পাবে,

    এরা, আপন হাতে হাঁকিয়ে বগী,

    গড়ের মাঠে হাওয়া খাবে।”

    ঈশ্বর গুপ্তের আর একটি মস্ত গুণ, বাংলা কাব্য-সাহিত্যে তিনিই হচ্ছেন প্রথম স্বদেশভক্ত কবি। তাঁর পূর্ববতী বাঙালি কবিরা দেশকে ভালোবাসতেন না, এমন অপবাদ দিতে পারি না—স্বদেশকে ভালোবাসে না এমন অমানুষ কে আছে? নিশ্চয়ই তাঁরা স্বদেশকে ভালোবাসতেন। কিন্তু স্বদেশের আশা-নিরাশা আলোচনা করা তাঁরা কাব্যের ধর্ম বলে মনে করতেন না। দৃষ্টান্তস্বরূপ ভারতচন্দ্রকে দেখানো যেতে পারে। বিধর্মী ফিরিঙ্গির আক্রমণে দেশের সর্বনাশ হল পলাশির প্রান্তরে। এতবড় একটা ওলটপালটে বাঙালি ভারতচন্দ্র যে প্রাণে বেদনা অনুভব করেছিলেন, এটুকু আমরা অনায়াসেই অনুমান করে নিতে পারি। কিন্তু তাঁর সমগ্র কাব্যগ্রন্থাবলীর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না কবির সে বেদনাকে।

    কিন্তু ঈশ্বর গুপ্তই নানা কবিতার ভিতর দিয়ে বাঙালি জাতিকে সর্বপ্রথমে শোনান অধীনতার দুঃখ এবং স্বদেশের দুর্দশার কথা। তিনি হচ্ছেন বাংলার প্রথম চারণ-কবি এবং পরে তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে দেখা দিয়েছেন : মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলাল প্রমুখ। তাঁর ‘স্বদেশী কবিতার কিছু কিছু নমুনা উদ্ধার করছি।

    স্বদেশ সম্বন্ধে কবির উক্তি :

    ‘জানো না কি জীব তুমি, জননী জনমভূমি,

    সে তোমারে হৃদয়ে রেখেছে।

    থাকিয়া মায়ের কোলে, সন্তানে জননী ভোলে,

    কে কোথায় এমন দেখেছে।’

    ভারতবাসীকে সম্বোধন করে কবি বলছেন :

    ‘জাগ জাগ জাগ সব ভারত-কুমার,

    আলস্যের বশ হয়ে ঘুমায়োনা আর।

    তোল তোল তোল মুখ, খোল রে লোচন,

    জননীর অশ্রুপাত কর রে মোচন।

    ভেঙেছে শোবার খাট পড়িয়াছে ভূমে,

    এখনও তোমার এত সাধ কেন ঘুমে?’

     কবির এই আশা আজ সফল হয়েছে :

    স্বাধীনতা মাতৃস্নেহে, ভারতের জরা দেহে

    করিবেন শোভার সঞ্চার।

    দূর হবে সব ক্লান্তি, পালাবে প্রবলা ভ্রান্তি,

    শান্তিজল হবে বরিষণ!

    পুণ্যভূমি পুনর্বার, পূর্বমুখ সহকার,

    প্রাপ্ত হবে জীবন-যৌবন।’

    অন্যত্র :

    ‘জন্মভূমি জননীর

    কোলেতে বসেছি।’

    আর এক জায়গায় :

    ‘ভারতের দৃশ্য হেরি বিদরে হৃদয়।

    জননী দুর্ভাগ্যে যথা অর্পিত তনয়।’

    আবার :

    ‘জননী ভারতভূমি

    আর কেন থাক তুমি,

    ধর্মরূপে ভূষাহীন হয়ে?

    তোমার কুমার যত

    সকলেই জ্ঞানহত,

    মিছে কেন মর ভার বয়ে?’

    অন্যত্র বলেছেন :

    ‘ভ্রাতৃভাব ভাবি মনে, দেখ দেশবাসিগণে,

    প্রেমপূর্ণ নয়ন মেলিয়া।

    কত রূপ স্নেহ করি, দেশের কুকুর ধরি,

    বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।’

    বিলাতের টোরি ও হুইগ সম্বন্ধে :

    ‘কিছুমাত্র নাহি জানি রাম রাম হরি,

    কারে বলে রেডিকেল, কারে বলে টোরি।

    হুইগ কাহারে বলে কেবা তাহা জানে,

    হুইগের অর্থ কভু শুনি নাই কানে।

    টোরি আর হুইগের যে হন প্রধান,

    আমাদের পক্ষে ভাই সকল সমান।’

    ইংরেজ সম্পাদক সম্বন্ধে :

    ‘এ দেশেতে আছে যত সম্পাদক সাদা,

    সকলেই আমাদের বড় ভাই—দাদা।’

    বহু-ব্যবহারের ফলে এ-সব ভাব ও কথা আজকাল এত সাধারণ হয়ে পড়েছে যে, আমাদের হৃদয়তন্ত্রীতে ঝঙ্কার তোলবার ক্ষমতা হয়তো আর ওদের নেই। কিন্তু ঈশ্বর গুপ্তের সমসাময়িক যুগে ওই সব ভাব এবং ‘জননী জনমভূমি’ ও ‘জননী ভারতভূমি’ প্রভৃতি কথা যে বাঙালিদের মনে কতখানি অপ্রত্যাশিত বিস্ময় জাগিয়ে তুলত, সেটুকু কল্পনা করা কঠিন নয়! জন্মভূমিকে মা বলে ডাকতে পেরেছিলেন বাঙালি কবিদের মধ্যে ঈশ্বর গুপ্তই সর্বপ্রথমে।

    তবে নীচের এই কয়েকটি পঙক্তি লিখতে পারলে একালেরও যে-কোনও প্রথম শ্রেণির কবি গৌরব অনুভব করতেন :

    ‘ভ্রাতৃভাব ভাবি মনে, দেখ দেশবাসিগণে,

    প্রেমপূর্ণ নয়ন মেলিয়া।

    কত রূপ স্নেহ করি, দেশের কুকুর ধরি,

    বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।’

    ঈশ্বর গুপ্তের কাব্য সমালোচনা করতে বসে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন : ‘দেশবাৎসল্য! বাৎসল্য পরমধর্ম; কিন্তু এ ধর্ম অনেক দিন হইতে বাঙালা দেশে ছিল না। কখনও ছিল কি না, বলিতে পারি না। এখন ইহা সাধারণ হইতেছে দেখিয়া আনন্দ হয়, কিন্তু ঈশ্বর গুপ্তের সময়ে ইহা বড়ই বিরল ছিল। তখনকার লোকে আপন আপন সমাজ, আপন আপন জাতি বা আপন আপন ধর্মকে ভালোবাসিত, ইহা দেশবাৎসল্যের ন্যায় নহে—অনেক নিকৃষ্ট। মহাত্মা, রামমোহন রায়ের কথা ছাড়িয়া দিয়া রামগোপাল ঘোষ ও হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে বাঙালা দেশে দেশবাৎসল্যের প্রথম নেতা বলা যাইতে পারে। ঈশ্বর গুপ্তের দেশবাৎসল্য তাঁহাদিগেরও কিঞ্চিৎ পূর্বগামী।’

    এই তো গেল ঈশ্বরচন্দ্রের একটা দিক। আর একদিক দিয়ে দেখি তাঁকে সাহিত্য-গুরুরূপে। নতুন নতুন লেখক তৈরি করবার জন্যে তিনি প্রকাশ করতেন বিপুল উৎসাহ। সে-কালের অনেক লেখকেরই হাতে-খড়ি হয়েছিল তাঁর সাহিত্য-পাঠশালায়। রচনা-শক্তি প্রকাশ করলে ছাত্রদের জন্যে তিনি নগদ টাকা পুরস্কারের ব্যবস্থাও করতেন। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে অন্তত কয়েকজনের নাম বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে—বঙ্কিমচন্দ্র ও দীনবন্ধু, কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, নাট্যকার মনোমোহন বসু ও গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ।

    পুরাতন ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ প্রকাশিত ঈশ্বরচন্দ্রের ছাত্রদের কবিতা পাঠ করবার সুযোগ আমার হয়েছে। দেখেছি, ঈশ্বরচন্দ্র কেবল নতুন কবিদের কবিতাই প্রকাশ করতেন না, সেইসঙ্গে প্রকাশ করতেন ছাত্রদের দোষ ও গুণ সম্বন্ধে নিজের মতামতও। তরুণ বঙ্কিমচন্দ্র সম্বন্ধে বলেছিলেন : ‘বঙ্কিমের ভাষা কিঞ্চিৎ বঙ্কিম।’ তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন সরল ভাষায় লিখতে। পদ্যের চেয়ে গদ্যই বঙ্কিমের পক্ষে অধিকতর উপযোগী, এমন কথাও বলেছিলেন। তাঁর শেষোক্ত উক্তিটি রীতিমতো ভবিষ্যদ্বাণীর মতো। পরে প্রমাণিত হয়েছিল তার সত্যতা।

    সাহিত্যই ছিল ঈশ্বরচন্দ্রের জীবনের একমাত্র সাধনা এবং সেই জন্যেই বাংলাদেশে যাতে সাহিত্যসাধকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তিনি বরাবরই সেই চেষ্টা করে গিয়েছেন। তাঁর এই উক্তিটির তুলনা নেই :

    ‘যে ভাষায় হতে প্রীত পরমেশ-গুণ-গীত

    বৃদ্ধকালে গান কর মুখে।

    মাতৃ-সম মাতৃ-ভাষা পুরালে তোমার আশা,

    তুমি তার সেবা কর সুখে।’

    আর একদিকে দিয়েও দেখা যায় ঈশ্বর গুপ্তকে। প্রথমে তাঁর সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের কথা উদ্ধার করি : ‘তিনি সদাই হাস্যবদন। মিষ্টি কথা, রসের কথা, রসের হাসির কথা নিয়তই মুখে লাগিয়া থাকিত। রহস্য এবং ব্যঙ্গ তাঁহার প্রিয় সহচর ছিল। কপটতা, ছলনা, চাতুরী জানিতেন না। তিনি সদালাপী ছিলেন। কথায় হউক, বক্তৃতায় হউক, বিষাদে হউক, কবিতার হউক, গীতে হউক, লোককে হাসাইতে বিলক্ষণ পটু ছিলেন…তিনি রস ব্যতীত একদণ্ড থাকিতে পারিতেন না!’

    ঈশ্বরচন্দ্রের রসের কবিতা অনেক আছে, তা নিয়ে আমার নাড়াচাড়া করবার দরকার নেই, পাঠকরা অনায়াসেই সেগুলির আস্বাদ গ্রহণ করতে পারবেন।

    তিনি খাবার জিনিস নিয়ে কতকগুলি কবিতা লিখেছেন, যেমন ‘পাঁটা’, ‘এন্ডাওয়ালা তপ্স্যা মাছ’ ও ‘আনারস’ প্রভৃতি : কিন্তু তাঁর কদলী কবিতা রচনার কথা কি আপনাদের জানা আছে?

    বঙ্কিমচন্দ্রের মুখে আরও জানতে পারি : ‘ঈশ্বর গুপ্ত মেকির উপরে গালি-গালাজ করিতেন। মেকির উপর যথার্থ রাগ ছিল। মেকি বাবুরা তাঁহার কাছে গালি খাইতেন, মেকি সাহেবরা গালি খাইতেন, মেকি ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতেরা ‘নস্য-লোসা দধি চোষা’র দল গালি খাইতেন।’

    ঠিক কারণ জানি না, তবে অনুমানে বোধ হয়, ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ ঈশ্বরচন্দ্রের কোনও মন্তব্য পাঠ করে একদল ক্রুদ্ধ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের মুণ্ডিত মস্তকের শিখাগুলো অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। তাঁরা মারমুখো হয়ে ঈশ্বরচন্দ্রের কাঁচড়াপাড়ার বাসভবনের দিকে ধাবমান হলেন।

    তখন বেলা দুপুর। কবি বসেছেন মধ্যাহ্ন ভোজনে এবং খাদ্য পরিবেশন করছেন কবিজায়া দুর্গামণি দেবী।

    এমন সময়ে বাড়ির সদর দরজায় এসে হানা দিলেন দুর্বাসার আধুনিক অবতারের দল। সে এক বিষম গন্ডগোল।

    কেউ চিৎকার করছেন, ‘ওরে পাষণ্ড ঈশ্বর গুপ্ত, বেরিয়ে আয় তুই ভিতর থেকে, আমরা আজ তোর শাস্তিবিধান করব।’

    কেউ বলছেন, ‘আজ তোকে পৈতে ছিঁড়ে অভিশাপ দেব!’

    কেউ বলছেন, ‘আজ তোকে ভস্ম করে ফেলব।’

    দুর্গামণি দেবী তো ভয়ে তটস্থ! ঈশ্বরচন্দ্র তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে ও হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ে হাসতে হাসতে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেন।

    তারপর কথাবার্তার ধরনটা হল বোধ করি এইরকম :

    মনে মনে সব বুঝে, কিন্তু মুখে হেসে ঈশ্বরচন্দ্র শুধোলেন, ‘দেবতারা হঠাৎ পায়ের ধুলো দিতে এলেন কেন?’

    ও-তরফ থেকে জবাব এল, ‘জেনে শুনে আবার ন্যাকা সাজা হচ্ছে? ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ তুই আমাদের নামে কি দোষারোপ করেছিস?’

    কবি বললেন, ‘প্রভুরা যখন ‘প্রভাকর’ পাঠ করেছেন, তখন আমাকে আর জিজ্ঞাসা করে মুখ ব্যথা করছেন কেন?’

    প্রভুরা সগর্জনে ভবিষ্যদবাণী করলেন, ‘সর্বনাশ হবে, তোর সর্বনাশ হবে!’

    বাড়ির কাছেই ছিল কলাগাছের ঝাড়। সেই দিকে তাকিয়ে হঠাৎ এক ব্রাহ্মণ সন্তানের মাথায় জাগল দুষ্টু-বুদ্ধি। ব্যঙ্গের স্বরে তিনি বলে উঠলেন, ‘ওঃ, ভারি তো কবি! ফরমাজ করলে এখনি তুই মুখে মুখে কবিতা রচনা করতে পারবি?’

    কবি যুক্তকরে বললেন, ‘আজ্ঞে, হুকুম দিলেই পারি।’

    ‘উত্তম। এখনি কদলী নিয়ে একটা কবিতা রচনা কর দেখি।’

    ‘যথা আজ্ঞা! কিন্তু কবিতা শুনে প্রভুরা আরও বেশি ক্রুদ্ধ হবেন না তো?’

    ‘না, না, আমরা অভয় দিচ্ছি!’

    কবি বললেন :

    ‘গোলোকবিহারী হরি,

    ভূগুপদ বক্ষে ধরি

    তোদের মান বাড়িয়েছে

    শোন রে শোন নেড়ে নেড়ে,

    গলায় দড়ি ভেড়ে ভেড়ে

    তাইতে তোদের প্রণাম করি,

    (দুই হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে)

    নইলে কলা কেঁদেছে।’

    অবশ্য গাছের কলার বদলে কবি দেখালেন হাতের কলা, তবে সেকালকার ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতরাও নিতান্ত বেরসিক ছিলেন না, গুপ্ত-কবির অভিনব কদলী-কবিতা শ্রবণ করে সম্ভবত তাঁরা মুখ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

    ঘটনাটি বললুম আমার নিজের ভাষায়। গল্পটি শুনেছিলুম আমার স্বর্গীয় পিতৃদেবের মুখে।

    নাট্যকার গিরিশচন্দ্র বলেন : ‘একদিন ছেলেবেলায় পাঁচালির গাওনা শুনতে যাই—খুব ভিড়। দেখলেম সেই গোলমালের মধ্যে একজন সহাস্যবদন পুরুষ এলেন—মুখে চোখে তাঁর প্রতিভার ছবি—বেশ উজ্জ্বল মূর্তি bright face আসরের তাবৎ লোক তাঁকে দেখে দাঁড়িয়ে উঠল—বেজায় খাতির, বেজায় সম্মান। তাঁর নাম জানবার জন্য আমার কৌতূহল হল। পাশের লোককে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম ইনিই কবি ঈশ্বর গুপ্ত। গুপ্তকবির এইরকম সম্মান-প্রতিপত্তি দেখে একবার কবি হবার সাধ হয়েছিল।’

    ঈশ্বর গুপ্তের যুগে প্রথম ইংরেজি সভ্যতার চাকচিক্যে ভুলে শিক্ষিত বাঙালিরা দেশের সব কিছুকেই অনাদর করতে শিখেছিল। তাদের সবচেয়ে বেশি ঘৃণা ছিল বাংলা ভাষার উপরে। এমনকী মাইকেল মধুসূদনও প্রথমে বাংলা ভাষা প্রায় জানতেন না বললেই হয়। ‘পৃথিবী’ শব্দটি বানান পর্যন্ত করতে পারতেন না। কবিতা রচনা করতেন ইংরেজিতে। এইজন্যে পরে তিনি অনুতপ্ত হয়ে লিখেছিলেন :

    ‘হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন,—

    তা সবে (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,

    পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ

    পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।’

    মাতৃভাষার প্রতি এই অবহেলা ঈশ্বর গুপ্তের বুকে বড় বাজত। তাই তিনি বলেছেন :

    ‘হায় হায় পরিতাপে পরিপূর্ণ দেশ।

    দেশের ভাষার প্রতি সকলের দ্বেষ।।’

    আধুনিক বাংলা ভাষার মূলে ছিলেন কবি ঈশ্বর গুপ্ত। কারণ তাঁর কাছ থেকেই উপদেশ ও প্রেরণা লাভ করে বঙ্কিমচন্দ্র, দীনবন্ধু মিত্র, কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও নাট্যকার মনোমোহন বসু প্রমুখ স্বনামধন্য পুরুষরা তখনকার দিনে অবহেলিত বাংলা ভাষায় উচ্চশ্রেণির সাহিত্য সৃষ্টি করে গিয়েছেন।

    আজ এ-উপদেশ অতিশয় সহজ ও পুরাতন বলে মনে হবে, কিন্তু গুপ্তকবির যুগে একমাত্র তিনিই দরাজ বুকে এমন কথা বলতে পেরেছিলেন। না, সেই সময়কার আর এক কবির (রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবু) মুখেও আমরা এই রকম উক্তি শুনতে পাই :

    ‘নানান দেশের নানান ভাষা,

    বিনে স্বদেশী ভাষা, মিটে কি আশা?’

  • শিবদাস ভাদুড়ি

    শিবদাস ভাদুড়ি

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    শিবদাস ভাদুড়ি

    বাংলায় sport বলতে বুঝায় খেলা বা ক্রীড়াকৌতুক। এখানে জ্ঞানীরা ও-ব্যাপারটাতে মোটেই আমল দেন না বা দিতেন না এবং জাতীয় জীবনে তার বিশেষ প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করতেন না। কিন্তু ইউরোপীয়দের, বিশেষ করে ইংরেজদের কথা স্বতন্ত্র। পুরুষোচিত দেহগঠনের তথা জাতিগঠনের উপযোগী ক্রীড়াকৌতুকের অসামান্য সাফল্য তারা প্রকৃষ্টভাবে প্রমাণিত করেছে। ইংরেজরা বলে, আমরা ওয়াটার্লুর যুদ্ধে জিতেছি ইংল্যান্ডের ক্রীড়াক্ষেত্রেই। তারা জানে, পঙ্গু দেহে সক্রিয় মস্তিষ্কের চেয়ে সক্ষম দেহে সবল মস্তিষ্কের কার্যকারিতা হচ্ছে বেশি। তারা বড়-বড় পণ্ডিত, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক ও শিল্পীর সঙ্গে ডন ব্র্যাডমান প্রমুখ খেলোয়াড়দেরও স্যার উপাধিতে ভূষিত করতে ইতস্তত করে না।

    ক্রীড়াক্ষেত্রে মোহনবাগানের অবদান ভারতবর্ষে অমর হয়ে থাকবে। শিবদাস ছিলেন সেই মোহনবাগানের অতুলনীয় মুকুটমণি। প্রায় চল্লিশ বছর আগে মোহনবাগান ফুটবল খেলার মাঠে বিখ্যাত একটি ইংরেজ খেলোয়াড়ের দলকে পর্যুদস্ত করে যখন শিল্ড লাভ করেছিল, তখন সারা দেশে যে বিস্ময়, আনন্দ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল, এ যুগের বালক ও যুবকদের কথা ছেড়ে দিই, প্রৌঢ়রাও তা উপলব্ধি করতে পারবেন না। ও ঘটনাটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় পলাশীর যুদ্ধের প্রতিশোধের মতো। কলকাতার পথে পথে সেদিন যেসব স্মরণীয় দৃশ্য দেখেছি, তা দেখতে পাইনি ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবসেও।

    অতিবৃদ্ধ গিরিশচন্দ্র ঘোষ, দেহ তাঁর রোগে পঙ্গু। তিনি কারবার করেন সাহিত্য ও শিল্প নিয়ে, খেলার মাঠে কোনওদিন পদার্পণ করেছেন বলে শুনিনি। এই অভাবিত সংবাদ শুনে উচ্ছ্বসিত ভাষায় বলে উঠলেন, ‘বাঃ! আমাদের আজ বড় আনন্দের দিন! বাংলাদেশের ছেলেদের উপর কিছু ভরসা হচ্ছে! এও যে দেখব তা ভাবিনি।…মনে করে দেখ দেখি, যে লাল মুখ দেখলে আমরা ভয়ে আঁৎকে উঠি, বরাবর মনে করে থাকি আমরা চেষ্টা করলে তাদের চেয়ে intellectually বড় হলেও হতে পারি, কিন্তু বাহুবলে তাদের কাছে কস্মিনকালে শিখ-গোর্খা যেতে পারে—সেইজাতের মিলিটারি দলকে খেলায় পরাজিত করা কম কাজ নাকি? একটা ভয়—একটা সঙ্কোচ যেটা শুধু ঝগড়া ছায়া—সেটা দূর হয়েছে। এখন আমরা মনে করতে পারি যে বাহুবলে আমরা তাদের সামনে এগিয়ে যেতে পারি—প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে চেষ্টা করে তাদের পরাজিত করতে পারি। বা, খুব বাহাদুর! বাংলাদেশকে এই খেলায় জিতিয়ে দশ বছর এগিয়ে দিয়েছে।’

    সেই বিখ্যাত খেলায় নেমেছিলেন মোহনবাগানের এগারো জন খেলোয়াড় এবং প্রত্যেকেরই ক্রীড়ানৈপুণ্য হয়েছিল চমৎকার। কিন্তু তাঁদের ভিতরে শিবদাস বিরাজ করেছিলেন মধ্যমণির মতো। মোহনবাগানকে বিজয়-গৌরবে গরীয়ান করেছিল শিবদাসের প্রতিভাই।

    আমি তখন গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলের ছাত্র। মার্কাস স্কোয়ারে গিয়ে প্রতিদিন ক্রিকেট-ফুটবল-হকি খেলারও চর্চা করি কিছু কিছু। আমার তখনকার সমসাময়িক খেলোয়াড়দের মধ্যে ডোঙাবাবু, হাবুলবাবু ও স্বর্গীয় সুকুল পরে মোহনবাগানের দলে যোগ দিয়েও যশস্বী হয়েছিলেন (শেষোক্ত দুইজন তো শিল্ড-বিজয়ী দলের মধ্যেও ছিলেন)। আর্ট স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার আগে প্রত্যহই গড়ের মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলা দেখে আসতুম। সেই সময়ে আমার চোখের সামনেই মোহনবাগান প্রথম ট্রেডস কাপ লাভ করে বিখ্যাত হয়ে ওঠে! তখনকার দিনে ওই প্রতিযোগিতার গৌরব ছিল আজকের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু মোহনবাগান উপর-উপরি তিন-তিনবার ট্রেডস কাপ জিতে চ্যাম্পিয়ান আখ্যা লাভ করে। তখন তার প্রধান প্রতিযোগী ছিল মিলিটারি মেডিক্যাল ও ন্যাশন্যাল স্পোর্টিং-এর দল। প্রথমোক্ত দলটিতে খেলত অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা এবং তাদের উইলিয়মস নামে এক দীর্ঘদেহ যুবকের নিপুণ খেলা এখনও আমার মনে আছে। শেষোক্ত দলটির সব খেলোয়াড়ই ছিলেন বাঙালি এবং তাদের গোলরক্ষক বাঁকাবাবু তখন খুব নামজাদা। ন্যাশনাল এর আর এক খেলোয়াড় ছিলেন ক্ষেত্রবাবু। ছোটখাটো বেঁটে মানুষটি, কিন্তু তার অগ্রগতি রোধ করা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার। স্মরণ আছে, এক বৎসর ন্যাশনাল-এর বিরুদ্ধে উপর-উপরি তিনদিন খেলে মোহনবাগান জয়ী হতে পেরেছিল।

    কেবল তিনবার ট্রেডস কাপ জয় করার জন্যে নয়, আর এক বিশেষ কারণে মোহনবাগানের নাম ফিরতে লাগল লোকের মুখে মুখে। ইংল্যান্ডের অসামরিক দলের মধ্যে তখন সমধিক প্রসিদ্ধ ছিল ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাব। তাকে যে নিম্নতর কোনও দেশীয় দল হারিয়ে দিতে পারে এটা ছিল একেবারেই কল্পনার অতীত। কিন্তু মোহনবাগানের দলে একজন বাইরের খেলোয়াড় আছে, এই অজুহাতে কর্তৃপক্ষ সে খেলাটি নাকচ করে দেন।

    মোহনবাগানের এইসব বিজয়-যাত্রার অধিনায়ক রূপে অতুলনীয় খ্যাতি অর্জন করলেন শিবদাস ভাদুড়ি।

    সাধারণত তিনি লেফট লাইনে খেলতেন। একহারা ছিপছিপে দেহ, বিপুল-বপু ইংরেজ প্রতিযোগীদের পাশে কী নগণ্যই দেখাত। কিন্তু বলের উপরে যেমন তাঁর অসামান্য দখল ছিল, তেমনি তাঁর গতিও ছিল অত্যন্ত দ্রুত। প্রতিযোগীদের অনায়াসেই এড়িয়ে একেবারে কর্নারের কাছে গিয়ে তিনি সেন্টার করতেন, নয় বলটিকে এক পদাঘাতে প্রেরণ করতেন গোলপোস্টের দিকে। লাইন থেকে তার মতো আর কোনও খেলোয়াড়কে আজ পর্যন্ত এত বেশি গোল দিতে দেখিনি—অধিকাংশ খেলাতে গোল দেওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করতেন তিনিই। হয় নিজে গোল দিয়েছেন, নয় সুগম করে দিয়েছেন গোল দেওয়ার পথ। তাঁর আর একটি অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। বেগে ছুটতে ছুটতে এগিয়ে গিয়ে গোলের দিকে বল মেরেই তিনি প্রায়ই হতেন ভূতলশায়ী। হয়তো অতিরিক্ত দ্রুতগতির টাল তিনি সামলাতে পারতেন না।

    আর একটি ব্যাপার লক্ষ করেছি। লেফট ইনে অর্থাৎ ঠিক পাশেই তাঁর দাদা বিজয়দাস ভাদুড়ি না থাকলে শিবদাসের খেলা তেমন খুলত না। দাদার সঙ্গে তাঁর ঠিক মনের মিল ছিল বলেই তাঁরা দুজনেই বুঝতেন দুজনের খেলার ধরন ও কৌশল। সামনে বাধা পেলেই দুই ভাই এমন কায়দায় পরস্পরের সঙ্গে বল বিনিময় করতেন যে, প্রতিপক্ষেরা দেখত দুই চোখে অন্ধকার। বিজয়দাসও একজন সুচতুর ভালো খেলোয়াড় ছিলেন।

    ১৯১১ খ্রিস্টাদের শিল্ড ফাইনালের ছবি আজও চোখের সামনে ভাসছে। কিন্তু কী অবিশ্বাস্য কষ্ট স্বীকার করেই যে সে খেলা খেলতে হয়েছে! জানতুম মোহনবাগানের নামেই মাঠে জনতার সৃষ্টি হয় এবং শিল্ডের চরম খেলায় সেই জনতা যে বহুগুণ বেড়ে উঠবে, এটাও আমার অজানা ছিল না। বেশ সকাল-সকালই মাঠে গিয়ে হাজির হলুম। কিন্তু দেখলুম এক কল্পনাতীত, অসম্ভব দৃশ্য! সমস্ত গড়ের মাঠটা পরিণত হয়েছে জনতাসাগরে, তেমন বিপুল জনতা জীবনে আর কখনও চোখে দেখিনি। খেলার মাঠের দিকেও অগ্রসর হওয়ার কোনও উপায়ই নেই। তখন তো গ্যালারি ছিল না, লোকে খেলা দেখত ভাড়া দিয়ে ছয় ফুট থেকে বারো-চোদ্দো ফুট উঁচু মাচানের উপর চড়ে। নিতান্ত পলকা, বিপজ্জনক মাচান, প্রায়ই মানুষের ভার সইতে না পেরে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ত—কারুর মাথা ফাটত, কারুর হাত-পা ভাঙত। কিন্তু সে-সব মাচানেও আর তিলধারণের ঠাঁই নেই, দ্বিগুণ ভাড়ার লোভ দেখিয়েও একটুখানি পা রাখবার জায়গা সংগ্রহ করতে পারলুম না।

    ইডেন গার্ডেনে ফিরে গিয়ে ম্লানমুখে জনকোলাহল শ্রবণ করছি, এমন সময়ে এক পরিচিত ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা, তিনি ওই বাগানের রক্ষক। আমার দুঃখের কথা শুনে তিনি তখনই একখানা লম্বা মই আনিয়ে বললেন, ‘দক্ষিণ দিকের একটা দেবদারু গাছে চড়ে খেলা দেখুন।’ অন্য কোনও উপায় না দেখে তাই করতে হল।

    প্রায় আড়াই তলা উঁচু একটা ডালের উপরে বসে সানন্দে দেখলুম, জনতার ফ্রেমে বাঁধানো গোটা খেলার মাঠটি চোখের সামনে পড়ে রয়েছে। বাইরের মাঠও মানুষের মাথায় মাথায় কালো হয়ে উঠেছে, কিন্তু তখনও জনতার পর জনতার স্রোত। দেখতে দেখতে দুই পক্ষের খেলোয়াড়দের আবির্ভাব, রেফারির বংশীধ্বনি এবং খেলা হল শুরু।

    মোহনবাগানের প্রতিযোগী ইস্ট ইয়র্কের দল ঠিক বিজেতার মতোই প্রবল বিক্রমে খেলতে লাগল, বাঙালিরাও বাধা দিতে লাগল প্রাণপণে। বল একবার ছুটে যায় ওদিকে, আবার ছুটে আসে এদিকে। অবশেষে মোহনবাগানের গোল থেকে বেশ খানিকটা দূরে ইস্ট ইয়র্ক পেলে একটি ফ্রি-কিক। কিন্তু কী দুর্বিপাক! গোলরক্ষক হীরালালকে এড়িয়ে বল সাঁৎ করে ঢুকে গেল মোহনবাগানের গোলপোস্টের ভিতরে। বাঙালি দর্শকরা বজ্রাহত! ইংরেজরা প্রচণ্ড আনন্দে উন্মত্ত—চিৎকার করতে করতে কেউ লাফায়, কেউ শূন্যে টুপি ছোড়ে, কেউ পায়রা উড়িয়ে দেয়। কালা আদমির কাছে পরাজয়! কবি হেমচন্দ্রের ভাষায়—‘নেভার নেভার!’

    কিন্তু তারপরেই পাওয়া গেল শিবদাসের অপূর্ব প্রতিভার আশ্চর্য পরিচয়। তিনি যেন মরিয়া, তিনি যেন ‘একাই একশো! তাঁর স্থান যে লেফট লাইনে এ কথা আর তার মনে রইল না। কখনও পুরোভাগে, কখনও এদিকে, কখনও কখনও সেদিকে এবং বলও ছুটছে তাঁর সঙ্গে-সঙ্গে। সর্বত্রই শিবদাস। সে যেন ইস্ট ইয়র্ক বনাম শিবদাসের খেলা। আচম্বিতে শিবদাসের পদ ত্যাগ করে একটি বল উল্কাবেগে ছুটে গেল ইস্ট ইয়র্কের গোলের দিকে এবং তখনকার সর্বশ্রেষ্ঠ গোলকিপার ক্রেসি তাকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারলেন না।

    গোল! গো-ল! গোও-ল! বিশাল জনসাগরের সেই গগনভেদী কোলাহল গঙ্গার ওপার থেকেও শোনা গিয়েছিল! আমার পাশের গাছের একটা উঁচু লম্বা ডালে মাথার উপরকার আর একটা ডাল ধরে শাখামৃগের মতো সারি সারি বসে ছিল দশ-বারোজন লোক। উত্তেজনায় আত্মবিস্মৃত হয়ে উপরকার ডাল ছেড়ে তারা দুই হাতে তালি দিতে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে ঝুপঝুপ করে মাটির উপরে গিয়ে অবতীর্ণ হল সশব্দে। তাদের আর্তনাদ শুনতে-শুনতে সভয়ে আমি কোঁচা খুলে গাছের গুঁড়ির সঙ্গে নিজের দেহকে বেঁধে ফেললুম। কী জানি বাবা, বলা তো যায় না, আমারও যদি দৈবাৎ হাততালি দেওয়ার শখ হয়!

    মায়াবী শিবদাসের ইন্দ্রজাল তখনও শ্রান্ত হয়নি, তখনও তিনি বল নিয়ে দুর্বার গতিতে ছুটোছুটি করছেন এখানে-ওখানে, যেখানে-সেখানে। রীতিমতো মস্তিষ্ক চালনার সঙ্গে সঙ্গে পদচালনা না করলে সেরকম খেলা কেউ খেলতে পারে না। প্রতিপক্ষের দশাসই চেহারাগুলো কিছুতেই তাঁর ক্ষিপ্রগামী ছিপছিপে দেহের নাগাল ধরতে পারছে না—যেন আলেয়া। আবার তিনি হলেন গোলের নিকটবর্তী। একজন প্রতিযোগী বাঘের মতো তাঁর সামনে এসে পড়ল, কিন্তু তিনি টুক করে বলটি তুলে দিলেন নিজেদের সেন্টার ফরোয়ার্ড অভিলাষের পায়ের উপরে এবং অভিলাষও কিছুমাত্র ভুল করলেন না।

    আবার ইংরেজদের কানে ভয়াবহ সেই হাজার-হাজার কণ্ঠের আকাশ ফাটানো জয়ধ্বনি করতালি! নর্তন ও কুর্দন। সাহেবদের আসনে সমাধির স্তব্ধতা।

    বাজল খেলাশেষের বাঁশি। বাঙালির প্রথম শিল্ড অধিকার। পুরুষোচিত ক্রীড়াক্ষেত্রে কালোর কাছে গোরার প্রথম পরাজয়। তার পরের দৃশ্য বর্ণনাতীত। বাড়ি ফিরেছিলুম সারা শহর মাড়িয়ে, অনেক রাতে।

    খেলার মাঠে সেদিন শিবদাসের যে ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলুম তার তুলনা পাইনি অদ্যাবধি। অবশ্য তার পরে তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিখত হওয়ার ও আলাপ করবার সুযোগ পেয়েছিলুম বটে, কিন্তু ক্রীড়কের বিশেষত্ব ক্রীড়ানৈপুণ্যে; তাই তাঁর মুখের ভাষা লিপিবদ্ধ না করলেও ক্ষতি নেই।

  • ইতিহাসের রক্তাক্ত প্রান্তরে

    ইতিহাসের রক্তাক্ত প্রান্তরে

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    ইতিহাসের রক্তাক্ত প্রান্তরে

    ইতিহাসের রক্তাক্ত প্রান্তরে এই গল্পটির ওসিআর ও শুদ্ধিপাঠ সম্পন্ন হয়নি, তাই প্রকাশ করা হয়নি।

  • বীরাঙ্গনা, পরাক্রমে ভীমা-সমা

    বীরাঙ্গনা, পরাক্রমে ভীমা-সমা

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    বীরাঙ্গনা, পরাক্রমে ভীমা-সমা

    রণরঙ্গে বীরাঙ্গনা সাজিল কৌতুকে;—

    উথলিল চারিদিকে দুন্দুভির ধ্বনি;

    বাহিরিল বামাদল বীরমদে মাতি,

    উলঙ্গিয়া অসিরাশি, কার্মুক টংকারি,

    আস্ফালি ফলকপুঞ্জে।

     —মাইকেল মধুসূদন

    বীরাঙ্গনা, পরাক্রমে ভীমা-সমা : এক

    দেশে দেশে রণরঙ্গিণী রমণীর কাহিনি শোনা যায়,—কেবল কল্পিত গল্পে নয়, সত্যিকার ইতিহাসেও। চলতি কথায় এমন মেয়েকে বলা হয় ‘রায়বাঘিনী’।

    ভারতের রানী লক্ষ্মীবাঈ, রানী দুর্গাবতী, চাঁদ সুলতানা, ইংল্যান্ডের রোডিসিয়া ও ফ্রান্সের জোয়ান অব আর্ক প্রভৃতি রণরঙ্গিণী বীরনারীর কথা কে না শুনেছে?

    কথিত হয়, সেকালের কাপ্পাডোসিয়ার বীরাঙ্গনারা বাস করত নারীরাজ্যে—যেখানে পুরুষের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ! পুরুষদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে কোনওদিনই তারা পিছপাও হয়নি। আধুনিক নিউগিনিতেও এমন দেশের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। মাঝে মাঝে তারা আবার বাইরে হানা দিয়ে পুরুষ দেখলেই বন্দি করে নিয়ে যায়। একালের স্পেন, রুশিয়া ও চিন প্রভৃতি দেশে হাজার হাজার নারী-যোদ্ধার দেখা পাওয়া যায়। এবং এই অতি-আধুনিক যুগেও তিব্বতে শ্রীমতী রিপিয়েডোর্জেস প্রায় এক হাজার রণমুখো নারী-যোদ্ধা নিয়ে কমিউনিস্ট চিনের বিরুদ্ধে প্রবল বিক্রমে যুদ্ধে নিযুক্ত আছেন।

    কিন্তু আর এক শ্রেণির বীরনারীদের কথা নিয়ে বড় বড় ঐতিহাসিকরা মাথা ঘামান না এবং তার কারণ বোধ হয় তাঁরা হচ্ছেন কালো আফ্রিকার কাজলা মেয়ে।

    এঁদের প্রধানার নাম নান্সিকা। আজ এঁরই রক্তাক্ত কাহিনি বর্ণনা করব। কিন্তু তার আগে গুটিকয় গোড়ার কথা বলতে হবে।

    প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে জনৈক পাশ্চাত্য লেখক The Rising Tide of colour নামক পুস্তকে সভয়ে এই মর্মে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন : ‘শ্বেতাঙ্গরা এখনও আন্দাজ করতে পারছে না, অশ্বেত জাতিরা (পীত, তাম্র ও কৃষ্ণ বর্ণের) ক্রমেই অধিকতর শক্তিশালী হয়ে শ্বেতাঙ্গদের নাগালের বাইরে চলে যাবে। অবিলম্বে তাঁদের সাবধান না হলে চলবে না।’

    তারপর গত এক যুগের মধ্যেই তাঁর ভবিষ্যদবাণী সফল হয়েছে—গৌরাঙ্গরা সাবধান হয়েও পীতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি।

    প্রায় সমগ্র এশিয়া থেকেই তাম্র ও পীত বর্ণের প্রভাবে শ্বেতবর্ণ বিলুপ্তপ্রায় হয়েছে এবং তারপর বেঁকে দাঁড়িয়েছে এতকালের পশ্চাৎপদ আফ্রিকাও। একে একে শ্বেতাঙ্গদের বেড়ি ভেঙে স্বাধীন হয়েছে মিশর, সুদান, মরক্কো, ঘানা ও কঙ্গো প্রভৃতি আরও কয়েকটি প্রদেশ এবং আরও কোনও কোনও দেশ প্রস্তুত হয়ে আছে স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে কিংবা ইতিমধ্যেই স্বায়ত্তশাসনের অধিকার লাভ করেছে।

    সদ্য-স্বাধীন ঘানার প্রতিবেশী ডাহোমি। পশ্চিম আফ্রিকার টোগোল্যান্ড ও নাইজিরিয়ার মধ্যবর্তী আটলান্টিক সাগর-বিধৌত তটপ্রদেশে আটত্রিশ হাজার বর্গমাইল জায়গা জুড়ে ডাহোমির অবস্থান। তার লোকসংখ্যা প্রায় দশ লক্ষ। গত শতাব্দীর শেষভাগে ফরাসি দস্যুরা হানা দিয়ে ডাহোমির স্বাধীনতা হরণ করেছিল, কিন্তু সম্প্রতি কর্তার চেয়ার ছেড়ে আবার তাদের দর্শকের গ্যালারিতে সরে দাঁড়াতে হয়েছে।

  • বর্গি এল দেশে

    বর্গি এল দেশে

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    বর্গি এল দেশে : এক

    ‘খোকা ঘুমুলো, পাড়া জুড়ুলো
    বর্গী এল দেশে’—

    আমাদের ছেলেভুলানো ছড়ার একটি পঙক্তি।

    মনে করুন, বাংলাদেশের শান্ত স্নিগ্ধ পল্লিগ্রাম। দুপুরবেলা, চারিদিক নিরালা। শ্যামসুন্দর পল্লিপ্রকৃতি রৌদ্রপীত আলো মেখে করছে ঝলমল ঝলমল। বাতাসে কোথা থেকে ভেসে আসছে বনকপোতের অলস কণ্ঠস্বর।

    চুকে গিয়েছে গৃহস্থালির কাজকর্ম। মাটিতে শীতলপাটি বিছিয়ে খোকাকে নিয়ে বিশ্রাম করতে এসেছেন ঘুম ঘুম চোখে খোকার মা। কিন্তু ঘুমোবার ইচ্ছা নেই খোকাবাবুর। বিদ্রোহী হয়ে তারস্বরে তিনি জুড়ে দিলেন এমন জোর কান্না যে, ঘুম ছুটে যায় পল্লির এ-বাড়ির ও-বাড়ির সকলের চোখে, ছিঁড়ে যায় বনকপোতের শান্তিগান, তরুলতার কলতান, সচকিত হয়ে উঠে নির্জন পথের তন্দ্রাস্তব্ধতা।

    ঘুমপাড়ানি সঙ্গীতের তালে তালে খোকার মাথা আর গা চাপড়ে চলেন খোকার মা। সেই আদর-মাখা নরম হাতের ছোঁয়ায় খানিক পরে খোকাবাবুর চোখের পাতা জড়িয়ে এল ঘুমের ঘোরে, ধীরে ধীরে। অবশেষে মৌন হল ক্রন্দনভরা কণ্ঠস্বর।

    পাড়া গেল জুড়িয়ে।

    আচম্বিতে অগাধ স্তব্ধতার নিদ্রাভঙ্গ করে দিকে দিকে জেগে উঠল অত্যন্ত আতঙ্কিত জনতার গগনভেদী আর্ত চিৎকার!

    পথে পথে পাড়ায় পাড়ায় ভীত উচ্চরব শোনা গেল—’পালাও, পালাও! এল রে ওই বর্গি এল! সবাই পালাও, বর্গি এল!’

    ধূলিপটলে দিগবিদিক অন্ধকার। উল্কাবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে ধেয়ে আসে হাজার অশ্বারোহী—ঊর্ধ্বোত্থিত হস্তে তাদের শাণিত কৃপাণ, বিস্ফারিত চক্ষে নিষ্ঠুর হিংসা, কর্কশ কণ্ঠে ভৈরব হুংকার!

    বর্গি এল দেশে—ঘরে ঘরে হানা দিতে, গৃহস্থের সর্বস্ব লুঠতে, গ্রামে গ্রামে আগুন জ্বালাতে, পথে পথে রক্তস্রোত ছোটাতে, আবালবৃদ্ধবনিতার প্রাণ হরণ করতে!

    পাড়ায় পাড়ায় ঘরে ঘরে ধড়মড় করে উঠে বসল আবার ঘুমভাঙা খোকাখুকিরা। কিন্তু আর শোনা গেল না তাদের কান্না, বনকপোতের ঘুমপাড়ানি সুর এবং তরুলতার মর্মররাগিণী।

    এমনি ব্যাপার হয়েছে বারংবার। তখন অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কাল। বাংলার মাটিতে ইংরেজরা শিকড় গাড়বার চেষ্টা করছে ছলে বলে কৌশলে।

    ‘বর্গি’ বলতে কী বোঝায়?

    আভিধানিক অর্থানুসারে যার ‘বর্গ’ আছে সে-ই হল ‘বর্গি’। ‘বর্গে’র একটি অর্থ ‘দল’। যারা দল বেঁধে আক্রমণ করত তাদেরই বর্গি বলে ডাকা হত।

    ইতিহাসেও ‘বর্গি’ বলতে ঠিক ওই কথাই বুঝায় না। ‘বর্গি’ নাকি ‘বারগীর’ শব্দের অপভ্রংশ। মহারাষ্ট্রীয় ফৌজে যে-সব উচ্চ শ্রেণির সওয়ার ছিল নিজেদের ঘোড়ার ও সাজপোশাকের অধিকারী, তাদের নাম ‘সিলাদার’। কিন্তু ‘বারগীর’ বলতে বোঝায় সবচেয়ে নিম্নশ্রেণির সওয়ারদের। তারা অস্ত্রশস্ত্র ও অশ্ব লাভ করত রাজ-সরকার থেকেই।

    প্রাচীনকালে অনার্য হুনজাতীয় ঘোড়সওয়াররা দলে দলে পূর্ব-ইউরোপে এবং উত্তর-ভারতে প্রবেশ করে দিকে দিকে লুণ্ঠন ও হত্যাকাণ্ড চালিয়ে ইতিহাসে ভয়াল নাম অর্জন করেছিল। বর্গিরাও সেই জাতীয় হানাদার; তবে তাদের অত্যাচার অতটা ব্যাপক হয়নি, ‘বর্গির হাঙ্গামা’ হচ্ছে বিশেষভাবে বাংলাদেশেরই ব্যাপার।

    সত্য কথা বললে বলতে হয়, পরবর্তীকালের বর্গির হাঙ্গামার জন্যে এক হিসাবে দায়ী হচ্ছেন ভারতগৌরব ছত্রপতি শিবাজীই। প্রধানত লুণ্ঠনের দ্বারাই তিনি নিজের সৈন্যদল পোষণ করতেন। তিনি স্বয়ং উপস্থিত থেকে সদলবলে লুণ্ঠনকার্য চালিয়েছেন দক্ষিণ-ভারতের নানা স্থানেই; তার ফলে কেবল মুসলমান নয়, কত সাধারণ নিরীহ হিন্দুও যে নির্যাতিত হয়েছিল, ইতিহাসে তার সাক্ষ্য আছে। তখনকার মারাঠিরাও জানত, লুণ্ঠনই হচ্ছে সৈনিকের অন্যতম কর্তব্য।

    আরম্ভেই যেখানে নৈতিক আদর্শ এমনভাবে ক্ষুণ্ণ হয়, পরবর্তীকালে তা উন্নত না হয়ে অধিকতর অবনমিত হয়ে পড়বারই কথা। এক্ষেত্রেও হয়েছিল ঠিক তাই। শিবাজীর কালের মারাঠি সৈনিকদের চেয়ে বর্গিরা হয়ে উঠেছিল আরও বেশি নিষ্ঠুর, হিংস্র ও দুরাচার।

    কম-বেশি এক শতাব্দীর মধ্যে মোগলদের শাসনকালে হতভাগ্য বাংলাদেশকে দু-দুবার ভোগ করতে হয়েছিল ভয়াবহ নির্যাতন।

    সপ্তদশ শতাব্দীতে ফিরিঙ্গি ও মগ বোম্বেটেদের ধারাবাহিক অত্যাচারের ফলে নদীবহুল দক্ষিণ ও পূর্ব-বাংলার কতক অংশ জনশূন্য শ্মশানে পরিণত হয়েছিল বললেও অত্যুক্তি হবে না। সুন্দরবন অঞ্চলে আগে ছিল সমৃদ্ধিশালী জনপদ, পরে তা পরিণত হয়েছিল হিংস্র জন্তুর জঙ্গলাকীর্ণ বিচরণ ভূমিতে এবং পূর্ববঙ্গের কোনও কোনও অঞ্চলে নাকি আকাশ দিয়ে পাখি পর্যন্ত উড়তে ভরসা করত না।

    এমনি সব অরাজকতার জন্যে দায়ী কোনও কোনও লোককে ইতিহাস মনে করে রেখেছে। যেমন পোর্তুগিজদের গঞ্জেলেস ও কার্ভালহো এবং মারাঠিদের ভাস্কর পণ্ডিত। শক্তির অপব্যবহার না করলে এঁদেরও স্মৃতি আজ গরীয়ান হয়ে থাকত।

    পোর্তুগিজ বোম্বেটেরা বিজাতীয় বিদেশি। তারা মানবতার ধর্ম ক্ষুণ্ণ করেছিল বটে, কিন্তু স্বজাতির উপরে অত্যাচার করেনি। আর মারাঠি হানাদার বা বর্গিরা ভারতের বাসিন্দা হয়েও ভারতবাসীকে অব্যাহতি দেয়নি, তাই তাদের অপরাধ হয়ে উঠেছে অধিকতর নিন্দনীয়।

  • হে ইতিহাস গল্প বলো

    হে ইতিহাস গল্প বলো

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    হে ইতিহাস গল্প বলো

    ‘হে ইতিহাস গল্প বলো’ রচনাটির ওসিআর ও শুদ্ধিপাঠ সম্পন্ন না হওয়ায় পোস্ট করা হয়নি। অচিরেই পোস্ট করা হবে, ইনশাআল্লাহ। — কর্তৃপক্ষ।

  • প্রথম বাঙালি সম্রাট

    প্রথম বাঙালি সম্রাট

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    প্রথম বাঙালি সম্রাট

    তোমাদের অনেকেই হয়তো অবাক হবে। বাঙালি সম্রাট আবার কে? এমন বিস্ময় অহেতুক নয়। প্রাচীন আর্যাবর্ত বাঙালিদের আভিজাত্য স্বীকার করত না তো বটেই, উপরন্তু তাদের মনে করত অনেকটা হরিজনেরই সামিল। বলত, বাংলা হচ্ছে পাখির দেশ, ওখানে গেলে জাত যায়। ইংরেজরা শিখিয়েছে, বাঙালি হচ্ছে ভীরু, কাপুরুষ। ইস্কুলের ছেলেদের পড়িয়েছে, পুরোনো বাংলার বীরত্বের বড়াই করবার কিছুই নেই, প্রভৃতি।

    একালে ভারতে অবাঙালিদের মুখেও শুনি ওই ধরনের বুলি। অল্পদিন আগেও ভারতের এক গুজরাটি মন্ত্রী মুখ ফুটে বলতে লজ্জা পাননি—বাঙালি খালি কাঁদতেই জানে! ভদ্রলোক বেবাক ভুলে গিয়েছিলেন যে, ভারতে মুসলমানদের দাসত্ব সর্বপ্রথমে স্বীকার করে সিন্ধুর সঙ্গে গুজরাটই এবং তাঁর জীবনকালেই বাংলার মাটিতে জন্ম নিয়েছেন সুভাষ, বাঘা যতীন, কানাই, ক্ষুদিরাম প্রমুখ আগুনের দূতের দল।

    এইসব হট্টগোলের মাঝে হঠাৎ বাঙালি সম্রাটের নাম করলে প্রথমটা চমকে যেতে হয় বইকি! কিন্তু কেবল একজন নন, বাঙালি সম্রাট ছিলেন একাধিক। তবে আজ আমি যাঁর কথা বলব, লিখিত ইতিহাসে তিনিই হচ্ছেন সর্বপ্রথম। তাঁর নাম শশাঙ্ক। বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁকে সম্রাট বলেই পরিচিত করেছেন।

    কিন্তু জনসাধারণ তাঁর কথা ভালো করে জানে না কেন? এ-জিজ্ঞাসার জবাব হচ্ছে, কোনও কবি বা প্রাচীন লেখক তাঁর পক্ষ গ্রহণ করেননি বলে।

    বিশাখ দত্ত লিখিত ‘মুদ্রারাক্ষস’ নাটকে ও গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিসের বর্ণনায় পাই ভারতবর্ষের প্রথম সম্রাট মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের কাহিনি। প্রথম চৈনিক পর্যটক ফা-হিয়েন লিখে রেখে গেছেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা বিক্রমাদিত্যের কাহিনি।

    বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’-এ এবং চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাঙের ভ্রমণবৃত্তান্তে পাই সম্রাট হর্ষবর্ধনের কাহিনি। কল্হন প্রমুখ লেখকদের ‘রাজতরঙ্গিণী’ গ্রন্থে অমর হয়ে আছে কাশ্মীরের অনেক রাজার কাহিনি। কত বড় দিগবিজয়ী সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত! তাঁরও জীবনী সেদিন পর্যন্ত অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল। অল্প যা কিছু জানা গিয়েছে, তাও তাঁর সভাকবি হরিষেণের লিপি আবিষ্কারের পর।

    কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সম্রাট শশাঙ্কদেব তেমন সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে আছেন। নইলে তিনিও আজ ইতিহাসে কোণঠাসা না হয়ে সম্রাট হর্ষবর্ধন ও ললিতাদিত্য প্রভৃতির মতোই প্রখ্যাত হতে পারতেন।

    অবশ্য কেউ কেউ তাঁর উল্লেখ করে গিয়েছেন। কোথাও কোথাও তাঁর মুদ্রা বা শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। এবং এদিকে-ওদিকে ছড়ানোভাবে পাওয়া গেছে আরও কিছু টুকরো টুকরো নজির।

    বিশেষজ্ঞ ঐতিহাসিকরা ওই অপ্রচুর মালমশলার ভিতর থেকেই শশাঙ্কের যে অসম্পূর্ণ আখ্যান আবিষ্কার করেছেন, তার সাহায্যেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি তাঁর অপূর্ব মহাপুরুষত্ব। ওই আবিষ্কারকার্য এখনও চলছে, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো আমরা প্রায়-পরিপূর্ণ শশাঙ্ককে দেখবার সুযোগ পাব।

    আপাতত যেটুকু পেয়েছি তাই নিয়েই আমাদের তুষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু এর মধ্যে ও গণ্ডগোল ও তর্কাতর্কির অভাব নেই। ভিনসেন্ট স্মিথ, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোমোহন চক্রবর্তী, রাধাগোবিন্দ বসাক, রমেশচন্দ্র মজুমদার, কে. পি. জসওয়াল ও ডি. সি. গাঙ্গুলি প্রভৃতি বিশেষজ্ঞদের সৃষ্ট তর্কজালের মধ্যে পড়ুয়াদের জড়িয়ে ফেলবার ইচ্ছা আমাদের নেই। তাঁদের কাছ থেকে সহজ বুদ্ধিতে যেটুকু গ্রহণযোগ্য সেইটুকু নিয়েই এই প্রথম বাঙালি সম্রাটকে সকলের চোখের সামনে তুলে ধরতে চাই।

    ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ পাদ।

    অধঃপতিত গুপ্তসাম্রাজ্য। ধুলায় লুণ্ঠিত সম্রাটের শাসনদণ্ড! ভারতবর্ষ তখন অরাজক নয়, ‘সহস্ররাজক’! সাম্রাজ্যকে খান খান করে ফেলে পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করছেন ছোট ছোট রাজারা।

    বাংলাদেশের যে অংশ আগে গৌড় (এখনকার উত্তরবঙ্গ) বলে বিখ্যাত ছিল, সেখানে রাজত্ব করতেন শশাঙ্ক নামে এক নরপতি। তাঁর রাজধানীর নাম ছিল কর্ণসুবর্ণপুর। আধুনিক মুর্শিদাবাদের বহরমপুর শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ছয় মাইল দূরে আছে রাঙামাটি নামে গ্রাম। সেইখানেই ছিল প্রাচীন কর্ণসুবর্ণপুরের অবস্থান।

    একখানি সেকেলে শিলালিপি (অর্থাৎ পাথরের উপরে খোদা লিখন) পাওয়া গিয়াছে। তার উপরে লেখা ছিল—’শ্রীমহাসামন্ত শশাঙ্কদেবস্য’। সামন্ত বলে, অধীন রাজাকে। মহাসামন্ত অধিকতর বড় রাজা হলেও স্বাধীন নৃপতি নন।

    অতএব বুঝতে পারি, প্রথম জীবনে শশাঙ্কদেব স্বাধীন ছিলেন না। তাঁরও চেয়ে একজন বড় বা মহা রাজার অধীনে রাজত্ব করতেন। কিন্তু তিনি কে?

    ঐতিহাসিকদের অনুমান, তাঁর নাম মহাসেনগুপ্ত। বিক্রমাদিত্যের প্রথম পুত্র কুমারগুপ্ত, পিতার মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যের সিংহাসন পেয়েছিলেন এবং তাঁর দ্বিতীয় পুত্রের নাম গোবিন্দগুপ্ত। কালক্রমে গুপ্তসাম্রাজ্য লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় এবং কুমারগুপ্তের বংশ লোপ পায়। সেই সময়ে ছোট তরফের অর্থাৎ গোবিন্দগুপ্তের বংশধররা মগধ ও গৌড় প্রভৃতি দেশের মহারাজা নামে আখ্যাত হন। মহাসেনগুপ্ত সেই বংশেরই সন্তান। এসব কথা এখনও যথাযথভাবে প্রমাণিত হয়নি, কেবল এইটুকু নিশ্চিতভাবে জানা গিয়েছে যে, ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ ভাগে মহাসেনগুপ্তই ছিলেন মগধের অধিপতি। সেইজন্যেই শশাঙ্ককে তাঁরই সামন্ত বলে আন্দাজ করা হয়েছে।

    তারপর প্রশ্ন ওঠে, শশাঙ্কদেব কে? কেমন করে তিনি গৌড়ের সিংহাসন পেলেন? তাঁর পিতৃপরিচয় কী?

    রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে শশাঙ্কদেব ছিলেন ছোট তরফের গুপ্তবংশীয়দেরই একজন এবং মহাসেনগুপ্তের পুত্র। এটা মেনে নিলে, শশাঙ্কের মগধাধিকারের পক্ষে একটা সুযুক্তি পাওয়া যায় বটে, কিন্তু অন্যান্য ঐতিহাসিকরা ওই মত মানতে রাজি নন। আসল কথা, শশাঙ্কের পূর্বপুরুষদের কথা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে প্রবাদে বলে, পুরুষ ধন্য হয় স্বনামেই, অতএব তাঁর বংশপরিচয় না পেলেও আমাদের চলবে।

    ঐতিহাসিক বলছেন : ‘শশাঙ্ক কামরূপ ব্যতীত সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের অধীশ্বর ছিলেন।’ উত্তর-পূর্ব ভারত বলতে সমগ্র বঙ্গ ও বিহার (বা মগধ) প্রদেশ বোঝায়। উড়িষ্যাতেও শশাঙ্কের সামন্তরাজা ছিলেন, তাঁর নাম মাধববর্মা।

    সুতরাং শশাঙ্ককে হঠাৎ দেখি কেবল গৌড়ের সামন্তরাজার রূপে নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতব্যাপী বিশাল এক সাম্রাজ্যের স্বাধীন সম্রাট রূপে। কেমন করে এটা সম্ভবপর হল?

    ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ পাদে উত্তর ভারতকে পড়তে হয়েছিল বিষম সব অশান্তির আবর্তে। তারই ফলে যে শশাঙ্কের ভাগ্যপরিবর্তন হয়েছিল, এ-বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। দেখা যাক, সেইসব অশান্তির কারণ কী?

    প্রথমত, মধ্যপ্রদেশের কালাচুরি বংশীয় এক রাজার হস্তে মগধ-গৌড়ের অধিপতি মহাসেনগুপ্তের শোচনীয় পরাজয়। তারপর মহাসেনগুপ্তের আর কোনও কথা জানা যায় না, সম্ভবত তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।

    দ্বিতীয়ত, তিব্বতের শক্তিশালী রাজা স্রং সানের প্রবল আক্রমণে ছোট তরফের গুপ্তদের রাজ্য লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল।

    তৃতীয়ত, দাক্ষিণাত্যের চালুক্যবংশীয় রাজা কীর্ত্তিবর্মন দাবি করেন, তিনি নাকি যুদ্ধে জয়ী হয়ে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ ও মগধের ওপর অধিকার বিস্তার করেছিলেন।

    বেশ বোঝা যাচ্ছে, ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে যোগ্য নায়কের অভাবে উত্তর-পূর্ব ভারতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গিয়েছিল ভয়াবহ বিপ্লবের তরঙ্গের পর তরঙ্গ।

    এমনি সব বিপ্লবের সময়েই উদ্যোগী পুরুষরা পান আত্মপ্রতিষ্ঠার সুযোগ। দৃষ্টান্ত দিতে গেলে ফরাসি বিপ্লবের কথা তুলতে হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পাদে ফরাসি দেশে তুমুল বিপ্লব না বাধলে পুরুষসিংহ হয়েও নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সম্রাট হওয়ার সুযোগ লাভ করতেন না।

    নিঃসন্দেহে বলা যায়, শশাঙ্কও ছিলেন পুরুষসিংহ। তিনি কেবল তেজি, সাহসী ও কর্মঠ নন, সেইসঙ্গে ছিলেন চতুর, সুকৌশলী ও সুবুদ্ধি এবং রাজনীতিতে পরম অভিজ্ঞ। উপরন্তু তরবারি ধারণ করতেন না দুর্বল অপটু হস্তে।

    দৃপ্তকণ্ঠে তিনি বললেন, ‘বিদেশি শত্রুদের হানায় সোনার বাংলা ছারখারে যেতে বসেছে—এ-দৃশ্য সহ্য করা অসম্ভব! ক্ষুদ্র গৌড়ের পঙ্গু সামন্ত রাজার তুচ্ছ মুকুট পরে আর আমি তুষ্ট ও নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকব না, আমি হব অদ্বিতীয়, আমি হব স্বাধীন—স্বদেশে স্থাপন করব স্বরাজ্য!’

    শশাঙ্কের মুখে প্রেরণাবাণী শুনে জাগ্রত হল সমগ্র গৌড়-বঙ্গদেশ, উদ্বোধিত হল বাঙালিজাতির আত্মা, কোশমুক্ত হল হাজার হাজার শাণিত তরবাল!

    তারপরেই দেখি অতীত ও বর্তমানের মাঝখানে নেমে এসেছে এক দুর্ভেদ্য, অন্ধ যবনিকা। সেই যবনিকা সরিয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিকরাও এখনও পর্যন্ত বিশেষ কোনও দৃশ্য দেখতে পাননি—আমরা কিন্তু কান পেতে শুনতে পাই রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্রের গগনভেদী রণকোলাহল, বঙ্গবীরদের সিংহগর্জন, পলাতক শত্রুদের আর্তনাদ!

    তারপর যবনিকার ফাঁক দিয়ে কোনওক্রমে দৃষ্টি চালিয়ে ঐতিহাসিকরা সবিস্ময়ে দেখলেন কোনও কোনও উজ্জ্বল দৃশ্য!

    উত্তর-পূর্ব ভারতের সিংহাসনে সগৌরবে অধিষ্ঠিত প্রবল পরাক্রান্ত স্বাধীন সম্রাট শশাঙ্কদেব। চারণকবিরা রচনা করছেন তাঁর নামে কুলকীর্তিগীতি এবং নিখিল বঙ্গের বাসিন্দারা দেশ ও জাতির মুক্তিদাতা বলে তাঁর উদ্দেশ্যে নিবেদন করছে সশ্রদ্ধ প্রণতি!

    অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ ও মগধের ওপরে সগর্বে উড়ছে তখন প্রথম বাঙালি সম্রাট শশাঙ্কের বিজয়পতাকা।

    ‘এ নহে কাহিনি, এ নহে স্বপন’, এ-হচ্ছে ঐতিহাসিক সত্য।

    কিন্তু শশাঙ্কের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এইখানেই হল না পরিতৃপ্ত। সমগ্র উত্তরাপথে তিনি চালনা করতে চাইলেন নিজের বিজয়ী বাহিনীকে।

    কেবল যে নিজের সাম্রাজ্যের আয়তনবৃদ্ধির জন্যেই শশাঙ্কদেব এই নতুন অভিযানে নিযুক্ত হয়েছিলেন, এমন কথা মনে হয় না। তিনি কেবল যোদ্ধা নন, রাজনীতিবিদও ছিলেন। উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্ব দিক—তাঁর সাম্রাজ্যের দুই দিকেই ছিল পরম শত্রু—তাঁকে আক্রমণ করবার জন্যে তারা ছিল সর্বদাই প্রস্তুত।

    নিষ্কণ্টক হওয়ার জন্যেই শশাঙ্কের এই নতুন যুদ্ধযাত্রা। আধুনিক যুদ্ধনীতি ও রাজনীতিতেও বলে, শত্রুর স্বরাজ্যে গিয়েই শত্রুকে আক্রমণ করা উচিত। শশাঙ্কদেবও সেই নীতি অবলম্বন করতে চাইলেন।

    এইখানে আরও কোনও কোনও পাত্র-পাত্রীর একটু একটু পরিচয় দিলে পরের ঘটনাগুলো বোঝবার সুবিধা হবে।

    উত্তর-পশ্চিম ভারতে (আধুনিক পাঞ্জাব প্রদেশে) ছিল শক্তিশালী স্থানেশ্বর রাজ্য—তার রাজা ছিলেন প্রভাকরবর্ধন, তাঁর বড় ছেলের নাম রাজ্যবর্ধন এবং তাঁর ছোট ছেলে ও ছোট মেয়ের নাম যথাক্রমে হর্ষবর্ধন ও রাজ্যশ্রী। কনৌজের রাজা গ্রহবর্মনের সঙ্গে রাজ্যশ্রীর বিবাহ হয়েছিল।

    কনৌজের গ্রহবর্মন ছিলেন মৌখরী বংশের রাজা। ওই বংশের রাজারা বরাবর মগধ ও গৌড়ের সঙ্গে শত্রুতা করে এসেছেন। তাঁরা বারবার চেয়েছেন মগধ ও গৌড় অধিকার করতে। অতএব এই চিরশত্রুদের বিষদাঁত ভেঙে দেওয়া, শশাঙ্কদেব একটি প্রধান কর্তব্য বলেই গণ্য করলেন। শত্রুকে আগে আক্রমণ করবার সুযোগ না দিয়ে তিনিই আগে আক্রমণ করতে চাইলেন শত্রুকে। এ হচ্ছে রণনীতি।

    সাম্রাজ্যের পূর্ব দিকে ছিল কামরূপ (আধুনিক আসাম প্রদেশ) রাজ্য। তার রাজার নাম ভাস্করবর্মন। ঐতিহাসিকরা বলেন, খুব সম্ভব শশাঙ্ক সম্মুখযুদ্ধে তাঁকে হারিয়ে দিয়েছিলেন বলে তিনিও মনে-মনে শত্রুতা পোষণ করে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে সুযোগ খুঁজছিলেন।

    এইরকম পরিস্থিতির মধ্যে শশাঙ্কদেব সসৈন্য বেরিয়ে পড়লেন। তাঁকে যে যুদ্ধ করতে-করতে অগ্রসর হতে হয়েছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সে-সব যুদ্ধের কোনও বর্ণনা আর পাওয়া যায় না।

    তাঁর বিজয়যাত্রা বিস্তৃত হয়ে পড়ল কাশীধাম পর্যন্ত। মুর্শিদাবাদ থেকে বারাণসী, দূরত্বও যথেষ্ট এবং এতখানি জায়গা দখল করাও যা-তা শক্তির পরিচায়ক নয়। তারপর এই পর্যন্ত এসে তিনি নিজের ভূয়োদর্শনের আর-একটা মস্ত প্রমাণ দিলেন।

    তিনি বুঝলেন, মৌখরী রাজা গ্রহবর্মন হচ্ছেন স্থানেশ্বররাজ প্রভাকরবর্ধনের জামাই। সুতরাং তাঁকে আক্রমণ করলে তাঁর সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসবে স্থানেশ্বরের সৈন্যগণও। নিজের রাজ্য ছেড়ে অত দূরে গিয়ে একসঙ্গে দুই রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

    মধ্যভারতে ছিল মালব প্রদেশ, সেখানকার রাজার নাম দেবগুপ্ত, তিনি গুপ্তবংশীয়। গুপ্তসাম্রাজ্যের অস্তিত্ব লোপ পাওয়ার পরেও ভারতের এখানে-ওখানে সেই বংশের কোনও-কোনও প্রাদেশিক নৃপতি রাজত্ব করতেন। দেবগুপ্তও সেইরকম একজন রাজা এবং মৌখরীরা ছিল গুপ্তদেরও চিরশত্রু।

    দেবগুপ্তকে শশাঙ্ক মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্যে আহ্বান করলেন এবং দেবগুপ্তও সাগ্রহে দিলেন সেই আহ্বানে সাড়া।

    তারপর খবর এল স্থানেশ্বররাজ প্রভাকরবর্ধন পরলোকে গমন করেছেন। এত বড় সুযোগ ছাড়া উচিত নয় বুঝে দেবগুপ্তের কাছে দূতমুখে শশাঙ্ক বলে পাঠালেন : ‘আপনি মৌখরীরাজ গ্রহবর্মনের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করুন। আপনাকে সাহায্য করবার জন্যে আমিও সদলবলে যাত্রা করছি।’

    দেবগুপ্ত অবিলম্বে মৌখরীদের রাজ্য আক্রমণ করলেন।

    তারপর উপরি-উপরি ঘটল ঘটনার-পর-ঘটনা।

    মালবরাজের সঙ্গে যুদ্ধ হল মৌখরীরাজের এবং যুদ্ধে পরাস্ত ও নিহত হলেন গ্রহবর্মণ। দেবগুপ্ত মৌখরীরাজের সহধর্মিণী ও স্থানেশ্বরের রাজকন্যা রাজ্যশ্রীকে বন্দিনী করে শত্রুদের রাজধানী কনৌজ অধিকার করলেন।

    যুবরাজ রাজ্যবর্ধন তখন রাজা হয়ে স্থানেশ্বরের সিংহাসনে আরোহণ করেছেন। নিজের ভগ্নীপতির মৃত্যু ও সহোদরার বন্দিদশার কথা শুনে তিনি একটুও সময় নষ্ট করলেন না। দেবগুপ্তের সঙ্গে শশাঙ্ক যোগ দেওয়ার আগেই তাড়াতাড়ি দশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য সংগ্রহ করে ঝড়ের মতো কনৌজের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সে প্রবল আক্রমণ সহ্য করতে পারলেন না দেবগুপ্ত।

    স্থানেশ্বরের তরুণ রাজা যে এত শীঘ্র যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হতে পারবেন, শশাঙ্ক নিশ্চয়ই সেটা আন্দাজ করেননি। তিনি যখন সসৈন্যে ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হলেন, দেবগুপ্ত তখন পরাজিত ও নিহত।

    সদ্য-সদ্য যুদ্ধজয়ী হয়ে তখন রাজ্যবর্ধনের সাহস গিয়েছে বেড়ে। প্রাজ্ঞতার পরিবর্তে তিনি দেখালেন অজ্ঞতা। আরও সৈন্যবলের জন্য অপেক্ষা না করেই তিনি শশাঙ্কের মতো অভিজ্ঞ যোদ্ধাকে আক্রমণ করতে ইতস্তত করলেন না, ফলে তিনিও যুদ্ধে হেরে বন্দি ও নিহত হলেন।

    স্থানেশ্বরের রাজকন্যা ও কনৌজের রানি রাজ্যশ্রী এই গোলযোগের সময়ে কেমন করে কারামুক্ত হলেন তা জানা যায় না। তিনি পালিয়ে গেলেন বিন্ধ্যারণ্যের দিকে। শশাঙ্কের উদ্দেশ্য সিদ্ধ—চূর্ণ হল চিরশত্রু মৌখরীদের দর্প! সুদূর গৌড় থেকে বেরিয়ে তিনি আর্যাবর্তের প্রায় প্রান্তদেশে এসে রোপণ করেছেন নিজের গৌরবনিশান!

    ওদিক থেকে সংবাদ এল, স্থানেশ্বরের রাজপুত্র বা নতুন রাজা হর্ষবর্ধন বিপুল এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাঁকে আক্রমণ করতে আসছেন।

    এদিকে আবার কামরূপরাজ ভাস্করবর্মণও শশাঙ্কদেবের অবর্তমানে সাহস পেয়ে হর্ষবর্ধনের পক্ষে যোগ দিয়ে সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তে উপদ্রব আরম্ভ করেছেন।

    দুই দিকে প্রবল শত্রু দেখে বিচক্ষণ নায়কের মতো শশাঙ্ক আবার স্বদেশের দিকে প্রত্যাবর্তন করলেন। কিন্তু তার আগে নিহত ও পরাজিত মৌখরীরাজের ছোটভাই অবন্তীবর্মণকে কনৌজের সিংহাসনে বসিয়ে দিয়ে গেলেন—নিশ্চয়ই নিজের সামন্তরাজা রূপে।

    হর্ষবর্ধন প্রথমে বিন্ধ্যারণ্যে যাত্রা করলেন। কারণ তিনি খবর পেয়েছিলেন, তাঁর সহোদরা রাজ্যশ্রী নাকি সেখানকার আদিবাসীদের আশ্রয়ে বাস করছেন। তিনি যথাস্থানে উপস্থিত হয়ে দেখলেন, ভবিষ্যতের আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে রাজ্যশ্রী জ্বলন্ত চিতায় প্রবেশ করে জীবন দেওয়ার উদ্যোগ করছেন। ভগ্নীকে উদ্ধার করে তিনি ধাবিত হলেন শশাঙ্কের সন্ধানে। এসব হচ্ছে সপ্তম শতাব্দীর প্রথম পাদের ঘটনা।

    তার পরের ঘটনা স্পষ্ট করে জানা যায় না। শশাঙ্কের সঙ্গে হর্ষবর্ধনের কোথাও সম্মুখযুদ্ধ হয়ে থাকলেও তার কোনও সঠিক বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে এটা ঠিক, শশাঙ্কের গতি কেউ রোধ করতে পারেনি, তিনি নিজের রাজ্যে ফিরে গিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, শশাঙ্কদেব পলায়ন করেননি, সুব্যবস্থিতভাবে সমগ্র ফৌজ নিয়ে পশ্চাদবর্তী হয়েছিলেন। এই বিংশ শতাব্দীতেও বৃহত্তর বাহিনীর সম্মুখীন হলে বড়-বড় সেনাপতিরা ঠিক ওই পদ্ধতিই অবলম্বন করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে রুশিয়ানরা প্রথমে হটে গিয়েছিল বলেই পরে জার্মানদের একেবারে হারিয়ে দিতে পেরেছিল। শশাঙ্কদেবেরও এই চাতুর্যপূর্ণ যুদ্ধকৌশল ব্যর্থ হয়নি, কারণ পরে তাঁর রাজ্যে গিয়ে হর্ষবর্ধন হয়তো অল্পবিস্তর উৎপাত করেছিলেন, কিন্তু মগধ ও বঙ্গদেশ জয় বা শশাঙ্ককে বন্দি না করেই সে যাত্রা তাঁকে ফিরে আসতে হয়েছিল স্বদেশে।

    নিজের সাম্রাজ্যে স্বাধীন সম্রাট শশাঙ্কদেব স্বয়ংপ্রভু হয়েই সগৌরবে বিরাজ করতে লাগলেন।

    হর্ষবর্ধন যখন ‘মহারাজাধিরাজ শ্রীহর্ষ’ বলে নিজের নামসই করতেন, তখনও শশাঙ্কদেব মাথা নত করে তাঁর সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করেননি। শ্রীহর্ষের সঙ্গে সংঘর্ষের পরে বহু বৎসর পর্যন্ত তিনি দোর্দণ্ডপ্রতাপে নিজের রাজ্যচালনা করে গিয়েছেন। একদিকে হর্ষবর্ধন এবং আর-একদিকে কামরূপরাজ ভাস্করবর্মন, দুই দিকে দুই পরাক্রান্ত শত্রু, কিন্তু কেহই মগধ ও বাংলাদেশের সূচ্যগ্রপরিমিত ভূমি অধিকার বা শশাঙ্কের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করতে পারেননি। এ থেকেই প্রমাণিত হয়, তাঁদের কারুরই শশাঙ্কদেবকে দমন করবার শক্তি ছিল না।

    হর্ষবর্ধন কবি বাণভট্টের পালক ও অন্নদাতা ছিলেন। তাঁর প্রতিপালকের শত্রু বলে বাণভট্টও শশাঙ্কদেবকে বাছাবাছা গালাগালি দিয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগও করেছেন। একটি অভিযোগ এই : শশাঙ্ক রাজ্যবর্ধনের হত্যাকারী।

    পৃথিবীর সব দেশেই সেকালকার রাজনীতিতে বিধি ছিল, পরাজিত শত্রুকে মৃত্যুমুখে নিক্ষেপ করা। অধিকাংশ স্থলেই সেই নীতি পালিত হত এবং আজও হয়। গত দ্বিতীয় মহাসমরে জয়ী হয়ে মিত্রপক্ষ বিচারের নামে জার্মানির বন্দি রণনায়কদের নিয়ে কী নরমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন, সেকথা সর্বজনবিদিত। শশাঙ্কদেব রাজনীতিই পালন করেছিলেন এবং রাজনীতি চিরদিনই নিষ্করুণ।

    হর্ষবর্ধন হিন্দুধর্ম ত্যাগ করেননি, কিন্তু তিনি ছিলেন বৌদ্ধদের পৃষ্ঠপোষক এবং এইজন্যে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী চৈনিক ভ্রমণকারী হিউয়েন সাং সর্বত্রই তাঁর গুণগান ও তাঁর শত্রুদের দোষকীর্তন করে গিয়েছেন। তিনি বলেন, শৈব শশাঙ্ক ছিলেন বৌদ্ধদের প্রতি অত্যাচারী ও বৌদ্ধ-কীর্তি ধ্বংসকারী। কিন্তু ঐতিহাসিকরা বলেন, এর কারণ শশাঙ্কের ধর্মদ্বেষিতা নয়, মগধে ও গৌড়ে যেসব বৌদ্ধ বাস করতেন, তাঁরা দেশের মহাশত্রু হর্ষবর্ধনের অনুগত ছিলেন বলেই শশাঙ্কের বিরাগভাজন হয়েছিলেন।

    বাণভট্ট ও হিউয়েন সাং-এর অভিযোগ অমূলক বা অতিরঞ্জিত বলেই গ্রহণ করা হয়।

    সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারত যে সম্রাট শশাঙ্কের অপূর্ব প্রতিভায় ও প্রবল প্রতাপে গৌরবোজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, এ-বিষয়ে কিছুমাত্র সন্দেহের কারণ নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখনও তাঁর সম্বন্ধে আরও বেশি কিছু আবিষ্কৃত হয়নি।

    তাঁর মৃত্যুর তারিখও সঠিকভাবে বলা চলে না। তবে তিনি যে ৬১৯ খ্রিস্টাব্দের পরেও জীবিত ছিলেন, একথা নিশ্চিতভাবে জানা গিয়েছে। খুব সম্ভব ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের কিছু আগেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন।

    শশাঙ্কের বলিষ্ঠ মুষ্টি থেকে রাজদণ্ড খসে পড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই সাম্রাজ্যের মধ্যে হল বহিঃশত্রুর আবির্ভাব। পূর্বদিক থেকে হানা দিলেন কামরূপরাজ ভাস্করবর্মণ এবং উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে হানা দিয়ে আর্যাবর্তের সম্রাট হর্ষবর্ধন সমগ্র মগধ ও বঙ্গদেশ দখল করে বসলেন। শশাঙ্কদেব বর্তমান থাকতে এমন সাহস বা ক্ষমতা তাঁদের কারুরই হয়নি। শশাঙ্কের শক্তি ও বীরত্বের এ-ও একটা শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।

    তখনকার মতো বাঙালির গৌরব বিলুপ্ত হল বটে, কিন্তু অষ্টম শতাব্দীতে পুনর্বার বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিল নবজাগ্রত বাঙালির অমিত বাহুবল—তবে সে হচ্ছে ভিন্ন কাহিনি।

    সম্রাট শশাঙ্কের এক পুত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর নাম মানব। কিন্তু তিনি অযোগ্য পুত্র, পিতার মতো মহামানব হতে পারেননি, রাজ্যশাসন করতে পেরেছিলেন মাত্র আট মাস পাঁচ দিন।

  • অনামা বীরাঙ্গনা

    অনামা বীরাঙ্গনা

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    অনামা বীরাঙ্গনা

    দিল্লির প্রথম আফগান সুলতান হচ্ছেন লোদী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বহলল। ১৪৫৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি সিংহাসন অধিকার করেন। ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে সুবিখ্যাত প্রথম পানিপথের যুদ্ধে বাবরের কাছে পরাজিত হওয়ার পর আফগানরা আর কখনও ভারতের ওপরে কর্তৃত্ব করতে পারেনি।

    বহলল জীবনে অনেক যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত হয়েছেন, কিন্তু সে-সবের কথা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার দরকার নেই। আমরা এখানে একটি বিশেষ যুদ্ধের কাহিনি বলতে চাই। ভারতে মুসলমান রাজত্বের ইতিহাসে এরকম কাহিনি দুর্লভ। ‘তারিখ-ই-সালাতিন-ই-আফগান’ নামক গ্রন্থ থেকে কাহিনিটি সংগৃহীত।

    সিন্ধু প্রদেশে আহম্মদ খাঁ ভাট্টি বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন, তিনি আর মূলতানের শাসনকর্তার হুকুম তামিল করতে রাজি নন। তিনি গঠন করেছেন এক বৃহৎ সেনাদল এবং তার মধ্যে অশ্বারোহী সৈনিকের সংখ্যা বিশ হাজারের কম নয়। এই ফৌজ নিয়ে তিনি মূলতানের যত্রতত্র হানা দিয়ে বেড়ান—কোথাও লুঠতরাজ করেন, কোথাও কোনও শহর দখল করেন। দিনে-দিনে বেড়ে উঠছে তাঁর শক্তি ও সাহস। জীবনযাপন করেন তিনি স্বাধীন নৃপতির মতো।

    দিল্লিতে গিয়ে পৌঁছোল এই দুঃসংবাদ। সুলতান বহললের বুঝতে বিলম্ব হল না যে, অবিলম্বে এই বিদ্রোহ দমন করতে না পারলে ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়াবে রীতিমতো গুরুতর।

    দিল্লি থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে বেরিয়ে পড়ল সুলতানের তিরিশ হাজার সুশিক্ষিত সাদী-সৈনিক, তাদের পুরোভাগে রইলেন সেনাপতি উমর খাঁ ও রাজপুত্র বেয়াজিদ।

    কিন্তু খবর শুনে আহম্মদ খাঁয়ের মুখ শুকিয়ে গেল না, আত্মশক্তির ওপরে তাঁর অটল বিশ্বাস। সবদিক তলিয়ে না বুঝে তিনি অস্ত্রধারণ করেননি। সুলতানের ফৌজকে উত্তপ্ত অভ্যর্থনা দেওয়ার জন্যে তিনিও প্রস্তুত হতে লাগলেন।

    সুলতানের মতো তিনিও স্বশরীরে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন না। সেনাপতি করলেন নিজের ভ্রাতুষ্পুত্র নওরং খাঁকে এবং সুলতানের তিরিশ হাজার অশ্বারোহীর বিরুদ্ধে পাঠিয়ে দিলেন মাত্র পনেরো হাজার অশ্বারোহী। নিশ্চয়ই তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে, তাঁর এক-একজন লোক শক্তিতে দুজন শত্রুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

    নওরং খাঁ বয়সে নবীন, বীরধর্ম পালনের চেয়ে আমোদ-আহ্লাদের দিকেই তাঁর ঝোঁক ছিল বেশি। প্রথমেই নিজের তরবারি কোষমুক্ত করবার ইচ্ছা তাঁর হল না।

    দাউদ খাঁ নামে এক সেনানীকে ডেকে বললেন, ‘দশ হাজার সৈন্য নিয়ে তুমি শত্রুদের মুণ্ডপাত করে এসো। দরকার হলে আমি সাহায্য করব।’

    তিরিশ হাজারের বিরুদ্ধে দশ হাজার! কথাটা শুনতেও হাস্যকর। কিন্তু দাউদ খাঁ মুখে কোনও প্রতিবাদ করলেন না, সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হলেন যথাসময়ে।

    যুদ্ধ হল। তিরিশ হাজার তরবারিকে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলে দশ হাজার তরবারি। কিন্তু পারবে কেন? জয়ী হল সুলতানের পক্ষ। রক্তাক্ত মাটির ওপরে লুটিয়ে পড়ল দাউদ খাঁর মৃতদেহ। মারা পড়ল বা জখম হল তাঁর অনেক সৈন্য। বাকি সবাই প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এল।

    ছুটে গেল নওরং খাঁর আমোদ-আহ্লাদের স্বপ্ন। কেমন করে তিনি আর পিতৃব্যের কাছে মুখ দেখাবেন? বিলাসের আসন ছেড়ে নেমে এসে তিনি সজ্জিত হতে লাগলেন রণসজ্জায়।

    এখন তিনি মরিয়া। নেই তাঁর মৃত্যু-ভীতি। তিনি প্রমাণ করতে চান, তাঁরও ধমনিতে প্রবাহিত হচ্ছে বীরের রক্ত, যোদ্ধার রক্ত।

    তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন এক নারী। ইতিহাস তাঁর প্রকৃতির বর্ণনা দিয়েছে। কিন্তু আকৃতির কথা বলেনি। তাঁর নামও আমরা শুনিনি। কেবল এইটুকু জানতে পেরেছি, তিনি ছিলেন নওরং খাঁর প্রিয়বান্ধবী। বর্ণনার সুবিধার জন্যে আমরাও তাঁকে বান্ধবী বলে ডাকব।

    বান্ধবী বললেন, ‘বন্ধু, আমিও তোমার সঙ্গে যুদ্ধে যেতে চাই।’

    নওরং খাঁয়ের আপত্তি হল না। সেকালকার অনেক রাজা-বাদশা নারীদের সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করতেন।

    পরাজিত সৈন্যদের সঙ্গে নিজের নূতন সেনাদল নিয়ে নওরং খাঁ ছুটলেন শত্রুদের গতিরোধ করবার জন্যে। মনে-মনে তাঁর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা—হয় জিতব, নয় মরব।

    আবার দুই দল হল মুখোমুখী। বাজল কাড়া-নাকাড়া, দুলল যোদ্ধাদের মন, জাগল ‘আল্লা হো আকবর’ ধ্বনি। আরম্ভ হল সংঘর্ষ।

    হ্রেষারবে চতুর্দিক ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত করে, ধূলিপটলে আকাশ-বাতাস আচ্ছন্ন করে তুলে দুই পক্ষের অশ্বরা পরস্পরের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল, সওয়ারদের শাণিত অস্ত্রগুলো দিকে-দিকে সৃষ্টি করতে লাগল চোখ-ধাঁধানো বিদ্যুৎ-চমক। কত সওয়ার, কত ঘোড়া মাটির ওপরে লুটিয়ে পড়ে ছটফট করতে-করতে একেবারে স্থির ও নিঃসাড় হয়ে গেল, কত হুঙ্কারের সঙ্গে কত আর্তনাদ মিলিত হয়ে বিদীর্ণপ্রায় করে দিতে লাগল কর্ণপটহ।

    লড়াই করছেন নওরং খাঁ মত্তহস্তীর মতো—যেখানে বিপদ সেখানেই তিনি এবং সেইখানেই ঝকমকিয়ে উঠছে তাঁর অশ্রান্ত হাতের তরবারি। শত্রুসৈন্যরা দলে-দলে হতে লাগল পপাত-ধরণীতলে!

    কিন্তু বৃথা! নওরং খাঁ নিহত হলেন অবশেষে। নায়কের মৃত্যু দেখে হতাশ হয়ে তাঁর সৈন্যরা রণক্ষেত্র ত্যাগ করতে উদ্যত হল। সেই সময়ে ঘটল এক অভাবিত ঘটনা। কোথা থেকে সবেগে ছুটে এল এক তরুণ সুকুমার বীর, পরনে তার যোদ্ধার সাজ, চক্ষে তার তীব্র দীপ্তি এবং কণ্ঠে তার দৃপ্ত চিৎকার—’যুদ্ধ করো, যুদ্ধ করো! আমি আহম্মদ খাঁর পুত্র, আমিই তোমাদের চালনা করে যুদ্ধ জয় করব। ফিরে দাঁড়াও, যুদ্ধ করো!’

    ফিরে দাঁড়াল আবার পলায়মান সৈন্যগণ। এই নবীন নায়কের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখবার অবসরও তাদের হল না, কিন্তু যেন নতুন জীবন ফিরে পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে দৃঢ়পদে ও ক্ষিপ্রহস্তে তারা করতে লাগল অস্ত্রচালনা এবং শত্রুসংহার।

    নবীন নায়ক এসে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। সংখ্যায় দ্বিগুণ হয়েও দিল্লির সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্রে আর তিষ্ঠতে পারলে না, ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যেদিকে পারল পলায়ন করতে লাগল ঊর্ধ্বশ্বাসে। বিজয়গৌরব অর্জন করে তরুণ নায়কের চারিপাশে দাঁড়িয়ে আহম্মদ খাঁয়ের সৈন্যরা গগনভেদী স্বরে জয়ধ্বনির পর জয়ধ্বনি করতে লাগল।

    এই তরুণ নায়ক হচ্ছেন নওরং খাঁয়ের অনামা বান্ধবী!

    বন্ধুর মৃত্যু দেখে পুরুষের ছদ্মবেশে তিনি ক্রুদ্ধ সিংহীর মতো প্রতিশোধ নিতে ছুটে এসেছেন যুদ্ধক্ষেত্রে।

    আহম্মদ খাঁ এই সংবাদ পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। এবং বীরাঙ্গনার কাছে উপহার পাঠিয়ে দিলেন দশ হাজার টাকার অলঙ্কার। পনেরো শতাব্দীতে দশ হাজার টাকার মূল্য ছিল এখনকার চেয়ে অনেক বেশি।

    ভারতের মুসলমানদের মধ্যে সৈন্যচালনা করেছেন এমন আরও দুই বীরনারীর নাম অতি বিখ্যাত। রাজিয়া এবং চাঁদবিবি। কিন্তু তাঁরা ছিলেন সুলতানা এবং রাজধর্ম পালনের জন্যে লোকের ওপর কর্তৃত্ব করতে অভ্যস্ত। আর নওরং খাঁয়ের বান্ধবী সাধারণ নারী হয়েও অসাধারণ বুদ্ধি, বীরত্ব ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের পরিচয় দিয়ে বিস্মিত করেছিলেন সবাইকে। এইরকম দ্বিতীয় ঘটনা ইতিহাস তন্ন-তন্ন করে খুঁজলেও পাওয়া যাবে না।

    সুলতান বহলল আবার আহম্মদ খাঁয়ের বিরুদ্ধে অসংখ্য সৈন্য প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু সে হচ্ছে ভিন্ন গল্প।

  • ইতিহাসের রক্তাক্ত দৃশ্য

    ইতিহাসের রক্তাক্ত দৃশ্য

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    ইতিহাসের রক্তাক্ত দৃশ্য

    বিশ্বজিৎ তৈমুর লং!

    হ্যাঁ, ‘বিশ্বজিৎ’ উপাধি তাঁরই প্রাপ্য। উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে রুশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত দেশে দেশে সগর্বে উড়েছিল তাঁর রক্তাক্ত জয়পতাকা এবং সমগ্র ইউরোপের রাজারাজড়ারা সর্বদাই সভয়ে তাঁকে খোশামোদ করে তুষ্ট রাখতে চাইতেন।

    ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর ছিলেন ওই তৈমুরেরই ষষ্ঠ বংশধর। তারপর একে একে সিংহাসনে বসেন হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর ও শাজাহান। শাজাহানের জ্যেষ্ঠপুত্র ছিলেন দারা সুকো। আজ আমরা এই দারারই করুণ জীবনকাহিনি বর্ণনা করব।

    দারার কথা বলতে তৈমুরের কথা মনে পড়ল বিশেষ এক কারণে। তৈমুরের রক্তে কী বিশেষত্ব ছিল জানি না, কিন্তু তাঁর বংশধররা গৃহবিপ্লব, পিতৃদ্রোহ ও ভ্রাতৃবিরোধ প্রভৃতির দ্বারা নিজেদের কলঙ্কিত করেছিলেন যেন বংশানুক্রমেই।

    তৈমুরের মৃত্যুর পরেই তাঁর পুত্রগণ সিংহাসনের জন্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে করেছিলেন অস্ত্রধারণ। ফলে তৈমুরের সৃষ্ট অমন বিশাল সাম্রাজ্য কেবল খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়েনি, তার অধিকাংশই তাঁর বংশধরদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল।

    বাবর প্রথমে ছিলেন ক্ষুদ্র এক নরপতি। কেবল ব্যক্তিগত শক্তি ও প্রতিভার প্রসাদেই তিনি অধিকার করতে পেরেছিলেন দিল্লির সিংহাসন। তাঁর পুত্র ও পৌত্র হচ্ছেন হুমায়ুন ও আকবর। সিংহাসনের কোনও ভাগীদার ছিল না বলেই তাঁদের আর ভাইয়ে ভাইয়ে কাটাকাটি করতে বা গৃহযুদ্ধে প্রবৃত্ত হতে হয়নি।

    কিন্তু তারপরেই দেখা গেল, আকবরের পুত্র জাহাঙ্গীর হয়েছেন পিতৃদ্রোহী এবং জাহাঙ্গীরের পুত্র শাজাহানও করেছেন পিতার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ। তারপর ঔরংজীবও বংশের ধারা বজায় রাখতে ছাড়লেন না, সম্রাটের আসন অধিকার করলেন তিনি পিতৃদ্রোহ এবং ভ্রাতৃহত্যার দ্বারা।

    এবং নিয়তির ওই অভিশাপ থেকে ঔরংজীব নিজেও অব্যাহতি লাভ করেননি। ঔরংজীবের জীবনকালেই তাঁর পুত্র আকবর বিদ্রোহী হয়েছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পরেই অন্যান্য পুত্ররা সিংহাসন লাভের জন্যে পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করে পিতারই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন। তারপরেও মোগল রাজবংশ ওই অভিশাপ থেকে মুক্তিলাভ করতে পারেনি। ভ্রাতৃহত্যার দ্বারা তা কলঙ্কিত হয়েছিল আরও কয়েকবার।

    এমন সব অস্বাভাবিক দৃষ্টান্ত এবং একই মারাত্মক দৃশ্যের পৌনঃপুনিক অভিনয় পৃথিবীর আর কোনও রাজবংশের ইতিহাস খুঁজলে পাওয়া যাবে না।

    সম্রাট শাজাহানের চার পুত্র ও দুই কন্যা—তাঁদের নাম যথাক্রমে দারা সুকো, মহম্মদ সুজা, মুহিউদ্দীন মহম্মদ ঔরংজীব ও মহম্মদ মুরাদ বক্স এবং জাহানারা ও রোশেনারা। শাজাহান যাঁর নাম স্থাপত্যে অমর করে রেখে গিয়েছেন, সেই মমতাজমহলই হচ্ছেন এই ছয় সন্তানের জননী।

    দারা সুকো ছিলেন জ্যেষ্ঠ। পৃথিবীর সব দেশেই একটা সাধারণ নিয়ম প্রচলিত আছে। জ্যেষ্ঠ রাজপুত্রই হন সিংহাসনের অধিকারী। সুতরাং সম্রাট শাজাহান যে দারাকেই নিজের উত্তরাধিকারী রূপে নির্বাচন করবেন, এটা কিছুমাত্র অন্যায় বা অভাবিত কথা নয়।

    কিন্তু তার উপরে একটা বিষয় সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সম্রাট শাজাহানের হাবে-ভাবে-ব্যবহারে সর্বদাই জাহির হয়ে পড়ত যে, তিনি ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন জ্যেষ্ঠপুত্র দারাকেই। এই পক্ষপাতিতা অন্যান্য রাজপুত্রদের ভালো লাগত না।

    তবে এ ব্যাপারটাও কিছুমাত্র অস্বাভাবিক নয়। পৃথিবীর প্রত্যেক সাধারণ গৃহস্থ পরিবারের মধ্যেও দেখা যায়, একাধিক পুত্রের পিতারা নিজের কোনও একটি ছেলেকে অন্য সন্তানদের চেয়ে বেশি ভালো না বেসে পারেন না।

    এমনকী পিতার পক্ষপাতিতার জন্য যে-ঔরংজীব তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে সবচেয়ে বিষদৃষ্টিতে দেখতেন, তিনিও তাঁর অতি অক্ষম কনিষ্ঠ পুত্র কামবক্সকে তাঁর অন্যান্য ছেলেদের চেয়ে বেশি আদর করতেন।

    সাধারণ গৃহস্থ পিতার সম্বল বা সম্পদ হয় নগণ্য কিংবা যৎসামান্য। সে ক্ষেত্রে পিতার একদেশদর্শিতার ফলে পুত্রদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা গেলেও তা আর বেশি দূর পর্যন্ত গড়াতে পারে না। কিন্তু যেখানে ভারতবর্ষের মতো বিপুল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে কথা, সেখানে ভাইয়ে ভাইয়ে মিল না থাকলে গুরুতর অনর্থপাতের সম্ভাবনাই বেশি। দেখা গেছে, মুকুটের লোভ পারিবারিক স্নেহের বন্ধন মানে না—পিতা ও পুত্রও হতে পারে পরস্পরের শত্রু। এক্ষেত্রে তাই হয়েছিল।

    দারা ছিলেন শাজাহানের নয়নের মণি। দারাকে তিনি নিজের কাছে কাছে রাখতে চাইতেন অহরহ। এবং দারার প্রতি তাঁর এই অতিরিক্ত স্নেহটা বিশেষভাবে জাহির হয়ে পড়ায় অন্যান্য পুত্রের মন হয়ে উঠেছিল হিংসায় পরিপূর্ণ। একটা দৃষ্টান্ত দিই।

    শাজাহান তাঁর প্রত্যেক পুত্রকে বালক বয়স থেকেই উপযুক্ত শিক্ষকের অধীনে রেখে নানা বিদ্যায় পারদর্শী করে তোলবার চেষ্টা করেছিলেন। তারপর ছেলেদের রাজকার্যে হাতেনাতে অভিজ্ঞ করবার জন্যে প্রেরণ করতেন সাম্রাজ্যের এক-এক প্রদেশে রাজপ্রতিনিধিরূপে।

    দাক্ষিণাত্য ছিল অশান্তিপূর্ণ এবং রাজধানী দিল্লি থেকে বহুদূরে। শাজাহানের নির্দেশে ঔরংজীবকে রাজপ্রতিনিধিরূপে যেতে হয়েছিল সেইখানে।

    মুরাদকেও পাঠানো হয়েছিল দক্ষিণের আর এক প্রদেশে।

    মোগল সম্রাটরা নরকের মতো ঘৃণা করতেন সুদূর বাংলাদেশকে, কারণ সেখানকার আবহাওয়া পশ্চিমাদের ধাতে সইত না। দ্বিতীয় রাজপুত্র সুজা প্রেরিত হয়েছিলেন ওই বঙ্গদেশেই।

    পাঞ্জাব, এলাহাবাদ ও মূলতান প্রভৃতি প্রদেশ ছিল না অশান্তিকর ও আপত্তিকর, বরং অর্থকর বলেই তাদের খ্যাতি ছিল। সেই সব প্রদেশেই দারাকে রাজপ্রতিনিধির পদে নিযুক্ত করা হত। উপরন্তু, দারাকে অত দূর পর্যন্তও যেতে হত না, তিনি নিজে থাকতেন পিতার আশেপাশেই, প্রাদেশিক শাসনকার্য পরিচালনা করতেন তাঁর দ্বারা নিযুক্ত কোনও প্রতিভূ।

    শাজাহান যখন সসম্মানে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত, তখন থেকেই দারা হয়ে উঠেছিলেন সাম্রাজ্যের মধ্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি,—তাঁর আসন ছিল সম্রাটের পরেই। তাঁকে ‘শাহী-বুলন্দ-ইকবাল’ (বা মহৎ সৌভাগ্যের রাজা) নামে সুদুর্লভ ও মহাসম্মানকর উপাধিতে ভূষিত এবং চল্লিশ হাজার অশ্বারোহী সৈনিকের নায়কের পদ প্রদান করা হয়েছিল। যে প্রভূত অর্থ তাঁর জন্যে বৃত্তি বলে বরাদ্দ করা হয়েছিল, তা বহু নৃপতিরও হিংসা উদ্রেক করতে পারত। বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মতানুসারে, দারার বাৎসরিক বৃত্তির পরিমাণ ছিল দেড় কোটি থেকে দুই কোটি টাকা। আজকের হিসাবে ওই টাকার পরিমাণ হবে কত গুণ বেশি, সকলে তা কষে দেখতে পারেন।

    রাজসভায় সম্রাটের কাছেই থাকত যুবরাজ দারার জন্যে নির্দিষ্ট সোনার সিংহাসন—ময়ূর সিংহাসনের চেয়ে তার উচ্চতা খুব কম ছিল না। সামরিক পদমর্যাদায় দারার পুত্ররাও ছিলেন সম্রাটের অন্যান্য পুত্রদের সমকক্ষ।

    মুখাপেক্ষী কিংবা সামন্ত রাজা, উপাধি বা পদপ্রার্থীরা এবং সম্রাটের বিরক্তিভাজন কৃপাপ্রার্থীরা শাজাহানের কাছে যাওয়ার আগে দারার কাছে গিয়ে ধরনা দিতেন। পদস্থ সরকারি কর্মচারী এবং নূতন উপাধিধারীগণ যুবরাজের কাছে নতি স্বীকার করবার জন্য স্বয়ং সম্রাট কর্তৃক আদিষ্ট হতেন।

    শেষের দিকে সম্রাটের সামনে বসে বা তাঁর অনুপস্থিতিকালেও শাসনকার্য পরিচালনা করতেন দারাই স্বয়ং। এমনকী তিনি স্বাধীনভাবে সম্রাটের নাম ও শীলমোহর পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারতেন।

    ব্যাপার দেখে অন্যান্য রাজপুত্রের মনে হিংসা ও ক্রোধের সীমা ছিল না। এইভাবে দিল্লির রাজপরিবারের মধ্যে গোড়া থেকেই বোনা হয়েছিল বিষবৃক্ষের বীজ।

    শত্রুরা দারার চরিত্রকে কালো রঙে এঁকে দেখাবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষ্য দেখে বোঝা যায়, সেটা হয়েছে অপচেষ্টা মাত্র।

    দারা ছিলেন ভদ্র ও বিনয়ী এবং বন্ধু ও দুর্গতদের সাহায্য করবার জন্যে প্রস্তুত। পত্নী ও পুত্রদের তিনি খুব ভালোবাসতেন এবং পিতাকেও করতেন রীতিমতো শ্রদ্ধা।

    কিন্তু তিনি আজন্ম লালিতপালিত হয়েছিলেন অসামান্য সৌভাগ্যের কোলে, যখন যা চেয়েছেন তা পেয়েছেন অনায়াসেই এবং কখনও কিছুমাত্র দুঃখবোধ করেননি। তাই ছিল না তাঁর দূরদৃষ্টি ও মানুষ চেনার ক্ষমতা। মনের ও বুদ্ধির জোরে প্রতিবন্ধকতাকে এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও তাঁর ছিল না।

    শাজাহানের কন্যা জাহানারার আত্মজীবনীতে প্রকাশ, প্রপিতামহ আকবর যে স্বপ্ন দেখতেন, প্রপৌত্র দারা নিজের জীবনে তাকেই সম্ভবপর করে তোলবার চেষ্টা করতেন। আকবর হিন্দু-মুসলমানের বিরোধের অবসান এবং এক নূতন ও উদার ধর্মমত প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন। দারারও কাম্য ছিল তাই।

    কিন্তু কেবল স্বপ্ন দেখেই রাজদণ্ড পরিচালনা করা যায় না। সর্বত্র উদারতার সাধনা করা রাজধর্মের বিরোধী। আকবর ছিলেন কূটকচালে রাজনীতিতে বিশেষ অভিজ্ঞ—দারা যা ছিলেন না। আকবরের ছিল প্রথম শ্রেণির যুদ্ধপ্রতিভা। দারাও যোদ্ধা ছিলেন, কিন্তু সেনাপতির কর্তব্যপালন করতে পারতেন না।

    একজন বিখ্যাত ঐতিহাসিক দারার ধর্মমত সম্বন্ধে যা বলেছেন, তার সারমর্ম হচ্ছে এই :

    দারা ছিলেন সর্বেশ্বরবাদে বিশ্বাসী, তাই তিনি ইহুদিদের ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, মুসলমানদের সুফিধর্ম (যার সঙ্গে আমাদের বৈষ্ণবধর্মের মিল দেখা যায়) এবং হিন্দুদের বেদান্তধর্ম অনুশীলন করেছিলেন।

    তাঁর দ্বারা একদল হিন্দু পণ্ডিতের সাহায্যে পারসি ভাষায় উপনিষদ অনূদিত হয়েছিল। তাঁর আর একখানি পুস্তকের নাম হচ্ছে, ‘মাজমুয়া-উল-বাহারিণ’ বা ‘দুই সাগরের সম্মিলন’। তা পাঠ করলে বোঝা যায়, তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন এক মিলনক্ষেত্র আবিষ্কার করা, যেখানে এসে হিন্দু ও মুসলমান পরস্পরের সঙ্গে সম্মিলিত হতে পারে।

    তিনি হিন্দু যোগী লালদাস ও মুসলমান ফকির সারমাদের পদতলে বসে শিষ্যের মতো মনোযোগ দিয়ে উভয়ের উপদেশবাণী শ্রবণ করতেন।

    তাবলে তিনি স্বধর্মবিরোধী ছিলেন না। তিনি মুসলমান সাধুদের একখানি জীবনচরিত সংকলন করেছিলেন। শিষ্যরূপে তাঁর দীক্ষা হয়েছিল মুসলমান সাধু মিয়ান মীরের কাছে—কোনও কাফেরের পক্ষে যা ছিল অসম্ভব। দারার নিজের কথাতেই প্রকাশ পেয়েছে যে, তিনি ইসলামের মূল ধর্মমতে অবিশ্বাসী ছিলেন না।

    কিন্তু তিনি ছিলেন হিন্দুদের বন্ধু। অন্যান্য গোঁড়া মুসলমানের মতো তিনি কোনও দিনই হিন্দুদের বিরুদ্ধে ‘জেহাদ’ বা ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করতে পারতেন না। এইসব কারণে, বিশেষ করে হিন্দুদের কাছে দারা ছিলেন অত্যন্ত লোকপ্রিয়।

    আলোচ্য নাটকীয় কাহিনির প্রধান ও প্রথম নায়ক দারা এবং দ্বিতীয় নায়ক হচ্ছেন ঔরঙ্গজিব। এইবারে তাঁরও একটু পরিচয়ের দরকার।

    ঔরঙ্গজিব ছিলেন দারার চেয়ে কিছু কম, চার বৎসরের ছোট। সম্রাট শাজাহানের অন্যান্য পুত্রের মতো বাল্যে ও যৌবনে উপযুক্ত শিক্ষকদের অধীনে তিনিও বিদ্যালাভের যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছিলেন।

    আরবি, পারসি, হিন্দি ও তুর্কি ভাষায় তাঁর দক্ষতা ছিল। কাব্যের প্রতি তাঁর বিশেষ শ্রদ্ধা না থাকলেও তিনি কয়েকজন কবির উপদেশপূর্ণ রচনার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং দরকার হলেই মুখে মুখে তাঁদের বচন উদ্ধার করতে পারতেন। তিনি ইতিহাস পছন্দ করতেন না, কিন্তু ধর্মশাস্ত্র পাঠ করতে ভালোবাসতেন। নাচ-গান-ছবি তিনি পছন্দ করতেন না।

    জাহানারার আত্মকাহিনিতে বালক ঔরঙ্গজিব সম্বন্ধে একটি কাহিনি পাঠ করা যায়। পিতামহ জাহাঙ্গীর ও পিতা শাজাহান দুজনেই প্রথম বয়সে হয়েছিলেন পিতৃদ্রোহী। শাজাহানেরও তাই ভয় ছিল যে, তাঁর পুত্রেরাও হয়তো কোনওদিন পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে। সেইজন্যে এক ভবিষ্যদবক্তা সন্ন্যাসীকে তিনি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আমার কোনও ছেলে কি আমার বিরুদ্ধাচারণ করে সাম্রাজ্য নষ্ট করবে?’

    সন্ন্যাসী বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ।’

    —‘কে সে?’

    —‘যে সবচেয়ে ফরসা।’

    ঔরঙ্গজিবের গায়ের রং ছিল অতিশয় শুভ্র। ভবিষ্যদবাণীর সময় তাঁর বয়স ছিল দশ বৎসর মাত্র। শাজাহান কিন্তু সেই দিন থেকেই তাঁকে আর ভালো চোখে দেখতেন না এবং তার নাম রেখেছিলেন ‘শ্বেতসর্প’।

    বালক বয়েস থেকেই ঔরঙ্গজিব ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও বীর। এখানে তাঁর সাহস ও বীরত্বের একটি গল্প দেওয়া গেল :

    কিন্তু তার আগে আর একটা কথা বলা উচিত। মোগল সম্রাট ও রাজপুত্ররা—অর্থাৎ তৈমুরের বংশধররা চিরদিনই ছিলেন বীরত্ব ও সাহসের জন্যে বিখ্যাত, তৈমুরের রক্তে কাপুরুষের জন্ম হয়নি বললেও চলে। মোগল রাজবংশের উৎপত্তি যে তৈমুরের রক্ত থেকেই, এর জন্যে তাঁরা ছিলেন মনে মনে গর্বিত।

    ঔরঙ্গজিবের ছোট ছেলে কামবক্স ছিলেন নির্বোধ, নিষ্ঠুর, অত্যাচারী ও প্রমোদপ্রিয়—তাঁকে অকালকুষ্মাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করলেও অন্যায় হবে না।

    মেজো ভাই সম্রাট বাহাদুর শাহের সঙ্গে যুদ্ধ পরাস্ত হয়ে অনায়াসেই তিনি পলায়ন করতে পারতেন। কিন্তু পালাবার নাম মুখেও না এনে লড়তে লড়তে সাঙ্ঘাতিকরূপে আহত হয়ে তিনি প্রাণত্যাগ করেন এবং মরবার আগে বলে যান—আমি হচ্ছি তৈমুরের বংশধর, পাছে কেউ আমাকে কাপুরুষ ভাবে সেই ভয়েই স্বেচ্ছায় আমি মৃত্যুকে বরণ করেছি।

    এইবারে গল্পটা বলি।

    যে সময়ের কথা বলছি তখন ঔরঙ্গজিবের বয়স মাত্র চৌদ্দো বৎসর।

    সম্রাট শাজাহানকে হাতির লড়াই দেখানো হচ্ছে, আশেপাশে দর্শকরূপে রাজপুত্র ও আমির-ওমরাওদের সঙ্গে উপস্থিত আছে সৈন্যসামন্ত ও এক বৃহতী জনতা।

    আচম্বিতে একটা হাতি খেপে গিয়ে তেড়ে এল অশ্বারোহী ঔরঙ্গজিবের দিকে। তখনও পালাবার পথ খোলা ছিল, কিন্তু ঔরঙ্গজিব সে কথা মনেও আনলেন না। পাছে ঘোড়া ভয় পেয়ে সরে পড়ে, তাই তিনি তার বল্গা টেনে রেখে স্থিরভাবে অপেক্ষা করতে লাগলেন। হাতিটা আরও কাছে এগিয়ে এল, ঔরঙ্গজিব বল্লম তুলে সজোরে তার দিকে নিক্ষেপ করলেন।

    হইহই রব উঠল চারিদিকে। আমির-ওমরাও এবং অন্যান্য লোকজন ছুটোছুটি ও চেঁচামেচি করতে লাগল—হাতিকে ভয় পাওয়াবার জন্যে অনেক আতসবাজি ছোড়া হল—কিন্তু বৃথা!

    মত্তমাতঙ্গ ছুটে এসে শুঁড়ের এক আঘাতে ঘোড়াটাকে মাটির উপরে পেড়ে ফেললে—আর রক্ষা নেই!

    ঔরঙ্গজিব এক লাফে মাটির উপরে লাফিয়ে পড়ে, খাপ থেকে তরোয়াল খুলে অটল পদে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালেন হাতির সামনে।

    হঠাৎ দৈবগতিকে হল দৃশ্য পরিবর্তন! একে তো ভীষণ হট্টগোলে, বল্লমের খোঁচায় ও আতসবাজির সশব্দ অগ্নিকাণ্ডে হাতিটা চমকে ও ভেবড়ে গিয়েছিল, তার উপরে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হাতিটাও আবার রুখে উঠে তাকে আক্রমণ করতে আসছে দেখে সে ঊর্ধ্বশ্বাসে পৃষ্ঠভঙ্গ দিতে কালবিলম্ব করলে না।

    ফাঁড়া উৎরে গেল ভালোয় ভালোয়, সকলে আশ্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচল।

    শাজাহান তাঁর বীর সন্তানকে সাদরে বুকের ভিতরে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি বুঝলেন, একদিক দিয়ে ঔরঙ্গজিব হচ্ছেন তাঁরই যোগ্য পুত্র, কারণ তিনিও যৌবনে পিতা জাহাঙ্গীরের চোখের সামনে তরবারি হাতে নিয়ে নির্ভয়ে আক্রমণ করেছিলেন এক বন্য ও দুর্দান্ত ব্যাঘ্রকে।

    ঔরঙ্গজিব লাভ করলেন ‘বাহাদুর’ উপাধি এবং পুরস্কার স্বরূপ দুই লক্ষ টাকা দামের উপহার ও নগদ পাঁচ হাজার মোহর।

    ছেলের গোঁয়ারতুমির জন্য সম্রাট যখন মৌখিক ভর্ৎসনা করলেন। ঔরঙ্গজিব উত্তরে বললেন, ‘পলায়নই ছিল লজ্জাকর। আমি মরলেও সেটা লজ্জার বিষয় হত না। মৃত্যু সম্রাটকেও ছেড়ে দেয় না, তাতে সম্মানহানি হয় না।’

    দারা বাপের আদুরে ছেলে বলে রাজপুত্ররা সবাই অসন্তুষ্ট ছিলেন, এ কথা আগেই বলা হয়েছে। কিন্তু দারার প্রতি ঔরঙ্গজিবের অসন্তোষ, ক্রোধ ও আক্রোশ ছিল আর সকলেরই চেয়ে বেশি। এ বিদ্বেষ তাঁর বাল্যকাল থেকেই এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বিদ্বেষও বেড়ে উঠেছিল ক্রমে ক্রমে।

    ঔরঙ্গজিব তখন দাক্ষিণাত্যের রাজপ্রতিনিধি এবং তাঁর বয়স ছাব্বিশ বৎসর। জ্যেষ্ঠ দারা পিতার সবচেয়ে প্রিয়পাত্র বলে মন তাঁর তিক্তবিরক্ত। তাঁর তখনকার মৌখিক ভাষায় এবং চিঠিপত্রে দারার প্রতি এই বিষম আক্রোশটা সর্বদাই প্রকাশ পেত। তার উপরে সেই সময়ে এমন এক ঘটনা ঘটল যার ফলে সেই বিরাগটা হয়ে উঠল দস্তুরমতো বিজাতীয়।

    দৈবগতিকে আগুনে পুড়ে সহোদরা জাহানারার জীবন নিয়ে টানাটানি চলছে। বোনকে দেখবার জন্যে ঔরঙ্গজিব এলেন আগ্রা শহরে।

    সেই সময়ে সেখানে যমুনাতীরে দারা নিজের জন্যে তৈরি করিয়েছিলেন এক নতুন প্রাসাদ। একদিন তিনি পিতা ও তিন ভ্রাতাকে প্রাসাদ দেখবার জন্যে আমন্ত্রণ করলেন।

    গ্রীষ্মের দারুণ উত্তাপ থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্যে সেখানে ভূগর্ভে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি কক্ষ এবং তার মধ্যে আনাগোনা করবার জন্যে ছিল একটিমাত্র দ্বার।

    দারার সঙ্গে সঙ্গে শাজাহান, সুজা ও মুরাদ ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলেন, কিন্তু ঔরঙ্গজিব একা বসে রইলেন দ্বারের কাছে।

    শাজাহান বারংবার জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, তাঁর ওই আশ্চর্য ও অশোভন ব্যবহারের কারণ কী, তিনি কিন্তু চুপ করে বসে রইলেন সেইখানেই, কোনও জবাব দিলেন না।

    তাঁর এই অবাধ্যতার শাস্তি হল গুরুতর। কেবল তাঁর বৃত্তিই বন্ধ করে দেওয়া হল না, দাক্ষিণাত্যের রাজপ্রতিনিধিত্ব ও রাজসভায় প্রবেশাধিকার থেকেও তিনি বঞ্চিত হলেন।

    সুদীর্ঘ সাতমাসকালে অলসভাবে বসে থাকবার ও অপমানকর জীবনযাপন করবার পর অবশেষে জাহানারার কাছে তিনি তাঁর অবাধ্যতার কারণের কথা খুলে বললেন :

    —‘ঘরের একটি মাত্র দরজা, বাইরে যাবার দ্বিতীয় পথ নেই। আমি ভেবেছিলুম সেখানে সুযোগ পেয়ে দারা আমাদের সকলকে হত্যা করে সিংহাসনের পথ সুগম করে ফেলবেন! তাই পাহারা দেওয়ার জন্যে আমি দরজার কাছেই বসেছিলুম।’

    দেখা যাচ্ছে, যৌবন বয়সেই ঔরঙ্গজিবের মনে ধারণা জন্মেছিল, দারাই হচ্ছেন তাঁর প্রধান শত্রু এবং সিংহাসনের লোভে ভ্রাতৃহত্যা—এমনকী পিতৃহত্যা করাও অত্যন্ত স্বাভাবিক।

    এই একটি ঘটনার মধ্যেই ঔরঙ্গজিব-চরিত্রের সমস্ত রহস্যের হদিশ পাওয়া যাবে। বীজ থেকে বিষবৃক্ষের জন্ম হয়েছে তখনই, বাকি কেবল ফল ধরা!

    সাতমাস পরে ভগ্নী জাহানারা ভ্রাতা ঔরঙ্গজিবের জন্য পিতার কাছে ধরনা দিলেন। মেয়েদের মধ্যে জাহানারাই ছিলেন সবচেয়ে প্রিয়পাত্রী। তাঁর অনুরোধ শাজাহান ঠেলতে পারলেন না, ঔরঙ্গজিবের অপরাধ মার্জনা করে রাজপ্রতিনিধিরূপে তাঁকে পাঠিয়ে দিলেন গুজরাট প্রদেশে।

    ১৬৫৭ খ্রিস্টাব্দ। পরিপূর্ণ সুখ, সমৃদ্ধি ও গৌরবের মাঝখানে ভারত সম্রাট শাজাহান অকস্মাৎ সাংঘাতিক ব্যাধির আক্রমণে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন।

    সম্রাট বাইরে আর দেখা দেন না, দরবারও আর বসে না। রোগীর গৃহে রাজ-সভাসদদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। রোগশয্যার পাশে যেতে পারতেন একমাত্র দারাই।

    হপ্তাখানেক ধরে চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টার পর সম্রাটের অবস্থার কিঞ্চিৎ উন্নতি হল বটে, কিন্তু ওই পর্যন্ত। তিনি শয্যা ছাড়তে পারলেন না। চিকিৎসকরা উপদেশ দিলেন বায়ুপরিবর্তন করতে। দিল্লি থেকে তাঁকে আগ্রায় নিয়ে যাওয়া হল। তবু তাঁর অসুখ সারল না।

    ইতিমধ্যে নিজের আসন্নকাল উপস্থিত হয়েছে ভেবে, সম্রাট আমির-ওমরাওদের আহ্বান করে সকলের সামনে ঘোষণা করেছেন, তাঁর অবর্তমানে সিংহাসনের মালিক হবেন যুবরাজ দারাই।

    আগ্রায় এসে সম্রাট আশ্রয় গ্রহণ করেছেন দারার নিজস্ব প্রাসাদেই। দারা সেখানে আর কাউকে ঢুকতে দেন না, একাই সেবাশুশ্রূষা করে পিতাকে নিরাময় করে তোলবার চেষ্টায় নিযুক্ত থাকেন এবং সম্রাটের নামে নিজেই রাজকার্য পরিচালনা করেন।

    ওদিকে বাইরে গুজবের অন্ত নেই। দিকে দিকে জনরব উঠল, সম্রাটের মৃত্যু হয়েছে, স্বার্থসিদ্ধির জন্যে দারা সে খবর গোপন রাখতে চান।

    সুজা, মুরাদ ও ঔরঙ্গজিব এই সুযোগই খুঁজছিলেন, স্বরূপ প্রকাশ করতে তাঁরা আর বিলম্ব করলেন না।

    বাংলাদেশের রাজপ্রতিনিধি সুজা সেইখানে বসেই নিজেকে ভারতসম্রাট বলে ঘোষণা করলেন।

    গুজরাটের তখনকার রাজপ্রতিনিধি মুরাদও পিছনে পড়ে থাকবার পাত্র নন—তিনিও ধারণ করলেন ভারতসম্রাটের পদবি!

    দাক্ষিণাত্যের রাজপ্রতিনিধি ছিলেন ঔরঙ্গজিব। ভ্রাতাদের মধ্যে তিনিই হচ্ছেন ধূর্ত ও সাবধানী। তিনি সহজে মুখোশ খুললেন না। তিনিও সৈন্যাদি সংগ্রহ করে যুদ্ধের তোড়জোড় করতে লাগলেন বটে, কিন্তু গাছে কাঁঠাল দেখেই গোঁফে তেল মাখতে চাইলেন না—অর্থাৎ প্রথমেই ধারণ করলেন না সম্রাট উপাধি।

    মুরাদ ছিলেন তাঁর কাছেই এবং তিনি জানতেন ভাইদের মধ্যে মুরাদই হচ্ছে সবচেয়ে নির্বোধ। তার উপরে তিনি উগ্র এবং গোঁয়ার-গোবিন্দ। কিন্তু তিনি ছিলেন রীতিমতো যোদ্ধা; একবার রণক্ষেত্রে গিয়ে দাঁড়ালেই তাঁর ধমনীর মধ্যে তৈমুরের রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠত। এমন লোককে সহজেই দলে টানা যায় এবং এমন লোককে দলে টানতে পারলে যথেষ্ট শক্তিবৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা।

    অতএব ঔরঙ্গজিব মিষ্ট কথায় মুরাদকে বোঝালেন যে, দারা হচ্ছে অধার্মিক, নমাজ পড়ে না, রমজানের উপবাস করে না, তার বন্ধু হচ্ছে হিন্দু যোগী, সন্ন্যাসী ও ব্রাহ্মণগণ। শর্ত হল যে, আগে দুইজনে মিলে এমন নাস্তিক লোককে পথ থেকে সরাতে হবে, তারপরে যুদ্ধে জয়লাভ করলে মুরাদ হবেন পাঞ্জাব, আফগানিস্তান, কাশ্মীর ও সিন্ধু প্রদেশের মুকুটধারী স্বাধীন নরপতি এবং সাম্রাজ্যের বাকি অংশ লাভ করবেন ঔরঙ্গজিব। সেইসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, শর্তের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন বলে ঔরঙ্গজিব পবিত্র কোরান পর্যন্ত স্পর্শ করতে ভোলেননি। সরল বিশ্বাসী মুরাদও এই শর্তে রাজি হয়ে গেলেন।

    সবাই মিলে একজোট হয়ে দাঁড়াবে আক্রমণ করবার জন্যে। সুজাকেও ফুসলে দলে ভেড়াবার ইচ্ছা ছিল ঔরঙ্গজিব ও মুরাদের, কিন্তু বাংলা অত্যন্ত দূরদেশ বলে ইচ্ছাটা শেষ পর্যন্ত কার্যে পরিণত হয়নি।

    ইতিমধ্যে শাজাহান রোগমুক্ত হয়ে সমস্ত খবর শুনলেন। তাড়াতাড়ি স্বহস্তে পত্র লিখে সিংহাসনপ্রার্থী তিন পুত্রকে জানালেন যে, তিনি ইহলোকেই বর্তমান এবং সম্পূর্ণরূপে রোগমুক্ত। কিন্তু তাতেও ফল হল না। পুত্ররা সন্দেহ করলেন জালপত্র পাঠিয়ে দারা তাঁদের ঠকাবার চেষ্টা করছে।

    সম্রাটের সম্মতি নিয়ে দারা তখন সুজা, ঔরঙ্গজিব ও মুরাদের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক বৃহৎ ফৌজ প্রেরণ করলেন। সেই তিন ফৌজের সঙ্গে গেলেন শাজাহানের প্রধান প্রধান খ্যাতিমান সেনাপতিরা, ফলে দারার কাছে আগ্রায় যে সেনাদল রইল, তাদের চালনা করবার মতো যোগ্য সেনাপতির অভাব হল অত্যন্ত।

    এই গৃহযুদ্ধের সময়ে রোগদুর্বল, জরার্জর শাহাজানের অবস্থা হয়েছিল অতিশয় করুণ। যারা এখন পরস্পরের সঙ্গে হানাহানি করতে উদ্যত, তারা প্রত্যেকেই তাঁর নিজের রক্তে গড়া পুত্র, কত আদরের ও স্নেহের নিধি, তাদের যে-কোনও একজনকে আঘাত করলে সে আঘাত বাজবে তাঁর নিজেরই বুকে!

    যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে ভারতসম্রাট শাজাহান সাধারণ পিতার মতোই কাতরভাবে তাঁর সেনাপতিদের কাছে মিনতি জানালেন যেন তাঁর পুত্রদের কোনও অনিষ্ট না হয়, যেন বিনা যুদ্ধেই মিষ্ট কথায় বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাদের আবার যথাস্থানে ফিরে যেতে বলা হয়!

    যুদ্ধ যখন বাধে, তখন সাজাহানের বয়স আটষট্টি। তাঁর প্রত্যেক পুত্রও তখন যৌবনের সীমা অতিক্রম করেছেন—দারার বয়স হয়েছিল তেতাল্লিশ, সুজার বয়স একচল্লিশ, ঔরঙ্গজিবের উনচল্লিশ এবং মুরাদের তেত্রিশ।

    ঔরঙ্গজিব ও মুরাদের বিরুদ্ধে যে সেনাদল প্রেরিত হয়েছিল তার সেনাপতি ছিলেন মহারাজা যশোবন্ত সিংহ এবং কাসিম খাঁ ছিলেন তাঁর সহযোগী সেনাপতি। উজ্জয়িনী নগরের নিকটস্থ ধরমাট নামক স্থানে দুইপক্ষের প্রথম শক্তিপরীক্ষা হয়। উভয় পক্ষেই সৈন্যসংখ্যা ছিল কিছু বেশি—পঁয়ত্রিশ হাজার।

    রাজপুত ও মুসলমান নিয়ে দারার সৈন্যদল গঠিত হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে ছিল না কিছুমাত্র একতা। রাজপুতরা বীরের মতো লড়তে ও মরতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে অনেকেই ছিল বিশ্বাসঘাতক এবং মনে মনে ঔরঙ্গজিবের পক্ষপাতী। তাই যুদ্ধ শেষ হলে দেখা গিয়েছিল, চব্বিশজন রাজপুত সর্দার নিহত হয়েছেন এবং মুসলমানদের মধ্যে মারা পড়েছেন একজন মাত্র সেনাপতি। মুসলমানরা কেবল যে ভালো করে লড়েনি, তা নয়; লড়াই শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চার-চারজন মুসলমান সেনাপতি শত্রুপক্ষে যোগদান করেছিল।

    উপরন্তু ঔরঙ্গজিবের ফৌজে ছিল সুনিপুণ ফরাসি ও ইংরেজ গোলন্দাজগণ; দারার বা সম্রাটের ফৌজে ছিল না আগ্নেয়াস্ত্র। কজেই ধরতে গেলে কামানের সঙ্গে লড়তে হয়েছিল তরবারিকে।

    এমন যুদ্ধের ফল যা হওয়া উচিত, তাই হল। হাজার হাজার রাজপুত সৈন্য প্রাণদান করলে বটে, কিন্তু জয়লাভ করতে পারলে না। যশোবন্ত সিংহকে রণক্ষেত্র ছেড়ে পলায়ন করতে হল।

    জাহানারা বলেন, আগ্রায় যখন খবর এল, ধরমাটের যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ঔরঙ্গজিব সদলবলে রাজধানীর দিকে ছুটে আসছেন, তখন বিপুল সম্পদের মধ্যেও হতভাগ্য সম্রাট শাজাহান আকাশের দিকে হাত তুলে আর্তকণ্ঠে বলে উঠেছিলেন—‘হে ঈশ্বর, তোমারি ইচ্ছা!’

    তারপর তিনি নিজেই যুদ্ধযাত্রার জন্যে প্রস্তুত হয়ে সেনাপতিদের আহ্বান করে আদেশ দিলেন, ‘অবিলম্বে সৈন্য সমাবেশ করো!’

    কিন্তু সম্রাটের পরামর্শদাতাদেরও মধ্যে ঔরঙ্গজিবের চরের অভাব ছিল না। তারা বেশ জানত, শাজাহান স্বয়ং সেনাদলের পুরোভাগে গিয়ে দাঁড়ালে বিলুপ্ত হবে বিদ্রোহী পুত্রদের সমস্ত আশা-ভরসা! অতএব তারা নানা মিথ্যা কারণ বা ভয় দেখিয়ে যুদ্ধযাত্রা থেকে সম্রাটকে নিরস্ত করে।

    দারা তাড়াতাড়ি ষাটহাজার নূতন সৈন্য সংগ্রহ করে ঔরঙ্গজিব ও মুরাদকে বাধা দেওয়ার জন্যে অগ্রসর হলেন। এই নূতন সৈন্যরা দলে ভারী হল বটে, কিন্তু তাদের মধ্যে ছিল শিক্ষিত যোদ্ধার অভাব।

    এবারও ফৌজের মধ্যে মুসলমান সেনানী ও সৈনিকদের মধ্যে অনেকেই ছিল শত্রুপক্ষের চর বা ঔরঙ্গজিবের পক্ষপাতী। ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দের উনত্রিশ মে তারিখে সামুগড়ের প্রান্তরে যে যুদ্ধ হল, তাতেও প্রধান অংশ গ্রহণ করলে রাজপুত যোদ্ধারাই—তারাই হিন্দুদের প্রিয় দারার স্বার্থরক্ষার জন্যে দলে দলে লড়তে ও মরতে লাগল এবং ফৌজের প্রায় অর্ধেক মুসলমান সৈন্য ছিল বিশ্বাসঘাতক, তারা মুখরক্ষার জন্যে করলে কৃত্রিম যুদ্ধের অভিনয় মাত্র।

    ফলে এবারেও হল যুবরাজ দারার শোচনীয় পরাজয়।

    সামুগড়ের যুদ্ধে সম্রাটের ফৌজ পরাজিত এবং ঔরঙ্গজিব ও মুরাদ সসৈন্যে আগ্রার দিকে ধাবমান, এই দুঃসংবাদ বহন করে নিয়ে এল এক ফিরিঙ্গি ভগ্নদূত।

    রাত্রের অন্ধকারে গা ঢেকে পরাজিত, পরিশ্রান্ত ও দুঃখে মুহ্যমান দারা কয়েক জন অনুচরের সঙ্গে আগ্রায় ফিরে এলেন বটে, কিন্তু দুর্গের মধ্যে প্রবেশ না করে নিজের প্রাসাদের ভিতরে গিয়ে আশ্রয় নিলেন।

    দুর্গের মধ্যে অপেক্ষা করছিলেন বৃদ্ধ সম্রাট শাজাহান—গভীর নিরাশার প্রস্তরীভূত মূর্তির মতো। প্রিয় পুত্র দারাকে নিজের কাছে ডেকে পাঠালেন, কিন্তু উত্তরে দারা লিখে জানালেন, ‘এই শোচনীয় দুর্দশার দিনে সম্রাটের কাছে মুখ দেখাবার ক্ষমতা আমার নেই। আমার সামনে রয়েছে যে সুদীর্ঘ পথ, আপনার আশীর্বাদ ও আদেশ পেলে আমি এখন সেই পথেরই পথিক হব।’

    মর্মাহত শাজাহানের মনে হল, তাঁর আত্মা যেন দেহপিঞ্জর ত্যাগ করে বেরিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু শত্রুরা এখন হিংস্র শার্দূলের মতো অসহায় দারার বিরুদ্ধে বেগে ছুটে আসছে, তাঁর আর দুঃখ প্রকাশ করবারও অবসর নেই। তিনি তৎক্ষণাৎ দুর্গপ্রাসাদের ধনভাণ্ডার খুলে পুঞ্জ পুঞ্জ ধনরত্ন স্নেহাস্পদ দারার কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

    আগ্রা থেকে দারা যাবেন দিল্লিতে। সেখানকার শাসনকর্তার কাছেও সম্রাটের আদেশ গেল—দিল্লির ধনভাণ্ডারের চাবি যেন দারার হাতে সমর্পণ করা হয়।

    জন বারো অনুচর ও রক্ষী নিয়ে পলাতক দারা সহধর্মিণী নাদিরা বানু ও সন্তানদের সঙ্গে বিপদজনক আগ্রা নগরী ত্যাগ করলেন। বিজয়ী সৈন্যদলের সঙ্গে নিষ্ঠুর ঔরঙ্গজিব আগ্রা অধিকার করতে আসছে, একবার তার কবলে গিয়ে পড়লে যে তাঁর মুক্তিলাভের কোনও উপায়ই থাকবে না, এ কথা দারা ভালো করেই জানতেন।

    তারপর আগ্রায় যে অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হল তার কথা এখানে বর্ণনা করবার দরকার নেই, কারণ আমাদের এখন যেতে হবে এই কাহিনির নায়ক দারার পিছনে পিছনে।

    তবে দু-চারটে কথা উল্লেখযোগ্য। ঔরঙ্গজিব আগ্রা অধিকার ও দুর্গ অবরোধ করলেন। তাঁকে বোঝাবার জন্যে একবার শেষ চেষ্টা করবার উদ্দেশ্যে ঔরঙ্গজিবের সঙ্গে সম্রাট দেখা করতে চাইলেন।

    কিন্তু ঔরঙ্গজিব নারাজ।

    তখন সম্রাট-কন্যা জাহানারা নূতন এক প্রস্তাব নিয়ে ভ্রাতা ঔরঙ্গজিবের কাছে এসে উপস্থিত হলেন। প্রস্তাবটি হচ্ছে এই :

    সম্রাটের ইচ্ছা যে, সাম্রাজ্য চার রাজপুত্রদের জন্যে চার ভাগে বিভক্ত করা হোক।

    দারাকে দেওয়া হোক পাঞ্জাব ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রদেশগুলি।

    মুরাদের জন্যে গুজরাট, সুজার জন্যে বঙ্গদেশ এবং ঔরঙ্গজিবের জ্যেষ্ঠ পুত্র মহম্মদ সুলতানের জন্যে দাক্ষিণাত্য।

    সাম্রাজ্যের বাকি অংশ এবং সাজাহানের অবর্তমানে সিংহাসনের অধিকারী হবেন দারার বদলে ঔরঙ্গজিব।

    ঔরঙ্গজিব কিন্তু নিজের সংকল্পে অটল। জবাবে জানালেন, ‘দারা হচ্ছে ইসলামে অবিশ্বাসী ও হিন্দুদের বন্ধু। সত্য ধর্ম ও সাম্রাজ্যের শান্তির জন্যে দারাকে একেবারে উচ্ছেদ না করে আমি ছাড়ব না।’

    ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শাজাহান আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন এবং সুদীর্ঘ সাত বৎসরকাল আগ্রা দুর্গে বন্দিজীবন যাপন করবার পর তাঁর মৃত্যু হয়। তখন তাঁর বয়স পূর্ণ চুয়াত্তর বৎসর।

    মুরাদের সম্বন্ধে এখানে বিশেষ কিছু বলবার নেই। নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে ঔরঙ্গজিব যে তাঁকে স্বহস্তচালিত যন্ত্রের মতো ব্যবহার করেছেন, নির্বোধ মুরাদ শেষ পর্যন্ত এই সহজ সত্যটা উপলব্ধি করতে পারেননি—যেদিন তাঁর চটকা ভাঙল, সেদিন তিনি বন্দি। সে হচ্ছে ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দের পঁচিশে জুন তারিখের কথা। তিন বৎসর পরে গোয়ালিয়র দুর্গ থেকে পলায়নের চেষ্টা করেছিলেন বলে ঔরঙ্গজিবের ইচ্ছানুসারে কাজীর বিচারে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হন।

    সুজাও করেছিলেন সিংহাসনের লোভে অস্ত্রধারণ। প্রথম যুদ্ধে তিনি দারার পুত্র সুলেমান সুকোর কাছে পরাজিত হন, কিন্তু তারপর তাঁর সঙ্গে দারার কাহিনির আর কোনও সম্পর্ক নেই। তারপর তিনি ঔরঙ্গজিবের কাছে বার বার হার মেনে ভারত ছেড়ে আরাকানে গিয়ে মগদের হাতে মারা পড়েন, কিন্তু সে সব কথা হচ্ছে এখানে অবান্তর।

    অতঃপর দারার জীবনের কথা বলতে গেলে বলতে হবে কেবল দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনার কাহিনি। এতদিন জীবন ছিল তাঁর সুদীর্ঘ এক সুখস্বপ্নের মতো, কিন্তু সামুগড়ের যুদ্ধের পর তিনি এ জীবনে আর এক মুহূর্তের জন্যেও সুখশান্তির ইঙ্গিত পর্যন্ত দেখতে পাননি। সুখ আর দুঃখ, দুয়েরই দান পেয়েছিলেন তিনি অপরিমিত মাত্রায়।

    দিল্লিতে এসে দারা আবার নতুন ফৌজ গঠনের জন্যে তোড়জোড় করতে লাগলেন। কতক সৈন্য সৃংগৃহীত হল বটে, কিন্তু তাদের সংখ্যা হল না সন্তোষজনক।

    তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র সুলেমান সুকোকে বাইশ হাজার সৈন্য দিয়ে সুজার বিরুদ্ধে প্রেরণ করা হয়েছিল এবং তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিখ্যাত দুই সেনাপতি—মির্জ্জা রাজা জয়সিংহ ও দিলির খাঁ। দারা তাঁদের দিল্লিতে এসে তাঁর সঙ্গে যোগদান করতে বললেন।

    কিন্তু তাঁদের আগে আগেই বিপুল এক বাহিনী নিয়ে দিল্লির দিকে আসতে লাগলেন স্বয়ং ঔরঙ্গজিব। উপায়ান্তর না দেখে দারা প্রস্থান করলেন লাহোরের দিকে, সঙ্গে রইল তাঁর দশহাজার সৈন্য।

    দিল্লিতে পৌঁছে ঔরঙ্গজিব প্রথমে নিজেকে ভারত সম্রাট বলে ঘোষণা করলেন। তারপর যাত্রা করলেন লাহোরের দিকে।

    দারা হতাশভাবে বললেন, ‘আমি ঔরঙ্গজিবকে বাধা দিতে পারব না। আর কেউ হলে এইখানে দাঁড়িয়েই তার সঙ্গে আমি যুদ্ধ করতুম।’

    দারা আবার পলায়ন করলেন মুলতানের দিকে। সেখানেও পিছনে পিছনে এলেন সদলবলে ঔরঙ্গজিব। দারা মুলতান থেকে পালালেন সক্কর শহরের দিকে এবং তারপর কান্দাহারের পথে এবং তারপর আবার স্থান থেকে স্থানান্তরে।

    এমন সময় খবর এল সুজা সসৈন্যে আগ্রার নিকটবর্তী হয়েছেন। দারার অবস্থা তখন একান্ত অসহায়, কারণ তাঁর অধিকাংশ সৈন্য হতাশ হয়ে তাঁর পক্ষ পরিত্যাগ করেছে। আপাতত কিছুকাল তিনি আর মাথা তুলতে পারবেন না বুঝে ঔরঙ্গজিব সমস্ত শক্তি একত্র করে সুজার বিরুদ্ধে করলেন যুদ্ধযাত্রা। কিছুদিনের জন্য দারা পেলেন রেহাই।

    পর বৎসর—অর্থাৎ ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দ। খাজোয়ার ক্ষেত্রে সুজাকে পরাজিত ও বিহারের দিকে বিতাড়িত করে ঔরঙ্গজিব খবর পেলেন যে, দারা রাজস্থানে গিয়ে বাইশ হাজার সৈন্য সংগ্রহ করে আবার যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন। তিনিও যাত্রা করলেন দারার উদ্দেশ্যে।

    আজমীরের চার মাইল দক্ষিণে দেওরাই গিরিসঙ্কটের কাছে আবার দুই ভ্রাতার শক্তি পরীক্ষা হল। এবারে দারা চারিদিক সামলে প্রাণপণে যুঝে প্রথমটা ঔরঙ্গজিবকে বেশ কাবু করেও শেষ পর্যন্ত আবার হার মানতে বাধ্য হলেন। এই হল তাঁর শেষ প্রচেষ্টা। এর পর তিনি হয়ে পড়লেন একবারেই নিঃস্ব ও শক্তিহারা।

    তারপর দারা বাস্তুহারার মতো ঘুরে বেড়াতে লাগলেন দেশে দেশে, দিকে দিকে। কিন্তু তিনি যেখানেই যান, পিছনে লেগে থাকে শত্রুচর। প্রথমে তাঁর সঙ্গে ছিল দুই হাজার সৈনিক, কিন্তু ক্রমেই তারা দলে দলে বা একে একে অন্নকষ্ট, জলকষ্ট ও পথকষ্ট সইতে না পেরে তাঁকে পরিত্যাগ করে গেল।

    নির্জ্জন মরুপ্রদেশ—তৃষ্ণায় সর্বদাই প্রাণ টা-টা করে, খাদ্য মেলাও দুষ্কর। হিন্দুস্থানের যুবরাজ চলেছেন দুপুরের ঝাঁ-ঝাঁ রোদে ধুঁকতে ধুঁকতে ও ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে; তাঁর পরনে ময়লা সুতির পোশাক, পায়ে আট আনা দামের জুতো, সঙ্গে আছে মাত্র একটি ঘোড়া, নারীদের ও মালপত্তর বহনের জন্য গুটিকয় উট এবং মাত্র কয়েকজন বিশ্বাসী অনুচর।

    তারপর দুর্ভাগ্যের উপরে দুর্ভাগ্য! তাঁর রুগ্না সহধর্মিনী ও বিশ্ববিখ্যাত আকবর বাদশাহের প্রপৌত্রী, নাদিরা বানু আর কষ্ট সইতে না পেরে প্রাণত্যাগ করলেন। সে আঘাতে দারা একেবারেই ভেঙে পড়লেন। জীবন্মৃত অবস্থায় তিনি বোলান গিরিসঙ্কটের নিকটস্থ দাদার নামক স্থানের আফগান জমিদারের কাছে পেলেন শেষ আশ্রয়। সে হচ্ছে ভয়াবহ আশ্রয়।

    জমিদারের নাম মালিক জিওয়ান। কয়েক বৎসর আগে সম্রাট শাজাহান আদেশ দিয়েছিলেন, তাকে হাতির পায়ের তলায় ফেলে মেরে ফেলা হোক। কিন্তু যুবরাজ দারার প্রার্থনায় প্রাণদণ্ড থেকে সে অব্যাহতি লাভ করে।

    বিশ্বাসঘাতক ও অকৃতজ্ঞ মালিক জিওয়ান প্রচুর পুরস্কারের লোভে তার প্রাণরক্ষক দারাকেই আজ নিঃসহায় অবস্থায় পেয়ে গ্রেপ্তার করে সমর্পণ করলে শত্রুপক্ষের হস্তে!

    সম্রাট ঔরঙ্গজিব আদেশ দিয়েছেন, দিল্লির রাজপথে আবালবৃদ্ধ-বনিতার সামনে মিছিল করে দারাকে দেখিয়ে আনতে হবে!

    একটা কর্দমাক্ত ছোট মাদী হাতি তার পিঠের উপরে খোলা হাওয়ায় উপবিষ্ট পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী এবং সম্রাট শাজাহানের প্রিয়তম পুত্র দারা সুকো! ঠিক পাশেই বসে তাঁর চতুর্দশ বর্ষীয় দ্বিতীয় পুত্র সিপির সুকো।

    দারার পরনে ধূলিধূসরিত কর্কশ ও নিকৃষ্ট পোশাক, মাথায় অতি দীনদরিদ্রের উপযোগী ময়লা পাগড়ি, আজ তাঁর কণ্ঠে নেই আর রত্নহার। তাঁর হস্তযুগল মুক্ত বটে, কিন্তু পদযুগল শৃঙ্খলে আবদ্ধ। পিছনে বসে আছে নগ্ন কৃপাণ হস্তে কারারক্ষক নজর বেগ।

    প্রচণ্ড সূর্য মাথার উপরে করছে অগ্নিবর্ষণ। দিল্লির এই রাজপথই একদিন দেখেছে যুবরাজ দারার সুখসৌভাগ্য ও বদান্যতা। অপমানে মাথা নুইয়ে কোনও দিকে না তাকিয়ে দারা নিশ্চেষ্টভাবে বসে রইলেন স্তম্ভিতের মতো।

    পথের ধার থেকে জনৈক ভিখারি কাতর কণ্ঠে ফুকরে উঠল, ‘হে দারা, যখন তুমি প্রভু ছিলে, তখন সর্বদাই আমাকে ভিক্ষা দান করতে। কিন্তু আজ আর তোমার দান করবার কিছু নেই।’

    সেই সময়ে মাত্র একবার মুখ তুলে ভিখারিকে দেখে দারা নিজের কাঁধ থেকে আলোয়ানখানা খুলে তার দিকে নিক্ষেপ করলেন।

    দারাকে হাস্যাস্পদ করবার জন্যই জনসাধারণের সামনে বার করা হয়েছিল। কিন্তু তার ফল হল উলটো। সেই বিপুল জনতার পুরুষ, নারী ও শিশুরা এমন তারস্বরে সম্মিলিত কণ্ঠে আর্তনাদ করতে লাগল, যেন তারা নিজেরাই পড়েছে কোন ভীষণ দুর্ভাগ্যের কবলে। দানশীলতার জন্য দারা ছিলেন জনতার মানসপুত্রের মতো।

    মিছিলের ভিতরে ক্রুদ্ধ জনতা বিশ্বাসঘাতক মালিক জিওয়ানকেও লক্ষ করেছিল। চরম অকৃতজ্ঞতার পুরস্কার স্বরূপ সে এখন লাভ করেছে সম্মানজনক বক্তিয়ার খাঁ উপাধি এবং একহাজার অশ্বারোহী সৈন্যের নায়কত্ব। কিন্তু মনে মনে গুমরেও কেউ তাকে কিছু বলতে সাহস করেনি, কারণ মিছিলের সঙ্গে অসংখ্য সশস্ত্র সৈনিক।

    কিন্তু পরদিন নূতন খাঁ-সাহেব যখন নিজের দলবল নিয়ে ঔরঙ্গজিবের রাজসভায় যাচ্ছিল, ক্ষিপ্ত জনসাধারণ চারিদিক থেকে ছুটে এসে তাকে আক্রমণ করলে, তার কয়েকজন অনুচরকে মেরে ফেললে এবং তাকেও যে নির্দয়ভাবে হত্যা করত সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। কেবল সদলবলে কোতোয়াল এসে পড়াতে কোনওক্রমে সে প্রাণে বেঁচে গেল।

    আবার হল বিচার-প্রহসন। জ্যেষ্ঠ দারার উপরে প্রাণদণ্ডের হুকুম দিলেন সেজো ভাই ঔরঙ্গজিব।

    রাত্রিবেলা। পুত্র সিপির সুকোর সঙ্গে কারাগৃহে বসে ছিলেন দারা, এমন সময় সেখানে এসে দাঁড়াল সশস্ত্র নজর বেগ ও তার অনুচরেরা।

    তাদের মুখ দেখেই দারা বলে উঠলেন, ‘বুঝেছি, তোমরা আমাকে হত্যা করতে এসেছ।’

    নজর বেগ বললে, ‘না, আমরা সিপির সুকোকে এখান থেকে নিয়ে যেতে এসেছি।’

    কিন্তু বালক সিপির বাবাকে ছেড়ে কিছুতেই যাবে না, সে কাঁদতে কাঁদতে দারার দুই পা জড়িয়ে ধরলে। দারাও সক্রন্দনে পুত্রকে বদ্ধ করলেন আলিঙ্গনের মধ্যে, কিন্তু নির্মম ঘাতকরা সিপিরকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে বাইরে চলে গেল।

    দারা তখন একখানা কলম-কাটা ছুরি নিয়ে আততায়ীদের একজনকে আহত করলেন এবং অন্যান্য সকলের উপরেও করতে লাগলেন ঘন ঘন মুষ্টির আঘাত—ভেড়ার মতো তিনি প্রাণ দিতে নারাজ!

    কিন্তু একদল সশস্ত্রের সঙ্গে একজন নিরস্ত্রের যুদ্ধ কতক্ষণ চলতে পারে? দারার দেহের উপরে হতে লাগল, ঘন ঘন শাণিত ছোরার আঘাত।

    পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছিল সিপিরের যন্ত্রণাপূর্ণ তীব্র ক্রন্দনধ্বনি, কিন্তু তার মধ্যেই দারার কারাকক্ষ হয়ে পড়ল, একেবারে নিস্তব্ধ। সেখানে ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে রক্তের লেখন, মেঝের উপরে রক্তগঙ্গার ঢেউ, দিকে দিকে কেবল রক্ত আর রক্ত আর রক্ত! এবং এই বীভৎস ও ভয়াল রক্তোৎসবের মাঝখানে আড়ষ্ট হয়ে পড়ে আছে সম্রাটপুত্রের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ!

    সিপিরের বুকফাটা কান্না আর থামল না। আজও পাষাণ-কারাগারের অন্দরে বন্দি হয়ে আছে সেই মৌন ক্রন্দনরব। প্রাণের কানে শোনা যায় সেই নীরব ক্রন্দন!

    ওদিকে দাদার ছিন্নমুণ্ড স্বচক্ষে না দেখে ঔরঙ্গজিব নিশ্চিন্ত হতে পারছিলেন না। তাঁর কাছে দারার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন মুণ্ড প্রেরিত হল।

    সেই কাটা মুণ্ড দেখে ছোট ভাই ঔরঙ্গজিব কী বলেছিলেন, ইতিহাসে তা লেখা নেই। তবে তিনি যে কিছুমাত্র অনুতপ্ত হননি, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়।

  • ছত্রপতির অ্যাডভেঞ্চার

    ছত্রপতির অ্যাডভেঞ্চার

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    ছত্রপতির অ্যাডভেঞ্চার

    ভারতে ‘ছত্রপতি’ বললেই বোঝায় মহারাষ্ট্রের মহাবীর শিবাজীকে। কিন্তু যখনকার কাহিনি বলছি, তখনও তিনি ‘ছত্রপতি’ উপাধি ধারণ করেননি।

    বাহশাহ ঔরঙ্গজিবের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিলেন ছত্রপতি শিবাজী। শিবাজীকে বধ করতে পারলে দিল্লিশ্বর নিশ্চিন্ত ও নিষ্কণ্টক হতেন, কিন্তু তাঁর সব অপচেষ্টাই হয়েছিল নিষ্ফল, শেষপর্যন্ত। তার প্রধান কারণ শিবাজীর বাহুবল নয়, বুদ্ধিবল।

    ঔরঙ্গজিবের ফাঁদে পা দিয়ে শিবাজী তো বন্দি হলেন আগ্রা শহরে। তারপর তিনি কী অপূর্ব কৌশলে মারাত্মক ফাঁদ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসেন, সে গল্প সকলেই জানেন, কারণ অনেক লেখক অনেকবার তা বর্ণনা করেছেন। সত্য যে উপন্যাসের চেয়ে অদ্ভুত, ওই বিখ্যাত ঐতিহাসিক কাহিনিটি সেই কথাই প্রমাণিত করে। ছেলেবেলায় রুদ্ধশ্বাসে গল্পটি পাঠ করতুম।

    তারপরেই পড়ে যেত ছেদ! জেল ভেঙে অনেক কয়েদিই তো পালায়, কিন্তু তাদের অধিকাংশই পরে নাগালের বাইরে যাওয়ার আগেই ধরা পড়ে সুড়-সুড় করে ফের জেলে ঢুকতে বাধ্য হয়, এই ব্যাপারটাই দেখা গেছে বারংবার।

    দিল্লি থেকে মহারাষ্ট্র—বহু দূরে। তার মধ্যে দিকে-দিকে কড়া পাহারা দিচ্ছে হাজার-হাজার সতর্ক প্রহরী। শিবাজী কেমন করে তাদের চোখে দিলেন ধুলো, ছেলেবেলায় তা জানবার জন্যে মনে জাগত ব্যাকুল প্রশ্ন। কিন্তু ইস্কুলের ইতিহাসে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেত না।

    আজকের ছেলেমেয়েরাও নিশ্চয়ই মনে-মনে এই প্রশ্ন করে। তাদের কৌতূহল নিবারণের জন্যে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব।

    এ হচ্ছে রীতিমতো চিত্তোত্তেজক অ্যাডভেঞ্চার।

    আগ্রা থেকে কয়েক মাইল দূরে এক বিজন অরণ্য।

    সেইখানে বসল পলাতকদের পরামর্শ-সভা। অবশেষে স্থির হল পাছে ভারী দল দেখে লোকের সন্দেহ জাগে, তাই দলের অন্যান্য সকলে যাবেন একদিকে এবং শিবাজী তাঁর বালক-পুত্র শম্ভুজী ও তিনজন পদস্থ কর্মচারীকে নিয়ে যাত্রা করবেন অন্যদিকে।

    শিবাজী ও তাঁর সঙ্গীরা সর্বাঙ্গে ছাই মেখে সাজলেন ভবঘুরে সন্ন্যাসী, তারপর অগ্রসর হলেন মথুরার পথে।

    ওদিকে আগ্রায় বন্দির ঘর শূন্য দেখে প্রহরীদের সর্দার ফুলাদ খাঁ হন্তদন্ত হয়ে সম্রাটের কাছে গিয়ে কুর্নিশ ঠুকে খবর দিলে—‘জাঁহাপনা, শিবাজী-রাজা যে নিজের ঘরেই আটক ছিলেন, এ আমরা বারবার উঁকি মেরে স্বচক্ষে দেখেছি। তারপর আচমকা আমাদের চোখের সামনেই তিনি মিলিয়ে গেলেন কোথায় কে জানে! তিনি পাখির মতো ফুড়ুত করে আকাশে উড়ে পালালেন, না মাটি ফুঁড়ে পাতালে ঢুকে গেলেন, না অন্য কোনওরকম ভানুমতীর খেল খেললেন, সেসব কিছুই বোঝা গেল না!’

    কিন্তু এ হেন গাঁজাখুরি গল্পে বিশ্বাস করবেন, ঔরঙ্গজিব মোটেই সে-পাত্র ছিলেন না। হইহই রব উঠল তখনই! শিবাজীর পলায়নবার্তা নিয়ে দলে-দলে দূত ব্যস্তভাবে ছুটে গেল দিকে-দিকে! দাক্ষিণাত্যে যাওয়ার প্রত্যেক পথ আগলে সজাগ হয়ে রইল হাজার-হাজার সেপাই-সান্ত্রী।

    কিন্তু চাতুর্যে শিবাজীকে ঠকাবে কে? তিনি মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা, তাঁর গন্তব্যপথ ভারতের দক্ষিণদিকেই বটে। তবে সেদিকের পথের ওপরে থাকবে যে প্রহরীদের শ্যেনদৃষ্টি, সে বিষয়ে তাঁর সন্দেহ ছিল না কিছুমাত্র।

    অতএব তিনি মাথা খাটিয়ে ধরলেন উত্তর-ভারতের পথ। আগ্রা ছেড়ে ঘণ্টা ছয় পরে পদব্রজে পৌঁছোলেন গিয়ে মথুরায়, কেউ কিছু সন্দেহ করতে পারলে না।

    কিন্তু ছেলেমানুষ শম্ভুজী, মথুরা পর্যন্ত গিয়ে পথশ্রমে একেবারে ভেঙে পড়ল।

    এও এক গুরুতর সমস্যা। অক্ষম ছেলের মুখ চেয়ে সেখানে অপেক্ষা করলে বাদশাহের গোয়েন্দাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে এবং অক্ষম পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ারও উপায় নেই। এখন মুশকিল আসান হয় কেমন করে?

    কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে সেখানে ছিল শিবাজীর তিনজন জানিত লোক, তাঁদের হাতেই পুত্রকে সমর্পণ করে আবার তিনি বেরিয়ে পড়লেন।

    ইতিমধ্যেই শিবাজী গোঁফদাড়ি কামিয়ে ফেলেছিলেন। পথে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন, কিন্তু তাও অতি গোপনে না নিয়ে গেলে চলবে না। অতএব তিনি হাতে নিলেন এমন এক মোটা লাঠি—ভিতরটা যার ফাঁপা। কিন্তু সেই শূন্যগর্ভ যষ্টির ভেতরটা পূর্ণ রইল বহু অমূল্য রত্ন ও স্বর্ণমুদ্রায়। আরও কিছু ঐশ্বর্য লুকিয়ে রাখা হল পাদুকার মধ্যে। হিরা-চুনির ওপরে মোমের প্রলেপ মাখিয়ে শিবাজীর ভৃত্যরাও মুখের ও পোশাকের ভেতরে লুকিয়ে রাখলে।

    তারপর দিনের বেলায় বিশ্রাম ও রাতের অন্ধকারে পথ চলা। শিবাজীর অনুচররা তিন দলে বিভক্ত হয়ে বৈরাগী, গোঁসাই ও উদাসী এই তিন শ্রেণির সন্ন্যাসীর ভেক ধারণ করে পেছনে-পেছনে চলল। সংখ্যায় ছিল তারা পঞ্চাশ-ষাটজন।

    মাঝে-মাঝে ছদ্মবেশ পরিবর্তনের প্রয়োজন হত। পলাতকরা কখনও সাজতেন ভিক্ষাজীবি সাধু, কখনও বা নিম্নশ্রেণির সওদাগর। এক তীর্থক্ষেত্রে যারা তাঁদের দেখেছে, তারা অন্য তীর্থক্ষেত্রে তাঁদের চিনতে পারত না।

    মথুরা ছেড়েও শিবাজী দেশমুখো হলেন না—চললেন পূর্বদিকে। একে-একে গেলেন এলাহাবাদ, বেনারস ও গয়াধামে, তাঁকে সাধারণ তীর্থযাত্রী ছাড়া আর কিছু বলে ভ্রম করবার উপায় রইল না।

    এসব অঞ্চলেও যথাসময়ে বাদশাহের ফরমান এসেছে বটে, কিন্তু মহারাষ্ট্রের যাত্রীর আসবার কথা নয় পূর্বভারতের দিকে, তাই দক্ষিণাপথের মতো এদিককার কর্তৃপক্ষও যে খুব বেশি হুঁশিয়ার ছিলেন না, সেটুকু সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। এবং শিবাজীও চেয়েছিলেন তাই!

    তবু মাথার ওপরে মাঝে-মাঝে নেমে এসেছিল বিপদের ফাঁড়া। এইবারে সেই কাহিনিই বলব। সেসব যেন চমকদার ডিটেকটিভ উপন্যাসের ঘটনা।

    শহরের ফৌজদারের নাম আলি কুলি। সন্ন্যাসীর বেশে শিবাজী সদলবলে প্রবেশ করলেন সেই শহরে।

    বাদশাহের ফরমান জাগ্রত করে তুলেছে ফৌজদারকে। শিবাজী ও তাঁর দলবলের হাবভাব সন্দেহজনক মনে হওয়াতে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হল এবং বন্দিদের নিয়ে জোর জেরা চলতে লাগল।

    বোধকরি বন্দিদের পক্ষে জেরার ফল হল না বিশেষ সন্তোষজনক। গতিক সুবিধার নয় বুঝে শিবাজী ফৌজদারের সঙ্গে গোপনে দেখা করলেন।

    তখন দুপুর রাত। বন্দি বললেন, ‘আমি শিবাজী।’

    সচকিত ফৌজদার বুঝলেন, তাঁর জালে পড়েছে সবচেয়ে সেরা ঘাগি মাছ। আশা করা যায় বন্দির পরিচয় পেয়ে তাঁর বুক হয়ে উঠেছিল দশহাত।

    শিবাজী বললেন, ‘যদি আমাকে মুক্তি দেন, আমার কাছ থেকে আপনি লাখটাকা দামের একখানা হিরা ও একখানা পদ্মরাগমণি উপহার পাবেন।’

    পরম লোভনীয় উৎকোচ—একেবারে কল্পনাতীত। বুদ্ধিমান ফৌজদার এমন দুর্লভ সুযোগ ত্যাগ করতে পারলেন না।

    আলি কুলি কর্তব্য ভুললেন এবং শিবাজী সদলবলে নিরাপদে আবার পদচালনা করলেন নিজের গন্তব্য পথে।

    এলাহাবাদ। গঙ্গা-যমুনা সঙ্গম। স্মরণাতীতকাল থেকে তীর্থযাত্রীরা এখানে এসে অবগাহন-স্নান এবং শাস্ত্রকথিত অন্যান্য ধর্মানুষ্ঠানের নিয়ম পালন করে থাকেন। শিবাজীও সেখানে স্নানাদি সেরে যাত্রা করলেন কাশীধামের দিকে।

    পুণ্যতীর্থ বারাণসী—ভারতের বর্তমান নগরগুলির মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন। ইউরোপে যখন কেউ রোমের নামও শোনেনি, তখনও বারাণসীর খ্যাতি দিকে-দিকে দেশ-বিদেশে বিস্তৃত।

    চারিদিকে তরুণ উষার আলো-আঁধারির খেলা। নিষ্ঠাবান হিন্দুর মতো শিবাজীও তীর্থ-কৃত্য পালন করতে উদ্যত হয়েছেন, এমন সময়ে সম্রাটের বার্তাবহ নগরে ঢুকে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলে—রাজা শিবাজী পলাতক! অবিলম্বে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে!

    ঠিক তার একটু আগেই শিবাজী জনৈক পূজারির হাতের মধ্যে কিছু ধনরত্ন গুঁজে দিয়ে বলেছেন—‘এখন মুঠো খুলো না, শীঘ্র আগে আমাকে শাস্ত্রীয় বিধি পালন করাও!’

    ইতিমধ্যে শিবাজী ক্ষৌরকার্য ও স্নান সেরে নিয়েছেন, কিন্তু তখনও তাঁর অন্যান্য কর্তব্য শেষ হয়নি। ঠিক সেই সময়ে রাজদূতের ঘোষণা তাঁর কর্ণগোচর হল…

    পুরোহিত ফিরে দেখেন, তাঁর যজমান অদৃশ্য!

    হাতের মুঠো খুলে তিনি সবস্মিয়ে দেখলেন, নয়খানি রত্ন এবং কতকগুলি স্বর্ণমুদ্রা!

    শিবাজীর কাছ থেকে প্রাপ্ত এই দৌলতের প্রসাদে পুরোহিত পরে হয়েছিলেন প্রাসাদোপম ভবনের অধিকারী।

    পূর্বে—আরও পূর্বে—দক্ষিণের যাত্রী চলেছেন আরও পূর্বদিকে, ধূলিনিক্ষেপ করতে হবে বাদশাহের গুপ্তচরদের ক্ষুধিত চক্ষে!

    কাশীধাম থেকে তাড়া খেয়ে শিবাজী ক্রোশের-পর-ক্রোশ পার হয়ে গেলেন দ্রুতপদে। অবশেষে গয়াধামে। সেখানে অর্ঘ্য নিবেদন করলেন বিষ্ণুর পাদপদ্মে।

    তারপরেই আছে বঙ্গদেশ। কিন্তু বঙ্গদেশ তীর্থের জন্যে ভারতবিখ্যাত নয়। এবং সম্রাটের গোয়েন্দারাও দক্ষিণাপথে মিথ্যা ছুটোছুটি করে শ্রান্ত হয়ে এতদিনে শিবাজীর আশা নিশ্চয়ই পরিত্যাগ করেছে! আলেয়ার পিছনে ছোটারও মানে হয়, কারণ তাকে দেখা যায়; কিন্তু যে থাকে একেবারে চোখের আড়ালে, তার পাত্তা পাওয়া যাবে কেমন করে?

    অতএব এইবারে এসেছে স্বদেশ প্রত্যাগমনের প্রশস্ত সুযোগ।

    শিবাজী এবারে অগ্রসর হলেন বিহার থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। সুদূর পথ—ভারতের প্রায় এক প্রত্যন্ত দেশ থেকে আর-এক প্রান্তে। মাঝে পড়ে বিস্তর নদনদী, দুস্তর প্রান্তর, দুশ্চর অরণ্য, দুর্লঙ্ঘ্য পর্বত, বিপদজনক জনপদ। পায়ে হেঁটে ক্রোশের-পর-ক্রোশ পার হতে-হতে পা ওঠে টনটনিয়ে, গায়ে হয় ব্যথা। শিবাজী ছিলেন অশ্বপৃষ্ঠে ভ্রমণে অভ্যস্ত, পদব্রজে পথ অতিক্রম করতে আর তাঁর ভালো লাগল না।

    অতএব পথিমধ্যে একজায়গায় দরদস্তুর করে তিনি একটি টাট্টু ঘোড়া কিনে ফেললেন।

    সঙ্গে রৌপ্যমুদ্রার অভাব, তাই তিনি জেব থেকে থলি বার করে অশ্ব-ব্যবসায়ীর হাতে সমর্পণ করলেন কয়েকটি মোহর।

    অশ্ব-ব্যবসায়ীর বিস্ময়ের সীমা রইল না। বলা বাহুল্য, তখন শিবাজীর অদ্ভুত পলায়ন-বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতে। সে সচমকে বলে উঠল, ‘একটা ছোট টাট্টু ঘোড়ার জন্যে আপনি এত বেশি দাম দিচ্ছেন, নিশ্চয়ই আপনি শিবাজী-রাজা!’

    ব্যবসায়ীর মুখ চটপট বন্ধ করবার জন্যে মোহর-ভরতি থলিটাই তার হাতে ফেলে দিয়ে শিবাজী তৎক্ষণাৎ ঘোড়া ছুটিয়ে সেখান থেকে সরে পড়লেন।

    গোদাবরী নদীতীরের এক গ্রাম। ছদ্মবেশী সন্ন্যাসীর দল সেখানকার কোনও চাষির বাড়িতে গিয়ে অতিথি হল।

    চাষির বুড়িমা দুঃখ করে বললে, ‘কী বলব বাবা, সর্বস্ব গিয়েছে, আর কি আমাদের অতিথি সৎকার করবার সামর্থ্য আছে?’

    কৌতূহলী শিবাজী শুধোলেন, ‘কেমন করে সর্বস্ব গেল মা?’

    বুড়ি বললে, ‘শিবাজী-ডাকাতের চ্যালাচামুণ্ডারা গোটা গাঁ লুঠ করে গেছে, আমাদেরও কিছু রেখে যায়নি।’ তারপর সে লুঠেরাদের দলপতি শিবাজীর উদ্দেশে চোখা-চোখা বাক্যবাণ বর্ষণ করতে লাগল।

    শিবাজী চেপে গেলেন তখনকার মতো। কিন্তু সেই কৃষাণ পরিবারের নাম ও ঠিকানা মনে রাখতে ভুললেন না।

    পরে যথাসময়ে দেশে ফিরে তিনি সেই কৃষককে সপরিবারে নিজের কাছে তলব করে আনিয়েছিলেন। নিশ্চয়ই তারা এসেছিল খুব ভয়ে-ভয়ে, কিন্তু বাড়ি ফিরেছিল ভারি হাসিমুখে, শিবাজীর মঙ্গলকামনা করতে-করতে।

    কেন, তাও কি আবার খুলে বলতে হবে?

    উত্তর, পূর্ব, পশ্চিম ঘুরে অবশেষে দক্ষিণে! রীতিমতো ভারত-পরিক্রমা! দিগবিজয়ী রূপে নয়, মহাবীর হয়েও ভাগ্যহত, শত্রুভীত অভাগাজনের মতো শিবাজী আজ বৃহৎ ভারতের যে-অংশের মাটি মাড়িয়ে স্বদেশে ফিরে এলেন, অদূর-ভবিষ্যতে তাঁরই সৃষ্ট সৈন্যসামন্তগণ যে সেই বিপুল ভূখণ্ডেরই দিকে-দিকে গৈরিক পতাকা উড়িয়ে বিজয়োৎসবে প্রমত্ত হয়ে উঠবে, একথা কেউ সেদিন কল্পনায়ও আনতে পারেনি। একান্ত অকালে পূর্ণগৌরবের মাঝখানে অন্তিম নিশ্বাস ত্যাগ করবার আগেই মাত্র তেত্রিশ বৎসরের মধ্যেই নিজের হাতে তিনি এমন এক দুর্ধর্ষ জাতি তৈরি করে গিয়েছিলেন, যার কাছে সকল গর্ব হারিয়ে সকাতরে করুণা ভিক্ষা করতে হয়েছিল একদা-অপরাজেয়, শক্তিগর্বিত মোগল রাজবংশকেও। স্বর্ণ ও রত্নখচিত ময়ূর সিংহাসনে আসীন হয়ে সেদিন যে আলমগীর ঘৃণার্হ শিবাজী, মারাঠি ও সেইসঙ্গে সমগ্র হিন্দুজাতির উচ্ছেদ সাধনের জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করে গিয়েছিলেন, পরে সেই আলমগীর নামেই পরিচিত দ্বিতীয় দিল্লিশ্বর মারাঠিদেরই আশ্রয়গ্রহণ করতে লজ্জিত হননি এবং তখন তাঁর মসনদ বলতে বোঝাত কাঠে তৈরি এক নকল ময়ূর সিংহাসন। আবার তারও বৎসর দুই পরে ওই মারাঠিরাই গায়ের জোরে দখল করেছিল রাজধানী দিল্লি পর্যন্ত।

    কিন্তু সেসব হচ্ছে আরও কিছুকাল পরের কথা। আপাতত ঔরঙ্গজিবের লক্ষ্যচ্যুত শিবাজী কোনওক্রমে নিজের কোটে পদার্পণ করে আশ্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলেন। কালচক্র ঘুরে যাবে কোনদিকে, তিনি বা ঔরঙ্গজিব কেউই তা এখন পর্যন্ত জানতে পারেননি…

    বীরধাত্রী, রত্নপ্রসবিত্রী, পুত্রগত-প্রাণা জিজাবাই! নিজের হাতে মানুষের-মতো-মানুষ করা ছেলে আজ হিন্দুবিদ্বেষী, কূটচক্রী, নৃশংস ঔরঙ্গজিবের খপ্পরে গিয়ে পড়েছে, তাই শিবাজী-জননীর জীবন হয়ে উঠেছে দুঃসহ দুঃস্বপ্নের মতো।

    একাকিনী বসে-বসে তিনি নিজের দুর্ভাগ্যের কথা চিন্তা করছেন, এমন সময়ে দ্বারী এসে খবর দিলে, একদল বৈরাগী তাঁর সাক্ষাৎ প্রার্থনা করে। তিনি সম্মতি দিলেন।

    সন্ন্যাসীরা সামনে এসে দাঁড়াল। একজন হাত তুলে তাঁকে আশীর্বাদ করলে। কিন্তু আর-একজন এগিয়ে এসে লুটিয়ে পড়ল একেবারে তাঁর পায়ের তলায়!

    জিজাবাই বিস্মিত ও তটস্থ! কোনও সন্ন্যাসী যে তাঁর পায়ে মাথা ছুঁইয়ে প্রণাম করবে, এ-যে স্বপ্নাতীত! এ-যে অমঙ্গলকর!

    তারপর সন্ন্যাসী মাথা রাখলে একেবারে তাঁর কোলের ভেতরে এবং একটানে খুলে ফেললে নিজের শিরস্ত্রাণ!

    মাথার একটা পরিচিত চিহ্ন দেখেই জিজাবাইয়ের বুঝতে দেরি হল না যে, তাঁর কোলের ছেলেই আবার ফিরে এসেছে মায়ের কোলে! দুই হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে তিনি আবেগকম্পিত কণ্ঠে ডাকলেন, ‘শিবা, শিবা, আমার শিবা!’

    আদরে গলে শিবাজী সাড়া দিলেন, ‘মা-গো, আমার মা!’

  • বাংলাদেশের বোম্বেটেরাজ

    বাংলাদেশের বোম্বেটেরাজ

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    বাংলাদেশের বোম্বেটেরাজ

    চলতি বাংলায় জলদস্যুকে বলা হয় বোম্বেটে। ইংরেজিতে বলে Pirate—শব্দটি এসেছে গ্রিক ভাষা থেকে। বাংলা ‘বাম্বেটে’ কথাটির উৎপত্তি পর্তুগিজ শব্দ থেকে, তার কারণ একসময়ে পর্তুগিজ জলদস্যুদের বিষম অত্যাচারে বাংলা দেশের অনেক জায়গাই প্রায় জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল। বোম্বেটে বলতে লোকে বুঝত তখন প্রধানত পর্তুগিজদেরই।

    Pirate—শব্দটির উৎপত্তি যখন প্রাচীন গ্রিক ভাষা থেকে, তখন বুঝতে হবে যে খ্রিস্টপূর্ব যুগেও গ্রিসদেশের জলপথে ছিল বোম্বেটেদের উৎপাত। কেবল গ্রিস কেন, রোম, মিশর, ভারতবর্ষ ও চিন প্রভৃতি প্রত্যেক প্রাচীন দেশকেই স্মরণাতীত কাল থেকে জলদস্যুদের মারাত্মক উপদ্রবের জন্যে বর্ণনাতীত যন্ত্রণাভোগ করতে হয়েছে।

    এক শ্রেণির ডানপিটে লোক দুঃসাহসিক কাজ করে আনন্দ পায়। তার উপরে থাকে যদি প্রচুর অর্থলাভের প্রলোভন, তাহ’লে তো আর কথাই নেই। অনেক তথাকথিত সাধুও তখন আর শয়তান হয়ে উঠতে লজ্জা পায় না। আর এ কথাও সকলেই জানে যে, মনুষ্যসমাজে শয়তানের দলই প্রবল।

    স্থলপথে সতর্ক পাহারা। সশস্ত্র সৈনিক, জাগ্রত জনতা, পদে পদে আইনের বাধা। চম্পট দেওয়ার আগেই চটপট ধরা পড়বার সম্ভাবনা।

    জলপথেও আইনবিরুদ্ধ কাজ করে ধরা পড়লে শাস্তি পেতে হয়। কিন্তু আগেকার যুগে স্থলপথের মতো জলপথেও উচিতমতো পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। বিশেষত অসীম সাগরে। জলদস্যুরা লুটপাট করে কোথায় ডুব মারত, তাদের গ্রেপ্তার করবার আশা ছিল সুদূরপরাহত। বার বার দেখা গেছে, ভারতসাগরে বোম্বেটেদের অত্যাচার হয়ে উঠেছে মারাত্মকরূপে ভয়াবহ, অথচ ‘সর্ব্বশিক্তমান’ উপাধিধারী দিল্লির বাদশাহও তাদের নাগাল ধরতে পারছেন না। এইসব কারণে বোম্বেটেদের প্রাধান্য ছিল বিশেষ করে সেকালেই।

    একালেও বোম্বেটে হতে চায়, এমন সব দুরাত্মার অভাব নেই। কিন্তু স্থলে সৈন্যবাহিনীর মতো জলে রাজার নৌবাহিনীও এতটা প্রবল হয়ে উঠেছে যে, বোম্বেটেগিরি আর নিরাপদ ও লাভজনক নয়। বোম্বেটেরা আর সশস্ত্র ও দ্রুতগামী যুদ্ধ জাহাজের অধিকারী হতে পারে না এবং প্রত্যেক দেশে থাকে ওই শ্রেণির শত শত সরকারি জাহাজ। আজকাল তাই সহজেই দমন করা যায় জলদস্যুতা। একমাত্র চিনসমুদ্র ছাড়া আর কোথাও আজ জলদস্যুতার কথা শোনা যায় না।

    কিন্তু যে জলপথে হানা দিতে চায়, রণতরীর অধিকারী হলে সে যে কী সাংঘাতিক হুলস্থূল বাধিয়ে দিতে পারে, গত প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ে ‘এমডেন’ জাহাজের জার্মান কাপ্তেন তার জ্বলন্ত প্রমাণ রেখে গিয়েছেন। দিনের পর দিন দীর্ঘকাল ধরে এমডেন বিভীষিকা সৃষ্টি করেছিল দিকে দিকে, কিন্তু সমগ্র ভারতসাগরে দিশেহারার মতো ছুটোছুটি করেও তার পাত্তা পায়নি ইংরেজদের দুর্দ্ধর্ষ যুদ্ধজাহাজগুলো।

    জলদস্যুতা বেআইনি হলেও তার সঙ্গে আছে রোমান্সের সম্পর্ক। দেশ-বিদেশের সমুদ্রে ও নদনদীতে অর্থ আর রক্ত লোভী সেই বেপরোয়া মানুষদের রোমাঞ্চকর কাহিনি পড়তে ভালোবাসে ছেলে-বুড়ো সকলেই। তাদের কথা নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য গল্প ও শত শত উপন্যাস এবং তাদের চাহিদা আছে সমগ্র পৃথিবীতে। তবে কেবল হানাহানি, রক্তারক্তি ও লুঠতরাজের জন্যে নয়, সে সব কাহিনি অধিকতর চিত্তোত্তেজক হয়ে ওঠে ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে যখন নায়ক রূপে দেখা দেয় এক-একজন সাধু ব্যক্তি।

    কিন্তু আজ আমি তোমাদের কাছে যে সব দুষ্ট লোকের কথা বলতে বসেছি, তারা কল্পিত গল্প উপন্যাসের কেউ নয়, রক্তমাংসের দেহ নিয়ে বিদ্যমান ছিল তারা সত্যিকার পৃথিবীতেই। জাতে তারা হচ্ছে মগ বা আরাকানী ও ফিরিঙ্গি ও পর্তুগিজ। তাদের পেশা ছিল বাংলাদেশের নদীতে নদীতে জলদস্যুতা করা। সে সব হচ্ছে প্রধানত সপ্তদশ শতাব্দীর ব্যাপার।

    আরও কয়েকশত বৎসর পিছিয়ে গেলে আমরা উপলব্ধি করতে পারব একটি পরম সত্য।

    ভারতের মাটিতে মুসলমানরা প্রথম শিকড় গাড়বার সুযোগ পেয়েছিল কেন?

    উত্তরে ইতিহাস বলবে, বোম্বেটেদের জন্যেই।

    পশ্চিম এশিয়ার কতক অংশ তখন আরবদের করতলগত। মুসলমানদের ধর্মনেতা ও নরপতি বা খলিফার অধীনে হাজাজ ছিলেন ইরাকের শাসনকর্তা।

    সিংহলের রাজা ওই খলিফা ও হাজাজের উদ্দেশে পাঠিয়েছিলেন বহুমূল্য দ্রব্যে পরিপূর্ণ নয়খানা জাহাজ।

    জাহাজগুলো অগ্রসর হচ্ছিল সিন্ধুদেশের নিকটস্থ সাগরপথ দিয়ে। আচম্বিতে একদল জলদুস্য (খুব সম্ভব তারা ভারতীয়) সেই সব জাহাজ লুণ্ঠন করে সরে পড়ল।

    সিন্ধুদেশের রাজা তখন দাহীর। মূল্যবান সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে হাজাজ দূত পাঠিয়ে দাহীরকে বললেন, ‘এর জন্যে ক্ষতিপূরণ করতে ও দস্যুদের শাস্তি দিতে হবে আপনাকেই।’

    দাহীর বললেন, ‘সে কী কথা? দস্যুরা তো আমার হাতধরা নয়, আমি তাদের শাস্তি দেব কেমন করে?’

    এ যুক্তি হল না হাজাজের মনের মতো। ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি দাহীরের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলেন সৈন্যদল এবং প্রথম যুদ্ধে হেরে ও দ্বিতীয় যুদ্ধে জিতে হাজাজ সিন্ধুদেশ অধিকার করলেন।

     সেই হল ভারতে মুসলমান রাজত্বের সূত্রপাত। সেটা হচ্ছে ৭১২ খ্রিস্টাব্দের কথা।

    বাংলাদেশে বোম্বেটেরা যখন দস্তুরমতো পসার জমিয়ে তুলেছে, সেই সময়ে ইউরোপে ও আমেরিকাতেও সকলকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারছিল জলদস্যুরা। আগে সংক্ষেপে তাদেরও কিছু কিছু পরিচয় দিয়ে রাখি, কারণ ওই ফিরিঙ্গি বোম্বোটেদেরই একদল হয়েছিল ভারতীয় জলপথের পথিক।

    আগেই বলেছি, গ্রিক ও রোমানদের সময়েও ইউরোপে জলদস্যুর অভাব ছিল না। বিশ্ববিখ্যাত দিগবিজয়ী জুলিয়াস সিজারকেও একবার জলদস্যুর কবলে পড়ে বিস্তর নাস্তানাবুদ হতে হয়েছিল।

     রোম সাম্রাজ্যের অধঃপতনের পর উত্তর আফ্রিকার মুসলমান জলদস্যুরা ভূমধ্য- সাগরে অত্যন্ত প্রবল হয়ে ওঠে। পনেরো শতাব্দীর শেষভাগে স্পেন থেকে বিতাড়িত হয়ে মুসলমানরা উত্তর-আফ্রিকার মরক্কো প্রভৃতি প্রদেশে গিয়ে আশ্রয় নেয়। তারপর তাদের অনেকে জলদস্যুর পেশা নিয়ে ইউরোপীয়দের উপরে অবাধ অত্যাচার চালাতে থাকে। তাদের বিপুল প্রতাপে সারা ইউরোপ হত থরথরি কম্পমান। তারা কেবল সমুত্রযাত্রীদের সর্ব্বস্ব কেড়ে নিত না, মানুষদেরও ধরে নিয়ে গিয়ে গোলাম করে রাখত—এইভাবে হাজার হাজার ইউরোপীয়কে চিরজীবনের জন্য বন্দি হয়ে থাকতে হত। তারা ক্রমে ক্রমে এমন শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে, সমগ্র ইউরোপের বিভিন্ন রাজ্য একত্রে চেষ্টা করেও ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত তাদের দমন করতে পারেনি। খৈর এদ-দিন, দ্রাগুত ও আলি বাসা প্রভৃতি বোম্বেটের নাম শুনলেই তখনকার ইউরোপীয় বণিকেদের পেটের পিলে চমকে উঠত। একদিক দিয়ে বাংলাদেশের ফিরিঙ্গি বোম্বেটেরাও ছিল তাদের সুযোগ্য ছাত্র। সে কথা বলব যথাসময়ে।

    ভূমধ্যসাগরে মুসলমান বা মুর-জাতীয় বোম্বেটেরা আর সকলের উপরে টেক্কা মেরেছিল বটে, কিন্তু তা বলে মনে কোরোনা যে, নানাদেশীয় ইউরোপীয় জলডাকাতরা হাত গুটিয়ে চুপ করে বসেছিল নিতান্ত ভালোমানুষের মতো। সুবিধা পেলেই তারা প্রাণপণে উৎপাত করত যেখানে-সেখানে। নিম্নশ্রেণির সাধারণ জলডাকাতরা তো ছিলই, তার উপরে আত্মপ্রকাশ করে নূতন একশ্রেণির বোম্বেটে। জাতে তারা ইংরেজ, এবং অনেক সময়ে ইংল্যান্ডের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তানরাও তাদের দলে যোগ দিতে ইতস্তত করত না। ইংরেজ ছাড়া আর সব জাতের জাহাজ তারা নির্বিচারে লুণ্ঠন করত।

    ক্রমে ইউরোপীয় বোম্বেটের দল দূর-দূরান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরদিকে আছে ক্যারিবিয়ান সমুদ্র, তা হচ্ছে আটলান্টিক মহাসাগরেরই একটি শাখা। ওইখানেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে এই অঞ্চলটা ছিল ফিরিঙ্গি বোম্বেটেদের জন্যে অত্যন্ত কুখ্যাত। তাদের নির্দয়তা ছিল মর্মভেদী। তারা কেবল জাহাজ লুণ্ঠন করেই ক্ষান্ত হত না, সর্ব্বস্ব কেড়ে নেওয়ার পর যাত্রীদেরও অকূল সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করত। এইভাবে কত হাজার হাজার অভাগাকেই যে জীবন্ত অবস্থাতেই সলিলসমাধি লাভ করতে হয়েছে, তার হিসাব কেউ রাখতে পারে নি।

    নতুন এক ওজুহাত দেখিয়ে সমুদ্রে জাহাজ ভাসালে আর এক শ্রেণির ইংরেজজাতীয় জলদস্যু। তখন ইংল্যান্ডের সঙ্গে স্পেনের দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধ চলেছে। সে সময়ে স্পেনের সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল আমেরিকার নানাস্থানে। ইংরেজ বোম্বেটেরা সুবিধা পেলেই স্পেনের কোনও জাহাজই লুণ্ঠন করতে ছাড়ত না। এত বড় তাদের বুকের পাটা ছিল যে, সরকারি যুদ্ধজাহাজের সঙ্গেও তারা লড়াই করতে ভয় পেত না। কেবল সমুদ্রে নয়, প্রায়ই তারা ডাঙ্গায় নেমে বড় বড় অরক্ষিত নগরকেও আক্রমণ করত! সে এক বিষম সর্বনেশে ব্যাপার—লুঠতরাজের সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিকাণ্ড ও হত্যাকাণ্ড! তাদের কবলে পড়ে বহু শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ জনপদ পরিণত হয়েছে প্রাণীশূন্য ভস্মস্তূপে। লাভের লোভে এদের দলে যোগ দিয়েছিল ফরাসি বোম্বেটেরাও। ইংরেজিতে এদের এক নূতন নামকরণ হয়েছে—বাক্যানীয়ার (Bueeaner)। এই দলের কাপ্তেন বার্থোলোমিউ রবার্টস নামে একজন ডাকাত একাই লুণ্ঠন করেছিল চারিশত জাহাজ। এ ছাড়া কীড, টীচ ও লোলোনয়েজ প্রমুখ প্রসিদ্ধ বোম্বেটেরাও হিংস্রতা ও ভীষণতার জন্যে অতিশয় কুখ্যাত হয়ে আছে।

    স্বার্থের গন্ধ পেয়ে নীতিজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল ইংরেজ গভর্নমেন্ট পর্যন্ত। ‘আমি স্পানিয়ার্ডদের লঙ্গে লড়াই করেছি’ বললেই অত্যন্ত নরাধম যে কোনও জলডাকাতের সাত খুন মাফ হয়ে যেত। হেনরি মর্গ্যান নামে এই দলের এক পাপাত্মাকে বন্দি করে ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল—শাস্তিলাভ করবার জন্যে। ইংরেজের আইনে বোম্বেটের শাস্তি হচ্ছে প্রাণদণ্ড। কিন্তু তখনকার ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস মর্গ্যানকে বোম্বেটে জেনেও ‘স্যর’ উপাধিতে ভূষিত করেও তৃপ্ত হলেন না, তাকে লেফটেন্যান্ট গভর্নর রূপে পাঠিয়ে দিলেন জামাইকা দ্বীপে। ভক্ষক হল রক্ষক!

    ফিরিঙ্গি বোম্বেটেদেরই এক দলের কার্যক্ষেত্র হল বঙ্গদেশ। ওই দলে ইউরোপের অন্যান্য জাতির লোকও ছিল, হানা দিয়ে বেড়াত তারা ভারতসাগরে। কিন্তু তাদের মধ্যে সব চেয়ে মাথা চাগাড় দিয়ে উঠল পর্তুগিজরাই।

    তার কারণও আছে। সমুদ্রপথে তখন পর্তুগালের প্রভুত্বের সীমা নেই। পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-ডা-গামা ইউরোপ থেকে ভারতে আসবার জন্যে নতুন সমুদ্রপথ আবিষ্কার করে মস্ত নাম কিনেছেন। আমরা তাঁকে যদি ভদ্রবংশীয় বোম্বেটে বলে ডাকি, তবে কিছুমাত্র অন্যায় হবে না। কারণ ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারতে কালিকট নগরকে কামানের মুখে সমর্পণ করেন এবং প্রভূত সম্পত্তি লুণ্ঠন ও অগুন্তি নরহত্যা করে স্বদেশে ফিরে যান।

    প্রথম ইমানুয়েল ছিলেন পর্তুগালের রাজা। পর্তুগিজরা তখন দক্ষিণ ভারতের একাধিক প্রত্যন্ত প্রদেশে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। ভাস্কো-ডা-গামার দস্যুতা রাজার কাছে গৃহীত হল বীরত্ব রূপে এবং পুরস্কার স্বরূপ ভাস্কো-ডা-গামা লাভ করলেন পর্তুগালের ভারতীয় উপনিবেশের রাজ-প্রতিনিধি বা শাসনকর্তৃত্ব। তিন মাস পরে দক্ষিণ ভারতেই (কোচিনে) তাঁর মৃত্যু হয়।

    ভারতের সঙ্গে পর্তুগালের ওই সম্পর্কের ফলে তাড়াতাড়ি বড়লোক হওয়ার লোভে দলে দলে পর্তুগিজ এদেশে আসতে আরম্ভ করলে এবং অন্যান্য ইউরোপীয়দের চেয়ে তারাই দলে ভারী হয়ে উঠতে লাগল। ক্রমে তারা বৈধ ও অবৈধ উপায়ে বাংলাদেশের স্থানে স্থানে আড্ডা গেড়ে কায়েমী হবার জন্যে চেষ্টা করতে লাগল। প্রথমে তারা কুঠি স্থাপন করলে চট্টগ্রাম ও সপ্তগ্রামে। তারপর আরও নানা জায়গায় তাদের আস্তানার সংখ্যা বেড়ে উঠতে লাগল ক্রমে ক্রমে।

    ইংরেজরা যে বৈধ ভাবে বাংলাদেশে প্রধান হয়ে উঠেছিল, ইতিহাস এ কথা বলে না। পর্তুগিজরাও গোড়া থেকেই এখানে প্রাধান্য বিস্তার করতে চেয়েছিল অবৈধ উপায়ে। কিন্তু তারা ছিল ইংরেজদেরও চেয়ে বেশি অসৎ। স্বার্থসিদ্ধির জন্যে তারা কোনওরকম সঙ্কোচ বা ন্যায়-অন্যায়ের ধার ধারত না। দরকার হলেই তারা জলদস্যুতা করত বঙ্গোপসাগরের সেখানে-সেখানে। বাংলার বাসিন্দারা তাদের বন্ধুভাবে গ্রহণ করতে পারেনি।

    তার কারণও ছিল। পর্তুগালের রাজা ভারতেও সুবৃহৎ উপনিবেশ স্থাপন করতে চেয়েছিল, কিন্তু রাজ্যবিস্তার করবার মতো লোকবল তাঁর ছিল না, কারণ পর্তুগাল হচ্ছে ক্ষুদ্র দেশ—ভারতবর্ষের বৃহৎ আসর জমাতে পারে, এমন যোগ্য ও শিষ্ট লোকের সংখ্যা সেখানে বেশি নয়।

    যোগ্য লোকের অভাবে পর্তুগালের কর্তৃপক্ষ যে উপায় অবলম্বন করলেন, শেষ পর্যন্ত সেইটেই হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁদের সর্বনাশের কারণ।

    পর্তুগালের কারাগারে ছিল দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীগণ। তাদের বলা হল, ‘তোমরা স্বদেশে বসে জেল খাটতে কিংবা ভারতবর্ষে গিয়ে স্বাধীনতার ভাগ্যপরীক্ষা করতে চাও?’

    বলা বাহুল্য, কয়েদিরা ভারতবর্ষে যাওয়াই শ্রেয়স্কর বলে মনে করলে।

    তাদের দলে ছিল গুরুতর অপরাধের জন্য দণ্ডিত অপরাধীরাও—কেউ খুনি, কেউ ডাকাত, কেউ গুন্ডা। ভারতে তথা বাংলাদেশে গিয়েও তারা নিজেদের স্বভাব বদলাতে পারলে না, বরং দেশের সমাজ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে তাদের চক্ষুলজ্জা পর্যন্ত ঘুচে গেল। আর কয়লার ময়লাও যায় না।

    তখন নানা দেশের ইউরোপীয় ভ্রমণকারীরা ভারত পর্যটন করতে আসতেন। তাঁদের ভ্রমণকাহিনিতে ভারতের পর্তুগিজদের ‘বন্য মানুষ’ এবং ‘পোষ-না-মানা ঘোড়া’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। দক্ষিণ ভারতের উপনিবেশে সুশাসনের গুণে পর্তুগিজরা অপেক্ষাকৃত ভদ্রভাবে জীবনযাপন করতে বাধ্য হত। এটা যাদের সহ্য হত না, তারা সেখান থেকে সরে পড়ে বাংলাদেশে গিয়ে পদার্পণ করত, কারণ বাংলার নদীতে নদীতে ছিল জলডাকাতি করে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার সুযোগ।

    চতুর্দিকে হাহাকার! ফিরিঙ্গি বোম্বেটেদের অত্যাচার! সমাজ-সংসার উৎসন্নে যেতে বসল, বাংলায় গ্রামের পর গ্রাম শ্মশানের মতো হয়ে উঠল।

    ফিরিঙ্গিরা নদীতে নদীতে হানা দেয় এবং সুযোগ পেলেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের ইউরোপীয় জলদস্যুদের মতো তীরে নেমেও লুটপাট করে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয় দেয়, মানুষদের বন্দি করে নিয়ে যায়। দেখতে দেখতে তাদের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে বাসিন্দারা পলায়ন করতে লাগল—দেশ হয়ে উঠল অরাজক বা ‘ফিরিঙ্গিরাজক’।

    মুকুন্দরাম চক্রবর্ত্তীর ‘কবিকঙ্কন চণ্ডী’ কাব্য নাকি ষোড়শ বা সপ্তদশ শতাব্দীতে রচিত। তার মধ্যেও ওই বোম্বেটে-বিভীষিকার প্রমাণ আছে। ধনপতি সওদাগর নদীতে নৌকো ভাসিয়ে চলেছেন—

    ‘ফিরিঙ্গীর দেশ’ খান বাহে কর্ণধারে,

    রাত্রিতে বহিয়া যায় হরমাদের ডরে।’

    ‘হরমাদ’ মানে রণপোতবহর। পাছে ফিরিঙ্গি বোম্বেটেদের দ্বারা আক্রান্ত হতে হয়, সেই আশঙ্কায় নৌকো চালানো হয়েছিল রাত্রির অন্ধকারে চুপে চুপে। আর একটি লক্ষ করবার বিষয় হচ্ছে, কবি মুকুন্দরাম ওই অঞ্চলটিকে ‘ফিরিঙ্গির দেশ’ বলে বর্ণনা করেছেন। বাংলাদেশ তখন মোগলসাম্রাজ্যের অন্তর্গত এবং তার কয়েকটি প্রান্তে এমন কয়েকটি রাজ্য ছিল, যাদের স্বাধীন বা প্রায়-স্বাধীন বলা চলত। কিন্তু পূর্ব্বোক্ত অঞ্চলে তখন ফিরিঙ্গি পর্তুগিজ জলডাকাতদের প্রাধান্য ছিল এত বেশি যে, তা কেবল ‘ফিরিঙ্গিরি দেশ’ বলেই বর্ণিত হয়েছে।

    কিন্তু কেবল কি ফিরিঙ্গি? তাদের সহচর ছিল মগরাও। মগ ও ফিরিঙ্গি—দুষ্টামি ও নষ্টামিতে ‘কে হারে, কে জিতে দুজনে সমান!’ বাংলায় ‘মগের মুল্লুক’ বলে একটা চলতি কথা আছে। মগের মুল্লুক—অর্থাৎ অরাজক দেশ। ফিরিঙ্গি এবং মগদের অত্যাচারে তখন বাংলাদেশের কতকাংশ সত্য সত্যই অরাজক হয়ে উঠেছিল।

    আরাকান হচ্ছে ব্রহ্মদেশেরই একটা প্রদেশ। ত্রিপুরার দক্ষিণ দিক থেকে আরাকান রাজ্য আরম্ভ হয়েছে। মগরা হচ্ছে সেখানকারই বাসিন্দা। ধর্মে বৌদ্ধ হলেও তারা অহিংসার মন্ত্র উচ্চারণ করত না। এক সময়ে তারা বাংলাদেশও আক্রমণ করে সমগ্র চট্টগ্রাম জেলা এবং নোয়াখালি আর ত্রিপুরারও কতক অংশ অধিকার করেছিল। এইজন্যে অবশেষে তাদের সঙ্গে মোগলদের সঙ্ঘর্ষ উপস্থিত হয়।

    কথায় বলে ‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাই।’ কাজেই ফিরিঙ্গি দস্যুদের সঙ্গে মগ দস্যুদের মিতালি হতে দেরি লাগল না। মগ ও ফিরিঙ্গিরা মনে মনে পরস্পরকে পছন্দ করত না, কিন্তু তারা একজোট হয়েছিল কেবল একই স্বার্থের খাতিরে। মগদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দরকার হলে ফিরিঙ্গিরা মোগলদের সঙ্গে লড়াই করেছিল এবং আরাকানের দুই জায়গায় তাদের দুটো বড় বড় ঘাঁটিও ছিল বটে, কিন্তু তারা কোনওদিনই সম্পূর্ণরূপে আরাকানরাজের বশ্যতা স্বীকার করেনি।

    আসলে বাংলায় প্রবাসী ফিরিঙ্গি বা পর্তুগিজরা ছিল জাতিভ্রষ্ট বা সমাজচ্যুত জীব। পর্তুগাল তাদের স্বদেশ হলেও পর্তুগালপতির বা তাঁর রাজপ্রতিনিধিরও কোনও ধারই তারা ধারত না—মায়ে-খেদানো বাপে-তাড়ানো ছেলেদের মতো যা খুশি তাই করতে পারত।

    কিন্তু তারা ছিল নিপুণ নাবিক ও জলযুদ্ধে মহা ওস্তাদ। তাদের নৌকো বা জাহাজ ছিল রণপোতেরই নামান্তর, সর্বদাই তার মধ্যে থাকত কামান, বন্দুক ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র। এইজন্যে বাংলার কয়েকজন বিদ্রোহী রাজা তাদের অনেককে বেতন দিয়ে নিজেদের দলে নিযুক্ত করতেন—যেমন শ্রীপুর ও বিক্রমপুরের রাজা চাঁদ রায় ও কেদার রায় এবং যশোহরের রাজা প্রতাপাদিত্য।

    চট্টগ্রামে ও আরাকানে ছিল পর্তুগিজ বোম্বেটেদের প্রধান আস্তানা। সাধারণত তারা চট্টগ্রাম থেকে বেরিয়ে নদীপথে নৌবাহিনী চালিয়ে যখন-তখন হানা দিত হুগলি, যশোহর, ভূষণা, বাকলা, বিক্রমপুর, সোনারগাঁ ও ঢাকা প্রভৃতি স্থানে। বলা বাহুল্য, তাদের পাপকার্যের সঙ্গী হত মগের দলও এবং তারাও ছিল তাদেরই মতো নিপুণ নাবিক।

    শোনা যায়, এখন যেখানে হিংস্রজন্তুপূর্ণ, জনশূন্য সুন্দরবন, আগে সেখানে ছিল সব সমৃদ্ধিশালী জনপদ। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে মগ ও ফিরিঙ্গি বোম্বেটেদের কবলে নির্যাতিত হয়ে নাগরিকরা ঘরবাড়ি ছেড়ে পলায়ন করতে বাধ্য হয়েছিল।

    পরিত্যক্ত, বিজন নগর আচ্ছন্ন হয়ে যায় ঝোপঝাপ আগাছায়, কালক্রমে বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষের উপরে মাথা তুলে দাঁড়ায় মহা মহা মহীরুহ এবং চর্তুদিকে নরনারীর কলকোলাহলের পরিবর্তে শোনা যেতে থাকে ভয়াল জন্তুদের ভৈরব গর্জন।

    নাম হয় তার সুন্দরবন। সুন্দর বটে, কিন্তু ভীষণ সুন্দর!

    ”আরাকানী জলদস্যুরা (মগ ও ফিরিঙ্গি) নিয়মিত ভাবে বাংলাদেশ লুণ্ঠন করত। হিন্দু বা মুসলমান যাকে হাতের কাছে পেত, তাকেই তারা গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেত।

    বন্দিদের হাতের তেলোয় ছ্যাঁদা করে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হত বেতের ফালি (বা রজ্জু), তারপর তাদের নিক্ষেপ করা হত জাহাজের পাটাতনের তলায়। দিনের পর দিন তারা সেইখানে অন্ধকারে গাদাগাদি করে বাস করত। প্রতিদিন সকালে তাদের ক্ষুণ্ণিবৃত্তির জন্যে উপর থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হত কয়েক মুঠো আরাঁধা চাল—যেমন করে লোকে ছড়িয়ে দেয় মুরগিদের জন্যে।

    ফিরিঙ্গিরা দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন বন্দরে গিয়ে ওলন্দাজ, ইংরেজ ও ফরাসিদের কাছে বন্দিদের বিক্রয় করে ফেলত। কিন্তু মগরা তা করত না, তারা স্বদেশে নিয়ে গিয়ে বন্দিদের নিযুক্ত করত কৃষিক্ষেত্রে বা গৃহস্থালীর কাজে।’

    এই হল ঐতিহাসিকের উক্তি।

    তমলুকের কিছুদূর থেকে গঙ্গার একটি শাখা চলে গিয়েছিল ঢাকা ও চট্টগ্রামের দিকে। এই জলপথ দিয়েই আনাগোনা করত মগ ও ফিরিঙ্গি দস্যুদল। ইংরেজ বণিকরা ওই জলপথের নাম দিয়েছিল, ‘দুরাত্মাদের নদী’।

    আগেই ইউরোপীয় সমুদ্রে মূর জলদস্যুদের কথা বলা হয়েছে। বন্দিদের তারা এখানে-ওখানে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে ফেলত।

    লুণ্ঠনের সঙ্গে সঙ্গে তারা চালাত দাসব্যবসায়। খুব সম্ভব তাদের দেখাদেখি বাংলাদেশের ফিরিঙ্গি বোম্বেটেরাও ওই পেশা অবলম্বন করেছিল।

    ভেবে দেখ, সে কী নিদারুণ ব্যাপার! চারিদিকে অখণ্ড শান্তি, নদীর ধারে ঘুমিয়ে আছে সবুজ বাংলার গ্রাম্য প্রকৃতি। সোনার ধান দোলানো খেতের আশেপাশে মাঠে মাঠে নির্ভয়ে খেলা করছে গৃহস্থদের শিশুর দল—তাদের কারুর নাম রাম বা শ্যাম কিংবা কাসেম বা কাদের।

    আচম্বিতে দিকে দিকে হইচই উঠল—‘ওরে, পালা, পালা!’ ”ফিরিঙ্গিরা আসছে, বোম্বেটেরা আসছে!’

    নদীর ধারে হুড়মুড় করে এসে পড়ল বোম্বেটেদের জাহাজ এবং তার ভিতর থেকে টপাটপ লাফিয়ে পড়ল মূর্তিমান যমদূতের মতো পর্তুগিজের গোরার দল!

    ছেলের দল খেলা ভুলে প্রাণপণে দৌড় মারলে যে যেদিকে পারে। কিন্তু সবাই পালাতে পারলে না, ধরা পড়ল অনেকেই।

    তারপর? ফিরিঙ্গি বোম্বেটেরা তাদের নিয়ে গিয়ে বেচে ফেললে, ইংরেজ, ফরাসি ও ওলন্দাজ বণিকদের কাছে। ক্রীতদাস নিয়ে তারা ফিরে গেল সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে আপন আপন দেশে।

    বাংলাদেশের কচি কচি শ্যামলা ছেলে, যেখানে গিয়ে পড়ল সেখানকার মানুষ, ভাষা, তুষারপাত ও জীবনযাত্রা—সবই তাদের কাছে নতুন, আজব, দুর্বোধ! কোথায় আদরভরা মা-বাপের কোল আর কোথায় অজানা বিদেশীদের কাছে যন্ত্রণাপূর্ণ ক্রীতদাসের জীবন। ছিল সবাই আনন্দময় ফুলের বাগানে, গিয়ে পড়ল নির্জল, নির্মম মরুভূমিতে।

    ম্যাডাম দ্যু বেরী ছিলেন ফরাসিদেশের এক পরমাসুন্দরী বিলাসিনী, রাজা পঞ্চদশ লুইর প্রিয়-বান্ধবী। এমনি এক বাংলার ছেলে গিয়ে পড়েছিল তাঁর কাছে, তিনি তাকে শখ করে দামি দামি পোশাক পরিয়ে লালনপালন করতেন—মানুষ যেমন করে পাখি পোষে সোনার খাঁচায়। তার বাঙালি বাপ-মা কী নাম ধরে তাকে ডাকতেন কেউ তা জানে না, কিন্তু ফরাসি দেশে সবাই তাকে জামোর বলে ডাকত।

    জামোর কি খুশি ছিল? মোটেই নয়, মোটেই নয়! স্বাধীন পাখি কি সোনার খাঁচায় খুশি থাকতে পারে? জামোর জানত, সবাই তাকে বলে ‘বিকটাকার ক্ষুদে জন্তু’! বুকের তলায় প্রাণ তার বিদ্রোহী হয়ে উঠত।

    অবশেষে সে প্রতিশোধ নিলে। শুরু হল ফরাসি বিপ্লব, রাজা পঞ্চদশ লুইর প্রিয়পাত্রী ও জামোরের কর্ত্রী দ্যু বেরী হল বন্দিনী।

    বিচারালয়ে তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিলে জামোর। দ্যু বেরীর উপরে হল প্রাণদণ্ড।

    পূর্ববাংলায় মগরাও করত ফিরিঙ্গিদের মতো অমানুষিক অত্যাচার। মুসলমান ঐতিহাসিক তাদের সম্বন্ধে বলেছেন :

    ‘বাংলার সীমান্তপ্রদেশে মগদের অত্যাচারে আকাশে উড়ত না একটা পাখি, স্থলে বিচরণ করত না একটা জন্তু। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত যাতায়াত করবার পথের দুই পাশে দেখতে পাওয়া যেত না একজনমাত্র গৃহস্থকেও।”

    এমন অস্বাভাবিক অবস্থা কল্পনাও করা যায় না। এবং এমন অস্বাভাবিক অবস্থা চিরদিন কখনও স্থায়ী হতেও পারে না। অবশেষে মোগলসম্রাট ও মুসলমান শাসনকর্তাদের টনক নড়ল। প্রথমে তাঁরা ব্যাপারটার গুরুত্ব না বুঝে দুই-চারিদল সেপাই পাঠিয়ে বোম্বেটেদের দমন করবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বোম্বেটেরা অনায়াসেই তাদের হারিয়ে দিলে। তখন তাঁরা দস্তুরমতো আয়োজন করে কোমর বেঁধে কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন।

    সর্বপ্রথমে ভারত সম্রাট শাজাহানের দৃষ্টি পড়ল হুগলীর পর্তুগিজ উপনিবেশের উপরে। তাঁর আজ্ঞায় সেনাপতি কাসিম খাঁ সসৈন্যে যাত্রা করলেন হুগলীর দিকে।

    বাংলার মধ্যে হুগলিতেই পর্তুগিজ উপনিবেশ ছিল সব চেয়ে সুপরিচালিত, সুরক্ষিত ও সুবৃহৎ। সেখানকার পর্তুগিজদের অধিকাংশই জলদস্যু ছিল না বটে, কিন্তু তারা মোগলদের শত্রু আরাকানরাজকে সৈনিক ও গোলা-বারুদ প্রভৃতি দিয়ে সাহায্য করত। উপরন্তু বাংলার ফিরিঙ্গি বোম্বেটেরা হুগলিতে এসে ফলাও ভাবে দাস-ব্যবসায় চালিয়ে যেত। তাঁর অভাগা প্রজাদের বন্দি করে ফিরিঙ্গিরা যে হাটে নিয়ে গিয়ে গরু-ছাগলের মতো বিক্রি করে ফেলবে, সম্রাট শাজাহানের পক্ষে এটা অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।

    মোগলরা যে সৈন্যবলে ছিল অধিকতর বলীয়ান, সে কথা বলাই বাহুল্য। আগে জলস্থলের চারিদিক থেকে হুগলিকে ঘিরে ফেলে তারা আক্রমণ করতে অগ্রসর হল। কিন্তু পর্তুগিজদের যুদ্ধপ্রতিভা ছিল অসামান্য, সংখ্যায় দুর্বল হলেও তারা দীর্ঘ তিন মাস ধরে মোগলদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিলে। অবশেষে তারা গঙ্গায় জাহাজ ভাসিয়ে যুদ্ধ করতে করতে কতক পলায়ন করলে। কতক মারা পড়ল এবং কতক বন্দি হল। মোগলসম্রাট উপহার লাভ করলেন চারিশত বন্দি ফিরিঙ্গি নরনারী। এইভাবে পশ্চিম বাংলায় হুগলি বন্দরে পর্তুগিজদের প্রধান আস্তানা বিলুপ্ত হয়।

    কিন্তু এর আগে এবং এর পরে অনেক কাল ধরেই পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলায় ফিরিঙ্গি বোম্বেটেদের প্রভাব বা অত্যাচার ছিল অপ্রতিহত। তারা নিষ্ঠুর ও দস্যু ছিল বটে, কিন্তু যুদ্ধের সময়ে কোনওদিনই তাদের সাহস ও বীরত্বের অভাব হয়নি। মোগলদের সঙ্গেও তারা লড়াই করেছে, মগদের সঙ্গে বিবাদ বাধলেও তারা অস্ত্র ধরেছে এবং জয়ী হয়েছেও বারংবার।

    তাদের মধ্যে দুইজন নেতার নাম বাংলার ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। ডোমিঙ্গো কার্ভালহো ও সিবাষ্টিয়ো গঞ্জেলেশ।

    কার্ভালহো শ্রীপুরের রাজা কেদার রায়ের অধীনে কাজ করত। সে মগদের কবল থেকে সনদ্বীপ কেড়ে নিয়ে কেদার রায়ের হাতে সমর্পণ করেছিল। এবং কেদার রায়ের রাজধানী মোগলদের দ্বারা আক্রান্ত হলে কার্ভালহোই তাদের হারিয়ে শ্রীপুরকে রক্ষা করে। পরে রাজা প্রতাপাদিত্যের আদেশে সে নিহত হয়।

    গঞ্জেলেশ ছিল এক নম্বরের দুরাত্মা। তার নেতা হওয়ার উপযুক্ত বিশিষ্ট গুণ থাকলেও দস্যুতায়, নৃশংসতায় ও বিশ্বাসঘাতকতায় তার তুলনা ছিল না। বাকলার বাঙালি রাজার কাছ থেকে সৈন্যসাহায্য পেয়ে সে মুসলমানদের হারিয়ে সনদ্বীপ অধিকার করে, অথচ পরে ওই রাজাকেই বঞ্চিত করে নিজেই সেখানে প্রভু হয়ে বসে শাসনকার্য চালাতে থাকে। কিন্তু গঞ্জেলেশের ক্রুরতা ও কঠিন স্বভাবের জন্যে তার অধীনস্থ অন্যান্য ফিরিঙ্গি বোম্বেটেরা পর্যন্ত তাকে দু-চক্ষে দেখতে পারত না। ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের রাজা তার কাছ থেকে সনদ্বীপ কেড়ে নেন এবং গঞ্জেলেশের নামও ডুবে যায় বিস্মৃতির অন্ধকারে!

    শেষের দিকে মগদের সঙ্গে ফিরিঙ্গিদের আর বিশেষ সদ্ভাব ছিল না।

    দুই জাতির মধ্যে প্রায়ই খিটিমিটি বাধতে থাকে। ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের বিখ্যাত শাসনকর্তা শায়েস্তা খাঁ যখন সনদ্বীপ দখল করে চট্টগ্রাম আক্রমণের উদ্যোগ করছিলেন, সেই সময়ে মগেদের সঙ্গে ঝগড়া করে ফিরিঙ্গিরা তাঁর ফৌজে যোগ দেয় সদলবলে। সেই সম্মিলিত মোগল ও ফিরিঙ্গি সৈন্যদের আক্রমণের সামনে দাঁড়াতে না পেরে আরাকানীরা সে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেল এবং অবশেষে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হল মগের মুল্লুক। সেখানে বন্দিদশায় জীবনযাপন করছিল হাজার হাজার বাঙালি কৃষক। স্বাধীনতা পেয়ে ঘরের ছেলে আবার ঘরে ফিরে এল।

    প্রথমে হুগলি এবং তারপর চট্টগ্রাম—এই দুই প্রধান বন্দর ও আস্তানা থেকে বঞ্চিত হয়ে বোম্বেটেদের মেরুদণ্ড একেবারেই ভেঙে গেল। মগরা আর বাংলার দিকে লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারেনি এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রায় শেষের দিকেও বাংলাদেশ পর্তুগিজরা নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল বটে, কিন্তু তাদের অবস্থা হয়ে পড়েছিল বিষদাঁতভাঙা ভুজঙ্গের মতো।

    বোম্বেটেদের হাতে ইংরেজদের নাকাল হতে হয়নি। তারা এখানে কায়েমি হয়ে বসবার আগেই বাংলাদেশ থেকে বোম্বেটেরাজ বিলুপ্ত হয়েছে।

  • ফেরোমন

    ফেরোমন

    অজেয় রায়

    [book]

    এক

    পূর্ব আফ্রিকার ডার-এস-সালাম শহর থেকে সমদ্রপথে লঞ্চে চেপে আমরা রুফিজি নদীর মোহনার দিকে চলেছি। আমরা মানে প্রাণিতত্ত্ববিদ নবগোপাল ঘোষ অর্থাৎ আমাদের মামাবাবু, আমার বন্ধু সুনন্দ, আমি শ্রীমান অসিত ও বিল হার্ডি। আমরা তিনজন ভারতীয় বেশ কিছুদিন ধরে ডার-এস-সালামের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের কিউরেটর ডক্টর হাইনের আতিথেয়তা ভোগ করছি। ইতিমধ্যে আমাদের একটা অ্যাডভেঞ্চার হয়ে গেছে! রুফিজি নদীর মোহনার কাছে একটা দ্বীপে মামাবাবু সরীসৃপ ও পাখির মাঝামাঝি কোনো জীবের এক দুর্লভ প্রস্তরীভূত কঙ্কাল আবিষ্কার করেন এবং ঘটনাচক্রে সেই ফসিলটা আবার সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যায়। দ্বীপের অধিবাসীরা টাঙ্গানিকার এক গ্রাম থেকে ফসিলটা দ্বীপে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের এই দ্বিতীয় অভিযানের উদ্দেশ্য হল, যে গ্রামে ফসিলটা পাওয়া গিয়েছিল, তারই আশেপাশে ওই রকম আরও অন্য ফসিলের অনুসন্ধান করা। মামাবাবুর বিশ্বাস ছিল, বিল হার্ডি ওই গ্রামে যাবার একটা সহজ রাস্তা বাতলে দিতে পারবেন, কারণ সে ওই গ্রামে গিয়েছিল। সেই রকমই অনুরোধ করে একটা চিঠি পাওয়ামাত্র বিল ডার-এস-সালামে চলে আসেন এবং তার পরদিনই আমরা রওনা হয়ে যাই। এখানে বলা দরকার–হ্যার্ডি নামক এই শ্বেতাঙ্গ শিকারী পর্যটকটি সারা পূর্ব আফ্রিকায় ডেয়ারিং বিল নামে খ্যাত। তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময়টাই তিনি আফ্রিকা মহাদেশ চষে বেড়িয়েছেন। দীর্ঘ ঋজু বলিষ্ঠ চেহারা, বয়স পঞ্চাশের উপর, কিন্তু কানের পাশে সামান্য কয়েকটা পাকা চুল ছাড়া কোথাও প্রৌঢ়ত্বের ছাপ নেই।

    মামাবাবু এতক্ষণ ডেকে বসে ভারি মনোযোগ দিয়ে জুওলজি পত্রিকা পড়ছিলেন, এখন সেটা বন্ধ করে প্রায় আপন মনেই বলে উঠলেন, আশ্চর্য আবিষ্কার…ফেরোমন!

    বিল হার্ডি কিছুদূরে ঠোঁটে পাইপ কামড়ে চোখ বুজে লঞ্চের রেলিং-এর উপর পা তুলে বসে আছেন। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সম্বন্ধে তার বিন্দুমাত্র কৌতূহল নেই। মামাবাবর সঙ্গে নানান জায়গায় নানান অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গে জড়িত থাকার ফলে আমাদের দুজনের মধ্যেই সেটা বেশ বেশি পরিমাণেই সঞ্চারিত হয়েছে, তাই জিজ্ঞেস না করে পারলাম না–

    ফেরোমন কী জিনিস, মামাবাবু?

    মামাবাবু তার চশমার কাঁচটা রুমালে মুছতে মুছতে বললেন, ফেরোমন গড়ে প্রাণিদেহ-নিঃসৃত একরকম রাসায়নিক বস্তু। অনেক প্রাণী এর সাহায্যে পরস্পরের মধ্যে। নানারকম যোগাযোগ করে।

    আমি আর সুনন্দ পরস্পর মুখ চাওয়াচায়ি করলাম।

    পরিষ্কার হল না? মামাবাবু মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “বেশ, আরো সহজ করে। বলছি। বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর দেহকোষ থেকে এক বা একাধিক রকম লালা বা রস . বেরোয়। যে জিনিসটা বেরোয়, সেটা হল কয়েকটা রাসায়নিক পদার্থের সংমিশ্রণ। এগুলোর প্রত্যেকটির গন্ধ বা স্বাদ একটা বিশেষ সংকেত বহন করে। সেই সংকেতের ভাষা কেবল ওই প্রজাতির প্রাণীরাই বুঝতে পারে। যে রাসায়নিক বস্তুর সাহায্যে এই সাংকেতিক যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে, তাকেই বলে ফেরোমন। কোনো কোনো উন্নত প্রাণী, যাদের মখের ভাষা আছে, তাদের মধ্যেও বিশেষ প্রয়োজনে ফেরোমনের ব্যবহার দেখা যায়। যেমন, হরিণের মৃগনাভি বা কস্তুরী একরকম ফেরোমন। পুরুষ কস্তুরীমৃগ এর তীব্র সুবাস বাতাসে ছড়িয়ে তার হরিণীকে ডাকে। তবে কীট-পতঙ্গ ইত্যাদি নিম্নশ্রেণির জীবের ব্যাপারে বলা চলে যে তাদের সামাজিক জীবনটা একেবারে পুরোপুরি ফেরোমন নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন পিঁপড়ে, পিঁপড়ে নিয়েই গবেষণা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। পিঁপড়েরা চোখে দেখে না সেটা জানো বোধ হয়। বিভিন্ন প্রজাতির পিঁপড়ের মধ্যে অন্তত দশ রকম ফেরোমন আবিষ্কার করা গেছে। কোনোটার গন্ধে তারা বিষাদের সংকেত দেয়, কোনোটার সাহায্যে তারা মৃত সঙ্গীকে আবিষ্কার করে। কোনোটা তাদের সার বেঁধে পথ চলতে সাহায্য করে, আবার কোনো ফেরোমনের সাহায্যে তারা সাথীকে কাছে ডাকে।

    ফেরোমনের বৃত্তান্ত শুনে সত্যিই আমাদের অবাক লাগছিল। মামাবাবু কয়েক সেকেন্ড দম নিয়ে আবার বলে চললেন, অনেক জাতের পোকা ক্ষেতের শস্য নষ্ট করে। কীটনাশক ওষুধ ব্যবহার করেও তাদের ধ্বংস করা যায় না। মনে করো, কোনো পোকা ধান নষ্ট করে। আবিষ্কার করা গেল যে ওই জাতের স্ত্রী পোকা ফেরোমনের সাহায্যে পুরুষ পোকাকে কাছে ডাকে। তারপর ল্যাবরেটরিতে ওই ফেরোমনের রাসায়নিক মিশ্রণ আবিষ্কার হল। তৈরি হল কৃত্রিম ফেরোমন। ব্যস, এইবার কৃত্রিম ফেরোমন ধানক্ষেতের একপাশে ছড়িয়ে রেখে দাও। তখন কী হবে? পুরুষ পোকারা ছুটে আসবে কৃত্রিম ফেরোমনের গন্ধ পেয়ে আর সেই সুযোগে তাদের ধ্বংস করে ফেলা যাবে। আমেরিকায় এই উপায়ে প্রতি বছর হাজার হাজার জিপসি মথ ধ্বংস করে শস্য বাঁচানো হয়।

    ফেরোমনের বর্ণনা হয়তো আরো কিছুক্ষণ চলত, কিন্তু বাধ্য হয়ে থামাতে হল। সামনেই শহর দেখা যাচ্ছে। নদীর মোহনায় ছোট্ট শহর, নাম মোহোরা। এই মোহোরা। থেকেই আমাদের হাঁটা-পথে এগোতে হবে ফসিলের সন্ধানে। আমরা উঠে পড়লাম।

    সাফারির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ডার-এস-সালাম থেকে নিয়ে এসেছিলাম। বিল একটা রাইফেল ও পিস্তল এনেছিলেন। তাছাড়া ডক্টর হাইনের বন্দুকটা আমরা চেয়ে এনেছিলাম। বিল বলেছিলেন, শিকার আমি ছেড়ে দিয়েছি। অযথা প্রাণিহত্যা করতে আর ভালো লাগে না তবে আমাদের মাংসের দরকার হবে, টাটকা মাংস। তাই মাঝে মাঝে টোটা খরচ। করব।

    মোহোরা থেকে বিল চারজন চাম্বা পোর্টার ভাড়া করলেন। এরা মালপত্র বইবে। দরকার মতো মাটি পাথর খুঁড়বে। একজন কিছুটা রান্নাও জানে। শহর ছেড়ে পরদিন আমরা উন্মুক্ত প্রকৃতির রাজ্যে পদব্রজে যাত্রা করলাম।

    বেশি তাড়াতাড়ি এগোতে পারছিলাম না। একে খারাপ পথ, তার উপর মামাবাবুর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান। পথে যেতে যেতে তিনি মাঝে মাঝে আমাদের অপেক্ষা করতে বলছিলেন। নতুন ধরনের পোকা-মাকড়, সরীসৃপ ইত্যাদি দেখে তিনি দাঁড়িয়ে পড়ছিলেন। চোখে দূরবিন লাগিয়ে গভীর মনোযোগে লক্ষ করছিলেন। কখনও স্পেসিমেনটি জীবিত বা মৃত অবস্থায় সংগ্রহ না করে ছাড়ছিলেন না। নিজেই দেরি করছিলেন, আবার তারপরই আমাদের চলো চলো, এগোও, বলে তাড়া লাগাচ্ছিলেন।

    বিল পথ চলতে চলতে আমাদের নানারকম গাছপালা চেনাচ্ছিলেন। আফ্রিকার বনভূমিতে পথ চলার কায়দা-কানুন রপ্ত করাচ্ছিলেন। ছোট-বড় জীবজন্তু দেখিয়ে বোঝাচ্ছিলেন তাদের বয়স, মেজাজ ইত্যাদি।

    প্রায় পনেরো মাইল পথ চললাম। একবার মাত্র দপরে খেতে থেমেছিলাম। তারপর টানা হন্টন। সন্ধে নাগাদ তাঁবু ফেললাম। সবাই বেশ ক্লান্ত, রান্নার জোগাড় হতে থাকে। বিল বললেন, কাল আমরা নদীর কাছ ছেড়ে বাঁ দিকে বেঁকে যাব। প্রথমে একটা? স্টেপ অর্থাৎ তৃণভূমি পড়বে। সেটা পেরিয়ে ছোট ছোট পাহাড়ের সারি। ওইখানেই সেই গ্রাম ছিল। এতদূর অবধি আসতে অসুবিধা হয়নি, তবে স্টেপের মধ্যে দিয়ে দিক নির্ণয় করা একটু কঠিন। যা হোক, মনে হয় ঠিকঠাক পৌঁছে যাব। কতগুলো চিহ্ন আমার মনে আছে।

    মামাবাবু একটা প্যাকিং বাক্সকে টেবিল বানিয়ে কিছু পোকামাকড়ের স্পেসিমেন পরীক্ষা করতে লাগলেন। আমি ও সুনন্দ বিলের কাছে বসে রইলাম গল্প শোনার আশায়।

    বিল একটা গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে আরাম করে পা ছড়িয়ে একমনে কিছুক্ষণ পাইপ টানতে টানতে দূরে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, আফ্রিকার প্রকৃতিতে মায়া আছে বুঝলে, আজ রাতে চাঁদ উঠবে। তখন দেখবে কি অদ্ভুত রহস্যময় দেশ। এই বিশাল মহাদেশের কতটুকুই বা আজ পর্যন্ত আমরা জেনেছি–এখানকার অসংখ্য জীবজন্তু, গাছপালা, এ দেশের উপজাতিদের রীতিনীতি।

    প্রশ্ন করলাম, আপনি প্রথম কবে আফ্রিকায় আসেন?

    আজ থেকে তিরিশ বছর আগে, মাত্র বাইশ বছর বয়সে।

    কী করতে এসেছিলেন? শিকার?

    দূর দূর! তখন আমি ভালো করে বন্দুক চালাতেই জানতাম না। এলাম স্রেফ খেয়ালে পড়ে।

    যাঃ! স্কটল্যান্ড থেকে এত দূরে অকারণে? সুনন্দ প্রতিবাদ জানাল।

    সত্যি বলছি, কিছু ভেবে আসিনি। এসেছিলাম নিছক অ্যাডভেঞ্চারের নেশায়। আফ্রিকা সম্বন্ধে আমার তখন ধারণা ছিল অতি সামান্য, শুধু জানতাম এ এক বিশাল অজানা। রহস্যময় দেশ। ঠিক করলাম, যেমন এ দেশের অধিবাসীরা প্রায় খালি হাতে মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়, আমিও তেমনি বেড়াব। তারপর একটু একটু করে আফ্রিকান চিনলাম। উবসক নামে আমার প্রথম উপজাতি যুবক গাইডটি হল আমার গুরু। বন্ধও বলতে পারো। জানো, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ আরম্ভ হবার দু-বছর পরও আমি জানতে পারি যে, এমন এক সর্বনাশা যুদ্ধ চলছে! মোম্বাসা থেকে কিছু দরকারি জিনিস আনতে একজন পোর্টার পাঠিয়েছিলাম। জিনিস এল খবরের কাগজের মোড়কে। সেই কাগজ পডে জানলাম ওয়ালর্ড-ওয়র লেগেছে।

    বলেন কি! কোনো শ্বেতাঙ্গের সঙ্গে আপনার দেখাই হয়নি এই দু-বছর? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

    না। কোনো শ্বেতাঙ্গের সঙ্গে দেখা হয়নি! রেডিও শুনিনি, খবরের কাগজ পড়িনি। এই বিরাট দেশের কয়েকটি শহর এবং বাঁধা পথঘাটের বাইরে বিদেশি লোক বড় একটা পা বাড়ায় না। আর আমি ঘুরতাম অজানা প্রকৃতি-রাজ্যে। পশু শিকার করে, ছাল বা দাঁত উপজাতির কারো হাতে শহরে পাঠাতাম চিঠি দিয়ে। সে দাম নিয়ে আসত কিংবা বদ জিনিস কিনে আনত। কখনও শিকারের মাংস বা ছালের বিনিময়ে উপজাতিদের গ্রাম থেকে প্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করতাম। আর আমার জীবনধারণের প্রয়োজন ছিল অতি সামান্য। শুধু ঘুরতাম, প্রাণভরে দেখতাম। শিকার করতাম।

  • মিস্টার বাসুর ফরমুলা

    মিস্টার বাসুর ফরমুলা

    অজেয় রায়

    [book]

    মুখবন্ধ

    অজেয় রায় হলেন প্রকৃত বিজ্ঞানভিত্তিক কিশোর উপন্যাসের জগতে একজন বিশিষ্ট লেখক। এঁর গল্পে সরস বাষায় প্রকৃত  বৈজ্ঞানিক তথ্য পিরবেশন করা হয়। এগুলি পাঠ্যপুস্তকের চাইতে বেশি মূল্যবান, কারণ ছেলেমানুষরা আনন্দ এবং আগ্রহের সঙ্গে পড়ে। এঁর প্রচ্ছন্ন রসিকতাগুলিও পরম উপভোগ্য। আজগুবি গল্প লেখা বরং সহজ, কিন্তু তথ্যসমৃদ্ধ আনন্দের উপাদানের অনেক বেশি দাম।

    এই বইটিকে আমি স্বাগত জানাই এবং আশা করি তরুণ পাঠকরাও পড়ে এক অন্য জগতের আস্বাদ পাবে। ইতি—

    ১৫ জুন ১৯৮৮
    আঃ লীলা মজুমদার
  • ঔরস

    ঔরস

    মলয় রায় চৌধুরী

    [book]

    গ্রন্থকথা

    তিনটি নষ্ট উপন্যাসের সংকলনের প্রথমটি ‘রাহুকেতু’ যা একটি আত্মজীবনীমুলক কাহিনি। হাংরি আন্দোলনের সময়কালের সারস্বত সমাজের উথালপাতাল পাবেন পাঠকরা, তবে বুঝে নিতে হবে কারণ নামগুলি সবই ছদ্মনামে আছে। দ্বিতীয় উপন্যাসটি ‘ঔরস’ যা আপাদমস্তক রাজনৈকিত বক্তব্যে ঠাসা। ভাগলপুরের মাফিয়া অধ্যুষিত গাংগোতা সমাজ, গঙ্গায় জেগে ওঠা চরের দখল, অন্যদিকে চার হাজার কিলোমিটার জঙ্গল ঘিরে সালোয়া জুড়ুম, মাওবাদী, আধাসেনা, মিলিটারির মাঝে পড়ে অর্ধমৃত জনজীবনের বেঁচে থাকার গল্প। ‘লবিয়ার মাকড়ি’ উপন্যাসটি জাদু বাস্তবতার এক অনবদ্য পরিবেশন। এক ভিন্ন আঙ্গিকে লেখা তীব্র রাজনৈতিক শ্লেষ, ব্যাঙ্গোক্তি, যা লাতিন আমেরিকার ম্যাজিক রিয়েলিজম নয়, এই লেখা পাঠককে তৃপ্তি দেবে। মলয় রায়চৌধুরী বাংলা সাহিত্যের একজন দ্রোহী পুরুষ। ছয়-এর দশকে বাংলা সাহিত্যকে উচ্চকোটির লেখকদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে মাটিতে নামিয়ে দিয়েছিলেন। চট্টোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায়, বসু, গুহ, মিত্রদের হাত ছেড়ে কবিতা, গল্প, উপন্যাস দাস, মণ্ডল, ধাড়াদের মতো যাদেরকে সাহিত্যের আঙিনায় ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল তাদের হাতে উঠে এসেছিল। আর, এই অসাধ্য সাধন ঘটিয়েছিলেন মলয় রায়চৌধুরী হাংরি সাহিত্য আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে।