Category: হেমেন্দ্রকুমার রায়

  • ঐতিহাসিক সমগ্র

    ঐতিহাসিক সমগ্র

    ঐতিহাসিক সমগ্র

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    সংকলন – শোভন রায়

    প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ২০১৪

    প্রচ্ছদ – মানস চক্রবর্তী

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    বাংলাভাষায় ছোটদের সাহিত্যে যে কয়েকজন হাতে-গোনা লেখক সবস্বাদের লেখায় সববয়েসি ছোটদের মন জয় করেছেন হেমেন্দ্রকুমার তাঁদের শীর্ষে বললেও অত্যুক্তি হয় না।

    সে গোয়েন্দা-অ্যাডভেঞ্চার গল্প-কাহিনি…বিমল-কুমার-সুন্দরবাবুকে নিয়ে হোক, কি অনুবাদ সাহিত্য হোক, কী ইতিহাসের পাতা থেকে মণিমুক্তো তুলে আনাই হোক, হেমেন্দ্রকুমার রায় সব কলমেই সব্যসাচী।

    হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন পত্রপত্রিকার পৃষ্ঠা থেকে, দীর্ঘদিন অমুদ্রিত বই থেকে খুঁটে-খুঁটে নিরলসভাবে এই গবেষণামূলক কাজটি সম্পন্ন করেছেন আদ্যন্ত হেমেন্দ্রকুমার-ভক্ত শোভন রায়।

    এই বৃহৎ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৮টি উপন্যাস, ১৪টি বড় ও ছোট গল্প, ১৮টি অসামান্য রচনা।

    শোভন রায়কে আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

    ১৫ নভেম্বর ২০১৩
    ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়
  • ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতে

    ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতে

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    আঁধার আঁধার! অসীম আঁধার!

    আঁখি হয়ে যায় অন্ধ!

    জাগো শিশু-রবি, আনো আলো-সোনা

    আনো প্রভাতের ছন্দ!

    হ্যাঁ, ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতের কথা বলব। প্রাগৈতিহাসিক কালে আর্যাবর্তে বিচরণ করতেন রঘু, কুরু, পাণ্ডব, যদু ও ইক্ষ্বাকু প্রভৃতি বংশের মহা মহা বীররা। তাঁদের কেউ কেউ অবতার রূপে আজও পূজিত হন। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকদের জগতে ভারতে প্রথম প্রভাত এনেছিলেন উত্তর-পশ্চিম ভারতবিজয়ী আলেকজান্ডার এবং গ্রিকবিজয়ী সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত।

    রাম-রাবণ ও কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধকাহিনির মধ্যে অল্পবিস্তর ঐতিহাসিক সত্য থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু সে সম্বন্ধে তর্ক না তুলে আপাতত এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, পুরাণ-বিখ্যাত সেই সব যুদ্ধের পরেও ভারতে এসেছিল দীর্ঘকালব্যাপী এক তমিস্রযুগ। তারই মধ্যে কেবল সত্যের সন্ধান দেয় নিষ্কম্প দীপশিখার মতো বুদ্ধদেবের বিস্ময়কর অপূর্ব মূর্তি। আজ ইতিহাস বলতে আমরা যা বুঝি, তখনও তার অস্তিত্ব ছিল না বটে, কিন্তু কি এদেশি, কি বিদেশি কোনও ঐতিহাসিকেরই এমন সাহস হয়নি যে বুদ্ধদেবকে অস্বীকার করে উড়িয়ে দেন। সেই খ্রিস্টপূর্ব যুগে মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের আবির্ভাব না হওয়া পর্যন্ত ভারতের ইতিহাস বলতে বুঝি, বুদ্ধদেবের জীবনচরিত।

    বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ এবং শিলালিপি প্রভৃতির দৌলতে বুদ্ধদেবের আবির্ভাবের পরবর্তী যুগের ভারতের কতকগুলি প্রামাণিক ছবি আমরা পেয়েছি। যদিও সে যুগের বৌদ্ধ চিত্রশালা সম্পূর্ণ নয়, তবু আলো-আঁধারের ভিতর থেকে ভারতের যে মূর্তিখানি আমরা দেখতে পাই, বিচিত্র তা—মোহনীয়!

    তারপরই সেই ছায়ামায়াময় প্রাচীন আর্যাবর্তে সমুজ্জ্বল মশাল হাতে নিয়ে প্রবেশ করলেন দিগবিজয়ী আলেকজান্ডার। যে শ্রেণির কাহিনিকে আজ আমরা ইতিহাস বলে গ্রাহ্য করি, তার জন্ম হয়েছিল সর্বপ্রথমে সেকালকার গ্রিক দেশেই। কাজেই আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান স্থানলাভ করল গ্রিক ইতিহাসেও এবং আলেকজান্ডারের পরেও প্রাচীন ভারতের সঙ্গে গ্রিসের আদান-প্রদানের সম্পর্ক বিলুপ্ত হয়নি। তাই সে যুগের ভারতবর্ষের অনেক কথাই আমরা জানতে পেরেছি গ্রিক লেখকদের প্রসাদে। সেলিউকস প্রেরিত গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস লিপিবদ্ধ করে না রাখলে আমরা মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের যুগে মগধ সাম্রাজ্য তথা ভারতবর্ষের রাজপ্রাসাদ, রাজসভা, রাজধানী, সমাজনীতি, শাসননীতি, আচার-ব্যবহার প্রভৃতির অনেক কথাই জানতে পারতুম না। এজন্যে গ্রিসের কাছে ভারতবর্ষ হয়ে থাকবে চিরকৃতজ্ঞ।

    প্রাকৃতিক জগতে যেমন কখনও মেঘ কখনও রোদের খেলা, কখনও আলো কখনও ছায়ার মেলা, প্রত্যেক দেশের সভ্যতার ইতিহাসেও তেমনই পরিবর্তনের লীলা দেখা যায়। মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত মগধের বা ভারতের সিংহাসনে আরোহণ করেন খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ কি আরও দুই-এক বছর আগে। তার কিছু কম দেড় শতাব্দী পরে মৌর্য সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়। তারপর ভারতবর্ষের ইতিহাসে দেখি সুঙ্গ, কান্ব ও অন্ধ্র প্রভৃতি বংশের কমবেশি প্রভুত্ব। ইতিমধ্যে গ্রিকরাও বারকয়েক ভারতের মাটিতে আসন পাতবার চেষ্টা করেছিল বটে, কিন্তু বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারেনি।

    কেবল গ্রিকরা নয়, মধ্য এশিয়ার ভবঘুরে মোগলজাতি তখন থেকেই ভারতবর্ষে হানা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। মোগল বলতে তখন মুসলমান বোঝাত না (নিজ মঙ্গোলিয়ায় আজও বৌদ্ধধর্মাবলম্বী মোগলরা আছে) এবং মোগল বলতে আসলে কী বোঝায় সে সম্বন্ধেও সকলের খুব পরিষ্কার ধারণা নেই। যুগে যুগে নানা জাতি মোগলদের নানা নামে ডেকেছে। এদের বাহন ছিল ঘোড়া, খাদ্য ছিল মাংস, পানীয় ছিল দুগ্ধ। গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোদোতাস এদের ডেকেছেন ‘সিথিয়ান’ বলে, পরবর্তী যুগের রোমানরা এদের ‘হুন’ নামে ডাকতেন, প্রাচীন ভারতে এদের নাম ছিল ‘শক’, এবং চিনারা এদের নাম দিয়েছিল Hiungnu। আসলে মোগল, শক, হুন, তাতার ও তুর্কিরা একরকম এক জাতেরই লোক, কারণ তাদের সকলেরই উৎপত্তি মধ্য এশিয়ায় বা মঙ্গোলিয়ায়। এই আশ্চর্য জাতি ধরতে গেলে এক সময়ে প্রাচীন পৃথিবীর অধিকাংশ সভ্য দেশকেই দখল করেছিল এবং ভারতবর্ষ তাদের অধিকারে এসেছিল দুইবার। প্রথমবারে তাদের বংশ কুষাণ বংশ বলে পরিচিত হয়। বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বিখ্যাত সম্রাট কনিষ্ক এই বংশেরই ছেলে। দ্বিতীয়বারে তারা মোগল রাজত্বের প্রতিষ্ঠা করে।

    মোগল বা শকরা ভারতে এসে ভারতীয় সভ্যতার প্রভাবে নিজেদের সমস্ত বিশেষত্ব—এমনকী ধর্ম পর্যন্ত হারিয়ে একেবারে এদেশের মানুষ হয়ে পড়েছিল। কনিষ্ক ছিলেন বৌদ্ধ, তবু তাঁর নামে বিদেশি গন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু কুষাণ বংশের শেষ সম্রাট বাসুদেবের নামই কেবল ভারতীয় নয়, ধর্মেও তিনি ছিলেন শৈব মতাবলম্বী হিন্দু। কারণ তাঁর নামাঙ্কিত প্রায় প্রত্যেক মুদ্রায় দেখা যায় শিব এবং শিবের ষাঁড়ের প্রতিমূর্তি।

    আনুমানিক ২২০ খ্রিস্টাব্দে বাসুদেবের মৃত্যু হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে হয় কুষাণ সাম্রাজ্যের পতন। যদিও তারপরেও কিছুকাল পর্যন্ত ভারতের এখানে-ওখানে কুষাণদের খণ্ড খণ্ড রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু কুষাণদের কেউ আর সম্রাট নামে পরিচিত হতে পারেননি।

    মোগল বা শকদের রাজত্বের সময়েই ভারতবর্ষের ইতিহাসের উপরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে গোধূলির ম্লান আলো। প্রাচীনতর হলেও মৌর্য যুগের ভারতবর্ষ যেন স্পষ্ট রূপে ও রেখায় আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। শক ভারতবর্ষে তেমনভাবে নজর চলে না—সেটা ছিল যেন আলো-মাখানো ছায়ার যুগ, তার খানিকটা স্পষ্ট আর খানিকটা অস্পষ্ট।

    কিন্তু কুষাণ সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতে এল সত্যিকার তমিস্রযুগ। যেন এক অমাবস্যার মহানিশা এসে সমগ্র আর্যাবর্তকে তার বিপুল আঁধার আঁচলে ঢেকে দিলে। অবশ্য, এ সময়কার হিন্দুস্থানে কোনও সাম্রাজ্য ও সম্রাট না থাকলেও ছোট ছোট রাজ্যের খুদে খুদে রাজার যে অভাব ছিল না, এ বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। নানা পুরাণে এ সময়কার যেসব বর্ণনা পাওয়া যায়, তাও ভাসা ভাসা, রহস্যময়। ওই খুদে রাজাদের কারুর ভিতরে এমন শক্তি ও প্রতিভা ছিল না যে সমগ্র ভারতের উপরে বিপুল একচ্ছত্র তুলে ধরেন। এক-এক দেশের সিংহাসন পেয়ে এবং বড়জোর প্রতিবেশি ছোট ছোট রাজাদের সঙ্গে যুদ্ধ বা ঝগড়া করেই তাঁরা তুষ্ট ছিলেন। এই গভীর অন্ধকার জগতে মাঝে মাঝে যেন, বিদ্যুৎ-চমকের মধ্যে দেখা যায় আভিরাস, যবন, শক, বল্হীক ও গর্দব্বিলাস প্রভৃতি অদ্ভুত বা বিদেশি বংশকে!

    বৃহৎ ভারতের আত্মা যখন ঘুমিয়ে পড়েছিল। অনুমানে বোঝা যায়, তখন ক্রমেই বৌদ্ধধর্মের অধঃপতন হচ্ছিল এবং হিন্দুধর্মের হচ্ছিল ক্রমোন্নতি। কিন্তু তখনকার দেশাচার, কলা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির কথা, রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক ইতিহাস জানবার কোনও উপায়ই এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। চন্দ্রগুপ্তের রাজধানী পাটলিপুত্র মৌর্য বংশ লোপ পাওয়ার পরেও এবং সেই অন্ধকার যুগেও যে একটি প্রসিদ্ধ নগর বলে গণ্য হত, এ কথা জানা যায়। কিন্তু পাটলিপুত্রের রাজার নাম পাওয়া যায় না। পাঞ্জাবে ও কাবুলে ছিলেন শকবংশীয় কোনও কোনও রাজা। এ কথাও জানা গিয়েছে যে, কাবুলের ভারতীয় শক রাজারা ছিলেন বিলক্ষণ ক্ষমতাবান (৩৬০ খ্রিস্টাব্দেও কাবুলের শক রাজার দ্বারা প্রেরিত ভারতীয় যুদ্ধহস্তী ও সৈন্যের সাহায্যে পারস্যের অধিপতি দ্বিতীয় সাপর প্রাচ্য রোম-সৈন্যদের পরাজিত করেন)।

    প্রায় এক শতাব্দী এই অন্ধকার রহস্যের মধ্য দিয়ে অতীত হয়ে যায়। এই হারানো ভারতকে আর অতীতের গর্ভ থেকে উদ্ধার করা যাবে না, বহুযুগের ওপার থেকে ভেসে আসে কেবল অন্ধকারের আর্তনাদ!

    ইউরোপের অবস্থাও তখন ভালো নয়। গ্রিস তখন গৌরবহীন এবং পশ্চিম রোম সাম্রাজ্য হয়েছে বর্বর, অন্ধকার যুগের মধ্যে প্রবেশ করতে উদ্যত। চতুর্থ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কনস্তানতাইন দি গ্রেটের মৃত্যুর পর ইউরোপীয় রোম-সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল নামে মাত্র।

    কিন্তু ইউরোপীয় সভ্যতা যখন মৃত্যুন্মুখ,  মহাভারতে জাগল তখন নবজীবনের কলধ্বনি।

    প্রায় শতাব্দীকাল পরে ঐতিহাসিক ভারতে এল আবার দ্বিতীয় প্রভাত! আমরা আজ সেই নবপ্রভাতের জয়গান গাইবার জন্যেই আয়োজন করছি।

    দীর্ঘরাত্রি শেষে প্রাতঃসন্ধ্যা এসে অন্ধকারের যবনিকা যখন সরিয়ে দিলে, তখন দেখলুম পাটলিপুত্রের সিংহাসনে বিরাজ করছেন যে রাজা, ইতিহাসে তিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত নামে বিখ্যাত (আনুমানিক ৩১৮ খ্রিস্টাব্দে) তাঁর বাপের নাম ঘটোৎকচ এবং ঠাকুরদাদা ছিলেন শুধু গুপ্ত নামেই পরিচিত।

    গুপ্তবংশের উৎপত্তি নিয়ে গোলমাল আছে। কেউ বলেন, তাঁরা ছিলেন নীচ জাতের লোক। কেউ বলেন, তাঁরা ছিলেন অহিন্দু।

    লিচ্ছবি জাতি বুদ্ধদেবের সময়েই বিখ্যাত হয়েছিল। বৌদ্ধগ্রন্থে প্রসিদ্ধ বৈশালী নগরে ছিল লিচ্ছবিদের রাজ্য। লিচ্ছবিরা আর্য না হলেও সম্ভ্রান্ত ছিল অত্যন্ত এবং তাদের শক্তিও ছিল যথেষ্ট।

    এই বংশের রাজকন্যা কুমারদেবীকে বিয়ে করে প্রথম চন্দ্রগুপ্তের মানমর্যাদা এত বেড়ে গেল যে, তুচ্ছ ‘রাজা’ উপাধি আর তাঁর ভালো লাগল না। তিনি গ্রহণ করলেন ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি এবং স্বাধীন নরপতির মতো নিজের ও রানি কুমারদেবীর নামাঙ্কিত মুদ্রারও প্রচলন করলেন।

    সঙ্গে সঙ্গে চলল রাজ্য বাড়াবার চেষ্টা। এ চেষ্টাও বিফল হল না। দেখতে দেখতে মাত্র কয়েক বৎসরের মধ্যেই তিরহুত ও অযোধ্যা প্রভৃতি দেশ হস্তগত করে প্রথম চন্দ্রগুপ্ত প্রমাণ করলেন যে সত্যসত্যই তিনি মহারাজাধিরাজ উপাধি লাভের যোগ্য। ওদিকে তাঁর রাজ্যসীমা গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমস্থল (আজ যেখানে এলাহাবাদের অবস্থান) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রাজ্যাভিষেকের পরে নিজের নামে তিনি এক নতুন অব্দও চালালেন—তা গুপ্তাব্দ বলে পরিচিত।

    প্রথম চন্দ্রগুপ্ত বেশিদিন রাজ্যসুখ ভোগ করতে পারেননি। কিন্তু ছোট্ট একটি খণ্ড রাজ্যের মালিক হয়েও তিনি যখন মাত্র দশ-পনেরো বছরের ভিতরেই নিজের রাজ্যকে প্রায় সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন, তখন তাঁর যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, অসাধারণ বীরত্ব ও যথেষ্ট যুদ্ধকৌশলের অভাব ছিল না, এ সত্য বোঝা যায় সহজেই। ম্যাসিদনের অধিপতি ফিলিপ তাঁর সমধিক বিখ্যাত পুত্র আলেকজান্ডারের জন্যে এমন দৃঢ় ভিত্তির উপরে সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছিলেন যে বিশেষজ্ঞদের মতে ফিলিপের মতো রাজনীতিজ্ঞ ও যুদ্ধকৌশলী পিতা না পেলে আলেকজান্ডার বিশ্বজয়ী হতে পারতেন কিনা সন্দেহ! গুপ্তবংশীয় চন্দ্রগুপ্তও আর এক অতি বিখ্যাত পুত্রের পিতা। অতি অল্পদিনে খণ্ড-বিখণ্ড ভারতবর্ষে তিনি এমন এক অখণ্ড ও বিপুল রাজ্য স্থাপন করে গেলেন যে অদূর ভবিষ্যতেই আকারে ও বলবিক্রমে তা প্রায় সুপ্রসিদ্ধ মৌর্য সাম্রাজ্যের সমান হয়ে উঠেছিল এবং তার স্থায়িত্ব হয়েছিল কিছু কম দুইশত বৎসর! ব্যাপকভাবে ধরলে বলতে হয়, ভারতবর্ষের উপরে গুপ্তযুগের অস্তিত্ব ছিল তিনশত পঞ্চাশ বৎসর!

    বলেছি, গুপ্তবংশীয় প্রথম চন্দ্রগুপ্তের আবির্ভাব নিশান্তকালে প্রাতঃসন্ধ্যায়। কিন্তু ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতের গৌরবময় অপূর্ব সূর্যোদয় তখনও হয়নি। প্রথম চন্দ্রগুপ্ত তরুণ সূর্যের জন্যে অরুণ আসর সাজিয়ে রাখলেন। তারপরই হল গৌরবময় সূর্যোদয়। আর্যাবর্ত তারপরে আর কখনও দেখেনি তেমন আশ্চর্য সূর্যকে। তারই বিচিত্র কিরণে সৃষ্ট হয়েছিল ভারতের যেসব নিজস্বতা বা বিশেষত্ব, আজও বিশ্বসভায় তাই নিয়ে আমরা গর্ব করে থাকি। ভারতের অমর কালিদাস গুপ্তযুগেরই মানুষ। কেবল কি কালিদাসের কাব্য? ‘মৃচ্ছকটিক’, ‘মুদ্রারাক্ষস’ প্রভৃতি অতুলনীয় সাহিত্যরত্নের সৃষ্টি গুপ্তযুগেই। প্রাচীনতম পুরাণ ‘বায়ুপুরাণ’ এবং ‘মনুসংহিতা’ও তাই। গণিতজ্ঞ ও জ্যোতিষজ্ঞ হিসাবে গুপ্তযুগের বরাহমিহির ও আর্যভট্টের নাম বিশ্ববিখ্যাত। স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় গুপ্তযুগের প্রতিভাকে প্রমাণিত করবার জন্য আজও বিদ্যমান আছে অজন্তা, ইলোরা, সাঁচী, সারনাথ, ভরহুত, অমরাবতী ও শিগিরি প্রভৃতি। দিল্লির বিস্ময়কর লৌহস্তম্ভের জন্ম গুপ্তযুগেই। সংগীতকলাও হয়ে উঠেছিল সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ। কত আর নাম করব?

    এতক্ষণ গেল ইতিহাসের কথা। পরের পরিচ্ছেদেই আমাদের গল্প শুরু হবে এবং দেখা দেবেন আমাদের কাহিনির নায়ক।

  • পঞ্চনদের তীরে

    পঞ্চনদের তীরে

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    গ্রন্থকথা

    ‘পঞ্চনদের তীরে’ হেমেন্দ্রকুমার রায় রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাস। প্রকাশক মহাদেব সরকার, সমবায় পাবলিশার্স, ৩৩-২, শশিভূষণ দে ষ্ট্রীট, কলিকাতা। প্রাপ্তিস্থান ছিল বুক ফোরাম, ৭২, হ্যারিসন রোড, কলিকাতা। গ্রন্থটির দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৫২ বঙ্গাব্দে, মূল্য এক টাকা আট আনা। প্রকাশক কর্তৃক গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষিত ছিল। মুদ্রাকরণ যামিনী মোহন ঘোষ, পপুলার প্রিণ্টিং ওয়ার্কস, ৪৭, মধু রায় লেন, কলিকাতা।

    উৎসর্গ

    শ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুক্ত রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়

    শ্রীচরণেষু—

    মুখপাত

    প্রাচীন ঐতিহাসিক ভারতের সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ স্বদেশভক্ত বীর ও সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত সম্বন্ধে ভারতীয় জনসাধারণের পরিষ্কার ধারণা নেই। ভারতব্যাপী দেশাত্মবোধের এই নব-জাগরণের যুগেও দেশীয় বিদ্যামন্দিরের পাঠ্য ইতিহাসে এখনকার ছেলেমেয়েদের এ-সম্বন্ধে সচেতন করবার চেষ্টা দেখা যায় না। আমাদের সত্যিকার জাতীয় জীবনের এই অসাড়তা লক্ষ করলে হতাশ হতে হয়।

    ‘পঞ্চনদের তীরে’ উপন্যাস বটে, কিন্তু এর আখ্যানবস্তু কোথাও ঐতিহাসিক ভিত্তি ছেড়ে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেনি। যে-সময়ের কথা আমি বলতে বসেছি, সে-সময়কার ঐতিহাসিক সূত্র এখনও নানা স্থানে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে, সেই কারণে স্থলবিশেষে উপন্যাসের মর্যাদা ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করবার জন্যে কিছু কিছু কল্পনার আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি, কিন্তু সে-কল্পনাও কোথাও ঐতিহাসিক সত্যকে বাধা দেয়নি।

    ধরুন, শশীগুপ্তের কথা। ওই দেশদ্রোহীর শেষ জীবন অতীতের অন্ধকারের মধ্যে চিরদিনের জন্যে লুপ্ত হয়ে গেছে, ইতিহাসও তার সম্বন্ধে নীরব। কিন্তু তার একটা পরিণাম না দেখালে উপন্যাস হয় অসম্পূর্ণ। অতএব ওখানে কল্পনা ব্যবহার করা ছাড়া উপায়ান্তর নেই এবং গোঁড়া ঐতিহাসিকরাও সে-জন্যে আপত্তি প্রকাশ করবেন বলে মনে হয় না। তারপর ধরুন, সুবন্ধু প্রভৃতি সম্পর্কীয় ঘটনাবলি। প্রাচীন ইতিহাসকে ভালো করে গল্পের ভিতর দিয়ে দেখাবার জন্যেই ওদের অবতারণা করা হয়েছে। সুবন্ধু প্রভৃতি ভাগ্যান্বেষী সৈনিক বটে, কিন্তু সেখানকার ভারতে ওদের মতন লোকের ভিতরেও যে অতুলনীয় বীরত্ব ও স্বদেশভক্তির অভাব ছিল না, Massaga নামক স্থানে আলেকজান্ডারের দ্বারা সাতহাজার ভারতীয় ভৃতক-সৈন্যের (mercenaries) হত্যাকাণ্ডেই তার জ্বলন্ত প্রমাণ পাওয়া যায়। তারা প্রত্যেকে সপরিবারে প্রাণ দিলে, তবু বিদেশি শত্রুর অধীনে চাকরি স্বীকার করলে না! অতএব কাল্পনিক হলেও সুবন্ধু প্রভৃতিকে আমরা ঐতিহাসিক ভারতীয় চরিত্র বলে গ্রহণ করতে পারি অনায়াসেই।

    পঞ্চনদের তীরে উপন্যাসে স্বাধীন ভারতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেখানোই হচ্ছে আমার মুখ্য উদ্দেশ্য। সেই কারণে, সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের পরবর্তী জীবন দেখাবার প্রয়োজন বোধ করিনি, প্রসঙ্গক্রমে সর্বশেষে দু-চারটি ইঙ্গিত দিয়েছি মাত্র।

    এই বইখানি কেবল যারা বয়সে বালক তাদের জন্যেই লেখা হল না। পরীক্ষা করে দেখেছি, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস সম্বন্ধে এদেশের বয়স্ক পাঠকরাও বালকদের চেয়ে কম অজ্ঞ নন। বইখানি লেখবার সময়ে তাঁদের কথাও বার বার মনে হয়েছে। ইতি—

    ২৩০/১, অপার চিৎপুর রোড,
    বাগবাজার, কলিকাতা।
    শ্রীহেমেন্দ্রকুমার রায়
  • মহাভারতের শেষ মহাবীর

    মহাভারতের শেষ মহাবীর

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    ‘মহাভারতের শেষ মহাবীর’ হেমেন্দ্রকুমার রায় রচিত ঐতিহাসিক কাহিনী; এটি এশিয়া পাবলিশিং কোম্পানি প্রকাশিত হেমেন্দ্রকুমার রচনাবলীর ষষ্ঠ খণ্ডের প্রথম উপন্যাস, এবং শোভন রায় সংকলিত ‘ঐতিহাসিক সমগ্রে’র তৃতীয় উপন্যাস।

    কিন্তু কে এই মহাভারতের শেষ মহাবীর?

    মহাকাব্য মহাভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কুরুক্ষেত্র। এ নাম শুনলে আজও প্রত্যেক হিন্দুর ধমনিতে চঞ্চল হয়ে ওঠে রক্তস্রোত। এ কেবল কুরু-পাণ্ডবের আত্মঘাতী যুদ্ধক্ষেত্র নয়, এখানেই প্রথমে পার্থসারথিরূপে ভগবানের অবতার শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র মুখে আত্মপ্রকাশ করেছিল গীতার মহাবাণী। এখানে একদিকে যেমন ভীমার্জুন, কর্ণ, ভীষ্ম ও দ্রোণ প্রভৃতি মহা মহা যোদ্ধারা অপূর্ব বীরত্ব দেখিয়ে অর্জন করেছিলেন অমরত্ব, আর একদিকে তেমনি নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিল আর্য-ভারতের সমস্ত ক্ষাত্র-বীর্য। এই শতস্মৃতি-বিজড়িত ভূমির উপরে গিয়ে দাঁড়ালে আজও হৃদয়ের মধ্যে অনুভব করা যায় শত মৃত পুত্রের শোকে কাতর গান্ধার-কন্যা গান্ধারীর করুণ ক্রন্দন, নিষ্ঠুর সপ্তরথীর দ্বারা আক্রান্ত বালক অভিমন্যুর নিষ্ফল সিংহনাদ, দুঃশাসনের রক্তপান করে তৃতীয় পাণ্ডবের উন্মত্ত তাণ্ডব, রক্তবন্যায় ভাসতে ভাসতে অষ্টাদশ অক্ষৌহিণীর ঊনচল্লিশ লক্ষ ছত্রিশ হাজার ছয় শত সৈন্যের চরম মৃত্যুযন্ত্রণা! এই বিরাট নরমেধযজ্ঞের ফল কী? পাণ্ডবদের মৃত্যুর পরে আর্যাবর্তে এমন কোনও ক্ষত্রিয় রইল না, বিদেশি যবনদের বাধা দেবার জন্যে সবল হস্তে যে অস্ত্রধারণ করতে পারে। তাই তারই কিছুকাল পরে উত্তর ভারতের নাট্যশালার মধ্যে প্রবেশ করতে দেখি ইরানি এবং গ্রিক দিগ্‌বিজয়ীদের। ষষ্ঠ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কুরুক্ষেত্র বা স্থানেশ্বরের সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন প্রভাকরবর্ধন। তখন গুপ্তসাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল বটে, কিন্তু গুপ্তবংশীয় ক্ষুদ্রতর রাজারা তখনও ভারতবর্ষের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত বলে গণ্য হতেন। প্রভাকরবর্ধনের রানি ছিলেন যশোমতী। তিনি গুপ্তবংশজাতা এবং সেইজন্যে তার স্বামী নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করতেন। তাদের দুই পুত্র। জ্যেষ্ঠ রাজ্যবর্ধন এবং কনিষ্ঠ হর্ষবর্ধন। রাজশ্রী নামে তাদের এক কন্যার নাম ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে। তিনি ছিলেন কান্যকুজের অধিপতি গ্রহবর্মার সহধর্মিণী।

    কিন্তু এই বইটিতে যে মহাবীরের কাহিনি বলা হয়ছে, তিনি কে? তিনি কি পৌরাণিক ইতিহাস-পূর্ব যুগের মানুষ? হ্যাঁ। কেবল প্রাচীন ইতিহাসে, ভ্ৰমণ-কাহিনিতে, কাব্যে ও নাট্য-সাহিত্যেই তাঁর নাম অমর হয়ে নেই, তাকে সত্যিকার রক্ত-মাংসের মহাবীর বলে স্বীকার করেছেন আধুনিক ঐতিহাসিকরাও। সপ্তম শতাব্দীর আর্যাবর্ত গৌরবোজ্জ্বল হয়ে আছে একমাত্র তারই নামের মহিমায়। তিনি হচ্ছেন ভারতের শেষ হিন্দু-সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। মহারাজাধিরাজ শ্রীহর্ষ। ইতিহাস তাকে হর্ষবর্ধন বলে জানে।

  • ভগবানের চাবুক

    ভগবানের চাবুক

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    প্রথম : গোড়াপত্তন

    আফগানিস্তানের উত্তরে তুর্কিস্থান। সেইখানে আছে সমরখন্দ নগর। এই সমরখন্দ কেবল প্রাচীন গৌরবের জন্যে নয়—আর এক কারণেও হতে পারে চিরস্মরণীয়।

    পৃথিবীতে তিনজন দিগবিজয়ীর তুলনা নেই। খ্রিস্ট-পূর্বাব্দের আলেকজান্ডার দি গ্রেট, ত্রয়োদশ শতাব্দীর চেঙ্গিজ খাঁ ও চতুর্দশ শতাব্দীর তৈমুর লং।

    জুলিয়াস সিজার, হানিবল ও নেপোলিয়ন প্রভৃতিও প্রথম শ্রেণির দিগবিজয়ী বটে, কিন্তু পূর্বোক্ত তিন বীরের কীর্তিকলাপ তাদের চেয়ে ঢের বেশি অসাধারণ ও বিস্ময়কর।

    আলেকজান্ডার, চেঙ্গিজ ও তৈমুর—এই তিনজনের সঙ্গেই সমরখন্দ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছিল এবং ওই তিন দিগবিজয়ীই সমরখন্দ থেকে যাত্রা করেছিলেন ভারতবর্ষের দিকে। বেশ বোঝা যায়, সেকালে সোনার ভারতে পদার্পণ করতে না পারলে কেহই নিজের দিগবিজয়-কাব্য সম্পূর্ণ হল বলে মনে করতেন না।

    আর কেবল সেকালেই বা বলি কেন সর্বকালেই ভারত দিগবিজয়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে নেপোলিয়নও আসতে চেয়েছিলেন ভারতবর্ষের দিকে। এ যুগের হিটলারও তাই চেয়েছিলেন, জাপানিদেরও প্রাণের সাধ তাই ছিল। দিগবিজয়ীদের ভারত লুণ্ঠনের পথ সর্বাগ্রে খুলে দিয়েছিলেন বোধ হয় পারস্য সম্রাট প্রথম দরায়াস।

    কিছু কম ছয় শত বৎসর আগে এক মহাবীর বসেছিলেন সমরখন্দের সিংহাসনে; কিন্তু কেবল সেই ক্ষুদ্র সিংহাসনে তাঁর স্থান সংকুলান হল না, তিনি চাইলেন পৃথিবীর রাজতন্ত্র। পৃথিবীপতি হওয়ার জন্যে তিনি বার বার রণক্ষেত্রে ছুটে গেলেন এবং প্রত্যেকবারই ফিরে এলেন রক্তাক্ত বিজয়ী রূপে! তাঁর সাম্রাজ্যের দুই সীমানা হল ইউরোপের মস্কো এবং ভারতের দিল্লি!

    স্পেন, ইংল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের রাজারা তাঁর মন রাখবার ও তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে নিরাপদ হওয়ার জন্যে দূত ও নানা উপঢৌকন পাঠাতে লাগলেন। তিনি সেসব রাজাকে নগণ্য মনে করে খাপ থেকে তরোয়াল খুললেন না, তাঁদের আশ্বাস দিয়ে বললেন, ‘ভয় নেই, সমুদ্রে খালি বড় মাছই থাকে না, ছোট মাছরাও থাকে।’

    মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি স্তিমিত দৃষ্টি তুলে দেখলেন, পৃথিবীতে তখনও তাঁর যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী আছে মাত্র একজন—মহাচিনের অধিপতি! এটা তাঁর সহ্য হল না—ঊনসত্তর বৎসর বয়সে তরবারি হাতে নিয়ে ধরলেন তিনি চিনের পথ। কিন্তু চিনের ছিল বরাত জোর—’ভগবানের চাবুক’ ফিরিয়ে নিলেন ভগবান স্বয়ং!

    এই বিচিত্র দিগবিজয়ীকে ইতিহাস তৈমুর লং বলে জানে। এঁরই বংশধর বাবর ভারতে এসে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন মোগল রাজবংশ।

    তৈমুরের বংশধরদের মোগল বলা হয় বটে, কিন্তু এখানে একটু গোলমাল আছে। উত্তর এশিয়া থেকে যুগে যুগে যাযাবর জাতীয় যেসব যোদ্ধা পঙ্গপালের মতন ভারতে, চিনদেশে, পারস্যে ও ইউরোপের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল, কোনও নির্দিষ্ট নামে তাদের পরিচিত করা সহজ নয়। গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস তাদের ডেকেছেন, ‘সিথিয়ান’ বলে, রোমানরা তাদের ‘হুন’ নামে ডেকেছে এবং চিনারা ডেকেছে ‘হিউয়াং-নু (Hiung-nu) নামে। চেঙ্গিজ খাঁ যখন ওই যাযাবরদের এনে এক পতাকার তলায় দাঁড় করান, তখন তাদের মধ্যে ছিল মাঞ্চু, তাতার, মোগল প্রভৃতি বহু জাতির লোক। পরে চেঙ্গিজের মোগল সাম্রাজ্যের মধ্যে গণ্য হয়ে ওই নানাজাতির লোককে এক ‘মোগল’ নামেই ডাকা হত। আসলে তৈমুরকে কেউ বলেন তাতার, কেউ বলেন তুর্কি।

    সমরখন্দ নগরের কাছে ওকগাছের অরণ্য। তারপর এক গিরিসঙ্কট—দুই দিকে তার ছয় শত ফুট উঁচু লাল বালি-পাথরের দেওয়াল। স্থানীয় লোকেরা ‘লৌহ-দ্বার’ বলে ডাকে এবং এর ভিতর দিয়ে দুটির বেশি উট পাশাপাশি যেতে পারে না। এখানে বর্শাদণ্ডের উপরে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পাহারা দেয় রৌদ্রদগ্ধ তামাটে বর্ণের দীর্ঘদেহ প্রহরীরা।

    এই পথ দিয়ে খানিকদূর অগ্রসর হলে একটি পাহাড়ে-ঘেরা তরু-শ্যামল ক্ষেত্রের উপরে এসে পড়া যায়। সেখানে আছে একটি নগর, নাম তার ‘সবুজ শহর’। তার চারিদিকে খাল কাটা। কাবুলি ডুমুর ও খুবানি গাছের সারির উপরে দেখা যায় সাদা সাদা গুম্বুজ বা মসজিদের বুরুজ।

    ১৩৩৫ (মতান্তরে ১৩৩৬) খ্রিস্টাব্দে এই সবুজ শহরে তৈমুরের জন্ম।

    যাত্রীর দল আসে আর চলে যায় সবুজ শহরের ভিতর দিয়ে—মুখে তাদের সর্বদাই যুদ্ধের গল্প। এই গল্প শুনতে শুনতে তৈমুর বেড়ে উঠতে লাগলেন। তৈমুর মাতৃহারা হন অল্প বয়সেই। তাঁর বাবা ছিলেন বার্লাস গোষ্ঠীর তাতার জাতীয় সর্দার, কিন্তু কোনও গ্রাম বা দুর্গ তাঁর দখলে ছিল না। তাঁর নাম তারাগাই। তিনি সংসারে উদাসীন ব্যক্তি, সর্বদাই তীর্থভ্রমণ ও ধর্মকর্ম নিয়ে ব্যস্ত। টাকাকড়ি তাঁর ছিলও না, টাকা রোজগারের চেষ্টাও তিনি করতেন না।

    তৈমুর বাজপাখি, কুকুর আর সমবয়সি সঙ্গীদের নিয়ে পথে পথে খেলা করে বেড়ান। পথ দিয়ে চলে যায় দলে দলে পারসি, আরবি, ইহুদি ও হিন্দু সওদাগর; কেউ ঘোড়ায় চড়ে, কেউ উটের পিঠে, কেউ পদব্রজে,—পণ্য তাদের কিংখাব, রেশম বা কার্পেট। তাদের দলে গিয়ে ভিড়ে তৈমুর বাইরের জগতের খবর শোনেন।

    তারাগাই বলেন, ‘বাছা তৈমুর, এই পৃথিবীটা হচ্ছে সাপ আর বিছা ভরা সোনার পাত্রের মতন। এর প্রতি আমার কোনও মায়া নেই।’

    এসব কথা তৈমুরের মনকে স্পর্শ করে না।

    তিনি ভালোবাসেন দাবা ও পোলো খেলতে এবং বনে বনে শিকার করতে। অল্পস্বল্প কোরান মুখস্থ করেছিলেন, কিন্তু লেখাপড়া খুব বেশি শেখেননি। তিনি জানতেন তাতারদের ধর্ম হচ্ছে যুদ্ধ করা, তাদের আভিজাত্য হচ্ছে তরবারির আভিজাত্য।

    সবুজ শহরের বার্লাস তাতাররা তখনও নিজেদের অতীতকে ভোলেনি। চেঙ্গিজ খাঁ তাদের চোখ ফুটিয়ে দিয়ে গেছেন। তাতাররা জানে একদিন তারা পৃথিবী জয় করেছিল।

    তাদের মধ্যে যাদের শহরের মধ্যে বাড়ি আছে, তারাও বাস করে তাঁবুর ভিতরে। আজও তারা যাযাবর ধর্ম ছাড়তে পারেনি; বলে, ‘কাপুরুষরাই দুর্গ তৈরি করে লুকোবার জন্য।’

    তাদের আজানুলম্বিত বাহু, মোটামোটা দেহের হাড়, দাড়ি-গোঁফ ভরা মুখ—তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করে, ঘোড়ার পিঠ ছেড়ে যাতে না মাটিতে নামতে হয়। যখন পায়ে হাঁটে, চলে নবাবি চালে এবং কারুকে দেখে ফিরে বা সরে দাঁড়ায় না।

    পদব্রজে তারা বাঘ শিকার করতে যায় এবং লড়ায়ে যায় হাসতে হাসতে। তাদের দলে এমন লোক খুব কম, যাদের দেহে নেই অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন। তাদের মধ্যে এমন লোকও খুব কম, ছাদের তলায় বিছানায় শুয়ে বরণ করে যারা মৃত্যুকে। ডোরা-কাটা রেশমি জামার তলায় পরে তারা ইস্পাতের বর্ম। যুদ্ধের সুযোগ না পেলে তারা সুখী হয় না। একদিকে তারা যেমন মুক্তহস্ত ও অতিথিপরায়ণ, অন্যদিকে তেমনি গোঁয়ার ও নিষ্ঠুর।

    বাবার মুখে তৈমুর শুনলেন, ‘বৎস, চেঙ্গিজ খাঁ যখন পৃথিবী জয় করলেন, তখন তাঁর ছেলে চাগাতাই পেলেন আমাদের এ অঞ্চলের শাসনভার। কিন্তু আজ চাগাতাইয়ের বংশধর বিলাসের স্রোতে হাবুডুবু খাচ্ছেন আর রাজ্যের সর্বেসর্বা হয়েছেন তাঁর আমির কাজগান।’

    আমির কাজগানের নাম সকলের মুখে মুখে। তাতাররা দলে দলে যায় কাজগানের ফৌজে ভর্তি হওয়ার জন্যে।

    তৈমুর এখন প্রথম যৌবনে পা দিয়েছেন। এই বয়সেই তাঁর দেহ হয়ে উঠেছে যেমন সুন্দর ও সুগঠিত তেমনই বৃহৎ ও বলিষ্ঠ। তীক্ষ্ণনেত্র, কঠিন চরিত্র। তিনি কথা কন কম, তাঁর কণ্ঠস্বর সুগম্ভীর ও মর্মভেদী। হাসি-ঠাট্টার ধারও মাড়ান না!

    কোনও বলবান তাতার যুবকও যে-ধনুকের ছিলা মাত্র বুক পর্যন্ত টানতে পারে, তৈমুর সেই ধনুকের ছিলা আকর্ষণ করেন কান পর্যন্ত। তরবারি ক্রীড়ায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার।

    পুত্রের ভাবভঙ্গি ব্যবহারে যোদ্ধার পূর্ণ লক্ষণ দেখে পিতা তারাগাই ছেলেকে পরামর্শ দিলেন, আমির কাজগানের সভায় যাওয়ার জন্যে। পিতার পরামর্শের মধ্যে ভাগ্যদেবীর আহ্বান শুনে তৈমুর রাজসভার দিকে যাত্রা করলেন!

    তাঁর জীবনের আসল অ্যাডভেঞ্চার আরম্ভ হল।

  • আলেকজান্ডার দি গ্রেট

    আলেকজান্ডার দি গ্রেট

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    প্রথম অধ্যায়

    গ্রিস ও ভারত

    আলেকজান্ডার হচ্ছেন পৃথিবীর প্রথম দিগবিজয়ী।

    তাঁর আগে আর কোনও বীর দিগবিজয়ে যাত্রা করেননি এমন কথা বলছি না। প্রাচীন মিশর, ব্যাবিলন, আসিরিয়া, ভারত ও পারস্য প্রভৃতি দেশের ইতিহাস পড়লে আরও কয়েকজন দিগবিজয়ীর নাম জানা যায়। কিন্তু তাঁদের দৃষ্টিশক্তি ও দিগবিজয়ের ক্ষেত্র ছিল সংকীর্ণ। তাঁদের আদর্শবাদও তেমন উচ্চ ছিল না। এবং তাঁদের দিগবিজয়ের ফলে সমগ্র পৃথিবীতে যুগান্তরও উপস্থিত হয়নি।

    তিন বা একাধিক মহাদেশের উপরে যাঁরা ধূমকেতুর মতন ছুটে গিয়েছেন এবং যাঁরা আজ পর্যন্ত মানুষের চিন্তার রাজ্যে প্রভাব বিস্তার করে আছেন—যেমন আলেকজান্ডার, হানিবল, সিজার, চেঙ্গিস খাঁ, তৈমুর লং ও নেপোলিয়ন—যথার্থ দিগবিজয়ী বলি তাঁদের। কারণ, এঁদের দিগবিজয়ের পিছনে ছিল এক-এক শ্রেণির আদর্শবাদ। এঁদের মধ্যেই সর্বপ্রথমে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন আলেকজান্ডার।

    ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা। আলেকজান্ডারের যুগে মানুষ এই তিনটির বেশি মহাদেশের নাম জানত না। এবং তিন মহাদেশেই এমন অনেক জায়গা ছিল, যা তখনও পৃথিবীর সভ্য দেশগুলির অন্তর্গত ছিল না। আজ ইংরেজ, জাপান, আমেরিকান, রোমান, জার্মান, ফরাসি ও স্পেনীয় প্রভৃতি কত জাতির কথাই শুনতে পাই। কিন্তু তখন তাদের নামকরণ পর্যন্ত হয়নি। তাদের দেশ ছিল ঘৃণ্য বর্বরদের দেশ। অনেক দেশ তখনও সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। তখনকার মানচিত্রে সেসব দেশের স্থান পর্যন্ত ছিল না।

    কিন্তু যেসব দেশ তখন সভ্যতার উচ্চতম শিখরে আরোহণ করেছিল, আলেকজান্ডারের কবল থেকে তারা কেউই মুক্তি পায়নি। এমনকী তখনকার দিনে গ্রিকদের পক্ষে অতি দুর্গম ও দূরদেশ ভারতবর্ষেও তিনি ছুটে গিয়েছিলেন। যদিও তখনকার দিনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভারতীয় রাজার (ধননন্দ) সঙ্গে তাঁর শক্তিপরীক্ষা হয়নি এবং ভীত সৈনিক ও সেনাপতিদের বিদ্রোহিতায় অধিকাংশ ভারতবর্ষকে নাগালের বাইরে রেখেই তাঁকে প্রত্যাগমন করতে হয়ছিল, তবু তিনি বিজয়পতাকা তুলে যেটুকু অগ্রসর হতে পেরেছিলেন, সে যুগের পক্ষে তাই-ই ছিল কল্পনাতীত, অসম্ভব ব্যাপার!

    আলেকজান্ডারের কাছে একটি কারণে আমরা চিরকৃতজ্ঞ থাকব। তাঁর ভারত অভিযানের ফলেই ভারতবর্ষের সত্যিকার ঐতিহাসিক যুগ আরম্ভ হয়েছে।

    আলেকজান্ডারের আগমনের অনেক আগেই ভারতবর্ষ যে সভ্যতার শীর্ষস্থানে উঠেছিল, সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ থাকতে পারে না। কিন্তু প্রাচীন ভারতবাসীরা এক বিষয়ে রীতিমতো পশ্চাৎপদ ছিলেন। লিখিত ইতিহাস বলতে আজ আমরা যা বুঝি, প্রাচীন ভারতবর্ষে কেউ তা রচনা করেনি। কাব্য, পুরাণ, নাটক বা অন্যান্য গ্রন্থে আমরা ভারতীয় ইতিহাসের অনেক মালমশলা পাই বটে, কিন্তু সেগুলি অত্যন্ত অগোছালো অবস্থায় এমন নানা বিষয়ের সঙ্গে মিশিয়ে আছে যে, তাদের ভিতর থেকে সত্যিকার মানুষকে আবিষ্কার করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের কবির কল্পনা ও অবাস্তব প্রলাপ বলে মেনে নিলে আর কোনও গোলমালই থাকে না; কিন্তু তাদের ঐতিহাসিক সত্য রূপে দেখাতে গেলেই আমাদের সহজ-বুদ্ধি বিদ্রোহী হয়ে দাঁড়ায়। রাম, রাবণ, কুম্ভকর্ণ, শ্রীকৃষ্ণ, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, ভীম ও অর্জুন প্রভৃতি নামধারী ঐতিহাসিক ব্যক্তি যে ছিলেন না, একথা কে জোর করে বলতে পারে? কিন্তু কবির আকাশচারী কল্পনা ও অবাস্তব অত্যুক্তি তাঁদের মনুষ্যত্বকে এমন ভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, ওঁদের আর সত্যিকার মানুষ বলে মনে হয় না এবং সকলেই জানেন, ইতিহাস হচ্ছে সত্যিকার মানুষদেরই কীর্তিকাহিনি।

    উপরন্তু প্রাচীন ভারতীয় লেখকরা ধরতে গেলে সাল-তারিখের কোনও ধারই ধারতেন না। সাল-তারিখ ভুললে ইতিহাস হয়ে দাঁড়ায় উপহাস। বেশিদিনের কথা নয়, স্বর্গীয় দুর্গাদাস লাহিড়ি বহু খণ্ডে বিভক্ত প্রকাণ্ড একখানি ‘পৃথিবীর ইতিহাস’ রচনা করেছিলেন। সেই গ্রন্থে প্রাচীন ভারতবর্ষের কথা বলতে গিয়ে তিনি গুপ্তবংশীয় চন্দ্রগুপ্তকে ধরে নিয়েছিলেন মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত বলে। অথচ ভারতের প্রথম সম্রাট, গ্রিকবিজয়ী মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত ও গুপ্তবংশীয় চন্দ্রগুপ্তের মধ্যে ছিল সুদীর্ঘ কয়েক শতাব্দীর ব্যবধান! এই দুই সম্রাটের মাঝখানে হয়েছে কত বংশের উত্থান ও পতন এবং ভারতবর্ষের উপরে পড়েছে একাধিকবার অন্ধ যুগের কালো যবনিকা।

    আজকাল ভারতের নানা প্রদেশে হাজার হাজার শিলা বা তাম্রলিপি ও প্রাচীন মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে বা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা তাদের পাঠ উদ্ধার করে এতকাল পরে ইতিহাসপূর্ব যুগের অনেক সাল-তারিখ ও গুপ্তরহস্য আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ওসব লিপি বা মুদ্রা প্রভৃতি ইতিহাস রচনার জন্যে প্রস্তুত হয়নি।

    আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের ফলেই ভারতবর্ষে আরম্ভ হয়েছে সত্যিকারের ঐতিহাসিক যুগ। আলেকজেন্ডারের আগেও গ্রিসের সঙ্গে যে ভারতবর্ষের সম্পর্ক একেবারেই ছিল না, তা নয়; তাঁরও অনেক আগে (খ্রিঃ পূঃ ৫১০ ) স্কাইল্যাক্স নামে এক গ্রিক ভ্রমণকারী ভারতে বেড়িয়ে গিয়েছিলেন। ভারতীয় সৈনিকরাও পারস্য সম্রাট দরায়ুসের পক্ষাবলম্বন করে গ্রিসে গিয়ে যুদ্ধ করে এসেছে। এমনিভাবে আরও কোনও কোনও দিক দিয়ে ভারতের সঙ্গে গ্রিসের অল্পস্বল্প পরিচয় সাধন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এটুকু পরিচয়ের দাম খুব বেশি ছিল না। গ্রিকরা তখনও ভারতকে নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাত না।

    কিন্তু আলেকজান্ডারের অভিযানের পরেই গ্রিকরা ভারতবর্ষকে সর্বপ্রথমে ভালো করে চিনতে পারলে। তার ফলে নানা গ্রিক-লেখক ও ভ্রমণকারী স্বচক্ষে ভারতবর্ষকে দেখে তখনকার কথা নিয়ে আলোচনা করে গিয়েছেন। এরপরে ভারতের দৃষ্টি হয়ে পড়ে সুদূর প্রসারিত। তারপর নানা যুগে নানা দেশি ভ্রমণকারী এসে ভারতের অনেক উজ্জ্বল ছবি এঁকে গিয়েছেন। এইসব ছবির ভিতর থেকেই প্রাচীন আর্যাবর্তের অখণ্ড না হোক—কতকটা সম্পূর্ণ ইতিহাস ও সাল-তারিখ উদ্ধার করা সম্ভবপর হয়েছে। মাঝে মাঝে ফাঁক থেকে গিয়েছে বটে, কিন্তু বহু স্থলেই ফাঁকগুলি পূর্ণ করতে পারা গিয়েছে প্রাচীন শিলালিপি ও মুদ্রা প্রভৃতির দ্বারা। আলেকজান্ডার এদেশে না এলে ভারতবর্ষের ইতিহাসকে এমন ভাবে পুনরুদ্ধার করতে পারা যেত না।

    আলেকজান্ডার ভারত ত্যাগ করবার পরেই সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত গ্রিকদের আর্যাবর্ত থেকে বিতাড়িত করলেন বটে, কিন্তু ভারতের সঙ্গে গ্রিসের সম্পর্ক বিলুপ্ত হয়নি। আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলিউকসের মেয়েকে চন্দ্রগুপ্ত নিজে বিবাহ করেন। তাঁর সভায় বর্তমান থাকেন গ্রিক-রাজদূত মেগাস্থিনিস। তাঁর দেহরক্ষীরূপে নিযুক্ত থাকে অনেক গ্রিকনারী! এবং বিজয়ী রূপে না হোক, বিভিন্ন কাজ নিয়ে শতশত গ্রিক যে মৌর্যযুগের ভারতবর্ষে বাস করত, এটুকু আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। চন্দ্রগুপ্তের পৌত্র সম্রাট অশোক অনেক ভারতবাসীকেও গ্রিসে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করবার জন্যে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এর কী ফল হয়েছিল জানি না, তবে এটা দেখতে পাই যে, মৌর্য-রাজশক্তির পতনেরও বহুকাল পরে (খ্রি. পূ. ২১) গ্রিসের প্রধান নগর এথেন্সে একজন ভারতীয় বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বৌদ্ধধর্মের মহিমা দেখাবার জন্যে জ্বলন্ত চিতায় স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দিচ্ছেন!

    ভারতের নাট্যশালা থেকে মৌর্য-নৃপতিরা চিরবিদায় নেবার পরে ভারতবর্ষের উপরে আবার গ্রিক প্রভাব বাড়তে থাকে। ভারতের প্রান্তদেশে এবং উত্তর ভারতে একাধিক গ্রিক নরপতি রাজত্ব করেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছেন মেনান্ডার—এঁর জয়পতাকা প্রায় পাটলিপুত্রের (বর্তমান পাটনা) কাছ পর্যন্ত এসে পড়েছিল এবং ইনি ও এঁর সমস্ত গ্রিক সভাসদ বৌদ্ধধর্ম পর্যন্ত অবলম্বন করেছিলেন (খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে)। এরই কয়েই বৎসর পরে দেখি, তক্ষশিলার (বর্তমান পেশোয়ার অঞ্চল) অধিবাসী গ্রিক-রাজদূত হেলিয়োডোরাস হিন্দুধর্ম অবলম্বন করে বাসুদেবের নামে একটি স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করছেন! ‘বেসনগর স্তম্ভ’ নাম নিয়ে সেটি আজও বিদ্যমান আছে। এইসব দৃষ্টান্ত দেখেই বোঝা যায়, আলেকজান্ডারের পরবর্তী কালে গ্রিকরা নিজেদের কেবল ভারতবাসী বলেই মনে করতেন না, তাঁরা ভারতীয় ধর্ম পর্যন্ত গ্রহণ করতে ছাড়েননি।

    বহু ঐতিহাসিকের মত হচ্ছে, গ্রিকদের আগমনের আগে ভারতবর্ষে মূর্তিপূজা ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করবার পদ্ধতি প্রচলিত ছিল না। হিন্দু ও বৌদ্ধরা নাকি মূর্তি গড়তে ও মন্দির তৈয়ারি করতে শেখেন গ্রিকদের কাছ থেকেই। অথচ এখনকার ইউরোপীয় গ্রিকদের মাথার করে রাখলেও পৌত্তলিক বর্বর বলে ঘৃণা করেন হিন্দুদেরই!

    ভারতীয় ভাস্কর্য শিল্পও এক সময়ে আশ্রয় নিয়েছিল গ্রিক শিল্পীদের কাছে। তার ফলে উত্তর ভারতের বিখ্যাত গান্ধার ভাস্কর্যের আবির্ভাব। পরবর্তী যুগে এই ভাস্কর্য কেমন করে ভারতের নিজস্ব শিল্প হয়ে উঠেছিল, এখানে সবিস্তারে তা দেখাবার দরকার নেই।

    সংস্কৃত ভাষায় আজও কিছু কিছু গ্রিক শব্দ বর্তমান আছে। সংস্কৃত নাট্য-সাহিত্যেরও উপরে অল্পস্বল্প গ্রিক প্রভাব থাকতে পারে। কেউ কেউ বলেন, নেই।

    কিন্তু যাঁরা প্রথম হিন্দু-জ্যোতির্বিজ্ঞান রচনা করে গেছেন তারা যে গ্রিকদেরই শিষ্য, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কারণ গার্গী-সংহিতায় স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে : ‘যবনরা (গ্রিকরা) বর্বর বটে, কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রথম প্রকাশ হয়েছে তাদের মধ্যেই। এবং এই কারণে তাদের দেবতা বলে ভক্তি করা উচিত।’

    আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের ফলেই আর্যাবর্তের জ্ঞান ও চিন্তার রাজ্যে এসেছে এমনি উন্নতিমূলক নানা পরিবর্তন। তিনি সাহস করে অগ্রবর্তী না হলে আর কোনও গ্রিক যে এই বিপদসঙ্কুল পথে পদার্পণ করতেন না, সে কথা নিশ্চিত রূপেই বলা যায়।

    ভারতবর্ষের উপরে রক্তাক্ত খড়গ তুলে এসে দাঁড়িয়েছেন আরও কত দিগবিজয়ী! তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হচ্ছেন তাতার তৈমুর লং, গজনীর মামুদ, পারসি নাদির শা ও আফগান আহম্মদ শা আবদালি! কিন্তু তাঁদের অভিযানের ফলে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে শুধু রক্ত-সাগরের তরঙ্গ। বারংবার ভারতের সোনার ভাণ্ডার লুণ্ঠন করে তাঁরা দস্যুর মতন অদৃশ্য হয়েছেন, কিন্তু তাঁদের কাছ থেকে ভারত পায়নি কোনও দান। তাঁরা ডাকাতি করেছেন মাত্র, মানবতার পরিচয় দেননি।

    আলেকজেন্ডার রক্তলোভী দিগবিজয়ী ছিলেন না, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নিষ্ঠুর হলেও আদর্শবাদী ছিলেন। পরে দেখাব, প্রাচ্যের সঙ্গে প্রতীচ্যের মধুর মিলন সাধন করবার জন্যে তাঁর প্রাণের আকাঙ্ক্ষা ছিল কতখানি প্রবল!

  • দিগবিজয়ী নেপোলিয়ন

    দিগবিজয়ী নেপোলিয়ন

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    এক : শৈশব ও কৈশোর

    মহাভারতের কবি বলেন, অর্জুনের পুত্র অভিমন্যু যুদ্ধবিদ্যা শিখেছিলেন মাতৃজঠরে।

    একালের কবি আর-একটি ছেলের সম্বন্ধেও ও-কথা বলেননি বটে, কিন্তু তারও পিতা ছিলেন বীরপুরুষ ও মাতা ছিলেন বীরনারী এবং তিনিও যখন মাতৃগর্ভে বাস করতেন তখন তাঁর মাতা বিচরণ করতেন রণক্ষেত্রে—পাশে নিয়ে অস্ত্রধারী স্বামীকে।

    শত্রু আক্রমণ করেছে তাঁদের স্বদেশকে এবং শত্রু হয়েছে বিজয়ী। গভীর অরণ্যের অন্ধকার ভেদ করে, নদী, প্রান্তর, পর্বত, উপত্যকা, অধিত্যকা, অতিক্রম করে হাজার হাজার পলাতকের সঙ্গে তাঁরাও চলেছেন শ্রান্তপদে কিন্তু দৃপ্তমনে দূরে—দূরে—আরও দূরে—বহু দূরে! পিছন থেকে ভেসে আসছে গুরু গুরু মেঘগর্জনের মতন ঘনঘন কামান-তর্জন—মাঝে মাঝে কানের পাশ দিয়ে সশব্দে বাতাস কেটে ছুটে ছুটে যাচ্ছে বন্দুকের প্রতপ্ত গুলি।

    ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দ। ফরাসিরা কর্সিকা-দ্বীপ দখল করলে জুলাই মাসে। পরাজিত কর্সিকাবাসীদের দুঃখের সীমা নেই।

    কিন্তু ঠিক পরের মাসেই—১৫ আগস্ট তারিখে কর্সিকার বীরনারী লেটিজিয়ার গর্ভ থেকে যে পুত্র ভূমিষ্ঠ হয়ে পৃথিবীর আলোকে প্রথম চোখ মেললে, পিতা-মাতার পরাজয়-বেদনার প্রতিশোধ নেওয়ার ভার পড়ল তারই উপরে। আজ যারা জয় করে প্রভু হতে এসেছে, তাদেরই জয় করে সর্বশক্তিমান প্রভু হবে এই পুত্র।

    ছেলের নাম হল নেপোলিয়ন। আজ তিরিশলক্ষ ফরাসি সৈনিকের ঘৃণ্য তরবারির রক্তধারার তলায় অজানা গৃহকোণে যার জন্ম, কয়েক বৎসর পরে দেখা গেল—সমগ্র ফরাসি দেশ তারই পদতলে নিশ্চেষ্টভাবে নতশির।

    নেপোলিয়ন হচ্ছে ইতালিয় নাম। ইতালির ইতিহাসে এই নামের প্রথম অধিকারী বহু শতাব্দী পূর্বেই বিখ্যাত হয়েছিলেন। ষোলো শতাব্দীতে তাঁর বংশধররা উঠে আসেন কর্সিকায়। এবং তাদের বংশ পরিচিত হয় ‘বোনাপার্ট’ নামে।

    নেপোলিয়নের বাবার নাম কার্লো বোনাপার্ট ও মায়ের নাম লেটিজিয়া র‍্যামোলিনো। সম্ভ্রান্ত বংশে জন্ম বলে কার্লো যখন ইতালিতে লেখাপড়া শিখতে গিয়েছিলেন, লোকে তখন তাকে কাউন্ট বোনাপার্ট বলে ডাকত। কিন্তু তিনি ছিলেন ভারি বেপরোয়া খরুচে—একবার একটি মাত্র ভোজ দিয়েই তিনি তাঁর দুই বছরের আয় খরচ করে ফেলতে কুণ্ঠিত হননি! সুতরাং এমন লোকের দ্বারা ভালোভাবে সংসার-চালনা করা সম্ভব নয়।

    কার্লোর পেশা ছিল ওকালতি, কিন্তু তাঁর বাড়িতে মক্কেলদের দেখা খুব বেশি পাওয়া যেত না। তিনি সাহিত্যিকও ছিলেন—যদিও বিখ্যাত হতে পারেননি। নেপোলিয়নও প্রথম বয়সে বাপের শেষ-গুণের অধিকারী হয়ে কিছু কিছু লেখনীচালনা করেছিলেন। তাঁর লেখা ছোটগল্প ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। একখানি নভেলেও তিনি হাত দিয়েছিলেন।

    কার্লো বোনাপার্টের পাঁচ ছেলে, তিন মেয়ে। জোসেফ (জন্ম ১৭৬৮), নেপোলিয়ন (১৭৬৯), লুসিয়েন (১৭৭৫), লুইস (১৭৭৮), জেরোম (১৭৮৪) এবং ক্যারোলিন, এলাইজ ও পলিন।

    অতএব বোঝাই যাচ্ছে, সংসারটি বড় সামান্য নয়। বেহিসেবি কর্তার উপরে নির্ভর করলে এ সংসার হত একেবারেই অচল। কিন্তু নেপোলিয়নের এক খুড়ো ছিলেন, তিনি ধর্মযাজক। সংসারের কতক কতক ব্যয়ভার বহন করতেন তিনিও।

    নেপোলিয়নের মা লেটিজিয়া কেবল যে বুদ্ধিমতী ছিলেন, তা নয়; যথাসম্ভব অল্প ব্যয়ে চারিদিক গুছিয়ে গাছিয়ে সংসার চালাবার ক্ষমতাও ছিল তাঁর যথেষ্ট। এবং মেজো নেপোলিয়ন ও সবচেয়ে ছোট মেয়ে পলিনকে তিনি অন্য সব ছেলেমেয়ের চেয়ে ভালোবাসতেন বেশি।

    শিশু-বয়স থেকেই নেপোলিয়ন ছিলেন অত্যন্ত একগুঁয়ে বা একরোখা ছেলে। কিছুতেই ভয় পেতেন না, কারুকেই ভয় করতেন না। বড় কম ঝগড়াটেও ছিলেন না। কারুকে ঘুসি মারতেন, কারুকে দিতেন আঁচড়ে বা কামড়ে। তাঁর হাতে পড়ে দাদা জোসেফকেই হতে হত সবচেয়ে বেশি নাকাল। দাদাকে একচোট মেরে-ধরে তিনিই আবার আগে মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে করতেন দাদার নামে নালিশ; ফলে জোসেফ বেচারাকে মায়ের হাতেও আর একদফা লাভ করতে হত উত্তম-মধ্যম।

    কিন্তু নেপোলিয়নের প্রকৃতি বন্য হলেও তিনি তাঁর মায়ের একান্ত বশীভূত ছিলেন। এবং সেই ছেলেবয়সে দৃঢ়চরিত্র মায়ের কাছ থেকে যে-সব সৎশিক্ষা পেয়েছিলেন তাই-ই যে তাঁর বিচিত্র ও অভাবিত ভবিষ্যৎ-জীবনকে গঠন করে তুলেছিল, এ-কথা তিনি নিজেই স্বীকার করে গেছেন।

    প্রথম থেকেই এই ছোট্ট ছেলেটিকে কর্সিকার সকলেই অসাধারণ বলে মনে করত। তুঙ্গ গিরিশিখর, সুগভীর পার্বত্য খাত বা নির্জন গহন অরণ্য দেখে তিনি একটুও শঙ্কিত হতেন না। দ্বীপের এক প্রান্ত থেকে অন্য পর্যন্ত ছিল তাঁর নখদর্পণে।

    এবং নিজের জন্মভূমিকে তিনি প্রাণের চেয়ে ভালোবাসতেন। বহুকাল পরে ফ্রান্সের সম্রাট ও ইউরোপের সর্বেসর্বা হয়েও তিনি আত্মচরিতে লিখেছিলেন : ‘পৃথিবীর সকল জায়গার চেয়ে কর্সিকার যা কিছু সব ভালো—এমনকী তার মাটির গন্ধটুকু পর্যন্ত। আজও চোখ মুদে সে গন্ধ আমি পাই—এমন গন্ধ আর কোথাও নেই। আজও আমি কল্পনায় নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাই সেই সুমধুর শৈশব-দিবসে—সেই খাড়া পর্বতমালার মধ্যে, সেই তুঙ্গ শিখরশ্রেণির উপরে, সেই গভীরতম খাতের অতলে!’

    সৈনিক জীবনের দিকে তাঁর প্রাণের টান ছিল এতটুকু বয়স থেকেই। বাড়ির কাছ দিয়ে যখন ফৌজের সৈনিকরা আসা-যাওয়া করত, তিনি বিপুল আগ্রহে ছুটে তাদের দেখতে যেতেন। তাঁর সবচেয়ে শখের খেলা ছিল পুতুল-সেপাইদের নিয়ে। তিনি যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুরাগী হবেন, সেটাও তাঁর শিশু-বয়স থেকেই বোঝা গিয়েছিল। তাঁর আর সব ভাইবোনরা যখন তুচ্ছ খেলাধুলো নিয়ে মেতে থাকত, তখন তিনি একলা বসে ঘরের দেওয়ালে করতেন অঙ্কের রেখাপাত।

    নেপোলিয়নের দুষ্টুমির আর একটি গল্প শোনো।

    তাঁর বুড়ি ঠাকুমা যখন বয়সের ভারে ভেঙে দুমড়ে পড়েছেন, তখন নেপোলিয়ন ও তাঁর ছোট বোন পলিন ঠাকুমাকে ঠাট্টা করে তাঁর চলা-ফেরার অনুকরণ করতেন। একদিন ঠাকুমা হঠাৎ নাতি-নাতনির কীর্তি দেখে ফেলে তাঁদের মায়ের কাছে নালিশ করে বললেন, ‘বউমা, তুমি ছেলে-মেয়েদের মানুষ করতে জানো না, তাদের অসভ্য করে তুলছ! ওরা গুরুজনদের প্রতি সম্মান দেখাতে শেখেনি।’

    মা লেটিজিয়া তাঁর এই ডানপিটে ছেলেমেয়ে দুটিকে যতই ভালোবাসুন, তাদের কোনও অন্যায়কেই ক্ষমা করবার পাত্রী ছিলেন না। পলিনের পিঠে তখনই পড়ল চটাপট চড়-চাপড়! কিন্তু চালাক নেপোলিয়ন দূরে দূরে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে লাগলেন, মা কিছুতেই তাঁকে হাতের কাছে পেলেন না। দু-চার দিন গেল। নেপোলিয়ন ভাবলেন, মা ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছেন।

    তারপর একদিন মা বললেন, ‘নেপোলিয়ন, আজ লাটের বাড়িতে তোমার নিমন্ত্রণ। যাও, পোশাক পরে এসো।’

    নেপোলিয়ন খুব খুশি হয়ে পোশাক পরবার জন্যে ঘরের ভিতরে গিয়ে ঢুকলেন। খানিক পরেই দেখা গেল, মা সেই ঘরের ভিতর এসে দাঁড়িয়েছেন দরজায় পিঠ রেখে। মায়ের গম্ভীর মুখ দেখেই নেপোলিয়ন বুঝলেন, তিনি ফাঁদে পড়েছেন—পালাবার পথ বন্ধ! তারপর তাঁর যথাস্থানে পড়ল সপাসপ বেতের ঘা! মা কিছুই ভোলেননি—মনের রাগ মনের মধ্যেই পুষে রেখে দিয়েছিলেন।

    কার্লো দেখলেন, তাঁর ছেলে নেপোলিয়নের সৈনিক-জীবনের দিকেই বেশি ঝোঁক। তিনি স্থির করলেন এ ছেলেটিকে সামরিক বিদ্যালয়েই ভরতি করে দেওয়া উচিত। বড় ছেলে জোসেফ নির্বিরোধী ভালোমানুষ, অতএব তাকে পুরুতের কাজেই মানাবে ভালো।

    ছেলেদুটিকে নিয়ে কার্লো প্যারি শহরে গিয়ে রাজা লুইয়ের কাছে নিজের আবেদন জানালেন এবং তাঁর আবেদন মঞ্জুরও হল। এই হল নেপোলিয়নের ভবিষ্যৎ-জীবনের ভিত্তি। পিতার তীক্ষ্ণবুদ্ধিই করলে এই ভিত্তিপ্রতিষ্ঠা।

    সম্ভ্রান্তবংশজাত বলে নেপোলিয়ন ফরাসিদেশের সম্ভ্রান্তদের ইস্কুলে ঠাঁই পেলেন। কিন্তু তিনি ফরাসি ভাষা জানতেন না। তাই আগে তঁকে ফরাসি ভাষা শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা হল। তাঁর বয়স তখন এগারোর বেশি নয় (১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দ)।

    স্বভাবত মৌন ও নির্জনতাপ্রিয় নেপোলিয়ন ইস্কুল-সংলগ্ন বাগানের একটি প্রান্ত বেড়া দিয়ে ঘিরে নিয়ে সেইখানে বসেই নিজের মনে লেখাপড়া করেন। যে-জমিটুকু তিনি ঘিরে নিয়েছিলেন, তার সবটাই তাঁর নিজের নয়। কিন্তু আর কেউ সেই বেড়ার ভিতরে ঢুকলেই আর রক্ষা নেই—নেপোলিয়নের হাতে বেদম মার খেয়ে পালিয়ে আসা ছাড়া তার আর কোনও উপায় ছিল না।

    শিক্ষকরা শাস্তির ব্যবস্থা করেও এ-বিষয়ে নেপোলিয়নকে রাজি করাতে পারলেন না। ‘শিক্ষক হোক, সহপাঠী হোক—আমার বেড়ার ভিতরে সকলেরই প্রবেশ নিষেধ!’

    একজন শিক্ষক বললেন, ‘ছেলেটি দেখছি গ্রানাইট পাথরে গড়া। এর ভিতরে আছে আগ্নেয়গিরি।’

    সে-ইস্কুলে পড়ত ফ্রান্সের যত সব উপাধিধারী বড় ঘরের ছেলে। তারা গা-টেপাটেপি করে বলাবলি করত—’এ কোথাকার বিদেশি পাড়াগেঁয়ে ভূত রে! ও কী অদ্ভুত বেঁটে আর ওর নামটাও কী বেয়াড়া! ওর জামাটা কী-রকম লম্বা ঝলঝলে দেখেছিস? ছোকরা হাত-খরচাও পায় না—অথচ বলতে চায় ও নাকি বনেদি বংশের ছেলে। খুদে দ্বীপ কর্সিকার বনেদি বংশ! ওরে ভাই, বন-গাঁয়ের শেয়াল-রাজা!’

    কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করত, ‘তোমাদের কর্সিকার লোকরা যদি এতই বীর, তাহলে তারা আমাদের ফরাসি সৈন্যদের মারের চোটে নাকাল হয়ে হার মানলে কেন?’

    ক্রুদ্ধ নেপোলিয়ন জবাব দিতেন, ‘দশজনের বিরুদ্ধে একজন কতদিন দাঁড়াতে পারে? সবুর কর, আমি বড় হই, তারপর ফরাসিদের দর্পচূর্ণ করব।’

    বালক নেপোলিয়ন দেশে পিতাকে চিঠি লিখে জানালেন, ‘আমার দারিদ্র্যের জন্যে জবাবদিহি করতে করতে আমি শ্রান্ত হয়ে পড়েছি। এইসব বিদেশি ছোকরার ঠাট্টা-বিদ্রুপ আমাকে সহ্য করতে হচ্ছে দিন-রাত। এদের একমাত্র শ্রেষ্ঠতা হচ্ছে টাকার দেমাকের জন্যে; মনের আভিজাত্যে এরা আমার চেয়ে ঢের নীচে। এই স্বর্ণবাহী গর্দভদের সামনে আর কতকাল আপনি আমাকে মাথা হেঁট করে থাকতে বলেন?’

    বালকের মুখে প্রৌঢ়ের উক্তি শুনে পিতা হয়তো বিস্মিত হলেন। কিন্তু উত্তরে লিখেলেন : ‘আমাদের টাকা নেই, আমরা গরিব। তোমাকে ওখানেই থাকতে হবে।’

    নেপোলিয়নকে পাঁচটি বছর ওখানেই থাকতে হল।

    কিন্তু তাঁকে নিয়ে তাঁর সহপাঠীরা যতই রঙ্গব্যঙ্গ ও ঘৃণা জাহির করুক, তাঁর সুদৃঢ় চরিত্র ও মানসিক শক্তির প্রভাবে তারা সকলেই অভিভূত না হয়ে পারলে না। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই নেপোলিয়ন হতেন দলের সরদার এবং তারা করত তাঁর হুকুম তামিল। এমনকী, শিক্ষকরা পর্যন্ত তাঁকে বশ মানাতে পারতেন না।

    একবার সামান্য কী-একটা দোষের জন্যে জনৈক শিক্ষক বললেন, ‘বোনাপার্ট, নতজানু হয়ে বোসো। নতজানু হয়েই আজ তোমাকে ‘ডিনার’ খেতে হবে।’

    নেপোলিয়ন উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, ‘মাস্টারমশাই, যদি দরকার হয় আমি এখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই ‘ডিনার’ খাব। কিন্তু আমি নতজানু হব না! কারণ আমাদের পরিবারের কেউ ঈশ্বর ছাড়া আর কারুর সামনে নতজানু হয় না।’

    শিক্ষক গায়ের জোরে তাঁকে নতজানু করতে গেলেন। বিষম ক্রোধে নেপোলিয়ন চিৎকার করে উঠলেন, তারপর অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়লেন মাটির উপরে। বলা বাহুল্য, এর পরে আর কেউ তাঁকে নতজানু করবার চেষ্টা করলেন না।

    নেপোলিয়নের প্রথম যুদ্ধে হাতেখড়ি হয় এইখানেই। যদিও এ যুদ্ধ আসল নয়, নকল। একবার শীতকালে বরফে চারিদিক আচ্ছন্ন। ইস্কুলের ছেলেরা স্থির করলে, বরফ দিয়ে কেল্লা ও গড়খাই প্রভৃতি গড়ে কৃত্রিম যুদ্ধের অনুষ্ঠান করতে হবে। এক পক্ষ করবে কেল্লা রক্ষা, আর এক পক্ষ করবে আক্রমণ। নেপোলিয়ন কখনও এ-দলের, কখনও ও-দলের হয়ে লড়তেন; বলা বাহুল্য, নেতা রূপেই। এবং যে-দলে তিনি থাকতেন, বরাবরই জয়ী হত সেই দল। কিন্তু এ যুদ্ধক্রীড়া বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ ছেলেরা প্রথম-প্রথম বরফের নরম গোলা ছুড়েই খুশি হত, তারপর বরফের গোলার ভিতরে পাথর ভরে দিতে শুরু করলে। মিথ্যা যুদ্ধে ছেলেরা যখন সত্য-সত্যই আহত হতে লাগল, বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ তখন এই বিপদজ্জনক খেলা বন্ধ করে দিলেন।

    একবার মা লেটিজিয়া নেপোলিয়নকে দেখতে এসে চিনতে পারলেন না। ভাবলেন, ভুল করে তাঁর ছেলে বলে অন্য কারুকে ডেকে আনা হয়েছে। কেবল নির্দিষ্ট পাঠের সময়ে নয়, ছুটির সময়েও নেপোলিয়ন লেখাপড়া নিয়ে এমন ভাবে নিযুক্ত হয়ে থাকতেন যে, নিজের স্বাস্থ্যের দিকে একেবারেই নজর দিতে পারতেন না। দিনে যা পড়তেন, সারারাত জেগে তাই নিয়ে চিন্তা করতেন। ফলে ক্লাসে সর্বদাই তিনি প্রথম হতেন বটে, কিন্তু তাঁর চেহারা হয়ে গিয়েছিল একেবারে শীর্ণ-বিশীর্ণ।

  • রক্ত বাদল ঝরে

    রক্ত বাদল ঝরে

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    প্রথম পরিচ্ছেদ : বোম্বেটে না বর্বর

    বোম্বেটে কাকে বলে সবাই তা জানে। বোম্বেটে বা জলদস্যু পৃথিবীর সব দেশেই সব সময়ে ছিল। এখনও আছে।

    তবে বোম্বেটে-জীবনের গৌরবময় যুগ আর নেই। আগেকার বোম্বেটের ক্ষমতা ছিল অবাধ ও খ্যাতি ছিল আশ্চর্য, এখনকার বোম্বেটেরা তাদের কাছে হচ্ছে তিমিমাছের কাছে পুঁটিমাছের মতো।

    উড়োজাহাজ, বাষ্পীয় পোত ও বেতার টেলিগ্রাফের মহিমায় আজ আর কোনও বোম্বেটেই বেশি মাথা তুলতে বা বেশিদিন কোথাও গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে পারে না। চিনে বোম্বেটেরা আজও মাঝে মাঝে মাথা চাগাড় দেয় বটে, কিন্তু তাদের জারিজুরি ওই চিনা সমুদ্রের ভিতরেই। চিনদেশের ভিতরকার অবস্থা ভালো নয়, রাজ্যবিপ্লব নিয়েই সেখানকার গভর্নমেন্ট ব্যতিব্যস্ত, সেইজন্যেই চিনে বোম্বেটেরা মাঝে মাঝে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করবার সুযোগ পায়।

    অন্যান্য দেশের আধুনিক বোম্বেটেরা উল্লেখযোগ্য জীব নয়। তারা আছে—এইমাত্র

    বাংলাদেশে ‘বোম্বেটে’ কথাটি বেশিদিনের নয়। বারো ভুঁইয়ার সময়ে বাংলাদেশে পোর্তুগিজ জলদস্যুদের বিষম উপদ্রব হয়েছিল। তখনকার রডা, গঞ্জালিস ও কার্ভালো প্রভৃতি জলদস্যুর নাম বাঙালি এখনও ভুলতে পারেনি, কারণ বর্গির অত্যাচার ও মগের অত্যাচারের মতো পোর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচারও ছিল তখনকার বাংলাদেশের নিত্য নৈমিত্তিক বিভীষিকা। ওই সময়েই ‘বোম্বেটে’ কথাটি বাংলাদেশে চলতে শুরু হয়। ইংরেজি Bombasdies-এর বাংলা হচ্ছে ‘গোলন্দাজ সৈন্য’। পোর্তুগিজ জলদুস্যরা গোলন্দাজিতে অর্থাৎ কামান-বন্দুকের ব্যবহারে দক্ষ ছিল। তাই বোধহয়, ওই ইংরেজি কথাটা থেকে বাংলা ‘বোম্বেটিয়া’ বা ‘বোম্বেটে’ কথাটির সৃষ্টি হয়, আর সাধারণভাবে জলদস্যুদেরই প্রতি ব্যবহৃত হতে থাকে।

    ‘বোম্বেটে’ কথাটি খাঁটি বাংলা কথা না হলেও খাঁটি বাঙালি বোম্বেটের অভাব বাংলাদেশে ছিল না। তবে এখানে তো সমুদ্রতীরবর্তী নগর বেশি নেই, কাজেই বোম্বেটেদের ছোট ছোট নৌকো করে নদ-নদীর ভিতরে এসেই ব্যবসা চালাতে হত। বড় বড় জাহাজে চড়ে পৃথিবীর নামজাদা বোম্বেটেদের মতো সমুদ্রের উপর বড়রকমের ডাকাতি করার সুযোগ তাদের বেশি ছিল না।

    সেকেলে বাংলার জল-ডাকাতদের সাধারণ নিয়ম ছিল এই রকম : কোনও যাত্রীনৌকো দেখলেই তারা নিজেদের নৌকো নিয়ে তার কাছে গিয়ে বলত, ‘আমাদের আগুন নিবে গেছে। একটু আগুন দেবে ভায়া?’ যাত্রীনৌকোর লোকেরা কোনরকম সন্দেহ না করে আগুন দেওয়ার জন্যে বোম্বেটে নৌকোর পাশে গিয়ে হাজির হত এবং অমনি সেই সুযোগে বোম্বেটেরা যাত্রীনৌকোর ভিতরে লাফিয়ে পড়ে সর্বনাশের সৃষ্টি করত। বারে বারে এমনি ঠকে শেষটা অচেনা নৌকো আগুন চাইলেই তারা তাড়াতাড়ি আরও তফাতে সরে পড়ে পলায়ন করত।

    বাংলাদেশে জল-ডাকাতরা প্রায়ই ছিপনৌকো ব্যবহার করত। এখানকার ডাঙার ডাকাতরা তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্যে ব্যবহার করত ‘রণপা’। রণপা হচ্ছে দুটো লম্বা বাঁশের ডাণ্ডা—মানুষের মাথার চেয়ে অনেক উঁচু। সেই ডাণ্ডার মাঝখানে পা রাখবার জায়গা থাকে। (ইউরোপেরও অনেক দেশের চাষিরা শস্যখেতে চলাফেরা করবার সময়ে এমনই রণপা ব্যবহার করে থাকে।) কিন্তু বাংলার ডাঙার ডাকাতরাও জলপথে তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্যে বোম্বেটেদেরই মতো ছিপ ব্যবহার করত।

    আইনের চোখে অপরাধী হলেও সামাজিক হিসাবে, আগেকার বোম্বেটেরা বোধহয় সাধারণ খুনি বা ডাকাতের চেয়ে উচ্চশ্রেণির জীব ছিল। কারণ, দেখা যায়, আগেকার এমন কয়েকজন লোক নৌ-যোদ্ধারূপে বিখ্যাত হয়ে প্রভূত যশ ও রাজসম্মান অর্জন করে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় অমর হয়ে রয়েছেন, যাঁদের বোম্বেটে বললে খুব ভুল করা হয় না।

    যেমন ভাস্কো ডা গামা। পোর্তুগালের এই নামজাদা যোদ্ধা-নাবিক পোর্তুগিজ অধিকৃত ‘ভারতবর্ষে’র বড়লাটরূপে কোচিতে প্রাণত্যাগ করেন (১৫২৪)। কিন্তু আফ্রিকার স্থানে স্থানে ও ভারতের কালিকটে তিনি যেসব কাজ করে গেছেন, তা বোম্বেটের পক্ষেই সাজে। পোর্তুগালের আর এক নাবিক নেতা ফার্নান ম্যাগেল্যানও স্বদেশে যথেষ্ট শ্রদ্ধা প্রীতি লাভ করেছেন, কিন্তু তিনি সাধারণ ইতর বোম্বেটের চেয়ে ভালো লোক ছিলেন না।

    ইংল্যাণ্ডকে স্পেনের ‘আর্মাডা’র কবল থেকে বাঁচিয়ে এবং অনেক নতুন নতুন দেশ আবিষ্কার ও ব্রিটিশসাম্রাজ্যভুক্ত করে স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক আজ স্বদেশভক্ত বীর বলে সুপরিচিত। সে হিসাবে সত্য সত্যই তিনি এই সম্মানের অধিকারী। কিন্তু জলদস্যুরা যে কাজ করলে নিন্দিত হয়, তাঁর অনেক অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যেই তা লক্ষ করা যায়। ড্রেক একালে জন্মালে, পৃথিবী বোধহয় তাঁকে ক্ষমা করত না। ওয়েস্ট ইণ্ডিজে গিয়ে তিনি যথেচ্ছভাবে লুঠতরাজ করেছেন, হাজার হাজার অসহায় মানুষকে হত্যা করেছেন, বড় বড় শহরকে আগুনের মুখে সমর্পণ করেছেন। সে দেশের লোকের কাছে তিনি নিশ্চয়ই বীর নামে পরিচিত হয়নি। যুদ্ধের নামগন্ধ নেই, নগর লুণ্ঠনও শেষ হয়ে গেছে, তবু হাইতি দ্বীপের রাজধানী স্যান্টো ডোমিঙ্গো শহরের নিরীহ বাসিন্দাদের উপর ড্রেক অনবরত গুলিগোলা বৃষ্টি করেছেন। নগরের চতুর্দিকে যখন ভীষণ অগ্নির তাণ্ডবলীলা, নিরপরাধ নর-নারী ও শিশুর আর্তনাদে যখন আকাশ-বাতাস পরিপূর্ণ এবং ড্রেকের সৈন্যরা যখন ক্রমাগত গুলিগোলা বৃষ্টি করে একেবারে নেতিয়ে কাবু হয়ে পড়েছে, তখনও লক্ষাধিক মুদ্রা ঘুষ না পাওয়া পর্যন্ত ইংল্যাণ্ডের এই মহাবীর তুষ্ট হতে পারেননি।

    পনেরো, ষোলো ও সতেরো শতাব্দীতে ইংল্যাণ্ডবাসীরা নৌ-যোদ্ধা ও বোম্বেটেকে যে প্রায় অভিন্ন বলে মনে করত, তার অসংখ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে। তখন সমুদ্রে ও সাগর তীরবর্তী স্থানে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করবার সময়ে, ইংরেজরা অধিকাংশ সময়েই সাধারণ বোম্বেটেদের সাহায্য গ্রহণ করত। ইংল্যাণ্ডের রাজা, রানি ও শাসনকর্তারা পর্যন্ত বেতনভুক্ত নিয়মিত নৌ-সৈন্যদের সঙ্গে বোম্বেটেদের পালন করতে লজ্জিত হতেন না—যেমন হতেন না বাংলা দেশের বারো ভুঁইয়ারাও। রাজার সাহায্য পেয়ে বোম্বেটেদেরও বুক দশহাত হয়ে উঠত, তারা রাজশত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করবার অজুহাতে নিরীহ প্রজাদের ধন-প্রাণ নির্ভয়ে লুণ্ঠন করত।

    এই শ্রেণির বোম্বেটেদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে হেনরি মর্গ্যান। এই ভীষণ বোম্বেটেকে ইংল্যাণ্ডের রাজসরকার টাকা, জাহাজ ও লোকজন দিয়ে সাহায্য করেন। তার ফলে ওয়েস্ট ইণ্ডিজের কাছাকাছি দ্বীপপুঞ্জে এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলে কারুর পক্ষে ধন-প্রাণ বজায় রেখে বাস করাই অসম্ভব হয়ে ওঠে। পানামার মতো শহরেও হেনরি মর্গ্যান হানা দিতে ভয় পায়নি, তার কবলগত হয়ে পানামার অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়ে যায় এবং যথাসর্বস্ব হারিয়েও এখানকার কত হাজার বাসিন্দা যে মৃত্যুমুখে পড়তে বাধ্য হয়, তার কোনও হিসাব নেই। ওই ওঁচা বোম্বেটেকে জলদস্যুরা পর্যন্ত ঘৃণা করত। কারণ সে কাক হয়েও কাকের মাংস খেত,—অর্থাৎ মর্গ্যান কেবল পরিচিত নির্দোষ ব্যক্তিরই ধন-প্রাণ কেড়ে নিত না, নিজের দলের লোকদেরও টাকা দু-হাতে চুরি করত। জলপথে ও স্থলপথে অসংখ্য অত্যাচার, নরহত্যা, লুণ্ঠন ও পাপকাজ এবং বোম্বেটেদেরও তহবিল তছরুপ করে, শেষটা সে সকলকে ফাঁকি দিয়ে হঠাৎ একদিন লুকিয়ে সরে পড়ে। তখন ইংলণ্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের ধর্মভাব হঠাৎ জেগে উঠল। তাঁর হুকুমে মর্গ্যানকে ধরে দেশে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু বোম্বেটে সর্দারকে স্বচক্ষে দেখে রাজার মন এত খুশি হয়ে উঠল যে, শাস্তি দেওয়া দূরে থাক, ‘স্যার’ উপাধি ও ‘কর্নেল’ পদ দিয়ে তিনি তাঁকে আবার জামাইকা দ্বীপের ছোটলাট করে পাঠালেন।

    রেমব্রাণ্ডের মতো বিশ্ববিখ্যাত ও সর্বজনমান্য চিত্রকর আঁকলেন কর্নেল স্যার হেনরি মর্গ্যানের ছবি এবং যার মরা উচিত ছিল ফাঁসিকাঠে, ছোটলাটের উঁচু, পুরু ও নরম গদিতে বসে সে সাধু-অসাধুর শাসনভার অর্থাৎ মুণ্ডপাতের ভার পেয়ে চোদ্দো বছর সুখে সম্মানে কাটিয়ে তিয়াত্তর বৎসর বয়সে পরম নিশ্চিন্তভাবে ইহলোক ত্যাগ করলে! পাপের এমন জয়ের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্য কোনও দেশের ইতিহাসে দেখা যায় না! এমনকি আজও দেখি, অনেক নামজাদা ইংরেজ লিখিয়ে এই বোম্বেটের কলঙ্ক ক্ষালনের জন্যে প্রাণপণে ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। আশ্চর্য!

    অথচ ওই সময়কার ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরা কানহোজি আংগ্রেকে জলদস্যু রূপে বর্ণনা করতে লজ্জিত হননি। ভারতে যখন ঔরংজেবের রাজত্ব, মারাঠি নৌ-বীর কানহোজি আংগ্রের নামে তখন আরবসাগরগামী সমস্ত জাহাজ ভয়ে থরহরি কম্পমান হত। স্থলপথে ছত্রপতি শিবাজির মতন জলপথে কানহোজি আংগ্রেও ছিলেন সমান অজেয়। ইংল্যাণ্ডে জন্মালে তিনি ড্রেক বা নেলসনেরই মতো পৃথিবীজোড়া অমর নাম অর্জন করবার সুযোগ পেতেন। মোগল, ইংরেজ, ওলন্দাজ ও পোর্তুগিজদের কোনও জাহাজই তাঁর কবল থেকে সহজে নিস্তার পেত না। ইংরেজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় জাতিরা একসঙ্গে অনেক যুদ্ধজাহাজ নিয়ে বারবার তাঁকে আক্রমণ করেছে, কিন্তু প্রতিবারই একাকী লড়েও জলযুদ্ধে জয়ী হয়েছেন মহাবীর কানহোজি আংগ্রেই! অথচ তখন ইউরোপের পূর্বোক্ত জাতিরা স্থলযুদ্ধের চেয়ে জলযুদ্ধেই বেশি বিখ্যাত ছিলেন। বারবার পরাজিত শত্রুদের কলমে ‘বোম্বেটে’ বলে নিন্দিত এই অসাধারণ ভারতীয় নৌ-বীরের বীরত্বকাহিনি যে আজও এখানে ঘরে ঘরে পরিচিত হয়নি, আমাদের ঐতিহাসিকদের পক্ষে এটা অল্প কলঙ্কের কথা নয়। বাংলা ভাষায় প্রায় তিন যুগ আগে পুরাতন ‘ভারতী’তে একবার কানহোজি আংগ্রে সম্বন্ধে একটি ছোট প্রবন্ধ দেখেছিলুম, তারপর আর কারুর তাঁকে মনে পড়েনি!

    সাধারণ হত্যা বা দস্যুতার মধ্যে লুকোচুরি ও কাপুরুষতা আছে যতটা, বোম্বেটের কাজে যে ততটা নেই, সত্যের অনুরোধে এ কথা স্বীকার করা চলে অনায়াসেই। সে যুগে বোম্বেটেদের প্রাধান্য ছিল খুব বেশি, তখন সমুদ্রযাত্রার সময়ে প্রত্যেক জাহাজের আরোহীরাই তাদের দেখা পাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যেতেন ও সাবধান হয়ে থাকতেন এবং বোম্বেটেদের ভয়ে অধিকাংশ সওদাগরি জাহাজেও কামান-বন্দুক ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র রাখা হত। অনন্ত সমুদ্র,—সাধারণ খুনে বা ডাকাতের মতো বোম্বেটেরা অতর্কিতে হঠাৎ এসে আক্রমণ করতে পারত না, তাদের অনেক দূর থেকেই স্পষ্ট দেখা যেত এবং আক্রান্তরাও আত্মরক্ষা করবার সুযোগ পেত যথেষ্ট। কিন্তু তবু যে তারা বাঁচতে পারত না, তার প্রধান কারণ হচ্ছে বোম্বেটেদের সাহস ও বীরত্ব।

    তবে জলদস্যুদের এত নিন্দা কেন? তাদের মূলমন্ত্র হচ্ছে, জোর যার মুল্লুক তার। এ মূলমন্ত্র সমাজের শান্তিরক্ষার পক্ষে অচল। তার উপরে সেকালকার বোম্বেটেদের নিষ্ঠুরতা ও হিংসুকতা ছিল অসম্ভব—দয়ামায়ার অস্তিত্ব পর্যন্ত তারা মানত না। অধিকাংশ সময়েই তারা কোনও জাহাজ দখল ও লুট করে সমস্ত আরোহীকেই নির্বিচারে সমুদ্রের জলে নিক্ষেপ করত। প্রাণে মারবার আগে অনেক লোককে তারা অমানুষিক যন্ত্রণা দিতেও ছাড়ত না। তারা নরপশু ছিল বলেই তাদের সমস্ত সাহস ও বীরত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভস্মে ঘৃতাহুতির মতো। যে বীরত্বে ক্ষমা নেই, দয়া নেই, মনুষ্যত্ব নেই, তা একেবারেই উল্লেখযোগ্য নয়।

    ওয়েস্ট ইণ্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের ফরাসি জলদস্যু লোলোনজের পাশবিক বীরত্বের কাহিনি আমরা পরে বিবৃত করব। ব্রেজিলিয়ানো নামে আর এক বোম্বেটের গল্পও আমরা পরে বলব, যা পড়তে পড়তে পাঠককে শিউরে উঠতে হবে। এ শ্রেণির লোকের সাহস ও বীরত্ব না থাকলেই ভালো ছিল।

    জলদস্যু হচ্ছে প্রাচীন যুগেরই জীব। গ্রিকদের সময়েও জলদস্যুদের প্রভাব ছিল যথেষ্ট। সে সময়ে সমুদ্রে বেরিয়ে এক জাহাজ যদি আর এক জাহাজকে দেখতে পেত, তাহলে সর্বাগ্রে প্রশ্ন করত, ‘তোমরা বোম্বেটে, না সওদাগর?’ রোমানদের সময়েও গ্রিক বোম্বেটেরা দলে এত ভারি ছিল যে, ভূমধ্যসাগর দিয়ে সাধারণ জাহাজ প্রায় চলাফেরা করতে পারত না বললেই চলে।

    ভূমধ্যসাগরে বোম্বেটে জাহাজের সংখ্যা তখন এক হাজারের কম ছিল না। রোমানরা শেষটা বাধ্য হয়ে বিপুল এক রণতরীর বাহিনী পাঠিয়ে এই দস্যুতা দমন করেছিল। কিন্তু এর পরেও অনেকবার জলদস্যুদের অত্যাচারে রোমকে যারপরনাই কষ্টভোগ করতে হয়েছিল। সেকালকার ইংল্যাণ্ড, ফ্রান্স, পোর্তুগাল ও স্পেনের সমুদ্রতীরবর্তী নগরগুলি নানাদেশি বোম্বেটেদের অত্যাচারে যখন তখন ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ত।

    পঞ্চদশ শতাব্দীর আরম্ভে চিনারা সিংহলদেশের উপরে কী বিষম ডাকাতি করেছিল এইবারে সেই কথাই বলি। চেং হো নামে এক চিনা-খোজা একবার জাহাজে চড়ে সিংহলদেশে গিয়েছিল। সেখানে বুদ্ধদেবের পবিত্র দাঁত আছে শুনে সে আব্দার ধরে বসল, তাকে ওই দাঁত উপহার দিতে হবে। বলাবাহুল্য, সিংহলের তখনকার রাজা অলগাক্ষোনারা (?) তার সে অন্যায় আব্দার গ্রাহ্য করলেন না। চেং হো সেবারের মতো মুখ চুন করে খালি হাতেই চিনদেশে ফিরে গেল।

    কিন্তু ১৪০৯ খ্রিস্টাব্দে বাষট্টিখানা জাহাজ নিয়ে সে আবার সিংহলদেশে আবির্ভূত হল। সিংহলের রাজার সৈন্যদের সঙ্গে চিনাদের তুমুল লড়াই লেগে গেল। সেই ফাঁকে চেং হো একদল সৈন্য নিয়ে সিংহলি সৈন্যদের চোখে ধুলো দিয়ে হঠাৎ রাজধানীতে এসে কৌশলে নগর দখল করল এবং রাজা ও রাজপরিবারের ছেলেমেয়ে ও রাজ্যের প্রধান প্রধান লোকদের বন্দি করে সটান আবার চিনদেশে গিয়ে হাজির হল। পরে রাজ্যচ্যুত রাজাকে চিনারা আবার সিংহলদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল বটে, কিন্তু তারপর, কিছুকাল পর্যন্ত সিংহল দেশকে চিনসম্রাটের অধীনতা স্বীকার করে কর পাঠাতে হত! এই বোম্বেটেগিরির পরে, ভারতসাগরে চিনাদের প্রভাব দুর্দমনীয় হয়ে উঠেছিল।

    চিনদেশেরও সমুদ্রতীরবর্তী স্থানগুলি নিরাপদ ছিল না—সেসব জায়গায় জাপানি বোম্বেটেরা সকলকে নাস্তানাবুদ করে তুলেছিল। ষোড়শ শতাব্দীর পর ইংরেজ ও ওলন্দাজ বোম্বেটেদের দৌরাত্ম্যেও চিনাদের বড় কম নাকাল হতে হয়নি।

    আগেই বলেছি, ইংরেজরাও সেকালে বোম্বেটের ব্যবসায়ে যথেষ্ট বদনাম কিনেছিল। রানি এলিজাবেথ অনেক ইংরেজ বোম্বেটেকে নিজের নৌ-সেনাদলে ভর্তি করে নিয়েছিলেন। সে সময়ে জন স্মিথ নামে এক মহা ধড়িবাজ বোম্বেটের জ্বালায় ইংরেজরা পর্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছিল এবং তাকে বন্দি করে ফাঁসিকাঠে লটকে দেওয়ার জন্যে চারিদিকে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু কেউ তাকে ধরতে পারেনি।

    এমন যে শয়তান, তারও মনে ছিল প্রচুর দেশভক্তি। হঠাৎ সে একদিন নিজেই কর্তৃপক্ষের কাছে এসে হাজির—ধরা দিলে মুক্তি নেই জেনেও। সকলেই অবাক হয়ে গেল! কিন্তু বোম্বেটে জন স্মিথ বললে, ‘দেশের বিপদ দেখেই আমি ধরা দিচ্ছি। সবাই প্রস্তুত হও। আমি স্বচক্ষে দেখে এসেছি, ইংল্যাণ্ড ধ্বংস করবার জন্যে ‘স্প্যানিস আর্মাডা’ আসছে।’ এ খবর তখনও দেশের কেউ পায়নি,—শুনেই সারা ইংল্যাণ্ডে ‘সাজো সাজো’ রব উঠল, সকলে যথাসময়ে সাবধান হওয়ার সুযোগ লাভ করলে। বলাবাহুল্য, বোম্বেটে জন স্মিথের নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণ ব্যর্থ হল না। কেবল শাস্তি থেকে মুক্তি নয়—সেই সঙ্গে সে যথেষ্ট পুরস্কারও লাভ করল।

    স্পেন থেকে মরক্কোয় বিতাড়িত হওয়ার পর ষোড়শ শতাব্দীর মূররা ভয়ংকর বোম্বেটে রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তাদের ভয়ে ভূমধ্যসাগরের ব্যাবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো হয়েছিল। সারা ইউরোপের শক্তি তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারেনি। প্রথমে উর্জ ও পরে তার ভাই খয়েরুদ্দিনের নামে তখনকার খ্রিস্টান নাবিকদের বুক ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যেত। কারণ মূর বোম্বেটেরা কেবল জাহাজ লুট করত না, উপরন্তু খ্রিস্টানদেরও ধরে নিয়ে গিয়ে আফ্রিকায় গোলাম করে রাখত এবং তাদের পথের কুকুরের মতো কষ্ট দিত। একবার আন্দ্রিয়া ডোরিয়া নামে এক নৌ-বীর বহু জাহাজ ও সৈন্য নিয়ে জলযুদ্ধে মূর বোম্বেটেদের হারিয়ে দেন এবং তাদের কবল থেকে বিশ হাজার খ্রিস্টান স্ত্রী-পুরুষকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন—তাদের মধ্যে ইউরোপের অনেক বড়ঘরের ছেলেমেয়েও ছিল। কিন্তু তবু মূর বোম্বেটেরা কাবু হয়ে পড়ল না। অবশেষে কয়েক শত বৎসরের প্রাণপণ চেষ্টার পরে, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে, মূর জলদস্যুদের প্রতাপ দূর হয়। ইংরেজ নৌ-সেনাপতি লর্ড এক্সমাউথ ওলন্দাজদের সঙ্গে মিলে মূর বোম্বেটেদের আস্তানা ভেঙে দেন এবং তারপর ফরাসিরা আলজিয়ার্স দেশ অধিকার করলে মূররা আর মাথা তুলতে পারলে না। ইউরোপে এমন বোম্বেটের বিভীষিকা আর কখনও হয়নি।

  • হন্তারক নরদানব

    হন্তারক নরদানব

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    পটভূমিকা

    ইতিহাস যখন লিখিত হয়নি, জলদস্যু বা বোম্বেটের অত্যাচার আরম্ভ হয়েছে তখন থেকেই। খ্রিষ্টপূর্ব যুগেও দেখা যায় প্রাচীন মিশর, গ্রীস ও রোমের সমুদ্রযাত্রী জাহাজ বোম্বেটেদের পাল্লা থেকে রেহাই পায়নি। এমনকি, বিশ্ববিখ্যাত রোমান দিগ্বিজয়ী জুলিয়াস সিজারকে পর্যন্ত একবার বোম্বেটেরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল! ইংরেজিতে Pirate বলতে বুঝায় বোম্বেটে এবং গ্রিক Peirates থেকে ওই শব্দটির উৎপত্তি। উপরন্তু পর্তুগিজ Bombardier শব্দটি ভেঙে গড়া হয়েছে বাংলায় চলতি ‘বোম্বেটে’ শব্দটি।

    প্রাচীন ভারতবাসীরাও সাগরযাত্রায় বেরিয়ে যখন-তখন ধরা পড়ত বোম্বেটেদের ফাঁদে। তারপর অষ্টম শতাব্দীতে ভারতের মাটিতে মুসলমানরা যে প্রথম ইসলামের পতাকা রোপণ করবার সুযোগ পায়, তারও মূলে ছিল ভারত সাগরের বোম্বেটেরাই। কিন্তু সে হচ্ছে ভিন্ন কাহিনী, এখানে বলবার জায়গা নেই।

    তারপর মধ্যযুগের ইউরোপে ইংরেজ, ফরাসী, স্পেনীয়, পর্তুগিজ ও উত্তর-আফ্রিকার মুসলমান বোম্বেটেদের ভয়াবহ অত্যাচারে সমুদ্রযাত্রা অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল এবং জলদস্যুতা পরিণত হয়েছিল একটি রীতিমতো লাভজনক ব্যবসায়ে। ক্রমে ক্রমে পাশ্চাত্য বোম্বেটেদের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর অন্যান্য সমুদ্রেও। আফ্রিকা ও আমেরিকার মধ্যবর্তী অঞ্চলে বোম্বেটেদের প্রাধান্য এতটা বেড়ে ওঠে যে, তারা জল ছেড়ে ডাঙায় নেমেও দেশের পর দেশে হানা দিতে ভয় পেত না।

    বোম্বেটেদের সাহস বাড়বে না কেন? বড়ো বড়ো ইংরেজ বোম্বেটে ইংল্যাণ্ডের রাজাদের কাছ থেকেও আশকারা পেয়েছে। অনেক বোম্বেটের জন্ম আবার সন্ত্রান্ত পরিবারে। স্পেন বা ফ্রান্সের সঙ্গে যখন লড়াই চলত, ইংল্যাণ্ডের রাজারা তখন বোম্বেটেদেরও লেলিয়ে দিতে লজ্জিত হতেন না এবং তারাও প্রশ্রয় পেয়ে স্পেন বা ফ্রান্সের যে-কোনও জাহাজের উপরে হামলা দিয়ে অমানুষিক অত্যাচার করত। হেনরি মর্গ্যান ছিল সতেরো শতাব্দীর এক কুখ্যাত ইংরেজ বোম্বেটে। সে কেবল জলপথে নয়, স্থলপথেও শত শত নরহত্যা করেছে এবং নির্বিচার লুণ্ঠনের পর বহু জনপদকে করেছে অগ্নিমুখে সমর্পণ। তাকে বন্দি করে ইংল্যাণ্ডে পাঠানো হয়। কিন্তু রাজা দ্বিতীয় চার্লস তার সঙ্গে আলাপ করে এমন মুগ্ধ হলেন যে, শাস্তি দেওয়া দূরের কথা, মর্গ্যানকে স্যার উপাধিতে ভূষিত করে জামাইকা দ্বীপের শাসনকর্তার আসনে বসিয়ে দিলেন।

    জনৈক ইংরেজ বোম্বেটে একবার ভারত সাগরে এসে মোগলদের জাহাজের উপরে চড়াও হয়ে বাদশাহ আলমগীরের পরিবারভুক্ত দুইজন রাজকন্যাকেও বন্দিনী করতে ভয় পায়নি।

    সুন্দরবন ছিল আগে বর্ধিষ্ণু লোকালয়, পরে পরিণত হয়েছে বিজন জলা-জঙ্গলে। মানুষের বিচরণ-ভূমি দখল করেছে হিংস্র পশুর দল। কারণ? পর্তুগিজ ও মগ বোম্বেটেদের অত্যাচার।

    দুইজন মেয়ে-বোম্বেটেরও নাম বিখ্যাত—আন বোনি ও মেরি রিড। জাতে ইংরেজ। তাদেরও গল্প অতিশয় চিত্তাকর্ষক, কিন্তু আমরা বোম্বেটেদের ইতিহাস লিখতে বসিনি। ভূমিকার জন্য যতটুকু চাই, ততটুকু ইঙ্গিতই দিলুম, আপাতত এ সম্বন্ধে আর বেশি বাক্যব্যয় করবার দরকার নেই। এইবার মূল কাহিনী শুরু করা যাক।

    যার কথা বলব তার আসল নাম হচ্ছে এডওয়ার্ড টিচ, কিন্তু কালোদেড় ডাকনামেই সে সর্বত্র পরিচিত (যেমন কুখ্যাত মুসলমান বোম্বেটে উরুজ পরিচিত ছিল ‘লালদেড়ে’ ডাকনামে)। সে কেবল স্পেন ও ফ্রান্সের শক্রই ছিল না, নিজের জাতভাই ইংরেজদেরও সুবিধা পেলে ছেড়ে দিত না এবং সমগ্র ওয়েষ্ট ইণ্ডিজ দ্বীপপুঞ্জ তার নাম শুনলেই ভয়ে কেঁপে সারা হত। আঠারো শতাব্দীর প্রথম দিকেই তার উত্থান এবং পতন। আমেরিকায় তখন ইংরেজদেরই রাজত্ব।

  • সিরাজের বিজয় অভিযান

    সিরাজের বিজয় অভিযান

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    সিরাজের বিজয় অভিযান : এক

    এই অঞ্চলেই আগে ছিল প্রাচীন কর্ণসুবর্ণ। তারপর তার নাম হয় মাকসুসাবাদ, তারপর মুর্শিদাবাদ।

    মহানগরী মুর্শিদাবাদ।

    স্বাধীন বাংলার শেষ রাজধানী। বিস্ময়-বিমুগ্ধ ক্লাইভ যাকে দেখে লন্ডনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

    আজ সেখানে গেলে দেখা যায়, ধুলায় ধূসর হয়েছে তার গর্বোদ্ধত শির। যে ধুলার বিছানায় পড়ে আছে কঙ্কালসার মুর্শিদাবাদের জরাজীর্ণ মৃতদেহ, সেই ধুলার সঙ্গে কিন্তু মিশে আছে সুদূর এবং নিকট অতীতের কত মানুষের স্মৃতি!

    হিন্দুদের হর্ষবর্ধন, শশাঙ্ক, মহীপাল, রানি ভবানী ও মোহনলাল এবং মুসলমানদের হোসেন শা, মুরশিদকুলি খাঁ, আলিবর্দি খাঁ, মিরমদন—

    এবং সিরাজউদ্দৌলা।

    মিরজাফর ও মিরকাসিম বাংলায় নকল নবাবির অভিনয় করেছিলেন মাত্র। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব হচ্ছেন সিরাজউদ্দৌলা।

    কয়দিনই বা তিনি সিংহাসনে বসবার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয় মাত্র আঠারো বৎসর বয়সে। কিন্তু এর মধ্যেই তাঁর নাম করেছে অমরত্ব অর্জন। কারণ? তিনি ছিলেন স্বাধীনতা-যজ্ঞের পুরোহিত।

    বালক সিরাজের ছিল যথেষ্ট বালকতা, প্রচুর দুর্বলতা। সেজন্যে তাঁর নামে শোনা যায় অনেক কুৎসা। কিন্তু সেই নিন্দার খোলস থেকে মুক্ত করে নিলে আমরা যে সিরাজের দেখা পাই, তিনি হচ্ছেন সোনার বাংলার খাঁটি ছেলে। দেশমাতৃকার পায়ে পরাবার জন্যে যখন ফিরিঙ্গি দস্যুরা শৃঙ্খল প্রস্তুত করছিল এবং যখন সেই অপকর্মে তাদের সাহায্য করবার জন্যে এগিয়ে এসেছিল হিন্দু ও মুসলমান দেশদ্রোহীর দল, সিরাজ তখন তাদের বাধা দিয়েছিলেন প্রাণপণে। আমাদের দুর্ভাগ্যক্রমে তিনি পণরক্ষা করতে পারলেন না, তাঁকে দিতে হল প্রাণ।

    এই প্রাণদান, এই আত্মদানের জন্যেই সিরাজের নাম আজ মহনীয়, বরণীয় এবং স্মরণীয়। স্বদেশের জন্যে সিরাজ দিয়েছিলেন বুকের শেষ রক্তবিন্দু।

    এই জন্যেই সিরাজের সব দোষ ভুলে লোকে আজও তাঁর জন্যে চোখের জল ফেলে পরমাত্মীয়ের মতো এবং এইজন্যেই সিরাজের মৃতদেহ আজও যেখানে ধুলার সঙ্গে ধুলা হয়ে মিশিয়ে আছে, একদিন আমি সেখানে ছুটে গিয়েছিলুম তীর্থযাত্রীর মতো।

    সেখানে গিয়ে কানে শ্রবণ করলুম অতীতের গৌরববাহিনী বাণী, প্রাণে অনুভব করলুম স্মৃতির চিতাগ্নিজ্বালা, মানসচোখে দর্শন করলুম পলাশির রক্তাক্ত দুঃস্বপ্ন।

    আগে সেই কথা বলব।

  • তিন সম্রাটের ত্র্যহস্পর্শযোগ

    তিন সম্রাটের ত্র্যহস্পর্শযোগ

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    তিন সম্রাটের ত্র্যহস্পর্শযোগ : বিষবৃক্ষের বীজ

    দিগবিজয়ী তৈমুর লং এদিকে-ওদিকে-সেদিকে লুব্ধ দৃষ্টি সঞ্চালন করলেন, কিন্তু পৃথিবীর কোথাও একজন মাত্রও যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেখতে পেলেন না।

    —গর্বিত শ্বেতাঙ্গদের দেশ ইউরোপেও নয়। তাঁর হাতে রুশিয়ার ভয়াবহ দুরবস্থা দেখে শ্বেতাঙ্গদের প্রাণ ভীষণ ভয়ে থরহরি কম্পমান।

    তখনকার ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী নরপতি ছিলেন স্পেনের অধিপতি। তিনি তো ভেট পাঠিয়ে মোসাহেবি করতে চান।

    তৈমুর লং স্পেনকে আশ্বাস দিয়ে বলেন,—আচ্ছা, আচ্ছা, তুমি নির্ভয় হও। সমুদ্রে বড় মাছের সঙ্গে ছোট মাছরাও বাস করতে পারে।

    আচম্বিতে তাঁর দৃষ্টি আবিষ্কার করলে টিকিধারী চিনাদের মুল্লুক। কেবল ওকেই জয় করতে বাকি আছে। তৎক্ষণাৎ ঘোর রবে হতে লাগল ঘন ঘন তূর্যধ্বনি—বাজতে লাগল ডিমিডিমি রণডঙ্কা—ধেয়ে এল মেদিনী থরথরিয়ে পঙ্গপালের মতো সৈন্যদলের পর সৈন্যদল।

    তৈমুর লং খাপ থেকে তরোয়াল খুলে পদভারে মাটি কাঁপিয়ে সদম্ভে অগ্রসর হলেন। বার্ধক্যে তিনি তখন প্রায় অন্ধ।

    তারপর—

    তারপর বেশ খানিকদূর এগিয়ে গিয়ে সর্বজয়ী মৃত্যুর আলিঙ্গনে আবদ্ধ হলেন—পথের উপরে তাঁর অসাড় হাত থেকে খসে পড়ল দিগবিজয়ীর রক্তস্নাত তরবারি। ধনেপ্রাণে বেঁচে গেল চিনদেশ। সেখানে আর হাজার-হাজার নরমুণ্ড সাজিয়ে পিরামিড গড়া হল না।

    দেশের পর দেশ রক্তপ্লাবনে ডুবিয়ে, নরমুণ্ডের পিরামিডের পর পিরামিড সাজিয়ে তৈমুর লং যে বিষবৃক্ষের বীজ বপন করেছিলেন এইবারে ক্রমে ক্রমে তার ফলফসল ফলতে আরম্ভ করলে।

    তাঁর বংশধররা সিংহাসন নিয়ে সাংঘাতিক বিবাদ করতে লাগল—সহোদর আর সহোদরকে মানলে না। পৃথিবীর নানা দেশের রাজপরিবারে বিভিন্ন সময়ে এমন ব্যাপার দেখা গেছে বটে, কিন্তু আর কোনও বংশেই ব্যাপারটা এমন ধারাবাহিকভাবে অবশ্যপালনীয় ঐতিহ্যের মতো হয়ে ওঠেনি।

    তৈমুরের বংশে পুরুষানুক্রমে বারংবার দেখা গিয়েছে ভাইয়ে ভাইয়ে হানাহানি—এমনকী সে বংশে পিতাপুত্রের সম্পর্কও প্রায়ই অহি-নকুল সম্পর্কের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    ফলে তৈমুরের মৃত্যুর পরেই তাঁর বিপুল সাম্রাজ্য খণ্ড খণ্ড ও ছারখার হয়ে যায়।

    তাঁর এক উত্তরপুরুষ রাজপুত্র বাবর স্বদেশ ছেড়ে আফগানিস্তানে গিয়ে রাজ্য স্থাপন করলেন এবং পরে তিনিই হলেন ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা।

    তাঁর পুত্র হুমায়ুনের কোনও ভাই ছিল না। তাই বোধ করি সিংহাসন নিয়ে কোনও মারামারি কাটাকাটি হয়নি।

    তাঁর পুত্র আকবরও পিতার একমাত্র সন্তান। সুতরাং ভ্রাতৃবিরোধের প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু তিনি সন্তান-সৌভাগ্য লাভ করতে পারেননি। তাঁর পুত্র সেলিম (পরে জাহাঙ্গির নামে সিংহাসনে আরোহণ করেন) বিদ্রোহী হয়েছিলেন।

    তারপর থেকেই কাকে রেখে কাকে বাদ দেব? পিতৃদ্রোহ ও ভ্রাতৃবিরোধ মোগল রাজবংশে যেন একটা বাঁধাধরা রীতি হয়ে ওঠে—প্রজাদের সঙ্গে বেমালুম মিশে যায় রাজরক্ত এবং এসব কথা এতবার অসংখ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থে সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে যে, এখানে তা নিয়ে বাক্যব্যয় করা বাহুল্যমাত্র।

    যে সাজাহানের শেষ জীবনের ট্র্যাজেডি আমাদের চক্ষু অশ্রুজলে পূর্ণ করে তোলে, তিনিও যৌবনে পিতার আজ্ঞাবহ পুত্রের মতো জীবনযাপন করেননি। বিদ্রোহী হয়ে পিতা জাহাঙ্গির বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছিলেন, পরে যুদ্ধে হেরে ভালোমানুষ সাজতে বাধ্য হয়েছিলেন। এবং তিনি ভ্রাতৃহত্যাতেও হস্ত কলঙ্কিত করতে ছাড়েননি।

    তাঁরই যোগ্য পুত্র ঔরঙ্গজিব। বৃদ্ধ ও অক্ষম পিতাকে শেষজীবনের কয়েকটা বৎসরের জন্যে কারাগারে নিক্ষেপ করে তিনি রক্তের মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন। দুই সহোদরকে হত্যা ও আর এক সহোদরকে চিরদিনের মতো ভারত থেকে বিতাড়িত করে তবে ক্ষান্ত হয়েছিলেন।

    যথার্থ পক্ষে ধরতে গেলে মোগল রাজবংশের শেষ পরাক্রান্ত সম্রাট হচ্ছেন বাহাদুর শাহ। সিংহাসন পাওয়ার পর তাঁর রাজত্বকাল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি বটে, কিন্তু ঔরঙ্গজিবের পুত্র হয়ে সিংহাসন অধিকার করার সময়ে তিনিও বংশগত ধারা বজায় রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে তিনি প্রায় ইচ্ছার বিরুদ্ধেই ভ্রাতৃবিরোধে ও খুনখারাবিতে যোগদান না করে পারেননি।

    তারপরেও মোগল রাজপরিবারে ভ্রাতৃবিরোধ ও খুনোখুনি একটা অবশ্যম্ভাবী কাণ্ড হয়ে ওঠে এবং যে-কারণে তৈমুরের সাম্রাজ্য ছারখার হয়ে যায়, তৈমুরের বংশধরদের নির্বুদ্ধিতার জন্যে মোগল সাম্রাজ্যেরও অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয় ঠিক সেই কারণেই।

  • সাতহাজারের আত্মদান

    সাতহাজারের আত্মদান

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    সাতহাজারের আত্মদান

    আজ তোমাদের কাছে অতীত ভারতের এক বিচিত্র গৌরব কাহিনি বলব। প্রায় দুই হাজার সাড়ে তিনশো বৎসর আগেকার কথা। কিন্তু রূপকথা নয়, সত্য কথা।

    তোমরা সবাই জানো, প্রাচীন হিন্দু ভারতবর্ষে কেউ ইতিহাস লিখত না, তাই আমাদের অধিকাংশ কীর্তিকলাপ চিরকালের জন্যে লুপ্ত হয়ে গেছে। আজকের ঐতিহাসিকরা মাটি খুঁড়ে সেকালের নানা জিনিস ও ভাঙা স্তূপ আবিষ্কার করে এবং পাথরের লিখন ও পুরাতন মুদ্রা প্রভৃতি দেখে প্রাচীন ভারতের কিছু কিছু ইতিহাস জানতে পেরেছেন বটে, কিন্তু সে আর কতটুকু? শতাংশের একাংশও নয়। রামায়ণ ও  মহাভারতে আমরা হিন্দু ভারতবর্ষকে দেখতে পাই; কিন্তু তাদের মধ্যে আছে কতখানি ইতিহাস আর কতখানি কবিকল্পনা, সে সত্য আর কিছুতেই বোঝবার উপায় নেই।

    আজ সে সত্য গল্পটি বলব, সেটিও আমরা বলতে পারতুম না—গ্রিক ঐতিহাসিকরা যদি তা লিখে না রাখতেন। প্রাচীন ভারতের সত্যিকার ইতিহাস আরম্ভ হয়েছে গ্রিক ঐতিহাসিকদেরই দৌলতে। তাঁরা না থাকলে পুরুর বীরত্ব, চন্দ্রগুপ্তের দিগবিজয়, অশোকের মাহাত্ম্য এবং বিপুল মৌর্য সাম্রাজ্যের অসাধারণতার কথা আজ আমরা এত ভালো করে জানতে পারতুম না। এজন্যে গ্রিক ঐতিহাসিকদের কাছে আমাদের চিরকৃতজ্ঞ হয়ে থাকতে হবে।

    যখনকার কথা বলছি, তখন গ্রিক দিগবিজয়ী আলেকজান্ডার এসেছেন ভারত জয় করতে। তখন তিনি ভারতের যে প্রান্তে অবস্থান করছিলেন, আজ সে স্থানকে আমরা আফগানিস্তান বলে ডাকি। কিন্তু সে-সময়ে ওখানে বাস করত কেবল হিন্দুরাই। পৃথিবীতে তখন একজনও মুসলমান ছিল না, কারণ মুসলমান ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হজরত মহম্মদই জন্মেছিলেন আরও নয় শতাব্দী পরে।

    ভারত সীমান্তে তখন মাসাগা নামে একটি প্রকাণ্ড নগর ও সুরক্ষিত দুর্গ ছিল। মাসাগা নামটি হচ্ছে গ্রিক। তার এদেশি নাম কী ছিল, জানা না। মাসাগার রাজা ছিলেন বীর ও স্বদেশভক্ত। আলেকজান্ডারের বিপুল সৈন্যবল দেখেও তিনি ভয় পেলেন না, অসম্ভবের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে জেনেও, ভারতের প্রবেশপথে বিদেশি ও বিধর্মী শত্রুকে বাধা দিলেন প্রচণ্ড বিক্রমে।

    আলেকজান্ডারের সঙ্গে ছিল লক্ষাধিক সৈন্য। কেউ বলেন, দেড় লক্ষ; কেউ বলেন, আরও বেশি। তারা মাসাগা দুর্গকে চারিধার থেকে ঘিরে ফেলল।

    দুর্গ বেষ্টন করে ছিল ইট, পাথর ও কাঠে গড়া উঁচু এক প্রাচীর।

    তারই আড়ালে বসে মাসাগার সৈন্যরা দুর্গ রক্ষা করতে লাগল, দিনের পর দিন।

    গ্রিকরা দিকে দিকে দুর্গের প্রাচীরের চেয়ে উঁচু সব মঞ্চ তৈরি করে কেল্লার ভিতরে রাশি রাশি অস্ত্র নিক্ষেপ করতে লাগল।

    মাসাগার এক ধনুকধারী একদিন দুর্গ-প্রাচীরে বসে আলেকজান্ডারকে দেখতে পেলে। তখনই ধনুক তুলে লক্ষ্য স্থির করে সে তির ছুড়লে। তির সোজা গিয়ে আঘাত করলে আলেকজান্ডারকে। গ্রিক সৈন্যরা সভয়ে হাহাকার করে উঠল। তারপর দেখা গেল, আলেকজান্ডার আহত হয়েছেন বটে, কিন্তু মারাত্মক ভাবে নয়। তির যথাস্থানে গিয়ে বিঁধলে গ্রিকদের দিগবিজয়ের স্বপ্ন ফুরিয়ে যেত সেই দিনেই।

    কিন্তু ভাগ্যদেবী ভারতবর্ষের প্রতি এমন সুপ্রসন্ন হলেন না। হঠাৎ একদিন মাসাগার রাজা শত্রুদের মঞ্চের উপর থেকে নিক্ষিপ্ত অস্ত্রে আহত হয়ে মাটির উপরে লুটিয়ে পড়লেন এবং সেই বীর-শয্যা ছেড়ে আর উঠলেন না। রাজার মৃত্যুতে মাসাগার সৈন্যরা হতাশ হয়ে খুলে দিলে দুর্গদ্বার।

    মাসাগার পতন হল—গ্রিকদের সামনে খুলে গেল ভারতের সিংহদ্বার।

    মাসাগার বিধবা রানি রাজকুমারের হাত ধরে আলেকজান্ডারের সামনে এসে মার্জনা প্রার্থনা করলেন।

    আলেকজান্ডার তাঁকে কেবল মার্জনাই করলেন না, রানির রূপ দেখে তাঁকে বিয়েও করে ফেললেন।

    রানির দেশি নাম জানি না, কিন্তু গ্রিক ইতিহাসে তাঁকে ক্লিওফিস বলে ডাকা হয়। যদিও তখনকার ভারতে বিধবা বিবাহ প্রচলিত ছিল, তবু খুব সম্ভব আলেকজান্ডার তাঁকে জোর করেই বিবাহ করেছিলেন। অবশ্য সেকালে দুই জাতির মধ্যে এরকম বিবাহের সম্পর্কও খুব একটা নতুন ব্যাপার ছিল বলে মনে হয় না। কারণ, এরই কয়েক বৎসর পরে ভারত-সম্রাট চন্দ্রগুপ্তও বিবাহ করেছিলেন আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলিউকাসের মেয়েকে।

    ক্লিওফিসের গর্ভে আলেকজান্ডারের যে ছেলে হয়, তারও নাম আলেকজান্ডার কিন্তু এ সব কথা এখন থাক।

    গ্রিকদের বাধা দেবার জন্যে মাসাগার রাজা পঞ্চনদের দেশ বা পাঞ্জাব থেকে কয়েক হাজার হিন্দু সৈন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। এরা ছিল যুদ্ধ-ব্যবসায়ী অর্থাৎ মাহিনা পেলে এরা যে-কোনও রাজার হয়ে লড়াই করত। সেকালে এমন পেশাদার সৈন্য পৃথিবীর সব দেশেই ছিল। পারস্য-সম্রাট দরায়ুসের সঙ্গে আলেকজান্ডারের যখন যুদ্ধ হয়, তখন পারসিদের হয়ে অস্ত্রবরণ করেছিল প্রায় তিরিশ হাজার হিন্দু সৈন্য।

    কিন্তু ভারতের পঞ্চনদের তীর থেকে যেসব পেশাদার সৈন্য মাসাগার দুর্গ রক্ষা করতে গিয়েছিল, পেটের দায়কেই তারা যে বড় করে দেখেনি, গ্রিক ঐতিহাসিকদের লেখনী সেকথা স্পষ্ট ভাষায় লিখে রেখেছে।

    মাসাগার পতনের পরে যুদ্ধ-ব্যবসায়ী ভারতীয় সৈন্যরা মাসাগা থেকে বেরিয়ে নয় মাইল দূরে গিয়ে একটি ছোট পাহাড়ের উপরে তাঁবু ফেললে। সংখ্যায় তারা সাত হাজার। সেকালের প্রথামতো তাদের সঙ্গে ছিল স্ত্রী-পুত্র-কন্যা প্রভৃতি। পরিবারবর্গ নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রথা ভারতবর্ষে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। যুদ্ধে পরাজিত পক্ষের নারীদের অবস্থা যে কী শোচনীয় হত, ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দের পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে তার জ্বলন্ত প্রমাণ পাওয়া যায়।

    মাসাগার ভারতীয় সৈন্যদের দলপতির নাম কী ছিল, গ্রিক ইতিহাস তা বলেনি। আমরা তাঁকে উপগুপ্ত ও তাঁর স্ত্রীকে ধীরা বলে ডাকব।

    আলেকজান্ডারের কাছ থেকে দূত এসে জানালে, ‘উপগুপ্ত, আমাদের সম্রাট তোমাদের কোনও অনিষ্ট করবেন না। কিন্তু তোমাদের সাহায্য তিনি চান।’

    উপগুপ্ত বিস্মিত স্বরে বললেন, ‘গ্রিক সম্রাট চান আমাদের সাহায্য! তার মানে?’

    —‘সম্রাট আলেকজান্ডার উপযুক্ত বেতন দিয়ে তোমাদের গ্রহণ করতে চান।’

    —‘অর্থাৎ তোমাদের সম্রাটের ইচ্ছা, আমরা ভারতবাসী হয়েও ভারতবাসীর সঙ্গে লড়াই করব?’

    —‘হ্যাঁ।’

    —‘অসম্ভব!’

    —‘কেন? তোমরা তো পেশাদার।’

    —‘হতে পারে যুদ্ধ আমাদের পেশা। সেটা হচ্ছে পেটের দায়ে। কিন্তু পেটের দায়ে হিন্দু হয়েও আমরা হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে পারব না।’

    —‘পেশাদার সৈনিকদের স্বদেশ নেই। বহু গ্রিক পারসিদের মাহিনা খেয়ে গ্রিসের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছে।’

    —‘গ্রিকরা যা পারে, হিন্দু তা পারে না।’

    —‘বেশ। তাহলে সম্রাটের কাছে গিয়ে তোমার কথা জানাইগে।’

    পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে উপগুপ্ত দেখলেন, দূরের এক শৈল-শিখরের পিছনে সূর্য ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। নীচে নদী, বন, উপত্যকার উপরে দুলছে কুয়াশার স্বচ্ছ পরদা। এখনই চারিদিকে বিছিয়ে যাবে সন্ধ্যার কালো অঞ্চল।

    কয়েকজন সৈনিক কাছে এসে দাঁড়াল। একজন জিজ্ঞাসা করলে, ‘সরদার, গ্রিক দূত কী বলতে এসেছিল?’

    উপগুপ্ত বললেন, ‘গ্রিক সম্রাট আমাদের চাকরি দিতে চান।’

    সৈনিকরা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, ‘আমরা যবনের চাকরি করব না।’

    সেই চিৎকার শুনে শিবিরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন ধীরা।

    উপগুপ্ত তাঁর দিকে ফিরে হাসতে হাসতে বললেন, ‘শুনছ ধীরা! অতবড় যে গ্রিক সম্রাট, সৈনিকরা তাঁরও অধীনে চাকরি করতে চায় না!’

    ধীরা জ্বলন্ত চক্ষে বললেন, ‘গ্রিক সম্রাটের চাকরি করার মানেই হচ্ছে হিন্দুস্থানের শত্রু হওয়া। স্বামী, আমিও সৈনিকদের পক্ষে।’

    উপগুপ্ত তেমনই হাস্যমুখেই বললেন, ‘দেখছি তোমরা সকলেই একমত! খুব ভালো! আমিও তাই বলি। বেশ, আপাতত তোমরা খানিকক্ষণ বিশ্রাম করে নাও। আজ শেষরাতেই আমরা তাঁবু তুলে দেশে ফিরে যাব।’

    ধীরা বললেন, ‘তারপর নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে গ্রিক সম্রাটকে অভ্যর্থনা করব!’

    সৈনিকরা উচ্চকণ্ঠে বললে, ‘জয়, হিন্দুস্থানের জয়!’

    নিজের শিবিরে বসে আলেকজান্ডার হয়তো সেই জয়ধ্বনি শুনতে পেলেন।

    মধ্য রাত্রি। আকাশের চাঁদ যেন কি এক আসন্ন অশুভের আশঙ্কায় পাণ্ডু মুখে তাকিয়ে আছে পৃথিবীর দিকে! পৃথিবীও যেন ভয়ে বোবা। কেবল বনের গাছে গাছে, পাতায় পাতায় শোনা যাচ্ছে বাতাসের অস্ফুট আর্তনাদ।

    আচম্বিতে নিশীথিনীর স্তব্ধ বুক কেঁপে উঠল অসংখ্য কণ্ঠের বিকট হুঙ্কারে ও কাতর চিৎকারে। চারিদিকে পদশব্দ, অস্ত্রাঘাতের ধ্বনি!

    ধীরা ধড়মড় করে বিছানার উপরে উঠে বসলেন। কান পেতে বাইরের সেই ভয়াবহ গোলমাল শুনলেন। তারপর তাড়াতাড়ি বাইরে ছুটে গেলেন।

    মিনিট খানেক পরেই বেগে আবার তাঁবুর ভিতরে ফিরে এসে ধীরা দেখলেন, উপগুপ্ত জেগে হতভম্বের মতো বসে আছেন।

    ধীরা ব্যস্ত স্বরে বললেন, ‘স্বামী, স্বামী! গ্রিকরা আমাদের গোপনে আক্রমণ করেছে। ঘুমন্ত হিন্দুদের হত্যা করছে!’

    তাঁবুর বাইরে থেকে হিন্দু সৈনিকদের চিৎকার শোনা গেল—’বিশ্বাসঘাতকতা, বিশ্বাসঘাতকতা!’—’অস্ত্র ধরো, অস্ত্র ধরো!’

    ততক্ষণে উপগুপ্ত তরবারি ও বর্শা নিয়ে তাঁবুর দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। সেইখান থেকে তিনি ফিরে বললেন, ‘কিন্তু ধীরা, তুমি যে একলা থাকবে?’

    ধীরা হেঁট হয়ে মেঝে থেকে একখানা তরবারি তুলে নিয়ে বললেন, ‘যাও প্রভু, যুদ্ধ করো! আমি একলা নই—এই তরবারিই আমার সঙ্গী, আমার রক্ষাকর্তা।’

    উপগুপ্ত বাহিরে গিয়ে দাঁড়াতেই দুজন গ্রিক তাঁর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। হ্যাঁ, ঝাঁপিয়ে পড়ল; কিন্তু তাঁর উপরে, না মৃত্যুমুখে? কারণ পরমুহূর্তেই দেখা গেল, উপগুপ্তের বর্শা ও তরবারির রক্তাক্ত চিহ্ন বক্ষে ধারণ করে দুজন গ্রিকই মাটিতে পড়ে ছটফট করছে!

    উপগুপ্ত তাকিয়ে দেখলেন, কেবল পাহাড়ের উপরে নয়—নীচে, সমতল ক্ষেত্রে যতদূর চোখ যায় ততদূর পরিপূর্ণ করে ছুটে আসছে হাজার হাজার গ্রিক সৈন্য—সে যে কত হাজার, তার সংখ্যাই হয় না! চাঁদের ও শত শত মশালের আলোতে অগণ্য বিদ্যুৎ রেখার মতো জ্বলে উঠছে তাদের অস্ত্রফলকগুলো!

    একদল গ্রিক সৈন্য উপগুপ্তের দিকে এগিয়ে এল। হিন্দুরাও তখন সজাগ ও প্রস্তুত হয়ে তাদের সরদারের দুই পাশে এসে দাঁড়াল।

    সেনানীর পোশাকপরা এক গ্রিক বললে, ‘উপগুপ্ত, এখনও আমাদের কথা শুনলে তোমাদের ক্ষমা করা হবে।’

    উপগুপ্ত অবহেলার হাসি হেসে বললেন, ‘বিশ্বাসঘাতক দস্যুর দল! তোদের কথা শুনব? স্বদেশের শত্রু হব? কখনও নয়—কখনও নয়!’

    দলে দলে হিন্দু প্রতিধ্বনি করে আকাশ কাঁপিয়ে বললে, ‘কখনও নয়—কখনও নয়!’

    তারপরেই পিছন থেকে তীব্র নারীকণ্ঠে শোনা গেল—’ছুটে এসো হিন্দুনারী, ছুটে এসো! মান রাখো, প্রাণ দাও, যবন মারো।’

    সকলে ফিরে বিস্ময়মুগ্ধ চোখে দেখলে,—দলে দলে হিন্দুস্থানের বীর মেয়ে কেউ তরবারি, কেউ বর্শা, কেউ অন্য অস্ত্র নিয়ে দ্রুতপদে গ্রিকদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে—তাদের পুরোভাগে ধীরার মহিমময়ী মূর্তি!

    পরমুহূর্তে যেখানে যত হিন্দু সৈনিক ছিল, জাগ্রত সিংহের মতন গর্জন করে গ্রিকদের উপরে লাফিয়ে পড়ল!

    উপগুপ্ত দৃপ্তকণ্ঠে বললেন, ‘আমরা যুদ্ধ-ব্যবসায়ী, যুদ্ধ করতে করতেই মরব—প্রাণ থাকতে দেশের শত্রু হব না। জয়, হিন্দুস্থানের জয়!’

    তারপর যে দৃশ্যের অবতারণা হল ভাষায় তা বর্ণনা করা অসম্ভব!

    এক-একজন হিন্দুর বিরুদ্ধে দশ-দশজন গ্রিক! তবু আর্তনাদ উঠল কেবল গ্রিকদেরই দলে; হিন্দুরা প্রাণ নিতে ও প্রাণ দিতে লাগল হিন্দুস্থানের জয় গাইতে গাইতে!

    দেখতে দেখতে গ্রিক সৈন্য-সাগরের মধ্যে ছোট নদীর ধারার মতো ভারতের বীরপুরুষ ও বীরবালার দল কোথায় হারিয়ে গেল—কিন্তু তখনও শোনা যেতে লাগল অস্ত্রে অস্ত্রে ঝনৎকার, হিন্দু নরনারীদের অনাহত চিৎকার, ‘আমরা প্রাণ দেব, মান দেব না।’

    পেটের দায়ে তারা মান বিক্রয় করলে না, হিন্দুস্থানের জন্যে প্রাণই দান করলে। এও আমাদের কথা নয়, গ্রিক ঐতিহাসিক Arrian-এর কথা।

    পরদিন প্রভাতের সূর্য উঠে অবাক হয়ে দেখেছিল, ভারতবর্ষের সাতহাজার বীরপুরুষের মৃতদেহ, এবং তাদের আশেপাশে চিরনিদ্রার কোলে আশ্রয় নিয়েছিল শত শত বীরনারী। তাদের একজনও আত্মসমর্পণ করেনি।

    কোন দেশের ইতিহাসে স্বদেশানুরাগের এর চেয়ে গৌরবময় কাহিনি আছে? অথচ হিন্দু-বীরত্বের এই অপূর্ব কাহিনি আজকের হিন্দু ছেলেমেয়েদের কাছে বলে না। এ গল্প শুনিয়েছেন গ্রিকরাই—

    আমাদের লজ্জার কথা!

  • আলেকজান্ডারের পলায়ন

    আলেকজান্ডারের পলায়ন

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    আলেকজান্ডারের পলায়ন

    ভারতের শাসনদণ্ড হস্তগত করে ইংরেজ আমাদের কী শিক্ষা দিতে চেয়েছিল?

    ‘শৌর্যে-বীর্যে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে—সবদিক দিয়েই শ্বেতাঙ্গরা হচ্ছে শ্রেষ্ঠ এবং কৃষ্ণাঙ্গরা হচ্ছে নিকৃষ্ট।’

    কালি-কলমে ভারতের আধুনিক ইতিহাস আরম্ভ হয় গ্রিক দিগবিজয়ী আলেকজান্ডারের আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই।

    এবং তখন থেকেই ইংরেজি ইতিহাস আমাদের সগর্বে জানিয়ে দিতে চেয়েছে—আলেকজান্ডার ভারতবর্ষ জয় করে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন সগৌরবে।

    কিন্তু নিরপেক্ষ ইতিহাস কী বলে?

    আলেকজান্ডার ভারতে প্রবেশ করলেন এক লক্ষ বিশ হাজার পদাতিক ও পনেরো হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে (গ্রিক লেখক প্লুটার্কের মতে)। তারপর একে একে কয়েকজন ছোট ছোট নগণ্য রাজাকে হারাতে হারাতে এগিয়ে চললেন। প্রায় প্রত্যেক পরাজিত রাজাই তাঁকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে বাধ্য হলেন—ফলে গ্রিক সৈন্যেরা দলে রীতিমতো ভারী হয়ে উঠল। তারপর এই বিপুল বাহিনী নিয়ে আলেকজান্ডার আক্রমণ করলেন রাজা পুরুকে। তিনিও একজন স্থানীয় রাজা মাত্র—তাঁর সৈন্যসংখ্যা ছিল মোট পঞ্চাশ হাজার। কাজেই পুরুও গ্রিক শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারলেন না।

    এই যুদ্ধ ‘ঝিলামের যুদ্ধ’ নামে বিখ্যাত এবং এইটিই হচ্ছে ভারতের ভিতরে আলেকজান্ডারের সব চেয়ে বড় যুদ্ধ। বিদেশি ঐতিহাসিকদের অত্যুক্তির ফলে ঝিলামের যুদ্ধ ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

    কিন্তু ঝিলামের যুদ্ধ যে বিশেষভাবে স্মরণীয় নয়, আজ এই সত্য উপলব্ধি করবার সময় এসেছে। দুর্বল পুরু এবং প্রবল আলেকজান্ডার! এ তো কাঁসার বাসনের সঙ্গে মাটির বাসনের ঠোকাঠুকি! পুরু তো আলেকজান্ডারের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না! ঝিলামের যুদ্ধও ওয়াটার্লু, অস্টারলিটজ, পানিপথ বা পলাশির যুদ্ধের মতো চরম যুদ্ধ নয়। তার ফলে আসল ও বৃহত্তর ভারতবর্ষের পতন হয়নি! ঝিলামের যুদ্ধের ফলে আলেকজান্ডারের হস্তগত হয়েছিল উত্তর-পশ্চিম ভারতের এক অংশ মাত্র।

    আলেকজান্ডারের জীবনীলেখক প্লুটার্ক বলেছেন, প্রথম যৌবনে চন্দ্রগুপ্ত গ্রিক শিবিরে গিয়ে আলেকজান্ডারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

    চন্দ্রগুপ্ত তখন সহায়সম্পদহীন, মগধ থেকে নির্বাসিত। পিতৃরাজ্য মগধ পুনরুদ্ধার করবার জন্যেই তিনি অবলম্বন করতে চেয়েছিলেন গ্রিক দিগবিজয়ীকে।

    তিনি বলেছিলেন, ‘মগধ সাম্রাজ্যই হচ্ছে ভারতবর্ষের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আর শক্তিশালী। ভারতবর্ষ জয় করতে হলে আগে আপনাকে পরাজিত করতে হবে নন্দ রাজাকে।’

    আলেকজান্ডার তখন মুখে কিছু না বললেও মনে মনে যে সেই প্রস্তাবই কার্যে পরিণত করবেন বলে স্থির করেছিলেন, এমন অনুমানের কারণ আছে।

    ‘শনৈঃ পর্বতলঙ্ঘনম্!’ আলেকজান্ডারের মত রণকৌশলী সেনাপতির কাছে এটা অজ্ঞাত ছিল না যে, একেবারে মগধ সাম্রাজ্যের উপরে গিয়ে হানা দিলে পিছনে থেকে যাবে অনেক অপরাজিত শত্রু। একসঙ্গে সামনে ও পিছনে শত্রু রাখার মতো নির্বুদ্ধিতা আর নেই। তাই গন্তব্য পথের আশপাশে পড়ল যে সব ছোট ছোট রাজার রাজ্য, আলেকজান্ডার আগে তাদের দমন করতে লাগলেন।

    তারপর যখন পুরুর পতন হল, আলেকজান্ডার তখন বুঝলেন যে, ঝিলামের যুদ্ধ বিশেষ বড় যুদ্ধ না হলেও এর ফলে তাঁর পিছনে আর কোনও শত্রুর মতো শত্রু রইল না। এইবার নির্বিঘ্ন হল তাঁর মগধ যাত্রার বা ভারত বিজয়ের পথ।

    বর্তমান গুরুদাসপুর ও কাংগ্রা জেলার মাঝখানে যেখান দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ‘বিয়াস’ বা বিপাশা নদী, আলেকজান্ডার অগ্রসর হয়ে তারই তীরে শিবির স্থাপন করলেন।

    গ্রিক দিগবিজয়ীর চোখের সামনে নাচতে লাগল পারস্য সাম্রাজ্যের পর ভারত সাম্রাজ্যের সম্রাট উপাধি!

    নতুন করে যুদ্ধের আয়োজন আরম্ভ হল। ভারতীয় রাজারা আরও সৈন্য সাহায্য পাঠাতে লাগলেন, এমনকি পরাজিত রাজা পুরুও এলেন পাঁচ হাজার সৈন্য ও রণহস্তী প্রভৃতি নিয়ে স্বয়ং! দুদিন আগেই যিনি স্বদেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে প্রাণপণে অস্ত্রধারণ করেছিলেন, যবনের পক্ষ নিয়ে আজ তিনি হলেন ভারতবর্ষের শত্রু!

    পুরুকে আমরা স্বদেশপ্রেমিক বীর বলে অতুলনীয় সম্মান দিয়েছি, কিন্তু তাঁর চরিত্রের এই দুর্বলতার দিকে আমাদের দৃষ্টি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়নি।

    আসলে সে যুগের স্বদেশপ্রেমই ছিল এমনি সংকীর্ণ। তখনকার রাজারা স্বদেশ বলতে বুঝতেন কেবল নিজের রাজ্যটকুই। ভারতবর্ষকে বৃহত্তর জন্মভূমি বলে তাঁরা ধারণায় আনতে পারতেন না।

    অনতিবিলম্বেই এই সত্য প্রথম বুঝিয়েছিলেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত, একচ্ছত্রের ছায়ায় এনে সমগ্র ভারতবর্ষকে। তিনিও পুরুর যুগের লোক, কিন্তু বিপুল প্রতিভার অধিকারী, তাই তাঁর দৃষ্টি ছিল প্রশস্ত।

    চন্দ্রগুপ্ত, অশোক, সমুদ্রগুপ্ত ও হর্ষবর্ধন প্রভৃতির দৃষ্টান্ত দেখেও ভারতবাসীরা কিছুই শিক্ষালাভ করেনি। আবার বার বার তারা একতার বন্ধনকে অস্বীকার করেছে এবং সেই সুযোগেই ভারতবর্ষে ইসলাম এবং ব্রিটিশ সিংহের প্রবেশ।

    যবনের কাছে নতি স্বীকার করে পুরু যথেষ্ট লাভবানও হয়েছিলেন। পুরু ছিলেন ছোট রাজা, কিন্তু আলেকজান্ডার তাঁর হাতে সমর্পণ করে যান সমগ্র পাঞ্জাব প্রদেশ। তবে তাঁর এ সৌভাগ্য স্থায়ী হয়নি। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর কিছু পরেই ইউডেমস নামে এক দুরাত্মা গ্রিক সেনানী পুরুকে হত্যা করে ভারত ছেড়ে পালিয়ে যায়।

    প্লুটার্ক বলেছেন : ‘মগধ অধিকার করার পর চন্দ্রগুপ্ত নাকি বলতেন, আলেকজান্ডার ইচ্ছা করলে খুব সহজেই গোটা দেশটাকে দখল করতে পারতেন, কারণ দেশের সমস্ত লোকই নীচবংশজাত ও নিষ্ঠুরচরিত্র বলে রাজাকে (নন্দকে) ঘৃণা করত!’

    কিন্তু এসব জেনেশুনেও এবং মগধ আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েও আলেকজান্ডার বিপাশা নদীর তীর থেকে আর অগ্রসর হলেন না কেন?

    ভাগেলা নামে এক স্থানীয় রাজা সংবাদ দিলেন, ‘মগধের অধীশ্বরের অধীনে আছে বিশ হাজার অশ্বারোহী, দুই হাজার রথারোহী, তিন-চার হাজার গজারোহী ও দুই লক্ষ পদাতিক সৈন্য।’ (ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ হিসাব করে দেখিয়েছেন আসলে মগধপতির সৈন্যবল ছিল এইরকম : ছয় লক্ষ পদাতিক, তিরিশ হাজার অশ্বারোহী, ছত্রিশ হাজার গজারোহী ও চব্বিশ হাজার রথারোহী, অর্থাৎ মোট ছয় লক্ষ নব্বই হাজার সৈন্য।)

    রাজা পুরুও মগধপতির বিপুল সৈন্যবলের কথা স্বীকার করলেন।

    আলেকজান্ডার মনে মনে নিশ্চয় চমকিত ও বিস্মিত হয়েছিলেন, তবে মুখে প্রকাশ করলেন না মনের ভাব। বাইরে তিনি করতে লাগলেন যুদ্ধের আয়োজন।

    কিন্তু টনক নড়ল অন্যান্য গ্রিক সেনানি ও সৈন্যগণের। পঞ্চাশ হাজার সৈন্যের অধিকারী রাজা পুরুকে বশ করতেই তাদের দস্তুর মতো হিমশিম খেতে হয়েছিল। তার আগে ও পরে নানা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের লোকক্ষয়ও হয়েছে যথেষ্ট। এখন এই রণক্লান্ত স্বল্পসংখ্যক লোক নিয়ে এই সুদূর বিদেশে প্রায় সাত লক্ষ তাজা ও শিক্ষিত সৈন্যের সঙ্গে শক্তি পরীক্ষা করতে হবে? না, অসম্ভব! দারুণ আতঙ্কে তাদের মন বিদ্রোহী হয়ে উঠল। না, না, তারা আর অগ্রসর হতে পারবে না!

    আলেকজান্ডারও ব্যাপারটা বুঝলেন। তিনি উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা দিয়ে সৈন্যদের সঙ্কুচিত বীরত্বকে আবার উৎসাহিত করে তুলতে চাইলেন। বললেন, ‘এগিয়ে চল আমার সঙ্গে, সারা এশিয়ার ঐশ্বর্য আমি তোমাদের পায়ের তলায় বিছিয়ে দেব!’

    কিন্তু কে বা শোনে কার কথা! সৈন্যেরা পাথরের মতো নীরব ও নিশ্চল!

    অনেকক্ষণ স্তব্ধতার পর এগিয়ে এলেন সেনাপতি কয়নস, ঝিলামের যুদ্ধে ইনিই পুরুর বিরুদ্ধে অশ্বারোহীদের চালনা করেছিলেন। তিনি বললেন, ‘মহারাজ, অতি জিনিসটা ভালো নয়, সমস্তরই সীমা আছে। ভেবে দেখুন মহারাজ, আমাদের কত সৈন্য রোগে বা যুদ্ধে মৃত আর কত লোক আহত হয়ে অকর্মণ্য। যারা এখনও সঙ্গে আছে তাদেরও স্বাস্থ্য ভেঙে গিয়েছে, তাদের পোশাক ছিন্নভিন্ন, অস্ত্রশস্ত্রও উন্নত নয়। এদের নিয়ে আবার অগ্রসর হলে নিয়তি আমাদের উপরে কখনওই প্রসন্ন হবে না।’

    কয়নসের উক্তি শুনে সেনাদলের প্রত্যেকেই উচ্চকণ্ঠে তাঁকে অভিনন্দিত করলে।

    সৈন্যদের এমন বিরুদ্ধতা কল্পনাতীত! আলেকজান্ডার একেবারে স্তম্ভিত! বুঝলেন এর পরেও গোঁ না ছাড়লে নিশ্চয়ই ওরা বিদ্রোহ প্রকাশ করবে! আর কয়নসও তো যুক্তিহীন কথা বলছেন না, তার যুক্তি উড়িয়ে দেওয়াও চলে না।

    ভারতবর্ষ জয় করবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাঁর মন থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেল। তিনি আর একটিমাত্র বাক্য উচ্চারণ না করে ধীরে ধীরে নিজের তাঁবুর ভিতরে গিয়ে ঢুকলেন। সেদিন গেল, তার পরের দিনও গেল, তাঁবুর ভিতর থেকে আলেকজান্ডারের কোনও সাড়া নেই। বোধহয় তিনি একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন।

    তৃতীয় দিনে তিনি আবার বাইরে এসে দাঁড়ালেন।

    সুযোগ বুঝে সুবিধাবাদী গণৎকারের দল এসে জানালেন, ‘মহারাজ, গুণে দেখলুম আর অগ্রসর হলে অমঙ্গলের আশঙ্কা!’

    আলেকজান্ডার নীরস কণ্ঠে বললেন, ‘হ্যাঁ, আর অগ্রসর হওয়া উচিত নয়। তাঁবু তোল, ফিরে চল।’

    কিন্তু প্রত্যাবর্তনের আগে আলেকজান্ডার আর একটি কাজ করে গেলেন। ভারতের ভিতরে তিনি কতদূর অগ্রসর হয়েছিলেন তার নিশানা রাখবার জন্যে বিপাশা নদীর তীরে বারোজন দেবতার নামে প্রতিষ্ঠিত করলেন বারোটি বেদি। প্রত্যেক বেদির উচ্চতা ছিল পঞ্চাশ ফুট। ওই দ্বাদশ দেবতার মধ্যে ছিলেন আমাদের সূর্যদেবও। বেদি প্রতিষ্ঠার পর দেবতাদের উদ্দেশ্যে পূজা ও অর্ঘ্য নিবেদন করা হল এবং সেই উপলক্ষ্যে গ্রিকদের জাতীয় ক্রীড়াকৌতুকও বাদ গেল না।

    তারপর আলেকজান্ডার করলেন স্বদেশের দিকে প্রত্যাবর্তন। কিন্তু আমরা যদি এই প্রত্যাবর্তনের নাম দিই—পলায়ন, তাহলে অন্যায় হবে কি? আরব্ধ কার্য শেষ না করে প্রত্যাবর্তনের নামান্তরই হচ্ছে পলায়ন। নেপোলিয়নের মস্কো থেকে প্রত্যাবর্তনও কি পলায়ন নয়?

    একজন নিরপেক্ষ গ্রিক ঐতিহাসিক স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন : ‘মগধাধিপতির ভয়ে আলেকজান্ডার ভারত জয় না করেই পলায়ন করেছিলেন।’

    এইটেই হচ্ছে সত্যকথা। আলেকজান্ডার পাঞ্জাব বিজেতা মাত্র। এবং তাঁর পক্ষে তাও সম্ভবপর হত কিনা সন্দেহ, একতাবদ্ধ পঞ্চনদে তখন যদি চন্দ্রগুপ্তের মতো কোনও বড় রাজা থাকতেন।

  • ওষ্ঠাধরে রাজদণ্ড

    ওষ্ঠাধরে রাজদণ্ড

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    ওষ্ঠাধরে রাজদণ্ড

    তো মরা অনেকেই হাসান-হুসেনের নাম শুনেছ, কিন্তু তাঁদের করুণ কাহিনি তোমাদের সকলেই জানো না বোধ হয়।

    হাসান আর হুসেন হচ্ছে দুই সহোদর, হজরত মহম্মদের দুই দৌহিত্র। চতুর্থ খলিফা আলি তাঁদের পিতা। আলির পরলোকগমনের পর হাসান অধিষ্ঠিত হন তাঁর আসনে। মুসলমানদের মধ্যে খলিফাই হচ্ছেন সর্বপ্রধান ব্যক্তি।

    হজরত মহম্মদের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন হাসান। এবং তাঁর চেহারাও ছিল অনেকটা হজরত মহম্মদের মতন দেখতে। প্রকৃতিতেও তিনি ছিলেন ন্যায়নিষ্ঠ, দয়ালু ও ধার্মিক। যুদ্ধবিগ্রহ ও রক্তপাত পছন্দ করতেন না।

    এমন লোকের খলিফার উচ্চাসন ভালো লাগতেই পারে না। কিছুদিন পরেই তিনি স্বেচ্ছায় সে আসন ত্যাগ করলেন। নতুন খলিফা হলেন মোয়াউইয়া।

    নতুন খলিফার পুত্রের নাম এজিদ। তিনি হাসানকে প্রীতির চোখে দেখতেন না। এজিদের ভয় ছিল, তাঁর পিতার মৃত্যুর পর হাসান আবার খলিফার আসন দাবি করতে পারেন। তাঁর ষড়যন্ত্রে অবশেষে হাসানকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হল (৬৬৯ খ্রিস্টাব্দ)।

    খলিফা মোয়াউইয়ার মৃত্যুকাল আসন্ন।

    পুত্র এজিদকে ডেকে তিনি বললেন, ‘বাছা, হুসেন হচ্ছে তোমার প্রধান প্রতিযোগী। কিন্তু সে সরল আর ন্যায়পরায়ণ—বিশেষ, সম্পর্কে তোমার ভাই হয়। অতএব যদি কখনও তাকে হাতের মুঠোর ভিতরে পাও, তার সঙ্গে সদয় ব্যবহার কোরো।’

    ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে এজিদ লাভ করলেন খলিফার উচ্চাসন। তিনি কবিতা রচনা করতে পারতেন বটে, কিন্তু মানুষ হিসাবে খাঁটি মানুষ ছিলেন না। তাঁর বিলাসিতা ছিল যথেষ্ট।

    প্রথমেই তাঁর জানবার আগ্রহ হল, হুসেন বিশ্বস্তভাবে তাঁর অধীনতা স্বীকার করবেন কিনা?

    হুসেন তখন মদিনা নগরে বাস করছেন। সেখানকার শাসনকর্তা ছিলেন ওয়ালেদ। তিনি এজিদের হুকুম পেয়ে স্থির করলেন, হুসেন যদি নতুন খলিফার অধীনতা স্বীকার না করেন, তাহলে তাঁর মুণ্ডপাত করা হবে।

    সৌভাগ্যক্রমে সময় থাকতেই হুসেন জানতে পারলেন এই চক্রান্তের কথা। সপরিবারে তিনি মক্কা শহরে গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং প্রকাশ্যে প্রচার করে দিলেন যে, খলিফার আসনের উপরে তাঁরই দাবি সব চেয়ে বেশি, সুতরাং কোনওমতেই তিনি এজিদের অধীনতা স্বীকার করতে পারেন না।

    একদিক দিয়ে বড় ভাই হাসানের সঙ্গে তাঁর কোনওই মিল ছিল না। হাসান যুদ্ধবিরোধী, হুসেন বিখ্যাত যোদ্ধা। রণক্ষেত্রে বহুবার পরীক্ষিত হয়েছে তাঁর দুর্দমনীয় বীরত্ব।

    কিউফা শহর থেকে এল অত্যন্ত সুখবর। সেখানকার বাসিন্দারা হুসেনকে সাদরে আহ্বান করতে চায়। তারা বলে পাঠালে, খলিফার আসনের ন্যায্য অধিকারী হচ্ছেন হুসেন, সুতরাং তিনি যদি সেখানে গমন করেন, তাহলে বাবিলনের সমস্ত লোক তাঁর জন্যে করবে অস্ত্রধারণ।

    খবরটা কতখানি সত্য তা জানবার জন্যে হুসেন তাঁর ভ্রাতৃসম্পর্কীয় মুসলিমকে কিউফায় পাঠিয়ে দিলেন। ইরাকের দুর্গম মরুভূমি পার হয়ে মুসলিম প্রায় একাকী বহুকষ্টে হাজির হলেন গিয়ে কিউফা শহরে। তারপর ক্রমে ক্রমে তাঁর কাছ থেকে যেসব খবর আসতে লাগল তা হচ্ছে এই :

    কিউফায় হুসেনের পক্ষপাতীরাই দলে ভারী। প্রথমে, সেখানে তাঁর জন্যে হাসতে হাসতে প্রাণ দিতে পারে এমন সশস্ত্র লোকের সংখ্যা ছিল আঠারো হাজার। তারপর, দিনে দিনে হাজার হাজার লোক এসে যোগ দিচ্ছে তাদের সঙ্গে। অবশ্য সংখ্যায় তারা হয়ে উঠল এক লক্ষ চল্লিশ হাজার! এমন সঙ্গোপনে সমস্ত কাজ করা হচ্ছে যে, শহরের উপরওয়ালারা ঘুণাক্ষরেও কিছু টের পায়নি,—সুতরাং হুসেন অনায়াসেই কিউফায় এসে সগৌরবে উত্তোলন করতে পারেন তাঁর পতাকা।

    কিন্তু দামাস্কাস নগরে বসে গুপ্তচরের মুখে সব খবর রাখছিলেন খলিফা এজিদ।

    বসোরার শাসনকর্তা আমির ওবিদাল্লা। খলিফার হুকুমে তিনি গেলেন কিউফা শহরে। সমস্ত চক্রান্ত ধরা পড়তে বিলম্ব হল না। ভালো করে তৈরি হবার আগেই বিদ্রোহীদের নিয়ে মুসলিম অস্ত্রধারণ করলেন বটে, কিন্তু ব্যর্থ হল তাঁর চেষ্টা। পরাজিত হয়ে বিদ্রোহীরা পলায়ন করলে, খলিফার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হল মুসলিমের ছিন্নমুণ্ড।

    ওদিকে মুসলিমের পত্র পেয়ে হুসেন নিজের কর্তব্য স্থির করে ফেলেছেন। নিঃসন্দিগ্ধ মনে তিনি কিউফায় যাবার আয়োজন করতে লাগলেন, কারণ মক্কা নগরে তখনও সেখানকার শেষ খবর পৌঁছোয়নি।

    বন্ধুরা বললেন, ‘সাবধান হুসেন, সাবধান। কিউফার বাসিন্দাদের বিশ্বাসঘাতকতার কথা প্রবাদের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওদের উপরে তুমি খুব বেশি নির্ভর কোরো না।’

    হুসেন বললেন, ‘না, আমি বিশ্বাস করি তারা আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না।’

    নিকট আত্মীয় আবদাল্লা ইবন আব্বাস বললেন, ‘নিতান্তই যদি যেতে চাও, পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে যেও না, ওরা মক্কাতেই থাক।’

    হুসেন বললেন, ‘ভবিষ্যৎ আছে ভগবানের হাতে। মেয়েরাও আমার সঙ্গে যাবে।’

    কয়েকজন পত্নী, পুত্র-কন্যা, ভগ্নী ও ছোট একদল সৈন্য নিয়ে হুসেন কিউফার দিকে যাত্রা করলেন।

    মক্কা থেকে বাবিলন, মাঝখানে তার কয়েকশত মাইলব্যাপী রৌদ্রদগ্ধ নির্জন মরুভূমির উপর দিয়ে হা হা করে বয়ে যাচ্ছে তৃষ্ণার্ত ও উত্তপ্ত বাতাস। দৈহিক কষ্ট আমলে না এনে সেই ভয়াবহ সুদীর্ঘ পথ পার হয়ে হুসেন অবশেষে সদলবলে বাবিলনের প্রান্তে এসে উপস্থিত হলেন।

    এক হাজার অশ্বারোহী নিয়ে দেখা দিলে একজন সেনানী।

    হুসেন শুধোলেন, ‘কে তুমি?’

    সেনানী বললে, ‘আমি হার্যো, আমির ওবিদাল্লা আমার প্রভু! তাঁর আদেশে আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে কিউফা নগরে!’

    হুসেন সগর্বে বললেন, ‘আমি ওবিদাল্লার হুকুম মানতে বাধ্য নই। আমি হচ্ছি আসল খলিফা, এখানে এসেছি কিউফার বাসিন্দাদের আমন্ত্রণে।’

    দুই পক্ষে কথা কাটাকাটি হচ্ছে, এমন সময়ে হল আরও চারিজন নতুন অশ্বারোহীর আবির্ভাব। তাদের মধ্যে একজন ছিল হুসেনের পরিচিত, নাম তার থিরমা।

    থিরমার মুখে পাওয়া গেল কিউফার সমস্ত দুঃসংবাদ। সেখানে এখন হুসেনের বন্ধু বলতে কেউ নেই!

    থিরমা পরামর্শ দিলে, ‘আমার সঙ্গে আপনি নাজাপ্রদেশের আজাপাহাড়ে চলুন। সেখানে দশ হাজার যোদ্ধা নিয়ে আপনি আত্মরক্ষা করতে পারবেন।’

    হুসেন বললেন, ‘না।’

    সদলবলে তিনি আবার এগিয়ে চললেন এবং সঙ্গে সঙ্গে চলল হার্যোর যোদ্ধারা। তারা বাধাও দিলে না, সঙ্গও ছাড়লে না।

    হুসেনের ভাবভঙ্গি এখনও স্বপ্নাচ্ছন্নের মতে। তাঁর মনের মধ্যে রয়েছে ভাবি অমঙ্গলের সূচনা। একদিন দেখলেন, তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল এক অশ্বারূঢ় মূর্তি। সে বললে, ‘মানুষরা পথে চলে রাত্রে। নিয়তিও নিশাচরী। সে আসে মানুষদের সঙ্গে দেখা করতে।’ মূর্তি আবার অদৃশ্য।

    হুসেন বললেন, ‘আজ মৃত্যুদূতের দেখা পেলুম।’

    ইউফ্রেটিস নদীতীর। আমির ওবিদাল্লার প্রেরিত চার হাজার সৈন্য নিয়ে আমার ইবন স্বাদ এসে হুসেনের পথরোধ করলেন।

    হুসেন বললেন, ‘কিউফার বাসিন্দাদের কথায় ভুলে আজ আমার এই বিপদ। এখন আমি আবার মক্কায় ফিরে যেতে চাই।’

    আমার এই খবর আমির ওবিদাল্লার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। আমিরের হুকুম এল : ‘সমস্ত সৈন্য নিয়ে ইউফ্রেটিস নদীকে আড়াল করে হুসেনের সামনে দাঁড়িয়ে থাক—যেন সে একফোঁটা জল না পায়। আগে সে খলিফা এজিদের বশ্যতা স্বীকার করুক, তারপর অন্য কথা।’

    দিনের পর দিন যায়, জলাভাবে জীবন বিষময়—তৃষ্ণায় সকলের ছাতি ফেটে যাবার মতো হয়। তবু হুসেন অটল। কিছুতেই তিনি খলিফা এজিদের কাছে নতিস্বীকার করবেন না।

    ওদিকে বিলম্ব দেখে আমির ওবিদাল্লা অধীর হয়ে উঠলেন। আমারের কাছে প্রেরণ করলেন আবার এক নতুন আদেশপত্র : ‘হুসেন যদি বশ না মানে, তবে তাদের সকলের উপর ঘোড়া চালিয়ে দাও। ঘোড়ার পায়ের তলায় তারা পিষে মরুক।’

    পত্রবাহক হল সামার নামে এক যোদ্ধা—প্রকৃতি তার উগ্র, নিষ্ঠুর, ভীষণ। তার উপরেও গুপ্ত আদেশ রইল : ‘আমার ইবন সাদ যদি হুকুম না মানে, তরবারির আঘাতে তার মুণ্ড উড়িয়ে দিয়ে সৈন্যদের ভারগ্রহণ কোরো তুমিই।’

    হজরত মহম্মদের নাতি কোনও বিপদে পড়েন, আমারের এমন ইচ্ছা ছিল না। আমিরের আদেশপত্র দেখিয়ে তিনি মিষ্ট কথায় হুসেনকে বোঝাবার জন্যে চেষ্টা করলেন যথেষ্ট।

    কিন্তু হুসেন অটল।

    আমার বলে গেলেন, ‘কাল সকাল পর্যন্ত ভাববার সময় রইল।’

    হুসেন তাঁবুর দরজার কাছে তরবারির উপরে ভর দিয়ে বসে রইলেন স্তব্ধ মূর্তির মতো। তাঁর চক্ষের উপরে আবার ঘনিয়ে এল জাগ্রত স্বপ্নের ছায়া।

    খানিকক্ষণ পরে আত্মস্থ হয়ে তিনি বললেন, ‘স্বপ্নে কাকে দেখলুম জান? মাহামহকে।’ তিনি আমাকে বললেন—’শীঘ্রই তুই আমার সঙ্গে স্বর্গবাসী হবি!’

    তাঁর ভগ্নী কেঁদে উঠে বললেন, ‘আমাদের মা, বাবা, দাদা হাসান মারা গিয়েছেন, এইবারে আমাদের পালা।’ বলতে বলতে তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

    নিজের বন্ধু ও অনুচরদের ডেকে হুসেন বললেন, ‘শত্রুরা খালি আমার জীবন চায়। আমাকে এখানে রেখে তোমরা চলে যাও, আমার জন্যে তোমরা মরবে কেন?’

    তারা একবাক্যে বললে, ‘ভগবান যেন আমাদের এমন দুর্মতি না দেন! তোমার মৃত্যুর পর আমরা বেঁচে থাকব? অসম্ভব!’

    হুসেন বললেন, ‘তবে এস, সকলে মিলে মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হই।’

    প্রার্থনার ভিতর দিয়ে কেটে গেল তাঁদের জীবনের শেষরাত্রি।

    কারবালার মাঠে হল প্রভাতসূর্যোদয়।

    বিশেষ কৌশলে তাঁবুগুলোকে সাজিয়ে, তাঁবুর দড়িগুলো এখানে-ওখানে বেঁধে বাধা সৃষ্টি করে, খাত খুঁড়ে হুসেন এমন ভাবে ব্যূহরচনা করেছেন যে, সামনের দিক ছাড়া আর কোনও দিক দিয়ে কেউ তার ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে না।

    হুসেনের সঙ্গে ছিল মাত্র চল্লিশজন পদাতিক ও বত্রিশজন অশ্বারোহী সৈনিক। শত্রুদের তুলনায় সংখ্যায় তারা তুচ্ছ বটে, কিন্তু তাদের প্রত্যেকেই ধর্মের জন্যে আত্মদান করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। স্নান সেরে পোশাক পরে আতর মেখে যোদ্ধারা হাসিমুখে বলাবলি করতে লাগল, ‘আর একটু পরেই আমরা মেলামেশা করব স্বর্গের হুরিদের সঙ্গে!’

    তিরিশজন অশ্বারোহী নিয়ে হার্যো এসে হুসেনকে বললে, ‘প্রথমে আমিই আপনাকে বাধা দিতে বাধ্য হয়েছিলুম বলে এখন আমার অনুতাপ হচ্ছে। ব্যাপারটা এমন হবে আমি জানতুম না। আপনি পয়গম্বরের বংশধর, আপনার জন্যে আমরাও প্রাণ দিতে প্রস্তুত।’

    আমারও হুসেনকে আক্রমণ করতে ইতস্তত করছেন দেখে বিভীষণ সামার ধনুকবাণ তুলে প্রথম অস্ত্র নিক্ষেপ করলে হুসেনের ব্যূহের মধ্যে।

    আরম্ভ হল শেষদৃশ্য।

    আমিরের সেনাদল ব্যূহের ভিতরে প্রবেশ করতে না পেরে দূর থেকেই তির ছুড়তে লাগল। মাঝে মাঝে আরব দেশের চিরাচরিত রীতি অনুসারে দুই পক্ষের দুইজন করে লোক এগিয়ে হাতাহাতি দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিযুক্ত হয়, কিন্তু সেরকম যুদ্ধে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরাজিত হতে লাগল আমিরের সৈনিকরাই।

    সামার শেষটা হুসেনের তাঁবুর ভিতর বর্শা চালিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বললে, ‘আগুন আনো! আগুন আনো! তাঁবু পুড়িয়ে দাও!’

    তাঁবুর ভিতর থেকে উচ্চস্বরে কাঁদতে কাঁদতে নারীরা সভয়ে বাইরে পালিয়ে এল।

    হুসেন চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, ‘জাহান্নমে যাও! তোমরা কি আমার পরিবারর্গকেও ধ্বংস করতে চাও?’

    সামার আবার পিছিয়ে গেল।

    অসংখ্য শত্রুর ধনুক থেকে ছুটে আসছে রাশি রাশি বাণ, এবং দলে দলে ধরাশায়ী হচ্ছে হুসেনের সঙ্গীরা। এ যুদ্ধ নয়, এ হচ্ছে নির্দয় হত্যাকাণ্ড! অবশেষে হুসেন দাঁড়িয়ে রইলেন প্রায় একাকীই। কিন্তু তবু কেউ ভরসা করে তাঁর কাছে গেল না—এমনই তাঁর তরবারির মহিমা।

    তাঁর কচি ছেলে আবদাল্লা, বাণবিদ্ধ হয়ে সেও মাটির উপর লুটিয়ে পড়ল। সেই কুসুমসুকুমার আহত দেহের রক্তধারা অঞ্জলি ভরে নিয়ে আকাশের দিকে নিক্ষেপ করে হুসেন বললেন, ‘হে আল্লা! তোমার সাহায্য থেকে আমাকে বঞ্চিত করেছ বটে, কিন্তু যারা এই নির্দোষ রক্তপাত করলে তাদের তুমি ক্ষমা কোরো না।’

    তারপর সামার সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সঙ্গীহীন হুসেনের উপরে। হুসেন মরিয়া হয়ে লড়তে লড়তে অনেক শত্রু বধ করলেন বটে, কিন্তু শেষটা রক্তহীন অবশ দেহে মাটির উপরে পড়ে গেলেন, আর উঠলেন না। তাঁর দেহের উপরে তিরিশ জায়গায় ছিল অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন এবং দেহের চৌত্রিশ জায়গায় ছিল থেঁতলে যাওয়ার দাগ। সামার তাঁর মুণ্ড কেটে নিয়ে অশ্বারোহীদের হুকুম দিলে, ‘এই দেহের উপর দিয়ে বার বার ঘোড়া চালিয়ে দাও—যেন এর চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট না থাকে।

    এই হত্যাকাণ্ডে মারা পড়েন হুসেনের বাহাত্তরজন সঙ্গী। শত্রুপক্ষে নিহত হয়েছিল অষ্টআশিজন এবং আহত হয়েছিল আরও বেশি লোক।

    হুসেনের ছিন্নমুণ্ড বহন করে সামার উপস্থিত হল রাজসভায়। ওবিদাল্লা হাতের দণ্ড দিয়ে আঘাত করলেন মুণ্ডের ওষ্ঠাধারের উপরে।

    একজন বৃদ্ধ সভাসদ বলে উঠলেন, ‘হা আল্লা! আমি যে স্বচক্ষে দেখেছি, পয়গম্বর তাঁর পবিত্র ওষ্ঠাধার দিয়ে চুম্বন করেছেন ওই ওষ্ঠাধর।’

  • মরা মানিক আর জ্যান্ত মানিক

    মরা মানিক আর জ্যান্ত মানিক

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    মরা মানিক আর জ্যান্ত মানিক

    বাবর তখন কাবুলের সিংহাসনে। তিনি দিল্লির সিংহাসন আক্রমণ করবার জন্যে তোড়জোড় করছিলেন।

    হাজারা হচ্ছে আফগানিস্তানের একটি ছোট রাজ্য। হাজারার সরদারের ছোট ভাইয়ের নাম মুকারাব খাঁ।

    বসন্তকালের একটি দিন। মুকারাব খাঁ দূরদেশ থেকে ফিরে আসছেন—সঙ্গে তাঁর ছয়জন অনুচর।

    হাজারার কেল্লা-প্রাসাদের সামনে এসে মুকারাব সবিস্ময়ে অনুভব করলেন, চারিদিকে বিরাজ করছে এক অস্বাভাবিক, থমথমে মৃত্যুস্তব্ধতা।

    আরও দুই-চার পা এগিয়ে তাঁর বিস্ময় পরিণত হল আতঙ্কে। যেদিকে তাকানো যায়, চোখে পড়ে খালি ভীষণ দৃশ্য! শত্রুর দেখা নেই, কিন্তু কোথাও পড়ে আছে ভাঙা বাক্স-প্যাঁটরা, কোথাও বইছে রক্তের ঢেউ, কোথাও নর-নারীর ভূতলশায়ী নিশ্চেষ্ট মৃতদেহ।

    ঘোড়া থেকে লাফিয়ে পড়ে মুকারাব নগ্ন তরবারি হাতে করে প্রহরীহীন প্রাসাদ-দ্বার দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন।

    উপরে উঠে একটি ঘরে ঢুকে তিনি স্তম্ভিত চোখে দেখলেন, মেঝের উপরে মৃত প্রহরীদের মাঝখানে পড়ে আছে তাঁর দাদার স্ত্রী ও শিশু-পুত্রের দেহ!

    মুকারাব হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলেন, ‘এ বীভৎস দুঃস্বপ্নের অর্থ কী?’

    ঘরের কোণে মৃতদেহের স্তূপের ভিতর থেকে টলতে টলতে কাঁপতে কাঁপতে এক বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন। মুকারাব চিনলেন, তিনি হচ্ছেন তাঁদের পরিবারের বিশেষ বন্ধু—বিশ্বস্ত এক মোল্লা বা পুরোহিত। তাঁরও সর্বাঙ্গ, রক্তাক্ত, ডান হাতের তিনটি আঙুল উড়ে গেছে, দেহের এক পাশেও গভীর ক্ষত—দেখলেই বোঝা যায়, তাঁর মৃত্যু আসন্ন।

    বৃদ্ধ ক্ষীণ স্বরে বললেন, ‘বাছা, তোমার দাদা কেল্লার সমস্ত সৈন্য নিয়ে যুদ্ধে বেরিয়ে সদলবলে মারা পড়েছেন। সেই অবকাশে কুখ্যাত দস্যু-দলপতি মনসুর এসে কেল্লায় ঢুকে আমাদের এই সর্বনাশ করে গেছে। কিন্তু ভগবানকে ধন্যবাদ, যে লোভে দুরাত্মা এখানে এসেছিল তার সে লোভ ব্যর্থ হয়েছে! হাজারার পদ্মরাগমণি সে নিয়ে যেতে পারেনি—এই নাও, তোমার হাতে আমি তা সমর্পণ করছি!’ কোমরবন্ধের ভিতর থেকে মণি বার করে দিয়েই বৃদ্ধ আবার মাটির উপরে লুটিয়ে পড়লেন—সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রাণ বেরিয়ে গেল।

    হাজারার মহামূল্যবান পদ্মরাগমণি—এর নাম ফেরে লোকের মুখে মুখে! সাত রাজার ধন মানিক বলতে যা বুঝায়, এ হচ্ছে তাই। সকলেরই লোভী দৃষ্টি পাগল হয়ে ওঠে তাকে লাভ করবার জন্যে।

    মণিখানি হাতে নিয়ে মুকারাব মুখ ফিরিয়ে দেখলেন, তাঁর ছয় সঙ্গীর মধ্যে একজন হয়েছে অদৃশ্য।

    জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কোথায় গেল সে?’

    একজন বললেন, ‘সে হঠাৎ নীচে নেমে ঘোড়ায় চেপে পাহাড়ের দিকে চলে গেল!’

    সচকিত কণ্ঠে মুকারাব বললেন, ‘পাহাড়ের দিকে চলে গেল! এটা তো ভালো কথা নয়! সবাই হুঁশিয়ার থাক—নিশ্চয় সে বিশ্বাসঘাতক!’

    ডাকাতদের নায়ক মনসুর—বিরাট তার দেহ, বিকট তার চেহারা! সে যখন চলাফেরা করে, মনে হয় মস্ত এক বনমানুষ বেড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

    যেমন তার আকৃতি, তেমনি প্রকৃতি। দয়া-মায়ার স্বপ্নও সে দেখেনি কোনও দিন। মানুষের প্রাণ তার কাছে মাটির খেলনার মতন তুচ্ছ। প্রকাণ্ড দল নিয়ে সে যখন মানুষ শিকারে বেরোয়, দেশ জুড়ে ওঠে তখন হাহাকার!

    পাহাড়ের বুকের ভিতর মনসুরের সুরক্ষিত আস্তানা। সেখানে গিয়ে কেউ তাকে আক্রমণ করতে পারে না।

    হাজারার কেল্লা লুঠে ফিরে এসে মনসুর বিশ্রাম করছিল।

    হঠাৎ দেখা গেল, কে একটা অচেনা লোক দ্রুতপদে আসছে তাদের আস্তানার দিকে।

    সিংহ-বিবরের মুখে কে এই নির্বোধ হতভাগ্য? মনসুরের বিস্মিত সাঙ্গোপাঙ্গদের হাতে হাতে বিদ্যুৎ দুলিয়ে নেচে উঠল তরবারির পর তরবারি!

    আগন্তুক ত্রস্তভাবে দুহাত তুলে বললে, ‘আমি শত্রু নই, আমি বন্ধু।’

    ডাকাতরা বললে, ‘তোমাকে আমরা চিনি না। কে তুমি?’

    —‘আমি হাজারার এক সৈনিক, তোমাদের সরদারের কাছে এসেছি।’

    মনসুর চলন্ত মাংস-হাড়ের পাহাড়ের মতো এগিয়ে এসে বাজখাঁই গলায় বললে, ‘আমার কাছে কী চাও তুমি?’

    —‘হাজারার পদ্মরাগ মণির সন্ধান আমি জানি। আপনি যদি সেখানা আমাকে পাইয়ে দিতে পারেন, আমি তাহলে অনেক টাকা পুরস্কার দিতে রাজি আছি।’

    মনসুর ক্রুদ্ধস্বরে বললে, ‘পুরস্কার টুরস্কার নয়—আমি সেই মণিখানাই চাই। তার সন্ধান দিলে তুমি পাবে হাজার মোহর বকশিশ!’

    সৈনিক বুঝলে সে যমের মুখে এসে পড়েছে, এখন ছাড়ান পাওয়া যাবে না! হাতে যা আছে, তাই নিয়েই প্রাণে প্রাণে সরে পড়াই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ।

    সে বললে, ‘মণিখানা আছে আমার প্রভু মুকারাব খাঁয়ের কাছে। তিনি এখন আত্মীয়দের গোর দিতে ব্যস্ত। তাঁর সঙ্গে পাঁচজনের বেশি সৈনিক নেই।’

    মনসুর বললে, ‘সুখবর বটে। এই নাও তোমার বখশিশ।’

    সৈনিক সাগ্রহে মোহরগুলো গুনতে বসে গেল।

    মনসুর রহস্যময় হাসি হেসে বললে, ‘সুখবর এনেছ বলে প্রাপ্য পুরস্কার তুমি পেলে। এইবারে তোমার বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কার নাও’—মনসুরের তরবারি শূন্যে উঠল ও নীচে নামল। পরমুহূর্তে দেখা গেল, বিশ্বাসঘাতক সৈনিকের ছিন্ন মুণ্ড ধুলার উপরে গড়িয়ে যাচ্ছে।

    উচ্চ পর্বতের উপরে সমুজ্জ্বল আকাশপটে আচম্বিতে কে যেন এঁকে দিলে সারি সারি অশ্বারোহীর জীবন্ত ছবি!

    শোকে কাতর হলেও মুকারাব খাঁয়ের চোখের তীক্ষ্ণতা ভোঁতা হয়ে যায়নি। ক্ষণে ক্ষণে তিনি এদেরই দেখা পাবার আশা করছিলেন! গুণে দেখা গেল, সংখ্যায় তারা তিরিশজন।

    এক লাফে তিনি ঘোড়ার উপরে উঠে পড়ে সঙ্গের পাঁচজন সৈনিককে ডেকে বললেন, ‘তিরিশজনের বিরুদ্ধে আমরা ছ’জনে অস্ত্র ধরে কিছুই করতে পারব না। দক্ষিণ দিকে—কাবুলের দিকে ঘোড়া ছোটাও!’

    কাবুলের পথে পড়ে যে গিরিসঙ্কট, মুকারাব খাঁ সঙ্গীদের সঙ্গে তার ভিতরে এসে পড়লেন—পিছনে নিয়ে তিরিশজন শত্রু।

    ডাকাত সরদার মনসুরের বাহন ছিল তারই মতন বিপুলবপু, ভারী ও বলবান এক তুর্কি ঘোড়া।

    মুকারাবের আরবি ঘোড়া—আকারে ছিপছিপে, তার পায়ে পায়ে বিদ্যুৎগতির ইঙ্গিত।

    অন্যান্য ডাকাত ও মুকারাবের পাঁচ সঙ্গীর ঘোড়াগুলো ছিল সাধারণ!

    খানিক পথ পেরিয়েই মুকারাব বুঝলেন, সঙ্গীদের থাকলে তাঁকেও ধরা পড়তে হবে। তাঁর আরবি ঘোড়া সতেজে সবেগে এগিয়ে যেতে চায়, কিন্তু সঙ্গীরা তাঁর নাগাল পাবে না বলে তাঁকে রাশ টেনে ধরে থাকতে হচ্ছে। ফলে, পিছনের ডাকাতেরা খুব কাছে এসে পড়েছে।

    একটা তেমাথার কাছে গিয়ে মুকারাব সৈনিকদের ডেকে বললেন, ‘তোমরা আর আমার সঙ্গে এস না। তোমরা যাও বাঁ-দিকে, আমি যাব ডানদিকে।’

    তিনি ঘোড়ার রাশ ছেড়ে দিলেন—উড়ে চলল সে পক্ষিরাজের মতো!

    এতক্ষণ পরে মনের সাধে ছুটতে পেরে তার খুশি আর ধরে না! দেখতে দেখতে সে শত্রুদের চোখের আড়ালে চলে যায় আর কি!

    ওদিকে অন্যান্য ডাকাতদের ছোট ছোট ঘোড়াগুলো পাল্লা দিতে না পেরে ক্রমেই পিছিয়ে পড়তে লাগল। কিন্তু মনসুরের বলবান ঘোড়া সামনে এগিয়ে চলল সামনে।

    পাহাড়ের পথ কখনও উপরে ওঠে, কখনও নীচে নামে—তারপর পাহাড় পড়ে থাকে পিছনে। তারপর পায়ের তলায় এসে পড়ে রৌদ্রদগ্ধ প্রান্তর, দুপাশ দিয়ে ছুটে চলে যায় চলচ্চিত্রের মতন ঝোপ, গাছ, বন, এবং হু-হু করে বন্য গীতি গেয়ে যায় উচ্ছ্বসিত বাতাস।

    এখন দেখা যাচ্ছে কেবল দুই অশ্বারোহীকে। অন্যান্য ঘোড়সওয়াররা কোথায় কতদূর হারিয়ে গেছে, তার কোনও ঠিকানাই নেই!

    মনসুরের ঘোড়া বলবান, মুকারাবের ঘোড়া বেগবান। কেউ কারুর কাছে হারতে রাজি নয়—শক্তি আর গতি।

    সূর্য যখন ডুবু ডুবু—তখন গতি বুঝি শক্তিকে ফাঁকি দেয় দেয়!

    মনসুরের ঘোড়ার দেহ ভারী, মনসুরের দেহ ভারি, উপরন্তু তাকে আরও ভারী করে তুলেছে তার নিজের দেহের লোহার বর্ম! মুকারাব-এর হালকা দেহ নিয়ে তাঁর ছিপছিপে ঘোড়া ক্রমেই বেশি তফাতে চলে যাচ্ছে।

    মনসুর খুলে ফেলে দিলে শিরস্ত্রাণ আর বর্ম, খানিক হালকা হবার জন্যে।

    মুকারাব হঠাৎ পিছন ফিরে দেখেন, কাছে আছে মাত্র একজন শত্রু।

    এতক্ষণ বাধ্য হয়ে তাঁকে পালাতে হচ্ছিল, এইবার জেগে উঠল তাঁর আহত বীর্য ও পৌরুষ। ঘোড়া থামিয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে চোখের নিমেষে তিনি ধনুকে জুড়লেন তীক্ষ্ণ তির!

    মনসুর মনে মনে গুনলে মহাপ্রমাদ! বর্ম আর শিরস্ত্রাণ হেলায় হারিয়ে অনুতাপ করতে করতে ঘোড়ার পিঠে গা মিলিয়ে সে উপুড় হয়ে পড়ল, বাণ এড়াবার জন্যে।

    সে বাণ এড়ালে বটে, কিন্তু তার ঘোড়া এড়াতে পারলে না। আহত ঘোড়া হল ‘পপাত ধরণীতলে’। মনসুরের বিপুল দেহও মাটির উপরে পড়ে একেবারে নিশ্চেষ্ট।

    মুকারাব টপ করে ঘোড়া থেকে নেমে শত্রুকে মৃত ভেবে পরীক্ষা করবার জন্যে তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।

    কিন্তু মনসুর হচ্ছে মস্ত ধড়িবাজ, শত্রুর চোখে ধুলো দেবার জন্যেই মড়ার মতন স্থির হয়ে পড়েছিল। মুকারাবকে কাছে পেয়ে সে খপ করে হাত বাড়িয়ে তাঁর কোমরবন্ধ চেপে ধরলে এবং তারপর বিষম ঝাঁকানি দিতে আরম্ভ করলে।

    অতিকায় মনসুরের হাতে পড়ে মুকারাবের হাল হল বিড়াল কবলগত ইঁদুরের মতন। গায়ের জোরে তাকে বাধা দেবার সাধ্য তাঁর নেই। তিনি চটপট ছোরা বার করে তাকে আঘাত করলেন এবং মনসুরও আত্মরক্ষার জন্যে তাড়াতাড়ি তাঁকে ছেড়ে খাপ থেকে খুলে ফেললে তরবারি।

    তখন সূর্যহারা আকাশের তলায়, শেষবেলার আলতা-আলো গায়ে মেখে দুই বীরের নগ্ন তরবারি ধরলে মৃত্যু-সঙ্গীতের উদ্দাম ছন্দ!

    এ যুদ্ধে মনসুরের চেয়ে মুকারাবেরই সুবিধা বেশি। গুরুভার মনসুর প্রতিপক্ষের আক্রমণের ক্ষিপ্রতা এড়াতে এড়াতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল। সে ডানদিকে ফেরবার উপক্রম করতে-না-করতেই মুকারাব সাঁৎ করে তার বাঁদিকে সরে গিয়ে মেরে দেন তরোয়ালের খোঁচা!

    এইভাবে খানিকক্ষণ লড়তে পারলেই মুকারাবের শত্রু রক্তপাতের ও পরিশ্রমের জন্যে দুর্বল হয়ে হার মানতে বাধ্য হত। কিন্তু তাঁর অপেক্ষা করবার সময় নেই, কারণ যে-কোনও মুহূর্তেই পিছিয়ে পড়া ডাকাতদের পুনরাবির্ভাবের সম্ভাবনা!

    বারবার তরবারির খোঁচা খেয়ে মনসুর রাগে অজ্ঞান হয়ে হঠাৎ সামনের দিকে বাঘের মতন লাফিয়ে পড়ে নিজের তরবারি তুলে প্রচণ্ড এক কোপ বসিয়ে দিলে,—মুকারাবের তরবারি সে আঘাত সদর্পে গ্রহণ করলে এবং পরমুহূর্তে দস্যুর অসি ঝনঝন শব্দে ভেঙে দুখানা হয়ে গেল।

    মুকারাব সেই প্রবল আক্রমণ ভালো করে সামলাবার আগেই মনসুর ভগ্ন অসি ফেলে প্রকাণ্ড এক যুদ্ধ-কুঠার নিয়ে হুঙ্কার দিয়ে আবার তেড়ে এল—তার দুই তীব্র চক্ষু তখন জ্বলে উঠেছে হিংস্র পশুর মতো!

    মুকারাব পাঁয়তারা কষে একপাশে সরে গেলেন—শত্রুর কুঠার শূন্যে খুঁজে পেলে কেবল শূন্যতাকেই! তারপর চোখের পলক পড়বার আগেই মুকারাবের তরবারি আমূল প্রবেশ করলে মনসুরের দেহের মধ্যে।

    মনসুর মাটিতে আছড়ে পড়ল, আর উঠল না। তার লোভী মন পদ্মরাগমণি লাভ করলে না বটে, কিন্তু তার ক্ষত-বিক্ষত দেহের উপরে ফুটে উঠল পদ্মরাগের রক্তরাগ!

    কিন্তু মুকারাব তবু আশ্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারলেন না—দিকচক্রবাল রেখায় দেখা যাচ্ছে যেন কতকগুলি ঘোড়সওয়ারের মূর্তি!

    প্রভুভক্ত আরবি ঘোড়া অদূরে অপেক্ষা করছিল, প্রভুর ডাক শুনে কাছে ছুটে এল! মুকারাব তার লাগাম ধরে পাশের জঙ্গলের ভিতরে প্রবেশ করলেন।

    অন্ধকারের অন্তপুরে ঢুকে আলোর দৃষ্টিও তখন অন্ধ হয়ে আসছে।

    পরদিনের ভোরবেলা। গাছের পাতায় পাতায় সূর্যকরে সোনালি রূপ, গাছের ডালে ডালে পাখিদের খুশির সুর।

    আফগানিস্তানের ঘালমান উপত্যকা—যেন সৌন্দর্যের নাচঘর! নদীর মুখে ফোটে আনন্দের বন্দনা, বুকে দোলে হিরার লহর! দিকে দিকে ছায়ার আশ্রয় রচনা করে পুলক-রোমাঞ্চে মর্মর-ছন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে খুবানি, আখরোট, ঝাউ, পিচ, তুঁত ও চেরি প্রভৃতি গাছের দল।

    অদূরে দেখা যাচ্ছে সরদার দোস্ত মহম্মদের দুর্গ-প্রাসাদ।

    সরদারের মেয়ে জুলেখা। বাগানে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ তাঁর শাখ হল, একবার বনের ভিতরটা দেখে আসবার জন্যে।

    সহচরীরা সভয়ে জানালে, তিনি পর্দানসিন, সরর্দারের কানে একথা উঠলে তিনি ভারি রাগ করবেন।

    জুলেখা বললেন, ‘বনে এত ভোরে কেউ থাকে না। কেউ আমাকে দেখতে পাবে না।’

    সহচরীরা খিড়কির ফটক খুলে দিলে। জুলেখা বাইরে পা বাড়িয়েই দেখলেন এক অভাবিত অপূর্ব দৃশ্য!

    গাছের তলায় ঘাস বিছানায় দুই চোখ মুদে শুয়ে আছেন এক সুকুমার দেবকুমার।

    জুলেখার দেবকুমার হচ্ছেন আমাদের মুকারাব। হঠাৎ চোখ খুলে তিনিও হলেন চমৎকৃত! একি পরিস্থানের স্বপ্ন? এমন অপরূপ জীবন্ত রূপের ডালি কবে কে দেখেছে দুনিয়ায়?

    মুকারাব ধড়মড় করে উঠে বসলেন। মুখে গুণ্ঠন টেনে জুলেখা অদৃশ্য হয়ে গেলেন শরীরিনী বিদ্যুল্লতার মতো।

    মুকারাব চুপ করে বসে বসে ভাবতে লাগলেন। তারপর মনে মনে হেসে জামার ভিতর থেকে বার করলেন হাজারার বিশ্ববিখ্যাত পদ্মরাগমণি! সূর্যকরে সে জ্বলে উঠল আরক্ত অগ্নিশিখার মতো।

    মুকারাব বললেন, ‘তুচ্ছ এই সাতরাজারধন মরা মানিক! এর বিনিময়ে আমি এক জ্যান্ত মানিক আনতে চললুম!’

    এরপর আর বলবার কথা বেশি নেই।

    সরদার দোস্ত মহম্মদ যখন মুকারাবের পরিচয় পেলেন ও তাঁর সকল কথা শুনলেন, তখন তাঁকে আদর-যত্ন করতে কোনওই ত্রুটি করলেন না। বললেন, ‘বৎস, এত বিপদ এড়িয়ে তুমি যে হাজারার আশ্চর্য পদ্মরাগমণি উদ্ধার করতে পেরেছ, এরচেয়ে সৌভাগ্য আর হতে পারে না।’

    —‘কিন্তু সে মণি আপনার হাতেই সমর্পণ করতে এসেছি।’

    দোস্ত মহম্মদ যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারলেন না। বিপুল বিস্ময়ে বললেন, ‘আমার হাতে সমর্পণ করতে এসেছ?’

    —‘আজ্ঞে হ্যাঁ, বিনিময়ে এর চেয়েও মূল্যবান রত্ন পাব বলে।’

    —‘এর চেয়ে মূল্যবান রত্ন পৃথিবীতে নেই।’

    —‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আছে বইকি! আপনার কন্যা জুলেখাকে চোখে দেখবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।’

    তখন দোস্ত মহম্মদ সব বুঝলেন।

    মুকারাবের মতো সম্ভ্রান্ত, সুদর্শন ও বীর্যবান জামাই পাওয়াই সৌভাগ্যের কথা, তার উপরে প্রাপ্য হবে হাজারার অতুলনীয় পদ্মরাগমণি!

    সুতরাং বিয়ের বাজনা বাজতে দেরি লাগল না এবং জুলেখাকে আবার মুকারাবের সুমুখে এসে মুখের ঘোমটা খুলে দাঁড়াতে হল!

    কিছুদিন পরে বাবরের সঙ্গে মুকারাব যাত্রা করলেন পানিপথ যুদ্ধক্ষেত্রে।

  • মুসলমানের জহরব্রত

    মুসলমানের জহরব্রত

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    মুসলমানের জহরব্রত

    হিন্দুর রক্তে মুসলমানের এবং মুসলমানের রক্তে হিন্দুর হাত আজ রাঙা হয়ে উঠেছে। এ দৃশ্য নতুন নয়। এমনই সব রক্তাক্ত ঘটনার দ্বারা আজ হাজার বৎসর ধরে ভারতের ইতিহাস আরক্ত হয়ে আছে। রক্তস্রোত কখনও বেড়েছে কখনও কমেছে, কিন্তু একেবারে থামেনি কখনও।

    তবু ওরই মাঝে মাঝে এক-একটি সমুজ্জ্বল ছবি জেগে ওঠে অত্যন্ত অভাবিত ভাবে, কাজলকালো মেঘের কোলে রুপালি বিদ্যুৎলতার মতো! আজ তোমাদের হাতে উপহার দেব এমনি একখানি ছবি। বড় করুণ, কিন্তু বড় মিষ্টি ছবি।

    সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি তখন দিল্লির সিংহাসনে। তাঁর সাম্রাজ্য দিনে দিনে বিস্তৃততর হয়ে উঠেছে, হিন্দু রাজাদের মাথা থেকে খসে পড়ছে মুকুটের পর মুকুট।

    রণসম্বর দুর্গের রাজপুত রানা হামির দেব কিন্তু আলাউদ্দিনের সামনে মাথা নত করতে রাজি নন। আপন স্বাধীনতার জন্যে অস্ত্রধারণ করতে প্রস্তুত তিনি সর্বদাই। এখানে বলে রাখা ভালো, চিতোরের উদ্ধারকর্তা হামির ও রণসম্বরের হামির একই ব্যক্তি নন।

    সেনাপতি মির মহম্মদ সা একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে তিনি করেছিলেন বিদ্রোহ ঘোষণা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিফল হয়ে তাঁকে দেশত্যাগী হতে হল। পলাতক মহম্মদ রানা হামিরের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। রানা সম্মতি দিলেন।

    দিল্লি থেকে এল সুলতানের কড়া হুকুম—‘ফিরিয়ে দাও বিদ্রোহী মহম্মদকে!’

    হামির দেব জবাব দিলেন, ‘অসম্ভব! আশ্রিতকে জাতিধর্মনির্বিশেষে রক্ষা করাই হচ্ছে হিন্দুর কর্তব্য। মহম্মদ সাকে ফিরিয়ে দেব না।’

    ক্রুদ্ধ দিল্লিশ্বর বললেন, ‘বটে? তবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।’

    হামির দেব নির্ভয়ে বললেন, ‘আমি অপ্রস্তুত নই।’

    পঙ্গপালের মতো মুসলমান সৈন্য নিয়ে বিখ্যাত সেনাপতি নসরত খাঁ ধেয়ে এলেন রাজপুতনার দিকে। রাজপুতদের একটা দুর্গের পতন হল। ১২৯৯ খ্রিস্টাব্দের কথা।

    হামির দেব আশ্রয় গ্রহণ করলেন রণসম্বর দুর্গের মধ্যে। এই প্রসিদ্ধ ও দুর্ভেদ্য দুর্গ বহু শত্রুর আক্রমণ ব্যর্থ করেছে বারংবার। দিল্লির সৈন্যরা দুর্গ অবরোধ করলে বটে, কিন্তু অধিকার করতে পারলে না।

    রণসম্বরের মধ্যে অস্ত্র নিক্ষেপ করবার জন্যে দিল্লির সৈন্যরা একটা মোরচ বা উপদুর্গ নির্মাণ করছিল। তা পরিদর্শন করতে এলেন সেনাপতি নসরত খাঁ।

    আচম্বিতে দুর্গের ভিতর থেকে নিক্ষিপ্ত হল প্রকাণ্ড একখণ্ড প্রস্তর। প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে মাটির উপরে লুটিয়ে পড়লেন নসরত খাঁ। দুদিন পরে তাঁর মৃত্যু হল। দিল্লির সেনাদলের মধ্যে জাগল হাহাকার।

    এ সুযোগ ত্যাগ করলেন না রানা হামির দেব। সদলবলে দুর্গের বাইরে বেরিয়ে এসে তিনি মুসলমান সৈন্যদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন হিংস্র শার্দূলের মতো দুর্দান্ত বিক্রমে। রাজপুত যোদ্ধাদের কণ্ঠে কণ্ঠে জাগ্রত হল আকাশভেদী জয়ধ্বনি—‘হর হর মহাদেব! হর হর মহাদেব!’

    আরম্ভ হল রক্তরাঙা তরবারির তাণ্ডব নৃত্য, দিকে দিকে ছুটতে লাগল বল্লমগুলো উল্কাবেগে, শূন্যে যেন বিপুল জাল বিস্তার করে অধোমুখে নেমে আসতে লাগল ঝাঁকে ঝাঁকে শাণিত তির!

    ‘হর হর মহাদেব! হর হর মহাদেব!’ নীরব হয়ে পড়ল ‘আল্লা হো আকবর’ ধ্বনি। রক্তপিছল রণক্ষেত্রের উপরে অগণ্য শবদেহের স্তূপের পর স্তূপ রচনা করতে করতে দিল্লির পলাতক সৈন্যবাহিনীর পিছনে পিছনে ধাবমান হল রাজপুত বীরের দল।

    শত্রুহীন যুদ্ধক্ষেত্রের উপর দাঁড়িয়ে পরিতৃপ্ত মুখে তরবারি কোশবদ্ধ করলেন স্বদেশভক্ত মহাবীর হামির দেব। আজ দিল্লি হতগর্ব, রাজস্থানের রাজলক্ষ্মী রাহুমুক্ত। পৃথ্বীরাজের পর এক শতাব্দীর মধ্যে আর কোনও হিন্দু বীরই মুসলমানদের এমনভাবে পরাজিত করতে পারেননি। এবং হামিরও হচ্ছেন পৃথ্বীরাজেরই যোগ্য বংশধর।

    টলে উঠল দিল্লির সিংহাসন! আলাউদ্দিন তাড়াতাড়ি আরও অনেক সৈন্য সংগ্রহ করে নিজের পলাতক বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেবার জন্যে ছুটে এলেন। রণসম্বর আবার হল অবরুদ্ধ। মুসলমান সৈন্যের সংখ্যাধিক্য দেখে হামির দেব বুদ্ধিমানের মতো প্রকাশ্য রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে শত্রুর শক্তিপরীক্ষা করতে অগ্রসর হলেন না।

    হামির দেব জানতেন রণসম্বরের পতন অসম্ভব। দাসবংশীয় সুলতান বলবন এই দুর্গ অধিকার করতে পারেননি। খিলজিবংশীয় প্রথম সুলতান ফিরুজও সসৈন্যে দুর্গ অধিকার করতে এসে দুর্ভেদ্যতা দেখে হতাশ হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। আলাউদ্দিনকেও কিছুকাল পরে পাততাড়ি গুটিয়ে সরে পড়তে হবে, এ সম্বন্ধে হামির ছিলেন একরকম নিশ্চিন্ত।

    দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কেটে যায়, কিন্তু আলাউদ্দিন নিজের গোঁ ছাড়তে নারাজ। যেমন অটল রণসম্বর কেল্লা, তেমনই অটল দিল্লির সৈন্যরা। তারা কেল্লা দখল করতে পারলে না বটে, কিন্তু এমনভাবে চারিদিকের পথঘাট আগলে রইল যে অবরুদ্ধ রাজপুতেরা ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়তে লাগল।

    হিন্দুস্থানে কোনওদিনই দেশভক্তের অভাব হয়নি। আবার এখানে দেশদ্রোহীর সংখ্যাও গুণে ওঠা যায় না। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে প্রথম যে দেশদ্রোহী যবন গ্রিকদের সাহায্য করেছিল, তার নাম হচ্ছে শশীগুপ্ত। তারপর স্বদেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে কত যে বিশ্বাসঘাতক, এখানে সকলকার নাম করবার জায়গা হবে না।

    রণসম্বর অবরোধেও বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকায় অভিনয় করবার মতো লোকের অভাব হল না। হামির দেবের মন্ত্রী রণমল আরও কয়েকজন বিশ্বাসহন্তা হিন্দুর সঙ্গে দুর্গ থেকে বেরিয়ে অবলম্বন করলে শত্রুপক্ষ। দুর্গের কোথায় কী রকম দুর্বলতা আছে তা জানবার জন্যে আলাউদ্দিন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে লাগলেন।

    দুর্গের মধ্যে হামির দেবের আশ্রিত মুসলমানও ছিল অনেক। তারা কিন্তু খাঁটি মানুষ, নিমকের মর্যাদা নষ্ট করেনি একজনও। রাজপুতদের সঙ্গে সমানভাবে দাঁড়িয়ে তারাও প্রাণপণে বাধা দিয়েছিল আলাউদ্দিনের সৈন্যদের এবং তাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন মোগল সেনাপতি মির মহম্মদ সা। তাহলেই দেখা যাচ্ছে, এই ভারতবর্ষে বহু শতাব্দী পূর্বেই প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে যে, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সত্যিকারের মিলন কিছুমাত্র অসম্ভব নয়।

    কেটে গেল পুরো একটি বৎসর। অবশেষে আলাউদ্দিন কেল্লা দখলের এক নতুন উপায় আবিষ্কার করলেন। বালিভরা থলের উপরে থলে সাজিয়ে দুর্গ-প্রাকারের সমান উঁচু করা হল।

    তারপরে সেই থলেগুলোর উপর দিয়ে উঠে প্রাকারের শীর্ষদেশে গিয়ে দাঁড়াল কাতারে কাতারে মুসলমান সৈন্যগণ।

    দুর্গের মধ্যে দুই পক্ষের হাতাহাতি যুদ্ধ বাধল বটে, কিন্তু আর দুর্গ রক্ষা করা সম্ভব নয়, রণসম্বর আর নিজের অজেয় নাম রক্ষা করতে পারবে না।

    হতাশ হয়ে হামির দেব বললেন, ‘ওই পাহাড়ের উপরে জ্বালাও এক প্রকাণ্ড অগ্নিকুণ্ড! বীরের মৃত্যুকে যারা ভয় করে না, এগিয়ে আসুক তারা! আমাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় যেসব মাতা-ভগ্নী-জায়া আর শিশু সন্তানগণ, বিধর্মীদের অপবিত্র কবল থেকে রক্ষা করবার জন্যে নিক্ষেপ করো তাদের জ্বলন্ত অগ্নিশিখায়! আজ আমাদের উদযাপন করতে হবে জহরব্রত। তারপর শুরু হবে আমাদের বিচিত্র মরণ-খেলা—আমরা মারব আর মরব, মারব আর মরব, মারব আর মরব! শত্রু রক্তে সর্বাঙ্গ রঞ্জিত করে মরণবিজয়ীর দল আমরা মরতে মরতে হাসব, মরতে মরতে হাসব, মরতে মরতে হাসব! হা হা হা হা হা হা! আলাউদ্দিন রণসম্বর জয় করতে পারে, আমাদের জয় করতে পারবে না! হর হর মহাদেব!’

    মোগল সেনাপতি মির মহম্মদ সা এগিয়ে এসে বললেন, ‘রাজা, আমিও জহরব্রত পালন করতে চাই।’

    হামির দেব সবিস্ময়ে বললেন, ‘সে কী, আপনি যে মুসলমান!’

    মহম্মদ হাসিমুখে বললেন, ‘হাঁ রাজা, আমি মুসলমান হলেও আপনার সঙ্গে আমার অদৃষ্ট যে একসূত্রে গাঁথা! আর আমার জন্যেই আজ তো আপনার এই বিপদ!’

    হামির দেব বললেন, ‘ইচ্ছা করলে আপনি এখনও পলায়ন করতে পারেন। জহরব্রত পালন করার অর্থই হচ্ছে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। আপনি পারবেন?’

    মিষ্টি হাসি হেসে মহম্মদ বললেন, ‘হিন্দু পারে, মুসলমান কি পারে না? ভারতের হিন্দু-মুসলমান হচ্ছে এক বোঁটায় দুটি ফুল! ওদের একটি শুকোলে শুকিয়ে যাবে অন্যটিও।’

    হামির দেব বললেন ‘উত্তম। এর উপরে আর কথা নেই।’

    পাহাড়ের শিখরে দাউ দাউ জ্বলে উঠল বিশাল অগ্নিশয্যা। হামির দেবের সহধর্মিণী রানি রঙ্গদেবীর সঙ্গে দলে দলে রাজপুতকন্যা দৃঢ়পদে অগ্রসর হয়ে জ্বলন্ত শয্যায় শয়ন করলেন এমন প্রশান্ত মুখে যে, দর্শকদের মনে হল তা অগ্নিকুণ্ড নয়, চন্দনকুণ্ড!

    সব শেষ।

    হামির দেব অসি কোশমুক্ত করে বললেন, ‘এইবারে আমাদের পালা! হর হর মহাদেব!

    মহম্মদ সা অসি কোশমুক্ত করে বললেন, ‘চলুন রাজা! আল্লা হো আকবর!’

    হাজার হাজার রাজপুত বীর অস্ত্রচালনা করতে করতে ঝাঁপ দিলে শত্রু-সৈন্য-সাগরের মধ্যে। উচ্ছ্বসিত, আন্দোলিত হয়ে উঠল সৈন্যসাগরের তরঙ্গের পর তরঙ্গ, তার তলায় ডুবে গেল কে জানে কোথায় আত্মত্যাগী হিন্দু বীরদের রক্তলাঞ্ছিত ক্ষত-বিক্ষত পবিত্র দেহ।

    হামির দেবও ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু নিশ্চিত মৃত্যু তখনও নিকটস্থ নয়। অনেক কষ্টে উঠে বসলেন তিনি ধীরে ধীরে। পরাধীনতা যে মৃত্যুরও চেয়ে ভয়াবহ! প্রাণপণে দেহের সমস্ত শেষশক্তি সঞ্চয় করে নিজে তরবারি তুলে স্বহস্তে করলেন তিনি নিজের কণ্ঠদেশে প্রচণ্ড আঘাত! পৃথিবীর কোলে লুটিয়ে পড়ল মহাবীরের দেহহীন মুণ্ড এবং মুণ্ডহীন দেহ।

    মির মহম্মদেরও সর্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু মৃত্যু তখনও তাঁর কাছে আসেনি।

    স্বয়ং আলাউদ্দিন তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘মির মহম্মদ সা! এখন আমি যদি চিকিৎসা করিয়ে আবার তোমাকে বাঁচিয়ে তুলি, তাহলে তুমি কী করবে?’

    মহম্মদ সগর্বে বললেন, ‘আমি যদি বাঁচি, তাহলে আগে তোমাকে হত্যা করে পরে রাজা হামির দেবের পুত্রকে বসাব তাঁর প্রাপ্য সিংহাসনে!’

    বলা বাহুল্য মির মহম্মদকে বাঁচাবার চেষ্টা হল না!

    তারপর হল আর একটি ছোট্ট দৃশ্যাভিনয়, সে কথাও বলা উচিত বোধ হয়।

    বিশ্বাসঘাতক স্বদেশদ্রোহী রণমল সদলবলে এসে সুলতান আলাউদ্দিনকে সম্বোধন করে বললে, ‘আপনাকে সাহায্য করেছি, এইবারে আমাদের পুরস্কার দিন।’

    আলাউদ্দিন বললেন, ‘নিশ্চয়! বিশ্বাসহন্তাদের যোগ্য পুরস্কারই দেব। জল্লাদ! এদের মুণ্ডচ্ছেদ কর!’

    যা বললুম বানানো কথা নয়, ইতিহাসের সম্পূর্ণ সত্যকথা।

  • সূর্য দেবী, পর্মল দেবী

    সূর্য দেবী, পর্মল দেবী

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    সূর্য দেবী, পর্মল দেবী

    ঐতিহাসিক বলছেন : ইসলাম ধর্মের উদয় হচ্ছে ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ব্যাপার!

    ৬২২ খ্রিস্টাব্দে হজরত মহম্মদ সহায়-সম্পদহীন অবস্থায় প্রাণ রক্ষার জন্যে পালিয়ে যান মক্কা থেকে মদিনায়।

    তারই কিছু-বেশি এক শতাব্দীকাল পরেই দেখা গেল, হজরত মহম্মদের অনুবর্তীরা যে সাম্রাজ্য স্থাপন করেছেন, তার বিস্তার আটলান্টিক সাগর থেকে সিন্ধুনদ এবং কাস্পিয়ান সাগর থেকে নীলনদ পর্যন্ত!

    এই বিশাল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল ইউরোপের স্পেন, পোর্তুগাল ও দক্ষিণ ফ্রান্সের কতকাংশ; আফ্রিকার সমুদ্র-তীরবর্তী উত্তর অংশ, মিশর, আরব, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, আর্মেনিয়া, পারস্য, আফগানিস্তান, বেলুচিস্তান ও ট্রানসঅক্সিয়ানা।

    তারপরও হজরত মহম্মদের উত্তরাধিকারী ও অনুবর্তীগণ খ্রিস্টর্ধমাবলম্বীদেরও একসঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিম দিক থেকে বারংবার আক্রমণ করতে ছাড়েননি—এক কনস্তান্তিনোপল নগরকেই তাঁরা অবরোধ করেছিলেন উপরি উপরি তিনবার।

    কিন্তু ৭১৬ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় থিয়োডোসিয়াসের এবং ৭৩২ খ্রিস্টাব্দে চার্লস দি হ্যামারের কাছে যদি তাঁরা শোচনীয়রূপে পরাজিত না হতেন, তাহলে আজ হয়তো ইউরোপীয়দের হাতে হাতে থাকত বাইবেলের পরিবর্তে কোরান!

    ওই দুই স্মরণীয় পরাজয়ের কিছু আগেই ইসলাম ধর্মের বিপুল বন্যা এসে উপস্থিত হয়েছিল পশ্চিম আর্যাবর্তের সীমান্ত পর্যন্ত।

    তখন খলিফা ওয়ালিদের সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের শাসনকর্তা ছিলেন হাজাজ! এই পূর্বাঞ্চলের সীমান্তের পরেই আরম্ভ হয়েছে ভারতবর্ষের সিন্ধুদেশ এবং সেখানে রাজত্ব করতেন ব্রাহ্মণবংশীয় রাজা দাহির।

    ভারতবর্ষ তখন মুসলমান আরব-সন্তানদের নাম শুনেছিল অবশ্যই, কিন্তু আরবদের মনে যে ভারত আক্রমণের বাসনা জেগেছে, এমন কোনও সম্ভাবনার ইঙ্গিত তখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

    তার বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, তন্ত্র-মন্ত্র, মন্দির-মঠ ও তেত্রিশ কোটি দেবতা এবং হাজার রকম সু আর কু সংস্কার প্রভৃতি নিয়ে আর্য ভারতবর্ষ তখন নিশ্চিন্ত হয়ে দেখত কেবল অতীত গৌরবের স্বপ্ন!

    সারা ভারতবর্ষ ছোট ছোট রাজ্যের দ্বারা বিভক্ত। চন্দ্রগুপ্ত, অশোক, কনিষ্ক, সমুদ্রগুপ্ত বা হর্ষবর্ধনের মতো সাম্রাজ্য স্থাপন করতে পারেন, ভারতে তখন এমন প্রবল শক্তির অধিকারী ছিলেন না কেউ। ওরই মধ্যে যাঁরা অপেক্ষাকৃত বলবান রাজা, বৈচিত্র্য সন্ধানের জন্যে তাঁরা করতেন পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ-বিবাদ!

    বীরত্বের অভাব তাঁদের ছিল না, কিন্তু অভাব ছিল একতার। সকলে মিলে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে কোনও বহিঃশত্রুকে বাধা দেবার ক্ষমতা বা বিচারবুদ্ধি তাঁদের ছিল না। বহিঃশত্রুর আবির্ভাব হলে প্রত্যেকেই স্বতন্ত্রভাবে কেবল আপন রাজ্য সামলাবার জন্যেই ব্যস্ত হয়ে থাকতেন।

    এইভাবেই দিন যাচ্ছিল। হয়তো আরও কিছু কাল কেটে যেত এইভাবেই।

    আরবদের দৃষ্টি তখন ইউরোপের দিকে আকৃষ্ট, একতার অভাবে অন্তঃসারশূন্য হলেও ভারতবর্ষ তখন পর্যন্ত ছিল তাদের চোখের আড়ালে।

    কিন্তু ভগবান বোধহয় চাইলেন নির্বোধ ভারতকে কঠিন দণ্ড দিতে। দৈবের লীলায় ঘটল এমন এক অভাবিত ঘটনা, আর্যাবর্ত করলে আরবের দৃষ্টি আকর্ষণ।

    সুদূর সিংহলে ছিল কয়েকজন আরব সওদাগর। তাদের মৃত্যুর পর তাদের কন্যারা হল অনাথা। সিংহলের রাজা দয়াপরবশ হয়ে সেই অনাথা মেয়েগুলিকে জলপথে খলিফার পূর্বাঞ্চলের শাসনকর্তা হাজাজের নিকটে পাঠিয়ে দিলেন।

    কিন্তু তাঁর এই দয়ার ফলেই হল ভারতবর্ষের সর্বনাশের সূত্রপাত! সব সময়েই ভালোর ফলে ভালো হয় না।

    জলপথে খলিফার রাজ্যে যেতে গেলে পথিমধ্যে পড়ে সিন্ধুদেশের সাগরতট। সেইখানে একদল বোম্বটে খলিফার উদ্দেশে প্রেরিত জাহাজগুলিকে আক্রমণ ও লুণ্ঠন করে অদৃশ্য হয়।

    সেই সংবাদ শুনে শাসনকর্তা হাজাজ রাজা দাহিরকে এক পত্র পাঠিয়ে জানালেন, অবিলম্বে দুষ্ট বোম্বেটেদের দমন এবং তাঁর ক্ষতিপূরণ করতে হবে।

    রাজা দাহির উত্তর দিলেন, ‘বোম্বেটেরা আমার অধীন নয়। তাদের দমন করবার শক্তি আমার নেই।’

    হাজাজ এই উত্তর সন্তোষজনক বলে মনে করলেন না। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে খলিফার কাছ থেকে হুকুম আনিয়ে সেনাপতি উবেদুল্লাকে সসৈন্যে পাঠিয়ে দিলেন সিদ্ধুদেশ আক্রমণ করতে।

    সিন্ধুদেশের প্রধান বন্দর দেবুলের নিকটে হল আরবের সঙ্গে ভারতের সর্বপ্রথম শক্তিপরীক্ষা। হিন্দুরা হল জয়ী। আরব সৈন্যদের কতক মারা পড়ল, কতক পালিয়ে বাঁচল। সেনাপতি উবেদুল্লাও দেহরক্ষা করলেন যুদ্ধক্ষেত্রে।

    হাজাজ আরও বেশি সৈন্যের সঙ্গে আবার সেনাপতি বুদেলকে পাঠালেন দাহিরের বিরুদ্ধে।

    ফল অন্যরকম হল না। এবারেও ভারতের ত্রিশূলের আঘাতে বিশ্বজয়ী আরবের অর্ধচন্দ্রাঙ্কিত পতাকা ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেল এবং নিহত হলেন সেনাপতি বুদেল।

    রাগে ও দুঃখে হাজাজ পাগলের মতো হয়ে উঠলেন—খলিফার কাছে মান বুঝি আর থাকে না! তিনি বিপুল আয়োজন করতে লাগলেন তৃতীয় অভিযানের জন্যে।

    এবারে সেনাপতি হলেন হাজাজের ভাইয়ের ছেলে ও জামাই ইমাদ-উদ-দিন মহম্মদ। তাঁর অধীনে ছিল খলিফার সর্বশ্রেষ্ঠ সৈন্যদল—উষ্ট্রারোহী ও অশ্বারোহী। সেই বিপুল বাহিনী নিয়ে মহম্মদ দেবুল দুর্গ অবরোধ করলেন (৭১১ খ্রিস্টাব্দ)। দুর্গের ভিতর ছিল মাত্র চার হাজার রাজপুত সৈন্য। তারা বেশিদিন দলে ভারী আরবদের বাধা দিতে পারলে না। দুর্গের পতন হল।

    দেবুলের বাসিন্দাদের বলা হল, হয় মুসলমান হও, নয় মরো। হিন্দুরা ধর্ম ছাড়তে রাজি হল না। তখন নারী ও শিশুদের বন্দি করে প্রত্যেক পুরুষকে নিক্ষেপ করা হল তরবারির মুখে।

    দেবুলের পতনের জন্যে দাহির কিছুমাত্র বিচলিত হলেন না। বললেন, ‘দেবুল তো নগণ্য জায়গা, আসল যুদ্ধ হবে এইবারে আমার সঙ্গে।’ তিনিও তোড়জোড় আরম্ভ করলেন।

    দাহির ভুল বুঝেছিলেন। কোথায় বিশ্বজয়ী সম্রাট ওয়ালিদ—সাম্রাজ্য যাঁর তিনটি মহাদেশে বিস্তৃত, আর কোথায় দাহির—ভারতে একটি ক্ষুদ্র প্রদেশের রাজা! ধনবলে ও লোকবলে দুজনের মধ্যে তুলনাই চলে না! তবু যে দুই-দুইবার তিনি আরব অভিযানকে ব্যর্থ করতে পেরেছিলেন, এইখানেই দাহিরের বাহাদুরি।

    ঠিক সেই সময়ে ভারতে দাহিরের চেয়ে ঢের বেশি শক্তিশালী রাজা ছিলেন। দাক্ষিণাত্যের প্রতাপশালী চালুক্য, পল্লভ ও রাষ্ট্রকূট নৃপতিরা যদি তখন দাহিরকে সাহায্য করতে আসতেন, তাহলে আরবদের ভারতে প্রবেশ করবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা হয়তো অঙ্কুরেই হত বিলুপ্ত।

    কিন্তু আপন আপন প্রাধান্য বিস্তারের জন্যে তখন তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে গৃহযুদ্ধে নিযুক্ত, ভারত-সীমান্তে কালবৈশাখীর উদয় দেখবার সময় তাঁদের হয়নি।

    বিশেষ করে রাষ্ট্রকূট নৃপতিরা এমন প্রবল পরাক্রান্ত ছিলেন যে, পরে আরব শাসনকর্তারা পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব-বন্ধন অটুট রাখবার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টার ত্রুটি করতেন না।

    দাহিদের সঙ্গে আরবদের সঙ্ঘর্ষের মাত্র চৌষট্টি বৎসর আগে উত্তরভারতের একচ্ছত্র সম্রাট হর্ষবর্ধন দেহত্যাগ করেছিলেন। তাঁর বলিষ্ঠ বাহু যতদিন অস্ত্রধারণে সক্ষম ছিল, ততদিন কোনও বিদেশি শত্রু ভারতে প্রবেশ করতে সাহসী হয়নি।

    মহম্মদ সদলবলে অগ্রসর হতে লাগলেন, এবং জয়ী হলেন একাধিক ছোট ছোট যুদ্ধেও। কিন্তু তখনও রাজা দাহিরের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি।

    দাহির বামনাবাদ থেকে রাওয়ারে এসে হাজির হলেন—সঙ্গে তাঁর পঞ্চাশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য।

    আরবরাও সেইখানে এসে হাজির। দুই পক্ষই প্রস্তুত, কিন্তু সহসা কোনও পক্ষই আক্রমণ করতে অগ্রসর হল না।

    এইভাবে গেল কয়েকদিন। দুই পক্ষই পরস্পরের গতিবিধি লক্ষ করে, এখানে-ওখানে মাঝে মাঝে দু-একটা হাঙ্গামা হয়—ব্যস, এই পর্যন্ত!

    শেষটা দাহির আর স্থির থাকতে পারলেন না। ৭১২ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুন তারিখে রণহস্তীর উপর আরোহণ করে তিনি উচ্চকণ্ঠে বললেন, ‘সৈন্যগণ, আরবদের আক্রমণ করো!’

    আরম্ভ হল যুদ্ধ।

    কেউ হটতে রাজি নয়—দুই পক্ষেরই সমান জিদ! কার শক্তি বেশি, তাও বোঝা অসম্ভব! ঝন ঝন বাজতে লাগল তরবারি, শন শন ছুটতে লাগল শূল ও বাণ, ঝক-মক জ্বলতে লাগল হাজার হাজার বিদ্যুৎ-শিখা! বর্মে-বর্মে ঠোকাঠুকির শব্দ, যোদ্ধাদের ভৈরব-গর্জন, মত্ত হস্তীদের বৃংহিত ধ্বনি, অশ্বদের হ্রেষারব, আহতদের চিৎকার—পৃথিবীর কান যেন ফেটে যায়!

    যুদ্ধের পরিণাম যখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত, হঠাৎ ঘটল এক অঘটন।

    আরব তিরন্দাজরা জ্বলন্ত তুলা-জড়ানো তির নিক্ষেপ করছিল। আচম্বিতে সেই রকম একটি তির এসে লাগল দাহিরের হাতির গায়ে। তিরের শাণিত ফলার সঙ্গে সঙ্গে জ্বলন্ত আগুনের বিষম স্পর্শ পেয়ে হাতি দাহিরকে নিয়ে পাগলের মতো পাশের নদীর ভিতরে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। নেতা ও রাজার সেই দশা দেখে হিন্দু সৈন্যরা যুদ্ধ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল স্তম্ভিত, চিত্রার্পিতের মতো।

    নদীর মাঝখানে গিয়ে মাহুত অনেক কষ্টে হাতিকে শান্ত করলে। দাহির আবার তীরে এসে উঠলেন। আবার আরম্ভ হল যুদ্ধ।

    ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় জানা যায়, দাহির আরবদের মধ্যে গিয়ে পড়ে বিপুল বিক্রমে যখন শত্রুর পর শত্রু সংহার করছিলেন, তখন হঠাৎ এক তিরের আঘাতে আহত হয়ে হস্তীপৃষ্ঠ থেকে ঠিকরে পড়ে গেলেন মাটির উপরে।

    কিন্তু তবু তিনি নিরস্ত হলেন না, সেই আহত অবস্থাতেই উঠে দাঁড়িয়ে আবার তিনি ঘোড়ার উপরে চড়তে যাচ্ছেন, ঠিক সেই সময়ে কোথা থেকে একজন আরব সৈনিক ছুটে এসে তরবারি চালিয়ে তাঁকে কেটে ফেললে।

    সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ সাঙ্গ। নায়কের মৃত্যুতে হতাশ হয়ে হিন্দু সৈন্যরা রণক্ষেত্র ছেড়ে পলায়ন করলে। আকাশ-বাতাস পরিপূর্ণ হয়ে উঠল আরবদের জয়নাদে।

    বারংবার এই একই দৃশ্যের অভিনয় হয়েছে ভারতবর্ষে। প্রধান নায়কের পতন হলে এদেশি সৈন্যরা আর রণক্ষেত্রে দাঁড়াতে চায় না। কিন্তু ইউরোপের বহু রণক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, প্রধান নায়কের মৃত্যুর পরেও তাঁর স্থান গ্রহণ করে দ্বিতীয় নায়ক সৈন্যদের চালনা করে নিয়ে গেছেন জয়ের পথে।

    দাহির তো রণক্ষেত্রে বরণ করে নিলেন বীরের মৃত্যু এবং ভারতের মাটিতে সেইদিনই প্রথম কায়েমি হয়ে উড়তে লাগল অর্ধচন্দ্র-চিহ্নিত পতাকা, কিন্তু তারপর?

    তারপর সিন্ধুদেশের রাজধানীতে যখন সেই খবর গিয়ে পৌঁছোল, দাহিরের প্রধানা রানি রানিবাই তাঁর সখীদের সঙ্গে আত্মহত্যা করে শত্রুদের কবল থেকে করলেন উদ্ধারলাভ।

    তারপর? চরম যুদ্ধের পরেও হিন্দুরা মরিয়া হয়ে বামনাবাদে গিয়ে আর একবার ফিরে দাঁড়ালে। কিন্তু তারা আর ফেরাতে পারলে না ভারতবর্ষের দুর্ভাগ্যের স্রোত। যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মবলি দিলে ছাব্বিশ হাজার হিন্দু। আরবরা দখল করলে বামনাবাদ। তারপর আর মাথা তুলতে পারেনি সিন্ধুদেশবাসী হিন্দুরা। মুসলমানদের ভারত-বিজয়ের অধ্যায় সম্পূর্ণ হল।

    তারপর? বামনাবাদে ছিলেন রাজা দাহিরের দুই কুমারী কন্যা—সূর্য দেবী ও পর্মল (পরিমল) দেবী। তাঁদের রূপ দেখে চমৎকৃত হলেন বিজয়ী মহম্মদ। তিনি তাঁদের পাঠিয়ে দিলেন খলিফার হারেমের শোভাবৃদ্ধির জন্যে।

    তারপর? হ্যাঁ, তারপরেও আরও কিছু বাকি আছে। অপূর্ব এই পরিশিষ্ট! এ হচ্ছে এক ঐতিহাসিক রূপকথা!

    সূর্য দেবী, পর্মল দেবী! যেন স্বর্গীয় পারিজাতের দুটি হালকা পাপড়ি! রূপকাহিনির রাজকন্যারা যেন মূর্তিগ্রহণ করেছে তাঁদের মোহনীয় তনুলতার মধ্যে!

    পবিত্র আর্যাবর্তের দুই রাজকুমারী, বন্দিনী হয়ে তাঁরা চলেছেন কোন অজানা সুদূরে, বিধর্মী আরব খলিফার ভয়াবহ হারেমে! এমন সম্ভাবনা তখনকার দিনে কল্পনা করাও অসম্ভব!

    তাঁরা কাঁদছেন, কাঁদছেন আর কাঁদছেন; এবং কাঁদতে কাঁদতে মাঝে মাঝে তাঁরা গম্ভীর ও মূর্তির মতো স্থির হয়ে যাচ্ছেন; এবং তারপর মাঝে মাঝে গঙ্গাজলে-ধোয়া নির্মল ফুলের মতো অশ্রু-ভেজা মুখ দুখানি তুলে পরস্পরের সঙ্গে চুপিচুপি কী কথা বলছেন—যেন কী পরামর্শ করছেন! কিন্তু চুপিচুপি কথা বলবার দরকার ছিলনা। ভারতের ভাষা বোঝে না আরবরা।

    সূর্য দেবী, পর্মল দেবী! খলিফার হারেমে হাজির হলেন তাঁরা যথাসময়ে।

    দুই ভারতীয় রাজকুমারীর রূপের ছটা দেখে খলিফা ওয়ালিদের চক্ষু স্থির! শুষ্ক, দগ্ধ মরুর সন্তানের সুমুখে ভারতের স্নিগ্ধ সরস শ্যামল শ্রী মূর্তিমতী। চক্ষুস্থির হবার কথাই তো!

    জ্যেষ্ঠ রাজকুমারীর কাছে এগিয়ে গিয়ে খলিফা বললেন, ‘আমি তোমাকে বিবাহ করব।’

    সূর্য দেবী দুই হাত জোড় করে বললেন, ‘মহিমময় সম্রাট, আমাদের কারুর সঙ্গেই তো আপনার বিবাহ হতে পারে না!’

    খলিফা সবিস্ময়ে বললেন, ‘কেন?’

    সূর্য দেবী বললেন, ‘সম্রাটের সেনাপতি মহম্মদ আগেই আমাদের গ্রহণ করেছেন!’

    খলিফা ভ্রূ সঙ্কুচিত করে বললেন, ‘তোমার কথার অর্থ আমি বুঝতে পারছি না।’

    সূর্য দেবী বললেন, ‘সেনাপতি মহম্মদ গোপনে আমাদের বিবাহ করেছেন। আমরা সম্রাটের যোগ্য নই।’

    খলিফা ওয়ালিদ বজ্র-কণ্ঠে গর্জন করে বললেন, ‘কী! আমার ভৃত্য মহম্মদের এতবড় স্পর্ধা! উত্তম, আমি এখনই তার পাপের শাস্তি বিধান করব!’

    খলিফা ওয়ালিদ তখনই রাগে কাঁপতে কাঁপতে এক আদেশপত্র রচনা করলেন স্বহস্তে। তার মর্ম হচ্ছে এই : মহাপাপী মহম্মদ যেখানেই থাক, আমার এই আদেশপত্র পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন তাকে বন্দি করা হয়। তারপর কাঁচা গোচর্মের মধ্যে তাকে পুরে, চামড়া সেলাই করে আমার কাছে যেন পাঠিয়ে দেওয়া হয়—এই আমার হুকুম।

    খলিফা জানতেন, কাঁচা চামড়ার মধ্যে মহম্মদের দেহ সুদূর ভারত থেকে তাঁর রাজধানীতে আসতে লাগবে অনেকদিন। এর মধ্যে কাঁচা চামড়া যাবে শুকিয়ে, সঙ্কুচিত হয়ে এবং তা মহম্মদের দেহের চারপাশে চেপে বসে করবে তার প্রাণসংহার! এ-রকম শাস্তি দেবার পদ্ধতি বোধহয় আরবদের দেশে বহুকাল থেকেই প্রচলিত ছিল।

    রাজধানীতে যথাসময়েই এল চামড়ার থলির মধ্যে মহম্মদের মৃতদেহ।

    খলিফা সেইদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে সূর্য দেবীকে সগর্বে বললেন, ‘দ্যাখো, আমার ভৃত্যরা কীভাবে আমার হুকুম তামিল করে!’

    সূর্য দেবী বললেন, ‘সম্রাট, হুকুম দেওয়া খুবই সহজ! কিন্তু তার আগে সম্রাটের উচিত ছিল না, আমার অভিযোগ সত্য কি না সে-সম্বন্ধে খবর নেওয়া?’

    খলিফা বিপুল বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কী বলতে চাও?’

    —‘আমি মিথ্যাকথা বলেছি।’

    —‘মিথ্যাকথা বলেছ?’

    —‘হ্যাঁ সম্রাট, হ্যাঁ! মহম্মদ আমাদের বিবাহ করেননি।’

    —‘মহম্মদ তোমাদের বিবাহ করেনি!’

    —‘না।’

    —‘এমন মিথ্যাকথা বলার কারণ?’

    সূর্য দেবীর দুই চোখে ফুটল আগুনের ফিনকি। তীব্র স্বরে বললেন, ‘কারণ নেই সম্রাট? আপনি কি এরই মধ্যে ভুল গিয়েছেন যে, মহম্মদ আমাদের জন্মভূমি কেড়ে নিয়েছে, আমাদের পিতাকে হত্যা করেছে? তাই আমরা নিলুম প্রতিশোধ!’

    খলিফা ওয়ালিদ চিৎকার করে বললেন, ‘শয়তানি! তোদের জন্যে আমি আমার বিশ্বস্ত বিজয়ী সেনাপতিকে হারালুম। মৃত্যুদণ্ড! তোদের উপরেও আমি মৃত্যুদণ্ড দিলুম! এমন ভীষণ যন্ত্রণা দিয়ে তোদের হত্যা করা হবে যা তোরা কল্পনাও করতে পারবি না!’

    সূর্য দেবী কী উত্তর দিয়েছিলেন, মুসলমান ঐতিহাসিকরা তা লিপিবদ্ধ করেননি। কিন্তু সূর্য দেবী ও পর্মল দেবী ছিলেন সেকালকার আর্যাবর্তের কন্যা। তখনকার হিন্দু মেয়েরা যে কেমন হাসিমুখে অনায়াসে প্রাণ বিসর্জন দিতে পারত, ইতিহাসে আছে তার অগুনতি প্রমাণ।

    সুতরাং আমরা এটুকু অনুমান করলে অন্যায় হবে না যে, খলিফার কথার উত্তরে সূর্য দেবী হয়তো বলেছিলেন, ‘কী ভয় দেখাও সম্রাট? বিধর্মীর কবলে পড়লে ভারতের মেয়ে মৃত্যুকে দেখে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো! জন্মভূমির শত্রুকে আমরা ইহলোক থেকে বিদায় করেছি—আমরা পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিয়েছি! আর আমাদের বাঁচবার ইচ্ছা নেই—যা খুশি করতে পারো!’

    এই গল্পটি বলেছেন মুসলমান ঐতিহাসিকরাই এবং ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরাও এই গল্পটিকে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকরা কাহিনিটিকে সত্য বলে মানতে রাজি নন!

    গল্পটি রূপকথা কি না জানি না, কিন্তু সিন্ধু-বিজয়ের অল্পদিন পরেই মহম্মদকে যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, তার ঐতিহাসিক প্রমাণের অভাব নেই।

  • মারাঠার লিওনিডাস

    মারাঠার লিওনিডাস

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    মারাঠার লিওনিডাস

    চারশো আশি খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ। পারস্য করেছে গ্রিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা। পারস্যের বিপুল বাহিনীকে বাধা দেবার জন্য স্পার্টার রাজা লিওনিডাস এক হাজার মাত্র সৈন্য নিয়ে এগিয়ে এলেন।

    সংকীর্ণ গিরিসঙ্কট থার্মপিলি। সংখ্যায় অসংখ্য হলেও পারস্যের সৈন্যরা একসঙ্গে দল বেঁধে সেই সংকীর্ণ গিরিপথের ভিতরে প্রবেশ করতে পারলে না। নগণ্য গ্রিক সৈন্য নিয়ে লিওনিডাস অগণ্য শত্রু-সৈন্যকে বাধা দিলেন বহুক্ষণ ধরে। কিন্তু অসম্ভব হল না সম্ভবপর। অবশেষে লিওনিডাসকেই প্রাণ বিসর্জন দিতে হল সদলবলে।

    ইউরোপের লোকেরা এই ঘটনা আজ পর্যন্ত ভোলেনি। লিওনিডাসের জন্যে সারা ইউরোপ গর্ব অনুভব করে। সায়েবরা ইউরোপের বাইরে যেখানে গিয়েছে, সেইখানেই শুনিয়েছে লিওনিডাসের গল্প। তোমরাও নিশ্চয় ইশকুলের কেতাবে এই গল্প পাঠ করেছ। লিওনিডাস যে স্মরণীয় বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই; কিন্তু আমাদের ভারতবর্ষেও যে লিওনিডাসের সঙ্গে তুলনীয় বীরের অভাব নেই, তোমাদের কয়জনে সে খবর রাখে?

    ষোলোশো ষাট খ্রিস্টাব্দ। বিজাপুরের অধিপতি আলি আদিল শা করেছেন শিবাজির বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা। শিবাজি তখনও ছত্রপতি হননি। বিজাপুরের অধিপতি তখনও তাঁকে মনে করেন সামান্য এক বিদ্রোহী জায়গিরদারের মতো; কিন্তু বিজাপুরের সেনাপতি আফজল খাঁকে হত্যা করে তাঁর নাম তখন ছড়িয়ে পড়েছে মহারাষ্ট্রের দিকে দিকে। দলে দলে মারাঠি এসে সমবেত হয়েছে তাঁর পতাকার তলায়। তাদের সাহায্যে বারবার শত্রুদের পরাস্ত করে ইতিমধ্যেই তিনি গড়ে তুলেছেন একটি নাতিবৃহৎ স্বাধীন হিন্দুরাজ্য।

    পানহালা হচ্ছে দুর্গের নাম। তার অবস্থান কোলাপুরে। শিবাজি নিজের কতক সৈন্য নিয়ে বাস করছিলেন সেইখানেই।

    শিবাজির কয়েকখানি পুরাতন প্রতিকৃতি আছে। কিন্তু সেগুলি যে শিবাজির জীবনকালে তাঁকে চোখে দেখে আঁকা হয়েছিল, এমন কোনও নিশ্চিত প্রমাণ নেই। খুব সম্ভব, জীবন্ত শিবাজিকে স্বচক্ষে দেখলেও শিল্পীরা এ ছবিগুলি এঁকেছিলেন তাঁর মৃত্যুর পরে, নিজেদের স্মৃতির উপরে নির্ভর করে। সুতরাং ধরে নেওয়া যেতে পারে, চিত্রাঙ্কিত মূর্তির সঙ্গে আসল শিবাজির মোটামুটি সাদৃশ্য আছে।

    তবে পুরাতন চিঠিপত্রে শিবাজির চেহারার বর্ণনা পাওয়া যায়। শিবাজির বয়স যখন আটত্রিশ কি উনচল্লিশ, তখন Escaliot নামে এক ইংরেজ সুরাট শহরে তাঁকে দেখে লিখেছিলেন : ‘শিবাজির দেহ মাঝারি আকারের এবং সুগঠিত। তাঁর মুখ হাসি হাসি, দৃষ্টি চঞ্চল ও মর্মভেদী, তাঁর রং অন্যান্য মারাঠিদের চেয়ে সাদা।’

    প্রায় ওই সময়েই Thevenot নামে এক ফরাসি ভ্রমণকারীও শিবাজিকে স্বচক্ষে দেখে বলেছেন : ‘রাজা মাথায় উঁচু নন। তাঁর গায়ের রং কটা। চঞ্চল দৃষ্টির ভিতর দিয়ে প্রকাশ পায় সজীবতার প্রাচুর্য।’

    ইংরেজ দূত Henry Oxinden শিবাজিকে ওজন হতে দেখেছিলেন। ওজনে তাঁর দেহ ছিল কিছু বেশি দুই মন।

    পানহালাগড়ে শিবাজিকে আক্রমণ করতে এলেন বিজাপুরের সেনানী ফজল খাঁ ও তাঁর প্রধান পার্শ্বচর সিদ্দি হালাল। সঙ্গে তাঁদের পনেরো হাজার সৈন্য।

    যে আফজল খাঁকে শিবাজি হত্যা করেছিলেন, এই ফজল খাঁ হচ্ছেন তাঁরই পুত্র। তিনি যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে এসেছিলেন, এটুকু সহজেই অনুমান করা যায়। তাঁর হাতে পড়লে শিবাজির আর রক্ষা নেই!

    শিবাজির সৈন্যসংখ্যা পাঁচ-ছয় হাজারের বেশি ছিল না বটে, কিন্তু পানহালার মতো মস্তবড় ও সুরক্ষিত কেল্লার আশ্রয়ে থেকে তিনি আত্মরক্ষার সুযোগ পেলেন যথেষ্ট। উপরন্তু মাঝে মাঝে তাঁর সৈন্যরা হঠাৎ কেল্লা থেকে বেরিয়ে পড়ে এমনভাবে শত্রুসংহার করতে লাগল যে, বিজাপুরীর দল রীতিমতো ভয় পেয়ে নিরাপদ ব্যবধানে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হল। অবশ্য এটা বলা বাহুল্য, পিছিয়ে গিয়েও তারা চারিদিক থেকেই দুর্গকে বেষ্টন করে রইল।

    তারপর ফজল খাঁ অবলম্বন করলেন এক নতুন কৌশল।

    পানহালার কাছেই ছিল মারাঠিদের পানগড় নামে আর একটা কেল্লা। সেটি পানহালার মতো সুরক্ষিত না হলেও তার অবস্থিতি ছিল এমনধারা যে, পানগড় হারালে পানহালার মারাঠিদের খোরাকের অভাবে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া উপায়ান্তর থাকবে না।

    সুচতুর ফজল খাঁ প্রথমে পানগড়ের নিকটস্থ একটা ছোট পাহাড় দখল করলেন। তারপর পাহাড়ের টঙে কয়েকটা কামান টেনে তুলে একেবারে পানগড়ের ভিতর গোলা নিক্ষেপ করতে লাগলেন।

    পানগড়ের ভিতর ছিল অল্প মারাঠি সৈন্য। তাদের অবস্থা হল শোচনীয়। দুর্গ-রক্ষক শিবাজির কাছে খবর পাঠালেন, ‘শীঘ্র সৈন্য পাঠিয়ে সাহায্য করুন, নইলে আমরা শত্রুদের আর ঠেকাতে পারব না।’

    শিবাজি পড়লেন মহা সমস্যায়। তাঁর সঙ্গেও এত বেশি সৈন্য নেই যে, পানগড়কে সাহায্য করতে পারেন। অথচ লোকাভাবে পানগড়ের পতন হলে আহার অভাবে তাঁকেও করতে হয় আত্মসমর্পণ।

    বেশি ভাবনারও সময় নেই। তাড়াতাড়ি না করলে পালাবার পথও বন্ধ হবে। শিবাজি হুকুম দিলেন, ‘শোনো সবাই! কতক সৈন্য পানহালাতেই থাকো। তারা যতক্ষণ পারে দুর্গ রক্ষা করুক। আজকের রাত্রি অন্ধকার। এই সুযোগে আমি বাকি সৈন্য নিয়ে শত্রুব্যূহ ভেদ করে অন্য কোথাও চলে যাই।’

    সেই ব্যবস্থাই হল। সে রাত্রে চাঁদ ওঠেনি, অন্ধকারে মানুষের চোখ অন্ধ। মারাঠিরা বাঘের মতো বিজাপুরীদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

    এই আকস্মিক আক্রমণের জন্যে শত্রুরা প্রস্তুত ছিল না, তারা দস্তুরমতো হতভম্ব হয়ে গেল।

    সেই ফাঁকে শিবাজি অদৃশ্য হলেন সদলবলে। তিনি সোজা ধরলেন তাঁর আর এক কেল্লা বিশালগড়ে যাবার পথ। সেখান থেকে বিশালগড়ের দূরত্ব সাতাশ মাইল।

    কিন্তু শিবাজির অন্তর্ধানের কথা বেশিক্ষণ চাপা রইল না।

    ফজল খাঁ গর্জন করে বললেন, ‘কোথায় পালাবে আমার পিতৃহন্তা? সিদ্দি হালাল, ডাক দাও আমার সৈন্যদের। এই পাহাড়ে-ইঁদুরকে গর্তে ঢোকবার আগেই বন্দি করা চাই! জলদি চলো—জলদি চলো!’

    কালিমার ঘেরাটোপে ঢাকা রাত, মর্মর-আর্তনাদে ভরা গহন বন, অসমোচ্চ দুর্গম পাহাড়ে পথ।

    কিন্তু মারাঠিদের অভিযোগ নেই। তাদের দেশের রাজা, প্রাণের রাজা শিবাজির নির্দেশে তারা চলেছে মৌনমুখে, সারে সারে।

    কালো রাতের কোলে ফুটল আলোমাখা প্রভাতের নয়ন। সকলে এসে পড়েছে গজপুরে। এখনও আটমাইল দূরে বিশালগড়।

    সেইখানেই প্রথম জানা গেল, বিজাপুরীরাও সারা রাত ধরে ছুটে আসছে মারাঠিদের পিছনে পিছনে। সংখ্যায় তারা অনেক বেশি।

    সকলেই সচকিত! এখন উপায়? মুষ্টিমেয় মারাঠি সৈন্য নিয়ে শত্রুদের বাধা দেওয়া অসম্ভব। অথচ তাদের বাধা দিতে না পারলে এখানেই শিবাজির সমস্ত আশা-ভরসার অবসান!

    সেখানে পথ গিয়ে পড়েছে এক অতি-সংকীর্ণ গিরিবর্ত্মের ভিতরে।

    সেইদিকে তাকিয়েই শিবাজির চক্ষু প্রদীপ্ত হয়ে উঠল। তিনি ডাকলেন, ‘বাজি প্রভু!’

    একজন মারাঠি যোদ্ধা তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল।

    —‘বাজি প্রভু, ওই সরু গিরি-পথটা দেখছ?’

    —‘আজ্ঞে হ্যাঁ, রাজা!’

    —‘বিজাপুরীরা আসছে আমাকে বধ করতে। আমি তোমার অধীনে কয়েকজন লোক রেখে বিশালগড়ে যাত্রা করতে চাই বাকি সবাইকে নিয়ে। যতক্ষণ না আমি সেখানে গিয়ে উপস্থিত হই, ততক্ষণ তুমি ওই গিরিবর্ত্ম রক্ষা করতে পারবে কি?’

    —‘আজ্ঞে হ্যাঁ, রাজা!’

    —‘বিশালগড়ে পৌঁছেই আমি তোপধ্বনি করে জানিয়ে দেব আমরা নিরাপদ। তারপরে তোমার কর্তব্য শেষ হবে।’

    —‘উত্তম!’

    বাজি প্রভু তাঁর অনুচরদের নিয়ে গিরিবর্ত্ম জুড়ে দাঁড়ালেন। সকলেরই মুখে-চোখে এমন দৃঢ়প্রতিজ্ঞার ভাব যে, দেখলেই বুঝতে দেরি লাগে না, জীবনটাকে তারা বিক্রি করবে খুব চড়া মূল্যেই!

    বিজাপুরীদের দেখা গেল। তারা ছুটে আসছে কাতারে কাতারে। যেন বাঁধভাঙা বন্যা!

    কিন্তু গিরিবর্ত্মের সামনে এসেই তাদের অগ্রগতি হল রুদ্ধ! এই সরু পথের ভিতরে পাশাপাশি কয়েকজনের বেশি লোকের প্রবেশ করবার উপায় নেই।

    ফজল খাঁ ক্রুদ্ধস্বরে চিৎকার করে বললেন, ‘অগ্রসর হও—অগ্রসর হও! ওই গোটাকয়েক কাফেরকে কেটে কুচি কুচি করে ফ্যালো!’

    যে কয়জন বিজাপুরী বর্ত্মের মধ্যে গিয়ে ঢুকল, তাদের কেউ আর ফিরল না। মারাঠি বন্দুকধারী, ধনুকধারী, বর্শাধারী ও তরবারিধারী বীরদের পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ল তাদের ক্ষতবিক্ষত জীবনহীন দেহগুলো।

    ফজল খাঁ আবার গর্জে উঠলেন, ‘কুছ পরোয়া নেহি। আক্রমণ করো! যেমন করে পারো পথ সাফ করো!’

    পিঁপড়দের মতো লম্বা সার বেঁধে বিজাপুরীরা গিরিবর্ত্মে প্রবেশ করে, কিন্তু খানিক পরে আর অগ্রসর হতে পারে না, তাদের দেহ হয় ‘পপাত ধরণীতলে!’

    বর্ত্মের মধ্যে ক্রমেই উঁচু হয়ে উঠতে লাগল বিজাপুরীদের দেহের স্তূপ। মারাঠিরাও যে মরছিল না, এ কথা বলা যায় না। কিন্তু দু-একজন মারাঠি মরে তো বিজাপুরী মরে দশ-পনেরো জন।

    মারাঠিরা সংখ্যায় ছিল অতি অল্প। বহু শত্রু বধ করে দু-একজন করে মরতে মরতেও মারাঠিরা দলে হয়ে পড়ল আরও হালকা; কিন্তু তবু যুদ্ধ চলে, তবু বিজাপুরীরা অগ্রসর হতে পারে না, যদিও তাদের বাহিনী তখনও বিপুল!

    সর্বাগ্রে পথ জুড়ে অচল শিলামূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন বাজি প্রভু—তাঁর ঊর্ধ্বোত্থিত কৃপাণ রক্তাক্ত, তাঁর সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত। মধ্যাহ্ন সূর্যের কিরণে সেই শাণিত কৃপাণ জ্বলে জ্বলে উঠছে সরল বিদ্যুৎশিখার মতো, তার প্রতাপে আজ নিবে গিয়েছে কত শত্রুর জীবনদীপ, সে হিসাব কেউ রাখেনি!

    বাজি প্রভু ক্ষিপ্রহস্তে অস্ত্রচালনা করছেন আর দৃপ্ত কণ্ঠে বলছেন, ‘বাধা দাও, বধ করো! এখনও তোপধ্বনি হয়নি—এখনও মারাঠার রাজা নিরাপদ নন!’

    ইতিহাস বলে, সূর্যোদয়ের পরে সুদীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টাকাল ধরে চলেছিল এই অভাবিত যুদ্ধ এবং গিরিবর্ত্ম পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল সাত শত মৃতদেহে!

    বিজাপুরীরা ফিরে যায় এবং এগিয়ে আসে বারে বারে।

    ফজল খাঁ থেকে থেকে বলে ওঠেন, ‘পিতৃহন্তার—পিতৃহন্তার মুণ্ড চাই! মুণ্ড চাই!’

    আঘাতের পর আঘাতে বাজি প্রভুর আহত দেহ ক্রমেই অবসন্ন হয়ে আসে। সাগ্রহে উৎকর্ণ হয়ে তিনি গোনেন মুহূর্তের পর মুহূর্ত। কিন্তু তবু শোনা যায় না তোপধ্বনি! ওগো রাজা, তুমি কি ভুলে গেলে আমাদের কথা? আর যে পারি না! কোথায় তোমার কামানের ভাষা!

    বিজাপুরীরা আবার এগিয়ে আসছে। খালের ভিতরে ঢুকছে যেন সমুদ্রের প্লাবন!

    শোনা গেল ফজল খাঁর হুকুম : ‘গুলিবৃষ্টি করো-গুলিবৃষ্টি করো! কাফেররা আর বেশিক্ষণ আমাদের বাধা দিতে পারবে না!’

    বাজি প্রভু হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, ‘বাধা দাও! বধ করো। দেহে যতক্ষণ এক ফোঁটা রক্ত থাকবে—বাধা দাও, বাধা দাও, মারাঠার বীর সন্তান!’

    গিরিবর্ত্মের মধ্যে বেগে ছুটে এল উত্তপ্ত গুলির ঝড়! তার পিছনে ধেয়ে আসছে শত্রুসৈন্যের অফুরন্ত শ্রেণি!

    আবার আহত হয়ে রক্ত-পিছল পাহাড়ের উপরে আছাড় খেয়ে পড়লেন বাজি প্রভু! সেইখানে শুয়ে শুয়েই তিনি ক্ষীণ অথচ দৃঢ়স্বরে বললেন, ‘মারাঠার বীরগণ! জীবন শেষ হল, কিন্তু আমার কর্তব্য শেষ হল না। আমি চললুম, কিন্তু তোমরা রইলে। যতক্ষণ না তোপ শোনা যায়, বাধা দাও—বাধা দাও!’

    তাঁর শেষ-নিশ্বাস যখন পড়ে পড়ে আচম্বিতে বিশালগড় থেকে ভেসে এল গুড়ুম করে শিবাজির তোপের আওয়াজ!

    বাজি প্রভু বাক্যহীন হলেও তখনও সচেতন। তাঁর দুই চোখ হয়ে উঠল উজ্জ্বল এবং মুখে ফুটল স্বর্গের আনন্দ।

    বাজি প্রভুর স্মৃতিই অমর হয়ে নেই, তাঁর অবিনশ্বর আত্মাও বিরাজ করছে এই মহাভারতের স্বাধীন জনতার মধ্যে!

  • ভারতের একমাত্র সুলতানা

    ভারতের একমাত্র সুলতানা

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    ভারতের একমাত্র সুলতানা

    যেখানে থাকে বজ্র-আগুন সেখানেই ফোটে চন্দ্রের চন্দন-ধারা। তাই তো আকাশ এমন বিচিত্র, এত সুন্দর!

    পৃথিবীতেও মাঝে মাঝে এক-একজন মানুষ দেখা যায় যার মনের ভিতরে থাকে ফুলের কোমলতা আর বজ্রের কাঠিন্য। ভগবান তাদের জীবনের রাজপথে পাঠিয়ে দেন অসাধারণ হবার জন্যেই।

    ইতিহাসে এমনই অসাধারণ কয়েকজন পুরুষের নাম পড়ি। না, কেবল পুরুষ নয়, এমন অসাধারণ কয়েকজন নারীও পৃথিবীর ইতিহাসে বিখ্যাত ও অমর হয়ে আছেন।

    আজ এমনই এক বিচিত্র নারীর কথাই বলব। বাংলাদেশে তাঁকে ‘রিজিয়া’ বলে ডাকে, কিন্তু আসলে তাঁকে আমরা ডাকতে পারি ‘রাজিয়া’ নামে। বাংলাভাষায় ‘রিজিয়া’ বলে একখানি নাটক আছে, তার আগাগোড়াই কাল্পনিক প্রলাপে পরিপূর্ণ। সত্যিকার রাজিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই বললেও চলে।

    যেসব দাস-রাজা দিল্লির সিংহাসন অধিকার করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য বলে বিখ্যাত হয়েছে সুলতান ইলতুতমিস। অধিকাংশ পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকরা ভুল করে তাঁকে ডেকেছেন ‘আলতুমাস’নামে।

    রাজিয়া ছিলেন ইলতুতমিসেরই কন্যা। পৃথিবীর সব দেশেই রাজকন্যা বললে মনে জাগে এক সুন্দরীর ছবি। সুতরাং আশা করা যায়—রাজিয়াও ছিলেন সুন্দরী; এবং শিক্ষায়-দীক্ষায় ও চরিত্রের নানা গুণে তিনি যে যথেষ্ট উন্নত ছিলেন, এরও অনেক প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর পরবর্তী জীবনে; এবং কুসুমকোমলা নারীরূপে জন্মালেও রাজিয়ার চরিত্রে ছিল যে পুরুষোচিত দৃঢ়তা, এর প্রমাণ পাই আমরা তাঁর পিতার মুখেই।

    ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দ। সুলতান ইলতুতমিস শুয়েছেন মৃত্যু-শয্যায়।

    সুলতানের নানা মহিষীর কয়েকটি সন্তান ছিল। তাঁদের মধ্যে সিংহাসনে বসবার যোগ্যপাত্র ছিলেন কেবল জ্যেষ্ঠ রাজপুত্র—বঙ্গদেশের শাসনকর্তা মামুদ। কিন্তু তিনি অকালেই মারা পড়েছেন। তাই মন্ত্রী ও সভাসদদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই।

    তাঁরা বললেন, ‘সুলতান, আপনার অবর্তমানে সিংহাসনে বসবে কে?’

    ইলতুতমিস বললেন, ‘আমার মেয়ে রাজিয়া।’

    বিপুল বিস্ময়ে সকলে স্তম্ভিত! কোনও মুসলমান রাজ্যে কে কবে শুনেছে রাজ-সিংহাসনে বসেছে পুত্রের বদলে কন্যা?

    মন্ত্রীরা বললেন, ‘সুলতান, রাজিয়া যে পুরুষ নন!’

    ইলতুতমিস বললেন, ‘তোমরা লক্ষ করলেই বুঝবে, আমার সব ছেলের চেয়ে রাজিয়ার মধ্যেই আছে বেশি পুরুষত্ব।’ এই বলেই তনি অন্যদিকে পাশ ফিরে শুলেন। তাঁর মৃত্যু হল।

    যা কখনও হয়নি, তা হয় কেমন করে? মন্ত্রীদের সেই পুরাতন যুক্তি?

    ইলতুতমিসের শেষ-ইচ্ছা পূর্ণ হল না। আমির-ওমরাওরা সুলতানের এক ছেলেকেই দিল্লি-সাম্রাজ্যের অধিকারী বলে স্থির করলেন। তাঁর নাম ফিরুজ। তিনি রাজিয়ার সৎমা, শা তুর্কানের পুত্র।

    শা তুর্কান প্রথমে ছিলেন রাজবাড়ির দাসী, তারপর সুলতানের সুনজরে পড়ে হন রানি। অন্য অন্য রানিরা ছিলেন বড়ঘরের মেয়ে, তাঁরা কোনওদিনই শা তুর্কানকে রানির মর্যাদা দিতে পারেননি। শা তুর্কান এতকাল ধরে সেই অপমান পুষে রেখেছিলেন মনে মনে।

    ফিরুজের রাজা হবার কোনও যোগ্যতাই ছিল না। মুকুট পরে তিনি দিন-রাত মেতে রইলেন বাজে আমোদ-প্রমোদে। রাজকার্যের ভার গ্রহণ করলেন তাঁর মা। হাতে ক্ষমতা পেয়ে তাঁর প্রথম কাজ হল, অন্যান্য সতীনদের বধ করা। যাঁরা বেঁচে রইলেন, তাঁদের উপরেও অত্যাচার অপমানের সীমা রইল না। সুলতানের অন্য এক রানির এক শিশুপুত্রেরও দুই চক্ষু উপড়ে নেওয়া হল।

    ব্যাপার দেখে সকলেই বিরক্ত। রাজ্যে দিকে দিকে মাথা তুলে দাঁড়াল বিদ্রোহীরা। নানা প্রদেশের শাসনকর্তা প্রকাশ্যে স্বাধীনতা ঘোষণা করে পরস্পরের সঙ্গে মিত্রতা-সূত্রে আবদ্ধ হলেন। সৈন্য-সামন্ত নিয়ে ফিরুজ গেলেন তাঁদের দমন করতে, কিন্তু পারলেন না।

    এদিকে শা তুর্কানের বিষদৃষ্টি পড়েছে তখন রাজিয়ার উপরে। সুলতানের এই বুদ্ধিমতী ও গুণবতী মেয়েটিকে রাজ্যসুদ্ধ সবাই ভালোবাসে, এতটা শা তুর্কানের সইল না। তিনি রাজিয়াকে পৃথিবী থেকে সরাবার ষড়যন্ত্রে প্রবৃত্ত।

    শুনেই দিল্লির প্রজারা খেপে উঠল। বিদ্রোহীদের দলে অনেক আমির-ওমরাও পর্যন্ত যোগ দিলেন। দুষ্টা শা তুর্কান হলেন বন্দিনী; এবং ফিরুজ পালালেন রাজধানী ছেড়ে, কিন্তু আত্মরক্ষা করতে পারলেন না। বিদ্রোহীদের তরবারিতে তাঁর মুণ্ড গেল উড়ে। ফিরুজের ছয় মাস আর সাত দিনের রাজত্ব ভোগ শেষ হল। সে যেন আবু হোসেনের বাদশাগিরি!

    প্রজারা একবাক্যে বললে, ‘আমাদের রানি হবেন রাজিয়া!’

    মন্ত্রী ও আমির-ওমরাওরা প্রজাদের কথা ঠেলতে পারলেন না। সেই প্রথম ও শেষবারের জন্য দিল্লির রাজতন্ত্রের একমাত্র অধিকারিণী হলেন একজন নারী। এ এক কল্পনাতীত ব্যাপার! সুলতানা রাজিয়া! (১২৩৬ খ্রিস্টাব্দ)।

    কিন্তু সাম্রাজ্যের চতুর্দিকে বিপদের মেঘ তখনও পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে।

    মিত্রপক্ষ—অর্থাৎ মুলতান, হান্সি, লাহোর ও বুদায়ুনের বিদ্রোহী শাসনকর্তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ফিরুজের মন্ত্রী জুনাইদি তখন দিল্লি আক্রমণ করতে আসছেন—তাঁরা সবাই চান সুলতানা রাজিয়ার মুকুট কেড়ে নিতে। বিদ্রোহীরা দিল্লি অবরোধ করলে।

    রাজিয়া বুঝলেন তিনি দুর্বল ও বিদ্রোহীরা প্রবল। সম্মুখ-যুদ্ধে নামলে তাঁর পরাজয় নিশ্চিত। তখন কৌশলে কার্যসিদ্ধি করবার জন্যে তিনি দিল্লি থেকে বেরিয়ে পড়ে ছাউনি ফেললেন যমুনার তীরে।

    আমরা বলি—‘নারী-বুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী’। সুলতানা রাজিয়া দেখালেন তারই এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত। তবে প্রলয়টা হল এখানে কেবল বিদ্রোহীদেরই পক্ষে!

    তিনি গোপনে মুলতানের দুইজন প্রবল বিদ্রোহী নেতাকে আহ্বান করে মিষ্ট কথায় ও নানা লোভ দেখিয়ে তাঁদের পক্ষে আনলেন। তারপর তারা যখন তাঁর প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে বিদ্রোহীদের দলে গিয়ে হাজির হল, সুচতুরা সুলতানা রাজিয়া তখন সেই চক্রান্তের কাহিনি অন্যান্য বিদ্রোহী নেতাদের কাছে প্রকাশ করে দিলেন।

    বিদ্রোহীদের দলে পড়ে গেল মহা হইচই! সবাই ভীত, সবাই তটস্থ! কেউ কারুকে বিশ্বাস করতে পারে না—প্রত্যেকেই প্রত্যেককে ভাবে শত্রু বলে। তাদের দল গেল ভেঙে। এক-একজন নেতা আপন আপন দল নিয়ে সরে পড়বার চেষ্টা করেন-আর রাজিয়ার সৈন্যরা প্রধান দল ছাড়া সেইসব নেতাকে করে আক্রমণ ও বন্দি। এইভাবে বিদ্রোহীদের অনেকে মারা পড়ল। বাকি সবাই পালিয়ে গেল। জয় হল রাজিয়ার তীক্ষ্ণবুদ্ধির! সমগ্র হিন্দুস্থান হল তাঁর অধিকারভুক্ত। এমনকী, সুদূর বঙ্গদেশ ও সিন্ধুদেশও তাঁর বশীভূত না হয়ে পারলে না বিনাযুদ্ধেই কেল্লা ফতে!

    সাম্রাজ্য নিষ্কণ্টক! সুলতানা রাজিয়া তখন আমাদের পৌরাণিক চিত্রাঙ্গদার মতন নবমূর্তি ধারণ করলেন!

    অর্থাৎ তিনি ছুড়ে ফেলে দিলেন নারীর পোশাক, ত্যাগ করলেন নারীর ভাবভঙ্গি, ভুলে গেলেন মুসলমানি পরদা-প্রথা। সিংহাসনে বসেন পুরুষের সাজে, রণক্ষেত্রে যান সশস্ত্র যোদ্ধার বেশে। এই তেজীয়ান নারীর চিত্তের মধ্যে যথার্থ পুরুষত্বের আশ্চর্য বিকাশ দেখে, গোঁড়া মুসলমানরাও নীরব হয়ে রইলেন,—কোনওরকম আপত্তি প্রকাশ করলেন না।

    কিন্তু গোলমাল শুরু হল আর-এক কারণে।

    বুদ্ধিমতী রাজিয়া মানুষ চিনতেন। যোগ্যতা দেখে তিনি আফ্রিকা থেকে আগত জালালুদ্দিন ইয়াকুত নামক এক ব্যক্তিকে নিজের গার্হস্থ্য বিভাগের একটি উচ্চপদ প্রদান করলেন।

    রাজসভায় তখন তুর্কি আমির-ওমরাওদের বিশেষ প্রভাব,—আফ্রিকার লোকদের তাঁরা সুনজরে দেখতেন না, ঘৃণা করতেন। ইয়াকুতকে সুলতানার অনুগ্রহভাজন হতে দেখে তাঁরা হাড়ে হাড়ে জ্বলে উঠলেন; এবং নারীর প্রভুত্ব যাঁদের পক্ষে একেবারেই অসহনীয়, দেশে তখনও এমন সব লোকেরও অভাব ছিল না। তাঁরাও রাজিয়ার বিরুদ্ধে তুর্কি চক্রান্তকারীদের সঙ্গে যোগদান করলেন।

    আয়াজ ছিলেন একজন প্রধান চক্রী—রাজিয়ারই অনুগ্রহে তিনি হয়েছিলেন পাঞ্জাবের শাসনকর্তা। রাজিয়া প্রথমেই সসৈন্যে তাঁকে আক্রমণ ও পরাজিত করলেন। আয়াজ প্রাণ বাঁচালেন পালিয়ে!

    কিন্তু অন্যান্য চক্রীদের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে উঠতে লাগল। ইকতিরুয়াদ্দিন আলতুনিয়া ভাতিন্দার শাসনকর্তা, ক্ষমতাশালী ও যোদ্ধা বলে তাঁর অল্প প্রতিপত্তি ছিল না। চক্রীদের প্ররোচনায় ভুলে তিনিও বিদ্রোহী হলেন।

    রাজিয়া আলতুনিয়াকে দমন করবার জন্যে আবার যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন। তাঁর ফৌজের মধ্যে কেবল বিশ্বাসী ইয়াকুতই ছিলেন না, তুর্কি চক্রান্তকারীদের দলও ছিল রীতিমতো ভারী।

    বীর নারী রাজিয়া ভাতিন্দায় পৌঁছে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন, এমন সময়ে হঠাৎ তুর্কি চক্রীরা মুখোশ খুলে ফেললেন।

    শত্রুর সৃষ্টি হয় যখন ঘরে-বাইরে তখন তাদের আর ঠেকানো যায় না। বিশ্বাসঘাতক তুর্কি-আমির-ওমরাওরা প্রথমেই ইয়াকুতকে হত্যা করলেন, তারপর বন্দি করলেন সুলতানা রাজিয়াকে। তারপর আলতুনিয়াকে ডেকে বন্দিনি সুলতানাকে তাঁরই হাতে সঁপে দিলেন।

    রাজিয়ার এক বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন, তাঁর নাম মুইজুদ্দিন বারাম। চক্রীদের অনুগ্রহে দিল্লির সিংহাসন লাভ করলেন তিনিই (১২৪০ খ্রিস্টাব্দ)।

    চক্রীদের মনের বাসনা পূর্ণ। দিল্লির সিংহাসন থেকে নারীর প্রভুত্ব বিলুপ্ত। রাজিয়া শত্রুর হস্তে বন্দিনি।

    কিন্তু কারাগারের অন্ধকারে বসে রাজিয়া এখন কী করছেন? নিশ্চয়ই চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছেন না! তিনি সিংহাসনে বসে সাম্রাজ্যচালনা ও অশ্বপৃষ্ঠে বসে অস্ত্রচালনা করেছেন, তাঁর চোখে অশ্রু সাজে না।

    সিংহাসন বসেই একদিন তিনি বিনা যুদ্ধেই প্রবল শত্রুপক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছেন। আজ আবার তিনি কৌশলে শত্রুজয় করে নিজের গত গৌরবকে ফিরিয়ে আনতে চাইলেন।

    রাজিয়া আহ্বান করলেন আলতুনিয়াকে।

    বিস্মিত আলতুনিয়া কারাগারে এসে দাঁড়ালেন।

    রাজিয়া সহাস্যে তাঁকে অভ্যর্থনা করে বললেন, ‘বীরবর, আরও কতদিন আমি তোমার কারাগারে আতিথ্য স্বীকার করব? আমাকে বন্দিনী করে রেখে তোমার কী লাভ?’

    আলতুনিয়া তিক্ত স্বরে বললেন, ‘লাভ? কোনওই লাভ নেই। বোকার মতন আমি হয়েছি চক্রীদের হাতের খেলার পুতুল। তারা সবাই নিজের নিজের কাজ গুছিয়েছে—কেউ করেছে তোমার বোনকে বিয়ে, কেউ হয়েছে মন্ত্রী। আর আমাকে করে রেখেছে কেবল তোমার ভারবাহী গর্দভ!’

    রাজিয়া বললেন, ‘এ ভার ত্যাগ করতে পারবে?’

    —‘তাতেই বা আমার কী লাভ?’

    —‘লাভ?…জানো বীর, একদিন যে দিল্লির সিংহাসনে বসেছে, আবার সে সেই সিংহাসনে আরোহণ করতে পারে!’

    —‘কেমন করে?’

    —‘তুমি যোদ্ধা, তোমার নিজের সৈন্য আছে। ইচ্ছা করলে তুমি আরও অনেক নতুন সৈন্য সংগ্রহ করতে পারো। তারপর তোমার সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করে আবার আমি দিল্লি অধিকার করব।’

    আলতুনিয়া খানিকক্ষণ ভেবে বললেন, ‘সুলতানা, ধরো, যুদ্ধে আমরাই জয়ী হলুম। কিন্তু সিংহাসনে আবার বসে তুমি কি আর আমার কথা মনে রাখবে?’

    —‘বীর, তোমার কি সন্দেহ হচ্ছে?’

    —‘হচ্ছে। রাজনীতি বড়োই কুটিল।’

    —‘কী করলে তোমার সন্দেহ দূর হবে?’

    —‘সুলতানা, তুমি যদি আমাকে বিবাহ করো, তবেই আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি।’

    রাজিয়া নতনেত্রে বললেন, ‘বেশ, আমি রাজি।’

    শত্রু হলেন স্বামী!

    সুলতানা রাজিয়া আবার শত্রুজয় করলেন।

    কিন্তু তারপর আর বেশি কিছু বলবার নেই। এবার ভাগ্যদেবী দাঁড়ালেন তাঁর বিপক্ষে।

    স্বামীর সঙ্গে সৈন্য নিয়ে আবার তিনি দিল্লির পথ ধরলেন, পথিমধ্যে দেখা হল তাঁর ভাই বারামের সঙ্গে—দিল্লির যিনি নতুন সুলতান।

    যুদ্ধ হল। ভাই দিলেন বোনকে হারিয়ে।

    তার পরদিনই স্ব-পক্ষীর ঘাতকের হস্তে সুলতানা রাজিয়া ও তাঁর স্বামী আলতুনিয়া ইহলোক ত্যাগ করলেন।

    দিল্লি এবং পৃথিবীর আর কোনও মুসলমান সাম্রাজ্যে আর কোনও নারী মাথায় সম্রাজ্ঞীর মুকুট পরবার সৌভাগ্য অর্জন করেননি।

  • ব্যাঘ্রভূমির বঙ্গবীর

    ব্যাঘ্রভূমির বঙ্গবীর

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    ব্যাঘ্রভূমির বঙ্গবীর

    ললিতাদিত্য তখন কাশ্মীরের রাজা। তিনি সিংহাসন অধিকার করে ছিলেন ৭৩৩ থেকে ৭৬৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।

    তিনি ছিলেন শক্তিশালী দিগবিজয়ী। তিব্বতিদের, ভুটিয়াদের ও সিন্ধুতীরবর্তী তুর্কিদের দমন করে তিনি নাম কিনেছিলেন। ভারতের দেশে দেশেও উড়েছিল তাঁর জয়পতাকা। কাশ্মীরের বিখ্যাত মার্তণ্ড-মন্দির তাঁর দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আজও বিদ্যমান আছে ওই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ।

    সেই সময়ে কনোজ বা কান্যকুব্জে রাজত্ব করতেন আর এক পরাক্রান্ত রাজা, নাম তাঁর যশোবর্মা। তাঁর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মগধ ও বঙ্গদেশের রাজারা পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হন। মগধের রাজা ছিলেন দ্বিতীয় জীবিতগুপ্ত। কিন্তু বঙ্গ বা গৌড়ের সিংহাসন ছিল কোনও রাজার অধিকারে, ঐতিহাসিকরা আজও তাঁর নাম খুঁজে পাননি। তবে তিনি ছিলেন নাকি অসংখ্য হস্তীর অধিকারী।

    চিরকালই এক রাজার উন্নতি আর এক রাজা দেখতে পারেন না। পৃথিবীতে এই নিয়েই যত অশান্তি, যত যুদ্ধবিগ্রহ। রাজা যশোবর্মার যশ ললিতাদিত্য সহ্য করতে পারলেন না। সসৈন্যে তিনি করলেন যশোবর্মাকে আক্রমণ। যশোবর্মা হলেন পরাজিত ও সিংহাসনচ্যুত।

    তখন বঙ্গেশ্বর কতকগুলি হস্তী উপঢৌকন স্বরূপ পাঠিয়ে দিলেন লতিতাদিত্যের কাছে। এর দুটি কারণ থাকতে পারে। যশোবর্মার দ্বারা বিজিত বঙ্গেশ্বর শত্রুর পতনে খুশি হয়েই হয়তো ললিতাদিত্যের কাছে উপহার পাঠিয়ে মনের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। কিংবা এও হতে পারে, ললিতাদিত্য পাছে বঙ্গদেশও আক্রমণ করেন, সেই ভয়েই তিনি তাঁকে তুষ্ট করতে চেয়েছিলেন।

    তারপর বঙ্গেশ্বরের কাছে কাশ্মীর থেকে এল আমন্ত্রণ, তাঁকে ললিতাদিত্যের আতিথ্য স্বীকার করতে হবে।

    তখন অষ্টম শতাব্দী চলছে। সে সময়ে বাংলা থেকে কাশ্মীরে যাওয়া বড় যে-সে কথা ছিল না। তারপর এই আমন্ত্রণের উদ্দেশ্য এবং ললিতাদিত্যের মনের কথা কেউ জানে না। বঙ্গেশ্বর যথেষ্ট ভীত হলেন বটে, কিন্তু উপায় কী? দিগবিজয়ী ললিতাদিত্যের আমন্ত্রণ ও আদেশ একই কথা।

    সুদীর্ঘ, দুর্গম পথ পার হয়ে কয়েক মাস পরে বঙ্গেশ্বর কাশ্মীরে গিয়ে উপস্থিত হলেন।

    কাশ্মীরে ললিতাদিত্য একটি নতুন নগর স্থাপন করে তার নাম রেখেছিলেন, ‘পরিহাসপুর’, এখন তাকে ‘পরসপোর’ বলে ডাকা হয়। সেখানে ছিল তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘পরিহাসকেশব’ নামে দেবতার বিগ্রহ ও মন্দির।

    অবশেষে পরিহাসপুরে হল দুই রাজার সাক্ষাৎকার।

    বঙ্গেশ্বরের মুখ বিষণ্ণ, তখনও তাঁর মনের ভয় ভাঙেনি।

    আসল ব্যাপারটা উপলব্ধি করে ললিতাদিত্য বললেন, ‘রাজন, আশ্বস্ত হন। আপনি আমার অতিথি। এই আমি ভগবান পরিহাসকেশবকে মধ্যস্থ রেখে প্রতিজ্ঞা করছি, আমার দ্বারা আপনার কোনও অনিষ্ট হবে না।’

    বঙ্গেশ্বর হয়তো আশ্বস্ত হলেন।

    তার পরের ব্যাপারটা ভালো করে বোঝা যায় না। বঙ্গেশ্বর যখন ত্রিগামী নামে একটি স্থানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন, ললিতাদিত্য তাঁকে হত্যা করে নিজের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করলেন। হাতের মুঠোর মধ্যে পেয়ে এক অসহায় অতিথিকে এমন নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করার কারণ কী? ইতিহাস সে সম্বন্ধে নীরব! এমন অহেতুকী বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনি পৃথিবীর ইতিহাস খুঁজলেও আর পাওয়া যায় কি না সন্দেহ।

    যথাসময়ে এই দারুণ দুঃসংবাদ এসে পৌঁছোল বাংলাদেশে।

    সারা দেশ শোকাচ্ছন্ন, রাজপ্রাসাদে হাহাকার।

    কিন্তু নারীর মতো হায় হায় করে কেঁদে নিজেদের কর্তব্য সমাপ্ত করল না বঙ্গেশ্বরের প্রিয় পরিচারকবৃন্দ। বাঘের মুলুক বাংলাদেশে কোনওদিনই দৃপ্তমনের অভাব হয়নি। একালে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যেই ফিরিঙ্গি বণিকরা বাঙালি কাপুরুষ বলে মিথ্যা অপবাদ রটাবার চেষ্টা করেছে। আসলে তারাও বাঙালিদের ভয় করত মনে মনে।

    পরিচারকদের সরদার ক্রোধকম্পিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, ‘প্রতিশোধ চাই, প্রতিশোধ চাই!’

    কেউ প্রশ্ন করল, ‘কেমন করে প্রতিশোধ নেবে?’

    —‘আমরা কাশ্মীরে যাত্রা করব।’

    —‘কোথায় কাশ্মীর, আর কোথায় বাংলা!’

    —‘দরকার হলে আমরা পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও যেতে ছাড়ব না। হাত গুটিয়ে বসে থেকে এ অপমান মাথা পেতে সহ্য করব? ভাইসব, আমরা কি বাঙালি নই?’

    —‘আমরা হচ্ছি মুষ্টিমেয় বিদেশি, সেই সুদূর অজানা দেশে অসংখ্য শত্রুর সামনে গিয়ে আমরা কি দাঁড়াতে পারব? এ অসাধ্যসাধন কি সম্ভবপর?’

    —‘আমাদের অন্নদাতা প্রভু বিশ্বাসঘাতকের হাতে নিহত। যে তাঁর অন্নগ্রহণ করেছে, সেই-ই আজ একাই হবে একশোজন—সেই-ই আজ করতে পারবে অসাধ্যসাধন। আজ কোনও কথা নয়—কাশ্মীরে চলো, কাশ্মীরে চলো!’

    পরিচারকের দল সমস্বরে গর্জন করে উঠল, ‘কাশ্মীরে চলো, কাশ্মীরে চলো!’

    দিনের পর দিন যায়, রাতের পর রাত। সূর্য ওঠে, চাঁদ ওঠে, উদয়ের পরে অস্ত, মাসের পরে হয় মাসকাবার। নদ, নদী, প্রান্তর, দুর্গম কান্তার, দূরারোহ গিরিদরি। ক্রোশের পর ক্রোশ—তবু যেন পথের শেষ নেই। ঋতুর পর ঋতু চলে যায়—কখনও অগ্নিবাণ হেনে, কখনও তুষার-বৃষ্টি করে—তবু পথিকরা শ্রান্ত নয়, তারা চলছে, চলছে চলছে। একটু শিথিল হয়নি তাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।

    অবশেষে পথের শেষ। এই তো কাশ্মীরের সীমান্ত!

    কাশ্মীরি রক্ষী সবিস্ময়ে দেখল, অদ্ভুত পোশাক-পরা একদল বিদেশিকে। শুধোল, ‘কে তোমরা?’

    —‘আমরা গৌড়বাসী।’

    —‘এদেশে এসেছ কেন?’

    —‘তীর্থ করতে।’

    —‘কোথায় যাবে?’

    —‘কাশ্মীরে সারদা দেবীর মন্দিরে পূজা দিতে।’ রক্ষী পথ ছেড়ে দিল।

    সরদার পরিচারক বলল, ‘আমরা পরিহাসপুরেও গিয়ে পরিহাসকেশবের মন্দির দেখব। সেখানে যাবার পথ কোন দিকে?’

    রক্ষী পথ বাতলে দিল।

    —‘মহারাজ ললিতাদিত্য এখন কোথায়?’

    —‘রাজ্যের বাইরে।’

    মনে-মনে হতাশ হয়েও সরদার মুখে কোনও ভাবই প্রকাশ করল না।

    তারা প্রবেশ করল পরিহাসপুরে।

    সরদার গম্ভীর স্বরে বলল, ‘সবাই ছদ্মবেশ খুলে ফ্যালো। অস্ত্র ধরো!’

    —‘তারপর আমরা কী করব?’

    —‘পরিহাসকেশবকে আক্রমণ করব।’

    —‘পরিহাসকেশব যে দেবতা!’

    —‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বিশ্বাসঘাতকের উপাস্য দেবতা! পরিহাসকেশবকেই মধ্যস্থ রেখে ললিতাদিত্য প্রতিজ্ঞা করেছিল, বঙ্গেশ্বরের গায়ে সে হাত দেবে না। তারপর সে যখন প্রতিজ্ঞা করতে উদ্যত হয়, পরিহাসকেশব কি তাকে নিরস্ত করতে পেরেছিলেন? ললিতাদিত্য রাজ্যের বাইরে, এত দূরে এসে আমরা কি ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাব? তার বদলে চাই আমরা পরিহাসকেশবকেই! যে দেবতাকে উপাসনা করে মানুষ এমন হীন, এমন বিশ্বাসঘাতক হতে পারে, আমরা সকলে মিলে আজ চূর্ণবিচূর্ণ করব সেই পঙ্গু, অপদার্থ দেবতাকে! ভাইসব! অস্ত্র ধরো, অস্ত্র ধরো!’

    পরিহাসকেশবের মন্দিরের পূজারিরা সভয়ে ও সবিস্ময়ে দেখলেন, একদল ভৈরব মূর্তি শূন্যে তরবারি নাচাতে নাচাতে ও বিকট স্বরে চিৎকার করতে করতে বেগে ছুটে আসছে—‘চূর্ণ করো, চূর্ণ করো, চূর্ণ করো পরিহাসকেশব!’

    প্রমাদ গুনে পুরোহিতরা মন্দিরের প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিলেন।

    বাঙালিরা তখন পর্যন্ত জানত না, কোনটি পরিহাসকেশবের মন্দির।

    সামনে পেলে তারা আর একটি জমকালো মন্দির, তার ভিতরে ছিল রামস্বামীর রৌপ্যনির্মিত বিগ্রহ। তাকেই পরিহাসকেশবের মূর্তি মনে করে তারা হইহই করে তার উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ল ক্রুদ্ধ শার্দূলের মতো। যারা বাধা দিতে এল, তারা হল হত কি আহত। তারপর খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে ধুলোয় লুটোতে লাগল রুপোয় গড়া মূর্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। রাজধানী থেকে খবর পেয়ে ছুটে এল কাতারে কাতারে কাশ্মীরি সৈনিক।

    সরদার পরিচারক নির্ভীক কণ্ঠে বলল, ‘আমরা বাংলার বীর। কারুর দয়া চাইব না, কারুকে দয়া করব না! আমরা অস্ত্র নিয়ে শত্রুসংহার করতে করতে সম্মুখ-যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন করব! ভাইসব, মারো আর মরো!’ নগণ্য বাঙালির দল, অগণ্য শত্রু-সৈন্য। এক-এক বাঙালি চেষ্টা করল একশো জনের মতো হতে, মরিয়া হয়ে সবাই লড়তে লাগল—বধ করল বহু শত্রুকে। তারপর শত্রুরক্তে প্লাবিত মৃত্তিকার উপর লুটিয়ে পড়ে একে একে করল শেষ নিশ্বাস ত্যাগ। কেউ পালিয়েও গেল না, কেউ প্রাণেও বাঁচল না।

    প্রায় চার শতাব্দী পরেও কল্হন দেখেছিলেন রামস্বামীর বিগ্রহহীন মন্দির এবং তখনও সারা কাশ্মীরে কথিত হত বঙ্গবীরদের অপূর্ব বীরত্ব।