Author: তাহের আলমাহদী

  • সাতচল্লিশ

    সাতচল্লিশ

    ।। সাতচল্লিশ।।

    ভারী কঠিন সময়। কি যে দুর্যোগ আরম্ভ হয়ে গেল। মাস্তুলের দড়ি-দড়া বাতাসে উড়িয়ে নিচ্ছে। বৃষ্টিপাতে অন্ধকার আরও গভীর। পোর্ট-হোল খুলে কিছু দেখা যাচ্ছে না। কেবল বিদ্যুতের তরবারি আকাশ ফালা ফালা করে দিলে মনে হচ্ছে, নীল রঙের অতিকায় সব মনস্টার এগিয়ে আসছে। আবার কখনো মনে হচ্ছে জলস্তম্ভ সামনে।

    বাতাসের গতি ঠিক থাকছে না। জাহাজিদের এখন টালমাটাল অবস্থা। ডেকে কেউ উঠছে না। দিনে দিনে ভান্ডারী সবাইকে খাইয়ে দিয়েছে। সমুদ্রের অবস্থা ক্রমে খারাপের দিকে যাচ্ছে। হিবিং-লাইন দু’বার ছিঁড়ে গেছে। অন্ধকারে হেঁইয়ো হেঁইয়ো শব্দ জাহাজিদের। কারণ ঝড়ের ভেতর হিবিং-লাইন ফের বেঁধে দিতে হচ্ছে। অন্ধকারে আর ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ নয়। যে কোনো সময় সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। দু’জন ডেক-জহাজি আর ডেক-টিন্ডাল প্রায় প্রাণ হাতে করে ডেকে উঠে এসেছে। ডেকের ওপর ভুতুড়ে কিছু আলো, আর চারপাশে সমুদ্রে এখন যেন লক্ষ লক্ষ শিশুর আর্তনাদ। কি যে বাতাসের বেগ! ডেরিক তুলে ফেলছে। হাসিল সব ছিঁড়ে ফেলছে। যেন ওয়ারপিন, ড্রাম, উইনচ, মাস্তুল সব মুহূর্তে উড়ে যাবে বাতাসে। বাতাসের ঝাপটা মুখে এসে লাগলে নিশ্বাস নেয়া যাচ্ছে না। আর জাহাজিরা আশ্চর্য এই কঠিন সময়ে কে যেন বোট-ডেকে হিবিং-লাইন ধরে ঝুলে আছে। ঠিক ওরা নিচ থেকে বুঝতে পারছে না। হিবিং-লাইন ধরে কে ক্রমান্বয়ে টলে টলে অন্ধকারে এগিয়ে যাচ্ছে। লোকটার কি দুঃসাহস। কে এমন প্রাণ হাতে করে ওপরে উঠে এসেছে। লোকটাকে দেখার জন্য ডেক-টিন্ডাল ঝড়ের সমুদ্রে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যেতে থাকল। এবং ভয়ে সে প্রায় চিৎকার করে উঠত। জাহাজের মরা আলোর ভেতর আর্চির মুখ স্থির। ডোরাকাটা এক অতিকায় জীব। তাকে দেখেই খেঁকিয়ে তেড়ে আসছে মেজ মিস্ত্রি। শরীরে রেনকোট। মাথায় টুপি। মুখটা অতিকায় আলোর ভেতরে বিভীষিকার মতো ডেক-টিন্ডাল এক লাফে ভূত দেখার মতো হিবিং-লাইনে ঝুলে ঝুলে চলে আসার সময়ই নীল তরঙ্গ মালা অথবা বলা যায় উড়ন্ত জলস্তম্ভ মাথার ওপরে ভেসে গেলে সে হিবিং-লাইন বরাবর ঝুলে পড়ল। জাহাজ সমুদ্রের নিচে অতলে ডুবে যাচ্ছে বুঝি। কিন্তু প্রাচীনতা শরীরে একেবারে কোনো তিমি মাছের মতো। দু’দন্ড ডুবে থেকে ভেসে উঠলে সে চো দৌড়। আর্চি একটা জাহাজে অতিকায় জীব হয়ে গেছে। অতিকায় জীব হয়ে যত রাতে ঘোরাফেরা করছে, তত যেন সমুদ্র ক্ষেপে যাচ্ছে। ডেক-টিন্ডাল নিচে নেমে কারো সঙ্গে একটা কথা বলতে পারল না। ভয়ে ভেজা জামা-পান্ট খুলে নেংটা হয়ে শুয়ে থাকল কম্বলের নিচে। আবার ওকে ডেকে উঠে যেতে বললে সে ঠিক সমুদ্রে লাফিয়ে আত্মহত্যা করবে। মানুষের মুখে কখনও সে এমন বিভীষিকা দেখেনি। সে ত্রাসে পড়ে গেছে—সে যেখানে যেমনভাবে থাকছে, চোখ মুখের ওপর স্থির হয়ে আছে। ডেক-টিন্ডাল ভয়ে তাড়াতাড়ি কম্বলে মুখ ঢেকে ফেলল।

    বনির দরজায় তখন ঠক ঠক শব্দ। সমুদ্রে তেমনি রোলিং হচ্ছে। বনি বাংকে শুয়েছিল। পুরুষের পোশাক সে আর খুলছে না শরীর থেকে। বন্দুকটা যখন তখন আর্চি চেয়ে নিচ্ছে। হিবিং-লাইনে ঝুলে ঝুলে অথবা ঝড়ো হাওয়ার ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে লেডি-অ্যালবাট্রসকে খুঁজছে। জাহাজের মাথায় পেলেই গুলি করবে। আর পাখিটা তখন দূরে, ঝড়ো বাতাসে অথবা জলস্তম্ভের মাথায় বসে থেকে ভেসে যাচ্ছে দুরে আবার উড়ে আসছে। কখনও জাহাজের অনেক ওপরে ভেসে থাকছে। নাগাল পাচ্ছে না আর্টি। ছোটবাবুকে দেখা যাচ্ছে না। তবু সে জানে ছোটবাবু চুরি করে পাখিটাকে খাওয়াচ্ছে। পাখিটাকে উড়িয়ে দিচ্ছে মাস্তুল থেকে। এক ভয়ংকর লুকোচুরি খেলা চলছে জাহাজে। দরজায় জোরে কড়া নাড়ছে আর্চি। রাতে আর্চি যখন তখন মাঝে মাঝে ছুটে চলে আসে। জ্যাক জ্যাক ভেতরে আছো? ঝড়ের সমুদ্রে জ্যাক ভেতরে থাকতে পারে, ওপরে উঠে যেতে পারে, নিচে নেমে যেতে পারে। জ্যাক দরজা খুলে বলল, হ্যাঁ ভেতরে আছি।

    —আবার সী-ডেভিলটা আসছে।

    জ্যাক বলল, তাই বুঝি।

    —বন্দুকটা কোথায় রেখেছ?

    জ্যাক বলল, ঐতো, নিয়ে যাও।

    —জ্যাক তুমি রাগ করছ না তো?

    —আরে না। জ্যাক যেন ঠিক ছোটবাবুর সঙ্গে কথা বলছে।

    —বুঝতে পারছ, আসলে ওটাকে আমি মারব না। তবু দেখাতে হয় মাঝে মাঝে ওদের দেখাতে হয় আমি বসে নেই। রাত নেই দিন নেই খুঁজছি। সমুদ্রে সী-ডেভিলটাকে খুঁজছি। ঝড়ের মধ্যেও খুঁজছি।

    জ্যাক দরজা থেকে নড়ল না। এত রাতে আর্চি বন্দুকটা নিতে এসেছে। আর্চির চোখ মুখ সে ঠিক দেখতে পাচ্ছে না। অন্ধকারে আর্চি রেনকোট গায়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে। যেন ভেতরে ঢুকতে দিলেই আর্চি রেনকোট খুলে বাংকে বসে পড়বে। তারপর কত ডিপ্রেসান, সী-হাইট কত যাচ্ছে—বাতাসের ফোর্স কত—সোয়েল কোনদিক থেকে আসছে —এবং এভাবে কখন সে আরও ক’বার সমুদ্রে অতিকায় ঝড়ে পড়ে গেছে তার গল্প বলে হাত ছড়িয়ে দেবে। বিশ্রাম করার মতো এমন সুন্দর জায়গা আর বুঝি তার কোথাও নেই।

    জ্যাক বন্দুকটা বের করে বলল, ধরো।

    এত তাড়াতাড়ি! আর্চি বলল, দাঁড়াও। সে দু’পা ফাঁক করে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ফের বলল, দাঁড়াও। বলে সে বন্দুকটা নেবার অছিলাতে হাত বাড়িয়ে দিল। বলল, নো। নো গার্ল। নাগাল পাচ্ছি না। তারপর সে ঝুঁকে যেন জাহাজের পিচিং-এ টাল সামলাতে পারেনি, কেবিনে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে মতো ভেতরে ঢুকে বলল, বাইরে ভীষণ ঝড়। ডেকে যাওয়া যাবে না। একটু বসলে আশা করি তুমি রাগ করবে না।

    ভেতরে ঢুকলে বনি আর্চির মুখ স্পষ্ট দেখতে পেল। আর্চি উত্তেজনায় থর থর করে কাঁপছে। ধূর্ত চোখ লালসায় জ্বলছে। বারবার আর্চি অতি সাধারণ মানুষের মতো বলছে, জ্যাক দরজাটা বন্ধ করে দাও। কিন্তু জ্যাক দরজা বন্ধ করছে না। আর্চি এবার নিজেই দরজা লক করে বলল, ভেতরে জল ঢুকছে, ভাল হল না? জ্যাক তবু কিছু বলছে না। আর্চি তখন বলল, জ্যাক কি ঠাণ্ডা! ঠাণ্ডায় মরে যাব। ঝড় আর থামবে না!

    জ্যাক একপাশে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা এখন ইচ্ছে করলে যেন কুকুর দিয়ে ছোটবাবুকে খাইয়ে দিতে পারে। বারবার তাকে আর্চি এমন ভয় দেখিয়েছে। কেবল সেই রক্ষা করতে পারে সব। আর্চির মুখে এভাবে অস্বাভাবিক ক্রুরতা। আর্চি বাংকে বসে পড়েছে। মুখের ডোরাকাটা দাগ আরও বেশি হিংস্র। আর্চি পোর্ট-হোলের কাঁচ বন্ধ করে বলছে, জ্যাক কেউ টের পাবে না। জ্যাক প্লিজ।

    জ্যাক নড়ছে না। সমুদ্রে তেমনি তরঙ্গমালা। জাহাজ সমুদ্রে ওঠানামা করছে। জ্যাক দেয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শক্ত চোখ মুখ। এ দু’দিন আর্চি যতবার এসেছিল বাইরে দাঁড়িয়ে ভাল মানুষের মতো বন্দুকটা নিয়ে গেছে। জ্যাক দরজা খুলে অপেক্ষা করেছে। কিছু সময় পার হলে ফিরে এসেছে আর্চি। বন্দুকটা জ্যাকের কেবিনে রেখে ফের নিচে নেমে গেছে। প্রাণে কি যে ভয়! আর্চি ডেকে বন্দুক হাতে ঘুরে বেরিয়েছে। জ্যাক বাইরে তখন ঝড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে সব সময় লক্ষ্য রেখেছে কোথায় আর্চি। আর্চি যদি এলি-ওয়েতে ঢুকে যায়! ভয়ে ওর বুক গলা শুকিয়ে উঠেছে। এবং এভাবে আর্চিকে সে চোখের ওপর রেখেছে। আসলে সে চেয়েছে বন্দুকটা নিয়ে যেন কখনও আর্টি এলি-ওয়েতে ঢুকে না যায়। একবার সে ভেবেছিল বন্দুকটা সমুদ্রে ফেলে দেবে, তখনই আর্চির ভেতরের বীভৎস মানুষটা যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। চিৎকার করে সে বলতে থাকে যেন লোয়ার দ্য বোট, আই উইল গেট দিস হারপুন ইন ইউর বেলি। জ্যাক ভয়ে আর বন্দুকটা সমুদ্রে ফেলে দিতে পারেনি।

    আর এভাবে যা হয়ে থাকে এক ধূর্ত ব্যবসায়ীর মতো আর্চি চোরাকারবারী জাহাজের এবং অতিশয় হীন চক্রান্তে শেষবারের মতো সে কেবিনের ভেতরে ঢুকে বসে থাকবে জ্যাক কিছুতেই অনুমান করতে পারেনি। জ্যাকের এই কেবিনটাই ছিল সবচেয়ে বড় নিরাপদ আশ্রয়। আর্চি কত সহজে এখানে ঢুকে গেল। সে কাউকে ডাকতে পারছে না। ডাকলেই চিৎকার চেঁচামেচি জাহাজে, এই যে এখানে সুন্দরী বালিকা যুবতী হচ্ছে। স্যালি হিগিনস গোপনে জাহাজে সুন্দরী বালিকা দেশে যুবতী করে নিয়ে যাচ্ছেন। এর চেয়ে বড় পাপ কি আছে! ফলে ঝড়ে জাহাজডুবি পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। আমাদের পাপের শেষ নেই। এতেও কাজ না হলে বলবে, আসুন আপনারা, আপনাদের আমি জ্যান্ত পরী দেখিয়ে দিচ্ছি। একেবারে জ্যান্ত। রক্তমাংসের। জ্যাক বুঝতে পারছে সে জাহাজে ভারী অসহায়। ভয়ে সে প্রায় কেঁদে ফেলবে এবার।

    আর্চির যেন তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। বেশ রয়ে সয়ে সে সব দেখে যাচ্ছে। জ্যাক কি লম্বা! জ্যাকের পোশাক ছিঁড়ে ফেললে আশ্চর্য সব সুগন্ধ সারা কেবিনে ম ম করবে। জ্যাকের শরীরে সামান্য হাত যেন কতকাল পর যুবতী নারী-সুধা-পারাবার হয়ে যুবতী নারী তার সামনে। পোশাকের ভেতরে সেই সব চমৎকারিত্ব, সে একেবারে দু’হাতে লুণ্ঠন করে নেবার জন্য মাঝে মাঝে গোপনে চোখ তুলে দেখছে। একটা চুরুট সে অনায়াসে খেতে পারে। জ্যাককে সামান্য সময় দেবার জন্য, অথবা এটা এমন কিছু দুর্ঘটনা নয়, সে ইচ্ছে করলেই আর্চিকে খুব সহজে সুধা-পারাবারে নিমজ্জিত করে এই প্রবল ঝড় এবং সব আশঙ্কা থেকে মুক্ত থাকতে পারে। সে চুরুট জ্বালিয়ে পায়ের ওপর পা রাখল। একটা হাত বিছিয়ে দিল বাংকের রেলিঙে। প্রায় শরীর এলিয়ে নিশ্চিন্তে চুরুট টানছে। ধোঁয়ার রিঙ মুখে এবং বগলের কাছে ঘুরেফিরে নেমে যাচ্ছে। জ্যাক একটা কথা বলতে পারছে না। মুখ নামিয়ে রেখেছে। জালে পড়া ভীরু কবুতরের মতো কাতর চোখ। তখনই সে ডাকল, জ্যাক। জ্যাক তাকাচ্ছে না। আর্চি উঠে দাঁড়াল।—জ্যাক, সে আবার ডাকল। জিভে লালা জমছে। দু’ঠোঁটে আঠা আঠা লাগছে—সে ফের বসে পড়ল। ডাকল,জ্যাক। জ্যাক কাছে আসছে না। তাড়াহুড়ো করে সব সে মাটি করে দিতে পারে না। ওর চোখ জ্বলছে। শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে এবং শরীরে জ্বর আসার মতো। সে ফের উঠে দাঁড়াল। জ্যাক এতটুকু নড়ছে না। একবারে স্থির। জ্যাক যেন সামনে ভূত দেখছে।

    আর এভাবে ভীষণ অস্থির যেন সেই পাখিটা। সে সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে। বড় বড় সব সমুদ্রের নীল জলস্তম্ভের ওপর পাখা ছড়িয়ে দিচ্ছে জলে। আকাশের সেইসব ঝড়ো হাওয়া অথবা বিদ্যুতের ঝলকে সে যেন বিন্দুমাত্র ভয় পাচ্ছে না। বরং এমন একটা ভয়ংকর সমুদ্রে সে কতকাল পর চুপচাপ বসে থাকতে পারছে, ভেসে থাকতে পারছে, তাকে পাখা ছড়িয়ে দিতে হচ্ছে না। সব তরঙ্গমালার মাথায় সে আছে কখনও পাহাড়র মতো ঢেউয়ের শীর্ষে, কখনও পাতালের মতো নীল জলের তলায়। আর জাহাজটা দূরে কাছে কখনও। কখনও ডুবে যাচ্ছে, কখনও কাত হয়ে যাচ্ছে ভীষণ। রাশিরাশি মেঘ ভেসে যাচ্ছে মাথার ওপরে। তার ওপরে রয়েছে সেই চিরদিনের নক্ষত্রমালা। যেন পাখিটা মেঘ ফুঁড়ে উঠে গেলেই দেখতে পাবে পৃথিবীর মতো সব গ্রহ নক্ষত্র আপন মহিমায় স্ব স্ব কক্ষপথে বিচরণ করছে। এক অমোঘ শক্তি সবকিছুর অন্তরালে নিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। কেউ তার মহিমা ইচ্ছে করলেই পাল্টে দিতে পারে না।

    ঘোর দুর্যোগের ভেতর অন্ধকার সমুদ্রে মাঝে মাঝে পাখিটার কক কক আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। কোন লোহার তার-টার বোধহয় মাস্তুল থেকে আল্গা হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে লোহার তারে তারে বাড়ি খাচ্ছে। গং গং করে কঠিন ধাতব শব্দটা ঝড়ের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছিল। আবার কোথাও কাঠের ঘসা লেগে শব্দ উঠছে। ঝড়ের মুখে স্টিয়ারিং এনজিনের সব পেনিয়ান একটার ওপর আর একটা উঠে আসতে চাইছে। যেন মার মার কাট কাট। হাল বারবার জাহাজের ঘুরে যাচ্ছে। প্রবল ঝড়ের জন্য কম্পাসের কাঁটা ভীষণ কাঁপছে। কম্পাসের কাঁটা লাফিয়ে লাফিয়ে ঘর পার হয়ে যাচ্ছে। হালের ওপর প্রবল চাপ পড়ছে তখন। প্রপেলার বাতাসে ভেসে উঠলে হালে পানি পাচ্ছে না জাহাজ। যেন দম আটকে জাহাজটা সত্যি সমুদ্রে মরে যাবে।

    তখন স্যালি হিগিনস আর কেবিনে ফিরে যেতে পারেন না। তিনি পায়চারি করছেন ব্রীজে। মাঝে মাঝে ঝুঁকে আকাশ দেখছেন। সী-হাইট ক্রমশ বাড়ছে। বাতাসের গতিবেগ প্রবল হয়ে উঠছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় রেডিও-অফিসার বেতার সংকেতে সমুদ্রের খবর পাঠিয়ে যাচ্ছে। স্যালি হিগিনস তখন ভিজিবিলিটি কত, লক-বুকে উপুড় হয়ে দেখছেন। দেখে চক্ষু স্থির হয়ে যাচ্ছে। জাহাজ তবু চলছে।

    তিনটে বয়লারের সামনে তিনজন ফায়ারম্যান। এনজিন-সারেঙ উইণ্ড-সেলের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। স্টিম এক ঘর নামতে দিচ্ছেন না। টলতে টলতে সব ফায়ারম্যানরা এগিয়ে আসছে। রমারম কয়লা হাঁকড়ে যাচ্ছে। তবু স্টিম কিছুতেই ঠিক রাখা যাচ্ছে না। বার বার স্লাইস মেরে আগুনের কলজে উপড়ে আনার মতো সব ঘেঁটে নতুন কয়লা, এয়ার-বালব ছেড়ে একটু হাঁফ ছাড়তে না ছাড়তেই সেই ঐশী শক্তির ওপর নির্ভরশীল মানুষেরা চিৎকার করতে থাকে—আল্লা হু আকবর। অর্থাৎ আপনি এখন একমাত্র আমাদের ভরসা। সমুদ্রের নোনা জল তখন হুড়মুড় করে নিচে নেমে আসে। জাহাজটা আবার একটা বড় রকমের ঢেউ সামলে উঠেছে। ফায়ারম্যানরা পা ঠিক রাখতে পারছে না। পিছলে পড়ে যাচ্ছে।

    আর সেই গুম গুম শব্দ—যেন পাতালপুরী থেকে লক্ষ লক্ষ মনস্টার ধেয়ে আসছে। ভেসে আসছে অথবা উড়ে আসছে। কানে তালা লেগে যাচ্ছে। শিস্ দিচ্ছে সমুদ্রের চোরা বাতাস। এনজিন-রুমে ফাইভার দেখছে তখন প্রপেলার স্যাফটা ঘুরতে ঘুরতে আর দম পাচ্ছে না। প্রপেলার স্যাফট ঘুরতে ঘুরতে সহসা থেমে যাচ্ছে, ঝুপ করে জলের ভেতর প্রপেলার পড়ে গেলেই প্রাণ পেয়ে যাচ্ছে ফের। সেণ্টার-বয়লার যে ক্রমে নিচে বসে যাচ্ছে কেউ এতটুকু বুঝতে পারছে না।

    ছোটবাবু ডেবিডের ঘরে বসে ছিল। ডেবিডের ওয়াচ এবার আরম্ভ হবে। ডেভিড ছোটবাবুকে বার বার উঠতে বলছে—কেবিনে গিয়ে শুয়ে পড়তে বলছে। কিছুতেই উঠছে না ছোটবাবু। চুপচাপ বসে আছে। ডেবিড বুঝতে পারছিল, ছোটবাবুর চোখ-মুখের অবস্থা ভাল না। ছোটবাবু বোধহয় এবার কোনো কঠিন অসুখে পড়ে যাবে। ছোটবাবুর জন্য ওর ভীষণ ভাবনা হচ্ছিল।

    সারাদিন প্রবল ঝড়বৃষ্টিতে ছোটবাবু কাজ করেছে উইনচে। যখন কেউ ডেকে উঠতে সাহস পাচ্ছে না যখন ডেকে ওঠা নিষেধ তখনও তাকে দিয়ে কাজ করিয়েছে আর্চি। সে কোমরের সঙ্গে লম্বা দড়ি দিয়ে নিজেকে উইনচের সঙ্গে আটকে নিয়েছিল। আর সমুদ্র থেকে তরঙ্গমালা নাচতে নাচতে চলে গেলে সে ডুবে থাকত, শ্বাস ফেলতে পারত না। মনে হত এই বুঝি তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। জল যতক্ষণ সরে না যাচ্ছে, জলের নিচে দু’হাতে শক্ত করে ধরে রাখতো সে উইনচের লিভার। জল নেমে গেলে সে ভীষণ হাঁপিয়ে পড়ত। আর এভাবে যখন ছোটবাবুকে নিয়ে জাহাজে নিষ্ঠুরতার খেলা চলছিল—তখন কাপ্তান অথবা জ্যাক একটা কথা বলতে পারে নি। আর্চির কোনো ওয়াচ নেই। ওর ওয়াচের ভার এখন পাঁচ-নম্বরের ওপর। সে বেশ যেন এই খেলায় মেতে গিয়ে ভারী মজা পাচ্ছিল। বন্ধু অনিমেষ গণি জব্বার মাঝে মাঝে উঠে এসেছে ওপরে—সব দেখে ফোকসালে নেমে গেছে। এনজিন সারেঙকে বলেছে, কিছু একটা করুন। ছোট তো মরে যাবে। সারেঙ চুপচাপ বসে থেকেছে। একটা কথা বলেনি। পবিত্র কোরান থেকে বারবার সেইসব আয়াত সুরা দীর্ঘস্বরে যেন কতকাল থেকে আছে মানুষের দীপ্যমান আল্লাহ তাঁর কথাই একমাত্র এখন উল্লেখ করা যেতে পারে—তিনি পর পর সব সুরা পাঠ করে যাচ্ছেন, কারো কাছে তাঁর কোনো নালিশ নেই।

    আর আর্চি বার বার ঘুরে গেছে ওপরে। সে ঝড়ের ভেতর ঘুরে ঘুরে বোট-ডেক থেকে দেখছে ছোটবাবু ঠিকঠাক ডেকে এখনও আছে না সাবাড় হয়ে গেছে। ডেবিড আর্চিকে বলল, না, এ সময়ে তুমি ছোটবাবুকে ডেকে কাজ করতে পাঠিয়ে ঠিক করনি। বার বার সে অনুরোধ করেছে—আর্চি, এখন সময় নয়। আর্চি বলেছে, ভাঙা জাহাজ। কখন আর সময় পাওয়া যাবে। সমুদ্রে ‘সব ঠিকঠাক করে না নিলে বন্দরে উইনচ চালানো যাবে না।

    ডেবিড এক্তিয়ারের বাইরে কথা বলছে, আর্চি তার কথা আদৌ গ্রাহ্য করছে না। এবং ডেবিড বুঝতে পারছে আর্চির মতলব ভাল না। তবু ছোটবাবুর জন্য ডেবিডের ভীষণ মায়া। খাবার সময়ে সে বলেছে, ছোটবাবু তুমি সাবধানে কাজ করবে। ছুটির পর ছোটবাবুর চোখে ভীষণ আতঙ্ক! সে দেখেছে ছোটবাবু চুপচাপ শুয়ে থেকেছে ওর কেবিনে। শরীর চাঙ্গা করার জন্য সামান্য ড্রিংকস দিলে সে খেয়েছে। তবু ওর চোখ-মুখের চেহারা পাল্টায় নি। চোখের নিচে অনিশ্চিত অন্ধকার। যেন আবার সকাল হবে, ঝড় থাকলে সেই ডেকে আবার তার কাজ, যে-কোন সময় সমুদ্র তাকে ভাসিয়ে নিতে পারে। যে-কোনো সময় সমুদ্রের তরঙ্গমালা তাকে জলের নিচে নিয়ে গিয়ে হত্যা করতে পারে। ফলে ডেবিড বার বার ওকে ঘুমোতে যেতে বলছে। এমন অমানুষিক পরিশ্রমের পর ভাল ঘুম না হলে শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়বে। পরদিন এই নিষ্ঠুরতার সঙ্গে তবে ঠিক ঠিক যুঝতে পারবে না।

    ছোটবাবু কেবিনে ঢুকে দরজা লক করে দিল। সে শুল না। ডেবিড ওয়াচে চলে যাচ্ছে। সে বসে থেকে ডেবিডের পায়ের শব্দ পাচ্ছে। মাথার ওপর জ্যাকের কেবিন। পায়চারি করছে বোধহয় জ্যাক। খুব ধীরে ধীরে কেউ হেঁটে গেলে কাঠের পাটাতনে যেমন শব্দ হয় তেমন চতুর পদক্ষেপ, যেন প্রতিটি পদক্ষেপ ভীষণ সতর্ক। বনি তো এভাবে কখনও হাঁটে না! বনি তো এভাবে পায়চারি করে না। এখন আবার সব চুপচাপ। কেউ হাঁটছে না। ছোটবাবু দু’হাতের ভেতরে মুখ ঢেকে বসে পড়ল। বনি বার বার তাকে সতর্ক করে দিয়ে গেছে—ছোটবাবু তুমি আমার জন্য ভেব না। তুমি সাবধানে থেকো। আমাদের পোর্ট-মেলবোর্ন পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় নেই।

    তারপর বনি বুকে মুখ লুকিয়ে বলেছে, আমাকে নেমে যেতে হবে ছোটবাবু। আমি নেমে যাব। বাবাকে তোমাকে এতবড় বিপদে কিছুতেই পড়তে দেব না। বনি তারপর কিছুক্ষণ কেঁদেছে। চলে যাবে বলে কেঁদেছে। ছোটবাবুকে বলেছে, তুমি ঠিকই বলেছ ছোটবাবু, আমাকে নামিয়ে না দিলে জাহাজটা অশুভ প্রভাব থেকে মুক্তি পাবে না।

    ছোটবাবু বলেছিল, বনি তুমি ওকে বন্দুকটা দিয়ে দাও। ওটা তোমার কাছে না রাখাই ভাল।

    বনি কি বলবে, সে তো বুঝিয়ে বলতে পারে না, ছোটবাবু সমুদ্রে এখন সাইক্লোন এখন যে-কেউ জাহাজে গোপনে কিছু একটা করে ফেলতে পারে। তুমি কখন কিভাবে থাকবে, আর আর্চি তোমাকে ভয় পায় ছোটবাবু, আর্চি তোমাকে কিছু একটা করে ফেললে আমার কি হবে ছোটবাবু। যতক্ষণ আৰ্চি বোট-ডেকে থাকে, বন্দুকটা ওর হাতে থাকে। আসলে আমি পাহারায় থাকি তখন। ঝড়ে জলে আমি ভিজে যাই, তবু হিবিং-লাইনে ঝুঁকে অলক্ষ্যে ছোটবাবু এগিয়ে যাই দেখি আর্চি কতদূর যেতে পারে। তুমি ছোটবাবু আমার জান্য ভেব না। তুমি এখন আর কিছু করতেও পারবে না। বাবা বুঝতে পারছ কেমন হয়ে গেছে। বাবা এখন মাঝে মাঝে রাতে চিৎকার করে ওঠেন—কে? আর্চি তখন সেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে জবাব দেয় ছোটবাবু, আমি আর্চি স্যার। সী-ডেভিলটাকে খুঁজছি। আসলে সে আমার কেবিনের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। এলবাকে খোঁজার নামে আমার শরীরের গন্ধ শুঁকে বেড়ায়। সব বুঝতে পারি ছোটবাবু। বাবাও বুঝতে পারেন। কিন্তু বাবা আর কিছু করতে পারছেন না। আমাকে নামিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত তিনি কিছু করতে পারবেন না। তুমি ছোটবাবু কি আর করবে! মুখ বুজে সব সহ্য করে যাওয়া ছাড়া তোমার উপায় নেই।

    সে ছোটবাবুকে শুধু বলেছে, আমি আর নিচে আসছি না। তুমি ছোটবাবু আমার জন্য ভাববে না। বল ভাববে না। সে ছোটবাবুর কাছ থেকে কথা আদায় করে নিয়ে গেছে। ছোটবাবু আর কিছু করতে পারছে না। রাতে সে ভাল ঘুমোতে পারছে না। ঘুম ভেঙে যাচ্ছে বার বার। সে জেগে গেলেই শুনেছে বাইরে সেই সাইক্লোনের হাহাকার শব্দ। সমুদ্রের অস্থির গর্জনে কান পাতা যাচ্ছে না। সব পোর্ট-হোল, এলি-ওয়ের দরজা বন্ধ। ভেতরে একবিন্দু জল ঢুকতে পারছে না। দরজা অথবা পোর্ট-হোল খুললেই জলের ঝাপটায় কেবিন এলি-ওয়ে সব ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর তখনই মনে হচ্ছে ফের মাথার ওপর কে বার বার হেঁটে যাচ্ছে। পাটাতনে খুব সতর্ক নিস্তেজ পায়ের শব্দ। আসলে এটা ওপরে হচ্ছে না মাথার ভেতরে সেই ঘণ্টাধ্বনি যা সে মাঝে মাঝে আতঙ্কের ভেতর ডুবে গেলে শুনতে পায় এমন সব শব্দ কি মগজের ভেতরে নড়ানড়ি করছে! সে মাথা চেপে বসে থাকল দু’হাতে। সে দু’হাতে কান চেপে ওপরের কোন শব্দ শুনতে চাইছে না। তবু সে শুনতে পাচ্ছে যেন ঘোড়ার পায়ের শব্দ। ঠক ঠক মাথার ভেতরে বাজছে। চোখে মুখে অবসাদ আর ক্লান্তি। সে যত চেষ্টা করছে শুয়ে পড়বে—কোনো ঘণ্টাধ্বনি তাকে কাতর করতে পারবে না—তবু কি যে হচ্ছে মাথার ভেতরে সেই সব শব্দমালা। পাটাতনে কিছু পড়ে গেল যেন। হাত ফসকে পড়ে গেছে মতো। জ্যাক এত রাতে এভাবে কেবিনে ছুটোছুটি করছে কেন? ধাক্কা লেগে কিছু পড়ে গেল যেন। মনে হচ্ছে এক ভয়ংকর ধ্বস্তাধ্বস্তি চলছে ওপরে। কোনো দানবের পাল্লায় কেউ পড়ে গেছে মনে হয়। এবং কাঁচের গ্লাস ভাঙার শব্দ। এবং সে নিজে ক্রমে নিজের ভেতরে অস্থির হয়ে উঠছে।

    তখন অবিশ্রান্ত মার মার কাট কাট এনজিন-রুমে। স্টিম-গেজের কাঁটা দু’শো বিশে কিছুতেই লাল দাগ বরাবর তুলে দেয়া যাচ্ছে না। বয়লারের আগুন দাউ দাউ জ্বলছে। র‍্যাগ মেরে সব আগুন ঘেঁটে ক্রমান্বয় কয়লা হাঁকড়াচ্ছে, একদণ্ড বিশ্রাম পাচ্ছে না কেউ। এনজিন-সারেঙ গেজের কাঁটা শুধু দেখছেন। কাঁটাটা ক্রমশ ওপরে উঠে যাচ্ছে ক্রমশ ক্রমশ ওপরে উঠে যাচ্ছে, আর ঠিক জায়গায় যেতে না যেতেই দপ করে নেমে যাচ্ছে। এনজিন-সারেঙ চিৎকার করতে করতে ছুটছে, জাহাজ চলছে না, জাহাজ ঝড়ে পড়ে গোঙাচ্ছে। মিঞারা সাহস সঞ্চয় কর। দরিয়া দামাল হয়ে উঠছে। তোমরা কেন পারছ না।

    জ্যাক দু’হাতে আত্মরক্ষার্থে প্রাণপণ লড়ছে। ওর প্যান্ট জামা ছিন্নভিন্ন। ওর পা তুলে ফেলছে—ঠিক লাল দাগের কাছে কাঁটাটা উঠে যাচ্ছে আর সে দু’হাতে এনজিন-দানবের সঙ্গে লড়ছে। মুখে মুখোশ। বনি পা শক্ত করে রাখছে। পা সে কিছুতেই শিথিল করছে না। আর্চি লুটিয়ে পড়েছে শরীরে। সব আসুরিক ক্ষমতা তার ক্রমে পাগলের মতো মাথায় এসে জড়ো হচ্ছে। সে বনির স্তনের ওপর সজোরে খাবলে ধরতে যাচ্ছে। মুখে ঠোটে লালা। বাংকের ওপর লুটিয়ে পড়েছে বনি। দু’হাতে আর্চির মুখ ঠেলে তুলে রেখেছে ওপরে। যেন হাত ফসকে গেলেই মুখটা তার ঠোঁট কামড়ে ধরবে। পা তুলে ফেলছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে জ্যাকের। সে তবু পা প্রাণপণ জড়ো করে রাখছে। আর্চি এক হাতে ডান পাটা কব্জা করে আনছে। আঁচড়ে খামচে জ্যাক তাকে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে, যে কোনো মুহূর্তে আর্চি চিৎকার করে উঠতে পারে—লোয়ার দ্য বোট আই উইল গেট দিস হারপুন ইন ইউর বেলি, যে কোনো মুহূর্তে মুহূর্তে……মুহূর্তে আর তখনই মনে হল ঝড়ের দরিয়ায় কে দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকছে, জ্যাক দরজা খোল। ভীষণ ঠাণ্ডা গলা। ভীষণ স্থির। কতদিন পর কেউ ফিরে এসে যেভাবে ডাকে যে ভাবে বলে আমি এসেছি জ্যাক, দরজা খোল।

    সমুদ্রের হাহাকার বাতাসে এখন আর কোনো তঞ্চকতা নেই। জলোচ্ছ্বাস এসে ডেক ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে। জাহাজ কাত হয়ে একেবারে খাড়া হয়ে যাচ্ছে কখনও। ছোটবাবু বালকেডে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। ওপরে সব কেবিনের দরজা পোর্ট-হোল বন্ধ। ব্রীজে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। দরজা বন্ধ বলে কেউ দেখছে না নিচে ছোটবাবু জ্যাকের দরজা ধাক্কাচ্ছে।

    সহসা দরজা খুলে ছিটকে বের হয়ে গেল আর্চি। জ্যাক বিছানায় পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বালিশ, চাদর, লাইফ জ্যাকেট, জলের কুঁজো এবং ফুলদানি বই যা কিছু এই যেমন জামা প্যান্ট সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ছোটবাবু একটা কথা বলল না। সে যেন পাথর হয়ে যাচ্ছে। আর ক্রমাগত সেই ঘণ্টাধ্বনি—সে দেখতে পাচ্ছে, কেউ যেন উঠে যাচ্ছে দ্বীপে। পাহাড়ের মাথা থেকে সেই ঘণ্টাধ্বনি মুছে দিতে যাচ্ছে—জলের ভেতরে সেই ঘণ্টাধ্বনি অজস্র বুদবুদের মতো, অথবা মনে হচ্ছে মোষ বলির সময় সেই যে ঢাকীরা ঘুরে ঘুরে কেবল বাজায়, ধূপধুনো এবং মন্ত্রোচ্চারণ, মোষের ডাক, আর রক্তপ্রবাহ সব একসঙ্গে যেন তার মাথার ভেতরে বাজছে। জ্যাক মুখ তুলে ছোটবাবুকে দেখতেই আতঙ্কে ছোটবাবুর বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল—নো নো। ছোটবাবু তুমি এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? ছোটবাবু তুমি তুমি কথা বলছ না কেন! ছোটবাবু তুমি তুমি ছোটবাবু… ছোট…. বাবু।

    ছোটবাবু বনির দু’হাত ছাড়িয়ে নেমে গেল। এটা তার কাছে কোনো ঘটনা নয়। ছোটবাবু সিঁড়ি ধরে নেমে যাচ্ছে। যেন এটা একটা সহজ ঘটনা, সে একেবারে সহজভাবে নিয়েছে সব—এবং আলোর ডুম দুলছে। ছোটবাবুর ছায়া একবার বড় হয়ে যাচ্ছে আবার ছোট হয়ে যাচ্ছে। ছোটবাবুর কাছে এটা একটা কিছু নয়—ছোটবাবু হেঁটে যাচ্ছে। মাথার ভেতর মোষ বলির বাজনা বাজছে। মন্ত্রোচ্চারণের মতো মনে হচ্ছে এই সমুদ্রের হাহাকার বাতাস। সে হেঁটে যাচ্ছে। নিশীথে জাহাজ তখন উন্মাদের মতো মাথা কুটে মরছে, পেরে উঠছে না। কিছুতেই, পেরে উঠছে না সমুদ্রের সঙ্গে যুঝতে তখন ছোটবাবু নেমে যাচ্ছে। টলতে টলতে নেমে যাচ্ছে। সে নেমে সোজা আর্চির কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকছে, স্যার আমি ম্যান। দরজা খুলুন।

    —ম্যান। তোমার এত সাহস। আমার দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকছ। সে দরজা খুলে ভেবেছিল বন্দুকের বাঁটে একটা মাথায় বাড়ি মারবে—তুমি যত নষ্টের গোড়া তুমি আমার এমন সুযোগ নষ্ট করে দিলে হে। ইণ্ডিয়ান ডগ। কুত্তার বাচ্চা। কিন্তু দরজা খুলেই আর্চির মুখ আতঙ্কে শুকিয়ে গেল। ম্যানের চোখে শূন্যতা। যেন সাক্ষাৎ শয়তানের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ম্যানের চোখে পলক পড়ছে না।

    হায় তখন কেউ জানে না, একটা বিদ্যুতের শেকড় যেন ক্রমাগত মাংকি-আয়ল্যাণ্ডের ছাদ থেকে নেমে আসছে। বিদ্যুতের শেকড় কি বাতাসের ঝাপটায় এমন একটা অতিকায় দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে জাহাজিরা কেউ টের পাচ্ছে না। চিরে যাচ্ছে। আঁকাবাঁকা দাগের মতো মস্ত ফাটল দেখা দিচ্ছে। ঠিক সোজা বোট-ডেকে উইংসের নিচে দাঁড়ালে ফাটল গভীর থেকে ক্রমশ গভীরতর হয়ে যাচ্ছে। আর একভাবে দাঁড়িয়ে আছে বনি। দরজা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। ছোটবাবুর পেছনে পেছনে সে যেতে সাহস পায়নি। সে চিৎকার করে বলতে পারত, বাবা ছোটবাবু পাগল হয়ে যাচ্ছে। সেই যে তুমি বলেছিলে বাবা মাথায় ওর কোনো গণ্ডগোল দেখা দিতে পারে বাবা ওর বুঝি সত্যি সেই গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে—কোথায় অন্ধকারে নেমে গেল! বনি এভাবে কিছুতেই আর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। সে অস্থির হয়ে উঠছে। ছোটবাবু কিছু একটা করে ফেলতে পারে। ছোটবাবুকে আর্চি কিছু একটা করে ফেলতে পারে। সে দ্রুত নেমে আসছিল সিঁড়ি ধরে। তার পা ফেলা ঠিক থাকছে না। সে বুঝতে পারছে ঠিক এ-ভাবে এখন হেঁটে কোথাও যাওয়া যায় না। সে কোনরকমে সিঁড়ি ধরে নিচে নামতেই বুঝতে পারল আহাম্মকের মতো পোশাক না পাল্টে সে নেমে এসেছে। তাকে ওপরে উঠতে হবে। ঝুলে ঝুলে প্রায় কোনোরকমে হামাগুড়ি দিয়ে ওপরে ফের উঠে গেল। এবং মনে হল জাহাজের নিচে কোলাহল শোনা যাচ্ছে! বোধহয় এনজিন-রুমে। ছোটবাবু কোথায়! সে জামা গলিয়ে নিচে নেমে এসে দেখল, না সব ঠিক, কোথাও কোনো কোলাহল নেই। একেবারে আর দশটা দিনের মতো এলি-ওয়ে নির্জন। ছোটবাবুর দরজা বন্ধ। সে বার বার ডেকেও সাড়া পেল না।

    আর ঠিক জাহাজের এটা একটা অন্তিম সময় কেউ টের পেল না! জাহাজ ওঠানামার ভেতর কখন সেই ইণ্টারমিডিয়েট স্টপ ভালভ মুরগীর গলা ছেঁড়ার মতো কোন এক দানব দু’হাতে টেনে ছিঁড়ে ফেলছে। টের পাচ্ছে না কেউ কী করে জেনারেটর ঘুরতে ঘুরতে আর ঘুরতে পারল না। কখন এই অতিকায় যুদ্ধবাজ ঘোড়া ক্রমে অবসন্ন হতে হতে হাঁটু মুড়ে যাচ্ছে কেউ বুঝি বুঝতে পারছে না। সহসা সব অন্ধকার হয়ে গেল। জেনারেটর ফেল করেছে, সহসা মনে হল ভূখণ্ড চিরে অগ্ন্যুৎপাত হচ্ছে। আর ভীষণ বীভৎস তীক্ষ্ণ শিস্ শোনা যাচ্ছে। সহসা মনে হচ্ছে লোকজন ছোটাছুটি করছে। এলি-ওয়ে ধরে কেউ ছুটে গেল। সারা এনজিন-রুমে ভয়ংকর উত্তাপ, যেন ঝলসে যাচ্ছে শরীর, গরম স্টিমে সারা এনজিন-রুম ছেয়ে গেল। বনি আর শ্বাস নিতে পারছে না। আর চারপাশে শুধু গভীর অন্ধকার। বনি কোনো রকমে চেনা পথটা আবিষ্কারের চেষ্টায় হামাগুড়ি দিতে গেলে ওর ঘাড়ে এসে অন্ধকারে কেউ ছিটকে পড়ল। বনি এখন বুঝতে পারছে বোট-ডেকে উঠে যাবার জন্য প্রাণরক্ষার্থে সবাই যে যেদিকে পারছে এলোপাথাড়ি ছুটছে। এনজিন-রুমে ভয়ংকর রকমের দুর্ঘটনা। এ-সময়ে টর্চ জ্বালিয়ে কেউ টলতে টলতে ছুটে আসছে। অন্ধকারে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। এবং টর্চের আলোতে বনি বুঝতে পারল পাগলা- ঘণ্টি বাজিয়ে দিলে যেভাবে মানুষ ছুটে যায় সবাই তেমনি ছুটছে। বনি কাউকে কিছু বললে, কেউ দাঁড়াচ্ছে। বনি কাউকে কিছু বললে, কেউ দাঁড়াচ্ছে না। ডেকের দিকে পালাচ্ছে। আর তখনই কোথা থেকে ছোটবাবুর গলার স্বর সে সহসা শুনতে পেল। সতেজ, যেন সে ঘুম থেকে উঠে এসেছে। গলার স্বর এমনই মনে হয়েছিল। ছোটবাবুর হাতে টর্চ। সে বনিকে টানতে টানতে এবার ওপরে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। সব এলি-ওয়ে, সব কেবিন, সব এনজিন-রুম আর সব ফাঁকফোকড় স্টিমে অন্ধকার হয়ে গেছে। মুহূর্ত মাত্র দেরি করে ফেললে সবাই শ্বাস বন্ধ হয়ে মরে যাবে।

    আর যা হয় ছোটবাবুর এ-সময়ে। শুধু ছোটবাবুর কেন সবাই যে যার প্রাণ রক্ষার্থে নিজের নিজের যা কিছু আছে, এই যেমন ছোটবাবুর বনি আছে তাকে বগলদাবা করে ওপরে উঠে যাচ্ছে। অন্ধকারে কত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে কেউ অনুমানই করতে পারছে না। নিচে ঠিক জালির নিচে ক’জন লোক মনে হয় আটকা পড়েছে। ফানেলের কিছুটা অংশ উড়ে গেছে। দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে। সে ডাকল, হাই

    আবার সে ফের ডাকল, হাই। এবং সঙ্গে সঙ্গে বনির বুক ফেটে যাচ্ছে, বাবা! বাবা! অন্ধকারে ওপরে বাবা দু’হাত তুলে যেন সেই কঠিন প্রেতাত্মার মতো ঝুলে আছেন। যারা এনজিন-রুম থেকে আসতে পেরেছে, যারা নিঃশ্বাস নিতে পারছে না বলে বোট-ডেকে টুইন-ডেকে ছোটাছুটি করছে এবং চিফ-মেট পর্যন্ত সত্যি ওপরে উঠে দেখল মাস্টার প্রায় কোনোরকমে ঝুলে আছেন। বড় রকমের আর একটা ঢেউ এলেই ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, তখন টর্চের আলো বরাবর ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে ওরা দু’জন অর্থাৎ ছোটবাবু আর চিফ-মেট প্রায় বগলদাবা করে তুলে এনে নিচে জ্যাকের কেবিনে ঠেলে দিতেই হুড়মুড় করে ঝুলে থাকা মাংকি-আয়ল্যাণ্ড চার্টরুম সহ মনে হল নিমেষে উধাও হয়ে গেল সমুদ্রে। যারা ডেকে ছিল হিবিং-লাইন ধরে জলের নিচে কিছু কাল সাঁতার কেটে ওঠার মতো এবং এই জলরাশি কিছুটা স্টিম সঙ্গে নিয়ে যাওয়ায় মনে হল, জাহাজের ভেতরটা হাল্কা। কোথায় কি হয়েছে কেউ বলতে পারছে না। কোথায় আর্চি, কোথায় অন্য সব এনজিনিয়াররা এবং এমন একটা অন্তিম সময়ে শুধু থার্ড- মেট বলল, স্যার এস. ও. এস.। স্যার আমরা সব হারিয়েছি। স্যার আমাদের সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে! ডেবিডের পাত্তা নেই। রেডিও-অফিসারের পাত্তা নেই। ব্রীজ, মাংকি-আয়ল্যাণ্ড, চার্ট-রুম সব ভাসিয়ে নিয়ে গেলে যা হয় সবাই অন্ধকার নিশীথে জাহাজে মৃত্যুর মতো শীতল গভীর ঠাণ্ডা স্পর্শে মুহ্যমান কি করণীয়, কি এখন এনজিনের অবস্থা এবং জাহাজডুবী কি হয়ে যাচ্ছে, আসলে জাহাজটা ভেসে আছে তাও কেউ যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। জাহাজ ক্রমশ কাত হয়ে যাচ্ছে। জাহাজের অবস্থা একটা ভাসমান কাঠের গুঁড়ির মতো কেউ অনুমানই করতে পারছে না। যেন এক্ষুনি আবার আলো জ্বলে উঠবে। আবার সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। যেন এক পরাভূত মানুষের দল জয়লাভের নিমিত্ত স্বপ্ন দেখছে। সমুদ্রের দমকা বাতাস প্রবল পরাক্রম যুদ্ধবাজ—বিরাম নেই বিশ্রাম নেই। অন্ধকারে জাহাজ যে কাত হয়ে গেল কাতই হয়ে থাকল। অন্ধকারে জাহাজ যে ঘুরতে থাকল সমুদ্রে, কেবল ঘুরতেই থাকল। তবু কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। কোনো মন্ত্রঃপূত মানুষের মতো স্যালি হিগিনস বাইরে এসে দাঁড়ালেন তখন। শরীরের সব পোশাক জলে ভেজা। তখন একমাত্র সম্বল এল. বি. সেট, তার চেয়েও দরকার একবার দেখা আর্চি কোথায়। আর্চি, আর্চি। থার্ড এনজিনিয়ার এবং ফাইভার সামনে দাঁড়িয়েছিল। হাউমাউ করছে সব জাহাজিরা। কেউ কাপড় নষ্ট করে দিয়েছে। এবং কপাল থাবড়াচ্ছে যখন অর্থাৎ ওরা বুঝতে পারছে না, কোয়ার্টার-মাস্টার মহসীনের কি খবর। ওর ডিউটি ছিল ব্রীজে। অনেকের খবর নেই। এনজিন- রুম থেকে সবাই উঠতে পেরেছে কিনা, স্টিম নির্গত হলে যে অতিশয় শব্দ তা ক্রমে কমে আসছে। স্কাইলাইটের ভেতর থেকে একেবারে ধূম উদ্‌গিরণের মতো তখন সব স্টিম বের হয়ে আকাশ-বাতাস ঢেকে দিচ্ছে। ইচ্ছে করলেই কিছু করা যাবে না। তখন সবাই বুঝতে পারছে সমুদ্র শয়তান তার শেষ আক্রোশ জাহাজের ওপর মিটিয়ে নিয়েছে। মাংকি-আয়ল্যাণ্ডে ট্রান্সমিটার-রুম। মাংকি-আয়ল্যাণ্ড উড়িয়ে নিয়েছে। হুইল-রুমের সব লণ্ড ভণ্ড। দুমড়ে মুচড়ে একটা বীভৎস অবস্থা করে রেখেছে। আর ঠিক পাকা ফলটি তুলে নেবার মতো মাঝখান থেকে চার্ট-রুম উড়িয়ে নিয়েছে বলে ভারি মজার দৃশ্য। জাহাজের মাথা নেড়া। সবাই যেন হাসাহাসি করতে পারত। তখনই স্যালি হিগিনসের গলা, শিগগির দেখুন আর্চি কোথায়? দেখুন ডেবিড কোথায়। এল. বি. ট্রান্সমিটার সেট দ্যাখো কোথায় রেখেছে রেডিও-অফিসার। একটা টর্চ। আপনারা কেউ আমাকে একটা টর্চ দিতে পারেন! নিজের টর্চ নিজের বলতে যা কিছু চার্ট- রুমে। চার্ট-রুম উড়ে গিয়ে ভিখিরীর মতো তিনি। এটা ডেবিডের টর্চ। ছোটবাবু টর্চ দিয়ে বলল, এই নিন স্যার।

    স্যালি হিগিনস বললেন, ছোটবাবু! তুমি ছোটবাবু বেঁচে আছ!

    ছোটবাবু বলল, বনি আপনার পাশে। অন্ধকারে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না বলে তিনি বনির কাছে মুখ নামিয়ে বললেন, বনি তাহলে তুমিও বেঁচে আছ! তারপরই যেন দ্বিগুন উৎসাহে বললেন, এনজিন- রুমের কি খবর। দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই।

    থার্ড এনজিনিয়ারের মুখ স্টিমে সামান্য ঝলসে গেছে। সে উবু হয়ে বসে আছে। স্যালি হিগিনস ডাকতেই সে উঠে দাঁড়াল। বলল, শুধু দেখলাম স্যার বালব ফেটে বেরিয়ে গেছে। আর কিছু দেখার সময় ছিল না স্যার। ভয়াবহ শব্দে আমাদের মাথা ঠিক ছিল না। সারা এনজিন-রুম মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে গেল স্যার। এলার্ম বাজিয়ে উঠে এসেছি স্যার।

    আর তখন যে যার লাইফ-জ্যাকেট পরে নেবার কথা। কিন্তু অন্ধকারে এখন নিচে নামা পাতালে নামার সামিল। স্যালি হিগিনস বুঝতে পারছেন যা কিছু করণীয় খুব ঠাণ্ডা মাথায় করে ফেলতে হবে। হাল ঠিক নেই জাহাজের তিনি এটা বুঝতে পেরেই বললেন, হারি আপ ম্যান। সবার দিকে হাত তুলে দিলেন। চিফ-মেট বলল, স্যার এল. বি. সেট পাওয়া যাচ্ছে না। ডেবিডকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

    তখন স্যালি হিগিনস বললেন, চিফ তুমি ওদের নিয়ে আফটার-পিকে চলে যাও। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্টিয়ারিঙের পিনিয়ান ব্লক করে দিতে হবে। হাল ঠিক নাইনটি ডিগ্রিতে রাখবে! মনে রাখবে- কি বললাম? অন্ধকারে মুখ বাড়িয়ে প্রশ্ন করলেন স্যালি হিগিনস।

    —আচ্ছা স্যার। সে টর্চ নিয়ে কিছু লোকজন সঙ্গে নিয়ে প্রায় ঝুলে পড়ল নিচে।

    আর তখন তিনি জোরে হাঁকলেন, ডেবিড কোথায় আছ? ডেবিড, আর্চি কোথায় আছ! তিনি জানেন আর্চিকে খোঁজা বৃথা, তোমরা কে কোথায়! এবং এ-সময়ে মনে হল কারো গোঙানি শোনা যাচ্ছে, মেন-মাস্টের নিচে জড়াজড়ি করে দু’জন পড়ে আছে। বোট-ডেক থেকে টর্চ মেরে বুজতে পারলেন, ওরা ডেবিড আর রেডিও-অফিসার। ওরা দু’জন ভয় পেয়ে কখন একসঙ্গে লাফিয়ে নেমে আসছিল নিচে। কাপ্তানকে খবর দেবে বলে, তারপর কি হয়েছিল ওরা বলতে পারল না। স্যালি হিগিনসের গলা শুনে ওরা বিশ্বাস করেছে ওরা বেঁচে আছে। ওরা ভয়ে ভয়ে উঠে আসছে। ওদের টর্চ মেরে পথ দেখাচ্ছেন স্যালি হিগিনস। ওরা উঠে আসার সময় মনে হল, জালির নিচে কেউ আটকা পড়েছে। ছোটবাবু এদিকে নেই। সে গেছে নিচে সেই আফটার-পিকে—এনজিন-সারেঙ, এবং বন্ধু অনিমেষ সবার খবর নিতে গিয়ে দেখেছে কেউ আর নিচে নেই—সবাই উন্মুখ। সঠিক কি হয়েছে কেউ জানে না। এনজিন-রুমে কি হয়েছে, এনজিন-রুমে কেউ নামতে পারছে না কেন? জাহাজটা এভাবে মাতালের মতো ঘুরছে কেন? এমন সব প্রশ্ন করছে। স্টিম কোথা থেকে এত বের হয়ে আসছে। কোল-বয় দু’জনের খবর পাওয়া গেছে। ওরা উঠে এসেছে। এনজিন-সারেঙ কেবল আটকা পড়েছেন। সবাইকে তুলে দিয়ে নিচে আটকা পড়ে গেছেন। এবং তখনই ছোটবাবুর মনে হল, সেও শুনেছিল এমন। অথচ মাথা তার ঠিক ছিল না। কোনদিকে কি ভাবে সে এগুবে ঠিক বুঝতে পারছে না। যেন সেই অশুভ প্রভাব জাহাজ ছেড়ে যাবার আগে শেষবারের মতো শোধ তুলে নিয়ে গেছে। সে আর দেরি করতে পারল না। প্রায় ঝুলে ঝুলে হিবিং-লাইনে ঝুলে ঝুলে কখনও দড়িদড়া ধরে লাফিয়ে মুহূর্তে বোট-ডেকে উঠে জালির কাছে টর্চ মারতেই দেখল এনজিন-সারেঙ উপুড় হয়ে পড়ে আছেন নিচে! এ-সময় নামা ঠিক না, কারণ জাহাজের কড়িবরগা যা কিছু আছে সব প্রায় লণ্ডভণ্ড—কোনটা কিভাবে ছিটকে এসে পড়বে কেউ বলতে পারবে না। তবু যা হয়ে থাকে ছোটবাবুর কোনো কোনো সময় হুঁস থাকে না। স্বার্থপরের মতো মাথা ঠিক রেখে কাজ করতে পারে না। আর সে তো এখন আর অপোগণ্ড নেই। জাহাজে সে এখন সবচেয়ে বোধহয় শক্ত মানুষ। সে দু’হাতে ফাঁক করে ফেলল লোহার জালি। বনি ওপরে ঝুঁকে আছে। হাতে টর্চ। লোকজনের ভিড় চারপাশে। অন্ধকারে কারো মুখ চেনা যাচ্ছে না। এনজিন-সারেঙের গোটা শরীরটা কাঁধে ফেলে যখন সে সত্যি উঠে এল, এবং অন্ধকার সমুদ্রে সেই তরঙ্গমালা যখন শান্ত হয়ে আসছে, বাতাসের ঝাপটা আর তেমন প্রবল নেই বরং মনে হচ্ছে সব আকস্মিকতা শেষে সমুদ্র আবার শান্ত এবং শীতলপাটির মতো নির্ভরশীল আশ্রয়—তখন আর যেন ছোটবাবুর বিন্দুমাত্র ভয় থাকল না। সে ডেকের ওপর অন্ধকারে সারেঙকে শুইয়ে দিল। ডাকল, চাচা।

    এনজিন-সারেঙ তেমনি পড়ে আছেন। স্যালি হিগিনস, বয়-বাবুর্চিরা, এবং ডেক-জাহাজিরা জড়ো হচ্ছে চারপাশে। এখন দাঁড়িয়ে থাকার সময় নয়। কেউ কেউ মাথা চাপড়ে কাঁদতে বসে গেছে। এক ধমক তখন স্যালি হিগিনসের। পালস্ দেখে বললেন, নুনজল খাওয়াও। জলের ঝাপটা দাও চোখে। সব ঠিক হয়ে যাবে। আর তখন সেই মাস্তুলে এলবা পাখা ঝাপটে সবাইকে কিছুটা যেন আশ্বস্ত করে দিল। স্যালি হিগিনস নিজের এই অবস্থার কথা আর ভাবতে পারছেন না। অর্থাৎ জাহাজিরা পৃথিবীর সব সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, তখন যেন মাস্তুলে উঠে কেউ বলছে এবানডান দ্য শিপ। তখনই তিনি লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে গেলেন ডেক, বললেন সেই চরম পরিণতির উদ্দেশ্যে, নো। তিনি ডেকে দাঁড়িয়ে যখন এমন বারবার চিৎকার করে বললেন, নো, নো। শী ইজ ফেথফুল! সমুদ্রে শয়তান যতই চেষ্টা করুক, সিউল ব্যাংক আমাদের ঠিক কোনো ডাঙায় ভিড়িয়ে দেবে। এতগুলো মানুষের আশা- আকাঙ্ক্ষা এবং নির্ভর বলতে যা কিছু এখন তিনি। চিফ-মেট বুঝতে পারছে সকাল না হলে কিছু স্থির করা যাবে না। তিনিও গলা ছেড়ে বললেন, জাহাজ আমাদের ঠিক পৌঁছে দেবে। নাবিকগণ আপনারা এখন ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করুন। ঈশ্বর ব্যতিরেকে সম্বল বলতে আমাদের আর কিছু নেই। তারপর তিনি চিৎকার করে হেঁকে গেলেন, আর্চি আর্চি তুমি কোথায়? তখন মনে হল অতিশয় দূরবর্তী সমুদ্রে কেউ বাতাসে প্রবল শিস্ দিয়ে যাচ্ছে। আর্চির শিসের মতো প্রায় সঠিক আওয়াজ। চিফ-মেট বলল, আর্চি, বোধহয় স্যার সমুদ্রে ভেসে গেল। এবং কি মনে হতেই স্যালি হিগিনস গুম মেরে গেলেন।

    সঙ্গে সঙ্গে এক ঝাঁক টর্চের আলো দূরবর্তী সমুদ্রের মাথায় ভেসে উঠল। না, কিছু নেই সেখানে সাদা ফেনা সমুদ্রের অথবা জলের বুদবুদ অজস্র। টর্চের আলো ফেলে সর্বত্র এভাবে দেখার সময় স্যালি হিগিনস বললেন, একবার এনজিন-রুমে নামা দরকার! ওখানে যদি আর্চি আটকা পড়ে থাকে। মনে মনে বললেন, ছলনা ছাড়া আমার আর কিছু করণীয় নেই ঈশ্বর।

    ওরা সকাল পর্যন্ত চেষ্টা করেও এনজিন-রুমে নামতে পারল না। ধূম উদ্‌গিরণের মতো গরম স্টিম তখনও ভক ভক করে বের হচ্ছে। হালের পিনিয়ান ব্লক করে দেয়া হয়েছে। বড় বড় সব রড ভেতরে ঢুকিয়ে ব্লক করা হয়েছে পিনিয়ান। পিনিয়ান নড়তে পারছে বলে মনে হয় না। শক্ত সোজা লম্বা জলের ভেতরে হাল দাঁড়িয়ে আছে। জাহাজটা এখন কাত হয়ে যাচ্ছে না। সোজা এবং সরল কাঠের মতো ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে। ওরা এনজিন-রুমে যখন শেষ পর্যন্ত নেমে গেল, অবাক সিলিণ্ডারের নিচে তিনটে পিস্টন-রড একেবারে হাঁটু ভাঙা দ-এর মতো উবু হয়ে আছে। সেণ্টার বয়লার ছিটকে বেরিয়ে এসেছে কিছুটা। পোর্ট-সাইড বয়লার স্টাফোর্ড-সাইড বয়লার ঝুলে পড়েছে নিচে। তামার মোটা পাইপ ঠিক সিলিণ্ডারের মুখে ছিঁড়ে গেছে। ইণ্টারমিডিয়েট ভালভের কোনো হদিস নেই। মরা সাপের মুখের মতো হাঁ-করা পাইপ থেকে এখনও অল্প স্টিম বের হচ্ছে। জাহাজের এনজিন একেবারে অকেজো করে দিয়েছে। সমুদ্রের কোনো তুফান এভাবে এনজিন বিনষ্ট করতে পারে না। সেই অশুভ প্রভাব যাবার আগে শেষবারের মতো জাহাজের সব শক্তি হরণ করে চলে গেছে। চিফ-মেট কোথাও আর্চির বিন্দুমাত্র চিহ্ন পেল না। ওরা এখন নিয়তির হাতে পড়ে গেছে। আর একমাত্র সিউল-ব্যাংক পারে কোথাও তাদের এখন পৌঁছে দিতে। ঈশ্বরের প্রায় কাছাকাছি এই বিশ্বস্ত জাহাজ। এত কিছু ঘটে যাবার পরও স্যালি হিগিনস যেন নিশ্চিন্ত। তিনি যেন জানেন ভারী বিশ্বস্ত জাহাজ। এতদিন তার সঙ্গে ঘর করে এ-বয়সে জাহাজের এমন দুঃসময়ে আর তাকে অবিশ্বাস করেন কি করে! আবার তাঁর ছলনা তিনি বললেন, তোমরা আর্চির কেবিন খোঁজ করেছ?

    ফাইভার ঝুঁকে ছিল এনজিন-রুমের দরজায়। সে নিচে নামতে সাহস পায়নি। কোথায় কি আগা হয়ে আছে কখন কি মাথার ওপর পড়ে যাবে—সে পেছনে পেছনে দরজা পর্যন্ত গিয়েছিল। আর নিচে নামেনি। তারপর যখন ওরা উঠে আসছে খুব একটা কাজের মানুষের মতো সে চেঁচিয়ে উঠল, কেবিনের দরজা বন্ধ। কেউ সাড়া দিচ্ছে না স্যার, বেঁচে থাকলে ঠিক সাড়া দিতেন তিনি।

    স্যালি হিগিনস ডেকে উঠে দেখলেন বাতাস একেবারে পড়ে গেছে। তিনি আর্চির কেবিনে গেলেন না। সারা জাহাজ তাকে ঘুরে দেখতে হচ্ছে। অর্থাৎ তিনি ঘুরে ঘুরে বুঝতে পারছেন জাহাজটার খোলের কোনো ক্ষতি হয়নি। জল ঢুকে যাচ্ছে না জাহাজে। যতদিন খাবার থাকবে জাহাজে সবাইকে তিনি বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন। জল, খাবার, কয়লা এখনও মাসের মতো হয়ে যাবে। এবং মাসের ভেতর সিউল- ব্যাংক ঠিক কোনো ডাঙায় তাঁদের পৌঁছে দেবে—অথবা কোনো জাহাজ পাশাপাশি দেখা গেলে, অথবা যদি নিখোঁজ জাহাজের সন্ধানে উপকূল থেকে উড়োজাহাজ চলে আসে কিংবা গভীর সমুদ্রে কোনো মাছ-ধরা জাহাজের সঙ্গে যদি দেখা হয়ে যায়—কিছু একটা ঠিক হয়ে যাবে।

    ফাইভার ছুটে এসে বলল, খোলা যাচ্ছে না। কোনো চাবি লাগছে না। ডুপ্লিকেট চাবি পাওয়া যাচ্ছে না। স্যালি হিগিনস জানেন দরজা ভেঙে ঢুকতে হবে। এই ছলনার আশ্রয় না নিয়েও তাঁর উপায় নেই। তবু এসব করার আগে তন্ন তন্ন করে তিনি সব খুঁজে শেষে দরজা ভেঙে যখন বোঝা গেল শেষ পর্যন্ত মহসীন আর আর্চি সমুদ্রে ভেসে গেছে তখন সামান্য সময় মৌন থাকা দরকার। বোট-ডেকে সবাই ফের গোল হয়ে দাঁড়াল। মাথা হেঁট করে সমুদ্রের ভেতর সবাই দাঁড়িয়ে আছে। সবাই সমুদ্রে অসীম জলরাশির ভেতর অথবা আকাশে কোনো দৈববাণী হবে এমন প্রত্যাশা করছে যেন। তখনই ছোটবাবুর মনে হয়েছিল, একমাত্র লেডি অ্যালবাট্রস বুঝি তাদের খবর ডাঙায় পৌঁছে দিতে পারে।

    সে ছুটে বোট-ডেক থেকে নেমে গেল। মেন-মাস্টের গোড়ায় দাঁড়িয়ে ডাকল, এলবা আমাদের কি হবে? এলবা ওকে তখন ঘাড় বাঁকিয়ে দেখল। বাতাসে উড়ে গেল না। যেন বাতাসে উড়ে গেলেই সে ভাবতে পারত এলবা ডাঙায় খবর পৌঁছে দিতে যাচ্ছে। সে ফের বলল, আমাদের জন্য তুমি কিছু করছ না! এলবা এবার ঘাড় বাঁকিয়ে দেখল না পর্যন্ত। সে যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। শত চেষ্টায়ও সে পাখিটাকে আজ বাতাসে উড়িয়ে দিতে পারছে না। সামান্য খড়কুটোর মতো অবলম্বন এই জাহাজ এখন সব হারিয়ে শুধু পাখিটার আশায় যেন আছে। সেও চুপচাপ। যেন ছোটবাবু বুঝতে পারছে পাখিটা আর তাকে বিশ্বাস করছে না। এবং কেন বিশ্বাস করছে না সে কি করেছে এমন! সে বলল, আমি কি করেছি? সেই ঘণ্টাধ্বনি যেন ফের—একটা আশ্চর্য ঘোরের ভেতর পড়ে যাচ্ছে সে এবং মনে করতে পারছে সব। সে বলল, না আমি কোনো পাপ কাজ করিনি। আমার কোনো অনুশোচনা নেই। আমি আমার মনুষ্যত্ব হারাইনি। বরং মনুষ্যত্ব আমি এই প্রথম অর্জন করেছি এলবা। আমি এখন সম্পূর্ণ মানুষ। তবু এলাবা মুখ তুলে তাকাচ্ছে না। ভেতরটা কেমন শঙ্কায় অস্থির হয়ে উঠছে। সে ফের বলল, আমার কিছু আসে যায় না। যদি এটা পাপ কাজ হয়ে থাকে তবে আমার আসে যায় না। বনির জন্য আমি সব করতে পারি। যে-কোনো পাপ কাজ। আমার ভয় করে না।

    বরফ-ঘর থেকে সব শুয়োর ভেড়া-গরু তুলে আনা হচ্ছে তখন। অনিমেষের কাঁধে একটা বড় মাদি গরুর ঠ্যাং। সে ছোটবাবুকে দেখে বলল, কিরে বিড়বিড় করে কি বকছিস?

    ওদের দুর্জনের কথায় পাখিটা ফের ঘাড় বাঁকিয়ে নিচে তাকাচ্ছে।

    বন্ধু পাশ কাটিয়ে যাবার সময় বলল, কারো মাথা ঠিক থাকবে না। কে কার মাংস কামড়ে খায় এখন দ্যাখো।

    ছোটবাবুর কিছুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। সে শুধু পাখিটাকে দূরবর্তী কোনো ভূখণ্ডে পৌঁছে যেতে বলছে। কিন্তু সমুদ্রে এলবা কিছুতেই উড়ে গেল না। ফের ঠোঁট গুঁজে দিল পাখার ভেতরে। কত কাল পর কত দীর্ঘকাল পর সে যেন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। তখন কিছু ডলফিন ভেসে আসছিল, কিছু পারপয়েজ মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এমন একটা অদ্ভুত জীবকে সমুদ্রে আবিষ্কার করে পায়লট মাছের ঝাঁক ধেয়ে আসছে। দুটো একটা অতি ক্ষুদ্রকায় র‍্যামোরা মাছ ইতিমধ্যেই জাহাজের খোলে শামুকের মতো বসে গেছে। আর অন্তহীন জলরাশি লীলাচ্ছলে জাহাজটার চারপাশে খেলা করে বেড়াচ্ছিল।

    তখন ফের ছোটবাবু এলবাকে ডাকছে। সামান্য খড়কুটোর মতো পাখিটাই একমাত্র জাহাজের ত্রাণকর্তা। ওর বিশ্বাস পাখিটাই বুঝি একমাত্র এতগুলো অসহায় মানুষের বার্তা ডাঙায় পৌঁছে দিতে পারে। আর আশ্চর্য পাখিটা এত ডাকেও সাড়া দিচ্ছে না। চোখ বুজে আছে। সে বলছে, এলবা কি ভেবেছ! আমরা কি এমন পাপ করেছি যে সমুদ্রে হারিয়ে যাব। আর তখনই যা হয় ঘোরের ভেতর থেকে স্বপ্নাবলীর মতো কঠিন দৃশ্য আবার চোখের ওপর ভেসে যেতে থাকল। ওর গলা বুক শুকিয়ে উঠছে। সে দু’হাত তুলে বলতে চাইল, না না, এলবা আমি করিনি। সত্যি বলছি আমি করিনি। ঘোরের ভেতর কি করেছি আমার মনে নেই। এলবা তবু ঘুমোচ্ছে! কোনো সাড়া দিচ্ছে না। যারা উপাসনার মতো দাঁড়িয়েছিল তারা দেখল ছোটবাবু পাগলের মতো পাখিটার সঙ্গে কি সব কথা বলছে।

    এখন এমন সব ঘটনা ঘটবে—কেউ এসবে পাত্তা দিচ্ছে না। ছোটবাবু কেন জাহাজে সবাই উন্মাদ হয়ে যেতে পারে। ছোটবাবু ফের ডাকছে, এলবা আমার কোনো দোষ নেই। এতে আমার কিছু পাপ হয়নি। তুমি বুঝতে পারছ না কেন আমি না করলে বনির কি হত।

    দূর থেকে ওরা তখনও দেখছে মাস্তুলের নিচে দাঁড়িয়ে আছে ছোটবাবু। সে তখনও বলে যাচ্ছে—দ্যাখোনা আমার অনুশোচনা নেই। কেউ আবার আসছে না তো? সে চারপাশে দেখল। সে যে ফিসফিস করে কথা বলছে অথবা পাখিটার সঙ্গে এক আশ্চর্য তার টেলিপ্যাথি আছে ওরা কেউ বুঝি তা জানে না। সে বলল, বয়ে গেল! খবর পৌঁছে দেবে না ভারী বয়ে গেল। আমার কোনো দুঃখ নেই। বরং সে বনির জন্য এমন একটা কাজ করতে পেরে ভীষণ খুশী। সে বনির পবিত্রতা রক্ষার জন্য সব করতে পারে। তার আর কোন দুঃখ নেই। সমুদ্রে নির্বাসিত হলেও দুঃখ নেই। কি এক আনন্দে সে ছুটে গেল বনির কাছে। বনির কাছে গেলে শঙ্কা দূর হয়ে যাবে। সে ঘাবড়ে যাবে না। সারা সকাল সে বনিকে জাহাজ-ডেকে দেখতে পায়নি। সে বনিকে কেবল খুঁজছে। ওপরে উঠে দেখল দরজা লক করা ভেতর থেকে। সে ডাকল, বনি বনি।

    বনি বলল, শুয়ে আছি। ভারি নিষ্প্রাণ গলা বনির।

    —অসময়ে শুয়ে আছ! দরজা খুলে বনি মুখ বাড়াল তখন। বনিকে চেনা যাচ্ছে না, ভারী অসহায় মুখ। মুখে সব আঁচড়। দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনায় যখন মাথা সবার খারাপ হয়ে যাবার জোগাড় ছোটবাবু তখন কেমন চঞ্চল বালকের মতো কি বলতে গেল বনিকে। বনি চাদর গায়ে ফের শুয়ে পড়ছে। বলছে, আমার শরীর ভাল নেই ছোটবাবু। তুমি এখন যাও

    ছোটবাবু আর একটা কথাও বলতে পারল না। বনি ওর দিকে তাকাচ্ছে না। কঠিন সংশয়ে বনির মুখ থমথম করছে। কথা বললেই যেন সারা মুখে তার ঘৃণা ফুটে উঠবে। বনি টের পেয়েছে বুঝি ছোটবাবু একজন জঘন্য হত্যাকারী যুবক। বনির সব বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেছে। মানুষ খুন করলে বুঝি মুখের ছবি বদলে যায়। বনি তার দিকে তাকাচ্ছে না। কথা বললেই বনির চোখে মুখে বুঝি অতিশয় ঘৃণা ফুটে উঠবে। সে বনির সামনে আর দাঁড়াতে সাহস পাচ্ছে না। মাথা হেঁট করে নিচে নেমে গেল সিঁড়ি ভেঙে। মনে হল জাহাজে অথবা এই পৃথিবীতে জীবনযাপনের জন্য যা কিছু প্রয়োজন সব সে হারিয়েছে।

    ভেতরে ঢুকে সে এবার কেবিনের দরজা বন্ধ করে দিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে কোনো বীভৎস রেখা ঠিক আর্চির মতো ফুটে উঠে কিনা দেখার সময় সে কেঁদে ফেলল। সে বলল, ঈশ্বর আমি খুন করেছি। আমার পাপের শেষ নেই। পাপের শেষ নেই, পাপ তাকে আজীবন অনুসরণ করবে এবার থেকে। সে অসহায় নিরলম্ব মানুষের মতো এবার দেয়ালে মাথা কুটতে থাকল। সে হাউ মাউ করে কাঁদছে। তার এতদিনের পারিবারিক পরিমণ্ডল নষ্ট হয়ে গেল। সে একজন খুনি।

    স্যালি হিগিনসের কাছেও খবরটা পৌঁছে গেল। কেবিনের ভেতরে দরজা বন্ধ করে ছোটবাবু বালকের মতো উপুড় হয়ে কাঁদছে। দরজার সামনে ভিড়। সবাই দরজা খোলার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু খুলতে পারছে না। কেবল ছোটবাবু হাউ হাউ করে কাঁদছে—আর কি সব বলে যাচ্ছে! জাহাজের অনিশ্চিত এই যাত্রায় বুঝি প্রথমেই ছোটবাবু ধরাশায়ী হল। স্যালি হিগিনস দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বুকে ক্রস টানলেন। জাহাজে এবার শুধু আত্মহত্যা। সমুদ্রে মরীচিকা দেখে শুধু জলে লাফিয়ে পড়া। মৃত্যু-ভয় মানুষকে এভাবে দীন-হীন এবং বড় করুণভাবে যখন নিয়তির হাতে তুলে দিচ্ছে, স্যালি হিগিনস তখন ছোটবাবুকে দড়িদড়ায় বেঁধে ফেলে রাখার নির্দেশ দিলেন। এছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই। সংক্রামক ব্যাধির মতো রোগটা আবার সবার ভেতর যে কোনো সময় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

  • আটচল্লিশ

    আটচল্লিশ

    ।। আটচল্লিশ।।

    স্যালি হিগিনস নিচে আর অপেক্ষা করতে পারলেন না। ছোটবাবুকে সবাই মিলে ডাকাডাকি করছে। ছোটবাবু দরজা খুলছে না। দরজা ভাঙার আগে সবাই এই যেমন ডেবিড, এনজিন সারেঙ বন্ধু জব্বার বার বার বলেছে, ছোট দরজা খোল। তোর কি হয়েছে! এভাবে তুই শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়লি! ছোটবাবু কোনো জবাব দিচ্ছে না। স্যালি হিগিনস এক মুহূর্ত এখন সময় নষ্ট করতে পারেন না। এনজিন-সারেঙকে শেষ পর্যন্ত দরজায় পাহারা রেখে ওপরে উঠে গেছেন। সব অফিসারদের ডেকে পাঠিয়েছেন। সবাই এলে তিনি সাদা কাগজে পেনসিলে প্রথম বড় বড় তিনটে দাগ কেটে ফেললেন। যেহেতু সব চাৰ্ট, ওসেনোগ্রাফি সংক্রান্ত বই, লগ-বুক সেকসটান, চার্ট-রুমে থাকত অর্থাৎ জাহাজ চালাবার পক্ষে যা কিছু প্রয়োজনীয় সব এখন সমুদ্রগর্ভে—তিনি কিছুমাত্র বিচলিত বোধ না করে খুব সহজভাবে দাগ কেটে জাহাজের অবস্থান মোটামুটি নির্ণয়ের চেষ্টা করার সময় বললেন, আপনারা বুঝতে পারছেন আমরা লয়ালটি দ্বীপের কাছাকাছি কোথাও আছি। জাহাজটা সম্ভবত স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। এবং সম্ভবত দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতে জাহাজ ড্রিফটিং হচ্ছে। সামোয়া থেকে পোর্ট-মেলবোর্ণের দূরত্ব ধরুন প্রায় দু’হাজার তিনশ বিশ মাইলের মতো। জাহাজ প্রায় দশ দিন রান করেছে। সুতরাং অস্ট্রেলিয়ার উপকূল থেকে প্রায় বারোশো মাইলের দূরত্বে রয়েছি ধরে নিতে পারি। ঝড়ে যদি সাউথ-ইস্ট-ইস্টে কিছু এগিয়ে যাই দূরত্ব ধরে নিতে পারি সামান্য বেড়ে গেছে। আপনারা কি বলেন?

    চিফ-মেট বলল—স্যার, কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

    —কিছু না বুঝলে এ সময় চিফ-মেট আমাদের চলবে না। যখন আমরা বুঝতে পারছি জাহাজ থেকে নেমে পড়া বোকামি হবে—তুমি ডেবিড কি বুঝছ! সহসা কথা শেষ না করে তিনি ডেবিডকে প্রশ্ন করলেন।

    ডেবিড বলল—মাথা স্যার ঠিক নেই। মাথায় কিছু আসছে না।

    স্যালি হিগনস বললেন—মানুষকে এ সময়ে সবচেয়ে বেশি শক্ত থাকতে হয়। আচ্ছা ছোটবাবুটা কি! ওকে আমি ভেবেছিলাম এ সময়ে আমাদের বেশি কাজে আসবে। থার্ড, তুমি সব দেখছ ত?

    থার্ড-মেট ঝুঁকে বলল—হ্যাঁ। শেষে বলতে চাইলেন হারামজাদা তুমি তবে জানতে সব।

    স্যালি হিগিনস দরজার বাইরে একবার ঝুঁকে কি দেখলেন, অর্থাৎ জাহাজে কাজকর্ম ঠিক হচ্ছে কিনা। কারণ এ-সময়ে কাজকামে জড়িয়ে না রাখলে সবার অবস্থা ছোটবাবুর মতো হয়ে যাবে।

    তখন ডেক-কশপ বড় বড় সব রঙের টব খালি করে দিচ্ছিল আর মাঝে মাঝে ইনসে আল্লা বলছিল। কাজ করতে করতে সে সোজা ডেকে উঠে নামাজের ভঙ্গীতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। স্যালি হিগিনস ওপর থেকে চিৎকার করে উঠলেন, হাই। কি হচ্ছে? কাজ কাজ। ঈশ্বরকে ডাকার অনেক সময় পাবে। স্টুয়ার্ডকে ডাকো ডেবিড

    স্টুয়ার্ড এলে তিনি গম্ভীর গলায় বললেন—সব বের করে দিচ্ছ তো?

    স্টুয়ার্ড সালাম জানিয়ে বলল—হ্যাঁ স্যার। হ্যাম মটন বিফ টার্কি যা কিছু স্টক আছে সব তুলে দিয়েছি ওপরে।

    হিগিনস বললেন—ক্যাবেজ কতটা আছে?

    —স্যার স্টক বুকটা নিয়ে আসছি।

    —ননসেন্স! ভয়। আরে এখন তোমাকে আমি স্টক মেলাতে বলছি না। যা কিছু খাবার আছে এক ফোঁটা নষ্ট হলে জাহাজ থেকে ফেলে দেব বললাম।

    —ক্যাবেজ কি হবে স্যার?

    —তুলে দাও ওপরে, কেটে সব শুকোতে দাও। তখন তিন-নম্বর মিস্ত্রি ছুটে এল। বলল – চারটা জায়গা করেছি। হয়ে যাবে মনে হয়।

    —কোথায় কোথায় করেছ?

    —দু’টো ফোর-মাস্টের দু’পাশে আর দু’টো মেন-মাস্টের দু’পাশে।

    —বাড়াতে পারছ না?

    —আর সব তো কাঠের স্যার। ড্রামে আগুন জ্বললে কাঠের ডেক পুড়ে যেতে পারে।

    —বোর্ট-ডেকে বয়-কেবিনের পাশে একটা জায়গা করতে পার।

    একটা মস্ত ভুল করে ফেলেছে মতো বলল—তা স্যার ঠিক বলেছেন। ভাণ্ডারীদের বল যা বিফ আর মটন আছে যতটা পারে যেন বয়েল করে ফেলে। বরফ-ঘরে তোমার কিছু রাখা আর ঠিক হবে না। পচে যাবে সব। তারপর স্টুয়ার্ডের দিকে তাকিয়ে বললেন—এক টুকরো খাবার নষ্ট হলে তুমি মারা পড়বে স্টুয়ার্ড। এখন তুমি যেতে পার। তারপর তিনি চিফ-মেটকে বললেন—তবে এটা আমরা বুজতে পারছি স্রোতের মুখে জাহাজ ঘুরে না গেলে কোনো দ্বীপ-টিপ ঠিক পেয়ে যাব। আর মনে হচ্ছে ঠিক কোনো জাহাজের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে! শুধু ভয়, আমরা স্রোতের মুখে পড়ে না যাই। স্রোতটা যদি সাউথ-ইস্ট-ইস্টে তুলে নিয়ে যায় ভাগ্য আমাদের সুপ্রসন্ন বলতে হবে। চারপাশে অজস্র দ্বীপ-টিপ পেয়ে যাব। পাঁচ-সাতশ মাইলের ভেতরই পেয়ে যেতে পারি। চিফ-মেট কাপ্তানের কথার বিরুদ্ধে একটা কথা বলতে পারছে না। বললে যেন শোনাতো, আপনার কি মাথা খারাপ স্যার। সমুদ্রে পাঁচ-সাতশ মাইল চাট্টিখানি কথা। শুনে তো মনে হয় পাশেই একটা দ্বীপ রয়েছে। আমরা দ্বীপে যেন একেবারে নেমে যাচ্ছি। কিন্তু বুড়োর মুখের ওপর কথা বলার সাহস তার নেই। সন্তান-সন্ততিদের মুখ স্ত্রীর মুখ ভেসে উঠলে ভেতরে ভেতরে পাগল হয়ে যাচ্ছে, অথচ কথাবার্তায় কিছু হয়নি মতো থাকতে হচ্ছে। সে বলল—তা স্যার পেয়ে যাব মনে হচ্ছে।

    —সুতরাং খুব ঘাবড়ে যাবে না। আরে জাহাজ তো সিউল-ব্যাংক। তোমাদের বলছি—ভীষণ বিশ্বস্ত জাহাজ। এতগুলো জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করবে মনে হয় না।

    তারপর তিনি ফের বললেন—যদি ধরো নিরক্ষস্রোতের ঘূর্ণিতে পড়ে যাই তবে আমরা ঠিক কারমাদা দ্বীপের পাশ দিয়ে যাব। ওটা একটা অবশ্য আশার কথা। আর একটা কথা মনে রেখ, স্রোত কখনও ঠিক থাকে না। আমরা এমন সব চোরাস্রোতে পড়ে যেতে পারি যে দেখবে হয়তো জাহাজ যেখানে যাবার ঠিক সেখানেই চলে যাচ্ছে।

    ডেবিডের দাঁত শক্ত হয়ে যাচ্ছে। পাগল! পাগলের পাল্লায় পড়া গেছে। সব আজগুবি কথাবার্তা স্রোতে আর জাহাজ কতটা ঠেলে নেবে। জাহাজ তো প্রায় স্থির দাঁড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে যেমন কাঠের গুড়ি ভেসে থাকে তেমনি ভেসে আছে। একটু নড়ছে বলে তো মনে হচ্ছে না। চিফ-মেট আপনিই বা কেন সব কথায় সায় দিয়ে যাচ্ছেন। বলতে পারছেন না বোট দিয়ে দিন আমরা নেমে যাই। অন্তত আর কিছু না হোক বোটে আমরা অনেকটা পথ এগিয়ে যেতে পারব।

    স্যালি হিগিনস ফের উপুড় হয়ে পড়লেন তিনটে দাগের ওপর। মানচিত্র তৈরি করে ফেলেছেন। মে-জুন মাসে কোথায় কোন সমুদ্রে কি স্রোত কি আবহাওয়া কোথায় উচ্চচাপ কোথায় নিম্নচাপ এবং বাতাসের প্রভাবে জাহাজ কতটা কোনদিকে ভেসে যেতে পারে মোটামুটি তার একটা হিসেব দিয়ে বললেন, যদি জাহাজ আমাদের স্রোতের মুখে পড়ে সোজা দক্ষিণে চলতে তাকে তবে নিউজিল্যাণ্ডের উপকূল পেয়ে যেতে পারি। ওটা ধরুন প্রায় আঠারশ মাইলের মতো হবে।

    বেজন্মার বাচ্চা হিসাব শেখাচ্ছে। ডেবিড চিৎকার করে উঠতে চাইল। তারপরই মনে হল একজন যথার্থ নাবিকের পক্ষে এত সহজে ভেঙে পড়া ঠিক না! দুর্বল মানুষের মতো সে ব্যবহার করতে পারে না। ছোটবাবু এখনই তুমি এত ভেঙে পড়লে! আর মা বাবা বুঝি আমাদের নেই, দেশে আমাদের কেউ নেই! কেবল তুমি নিজের কথা ভেবে দরজা বন্ধ করে বসে আছ!

    স্যালি হিগিনস বললেন, যদি কোনো কারণে জাহাজের গতি সাউথ অথবা সাউথ-সাউথ-ইস্টে ঘুরে যায় তবে ভাববার কথা এবং যেন মুখে এসে গেছিল, জাহাজ তবে নির্ঘাত সাউথ-ইস্ট থেকে ক্রমে ইস্ট-সাউথ-ইস্টে উঠতে উঠতে একেবারে সোজা পূবমুখে ছুটতে থাকবে। তখন আমরা পাঁচ হাজার মাইলের আগে কোন ভূখণ্ড পাব না। দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে জাহাজ যেতে যেতে আমরা মরে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাব। তিনি একেবারে অন্য কথায় চলে এলেন, চিফ দেখবে কেউ যেন বসে থাকতে না পায়। বসে থাকলেই শয়তানের বাসা হয়ে যাবে।

    চিফ বলল, সে দেখছি স্যার।

    এবং সবাই নেমে গেল নিচে। বোট-ডেক ধরে হাঁটার সময়, ডেবিড, চিফ মেটকে বলল, কি বুঝছেন স্যার।

    —বুড়ো নিজেই একটা শয়তানের বাসা। ওর ভরসায় থাকলে সবাই মারা পড়ব। আমাদের গোপনে বসার দরকার। এবং চারপাশে সমুদ্রে নীলাভ জল আর অন্তহীন দিগন্ত দেখে সবাই কেমন হাহাকার করে উঠল। ডেকে উঠে এলেই বুকের রক্ত হিম হয়ে আসছে। সমুদ্র কি ভয়ঙ্কর কি যে শূন্যতা নিয়ে গ্রাস করার মতো উদ্যত হয়ে আছে। এই মহাশূন্যের ভেতর ওরা না জানি কত দিন ভেসে বেড়াবে। একটা কথা আর কেউ বলতে পারছে না। সূর্য মাথার ওপর উঠে আসছে। আপন মহিমায় তেমনি কিরণ দিচ্ছে। কি শান্ত জলরাশি! সব মাছের ঝাঁক বড় চক্রাকারে ভেসে আসছে। যেন জাহাজটাতে মাংসের গন্ধ পেয়ে গেছে সমুদ্রের অতিকায় সব প্রাণীরা। সব ধেয়ে আসছে। কে বলবে মধ্যরাতে জাহাজটা ঝড়ে তার সব সামর্থ্য হারিয়েছে। মধ্যরাতে সমুদ্র শেষবারের মতো তাদের পঙ্গু করে দিয়ে গেছে। সমুদ্রের শান্ত জলরাশি দেখলে এখন বিশ্বাস করা যায় না তার কোনো দুঃখ অথবা ক্রোধ আছে। বরং দুরন্ত বালিকার মতো ভারী মিষ্টি হাসি হাসছে। ছোট ছোট ঢেউ-এর ভেতর এমন সব সমুদ্রের দুরন্তপানা এবং উজ্জ্বল রোদ নীলাভ জলে বর্ষার ফড়িঙের মতো উড়ে বেড়াচ্ছে।

    .

    তখন কাপ্তান-বয় বলল, আপনি জানেন না সাব!

    —না তো!

    —ওপরে থাকেন শুনতে পাননি!

    বনি বলল, সত্যি ভাবতে পারিনি। ছোটবাবু এমন করবে আমি কি করে ভাবব। সে তাড়াতাড়ি প্রায় সবটা কফি একবারে গিলে ফেলার মতো খেয়ে ফেলল। পায়ে স্লিপার গলিয়ে সে ছুটে নেমে গেল। কেবিনে গোপনে লুকিয়ে আয়নায় মুখ দেখে বুঝেছিল কিছু নখের আঁচড় ওর মুখে স্পষ্ট। বাইরে বের হতে সংকোচ ছিল তার। এখন সে সব ভুলে নিচে নেমে গেল। এনজিন-সারেঙ দাঁড়িয়ে আছেন। সে তখনও কত কথা বলে যাচ্ছিল। একটা কথা বুঝতে পারছে না বনি। বনি ফিফিস্ গলায় ডাকল, সারেঙ! সারেঙ-সাব কাছে গেলে বলল, ও কি বলছে?

    —তা তো জানি না সাব। কি বলছে জানি না তো! মাইজলা মালোম ডেবিড বলল, ছেলে হাউ হাউ করে কাঁদছে। কোথায় কাঁদছে! আমি তো এসে দেখছি ভেতরটাতে কেউ রা করছে না। কখন কাঁদল! কত ডেকেছি, বলছে কেবল, আপনি যান চাচা আমার কিছু হয়নি। কিছু হয়নি তো দরজা বন্ধ করে আছিস কেন! দরজা খোল। দেখি ভয়ে চোখমুখের কি অবস্থা! আরে বাপু নসিব তো পালটাতে পারবি না। বার বার বলেছিলাম সাব, ছেলে ভেবে দেখ যাবি কিনা! ভাঙা জাহাজ, পুরোনো, কত দুৰ্ঘটনা ঘটতে পারে—কথা শুনল না। জেদ। জেদ ধরে চলে এল জাহাজে। আর আমার কি দুর্মতি হল সাব, যদি না নিয়ে আসতাম ঘরের ছেলে ঘরে থাকত আমাকে কলঙ্কের ভাগী হতে হত না।

    এসব কথা ছোটবাবু শুনছিল ভেতর থেকে। ওর চোখে জল চলে আসছে। চাচা কার সঙ্গে এতসব কথা বলছে। বরং জ্বালা এই যেমন সে ভেবেছিল তার পরিবারের আশ্চর্য এক পরিমণ্ডলের ভেতর সে মানুষ। তার বাবা মা, পাগল জ্যাঠামশাই, ঈশম অথবা ফতিমা এবং দুর্গাপূজার সময় অমলা কমলা অথবা সেই যে বনের ভেতর কখনও হারিয়ে যাওয়া, পাগল জ্যাঠামশাইকে খুঁজতে গিয়ে কখনও সোনালী বালির নদীর চরে, কখনও হাতীতে চড়ে সে আর জ্যাঠামশাই, পৃথিবী আর আকাশ তখন কত বড় হয়ে যেত তার কাছে। কিংবা সেই অর্জুন গাছে সে যে লিখে রেখেছিল জ্যাঠামশাই আমরা হিন্দুস্থানে চলিয়া গিয়াছি। তার নিরুদ্দিষ্ট জ্যাঠামশাইর জন্য সে অর্জুন গাছে একটা বার্তা রেখে এসেছিল —সব অধিকার থেকে সহসা মনে হয়েছিল সে বঞ্চিত। একজন হত্যাকারী মানুষের জন্য যেন ওরা আর তার নয়। ছোটবাবু ভারী অসহায় বোধ করেছিল। সে কেঁদেছিল। আর যা হয় ভেতরে সেই দাহ—বনি যেন তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বলছে—ছোটবাবু তুমি খুনী আসামী। তোমার আর কোনো পরিচয় নেই।

    সারেঙ-সাব তখনও অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। দেখুন সাব আপনি যদি পারেন। আপনাকে তো ভয় পায়। আমাকে তো আর ভয় পায় না। আমাকে মানবেই বা কেন। কত বললাম ছেলে ঘাবড়ে যাবি না। আল্লা মুবারক। ওর ওপরে তো কিছু নাইরে। তাই বলে ভয়ে মাথা খারাপ করে ফেললি! লোকে হাসাহাসি করবে না! লোকে হাসাহাসি করলে আমার সম্মান থাকে কোথায়! তুই তো কিছু বুঝলি না ছেলে, সবাই মুখে রক্ত তুলে খাটছে তুই এখন বসে থাকতে পারছিস ছেলে!

    ছোটবাবু আর পারছে না। সে বসেছিল দু’হাতে মুখ ঢেকে। এত কথা কার সঙ্গে বলছে চাচা! সে হঠাৎ টেনে দরজা খুলে বলল, কি হয়েছে আপনার কেবল সেই থেকে ঘ্যান ঘ্যান করছেন! সারেঙ- সাব বিন্দুমাত্র বিচলিত বোধ করলেন না। সরল হাসি মুখে ফুটে উঠল। বললেন, ছোটসাব পর্যন্ত এসে গেছে। তুই চল ছেলে, ডেকে চল। সবার সঙ্গে থাকলে মন ভাল থাকবে। আমার সোনা, লক্ষ্মী মানিক চল। সঙ্গে সঙ্গে ছোটবাবুর ফের বুক বেয়ে কান্না উথলে উঠল। সে সোনা ছিল, জাহাজে ছোটবাবু হয়ে গেল। এখন সে ম্যান হয়ে গেছে। সারেঙ-সাব পাশে দাঁড়িয়ে তখন বলছেন, ছেলে তোর কি হয়েছে? এভাবে ছেলে-মানুষের মতো কাঁদছিস কেন? আমরা সবাই দেখবি বাড়ি ফিরে যেতে পারব। ছেলে আল্লার কাছে আমার এত গুণাহ জমা নেই, সমুদ্রে তোকে আমার হারাতে হবে।

    ছোটবাবু বলল আপনি যান চাচা আমি যাচ্ছি। ছোটবাবু বনির দিকে তাকাল না। ছোটবাবু ফের বলল, আপনি ভাববেন না চাচা। আমার কিছু হয়েছে ভাববেন না। বাড়ির কথা মনে পড়ে গেছিল। কেন যে মাথাটা গোলমাল হয়ে গেল বুঝলাম না। সারেঙ-সাব পিছিলে চলে গেলে ছোটবাবু খুব শক্ত হতে চাইল ভেতরে। সে বনির দিকে তাকাল না পর্যন্ত। বনি পাশে বালকেডে হেলান দিয়ে আছে। সে ছোটবাবুর দিকে মাঝে মাঝে চোখ তুলে তাকাচ্ছে। ছোটবাবুর পিঠ ঘাড় লম্বা চুল দেখতে পাচ্ছে। আর কিছু না। একবারও তাকে মুখ ঘুরিয়ে দেখছে না ছোটবাবু। সে ভাবল, ডাকবে, ছোটবাবু তোমার কি হয়েছে! কিন্তু ছোট আবার বেশি সাহসী, ছোটবাবু যেন এক্ষুনি দরজা লক করে ডেকে বের হয়ে যাবে। যারা ড্রামে কয়লার বড় বড় উনুন তৈরি করছে, যারা কাঠের ঠেকা তৈরি করছে এবং যারা এখন প্রায় আস্ত গরু অথবা ষাঁড়ের শুয়োরের হতে পারে ভেতরে লোহার শিক ঢুকিয়ে প্রাচীন বন্য মানুষের মতো ডেকে আগুন জ্বেলে ভেড়া গরু হাঁস মুরগী রোস্ট করার ব্যবস্থা করছে, অর্থাৎ এখন সব মাংস পুড়িয়ে গুদামজাত করে রাখা, কতদিন এ-জাহাজ নিখোঁজ হয়ে থাকবে কেউ জানে না।—ছোটবাবুও জানে না, ছোটবাবু যাচ্ছে সে-সবে হাত লাগাতে। সকালে সে একটা সিন ক্রিয়েট করেছিল ভাবতেই সে আর যেন সঙ্কোচে পায়ে জোর পেল না।

    ছোটবাবু চলে যাচ্ছিল ভেতরে। বনি ছোটবাবুর হাতে হাত বাড়িয়ে দিল। ছোটবাবু তাকাচ্ছে না। ছোটবাবু এক পা ভেতরে রেখেছে, আর এক পা বাইরে। বনি ওর ডান হাত ছুঁয়ে রেখেছে। কিছুতেই হাতটা আর টেনে নিতে পারল না। সে কেমন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। বনি হাত ছেড়ে না দিলে ক্ষমতা নেই সে এখন কেবিনের ভেতর ঢুকে যায়। এত সে দুর্বল হয়ে যায় কি করে! কোথায় সেই আশ্চর্য রহস্যময়তা। ডেকে ভীষণ মাংসপোড়া গন্ধ উঠছে। ডেকে আগুনের ভেতর সব শিকে গেঁথে মাংস পোড়ানো হচ্ছে। গরু শুয়োর ভেড়া হাঁস মুরগী। পাঁচটা লোহার পিপের ভেতর আগুন জ্বলছে আর লোহার শিকে গোঁজা প্রায় আস্ত ঠ্যাং শিক-কাবাবের মতো রোস্ট হচ্ছে সব। আর তখন ছোট-বাবুর হাত সামান্য ছুয়ে আছে বনি। কি আশ্চর্য অধিকার। কিছু বলছে না। কোনো কথা বলছে না। কোনো আবদার অথবা অভিমান নেই। তুমি যেখানে আছ ছোটবাবু আমিও সেখানে আছি। যা কিছু পাপ সব আমার তোমার। তুমি একা কেঁদে পাপ থেকে রেহাই চাইবে সে হবে না ছোটবাবু। আমরা দু’জনে মিলে সব পাপের অধিকার বহন করব। সামান্য হাত ছুঁয়ে রেখে রনি এতবড় কথা বলে ফেললে ছোটবাবু এই প্রথম বনিকে টেনে ভেতরে নিয়ে প্রথম বুকে জড়িয়ে নিল। বলল, বনি মাই লিটল্ বনি। মাই ডার্লিং। আলিঙ্গনে অলিঙ্গনে একেবারে পাগল করে দিল। চুমো খেতে খেতে কোথায় কিভাবে যে জীবনের সব আকাঙ্খা ফুটে ওঠে ছোটবাবু জানে না।

    সহসা বনি চিৎকার করে উঠল, ছোটবাবু প্লিজ দরজাটা বন্ধ করে দাও।

    ছোটবাবু অবাক। দরজা খোলা ছিল। সে তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে যেই না ফিরে এল একেবারে আলাদা মানুষ। কেমন এক বিস্ময় অথবা বলা যেতে পারে সংকোচ—সে এটা কি করতে যাচ্ছিল! বনি তো তার কেউ নয়। সে আর্চির মতো কি সব করতে যাচ্ছিল! অমানুষ হয়ে গেলে তার আর অহঙ্কার বলতে কিছু থাকে না। সে বনির পাশে চুপচাপ বসে পড়ে বলল, বনি সত্যি আমার মাথার ঠিক নেই। তুমি রাগ কর না। তারপর সে বের হয়ে গেল। বনির সমস্ত চোখে উদগত অশ্রু। ছোটবাবু তুমি আমাকে কতভাবে অপমান করবে। তুমি আমাকে ছোটবাবু কি ভাবো…। আমার কি কোনো দাম নেই। আমি এতই খারাপ…?

    ছোটবাবু বাইরে এসে অবাক। ওকে আসতে দেখে জব্বার লাফিয়ে প্রায় চলে আসছে। সারেঙ- সাব আসছে। বন্ধু এবং কেউ কেউ যাদের কাজ এখন আগুনে মাংস ঝলসে ফেলা এবং যারা হাতে ধারালো ছুরি রেখেছে, যখন তখন খুশিমাফিক ঝলসানো মাংস সামান্য কেটে মুখে ফেলে দিচ্ছে, সব ফেলে তারা চলে আসছে। বেশ একটা নতুন পরিবেশ জাহাজে। এবং সিউল ব্যাংক স্থির। সব রেশন জাহাজের সীজ করে ফেলেছে কাপ্তান। ক্রুদের জন্যে সামান্য রসদ বের করে দেওয়া হয়েছে। এই যে সব মাংস ঝলসে রাখা হচ্ছে, কারণ এভাবে মাংস ঝলসে না রাখলে বিকেল থেকেই জাহাজে দুর্গন্ধে টেকা যাবে না। দু- চারদিন সবাইকে কেবল মাংস খেয়ে থাকতে হবে পুরোপুরি। ভাণ্ডারীরা বড় বড় ডেকচিতে যতটা পারছে মাংস খণ্ড খণ্ড করে সেদ্ধ করছে। আর যা হয় ঐ প্রলোভনে পড়ে সমুদ্রের সব বড় বড় হাঙ্গর কি যে অতিকায় তারা জাহাজের চারপাশে জড়ো হয়েছে, সমুদ্রের অতলে নেমে যাচ্ছে, আবার মুখ ভাসিয়ে রেখেছে। ভারি মনোরম গন্ধ। কেউ কেউ জলে বড় বড় কাঠের বাড়ি মারছে হাঙ্গরের মাথায়। চারপাশের সমুদ্রে বীভৎস দৃশ্য। সব ঝাক বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নীল রঙের পিঠ সাদা রংয়ের পেট। খুশীতে মাঝে মাঝে উল্টে গেলে অতিকায় সব মাছের চর্বির থলে দেখা যাচ্ছে পর্যন্ত। এবং ধারাল দাঁতের ঝিলিক দেখলে প্রাণে আর বিন্দুমাত্র সাহস থাকে না। জাহাজটাকে মনে হচ্ছে সেই হাজার বছর আগের পালতোলা জাহাজের মতো। কেবল সারা আকাশময় এখন ধুম উদগীরণ হচ্ছে প্রবলভাবে। আগুন জ্বলছে লেলিহান জিহ্বায়। তার ভেতরে সব মাংস ঝলসে তুলে নেওয়া হচ্ছে। এভাবে মাংস প্রথমে গুদামজাত করে রাখা, দরকার মতো রোদে শুকিয়ে রাখা, তেলে চর্বিতে ভেজে রাখা, অন্য সব খাবার যা আশু নষ্ট হয়ে যাবার কথা যেমন বাঁধাকপি, ফুলকপি, কাল থেকে ডেকে বাঁধাকপি ফুলকপি কেটে কেটে ত্রিপলে ছড়িয়ে দেওয়া হবে, সব শুকিয়ে যা কিছু খাবার আছে এখন কেবল গুদামজাত করে রাখা। স্যালি হিগিনসের বোধহয় মনে হয়েছে জাহাজে বেঁচে থাকতে হলে এটাই প্রাথমিক প্রচেষ্টা। তিনি ঘুরে ঘুরে দেখছেন। কেউ আবার সহজেই ঝলসানো মাংস সরিয়ে ফেলতে পারে এজন্য স্টুয়ার্ড যা যা দিচ্ছে আবার তা সঠিক ফেরত আসছে কিনা দেখে নিচ্ছে। কেউ কেউ যে চুরি করে এক দু’খণ্ড মাংস আলগা করে মুখে ফেলে দিচ্ছে—এরই মধ্যে দুটো একটা ঝলসানো ঠ্যাং অথবা মাংসপিণ্ড দেখে সে ঠিক ধরে ফেলেছে। এবং রিপোর্ট করলে স্যালি হিগিনস বলেছেন, কিছু খেতে দাও। একেবারে খেতে না দিলে চলবে কেন।

    ছোটবাবুর কাছে প্রায় অশ্বমেধ যজ্ঞের মতো ঘটনা। ফরোয়ার্ড ডেকে আছে চিফ-মেট, দু’জন ডেক- জাহাজি, তিনজন ফায়ারম্যান একজন কোল-বয়। চিফ-মেটের অধীনে দু’টো উনুন, ফোরমাস্টের দু’পাশে। তিন-নম্বর মিস্ত্রি কয়লা বাকেটে তুলে যোগান ঠিক রাখছে। বাংকারে আছে ছোট-টিণ্ডাল। দু’জন কোল- বয়। এবং উইণ্ড-সেলের নিচে একজন উইনচ চালিয়ে কয়লা বাংকার থেকে তুলে আনছে। যেখানে যত কয়লা লাগবে তার তদারকের ভার তিন-নম্বর মিস্ত্রির। ছোটবাবুর মনে হয়েছিল—যখন জাহাজ সমুদ্রে স্থির ভাসমান, সূর্যের মতো গনগনে আগুনে আকাশ দীপ্তিময় তখন শুধু খাওয়া আর বসে থাকা জাহাজে। দূরবীনে চোখ রাখা। আশ্চর্য সে-সবের কিছু নেই। কেউ দেখছে না কেন, কোথাও জাহাজ কিংবা দ্বীপটিপ যদি দূরে দেখা যায়। আর সে উল্টে দেখছে জাহাজের যা কিছু খাবার সব নিচ থেকে তুলে ডাইনিং হলে পাশের খালি কেবিনটায় সাজিয়ে রাখা হচ্ছে। কার্পেন্টার জলের পরিমাণ কত দেখছে। কেউ একদণ্ড দাঁড়াতে পারছে না। অমানুষের মতো সবার চোখমুখে। জব্বার মেন মাস্টের নিচে আছে। এখানে দেখাশোনা করছে ডেবিড। সে ঠিক ঠিক লোহার রডটা ঘুরিয়ে দিচ্ছে মাঝে মাঝে ঠ্যাং অথবা হৃৎপিণ্ড কলজে এবং যা কিছু সব ঝুলছে আগুনের ওপর টিপে টিপে দেখছে। চর্বিপোড়া গন্ধে টেকা যাচ্ছে না। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছে সবার। গরমে সবাই ঘামছে। চোখ লাল। কোমরে ফেটি বেঁধে নিয়েছে কেউ। মাথায় ফেটি। সবাই শ্মশানযাত্রীর মতো। যেন উল্টে-পাল্টে দিচ্ছে হাত-পা শরীর। ছোটবাবুর মাথা গুলিয়ে উঠল।

    —হেই ওখানে কেন? এস। হাত লাগাও।

    ছোটবাবু কোনো রকমে বলল, যাচ্ছি।

    এবং সে নেমেই জোরে একটা লোহার রড ঘুরিয়ে দিল। বোধ হয় চর্বির ভাগ বেশী, একটা বড় সাইজের ভেড়া প্রায় হাত-পা তার এখন লাল, ঘন সাদা আবার ফিনকি দিয়ে বের হচ্ছে যাবতীয় জমে থাকা বরফের রক্ত কণিকা, সব শুকিয়ে কাঠ কাঠ মাংস দিন মাস গেলে চিবিয়ে জীবনধারণ করতে হবে—সে কেমন সাহসী হয়ে গেল। একটা প্রেরণার মতো কাজ করছে বুড়ো মানুষটা। একবার খবরও নিচ্ছে না তার জাতক এ-জাহাজেই আছে, কোথায় কি করে বেড়াচ্ছে একবার দেখছে না। সে বলল, ডেবিড তুমি বরং ঠাণ্ডায় গিয়ে বস। ডেবিড নড়ছে না। রোদে ডেক তেতে আছে এবং সঙ্গে এই আগুনের উত্তাপ প্রায় ফার্নেসে ঢুকে যাবার মতো। ডেবিড ছুরি দিয়ে সামান্য মাংস কেটে দিল, দেখ তো জিভে দিয়ে ঠিক মতো রোস্ট হয়েছে কিনা?

    ছোটবাবুর বেশ খিদে পেয়েছে। ডাইনিং হলে আজও হয় তো নিয়মমাফিক খাওয়া হবে। বয়বাবুর্চিরা বড় বেশী এদিকে আসছে না, তবু সে একটু খেয়ে বলল, ঠিক বুঝতে পারছি না। তুমি দ্যাখো।

    ডেবিড মাঝে মাঝে ছিঁড়ে খেয়েছে। খেতে ক’টা হবে অফিসারদের কেউ জানে না। এবং জাহাজে কখন খাবার সময় পার হয়ে গেছে—কারো বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। খাওয়া দাওয়ার কথা কারো মাথায় থাকছে না।

    থার্ড-মেটকে নিয়ে তিনি ঘুরছেন জাহাজে। ডেবিডের ওখানে ছোটবাবুকে দেখে বললেন, ছোটবাবু তোমার জীবনটা খুব দামী না হে। আর এতগুলো জীবনের কোনো দাম নেই। ছোটবাবু সঙ্কোচে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকল। সে কি করে বলবে, স্যার আমাকে তেমন ছোট ভাববেন না। কিন্তু সে তো বলতে পারে না। সে তো বলতে পারে না, স্যার আর্চিকে আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে মেরেছি। বিশ্বাস করুন স্যার আর্চিকে সামান্য ইঁদুরের মতো মনে হয়েছিল। মুখ বালিশে চেপে ধরার সময় মনে হয়েছিল সামান্য একটা জীব। ওকে সমুদ্রে ছুড়ে দেবার সময় মনে হয়েছিল বনি আর কোন অশুভ প্রভাবে পড়ে যাবে না। এত বড় একটা পাপ কাজের জন্য বিশ্বাস করুন আমার এতটুকু অনুশোচনা হয় নি। তখন হিগিনস বললেন, দাঁড়িয়ে থাকবে না। নিচে যাও। চার-নম্বরের কাছ থেকে কাজ বুঝে নাও গে।

    সে যখন এনজিন-রুমে নেমে এল, অবাক, এত বড় এনজিনটা কিভাবে হাঁটু মুড়ে পড়ে আছে! সব এলোপাথাড়ি। কনডেনসার, সার্কুলেটিং পাম্প সব গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে। বয়লারের গেজ, ফিল্টার বকস্ কোথায় সব ছিটকে বের হয়ে গেছে। এভাপরেটারটা শুধু অক্ষত আছে। সিঁড়ি সব ঝুলে আছে। খুব সন্তর্পণে নিচে নেমে আসতে হয়েছে। তেলের ড্রাম গড়িয়ে ওপরে তোলা হচ্ছে। সে ডাকল! এই এনজিন-কশপ চার নম্বর কোথায়?

    আর্চি চলে যাওয়ায় এনজিন-কশপ খুব দমে গেছে। সে বলল, বয়লার-রুমে। টব কেটে সব লম্ফ বানাচ্ছে।

    ছোটবাবুকে দেখে চার-নম্বর বলল, তুমি টবগুলো গোল করে কেটে ফেল। দু’টো টব ক্রোজনেস্টে বসিয়ে দিতে হবে। লম্ফের মতো জ্বলবে। যেন দূর থেকে রাতে কোনো জাহাজ সমুদ্রে আমাদের দেখতে পায়। লম্ফ দু’টো মাস্তুলে সারা রাত জ্বলবে। বাংকারে দু’টো লম্ফ আছে আর সারেঙের ঘরে একটা, কশপের কাছে গোটা তিনেক আছে। বুড়োর সব তাতেই তাড়াহুড়ো। বিকেলের ভেতর সব ওপরে তুলে নিয়ে যেতে হবে। এবং ছোটবাবু সামান্য ঘুরে গেলে বলল, ওদিকে যাবে না। সব আম্মা হয়ে গেছে। মাথায় পড়তে কতক্ষণ?

    —কিভাবে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে!

    —তাই। চার-নম্বর মাথায় সামান্য ফাইলটা ঘসে নিল অর্থাৎ সামান্য তেল লাগিয়ে নেবার মতো সব ভুলে সে ফের ফাইল করছে। কেমন বিড় বিড় করে বলল, জাহাজে সত্যি কিছু একটা অশুভ প্রভাব ছিল ছোটবাবু, যাবার সময় সব নিয়ে চলে গেল জাহাজের। বলেই সে ক্রস টানল। মুখ থম থম করছে চার-নম্বরের। সে বোধ হয় কেঁদে ফেলবে। অথবা নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে মানুষের যে অবস্থা হয় একজন ছন্নছাড়া মানুষের মতো মুখ চোখ—চার-নম্বর ঠিক তেমন হয়ে গেছে! হুঁসের মাথায় সে কাজ করছে না। সে মাঝে মাঝে বলছে, আমরা সবাই মরে যাব ছোটবাবু। আমরা কেউ বাঁচব না। মিরাল কিছু না ঘটে গেলে আমরা কেউ বাঁচতে পারি না।

    ছোটবাবু কিছু বলল না। যত ভাবনা বনিকে নিয়ে। সে বুঝতেই পারে না বার বার তার চোখের সামনে কোনো হতাশা ফুটে উঠলে কেন দেখতে পায় বনি কাতর চোখে তাকিয়ে আছে। একটা নিমজ্জমান জাহাজে সে আছে। দেশের কত রকমের ছোট-বড় ছবি, যেমন অনায়াসে সে যে স্বপ্ন দেখেছিল মাথায় এংকারের টুপি সাদা নেভির পোশাক পরে সে ফিরে গেছে বাড়িতে, বাবা-মা রাতে দরজা খুলে লণ্ঠনের আলোতে একজন অপরিচিত সাহেব-সুবো মানুষ দেখে অবাক কে আপনি কাকে চান, তখন সে যেমন ভেবেছিল মা আমাকে তুমি চিনতে পারছ না, আমি সোনা। আমি তোমার মেজ ছেলে সোনা। তোমার নিখোঁজ সন্তান। আমি এত বদলে গেছি! মুখ দেখেও আমাকে চিনতে পারছ না? ছোট ছোট ভাই-বোনের মুখ, ওরা শীতের ভিতর কুঁকড়ে বসে আছে, সে তার দামী কম্বল দিয়ে ভেবেছিল, সংসারের সব শীত নিবারণ করবে, কিছুই আর বুঝি হয়ে উঠছে না—অথচ এখন কোনো তার দুঃখও নেই—কেবল বনির কথা ভাবলে হাহাকার করে ওঠে যেন বুকটা। সে বলল, বুড়ো মানুষটা যখন আছে তখন কোনও ভয় নেই।

    চার-নম্বর রোগা মতো মানুষ। ভীষণ কর্তব্যপরায়ণ। সে দেখেছে জাহাজে মানুষটা নিঃশব্দে কাজ করে গেছে। বন্দর এলে সে কাজের পর শুধু মাতাল হয়ে পড়ে থাকত। আর আশ্চর্য সে দেখে ভাবত সকালে চার-নম্বর অসুস্থ থাকবে, ডিউটিতে আসবে না, কিন্তু সেই মানুষ সকালে সরল সোজা আর কি তাজা শিস্ দিতে দিতে নেমে আসত নিচে যেন সে রাতে মাতাল না হলে গভীর ঘুমে ডুবে যেতে পারত না। গভীর ঘুম না হলে সে অসুস্থ হয়ে পড়ত। সেই মানুষটা পর্যন্ত ঘাবড়ে গেছে।

    ছোটবাবু এত দিনে এই প্রথম বলল, কে আছে দেশে?

    —দেশে আছে ছোটবাবু, সবার যা থাকে আমার তাই আছে। ছোট দু’টো বাচ্চা ফুটফুটে মেয়ে। বড়টা হাঁটতে পারে, ছোটটা মায়ের কোলে থেকে আমায় আদর জানিয়েছে। ভেবেছিলাম দেশে গিয়ে দেখব ছোটটাও হাঁটতে শিখে গেছে। ওদের দু’জনকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় যাব ভেবেছিলাম। বড় মেয়েটার খুব শখ হাতী বাঘ দেখার। কিছু বোধ হয় আর হয়ে উঠবে না। তাছাড়া যেন বলতে চাইল দু-চার দিনের ভেতরই সর্বত্র খবর ছড়িয়ে যাবে—সিউল-ব্যাংক জাহাজের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। একেবারে মাঝ-দরিয়ায় চুপ মেরে গেছে। তারপর যা হয়, পত্রিকায় ফলাও খবর জাহাজিদের ছবি ছেপে খবর, শেষে সব খবর কেমন মানুষের অগোচরে চলে যায়। আমাদের কথা ছোটবাবু কেউ আর মনে রাখবে না। ঘণ্টায় ঘণ্টায় যে জাহাজটা খবর পাঠিয়েছে ঝড়ের, সেই এখন অকুলে ভাসছে।

    ছোটবাবু বলল, আমরা একটা এস-ও-এস পর্যন্ত পাঠাতে পারলাম না।

    চার-নম্বর সতর্ক গলায় বলল, বুড়ো মানুষটার কোনো আপশোষ আছে সেজন্য। কেমন মজা পেয়ে গেছে। অন্য কাপ্তান হলে মার্কনি সাবের গলা টিপে ধরত। কোনো এস-ও-এস না পাঠিয়ে কেন স্টেশন লিভ করলে। কৈফিয়ত তলব করত। তারপর একটু থেমে বলল, কিচ্ছু করল না। বুঝলে,সব শয়তানটা জানত।

    —জানত মানে?

    —জানত না! না জানলে এত স্বাভাবিক কেউ থাকে? যেন মজা পেয়ে গেছে! জাহাজটা এখন আর কেউ স্ক্র্যাপ করতে পারছে না, জাহাজ নিয়ে সারা জীবন সমুদ্রে ভেসে বেড়াতে পারবে।

    ছোটবাবু বলল, ওর ছেলে জাহাজে আছে।

    —আরে ওকি মানুষ আছে? ও তো সারা জীবন জাহাজ চালিয়ে চালিয়ে একটা অদ্ভুত জীব হয়ে গেছে। সিউল-ব্যাংক ছাড়া মাথায় তার আর কেউ নেই।

    ছোটবাবু এ-নিয়ে কথা বলল না। আসলে মাথায় সবার এখন রক্ত উঠে যাচ্ছে। এবং এটা স্বাভাবিক। যত দিন যাবে ওটা বাড়বে। কাপ্তান তখন আর সত্যি মানুষ থাকবেন না। তিনি একটা আস্ত শয়তান হয়ে যাবেন সবার চোখে। আর যা মনে হল, যত দিন যাবে তত এই সব মানুষেরা ক্রমে অমানুষ হয়ে উঠবে। দুর্ঘটনা ঘটে যাবার মুখে কেউ বুঝতেই পারেনি কি ভয়াবহ এই ভাসমান জাহাজে বেঁচে থাকা। দিন যাবে আর ক্রমে টের পাবে খাবার যত ফুরিয়ে আসবে তত টের পাবে, জল যত কমে আসবে টের পাবে। এখনও যে জাহাজে সবাই মুখ বুজে কাজ করে যাচ্ছে সে কেবল তীরের আশায়। কোনো মিরাকলের আশায়।

    ঠিক সন্ধ্যার সময় দু’টো মাস্তুলের ক্রোজ-নেস্টে লম্ফ জ্বালিয়ে দেওয়া হল। বেশ বড় টবের মুখে হাসিল পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাসিল সলতের মতো কাজ করছে। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলে যেন মশালের মতো আকাশে লম্ফ দু’টো জ্বলতে থাকল। টর্চ সহজে কেউ ব্যবহার করবে না। সব টর্চ এখন কাপ্তানের জিম্মায়। চীফ-মেট সব বোট থেকে টেনে নামিয়েছে। সিগন্যালিং লাইট, থ্রি শর্ট থ্রি লঙ, আলোর সিগন্যালিংয়ে দূরবর্তী উপকূলে অথবা জেলে-জাহাজে কিংবা কোনো কার্গো-শিপ যদি যায় তবে বুঝতে পারবে এস-ও-এস আসছে জাহাজ থেকে। যারা সারা দিনমান মাংস ঝলসে গুদামজাত করেছে তারা এখনও কাজ করছে। সব রোস্ট করতে বেশ সময় লেগে যাচ্ছে। আধপোড়া হলেও যেন ক্ষতি নেই। দরকার মতো কাল আবার ঠিকমত ঝলসে নেয়া যাবে। এবং রাতে সেই গোল অগ্নিকুণ্ডের ভেতর মানুষের মুখ লাল আভায় ডুবে থাকল। স্যালি হিগিনস বুঝতে পারছেন জাহাজটা এখন এক দল ক্ষুধার্ত বন্য মানুষের হাতে পড়ে গেছে। অন্ধকার কেবিন থেকে তিনি সব দেখছেন। পোর্ট-হোল খোলা রেখে চারপাশে যা কিছু আছে প্রত্যেকটা পোর্ট-হোলে গিয়ে দাঁড়ালেই দেখতে পাচ্ছেন। দলে দলে এই সব বন্য মানুষেরা ভাগ হয়ে এখন আগুনের ওপর উপুড় হয়ে পড়েছে। মনে হল সেই আগুনের ভেতর জামা খুলে ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছে কেউ। স্যালি হিগিনস এত ওপর থেকে ঠিক বুঝতে পারছেন না। কে সে? সবাই আগুনের চারপাশে হল্লা করছে। আর লোকটাকে চ্যাংদোলা করে ধরে আনছে। ওর প্যান্ট খুলে আগুনে পুড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। এই বন্য ইচ্ছে কোনো রকমে বেড়ে গেলে ওরা লোকটাকে আগুনে ফেলে দিয়েও তামাশা দেখতে পারে। তিনি আর বিন্দুমাত্র দেরি করলেন না। তিনি বোট-ডেকে বয়-কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াতেই বিরাট এক পুরুষের মতো মুখ এবং চার-পাঁচ দিন দাড়ি না কামানোর জন্য সাদা দাড়ি ক্রমে বেড়ে যাচ্ছিল এবং তিনি সেই বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলেন—হাই। সঙ্গে সঙ্গে লোকটিকে ছেড়ে দেওয়া হল। লোকটি একেবারে উলঙ্গ। সে পিছনের দিকে ছুটছে। বন্য লোকগুলো আর হাতে তালি বাজাতে পারল না। আগুনের আভায় তিনি প্রায় যেন জ্বলে উঠলেন। তাড়াতাড়ি ডেবিড লোহার রডে একটা নরম পাছার মাংস গেঁথে আবার দু’টো কাঠের ফাঁকে ঝুলিয়ে দিল। স্যালি হিগিনসের সেই কঠিন চেহারার সামনে আর একটুও বেয়াদপি করার ক্ষমতা তার নেই। সে বিনীত ভদ্র ভাল মানুষ হয়ে গেল। এবং বুঝতে পারছে এক্ষুনি ডেকে পাঠাবে তাকে। কারণ তিনি ফিরে যাচ্ছেন অন্ধকারে। বোট-ডেকের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছেন। সে ভয়ে আর একবার ফিরে তাকাতে পর্যন্ত পারল না। চোখ মুখে কয়লার ধোঁয়া এবং কালিতে ছোপ ছোপ দাগ, এবং মুখে হাতে পায়ে মনে হয় সে কত দিন যেন স্নান না করে আছে। সমুদ্রে ভয়ংকর ঝড় ছিল বলে এতদিন কেউ দাড়ি কামাবার সুযোগ পায় নি। ফলে সবার খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ডেবিডের থুতনির সামান্য লাল দাড়ির পাশে আগোছালো সেই খোঁচা খোঁচা দাড়ি কেমন তাকে আরও বেশী জংলী করে তুলেছে। বয়স মনে হয় বেড়ে গেছে। ছোট-টিণ্ডালকে নিয়ে এতটা মশকরা না করলেই যেন ভাল ছিল। ওর চারটা বিবি। চার-নম্বর বিবি লিটল গার্ল। বুড়ো বয়সে লিটল গার্ল নিয়ে কি সুখ এবং অদ্ভুত রকমের ঠাট্টা-তামাশা করার স্পৃহা কেন যে জেগে উঠল! সে বলেছিল, লিটিল গার্ল বুড়ো বয়সে সামলাও কি করে?

    বাদশা মিঞা হেসেছিল দাঁত বার করে। যেন খুব মজার কথা। সে দাঁত সোনায় বাঁধিয়েছে বিবির জন্য, দাঁত বের করে হেসেছিল।

    ডেবিড আগুন উসকে দিয়ে বলেছিল, তুমি কি মিঞা বিবিকে দাঁতে কামড়ে সুখ দাও। টিণ্ডাল আবার হেসেছিল। সাহেব তার বিবিকে নিয়ে বেশ তামাশা করছে যা হোক। সেও মজা পেয়ে গেছিল। বলেছিল, তা পাই।

    —তাহলে বাদশা তোমার ওটা নেই

    —আছে।

    —না নেই।

    —আছে সাব।

    —তবে দ্যাখাও।

    —তোবা তোবা। বাদশা দৌড়ে পালাতে চেয়েছিল।

    আর সঙ্গে সঙ্গে সে বলেছিল দু’জন ফায়ারম্যানকে, সে বলেছিল দু’জন গ্রীজারকে, উস্‌কো পাকড়ো। আধা হিন্দী আধা বাংলায় সে যে দু’টো একটা কথা বলতে পারে ওদের মতো সে বলেছিল, পাকড়ো। বোলতা হ্যায় না। এবং সঙ্গে সঙ্গে ওরা চারজন ওকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে এলে কি যে বন্য রসিকতায় সে উন্মাদ হয়ে গেছিল। টেনে জামা প্যান্ট একেবারে খুলে সব আগুনে ছুড়ে ফেলে তাকে উলঙ্গ করে বলেছিল, তোমার কিছু নেই মিঞা। ঝুট বাত বলতা হ্যায়। তুমি নিমকহারাম। অর্থাৎ বোধ হয় অমানুষ অথবা তোমার কিছু নেই শালা, তুমি নপুংসক, কেন লিটল গার্ল ঘরে এনেছ? দেব আগুনে ফেলে। দাঁতে কামড়ে মজা পাও তুমি। আগুনে ফেলে তোমার মজা বের করে দেব। এবং স্যালি হিগিনস পেছনে বোট-ডেকে না দাঁড়ালে তাকে সত্যি আগুনে ফেলে দিত কিনা জানে না।

    তখন বনি ছুটে এসে বলল—তুমি এখন যাও ডেবিড। আমি এখানে আছি।

    ডেবিড বলল, কোথায় যাব।

    —তোমার ছুটি। এবারে তুমি বরং স্নান-টান করে পরিষ্কার হয়ে নাও। বাবা তোমাকে ছেড়ে দিতে বললেন।

    ডেবিড কি করবে বুঝতে পারল না। এমন একটা অমানুষিক খাটুনি জ্যাকের মতো নাবালক পারবে কেন। আগুনের সামনে পাঁচ-দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে। সে বলল–তুমি পারবে না জ্যাক।

    —খুব পারব।

    –একা কিছুতেই পারবে না।

    —এরা তো আছে।

    ডেবিড চলে যাচ্ছিল, তখন দেখল ছোটবাবু নেমে আসছে। মাথায় ফেটি বেঁধে নিয়েছে। সারা রাত ছোটবাবুর মাংস ঝলসে রাখার ডিউটি পড়েছে। আসলে ছোটবাবু করবে। জ্যাক মাঝে মাঝে এটা ওটা এগিয়ে দেবে। এবং ডেবিড চোখ তুলে ওপরে তাকাতেই দেখল অতিকায় দু’টো যেন মশাল জ্বলছে আকাশে। এতক্ষণ সে কিছু খেয়াল করেনি। মশালের প্রতিবিম্ব সমুদ্রে ভাসছে। এবং এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে প্রতিবিম্ব। সে বুঝতে পারল জাহাজ সকালে যেখানে ছিল এখনও ঠিক সেখানেই আছে। এতটুকু ভেসে যাচ্ছে না কোথাও। এবং আগুনের আভায় মশালের আলোতে সে লক্ষ্য করল চারপাশে সব সামুদ্রিক মাছ। বড় হাঙ্গর। অক্টোপাস উঠে এলেও বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। এবং জাহাজটা যে এক সময় সব ধুর্ত মনস্টারদের আড্ডা হয়ে যাবে না কে জানে! সে ঘরে ঢুকেই গলায় আকণ্ঠ মদ ঢেলে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকল। বুক গলা পুড়ে যাচ্ছে। আহা তবু কি আশ্চর্য আরাম। সে দেয়ালে মুখ লেপ্টে দিল।—এবি তুমি এখন কি করছ! সে ছেলেদের নাম ধরে ডাকতে থাকল, তোমরা সবাই কি করছ, কিছু করতে পারছো না। তারপর নেশার ঘোরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল, এবি আমাদের কি হবে। আমরা সবাই মরে যাব।

    স্যালি হিগিনস অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছেন। যারা সারাদিন আগুনের সামনে ছিল তাদের এখন ছুটি। অন্য দল কাজ করছে। এখনও যেন দুর্ঘটনার গুরুত্ব তেমনভাবে কেউ বুঝতে পারেনি। এটা হয়। দুর্ঘটনা ঘটে যাবার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারে না আসলে কতটা তারা বিপন্ন। বুঝতে সময় লেগে যায়। দিন যত যাবে তত সবাই মরিয়া হয়ে উঠবে। আফটার-পিকে এখন একজন জাহাজি চুপচাপ বসে আছে। ওর কাছে রয়েল সিগন্যালিং টর্চ। সে যদি কোনো জাহাজ দেখতে পায়। সে অন্ধকারে এখন ভীষণ সজাগ। দু’ঘণ্টা পর পর ডিউটি পাল্টে যাবে। এবং সকাল হলে তিনি পাহারায় রাখবেন জ্যাককে। জ্যাক, ডেবিড, চিফ-মেট, থার্ড-মেট পালা করে সতর্ক নজর রাখবে চারপাশে। ওরা দূরবীনে যদি কোনো জেলে জাহাজ অথবা কোনো মালবাহী জাহাজ দেখতে পায় দূরে। সবই দুরাশা। তবু যেন বিশ্বাস করতে ভাল লাগে সকাল হলেই দেখতে পাবেন কোনো উদ্ধারকারী জাহাজ সমুদ্রের জল কেটে দ্রুত চলে আসছে। তখন তিনি অনায়াসে সবাইকে নিরাপদে ডাঙায় পৌঁছে দিতে পারবেন।

    এবং তিনি এও জানেন আশা কুহকিনী ছাড়া তাঁদের বেঁচে থাকার আর কিছু অবলম্বন থাকবে না। মশাল দু’টো মাস্তুলে দপ দপ করে জ্বলছে। সামান্য হাওয়া পেলে আলোর শিখা লম্বা হয়ে যাচ্ছে এবং কেন জানি মনে হচ্ছে জাহাজ স্থির অনড়। মাস্তুলে অগ্নিশিখা কাঁপছে। জাহাজটা সেই আলোতে ভারী স্তব্ধ হয়ে আছে। সেই যেন সারা মাস কাল সে পিঠে ক্রস বহন করে চলেছে। যেতে যেতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে। আর উঠতে পারছে না। সমুদ্রের অতল থেকে ভেসে উঠছে সব সামুদ্রিক মাছ। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। জলে মাছের শব্দ। ওরা বোধহয় জলে একটা আজব জীব ভাসতে দেখে অবাক হয়ে গেছে। কেমন ঠাণ্ডা মরা ভুতুড়ে জাহাজ ভুতুড়ে আলো জ্বালিয়ে বেশ স্থির। তবে কি জাহাজ কোনো স্রোতের মুখে পড়ে যায় নি! জল দেখে কিছুই স্থির করা যাচ্ছে না। আকাশের নক্ষত্র দেখে তিনি বুঝতে পারছেন না কিছু। প্রতিদিনের মতো একই নক্ষত্রমালা আকাশে দপদপ করে জ্বলছে। এবং মনে হচ্ছে আকাশের নিচে জাহাজের চারপাশে রয়েছে সেই পাখিটা। ধোঁয়া এবং আগুনের জন্য সে মাস্তুলে এসে বসতে পারছে না। সমুদ্রে ভেসে রয়েছে কোথাও। পাখিটা মাঝে মাঝে কক-কক করে ডাকছে। তার শব্দ ভেসে আসছে। আশ্চর্য পাখিটা সেই যে জাহাজের পেছন নিয়েছে, সেই যে কেবল উড়ছে তো উড়ছেই সমুদ্রে থেকে যাচ্ছে না, জীবনে তিনি কখনও এমন দেখেননি। অ্যালবাট্রস পাখিদের দীর্ঘদিন জাহাজের পেছনে উড়তে দেখেছেন। ডাঙা এলেই তাদের আর দেখা যেত না। আবার হয় তো আর এক জোড়া পাখি। কিন্তু লেডি অ্যালবাট্রস একা নিঃসঙ্গ যেন জাহাজটাতেই আছে তার প্রিয়জন। ছোটবাবুর পোষ মানা পাখিটা খাবারের লোভে বুঝি জাহাজ ছেড়ে যাচ্ছে না। এবং কেন জানি এইসব বিপন্ন মানুষের সঙ্গে স্যালি হিগিনসের মনে হচ্ছে পাখিটাও ভারি বিপন্ন। তারা ডাঙায় ফিরে যেতে না পারলে পাখিটাও ফিরে যেতে পারবে না।

    সকালে চিফ-মেট দুঃখে হাসবে কি কাঁদবে ভেবে পেল না। এখন থেকে জাহাজে সবার দৈনিক রেশন কি পরিমাণে হবে ভাগ-বাঁটোয়ারার সময় প্রত্যেকের নাম এবং নিবাস লিখে রাখার মতো কাপ্তান পাখিটার নাম এবং নিবাস লিখে রাখলেন। সবার খাদ্যের গড়-তালিকা যেমন হওয়া দরকার ঠিক তেমনি পাখিটারও একটা খাদ্যতালিকা প্রস্তুত হয়ে গেল। চিফ-মেট অতি দুঃখে তালিকাটি দেখার সময় না হেসে পারল না।

    স্যালি হিগিনস আড়চোখে চিফ-মেটের মুখ দেখে সামান্য বিরক্ত হলেন। মুখের ওপর তিনি তাকে কিছু বলতে পারলেন না। দূরবীন নিয়ে বোট-ডেকে নেমে গেলেন। তাঁকে সত্যি ভারি দুঃখী এবং অসহায় মনে হচ্ছিল।

    চিফ-মেট সহসা তখন লাফিয়ে নেমে গেল পেছনে। বলল, স্যার দেখেছেন?

    স্যালি হিগিনস মুখ তুলে দেখলেন চিফ-মেটকে। ভীষণ ঝুঁকে আছে। চিফ-মেট ঘামছে।

    —কী হয়েছে?

    —যীশুর মূর্তি দেয়ালে নেই।

    —তুলে রেখেছি। চিফ বললেন, না ওটা ঝড়ের সময় পড়ে ভেঙে গেছে। ওটা শেষ।

  • উনপঞ্চাশ

    উনপঞ্চাশ

    ।। উনপঞ্চাশ।।

    জাহাজ তখন সমুদ্রে ক্রমাগত ভেসে বেড়াচ্ছিল। জ্যোৎস্নার ভেতর জাহাজটাকে আর জাহাজ মনে হচ্ছে না। সত্যি যেন কিংবদন্তীর জাহাজ হয়ে গেছে। অশরীরী আত্মার মতো সে মহাশূন্যে যেন পাড়ি জমিয়েছে।

    —স্যার ওরা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়।

    স্যালি হিগিনস কেবিনের ভেতর চুপচাপ বসেছিলেন। টেবিলের লম্ফটা বাতাসে কখন নিভে গেছে, কখন চিফ-মেট ঘরে ঢুকেছে তিনি টের পাননি। তিনি মুখ না তুলে বললেন, কারা দেখা করতে চায়?

    —সব জাহাজিরা।

    —ওরা দেখা করতে চায়! বল আমি এখন দেখা করতে পারব না। কোয়ার্টার-মাস্টারকে বল লম্ফটা যেন জ্বেলে দিয়ে যায়।

    চিফ-মেট বলল, অবস্থা স্যার ভাল না!

    —অবস্থা ভাল কে বলেছে!

    —ওরা বলছে জাহাজে থাকবে না।

    —থাকবে না কোথায় যাবে?

    —ওরা বোটে নেমে যেতে চাইছে।

    —কতদূর যানে?

    —যতদূর সম্ভব।

    —যতদূর কি দশ-বিশ মাইল কি পঞ্চাশ-একশ- পাঁচশ মাইল! সহসা উত্তেজিত গলায় বললেন—চিফ-মেট লম্ফটা তোমাকে জ্বেলে দিতে বলেছি না!

    চিফ-মেট গলা বের করে ডাকল, কোয়ার্টার মাস্টার। তারপর কেবিনের ভেতর ফের সেই অসহায় অন্ধকার। চোখের ওপর অন্ধকারটা সয়ে গেছিল। বাইরে মুখ বের করতেই সমুদ্রের জ্যোৎস্না ভয়ংকরভাবে চোখের ওপর ঝলমল করে উঠেছিল। এখন কেবিনের ভেতর সে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। কেবল ঘুলঘুলির মতো পোর্ট-হোল দিয়ে সামান্য জ্যোৎস্না নেমে আসছে। আর মনে হচ্ছিল মানুষটা একটা ইজি-চেয়ারে চোখ বুজে পড়ে আছেন। ঠিক লম্ফ না জ্বাললে সে বুঝতে পারবে না। বাইরে সেই ক্রোজ-নেস্টে মশাল জ্বলছে। জাহাজের সামনে পেছনে দু’টো অতিকায় লম্ফ ক্রোজ-নেস্টে ঠিক আগের মতো এবং কোথাও থেকে এতটুকু কোনো গণ্ডগোল ভেসে আসছে না। জাহাজটা সহসা ভারী নিশ্চুপ। সবাই যেন জাহাজ ছেড়ে চলে গেছে।

    কোয়ার্টার-মাস্টার লম্ফ জ্বালিয়ে চলে গেল নিচে। স্যালি হিগিনস এবার চিফ-মেটের দিকে তাকালেন। বললেন—বোটে তোমরা কতদূর যেতে চাও?

    চিফ-মেটের ফ্যাকাশে মুখ আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে বলল, আমি তো স্যার জানি বেশি দূর বোটে যাওয়া যাবে না!

    —যাওয়া যাবে না ঠিক না। যাওয়া যাবে। মোটর-বোট যখন বেশ কিছুদূর যেতে পারবে। তেল ফুরিয়ে গেলে পালে হাওয়া লাগবে। সবই তুমি জান। কিন্তু চিফ-মেট সেটা কতদূর! কতদিনে ডাঙা পাবে যখন কিছুই জানো না অহেতুক জাহাজ থেকে নেমে যাবে কেন?

    চিফ-মেট বলল—স্যার আপনি কিছু টের পাচ্ছেন না।

    কে বলছে টের পাচ্ছি না! সব টের পাই। স্টোররুম থেকে দু’টো কনডেনসড মিল্ক কে চুরি করেছে তাও বলতে পারি। করড্ বিফের প্যাকেট কে নেকড়ায় জড়িয়ে রেখেছে এবং রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে অন্ধকারে বসে খাচ্ছে তা আমি জানি না তো তুমি জানো চিফ-মেট

    চিফ-মেট বলল – কিন্তু স্যার সবাই নিচে জড়ো হয়েছে!

    —নিচে মানে বোট-ডেকে?

    —ইয়েস স্যার।

    —কেন? কেন জড়ো হয়েছে? কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছি না তো।

    —ওরা স্যার বলছে জাহাজে থাকবে না। নেমে যাবে। চুপচাপ নিচে বসে আছে।

    —নেবে যাবে বললেই নেমে যাওয়া যায়! স্যালি হিগিনস এবার উঠে দাঁড়ালেন।—ইউ হেল, গেট-আউট, আই সে গেট-আউট। তোমরা থাকতে আমার কাছে আসে কেন! তোমরা কি করতে আছো জাহাজে!

    চিফ-মেট, ডেবিড এবং ক্রমে রেডিও-অফিসার পর্যন্ত এসে গেল শেষ পর্যন্ত।

    —আপনি একবার বলুন। ওদের সঙ্গে কথা বলুন। আপনি বুঝিয়ে বললে ওরা শুনবে। স্যালি হিগিনস পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে বললেন—তোমরা কিছু শুনবে না ডেবিড। তোমরা সব আগেই ঠিক করে নিয়েছ।

    ধরা পড়ে গিয়ে আর মুখ থাকে না। তখন প্রায় ক্ষেপে যাবার মতো ডেবিড অনর্গল বলে যেতে থাকল—না স্যার, বুঝতে পারছেন এভাবে দিনের পর দিন আমরা ভাসতে ভাসতে কোথায় যাচ্ছি! কেবল জল কেবল আকাশ, কেবল জল কেবল আকাশ! কেবল দিগন্ত একই দূরত্ব। যেদিকে তাকাই স্যার সমুদ্র ঠিক একভাবে আমাদের ঘিরে রেখেছে। আমরা স্যার পাগল হয়ে যায়নি এ স্যার আপনার বাবার ভাগ্য। তারপর সে একসকিউজ মি বলে জিভে কামড় দিল এবং রসিকতা পুরো মাত্রায় বিন্দুমাত্র ভয়ডর নেই, সে যে এখন থেকেই জিভ ঝালিয়ে নিচ্ছে বোঝাই যাচ্ছিল। কারণ প্রথমেই তো আর বেজন্মার বাচ্চা বলে আরম্ভ করা যায় না। বাবার ভাগ্য দিয়ে আরম্ভ বেজন্মার বাচ্চা বলে শেষ

    স্যালি হিগিনস আর একটা কথা বললেন না ডেবিডের সঙ্গে।

    ডেবিড কেমন মরিয়া হয়ে উঠছে—স্যার আপনি আমাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। আমরা আপনাকে অসম্মান করতে চাই না। আমরা এতগুলো লোক একদিকে আপনি একা একদিকে। মানুষের জীবন মরণ বলে কথা। আপনার ভাবা উচিত।

    বাইরে সেই একইভাবে জাহাজে মশালের আলো জ্বলছে। বোট-ডেকে শান্তশিষ্ট বালকের মতো সব মানুষের মুখ। ওরা বসে আছে বোট-ডেকে। প্রায় হরি-সংকীর্তনের বাতাসা নেবে বলে যেন বসে আছে। একটা কথা কেউ বলছে না। ওপরে সব বাবুরা গেছে। বাবুরা ঠিক হেস্তনেস্ত করে আসবে। মশালের আলোতে আবছা ওদের মুখ দেখা যাচ্ছিল—প্রায় সব ফ্যাকাশে মুখ। ভয়ে চোখ ক্রমে কোটরাগত। দপ দপ করে জ্বলছে চোখ। ওরা স্যালি হিগিনসের কাছে এসেছে। ওরা জানে যেহেতু তিনি জাহাজের সর্বময় কর্তা তিনি ইচ্ছে করলে সব বিদ্রোহ সহজেই দমন করতে পারেন। সবাইকে তিনি জাহাজ থেকে যে কেন নামিয়ে দিচ্ছেন না! কি যে স্বার্থ এতগুলো লোকের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার, এখন যত দ্রুত সম্ভব জাহাজ থেকে নেমে পড়া বাঞ্ছনীয়। অথচ তিনি বেশ যেন সমুদ্রে এক চতুর খেলায় মেতে উঠেছেন—তাঁর বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই।

    তখন ডেবিড রেলিঙে ঝুঁকে চিৎকার করে বলল—তিনি আপনাদের মোকাবিলা করতে চাইছেন না।

    ছোটবাবু ফানেলের গুঁড়িতে ছিল। সে বলল—তুমি শিগগির যাও জ্যাক। রাজী করাও। বুড়ো নিজেও মরবে, আমাদেরও মারবে।

    জ্যাক বলল, বাবা ভীষণ একগুঁয়ে। আমার কথায় রাজী হবেন না। তুমি আমার সঙ্গে এস। ছোটবাবু এবং জ্যাক প্রায় লাফিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে লাগল। ডেবিড ওদের দেখে বলল—তিনি কি ভেবেছেন জ্যাক, তিনি কি ভেবেছেন আমরা এভাবে জাহাজে মরে যাই। বড় অসহায় চোখ ডেবিডের। ডেবিড ভেতরে ভেতরে উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে। শুধু ডেবিড কেন, সবাই। ছোটবাবু বলল, ডেবিড মাথা খারাপ করবে না। দেখছি।

    সে ঢুকে বলল—স্যার ওদের সঙ্গে আপনি কথা বলুন!

    স্যালি হিগিনস কেমন মরিয়া। তিনি বললেন—তোমরা সব ঠিকঠাক করে এসেছ। তোমাদের সঙ্গে আমি কি কথা বলব!

    —না স্যার, সব ঠিকঠাক করে আসিনি। আপনি কথা বলুন। কথা না বললে ওরা জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেবে। আপনি একা কিছু করতে পারবেন না। আমরা সবাই এবার বোট হারিয়া করে দেব। বোট সমুদ্রে নামিয়ে জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেব। জাহাজটা অলৌকিক না আপনি অলৌকিক কিছু, আমাদের এখন তাই দেখা দরকার। অলৌকিক হলে জাহাজ এবং আপনি নিশ্চিত বেঁচে যাবেন। আমরা আপনাদের কিছু করতে পারব না। আগুনে আমরা আপনাদের পুড়িয়ে মারতে পারব না। আমরা হেরে যাব। আপনি কথা বলুন স্যার। ওরা ভারী সরল সহজ মানুষ। এঁদের সংস্কার রয়েছে কিছু। এবং জাহাজে ওঠার পর থেকে এমন সব ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছে, এমন সব কাণ্ড কারখানা একের পর এক যে ওরা উন্মাদের মতো কিছু করে ফেললে আপনি আমাদের বিশ্বাসঘাতক ভাববেন না। আসলে এটা কোনো বিশ্বাসঘাতকতা নয়। ওরা আপনার ওপর সব বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে। ওদের কোনো দোষ নেই স্যার। ওদের দিনের পর দিন জাহাজে আটকে রেখেছেন, বোট দিচ্ছেন না, একবার, দোহাই আপনার ঈশ্বরের, একবার কথা বলুন। ছোটবাবুর কথায় স্যালি হিগিনস বোধহয় সামান্য ভয় পেয়ে গেলেন। জোরজার করে বোট নামিয়ে চলে যাবার আগে জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিলে কিছু করার থাকবে না। তাঁর চোখ-মুখ ভয়ঙ্কর কঠিন এবং খাবার ক্রমে ফুরিয়ে আসছে বলে ওরা দুর্ভাবনায় আর মানুষ নেই। এখন এরা সবকিছু করতে পারে। তিনি চোখ তুলে অপলক ছোটবাবুকে দেখলেন। ছোটবাবুকে তিনি অবিশ্বাস করছেন। করুন। সে এখন এছাড়া আর কিছু বলতে পারে না। যেন স্যালি হিগিনস ছোটবাবুর আসল চেহারা এতদিনে দেখেতে পেয়েছেন। ছোটবাবু পর্যন্ত হাত মিলিয়েছে।

    স্যালি হিগিনস বাইরে দাঁড়ালেন। চিফ-মেট লম্ফটা হাতে নিয়ে আসছে। চার্ট-রুম, মাংকি-আয়ল্যাণ্ড এবং হুইল-রুম সব উড়ে গেছে বলে রেলিং ভারী নড়বড়ে। যে কোনো সময় স্যালি হিগিনস সামান্য অসতর্ক হলে উল্টে নিচে পড়ে যাবেন। তা ছাড়া তাঁকে যেন পথ দেখানো দরকার—চিফ-মেট আগে আগে লম্ফের আলোতে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। সমুদ্রে সাদা জ্যোৎস্না। এত. জ্যোৎস্নায় আলো লাগে না। তবু নিচে যারা বসে আছে তারা বোধ হয় দেখে আশ্বস্ত হতে পারবে লম্ফের আলোতে সত্যি তিনি মাথার ওপরে দাঁড়িয়ে ওদের সঙ্গে কথা বলছেন। কি বলবেন, ওরা এক বিন্দু বুঝতে পারবে না। ছোটবাবু ওদের বুঝিয়ে দেবে—পাশে ছোটবাবু দাঁড়িয়ে আছে। ওরা ছোটবাবুকে দেখে নিচ থেকে সবাই হাত নাড়ল।

    আর ছোটবাবু দেখল, নিচ থেকে দু’টো মশাল জ্বালিয়ে এনেছে ডেক-কশপ। দু’দিকে দুটো মশাল বসিয়ে দিয়েছে সে। জ্যোৎস্নায় অস্পষ্ট মুখগুলি এবার স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ডেক-কশপ বুঝি ভেবেছে এভাবে মশাল জ্বেলে দিলে কাপ্তান সবার মুখ স্পষ্ট দেখতে পাবেন। এতগুলো নিষ্ঠুর অতিশয় ক্রুর মুখ দেখলে তিনি নিজের বিশ্বাসে আর অটল থাকতে পারবেন না। এবং মশালের শিখা পরিব্যাপ্ত হয়ে যাচ্ছে আকাশে বাতাসে। সমুদ্রে এমন যখন বিশালতা আর জাহাজের কিছু নাবিক মৃত্যুর বিভীষিকায় যখন উন্মাদ তখন স্যালি হিগিনস খুব ধীরে ধীরে বললেন—বন্ধুগণ, আমরা এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন। জাহাজ অচল। খাবার শেষ হয়ে আসছে। যা খাবার আছে বড় জোর দু’ হপ্তা। প্রায় তিন হপ্তা আমরা জাহাজে ভেসে বেড়াচ্ছি। এতদিন আপনারা ধৈর্য ধরেছিলেন বলে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

    ছোটবাবু তাদের এবার সবটা বাংলায় বুঝিয়ে দিল।

    —আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্বাস ছাড়া আমাদের এখন আর কি আছে! আমরা বিশ্বাস করি সিউল- ব্যাংক আমাদের ঠিক ডাঙায় পৌঁছে দেবে।

    ছোটবাবু বুঝতে পারছে স্যালি হিগিনস বিশ্বাস কথাটার ওপর জোর দিচ্ছেন। বারবার। বিশ্বাস কথাটার ওপর সেও বলার সময় বিশেষ জোর দেবার চেষ্টা করল। কিন্তু আশ্চর্য যতটা জোরের সঙ্গে কাপ্তান বিশ্বাস কথাটা উচ্চারণ করেছেন, সে যেন তেমনভাবে পারছে না। এমন নিরুদ্দিষ্ট যাত্রা প্রায় যেন এক অলৌকিক জলযানে এরা নিরুদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছে। অথবা তার মনে হচ্ছে আসলে যেন কেউ বেঁচে নেই জাহাজে। এক অন্যলোকে ওরা এসে গেছে। ঝড়ের রাতে ওরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সমুদ্রের অতলে। ওরা সবাই সেই সব মানুষের প্রেতাত্মা! এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষা মরে গেলেও শেষ হয়ে যায় না—সে আবার ফিরে আসে পৃথিবীতে। অথবা এমন দুর্ঘটনায় যখন মৃত্যু অনিবার্য তখন তো সবাই নিজের নিজের ইচ্ছের কথা স্যালি হিগিনসকে জানাবেই! ওরা দেশে ফিরে যেতে চায়—এমন শব্দগন্ধহীন সমুদ্রে তারা ঘুরে বেড়াতে চায় না। সেও যেমন ভাবত আর্চির ওপর প্রতিশোধ নেবে, মরে গিয়ে সে সেই প্রতিশোধের কথা ভেবে থাকে আর ভাবে ঘটনা সত্যি সে আর্চিকে খুন করেছে। আসলে সে কিছুই করেনি। সবই এক অন্যলোকের ঘটনা। সে মিথ্যে বিশ্বাস কথাটার ওপর জোর দিতে চাইছে। আর এভাবে ওর সত্যি কেন যে মনে হল কেউ বেঁচে নেই। এরা সবাই মানুষের ছায়া। মরে গিয়ে ছায়ার মতো জাহাজে সবাই ভেসে রয়েছে। ঠিক যেমন জলের বুদবুদ ভেসে থাকে সমুদ্রে তারপর সময়ে মিশে যায় সমুদ্রে তেমনি তারা এখন দুর্ঘটনা ঘটে যাবার পর বুদবুদের মতো পৃথিবীর বাতাসে ভেসে রয়েছে। সময় হলেই তারা বাতাসে মিশে যাবে। কোনো আর চিহ্ন থাকবে না।

    সে কেমন সব গুলিয়ে ফেলেছে। একটা কথাও সঠিক প্রকাশ করতে পারছে না। স্যালি হিগিনস পর পর কি বলে যাচ্ছেন সে বুঝতে পারছে না। এতগুলো মানুষের মুখমণ্ডলে কেমন কঠিন চোখ এবং মশালের আলোতে ওরা যেন সত্যি আর পৃথিবীর কেউ নয়। মাস্তুলে আগুনের প্রজ্বলিত শিখা যেন আকাশ এবং সমুদ্রে ভাসমান। স্থির। নক্ষত্রমন্ডলে তাদের বুঝি এখন প্রতিবিম্ব ভাসছে। সে বলল– আজ আসুন বরং স্যার আমরা কিছু সত্যি কথা বলি। আর্চি কোথায়। সে তো নেই—সে গেল কোথায়!

    স্যালি হিগিনস বললেন—ছোটবাবু এটা ফাজলামির জায়গা না। তুমি কিছু বলছ না। একটা কথা বলছ না আজে-বাজে বকছ। বেশি আজে বাজে বকলে জাহাজ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেব। এবং ছোটবাবু কেমন সম্বিত ফিরে আসার মুখে বলল–স্যার আপনার কি মনে হয় না আমরা এক অলৌকিক জলযানে ভেসে যাচ্ছি। মনে হয় না আমরা সত্যিকারের কেউ বেঁচে নেই। মনে হয় না আমাদের যাত্রা অন্য কোনো গ্রহলোকে, আমরা আর পৃথিবীর মানুষ না। মরে গিয়ে পৃথিবীর মানুষ ভেবে সান্ত্বনা পাচ্ছি। সহসা জ্যাক ছুটে এসে বলল তখন, ছোটবাবু প্লিজ! কি তুমি আজে-বাজে বকছ। তুমি কি সবার মাথা খারাপ করে দেবে?

    ছোটবাবু কেমন ফ্যাকাশে মুখে বলল—আমি সবার মাথা খারাপ করে দিচ্ছি!

    জ্যাক বলল—দিচ্ছ না! তুমি ভাগ্যিস বাবাকে বলেছ। এখন যদি তোমার ভাষায় বলতে, কি হত বলত!

    তখন পাঁচ-নম্বর এসে দাঁড়াল। সে স্যালি হিগিনসকে মাথা নুইয়ে বাউ করল। একসকিউজ মি! এমন বলল। লম্ফের আলোতে ডেবিড়, পাঁচ-নম্বরের মুখটা তুলে দেখাল সবাইকে। ডেবিড ওকে ঠেলে পাঠিয়েছে ছোটবাবুর কথাগুলো বাংলায় এখুনি সবাইকে বুঝিয়ে বলতে হবে! এমন মওকা আর পাওয়া যাবে না!

    পাঁচ-নম্বর তখন বলছে, ছোটবাবু কি বলছে শুনুন।

    ছোটবাবু বলল—ছোটবাবু কি বলছে—ছোটবাবুই বলবে ফাইভার……। — আপনারা শুনুন আমি কি বলছি। পাঁচ নম্বর বলল, ছোটবাবু বলছে…..।—ছোটবাবু বলল—আমার কথা আপনারা আমার কাছ থেকে শুনবেন না ফাইভারের কাছ থেকে শুনবেন?

    সবাই হাত তুলে দিল। কেউ বোধ হয় বিরক্ত হয়ে ছুটে আসছে। কে আসছে ওটা! এনজিনকশপ সে এসেই একটা মশাল নিচ থেকে চিৎকার করে ওপরে ছুঁড়ে মাড়ল! ছোটবাবু সেই মশাল ত্বরিতে খপ করে ধরে ফেলল। তারপর ফের ছুঁড়ে দিয়ে বলল—এনজিন-কশপ জায়গারটা জায়গায় রেখে দাও। মাথা গরম করবে না।

    ছোটবাবু চিৎকার করে এবার বলল—কাপ্তান সিউল-ব্যাংকের ওপর বিশ্বাস হারাতে আপনাদের বারণ করছেন। বিশ্বাস হারালে আমাদের আর কিছু থাকে না বলছেন। জাহাজ অচল, জাহাজে খাবার ফুরিয়ে এসেছে, আমরা চানের জল পাচ্ছি না, আমাদের এখন নোংরা জামাকাপড়ে থাকতে হচ্ছে। তিনি জল পর্যন্ত রেশন করে দিয়েছেন, সবাই কোনো না কোনো দিন আমরা ডাঙায় ফিরে যাব বলে।

    পাঁচ নম্বর বলল—ছোটবাবু তুমি কিন্তু নিজের কথা বললে না।

    পাঁচ নম্বর ভারী লম্বা মানুষ। ছোটবাবুকে অরাও লম্বা মনে হচ্ছে। ছোটবাবু কালো প্যান্ট হলদে শার্ট পরে আছে। সামান্য শীত লাগছে। ওর চুল এখনও মনোরম। সে তো কখনও দাড়ি কামায় না। ডেবিড এবং অন্য সবাই দাড়ি কামানো-টামানোর পাট প্রায় তুলে দিয়েছিল। সকালে কাপ্তান পাইকারি হারে সবাইকে দাড়ি কামিয়ে ঘরে হাজিরা দিতে বলেছিলেন। সবাই দাড়ি কামিয়ে মুখ দেখিয়ে গেছে। স্যালি হিগিনস ঠাট্টা করে বলেছিলেন, তোমাদের সবাইকে জামাই জামাই লাগছে হে! বোকার মতো হেসে সবাই বের হয়ে এসেছিল –কি যে বলেন স্যার! আর সেই লোকটার মুখ এখন কি নিষ্ঠুর। প্রায় নিয়তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন মাথার ওপর। মনেই হয় না মানুষটা জীবনে কারও সঙ্গে কোনো রসিকতা করেছেন

    পাঁচ-নম্বর ফের বলল—তুমি কি বলেছিলে একবার বল।

    এনজিন-কশপ ভিড়ের ভেতর থেকে উঠে দাঁড়াল। সে চিৎকার করে বলল—আমরা শুনতে চাই।

    এবং পাশাপাশি আর যারা ছিল ছোটবাবু অবাক সবাই বলছে—আমরা শুনতে চাই।

    সে এমন কাউকে দেখল না যে বলতে পারে, না শুনতে চাই না! সে সারেঙ-সাবকে খুঁজছে! সব মুখগুলো সে একে একে চিনতে পারছে। যতই বন্য হয়ে যাক যতই তারা অমানুষ হয়ে যাব সে সবাইকে চিনতে পারছে। কেউ উবু হয়ে বসে আছে। কেউ পা ছড়িয়ে দিয়েছে। কেউ সব হারিয়ে গেলে মানুষের যে মুখ যে উদাসীনতা অর্থাৎ মৃত্যু চারপাশে হাত তুলে নৃত্য করে বেড়ালে তখন যেমন লাগে মানুষকে হুবহু সেই সব ছবি! ঠান্ডা বাতাস সমুদ্র থেকে উঠে আসছে। বাতাসে জলের ভেজা গন্ধ। জলে কোনো অতিকায় মাছের ভেসে বেড়ানোর শব্দ। অথবা দূরে রাশি রাশি পাইলট ফিশের ঝাঁক। নিচে জাহাজের অতলে সব জোনাকির মতো জেলি-ফিশেরা সাঁতার কাটছে। এবং র‍্যামোরা মাছের প্রবল আক্রমণে জাহাজের খোল এখন হিজিবিজি আঁসের মাছ যেন একটা। এত বড় খোলের কোথাও আর বিন্দুমাত্র জায়গা নেই যেখানে ফাঁক রয়েছে। র‍্যামোরা মাছ ছোট গুগলির মতো নিজের আশ্রয় ইতিমধ্যে গড়ে তুলেছে এবং ক্রমে সময় পার হয়ে গেলে ছোটবাবুর মনে হল খোলের ইস্পাতে সব শ্যাওলা জমে বড় বড় দাড়ি এবং অতিকায় জলযানটা একসময় জলচর প্রাণী হয়ে যেতে পারে সে কোনো সময়। চারপাশে সাদা জ্যোৎস্নায় মরা সমুদ্রে এমনই মনে হল তার। এবং সঙ্গে সঙ্গে সে হাত তুলে বলল—আমার কখনও এটা কেন যে মনে হয় আমরা যেন এক অলৌকিক জলযানে ভেসে যাচ্ছি। যেন নিয়তির মতো এই যান। আমরা নিজেরা জানি না কোথায় তাকে নিয়ে যাব অথচ কি আশ্চর্য দেখুন ঠিক কোথাও যাবার জন্য আমরা প্রত্যেকে বের হয়ে পড়েছি—সেই কবে থেকে যেন সেই, আচ্ছা, আপনারা কেউ বলতে পারেন সেই কবে থেকে আমরা যানে চড়ে বের হয়ে পড়েছি—কেউ মনে করতে পারছেন না, এই সেদিন লক্ষ কোটি বছর আগে……..।

    —ও হো ছোটবাবু তুমি অন্য কথায় চলে যাবে না। ঠিক ঠিক বলে যাও। লম্ফটা এবার পাঁচ নম্বর ছোটবাবুর মুখের সামনে তুলে ধরল।

    স্যালি হিগিনস ঠিক ছোটবাবুর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। লম্বা রেলিং। তার পাশে চিফ-মেট, ডেবিড এবং রেডিও অফিসার। দোমড়ানো ফানেলের গুঁড়িতে বনি তেমনি তাকিয়ে আছে ওপরে। নিচে নেমে ছোটবাবু এবং বাবা তারপর এই জাহাজিরা কিভাবে পরস্পর মোকাবেলা করবে সে বুঝতে পারছে না। সে ভীষণ উদ্বিগ্ন চোখ মুখে প্রত্যাশায় আছে, ছোটবাবু ঠিক সব সামলে দিতে পারবে। কিন্তু কেমন জল ঘোলা করে ফেলেছে ফাইভার। ওরা পরস্পর বচসা করছে মতো! ছোটবাবুকে অপদস্থ করার জন্য বার বার চাপ দিচ্ছে।

    আর ছোটবাবু তখন আবার জাহাজিদের উদ্দেশ্য করে কি সব বলে যাচ্ছে। আশা করছে ছোটবাবু ওদের বলে দিয়েই সে ফের এই সব ইংরেজ অফিসারদের বুঝিয়ে বলবে।

    ছোটবাবু যা যা বলেছিল সব হুবহু বললে—পাঁচ নম্বর হৈ চৈ বাঁধিয়ে দিল—তবে! ডেবিড বুঝতে পারছ?

    ডেবিড বলল—না। কিছু বুঝতে পারছি না।

    পাঁচ-নম্বরই ইংরেজীতে বলল—স্যার। সে স্যালি হিগিনসকে উদ্দেশ্য করে বলছে।

    —দ্য বাস্টার্ড। স্যালি হিগিনস ক্ষেপে গেলেন। এই ফাইভারের এত রোয়াব। সময় বুঝে বদলা নিচ্ছে। আর ছোটবাবুর কথা শুনে স্যালি হিগিনস একেবারে থরথর করে কাঁপছেন উত্তেজনায়।

    —কি কি বলছ! এটা অলৌকিক জলযান! আমরা কেউ বেঁচে নেই। আমাদের যাত্রা অন্য কোন গ্রহলোকে। আমরা আর পৃথিবীর মানুষ না। ননসেন্স। স্যালি হিগিনস আর চুপচাপ থাকতে পারলেন না। মিথ্যে কথা। ছোটবাবু আপনাদের মিথ্যে কথা বলেছে। এটা অলৌকিক জলযান নয় আমি বলছি। আমরা বেঁচে আছি আমি বলছি। আমরা অন্য কোন গ্রহলোকে পাড়ি জমাচ্ছি না। আপনাদের ভয় পাইয়ে দেবার জন্য এসব ছোটবাবুর ষড়যন্ত্র। এরা সবাই আপনাদের ভয় পাইয়ে দিতে চায়। এটা ভুতুড়ে জাহাজ এটার মাথা ঠিক নেই—ঠিক না। এটা আর দশটা জাহাজের মতো জাহাজ, আর দশটা জাহাজের মতো এর কলকব্জা। দশটা জাহাজের মতো এটা পুরানো। পুরানো গন্ধ এর শরীরে আছে। এর ইস্পাত আর দশটা জাহাজের চেয়ে সামান্য আলাদা। কম্পাসে সামান্য গন্ডগোল দেখা দিত মাঝে মাঝে। আসলে জাহাজটা সম্পর্কে এত বেশি প্রচার ছিল, এত পুরোনো সব খবর জাহাজিদের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছিল যে জাহাজে উঠলেই সবাই ভয়ে একটা অস্বস্তিকর পরিবেশে পড়ে যেত। শুধু গুজব গুজব এ জাহাজটাকে এমন একটা অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। ছোটবাবু তুমি কী! তুমিও ছোটবাবু শেষ পর্যন্ত….. তোমার ওপর খুব বেশি নির্ভর করেছিলাম হে। হাতের শেষ তাসটাও কেড়ে নিলে!

    ছোটবাবু ততোধিক চিৎকার করে বলল—ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না। এবং তারপর কাপ্তানের সব কথার বাংলা করে দিলে এনজিন-কশপ, ডেক-সারেঙ সবাই উন্মত্তের মতো লাফাতে থাকল—মানি না। এটা কাপ্তান বাড়িয়ে বলছে। যদি আর দশটা জাহাজের মতো হয় তবে আমাদের এভাবে আটকে রেখে কি লাভ। তিনি কি জাহাজে রেখে সবাইকে মেরে ফেলতে চান। শয়তানির একটা সীমা থাকা উচিত।

    ছোটবাবু বলল—স্যার ওরা বলছে আর দশটা জাহাজের মতোই যদি হয় তবে সবাইকে জাহাজে আটকে রেখেছেন কেন? বোট দিচ্ছেন না কেন?

    স্যালি হিগিনস এবার ধীরে ধীরে বললেন—বন্ধুগণ, বোটের চেয়ে জাহাজে বেশি আপনারা নিরাপদ।

    ছোটবাবু বলল—বোটের চেয়ে জাহাজে আপনারা বেশি নিরাপদ।

    ডেবিড বলল—মিথ্যা কথা।

    স্যালি হিগিনস ভীষণ ধমকে উঠলেন—ডেবিড!

    ডেবিড বলল—আমরা তবে স্যার এভাবে বসে বসে নিয়তির হাতে মার খাব?

    —কোনো উপায় নেই। প্লিজ ডিপেনড অন দ্য ফেট।

    নিচ থেকে সোরগোল উঠছে। বাংলায় বলুন। বুঝতে পারছি না কি বলছেন।

    ছোটবাবু বলল—–ডেবিড বিশ্বাস করছে না জাহাজ বোটের চেয়ে বেশি নিরাপদ জায়গা।

    সমস্বরে সবাই চিৎকার করছে, আমরাও বিশ্বাস করছি না। আমরা সমুদ্রে নেমে যেতে চাই। আমরা সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে চাই। সমুদ্রের হাতে বসে বসে আর মার খাব না। সমুদ্রের হাতে পুতুল বনে যেতে চাই না।

    স্যালি হিগিনস ছোটবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন, কখন ছোটবাবু ওদের কথা সব খুলে বলবে।

    ছোটবাবু বলল–স্যার ওরা তো ঠিকই বলছে। ওরা বলছে বসে বসে নিয়তির হাতে মার খাবে না। ওরা বোট নিয়ে ভেসে পড়তে চায়। ওরা লড়তে চায়।

    স্যালি হিগিনস দাঁড়িয়ে থাকলেন। তিনি স্লিপিং গাউন পরে আছেন। সোনালী রঙের স্লিপিং গাউন। জ্যোৎস্নায় তার গেরুয়া রং ধরেছে। দাড়ি না কামানোর জন্য বেশ বড় দাড়ি। মাথার চুল সাদা বলে খুবই প্রাজ্ঞ পুরুষ মনে হচ্ছে। তিনি এবার সত্যি সত্যি জাহাজ সমুদ্র এবং এই সব নক্ষত্রমালা সম্পর্কে এমন খবর দেবেন যে সবাই তাজ্জব বনে যাবে। যেন এক্ষুনি বলবেন সমুদ্রকে তোমরা কতটুকু চেন! সিউল-ব্যাংককে তোমরা কতটুকু জান! তোমরা যখন আমার চেয়ে বেশি জান না তখন আমার ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় কি! কিন্তু তিনি আর কিছুই বললেন না। শুধু বললেন—আপনাদের কি মনে হচ্ছে না জাহাজ কোথাও যাচ্ছে! আপনারা কি বুঝতে পারছেন না জাহাজ এক জায়গায় নেই। বোটের কম্পাস থেকে আমি বুঝতে পারছি জাহাজ তার কোর্স পাল্টে ফেলেছে। চোখের ওপর অবশ্য মনে হয় জাহাজ স্থির—এত বড় সমুদ্রে এ ছাড়া কিছু বোঝারও উপায় নেই। তবু বলছি জাহাজ আমাদের ওয়েস্ট-নর্থ-ওয়েস্টে উঠে যাচ্ছে। জাহাজ তার কোর্স পাল্টে ফেলেছে যখন আমাদের ভয় নেই। আমরা এবার সামনে অসংখ্য দ্বীপ পেয়ে যাব। পাঁচ সাতশ মাইলের ভেতর এখানে আছে অসংখ্য দ্বীপ। বলা যায় না ফিজিতেও গিয়ে আমরা উপস্থিত হতে পারি। ভাগ্য যদি তেমন সুপ্রসন্ন থাকে ভিতিলেবুতে যেতে পারি। আরও ওপরে ফানফুতি—যদি জাহাজ চোরাস্রোতে কোরাল সীতে ঢুকে যায়, চারপাশে থাকবে নিও-ক্যালেডোনা, নিউ হেবরাইটস রতুম, সান্তাক্রুজ, সালামন দ্বীপপুঞ্জ, এমন কি আর একটু ওপরে উঠে গেলে এলিস। সেখানে খাবার থাকবার এবং ঘরে ফিরে যাবার সব রকমের ব্যবস্থা।

    বন্ধু বলল তখন—অ ছোটবাবু, সাহেব এত কি বলছে রে!

    জব্বার বলল—অ ছোটবাবু, নাকে নস্যি গুঁজে দাও। নইলে থামবে না।

    বাধা পেয়ে স্যালি হিগিনস থেমে ছোটবাবুর দিকে তাকালেন। ছোটবাবু বলল—স্যার আপনি বলে যান। ওদের কথায় কান দেবেন না।

    মনে হল সব বুঝতে পারছেন তিনি। এই জাহাজিরা তাকে এখন অপমান করতে চায়। তিনি জানেন তাঁর কাছে যেহেতু একমাত্র আগ্নেয়আস্ত্র আছে এবং তিনি যেহেতু যে কোন জাহাজিকে টেনে এনে বুলেটের সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন—তিনি বোধ হয় সেজন্য আদৌ বিচলিত হচ্ছেন না। তাঁর গলা মাঝে মাঝে চড়ে গেলেও অধিকাংশ সময় মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করে যাচ্ছেন।

    —আর ছোটবাবু তুমিও শালা শেষ পর্যন্ত দালাল হয়ে গেলে। বন্ধু লাফিয়ে রেলিঙের নিচে এগিয়ে এল।—কি বলছে সাহেব। ছোটবাবু ফের সবটা বুঝিয়ে বললে—এবার আর কেউ যেন তেমন চিৎকার চেঁচামেচি করে উঠল না।

    ওদের মুখ দেখে স্যালি হিগিনস কিছুটা স্বস্তি বোধ করছেন। তিনি ফের ওদের ভুল ধারণা মন থেকে মুছে ফেলার জন্য বললেন—এসব দ্বীপ আমরা পাঁচ-সাতশ মাইলের ভেতর পেয়ে যাব আশা করছি।

    ডেবিড তখন আর ধৈর্য ধরতে পারল না। সে চিৎকার করতে করতে নেমে যাচ্ছে।

    —সব ভাঁওতা। আপনারা এর বিন্দু-বিসর্গ বিশ্বাস করবেন না। দোহাই ঈশ্বরের, আপনারা ফাঁদে পা দেবেন না। তিনি মুখে যাই বলুন মনে মনে জাহাজের অলৌকিকত্বে বিশ্বাসী। তাঁর বিশ্বাস জাহাজ ঠিক আমাদের পৌঁছে দেবে। সব ওঁর মনগড়া কথা। জাহাজের তো আর পাখা গজায়নি!

    ছোটবাবু এখন কাকে কি বলবে বুঝতে পারছে না।

    ডেবিড তখনও তারস্বরে চিৎকার করছে।—এখনও আপনাদের সময় আছে। এই ছোটবাবু তুমি ওদের বোঝাও। বুড়োর কথায় ওরা তো সব বুঝে ফেলেছে। দ্যাখো সবাই মাথা নুয়ে চলে যাচ্ছে মতো। এই এনজিন-কশপ কোথায় যাচ্ছ! জাহাজের খাবার ফুরিয়ে গেলে কি করবে! জল ফুরিয়ে গেলে! চিফ-মেট আপনি একটা কথাও বলবেন না! জাহাজ এক ইঞ্চি নড়ছে না এটাও বলবেন না! এবং এ-সময় যা হয় চোখের ওপর শুধু শহর নদী গাছপালা এবং গমের খেত। আর সেই প্রিয়জনেরা মুখের ওপর মিছিলের মতো সরে সরে যায়! তখনই সে মরিয়া হয়ে বলল—আমি থাকব না, এ জাহাজে থাকব না। সমুদ্র অনেক নিরাপদ জায়গা। জাহাজের অশুভ প্রভাবে থাকলে আমরা কেউ বাঁচব না। বলতে বলতে সে একেবারে বোটের নিচে হামাগুড়ি দিয়ে সত্যি সমুদ্রে লাফিয়ে পড়তে যাচ্ছে। এবং তখন যে যার মতো ছুটছে ডেবিডকে ধরার জন্য। ছোটবাবু তখন বিরক্ত মুখে যেন না বলে পারল না, স্যার কেন এদের আটকে রেখেছেন! এদের বোট দিয়ে দিন। যারা নেমে যেতে চায় নেমে যাক।

    স্যালি হিগিনস প্রায় কৈফিয়তের সুরে বললেন—ছোটবাবু জাহাজ ভেসে থাকলে আমাদের চলে যাবার নিয়ম নেই। জাহাজ ডুবে যেতে থাকলে উই ক্যান এবানডান দ্য শিপ। কিন্তু সে তো আমাদের জলে ভাসিয়ে সমুদ্রের অতলে ডুবে যাচ্ছে না। এর জন্য তার প্রতি তোমাদের এতটুকু কৃতজ্ঞতা নেই!

    ছোটবাবু কেমন বোবা বনে গেল। কী আন্তরিক কথাবার্তা তাঁর! থার্ড-মেট বলল—স্যার দেশলাই আছে? লম্ফটা নিভে গেছে আবার। ডেবিডের পা কেটে গেছে ছুটতে গিয়ে। বেনজিন লাগাতে হবে।

    স্যালি হিগিনস পকেট থেকে দেশলাই বের করে লম্ফটা জ্বালালেন। অল্প অল্প হাওয়া বইছে। থার্ড মেট হাতে হাওয়া বাঁচিয়ে কোনোরকমে নিচে নেমে গেল। বেনজিন তুলো এনে এখন টুইনডেকে জোরজার করে ওষুধ লাগাচ্ছে। ওকে ঘিরে রেখেছে ক’জন জাহাজি। লাফিয়ে সমুদ্রে পড়ে গেলে কেলেঙ্কারি। মাস্তুলে লেডি-অ্যালবাট্রস বসতে পারছে না। তার নিচে এখনও আগুন জ্বলছে। কাছাকাছি কোথাও সে সমুদ্রে ভেসে রয়েছে। ছোটবাবু জ্যোৎস্নায় নিরুপায় হয়ে এখন কেবল পাখিটাকে যেন খুঁজছে। ফানেলের গুঁড়িতে বনি তেমনি শূন্যচোখে তাকিয়ে আছে ওপরে। সে বুঝতে পারছে না, কারা ঠিক। সে বাবার পক্ষে না বিপক্ষে তাও বুঝতে পারছে না বোধহয়।

    ডেবিড তখন খোঁড়াতে খোঁড়াতে আবার উঠে আসছে। সে সবার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। একটা মশাল সে নিজের মুখের ওপর ধরে রেখেছে। এবং মশালের আলোতে ওর চোখ-মুখ জ্বলছিল। সে তারপর নিশীথে সবার মুখের ওপর দিয়ে সেই মশালের আলো ভাসিয়ে নিয়ে গেল। এবং নাটকের পাত্র-পাত্রীর মতো সে ঘুরে দাঁড়াল। কোনো যুদ্ধবাজ মানুষের মতো সে জ্বলে উঠছে। যে জানে জীবনে সে আর জাহাজে কাজ পাবে না, যদি কোনো কারণে সবাই রক্ষা পেয়ে যায় সে জানে তার সব রেকর্ড, বিশ্বস্ততার সব ইতিহাস মুছে যাবে।—এমন কি শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে কারাগারে বন্দীজীবন যাপনও করতে হতে পারে। তবু সে এবির মুখ এবং সন্তানের কথা ভেবে কেমন মশাল তুলে নিচ্ছে ওপরে। বলছে, আপনারা ওই লুকেনারের ডামিটাকে শুধু একটা প্রশ্ন করুন। মাত্র একটা প্রশ্ন। তিনি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলবেন—সামোয়া বন্দরে তিনি কেন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ছোটবাবু তুমি এদের বুঝিয়ে বল। বলে সে খোঁড়াতে খোঁড়াতে সব জাহাজিদের পাশে ওদের সামিল হয়ে দাঁড়াল। ছোটবাবু বলল—ডেবিড আজ না হয় থাক। বুঝতেই পারছ আমরা কেউ ঠিক নেই। দু-একদিনে এমন কিছু হবে না আমাদের! আমাকে তোমরা সময় দাও বুঝিয়ে-সুঝিয়ে যদি মত বদলাতে পারি। সে কিছুতেই বলল না চাবিকাঠি তার হাতে। সে বনিকে দিয়ে কাজটা উদ্ধার করতে পারে বলল না।

    ডেবিডের কথায় আবার যেন সবাই সাহস ফিরে পেয়েছে। ওরা আবার আগের মতো গোল হয়ে দাঁড়াল। স্যালি হিগিনস এক পা নড়ছেন না। ঠিক আগের মতো স্থির। গীর্জার কোনো ফাদার সিঁড়িতে যে-ভাবে মানুষের শুভ কামনায় দাঁড়িয়ে থাকেন তেমনি তিনি দাঁড়িয়ে ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করবেন যেন এবার। তিনি সত্যি সত্যি বলতে আরম্ভ করলেন—ডেবিড, আপনি যা ভেবেছেন সত্যি তাই। আপনি সবটা জোর গলায় প্রচার করতে পারেন—আমার কোনো দুঃখ নেই আর। আমি সব মেনে নেব। এবং এই আপনি সম্বোধনে ডেবিড কেমন যেন অস্বস্তির ভেতর পড়ে গেল। একজন কাপ্তানের এ-ভাবে পরাজয় তাকে বোধহয় ক্ষতবিক্ষত করছিল। সে সহসা নতজানু হয়ে গেল, স্যার আমাকে ক্ষমা করুন। বলে সে দূরে সমুদ্রের ভেতর তার মশালটা নিক্ষেপ করে অন্ধকারে নিচে নেমে গেল। সবাই হাঁ। বোট-ডেকে কতগুলো ছায়া মাত্র। তাদের জোর একদম হারিয়ে গেছে। ওপরে মাথা নিচু করে রেখেছেন স্যালি হিগিনস। পাশে ছোটবাবু থার্ড-মেট, চিফ-মেট এবং এইমাত্র তিন-নম্বর মিস্ত্রি ওপরে উঠে কেমন একটা স্তব্ধতার ভেতর পড়ে গিয়ে আর সিঁড়ি ভাঙতে পারল না। সবাই যেন ফ্রিজ হয়ে গেছে মুহূর্তে।

    এনজিন-কশপ সেই স্তব্ধতাভঙ্গকারী। সে বলল, ছোটবাবু তিনি কেন ব্যামোতে পড়েছিলেন আমি বলতে পারি।

    ছোটবাবু একটা কথা বলল না।

    এনজিন-কশপ এবার চারপাশের জাহাজিদের কাছে গলা উঁচিয়ে বলতে থাকল—তার গলার রগ ফুলে যাচ্ছে, সে হাতে একটা মশাল জ্বালিয়ে নিয়েছে। না নিলে সে যেন জোর পাচ্ছে না। সবার সামনে মশাল তুলে বলছে—ইনসে আল্লা অথবা যেন বলছে আল্লার কসম—আপনারা মিঞাভাইরা আমার জানেরা থোড়া মেহেরবানী করে শুনে লেন—জাহাজ দু’-দু’বার পিঁজরাপোলে যাবার কথা!

    ফাইভার দেখছে ঠিকমতো লোকটা বলতে পারল না গুছিয়ে। সে মশালটা এবার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। বলল, তুমি থামো মিঞা। বলেই সে তাকাল ওপরে। তারপর বলল, থিও ফ্যাল স্যার দৈব দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। ঠিক?

    স্যালি হিগিনস বললেন—ঠিক।

    —জাহাজ স্ক্র্যাপ করার দলিলপত্রে সই করার নিমিত্ত গাড়িতে রওনা হয়েছিলেন?

    —হয়েছিলেন।

    —বজ্রপাতে তিনি রাস্তায় মারা গেলেন!

    স্যালি হিগিনস মাথা নুয়ে ক্রস্ টানলেন বুকে

    —তারপর রিচার্ড ফ্যালের পালা।

    —হ্যাঁ তিনিও জাহাজটা বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন।

    পাঁচ-নম্বর যেন এবার মশালের আলোতে সবাইকে একসঙ্গে দেখতে চায়। সে বলল, শেষ পর্যন্ত পারেন নি। একমাত্র নাবালক পুত্র একমাত্র উত্তরাধিকার তাঁর মরে গেল। দুর্ঘটনায় মারা গেল। রিচার্ড ফ্যাল গাড়ি করে যাচ্ছেন। হস্তান্তরের জন্য কাগজপত্র সব রেডি। যাবার পথে তাঁর বিঘ্ন ঘটল। গাড়িতে পুত্রের মৃতদেহ আবিষ্কার করলেন—ঠিক?

    ছোটবাবু এমন একটা ভয়াবহ ঘটনা যেন এই প্রথম শুনছে। আর জ্যোৎস্নায় সমুদ্র জাহাজ আকাশের সব নক্ষত্রমালা এবং চারপাশের সব মানুষ কেমন অজানা অচেনা হয়ে যাচ্ছে। ভীতিকর সব কথাবার্তা। জাহাজটা যেন ফুঁসছে নিরন্তর নিজের ভেতর। জাহাজটাকে আর কিছুতেই দশটা জাহাজের মতো মনে হচ্ছে না। স্যালি হিগিনসকে জ্যোৎস্নায় সেই মৃত, লুকেনারের অবয়ব মনে হচ্ছে। একমাত্র সে বনিকে চিনতে পারছে, ফানেলের গুঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে তেমনিভাবে। সে খুব অসহায় গলায় চিৎকার করে ডাকল, জ্যাক ওপরে এস, ওখানে দাঁড়িয়ে কি করছ তুমি!

    পাঁচ-নম্বর সেই সব কথাবার্তা একবার ইংরেজীতে একবার বাংলায় প্রায় ধর্মগ্রন্থ পাঠের মতো বলে যাচ্ছিল। সে এবার খুব সতর্ক গলায় বলল, ফোনে কথা বলতে বলতে পড়ে গেলেন। পাঁচ- নম্বর প্রায় একজন উকিলের মতো জেরা করে যাচ্ছে। আর বিস্ময়ের ব্যাপার ছোটবাবু দেখছে, কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রায় আসামীর মতো তিনি স্বীকারোক্তি করে যাচ্ছেন! বোধহয় পাঁচ-নম্বর এক্ষুনি ঘুরে যাবে, বলবে, হিয়ার ইজ দ্য পয়েন্ট।

    স্যালি হিগিনস বললেন, ফাইভার শরীরটা আমার ভাল ছিল না।

    –নো নো। ঠিক কথা বলছেন না। ঠিক কথা বলুন। আসল রহস্য খুলে বলুন। এমন দিগন্তব্যাপী সাদা জ্যোৎস্না যখন, আমরা যখন সবাই সমুদ্রের বিভীষিকায় পড়ে গেছি এবং যে কেনো মুহূর্তে জাহাজ সমুদ্রের অতলে ডুবে যেতে পারে, আমরা আশা করব মহামান্য ক্যাপ্টেন আমাদের কাছে কোনো রহস্য আর গোপন রাখবেন না।

    স্যালি হিগিনস আর পারলেন না, দু’হাতে মাথার চুল ছেঁড়ার মতো চিৎকারে ফেটে পড়লেন, ফাইভার প্লিজ, প্লিজ আমাকে আর টরচার করবে না।

    আর যায় কোথায়! এমন পরাজয়ের মুখে পাঁচ-নম্বর ভীষণ ক্ষিপ্ত গলায় বলে উঠল, আপনি এত সব জেনে কেন কাগজপত্রে সই করলেন জবাব দিন! কেন আপনি এতগুলো মানুষের জীবন নিয়ে ছিমিমিনি খেলছেন জবাব দিন! আপনি যখন জানতেন জাহাজে ক্যাপ্টেন লুকেনারের অশুভ প্রভাব আছে তখন কেন একবার ভাবলেন না, আপনার সই করার বিনিময়ে সব জাহাজির জীবন বিপন্ন হতে পারে। শুধু নিজের কথা আর শ্রীমান জ্যাকের কথা ভাবলেন। আমাদের কথা আপনার একবারও মনে হল না। আপনি স্বার্থপর, আপনি আপনি………।

    ছোটবাবু বলল, ফাইভার আপনি কী সব বলছেন!

    পাঁচ-নম্বর এবার আরও জোর গলায় যতটা সম্ভব, যেন তার চিৎকার সমুদ্রের দিগন্তে অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় যতদূর সম্ভব পৌঁছে দিতে চায়। তারপর প্রায় নাটকীয় গলায় বলে উঠল, বন্ধুগণ, আমরা এখন বুঝতে পারছি, মহামান্য ক্যাপ্টেনের প্রলোভন আমাদের নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কোম্পানির কর্তাব্যাক্তিরা তাঁকে পরিচালকবর্গের একজন করে নিয়েছেন বিনিময়ে। কতদূর নীচ হীন এই মানুষ, জাহাজের এতদিনের সংস্কার তুচ্ছ করে নিজের জীবন অথবা বলতে পারেন জ্যাকের জীবনের কথা একবার ভাবলেন না—সবচেয়ে অবাক লাগে এই বুড়ো বয়সে তোর কি এমন প্রয়োজন ছিল বলেই কোথায় যেন কথাবার্তায় গাফিলতি থেকে যাচ্ছে—ঠিক ঠিক সবাই যেন এখনও মশাল তুলে ছুটে আসছে না, মশালের আগুনে কাপ্তানকে পুড়িয়ে মারছে না—কিভাবে আর এইসব ঘটনা জোর গলায় বলা যেতে পারে—সে মরিয়া হয়ে ফের বলল, এখন কি দেখতে পাচ্ছি? চারিদিকে শুধু সমুদ্র। শুধু জল। আমরা বুঝতে পারছি না কোথায় আছি। তারপর সে কি ভেবে বলল, দেখুন দেখুন—জাহাজটাকে দেখুন। এর মাস্তুল, আফটার-পিক, ফরোয়ার্ড-পিক, ফানেল, উইন্ডসেল, হ্যাচ-উইনচ সব কেমন যেন কতদিন পর হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। রেস্ট….রেস্ট। নিরুদ্বিগ্ন জীবন। ভাবনা নেই আর। কেউ তাকে আর নাকে দড়ি দিয়ে টেনে নিয়ে যাবে না। সে মুক্ত। শী ইজ ফ্রি নাও।

    ছোটবাবু দেখছে সব মানুষগুলোর চোখ মশালের আলোতে প্রায় স্থির। গোল গোল চোখে স্যালি হিগিনসকে দেখছে। কারো পলক পড়ছে না। সে ভয় পেয়ে ডাকল, স্যার আপনি কিছু বলুন। দোহাই। দেখছেন না এরা কি হয়ে যাচ্ছে। স্যার, এ-ভাবে মাথা নুয়ে দাঁড়িয়ে থাকার এখন সময় নয়। আমরা সবাই এখন বুঝতেই পারছেন পাঁচ-নম্বরের হাতে পড়ে গেছি। আমরা কিছু করে ফেললে…..।

    পাঁচ-নম্বর এবার সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে আসছে। আর চিৎকার করছে। যেহেতু সে পরেছিল কালো প্যান্ট এবং খয়েরী রংয়ের গেঞ্জি, জ্যোৎস্নায় সব কালো দেখাচ্ছে, ওর পোশাকে কেউ যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছে এমনভাবে হাউ-মাউ করছিল—অর্থাৎ ভয়ে-ভীতিতে যেন সে ভেঙে পড়ছে।—সে চিৎকার করে কি বলছে, সব বোঝা যাচ্ছে না। কিছুটা বোঝা যাচ্ছে। সেই কিছুটাই প্রায় সবার হৃৎকম্প এনে দিয়েছে। সে বলছে, আমরা মরে কাঠ হয়ে যাব। সেই অশুভ প্রভাব—ক্যাপ্টেন লুকেনার আমাদের পাশেই আছে। এ-জাহাজে বহাল তবিয়তে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জাহাজের কলকব্জা সব উপড়ে ফেলেছে। একেবারে নিজের মতো চিরকালের একটা আশ্রয় বানিয়ে ফেলেছে। এতদিন লুকেনার সেই ফিকিরেই ছিল।

    ছোটবাবু বলল, স্যার দোহাই আপনার ঈশ্বরের। সব, সবাই পাঁচ নম্বরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু না বললে, আপনাকে স্যার ওরা পুড়িয়ে মেরে ফেলবে। আপনি বলুন, একটাও সত্যি কথা নয়! সব মিথ্যা কথা বলছে ফাইভার! সব বানিয়ে বলছে!

    পাঁচ নম্বর তখনও তেমনি চিৎকার করছে, একজন বিজ্ঞাপনদাতার মতো মুখ পাঁচ-নম্বরের। গুজব ছড়াবার পক্ষে যা যা দরকার সব সে এবার বিজ্ঞাপনে হাজির করছে। সে এবার প্রায় লাফাতে থাকল, যেন সারা শরীরের আগুন ওর মাথায় উঠে পড়েছে। সে বলল, এবার থিও ফ্যাল নয়। রিচার্ড ফ্যালের পুত্র নয়—এবারে বন্ধুগণ আমাদের পালা। আপনারা তৈরী হোন। মহামান্য ক্যাপ্টেন এবার আমাদের লুকেনারের হাতে তুলে দিলেন। অজানা সমুদ্রে শুধু ঢুকে গেছি। সমুদ্রে শুধু ভৌতিক অগ্নিকান্ড দেখতে পাব না। এবার লুকেনার ভয়াবহ নৃসংশতার ভেতরে নিয়ে যাবে। সোজা কথায় জাহাজটাতে আমরা সবাই লুকেনারের মতো মরে ভূত হয়ে যাব। লুকেনারের প্রোতাত্মা ভর করা জাহাজটাও এতদিন সেই ফিকিরে ছিল। এতদিন পর সে আমাদের বাগে পেয়েছে। আর তখনই দূরে কক্ কক্ করে ডাকছিল পাখিটা। সে কেমন এবার ফিসফিস গলায় বলতে থাকল, শুনতে পাচ্ছেন? ডাকছে! কেউ ডাকছে, মনে হচ্ছে কেউ হাসছে, কেউ হাসছে! দ্য সী-ডেভিল হাসছে। আমরা কেউ বাঁচব না। আতঙ্কে পাঁচ- নম্বর বলতে বলতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল।

    সমুদ্রের ভয়ংকর স্তব্ধতা তখন কি যে কঠিন শীতল হাহাকারে ভুগছে! কেউ একটা আর কথা বলতে পারছে না।

    ছোটবাবু তখন প্রায় পাগলের মতো দু’হাতে নাড়তে থাকল স্যালি হিগিনসকে—জ্যাক নিচে তুমি কি করছ! ওপরে এস! দেখ তিনি কী হয়ে যাচ্ছেন। সে নিরুপায় হয়ে বলল, চিফ-মেট আপনি কিছু বলছেন না—স্যার স্যার! একবার আপনি প্রতিবাদ করুন। তা না হলে সবাই ভয় পেয়ে যাবে। ঘাবড়ে যাবে। আমরা আর আপনার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারব না।

    স্যালি হিগিনস শুধু বললেন, ছোটবাবু ওতো ঠিকই বলেছে। ফাইভার তো বানিয়ে কিছু বলে নি!

    —স্যার আপনি কী বলছেন! এ-সব আজগুবী কথা স্যার আপনি বিশ্বাস করেন! এতদিনের বিশ্বস্ত জাহাজ! ফাইভার অযথা দুর্নাম দিচ্ছে, আর আপনি সবার সামনে স্বীকার করছেন! আমাদের শেষ বিশ্বাসটুকু এ-ভাবে নষ্ট করে দিচ্ছেন!

    স্যালি হিগিনস বিশ্বস্ত কথাটা বার বার উচ্চারণ করতে লাগলেন। সিউল-ব্যাংক ভারী তাঁর অনুগত ছিল। এখনও আছে। জাহাজটার জন্য তাঁর সর্বস্ব বাজি রেখে ভেবেছিলেন, তিনি স্যালি হিগিনস পাঁচ-নম্বর কত সহজে সব কেড়ে নিচ্ছে। তিনি জাহাজটাকে অযথা গুজবের হাতে ছেড়ে দিতে পারেন না। মনের দুর্বলতা প্রশ্রয় পেয়ে যাচ্ছে ভেবে সোজা হতে চাইলেন। তিনি সোজা হয়ে দেখলেন চারপাশে কি নিদারুণ জ্যোৎস্না, কি নীল আকাশ আর অনেক দূরে যেন সেই মহাপ্রাণ–কক্-কক্ করে ডাকছে। তিনি সাহস সঞ্চয় করছেন—কল আপন্ মি ইন দ্য ডে অফ ট্রাবল, আই উইল ডেলিভার দী অ্যাণ্ড দাউ শ্যান্ট গ্লোরিফাই মি। তিনি এবার দ্রুত নেমে গেলেন। আর বলতে থাকলেন, জাহাজটার প্রতি আপনারা কে বিশ্বস্ত বলুন। হু ইজ ফেথফুল টু দ্য শিপ। সবাই আপনারা মাস্তারে দাঁড়ান।

    এবং ওপরে কেউ আর থাকল না। সবাই যে যার মতো বোট-ডেকে মাস্তার দিলে তিনি বললেন—ইউ? ইউ? তাঁর আলখাল্লার মতো লম্বা স্লিপিং গাউন পাটাতনে লোটাচ্ছে। তাঁর কপাল ভীষণ ঘামছে। মনে শংকা তাঁর। প্রত্যেকের মুখের সামনে মশাল তুলে বললেন—ইউ? নান্। কেউ তাঁর স্বপক্ষে নেই। তিনি কেমন ভেঙে পড়ছেন! তখন ছোটবাবুর মুখ মশালের আলোতে প্রায় উদ্ভাসিত—তিনি বললেন, তুমি ছোটবাবু?

    ছোটবাবু বলল, মি ফেথফুল টু দ্য শিপ স্যার।

    —আর, আর কে! তিনি যেন ফের সাহস ফিরে পাচ্ছেন।—জ্যাক তুমি?

    জ্যাক হাত তুলে দিল। যেন বলতে চাইল ইয়েস মি ফেথফুল টু দ্য শিপ, টু ইউ অ্যাণ্ড…অ্যাণ্ড কথাটাতে সে বোধহয় ছোটবাবুকে বোঝাতে চাইল। সব মিলে যেন ছোটবাবু বাবার পাশে দাঁড়াবার মতো যথার্থ মানুষ। এবং এভাবে সে আর বিন্দুমাত্র ভয় পাচ্ছে না জাহাজে থাকতে। বাবা ছোটবাবু সে। তার আর কিছু লাগে না।

    তিনি তখন মশালের আলোতে বলে বলে যাচ্ছেন, আর, আর কে? এনি মোর? এক হাতে গাউন সামলাচ্ছেন অন্য হাতে মশাল তুলে বলছেন—ইউ? নো ফেথ্! নো…দে…ইউ…ইউ?

    —মি সাব ফেথফুল! এনজিন-সারেঙ হাত তুলে দিলেন।

    আর কেউ না, তিনি এবার ফিরে যেতে থাকলেন। আর কেউ জাহাজটার প্রতি বিশ্বস্ত নয়। তারা সহজেই তাঁকে পুড়িয়ে মারতে পারে। ভয়ে মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেলে তিনি সিঁড়িতে দ্রুত উঠে গেলেন। যেন ওরা ছুটে আসছে পেছনে। ওঁকে ধরবার জন্য হা-হা করে ছুটে আসছে। ওপরে উঠে পেছনে তাকালেন। তিনি কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। কেউ নেই। তিনি একা। একা দাঁড়িয়ে আছেন। জাহাজে একটা কাক-পক্ষী নেই। অন্তহীন সমুদ্র আর আকাশ। জাহাজটা সাঁতার কাটছে সমুদ্রে। তিনি এবার ভীষণ অহঙ্কারী গলায় বলে উঠলেন—আপনাদের ছুটি। কাল সকালে আপনারা সেল করবেন। ঈশ্বর আপনাদের সহায় হোন!

  • পঞ্চাশ

    পঞ্চাশ

    ।। পঞ্চাশ॥
    জাহাজ তেমনি সমুদ্রে ভাসমান। মাস্তুলে তেমনি জ্বলছে মশাল। ভারী নিভৃতে যেন জাহাজটা অজানা সমুদ্রে পালিয়ে আছে। পৃথিবীর সব সংযোগ হারিয়ে চুপচাপ নিশিদিন বেশ আছে সে—মনের সুখে সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে। ক্রমে জ্যোৎস্না আরও মনোহারিণী। নক্ষত্রে অধীর কুহেলিকা। এবং আকাশ সমুদ্র কোনো মরুভূমির মতো দায়দায়িত্বহীন। এতগুলো মহাপ্রাণ এই মহাসমুদ্রে এবং মহাকাশের ভেতর অবরুদ্ধ—তাদের কিছু আসে যায় না।

    ছোটবাবু বোটের নিচে শুয়ে ছিল। ওপরে যে বিস্তৃত আকাশ এবং নক্ষত্রমালা সেখানে ওর মতো কেউ যদি শুয়ে থাকে তবে দেখতে পাবে মাথার ওপরে আকাশের মতো স্থির সমুদ্র। জলরাশি নীল নীহারিকার সামিল। জাহাজ কাগজের নৌকোর মতো ভেসে ভেসে যাচ্ছে। কি যে হয়, মনে হয় দু’হাতে আকাশ ফাঁক করে কেউ যেন এক্ষুনি উঁকি দেবে—কি ছোটবাবু তুমি শুয়ে আছ? এবং যতবার চেষ্টা করছে, সেই আকাশ ছিঁড়ে যার মুখ দেখতে পাবে সে বনি। যেন বনি ক্রমে দূরবর্তী কোনো নীহারিকা- পুঞ্জের মতো অস্পষ্ট। অবিরাম সে আকাশ ছিঁড়ে ছিঁড়ে নেমে আসতে চাইছে তার কাছে। সে কিছুতেই আর বাঁধা দিতে পারছে না।

    জাহাজে সবাই যে যার ফোকসালে অথবা কেবিনে, কেউ কেউ বাংকে, কেউ ফল্কায় মাদুর পেতে শুয়ে আছে; অতীব এক কঠিন নিশুতি রাত। কলকল ছলছল শব্দ শুধু জলের। ছোট ছোট সব ঢেউ জাহাজটাকে নিয়ে বুঝি এখন খেলা করছে। সামান্য বাতাস উঠে আসছে সমুদ্র থেকে। আর সেই মশালের আলো প্রায় কখনও স্থির কখনও তির্-তির্ করে কাঁপছে। নিচে দু’একজন মানুষ ফল্কায় ঘুমোচ্ছে কি জেগে আছে সে বুঝতে পারছে না। আগামীকাল সেল করতে হবে। কাপ্তান সবাইকে ছুটি দিয়ে দিয়েছেন। যেহেতু কাল সবাইকে অজানা এক সমুদ্রে নেমে যেতে হবে, বোটে যেহেতু ঘুমোবার কোনো তেমন বন্দোবস্ত থাকবে না, যতটা পারা যায় এক্ষুনি ঘুমিয়ে নেয়া দরকার—এবং এসব ভেবে তিনি কড়া হুকুম জারি করেছেন—যার যার সামান সকালে ঠিক করে নেবেন, শুধু যতটুকু পারা যায় শেষবারের মতো ঘুমিয়ে নিন। যেন বলতে চেয়েছিলেন, নির্ভর করার মতো এই শেষ আশ্রয়। তাও আপনারা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন!

    ছোটবাবু এখন বোটের নিচে শুয়ে আছে। কড়া হুকুম সত্ত্বেও অন্ধকারে পালিয়ে এসেছিল বন্ধু, জব্বার মনু এবং এভাবে প্রায় অনেকে খুব নিচু গলায় ওরা অন্ধকারে বসে বলেছিল, ছোটবাবু তুই এমন আহাম্মক! তুই কি রে! তোর কি ভয়ডর বলে কিছু নেই। সবাই জাহাজ ছেড়ে দিচ্ছে—আর তুই কাপ্তানের শয়তানিতে ভুলে গেলি! তুই কি বলতে চাস—খুব বিশ্বাসী তুই। তুই কি বলতে চাস বড়-মালোম মেজ-মালোম তোর চেয়ে কম বোঝে! এভাবে যারা তার প্রিয় সবাই প্রায় অন্ধকারে লুকিয়ে ওর কেবিনে দেখা করতে এসেছিল। ওরা ওকে বলতে এসেছিল- —একজন মাথা খারাপ কাপ্তানের সঙ্গে থেকে যাওয়া ঠিক না। কিন্তু সবাইকে সে বুঝিয়েছিল সে যা করেছে ঠিকই করেছে। কেবল ডেবিডকে সে পারেনি। ডেবিড নিজেও ঘুমোচ্ছিল না। ক্ষণে ক্ষণে অন্ধকারে এসে ডাকছে, ছোটবাবু তুমি আমার কথা রাখো। তোমার মা-বাবার কথা ভাবো। ভাইবোনদের মুখ মনে পড়ছে না! ওরা তোমার আশায় রয়েছে—একদিন না একদিন তুমি দেশে ফিরবে।

    ছোটবাবু হেসেছিল। সে বলতে পারত ডেবিডকে, সঠিক আমি কিছু জানি না। তবু আমি এটুকু বুঝি তিনি সবচেয়ে বেশি প্রাজ্ঞ। একজন প্রাজ্ঞ মানুষের সঙ্গে থেকে যাওয়া অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।

    সে শুধু বলেছিল, ডেবিড তুমি ঘুমোতে যাও। খুব সকালে আবার তোমাদের উঠতে হবে। ডেবিড বারবার ছুটে এসেছিল, ছোটবাবু তোমাকে ফেলে যাই কি করে বলত। তারপর দু’ হাত ধরে বলেছিল, ছোটবাবু তোমাকে ফেলে গেলে আমি শান্তি পাব না। আমার খুব কষ্ট হবে ছোটবাবু। অন্ধকারে ওরা দু’জনে চুপচাপ বসে থেকেছিল। ডেবিড কিছুতেই ঘুমোতে যাচ্ছে না। সে বাধ্য হয়ে বলেছিল, আমার কাজ আছে ওপরে। আমি যাচ্ছি। এখন ওপরে যা কিছু কাজ দরকার হলে রাতে আমাকেই করতে হবে। এবং এভাবে কাপ্তানের নাম করে সে ওপরে উঠে এসেছে। ডেবিড ওপরে আসতে সাহস পাচ্ছে না। কাপ্তানের কাছে সে ফের মুখ দেখাবে কি করে—এবং এমন সব প্রতিকূল চিন্তাভাবনা ডেবিডের ভেতর আছে সে জানত। প্রায় আত্মগোপনের মতো আছে সে। ডেবিড নিজেও ঘুমোচ্ছিল না। ওকেও ঘুমোতে দিচ্ছিল না। সে এখানে চুপচাপ শুয়ে ঘুমোবে ভেবেছিল। কিন্তু ঘুম আসছে না। চোখের ওপর আকাশ আর নক্ষত্র কেবল দুলছে। আকাশ দুলে উঠলেই বুঝতে পারে সমুদ্র সামান্য মাতাল হয়েছে। সুতরাং আকাশ এবং নক্ষত্রমালা তার চোখের ওপর দুলছে। পাশে বনির কেবিন। অন্ধকার কেবিনে বনি শুয়ে আছে। যেন কান পাতলে সে বনির নিঃশ্বাসের শব্দ পাবে। সে কিছুতেই ঘুমোতে পারছে না। জাহাজে কেউ ঘুমোতে পারছে না—সকালে নেমে যাবে সবাই। সব লম্ফ স্যালি হিগিনস জমা নিয়েছেন। কেউ যে লম্ফ জ্বালিয়ে কি কি নেবে সঙ্গে রাত জেগে খুঁজবে তারও উপায় নেই। সামান্য যে তেল অবশিষ্ট তা তিনি সীল করে দিয়েছেন। সন্ধ্যার পর থেকে যে যার খুশিমতো মশাল জ্বালিয়েছে—প্রায় উপদ্রবের সামিল উচ্ছৃঙ্খল আচার-আচরণ এবং ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সবাই আর একটা কথা বলেনি। ডেক খালি করে নিচে নেমে গেছে। আর মনে হচ্ছে অন্ধকারে সবাই হাতড়াচ্ছে কোথায় কে কি রেখেছে। কেউ ঘুমোতে পারছে না। ছোটবাবু এখানে পালিয়ে এসেছে একটু ঘুমোবে বলে তারও ঘুম আসছিল না। তারপর ভোর রাতের দিকে কখন সে ঘুমিয়ে পড়েছিল টের পায় নি।

    সকালে জাহাজিদের দেখে মনে হল না ওরা কোনো বিভীষিকার ভেতর আছে। যেন খুব কাছে বন্দর। জাহাজ বন্দরে লাগবে—বন্দরে ওরা নেমে যাবে। অথবা মনে হয় জাহাজ হোমে ফিরে যাচ্ছে। বোটে ভেসে গেলেই সেই মাঠ এবং শস্যক্ষেত্র দেখতে পাবে তারা। সবাই যে যার পেটি এবং বাসো সকাল থেকে গোছাচ্ছে। নামার আগে সবার রেশন একসঙ্গে করে নেয়া হয়েছে। জাহাজে দু’টো র‍্যাফট আছে। চিফ-মেট র‍্যাফট দু’টোর জন্য স্যালি হিগিনসকে অনুরোধ জানিয়েছে এবং কথা আছে তিনটে বোট যাবে। স্যালি হিগিনস নিজের জন্য একটা রেখেছেন। যদিও তিনি এক-নম্বর বোট রাখতে পারতেন ওটা তাঁর বোট এবং যেহেতু বোট মোটরে চলে, রেখে দিলে স্বার্থপরের মতো দেখাবে। তিনি তাঁর বোট দিয়ে চার-নম্বর বোট পরিবর্তে চেয়ে নিলেন। একটা বোট কাপ্তানের জন্য রাখা দরকার। যাক সব ক’টা বোটই যে তিনি শেষ পর্যন্ত দিয়ে দেননি—এবং চিফ-মেট যেন একটু নিশ্চিন্ত—সে দৌড়ে দৌড়ে কোথায় কি লাগবে দেখছে। র‍্যাফট দু’টো মোটর-বোটের পেছনে বেঁধে নেওয়া হবে। তবে কাঠের পাটাতন বলে জল কেটে ঠিক ভেসে যেতে পারবে না, সেন্টার-বোর্ড লাগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কারপেন্টার সকাল থেকে কাঠ কেটে সেণ্টার-বোর্ড লাগিয়ে দিচ্ছে। দু’পাশে ঠিক জল কেটে তবে র‍্যাফট দু’টো বোটের সঙ্গে সমান তালে চলতে পারবে। র‍্যাফট দু’টোকে টানতে বোটের অসুবিধা হবে না। বোধহয় ছোটবাবুর করাতে কাঠ কাটার শব্দে ঘুম ভেঙে গেছিল। বেশ বেলা হয়ে গেছে। ঘুম থেকে উঠে ওর কেন যেন মনে হচ্ছিল—সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ডেকে সবাই ঠিক আগের মতো ছুটোছুটি করছে, তেমনি তেল বার্নিশের গন্ধ। তেমনি মনে হচ্ছিল ডেক-জাহাজিরা রঙের টব হাতে নিয়ে রং করতে যাচ্ছে জাহাজে। ওয়াচে যাচ্ছে মৈত্রদা, সে উইনচের নিচে কাজ করছে। বন্দর আসছে ডাঙা দেখা যাচ্ছে এমন যেন কেউ হাত তুলে বলছে। জাহাজটা ভাঙা অচল, এক অজানা সমুদ্রে তারা ভেসে বেড়াচ্ছে ছোটবাবুর যেন ঘুম থেকে উঠে একেবারেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। বুঝি বনি এই মাত্র ডাকবে, ছোটবাবু কিনারায় যাবে? ডেবিড তুমি আমি। জাহাজের মানুষগুলো কি যে স্বাভাবিক হয়ে গেছে মুহূর্তের জন্যে।

    কেবল চিফ-মেট জানে, ডেবিড এবং থার্ড-মেট বুঝতে পারে কি ভীষণ দুঃসাহসিক এই অভিযান। এখন একে অভিযান ভাবাই ঠিক হবে। এবং কে কি নিতে পারবে তার লিস্ট স্যালি হিগিনস নিচে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এবং তিনি জাহাজের সর্বত্র এই যেমন বোট খালি করে দেখে নিতে বলছেন অর্থাৎ বোট নামিয়ে দেখা দরকার কোথাও কোনো ফুটোফাটা আছে কিনা। শুকনো খাবার সব ঠিকঠাক আছে কিনা। র‍্যাফট দু’টোতে ওরা বোঝাই করছে এখন ওদের বাকি রেশন। কাপ্তান স্টোর-রুমে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে যার যা রেশন সমান ভাগে দিয়ে দিচ্ছেন। এগুলো দড়ি দিয়ে এখন নিচে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। র‍্যাফটের চারপাশে কাঠ লাগিয়ে নেওয়া হয়েছে। একটা চৌকোনা বড় ভাসমান বাসোর মতো দেখতে এবং যেহেতু সেন্টার-বোর্ড লাগিয়ে নেওয়া হয়েছে সেজন্য জলের ওপর কাৎ হয়ে যাচ্ছে না। বরং দুলে দুলে দু’টো র‍্যাফট যেন জলের ওপর মাতালের মতো টলছে।

    সকালে শেষ চর্বি ভাজা রুটির গন্ধ পাওয়া গেল। দুপুরে শেষ চাল ডাল সেদ্ধ খিচুড়ির গন্ধ পাওয়া গেল। সবাই ডেকের ওপর বসে গেছে। যেহেতু চাল ডাল শুকনো এবং পচে যায় না, জাহাজে শুধু চাল ডাল অবশিষ্ট। রেশন বলতে এখন এই চাল ডাল কিছু টিন ফুড। টিন-ফুড অফিসারদের রেশন। জ্যাম জেলি কিছু আছে। পচা খাবার শেষ পর্যন্ত পচতে পারেনি। স্যালি হিগিনসের হুকুমে সবাই এতদিন জাহাজে শুধু মাংস খেয়ে জীবনধারণ করেছে। তারপর ফলমুল। এবং এই চাল ডাল যেহেতু শেষদিনের সম্বল তিনি খুব কিপটের মতো টিপে টিপে খরচ করেছেন। আজ সেই মানুষ খুব অমায়িক। পেট-ভরে খাবার। অর্থাৎ যাবার আগে কতদিন পর পেট ভরে খাবার যেন। চাল- ডাল সেদ্ধ পাতলা প্রায় স্যুপের সামিল করে দেওয়া হয়েছে সাহেবদের—যেন সবাই সমুদ্রে ছুটির দিন কাটাতে এসেছে—কথাবার্তায় ছোটবাবুর এমনই মনে হচ্ছে। বনির জন্য ছোটবাবু আরও এক বাটি স্যুপ চেয়ে নিয়েছে। কেন জানি অন্যদিনের চেয়ে পাতলা খিচুড়িটা খেতে আজ বেশি মনোরম। সামান্য এলাচ দানা ফেলে দেওয়া হয়েছে। ছোটবাবু একটা পোড়া শুকনো লংকা পেয়ে গেল। আরে, একটুকরো আলু। মেপে দেওয়া হচ্ছে না। যার যত লাগে খাও। ভাবা যায় না। ষাট-পঁয়ষট্টি জন জাহাজি ডেকের ওপর পাত পেতে খাচ্ছে। বন্ধু একটা বড় রকমের ঢেকুর তুলছে। ওর যেমন স্বভাব খেয়ে-দেয়ে হাত চাটা, আজ আবার অনেক দিন পর সে হাত চাটছে। পিছিলে হাত ধোওয়া যাচ্ছে না। জল পরিমাপ মতো আছে। এনজিন-সারেঙ সবাইকে এক মগ করে জল দিচ্ছে—হাত ধোওয়া এবং খাওয়া, একবিন্দু বেশি চাইলে পাওয়া যাবে না।

    স্যালি হিগিনস, চিফ-মেট স্যামুয়েল, সেকেন্ড-মেট ডেবিড এবং থার্ড-মেট, তাছাড়া এনজিনিয়ার তিনজন এবং ছোটবাবু সবার সঙ্গে আজ এক লপ্তে বসে খেয়েছে। সবকিছু স্যালি হিগিনসের নির্দেশমতো হচ্ছে। কে বলবে গতকাল এই মানুষ ভীষণ অহংকারী ছিলেন, ভয়ে ওপরে উঠে কেউ কথা বলতে পর্যন্ত সাহস পায় নি। আজ এই মুহূর্তে মানুষটা একেবারে অন্যরকম। চিফ-মেটকে এক দন্ড ফুরসৎ দিচ্ছেন না। সারাক্ষণ একজন পরিবারের অভিভাবকের মতো তিনি। কে কি নিতে ভুল করেছে, বোটে কি আছে, আর কি লাগবে? সামান কি কি যাবে, কি কি যাবে না? যতটা পারা যায় খাবার আর জল। কিন্তু ইচ্ছে করলেই খাবার আর জল প্রচুর দেওয়া যাচ্ছে না। তবু বড় বড় চারটে ড্রাম ভর্তি করে জল নিচে নামানো হচ্ছে! বলতে গেলে দুটো র‍্যাফটের একটাতে খাবার, অন্যটাতে জল। প্রথম বোট আগে দু’নম্বর বোট পেছনে, তার পেছনে তিন-নম্বর বোট এবং একেবারে শেষে র‍্যাফট দু’টো। হাসিলে বাঁধা থাকবে একের পর এক। ঝড়ে-ঝঞ্ঝায় অথবা যখন খাবার, জল সব ফুরিয়ে আসবে- কেবল উত্তপ্ত জলরাশি আর সমুদ্রের মরীচিকা বাদে কিছু দেখা যাবে না, তখন যেন চিফ-মেট স্যামুয়েল অন্তত চিৎকার করে সবাইকে বলতে পারেন—দ্য লর্ড ইজ আওয়ার স্ট্রেংথ অ্যান্ড আওয়ার প্রেইজ। কারণ এতগুলো মানুষকে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব এখন থেকে তার। তাদের ভরসা-নির্ভর বলতে সে। ঈশ্বরের নামে সব ভেঙে-পড়া জাহাজিদের প্রাণে সাহস সঞ্চার করতে না পারলে পরস্পর মাংস খুবলে খাবে। তিনি স্যামুয়েলকে শেষ পর্যন্ত নিভৃতে ঘরে ডেকে নিলেন। সবাই দাঁড়িয়ে বোট-ডেকে। তিনটে বোট নিচে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। সূর্য সমুদ্রে হেলে পড়েছে। সঙ্গে কেউ বিশেষ কিছু নিতে পারছে না। সামান ছোটবাবুর জিম্মায় রেখে ঠিকানা রেখে গেছে সবাই। ছোটবাবু দেশে ফিরে গেলে সব সামান যেন নিয়ে যায়। ডেবিড একটা কথা বলছে না। ছোটবাবুর দিকে তাকাচ্ছে না ডেবিড। সে রেলিঙে একাকী চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ওকে খুব দুঃখী এবং বিষণ্ন দেখাচ্ছে।

    স্যামুয়েল আগে নেমে আসছে। পেছনে স্যালি হিগিনস। ছোটখাটো একটা বক্তৃতা করবেন বোধহয়। এতক্ষণ ওরা ভেতরে কি যে করছিল! সময় হাতে কম। স্যামুয়েল বার বার শেষবার অনুরোধ করেছিল, স্যার সবার হয়ে আমার অনুরোধ, একবার যদি ভেবে দেখতেন জাহাজে এভাবে থেকে যাওয়া আপনাদের উচিত হচ্ছে কিনা। স্যামুয়েলের কথায় তিনি বিন্দুমাত্র দুঃখ অথবা রাগ প্রকাশ করেননি। স্বার্থপরের মত ওরা নেমে যাচ্ছে। এখন তাঁকেও অনুরোধ করছে ছোটবাবু, জ্যাক, এনজিন-সারেঙকে নিয়ে নেমে যেতে। তিনি স্যামুয়েলকে ভীষণ অমায়িক গলায় এতক্ষণ বুঝিয়েছেন। স্যামুয়েল মনে কোন দুঃখ রাখবে না এমন বলছেন। আমি তো ওকে ছেড়ে যেতে পারি না। এত দিনের বিশ্বস্ত জাহাজ এমন বলতে পারতেন অথচ সে-রকম কিছু তিনি বলেননি। স্যামুয়েল বুঝেছিল নিরর্থক। সে শেষ পর্যন্ত নেমে এসেছে। পেছনে স্যালি হিগিনস নেমে এলে ফাইলে সবাই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকল। তিনি সবার সঙ্গে হ্যান্ড-শেক করলেন। কথা বললেন দু’টো-একটা। তোমরা তাহলে সবাই অন্ ইওর ওন হয়ে।

    স্যালি হিগিনসের গায়ে পুরো কাপ্তানের পোশাক। সাদা হাফ-শার্ট, সাদা হাফ-প্যান্ট, সাদা মোজা, সাদা জুতো, নীল রঙের এংকারের টুপি। সোনালী স্ট্রাইপ কাঁধে ঝকঝক করছে তেমনি। মুখে সাদা দাড়ি। তিনি ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছিলেন। বলছিলেন, এখন আপনাদের আমি শুধু একটা কথাই বলতে পারি—ঈশ্বর মঙ্গলময়। তাঁর করুণার শেষ নেই। সব হারালেও তাঁর ওপর আপনারা বিশ্বাস হারাবেন না। এইটুকু বলে হাত তুলে দিলেন। যেন সেই বলা—হাই। বিদায়। বিদায় বন্ধুগণ।

    তারপরের দৃশ্য দেখা যায় না। নেমে যাবার আগে ডেবিড ছোটবাবুর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে এসে একেবারে ভেঙে পড়ল। সে ছোটবাবুকে জড়িয়ে কাঁদছে। ছোটবাবু তুমি কোথাকার ছোটবাবু জানি না, তুমি যদি বেঁচে থাক যদি আমি বেঁচে থাকি দেখা হবে। ঠিক দেখা হবে ছোটবাবু। দেশের অনেক কিছু ভুলে ছিলাম হে ছোটবাবু! তুমি আমার পাশে ছিলে এতদিন। এখন আমার তাও থাকল না। এবং বঙ্কু আর যারা যেখানে ছিল সবাই এনজিন-সারেঙ ও ছোটবাবুর সঙ্গে আলিঙ্গন করে গেল। ওরা নেমে গেল বোটে। স্যালি হিগিনসও দড়ি ধরে নেমে গেলেন। কেন যে বুড়ো মানুষটা এমনভাবে নেমে যাচ্ছেন! তিনি তিনটি বোটেই লাফিয়ে লাফিয়ে এ-মাথা ও-মাথায় হাঁটাহাঁটি করছেন। বোট দুলছে। সমুদ্রের জলে বোট ভীষণ দুলে উঠছে। কোথায় কি রাখা হয়েছে, ঠিকমতো রাখা হয়েছে কিনা, আচ্ছা স্যামুয়েল—সব গীয়ার তুমি এদিকটায় রেখেছ কেন? ভাগ ভাগ করে দাও, তা হলে তোমাদের বসতে সুবিধা হবে।

    দু’নম্বর বোটে গিয়ে বললেন, ডেবিড়, কি মন খারাপ কেন? আরে আমরা দেখবে তোমাদের আগে পৌঁছে যাব। দ্যাখো না কে আগে যায়। তুমি ভাবছ আমাদের সমুদ্রে ফেলে যাচ্ছ। একদম এসব ভাববে না। ডেবিড নতজানু হয়ে গেল স্যালি হিগিনসের সামনে। মাথা নিচু করে বসে থাকলে স্যালি হিগিনস বললেন, তোমাদের বিশ্বস্ততার শেষ নেই ডেবিড। শেষ নেই। আবার আমাদের ব্যারি স্ট্রীটে দেখা হবে। তখন যদি তুমি মুখগোমড়া করে রাখ ত একদম তাড়িয়ে দেব।

    ডেবিডের দু’চোখ বেয়ে শুধু জল ঝরছে। মহান ঐতিহ্যবাহী এই মানুষ। মানুষের সব বিশ্বস্ততার প্রতীক তিনি। তাঁকে সে গতকাল কি যে অপমান করেছিল! সে বলল, স্যার আমার মাথা ঠিক ছিল না।

    তিনি বললেন, কারো থাকে না। তোমরা এভাবে বসেছ কেন? পাশাপাশি বস। দ্যাখো কত জায়গা। হিগিনস নিজ হাতে সব গুছিয়ে দিতে দিতে বললেন, আরে লণ্ঠনটা এত নিচে রেখেছ কেন? ওটা কাছে রাখো! হাতের কাছে দরকারের সময় খুঁজে পাবে না। দু’টো বাকেট। একটার ভেতরে আর একটা ভরে রাখো।

    তারপর তিন-নম্বর বোটে উঠে গেলেন। সবাই উঠে দাঁড়ালে বললেন, বোস। আচ্ছা থার্ডমেট, তোমার অয়েল-ব্যাগ ঠিক আছে তো? খুব সাবধান। কেরোসিনের ফাইল?

    —স্যার সব ঠিক আছে।

    –ঠেলেঠুলে নিচে ঢুকিয়ে নাও। ওপরে কিছু রাখবে না। শেষে তিনি দড়ির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলেন। ওরা চারজন—জ্যাক, ছোটবাবু, এনজিন-সারেঙ, স্যালি হিগিনস এবার সমুদ্রে আকাশের নিচে হাত তুলে দিলেন—দড়ি ফেলে দেওয়া হল নিচে। ওরা দড়ি লুফে তুলে নিল। মোটর-বোট দু’টোই গর্জে উঠল। জলের ভেতর সাদা ফেনা তুলে ধীরে ধীরে যেন একটা কনভয় গভীর সমুদ্রে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। ওরা চারজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। ওরা ক্রমে ছোট হয়ে যেতে থাকল। এবং বিন্দুবৎ হয়ে আসার মুখে ছোটবাবু দেখছে দূরে আবার একটা বিন্দু ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ক্রমশ বড় হয়ে যাচ্ছে। সকাল হলেই এলবা কোথায় চলে যায়। সারাদিন পর সন্ধ্যা হলে এলবা ফিরে আসে। ছোটবাবু বুঝতে পারছে বিন্দুবৎ যে ভেসে আসছে বাতাসে সে এলবা, আর কেউ নয়। এলবা ক্রমশ আকাশের ওপর সেই অতিকায় পাখি হয়ে যাচ্ছে। ওরা চলে যাওয়ায় যে নিঃসঙ্গতা জাহাজে চেপে বসেছিল, এলবা যেন কক্-কক্ করে ডেকে মুহূর্তে সব দূরে সরিয়ে দিল। এলবার খাবার সে রেখে দিয়েছে। এলবাকে দেখেই নিচ থেকে খাবার ছোটবাবু নিয়ে এসে ডাকল, এল…বা। খেতে এস। এলবা দু-পাখা ছড়িয়ে এই প্রথম বোট-ডেকে একেবারে পায়ের কাছে উপুড় হয়ে পড়ল। আর গর্ গর্ করে সব খাবার গিলে ফেলতে থাকল।

    এত কাছে থেকে ছোটবাবু এলবাকে যেন আর কখনো দেখে নি। কোনো ভয়ডর নেই এলবার। বনি আর সে দাঁড়িয়ে আছে। নিচে বড় একটা মাটির পাত্রে পাখিটার খাবার। পাখিটা আজ পেট ভরে খাবার পেয়েছে। কিছু পাতে পড়েছিলো কারো কারো। ছোটবাবু তাও তুলে রেখেছিল এলবার জন্য। এলবা খেতে খেতে দু’বার ঘাড় বাঁকিয়ে দেখেছে ওদের। পাখা ছড়িয়ে বসলে প্রায় বারো চোদ্দ ফিট লম্বা পাখা, এখন গুটিয়ে রেখেছে। গুটিয়ে রাখলে বোঝা যায় না বাতাসে ডানা মেলে দিলে কখনও এমন অতিকায় দেখাতে পারে। হাঁসের মতো ওর হলুদ রঙের পা পেটের দিকটা কি সাদা আর হাঁসের মতো নরম এবং যেন হাত দিলেই পাখিটা একটা ডিম পারবে। সোনালী রঙ সারা পিঠে ঠোঁট প্রায় কবুতরের মতো—আর কী গভীর নীল চোখ! ছোটবাবু আর বনির প্রতিবিম্ব চোখের মণিতে প্রায় এখন নাচানাচি করছে।

    বনি বলল, কী পেট ভরেছে?

    এলবা ঘাড় বাঁকিয়ে বনিকে দেখল। যেন বলছে, খুব। খুব খেলাম।

    ছোটবাবু বলল, ওদের সঙ্গে গেলে না কেন?

    এলবা খেতে গিয়ে যা আশে পাশে ছড়িয়ে পড়েছিল এখন ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে। ছোটবাবুর দিকে তাকাল না। ছোটবাবুর সঙ্গে কোন কথা বলল না।

    বনি এবার ছোটবাবুকে জড়িয়ে ধরল আনন্দে, এলবা আমাকে বেশি ভালবাসে। এলবা তোমাকে ভালবাসে না।

    ছোটবাবু বলল, বনি। প্লিজ। নিচে বুড়ো দাঁড়িয়ে আছে।

    বনি তাড়াতাড়ি সরে দাঁড়াল। ওর মনেই থাকে না কেউ পাশে থাকতে পারে। এনজিন-সারেঙ আসছেন। স্যালি-হিগিনস উঠে আসছেন। পাখিটার খাওয়া শেষ। সে উড়ে যাচ্ছে। ছোটবাবু ডেক সাফ করে রাখছে। আর তখন সূর্য অস্ত যাবে। বোট অথবা কোনো কিছু আর সমুদ্রে ভেসে নেই। সেই একঘেয়ে আকাশ আর নক্ষত্র। সমুদ্রে জ্যোৎস্না। ঝাঁক ঝাঁক সব সামুদ্রিক মাছ। অতিকায় হাঙ্গর ছুটে যাচ্ছে, আর পেছনে সব পাইলট মাছ অথবা সেই সব র‍্যামোরা মাছের আস্তানা এখন জাহাজের পুরো খোলটা। জাহাজের খোলে বোধহয় ধীরে ধীরে শ্যাওলা গজাতে শুরু করেছে। কারণ জাহাজ থেমে থাকলে শ্যাওলায় ঢেকে যাবে খোলটা। ছোটবাবু বনির দিকে ভয়ে তাকাতে পারছে না।

    আর তখন স্যালি হিগিনস বললেন, ছোটবাবু এদিকে এস। বনি এদিকে এস। বলে তিনি ওদের নিয়ে গোল হয়ে বসলেন। চুপচাপ। সমুদ্রে নিঃসঙ্গ চাঁদ, তার ছায়া জলে ভেসে যাচ্ছে।

    ছোটবাবু বলল, স্যার ক্রোজ-নেস্টে আলো দিয়ে আসছি। ক্রোজ-নেস্টে মশালে আগুন দিয়ে আসছি সে বলতে পারত। কিন্তু আগুন দিয়ে আসছি কথাটার ভেতর কেমন অমঙ্গলজনক কথাবার্তা থাকে। বরং আলো দিয়ে আসছি কথাটা ভারী পবিত্রতায় ভরা। সেই সন্ধ্যার সময় শীতের মাঠে দাঁড়িয়ে শঙ্খের শব্দের মতো অথবা দূরে খুব দূরে কোনো মন্দিরে ঘন্টাধ্বনি হলে যা হয়ে থাকে—সেই এক সুদূর পবিত্রতা মনে মনে ছোটবাবু অনুভব করছিল। সে মাস্তুলে আলো জ্বেলে ফিরে এল। মাথার ওপরে চাঁদ আর সমুদ্রের ঘন নীল কুয়াশা ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে আসছে। কেমন সেই অস্পষ্ট কুয়াশায় ওরা ঢেকে যাচ্ছিল। ছোটবাবু ফিরে না আসা পর্যন্ত স্যালি হিগিনস আরম্ভ করতে পারছিলেন না। সে এসে পাশে দাঁড়াতেই বললেন, বোস।

    ডেক-চেয়ারে বসেছিলেন তিনি। প্রাচীনকালের কোনো মানুষের মতো, প্রফেট যেন তিনি। অর্থাৎ এমন মুখ গম্ভীর যেন এক্ষুনি তিনি বলবেন, ছোটবাবু কাল আমরা ডাঙা পাচ্ছি। কাল আমরা বন্দর পাব। সেখানে আমাদের জন্য থাকবে প্রচুর সুস্বাদু খাবার, থাকবে ঠান্ডা পানীয় এবং সুপেয় জলের হ্রদ। তুমি বনি সেই ঠান্ডা জলে সাঁতার কেটে দারুণ আরাম পাবে। এবং গভীর পাইনের বন। ইচ্ছে করলে সবুজ পাইনের বনে তুমি বনিকে নিয়ে সামান্য ঘুরেও আসতে পার।

    স্যালি হিগিনস বললেন, এনজিন-সারেঙ তোমার কি মনে হয়।

    —কী স্যার!

    —থেকে ভাল করলাম তো।

    —খারাপ কিছু তো বুঝতে পারছি না।

    —কবে ডাঙা পাব কেউ যখন জানে না….!

    বনির মুখ দুশ্চিন্তায় কেমন কালো হয়ে গেল। বলল, বাবা আমরা আর ডাঙা পাব না?

    —ঠিক পাব। কোনো ভয় নেই। ছোটবাবু এখন আর বসে থাকা আমাদের কাজ নয়। ছোটবাবু তোমাকে একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের ওয়াচ ভাগ করে নাও। কে কি করবে ঠিক করে নাও।

    ছোটবাবুকে সহসা কেমন সমস্যার ভেতর ফেলে দিয়েছেন কাপ্তান। সে বিন্দুমাত্র বিচলিত বোধ করল না। সে খুব দৃঢ় গলায় বলল, স্যার সন্ধ্যা ছ’টা থেকে রাত বারোটা আপনার ওয়াচ। রাত বারোটা থেকে সকাল ছ’টা, চাচা আপনার ওয়াচ। আর সকাল ছ’টা থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত আমার।

    সে আর দাঁড়াল না। পকেটে টর্চ নিয়ে নেমে গেল। তারপর সিঁড়ি বেয়ে সোজা মাস্তুলের ডগায় ক্রোজ-নেস্টে উঠে দেখল কিভাবে এখানে সামান্য বসার জায়গা করে নেয়া যায়। দিনমানে মাস্তুলে মশাল জ্বলে না। সকাল হলেই উঠে আগুন নিভিয়ে দিতে হয়। সে পাশে আর একটু জায়গা পেলে বসার জায়গা করতে পারত। মাস্তুলের ডগায় বসে দূরবীনে চারপাশটা লক্ষ্য রাখতে তবে অসুবিধা হয় না। সে বুঝতে পারল হাত-পা মুড়ে সারাদিন এখানে বসে থাকা যাবে না। তার চেয়ে ফলঞ্চা বেঁধে নিলে সুবিধা হবে। প্রায় আকাশের নিচে দোল খাবার মতো একটা তক্তা ঝুলিয়ে নিলে সময়ে অসময়ে বনি এখানে উঠে পাহারা দিতে পারবে।

    ছোটবাবু মাস্তুলের গোড়ায় নেমে দেখল বনি মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার স্বভাব ভারি অদ্ভুত। কি এমন হল, সে বুঝতে না পেরে চিৎকার করে উঠল, কি হয়েছে বনি। মুখ ভার করার কি হল?

    বনি কেমন অভিমানের গলায় বলল, আমি বুঝি কেউ না জাহাজে!

    —তা তো বলি নি।

    —আমাকে কি করতে হবে? সবাই তোমরা কাজের, আমি বুঝি কোনো কাজের না!

    সে বুঝতে পেরে হেসে দিল। বলল, বনি তোমার অনেক কাজ। তোমাকে আমাদের খাওয়ানোর দায়িত্ব। কি ভাবে কি করবে সব দেখে নাও। আমাকে যখন তখন ডাকবে না। বলে সে স্টোররুমের চাবি কাপ্তানের কাছ থেকে চেয়ে নিতে বলল।

    এবং ছোটবাবু আর দাঁড়াল না। রাতের ভেতর সে মাস্তুলের ডগায় ফলঞ্চা বাঁধার জন্য কাঠ সংগ্রহ করতে এনজিন-রুমে নেমে যাবে ভাবল। এনজিন-কশপের স্টোর রুম থেকে দড়ি-দড়া বের করতে হবে। একটা লম্বা তক্তা বের করতে হবে। সে এলি-ওয়ের অন্ধকারে ঢুকতেই কেমন গা ছমছম করতে থাকল। সব খালি কেবিন। এবং অন্ধকারে টর্চ ফেলে সে এগুচ্ছে। সে যতটা পারছে অন্ধকারে নামার চেষ্টা করছে। কোথাও থেকে কোনো বিদঘুটে শব্দ ভেসে এলে টর্চ জ্বালছে। আর আশ্চর্য মনে হচ্ছে সর্বত্র নড়বড়ে জাহাজ—ক্যাঁ কোঁ এমন শব্দ যেন ঝিঁঝিঁ পোকার মতো ডাক। কখনও দরজা ঠাস করে কে বন্ধ করছে। আর্চির সেই ফেটে বের হয়ে আসা চোখ যেন তার পেছনে পেছনে আসছে। এ-সব মনের দুর্বলতা, এমন কি নিঃশ্বাসের শব্দ আর মনে হচ্ছে দৌড়ে কে পালাচ্ছে—সে মুহূর্তে টর্চ জ্বাললেই দেখতে পেল পাঁচ-নম্বরের দরজা খোলা। দু-চারটে ইঁদুর দৌড়ে পালাচ্ছে, দু’টো একটা আরশোলা দেয়াল বেয়ে নেমে আসছে—যেন এক পরিত্যক্ত বাসভূমি—সে সহজে নিচে নেমে যেতে পারল না। দরজা লক্ করে পরিত্যক্ত কেবিন এবং এলিওয়ের অন্ধকারে ঘুরে বেড়াবে ভাবল। অন্ধকারে ঘুরে সাহস সঞ্চয় করবে। কোনো অশুভ প্রভাবকে সে আমল দেবে না। দিলে মনের দুর্বলতা প্রশ্রয় পেয়ে যাবে।

    তখন কাপ্তান এনজিন সারেঙকে বললেন, তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি। এখন ভাবছি বলা উচিত। জাহাজে এখন আমরা চারজন। একটা গোপন খবর আছে জাহাজে, খবরটা তুমি জান না। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে তোমার জানা উচিত। তুমি জানলে এ-জাহাজে সে মুক্ত হয়ে যাবে। তার আর কোনো বাধা থাকবে না।

    এনজিন-সারেঙ সামনে সোজা দাঁড়িয়ে আছেন। কাপ্তানের মুখোমুখি বসতে তাঁর ভারি সংকোচ। যেন তিনি সামনে হাঁটু মুড়ে বসে কথা বললে এত বড় মানুষটাকে অপমান করা হবে। তিনি দাঁড়িয়ে থেকে দু একটা কথা ভাঙা ইংরেজীতে বলছিলেন। স্যালি হিগনিস খুব ধীরে ধীরে কথা বলছেন। সারেঙের বুঝতে যেন এতটুকু অসুবিধা না হয়। তবু মুখ দেখে বুঝতে পেরেছেন তিনি সব কথা তাঁর বুঝতে পারেন নি। তিনি এবার আরও সহজ করে বললেন, জ্যাক ছেলে নয়। মেয়ে। ওকে আমি জাহাজে ছেলে সাজিয়ে রেখেছি। জ্যাক মাঝে মাঝে ছেলের পোশাকে হাঁপিয়ে উঠলে গোপনে বোধহয় মেয়ের পোশাক পরে গভীর রাতে ডেকে ঘুরে বেড়াতো। কেউ কেউ পরী দেখতে পেত। বলে তিনি থামলেন।

    সারেঙ-সাব বললেন, ওম্যান স্যার।

    —ইয়েস ওম্যান। শী ইজ ওম্যান নাউ।

    সারেঙ-সাব বললেন, জী, ছোটবাবু তো সাব ম্যান হয়ে গেছে। যেন বলতে চাইলেন বনি ওম্যান হলে ছোটবাবু ম্যান। ছোটবাবু টের পেলে যদি কেলেঙ্কারী করে ফেলে কিছু—তবে অসম্মান তাঁর। ছোটবাবু কোনো খারাপ কাজ করে ফেললে তাঁর আর মুখ দেখাবার জায়গা থাকবে না।

    স্যালি হিগিনস বললেন, ছেলে খুব সেয়ানা। সে আগেই টের পেয়ে গেছে। তার জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না।

    ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো সারেঙ-সাব হাল্কা হয়ে গেলেন। জেনেও যখন কিছু করে নি, কাপ্তানের যখন বিশ্বাস আছে ছোটবাবুর ওপর তখন তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না।

    স্যালি হিগিনস বললেন, আমি ভাবছি বনি এবার থেকে জাহাজে আর যে ক’দিন আছে মেয়ের পোশাক পরবে। তুমি কি বল?

    —জী সাব, পরবে বৈকি। সারেঙ-সাবের নামাজের সময় হয়ে যাচ্ছে। তিনি বললেন, আমি যাই সাব।

    —দাঁড়াও। তিনি জোরে ডাকলেন, বনি। বনি এদিকে এস। এই প্রথম বাবা তাকে জাহাজে বনি বলে জোরে ডাকছেন। বনির ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল। সে বলল, যাই বাবা।

    কাছে গেলে তিনি বললেন, তোমার কথা সারেঙকে জানিয়ে দিলাম। তুমি গাউন পরে এস। আমরা তোমাকে দেখি।

    বনির হাত-পা ভীষণ কাঁপছিল। সে যেন কেবিন পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারবে না। এতদিন ছেলের মতো জাহাজে তার বেশ দিন কেটে গেছে। সে মেয়ের মতো এবার থাকবে। মেয়েরা কিভাবে হেঁটে যায়—অথবা লজ্জা-সংকোচ এবং সুষমা বলতে যা-কিছু সব সে ঠিক ঠিক আয়ত্তে রাখতে পেরেছে কিনা, এসব চিন্তায় সে কেমন সব গুলিয়ে ফেলছে।

    স্যালি হিগিনস বললেন, কী দাঁড়িয়ে থাকলে কেন? যাও। পকেট থেকে টর্চ বের করে দিলেন। বললেন, লম্ফ জ্বালিয়ে নাও। তুমি জাহাজে কত বড় হয়ে গেছ আমরা দেখব না?

    বনি টর্চ নিয়ে প্রায় ছুটে পালিয়ে গেল। সে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। আলো ফেলে সে লকারের চাবি খুঁজছে। আর ভীষণ ঘামছিল। এই প্রথম সে টের পাচ্ছে সবার সামনে তার প্রিয় পোশাক পরে দাঁড়াতে ভারী সংকোচ। সে তবু লকার খুলে সবচেয়ে দামী গাউন বের করল। পোর্ট-হোল থেকে গলে পড়ছে সাদা জ্যোৎস্না। আলো জ্বালতেই জ্যোৎস্না সরে গেল। আলোতে নিজেকে ভারী মহার্ঘ ভেবে আয়নায় নিজেকে দেখতে থাকল। খুব বেশি উগ্র দেখাচ্ছে সবকিছু। তাড়াতাড়ি পোশাক পাল্টে ফেলল, এবং সাধারণ একটা নীল রঙের গাউন পরে দাঁড়িয়ে থাকল। দরজা পর্যন্ত সে কোনরকমে হেঁটে এসেছে। আর তার পা সরছে না। দু’জন বুড়ো মানুষ তাকে দেখবেন বলে ডেকে অপেক্ষা করছেন। সে অতদূরে হেঁটে কিছুতেই যেন আর যেতে পারবে না। তার আগেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়বে অথবা পড়ে যাবে।

    স্যালি হিগিনস তখন ডাকছেন—বনি, এত দেরি কেন? তাড়াতাড়ি এস।

    কোনো জবাব নেই। সমুদ্রে ছোট ছোট ঢেউ। উঠছে। ভেঙে যাচ্ছে। ভোঁস করে ভেসে উঠছে কোনো সামুদ্রিক প্রাণী। তাদের নিশ্বাস ফেলার শব্দ শোনা যাচ্ছে। তিনি ফের ডাকলেন, বনি এস সারেঙের নামাজের সময় পার হয়ে যাচ্ছে।

    সারেঙ-সাব বললেন, সরম লাগছে সাব। সারাটা সফর জাহাজে দুষ্টুমী করেছে, এখন মেয়ে হয়ে গেলে দুষ্টুমী করতে পারবে না। খুব বিপাকে পড়ে গেছে।

    স্যালি হিগিনস বললেন, কি ব্যাপার? কোনো সাড়াশব্দ নেই? এস তো সারেঙ। দেখি ও কি করছে? তারপর দারজার সামনে এসে থামতেই কেমন অবাক। বনি দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। ওর মুখ দেখা যাচ্ছে না। হিগিনস বললেন, লাইট। যেন জোরে হেঁকে উঠতেন—মোর লাইট, সারেঙ লম্ফটা নিয়ে এলে প্রায় ওরা দুই ফেরেস্তার সামিল যেন, লম্ফের আলোতে যুবতীর মুখ দেখছেন। মুখে কপালে যুবতীর বিন্দু-বিন্দু ঘাম। লজ্জায় চোখ বুজে আছে। সারেঙ-সাব তখন ডাকলেন, ছোট্‌সাব আপনি কি খুবসুরত!

    স্যালি হিগিনস নুয়ে মুখের কাছে প্রায় মুখ নিয়ে ডাকলেন, বনি, আমার বনি, বনি তাকাও।

    বনি কিছুতেই বাবার দিকে তাকাতে পারছে না। যেন বনির এতবড় গোপন ঐশ্বর্যের খবর পৃথিবীতে এবার প্রচার হয়ে গেল। বনি সেদিনও ভারী ছোট্ট, জাহাজে থেকে থেকে সে কখন যুবতী হয়ে গেছে। যুবতী হয়ে গেলেই সুন্দর সব দৃশ্যমালা—কোনো মনোরম উপত্যকায় ফুল ফোটার মতো। স্যালি হিগিনস এত ঝুঁকে মেয়েকে দেখছিলেন যেন মনে হয় উপত্যকায় ফুল সত্যি যথাযথ এবার ফুটেছে, না এখনও ফুল ফুটতে সময় লেগে যাবে।

    সারেঙ-সাব বললেন, কি মনে হয় সাব?

    হিগিনস বললেন, ভাল। খুব ভালো।

    আর এই সমুদ্রে দুই বুড়োর হাতে লম্ফ সামনে রূপবতী কন্যা। হাজার হাজার মাইল ব্যাপ্ত আকাশের নিচে, সমুদ্রে অথবা কঠিন বিভীষিকার ভেতর যুবতী ইহকাল পরকালের মতো। আর এক অপোগন্ড তখন ডেকে কাঠ চিরে যাচ্ছে। মাস্তুলে ফলঞ্চা বাঁধতে না পারলে সারা দিনমান পাহারায় থাকা যাবে না। যেন প্রায় শপথের সামিল। স্যালি হিগিনস তখন জোরে হাঁকলেন, ছোট বা……!

    ছোটবাবু বহুদূর থেকে যেন জবাব দিচ্ছে—যাই স্যার।

    —স্কাউড্রেল, এখানে দেখে যাও। তুমি অপোগণ্ড কত সেয়ানা দেখি।

    ছোটবাবু কাছে এসে ঘাবড়ে গেল। বনি মেয়ের পোশাক পরে আছে। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দরজায় দু’বুড়োর হাতে লম্ফ। ঠিক মুখের ওপর ওরা লম্ফ ঝুলিয়ে রেখেছে। দূর নীহারিকার কোনো গ্রহনক্ষত্রের দরজায় দাঁড়িয়ে যেন তারা বনিকে সন্তর্পণে দেখছে।

    তখনই স্যালি হিগিনস বললেন, কী চিনতে পারো?

    ছোটবাবু বলতে পারল না, হাঁ চিনি। সে সমুদ্র দেখতে থাকল।

    হিগিনস কেমন ক্ষেপে গেছেন মতো। বললেন, চিনতে পারছো না?

    ছোটবাবু সমুদ্র দেখতে দেখতেই যেন খুব অন্যমনস্ক গলায় বলল, হ্যাঁ চিনি স্যার।

    —হিগিনস পরিবারের শেষ নোঙর।

    ছোটবাবু বলল, জানি স্যার।

    তারপর সহসা স্যালি হিগিনস ফু দিয়ে দু’টো লম্ফই নিভিয়ে দিলেন। আবার সেই মরা জ্যোৎস্না সমুদ্রে, ডেকে জ্যোৎস্না, মাস্তুলের ছায়া ডেকে লম্বা হয়ে পড়েছে, কিছুটা সমুদ্রে ভেসে গেছে। আর ওরা চারজন কেমন এক রহস্যময় সমুদ্রে দাঁড়িয়ে চুপচাপ অনেক দূরে এক দল নিরীহ ডলফিনের আর্তনাদ শুনতে পেল। বোধহয় ভেড়ার পালে বাঘ পড়ার মতো অতিশয় হিংস্র হাঙরেরা পেছনে লেগেছে। কাছাকাছি এলে ঠিক দেখা যেত সমুদ্রের জল আর নীল থাকছে না। ধীরে ধীরে রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছে সবকিছু।

    তারপর স্যালি হিগিনস ওপরে উঠে গেলেন। তাঁর ডিউটির সময় পার হয়ে যাচ্ছে। শুধু এখন চুপচাপ জ্যোৎস্নায় দাঁড়িয়ে থাকা। বারোটার পর আসবে সারেঙ। ঠিক ব্রীজে উঠে যাবার জায়গায় সে থাকবে। অন্তত বুড়ো মানুষের পক্ষে এর চেয়ে উঁচুতে দাঁড়াবার আর জাহাজে জায়গা নেই। দূরে কোথাও যদি কোনো আলোর বিন্দু দেখা দেয়। কতবার যে সমুদ্রে সব নক্ষত্রেরা কুহেলিকা তৈরি করেছে—ঠিক ঠিক আলোর বিন্দুর মতো যেন এগিয়ে আসছে, আসছে—স্যালি হিগিনস ঝুঁকে থেকেছেন—তারপর চমকে গেছেন—এতো দিগন্তে ঝুলে থাকা একটি সামান্য নক্ষত্র! দূরবর্তী মাস্তুলের কোনও আলো নয়। অথচ চোখের ওপর স্বপ্নের মতো আশা কুহকিনী, চোখ মুছে বার বার অবিশ্বাস করেছেন নিজেকে। কিছুতেই আর এ-সব গ্রহ-নক্ষত্রের ছলনায় পড়ে যাবেন না। তিনি পায়চারি করছেন আর দেখছেন—যদি কোথাও কিছু, না—কিছু না, কেবল ধূসর ঠান্ডা মরুভূমির মতো চারপাশে মৃত্যুর আতঙ্ক।

    তখন দেখলেন বনি টুইন-ডেকে নেমে যাচ্ছে। হাতে লম্ফ। সে বোধ হয় কিছু আনতে যাচ্ছে নিচে। ফল্কায় মাদুর বিছিয়ে নামাজ পড়ছেন এনজিন-সারেঙ। ছোটবাবু মাস্তুলের ওপর উঠে ঠুকে ঠুকে সেই থেকে কি সব করছে। বনি আবার ওপরে উঠে আসছে। হাতে লম্ফ নিয়ে সে বোধ হয় কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে। ছোটবাবু বনিকে যা-হোক একটা কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। বনি ওদের জন্য রাতের খাবার তৈরী করছে বোধ হয়। খাবারের নামে তাঁর জিভে জল এসে গেল।

    আর যখন ওরা ডেকের ওপর গোল হয়ে খেতে বসল—তখন হিগিনস অবাক, বনি বেশ চারটে কেক বানিয়েছে। চিনি নেই, ডিম নেই, সামান্য জেলি আর ময়দা গুলে বেশ রাতের মতো চারটে কেক। এবং মনে হল, ছোটবাবুর পাতে বনি সব চেয়ে বড়টা দিয়েছে। হিগিনস মুখ গোমড়া করে খাচ্ছিলেন আর ছোটবাবুর পাতের দিকে বার বার তাকাচ্ছিলেন। সারেঙ একটু দূরে বসে খাচ্ছেন। তাঁর কাছে একটা লম্ফ দরকার। ছোটবাবু কেমন ধমকের গলায় বলল, বনি, চাচা অন্ধকারে বসে খাচ্ছেন।

    সারেঙ-সাব বললেন, তোর ব্যস্ত হতে হবে না। তুই খা। আমি ঠিক দেখতে পাচ্ছি।

    হিগিনস কফি খাচ্ছিলেন। কফি বলা যাবে না, গরম জলে সামান্য কফির গন্ধ। খুব যেন কষ্ট হচ্ছে খেতে। পানসে। বনি একটু চিনি হবে না! এই একটু হলেই হয়ে যেত।

    ভাঁড়ার খালি হয়ে গেছে প্রায়। খুব সতর্ক না থাকলে বিশ-পঁচিশ দিনও যাবে না। সে ছোটবাবুর দিকে তাকালে, কি বলবে ছোটবাবু বুঝতে পারল না। বুড়ো মানুষটা কেমন শিশুর মতো আবদার করছে। সে শক্ত হতে পারলে ভাল করত। কিন্তু বুড়ো মানুষটা এভাবে তাকিয়ে আছেন যেন কতদিন তিনি সুস্বাদু কফি খান নি। ছোটবাবু বলল, দাও। বুড়ো মানুষেরা সময়ে সময়ে কি যে হয়ে যান।

    বনি একটা জেলির কৌটা থেকে আধ-চামচ বের করে দিল। হিগিনস চামচটা দিয়ে খুব জোড়ে নাড়তে থাকলেন। তারপর পা দুলিয়ে দুলিয়ে খেতে থাকলেন। কি যে সুন্দর লাগছে এখন বনিকে। ছোটবাবুকে সামান্য খোশামোদ করলে তিনি যদি সামান্য বেশী সুযোগ-সুবিধা পান—তাঁর কথাবার্তা শুনে এখন এমনই মনে হচ্ছিল।

    স্যালি হিগিনস কফি খেতে খেতে বললেন, বুঝলে ছোটবাবু তোমাকে একটা কথা বলে রাখি, বেশি রাত জাগবে না। সকালে উঠে আবার করবে। মাস্তুলে বসে সারারাত খুট খুট করলে দিনের বেলা ভীষণ ঘুম পাবে

    বনি তখন তার অ্যাপ্ৰনে হাত মুছে নিল। সে কাজের জন্য খাটো স্কার্ট পরে নিয়েছে। পা হাঁটু পর্যন্ত খালি। আর মোমের মতো এত মসৃণ পা যে ছোটবাবু খেতে খেতে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল ভীষণ। সে তাড়াতাড়ি উঠে কাজে চলে গেল। যত রাত হোক শেষ করে ফেলতে হবে। নেমে যাবার সময় বলল, এলবা আফটার-পিকে আছে। তুমি ওর খাবারটা নিচে রেখে এস।

    এখন দেখলে কে বলবে, জাহাজটা ভাঙা, জাহাজ অনন্ত সমুদ্রে কাঠের গুড়ির মতো ভাসছে। যেন এরা যাযাবর মানুষ, কিছুদিন এখানে আছে আবার সময় হলেই অন্য কোথাও চলে যাবে। কেউ এতটুকু যেন বিচলিত নয়। খুব স্বাভাবিক। বনি তার কাজে এতটুকু খুঁত রাখে নি। যা স্বভাব মানুষটার—যখন তখন যার তার সামনে অপমান করতে পারলে যেন বাঁচে।

    এভাবে জাহাজে ক্রমে আর একটা রাত কেটে গেল। সকালে সবাই দেখল ছোটবাবু ক্রোজনেস্টে বসে থাকার মতো ছোট্ট একটা ঘর বানিয়ে চলেছে। ওপরে ত্রিপল দিয়ে কোনো আদিবাসী মানুষের মতো ঘর বানিয়ে ছোটবাবু বসে আছে। চারপাশটা ফাঁকা। মাথার ওপরে ছাদের মতো ত্রিপলের ছাউনি। সে ছাউনির নিচে বসে আছে। চোখে দূরবীন। সে এক মুহূর্ত অন্যমনস্ক হচ্ছে না। বার বার মনে হচ্ছে ঠিক কিছু দেখে ফেলবে। মাস্তুলের নিচে দাঁড়িয়ে খবর নিচ্ছেন স্যালি হিগিনস—কিছু দেখতে পাচ্ছ ছোটবাবু? কোনো মাছ অন্তত! এই তিমি মাছটাছ!

    ছোটবাবু বলেছিল, না স্যার। কেবল চারপাশে সমুদ্র আমাদের যেন গিলতে আসছে। আমরা বাদে এ-সমুদ্রে আর কোনো প্রাণী আছে দেখে বিশ্বাস হচ্ছে না। চারপাশে এত পারপয়েজের ঝাঁক থাকে—তাও নেই। র‍্যামোরা মাছ আর একটাও ভেসে আসছে না।

    স্যালি হিগিনস বললেন, দ্যাখো তো কোথাও নীল হাঙ্গর দেখতে পাচ্ছ কিনা। ওরা কাছাকাছি ঘুরে বেড়ালে কোনো মাছ থাকবে না। ভয়ংকার হিংস্র এরা।

    সে বলল, না স্যার। জলের নিচে কিছু দেখা যাচ্ছে না। মাছের কোনো ফুটকরি পর্যন্ত নেই।

    ক্রমশ সূর্যের উত্তাপ বাড়ছে। প্রখর উত্তাপে ঘামছে ছোটবাবু। বনি একটা তোয়ালে রেখে গেছে। সে বার বার ঘাম মুছছিল। তোয়ালে ভিজে গেছে। খালি গা। আর সে পরেছে সাদা হাফ-প্যান্ট। শরীরে কিছু রাখা যাচ্ছে না গরমে। সকালে চিনি ছাড়া চা মিলেছে শুধু। তারপর কি করে সময় যে কেটে যাচ্ছে। স্যালি হিগিনস ফের বললেন, চারপাশে কোথাও কিছু দেখতে পাচ্ছ না।

    —না স্যার।

    —অন্তত এক ঝাঁক ডলফিন?

    —না স্যার।

    —সমুদ্র তো এমন হয় না। তিনি বললেন, জলের গভীরে কাছাকাছি যদি…….

    সে বলল, গভীরে শুধু নীল কাঁচের মতো জল ঝকঝক করছে। একেবারে পরিষ্কার, সাত-আট ফেদম্ নিচে কি আছে দেখা যাচ্ছে।

    —এত স্বচ্ছ!

    —হ্যাঁ স্যার।

    —তবু কিছু চোখে পড়ছে না। স্ট্রেঞ্জ!

    এতদিন জাহাজটার চারপাশে কত সব বিচিত্র মাছের ভিড় ছিল। সিউল-ব্যাংক অদ্ভুত প্রকৃতির এক আগন্তুক তাদের কাছে! ওরা নাক ভাসিয়ে পিঠ ভাসিয়ে দেখে গেছে। এবং ছোটবাবু প্রায় সব রকমের মাছ দেখলে চিনতে পারে। কোনটা কি মাছ। সমুদ্রের প্রাণীতত্ত্ব সম্পর্কে ডেবিড কিছু খোঁজ- খবর রাখত। স্যালি হিগিনসও সব মাছের এবং প্রাণীদের নাম বলে দিতে পারেন। ওর এখন মনে হচ্ছিল, আসলে এ-সমুদ্রে বুঝি কোনো অতিকায় মনস্টার এসে গেছে—ভয়ে একটা মাছ আর নেই। রাতারাতি সব ভেগেছে। এবং যেন সব দিগন্ত জুড়ে সে ভেসে উঠবে—তারপর এই ছোট্ট জাহাজটাকে টেনে নেবে জলের নিচে। আর থাকবে অতিকায় লেজ, মুখ ড্রাগনের মতো। সে ডুবে ডুবে বোধ হয় আসছে।

    স্যালি হিগিনস মাথায় টুপি পরে রোদে দাঁড়িয়ে আছেন। খুবই চিন্তিত দেখাচ্ছে তাঁকে। অন্য সময়ে তিনি নীল হাঙ্গরের কথায় এলে অন্য সব হাঙ্গরের কথা সঙ্গে না বলে পারতেন না। তাদের স্বভাব কি রকমের—কতটা ধূর্ত, কোন মাছ সমুদ্রে সবচেয়ে বোকা এ-সব বলে তিনি বেশ সময় কাটিয়ে দিতে পারতেন। হিংস্র অক্টোপাসেরা জ্যোৎস্না রাতে প্রবালের পাহাড়ে উঠে বসে থাকে। চাঁদের আলো ওদের বড়ই প্রিয়। এবং প্রবালের নিচে যে সব জলজ ঘাস, সেখানে সে যে ধূসর রঙের লালা ছড়িয়ে রাখে শিকার ধরার আশায়, যাবতীয় তথ্য দিয়ে বোধ হয় বুঝিয়ে দিতেন। এখন তিনি মাস্তুলের নিচে চুপচাপ। রোদে কেন যে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন! ছোটবাবু বলল, কিছু দেখলে ঠিক ডাকব; রোদে দাঁড়িয়ে থাকবেন না।

    স্যালি হিগিনস সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে আসছেন কেন? ছোটবাবু ঝুঁকে বলল, সাবধানে উঠবেন, ওপরের সিঁড়ি ভাল নয়। হিগিনস প্রায় ঝুলে ঝুলে ওপরে উঠে এলেন। তিনি ছোটবাবুকে সরিয়ে দূরবীনে কি দেখতে থাকলেন। এমন নির্বোধ উদাসীন সমুদ্র কখনও দেখেন নি। সত্যি কিছু নেই কোথাও। কোনো মাছ, অথবা স্কুইড দেখলেও তিনি যেন আশ্বস্ত হতে পারতেন। এতটা ঘাবড়ে যেতেন না। তাঁর মুখ চোখ কালো হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। তিনি নেমে যাবার সময় বললেন, কিছু দেখলেই ডাকবে। এতটুকু দেরি করবে না। যেন হিগিনস বুঝিয়ে গেলেন—তিনি আবার জাহাজে স্যালি হিগিনস হয়ে গেছেন।

    হিগিনস ক্রোজ-নেস্ট থেকে নেমে ডেকে পা ফেলতে না ফেলতেই ছোটবাবু চিৎকার করে উঠল, স্যার সামথিং ভিজিবল্। দূরে কিছু দেখা যাচ্ছে। নর্থ-ওয়েস্ট-নর্থে সে ভেসে উঠেছে। সে দিগন্তের ওপর প্রায় আকাশ ছুঁয়ে দিচ্ছে মতো। ক্রসের মতো—অথচ মনে হয় প্রতিহিংসাপরায়ণ। জাহাজ এক আশ্চর্য স্রোতের মুখে পড়ে গেছে। দেখুন সে গতি পেয়ে গেছে। কোথায় যাচ্ছি আমরা স্যার কিছু জানি না। সমুদ্রের ও-পাশে ক্রসটা মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।

  • একান্ন

    একান্ন

    ।। একান্ন।।

    সিউল-ব্যাংক এগিয়ে যাচ্ছে কি অতিকায় ক্রসটা কাছে ছুটে আসছে বোঝা যাচ্ছে না। সমুদ্র পার হয়ে দিগন্তের নিচ থেকে ক্রমে ওটা আকাশের বুকে বড় হয়ে যাচ্ছিল। যেন কেউ ওটা ঠেলে আকাশের গায়ে তুলে দিচ্ছে। সব বর্ণচ্ছটা ক্রসটার গা থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে—কারণ মনে হচ্ছিল এক আলোময় জগত, যেন অনেক সূর্যের দীপ্যমান আলো নিয়ে সে আকাশে জ্বলে উঠেছে। স্যালি হিগিনস দেখতে দেখতে প্রায় বিহ্বল। তিনি বিড়বিড় করে বকছিলেন—মাই টাইম হ্যাজ কাম্। মাই টাইম হ্যাজ কাম্। শী উইল সুন সারাউন্ড মি। অ্যান্ড দিস ইজ মাই ফেট।

    ছোটবাবু নিচে দাঁড়িয়ে আছে। সে দেখছিল—বহুদূরে প্রায় দিগন্তে কিছু দেখা যাচ্ছে। বিন্দুর মতো অস্পষ্ট। কখনও অজস্র ঢেউ-এর ভেতর ওটা হারিয়ে যাচ্ছে। সে নিজের চোখকে ভীষণ অবিশ্বাস করছে এখন। ক্রোজ-নেস্ট থেকে সে যা দেখেছিল—ডেকে নেমে সে তার প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কখনও বিন্দুবৎ কালো কিছু দিগন্তে উঁকি মেরে সমুদ্রগর্ভে অন্তর্হিত হয়ে যাচ্ছে। যা সে এত কাছে দেখেছিল, যা সে ভেবেছিল প্রায় আকাশের মতো অতিকায় কি করে যে সে সহসা অবার বিন্দুবৎ হয়ে গেল। সে বলল, এনি মিরাকল্?

    তিনি বললেন, মিরাকল! অল ননসেন্স।

    ছোটবাবু বলল, শুধু বিন্দুবৎ কিছু দেখা যাচ্ছে। একটা পাহাড়ের মতো ক্রসটা দেখেছিলাম। এখন কিছু নেই। একেবারে ফাঁকা।

    হিগিনস আর একটা কথাও বলছেন না। তিনি দ্রুত নেমে আসছেন। সারেঙ-সাব পাশে দাঁড়িয়ে কি করবে ভেবে পাচ্ছেন না। বনি চিফ-কুকের গ্যালি থেকে মুখ বার করে রেখেছে। সে চাপাটি উল্টে পাল্টে দিচ্ছে। একটু এদিক ওদিক হলে পুড়ে যাবে। সে বের হয়ে আসতে পারছে না। চিৎকার করে কথা বলছে—বাবা ওটা কি! কি দেখলে?

    হিগিনস ডেকে লাফ দিয়ে প্রায় নেমে পড়লেন। খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন—কিছু না। প্রবালের দ্বীপ-টিপ হবে।

    —আমরা ওখানে নামতে পারব বাবা?

    ছোটবাবু লাফ দিয়ে তখন ফের দেখার জন্য মাস্তুলের মাথায় উঠতে গেলে খপ করে হিগিনস হাত ধরে ফেললেন। বললেন, ইয়ং ম্যান, প্লিজ লি টু মি। ডোন্ট গো।

    ছোটবাবু বলল, কিন্তু স্যার…….

    হিগিনস বললেন, প্লিজ ইউ ফলো মি।

    সারেঙ-সাব বললেন, আমি একবার উঠে দেখব সাব?

    হিগিনস বললেন, কিছু আর দেখার নেই।

    বনি দু’হাতে তখন চাপাটি উল্টে-পাল্টে দিচ্ছে। সে কিছুতেই বের হয়ে, কেন ছোটবাবু ক্রোজনেস্ট থেকে চিৎকার করে উঠেছিল—বাবা উঠে গেলেন কেন আবার তিনি নেমেই বা এলেন কেন এবং একটা কথা কেউ বলছে না, বাবা ছোটবাবুকে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন, এসব জিজ্ঞাসা করলে হত। সে একটা পাতলা ফ্রক গায়ে দিয়ে নিয়েছে। দিন যত এগিয়ে যাচ্ছে বাতাসে তত উত্তাপ। শরীরে দু’তিন জায়গায় ইতিমধ্যে গরমে ফোসকা পড়েছে। সারেঙ সাব সব হাতের কাছে এগিয়ে দিচ্ছেন। আগুন ধরিয়ে দিচ্ছেন। এবং সব কাজে সহায়তা না করলে সে কিছু করতে পারত না। অথচ সে যে ছুটে গিয়ে বলবে—ছোটবাবুকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ বাবা? ও কি করেছে? আমাকে কিছু বলছ না কেন—সে না পেরে সব উনুন থেকে নামিয়ে দু’লাফে বাইরে বের হয়ে এল। বলল, বাবা ছোটবাবুকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?

    হিগিনস দেখলেন সত্যি তিনি ছোটবাবুকে প্রায় টেনে নিয়ে যাচ্ছেন বোট-ডেকে। যেন কিছুতেই আর তাকে ক্রোজ-নেস্টে উঠতে দেবেন না। তিনি যে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন একেবারে খেয়াল করেন নি। কেমন বিভ্রমের ভেতর সব ঘটে যাচ্ছে। তিনি বনিকে আশ্বস্ত করার জন্য না বলে পারলেন না, বোট-ডেকে আমাদের সামান্য কাজ আছে বনি।

    বনি বলল, কি যে দেখলে তোমরা!

    —কিছু না তো।

    —ছোটবাবু যে চিৎকার করে উঠছিল—কি সব এগিয়ে আসছে?

    —কোথায় কি এগিয়ে আসছে! দ্যাখো না। কিছু দেখতে পাচ্ছ? বনি চারপাশে খালি চোখে সত্যি কিছু দেখতে পেল না। বলল, ছোটবাবু তোমার ঠাট্টা করার সময়-অসময় নেই।

    ছোটবাবু বোকার মতো তাকিয়ে আছে। সে বলল, স্যার তবে আমি চোখে ভুল দেখেছি।

    তিনি শান্ত গলায় বললেন, উই উইল নো লংগার ওয়ানডার ইন দ্য ডারকনেস। তাড়াতাড়ি আমাদের হাতের বাকি কাজ সব সেরে ফেলা ভাল। স্যালি হিগিনস ফের তাঁর পুরানো মরজি পুরোনো স্বভাব পুরোনো ব্যক্তিত্ব ফিরে পাচ্ছেন। ছোটবাবুকে কিছু বলার সময় দিচ্ছেন না। তিনি কি সব অজস্ৰ কথা বলে যাচ্ছেন বিড়বিড় করে। মাথামুন্ডু সে কিছু বুঝতে পারছে না। তিনি তাকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। এবং জাহাজের ফরোয়ার্ড-পিকে উঠে যাবার মুখে প্রায় লাথি মেরে দরজা খুলে ফেললেন। এবং বললেন, ইয়াংম্যান, প্লিজ গো ইন-সাইড। বলে অন্ধকারে তাকে ঢুকিয়ে বললেন, দ্যাখো কি কি কাঠ আছে। তিন বাই চার এবং যত লম্বা সব কাঠ আছে বের করে ফেল। ছোটবাবু জানে এটা কার্পেন্টারের ঘর। পাশে ডেক-কশপের স্টোর রুম। সে যত লম্বা কাঠ ভারী কাঠ আছে ছোট বড় সব ডেকে টেনে টেনে বের করে আনছে। আর মাঝে মাঝে বলছে, স্যার এত সব ভারী কাঠ দিয়ে কি হবে? তিনি ফিতে গজ দিয়ে মাপছেন। এবং পছন্দমতো সব কাঠ টেনে একপাশে রেখে দিচ্ছেন। তারপর হাঁটু গেড়ে বললেন, কাঠগুলো সব আমার কাঁধে তুলে দাও ছোটবাবু।

    ছোটবাবু বিব্রত বোধ করছে।

    —রাখুন। আপনাকে নিতে হবে না। কোথায় রেখে আসতে হবে বলুন, রেখে আসছি। ছোটবাবু বিরক্ত গলায় এ-সব বলতে গেলে বুঝতে পারল, স্যালি হিগিনস তার দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন। সেই চোখ, যেমন সে জাহাজে উঠে প্রথম দেখেছিল—যা দেখলে ওর বুকের রক্ত হিম হয়ে যেত। সে বলল, এক্সকিউজ মি স্যার। আপনার কষ্ট হবে ভেবে বলেছি। ছোটবাবু বুড়ো মানুষটার কাঁধে সব ক’টা কাঠ তুলে দিলে তিনি সোজা উঠতে পারলেন না। প্রায় টাল খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। ছোটবাবু এবার ধরে ফেলল। বলল, স্যার আপনি পারবেন না।

    তিনি তবু কাঁধে সব ক’টা কাঠ নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। এত ভারী যে তিনি নুয়ে পড়ছিলেন। তবু যেন হার মানবেন না।—বিড়বিড় করে বকছেন। কখনও ঈশ্বরকে অজস্র গালাগাল করছেন—কখনও বোধহয় নতজানু—যেমন তিনি এবার জোরে জোরে বলছেন, লর্ড ব্রিংগ মি আউট অফ অল দিস ট্রাবল, বিকজ্ উই আর ট্রু টু ইউর প্রমিসেজ। অ্যান্ড বিকজ ইউ আর লাভিং অ্যান্ড কাইনড টু মি….. বলতে বলতে চলে যাচ্ছেন। ছোটবাবু পেছনে পেছনে যাচ্ছে—যদি উপুড় হয়ে পড়ে যান—তার আগেই ধরে ফেলতে হবে—এবং আবার তিনি বলছেন—কাট্ অফ অল আওয়ার এনিমিজ অ্যান্ড ডেস্ট্রয় দোজ হু আর ট্রাইং টু হার্ম আস, ফর উই আর ইয়োর সার্ভেন্টস। যেন জপ করছেন, উই আর ইয়োর সার্ভেন্টস।

    ছোটবাবু বলল, আমাকে কিছু দিন। পড়ে গেলে হাত-পা ভাঙবে। তিনি একটা কাঠও ওকে দিলেন না। বসলেন। কাঠগুলো এবার সিঁড়ির কাছে রেখে একটা একটা করে বোট ডেকে তুলে নিয়ে গেলেন। সব ক’টা কাঠ তুলে ফের নেমে এলে ছোটবাবু বলল, কোথায় যাচ্ছেন আবার!

    —আমার সঙ্গে এস। মুখে যে ছোটবাবুর সামান্য বিরক্তি ফুটে উঠেছিল স্যালি হিগিনসের গলার স্বরে তা মিইয়ে গেল। সে তাঁর পেছনে মন্ত্রঃপূত মানুষের মতো হেঁটে যেতে থাকল। আর একটা প্রশ্ন করতে পারল না।

    ছোটবাবুকে নিয়ে তিনি ফের ডেক-কশপের ঘরে ঢুকে তন্ন তন্ন করে খুঁজছেন সব। পেরেক ছোট- বড় মাপের যা পাচ্ছেন ছোটবাবুর হাতে দিয়ে বলছেন, রাখো। কিছু লোহার পাতলা প্লেট এবং স্ক্রু। ত্রিপল টেনে বের করছেন। আর যেন এখন ঘরভর্তি আরশোলা পা বেয়ে মাথা বেয়ে উঠে যাচ্ছে। আবার উড়ে যাচ্ছে কখনো। কত অল্প সময়ে ওদের উপদ্রব বেড়ে যাচ্ছে। এবং রং তেল বার্নিশের গন্ধ। তিনি পাতলা কাঠ যা পাচ্ছেন টেনে বের করছেন। লোহার শিক টেনে বের করছেন। ছোটবাবু একটা কথা বলছে না। ভয় পেয়ে গেছে হয়তো, তিনি এবার টর্চের আলো অন্ধকারে ছোটবাবুর মুখে ফেললেন। সহসা আলো পড়ায় সে মুখের ওপর হাত তুলে দিলে স্যালি হিগিনস কেমন অমানুষের মতো হেসে উঠলেন। বললেন, ছোটবাবু তুমি ভীষণ কাওয়ার্ড। মুখ এমন করে রেখেছ কেন? আরে কিছু হয় নি। এই ছোটবাবু, তুমি ক্রোজ-নেস্টে উঠে গেলে কিছু আর দেখতে পাবে না। কিন্তু আমি জানি আমরা কোথায় এসে গেছি। তোমাকে বলতে পারি কিন্তু তুমি যা একখানা মানুষ! ছোটবাবু শক্ত গলায় বলল, স্যার আমরা কোথায় এসেছি? কোন সমুদ্রে?

    —সমুদ্রটার সঠিক কিছু আমি জানি না। তবে এটা বলতে পারি কোরাল-সীর কাছাকাছি জায়গা। এতদিনে অন্তত কোথায় আমরা আছি জানা গেল। একবার এখানে সিউল ব্যাংক কোর্স ভুল করে ফেলেছিল।

    —কি বলছেন স্যার!

    —ভয় পাচ্ছ কেন? এই দ্যাখো হাত থেকে দু’টো তোমার স্ক্রু পড়ে গেল। তবে তাঁর একান্ত করুণায় ছ’ সাত দিনের ভেতর আমরা আবার কোর্স পেয়ে গেলাম। একেবারে সহজ স্বাভাবিক কথা।

    —তখন কিউ-টি-জি চাইলেন না কেন?

    —চাইতে পারিনি। ভারী অসম্মানের ব্যাপার। এই তুমি কিন্তু আবার বনিকে বলবে না।

    —না স্যার।

    —বনিকে বললে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দেব। তিনি টর্চের আলো কাঠের র‍্যাকগুলোতে ফেলে যাচ্ছেন। ছোট ছোট প্যাকেট, সব প্যাকেটে ঠিক পছন্দমতো তিনি ওয়াশার পাচ্ছেন না। দু’টো বড় হাতুড়ি বেছে নিলেন। একটা র্যাদা। করাতের ব্লেড হাতে নিয়ে বাঁকিয়ে দেখলেন কতটা ধকল সইতে পারবে। কাজ করছেন আর অজস্র কথা বলে যাচ্ছেন।—বুঝলে হে, জায়গাটা ভাল না। ক্রোজ-নেস্টে আর উঠবে না। কে কখন ঠেলে ফেলে দেবে ক্রোজ-নেস্ট থেকে!

    ছোটবাবু বলল, তা হলে দূরে কিছু দেখতে পেলেন?

    —দেখার আর কিছু নেই। সব ঠিক হয়ে গেছে।

    —তা হলে স্যার আমরা দু’ একদিনের ভেতর ডাঙা পেয়ে যাব!

    —পেতে পার। ছোটবাবুকে সব খুলে বলতে বড় কষ্ট হচ্ছিল। এমন দু’টো তাজা প্রাণ বিনষ্ট হবে! ভাবতেই চিৎকার করে বললেন, হ্যালেলুজা। ছোটবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ডিয়ার ফ্রেণ্ড আই অ্যাম প্রেইং দ্যাট অল ওয়েল উইদ ইউ অ্যাণ্ড দ্যাট য়োর বডি ইজ অ্যাজ হেলদি অ্যাজ আই নো য়োর সোল ইজ…

    ছোটবাবু বলল, স্যার আমাকে ভয় পাইয়ে দেবেন না।

    তিনি শুধু বললেন, এস।

    এবং ওরা দু’জন আরও ভেতরে ঢুকে যেতে থাকল। তারপর তিনি কশপের ঘরে হন্যে হয়ে কি খুঁজতে থাকলেন। এবং পেয়ে গেলে বললেন, টর্চ জ্বালো।

    বাইরের আলো ভেতরে এতটুকু ঢুকতে পারছে না। ওরা অন্ধকারে যেন ভীষণ একটা গোপন জায়গায় চলে যাচ্ছে। ছোটবাবু বুঝতে পারছে না হিগিনস তাকে নিয়ে জাহাজের কোথায় নেমে যাচ্ছেন। এতদিন সে জাহাজে আছে কখনও এদিকটায় আসে নি। হিগিনস কি ওকে নিয়ে একেবারে জাহাজের তলায় নেমে যাচ্ছেন! অন্ধকারে ওরা একটা সিঁড়ি পেয়ে গেল। এবং টর্চ জ্বালিয়ে ক্রমে নিচে নেমে যখন ওপরে আলো ফেলল, তখন মাথার ওপরে ছাদ। পাশেই এক নম্বর হ্যাচ। ফসফেটের গন্ধ উঠে আসছে। ছোটবাবু বুঝতে পারছে না তিনি তাকে এত নিচে কেন নিয়ে এসেছেন। ওকে ফেলে তিনি ওপরে উঠে গেলে সে যেন ঠিক পথ চিনে ওপরে উঠতেও পারবে না। হিগিনস আর পার্থিব জগতের কেউ, বিশ্বাস হচ্ছে না। চোখ জ্বলছে। বোধ হয় তিনি লুকেনারের প্রেতাত্মা কোথায় লুকিয়ে আছে অথবা মনে হয় তিনি তাকে বুঝি এখুনি দরজা খুলে দেখাবেন—হিয়ার ইজ দ্য ডেভিল। তার শুকনো অস্থিচর্মসার কংকাল, দ্যাখো এখনও কি যে বহাল তবিয়তে আছে। ছোটবাবু চিৎকার করে উঠল, স্যার আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে এলেন, আপনার কি ইচ্ছে?

    হিগিনস চক-খড়ি দিয়ে তখন ইস্পাতের দেয়ালে একটা চার্ট এঁকে বললেন, এই হচ্ছে কোরাল সী। অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকুল থেকে প্রায় উত্তরে এর আটশ নটিক্যাল মাইলের ওপর বিস্তৃতি। আমরা আছি তারও ওপরে। অর্থাৎ জাভা সুমাত্রা নিউ-গিনি এখন আমাদের পাশাপাশি অঞ্চল। এখানে আছে অজস্র প্রবাল দ্বীপ। পাঁচ-সাতশ মাইলের ভেতর জনহীন দ্বীপ তোমরা পেয়ে যেতে পার।

    প্রায় ভূগোল মাস্টারের মতো ছোট একটা স্টিক দিয়ে তিনি কাছাকাছি দ্বীপের দূরত্ব কি হবে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। ঠিক কম্পাসের কাঁটার বরাবর চালাতে পারলে আর পালে বাতাস লাগলে আট- দশ দিনের ভেতর পেয়ে যাবে। যদি কোনো কারণে দ্যাখো পাচ্ছ না, তবে বুঝতে হবে—

    —তুমি ঠিক ঠিক বোট চালাতে পার নি। বলেই তিনি থামলেন, দু’টো আরও দ্বীপের নাম লিখলেন—বেশ বড় বড় অক্ষরে যেন বুঝতে ছোটবাবুর অসুবিধা না হয়। এই হচ্ছে সান্তাক্রুজ দ্বীপপুঞ্জ তারপর ফানাফুতি তারপর ওপরে তাকালেন। বোধ হয় গলা ছেড়ে কেউ ডাকছে। ছোটবাবু কান পেতে বুঝতে পারল, ডেকে বনি গলা ফাটিয়ে ডাকছে। বাবা, ছোটবাবু তোমরা কোথায় গেলে? প্রায় ওর গলা কান্নায় বুজে আসছে। সারেঙ-সাবও চেঁচাচ্ছেন—ছোট তোরা কোথায় গেলি? হিগিনস তাড়াতাড়ি দু’হাতে সব মুছে বললেন, ছোটবাবু শিগগির ওপরে চল। উঠতে উঠতে বললেন, তোমাকে একটু শক্ত হতে হবে ছোটবাবু।

    ছোটবাবু কেমন জেদি বালকের মতো নিচে দাঁড়িয়ে থাকল।

    হিগিনস টর্চের ফোকাসে দেখলেন ছোটবাবু তেমনি দাঁড়িয়ে আছে। উঠে আসছে না। তিনি খুব সতর্ক গলায় বললেন, অন্ধকারে ভয় পাবে ছোটবাবু। শিগগির উঠে এস।

    ছোটবাবু বলল, স্যার আপনি আমাকে দিয়ে কি করাতে চাইছেন? আপনি চলে যান।

    হিগিনস ফের নিচে নেমে বললেন, পরে বলব। সব তোমাকে বলব ছোটবাবু। তুমি প্লিজ মুখ গোমড়া করে রাখবে না। বনি টের পেলে আমার কিছু আর করার থাকবে না। আমাদের ওরা খুঁজছে।

    গলার স্বর এত অসহায়! এত তিনি অসহায় ছোটবাবু যেন এই জাহাজে প্রথম টের পেল। সে আর বিন্দুমাত্র দেরি করল না। সিঁড়ি ভেঙে ওপরে কশপের ঘরে এসে প্রথম সাড়া দিল, আমরা এখানে বনি। চাচা, আমরা এখানে কাঠ খুঁজছি।

    বনি কশপের ঘরে ঢুকে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাবার ওপরে—কোথায় ছিলে! টেবিলে খাবার কখন সাজিয়ে রেখেছি—তোমাদের কারো পাত্তা নেই।

    ছোটবাবুর সকাল থেকে এত বেশি উৎকণ্ঠা ছিল, এত বেশি উত্তেজনা ছিল যে মনেই হয়নি সে মাত্র এক কাপ চা খেয়ে আছে। ক্ষুধায় পেট জ্বলছে, যেন দাবানল এবং সে আর একটা কথা না বলে বের হয়ে এল। কি মুক্ত আকাশ আর সমুদ্র! জাহাজের ভেতর এমন ভয়াবহ সব জায়গা আছে সে কখনও জানত না।

    খেতে বসে হিগিনস বললেন, বুঝলে ছোটবাবু গুডমেন ইট টু লিভ ব্যাড মেন লিভ টু ইট। দু’টো চাপাটি দু’টো আলুসেদ্ধ দুপুরের লাঞ্চ। ছোটবাবু জলখাবারের মতো প্রায় গিলে খেয়ে ফেলল। খিদে একেবারে যাচ্ছে না। সে ঢকঢক করে জল খাচ্ছিল—তখন স্যালি হিগিনস তাঁর দু’টো আলুসেদ্ধ এবং একটা চাপাটি ওর পাতে তুলে দিলেন। বললেন, খাও ছোটবাবু। ছোটবাবু বলল, আপনি এ- সব কি আরম্ভ করেছেন স্যার!

    সারেঙ-সাব ভেতরে একসঙ্গে খেতে লজ্জা পাচ্ছিলেন। তিনি তাঁর খাবার ডেকে নিয়ে গেছেন। বনি একেবারে এরই মধ্যে যতটা পারা যায় সেজেগুজে এসেছে। সে পাশে বসে খাচ্ছিল। ছোটবাবুর যা শরীর ওরও ইচ্ছে করছে—ছোটবাবুর জন্য কিছু তুলে দেয়—কিন্তু সে জানে ছোটবাবু হয়তো খাবার ফেলে উঠে চলে যাবে। বাবা দিয়েছে বলে ঘাড় গুঁজে খেয়ে উঠেছে। এবং বনি দেখল ছোটবাবুর মুখ কেমন ভারী শুকনো। ছোটবাবু কেন যে বাবা জাহাজে থাকতে এত দুশ্চিন্তা করছে। বাবা ক্রমশ রোগা হয়ে যাচ্ছেন এবং বাবাকে দেখলেই বোঝা যায় আর তিনি আগের মতো নেই। চোখে মুখে যদিও হাসিটুকু তেমনি আছে তবু কোথায় যেন তিনি জোর হারিয়ে ফেলেছেন।

    ছোটবাবু বোট-ডেকে উঠে আবার সেই বিন্দুবৎ প্রবাল দ্বীপটিপ যদি চোখে দেখতে পায়—সে এগিয়ে যেতে থাকল, রেলিঙে ঝুঁকে দাঁড়াল—কি কঠিন আর বিভীষিকার সমুদ্র ক্রমে চোখে ইতস্তত পাক খাচ্ছে—কেমন সামনে দুলে উঠছে সবকিছু—সেই প্রবাল দ্বীপ অথবা ক্রস কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সকাল থেকে সব অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছেন কাপ্তান। কেন যে তিনি এ-সব বলছেন—আর থেকে থেকে চিৎকার করে উঠছেন—হ্যালেলুজা অর্থাৎ জয় জগদীশ হরে। কখন বুড়ো মানুষটা চুপি- চুপি সারেঙকে ডেকে নিয়ে গেছেন। আড়ালে কিসব শলাপরামর্শ করেছেন। এবং সারেঙ-সাব যখন বোটডেক থেকে নেমে এলেন মুখ ফ্যাকাশে, যেন ওঁর ফাঁসির হুকুম হয়েছে। চোখ স্থির। অতিশয় চুপচাপ তিনি হেঁটে যাচ্ছিলেন। ছোটবাবু ডাকল, চাচা!

    তখন হিগিনস ডাকলেন, ছোটবাবু এদিকে এস।

    ছোটবাবু দেখল, তিনি সব কাঠ বিছিয়ে দিচ্ছেন। করাত চালাচ্ছেন। ছোটবাবুকে একটি র্যাঁদা দিয়ে বললেন, চালাও। সারেঙ-সাব বোটে উঠে গেছেন—সব গিয়ার নিচে নামিয়ে রাখছেন। এবং কাঠের লাইনিং সেরে নেওয়া হচ্ছে। আর হিগিনস কাজের ফাঁকে ফাঁকে কথা বলে যাচ্ছেন। একজন বুড়ো মানুষ যেভাবে তার সন্তানসন্ততিকে তীর্থে যাবার আগে বলে থাকে—তেমনি কথা বলে যাচ্ছেন। যেন মানুষটা প্রবাসে যাবার আগে বলে যাচ্ছেন, বুঝলে হে—পাপের প্রতি মানুষের ভারী প্রলোভন। তিনি হাতুড়ির কাঠ ঢিলে হয়ে যাওয়ায় ডেকে বার বার ঠুকছিলেন। ছোটবাবুর র্যাঁদায় খসখস শব্দ হচ্ছে। হিগিনস এবার সোজা হয়ে বললেন, ছোটবাবু তুমি কি কি ধর্মগ্রন্থ পড়েছ?

    —রামায়ণ মহাভারত পড়েছি স্যার।

    তোমাকে আমি বাইবেল দেব। তুমি পড়বে। প্রত্যেক মানুষের সব ধর্মগ্রন্থগুলো পড়ে ফেলা উচিত।

    সে বলল, পড়ব স্যার।

    স্যালি হিগিনস খাকি রঙের হাফ-প্যান্ট পরেছেন। গায়ে স্যাণ্ডো গেঞ্জি। এবং ভীষণ লম্বা বলে, আর চোখে গোল চশমা বলে গালে সাদা দাড়ি বলে কখনও কখনও তাঁকে ধার্মিক মানুষ মনে হচ্ছিল। তিনি যখন রাতে স্লিপিং গাউন পরে থাকেন অর্থাৎ সমুদ্রে ঠাণ্ডা বাতাস বইলে তিনি যখন বেশ লম্বা পোশাক পরেন তাঁকে সান্তাক্লজ না ভেবে পারা যায় না। তিনি এখন একটা কাঠ সোজা দাঁড় করিয়ে কতটা উঁচু দেখছেন। দেখতে দেখতে তিনি কিছু পাপ এবং লোভের গল্প বললেন। তার পরিণতির গল্প বললেন। তারপর সামান্য সময় কান থেকে পেনসিল বের করে প্রায় একজন ছুতোর মিস্ত্রির মতো কি সব রেখা টেনে গেলেন, তাকালেন ছোটবাবুর দিকে—এ-সব গল্প শুনে ছোটবাবুর মুখে চোখে কি প্রতিক্রিয়া হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করতে করতে এক সময় বলে ফেললেন, ডিয়ার ফ্রেণ্ড ডোন্ট লেট দিস ব্যাড একজামপল ইনফ্লুয়েন্স ইউ। ফলো ওনলি হোয়াট ইজ গুড। রিমেম্বার দ্যাট দোজ ডু হোয়াট ইজ রাইট প্রুভ দ্যাট দে আর গডস চিলড্রেন; অ্যাণ্ড দোজ হু কনটিনিউ ইন ইভিল প্রুভ দ্যাট. দে আর ফার ফ্রম গড।

    ছোটবাবু বুঝতে পারছিল, চরম পরিণতির দিকে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। সে বলল, স্যার আমি ছবিতে বাইবেলের কিছু গল্প দেখেছিলাম। একটা ব্যাপার ভারী আশ্চর্য মনে হল—মাঝে মাঝে এটা আমি স্বপ্নেও দেখি—সেই মরুভূমির ভেতর সব মানুষেরা হেঁটে যাচ্ছে। তাদের পিঠে অতিকায় ক্রস। ছবিতে এটা দেখে কখনও ভুলতে পারিনি ভাল বুঝতেও পারিনি।

    তিনি চিৎকার করে উঠলেন ফের—হ্যালেলুজা! তারপর কাঠে পেরেক ঠুকতে ঠুকতে বললেন, সাফারিঙস। সাফারিঙস অফ ম্যানকাইণ্ড। মানুষ তার সবকিছুর জন্য দায়ী সে নিজে। যা কিছু সে বিনিয়োগ করবে লাভালাভ তার ওপর বর্তাবে। সে নিজেই তার ক্রস বহন করে নিয়ে যায়। সে নিজেই রচনা করে তার বধ্যভূমি। শৈশব থেকে যৌবনে এবং যৌবনকাল পার হলে প্রৌঢ় বয়সে সে দেখতে পায় এতদিনের যা কিছু প্রয়াস সব এক সুন্দর নীল উপত্যাকাতে তার নিজের বধ্যভূমি তৈরিতে কেটে গেছে। জনগণেরা এবার হাততালি দিলে গলায় দড়িটা পরে ফেলবে। তারপর সব শেষ—শুধু থাকে নীলবর্ণের এক আলোর ভূখণ্ড। বুঝতে পারছ আমাদের তা হলে কিছুই নেই। এত সুখ এত দুঃখ সবই তাঁর। তিনিই সব। সো প্রেইজ দ্যা লর্ড। হাউ গুড ইট ইজ টু সিং হিজ প্রেইজেস! হাউ ডিলাইটফুল, অ্যাণ্ড হাউ রাইট।

    বনি তখন ওপরে উঠে এসেছে।

    বাবাকে ভীষণ উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। বাবা কাঠগুলো পালিশ করছেন। সারেঙ ছোট ছোট সব কাঠের লাইনিং মেরে দিচ্ছে বোটে। সব ড্রাই ফুডের প্যাকেট নামিয়ে রেখেছে। পরিচ্ছন্ন নীল আকাশ। গরম নেই তেমন। পরিচ্ছন্ন আকাশের নিচে এখন একটু সময় পেয়ে গেছে বনি। সে চুল আঁচড়াচ্ছে। ওর সুন্দর নীলাভ চুলে ক্রিম ঘষে দিচ্ছে। সামনে সে রেখেছে ছোট্ট আয়না। সে ক্ষণে ক্ষণে পোশাক পাল্টাচ্ছে। বাবাকে, ছোটবাবুকে দূর থেকে দু’টো-একটা কথা বলে আবার চুলে ক্রিম ঘষছে। কেবিনের অন্ধকারে ভালো কিছু দেখা যায় না। বাবা ছোটবাবু সারেঙ সারাদিন কেবল বোট-ডেকে খুট খুট করে কাঠ কাটছে, পেরেক পুঁতে দিচ্ছে কাঠে এবং আশ্চর্য বনি সন্ধ্যায় দেখল বাবা বেশ বড় দু’টো ক্রস বানিয়ে ফেলেছেন। ক্রস দেখে সে কেমন ভয় পেয়ে গেল। বলল, বাবা এ-দিয়ে কি হবে?

    তিনি ভয়ে মেয়ের দিকে তাকাতে পারলেন না। তিনি গজ ফিতে সব তুলে রাখছেন। সারেঙের পক্ষে একা কাজ শেষ করা কঠিন। এবার তিনি ছোটবাবুকে নিয়ে বোটের কাছে এসে দাঁড়ালেন। বনিকে তিনি কিছু বললেন না। অথবা কি বললে বনি আপাতত শান্ত থাকবে কি বললে বনি বুঝতে পারবে না দ্য টাইম হ্যাজ কাম্‌—ভেবে ভেবে তিনি যখন দেখলেন বনি কিছুতেই যাচ্ছে না তখন বাধ্য হয়ে বললেন, জায়গাটা ভাল না বনি। খারাপ জায়গা। শয়তানের প্রভাবে পড়ে যেতে পারি। ক্রস দু’টো জাহাজের মাথায় দাঁড় করিয়ে দিলাম। এবার দেখি কার কত সাহস?

    ছোটবাবু তখন লোহার সরু জালের ওপর ত্রিপল ফেলে দিচ্ছে। বোটের ওপর হুড খোলা গাড়ির মতো এই ত্রিপল কাজ করবে। ঝড়বৃষ্টিতে হুড টেনে দিলে প্রায় নৌকার ছই, সমুদ্রে বোট ভেসে গেলে ঝড়বৃষ্টিতে সামান্য আশ্রয়। জাহাজ তবে সত্যি অশুভ প্রভাবে পড়ে যেতে পারে—বাবা ক্রস দু’টো বানিয়ে ভাল করেছেন। ক্রস থাকলে জাহাজে অশুভ প্রভাব ভিড়তে সাহস পাবে না। সে খুব নিশ্চিন্তে ঘরে ঘরে আলো জ্বালাবার জন্য নিচে নেমে গেল। সে ঘরে ঘরে লম্ফ জ্বেলে দিয়ে গেল।

  • বাহান্ন

    বাহান্ন

    ॥ বাহান্ন।।

    হিগিনস বোট থেকে চিৎকার করে বললেন, নো নো। সব কেবিনে লম্ফ জ্বালতে হবে না। এখানে একটা লম্ফ দিয়ে যাও। গ্যালিতে রাখো একটা আর একটা বোট-ডেকে ঝুলিয়ে রাখো।

    বনি নেমে যাবার সময় হঠাৎ দেখল তখন পায়ের কাছে দু’তিনটে ফ্লাইং ফিশ পড়ে আছে। ওদের বোধ হয় কোনো অতিকায় মাছটাছ তাড়া করেছিল, উড়ে এসে ডেকে পড়েছে। বনি মাছগুলো কুড়িয়ে নেবার আগে এমন চেঁচামেচি লাগিয়ে দিয়েছিল যে ছোটবাবু ভয় পেয়ে লাফ মেরে ছুটছে সেদিকে। গিয়ে সে অবাক। তিনটে মাছ। রুপোলী লম্বা, এবং বড় পাখনাঅলা মাছ। প্রায় পারশে মাছের মতো এবং খেতে বসে ছোটবাবু দেখছে এ-বেলাতেও হিগিনস তাঁর অধিকাংশ খাবার তার পাতে তুলে দিচ্ছেন। মাছভাজা সে একটা আস্ত পেয়েছে। বনির কি যে স্বভাব হয়েছে! ওকে খাওয়াতে পারলে বাঁচে। আর কেউ খাবে সে যেন মনে রাখতে পারে না। ছোটবাবু বুঝতে পারছে না বুড়ো বনির ওপর রাগ করে সব খাবার ওকে দিয়ে দিচ্ছেন কিনা। সে ভেবেছিল বনিকে জোর ধমক দেবে—কিন্তু তখন হিগিনস বললেন, ছোটবাবু তুমি খুব ভাগ্যবান হে!

    ছোটবাবু বললে, না স্যার এটা বুঝতে পারি বনির উচিত হচ্ছে না।

    হিগিনস বললেন, ভারী মজা কি বল!

    ছোটবাবু বলল, বনি সবাইকে সমান দিতে হয়।

    বনি, মাত্র মুখে সামান্য মাছভাজা পুরেছে, লম্ফের আলোতে ওর মুখ রহস্যময়ী নারীর মতো, চোখে অপার বিস্ময় ছোটবাবু সম্পর্কে এবং হিগিনস ঝুঁকে আছেন সামান্য—তখন ছোটবাবু কি যে বাজে বকছে। সে বলল, আমি কি বাবাকে কম দিয়েছি?

    হিগিনস বললেন, তোমাকে খুব হিংসে হচ্ছে ছোটবাবু।

    বনি বলল, বাবা তোমাকে বলছি, এ-সব আমার সহ্য হয় না। তুমি ওকে দিতে যাও কেন? তুমি খেতে না পার ফেলে দেবে।

    ছোটবাবু বলল, বনি কি বকছ আজেবাজে! এতে কারো পেট ভরে! তুমি খাচ্ছ না তিনি খাচ্ছেন না, আমাকে তোমরা সব দিচ্ছ! কি পেয়েছ তোমরা! প্রায় সব ছুঁড়ে ফুঁড়ে সে উঠে যেতে চাইলে হিগিনস বললেন, কোথায় যাচ্ছ! তুমি না খেলে আমরা খাব ভেবেছ? বুঝলে ছোটবাবু মাঝে মাঝে তুমি ভারী স্বার্থপর হয়ে যাও। তোমার সব ভাল লাগে এটা কিন্তু ভাল লাগে না।

    বনির মুখ অপমানে থমথম করছে। যেন সে কথা বললেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলবে। সে মুখ নামিয়ে রেখেছে। খাচ্ছে না! যেন কিছু বলতে পারলে এতটা সে অপমানিত হত না অথবা সে যদি বলতে পারত বাবা, তুমি ওকে আর কতটুকু চিনেছ আমি ওকে হাড়ে হাড়ে চিনি। ও নিজেকে ছাড়া পৃথিবীতে আর কাউকে চেনে না। আমি এমন সুন্দর পোশাক পরে দাঁড়িয়ে থাকি রেলিঙে—কতবার ভেবেছি ও আসবে, আমার পাশে ঠিক দাঁড়াবে, কথা বলবে—কত কিছু আমি আশা করি ওর কাছে—সে আসে না বাবা। একবার বলে না বনি তোমাকে মেয়ের পোশাকে এমন সুন্দর দেখায় জানতাম না।

    কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। ছোটবাবু এখনও হাত নামিয়ে রেখেছে। হিগিনস বললেন, খাও। বনির ওপর রাগ কর না। কি ব্যাপার! তোমরা কেউ খাচ্ছ না। আচ্ছা জ্বালা হল দেখছি—ছোটবাবু তোমাকে আমি খেতে বলছি। তুমি না খেলে মেয়েটা আমার খেতে পারবে ভাবছ!

    ছোটবাবু ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে কাঁটা-চামচ টেনে নিলে।

    হিগিনস ফের বললেন, তুমি ভীষণ ভাগ্যবান হে ছোটবাবু। তোমাকে আমার হিংসে হচ্ছে। সারাজীবন যা চেয়েছি, কত সহজে তুমি ছোটবাবু তা পেয়ে গেছো। এত সহজে তাকে নষ্ট করে দিও না।

    স্যালি হিগিনস ফের খেতে খেতে বললেন, আমি পাইনি। কত সহজভাবে তিনি এখন কথা বলছেন! ডাইনিং হলে তেমনি সব বড় বড় তৈলচিত্র। এখন আর ফুলদানিতে কোনো ফুল নেই। অন্ধকারে অস্পষ্ট আলোর ভেতর সেইসব কাপ্তানের ছবি কেমন অর্থহীন। বড় টেবিল, সাদা চাদর, কারুকার্যময় ন্যাপকিন, সব আছে শুধু মানুষগুলো একে একে তাঁকে ছেড়ে গেছে। তিনি বললেন, তোমাকে হিংসে করতেও আমার ভাল লাগছে। মানুষের জন্য পৃথিবীতে তারপর আর কি দরকার থাকে বুঝি না। তোমরা ঝগড়া করলে আমার খুব খারাপ লাগে।

    তারপর যেন ছোটবাবুকে বলার ইচ্ছে ওহে মানবজাতির অপোগণ্ড তুমি বুঝতে পারছ না, সবকিছু হারিয়ে সামান্য একটা জাহাজের ওপর বাজি রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, দেয়ার লাইজ এ ওয়াইড অ্যাণ্ড প্লেজেন্ট রোড দ্যাট সিমস রাইট, কিন্তু এখন দেখছি দ্যাট এণ্ডস ইন ডেথ। কেউ আমাদের কোনো ডাঙায় পৌঁছে দেয় না ছোটবাবু। নিজেকে সাঁতরে পার হতে হয়।

    স্যালি হিগিনস মুখ ন্যাপকিনে মুছে বললেন, তোমরা খাও। আমি উঠছি। ফের ঝগড়া করলে খুব খারাপ হবে। বলে তিনি উঠে গেলেন।

    বনি বলল, খাবার নিয়ে কি দরকার ছিল নাটক করার!

    ছোটবাবু বলল, বেশ করেছি।

    স্যালি হিগিনস এলি-ওয়েতে দাঁড়িয়ে গেলেন। ধমক দিলেন—আবার!

    দু’জন চুপচাপ ফের। কোনো কথা আর কানে ভেসে আসছে না। তিনি দাঁড়িয়ে থাকলেন। নড়তে ইচ্ছে করছে না। সৌরলোকে আর একটা নতুন পৃথিবী তৈরি হয়ে গেছে। দু’জনই সমুদ্রে দাঁড়িয়ে লম্ফের আলোতে নতুন ডাঙার অনুসন্ধানে আছে। তিনিও ছিলেন—আজীবন সেই ডাঙা খুঁজে বেড়িয়েছেন। সামান্য আশ্রয় প্রেম। বিশ্বাসহীনতায় বেঁচে থাকতে কখনও চাননি। অথচ সংশয় সন্দেহ এবং এক অশুভ প্রভাব যেন কি করে এই এক মহাজীবনে এসে যায়—মনে হয় তিনি, তার অস্তিত্ব এক মহামায়া, শেষ নেই যার। কেনো অলৌকিক জলযানের মতো নিরুদ্দিষ্ট যাত্রা। অথচ পাশেই আছে জীবনপ্রবাহ—কি তাজা আর খাঁটি! এত জেনেও তাঁর কেন এখন চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। ধরা পড়ে যাবেন ভেবে তিনি ওপরে উঠে যাচ্ছেন। আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে হাউ-হাউ করে এভাবে তিনি কার জন্য কাঁদছেন। বুক থেকে কেন সেই অমোঘ বাণী জোরে উঠে আসছে না—কেন জোরে জোরে গাইতে পারছেন না, গ্লোরি হ্যালেলুজা আই অ্যাম অন মাই ওয়ে। আড়ষ্ট গলায় তবু তিনি কোনোরকমে গাইলেন, গ্লোরি হ্যালেলুজা—আই অ্যাম অন মাই ওয়ে। কেউ দেখছে না, স্যালি হিগিনস অন্ধকার সমুদ্রে ভাঙা জাহাজ-ডেকে দাঁড়িয়ে গাইছেন—চোখে অবিরাম অশ্রুপাত—কি করুণ আর অসহনীয় এই শেষ সমুদ্রযাত্রা। তাঁকে সব ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। তিনি তবু সবকিছু তুচ্ছ করে হাঁকলেন, এলিস আমি ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস বলছি—শুনতে পাচ্ছ! এলিস এ-আমাদের শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে এলে! কি চাও তুমি! কি ইচ্ছে তোমার! এলিস, ভগবানের দোহাই, সবার অশুভ প্রভাব থেকে বনিকে বাঁচাও। আমি আর কিছু চাই না এলিস। পৃথিবীতে আমার আর কিছু চাইবার নেই।

    গমগম করে সেই অসীম অজানা সমুদ্রে স্যালি হিগিনসের কণ্ঠস্বর ভেসে যাচ্ছিল। দূরদিগন্তে নীহারিকালোকে যেন তিনি তাঁর শেষবার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন। ছোটবাবু, বনি, সারেঙ বুঝতে পারছিল না স্যালি হিগিনস কোথায় দাঁড়িয়ে এভাবে পাগলের মতো চিৎকার করছেন। ওরা লম্ফ নিয়ে জাহাজ- ডেকে ছোটাছুটি করছে। কোথায় তিনি! বোট-ডেকে নেই, আফটার-পিকে নেই, কেবিনে নেই। তবু কিছু অস্পষ্ট চিৎকার জাহাজের কোথাও থেকে যেন উঠছে। সমুদ্রে ডুবে যাবার আগে যেভাবে একজন আর্ত মানুষ দুহাত তুলে চিৎকার করতে থাকে—স্যালি হিগিনস তেমনি এক মুহ্যমান আর্তনাদে ভেঙে পড়ছেন। ছোটবাবু তাঁকে শেষ পর্যন্ত ফরোয়ার্ড-পিকে খুঁজে পেল। উইণ্ড-সেলের আড়ালে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। সেই শান্ত মুখ আর নেই। পরনে সোনালী রংয়ের রাতের পোশাক। একজন সন্ত মানুষের মতো দাঁড়িয়ে সমুদ্রের সঙ্গে চিৎকার করে কথা বলছেন—যেন কোনো রমণীর চেয়েও বেশি রহস্যময়ী সমুদ্রকে তাঁর জীবনের সুখ দুঃখ হতাশার কথা শোনাচ্ছেন। জ্যোৎস্না রাতে সমুদ্রের ভয়ংঙ্কর নির্জনতার ভেতর বনি বাবার বুকে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল। বলল, বাবা কি হয়েছে তোমার! কি হয়েছে বল! এমন করছ কেন? এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে কাকে কি বলছ! কি, কথা বলছ না কেন! আমরা কি সত্যি আর ফিরে যেতে পারব না!

    স্যালি হিগিনস শান্ত কণ্ঠে শুধু বললেন, তুই তো জানিস আমার মাঝে মাঝে এমন হয়। তুই ঘাবড়ে গেলে চলবে কেন! খুব আদর করে মেয়ের কপালে চুমো খেলেন। তারপর লজ্জায় যেন মুখ লুকিয়ে ফেললেন বনির চুলের ভেতর। কি তাজা ঘ্রাণ চুলে। এমন একটা ছেলেমানুষী করে তিনি যেন আর লজ্জায় মুখ তুলতে চাইছেন না। কাউকে আর মুখ দেখাতে চাইছেন না।

    বাপ মেয়ে পৃথিবীর যাবতীয় সুখ দুঃখ ভুলে গেছে বুঝি। ওরা পরস্পর কি নিবিড় স্নেহ মমতায় পরস্পরকে জড়িয়ে রেখেছে। ছোটবাবুর কেন জানি বুক বেয়ে এই বৃদ্ধ মানুষটির জন্য কান্না উঠে আসছিল। হাঁটু গেড়ে প্রায় কোনো মধ্যযুগীয় নাইটদের মতো তার বলার ইচ্ছে হচ্ছিল, আপনি আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেন। তারপর সেই নাটকীয় শব্দসমূহ তার কণ্ঠে প্রায় ভেসে আসছিল, স্যার সমুদ্র আর ঈশ্বরের নামে শপথ করছি। যেন তরবারি থাকলে সে এক্ষুনি মাথার ওপরে দুলিয়ে অশুভ প্রভাব জাহাজের কেটে কেটে ফালা ফালা করে দিত। কোনো প্রাচীন ঐতিহাসিক যুবার মতো এই জ্যোৎস্না রাত, নির্জন সমুদ্র, কাঠের ক্রস আর আকাশের অন্তহীন নক্ষত্রমালা ছুঁয়ে ওর শপথ নিতে ইচ্ছে করছিল—আমি আছি, আমি থাকব। আমি কোনো পাপ কাজ করব না। কোনো অশুভ প্রভাবে বনিকে পড়ে যেতে দেব না।

    সারেঙ্গ-সাব দেখলেন, ছোটবাবু জ্যোৎস্নায় শুধু সমুদ্র দেখছে। একটা কথা বলছে না। তিনি হিগিনসকে বললেন, সাব অনেক রাত হয়েছে।

    ওরা তারপর নিঃশব্দে নেমে আসছিল ডেকে। বোট-ডেকে যে যার মতো উঠে গেল। কেউ কোনো কথা বলল না। বোট-ডেকে এখন সবাই থাকে বলে ক্যাপ্টেন তাঁর কেবিনে, বনি নিজের কেবিনে এবং সারঙে-সাব খোলা ডেকে শুয়ে পড়লেন। ছোটবাবু শুয়ে থাকল ও-পাশের বয়-কেবিনে। আর মধ্যরাতে মনে হল তার কেউ ডাকছে। পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে ফিস-ফিস করে ডাকছে। বনির কথা ভেবে কি করবে বুঝতে পারছিল না। কিন্তু চোখ মেলে সে দেখল—পোর্ট-হোল থেকে টর্চের ফোকাস আসছে—সে বলল, বনি তুমি আমাকে পাগল করে দেবে দেখছি। আর তখনই সামান্য জোরে কথা বলছে কেউ। বনির গলা মনে হল না। ক্যাপ্টেন পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে ডাকছেন—স্যালি হিগিনস বলছি ছোটবাবু। শিগগির ওঠো। চেঁচামেচি করবে না। ভারী সন্তর্পণে কথা বলছেন।

    দরজা খুলে ছোটবাবু বের হয়ে এল। হিগিনস আর একটা কথা বললেন না। সিঁড়ির নিচে সে দেখল, সারেঙ-সাব দাঁড়িয়ে আছেন। সমুদ্রে তেমনি ছলছল কলকল শব্দ। ঢেউ-এর ওপর জ্যোৎস্না পিছলে যাচ্ছে। দূরে নদীর পাড় ভেঙে পড়ার মতো সহসা সব ভারী শব্দ উঠছে। হিগিনস তখন বলছেন—ভয় পাবে না। বোধ হয় কোনো বড় তিমি মাছ দূরে কোথাও ডুবছে ভাসছে।—এস। এবং ওরা তিনজন এভাবে সেই কার্পেন্টারের ঘরের দিকে এগুতো থাকলে ছোটবাবু বলল, বনি জেগে গেলে ভয় পাবে স্যার। ওকে একা এভাবে ওপরে রেখে আমাদের ঠিক নিচে নামা উচিত হবে না।

    স্যালি হিগিনস বললেন, ওপরে অসুবিধা আছে ছোটবাবু।

    —কোনো অসুবিধা হবে না। আপনি আসুন। আমরা বরং বোট-ডেকের নিচেই বসি। বনি ডাকলেই সাড়া দিতে পারব।

    হিগিনস বললেন, বনি জেগে গেলে সব টের পাবে।

    —তা-হলে চাচা ওপরে থাকুক। তিনি আমাদের দরকারে খবর দেবেন।

    স্যালি হিগিনস যেন নিঃশ্বাস ছেড়ে বাঁচলেন। বনির জন্য তবে পৃথিবীতে আর একজন তাঁর চেয়ে কম দুর্ভাবনায় থাকে না। তাঁর ভীষণ ভাল লাগল। তিনি প্রায় ভেতরে পুলক বোধ করলেন। এবং সেই ছেলেমানুষের মতো পুলকে প্রায় শিস্ দিতে যাচ্ছিলেন। তখন ছোটবাবু বলল, স্যার আপনার কেবিনেও আমরা বসতে পারি।

    স্যালি হিগিনস দাঁড়িয়ে গেলেন। ছোটবাবু এবং সারেঙ দাঁড়িয়ে গেল। ওদের ছায়া স্থির। এবং মনে হচ্ছে জাহাজটাকে বাতাসে সামান্য ভাসিয়ে নিচ্ছে। বাতাস কি সমুদ্রস্রোত ওরা বুঝতে পারছে না। তবু এই মধ্যরাত্রে মনে হচ্ছে জাহাজটা যেন নিয়ত চলছে।

    স্যালি হিগিনস বললেন, খুব সাবধান।

    ওরা এবার প্রায় চুপি চুপি উঠে যাচ্ছিল। যাবার সময় টর্চ মেরে ছোটবাবু দেখল বনি সাদা চাদর গায়ে ঘুমিয়ে আছে। নীলাভ চুলে ওর মুখ প্রায় ঢাকা। এবং সুন্দর স্তন এই প্রথম সে বুঝতে পারল খুবই ভারী হয়ে উঠেছে। বোধহয় ওর শরীরে রাতের পোশাকও নেই। ছোটবাবুর মাথা ঝিমঝিম করছে।

    স্যালি হিগিনস ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন। ছোটবাবুর দেরি দেখে বললেন, দ্যাখো তো সারেঙ ছোটবাবু কি করছে!

    সারেঙ ঘুরে ও-পাশে নেমে গেলেই ছোটবাবু সতর্ক হয়ে গেল। টর্চের আলো নিভিয়ে দিল। বলল, ঘুমোচ্ছে। বাঁচা গেল। সিঁড়িতে ওঠার মুখে খুব আস্তে আস্তে বলল, স্যার বনি অঘোরে ঘুমোচ্ছে। আমরা নিশ্চিন্তে এখন বসতে পারি।

    স্যালি হিগিনস এবার লম্ফ জ্বালিয়ে দিলেন। একটা বড় নীল রঙের চার্ট বের করলেন পকেট থেকে। সাদা সব দাগ। সেই দাগগুলো বড় একটা কাগজে সোজা কেটে কেটে বললেন, ছোটবাবু এদিকে এসে তুমি বোস। সারেঙ-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি দাঁড়িয়ে থাকলে কেন। বোস।

    সারেঙ-সাব বললেন, ঠিক আছে সাব।

    ছোটবাবু টেবিলে ঝুঁকে আছে। হিগিনস ঝুঁকে আছেন। তিনি বললেন, ছোটবাবু কাল তোমাদের বোট দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার আগে সব বুঝে নাও। তোমরা থাকছ না।

    —আপনি কি বলছেন!

    হিগিনস সহসা ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, চেঁচাবে না। বনি ঘুমোচ্ছে। মাঝে মাঝে তোমার হাবভাব আমার একদম ভাল লাগে না ছোটবাবু। তুমি চেঁচাবে আমি জানতাম। এজন্য নিচে নেমে যেতে চেয়েছিলাম।

    ছোটবাবু বলল, কিন্তু স্যার।

    —আগে আমার কথা শেষ করতে দাও। আমার বলা শেষ হলে বলবে। কতদিন বলেছি কথার মাঝে কিছু বলবে না। আগে শুনবে তারপর বলবে।

    ছোটবাবু বসে পড়ল।

    —ছোটবাবু, তুমি ভয় পাচ্ছ। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন।

    ছোটবাবু বলল, স্যার আস্তে। বনি ঘুমোচ্ছে।

    হিগিনস বসে পড়লেন। তারপর কপাল টিপতে থাকলেন। মাথা ধরেছে বুঝি। এবং চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। তিনি যেন কতদিন না ঘুমিয়ে আছেন।

    ছোটবাবু বলল, বোটে আমরা কে কে থাকছি?

    —বনি এবং তুমি।

    —আপনারা?

    —আমরা জাহাজে থেকে যাচ্ছি।

    —সবাই নেমে গেলে হত না!

    —এই রাসকেল, জাহাজটা তোমার না আমার। জাহাজের কাপ্তান তুমি না আমি। কে নামবে, কে নামবে না তুমি বলবে, না আমি বলব।

    ছোটবাবুর এটা ভাল লাগে না। মাঝে মাঝে বুড়ো অহেতুক রেগে যায়। ভাল কথা বললেও রেগে যায়। কেমন রগচটা মানুষের মতো তখন আবোল-তাবোল বকতে থাকে। সে আর একটা কথা বলল না।

    আর হঠাৎ কি যে হয়ে যায় হিগিনসের। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, সারেঙ, তুমি ওপরে থাক। .আমরা নিচে যাচ্ছি। বনি জেগে গেলে বলবে, আমরা স্টোর-রুমে আছি। তিনি প্রায় দ্রুতগতিতে এবার নেমে যেতে থাকলেন। ছোটবাবুকে একবার বললেনও না, তুমি আমার সঙ্গে এস। অথচ ছোটবাবু প্রায় লেজ তুলে বুড়ো মানুষটার পেছনে ছুটছে।

    সিঁড়ি ধরে নিচে নামার সময় ওপরে টর্চ মেরে বললেন, কি পায়ে জোর পাচ্ছ না? খুব জোয়ান! একটা বুড়ো মানুষের ঘাড়ে চেপে থাকতে খুব ভাল লাগছে!

    ছোটবাবু বলল, স্যার সমুদ্রের আমি কিছু জানি না।

    হিগিনস বললেন, কেউ জানে না। সবাই বড় বড় কথা বলে। সমুদ্রকে জানা বুঝি ইয়ার্কি। বলে লাফ দিয়ে নেমে পড়লেন নিচে। তারপর হাত নেড়ে অন্ধকারে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ছোটবাবু বলল, স্যার টর্চ জ্বালুন। কিছু দেখতে পাচ্ছি না। তিনি ফস করে দেশলাই জ্বালিয়ে লম্ফ খুঁজে বের করলেন। ওটা জ্বেলে দেয়ালে টানিয়ে দিলেন। প্রায় খাদের নিচে এখন দু’জন মানুষ। দু’জন যতই চেঁচামেচি করুক কেউ টের পাবে না। দু’জন মানুষ আর দু’টো ছায়া যতক্ষণ থাকবে, ছোটবাবুর ভয় থাকবে না। কারণ একটা হয়ে গেলেই বুঝতে পারবে হিগিনসের কোনো ছায়া নেই। জাহাজে হিগিনস তবে সত্যি আস্ত শয়তান। জাহাজটার সবই ভুতুড়ে। প্রলোভনে ফেলে ছোটবাবুকে রেখে দিয়েছে হিগিনস। সে সব সময় হিগিনসের চেয়ে তার ছায়ার প্রতি বেশি নজর রাখছিল।

    হিগিনস বড় একটা কাঠের বোর্ডে পেরেক পুঁতে দিচ্ছেন। আর অজস্র কথা, ছোটবাবু সমুদ্রে অগ্নিকাণ্ড নিজের চোখে দেখেছ। কি কথা বলছ না কেন? আরে আমি মানুষ। শয়তান নই। তোমার চোখ এমন হয়ে যাচ্ছে কেন?

    —স্যার বলুন। আমি শুনছি।

    —কী মনে হয়েছে? জাহাজ-ডুবি ভুতুড়ে ব্যাপার—আমেরিকান অয়েল-ট্যাঙ্কার ভূত সেজে ভয় দেখাচ্ছে। কিছু না। কোথায় কি প্রাকৃতিক কারণে ঈশ্বরের ইচ্ছেয় কি হচ্ছে আমরা জানি না। আমরা নানাভাবে তাঁকে বিশ্বাস করতে ভালবাসি। কিছু অবিশ্বাস্য দেখলে ভূতটুত ভাবি। বাজে কথা। সব বাজে কথা।

    ছোটবাবু কি বলতে যাচ্ছিল তিনি থামিয়ে দিয়ে বললেন, শেষ করতে দাও।

    তিনি এবার লম্ফের আলোতে চার্টের মাথায় কি দেখালেন।—কাছে এস। দূরে দাঁড়িয়ে তুমি কি দেখবে! এই দ্যাখো, যদি তুমি সোজা নব্বই ডিগ্রি বরাবর উঠে যাও মনে রাখবে পালে বাতাস’ পাবে দক্ষিণ-পূর্ব আয়নবায়ুর। তোমার হাল ঠিক থাকলে, যে-কোনো দিকে বোটের মুখ ঘুরিয়ে দিতে পার—একমাত্র সাউথ-ইস্ট বাদে সব দিকে। জুন মাসের এখন মাঝামাঝি সময়। তুমি জুলাই অবধি এই বায়ুপ্রবাহ পাবে মনে রাখবে। বাতাস উঠলেই পাল খুলে দেবে। আর সব সময় কম্পাসের কাঁটা নব্বই ডিগ্রি বরাবর। পাঁচ-সাতশ’ মাইলের ভেতর তুমি দু’টো দ্বীপ দু’পাশে পাচ্ছ, যদি কোনো কারণে ভুল, ভুল হওয়া স্বাভাবিক। বরং ঠিক ঠিক উঠে যাওয়া কঠিন, তবে দু’টো দ্বীপের ফাঁকে আরও ওপরে চলে যাচ্ছ মনে রাখবে। প্রায় তিনশো তেত্রিশ-টেত্রিশ হবে দূরত্ব, এলিস দ্বীপ, এ-দ্বীপগুলোতে সব পলিনেশিয়ানদের বাস। এছাড়া আশেপাশে অজস্র দ্বীপ আছে ভয় পাবে না। হাতে দেড়-দু’মাস সময় বায়ুপ্রবাহ তোমার অনুকূলে। যা খাবার আছে, যদি আধপেটা খাও মাস চালিয়ে দিতে পারবে। জল যতটা দরকার নেবে। সব ফুরিয়ে গেলে ঘাবড়ে যাবে না। সামুদ্রিক সব মাছ দেখবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দরকারে বড়শিতে মাছ শিকার করবে। আগুনে ঝলসে খেয়ে নেবে। আর যদি দ্যাখো ঝড়ে পড়ে গেছে বোট—সী-অ্যাংকার ফেলে দেবে সামনে। ছোটবাবু মনে রাখবে—ইউ হ্যাভ এ গুড সোল। জল, খাবার ফুরিয়ে গেলে মরীচিকা দেখবে সব অদ্ভুত রকমের, ভয় পাবে না। দেন প্ৰেজ দ্যা লর্ড। হি ইজ দ্যা গ্লোরি অফ হিজ পীপল্ প্রেইজ হিম। তারপর তিনি বললেন, ইয়ং ম্যান লিসেন টু মি অ্যাজ ইউ উড টু য়োর ফাদার। লিসেন অ্যাণ্ড গ্রো ওয়াইজ ফর আই স্পিক দ্য ট্রুথ। ডোণ্ট টার্ন অ্যাওয়ে।

    ছোটবাবু ওঁর কথা শুনতে শুনতে কেমন আবিষ্ট হয়ে গেছে। সে দেখছে স্যালি হিগিনস তার মাথার ওপর হাত রেখে যেন দাঁড়িয়ে আছেন। পৃথিবীতে এই জাহাজ, বনি, সারেঙ-সাব এবং বুড়ো মানুষটা বাদে আর কোনো তার অস্তিত্ব আছে—সে ছোটবাবু নয়, সে অতীশ দীপঙ্কর দেবশর্মণঃ, সে শ্রীযুক্ত চন্দ্রনাথ দেবশর্মণ নামক ব্যক্তির জাতক—মা তাঁর দরজায় রাতে শব্দ হলে জেগে যায়—আর মনে করতে পারছে না।

    তিনি ফের বলছেন, লিসেন টু মি, মাই সন। লার্ন টু বি ওয়াইজ। ডেভেলাপ গুড জাজমেন্ট অ্যাণ্ড কমনসেন্স। সমুদ্র তোমাকে অযথা তবে ভয় দেখাতে পারবে না।

    তিনি এবার ঘুরে দাঁড়ালেন—ছোটবাবু এবার দেখতে পাচ্ছে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন পেছন ফিরে। সে তাঁর মুখ দেখতে পাচ্ছে না। তিনি কি পেছন ফিরে কাঁদছেন। তিনি তাঁর সব সাহস হারিয়ে ফেলেছেন! সে তাঁর সাহস ফিরিয়ে আনার জন্য কিভাবে যে কি করবে বুঝতে পারছে না। ভেতরে ছটফট করছে। এবং লম্ফের আলোতে অতীব অস্পষ্ট এক করুণ অপার্থিব অভিজ্ঞতা। সে কেমন স্থির গলায় তখন স্যালি হিগিনসকে ঈশ্বরের কথা বলে যাচ্ছে। নিজেকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না—সে এভাবে বলতে পারে। বিশ্বাস করতে পারছে না—সে বলছিল, স্যার উই লিভ উইদিন দ্যা শ্যাডো অফ দ্য অলমাইটি, শেলটারড বাই দ্য গড হু ইজ এভাভ অল গডস্। তবে আমরা ভয় পাব কেন। যেখানেই যাই তাঁর কাছে আমরা থাকব।

    আর তখন হিগিনস প্রায় ঈশ্বরের নামে অশ্রুপাতের মতো ছোটবাবুকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি চিৎকার করে বলতে থাকলেন—সব বাইবেলের কথা তুমি জানলে কি করে! বলেই কেমন শক্ত গলায় বললেন, তোমাদের নিশ্চিন্তে বোটে নামিয়ে দিতে পারতাম—আমার বিশ্বাস ছিল কেউ তোমাদের অনিষ্ট করতে পারবে না। কেউ না। কিন্তু ছোটবাবু, আর্চিকে তুমি খুন করেছ। তিনি তোমাকে ক্ষমা করবেন না। আর তারপরই ঘুরে ঘুরে প্রায় জাহাজডুবির গল্প যেন বলে যাচ্ছেন—সমুদ্রে অতীব মায়ায় পড়ে গেলে মরীচিকা প্রায়, তেষ্টায় যখন বুক ফেটে যাবে, মাঝে মাঝে সমুদ্রে ডুবে স্নান করে নিতে পার ছোটবাবু। ঘামে যা নুন বের হয়ে যাবে, শরীর ঠাণ্ডা হলে তা লাঘব হবে। সামান্য লোনা জল খেয়ে ফেলতে পার। তারপরও দেখবে তৃষ্ণা যাচ্ছে না। চোখ বসে যাচ্ছে, গলা শক্ত হয়ে যাচ্ছে কাঠের মতো। তখন যদি পারো কোনো মাছ শিকার করে য়ো ক্যান সাক্ হার ব্লাড। এবং মনে রাখবে যা হয়ে থাকে, তখন মানুষ দিকবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে যায়, সে পাশের লোকটির ওপর ঝাঁপিয়ে তার গলা কামড়ে ধরে। তুমি বনিকে অনায়াসে ধরতে পার। তুমি তাহলে বেঁচে যাবে।

    ছোটবাবু বুঝতে পারছিল মাথা ঠিক রাখতে পারছেন না তিনি। মাঝে মাঝে ছোটবাবুকে ভীষণ অবিশ্বাস করছেন। তিনি তবে জানেন, তিনি জানেন সে আর্চিকে খুন করেছে। সে কিন্তু কোনো পাপ কাজ করেছে বলে মনে করতে পারে না। একটা হত্যাকাণ্ড—এটা সে কেন যেন বুঝতে পারে না, শ্বাসরোধ করে মারা হত্যাকাণ্ডের সামিল। অথচ বার বার সে আর্চির মুখে সামান্য কীট-পতঙ্গের ছায়া দেখেছে। নির্বোধ, অর্থহীন চোখে যে সামান্য মায়া থাকে, তাও পর্যন্ত ছিল না। সে কোনো কীট-পতঙ্গ হত্যার মতো আর্চিকে হত্যা করেছে। হিগিনসের কথায় সে সামান্যতম ব্যাকুল বোধ করল না। বলল, শুধু একটা কথা আমার। যদি রাগ না করেন।

    তিনি হাত উঁচিয়ে বললেন, নো। আমার এখনও শেষ হয়নি। সব খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছ আশা করি। আর একটা কথা। খাবার ফুরিয়ে গেলে সমুদ্রে প্ল্যাংকাটন পাবে। ছাঁকনি দিয়ে তুলে নেবে। শ্যাওলার মত সবুজ। সঙ্গে কুচোচিংড়ির মতো জেলি ফিশ থাকবে। সব অণুর মতো। ওগুলো বেছে নেবে। খেতে খুব খারাপ লাগবে না। খাওয়ার অভ্যাস হয়ে গেলে দেখবে, সমুদ্রে তোমার জল এবং খাবার না হলেও চলবে। যতদিন বোট ভেসে থাকবে, তোমরা ততদিন বেঁচে থাকতে পারবে।

    ছোটবাবু আবার হাত তুলে কিছু বলতে চাইলে তিনি বললেন—নো। আর কোনো কথা না। তুমি কি বলবে আমি জানি। তুমি আমাকে নিয়ে নামতে চাইবে। সারেঙকে আমি সব খুলে বলেছি। সারেঙ আমাকে ছেড়ে যেতে চাইছে না। সেই এক অহঙ্কার। জাহাজটাকে সমুদ্রে ফেলে ডাঙায় ফিরে গেলে লোকে হাসাহাসি করবে। বুঝতে পারছ না জাহাজ না নিয়ে আমাদের বন্দরে যাবার নিয়ম নেই। আর সেই বা কি ভাববে?

    তারপর তিনি থেমে থেমে বলতে থাকলেন—সিউল-ব্যাংক আমাকে ছেড়ে দেবে না। আমি সঙ্গে থাকলে সব অশুভ প্রভাব তোমাদের বোটে উঠে যাবে। আমাকে কেউ ছেড়ে দেবে না। সিউল-ব্যাংক, এলিস, ক্যাপ্টেন লুকেনার এতদিন সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। ওদের হাতে সুযোগ এসে গেছে। সিউল- ব্যাংক আমার ওপর তার সব বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। আমিও তার বিশ্বাসের মর্যাদা দেইনি। জাহাজ বিক্রিবাট্টার কাগজ পত্রে আমি সই করেছি। নেমকহারাম আমি।

    ছোটবাবু আবার কিছু বলার চেষ্টা করলে চিৎকার করে উঠলেন—যা বলছি শোনো। এটা সেই সমুদ্র, সেই আকাশ, সেই নক্ষত্রমালা যার নিচে এলিসকে আমি খুন করেছিলাম ছোটবাবু। এলিস মৃত্যুর পর আমাকে কোথাও ছেড়ে যায়নি। মাঝে মাঝে আমি ওকে দেখতে পেতাম ছোটবাবু। এখন আমার পাশে সেও নেই। তাকে আর দেখতে পাচ্ছি না। সে আমাদের ঠিক তার জায়গায় টেনে এনেছে।

    কথা বলতে বলতে হিগিনস কেমন ম্রিয়মান হয়ে যাচ্ছেন। করুণ চোখ-মুখ। ভীতু মানুষের মতো ছোটবাবুর দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন। আর যেন প্রায় স্বীকারোক্তির মতো তিনি সব বলে যাচ্ছেন। লম্ফটা তেমনি দপদপ করে জ্বলছে।—বুঝলে ছোটবাবু, এলিস আমার প্রথম পক্ষের স্ত্রী। বনি আমার দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান। স্বাভাবিক কারণেই বনির ওপর তার আক্রোশ। এতদিনে বুঝতে পারছি—সে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সকালে দেখতে পাবে সামান্য একখণ্ড জমি সমুদ্রে দ্বীপের মতো। ওপরে ক্রস। প্রবালে দ্বীপে হয়তো পলি পড়ে পড়ে ক্রসটা আরও মাথার ওপরে উঠে এসেছে। আমার কেন জানি মনে হয় এলিস শুয়ে আছে তার নিচে। মমির মতো শরীর। সারাক্ষণ সমুদ্র তার ওপর আছড়ে পড়ছে। তুমি ভুল দ্যাখোনি। আমিও না। তারপর মুখ নামিয়ে নিলেন। আর একটা কথাও বলছেন না।

    ছোটবাবুর মনে হল তিনি আর কথা বলবেন না। সে এগিয়ে গেল। এবং ডাকল, স্যার…! তিনি তবু কেমন স্থির আর অস্বাভাবিক রকমের ঠাণ্ডা।

    —আর কথা না ছোটবাবু। এই বলে তিনি লম্ফটা হাতে নিলেন। চার্ট তিনি ছিঁড়ে ফেললেন। এবং সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় সহসা থমকে দাঁড়ালেন।

    ছোটবাবু বললে, কি হল স্যার?

    —বনি জানবে না। বনি জানবে না, তোমাদের সমুদ্রে আমরা ভাসিয়ে দিচ্ছি। তোমরা, কাছে কোথাও ডাঙা আছে সেখানে যাচ্ছ। দু-একদিনের ভেতর লোকালয় পেয়ে যাবে—আমরা আছি জাহাজে। ডাঙা পেয়ে গেলে খবরাখবর পৃথিবীতে পৌঁছে দেবার চেষ্টা করা হবে। তারপর রেসকিউ—আমরাও ফিরে যাচ্ছি তখন। ঘুম থেকে উঠে বনি চোখ-মুখ দেখে যেন টের পায় আমরা ভাল আছি। আমরা বেঁচে আছি। কারো চোখে-মুখে মরা মানুষের ছবি দেখতে চাই না ছোটবাবু। তারপর ওপরে উঠে যেতে যেতে বললেন, আমার সামনে বনি ক্ষুধায় তৃষ্ণায় মরে যাবে –আর আমি ভাবতে পারছি না ছোটবাবু আশা করি তুমি ওকে ঠিক পৌঁছে দেবে। তাকে কোনো কষ্ট দেবে না। বলতে বলতে ছোটবাবুর দু’হাত জড়িয়ে ধরলেন। মুখ তাঁর অন্য দিকে। ছোটবাবু বুঝতে পারল, তিনি এখন বালকের মতো কাঁদছেন।

  • তিপ্পান্ন

    তিপ্পান্ন

    ।। তিপ্পান্ন।।

    বনি অঘোরে ঘুমোচ্ছিল। হিগিনস ভাঙা যীশুর মূর্তি টেবিলে জোড়া লাগাচ্ছেন। সারেঙ পোর্ট- হোলে দাঁড়িয়ে আছেন। ফ্যাকাশে চাঁদ সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে এবং অজস্র চাঁদ এভাবে যেন হাজার লক্ষ চাঁদের প্রতিবিম্ব ভাসছে সমুদ্রে। তারপর অন্ধকার। কিছু দেখা যাচ্ছে না। সমুদ্রে তেমনি কল-কল ছল-ছল শব্দ। ছোটবাবু হেঁটে যাচ্ছে ডেক ধরে। সে শেষবারের মতো জাহাজটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। সবই মনে পড়ছিল। যেন পাশে দাঁড়িয়ে মৈত্রদা বলছে—কিরে ছোট, তোরাও চললি। সে পিছিলের রেলিঙে এসে ঝুঁকে দাঁড়াল। ডাঙার কাছে এলে, মৈত্রদা সে অমিয় জব্বার মনু দাঁড়িয়ে থাকত।—কিরে ছোটবাবু বিফ খেয়েছিস বলে মন খারাপ! পৃথিবীটাকে এত ছোট ভাবিস কেন। আমি বামুনের ছেলে না! আমার জাত নেই বুঝি? অথবা যেন দূরে বোট-ডেকে ডেবিড দাঁড়িয়ে হাঁকছে, ছোটবাবু সামনে আটলান্টিক। এবার আমরা ভারত মহাসাগর পার হয়ে যাচ্ছি। অথবা মৈত্রদার দু’টি একটা কথা, হেঁটে যাবার সময় মনে করতে পারছে। গ্যালিতে ভাণ্ডারি জ্যেঠার চর্বি ভাজা চাপাটির গন্ধ একটু নাক টানলেই যেন পেয়ে যাবে। সে পিছিলে এসে গেছে। কত জমজমাট ছিল জায়গাটা। অনিমেষের গলা যেন এক্ষুনি শুনতে পাবে—সে যেন পায়ে ঘুঙ্গুর বেঁধে গাইছে—ওলো সই ললিতে, যাচ্ছি আমি গলিতে। অথবা গানের সঙ্গে তার গলায় বাজছে—ছোটবাবু ভূত দেখেছে। সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে গেলে অন্ধকারটা আরও চাপ বেঁধে আছে। কোন শব্দ নেই। কেবল স্টিয়ারিং-এনিজিনের পেনিয়ান এখনও বাতাসে কক্ কক্ করছে। কাল তাদের জাহাজ ছেড়ে সমুদ্রে ভেসে পড়তে হবে। বনি এত বড় বিপদের কথা বিন্দুমাত্র জানে না। বনি অঘোরে ঘুমোচ্ছে।

    অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। সব ফোকসালের দরজা বন্ধ। দু’টো-একটা ইঁদুর ছুটে যাচ্ছে। আর এক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে গেলে তার ফোকসাল। জাহাজে এটাই ছিল তার প্রথম আস্তানা। সে টর্চ জ্বেলে এবার ভিতরে ঢুকে নিজের বাংকে কিছুক্ষণ বসে থাকল। মৈত্রদা পাশেই আছে মনে হচ্ছিল। যেন বলছে, খাও ছোটবাবু, খাও। সমুদ্রে কারো বাবা-মা থাকে না। আমরাই আমাদের বাবা-মা। বাংকে তেমনি মৈত্রদার বিছানা পাতা। অমিয় যাবার আগে ওর বিছানাটা উল্টে রেখে গেছে। সব হুবহু তেমনি আছে। সবই এখন স্মৃতি। ডেবিড বন্ধু অনিমেষ জব্বার কিভাবে সমুদ্রে বেঁচে আছে কে জানে! চুপচাপ অন্ধকারে সে বসে থাকল। সে কিছু আর ভাবতে পারছে না।

    ছোটবাবুর এভাবে তন্দ্রার মতো এসে গেছিল। তখন মনে হল সারেঙ- সাব ডাকছেন। ছোটবাবু বুঝতে পারছে সারেঙ-সাব দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকছেন। হাতে একটা লম্ফ! সারেঙ-সাবের সাদা পোশাক সাদা চুল সাদা দাড়ি, কোনো কিংবদন্তীর পুরুষের মতো অথবা মনে হয় সেই শৈশবের ফকিরসাব যেন—হাতে তাঁর মুশকিল আসান। একটা পয়সা লম্ফের ভেতর ফেলে দিলেই তিনি তার কপালে ফোঁটা টেনে দেবেন—মুশকিল আসান আসান করে—সেই মাঠে লম্ফ জ্বালিয়ে অন্ধকার রাতে শৈশবে সে যেমন দেখেছে, একজন মানুষ উঠে আসছে, গলায় মালা তাবিজ, গায়ে কালো কাপড়ের অজস্র তালি মারা জোব্বা, হাতে মুশকিল আসানের লম্ফ—তিনি এখন তেমনি দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছেন। বলছেন—কখন তুই এখানে নেমে এয়েছিস! ভাবলাম ছোট ওদিকে যাচ্ছে কেন! তারপর আর তোর পাত্তা নেই। আমার দিলে ধুকপুক উঠে গেছে। নেমে এলাম। এখানে তুই কি করছিস!

    সে বলল, চাচা কাল তো আপনি আমার সঙ্গে থাকবেন না!

    সারেঙ-সাবের মুখটা কালো হয়ে গেল।

    ছোট বলল, তখন এভাবে কে দেখবে! কে খুঁজে বেড়াবে আমি কোথায় আছি!

    তিনি ওপরে হাত তুলে দিলেন! যেন বলার ইচ্ছে, তিনি দেখবেন, ছোট। তারপর বললেন, ওপরে চল। কতক্ষণ বসে থাকবি!

    ছোটবাবু ঘড়িতে দেখল চারটে বেজে গেছে।

    —একটু ঘুমিয়ে নে ছোট।

    —সকাল হয়ে যাচ্ছে। ঘুম আসবে না।

    —তবু একটু গড়িয়ে নে।

    —শুলে আর উঠতে ইচ্ছে করবে না। চলুন ওপরে যাই।

    আর ওপরে এসেই ছোটবাবু তাজ্জব। সেই ক্রস, সেই আলো—প্রায় ফসফরাসের মতো সাদা উজ্জ্বল-বর্ণময় আলো ক্রসটা থেকে দপদপ করে জ্বলছে। একেবারে সামনে। মনে হয় আধ মাইলের ভেতর—কি আরও কাছে কি দূরে কতদূরে হবে—সে এবং সারেঙ-সাব বুঝতে পারছে না। আর ফসফরাসের আলো কখনও জ্বলছে নিভছে। কখনও নীল হলুদ অথবা রক্তবর্ণ হয়ে যাচ্ছে—প্রাচীন মোজেসের সেই দৈববাণীর মতো যেন ক্রসটা বিধাতার করুণ অহমিকা। অথবা অট্টহাস্য করছে সমুদ্রে। ওরা ছুটে যেতে পারল না। হাত পা স্থবির হয়ে যাচ্ছে। বোধ হয় ছোটবাবু মূর্ছা যেত। তখনই কাপ্তানের গলা, আমার সঙ্গে এস।

    হিগিনস যেতে যেতে সহসা সতর্ক গলায় ধমক দিলেন, তুমি ওদিকে কোথায় গিয়েছিলে?

    —ফোকসালে স্যার।

    —কি দরকার এখন সেখানে ঘোরার!

    —নেমে যাবার আগে…

    তখনও তেমনি ক্রসটা আকাশের নিচে জ্বলছে। সমুদ্রে সামান্য ঢেউ আছে। বাতাস বেশ জোরে বইছে। জাহাজটা উঠছে নামছে। তার মনে হচ্ছিল ক্রসটা উঠছে নামছে। কখনও আকাশের গায়ে অতিকায় হয়ে যাচ্ছে কখনও ঢেউ-এর আড়ালে পড়ে ছোট হয়ে যাচ্ছে।

    তিনি ওদের নিয়ে বোট-ডেকে উঠে যাচ্ছেন। কিছু বলছেন না। চুপচাপ। ছোটবাবু আর না পেরে খুব সতর্ক গলায় বলল, আপনি কিছু বলুন। আমাদের এ কোথায় নামিয়ে দিচ্ছেন।

    হিগিনস খুব সহজ গলায় বললেন, ক্রসটা দেখে ঘাবড়ে যাবে না। তারপর বললেন, সকাল হয়ে যাচ্ছে। যত সকাল হবে ক্রসটার সব আগুন অথবা লাল নীল ফসফরাসের জ্বলা কমে আসবে। দিনের আলোতে কিছু দেখতে পাবে না। বোধ হয় কোনো প্রবালের পাহাড়টাহাড় সমুদ্র থেকে ভেসে উঠে এমন হয়েছে। ঝড়ে বৃষ্টিতে রোদে জলে ক্ষয়ে পাহাড়ের মাথাটা এক অতিকায় ক্রস। যত দিন যাচ্ছে তত এটা বড় হয়ে যাচ্ছে। বিশ বছর আগে যা দেখেছিলাম ওটা, এখন তার চেয়ে অনেক বড়। ক্রমশ ওটা সমুদ্রের পাতাল থেকে ওপরে উঠে আসছে বুঝি। গায়ে তার অজস্র ফসফরাস জোনাকির মতো। আত্মগোপন করে আছে।

    এবং সত্যি ছোটবাবু দেখল যত পুবদিক ফর্সা হয়ে যাচ্ছে, যত সমুদ্র আর আকাশ কুসুম-কুসুম রঙ ধরছে তত ক্রসটার বিচ্ছুরণ নিস্তেজ হয়ে আসছে। আর সকালে স্পষ্ট দেখল ওটা একটা পাহাড়ের শীর্ষদেশ। এঁকেবেঁকে ক্রুশের মতো। ক্ষয়ে গিয়ে চারপাশে চারটা কালো স্তম্ভ। এবং দূর থেকে দেখতে হুবহু একটা লম্বা প্রায় মাস্তুলের মতো উঁচু ক্রস। ছোটবাবু বলল, কেমন ভয় পেয়ে গেছিলাম পাহাড়টা দেখে। পাহাড়টা কেমন ওপরে উঠে যাচ্ছে।

    —ওর দোষ কি বল! ওতো উঠে আসতে চাইবেই।

    আর চেঁচামেচিতে বনিও উঠে এসেছে। সে খুব অবাক—ওরা তিনজন দাঁড়িয়ে একটা কালো কুচকুচে প্রবালের খাড়া পাহাড় দেখতে দেখতে কেউ কোনো কথা বলতে পারছে না। সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। ক্রসের মাথা থেকে যে জল চুইয়ে পড়ছে নিচে তাও দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রের ঢেউ পাহাড়টাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে।

    বনি বলল, বাবা জাহাজটা ওটার গায়ে গিয়ে আবার ধাক্কা খাবে নাতো!

    কারণ তখন তো জাহাজটাও যে কি কারণে ছুটে যাচ্ছে। কোন দিকে যাবে—ওটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে না চারপাশে গভীর খাদে নিবিষ্ট এক চোরাস্রোতে পড়ে গেছে জাহাজ বোঝা যাচ্ছে না। তিনি হেঁকে উঠলেন, বনি, তোমার যা কিছু আছে ঠিক করে নাও। তোমরা নেমে যাবে। পাহাড়টা দেখে সব ঠিক করে ফেলেছি।

    বনি বলল, কি ঠিক করে নেব?

    —তোমার যা কিছু আছে সব।

    —কেন বাবা! কি হবে?

    —কাছে একটা দ্বীপ পাবে। সেখানে তোমরা যাবে। ছোটবাবুকে আমি সব বুঝিয়ে দিয়েছি। তোমরা খবর পাঠালে আমরা ঠিক উদ্ধার পাব। জাহাজটা উদ্ধার পাবে। দ্বীপে মানুষজন আছে। একটু থেমে বললেন, সবাইর জাহাজ ছেড়ে যাওয়া ঠিক না। আমি আর সারেঙ থাকলাম।

    বনি মাথামুণ্ডু কিছু বুঝছে না। সে কি ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখছে! ভাল করে চোখ মুছে দেখল, না, সে ঠিকই দেখছে। বাবা তাকে ভীষণ তাড়াতাড়ি করতে বলছেন। আর ছোটবাবুকে ধমক—এই তোমাকে যে বললাম, বনিকে নিয়ে যাও তুমি, কি হে এত তুমি ভীতু—তোমার কাণ্ডজ্ঞান নেই কিছু। বয়সে তো আর ছোট নেই, কবে দামড়া হয়ে গেছ।

    বনি বলল, কতদূর বাবা?

    —এই কাছেই। দু-তিন দিনের ভেতর ডাঙা পেয়ে যাবে। সব বলে দিয়েছি। কম্পাসের কাঁটা কত ডিগ্রী বরাবর রাখলে দ্বীপটা পেয়ে যাবে তাও বলে দিয়েছি। পালে জোর বাতাস লাগলে এক আধ দিনেও পেয়ে যেতে পার। দ্বীপটায় সবকিছু পাবে।

    বনি বলল, কি মজা! সে ছুটে প্রায় চলে যাচ্ছিল—কিন্তু কি মনে হওয়ায় সে ফের ফিরে এসে বলল, একটু চা করে তোমাদের খাইয়ে যাচ্ছি বাবা। আর কোনও আমাদের তা হলে ভয় নেই বলছ ত!

    হিগিনস বললেন, আরে না না, কোনও ভয় নেই। এবারের মতো সবাই বেঁচে গেলাম। তারপর কি মনে পড়ায় বললেন, তা মন্দ না, কি বল সারেঙ। চা করলে ভালই লাগবে। বনি তাড়াতাড়ি করবে! এই রাসকেল—কি, দাঁড়িয়ে থাকলে কেন। হাত লাগাও। বলে তিনি বোটে দু’লাফে উঠে গেলেন। হুড তুলে বললেন, রেশন আগে রাখো। জল রাখো। বাকি সব কাল আমি ঠিক করে রেখেছি। সব আছে। এই একটা দা রেখে দিয়েছি দ্যাখো। রাত-বিরেতে অক্টোপাসের ঠাণ্ডা পা বোটে উঠে এলে দা দিয়ে কোপ মারবে। একজন ঘুমোবে একজন পাহারায় থাকবে।

    বনি নিচে নেমে গেছে। ছোটবাবু বোটে উঠে এসেছে। সারেঙ-সাব নিচ থেকে রেশন টেনে তুলছেন। ছোটবাবু আর কাপ্তান সব সাজিয়ে রাখছে—যেন হাতে যা সময় পাওয়া যায়—ছোটবাবুকে সমুদ্র সম্পর্কে আরও কিছুটা অভিজ্ঞ করে তোলা। কাল রাতে একবারে ভেঙে পড়েছিলেন—মাথা ঠিক ছিল না। এখন খুব মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজকাম করে যেতে হবে। বার-বার তিনি সমুদ্র সম্পর্কে বলে যাচ্ছেন—বুঝলে ছোটবাবু, খাবার ফুরিয়ে গেলে প্ল্যাংকাটন সম্বল। প্রাণীজাতীয় শৈবালজাতীয় দু’রকমেরই পাবে। সমুদ্রে এমন সব অনু-পরিমাণ মাছ ভেসে বেড়ায়। চোখে ঠিক দেখা যায় না। হিগিনস আশেপাশে খুঁজে দেখলেন, বনি কাছে কোথাও আছে কিনা। এই দেখছ এটা তোমাদের দিয়ে দিলাম। এটা জলে ফেলে এই বিশ পঁচিশ মিনিট পরে তুললে সামান্য প্ল্যাংকাটন উঠে আসবে। বেশ জল ঝরে গেলে প্রায় সবুজ জেলির মতো দেখতে। আর মনে রাখবে জল না থাকলে তোমরা কাঁচা মাছ চিবিয়ে খেতে পার। ওতে তেষ্টা নিবারণ হবে। আর শোনো সবসময় দু-চারটা মাছ তুলে ভেতরে গর্ত করে রাখবে—কিছুটা লালার মতো জমলে চেটে খেলে তেষ্টা নিবারণ হবে। ওয়াটার ওয়াটার এভরিহোয়েয়ার বাট নট এ ড্রপ টু ড্রিংক—মিথ্যে কথা। ঈশ্বর কোথাও মানুষের আহার রাখেননি তা হতে পারে না। কোলরিজ কিছু জানতেন না। তাঁর কবিতায় নায়কেরা মরীচিকা দেখেছে। সব রপ্ত হয়ে গেলে তোমরা সমুদ্রকে কলা দেখাতে পারবে। একজন যুবকের পক্ষে দীর্ঘ দিন সমুদ্রে বেঁচে থাকা খুব কঠিন না।

    আসলে তিনি ছোটবাবুকে সাহস দিচ্ছিলেন। সমুদ্র সম্পর্কে যতটা জ্ঞানগম্যি আছে—যা তিনি পড়াশোনা করেছেন—এবং কিছুদিন আগে কনটিকি অভিযানের সব পৃথিবী তোলপাড় করা খবর তিনি জানেন এবং এইসব ঘটনা, অর্থাৎ মহাসমুদ্রে সামান্য মানুষেরা ভেলায় চড়ে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিলে কি কি অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় তার একটা নিদারুণ ছবি তিনি ছোটবাবুকে দিতে পারতেন—কিন্তু ইচ্ছে করেই দিলেন না। কেবল বললেন, যদি কোন অতিকায় হাঙর দেখ পেছন নিয়েছে—তাকে অনিষ্ট করার চেষ্টা করবে না। সমুদ্রের কোন জীব অহেতুক হত্যা করবে না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাছ সমুদ্র থেকে তুলবে না। ছোট ছোট সব কাঁকড়া এইসব ক্রান্তীয় সমুদ্রে ভেসে বেড়ায় খেতে বেশ সুস্বাদু। তোমার সঙ্গে জল, কয়লা, এবং এই দ্যাখো লোহার উনুন, একেবারে পাটাতনের সঙ্গে ফিট করা সব—সমুদ্রের দুলুনিতে যেন কিছু আবার ছিটকে পড়ে না যায়।

    কাল সারাদিন কখন যে সারেঙ-সাব সব করে রেখেছেন! তিনি এতটুকু সময় নষ্ট করেন নি। খেতে পরতে যা লাগে সব তিনি তুলে এনেছেন বোটে।

    বনি উঠে আসছিল। চা-এর ট্রে হাতে। কাপ উপুড় করে সন্তর্পণে উঠে আসছে। কালো অ্যাপ্রন, সাদা ফ্রক এবং সে গলায় বেশ সাদা পাথরের মালা পরেছে। নীলাভ চোখে কি দীপ্তি, ছোটবাবু ইশারায় চোখ টিপে দিল। বলল, আসছে।

    সঙ্গে সঙ্গে হিগিনস প্রায় লাফ মেরে নামলেন নিচে। ছোটবাবুও নিচে নেমে গেল। ওরা বোটে হেলান দিয়ে চা খেতে খেতে তখন কত রকমের কথা বলতে থাকল—বনি, বাবা এবং ছোটবাবুর দিকে তাকিয়ে আছে। দ্বীপটার কি নাম, শহরে কি পাওয়া যায় কাপ্তান সব বানিয়ে বলে যাচ্ছেন। সব আম, জাম, নারকেল গাছ আর লেবুর জঙ্গল—আনারসের খেত—ঠিক সামোয়ার মতো দেখতে—সামনে তার দিগন্ত জোড়া বালিয়াড়ি—কি আনন্দ ছোটবাবু। খুব সাবধান, আমাদের কথা গিয়ে ভুলে যাবে না। ওখানে পৌঁছে প্রথমে তোমরা খবরের কাগজের অফিসে দেখা করবে—তোমাদের কথা বলবে—আমাদের কথা বলবে—মিসিং জাহাজটার তোমরা ক্রু বলবে। কাপ্তান, বৃদ্ধ সারেঙ জাহাজটায় রয়ে গেছে বলবে। ওদের জন্য রেসকু চাই। তারপরই দেখবে জাহাজটা নিয়ে আমরা পৌঁছে গেছি। একজন কাপ্তানের পক্ষে এর চেয়ে গৌরবের আর কি আছে!

    বনি বলল, আমার ভাল লাগছে না বাবা! মনটা আমার কেমন করছে!

    —দূর বোকা মেয়ে—স্যালি হিগিনস সহসা যেন মুখ ফিরিয়ে সমুদ্রে ঝুঁকে পড়লেন। বললেন, ছোটবাবু বোটে ক্রস তুলে নাও। এস এদিকে এস। তিনি কাপ বনির হাতে দিয়ে এগুতে থাকলেন। বনি বলল, বাবা ক্রস কেন?

    —বুঝতে পারছ না, সমুদ্রে কত রকমের অপদেবতা থাকে। শয়তান থাকে। অশুভ প্রভাব থাকে। তাদের হাত থেকে তোমাদের রক্ষা করতে হলে আর কি দিতে পারি। ক্রসটা মাঝখানে থাকবে। তিনি বলতে চাইলেন, মহাসমুদ্রের অন্তহীন এই যাত্রায় মৃত্যু প্রায় অনিবার্য—তবু শুভ প্রতীকের মতো অথবা ঈশ্বরের সেই অমোঘ বাণী খোদিত আছে যেন ক্রসের গায়ে—সেই কঠিন বিভীষিকার ভেতর মৃত্যু যত অনিবার্য হয়ে উঠবে—তত এই ক্রস সব অশুভ প্রভাব থেকে মুক্ত রাখবে বনি এবং ছোটবাবুর মৃতদেহ—অর্থাৎ তিনি যেন জানেন, বোট ভাসতে ভাসত্বে কোথায় চলে যাবে—অথবা পালে বাতাস লাগলে কতদিন কে জানে এবং যখন কিছু জানা নেই মৃত্যু অনিবার্যতার সামিল এবং যেহেতু মেয়েটার কঠিন মৃত্যুর দৃশ্য চোখের ওপর দেখার তাঁর সাহস নেই—ছোটবাবুকে দিয়ে দূরে পাঠিয়ে তিনি এলিসের ক্রূরতার হাত থেকে রেহাই পেতে চাইছেন। সঙ্গে ক্রস থাকলে কবর-ভূমির ওপর কোনোদিন কেউ যদি ক্রসটা পুঁতে দেয়। যেন ক্রসের নিচে শুয়ে আছে বনি এবং ছোটবাবু।

    তিনি বনির দিকে এখন তাকাচ্ছেন না। যতটা দ্রুত সম্ভব ওদের নামিয়ে দিতে পারলে তিনি বেঁচে যান। জাহাজ এবং সেই পাহাড় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। অথবা সেই অতিকায় ক্রসটা—প্রায় দু’টো ষাঁড় লড়ার মুখে মনে হয়। এবং আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ। সারেঙ সব তুলে যা যেখানে দরকার রেখে দিচ্ছেন। কাপ্তান একটা ক্রস কাঁধে বয়ে আনলেন। ক্রসটা বোটের মাঝখানে শুইয়ে রাখা হল। অন্য ক্রসটা ছোটবাবু এবং কাপ্তান মিলে জাহাজের মাথায় পুঁতে দিচ্ছে। লোহার বড় বড় পেরেক পুঁতে ওটাকে জাহাজে দাঁড় করিয়ে কিছুটা ভয় থেকে মুক্ত হবার মতো তিনি চিৎকার করে ডাকলেন—সারেঙ।

    সারেঙ কাছে এসে দাঁড়ালে ডাকলেন, বনি!

    বনি কাছে এলে বললেন, সব তুলে দিয়েছ?

    বনি ফের কেবিনে ঢুকে ওর শেষ সম্বল দুটো বর্শা এবং অক্সিজেন সিলিণ্ডার তুলে দিল বোটে। তিনি বললেন, খুব রোদ উঠলে হুড তুলে দেবে। নিচে দু’জনের মতো শোবার জায়গা আছে। হুড খুলে দিলে কতটা জায়গা তাও দেখিয়ে দিলেন। কোথায় কি রেখেছেন বনিকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। কোথায় ওরস্ ক্রাচেজ, বোট-হুক, প্লাগস, বাকেট, বেলার সব ঠেলে ঠেলে দেখিয়ে দিলেন। কম্পাস, কুড়োল, ল্যাম্প, ম্যাচিজ, কোথায় কিভাবে রেখেছেন দু’জনকেই দেখিয়ে দিলেন। পালের মাস্তুল বোটের কিনারায় ঝুলিয়ে নেবে। তবে কিছুটা তোমাদের বেশি জায়গা হবে। ছোটবাবুকে ডেকে বললেন, এই দ্যাখ্যো এখানে অয়েলব্যাগ থাকল। মাথায় সী-অ্যাংকার। গ্যালনের মতো এনিম্যাল অয়েল রেখে দিয়েছি। হাত- পাম্প কোথায় রাখলাম আবার! তিনি জলের ড্রামের পেছনে উঁকি দিলেন, আরে এখানেই তো রেখেছি! না, সেই দূরের পাহাড় আর কাছে আসছে না। জাহাজের মাথায় ক্রস তুলে দিয়ে তিনি সব অশুভ ভয় থেকে মুক্ত হয়ে গেছেন। বেশ নিশ্চিন্তে তিনি খুঁজছেন যেন।—এই তো হাত-পাম্প। এই হচ্ছে বিস্কুটের টিন, বার্লি চিনি সব ষোল আউন্সের মতো করে আছে। এগুলোতে প্রথমেই হাত দেবে না।

    ছোটবাবু দেখল, স্যালি হিগিনস নিজের কথায় নিজে ধরা পড়ে যাবেন। সে তাড়াতাড়ি বলল, স্যার সিগন্যালিং টর্চ কোথায় রেখেছেন?

    সারেঙ বললেন, ওপরের দিকে আছে। এই দ্যাখ বলে তিনি সিগন্যালিং টর্চ-রকেট-প্যারাসুট, ফ্ল্যাশ- লাইট সব এক এক করে তুলে দেখালেন। এখানে ফার্স্ট-এড, একটা ছোট্ট কাঠের বাকসের ভেতরে রেখেছেন কোরামিনের ফাইল। জীবন ধারণের শেষ প্রয়াস এটা। খুব যত্নের সঙ্গে কাঠের বাকসে মানুষের আত্মার মতো বন্দী করে রেখেছেন সারেঙ। তিনি বোটে ছুটে ছুটে যাচ্ছিলেন বলে, বোট, দু’টো ডেবিডের হুকে বেশ দুলছিল, দু’টো কপিকল দিয়ে ডেবিড কাত করে দিলেই বোট নিচে ঝুলে পড়বে। তারপর উইনচ চালিয়ে শুধু দড়ি ছেড়ে দেওয়া। কপিকলে ঝুলে থাকা ডেবিডের হুক থেকে বোট ধীরে ধীরে নেমে যাবে। পাল তিনি মাস্তুলে পরিয়ে একেবারে ঠিকঠাক করে শেষবারের মতো নেমে এলেন। এখন বোধহয় বোট নামিয়ে দেওয়া হবে।

    সারেঙ-সাব ছোটবাবুকে বললেন, তোর আর কিছু পড়ে থাকল না তো!

    ছোটবাবু ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে পড়ছে। সে চোখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারছে না। এই ছোট্ট বোট নিয়ে এমন অকুল সমুদ্রে একা ভেসে পড়া—কি যে কঠিন আর ভয়াবহ—তার হাত পা যত সময় এগিয়ে আসছে তত যেন ঠাণ্ডা মেরে যাচ্ছে –বনি প্রায় অবলার মতো—এবং সে একা থাকলে তবু দায়িত্ব কম—নিজের জন্য চিন্তা-ভাবনা তার তত নয়, এই মেয়েটা ফুলের মতো মাত্র ফুটে-ওঠা মেয়েটা জানে না সামনে কি নিদারুণ সমুদ্র হাঁ করে আছে। তার ভেতর ঢুকে গেলে পৃথিবীর কোনো মানুষের সাধ্য নেই ফের তাকে আবিষ্কার করে—তখন কিনা-সারেঙ-সাব তার কি আর পড়ে আছে জিজ্ঞাসা করছেন—সব জেনে কেন এমন করছেন তাঁরা! কি হবে কিছু পড়ে থাকলে! সে দাঁত চেপে বলল, সরুন এখান থেকে, সামনে থেকে সরে যান! সরে যান বলছি! আপনারা আমাকে কি পেয়েছেন!

    স্যালি হিগিনস তখন কাঁধে হাত রাখলেন ছোটবাবুর। তাকে খ্রীষ্টের গল্প শোনালেন। বললেন, ছোটবাবু স্ট্রাগল ইজ দ্যা প্লেজার। এত সহজে ভেঙে পড়লে চলবে কেন! বনি আসছে। তিনি মুহূর্তে গলার স্বর পাল্টে ফেললেন। সতর্ক হয়ে গেলেন খুব। ছোটবাবুকে টিপে দিলেন।

    কাপ্তান এবার হাঁকলেন, বনি! বনির দিকে তাকিয়ে আর একটা কথাও বলছেন না। বনি কিছুতেই বাবার মুখ দেখতে পাচ্ছে না। সে বলল, এই তো আমি।

    —ওপরে উঠে বসো।

    —ছোটবাবু!

    —ছোটবাবু দড়ি ধরে নেমে যাবে। আমরা দু’ বড়ো ডেবিড থেকে বোট হারিয়া করতে পারব না। স্থির এবং ভীষণ গম্ভীর গলা। বনি আর একটা কথা বলতে সাহস পেল না। সে লাফ দিয়ে বোটে উঠে বসল। পাটাতনে একটা ম্যাট্রেস পেতে নিতে পার। তিনি বনিকে যেন বলছেন না। অন্য কাউকে। বনি এখনও বাবার মুখ দেখতে পাচ্ছে না। সে সেই দুঃসময়ের মতো, মা চলে যাবার পর যেমন অসহায় গলায় ডাকত, বাবা, তেমনি ডেকে উঠল, বাবা।

    কিন্তু স্যালি হিগিনস তখন ডেবিডের গোড়ায় গিয়ার খুলে প্রায় ছোটবাবুর সঙ্গে সঙ্গে ডেবিডের মাথা এগিয়ে ধরলেন, ছোটবাবু তখন চিৎকার করছে, বনি শক্ত করে ধরো, না হলে পড়ে যাবে—বোট ভীষণ দুলছে। বনি বোটের একটা দিক চেপে ধরে আছে। বোট দুলে দুলে নিচে নিয়ে গেলে সে যেন নিচে না পড়ে যায়। এবং উইনচ ছেড়ে দিলে হড়হড় করে বোট নিচে নেমে গেল। বনি তখনও ডাকছে, বাবা বাবা! তুমি আমার সঙ্গে কথা বলছ না কেন! আমার ভীষণ ভয় করছে! এবং ছোটবাবু দেখল বোট জলে নেমে গেছে, সে তাড়াতাড়ি দড়ি ধরে ঝুলে পড়ল নিচে। দড়ি বেয়ে বেয়ে নেমে যেতে থাকল। বোট সরে যাচ্ছিল—আর সে চিৎকার করছে, বনি দড়ি টেনে রাখ। আমি পড়ে যাব সমুদ্রে। বনি তখনও চিৎকার করছে, বাবা, তুমি কোথায়? তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন! বনির খেয়াল নেই বোট নিচে নেমেই জাহাজের পাশে থাকছে না। ঢেউ খেয়ে ছিটকে দূরে সরে গেছে। ছোটবাবু তেমনি দড়িতে ঝুলে থাকল, বনি দড়ি টেনে ধরো প্লিজ। কি করছ তুমি! তোমরা সবাই মিলে আমাকে কি পেয়েছ?

    বনি এবার কেমন নিচে তাকালে দেখল ছোটবাবু দড়িতে ঝুলে আছে। পা প্রায় কিছুটা সমুদ্রের জলে ডুবে গেছে। ঢেউ এলে ওর সবটা ডুবে যাবে। সে তাড়াতাড়ি এবার দড়ি টেনে ধরলে বোট ছোটবাবুর কাছে এগিয়ে গেল। ছোটবাবু বোটে লাফ দিয়ে পড়লে বনি অতি করুণ গলায় ডেকে উঠল, বাবা তোমরা আমাদের কোথায় পাঠিয়ে দিচ্ছ! বাবা আমি তোমাকে আর দেখতে পাচ্ছি না কেন!

    ছোটবাবু আর বিন্দুমাত্র দেরি করল না। সে বোটের গুড়াতে মাস্তুল বসিয়ে দিল। তারপর সব রিং পরিয়ে পাল টানিয়ে দিল বোটে। লাল রংয়ের শালুর তেকোনা পাল, তুলে দিতেই হাওয়ায় টান ধরল। নিমেষে বোট চঞ্চল হয়ে উঠল। ছোটবাবু এক হাতে দড়ি সামলাচ্ছে, অন্য হাতে বোটের হাল ধরার জন্য ছুটে যাচ্ছে। পালের দড়ি দড়া আলগা বলে এক দিকে বোট একেবারে হাওয়ায় কাত হয়ে গেছিল। এবং সে দেখল, বনি প্রায় ছিটকে ওদিকে পড়ে গেছে। এবং এখন ওর এ-সব দেখার সময় নয়। ভীষণ দ্রুত সে দড়ি বোটের হুকে বেঁধে দিতেই এবার বোট সোজা হয়ে গেল। আর তখনই জাহাজের ডেকে স্যালি হিগিনস প্রায় দু’হাত আকাশে তুলে চিৎকার করে উঠলেন, এম্মানুয়েল—আমাদের সহিত ঈশ্বর। বনির গলার সেই অসহায় স্বর আর তিনি শুনতে চান না। বোট যত এগিয়ে যাচ্ছে, দূরে সরে যাচ্ছে তত তিনি চিৎকার করে হেঁকে যাচ্ছেন—এম্মানুয়েল, আমাদের সহিত ঈশ্বর। এম্মানুয়েল, আমাদের সহিত ঈশ্বর—বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি হাঁটু মুড়ে রেলিঙের ধারে বসে পড়লেন—তারপর হা হা করে হারিয়ে যাওয়া ছোট শিশুর মতো মাঠে বসে যেন কান্না। সব হারিয়ে তিনি হা হা করে কাঁদছেন। সারেঙ সাব পাশে মাথা গুঁজে বসে আছেন। তিনি কি বলে সান্ত্বনা দেবেন বুঝতে পারছেন না।

  • চুয়ান্ন

    চুয়ান্ন

    ।। চুয়ান্ন।।

    পালে বাতাস লেগেছে। ছোটবাবু শেষবারের মতো দুর থেকে হাত তুলে হাঁকল, গুডবাই ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস, গুডবাই। আর সে তখনই দেখতে পেল এলবা উড়ে আসছে সাঁ-সাঁ করে। সোজা বোটের মাথায় বসে গেল। সে ফের তখন চিৎকার করে বলছে, চাচা, অপনি আমার জন্য ভাববেন না। ঠিক আমরা পৌঁছে যাব। এলবা বোধ হয় আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।

    ছোটবাবু দেখল বনি তখন দু’হাঁটুর ভেতর মাথা গুঁজে দিয়েছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ছোটবাবু ডাকল, বনি প্লিজ—কি হচ্ছে বনি! পালে বাতাস লেগেছে, এলবা বোটের চারপাশে উড়ছে—এবং সে কখনও আকাশের ওপরে উঠে যাচ্ছে কখনও আবার নিচে নেমে এসে ঝুপ করে বসে পড়ছে বোটের মাথায়, বোট দুলে উঠছে—অসংখ্য সব ছোট ছোট, ঝাঁকে ঝাঁকে শোলমাছের বাচ্চার মতো কতসব বিচিত্র মাছ, এবং তার নিচে কোনো বড় মাছের ঝাঁক এই পাঁচ-সাত ফুট লম্বা এবং চারপাশে জলের নিচে এক ডিজনি-ল্যাণ্ডের মতো ব্যাপার। এত স্বচ্ছ যে একটু নিচে তাকালেই যেন সমুদ্রের অতল দেখা যায়। গুচ্ছ গুচ্ছ কখনও সব সবুজ শ্যাওলা—আর হয়তো অতিকায় কোনো প্রাণী ভেসে উঠলে জলের নিচে তার কালো ছায়া প্রথম ভেসে উঠবে—ছোটবাবু সমুদ্রের বিশালতায় কি আশ্চর্য রোমাঞ্চ বোধ করতে থাকল। মৃত্যু যতই অনিবার্যতার শামিল হোক—সে কেমন সাহস পেয়ে যাচ্ছে—জাহাজ যত চোখের ওপর থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল, যত সে বনিকে নিয়ে অকুল সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে তত সে এক আশ্চর্য পৃথিবীর খবর পেতে চঞ্চল হয়ে উঠছে। সে হুকের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ফেলল। বনির কান্না থামছে না। সে ওর পাশে হাঁটু মুড়ে বসল। নানভাবে বুঝিয়ে সে বনিকে শান্ত করতে পারছে না। বনি বুঝতে পেরেছে সব। এবং বনির কান্না ছোটবাবু একদম সহ্য করতে পারে না। সে শেষে ওর মুখ তুলে বলল, এই, আমি বুঝি, তোমার কেউ না!

    বনি যেন কতকাল পর, কতদিন পর এক সাম্রাজ্য জয়ের অধিকারে সহসা ছোটবাবুর বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল। আর কি নরম সাবলীলতা রয়েছে সেই বলিষ্ঠ বাহুতে। যত ছোটবাবু সেই সমুদ্রে পাটাতনের ওপর আকাশের নিচে বনিকে বুকে টেনে নিচ্ছে যত ওকে আদর করছে, তত বনি ওর শরীরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, তত লতাপাতার মতো সে শরীরে জড়িয়ে যাচ্ছে এবং মসৃণ ত্বকের বর্ণমালায় ছোটবাবু ক্রমশ ডুবে যাচ্ছিল। বনি কি যে করছে! বনি তখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বুঝি কাঁদছে—অথবা যুবতী হবার মুখে তার উপত্যকায় সত্যি বুঝি ফুল ফুটে যাচ্ছে—সেই যাতনা ফুলের, ফুল ফোটার যাতানায় বনির মুখে চোখে অধীর কুসুম কুসুম রঙ। পালে তেমনি বাতাস। সমুদ্রের জল কেটে কেটে বোট প্রায় উড়ে যাচ্ছে। আর ওদের মাথার ওপর এলবা উড়ছে। হঠাৎ বনি .ওপরে এলবাকে দেখে পা গুটিয়ে ফেলল, এই, এলবাটা দেখছে। এস ভিতরে এস। বনি ছোটবাবুকে নিয়ে ছই-এর ভেতরে ঢুকে গেল।

    তারপর বনি বলল, ছোটবাবু আমরা কোথায় যাচ্ছি? ছোটবাবু হাঁটুর কাছে মুখ নিয়ে বলল, জানি না বনি, আমরা কোথায় যাচ্ছি জানি না। তবু জানি এ-ভাবেই আমাদের সবাইকে কোথাও না কোথাও পৌঁছে যেতে হয়। সামনে কি থাকে আমরা কেউ জানি না।

    বনি বলল, বাবা কোথায় যাচ্ছেন? বাবা আমাদের বোটে ভাসিয়ে দিল কেন?

    ছোটবাবু বলল, তিনিও রওনা হয়েছেন। কোথাও যাবেন বলেই তিনি আমাদের ফেলে গেলেন এখানে। তারপর ছোটবাবু যেন এক অকূল সাগরে ভেসে যাচ্ছে। বলল, শৈশবে আমার পাগল জ্যাঠামশাই ছিল, ঈশম দাদা ছিল। ফতিমা, মা বাবা কত কি ছিল। এখন শুধু তুমি আছ। তুমি ভেঙে পড়লে আমার আর এতটুকু দাঁড়াবার জায়গা থাকবে না বনি।

    এভাবে এক অধীর প্রাণপ্রবাহ সামান্য এই বোটে উদ্দাম হয়ে উঠেছিল। নিশীথে যখন নক্ষত্রমালা বিরাজমান আকাশে এবং খেলাচ্ছলে ওরা বোটের নিচে শুয়ে নিজেদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিল—পাখিটা তখন বোটের মাথায় পাখায় ঠোঁট গুঁজে রেখেছে। ওরা যখন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে জ্যোৎস্নায় সমুদ্রের অন্তহীন রহস্য খুঁজে বেড়াচ্ছে পাখিটা তখন বাতাসে ডাঙার গন্ধ শুঁকে বেড়াচ্ছে, ওরা যখন বোটের ভেতর রেশমের মতো নরম উলের বল নিয়ে খেলা করছে—আকাশের নক্ষত্রমালা তখন সব নিচে নেমে এসেছিল, চুরি করে দেখেছে ওরা কি যে এক অতীব সুন্দর বল ছুঁড়ে দিচ্ছে। মনে হয় এখুনি সেই নরম উলের বল বাতাসে উড়ে গিয়ে আকাশের দু’প্রান্তে দু’টো নক্ষত্র হয়ে যাবে। বনি বলছিল, ছোটবাবু আমার পৃথিবীতে আর কিছু লাগে না।

    ছোটবাবু বলছিল, আমারও না।

    ছোটবাবু বলেছিল, বনি ক্রসটা ভাসিয়ে দিচ্ছি। বোট হাল্কা হলে তাড়াতাড়ি ডাঙায় পৌঁছতে পারব।

    বনি বলেছিল, দাও। ওটা আমাদের কোনো কাজে লাগবে না।

    ছোটবাবু ক্রসটা নামিয়ে দেবার সময় কি ভেবে বলল, থাক। আছে যখন থাক। আগুন জ্বালানো যাবে।

    বনি এবং ছোটবাবু এভাবে মৃত্যু এবং বিধাতাকে যখন অস্বীকার করে পৃথিবীতে ফিরতে চেয়েছিল—তখন স্যালি হিগিনস জাহাজে চুপচাপ শুয়ে আছেন। সারেঙ পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন, সাব খাবার খান এ-ভাবেই নিশীথে জাহাজ ভেসে যায়। দিন যায় জাহাজে। আবার রাত আসে। আবার নক্ষত্র মালার নিচে জাহাজ ভেসে যায়।

    হিগিনসের চোখেমুখে শুধু বনি, বনির সেই অবোধ মুখ। যত দিন যাচ্ছে কেবল সমুদ্রের ভেতর থেকে তার আর্ত কান্না শুনতে পাচ্ছেন—বাবা তোমার মুখ দেখতে পাচ্ছি না কেন, বাবা! তুমি আমাকে বোটে নামিয়ে দিচ্ছ কেন?

    হিগিনস একদিন বললেন, তুমি খেয়েছ?

    সারেঙ-সাব বললেন, খেয়েছি। আসলে কিছুই আর সারেঙ-সাব খাচ্ছেন না। আহার এবং পানীয় বলতে যা কিছু সব নিঃশেষ। এবং এই বোধহয় শেষ খাবার। সারেঙ-সাব চোখে ভাল দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি শীর্ণকায় এবং অতীব দুর্বল হয়ে পড়েছেন। নিশিদিন স্যালি হিগিনস বিছানায় চুপচাপ শুয়ে আছেন। জাহাজটা মনে হচ্ছে নিশিদিন ছুটে যাচ্ছে কোথাও। সারেঙ-সাব টেবিলে শেষ জল এবং খাবার রেখে প্রায় হাঁটু মুড়ে নিচে বসে পড়লেন একদিন। চোখে আর কিছু দেখতে পাচ্ছেন না। স্যালি হিগ্রিসকে কিছুতেই বুঝতে দিচ্ছেন না তিনি ক্রমশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলছেন। এবং বোধহয় বুঝতে পারছিলেন এই শেষবার তাঁর এ-ঘরে আসা। তিনি অন্ধকারে বাইরে বের হয়ে এলেন। ডেকের ওপর বসে দু’হাত বিধাতার কাছে প্রার্থনার মতো বিছিয়ে রাখলেন—মনে হচ্ছিল চার পাশে শুধু সীমাহীন অন্ধকার, এক অন্ধকার জগতে তিনি এখন বিরাজমান—এবং মাঝে মাঝে দু’টো একটা আয়াত তাঁর মনে আসছিল- কেয়ামতের দিন তিনি কি জবাব দেবেন তাঁকে, এ-সবই বার বার মনে আসছিল। এবং তখন জাহাজটাকে ভাবাই যায় না আর সাধারণ জাহাজ, কেমন নিশীথে সে বেশ ছুটে চলেছে। এই অন্ধকার আকাশ নক্ষত্রমালা আর সমুদ্র অতিক্রম করে তার কোথাও যেন এক অলৌকিক যাত্রা শুরু হয়েছে। তিনি বুঝতে পারছিলেন, সমুদ্র ফের প্রলয়ঙ্কর ঝড় নিয়ে ছুটে আসছে। তিনি স্থির এবং অবিচল। জলোচ্ছ্বাসে তিনি ভেসে যাবেন হয়তো, কোনো দুঃখ থাকছে না—তাঁর কাছে এখন এই জাহাজ, সমুদ্র, জলোচ্ছ্বাস সব সমান। তাঁর কাছে এখন বিশ্বস্ত থাকার চেয়ে বড় কিছু নেই। তাঁর শেষ আহার ভোজ্যদ্রব্য যা কিছু তিনি স্যালি হিগিনসের টেবিলে রেখে এসেছেন। কেয়ামতের দিন বিধাতার কাছে তাঁর এটাই একমাত্র জবাব—বিশ্বস্ততা। শুধু এই সম্বল নিয়ে তিনি আল্লার কাছে করুণা প্রত্যক্ষ করছেন এখন। এবং সেই জলোচ্ছ্বাসে নিঃশ্বাস ক্রমে বন্ধ হয়ে এলে কেমন নীল বিন্দু বিন্দু বেলুনের মতো উজ্জ্বল আলোর মালার ভেতরে তিনি যাত্রা করেছেন। তারপর তারা একে একে সবাই নিভে যেতে থাকল। জীবনের এক রহস্যময় যাত্রা থেকে অন্য এক রহস্যময় যাত্রায় তিনি আবার রওনা হয়েছেন। গভীর বায়ুহীন আলোহীন এক জগৎ তাঁকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলল।

    স্যালি হিগিনস ক্ষীণকণ্ঠে ডাকলেন, সারেঙ।

    কোনো জবাব নেই। আবার ডাকলেন, সারেঙ।

    শুধু হিস হিস সমুদ্রের তরঙ্গমালার শব্দ। জাহাজটা এবার যেন গতি পেয়ে গেছে। কোনো আলো নেই। আকাশে কোনো জ্যোৎস্না নেই। কোথায় কবে তিনি কোন জাহাজে উঠে এসেছিলেন মনে করতে পারছেন না—কেবল ঝড়ো বাতাসে জাহাজ দুলছে। আর বোধহয় সব তরঙ্গমালা জাহাজ ডেক ভাসিয়ে নিচ্ছে। ঝড়ের ভেতর তিনি বের হয়ে ডাকলেন—সারেঙ তুমি কোথায়? তুমি খাবে না?

    শুধু অন্ধকার চারপাশে। নিরবছিন্ন অন্ধকার। আর আশ্চর্য তিনি আকাশের নক্ষত্রমালা দেখতে পাচ্ছেন না। আকাশে তবে এখন প্রলয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে। যত জোরে সম্ভব দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকলেন। হাত পা কাঁপছে। শরীর মনে হচ্ছে শক্ত হয়ে গেছে। গলা কাঠ। শেষ জল এবং আহার সারেঙ রেখে চলে গেছে। সারেঙ বনির কেবিনে থাকত। সব ফাঁকা। কিছু নেই।

    তারপর তিনি ফের শুয়ে পড়লেন এসে। তিনি বুঝতে পারছিলেন, জাহাজে এখন একা তিনি। জাহাজটা যা চেয়েছে পেয়ে গেল। সে তার বিশ্বস্ত আরোহীকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর আর কোন দুঃখ থাকল না। তিনি জাহাজটার জন্য মায়া বোধ করলেন। জাহাজটা এখন নিশিদিন সমুদ্রে ভেসে বেড়াবে। তিনি এবং সে। সমুদ্রে তিনি এবং সে। এক অলৌকিক জলযানে তিনি সমুদ্রে ভেসে যেতে থাকলেন। এবং ক্রমে এভাবে দিন যায়। রাতে তিনি পোর্ট-হোলে আকাশের নক্ষত্র দেখতে পান, চাঁদের আলো এসে পড়ে—সমুদ্র নিথর নীরব, বর্ণহীন, গন্ধহীন। তিনি সাদা বিছানায় সাদা পোশাকে লম্বা হয়ে শুয়ে আছেন। শেষ খাবার আর জল টেবিলে। হাত তুলে খেতে পর্যন্ত পারছেন না।

    হাত-পা ক্রমে এ-ভাবে ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। যেন অসাড় চোখ, স্থির বায়ুমণ্ডলে ভারী অক্সিজেনের অভাব। দু-হাতে তিনি সমস্ত বায়ুপ্রবাহ গিলে খেতে চাইছেন। পারছেন ন। কঠিন যন্ত্রণায় চোখ ঠেলে বের হয়ে আসছে। পাশে এখন কত সব মিছিলের মতো ছায়া এসে জড়ো হচ্ছে। এবং বার বার সেইসব শৈশবের মুখ, বাবা মা ছোট বোন, আর তারপর যৌবনে সেই প্রেমিকারা। কেউ কেউ ভারী অস্পষ্ট। তাদের তিনি চিনতে পারছেন না। কেবল তিনি দেখতে পেলেন এলিস পোর্টহোলে এসে দাঁড়িয়েছে। এবং দরজায় লুকেনার। আর আর কে আছেন, বনি ছোটবাবু তোমরা কোথায়—বনি বনি এবং বুঝতে পারছেন তিনি তাঁর অলৌকিক জলযানে এবার সত্যি আবার বের হয়ে পড়েছেন—কেউ তাঁর কথায় সাড়া দিচ্ছে না। এত কষ্ট এত যাতনা এবং স্থবির শরীর থেকে যেন শেষ বায়ুপ্রবাহ বের হয়ে যাবার আগে, সমস্ত ভূমণ্ডল জুড়ে প্রকম্পন। সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। উৎক্ষিপ্ত হচ্ছে লাভা। শিলাস্তর ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে গ্রহনক্ষত্রের। আহা ক্রমে সব আবার শিথিল স্থবির হয়ে আসছে—শান্তি, পরম শান্তির বাণী তাঁর কানে বাজছিল—কেউ যেন পাশে দাঁড়িয়ে আছেন—তাঁর হাতে সবুজ লণ্ঠন, লণ্ঠনের আলোয় সেই পরম করুণাময়, আশ্চর্য সুধাপারাবারের খবর পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁর কানে। তিনি বলছেন, ডোনট বি অ্যাফরেড—আই অ্যাম দ্য ফার্স্ট অ্যাণ্ড আই অ্যাম দ্য লাস্ট। আজানু তাঁর সোনালী আলখাল্লায় ঢাকা। মাথায় বড় বড় সোনালী চুল। বড় বড় সব লাল নীল হলুদ অথবা ক্রিমসন কালারের আলোময় সৌরজগতের ভেতর দিয়ে তিনি হেঁটে যাচ্ছেন। এবং বার বার সেই অমোঘ বাণী, সব গ্রহনক্ষত্র থেকে যেন ভেসে আসছে। যত তিনি সেই অলৌকিক জলযানে ভেসে যাচ্ছেন সেই অমোঘ বাণী সব গ্রহনক্ষত্রের ভেতর গীর্জার ঘণ্টার মতো গমগম করে বাজছিল —ডোন্ট বি অ্যাফরেড, আই অ্যাম দ্য ফাস্ট অ্যাণ্ড আই অ্যাম দ্য লাস্ট।

    সিউল-ব্যাংক জাহাজ নীল আকাশের নিচে ঘুরে ঘুরে কখনও অন্ধকারে, অথবা সাদা জ্যোৎস্নায় অজানা সমুদ্রে এভাবে ভেসে যাচ্ছিল। তার প্রিয় ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস ভেতরে শুয়ে আছেন। সাদা চাদরে ওঁর শরীর ঢাকা। পোর্ট-হোলে তেমনি সূর্যের আলো, কখনো সমুদ্রের জল, কখনও সব নক্ষত্রমালার ছবি।

    অসীম সমুদ্রে সিউল-ব্যাংক এখন একটা ভাসমান কফিনের মতো। নীল আকাশের নিচে নীল অন্ধকারে সাদা জাহাজটা এখন শুধু একজন ক্যাপ্টেনের কফিন। আর কিছু না। ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস যেন ভেতরে শুয়ে আছেন। ঘুমিয়ে আছেন। ভেসে যাচ্ছেন তাঁর প্রিয় অলৌকিক জলযানে। যেন বলছেন, গ্লোরি হ্যালেলুজা আই অ্যাম অন মাই ওয়ে।

    ***

    তৃতীয় পর্ব সমাপ্ত

    ‘দেশভাগ বা নীলকণ্ঠ পাখীর খোঁজে’ সিরিজের পর্বসমূহ —

  • ঈশ্বরের বাগান

    ঈশ্বরের বাগান

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    পৃথিবীপৃষ্ঠের পাঁচ ভাগের চার ভাগই জল। অলৌকিক জলযানে চড়ে সেই জল, সমুদ্র পেরিয়ে আমাদের ছোটবাবু অবশেষে ভিড়ল সেই একাংশ ভূমিতে, যেন ঈশ্বরের বাগানে।

    শৈশবে সোনা, কৈশোরে বিলু, জাহাজী জীবনে সে সোনাবাবু, যৌবনে থিতু হয়ে গেল শেষে এক টুকরো জমিতে, অতীশ দীপঙ্কর পরিচয়ে। এই বাগানের জীবন যুদ্ধে তার নানা ভূমিকা। বাবা-মায়ের মেজ সন্তান, দুই ছেলে মেয়ের পিতা, এক নারীর স্বামী, তাছাড়াও কারখানার ম্যানেজার, এভাবে সে বিভিন্নজনের অবলম্বন।

    একটা সময়, যখন সে ছিল ছোটবাবু, বনিকে সমুদ্র পার করে ডাঙ্গায় পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল তার, এখনো মনে হয় চারিদিকে সমুদ্রের মাঝে বোট নিয়ে ডাঙার সন্ধানে হাল ধরে আছে সে, কিন্তু এবার বোটে বনি নেই, এবার ডাঙায় পৌঁছে দিতে হবে মিন্টু, টুটুল, নির্মলাকে। সে জীবনে, জাহাজের কাপ্তান ছিল স্যালি হিগিনস, এখন জাহাজের কাপ্তান সে নিজেই।

    উপন্যাসের বিভিন্ন প্লটকে জোড়া দিয়েছে অতীশ। অতীশের সংসার যুদ্ধ দিয়ে আরম্ভ, তারপর এসেছে নীতির যুদ্ধ, কখনো বা ঈশ্বরের সঙ্গে যুদ্ধ। সব যুদ্ধ সামাল দিয়ে অতীশ ফিরে গেছে সুদূর অতীতের স্মৃতিতে, আবার খুলেছে দেওয়া-নেওয়ার সেই জীর্ণ খাতাটা। মিলিয়ে দেখছে ঈশ্বরের এই বাগানে কার কতটুকু অধিকার, কারোই কি হার-জিত হয় এই যুদ্ধে?

    জীবিকার নিমিত্তে কলকাতা শহরে কারখানার ম্যানেজারের কাজ নেয় অতীশ। শৈশব কেটেছে যার সোনালি বালির নদীর চরে, অসীম সমুদ্র ও বিস্তৃত আকাশের মাঝে যার যৌবনের প্রাক্কাল, কলকাতা শহরের এই কড়ায়-গণ্ডায় জীবন তার কাছে কোলাহলের মতো লাগে। লেখার মাঝে এই কোলাহল, ফুটপাতের নোংরা আবর্জনা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ময়লার স্তুপে ঝুপড়ি গেড়ে পাগলের বাস; নগ্ন শ্বেতাঙ্গ নারী-মূর্তি, অয়েল পেইন্টিং এ সাজানো অভিজাত বসবার ঘর — দুয়ের মাঝে শুধু একটা প্রাচীর। দু’জনে বেশ আছে দিব্যি। মাঝে মাঝে যখন নর্দমার মাছি সুগন্ধে ভরা অভিজাত ঘরে প্রবেশ করে, তখন দেখা যায় খানিকটা ত্রাস।

    জীবনের গতি প্রচণ্ড এখানে। ব্যয়ের গতি যদি ছাড়িয়ে যায় আয়ের গতিকে, তবেই গণ্ডগোল। এছাড়াও আছে সন্তানকে বড় স্কুলে ভর্তি করার প্রতিযোগিতা। বাইরের ঘরে একটা তক্তপোষ, শোবার ঘরে একটা বড় আয়না— এমনই বেড়েই চলেছে জীবনে অভাবের লিস্টি। কারখানার উপার্জন সীমিত, লেখালিখি থেকে হাতে একটা অঙ্ক আসে অতীশের।

    দেশভাগের এই চতুর্থ ও শেষ উপন্যাসে লেখক যেন আরো বেশি করে ব্যক্তিসত্তার মধ্যে ডুবে গেছেন। বলে দিতে হয় না এই অতীশ দীপঙ্কর যে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। উপন্যাসের নায়ক অতীশকে তিনি যত পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন, সেসব নিজেই পার করে এসেছেন জীবনের বিভিন্ন অঙ্কে।

    বিভিন্ন নারীকে পরিক্রমণ করে আমাদের এই উপন্যাসের নায়কের জীবন। যৌবনে সেই পরিক্রমণ আরও গভীর। তার সৌম্য চেহারা, নম্র আচরণ আকর্ষণ করে চারপাশের নারীদের। বহু নায়িকা তাই তার এই জীবন নামের উপন্যাসে।

    বারবার লেখক নারী-পুরুষের কামপ্রবৃত্তিকে তুলে এনেছেন। আমাদের এই উপমহাদেশে চায়ের টেবিলে আলোচনায় সে প্রসঙ্গ আসে না, অথচ মানুষের শরীরের রন্ধে রন্ধে যে গোপন আকাঙ্ক্ষা সূচ ফুটায় লেখক বারবার বুঝিয়ে দিয়েছেন।

    অথচ এত গোপন এই কর্মধারা, জীবনের চলাফেরায় তার কোনো অস্তিত্ব আছে মনে হয় না। কিংবা মুখোশ পরে থাকা সংসারে, আসলে সেই প্রবল ইচ্ছের তাড়নাতেই মানুষের এই ধর্মশাস্ত্র, বীজ বপন এবং আবাদ।

    বড় ভাল লেগেছে এই জায়গাটা। হাওয়াকে সৃষ্টি না করলে আদম কি সেই পাপে জড়াত?

    কুম্ভবাবুর চরিত্রটা নজর কাড়ে। আমিও যেন সংসারে এমন প্রচুর মানুষ দেখলাম। কর্তাব্যক্তিদের সাথে হে হে করে আলাপ করে যারা পকেটে টাকা গোছাচ্ছে। অত্যন্ত আপনার মত ব্যবহার, কিন্তু কি, পকেটে টাকা পুরার গ্রিডি আলগরিদম ছাড়া মগজে আর কিছুই নেই।

    সংসার, দাম্পত্য ছাড়িয়ে উপন্যাস মোড় পাল্টায়। বিদেশি আলোকচিত্রের একটা প্রদর্শনী। অ আজার বালথাজার। ফরাসি চলচ্চিত্রটির কিছুই অনুধাবন করতে পারে না অতীশ। না পারলেও দর্শকসারিতে খুঁজে পায় অতীতের একটি দরজা। বর্তমানে কি অতীতের প্রশ্নের উত্তর মেলে। নাকি জীবনটাই সেই সিনেমার মতোন, অনুধাবনের অতীত।

    অ আজার বালথাজার।

    হিন্দুর বাড়িতে মুসলিমের প্রবেশ বারণ, আবার হিন্দু সম্প্রদায়কে ছাড়তে হ’ল দেশ। আমরা কি কারো প্রতি সুবিচার করতে পেরেছি? যে ঈশ্বরের জন্য আমরা পরস্পরকে ঘৃণা করেছি, কোথায় পেয়েছি তার সান্নিধ্য… ধর্মভীরু পিতার সন্তান অতীশ। যৌবন ছুঁতেই তার ঈশ্বর বিশ্বাস ফেটে চৌচির। কুম্ভ বাবু আপনার তো ঈশ্বর আছে আমার তাও নেই।

    ঈশ্বরকে আমরা নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করি, হয়ত টের পাই না কত বড় অবলম্বন সে আমাদের বেঁচে থাকার। জীবনের যাবতীয় টেনশন ঈশ্বরের কাঁধে ছেড়ে না দিলে, কত অসহায় আমরা।

    সেই ঈশ্বরই আবার আমাদের যুদ্ধের কারণ।

    ঈশ্বর আপনার জন্ম দিয়ে আমরা ঠিক করিনি। আপনি না জন্মালেই পারতেন ঈশ্বর।

    আবারও মোড় নেয় উপন্যাস। এই চূড়ান্ত মোড়ে অতীতের জালে ধরা দেয় অতীশ।

    আমি ভুলতে চেয়েছি। দেশের কথা ভাবলেই ক্ষোভে জ্বলে উঠতাম। তোরা আলাদা দেশ দাবি করলি! আমাদের মানুষ মনে করলি না। আমরা কোথায় যাব, কোথায় গিয়ে উঠব ভাবলি না। লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান। বাংলাদেশ, এমন সোনার বাংলা, তাকে পূর্ব-পাকিস্তান বানিয়ে ছাড়লি। ক্ষোভ হবে না! কেন আমাদের চলে আসতে হল। আমরা তোদের পর হয়ে গেলাম। একই জল মাটিতে নিশ্বাস ফেলেছি—বড় হয়ে উঠেছি, দেশান্তরী করে ছাড়লি!

    দেশভাগ স্তিমিত ছিল দ্বিতীয় ও তৃতীয় উপন্যাসে। এখানে অতীন বাবু সোনার শৈশবের সেই ভূখণ্ডকে আবার তুলে এনেছেন। এসেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম। হিন্দুদের তাড়িয়ে কি ভাল ছিল এ দেশ? বাঙালি ও পাকিস্তানি মুসলিমে কি ভাগাভাগি লাগেনি?

    এত ভাগাভাগি কেন মিঞা সাব! ভাগের শেষ আছে! যত ভাগ করবেন শরীর তত পঙ্গু হয়ে যাবে না?

    প্রায় শেষে চলে এসেছি আমরা। জীবনে শেষকৃত্যের কাছাকাছি হলে, সেই ঈশ্বরকে স্মরণ করি আমরা। সেই একি বাণী উচ্চারিত হয় আমাদের মগজে, যাকে পৃথক প্রমাণ করার জন্য আমরা যুদ্ধ চালিয়েছি সারাটা জীবন।

    তারপর সর্বতোভাবে ফলন্মোথ অদৃষ্ট বশত প্রথমে জলময় সমুদ্র উৎপন্ন হইল। অতঃপর সেই জলময় সমুদ্র হইতে প্রকাশমান জগতের নির্মাণে সমর্থ ব্রহ্মা আবির্ভূত হইলেন। তিনি যথাক্রমে সূর্য ও চন্দ্র কে সৃষ্টি করলেন— তাহাতে দিন রাত্রি হইতে লাগিল। দিন রাত্রি হওয়ায় সংবৎসর সৃষ্টি হইল। অনন্তর ব্রহ্মা পৃথিবী, আকাশ, স্বর্গ এবং মহঃ প্রভৃতি লোকের সৃষ্টি করিলেন।

    কেমন করে তোমরা আল্লাহতে অবিশ্বাস কর, যখন তোমরা ছিলে মৃত আর তিনি করলেন জীবিত? পুনরায় যিনি তোমাদের মৃত্যু দেবেন, আর পুনরায় জীবিত করবেন, তখন ফিরিয়ে আনা হবে তোমাদের তাঁর কাছে।

    হাউ হি মাস্ট রিজয়েস ইন অল হিজ ওয়ার্ক। দ্য আর্থ ট্রেমবেলড্ অ্যাট হিজ গ্ল্যান্স। দ্য মাউন্টেনস বার্স্ট ইনটু ফ্লেম অ্যাট হিজ টাচ। ইউ উইল সিঙ টু দ্য লর্ড অ্যাজ লঙ অ্যাজ ইউ লিভ। ইউ উইল প্রেইজ গড টু ইয়োর লাস্ট ব্রেথ।

    উপন্যাসের শুরুটা হয় পাগল হাঁকছে দু-ঘরের মাঝে অথৈ সমুদ্দুর। আবার ঠিক শেষে অতীন বাবু আমাদের এই দূরত্বের অঙ্কটা মিলিয়ে দিতে চান।

    মা তুমি বড় বৃক্ষ। দাঁড়িয়ে আছ ডালপালা মেলে। ফুল ফোটে। ফল ধরে। হাওয়ায় কে কোথায় সব বীজ উড়িয়ে নিয়ে যায়। জল পড়ে। শস্য দানার মতো তারাও মাটির নিচে শেকড় চালিয়ে দেয়। বড় দূরের হয়ে যায় সব কিছু। সারা পৃথিবী জুড়ে কত গাছপালা, ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে তারও ফুল ধরে ফল হয়। আবার ঝড়ো হাওয়ায় বীজ উড়িয়ে কোন এক সুদূরে নিয়ে যায়। আমরা তোমার সেই বীজ উড়ে গেছি।

    সোনা ট্রিলজির প্রথম পর্ব ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’। দ্বিতীয় পর্ব ‘অলৌকিক জলযান’। শেষ পর্ব ‘ঈশ্বরের বাগান’। প্রথম পর্বে যে সোনা, দ্বিতীয় পর্বে— ছোটবাবু, শেষ পর্বে— অতীশ দীপঙ্কর। তিন পর্বে একই ব্যক্তিসত্তা ভিন্নতর সত্যে উদ্ভাসিত। যেমন একই শক্তি মহাজাগতিক নিয়ন্ত্রণে নানা ব্যঞ্জনার নিত্য প্রকাশিত। তিনটি পর্বই স্বয়ংসম্পূর্ণ। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজের পটভূমি—প্রকৃতি। অলৌকিক জলযানের পটভূমি—অনন্ত অসীম সমুদ্র। আর ঈশ্বরের বাগান, নগর জীবনের এক নীরস ইট কাঠের গদ্যময় জগৎ। শৈশব, বয়ঃসন্ধিকাল পার হয়ে সোনা এখন ঈশ্বরের বাগানে অতীশ দীপঙ্কর—এক পরিণত মানুষ। পৃথিবীটা তার কাছে এখন প্রকৃতির মতো নিরন্তর সুষমামণ্ডিত নয় অথবা সমুদ্র এবং আকাশের মতো উদার নয়। নগর জীবনে সে শুভ-অশুভের দ্বন্ধে ক্ষতবিক্ষত। ঈশ্বর এবং প্রেতাত্মা দুই তাকে নিয়ত তাড়া করছে।

    ঈশ্বরের বাগানের প্রথম অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশ করেছে করুণা প্রকাশনী, অক্টোবর ২০০০এ। প্রচ্ছদ এঁকেছেন সুব্রত চৌধুরী।

    উৎসর্গ

    সমরেশ বসু

    দিব্যেন্দু পালিত

    শ্রীমান শুভাশিস ব্যানার্জী

    বামাচরণ মুখোপাধ্যায়

  • এক

    এক

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    এক

    পাগল হাঁকছে দু-ঘরের মাঝে অথৈ সমুদ্দুর। পাগল হাঁকছে—ছবি গণ্ডারের এক ঝুলে থাকে সদর দেউড়িতে। এইসব হাঁকডাক যেন কোন এক অদৃশ্য গোপন অভ্যন্তর থেকে ভেসে আসছিল। সদর দেউড়িতে এসে এমন সব শব্দে থমকে দাঁড়াতেই সে দেখল, সত্যি সত্যি মাথার ওপরে একটা গণ্ডারের ছবি, একটা দেড় হাত গণ্ডারের ছবি, নাকটা লম্বা হয়ে ঝুলে আছে—নীল রঙের ছবি, তেড়ে ফুঁড়ে যাচ্ছে আর বাতাসে ওটা পতপত করে উড়ছে। দেউড়িতে এক সিপাই—লম্বা, ততোধিক তালপাতার শামিল। হাতে জীর্ণ একটা একনলা বন্দুক। মরচে-পড়া। খাঁকি পোশাক গায়ে, মাথায় লম্বা টুপি জোকারের মত। বুট-জুতোর একটা ফিতা বাঁধা। অন্যটা হাঁ হয়ে আছে। লোকটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোচ্ছিল। এই সকালে, এখন আর কটা হবে, নটাও বাজেনি অথচ লোকটা বসে নেই, শুয়ে নেই, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। চোখ কোটরাগত, বহুদিনের উপবাসে এমন একটা ভঙ্গী মানুষের মুখে থাকে।

    সে বলল, এটা রাজবাড়ি?

    সিপাই চোখ খুলে দেখে হাই তুলল। বন্দুকটা নিয়ে সটান এটেনসান, তারপর খুব তাচ্ছিল্য—যেন কিছুই আসে যায় না, কে কখন যায় আসে খবর রাখার কথা না তার। এই লোকটা তাকে রাজার বাড়ি সম্পর্কে প্রশ্ন করছে—বেয়াদপ আর কাকে বলে! চোখ নেই! সামনে অতবড় পাথরে লেখা কুমারদহ রাজবাটী! লোকটা কি লেখাপড়া শেখেনি? তারপরই হুঁশ ফিরে আসার মত—অর্থাৎ এমন আহাম্মক যে এত বড় রাজবাড়ির মানুষের সঙ্গে কী করে কথা বলতে হয় জানে না! বরং ধিক্কার দিতে গিয়ে ভাল করে তাকাতেই অবাক! এক উঁচু লম্বা সৌম্যকান্তি যুবক দেউড়িতে দাঁড়িয়ে। মুখে বড়ই ভালমানুষের ছাপ। সে রাজার বাড়িতে ঢুকতে চায়।

    তখনই সৌম্যকান্তি যুবক লক্ষ্য করল বিশাল পেল্লাই দেউড়ির এক কোণে ছোট্ট চৌকো মত ফুট তিনেকের দরজা। কুকুর বেড়াল লাফিয়ে ঢুকতে পারে। দুজন মানুষও ঢুকে গেল। ঘাড় মাথা হেঁট করে ঢুকে যাচ্ছে তারা। এই তবে সেই দরজাটা, যা দিয়ে মানুষ এই বাড়ির অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে। সে ভাবল, কি করবে! মাথা হেঁট করে ঢুকবে, না সোজা মাথায় অপেক্ষা করবে। আর তখনই তালপাতা ঘটাং ঘটাং করে কি সব খুলে ফেলছিল, টেনে নিচ্ছিল জোরে দেউড়ির এক কপাট। সে তার জান কবুল করে কোনরকমে একটা পাট কিছুটা ঠেলে দিতেই হাঁ হয়ে গেল রাজার বাড়ি। যুবক ভিতরে ঢুকে সিপাইকে বলল, রাজেনবাবুর সঙ্গে দেখা করব।

    এত ভাল কথা নয়—বাড়ির হালচাল জানে না মানুষটা! এই বাড়ির মধ্যে কার বুকের পাটা আছে রাজার নাম নিয়ে কথা কয়। যুবকের কথায় সিপাই খুবই হকচকিয়ে গিয়েছিল। বলল, কুমার বাহাদুর?

    সে সহসা ভুল হয়ে গেছে মত বলল, কুমার বাহাদুর।

    সিপাই এতক্ষণে কিছুটা আশ্বস্ত হল যেন। হাত তুলে বলল, সামনে যান। বাবুরা আছে, বলে দেবে সব।

    যেন বাবুরা তাকে প্রথম এ-বাড়ির সহবত শেখাবে। এখানে এলে এমনিতেই রাজার সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার কথা না। কত বড় আহাম্মক আর কিছুটা গেলেই টের পাবে। মনে মনে কিঞ্চিৎ শঙ্কা। সেখানে গিয়ে না আবার বলে ফেলে, রাজেনবাবু। তোবা তোবা সে কান ছুঁল। এরকম এ বাড়িতে কেউ ভাবতেও ভয় পায়। লোকটা এত সুন্দর দেখতে। এমন উঁচু লম্বা, মুখে চোখে আশ্চর্য আচ্ছন্ন এক ভাব, যেন এত সবের মধ্যেও কি সব গভীর ভাবনা মানুষটার মধ্যে কাজ করছে। সিপাই সাদেক আলি একটু এগিয়ে বলবে ভাবল, হুজৌরের নাম লেবেন না বাবু। সম্মানে লাগে। কিসে কি বিপদ আসবে কে বলতে পারে। কিন্তু কিছুটা গিয়েও যুবককে দেখতে পেল না। গাড়িবারান্দার পাশে বড় বড় থামের আড়ালে পড়ে গেছে। তার এতদূরে যাওয়া আর সম্ভব না। খোঁজা সম্ভব না। অষ্ট প্রহর দেউড়ি আগলানো তার কাজ। এদিক ওদিক হলেই কৈফিয়ত তলব।

    আসলে নবীন যুবক যায়, কেউ হাঁকে, সেই কোন গোপন গভীর অদৃশ্য অন্তরাল থেকে হাঁকে, নবীন যুবক যায়। সে হেঁটে যায়, চারপাশ দেখে। দেউড়িতে দাঁড়িয়ে ভেবেছিল, বড় ভগ্ন প্রাসাদ। রাজার বাড়ি ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু ভেতরে যত ঢুকছে জেল্লা বাড়ছে। বাঁদিকে বড় লন। সবুজ ঘাস, কিছু বিদেশী ফুলের গাছ, ঝাউগাছ, পাম-ট্রি, ছোট্ট জলাশয়। সেখানে শালুক এবং পদ্মপাতা তারপরই লতানে গুচ্ছ গুচ্ছ সবুজ পাতার প্রাচীর। বাড়িটা কত বড় ভেতরে! যেন শেষ নেই। ডানদিকে পথ, বাঁদিকে পথ। একটা দোতলা বাড়ি কতদূর চলে গেছে পাশ দিয়ে। সে গাড়ি-বারান্দায় উঠে যেতেই এ-সব দেখল। তবু সব কিছু পুরানো। প্রাচীন এবং একটা সোঁদা গন্ধ। গাড়ি-বারান্দায় উঠতেই সে এটা টের পেল। গাড়ি-বারান্দা পার হলে লম্বা আর একটা বারান্দা—বিশাল চত্বর জুড়ে যেন। কোণায় কোণায় গোল শ্বেত-পাথরের টেবিল, কারুকাজ করা চেয়ার। দেয়ালে বড় বড় আয়না। যুবক সেই আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে বুঝল, চোখে মুখে ক্লান্তি জমেছে। রাত জেগে গাড়িতে আসায় এটা হয়েছে। তখনই কেউ দরজায় উঁকি মেরে বলল, কাকে চাই?

    যুবক বলল, রাজেনবাবুর সঙ্গে আজ দেখা করার কথা।

    লোকটা যেন কি বুঝে ফেলল, আরে এত সেই লোক—যে আসবে আসবে কথা হচ্ছে। ভালমানুষ সত্যবাদী এবং যাকে দিয়ে কুমার বাহাদুরের অনেক উপকার হবে। পলকে চিনে ফেলে বলল, বসুন বাবু। হুজুর এখনও নামেন নি। তারপরই কি ভেবে বলল, দাঁড়ান। লোকটা জাদুকরের মত প্রাসাদের ভিতরে অন্তর্হিত হয়ে গেল। এবার সে একা এল না। আরও একজন সঙ্গে। সঙ্গের বাবুটি বলল, —কুমার বাহাদুরের কাছে যেতে চান?

    —তেমনই কথা আছে।

    —কোত্থেকে আসছেন?

    —অনেক দূর থেকে।

    —নাম?

    —অতীশ দীপঙ্কর ভৌমিক।

    —মানে আপনি আমাদের নতুন— বাবুটি আর কথা শেষ করতে পারল না। দন্তপাটি নিমেষে বের করে দিল। কিছুটা কুঁজো হয়ে গেছে অল্পবয়সেই। যুবক চোখ তুলে লোকটিকে দেখে রাজেনবাবুর কথাবার্তার সঙ্গে কি যেন মিল খুঁজে দেখার চেষ্টা করল। যখন কুঁজো হয়ে গেছে তখন বুঝতে বাকি থাকল না, রাজেনবাবুর বড় বিশ্বাসীজন।

    —ওরে সুরেন। কোথায় গেলি বাবা?

    ও-পাশের একটা ঘর থেকে সুরেন হাঁকল, আজ্ঞে যাই বাবু।

    এবার অতীশের দিকে তাকিয়ে বলল, বসুন। এখনও নামার সময় হয়নি। ও সুরেন, কি করছিস?

    —আজ্ঞে যাই।

    অন্যপাশের টেবিলগুলিতেও কিছু দর্শনার্থী।

    বাবুটি বলল, ভিতরে এসে বসুন।

    যুবক বলল, বেশ হাওয়া দিচ্ছে। বারান্দাটা খুব খোলামেলা মনে হল তার।

    সুরেন কোথায় গেল কে জানে। সেই বোধ হয় খবর দেবে কুমার বাহাদুর নেমেছেন কিনা। সেই এখন তার কাণ্ডারী। সেই লোকটি হারিয়ে গেলে যা বিরাট প্রাসাদ তার পক্ষে রাজেনবাবু ওরফে কুমার বাহাদুরকে খুঁজে বার করা কঠিন হবে।

    বাবুটি বলল, পথে কোন কষ্ট হয়নি ত?

    —ঘুম হয়নি। গরম। রাতের ট্রেনে এত ভিড় জানতাম না।

    —তাহলে খুব কষ্ট গেছে। রাত জেগে এসেছেন বাবু। ওরে সুরেন বাবা, তোর হল? তুই কোথায়?

    —আজ্ঞে যাই।

    অতীশ এই কথাগুলিতে মজা পাচ্ছে। সুরেন ভেতর থেকে যাই করছে, আর বাবুটি অনবরত হেঁকে যাচ্ছে, তোর হল?

    শেষ পর্যন্ত যা হল তাতে অতীশ আরও মজা পেল। হল অর্থাৎ এক কাপ চা এবং দুটো বিস্কুট। এই হতে এত সময়! এ বাড়িতে একসময় দানধ্যান পূজা-পার্বণ দোল দুর্গোৎসব বাই-নাচ, সঙ্গীত সম্মেলন এবং রাজা-বাদশা-মহাত্মারা পায়ের ধুলো রেখে গেছেন কত। সে এখন এই বাড়ির বিশাল বারান্দায় বসে এক কাপ চা দুটো ক্রিমকেকার খাচ্ছে।

    খেতে খেতে তার ওপরের দিকে চোখ গেল। বড় বড় তৈলচিত্র। কবেকার কে জানে। অধিকাংশ ছবি উলঙ্গ যুবতীদের। বিদেশিনী। সঙ্গে সঙ্গে কোথায় কোন সুদূরের এক বাসভূমি তার চোখে ভেসে উঠল। সমুদ্রবেলায় সে আর পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। অথবা কোনও ভাঙা জাহাজের মাস্তুলে সে, দূরে সমুদ্রগর্ভে অতিকায় সেই ক্রস। কখনও ঢেউয়ে ভেসে উঠছে কখনও ডুবে যাচ্ছে। মাস্তুলের ডগায় সে লম্ফ জ্বালিয়ে নেমে আসছে। এইসব স্মৃতি মনে হলেই তার ভেতরে হাহাকার বাজে। কত বছর আগেকার এক দৈব ঘটনা তাকে এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এবং সেই আচ্ছন্ন ভাবটা আবার তার মধ্যে ঢুকে গেলে সে কেমন আনমনা হয়ে গেল। সে চুপচাপ বসে দেয়ালের ছবি দেখতে দেখতে দূরের অদৃশ্য দিগন্তে বালুবেলা অথবা নীল সমুদ্রে সেই অতিকায় পাখির আর্ত চিৎকারে মুহ্যমান হয়ে পড়ল।

    —বাবু।

    অতীশ চোখ তুলে তাকাল।

    —আসুন।

    সে উঠে গেল ভিতরে। ঘরটা ফাঁকা। ডানদিকে কাঠের পার্টিসান দেয়া দেয়াল। পাশে দরজা। ভেতরে কিছু বাবু। টেবিলে দলিল দস্তাবেজের পাহাড়। তারা মনোযোগ দিয়ে কি-সব দেখছে। ঘরটা অতিক্রম করতেই বড় একটা হলঘর পড়ল। সেই ঘরটাও বড় বড় তেলরঙের ছবিতে সাজানো। কোথাও একটা লোক উবু হয়ে কি যেন করছে। ভাল করে লক্ষ্য করতে গিয়ে বুঝল লোকটার সম্বল বলতে একটা বালতি কিছু জল এবং ন্যাতা। সে টেনে টেনে ঘর মুছে যাচ্ছে।

    বাইরে থেকে সে ভাবতেই পারেনি ভেতরে এখনও সেই জাঁকজমক আছে। হাতীশালায় হাতী ঘোড়াশালায় ঘোড়া। সব কিছু এখানে বড় বেশি মহার্ঘ মনে হচ্ছিল। ঘরটার মাঝখানে কাশ্মীরী কার্পেট, সোফা, মাথায় রকমারি কাঁচের ঝালর। দুপাশে সেই বড় বড় বেলজিয়াম কাঁচের আয়না। একটি ঘড়ি লম্বা কালো রঙের। চারপাশটা সোনার জলে কাজ করা। থেকে থেকে বাজছে। ঠিক যেন জলতরঙ্গ বাজনা। ঘড়িটার দিকে তাকাতেই সুরেন বলল, দাঁড়ান। সুরেন চবর চবর করে পান চিবুচ্ছিল। মুখের গহ্বর আগুনের মত লাল।

    সে দাঁড়াল।

    সামনে আবার একটা লম্বা ঘর। দেয়াল জুড়ে বুক-সমান উঁচু লম্বা সব কালো রঙের বেতের চেয়ার। এখানে দাঁড়ালে সে পর পর আরও সামনে তিনটে অতিকায় দরজা দেখতে পেল। কতবড় এই বাড়ি সব ঘুরে না দেখলে বোঝা যাবে না। সে পেছনে তাকালে বুঝল, ওদিকের দরজাটা কেউ বন্ধ করে দিয়ে গেছে। এখান থেকে একা পালাতে চাইলেও সে আর পালাতে পারবে না।

    সুরেন পরেছে একটা খাটো কাপড়। গায়ে রাজবাড়ির ছাপ মারা খাকি উর্দি। বোতামেও রাজবাড়ির ছাপ। খোঁচা খোঁচা দাড়ি গালে। মাঝারি হাইট। চোয়ালে মাংস কম। এক সময় শক্ত মজবুত ছিল মানুষটা, এখন হাড় ক’খানা ছাড়া কিছুই সম্বল নেই। হাতের রগ ভেসে উঠেছে। চোখে-মুখে সব সময় কেমন শঙ্কা। সে সুরেনের দিকে তাকিয়ে থাকলে বলল, ওখানটায় গিয়ে বসুন। এখুনি নামবেন।

    সেই উঁচু মত লম্বা চেয়ারটায় সে উঠে গিয়ে বসল। সামনে বিলিয়ার্ড টেবিল। লালরঙের সিল্ক কাপড়ে সবটাই ঢাকা। কোণায় একটা রিংয়ের মধ্যে ছোট বড় মাঝারি স্টিক। এ ঘরে রাজেনবাবুর পূর্বপুরুষদের তৈলচিত্র। নিচে কোনো এক বড়লাটের সঙ্গে গ্রুপ ছবি। রাজেনবাবুর প্রপিতামহের আমলে বড়লাট এ বাড়িতে পদার্পণ করেছিলেন বলে একটা ব্রোঞ্জের মূর্তি কোণায় সযত্নে এখনও রাখা। তার নিচের ছবিটা যেমন ছোট তেমনি বিদ্ঘুটে। একটা কালো কোট ছবিটাতে ঝুলছে। খালি কোট, ভেতর থেকে একটা হাত ফুটে বের হচ্ছে। কাঠের বেড়া ফাঁক করে হাতটা নিচে জলে কিছু যেন খুঁজছে। ছবিটা ভাল করে দেখার জন্য অতীশ নিচে নেমে গেল। কেউ নেই। সুরেনও না। কেমন এক নিঃসঙ্গ পুরী, বাইরে ট্রাম-বাসের শব্দ কান পাতলে শোনা যায়। আর মনে হচ্ছিল আর একটু গেলেই অন্দর মহল—সেখানে রাজেনবাবুর পিতৃপুরুষদের কেচ্ছা-কাহিনীর কূট-গন্ধ এখনও নাক টানলে পাওয়া যাবে। বিলিয়ার্ড টেবিলের অদূরেই পিয়ানো। ঢাকনাটায় ময়লা জমে আছে। একসময় এই ঘরটা ময়ফেলের জায়গা ছিল বোঝা যায়। সাহেব-সুবোরা আসত। মেমসাবরা আসত। সারারাত খানাপিনা চলত। কতকাল আগে সে-সব পাট উঠে গেছে বোধহয়। মানুষ মরে গেলে সাদা চাদরে ঢেকে দেবার মত বিলিয়ার্ড টেবিল, পিয়ানো—সব ঢেকে রাখা হয়েছে এখন।

    সে এই প্রথম এখানে। রাজেনবাবুর বাইরে একটা পোশাকী ভালমানুষের চেহারা আছে। তার সঙ্গে কথাবার্তায় প্রথম দিন এমন মনে হয়েছিল। আর দশটা সাধারণ মানুষের মতই তাকে অতীশের খুব ভাল লেগেছিল। কিন্তু যত বাড়ির অভ্যন্তরে ঢুকছে, তত এক সংশয় দানা বাঁধছে। ওর কিছুটা ভয় ভয়ও করছিল। রাজেনবাবুর বাড়ির ভেতরের হালচাল ওর কাছে কিছুটা অস্বাভাবিক ঠেকছে। এ সময় এক ধু-ধু মরুভূমির বুকে কোনো এক জরদগব পাখি তার চোখে ভেসে উঠল। এই এক ল্যাটা তার। সে অনেক কিছু দূরে অদূরে দেখতে পায়। পাখিটা ঠোঁট গুঁজে বসে আছে। একটা মরুভূমির কাঁকড়া গোপনে হেঁটে আসছে। টুক করে গলায় থাবা বসাবে। সে সহসা হাত তুলে কাঁকড়াটাকে তাড়াতে গেল। এবং ছবিটাতে হাত লাগায় জলটা যেন নড়ে উঠল। সে ভাবল, এটা কি করতে যাচ্ছে সে!

    তারপরই মনে হল ছবির জলটা নড়ে কি নড়ে না, সে প্রায় ছবির মধ্যে মুখ গুঁজে দেখার মত দাঁড়িয়ে থাকল। এবং বুঝল মনের ভুলে সে এ-সব দেখে ফেলে—এটা তার সেই কবে থেকে যে হয়ে আসছে। ছবিটা থেকে ভয়ে ভয়ে সে দূরে সরে দাঁড়াল। আজীবন এই এক ভয় সে বয়ে বেড়াচ্ছে। তখনই মনে হল ও-পাশের কোনও অদৃশ্য অন্ধকার সিঁড়িতে কেউ নেমে আসছে। সে দ্রুত তার নির্দিষ্ট জায়গায় ফিরে এসে বসে পড়ল। এটা তার নির্দিষ্ট জায়গা। এখানে সুরেন তাকে বসতে বলে গেছে। তার এদিক ওদিক যাবার নিয়ম নাও থাকতে পারে। আসলে সে সেই সরল ভীতু স্বভাবের মানুষ। ভেতরে কখনও কখনও যে গোঁয়ার মানুষটা উঁকি দেয়, তা নিতান্ত ফেরে পড়ে গেলে।

    বাড়িটাতে সোজা টানা লম্বা দরজা একের পর এক। একটা পার হলে আর একটা। যেখানটায় বসেছিল, সেখান থেকে ডাইনে বাঁয়ে দু-দুটো দরজা চোখে পড়ছে। সেই লোকটা এখনও ঘরের মেঝে মুছে যাচ্ছে। প্রচণ্ড ঘাম হচ্ছিল তার। মারবেল পাথরের মেঝে সে ঘষে চকচকে করে তুলছে। এই একমাত্র মানুষ তার কাছাকাছি। সিঁড়িতে তখন আর পায়ের শব্দ হচ্ছে না। পাশের ঘরে সরে যাচ্ছে। সে উঁকি দিয়ে দেখল রাজেনবাবু, সাদা শার্ট, গলায় টাই, সাদা জিনের প্যাণ্ট— বড় গম্ভীর। কোন দিকে না তাকিয়ে তিনি দেয়ালের আড়ালে কোথায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। আর তার ঠিক পিছু পিছু ফতুয়া গায়ে একজন মাঝবয়সী মানুষ কাঠের একটা ছোট্ট বাক্স নিয়ে রাজেনবাবুকে অনুসরণ করছে। অতীশের মনে হল, এক্ষুনি সেই হা হা হাসি শুনতে পাবে। আরে এস এস। কটায় এলে! সব ঠিক ত! কারণ অতীশের ধারণা তার আসার খবর রাজেনবাবু পেয়ে গেছে। এত অন্তরঙ্গ কথাবার্তার পর তাকে আর দশটা আমলার মত দেখতে না পারারই কথা। সেই বাক্সধারী লোকটা তখন পাশের  দরজা দিয়ে বের হয়ে এল। হাতে বাক্স নেই। ভেতরে কোন ঘরে রাজেনবাবু আর তার বাক্স বুঝি রেখে এল। মাঝবয়সী লোকটা একা এদিকের দরজায় আসতেই কুরকুর করে দৌড়ে এল সুরেন।

    মাঝবয়সী মানুষটা এত্তেলা দিল—কুমার বাহাদুর নেমেছেন। তার আগে মহারাজাধিরাজ গণ-নারায়ণ বীর বিক্রম এমন সব কিছু কি হাবিজাবি কথা—এবং অতীশের বুঝতে দেরি হল না, জমিদারী চলে গেলেও ঠাঁট বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন রাজেনবাবু। তার ফিক করে হাসি পেল।

    খবর পেয়ে সুরেন কোথায় আবার কুরকুর করে দৌড়ে গেল। তাকে কেউ কোন আমলই দিচ্ছে না। মাঝবয়সী মানুষটা তার দিকে ফিরেও তাকাল না—সোজা দরজাগুলির একটা দিয়ে নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল। এবং দেখতে দেখতে মনে হল সারি সারি ক’জন নানা বয়সী মানুষ। পাটভাঙা ধুতি, পায়ে পামশু। পাশের অফিসটাতে ওদের সে উবু হয়ে বসে থাকতে দেখেছিল। ওরা ঘরটায় ঢুকে প্রথম একে একে জুতো খুলে ফেলল। অতীশের বড় বেশি কৌতূহল—কোথায় এরা যায় দেখার বড় বাসনা। দেখলে মনে হবে ঈশ্বর দর্শনে যাচ্ছে। সে গুটি গুটি নেমে গেল। দেখল বড় কাঠের দরজা খুলে একে একে সবাই প্ৰণিপাত করছে। তারপর বেরিয়ে আসছে। টের পেলে অধম্ম হতে পারে—অতীশ তাড়াতাড়ি দেয়ালের ছবিতে মনোযোগ দিল।

    পাশ থেকে তখনই সেই বাবু, বাবা সুরেন তোর হল—সেই বাবু কালো আবলুশ কাঠের রং, চুল কাঁচাপাকা, চাঁচা মুখ, তেমনি দাঁত বের করে হাসল। বলল, এই হয়ে গেল। এবারে আপনাকে ডেকে পাঠাবেন কুমার বাহাদুর। আর একটু অপেক্ষা করুন। খবর দেওয়া হয়েছে।

    অতীশ ভারি বিভ্রমের মধ্যে পড়ে গেল। সবাই জুতো খুলে ঘরে ঢুকছে। বের হচ্ছে। তার পায়ে শু। কালো টেরিকটনের প্যাণ্ট সে পরে আছে। ফুল ফল আঁকা হাওয়াইন শার্ট গায়ে। সে জুতো খুলে ঢুকবে কি ঢুকবে না, জুতো খুলে ঢুকলে রাজদর্শন বড়ই পুণ্য কাজ, প্রায় ঈশ্বর দর্শনের শামিল—নেহাত দৈব বলে এই ঘরানার একমাত্র উত্তরাধিকারের সঙ্গে তার যোগাযোগ। অত সহজে হেলায় নষ্ট করার মত আহাম্মক সে নয়। কিন্তু তখনই তার ভেতরের গোঁয়ার মানুষটা ফুঁসে উঠল। এই গোঁয়ার মানুষটাকে অতীশ বড় ভয় পায়। গোঁয়ার মানুষটার মাথা গরম হলে হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। ঘিলু ফেটে যায়। রক্ত ঝরে। খুন খারাপি করতে দ্বিধা করে না। সে জুতোর ফিতা আলগা করে দাঁড়িয়ে থাকল। কিন্তু পা থেকে জুতো খুলতে তার সম্ভ্রমে বাধল।

    সুরেন আবার কুরকুর করে হাজির। বলল, আজ্ঞে আপনি অতীশবাবু?

    অতীশ বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ।

    —হুজুর ডেকেছেন।

    সে  দরজার কাছে যেতেই সুরেন হা-হা করে উঠল! অতীশ পেছন ফিরে তাকাল। দেখল সুরেন কাঠ হয়ে গেছে। চোখ ওর পায়ের দিকে।

    অতীশ কিছু বলল না। আসলে অতীশের ভেতরে সেই রাগী মানুষটা এখন একটা দৈত্যের মত সব অগ্রাহ্য করতে চাইছে। সে দরজা ঠেলে গট গট করে ঢুকতেই রাজেনবাবুর অন্তরঙ্গ সেই ডাক—আরে এস এস। কি রকম আছ? রাস্তায় কোন অসুবিধা হয়নি ত! ক’টার গাড়িতে এলে?

    সঙ্গে সঙ্গে অতীশের রাগী মানুষটা ভোঁ করে কোথায় ছুটে পালাল। সে আবার সেই অতীশ দীপঙ্কর। সোজা সরল মানুষ। বলল, আর বলবেন না, বড় বেশি নিয়ম-কানুন বাড়িতে। সব ঠিক বুঝি না দাদা।

    —ও ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। এ জন্য ব্যস্ত হবার কোনও কারণ নেই।

    অতীশ সোজা হয়ে বসল। না, সেই এক অন্তরঙ্গ কথাবার্তা। বড় সহজে দাদা মানুষকে কাছে টেনে নিতে পারেন। এটা একটা মানুষের বড় গুণ। অতীশ এতক্ষণ অযথা ভয় পেয়েছে। এবং মনে হল সব নতুন কাজেই সে এভাবে সবসময় একটা শঙ্কা বোধ করে আসছে। আগে সে কম বয়সের ছিল, এখন বয়স হয়েছে অথচ সেই এক শঙ্কাবোধে সে পীড়িত হচ্ছিল। এটা তার ভারি দুর্বলতা জীবনে। সে নিজেকে সাহসী করে তোলার জন্য বলল, ঠিক বুঝতে পারছি না আপনার এখানে আমাকে কি করতে হবে।

    ঘরে ভারি সুঘ্রাণ। যেন কেউ এইমাত্র কিছু স্প্রে করে দিয়ে গেছে। গোল অতিকায় মেহগনি কাঠের টেবিলের ও-পাশে রিভলবিং চেয়ারে কথা বলতে বলতে রাজেনবাবু ঘুরে ফিরে যাচ্ছিলেন। মাঝে মাঝে কান চুলকাচ্ছেন পেনসিল দিয়ে। কাচের রং-বেরংয়ের দোয়াতদানি, নানা সাইজের বিদেশী কলম। একটা লাল পেন্সিল। এক পাশে ডাঁই করা কাটা এনভেলাপ। তিনি কথা বলতে বলতে কাজ সারছিলেন। চিঠিপত্র দেখছিলেন। দরকার মত জায়গায় জায়গায় লাল টিক-মার্ক। মাঝে মাঝে বেল টেপা। উর্দি-পরা সুরেন হাজির। এটা ওটা এগিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। অতীশের কথায় কিঞ্চিৎ অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। বললেন, ও তেমন কিছু না। আমার একজন ভালমানুষের দরকার। জান তো সৎ মানুষের বড় অভাব আজকাল। তোমার কথা আমি গোবিন্দের কাছে শুনি প্রথম। তোমাকে দেখি বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনে। গোবিন্দই আলাপ করিয়ে দিয়েছিল—নিশ্চয়ই তোমার মনে পড়ছে সব।

    অতীশ তাকিয়েই আছে, কি বলবে বুঝতে পারছে না।

    —আজকাল অকপট কথাবার্তা কেউ বলে না। তোমার কিছু কথাবার্তা আমার কাছে ভারি অকপট মনে হয়েছিল।

    অতীশ বলল, তাই বুঝি!

    অতীশ কি ভেবে বলল, আপনি একবার শুনেছি বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলেন, একজন সৎ মানুষ চাই। ভাল মানুষ। বেঁচে থাকার সব রকমের সুযোগ সুবিধা দেওয়া হবে।

    —তুমি দেখেছিলে বিজ্ঞাপনটা?

    —দেখিনি। গোবিন্দদাই বলেছেন। তিনিই আপনার কাছে চলে আসতে বললেন, কলকাতায় না এলে মানুষের নাকি কপাল খোলে না।

    —তাহলে এটা বিশ্বাস কর?

    বিশ্বাস করা ঠিক কি ঠিক না অতীশ বুঝতে পারছে না। সে স্কুলে চাকরি করত। বেশ ছিল। তখনই ঘুণপোকার মত মাথায় কিটকিট করে অদৃশ্য এক চক্র ঢুকে যাচ্ছে। সে কেমন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল। কে যেন কোন সুদূর থেকে বলছে, ছোটবাবু মনে রাখবে, ইউ হ্যাভ এ গুড সোল। লার্ন টু বি ওয়াইজ। ডেভালাপ গুড জাজমেণ্ট অ্যাণ্ড কমনসেন্স। সমুদ্র তোমাকে অযথা তবে ভয় দেখাতে পারবে না। জল এবং খাবার ফুরিয়ে গেলে মরীচিকা দেখবে সব অদ্ভুত রকমের। ভয় পাবে না। দেন প্রেজ দ্য লর্ড।

    রাজেনবাবু বললেন, তুমি কিছু বলছ না কেন?

    সংবিৎ ফিরে পাবার মত অতীশ তাকাল। বড় বড় চোখ—কেমন অসহায় ছেলেমানুষের মত চোখ দুটো এবং সে মাথা নিচু করে বলল, জীবনে খুব বড় হতে চাই না। সৎভাবে বাঁচতে চাই। আমায় শুধু এ সুযোগটুকু দেবেন। স্কুল আমাকে সে সুযোগটুকু পর্যন্ত দিতে চায় নি।

    —আলবাৎ। তুমি কি ভয় পাচ্ছ! তোমার সঙ্গে সবার আলাপ করিয়ে দেব। এরা আমার বিশ্বস্ত লোক। তুমি খুশী হবে।

    অতীশ বলল, শহর আমার এমনিতে ভাল লাগে না। বেশ ছিলাম। জানেন, আমার স্কুলের সামনে ছিল রেল-লাইন, তারপর দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। স্কুল ছুটির পর কতদিন একা একা কতদূরে চলে গেছি। গাছপালার মধ্যে আলাদা একটা মজা আছে।

    —থাকতে থাকতে এই শহরও একদিন ভাল লেগে যাবে।

    অতীশ কি বলবে ভেবে পেল না। চাকরিটা সে প্রায় বলতে গেলে দুম করেই ছেড়ে দিয়েছিল। চাকরি ছাড়ার আগে কে যেন কেবল সুদূর থেকে বলত, ফলো ওনলি হোয়াট ইজ গুড।

    অতীশের এমনই হয়। নতুন কাজে ঢুকলেই এমন হয়। কে যেন দূর থেকে তাকে বার বার সতর্ক করে দেয়। কবে সেই যে মানুষটার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল তারপর থেকে বিচলিত বোধ করলে, শুনতে পায় তিনি দূর অতীত থেকে বলে যাচ্ছেন, কেউ আমাদের ডাঙায় পৌঁছে দেয় না ছোটবাবু। নিজেকে সাঁতরে পার হতে হয়।

    রাজেনবাবু বললেন, আমাদের একটা কারখানা আছে। আমার ঠাকুরদা কারখানাটা করে গেছিলেন। জানই ত জমিদারদের ওসব পোষায় না। বাবা-দাদাদেরও পোষাত না। এই শখ আর কি। কিন্তু এখন ত আমাদের শখ নয়। এটা প্রফেশান বলতে পার। তাই জায়গায় জায়গায় ঠিক ঠিক লোক বসিয়ে দিচ্ছি।

    অতীশ বলল, কি করতে হবে?

    —দেখাশোনা।

    ঠিক বুঝতে না পেরে বলল, আমি ওসব ভাল বুঝি না। ওখানে কি হয়?

    —কনটেনার। টিন কনটেনার। দেখলে সব বুঝতে পারবে।

    —ওগুলো কোথায় যায়?

    রাজেনবাবু হেসে ফেললেন। অনভিজ্ঞ। জানে না। কিন্তু ঐ যে বলে না, চোর-ছ্যাঁচোড়ের হাত থেকে কেড়ে নিতে না পারলে, ঠিক মানুষ বসাতে না পারলে কাজ হবে না। সময় এবং চর্চা সব ঠিক করে দেয় মানুষকে। রাজেনবাবু তক্ষুনি বেল টিপলেন, যেন যা বলার ছিল শেষ। সুরেন হাজির। কি বলতেই কেউ আর একজন ঘরে ঢুকল। রাজেনবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন, ইনি তোমাকে সব বুঝিয়ে দেবেন। আজ থেকেই কাজে লেগে যাও। থাকার কোনও অসুবিধা হবে না। মেস বাড়ি আছে। সেখানে খেতে পার। স্কুলে যা পেতে তার চেয়ে বেশিই পাবে। কি ঠিক! পরে কোম্পানির উন্নতি হলে তোমারও উন্নতি।

    অতীশ এ-রাজেনবাবুকে যেন চিনতে পারল না। ব্যস্ত, তক্ষুণি যেন কোথাও জরুরী কাজে যাবেন—কেমন গম্ভীর কথাবার্তা। তার সরল সহজ মানুষটা বিচলিত বোধ করল। এবং ভেতরে অস্বস্তি। তবু হাতের কাছে কাজ, সে ছেড়ে দিতে পারে না। তার এখন যেভাবে হোক আবার ঝুলে পড়া দরকার। কলকাতায় এটা ১৯৬৪ সাল। সে বহু দেশ-বিদেশ করে, স্কুলের জীবন সাঙ্গ করে শেষে এক রাজার বাড়িতে হাজির। জীবনের নতুন পালা।

    কথাবার্তা সারতে সময় বেশি লাগল না। প্রাইভেট অফিসের নধরবাবু তাকে সঙ্গে নিয়ে অতিথিশালার দোতলার একটা এক কামরার ঘর দেখালেন। আপাতত এখানেই থাকা। পাশে বাথরুম—সামনে লম্বা বারান্দা। দোতলার নিচের ঘরগুলিতে বচসা চলছিল—ওপরের ঘরগুলির চার নং ঘরটা তার জন্য বরাদ্দ। অন্য সব ঘরগুলোয় তালা মারা। দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে। দেয়ালে ফাটল বড় বড়। যে কোন মুহূর্তে সব ভেঙে পড়তে পারে। সে বুঝতে পারল, তার কপালই এমন। লঝঝড়ে। সে ঘুরে ফিরে দেখতে চাইল, কোথায় কতটা রেলিং ভাঙা, কোথায় কখন ফাটল আরও প্রশস্ত হতে হতে আকাশ দেখা যেতে পারে, এবং সে বিস্মিত হল দেখে, শেষ ঘরে কেউ বসে আছে। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। আশ্চর্য সুপুরুষ। তার পাগল জ্যাঠামশাইর মত চুপচাপ। দেয়ালের দিকে নিথর চোখ। জানালায় সে, নতুন লোক—কিছু আসে যায় না যেন। তারপরই সে কেমন বিমূঢ় হয়ে গেল— দরজার বাইরে থেকে তালা মারা। লোকটাকে আটকে রাখা হয়েছে তবে!

    এই রাজবাড়ির কেতাকানুন ঠিক সে জানে না। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক কিনা তাও সে জানে না। তাড়াতাড়ি সে সরে যাবার সময়ই লোকটি ডাকল, হেই নবীন যুবক।

    অতীশ ঘুরে দাঁড়াল।

    —হেই নবীন যুবক তালাটা খুলে দেবে?

    অতীশ বুঝল পাগল মানুষ। আটকে রাখা হয়েছে। সে চলে যাচ্ছিল, আবার ডাক—হেই নবীন যুবক দরজাটা খুলে দাও। ভগবান তোমার ভাল করবেন।

    কথাবার্তা খুবই স্বাভাবিক। তার বলতে ইচ্ছে হল, আপনাকে কে আটকে রেখেছে?

    —ঈশ্বর। তিনি মাথার ওপরে হাত তুলে দেখালেন। তারপর বললেন, রাজার বাড়িতে ঢুকে খুব ঘাবড়ে গেছ দেখছি!

    অতীশ ভাবল বারে বা, এত প্রায় অর্ন্তযামী। লোকটা মুখ দেখলে মানুষের ভেতরটা দেখতে পায়। তার কৌতূহল হল। বলল, পাশের ঘরগুলিতে কারা থাকে?

    —বাবুরা থাকে।

    তখনই অতীশ লক্ষ্য করল বারান্দার ওপর আর একটা  দরজা বসানো। দরজাটা দিয়ে এই মানুষটির ঘর একেবারে আলাদা করে রাখা হয়েছে। দরজা খোলা রেখে গেছে কেউ ভুলে। সে এ জন্য এদিকটায় ঢুকতে পেরেছে। পৃথিবী থেকে লোকটাকে গোপন করে রাখার জন্য বড়ই সুবন্দোবস্ত করা হয়েছে। লোকটার কি অপরাধ জানার ইচ্ছে হল তার। নীচে দেখল নধরবাবু সিঁড়ি ধরে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছেন। হাঁপাতে হাঁপাতে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠলেন, ওকি করছেন অতীশবাবু! দরজা খুলল কে? ওখানে না, ওখানে না। সঙ্গে সঙ্গে বড় একটা তালা ঝুলিয়ে চলে গেলেন। এবার বারান্দা থেকে সোজা পুবের দিকে তাকালে বড় তালাটাই কেবল চোখে পড়ে। ওখানে একটা আলাদা ঘর, কার বাপের সাধ্যি আছে আর টের পায়।

    বিকেলের দিকে অতীশ নিজের ঘরে শুয়েছিল। একটা তক্তপোশ চাদর তোষক বালিশ রাজবাড়ি থেকেই এসেছে। সবই নধরবাবু ব্যবস্থা করেছেন। তিনি বলে গেছেন, আজ বিশ্রাম করুন। কাল খবর দেব। রাতের খাবার ঘরেই আসবে। চা আসছে। কিছু দরকার হলে বলবেন। কোন সংকোচ করবেন না। নিজের বাড়ি মনে করবেন। একই পরিবারের লোক ভাববেন। তবে আর কোন কষ্ট থাকবে না। আমি স্ত্রী-পুত্র নিয়ে ওদিকের কোয়ার্টারগুলোর একটাতে থাকি। নিচের তলায় আমার ঘর। বলে তিনি চলে গেছিলেন। তারপর এলেন আরও একজন প্রবীণ মানুষ। লম্বা, বেশ সৌখিন। কানে আতর মাখানো তুলো গোঁজা। মাথায় প্রশস্ত টাক। বিছানায় বসে বললেন, তোমার বাবা আমাকে চেনেন। আমার নাম রাধিকাবাবু।

    অতীশ রাধিকাবাবুর নাম শুনেছে। কুমার বাহাদুরের বাবার আমলের লোক। তিনি বললেন, যে ক’দিন ঠিকঠাক না হয়ে বসছ, সে ক’দিন আমার বাড়িতে ডালভাত খাবে। কাল থেকে মনে থাকে যেন। এরপরই এল গোলগাল চেহারার একজন মানুষ। বলল, আমার নাম রজনীবাবু। একে একে অনেকেই এল, পরিচয় দিল কুমারবাহাদুরের কোন কোন কনসার্নে কে আছে, কি করে এবং দুটো চারটে উড়ো কথাও বলে গেল। মশাই, স্কুলে ছিলেন বেশ ছিলেন। এখানে মরতে এলেন কেন? সে ঠিক বুঝল না কি জবাব দেবে। তারপরই সে শুয়ে পড়েছিল। নতুন জায়গায় এলেই তার মন খারাপ হয়ে যায়। মুখচোরা মানুষদের যা হয়। প্রায় লাইনবন্দী হয়ে লোক এসে দেখা করে যাওয়ায় কিছুটা ঘাবড়েও গিয়েছিল। এত খাতির! তারপর সে দেখল, একজন লাঠি হাতে লোক সেই আটকে রাখা মানুষটাকে নিয়ে তার দরজার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। মানুষটা তার জানালায় এসে নড়তে চাইল না। অতীশ কেন জানি সম্ভ্রমবোধে নিজেই উঠে গেল। মানুষটা সহসা কানের কাছে মুখ এনে কি বলতে চাইল—সবটা সে শুনল না। খুন-টুনের কথা। নবীন যুবক তুমি খুন হয়ে যাবে এমন কথাটথা। সবটা শোনার আগেই লোকটা ঠেলতে ঠেলতে সেই মানুষটাকে সিঁড়ির দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকল। অতীশ দরজা থেকে নড়তে পারছে না। কেমন আড়ষ্ট ভাব। সুদূরে তখন কেউ যেন হেঁকে যাচ্ছে, হাই ছোটবাবু ভয় পাচ্ছ কেন! স্ট্রাগল ইজ দ্য প্লেজার, গো অন।

  • দুই

    দুই

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    দুই

    রাতেই অতীশ ভেবেছিল, স্ত্রীকে চিঠি লিখবে। ওর ধারণা ছিল, নির্মলা তার এটাচিতে খাম রেখে দিয়েছে। কারণ কোথাও গেলে নির্মলার এটা স্বভাব। পৌঁছেই একটা চিঠি। সময়মত চিঠি না পেলে নির্মলা ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু এটাচিটা খুলে দেখল, খাম অথবা পোস্টকার্ড কিছুই দেয়নি। নির্মলার এত বড় ভুল হয় না। পরে মনে হল, নির্মলা ওকে ছেড়ে থাকতে হবে ভেবে খুব ভেঙে পড়েছিল। কারণ বিয়ের পর সে অতীশকে ছেড়ে বেশিদিন থাকেনি। কলকাতায় অতীশ যাচ্ছে। সেখানে কি কাজ কি মাইনে, কিছুই জানা নেই। সেখানে এমন মাইনে আশা করে না যাতে করে বাসা ভাড়া করে থাকতে পারে অতীশ। বাসার খরচ চালিয়ে এমন উদ্বৃত্ত আর অতীশের হবে না, যাতে করে বাবা-মা ভাই-বোনেদেরও ভরণপোষণ করতে পারে। ফলে নির্মলা ভেবেছিল, অতীশ প্রবাসী হয়ে গেল। তার সঙ্গে মাঝে মধ্যে এবার থেকে কখনও সখনও প্রবাসী মানুষের মতই দেখা হবে। এই বিরহে সে ক’দিন থেকেই পীড়া বোধ করছিল এবং ভুলটাও তার সে জন্য হয়েছে।

    চিঠিটা  লেখা খুব জরুরী ভাবল। চিঠিটার জন্য নির্মলার অপেক্ষা কি গভীর সে এ-মুহূর্তে টের পাচ্ছে। নধরবাবু তাকে সাহায্য করতে পারে। সে নধরবাবুর কাছেই একটা খাম পেয়ে গেল। এবং ঘরে এসে প্রথমেই লিখল, কল্যাণীয়াসু—এখানে মঙ্গলমত পৌঁছেছি। আজ থেকেই কাজে বহাল হলাম। মাইনে স্কুলে যা পেতাম আপাতত মনে হচ্ছে তার চেয়ে বেশিই হবে। মূল প্রাসাদ সংলগ্ন একটা দোতলা বাড়িতে এক কামরার ঘর দিয়েছে। সেখানে আছি। কোনও অসুবিধা নেই। তারপরই  লেখার ইচ্ছে হল, কিছু কিছু ঘটনা চোখে খুব ঠেকে। কিন্তু এটা লেখা যুক্তিযুক্ত ভাবল না। নির্মলার স্বভাব একটুকুতেই ভেঙে পড়া। তখন ওর শরীর ভেঙে পড়ে। বিয়ের আগে নির্মলা ভারি সুন্দর ছিল দেখতে। চোখে মুখে বালিকাসুলভ হাসি লেগেই থাকত। কিন্তু একজন স্কুল শিক্ষকের পক্ষে আর্থিক নিরাপত্তা তত প্রবল ছিল না বলে তাকে প্রায়ই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলত। আর বিয়ের বছর পার না হতেই পেটে মিণ্টু হাজির। তখন নির্মলার এমনও মনে হয়েছে অতীশ অবিবেচক। অতীশ বাইরের বারান্দায় অনেকদিন চুপচাপ সন্ধ্যায় নির্জনে বসে থেকেছে সেজন্য। বারান্দা থেকে গাছপালার ফাঁকে কিছু নক্ষত্র দেখা যেত আকাশে। অনেক দূরের নক্ষত্র দেখতে দেখতে সে এক রহস্যময় জগতে ডুবে যেত। সেই জগৎ স্বপ্নের মত। কোনো দূরাতীত স্বপ্ন তাকে তাড়া করে বেড়ালে, নির্মলা বলত, এই অন্ধকারে চুপচাপ কেন। আমি তোমাকে কিছু বলেছি! তুমি রাগ করেছ?

    অতীশ নির্মলার কথায় বলত, না না। এমনি বসে আছি।

    নির্মলা বলত, তুমি মাঝে মাঝে এত কি ভাব বলত!

    —কী ভাবি!

    —বাবা কখন থেকে প্রসাদ নিতে ডাকছে।

    —বৈকালি হয়ে গেছে?

    —কখন! কাঁসিঘণ্টা বাজল শুনতে পাওনি। কোথায় চলে যাও বলত!

    অতীশ বুঝত সে ধরা পড়ে গেছে। সে বলত, গল্পের একটা চরিত্র ভারি কূট খেলা খেলছে। ঠিক ধরতে পারছি না।

    অতীশ সমুদ্র থেকে ফিরে আসার পর পত্রপত্রিকায় ছোট্ট একটা খবর বের হয়েছিল। সেই খবর থেকেই অতীশ কোনও কাগজের সম্পাদকের নজরে পড়ে গেছিল। একটা লেখা লিখেছিল, সুনাম পেয়েছে। দুটো একটা লেখা লিখলে সযত্নে ছাপা হয়ে যায় বলে বাড়তি কিছু পয়সা আসে। ফলে চর্চা করে লেখার। এমন কথায় নির্মলা আর কোন অভিযোগ তুলতে পারত না। সে বলত, এস খাবে। বাবা তোমার জন্য বসে আছেন।

    তারপরই কেন জানি মনে হল অতীশের, অসীম অনন্ত আকাশের নিচে জীবন বয়ে যায়। তার জীবন বয়ে যাচ্ছে, ভাঙা হাল ছেঁড়া পাল নৌকায়। কখনও হাওয়া বয়, পালে হাওয়া লাগে। মনে হয় জীবন বড়ই মনোরম। কখনও হাওয়া থাকে না, পালে হাওয়া লাগে না—নিঝুম চারপাশ, বড়ই গুমোট। চাকরি ছেড়ে দেবার পর এমন মনে হয়েছিল তার। আবার পালে বাতাস লেগেছে—নিরুদ্দিষ্ট যাত্রা—কারণ সে জানে না, কোথায় কিভাবে সে শেষপর্যন্ত কোন ঘাটে নোঙর ফেলবে। সে এ-জন্য তার চিঠিতে চাকরি পাবার কথাটা খুব উৎসাহের সঙ্গে প্রকাশ করতে পারছে না। চাকরি সম্পর্কে দ্বিধা আছে এখনও। তারপর সেই মানুষটার ফিসফাস কথাবার্তা— তুমি খুন হয়ে যাবে নবীন যুবক– ঘরের চারপাশটা সে দেখল, বড়ই জীর্ণ আবাস। অনেকদিন এদিকটায় প্রাসাদের কোনও সংস্কার হয়নি। দেয়ালের কোথাও ইট বের হয়ে আছে। ছাদের কড়ি বরগা আলগা। চাপা পড়তে পারে—আসলে কি এই ঘরটায় তাকে থাকতে দিয়েছে বলেই মানুষটা তাকে এভাবে সতর্ক করে দিয়ে গেল! সে ভাবল, কালই কুমার বাহাদুরকে বলবে, একটা ভাল থাকার ঘর দিন। ভয় করে। যে কোনও সময় ধসে পড়তে পারে সব। এ-সব কিছুই চিঠিতে অবশ্য লেখা চলে না। আর কি লিখবে বুঝতে পারছে না। বাবা-মার খবর, ঠিকমত পত্রের জবাব, টুটুল এবং মিণ্টুর খবর নিতে পারে। সে ত শেষ লাইনে এগুলি লিখবেই। নির্মলাকে আরও কিছু লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে। আসলে এত ছোট চিঠি পেলে নির্মলা দুঃখ পাবে। সে লিখল, নির্মলা আমি ফেমিলি কোয়ার্টার পাব মনে হচ্ছে। পেলে, এখানকার কোনও স্কুলে যদি কোনরকমে তোমাকে ঢুকিয়ে দিতে পারি তবে খুব অসুবিধা হবে না। আমার টাকায় বাড়ির খরচ, তোমার টাকায় ওখানকার খরচ! তুমি নিজেও জান, তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারি না। এক রববারের ছুটিতে চলে যেতে পারি। কবে যাব লিখব না! গিয়ে অবাক করে দেব।

    আর কি লিখবে! লিখতে পারে! প্রাসাদের কথা লিখলে চিঠিটা বেশ বড় হয়ে যাবে। সে লিখল সব ঘুরে ফিরে দেখলাম। কলকাতার ওপর এমন খোলামেলা জায়গা আশাই করা যায় না। একটা খুদে সাম্রাজ্য বলতে পার। প্রাসাদের চারপাশে বিরাট জেলখানার মত পাঁচিল। বাইরে থেকে মনে হবে, কেউ থাকে না বাড়িটাতে। ভেতরে ঢুকলে টের পাওয়া যায় সব। বড় বড় দুটো পুকুর, খেলার মাঠ, গোয়ালবাড়ি, বেয়ারা, বাবুর্চি খানসামাদের থাকার জন্য একটা ছোটখাট পাড়া আছে। ছোট ছোট ঘর—বস্তির মত কিছুটা। বাবুদের জন্য মাঝারি সাইজের ঘর। কিছুটা ছিমছাম। প্রাইভেট সেক্রেটারির জন্য আলাদা দোতলা বাড়ি। গাছপালা ফুলের বাগান সবই আছে। তুমি থাকলে আরও ভাল লাগত নির্মলা। তারপরই কেন যে লিখল, আমি সাঁতার কাটছি। পারে উঠব বলে সাঁতার কাটছি। কতদিন থেকে সাঁতার কাটছি। ঠিক একদিন তীর দেখতে পাব। আর তখনই মাথার মধ্যে ঠুক ঠুক করে কে যেন তার পেরেক পুঁতে দিচ্ছে।

    —না ছোটবাবু, সামনে কিছু দেখা যাচ্ছে না।

    —কিছু না?

    —না।

    —পাখিটা?

    —এলবা এলবা! ছোটবাবু চিৎকার করে ডাকতে থাকল; হোয়েআর ইউ আর। নট ইন দা স্কাই, নট আপন দা সি—হোয়েআর ইউ আর? অতীশ চিঠি লেখা বন্ধ করে দিল। ছোটবাবু তুমি কে, তুমি কেন আবার আমার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছ! তোমাকে আমি কবে কোথায় রেখে এসেছি ঠিক মনে করতে পারছি না। আসলে মনে করতে পারছি না, না মনে করতে আর চাই না। তুমি মাঝে মাঝে এমন বিড়ম্বনায় ফেলে দাও কেন! কেমন আচ্ছন্ন বোধ করি। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, আমার একসময় একজন ছোটবাবুর জীবন ছিল। তারপরই কেমন অসহায় চোখে তার দিকে কে যেন তাকিয়ে থাকে। সেই চোখ দুটো কবেকার দেখা যেন—মাথার মধ্যে স্মৃতি কূট কামড় বসালে সে অস্থির হয়ে ওঠে। এবং সে জানে, ছোটবাবু তার ভিতর ঢুকে গেলে তার আর সারারাত ঘুম হবে না। শুধু এ-পাশ ও- পাশ করবে। একা থাকলে এসব বেশি মনে হয়। পাশে নির্মলা থাকলে, মিণ্টু টুটুল থাকলে সেই স্মৃতি সহজেই সে ভুলে থাকতে পারে। এবং বিড়ম্বনার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্যই অতীশের মনে হল, নির্মলাকে কাছে রাখা দরকার। তা না হলে সে পাগল হয়ে যেতে পারে। বংশে এটা আছে। এবং সেই শৈশবের কোনও পাগল মানুষের জীবন, তার জীবনে এসে ধীরে ধীরে ভর করার যেন একটা চক্রান্ত করছে।

    কারণ কখনও মনে হয় কোন সমুদ্রগামী জাহাজের সে নাবিক, কখনও মনে হয়, গভীর অরণ্যের মধ্যে দিয়ে সে পথ হাঁটছে। আবার কখনও দেখতে পায় নীল আকাশ, বিশাল সমুদ্র, একটা অতিকায় পাখি, নিরিবিলি আকাশ, সব শেষে একটা সামান্য বোটে সে আর এক বালিকা। কখনও মরীচিকার মত সমুদ্রের অপদেবতারা তার পিছু নেয়। সেইসব অপদেবতারা যেন এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে। জলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, ছায়া ছায়া মূর্তি, সব কঙ্কালের মত কী যেন হাওয়ায় ভাসমান। একে একে নেমে আসছে তারা। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে চাইছে। আর এলবার ডাক, এলবা যেন সেই অপদেবতাদের প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য মাঝে মাঝেই হাঁকছে—আমাকে অনুসরণ কর। একদিন না একদিন ডাঙ্গা দেখতে পাবে। ডাঙ্গা দেখতে পেলেই অপদেবতারা আর ভয় দেখাতে পারবে না।

    অতীশ একসময় দেখল, খাম খোলা, চিঠি লেখা বন্ধ। অন্য এক যুবক এসে তাকে বলছে, কি কেমন আছ? সে কে? দেখতে পেল, সে আর কেউ নয়, সেই ছোটবাবু। তার আগেকার স্মৃতি।

    ছোটবাবু বলল, আমি মরে গেছি ভেব না।

    অতীশ বলল, জানি।

    —তুমি পাপ কাজ করেছ।

    অতীশ বলল, না না আমি কোনও পাপ কাজ করিনি।

    —তুমি খুন করেছ। কেউ সাক্ষী নেই। কেবলমাত্র আমি এখনও সাক্ষী।

    অতীশ বুঝল, আজ তাকে ছোটবাবু আবার জ্বালাবে। সে বাথরুমে ঢুকে চোখে মুখে জল দিল। ঘাড়ে জল দিল। ভাবল স্নান করলে ভাল হয়। সে তারপর স্নান করে নিল। এবং সে বাইরের দিকে তাকাল। গাড়ি-বারান্দার বড় আলোটা জ্বলছে। ঘরে ঘরে আলো। মানুষজন অনেক থাকে এ বাড়িতে। রাত খুব বেশি হয়নি। গাঁয়ের মত ন’টা বাজলেই যে বেশি রাত ভাবা সেটা এখানে অচল। বরং যেন সারাদিন সব মানুষের খাটাখাটনির পর এখন একটু হৈ-চৈ করা। পাশের ঘরে কারা তাস খেলছিল। এদের কাউকে সে এখনও ভাল চেনে না। তাস খেলায় তার কোনও আকর্ষণ নেই। সে খেলাটা কখনও শেখার চেষ্টা করেনি। আজ কেন জানি তার মনে হল, সময় কাটাবার এমন একটা আকর্ষণ জীবনে তৈরি করা দরকার। এখন এই খেলাটা জানলে কত কাজে লাগত। আর যাই হোক ছোটবাবু অসময়ে এসে তাকে বিব্রত করতে পারত না।

    সে তাড়াতাড়ি চিঠিটা নিয়ে আবার বসল। বুঝতে পারল জীবনে এমন অনেক সময় আসে যখন আর এক লাইন বেশি ভাবা যায় না। সে চিঠিটা সংক্ষিপ্ত করল। খুব ছোট চিঠি। এবং খামে ভরে ঠিকানা লিখে বের হয়ে গেল। এখন তার চারপাশে কিছু মানুষজন দরকার। অন্তত রাস্তায় বের হয়ে যদি হাঁটতে হাঁটতে দোকানপাট দেখতে দেখতে আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে।

    ছোটবাবু বলল, পালাচ্ছ কেন?

    —কৈ পালাচ্ছি!

    —পালাচ্ছ না! কিন্তু যাবে কোথায়?

    —কোথাও না।

    —খুব সাধুজন হয়ে গেছ না?

    অতীশ বলল, দেখ ছোটবাবু আমি নিজেকে সাধুজন ভাবি না। তবে আমি খারাপ মানুষ না। ভাল থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছি। স্কুলে তুমি দেখলে ত কেমন চক্রান্ত করছিল তারা।

    —তোমার জন্য ওদের অসুবিধা হচ্ছিল। ওরা তা সহ্য করবে কেন?

    —তাই বলে মিছিমিছি আমাকে ভাউচার সই করে দিতে হবে। যা নয় তাই লিখতে হবে!

    —লিখলেই পারতে। চাকরি ছাড়ার কি হল!

    অতীশ বলল, ওদের সঙ্গে পেরে উঠছিলাম না।

    —এখানেও পেরে উঠবে না, যতদূরেই যাও একজন আর্চি তোমাকে অনুসরণ করবেই।

    —আমি মানি না।

    সিঁড়িটা অন্ধকার। অতীশ পা টিপে টিপে নামছিল। সিঁড়িতে তবে কেউ আলো জ্বেলে দেয় না। হয়ত দেওয়া হয়, কেউ আলোর ডুম চুরি করে নিয়ে যায়। সে পা টিপে টিপে নামছিল। ছোটবাবু এখনও গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আছে। প্রায় তার শরীরের সঙ্গে লেপ্টে থাকার মত। যখনই কোনও অনিশ্চিত জীবনে সে পা দেয়, তখনই ছোটবাবুর যেন পোয়াবারো। ছোটবাবু না আর্চির! আবার পাওয়া গেছে। সে নামতে নামতে বলল, কতক্ষণ আমাকে অনুসরণ করবে! দেখি কতক্ষণ করতে পার! আমি গেলে তিনি খুব খুশী হবেন। জানো রাধিকাবাবুটি কুমারবাহাদুরের খুব বিশ্বাসীজন। এ-রাজ-বাড়িতে পাকশালায় প্রথম কাজ নিয়ে এসেছিল কুমারবাহাদুরের বাবার আমলে। সেই মানুষ এখন রাজবাড়ির অফিস সুপার। খুব প্রতাপ মানুষটির। তিনি নিজে এসে আমাকে ঠিকঠাক হয়ে না বসা পর্যন্ত বাসায় খেতে বলেছেন। খুব আপনজনের মত ব্যবহার।

    এ-সব ভাবতে ভাবতে সে নিচে নামল। সামনে সবুজ লন, সারি সারি কামিনীফুল এবং গন্ধরাজ ফুলের গাছ। কিছু ফুলের গন্ধ আসছিল। সে দাঁড়িয়ে গা ঝাড়া দিল। কাউকে ঝেড়ে ফেলতে চাইল। দেখলে কেউ ভাববে মানুষটার জামার মধ্যে পোকা ঢুকে গেছে। সে গোপনেই এসব করে থাকে। কারণ তার জানা আছে সবার সামনে সে এটা করলে তার মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার আছে টের পাবে। আর তখনই অন্ধকার ছায়া থেকে কে যেন উঠে এসে বলল, না না জামা ঝাড়বে না। ওখানে কিছু নেই।

    আরে সেই লোকটা! যেন বিয়েবাড়ি থেকে নেমন্তন্ন খেয়ে ফিরছেন। পরনে আদ্দির পাঞ্জাবি পাটভাঙা ধুতি। হাতে বেলফুলের মালা। একা। সঙ্গের সেই লাঠিয়ালটিও নেই। পায়ে শু চকচক করছে। খুবই দিলদরিয়া মেজাজ। মুখ কামানো।

    অতীশ বলল, আপনি!

    —এই ভ্রমণ সেরে এলাম।

    —কোথায় গেছিলেন?

    —রাজবাড়ি।

    —এটাই তো রাজবাড়ি।

    —ধুস। বলে, ছোটবাবুর হাত চেপে ধরল। বলল, নবীন যুবক, একা থাকতে ভয় পাচ্ছ!

    —না না। রাধিকাবাবুর বাসায় যাব বলে বের হয়েছি।

    অতীশের চোখমুখ রাস্তার আলোতে স্পষ্ট। সে ভাল করে অতীশের মুখটা দেখল। বলল, না না এভাবে ভয় পাওয়া ঠিক না। আমি এভাবে ভয় পাই না। আমার সঙ্গে এস। ভয় পেলে মানুষের জীবনে করার কিছু থাকে না। আমার মত তোমাকে তখন ভূতে পেয়ে বসবে।

    লোকটা তার হাত ধরেই আছে। যেন কত চেনাজানা মানুষ। নির্বান্ধব শহরে বড়ই বান্ধব। হাত ছাড়ছে না। গা থেকে আশ্চর্য সুবাস উঠছে। অতীশ কি করবে ভেবে পেল না। কি বলবে বুঝতে পারল না।

    —দাঁড়িয়ে থাকলে কেন, এস।

    —কোথায়?

    —কেন, আমার ঘরে। তখন উঁকি দিয়েছিলে, এখন ভাল করে দেখে যাও।

    —আপনার ওখানে যাওয়া বারণ।

    —কে বারণ করেছে!

    নাম বলতে অতীশ ইতস্তত করছিল। তারপর মনে হল, তখন সেই বাবুটি তো তাঁকে দেখেছে। তাঁর সামনেই সতর্ক করে দিয়ে গেছে অতীশকে। সে বলল, কেন দেখেননি!

    —অ হ, নধর। সেই ইতর লোকটা। রাজার খায়, রাজার দাড়ি উপড়ায়। ওর কথা তোমাকে শুনতে কে বলেছে!

    —না, উনি তো…।

    —আরে কিছু না। এ-বাড়িতে কার তেজ কত, কখন কতটা থাকে কেউ কিছু বলতে পারে না।

    অতীশ ভেবে পেল না এমন কেন হয়। দুপুরে এই লোকটাকেই আটকে রাখা হয়েছিল। এখন এই লোকটা ভীষণ তেজের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে। মাথায় যেন কোনও গণ্ডগোল নেই! একেবারে সংসারী মানুষের মত কথাবার্তা।

    —আরে এস এস। নবীন যুবক, তুমি অত কি ভাবছ। সংসারে যত ভাববে তত মরবে।

    অতীশ অগত্যা লোকটাকে অনুসরণ করল। সিঁড়ি পার হয়ে দোতলায় উঠতেই দেখল, চুনট করা শান্তিপুরী ধুতি পরনে। যেন কেউ তাকে সাজিয়ে দিয়েছে।

    লোকটির কি তবে কারাদণ্ড হয়েছিল। রাজবাড়িতে গোপনে কি সেই আগেকার বিচারের বিধিব্যবস্থা আছে! নির্দোষ প্রমাণিত হবার পর পুরস্কার মিলেছে! স্বৈরাচারী রাজরাজড়াদের এমন খামখেয়ালীর কথা সে বইয়ে পড়েছে। কে জানে সে যে এখানে দুম করে চাকরিটা পেয়ে গেল, সেটাও কোনো খামখেয়াল কিনা। সে ভয়ে ভয়ে অগত্যা তাঁকেই অনুসরণ করতে থাকল। এই মানুষটাকেই এ-বাড়িতে স্বাধীন মনে হল তার। সে তাঁর খুশিমত চলে। পছন্দ না হলে, তালা দিয়ে রাখে, পছন্দ হলে বেশভূষায় সাজিয়ে দেওয়া হয়। কোনো কিছুতেই তাঁর যায় আসে না। আজ এমন কি ঘটেছে যার জন্য মানুষটির কপাল খুলে গেল! অতীশের কিছুটা কৌতূহল, সেই দুপুর থেকে এই লোকটা তাকে অজস্র চিন্তা-ভাবনার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তাকে বলে গেল কেন, তুমি খুন হয়ে যাবে নবীন যুবক।

    ওরা যেতেই তাস খেলার কেউ একজন বলল, ঐ যায়। আর একজন বলল, ও মানসদা ছুটি মিলেছে বুঝি!

    —তাস খেলছ খেল। বাজে কথা বল কেন?

    লোকটার নাম তবে মানস। সে বলল, মানসদা আপনার ঘরে যাওয়া আমার ঠিক হবে?

    —আমি তোমাকে খেয়ে ফেলব ভাবছ।

    —না তা না…

    ওরা তখন দরজার কাছে এসে গেছে। মানসদা দরজায় দাঁড়াতেই একজন নফর লোক তাকে কুর্নিশ করল। সে মানসদার ঘরদোর সব সাফ করে দিচ্ছে। ঝাড়পোঁচ করছে। ধুলো উড়ছিল। মানসদা অতীশকে বলল, নাকে রুমাল দাও। শহর আর গাঁয়ের ধুলো এক মনে কর না, এখানকার ধুলোতে সংক্রামক ব্যাধির জীবাণু খুব বেশি থাকে।

    প্রায় বস্তাখানেক ছেঁড়া কাগজের টুকরোর একটা ডাঁই। এই ঘরে এত ছেঁড়া কাগজ আসে কি করে! অতীশ একটুকরো ছেঁড়া কাগজ তুলতেই দেখল ওতে গুঁড়ি গুঁড়ি লেখা। পিঁপড়ের মত, আলোটা জোর নয় বলে সে পড়তে পারছে না। মানসদা কেমন ক্ষেপে গিয়ে ওর হাত থেকে টুকরো কাগজটা ছিনিয়ে নিল, তুমি বড়ই আহাম্মক দেখছি। এ-সব পড়তে হয় না। অনেক গূঢ় কথা  লেখা আছে। এমনিতেই মাথা খারাপ করে ফেলেছ, এ-সব পড়ে আরও মাথা খারাপ হয়ে যাক আর কি! এই বেটা, বাঙ্গাল ভূত, কাগজগুলি নিচে নিয়ে পুড়িয়ে দিবি?

    —তাই অর্ডার আছে হুজুর।

    মানসদা কেমন ভূত দেখার মত অতীশকে দেখল। ছোঁড়াটা মরবে। তারপর মুখ চেপে দিল হাতে। একটা কথা না আর। তোমাকে ঢুকতে দিয়েছি এ-ঘরে। মনে রাখবে, অনেক জন্মের পুণ্যফল এটা। তুমি জান না, কতটা তোমার অধিকার। তারপর পা টপকে শুচিবাই মানুষের মত নিজের খাট পর্যন্ত গেলেন। সোফা আছে, সেন্টার টেবিল আছে, পাখা আছে, ঘরের ফাটলে কিছু লেখা গোপনে ঢুকে যাচ্ছিল, অতীশ সেই লেখা দেখতে গেলেও টেনে আনল। বলল, বোসো। ঠিক হয়ে বোসো। অন্যের গোপন লেখা দেখতে হয় না। অনেক দেশ-টেশ ঘুরেছ শুনেছি—এ আক্কেলটা হয়নি কেন?

    তারপর সোফায় বসে ওপরের দিকে চাইলেন। গুনগুন করে গানের কলি ভাঁজলেন একটা—ও ফুলবনে যেও না ভোমরা। তোমার কেমন লাগছে সুরটা। খাওয়া হয়েছে? অসুবিধা হলে বলবে।

    এতগুলো প্রশ্নের একসঙ্গে জবাব দেবে কিভাবে। সে বলল, বেশ ভাল ঘর। বড়। একজনের পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু অতীশ বিস্মিত, এই মানুষটি প্রায় তার সব জানে। সে বলল, বিদেশ-টিদেশ ঘুরেছি আপনাকে কে বলল?

    এটা রাজার বাড়ি। নবীন যুবক, তোমার নাম অতীশ দীপঙ্কর ভৌমিক। স্কুলে মাস্টার ছিলে। পোষাল না। ছেড়ে দিলে। এখানে সব চাউর হয়ে যায়। এখানে কিছু গোপন থাকে না। কত পাপ এ-বাড়িতে, সবাই মনে করে বড়ই গোপন—কাকপক্ষীতেও টের পায় না! তারপর থেমে থেমে বললেন, নবীন যুবক, ঈশ্বরের বাগানের চেহারাটাই এই। এত ভাব কেন?

    নফর লোকটা ছেঁড়া টুকরো কাগজগুলো এখন বারান্দায় বস্তাবন্দী করছে। পরনে খাকি হাফ- প্যাণ্ট হাফ শার্ট। ছেঁড়া। জায়গায় জায়গায় ছিট কাপড়ে তালি মারা। সে তারপর আবার ঘরে ঢুকে দেখল, কোথাও যদি ভুলক্রমে এক টুকরো থেকে যায়, না নেই। নিশ্চিন্তে সে সেই গন্ধমাদনটি মাথায় নিয়ে চলে গেল। মানসদা উঠে গিয়ে লোকটার নির্গমন দেখলেন। এবং বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকলেন। এ ঘরে অতীশ আছে যেন তাঁর আর মনেই নেই। সে এবার ভাল করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। দেয়ালে হিজিবিজি লেখা। কাঠ কয়লা পেনসিল, ইটের টুকরো যখন যা হাতের কাছে পাওয়া গেছে তাই দিয়ে লেখাগুলোর কাজ সারা হয়েছে। আর বিচিত্র সব জীব-জন্তুর মুখ। এসব যেন পৃথিবীর নয় অন্য কোন সৌরলোকের। প্রতিটি জীব-জন্তুর নিচে কিছু লেখা। উঠে না গেলে পড়া যাবে না। কিন্তু উঠতে সংকোচ হচ্ছে। অথবা বড় সংক্রামক ব্যাধির মত সেই যে ভয় গ্রাস করেছে তাকে তা থেকে, সে কিছুতেই অব্যাহতি পাচ্ছে না। সে কারণে সে বসেই থাকল। জীব-জন্তুগুলো কাছে গিয়ে দেখতে পেল না। কিছুটা হাঁসজারু হাতিমি বকচ্ছপের মত এরা দেয়ালে উঁকি দিয়ে আছে। ছবিগুলো দেখে শিল্পীর নিখুঁত হাতের প্রশংসা করতেই হয়। চারপাশের দেয়ালে এমন সব হিজিবিজি অজস্র লেখা আর জীব-জন্তুরা একত্রে কতদিন থেকে যেন বাস করে আসছে।

    তখনও মানসদা দাঁড়িয়ে আছেন রেলিং ভর করে। অতীশ দেখল, বিছানার চাদর বালিশের ওয়াড় পাট ভাঙা। এই মাত্র বদলে দিয়ে গেছে কেউ। সেন্টার টেবিলে ফুলদানি, ওতে রজনীগন্ধার গুচ্ছও রাখা হয়েছে। তাজা শিশির বিন্দুর মত ফোঁটা ফোঁটা জল লেগে আছে গায়ে। সে হাত দিয়ে দেখল, হাতে জল লাগছে। এত তাজা আর নিটোল ফুলের পাপড়ি—আর দেয়ালে অস্বাভাবিক সব কথাবার্তা। অদৃশ্য গোপন ইচ্ছার এক প্রিয়তম খেলা। গানের কলি থেকে তার মনে তখনই কিছু প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। কিন্তু মানসদা রেলিঙে এখনও অনড়। কি দেখছেন! সে তখন দূর থেকেই দেখতে পেল, সেই বড় মাঠটায় অগ্নিশিখা। তারপর দাউদাউ করে কি জ্বলে উঠল। মানসদা আগুনে কাকে যেন জ্বলতে দেখলেন—তাঁর সর্বস্ব কেউ যেন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। তিনি ঘরে ফিরে বললেন, ঈশ্বরের বাগানে রোজ এমন কত ঘটনা ঘটছে, কে আমরা তার খবর রাখি।

    অতীশ দেখল মানুষটির চোখ এখন ভারি বিষণ্ণ। তার সঙ্গে আর একটি কথা বলছেন না। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছেন। যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। কারণ মানুষটার শরীর কেঁপে কেঁপে যাচ্ছিল। খোলস বদলাবার সময় সরীসৃপদের যাতনার মত এক অতীব যাতনা সারা শরীরে তার কষ্টের সূচ ফোটাচ্ছে কেউ।

    অতীশ এতে ভারী বিড়ম্বনা বোধ করল। কিছুই জানতে পারছে না। কাউকে কোনও প্রশ্ন করতে পারছে না। নতুন মুখ সব। এসে বুঝেছে—এখানে অদৃশ্য কিছু চক্রান্ত সব সময়েই চলছে। দৈবের মত হঠাৎ তা কারো মাথার ওপর নেমে আসে। যখন টের পাওয়া যায় তখন আর করার কিছু থাকে না।

    সে অগত্যা বলল, উঠছি মানসদা।

    মানসদা কেমন সংবিৎ ফিরে আসার মত বললেন, তোমার খাওয়া হয়ে গেছে?

    —আজ্ঞে না।

    —আমরা একসঙ্গে খাব। অনেক খাবার। অনেক। তুমি সঙ্গে থাকলে আমি খাওয়ায় স্বস্তি পাব।

    আর তখনই অতীশ প্রশ্ন করল, আমি কেন খুন হয়ে যাব? খুন হয়ে গেলে কে একসঙ্গে বসে খেতে পারে বলুন?

    —নবীন যুবক,—বলতে বলতে তিনি উঠে বসলেন। তোমার চোখ এত গভীর কেন। তুমি কি সুদূরের কিছু দেখতে পাও?

    সে বলল, আমার কথার জবাব দিন।

    —নবীন যুবক, অনেক দিন হয়ে গেল, মাঠঘাট পার হয়ে কোথাও যাবে বলে রওনা হয়েছিলে। শেষে এক রাজার বাড়িতে হাজির। রাজা তোমাকে নিয়ে এসেছেন তাঁর ভাঙা প্রাসাদের ফাঁক-ফোকর বন্ধ করার জন্য। কোন গর্তে তুমি হাত দেবে কে জানে। কোথায় কালসাপ ফণা তুলে আছে গর্তে বাইরে থেকে কি করে বুঝবে। মাথায় হাত পড়লে তোমায় তারা ছেড়ে দেবে ভাবছ?

    অতীশ প্রতিটি কথা স্পষ্ট শুনতে পেল। সে বলল, একজন খাঁটি মানুষ কিন্তু আমাকে বলেছেন স্ট্রাগল ইজ দ্য প্লেজার।

    —পারলে কোথায়। তা’হলে পালালে কেন? মাস্টারি ছেড়ে পালালে কেন?

    অতীশ দেখল তখন দুজন বয় বাবুর্চি। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে একজন খানসামা। লাইন বন্দী হয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে। হাতে তাদের নানা রকমের কারুকাজ করা প্লেট। প্লেটে রকমারী সুস্বাদু খাবার। সেন্টার টেবিল সরিয়ে বড় ভাঁজ করা টেবিলে খেতে দেওয়া হয়েছে। সাদা চাদর বিশাল। মাঝে একটা প্রজাপতি উড়ছে। দূরে একটা টিকটিকির ছবি। লেজ নাড়ছে টিকটিকিটা। প্রজাপতিটা জানেও না পেছনে একটা রাক্ষস। লোভে লালসায় লেজ নাড়ছে। যে কোন মুহূর্তে তাকে গিলে ফেলতে পারে।

  • তিন

    তিন

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    তিন

    রাজবাড়িতে কে জাগে। ছেদিলাল জাগে। সবার আগে ছেদিলাল সদর দিয়ে ঢোকে। আর বলে, কোন জাগে? ছেদিলাল জাগে। তার সঙ্গে বিবি থাকে। লেড়কি থাকে। আর সে মরদ ছেদিলাল। কখনও কখনও সে বলে, হামি জমাদার ছেদিলাল আছে। হামি রাজবাড়ির নোকর আছে। বাবু দেখলেই সে সেলাম করে। সকাল সকাল, তখন আসমানটা আনধার থাকে, সে ঢুকে যায়। রাজবাড়ির কাজ বলে কথা। সে না গেলে রাজার ঘুম ভাঙবে না। প্রথমেই অন্দরে ঢুকে গলা হাঁকড়াবে। সাড়া না পেলে, হাঁকবে, ছেদিলাল হাজির। অন্দর মহলের দরজা খুলে গেলেই ঝটপট জল মারা, ঝাঁট দেওয়া। সে থাকে রাজার মহলায়, বিবি যায় রাণীমার মহলায়। অন্দরের কাজ সারতে বেলা বাড়ে। সূর্য উঠে আসে। ছেদিলালের এটা এক নম্বর কাজ। তার পল্টন এক নম্বর কাজ সেরে জড় হয় বড় একটি পাতাবাহার গাছের নীচে। বালতি ঝাঁটা রেখে গোল হয়ে বসে বাসি রুটি শুকনো, জল দিয়ে গুড় দিয়ে খায়। গোঁফে গুড় লেগে থাকে। কাঁচা-পাকা গোঁফে গুড় লেগে যায় বলে মাঝে মাঝে খুব ক্ষেপে যায়। তখন ছেদিলালকে কেউ কিছু বলে না। মর্জি হলে দু-নম্বর কাজে হাত দেবে, নয় গাছের নিচে শুয়ে ঘুম যাবে। বিবি বেটি বসে থাকে না, তারা কাজ করে চলে। প্রাইভেট অফিসারের বাড়ি, নধরবাবু বেণীবাবু রজনীবাবু, সব বাবুরা থাকে ওদিকে—সেটা দু-নম্বর কাজের পালা।

    সব শেষে বাবুর্চিপাড়া, সেটা সে বিকেলের দিকে করে। দুপুরের দিকে মেস বাড়ির নালা-নর্দমা সব সাফ করে। সূর্য না উঠতে ছেদিলালের কাজ আরম্ভ হয়, সূর্য হেলে গেলে সে পল্টন নিয়ে চলে যায় খালাসিবাগানের বস্তিতে। রাজার দেওয়া জায়গা, বিনা পয়সায় থাকতে পায়। বড় রাজার আমল থেকেই তার এই সুবিধাটুকু। সে এ-জন্য বাবুর্চিপাড়ার লোকদের একদম গ্রাহ্য করে না। মর ব্যাটারা নালা নর্দমায় পচে। শালে শূয়রকে বাচ্চে। কোনদিন সে যায়, কোনদিন যায় না।

    কিছু বললে বলবে, শালা হামি রাজার জমাদার আছে। খুশি মাফিক কাজ-কাম হবে।

    সুরেন বাজারে যাবার সময় দেখল ছেদি খুব মনোযোগ দিয়ে রুটি খাচ্ছে। পাশে তার ডবকা লেড়কি পাছা ভারি করে বসে আছে। রুপোর বিছে কোমরে। বৌটা ঠ্যাং ছড়িয়ে হাঁটুর ওপর কলাইর থালা নিয়ে বসে। যাকে যা লাগছে দিচ্ছে। পাশে বড় মগে চা। সুরেন বেশ নাগাল পেয়ে গেছে মত বলল, তুই কি আমাদের বেটা মারবি! গন্ধে টেকা যাচ্ছে না।

    ছেদি গ্রাহ্য করছে না। সে গোঁফে গুড় লেগে না যায়, এ-সব কারণে তার এখন অমনোযোগী হওয়া একেবারে বারণ।

    সুরেন বুঝতে পারল, ছেদিলাল নেশাখোর মাতাল। ওকে বলে লাভ নেই। সে তার বিবিকে বলল, এই কুমরি, একবার দেখে আয় কি হয়ে আছে।

    কুমরি বোঝে এই বাড়ির সবাই রাজা-মহারাজা। কাউকে চটাতে নেই। ওরা সকালে কাজ করে। দুপুর হলে চলে যায়। রাতে কর্পোরেশনের কাজ আছে। দু-চারটা এমনিও আছে ঠিকা কাজ। এটাই তাদের আসল কাজ। এখান থেকে তাড়ালে তাদের কোন মোকাম থাকবে না। সে বলল, সুরেনবাবু, আজ যাবে।

    সুরেন যেতে যেতে দেখল, মেসবাড়ির সামনের জানালায় কেউ উঁকি দিয়ে আছে। পাশে রাজার নতুন বাড়ি। বড় বড় জানলা—গাড়ি-বারান্দা। নতুন বাড়িতে রাজার মামাত ভাই কাবুলবাবু থাকে। জানলায় দাঁড়িয়ে দাঁত মাজে, সকাল পাঁচটা থেকে সাতটা পর্যন্ত। এই দু-ঘণ্টা একটা লোকের দাঁত মাজতে যায়। সে জানে কাবুলবাবু দাঁত মাজতে মাজতে মেসবাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। ডান দিকের কোয়ার্টারে থাকে রাধিকাবাবু। তিনটে ঘর দখল করে আছে। বড় ছেলেকে বিয়ে দিয়ে এনে আরও একটা বাড়তি ঘর রাজার কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছে। সেই ঘরটায় বৌ হাসিরাণী থাকে। কাবুলবাবুর নজর পড়েছে বৌটার ওপর। সে দেখেছে, মাঝে মাঝেই দু-চোখে মিলন হয়। এরা রাজার খোদ লোক—এই নিয়ে কোন কথা চলে না। ফলে গোপন আছে সব। সে যেতে যেতে হাই তুলল। তুড়ি দিল দু-আঙুলে।

    ফটাফট শব্দ কে করে! বেটা সুরেনের কাজ। কাবুলবাবু বলল, সুরেন তোমার আঙ্গুলে এত জোর আসে কি করে!

    সুরেন বুঝতে পারল কাজটা সে ভাল করে নি। সে গড় হল। তারপর কাঁচমাচু মুখে বলল, বড্ড হাই উঠছে।

    —রাতে ঘুম হয় না?

    সুরেন কি বলবে ভেবে পেল না। রাতে ঘুম না হলে দিনে পড়ে পড়ে ঘুমাবে। নির্ঘাত কাজে ফাঁকি। এই করে সব রসাতলে গেল। ঘুম হয়েছে বললেও ল্যাটা আছে। খুব কামাচ্ছ। শালা ফিকিরবাজ। এদিক-ওদিক পয়সা হচ্ছে। রাজার খাচ্ছ নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছ। আঙুলে জোর কেন? বাড়তি প্রোটিন। ওটা আসে কি করে! কে দেয়। এই লোকটার সঙ্গে বাড়ির আসল মনিবের লাইন। পুট করে লাগালেই হল। সুরেনটা তুড়ি মারতে শিখেছে। ভাল কথা নয়। গ্যারেজের ইনচার্জ এই বাবু। সব গাড়ির জিম্মাদার। কেউ কেউ গাড়িবাবু ডাকে। গাড়ি মেরামতের কাজ জানে বাবু। গাড়ি চালাতে জানে। ড্রাইভারদের ছুটি-ছাটায় সে বৌরাণীর গাড়ি চালায়। কুমারবাহাদুরের গাড়ি চালায়। কান ভাঙাতে কতক্ষণ। সে বলল, ঘুমের দোষ কি বাবু! মশা! মশা হয়েছে।

    মশার প্রসঙ্গ ওঠায় ছেদিলালের প্রসঙ্গ এসে গেল। এত ফিনাইল যায় কোথায়? প্রশ্ন করল কাবুলবাবু।

    —সেই ত কথা। কে দেখে! যার যা খুশি চালিয়ে যাচ্ছে। মেরে দিচ্ছে সব। ছেদিলালের বিরুদ্ধে সুরেনের রাগটা এতক্ষণে ঝালা মেরে উঠল।—এই দেখুন না, দু-দিন হল আমাদের লাইন মাড়াচ্ছে‍ই না। বললে হম্বিতম্বি করে।

    কাবুলবাবু জানলা থেকে সরে গেল। এই হা-ভাতে লোকটার সঙ্গে কথা বলতে বয়ে গেছে! সুরেনকে দেখেই জানলার সুন্দর ডাগর চোখ দুটো টুপ করে ডুব মেরেছে। রাতে কুম্ভটা করে কি! বৌটার বড়ই বালিকা বয়স। কুম্ভটা শালা কুম্ভকর্ণ। এখনও ঘোমাচ্ছে। বৌটা পালিয়ে বসার ঘরে চলে এসেছে। এখান থেকে সে রাজার নতুন বাড়ির জানলা স্পষ্ট দেখতে পায়। রাজার সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক একজন মানুষ তাকে জানলায় দেখতে ভালবাসে। কাবুলবাবু এটা টের পেয়ে গেছে।

    সুরেন দেখল এখন দুটো জানলাই সুনসান। সে হাঁটতে থাকল। বড় মেয়েটা চার-পাঁচদিন হল বরের কাছ থেকে এখানে আবার চলে এসেছে। ফের ঠেঙিয়েছে। পিঠে দাগ, হাতে পায়ে দাগ। আর যাবে না বলেছে। রাতেই বায়না করছিল, চিংড়ি-মাছ দিয়ে কচুর শাক খাবে। এখন বাজারে সে চল্লিশ পয়সার চিংড়ির খদ্দের। গায়ে রাজবাড়ির ছাপ মারা কোট।

    বাজারটা রাজার। কোটটা দেখলে গণ্যিমান্য করে। বাজারে যাবার সময় কোটটা আগে চাই। আর চাই পান-সুপারি, খয়ের। গলায় রক্ত কফ ওঠে। পান খায় সুরেন। রক্ত কফ কেউ টের পায় না। চবর চবর করে খায় আর পিক ফেলে। গায়ে তাত থাকে। গায়ে তাত হলে সে বেশ মজা পায়। কেমন নেশা নেশা লাগে। নেশাখোরের মত চোখ লাল থাকে। খকর খকর কাশে। শরীরটা নাচে, টাল খায়—এই করে চালিয়ে দিচ্ছে। শালা দুনিয়ার কেউ টেরও পাচ্ছে না তার একটা বড় ব্যারাম আছে। সুপারিনটেন্ডেণ্ট মাঝে মাঝে জ্বালায়।—আরে ডাক্তার দেখা। খুক খুক কাশি মানুষের ভাল নয়।

    ডাক্তার দেখাই, আর তোমরা রক্ষা পেয়ে যাও। সেটি হচ্ছে না।

    মেসবাড়ি পার হলেই দোতলা বাড়ির নিচে চার-চারটা ঘর। প্রথম ঘরটায় থাকে, কলকাতা অফিসের অ্যাকাউট্যাণ্টবাবু। একটা ঘর। আর বারান্দা। বারান্দায় মুলি বাঁশ দিয়ে ঘেরা। তক্তপোশ আছে একটা। ভোরে বাবুর মেয়েটা এখানে গরমে চিত হয়ে পড়ে থাকে। খুব ভোরে সে একবার যেতে গিয়ে ভারি সরমে পড়ে গিয়েছিল। শাড়ি উঠে আছে। সে দেখি দেখি করে সবটা দেখেও ফেলেছিল। সবাই ঘুমে অচেতন। এত বড় মেয়েকে কেন যে বারান্দায় শুতে দেওয়া। শহরে থাকলে মানুষের আক্কেল থাকে না। পরের ঘরটায় আছেন কেষ্টবাবু। অফিসের কালেকটরবাবু। ভাড়া আদায়, রাজার মামলা-মোকদ্দমার তদারকি করা, আদালত হাজিরা দেওয়া এ-সব কাজে মানুষটার দু-চার পয়সা উপরি। তাই সকালে কেমন মৌজ করে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে গেছে। গলা সাধছে। গলা সাধা শেষ হলেই গান ধরবে—আয়লো অলি কুসুম কলি। কলি পর্যন্ত আসতে সাতটা বাজবে। তারপর চুলে কলপ, গোঁফে কলপ, মসৃণ মুখ গাল নিয়ে আদ্দির পাঞ্জাবি, আর ধুতি পরে অফিসে হাজিরা। তারপর সারা দিন কোথায় যে থাকে। রাজার টাকা বারো ভূতে লুটে খাচ্ছে খাক—তার সে-জন্যে হিংসে নেই। তাই বলে বেকার ছেলেটা ঘরে বসে তার দাড়ি গোঁফ উপড়াবে! কেউ দেখার লোক নেই! রাজার বাড়িতে সবাই গোঁফ রাখে—কুমারবাহাদুরের গোঁফ আগে বড়ই সরু ছিল, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মোটা হয়ে উঠেছে। রাজা খুশি হবেন ভেবে সব ব্যাটা ভয়ে গোঁফও রাখতে শুরু করেছে। কাজের উন্নতি চার কুড়ি দশ টাকায় সেই যে থেমে আছে, তার থেকে আর তার মুক্তি মেলে নি।

    জানলা থেকে কেষ্টবাবু সুরেনকে দেখতে পেল। গুটি-সুটি যাচ্ছে। এত সকালে যাচ্ছে যখন, খবরটা দিয়ে যেতে পারবে। সে গলা বাড়িয়ে বলল, সুরেন নাকি রে!

    —আজ্ঞে হ্যাঁ।

    —মুক্তাকে বলে যাস, আজ ওর ওখানে খাব না।

    মুক্তাকে সুরেন চেনে। বাজার যেতেই সুনীল ডাক্তারের ডিসপেন্সারি—তার লাগোয়া গলিতে মুক্তা থাকে। বিধবা মানুষ। সংসারে একা। আগে বাড়ি বাড়ি কাজ করত। এখন নিজেই হোটেল খুলেছে টাকা জমিয়ে, কেষ্টবাবু মেসের সঙ্গে ঝগড়া করে মুক্তার কাছে চলে গেছে। দুপুরে রাতে মুক্তার কাছে মিল নেয়। যেদিন খাবে না, সকালে বলে দিতে হয়। মেসে এই নিয়ে একদিন তুলকালাম। কেষ্টবাবু দেশ থেকে এসে দেখল, বিল পড়ে আছে। মেসে না খেলেও বিল দিতে হয়। দু-দিন খায় নি, বিল ঠিক এক মাসের। কেষ্টবাবু এই নিয়ে দরবার করেছিল। কিন্তু মেসের ম্যানেজার বলেছে, ওভাবে হয় না মশাই—কড়াক্রান্তির হিসাব রাখার সময় কার আছে! সাত দিন দশ দিন না থাকলে এক কথা। সেই থেকে কেষ্টবাবু খাওয়ার পাট মেসবাড়ির চুকিয়ে মুক্তার কাছে চলে গেছে। মানুষটার আবার যৎকিঞ্চিৎ মেয়েছেলের দোষ আছে। সম্বল এই গান। এবং কেউ কেউ গান শিখতে আসে। মেয়েদের ছেলেদের নিয়ে মাঝে মাঝে বেশ জলসা বসায়—ছলচাতুরি জানে লোকটা। আসলে লোকাটা স্ফূর্তিফার্তা করার কৌশল জানে। লোকটাকে দেখলেই সুরেনের মনে হয় খেপলা জাল নিয়ে পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে কেষ্ট চক্কবর্তি। পরনে গামছা। কুচ্ছিত লোমশ শরীর। মুখে মাছ ধরার ছলাকলা। লোকটাকে সে একদম সহ্য করতে পারে না। ধম্ম বলে মানুষের আর কিছু নেই! সোমত্ত মেয়ে আছে তিন-তিনটা। বৌ-এর দাঁত পড়ে গেছে। এই শহর থেকেই কেষ্টবাবু বৌ-এর জন্য দাঁত বাঁধিয়ে নিয়ে গেছে। ছেলেরা ছোট। স্কুল-কলেজে পড়ে। তোর এ-সব আর শোভা পায় কেষ্ট!

    এইভাবে সকাল থেকেই সুরেনের মানুষের ওপর রাগ বাড়ে। বেলা যত বাড়ে রাগটা বাড়ে, যত পড়ে আসে রাগটা কমে আসে। বিকেলে আনাজের বাজারটা সস্তা। কচুর শাক কচুর লতা থেকে থানকুনি পাতা সবই তখন তার জন্য বাজারে অপেক্ষা করে থাকে। মাথা গরম রাখলে দরদাম করা যায় না। তা ছাড়া মাথা গরম রাখলে সংসারে কি-ই বা হয়! যত মাথা ঠাণ্ডা তত মানুষের উপকার। আসলে তার এটাই নেই। সে যখন-তখন যা না তাই বলে বসে। এই যেমন সে এখন কেষ্ট চক্কবর্তিকে গাল দিতে দিতে যাচ্ছে। বোঝ বেটা আমি কত সোজা সাপটা লোক। রাজাগজা নস্যি। তুই ত কেষ্ট চক্কত্তি।

    তখনই আবার জানলায় হাঁক—ওরে সুরেন, যাচ্ছিস যখন, পান আনবি।

    সুরেন অনেকটা দূরে চলে গেছিল, প্রায় সদর দেউড়িতে। সেখান থেকে কেষ্ট চক্কত্তির গলা পেয়ে সে ছুটে আসতে লাগল—আজ্ঞে যাই বাবু। তারপর মনে মনে বলল, ও-বাবু ভেব না, তোমার হাঁক, পেয়ে ছুটছি। সুরেন তেমন লোকই নয়। তার ইজ্জত আছে। যাচ্ছি গরজে। পান না থাকলে পানটা সুপুরিটা তোমার কাছে হাত পাতলে পাই। তখন তোমাকে বড়ই গুণী মানুষ ভাবি হে। কেষ্ট চক্কত্তির গলা! ফান্দে পড়িয়া বগায় কান্দে, গাও ত এমন একখানা গান—বলি গানই বটে। গুণীজনকে ধন্যি ধন্যি করতে হয়। সুরেন জানলায় এসে দাঁড়ালে কেষ্টবাবু দশটা পয়সা দিয়ে বলল, একটা গোটা সুপুরি আনবি। তারপর সতর্ক গলায় বলল, নতুন বাবুকে দেখেছিস!

    —আজ্ঞে হ্যাঁ।

    —কেমন, কোথায় উঠেছে?

    —আপনাদের ওপরে।

    —কাল রাত হয়ে গেল। দেখা-সাক্ষাৎ হয় নি। আজ সবার আগে যাব। কোন ঘরে আছে?

    সে বলল, ওপরেই আছে।

    —ফুলি বলল, সাধু-সম্ভের মত মুখ নাকি!

    —তা ভাল মানুষই মনে হল। বড় বড় চোখ। লম্বা গৌরবর্ণ। দশাসই মানুষ।

    —পাগলাবাবুর মত।

    —তাই বলতে পারেন।

    —পাগল না হয়ে যায়! এ-বাড়িতে সাধুসজ্জন এলে ত শুনেছি পাগল হয়ে যায়।

    কেষ্ট চক্কত্তির এই এক কু-কথা। মগজের মধ্যে যত কু-ভাবনা। ঠাকুরের নাম নে। গলা সাধছিলি সাধ। কে পাগল হবে দুনিয়ায় তার তুই কি জানিস! সে বলল, একটা গোটা সুপারী?

    —ঐ একটাই। কোর্ট থেকে ফিরে আসার সময় আনব। ভাল ভাল গোটা গোটা। বড়বাজারে রাখুর দোকানে ভাল সুপারী রাখে। কাটলে সাদা। খেতে মিষ্টি মিষ্টি। কস্ একদম নেই। গলা সাধা শেষ। স্টোভে চা করবেন বোধ হয়। গলাটা কাঠ কাঠ ঠেকলে সুরেন বলল, বাবু চা বানাবেন বুঝি? কেষ্টবাবু বুঝতে পেরেই বলল, না। চা না। কাপটাপগুলি ধুয়ে রাখছি। চিনি নেই। আনতে হবে।

    —দিন না এনে দিচ্ছি।

    —না এখন থাক। তুই যা।

    সে মনে মনে বলল, বাবু মিছে কথা বল না। ভগবান রাগ করবে। তোমার ঘিলু পরিষ্কার বাবু। তুমি নয় ছয় করতে পার। তুমি সুধাসাগর। তোমার এ-সকালে মিছে কথা বললে মুখ খসে পড়বে। সুরেন অগত্যা হাঁটা দিল। সকালবেলায় কোত্থেকে যে শয়ে শয়ে কাক এ-বাড়িটাতে উড়ে আসে! আসলে বুঝি পচা গন্ধ পায়। পচা গন্ধ মানুষের না টাকার। কাল থেকে দুর্গন্ধে ঘরে টেকা যাচ্ছে না। প্রথমে ভেবেছিল, কোন খুপড়িতে ইঁদুর মরে পচে আছে কিন্তু কোন ঘরেই কিছু পাওয়া যায়নি। এই গন্ধের মধ্যেই রাতে পুঁই চচ্চড়ি আর শুকনো রুটি খেয়েছে। নালা-নর্দমা সাফ হয় না, আজ কেন, ছেদিলাল কবে রোজ নালা-নর্দমা সাফ করে! কিন্তু গন্ধটা এখনও নাকে লেগে আছে কেন? আঁস্তাকুড় থেকে গন্ধটা উঠছে। ছাই, তরকারির খোসা, মাছের আঁশ, পচা মাছের ধোওয়া জলের একটা বোটকা গন্ধ থাকে—ডাঁই হয়ে আছে।—দু-দিন না নিলেই ডাঁই হয়ে যায়—তার ভেতরে মরা কুকুর বেড়াল কেউ সেঁধিয়ে রাখেনি ত। যদি ছেদিলালের সঙ্গে সক্কাল বেলায় ভাল করে কথা কয়ে হাতে পায়ে ধরে, তারপরই বামুনের আভিজাত্য সুরেনের মাথায় চাগিয়ে উঠল। তারা হল গে নবীনগড়ের গাঙ্গুলী বংশ। সে ছোট কাজ করে বলে বাপ-ঠাকুর্দার ইজ্জত নিতে পারে না।

    কাকগুলি মাথার ওপর উড়ছে। বাবুপাড়ার দরজা জানলা খুলছে। বাবুদের একটা ছোট ছেলে ওর সামনেই নর্দমায় পেচ্ছাপ করতে থাকল। সুরেন বলল নুনুবাবু, চিনুদিদি ভাল আছে?

    নুনু পেচ্ছাপ করতে করতেই মুখ তুলে তাকাল। সুরেন দাদা যেন তাকে কিছু বলছে। সে বলল, দিদি সকালে উঠে বসেছে।

    তারপরই সুরেন জিভে কামড় দিয়ে ফেলল। কেউ তো জানে না নধরবাবুর মেয়ের অসুখ। শুয়ে থাকে। ঘর থেকে বের হয় না। বড়ই গোপন—এই বাড়িটাতে পুষ্যির শেষ নেই। যত যাও—ঘর-বাড়ি। কে কোথায় কিভাবে পড়ে আছে, পড়ে থাকে কারও জানার কথা নয়।

    বাবুদের হেঁশেলের খবর না জানাই ভাল—কারণ সে বোঝে, দফাদারের আবার গোঁফ। তার চেয়ে এখন জোরে হাঁটা ভাল। এ সময়টা রাস্তায় গাড়ি ঘোড়া থাকে না। সে সোজা ট্রাম লাইনের ওপর দিয়ে হাঁটতে পারবে। সকালে ট্রামের পাতে কেমন ঠাণ্ডা ভাব। খালি পায়ে সে তখন বড়ই সুড়সুড়ি বোধ করে। এই সুড়সুড়িটা তার আর কোথাও লাগে না। স্ত্রী সহবাসেও না। সুতরাং সে খুবই পা চালিয়ে হাঁটবে ভাবল। কিন্তু কিন্তু —কৈ, জানালায় কৈ!

    ওপরের জানলা থেকে তখনই কে ডাকল, সুরেনদা বাজারে যাচ্ছ। সঙ্গে সঙ্গে সুরেনের মুখে হাসি খেলে গেল। ঐ ত দাঁড়িয়ে। সে ভাবল চোখে কম দেখছে না ত! — কে মতি বোন বলছ! তা যাচ্ছি।

    —সুখি নাকি চলে এসেছে!

    —কি করবে বোন। স্বামীটা বড় জ্বালায়। খেতে দেয় না। পেটের ছাঁচ পাল্টাবে কি করে কও। কেবল মেয়ে হয়, চার-চারটা মেয়ে তাই বলে লাথি ঝাঁটা। এরাই ত সংসারে লক্ষ্মী।

    —মেয়েগুলো সঙ্গে এসেছে।

    —তা আনবে কেন? ছাঁচে ঢালবে তুমি খাওয়াব আমি। বলে দিয়েছি, আসবি ত একা আসবি। আমার ছাঁচ আমি ফেলতে পারি না। কি, ঠিক কিনা!

    কথাগুলো জোরে জোরে বলছিল সুরেনদা। সকালবেলায় কত সহজে খারাপ কথা বলতে পারে। মতির কান গরম হয়ে গেছিল। কিন্তু মার ঐ স্বভাব—তক্কে তক্কে থাকা—সুরেনটা দেখিস বাজারে যায় কিনা। সে রাজবাড়ির ছাপ দেখিয়ে ভাল জিনিস কিনতে পারে। দু’পয়সা সস্তাও হয়। কিছু মারার স্বভাব আছে। তা মেরেও বেশ তাজা সবজি টবজি চিনে আনতে পারে। মতি বাইরে বের না হলে কেবল খায় আর ঘুমায়। ছোট দুটো স্কুলে-কলেজে পড়ে। মতিরই সব চালাতে হয়। কাল বের হয় নি বলে, সে ঘুম থেকে সকাল সকাল উঠেছিল। শরীরটা ভাল ছিল না। শরীর ভাল না থাকলে বেহুঁশ হয়ে ঘরেই পড়ে থাকে। তার সকালে ওঠার অভ্যাস। আজও উঠে তার মনে হয়েছিল, মাথাটা ঝিমঝিম করছে। সে একটা চেয়ার নিয়ে জানলায় বসেছিল—মা এসে বলে গেছে, দেখিস ত সুরেনটা বাজারে যায় কিনা।

    তখন সুরেন ভাবল, সিকিটা হয়ে যাবে। সে খুবই দ্রুত পায়ে হেঁটে এল, সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে থাকল। নিচের এখানটায় প্রায় বারো ঘর এক উঠোনোর মত। পাখির খাঁচার মত পুরানো স্যাঁতস্যাঁতে বাড়ির সব দরজা। রং ওঠা। মরচে পড়া জানলার সিক। নিচে একদম আলো বাতাস নেই। দোতলায় উঠলে, আলো বাতাস আসে। পারতপক্ষে সে এই বারোয়ারি বাড়িটাতে ঢোকে না। কে না থাকে। ট্রামের কণ্ডাকটার থেকে, বড়বাজারের দালাল। মতি বোনেদের সে অন্য সময় হলে হাফ-গেরস্থ ভাবত। কিন্তু এখন মনে হল, মতিবোন দেখতে কি সুন্দর? চুল লম্বা। লম্বা থুতনি। চোখের নিচে কাজল লেপ্টে থাকে। ছোট একটা তিল আছে ঠোঁটের নিচে। ডুরে শাড়ি পরলে লক্ষ্মীমতী লাগে।

    মতি দরজায় দাঁড়িয়েই ছিল। একটা সাদা থানের ব্যাগ, তিন টাকা হাতে। এই তিন টাকায় বাজার। মাছ, আনাজপাতি, শাক, একটা ডিম। ডিমটা মতির জন্য আসে। শরীরে বড় ধকল তার। ডিম না খেলে জোর পাবে কি করে। শরীরের লাবণ্য থাকবে কি করে! একা ডিম খাওয়া কোন দোষের না। সুরেন বাজারে যাওয়ার সময়, এখানটায় এলেই খুব আস্তে হাঁটে। যেন জানলা থেকে কেউ তাকে দেখতে পায়। সিকিটা আধুলিটা থাকে বলে ইজ্জতের মাথা খেয়ে নিজে বলবে না, দিন বাজারে যখন যাচ্ছি, আপনাদেরটাও দিন। তালেই ধরে ফেলবে। ভারি গরজ। কেন গরজ, কিসের গরজ মানুষ টের পায় সব।

    মতি বলল, আজ ডিম এনো না। খাব না। পেটটা গণ্ডগোল করছে।

    —তোমাকে বোন এত বলি, খাও দাও। শরীর ঠিক রাখ। তবে বেশি খেলে পেট ঠিক থাকে না। গতরে লড়ালড়িওতো কম যায় না। কোথায় কোথায় চলে যাও।

    মতি বলল, কোথায় আর যাই! বাড়িতেই ত পড়ে থাকি।

    সুরেন বুঝতে পারল, সক্কালবেলায় তার সত্যি কথা বলা উচিত হয় নি। পাবলিক নিয়ে কারবার— তার ওপর মেয়েমানুষ, রাজার বাড়িতে ভাড়া থাকে … সব দিক বিবেচনা করে চলতে হয়। সে আহাম্মকের মত সত্যি কথা বলে ফ্যাসাদে পড়ে গেছিল আর কি। সে বলল, আমি জানি না তুমি কোথায় যাও! দশজন কু-কথা বললেই আমি শুনব! এ-বাড়িতে তোমার মত কটা সতী লক্ষ্মী মেয়ে আছে!

    মতি বলল, ও কথা থাক সুরেনদা।

    —না আমি বলবই। ভয় পাই ভাবছ। বাড়িতে থাকি, আমরা বুঝি কিছু টের পাই না।

    সুরেনের নিজেরও এক গণ্ডা মেয়ে আছে। কেবল বড়টার বিয়ে হয়েছে। বাকি তিনটে দেখতে মন্দ না। সে জন্য নিজের ছাঁচ নিয়ে বড়াই আছে তার। তবে মেয়েগুলান বড়ই কাকলাশ। গায়ে মাংস লাগলেই অন্য চেহারা। কাকলাশ বলে মানুষের নজর কাড়ে না। সুরেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারে। সে যার তার নামে অকথা কু-কথা বলে ফেলতেও পারে। মেয়েরা বড় হচ্ছে তার সে নিয়ে ভয় নেই।

    তারপর সুরেন হাঁটে। বেলা হয়ে গেল আজ। ট্রাম বাস বেশ চলছে। রোদ উঠে গেছে। আসলে সে আজ ঘুম থেকেই দেরি করে উঠেছে। যখন সে ছেদিলালের সঙ্গে কথা বলছিল, তখনই বোঝা উচিত ছিল, বেলা হয়ে গেছে। মেঘলা আকাশ, কখনও রোদ। আষাঢ় মাস হলে কি হয়, কখনও শরতের মত আকাশ। সে ঘুম থেকে উঠে মেঘলা আকাশ দেখে টেরই পায় নি, বেলা হয়েছে। সে ত সকাল সকাল ওঠে। তবে রাতে খুব কাশছিল। দুপুর রাতেও। শেষ রাতের দিকে তার ঘুমটা এসেছিল। আগ রাতেও সে ঘুমাতে পারে। কিন্তু কুম্ভবাবু ডেকে নিয়ে গেছিল। তাকে বলেছিল, সুরেনদা, বাতাসী কাল থেকে তোমার বৌমার সঙ্গে থাকবে।

    —আপনি কোথায় থাকবেন?

    —আমার অফিস আছে না। বাবার অফিস, ভাইরা কলেজ যায়, আড্ডা মারে, বাড়ি থাকে না। তোমাদের বৌমা বাসায় একা থাকতে বড়ই ভয় পায়। জামাইবাবু ছিল, সেও বাবার ওপর রাগ করে চলে গেল। সারাদিন থাকবে। অফিস থেকে ফিরে এলে বাতাসী তোমার বাসায় ফিরে যাবে।

    —বৌদি বুঝি বলেছে ভয় পায়!

    —বৌদি না বললে বুঝব কি করে।

    ল্যাটা। ধর্মের বৌ নিয়েও শান্তি নেই। কাগে বগে ঠোকরায়। তা বাবু সোমত্ত বয়সে এটা সবারই থাকে। কম বেশি থাকে। তখন ভরা যৌবন উথাল-পাথাল করে—টাল সামলাতে পারে না বাবু—এধার-ওধার নজর যায়। কিন্তু সে তো সুরেন। হাবা-গোবা না। লেখাপড়া জানে, ক্লাস এইট অব্দি বিদ্যা তার। অত সহজে কাবু হবে কেন। সে বলেছিল, ওর মাকে বলে দেখি। আপনার বৌদির তো শরীরটা ভাল না জানেন। বাতাসী এটা-ওটা এগিয়ে দেয়। রুটিটা করে দেয়। জলটা এনে দেয়। বাটনাটা বেটে দেয়। ঘরটা মুছে দেয়।

    —টেবি কি করে?

    সুরেন বুঝল আতান্তরে পড়েছে।

    —টেবি বড় সোহাগী বাবু। মাকে ছেড়ে থাকতে পারে না।

    কিন্তু ছোটটা নিতান্তই ছোট। ইচ্ছে হলে ইজের পরে ইচ্ছে হলে পরে না। পরে না বললেই হয়। পরতে চাইলেই দেবে কোত্থেকে। সুরেন অকপটে বলল, মানারে দিলে চলে না কুম্ভদা? কন্যে আমার চতুর হয়েছে।

    কুম্ভ বুজল শালা ত্যাঁদড়। কিন্তু সে খুব সরল মানুষের মত বলেছিল, মনা তো ভাল করে কথা বলতেই পারে না।

    —তালে বলেন কথা বলার লোক চান। বৌদির একা খুব কষ্ট। আপনি চলে গেলে বৌদিরে টেবি নিয়ে যাবে এসে।

    কুম্ভ বুঝতে পারছিল, পয়সা চায়। এখন আর কিছুই পয়সা ছাড়া হবার উপায় নেই। না হলে কেমন হাবা-গোবার মত বলে দিল সুরেনদা, নিয়ে যাবে। ইজ্জত বোঝে। জানে, ইজ্জতের ব্যাপার। বৌকে পাঠালে বাপ ঘর থেকে বের করে দেবে। তাছাড়া সেও এই বাড়িতে সম্প্রতি রাজার নজর কেড়ে নিতে পেরেছে। তারই প্ররোচনা, প্ররোচনা কথাটাই কুম্ভ ভেবেছিল—রাজা খুঁজে পেতে ঠিক তার মনমত হাবা-গোবা লোক ধরে এনেছে। সেই রাজাকে বলেছিল কুমার বাহাদুর এটা আপনার গোল্ড মাইন। চুরি করে ফাঁক করে দিচ্ছে। সেই থেকে রাজার নজর তার ওপর। পাঁচ-সাত বার কারখানায় রাজা ঘুরেও এসেছেন। তারপরই বুড়ো ম্যানেজারকে ছাড়পত্র দিয়ে বলেছেন, এখন তুই দ্যাখ। লোকের খোঁজে আছি। রাজার সেই মনের মত লোকটা নাকি রাজবাড়িতে হাজির। সে যায় নি। বাপকে পাঠিয়েছে। বাপকে দিয়েই বাড়িতে খেতে বলেছে। প্রথম থেকেই কব্জা করা—নাহলে লাগানি-ভাঙানি আগে থেকেই হতে থাকলে হুঁশিয়ার হয়ে যাবে।

    কুম্ভ সুরেনের দিকে তাকিয়েছিল। কথা বলছিল না।

    —তালে কুম্ভদা ঐ কথা থাকল। সুরেন হাঁটা দিচ্ছিল।

    —আরে না না। শোন সুরেনদা। তুমি বাতাসীকে সকালেই পাঠিয়ে দিও। মাসে ও কিছু হাত খরচ পাবে। কাল থেকে শিট মেটালের নতুন ম্যানেজার এখানে খাবে। একা তোমার বৌদি পেরে উঠবে না।

    সুরেন সহসা হাতে আকাশ পাবার মত বলেছিল, তালে নবর চাকরি হবে বাবু? এতদিন ত বলেছেন, ম্যানেজার বদমাইস আছে। আপনার লোক বলেই নিতে চায় না। এবারে নতুন ম্যানেজারকে বলে কয়ে নবটার হিল্লে করেন। পায়ে পড়ছি কুম্ভদা। শরীর আর টানছে না। বাতাসী সক্কালেই চলে যাবে।

    কুম্ভ বুঝেছিল ছকের ঘুঁটি তার দিকে। সে হাই তুলতে তুলতে বলেছিল, হয়ে যাবে। সে বলেছিল, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি যখন আছি, তখন তোমার চিন্তা নেই সুরেনদা। এমন একটা কথা পেয়েই সুরেন নানা সুখের কথা বলছিল। ভাবতে ভাবতে নিজেই একটা রাজার বাড়ি বানিয়ে ফেলছিল। আজ রাতে সে জন্য ঘুম আসে নি। তাড়াতাড়ি, বড়ই তাড়াতাড়ি করা দরকার। আটটা বাজার আগে রাজার অফিসে হাজিরা। সে পা চালিয়ে বাজার থেকে প্রায় দৌড়ে ছুটে আসতে থাকল। বিকেলে নিশ্চিন্তে লম্বা টানা একটা ঘুম। নতুন ম্যানেজার—নবর চাকরি—ঘুম। আর বিকেলেই ছেদিলাল সুরেনদের বস্তির নালা নর্দমা সাফ করতে গিয়ে গোলমাল বাধিয়ে বসল। ঘুম দিল চটকে।—ই কিয়া বাবু! এ-কিয়া চীজ। মানুষ ভি নেহি কুত্তাভি নেহি। দেখিয়ে। বলে সে আঁস্তকুড় থেকে কি একটা মরা ছোট কুকুর বেড়ালের বাচ্চা টেনে বের করল। ফুলে ফেঁপে ঢাক। সে দোলাচ্ছে। লোকজন ছুটে আসছে। রাজবাড়ির লোকজন যে যেখানে ছিল ছুটে আসছে। একটা মানুষের লাশ। মানুষটা জন্মাবার সঙ্গেই কারা হত্যা করে এই আবর্জনার মধ্যে পুঁতে রেখে গেছে। তার খুপরির সামনে এই হত্যাকাণ্ড। ক্রোধে সুরেনের মাথা গরম হয়ে গেল। সে খুক খুক করে কাশছে। নিজেকে যজিয়েছে, এবার সবাইকে যজাবে। কেউ শালা রক্ষা পাবে না। দুটো খুপরি পার হলে আর একটা খুপরি। সেখানে তার বৌ মেয়েরা থাকে। নব থাকে। সে সেখানে দূর থেকে আনাজপাতি ছুঁড়ে দেয়। ভেতরে যায় না। সংসারে শুধু এই খুপরিটার জন্য তার এখনও কিছুটা মায়া আছে।

    লাশটা দেখছিল আর থুতু ফেলছিল সুরেন। সবার গায়ে থুতু ছিটাচ্ছিল অলক্ষ্যে। চোখ দুটো দুর্বাসার মত জ্বলছে।

  • চার

    চার

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    চার

    রাতে চন্দ্রনাথ ভাল ঘুমাতে পারেন নি। এমনিতেই সকালে ওঠার অভ্যাস। ঘুম না হলে আরও সকালে উঠে বসে থাকেন। অন্ধকার থাকে উঠোনে। গাছপালাগুলো নিঝুম। উত্তরের আকাশে বারান্দা থেকে বড় নক্ষত্রটা দেখতে পান। আজ দেখলেন বড় নক্ষত্রটা দেখা যাচ্ছে না। বর্ষাকাল, আকাশ মেঘলা থাকে। কিন্তু দু-দিন ধরে আকাশ শরতের আকাশের মত। নক্ষত্রটা দেখা যাবার কথা! কোথায় গেল। লিচু গাছটার নিচে এসে তিনি নিশ্চিন্ত হলেন। না, দেখা যাচ্ছে। ফের এসে বসলেন বারান্দায়। শান বাঁধানো মেঝে মাটির দেয়াল। ওপরে টিনের শেড। এটাই বড় ঘর। এই ঘরে তিনি একটা তক্তপোশে আলাদা শোন। পাশের বড় তক্তপোশটায় ধনবৌ তার দুই নাতিনাতিন আর মেজ বৌমা শুয়েছে। অতীশ চলে যাওয়ায় উত্তরের ঘরটা ছোট দুই ছেলে দখল করে নিয়েছে।

    নক্ষত্রটা দেখার পর তার কেন জানি মনে হল, না কিছুই হারিয়ে যায় নি। অথচ সারাটা রাতই তিনি আধো ঘুম আধো জাগরণে দেখেছেন তাঁর কিছু হারিয়ে গেছে। তিনি দুবার বালিশের তলা, তোষকের নিচে হাত বাড়িয়েও দেখেছেন। তাঁর বাক্‌স প্যাঁটরা বলে কিছু নেই। অতীশ যা টাকা দেয় সব একটা পুঁটুলিতে রাখেন। দরকার মত টাকা পয়সা বের করে দেন। কড়াক্রান্তির হিসেব তিনি কখনও রাখেন না। জীবনটাই আন্দাজের ওপর চলে যাচ্ছে! অত হিসেবে কি দরকার। মোটামুটি একটা হিসাব রাখেন। দু-চার টাকার এদিক-ওদিক হলে তিনি কখনই ধরতে পারেন না। পুঁটুলিতে রুদ্রাক্ষের মালা আছে। আর আছে গোটা দশেক তাঁর জীবনের অমূল্য বই। বইগুলোও ঠিক আছে। পদ্মপুরাণ, পুরোহিতদর্পণ, কৃত্তিবাসের রামায়ণ, একটি এ-বছরের পঞ্জিকা, দ্রব্যগুণ সম্পর্কিত বই … না সবই ঠিক আছে। কেউ কিছু সরায়নি। তবু রাতে আধো ঘুম আধো জাগরণে কেন যে মনে হচ্ছিল কেউ তাঁর কিছু সরিয়ে নিয়েছে। তিনি কিছু হারিয়েছেন।

    ধনবৌর পাতলা ঘুম। লম্ফ জ্বালতে দেখে বলেছিল, কি করছ?

    চন্দ্রনাথ গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, টাকা গুনছি। যেন এমন সময় কারো জেগে থাকা ঠিক না। তোমাকে কে আবার জাগতে বলেছে! খবরদারি করতে বলেছে। ঘুমাচ্ছ ঘুমাও।

    ধনবৌ পাশ ফিরে শুতে গিয়ে বুঝেছিল ছোট নাতি প্যাণ্ট কাঁথা সব ভিজিয়েছে। তাড়াতাড়ি উঠে ডাকল, ও বৌমা, ওঠো। কাঁথা পাল্টে দাও। সব ভিজিয়েছে।

    বৌমা উঠেও দেখেছিল, মশারির নিচে চন্দ্রনাথ বসে আছেন। সামনে সেই নতুন লাল সালু কাপড়ের পুঁটুলিটা। কি আঁতিপাতি করে খুঁজছেন।

    —এত রাতে বাবা কি করছেন? বৌমা এমন প্রশ্ন করেছিল।

    —এই খুঁজছি।

    —কি খুঁজছেন?

    —সেটা বলতে পারলে তো হতই। মনে করতে পারছি না। তোমরা কিছু আমার ধরেছিলে!

    —না বাবা। পাশ থেকে আর একটা ছোট্ট কাঁথা বের করে ধনবৌর হাতে দেবার সময় বৌমা বলেছিল, এই নিন মা। এত পেচ্ছাপ করে!

    —ছেলেমানুষ করবে না। শরীর না হলে হাল্কা হবে কি করে। বড় হবে কি করে। তোমরাই বা বুঝবে কি করে সন্তান মানুষ করা কি কষ্ট!

    মেজবৌমা তারপর শুয়ে পড়েছিল। অতীশ চলে যাওয়ায় উত্তরের ঘরটা বৌমা ছেড়ে দিল। রাতে একা শুতে ভয় পায়। মেয়েটা বাড়ি নেই। বড় শ্যালক গোপাল এসে নিয়ে গেছে।

    চন্দ্রনাথের দুম করে বড় শ্যালকের ওপর কেমন রাগ চড়ে গেছিল। নবাবী এখনও ঠিক আছে। স্বভাব চরিত্র ভাল ছিল না। বৌটিকে মারে! চরিত্রে কিছু দোষ ছিল এক সময়। গুণের মধ্যে এই নিঃসন্তান মানুষটি অলকাকে মেয়ের চেয়ে বেশি ভালবাসে। সময়ে অসময়ে অলকাকে কিছুদিন কাছে নিয়ে রাখে।

    ধনবৌ কাঁথা পেতেও বোধহয় বসে বসে মজা দেখছিল। না হলে এক সময় বলবে কেন, বয়স যত বাড়ছে, তত ভীমরতি ধরছে।

    —হ্যাঁ বলেছে!

    —তা না হলে মানুষ কি হারায় নিজে জানে না!

    —জানলে ত হয়েই যেত।

    হঠাৎ ধনবৌ কেমন ক্ষেপে গেল।—আলো নিভিয়ে শোবে কিনা বল! তোমার কি। সময় নেই অসময় নেই পড়ে পড়ে ঘুমালেই হল। নিশ্চিন্ত জীবন। এখানে এসে আর কুটোগাছটি নাড়লে না।

    চন্দ্রনাথ এসব কথায় ধনবৌকে ভীষণ ভয় পান। এদেশে আসার পর সত্যি তিনি আর কাজ নেননি। আর যে লোকটা এদেশে প্রায় যৌবন শেষে প্রৌঢ় বয়সে এলেন, তাঁকে কাজ দেবেই বা কে! কাজ যে একেবারে জুটছিল না তা বললে মিথ্যা হবে—কিন্তু কোথায় যেন চন্দ্রনাথের একটা বড় অহঙ্কার ছিল। এখন আর তেমন জমিদার কোথায়, জমিদারী কোথায়। দোকানে বসে বসে খাতা লিখবেন—চন্দ্রনাথ এটা ভাবতেও পারতেন না। এরই মধ্যে সুখে দুঃখে ঘর-বাড়ি বানিয়েছেন, পৈতৃক পেশা যজমানিটা ছাড়েন নি। কলোনির প্রায় সব ঘরেই পূজা পার্বণে তাঁর ডাক আসে। এখনও এটাই সম্বল। মেজছেলে অতীশ এখানে এসে চাকরি নেবার পর সংসার সচ্ছল। দিন তাঁর ভালই যাচ্ছিল। কিন্তু গোল বাধাল—কি যেন তাঁর হারিয়েছে। এইসব সাত-পাঁচ ভেবে তিনি আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন। ধনবৌর মাথা গরম হলে, হয়ত আর ঘুমাবেই না। বকর বকর শুরু করে দেবে। সারা-জীবন হাড়মাস জ্বলে খাঁ খাঁ হয়েছে এমন কত অভিযোগ উঠবে। এসব ভয়েই তিনি হারিকেনটা নিভিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তারপরও ঘুম এল না। মানুষের কিছু হারিয়ে গেলে ঘুমায় কি করে!

    রাত থাকতেই পা টিপে টিপে নেমে গেছিলেন তক্তপোশ থেকে। তামাকের একটা পিপাসা আছে। খুব সন্তর্পণে যেন কেউ টের না পায় দরজা খুলে বারান্দায় মাদুর পেতে বসেছিলেন। একপাশে শুকনো সব গাছগাছড়া টোফা মুছিতে রাখা। সেগুলো তাঁর কাছে গুপ্ত সম্বলের মত। তার মধ্যে দেশলাই গোঁজা থাকে। সেটা খুঁজে বের করার সময়ই মনে হয়েছিল, নক্ষত্রটা আকাশে নেই। কোথাও নেমে গেছে। লিচু গাছটার নিচে এসে নক্ষত্রটা খুঁজে বের করতেই সাহস ফিরে পেলেন। নিশ্চিন্তে তামাক খেলেন। তারপরই মনে করতে পারলেন অতীশের কোষ্ঠীটা তিনি দেখছেন না। বইপত্রের মধ্যে সবার করকোষ্ঠী তিনি ভারি গোপনে রেখেছেন। সেটাই বুঝি তাঁর হারিয়েছে। তার কাছে এখন সেটা যে খুবই প্রয়োজনীয় বস্তু।

    নির্মলা সকালে উঠে ঘর থেকে বের হতেই দেখল, বাবা চোখ বুজে বারান্দায় বসে আছেন। ঠিক যেন এক নির্বিকল্প পুরুষ। অচৈতন্য প্রায়। আগে এমন রূপ দেখা না থাকলে নির্মলা এ-সময় খুবই বিপাকে পড়ে যেত। বাবার মধ্যে কি যেন অতিপ্রাকৃত কিছু খেলা করে বেড়ায়। তিনি সংসারে থেকেও যেন নেই। কোথায় এক অদৃশ্য অভিকর্ষ আছে যা তাঁকে টানে। তখন তিনি এমন কথাবার্তা বলেন যা সংসারী মানুষের পক্ষে সম্ভব না। এজন্য নির্মলা এই মানুষটির সেবাযত্নের কোনও ত্রুটি রাখে না।

    সে ভাবল ডাকে, আপনি কি বসে বসে ঘোমাচ্ছেন। কিন্তু নির্মলা জানে, এ সময় তাঁকে ডাকলে তিনি ভারি বিরক্ত বোধ করেন। নির্মলার মুখে সামান্য হাসি খেলে গেল। আসলে মেজ ছেলে কলকাতায় চলে যাওয়ায় নিজেকে তিনি তার চেয়ে বেশি বিপন্ন বোধ করছেন। বার বার বলেছেন, তুমি এদিকে কোথাও কাজ দেখ। অত দূরে যেয়ে কাজ নেই। মানুষ দূরে গেলে পর হয়ে যায়।

    অতীশ বাবার কথায় হেসে ফেলেছিল।

    —হাসবে না।

    —আপনি তো আগে এমন ছিলেন না বাবা। কত সহজে সব কিছু অগ্রাহ্য করতে পারতেন।

    —বৃক্ষের মত মানুষ। যত বড় হয়, বয়স বাড়ে, তত ঝড় ঝাপ্টা বেশি লাগে। তাছাড়া কলকাতা জায়গাটা ভাল না। ওখানে গেলে মানুষ মানুষ থাকে না। তুমি ইতিহাস পড়ে দেখ। তাই লেখা আছে।

    অতীশ বাবার সেকেলে মনোভাব একদম পছন্দ করে না। বাবার ঐ ভয়। অতীশ বলেছিল, সব বড় বড় মানুষেরা কিন্তু সেখানেই শেষ পর্যন্ত গেছেন। বিদ্যাসাগর মশাই বাবার আদর্শ পুরুষ। সে বলেছিল, আপনি জানেন না, তিনি কলকাতায় এসে বিদ্যাসাগর মশাই হয়েছিলেন। বীরসিংহ গাঁয়ে থাকলে বিদ্যাসাগর হতেন না।

    বাবা কেন জানি আর কিছু বলেন নি। শুধু বলেছিলেন, তোমরা বড় হয়েছ, যা ভাল মনে কর করবে। তবে বয়স বাড়লে মানুষের ভয় বাড়ে।

    নির্মলা তখন অতীশকে সমর্থন করে বলেছিল, বাবা, আপনি কলকাতার অত দোষ দেবেন না। নিজে ঠিক থাকলে কার কি করার আছে।

    বাবা এ কথায়, তার দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছিলেন। বুঝেছিলেন নির্মলা কলকাতার মেয়ে বলেই অভিযোগ হজম করতে রাজি না। পায়ের ওপর দু’ হাত ছড়িয়ে নিজের সারা শরীর দেখতে দেখতে বলেছিলেন, বড়ই প্রলোভন। কলকাতায় গেলেই লোভে পড়ে যায় মানুষ।

    অতীশ বলেছিল, মানুষ বেঁচে থাকতে চাইবে না? মানুষ বড় হতে চাইবে না? কলকাতায় কত সুযোগ!

    —মানুষের বড় হওয়া আর ধান্দাবাজ হওয়া এক কথা না অতীশ।

    —সেটা সব জায়গাতেই আছে। দুষ্টু লোকেরা, ধান্দাবাজ লোকেরা ছত্রাকের মত গজায়। তারপর আর বাবা কোন কথা বলতে সাহস পান নি। এখন টের পাচ্ছে নির্মলা অতীশ বাড়ি না থাকায় সামান্য বিভ্রমে পড়ে গেছেন তিনি। আজীবন শহরে থেকে মানুষ বলে, প্রথম প্রথম এখানকার সব কিছুই বড় নির্জন এবং চুপচাপ মনে হত নির্মলার। কোথাও যেন জীবন সে-ভাবে জাঁকিয়ে বসে নেই। ব্যস্ততা নেই, অনিশ্চয়তা নেই—কেমন প্রাণহীন এক জগৎ। প্রথম প্রথম সে খুবই হাঁফিয়ে উঠত। মাইল তিনেক দূরে শহর, বড় মাঠ পার হয়ে গেলে পাকা রাস্তা। মাঝে মাঝে বাস ট্রাকের শব্দ কানে আসত শুধু। দূর দিয়ে গরুর গাড়ি যায়। একটা কোঁ কোঁ আওয়াজ। বাগদি মেয়েরা মাছ ধরে ফিরে আসে। গায়ে গামছা। হাল গরু ধানের ক্ষেত, হাঁসের ডাক প্রথম প্রথম কেমন বিশ্রী লাগত। বাবা হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে ক্ষেতের মধ্যে চবর চবর করে হাঁটছেন। তার শ্বশুর এই মানুষটা, জমিতে মুনিষদের সঙ্গে কেমন লেপ্টে থাকতেন—নির্মলার ভাল লাগত না। সকাল হলে গরু বের করা, গরু মাঠে দিয়ে আসা, দুধ দোওয়ানো, গোয়াল ঘর পরিষ্কার করা—এসবে ভারি দুর্গন্ধ—মাঝে মাঝে ওক পেতো তার। বৃষ্টির সময় উঠোনে পা দেওয়া যেত না, সারাটা উঠোন কাদায় থিকথিক করছে। নালা ডোবায় জল, ঘাস জঙ্গল, আর সাপের উপদ্রব। সব সময় নির্মলা বড় ভয়ে ভয়ে থাকত। শুধু একজন তার নিজের। তার সর্বস্ব। তাকে পাবে বলে সব স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সে এ-জীবনে এসে ঢুকেছিল। চার বছর বাদে সেই মানুষ তাকে এখানে ফেলে কলকাতায় প্রবাসী হবে বলে চলে গেল।

    নির্মলা কল পাড়ে গিয়ে মুখ ধুল। কাপড় ছাড়ল। সকালে বাবা তাকে একটা গুরুদায়িত্ব এখানে আসার পরই দিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বৌমা তুমি গৃহলক্ষ্মী। ঠাকুর তোমার হাতের ফুল বেলপাতা পেলে খুশী হবেন। তুমি রোজ পূজার ফুল দূর্বা তুলবে। বাসি কাপড় ছেড়ে নিও। এখন নির্মলার সেই গুরুদায়িত্ব পালনের সময়। ঠাকুরঘরের শেকল খুলে ঠাকুর প্রণাম সারল। ভেতর থেকে সাজি বের করে নিল নির্মলা। সব কাজই খুব আস্তে করছে। কারণ বাবার যা নমুনা তাতে মনে হচ্ছে তিনি অনেক ওপরে উঠে সন্তানকে লক্ষ্য রাখার জন্য চোখ বুজে আছেন। এই অবস্থায় খুটখাট শব্দে যদি তাঁর অভিকর্ষ নষ্ট হয় তবে তিনি ব্যাজার মুখে বলবেন, দিলে ত সব মাটি করে। আমি অতীশের চারপাশটা দেখব বলে বসেছিলাম—কোথায় গিয়ে উঠল—আর তোমরা খটাখট করে, দিলে সব মাটি করে।

    প্রথম প্রথম নির্মলার বাবার এমন সব আচরণে হাসি পেত। সে দেখত, প্রতিবেশীরা বাবার কাছে এসে পায়ের কাছে বসে আছে। বলছে, কর্তা দেখেন ত সানু ভাল আছে কিনা। মাসের ওপর হল কোন চিঠি নেই!

    বাবা বলতেন, এখন হবে না।

    —কখন আসব কর্তা?

    —কাল ঠাকুরঘরে যখন বসব তখন আসিস।

    পরদিন এলে বাবা বলতেন, বুঝতে পারলাম না কিছু। দেখি রাতে।

    সকালের দিকে এলে বলা, ভালই আছে। চিন্তা করিস না। চিঠি আসবে। কাজে কম্মে আটকে গেছে।

    নির্মলার প্রথম প্রথম বাবার এমন আচরণ ভালও লাগত না। মনে হত বাবা মানুষকে ঠকাচ্ছেন। একদিন রাতে সে অতীশকে অভিযোগও করেছিল, এটা কি! বাবার কি দরকার লোককে মিথ্যে স্তোকবাক্য দেওয়া। বাবাকে ত এ-জন্য মিছে কথা বলতে হয়। তিনি কি ঠিক জানেন, কে কি করছে!

    অতীশ কি লিখছিল, সব শুনতে পায়নি, বলেছিল, কে মিছে কথা বলছে!

    —বাবা!

    —বাবা মিছে কথা বলছেন! কেমন অবাক চোখে তাকিয়ে নির্মলাকে দেখছিল। অতীশের এই চোখকে নির্মলার বড় ভয়। যেন গভীর থেকে এক আত্মজিজ্ঞাসার মত প্রশ্ন, তুমি কে? তুমি আমার কে!

    —তাই তো। আমতা আমতা করে নির্মলা পালাতে চাইলে, অতীশ খুব ধীরে ধীরে বলল, বাবার মিছে কথা বলার কারণ?

    —লোককে দূরের খবর দেন। বাবা কি সেখানে গেছেন?

    অতীশ কেমন সামান্য আশ্বস্ত ভঙ্গীতে বলল, তবে বিষয় এই। বাবা লোককে দূরের খবর দেন কেন! আমারও সেই প্রশ্ন, বাবা দূরের খবর দেন কেন। তারপরই অনেক দূরের কিছু যেন অতীশও দেখতে পায়। সে বলেছিল মানুষের মধ্যে কি থাকে, কি থাকতে পারে তুমি জান না। তাছাড়া বাবা আমার সরল মানুষ, ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি বাবা ঠকেছেন, কাউকে ঠকান নি। এই যে, বাড়িঘর এখানে বানিয়েছেন বাবা, কত সাপ ছিল, বাবা একটা সাপের গায়েও আমাদের হাত দিতে দেন নি। প্রকৃতির জীব, তোমরা বেঁচেবর্তে থাকবে তারা থাকবে না! বাবা এমন বলতেন। বাবার সঙ্গে যেখানে যখন যজমান বাড়ি গেছি দেখেছি বাবা সবার মঙ্গল কামনা করছেন। বলছেন, দাসমশাই আপনার সোনার সংসার, লক্ষ্মী ঘরে বাঁধা। বাবা নিজের জন্য তাঁর ঈশ্বরের কাছ থেকে বোধহয় কিছুই চেয়ে নেননি!

    নির্মলার তখন ভারি অস্বস্তি। অতীশ কথাগুলি তার দিকে তাকিয়ে বলছিল না। বাইরে জানালার দিকে অতীশের মুখ। সে দূরের কোথাও কিছু দেখতে দেখতে যেন বলে যাচ্ছে। সুদূরে সে একবার হারিয়ে গিয়েছিল। এখানে আসার আগেই লোকমুখে সে-সব খবর নির্মলা জানে—দ্বীপ-টিপ সমুদ্র এবং পৃথিবীর এক কোমল অন্ধকার থেকে মানুষের প্রত্যাগমন ঘটলে এমনই বুঝি হয়। নির্মলা বলেছিল, তারাপিসি পাড়ায় বলে বেড়াচ্ছে, সব মিছে কথা। কর্তা কিছুই দেখতে পান না। আন্দাজে বলেন। বাবার কথা নাকি ঠিক হয় নি।

    তারাপিসি প্রতিবেশী। এখানকার চারপাশে যারা আছে সবাই দেশের লোক। বাবা বাড়ি করার পরই দেশের মানুষজনকে খবর পৌঁছে দিয়েছিলেন, নিজের মঙ্গল চাও তো চলে এস। এখানে একটা বড় বনভূমিতে নতুন আবাস তৈরি হচ্ছে। সময় থাকতে বাড়ি-ঘর বানিয়ে নাও। পরে আর আসতে পারবে কি পারবে না ঠিক কি। সেই থেকে দেশের মানুষজন চলে আসতে লাগল। বাড়িঘর বানাতে থাকল। আসলে বাবার বাড়ি-ঘর হয়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল বুঝি সবই আছে, গাছপালা মাঠ সবই আছে, কেবল সেই কাছের মানুষেরা নেই।

    অতীশ নির্মলার দুঃখটা টের পেয়ে বলেছিল, বাবা কেন যে বলতে যান! এবং পরদিন সকালেই সে বাবাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, আপনি আর এ-সবের মধ্যে থাকবেন না। কার কে কোথায় আছে, কেমন আছে আপনার কি দরকার বলার। সংসারের কি লাভ এতে!

    অতীশকে বিষয়ী হতে দেখে বাবা বলেছিলেন, রক্তে তোমার দোষ ঘটেছে। জীবনে লাভালাভই বড় করে দেখছ। মানুষের শুভাশুভ দেখছ না। তুমি তো বিষয়ী মানুষ নও।

    অতীশ বাবার কথার জবাবে কিছু বলতে পারে নি। বোধহয় ভেবেছিল এই রকমেরই মানুষ তার বাবা। নির্মলার ওপরও বিরক্ত হয়েছিল। তার কথাতেই সে বাবার ব্যক্তিগত ভাল লাগা মন্দ লাগা বিষয়ে নাক গলাতে গিয়েছিল। বাবা কি টের পেয়ে তখনই বললেন, তারা বলেছে। ও তো বলবেই। বললাম, আমাকে সময় দে, বসতে দে, ভাবতে দে, মনোযোগী হতে দে, না তা চলবে না। তক্ষুনি বলে দিতে হবে। না হলে রাতে তারার ঘুম আসবে না। রাতে না ঘুমালে শরীর নষ্ট। আয়ু নষ্ট। এ-সব তোমরা বুঝবে না। বেঁচে থাকার জন্য জীবনে প্রশান্তি দরকার। তারার খুব কষ্ট হবে ভেবে বলতে গেলাম। মিলল না। মিলতে নাই পারে। তখন যে আমার শরীরে কোন দোষ ঘটেনি, তাই বা কে বলবে। দোষে পড়লে হয় না।

    এই দোষ শব্দটি বাবা খুব বলেন। অর্থাৎ অপবিত্র ছিলেন। তারাপিসি বয়স আন্দাজে যৌবন ধরে রেখেছেন। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স—বাবা কি সেই যৌবনবতী মহিলাকে দেখে লুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। নতুবা দোষ ঘটে থাকতে পারে বলেছিলেন কেন। নির্মলা ফুলের সাজিতে একটা একটা করে শ্বেত জবা, রাঙা জবা বেলফুল রাখছে আর এমন সব ভাবছে। মানুষের শরীর ত। দোষ ঘটতেই পারে। বাবার পক্ষেই সম্ভব অকপটে সব স্বীকার করা। আর এভাবেই নির্মলা বুঝতে পারছিল, এই বাড়িটার ওপর গাছপালার ওপর এবং বাবার ওপর তার টান বেড়ে যাচ্ছে। আগের মত আর খারাপ লাগে না। ক্রমে নির্মলা এই সংসারের পবিত্রতা টের পেয়ে শহরের আকর্ষণ ভুলে যেতে বসেছিল। আর তখনই তার মানুষটার যে কি জেদ অথবা অভিমান বলতে পারে, মানুষের নীচতায় সে বড় কষ্ট পায়, সে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে কলকাতায় চলে গেল।

    কাল রাতে নির্মলারও ভাল ঘুম হয়নি। এমনিতেই তার মানুষটার শরীরের প্রতি আকর্ষণ কম। সে দেখেছে, এগিয়ে না দিলে মানুষটা তার কিছুই গ্রহণ করে না কিংবা বলা যেতে পারে কোন দূরবর্তী নক্ষত্রের প্রভাব আছে তার ওপর। বাবাও বলেন এই নক্ষত্রের প্রভাবেই অতীশ এক জায়গায় সুস্থির হয়ে বসতে পারছে না! সময় লাগছে।

    নির্মলা বাসন্তী রঙের শাড়ি পরেছে। নির্মলা লম্বা উঁচু। ছিমছাম সুন্দর চেহারা। তীক্ষ্ণ নাক চোখ। চোখের ধার প্রবল। এই ফুলের বাগানে সে ঘুরে বেড়ালে টের পায় আশ্চর্য এক সুঘ্রাণ উঠছে। নীল আকাশ। ঘাস ভিজা ভিজা। ঘাসে বর্ষার কীট-পতঙ্গ উড়ে বেড়াচ্ছে। ফুল গাছগুলোর ডালপালা হাওয়ায় সামান্য দুলছিল। মা উঠে পড়েছেন। রান্নাঘর থেকে বাসন কোসন বের করার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। সাবিত্রী এসে যাতে বসে না থাকে সে জন্য সব কাজ এগিয়ে রাখছেন।

    বাবা বারান্দা থেকেই তখন ডাকলেন, আরে ওঠ তোরা। বেলা হয় না। তোদের ঘুম ভাঙে না কেন। একবার উঠে দেখ। কি দেখবে যেন নির্মলা বোঝে। দিন বয়ে যায়। কাজ কাম ফেলে রাখিস না। সকাল সকাল সব ঘরে তুলে নে। আসলে যেন সেই মোজেসের মত সে বাবার দৈববাণী শুনতে পায়। অতীশ কেন যে বাবার সবটাই এক আত্মসুখ ভেবে থাকে। বাবা এ-সব ভাবতে ভালবাসেন—ঈশ্বরের সঙ্গে তাঁর খুব নিকট সম্পর্ক। খেতে বসলে, বাবা বলবেন, ঠাকুর খাও। কখনও রান্নাবান্না পছন্দ মত না হলে বলবেন, ঠাকুর আজ খেয়ে সুখ পেল না।

    ফলে নির্মলার কাছে বাড়িটা কোন আশ্রম টাশ্রমের মত মনে হয়। দু’দিনের জন্য এই আশ্রমে সবাই এসে হাজির হয়েছে। গাড়ি এলে সবাই সব ফেলে আবার উঠে পড়বে। রাস্তা গেছে বাড়ির পাশ দিয়ে। ইঁট সুরকির রাস্তা। ধারে ধারে বাবার হাতের গাছ। আম জাম নারকেল লিচু। বার-চোদ্দ বছরে গাছগুলো আকাশের নিচে ডালপালা ছড়িয়ে দিয়েছে। পূবমুখী ঠাকুরঘর। পশ্চিমমুখী বড় ঘর। পাশাপাশি দুটো উত্তর-দক্ষিণমুখী ঘর। বাড়ি-ঘর ছেড়ে বাবা কোথাও আজকাল দু-একদিনের বেশি থাকতে পারেন না। সব তিনি খেটে-খুটে করেছেন। বড় ছেলে তার বৌ নিয়ে বিদেশে থাকে। কালেভদ্রে আসে। কেমন আলগা সম্পর্ক সবার সঙ্গে। মাঝে মাঝে অতীশকে বলেন, ওকে একটা চিঠি দিস। আমি ভাল আছি লিখবি। টাকা পয়সার কথা কিন্তু কিছু লিখবি না। সুবিধা অসুবিধায় বাবাকে বড় ছেলে টাকা দেয় না বলে অভিমান আছে একটা। বড়ই স্বার্থপর। সংসারে লেপ্টে থাকার দামটা বুঝল না। তখনই কেন জানি এই মানুষকেই মনে হয় বড় বিষয়ী। বাবাকে বিষয়ী ভাবলে, নির্মলা অস্বস্তি বোধ করে। সে দেখল তখন সাজিতে নানা বর্ণের ফুল। বেলফুল, শ্বেত জবা, অপরাজিতা, ঝুমকো লতা, স্থলপদ্ম। সাজিটা বেশ বড়। পূজায় বসে বাবার ফুল কম পড়লে রাগ করেন।

    নির্মলা এখন আঁতিপাঁতি করে খুঁজছে আর কি ফুল আছে। দেখলে মনে হবে সক্কালবেলায় এক যুবতী গাছগুলোর সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। একবার এ-গাছের নিচে আবার ও-গাছের নিচে বসে উঁকি দিয়ে যখন বুঝল, বাগানে আর একটি ফুলও নেই তখন নিশ্চিন্তি। বাবা বাগানে এসে ফুল আছে গাছে দেখতে পেলে রাগ করেন। বিফলেই ফুটল ফুলটা, যেন অভিশাপ দিতে পারে। ফুলের অভিশাপ বলতে! তখন তিনি বিড়বিড় করে খড়ম পায়ে বকবেন আর হাঁটবেন।—তোমরা বৌমা গাছে ফুল ফুটে থাকে দেখতে পাও না। বলত, আমি না দেখলে অনর্থক সকালে ঝরে থাকত গাছের নিচে। ঠাকুর সেবায় না লাগলে ফুল ফোটার কি দরকার বল!

    বাবা তখনও ডাকছেন, ওরে ওঠ। উঠে ঠাকুর প্রণাম কর। প্রহ্লাদ আর কত ঘুমাবি। একবার শুক্রাচার্যের কাছে যেতে হবে। তারপর কি ভেবে আবার জোরে জোরে ডাকছেন, অ-বৌমা, বৌমা, আসল কথাটাই বলা হয়নি। তুমি শিগগির এসো।

    নির্মলা কাছে এলে বললেন, অতীশের কোষ্ঠীটা পাচ্ছি না। তুমি কোথাও রেখেছ?

    —আমার কাছেই ত রাখলেন। বললেন, বৌমা নিজের জিনিস বুঝে নাও।

    —ঠাকুর একেবারে ভুলে গেছে। তারপরই প্রফুল্ল হাসি। যেন মসকরা করছেন নিজের সঙ্গে। তালে ভুল হচ্ছে। ঠাকুর তোমার তো সন্তান-সন্ততির বিষয়ে এত ভুল হয় না। শেষে বললেন, এটা দেবে। সুবল আচার্যকে ডেকে আনতে হবে। কোষ্ঠীটা দেখে শুক্রাচার্য কি বলে দেখি!

    প্রহ্লাদ কর্তার হাঁক পেয়েই উঠে পড়ল। তারপর হাসু ভানুকে ডাকল। এই যে কর্তাসকল ওঠেন! ঘণ্টা বাজছে।

    প্রহ্লাদ দরজা খুলে বের হয়ে এল। হাসু শুয়ে শুয়েই চিৎকার করছে, বৌদি বৌদি, ভানু আমাকে লাথি মারছে। দেখ এসে।

    এই ছোট দুই দেওর ভারি দুষ্টু। বাবার বেশি বয়সের জাতক। এ-দেশের মাটিতে এ-দুটির জন্ম। অতীশের সঙ্গে বয়সের তফাত অনেক। যেন এরা বাবার পুত্র সন্তান না, অতীশের। এদের জন্য তার বড়ই দুর্ভাবনা। পড়াশোনা দেখার ভার তার ওপর। বাবা পড়ল কি পড়ল না—একেবারে দেখেন না। মানুষ নিজের চেষ্টাতেই সব করে—তার ইচ্ছাতেই সব হয়—এমন মানুষের ওপর সব ছেড়ে দেওয়া যায় না বলেই অতীশ যাবার আগে এই দুই ছেলের ভার নির্মলার ওপর দিয়ে গেছে।

    নির্মলা ধমক লাগাল, দুটোকেই কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখব। তাড়াতাড়ি উঠে মুখ ধুয়ে নাও। পড়তে বসো। টাস্কগুলো কর। সব দেখব।

    প্রহ্লাদ তখন বের হয়ে মাটি ছুঁয়ে প্রণাম করল। তারপর ঠাকুরঘরের দাওয়ায় মাথা ঠেকাল। চিমটি কেটে একটু মাটি তুলে জিভে ছোঁয়াল। দিনের কাজ এই করে আরম্ভ। গরুর ঘর থেকে ধলি কালিকে বের করতে হবে। দোয়াতে হবে। দুধের বালতিটা কলপাড়ে যাবার সময় সঙ্গে নিয়ে গেল। জমিতে কাদা করা আছে। কাল বিকেলে কিছু সাঁওতাল মেঝেন ঠিক করে এসেছে। সাতটা না বাজতেই চলে আসবে। এরই মধ্যে একবার যেতে হবে আচার্যের কাছে। তাকে ডেকে নিয়ে আসতে হবে। কাল থেকেই কর্তা কেমন উসখুস করছেন। আজ সকালে বুঝতে পারল তিনি অতীশ দাদাকে পাঠিয়ে ভাল নেই। আচার্য না আসা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছেন না। এবং তখনই মনে হল কর্তা সবার বেলায় এত জানেন নিজের বেলায় কিছু জানেন না কেন! অবশ্য এত সাহস নেই তার। ধার্মিক মানুষ বলে জানে এই ঠাকুরকর্তাকে। তল্লাটের মানুষেরা ভক্তি শ্রদ্ধা করে। সেও করে। কোনও গুপ্ত কলকাঠি আছে ঠাকুরের কাছে। সেটা নিজের বেলায় অকাজের বান্দা।

    তখন ফুল দূর্বা ঠাকুরঘরে রেখে এল নির্মলা। তারপর ট্রাঙ্ক খুলে কুষ্ঠিটা বের করল। লম্বা। কারুকাজ করা ফিতে লাগানো একটা সরু কাঠের দণ্ড দিয়ে লাটাইর মত প্যাঁচানো। সবটা খুললে প্রথমেই চোখে পড়ে কল্যাণ শ্রীমান অতীশ দীপঙ্কর দেবশর্মণ ভৌমিকস্য জন্ম পঞ্জিকা— রোহিণী নক্ষত্র, বৃষ রাশি, নরগণ। তারপরই বোধহয় নিচের লেখাটুকুতে আছে গ্রহ নক্ষত্রের ভজনা—ওঁ আদিত্যাদি গ্রহাসর্বেন নক্ষত্রানি চরাশয় দীর্ঘসায়ু প্রকুবর্বন্ত যস্যের জন্মপত্রিকাং ব্রহ্মাদি দেবতা সর্বে গোষ্যাদি মাতৃকাস্তথা সূর্যাদয়ো গ্রহাসর্ব্বে রক্ষন্তু বালকং। হে আদিত্যাদি গ্রহ সব, বালককে সব বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করুন। নির্মলারও সঙ্গে সঙ্গে এমন বলতে ইচ্ছে হল। বালক কথাটা ভাবতেই কেমন রোমকূপে নির্মলার বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিল। অতীশের বালক বয়সের কোন ফটো নেই। এই বাড়িটা তার মানুষজন, শতাব্দী পিছিয়ে এই গ্রহে এখনও বসবাস করে যাচ্ছে। ভাবতে গিয়ে কেমন আচ্ছন্ন বোধ করল নির্মলা। বাবার ডাকে সংবিৎ ফিরে পেল। বাবা জিজ্ঞেস করছেন বারান্দা থেকে, পেলে?

    —পেয়েছি।

    —আমাকে দাও। কাজ আছে।

    মানুষটার সব কর্মফল এই কোষ্ঠীর মধ্যে আছে। মানুষটার ভূত ভবিষ্যৎ সব। কোষ্ঠীটা হাতে নিয়ে সে আজ কেন জানি ভারি রোমাঞ্চ বোধ করল। মানুষটা কিছুদিন হল তার সঙ্গে নেই। নেই বলেই বুঝি এত আগ্রহ। তার এখন কেন জানি কোষ্ঠীটা হাত-ছাড়া করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। নির্মলা কোষ্ঠীটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। সুবল আচার্য এল যখন তখন দশটা বাজে।

    কলকাতায় তখন অতীশ, কুম্ভর সঙ্গে প্রিন্টিং সেকসান থেকে বের হয়ে আসছে। রঙ বার্নিশের গন্ধ। গন্ধটা সে কবে থেকেই পেয়ে আসছে। সেই সুদূরেও সে যখন ছিল এমনি রঙ বার্নিশের গন্ধ, গ্যাসের গন্ধ। জাহাজে ওঠার সময়ও প্রথম সে এমন একটা বিশ্রী কূট গন্ধ পেয়েছিল। তার পাশে সুপারভাইজার হরিহরবাবু, প্রিন্টিং ইনচার্জ মণিলাল। কুম্ভ সব বোঝাচ্ছিল। টিনপ্লেট কোথায় সাইজ করা হয় তারপর কিভাবে ব্লক হয় এবং শেষে সেই ব্লক লিথোতে তুলে টিন ছাপা থেকে ফ্যাব্রিকেশন সব।

    তিনটে বড় বড় টিনের সেডের মধ্যে কারখানা। প্রিন্টিং সেকসানের দুটো অংশ। বড় অংশটায় গ্যাস চেম্বার, প্রিন্টিং প্রেস। বার্নিশ করার জন্য ছোট্ট ঘেরা জায়গা। তার পাশে আর্টিস্টদের ঘর। ডিজাইন থেকে ব্লক সব এ-ঘরে। তারই পাশে কাঠের পার্টিশান —সেখানে ম্যানেজারের ঘর। নিচের দিকে লাগোয়া অফিস, আলমারি ফাইল-পত্র সব। সেডের পাশে বড় অশ্বত্থ গাছ—গাছটায় একটা লাল রঙের ঘুড়ি আটকে আছে।

    এক নম্বর টিনের শেড থেকে নেমে রাস্তা পার হতে হয়, রাস্তা পার হলে দু নম্বর টিনের শেড। অতীশ রাস্তায় নামতেই দেখল, একজন কুষ্ঠ রোগী খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আসছে। কুম্ভ বলল, আমাদের পুরোনো মিস্ত্রি শিউপূজন। পাশেই থাকে। গেটে দারোয়ান, উঠে দাঁড়িয়েছে। বস্তি এলাকার মধ্যে এই তিনটে শেড বলে, কলহ বচসা কানে আসছে।

    শিউপূজন দূর থেকেই গড় হল।

    অতীশ বলল, আরে করছেন কি!

    কুম্ভ আগে, হরিহর পেছনে, মাঝখানে অতীশ। কারখানায় কেউ উঁকিঝুঁকি মারছে না। লম্বা প্ল্যাটফরমের মত টিনের চালা বেশ দূরে চলে গেছে। ভিতরে ঢুকে সামনেই দেখল, একটা চওড়া বেল্টিং ঘুরছে। শেডের মধ্যে ঢুকতেই বাইরের সব কোলাহল মেশিনের শব্দে ডুবে গেল।

    কুম্ভ বলল, এগুলো কামড়ি মেশিন। পাশে কাইচি। কাইচিতে দুটো লোক ভীষণ নিবিষ্ট হয়ে কাজ করছে। সেখান থেকে টিন ঢুকিয়ে নিয়ে কেউ আসছে কামড়ি মেশিনে। ঝপাঝপ মেশিন থেকে সাইজকরা টিনের পাত পড়ছে। প্রতিটি কর্মী ভীষণ হাত চালিয়ে কাজ করছে।

    কুম্ভ বলল, নজর দিলে এটাও দেখবেন একদিন মেটাল বকস হবে। লাভের গুড় সব আগের ম্যানেজারের পেটে। এখন কে খায় দেখুন।

    অতীশ হাঁটতে থাকল। কুম্ভবাবু সারাক্ষণ বকবক করছে। লম্বা চওড়া বাত বলছে। চারপাশে অজস্র বেল্টিং ঘুরছে। পরপর কটা পাঞ্চিং মেশিন, লেদ মেশিন। লেদম্যান ফুল স্পিডে লোহার মোটা রডে চিজেল সেট করে বসে আছে। কটর কটর করে লোহা কাটার শব্দ কানে আসছিল। পরিশ্রমী এই মানুষগুলো খুব বিপাকে পড়ে যেন কাজ করে যাচ্ছে। পর পর সে এ-ঘরে পঁচিশ ত্রিশজন কর্মী দেখল, সবাই রুগ্ন, চোখ কোটরাগত। একটা লোক ডিবের বিট কাটছিল উবু হয়ে, আর তার দিকে কেমন জ্বলন্ত চোখে তাকাচ্ছে। দেখলেই অস্বস্তি হয়। পাতলা ঢ্যাঙা পাতলুনের মত চেহারা, গোঁফ ততোধিক লম্বা। কুম্ভ নাম বলে যাচ্ছে।

    দেখতে দেখতে অতীশের মনে হল, আবার সেই লজঝড়ে জাহাজ। হাত দিলেই সব খসে পড়বে। এই লজঝড়ে জাহাজটাকে মেটাল বকস বানাতে হবে। কিন্তু যা সব চেহারা শ্রমিকদের মেশিনপত্রের তার আগেই যদি সমুদ্রে জাহাজ ডুবে যায়! লজঝড়ে জাহাজের ক্যাপ্টেন সে এখন নিজে। নিয়তি মানুষকে শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে আসে। সে যতই লজঝড়ে জীবন থেকে পালাতে চায়, তাকে কে বা কারা বলিদানের জন্য যেন সেখানেই টেনে নিয়ে যায়। আর্চির প্রেতাত্মা সঙ্গে থাকে। গন্ধে অতীশ টের পায় সে এসে গেছে। তখনই কুম্ভ বলল, এর নাম মনোরঞ্জন। আমাদের বিটম্যান। ইউনিয়নের অ্যাসিস্ট্যাণ্ট সেক্রেটারি।

    অতীশ জাহাজে ইউনিয়ন দেখেনি। সে বলল, ইউনিয়ন!

    —এখানে সি পি এম-এর ইউনিয়ন।

    সেই ইউনিয়নের লোকটা তখন বিট থামিয়ে হাতজোড় করে নমস্কার করল। অতীশও হাত তুলে নমস্কার করল। কিছু যেন বলতে চাইল লোকটা—অতীশ শুনতে চাইল না। প্রেতাত্মার গন্ধ তার নাকে এসে লাগছে। সে সোজা অফিসে এসে বসল, একদিনে সব বোঝা যাবে না। তবে গন্ধে বুজতে পারল আর্চি আশেপাশেই আছে। তাকে ধাওয়া করছে। কারো না কারো ওপর ভর করে তাকে জ্বালায়। এখানেও সে তাকে ছেড়ে দেবে না। অতীশ কিছু কিছু কাজ বুঝে নিতে গিয়ে বুঝল, এ-বিষয়ে তার কোনও অভিজ্ঞতাই নেই—ম্যাসিনের শব্দে সব কানেও ঢুকছে না। এতে আর্চির অনেক সুবিধে।

    সে বলল, কুম্ভবাবু, একদিনে সব হবে না। চলুন বরং বস্তিটা একবার ঘুরে দেখে আসি। আসলে সে আর্চির অশুভ প্রভাব থেকে মুক্তি পাবার জন্যই যেন বাইরে বের হয়ে এল। এবং নিশ্বাস নিতে গিয়ে বুঝল, সেই গন্ধটা আরও ভারি, আরও ভুরভুর করছে। এখানে সে ভাল করে নিশ্বাস নিতে পর্যন্ত পারছে না। আর্চি আগের মত আবার তার পিছু নিয়েছে। কিন্তু সেটা কেন সে এখনও বুঝতে পারছে না। আর্চি কার উপর ভর করেছে, কুম্ভ না মনোরঞ্জন! সেটা কে? তার চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে হল।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    পাঁচ

    ফেরার পথে অতীশ বলল, ভাল ধূপকাঠি দরকার। ধূপকাঠি কিনব কুম্ভবাবু।

    কারখানা থেকে গাড়ি বের হতেই অতীশ কথাটা বলল। দু-পাশের বস্তি তখনও শেষ হয়নি। কালীমাতা হোমিওপ্যাথ ডিসপেনসারির সামনে গাড়ি। রাস্তার কলে বালতির লাইন। পাশে বড় বড় ঝাঁকা। বেতের মোড়া লম্বা। ছোলা শসা পেঁয়াজ গুঁড়ো লঙ্কায় সাজানো। রাস্তা জুড়ে বসে গেছে হকাররা। রাস্তা জুড়ে কুকুর মুরগি হাঁস। সিটমেটালের ম্যানেজার যাচ্ছেন। গাড়ি দেখে ওরা তাড়াতাড়ি ঝাঁকাগুলি সরিয়ে নিচ্ছে।

    অতীশ দেখল, দাওয়ায় বসে এক বুড়ি নাতিনের উকুন বাচ্ছে। বস্তির উলঙ্গ শিশুরা কোথা থেকে একটা আখ চুরি করে এনেছে—তাই নিয়ে হুটোপাটি। বেওয়ারিশ কুকুর এবং আবর্জনায় ভর্তি চারপাশ। থিকথিক করছে নোংরা জল। তার মধ্যে গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। ছাগল গরু ঘুরে বেড়াচ্ছে। গাড়ি চালাবার সময় খুব সতর্ক থাকা দরকার। কুম্ভকে এরা চেনে। কেউ কেউ সেলাম ঠুকে গেল।

    কুম্ভ বলল, ভাল ধূপকাঠি আমারও দরকার। ড্রাইভারকে বলল, একটু ঘুরে যাবি। দোকান থেকে ধূপকাঠি কেনার সময় কুম্ভ বলল, আপনার পছন্দ হচ্ছে না?

    —ভাল গন্ধ হবে ত!

    —খুব সুন্দর গন্ধ। নিয়ে দেখুন না।

    —কড়া গন্ধ দরকার।

    —আমার কিন্তু কড়া গন্ধ অতীশবাবু একদম পছন্দ না।

    অতীশ বলতে পারত, আমারও না। কিন্তু এ মুহূর্তে কড়া গন্ধ চাই। এই এক ল্যাটা জীবনে। সে এক ধূপকাঠি কিনতে কিনতেই ফেরার হয়ে যাবে এমন ভাবল। সে প্রায় হামলে তুলে নিল ডজনখানেক ধূপবাতির প্যাকেট।

    কুম্ভ অতীশবাবুর কাণ্ড দেখে হাঁ হয়ে গেল। এত ধূপকাঠি দিয়ে কি হবে?

    অতীশ কিছু বলল না। দাম মিটিয়ে বলল, চলুন।

    কুম্ভ ভাবল বেশ লোক বটে। এসেই ধূপকাঠি কিনতে শুরু করেছে। সে তবু বলল, দেশে পাঠাবেন বুঝি?

    অতীশ বলল, না।

    —ধূপকাঠি বেশিদিন থাকলে নষ্ট হয়ে যায়।

    অতীশ বলল, জানি।

    কুম্ভ কেন জানি আর কিছু বলতে সাহস পেল না; পাঁচ সাত ঘণ্টা একসঙ্গে কাটিয়ে মনে হয়েছে মানুষটা কথা বলতে বলতে খুব অন্যমনস্ক হয়ে যায়। কাজ বুঝে নেবার সময় না হলে কেউ বলতে পারে না, চলুন বস্তিটা ঘুরে দেখি। মানুষটা লেখালেখি করে। বস্তি দেখার তাই আগ্রহ। কিন্তু বস্তির কিছুটা ভিতরে গিয়েই বলল, থাক চলুন। পরে দেখা যাবে। এই বস্তির মধ্যে মাত্র একটা ন্যাড়া বেলগাছ এবং অশ্বত্থ গাছ দাঁড়িয়ে। আর কিছু নেই। ইলেকট্রিকের তার এদিক-ওদিক ঝুলে আছে। সব খুপরিগুলি আলকাতরায় অথবা পিচের টিনে মোড়া। ছোট ছোট দরজা। মানুষগুলি আরও ছোট, কাকলাশ। দেখে দেখে কুম্ভর অভ্যাস হয়ে গেছে। একটা লোক গামছা পরে শেডের নিচে বসে আছে। চা বানায় লোকটা। গালে বড় জড়ুল। চুল সাদা। লোকটা দাওয়ায় ঘুমায়। লোকটার নাম হরকু সিং। নাম শুনেই অতীশবাবু কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিল।

    কুম্ভ বলেছিল, আপনি আলাপ করতে পারেন। যদি বলেন অফিসে ডাকিয়ে আনব। বস্তির কেচ্ছা কাহিনী জানে।

    অতীশ বলেছিল, কেচ্ছা কাহিনী লেখার বিষয় হতে পারে না কুম্ভবাবু।

    কুম্ভর তাই ধারণা। সে হিন্দী সিনেমাখোর। বৌ হাসিরাণী প্রায় পারলে এবেলা ওবেলা দেখতে চায়। কোনোও রববার ফাঁক গেলে কুম্ভ জানে বিছানায় বউ ঘেঁষতে দেবে না। ভয়ে সে আগেই সেজন্য টিকিট কেটে রাখে, এবং একটা সপ্তাহ বৌকে তবে বিছানায় উল্টে-পাল্টে নিরাপদে বেশ জুতসই দেখা যায়। হাসিরাণীর রং গৌরবর্ণ। মসৃণ ত্বকে কি সুষমা! রক্তে বিজবিজ করে থোকা থোকা পোকা। ভেতরে কামড়ায়। হিন্দী সিনেমা না দেখলে পোকারা ভেতরে কামড়াতে উদ্‌গ্রীব হয় না। কেমন নিরাসক্ত, ঠেলে ফেলে দেয় বুকের ওপর থেকে। কুম্ভ নিচে গিয়ে শুয়ে থাকে।

    গাড়িটা যাচ্ছে। ট্রাম লাইনে দুটো ট্রাক দাঁড়িয়ে। সিনেমা ভাঙছে। হাউসের গায়ে সাই জোয়ান এক মদ্দ এবং পাশে লম্বা ঠ্যাংখালি করে যুবতী দাঁড়িয়ে। বড়ই কামের উদ্রেক করে। রাস্তায় ভিড়। মানুষজন বাসের জন্য মোড়ে মোড়ে জমা হয়ে আছে। কাদার মতই থিকথিক করছে মানুষেরা।

    অতীশ এইসব দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক থাকতে চাইছে। কারণ গন্ধটা নাক থেকে যাচ্ছে না। সে ধূপকাঠির প্যাকেটগুলি নাকের ডগায় এনে প্রায় উবু হয়ে বসল। কতক্ষণে গাড়িটা রাজবাড়িতে ঢুকবে। ঢুকলেই স্নান, এবং ঘরে ধূপবাতি জ্বেলে দেবে। গন্ধটা তবে নাকে ঝুলে থাকবে না। আর্চির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে।

    গাড়িটা ওদের রাজবাড়ির সামনে নামিয়ে দিল। বাকি পথটুকু হেঁটে যেতে হবে। প্রথম দিন বলে একটা গাড়ি পাওয়া গেছে। পরে অতীশকে ট্রামে বাসেই যেতে হবে। তার ট্রামে-বাসে ওঠার অভ্যাস একেবারে নেই। রাস্তাঘাটও ভাল চেনে না। সে নামার সময় বলল, কুম্ভবাবু অফিসে যাবার সময় কাল আমাকে ডেকে নেবেন।

    কিন্তু রাজবাড়ি ঢোকার মুখেই দেখল ভেতরে যতদূর দেখা যায়—খালি। একটা লোক নেই। হঠ যা হঠ যা করে চিৎকার করছে একটা লোক। দু’পাশ থেকে লোকজন সরে যাচ্ছে। যদি কেউ সামনে পড়েও যায়, নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এবং হাতজোড় করা সবার।

    সদরের সিপাই হাঁকল, খবরদার রাজার গাড়ি আতা হ্যায়।

    অতীশ দেখল, সাদা রঙের একটা ক্যাডিলাক। ভেতরে রাজেনদা। পাশে মেমসাহেবের মত ববকাটা চুলের এক যুবতী। চোখে নীল চশমা। ভারি সুন্দর দেখতে এক রহস্যময়ী নারী। চোখ উদাস মনে হল। চশমা খুলে অতীশকে চোখ তুলে দেখেছেও। অতীশেরও চোখে পড়ে গেছে। তারপরই সে কেমন বিমূঢ়। যুবতীকে কোথায় যেন দেখেছে, কতকালের যেন চেনা। কে এই যুবতী এমন মনে হল তার! চেনা। কিন্তু সে তো দীর্ঘদিন বিশেষ করে নিরুদ্দিষ্ট জীবন থেকে ফিরে আসার পর গাঁয়ে ছিল। মাঝে এক বছর একটা কো-এডুকেশন ট্রেনিং কলেজে বি টি পড়েছে। হোস্টেল জীবনের সে কিছু মেয়ের মুখ মনে করার চেষ্টা করল। সবিতা, আরতি, চন্দ্রা, জ্যোৎস্না, পূরবী এক এক করে তার সব সহপাঠিনীদের মুখ মনে করার চেষ্টা করল। না ওদের কেউ এমন দেখতে ছিল না। ওরা কেউ এত সুন্দর, এত লম্বা, এত মহিমময়ী ছিল না। শরীরে নীল রক্ত না থাকলে এমন নমনীয়তা চোখে মুখে কখনও আসে না।

    সদরে সেও এক পাশে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। রাজবাড়ির এই নিয়ম। রাজা বের হলে প্রাসাদের মানুষজনের রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। হাত করজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকা। সে যত বড় অফিসার হোক রেহাই নেই। অতীশ নতুন। জানে না সব কিছু। সে হাতে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কুম্ভবাবু বলল, এটা কি করলেন!

    কি হল! তখনই বুঝল, তারও উচিত ছিল কুম্ভবাবুর মত হাত তুলে কপালে ঠোকা। তারপর বলল, আমি ত জানি না। তারপরই ভেতরে কেমন এক দৈত্য মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ক্রীতদাসের ভূমিকা পালন করতে হবে ভেবেই মাথার ঘিলুতে জ্বর চলে আসে। সে ভেতরে ভেতরে কেমন ক্ষেপে যায়। শক্ত এবং অমার্জিত গলায় বলল, এটাই এ-বাড়ির নিয়ম বুঝি?

    কুম্ভ বলল, আজ্ঞে তাই। তবে সব ঠিক হয়ে যাবে। থাকতে থাকতে অভ্যাস হয়ে যাবে। আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। প্রেতাত্মার ভয় থেকেও এই অবমাননার ভয় তীব্র তীক্ষ্ণ। সে আসলে বিভ্রমের মধ্যে পড়ে গেছে। যে গেল সে কে এমন মহামান্য? তার গাড়ি গেলেই করজোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা—ভাবা যায় না। বরং বিদ্রোহ করবে। বিপ্লব করবে এ-বাড়িতে এটা বিপ্লবেরই শামিল। গতকাল সে রাজার সঙ্গে জুতো পরে দেখা করেছে। বাড়িতে এই নিয়ে তোলপাড় গেছে। মানসদাও খবরটা পেয়ে গেছিলেন। একবার সকালে এসে বলে গেলেন, ওহে নবীন যুবক, তোমার ত ভারি আস্পর্ধা হে। রাজার ঘরে জুতো পরে ঢোকো। বেয়াদপ।

    নবীন যুবক হাঁ করে তাকিয়েছিল।

    মানসদা বলেছিলেন, বুটের তলায় যতক্ষণ থাকবে মনে রাখবে ভাল আছ। চুরি কর চামারি কর খুন কর সব মাফ। বের হতে চেয়েছ কি মরেছ।

    অতীশ কি বলতে গেলে এক ধমক দিয়েছিল মানসদা।—দেখ নবীন যুবক, আমি তোমার আগে পৃথিবীতে এসেছি। অনেক দেখা। তুমি মনে করছ দেশ বিদেশ করেছ বলে সব বোঝ সব জান। মোসায়েব বলে একটা কথা আছে অভিধানে। সেটা একবার খুলে পড়ে দেখ। উপকারে লাগবে। তুমি কতটা কাজের তার চেয়ে বেশি দরকার কত বড় তুমি মোসায়েব। ইংরেজ আমল থেকে দেশে সেই এক ট্রাডিশন চলছে। ফক্কা ছক্কা বাইরে চলে, রাজার বাড়িতে চলে না। বলে তিনি তাঁর মুঠো আল্গা করে দেখালেন, কিছুই নেই। তবু কত জোর এই মুঠিতে। চেপে ধর, মনে হবে, বিশ্বসংসার তোমার তালুতে, আল্গা করে দাও, মনে হবে সাঁতার কাটছ।

    সে ভাঙা শ্যাওলাধরা দোতলা বাড়িটার সামনে এসে সকালের কথাগুলি মনে করতে পারল। সৎ মানুষ চাই। সৎ জীবনের আশায় সে এখানে এসেছে। প্রথম সে নির্ভয় পেয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে সব ফাঁকা। সে বলল, আচ্ছা কুম্ভবাবু, রাজেনদার পাশে ভদ্রমহিলা কে? প্রায় বিদেশিনীর মত দেখতে।

    —ওরে বাপ, আপনার সঙ্গে কথা বললেও দেখছি কেলেঙ্কারি হবে। বলতে হবে কে? তারপর খুব গলা নামিয়ে ফিস্ ফিস করে বলল, বৌরাণী। সব কব্জা করে ফেলেছে। কুক্ষিগত করেছে সব। এ-সব কথা আবার দু-কান করবেন না যেন। কুম্ভ পরে বলতে যাচ্ছিল, কাছা-আলগা লোক মশাই আপনি। ধরে ফেলেছি। তারপরই সতর্ক করে দিয়ে বলল, দু-কান করবেন না। করলে সোজা মশাই অস্বীকার করব। বাবা বলেছেন, আত্মরক্ষার জন্য সব করা চলে। বাবার কথা খুব মানি। দেখছি এতে আমার উপকারই হয়েছে। অনেক বিপদ আপদ থেকে রক্ষা পেয়ে গেছি।

    কুম্ভ বলল, আর কিছু বলবেন?

    —আচ্ছা বৌরাণীর দেশ কোথায় ছিল জানেন?

    —আপনার দেখছি ভারি ব্যামো আছে। ও দিয়ে কি হবে! আমাদের সাহস আছে জানার!

    —বাঙালী মেয়েরা তো দেখতে এমন হয় না।

    —কে বলেছে বাঙালী। তবে শুনেছি বাপ বাঙালী জমিদার ছিল। বাকিটা ঠিক জানি না। জানলেও বলব না। আপনি আমার ওপরওয়ালা, যদি জোর করে জানতে চান বলতে পারি। ধরা পড়লে বলব, চাকরি রক্ষার্থে বলেছি। তাহলেই দোষ খণ্ডন।

    —না, জানতে চাই না। আর শুনুন, আমি কিন্তু রাতে মেসে খাব। আমার জন্য আর বাড়িতে ঝামেলা বাড়াবেন না।

    কুম্ভ খুব মোলায়েম গলায় বলল, আপনাকে দাদার মত দেখি বলেই এত জোর গলায় কথা বলি। বাবা বলেছেন, মানুষটা ভাল। সেই থেকে ভাল মানুষ আছেন। তবে কি জানেন, এ-বাড়িতে ভাল মানুষকেই আমাদের ভয়। আপনাকে কোন কথা বলতে ভয় করে।

    অতীশ সিঁড়িতে উঠে যেতে যেতে বলল, আরে না, যত ভাল মানুষ আমাকে আপনারা ভাবছেন, আসলে আমি তত ভাল নই। শেষে নিজের কাছেই জবাবদিহি করার মত বলল, কি ছোটবাবু ঠিক না! তুমি আড়ালে চলে যাচ্ছ কেন। সামনে এস। আমি ঠিক বলিনি!

    অতীশ দেখতে পেল তার পাশে পাশে ছোটবাবু লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে। ছোটবাবু একটা ক্রস কাঁধে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে টুইন ডেকে উঠছে। পেছনে পেছনে বনি উঠে আসছে। পাশে সেই বুড়ো মানুষ—হাত তুলে দিগন্ত প্রসারিত সমুদ্র দেখিয়ে বলছেন, ইউ উইল কেরি দিস ক্রস।

    অতীশ ছোটবাবুকে প্রশ্ন করল, সেটা মানুষের কতদিন।

    ছোটবাবু বলে যাচ্ছে যেন, আজীবন অতীশ। আজীবন এই ক্রস বহন করে যেতে হয়।

    অতীশ সাহস পেয়ে গেল। এই করে সে তার সাহস ফিরিয়ে আনে। সে তখন আবার স্বাভাবিক, সাধারণ মানুষ। কেউ একজন পাশের ঘর থেকে বলল, ফিরলেন?

    —এই ফিরলাম।

    —তাস খেলবেন? পার্টনার পাচ্ছি না।

    অতীশ হেসে বলল, খেলব। তবে শিখিয়ে নিতে হবে।

    —ধুস। আপনি মশাই তবে কি!

    অতীশ বুঝতে পারল, তাঁর সমবয়সী এই যুবকটি আজ অফিস কামাই করেছে। সে যখন বের হয়, তখন সিঁড়িতে দেখেছে শ্যামলা রঙের একটা মেয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এই যুবকের ঘরে ঢুকে গেল। কলেজে পড়ে-টড়ে বোধ হয়। হাতে বই খাতা। মেয়েটি এখন না থাকায় নিঃসঙ্গ বোধ করছে। তাকে তাস খেলতে বলছে। তাস খেলা জানে না বলে, উজবুক ভেবেছে। সে যুবকের নাম জানে না। আলাপ করে নাম জেনে নেবার মানসিকতাও তার গড়ে ওঠেনি। ফলে সে দেখেছে, মানুষের সঙ্গে কিছুতেই তার দূরত্ব ঘুচতে চায় না। সে যেখানেই গেছে নিঃসঙ্গ এবং একা হয়ে পড়েছে। এবারে সে ভাবল, এগুলো ভাল লক্ষণ না। এখানকার জীবনও যে তার কাছে সেই অনিশ্চিত সমুদ্র যাত্রার মত। এখানেও সে চায় কোনো মৈত্রদা তার পাশে থাকুক। সারেঙসাব থাকুন। মাথার ওপর কেউ না কেউ বিশাল বৃক্ষের মত দাঁড়িয়ে থাকুক জীবনভর। এখানে একমাত্র মানসদাই যেন কিছুটা বৃক্ষের মত। কিন্তু গতকাল সে যা দেখেছে তারপর এই মানুষের ওপর কতটা নির্ভর করতে পারবে সে ঠিক বুঝতে পারছে না।

    অতীশ গলা বাড়িয়ে বলল, আপনার নামটা জানা গেল না।

    —জয়ন্ত চক্রবর্তী। জয়ন্তু বলে ডাকবেন। এখানে সবাই চক্রবর্তী বলে। এটা আমার ভাল লাগে না।

    —রাজার অফিসেই আছেন?

    —ওরে বাপ, মরে গেলেও না। আমার বাবা করতেন। আমরা কেউ করি না। বাবা আমার রাজার আতঙ্কেই অকালে মরে গেলেন। আসলে এদের মুশকিল কি জানেন, এরা ভাবে তাদের ছেড়ে গেলে আর কোথাও কেউ কাজ করতে পারবে না। বাপের মত বেটারাও ভিক্ষা চাইতে আসবে।

    অতসব কথা অতীশ শুনতে চায়নি। শুধু সামান্য অন্তরঙ্গ হবার জন্য দুটো একটা কথা বলা। ছেলেটি খুব খোলামেলা কথা বলছে। আরও বলত, কিন্তু হাত মুখ ধুয়ে এখন কিছু খাওয়া দরকার। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। মেসবাড়িতে ন’টায় খাবার দেবে। এর আগে সামান্য কিছু খেয়ে না নিলে খিদেয় কষ্ট পাবে ভাবল। গাড়িবারান্দায় আলো জ্বলে উঠেছে। রাজপ্রাসাদে আলো, নতুন বাড়ির একটা দিকে আলো জ্বলছে। অন্য দিকটা অন্ধকার। নিচে সব অফিস ফেরত মানুষ যে যার ঘরে ঢুকে যাচ্ছে।

    অতীশ বাথরুমে স্নান করে নিল। ঘরে এসে তোয়ালে মেলে দেবার সময় দেখল, জয়ন্ত বারান্দায় রেলিঙে ভর করে কি দেখছে। নাকে রুমাল চাপা এবং সেও একটা পচা গন্ধ পেল। নিচ থেকে খুপরি ঘরগুলোর বাচ্চাদেরও সোরগোল আসছে। সে বলল, কী বিশ্রী পচা গন্ধ!

    —আরে বাইরে এসে দেখুন। মানুষের লাশ। কে গায়েব করে রেখেছিল।

    এমন নিরাসক্ত গলায় জয়ম্ভ কথাটা বলল, যেন এটা কোনও ঘটনাই নয়। সে দৌড়ে বারান্দায় বের হয়ে গেল। দেখল তিন চাকার আবর্জনা টানার টিনের একটা গাড়িতে এ-বাড়ির জমাদার বস্তা ঢেকে কি নিয়ে যাচ্ছে। পেছনে এক দঙ্গল লোক।

    অতীশ মানুষগুলোর কৌতূহল দেখে বুঝল, জয়ন্ত ঠাট্টা করছে। এতটুকু গাড়িতে মানুষের লাশ যায় কি করে। কুকুর বেড়াল মরেছে। সে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে ঘরে ফিরে এল।

    জয়ন্ত ওখান থেকে বলল, বিশ্বাস হচ্ছে না! এ বাড়িতে আপনি আসার সঙ্গে সঙ্গে একটা ভ্রূণ হত্যা হয়েছে। লক্ষণ ভাল না।

    অতীশ বলল, তার মানে!

    জয়ন্ত বলল, ভালবাসার দান এখন আঁস্তাকুড়ে। পচে ঢোল।

    অতীশ কেমন বিমর্ষ হয়ে গেল। এই ঘটনার সঙ্গে তার আসায় একটা সম্পর্ক খুঁজছে জয়ন্ত। সে বলল, হত্যাকারী ধরা পড়েছে?

    —না। প্রাইভেট অফিসে এই নিয়ে ঝামেলা গেল। আমার ডাক পড়েছিল।

    —কেন?

    —যদি জানি। যদি কোন ক্লু দিতে পারি। আসলে এটা তো আর রাজার বাড়ি নেই। চারপাশটা দেখুন বস্তির মত। ঐ ঘেরাটা দিয়ে রাজা সতীত্ব বাঁচাচ্ছে। কতদিন চলে দেখা যাক। এখন বাড়িতে যত যুবতী মেয়ে আছে ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করালেই সব ধরা যায়। ওতে কারো গরজ নেই। তখনই কুম্ভবাবু নিচে ছুটে আসছে। হস্তদন্ত হয়ে সিঁড়িতে উঠছে।

    —দাদা শুনেছেন কাণ্ড?

    —এই ত নিয়ে গেল।

    —বলেন, এ-বাড়িতে কারো থাকতে ইচ্ছে করে। বাড়িটাকে রেণ্ডিপাড়া করে ছাড়লি!

    অতীশ বলল, এতে উত্তেজিত হবার কি আছে!

    —নেই বলছেন! তা হলে নেই। সে উঠে পড়ল। তারপর কেমন উত্তেজিত গলায় বলল, কোথায় ও-সব পয়দা হয় জানা আছে। হাত দিতে পারছি না। যখন দেব না রাজার বাড়ি উল্টে যাবে।

    অতীশের কানে লাগছিল কথাগুলো। বলল, কুম্ভবাবু বসুন। চা আনান কাউকে বলে। কিছু খাবার। অতীশ টাকা বের করে দিল।

    কুম্ভবাবু বেশ প্রফুল্ল হয়ে গেল। এ-বাড়ির সবার ওপর খবরদারি করার একটা হক আছে তার। সে রেলিঙে ঝুঁকে ডাকল, দেখত, অফিসে কে আছে নকুল। কালীদা পঞ্চানন যেই থাকুক পাঠিয়ে দিবি। নতুন ম্যানেজারবাবুর চা মিষ্টি আনতে হবে।

    চা মিষ্টি খাবার পর কুম্ভবাবু বলল, যাই দাদা, কাল মোহনবাগান ওয়াড়ি খেলা আছে। যাবেন নাকি! টিকিটের জন্য ভাববেন না। কাবুলবাবুকে ধরলেই হবে। রাজার মেম্বারশিপের কার্ড আছে। কাবুলবাবুর আছে। ওকে ধরলে দুটোই পাওয়া যাবে।

    অতীশ দেখল, এই মানুষ কিছুক্ষণ আগে ভেবেছিল, সমাজ সংসার রসাতলে গেল, এই মানুষ সিঙারা মিষ্টি খেয়ে কাল খেলা দেখবে ভেবে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। এই মানুষ তার অফিসে তার পরেই জায়গা দখল করে আছে। বছর চারেক হল কাজ করছে। কাজ বোঝে ভাল। আসলে অফিসে সে ওপরওয়ালা না এই কুম্ভবাবু পরে বোধ হয় টের পাওয়া যাবে। অতীশ এ-মুহূর্তে এই নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করা পছন্দ করছে না। এখন তার মনের মধ্যে সেই রহস্যময়ী নারী—কোথায় কখন, কবে কত দূরে কোন অতীতে, তবু এত পরিচিত, যেন কতকাল আগে সে শৈশবে এই মুখটা মনে মনে লালন করেছিল—অথচ মনে করতে পারছে না।

    তখন কুম্ভবাবু বলল, আপনি খাবেন না শুনে বাবা খুব কষ্ট পেয়েছেন। মেসের খাওয়া আপনার সহ্য হবে!

    —সে হয়ে যাবে।

    —শুনছি ত আপনার কোয়ার্টার ঠিক হচ্ছে।

    —আমার কোয়ার্টার!

    —আরে দাদা আপনি খুব গুড বুকে আছেন। চালিয়ে যান। কোথায় যে আপনি সুতো টেনে রেখেছেন কে জানে। আমি একটা আলাদা কোয়ার্টার চাইলুম, কিছুতেই রাজাকে রাজি করানো গেল না। পাশের একটা বাড়তি ঘর দিয়ে দায় চুকিয়ে দিল।

    অতীশ কিছুই শুনছে না। সে কি ভেবে কিছুক্ষণ আচ্ছন্ন থাকার পর বলল, আমি তো কোয়ার্টারের কথা বলিনি কুম্ভবাবু। কারটা আমার ঘাড়ে চাপাচ্ছেন দেখুন!

    কুম্ভবাবু বেঁটে গোলগাল চেহারার মানুষ। মাথায় ঘন চুল, রং ফর্সা। পাতলুন পরনে। জরির কাজ করা পাঞ্জাবি গায়ে। বাপের মত সৌখিন। কেবল কানে এখনও আতর মাখানো তুলো গোঁজা নেই। বয়স বাড়লে হবে। অফিস থেকে ফিরে স্নান-টান সেরে এসেছে। গলায় ঘাড়ে পাউডার। বেশ সুগন্ধ ছড়াচ্ছিল। সে এখন ঘরটা দেখছে। দোতলায় এটা এখন রাজার গেস্ট-হাউস। বাইরের কেউ এলে থাকে। কুম্ভ এ-ঘরটায় অনেকদিন আসেনি। অতীশ আসায় এ-ঘরটায় আবার আসার সুযোগ পেয়েছে। সে পায়ের ওপর পা রেখে বলল, এ শর্মা দাদা না জেনে কিছু বলে না।

    এ-বাড়ির ওপর অতীশের কৃতজ্ঞতায় মনটা কেমন ভরে গেল। নির্মলা এলে সে এত ভয় পাবে না। নির্মলাও এখন তার কাছে বড় বৃক্ষের মত। মিণ্টু টুটুল সে। আসার সময় মিণ্টু টুটুল ঘুমিয়েছিল। ফুটফুটে দুটো শিশু জানেই না তাদের বাবা একা পড়ে গিয়ে কত অসহায় বোধ করছে। ভয় পাচ্ছে। এবং যা হয়ে থাকে, তাকে একা পেলেই সেই প্রেতাত্মা গন্ধ ছড়ায়। অফিসে আজ প্রথম গন্ধটা পেয়েছিল। এবং যা করে থাকে, সে এক গাদা ধূপকাঠি কিনে এনেছে। ধূপকাঠি জ্বালিয়ে রাখলে অতীশ দেখেছে গন্ধটা কেমন ক্রমে মরে আসে! সে নিজেই এভাবে আত্মরক্ষার উপায় বের করে নিয়েছে। প্রথম প্রথম সহসা কখনও এভাবে ঘরে ধূপকাঠি রাশি রাশি জ্বালিয়ে দিলে নির্মলা বিস্মিত হয়ে বলত, করছ কি! একটা-দুটো জ্বালাও। এত জ্বালাচ্ছ কেন। লোকে তো পাগল বলবে।

    অতীশ নির্মলার কথায় তখন ক্ষেপে যেত। গন্ধটা ছড়ালেই তার মাথা কেমন ঠিক থাকে না। চোখ লাল হয়ে যায়। কথা কম বলে। চুপচাপ বসে থাকে। কেউ কিছু বললেই, চিৎকার করে ওঠে। নির্মলা বুঝতে পারে না কেন এমন হয়, মাঝে মাঝে বিভ্রমে পড়ে গিয়ে কেঁদে ফেলে। আর তখনই অতীশের কি হয়ে যায়। সে নির্মলার প্রতি অহেতুক নিষ্ঠুর আচরণ করছে ভাবে। বলে তুমি ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন। মাঝে মাঝে আমার এটা হয়। কিসের গন্ধ পাই। খেতে পারি না। ধূপকাঠি জ্বেলে দিলে স্বস্তি পাই।

    ধূপকাঠি জ্বেলে দিলেই সে আবার ভাল হয়ে যায়। মনের সব ধন্দ ঘুচে যায়। নাক টেনেও তখন আর কোনও গন্ধ পায় না। আজ অফিসে গন্ধটা পাবার পরই সে খুব বিচলিত বোধ করছিল। ফেরার পথে এক ডজন ধূপকাঠি কিনেছে। গাড়িতে প্রেতাত্মার গন্ধটা ভুরভুর করছিল। চোখ লাল হয়ে উঠছিল। পারলে গাড়িতেই যেন সে ধূপকাঠি জ্বালাত। কিন্তু এতে কুম্ভবাবু মাথায় গোলমাল আছে ভাবতে পারে। সেজন্য ধূপকাঠি নাকের কাছে নিয়ে বসে ছিল। আর কখন গন্ধটা নিজ থেকেই উবে গেল। এমন ত হয় না। কখন হল এটা। রাজার দেউড়িতে আসতেই সেই রহস্যময়ী নারী—সে কে? সে এখন রাজার ঘরণী—আগে কি ছিল, কোথায় ছিল, তখনই গন্ধটা বুঝি ভয়ে উড়ে গেছে।

    কুম্ভবাবু বলল, কি ভাবছেন। গল্পের প্লট?

    —না, না।

    —বৌদিকে ফেলে এসে মন খারাপ?

    অতীশ হাসল। বলল, তা বলতে পারেন। রমণীরা ভারি তুকতাক জানে, কোথাকার কে, অথচ দেখুন কেমন মৌরসী পাট্টা গেড়ে বসে গেল। তাকে ফেলে এক-পা নড়া যায় না। কোথাও গেলেই মন কেমন করে।

    —ভাববেন না। কোয়ার্টার পেয়ে যাচ্ছেন। শুনছি তো অন্দরের পাশেই আপনার কোয়ার্টার দেওয়া হবে।

    অতীশের বুকটা ছাঁত করে উঠল। ওদিকটা ত খুব রেসট্রিকটেড জোন। নির্দিষ্ট কিছু আমলা যেতে পারে। বয়বাবুর্চিরা যেতে পারে। জমাদার, পুরনো পাইক বরকন্দাজ যেতে পারে—যারা গতকাল তার সঙ্গে দেখা করে গেছে তারাই রাজবাড়ির সব হালচাল বলে গেছে। ভুলেও ওদিকটা মাড়াবেন না। কৈফিয়ত তলব হবে। খাস খানসামার খুব লাগানো ভাঙানোর স্বভাব।

    এ-বাড়ির কিছু কিছু গোপন খবর খুব সহজেই চাউর হয়ে যায়। কিছু কিছু গোপন খবর দু- একজনের কানে আসে আর অতি গোপন খবর কেউ জানতে পারে না। কুমার বাহাদুর বৌরাণী আর নির্দিষ্ট কিছু আমলা শুধু জানে। কুম্ভ কিছু কিছু গোপন খবর পায়। রাধিকাবাবু পুত্রদের কন্যাদের এই গোপন উৎসের মুখ খুলে দিয়ে প্রমাণ করেন, রাজার তিনি কত বিশ্বস্ত লোক। কুম্ভ বড় হয়ে এটা টের পেয়েছে। বাবার কাছ থেকেই সে জানে, কুমার বাহাদুর বলেছেন, অতীশকে ভাল দেখে একটা কোয়ার্টার দিন। ওর যাতে কোন অসুবিধা না হয় দেখুন।

    বিকেলে বাসায় ফিরেই কুম্ভ সব শুনেছে। শুনেই সে ক্ষেপে গিয়েছিল। আসতে না আসতেই কোয়ার্টার। আমরা ভেসে এসেছি। তবে তার বাবা রাধিকাবাবু রাজার সুপার, সোজা কথা? সে ভাবতে গর্ব বোধ করে। সে বলল, বাবাই কুমার বাহাদুরের কাছে কথাটা তুললেন। অতীশের খুব অসুবিধা হচ্ছে। একা, থাকে কোথায়, খায় কি, কে দেখে? মেসে খেলে অজীর্ণ রোগে ভুগে মারা পড়বে ছেলেটা।

    অতীশ শুনে যাচ্ছিল।

    কুম্ভ বলল, বাবা আপনার খুব সুখ্যাতি করেছেন কুমারবাহাদুরের কাছে।

    অতীশ বলল, আগেকার দিনের মানুষদেরই এই স্বভাব। খুঁটিয়ে দেখে না। ভাল লাগলেই ভাল বলে ফেলে। আমার বাবাকেও দেখেছি এরকমের।

    কুম্ভ বলল, বাবাই কুমারবাহাদুরকে কোয়ার্টারের কথা বললেন। কিন্তু এরা একদম পিচাশ জানেন। থাকলেও দেবে না। কুমারবাহাদুর বলল, কোয়ার্টার কোথায়। ফাঁকা তো একটাও নেই। কিন্তু বাবার সঙ্গে পারবে কেন? বললেন, সোজাসুজি বললেন, দেখুন কুমারবাহাদুর কাজ ভাল চাইলে তাকে সুযোগ-সুবিধা দিতেই হবে। সারাদিন কাজের পর যদি নিজের পরিজন নিয়ে একটু থাকার জায়গা না পায় তো মন দিয়ে কাজ করবে কেন!

    অতীশ এবার প্রশ্ন না করে পারল না, রাজেনদা কি বললেন?

    —এরা কিছু বলতে চায় দাদা? এদের মুখ থেকে কথা খসিয়ে নিতে হয়। বাবা ঠিক খসিয়ে নিয়েছেন। নিধিবাবুর কোয়ার্টার ফাঁকা।

    —নিধিবাবুটা কে?

    —নিউবেঙ্গল টাইপ ফাউন্ড্রির ম্যানেজার। রিটায়ার করেছেন মাস দুই হল। কুমারবাহাদুরের বাবার আমলের লোক। ইদানীং চোখে দেখতে পেতেন না। আশির কাছাকাছি বয়েস। মহারাজার খুব বন্ধুলোক ছিলেন।

    কুম্ভকে এখন অন্যরকম লাগছে। এরা তার ভাল চায়।

    কুম্ভর বাবার প্রতি অতীশের মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। আসলে বাবার সঙ্গে আলাপ ছিল বলেই হয়ত তাকে খুব স্নেহ করছেন। সে রাতে খাবে না বলায়ও কষ্ট পেয়েছেন। আগেকার আমলের মানুষ বলেই এটা হয়। আজকাল মানুষের মধ্যে এসব গুণ একেবারেই নেই। অতীশের বলার ইচ্ছা হল, আপনার বাবার এ ঋণ শোধ করতে পারব না। কি বলে এখন সে যে কৃতজ্ঞতা জানাবে তার বাবাকে! কিন্তু তার আছে আশ্চর্য এক স্বভাব, সে কিছুতেই খুব বিগলিত হয়ে যেতে পারে না। বিন্দুমাত্র কাউকে তোষামোদও করতে পারে না। কখনই সে ভেতরের কথা প্রকাশ করতে পারে না। সংকোচে পড়ে যায়। সে তখন আবার চুপচাপ বসে থাকে।

    কুম্ভ বলল, কোয়ার্টার পেলে খাওয়াবেন। কত বড় খবর। রাজার খুব নিজের লোক না হলে এখানে কোয়ার্টার মেলে না। আপনি আসতে না আসতেই তার নিজের লোক হয়ে গেলেন। ঈর্ষা হয়।

    তারপর কুম্ভ উঠে যাবার সময় বলল, কি খেলা দেখছেন ত?

    অতীশ হেসে বলল, কাল থাক। আর একদিন যাওয়া যাবে।

    কুম্ভ উঠে যাবার সময় ভাবল, বড়ই নীরস লোক। খেলাতে পর্যন্ত উৎসাহ নেই। কি ভাবে লোকটা সব সময়! এত আচ্ছন্ন থাকে কেন! কিছু একটা রহস্য আছে। জাহাজে কাজ করত। স্বভাব-চরিত্র ভাল থাকার কথা না। মেয়েমানুষ ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে বড় রকমের অসুখ বাধিয়েছে। শরীরে ঘা ফুটে বের হলে টের পাওয়া যাবে। এবং সে বের হবার মুখে যাতে ক্ষত ফুটে বের হয় সেই প্রার্থনাই করল ভগবানের কাছে। তারই কথা ছিল, শিট অ্যানড মেটাল প্রিন্টিং পাবলিক লিমিটেডের ম্যানেজার হবার। কিন্তু এত করেও রাজার বিশ্বাস অর্জন করতে পারল না। মনে মনে ভারি আফসোস। কোথা থেকে উটকো লোক রাজা যে ধরে আনল।

    সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে কুম্ভর মাথা গরম হয়ে গেল; যত নামছে, তত গরম হচ্ছে মাথা—সে শেষ পর্যন্ত হেরে গেল। কি না করেছে সে, আগের ম্যানেজারের বাড়ির ছবি তুলে এনে দেখিয়েছে, দেখুন টাকা আপনার কোথায় যায়! কাস্টমারদের ধরে নিয়ে গিয়ে বলেছে, কি পারশেন্টেজে কাজ হয় দেখুন। যতটা ঘটেছিল তার চেয়ে বেশি বানিয়ে বানিয়ে সে প্রথম তার বাবা ওরফে রাধিকাবাবুর মারফত রাজার কান ভারি করেছে। বলেছে, এটা আপনার গোল্ড মাইন। নজর দিন। আপনার পূর্বপুরুষের স্বার্থ রক্ষা করুন। চার বছরে অক্লান্ত খেটে সে কোম্পানীর খুঁটিনাটি বিষয় রপ্ত করেছে। প্রিন্টিং থেকে ফেব্রিকেশনে, কোথাও এতটুকু খুঁত থাকলে ধরতে পারে, শোধরাতে পারে। একাউণ্টস তার নখদর্পণে। সেলট্যাকস, ইনকামট্যাকস সে নিজে করতে পারে। ক্যাশ, লেজার, ব্যালেন্সশীট তার কাছে এখন জলভাত। এক আশাতেই সে এতদূর দৌড়ে গেছে। এখন কি না এই হারামজাদা ঘুঘু লোকটা তার বাড়াভাতে ছাই দিয়েছে। গত রাতে পৃথিবীতে সেও আর এক মানুষ যে বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছে। এসে গেছে শুনেই তার হৃৎপিণ্ডে কে যেন আগুন নিক্ষেপ করেছিল। সে স্থির থাকতে পারে নি! ছট-ফট করেছে সারারাত। সকালের দিকে ঘুম চোখে লেগে এসেছিল। ঘুম ভাঙলে দেখেছিল, হাসিরাণী ঘরে নেই। কাবুলকে দেখার জন্য ঠিক জানালায় পালিয়ে গেছে। তাহলে বল বাবু আমি তোমাকে ক্ষমা করব কেন। তুমি যত ভালমানুষই হও, আমি তোমাকে নরকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করব। আমি তো মানুষ।

  • ছয়

    ছয়

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    ছয়

    সুরেন জানালায় উঁকি দিয়ে অবাক হয়ে গেছে। আটটা বেজে গেছে কখন, এখনও ঘুমাচ্ছে। সাদা চাদরে ঢাকা শরীর। চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন তিনি। ফুল স্পিডে পাখা চলছে। সাদা সাদা ছাই উড়ছে ঘর ভর্তি। রোদ এসে পড়েছে জানালায়। জানালার একটা পাট সামান্য খোলা, সে উঁকি দেবার সময় পাটটা ঠেলে দিল। দরজা বন্ধ দেখে প্রথমে অবাক হয়ে গেছিল—তিনি কি ভেতরে নেই! দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে ভেবেছিল, ভেতরেই আছেন। এত বেলায় দরজা বন্ধ করে কি করছেন। কিন্তু তার শিরে শমন। অন্দরে ডাক পড়েছে। সে বৌরাণীর মেজাজ জানে। এক্ষুণি ডেকে নিয়ে না গেলে, তার কৈফিয়ত তলব হবে। দরজা বন্ধ যখন জানালায় উঁকি দেওয়া যাক—কিন্তু যদি মানুষটার জপ-তপের অভ্যাস থাকে—তা ভঙ্গ হলে ক্ষেপে যেতে পারেন। তবু খুব সাহস করে জানালায় উঁকি দিতেই অবাক। আবছা মত একটা ছায়ামূর্তি বিছানায় পড়ে আছে। জানালা ঠেলে দিতেই স্পষ্ট দেখল, তিনি চিত হয়ে শুয়ে আছেন। চাদরে গলা পর্যন্ত ঢাকা। হাওয়ায় চুল ঝড়ের মত উথাল-পাতাল হচ্ছে। তিনি ঘুমাচ্ছেন। তারপরই কেমন শঙ্কায় বুক কেঁপে গেল। এভাবে মানুষ ঘুমায় না। মরেটরে যায়নি তো। আজকাল আকছার এই শহরে কত রকমের অপমৃত্যু ঘটছে। কাল বিকেলে একটা লাশ পাওয়া গেছে, আবার কি আজ সকালে আর একটা লাশ বের করা হবে। প্রায় তার পা ঠকঠক করে কাঁপছিল। তখনই সে চিৎকার করে উঠল: অ নতুনবাবু, নতুন বাবু অন্দরে আপনাকে নিয়ে যেতে বলেছে।

    অতীশ অনেক দূর থেকে যেন শুনতে পাচ্ছে তখনও, ও ছোটবাবু ছোটবাবু আর কতদূর। আমরা আর ডাঙা পাব না? দু’দিন হয়ে গেল!

    দরজায় খুটখুট শব্দ, তারপর সজোরে কেউ দরজায় ধাক্কা মারতেই সে ধড়মড় করে উঠে বসল। দেখল, জানালায় সুরেন। আরও কেউ কেউ বারান্দায় দাঁড়িয়ে। সে উঠে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিল। মানসদা, সেই ছেলেটা, আরও দু-একজন। মানসদা চটেই গেলেন, তুমি কি মানুষ না! এত বেলায় লোকে ঘুমোয়! তোমার চোখ-মুখ ভাল না বাপু। তোমাকে বিশ্বাস নেই।

    অতীশ খুব লজ্জায় পড়ে গেছে। এত বেলা হয়েছে সে টের পায়নি। সারারাত সে ধূপকাটি জ্বালিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, কখন সে ঘুমিয়ে পড়েছিল জানে না। সে সারারাত হিজিবিজি সব স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্ন দেখলে তার ভাল ঘুম হয় না। সকালে কেমন অবসাদ লাগে। সে একবার সকালে জেগেছিল, তারপর অবসাদ বোধ করতেই আর একটু গড়াগড়ি দিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। এত বেলা হয়ে গেছে সে ঘুণাক্ষরে টের পায়নি।

    সে দরজা খুলতেই সুরেন ওকে সেলাম দিল। এ-বাড়িতে এ-সব রেওয়াজ এখনও চালু আছে। সে তো খুব বড় কাজ করে না এদের। মাঝারি সাইজের কর্তা-ব্যক্তি। তার আর কুমারবাহাদুরের মাঝখানে একজন বুড়ো মত অফিসার আছেন। কলকারখানার সাধারণ সমস্যা সংক্রান্ত কথাবার্তা সব তারই সঙ্গে সারতে হবে বলে কুম্ভবাবু জানিয়েছে। এখন সুরেনের কথাবার্তা শুনে সে খুবই চমকে গেল। তার অন্দরে ডাক পড়েছে। কে ডাকছে কেন ডাকছে এত সব প্রশ্ন করার ক্ষমতা তার নেই। বোধ হয় সুরেনেরও জানার কথা নয়। সে তাড়াতাড়ি কি করবে ভেবে উঠতে পারছে না। বিছানার চাদর ঠিকঠাক করতে গিয়ে দেখল মানসদা তার দিকে সংশয়ের চোখে তাকিয়ে আছেন। সে বলল, কি হল মানসদা?

    —তোমার সাহস দেখছি। তুমি যেন গ্রাহ্যই করছ না।

    —হাতমুখ না ধুয়ে যাই কি করে!

    —তাড়াতাড়ি কর। এই সুরেন বেটা দালাল, বলগে যা, যাচ্ছে। এক্ষুণি ঘুম থেকে উঠল।

    অতীশ মুখে পেস্ট নিয়ে বলল, আমাকে ডাকছে কেন সুরেন?

    —বাবু আমরা নফর মানুষ। অত জানলে এখানে আমাদের রাখবে কেন বলুন।

    মানসদা, জয়ন্ত বিছানায় বসে পড়েছে ততক্ষণে। জয়ন্ত ঘরটা দেখছে। অজস্র পোড়া ধূপকাঠি ছড়ানো ছিটানো। ঘরটা নোংরা হয়ে আছে। ঘুমের ঘোরে সে নিজের ঘরেও সুগন্ধ আতরের মত কিছুর গন্ধ পেয়েছে। একবার সে বিছানা ছেড়ে উঠবে ভেবেছিল—গন্ধটা কোত্থেকে আসছে। এবাড়িতে এখানে সেখানে দুর্গন্ধ উঠছে কবে থেকে, সুগন্ধ থাকার ত কথা নয়। এখন বুঝতে পারছে এটা অতীশবাবুর কাণ্ড। শোবার সময় গুচ্ছের ধূপকাঠি শিয়রে জ্বালিয়ে রাখে। সে মানসদার দিকে তাকিয়ে বলল, প্রায় আপনার জুড়িদার।

    মানসদা কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলেন। তাঁর ঘরে মাঝে মাঝে তালা মেরে যায় কেউ। সে এত ভাল থাকার চেষ্টা করে, কারো কোন অপকার করে না, কেবল মাঝে মাঝে তার কি হয়—সে চিৎকার করতে থাকে—ও কি গন্ধ! পচা টাকার গন্ধ! ঘরের মধ্যে সে তখন ছুটে বেড়ায়।

    —তোমরা পচা টাকার গন্ধ পাচ্ছ না। অহ কি গন্ধ! টেকা যাচ্ছে না। কোত্থেকে আসছে গন্ধটা। পুলিশে খবর দাও। সব অসুখে পড়ে যাবে। মহামারী শুরু হয়ে যাবে।

    অতীশ বাথরুমে বলে জয়ন্তর কথা শুনতে পায়নি। সে এসে দেখল, তখনও সুরেন দাঁড়িয়ে আছে! অতীশ মুখ মুছে বলল, তুমি যাও। আমি যাচ্ছি।

    —চিনবেন না বাবু।

    আসলে সুরেন সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইছে। সে ভাবল, এমন কি করেছে, যার জন্য তার অন্দরে ডাক পড়েছে। এটা তার কাছে খুবই অস্বাভাবিক ঠেকছে। এরা বনেদী জমিদার বংশ। এখনও যা আছে যেমন ধরা যাক কলকাতার ওপর ত্রিশ-বত্রিশ বিঘে নিয়ে এই বাড়ি, কাঠাপিছু দাম কুড়ি হাজার টাকা করে হলে, কি দাম হয় এবং কলকাতায় এমন আছে অনেক অট্টালিকা, দেশে বিশাল দেবোত্তর সম্পত্তি এবং শহরের কিছু এলাকা এখনও ইজারা দেওয়া আছে। সবই উড়ো খবরের মত তার কানে এসে ঢুকেছে। বাইরে থেকে এদের বৈভব এখন ঠিক বোঝা যায় না। ভিতরে ঢুকলে বোঝা যায়, বৈভবের অন্ত নেই। অন্দরের নিয়মকানুন লঙ্ঘন করা যায় না। পর্দা ঢাকা গাড়ির চল সেদিনও ছিল নাকি। এ-বাড়ির রাজকন্যাদের মুখ বৌরাণীদের মুখ কেউ দেখেছে কখনও এককালে বিশ্বস্ত আমলারাও বলতে পারত না। এখন অবশ্য এতটা বোধহয় বেড়াজাল নেই। অতীশ জামা প্যাণ্ট পরতে পরতে বলল, মানসদা, কেন যে ডাকছে, বুঝছি না।

    মানসদা পরেছেন পাজামা পাঞ্জাবি। তার চা এসেছে। তিনি বললেন, চাটা দু’ভাগ করে দাও। অতীশ চা পেয়ে খুব বিগলিত হয়ে গেল। চা খেতে খেতে বলল, মানসদা বসুন, আমি ঘুরে আসছি। সে এটাচি খুলে একটা পাট ভাঙা রুমাল পকেটে গুঁজে নিল। তখন মানসদা বলল, ঘাবড়ে যাচ্ছ খুব দেখছি। মাথার চুলটা আঁচড়ে নাও। এত স্বাভাবিক এবং ভাল মানুষ মানসদা, তার ঘরে তালা ঝোলে কেন। মানসদার চোখ নীলচে রঙের উজ্জ্বল। এতটুকু অস্বাভাবিকতা নেই চোখে মুখে। এ-মুহূর্তে মানসদাকে তার পৃথিবীর একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানুষ মনে হচ্ছে। এই মানুষটি সম্পর্কে কুম্ভ কোনও খবর দেয়নি। কুম্ভ রাজবাড়ির এত খবর রাখে, অথচ এই মানুষটি সম্পর্কে যেন কিছুই জানে না। সে বের হবার মুখে মানসদা বলল, আমি ঘরে তালা দিয়ে দিচ্ছি। এসে চাবিটা নিয়ে নিও।

    অতীশ সিঁড়িতে নামতে নামতেই হাত তুলে দিল। সিঁড়ির মুখে ছোট্ট লন। কাঁটা তারের বেড়া। মাঝে ছোট গেট। ওপরে মাধবীলতার ঝাড়। সে লম্বা বলে মাথা এখানটায় নুইয়ে ঢুকল। লন পার হয়ে লম্বা বারান্দার ওপর বড় বড় সেকালের পেল্লাই দরজা। বার্মা টিকের। যে কোনও দরজা দিয়ে সামনের মারবেল পাথরের মেঝে দেখা যায়। সুরেন একটা দরজায় তার জন্য অপেক্ষা করছে। অতীশকে বলল, আজ্ঞে এখানে বসুন। শঙ্খ এসে আপনাকে নিয়ে যাবে।

    সেই বড় বসার ঘরটা। মাঝখানে কার্পেট পাতা। সোফা নেই। কোণায় কোণায় বসার জন্য আলাদা ডিভান। এই ঘরটা এত বড় যে ও পাশে একটা লোক বসে ন্যাতা মারছে সে টেরই পায় নি। দু’দিন ধরে যতবার সে এই প্রাসাদে ঢুকছে, লোকটাকে দেখেছে, জল আর ঝাড়ন নিয়ে ঘরদোর সাফ করে যাচ্ছে। এ-প্রাসাদে লোকটা বুঝি সারাদিন এই একটা কাজই করে। হাবা-গোবা মুখ। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পরনে ছেঁড়া খাঁকি হাফপ্যাণ্ট শতচ্ছিন্ন গেঞ্জি গায়ে। অতীশ ঘরে কেমন একটা বিদেশী আতরেরও গন্ধ পাচ্ছে। সকালেই বোধহয় এই প্রাসাদের নিয়ম সারা ঘরে দামী আতর স্প্রে করে দেওয়া। বাইরে থেকে গন্ধটা পাওয়া যায় না। যত ভিতরে ঢোকা যায় গন্ধটা তত প্রবল হয়।

    ঘড়িতে দেখল, সাড়ে আটটা বেজে গেছে। ঘরের এখানে সেখানে কাঁচের জারে সব রকমারি ঘড়ি, কোনটা সাড়ে আটটা বাজায় বেহালার ছড় টেনে দিল, কোনটার শব্দ কাচের বলের মত গড়িয়ে গেল—কোনটা এক জলতরঙ্গ আওয়াজ তুলে নিথর হয়ে গেল। বিচিত্র এক শব্দ ধ্বনির মধ্যে দেখল রাধিকাবাবু হন্তদন্ত হয়ে এদিকে আসছেন। পেছনে নধরবাবু এবং অফিসের সেই বুড়ো বড়কর্তা, পরনে ছাই রঙের সুট, চোখে ভারি চশমা, পেছনে আরও কেউ আসছে ফাইলের পাহাড় নিয়ে। অতীশকে অসময়ে এখানে বসে থাকতে দেখে রাধিকাবাবু কিঞ্চিৎ সংশয়ে পড়ে গেল। বলল, তুমি এখানে ভাই। কুমারবাহাদুরের সঙ্গে দেখা করবে?

    অতীশ উঠে দাঁড়াল। বলল, না।

    অতীশের কথা শোনার সময় নেই রাধিকাবাবুর। তিনি চলে যাচ্ছেন। বোকার মত অতীশ কিছুটা তার সঙ্গে হেঁটে গেল। আবার যদি কিছু প্রশ্নটশ্ন করে সেই আশায়—কিন্তু রাধিকাবাবু সোজা বিলিয়ার্ড টেবিলের ধার ঘেঁষে দ্রুত হেঁটে চলে গেল। এবং সে দেখল অফিসার, কেরানী, পিয়নের একটা পল্টন লাইনবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে যাবে বলে, তারা দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরের দরজা বন্ধ। ভেতর থেকে নির্দেশ না এলে কেউ ঢুকতে পারছে না। অতীশ এটা দেখার পরই ভাবল, সে ঠিক জাগয়ায় বসে নেই। শঙ্খ এসে যদি দেখতে পায় সে নেই, তবে খবর দেবে, কোথায়, কেউ নেই ত! তবে আর এক কেলেঙ্কারী। সুরেন তাকে যেখানে বসতে বলে গেছে, তাড়াতাড়ি সেখানে গিয়ে সে বসে পড়ল। পাশে কুম্ভবাবু থাকলেও যেন এ-মুহূর্তে সাহস পাওয়া যেত।

    সেই লোকটার কিন্তু কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে জল ঝাড়ন নিয়ে বিশাল কক্ষের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ন্যাতা মেরেই চলেছে। এ-ঘরটা হয়ে গেলে পাশের ঘরে। ওটা হলে তার পাশের ঘরে। সকাল থেকে সে এই কাজটা যে কত মনোযোগ দিয়ে করে যাচ্ছে! তখনই সাদা ধবধবে উর্দি পরা একজন হাফ যুবক তাকে সেলাম দিল।

    —আসুন সাব। বলে সে তাকে বিশাল কক্ষের একটার পর একটা পার করে নিয়ে যেতে থাকল। এবং শেষে দেখল, সব রেশমী সুতায় কারুকাজ করা সাদা চাদরে ঢাকা এক আশ্চর্য বিলাস কক্ষ। মেহগনি কাঠের দেয়াল। এয়ার কণ্ডিশানড ঘর। দু’পাশের দরজা ভারি কাঁচের। সিল্কের দামী পর্দা ঝুলছে; কারুকাজ করা কাঁচের জানালায় দুটো পাখি বসে। দেয়ালে রাজপুরুষদের সব মাথা সমান বিশাল ছবি, মাথায় পাগড়ি, এবং সম্ভবত দামী বৈদূর্যমণি পাথর-টাথরের মালা গলায়। দেয়ালে ছ’-সাতজন রাজপুরুষ কোমরে তরবারি, নাগরাই জুতো পায়ে। বংশ পরম্পরায় এক একজন এসে এই দেয়ালে দাঁড়িয়ে গেছেন। রাজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী ওরফে রাজেনদার ছবিটা সে আবিষ্কার করল, উত্তরের দেয়ালে। পরিচিত মানুষটাকে এই পোশাকে দেখে সে কেন জানি ফিক করে হেসে ফেলল। তারপরই মনে হল, ঘরে কেউ নেই ত! কোনও গুপ্ত পথে তাকে কেউ দেখছে না ত! সে খুব সতর্ক হয়ে গেল। শঙ্খ ওকে বসতে বলে গেছে। কেন বসতে বলে গেছে, কে আসবে এ ঘরে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। আশেপাশে কোনও কাকপক্ষী আছে বলে টের পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু সেই দামী আতরের গন্ধটা এখানেও ভুরভুর করছে। গতকাল সে বৌরাণীকে এক পলক দেখেছিল—বড় চেনা, বড় অন্তর্গত সেই ছবি—কিন্তু সারারাত ধূপকাঠি পুড়িয়েও সে কে আবিষ্কার করতে পারে নি।

    মনে পড়ছে, একবার এমনি দৈবদুর্বিপাকের মত স্যালি হিগিনসের কেবিনে তার ডাক পড়েছিল। সে সেখানে এমনি এক সংশয় নিয়ে গেছিল। বুক কাঁপছিল। এখানেও তাই। কোনও অবিশ্বাস্য ঘটনা জীবনে ঘটে গেলে তার এই রকমের হয়। মুখে ভীতু বালকের ছাপ ফুটে ওঠে। সোফাগুলোর কভার সব দামি ভেলভেট কাপড়ের। কার্পেটে বাঘ সিংহের লাল নীল মুখ আঁকা। মাথা সমান উঁচু আয়না। কাঁচের বড় জারে শ্বেতপাথরের দুটো নগ্ন নারী মূর্তি। পরস্পর জড়িয়ে আছে। এমন একটা কক্ষে তার সঙ্গে এখন কে দেখা করতে আসছে!

    তখনই মনে হল খুব মৃদু পায়ের শব্দ। কেউ আসছে। তার উত্তেজনায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এমন এক বনেদি পরিবারে সে এই ঘরে এসে বসতে পেরেছে—তার সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য সে ঠিক বুঝতে পারছে না। পায়ের শব্দ ক্রমশ এগিয়ে আসছে। খুব নরম চটি পরে কেউ আসছে। তারপরই সে দেখতে পেল, প্রায় জাদুমন্ত্রে বিপরীত দিকের দরজার পর্দা সরে যাচ্ছে। এবং প্রায় আবির্ভাবের মত এক যুবতী নারী তার সামনে হাজির। লাল পেড়ে সাদা সিল্ক, হাতে ঢাকাই শাঁখা, কপালে বড় সিঁদুরের টিপ এবং চোখে অনেক দূর অতীতের স্মৃতি। তার দিকে অপলক তাকিয়ে বলছে, তুই কি রে, তুই চিঠির জবাবটাও দিলি না। এমন অমানুষ তুই!

    অতীশ হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। এবং ক্রমে কেমন জলের অতলে ডুবে যাচ্ছিল। কি বলবে, কিভাবে অভিবাদন করবে এবং সহজ স্বাভাবিক হতে গেলে তার এখন কি করণীয় কিছুই বুঝতে পারছে না। সে নির্বাক হয়ে গেছে। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে—চিঠি, কিসের চিঠি। রমণী তার কবে দেখা এক বালিকা যেন। সে কিছুতেই কাল রাতে মনে করতে পারে নি। সে শেষ পর্যন্ত কোথায় এসে উঠল!

    —কি রে তুই আমার কথার জবাব দিচ্ছিস না কেন? এতটুকু দেখছি স্বভাব পাল্টায় নি তোর সেই আগের মত দশটা কথা না বললে কথার উত্তর দিস না।

    এবার আর না পেরে অতীশ বলল, কিছুই বুঝতে পারছি না বৌরাণী! আমার কিছু মনে পড়ছে না।

    —তুই আসলে নিজেকে ছাড়া আর কিছু চিনলি না। খুব স্বার্থপর তুই। না হলে ভুলে যায় কেউ!

    আর তখনই অতীশের মাথার মধ্যে ড্যাং ড্যাং করে পূজার বাজনা বাজতে থাকল। ঢাক বাজছে ট্যাং ট্যাং। সবুজ ঘাস খাচ্ছে একটা মোষ। মোষটাকে কারা বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে পূজামণ্ডপে। নতুন গামছা কোমরে বেঁধে ছোটাছুটি করছে কারা। ধূপ দীপ জ্বলছে। মোষ বলির রক্ত নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে কারা। কে ছুটে এসে ওর কপালে, সেই রক্তের ফোঁটা দিয়ে গেল। সে একটা থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। সেই মুখ, সেই মুখ, সেই সেই—সে কেমন মুহ্যমানের মত বলল, তুমি অমলা!

    —অমলা কি রে? অমলা পিসি বল।

    অতীশ মাথা নিচু করে বলল, আমি জানতাম না, তুমি এ-বাড়ির বৌরাণী অমলা!

    —কে জানত। আমি জানতাম! কত নতুন ম্যানেজার আসে। আমি জানতাম তুই সেই মুখচোরা জেদি ছেলেটা! কাল এক পলক দেখেই অবাক—আরে এ যে সেই! সব ঠিক আছে। সব। কেবল লম্বায় তালগাছ হয়ে গেছিস।

    তারপর অতীশ কোনও রকমে একবার চোখ তুলে বলল, কাল আমারও মনে হচ্ছিল বড় চেনা তুমি। কবে কোথায় যেন দেখেছি? তারপর, তারপর সেই ভাঙা শ্যাওলা ধরা পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ির কক্ষের কথা ভাবতেই ওর কান গরম হয়ে গেল। এই হাত দে। দে না। কেউ দেখবে না। ফ্রক পরা এক বালিকা, চুল সোনালী, চোখ নীল এক বালিকা তাকে জাপ্টে ধরেছিল। সে এখন নারী। তার শরীর শিউরে উঠল। অমলা তার সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে যেন সামনে বসে আছে। অমলা সোফায় শরীর এতটুকু এলিয়ে দেয় নি। সোজা হয়ে বসে আছে। হাত দুটো হাঁটুর ওপর রাখা। আঙুলে বিশাল হীরের আংটি জ্বলজ্বল করছে। মাথায় সামান্য ঘোমটা, পায়ের পাতা শাড়িতে ঢাকা। অতীশের কেন জানি ইচ্ছা হল অমলা তার পা সামান্য বের করে রাখুক। সেই সুন্দর দেবী প্রতিমার মত পা দুটো তার এখন দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে।

    তারপরই অমলা কেমন আবেগে বলল, তুই এতদিন কোথায় ছিলি!

    অতীশ কত কথা বলতে পারে। কিন্তু সে এ-বাড়িতে নতুন। তার পক্ষে সব জানা সম্ভব না। অমলা ফের গোপনে ডেকে এনেছে কিনা কে জানে। এতে তো বিপদ বাড়ে। কিংবা অমলার মাথায় কোনও গণ্ডগোল ঘটে যায় নি তো। একজন সদ্য আসা যুবককে, এই অন্দরে নিয়ে আসা নিয়ে হৈচৈ হতে পারে। পারিবারিক মানসম্মানের প্রশ্ন আছে। সে বলল, অমলা তুমি ডেকেছ কেন?

    —তোকে একটু দেখব বলে।

    অতীশ এর কি জবাব দেবে! সে বলল, কমলা কোথায় আছে?

    বৌরাণীর মুখে কূট হাসি খেলে গেল। বলল, সে আছে। সে তোকে নিয়ে যেতে বলেছে।

    —ও জানল কি করে?

    —কালই ফোন করলাম। বললাম, একটা আশ্চর্য খবর দিচ্ছি কমলা। খুব অবাক হয়ে যাবি। তার ইচ্ছা হল জানতে কমলার বর কি করে। তারপর মনে হল, অমলা না কমলা—কে তাকে জাপ্টে ধরেছিল! আসলে সেই শৈশব মানুষকে চিরদিন তাড়না করে বেড়ায়। অতীশের কেন জানি আজ কমলাকেও দেখতে ইচ্ছে করছে। যা ফেলে এসেছিল, এই দেখার মধ্যে তা সে নতুন করে যেন ফিরে পাবে। সেই সুবিশাল জমিদার গৃহে সে তখন কুণ্ঠিত বালক। তার কাছে জগৎটা ছিল রূপকথার দেশের মত। অমল কমল ছিল তার জীবনে প্রথম দেখা রূপকথার রাজকন্যা। তাদের একজনকে এখানে সে দেখবে স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি। সে ভাবল, এই নতুন জীবনে এটা ভাল হল কি মন্দ হল জানে না। ওদের দু’জনকে দূরাগত কোন ছবির মধ্যে সে পেতে চেয়েছে এতদিন। এত সামনা-সামনি একজনকে পেয়ে সে কেমন ঘাবড়ে গেছে।

    অমলা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। বলছে, হাবার মত কি দেখছিস?

    অতীশ বলল, না কিছু না।

    —আমার দিকে তাকা।

    অতীশ তাকাতে পারল না।

    —তাকা বলছি।

    অতীশ বলল, আমি বুঝতে পারছি না। তোমার কি ইচ্ছে। আমাকে বিভ্রমের মধ্যে ফেলে দিও না।

    —তুই অনেক দিন জাহাজে ছিলি না রে?

    —ছিলাম।

    —অনেক দিন নিরুদ্দেশ হয়ে ছিলি?

    —ছিলাম।

    তোকে দেখলেই মনে হয় যে নাবিক হারায়েছে দিশা। তোর যেন কি হারিয়ে গেছে না রে?

    অতীশ খুব বিষণ্ণ বোধ করল।

    অতীশের এই মুখ দেখলে ভারি কষ্টের মধ্যে পড়ে যেতে হয়। অমলা সহসা উঠে কাছে এল অতীশের। শরীরে সামান্য ঠেলা দিয়ে বলল, ভয় পাচ্ছিস!

    —না!

    —মুখ এত কাতর কেন?

    অতীশ বলল, অমলা, মেজবাবুর খবর কি! সে কথা ঘোরাতে চাইল।

    —বাবা গত হয়েছেন সোনা। কথাটা বলতে গিয়ে ভেতরে কেমন অমলার কান্নার উদ্রেক হল। সে উঠে গেল জানালায়—কি দেখল, তারপর ফিরে এসে পায়ের ওপর পা তুলে বসল। একটা মাছি ভনভন করে উড়ছিল। অমলা বেল টিপল। সেই উর্দি পরা হাফ যুবক হাজির। ওর দিকে তাকিয়ে বলল, এটা কি!

    শঙ্খ মাছিটাকে ঘর থেকে তাড়াবার জন্য উঠে পড়ে লেগে গেল। পর্দা তুলে দিল। দরজা খুলে দিল, তারপর মাছিটাকে তাড়িয়ে নিজেও অদৃশ্য হয়ে গেল।

    অতীশ বলল, কত তাড়াবে। ঐ দেখ পাশে আর একটা।

    অমলা খুব কাতর চোখে তাকাল। যেন এখুনি ওটা এসে ওকে কামড়াবে। হুল ফোটাবে। এবং সে মরে যাবে। অতীশ উঠে গিয়ে হাওয়ার মধ্যেই খপ করে মাছিটাকে ধরে ফেলল।

    অমলা বলল, ছি ছি সোনা তোর ঘেন্না-পিত্তি নেই। তুই একেবারে গেছিস। বলে অমলা নিজে উঠে গেল। একটা ট্রে নিয়ে এল। একটা দামী শ্যামপোর শিশি। ট্রেটা কাছে নিয়ে বলল, হাত ধো। অতীশ হাত পাতলে জল দিল, সে হাত ধুলে কাঁধ থেকে তোয়ালে নিয়ে বলল, হাত মুছে ফেল। এবং হাত মোছা হলেই দেখল, ট্রে হাতে আর কেউ আসছে। শরবতি লেবুর রস, কিছু আঙুর, দুটো হাফ-বয়েল ডিম, স্যাণ্ডউইচ চার পিস। অমলা নিজেই সাদা চাদরের উপর প্লেট সাজিয়ে রাখল। খা।

    সে কিছুই না করতে পারছে না। সে যতবার অমলাকে চোখ তুলে দেখেছে, সেই মুখ, ফ্ৰক গায়ে বব কাট চুলের মুখ। বিশাল বারান্দায় অথবা ছাদে দৌড়াচ্ছে। চঞ্চল বালিকার সেই মুখ ছাড়া অমলার মুখে আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না অথবা নদীর পাড়ে জুড়িগাড়িতে বসে আছে অমলা। অনেক দূরের কোন বালিয়াড়িতে সে দাঁড়িয়ে। তাকে হাত তুলে ডাকছে। অথবা সেই হাতী—গলায় ঘণ্টা বাজছে, যেন দূর অতীত থেকে সে ধ্বনি কানে আসছে। অতীশ চামচেয় দুটো আঙুর মুখে তুলে বলল, আমরা সব হারিয়েছি অমলা। বড় হতে হতে আমরা কত কিছু হারাই।

    অমলা ওর খাওয়া দেখছিল—সতর্ক নজর রাখছে—এ-ঘরে দু’দুটো মাছি কি করে ঢুকল। আরও যে নেই কে জানে। কখন খাবারটার ওপর উড়ে এসে বসবে কে জানে! সে চারপাশে খুব সতর্ক নজর রাখছিল। আর চুরি করে সোনার মুখ দেখছিল।

    —রোজই আমি কেন জানি আশা করতাম, তুই আমাকে চিঠি লিখবি। এখন দেখছি নিজেই হাজির। আমার ঈশ্বর তোকে এখানে নিয়ে এসেছেন। আমি প্রার্থনায় বিশ্বাস করি সোনা।

    অতীশ বলতে পারত, দেশ ভাগের পর আমরা এক মহাপ্লাবনে ভেসে যাচ্ছিলাম। সেখানে নদীর দু’পাড়ের সব কিছু অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল। কোথায় কার ঘরবাড়ি কিছুই চোখে পড়ছিল না। কে কিভাবে বেঁচে আছে জানার কোনও উপায় ছিল না। এখন প্লাবনের জল নেমে গেছে। দু-পাড়ে বাড়ি-ঘর মাঠ, গাছপালা, পাখি সব এখন দৃশ্যমান। কিন্তু মানুষের যা হয়, জীবন বয়ে যেতে যেতে সে অন্য এক প্লাবনে ভেসে যায়। সে কোথাও স্থির থাকতে পারে না অমলা। আমিও এক জায়গায় স্থির বসে নেই। কত রকমের জটিলতা আমাকে গ্রাস করছে তুমি জান না। কাল সারারাত ঘুমাতে পারি নি ভাল করে। এখানে আসার পর কেন জানি না আর্চির প্রেতাত্মার আবার গন্ধ গাচ্ছি। গন্ধটা পেলেই বুঝি, আমার খুব সতর্ক থাকা দরকার। কোন দিক থেকে বিপদ আসবে বুঝতে পারছি না।

    অমলা সহসা বলল, তোর বৌ দেখতে কেমন হয়েছে রে?

    —খুব সুন্দর। খুব ভাল মেয়ে।

    —ভূঁইয়া দাদু কোথায় আছেন?

    অতীশ বুঝতে পারল অমলা তার সোনাজ্যাঠামশাইর খবরাখবর নিতে চায়। সে বলল, বড়দার কাছে আছেন।

    —তোর সেই পাগল জ্যাঠামশাই?

    —তিনি কোথায় চলে গেছেন।

    —কোথায় গেলেন! কোন খবর পাস নি?

    —না। বাবা জ্যাঠামশাই ঘর-বাড়ি বিক্রি করে চলে এলেন এখানে। আমরা সবাই। তার পরের ঘটনার কথা ভেবে হাসি পেল অতীশের। সে তখন জানতও না, হিন্দুস্থান বললে মানুষের কোন ঠিকানা বোঝায় না। কত সরল বিশ্বাসে সে একটা গাছে লিখে এসেছিল, জ্যাঠামশাই আমরা হিন্দুস্থানে চলিয়া গিয়াছি। পাগল জ্যাঠামশাইর কথা বলতে গিয়ে কেন জানি অতীশের চোখে জল এসে গেল। অতীশ চোখ আড়াল করার জন্য মুখ ঘুরিয়ে বলল, উঠি অমলা।

    —দাঁড়া। আর একটু বোস। বলে অমলা উঠে এল তার কাছে। তারপর কেমন ঝুঁকে পড়ল মাথার ওপর। নাক টানল, তারপর কেমন হতাশ গলায় বলল, হ্যাঁ রে তোর গায়ে যে চন্দনের গন্ধ লেগে থাকত, সেটা টের পাচ্ছি না কেন রে।

    অতীশ বলল, আমার গায়ে কবে চন্দনের গন্ধ ছিল অমলা।

    —ছিল। তুই জানতিস না। ছাদে আমি প্রথম গন্ধটা পাই।

    —এখন নেই?

    —না।

    —বোধহয় তাও হারিয়েছি।

    —এই তুই দাঁড়া তো!

    অতীশ দাঁড়াল। অমলাও পাশে এসে দাঁড়াল। আশ্চর্য সুঘ্রাণ অমলার শরীরে। প্রায় গা ঘেঁষে। সেই বালিকা বয়সের মত মাথায় হাত তুলে দেখল, সোনা তার চেয়ে কতটা লম্বা! অনেকটা। হাত নামিয়ে বলল, তুই আমার চেয়ে তখন খাটো ছিলি না রে?

    অতীশ বলল, মনে নেই।

    —আমার সব মনে আছে। সব।

    সব বলতে অমলা কি বোঝাতে চায়। অমলার কি সংশয় জন্মেছে, প্রাচীন শ্যাওলা ধরা ঘরটার স্মৃতি সে ভুলে গেছে! সে ইচ্ছে করেই বলল, তোমার মুখ বাদে আমার কিছু মনে নেই অমলা।

    —চিঠিটার কথা?

    —তাও ভুলে গেছি।

    —এত ভুলে গেলে কোম্পানি চালাবি কি করে। অমলা কেমন একটু রূঢ় হয়ে উঠল।

    —কুম্ভবাবু আছে। সনৎবাবু আছেন।

    —তোর নিজের কিছু থাকবে না! না থাকলে ওরা পেয়ে বসবে না!

    অতীশ কোনও জবাব দিল না।

    অমলার ঋজু নাক মুখ। স্বর্ণ চাঁপার মত রঙ। আর বড় বড় চোখ। পরনে লাল পেড়ে সিল্ক যেন আগুন হয়ে জ্বলছে তার পাশে। অন্ধকারে মোমের আলোর মত জ্বলছে। তার ভয় হচ্ছিল। কেউ এ ঘরে আসতে পারে, রাজেনদা আসতে পারে। এত কাছাকাছি যে সে ঘেমে উঠছিল। অমলা তখনই বলল, সোনা তুই নষ্ট হয়ে গেছিস। তুই আর ভাল নেই। চন্দনের গন্ধ চলে গেলে কেউ আর ভাল থাকে না।

    সে বলতে পারত, জীবনে এক পরিমণ্ডল থেকে অন্য এক পরিমণ্ডলে চলে এসেছি অমলা। বয়স বাড়ছে, আর পরিমণ্ডল পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন আর ইচ্ছে করলেই দুম করে কাজ ছেড়ে দিতে পারব না। সেদিনও যা পেরেছি, আজ আর তাও পারব না। আগে আমার একটা ছোট জাহাজ ছিল। জাহাজটার যাত্রী মা বাবা ভাই বোন। এখন জাহাজে যাত্রী বেড়েছে। নির্মলা, মিণ্টু, টুটুল নতুন যাত্রী। এই জাহাজটাকে চালিয়ে ঘাটে পৌঁছে দিতে হবে। আগে জাহাজের ক্রু ছিলাম। এখন নিজেই কাপ্তান। খুশি মত যেখানে সেখানে জাহাজ ছেড়ে দিতে পারি না। যাত্রা অনিশ্চিত। তবু ঘাটে পৌঁছাব বলেই এই বড় শহরে চলে এসেছি। তুমি আমাকে যতই নষ্ট চরিত্রের বল, আমি আর কিছুতেই ঘাবড়াব না। তারপরই মনে হল সে কি সব হিজিবিজি ভাবছে। অমলা কখন চলে গেছে এই বিলাস কক্ষ থেকে সে টেরও পায় নি। সামনে সেই উর্দি পরা হাফ-যুবক সে বলছে, আজ্ঞে আইয়ে সাব। সে তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

    খাবার টেবিলে কুমারবাহাদুর ঠাট্টা করে বৌরাণীকে বললেন, দ্যাশের পোলা কিডা কয়।

    বৌরাণীও ঠাট্টা করে বলল, কিছু কয় না। তারপর চামচে করে সামান্য গ্রীন পিজ মুখে দেবার সময় খুব গম্ভীর হয়ে গেল বলতে বলতে, ওকে না আনলেই ভাল করতে। ওর বাবাকে চিনি, ওর জ্যাঠামশাইকে চিনি। সেকেলে মানুষ। ভাল মানুষ। অতীশও তাই। ওর বড় জ্যাঠামশাই পাগল হয়ে গেছিলেন। অতীশের আর কি সম্ভ্রান্ত চেহারা, ওর পাগল জ্যাঠামশাইকে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না মানুষ দেখতে কত সুপুরুষ হয়। ভুঁইয়া দাদুকে আমাদের বাড়ির সবাই সমীহ করত। বাবা স্টীমার ঘাটে নেমে প্রথম সে মানুষটার পায়ে মাথা ঠুকতেন। নিয়ম ছিল, আমাদেরও গড় হওয়া। তাঁর ভাইপোকে এনে কতটা ভাল করলে মন্দ করলে বুঝতে পারছি না।

  • সাত

    সাত

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    সাত

    সকাল থেকেই সুরেনের মেজাজ বিগড়ে গেছে। সকালেই সে মেজ মেয়েটাকে সেই খারাপ লোকটার ঘরে যেতে দিল। লোকটা লম্বা ঢ্যাঙা। চুপচাপ জানালায় বসে থাকে। বিড়ি খায়। রেলে কাজ করে। মেসবাড়ির একটা আলগা ঘরে থাকে। জানালার একটা পাট বন্ধ থাকলে ভেতরে লোকটা কি করছে বোঝা যায় না। বাতাসী চা পাউরুটি এনে দেয় রাস্তা থেকে। কখনও বাতাসা মুড়ি। বিড়ি, পান যখন যা দরকার বাতাসীকে দিয়ে আনায়। সঙ্গে দশ-পাঁচটা পয়সা বেশি দেয়। একবার আলতার শিশি পাউডার কিনে দিয়েছিল। তা ছাড়া দরকারে-অদরকারে সুরেনকে পাঁচ-সাত টাকা ধার দেয়। ধার দিয়ে আবার ভুলেও যায়। কিন্তু এবারে কিছুতেই ভুলছে না। সকালবেলাতেই ডেকে বলল, অ সুরেন, টাকা কটা দেবে নাকি?

    কদিন বাতাসীকে যেতে দেওয়া হয় নি। কুম্ভবাবুর বাসায় সকালেই চলে যায়। বাসি রুটি দু’খানা খেতে দেয় কুম্ভদার বৌ। দুপুরে ডাল-ভাতও দেয়। রাতে কুম্ভবাবু ফিরে না এলে ছুটি হয় না বাতাসীর। কুম্ভবাবুকে খুশি রাখার জন্য সে বাতাসীকে খারাপ লোকটার কাছ থেকে তুলে এনেছে। বাতাসী কত দিক সামলাবে! টাকাটা চাইতেই সে বাতাসীকে বলল, যা হামুবাবুর ঘরে যা। ঝাট-ফাট দিয়ে আয়। খুব চটে গেছে। তারপরই মনে হয়েছিল মেয়েটা যেন খুব খুশি বাপের কথা শুনে। বলল, যাচ্ছি! এবং চুলে কাঁকুই দিয়ে বেশ সেজে-গুজে যেতেই সুরেনের মেজাজটা বিগড়ে গেল। তোর বাপের বয়সী মানুষ তার কাছে এত সাজ-গোজের কি থাকে! কিন্তু টাকাটা বড়ই দায় তার। গেলে যদি টাকাটার কথা হামুবাবু ভুলে যায়। তারপরই মনের মধ্যে কূট কামড়। মেয়েটা তার ভাল করে বড়ই হয় নি—অথচ খুব পেকে গেছে। মাঝে মাঝে এমনভাবে পুরুষমানুষ দেখলে ফিক্‌ফিক্ করে হাসে যে তার বুকে হিম ধরে যায়। তখন কাশিটা বাড়ে। বাতাসীর ঘর ঝাঁট দিতে অত সময় লাগার কথা না। কি করে! মনের মধ্যে তার প্রবৃত্তি ছোট হয়ে যায়। টুক টুক করে জানালায় হেঁটে এসে বলে, অ হামুবাবু, বাতাসীর হল!

    হামুবাবু জানলার ফাঁক দিয়ে গলা বাড়িয়ে বলে, সুরেন নাকি!

    হামুবাবু নিচের দিকে হাত টেনে কি সামলায়। ঘরে বাতাসী আছে কি নেই বোঝা যাচ্ছে না। হামুবাবু শুয়ে আছে। ঘরটায় আলো ঢোকে না। সব সময় কেমন অন্ধকার থাকে। হামুবাবু পোশাক-আসাকে বড়ই ঢিলেঢালা। যতক্ষণ ঘরে থাকবে শুধু একটা আণ্ডারওয়েয়ার পরনে। মাকুন্দ মানুষ, গায়ে একটা লোম নেই, চুল ছোট্ট করে ছাঁটা—মাথা নাকি এতে হাল্কা থাকে। একটা ছোট জানলা একটা ছোট দরজা। মেসবাড়ির ভেতরে না ঢুকলে দরজাটা দেখা যায় না। বাতাসী কি করছে! সুরেন বলল, বাতাসী, হয়েছে তোর!

    বাতাসী ভেতর থেকেই বলল, এই হল যাই। হামুকাকার কাপ-ডিশ ধুয়ে যাচ্ছি।

    —সকাল সকাল চলে যাস মা। কুম্ভবাবু বের হয়ে যাবে।

    বাতাসী ফ্রক গায়ে দেয়। ফ্রক গায়ে দিলে বড়সড় লাগে না। আর যে বয়সে যতটা শরীরে বড় হওয়া দরকার ছিল, যেন তা বাতাসীর ঠিকঠাক বড় হয় নি। অকালে সব অপুষ্টির জন্য। কিন্তু মানুষের সব জায়গায় অপুষ্টি বুঝি এক রকম থাকে না। সুরেন ভাবল এটা-ওটা বলে দাঁড়িয়ে থাকা যাক—তাহলে এই যে গায়ে-ফায়ে হাত দেওয়া সেটা হামুবাবু পারবে না। তবে সে আর কতক্ষণ—আর একটু বাদেই অফিস, তখন ছানাপোনাগুলি বেড়ালছানার মত ম্যাও ম্যাও করে। এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। কিছু গন্ধটন্ধ পেলেই দাঁড়িয়ে যায়। তবে ঐ একটা সুবিধে। বয়স বাড়লে তার মেয়েরা আদর পায়। সুখীর বেলাতেও দেখেছে। শরীরে মাংস লাগতেই রাধিকাবাবু বললেন, বিয়ে দিয়ে দে। ভাল ছেলে। জমিজমা আছে। ইস্টিশনে ভাজাভুজির দোকান আছে। থাকবে ভাল, খাবে ভাল। প্ৰায় বলতে গেলে ওরা তুলে নিয়েই গিয়েছিল। বাতাসীও আজকাল আদর পেতে শুরু করেছে।

    সুরেন বলল, সিগারেট আছে নাকি হামুবাবু?

    আমি ত আজকাল গাঁজা খাচ্ছি সুরেন।

    সুরেন কেমন ভীত গলায় বলল, অত কড়া সহ্য হবে না। গাঁজা খায় লোকটা সে শুনেছে। ইদানীং অফিসেও যায় না। এই ঘরটায় বসে বসে কেবল আইনের বই পড়ে। হামুবাবুর ধারণা, তার বিরুদ্ধে সবাই যড়যন্ত্র করছে। সেই ষড়যন্ত্র আটকাবার জন্য সে এখন আইনের বই ঘাঁটাঘাঁটি করছে। মাঝে দেখেছে কপালে লম্বা সিঁদুরের ফোঁটা টেনে কোথায় একবার নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। ফিরে এসে বলল, তীর্থে গেছিলাম। বাতাসীকে দিয়ে কাশী বিশ্বনাথের প্রসাদও পাঠিয়েছিল।

    সুরেনের কাছে হামুবাবুর সবটাই ভাল, ঐ হাত-ফাত দেয় এমন একটা ধান্দা দেখা দিতেই মনটা বিগড়ে গেছে। আগে সে এটা বুঝতে পারত না। তার মেয়েদের আদর করে ডাকত ঘরে, বাতাসী টেবি সবাইকে। লজেন্স দিত খেতে। চা বানিয়ে নিজে খেত, মেয়ে তিনটেকে দিত। মুড়ি বাদাম ভাজা মেখে ভাগ ভাগ করে দিত। তিনটে মেয়েই হামুবাবুর ন্যাওটা। রথের মেলায় গেলে দশটা করে পয়সা। এত কে করে! কিন্তু বাতাসী না গেলে রাগ করে। পয়সা ফেরত চায়। এটা সুরেনের মনে ধন্দ ঢুকিয়ে দিয়েছে। কূট কামড়। সে ডাকল, হল বাতাসী?

    —তুমি যাও না সুরেন! হলেই চলে যাবে।

    —বাবু আমরা হলেম গে কপাল পোড়া মানুষ। তা ঘরে আপনার থাকলে হাতের কাজ এগিয়ে দিলে কার কি আসে যায়। কিন্তু কুম্ভবাবু অফিসে যাবে তো।

    —তা বাতাসী কেন?

    —উ কুম্ভবাবু আর ভরসা পায় না।

    হামুবাবু সব জানে। নতুন বাড়ির ওদিকে জানালাটা খুলে গেলেই সব বোঝে। সে বলল, পাহারা দিয়ে কিছু হয় না সুরেন। এ হল গে ঘুসঘুসে আগুন। কেবল পোড়ে। আর পোড়ে।

    —ভাল আছেন বাবু বিয়ে থা করলেন না। মুক্ত। কি খাব, কি খাওয়াব ভাবতে হয় না। ওরে বাতাসী হল?

    হামুবাবু বিরক্ত হয়ে উঠে বসল। পা দুটো কাঠি কাঠি—রগফগ সব ভেসে উঠেছে। রুগ্ণ শরীর। মাংস না থাকলেও ছিবড়েটা আছে শরীরে। চোখ লাল করে বসে থাকে। গাঁজা খেলে চোখ সাদা থাকবে কি করে। তুরীয় ভাব সব সময়। কাজ-ফাজ করে যা পায়, তাও নেশা-ভাঙে ওড়ায়। খায়- দায় কম। মেসে দুবেলা খায় ঐ নামে। আর কেবল মানুষের বসে বসে আদ্যশ্রাদ্ধ করে। কোথায় মিছিল হচ্ছে, কোথায় প্লাবন হচ্ছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কাগজে দেখে। এতে তার খুব আনন্দ। কাগজটা মেলাই থাকে। অপঘাতে মৃত্যু, বালিকা হরণ, বাসের চাকায় চেপ্টে গেছে, বৌ পলাতক, এ-সব খবর পড়ে লোকটা মজা পায়।

    সুরেন ভাবল, আজ কি মজার খবর আছে জেনে নেয়। এতে তারও মজা আছে। এই একটা জায়গায় হামুবাবুর সঙ্গে তার খুব মিল। সে বলল, কাগজে কি খবর হামুবাবু?

    —খবর তো অনেক। তোমার রাজার মাথা ঠিক আছে ত!

    সুরেন বুঝতে পারল না, এ-কথা কেন সে বলল,—রাজার কি অভাব আছে হামুবাবু, মাথা ঠিক থাকবে না!

    —তুমি একখানা মানুষ বটে সুরেন। কাকের মত স্বভাব।

    এই সক্কালে কাকের সঙ্গে তুলনা করায় সে খুব আহত হল। কাক হল নিম্নস্তরের প্রাণী। সে হল নবীনগরের গাঙ্গুলীবংশের মানুষ। দেশ ভাগ হয়ে গিয়ে এত ফের। তাই এই লোকটা তাকে যৎপরোনাস্তি কটুক্তি করছে। সে মুখ ব্যাজার করে বলল, কাক কেন বাবু, কোকিলের কথা বলুন।

    —কোকিল কি আন্ধা আছে। তুমি একটা আন্ধার মত কথা বলছ। যেন কিছু জান না। খবর পাও নি!

    সুরেন খুব মহামুশকিলে পড়ে গেছে।—কি খবর। এ-বাড়িতে ত সকাল হলেই খবর লেগে থাকে। সেই সেদিন, বৌরাণী নতুন ম্যানেজারকে অন্দরে ডেকে পাঠিয়েছিল বলে একটা খবর রটে গেল। ঘরে ঘরে এক কথা। এ-বাড়ির সব ভাঙছে। মানে সম্ভ্রমে সব। কোথাকার একটা উজবুককে শেষে কিনা অন্দরে ডেকে পাঠাল! কেবল ভাঙচুর হচ্ছে। এটাতেও সে মজা পায়।

    তখনই হামুবাবু বলল, তোমার রাজার ফুটানি এবারে যাবে। বুঝেছ। বস্তি সব সরকার নিয়ে নেবে বলেছে। বিল আসছে।

    সে বলল, তাই হয় যেন বাবু। সব যাক। ফিসফিস করে বলল, আমাদের রতনবাবু, চিনেন না, রাধিকাবাবুর শ্যালক। নলগায়ের এজেণ্ট ছিল, রাজা ওটাকে তাড়িয়েছে। লাখ টাকা নাকি মেরে দিয়ে সরে পড়েছে।

    —রাজা কেস করছে না কেন?

    —কেস! কি যে বলেন! রন্ধ্রে রন্ধ্রে পোকা। কোথাকার জল শেষে কোথায় গড়াবে—রাজা মামলা একেবারে পছন্দ করে না। কত খাবি, নে লাখ টাকা নিয়ে সুখে থাক।

    —তাড়িয়ে দিল কেন! ওতো জেনে-শুনেই চোর পোষে। দু-পয়সা তোমার রাজারও হয়, তারও হয়। সাদা টাকা আর কে চায় এখন।

    সুরেন বলল, তাহলে সিগারেট না থাকলে একটা বিড়ি দেন, ও বাতাসী তোর হল? আমার হয়েছে জ্বালা। বাবু আপনাকে কত বললাম, নবরে একটা কিছু করে দিন, মাথা ঠিক রাখতে পারছে না। কাল সারারাত ফেরেনি। কি দুর্ভাবনা কন। সকালে হাজির। বললাম, কোথায় গেছিলি। তোর জননী সারারাত দুঃশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারেনি।

    —কোথায় গেছিল!

    —রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ি গুনছিল নাকি।

    —কে দিল এ-কাজ?

    —নিজেই ঠিক করে নিয়েছে। পয়সা হাতে না থাকলে কি করবে। বলল, কাজটা খুবই ভাল। এতে কারো চোখ টাটায় না।

    হামুবাবু বুঝতে পারল, বেকার থাকলে মাথায় গণ্ডগোল দেখা দিতেই পারে।

    —তুমি বললে না, গাড়ি গুণে কি হবে?

    —আমার কথা শোনে!

    —গাড়ি যখন গুণছে তখন ধূপকাঠি বিক্রি করছে না কেন?

    সেটা বুঝিয়ে বলুন না আপনারা। তারপরই মনে হল, গাড়ির সঙ্গে ধূপকাঠির সম্পর্ক কি থাকতে পারে? সে বলল, এ কথা কেন বাবু?

    —আজকাল দেখতে পাচ্ছ না, কত ধূপকাঠি জ্বলছে। সবাই ঘরে এখন ধূপকাঠি পোড়ায়। তোমাদের নতুন ম্যানেজারের নাকি গোছা গোছা ধূপকাঠি লাগে। ভাল খদ্দের। তারে পাকড়াও না।

    —তারে ত কুম্ভবাবুরে ধরে সিট মেটালে ঢোকানো যায় কিনা দেখছি। কুম্ভবাবু নাকি হাতের মুঠোয় এনে ফেলেছে মানুষটাকে। কাজ একদম বোঝে না। কুম্ভবাবু পাশে না থাকলে চোখে আন্ধার দেখে।

    —নবরে পাঠিয়ে দাও না নতুন ম্যানেজারের কাছে। কুম্ভ তোমাকে ঘোরাবে।

    —পাঠাব কি বাবু পেনসিল নিয়ে বসে এখন অঙ্ক করছে।

    —আবার পরীক্ষা দিচ্ছে নাকি!

    —পরীক্ষা না বাবু। সকালে এসেই স্নানটান সেরে মাদুর বিছিয়ে বসে পড়েছে। কেবল গুণ অঙ্ক!

    —এত গুণ দিয়ে কি হবে?

    —কি নাকি হিসাব করে দেখছে। দেশের অপচয় কতটা দেখছে। এই অপচয় বন্ধ করলে, কতজন বেকার কাজ পেতে পারে তার একটা সরল অঙ্ক মাথায় এসে গেছে তার। কিছুতেই মাদুর থেকে ওঠানো গেল না।

    —নবর মাথা পরিষ্কার ছিল। তুমি পড়ালে না সুরেন! আমার ঘরে এসে কাগজ পড়ে যায়। কত রকমের প্রশ্ন করে। আমি ঠিক উত্তর দিতে পারি না। হামুবাবুর মধ্যে এখন একটা ভালমানুষ দেখা দেওয়ায় খুব গম্ভীর গলায় কথা বলছে।

    —খুব মনে রাখতে পারে। কিছু বললেই সাল তারিখ উল্লেখ করে বলবে, সব বেটা ফেরেববাজ। ঘুষখোর। ধান্দাবাজ। সেতো কাউকে মানে না বাবু। ঈশ্বর পর্যন্ত তার কাছে একটা হারামী। বলেন, এ ছেলের কি গতি হবে!

    হামুবাবু এবার কি ভেবে বলল, এই বাতাসী যা। আজ আর আসতে হবে না। কাল সকালে কুম্ভবাবুর বাড়ি যাবার আগে একবার আসিস। আর সঙ্গে সঙ্গে বাতাসী বের হয়ে গেল। সুরেনের ইজ্জতে বড় লাগল। বাপের কথায় গ্রাহ্য নেই। বাপ নয়, কাকা নয়, মামাও নয় লোকটা, তার কথা কেবল শোনে। সুরেনের আবার কাশি উঠল। কফ উঠল। সে জানালার পাশেই কফটা ফেলে রাখল। কফের পোকা দেয়াল বেয়ে উঠুক। জখম করুক লোকটাকে। এ-মুহূর্তে সেও নেশাখোরের মত বলল, মানুষ জাতটাই হারামী। জাতটার সর্ব অঙ্গে ঘা হোক পোকা-হোক। বসে বসে দেখি। এবং এইসব বলতে বলতে সুরেনের মাথা গরম হয়ে গেল। সব তার হাতের নাগালের বাইরে। বড় ছেলে তাও বকে যাচ্ছে। সর্ব কনিষ্ঠটিও তার পুত্র সন্তান। হামাগুড়ি দেয়। উঠে দাঁড়ায় হাতে তালি বাজায়। পা পা করে হাঁটে। সামনে এক মানুষ সমান গর্ত। সারা বাড়ির মলমূত্র সেখান দিয়ে বয়ে যায়। ধর্মপত্নীকে বার বার সাবধান করে দিয়েছে, ডুববে। সব ডুববে। ধর্মপত্নীর এক কথা, কপালে থাকলে হবে। বিধাতার ওপর বড়ই বিশ্বাস! পাঁচ পাঁচটা নর্দমা পার হয়ে গেল, এই একটার বেলায় তেনার যত আদিখ্যেতা। কেউ তাকে মর্যাদা দেয় না। বাতাসী না, টেবি না, সুখী না। বড়টা তো এখন অঙ্ক নিয়ে বসেছে। কোথা থেকে বগল দাবা করে এনেছে কাটা কাগজ। তাতে একটা রোঁয়া ওঠা পেন্সিল দিয়ে লম্বা অঙ্ক করছে। কার মাথা ঠিক থাকে! এখন গিয়ে লাথি কষালে হয়! হারামজাদা ইতর, কাজের কাজ না করে অঙ্ক করা। অঙ্ক করবে বাবুরা। তেনাদের হিসাব রাখতে হয়। তোর আছেটা কি হিসাব রাখবি! নর্দমা পার হয়েই হাঁক পাড়ল, বাবা নব, অঙ্ক তোমার হল?

    —না বাবা। এই আর একটু, তবেই হিসাব মিলে যাবে।

    —বাবা নব, তুমি আর অঙ্ক কর না। হামুবাবু বলল, ধূপকাঠি বিক্রি করতে। পুঁজি কম লাগে। নতুন ম্যানেজার বড় খদ্দের। সময় থাকতে পাকড়ে ফেল।

    নবর বড় বড় চুলে কপাল ঢাকা। সে নুয়ে অঙ্ক করছে। শিরদাঁড়াটা দাঁড়াশ সাপের মত মোটা হয়ে নেমে গেছে কোমরে। সব ক’টা পাঁজরের হাড় গোনা যায়। তবু অঙ্কের হিসাব মেলে না। যতবার গুনেছে এক দিকে দশটা অপর দিকে এগারটা। ডাক্তারবাবু তার পাঁজরার হিসাব দিয়েছিল, বাইশটা। কে ঠিক জানে না নব, না ডাক্তারবাবু। তার নিচে দুটো হলদে থলে পাঁঠার ফুসফুসের মত। তার ফুসফুসে নাকি বিজবিজে পোকা বাসা বানিয়েছে। সে ভাল হয়ে যাওয়া মানেই সেখানে বড় রকমের একটা হত্যাযজ্ঞ।

    সে আবার বলল, বাবা নব, তোমার অঙ্কের বিষয়টা জানতে পারি? হামুবাবু বললেন, বিষয়টা জেনে নাও।

    —হামুবাবুকে বলবে, ওকে ধরে আমি ঠ্যাঙাবো, অঙ্ক করছি, এখন ডিস্টার্ব করবে না।

    —তুমি বারান্দা থেকে নেমে অঙ্কটা কষ। আমার স্নানের সময় হয়েছে। দুটো মুখে দেব বাবা। নব খুব দার্শনিকের মত উবু হয়েই বলল, খাওয়াটা বড় কথা নয়। খেলে পেট ভরে। এটুকু হলেই তোমার বাসনা উবে যায়। কিন্তু তারপরেও কিছু থাকে। তার খবর রাখ না!

    —অত খবরে কাজ নেই বাবা নব। আমি অবগাহনে যাচ্ছি। তুমি নতুন ম্যানেজারকে গিয়ে বলে এস, এবার থেকে যত ধূপকাঠি লাগবে তুমি দেবে। পয়লা এই দিয়ে শুরু করে দাও। আলামোহন জীবন এ-ভাবেই শুরু করেছিলেন জান?

    নব জানে, এগুলো সবই বাবার ধর্ম কথা। সেই কবে থেকে নজির টেনে আসছে। বাপের বিদ্যে ক্লাস এইট পর্যন্ত। ঐ বিদ্যায় যা খবর সংগ্রহ করেছিল সেটাই এখন জীবনে মূলধন হয়ে আছে। এই নিয়ে তার কাছে একশ আটাশবার বাবা আলামোহন দাসের নজির টানলেন। সে অঙ্কটা করছে বলে মাথা গরম করতে পারছে না। তা না হলে কুরুক্ষেত্র বেধে যেত। এটাও এ-বাড়ির সকাল বিকেলের ধর্মযুদ্ধ! সে তাই মাথা ঠাণ্ডা রেখে বলল, অঙ্কের হিসেবটা শোনো তাহলেই মাথায় খাওয়া উঠে যাবে। ভি আই পিতে চব্বিশ ঘণ্টায় গাড়ির সংখ্যা তোমার সতের হাজার চারশ আটাশ। এই সংখ্যাকে তুমি গুণ দাও তিনশ পয়ষট্টি দিয়ে। তোমার মনে আছে ত এই কটা দিনে পৃথিবীতে বছর হয়। তারপর গুণ কর গড়ে চার লিটার তেল। তারপর গুণ কর।

    —কি দিয়ে গুণ করব বাবা?

    —দাম। তেলের দাম। কত টাকা হয় জান। তোমার মাথায় আসবে না। বাবুদের বাবুগিরিতে একটা পঞ্চাশ হাজার একর জমির চাষ বছরে ভি আই পিতে উবে যায়। এই দেশে কত এমন ভি আই পি আছে। কত পঞ্চাশ হাজার একর চাষ হতে পারে কত পঞ্চাশ লক্ষ বেকার চাকরি পেতে পারে ভেবে দেখ।

    সুরেন ভাবল ছাওয়ালের মাথাটি গেছে। রেগে গেলে মাতৃভাষা তার লব্জে আসে। সে বলল, বাইর হ শুয়ার। বাইরাইয়া যা। সে কি খুঁজতে থাকল। বোধ হয় লাঠিটাটি, সে আত্মরক্ষার্তে লাঠি টেনে বের করতে গেল।

    বাপের এই রাগকে নব গ্রাহ্য করে না। লাঠি টেনে এনে মাথায় তুলতেই খপ করে ধরে ফেলল। পাশের খুপরি থেকে তখন বের হয়ে আসছে ছুতোর হরিচরণ, তার বৌ, ছোট মেয়েটা। তার পাশ থেকে ছুটে এসেছে রাজমিস্ত্রি অধীর। বিপত্নীক বলে একা। সঙ্গে পুটি ডবকা ছুড়িটা। নবর সঙ্গে মাঝে মাঝে ঠাট্টা-তামাশা করে। কোলাহল শুনে বাবুর্চিপাড়ার লোকজনও ছুটে এল। এরা সব একই লাইনবন্দী লোক। দুঃখ-কষ্টে একই গোত্রের মানুষ। সুরেনের আজ আবার কি নিয়ে মাথা গরম হয়েছে! ওরা এসে দেখল নব বাপের লাঠি কেড়ে নিয়ে সুরেনের বুকের ওপর চেপে বসে আছে। আর মুখের ওপর আঠা দিয়ে জোড়া একটা লম্বা কাগজ। সে সেটা খুব নিবিষ্ট মনে দেখছে। নিশ্চিন্তে মুখ আড়াল করে হিসাবটা ফের মিলিয়ে দেখছে।

    সবাইকে লক্ষ্য করে সুরেন বলল, বলেন, কার মাথা ঠিক থাকে। তুই আমার জ্যেষ্ঠ পুত্ৰ, তুই আমার শ্রাদ্ধের অধিকারী আর তুই তোর পিতৃদেবকে কলা দেখাস। দিনরাত টোটো করে ঘুরে বেড়াস।

    রাজমিস্ত্রি অধীর বলল, দিনকাল খুব খারাপ। আমাদের সময় যা হক করে কেটে গেল। বড় খারাপ দিন আসছে। লোক সব না খেয়ে মরে যাবে। কলিতে মানুষের হেনস্তা কত। আগে থেকে হিসেব করে না চললে তারপর ডডনং। রাস্তায় ঐ পাগলটার মত হাঁকতে হবে—কি যেন হাঁকে, ও হরিচরণ, কি যেন সাধুবাক্য কয়।

    —ও মনে থাকে না। কাল দেখি পাগলার মাথায় একটা কাগের পালক বাঁধা মাঝ রাস্তায় ঊর্ধ্বনেত্রে দাঁড়িয়ে আছে।

    তখনই কেমন হুঁশ ফিরে এল সুরেনের। তার জ্যেষ্ঠপুত্র পাগল হয়ে যাচ্ছে না ত। সে নবকে ঠেলে বুকের ওপর থেকে ফেলে উঠে বসল। পাগলের উপদ্রব খুবই বেড়েছে। দোতলা বাড়িটায় থাকে পাগলাবাবু নতুন ম্যানেজারের মাথায়ও কি নাকি গণ্ডগোল আছে! সারা রাত ধরে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে নাকি বসে ছিল। আর পাগলাবাবুর ত কথাই নেই। নতুন বাবু আসার পরই কেমন বিবেচক মানুষ হয়ে গেল। বিকেলে এখন মাঠে বেড়াবার অনুমতি পর্যন্ত পেয়ে গেছে। সে বলল, বাবা নব, মাথা ঠাণ্ডা কর। মাথার মধ্যে গ্যাঁজা দিস না। ওতে বিপত্তি বাড়ে। তোর চাকরির ভাবনা কি। কুম্ভবাবু বলেছে সিট মেটালে তোর একটা কিছু হয়ে যাবে বাবা। ছেলের মাথা ঠাণ্ডা করার জন্য সাহস দিল। যেন সব ঠিক হয়ে গেছে।

    হরিচরণ বলল, তুমি যাও সুরেনদা। এখানে থাকলে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে। অগত্যা সুরেন অবগাহন করবে বলে বের হয়ে গেল। সামনেই দুটো বড় বড় পুকুর। এ-ছাড়া আছে অন্দরের পুকুর। অন্দরের পুকুরের চারপাশে উঁচু দেয়াল। তার ওপর কাঁটাতারের বেড়া। ও পাশে মাঠ। মাঠের পর গোয়ালবাড়ি—তারপর জেলখানার মত উঁচু পাঁচিল। অন্দরে নতুন বৌরাণী সকালে সাঁতার কাটেন। গায়ে-পায়ে প্রায় নাকি উলঙ্গই থাকেন তখন। একমাত্র খাস বেয়ারা শঙ্খ থাকতে পারে কাছে। তার হাতে তোয়ালে, গন্ধ সাবান এবং কতরকমের সুগন্ধী তেল। কুমারবাহাদুর বেতের চেয়ারে পাশের লনে বসে থাকেন। নভেল পড়েন। চুরুট খান। বৌরাণী এসেই একটা নিজস্ব ফুলের বাগান করেছেন। সেখানে দুজনে জ্যোৎস্না রাতে ঘুরে বেড়ান। কত সব পাথরের মূর্তি সেখানে। স্নানে গেলেই সুরেনের কেন যে মনে হয় পাঁচিল বেয়ে একবার অন্দরের পুকুরটা উঁকি দিয়ে দেখে। কি ফল, কি গাছ কি দেবদেবীর মূর্তি আছে ওখানে দেখার একটা ঘুসঘুসে ইচ্ছা পুকুরের পাড়ে এলেই সুরেনকে কেন জানি পেয়ে বসে। সে এই খোলা পুকুরে সাঁতার কাটছে, তাকে দেখার কেউ নেই। সেও একসময় মেঘনা নদী পার হয়ে যেত। সেও একবার আসমানদি চরে সাঁতার দিয়ে রুপোর মেডেল পেয়েছিল। ধর্মপত্নী তার সাক্ষী। আর তখনই টেবি সুখী আরও কেউ কেউ ছুটে আসছে। হাউহাউ করে চিৎকার করছে। আর্ত চিৎকার–বাবা তাড়াতাড়ি উঠে এস। দাদা কি করছে! কেমন করছে। সবাই জোরজার করে ধরে রেখেছে। বাবা! বাবা!

    মাথার সব উবে গেল সুরেনের। সে এসে দেখল নবর সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছে সবাই। হরিচরণ হাত-পা বাঁধছে। সে বলল, কী হল নব বাবা? তোমরা ওকে ছেড়ে দাও। আমি দেখছি।

    আরও সব লোকজন ছুটে এসেছে—প্রায় রাজবাড়ি ভেঙে। নব মাথা ঠুকছিল দেয়ালে। আমাদের ইজ্জত সব কেড়ে নিচ্ছে কেন। কেন, কেন? কপাল থেকে রক্ত পড়ছে। তারপরই সে কেমন হাত ছুঁড়ে বলল, খুন হবে, খুন। একটা খুন হবে। বলতে বলতে সে ছুটে রাজবাড়ির দেউড়ি পার হয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।

    অতীশ চেঁচামেচি শুনে বারান্দায় বের হয়ে এল। দেখল কিছু লোক দেউড়ির দিকে ছুটে যাচ্ছে। সে দেখল কুম্ভবাবুর ভাইরা, দাসবাবু তার ছেলেমেয়ে, ওদিক থেকে আসছে। সে বলল, কি হয়েছে নিমু?

    সুরেনের ছেলেটা বোধ হয় আত্মহত্যা করতে গেল।

    —কোথায় গেল?

    —রাস্তায়! গাড়ির তলায় চাপা পড়ে মরবে বলছে।

    —কি হয়েছিল?

    —চাকরি পাচ্ছে না। কাল নাকি সারা দিন ভি আই পিতে দাঁড়িয়ে গাড়ি গুনেছে।

    এই অশুভ খবর অতীশকে খুবই বিড়ম্বনায় ফেলে দেয়। সে বুঝতে পারে না, সুরেন এতদিন এই বাড়িতে কালাতিপাত করেও কেন ছেলের একটা কাজ সংগ্রহ করতে পারে না। সে দেখল তখন সুরেন ফিরে আসছে। অতীশ ওপর থেকেই বলল, পেলে?

    —না। সুরেন মাথা নীচু করে চলে যাচ্ছিল। মানুষের সন্তান কত প্রিয়—এই মানুষটারও তাই। চোখ মুখ শুকনো বিপর্যস্ত এক মানুষ সুরেন। সে যদি এখন ঘরে ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয় তবু যেন তার সাতখুন মাপ। সে বলল, তুমি একবার দেখা কর সুরেন।

    সে বলল, এখন ত হবে না বাবু। অফিসের টাইম হয়ে গেছে। পরে যাব।

    আসলে মানুষ সেই কবে থেকে ক্রীতদাস পালন করে আসছে। তার থেকে মানুষ এখনও মুক্তি পায়নি। সুরেন এখন ক্রীতদাসের ভূমিকা পালন করছে। তার নিজের মরার সময়টুকু নেই। ঠিকমত হাজিরা না দিলে—কোনদিন একটা নোটিশ ধরিয়ে দেবে। তার লায়েক ছেলেটা কোথায় কি করছে এই মুহূর্তে তা নিয়ে ভাববারও সময় নেই। সবারই সন্তান-সন্তুতি থাকে। তার নিজেরও আছে। সে কেমন বিচলিত বোধ করল। সে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকল। তারপর সুরেনকে ডেকে বলল, কোন দিকে গেছে বলতে পার?

    সুরেন হতাশ গলায় বলল, মনু খানসামা লেন দিয়ে কোথায় চলে গেল।

    অতীশের এই এক বিড়ম্বনা—কোথায় গেল বাপের কোনও তাড়া নেই। সে কুম্ভবাবুর বাড়ির পাশে আসতেই দেখল, একটা জটলা। অতীশকে দেখে কেউ কেউ চুপ করে গেল। কুম্ভবাবু দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে। অতীশকে দেখেই বলল, আসুন দাদা, ঘরে আসুন।

    —সুরেনের ছেলেটা নাকি চলে গেছে?

    —আবার আসবে।

    —বাসটাসের তলায় পড়ে নাকি মরবে বলছে।

    —কতবার মরে এরা। সে-নিয়ে আপনার মাথা খারাপ করে কি হবে দাদা। আমরা কি করতে পারি। সরকারই কিছু করছে না। রাজাকে বললেই বলবে, দেয়ার ইজ গভমেণ্ট, গো টু হিম। আমরা তো শোষণ করছি, আমাদের কাছে আর আসা কেন।

    অতীশ এ-মুহূর্তে এই ছেলেটার জন্য আর কার কাছে যাবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না।

    সকালে উঠেই অতীশের কিছু লেখালিখি থাকে। লেখা নিয়ে নিবিষ্ট থাকতে হয়। আজ সকালে উঠে একটা লাইন লেখা হয়নি। বাড়ির জন্য মনটা কেমন খারাপ হয়ে আছে। নির্মলা লিখেছে, টুটুলের জ্বর। বাবা নেই বলে মিণ্টুর মন খারাপ। সে স্ত্রী পুত্র ছেড়ে কোথাও এতদিন একা থাকেনি। সকালেই সে একবার তার কোয়ার্টার দেখতে গিয়েছিল। বড় বড় তিনখানা ঘর! সামনে লম্বা বারান্দা। রান্নাঘর বাথরুম। অন্দরের লাগোয়া ঘর। দরজায় দাঁড়ালে অন্দরের গাড়িবারান্দা দেখা যায়। সামনে সব বড় বড় পাতাবাহারের গাছ।

    সবই ভাল—তবে খুব পুরানো বাড়ি বলে ঘরের পলেস্তারা সব খসে পড়েছে। এখন মেরামত হচ্ছে সব। মেঝের জায়গায় জায়গায় তাপ্পিমারা। উঁচু শিলিং। আগেকার আমলের ঘরবাড়ি যেমন হয়ে থাকে। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড সব দরজা। মেরামত শেষ হলে হোয়াইট ওয়াস। তারপরই সে নির্মলাকে নিয়ে আসতে পারবে। শনিবারে ভেবেছিল বাড়ি চলে যাবে— কয়েকদিনেই সে এখানে কেমন হাঁপিয়ে উঠেছে। কেমন একটা বন্দী জীবন—সব সময় নিরাপত্তা বোধের অভাব। বিশেষ করে তার অফিসে বসলে সে এটা বেশি টের পায়। লুজিং কনসার্ন। প্রিন্টিং সেকেলে, গ্লেজ ঠিক আসে না। লিথো প্রিন্টিং এখন অচল। এই অচল কারখানার সে ম্যানেজার। কর্মীদের মাইনে দেখে সে খুবই অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। সব চেয়ে বেশি বেতন পায় প্রিন্টিংম্যান মণিলাল সেটা দু’শ টাকাও নয়। হেলপারদের মাইনে সাতাশ টাকা। সাতাশ টাকায় কি হয়! সে একজন কর্মীকে ডেকে বলেছিল, তোর কে আছে? সে বলেছিল, কেউ নেই। সাতাশ টাকায় স্যার কেউ থাকলে চলে না! ফুটপাথে থাকি। চা-পাঁউরুটি খাই। তারপরও যা বলেছে তাতে সে আরও হতবাক হয়ে গেছিল। মাইনে পাবার দিনে শুধু ভাত খায়। মাইনে হলে সে কলের জলে ভাল করে স্নান করে নেয়। ঐ একটা দিনই তার প্রকৃতপক্ষে স্নান আহার। এ-সব শুনে সে আর বেশি কথা বলতে সাহস পায়নি। দেখলেই ভয় ধরে যায়। যে কোন মুহূর্তে এরা ওর শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। তার এখন মনে হচ্ছে, সুরেনকে দেখা করতে বলে খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ করেনি। সে সুরেনের ছেলেকে একটা হেলপারের কাজ অবশ্য দিতে পারে। এতে সে তার নিজের বিরুদ্ধে আরও একজন শত্রু তৈরি করবে। তবু মনের মধ্যে কি থেকে যায়, সুরেনের জন্য তার কষ্টবোধ বাড়ে।

    অফিসে যাবার সময় এ-নিয়ে একবার কুমারবাহাদুরের সঙ্গে কথা বলল। যে কোন কারণেই হোক কুমারবাহাদুর অতীশকে অন্য গোত্রের মানুষ ভেবে থাকে। তিনি বললেন, ব্যালেন্সসীট দেখেছ?

    অতীশ বলল, দেখেছি।

    —এরপর লোক নেওয়া ঠিক হবে কিনা ভেবে দ্যাখ।

    অতীশ কেমন শিশুসুলভ হাসিতে বলল, একজন নিলে আপনার আর কত ক্ষতি হবে দাদা?

    কুমারবাহাদুর জানেন, অতীশই এমনভাবে কথা বলতে পারে। তিনি বললেন, তোমার কারখানা, যা ভাল বোঝ করবে।

    অতীশ বাইরে এসে দেখল, সুরেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। সে তাকে বলল, কাল তোমার ছেলেকে পাঠিয়ে দিও। কিছু একটা হয়ে যাবে। কুম্ভবাবু পাশের চেয়ারে বসেছিল। সে কথাটা শুনে চোখ কেমন ছোট করে ফেলল। অতীশের মাথা হেঁট করে কুমারবাহাদুরের ঘরে সে অবশ্য যেতে পারে না। তার সম্বল তার বাপ রাধিকাবাবু। কাবুল আর প্রাইভেট অফিসের স্যার—সনৎবাবু। সনৎবাবুকে সে গিয়ে চুপিচুপি বলল, স্যার অতীশবাবু সুরেনের ছেলেকে কারখানায় কাজ দেবে বলেছে। আপনি জানলেন না, আপনাকে না জানিয়ে এটা হচ্ছে। আমি নিজেই এতে অপমান বোধ করছি।

    সনৎবাবু দলিলের কপি মেলাচ্ছিলেন বসে বসে। পাশে একজন সেরাস্তাদার। এই কপি নিয়ে আজই উকিলের কাছে ছুটতে হবে। সব বস্তি অঞ্চলটাকে একটা পাবলিক লিমিটেডে কেস দেওয়া হচ্ছে। বছরকার রেভিনিউ স্ট্যাম্প জুডিসিয়েল স্ট্যাম্প সব জমা থাকে। সবই ব্যাক ডেটে করা হচ্ছে। রেজিস্টারকে বড় রকমের ঘুষ দিলেই বাকি কাজটা হয়ে যাবে। এ-সব খুবই নটঘটে কাজ। দলিল দস্তাবেজ ঘাঁটতে ঘাঁটতে মাথা খারাপ, ঠিক এই সময়ে এমন খবরে তিনি খুবই চটে গেলেন। বললেন, অতীশকে ডাকো।

    কুম্ভবাবুর বাপ রাধিকাবাবু পাশের টেবিল থেকে উঠে এসে বলল, স্যার এখন না। আগে কুমারবাহাদুরের সঙ্গে কথা বলুন। মনে হয় অতীশ কুমারবাহাদুরের সঙ্গে কথা বলেই করেছে। ওখানে ঠিক না করে, অতীশকে বললে ভুল করবেন।

    পরদিন সকালে অতীশকে এসে সুরেনই ডেকে নিয়ে গেল। রাস্তায় অতীশ বলল, ছেলেকে পাঠিয়ে দিও কিন্তু। কাল শুনলাম রাতে ফিরে এসেছে।

    —যাবে বাবু। আপনি মা বাবা। একটু দেখবেন। আমার বড় আদরের ছেলে নব। জ্যেষ্ঠ সন্তান কার না আদরের হয় বলেন।

    অতীশ কুমারবাহাদুরের ঘরে ঢুকেই দেখল তিনি একগাদা চিঠিপত্র নিয়ে ব্যস্ত। চিঠিগুলো তাঁর বেয়ারা সুরজিত কাঁচি দিয়ে মুখ কেটে রেখেছে। তিনি একটা করে চিঠি বের করছেন, আর লাল পেনসিলে টিক মেরে যাচ্ছেন। কোথাও সামান্য নোট দিচ্ছেন কিছু। সে যে দাঁড়িয়ে আছে তিনি যেন খেয়ালই করছেন না। চিঠি দেখতে দেখতেই সহসা বললেন, সুরেনের ছেলেকে কাজ দেওয়া ঠিক হবে না। অতীশ কিছু বলতে যাচ্ছিল, তিনি ফের বললেন, কারো কারো ইচ্ছে নয় তার এখানে কাজ হোক। মাথা গরম ছোকরা, তুমি বিপদে পড়বে।

    —কিন্তু কথা দিয়েছি।

    —কথার দাম আমরা এখন ক’জন রাখতে পারি। সরকারই রাখতে পারছে না।

    —এটা মানসম্মানের প্রশ্ন।

    —সেটা আমাদের বাপ-জ্যাঠাদের আমলে ছিল।

    অতীশ বলল, কতটা আর ও ক্ষতি করতে পারে?

    —অনেক। আরে তুমি এতটুকুতেই বিচলিত হলে চলবে কি করে? চার পাশে চোখ মেলে দেখ। রাস্তায় পাঁচিলের পাশে কত আঁস্তাকুড়। তুমি ভাঙতে পারবে। বলেই তিনি বেল টিপলেন। দরজার পাশে অন্য কোনও আমলা অপেক্ষা করছে। তাকে তিনি ডেকে পাঠালেন। অতীশ বুঝতে পারল, কুমারবাহাদুর এ-নিয়ে তার সঙ্গে আর কোনও কথা বলতে চান না। তার চোখ মুখ কেমন লাল হয়ে যাচ্ছে। গায়ের রক্তে কোথায় যেন অসম্মানের কাঁটা বিজবিজ করছে। মগজের ঘিলুতে কেউ সূচ ফোটাচ্ছে। সুরেনকে কি বলবে! তার কেন জানি মনে হচ্ছে এটা আর্চির কাজ। আর্চির সেই প্রেতাত্মার প্রভাব। তার মাথার মধ্যে তক্ষুনি ঘণ্টাধ্বনি শুরু হয়। সেই কবে থেকে সেটা হয়ে আসছে। সে ঘেমে যাচ্ছিল। কুমারবাহাদুর তার দিকে একবার চোখ তুলেও তাকায়নি। ভারি ঠাণ্ডা ব্যবহার। কেন এমন হয়! সেতো কারো প্রতি বিরূপ নয়, শত্রুতা করেনি। তবে কেন তাকে এভাবে বিড়ম্বনার মধ্যে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারপরই শুনতে পেল সুদূর থেকে কারা যেন কিছু বলে যাচ্ছে—পৃথিবীতে সর্বত্রই আর্চিরা রয়েছে অতীশ, ঘাবড়ে যেও না। দূরাতীত কোনও গ্রহের মধ্যে জীবনের দেখা সেই তিন মহাপুরুষ যেন হাত তুলে দিয়েছেন—দেখল সেখানে ঈশম, সারেঙসাব, আর স্যালি হিগিনস—তাঁদের হাত সে দেখতে পেল অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গেছে। মাথা নিচু করে সে ধীরে ধীরে অগত্যা বের হয়ে এল। তার এখন সত্যি আর কিছু যেন করণীয় নেই।

  • আট

    আট

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    আট

    অতীশ অফিসে আজ ভাল করে কাজে মনোযোগ দিতে পারল না। ভারি অসম্মান এবং অপমানে সে কেমন প্রায় চুপচাপই ছিল। বিল ভাউচার এলে সই করে দিয়েছিল। পার্টির কাছে তাগাদার একটা লিস্ট পড়ে আছে। সে আজ টাকার জন্য কাউকে তাগাদা দেবার পর্যন্ত উৎসাহ পেল না। কুন্তবাবু বাইরের ঘরে বসে সেলট্যাকসের রিটার্ন করছে। সুপারভাইজার বলে গেছে বার্নিশ ভাল দেয়নি। ঢাকনার রং চটে যাচ্ছে। ডাইস খারাপ হতে পারে—এমন সব কথাবার্তা কিছু এবং জানালা দিয়ে তাকালেই চোখে পড়ে সেই শিউপূজনের ঘর। সে কলপাড়ে বসে গা ঘষছে। পাশ থেকে জল নিচ্ছে লাইনবন্দী লোকেরা। রাজবাড়িতে সে সুরেনকে কিছু বলেই আসেনি। নব হয়ত আসবে। নব আসবে এই ভয়ে সে খুবই বিমর্ষ বোধ করছিল। নব চাকরির আশায় কারখানায় চলেও আসতে পারে। এলে তাকে কি ভাবে ঠেকাবে বুঝে উঠতে পারছে না। দুবার কুম্ভবাবু তার ঘরে এসে একটু বসার তাল খুঁজছিল। কিন্তু চুপচাপ থাকায় বিল ভাউচার সই করিয়ে নিয়ে চলে গেছে।

    আর সবকিছুই কেন জানি এখানে তার অস্বাভাবিক ঠেকছে। শহরের মানুষ সে নয় বলেই হয়ত তার এসব খুব অস্বাভাবিক ঠেকছে। অমলার সঙ্গে কথাবার্তা তার কিছুটা ভুতুড়ে ব্যাপার মনে হচ্ছে। আসলে কি তার ভেতর বৌরাণীকে দেখার পরই অমলা অবচেতন মনে এসে আশ্রয় করেছে। সে রাতে কি অমলাকে নিয়ে কোনও স্বপ্ন দেখেছিল! অমলার ব্যবহারও ভারি বিস্ময়ের মনে হয়েছে তার কাছে। এসব বনেদি বংশে ভাঙচুর হচ্ছে ঠিক, তাই বলে অন্দরে ডেকে নিয়ে যাওয়া! তার এখনও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে ঘটনাটা। মানসদা, নব, সুরেন এবং ভ্রূণ হত্যা সবই কেমন রহস্যজনক। নব নাকি সারাদিন সারারাত ভি আই পিতে গাড়ি গোণে। মানুষের এমন নিষ্ঠুর পরিণতি শহরে না এলে যেন সে বুঝতে পারত না। সেই পাখিটা তাকে হণ্ট করছে। পাগলাটা আজও দেখেছে একটা পালক বেঁধে লাঠিতে রাজাবাজারের দিকে বীর দর্পে হেঁটে যাচ্ছে। সে এই নগরজীবনের একজন মস্ত ব্যস্ত মানুষ যেন। সব কিছু অগ্রাহ্য করে কেবল হাঁকছে, দু’ঘরের মাঝে অথৈ সমুদ্দুর। কখনও বলছে, দম মাধা দম, পাগলা মাধা দম। তার কত কাজ। এক মুহূর্ত তার বসে থাকার সময় নেই। যেন সে চুপচাপ থাকলে, বসে থাকলে পৃথিবীটা রসাতলে যাবে।

    আর এ সময়ই বাড়ির জন্য মনটা কেমন হাহাকার করে উঠল। নির্মলা থাকলে আজ তাকে সব খুলে বলতে পারত। সব অপমান তাহলে সেই পাগলের মত সেও অগ্রাহ্য করতে পারত। প্রায় মাস হতে চলল—কাজটাজ কিছটা বুঝে নিয়েছে। পার্টিরা আসছে। এবং সে এ কদিনেই টের পেয়েছে, এই পার্টিদের সঙ্গে কুম্ভবাবুর একটা গোপন লেনদেন আছে। কুম্ভবাবু সহজেই দশ-বিশ টাকা ট্যাকসি খরচা করতে পারে। বৌকে নিয়ে ট্যাকসি ছাড়া ঘোরে না। নামী রেস্তোরাঁয় বৌকে নিয়ে প্রায়ই রাতের খাওয়া-দাওয়া সারে। বৌকে প্রায়ই নতুন নতুন শাড়ি গয়না কিনে দেয়। এমন অভিযোগ তার কানে এসেছে। লোকটাকে চোখে চোখে রাখতে বলেছে কেউ। কুম্ভবাবু নিজেও ভারি ফিটফাট থাকে। সামান্য মাইনেতে এটা কি করে সম্ভব সে বুঝে উঠতে পারে না। কস্টিং দেখা দরকার। সবটা বুঝে না নিতে পারলে সে আপাতত কাজটা করতে পারছে না। তার জন্য প্রাণপণে সে কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে চাইছে।

    হলে কি হবে—সেই এক পাগল বার বার হাঁকছে—এবং এই হাঁক থেকেই সে বুঝতে পারে, লোকটা তার কোন গল্পের নায়ক হতে চলেছে। এ বাড়িতে ঢোকার দিন, যেন তাকে দেখেই পাগলটা হেঁকে উঠেছিল—অথচ তার মনে হয়েছিল অদৃশ্য কোন এক জগৎ থেকে সে হাঁকছে। এখন মনে হচ্ছে তার ভেতরে সব অপমানের জ্বালা এই পাগলটাই পারে নিঃশেষ করে দিতে। কারণ সে যখন লেখাতে দেখতে পায়, সেই মানুষ অবিকল উঠে এসেছে, তখন কেমন বিজয়ীর মত তার উল্লাস—অহংকার অতীব এক তখন তাকে গ্রাস করে।

    সে ক্যাশবুকের পাতা উল্টে যাচ্ছিল। কিছু ভাউচার এখনও ক্যাশবুকে রয়ে গেছে। ক্যাশবুকের সঙ্গে মিলিয়ে টিকমার্ক দিয়ে দিচ্ছে। ক্যাশ এখন থেকে তার কাছে আছে। কোম্পানির দায়িত্ব নেবার দ্বিতীয় দিনেই নির্দেশ এসেছে, ক্যাশ আগলানোর দায় তার। কারণ টিফিন এবং ট্র্যাভলিং-এ দেখা যাচ্ছে প্রতিদিন একটা বিরাট খরচের বহর। পার্টিদের ঘরে যাওয়া আসা কাটা, টাকা আদায়ের কাজটা কুম্ভবাবু টিফিনের পরে করে থাকে। ট্রামের মানথলি কাটা আছে। টিফিনের পর তাকে আর পাওয়া যায় না। সে তখন প্রায় মুক্ত। ট্র্যাভলিং অ্যালাউন্স বাবদ সে রোজই পাঁচ-সাত টাকা ক্যাশ থেকে নেয়। সনৎবাবু বলেছেন, এ দিকটা দেখতে। পার্টিদের নাম চাইবে। মাঝে মাঝে ফোনে যোগাযোগ করবে। অর্থাৎ আকারে ইঙ্গিতে বিষয়টা যাচাই করে নিতে তাকে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু মুশকিল এটা যে অতীশের কাছে বড়ই ছোটমনের পরিচয়! সে আজ পর্যন্ত কোন কাস্টমারকেই ফোন করে বলতে পারেনি, কুম্ভ যথার্থই পার্টির ঘরে গিয়েছিল কিনা।

    এতে মনে হয় সে নিজেই পার্টির কাছে ছোট হয়ে যাবে।

    এবং এই এক মাসে সে বুঝতে পারছে, কাজটার পক্ষে সে খুবই অনুপযুক্ত। কাজটার সঙ্গে তার মনের কোন মিল নেই। সাধারণ সব কাজই মানুষের একদিন একঘেয়ে ঠেকে কিন্তু এখানে এসে মনে হয়েছে—সে জীবনে আর একটা বড় ভুল করেছে। আর তখনই কেন জানি ইচ্ছা হয় যদি কোথাও আবার শিক্ষকতার কাজ পায় চলে যাবে। কোনও দূর গাঁয়ে। সেখানে থাকবে আদিগন্ত মাঠ, নদী ফুল পাহাড় উপত্যকা, এমন একটা জায়গায় তার চলে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সে জানে, আপাতত যা মাইনে পাচ্ছে, শিক্ষকতা করে সেটা সে উপার্জন করতে পারবে না। তাছাড়া নিরাপত্তাবোধের অভাবেও সে বিশেষ উদ্বিগ্ন। একটা লজঝড়ে কোম্পানির প্রায় সব দায়িত্বভার তার ওপর। টাকা আদায়, কাঁচামাল সংগ্রহ, পার্টির পেমেণ্ট, সেলট্যাকস, প্রভিডেণ্ট ফাণ্ড কন্ট্রিবিউউশন সব জমা যথাসময়ে দেওয়ার দায়িত্ব তার। সে বুঝতে পারে এটা এখন তার জীবনের বড় ফ্রণ্ট। আর একটা ফ্রণ্ট সেই প্রেতাত্মা। স্যালি হিগিনস যার সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, তৃতীয় ফ্রণ্ট তার স্ত্রী-পুত্র এবং বাবা-মা। আর চতুর্থ ফ্রণ্ট সে নিজেই গলায় ফাঁসের মত আটকে নিয়েছে—সেটা তার লেখা। সে বুঝতে পারে এখানে আজীবন তাকে চারটা ফ্রন্টে লড়তে হবে। আর তখনই আর একটা মুখ সুদূর থেকে ভেসে আসে সে আর কেউ নয়, বনি। সে একটা বোট দেখতে পায়। সেও এক গভীর গোপন ফ্রণ্ট। বনি চঞ্চল বালিকার মত পাটাতনে ছুটে বেড়াচ্ছে। কখনও হালে বসছে। কখনও চাপাটি তৈরি করছে। ছোটবাবুকে খেতে দিচ্ছে। আর চারপাশে খুঁজছে যদি কোথাও একটুকু ডাঙা চোখে পড়ে। শুধু হাহাকার সমুদ্র বাদে বনি কিছু আবিষ্কার করতে না পারলে বলছে, ছোটবাবু আমাদের কী হবে?

    ছোটবাবুর তখন আশ্বাস, এই দেখ চার্ট। তিনি সব বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমরা এর বরাবর গেলে, ঠিক সান্তাক্রুজ দ্বীপ পেয়ে যাব। কোরাল সীতে সবচেয়ে কাছের দ্বীপ ওটাই। কম্পাসের কাঁটার দিকে লক্ষ্য রাখবে, যেন সাউথইস্ট ইস্টে বোটের মুখ ঘুরে না যায়।

    তাহলে কি হবে?

    আমরা তবে অজানা এক সমুদ্রে গিয়ে পড়ব।

    তাহলে আমরা মরে যাব ছোটবাবু?

    সেই মুখ কি করুণ আর অপার্থিব। বালিকার চোখ সজল হয়ে ওঠে। কতদিন থেকে তারা সমুদ্রে ভেসেই বেড়াচ্ছে। সে কবে থেকে যেন। কোন দূর অতীতে মনে হয় বনি ডাঙার মানুষ ছিল। সেও। এখন সমুদ্রের সব রকমের হাহাকার দেখে বনি অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এখন শুধু ছোটবাবুর জন্য তার বেশি চিন্তা। ছোটবাবু এতটুকু মুখ ভার করে থাকলে, কাছে ছুটে এসে হাঁটু গেড়ে বসে। এই ছোটবাবু— বলে ছোটবাবুর থুতনি তুলে ধরে। বলে, বাবা সত্যি কি বলেছে বল! বাবা আমাদের সমুদ্রে ভাসিয়ে দিল কেন? সঙ্গে ক্রসটা দিয়েছে কেন? বাইবেল দিয়েছে কেন। আমরা কি কোনও পাপ কাজ করেছি?

    তিনি তো বনি আমাদের নামিয়ে দেবার আগে বললেন—সমুদ্রের অশুভ প্রভাবে পড়ে যেতে পারি। সেজন্য ক্রসটা বোটে তুলে দিলেন, বাইবেল দিলেন। আসলে ছোটবাবু বলতে পারল না, আমরা আর ডাঙা পাব না। এই বোটেই আমরা মরে পড়ে থাকব। মাথার কাছে বাইবেল থাকবে। ক্রসটা থাকবে। আমরা মরে গিয়ে আবার ভূত হয়ে না যাই—সেজন্য তিনি তাঁর ধর্মীয় কাজটুকু আগে থেকেই সেরে রেখেছেন। তারপরই ছোটবাবু দেখল সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সমুদ্র শান্ত। পারপয়েজ মাছের ঝাঁক ভেসে উঠেছে। অতল নীল গভীর জল। যতদূর চোখ যায় শুধু অসীম জলরাশি। ছোটবাবুর মনে হয়, এখুনি সেখানে কোন অতিকায় প্রাণী ভেসে উঠবে। পাইলট মাছ দেখলেই বুঝতে হবে কোন নীল হাঙর সমুদ্রের অতলে ঘাপটি মেরে আছে।

    বনি হাঁটু গেড়ে বসে আছে পাটাতনে। মাথার ওপরে বিশাল আকাশ। কোথাও এতটুকু মেঘ নেই। নক্ষত্রেরা সব ফুটে উঠছে একে একে। দূর থেকে ডানার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। লেডি অ্যালবাট্রস উড়ে গেছিল সকালে, সন্ধ্যায় ফিরে আসছে। ফিরে এসেই চুপচাপ হালটার মাথায় ঘাড় গুঁজে বসে থাকবে। আর অজস্র প্রশ্ন তখন বনির, এই এলবা ডাঙার খোঁজ পেলে! কতদূর গেছিলে? আমরা ঠিক যাচ্ছি তো। কোথাও জাহাজ, জেলে নৌকা কিছু দেখলে?

    ছোটবাবু পালের দড়িদড়া খুলে ফেলছিল। বনির চিৎকার তখন পরিত্যক্ত জাহাজটা সম্পর্কে, তখন একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে। ওরা কোথায়? কত দূরে।

    ছোটবাবু পালের দড়িদড়া এক জায়গায় জড় করে রাখছে। সে পাটাতন তুলে দেখল অয়েল ব্যাগটা ঠিক আছে কিনা। সমুদ্র এমন শান্ত থাকলে ভয়ের কথা। সে যেন বাতাসের গন্ধে ঝড়ের আভাস পাচ্ছিল।

    সে বলল, বনি জল, খাবার এখনও আমাদের মাসের মত মজুত আছে। দুই বুড়ো মনে হয় শেষদিকে নিজেরা কিছু খায় নি। অথবা বুড়োরা টের পেয়েছিল, জাহাজের পরিণতি এই হবে।

    বনি বলল, তোমাকে আমি বিশ্বাস করি না। তুমি এখনও আমাকে সত্যি কথা বলছ না!

    ছোটবাবুর ভারি অসহায় মুখ। তাঁর নির্দেশ আছে, বনি যেন জানতে না পারে এক অজানা সমুদ্রে ছোটবাবুর সঙ্গে বনিকে ভাসিয়ে দেওয়া হল। এখন একমাত্র যেন দৈবই তাদের রক্ষা করতে পারে।

    ছোটবাবুর এই অসহায় মুখ দেখলেই আর্চির সেই দৌরাত্ম্যের কথা মনে হয়। সঙ্গে সঙ্গে বনি কেমন হয়ে যায়। গায়ে নীলাভ ফ্রক, মাথায় নীলাভ চুল, সামনেই ডাঙা পাবে বলে সে বোটে উঠে এসেছিল। সে তার দামী দামী পোশাক, পারফিউম সঙ্গে এনেছে। সন্ধ্যা নামার আগে সে একজন নারীর মত সাজতে বসে গেল। ছোটবাবুকে কষ্ট দিলে সে নিজেই বড় বেশি ভেঙে পড়ে। তারপর প্লেটে খাবার, সামান্য জল। খাবার বলতে দুখানা চাপাটি, দুটো সারডিন মাছ, এক গ্লাস জল, দুটো আলু সেদ্ধ। নিজের জন্য বলতে গেলে বনি কিছুই রাখেনি।

    ছোটবাবু পালটা ভাঁজ করে সব গিয়ারের সঙ্গে ফেলে রাখল। কম্পাসের কাঁটা দেখে সে বুঝেছিল উল্টো হাওয়া বইছে। কেমন এলোমেলো হাওয়া। যদি পাল তুলে রাখে যতটা তারা এগিয়েছে, ঠিক ততটা তারা পিছিয়ে যাবে। এই ভেবে পাল খুলে দড়িদড়া নিচে রেখে সমুদ্র থেকে জল তুলে হাতমুখ ধুয়ে নিল। লোনা জলে শরীর মুখ করকর করে। সেটা শুকিয়ে গেলে একরকমের প্রসন্নতা বোধ করে ছোটবাবু। দুপুরে ওরা দুজনেই দড়িদড়া ধরে সমুদ্রে ডুব দিয়ে উঠে এসেছিল। বেশি ঘাম হলে তেষ্টা পায়। ডুব দিয়ে বুঝেছিল, ঘাম হচ্ছে না, তেষ্টাও কম পাচ্ছে। গত রাতে মনে হয়েছিল অতিকায় কিছু মাছেরা পাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। কিন্তু শেষ রাতে অন্ধকার ছিল বলে কিছুই টের পায়নি। আজ রাতে কি হবে কে জানে। একটা লম্প জ্বালা থাকে মাস্তুলে। কোন দূরবর্তী জাহাজের ওটাই সঙ্কেত। আর অজস্র প্রশ্ন তখন বনির, এই যদি দূর থেকে কোন জাহাজ অথবা জেলে নৌকা তাদের দেখতে পায়! সে বলল, আগে লম্পটা জ্বালিয়ে দাও। এত তাড়াতাড়ি খেতে দেবার কি হল! কত কাজ বাকি।

    বনির চোখ ভারি বিহ্বল। ছোটবাবু বনির এই চোখ দেখলে আবিষ্ট হয়ে যায়। হাঁটু গেড়ে পাশে বসে দুহাতে জড়িয়ে ধরে চুলে মুখ ঘষতে থাকে। বনি ছোটবাবুর বুকে টুপ করে মুখ লুকিয়ে ফেলে। অতিকায় পাখিটা তখন হাওয়ায় পাখা ঝাপটায়।

    কুম্ভ এসময় টেবিলে ঝুঁকে একবার উঁকি দিয়ে দেখল, মানুষটা ক্যাশবুকে ঝুঁকে আছে। সামনে ক্যাশবুক খোলা। বিরাট সেক্রেটারিয়েট টেবিল, চার-পাঁচটা চেয়ার সামনে। তার ভেতর দিয়ে মানুষটার মাথা মুখ হিজিবিজি মাকড়সার জালের মত অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মাথা নিচু করে বসে আছে। কপালে অবিন্যস্ত চুল পাখার হাওয়ায় উড়ছে। বড়ই আবিষ্ট। বোধহয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে সব। কিন্তু পরে মনে হল, না, কিছুই দেখছে না মানুষটা। নেশায় বুঁদ হয়ে মানুষ বসে থাকলে যেমনটা হয় অনেকটা সেরকমের। খুব কাহিল হয়ে গেছে। আজ যা বড় একখানা ল্যাং খেয়েছে তাতেই এই। সকাল থেকেই দেখছে খুব গম্ভীর। মুখে আশ্চর্য প্রসন্নতা থাকে সকাল থেকে, তা আর নেই। এই প্রসন্নতা সে সহ্য করতে পারে না। মুখে এমন একটা ধার্মিকভাব থাকে যে সাধুসন্ত ভাবতেও কষ্ট হয় না। এই ক্যামোফ্লেজ লোকটার না ভাঙতে পারলে তার শান্তি নেই। সে পুলকিত বোধ করল। সে ভাবল উঠে একবার যায় কাছে। একটু দরদ দিয়ে কথা বলে। এই ভেবে সে উঠে এল। তারপর চেয়ারে বসে বলল, কাবুল আসবে যাবেন নাকি?

    অতীশ কেমন ধড়মড় করে উঠে বসার মত মুখ তুলে তাকাল।—অঃ আপনি!

    —তবে কি ভেবেছিলেন!

    —না, ভাবলাম … আসলে সে ভেবেছিল, নব বুঝি এসে গেছে।

    —ঠিক প্লট ভাবছেন!

    অতীশ বলল, ঐ আর কি!

    —কাবুল আসবে। চাঙ্গোয়ায় যাব। যাবেন নাকি। কাবুল খাওয়াবে বলেছে।

    কাবুলবাবু কুম্ভের ছেলেবেলার বন্ধু। একসঙ্গে রাজপ্রাসাদে বড় হয়েছে। কুম্ভের বাড়িতে কাবুলবাবুর যেতে কোন নোটিশ লাগে না। এই মানুষটা যখন তখন চলে আসে এবং কুম্ভকে সঙ্গে নিয়ে কোথায় যায়। সে কোনও প্রশ্ন করতে পারে না। কারণ কুম্ভবাবুই বলেছে, কাবুল থেকে সাবধান থাকবেন। ও রাজবাড়ির এজেণ্ট। ওর কাছে কোন বেফাঁস কথা বলবেন না।

    অতীশ বলল, বিকেলে কাজ আছে। একটু কলেজ স্ট্রীট পাড়ায় যাব ভাবছি।

    —আপনার ঐ এক দোষ দাদা। জীবনটাকে বড় সিরিয়াসলি নিয়েছেন। সব ব্যাপারে অত সিরিয়াস হওয়া ভাল না। সকাল থেকেই দেখছি মুখ গোমড়া করে বসে আছেন।

    —কখন মুখ গোমড়া করলাম?

    —মুখ গোমড়া না করেন, মনটা প্রসন্ন নয় এটা আপনাকে স্বীকার করতেই হবে।

    অতীশ ক্যাশবুকটা বন্ধ করে সরিয়ে রাখল। বেল টিপে সুধীরকে ডাকল। সুধীর এলে বলল, চা কর। সে কেমন জড়তা কাটিয়ে ওঠার জন্য ফ্যানটা পুরো পাঁচে দিয়ে এসে আবার নিজের জায়গায় বসল।

    দুটো ঘর থেকেই মেশিনের শব্দ কানে আসছে। তিন নম্বর শেডটা দূরে বলে তার মেশিনপত্রের আওয়াজ এখান থেকে পাওয়া যায় না। অতীশ শব্দ শুনেই টের পায় কোন মেশিনটা চলছে, কোনটা বন্ধ আছে। জাহাজের এঞ্জিনরুমে কাজ করে তার ভেতরে এই সহজাত বোধ গড়ে উঠেছে। আর তার জানালা থেকে রাস্তার ও পাশের শেডের সবটাই প্রায় দেখা যায়। এই একমাসেই বুঝছে, কর্মীরা সারাদিনে যা কাজ করে, ওভারটাইমে তার ডবল কাজ দেয়। কিছুতেই সে বুঝিয়ে-সুজিয়ে কারখানার উৎপাদন বাড়াতে পারেনি। যেখানে আট দশ হাজার কনটেনার তৈরি হয় আট ঘণ্টায়, কাজের লোকগুলি সামান্যতম আন্তরিক হলে একই সময়ে দ্বিগুণ কাজ দিতে পারে। আসলে ঘুণ ধরেছে—এই কারখানার দেয়ালে, দরজায়, যন্ত্রপাতিতে সর্বত্র ঘুণ। কাজের লোকগুলির শরীরেও ঘুণ ধরেছে। এভাবে চালালে, দু-চার বছরে কারখানা লাটে উঠবে। এই থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে তাকে কিছু একটা করতেই হবে। এবং যেটা এখন তার মাথায় বেশি কাজ করছে, সেটা হচ্ছে এদের বেতন বৃদ্ধি দরকার। এই বেতনে কোনও মানুষের পক্ষে দুবেলা পেট ভরে খেয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব না।

    কুম্ভ বলল, সকালে কুমারবাহাদুর কি বলল?

    অতীশ অকপটেই বলল, রাজি হলেন না।

    —রাজি হলেন না মানে?

    —নবর কাজের জন্য বলেছিলাম। কাল বললেন, নাও। যদি দরকার মনে কর নাও। আজ সকালে ডেকে একেবারে উল্টো কথা বললেন।

    কুম্ভ মনে মনে বেশ মজা পাচ্ছে। বলল, উল্টো কথা বলাই এদের স্বভাব। এরা বড়লোক দাদা। এরা টাকা ছাড়া কিছু বোঝে না।

    সুধীর এসে বলল, চা নেই স্যার।

    কুম্ভ ধমক লাগাল। —চা নেই তো আগে বলতে পার না কেন! দেখ সুধীর তোকে বার বার বলছি, কাজ ঠিক মত করবি। তুই আছিস কি জন্যে! এখন চা এনে তারপর জল গরম করবি! অতীশ ড্রয়ার খুলে টিফিন একাউন্টে দুটো টাকা বের করে দিল।—চা রাস্তা থেকে নিয়ে এস। এবার থেকে যেন ভুল না হয়।

    সুপারভাইজার এসে দরজায় মুখ বাড়াল। দেখল কুম্ভবাবু ম্যানেজারের সঙ্গে গল্প করছেন। সে একজন কর্মীর অভিযোগ নিয়ে এসেছে। কর্মীটি হেল্পার, বিটের কাজ জানে, এখন জরুরী দরকার পড়ায় তাকে বিটে বসতে হবে। কিন্তু সে রাজি না। তাকে বিটম্যান না করলে সে কাজে বসবে না বলছে।

    অতীশ অভিযোগটি মন দিয়ে শুনল। তারপর বলল, আজকের মত চালিয়ে দিতে বলুন। কাল এ-নিয়ে কথা বলব।

    —কথা অনেকদিন ধরেই হচ্ছে। কোন ফয়সালা হচ্ছে না।

    অতীশ বলল, আমি তো আজই শোনলাম। একটা দিন তো সময় দেবেন।

    কুম্ভ তখন বেশ জাঁকিয়ে বসে গেল। বলল, দাদা আসকারা দেবেন না। কারখানা জায়গাটাই খারাপ। আপনি যেই একজনকে লিফট দেবেন, অমনি দেখবেন পাতাল থেকে দশটা মুখ বার হয়ে আসছে। আপনাকে খাব খাব করছে।

    অতীশ আগে এই সব সমস্যায় একটুকুতেই নিজেকে বিপর্যস্ত বোধ করত। এখন কিছুটা সয়ে গেছে। সে কুম্ভকে বলল, আপনি একবার ভেতরে যান। দেখুন বুঝিয়ে কিছু করতে পারেন কিনা। সঙ্গে সঙ্গে কুম্ভ উঠে চলে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে সব ঠিকঠাক করে চলে এল। অতীশ ভাবল কুম্ভবাবুর ক্ষমতা আছে। সে দেখেছে কিছু কিছু শ্রমিক ওর খুব বাধ্যের। চার-পাঁচ বছর কুম্ভবাবু আছে। মাঝখানে ম্যানেজার ছিল না কুম্ভবাবুই চালিয়েছে সব। এতেই প্রভাব প্রতিপত্তি তার বেড়েছে। সে বলল, দেখুন তো কি ঝামেলা। এখন নব আসলে কি বলি।

    —কি বলবেন আবার। সোজাসুজি না করে দেবেন।

    —কিন্তু ওর বাবাকে আমি কথা দিয়েছি। আর এটা তো আমার খুশি মত করিনি। রাজার অনুমতি নিয়েই করেছি। এখন আমার সম্মানটা থাকে কোথায়।

    কুম্ভ ভীষণ রেগে গেছে মত বলল, এতে শুধু আপনার সম্মান, কোম্পানির সম্মান যায় না! কর্তৃপক্ষের সম্মান থাকে! কান টানলে মাথা আসে না!

    অতীশ বলল, কারা নাকি আপত্তি জানিয়েছে?

    —কার দায় পড়েছে দাদা। একটা বেকার ছেলের কাজ হবে, কেউ তাতে বাগড়া দিতে পারে। ধর্মের ভয় নেই! আসলে কি জানেন দাদা, এরা সব পছন্দ অপছন্দ অপরের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে খালাস। নিজেরা ধোওয়া তুলসীপাতা সেজে বসে থাকে। এদের আপনি একদম বিশ্বাস করবেন না। দেখছেন ত কাবুলটা এলে সব নিয়ে কথা হয়। বলতে কি খিস্তিখাস্তাও হয়। কিন্তু কারখানা নিয়ে একেবারে স্পিকটি নট।

    কুম্ভর প্রতি অতীশের কেন জানি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে গেল। যদিও মাঝে মাঝে আশ্চর্য এক নিশুতি গন্ধ পায়, কুম্ভবাবুর নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে সেই নিশি পাওয়া ভূতের গন্ধটা কেন জানি লেগে থাকে। আর্চির সেই হাঁ করা মুখ—মুখের ওপর ছোটবাবু উপুড় হয়ে পড়ে দেখেছিল লোকটাকে সে যথার্থই খুন করতে পেরেছে কিনা, আর তখনই ভক করে গন্ধটা এসে লেগেছিল নাকে। হাঁ করা মুখ থেকে একটা পচা গন্ধ বের হচ্ছে। ওর মাথাফাতা গুলিয়ে উঠতেই সিঁড়ি ধরে নেমে আসছিল। আর চারপাশে তখন কি গভীর অন্ধকার। চারপাশে জাহাজীদের হল্লা চিৎকার। এলিওয়ে ধরে কারা বোট ডেকে ছুটে যাচ্ছে। এনজিনরুমে বিস্ফোরণ! বয়লার-ফয়লার সব ছত্রাকার। সারা জাহাজে এক অতিকায় দুর্যোগ—ছোটবাবু দুর্যোগে পড়ে গন্ধটার কথা ভুলে গেছিল। পরে কিছুদিন সে সুস্থ স্বাভাবিক। কিন্তু সমুদ্রে ভাসমান বোটে বনির লুকনো মুখের দিকে তাকাতেই সে শিউরে উঠল। একটা ভুরভুরে পচা গন্ধ আসছে কোত্থেকে! সে বনিকে শুঁকে দেখল না সেখান থেকে উঠছে না। অতিকায় একটা সুরমাই মাছ তুলে রেখেছিল, ওর ভেতর থেকে লালা চুষে খাবে বলে —সেটা পচে যেতে পারে, সে তাড়াতাড়ি মাছটার কাছে চলে গেল—না আঁষটে গন্ধ, কোনও পচাগন্ধ নেই। লেডি আলবাট্রসও বোটে নেই –তবে গন্ধটা আসছে কোত্থেকে। যেন চেনা চেনা গন্ধ। একবার এই গন্ধে তার মাথাফাতা গুলিয়ে উঠেছিল—সেটা কবে কখন, ঠিক সেই গন্ধ, ঠিক তক্ষুনি মাথায় ঘণ্টা ধ্বনি, যেন সেই অ্যাবট অফ অ্যাবট ব্রথক—নিরন্তর ঝড়ের রাতে ঘণ্টা ধ্বনি করে চলেছে, ছোটবাবু তুমি আর্চিকে খুন করেছ। সে তোমাকে ক্ষমা করবে না। তাহলে কি সেই প্রেতাত্মার নিশ্বাস-প্রশ্বাসের গন্ধ! সে কাছেই রয়েছে। সে তার প্রতিশোধ নেবে বলে এই বিশাল দিগন্ত প্রসারিত জলরাশির ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে। ছোটবাবু চিৎকার করে উঠেছিল, গড সেভ আজ। সেভ আজ ফ্রম অল ট্রাবলস। বনি টের পেয়ে বলেছিল, ছোটবাবু ক্রসটা আমার মাথার কাছে এনে দাও। ওটা ছুঁয়ে বসে থাক। কোন অশুভ প্রভাবে আমরা তবে পড়ে যাব না। কুম্ভবাবু কাছে এলে মাঝে মাঝে সেই গন্ধটা কেন জানি আজকাল নাকে এসে লাগে।

    কুম্ভবাবু বলল, চলুন ঘুরে আসি। মনটা ভাল হবে। কাবুল আমাদের খাওয়াবে বলেছে। ও গাড়ি নিয়ে আসবে।

    অতীশ কোনও জবাব দিল না।

    তারপর ভারি বিশ্বস্ত মানুষের মত বলল, জাহাজে ত শুনেছি সবাই সব খায়। গরু বাছুর মেয়েছেলে মদ। আপনি খাননি?

    অতীশ চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিল। তারপর হাতটা মাথার ওপর ছড়িয়ে বলল, জাহাজে সবই চলে।

    —তবে আপনি যেতে চাইছেন না কেন। আপনার তো প্রেজুডিস থাকা ঠিক না।

    —তা অবশ্য নেই। তবে এখন ভুলে গেছি সব।

    তখনই ফোনটা বেজে উঠল, হ্যালো হ্যালো। হ্যাঁ মিঃ ভৌমিক বলুন। কি খবর! মাল কাল যাবে না। তারপর অতীশ ক্যালেণ্ডারের পাতা দেখে বলল, বুধবার পাবেন।

    —বহুৎ ঝামেলা হো জায়গা বাবুজী। থোড়া জলদি করিয়ে।

    —জলদিই করছি।

    —বাবুজী সিজন টাইম আছে। থোড়া মেহেরবানী করিয়ে।

    —আরে এতে মেহেরবানী করার কি আছে!

    তখনই কুম্ভ বলল, রামলাল?

    অতীশ ঘাড় কাত করল।

    —হাজার তিনেক টাকা আরও অ্যাডভান্স চান।

    অতীশ কোনও অ্যাডভান্সের কথা বলল না। সে ফোন ছেড়ে দিল। কুম্ভের ভেতরে তখন একটা জেদী চিতাবাঘ ওৎ পেতে থাকে। যেন অতীশ খুবই একটা ভুল করে ফেলেছে। তার কথার কোনও গুরুত্ব দেওয়া হল না। সে কি নিজের জন্য এটা করছে। ফোন নামাবার সঙ্গে সঙ্গে বলল, অ্যাডভান্সের কথা কিছু বললেন না?

    —ওর তো অনেক টাকা অ্যাডভান্স পড়ে আছে। শোধ দেবো কি করে।

    —আপনি কি মনে করেন, লোকটা এমনিতে লোটা কম্বল নিয়ে কলকাতায় এসেছে। ধান্দা নেই। এমনিতেই দশ-বার হাজার টাকা ফেলে রেখেছে। কোন ধান্দা নেই। মেহেরবানী করেন বলে, অথচ কোনও ধান্দা নেই!

    —আপনিই যে বলেছেন, লোকটা দুঃসময়ে কোম্পানিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

    —বাঁচিয়ে রেখেছে কেন? আখের না থাকলে সে বাঁচাতে আসবে কেন! আর কারখানা নেই, আর মাল সাপ্লাই করার লোক নেই!

    অতীশ এসব কথার জবাবে কি বলবে! এই মানুষটাই রামলালকে একদিন সঙ্গে নিয়ে এসে বলেছিল, রামলাল ছিল বলে আপনি কোম্পানির ম্যানেজার হয়ে আসতে পেরেছেন। না হলে কবে লাটে উঠে যেত। বিপদে আপদে শেঠজী আমাদের রক্ষা করে আসছে! সেই শেঠজীকেই কুম্ভবাবু এখন ধান্দাবাজ বলছে। লোকটার মতি-গতি অদ্ভুত রকমের। সে কুম্ভবাবুর হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্য বলল, পরে এক সময় বললেই হবে।

    —দাদা, ঐতো মুশকিল। তপ্ত কড়াইয়ে তেল ঢালবেন না, ত কী হবে। ওর চাপ আছে আপনিও চাপান দেবেন। দেখবেন সুড়সুড় করে টাকা নিয়ে হাজির।

    কিন্তু তার মাথায় এখন আর কুম্ভবাবুর কথা ঢুকছে না। সে সেই কুষ্ঠ রোগীর ঘরটার দিকে তাকিয়ে আছে। জানালা দিয়ে দেখা যায় শিউপূজণ রকে বসে পায়ে ন্যাকড়া জড়াচ্ছে। তারপরই একটা মেয়েছেলে এসে তাকে খাবার দিয়ে যায়। শিউপূজণ ঘরের মধ্যে আসন পেতে খাবে। ঘরটায় সে একবার উঁকি দিয়ে দেখেছিল। দেয়ালে রাজ্যের ক্যালেণ্ডার। সবই রাম সীতার ছবি। এবং একপাশে আরও একটা ছবি—বৈজয়ন্তীমালা। প্রায় উলঙ্গ হয়ে আছে মত। জলে নেমে সাঁতার কাটছে! ঘরের মধ্যে আসবাব বলতে কাঠের একটা বাক্স, কাঠের পাটাতনে বিছানা পাতা এবং ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত কিছু কাঁথা বালিশ। সম্বল বলতে তিনটি রিকশা, কটা ঠেলা তার ভাড়া খাটে। বাইরে বিকেলে বসে থাকে। সামনে থাকে জলচৌকি, সেখানে ভাড়ার পয়সা কড়া ক্রান্তি গুণে নেয়। সন্ধ্যা হলে, সে রাস্তার আলোতে তুলসীদাসী রামায়ণ সুর ধরে পাঠ করে। সকালের দিকে দেখেছে, সে প্রত্যেক ভিখারীকে দুটো করে পয়সা দেয়। কাউকে ফেরায় না। যে মেয়েটি রেঁধেবেড়ে খাওয়ায় কুম্ভবাবু বলেছে যুবতীকে সে রক্ষিতা রেখেছে। এসব ভাবতে গিয়ে অতীশের মনে হল, মানুষের বেঁচে থাকার মত বড় কিছু নেই। তার এত ভালমানুষ না হলেও পৃথিবীর কোন ক্ষতি নেই। আসলে সে ভালমানুষ, না কাপুরুষ! সব তাতেই ভয়। কি যেন তার হারিয়ে যাবে বলে ভয়। সেই ভয় থেকেই যত গন্ধ নাকে এসে লাগে। নিজেকে অতীশ শক্ত করতে চাইল। বলল, কখন যাবেন?

    কুম্ভ বলল, কোথায়?

    —এই যে হোটেলে যাবেন বলছেন।

    —আপনি যাবেন ত। গেলে কাবুল খুব খুশী হবে। ওর বৌদির আপনি খুব পিয়ারের লোক। এখন আপনাকে তেল দেবার জন্য রাজবাড়ির সব চোর ছ্যাঁচোড়েরা উঠে পড়ে লাগবে।

    অতীশ এমন কথায় কিঞ্চিৎ বিরক্ত হল। এর ভিতর অমলাকে টেনে আনা কেন। তা ছাড়া অমলা সম্পর্কে তার শৈশব থেকেই একটা দুর্বলতা আছে। অমলাকে নিয়ে কেউ কিছু বললে সে অপমানিত বোধ করে। কুম্ভবাবু আরও দু একবার জানার চেষ্টা করেছে, কি কথা হল বৌরাণীর সঙ্গে। কিছু বলল?

    অতীশ বলেছিল, কিছু বলেনি। এমনি কথাবার্তা হয়েছে। কেমন লাগছে এই শহর। কোন অসুবিধা হচ্ছে না ত। এই সব আর কি।

    —আর কিছু না!

    —না।

    —তা এই কটা কথা বলতে এত সময় লাগে!

    —আর কি কথা হতে পারে বলে আপনার ধারণা।

    —কত কথা হতে পারে। আমরা বাইরের লোক কি করে জানব। তবে দাদা সাবধান থাকবেন। লক্ষণ ভাল বুঝছি না। যারাই রাজার পেয়ারের লোক হতে গেছে তারাই মরেছে।

    অতীশ বুঝতে পারছে না এরা সবাই রাজবাড়িতে জন্মেছে বড় হয়েছে, এদের কারো কারো তিন পুরুষ চার পুরুষ এই বাড়ির খেয়েছে, পরেছে, কেউ কেউ চুরি চামারি করে নিজেরাও ছোটখাট রাজা বনে গেছে—এবং এই কুম্ভবাবু, এদের রক্তে এবাড়ির নিমকের গন্ধ শুঁকলেই পাওয়া যাবে। কিন্তু প্রথম থেকেই কুম্ভ কেমন বেপরোয়া। যেন সে পারলে গোটা রাজাবাড়িটাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আসলে তার আসার জন্য এটা হয়েছে কিনা কে জানে। সে এজন্য কেন জানি এখন থেকেই কুম্ভবাবুকে সামান্য তোয়াজ করতে শুরু করেছে। তা না হলে অমলার সঙ্গে দেখা হবার পর তাকে সাহস পায় কি করে প্রশ্ন করার। সেই বা এ নিয়ে কথা বলে কেন! তার তো বলা উচিত ছিল বৌরাণীর সঙ্গে কি কথা হল, আপনার জানার কি দরকার। অথবা সে এড়িয়ে গেলেই পারত। তারপরই মনে হল, অফিসের কাজে কর্মে সে এই লোকটার ওপর নির্ভরশীল। এই মৌকায় লোকটা তাকে পেয়ে বসেছে। কাবুল-বাবু এলে সে সোজাসুজি বলল, আপনারা যান। আমার সময় হবে না।

    কুম্ভ বলল, এই দাদা সাহস! আপনার বৌমা বলল, দাদাকে কিন্তু সঙ্গে নেবে।

    অতীশ আঁতকে উঠল। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ কুম্ভবাবু। অজ পাড়াগাঁয়ের মেয়ে তার বৌ। বছরখানেক হল বিয়ে হয়েছে। গর্ভবতী। মাস তিন-চার বাদে কুম্ভবাবুর স্ত্রী জননী হবে। সেই জননীও যাচ্ছে সঙ্গে। তার মুখ থেকে রা সরছিল না।

    কাবুল বলল, রোজ তো হয় না। দাদা বৌদি রোটারি ক্লাবে গেছে। ওদের পার্টি আছে গ্র্যান্ডে। আমরাও তিনজনে মিলে ছোটখাট একটা পার্টির আয়োজন করেছি। আপনি আমাদের গেস্ট।

    অতীশ অগত্যা আর যেন কিছু বলতে পারছে না। সে ওদের পিছু পিছু উঠে গেল। কুম্ভবাবু সুপারভাইজারকে ডেকে বলল, কেউ যদি ফোন করে বলবেন কাজে বের হয়েছি। আমরা আর ফিরব না। ট্রাম রাস্তায় গাড়ি রেখে এসেছে কাবুলবাবু। গাড়ির পাশ থেকেই হাসিরাণী দরজা খুলে দিল। দারুণ সেজেছে। ঠোটে প্রচণ্ড লাল লিপস্টিক নখে রুপোলি নেল পালিশ, দামী শিফনের শাড়ি হাতে মীনা করা বালা। বগল খালি করে হাত তুলে বলছে, আপনি এখানটায় বসুন দাদা।

    অতীশের কেন জানি মনে হল হাসিরাণীকে আজ হোক কাল হোক একটা লক্ষ্মীর পট তার কিনে দেওয়া দরকার। শরীরে বড়ই কামুক গন্ধ।

  • নয়

    নয়

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    নয়

    চার্চের ঠিক সামনে সেই পাগল। গায়ে কিম্ভুতকিমাকার পোশাক। ছেঁড়া তালিমারা উচ্ছিষ্ট জামা পাতলুনে ঢাকা শরীর। নোংরা। গালে দাড়ি। চোখ কোটরাগত। বগলে বোঁচকা। হাতে দম মাধা দমের লাঠি। ন্যাকড়া জড়ানো পালক বাঁধা। একটা লম্বা দাঁত ঠোঁটের ফাঁকে বের হয়ে ঝুলছে। —সে বিকেল থেকেই উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। আর কেবল হাঁকছে দম মাধা দম পাগলা মাধা দম।

    এখন চার্চের সামনে দাঁড়িয়ে সে মাথায় তেনাকানি বাঁধছে। মাথার ওপরে কাক উড়তে দেখে ভয় পেয়ে গেছে। কারণ এরা বড়ই তাকে ঠোকরায়। তার এখন শত্রুপক্ষ বলতে শহরে এরাই। আর সব মেরে এনেছে। কুকুর বেড়াল সে ঠেঙিয়ে সব তাড়িয়েছে। হাতের লাঠিটা জাদুমন্ত্রের মত। সে ডাস্টবিনের পাশে ঘোরা ফেরা করলে ভয়ে আর কেউ ত্রিসীমানা মাড়ায় না। কিন্তু কাকেদের বেলায় তার জারিজুরি খাটে না। এরা কোত্থেকে এসে সব ছোঁ মেরে তুলে নেয়। এসব কারণে তার মাথা গরম। সে গাছে উঠে কাকের বাসা দেখলেই ভেঙে ফেলে। ক’দিন ধরে সে এই কাজটা খুব মনোযোগ সহকারে করে যাচ্ছে। আজ সকালে দুটো অশ্বত্থ গাছ এবং দেবদারু গাছ খুঁজে সাতটা কাকের বাসা ভেঙেছে। আর সেই থেকেই কাকের তাড়া থেকে বাঁচবার জন্য চার্চের কফিনের মধ্যে কিছূক্ষণ লুকিয়েছিল। সে কফিনটায় শুয়ে থেকে দেখেছে মরে গেলে সে কতটা লম্বা জায়গা নেবে। খুব বেশি না। মরে গেলে তার এ জায়গাটুকুর অভাব হবে না বুঝেই বের হয়ে এসেছিল। মনে ভারি অশান্তি। তখনই দেখল একটা কাক আবার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। মাথা ফাতা ঠুকরে না দেয়, ঠুকরে ঘিলু তুলে না খায়, খেলেই মাথাটা ফাঁকা হয়ে যাবে। বড় ভয় তার ফাঁকা মাথা নিয়ে আর যাই করা যাক এমন চোর-জোচ্চোরের শহরে ঘোরাফেরা করা যায় না। কখন তবে কে তার সর্বনাশ করে বসবে। তার একটু সতর্ক থাকা দরকার। এবং এখন একমাত্র কাজ দামী মস্তিষ্ককে রক্ষা করা। এর মধ্যেই ঘিলু পোরা আছে। কাকেরা মগজের ঘিলু খেতে খুব ভালবাসে। প্রথমে তেনাকানি, পরে গামছা তারপর বোঁচকা কুঁচকির যত সংগ্রহ করা ন্যাকড়া সব মাথায় পেঁচিয়ে ওটাকে ঢাউস কুমড়ো পটাস বানিয়ে ফেলল।—খা শালারা, কত খাবি খা। কত ঠোকরাবি ঠোকরা। ও বাপ এই বহ্মতালু ভেদ করা আর তোগো কম্ম নয় বাপ। মাথাটা ভারি নিরাপদ ভেবে সঙ্গে সঙ্গে দুটো ডিগবাজি।

    একটা ডিগবাজি খেতেই স্বাদ পেয়ে গেল। চোখ ঘুরে যায় উল্টে যায়, মাথা ঘুরে যায়, বড়ই নেশার মত লাগে। সে পর পর ডিগবাজি খায়। কাঠের দেয়াল পার হয়ে ডিগবাজি খায়, ট্রাম লাইন ফাঁকা পেয়ে সে সম্রাট সিজার হয়ে যায়। সবই তার দখলে। সে সেখানেও ডিগবাজি খায়। তারপরই অগুনতি বাসের ভিড় জটলা। কারা তেড়ে আসে, সে দৌড়ে যায়। যেন বলে, আমার কোনও ভোগ দখলের স্পৃহা নেই বাপু, সব তোদের দান করে দিলাম। যা এবার লুটে পুটে খা।

    তারপর সে আর যানবাহনের জন্য, মানুষের জন্য প্রতীক্ষা করছিল না। এখন এক পাগলিনীর জন্য তার প্রতীক্ষা। তার আসার কথা। সে তার জুড়িদার এই শহরে। সকাল থেকেই দেখছে না। সে কাছে থাকলে সাহস পায়। তার মনোযোগ বাড়ে। আকর্ষণ বাড়ে। মারামারি করতে পারে। মনুষ্যকুলে এই একজনই তার বলতে গেলে সম্বল—যার সঙ্গে মিনি মাগনায় শুতে পায়। কখনও খেতে পায়।

    বর্ষাকাল, অথচ ক’দিন বৃষ্টি নেই। খাঁ খাঁ শুকনো আকাশ। প্রখর উত্তাপ। প্রখর উত্তাপে তার সঙ্গিনী গায়ে জামা কাপড় রাখতে পারে না। নগ্ন থাকে।

    কতবার সে কোমরে গামছা বেঁধে দিয়ে বলেছে—ঢেকে ঢুকে রাখ, কাকের উপদ্রব বেড়েছে। ওটা ঠুকরে তুলে খেলে মজা বুঝবি। কেউ আর তোর দিকে তাকাবে না।

    ঠিক তখনই চার্চের সামনে এক শববাহী শকট। কাচের ভেতরে কালো বোরখা পরা বিবির মত কফিনটা লম্বা। সোনার ঝালরে ঢাকা। কত তাজা ফুল সুগন্ধ আতর। সে জোরে জোরে নাক টেনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল। ধূপকাঠি পুড়ছে। শোকের পোশাকে কিছু যুবক যুবতী। কালো পোশাক পরা সাদা চুলের সেই লোকটা সিঁড়ি ধরে উঠে যাচ্ছে। হাতে একটা বই। তারই মত জোব্বা গায়ে দেওয়া। মরা মানুষ এলেই সে দেখেছে এই লোকটা আসে। খুব মান্যিগণ্যি পুরুষ। মরা মানুষের কফিনটাকে তুলে নিয়ে যায় কারা। সে তখন গম্ভীর গলায় হেঁকে উঠে বলে— কে আসবি আয়, সংক্রান্তির মাদল বাজছে আয়। তারপরই অশ্লীল গালাগাল— লে বাবা তোর সুখ পুটলিতে লিয়ে এলি না বাপ। যাবি যখন সব লিয়ে যাবি না। শেষে কি বিড়বিড় করে বলতে থাকে— লে বাবা, শালার কিছুই সঙ্গে গেল নাকো। একেবারে ফক্কা। তারপরই ভেউভেউ করে কান্না— ওখানটায় গিয়ে তোরে কে দেখবে গো! তোর সঙ্গে কেউ গেল না, কি হবে গো!

    যাতায়াতের পক্ষে বড়ই বিঘ্ন এই পাগল। ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলা পর্যন্ত দায়। কে একজন হেঁকে উঠল, এই উজবুক, ওঠ রাস্তা থেকে। গাড়ি চাপা পড়বি তো। রাজার বাড়ি থেকে গাড়ি বের হচ্ছে। কোটিপতি মানুষের বৌ যাচ্ছে গাড়িতে। সেই গাড়িটা পর্যন্ত ছোঁয়াচে অস্পৃশ্য হয়ে যাবে ভেবে পাগলকে মাঝ রাস্তায় কাটিয়ে চলে যায়। তখন সে দিগ্বিজয়ী বীরের মত হাসে— হা হা হা। জয় জয় হে। জয় দাও প্রভু, কৃপানাথের। জয়রাজা হরিশ্চন্দ্রের। সে কোঁচড় থেকে এক এক করে বাতাসে উড়িয়ে দেয় পাখির পালক। এক মরা কাকের ছানাও সে উড়িয়ে দেয় হাওয়ায়। ওটার গন্ধেই কাকগুলি তার পিছু তাড়া করছিল। সে এতক্ষণে এটা টের পেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাথায় জড়ানো বোঁচকাবুঁচকি খুলে দেখতে থাকল পাগলিনী একটা ভাঙা ঠেলাগাড়ির নিচে শুয়ে সব দেখছে আর মুচকি হাসছে। তারপর কি ভেবে উঠে এক দৌড়। পাগলিনী সেই ছানাটা হাতে দুলিয়ে যেন বাজার করে ফিরছে মত বাতিল ঠেলাগাড়ির আস্তানায় গিয়ে ঢুকে পড়ল।

    কবে কোন এক বুড়ো নির্জীব ঠেলাওলা ওটা রাস্তার ধারে ফেলে চলে গেছিল। ছেঁড়া ত্রিপল ফেলে চলে গেছিল। পাগলিনী ভারি মজা ভেবে ঠেলাগাড়ির ওপরে দৌড়াদৌড়ি করেছে কতদিন। তারপর ওটা আরও ওপরে তুলে নিয়ে রাজবাড়ির পাঁচিলের পাশে উঁচু মত জায়গা দেখে ফেলে রাখল। বড়ই পরিত্যক্ত ভূমি। সব আবর্জনার আঁস্তাকুড় জায়গাটা। এখন সেটা আশ্রয় তার। সে রোদ বৃষ্টিতে তার নিচে শুয়ে থাকে। ঘুমিয়ে থাকে। ত্রিপলটা দিয়ে ঢাকা বলে কেউ দেখতে পায় না গাড়ির নিচে বসে সে কি করছে। কি খাচ্ছে।

    কাকগুলি এখন আর সেই পাগলের মাথায় নেই। পাগল হরিশ নিশ্চিন্তে হেঁটে গিয়ে দেবদারু গাছটার নিচে বসল। পোড়া বিড়ি বের করল ঝোলাঝুলি থেকে। কাকের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে তার রাজ্য জয়ে বের হবার ইচ্ছা। বের হবার আগে দম নিচ্ছে বসে বসে।

    তখনই বাসট্রামের লোকজন দেখতে পেল কাকেরা যুদ্ধ বাধিয়েছে। ঝাঁকে ঝাঁকে কাক উড়ে এসে সেই ত্রিপলে ঢাকা পরিত্যক্ত ঠেলাগাড়িটায় ঝাপটা মারছে। ঠোকরাচ্ছে। নিশ্চিন্তে কেউ নিচে বসে কাকের ছানার পালক ছাড়াচ্ছে লোকজনরা কেউ আর টের পাচ্ছে না। এমন একটা কাকেদের যুদ্ধ—প্রায় যেন পঙ্গপাল নেমে আসছে, আকাশ কালো হয়ে গেছে, দুনিয়ার সব কাক মানুষের ইতরামিতে অতিষ্ঠ হয়ে যেন শহর আক্রমণ করতে আসছে। আশেপাশের বাসিন্দারা তো ভয়ই পেয়ে গেল। মন্ত্রিসভায় তখন বৈঠক চলছিল, পুলিশ তখন খবর দিল, স্যার কাকেরা শহর আক্রমণ করছে। এই খবরে দমকলবাহিনীকে ছুটে যেতে বলা হল। খবরের কাগজ থেকে সাংবাদিক ছুটল। সঙ্গে ফটোগ্রাফার। বড় বড় হরফে ছাপার জন্য বার্তা সম্পাদক কি হেড-লাইন করা যায় ভাবতে ভাবতে পায়চারি শুরু করে দিল। জনগণ খবরটা পাবে। কিছুদিন থেকে খবরের বড় আকাল চলছে। এখন পাল্লা দিয়ে মজাদার হেড-লাইন না করতে পারলে কাগজ কাল সকালে মার খেতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে কোন কোন সালে এই কাকের আক্রমণ ঘটেছিল, কাকের সংখ্যা কত, কত বিচিত্র রকমের স্বভাবের কাক আছে, এদের চরিত্র মনুষ্য চরিত্রর সঙ্গে কোথায় মিল এই নিয়ে একটা চতুর্থ পাতায় ফিচার লেখার জন্যও নানারকমের কাক চরিত্রসহ—এনসাইক্লোপিডিয়া সংগ্রহে মেতে গেল খবরের কাগজের সাঁতারুরা।

    ততক্ষণে পাগলিনী মতিবিবির পালক ছাড়ানো শেষ। আগুন জ্বালল নিচে। খড়কুটোতে বাচ্চাটাকে পুড়িয়ে নিল। তারপর গোগ্রাসে গিলে ফেলল কাকের রোস্ট। বড়ই সুস্বাদু খাবার। জনগণেরা তখন রাস্তায় ভিড় করেছে। ট্রাম বাস জ্যামে পড়ে গেছে। দোকানদার, দালাল, ফেরিয়ালা, নাট্যকার, কবি, সাংবাদিক অঞ্চলের যে যেখানে ছিল ছুটে এসে দেখল, কাকেরা চলে যাচ্ছে। ধোঁয়া মাংস পোড়া গন্ধ কমে আসতেই কাকেরা সব চলে যেতে থাকল। সামান্য ধোঁয়া উঠছিল ত্রিপলের ফাঁক ফোকরে। হোসপাইপে জল মারতেই এক মূর্তিমতী কলকাতা কল্লোলিনী। সবাইকে দাঁড়িয়ে দাঁত ভ্যাংচাচ্ছে। আসলে এটা কাকতালীয় ব্যাপার ভাবল শহরের লোকেরা। কেউ কেউ বলল, কাকেরা যুদ্ধ করলে দেশে প্লাবন দেখা দেয়। জ্যোতিষিরা বললেন, শনি ও রাহু সিংহে রয়েছে। আগামী দশই জুলাইর মধ্যে একের পর এক গ্রহ গিয়ে সিংহে সন্নিবিষ্ট হচ্ছে। রবি চার জুলাই, শুক্র সাত জুলাই, বৃহস্পতি নয় জুলাই এবং বুধ দশই জুলাই সিংহে মিলিত হচ্ছে শনি ও রাহুর সঙ্গে। এতগুলি গ্রহ সন্নিবেশের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিবাদ বিসম্বাদ স্বাভাবিক। এই বিবাদ বিসম্বাদের ফলে আর কিছু না হোক কাকেদের আক্রমণ অবশ্যম্ভাবী। এর ফলে বৃহৎ রাষ্ট্রের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দিতে পারে। মধ্য এশিয়ায় ও আফ্রিকায় রক্তপাত ঘটতে পারে। রাজনৈতিক উত্থান পতনেরও সম্ভাবনা আছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ ভারতের কোন কোন অংশে ভূমিকম্প, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহাপ্লাবনেরও আশঙ্কা আছে।

    পাগলের এতসব জানার কথা নয়। তার কাজ শুধু সঞ্চয় করে যাওয়া। সে রাস্তায় কিছুই ফেলার জিনিস ভাবে না। যা পায় সঙ্গে নিয়ে নেয়। ভাঙা খুরি হাঁড়ি পাতিল দেশলাইর বাক্স প্লাস্টিকের ছেঁড়া ব্যাগ সবই তার বড় দরকারি। সে তার সঞ্চয় কোথাও ফেলে যায় না। দিনকে দিন সঞ্চয় বাড়তে বাড়তে ওটা ভারি একটা বস্তা হয়ে গেছে। মাথায় তুলতে কষ্ট হয়। সেজন্য সে মাথা থেকে নামাতে ভয় পায়। মাথায়ই থাকে। এবং ঘাড় শক্ত হয়ে যায়। শিরাগুলি শক্ত হয়ে যায়। তবু সে মাথা থেকে নামাতে সাহস পায় না। কে আবার তুলে দিতে এসে ছিনতাই করে নেবে তার চেয়ে এই ভাল বাবা, মাথার জিনিস মাথায় থাক। কিছুই ফেলা যায় না। সেজন্য সে নারকেলের মালা এবং সিগারেটের বাকস দিয়ে মালা গেঁথে গলায় পরেছিল। পিঠে পুরাতন জামার নিচে পচা ঘামের গন্ধ। রাস্তায় জ্যাম দেখে, ভিড় দেখে মানুষের পাগলামি দেখে হাসছিল। পাগল হেসে হেসে সবাইকে বলছিল, দু-ঘরের মাঝে অথৈ সমুদ্দুর। সে অন্য কোনও সংলাপ খুঁজে পাচ্ছিল না। সে এই একটা কথাই এখন পর্যন্ত মনে রাখতে পেরেছে।

    কিন্তু তার বোঁচকার কথা মনে পড়ে গেল। দম মাধা দমের লাঠিটার কথা মনে পড়ে গেল। মানুষের ভিড় দেখে মনে হয়েছিল এরা তার এতদিনের সঞ্চিত সব তৈজসপত্র ছিনতাই করে নেবে। সে বোঁচকা এবং দম মাধা দমের লাঠি ফেলে দেবদারু গাছটার নিচে ছুটে এসেছিল। তার সেই বস্তাটা মাথায় নেই। দাঁড়াতেই মনে পড়ল, ওগুলো সে কোথায় যেন রেখে এল। এত সম্পত্তি ফেলে রাখা ঠিক না। এতে বিপত্তি বাড়ে। কোনটা ফেলে সে কোনটা রক্ষা করবে বুঝতে পারছে না। বস্তাটা মাথা থেকে নামালেই এটা তার সম্পত্তি থাকবে না এমন কখনও মনে হয়। মনে হয় সব সাধারণের সম্পত্তি হয়ে যাবে। এত কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কি দরকার ছিল তবে সম্পত্তি বাড়াবার। একটু উদার হওয়া যায় না! এই দিয়ে থুয়ে সে হাল্কা হতে পারে। ভাবতেই এক দণ্ড আর সে দেরি করতে পারল না। সে লাঠিটা খুঁজতে ছুটে গেল। ওটাতে সে কাকের পালক বেঁধে রেখেছে। বড়ই মূল্যবান বস্তু। হারালে সে বংশে নির্বংশ হবে।

    মানুষের বংশে নির্বংশ হওয়া ভাল কথা না। লাঠিটা না থাকলে সে নির্বংশ হতে পারে ভেবে খুবই বিচলিত বোধ করল। যেন বড়ই আতান্তরে পড়ে গেছে। তখন বাস যায় ট্রাম যায়, মানুষের মিছিল যায়। আর দেখে আঁস্তাকুড়টা ক্রমেই বড় হয়ে যাচ্ছে। যেন জাদুমন্ত্র বলে আঁস্তাকুড়টা এই শহরের যত সুখি পায়রা সম্বল আছে সব পুড়িয়ে খাবে। সে সেটা কিছুতেই হতে দেবে না। লাঠিটা বগলে থাকলে কাকের পালক বাঁধা থাকলে কোন দুষ্ট প্রভাব কাছে ঘেঁষতে পারবে না। সেটা কাঁধে নিয়ে বেড়ালে মানুষের মঙ্গল হবে। এই মানুষের মঙ্গল হবে ভেবেই সে লাঠিটার খোঁজ করছে এত করে। দেখলে মনে হবে তন্ন তন্ন করে খুঁজছে সারাটা রাস্তা। সেই বুড়োটা চুরি করে নেয়নি তো আবার। লোকটাকে সে কিছুদিন থেকেই খুব সন্দেহ করছে। কোত্থেকে এসে তার জায়গাটা দখল করে বসে গেল। সঙ্গে পুরুষ্ট মাইয়া আছে একখান। নাম কয় চারু।

    তখন সূর্যের প্রখর উত্তাপ কমে আসছে এবং ছায়াবিহীন এই পথ। ফুটপাথে অথবা গাড়িবারান্দায় যারা রাত যাপন করছে যারা ঠিকানাবিহীন, যাদের তৈজসপত্র ছেড়া নোংরা এবং পাগল হরিশের মত প্রাচীনকাল থেকে সব সংরক্ষণ করছে তারা এখনও অন্নের জন্য ফেরেববাজের মত ঘোরাফেরা করছে। ছেঁড়া সব তৈজসপত্রের ভিতর শুধু এক অতিকায় বৃদ্ধ মুখে দাড়ি শণপাটের মত এবং সাদা মিহি চুল আর অবয়বে রবিঠাকুরের মত যে কপালে হাত রেখে শেষ সূর্যরশ্মি আকাশে দেখার চেষ্টা করছিল। কিছুদিন থেকে হরিশ এই লোকটাকে সন্দ করছে। সঙ্গের ডবকা ছুঁড়িটা উদোম গায়ে পড়ে থাকে। গা আল্গা করে রাখে। এরাই দমমাধাদমের লাঠিটা গায়েব করতে পারে। লাঠিটার জাদুটোনা টের পেয়ে গেছে বুড়োটা। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও যখন পেল না তখনই বুড়োটার সামনে এসে ঊর্ধ্ববাহু হয়ে গেল। এটা তার একটা প্রশ্নের তরিকা। ঊর্ধ্ববাহু হলেই বুঝতে হবে সে কিছু ফেরত চায়।

    বুড়োটা বলল, আমার কাছে কিছু নেই।

    হরিশ কোমর দোলাল। অর্থাৎ আছে।

    বুড়োটা বলল, নেই, কিছু নেই।

    হরিশ আরো জোরে ডাইনে বাঁয়ে কোমর দোলাল। অর্থাৎ আছে, আছে। দাও। না দিলে অমঙ্গল হবে। মনুষ্য জাতি বিলোপ পাবে। ওটা বড়ই প্রয়োজনীয় দ্রব্যবস্তু।

    তখন বুড়োটা বিরক্তিতে অতিকায় বৃদ্ধ হয়ে যেতে থাকল। গায়ে কি পচা দুর্গন্ধ।—সরে দাঁড়া। বলে একটা ঠ্যাঙা নিয়ে তেড়ে গেল।

    হরিশ ঊর্ধ্ববাহু হয়েই দাঁড়িয়ে থাকল। নড়ল না।

    ফুলি বলল, কি সুন্দর দিন। আমার এই ঘাসে এখন ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে। ফুলি রাজবাড়ি থেকে বের হয়ে এখানে একটু প্রেম করতে চলে এসেছে।

    সত্যি সুন্দর দিন। বর্ষাকাল, অথচ কি নির্মল আকাশ। ঠিক শরতের আকশের মত। ফুলি মাঠের ঘাস মাড়িয়ে যাচ্ছিল। পাশে তার সুন্দর যুবক সুনন্দ। সে তার হাত ধরে হাঁটছে। এ-সময়ে পৃথিবীটা মানুষের কাছে কত পবিত্র হয়ে যায়। ওদের হাঁটা চলা কথাবার্তা থেকেই ধরা যাচ্ছিল, এরা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। ওরা ঘাসের ওপর বসে পড়ল। তারপর দু’জন দুজনের মুখ দেখল।

    ফুলি সারাটা বিকেল শুধু আজ আয়নায় মুখ দেখেছে। বাথরুমে সুগন্ধ সাবানে চান করেছে। মা বলেছে, অত সময় ধরে চান করছিস কেন ফুলি। ফুলি মুখে জল নিয়ে ফুৎ করে উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, ঠাণ্ডা জলে চানে কি আরাম। আহা সেই মানুষ আজ আবার তার জন্য কোনও গাছের নিচে অপেক্ষা করবে বলেছে। কতদিন থেকে সে এমন আশা করতে করতে বড় হচ্ছিল। তার থাকবে একজন সুন্দর প্রেমিক। যে সহজেই বলবে ফুলি তুমি কি সুন্দর। চল না কোন জ্যোৎস্না রাতে আমরা কোন গভীর অরণ্যে চলে যাই।

    ফুলি তারপর কার কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিল, সেই লতাপাতা আঁকা সিল্কের শাড়িটা। তার এক মাথা চুল। চুলে শ্যাম্পু দিয়েছে। ওর ফাঁকা চুল ঘন নীল রঙের হয়ে যায় তখন। প্রতিটি লোমকূপ থেকে চুলের গভীর সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। সে এটা টের পেলেই লা লা করে গান গায়। তার অহংকার বলতে এই ঘন নীল রঙের চুল। ছেড়ে দিলে একেবারে হাঁটু অব্দি নেমে যায়। সুনন্দ ফুলির সারা মাথা ভরা চুল দেখতে দেখতে সবুজ বাবুইর বাসাটার দিকে হাত দিতে গিয়ে কেমন চঞ্চল হয়ে উঠল।

    ফুলি বলল, এই কি হচ্ছে!

    —একটু দেখি না।

    —না এখন না।

    সুনন্দ বলল, একদিন দ্যাখ ঠিক আমি মরে যাব। আমি তোমার কিছুই পাব না।

    সুনন্দর এই বোকা বোকা কথা ফুলির বুকে কেমন আগুন ধরিয়ে দেয়। সে বলে, দাদা তোমাকে আমাদের বাসায় আসতে বারণ করেছে?

    —কৈ না তো!

    —তবে তুমি যে সেদিন এলে না?

    —সেদিন মানে?

    —সব ভুলে যাও কেন। তুমি বললে না, রোববার বিকেলে যাব।

    —ও সেই কথা। যাব ভাবলাম, কিন্তু পরে মনে হল গিয়ে কি হবে। সবাই বাড়ি থাকলে গিয়ে কি লাভ।

    —ঐ একটাই বোঝ। আর কিছু বোঝ না। আর আসছি না দ্যাখো।

    সুনন্দ পায়ের শাড়ি সামান্য তুলে দেখল ফুলির। কি সাদা আর মাখনের মত নরম ঊরু। ফুলি শাড়িটা নামিয়ে দিল জোর করে। তুমি কি! মানুষ জন আছে না।

    —অতদূর থেকে কেউ বুঝতে পারবে না।

    —ঐ দেখ, একটা ঘোড়সওয়ার পুলিশ।

    সুনন্দ দেখল, দূরেই ঘোড়সওয়ার পুলিস। ঘোড়ার মুখটা তাদের দিকে কদম দিচ্ছে। সে একটু সরে বসে বলল, কি বলে বাড়ি থেকে বের হলে?

    —যা বলে বের হই।

    —কিন্তু যদি ধরা পড়।

    —কি হবে তবে? বলব, সুনন্দার কাছে গেছিলাম। তারপরই বলল, রাজবাড়িতে জানো একটা মানুষের অ্যামব্রায়ো পাওয়া গেছে। আঁস্তাকুড়ে পড়েছিল।

    ফুলির উচ্চ মাধ্যমিকে বায়োলজি আছে সেই সুবাদে ভ্রূণ-টুণ না বলে অ্যামব্রায়ো বলল। যেন ফুলি কত অভিজ্ঞ—এবং বলল, জানো আমার আর পড়াশোনা করতে ভাল লাগে না। তোমাদের বাড়ি থেকে কিছু অমত হবে?

    সুনন্দ বলল, এখনও আমার দুই দিদির বিয়ে বাকি—তুমি তো সব জান।

    —তা হলে আমরা কতদিন এ-ভাবে থাকব?

    —দিদিদের বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত।

    —কবে ওরা করবে?

    —করবে মনে হয়। কারণ ওরাও তো তোমার মত অধীর।

    এ-সব কথা হামেশাই এ-শহরের উঠতি যুবকদের যুবতীদের এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের যারা, তাদের এই পার্ক, সিনেমা, থিয়েটার এবং মাঠটা সম্বল। দূরে দূরে যতদূর চোখ যায়, কোথাও তরুণ যুবকেরা খেলা করছে—কোথাও ঘোড় দৌড় হচ্ছে, কোথাও জোড়ায় জোড়ায় ঘুরছে। মহারাণীর স্মৃতিসৌধটির পাশে এমন সব কত যুবক যুবতী গাছের নিচে বসে উত্তেজনায় অধীর হচ্ছে। চোখ মুখ জ্বলছে। এই বয়সে তাদের আর কি করণীয়। কিন্তু তারা জানে তাদের অনেকেরই এক স্বপ্ন-সমুদ্রে শুধু ভেসে বেড়াতে হয়। ইচ্ছেমত তারা গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। তাদের জন্য সব সুন্দরী যুবতীরা বড় হয়ে ঘুরে বেড়ায়, তারা শুধু দেখে যায়। সুনন্দ দেখল নদীর পাড়ে সূর্যাস্ত হচ্ছে। অসংখ্য পাখি উড়ে যাচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে। চারপাশে নগরীর কোলাহল, বাস ট্রাম এবং স্কাইস্ক্যাপার। সে রেড রোডের গোলমোহর গাছগুলি পার হয়ে আরও গভীর মাঠের মধ্যে ফুলিকে নিয়ে ঢুকে যেতে থাকল। ফুলির শরীরে আশ্চর্য লাবণ্য। ওর জঙ্ঘায় না জানি কোন মহাসমুদ্র খেলা করে বেড়াচ্ছে। সে এখনও সেখানটায় হাত দিতে পারেনি। এই একটা ভীষণ ইচ্ছেয় ফুলির কাছে এলেই তার শরীরে কেমন জ্বর এসে যায়। ইচ্ছে হয় কত কথা বলবে, কিন্তু কেমন মূক বধিরের মত সে শুধু তাকিয়ে থাকে। শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করে তাকে ফিরে যেতে হয়—কারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যে মা বাবা, ভাই বোন সব মিলে এক প্রাচীর তৈরি হয়ে আছে। সেই প্রাচীর ভাঙার জন্য একটু এগোলেই সংসারে কোথায় কিছু যেন হারিয়ে যায়।

    ফুলি বলল, এই, আমি ফিরব। সন্ধ্যা হয়ে গেছে।

    —আর একটু চল না হাঁটি।

    ফুলির মধ্যেও মানুষের সঙ্গ পেলে যা হয়—এক জলোচ্ছ্বাস ঘটছে। সেটা সে টের পাচ্ছিল। সে হাঁটতে পারছিল না। শরীরে আশ্চর্য জড়তা নেমে আসছিল এবং সে নিজেকে নিজেই ভয় পাচ্ছিল। শেষে তো সেই এমব্রায়ো। এটার জন্য সে জানে খুব ভাববার নেই। কিন্তু অস্পষ্ট অন্ধকারেও সে বুঝল কোথাও এই শহরে একটু নিরিবিলি জায়গা নেই—যেখানে সে এবং সুনন্দ মুহূর্তের জন্য এক হয়ে যেতে পারে। ফুলি অন্যমনস্ক হবার জন্য বলল, এই প্রিয় শহরে আমরা একদিন বুড়ো হয়ে যাব। ভাবতেও কেমন লাগে।

    সুনন্দ বলল, বুড়ো হতে দিচ্ছি না।

    —তুমি না দেবার কে! জান আমার মা এখন কেমন হয়ে গেছে! কি সুন্দর না ছিল দেখতে! একেবারে মধুবালার মত। সেই মা কেমন হয়ে গেছে। জান আমার কেবল ভয় করে—আমিও একদিন ঠিক মার মত হয়ে যাব।

    সুনন্দ দেখল এখন ওরা অনেকটা মাঠের গভীরে ঢুকে গেছে। বলল, এস আমরা পাশাপাশি এখানে শুয়ে থাকি।

    —পুলিশ ধরুক আর কি।

    সুনন্দ বলল, বড়ই সুসময় চলে যাচ্ছে। এই সুসময় আমরা শুধু পালিয়ে ভালবাসছি। জানো রাতে তোমার কথা ভাবতে ভাবতে কেমন অস্থির হয়ে যাই, মা বাবা দিদি সব কেমন দূরের মনে হয়। যেন এতদিন যে বড় হওয়া সে শুধু তোমার জন্য।

    ভালবাসার কথা সাধারণত এই রকমেরই হয়ে থাকে। কাজেই নতুনত্ব কিছু নেই। সুনন্দদের সময়ে এই কথা, তার বাপের আমলেও এই কথা, তার পিতামহের আমলেও এই কথা। আগামী জন্ম জন্মান্তরেও এই কথা। এইভাবেই মানুষ বালক থেকে যুবক হয়, যুবক থেকে প্রবীণ, তারপর বুড়ো। তখন ঈশ্বর দরকার হয়। মানুষের কোথাও না কোথাও শেষ আশ্রয় এই ঈশ্বর। এখন সুনন্দর আশ্রয় এই ফুলি।

    সুনন্দ পাশে বসে দাঁতে ঘাস কাটতে কাটতে এ-সব ভাবছিল। ফুলির দাদা ওর সঙ্গে পড়ত সুরেন্দ্রনাথে। ওর দাদা ভাল কবিতা আবৃত্তি করতে পারত। নাটক করতে পারত ভাল। একবার একটা কবিতাও লিখেছিল কলেজ ম্যাগাজিনে। সে কবিতাটা পড়ে ফুলির দাদার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। আলাপ, ভাব, তারপর বন্ধুত্ব। ওর দাদা যা কিছু লিখত প্রথমেই তাকে সেগুলো দেখাত। সুনন্দর মনে হত, ফুলির দাদা রবিঠাকুর না হয়ে যায় না। অশেষ গুণ আছে তার। কিন্তু এখন সে সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে একটা অর্ডার সাপ্লাইয়ের ব্যবসা করছে। আর সুনন্দ এই নিয়ে আঠারবার ইন্টারভিউ এবং প্রথম প্রেম। ফুলির সঙ্গে তার প্রেম চলছে। সে ভেবেছে মরে যাবে ফুলির জন্য। একটা কিছু করে ফেলবেই। প্রেম নিয়ে সে ছেলেখেলা করতে ভরসা পাচ্ছে না।

    —এই শোনো। ফুলি সুনন্দর হাত ধরে বলল।

    —কী?

    —বাবা সেদিন তোমার কথা দাদাকে বলছিল। সুনন্দর খবর কিরে! দু-তিন হপ্তা হল আসছে না।

    —সুধীন কি বলল?

    —বোধহয় কাজে আটকে পড়েছে।

    —একবার খোঁজ-নিলে হয় না। ওরা তো বেলঘরিয়ায় থাকে। রিফুজী কলোনিতে ওর বাবা বাড়ি করেছে।

    ফুলিদের পরিবারে রিফুজি জল চল নয়। প্রথম প্রথম সুনন্দকে বাঙাল বলে বাড়ির সবাই ঠাট্টা তামাশাও করেছে। এবং জল চল নেই বলেই ফুলির বাবা প্রথম দিকে সুনন্দর আসা যাওয়া খুব পছন্দ করত না। কিন্তু বছরখানেক ধরে অন্যরকম। অফিসে তার বস বাঙাল। সিট মেটালে নতুন ম্যানেজার এসেছে সেও বাঙাল। একেবারে দেশটা ক্রমেই বাঙালে বাঙালে ছয়লাপ হয়ে যাচ্ছে। যেখানে যাও, অফিসে, ব্যাঙ্কে, ট্রামে বাসে শুধু বাঙাল ছাড়া মুখ দেখা যায় না। আত্মীয়-স্বজনদের মেয়েরাও এখন বাঙাল বিয়ে করতে ব্যস্ত। তার দিদির দুই মেয়েই ভালবাসাবাসি করে অফিসের দুই বাঙালকে তুলে এনেছে। তার বোনের নন্দাই মেয়ের বিয়েই দিয়েছে বাঙাল দেখে। বাঙালরা নাকি খুব করিতকর্মা হয়। মেয়েদের বিয়ে দাও তো বাঙাল খোঁজ। ছেলেদের বিয়ে দাও তো স্বজাতি দেখে দাও।

    এইসব কারণে সুনন্দর ওপর ফুলির বাবার বেশ স্নেহ ভালবাসা জন্মাচ্ছিল। এ-জন্য অভাবের সংসারে দুবার নিমন্ত্রণ করেও খাইয়েছে। সুনন্দ একটা চাকরিও করছে লজঝরে প্রাইভেট ফার্মে। তবে সে ব্যাঙ্কে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ওর আশা ব্যাঙ্কে সে একটা কাজ পেয়ে যাবে। ফুলির বাবা আজকাল ঠনঠনে দিয়ে আসার সময় শরীর ভাল থাকা নিয়ে যখন মা ঠাকরুণকে মাথা ঠোকে তখন সঙ্গে সুনন্দর ব্যাঙ্কের চাকরিটার কথা মাকে মনে মনে স্মরণ করিয়ে দেয়।—তোমার তো মা সবাই সন্তান। সন্তানের শখ-আহ্লাদ তুমি না মেটালে কে মেটাবে। মা মাগো। তোরই ইচ্ছা সব। তারপরেই মনে হয়, মুখটা খালি, দোক্তাপান খাওয়ার ভারি বদভ্যাস। পাশের পানের দোকান থেকে একটা পান হাতে কিছু জর্দা নিয়ে হাঁটা দেয়। এ-সব অবশ্য ফুলিই বলেছে সুনন্দকে।—মনে হয় বাবা তোমাকে এখন পছন্দ করছে। সেই সুবাদে সব ঝেঁটিয়ে সেদিন ফুলির বাবা পরিবারবর্গ নিয়ে দক্ষিণেশ্বরে চলে গেল। ফুলি বাড়ি পড়ে থাকল একা। সুনন্দর সেদিন আসার কথা। ফুলির মনে হয়েছিল, বাবা ভুলে গেছেন। মাও। দাদারা তো রাত দশটার আগে বাড়ি ঢোকে না। কেবল সুনন্দ ওকে জড়িয়ে আদর করার সময় বলেছে, তুমি একা। ওফ্ কি যে ভাল লাগছে না।

    সেই থেকেই ফুলির কাছ থেকে সুনন্দ এটা ওটা চেয়ে নেয়। সব চাইলেই অবশ্য পাওয়া যায় না। কুমারী মেয়ের নিরাপত্তার বিঘ্ন ঘটতে পারে। নিরাপত্তার বিঘ্ন না ঘটিয়ে যতটা দেওয়া যায়, ফুলি সুনন্দ কিছু চাইলে সেইটুকু দেয়। তার বেশি না। সেজন্য সুনন্দ যে ছবি উঠে যাচ্ছে তার শেষ শো দেখে। হল ফাঁকা। অনেক কিছু তখন চাওয়া যায়। সেজন্য সুনন্দ কখনও অপরিচিত রেস্তোরাঁতে ফুলিকে নিয়ে বসে। পর্দা টেনে দেয়। তারপর জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। ফুলি তখন শরীরের সঙ্গে একেবারে আঠা হয়ে থাকতে ভালবাসে। এইভাবে মাস ছয়েক ধরে খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। এখন ব্যাঙ্কে শুধু একটা চাকরি। ওটা হয়ে গেলেই সে নদীর পাড় ধরে আর হেঁটে যাবে না। নদীটা সোজাসুজি অতিক্রম করবে। এবং সেখানেই সে প্রথম এক গভীর অরণ্য দেখতে পাবে। ফুল লতাপাতা, ঝড় বিদ্যুৎপ্রবাহ, শ্বাপদসংকুল এক অরণ্য। নিয়তি মানুষকে শেষ পর্যন্ত সেখানেই টেনে নিয়ে যায়। সুনন্দ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলতে চাইল, তুমি মা হয়ে যাবে, আমি বাবা হয়ে যাব। দাঁত নড়বড়ে হবে—তবু ফুলি আমরা যুবকেরা যুবতীরা কি এক তাড়নায় সেখানেই শেষ পর্যন্ত গিয়ে হাজির হই। এইটুকু ভেবে সুনন্দ ঘাসের উপর সত্যি শুয়ে পড়ল। সে যেন বলতে চাইল এইভাবে নিয়তি আমাদের কবরের দিকে নিয়ে যায়।

    ফুলি মাথার কাছে বসে বলল, এই শুলে কেন?

    সুনন্দ বলল, কত নক্ষত্র না আকাশে!

    ফুলি বলল, লক্ষ্মীটি ওঠো।

    সুনন্দ বলল, তুমি যাও।

    ফুলি তখনই বলল, দ্যাখ কারা আসছে। দু-তিনটা যণ্ডামার্কা ছেলে।

    সুনন্দ দেখল ছেলেগুলি তাদের ঘিরে ফেলেছে। একজন বলল, দাদা কি করছিলেন বেশ মজা, না বেশ টিপে টুপে দেখা হচ্ছে। তারপরই ধাঁই করে মুখে ঘুষি।

    সুনন্দ বলল, আমাকে মারছেন কেন?

    —প্রেম। শালা প্রেম চুটিয়ে দিচ্ছি। এই ক্যাবা দুটোকেই ন্যাংটো করে ছেড়ে দে ত।

    —দেখুন আমরা বেড়াতে এসেছি।

    —আর জায়গা পাও নি চাঁদু। কি আছে দেখি!

    —কিচ্ছু নেই।

    একজন বলল, মার না আর একটা টুসকি। বাছাধন হড়হড় করে সব বের করে দেবে।

    ফুলি ভয়ে কাঁপছিল। গলা শুকিয়ে আসছে। চিৎকার করতে গিয়েও পারল না। পুলিশ পুলিশ। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। গাছের ও-পাশ দিয়ে মানুষজন হেঁটে যাচ্ছে। ফুলি দৌড়ে খবর দেবে ভাবল। আর তখনই তিন নম্বর যণ্ডামার্কা ছেলেটা ওর হাত ধরে ফেলেছে। দেখি রানী। কাছে এস। কি আছে? কিছু নেই। আহারে! বলে কানের দুল খসিয়ে নিল। সুনন্দ ঘড়ি খুলে দিচ্ছে। ফুলির হাতে আর আছে কাঁচের চুড়ি।

    —পকেট দ্যাখ ক্যাবা।

    পকেট হাতড়ে দেখা হল।

    তখন সেই দস্যু সর্দারটি বলল, তোরা একে একে চুমু খা।

    তখন সুনন্দর কি হয়ে যায়। সে ক্ষেপে গিয়ে এলোপাথাড়ি লাথি ছুঁড়তে থাকে। এবং প্রায় পাগলের মত সে লাফিয়ে পড়ল একটার ঘাড়ে তারপর জোর হিন্দি সিনেমার মত রদ্দা চালাল। ওর মাথার মধ্যে কেউ কিছু চালিয়েছে। সে রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছিল। ফুলি চিৎকার করছে, মেরে ফেলল, মেরে ফেলল। সেই আর্ত চিৎকারে মানুষজন ছুটে আসছে। তারপরই দেখল সব ফাঁকা। ফুলি অপরিচিত মানুষজনের মধ্যে বোবা হয়ে গেছে। একটা কথা বলতে পারছে না। সুনন্দ পায়ের কাছে পড়ে আছে। মানুষজন দেখে ওঠার চেষ্টা করছে।

    তখন জনতা ওদের ওপরই ক্ষেপে গেল। কেন আসেন—ঠিক হয়েছে বেশ হয়েছে। সুনন্দ তখন হাত ধরে টানল ফুলির, এই এস। মানুষজন তামাশা দেখার জন্য ভিড় করতেই ফুলি বলল—তোমার রক্ত পড়ছে।

    —ঠিক হয়ে যাবে। এস।

    —কৃতকর্মের ফল। জনতা থেকে কেউ একজন বলল। যেন এরা জীবনে মেয়েমানুষ ছুঁয়েও দেখেনি।

    —বাড়ির লোকও বলি, এমন একটা ধিঙ্গি মেয়েকে ছেড়ে দেয়! তারপর ওরা মানুষের মূল্যবোধ নিয়ে কথা বলতে বলতে চলে গেল। সব ভেঙে পড়ছে। জীবনে সততা নেই। কি হল দেশটা!

    সুনন্দ রুমাল দিয়ে ক্ষত স্থানটা চাপা দিয়ে হাঁটতে লাগল।

    ফুলি বলল, আমরা এখন কোথায় যাব সুনন্দ? আর্ত অসহায় মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে সুনন্দ কেমন বিভ্রমে পড়ে গেল।

    তখন বিশাল কাঁচের দরজা ঠেলে মতি ভিতরে ঢুকছে। সুবিশাল করিডোরের পাশে কাঁচের কাউন্টার। পাঁচ সাতটা ফোন নিয়ে ঘোষবাবু দাঁড়িয়ে আছেন। একটা তুলছেন, একটা নামাচ্ছেন। মসৃণ গোলগাল মুখ। মাছির মত দুটুকরো গোঁফ নাকের নিচে। গলায় বো টাই। চেক কাটা টেরিকটনের স্যুট পরে ফোনের রিসিভারে ঝুঁকে আছেন। কাউন্টারে বসে মিস কাপুর গোলাপী রঙের ভেলভেটের শাড়িতে আগুন হয়ে বসে আছে। এখনও বোধহয় ঘোষবাবু ক্লায়েণ্ট ধরতে পারে নি। মতিকে দেখে মিস কাপুর সামান্য মাথা নত করল। হাসল সামান্য। দেরিতে আসায়, পরে সে ক্লায়েণ্ট পাবে। তার নিজেরও আজ দেরি হয়েছে। ঘোষ মতিকে দেখেই, ইশারায় কাউন্টারের ভেতরে চলে আসতে বলল।

    এখানে এলেই মতি যেন অন্য এক জগতে চলে আসে। কত সুন্দর পৃথিবী মানুষ নিজের জন্য তৈরি করে নিতে পারে এখানে না এলে বিশ্বাস করা যায় না। লাল কার্পেট পাতা করিডোর। সব অদৃশ্য লাল নীল আলো দেয়াল থেকে যেন চুইয়ে পড়ছে। সব ছিমছাম নারী পুরুষ হল্লা করতে করতে ডানদিকের সিঁড়ি ধরে উঠে যাচ্ছে। বয় বেয়ারারা সাদা উর্দি পরে ভারি ব্যস্ত। কাঁচের দরজার ওপাশে উর্দিপরা ইকবাল অনবরত সেলাম ঠুকে যাচ্ছে। তাকে দেখেও সেলাম ঠুকতে যাচ্ছিল—যেই দেখল মতি বোন, আর অমনি হেসে বলল, ক’দিন এদিকে আর মাড়ান নি বুঝি?

    কথাটার মধ্যে কেমন একটা নগ্নতা টের পেয়ে মতি প্রথম ভ্রু কুঁচকে ছিল। তারপর বুঝল, ইকবাল সে ধরনের মানুষ নয়। সে ইতর কথাবার্তা প্রায় জানেই না। মিস কাপুরের পাশে দাঁড়িয়ে মতি রিসেপসনিস্টদের মত হাবভাব করতে থাকল। মতি এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছে। সিগারেটের কেস থেকে একটা সিগারেট তুলে নিল। কোনও পুরুষ একা উঠে গেলেই মিষ্টি করে হাসতে হচ্ছে। কাউন্টারে দাঁড়ালেই এটা করতে হয়। কোথায় কোনটা কাজে লেগে যাবে—এই হাসির মধ্যে শরীরের এক বিশেষ ইচ্ছের ইশারা ফুটে উঠলে হয়ত সিঁড়ি ধরে ওঠার মুখেই বুক করে ফেলতে পারে।

    মতি আজ হাল্কা লিপস্টিক ঠোঁটে দিয়ে এসেছিল। ইদানীং সে বুঝেছে খাপ খোলা পুরুষেরা খুব উগ্র সাজ পছন্দ করে না। সে জন্য সে তার স্বভাবে চরিত্রে নারী মহিমময়ী এমন একটা ভাব ফুটিয়ে রাখে। লাজুক, চোখ নামিয়ে নেওয়া, আস্তে আস্তে কথা বলা, কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়া, একটু উদাস হয়ে যাওয়া এ-সব অভিনয় রপ্ত করতে না পারলে বেলাইনের পুরুষেরা আরাম পায় না। প্রথম দিকে তার স্বভাবেই ছিল এগুলো। পরে লাইনের মেয়ে হয়ে যাবার পর, তার সে-সব হারিয়ে গিয়েছিল। ঘোষবাবু একদিন বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, ক্লায়েণ্টদের সঙ্গে কি কর! ফিরতি বার আর তোমার নাম করে না। আসলে মতি বুঝেছিল, সে পাকা বেশ্যা হতে গিয়েই ভুল করেছে। পাকা বেশ্যাদের বাবুরা ঠিক চিনে ফেলে। সেই থেকে সে এখন যেটা তার স্বভাবে ছিল, সেটা অভিনয়ে দাঁড় করিয়েছে।

    ঘোষবাবু ফোন রেখে একটা চিরকুট এগিয়ে দিলেন। চলে যাও।

    মিস কাপুর ভীষণ উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। পরে এসে আগে। আসলে বাঙালী বলেই এই স্বজাতি প্রীতি। কিন্তু লোকটা জানে না, এর আসল মালিক একজন পাঞ্জাবী। যদি এই প্রাদেশিকতার কথা কানে তুলতে পারে তবে নাকানি-চোবানি খেতে হবে খুব। তবু মিস কাপুর এই ঘোষবাবুকে সমীহ করে। কারণ তিনি ইচ্ছে করলে বলতে পারেন, আপনার চাহিদা কমে গেছে। বাজারে আর চলছে না। সেটা যে কত বড় অপমানের বিষয়! সে-জন্য সে খুব করুণ গলায় বলল, বাবুজী ইট ওয়াজ মাই টার্ন।

    ঘোষবাবু স্মিত হাসলেন। মাথার ওপরে কাঁচের বোর্ডে নীল অক্ষরে লেখা ওয়েল-কাম। তার নিচে ঘোষবাবুর মাছির মত গোঁফের ফাঁকে স্মিত হাসি বড়ই কূটগন্ধ ছড়াচ্ছিল। বললেন, ক্লায়েণ্ট প্রেফারস মতি। হোয়াট কেন আই ডু।

    এর পর মিস কাপুর অগত্যা চাবির রিং ঘোরাতে থাকল। মতি সিঁড়ি ধরে উঠে যাচ্ছে। প্রায় যেন একটা স্বর্গরাজ্য পার হয়ে আর একটা স্বর্গরাজ্যে সে চলে যাচ্ছে। নীল রঙের কার্পেট পাতা সিঁড়িতে পা ডুবে যাচ্ছিল। ৩০৮ নম্বর ঘর। তার এখন, কোন দিকে কোন ঘরের সিরিয়েল আরম্ভ সব মুখস্থ। একতলা, দোতলা, তিন-চার-পাঁচ তলা। দোতলায় সব লাউঞ্জ, ব্যাংকোয়েট হল পাঁচটা। সে এখন গ্রীন ভেলির পাশ দিয়ে যাচ্ছে। কাঁচের ঘরে ভেলভেটের তাকে নানান রকম ইংরাজী হিন্দি বই। দু’জন যুবক একজন যুবতীকে নিয়ে বইগুলি দেখছে। পাশে একটা রকমারী শাড়ির শো-রুম। তারপরই ম্যাডভিলা—সেখানে মিউজিক বাজছে। কাঠের সুইংডোর ঠেললেই সব নানা রকমের আবছা আলো আঁধারে শোনা যাবে মিউজিক বাজছে। আর দূরে অদূরে সব হিজিবিজি মানুষের মুখ—কেমন ভুতুড়ে ছায়া—অবিকল এক নকল নরকের ভয়ের মত জায়গাটা। নারী পুরুষ লাল নীল গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে—কি যেন গোপন ব্যথায় মুষড়ে যাচ্ছে—অথবা সুরা যা মানুষকে অতীব এক সরলতা এনে দেয়—একটা লোককে সে উঠে যেতে দেখল, দাঁড়িয়ে হাঁকছে এনি মোর ফ্লাওয়ার? মতি পাশের বিরাট কাঁচের ফুলদানি থেকে যেতে যেতে দুটো ফুল তুলে নিয়ে লোকটার হাতে দিতেই কেমন চকমক করে তাকাচ্ছে। নেশায় লোকটা বড়ই টলছিল। ফুল পেয়েই মুখে পুরে দিল এবং চিবুতে থাকল।

  • দশ

    দশ

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    দশ

    প্রথমেই মনে হল একটা চৌকো মত মুখ তার চোখের সামনে ঘুরে গেল। তারপর বাঘের মত একটা ডোরা কাটা মুখ। অতীশ চোখ রগড়াল। জিভ ভারি হয়ে আসছে। মাথা বেশ ঝিমঝিম করছে। হাসিরাণীর ভ্রু প্লাক করা। নাকে ফলস নথ। কাবুলবাবু লেমন জিন নিয়েছে। চুকচুক করে খাচ্ছে। কুম্ভবাবুর হুইস্কি ছাড়া পছন্দ না। ওকেও পীড়াপীড়ি করেছিল। কিন্তু সে বলেছে, অনেকদিন অভ্যাস নেই। আপনাদের অনারে সামান্য বিয়ার খাব। হাসিরাণীর গ্লাসে খুবই সামান্য লেমন জিন। সে বেশি খায় না। কখনও খায় না কেবল দাদার অনারে সে যেন নিয়ম রক্ষা করছে। সব কিছুই এভাবে অনারে হচ্ছিল, যখন প্লেট ভর্তি চিলি চিকেন, যখন অতীশ একবার ইতিমধ্যেই বাথরুম থেকে ঘুরে এসেছে তখনই চোখে একটা ডোরাকাটা বাঘ উঁকি দিয়ে গেল। সে বুঝতে পারল না এত নেশা লাগছে কেন। জিভ এত ভারি ঠেকছে কেন। এক বোতল বিয়ারে এমন ত হবার কথা না। সে গ্লাসটা তুলে চোখের সামনে নিয়ে এল—না কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তারপর মনে হল দীর্ঘদিন অনভ্যাসের ফল—অথবা কলকাতায় আসলে বিয়ারের বদলে হুইস্কিই দেওয়া হয়। সে অনেক খবর রাখে কিন্তু এই শহরের কোনও খবরই রাখে না। এক মাসেই বুঝেছে, তার শেকড়বাকড় আলগা হয়ে যাচ্ছে ফের।

    কাবুলবাবু বলল, আর একটা নিন।

    অতীশ মাংস চিবুচ্ছিল। কেমন গা বমি বমি ভাব। এটাও তার কখনও হয়নি। সে বলল, না আর পারব না।

    কুম্ভ হোহো করে হেসে উঠল। বলল, দাদা এই আপনার দৌড়। হাসি তো আপনার চেয়ে বেশি টানতে পারে?

    —তা পারে। আমি পারি না।

    —বাবা বাড়ি আছেন বলে না হলে দেখতেন।

    হাসিরাণী বলল, না দাদা আমি খাই না। ও মিছে কথা বলছে।

    কুম্ভ বলল, খেলে দোষের কি! বউরাণীও খায়। তার জন্য বউরাণীকে চরিত্রহীন বলতে হবে। খারাপ মেয়ে-মানুষ বলতে হবে। কি কাবুল বলিস নি। কাবুল চুপ করে থাকল। অতীশের কোথায় যেন চড়াৎ করে লাগল। অমলাকে নিয়ে কথা বলছে কুম্ভবাবু। কুম্ভর কথাবার্তা কাবুল ঠিক রেলিশ করছে না। রাজবাড়ির আদর্শ বলতে কুমারবাহাদুর এবং বউরাণী। এরা যখন খায় তখন এটা একটা আধুনিকতার লক্ষণ। এদের কথাবার্তায় বুঝেছে কুমারবাহাদুর দামী দামী ইংরেজী রেকর্ডে গান শুনতে ভালোবাসে—কুম্ভবাবুর বাড়িতেও সেই গানের রেকর্ড। কুমারবাহাদুর নীল রঙের টাই পরতে ভালবাসেন, কুম্ভবাবুও মাঝে মাঝে নীল রঙের টাই পরে। কুমারবাহাদুর পাইপ টানে, অফিসে মাঝে মাঝে কুম্ভকে পাইপ টানতেও দেখেছে। মাঝে মাঝে কুম্ভ রজনীগন্ধার ঝাড় কিনে নিয়ে যায়। ঘরটায় তাকে একদিন নিয়ে গেছিল—বসতে দিয়েছিল, দেয়ালে তার ও রাজা বাহাদুরদের ফটো, নিজের ফটো। সমুদ্র তীরের ফটো—শেষ পর্যন্ত সেখানে পৌঁছাতে চায়। কাবুল সে আর হাসিরাণী হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সংসারে সে হাসিরাণীর স্বপ্নের মধ্যে সাঁতার কাটে। তারপরই চিন্তার সূত্র এলোমেলো। কেমন ঝিমঝিম মাথা। গা ভারি ভারি। দাঁড়াতে গিয়ে বুঝল বেশ টলছে—মানুষজন অস্পষ্ট এবং দু’জন হয়ে যাচ্ছে। আসলে কি এরা বিয়ারে কিছু মিশিয়েছে, এই যেমন হুইস্কি—এতে তার এলার্জি আছে। সে কখনও খায় না।

    অতীশ বলল, আপনারা খান! আমি আর খাচ্ছি না।

    হাসিরাণী বোধহয় মানুষটার জন্য ভেতরে কোনোও অনুরাগ বোধ করে থাকবে, সে বলল, তোমরা দাদাকে আর দেবে না, দিলে খুব খারাপ হবে।

    হাসিরাণীর কথায় কুম্ভ এবং কাবুল দুজনেই কেমন সচকিত হয়ে গেল। বলে না দেয়! অতীশ টের পাবে তাকে মাতাল করার জন্যই এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। অতীশবাবুর মনে সংশয় দেখা দিলে—তাকে নিয়ে ওরা যতদূর যেতে চায়, আর যেতে পারবে না।

    কুম্ভ বেয়ারাকে ডেকে বিল মিটিয়ে দিল। অতীশকে বলল, ধরব?

    —না ধরতে হবে না। চলুন।

    সবার পেছনে হাসিরাণী। এই মানুষটার পেছনে ওরা এত লেগেছে কেন? বউরাণীর খুব পছন্দ বলে, কুমারবাহাদুরের খুব বিশ্বাসী বলে! হাসিরাণীর কেন জানি মনে হল, একদিন গিয়ে সে দাদাকে সতর্ক করে দেবে গোপনে। দাদা এদের সঙ্গে যাবেন না। এরা আপনাকে বিপদে ফেলতে চায়। এবং তখনই কেন জানি ইচ্ছে হয়, এই মানুষটার সঙ্গে হেঁটে গেলে সে আরাম বোধ করবে। কাবুল দরজা খুলে ধরলে হাসিরাণী বলল, আসুন ভিতরে।

    —কুম্ভবাবু কোথায়?

    —পান কিনছে।

    হাসিরাণী হাসল। বলল, বাড়িতে গন্ধ পাবে না!

    —কি হয় গন্ধ পেলে?

    —কি ভাববে সবাই। দাদা মদ খায়। মান মর্যাদা বলে কথা!

    —মদ খাওয়াটা খারাপ হবে কেন। এতে কাজের ক্ষমতা বাড়ে। অতীশ কথাগুলি জড়িয়ে জড়িয়ে বলছে। কথা জড়ালেই খারাপ। কথা জড়ালেই মাতাল। তখন অনিয়মে পড়ে যাওয়া। সে দেখল আরও চার-পাঁচজন বের হয়ে আসছে। একটা লোক বেহালা বাজিয়ে পয়সা চাইছে। গরীব ভিখারীর হাত লম্বা হয়ে আসছে। সে পকেট থেকে তুলে রেজকিগুলো দিয়ে দিল। হাসিরাণী গাড়ির ভেতরে ঢুকে তাড়াতাড়ি অতীশকে যেন ভিতরে ঢুকিয়ে নিল। বলল, চুপ করে বসুন। মাথাটা এলিয়ে দিন, আরাম পাবেন।

    অতীশ বলল, হাসি একটা কথা বললে, রাগ করবে না বল!

    —রাগ করব কেন?

    —বাড়িতে তোমার লক্ষ্মীর পট নেই। আমার খুব ইচ্ছে একটা পট কিনে দেব। লক্ষ্মীর পট। পাঁচালি। কিনে দিলে নেবে ত?

    —ওর এসব পছন্দ না। আপনার ভাই কালীভক্ত।

    —তাহলে দেব না। স্বামীর অবাধ্য হতে আমি তোমাকে বলব না। স্বামীর অবাধ্য হওয়া ভাল না।

    তখন কুম্ভ এসে দেখল হাসিরাণীর পাশে অতীশ গা লেপ্টে বসে আছে। কুম্ভর ভেতরটা গরগর করে উঠল। কিন্তু কিছু না বলে একটা পান এগিয়ে দিল অতীশের দিকে। বলল, খান। গন্ধটা মরবে। অতীশের মনে হল সেই ডোরাকাটা বাঘটা চোখের সামনে লাফিয়ে পড়ছে।

    হাসিরাণী বলল, আমারটা কৈ?

    —তোমার মুখে গন্ধ কোথায়, তুমি যে খাবে!

    অতীশ বলল, আচ্ছা কুম্ভবাবু আপনি কি আর জন্মে বাঘ ছিলেন? না, আই মিন বাঘের বাচ্চা। কাবুল চোখ টিপল। কুম্ভ এর বিয়ারের সঙ্গে তিন তিনবার হুইস্কি মিশিয়েছে। আর একটু হলেই কাবু করে আনতে পারত। কিন্তু হাসিরাণীর বাধা ছিল। কুম্ভ বলল, আপনি কি টের পান, মানুষ কোন জন্মে কি থাকে?

    —কি যেন হয় মাথার মধ্যে। এই দেখুন না কখন থেকে একটা জন্তুর মুখ আমাকে কেবল তাড়া করছে। কখনও বাঘের মনে হয়, কখনও শেয়ালের, কখনও মানুষের মুখ—হিজিবিজি দাগ কাটা, টলতে টলতে আসছে। আমাকে ধরতে আসছে।

    অতীশের পাশে কুম্ভ বসে পড়ল। গাড়ি চালাচ্ছে কাবুল। কাবুলের কাছে অতীশবাবুর মুখোশ যত খুলে ধরা যায়। কারণ কাবুল, রাজার এবং বউরাণীর এজেণ্ট, অতীশবাবু যে ধোওয়া তুলসীপাতা নয়, সুযোগ সুবিধে মত কাবুলই পারে বউরাণী কিংবা রাজার গোচরে আনতে। সবই সে করছে হাসিরাণীর জন্য, তুমি যে কেমন মেয়েছেলে বাব্বা বুঝি না। নিজের ভালটাও বোঝ না। তুমি জান না এই লোকটা আমার তোমার সব সুখ কেড়ে নিতে এসেছে।

    কুম্ভ ভেবেছিল মদ খাওয়ার ঘোরে অতীশবাবু রাজার দুমুখো স্বভাব নিয়ে কিছু বলবে—এই ভুলচুক কথাবার্তা, সঙ্গে বেফাঁস দুটো-একটা বের হয়ে গেলেই কাজ দেবে। নবর চাকরির প্রসঙ্গও তুলেছিল। কিন্তু অতীশবাবু ভারি সেয়ানা, শুধু ঘাড় নেড়ে গেছে। নিজের কথা বলে নি। বউরাণী তাকে ডেকে কি বলেছে, তাও সে বিন্দুমাত্র ওগলায়নি। মদ খেলে তো মানুষ সোজা সরল হয়ে যায়—অথচ এত খাওয়ার পরও রাজার সম্পর্কে একটা বেফাঁস কথা বলে নি। এ-ছাড়া কুম্ভর মাথা নানা রকম ফন্দি খেলা করে বেড়ায়। কোথা দিয়ে কোন রন্ধ্রপথে ঢোকা যাবে, কাকে কিভাবে জড়িয়ে দেওয়া যায়—এটাই তার মাথায় থাকে। সে ইচ্ছে করেই খাবার টেবিলে বউরাণীর কথা টেনে এনেছিল। অন্দর মহলের গোপন খবর কাবুল রাখে। আসলে সে অতীশবাবুর কাছে কাবুলকেও জড়িয়ে রাখল। যেভাবে রাজবাড়ির প্রভাব প্রতিপত্তি কমছে-বাড়ছে তাতে করে কাবুলের ফ্রণ্টকেও দুর্বল করে রাখা দরকার। যখনই কাবুল তেরিয়া হয়ে উঠবে তখনই হাতের অস্ত্র, বউরাণী মদ খায়। কাবুলবাবু খবরের উৎস। কুম্ভ চায় এক সঙ্গে দুটো ফ্রণ্টকেই ঘায়েল করতে। হাসির বুদ্ধি কম। সে বুঝছেই না, এতগুলি টাকা গচ্চা এমনি সে দেয় নি। কাবুলের নামে পার্টি দিয়ে সে দু’ফ্রন্টে লড়াই জমিয়ে তুলতে চায়। কিন্তু এত করেও অতীশবাবুর মুখ থেকে রাজবাড়ির কোনও নিন্দা প্রশংসাই বের করতে পারল না। ভেতরে ভেতরে সে টাকার জ্বালায় জ্বলছিল। তবে এখন এটাই সুখ, কাবুল অন্দরমহলের গোপন খবর বাইরে বের করে দেয়। অদ্ভুত কাবুলের সামনে অতীশের কাছে বউরাণী মদ খায় প্রকাশ করতে পেরে মনে মনে কিছুটা আত্মপ্রসাদ লাভ করছে।

    গাড়িটা তখন রাজবাড়ির মুখে বাঁক নেবে। ওরা সবাই দেখল ঠিক ঢোকার মুখে সেই পাগল ঊর্ধ্ববাহু হয়ে দাঁড়িয়ে। কাবুল গলা বার করে বলল, এই হরিশ পাগল পালা। দাঁড়া এক্ষুনি পুলিশে খবর দিচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে কাজ। হরিশ দৌড়ে পাশের দেবদারু গাছটার নিচে হাঁটুমুড়ে বসে পড়ল।

    আর কিছু পরেই ঢুকছে বউরাণীর গাড়ি। রাস্তা থেকে গাড়ির হর্নেই টের পায় তিনি আসছেন। কিন্তু মাঝপথে যেন গাড়ি আটকে গেল। হরিশ ঊর্ধ্ববাহু হয়ে আবার দাঁড়িয়ে আছে। এই পাগলের উৎপাতে আর শহরে থাকা যাবে না। শঙ্খ দরজা খুলে লাফিয়ে নামল। তারপর একটা ব্যাটন নিয়ে এগিয়ে গেল। কিন্তু হরিশ নড়ল না। সে ব্যাটনটা চেপে ধরল, লাঠিটা যেন পেয়ে গেছে। দম মাধা দমের লাঠিটা রাজবাড়ির লোক তাহলে চুরি করেছে। সে ব্যাটনটা চেপে ধরল। এবং ঈষৎ গণ্ডগোল হচ্ছে ভেবেই দারোয়ান দৌড়ে গেল। টের পেয়ে অন্য পাইকরা দৌড়ে গেল। ঠেলেঠুলে থাবড়া মেরে হরিশকে বসিয়ে দিল সবাই। হরিশ সেই কখন থেকে খুঁজছে। পেয়েও পেল না। সে রাজবাড়ির দিকে মুখ করে দাঁড়াল। তারপর থুতু ছিটাতে থাকল, শেষে নুনু বের করে হিসি করে দিল।

    তখন অতীশ সিঁড়ি ভেঙে উঠছে। যেন সে অন্ধকারে ধাপ খুঁজে পাচ্ছে না। হাতড়ে হাতড়ে উঠে যাচ্ছে। অন্ধকারে বোধহয় চামচিকে উড়ছিল। একটা চামচিকে অন্ধকারে নাকে মুখে গোত্তা খেয়ে পড়ল—সে কোনরকমে বলল, যা পালা। তারপর আবার সিঁড়ি ভাঙতে থাকল।

    অন্ধকারে অতীশ ভারি সতর্ক—কেউ দেখে ফেলতে পারে, সে টলে টলে উঠেছে। বাইরে থেকে আলো পড়ছে—সিঁড়িটা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পা টেনে টেনে সে উঠে এল। মানসদা দেখে ফেললে ভারি অস্বস্তিতে পড়ে যাবে। এই মানুষটাকেই সে এখন এ-বাড়িতে একমাত্র সমীহ করে। আর সবাইকে কেন জানি মনে হয় সকাল সন্ধ্যা কেবল ধান্ধায় ঘুরছে। তালা খুলে ঘরের ভেতর ঢুকতেই দেখল, একটা চিঠি—নীল খামের চিঠি মেঝেতে পড়ে আছে। নির্মলা চিঠি লিখেছে। বড়ই ছেলেমানুষের মত চিঠিটা তুলে নিল। ঘাম হচ্ছে—জবজবে ভিজা শরীর। ফুল স্পীডে পাখা চালিয়ে সে গড়িয়ে পড়ল বিছানায়। সারা শরীরে ক্লান্তি। চোখ বুজে আসছে—কেমন অসাড় লাগছে। তার জুতো মোজা খোলার পর্যন্ত যেন শক্তি নেই। অথচ চিঠিটা পড়া দরকার। বাড়ির খবরের জন্য দুঃশ্চিন্তায় ছিল। টুটুল মিণ্টুর কথা মনে হলেই সে অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। এত প্রিয় চিঠিটা পর্যন্ত পড়ার সে কেন জানি আকর্ষণ বোধ করছে না। মেজাজটা কেমন বোঁদা মেরে আাছে। চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিতে পারলে ভাল হত। স্নান করলে সে আরাম পেত। এমন আলস্য শরীরে যে তার এক পা উঠে গিয়ে কিছু করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। এত প্রিয় চিঠি সে এখনও অবহেলায় ফেলে রেখেছে। এভাবে কতক্ষণ ছিল সে জানে না, সহসা দরজায় খুটখুট শব্দ হতেই ওর যেন হুঁশ ফিরে এল—কে! কে!

    —আমি নব।

    অতীশ বুঝতে পারল সারা দিন এই ভয়টাই তাকে তাড়া করেছে। নব আসবে। নবর বাবাকে সে কথা দিয়েছে। নব এলে কি বলবে! নব বিশ্বাস করবে না, সুরেন বিশ্বাস করবে না চাকরি দেবার কোনও ক্ষমতা তার নেই। রাজবাড়ির সে একজন ক্রীতদাস। এই ভয়ংকর তাড়না তাকে শেষ পর্যন্ত চাঙোয়ায় নিয়ে গেছে। নবর কাছ থেকে পালিয়ে যাবার এছাড়া তার যেন কোনও উপায় ছিল না। না কি সে বুঝতে পারছে, নিয়তি তাকে এই বড় শহরে টেনে এনেছে। জীবনের এক পরিমণ্ডল থেকে এখন অন্য এক পরিমণ্ডলে। মানুষের নিয়তি এই রকমের, বিশ্বাস করতে পারলে তার কষ্ট থাকত না, এর জন্য সেই দায়ী—এবং এসব ভাবনা আরও তাকে পেয়ে বসলে, নব ফের ডাকল, স্যার সুখবর দিতে এলাম, দরজাটা খুলুন।

    নবর জীবনে সুখবর! এযে এক আশ্চর্য ঘটনা! সে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে সরে দাঁড়াল। মুখে মদের গন্ধ পেতে পারে। সে বিছানায় এসে বসল। নবকে অন্য সময় হলে বলতে পারত, এখন না কাল এস, কিন্তু সকাল থেকেই সে নবর কাছে একটা বড় রকমের কথার খেলাপ করে অপরাধী সেজে বসে আছে। তার মুখে বড় কথা শোভা পায় না। ছোট কথাও না। সে বলল, কি খবর নব?

    নব বসল না। দরজার কাছে দাঁড়িয়েই কাঁচুমাচু মুখে বলল, দশটা টাকা সাহায্য দেবেন স্যার। সাহায্য কথাটা যেন খুবই কৃপাপরবশ হয়ে নব বলল। সোজা বললেও যেন দোযের হত না। দশটা টাকা ছাড়ুন তো। কেরামতি অনেক দেখা গেল। দশটা টাকা এখন দরকার। দিন।

    অতীশের কাছে দশটা টাকা অনেক। এখানে সে খুব টিপে টিপে চলছে। দশটা টাকা চাইলেও হুট করে দিতে পারে না। কিন্তু যেন যখের মত নব দরজায় ঠাণ্ডা মেরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মুখ স্থির। ভয়ে ভয়ে সে বলল, নব কাল নিলে চলে না। এখন তো টাকা নেই।

    —কালই দেবেন স্যার। শনিপূজা করব। মূলধনের অভাব। বাবা বললেন, নতুন স্যারকে বলেছি, তোকে যেতে বলেছে। আমি কিন্তু স্যার গেলাম না। রাজার কারখানা সব লাটে উঠছে। ভাঙা কপাল, আর ভাঙতে চাই না স্যার। তাছাড়া বামুনের ছেলে, পূজাপার্বণে লেগে থাকাই ভাল। সবার কাছ থেকে চাঁদা তুলছি। মোট ত্রিশ টাকা দরকার। একটা পুরোহিত দর্পণ, শনির পাঁচালী, বলে নব এগিয়ে এল। তাঁর বিজনেস প্রজেটের খাতাটা খুলে দেখাল, বিশ্বাস না হয় দেখুন, এ ছাড়া আতপ চাল, কলা, বাতাসা, দুখানা সন্দেশ, এক কেজি দুধ, চালের গুঁড়ো সিন্নি প্রসাদের জন্য, ফুল-ফল আমের পল্লব, ঘট হরিতকি তামা তুলসী এসবে মোট খরচ আঠার টাকা বাষট্টি পয়সা। একটা আসন, মূর্তি গড়া, ঢাকের খরচ বাবদ সাতটা টাকা। মিসলেনিয়াস খরচ আরও পাঁচ টাকা। ত্রিশ টাকা মূলধনে বিজনেস। কনসার্নের নাম নবর শনিপূজা। আমহার্স্ট স্ট্রীটের মোড়ে। রোজ শনিবার। শনি ঠাকুরকে সব শুয়োরের বাচ্চা ভয় পায় স্যার। মোক্ষম লাইন ধরেছি। কি বলেন স্যার। বলে নব কাছে ঘেঁষে আসতে চাইলে, অতীশ সরে বসল। বলল, তুমি ওখান থেকেই বল। হ্যাঁ হ্যাঁ সব বুঝছি। ভাল ব্যবসা।

    —আপনার দশ টাকা শেয়ার। বাবার দশ টাকা শেয়ার, হামুবাবু দেছেন পাঁচ টাকা, দু টাকা মতিপিসি, এক টাকা নধরবাবু, এক টাকা রাধিকাদাদু। এই ছজন শেয়ার হোল্ডার। আর চারজন শেয়ার হোল্ডার টাকা দিচ্ছে না। যার দোকানের সামনে ফুটপাথ, সে একটা শেয়ার চাইছে। বাকি তিনটে শেয়ার নিজের। আমি স্যার অ্যাকটিং পার্টনার। আপনি ভাল মানুষ বলে দশ টাকার শেয়ার দিচ্ছি।

    নব তাকে মুক্তি দিয়েছে ভাবতে গিয়ে অতীশের চোখে কেন জানি জল এসে গেল। বলল, আমি এক্ষুনি দিচ্ছি। তুমি নিয়ে যাও নব। তোমার ভাল হোক।

    —ভাল আমার হবেই স্যার। আমি এই দিয়েই বিপ্লবের কাজটা শুরু করব। আতঙ্কে ঘুম আসবে না চোখে। শনিঠাকুর বলে কথা—হাজার হাজার মানুষ শিয়ালদায় নেমে অফিসে যাচ্ছে আবার ফিরছে। পাঁচ পয়সা দশ পয়সা দিলে তখন ভেবে দেখুন কত পয়সা। একটুও ব্লাফ দিচ্ছি না স্যার। তারপর পরামর্শ নেবার মত গলা বাড়িয়ে আরও কাছে আসতে চাইলে অতীশ আবার দূরে সরে একেবারে খাটের কোণায় চলে গেল। তারপর এগোলে তাকে দেয়ালে ঠেস দিতে হবে।

    —আচ্ছা স্যার, কার্ড ছাপলে কেমন হয়। নবর শনি পূজা। স্বপ্নে পাওয়া। তিনি জাগ্রত, মানুষের দুঃখ দুর্দশায় বিচলিত হয়ে নবর আশ্রয়ে হাজির। এমন সব বিজ্ঞাপন দিয়ে একটা কার্ড ছাপালে কেমন হয়?

    অতীশ বলতে পারত—কিছু হয় না। আবার হয়ও। কিন্তু কথা বললে কথা বাড়বে। সে বালিশের নিচে থেকে মানিব্যাগ বের করে দশটা টাকা দিয়ে সারা দিনের গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে চাইল। নব বলল, স্যার আপনি দেখবেন, কি করি! সারা শহরটা শনির আখড়া বানিয়ে ছাড়ব। দরকার হলে পার্টনারশিপ থেকে প্রাইভেট লিমিটেড, ব্যবসা বড় হলে পাবলিক লিমিটেড করে ফেলব। উত্তর কলকাতা, মধ্য কলকাতা, দক্ষিণ কলকাতায় আমরা অফিস খুলব। পাড়ায় পাড়ায় সমাজসেবা কেন্দ্র খুলব। ভিখারীদের জন্য লঙ্গরখানা। অনেক স্বপ্ন স্যার, আশীর্বাদ করবেন যেন সার্থক হয়।

    মদের ঘোরে অতীশ বলল, তোমাকে আশীর্বাদ করছি নব। আমার বাবা এখানে থাকলে তিনিও তোমাকে আশীর্বাদ করতেন। ভারত জননী বেঁচে থাকলে তিনিও তোমায় আজ আশীর্বাদ করতেন। তুমি এবারে যাও। শুভ কাজ ফেলে রেখ না।

    নব চলে যাবার পরই অতীশ কেমন হাল্কা হয়ে গেল। শরীরে জড়তা নেই। সে কেমন মুক্ত পুরুষ। তার চান করা দরকার। সে চান করে এল।

    খুব ফ্রেস লাগছে শরীর। ঘড়িতে দেখল এগারটা বেজে গেছে; পাশের ঘরগুলি থেকে কেউ দেখে না ফেলে, সেজন্য সে বারান্দার জানালা-দরজা বন্ধ করে রেখেছে। পেছনের জানালা খুলে দিয়েছে। খুলে দিলেই বড় একটা ডুমুর গাছ আর তার পাশে সেই অতিকায় জেলখানার পাঁচিল। পলেস্তারা খসে পড়ার শব্দ, কীট-পতঙ্গের শব্দ। তখনই মনে হল নির্মলার চিঠি। তার দুই জাতক, বাবা-মা ভাইদের খবর, বাবার অনুমতির খবর সবই এই চিঠিতে থাকার কথা। পড়লে জানতে পারবে।

    খাম খুলে সে দুটো চিঠি পেল। একটি বাবার, একটি নির্মলার। নির্মলার চিঠি খুলে দেখল; কয়েক লাইন মাত্র লেখা। টুটুলের জ্বর সেরেছে। বাবার খুব ইচ্ছে নয় আমরা কলকাতায় যাই। কিন্তু আমার খুব কষ্ট হচ্ছে! তোমাকে ছেড়ে একদণ্ড থাকতে পারব না। তাহলে মরে যাব। দাদাকে ফোন করেছিলে কিনা জানিও।

    বাবার চিঠি খুবই দীর্ঘ। লিখেছেন, পরমকল্যাণবরেষু। বাবা অতীশ, তোমার পত্রে সব অবগত হলাম। বউমাদের নিয়ে যেতে চাইছ। তুমি জানিয়েছ সেখানে তোমার বিনা পয়সায় একটি থাকবার বাসস্থান মিলেছে। বউমার ইচ্ছা যায়। আমারও অমত নেই। তবে বড় আশঙ্কা তুমি না আবার দ্বিতীয়বার ছিন্নমূল হও। সংসার থেকে মানুষ আজকাল বিচ্ছিন্ন হতে ভালবাসে। এটাই রেওয়াজে দাঁড়িয়েছে। নাড়ির টান ছিঁড়ে গেলে মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতা বাড়ে। মানুষের মহত্ত্ব ছোট হয়ে যায়। ওরা চলে গেলে বাড়িটা খালি হয়ে যাবে এই কষ্টটা বাজছে। যাইহোক, আমার কোনও অমত নেই। তাছাড়া আর একটা দিকও আছে। সেটাও ভেবে দেখলাম। বউমা কাছে থাকলে তোমার বাইরের আকর্ষণ কমবে। আমার নাতি নাতনী কাছে থাকলে তুমি অসাধু কাজ করতে ভয় পাবে। নিজের আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে এজন্যই ঘনিষ্ঠ থাকা দরকার হয়ে পড়ে। অশুভ প্রভাব থেকে এই ঘনিষ্ঠতা মানুষকে বাঁচায়।

    বাবা কি টের পেয়েছেন, সে কখনও কখনও অশুভ প্রভাবে পড়ে যাচ্ছে। বাবা তো বলেন, তিনি সব টের পান। বউরাণী অমলাকে দেখে তার ভেতরে কিছু একটা হচ্ছে এটা কি বাবা ধরে ফেলেছেন! কিংবা বাবা কি তারপরের চিঠিতে লিখবেন, অতীশ তুমি প্রলোভনে পড়বে না। হাসিরাণীর নথ যে তোমাকে নাড়া দিচ্ছে। বাবার এই ধরনের সাধুবাক্যের প্রতি তার সহসা কেন জানি ভারি উষ্মা জন্মাল। যত্ত সব। যত না বউরাণীর জন্য, তার চেয়ে বেশি বাবার এই চিঠিটা তাকে পাগলা ঘোড়ার মত তাড়া করতে থাকল। কখনও মনে হয়েছে বোকামি, কখনও মনে হয়েছে না সে ঠিকই করেছে। ইস্কুলের কাজটা ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় এসে সে ঠিকই করেছে। কাজের ক্ষেত্রে কোন সরল বিশ্বাসের ক্ষেত্র থাকবে না সে ভাবতে পারে না। অতীশ পরমুহূর্তেই বুঝতে পারে বয়সেরই দোষ এটা। অথবা বাবার জীবন যাপন—অঋণী অপ্রবাসী থাকতে চেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত কিন্তু প্রবাসে তাঁকে আসতেই হয়েছে। ঘাড়ধাক্কা খেয়ে প্রবাসে এসেছেন। প্রবাসে এসেও অঋণী থাকার কি হাস্যকর প্রচেষ্টা। চিঠিটা পড়তে পড়তে বাবার ওপর কেমন ক্ষিপ্ত হয়ে গেল এসময়। বাবা সামান্য অসাধু হলে পৃথিবীর আর কতটা ক্ষতি হত। আর এরই নাম বোধ হয় রক্তে বীজ বপন করা। বাবার সব সংস্কার সে রক্তে ধারণ করে আছে। মাঝে মাঝে গা ঝাড়া দিয়েছে—বাড়তি কিছু ফেলেও দিয়েছে।

    যেমন তার খুব শৈশবে উপনয়ন হয়েছিল। আহ্নিক করা, দু বেলা আহার একাদশীর দিনে শুধু ফলমূল আহার—তাকে কিছুটা সংশয়ে ফেলে দিয়েছিল। জীবনে এটা বড় কৃচ্ছ্র তার দিকে। বড় হবার বয়সে সে মাঝে মাঝে গা ঝাড়া দিত—বাবা তখন আরও ধার্মিক হয়ে যেতেন। তাকে কাছে ডেকে প্রাচীন ঋষি পুরুষদের কথা বলতেন। তাঁদের কাম লোভ মোহ সম্পর্কে জাগতিক সরল ব্যাখ্যা দিতেন। এভাবে বর্ণাশ্রম থেকে আরম্ভ করে ঋষি যাজ্ঞবন্ধে চলে আসতেন। শ্লোক উচ্চারণ করতেন গম্ভীর গলায়। বেদ উপনিষদের সব গুহ্য কথা আওড়ে যেতেন। ধর্ম মানুষকে বড় করে দেয়। ছোট করে না। এ-সবও বলতেন। তবু সে কেন জানি নিজের বিবেকের সঙ্গে ঠিক ঠিক সমঝোতা না হওয়ায় জাহাজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে উপবীত ত্যাগ করেছিল, শরীরে অপ্রয়োজনীয় বাড়তি কিছু রাখা আদপেই কেন জানি তখন তার পছন্দ হত না। জাহাজ থেকে ফিরে এসে বাবার সঙ্গে প্রথম খটাখটি সেই নিয়ে। এভাবে এক অদৃশ্য খাণ্ডবদহন পিতা-পুত্রের মধ্যে চলছিল।

    কিন্তু তার মনে হয় বাবাই শেষ পর্যন্ত জিতে গেছেন। এই যে সে কিছুকাল আগে স্কুলের কাজে ইস্তফাপত্র দিল, তারও মূলে বাবা। আসলে তার অহংকার, সততার অহংকার, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবা কেন যে বললেন, না, কিছু না কিছু মানুষকে অসাধু হতেই হয়। এবং মানুষ এই অসাধু হবার প্রবৃত্তি থেকে রেহাই পায় না।

    এসব কারণেই বাবার যৌবনকাল সম্পর্কে সে উদাসীন থাকতে পারত না। বাবার সঙ্গে যখন মুখোমুখি হবার বয়স, তখন বাবার ঠিক যৌবনকাল ছিল না। খুব প্রৌঢ়ও নন। বাবার ঠিক যৌবনের কোনও আচরণেরই সে সাক্ষী থাকে নি। থাকলেও মানুষের সেই কূট রহস্য বোঝার বয়স তার হয়নি। তা না হলে বুঝতে পারত কোনও প্রলোভনে পড়ে গেছিলেন কিনা তিনি। হঠকারী এমন কি কিছু ঘটনা নেই, যা মানুষের বেঁচে থাকার পক্ষে অতীব প্রয়োজনীয়—মানুষ কখনও না কখনও হঠকারী কিছু করেই থাকে—সব বাবাদের জীবনেই এটা ঘটে থাকে এবং সব বাবারাই পরে সাধুপুরুষ সেজে যান। সে এ নিয়ে মাঝে মাঝে মার সঙ্গে কথা বলবে ভেবেছে। কিন্তু সেটা এখনও হয়ে ওঠে নি। এমনিতেই মা, বাবার ওপর খড়্গহস্ত—একরোখা রক্ষাকালীর মত সব সময় জিভ ব্যাদান করে আছে। কেন এটা হয় বুঝতে পারে না। তার দিকে তাকিয়ে একদিন মা কেঁদেই ফেলেছিল, তোর বাবার সব সহ্য হয়—কিন্তু এমন নিস্পৃহ স্বভাবের মানুষকে কেউ সহ্য করতে পারে না। ঈশ্বর বিশ্বাসী মানুষ হওয়ায় বাবার কর্মক্ষমতায় যেন কোথায় ঘুণ ধরেছিল। এবং ঈশ্বর সম্পর্কিত চিন্তা, ভাবনায় যত মশগুল হতে জানতেন কাঠখড় কেরোসিনের ব্যাপারে তত তিনি অনাগ্রহী। কৈশোর থেকেই পিতাপুত্রের এজন্য লাঠালাঠি। সে যতবার খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াতে চেয়েছে বাবা ততবার হাত ধরে নিয়ে গেছেন ঘরে। বাবার যৌবনকালের কোন অসাধু আচরণের খবর পেলে সে অন্তত হাতটা ছাড়িয়ে নিতে পারত। কিন্তু বহু চেষ্টায়ও সে সেটা পারে নি। আর পারে নি বলেই এখনও পিতার কাছে নতজানু হতে তার ভাল লাগে।

    চিঠিটা খোলা পড়ে আছে। খুব জড়ানো লেখা। পড়তে পড়তে তার অভ্যাস হয়ে গেছে বলে কোনও কষ্ট হয় না, সে চিঠিটা ফের তুলে দেখল, বাবা লিখেছেন, তোমার কুষ্ঠী সুবলকে দেখিয়েছি। সে বলল, এখন তোমার গ্রহ সন্নিবেশ খুব ভাল নয়। সাবধানে থাকবে। পারো তো হাতে একটা গোমেদ নেবে। এ-সবে অবশ্য তোমার বিশ্বাস কম, তবু এটা করবে, না পার একটা লোহার আংটি পরবে। তাতেও যদি আপত্তি থাকে ওটা কোমরের তাগাতে বেঁধে রাখবে। এতে জানবে গ্রহের প্রকোপ কমবে। এঁরা শান্ত থাকলে জীবন শুভ হয়।

    তার কেন জানি মনে হল আসলে বাবা খুবই একা পড়ে গেছেন। মেজ জ্যাঠামশাই বড় জ্যাঠিমা ছোট কাকা সবাই আলাদা হয়ে গেছে। বড়দার কাছে মেজ জ্যাঠামশাই আছেন। অন্তত মেজ জ্যাঠামশাই বাবার কাছে থাকলে বোধ হয় এত ভীতু হয়ে পড়তেন না। সংসারে বড় বৃক্ষের একটা প্রয়োজন থাকে। এখন যেমন বাবা তার কাছে বড় বৃক্ষের মত তেমনি জ্যাঠামশাই বাবার কাছে ছিলেন। এদেশে এসে সব ছত্রাখান হয়ে গেল। বাবার ভরসা বলতে গৃহদেবতা। আর বালিশের নিচে কিছু ফুল বেলপাতা রয়েছে। শুকিয়ে কাঠ। তার ডাইরিতেও বাবা ফুল বেলপাতা গুঁজে রাখতে বলেছেন। সে এসব মানুক না মানুক তাকে সবই রাখতে হয়েছে।

    তারপর বাবার চিঠিতে, আছে বাড়ির সব খবর। ধলীর একটা বাঁটে কি হয়েছে—দুধ দোওয়ানো যাচ্ছে না। উত্তরের জমিতে বীজধান পুঁতে দেওয়া হয়েছে। প্রহ্লাদের স্ত্রীর অসুখ। সে ছুটি নিয়ে বাড়ি গেছে। দুটো বেড়ালের একটার কদিন থেকে খোঁজ নেই। হাসু-ভানু পড়াশোনা করছে না। কেবল মাছ ধরে না হয় ক্লাব-ঘর বানায় এমন সব অভিযোগ। মার শরীর ভাল যাচ্ছে না। অলকা ফিরে এসেছে। ঘরের চালে দুটো কুমড়ো ফলেছে, আমের কলম করেছেন কটা, প্রতি বছরই তিনি তাঁর গাছগুলোর কলম বানান এবং যজমানদের বাড়ি বাড়ি বিলিয়ে দেন। এই সব খবর লেখার পর পুনশ্চ দিয়ে লিখেছেন, এটা শ্রাবণ মাস, পারত সন্ধ্যের অন্ধকারে আকাশের দক্ষিণে যে তারামণ্ডল আছে তা দ্যাখো। এটির নাম বৃশ্চিক রাশি। গ্রহ-নক্ষত্রের সঙ্গে মানুষের যোগ অমোঘ। ওকে অবহেলা কর না। রাশিটির উত্তরে ঠিক মাঝ আকাশে সামান্য পশ্চিম ঘেঁষে আছে স্বাতী। তার উত্তরে সাতটি তারা নিয়ে সপ্তর্ষি আর ধ্রুবতারা নিয়ে শিশুমার। পশ্চিম দিকে তাকালে বড় একটা গ্রহ দেখতে পাবে। এটা শনিগ্রহ। ওটা আছে সিংহ রাশিতে। এই সব গ্রহলোক অবলোকনে তোমার শরীর ভাল থাকবে। মন প্রসন্ন হবে। অশুভ প্রভাব থেকেও রক্ষা পাবে—ইতি আং তোমার পিতৃদেব।

    অতীশ চিঠি দুটো ভাঁজ করে তোশকের নিচে ফেলে রাখল তারপর মাথার জানলা খুলে দিল। সারা রাজবাড়িটা নিঝুম। রাস্তায় আলো জ্বলছে। প্রাসাদের গাড়িবারান্দায় বলের মত আলোটা বাতাসে দুলছে। শ্রাবণী পূর্ণিমা আসছে। কোথাও মাইকে গান ভেসে আসছিল। বাবা তারকনাথের মাথায় জল দিতে যাবে, নতুন গামছা, সাদা প্যাণ্ট পরনে ছেলে-ছোকরারা মাইকে হল্লা জুড়ে দিয়েছে। বড় বিশ্রী এবং বিরক্তিকর—মানুষের তীর্থযাত্রার আগে এই উল্লাস কেমন তাকে পীড়িত করছিল। আর এ-সময়ই মনে হল জ্যোৎস্নায় প্রাসাদের ছাদে কোন নারী উর্ধ্বমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন গ্রহ-নক্ষত্র দেখছে। এত দূর থেকে স্পষ্ট নয়—তবু অমলার মত লম্বা কোন যুবতী, কোনও দূর গ্রহলোকে দৃষ্টি এবং স্থির—অতীশ ভাবল অমলাই হবে। এই প্রাসাদে আর কে আছে, রাণীমা এখানে নেই তিনি কাশীতে থাকেন। এক মাসে সে যা খবর জেনেছে তাতে করে সে জানে এই প্রাসাদে অমলা বাদে আর কোন যুবতী বিচরণ করে না। এই পরিবার সম্পর্কে নানা রকম রহস্যময়তা জড়িয়ে আছে। মানসদা এ বাড়ির প্রতিপক্ষ শুনে সে প্রথমে কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেছিল। কুম্ভবাবুই আজ খবরটা দিয়েছে। সে প্রশ্ন করতে পারত, তিনি একা কেন, তালাবন্ধ অবস্থায় থাকেন কেন? মাথার গোলমাল দেখা দেয় কেন? কিন্তু সে কোনও প্রশ্নই করে নি। কারণ কাবুলবাবু এ-সব পছন্দ নাও করতে পারে। বাড়ির কেচ্ছা কাহিনী কে সামনে বসে শুনতে ভালবাসে!

    এ-ছাড়া আরো যা খবর, তাতে সে অমলা সম্পর্কে কেমন আবেগ বোধ করছে। গুজব অমলা রাজেনদার ধর্মপত্নী না হয়েও এ-বাড়ির বউরাণী। রাজেনদার ধর্মপত্নী আত্মহত্যা করার পরই অমলা এ-বাড়িতে আসে। বাড়ির আনাচে কানাচে এমন খবর ছড়িয়ে আছে। একটু সতর্ক থাকলেই কানে আসে। খুব সাদামাটা একটা রেজিস্ট্রেশন, তারপর পার্টি এবং অমলা এ-বাড়ির বউরাণী। এ বাড়িতে অমলার পাঁচ বছর কেটে গেছে। অমলা এখনও নিঃসন্তান। অমলা এবং রাজেনদার ওপর কিছুটা বিরক্ত হয়েই রাণীমা প্রাসাদ ত্যাগ করেছেন! এখন রাণীমার মহলে কিছু দাসীবাঁদি থাকে। রাণীমা অমলাকে এ-বাড়ির বউরাণী স্বীকার করে নিতে পারেন নি। অমলাকে এ-বাড়িতে এনে বংশের ঐতিহ্যে রাজেন চিড় ধরিয়েছে। বড় অসুখী রাণীমা। রাজবংশের প্রতিপত্তি এভাবে একজন সাধারণ রমণীর কাছে বিকিয়ে যাওয়ায় তিনি রাজেনকে কুলাঙ্গার ভেবেছেন। এবং এই বিরোধ থেকেই তাঁর কাশীবাস।

    অতীশ কান পাতলে এ-সব উড়ো খবর শুনতে পায়। রাণীমার সহ্য হবে কেন! শুভাশুভ বলে কথা! কোন মন্ত্রপাঠ নেই, অগ্নিসাক্ষী নেই। বউরাণী করে ঘরে নিয়ে এলেই হল। কোথাকার কোন এক পরিবার তার কি ঐতিহ্য, তার বংশাবলী কি, কোন ঘরানার কিছুই বাছবিচার নেই! এ-বাড়ির বউরাণী হয়ে আসা কি চাট্টিখানি কথা। খানদানী বংশ দেখে বেছে বেছে এ-বাড়ির বউরাণী করা হয়েছে। আর তুই কিনা রূপ দেখে মজে গেলি। বংশের মুখে চুনকালি দিলি।

    অতীশ বুঝতে পারে না, এতে ব্যভিচারের কি আছে। তবু খটকা থেকে যায়, অতীশ বারান্দা থেকে এবার ঘরে চলে এল। এই নিয়ে সে এত ভাবছে কেন? অমলা তাকে আর ডাকে নি, কিছু বলেও নি আর। তবু তার মনে হয় এই তাড়াতাড়ি কোয়ার্টার পাওয়ার পেছনে অমলার হাত আছে। অমলা তাকে চিঠিতে কি লিখেছিল? সেই চিঠি, সেই কবেকার চিঠি, সে তখন ভাল করে বুঝতেও পারত না এ-সব। তারপরই কেমন একটা বিভ্রমে পড়ে যায়। চিঠিটা কমলা দিয়েছিল না অমলা। সেই শ্যাওলাধরা ঘরটায় অমলা নিরিবিলি জড়িয়ে ধরেছিল না কমলা। কত দূর অতীতের স্মৃতি। সে ঠিক বুঝতে পারছে না। কখনও মনে হয় কমলা, কখনও মনে হয় অমলা। মাথার ভেতরে তার সেই ঘণ্টা বাজছে। বিভ্রমে পড়ে গেলেই এই ঘণ্টা বাজতে শুরু করে। সে যতবার ভাবে এ-নিয়ে আর কিছু ভাববে না তত কেন জানি বার বার ঘড়ির দোলকের মত দুলতে থাকে, কমল না অমল। এদিকে এলে অমল, ওদিকে গেলে কমল। অমলের চুল নীল, না কমলের চুল নীল। কার চুল সোনালী ছিল? বড় ফ্রক পরা মেয়েটার, না ছোট ফ্রক পরা মেয়েটার? এত আভিজাত্য ছিল ওদের অথচ এ-বাড়িতে অমলা আসায় সবাই কেমন রুষ্ট।

    অতীশ আলো নিবিয়ে উপুড় হয়ে শুল। পাখা চালিয়ে সে শোয় না। অভ্যাস নেই বলে, দু-এক রাতে চালিয়ে সে বেশ কষ্ট পেয়েছে। সারা শরীরে কেমন হাড় মুড়মুড়ি ব্যথা হয় পাখার হাওয়ায়। কিন্তু ভ্যাপসা গরম। তাছাড়া মাথাটা গরম হয়ে গেছে। বাবার চিঠি, নবর শনিপূজা, রাস্তায় মাইকের হল্লা, প্রাসাদের ছাদে কোনও রমণীর ছবি তাকে কেমন কাতর করে রেখেছে। সে চোখ বুজে পড়ে থাকল। তার কিছুতেই ঘুম আসছে না। সে চোখ বুজে বলল, কমল তুমি আমার সঙ্গে তঞ্চকতা করেছ। তুমি কমল নও। তুমি অমল। তুমি ভেবেছ আমি সেই শ্যাওলাধরা ঘরটার কথা ভুলে গেছি। কমল আমি ভুলে যাইনি। তোমার মাথায় সোনালী চুল ছিল না কমল। কমলের মাথা ভর্তি ছিল নীলাভ রঙের চুল। তুমি আমার কাছে সতী সেজে থাকতে চাইছ। সতী কথাটা সে বারবার বিড়বিড় করেবকতে থাকল। প্রায় মন্ত্রোচ্চারণের মত।

  • এগার

    এগার

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    এগার

    এই পাগল কতকালের চেনা। গাছের নিচে বসে ফকিরচাঁদ হরিশের দিকে তাকিয়ে থাকল। বুড়ো অথর্ব ফকিরচাঁদকে হরিশ এই সেদিন সারা দিনমান জ্বালিয়েছে। কথা নেই বার্তা নেই ঊর্ধ্ববাহু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। ফকিরচাঁদ অভিশাপ দিয়েছে, হরিশ তোর মরণ ফুটপাথে। বেজন্মার বাচ্চা তুই, ভাবিস মরণ নাই। স্বার্থপর তুই –খাওয়া ছাড়া আর কিছু বুঝিস না। ঝুপড়িতে কে কোথায় কি লুকিয়ে রাখে তক্কে তক্কে থাকিস। পাগল সেজে বেশ কালাতিপাত করে গেলে হে। ঢ্যামনামি করে গেলে হে।

    হরিশ তেরিয়া হয়ে গেল। কুকথা বলছে ফকরা। সে দু ঠ্যাং-ফাঁক করে চিৎকার করে উঠল, ফকরা তোর মুখে চুনকালি পড়বে।

    পাশে হবু যুবতী চারু চিৎকার শুনে উঠে বসেছিল। এবং পিতামহের হাত ধরে ফুটপাথের অন্য প্রান্তে চলে গিয়েছিল। ওরা হরিশের ঝোলাঝুলির মধ্যে সতী বিবির ঝোলঝুলির মধ্যে পচা গন্ধ পাচ্ছিল কারণ এই ঝোলাঝুলি বরফ ঘরের মত। সবই দুর্দিনের জন্য সংগ্রহ করা এবং কত রকমের যে উচ্ছিষ্ট খাবার! পাগলিনী সতীবিবি পাশেই চিৎ হয়ে শুয়েছিল। মাংসের হাড় অনবরত চোষার জন্য গালের দু’ধারে ঘায়ের মত সাদা দাগ। শরীরে দীর্ঘ দিনের ময়লার পলেস্তারা মুখের অবয়বকে নষ্ট করে দিয়েছে। চেনা যাচ্ছিল না ওরা জন্মসূত্রে কোনো গ্রাম্য গৃহস্থের ঔরসজাত না অন্য কোনওভাবে অযথা কোনও অলৌকিক ঘটনার নিমিত্ত এই ফুটপাথ সংলগ্ন অসংখ্য ডাকবাক্সের মত পাতলা অস্থায়ী প্লাইউডের ঝুপড়িতে বসবাস করছে।

    পাশের বাড়িটা চারতলা এবং নিচে ফুটপাথের ওপর ছাদের মত গাড়িবারান্দা। সামনে হাসপাতাল এবং রাজবাড়ি। সদর দরজায় কোন এক গোপন চক্রান্তকারী এক হাত লম্বা গণ্ডারের ছবি ঝুলিয়ে রেখে গেছে। কেউ লক্ষ্যই করছে না দেউড়ির মাথায় বাঘ সিংহের পাশে ছবিটা লেপ্টে আছে। রাজবাড়ির ছাদের কার্নিসে কার্নিসে সব পরীদের মূর্তি। ওরা যেন বসনভূষণ আলগা করে বাতাসে উড়ে যেতে চাইছে। সময়ে অসময়ে বুড়ো ফকিরচাঁদ সেইসব বৈভবের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে! হাসপাতালের বাড়িটাও দীর্ঘদিন খালি পড়েছিল, শুধু কাক উড়ত ছাদে এবং পাঁচিলের পাশের পেয়ারা গাছটাতে এক জোড়া ঘুঘু পাখি আশ্রয় নিয়েছিল। ইদানীং চুনকাম হবার সময় মোষের মত একটা ইতর ছোকরা কিছু চুনগোলা জল ছাদ থেকে নালির ফুটোর মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। মোষটা চারুকেও চেটেপুটে রেখে গেছে। সেই থেকে গাছটায় পাখিরা আর বসবাস করে না। সময়ে উড়ে এসে বসে, সময়ে হাওয়া পেলে উড়ে চলে যায়। কেউ আর গাছটায় বাসা বানায় না। নিচে চারু মাঝে মাঝে ছায়া পেলে গামছা পেতে শুয়ে থাকে।

    আর এই বাড়িটার জন্যই ভোরের দিকে সূর্যের উত্তাপ ছাদের নিচে নামতে পারে না। অথবা লম্বা হয়ে যখন সূর্য হাসপাতালের মৃত মানুষের ঘর অতিক্রম করে পেয়ারা গাছটার মাথায় এসে নামে তখন ছাদের ছায়া পুরো ফকিরচাঁদকে রক্ষা করতে থাকে। এই জন্যে অভ্যাসের মত এই জায়গাটা বসবাসের পক্ষে ফকিরচাঁদের পক্ষে বড়ই উপযোগী। স্টেশন থেকে সে বেশিদূর হেঁটে যায়নি। কাছেই জায়গাটা পেয়ে গিয়ে ফকিরচাঁদ হাতের কাছে স্বর্গ পেয়ে গেছিল। বাসস্থান মিলে যাওয়ায় সে আর নিজেকে উদ্বাস্তু ভাবতে পারে না। প্রায় নিজের ফেলে আসা বাড়ি ঘরের মতই জায়গাটাকে সে ভালবেসেছে। কেবল উপদ্রব বলতে এই পাগলটা। যখন তখন সামনে এসে উর্ধ্ববাহু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পচা দুর্গন্ধে তখন টেকা যায় না।

    চারু পাশে নেই। কোথাও আহারের জন্য অন্ন সংস্থান করতে গেছে। একটা শতচ্ছিন্ন তালিমারা চাদর ফুটপাথে ছড়ানো। সে তাতে শুয়ে আছে। পাশে গোটা গোটা অক্ষরে লিখে রেখেছে জীবনের কিছু কথা। পথচারীরা যায়, দেখে–কেউ দয়াপরবশে দু-পাঁচ পয়সা ফেলে দিয়ে যায়। সকাল থেকে একটা পয়সাও পড়ে নি। ফলে ফকিরচাঁদ মানুষজনের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে।

    কি আর করে ফকিরচাঁদ। প্রচণ্ড দাবদাহ যাচ্ছে। অনাবৃষ্টি। একটা ছেঁড়া কাগজে সে ফসলহানির কথা পড়ে ভারি চিন্তান্বিত। সবার হলে, খেয়ে পরে বাঁচলে তবে তার বরাদ্দ! সবাই ভাল থাকলে, খেতে পেলে সে খেতে পাবে। কিন্তু অনাবৃষ্টিতে ফসলহানি হলে, তার চলবে কেন। কিছু তুকতাক মন্ত্রপাঠ সে জানে। সে বিশ্বাস করে, কোনও জাদুটোনা করতে পারলে আকাশ উপুড় হয়ে ঢল নামাবে। সে পানের দোকান থেকে চুনের টোফা চুরি করে এ জন্য কাল রাত থেকে নিজের খুপরিতে লুকিয়ে রেখেছে। রোদ উঠলেই সেটা নিয়ে সে যায়। হরিশ ব্যাটা ঠিক টের পেয়ে গেছে। ও বেটা বুঝি আরও বড় গুনিন। হিতে বিপরীত হতে পারে ভেবে টোফাটা রোদে রাখার সময় ভারি সতর্ক দেখে ফেললেই গেল। সে বাণ মেরে তার অভিসন্ধি উড়িয়ে দিতে পারে। ফকিরচাঁদ বড়ই অস্বস্তিতে আছে। মন দিয়ে বাবা দয়া করেন, পুত্র কন্যা সুখে থাকবে, মঙ্গল হবে আপনার, ঠিকঠাক বলতে পারছে না। বড়ই সমস্যা তার। চুনের টোফায় লোহা ডুবিয়ে তাতে দিলে বরুণদেবের কলিজা ফেটে যায়—ভয়ে বৃষ্টি নিয়ে আসে এমন বিশ্বাস ফকিরচাঁদের। কিন্তু তাতে দিলেই ঢ্যামনা হরিশ ঠিক টের পেয়ে পালটা তুকতাক করে ফেলতে পারে। বেটা মনুষ্যজাতির অপোগণ্ড। ভাল চায় না। রসাতলে সব গেলে সে হাহা করে হাসতে পারে। ফকিরচাঁদ মানুষের ভালর জন্য বৃষ্টি নামাচ্ছে জানতে পারলেই ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধিয়ে বসবে। সেদিন যেমন লাঠি নিয়ে পড়েছিল, আজ ফকিরচাঁদকে। পুলিশে জানাজানি হলে জেল হাজতবাস হতে পারে। না বলে না কয়ে টোফা চুরি অসাধু কাজ।

    সব কিছু রোদের উত্তাপে পুড়ে যাচ্ছে। বর্ষাকাল কে বলবে! গ্রীষ্মের মত পিচে কাদা ধরেছে। চটচট করছে। বাস ট্রাক গেলে চটর চটর শব্দ সে শুনতে পায়। কর্পোরেশনের গাড়ি রাস্তায় বালি ছিটিয়ে যাচ্ছে। তখন পাগলা হরিশ পিচগলা পথে, মাথায় দুপুরের রোদ, লাঠিতে পাখির পালক বাঁধা—বিজয় গর্বে হেঁটে যাচ্ছে। যত শহরটা দাবানলে পুড়ছে তত হরিশ উৎক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে।

    দুরে অদুরে সব ডাস্টবিনের জংশন এবং সেখানে হয়ত চারু পোড়া কয়লা, ছেঁড়া কাগজ, লোহার টুকরো খুঁজছে? ফকিরচাঁদের বিশ্বাস খুঁজতে খুঁজতে একদিন চারু ঠিক শহরের গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে যাবে। এই আশায় ফকিরচাঁদ এখনও বেঁচে আছে—না হলে সে কবেই মরে যেত। ফকিরচাঁদ এবার উঠে পড়ল। এক মগ চা এ-সময়টায় সে খায়। চেয়েচিন্তে কিছু পয়সা দিয়ে চা নিয়ে এসে বসতেই মনে হল ঢ্যামনা হরিশ এদিকটায় আসছে। বড় জ্বালা হয়েছে। কিছু মুখে দিতে পারে না। সে হামাগুড়ি দিয়ে খুপরির মধ্যে ঢুকে ঝাঁপ টেনে দিল আর তখনই মনে হল টোফাটা রোদের তাতে রয়েছে। ওটা হরিশ এক ফাঁকে তার ঝোলাঝুলিতে ঢুকিয়ে ফেলতে পারে। এতবড় একটা শত্রুপক্ষ তার—মোকাবেলা করতে পর্যন্ত ভয় পায়। সে চা খাবে না টোফা তুলবে। কোনটা আগে দরকার। আসলে শরিকী ঝগড়া। ফকিরচাঁদ ভাবে এলাকাটা তার, হরিশ ভাবে তার। এই নিয়ে উভয়ের মধ্যে কতদিন থেকে একটা অদৃশ্য যুদ্ধ চলছে শহরের মানুষেরা যদি টের পেত। তাদের কি, খায় দায়—আছে সুখে। গাড়ি বাড়ি করে আছে বেশ। ঝামেলা ঝঞ্ঝাট কিছুই পোহানোর দায় নেই। বুঝত, ঠ্যালা বুঝত, যদি হরিশের মত থাকত একটা বড়ই হিসেবী শত্রুপক্ষ।

    না হরিশ টেয় পায় নি। সে চা খাচ্ছে টের পায় নি। সে টোফা রোদে দিয়ে বসে আছে টের পায় নি। যাক নিশ্চিন্তি। পরম আরাম। হরিশ উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে যাচ্ছে। গির্জার ওদিকটায় চলে যাচ্ছে। পথ থেকে সে তার অমূল্য আসবাবপত্র কুড়িয়ে নিতে ভুলছে না। কোনটা কখন কি মহার্ঘ কাজে লেগে যাবে কে জানে।

    রাতের আহারের জন্য খড়কুটো অথবা পাতলা কাঠ সংগ্রহ করতে হয়। চারু সাঁজবেলায় গাছতলায় আগুন দেয়। হাঁড়িতে চাল দিয়ে কুমড়ো আলু কাটতে বসে। কোত্থেকে পচা মাছটাছও নিয়ে আসে চারু। খুবই সংসারী। চারু যে ঘরে যাবে, আলো হয়ে যাবে সে ঘর। বুড়ো ফকিরচাঁদ চোখ বুজে সুখের স্বপ্ন দেখে।

    বুড়ো ফরিকচাঁদ এবার পা দিয়ে নিজের হস্তাক্ষর মুছে দিল। পাঁচিল সংলগ্ন ওর ছোট প্লাইউডের সংসার। বসবাসের উপযোগেী নয়, শুধু তৈজসপত্র রাখার জন্য পাতলা প্লাসটিকের চাদর দিয়ে সব ঢাকা। ফকিরচাঁদ কি মনে করে আজ সব টেনে বের করতে থাকল—হাঁড়ি পাতিল, ছেঁড়া কাঁথা, ভাঙা জলের কুঁজো সবই চারুর সংগ্রহ করা—ডাস্টবিন থেকে। মেয়েটার সারাদিন ঘুরে ঘুরে ঐ এক সংগ্রহের বাতিক—ঠিক ঢ্যামনা হরিশের মত। এবং চারুই স্টেশন থেকে এই বাড়িসংলগ্ন পরিত্যক্ত গাড়িবারান্দা আবিষ্কার করে ফকিরচাঁদের হাত ধরে চলে এসেছিল এবং জায়গাটার দখল নিয়েছিল। দখল নিলেই হয় না, তাকে রক্ষা করতে হয়। এক বছরে পাঁচ সাতবার এই রাজ্যটার ওপর নানারকম আক্রমণ ঘটেছে। চারুর চোপার গুণে কেউ তিষ্ঠতে পারে নি। মেয়েটার চোপা ছিল বলেই এ-যাত্রা ফকিরচাঁদ বেঁচে গেল। পরজন্মে চারুর মতন একটা নাতিন যদি না মেলে জীবনে হেনস্থা আছে। সে-জন্য সে হরিশের মত চুরি-চামারি করতেও ভয় পায়। ভগবান বড়ই সতর্ক প্রহরী।

    ফকিরচাঁদ এ-সময় চারপাশটা দেখল। কত বড় শহর, কত লম্বা ট্রাম লাইন, কত মানুষজন, কেবল যাচ্ছে আর আসছে। শেষ নেই। সকাল থেকে মানুষের পেছনে কোন এক অদৃশ্য শক্তি তাড়া করে বেড়াচ্ছে। কাউকে নিস্তার দিচ্ছে না। তাড়া খেয়ে কেবল ছুটছে। দু’দণ্ড বিশ্রাম নেবে তারও সময় নেই। এইসব মানুষের জন্য ফকিরচাঁদের কষ্ট হয়। কে সেই কাকতাড়ুয়া যে মানুষকে স্বস্তি দিচ্ছে না। মানুষজন, বাস, ট্রাম, ঝোলাঝুলি দেখতে দেখতে এ-সব মনে হয় ফকিরচাঁদের। তার হাই ওঠে। মগের চা কিছু খেয়ে কিছুটা চারুর জন্য রেখে দিয়েছে। একটু দূরেই হরিশের আস্তানা। দুজনের একজনও কাছে-ভিতে নেই। দু’জনেই সারা রাস্তায় ঢ্যামনামির জন্য বের হয়ে গেছে। দু’জনই কোমর দুলিয়ে পাগলামি করে হোটেলের উচ্ছিষ্ট খাবার নিয়ে আসতে গেছে।

    আর তখনই গাড়ি থেকে একটা সুন্দর মত বউ নেমে বলল, পাগলা বাবা কাঁহা?

    ফকিরচাঁদ বউটাকে চেনে না। কে জানে কি বিশ্বাস, বউটা এক ঝুড়ি ফলমূল হরিশের আস্তানায় রেখে দাঁড়িয়ে থাকল। সঙ্গের চাপরাশিটাকে বলল, দেখত পাগলা বাবা কাঁহা?

    ফকিরচাঁদ বলল, দে যান আমাদের, হরিশ এলে দেব। হরিশ কবে থেকে পাগলা বাবা হল। নধরকান্তি বৌটির নাকে নথ দুলছে। ফকিরচাঁদকে হয়ত ফেরেববাজ ভাবছে। বৌটি কিছু বলল না। চাপরাশি এসে বলল, গির্জার ওদিকটায় হাঁটু মুড়ে বসে আছে। এবার গাড়ি থেকে এক স্থূলকায় বাবু নামলেন, তিনি হনহন করে হাঁটতে পারেন না, বৌটি হনহন করে হাঁটতে থাকল। তারপর সেই পাগলা বাবার পায়ে গড় হতেই হরিশ বুঝল আরে সেই নারী, যারে সে মুতে দিয়ে বলেছিল খা, দেখবি তোর ভাল হবে। কে জানে কি হল, বৌটি সত্যি সামান্য কণিকামাত্র ধূলিকণার মত আঙুলে তুলে মুখে মাথায় দিয়েছিল। স্বামীর বাড়াবাড়ি তা নিয়ে সে গেছিল ঠনঠনে। সেখানে পূজা দিয়ে ফেরার সময় পাগলা বাবার দেখা। পাগলা বাবা তার বিড়ম্বনা টের পেয়ে সাধু বাক্য উচ্চারণ করেছে। রমণী সবই সেই বিধাতার নির্বন্ধ ভেবে মুখে দিয়ে বাড়ি ফিরেছিল এবং অলৌকিক কিছু প্রায় তার স্বামীর শরীরে ঘটে গিয়েছিল। মানুষটা চোখ মেলে তাকিয়েছে। সেই থেকেই হরিশের খোঁজ। খুঁজে খুঁজে পেয়েও গেল একদিন। পাগলা বাবার জন্য হাঁড়ি পাতিল ভর্তি দই সন্দেশ ফলমূল নিয়ে এসেছে। হরিশ দেখেই হাঁ হাঁ করে তেড়ে গেল। পাগলামি আরও বাড়িয়ে ফেলল। রাস্তায় অপোগড় সব হাজির। দু’হাতে সে সব বিলিয়ে দিয়ে খালি পাতিল মাথায় টুপির মত পরে দৌড়াতে থাকল। তারপর গলি গুঁজিতে ঢুকে উঁকি দিতে থাকল, বাবু মানুষের বৌ আর খুঁজছে কিনা। উঁকি দিয়ে দেখতে থাকল।

    অতীশ অফিস যাবার মুখেই দেখল, দেবদারু গাছটার নিচে পরিচিত কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে। আর এ যে শেঠজী! সিট মেটালের এক নম্বর খদ্দের। এত বড় মানুষটা এখানে! মাঝে খুব অসুখ শুনেছিল। কুম্ভবাবু খুব যাতায়াত করত তখন। তাকেও বলেছিল চলুন। সময়ে অসময়ে কোম্পানির টাকা যোগায়। লোকটার ভাল মন্দের সঙ্গে কোম্পানির নসিব জড়িয়ে আছে। অতীশ যাব যাব করেও যেতে পারে নি। সেই মানুষ দেবদারু গাছের নিচে! সে ট্রাম রাস্তা পার হতেই শেঠজী তাকে দেখে বলল, বাবুজী আপ!

    —আপনি!

    —আর বলবেন না। বহুৎ মুসিবৎ মে গির গিয়া। পাগলা বাবা থুথু ফিক দিয়া। কাঁহা চলে গেল!

    রাস্তায় লোকজন জমা হয়ে গেছে। কারণ এই রাস্তার পাগলটাকে খাওয়াবার জন্য খানদানী ঘরের একজন বৌ ছুটাছুটি করছে। পাগলটা সব রাস্তার অপোগণ্ডদের দিয়ে-থুয়ে খালি পাতিল মাথায় দিয়ে কোন দিকে চলে গেল! অতীশ শেঠজীর এই পাগলপ্রীতিতে কিছুটা অবাক হয়ে গেল। দু’নম্বরী কাজ করে মানুষটা বছর দশেকের মধ্যে কলকাতায় মোকাম, দেশে মোকাম, ইস্কুল, মন্দির বানিয়ে ফেলেছে। এবং সিট মেটাল না থাকলে এটা সে পারত না। কোম্পানি সুযোগ পেলে দু’নম্বরী মাল তৈরি করে। অতীশ গতকাল এটা টের পেয়েই মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছে। তেল পাউডার, ওষুধের সব ডিব্বা বানিয়ে দিতে হয়। ছাপ নম্বর হুবহু এক থাকে। আজ এ-নিয়ে সে রাজেনদার সঙ্গে কথা বলেছে। রাজেনদা খুব দূর থকে দেখার মত দার্শনিক গলায় জবাব দিয়েছেন, চারপাশটা ভাল করে দেখ। বোঝ সব। আরও কিছুদিন লাগবে দেখছি তোমার।

    অতীশ বলেছিল, এতে জেল হাজতের ভয় আছে। ধরা পড়লে।

    বিশ বছর ধরে এই হচ্ছে। কেউ ধরা পড়ছে বলে ত জানি না! তুমি পড়বে কেন? সব দিকে নজর রাখ, ঠিকঠাক রাখ, তবে দেখবে কেউ কিছু করতে পারবে না। তারপরই বাঙালীর অধঃপতন নিয়ে কিছু ভাষ্য—এর জন্যই জাতটা গেল। বাইরের লোক এসে দু’ দিনেই টু পাইস করে ফেলছে। দেশের লোক, নিজের শহর, রামমোহন, বিদ্যাসাগর মশাই এ শহরে বড় হয়েছেন, তোমরা তার উত্তরাধিকার, বাইরের লোক সব লুটেপুটে নিচ্ছে—আটকাতে পারছ না।

    শেঠজী কানে কানে বলল, ই রাজবাড়ি হ্যায়। কেতনা বড়া মোকাম। রাজাবাবু কো একদিন দেখিয়ে দেবেন।

    অতীশ বলল, দেব।

    —বহুত পুণ্যবান আদমী। দর্শনে মুক্তি ভি হয়।

    অতীশ বলল, হয়।

    অতীশ তারপর বলল, রাস্তায় লোক জমে যাচ্ছে। গিন্নিকে নিয়ে বাড়ি যান।

    —হামার বাত ও শুনবে! পাগলা বাবা পাগলা বাবা করে ওয়ার ত জান গেল!

    এই হচ্চে মানুষ, অতীশের এমনই মনে হল। নিজের জন্য সব পাপ কাজ করছে—পুণ্য কাজও করছে। সেও ভাল নেই। একটা চক্রান্তের মধ্যে সে নিজেও জড়িয়ে পড়ছে। এখান থেকে সে নিস্তারও পাবে না। এক জটিল আবর্তে সে পড়ে গেছে। আর এ-সময় কেন জানি নির্মলার ওপর সে খেপে গেল। তারপর ভাবল যেভাবেই হোক বাজারে দু’নম্বরী মাল সাপ্লাই সে বন্ধ করবে। আর তখনই দেখা গেল শহরের ওপর দিয়ে কেউ দুই অতিকায় বাহু বাড়িয়ে দিয়েছে আকাশে। সে তখনই শেঠজীকে বলল, চলি।

    শেঠজী বলল, নেহি নেহি। হামার সাথে যানে হোগা। এ ভজনলাল তেরা ভাবিকো বোলা। বাবুজী ইধর হায়।

    কিন্তু ভাবিজীর এখন মাথা খারাপ। পাগলা বাবা খেপে গিয়ে কিছু খেল না। সে পাগলা বাবাকে খাওয়াতে পারল না। নসিবে কি আছে কে জানে। কোথায় আবার কোন অপদেবতা এসে ভর করবে সংসারে। সেই ভয়ে ভাবিজীর চোখ মুখ উদ্বিগ্ন। কাছে এলে শেঠজী তার বহুকে বলল, বাবুজী দেবতা আছেন।

    অতীশ কোন উত্তর করল না। হাত তুলে নমস্কার করল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে এই আলাপ তার খুব ভাল লাগছিল না। চারপাশের মানুষজন লক্ষ্য করছে। সে কিছুটা অস্বস্তিবোধ করছিল। গাড়ি এলে উঠে বসল। শেঠজী তাকে সিট মেটালে নামিয়ে দিয়ে চলে যাবে।

    শেঠজীর বহু সারাটাক্ষণ ঘোমটা টেনে বসে থাকল। বয়স শেঠজীর তুলনায় খুব কম। চোখ দুটো ছোট, বেঁটেখাট, ঠোঁট ভারি, ভরাট যৌবন। এই যুবতী এত ধর্মপরায়ণ, ভীরু ভাবতে কেমন অতীশের কষ্ট হচ্ছিল। মানুষ সম্পর্কে অতীশের এমনিতেই নালিশ কম, সে মানুষকে খুব ছোট ভাবতে পারে না, শেঠজী আসলে যে একজন প্রতারক সেটা সে সোজাসুজি ভাবতে পারছে না। বরং মনে হল, সে নিজেই প্রতারক। সে কোম্পানির ম্যানেজার। দু’নম্বর মাল তার কোম্পানি সাপ্লাই দিয়ে যাচ্ছে। সে সব বন্ধ করে দিতে পারে–ফলে সে শুধু নিজেকেই বিপন্ন করে তুলবে না, যে মানুষগুলি এই কনসার্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের জীবনও বিপন্ন করে তুলবে। কাল সারারাত সে ঘুমাতে পারে নি, মাথা গরম। মাথা গরম হলেই কেমন এক অন্ধকার গ্রহনক্ষত্রের দেশ তাকে গ্রাস করে। তার এও মনে হল সহসা সে কিছু করতে পারে না। তাকে ধীরে ধীরে এগোতে হবে। তার প্রথম কাজ কস্টিং। সে কালি, টিন, বার্নিশ ম্যানুফ্যাকচারিং কস্ট এবং মিসলেনিয়াস খরচাসহ প্রতিটি আইটেমের একটি তালিকা তৈরি করেছে। সারারাত জেগে এই কাজটা করেছে। তাকে গোপনে এ-সব করতে হচ্ছে। কারণ কুম্ভবাবুর পছন্দ না, এক্ষুনি মালের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হোক। যে কটা কাস্টমার আছে তবে তারাও ভাগবে বলে কুম্ভবাবু অতীশকে ভয় দেখিয়েছে।

    অফিসে ঢুকে অন্য দিন, একবার সব শেডগুলি ঘুরে দেখে। কোথায় কি কাজ হচ্ছে, ছাপাখানায় কি ছাপা হচ্ছে, একবার ঘুরে না দেখলে সে স্বস্তি পায় না। কিন্তু আজ কেন জানি কোনও শেডে ঢুকতে ইচ্ছে হল না। সুইংডোর ঠেলে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে গেল। এক গ্লাস জল রাখা থাকে। সে বসে জলটা খেল। টেবিলের ওপর কিছু ফাইল, বিল ভাউচার। ক্যাস বুক। বাইরে সুধীর বসে আছে। ভারি ভীতু মুখ ছেলেটার। সব সময় কেমন মুখ গোমড়া করে রাখে। আজ এক মাস হয়ে গেল, অতীশ কখনও ওকে হাসতে দেখে নি। কুম্ভবাবু সব সময় ধমকের ওপর রাখে। কাজে ত্রুটি বের করে পেছনে লাগে। এখানে আসার পর অতীশের কেন জানি ছেলেটির প্রতি একটা মায়া জন্মে গেছে। একবার চুপি চুপি ডেকে বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, অত ভয় পাস কেন। কিসের ভয়। কত মাইনে পাস যে ভয় পাবি! আমার মত বেশি মাইনে পেলে না হয় চাকরির ভয় ছিল। তাছাড়া বিয়ে থা করিস নি। ছেলেপুলে হয় নি। এখনই ত সময় মাথা উঁচু করে চলার। কিন্তু সে বলতে পারে নি। এ রকমেরই স্বভাব তার। মনে মনে অষ্টপ্রহর সব অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, খোলাখুলি সে প্রতিবাদ করতে পারে না।

    এখানে এসে সে আজ পর্যন্ত একবার ও নির্মলার বাপের বাড়ির খোঁজ নেয় নি। নির্মলা প্রতিটি চিঠিতেই লিখেছে তোমার ফোন নম্বর জানাচ্ছ না কেন! দাদাকে লিখেছি, তুমি কলকাতায় কাজ পেয়েছ। দাদা তোমার ওখানে ঘুরেও এসেছে। পায় নি। তোমার একবার যাওয়া দরকার ছিল। বাবা মাই বা কি ভাববেন। আসলে সে এই কাজটা নেবার পর কেমন হতাশও হয়ে পড়েছে। এই গোল্ড মাইনে এসে বুঝেছে, স্বর্ণ অন্বেষণে এখানে কুম্ভবাবুর মত লোকেরই লেগে থাকা সম্ভব। যত দিন যাচ্ছে, তত জটিলতা উপলব্ধি করতে পারছে। রবিবার সন্ধ্যার গাড়িতে নির্মলাও চলে আসছে। সে মুখ ফুটে বলতেই পারবে না, নির্মলা আমি এখন একজন প্রতারকের ভূমিকা পালন করছি। টুটুল মিণ্টুর দিকেও সে আর সহজে যেন চোখ তুলে তাকাতে পারবে না। শিশুরা বোধহয় সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারে সব। তারাই প্রথম বুঝতে পারবে তাদের বাবা ভাল নেই। ঠিকঠাক বেঁচে নেই। এখানে আসার পর একটা লাইন সে লিখতে পারে নি। দু’ একজন লেখক বন্ধুকে সে ফোন করেছিল। তারা তার সঙ্গে কফি হাউসে দেখা করেছে। কেউ কেউ অফিসেও এসেছিল। এই বয়সে এমন একটা ভাল কাজ পাওয়ায় কেউ কেউ ঈর্ষা বোধও করেছে। অথচ সে তাদেরও বলতে পারে নি, আমি ভাল নেই। আমি ঠিকঠাক বেঁচে নেই। আর্চির প্রেতাত্মা আমাকে আবার গোলমালে ফেলে দিল।

    সুইং ডোর ঠেলে কেউ ঢুকছে। চোখ তুলে দেখলে বুড়ো দারোয়ান রঘুবীর। ফতুয়া গায়ে হাঁটুর ওপর কাপড়। সে ঢুকে এক বাণ্ডিল টাকা রেখে বলল, মন্টু সাহা দিয়ে গেছে।

    —কত টাকা?

    —আঠারশ টাকা। আরও দশ হাজার সুরমা নেবে বলেছে। বাজার ফিরতি দেখা করে যাবে। অতীশ টাকাটা গুণে ক্যাশবাকসে রেখে দিল। ক্যাশবুক খুলে টাকাটা মন্টু সাহার নামে জমা করে ভাবল একবার বিলগুলি চেক করে দেখে। তখনই সুধীর মুখ বাড়িয়ে বলল, দুজন লোক দেখা করতে চায়।

    —ডাক!

    দুজন দু’রকমের মানুষ। দু’রকম মানুষ ঘরে ঢুকে দুটো চেয়ারে বসতে বসতে বলল, রাম রামজী। এই ধরনের অভিবাদনে সে আজকাল অভ্যস্ত হয়ে গেছে। মধ্যবয়সী মানুষের একজনের হাতে ছটা আংটি। মুখে খৈনি। ধুতি পাঞ্জাবি পরনে। পায়ে বুট জুতো। অন্য জনের মুখে কেমন শয়তানের ছাপ। কথা বলতে বলতে একটা কনটেনার পকেট থেকে বের করে বলল, এ-রকম মাল চাই।

    অতীশ দেখল একটা চালু ওযুধের কৌটা।

    সে বলল, হবে।

    —ঠিক এরকম হবে না বাবুজী।

    —কি রকম হবে?

    —একটা হসসু বাদ। লাল মার্জিন থাকবে না।

    অতীশ বুঝল সেই নকল মালের পার্টি। মেজাজটা কেমন বিগড়ে গেল, বলল হবে না।

    —বাবুজী ভাল দাম দেব।

    —হবে না। এখানে দু-নম্বরী মাল হয় না।

    এ-কথা শুনে লোকটা মুচকি হাসল। বলল, বিশোয়াস কা বারে মে কৈ হুজ্জুতি নেই হোগা।

    অতীশের মনে হল লোক দুটো শয়তানের প্রতিভূ। সব খবরাখবর নিয়ে এসেছে। এদের পাশাপাশি আরও একজন অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে শীতল চোখে তাকিয়ে আছে। যেন বলছে, ছোটবাবু আমি এদের চেয়ে খারাপ ছিলাম না। জাহাজে তুমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলে, মুখে বালিশ চাপা দিয়ে খুন করেছ। সবার অলক্ষ্যে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলে। এখন কি করবে?

    অতীশ মুখ নিচু করে বসে থাকল।

    তখনই ঢুকল কুম্ভবাবু। লোক দুটোকে দেখেই অবাক হয়ে গেছে যেন। আরে আপনারা। কি ব্যাপার!

    —মাল চাই। লিকিন বাবুজী বলছেন হোবে না।

    কি মাল যেন কুম্ভবাবু কিছুই জানে না।

    ওরা টেবিল থেকে কৌটাটা তুলে নিয়ে দেখাল।

    কুম্ভবাবু অতীশের দিকে তাকিয়ে বলল, আমাদের ডাইস আছে। হবে না কেন?

    অতীশের কেন জানি এ সময় চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছা হল। বলতে ইচ্ছা হল, দু-নম্বরী কারবার সব বন্ধ করে দেব ভাবছি। নতুন কোনও আর অর্ডার নেব না। কিন্তু বলতে পারল না। শুধু বলল, ওরা দু-নম্বরী মাল চায়।

    কুম্ভ বলল, তাহলে ত মুশকিল। আমরা করি না সে স্পষ্ট করে বলতে পারল না। তাকে আরও চতুর হতে হবে। সে সোজাসুজি ওদের সামনে বলতে পারল না, হবে। সেই যে পাঠিয়েছে, কপিলদেব তাকে ধরেই যে এই দুজন লোককে পাঠিয়েছে তাও বুঝতে দিল না। শুধু বলল, আসুন। আমার সঙ্গে আসুন।

    ওরা বের হয়ে গেলে অতীশ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এত গরম লাগছে কেন। এই শহরে গরম কি খুব একটা বেশি। ফুল স্পিডে পাখা চালিয়েও সে রেহাই পায় না। এবং তখনই আবার কুম্ভবাবু হাজির। বলল, ভাল রেট দেবে। দেড় গুণ রেট। মোটা অ্যাডভান্স দেবে। কাল মাইনে। টাকা নেই। বুঝতেই পারছেন সাধা লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা ঠিক হবে না।

    অতীশ বলল, মন্টু সাহা কিছু টাকা দিয়ে গেছে। কপিলদেবের লোক আসার কথা। আর ব্যাঙ্কে যা আছে হয়ে যাবে।

    —এরাই কপিলদেবের লোক।

    সে আর কোনও কথা বলল না। কিছু জেনুইন কাস্টমার আছে। সে তাদের একজনকে ফোনে ধরার চেষ্টা করল। বৈদ্যনাথ সাধনার কিছু মাল কোম্পানি সাপ্লাই করে থাকে। যোগেশবাবুকে ধরতে পারলে কাজ হয়। এবং ফোনে পেয়েও গেল। সে তার অসুবিধার কথা বললে, তিনি তার রেট আরও কমাবার সুযোগ নিলেন। অতীশ হতাশ গলায় বলল, তাই হবে।

    কুম্ভবাবু আজ কিছুতেই অতীশকে দিয়ে অর্ডার বুক করাতে পারল না। লোকসানের কোম্পানিকে আরও লোকসানে ফেলে দিচ্ছে। কুম্ভ ভীষণ অপমানিত বোধ করল। পার্টিদের কাছে তার প্রভাব অতীশের চেয়ে বেশি। সততার ঢ্যামনামি কুম্ভ একদম পছন্দ করে না। সে বিকেলেই এই নিয়ে বেশ বড় রকমের একটা গোলযোগ বাধিয়ে অফিস ফেরত সোজা সনৎবাবুর কাছে চলে এল।

    সনবাবু দোতলার বারান্দায় একটা ইজিচেয়ারে আরাম করছিলেন। পাশে বড় ছেলের নাতনি। সামনে গ্যারেজ, পাশে লম্বা দুটো তালগাছ। একটা পাখি ডানা মেলে এসে বসল। নাতনি দুধ খাচ্ছে না। ছোটাছুটি করছে, দাপাদাপি করছে। তিনি পাজামা পাঞ্জাবি পরে সন্ধ্যের সময় সমুদ্রের হাওয়া খাওয়ার মত একটা টেবিলে পা তুলে বসে আছেন। খুব বড় ঝড় গেল কদিন। বস্তিগুলি হাত ছাড়া হতে যাচ্ছিল। প্রাইভেট লিমিটেড করে দিয়ে আপাতত ঠেকা দেওয়া গেছে, বছরকার আয় লাখ টাকার ওপর রক্ষা পেয়ে যাওয়ায় কুমারবাহাদুর এ মাস থেকে আরও দুটো ইনক্রিমেণ্ট দিয়েছেন। এখন রিটায়ার করার বয়সে যত তিনি নিজেকে কাজের মানুষ প্রতিপন্ন করবেন, তত বাড়তি সুযোগ। সরকারি কাজে যে যাননি, যোগ্যতা থাকতেও এই রাজবাড়িতে এসে যে প্রথমেই অফিসার পদে চাকরি পেয়ে গেছিলেন, সেটা আজ মনে হচ্ছে বড়ই সৌভাগ্য। পাশে কিছু আঙুর আপেল এবং বেদানার কোয়া। এক গ্লাস দুধ। কুটকুট করে খাচ্ছেন। রোগা কালো ছিমছাম চেহারা। মাথা ভর্তি সাদা চুল। খুব প্রাজ্ঞ মানুষের মত মুখের অবয়ব। টেবিলের একপাশে একটা ইংরেজি দৈনিক। ওপরে ওয়ালেস স্টিভেনসের কবিতা সংগ্রহ। এটা পড়বেন বলে এনেছেন। নানারকম আইনের মার-প্যাঁচ মাথায় ঘোরার জন্য তিনি এতদিন বইটি উল্টেও দেখেন নি। কুমারবাহাদুরের প্রিয় কবি। কুমারবাহাদুরই পড়তে দিয়েছেন। এবং এটা পড়ে নতুন কিছু আরও আবিষ্কার করতে পারলে বিদ্যের দৌড়ে এই বয়সেও কম যান না তিনি প্রমাণ করতে পারবেন। সুতরাং আর দশটা রাজকীয় কাজের সঙ্গে সম্প্রতি কবিতা পাঠও যোগ হয়েছে।

    সিঁড়ি ধরে কেউ উঠছে। পুত্রবধূ ফিরতে পারে। কলেজ করে বাপের বাড়ি হয়ে আসার কথা। শঙ্কু ফিরতে পারে অফিস ছুটির পর। কিছু টুকিটাকি বাজার সেরে ফেরার কথা। কিন্তু পায়ের আওয়াজে তিনি ঠিক ধরতে পারছেন না কে উঠে আসছে। খুব সতর্ক পা ফেলে কেউ উঠে আসছে। তারপরই বুঝতে পারলেন, কুম্ভ। এ বাড়িতে সিঁড়ি ভাঙার সময় কুম্ভই একমাত্র টেনে টেনে পা তুলে হেঁটে আসে। এ-বাড়িতে কে কি খায়, কার দু পয়সা ফাউ রোজগার আছে তলেতলে সবারই জানার আগ্রহ। এবং তিনি একজন সৎ এবং অভিজ্ঞ মানুষ হিসাবে সম্মানীয় ব্যক্তি—প্রায় কুমারবাহাদুরের পরই। তবু এত সব ভাল খাবার দেখলে কুম্ভর চোখ টাটাতে পারে। বাপকে বলতে পারে–স্যারেরও বেশ দু-পয়সা আলগা তাহলে হচ্ছে। তিনি তৎক্ষণাৎ খাবারের প্লেট ঘরে পাঠিয়ে কবিতার বই খুলে গম্ভীর মুখে বসে থাকলেন। কারণ এই মুখোশটাকে রাজবাড়ির সবাই বড় ভয় পায়। এটি তাঁর প্রিয় মুখোশ।

    ভিতরে ঢুকলে, সনৎবাবু বই থেকে মুখ না তুলেই বললেন, বোসো। কুম্ভ বসল, কিছু বলল না। স্যার বইয়ে নিমগ্ন। বড়ই অসময়ে এসে গেছে। কিন্তু এখন উঠে চলে যেতেও পারে না। এই লোকটার হাতে অনেক ক্ষমতা। এর পরামর্শ ছাড়া সিট মেটাল সম্পর্কে কুমারবাহাদুর কোন সিদ্ধান্ত নেন না। তাছাড়া সে যে চোরছ্যাঁচোড় জাতের লোক স্যার তা আন্দাজ করে ফেলেছে। দু-একবার হাতেনাতে ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে গেছে। এজন্য কুম্ভ খুব সরল বিনয়ী এবং বাধ্য ছোকরার মত এখন চেয়ে আছে কখন মুখ তুলে একটু কথা বলবেন।

    সনৎবাবু এবার বইয়ের পাতায় একটা বাসের টিকিট গুঁজে দিলেন। তারপর বই বন্ধ করে বললেন, কিছু বলবে?

    —স্যার কোম্পানি লাটে উঠলে আমায় দোষ দেবেন না। কাস্টমাররা সব খেপে যাচ্ছে। অতীশবাবু অর্ডার নিচ্ছেন না। ভাল ভাল অর্ডার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এই বলে সহসা চুপ করে গেল কুম্ভ। সনৎবাবু বললেন, খুলে বল সব। এতে কি আমি বুঝব। কুম্ভর ভেতরে যে অপমানের দাপাদাপিটা চলছিল সেটা কিছুটা প্রশমিত হচ্ছে। সে বুঝতে পারছিল—তার কথাবার্তা এখন অনেক স্পষ্ট। এবং সনৎবাবু সব শুনে কিছুক্ষণ দু-আঙুলে চোখ টিপে ধরলেন। গভীর বিষয়ে চিন্তা করলে এটা তাঁর হয়। কুম্ভ মনে মনে আর কিভাবে লাগানো ভাঙানো যায়, আর কি কুটকৌশলের সাহায্য নেওয়া যায়, কারণ অতীশবাবুর এই শুচিবাই কোম্পানির ভরাডুবির কারণ হতে পারে, যেভাবেই হোক স্যারকে বোঝানো দরকার।

    সনৎবাবু উঠে দাঁড়ালেন। রেলিং-এ ঝুঁকে দেখলেন কিছু। বৌমা এখনও এল না। শঙ্কুরও ফেরার সময় হয়ে গেছে। গিন্নি শনিপূজা দিতে গেছে কোথায়। বাড়িতে চাকর নাতনি এবং নিজে। সমস্যা একের পর এক। তিনি বললেন, কাল অফিসে এস। কুমারবাহাদুরের সঙ্গে কথা বলে রাখব। আমার মনে হয় সবার কাছেই বিষয়টা পরিষ্কার হওয়া দরকার।

    কুম্ভ বুঝল জল ঘোলা করে তুলতে পেরেছে। এবং পরদিনই সে সেটা টের পেল। সকাল নটায় দুজনেরই ডাক পড়েছে। বারান্দায় অতীশবাবু একটা হলুদ কলার দেয়া গেঞ্জি গায়ে বসে। সে কাছে গিয়ে বলল, দাদা কি ব্যাপার আমাদের সহসা এত্তেলা!

    অতীশ দেখল কুম্ভ ভারি প্রসন্ন আজ। তলে তলে যে ঠাণ্ডা যুদ্ধটা চলছে অতীশ আজ টের পেতে দিল না। আসলে নিজেও ধূর্ত হয়ে উঠছে। ধূর্ত না হলে সে হেসে বলতে পারত না, বোধহয় রাজবাড়িতে নেমন্তন্ন। আমাদের খেতে ডেকেছেন। তারপরই অতীশ সুরেনকে ডেকে বলল, কি হে পাত পাড়বে কখন?

    নধরবাবু জানকীবাবু ভিতরে আছেন। বের হলেই স্যার পাত পড়বে।

    একটু পরে সনৎবাবুই মুখ বার করে বললেন, তোমরা এস।

    সনৎবাবু আগে, মাঝে কুম্ভবাবু সে পেছনে। দরজার গোড়ায় জুতো খোলার পাট। সে তা করে না। সে পেছনে দাঁড়িয়ে দেখছে। প্রথম দিন থেকেই সে এই দাস মনোভাব থেকে আত্মরক্ষা করে আসছে। বাড়ির আমলারা কেউ এটা পছন্দ করছে না—কিন্তু রাজার মর্জি বোঝা ভার। এই আমলারা ভেতরে ঢুকে সামনের চেয়ারে বসারও সাহস পায় না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ সেরে আসে। সনৎবাবু একমাত্র বসতে পারেন। তিনি ভিতরে ঢুকে প্রথম গড় হলেন। কুম্ভ আরও বেশি মাথা নুয়ে গড় হল। খালি পা দুজনের পেছনে অতীশ তামাশা দেখার মত দাঁড়িয়ে। রাজেনদা তাকে দেখেই বললেন, আরে এস এস। কি খবর, সদলবলে দেখছি। সে পাশের চেয়ারটা দখল না করে মাঝখানেরটায় গিয়ে বসে পড়ল। সনৎবাবু পাশে বসলেন। কুম্ভ বসতে ইতস্তত করছিল। আশ্চর্য রাজেনদা কুম্ভকে বসতে বলছেন না। অতীশের নিজেরই গায়ে কেমন খোঁচা লাগছে। সে বলল, বসুন না।

    রাজেনদা যেন বাধ্য হয়ে বললেন, বোস বোস।

    কুম্ভ বড়ই বিনয়ী এখন। যেন জীবনে কোনও কুবাক্য শোনেনি। যেন পৃথিবীটা সাধুজনে ভরে আছে।

    অতিকায় টেবিলটার ওপাশটায় একজন রাজা মানুষের এত প্রভাব! ফুলকো লুচির মত টাক। জুলপি এবং গোঁফে চুলের খামতি ঢাকার চেষ্টা রাজেনদার। তিনি সনৎবাবুর মুখ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট শুনলেন। হুঁ হাঁ করছেন। কথার মাঝেই একবার অতীশকে বললেন, বৌমা কবে আসবে? তোমার বাবা-মা কেমন আছে। আরে তোমার ঐ গল্পটা নিয়ে এক ভদ্রলোক খুব তারিফ করলেন—এ রকমের কিছু কথাবার্তা। সাংঘাতিক বিচারালয়ে এমন হাল্কা মেজাজে কেউ সব অভিযোগ শুনতে পারে অতীশের কেমন অবিশ্বাস্য ঠেকছিল। এবং পরে রাজেনদা শুধু বললেন, অতীশ, এ শহরে লোকে খালি হাতে আসে। ফুটপাথে থাকে। তুমি খালি হাতে আসনি! এটা তোমার জীবনের পক্ষে বড় সৌভাগ্য ভাবতে পার।

    অতীশ বুঝতে পারছে রাজেনদা তাকে তিরস্কার করছেন। তার তিরস্কারের ভঙ্গীটাও মনোরম। তবু তার চোখ মুখ লাল হয়ে উঠছে। সে মাথা নিচু করে বলল, আমাদের অ্যাকুমুলেটেড লস দু’লাখের উপর। এটা এ-বছর আরও বাড়বে। কাস্টমার ব্যাঙ্ক সর্বত্র দেনা। জাল মাল করলে কাস্টমারদের হাতের মুঠোয় চলে যাব। পরে দেখবেন ওখানটায় একটা অশ্বত্থ গাছ আছে। আর কিছু নেই।

    কুম্ভবাবু একটা কথাও বলছে না। সে আগেই সব বলে রেখেছে। সে কেবল রাজার নির্দেশ জানতে চায়। কোম্পানির প্রতি কত নিষ্ঠা তার তাও সে বোঝাতে চায়। সে নিজের জন্য অভিযোগ দায়ের করেনি। যেন তার মূল লক্ষ্য কোম্পানিকে সমূহ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা। কিন্তু অতীশবাবু একটা বেশ বড় বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাল! রাজার মাথায় কি গেছে কথাটা! শুধু একটা অশ্বত্থ গাছ থাকবে। ওটা রাজাকে একটা বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখানোর শামিল। রাজা এটা বুঝছে না কেন!

    অতীশ আগে একবার সব হজম করে গেছে। আজ কেন জানি সে তার সিদ্ধান্ত থেকে নড়তে চাইল না। সে তেমনি ঠাণ্ডা গলায় বলল, দু-আড়াই মাস আগে যা ছিলাম এখন আর তা নেই। কিছু কিছু আমিও বুঝি। তারপর থেমে গেল। যেন বাকিটা বললে অশোভন হবে। তবু শেষে না বলে পারল না, আপনার হাতে অন্যে তামাক খেয়ে যাবে কেন? তামাকটা আপনিই খান।

    সনৎবাবু বললেন, তুমি বোঝ না কিছু কে বলেছে?

    —না কেউ কেউ এমন ভেবে থাকতে পারে।

    কুম্ভর মনে হচ্ছিল সে হেরে যাচ্ছে। সে বলল, এই মুহূর্তে মালের দাম বাড়াবার আমি পক্ষপাতি নই স্যার।

    অতীশ বলল, আমি পক্ষপাতি। কস্টিং করে দেখলাম মার্জিনাল প্রফিট দূরে থাক খরচাই ওঠে না।

    কুম্ভ বলল, আরও তো কারখানা আছে। তারা কি রেটে কাজ করে দেখুন না।

    —কেউ বলে না কি রেটে কাজ করে।

    —কাস্টমারদের জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন।

    অতীশ বেশ দূর থেকে যেন বলল, ওরা রেট নিয়ে মিছে কথা বলে। কম বলে। পার্টিদের এত অ্যাডভান্স রাখার কি কারণ থাকতে পারে। যদি একদিন সব পার্টি অ্যাডভান্স ফেরত চায় কোম্পানির ঘটি বাটি বিক্রি করে দিতে হবে।

    রাজেনদা কি যেন বুঝলেন। দুজনই কোম্পানির ভাল চায়। দুজনই দু-রকমের কথা বলছে। সনৎবাবু অভিযোগ দায়ের করার পর চুপ। তবু অতীশ নতুন। রাজেনদা অতীশকে বললেন, আপাতত নকল আসল সব অর্ডারই বুক কর। কাজ চালু রাখতে হবে ত!

    অতীশ কেমন মরিয়া হয়ে বলল, নকল অর্ডার আমি বুক করতে পারব না। কুম্ভবাবু যদি করেন করুন। অর্ডার বুকের বই ওঁকে দিয়ে দিচ্ছি।

    কুমারবাহাদুর সনৎবাবুর দিকে তাকিয়ে কি যেন জানতে চাইলেন। অতীশের মুখ থমথম করছে। তখনই একটা চিরকুট কেউ দিয়ে গেল কুমারবাহাদুরের হাতে। তিনি বললেন, অতীশ ভিতরে যাও। তোমাকে ডাকছে। শঙ্খ হাজির। অতীশ বের হয়ে গেলে কুমারবাহাদুর বললেন, ভীষণ সেনসেটিভ ছেলে। টেকল করা মুশকিল। কি করবেন?

    আসলে মানুষ শৈশবে ফিরে যেতে বার বার ভালবাসে। এই মুহূর্তে অতীশের সব রাগ ক্ষোভ কেমন উবে গেল। অমলা তাকে ডেকে পাঠিয়েছে। সেই যেন বিশাল ছাদের কার্নিসে দাঁড়িয়ে আছে অমলা। কখন সেই ছেলেটা আসবে বলে দাঁড়িয়ে আছে। তার কাছে যাচ্ছে অতীশ। আপনজন বলতে এ বাড়িতে তার অমলা। এবং এ-মুহূর্তে এটা মনে হতেই চোখমুখে রক্তচাপ বেড়ে যেতে থাকল। চারপাশে জাঁকজমক —ধনাঢ্য পরিবারগুলোর যা হয়—ঘরের পর ঘর।

    আশ্রিতজনেরা একসময় এই বাড়ির তলাকার অসংখ্য ঘরে গিজগিজ করত। এখন তারা নেই। বৈভবের শেষ পর্যায় চলছে বোধহয় এটা। আর দু-এক পুরুষে এরা আর দশজনের মত নামগোত্রহীন হয়ে যেতে পারে।

    শঙ্খ আগে যাচ্ছে। যেন অনেকদূরে কোথাও আজ অতীশকে নিয়ে যাবে বলে সে রওনা হয়েছে। কোথাও বেশ অন্ধকার কোথাও আসবাবপত্রে ঠাসা ঘর, তারপরই সিঁড়ি, নীল সবুজ আর লাল গালিচা পাতা সিঁড়ি ধরে উঠতে থাকল। সেই গন্ধটা চারপাশে। লেভেণ্ডার জাতীয় গন্ধ—অথবা ধূপদীপের মত গন্ধ—কিন্তু ধূপদীপ নয়—সে উঠে যাচ্ছে। সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতেই ঝাউগাছগুলোর ফাঁকে সূর্য দেখতে পেল। একেবারে শেষ মহলায় তাকে নিয়ে আসা হয়েছে। বিরাট প্রাসাদে মানুষজন কম। চাকর চোপদার, খাজাঞ্চি নায়েব গোমস্তা অথবা সেরাস্তায় যেসব লোক থাকত তারা আর তেমনভাবে জাঁকিয়ে বসে নেই। মাঝে মাঝে দু-একজন দাসী বাঁদি চোখে পড়ছে—অতীশ আসছে দেখেই ওরা মুহূর্তে অন্ধকারে কোথায় লুকিয়ে পড়ল।

    শঙ্খ বলল, যান ভিতরে বউরাণী আছেন।

    সামনে বিশাল লম্বা বারান্দা। কারুকাজ করা মোজেইক। নীলরঙের চিক ফেলা। কথা বললেই গমগম করে বাজছে। শঙ্খের গলা বড়ই গম্ভীর শোনাচ্ছিল।

    অতীশ ইতস্তত করছিল। ভেলভেটের পর্দা প্রকাণ্ড দরজায় ঝুলছে। এর ভেতরে যেতে হবে তাকে। এতক্ষণ মনটা যেভাবে যতটা হাল্কা হয়ে গেছিল, এখানে এসে আবার তা ভারি হয়ে গেল। তার মনে হল সহসা, সে আর সেই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নেই। অনেক দূর অতীতে সে তা ফেলে এসেছে। আর তখনই পর্দা তুলে বউরাণী বলল, আয়।

    যেন নির্দেশ। তার কিছু করণীয় নেই।

    যেতে যেতে বৌরাণী বলল, খুব খেপে গেছিস শুনলাম।

    সব খবর এখানে তবে আগেই পাচার হয়ে যায়। সেদিন যে সে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরেছিল, তার খবরও বোধহয় রাখে।

    বউরাণী আগে আগে যাচ্ছে। এখন সে এই রমণীকে অমলা কিংবা কমলা কিছুই ভাবতে পারছে না। লম্বা দৃঢ় মজবুত রমণী। পুরো শরীর হাল্কা সবুজের ওপর লাল ফুল ফল আঁকা ম্যাকসিতে ঢাকা। ইতিহাসের পাতার ছবির মত কোনও সম্রাজ্ঞী যথার্থই তার সামনে হেঁটে যাচ্ছে যেন। ম্যাকসির ঝালর মেঝেয় অনেকটা ছড়িয়ে চলে যাচ্ছে। রুপোলী চুমকিতে সারা অঙ্গ জ্বলজ্বল করছিল। কোমর এবং বাহু দুই ভারি কামনার উদ্রেক করে। অতীশ ভয়ে রমণীর দিকে তাকাচ্ছে না। সে দেয়াল এবং দু-পাশের বিদেশী শিল্পীদের আঁকা ছবি দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছে। অমলা সামান্য বেহুঁশের মত হেঁটে যাচ্ছিল।

    দরজা ঠেলে পর্দা তুলে ফের বলল, আয়।

    সে ঢুকলে বলল, বোস। তারপর জরুরী কাজ পড়ে আছে মত অন্য দরজার দিকে এগোলে, অতীশ বলল, আমি কিছু বুঝতে পারছি না অমলা, তুমি আমাকে এখানে নিয়ে এলে কেন!

    বউরাণী কেমন সহসা অতর্কিতে ফিরে দাঁড়াল। বলল, ঠিক বলছিস আমি অমলা?

    —হ্যাঁ, তুমি অমলা। অমলা। কমলা নও। কমলার চুল নীল ছিল।

    —তাহলে তোর সব মনে আছে?

    —আছে।

    —ছাদের কথা?

    —মনে আছে।

    —নদীর ধারে সেই কাশবন……

    —মনে আছে।

    —ল্যান্ডোতে পূজা দেখতে বের হয়েছিলাম তোকে নিয়ে……

    —মনে আছে।

    —স্টীমার ঘাটের সেই আলো তারপর সেই বনটা—কত শত পাখি, রাতের জোৎস্না…সব মনে আছ তোর! যেন এবারে অমলা বলতে বলতে চিৎকার করে উঠবে—মনে আছে তোর সেই শ্যাওলাপিচ্ছিল ধূসর পৃথিবীর কথা! কিন্তু বলতে পারল না। গ্রীকরমণীর মত চোখেমুখে এক আশ্চর্য মুহ্যমান দৃষ্টি। সোনার মজবুত দৃঢ় লম্বা শরীরের দিকে তাকিয়ে কেমন অস্পষ্ট কন্ঠে বলে উঠল, সোনা তুই একটা দস্যু। তুই দস্যু সোনা। কেন তুই এখানে মরতে এলি সোনা!