Category: অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

  • কল্লোল যুগ

    কল্লোল যুগ

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    কল্লোল যুগ

    ‘কল্লোল যুগ’ অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত রচিত কল্লোল যুগ বিষয়ে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। প্রথম প্রকাশ, আশ্বিন ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ; প্রকাশক, শমিত সরকার, এম. সি. সরকার অ্যাণ্ড সন্স প্রাইভেট লি., ১৪ বঙ্কিম চাটুজ্যে ষ্ট্রীট, কলিকাতা ৭৩। মুদ্রক, সাধনকুমার গুপ্ত, শ্রীরাধাকৃষ্ণ প্রিণ্টিং, ২১ বি, রাধানাথ বোস লেন, কলিকাতা ৬।

    উৎসর্গ

    দীনেশরঞ্জন দাস

    গোকুলচন্দ্র নাগের

    উদ্দেশে উৎসর্গ

  • এক

    এক

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    এক

    একই শ্লেটের দুপিঠে দুজনে একই জনের নাম লিখলাম।

    তেরো শ আটাশ সালের কথা। গিয়েছিলাম মেয়েদের ইস্কুল-হসটেলে একটি ছাত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। দারোয়ানের কাছে গেট জিম্মা আছে, তাতে কাঙ্ক্ষিতদর্শনার নামের নিচে দর্শনাকাঙ্ক্ষীর নাম লিখে দিতে হবে। আরো একটি যুবক, আমারই সমবয়সী, এধার-ওধার ঘুরঘুর করছিল। শ্লেট নিয়ে আসতেই দুজনে কাছাকাছি এসে গেলাম। এত কাছাকাছি যে আমি যার নাম লিখি সেও তার নাম লেখে।

    প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে বন্ধু হয়ে গেলাম দু’জনে।

    তার নাম সুবোধ দাশগুপ্ত। ডাক নাম, নানকু।

    হৃদ্যতা এত প্রগাঢ় হয়ে উঠল যে দুজনেই বড় চুল রাখলাম ও নাম বদলে ফেললাম। আমি নীহারিকা, সে শেফালিকা।

    তখন সাউথ সুবার্বন কলেজে—বর্তমানে আশুতোষ—আই-এ পড়ি। এন্তার কবিতা লিখি আর “প্রবাসী”তে পাঠাই। আর প্রতি খেপেই প্যারীমোহন সেনগুপ্ত (তখনকার “প্রবাসী”র সহসম্পাদক) নির্মমের মত তা প্রত্যর্পণ করেন। একে ডাক-খরচা তায় গুরু-গঞ্জনা, জীবনে প্রায় ধিক্কার এসে গেল। তখন কলেজের এক ছোকরা পরামর্শ দিলে, মেয়ের নাম দিয়ে পাঠা, নির্ঘাৎ মনে ধরে যাবে। তুই যেখানে পুরো পৃষ্ঠা লিখে পাশ করতে পারিস না, মেয়েরা সেখানে এক লাইন লিখেই ফার্স্ট ডিভিশন। দেখছিস তো—

    ওই ঠিক করে দিলে, নীহারিকা। আর, এমন আশ্চর্য, একটি সদ্যফেরৎ-পাওয়া কবিতা নীহারিকা দেবী নামে প্রবাসীতে পাঠাতেই পত্রপাঠ মনোনীত হয়ে গেল।

    দেখলাম, সুবোধেরও সেই দশা। বহু জায়গায় লেখা পাঠাচ্ছে, কোথাও জায়গা পাচ্ছে না। বললাম, নাম বদলাও। নীহারিকার সঙ্গে মিলিয়ে সে নাম রাখলে শেফালিকা। আর, সঙ্গে-সঙ্গে সেও হাতে-হাতে ফল পেল।

    লেখা ছাপা হল বটে, কিন্তু নাম কই? যেন নিজের ছেলেকে পরের বাড়িতে পোষ্য দিয়েছি। লোককে বিশ্বাস করানো শক্ত, এ আমার রচনা। গুরুজনের গঞ্জনা গুরুতর হয়ে উঠল। কেননা আগে শুধু গঞ্জনাই ছিল, এখন সে সঙ্গে মিশল এসে গুঞ্জন। নীহারিকা কে?

    অনেক কাগজ গায়ে পড়ে নীহারিকা দেবীকে কবিতা লেখবার জন্যে অনুরোধ করে পাঠাতে লাগল। নিমন্ত্রণ হল কয়েকটা সাহিত্যসভায়, দু-একজন গুণমোহিতেরও খবর পেলাম চিঠিতে। ব্যাপারটা বিশেষ স্বস্তিকর মনে হল না। ঠিক করলাম স্বনামেই ত্রাণ খুঁজতে হবে। স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ ইত্যাদি। অনেক ঠোকাঠুকির পর “প্রবাসী”তে ঢুকে পড়লাম স্বনামে, ভারতীও অনেক বাধা-বারণের পর দরজা খুলে দিল।

    গেলাম সুবোধর কাছে। বললাম, ‘পালাও। মাননীয়া সাহিত্যিকারা নীহারিকা দেবীর সঙ্গে বাড়িতে দেখা করতে আসছেন। অন্তত নিজের ছদ্মনাম থেকে পালাও। আত্মরক্ষা করো। নইলে ঘরছাড়া হবে একদিন।’

    অর্ধশস্ফুট একটি বিশেষ হাসি আছে সুবোধের। সেই নির্লিপ্ত হাসি হেসে সুবোধ বললে, ‘ঘরছাড়াই হচ্ছি সত্যি। পালাচ্ছি বাংলা দেশ থেকে।’

    কোন এক সমুদ্রগামী মালবাহী জাহাজে ওয়ারলেস-ওয়াচার হয়ে সুবোধ অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছে। পঞ্চাশ টাকা মাইনে। মুক্ত পাখির মতন খুশি। বললে, অফুরন্ত সমুদ্র আর অফুরন্ত সময়। ঠেসে গল্প লেখা যাবে। যখন ফিরব দেখা করতে এসো ডকে। অক্স-টাং খুব উপাদেয় জিনিস, খেয়ে দেখতে পারো ইচ্ছে করলে। আর এক-আধ দিন যদি রাত কাটাতে চাও, শুতে পাবে পালকের বালিশে।’

    সেই সুবোধ একদিন হঠাৎ মাদ্রাজ থেকে ঘুরে এসে আমাকে বললে, ‘গোকুল নাগের সঙ্গে আলাপ করবে?’

    জানতাম কে, তবু ঝাঁজিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে গোকুল নাগ? ওই লম্বা চুল-ওলা বেহালা-বাজিয়ের মত যার চেহারা?’

    অধস্ফুটশব্দে সুবোধ হাসল। পরে গম্ভীর হয়ে বললে, “কল্লোলে”র সহসম্পাদক। তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চান। তোমার লেখা তাঁকে পড়াব বলে বলেছি। চমৎকার লোক।’

    ব্যাপার কি—কৌতূহলী হয়ে তাকালাম সুবোধের দিকে।

    গোকুলের প্রতি, কেন জানি না, মনটা প্রসন্ন ছিল না। মাঝে-মাঝে দেখেছি তাকে ভবানীপুরের রাস্তায়, কখনো বা ট্রামে। কেমন যেন দূর ও দাম্ভিক মনে হত। মনে হত লম্বা চালের লোক, ধরাখানাকে যেন সরা জ্ঞান করছে। “প্রবাসী” “ভারতী”তে ছোট ধাঁচের প্রেমের গল্প লিখত, যাতে অর্থের চাইতে ইঙ্গিত থাকত বেশি, যার মানে, দাঁড়ি-কমার চেয়ে ফুটকিই অধিকতর। সেই ফুটকি-চিহ্নিত হেঁয়ালির মতই মনে হত তাকে।

    দুরের থেকে চোখের দেখা দেখে বা কখনো নেহাৎ কান-কথা শুনে এমনি মনগড়া সিদ্ধান্ত করে বসি আমরা। আর সে সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে এত নিঃসন্দেহ থাকি। সময় কোথায়, সুযোগই বা কোথায়, সে সিদ্ধান্ত যাচাই করি একদিন। যাকে কালো বলে জেনেছি সে চিরকাল কালো বলেই আঁকা থাক।

    সুবোধ এমন একটা কথা বললে যা কোনো দিন শুনিনি বা শুনব বলে আশা করিনি বাংলা দেশে।

    জাহাজে বসে এতদিন যত লিখেছে সুবোধ, তারই থেকে একটা গল্প বেছে নিয়ে কি খেয়ালে সে কল্লোলে পাঠিয়ে দিয়েছিল। আরো অনেক কাগজে সে পাঠিয়েছিল সেই সঙ্গে, হয় খবর এসেছে মনোনয়নের, নয় ফেরৎ এসেছে লেখা—সেটা এমন কোনো আশ্চর্যজনক কথা নয়। কিন্তু কল্লোলে কী হল? কল্লোল তার গল্প অমনোনীত করলে, সম্পাদকীয় লেপাফায় লেখা ফেরৎ গেল। কিন্তু সেই সঙ্গে গেল একটি পোস্ট কার্ড। “যদি দয়া করে আমাদের অফিসে আসেন একদিন আলাপ করতে।” তার মানে, লেখা অপছন্দ হয়েছে বটে, কিন্তু লেখক, তুমি অযোগ্য নও, তুমি অপরিত্যাজ্য। তুমি এসো। আমাদের বন্ধু হও।

    ঐ পোস্টকার্ডটিই গোকুল।

    ঐ পোস্টকার্ডটিই সমস্ত “কল্লোলে”র সুর। “কল্লোলে”র স্পর্শ। তার নীড়-নির্মাণের মূলমন্ত্র।

    খবর শুনে মন নরম হয়ে গেল। আমার লেখা বাতিল হলেও আমার মূল্য নিঃশেষ হয়ে গেল না এত বড় সাহসের কথা কোনো সম্পাদকই এর আগে বলে পাঠায়নি। যা লিখেছি তার চেয়ে যা লিখব তার সম্ভাব্যতারই যে দাম বেশি এই আশ্বাসের ইসারা সেদিন প্রথম পেলাম সেই গোকুলের চিঠিতে।

    সুবোধ বললে, ‘তোমার খাতা বের করো।’

    তখন আমি আর আমার বন্ধু প্রেমেন্দ্র মিত্র মোটা-মোটা বাঁধানো খাতায় গল্প-কবিতা লিখি। লিখি ফাউন্টেন পেনে নয়—হায়, ফাউন্টেন পেন কেনবার মত আমাদের তখন পয়সা কোথায়—লিখি বাংলা কলমে, সরু জি-মার্কা নিবে। অক্ষর কত ছোট করা যায় চলে তার অলক্ষ্য প্রতিযোগিতা। লেখার মাথায় ও নিচে চলে নানারকম ছবির কেরামতি।

    তারিখটা আমার ডায়রিতে লেখা আছে—৮ই জ্যৈষ্ঠ, বৃহস্পতিবার, ১৩৩১ সাল। সন্ধেবেলা সুবোধের সঙ্গে চললাম নিউ মার্কেটের দিকে। সেখানে কি? সেখানে গোকুল নাগের ফুলের দোকান আছে।

    যে দোকান দিয়ে বসেছে সে ব্যবসা করতে বসেনি এমন কথা কে বিশ্বাস করতে পারত? কিন্তু সেদিন একান্তে তার কাছে এসে স্পষ্ট অনুভব করলাম, চারপাশের এই রাশীভূত ফুলের মাঝখানে তার হৃদয়ও একটি ফুল, আর সেই ফুলটিও সে অকাতরে বিনামূল্যে যে-কারুর হাতে দিয়ে দিতে প্রস্তুত।

    সুবোধের হাত থেকে আমার খাতাটা সে ব্যগ্র উৎসাহে কেড়ে নিল। একটিও পৃষ্ঠা না উলটিয়ে কাগজে মুড়ে রেখে দিলে সন্তর্পণে। যেন নীরব নিভৃতিতে অনেক যত্নসহকারে লেখাগুলো পড়তে হবে এমনি ভাব। হাটের মাঝে পড়বার জিনিস তারা নয়—অনেক সদ্‌ব্যবহার ও অনেক সদ্‌বিবেচনা পাবার তারা যোগ্য। লেখক নতুন হোক, তবু সে মর্যাদার অধিকারী।

    এমনি ছোটখাটো ঘটনায় বোঝা যায় চরিত্রের বিশালতা।

    বুঝলাম কত বড় শিল্পীমন গোকুলের। অনুসন্ধিৎসু চোখে আবিষ্কারের সম্ভাবনা দেখছে। চোখে সেই যে সন্ধানের আলো তাতে তেল জোগাচ্ছে স্নেহ।

    যখন চলে আসি, আমাকে একটা ব্ল্যাকপ্রিন্স উপহার দিলে। বললে, ‘কাল সকালে আপনি আর সুবোধ আমার বাড়ি যাবেন, চা খাবেন।’

    ‘আপনার বাড়ি–’

    ‘আমার বাড়ি চেনেন না? আমার বাড়ি কোথায় চেহারা দেখে ঠাহর করতে পারেন না?’

    ‘কি করে বলব?’

    ‘কি করে বলবেন। আমার বাড়ি জু-তে, চিড়িয়াখানায়। আমার বাড়ি মানে মামার বাড়ি। কোনো ভয় নেই। যাবেন স্বচ্ছন্দে।’

    পরদিন খুব সকালে সুবোধকে নিয়ে গেলাম চিড়িয়াখানায়। দেখলাম শিশিরভেজা গাঢ়-সবুজ ঘাসের উপর গোকুল হাঁটছে খালি পায়ে। বোধহয় আমাদেরই প্রতীক্ষা করছিল। তার সেদিনের সেই বিশেষ চেহারাটি বিশেষ একটা অর্থ নিয়ে আজো আমার মনের মধ্যে বিঁধে আছে। যেন কিসের স্বপ্ন দেখছে সে, তার জন্যে সংগ্রাম করছে প্রাণপণ, প্রতীক্ষা করছে পিপাসিতের মত। অথচ, সংগ্রামের মধ্যে থেকেও সে নির্লিপ্ত, নিরাকাঙ্ক্ষ। জনতার মধ্যে থেকেও সে নিঃসঙ্গ, অনন্যসহায়।

    তার ঘরে নিয়ে গেল আমাদের। চা খেলাম। সিগারেট খেলাম। নিজের অজানতেই তার অন্তরের অঙ্গ হয়ে উঠলাম। বললে, ‘আপনার “গুমোট” গল্পটি ভালো লেগেছে। ওটি ছাপব আষাঢ়ে।

    “কল্লোলে”র তখন দ্বিতীয় বর্ষ। প্রথম প্রকাশ বৈশাখ, ১৩৩০। সম্পাদক শ্রীদীনেশরঞ্জন দাশ; সহ সম্পাদক, শ্রীগোকুলচন্দ্র নাগ। প্রতি সংখ্যা চার আনা। আট পৃষ্ঠা ডিমাই সাইজে ছাপা, প্রায় বারো ফর্মার কাছাকাছি।

    নিজের সম্বন্ধে কথা বলতে এত অনিচ্ছুক ছিল গোকুল। পরের কথা জিজ্ঞাসা করো, প্রশংসায় একেবারে পঞ্চমুখ। তবু যেটুকু খবর জানলাম মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

    গোকুল হালে সাহিত্য করছে বটে, কিন্তু আসলে সে চিত্রকর। আর্ট স্কুল থেকে পাশ করে বেরিয়েছে সে। অয়েল পেন্টিংএ তার পাকা হাত। তারপর তার লম্বা চুল দেখে যে সন্দেহ করেছিলাম, সে সত্যিই-সত্যিই বেহালা বাজায়। আর, আরো আশ্চর্য, গান গায়। শুধু তাই? “সোল অফ এ শ্লেভ” বা “বাদীর প্রাণ” ফিল্‌মে সে অভিনয়ও করেছে অহীন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে। শিল্প-পরিচালকও ছিল সে-ই।

    গোকুল ও তার বন্ধুদের “ফোর আর্টস ক্লাব” নামে একটা প্রতিষ্ঠান ছিল। বন্ধুদের মধ্যে ছিল দীনেশরঞ্জন দাশ, মণীন্দ্রলাল বসু আর সুনীতি দেবী। এরা চার জনে মিলে একটা গল্পের বইও বের করেছিল, নাম “ঝড়ের দোলা”। প্রত্যেকের একটি করে গল্প। মাসিক পত্রিকা বের করারও পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু তার আগে ক্লাব উঠে গেল।

    ‘আমার ব্যাগে দেড় টাকা আর দীনেশের ব্যাগে টাকা দুই—ঠিক করলাম “কল্লোল” বের করব।’ স্নিগ্ধ উত্তেজনায় উজ্জ্বল দুই চোখ মেলে গোকুল তাকিয়ে রইল বাইরের রোদের দিকে। বললে, ‘সেই টাকায় কাগজ কিনে হ্যাণ্ডবিল ছাপালাম। চৈত্র সংক্রান্তির দিন রাস্তায় বেজায় ভিড়, জেলেপাড়ার সং দেখতে বেরিয়েছে। সেই ভিড়ের মধ্যে দুজনে আমরা হ্যাণ্ডবিল বিলোতে লাগলাম।’ পরমুহূর্তেই আবার তার শান্ত স্বরে ঔদাস্যের ছোঁয়া লাগল। বলল, ‘তবু “ফোর আর্টস্ ক্লাব”টা উঠে গেল, মনে কষ্ট হয়।

    বললাম, ‘আপনিই তো একাধারে ফোর আর্টস। চিত্র, সঙ্গীত, সাহিত্য, অভিনয়।’

    নম্রতায় বিমর্ষ হয়ে হাসল গোকুল। বললে, ‘আসুন আপনারা সবাই কল্লোলে। কল্লোলকে আমরা বড় করি। দীনেশ এখন দার্জিলিঙে। সে ফিরে আসুক। আমাদের স্বপ্নের সঙ্গে মিশুক আমাদের কর্মের সাধনা।’

    যখন চলে আসি, গোকুল হাত বাড়িয়ে আমার হাত স্পর্শ করল। সে স্পর্শে মামুলি শিষ্টাচার নয়, তার অনেক বেশি। একটি উত্তপ্ত স্নেহ, হয়তো বা অস্ফুট আশীর্বাদ।

    তারপর একদিন “কল্লোল” আফিসে এসে উপস্থিত হলাম। ১০/২ পটুয়াটোলা লেন। মির্জাপুর স্ট্রিট ধরে গিয়ে বাঁ-হাতি।

    “কল্লোল”-আফিস!

    চেহারা দেখে প্রথমে দমে গিয়েছিলাম কি সেদিন? ছোট্ট দোতলা বাড়ি—একতলায় রাস্তার দিকে ছোট্ট বৈঠকখানায় “কল্লোল”-আফিস! বাঁয়ে বেঁকে দুটো সিঁড়ি ভেঙে উঠে হাত-দুই চওড়া ছোট একটু নোয়ক ডিঙিয়ে ঘর। ঘরের মধ্যে উত্তরের দেয়াল ঘেঁসে নিচু একজনের শোয়ার মত ছোট একফালি তক্তপোশ, শতরঞ্চির উপর চাদর দিয়ে ঢাকা। পশ্চিম দিকের দেওয়ালের আধখানা জুড়ে একটি আলমারি, বাকি আধখানায় আধা-সেক্রেটারিয়েট টেবিল। পিছন দিকে ভিতরে যাবার দরজা, পর্দা ঝুলছে কি ঝুলছে না, জানতে চাওয়া অনাবশ্যক। ফাঁকা জায়গাটুকুতে খান দুই চেয়ার, আর একটি ক্যানভাসের ডেক-চেয়ার। ঐ ভেক চেয়ারটিই সমস্ত “কল্লোল”-আফিসের অভিজাত্য। প্রধান বিলাসিতা।

    সম্পাদকী টেবিলে গোকুল নাগ বসে আছে, আমাকে দেখে সস্মিত ‘শুভাগমন’ জানালে। তক্তপোশের উপর একটি প্রিয়দর্শন যুবক, নাম ভূপতি চৌধুরী, শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ে, বাড়ির ঠিকানা ৫৭ আমহার্স্ট স্ট্রিট। আরো একটি ভদ্রলোক বসে, ছিমছাম ফিটফাট চেহারা, একটু বা গম্ভীর ধরনের। খোঁজ নিয়ে জানলাম, সতীপ্রসাদ সেন, “কল্লোলে”র গোরাবাবু। দেখতে প্রথমটা একটু গম্ভীর, কিন্তু অপেক্ষা করো, পাবে তার অন্তরের মধুরতার পরিচয়।

    ভূপতির সঙ্গে একবাক্যেই ভাব হয়ে গেল। দেখতে দেখতে চলে এল নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়।

    কিন্তু প্রথম দিন সব চেয়ে যা মন ভোলাল তা হচ্ছে ঠিক সাড়েচারটের সময় বাড়ির ভিতর হতে আসা প্লেট-ভরা এক গোছা রুটি আর বাটিতে করে তরকারি। আর মাথা-গুনতি চায়ের কাপ।

    ভাবলাম, প্রেমেনকে বলতে হবে। প্রেমেন আমার স্কুলের সঙ্গী। ম্যাট্রিক পাশ করেছি এক বছর।

  • দুই

    দুই

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    দুই

    সাউথ সুবার্বন স্কুলে ফার্স্ট ক্লাশে উঠে প্রেমেনকে ধরি। সে-সব দিনে ষোলো বছর না পুরলে ম্যাট্রিক দেওয়া যেত না। প্রেমেনের এক বছর ঘাটতি পড়েছে। তার মানে ষোলো কলার এক কলা তখন বাকি।

    ধরে ফেললাম। লক্ষ্য করলাম সমস্ত ক্লাশের মধ্যে সব চেয়ে উজ্জ্বল, সব চেয়ে সুন্দর, সব চেয়ে অসাধারণ ঐ একটিমাত্র ছাত্র–প্রেমেন্দ্র মিত্র। এক মাথা ঘন কোঁকড়ানো চুল, সামনের দিকটা একটু আঁচড়ে বাকিটা এক কথায় অগ্রাহ্য করে দেওয়া—সুগঠিত দাঁতে সুখস্পর্শ হাসি, আর চোখের দৃষ্টিতে দূরভেদী বুদ্ধির প্রখরতা। এক ঘর ছেলের মধ্যে ঠিক চোখে পড়ার মত। চোখের বাইরে একলা ঘরে হয়তো বা কোনো-কোনো দিন মনে পড়ার মত।

    এক সেকশনে পড়েছি বটে কিন্তু কোনো দিন এক বেঞ্চিতে বসিনি। যে কথা-বলার জন্যে বেঞ্চির উপর উঠে দাঁড়াতে হয়, তেমন কোনো দিন কথা হয়নি পাশাপাশি বসে। তবু দূর থেকেই পরস্পরকে আবিষ্কার করলাম।

    কিংবা, আদত কথা বলতে গেলে, আমাদের আবিষ্কার করলেন আমাদের বাংলার পণ্ডিত মশাই—নাম রণেন্দ্র গুপ্ত। ইস্কুলের ছাত্রদের মুখ-চলতি নাম রণেন পণ্ডিত।

    গায়ের চাদর ডান হাতের বগলের নিচে দিয়ে চালান করে বা কাঁধের উপর ফেলে পাইচারি করে-করে পড়াতেন পণ্ডিত মশাই। অদ্ভুত তার পড়াবার ধরন, আশ্চর্য তাঁর বলবার কায়দা। থমথমে ভারী গলার মিষ্টি আওয়াজ এখনো যেন শুনতে পাচ্ছি।

    নিচের দিকে সংস্কৃত পড়াতেন। পড়াতেন ছড়া তৈরি করে। একটা আমার এখনো মনে আছে। ব্যাকরণের সুত্র শেখাবার জন্যে সে ছড়া, কিন্তু সাহিত্যের আসরে তার জায়গা পাওয়া উচিত।

    ব্যধ্-যজ্ এদের য-কার গেল

    তার বদলে ই,

    ই-কার উ-কার দীর্ঘ হল

    ঋকারান্ত রি।

    শাস্‌-এর হল শিষ-দেওয়া রোগ

    অস্-এর হল ভূ,

    স্বপ-সাহেবের সুপ এসেছে

    হেব সাহেবের হু।

    বহরমপুরের বাদীরা সব

    বদমায়েসি ছেড়ে

    চন্দ্র পরান দয়াল হরি

    সবাই হল উড়ে॥

    একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। বাচ্যান্তর শেখাচ্ছেন পণ্ডিত মশাই— কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্য। তখন সংস্কৃত ধাতুগুলো কে কি রকম চেহারা নেবে তারই একটা সরস নির্ঘণ্ট। তার মানে ব্যধ্ আর যজ্–ধাতু য-ফলা বর্জন করে হয়ে দাঁড়াবে বিধ্যতে আর ইজ্যতে। কৃয়তে-মৃয়তে না হয়ে হবে ক্রিয়তে-ম্রিয়তে। তেমনি শিষ্যতে, ভূয়তে, সুপ্যতে, হূয়তে। বহরমপুরের বাদীরাই সব চেয়ে মজার। তারা সংখ্যায় চারজন—বচ, বপ, বদ আর বহ। কর্মবাচ্যে গেলে আর বদমায়েসি থাকবে না, সবাই উড়ে হয়ে যাবে। তার মানে, ব উ হয়ে যাবে। তার মানে উচ্যতে, উপ্যতে, উদ্যতে, উহ্যতে। তেমনি ভাববাচ্যে উক্ত, উপ্ত, উদিত, উঢ়। ছিল বক হয়ে দাঁড়াল উচ্চিংড়ে।

    বাংলার রচনা-ক্লাশে তিনি অনায়াসে চিহ্নিত করলেন আমাদের দুজনকে। যা লিখে আনি তাই তিনি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন ও আরো লেখবার জন্যে প্রবল প্ররোচনা দেন। একদিন দুঃসাহসে ভর করে তার হাতে আমার কবিতার খাতা তুলে দিলাম। তখনকার দিনে মেয়েদের গান গাওয়া বরদাস্ত হলেও নৃত্য করা গর্হিত ছিল, তেমনি ছাত্রদের বেলায় গদ্যরচনা সহ্য হলেও কবিতা ছিল চরিত্রহানিকর। তা ছাড়া কবিতার বিষয়গুলিও খুব স্বর্গীয় ছিল না, যদিও একটা কবিতা “স্বর্গীয় প্রেম” নিয়ে লিখেছিলাম। কিন্তু পণ্ডিত মশায়ের কি আশ্চর্য ঔদার্য! পঙ্গু ছন্দ, অপাঙক্তেয় বিষয়, সঙ্কুচিত কল্পনা—তবু যা একটু পড়েন, তাই বলেন চমৎকার। বলেন, ‘লিখে যাও, থেমো না, নিশ্চিতরূপে অবস্থান কর। যা নিশ্চিতরূপে অবস্থান তারই নাম নিষ্ঠা। আর, শোনো—’ কাছে ডেকে নিলেন। হিতৈষী আত্মজনের মত বললেন, ‘কিন্তু পরীক্ষা কাছে, ভুলো না—’

    ম্যাট্রিক পরীক্ষায় আমি আর প্ৰেমেন দুজনেই মান রেখেছিলাম পণ্ডিত মশায়ের। দুজনেই ‘ভি’ পেয়েছিলাম।

    রাস্তায় এক দিন দেখা পণ্ডিত মশায়ের সঙ্গে। কাঁধ চাপড়ে বললেন, আমার মান কিন্তু আরো উঁচু। নি-পূৰ্ব্বক স্থা ধাতু অ—কতৃর্বাচ্যে। মনে থাকে যেন।’

    তাঁর কথাটা মনে রেখেছি কিনা আমাদের অগোচরে তিনি লক্ষ্য করে এসেছেন বরাবর। শুনেছি পরবর্তী কালে প্রতি বৎসর নবাগত ছাত্রদের উদ্দেশ করে স্নেহ-গগদ কণ্ঠে বলেছেন—এইখানে বসত প্রেমেন আর ঐখানে অচিন্ত্য!

    ম্যাট্রিক পাশ করে প্রেমেন চলে গেল কলকাতায় পড়তে, আমি ভর্তি হলাম ভবানীপুরে। সে সব দিনে ধর্মতলা পেরিয়ে উত্তরে গেলেই ভবানীপুরের লোকেরা তাকে কলকাতায় যাওয়া বলত। হয়তো ঘুরে এলাম ঝামাপুকুর বা বড়বাগান থেকে, কেউ জিগগেস করলে বলতাম কলকাতায় গিয়েছিলাম।

    নন-কোঅপারেশনের বান-ডাকা দিন। আমাদের কলেজের দোতলার বারান্দা থেকে দেশবন্ধুর বাড়ির আঙিনা দেখা যায়—শুধু এক দেয়ালের ব্যবধান। মহাত্মা আছেন, মহম্মদ আলি আছেন, বিপিন পালও আছেন বোধ হয়—তরঙ্গতাড়নে কলেজ প্রায় টলোমলো। কি ধরে যে আঁকড়ে থাকলাম কে জানে, শুনলাম প্রেমেন ভেসে পড়েছে।

    ডাঙা পেল প্রায় এক বছর মাটি করে। এবার ভালো ছেলের মত কলকাতায় না গিয়ে ঢুকল পাড়ার কলেজে। সকাল-বিকেলের সঙ্গীকে দুপুরেও পেলাম এবার কাছাকাছি। কিন্তু পরীক্ষার কাছাকাছি হতেই বললে, ‘কী হবে পরীক্ষা দিয়ে। ঢাকায় যাব।’

    ১৯২২-সালে পুরী থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্রের চিঠি :

    “দুঃখের তপস্যায় সবই অমৃত, পথেও অমৃত, শেষেও অমৃত। সফল হও ভালই, না হও ভালই। আসল কথা সফল হওয়া না-হওয়া নেই—তপস্যা আছে কিনা সেইটেই আসল কথা। সৃষ্টি তো স্থিতির খেয়ালে তৈরী নয়, গতির খেয়ালে। যা পেলুম তাও অহরহ সাধনা দিয়ে রাখতে হয়, নইলে ফেলে যেতে হয়। এখানে কেউ পায় না, পেতে থাকে—সেই পেতে-থাকার অবিরাম তপস্যা করছি কিনা তাই নিয়ে কথা। যাকে পেতে থাকি না সে নেই।…যা পাই তাও ফেলে যাই, গাছ যেই ফুল পায় অমনি ফেলে দিয়ে যায়, তেমনি আবার ফল ফেলে দিয়ে যায় পাওয়া হলেই।…যারা পায় তাদের মতো হতভাগা আর নেই। দুঃখের ভয়ে যারা কঠিন তপস্যা থেকে বিরত হয়ে সহজ পথ খোঁজে আরামের, তাদের আরামই জোটে, আনন্দ নয়।…

    আমি পড়াশুনা একদিনও করিনি—পারা যায় না। আমার মত লোকের পক্ষে পড়ব বল্লেই পড়া অসম্ভব। হয়ত এবার একজামিন দেওয়া হবে না।

    তোর প্রেমেন্দ্র মিত্র”

    পুরী থেকে লেখা আরেকটা চিঠির টুকরো—সেই ১৯২২-এ :

    “সমুদ্রে খুব নাইছি। মাঝে-মাঝে এই প্রাচীন পুরাতন বৃদ্ধ সমুদ্র আমাদের অর্বাচীনতায় চটে গিয়ে একটু আধটু ঝাঁকানি কানমলা দিয়ে দেন—নইলে বেশ নিরীহ দাদামশাইয়ের মত আনমনা!

    ঝিনুক কুড়োচ্ছি। পড়াশোনা মোটেই হচ্ছে না—তা কি হয়?”

    সে-সব দিনে দুজন লেখক আমাদের অভিভূত করেছিল—গল্পেউপন্যাসে মণীন্দ্রলাল বসু আর কবিতায় সুধীরকুমার চৌধুরী। কাউকে তখনো চোখে দেখিনি, এবং এদেরকে সত্যি-সত্যি চোখে দেখা যায় এও যেন প্রায় অবিশ্বাস্য ছিল। কলেজের এক ছাত্র—নাম হয়তো উষারঞ্জন রায়—আমাদের হঠাৎ একদিন বিষম চমকে দিলে। বলে কিনা, সে সুধীর চৌধুরীর বাড়িতে থাকে, আর, শুধু এক বাড়িতেই নয়, একই ঘরে, পাশাপাশি তক্তপোশে! যদি যাই তো দুপুরবেলা সেই ঘরে ঢুকে বাক্স ঘেটে সুধীর চৌধুরীর কবিতার খাতা আমরা দেখে আসতে পারি।

    বিনাবাক্যব্যয়ে দুজনে রওনা হলাম দুপুরবেলা। সুধীর চৌধুরী তখন রমেশ মিত্র রোডে এক একতলা বাড়িতে থাকেন—তখন হয়তো রাস্তার নাম পাকাপাকি রমেশ মিত্র রোড হয়নি—আমরা তাঁর ঘরে ঢুকে তাঁর ডালা-খোলা বাক্স হাঁটকে কবিতার খাতা বার করলাম। ছাপার অক্ষরে যার কবিতা পড়ি স্বহস্তাক্ষরে তাঁর কবিতা দেখব তার স্বাদটা শুধু তীব্রতর নয়, মহত্তর মনে হল। হাতাহাতি করে অনেকগুলি খাতা থেকে অনেকগুলি কবিতা পড়ে ফেললাম দুজনে। একটা কবিতা ছিল “বিদ্রোহী” বলে। বোধ হয় নজরুল ইসলামের পালটা জবাব। একটা লাইন এখনও মনে আছে—“আমার বিদ্রোহ হবে প্রণামের মত।” গভীর উপলব্ধি ও নিঃশেষ আত্মনিবেদনের মধ্যেও যে বিদ্রোহ থাকতে পারে—তারই শান্ত স্বীকৃতির মত কথাটা।

    কবিতার চেয়েও বেশি মুগ্ধ করল কবিতার খাতাগুলির চেহারা। ষোলপেজী ডবল ডিমাই সাইজের বইয়ের মত দেখতে। মনে আছে পরদিনই দুইজনে ঐ আকৃতির খাতা কিনে ফেললাম।

    ১৯২২ সালের নভেম্বর মাসে বটতলা বাড়ি, পাথরচাপতি, মধুপুর থেকে প্রেমেন আমাকে যে চিঠি লেখে তা এই :

    “অচিন, তবু মনে হয় ‘আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে।’ তারা মিথ্যা বলেনি সেই সত্যের সাধকেরা, ঋষিরা। আনন্দে পৃথিবীর গায়ে প্রাণের রোমাঞ্চ হচ্ছে, আনন্দে মৃত্যু হচ্ছে, আনন্দে কান্না আনন্দে আঘাত সইছে নিখিলভুবন। নিখিলের সত্য হচ্ছে চলা, প্রাণ হচ্ছে দুরন্ত নদী—সে অস্থির, সে আপনার আনন্দের বেগে অস্থির। আনন্দভরে সে স্থির থাকতে পারে না—প্রথম প্রেমের স্বাদ পাওয়া কিশোরী। সে আঘাত যেচে খেয়ে নিজের আনন্দকে অনুভব করে। ভগবানও ওই আনন্দভরে স্থির থাকতে পারেননি, তাই সেই বিরাট আনন্দময় নিখিলভুবনে নেচে কুঁদে খেলায় মেতেছেন। সে কি দুরন্তপনা! অবাধ্য শিশুর দুরন্তপনায় তারই আভাস।

    কিন্তু মানুষ যে বড্ড বড়, সে যে ধারণাতীত—সে যে সুধীর চৌধুরী যা বলতে গিয়ে বলতে না পেরে বলে ফেলে—‘ভয়ংকর’—তাই। তাই তার সব ভয়ংকর, তার আনন্দ ভয়ংকর, তার দুঃখ ভয়ংকর, তার ত্যাগ ভয়ংকর, তার অহংকার ভয়ংকর, তার স্থলন ভয়ংকর, তার সাধনা ভয়ংকর। তাই একবার বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে যাই যখন তার সাধনার দিকে তাকাই, তার আনন্দের দিকে তাকাই। আবার ভয়ে বুক দমে যায় যখন তার দুঃখের দিকে তাকাই, তার স্খলনের দিকে তাকাই। আর শেষকালে কিছু বুঝতে না পেরে বলি—ধন্য ধন্য ধন্য।

    কাল এখানে চমৎকার জ্যোৎস্নারাত ছিল। সে বর্ণনা করা যায় না। মনের মধ্যে সে একটা অনুভূতি শুধু। ভগবানের বীণায় নব নব সুর বাজছে—কালকের জ্যোৎস্নারাতের সুর বাজছিল আমার প্রাণের তারে, তার সাড়া পাচ্ছিলুম। তারাগুলো আকাশে ঠিক মনে হচ্ছিল সুরের ফিনকি আর পথটা তন্দ্রা, পাতলা তন্দ্রা, আকাশটা স্বপ্ন। এক মুহূর্তে মনের ভেতর দিয়ে সুরের ঝিলিক হেনে দিয়ে গেল, বুঝলুম, ভয় মিথ্যা হতাশা মিথ্যা মৃত্যু মিথ্যা। কিন্তু আমার বিশ্বাস করতে হবে, প্রমাণ করতে হবে আমার জীবন দিয়ে। বলেছিলুম প্রিয়া অচেনা, আজ দেখছি আমি যে আমার অচেনা। প্রিয়া যে আমিই। এক অচেনা দেহে, আর এক অচেনা দেহের বাইরে। স্থূল জগতে একদিন আদিপ্রাণ—protoplasm—নিজেকে দুভাগ করেছিল। সেই দুভাগই যে আমরা। আমরা কি ভিন্ন? আমি পৃথিবী, প্রিয়া আকাশ—আমরা যে এক। এই এককে আমায় চিনতে হবে আমার নিজের মাঝে আর তার মাঝে। এই চেনার সাধনা অন্তহীন তপস্যা হচ্ছে মানুষের। সেই চেনার কি আর শেষ আছে? একদিন জানতুম আমি রক্তমাংসের মানুষ, ক্ষুধাতৃষ্ণাভরা আর প্রিয়া দেহসুখের উপাদান—তারপর চিনছি আর চিনছি। আজ চিনতে চিনতে কোথায় এসে পৌঁছেছি, তবু কি আনন্দের শেষ আছে। আমার আমি কি অপরূপ, কি বিস্ময়কর! এই চেনার পথে কত রৌদ্র কত ছায়া কত ঝড় কত বৃষ্টি কত সমুদ্র কত নদী কত পর্বত কত অরণ্য কত বাধা কত বিঘ্ন কত বিপথ কত অপথ।

    থামিসনি কোনোদিন থামিসনি। থামব না আমরা, কিছুতেই না। ভয় মানে থামা হতাশা মানে থামা অবিশ্বাস মানে থামা ক্ষুদ্র বিশ্বাস মানেও থামা। দেহের ডিঙা যদি তুফানে ভেঙে যায় খুঁড়িয়ে যায়, গেল তো গেল—‘হালের কাছে মাঝি আছে।’ যৌবনটা হচ্ছে রাত্রি, তখন আমার পৃথিবী অন্ধকারে ঢেকে যায়, শুধু থাকে প্রিয়ার আকাশ—যেটুকু আলো পড়ে, কখনো তারা কখনো জ্যোৎস্নার, আমার পৃথিবীর ওপর শুধু সেইটুকু। তোর সেই জীবনের রাত্রি এসেছে, কিন্তু এসেছে ঘোর ঘনঘটা করে, নিবিড় অন্ধকার করে—তা হোক, বিচিত্র পৃথিবী। বিচিত্র জীবনের কাহিনী। শুধু মনের মধ্যে মন্ত্র হোক—‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত।’ যদি কেউ ঐশ্বর্য নিয়ে সুখী হয় হোক, ক্ষুদ্র শান্তি নিয়ে সুখী হয় হতে দাও, আমরা জানি ‘ভূমৈব সুখং নাল্পে সুখমস্তি।’ অতএব ‘ভূমৈব জিজ্ঞাসিতব্য।’ সেই ভূমার খোঁজে যেন আমরা না নিরস্ত হই। আর যৌবনকে বলি, ‘বয়সের এই মায়াজালের বাঁধনখানা তোরে হবে খণ্ডিতে।’

    এর ক’দিন পরেই আরেকটা চিঠি এল প্রেমেনের সেই মধুপুর থেকে :

    “হ্যাঁ, আরেকটা খবর আছে। এখানে এসে একটা কবিতার শেষ পূরণ করেছি আর চারটে নতুন কবিতা লিখেছি। তোকে দেখাতে ইচ্ছে করছে। শেষেরটার আরম্ভ হচ্ছে ‘নমো নমো নমো।’ মনের মধ্যে একটা বিরাট ভাবের উদয় হয়েছিল, কিন্তু সব ভাষা ওই গুরুগভীর ‘নমো নমো নমো’-র মধ্যে এমন একাকার হয়ে গেল যে কবিতাটা বাড়তেই পেল না। কবিতার সমস্ত কথা ওই ‘নমো নমো নামো’-র মধ্যে অস্পষ্ট হয়ে রইল। কি রকম কবিতা লিখছিস?”

  • তিন

    তিন

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    তিন

    তেরো-শ একত্রিশ সালের পয়লা জ্যৈষ্ঠ আমি প্রেমেন আর আমাদের দু’টি সাহিত্যিক বন্ধু মিলে একটা সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করলাম। তার নাম হল “আভ্যুদয়িক”। আর বন্ধু দু’টির নাম শিশিরচন্দ্র বসু আর বিনয় চক্রবর্তী।

    যেমনটি সাধারণত হয়ে থাকে। অভিভাবক ছাড়া আলাদা একটা ঘরে জন কয়েক বন্ধু মিলে মনের সুখে সাহিত্যিকগিরির আখড়াই দেওয়া। সেই গল্প-কবিতা পড়া, সেই পরস্পরের পিঠ চুলকোনো। সেই চা, সিগারেট, আর সর্বশেষে একটা মাসিক পত্রিকা ছাপাবার রঙিন জল্পনাকল্পনা। আর, সেই মাসিক পত্রিকা যে কী নিদারুণ বেগে চলবে মুখে মুখে তার নির্ভুল হিসেব করে ফেলা। অর্থাৎ দুয়ে-দুয়ে চার না করে বাইশ করে ফেলা।

    তখনকার দিনে আমাদের এই চারজনের বন্ধুত্ব একটা দেখবার মত জিনিস ছিল। রোজ সন্ধ্যায় একসঙ্গে বেড়াতে যেতাম হয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বা উডবার্ন পার্কে, নয়তো মিন্টো স্কোয়ারে মালীকে চার আনা পয়সা দিয়ে নৌকা বাইতাম। কোনো দিন বা চলে যেতাম প্রিনসেপ ঘাট, নয়তো ইডেন গার্ডেন। একবার মনে আছে, স্টিমারে করে রাজগঞ্জে গিয়ে, সেখান থেকে আন্দুল পর্যন্ত পায়ে হাঁটা প্রতিযোগিতা করেছিলাম চারজন। আমাদের দলে তখন মাঝে-মাঝে আরো একটি ছেলে আসত। তার নাম রমেশচন্দ্র দাস। কালে ভদ্রে আরো একজন। তার নাম সুনির্মল বসু। “বলিয়া গেছেন তাই মহাকবি মাইকেল, যেওনা যেওনা সেথা যেথা চলে সাইকেল।” মনোহরণ শিশু-কবিতা লিখে এরি মধ্যে সে বনেদী পত্রিকায় প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে।

    শিশির আর বিনয়ের সাহিত্যে বিশেষ প্রতিশ্রুতি ছিল। বিনয়ের ক’টি ছোট গল্প বেরিয়েছিল “ভারতী”তে, তাতে দস্তুরমতো ভালো লেখকের স্বাক্ষর আঁকা। শিশির বেশির ভাগ লিখত “মৌচাকে”, তাতেও ছিল নতুন কোণ থেকে দেখবার উঁকিঝুকি। আমরা চার জন মিলে একটা সংযুক্ত উপন্যাসও আরম্ভ করেছিলাম। নাম হয়েছিল “চতুষ্কোণ”। অবিশ্যি সেটা শেষ হয় নি, শিশির আর বিনয় কখন কোন ফাঁকে কেটে পড়ল কে জানে। সেই একত্র উপন্যাস লেখার পরিকল্পনাটা আমি আর প্রেমেন পরে সম্পূর্ণ করলাম আমাদের প্রথম বই “বাঁকালেখা”য়। জীবনের লেখা যে লেখে সে সোজা লিখতে শেখেনি এই ছিল সেই বইয়ের মূল কথা।

    “আভ্যুদয়িকে”র বৈঠক বসত রোজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। ভালো ঘর পাইনি কিন্তু ভালো সঙ্গ পেয়েছি এতেই সকল অভাব পুষিয়ে যেত। আড্ডায় প্রথম চিড় খেল প্রেমেন ঢাকায় চলে গেলে। সেখানে গিয়ে সে “আভ্যুদয়িকে”র শাখা খুললে, শুভেচ্ছা পাঠাল এখানকার আভ্যুদয়িকদিগের :

    “আভ্যুদয়িকগণ, আমার শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।

    ঢাকায় এসেও আপনাদের ভুলতে পারছি না। আজ বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যায় সেই ছোট ঘরটিতে যখন জলসা জমে উঠবে তখন আমি এখানে বসে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলব বই আর কি করব? ঢাকার আকাশ আজকাল সর্বদাই মেঘে ঢাকা, তবু কবিতার কলাপ বিকশিত হয়ে উঠছে না। আপনাদের আকাশের রূপ এখন কেমন? কোন কবির হৃদয় আজ উতলা হয়ে উঠেছে আপনাদের মাঝে, প্রথম শ্রাবণের কাজল-পিছল (দোহাই তোমার অচিন্ত্য, চুরিটা মাফ কোরো) চোখের কটাক্ষে? কার “বাদল-প্রিয়া” এল মেঘলা আকাশের আড়াল দিয়ে হৃদয়ের গোপন অন্তঃপুরে, গোপন অভিসারে?

    এখানে কিন্তু “এ ভরা বাদর, মাহ—ভাদর নয়, শাঙন, শূন্য মন্দির মোর।” কেউ আপনারা পারেন নাকি মন্দাক্রান্তা ছন্দে দুলিয়ে এই শ্রাবণ-আকাশের পথে মেঘদূত পাঠাতে? কিন্তু ভুলে যাবেন না যেন যে আমি যক্ষপ্রিয়া নই।

    দূর থেকে এই আভ্যুদয়িকে’র নমস্কার গ্রহণ করুন। আর একবার বলি সেই প্রাচীন বৈদিক যুগের সুরে—“সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সংবো মনাংসি জানতাম—”

    আমরা যে যেখানেই থাকি না, আমরা আভ্যুদয়িক।”

    এই সময়কার প্রেমেনের তিনখানা চিঠি—ঢাকা থেকে লেখা :

    “অচিন,

    আজকালকার প্রেমের একটা গল্প শোন।

    সে ছিল একটি মেয়ে, কিশোরী—তনু তার তনুলতা, চোখের কোণে চঞ্চলতাও ছিল, আর তাদের বাড়ীর ছিল দোতলা কিম্বা তেতলায় একটা ছাদ। অবশ্য লাগাও আর একটা ছাদও ছিল। মেয়েটির নাম অতি মিষ্টি কিছু ঠাউরে নে—ভাষায় বললে তার মাধুৰ্য্য নষ্ট হয়ে যাবে। কৈশোরের স্বপ্ন তার সমস্ত তনুবল্লরীকে জড়িয়ে আছে, ফুটন্ত হাসনাহানায় চাঁদের আলোর মত। সে কাজ করে না, কিচ্ছু করে না—শুধু তার পিয়াসী আঁখি কোন সুদূরে কি খুঁজে বেড়ায়। একদিন ঠিক দুপুর বেলা, রোদ চড়চড় করছে অর্থাৎ রুদ্রের অগ্নিনেত্রের দৃষ্টির তলে পৃথিবী মুর্চ্ছিত হয়ে আছে—সে ভুল করে তার নীলাম্বরী শাড়ীখানি শুকোতে দিতে ছাদে উঠেছিল। হঠাৎ তার দূরাগত-পথ-চাওয়া আঁখির দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। ওগো জন্মজন্মান্তরের হৃদয়দেবতা, তোমায় পলকের সৃষ্টিতেই চিনেছি—এইরকম একটা ভাব। হৃদয়দেবতাও তখন লম্বা চুলে টেড়ি কাটছিলেন, সামনেই দেখলেন তীব্র জ্বালাময় আকাশের নীচে স্নিগ্ধ আষাঢ়ের পথহারা মেঘের মত কিশোরীটিকে। আর্শির রোদ ঘুরিয়ে ফেললেন তার মুখে তৎক্ষণাৎ। “ওগো আলোকের দূত এলো তোমার হৃদয় হতে আমার হৃদয়ে।” মেয়েটি একটু হাসলে যেন দূর মেঘের কোলে একটু শীর্ণ চিকুর খেলে গেল। প্রেম হল। কিন্তু পালা এইখানেই সাঙ্গ হল না। আলোকের দূত যাতায়াত করতে লাগল। লোষ্ট্রবাহন লিপিকা তারপর। একদিন লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে হৃদয়দেবতার স্থূল দেহের কপাল নামক অংশবিশেষকে আঘাত করে রক্ত বার করে দিলে ও কালশিরে পড়িয়ে দিলে। হৃদয়দেবতা লিখলেন, ‘তোমার কাছ থেকে এ দান আমার চরম পুরস্কার। এই কালো দাগ আমার প্রিয়ার হাতের স্পর্শ, এ আমার জীবন পথের পাথেয়। তোমার হাতে যা পাই তাইতেই আমার আনন্দ।’ অবশ্য প্রিয়ার হাতের স্পর্শ ও জীবনপথের পাথেয়র ওপর টিঙ্কচার আয়োডিন লাগাতে কোন দোষ নেই। জীবনদেবতা তাই লাগাতেন। এবং বাড়ীর লোক কারণ জিজ্ঞাসা করলে একটা অতি কাব্যগন্ধহীন স্থূল বিশ্রী মিথ্যা বলতে দ্বিধা করেন নি, যথা—‘খেলতে গিয়ে ইটে আছাড় খেয়েছি।’

    ওই পর্যন্ত লিখে নাইতে খেতে গেছলুম। আবার লিখছি। এখানে সাহিত্য জগতের সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা রাখবার সুযোগ নেই। লেখা তো একেবারেই বন্ধ। My Muse is mute. কোন কালে আর সে মুখ খুলবে কিনা জানি না। মাথাটায় এখন ভারী গোলমাল। মাথা স্থির না হলে ভালো আর্ট বেরোয় না, কিন্তু আমার মাথায় ঘূর্ণি চলেছে। শরীর ভালো নয়। বিনয় আর রমেশের ঠিকানা জানি না, পাঠিয়ে দিস।

    খানিক আগে ক’টা প্রজাপতি খেলছিল নীচের ঘাসের জমিটুকুর ওপর। আমার মনে হল পৃথিবীতে যা সৌন্দর্য প্রতি পলকে জাগছে, এ পর্যন্ত যত কবি ভাষার দোলনা দোলালে তারা তার সামান্যই ধরতে পেরেছে—অমৃত-সাগরের এক অঞ্জলি জল, কেউ বা এক ফোঁটা। আমরা সাধারণ মানুষ এই সৌন্দর্যের পাশ দিয়ে চলাচল করি, আর কেউ বা দাঁড়িয়ে এক অঞ্জলি তুলে নেয়। কিন্তু কিছুই হয়নি এখন। হয়ত এমন কাল আসছে যার কাব্যের কথা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। তারা এই মাটির গানই গাইবে, এই সবুজ ঘাসের এই মেঘলা দিনের কিম্বা এই ঝড়ের রাতের–কিন্তু যে সুক্ষ্মতম সুর যে পরম ব্যঞ্জনা আমরা ধরতেও পারি নি তারা তাকেই মূৰ্ত্ত করবে। আমি ভাবতে চেষ্টা কচ্ছি তখন নারীর ভেতর মানুষ কি খুঁজে পাবে। মানুষ দেহের আনন্দ নারীর ভেতর খুঁজতে খুঁজতে আজ এইখানে এসে দাঁড়িয়েছে—সেদিন যেখানে গিয়ে পৌঁছাবে তার আমরা কল্পনাও করতে পারি না। কিন্তু আছে সৃষ্টির অন্তরে অনন্ত অমৃতের পথ—তার কোথায় আজ আমরা? চাই অমৃতের জন্যে তপস্যা। মানুষ ড্রেডনটই তৈরী করুক আর ওয়ারলেসই চালাক এ শুধু বাইরের–ভেতরের সাধনা তার অমৃতের জন্যে।”

    “কিন্তু আসল কথা কি জানিস অচিন, ভালো লাগে না—সত্যি ভালো লাগে না। …বন্ধুর প্রেমে আনন্দ নেই, নারীর মুখেও আনন্দ নেই, নিখিল বিশ্বে প্রাণের সমারোহ চলেছে তাতেও পাই না কোনো আনন্দ। কিন্তু একদিন বোধ হয় পৃথিবীর আনন্দসভায় আমার আসন ছিল—অন্ধকার রাত্রে হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে আকাশের পানে চাইলে মনে হত, সমস্ত দেহ-মন যেন নক্ষত্রলোকের অভিনন্দন পান করছে—অপরূপ তার ভাষা। বুঝতে পারতুম আমার দেহের মধ্যে অমনি অপূৰ্ব রহস্য অনাদি অনন্ত আকাশের ভাষায় সাড়া দিচ্ছে। আজকাল মাঝে মাঝে জোর করেই সেই আসনটুকু অধিকার করতে যাই কিন্তু বৃথাই। ভালো লাগে না, ভালো লাগে না। আশ্চর্য হয়েই ভাবি এই দেহটার মাল মশলা সবই প্রায় তেমনি আছে। হৃৎপিণ্ড তেমনই নাচছে, শিরায় শিরায় রক্ত ছুটছে, ফুসফুস থেকে নিংড়ে নিংড়ে রক্ত বেরুচ্ছে। খাড়া হয়ে হাঁটি, গলা থেকে তেমনি স্বর বেরোয়। এই সেই দেবতার দেহটা এমন হল কেন? আর সে বাজে না। নিখিল-দেবতার এই যে দেহ সে নিখিল-দেবতাকেই এমন করে ব্যঙ্গ করে কেন? …এখানে ধারা-শ্রাবণ, কিন্তু শ্রাবণঘন-গহন মোহে কারুর গোপন চরণ-ফেলা টের পাই না। বৃষ্টিতে দেশ ভেসে গেল কিন্তু আমার প্রাণে তার দৃষ্টি পড়ল না। কেবল শুকনো তৃষ্ণার্ত মাটি—নিস্পন্দ নির্জীব। বর্ষার নৃত্যসভার গান শোনবার জন্যে দেখছি মাটি পাথর মরু ফুড়ে কোণে-কোণে আনাচে-কানাচে পৃথিবীর স্থানে-অস্থানে নব নব প্রাণ মাথা তুলে উঁকি মারছে, কিন্তু আমার জীবনের নবাঙ্কুর শুকিয়ে মরে আছে। আমার মাটি সরস হল না। সেদিন রাত্রে শ্রাবণের সারঙে একটা সুর বাজছিল, সুরটা আমার বহুদিনকার পরিচিত। ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালুম, আশা হচ্ছিল হয়ত পুরোনো বর্ষারাত্রির আনন্দকে ফিরে পাব। কিন্তু হায়, বৃষ্টি শুধু বৃষ্টি, অন্ধকার আকাশ শুধু অন্ধকার আকাশ। এই বৃষ্টি পড়াকে ব্যাখ্যা করতে পারি অনুভব করতে পারি ইন্দ্রিয় দিয়ে কিন্তু অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে পারি না। তাই মেঘের জল শুধু ঝরতে লাগল, আমার হৃদয় সাড়া দিলে না।

    সত্যি নিজেকে আর চিনতে পারি না। তোদের যে প্রেমেন বন্ধু ছিল তাকে আমার মধ্যে খুঁজে খুঁজে পাই না। মনে হয় গাছের যে ডালপালা একদিন দুবাহু মেলে আকাশ আর আলোর জন্যে তপস্যা করত, যার লোভ ছিল আকাশের নক্ষত্র, সে ডালপালা আজ যেন কে কেটেকুটে ছারখার করে দিয়েছে। শুধু অন্ধকার মাটির জীবন্ত গাছের মূলগুলো হাতড়ে-হাতড়ে অন্বেষণ করছে শুধু খাবার, মাটি আর কাদা, শুধু বেঁচে থাকা—কেঁচোর মত বেঁচে থাকা। এ প্রেমেন তোদের বন্ধু ছিল না বোধ হয়।

    বাতি নিবে গেছে। হৃদয়ের বিষাক্তবাতাসে সে কতক্ষণ বাঁচতে পারে? ‘যে প্রদীপ আলো দেয় তাহে ফেল শাস।’

    মানুষের দিকে তাকিয়ে আজকাল কি দেখতে পাই জানিস? সেই আদিম পাশব ক্ষুধা—হিংসা, বিষ, আর স্বার্থপরতা। চোখের বাতায়ন দিয়ে শুধু দেখতে পাই সুসভ্য মানুষের অন্তরে আদিম পশু উৎপেতে আছে। যে চোখ দিয়ে মানুষের মাঝে দেবতাকে দেখতুম সেটা আজ অন্ধপ্রায়। আমার যেন আজকাল ধারণা হয়েছে এই যে, লোকে বন্ধুকে ভালবাসে এটা নেহাৎ মিথ্যে—মানুষ নিজেকেই ভালবাসে। যে বন্ধুর কাছে অর্থাৎ যে মানুষের কাছে সেই নিজেকে ভালবাসার অহঙ্কারটা চরিতার্থ হয়, অর্থাৎ যার কাছ থেকে সে নিজের আত্মম্ভরিতার থোক পায় তাকেই সে ভালবাসে মনে করে। দরকার মানুষের শুধু নিজেকে, শুধু নিজেকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে সে অহঙ্কার চরিতার্থ করতে চায়। বন্ধু হচ্ছে মাত্র সেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখবার আর্শি। ওই জন্যেই তাকে ভালবাসা। যে আর্শি থেকে নিজেকে সব চেয়ে ভাল দেখায় তাকেই বলি সব চেয়ে বড় বন্ধু। বন্ধুর জন্যে বন্ধুকে মানুষ ভালবাসে না—ওটা মিথ্যা কথা—মানুষ নিজের জন্যে বন্ধুকে ভালবাসে। শুধু স্বার্থ, শুধু স্বার্থ। তাই নয় কি?

    আচ্ছা অচিন্ত্য, পড়েছিস তো, ‘এতদিনে জানলেম যে কাঁদন কাদলেন সে কাহার জন্য?’ পেরেছিস কি জানতে? সে কি প্রিয়া? সে প্রিয়াকে পাব কি মেয়েমানুষের মধ্যে? কিন্তু কই? যার জন্যে জীবনভরা এই বিরাট ব্যাকুলতা সে কি ওইটুকু? দিনরাত্রি আকাশ-পৃথিবী ছাড়িয়ে গেল যার বিরহের কান্নায় সে কি ওই চপল ক্ষুদ্র ক্ষুধায় ভরা প্রাণীটা? যাকে নিঃশেষ করে সমস্ত জীবন বিলিয়ে দিতে চাই, যার জন্যে এই জীবনের মৃত্যু-বেদনা-দুঃখ-ভয়-সংকুল পথ বেয়ে চলেছি, সে প্রিয়াকে নারীর ভেতর পাই কই ভাই! কার জন্যে কান্না জানি না বটে, কিন্তু কেন তা তো জানি—এ কথা তো জানি যে এটা দিতে চাওয়ার অশ্রান্ত কান্না। দেব, দেব—মায়ের স্তন যেমন দেবার কান্নায় ব্যথাভরা আনন্দে টলমল করে ওঠে, আমাদের সমস্ত জীবন যে তেমনি ব্যথায় কাঁপছে। কিন্তু কে নেবে ভাই? কে নেবে ভাই নিঃশেষ করে আমাকে, শিশির প্রভাতের আকাশের মত নিঃস্ব, রিক্ত, শূন্য করে, বাশির বেণুর মত নিঃসম্বল করে—কে সে অচিন?”

    “কি কথা বলতে চাই বলতে পারছি না। বুকের ভেতর কি কথার ভিড় বন্ধ ঘরে মৃগনাভির তীব্র ঘ্রাণের মত নিবিড় হয়ে উঠেছে, তবু বলতে পারছি না। কত রকমের কত কথা—তার না পাই খেই না পাই ফাঁক! হাসনাহানার বন্ধ কুঁড়ির মত টনটন করছে সমস্ত প্রাণ—কিন্তু পারছি না বলতে। কাল থেকে কতবার ছন্দে দুলিয়ে দিতে চাইলুম, পারলুম না। ছন্দ দোলে না আর। বোবা বাঁশী যেন আমি, ব্যাকুল সুরের নিশ্বাস শুধু দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে—বাজাতে পারছি না। কত কথা ভাই—যদি বলতে পারতুম!

    গলসওয়ার্দির Apple Tree পড়ছিলুম—না, পড়ে ফেলেছি আজ দুপুরে। সেই না-জানা আপেল-মঞ্জরীর সুবাস বুঝি এমন উদাস করেছে। তুই সেখানে পাস খুঁজে গলসওয়ার্দির Apple Tree গল্পটা পড়িস। Pan ছাড়া এ রকম love story পড়েছি বলে তো মনে পড়ছে না।

    না, শুধু Apple Tree নয় ভাই, এই নতুন শরৎ আমার মনে কি যেন এক নেশা ধরিয়ে দিয়েছে। মরতে চাই না, কিন্তু মরতে আর ভয়ও পাই না বোধ হয়। যে একদিন অযাচিত জীবন দিয়েছিল সেই আবার কেড়ে নেবে তাতে আর ভয় কিসের ভাই। তবে একটু সকাল-সকাল এই যা। তাতে দুঃখ আছে, ভয়ের তো কিছু দেখি না। আজ পর্যন্ত তো ভাই কোটি-কোটি মানুষ এমনি করে চলে গেছে—এমনি করে নীল আকাশ শিউলি মেঘ সবুজ ঘাস বন্ধুর ভালবাসা ছেড়ে—নিস্ফল প্রতিবাদে। তবে? জীবন কেন পেয়েছিলাম তা যথন জানি না, জানি না যখন কোন পুণ্যে, তখন হারাবার সময় কৈফিয়ৎ চাইবার কি অধিকার আছে ভাই? খোঁড়া হয়ে জন্মাই নি, অন্ধ হয়ে জন্মাই নি, বিকৃত হয়ে জন্মাইনি—মার কোল পেলাম, বন্ধুর বুক পেলাম, নারীর হৃদয় পেলাম, তা যতটুকু কালের জন্যেই হোক না—আকাশ দেখেছি, সাগরের সঙ্গীত শুনেছি, আমার চোখের সামনে ঋতুর মিছিল গেছে বার বার, অন্ধকারে তারা ফুটেছে, ঝড় হেঁকে গেছে, বৃষ্টি পড়েছে, চিকুর খেলেছে—কত লীলা কত রহস্য কত বিস্ময়! তবে জীবনদেবতাকে কেন না প্রণাম করব ভাই! কেন না বলব ধন্য আমি—নমো নমো হে জীবনদেবতা!

    যা পেয়েছি তার মান কি রাখতে পেরেছি ভাই? কত অবহেলা কত অপচয় কত অপমান না করলুম! এখনো হয়তো করছি। তাই নো কেড়ে নেবে বলে জোর করে তাকে ভর্ৎসনা করতে পারি না। জানি তুলনা করে তাকে দোষ দিয়েছি কতবার, কিন্তু কি সে যে ভুল ভাই—তার খুশির দান তাতে আমার কি বলবার আছে? কারুর গলায় হয়তো সে বেশী গান দিলে, কাউকে প্রাণ বেশী, কাউকে সে সাজিয়ে পাঠালে, কাউকে না—আমায়ও তো সে রিক্ত করে জাগায়নি।

    তাই ভাবি যখন যাব তখন ভয় কেন? এখনও শিরায় জোয়ার ভাটা চলছে, স্নায়ুতে সাড়া আছে, তবে চোখ বুজে মাথা গুঁজে পড়ব কেন? যেমন অজান্তে এসেছিলাম তেমনি অজান্তে চলে যাব—হয়ত শুধু একটু ব্যথা একটু অন্ধকার একটু যন্ত্রণা। তা হোক। এখন এই নীলাভ নিথর রাত্রি, এই কোমল জ্যোৎস্না, তন্দ্রালস পৃথিবীর গুঞ্জন—সমস্ত প্রাণ দিয়ে পান করি না কেন—এই বাতাসের ক্ষীণ শীতল ছোঁয়া—এই সব।

    এমনি সুন্দর শরতের প্রভাতে নিষ্কলঙ্ক শিশিরের মত না একদিন এসেছিলাম অপরূপ এই নিখিলে। কত বিস্ময় সে সাজিয়েছে, কত আয়োজন কত প্ৰাচুৰ্য্য। কত আনন্দই না দেখলাম। হ্যাঁ, দুঃখও দেখেছি বটে, দেখেছি বটে কদৰ্যতা। মার চোখের জল দেখেছি, গলিত কুষ্ঠ দেখেছি, দেখেছি লোভের নিষ্ঠুরতা, অপমানিতের ভীরুতা, লালসার জন্য বীভৎসতা, নারীর ব্যভিচার, মানুষের হিংসা, কদাকার অহঙ্কার, উন্মাদ, বিকলা, রুগ্ন-গলিত শব। তবু— তবু তুলনা হয় না বুঝি!

    এই যে জাপানের এতগুলো প্রাণ নিয়ে একটা অন্ধ শক্তি নির্মম খেলাটা খেললে—এ দেখেও আবার যখন শান্ত সন্ধ্যায় ঝাপসা নদীর ওপর দিয়ে মন্থর না-খানি যেতে দেখি স্বপ্নের মত পাল তুলে, যখন দেখি পথের কোল পর্যন্ত তরুণ নির্ভয় ঘাসের মঞ্জি এগিয়ে এসেছে, দুপুরের অলস প্রহরে সামনের মাঠটুকুতে শালিকের চলাফেরা দেখি, তখন বিশ্বাস হয় না আমার মত না নিয়ে আমায় এই দুঃখভরা জগতে আনা তার নিষ্ঠুরতা হয়েছে।

    একটা ছোট্ট, অতি ছোট্ট পোকা—একটা পাইকা অক্ষরের চেয়ে বড় হবে না—আমার বইয়ের পাতার উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে পাখা দুটি ছড়িয়ে–কি আশ্চর্য নয়? এইবারের পৃথিৰীতে এই জীবনের পরিচিতদের মধ্যে ও-ও একজন। ওকেও যেতে হবে। আমাকেও।

    কিন্তু এমন অপরূপ জীবন কেনই বা সে দেয়, কেনই বা কেড়ে নেয় কিছু বুঝতে পারি না—শুধু এইটুকুই বিরাট সংশয় রয়ে গেল। যদি এমন নিঃশেষ করে নিশ্চিহ্ন করে মূছেই দেবে তবে এমন অপরূপ করে বিস্ময়েরও অতীত করে দিলে কেন? কেন কে বলতে পারে? এত আশা এত বিশ্বাস এত প্রেম এত সৌন্দৰ্য্য—আমার জগতের চিহ্ন পৰ্যন্ত থাকবে না—কোনো অনাগত কালের তৃণের রস জোগাবে হয়ত আমার দেহের মাটি—অনাগত মানুষের নীলাকাশতলে তাদের রৌদ্রে তাদের বাতাসে তাদের ঝড়ে তাদের বর্ষায় থাকব ধূলা হয়ে বাষ্প হয়ে।  প্ৰীতি-বিনিময় তোর সাথে আমার, দুদিনের জীবনবুদ্বদের সঙ্গে দুদিনের জীবনবুদ্বুদের। তবু জয়তু জীবন জয়, জয় জয় সৃষ্টি—”

    কুস্তি করে সারা গায়ে মাথায় ধুলো মাটি মাখা—কাপড়ের খুঁটটা শুধু গায়ের উপর মেলে দেওয়া—সকালবেলা ভবানীপুরের নির্জন রাস্তা ধরে বাঁশের আড়বাঁশি বাজিয়ে ঘুরে বেড়াত কে একজন। কোন নিপুণ ভাস্কর্যের প্রতিমূর্তি তার শরীর, সবল, সুঠাম, সুতনু। বলশালিতা ও লাবণ্যের আশ্চর্য সমন্বয়। সে দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী। ভবিষ্যতে ভারতবর্ষের যে একজন শ্রেষ্ঠ ভাস্কর হবে, যৌবনের প্রারম্ভেই তার নিজের দেহে তার নির্ভুল আভাস এনেছে। ব্যায়ামে বলসাধনে নিজের দেহকে নির্মাণ করেছে গঠনগৌরবদৃপ্ত, সর্বসঙ্গত করে।

    ইস্কুলে যে-বছর প্রেমেনকে গিয়ে ধরি সেই বছরই দেবীপ্রসাদ বেরিয়ে গেছে চৌকাট ডিঙিয়ে। কিন্তু ভবানীপুরের রাস্তায় ধরতে তাকে দেরি হল না। শম্ভুনাথ পণ্ডিত স্ট্রিট ও চৌরঙ্গীর মোড়ের জায়গাটাতে তখন একটা একজিবিশন হচ্ছে। জায়গাটার হারানো নাম পোড়াবাজার। নামের জন্যেই একজিবিশনটা শেষ পর্যন্ত পুড়ে গিয়েছিল কিনা কে বলবে। একদিন সেই একজিবিশনে দেবীপ্রসাদের সঙ্গে দেখা—একটি সুবেশ সুন্দর ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা কইছে। ভদ্রলোক চলে গেলে জিগগেস করলাম, কে ইনি? দেবীপ্রসাদ বললে, মণীন্দ্রলাল বসু।

    এই সেই? ভিড়ের মধ্যে তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলাম। কোথাও দেখা পেলাম না। এর কত বছর পর মণীন্দ্রলালের সঙ্গে দেখা। “কল্লোল” যখন খুব জমজমাট তখন তিনি ইউরোপে। তারপর “কল্লোল” বার হবার বছর পাঁচেক পরে “বিচিত্রা”য় যখন সাব-এডিটরি করি তখন ভিয়েনা থেকে লেখা তাঁর ভ্রমণকাহিনীর প্রুফ দেখেছি।

    “আভ্যুদয়িক” উঠে গেল। তার সব চেয়ে বড় কারণ হাতের কাছে “কল্লোল” পেয়ে গেলাম। যা চেয়েছিলাম হয়তো, তৈরি কাগজ আর জমকালো আড্ডা। সে সব কথা পরে আসছে।

    একদিন দুজনে, আমি আর প্রেমেন, সকালবেলা হরিশ মুখার্জি রোড ধরে যাচ্ছি, দেখি কয়েক রশি সামনে গোকুল নাগ যাচ্ছে, সঙ্গে দুইজন ভদ্রলোক। লম্বা চুল ও হাতে লাঠি গোকুল চিনতে দেরি হয় না কখনো।

    বললাম, ‘ঐ গোকুল নাগ। ডাকি।’

    ‘না, না, দরকার নেই।’ প্ৰেমেন বারণ করতে লাগল।

    কে ধার ধারে ভদ্রতার! “গোকুলবাবু” “গোকুলবাবু” বলে রাস্তার মাঝেই উচ্চস্বরে ডেকে উঠলাম। ফিরল গোকুল আর তার দুই সঙ্গী।

    প্রেমেনের তখন দুটি গল্প বেরিয়ে গেছে “প্রবাসী”তে—“শুধু কেরাণী” আর “গোপনচারিণী”। আর, সেই দুটি গল্প বাংলা সাহিত্যের গুমোটে সজীব বসন্তের হাওয়া এনে দিয়েছে। এক গল্পেই প্রেমেনকে তখন একবাক্যে চিনে ফেলার মত।

    পরস্পরের সঙ্গে পরিচয় হল। কিন্তু গোকুলের সঙ্গে ঐ দুজন সুচারুদর্শন ভদ্রলোক কে?

    একজন ধীরাজ ভট্টাচার্য।

    আরেকজন?

    ইনি শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। সানন্দবিস্ময়ে তাকালাম ভদ্রলোকের দিকে। বাংলা সাহিত্যে ইনিই সেই কয়লাকুঠির আবিষ্কর্তা! নিঃস্ব রিক্ত বঞ্চিত জনতার প্রথম প্রতিনিধি? বাংলা সাহিত্যে যিনি নতুন বস্তু নতুন ভাষা নতুন ভঙ্গি এনেছেন? হাতির দাঁতের মিনারচূড়া ছেড়ে যিনি প্রথম নেমে এসেছেন ধুলিম্লান মৃত্তিকার সমতলে?

    বিষণ্ণ মমতায় চোখের দৃষ্টিটি কোমল। তখন শৈলজা ‘আনন্দ’ হয়নি, কিন্তু আমাদের দেখে তার চোখ আনন্দে জ্বলে উঠল। যেন এই প্রথম আলাপ হল না, আমরা যেন কত কালের পরিচিত বন্ধু।

    ‘কোথায় যাচ্ছেন?’ জিগগেস করলাম গোকুলকে।

    ‘এই রূপনন্দন না রসনন্দন মুখার্জি লেন। মুরলীবাবুর বাড়ি। মুরলীবাবু মানে ‘সংহতি’ পত্রিকার মুরলীধর বসু।’

    মনে আছে বাড়িতে মুরলীবাবু নেই—কি করা—গোকুলের লাঠির ডগা দিয়ে বাড়ির সামনেকার কাঁচা মাটিতে সবাই নিজের নিজের সংক্ষিপ্ত নাম লিখে এলাম। মনে আছে গোকুল লিখেছিল G. C.—তার নামের ইংরিজি আদ্যাক্ষর। সেই নজিরে দীনেশরঞ্জনও ছিলেন D. R.। কিন্তু গোকুলকে সবাই গোকুলই বলত, G. C. নয়, অথচ দীনেশরঞ্জনকে সবাই ডাকত, D.R.। এ শুধু নামের ইংরিজি আদ্যাক্ষর নয়, এ একটি সম্পূর্ণ অর্থান্বিত শব্দ। এর মানে সকলের প্রিয়, সকলের সুহৃৎ, সকলের আত্মীয় দীনেশরঞ্জন।

  • চিঠি

    চিঠি

    চিঠি

    গেস্ট হাউসটা দোতলায়। পুরো দোতলাটা জুড়েই। সরু একটা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। সব মিলিয়ে চারটে ঘর, হুবহু এক ভাবে সাজানো–দুটো সিঙ্গল খাট, একটা ডেস্ক আর-একটা চেয়ার। ঘরগুলোর সামনে দিয়ে টানা একটা জায়গা। তার খানিকটা বারান্দা, খানিকটা ডাইনিং রুম, আর একদিকে রান্না-বান্নার ব্যবস্থা। বারান্দার শেষপ্রান্তে একটা বাথরুম, শাওয়ার লাগানো। গোটা বাড়িটায় এটুকুই যা বিলাসিতার ছোঁয়া। বাথরুমটা দেখে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল কানাই। পুকুরে গিয়ে স্নান করতে হবে ভেবে ও একটু ভয়ে ভয়েই ছিল এতক্ষণ।

    ডাইনিং টেবিলের ওপর ঝকঝকে স্টেনলেস স্টিলের একটা টিফিন ক্যারিয়ার। ওর রাতের খাবার, কানাই আন্দাজ করল। নিজের সংসারের সব দুশ্চিন্তা সত্ত্বেও ময়না খাবারটা রেখে যেতে ভোলেনি। ঘুরে ফিরে দেখে একটা ঘরে ওর সুটকেসটা রাখল কানাই। ওরই জন্যে মনে হয় গুছিয়ে গাছিয়ে রাখা হয়েছে ঘরটা। তারপর ধীরে সুস্থে সিঁড়ির দিকে এগোল।

    ছাদের ওপর উঠে এসে চোখ জুড়িয়ে গেল কানাইয়ের। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সারা আকাশ লালে লাল। ভাটা পড়ে গেছে অনেকক্ষণ, দ্বীপগুলো জলের অনেক ওপরে মাথা তুলে জেগে রয়েছে। নীচে নদীর জলেও যেন লাল আবির ছড়িয়ে রয়েছে। ছাদটায় এক চক্কর মেরে কানাই দেখল এদিকে ওদিকে সব মিলিয়ে অন্তত গোটা ছয়েক দ্বীপ দেখা যাচ্ছে কাছাকাছি। আর আটটা নদী’। লুসিবাড়ির দক্ষিণে আর কোনও দ্বীপেই জনবসতি নেই। খেত-জমি বাড়ি-ঘরেরও তাই কোনও চিহ্ন নেই। গভীর ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে ঢাকা দ্বীপগুলো।

    ছাদের একধারে একটা লম্বাটে টিনের চালাঘর। দরজায় তালা আঁটা। এটাই তা হলে মেশোর পড়াশোনার ঘর ছিল। নীলিমার দেওয়া চাবিটা দিয়ে তালাটা খুলল কানাই। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল। মুখোমুখি উলটোদিকের দেওয়াল ভর্তি তাক, কাগজ আর বইপত্রে ঠাসা। একটাই মাত্র জানালা ঘরটার পশ্চিম দিকে। সেটা খুলে দিল কানাই। এখান থেকে রায়মঙ্গলের মোহনাটা দেখা যায়। জানালার ঠিক নীচে ডেস্ক। তার ওপর একটা দোয়াত, কয়েকটা কালির কলম, একটা পুরনো ধাঁচের অর্ধগোলাকার ব্লটার সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা। মনে হচ্ছে যেন কাছেই কোথাও গেছে নির্মল, একটু পরেই ফিরে এসে কাজে বসবে। ব্লটারটার নীচে বেশ বড়সড় একটা বন্ধ খাম, কানাইয়ের নাম লেখা। খামটা কয়েকপ্রস্থ প্লাস্টিকে মোড়া। সেগুলোকে আবার গঁদের আঠা দিয়ে জোড়া হয়েছে। তার ওপর বোধহয় কোনও নোটবই থেকে ছেঁড়া টুকরো একটা কাগজে কুড়ি বছর আগের নির্মলের হাতে লেখা কানাইয়ের নাম ঠিকানা। দু’আঙুলে চাপ দিয়ে বুঝতে পারল না কানাই ভেতরে কী আছে। কী করে প্যাকেটটা খোলা যাবে সেটাও কিছু বোঝা গেল না। প্লাস্টিকের পরতগুলো একেবারে গায়ে গায়ে সেঁটে গেছে মনে হচ্ছে। চারদিকে তাকিয়ে জানালার তাকের ওপর আধখানা দাড়ি কামানোর ব্লেড দেখতে পেল কানাই। সেটা নিয়ে এসে সাবধানে খামটার একদিকে কাটতে শুরু করল। বেশ কয়েক পরত কেটে ফেলার পর প্যাকেটটার ভেতরের বস্তুটা নজরে এল। একটা বাঁধানো খাতা। পাখির বাসার মধ্যে ডিমের মতো সযত্নে রাখা। একটু আশ্চর্য হল কানাই। ও ভেবেছিল হয়তো এক গোছা খোলা পাতা থাকবে, কবিতা বা প্রবন্ধ লেখা। একটা গোটা বাঁধানো খাতা ঠিক আশা করেনি। কয়েকটা পাতা উলটে পালটে দেখল। ঘন করে বাংলায় লেখা। জায়গা বাঁচানোর জন্য এত ছোট ছোট করে লেখা হয়েছে যে প্রায় গায়ে গায়ে লেগে গেছে লাইনগুলো। হাতের লেখাও ট্যারাবাকা, দেখেই মনে হয় খুব তাড়াহুড়ো করে লেখা হয়েছে। কাটাকুটিতে ভর্তি সমস্ত খাতাটা, একেকটা লাইন মার্জিনের বাইরে বেরিয়ে পড়েছে। এতগুলি প্লাস্টিকের মোড়কের মধ্যে রাখা সত্ত্বেও ছোপ ছোপ ড্যাম্প ধরে গেছে মাঝে মাঝে। কয়েক জায়গায় তো লেখা এমন ঝাপসা হয়ে গেছে যে প্রায় পড়াই যায় না।

    লেখাটার প্রথম কয়েকটা শব্দ খুবই অস্পষ্ট। খাতাটা প্রায় নাকের কাছে নিয়ে এসে সেগুলো পাঠোদ্ধার করতে হল। প্রথম পাতার একেবারে ওপরে বাঁদিকে তারিখ আর সময় ইংরাজিতে লেখা : May 15, 1979, 5.30 a.m. তার ঠিক নীচে কানাইয়ের নাম। বিশেষ কোনও সম্ভাষণ দিয়ে শুরু না হলেও, পড়তে শুরু করলেই বোঝা যায় এটা আসলে কানাইয়ের জন্যই লেখা লম্বা একটা চিঠি।

    প্রথম কয়েকটা লাইন পড়তেই সে ব্যাপারে নিঃসন্দিগ্ধ হয়ে গেল কানাই : “এ লেখাটা আমি এমন একটা জায়গায় বসে লিখছি যে জায়গার নাম তুমি হয়তো শোনেইনি। ভাটির দেশের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তের এই দ্বীপের নাম মরিচঝাঁপি..”

    খাতা থেকে মুখ তুলে নামটা নিয়ে মনের মধ্যে কয়েকবার নাড়াচাড়া করল কানাই। অভ্যাসের বশেই প্রায় শব্দটার একটা মানেও চলে এল মনে : ‘লঙ্কার দ্বীপ।

    আবার খাতার দিকে মন দিল ও :

    “ঘড়ির কাটা যেন আর ঘুরতেই চাইছে না। অজানা এক ভয়ংকরের আশঙ্কায় কাটছে প্রতিটা মুহূর্ত। মনে হচ্ছে যেন খানিক বাদেই এসে আছড়ে পড়বে প্রচণ্ড সাইক্লোন, আমরা সবাই যেন তার অপেক্ষায় গুটিসুটি মেরে ঘরের ভেতরে বসে আছি। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। একেকটা সেকেন্ড মনে হচ্ছে একেকটা যুগ। বাতাসও যেন গম্ভীর, স্থির হয়ে আছে। সময় যেন নিথর হয়ে গেছে ভয়ের ধাক্কায়।

    অন্য কোনও পরিস্থিতিতে হলে হয়তো এরকম ক্ষেত্রে আমি কিছু একটা পড়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু এখন এই খাতা, ডটপেন আর রিলকের দুইনো এলিজির ইংরাজি আর বাংলা অনুবাদগুলো ছাড়া আর কিছুই নেই আমার সঙ্গে। এমনিতেও অবশ্য খানিকক্ষণ আগে পর্যন্ত কিছুই পড়া সম্ভব ছিল না। কারণ এইমাত্র ভোরের আলো ফুটছে, আর আমি বসে আছি একটা ঘঁচের বেড়ার ঘরে, যেখানে একটা মোমবাতি পর্যন্ত নেই। ছাঁচের বেড়ার ফাঁক দিয়ে সামনে গারল নদী দেখা যাচ্ছে। সবে মাত্র সূর্য উঠতে শুরু করেছে, আর তার সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নদীর জল। জোয়ার আসছে। আশেপাশের দ্বীপগুলো তলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। খানিক পরেই মেরু সমুদ্রের আইসবার্গের মতো ওগুলোর বেশিরভাগটাই চলে যাবে জলের নীচে। শুধু সবচেয়ে উঁচু গাছের চুড়াগুলো জেগে থাকবে নদীর ওপর। এখনই দ্বীপের ধারের চর আর জালের মতো ঠেসমূলগুলোর ওপর দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে–শেকড়-বাকরগুলি জলের নীচে কেমন একটা ঝাপসা ভূতুড়ে চেহারা নিয়েছে মনে হচ্ছে যেন ওগুলো কোনও সামুদ্রিক আগাছা, থিরথির করে কাঁপছে স্রোতের টানে। একটু দূরে একঝাক বক উড়ে যাচ্ছে জলের ঠিক ওপর দিয়ে। জোয়ার আসছে, তাই ডুবন্ত দ্বীপগুলোর থেকে দূরে কোনও নিশ্চিন্ত আস্তানার খোঁজে যাচ্ছে ওরা। ভোর হচ্ছে, ভাটির দেশের মিষ্টি সুন্দর ভোর।

    যে ঘরটায় আমি এখন বসে আছি সেটা আসলে আমার ঘর নয়। আমি এখানে অতিথি। এ ঘরের মালকিনকে তুমি চেন–কুসুম। প্রায় বছরখানেক হল ও ছেলেকে নিয়ে এখানে আছে। আচ্ছা, এই এক বছর রোজই তো ঘুম ভেঙে উঠে ওরা এই রকম ভোর দেখেছে–কুসুম আর ফকির। কেমন লেগেছে ওদের? ওদের প্রতিদিনের জীবন-যাপনের যন্ত্রণায় কতটুকু শান্তির প্রলেপ দিতে পেরেছে এই ভোর? কে বলতে পারে? এখন, এই অন্তহীন অপেক্ষার সময়, আমার শুধু কবির কথাগুলোই মনে পড়ছে:

    ‘সৌন্দর্য আর-কিছু নয়,

    শুধু সেই আতঙ্কের আরম্ভ, যা অতি কষ্টে আমাদের পক্ষে নয়

    এখনো অসহনীয়। আরাধ্য সে আমাদের, যেহেতু সে শান্ত উপেক্ষায়

    তার সাধ্য সংহার হানে না।’

    কাল সারারাত ধরে আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি, কাকে ভয় পাচ্ছি আমি? কীসের ভয়? আজ, এই সূর্যোদয়ের সময় আমি সে প্রশ্নের উত্তর পেলাম। আমি ভয় পাচ্ছি কারণ আমি জানি এই ঝড় কেটে গেলে তার আগের কথা কেউ আর মনে রাখবে না। এই ভাটির দেশের পলি কত তাড়াতাড়ি অতীতকে ঢেকে দেয় তা আমার চেয়ে ভাল তো আর কেউ জানে না।

    যে অনাগত ভয়ংকরের অপেক্ষায় আমরা এখানে প্রহর গুনছি, তাকে বাধা দেওয়ার মতো শক্তি আমার নেই। কিন্তু এক সময় তো আমি সাহিত্যচর্চা করেছি। যা এখানে ঘটছে, ঘটতে চলেছে, তার কিছুটা তো আমি লিখে রেখে যেতে পারি। একটু তো অন্তত দাগ রেখে যেতে পারি মহাকালের স্মৃতির পাতায়। এই ভাবনা আর এই ভয়ই আমাকে দিয়ে আজ এক অসাধ্য সাধন করিয়ে নিল–তিরিশ বছর পর কলম ধরিয়ে ছাড়ল আমাকে।

    জানি না কতটা সময় আমার হাতে আছে। হয়তো শুধু আজকের দিনটাই। তার মধ্যেই আমি চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব লিখে রেখে যেতে যদি কোনওদিন তোমার হাতে গিয়ে পৌঁছয় এ লেখা। তুমি হয়তো ভাববে, এত লোক থাকতে তোমার জন্যই কেন লিখছি। কারণ হিসাবে এটুকুই আমি বলতে পারি যে এ গল্প আসলে আমার গল্প নয়। যাকে নিয়ে এই লেখা, লুসিবাড়িতে থাকার দিনগুলিতে সেই ছিল তোমার একমাত্র সঙ্গী। সে হল কুসুম। আমার জন্য না হলেও, কুসুমের কথা মনে করে অন্তত লেখাটা পড়ো।”

  • আলাপ

    আলাপ

    আলাপ

    স্নান সেরে জানালার পাশে চেয়ারটায় গা ডুবিয়ে বসল পিয়া। খানিক পরে দেখল ওর আর ওঠার ক্ষমতা নেই। এই কদিন স্রেফ উবু হয়ে আর আসন করে বসে থাকার পর একটা হেলান দেওয়ার জায়গা পেয়ে কেমন যেন এক অদ্ভুত আরামের অনুভূতি হচ্ছে। ইচ্ছেমতো পা-ও দোলানো যাচ্ছে–পড়ে যাওয়ার কোনও ভয় নেই। এখনও মনে হচ্ছে নৌকোর দুলুনি টের পাচ্ছে সারা শরীরে, কানে বাজছে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের ঝিরঝির শব্দ।

    নৌকোয় চলার বোধটা ফেরত আসতেই হঠাৎ সকালের সেই ভয়ংকর ঘটনার কথা মনে পড়ে গা শিউরে উঠল পিয়ার। মাত্রই কয়েকঘন্টা আগের ঘটনা অনুভূতিগুলি যেন এখনও স্মৃতি হয়ে যায়নি; টাটকা, স্পষ্ট রয়ে গেছে মনের মধ্যে। পরিষ্কার দেখতে পেল পিয়া কুমিরটার মাথা মোচড় খেয়ে ঘুরে যাচ্ছে শূন্যে, দেখতে পেল এক মুহূর্ত আগেও ওর কবজিটা যেখানে ছিল ঠিক সেইখানটায় এসে খপাত করে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সরীসৃপটার হাঁ মুখ : হাতটা ধরে ফেলবে বলে এত নিশ্চিত ছিল কুমিরটা, যে ওকে ডিঙি থেকে টেনে জলের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য শরীরের চলন যেরকম হওয়া দরকার ঠিক সেইভাবেই লাফ দিয়েছিল ওটা। পিয়া কল্পনা করল একটানে ওকে জন্তুটা নিয়ে চলে যাচ্ছে জলের নীচে, একবার মুহূর্তের জন্য আলগা হচ্ছে কামড়, তারপর ওর শরীরের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় এসে ফের বন্ধ হচ্ছে হাঁ-মুখ। দ্রুত ওকে নিয়ে চলে যাচ্ছে সেই অদ্ভুত উজ্জ্বল গভীরে, যেখানে সূর্যের আলোর কোনও দিক-দিশা নেই, যেখানে বোঝা যায় না কোনদিকে গেলে ওপরে ওঠা যাবে, আর কোনদিকে গেলে তলিয়ে যাবে আরও নীচে। লঞ্চ থেকে পড়ে যাওয়ার সময়কার আতঙ্কের কথা মনে পড়ে গেল ওর, মনে পড়ল সেই শরীর অবশ করা ভয়ের কথা, যখন চেতনার মধ্যে একটাই কথা বাজতে থাকে–এই অতল কারা থেকে মুক্তির কোনও উপায় নেই। পর পর এই সব দৃশ্যগুলো চোখের সামনে এসে এমন এক স্পষ্ট জীবন্ত মন্তাজ তৈরি হল যে পিয়ার হাত আবার থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। আর ফকিরের অনুপস্থিতিতে ঘটনাগুলিকে তখনকার থেকে অনেক বেশি ভয়াবহ মনে হল এখন।

    জোর করে উঠে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল পিয়া। এখনও চাঁদ ওঠেনি, অন্ধকারে ঝুপসি কয়েকটা নারকেলগাছ আবছা নজরে আসছে, তার পরেই ফসল কাটা ন্যাড়া জমির বিস্তীর্ণ শূন্যতা। বাড়ির সামনের দিক থেকে একটা কথাবার্তার আওয়াজ ভেসে আসছে : কোনও মহিলার গলা আর তার সঙ্গে কানাইয়ের ভারী গম্ভীর কণ্ঠস্বর।

    চেয়ার থেকে শরীরটাকে টেনে তুলে একতলায় নেমে এল পিয়া। দরজাটার সামনে হাতে একটা লণ্ঠন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কানাই লাল শাড়ি পরা এক মহিলার সঙ্গে কথা বলছে। খানিকটা অন্যদিকে ফিরে দাঁড়িয়েছিল মহিলা, পিয়াকে আসতে দেখে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে কানাইয়ের লণ্ঠনের আলোয় হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার মুখের একটা পাশ। পিয়া দেখল ওরই কাছাকাছি বয়স হবে মেয়েটির, ভরা শরীর, চওড়া হাঁ মুখ আর বড় বড় ঝকঝকে দুটো চোখ। দুই ভুরুর মাঝে বড় একটা লাল টিপ আর মাথায় চকচকে কালো চুলের মাঝখান দিয়ে একটা ক্ষতচিহ্নের মতো মোটা করে টকটকে লাল সিঁদুরের দাগ।

    “আরে এই যে পিয়া”, কানাই বলল ইংরেজিতে। ওর গলায় বাড়তি উচ্ছ্বাসের সুরটা থেকে পিয়া আন্দাজ করল ওকে নিয়েই কথা হচ্ছিল এতক্ষণ। দেখল মেয়েটি স্পষ্ট স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে, যেন বুঝতে পেরেছে ও কে, আর মনে মনে যাচাই করে নিচ্ছে ওকে। তারপর ওই খোলা নজরে জরিপ করার মতোই অস্বস্তিকর ভঙ্গিতে হঠাৎ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল মুখটা। কানাইয়ের হাতে কয়েকটা স্টেনলেস স্টিলের কৌটো ধরিয়ে দিয়ে নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে; তারপর অন্ধকারে ঢাকা ট্রাস্ট চৌহদ্দির মধ্যে মিলিয়ে গেল কোথায়।

    “কে ওই মহিলা?” পিয়া জিজ্ঞেস করল কানাইকে।

    “বলিনি আপনাকে? ও তো ময়না, ফকিরের বউ।”

    “তাই বুঝি?”

    ফকিরের বউয়ের চেহারা যেমন কল্পনা করেছিল পিয়া তার থেকে ময়না এতটাই আলাদা যে ব্যাপারটা হজম করতে একটু সময় লাগল ওর। তারপর বলল, “বোঝা উচিত ছিল আমার।”

    “কী বোঝা উচিত ছিল?”

    “যে ও ফকিরের বউ। ছেলেটার চোখদুটো ঠিক ওর মতো।”

    “তাই নাকি?”

    “হ্যাঁ,” বলল পিয়া। “কী বলতে এসেছিল ও?”।

    “এই যে, এই টিফিন ক্যারিয়ারটা দিয়ে গেল,” স্টিলের কৌটোগুলো তুলে দেখাল কানাই। “আমাদের রাতের খাবার আছে এর মধ্যে। হাসপাতালের রান্নাঘর থেকে ময়না নিয়ে এসেছে আমাদের জন্য।”

    মুহূর্তের জন্য কানাইয়ের ওপর থেকে মনোযোগ সরে গেল পিয়ার। ওই মেয়েটির কথা ভাবছিল ও, ফকিরের বউয়ের কথা। ফকির আর টুটুলের কাছে ফিরে গেল বউটি, আর ওকে ফিরে যেতে হবে গেস্ট হাউসের দোতলার শূন্যতায় ভেবে অল্প একটু ঈর্ষা হল মনে। এই চিন্তায় নিজেরই লজ্জা লাগল পিয়ার, আর সেটা ঢাকার জন্য ও কানাইয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে তাড়াতাড়ি বলল, “আমি যেরকম ভেবেছিলাম তার সঙ্গে কোনওই মিল নেই ওর।”

    “মিল নেই?”

    “না।” আবার পিয়া দেখল ঠিক উপযুক্ত শব্দটা কিছুতেই মনে আসছে না। বলল, “মানে, বেশ ভালই দেখতে, না?”

    “আপনার তাই মনে হল?”

    বুঝতে পারছিল পিয়া এ প্রসঙ্গটা এখানেই শেষ করে দেওয়া ভাল, কিন্তু তাও থামল না, ক্ষতস্থানের ওপর থেকে মামড়ি খুঁটে তোলার মতো বলেই যেতে লাগল : “তাই তো। বেশ সুন্দরীই বলা চলে।”

    “ঠিকই বলেছেন, নিজেকে সামলে নিয়ে একটু মোলায়েম সুরে বলল কানাই। “খুবই অ্যাট্রাক্টিভ। কিন্তু আরও গুণ আছে ওর সেসব দেখতে গেলে খুব একটা সাধারণ মেয়ে নয় ময়না।”

    “তাই নাকি? কী রকম?”

    “অদ্ভুত ওর জীবনের কাহিনি,” বলল কানাই। “অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও নিজের চেষ্টায় লেখাপড়া শিখেছে, শিগগিরই হয়তো পুরোদস্তুর নার্স হয়ে যাবে এই হাসপাতালে, নিজের এবং পরিবারের জন্য ও ঠিক কী চায় সেটা ও জানে, এবং সেটা অর্জন করার জন্য যে-কোনও বাধাকে তুচ্ছ করে এগিয়ে যাওয়ার জোর ওর আছে। ওর মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, এক ধরনের বলিষ্ঠতা আছে। অনেকদূর যাবে ওই মেয়ে।”

    কানাইয়ের কথার মধ্যে কোথায় যেন একটা তুলনামূলক বিচারের আভাস রয়েছে মনে হল। সেই বিচারে ও নিজে কোন জায়গায় দাঁড়াবে মনে মনে না ভেবে পারল না পিয়া–ওর কখনওই বিশেষ কোনও উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না, আর পড়াশোনা শেখার জন্যও কখনও নিজের চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করতে হয়নি। ও জানে, কানাইয়ের চোখে ও একটা নরম-সরম, বাপ-মার আদরে মানুষ হওয়া সাদামাটা ধরনের মেয়ে। তবে এই ভাবে ওকে বিচার করার জন্য কানাইকে দোষ দেয় না পিয়া; কানাইয়ের সম্পর্কেও তো ওর যেমন মনে হয় যে বিশেষ একটা ধাঁচের ভারতীয় ছেলেরা যে রকম হয় সেই রকম ধরনের মানুষ ও–দাম্ভিক, আত্মকেন্দ্রিক, জোর করে নিজের মতামত অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে আগ্রহী–তবু, এ সব কিছু সত্ত্বেও অপছন্দ করার মতো নয়।

    এবার একটা নিরাপদ দিকে কথা ঘোরাল পিয়া, “ওরা কি এই লুসিবাড়িরই লোক? ফকির আর ময়না?”

    “না,” কানাই বলল। “ওদের দুজনেরই বাড়ি ছিল অন্য একটা দ্বীপে, সাতজেলিয়ায়। এখান থেকে অনেকটা দূরে।”

    “তা হলে ওরা এখানে কেন থাকে?”

    “একটা কারণ হল ময়না এখানে নার্সিং-এর ট্রেনিং নিচ্ছে, আর একটা কারণ হচ্ছে ও ছেলেকে লেখাপড়া শেখাতে চায়। ফকির টুটুলকে নিয়ে মাছ ধরতে চলে গিয়েছিল বলেই তাই রেগে গেছে ময়না।”

    “দু’দিন ধরে আমিও যে ছিলাম ওই নৌকোতে সেটা ও জানে?”

    “জানে,” বলল কানাই। “সবই জানে–ফরেস্ট গার্ড টাকা নিয়ে নিয়েছিল, আপনি জলে পড়ে গিয়েছিলেন, আপনাকে বাঁচাতে ফকির ঝাঁপ দিয়েছিল–সব। কুমিরের ঘটনাটাও জানে দেখলাম–বাচ্চাটা সব বলেছে ওকে।”

    কানাই যে শুধু বাচ্চার কথাটাই উল্লেখ করছে সেটা লক্ষ করল পিয়া : তার মানে কি ফকির ময়নাকে বিশেষ কিছু বলেনি এই দু’দিনের ঘটনা সম্পর্কে, না কি ও অন্য রকম কিছু বিবরণ দিয়েছে? এই দুটো প্রশ্নের কোনওটারই উত্তর কানাইয়ের জানা আছে কিনা বুঝতে পারল না পিয়া, কিন্তু জিজ্ঞেসও করে উঠতে পারল না নিজে থেকে। তার বদলে বলল, “ময়না নিশ্চয়ই ভাবছে আমি কী করতে এসেছি এখানে?”

    “সে তো বটেই,” বলল কানাই। “আমাকে জিজ্ঞেসও করল। আমি বললাম যে আপনি একজন বৈজ্ঞানিক। খুব ইমপ্রেসড হল ও।”

    “কেন?”

    “বুঝতেই পারছেন, লেখাপড়া সংক্রান্ত যে-কোনও বিষয়েই ওর খুব আগ্রহ।”

    “ওকে বললেন নাকি যে আমরা কাল যাব ওদের বাড়িতে?”

    “বললাম,” কানাই জবাব দিল। “ওরা থাকবে বাড়িতে, অপেক্ষা করবে আমাদের জন্য।” কথা বলতে বলতে দোতলায় গেস্ট হাউসে উঠে এসেছে কানাই আর পিয়া। হাতের টিফিন ক্যারিয়ারটা টেবিলের ওপর রাখল কানাই। “নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে আপনার?” বাটিগুলো আলাদা করতে করতে জিজ্ঞেস করল ও। “সব সময় এত খাবার নিয়ে আসে ময়না–আমাদের দুজনের কুলিয়ে বেশি হয়ে যাবে। দেখি কী এনেছে–ভাত আছে, ডাল আছে, মাঝের ঝোল আছে, চচ্চড়ি আর বেগুন ভাজা। নিন, কী দিয়ে শুরু করবেন?”

    পাত্রগুলোর দিকে একটু সংশয়ের দৃষ্টিতে তাকাল পিয়া। বলল, “কিছু মনে করবেন না আশা করি, কিন্তু এগুলোর একটাও কিছু খাওয়ার সাহস নেই আমার। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আমাকে খুব সাবধানে থাকতে হয়।”

    “এমনি ভাত খান হলে একটু,” কানাই বলল। “সেটা তো খেতেই পারেন?” মাথা নাড়ল পিয়া। “হ্যাঁ, সেটা হয়তো খেতে পারি একটু–শুধু প্লেন, সাদা ভাত।”

    “এই নিন।” কয়েক হাতা ভাত পিয়ার প্লেটে তুলে দিল কানাই। একটা চামচও দিল। তারপর জামার হাতাটা গুটিয়ে, নিজের থালাতে খানিকটা ভাত নিয়ে খেতে শুরু করল হাত দিয়ে।

    খেতে খেতে লুসিবাড়ির বিষয়ে অনেক কথা বলল কানাই। ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের কথা বলল, কী করে এই দ্বীপে বসতি শুরু হল সে কথা বলল, নির্মল আর নীলিমা কীভাবে এখানে এসেছিল সেই গল্প করল। জায়গাটার বিষয়ে ও এত্ব কিছু জানে দেখে শেষে পিয়া জিজ্ঞেস করল, “আপনার কথা শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে যেন আপনি বহু দিন কাটিয়েছেন এখানে। কিন্তু সেটা তো ঠিক নয়, তাই না?”

    পিয়ার বক্তব্য সমর্থন করল কানাই, “একেবারেই না। আমি এর আগে একবার মাত্র এসেছিলাম এখানে। ছোটবেলায়। সত্যি কথা বলতে কী, এখনও এত স্পষ্ট সব কিছু মনে আছে দেখে আমি নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি। আরও বিশেষ করে, কারণ আমাকে তো আসলে শাস্তি দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল এখানে।”

    “কেন আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছেন?”

    কাধ ঝাঁকাল কানাই। “আমি আসলে যে ধরনের মানুষ তাতে আমার পক্ষে এটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। আমি অতীত আঁকড়ে পড়ে থাকি না। সব সময় সামনের দিকে তাকিয়ে চলতে পছন্দ করি।”

    “কিন্তু এখানে, এই লুসিবাড়িতে এখন তো আমরা অতীতে নেই, আমরা তো বর্তমানে আছি, তাই না?” হেসে বলল পিয়া।

    “মোটেও না,” জোর দিয়ে বলল কানাই। “আমার কাছে লুসিবাড়ি সবসময় অতীতেরই অংশ হয়ে থাকবে।”

    ভাত শেষ হয়ে গিয়েছিল পিয়ার, টেবিল থেকে উঠে থালা বাসনগুলো গুছোতে শুরু করল ও। তাই দেখে ব্যস্ত হয়ে উঠল কানাই।

    “আরে, বসে পড়ুন। আপনি আবার এগুলোতে কেন হাত দিচ্ছেন? ওসব ময়না করে নেবে এখন।”

    “আমি ময়নার থেকে কিছু খারাপ করব না,” পিয়া জবাব দিল।

    কানাই কাঁধ ঝাঁকাল। “বেশ।”

    নিজের প্লেটটা ধুতে ধুতে পিয়া বলল, “এই যে আপনি এখানে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করলেন, এত কিছু করলেন, কিন্তু আমার এদিকে মনে হচ্ছে আমি তো আপনার সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানি না বলতে গেলে। শুধু নামটা ছাড়া।”

    “তাই?” একটু অবাক হয়ে হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল কানাই। “কেমন করে ঘটল। এই আশ্চর্য ঘটনাটা বলুন তো? আমার খুব একটা বাক্ সংযম আছে বলে তো বাজারে কোনও দুর্নাম নেই।”

    “তা হলেও, কথাটা সত্যি। এমনকী আপনি কোথায় থাকেন সেটা পর্যন্ত আমি জানি না।”

    “এক্ষুনি সব সমস্যার সমাধান করে দিচ্ছি,” কানাই বলল। “আমি থাকি নতুন দিল্লিতে, আমার বয়স বিয়াল্লিশ এবং বেশিরভাগ সময়েই আমি সঙ্গিনীহীন।”

    “তাই বুঝি?” একটু কম ব্যক্তিগত দিকে কথা ঘোরাল পিয়া, “আর আপনি তো ট্রান্সলেটর, তাই না? এই একটা কথা বলেছিলেন মনে আছে আমার।”

    “একদম ঠিক। মৌখিক এবং লিখিত অনুবাদের কাজ করি আমি। যদিও এখন সেসব কিছুর চেয়ে ব্যবসাটাই বেশি করে করছি। বছর কয়েক আগে আমি খেয়াল করি যে দিল্লিতে পেশাদার ভাষাবিদের সংখ্যা খুব কম। তখন নিজেই একটা অফিস খুলে বসলাম। এখন আমার কোম্পানি সমস্ত রকম সংস্থার জন্য সব রকমের অনুবাদের কাজ করে–ব্যবসায়ীদের জন্য, বিভিন্ন দূতাবাসের জন্য, সংবাদমাধ্যমের জন্য, নানারকম সব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের জন্য–এক কথায়, যারাই পয়সা দেয় তাদেরই জন্য কাজ করি আমরা।”

    “এ কাজের চাহিদা কী রকম বাজারে?”

    “চাহিদা আছে, চাহিদা আছে,” মাথা নেড়ে বলল কানাই। “দিল্লি এখন হল পৃথিবীর ব্যস্ততম কনফারেন্স সিটিগুলির মধ্যে একটা। মিডিয়ারও প্রচুর কাজ। কিছু না কিছু একটা সব সময় লেগেই আছে। আমি তো কাজ করে কুলিয়ে উঠতে পারি না অনেক সময়। ব্যবসা সমানে বেড়েই যাচ্ছে। এই তো কয়েকদিন আগেই আমরা চালু করলাম একটা স্পিচ ট্রেনিং অপারেশন। কল সেন্টারে যারা কাজ করে তাদের ইংরেজি উচ্চারণ শেখানোর জন্য। সেই বিভাগের কাজ তো এখন দিনে দিনে বাড়ছে।”

    শুধু মাত্র ভাষার আদান প্রদানের ওপর নির্ভর করে যে একটা ব্যবসা দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায় এই ধারণাটাই খুব আশ্চর্য মনে হল পিয়ার। “তা হলে আপনি নিজেও নিশ্চয়ই

    অনেকগুলো ভাষা জানেন, তাই না?”

    “ছ’টা,” মুচকি হেসে সঙ্গে সঙ্গে বলল কানাই। “হিন্দি, উর্দু আর বাংলাটাই প্রধানত কাজে লাগে এখন। আর ইংরেজি তো আছেই। তা ছাড়াও আরও দুটো জানি, ফরাসি আর আরবি–সেগুলোও সময়ে অসময়ে কাজে লেগে যায়।”

    অদ্ভুত লাগল পিয়ার এই দুটো ভাষার কথা শুনে। “ফরাসি আর আরবি! এই ভাষাগুলো আবার কী করে শিখলেন?”

    “স্কলারশিপ,” একটু হেসে বলল কানাই। “বিভিন্ন সব ভাষার ব্যাপারে আমার সব সময়ই খুব আগ্রহ। ছাত্র অবস্থায় প্রায়ই ঢু মারতাম কলকাতার অলিয়স ফ্রঁসেতে। তারপর এটা ওটা নানা যোগাযোগে স্কলারশিপ পেয়ে গেলাম একটা। তারপর প্যারিসে যখন ছিলাম সেই সময় একটা সুযোগ এল টিউনিশিয়াতে গিয়ে আরবি শেখার। এরকম সুযোগ আর কে ছাড়ে? তারপর থেকে আর কখনও পেছনে তাকাতে হয়নি।”

    একটা হাত তুলে ডান কানের রুপোর দুলটা খুঁটতে লাগল পিয়া। ভঙ্গিটার আত্মবিস্মৃত ভাবটা ছেলেমানুষি, কিন্তু তারই মধ্যে যুবতীসুলভ একটা সুষমাও রয়েছে। “আপনি তা হলে ঠিকই করে নিয়েছিলেন যে এই অনুবাদের কাজটাকেই এক সময় পেশা করবেন?”

    “না না,” বলল কানাই। “একেবারেই না। আমি যখন আপনার বয়সি ছিলাম, কলকাতার আর পাঁচটা কলেজের ছাত্রর মতো তখন আমারও মাথার মধ্যে গজগজ করত কবিতার ভূত। পেশাদারি জীবনের শুরুতে আমার ইচ্ছে ছিল আমি জীবনানন্দ অনুবাদ করব আরবিতে আর অ্যাডোনিস অনুবাদ করব বাংলায়।”

    “তারপর কী হল?” নাটকীয় ভাবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল কানাই। “সংক্ষেপে বলতে গেলে, কিছুদিনের মধ্যেই আমি আবিষ্কার করলাম যে ভাষা হিসেবে যদিও বাংলা এবং আরবি দুটোরই সম্পদ অপরিমেয়, কিন্তু এই দুটোর কোনও ভাষাতেই শুধু সাহিত্যিক অনুবাদের কাজ করে পেট চালানো সম্ভব নয়। বড়লোক আরবদের বাংলা সাহিত্যের বিষয়ে কোনও আগ্রহই নেই, আর বড়লোক বাঙালিদের কীসে আগ্রহ আছে তাতে কিছুই যায় আসে না, কারণ সংখ্যায় তারা এত কম যে তাদের পক্ষে কিছু করে ওঠা সম্ভব নয়। একটা সময় এসে তাই আমি নিজেকে ভাগ্যের হাতে সঁপে দিলাম, আর এইসব ব্যবসায়িক কাজ শুরু করলাম। তবে এটা বলতেই হবে খুবই ভাল সময়ে শুরু করেছি আমি : অনেক কিছু হচ্ছে এখন এই দেশে, আর তার অংশ হতে পারাটা বেশ একটা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আমার মনে হয়।”

    পিয়ার মনে পড়ল বাবার কাছে শোনা ইন্ডিয়ার গল্প, যে দেশ ছেড়ে বাবা চলে গিয়েছিল আমেরিকায় : সে ছিল এমন এক দেশ যেখানে গাড়ি ছিল মাত্র দু’রকমের, আর যেখানে মধ্যবিত্ত জীবনকাঠামোর প্রধান ধর্ম ছিল বিদেশি যে-কোনও কিছুর প্রতি এক তীব্র আকর্ষণ। কিন্তু কানাই যে জগতে বাস করে এই লুসিবাড়ি বা ভাটির দেশের থেকে সে পৃথিবী যতটা দূরে, পিয়ার বাবার স্মৃতির ভারতের সঙ্গে তার দূরত্ব কোনও অংশে কম নয়।

    “আপনার কখনও আবার সাহিত্যিক অনুবাদের কাজে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে হয় না?” ও জিজ্ঞেস করল কানাইকে।

    “হয় কখনও কখনও। খুব বেশি হয় না। সব মিলিয়ে এটা স্বীকার করতেই হবে যে একটা গোটা অফিস চালাতে আমার বেশ ভালই লাগে। ভাবতে ভাল লাগে আমি লোকজনদের চাকরি দিচ্ছি, মাইনে দিচ্ছি, অর্থহীন ডিগ্রিওয়ালা ছাত্রছাত্রীদের কাজের সুযোগ করে দিচ্ছি। আর, পয়সা এবং স্বাচ্ছন্দ্যটাও যথেষ্ট উপভোগ করি আমি। সেটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। পয়সাওয়ালা একা লোকের পক্ষে দিল্লি বেশ ভাল জায়গা। অনেক ইন্টারেস্টিং মহিলার সঙ্গে যোগাযোগ হয়।”

    এই শেষ কথাটায় একেবারে আশ্চর্য হয়ে গেল পিয়া। এক মুহূর্ত ঠিক বুঝে উঠতে পারল

    কী বলবে। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে সদ্য বোয়া প্লেটগুলোকে গুছিয়ে রাখছিল ও। শেষ প্লেটটা রেখে একটা হাই তুলল, এক হাত তুলে আড়াল করল মুখটা।

    “সরি।”

    সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে কানাই বলল, “এত সব ঘটনার পরে নিশ্চয়ই খুব টায়ার্ড আপনি?”

    “ভীষণ। মনে হচ্ছে ঘুমোতে যেতে হবে এবার।”

    “এক্ষুনি?” জোর করে একটু হাসল কানাই, যদিও বোঝাই যাচ্ছিল বেশ একটু হতাশ হয়েছে ও। “অবশ্য ঠিকই তো, যা ধকলটা গেছে। আপনাকে বলেছি কি যে আর ঘণ্টাখানেক বাদে কিন্তু ইলেকট্রিক আলো বন্ধ হয়ে যাবে। হাতের কাছে মোমবাতি রাখবেন একটা।”

    “তার অনেক আগেই আমি ঘুমিয়ে পড়ব।”

    “গুড। আশা করি ভাল করে বিশ্রাম নিতে পারবেন রাত্তিরটা। আর যদি কিছু দরকার হয়, ওপরে গিয়ে দরজা ধাক্কাবেন। আমি মেসোর পড়ার ঘরে থাকব।”

  • চার

    চার

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    চার

    কাঁচা মাটিতে নামের দাগ কতক্ষণ বেঁচে থাকবে?

    গোকুলের পকেট থেকে ভিজিটিং কার্ড বেরুল। কিন্তু তার পৃষ্ঠে ললাটে নিজেদের নাম লিখি কি দিয়ে? কলম? কারুরই কলম নেই। পেন্সিল? দাঁড়াও, বাড়ির ভিতর থেকে জোগাড় করছি একটা।

    পেন্সিল দিয়ে সবাই সেই ভিজিটিং কার্ডের গায়ে নিজের নিজের নাম লিখে দিলাম। সেই ভিজিটিং কার্ডটি মুরলীদার কাছে এখনো নিটুট আছে।

    মুরলীধর বসু ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশনের একজন সাদাসিদে সাধারণ ইস্কুল মাস্টার! নিরাড়ম্বর নিরীহ জীবন, হয়তো বা নিম্নগত। এমনিতে উচ্চকিত উৎসাহিত হবার কিছু নেই। কিন্তু কাছে এসে একটা মহৎ উপলব্ধির আস্বাদ পেলাম। অদম্য কর্ম বা উত্তঙ্গ চিন্তায় শুধু নয়—আছে সুদূরবিলাসী স্বপ্ন। দীনেশরঞ্জনের মত মুরলীধরও স্বপ্নদর্শী। তাই একজন D. R. আরেকজন মুরলীদা।

    একদিকে “কল্লোল”, আরেক দিকে “সংহতি”।

    ভাবতে আশ্চর্য লাগে, দুটি মাসিক পত্রই একই বছরে একই মাসে এক সঙ্গে জন্ম নেয়। ১৩৩০, বৈশাখ। “কল্লোল” চলে প্রায় সাত বছর, আর “সংহতি” উঠে যায় দু বছর না পুরতেই।

    “কল্লোল” বললেই বুঝতে পারি সেটা কি। উদ্ধত যৌবনের ফেনিল উদ্দামতা, সমস্ত বাধা-বন্ধনের বিরুদ্ধে নির্ধারিত বিদ্রোহ, স্থবির সমাজের পচা ভিত্তিকে উৎখাত করার আলোড়ন। কিন্তু “সংহতি” কি? সংহতি তো শিলীভূত শক্তি। সংঘ, সমূহ, গণগোষ্ঠী। যে গুণের জন্যে সমধর্মী পরমাণুসমূহ জমাট বাঁধে, তাই তো সংহতি। আশ্চর্য নাম। আশ্চর্য সেই নামের তাৎপর্য।

    এক দিকে বেগ, আরেক দিকে বল। এক দিকে ভাঙন, আরেক দিকে সংগঠন, একীকরণ।

    আজকের দিনে অনেকেই হয়তো জানেন না, সেই “সংহতি”ই বাংলাদেশে শ্রমজীবীদের প্রথমতম মুখপত্র, প্রথমতম মাসিক পত্রিকা। সেই ক্ষীণকায় স্বল্পায়ু কাগজটিই গণজয়যাত্রার প্রথম মশালদার। “লাঙল”, “গণবাণী” ও “গণশক্তি”—এরা এসেছিল অনেক পরে। “সংহতি”ই অগ্রনায়ক।

    এই কাগজের পিছনে এমন একজনের পরিকল্পনা ছিল যার নাম বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে উজ্জ্বল অক্ষরে লিখে রাখা উচিত। তিনি জিতেন্দ্রনাথ গুপ্ত। আসলে তিনিই এই কাগজের প্রতিষ্ঠাতা। অমৃতবাজার পত্রিকার ছাপাখানায় কাজ করেন। ঢোকেন ছেলেবয়সে, বেরিয়ে আসেন পঞ্চাশ না পেরোতেই, জরাজর্জর দেহ নিয়ে। দীর্ঘকাল বিষাক্ত টাইপ আর কদর্য কালি ঘেঁটে ঘেঁটে কঠিন ব্যাধির কবলে পড়েন। কিন্তু তাতেও মন্দা পড়েনি তার উদ্যমে-উৎসাহে, মুছে যায়নি তাঁর ভাবীকালের স্বপ্নদৃষ্টি।

    একদিন চলে আসেন বিপিন পালের বাড়িতে। তাঁর ছেলে জ্ঞানাঞ্জন পালের সঙ্গে পরিচয়ের সুতো ধরে।

    বিপিন পাল বললেন, ‘কি চাই?’

    ‘শ্রমজীবীদের জন্যে বাংলায় একটা মাসিকপত্র বের করতে চাই।’

    এমন প্রস্তাব শুনবেন বিপিনচন্দ্র যেন প্রত্যাশা করেন নি। তিনি মেতে উঠলেন। এর কিছুকাল আগে থেকেই তিনি ধনিক-শ্রমিক সমস্যা নিয়ে লেখা আর বলা শুরু করেছেন। ইন্টারন্যাশন্যাল গ্রুপ-এর ম্যানিফেস্টোর (পৃথিবীর অন্যান্য মনীষীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও রোঁলারও দস্তখৎ আছে) ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর “World situation and Ourselves” বক্তৃতায়; ইংরিজিতে প্রবন্ধ লিখেছেন মানুষের বাঁচবার অধিকার—“Right to Live” নিয়ে। তিনি বলে উঠলেন : ‘নিশ্চয়ই। এই দণ্ডে বের করুন, আর কাগজের নাম দিন “সংহতি”।’

    কিন্তু কাগজ কি চলবে?

    কেন চলবে না? জিতেনবাবু কলকাতার প্রেস-কর্মচারী সমিতির উদ্যোক্তা, সেই সম্পর্কে তাঁর সহকর্মী আর সহ-সদস্যেরা তাকে আশ্বাস দিয়েছে, কাগজ বের হওয়া মাত্রই বেশ কিছু গ্রাহক আর বিজ্ঞাপন জুটিয়ে আনবে। সকলে মিলে রথের রশিতে টান দেব, ঠিক চলে যাবে।

    ‘কিন্তু সম্পাদক হবে কে?’

    ‘সম্পাদক হবে জ্ঞানাঞ্জন পাল আর তার বন্ধু মুরলীধর বসু।’

    ‘আর আফিস?’

    ‘আফিস হবে ১ নম্বর শ্রীকৃষ্ণ লেন, বাগবাজার।’ কুণ্ঠিত মুখে হাসলেন জিতেনবাবু।

    ‘সেটা কি?’

    ‘সেটা আমারই বাসা। একতলার দেড়খানা ঘরের একখানি।’

    সেই একতলায় দেড়খানা ঘরের একখানিতে ‘সংহতি’র আফিস বসল। দক্ষিণচাপা গলি, রাস্তার দিকে উত্তরমুখো লম্বাটে ঘর। আলো-বাতাসের সংস্পর্শ নেই। একপাশে একটি ভাঙা আলমারি, আরেক পাশে একখানি ন্যাড়া তক্তপোশ। টেবিল চেয়ার তো দূরের কথা, তক্তপোশের উপর একখানা মাদুর পর্যন্ত নেই। শুধু কি দরিদ্রতা? সেই সঙ্গে আছে কালান্তক ব্যাধি। তার উপর সদ্য স্ত্রী হারিয়েছেন। তবু পিছু হটবার লোক নন জিতেনবাবু। ঐ ন্যাড়া তক্তপোশের উপর রাত্রে ছেলেকে নিয়ে শোন আর দিনের বেলা কাশি ও হাঁপানির ফাঁকে “সংহতি”র স্বপ্ন দেখেন।

    সম্পাদকের সঙ্গে রোজ তার দেখাও হয় না। তারা লেখার জোটপাট কবেন ভবানীপুরে বসে, প্রুফ দেখেন ছাপাখানায় গিয়ে। কিন্তু ছুটির দিন অফিসে এসে হাজিরা দেন। সেদিন জিতেনবাবু অনুভব করেন তার রথের রশিতে টান আছে। মুঠো থেকে খসে পড়েনি আলগা হয়ে। অস্বাস্থ্যকে অস্বীকার করেই আনন্দে ও আতিথেয়তায় উদ্বেল হয়ে ওঠেন। আসে চা, আসে পরোটা, আসে জলখাবার। আপত্তি শোনবার লোক নন জিতেনবাবু।

    কাগজ তো বেরুলো, কিন্তু লেখক কই?

    প্রথম সংখ্যার প্রথমেই কামিনী রায়ের কবিতা—“নিদ্রিত দেবতা জাগো”। সেই সঙ্গে বিপিন পাল ও পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ। জ্ঞানাঞ্জন লিখলেন “সংহতি”র আদর্শ নিয়ে। তারই ছাপানো নকল আগুড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হল ব্রজেন্দ্র শীল আর রবীন্দ্রনাথকে। আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ টেলিগ্রামে আশীর্বাণী পাঠালেন, তার বাংলা অনুবাদ ছাপা হলো পত্রিকার প্রচ্ছদে। আর রবীন্দ্রনাথ? এক পরমাশ্চর্য সন্ধ্যায় পরম-অপ্রত্যাশিত ভাবে তার এক অপূর্ব প্রবন্ধ এসে পৌঁছুল। সেই প্রবন্ধ ছাপা হল জ্যৈষ্ঠের সংখ্যাতে।

    কিন্তু তারপর? গল্প কই?

    বাংলাসাহিত্যের বীণায় যে নতুন তার যোজনা করা হল সে সুরের লেখক কই? সে অনুভূতির হৃদয় কই? কই সেই ভাবের সূত্রধর?

    বিপিনচন্দ্র বললেন, ‘নারান ভটচাজকে লেখ। টাকা চায় ভি-পি করে যেন পাঠায়।’

    নারায়ণ ভট্টাচার্য গল্প পাঠালেন, “দিন মজুর”।

    একবার শরৎচন্দ্রের কাছে গেলে হয় না? শোষিত মানবতার নামে কিছু খুদকুড়া মিলবে না তাঁর কাছে?

    কে জানে! তবু দুই বন্ধু জ্ঞানাঞ্জন আর মুরলীধর একদিন রওনা হলেন শিবপুরের দিকে।

    বাড়ির মধ্যে আর ঢুকতে পাননি। শরৎচন্দ্রের কুকুর ভেলির তাড়া খেয়েই দোরগোড়া থেকে ফিরে এলেন দুই বন্ধু।

    এমন সময় শৈলজার লেখা গল্প “কয়লাকুঠি” নজরে পড়ল।

    কে এই নবাগত? মাটির উপরকার শোভনশ্যামল আন্তরণ ছেড়ে একেবারে তার নিচে অন্ধকার গহ্বরে গিয়ে প্রবেশ করেছে? সেখান থেকে কয়লার বদলে তুলে আনছে হীরামণি?

    ঠিকানা জানা হল—রূপসীপুর, জেলা বীরভুম। চিঠি পাঠানো হল গল্প চেয়ে। শৈলজা তার মুক্তোর অক্ষর সাজিয়ে লিখে পাঠাল গল্প। নাম “খুনিয়ারা”।

    এ গল্প “সংহতি”র তারে ঠিক সুর তুলল না। মুরলীধর শৈলজার সঙ্গে পত্রালাপ চালাতে লাগলেন।

    শৈলজা লিখে পাঠাল : ‘নতুন উপন্যাসে হাত দিয়েছি। কারখানায় সিটি বেজেছে আর আমার আখ্যানও সুরু হল।’

    মুরলীধর জবাব দিলেন : ‘ছুটির সিটি বাজবার আগেই লেখাটা পাঠিয়ে দিন। অন্তত প্রথম কিস্তি। পত্রপাঠ।’

    “বাঙ্গালী ভাইয়া” নাম দিয়ে শৈলজার সেই উপন্যাস বেরুতে লাগল “সংহতি”তে; পরে সেটা “মাটির ঘর” নামে পুস্তকাকৃত হয়েছে।

    শৈলজা তো হল। তারপর? আর কোনো লেখক নেই? যজ্ঞের আর কোনো পুরোধা?

    “শুধু কেরানী” আর “গোপনচারিণী” তখন প্রেমেনকে অতিমাত্রায় চিহ্নিত করেছে। মুরলীধর তাকে খুঁজে বেড়াতে লাগলেন। বীরেন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় নামে কলেজের এক ছাত্র (বর্তমান দিল্লীতে অধ্যাপক) “সংহতি”র দলের লোক। ইস্কুলে আমাদের তিনি অগ্রজ, চিনতেন প্রেমেনকে। বললেন, ‘আরে, প্রেমেন তো এ পাড়ারই বাসিন্দে, কোথায় খুঁজছেন তাকে মফঃস্বলে? আর এ শুধু হাতের কাছের লোক নয়, তার লেখাও মনের কাছেকার। সম্প্রতি সে বস্তিজীবন নিয়ে উপন্যাস লিখছে—নাম “পাঁক”।’

    মুরলীধর লাফিয়ে উঠলেন। কোথায় ধরা যায় প্রেমেনকে?

    এদিকে মুরলীধর প্রেমেনকে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন আর প্রেমেন তার বাড়ির দরজা থেকে নিরাশ মুখে ফিরে যাচ্ছে।

    কিন্তু ফিরবে কোথায়? গোকুল আর ধীরাজ চলে গেল যে যার দিকে, কিন্তু আমাদের তিন জনের পথ যেন সেদিন আর শেষ হতে চায় না। একবার শৈলজার মেস, শাখারীপাড়া রোড, পরে প্রেমেনের মেস গোবিন্দ ঘোষাল লেন, শেষে আমার বাসা বেলতলা রোড—বারে-বারে ঘোরাফিরা করতে লাগলাম। যেন এক দেশ থেকে তিন পথিক একই তীর্থে এসে মিলেছি।

    বিকেলে আবার দেখা। বিকেলে আর আমরা “আপনি” নেই, “তুমি” হয়ে গিয়েছি। শৈলজা তার গল্প বলা শুরু করল:

    ‘আমার আসল নাম কি জানো? আসল নাম শ্যামলানন্দ। ডাকনাম শৈল। ইস্কুলে সবাই ডাকত শৈল বলে। সেই থেকে কি করে যে শৈলজা হয়ে গেলাম—’

    প্রায় নীহারিকার অবস্থা!

    ‘বাড়ি রূপসীপুর, জন্মস্থান অণ্ডাল মামাবাড়ি, আর—বিয়ে করেছি ইকড়া—বীরভূম জেলায়—’

    বিয়ে করেছ এরি মধ্যে? কত বয়স? এই তেইশ-চব্বিশ। জন্মেছি ১৩০৭ সালে। তোমাদের চেয়ে তিন চার বছরের বড় হব।

    ‘বাবা ধরণীধর মুখোপাধ্যায়।  সাপ ধরেন, ম্যাজিক দেখান—’

    তাকালাম শৈলজার হাতের দিকে। তাইতেই তার হাতের এই ওস্তাদি। এই ইন্দ্রজাল।

    ‘বিশেষ কিছুই করতে পারলেন না জীবনে। মাকে হারিয়েছি যখন তিন বছর বয়স। বড় হয়েছি মামার বাড়িতে। দাদামশায় আমার মস্ত লোক। জাদরেল রায়সাহেব।’

    তাঁর নাতির এই দীনদশা! আছে এই একটা থুত্থুরো ভাঙা মেসে! হাঁটতে-চলতে মনে হয় এই বুঝি পড়ল হুড়মুড় করে। দোতলা বাড়ি, পূর্ব পশ্চিমে লম্বা, দোতলায় মুখের দিকে কাঠের রেলিং দেওয়া একফালি বারান্দা, প্রায় পড়ো-পড়ো, জায়গায়-জায়গায় রেলিং আলগা হয়ে ঝুলে পড়েছে। উপরতলায় মেস, নিচে সাড়ে বত্রিশ ভাজার বাসিন্দে। হিন্দুস্থানী ধোপা, কয়লা-কাঠের ডিপো, বেগুনি-ফুলুরির দোকান, চীনেবাদামওয়ালা কুলপিবরফওয়ালার আস্তানা। বিচিত্র রাজ্য। সংহতির সংকেত!

    ‘দাদামশায় তাড়িয়ে দিলেন বাড়ি থেকে। “বাঁশরী”তে গল্প লিখেছিলাম “আত্মঘাতীর ডায়রি” বলে। গল্প কি কখনো আত্মকাহিনী হতে পারে? তবু ভুল বুঝলেন দাদামশায়, বললেন, পথ দেখ।’

    মেসের সেই ঘরের চারপাশে তাকালাম আশ্চর্য হয়ে। শৈলজার মত আরো অনেকে মেঝের উপর বিছানা মেলে বসেছে। চারধারে জিনিস পত্রের হাবজা-গোবজা। কারু-বা ঠিক শিয়রে দেয়ালে-বেঁধা পেরেকের উপর জুতা ঝুলানো। পাশ-বালিশের জায়গায় বাক্স-প্যাঁটরা। পোড়াবিড়ির জগন্নাথক্ষেত্র। দেখলেই মনে হয় কতগুলি যাত্রী ট্রেনের প্রতীক্ষায় প্ল্যাটফর্মে বসে আছে। কোথাকার যাত্রী? “ধ্বংসপথের যাত্রী এরা।”

    নিজেরা যদিও অভাবে তলিয়ে আছি, তবু শৈলজার দুঃস্থতায় মন নড়ে উঠল। কী উপায় আছে, সাহায্য করতে পারি বন্ধুকে?

    বললাম, ‘কি করে তবে চালাবে? সম্বল কি তোমার?’

    ‘সম্বল?’ শৈলজা হাসল : ‘সম্বলের মধ্যে লেখনী, অপার সহিষ্ণুতা আর ভগবানে বিশ্বাস।’

    তারপর গলা নামাল : ‘আর স্ত্রীর কিছু অলঙ্কার, আর “হাসি” আর “লক্ষ্মী” নামে দুখানা উপন্যাস বিক্রির তুচ্ছ ক’টা টাকা।’

    ‘কিন্তু “কল্লোলে” এলে কি করে?’

    “‘কল্লোলে” আসব না?’ শৈলজার দৃষ্টি উৎসাহে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ‘“কল্লোলে” না এসে পারি? আজকের দিনে যত নতুন লেখক আছে স্তব্ধ হয়ে, সবাইর ভাষাই ঐ “কল্লোল”। সৃষ্টির কল্লোল, স্বপ্নের কল্লোল, প্রাণের কল্লোল। বিধাতার আশীর্বাদে তাই সবাই একত্র হয়েছি। মিলেছি এক মানসতীর্থে। শুধু আমরা ক’জন নয়, আরো অনেক তীর্থঙ্কর।’

    ‘শোনো, কেমন করে এলাম।’ হঠাৎ কথা থামিয়ে প্রশ্ন করল শৈলজা : ‘পবিত্রকে চেন? পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়?’

    ‘চিনি না, আলাপ নেই। অনুবাদ করেন, দেখেছি মাসিকপত্রে।’

    ‘চিনবে শিগগির। বিশ্বজনের বন্ধু এই পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়। বুড়ো হোক, কচি হোক, বনেদী হোক, নির্বনেদ হোক, সকল সাহিত্যিকের সে স্বজন-বান্ধব। শুধু মনে মনে নয়, পরিচয়ের অন্তরঙ্গ নিবিড়তায়। শুধু উপর-উপর মুখ-চেনাচেনি নয়, একেবারে হাঁড়ির ভিতরের খবর নিয়ে সে হাঁড়ির মুখের সরা হয়ে বসবে। একেবারে ভিতরের লোক, আপনার জন। বিশ্বাসে অনড়, বন্ধুতায় নির্ভেজাল। এদল-ওদল নেই, সব দলেই সমান মান। পূর্ববঙ্গে বর্ষার সময় পথ-ঘাট খেত-মাঠ উঠান-আঙিনা সব ডুবে যায়, এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যেতে হলে নৌকো লাগে। পবিত্র হচ্ছে সেই নৌকো। নানারকম ব্যবধানে সাহিত্যিকরা যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন এক সাহিত্যিকের ঘর থেকে আরেক সাহিত্যিকের ঘরে একমাত্র এই একজনই অবাধে যাওয়া আসা করতে পারে। এই একজনই সকল বন্দরের সদাগর।

    আসল কথা কি জানো? লেশমাত্র অভিমান নেই, অহংকার নেই। নিষ্ঠুর দারিদ্র্যে নিষ্পেষিত হয়ে যাচ্ছে, তবু সব সময়ে পাবে নির্ধারিত হাসি। আর, এমন মজার, ওর হাত-পা চোখ-মুখ সব আছে, কিন্তু ওর বয়স নেই। ভগবান ওকে বয়স দেননি। দিন যায়, মানুষ বড় হয়, কিন্তু পবিত্র যে-পবিত্র সেই পবিত্র। নটনড়নচড়ন। আজ যেমন ওকে দেখছি, পঁচিশ বছর পরেও ওকে তেমনি দেখব। অন্তরে কী সম্পদ, কী স্বাস্থ্য থাকলে এই বয়সের ভার তুচ্ছ করা যায় ভেবে দেখো।’

    ‘নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে।’

    ‘রহস্যের মধ্যে আমার যেমন বিড়ি ওর তেমনি খইনি। আর তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।’

    সবাই হেসে উঠলাম।

    সেই পবিত্র “প্রবাসী”তে কাজ করে। “প্রবাসী” চেন তো?

    “প্রবাসী” চিনি না? বাংলা দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ মাসিক পত্রিকা।

    ‘কিন্তু নজরুল বলে, প্রকৃষ্টরূপে বাসি—প্রবাসী।’

    চারু বন্দ্যোপাধ্যায় “প্রবাসী”র তখন প্রধান কর্ণধার, এদিকে-ওদিকে আরো আছেন ক’জন মাঝিমাল্লা। আমার গল্প পড়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে উৎসুক। থাকি বাদুড়বাগান রো-র এক মেসে, চললাম কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট। সাধারণ ব্রাহ্মমন্দিরের পাশের গলিতে “প্রবাসী”-আপিস, গলির মাঝখানে ঝুলছে কাঠের ঢাউস সাইনবোর্ড। সেখান থেকে যাব বত্রিশ কলেজ স্ট্রিটের দোতলায়, “মোসলেম-ভারত” আপিসে, নজরুলের কাছে। সঙ্গে সর্বপ্রিয় পবিত্র। আমহার্স্ট স্ট্রিটে পড়েছি, অমনি পবিত্র সামনে কাকে দেখে “গোকুল” “গোকুল” বলে চেঁচিয়ে উঠল। আর যাই কোথা, ধরা পড়ে গেলাম। কথা কম বলে বটে কিন্তু অদম্য তার আকর্ষণ। যেন মন্ত্রবলে টেনে নিয়ে গেল আমাকে “কল্লোল” আপিসে, সেই “এক মুঠো” ঘরে। “কল্লোল” সবে সেই প্রথম বেরুবে, আদ্ধেক প্রেসে, আদ্ধেক কল্পনায়। সাহিত্যের জগতের এক আগন্তুক পত্রিকার জগতের এক আগন্তুকের দুয়ারে এসে দাঁড়ালাম। আজ তারিখ কত?

    বাইশে জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩১, বৃহস্পতিবার।

    সেদিনটা চৈত্রের মাঝামাঝি, ১৩২৯ সাল। এক বছরের কিছু বেশি হল। ঘরে ঢুকে দেখি একটি ভদ্রলোক কোণের টেবিলের কাছে বসে নিবিষ্ট মনে ছবি আঁকছে। পরিচয় হতে জানলাম ও-ই দীনেশরঞ্জন। বললে, “কল্লোল” আপনার পত্রিকা, যে আসবে এ-ঘরে তারই পত্রিকা। লিখুন—লেখা দিন।’ এমন প্রশস্তচিত্ততার সঙ্গে সংবর্ধিত হব ভাবতেও পারিনি। প্রবাসীর জন্যে লুকিয়ে পকেটে করে একটি গল্প নিয়ে চলেছিলাম। দ্বিরুক্তি না করে সেটি পৌঁছে দিলাম দীনেশের হাতে। দীনেশ একটি লাইনও না পড়ে লেখাটা রেখে দিলে তার দেরাজের মধ্যে। বললে, ‘লেখা পেলাম বটে, কিন্তু তার চেয়েও বড় জিনিস পেলাম। পেলাম লেখককে। “কল্লোলে”র বন্ধুকে। “কল্লোলে”র সেই প্রথম সংখ্যার প্রথম গল্প আমার “মা”। আমি আছি সেই প্রথম থেকে।

    বললাম, “প্রবাসী” আপিসে গেলে না আর সেদিন?

    কোথায় “প্রবাসী” আপিস! নজরুলও বুঝি খারিজ হবার জোগাড়। চারজনে তখন আড্ডায় একেবারে বিভোর। তারপরে, সোনায় সোহাগার মত, এসে পড়ল রুটি, আলুর দম আর চা। এমন আড্ডার জয়জয়কার।

    পবিত্র বললে, ‘এই শুভসংযোগ নিত্যকারের ঘটনা। দীনেশের এই মুক্ত দ্বার আর মেজবৌদির এই মুক্ত দাক্ষিণ্য।’

    একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে তবু থেকে যাচ্ছিল। বললাম, ‘নজরুলের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কি? ওকে কি করে চিনলে?’

    ‘বা রে, ও যে আমার ছেলেবেলার বন্ধু। আর সবাই ডাকবে আমাকে শৈলজা বলে, ও ডাকবে শৈল বলে। পাশাপাশি দুই ইস্কুলে একই ক্লাশে পড়েছি আমরা। আমি রানিগঞ্জে, নজরুল শিয়াড়শোল রাজার ইস্কুলে। মাইল দুয়েকের ছাড়াছাড়ি। থার্ড ক্লাশে এসে মিললাম দুজনে, আমি হিন্দু ও মুসলমান, আমি লিখি কবিতা—আশ্চর্য হচ্ছ—ও লেখে গল্প। তবু মিললাম দুজনে। সেই টানে মিললাম, যে টানে ধর্মাধর্ম নেই বর্ণাবর্ণ নেই—সৃষ্টির টান, সাহিত্যের টান। দুইজনে রোজ একসঙ্গে মিলি, ঘুরে বেড়াই, গল্প করি, কোনোদিন বা স্কুল পালাই। গ্র্যাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরি, ধরি ই-আই-আরের লাইন, কোনোদিন বা চলে যাই শিশু-শালের অরণ্যে। তখন ইংরেজ-জার্মানিতে প্রথম লড়াই লেগেছে। আমরা দুজনে ম্যাট্রিক ক্লাশে উঠে প্রি-টেস্ট দিচ্ছি। শহরে-গাঁয়ে চলেছে তখন সৈন্যজোগাড়ের তোড়জোড়। হাতে-গরম মুখে-গরম বক্তৃতা। সবাই এগিয়ে গেল বীরত্বের ঘোড়দৌড়ে, বাঙালি হিন্দু মুসলমানই শুধু পিছিয়ে থাকবে? বলো, বীর, চির-উন্নত মম শির! বলো বন্দে মাতরম্!

    দুই বন্ধু খেপে উঠলাম। পরীক্ষা দিয়েই দুজনে চুপিচুপি পালিয়ে গেলাম আসানসোল। সেখান থেকে এস-ডি-ওর চিঠি নিয়ে সটান কলকাতা। আসানসোলে এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা—তার কাছে কিছু বাহাদুরি করতে গিয়েছিলাম কিনা মনে নেই—সে-ই বাড়ি ফিরে গিয়ে সব ভণ্ডুল করে দিলে। ঊনপঞ্চাশ নম্বর বাঙালি রেজিমেন্টে ঢোকার সব ঠিকঠাক, ডাক্তার বললে, তোমার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ আরেকবার মাপতে হবে। দ্বিতীয়বারের মাপজোকে নামঞ্জুর হয়ে গেলাম। কেন যে নামঞ্জুর হলাম জানলেন শুধু ভগবান আর সেই রায়সাহেব দাদামশায়। নজরুলকে যুদ্ধে পাঠিয়ে সাথীহারা হয়ে ফিরে এলাম গৃহকোণে—

    তারপর কলেজে ঢুকলাম, অর্থাভাবে কলেজ ছাড়লাম। শিখলাম শর্টহ্যাণ্ড-টাইপরাইটিং। চাকরি নিলম কয়লকুঠিতে। পোষাল না। শেষে এই সাহিত্য।

    পাশা উলটো পড়েছিল ভাগ্যিস। তাই নজরুল কবি, তুমি হলে গল্পলেখক।

    এমন সময় মুরলীদার আবির্ভাব।

    প্রথম আলাপ-পরিচয়ের উত্তাল ঢেউ। কেটে যাবার পর মুরলীদা বললে, ‘আসছে রবিবার, পঁচিশে জ্যৈষ্ঠ, কাজীর ওখানে আমাদের সবাইর নেমন্তন্ন–’

    ‘আমাদের সবাইকার।’ আমি আর প্ৰেমেন একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলাম। যার সঙ্গে আলাপ নেই, তার ওখানে নেমন্তন্ন কি করে হতে পারে!

    ‘হ্যাঁ, সবাইকার।’ বললে মুরলীদা। ‘সমস্ত “কল্লোলে”র নেমন্তন্ন।’

    তা হলে তো আমাদেরও নেমন্তন্ন। নিঃসংশয়রূপে নিশ্চিন্ত হলাম। কল্লোলে তখনও লেখা এক আধটা ছাপা না হোক, তবু আমরা মনেপ্রাণে “কল্লোলে”র।

    বললাম, ‘কোথায় যেতে হবে?’

    ‘হুগলিতে। হুগলিতেই কাজী নজরুলের বাসা।’

    এই হুগলির বাসা উপলক্ষ্য করেই বুঝি কবি গোলাম মোস্তাফা লিখেছিল :

    “কাজী নজরুল ইসলাম

    বাসায় একদিন গিছলাম।

    ভায়া লাফ দেয় তিন হাত

    হেসে গান গায় দিন রাত।

    প্রাণে ফুর্তির ঢেউ বয়

    ধরায় পর তার কেউ নয়।”

    এর পাল্টা-জবাবে নজরুল কি বলেছিল জানো?

    “গোলাম মোস্তফা

    দিলাম ইস্তফা।”

  • পাঁচ

    পাঁচ

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    পাঁচ

    কশ্চিৎ কান্তা—বিরহগুরুণা—স্বাধিকারপ্রমত্তঃ

    শাপেনাস্তং—গমিতমহিমা—বৰ্ষভোগ্যেন ভর্ত্তুঃ—

    ললিতগম্ভীর সুমধুর কণ্ঠে একটু বা টেনে-টেনে আবৃত্তি করতে-করতে যে যুবকটি “কল্লোল”-আফিসে প্রবেশ করল প্রথম দর্শনেই তাকে ভালোবেসে ফেললাম। ভালোবাসতে বাধ্য হলাম বলা উচিত। এমন হৃদয়স্পর্শী তার ব্যক্তিত্ব। মাথাভরা দীর্ঘ উসকো-খুসকো চুল, পারিপাট্যহীন বেশবাস। এক চোখে গাঢ় ভাবুকতা, অন্য চোখে আদর্শবাদের আগুন। এই আমাদের নৃপেন, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। সে যুগের যন্ত্রণাহত যৌবনের রমণীয় প্রতিচ্ছবি। কিন্তু দেখব কি তাকে। কয়েক চরণ বাদ দিয়ে পূর্বমেঘ থেকে সে আবার আবৃত্তি সুরু করেছে তার অমৃতবর্ষী মনোহরণ কণ্ঠে :

    আষাঢ়স্য—প্রথমদিবসে—মেঘমাশ্লিষ্টসানু,

    বপ্রক্রীড়া—পরিণতগজ—প্রেক্ষণীয়ং দদর্শ॥

    কতক্ষণ তুমুল আড্ডা জমাবার পর আবার সে হঠাৎ উদাস হয়ে পড়ল, চলে গেল আবার ভাবরাজ্যে। পূর্বমেঘ থেকে উত্তরমেঘে। আঙুল দিয়ে টেনে-টেনে চুলের ঘুরুলি তৈরি করছে আর আবৃত্তি করছে তন্ময়ের মত :

    হস্তে লীলা—কমলমলকে—বালকুন্দানুবিদ্ধং,

    নীতা লোধ্র—প্রসবরজসা–পাণ্ডুতামাননেশ্রীঃ।

    চুড়াপাশে—নবকুরুবকং—চারু কর্ণে শিরীষং,

    সীমন্তেচ—ত্বদুপগমজং-যত্র নীপং বধূনাম্॥

    আবার কতক্ষণ হুল্লোড়, তর্কাতর্কি, আবার সেই ভাবুকের নির্লিপ্ততা। নৃপেন এতক্ষণ হয়তো দেয়ালে পিঠ রেখে তক্তপোশের উপর পা ছড়িয়ে বসে ছিল, এবার শুয়ে পড়ল। বলা-কওয়া নেই, সমুদ্র পেরিয়ে চলে গেল ইংরিজি সাহিত্যের রোমান্টিক যুগে, শেলির ওড টু ওয়েস্ট উইণ্ডে সুর মেলাল :

    Make me Thy lyre! even as the forest is,

    What if my thoughts are falling like its own,

    The tumult of Thy mighty harmonies

    Will take from both a deep autumnal tone

    Sweet though in sadness—

    জিগগেস করলাম, ‘হুগলি যাবে না? নজরুল ইসলামের বাড়ি?’

    ‘নিশ্চয়ই যাব।’ বলে নৃপেন নজরুলকে নিয়ে পড়ল।

    ভাঙা-গড়া খেলা যে তার কিসের তবে ডর?

    তোরা সব জয়ধ্বনি কর!

    এই তো রে তার আসার সময় ঐ রথ-ঘর্ঘর–

    শোনা যায় ঐ রথ-ঘর্ঘর!

    বধূরা প্রদীপ তুলে ধর!

    ভয়ঙ্করের বেশে এবার ঐ আসে সুন্দর।

    তোরা সব জয়ধ্বনি কর!

    তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!

    বললাম, ‘কি করে চিনলে নজরুলকে?’

    নৃপেন তখন সিটি কলেজে আই-এ পড়ে ও আরপুলি লেনের এক বাড়িতে ছাত্র পড়ায়। দু-তিনখানা বাড়ির পরেই কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচির বাড়ি। সে সব দিনে—তখন সেটা ১৩২৮ সাল—বাগচি-কবির বৈঠকখানায় কলকাতার একটা সেরা সান্ধ্য মজলিস বসত। বহু গুণী—গায়ক ও সাহিত্যিক—সে-মজলিসে জমায়েত হতেন। বাংলা দেশের সব জ্যোতির্ময় নক্ষত্র–গ্রহপতি স্বয়ং যতীন্দ্রমোহন। যতীন্দ্রমোহনের অতিথিবাৎসল্য নগরবিশ্রুত। কোথায় কোন ভাঙা দেয়ালের আড়ালে নূতনের কেতন উড়ছে, কোথায় কার মাঝে মৃদুতম সম্ভাবনা, ক্ষীণতম প্রতিশ্রুতি—সব সময়ে তার চোখ-কান খোলা ছিল। আভাস একবার পেলেই উদ্বেল হৃদয়ে আহ্বান করে আনতেন। তার বাড়ির দরজায় যে হাসনাহেনার গুচ্ছ ছিল তার গন্ধ প্রীতিপূর্ণ হৃদয়ের গন্ধ। নৃপেন দু-দুবার সে বাড়ির সুমুখ দিয়ে হেঁটে যায়, আর ভাবে, ঐ স্বর্গরাজ্যে তার কি কোনদিন প্রবেশের অধিকার হবে? আদৰ্শতাড়িত যুবক, সাংসারিক দারিদ্র্যের চাপে সামান্য টিউশনি করতে হচ্ছে, বাগচি-কবি কি করে জানবেন তার অন্তরের সীমাতিক্রান্ত অনুরাগ, তার নির্জনলালিত বিদ্রোহের ব্যাকুলতা? নৃপেন যায় আর আসে, আর ভাবে, ঐ স্বর্গরাজ্যে কে তাকে ডাক দেবে, কবে, কার কণ্ঠস্বরে?

    একদিন তার ছাত্র নৃপেনকে বললে, ‘জানেন মাস্টার মশাই, আজ বাগচি-বাড়িতে বিদ্রোহীর কবি কাজী নজরুল ইসলাম আসছেন।’ ‘বিদ্রোহী’র কবি! “আমি ইন্দ্রাণী-সুত, হাতে চাঁদ ভালে সূৰ্য; মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতুৰ্য।” “আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান-বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন; আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন।” সেই ‘বিদ্রোহী’র কবি? কেমন না জানি দেখতে! রাস্তার উপরে উৎসুক জনতা ভিড় করে আছে আর ঘরের মধ্যে কে একজন তরুণ গান গাইছে তারস্বরে। সন্দেহ কি, শুধু ‘বিদ্রোহী’র কবি নয়, কবি-বিদ্রোহী। তার কণ্ঠস্বরে প্রাণবন্ত প্রবল পৌঁরুষ, হৃদয়স্পন্দী আনন্দের উত্তালতা। গ্রীষ্মের রুক্ষ আকাশে যেন মনোহর ঝড় হঠাৎ ছুটি পেয়েছে। কর্কশের মাঝে মধুরের অবতারণা। নিজেরো অলক্ষ্যে কখন ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে নৃপেন। সমস্ত কুণ্ঠার কালিমা নজরুলের গানে মুছে গেছে। শুধু কি তাই? গানের শেষে অতর্কিতে সাহিত্যালোচনায় যোগ দিয়ে বসেছে নৃপেন। কথা হচ্ছিল রুশ সাহিত্য নিয়ে, সব সুমহান পূর্বসূরিদের সাহিত্য—পুশকিন, টলস্টয়, গোগল, ডস্টয়ভস্কি। নৃপেন রুশ সাহিত্যে মশগুল, প্রত্যেকটি প্রখ্যাত বই তার নখমুকুরে। তা ছাড়া সেই তরুণ বয়সে সব সময় নিজেকে জাহির করার উত্তেজনা তো আছেই। কে যেন ডস্টয়ভস্কির কোন উপন্যাসের চরিত্রের নামে ভুল করেছে, নৃপেন তা সবিনয়ে সংশোধন করলে। সঙ্গে সঙ্গে প্রমাণ করলে তার প্রত্যক্ষ পরিচয়ের বিস্তৃতি। সকলের বিস্মিত চোখ পড়ল নৃপেনের উপর। নজরুলের চোখ পড়ল নবীন বন্ধুতার।

    ঘর থেকে নেমে এসেছে পথে, পিছন থেকে কে ডাকল নৃপেনকে। কি আশ্চর্য! বিদ্রোহী কবি স্বয়ং, আর তার সঙ্গে তার বন্ধু আফজল-উল হক—“মোসলেম ভারতে”র কর্ণধার। মানে, যে কাগজে ‘বিদ্রোহী’ ছাপা হয়েছে সেই কাগজের। সুতরাং নৃপেনের চোখে আফজল ও প্রকাণ্ড কীর্তিমান। আর, “প্রবাসী”র যেমন রবীন্দ্রনাথ, “মোসলেম ভারতে”র তেমনি নজরুল।

    নজরুল বললে, ‘আপনার সঙ্গে আলাপ করতে চাই।’

    ‘তা হলে আসুন, হাঁটি।’

    নৃপেন তখন থাকে চিংড়িঘাটায়, কলকাতার পূব উপান্তে। নজরুল আর আফজল চলে এল নৃপেনের বাড়ি পর্যন্ত। নৃপেন বললে, আপনারা পথ চিনে ফিরতে পারবেন না, চলুন এগিয়ে দিই। এগিয়ে দিতে দিতে চলে এল কলেজ স্ট্রিট, নজরুলের আস্তানা। এবার ফিরি, বলে নৃপেন। নজরুল বললে, চলুন, ফের এগিয়ে দিই আপনাকে। সে কি কথা? নজরুল বললে, পথ তো চিনে ফেলেছি ইতিমধ্যে।

    রাত গভীর হয়ে এল, সঙ্গে-সঙ্গে গভীর হয়ে এল হৃদয়ের কুটুম্বিতা। দৃঢ় করে বাঁধা হয়ে গেল গ্রন্থি।

    নজরুল বললে, “ধুমকেতু” নামে এক সাপ্তাহিক বের করছি। আপনি আসুন আমার সঙ্গে। আমি মহাকালের তৃতীয় নয়ন, আপনি ত্রিশূল! আসুন, দেশের ঘুম ভাঙাই, ভয় ভাঙাই–

    নৃপেন উৎসাহে ফুটতে লাগল। বললে, এমন শুভকাজে দেবতার কাছে আশীর্বাদ ভিক্ষা করবেন না? তিনি কি চাইবেন মুখ তুলে? তবু নজরুল শেষমুহূর্তে তাঁকে টেলিগ্রাম করে দিল। রবীন্দ্রনাথ কবে কাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন? তা ছাড়া, এ নজরুল, যার কবিতায় পেয়েছেন তিনি তপ্ত প্রাণের নতুন সজীবতা। শুধু নামে আর টেলিগ্রামেই তিনি বুঝতে পারলেন “ধূমকেতু”র মর্মকথা কি। যৌবনকে “চিরজীবী” আখ্যা দিয়ে “বলাকা”য় তিনি আধ-মরাদের ঘা মেরে বাঁচাতে বলেছিলেন, সেটাতে রাজনীতি ছিল না, কিন্তু, এবার “ধূমকেতু”কে তিনি যা লিখে পাঠালেন তা স্পষ্ট রাজনীতি, প্রত্যক্ষ গণজাগরণের সঙ্কেত।

    আয় চলে আয় রে ধূমকেতু

    আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,

    দুর্দিনের এই দুর্গশিরে

    উড়িয়ে দে তোর বিজয়কেতন,

    অলক্ষণের তিলকরেখা

    রাতের ভালে হোক না লেখা,

    জাগিয়ে দে রে চমক মেরে

    আছে যারা অর্দ্ধচেতন।

    সাত নম্বর প্রতাপ চাটুজ্জের গলি থেকে বেরুল “ধূমকেতু”। ফুলস্কাপ সাইজ, চার পৃষ্ঠার কাগজ, দাম বোধ হয় দু পয়সা। প্রথম পৃষ্ঠায়ই সম্পাদকীয় প্রবন্ধ, আর তার ঠিক উপরে রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখা ব্লক করে কবিতাটি ছাপানো।

    নৃপেনের মত আমিও ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। সপ্তাহান্তে বিকেলবেলা আরো অনেকের সঙ্গে জগুবাবুর বাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকি, হকার কতক্ষণে “ধূমকেতু”র বাণ্ডিল নিয়ে আসে। হুড়োহুড়ি কাড়াকাড়ি পড়ে যায় কাগজের জন্যে। কালির বদলে রক্তে ডুবিয়ে ডুবিয়ে লেখা সেই সব সম্পাদকীয় প্রবন্ধ। সঙ্গে “ত্রিশূলে”র আলোচনা। শুনেছি স্বদেশ যুগের “সন্ধ্যা”তে ব্রহ্মবান্ধব এমনি ভাষাতেই লিখতেন। সে কী কশা, কী দাহ! একবার পড়ে বা শুধু একজনকে পড়িয়ে শান্ত করবার মত সে লেখা নয়। যেমন গদ্য তেমনি কবিতা। সব ভাঙার গান, প্রলয়-বিলয়ের মঙ্গলাচরণ।

    কারার ঐ লৌহকপাট             ভেঙে ফেল কর রে লোপাট

    রক্ত-জমাট, শিকলপূজার পাষাণবেদী।

    ওরে ও তরুণ ঈশান!              বাজা তোর প্রলয়-বিষাণ

    ধ্বংশ-নিশান উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি!

    গাজনের বাজনা বাজা!           কে মালিক কে সে রাজা?

    কে দেয় সাজা মুক্ত স্বাধীন সত্যকে রে?

    হাহাহা পায় যে হাসি,             ভগবান পরবে ফাঁসি

    সৰ্বনাশী শিখায় এ হীন তথ্য কে রে?

    ওরে ও পাগলা ভোলা,           দে রে দে প্রলয় দোলা

    গারদগুলা জোরসে ধরে হেঁচকা টানে!

    মার হাঁক হায়দরী হাঁক,           কাঁধে নে দুন্দুভি-ঢাক

    ডাক ওরে ডাক মৃত্যুকে ডাক জীবনপানে।

    নাচে ঐ কালবোশেখী,            কাটাবি কাল ব’সে কি?

    দে রে দেখি ভীম কারার ঐ ভিত্তি নাড়ি!

    লাথি মার ভাঙরে তালা          যত সব বন্দীশালা।

    আগুন জ্বালা আগুন জ্বালা ফেল উপাড়ি॥

    “ধূমকেতু”র সে-সব সম্পাদকীয় প্রবন্ধ সংকলিত থাকলে বাংলাসাহিত্যের একটা স্থায়ী উপকার হত। অন্তত সাক্ষ্য থাকত বাঙলা গদ্য কতটা কাব্যগুণান্বিত হতে পারে, “প্রসন্নগম্ভীরপদা সরস্বতী” কি করে “বিনিষ্ক্রান্তাসিধারিণী” সংহারকর্ত্রী মহাকালী হতে পারে। প্রসাদরম্য ললিত ভাষায় কি করে উৎসারিত হতে পারে অগ্নিগর্ভ অঙ্গীকার। একটা প্রবন্ধের কথা এখনো মনে আছে—নাম, “ম্যয় ভখাহুঁ”। মহাকালী ক্ষুধার্ত হয়ে নরমুণ্ডের লোভে শ্মশানে বেরিয়েছেন তারই একটা ঘোরদর্শন বর্ণনা। বোধ হয় সে-সংখ্যাটা কালীপূজার সন্ধ্যায় বেরিয়েছিল। কালীপূজার দিন সাধারণ দৈনিক বা সাপ্তাহিক কাগজে যে মামুলি প্রবন্ধ বেরোয়—মুখস্তকরা কতকগুলো সমাসবদ্ধ কথা—এ সে জাতের লেখা নয়। দীপান্বিতার রাত্রির পরেই এ-দীপ নিবে যায় না। বাঙলাদেশের চিরকালীন যৌবনের রক্তে এর দ্যুতি জ্বলতে থাকে।

    “ধূমকেতু”তে একটা কবিতা পাঠিয়ে দিলাম। অর্থাৎ, একটা সাঁকো ফেললাম নজরুলকে গিয়ে ধরবার জন্যে। সেই কবিতাটা ঠিক পরবর্তী সংখ্যায় বেরুল না। অনুৎসাহিত হবার কথা, কিন্তু আমার স্পর্ধা হলো নজরুল ইসলামের কাছে গিয়ে মুখোমুখি জবাবদিহি নিতে হবে। গেলাম তাই একদিন দুপুরবেলা। রঙিন লুঙ্গি পরনে, গায়ে আঁট গেঞ্জি —অসম্পাদকীয় বেশে নজরুল বসে আছে তক্তপোশে—চারদিকে একটা অন্তরঙ্গতার আবহাওয়া ছড়িয়ে। ‘অগ্নিবীণা’র প্রথম সংস্করণে নজরুলের একটা ফোটো ছাপা হয়েছিল, সেটায় বড় বেশি কবি-কবি ভাব—এখন চোখের সামনে একটা গোটা মানুষ দেখলাম, স্পষ্ট, সতেজ প্রাণপূর্ণ পুরুষ। বললাম, আমার কবিতার কি হল? নজরুল চোখ তুলে চাইল। কোন কবিতা? বললাম—আপনার কবিতা যখন ‘বিদ্রোহী’, আমার কবিতা ‘উচ্ছৃঙ্খল’। হাহাহা করে নজরুল হেসে উঠল। বললে–আপনি মনোনীত হয়েছেন।

    কবিতাটা ছাপা হয়েছিল কিনা জানি না। হয়তো হয়েছিল, কিংবা হয়তো তার পরেই নজরুলকে ধরে নিয়ে গেল পুলিশে। কিন্তু তার সেই কথাটা মনের মধ্যে ছাপা হয়ে রইল : আপনি মনোনীত হয়েছেন।

    ‘নজরুলকে কিসের জন্যে ধরলে জানো?’ জিগগেস করলে নৃপেন।

    ‘কিসের জন্যে?’

    ‘আগে লিখেছিল—“রক্তাম্বর পর্ মা এবার জ্বলে পুড়ে যাক শ্বেতবসন। দেখি ঐ করে সাজে মা কেমন বাজে তরবারি ঝনন ঝন॥” এবারে লিখলে—“আর কতকাল রইবি বেটি মাটির ঢেলার মুর্তি-আড়াল? স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি-চাঁড়াল!” এই লেখার জন্যে নজরুলের এক বছর জেল হয়ে গেল। সে যা জবানবন্দি দিলে তা শুধু সত্য নয়, সাহিত্য।

    পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় বসে ছিল একপাশে! বললে, ‘তার জেলের কাহিনীটা আমার কাছ থেকে শোনো।’

    ‘তোমার সঙ্গে নজরুলের আলাপ হল কবে?’

    ‘নজরুল যখন করাচিতে, যখন ও শুধু-কবি নয়, হাবিলদার কবি। পল্টনে লেফট-রাইট করাতে হত তাকে। পল্টনও এমন পল্টন, লেফটরাইট বোঝে না। তখন এক পায়ে ঘাস ও অন্য পায়ে বিচালি বেঁধে দিয়ে বলতে হত, ঘাস-বিচালি ঘাস। সেই সময়কার থেকে চেনা। আছি তখন ‘সবুজপত্রে’—হঠাৎ অপ্রত্যাশিত এক চিঠি আসে করাচি থেকে, সঙ্গে ছোট একটি কবিতা। লেখক উনপঞ্চাশ নম্বর বাঙালি পল্টনের একজন হাবিলদার, নাম কাজী নজরুল ইসলাম। কবিতাটি বড় রবীন্দ্রনাথ-ঘেঁসা। স্বকীয়তা খুঁজে পেলেন না বলে চৌধুরী মশায়ের পছন্দ হল না। আমার কিন্তু ভাল লেগেছিল। কবিতাটি নিয়ে গেলাম “প্রবাসী”র চারুবাবুর কাছে। চারুবাবু খুশি হয়ে ছাপলেন সে-কবিতা। বললেন, আরো চাই। এক জায়গায় পাঠানো কবিতা অন্য জায়গায় চালিয়ে দিয়েছি লেখকের সম্মতি না নিয়ে, কুণ্ঠিত হয়ে চিঠি লিখলাম নজরুলকে। “দে গরুর গা ধুইয়ে”–নজরুল তা থোড়াই কেয়ার করে। প্রশস্ত সাধুবাদ দিয়ে চিঠি লিখলে আমাকে, এতটুকু ভুল বুঝলে না। নবীন আগন্তুককে প্রবেশ-পথে যে সামান্য সাহায্য করেছি এতেই তার বন্ধুতা যেন সে কায়েম করলে। তারপর পল্টন ভেঙে দেবার পর যখন সে কলকাতায় ফিরল, ফিরেই ছুটল “সবুজপত্রে” আমাকে খোঁজ করতে–’

    একদিন জোড়াসাঁকো থেকে খবর এল—রবীন্দ্রনাথ পবিত্রকে ডেকেছেন। কি ব্যাপার? ব্যাপার রোমাঞ্চকর। রবীন্দ্রনাথ তার “বসন্ত”-নাটিকাটি নজরুলের নামে উৎসর্গ করেছেন। এখন একখানা বই ওকে জেলখানায় পৌঁছে দেওয়া দরকার। পারবে নাকি পবিত্র?

    নিশ্চয়ই পারব। উৎসর্গ-পৃষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথ নিজের নাম লিখে দিলেন। উৎসর্গ-পৃষ্ঠায় ছাপা ছিল : ‘শ্ৰীমান কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কল্যাণীয়েষু।’ তার নিচে তার কাঁচা কালির স্বাক্ষর বসল। শুনেছি তার আশেপাশে যে সব উন্নাসিক ভক্তের দল বিরাজ করত তারা কবির এই বদান্যতায় সেদিন বিশেষ খুশি হতে পারেনি। কিন্তু তিনি নিজে তো জানতেন কাজী নজরুল তাঁরই পরেকার যুগে প্রথম স্বতন্ত্র কবি, স্বীকার করতে হবে তার এই শক্তিদীপ্ত বিশিষ্টতাকে। তাই তিনি তার অন্তরের স্নেহ ও স্বীকৃতি জানাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলেন না। “শ্রীমান” ও “কবি” এই কথা দুটির মধ্যে তার সেই গভীর স্নেহ ও আন্তরিকতা অক্ষয় করে রাখলেন।

    নজরুল মিঠে পান ও জর্দা ভালোবাসে, আর ভালোবাসে হেজলিন স্নো। এই সব ও আরো ক’টা কি বরাতী জিনিস নিয়ে পবিত্র একদিন আলিপুর সেণ্টাল জেলের দুয়ারে হাজির, নজরুলের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশে। লোহার বেড়ার ওপার থেকে নজরুল চেঁচিয়ে জিগগেস করলে—সব  এনেছিস তো? পবিত্র হাসল। কী জানে নজরুল, কী জিনিস পবিত্র আজ নিয়ে আসছে তার জন্যে। কী দেবতা-দুর্লভ উপহার! কী এনেছিস? চেঁচিয়ে উঠল নজরুল। পবিত্র বললে, তোর জন্যে কবিকণ্ঠের মালা এনেছি। বলে “বসন্ত” বইখানা তাকে দেখাল। নজরুল ভাবলে, রবীন্দ্রনাথের “বসন্ত” কাব্যনাট্যখানা নিয়েই পবিত্র বুঝি একটু কবিয়ানা করছে। এই দ্যাখ। উৎসর্গ-পৃষ্ঠটা পবিত্র খুলে ধরল তার চোখের সামনে। আর কী চাস্! সব চেয়ে বড় স্তুতি আজ তুই পেয়ে গেলি। তার চেয়েও হয়তো বড় জিনিস। রবীন্দ্রনাথের স্নেহ!

    রবীন্দ্রনাথ যে নজরুলকে দেশের ও সাহিত্যের একটা দামী সম্পদ বলে মনে করতেন তার আর একটা প্রমাণ আছে। নজরুল যখন হুগলি জেলে অনশন করছে তখন রবীন্দ্রনাথ ব্যস্ত হয়ে তাকে টেলিগ্রাম করেছিলেন–Give up hunger strike, our literature claims you. টেলিগ্রাম করেছিলেন প্রেসিডেন্সি জেলে। সেই টেলিগ্রাম ফিরে এল রবীন্দ্রনাথের কাছে। কর্তৃপক্ষ লিখে পাঠাল : Addressee not found।

    ‘এই সময়ে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। পবিত্র তা চেপে যাচ্ছে।’ বললেন নলিনীকান্ত সরকার, আমাদের নলিনীদা। কৃষ্ণের যেমন বলরাম, নজরুলের তেমনি নলিনীদা। হাসির গানের তানসেন। নজরুল গায় আর হাসে, নলিনীদা গান আর হাসান। নজরুলের পার্শ্বাস্থি বলা যেতে পারে। নজরুলকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, নলিনীদার কাছে সন্ধান নাও। নজরুলকে সভায় নিয়ে যেতে হবে, নলিনীদাকে সঙ্গে চাই। নজরুলকে দিয়ে কিছু করাতে হবে, ধরো নলিনীদাকে। নজরুল সম্বন্ধে সব চেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল।

    শোনো সে মজার কথা। আলিপুর সেণ্টাল জেল থেকে নজরুল তখন বদলি হয়েছে হুগলি জেলে। হুগলি জেলে এসে নজরুল জেলের শৃঙ্খলা ভাঙতে শুরু করল, জেলও চাইল তার পায়ে ভালো করে শৃঙ্খল পরাতে। লেগে গেল সংঘাত। শেষকালে নজরুল হাঙ্গার স্ট্রাইক করলে। আটাশ দিনের দিন সবাই আমাকে ধরলে জেলে গিয়ে নজরুলকে যেন খাইয়ে আসি। জানতাম নজরুল মচকাবার ছেলে নয়, তবু ভাবলাম একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি। গেলাম হুগলি জেলের ফটকে। আমি আর সঙ্গে, সকল অগতির গতি, এই পবিত্র। জেলে ঢুকতে পারলাম না, অনুমতি দিলে না কর্তারা। হতাশ মনে ফিরে এলাম হুগলি স্টেশনে। হঠাৎ নজরে পড়ল, প্ল্যাটফর্মের গা ঘেঁসেই জেলের পাঁচিল উঠে গেছে। মনে হল জেলের পাঁচিলটা একবার কোনোরকমে ডিঙোতে পারলেই নজরুলের সামনে সটান চলে যেতে পারব। আর এভাবে জেলের মধ্যে একবার ঢুকতে পারলে সহজে যে বেরুনো চলবে না তা এই দিনের আলোর মতই স্পষ্ট। তবু বিষয়টা চেষ্টা করে দেখবার মত। পবিত্রকে বললাম, তুমি আগে উবু হয়ে বোসো, আমি তোমার দু’ কাঁধের উপর দু’ পা রেখে দাঁড়াই দেয়াল ধরে। তারপর তুমি আস্তে-আস্তে দাঁড়াতে চেষ্টা করো। তোমার কাঁধের থেকে যদি একবার লাফ দিয়ে পাঁচিলের উপর উঠতে পারি, তবে তুমি আর এখানে থেকো না। স্রেফ হাওয়া হয়ে যেয়ো। বাড়তি আরেক জনের জেলে যাওয়ার কোনো মানে হয় না।

    বেলা তখন প্রায় দুটো, প্ল্যাটফর্মে যাত্রীর আনাগোনা কম। ‘য়্যাকর্ডিং টু প্ল্যান’ কাজ হল। পবিত্রর কাঁধের থেকে পাঁচিলের মাথায় কায়ক্লেশে প্রমোশন পেলাম। প্রমোশন পেয়েই চক্ষু চড়কগাছ! ভিতরের দিকে প্রকাণ্ড খাদ—খাই প্রায় অন্তত চল্লিশ হাত। বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখি পবিত্রর নামগন্ধ নেই। যা হবার তা হবে, দুদিকে দু ঠ্যাং ঝুলিয়ে জাঁকিয়ে বসলাম পাঁচিলের উপর ঘোড়সওয়ারের মত। যে দিকে নামাও সেই দিকেই রাজি আছি—এখন নামতে পারাটাই কাম্যকর্ম।  কিন্তু কই জেলখানার ভিতরের মাঠে লোক কই? খানিকপর সামধ্যায়ী মশাইকে দেখলাম—মোক্ষদাচরণ সামধ্যায়ী। বেড়াতে বেড়াতে একটু কাছে আসতেই চীৎকার করে বললাম, নজরুলকে ডেকে দিন। নজরুলকে।

    সার্কাসের ক্লাউন হয়ে বসে আছি পাঁচিলের উপর। জেলখানার কয়েদীরা দলে-দলে এসে মাঠে জুটতে লাগলো বিনা টিকিটে সে-সার্কাস দেখবার জন্যে। দু’টি বন্দী যুবকের কাঁধে ভর দিয়ে দুর্বল পায়ে টলতে টলতে নজরুলও এগিয়ে আসতে লাগল। বেশি দূর এগুতে পারল না, বসে পড়ল। গলার স্বর অতদূরে পৌঁছুবে না, তাই জোড়হাত করে ইঙ্গিতে অনুরোধ করলাম যেন সে খায়। প্রত্যুত্তরে নজরুল ও জোড়হাত করে মাথা নেড়ে ইঙ্গিত করল এ অনুরোধ অপাল্য।

    এ তো জানা কথা। এখন নামি কি করে? পবিত্র সে ঠিক “ধরো লক্ষ্মণে”র মতই অবিকল ব্যবহার করবে এ যেন আশা করেও আশা করিনি। গাছে তুলে মই কেড়ে নেওয়ার চেয়ে পাঁচিলে তুলে কাঁধ সরিয়ে নেওয়া ঢের বেশি বিপজ্জনক। কিন্তু ভয় নেই। স্টেশনের বাবুরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আমার চোদ্দপুরুষের—আদ্য কি করে বলি—শেষ শ্রাদ্ধ করছেন। ধরণী, সিধা হও, বলে পাঁচিল থেকে পড়লাম লাফ দিয়ে। স্টেশনের মধ্যে আমাকে ধরে নিয়ে গেল, পুলিশের হাতে দেয় আর কি। অনেক কষ্টে বোঝানো হল যে আমি সন্ত্রাসবাদীদের কেউ নই। ছাড়া পেয়ে গেলাম। অবিশ্যি তার পরে পবিত্র আর কাছ-ছাড়া হল না—’

    ‘তারপরে নজরুল অনশন ভাঙল তো?’

    ভাঙল চল্লিশ দিনের দিন। আর তা শুধু তার মাতৃসমা বিরজাসুন্দরী দেবীর স্নেহানুরোধে।

    নজরুলের বিদ্রোহ, প্রতিজ্ঞার দৃঢ়তা ও আত্মভোলা বন্ধুত্বের পরিচয় পেলাম। তারপরে স্বাদ পাব তার দারিদ্রজয়ী মুক্ত প্রাণের আনন্দ, বিরতিহীন সংগ্রাম ও দায়িত্বহীন বোহিমিয়ানিজম! সবই সেই কল্লোলযুগের লক্ষণ।

    কিন্তু তোমরা কে কি করে এলে “কল্লোলে”?

    নৃপেন হঠাৎ একদিন একটা দীর্ঘ প্রেমপত্র পায়—তুমি এসো, আমার হাতের সঙ্গে হাত মেলাও। এ প্রেমপত্র তাকে কোনো তরুণী লেখেনি, লিখেছে “কল্লোলে”র পরিকল্পক স্বয়ং দীনেশরঞ্জন। “ধূমকেতু”তে “ত্রিশূলে”র লেখায় আকৃষ্ট হয়েই দীনেশরঞ্জন নৃপেনকে সম্ভাষণ করেন–আর, শুধু একটা লেখার জন্যে অনুরোধ নয়, গোটা লোকটাকেই নিমন্ত্রণ করে বসলেন। ভোজ্য সাজাতে, পরিবেশন করতে। নৃপেন চলে এল সেই ডাকে। মুখে সেই মধুর মন্দাক্রান্তা ছন্দ—

    ছন্নোপান্তঃ—পরিণতফল—দ্যোতিভিঃ কাননাম্রৈ—

    স্ত্বয্যারূঢ়ে—শিখরমচলঃ—স্নিগ্ধবেণীসবর্ণে।

    নূনং যাস্য—ত্যমবমিথুন—প্রেক্ষণীয়ামবস্থাং

    মধ্যে শ্যামঃ—স্তন ইব ভুবঃ—শেষবিস্তারপাণ্ডুঃ॥

    আর, পবিত্র একদিন ফোর আর্টস বা চতুষ্কলা ক্লাবে এসে পড়েছিল ওমরখৈয়ামের কবি কান্তিচন্দ্র ঘোষের সঙ্গে। পুরানো ঘর ভেঙে যখন ফের নতুন ঘর বাঁধা হল, ছোট করে, বন্ধুতায় ঘন ও দৃঢ় করে, তখনও পবিত্রর ডাক পড়ল। ঘর ছোট কিন্তু টুই খুব উঁচু। সে চূড়া উঁচু আদর্শবাদের।

    কান্তিচন্দ্র ঘোষকে দুর থেকে মনে হত সুকৃত্রিম আভিজাত্যের প্রতীক। এক কথায় স্নব। তিনিও নিজেকে dilettante বলতেন। “বিচিত্রা”য় থাকা কালে তার সংস্পর্শে আসি। তখন বুঝতে পারি কত বড় রসিক কত বড় বিদগ্ধ মন তার। তিনি “সবুজপত্রে”র লোক। তাই সাহিত্যে সব সময় নব্যপন্থী, অচলায়তনী নন। রসবোধের গভীরতা থেকে মনে যে স্নিগ্ধ প্রশান্তি আসে তা তার ছিল—সে শান্তির স্বাদ পেয়েছে তার নিকটবর্তীরা।

    কিন্তু নজরুল এল কি করে?

    পবিত্র যখন জেলে নজরুলকে “বসন্ত” দিতে যায় তখনই নজরুল কথা দেয় নতুন কবিতা লিখবে পবিত্রর ফরমায়েসে। “কল্লোলে”র জন্যে কবিতা। লাল কালিতে লেখা কবিতা। জেল থেকে এল একদিন সেই কবিতা—সত্যিসত্যিই লাল কালিতে লেখা—“সৃষ্টি সুখের উল্লাসে”।

    আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পল্বলে।

    বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার-ভাঙা কল্লোলে।

    আসল হাসি আসল কাঁদন, আসল মুক্তি আসল বাঁধন;

    মুখ ফুটে আজ, বুক ফাটে মোর তিক্ত দুখের সুখ আসে,

    রিক্ত বুকের দুখ আসে—

    আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে॥

    এই কবিতা ছাপা হল “কল্লোলে”র প্রথম কি দ্বিতীয় সংখ্যায়। কবিতাটির জন্যে পাঁচ টাকা দেওয়া হয়েছিল। জেলে সেই টাকা পবিত্র পৌঁছে দিয়েছিল নজরুলকে।

    এমন সময় “কল্লোল”-আপিসে কে আরেকটি যুবক এসে ঢুকল। ছিপছিপে ফর্সা চেহারা, খাড়া নাক, বড়-বড় চোখ, মুখে স্নিগ্ধ হাসি। কিন্তু একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এই বয়সেই কপালের উপর দু-চারটি রেখা বেশ গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। কে এ? এ সুকুমার ভাদুড়ি। একদিন এক গ্রীষ্মের দুপুরে হঠাৎ অনাহুত ভাবে “কল্লোল”-আপিসে চলে আসে। একটা গল্প হয়তো বেরিয়েছিল “কল্লোলে”—সেই অধিকারে। এসে নিঃসংকোচে দীনেশ ও গোকুলকে বললে, ‘আমি আপনাদের দেখতে এসেছি।’ আর ঘরের এক কোণে নিজের জায়গাটি পাকা করে রেখে যাবার সময় বললে, ‘আমি “কল্লোলে”র জন্যে কাজ করতে চাই।’

    আনন্দের খনি এই সুকুমার ভাদুড়ি। কিন্তু কপালে ঐ দুশ্চিন্তার রেখা কেন? এমন সুন্দর সুকান্ত চেহারা, এমন স্নিগ্ধ উজ্জ্বল চক্ষু, কিন্তু বিষাদের প্রলেপ কেন?

    নৃপেন বললে, ‘এখন এসব থাক। এখন হুগলি চলো।’

    বলে, এখন, এতক্ষণে রবীন্দ্রনাথ আবৃত্তি করলে :

    হে অলক্ষ্মী, রুক্ষকেশী, তুমি দেবী অচঞ্চলা

    তোমার রীতি সরল অতি নাহি জানো ছলাকলা।

    জ্বালাও পেটে অগ্নিকণা, নাইকো তাহে প্রতারণা

    টানো যখন মরণ ফাঁসি বলো নাকো মিষ্টভাষ,

    হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে করবো মোরা পরিহাস।

  • ছয়

    ছয়

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    ছয়

    ‘আপনি যাবেন না?’

    ‘তোমার কি মনে হয়?’ দুই চোখে কথা-ভরা হাসি নিয়ে তাকালেন দীনেশদা।

    উজ্জ্বল দৃষ্টির মধ্য দিয়ে এমন বন্ধুতাপূর্ণ হাসি—এ আর দেখিনি কোনোদিন। সে-হাসিতে কোমল স্নেহের স্পর্শ মাখানো। পুঁজিপাটা তাঁর কিছুই ছিল না—শুধু হৃদয়ভরা নীরবনিবিড় স্নেহ আর দুই চোখের এই মাধুৰ্যময় মিত্রতা। যেন বা একটি অন্তিম আশ্রয়ের প্রশ্নহীন প্রতিশ্রুতি। সব হারিয়ে-ফুরিয়ে গেলেও আমি আছি এই অভয় ঘোষণা। তাই দীনেশরঞ্জন ছিলেন “কল্লোলে”র সব-পেয়েছির দেশ। সব-হারানোদের মধ্যমণি।

    দেখতে সুপুরুষ ছিলেন। চৌরঙ্গি অঞ্চলে এস রায়ের খেলার সরঞ্জামের দোকানে যখন চাকরি করতেন, তখন সবাই তাঁকে পার্শি বলে ভুল করত। দু-চার কথা আলাপ করেই বোঝা যেত ইনি যে শুধু বাঙালি তা নন, একেবারে বিশ্বাসী বন্ধুস্থানীয়। অল্প একটু হেসে দু’ চারটি মিষ্টি কথায় দূরকে নিকট ও পরকে আপন করার আশ্চর্য জাদুমন্ত্র জানতেন। একটি বিশুদ্ধ প্রীতিস্বচ্ছ অন্তরের নির্ভুল ছায়া এসে সে চোখে পড়ত বলেই সে-জাদুমন্ত্রের মায়ায় মুগ্ধ না হয়ে থাকা যেত না। এস রায়ের দোকান থেকে চলে আসেন তিনি লিসে স্ট্রিটে এক ওষুধের দোকানে অংশীদার হয়ে। সমবেত রুগীদের এমন ভাবে যত্ন-আত্তি করতেন কে বলবে ইনিই ডাক্তার নন। মানুষের অন্তরে প্রবেশ করবার সহজ, সংক্ষিপ্ত ও ত্বরান্বিত যে পথ আছে তিনি ছিলেন সেই পথের পথকার। সে পথের প্রবেশে স্বচ্ছ-স্নিগ্ধ হাসি, প্রস্থানে অকপট আন্তরিকতা। এই সময়ে প্রায়ই নিউ মার্কেটে ফুলের স্টলে বেড়াতে আসতেন। ফুল ভালবাসতেন খুব, কিন্তু কেনবার মত স্বচ্ছলতা ছিল না। মাসে দু-এক টাকার কিনতেন বড় জোর, কিন্তু যখনই দোকানের গলিতে এসে ঢুকতেন দোকানীদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত—কে কোন ফুল তাকে উপহার দেবে। অম্লান ফুলের মতই যে এর হৃদয় ফুলের জহুরিরা বুঝতে পারত সহজেই। কথা-ভরা উজ্জ্বল চোখ, হাসিভরা মিষ্টি আলাপ আর অনন্যসাধারণ সরল সৌন্দর্যবোধ—সকলের থেকেই কিছু না কিছু আদায় করে নিত অনায়াসে। শুধু ক্ষণজীবনের ফুল নয়, আমার-তোমার ইহজীবনের ভালোবাসা। অজাতশত্রু শুনেছি, কিন্তু এই প্রথম দেখলাম—জাতমিত্র। এই একজন।

    এই ফুলের স্টলে ঢুকেই গোকুলের কাছাকাছি এসে পড়েন। লক্ষ্য করেন একটি উদাসীন বিমনা যুবক ছিন্নবৃন্ত ফুল গুচ্ছের দিকে করুণ চোখে চেয়ে কি ভাবছে। হয়তো ভাবছে ফুল বেচে জীবিকার্জন করতে হবে এ কি পরিহাস! পরিহাসটা আরো বেশি মর্মান্তিক হয় যখন তা আঘ্রাণেও লাগে না—আস্বাদনেও লাগে না। পুরোপুরি অন্তত জীবিকার্জনটাই কর। দীনেশরঞ্জন হাত মেলালেন গোকুলের সঙ্গে। তার বিপণি-বীথি নতুন ছন্দে সাজিয়ে দিলেন, নতুন বাচনে আলাপ করতে লাগলেন হলে-হতে-পারে খদ্দেরদের সঙ্গে। ফুল না নাও অন্তত একটু হাসি একটু সৌজন্য নিয়ে যাও বিনি-পয়সায়। আর এমন মজা, যেই একটু সেই হাসি দেখেছ বা কথা শুনেছ, নিজেরও অলক্ষিতে কিনে বসেছ ফুল। দেখতে-দেখতে গোকুলের মরা গাঙে ভরা কোটালের জোয়ার এল। তবু যেন মন ভরে না। এমন কিছু নেই যার সৌরভ অল্পযায়ী বা অল্পজীবী নয়? যা শুকায় না, বাসি হয় না? আছে নিশ্চয়ই আছে। তার নাম শিল্প, তার নাম সাহিত্য। চলো আমরা সেই সৌরভের সওদা করি। হোন তিনি এ সৃষ্টির কারিক, তবু আমরা পরের জিনিসে কারবার করব কেন? আমরা আমাদের নিজের জিনিস নিজেরাই নির্মাণ করব।

    সেই থেকে ফোর আর্টস বা চতুষ্কলা ক্লাব। আর সেই চতুষ্কলার ক্ষীরবিন্দু “কল্লোল”।

    মুরলীদা, শৈলজা, প্রেমেন আর আমি চারজন ভবানীপুর থেকে এক দলে, আর অন্য দলে ডি-আর, গোকুল, নৃপেন, ভূপতি, পবিত্র, সুকুমার— সকলে সদলবলে হুগলিতে এসে উপস্থিত হলাম। প্ল্যাটফর্মে স্বয়ং নজরুল। “দে গরুর গা ধুইয়ে” অভিনন্দনের ধ্বনি উঠল। পূর্ব-পরিচয়ের নজির এনে ব্যবধানটা কমাবার চেষ্টা করা যায় কিনা সে-কথা ভেবে নেবার আগেই নজরুল সবল আলিঙ্গনে বুকে টেনে নিলে—শুধু আমাকে নয়, ভনে-জনে প্রত্যেককে। তোমরা হেঁটে-হেঁটে একটু-একটু করে কাছে আস আর আমি লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে পড়ে জাপটে ধরি–সাঁতার জানা থাকতে সাঁকোর কি দরকার!

    সেটা বোধ হয় নজরুলের বড় ছেলের আকিকা উৎসবের নিমন্ত্রণ। দিনের বেলায় গানবাজনা, হৈ-হল্লা, রাতে ভুরিভোজ। ফিরতি ট্রেন কখন তারপর? “দে গরুর গা ধুইয়ে।” ফিরতি ট্রেনের কথা ফিরতি ট্রেনকে জিগগেস করো।

    দুপুরে নজরুলকে নিয়ে কেউ-কেউ চলে গেলাম নৈহাটি—সুবোধ রায়ের বাড়ি। সুবোধ রায় মুরলীদার সহপাঠী, তাছাড়া সেই বছরেই তার আর সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের হাতে এসে গিয়েছে “বিজলী”—মহানিশার অন্ধকারে সেই বিদ্যুজ্জ্বালাময়ী কথা। আর তার সঙ্গে আছে কিরণকুমার রায়, সংক্ষেপে কিকুরা। তীক্ষ্ণধী সুজন-রসিক বন্ধু। কিন্তু সে নিজের আত্মপরিচয় দিতে ভালবাসে চিরকেলে সাব-এডিটর বলে। বলেই বয়েৎ ঝাড়ে : এডিটর মে কাম, এডিটর মে গো, বাট আই গো অন ফর এভার। আরো একজন আছেন—তিনি শিল্পী নাম অরবিন্দ দত্ত, সংক্ষেপে এ-ডি। নিপুণ রূপদক্ষ। কিন্তু তিনি বলেন, তার শিল্পের আশ্চর্য কৃতিত্ব তার রঙে-তুলিতে-কাগজে-কলমে তত নয়, যত তার আননমণ্ডলে। কেননা উত্তরকালে তিনি বহু সাধনায় তার মুখখানাকে চার্চিল সাহেবের মুখ করে তুলেছেন। দাঁতের ফাঁকে একটা মোটা চুরুট শুধু বাকি।

    ছোটখাটো বেঁটে মানুষটি এই সুবোধ রায়, অফুরন্ত উচ্চহাস্যের ও উচ্চরোলের ফোয়ারা। প্রচুর পান খান আর প্রচুর কথা বলেন। আর, উচ্চগ্রামের সেই কথায় আর হাসিতে নিজেকে অজস্র ধারায় অবারিত করে দেন। আজো, বহু বৎসর অতিক্রম করে এসেও, সেই সরল খুশির সবল উৎসার যেন এখনো শুনতে পাচ্ছি।

    আসলে সেই যুগটাই ছিল বন্ধুতার যুগ, কমরেডশিপ বা সমর্মিতার যুগ। যে যখন যার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, আত্মার আত্মজনের মত দাঁড়িয়েছে। জিজ্ঞাসা নেই, পরীক্ষা নেই, ব্যবধান নেই। সৃজনসমুদ্রের উর্মিল উত্তালতায় এক ঢেউয়ের গায়ে আরেক ঢেউ—ঢেউয়ের পরে ঢেউ। সব এক জলের কলোচ্ছ্বাস! বাঁধ ভাঙা এক বন্যার বল।

    কল্লোল-যুগের আরেক লক্ষণ এই সুন্দর সৌহার্দ্য, নিকটনিবিড় আত্মীয়তা। একজনের জন্যে আরেকজনের মনের টান। একজনের ডাকে আরেকজনের প্রতিধ্বনি। এক সহমর্মিতা।

    নজরুল বিষের বাঁশি বাজাচ্ছে, আর সে-সুর সে-কথা সবাইর রক্তে বিদ্রোহের দাহ সঞ্চার করছে। গলার শির জোঁকের মত ফুলে উঠেছে, ঝাঁকড়া-চুলে মাথা দোলাচ্ছে অনবরত, আর কখনো-কখনো চড়ার কাছে গিয়ে গলা চিরে যাচ্ছে দুতিন ভাগ হয়ে—সব মিলে হয়ত একটা অশালীন কর্কশতা—কিন্তু সব কিছু অতিক্রম করে সেই উন্মাদনার মাধুর্য–ইহসংসারে কোথাও তার তুলনা নেই। প্রখরতার মধ্যে সে যে কি প্রবলতা, কার সাধ্য তা প্রতিরোধ করে! কার সাধ্য সে অগ্নিমন্ত্রে না দীক্ষা নেয় মনে-মনে! এ তো শুধু গান নয় এ আহ্বান—বন্ধনবর্জনের আর্তনাদ! কার সাধ্য কান পেতে না শোনে! বুক পেতে না গ্রহণ করে।

    এই
    শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল!
    এই
    শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল॥
    তোদের
    বন্ধ-কারায় আসা মোদের বন্দী হতে নয়,
    ওরে,
    ক্ষয় করতে আসা মোদের সবার বাঁধন-ভয়।
    এই
    বাঁধন পরেই বাঁধন তোদের করব মোরা জয়
    এই
    শিকল-বাঁধা পা নয় এ শিকল ভাঙা কল॥
    ওরে
    ক্রন্দন নয় বন্ধন এই শিকল ঝঞ্চনা
    এ যে
    মুক্তি পথের অগ্রদূতের চরণবন্দনা।
    এই
    লাঞ্ছিতেরাই অত্যাচারকে হানছে লাঞ্ছনা,
    মোদের
    অস্থি দিয়েই জ্বলবে দেশে আবার বজ্রানল॥

    একবার গান আরম্ভ করলে সহজে থামতে চায় না নজরুল। আর কার এমন ভাবের অভাব হয়েছে যে নজরুলকে নিবৃত্ত করে। হারমোনিয়মের রিডের উপর দিয়ে খটাখট খটাখট করে ক্ষিপ্তবেগে আঙুল চালার আর দীপ্তস্বরে গান ধরে :

    মোরা ভাই বাউল চারণ মানি না শাসন বারণ

    জীবন মরণ মোদের অনুচর রে।

    দেখে ঐ ভয়ের ফাঁসি হাসি জোর জয়ের হাসি

    অ-বিনাশী নাইক মোদের ডর রে॥

    যা আছে যাক না চুলায়, নেমে পড় পথের ধূলায়

    নিশান দুলায় ঐ প্রলয়ের ঝড় রে।

    ধর হাত ওঠরে আবার দুর্যোগের রাত্রি কাবার

    ঐ হাসে মার মূর্তি মনোহর রে॥

    জীবনে এমন কয়েকটা দিন আসে যা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে স্মৃতিতে—অক্ষরও মুছে যায় ক্রমে-ক্রমে কিন্তু সেই স্বর্ণচ্ছটা জেগে থাকে আমরণ। তেমনি সোনার আলোয় আলো করা দিন এ। রেখা মুছে গেছে কিন্তু রূপটি আছে অবিনশ্বর হয়ে। দুপুরে গঙ্গায় স্নান, বিকালে গঙ্গায় নৌকাভ্রমণ, রাত্রে আহার—এ একটা অমৃতময় অভিজ্ঞতা। বায়ু, জল, তরু, লতা, তারা, আকাশ সব মধুমান হয়ে উঠেছে— মৃত্যুজিৎ যৌবনের আস্বাদনে। সৃষ্টির উল্লাসে বলীয়ান হয়ে উঠেছে দুর্বার কল্পনা।

    সেই রাত্রে আর গান নেই, সুরু হল কবিতা। প্রেমেন একটা কবিতা আবৃত্তি করলে—বোধ হয়, “কবি নাস্তিক”। “বুক দিলে যে, ভুখ দিলে যে, দুখ দিতে সে ভুলল না, মৃত্যু দিলে লেলিয়ে পিছে পিছে।” আমিও অনুসরণ করলাম। “দে গরুর গা ধুইয়ে।” এরা আবার কবিতাও লেখে নাকি? সবাই অভিনন্দন করে উঠল এই প্রথম ও অত্যাশ্চর্য আবিষ্কারে। বলো, আরো বলো—আরও যতটা মুখস্থ আছে।

    ফিরতি ট্রেন কখন চলে গিয়েছে। নেমে এসেছে ক্লান্তিহরণ স্তব্ধতা। কিন্তু নৃপেন কাউকে ঘুমুতে দেবে না। যেন একটা ঘরছাড়া অনিয়মের জগতে চলে এসেছি সবাই। দেখলাম, বাড়ি ফিরে না গেলেও চলে, দিব্যি না ঘুমিয়ে আড্ডা দেওয়া যায় সারারাত। প্রতিবেশী হৃদয়ের উত্তাপের পরিমণ্ডলে এসে নবীন সৃষ্টির প্রেরণা লাভ করা যায়, কেননা আমরা জেনে নিয়েছি, আমরা সব এক প্রাণে প্রেরিত। এক ভবিষ্যতের দিশারী।

    “বিষের বাঁশী”র ভূমিকায় নজরুল দীনেশরঞ্জনকে উল্লেখ করেছিল আমার ঝড়ের রাতের বন্ধু বলে। দীনেশরঞ্জন বয়সে আমাদের সকলের চেয়ে বড়, কিন্তু আশ্চর্য, বন্ধুতায় প্রত্যেকের সমবয়সী, একেবারে নিভৃততম, দুঃসহতম মুহূর্তের লোক। কি আকর্ষণ ছিল তাঁর, তাঁর কাছে প্রত্যেকের নিঃসঙ্কোচ ও নিঃসংশয় হবার ব্যাকুলতা জাগত। অথচ এত ঘনিষ্ঠতার মাঝেও একদিনের জন্যেও তাঁর জ্যেষ্ঠত্বের সন্ত্রম হারাননি। তাঁর দৃঢ়তাকে উচ্চতাকে অবনমিত করেননি। নিজে আর্টিস্ট ছিলেন, তাই একটি পরিচ্ছন্ন শালীনতা তার চরিত্রে ও ব্যবহারে মিশে ছিল। তারই জন্যে এত আস্থা হত তাঁর উপর। মনে হত, নিজে নিঃসম্বল হলেও নিঃসম্বলদের ঠিক তিনি নিয়ে যাবেন পরিপূর্ণতার দেশে। নিজে নিঃসহায় হলেও নিঃসহায়দের উত্তীর্ণ করে দেবেন তিনি বিপদ-বাধার শেষে শ্যামলিম সমতলতায়।

    দীনেশরঞ্জনের বিদ্রোহ রাজনৈতিক নয়, জীবনবাদের বিদ্রোহ। একটা আদর্শকে সমাজে সংসারে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে বৈরাগ্যভূষণ সংগ্রাম। সাংসারিক অর্থে সাফল্য খোঁজেন নি, শুধু একটি ভাবকে সব কিছুর বিনিময়ে ফলবান করতে চেয়েছিলেন। সে হচ্ছে সত্যভাষণের আলো-কে সাহিত্যের পৃষ্ঠায় অনির্বাণ করে রাখা। প্রতিদিনকার সাংসারিক তুচ্ছতার ক্ষেত্রে অযোগ্য এই দীনেশরঞ্জন কত বিদ্রুপ-লাঞ্ছনা সহ্য করেছেন জীবনে, কিন্তু আদর্শভ্রষ্ট হননি। তাঁর দীপায়নের উৎসবে ডাক দিয়ে আনলেন যত “হাল-ভাঙা পাল-ছেঁড়া ব্যথার” ঘরছাড়াদের। বললেন, অমৃতের পুত্রকে কে বলে গৃহহীন? এই ঘরছাড়াদের নিয়েই ঘর বাঁধব আমি। থাকব সবাই মিলে একটা ব্যারাক বাড়িতে। কেউ বিয়ে করব না। বিভক্ত হব না। থাকব অন্তরঙ্গ ঘনিষ্ঠতায়। সাহিত্যের ব্রতে একনিষ্ঠ হব। মৃত্যুর পরে কোনো সহজ সুন্দর পরলোক চাই না, এই জীবনকেই নব-নব সৃষ্টির ব্যঞ্জনায় অর্থ দেব, মূল্য দেব নব-নব পরীক্ষায়।

    কিন্তু গোকুলের বিদ্রোহ সাহিত্যিক বিদ্রোহ। গোকুলকে থাকতে হত তার ব্রাহ্ম মামাবাড়িতে নানারকম বিধি-বিধানের বেঁড়াজালে। সে বাড়িতে গোকুলকে গলা ছেড়ে কেউ ডাকতে পেত না বাইরে থেকে, কোনো মুহূর্তে জামা খুলে খালি-গা হতে পারত না গোকুল। এমন যেখানে কড়া শাসন, সেখান থেকে আর্টস্কুলে গিয়ে ভর্তি হল। তার অভিভাবকদের ধারণা, আর্টস্কুলে যায় যত বাপে-তাড়ানো মায়ে-খেদানো ছেলে, এবার আর কি, রাস্তায়-রাস্তায় বিড়ি ফুঁকে বেঁড়াও গে। শুধু আর্ট স্কুল নয়, সেই বাড়ি থেকেই সিনেমায় যোগ দিলে গোকুল। “সোল অফ এ শ্লেভ” ছবিতে নামল একটি বিদূষকের পার্টে। সহজেই বুঝতে পারা যায় কত বড় সংঘর্ষ করতে হয়েছিল তার সেদিনকার সেই পরিপার্শ্বের সঙ্গে। নীতি-রীতির কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে। কিছু কিছু তার ছায়া পড়েছে “পথিকে”:

    “মায়া উঠিয়া মুখ ধুইয়া আসিয়া চুল আঁচড়াইতে আঁচড়াইতে গান ধরিল–

    তোমার আনন্দ ঐ এলো দ্বারে

    এলো–এলো–এলো গো!

    বুকের আঁচলখানি I beg your pardon, miss–

    সুখের আঁচলখানি ধূলায় পেতে

    আঙ্গিনাতে মেল গো—’

    নাঃ, আমার মুখটা দেখছি সত্যিই খারাপ হয়ে গেছে। ভাগ্যিস কেউ ছিল না—‘বুকের আঁচল’ বলে ফেলেছিলাম!

    দীপ্তি হাসিয়া বলিল—বাঃ বাঃ! দিদি, তোকে পারবার যো নেই!

    মায়া। কেন, দোষটা শুধরে নিলাম তাতেও অপরাধ?

    দীপ্তি। ওর নাম দোষ শুধরে নেওয়া? ও ত চিমটি কাটা।

    মায়া। তা হলে আমার দ্বারা হয়ে উঠল না সভ্য হওয়া। তোদের মত ভাল মেয়ের পাশে থেকে যে একটু-আধটু দেখে শুনেও শিখব, তাও দিবি না? আচ্ছা সবাই এত রেগে যায় কেন বলতে পারিস? সেদিন যখন কমলা ঐ গানটা গাইছিল, মিসেস ডি এমন করে তার দিকে তাকালেন যে বেচারীর বুকের আঁচল বুকেই রইল, তাকে আর ধূলায় মেলতে হল না। মিসেস ডি বলে দিলেন, বই-এ ওটা ছাপার ভুল কমল, সুখের আঁচল হবে–

    কমলা বলল—কিন্তু রবিবাবুকে আমি ওটা বুকের আঁচল–

    মিসেস ডি বলিল—তর্ক কোর না, যা বলছি শোন। আর কমলাটারও আচ্ছা বুদ্ধি! না হয় রবিবাবু গেয়েছিলেন বুকের আঁচল–কিন্তু এদিকে বুকের আঁচলটা ধূলায় পাততে গেলে যে ব্যাপারটা হবে তার সম্বন্ধে কবির অনভিজ্ঞতাকে কি প্রশ্রয় দেওয়া উচিত?…”

    “বীরেন্দ্রনাথ বলিলেন—আজকের ব্যাপারের হোষ্টেস কে?

    দীপ্তি। দিদি।

    মায়া ফোঁস করিয়া উঠিল—হাঁ, তা-ত হবেই, ছাই ফেলতে এমন ভাঙা কুলো আর কে আছে বল?

    করুণা বলিলেন—ঝগড়াঝাঁটির দরকার কি? মেয়েদের মত তোদের ত আর সঙ্গে নিয়ে এক টেবিলে খেতে হবে না—তোরা খাওয়াবি।

    মায়া বলিল—তাও ত বটে।

    সুবর্ণ। টেবিলে! তার মানে? ওরা কি কখনো টেবিলে খেয়েছে? একটা বিদ্ঘুটে কাণ্ড না করে তোমরা ছাড়বে না দেখছি। চিবোনো জিনিষগুলো চারদিকে ছড়িয়ে ফেলবে—মুখে ভাত তোলার সময় সর-সর শব্দের সঙ্গে ঝর-ঝর করবে। হাতটা চাটতে চাটতে কনুই পর্যন্ত গিয়ে ঠেকবে–

    মায়া হাসিয়া বলিল, আচ্ছা মা, তুমি কি কোনদিন ওঁদের খেতে দেখেছ?

    সুবর্ণ। দেখব আবার কি। মেসে থাকে, এক সঙ্গে পঞ্চাশজনে মিলে বাইরের কলে চান করে আর চেঁচামেচি কাড়াকাড়ি করে খায়— আমাদের কর্পূরীটোলা লেনের বাড়ীর ছাদ থেকে একটা মেস স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়, ছেলেগুলো শুধু গায়ে বিছানার ওপর শুয়ে শুয়ে পড়ে, আর পড়ে তো কত! খাটের ছৎরিতে ময়লা গামছা আর ঘরের কোণে গামলায় পানের পিক, এ থাকবেই।”

    “কল্যাণী বলিল,–মনিবাবু, আপনি আমার খুব কাছে কাছে থাকুন না–

    মুনি কিছু বুঝিতে না পারিয়া কল্যাণীর মুখের দিকে চাহিল।

    কল্যাণী হাসিয়া বলিল—জানেন না বুঝি, এটা ব্রাহ্মপাড়া। চারপাশের জানালাগুলোর দিকে একটু ভাল করে চেয়ে দেখুন, দেখবেন, কত ছোটবড় কত রকমের সব চোখ ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। আধঘণ্টার মধ্যেই গেজেট ছাপা হয়ে যাবে। ঐ যে প্রকাণ্ড হলদে রং-এর বাড়ীটা দেখছেন ওটা হচ্ছে মিসেস ডির বাড়ী, ওঁকে চেনেন না?

    মনি ভীতভাবে বলিল—চলুন নীচে যাই, দরকার নেই ওসব গণ্ডগোলে।

    কল্যাণী হাসিয়া বলিল—এই আপনার সাহস?

    মুনি বলিল—তলোয়ারের চেয়ে জিভটাকে আমি ভয় করি। চলুন—

    কল্যাণী বলিল—Its too late. ঐ দেখুন—

    মুনি দেখিল প্রায় প্রত্যেক জানালা হইতে মেয়েরা বিশেষ আগ্রহের সহিত দেখিতেছে।”

    “মিস লতিকা চ্যাটার্জি তাহার মাতাকে বলিল—মা, আমি এই গোল্ড-গ্রে শাড়ীটার সঙ্গে বাফ-ব্লাউজটা পরব?

    মিসেস চ্যাটার্জি। ওটা না তুই মিসেস গুপ্তর পার্টিতে পরে গিয়েছিলি!

    লতিকা। তবে এই ফ্লেম কলারের শাড়ী আর স্যামন পিঙ্ক ব্লাউজটা পরি, কি বল মা?

    মিসেস চ্যাটার্জি। মরি মরি, যে না রূপের মেয়ে, ঠিক যেন কয়লার বস্তায় আগুন লেগেছে মনে হবে।

    তাহার পর মাতা এবং কন্যার মধ্যে যে প্রহসন সুরু হইল তাহার দর্শক কেহ থাকিলে দেখিত, কাপড় জামা ঘরময় ছড়াইয়া লতিকা তাহার উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া হিষ্টিরিয়া-গ্রস্ত রোগীর ন্যায় হাত-পা ছুঁড়িতেছে এবং তাহার মাথার কাছে বসিয়া মিসেস চ্যাটার্জি তাহাকে কিলাইতেছেন।”

    নজরুলের যেমন ছিল “দে গরুর গা ধুইয়ে”, গোকুলের তেমনি ছিল, “কালী কুল দাও মা, নুন দিয়ে খাই”। এমনিতে ক্লান্ত-কঠিন গম্ভীর চেহারা, কিন্তু শুকনো বালি একটু খুঁড়তে পেলেই মিলে যাবে শীতল স্নিগ্ধ জলস্পর্শ। দীনেশ আর গোকুল দু’জনেই সংসার-সংগ্রামে ক্ষতবিক্ষত, দু’জনেই অবিবাহিত—দু’জনের মাঝেই দেখেছি এই স্নেহের জন্যে শিশুর মত কাতরতা। স্নেহ যে কত প্রবল, স্নেহ যে কত পবিত্র, স্নেহ যে মানুষের কত বড় আশ্রয় তা দু’জনেই তাঁরা বেশি করে বুঝতেন বলে তাঁরা দুজনেই স্নেহে এত অফুরন্ত ছিলেন।

    প্রেমেন ঢাকায় ফিরে যাবে, আমি আর শৈলজা তাকে শেয়ালদা স্টেশনে গিয়ে তুলে দিলাম। প্রেমেন লিখলে ঢাকা থেকে :

    অচিন,

    এই মাত্র ‘কল্লোল’ অফিস থেকে সংক্রান্তির ফাইলের সঙ্গে তোর, শৈলজার আর দীনেশবাবুর চিঠি পেলুম।

    সারাদিন মনটা খারাপই ছিল। খারাপ থাকবারই কথা। কলেজে যাই না, এখানেও জীবনটা অপব্যয় করছি। কিন্তু তোদর চিঠি পেয়ে এমন আনন্দ হল কি বলব।

    ভাই, একটা কথা তোকে আগেও একবার বলেছি, আজও একবার বলব—না বলে পারছি না। দ্যাখ ভাই, জীবনে অনেক কিছুই পাইনি, কিন্তু যা পেয়েছি তার জন্যে একবার কৃতজ্ঞ হয়েছি কি? এই বন্ধুদের ভালবাসা—এর দাম কি কোন ভালবাসার চেয়ে কম? এর দাম আমরা সব চুকিয়ে কি দিতে পেরেছি?

    আদিম মানুষ অর্ধসভ্য, মানুষ ছিল একক, হিংস্র। সে আরেকটা পুরুষকে কাছে ঘেঁষতেও দিত না। (উর্দ্ধতনের গোড়ার দিকের কথা বলছি) নারীর প্রতিও তার কাম তখনও প্রেমে রূপান্তরিত হয়নি। তারপর অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। তবু হুইটম্যান যখন sexless loveএর কথা প্রথম প্রচার করেছিলেন অনেকেই মনে-মনে হেসেছিল, এখনও অনেকে হয়ত হাসে। কিন্তু আমি জানি ভাই, মানুষ পশুত্বের সে-স্তর ছাড়িয়ে এখন যে-স্তরে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে সেখানে যৌনসম্বন্ধ ছাড়াও আর একটা সম্বন্ধ মানুষের সঙ্গে মানুষের হওয়া সম্ভব। কথা ভাল করে হয়ত বোঝাতে পারলুম না। তবুও তুই বুঝতে পারবি জানি।

    এই যে প্রেম, মানুষের অন্তরের এই যে নতুন এক প্রকাশ এটা এত দিন সম্ভব ছিল না। যৌনমিলনপিপাসা ও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে দরকারী ক্ষুধা ও প্রবৃত্তিকে নিবৃত্ত করতেই একদিন মানুষের। দিন কেটে যেত। নিজের অন্তরের গভীরতর সত্যকে তলিয়ে খুঁজে বুঝে দেখবার অবসর তার ছিল না। আজ কয়েকজনের হয়েছে বা কয়েকজন সে অবসর করে নিয়েছে।

    জীবনের চরম সার্থকতা এই প্রেমের জাগরণে। যতদিন না এই প্রেম জাগে ততদিন মানুষ খণ্ডিত থাকে, সে নিজেকে পায় না সম্পূর্ণ করে। কিন্তু বন্ধুর মাঝে যেই সে আপনাকে প্রসারিত করে দিতে পারে তখনই সে-খণ্ডতার হীনতা দুঃখ ও লজ্জা থেকে মুক্তি পেয়ে সার্থক হয়। আমি যতদিন বন্ধুকে অন্তর দিয়ে ভালবাসতে না পারি ততদিন আমার দরজা বন্ধ থাকে। যে পথে আনন্দময় পৃথিবীর চলাচল সে-পথ আমি পাই না।

    কথাটাকে কিছুতেই গুছিয়ে ভাল করে বলতে পারছি না, শুধু অন্তরে অনুভব করছি এর সত্য। এইটুকু বুঝতে পারছি প্রিয়া আমার জীবনের যতখানি, বন্ধু তার চেয়ে কম নয়। এই কমরেডশিপের মুল্য হুইটম্যান প্রথম বোঝাতে চেষ্টা করেন। আমরাও একটু বুঝেছি মনে হয়। এখানে হুইটম্যান থাকলে সেই জায়গাটা একটু তুলে দিতুম।

    বন্ধুত্ব, কমরেডশিপ ইত্যাদি কথাগুলো সব জাতির ভাষাতেই বহুকাল ধরে চলে আসছে, কিন্তু এই বন্ধুত্ব কথাটার ভেতরকার অর্থের গভীরতা দিন দিন মানুষ নতুন করে উপলব্ধি করছে। পঞ্চাশ বছর আগে এ কথাটার মানে যা ছিল আজ তা নেই, আকাশের মত এ কথাটার অর্থের আর সীমা, বিস্ময়ের আর পার নেই।

    আমার অন্তরের দেবতা তোর অন্তরের দেবতার মিলন-প্রয়াসী, তাই তো তুই আমার বন্ধু। আমরা নিজেদের অন্তরের দেবতাকে চিনি না ভাল করে, ক্রমাগত চেনবার চেষ্টা করছি মাত্র। বন্ধুর ভেতর দিয়েই তাকে ভালো করে চিনি।

    শুধু প্রিয়াকে পেল না বলে যে কাঁদে, সে হয় মূর্খ, নয় যৌনপিপাসার স্তরে আবদ্ধ অন্ধ। প্রিয়ার মাঝেও যতক্ষণ না এই বন্ধুকে খুঁজি ততক্ষণ প্রিয়াকে পূর্ণ করে পাই না। যে প্রেম বৃহৎ সে প্রেম মহৎ। সে প্রেম প্রিয়ার মাঝে এই বন্ধুকে খোঁজে বলেই বৃহৎ ও মহৎ। প্রিয়ার মাঝে শুধু নারীকে খুঁজত ও খোঁজে পশু।

    অনেকক্ষণ বললুম। তোর ভাল লাগবে কি এই একঘেয়ে বক্তৃতা? তবু না বলে পারি না, কারণ তুই যে আমার “বন্ধু”।

    দিন-দিন নিজের অজ্ঞাতে একটা বিশ্বাস বাড়ছে যে মৃত্যুই চরম কথা নয়। “কিরণ1” অর্থহীন জীবন বুদ্বদ ছিল না–আরো কিছু–কি?

    চিঠি দিস, ওখানকার সব খবর লিখিস। খুব লম্বা চিঠি দিবি। আভ্যুদয়িকের খবর, ‘কল্লোল’ আফিসের খবর, শৈলজা, মুরলীদা, শিশির, বিনয়ের খবর ইত্যাদি ইত্যাদি সব চাই। পড়াশুনা করছি না মোটে। কি লিখছিস আজকাল? সেদিন যিনি ফল খেতে দিলেন তিনিই কি তোর মা? তোর মাকে আমার প্রণাম দিস।–তোর প্রেমেন্দ্র মিত্র

  • সাত

    সাত

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    সাত

    ঘোর বর্ষায় পথ-ঘাট ডুবে গেলেও আড্ডা জমাতে আসতে হবে তোমাকে কল্লোল: আপিসে—তা তুমি ভবানীপুরেই থাকো বা বেলেঘাটায়ই থাকে। আর সোমনাথ আসত সেই কুমোরটুলি থেকে। সোমনাথের যেটা বাড়ি তার নিচেটা চালের আড়ত, সারবাঁধা চালের বস্তায় ভর্তি। উপরে উঠে গিয়ে চালের গাদি পেরিয়ে সোমনাথের ঘর। একটা জলজ্যান্ত প্রতিবাদ। সেই প্রতিবাদ শুধু তার ঘরে নয়, চেহারায়ও। গদির মালিকদের পরনে আটহাতি ধুতি, গা খালি, গলায় তুলসীর কন্ঠী। সোমনাথের পরনে ঢিলেঢালা অঢেল পাঞ্জাবি, লম্বা লোটানো কোচা, অতৈললাঞ্ছিত চুল ফাঁপিয়ে-ফাঁপিয়ে ব্যাকব্রাশ করা। সব মিলিয়ে একটা উদ্ধত বিদ্রোহ সন্দেহ নেই, কিন্তু দেখতে যেমন সৌম্যদর্শন, শুনতেও তেমনি অতিনম্র। মোলায়েম মিষ্টি হেসে একটু বা চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলে, কথায় পরিহাসের রসটাই বেশি। অথচ এদিকে খুব বেশি সিরিয়স—পড়ছে মেডিকেল কলেজে। ডাক্তারি করবে অথচ গল্প লিখছে “ভারতী”তে, কাগজ বের করেছে “ঝর্ণা” বলে। (একটা স্মরণীয় ঘটনার জন্যে ও কাগজের নাম থাকবে, কেননা ও কাগজেই সত্যেন দত্তের “ঝর্ণা” কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল।) এ হেন সোমনাথ, হঠাৎ শোনা গেল, ব্রাহ্ম হচ্ছে। সখের ব্রাহ্ম নয়, কেতাদুরস্ত ব্রাহ্ম। গোকুলই খবর নিয়ে এল তার দীক্ষার দিন কবে। স্থান ভবানীপুর সম্মিলন সমাজ। গেলাম সবাই মজা দেখতে। গিয়ে দেখি গলায় মোটা ফুলের মালা পরে সোমনাথ ভাবে গগদ হয়ে বসে আছে আর আচার্য সতীশ চক্রবর্তী ফুল দিয়ে সাজানো বেদী থেকে হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা দিয়ে তাকে দীক্ষিত করছেন। বহু চেষ্টা করে চোখের সঙ্গে চোখ মিলিয়ে তাকে টলানো  গেল না, ধর্মবিশ্বাসে সে এত অবিচল। ব্যাপার কি? মনোবনবিহারিণী কোনো হরিণী আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু, কি পরিহাস, কিছুকাল পরে বিধিমত হিন্দুমতে সমাজমনোনীত একটি পাত্রীর পাণিগ্রহণ করে বসল। সোমনাথ সাহা কল্লোল যুগের এক ঝলক বাসন্তী হাওয়া।

    সমস্ত বিকেলে হৈ-চৈ-হল্লার পর সন্ধ্যোত্তীর্ণ অন্ধকারে গোকুলের সঙ্গে একান্ত হবার চেষ্টা করতাম। কল্লোল-অপিসে একখানি যে চটের ইজিচেয়ার ছিল তা নিয়ে সারাদিন কাড়াকাড়ি গেছে—এখন, নিভৃতে তাইতেই গা এলিয়েছে গোকুল। পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছে বুঝি? সারাদিন সুবোধকে “পথিকে”র শ্রুতলিপি দিয়েছে। তারই জন্যে কি এই ক্লান্তি? মনে হত, শুধু শারীরিক অর্থেই যেন এ ক্লান্তির ব্যাখ্যা হবে না। যেন আত্মার কোন গভীর নিঃসঙ্গতা একটি মহান অচরিতার্থতার ছায়া মেলেছে চারপাশে; হয়তো অন্ধকার আর একটু ঘন ও অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেই তার আত্মার সেই গভীর স্বগতোক্তি শুনতে পাব।

    কিন্তু নিজের কথা এতটুকুও বলতে চাইত না গোকুল। বলতে ভালোবাসত ছেলেবেলাকার কথা। সতীপ্রসাদ সেন—আমাদের গোরাবাবু–গোকুলের সতীর্থ, নিত্যি যাওয়া-আসা ছিল তার বাড়িতে, রূপনারায়ণ নন্দন লেনে। গোরাবাবুদের বাড়ির সামনের শীতলাতলায় বৈশাখ মাসে তিন দিন ধরে যাত্রা হত, শলমা-চুমকির পোশাক-পরা রাজা-রাণী-সখির দল সরগরম করে রাখত সেই শীতলাতলা। প্রতি বৎসর গোরাবাবুদের বাড়ির ছাদে বসে সারারাত যাত্রা শুনত গোকুল—একবার কেমন বেহালা নিয়ে এসেছিল সখীদের গানগুলো বেহালায় তুলে নেবার জন্যে। কিংবা বলতে চাইত আর আগের কথা। সেই যখন সাউথ সুবার্বান স্কুলে ফিফ্‌থ ক্লাশে এসে ভর্তি হল। অত্যন্ত লাজুক মুখচোরা ছেলে, ক্লাশের লাস্ট বেঞ্চিতে লুকিয়ে থাকবার চেষ্টা। আলিপুরে মামার বাড়িতে থাকে, মামা ব্রাহ্ম, তাই তার কথাবার্তায় চালচলনে একটা চকচকে গোছগাছ ভাব সকলের নজরে না পড়ে যেত না। তার উপর মার্বেল ডাণ্ডাগুলি চু-কপাটি খেলবে না কোনোদিন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকে, আর নাকি খাতার পাতায় ছবি আঁকে, কবিতা লেখে। রাষ্ট্র হয়ে গেল, ও বেহ্মজ্ঞানী। সে না জানি কি রকম জীব, ছেলেরা মন খুলে মিশত না, কপট কৌতূহলে উঁকিঝুকি মারত। মাস্টার-পণ্ডিতরাও টিটকিরি দিতে ছাড়তেন না। ফোর্থ ক্লাশে যখন পড়ে তখন ওর খাতায় কবিতা আবিষ্কার করে ওর পাশের এক ছাত্র পণ্ডিতমশায়ের হাতে চালান করে দেয়। পড়ে পণ্ডিতমশায় সরাসরি চটে উঠতে পারলেন না, ছন্দেবন্ধে কবিতাটি হয়ত নিখুঁত ছিল। শুধু নাক সিঁটকে মুখ কুঁচকে বলে উঠলেন : ‘এতে যে তোদের রবিঠাকুরের ছায়া পড়েছে! কেন, মাইকেল হেম নবীন পড়তে পারিস না? রবিঠাকুর হল কিনা কবি। তার আবার কবিতা। আহা, লেখার কি নমুনা। রাজার ছেলে যেত পাঠশালায়, রাজার মেয়ে যেত তথা—’ “তথা”—কথাটা এমন মুখভঙ্গি করে ও হাত নেড়ে উচ্চারণ করলেন যে ক্লাশশুদ্ধ, ছেলেরা হেসে উঠল।

    মেজবৌদি গোকুলের জন্যে খাবার পাঠিয়ে দিলেন। কি করে খবর পেয়েছেন তিনি গোকুল আজ সারাদিন ধরে উপবাসী। বাড়িতে ফিরতে তার দেরি হয় বলে সে সাফাই নিয়েছে বাইরে খেয়ে-আসার। তার মানে, প্রায় দিনই একবেলা অভুক্ত থাকবার। কোনো-কোনদিন আরো নির্জন হবার অভিলাষে সে বলত, চলো, এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত হাঁটি, তার মানে তখন বুঝতে পারিনি পুরোপুরি। তার মানে, গোকুলের কাছে পুরোপুরি ট্র্যামভাড়া নেই।

    অথচ এই গোকুল কোনো-কোনোদিন নৃপেনের পাশ ঘেঁসে বসে অলক্ষ্যে তার বুক-পকেটে টাকা ফেলে দিয়েছে যখন বুঝেছে নৃপেনের অভাব প্রায় অভাবনীয়।

    অথচ যখন কথা বলতে যাও গোকুলের মুখে হাসি আর রসিকতা ছাড়া কিছু পাবে না। সুর করে যখন সে পূর্ববাংলার কবিতা বলত তখন অপরূপ শোনাত :

    পদ্মা-পাইড়া রাইয়তগ লাঠি হাতে হাতে

    গাঙের দিকে মুখ ফিরাইয়া ভাত মাখেন পাতে।

    মাখা ভাতটি না ফুরাতেই ভাইঙ্গা পড়ে ঘর

    সানকির ভাত কোছে ভইরা খোঁজেন আরেক চর।

    টানদেশী গিরস্তগ বাপকালান্যা ঘটি

    আটুজলে ডুব দেন আর বুকে ঠেকে মাটি।

    আপনি পাও মেইল্যা বইস্যা উক্কায় মারেন টান,

    একপ্রহরের পথ ভাইঙ্গা বউ জল আনবার যান!

    সাতাশ নম্বর কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে একটা একদুয়ারী এক চিলতে ঘরে “কল্লোলে”র পাবলিশিং হাউস খোলা হয়। আপিস থাকে সেই পটুয়াটোলা লেনেই। তার মানে সন্ধের দিকের তুমুল আড্ডাটা বাড়ির বৈঠকখানায় না হয়ে হাটের মাঝখানে দোকানঘরেই হওয়া ভালো। সেই চিলতে ঘরে সবাইর বসবার জায়গা হত না, ঘর ছাপিয়ে ফুটপাতে নেমে পড়ত। সেই ঘরকেই নজরুল বলেছিল “একগাদা প্রাণভরা একমুঠো ঘর।” সেই একমুঠো ঘরেই একদিন মোহিতলাল এসে আবির্ভূত হলেন। আমরা তখন এক দিকে যেমন যতীন সেনগুপ্তের পেসিমিজম-এ মশগুল, তেমনি মোহিতলালের ভাবঘন বলিষ্ঠতায় বিমোহিত। মোহিতলালকে আমরা মাথায় তুলে নিলাম। তিনি এসেই কবিতা আবৃত্তি করতে সুরু করলেন, আর সে কি উদাত্তনিস্বন মধুর আবৃত্তি! কবিতার গভীর রসে সমস্ত অনুভূতিকে নিষিক্ত করে এমন ভাবব্যঞ্জক আবৃত্তি শুনিনি বহুদিন। দেবেন সেনই আবৃত্তি করতে ভালোবাসতেন। আজো তাঁর সেই ভাবগদগদ কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি, দেখছি তার সেই অধমুদ্রিত চক্ষুর সূক্ষ্ম শুভ্ররেখা।

    চাহিনা না আনার যেন অভিমানে ক্রূর

    আরক্তিম গণ্ড ওষ্ঠ ব্রজসুন্দরীর,

    চাহিনাক ‘সেউ’ যেন বিরহবিধূর

    জানকীর চিরপা বদন রুচির।

    একটুকু রসে ভরা চাহি না আঙুর

    সলজ্জ চুম্বন যেন নববধূটির,

    চাহিনা ‘গন্না’র স্বাদ, কঠিনে মধুর

    প্রগাঢ় আলাপ যেন প্রৌঢ় দম্পতির।

    কল্লোল-পাবলিশিং হাউস থেকে প্রথম বই বেরোয় সুবোধ রায়ের “নাটমন্দির”—তিনটি একাঙ্ক নাটিকার সঙ্কলন। আর চতুষ্কলা ক্লাবের খানকয় পুরানো বই, “ঝড়ের দোলা” বা “রূপরেখা”—তার বিষয়বিভব। আর, সর্বোপরি, নজরুলের “বিষের বাঁশী” জমায় রেখে হুহু করে যে বেচতে পারছে এই তার ভবিষ্যতের ভরসা।

    তেরোশ একত্রিশ সালের পূজার ছুটিতে কলকাতার বাইরে বেঁড়াতে যাই। সেখানে দীনেশদা আমাকে চিঠি লিখেন :

    সোমবার

    ৩রা কার্তিক, ১৩৩১

    সন্ধ্যা ৭-৩০ টা

    পথের ভাই অচিন্ত্য,

    কিছুদিন হল তোমার সুন্দর চিঠিখানি পেয়ে কৃতার্থ হয়েছি। তোমাকে ছাড়া আমাদেরও কষ্ট হচ্ছে—কিন্তু যখন ভাবি হয়ত ওখানে থেকে তোমার শরীর একটু ভাল হতে পারে তখন মনের অতখানি কষ্ট থাকে না।

    হয়ত এরই মধ্যে পবিত্র ও ভূপতির বড় চিঠি পেয়েছ। কি লিখেছে তারা তা জানি না, তবে এটা শুনেছি যে পত্র দুখানাই খুব বড় করে লিখেছে।

    আজ সারাদিন খুব গোলমালে গেল। এই কিছুক্ষণ আগে মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা আমার শেষ হল। শৈল, মুরলী, গোকুল, নৃপেন, পবিত্র ভূপতি প্রভৃতি কল্লোল আপিস ছেড়ে গেল। আমি স্নান সেরে এসে নিরালায় তাই তোমার কাছে এসেছি। এইটুকু আমার সময়—কিন্তু তাও কেউ কেউ আসেন কিংবা মনের ভিতরই গোলমাল চলতে থাকে।

    কাল রবিবার গেল, মুরলীদার বাড়ীতে সন্ধ্যাবেলা জোর আড্ডা বসেছিল। চা, পান, গান, মান, অভিমান সবই খুব হল। বীরেনবাবু ও জ্ঞানাঞ্জন পাল মহাশয়রাও ছিলেন।

    “রূপরেখা”র বেশ একটা রিভিয়ু বেরিয়েছে Forward-এ কালকের।

    “নাটমন্দির”ও আজ বেরিয়ে গেল। এবার তোমাদের পালা। একখানা করে সবাইকার বের করতেই হবে। কেমন? অন্তত একশটি টাকা আমাকে প্রথম এনে দাও, আর তোমাদের লেখাগুলি, তা হলেই কাজ শুরু করে দিতে পারি।

    প্রেমেন এসেছে ফিরে, তাকেও জোর দিয়েছি। সে তো একটু seriouslyই ভাবছে।

    শৈলজার “রাঙাশাড়ী”খানা যদি পাওয়া যায়—যেতেও পারে—তা হলে তো কথাই নেই।

    তোমার “চাষা-কবি” এখনও পেলাম না কেন? এতই কি কাজ যে কপি করে আজও পাঠাতে পারলে না? তোমার কবিতাটিই যে আগে যাবে, সুতরাং কবিতা পাঠিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত করবে। এবারে প্রেমেনের “কমলা কেবিন”টা ফিরিয়ে পেলে হয়তো যাবে। তুমি না থাকাতে তার যথেষ্ট একলা লাগছে বুঝতে পারি। সত্যি, বেচারার একটা আস্তানা নেই যে খাবে থাকবে।

    কিন্তু এরকমই থাকব সব? না, তা হবে না—এই মাটি খুঁড়ে তা হলে শেষ চেষ্টা করে যাব। আমরা তো সইলাম আর বুঝলাম কিছু কিছু। কিন্তু যে কষ্ট নিজেরা পেলাম তা কি পরকে জেনে-শুনে দিতে পারি? ঐ সারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনাগত অযুত সংখ্যক কালকের মানুষের দল, তারা এসেও কি এই ভোগই ভুগবে? আমাদের এই সত্যের নির্বাক যুদ্ধ জয় করে রাখবে বাংলার প্রাণের প্রান্তে-প্রান্তে সবুজ পাতার বাসা। নীড়হারা পথহারা নীল-আকাশের রং-লাগান নীলপাখীর দল একেবারে সোজা সবুজ পাতার বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেবে। পথের বাঁকের বিরাট আয়ুবৃদ্ধ বটগাছ দেখবে বাংলার প্রান্ত হতে প্রান্তে রুক্ষরূপের বক্ষভেদ করে ফুটে আছে অপরাজিতার দল।

    কি জানি কতদূর হবে। যদি না থাকি!

    আহা, বাঁচুক তারা যারা আসছে। বেচারারা কিছু জানে না, বিশ্বাস ভাঙিয়ে সাদা মনের সওদা কিনতে গিয়ে কিনছে কেবল ফুটো আর পচা! তারা যে তখন কাঁদবে। আহা, যদি তাদের মধ্যে এমন কেউ থাকে যে সে ভেঙে পড়বে, পৃথিবীকে অভিশাপ দিয়ে ফেলবে? না, না, তাদের জন্য কিছু রেখে যেতে পারব না আমরা ক’জনে?

    পলিটিক্স বুঝি না, ধর্ম মানি না, সমাজ জানি না—মানুষের মনগুলি যদি সাদা থাকে—ব্যস, তা হলেই পরমার্থ।

    তোমাকে একটা কথা বলছি কানে-কানে। মনটার জন্য একটা চাবুক কেনো। চাবুক মেরো না যেন কখনও, তাহলে বিগড়ে যাবে। মাঝে-মাঝে কেবল সপাং-সপাং করে আওয়াজ করবে—মনের ঘরের যে যেখানে ছিল দেখবে সব এসে হাজির। ভয়ও না ভাঙে, ভয়ও না থাকে–এমনি করে রাখতে হবে।

    আর একটা কথা—ভালবাসাটাকে খুঁজে বেড়িও না। ওটা ঘোড়ার পায়ের নালও নয় আর মাটির তলায় মোহরের কলসীও নয়। হাতড়ে চললেই হোঁচট খাবে। তবে কোথায় আর কবে সত্যিকারের ভালবাসবার মত ভালবাসাটুকুকে পাবে তা জানবার চেষ্টাও করো না। খানেখানে পাওয়া যায়—সবটুকু রসগোল্লায় মত একজায়গার তাল পাকিয়ে রসের গামলায় ভাসে না।

    ঝড়ের দিনে শিল কুড়োয় না ছেলেমেয়েরা? কুড়োতে-কুড়োতে দু’ একটা মুখেই দিয়ে ফেলে আর সব জড় করে একটা তাল পাকায়, সেটা আর চোষে না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আর দেখে। কত রঙের খেলা। ঘুরতে থাকে—আর মাঝে-মাঝে ঠাণ্ডা হাত নিজেরই কপালে চোখে বুলোয়। কুড়েবার সময়ও ঝড়ের যেমন মাতন, যারা শিল কুড়োয় তাদেরও তেমনি ছুটোছুটি হট্টগোল! কোনটা ঠকাস করে মাথায় পড়ে, কোনটা পায়ের কাছে ঠিকরে পড়ে গুড়িয়ে যায়, কোনটা বা এক ফাঁকে গলার পাশ দিয়ে গলে গিয়ে বুকের মধ্যে ঢুকে পড়ে। কুড়োনো শেষ হলে আর গোল থাকে না, সব চুপচাপ করে তাল পাকায় আর নিজের সংস্থান ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে।

    বিয়ে করতে চাও? চাকরী দেখ। অন্ততঃপক্ষে দেড়শ টাকার কমে হবেই না। তা-ও নেহাৎ দরিদ্রমতে—প্রেম করা চলবে না। যদি সমাজকে ডিঙিয়ে যেতে চাও তাহলে অন্তত দুশো আড়াই শো।

    শরীরের খবর দিও। লেখা immediately পাঠাবে। দেরী করোই না। ভালবাসা জেনো।

    তোমাদের দীনেশদা

    এর দিন কয়েক পরে গোকুলের চিঠি পাই।

    ‘কল্লোল’

    ১০-২ পটুয়াটোলা লেন, কলিকাতা

    ১১ই কার্তিক, ৩১

    স্নেহাস্পদেষু

    তোমার চিঠি যখন পাই তখন উত্তর দেবার অবস্থা আমার ছিল না। অবস্থা যখন ফিরে পেলাম তখন মনে হল—কি লিখব? লেখবার কিছু আছে কি? চোখের সামনে বসে পবিত্র পাতার পর পাতা তোমায় লিখেছে দেখেছি, ভূপতি নাকি এক ফর্মা ওজনের এক চিঠি লিখেছে, দীনেশ ও সম্ভবত তাই। আর কে কি করেছে তা তুমিই জান, কিন্তু আমার বেয়াদবি আমার কাছেই অসহ্য হয়ে উঠছিল। তাই আজ ভোরে উঠেই তোমাকে লিখতে বসেছি। আমার শরীর এখন অনেকটা ভাল। তোমার প্রথমকার লেখা চিঠিগুলো থেকে যেকথা আমার মনে হয়েছিল তোমার পবিত্রকে লেখা দ্বিতীয় চিঠিতে ঠিক সেই সুরটি পেলাম না। কোথায় যেন একটু গোল আছে। প্রথমে পেয়েছিলাম তোমার জীবনের পূর্ণ বিকাশের আভাস, কিন্তু দ্বিতীয়টা অত্যন্ত melodramatic. দেখ অচিন্ত্য, যে বলে দুঃখকে চিনি, সে ভারী ভুল করে। অনেক দুঃখ পেয়েছি জীবনে কথাটার সুর অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। মনের যে কোন বাসনা ইচ্ছা বা প্রবৃত্তি অতৃপ্ত থাকলেই যে অশান্তি আমরা ভোগ করি তাকেই বলি দুঃখ, কিন্তু বাস্তবিক ও দুঃখ নয়। যে বুকে দুঃখের বাসা সে বুক পাথরের চেয়েও কঠিন, সে বুক ভাঙ্গে না টলে না। দুঃখের বিষদাঁত ভেঙ্গে তাকে নির্বিষ করে যে বুকে রাখতে পারে সেই যথার্থ দুঃখী। ভিখারী, প্রতারিত, অবমানিত, ক্ষুধার্ত—এরা কেউই দুঃখী নয়। খৃষ্ট দুঃখী ছিলেন না, তিনি চিরজীবন চোখের জল ফেলেছেন, নালিশ করেছেন, অভিশাপ দিয়েছেন, অভিমান করেছেন। গান্ধী যথার্থ দুঃখী। এবার ক্ষুধা, অশান্তি, ব্যথার প্রত্যেকটি stage-এর সঙ্গে মিলিয়ে নাও, বুঝতে পারবে দুঃখ কত বড়। সবাই যে কবি হতে পারে না তার কারণ এই গোড়ায় গলদ। অত্যন্ত promising হয়েও melodramatic monologue-এর সীমা এড়িয়ে যেতে পারে না। প্রত্যেক ব্যক্তিগত অতৃপ্তি ও অশান্তির ফর্দ করে যায়, তাই সেটাকে মানুষ বলে সখের দুঃখ। যাক বাজে কথা, কতকগুলো খবর দিই।

    হঠাৎ কেন জানি না পুলিশের কৃপাদৃষ্টি আমাদের উপর পড়েছে, আমাদের আপিস দোকান সব খানাতল্লাস হয়ে গেছে, আমরা সবাই এখন কতকটা নজরবন্দী–‘1818 Act 3’-তে।

    নৃপেন বিজলী আপিসে কাজ করছে। শৈলজার ‘বাংলার মেয়ে’ বেরিয়েছে, সে এখন ইকড়ায়। মূরলীর জ্বর হয়েছিল। প্রেমেনের ‘অসমাপ্ত’ আমি পড়েছি, সম্ভবত পৌষ থেকে ছাপব। ভূপতি এখন পুরুলিয়ায়। পথিক ছাপা আরম্ভ হয়েছে, 1st form-এর অর্ডার দিয়েছি। আমাদের চিঠি না পেলেও মাঝে মাঝে যেখানে হোক লিখো। শুভ ইচ্ছা জেনো। ইতি। গোকুলচন্দ্র নাগ।

    নজরুলের ‘বিষের বাঁশী’র জন্যই পুলিশ হানা দিয়েছিল। মনে করেছিল সবাই এরা রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী। ভাবনৈতিক সন্ত্রাসবাদীদের দিকে তখনো চোখ পড়েনি। তখন আসেননি তারক সাধু।

    “কাগজে পড়েচো কলকাতায় ধরপাকড়ের ধুম লেগে গেছে।” পবিত্র লিখল : “কাজীর বিষের বাঁশী নিষিদ্ধ হয়েছে। কল্লোলের আপিস ও দোকান খানাতল্লাসী হয়েছে। সকলের মধ্যেই একটা প্রচণ্ড আশঙ্কাভীতি এসে গেছে। সি আই ডি-র উপদ্রবও সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড রকম বেড়ে গেছে। কলকাতা শহরটাই তোলপাড় হয়ে গেছে। যেখানেই যাও চাপাগলায় এই আলোচনা। যারা ভুলেও কখনও রাজনীতির চিন্তা মনে আনে নাই তাদের মধ্যেও একটা সাড়া পড়ে গেছে–”

    সেই সাড়াটা “কল্লোলে”র লেখকদের মধ্যেও এসে গেল। চিন্তায় ও প্রকাশে এল এক নতুন বিরুদ্ধবাদ। নতুন দ্রোহবাণী। সত্যভাষণের তীব্র প্রয়োজন ছিল যেমন রাজনীতির ক্ষেত্রে, তেমনি ছিল অচলপ্রতিষ্ঠ স্থবির সমাজের বিপক্ষে।

  • এগার

    এগার

    সোনা বিকেলের দিকেই দেখল এই বাড়ি মানুষজনে গিজগিজ করছে। ঘোড়ায় চড়ে এলেন তারিণী সেন, তনি ঘোড়ায় চড়ে ফের নেমেও গেলেন। ব্রাহ্মন্দী থেকে রায়মশাইরা খবর পেয়ে বের হয়ে পড়েছেন। গোপালদি থেকে এসেছে অর্জুন সাহা, তার বৌ মা সবাই। লতব্দি থেকে এসেছেন অম্বিকা রায়। এসেছেন হাজিসাহেব, তাঁর দুই ছেলে। আবেদালি, হাসিমের বাপ মনজুর, সবাই এসেছে। ওরা বৈঠকখানা ঘরে বসে রয়েছে। মনজুর আমগাছ কেটে কাঠ করার দায়িত্ব নিয়েছে। যেখানে যা কিছু খবর এখন, সে শুধু এক খবর, বুড়োকর্তার মহাপ্রয়াণ হচ্ছে। শতবর্ষ পার করে মানুষটা আর একদিনও সবুজ বনে মৃত বৃক্ষ হয়ে বাঁচবেন না।

    সারাদিন ধরেই এ-ভাবে মানুষজন আসছে যাচ্ছে। ছোটকাকা শিয়রে বসে গীতা পাঠ করছেন। রায়মশাই পিঁড়িতে বসে মহাভারত থেকে বিরাট পর্ব পড়ে শোনাচ্ছেন। ঠাকুমা পায়ের কাছে সারাদিন বসে আছেন। জ্যাঠামশাইকে ধরে এনে পাশে বসিয়ে দিয়েছেন জ্যেঠিমা। মুখের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে ডেকেছে, বাবা, বাবা।

    তখন যেন এই মানুষ কত দূরে চলে যেতে যেতে কার ডাক শুনে চোখ মেলে একটু তাকাচ্ছেন, তারপরই চোখ বুজে আবার কোন দূরাগত মায়ার সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছেন। জ্যেঠিমা ডাকছে বাবা, বাবা, ও আপনার বড় ছেলে। বলে জ্যেঠিমা শীর্ণ হাতখানা তুলে, পাগল মানুষের মাথায় ধরে রাখছেন বাবা, বাবা, আপনি আশীর্বাদ করুন আপনার পাগল ছেলেকে। তাকে বলুন, তুই আর কোথও যাবি না। ওকে আপনি বলে যান সে কি করবে!

    সোনা দেখেছিল তখন ঠাকুরদার চোখে জল। দু’চোখ দিয়ে দরদর করে জল গড়িয়ে পড়ছে। জ্যেঠিমা খুব ধীরে ধীরে সেই জল মুছিয়ে দেবার সময় ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। সবারই চোখ ছলছল করছে। ছোটকাকা বোধ হয় দৃশ্যটা সহ্য করতে পারছিলেন না। তিনি কিছুক্ষণের জন্য গীতা পাঠ বন্ধ রেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলেন। বুঝি এ-সময় ঠাকুরদার পাশে জ্যাঠামশাইর এই চেহারা সহ্য করা যায় না। বুক ভেঙে কান্না উঠে আসে।

    জ্যেঠিমা বললেন, আপনি, ওকে কিন্তু চোখে চোখে রাখবেন সব সময়

    সোনার কেমন অস্বস্তি লাগছিল। বুকের ভিতর ওরও একটা কষ্ট হচ্ছে। যা সে ঠিক এখন ছুঁতে পারছে না। ঠাকুর্দা মরে গিয়ে স্বর্গ থেকে সবসময় চোখে চোখে রাখবেন। জ্যেঠিমা কাঁদছেন। সোনার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। আর ভয় কি! এখন থেকে সবসময় একজন পাহারাদার পাওয়া গেল। তিনি সব লক্ষ রখবেন। তবে আর কান্নার কী আছে! তবু কেন জানি কান্না পায়। সোনারও কান্না পাচ্ছিল! এতক্ষণ যে বুকের ভিতর অস্বস্তি, এই কান্নার জন্য। ঠাকুর্দা মরে যাবেন। এটা ভাবতেই এখন ওর কান্না পাচ্ছে। অর্জুন গাছের নিচে ঠাকুর্দাকে পোড়ানো হবে, বাবা জ্যাঠামশাই মন্দির বানিয়ে দেবেন। সোনা বিকেলে মন্দিরের চাতালে জ্যাঠামশাইকে নিয়ে বসে থাকবে। বর্ষাকাল এলে চাতালের পাশে জল উঠে আসবে। জলের নিচে রূপালি রঙের পুটিমাছ। সে এবং জ্যাঠামশাই ছিপ ফেলে পুটিমাছ ধরবে।

    সে নিজে এ-ভাবে জ্যাঠামশাইকে কোন-না-কোন কাজের ভিতর নিযুক্ত করে রাখবে। কোথাও যেতে দেবে না। কোনও কাজের ভিতর, এই যেমন মাছধরা, ফলের দিনে জ্যাঠামশাইকে নিয়ে ফল-পাকুড় পেড়ে আনা, ফসলের দিনে ঈশমদাদার পাশে বসে জমি পাহারা দেওয়া, বিদ্যালয়ে যাবার সময় সঙ্গে নিয়ে যাওয়া এবং কোনও গাছের নিচে বসিয়ে রেখে ক্লাস সেরে আসা, ফেরার পথে কোঁচড়ে জাম-জামরুল, অথবা চিনা বাদাম। চৈত্রমাসে দু’পকেটে খিরাই, দু’জনে পথে পথে খেতে খেতে আসা—এমন একটা ছবি ওর চোখের ওপর ভেসে উঠল। ঠাকুরদার কানের কাছে এ-সব বলে দেবার ইচ্ছা তার। ঠাকুরদা, কেন কাঁদেন আপনি! আমি তো আছি। সারাজীবন জ্যাঠামশাইর সঙ্গে সঙ্গে আমি থাকব। তাঁকে ফেলে কোথাও যাব না।

    কিন্তু এত মানুষজন ঘরের ভিতর, ওরা আসছে যাচ্ছে, ঠাকুরদাকে দেখে উঠোনে নেমে যাচ্ছে, ঠাকুরদার সততা সম্পর্কে ওরা কথাবার্তা বলছে, এমন মানুষ হয় না, কথিত আছে রাম রাজত্ব করেন, সীতা বনবাসে যায়….প্রায় যেন, এ-সংসারে তেমন চিত্র, এক পাগল মানুষ নিশিদিন হাটে মাঠে ঘুরে বেড়ান, এক সীতার মতো সাধ্বী নারী জানালায় দাঁড়িয়ে স্বামীর জন্য প্রতীক্ষা করে অথবা সংসারের কাজকর্মে ডুবে থাকে সে।

    সোনা ঠাকুরদার কানের কাছে গিয়ে বলতে পারল না, আমি সোনা কথা বলছি, আপনার ছোট নাতি। জ্যাঠামশায়কে আমি দেইখা রাখুম। আপনে কাঁদছেন কেন? কিন্তু এত লোকজনের ভিতর সে যে কী করে বলবে! তবু সে কোনওরকমে, শিয়রের দিকে ভিড়ের ভিতর মাথা ঠেলে শিয়রের ডানদিকে এসে গেল। একটা মোটা কম্বলে শরীর ঢাকা ঠাকুরদার। জোরে জোরে শ্বাস ফেলছেন। সব শরীরটা তাঁর কাঁপছে। সোনা কোনওরকমে মাথার কাছে মুখ নিতেই, কারা যেন তাকে জোর করে সরিয়ে নিল। ওর চোখে জল। সবাই হয়তো ভেবেছে, সোনা এখন ঠাকুর্দার গলা জড়িয়ে কাঁদবে। সে বলতে পারল না, আমি কাঁদছি না, আমি কাঁদছি না, আমি গলা জড়িয়ে কাঁদব না। সোনাকে এখন তবু কারা জোর করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, ওকে বোঝ-প্রবোধ দিচ্ছে, ঠাকুরদা বুড়ো হয়েছে, মরে যাচ্ছে, কাঁদছ কেন? কী ভাগ্যবান মানুষ তিনি। তাঁর কত সুনাম। তোমরা কাঁদলে ঠাকুরদার আত্মা শান্তি পাবে না।

    সে এসে দাঁড়াল জামরুল গাছটার নিচে। তারিণী কবিরাজ গোপাটে ঘোড়ার ওপর বসেই একটা মানুষের কী যেন দেখছেন! সেই মানুষ ফেলু শেখ। সে একজন প্রবীণ মানুষকে তার কুষ্ঠের মতো ঘা দেখাচ্ছে। এবং লোকজন চারপাশে। সোনার মনটা ক্রমশ ভারি হয়ে আসছিল। তারিণী সেন ঘোড়ায় চড়ে চলে যাচ্ছেন। যারা দূরের মানুষ তারা উঠে আসছে। তারা কত রকমের সব মহৎ গল্প ঠাকুরদা সম্পর্কে বলছে। সব প্রাচীন গাঁথার মতো মনে হয়। একজন মানুষ মরে গেলে বুঝি তার অতীত সবার চোখে ঘুরেফিরে আসে। সোনার এখন এ-সব শুনতে ভালো লাগছে। সে সব মানুষদের ভিতরে ঘুরেফিরে—তার ঠাকুরদার অতীত ইতিহাস, সত্যবাদিতা, পৌরুষ এবং দানশীলতা সম্পর্কে সব শুনছে। কিন্তু একজন শুধু বলছে, তিনি একবার মিথ্যা তার করেছিলেন, তাঁর বড়ছেলেকে। তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। অথচ তার করলেন, তিনি অসুস্থ, বাঁচা দায়। তিনি সেই মিথ্যা তার করে ছেলেকে আনিয়েছিলেন, এবং বড় ছেলে তাঁর ফিরে এলেই বিবাহ। বড় ছেলে তাঁর বৈঠকখানায় সারাটা দিন মাথা নিচু করে বসেছিল। পিতার সম্ভ্রমের কথা ভেবে কেমন নিরন্তর দুঃখী মানুষের মতো মুখ। সে মানুষটা, সবাইকে রামায়ণ গানের মতো তার বর্ণনা দিচ্ছিল। যেন পিতার সত্যরক্ষার্থে পুত্রের বনে গমন। জীবনের সব কিছু ভালোবাসা বনবাসে রেখে আসা।

    সোনার কেন জানি মনে হল, মানুষ কখনও সারাজীবন সত্য কথা বলতে পারে না। ঠাকুরদা যখন পারেননি, তখন আর কেউ পারবে না। বড় জ্যাঠামশাই কেন যে পাগল হয়ে গেলেন। এমন একটা মিথ্যা তার না করলে তার বড় জ্যেঠিমা এ-সংসারে আসতেন কি করে! বড় জ্যেঠিমার, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কেবল সেবাশুশ্রূষা সকলের, নিজের বলতে তাঁর কিছু নেই—আর কী সুন্দর তার কথা! সোনা, জ্যেঠিমার মতো অনায়াসে এখন কথা বলতে পারে। তার কখন খিদে লাগে তিনি টের পান। সে কখন অসুস্থ বোধ করে জ্যেঠিমা চোখ দেখে ধরে ফেলেন। এবং সোনা যে বড় হয়ে গেছে তাও তিনি আজকাল ধরতে পেরে কেমন মাঝে মাঝে বলে দেন, আর কি, তোমাদের এখন পাখা হয়েছে, উড়ে যাবে। আমাদের কথা তোমরা কেউ ভাববে না।

    সে শুধু তখন বলতে পারে—না জ্যেঠিমা, আমি কখনও এমন হব না। ভালো হব আমি। আমি এই পরিবারের জন্য সব করব। ঠাকুরদা মরে যাচ্ছে বলে কী হয়েছে, আমরা তো আছি। আমি মেজদা বড়দা। সংসারের সব দুঃখ আমরা মুছে দেব। কত কিছু তার এখন বলতে ইচ্ছা হয়। সুন্দর, যা কিছু মহৎ এই পৃথিবীতে আছে সব কিছু তার হতে ইচ্ছা হয়। সে জামরুল গাছটায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠাকুরদা মরে যাচ্ছেন। মৃত্যু সম্পর্কে নানা রকম ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে তার। ওর মনে হয় ঠাকুরদা মরে কোথাও যাবেন না। সবাই অনর্থক কাঁদছে। সংসারের এমন ভালোবাসা ফেলে কেউ কখনও দূরে গিয়ে থাকতে পারে না। তিনি এ বাড়িতেই থাকবেন। তবে অদৃশ্য হয়ে থাকবেন। মরে গিয়ে মানুষ কোথাও বেশিদূর যেতে পারে না। ঠাকুরদাও বেশিদূর যেতে পারবেন না। সংসারে তার বড় জেঠিমার মতো বৌ আছে, পাগল জ্যাঠামশাইর মতো ছেলে আছে, ঈশম দাদার মতো মানুষ আছে, মার মতো ধনবৌ আছে, তবে তিনি যাবেন কোথায়! তিনি থাকবেন, এ সংসারেই থাকবেন। সকলের ভিতর অদৃশ্য হয়ে থাকবেন। বিপদে আপদে তিনি সকলকে দেখবেন।

    আবার এও কেন জানি মনে হয় সোনার, ঠাকুরদা মরে গেলে আকাশের নিচে বড় বটগাছটার মাথায় একটা নক্ষত্র হয়ে জ্বলবেন। তিনি বড় ধার্মিক মানুষ, পুত্রের ম্লেচ্ছ আচরণের জন্য জীবনপণ করে বাজি ধরা ঈশ্বরের সঙ্গে—এ সব তাঁকে দেবতা বানিয়ে দেবে। তিনি এত পুণ্যবান যে, সে দেখল এখন আকাশে চাঁদ উঠেছে। লণ্ঠন জ্বেলে মানুষজন আসছে। সে মাথা তুলে আকাশ দেখে বুঝল, চাঁদের চারপাশে গোল মণ্ডল। সেখানে দেবতারা সব চুপচাপ বসে একজন গুণী জ্ঞানী মানুষের অপেক্ষায় আছেন। তিনি এলে তাঁর নিবাস ঠিক করা হবে। একজন পুণ্যবান মানুষ মাটি ছেড়ে চলে আসছে—সে কোথায় থাকবে, তার বাড়ি, বাগান, ঠাকুরপূজার ঘর এ-সবের আয়োজন করছেন তাঁরা। তার ঠাকুরদা যথার্থই পুণ্যবান মানুষ। তিনি আকাশে নক্ষত্র হয়ে যাবেন। এবং তাঁর পাগল ছেলে কোথায় নিরুদ্দেশে যান ঠিক তিনি সেখান থেকে টের পাবেন এবং তাকে চোখে চোখে রাখবেন। ঠাকুরদার আর জন্ম হবে না। তিনি আকাশ থেকে দেখতে পাবেন সোনা কী করছে, জ্যাঠামশাই হেঁটে হেঁটে কোথায় চলে যাচ্ছেন, ঈশমদাদা তরমুজ খেতে পাহারা দিতে দিতে ঘুমোচ্ছে কি-না—যেন সংসারের সব ফাঁকি এবার তিনি ধরে ফেলবেন। এবং রাতে ছোটকাকাকে স্বপ্নে বলে দেবেন, আগামী বছর দুর্দিন কি সুদিন। সোনাকে বলে দেবেন, জ্যাঠামশাই কোথায় কোন গাছের নিচে বসে আছেন। দুঃখ বলতে যেটুকু সংসারে আছে ঠাকুরদার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তা শেষ হয়ে যাবে।

    সোনা যখন এসব ভাবছিল তখন কেউ বলে গেল—তুমি সোনা যাও, ঠাকুরদার মুখে গঙ্গাজল দ্যাও—তখন ফেলু ট্যাবার পুকুরপাড়ের দিকে ছুটছে। সে জোনাকি ধরার জন্য ছুটছে। একটা জোনাকি ওকে সেই মাঠ থেকে উড়ে উড়ে এতদূর নিয়ে এসেছে।

    —কবিরাজমশয়, আমার ঘাড়া সারাইয়া দ্যান। আপনের গোলাম হইয়া থাকমু। সে এমন বলেছিল কবিরাজমশাইকে।

    —তুই কেডারে?

    —আমি ফেলু। আপনেগ ফ্যালা। হাডুডু খ্যালছি কত। আপনের মনে নাই আমার নামডা?

    —অঃ, তুই ফ্যালা। তা তর কি হইছে?

    —ঘাও হইছে।

    —কাছে আয় দ্যাখি।

    —এই যে কবিরাজমশয়। দ্যাখেন।

    ফেলুর মাথার ওপর মাছি উড়ছিল। কাছে যেতেই কী পচা গন্ধ।—আরে ফ্যালু, তুই ত ম‍ইরা যাইবি।

    —এডা কি কন কবিরাজমশয়! আমি মইরা গ্যালে আন্নুডার কি হইব?

    —তর যে বড় কঠিন অসুখ শরীরে।

    —ঘাওড়া আর সারব না!

    তারিণী কবিরাজ ঘা-টার চারপাশে টিপে টিপে দেখল।

    —জ্বলে?

    —হ জ্বলে। দাবদাহের মত জ্বলে।

    —জোনাকি জ্বললে নিভলে যেমন জ্বলে?

    –হ কবিরাজমশয়, ঠিক ধরছেন। জ্বালাডা দপ কইরা নিভা যায় আবার দপ কইরা জ্বইলা ওঠে।

    —বড় কঠিন অসুখ রে ফ্যালা। তুই এক কাম করতে পারস?

    —কি কাম কন দেখি। যা কন মাথা পাইতা দিমু।

    —শতমূলের গাছ চিনিস?

    চিনতে কতক্ষণ! বলে সে গামছা দিয়ে ওর ঘাটা ফের ঢেকে দিল। তারিণী সেন ঘোড়ার উপর বসে রয়েছেন। তিনি নামছেন না। ফেলুকে খুব কাছে আসতে বারণ করছেন। তিনি চোখ বুজে কী যেন ভাবছেন। তারপরই যেন বলে দিলেন, ঠিক কবিরাজিতে তর ব্যারামের অষুধ নাই। এডা আমি শিখছিলাম এক হেকিমদার মানুষের কাছে। তিনি কইছেন, বৃশ্চিক রোগে এডা লাগে।

    —আমার কি বৃশ্চিক হইছে কবিরাজমশয়?

    —ঠিক বৃশ্চিক না। তবে তর এই ঘাও আর ছাড়নের কথা না। সূর্যমুখি ঘাও। রোদ উঠলেই জ্বালাটা বাড়ে, রোদ পইড়া আইলে কমে জ্বালা।

    —হ, বাড়ে কমে।

    —সারে না। কবিরাজি মতে এর অষুধ নাই

    —আমি যে কি করিগ কবিরাজমশয়।

    —এটা কইরা দ্যাখতে পারস। আর তুই উবুৎল্যাঙরার গাছ চিনস?

    —না গ কবিরাজমশয়, চিনি না।

    —চিন কি তবে? সারা জন্ম শুধু ভাত গিল্যে চলে!

    —তা চলে কবিরাজমশয়। হায়, কি যে আমার হইল!

    —আজই ত পূর্ণিমা। বৈশাখি পূর্ণিমা।

    —হ, কবিরাজমশয়!

    —দিনটা ভাল আছে। শুক্লা তিথিতে এই জ্যোৎস্নায় একশটা জোনাকি ধইরা ফ্যাল। পক্ষকাল জলের ভিতর ডুবাইয়া রাখ। তারপর যখন দ্যাখবি জলটা ঘোলা ঘোলা হইয়া গ্যাছে তখন শতমূলি গাছের মূল গোলমরিচ গণ্ডা দুই জোনাকির জলে বেটে লাগাবি। কবিরাজিশাস্ত্রে এ-সব লেখা নাই। পেঁয়াজ রসুনে তগ শরীরটা ত আর শরীর থাকে না। দুরমুস বইনা যায়। কবিরাজি অষুধে কামে লাগব না। দিয়া গ্যালাম, একবার লাগাইয়া দ্যাখতে পারস! লাগানোর আগে জোনাকির জল দিয়া ঘা ধুইয়া নিবি।

    কবিরাজমশয় ওবুল্যাঙরা গাছের নিমিত্ত কি কইলেন যেন?

    —পক্ষকাল কষ্ট পাইবি। তার আগে গাছটা সিদ্ধ কইরা কিছু বাসকের ছাল, অর্জুনের ছাল, জায়ফল, লবঙ্গ ফেইলা দিয়া একটা পাচন খাইতে পারস। শরীরের রক্ত তর খারাপ। কালোমেঘের পাতা সিদ্ধ কইরা খাইতে পারস। রক্তটা ঠিক হইলে ঘাও শুকাইতে সময় লাগব না। বলেই তারিণী সেন মাঠের ওপর দিয়ে ঘোড়া ছুটালেন। ফেলু দেখল চারপাশে তার জ্যোৎস্না। একটা জোনাকি, একটা একটা করে একশটা জোনাকি। ওর চোখের ওপর এখন জীবনের সবচেয়ে দামী এবং নামী বস্তু জোনাকি। তখনই সে দেখল মরীচিকার মতো একটা জোনাকি বেশ পুচ্ছ তুলে উড়ে যাচ্ছে।

    সে জোনাকিটাকে ডান হাতে খপ করে ধরতে গেল।

    হাওয়ায় হাওয়ায় দুলে দুলে জোনাকিটা যাচ্ছে। ফেলু ছুটছে তার পিছনে। মাঠের ভিতর ওর মনে হল আর একটা জোনাকি। এই কাছের জোনাকি হাতের বাইরে চলে যাবে, সে স্থির থাকতে পারছে না। যত সোজা মনে করেছিল জোনাকি ধরা, যত সহজে সে ভেবেছিল খপ করে ধরে কোঁচড়ে ফসলের মতো তুলে নেবে তত সে দেখল মরীচিকার মতো হাতের ফাঁকে জোনাকি উধাও। সে বলল, হালার কাওয়া।

    সে সুতরাং জিদের বশে, অথবা এক দুই মিলে এক গণ্ডা পাঁচ গণ্ডা মিলে এক কুড়ি পাঁচ কুড়িতে শ। একশ জোনাকি। সে গণ্ডার হিসাব জানে। কুড়ির হিসাব জানে। শয়ের হিসাব তার জানা নেই। সে যে এত বড় হাডু ডুডু খেলোয়াড় ছিল, নাম তার ফেলু ছিল, ভয়ে তাকে কেউ কাঁইচি চালাত না, তার নামে কিংবদন্তী ছিল কত, ফেলু খেলার দিন সারারাত তেল মাখে গায়ে, রসুন গোটার তেল। তেলটা তার ভিতর বসে যায়। সে পিছল করে রাখে শরীর। ঠিক পাঁকাল মাছের মতো সে বের হয়ে যায়। যত বড় প্যাচ দাও, যত বড় কাঁইচি চালাও, কি জুতসই, সে যে ফুসফাস বের হয়ে আসে কেউ টের পায় না। কেউ বলে মানুষটা এক ফকিরের কাছে তাবিজ নিয়েছে, গলায় মাদুলি বড় ঝোলে তার, পারো তো সেটা কেড়ে নাও। দেখবে কেমন ভুতের ভয়ে মামদোবাজি খেলা খেলে ফ্যালা।

    এখন সেই ফ্যালা মাঠের ওপর দিয়ে ছুটছে। গলায় তার সেই কালো তার জড়ানো রুপোর চাকতি। সে একটা জোনাকির সঙ্গে পারছে না। তার সব কেড়ে নিলেন এক মানুষ। পাগল মানুষ। মনে হল তার তখন ঠাকুরবাড়ি লণ্ঠন হাতে কারা উঠে যায়। বুড়ো ঠাকুর চিৎপাত হয়ে শুয়ে আছেন। কত লোক যাচ্ছে দেখতে তাঁকে, আর ফেলু এখন কানা খোঁড়া বলে কেউ একবার তাকাচ্ছে না। তার যা ইজ্জত, ধর্ম সব কেড়ে নিয়েছেন মানুষটা। সে উন্মত্ত হয়ে ছুটছে। জোনাকিটা সাদা জ্যোৎস্নায় ভারি খেলা করছে বটে। কাছে এসে যাচ্ছে, খপ করে ধরতে যাচ্ছে, আবার উড়ে যাচ্ছে, হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে, ওপরে উঠে যাচ্ছে, সে ভেবেছে ছেড়ে দেবে, অন্য ঝোপে খুঁজবে জোনাকি। যেখানে জল ঘোলা, অথবা পচা ডোবা সে সেখানে চলে যাবে, তখনই আবার জোনাকিটা চোখের সামনে নেমে আসছে। যেন ধরা দিতে আসছে। সে বলল, আহারে, আমার সুন্দর জোনাকি। আয় তরে ধইরা লই। পরাণ আমার তর লাইগা কত না কান্দে।

    সে খপ্ করে ধরতে গেল। আর উড়ে গেল ফের জেনাকি। হাওয়ায় দুলতে দুলতে কঠিন রুক্ষ মাঠের ওপর দিয়ে ভেসে যেতে লাগল সে।

    ফেলুর মনে হল শরীরে তার পাখা গজিয়েছে। জেনাকির মতো দুই পাখা মেলে সেও যেন উড়ছে। কঠিন রুক্ষ মাঠের ওপর দিয়ে সে ভেসে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে। জোনাকিটা যেদিকে যাচ্ছে সেদিকে সে ভেসে যাচ্ছে। জেনাকিটা যত দুলে দুলে যাচ্ছে, সে তত দুলে দুলে যাচ্ছে। সে কী হাজার আরব্য রজনী গল্পের নায়ক হয়ে যাচ্ছে! তার যে কী ইচ্ছা এখন, আহা, সে কোথায় যাচ্ছে, তার যে কী ইচ্ছা, আল্লার কুদরতে সে আবার সব ফিরে পাবে, এমনকি এটা যখন ফকির প্রদত্ত ওষুধ, দানরি ফানরিতে কী না হয়, মনে হয় তার জোনাকিটা উড়ে তাকে আল্লার দরবারে নিয়ে যাচ্ছে। অথবা এই জোনাকি বুঝি তাকে একশটা জোনাকির খবর দেবে। খবর দিলেই সে খপ্ করে ধরে ফেলবে, জলে ভিজিয়ে একবার শতমূলি বেটে লাগাতে পারলেই নিরাময় হবে শরীর। এমন কি তার সেখানে একটা ব্যাঙের লেজ গজানোর মতো সুন্দর হাতও গজাতে পারে। সে তার ডান হাতটা নেড়ে বাঁ হাতটা আবার গজালে কি কি করবে, প্রথমেই তার কি করণীয় এমন ভাবতে ভাবতে সে যে কোথায় চলে যাচ্ছে!

    ফেলু ট্যাবার পুকুরপাড়ে এসে দেখল জোনাকিটা ঝোপের ভিতর লুকিয়ে পড়েছে। সে ভাবল, বা রে, বেশ মজা, তুমি কুহেলিকা, পদ্ম ফোটালে না চক্ষে, লক্ষ্মী তুমি আমারে কোনখানে নিয়া আইলা! বলেই সে ঝোপটার অন্তরালে উঁকি মারল, ঠিক মাইজলা বিবির সনে যেন এখন পীরিত তার। সে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল ঝোপের ভিতর, যেমন সে একবার বটগাছের নিচে উঁকি দিয়েছিল, কখন মাইজলা বিবি তারে দেখা দেবার তরে পানিতে নেমে আসে।

    এখানেও ঠিক সেই উঁকি দিয়ে থাকা! জোনাকিটা ঝোপের এ-পাশে উড়ে এলেই খপ করে ধরে ফেলবে। আর কী আশ্চর্য, সে দেখল জোনাকিটা তার দলে ভিড়ে গেছে। এখানে সে যে উড়ে এল, সে তার দলে ভিড়ে যাবার জন্য। মরি হায় হায়! কলিজা কামড়ায়, সে নাগাল পাচ্ছে না, জোনাকিডারে। একডা দুইডা জোনাকি না, হাজার গণ্ডা জোনাকি। কেবল ঝোপের ভিতর বসে থাকছে ডালে। নাড়া খেলেই উড়ে চলে যাচ্ছে।

    সে বুঝল নড়লে উপায় নেই। চুপি চুপি চিৎ হয়ে পড়ে থাকা। যেই না উড়তে উড়তে কাছে চলে আসবে খপ্ করে ধরে ফেলা। ফেলু সেই আশায় ঝোপের ভিতর চিৎ হয়ে শুয়ে থাকল। শিকারী মানুষের মতো সে জোনাকি ধরার কায়দা শিখে ফেলেছে। সে চুপচাপ শুয়ে থেকে বেশ ফল পেল। গণ্ডা দুই জোনাকি এখন তার করতলে। কোঁচড়ে রেখে সে অবাক, মরা মানুষের মতো সে পড়ে আছে, টুপটাপ কী যেন পড়ছে ডাল বেয়ে। সে সে-সব লক্ষ রাখছে না। ওরা বেশ উড়ে উড়ে আসছে। কোনওটা ধরতে পারছে, কোনওটা ধরতে পারছে না। ওর বুক জ্বালা করছে। গামছা দিয়ে ঘা ঢেকে রেখেছে। মনে হল ফোঁটাগুলো শরীরে পড়ে নিচে ভেসে যাচ্ছে। বৃষ্টিপাত নয়। কারণ, আকাশ পরিষ্কার। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিপাতের মতো কিছু পড়ছে। এক ফোঁটা দু’ফোঁটা পড়ছে। সে আঙুল দিয়ে দেখল আঠা আঠা। তখনই আবার ওর বুকের কাছে দুটো জোনাকি খেলা দেখাচ্ছে। সে হাতটা তুলে একটা ধরে ফেলল। অন্য জোনাকিটা দূরে সরে গেল। দলে ভিড়ে গেল। ওরা সবাই কেন উড়ে আসছে না। চারপাশে গুঞ্জন করছে না। ফোঁটা পড়ছে। বুকে পিঠে ফোঁটা আঠার মতো। সে সে-সব ভ্রূক্ষেপ করছে না। পড়ুক। উঠে গেলেই এমন রাত আর মিলবে না। কাল, পক্ষ বিচার ঠিক না থাকলে অষুধে কাজ দেয় না। সে বলল, আনুরে, আবার আমি ফেলু শেখ। তরে নিয়া উজানে যামু। আমার শরীরে পচা গন্ধ থাকবে না। তরে নিয়া যামু শহরে। আকালু তরে আর কি আতর আইনা দ্যায়, আমি দিমু তরে পারস্য দেশের আতর। আমার শরীর সবল হইলে কি দিতে না পারি তরে। খপ্ করে সে ফের আর একটা জোনাকি ধরে ফেলল। আকালু ঘরে যায় নাই তো! বিবি, তুই আমাকে দুইটা মাস সময় দে। তরে আমি জোনাকির মত উড়াইয়া দিমু বাতাসে। খপ্।

    সে খপ্ করে আরও একটা জোনাকি ধরে ফেলল। আর কী আশ্চর্য! খপ্। সে দেখল বুকের উপর আঠায় একটা জোনাকি আটকে গেছে। খপ্। সে তুলে কোঁচড়ে রেখে দিল। আঙুলে সে আঠার মতো বস্তুটি ঠোটে ছোঁয়াল। আরে হালার কাওয়া, এয় রে কয় মধু। মধু বর্ষণ হইতাছে। ওপরে কোন বড় বৃক্ষ আছে। বৃক্ষ তুমি কার?

    —রাজার!

    —এখন কার?

    —এখন তোমার।

    —তবে মধু বুর্ষণ কর। ডালে তোমার মধুর চাক যখন আছে বর্ষণ কর। চান্দের রাইতে মধুতে আমার শরীর ভাইসা যাউক আমি শুইয়া থাকি। জোনাকিরা উইড়া আসুক। মরা কাঠ ভাইবা বসলেই, খপ্। সে খপ্ করে আরও একটা জোনাকি পায়ের পাতা থেকে তুলে আনল। ওর গোটা শরীর আঠাময় হয়ে গেছে। এখন সে ওদের না ধরলেও পারে। গোটা শরীরে জোনাকি, বিন্দু বিন্দু জোনাকি এক দুই করে এসে পড়তে থাকল।

    তাকে আর মানুষ মনে হচ্ছিল না। প্রথম একটা কাঠের গুঁড়ি মনে হচ্ছিল। উপরে ঝোপঝাড়। তার ওপর বড় বৃক্ষের ডাল। ডালে প্রকাণ্ড মধুর চাক। কোনও বন্য জীব হয়তো মধুভাণ্ডে মুখ দিতে এসে কামড় খেয়ে চলে গেছে। সব মধু এখন ঝোপের ওপর বৃষ্টিপাতের মতো পড়ে পড়ে নিচের মানুষটাকে ভিজিয়ে দিয়েছে। সে নড়ছে না। নড়লে জোনাকি উড়ে আসবে না। ওকে একটা কালো কাঠের গুঁড়ি ভেবে এক দুই করে সব জোনাকি শরীরে বসে গেলে সে যেন জোনাকির রাজা হয়ে গেল। তার ঘরে বিবি আন্নু যে এখন একা আছে, একেবারে সে তা ভুলে গেছে। আন্নুর কাছে সে আবার রাজার মতো ফিরতে পারবে, সে আবার ফসলের মাঠে ছুটতে পারবে—কী আনন্দ, কী আনন্দ। সে মশগুল হয়ে গেছে। নানারকম লতাপাতার স্বপ্ন দেখছে। চাই একশটা জোনাকি। সে গুনে আরও এক কুড়ি পাঁচ গণ্ডা করে ফেলেছে। সে উঠে বসল। এখন রাতের শেষ প্রহর। কালো মোষের মতো এক খণ্ড মেঘ আকাশের চাঁদ ঢেকে দিলে সে দেখল, ফেলু এক আশ্চর্য মানুষ হয়ে গেছে। তার শরীরে এখন অন্ধকারে বিন্দু বিন্দু জোনাকি জ্বলছে। আঠায় ওরা আটকে গিয়ে আর উড়তে পারছে না।

    আর তখনই শচীন্দ্রনাথ বলছেন, বাবা জল খান। গঙ্গাজল। হাইজাদির পরান আইছে আপনের মুখে গঙ্গাজল দিতে।

    বুড়ো মানুষ হাঁ করার চেষ্টা করলেন। তাঁর শ্বাসকষ্ট প্রবল। নাকের বাঁশি ফুলছে। নাভিশ্বাসে তিনি খুব কষ্ট পাচ্ছেন। গোটা শরীর দুলছে তাঁর। ঝড়ের ভিতর সমুদ্রের তরঙ্গে যেন এক পালবিহীন নৌকা দুলে দুলে এই সসাগরা ভূমণ্ডল পার হচ্ছে।

    সোনা ঠাকুরদার মুখে সেই যে গঙ্গাজল দিতে এসেছিল আর নড়েনি। সেও পায়ের কাছে চুপচাপ বসে রয়েছে। এখনও পর্যন্ত চন্দ্রনাথ, ভূপেন্দ্রনাথ কেউ ফিরে আসেন নি। তাঁরা আসেন নি বলেই এখনও আত্মাটা আছে। ওঁদের জন্য ঠাকুরদার প্রাণপাখিটা বুকের ভিতর এখনও বসে আছে। ওঁরা এলেই ওঁদের দেখে সে উড়ে যাবে। নাক অথবা কানের ভিতর দিয়ে সে বের হবে। চোখের ভিতর দিয়েও বের হয়ে আসতে পারে। চোখের ভিতর দিয়ে বের হলে চোখটা খোলা থাকবে। নাকের ভিতর দিয়ে বের হলে ডগা হেলে যাবে। আর মুখের ভিতর দিয়ে বের হলে তিনি হাঁ করে থাকবেন। ওর বড় ইচ্ছা দেখার, ঠাকুরদার প্রাণ-পাখিটা কীভাবে বের হয়ে আসে।

    সোনা, সেই আত্মা পাখির মতো, না পাখির হৃৎপিণ্ডের মতো, আত্মার কী চেহারা, বুকের কোন জায়গাটায় থাকে, কী খায়? নিঃশ্বাস ফেলে কী করে, বের হবার মুখে সে আত্মাটাকে দেখতে পাবে কি-না, সংসারে এই আত্মা কেউ কোনওদিন দেখেছে কি-না, অথবা একটা ছোট্ট হাওয়ার মতো, তাই হয়তো সেটা দেখা যায় না—তবু ওর মনে হয়েছে, নিরিবিলি চুপচাপ বসে থাকলে টের পাওয়া যাবে, আত্মা বড় অভিমানী বস্তু। চারপাশের দরজা-জানালা বন্ধ করে দিলে কোথায় যাবে তুমি, আবার ফিরে এসে এই দেহে তোমাকে আশ্রয় নিতে হবে। অথচ সোনা ঘরটার চারপাশে তাকালে দেখল, দরজা-জানালা বন্ধ করলেও অজস্র ফাঁকফোকর রয়েছে। সে কিছুতেই আত্মাকে আর আটকে রাখতে পারবে না। সেই চাঁদ-সদাগরের পুত্রবধূর মতো ওর ইচ্ছা এখন নিশ্ছিদ্র কোনও ঘরে ঠাকুরদাকে নিয়ে তুলতে পারলেই—তিনি আবার শতবর্ষ বেঁচে যাবেন। কেন যে মানুষ মরে যায়, বাঁচে না, সে-ও একদিন মরে যাবে, ভাবতে ভারি কষ্ট হল তার। ঠাকুরদার মতো, বাবা, মা, জ্যাঠামশাই, ছোটকাকা সবাই মরে যাবেন। সে বড় হলে একটা এমন ঘর তৈরি করবে, যেখানে হাওয়া ঢুকতে পারবে না। ঘরটায় সে তার বাবা মা অথবা জ্যাঠামশাইকে রেখে দেবে। অভিমানী আত্মা বের হয়ে যখন দেখবে উড়ে যাবার পথ নেই, তখনই ফের সে ভিতরে ঢুকে যাবে অথবা সে যদি বের হয়ে যায়, সে ঈশ্বরকে বলবে, আমাকে দিব্যদৃষ্টি দাও ভগবান। আমি আত্মার পিছনে পিছনে ছুটব। খপ করে ধরে ফেলব তাকে। যার “ আত্মা তাকে আমি ফিরিয়ে দেব। তখনই কে যেন বলল, বের করে আনুন। ঘর থেকে বের করে আনুন। বাইরে এই ধরণীর শান্ত চন্দ্রালোকে শতবর্ষ পার করে মানুষটা এবার মুক্ত হোক। ঠাকুরদাকে ধরাধরি করে নিয়ে যাবার সময় হুঁশ হল সোনার, এতক্ষণ সে কী সব আজেবাজে কথা ভেবেছে। ঠাকুরদাকে সেও ধরাধরি করে উঠানে নিয়ে নামাল। শিয়রে একটি লণ্ঠন রেখে দেওয়া হল। শেষ প্রহরে ফিরে এলেন ভূপেন্দ্রনাথ, চন্দ্রনাথ। তাঁরা ঠাকুরদার পায়ে ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়ে থাকলেন। দেখলে মনে হবে ওঁরা যেন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন।

    দেখলে মনে হবে ফেলুও যেন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সে বাড়িতে উঠেই ডাকল আন্নু, দ্যাখ আমি আইছি। তারিণী কবিরাজ ধন্বন্তরি। তার অষুধ পাইছি আমি। দ্যাখ আমার শরীরে কি জ্বলতাছে। দ্যাখ। তুইলা রাখ, বোনাকি পোকা পানিতে ভিজাইয়া রাখ। আর মাসাধিককাল আমার কষ্ট। আন্নু, আন্নু তুই ঘরের ভিতর আছস, রা করস না ক্যান! ভাল হইব না কিন্তু। কথা ক! কথা ক কইতাছি। কাফিলা গাছটার নিচে আমি খাড়াইয়া আছি। তুই আয়। খুইটা খুইটা জোনাকি তুইলা নে শরীর থাইকা।

    কোনও সাড়াশব্দ নেই ভিতরে। ঝাঁপের দরজা ভেজানো। বাগিগরুটা ফেলুর সাড়া পেয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। সে বলল, আন্নুড়া কথা কয় না। কি কারণ। কার উদ্দেশে যে বলা! যেন সে জাফরিকে বলছে, আমারে চিনতে কষ্ট হয় জাফরি। আমার শরীরে কি জ্বলতাছে দ্যাখ। আমি ইবারে ভাল হইয়া যামু। দ্যাখবি, তগ আর অভাব-অনটন থাকব না। আন্নু, আন্নু রে!

    না, কেউ সাড়া দিচ্ছে না। বড় অভিমানী মেয়ে। সে এই ভেবে বলল, রাইতে ফিরি নাই, কারণ, ধন্বন্তরি আমারে কইল, ফ্যালা, পূর্ণিমার রাইতে একশডা জোনাকি ধইরা রাখ। কামে লাগব।

    —তা কি কাম? সে নিজেই প্রশ্ন করছে নিজেকে। যেন সে আন্নুর হয়ে জবাব দিচ্ছে। কাম হইছে দুরারোগ্য ব্যাধি ছাইড়া যায়। আমি ঝোপ-জঙ্গল থাইকা দ্যাখ কি কৌশলে জোনাকি ধইরা আনছি!

    তবু সাড়া দিচ্ছে না কেউ। তা দেবে না। ঘুম তো ওর ষোলআনা। ঘুমালে আর উঠতে চায় না। সে এবার ঝাঁপের দরজায় সামান্য ঠেলে ভিতরে উঁকি দেবে ভাবল, অথবা ডাকবে, আনু ওঠ। আর ঘুমাইস না। ভোর হইতে আর দেরি নাই।

    এটা কী হয়ে গেল! দরজাটা পড়ে যাচ্ছে কেন! ভিতরের দিকে একটা বাঁশে আটকানো থাকে দরজাটা। ঘুমোবার আগে আন্নু বাঁশটা ঠেলে দেয়। বাইরে থেকে ঠেলে দিলে দরজাটা ফেলে দেওয়া যায় না। কিন্তু এমন অদ্ভুত, সে দেখল দরজাটা পড়ে যাচ্ছে। ভিতরে কেউ যেন বাঁশ সরিয়ে রেখেছে। সে বলল, আমার লাইগা দরজা খোলা রাখছস! তা ভাল। তর ঘুম বিধবা মাইয়ার মত, ঘুমাইলে আর হুঁশ থাকে না। কাপড়চোপড় উইঠা যায়। একখানে তুই, অন্যখানে তর কাপড়। তা তুই এডা ভাল করস নাই। আকালু নারাণগঞ্জে যাইব মোকদ্দমা করতে। তারে আমি কোরবানী দিমু। বলেই সে হাঁ হয়ে গেল।

    যা ভেবেছিল তাই। ঘর খালি। সে এতক্ষণ জোরজার করে মনকে প্রবোধ দিয়েছে। যেন পাশেই আছে, সাড়া দেবে। জলের তরঙ্গ ভাইসা যায় মত বিবি তার লুকোচুরি খেলছে। সে বলল, তা ভাল হইছে। সে জোরে বলল, তা ভাল হইছে! সে চিৎকার করে আসমান-জমিন কাঁপিয়ে হেঁকে উঠল, তা ভাল হইছে! ওর হাতের মুষ্টিতে সেই কোরবানীর চাকু! ভাল হইছে। আমার পরাণ কাইরা নিছে আকালুদ্দিন।

    —তুমি, আকালুদ্দিন কই যাইবা। হালার কাওয়া। বলতে বলতে সে কেমন স্থবির হয়ে গেল! মেঝের উপর সেও ভূলুণ্ঠিত হল। বালকের মতো কাঁদল, আন্নু, তুই আমারে ফালাইয়া কই গ্যালি! আমার মাটি জমিন কার লাইগা!

  • আঠার

    আঠার

    দিন-দশেক পর শশীভূষণ এবং ঈশম ফিরে এল। ওরা মহাদেব সাহার লোককে সঙ্গে নিয়ে গেছে। এত বড় মানুষকে দেশ-দেশান্তরে খুঁজতে যাওয়া ভাগ্যের কথা। ওরা এসে খবর দিল, না পাওয়া গেল না।

    বড়বৌ, শচীন্দ্রনাথ, এমন কী বাড়ির সবাই, ওরা ফিরে আসছে দেখতে পেয়েই পুকুরপাড়ে নেমে গেল। সেখানেই শশীভূষণ সবাইকে বললেন, না, তিনি সেখানে নেই। যাঁকে সন্দেহ করে খুঁজতে যাওয়া তিনি ছ-সাত দিন আগে কামাখ্যা দেবী দর্শনে চলে গেছেন।

    —তিনি কে? বড়বৌ সহসা লোক-লজ্জার মাথা খেয়ে একদল লোকের সামনে এমন প্রশ্ন করে বসল।

    —কেউ এমন কিছু খবর দিতে পারল না। বিশ্বনাথের মন্দিরে কিছু পাণ্ডাদের কথাটা বললাম। ওরা বলল, তিনি তো মৌনী-বাবা। কারো সঙ্গে কথা বলতেন না। প্রথম দিন এসেই পিপুল গাছের নিচে বসেছিলেন। ওঁর কি চেহারা! রাজপুরুষের মতো চেহারা। সংসারবৈরাগ্যে যেন তীর্থে চলে এসেছেন।

    —ওঁর হাতে কোন কালো কালো দাগ ছিল?

    শশীভূষণ বললেন, ওরা কিছু বলতে পারল না। শুধু বলল, ত্রিকূট পাহাড়ের নিচে তিনি চুপচাপ পিপুল গাছের নিচে বসেছিলেন। পরনে যতদূর মনে পড়ে লালকাপড়

    শচীন্দ্রনাথ বললেন, ওঁর গালে অশৌচের দাড়ি থাকার কথা।

    —না, তেমন কোন অশৌচের দাড়ি ছিল না। মাথা মুণ্ডন করা। রাশি-রাশি লোক ওঁকে দেখেই ভিড় করেছিল। বোধ হয় তিনি এত মানুষের ভিড় দেখেই সেখান থেকে পালিয়েছেন।

    —কিন্তু বললেন যে, কামাখ্যা দর্শনে গিয়েছেন?

    —ওটা ওদের অনুমান। কেউ কিছু ঠিক বলতে পারছে না।

    সবাই বাড়ি উঠে এল। মানুষটার খোঁজ পাওয়া না গেলে যা হয়, বড়বৌ আবার সেই সংসারের কাজের ভিতর ডুবে গেল। তিনি ফিরে আসবেন। যখন নিরুদ্দেশে গেছেন তখন ফিরে আসবেন।

    তারপর এলেন ভূপেন্দ্রনাথ। তিনি সঙ্গে নিয়ে এলেন এক বড় তান্ত্রিক। তান্ত্রিক নখের উপর এক মায়া দর্পণ সৃষ্টি করবেন। তাতে মানুষটা কোথায় বসে আছেন অথবা হাঁটছেন দেখা যাবে। সবচেয়ে যে প্রিয় মানুষ তাঁর নখে সবচেয়ে ভালো ছবি ফুটে ওঠে। তিনি আরও কিছু খবর নিয়ে এলেন এ সময়। দেশভাগের খবর। শরৎ বসু মশাই ময়মনসিং-এ মিটিং করে গেছেন। তিনি এই দেশভাগের বিরুদ্ধে। পণ্ডিতজী, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল খুব এগিয়ে গেছেন। কেবল এখন মহাত্মাজীর উপর সব নির্ভর করছে!

    তান্ত্রিক থাকবেন দু’দিন। তাঁর খাদ্যদ্রব্যের বিরাট তালিকা। নিশি রাতে তিনি তন্ত্র আরাধনায় বসবেন। সুতরাং তন্ত্রাচারের যা-যা দরকার তার একটা ফর্দ করতে করতে বললেন, তবে মহাত্মাজী বাইচা থাকতে দেশভাগ হবার নয়। যা কিছু আশা এখন আমাদের তাঁর ওপর।

    শশীভূষণ বললেন, যেভাবে চারপাশে দাঙ্গা হচ্ছে, কী যে হয় কিছু বলা যায় না।

    তান্ত্রিকমশাইর জটা খুলে দিলে মাটিতে এসে পড়ছে। সোনা, পলটু, লালটু, এবং শোভা আবু অথবা কিরণ এবং গ্রামের ছেলেরা ভয়ে আর ওদিকে যাচ্ছে না। চোখ বড়-বড়। টোপা কুলের মতো লম্বা চোখে কাজল এবং ভস্মমাখা শরীর। লাল রঙের আলখাল্লা এবং বড় কমণ্ডুল, হাতে ত্রিশূল। ওঁর মুখে বম্-বম্ ভোলানাথ শব্দ। শশীভূষণের বড় রাগ হচ্ছিল। কারণ এই মানুষটা তাঁর ঘরে রাত কাটাবে আজ। ওঁর কেমন ভয় ধরে গেল প্রাণে। অথচ মুখে কিছুই বলতে পারছেন না। ভূপেন্দ্রনাথের উপর মনে-মনে ভীষণ বিরক্ত হচ্ছেন। ভূপেন্দ্রনাথ যে দেশভাগের ব্যাপারে এত কথা বলে যাচ্ছেন তাঁর কথার আর একটাও জবাব দিচ্ছেন না। দিলেই যেন বলতে হয়, এগুলো যে আপনার কী হয়! যত সব আজে-বাজে লোক ধরে আনা।

    ভূপেন্দ্রনাথ বললেন, বোঝলেন মাস্টারমশাই, এবার ঠিক দাদার খোঁজ পাইয়া যামু।

    শশীভূষণ একটা ইংরেজি বই পড়ছিলেন। তিনি সেটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালেন। এখন নানা রকমের তিনি কথা বলবেন। এই জটাজুটধারী তান্ত্রিক মানুষ সম্পর্কে এমন ইমেজ তৈরি করবেন যে, তাঁর আর শোনার ধৈর্য থাকবে না। মাথা তাঁর গরম হয়ে যাবে। সেজন্য তাড়াতাড়ি একটা জামা গায়ে দিয়ে গোপাটের দিকে বের হয়ে গেলেন।

    —একেবারে ম্লেচ্ছ। লেখাপড়া শিখলে এই হয়। যেন ভূপেন্দ্রনাথের এমন বলার ইচ্ছা।

    তান্ত্রিকের কথামতো বড়বৌ সকাল-সকাল স্নান করেছে। হোমের বিবিধ-ব্যবস্থা তাকেই করতে হয়েছে। লালপেড়ে শাড়ি এবং কপালে বড়বৌ আজ অন্য দিনের চেয়ে অনেক বড় সিঁদুরের ফোঁটা দিয়েছে। তাকে সেই মানুষের সামনে চুপচাপ বসে থাকতে হবে। হোমের নানাবিধ আচারের পর বড়বৌর বাঁহাতের বুড়ো আঙুলের নখে ঘি মেখে আগুনের উপর কিছুক্ষণ ধরে তিনি বললেন, নখে কিছু দেখতে পাচ্ছেন মা?

    –না।

    —ভাল করে দেখুন। বুড়ো আঙ্গুলটা চোখের আরও কাছে নিয়ে আসুন-এবারে নখে মায়া দৰ্পণ সৃষ্টি হবে।

    —না, কিছু দেখতে পাচ্ছি না।

    খুব গম্ভীর গলায় হেঁকে উঠলেন, ভালো করে দেখুন। দর্পণের উত্তর দিকটায় ছায়ামতো কিছু ভেসে উঠছে কিনা দেখুন।

    সবাই গোল হয়ে চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে। উঠানে সব গ্রামের লোক ভেঙে পড়ছে। বড়বৌ ঘামছে। রোদ এসে ওর কপালে পড়েছে। সিঁদুর গলে গিয়ে সারা মুখ লাল। বড়বৌ কাঁপছিল!

    –দেখতে পাচ্ছেন?

    —দেখতে পাচ্ছি।

    —কী দেখতে পাচ্ছেন?

    —তিনি হেঁটে যাচ্ছেন।

    —কোন্ দিকে?

    —উত্তরের দিকে।

    —তারপর কী দেখছেন?

    —একটা গাছের নিচে বসলেন।

    —এখন কী করছেন?

    —কিছু না।

    —কিছু দেখতে পাচ্ছেন আর?

    —কিছুই না। হ্যাঁ, একটা আমবাগান মনে হচ্ছে।

    —আর কিছু?

    –চারপাশে কত লোক বসে রয়েছে।

    —আর কিছু?

    —সবাই ওঁর কাছে কিছু চাইছে।

    —কাউকে কিছু বলছেন না?

    —না।

    —এবারে দর্পণের পশ্চিমদিকে তাকান। কেউ ওঁর দিকে হেঁটে আসছে মনে হয় না?

    —একজন তান্ত্রিক সন্ন্যাসী।

    — সে কে?

    —আপনার মতো মুখ।

    —না-না, আমার মতো মুখ হবে কেন? ভাল করে দেখুন।

    বড়বৌ কিছু আর বলতে পারল না। মাথা ঘুরে পড়ে গেল মাটিতে। সবাই ধরাধরি করে ওকে তুলে নিয়ে পুবের ঘরে শুইয়ে রাখল।

    সোনার মনে হল, এক লাথি মারে সবকিছুতে। সে সন্তর্পণে ভিড়ের ভিতর থেকে ওর কমণ্ডুল চুরি করে নিয়ে ঘাটের জলে ডুবিয়ে রাখল। খোঁজ এবার। দেখাও বাবু তোমার কত হিম্মৎ, নিরুদ্দেশে গেছে কমণ্ডুল। বের কর খুঁজে।

    বিকেলের দিকে কমণ্ডুল খুঁজতে গিয়ে তান্ত্রিক মানুষ দেখে ওটা ওর থলের ভিতর নেই। কে নিল সারা বাড়ি হৈচৈ খোঁজাখুঁজি। সারা বাড়িতে কেউ বলতে পারল না কমণ্ডুল হেঁটে-হেঁটে কোথায় চলে গেছে। সোনা বলল, আমি বলতে পারি মাস্টারমশয়।

    —কোথায়?

    —দাঁড়ান। বলে সে নখ নিজে দেখে বলল, মনে হয় কমণ্ডুল হেঁটে যাচ্ছে।

    —কোনদিকে?

    —পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে।

    —তারপর?

    —টুপ। জলে ডুবে গেল।

    মাস্টারমশাই এবং সোনা উভয়ে হেসে উঠল। যা, বের করে দিয়ে আয়। নয়তো আবার তোকে ছোটকর্তা মারবে। তান্ত্রিক ব্যাটা বড় ফাঁপরে পড়ে গেছে।

    সোনা বলল, আমার একা যেতে ভয় লাগে।

    —কোথায় ডুবিয়ে রেখেছিস?

    —আমগাছটার গোড়ায় যে ঘাট তার ডান দিকে শ্যাওলার নিচে।

    শশীভূষণ কমণ্ডুল তুলে এনে তান্ত্রিকমশাইর সামনে রেখে চুপি-চুপি বললেন, ভড়ংবাজি ছাড়ুন।

    বেশি বাড়াবাড়ি করলে ছাল চামড়া তুলে নেওয়া হবে।

    তান্ত্রিক মানুষটি মুখ গম্ভীর করে ফেলল।

    পরদিন সকালে সবাই দেখল মানুষটি নেই। দুপুররাতে চলে গেছে কাউকে না বলে।

    ভূপেন্দ্রনাথ ভয় পেয়ে গেলেন। কোথায় কী অনিয়ম হয়েছে, তিনি না বলে চলে গেলেন। এসব মানুষের রোষে পড়লে নানাভাবে অমঙ্গল দেখা দিতে পারে সংসারে। সেজন্য সারাদিন ভূপেন্দ্ৰনাথ বড়ই বিমর্ষ থাকলেন।

    তার কিছুদিন পরই সোনা বের হল জ্যাঠামশাইকে খুঁজতে। সবশেষে সে একবার চেষ্টা করে দেখছে।

    সে সকাল-সকাল দুটো খেয়ে নিল। মাকে সে কিছু বলল না। সে দুটো বঁড়শি নিল। নদীর জলে মাছ ধরতে যাচ্ছে বলে বের হয়ে গেল। কারণ, এখন নদীতে জল কম। সোনা বঁড়শিতে ভালো মাছ ধরতে পারে। এখন বেলে মাছেরা বর্ষার জল পেলেই উঠে আসবে। খুব বড় নয়। ছোট-ছোট বেলে। সে বঁড়শি এবং একটা ঘটি সঙ্গে করে মাঠে নেমে গেল। ওর শরীরের সেই রুগ্‌ণ ভাবটা কেটে গেছে। এখন সে খুব তাজা। সামনে সব মাঠ আছে। মাঠে পাট গাছ ওর বুক সমান। দু’দিন যেতে না যেতেই সব পাট ওর মাথার উপর উঠে যাবে। উঠে গেলে তাকে কেউ আর দেখতে পাবে না। তাজা পাট গাছের নিচে সোনার রুগ্‌ণ ভাবটা একেবারে মুছে যাবে।

    গোপাটে নেমেই মনে হল ফতিমা এখনও ঢাকায় যায়নি। ফতিমাকে সে সঙ্গে নিতে পারে। কিন্তু ফতিমা হয়তো যাবে না। সে বড় হয়ে গেছে। ফতিমা বড় হয়ে গেছে। সে একা-একা কোথাও এখন চলে যেতে পারে, কিন্তু ফতিমা পারে না। তবু কেন জানি সে যে জ্যাঠামশাইকে মাছ ধরার নাম করে খুঁজতে বের হচ্ছে সেটা একবার ফতিমাকে না জানালে যেন নয়। কারণ, কেন জানি সোনার অসুখের ভিতর বার-বার মনে হয়েছে সে না গেলে জ্যাঠামশাই ফিরে আসবেন না। তাকে দেখলেই জ্যাঠামশাই ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর থেকে উঠে আসবেন। এই যে সোনা, আমি। এতদিন সবার সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছি, কিন্তু তোকে দেখে আর থাকতে পারলাম না। চল, বলে তিনি সোনার কাঁধে হাত রাখবেন। সবাই আশ্চর্য হয়ে দেখবে, সোনা জ্যাঠামশাইকে নিয়ে ফিরছে। জ্যেঠিমা সোনাকে নিশ্চয়ই তখন আশীর্বাদ করবে। সোনা, তুমি বড় ভালো ছেলে, তুমি দীর্ঘজীবী হও। সোনাকে কেউ আদর করে বললে সে সবকিছু তার জন্য করতে পারে। আর এ তো তার পাগল জ্যাঠামশাই। জ্যাঠামশাইকে সে বন জঙ্গলে ঢুকে ডাকলে তিনি চুপচাপ বসে থাকতে পারবেন না। ঠিক হাসি-হাসি মুখটি নিয়ে উঠে দাঁড়াবেন। এসে গেছিস! আমি তোর জন্যই বসেছিলাম। আরও কত কিছু ভাবে সোনা। মনে হয় তার জ্যাঠামশাইকে কেউ তেমন করে খোঁজেনি। খুঁজলে একটা মানুষকে পাওয়া যায় না এটা তার বিশ্বাস হয় না। সে থাকতে না পেরে একা-একা ট্যাবার পুকুরপাড়ে চলে যাচ্ছে। কারণ সোনার বার-বারই যে ঝোপ-জঙ্গলের কথা মনে হয়েছে সেটা ট্যাবার পুকুরপাড়ে, সেই বৃক্ষ, বৃক্ষ তুমি কার? রাজার! এখন কার? তোমার। আমার হলে তুমি বল আমার পাগল জ্যাঠামশাই কোথায় বসে আছেন? তাকে তুমি খুঁজে আনো। চল, তুমি আমার সঙ্গে তাঁকে খুঁজবে।

    সেই গাছটির কথা মনে হল, গাছ তো নয়, বৃক্ষ। বড় ডালপালা মেলে দিয়েছে আকাশে। আর সেই অজস্র শকুন কোনওটা উড়ছে, কোনওটা মগডালে বসে ঘুমোচ্ছে। কোনওটা শিকার কোন দিকে, বাতাসে গন্ধ আসছে কি-না, এই ভেবে গলা বার করে বসে আছে। সোনার দৃশ্যটা মনে হলেই ভয় হয়। কত বড়-বড় সব হাড়, মানুষের অথবা মাছের। সে হাড় ঠিক চিনতে পারে না। বড় হাড় হলেই মানুষের মনে হয়। সেই সব হাড়, মরা ডাল ডিঙিয়ে যেতেই তার যা ভয়। ফতিমা সঙ্গে থাকলে কিছুতেই ভয় থাকে না। সারা মাঠে পাট গাছ। এদিকের জমিতে আগে চাষ করা হয়েছে বলে সে কখন টুপ করে ডুবে গেল পাটের জমির ভিতরে। এবং গিয়ে যখন দাঁড়াল অন্য পাড়ে, ঠিক সামনে সেই পেয়ারা গাছ ফতিমাদের। সে কারও সাড়া পাচ্ছে না। কেমন নিঝুম বাড়িটা। নিঝুম থাকারই কথা। ওর নানী চলাফেরা করতে পারে না। ঘরের ভিতর চুপচাপ বসে থাকে। চোখে ভালো দেখে না। অথবা সারা বিকেল মাদূরে শুয়ে ঘুমায়। ধনু শেখ সারাদিন মাঠে থাকে। ওদের বাড়িটার পরে হাজিসাহেবের বাড়ি কেউ বড় আসে না এ-বাড়িতে। কারণ, সংসারে যে মানুষ থাকলে কথাবার্তা বলা যায় তেমন মানুষ বলতে এক ফতিমা। সে সারাক্ষণ বই নিয়ে একটা আলাদা ঘরে শুয়ে থাকে, পড়ে। কখনও কখনও ডাকলে সে নানীকে সাড়া দেয়। আজকাল আবার সে পড়ায় এত মনযোগী হয়ে উঠেছে যে নানী ডাকলেও বিরক্ত হয়। আমি তো নানী এ-ঘরে বসে আছি। তুই আমারে বারে বারে ডাকলে পড়া হয়! ফলে নানী তাকে ডাকে না। সোনা সে-ঘরটা চেনে। সে চুপি-চুপি ডাকল, এই ফতিমা!

    ফতিমা চিত হয়ে পড়ছিল। ওর এই বয়সে চুল কত বড়। সে বুকের ওপর বই রেখে পড়ছে। স্কুল খুললেই পরীক্ষা। সে পড়ায় ফাঁকি দেয় না। কিন্তু সোনাবাবুর মুখ জানালায় উঁকি দিতেই বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। সে তার পড়ার কথা ভুলে গেল।

    ফতিমা বলল, আপনে, সোনাবাবু!

    —আমি ভাবলাম তর লগে একবার দেখা করে যাই।

    —কই যাইবেন?

    —জ্যাঠামশাইকে খুঁজতে যাচ্ছি।

    —একলা?

    —কে আর যাবে সঙ্গে। সবাই খুঁজে দেখেছে, পায়নি। এবার আমার পালা।

    —আমাকে সঙ্গে নেবেন?

    —যাবি তুই! তোর নানী বকবে না?

    —টের পাইলে ত। বলেই খড়ম পায়ে নেমে এল। ফতিমার এটা শহরে থেকে হয়েছে। সারা দিন লাল রঙের খড়ম পরে থাকে। নীল রঙের স্ট্র্যাপ খড়মে। সে হাঁটলেই কেমন খট-খট শব্দ হয়। সোনার এটা কেন জানি পছন্দ হয় না। মেয়েরা জুতো পরে সে সেটা মুড়াপাড়ায় দেখেছে। অমলা কমলা জুতো পরত। সেবারই যে গেল ওরা, আর ওদের যাওয়া হল না। কী যে কারণ সোনা জানে না। আর নৌকা আসত না মুড়াপাড়া থেকে। ওরা যেতে পারত না। পরে সে যা শুনেছে তা সত্যি নয়—কারণ, সে বিশ্বাসই করতে পারে না। এত বড় বাড়ির আদায় পত্র কমে গেছে। মহালে তেমন আদায়পত্র নেই। বাবুদের বড় বড় কারবার ছিল। ঋণসালিশি বোর্ড ওদের আদায়পত্র কমিয়ে দিয়েছে—সে বিশ্বাস করতে পারত না। ওর কেন জানি মাঝে মাঝে অমলাকে চিঠি লিখতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু সে এতটুকু ছেলে অমলার কাছে কী লিখবে! কিছু লিখতে গেলেই মা বকবে। এসব কী পাকামি তোমার সোনা। তুমি চিঠি লিখছ অমলাকে।

    ফতিমা বলল, এদিক দিয়া আসেন।

    ফতিমা খালি পায়ে পা টিপে টিপে একবার নানীর ঘরে উঁকি দিল। দেখল নানী একটা মাদুরে কাঁথা পেতে শুয়ে আছে। সূর্য মাথার উপর না উঠতেই নানী খেয়ে নেয়। সেও তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়েছে। ওর সামনে তারপর থাকে অফুরন্ত সময়। সে মাঝে-মাঝে পেয়ারা গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। দূরে অর্জুন গাছের নিচে কোনও ছায়া-ছায়া কিছু দেখা দিলেই তার মনে হয় সোনাবাবু দাঁড়িয়ে আছে। সে তখন আর স্থির থাকতে পারে না। জন্মাষ্টমীর মিছিলে সোনাবাবুর জন্য যা-যা কিনে রেখেছিল, সেইসব দিতে চলে আসে। এবার সে কিছু আনতে পারেনি। কেবল ঢাকা থেকে ফিরে এসেছিল সোনাবাবুকে দেখতে পাবে এই ভেবে। ফতিমা যত বড় হচ্ছে কেন জানি এই গাছপালা পাখির ভিতর সোনাবাবুর সুন্দর নীল রঙের জামা, লম্বা-লম্বা হাত-পা বড় তার ভালো লাগে। আর চন্দনের গন্ধ শরীরে–শহরে চলে গেলেও তার মনে হয় নাকে গন্ধটা লেগে রয়েছে। এমন পবিত্র গন্ধ সে যেন আর কোথাও পায় না। সুতরাং সে এই সুযোগ ছেড়ে দিলে আর সময় হবে না, মনে মনে সেও জানে বড় হয়ে গেলে আর মাঠে-ঘাটে একা নেমে আসতে পারবে না।

    ওরা মাঠে নামতেই পাট গাছের নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল। জমির আলে ওরা ছুটছে। শাড়ি পরায় ফতিমাকে সোনার চেয়েও লম্বা মনে হচ্ছে। পাট গাছের নিচে থাকলে তারা টের পাবে না কোন দিকে যাচ্ছে। সুতরাং মাঝে-মাঝে গাছ ফাঁক করে উঁকি দিয়ে দেখে নিচ্ছে ওরা ঠিকমতো যাচ্ছে কি-না। সেই খাল। দালানবাড়ির খাল তারপর কিছু ধানের জমি। ধানের জমির ওপর দিয়ে গেলে ওরা ধরা পড়ে যাবে, ওরা একটু ঘুরে আলে-আলে পাটের জমি ভেঙে উঠে যেতে থাকল।

    ফতিমা ডাকল, এই সোনাবাবু।

    সে দাঁড়াল। পিছন ফিরে তাকাল। দেখল ফতিমা ধীরে ধীরে হাঁটছে। আয়। দেরি করিস না?

    —এত তাড়াতাড়ি ছুটছেন ক্যান?

    —ফিরতে দেরি হলে মা বকবে।

    –কেউ বকবে না। কি সুন্দর পাটগাছ, না সোনাবাবু?

    —খুব সুন্দর। তুই আয়।

    —আপনের লগে আমি হেঁটে পারি। আপনে পুরুষমানুষ না?

    সোনা এবার দাঁড়াল। সত্যি ফতিমা কেন পারবে? সে বলল, তুই নাকে নথ পরে থাকিস না কেন?

    —নথ পরলে আমাকে দেখতে ভাল লাগে?

    —খুব ভাল লাগে না। তবে না পরলে খারাপ লাগে। তোর পায়ে মল নেই। ঝুমঝুম শব্দ হয় না আগের মত!

    —এখন বড় হয়েছি না! ঝুমঝুম বাজলে লোকে টের পাবে সোনাবাবুর লগে ফতিমা যায়। লোকে পাপ ভাবতে পারে।

    সোনা বলল, অঃ পাপ! তা চলে আয়। পাপ ভাবলে পাপ। আমরা তো কিছু পাপ করছি না।

    —আমার হাত ধরবেন সোনাবাবু?

    —তোর হাত! দেখি কেমন?

    সোনা হাতটা নিয়ে দেখল। এগুলো লাল-লাল কি মেখেছিস ছিট-ছিট?

    –মেহেদি পাতার রং।

    —মাখলে কি হয়?

    —কি আবার হবে! বাড়ি এলেই মাখতে ইচ্ছা করে।

    সোনা বলল, তোর বাবা বকে না?

    —বকবে কেন?

    —তুই চোখে বড় লম্বা কাজল দিয়েছিস। তোর চোখ ছোট। বড় চোখে কাজল মানায়। ছোট চোখে মানায় না।

    ফতিমার কেমন ভিতরে-ভিতরে অভিমান হল। অভিমানে সে বলল, হাঁটেন, তাড়াতাড়ি ফিরতে হইব। বলেই ওরা দেখল সেই গাছের নিচে এসে গেছে। গাছের নিচটা পার হয়ে যেতেই যা ভয়। তারপর লতা-পাতার ঝোপ। বৃষ্টি হওয়ায় ঝোপজঙ্গল সবুজ হয়ে গেছে। ওরা দু’জনই জোরে-জোরে ডাকল, জ্যাঠামশয় আছেন? আমি সোনা।

    ফতিমা বলল, জ্যাঠা আছেন! আমি ফতিমা। আপনাকে নিতে এসেছি।

    কোনও সাড়াশব্দ নেই। ঘুরে-ফিরে ওরা কোথাও ডেকে-ডেকে সাড়া পাচ্ছে না। ওরা দু’জন দু’দিকে খুঁজছে। এই অঞ্চলে খুঁজে আবার ওরা ছুটতে আরম্ভ করবে। কারণ, যদি হাসান পীরের দরগায় ওঁকে পাওয়া যায়! ওখানে গেলেই দরগার ভিতর অথবা, যেসব ভাঙা মসজিদ এবং পাঁচিলঘেরা কবরের ঘর আছে সেখানে খুঁজে দেখলে পাওয়া যেতে পারে। ফতিমা ডাকতে ডাকতে পুকুরের উত্তর পাড়ে চলে গেছে। সোনাবাবুর ডাক সে এখান থেকে শুনতে পাচ্ছে না। সে ভাবল ডাকবে, সোনাবাবু আপনে আর বেশি দূর একা-একা যাইয়েন না। কিন্তু অভিমান ওর ভিতর বাজছে। কেবল অবহেলা। সে সুন্দর করে আজকাল চুল বাঁধতে শিখেছে। সে কপালে সেই কাঁচপোকা পরে থাকে। যা সোনাবাবু এক বর্ষায় ওর জন্য ধানখেত থেকে তুলে রেখেছিল। এখনও সেই কাঁচপোকা কী উজ্জ্বল! সে যে এমন সুন্দরভাবে সেজে বসে থাকে তার জন্য কোন টান নেই সোনাবাবুর। একবার বলল না, কী রে ফতিমা, সেই কাঁচপোকাটা তুই যত্ন করে রেখে দিয়েছিস? সে ভাবল, না আর ডাকবে না। অথবা কথা বলবে না। সে এসেছে পাগল মানুষটাকে খুঁজতে। তাকে খুঁজেই চলে যাবে।

    কিন্তু এতক্ষণ হয়ে গেল কোনও সাড়াশব্দ নেই সোনাবাবুর। কী ব্যাপার! কোনও ডাক শুনতে পাচ্ছে না। কেমন নিঝুম হয়ে গেছে বনটা। বনের ভিতর সোনাবাবু হারিয়ে গেছে ভেবে ফতিমার বুক কেঁপে উঠল।

    এখন জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের গরম। সাপ-খোপের খুবই উপদ্রব এই প্রাচীন বনে। কতকালের সেই সব বনজঙ্গল কে জানে! বড় কড়ুই গাছের নিচে কত সব মৃত ডাল। আর চারপাশে এত বেশি লতাপাতা যে, একটু দূরে গেলেই কিছু দেখার উপায় নেই। সে এবার অভিমানের মাথা খেয়ে সামনের যত ডালপালা ফাঁক করে ডাকতে থাকল, সোনাবাবু, আপনে কোনদিকে?

    না, কেউ উত্তর দিচ্ছে না। কারও কোনও সাড়া নেই।

    ফতিমা আরও দক্ষিণে ছুটতে থাকল, সোনাবাবু আপনি কথা বলছেন না কেন?

    সব নিঝুম এমন কী পাতার খস্থস শব্দ শোনা যাচ্ছে না। এত যে শকুন বসে রয়েছে মগডালে ওরা পর্যন্ত পাখা নাড়ছে না। কেবল কক্কক্‌ একটা শব্দ হচ্ছে। তক্ষকের ডাকের মতো শব্দটা ওকে চারপাশ থেকে গিলতে আসছে।

    —সোনাবাবু, আমি এখন কী করি!

    কক্কক্‌ শব্দটা থেমে গেছে। অন্য এক দ্রুত শব্দ। সে দৌড়াচ্ছে। যেন বালিকা বনে পথ হারিয়ে ফেলেছে। পাগলের মতো ডাকছে, আমি সোনাবাবু আপনার উপর রাগ করিনি! এই দেখুন, আমাকে দেখুন। আপনি কেন যে ওদিকে খুঁজতে গেলেন!

    না, সে আর পারছে না। ছুটে ছুটে ক্লান্ত। এ-পাশের ঝোপটা নড়ছে। সে তাড়াতাড়ি ছুটে গেল। না কিছু নেই। দুটো ছোট্ট বানর বসে রয়েছে ডালে। ওরা লাফালাফি করছে।

    —আমি মরে যাব সোনাবাবু। আপনি কাছে না থাকলে আমি মরে যাব। বলে শিশুর মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকল ফতিমা।

    সোনা আর পারল না। সে ঝোপ থেকে উঠে এসে ফতিমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল।

    —তুই বোকার মত কাঁদছিস?

    —আপনি আমাকে ভয় দেখালেন কেন? বলতে-বলতে হেসে ফেলল।

    ওরা দু’জন এত কাছাকাছি, আর কী সুন্দর উভয়ের চোখ—এখন মনেই হয় না যাবতীয় পৃথিবীতে কোনও গণ্ডগোল আছে। ওরা পরিশ্রান্ত হয়ে একটা গাছের নিচে বসল। তারপর ধীরে-ধীরে সোনা বলল, আমার জন্য তোর খুব মায়া না?

    ফতিমা বলল, আপনাকে বেশি দিন না দেখলে মনটা আমার কেমন করে! বলে আবার হাত দুটো ঘাসের ওপর বিছিয়ে দেখাল, দু’হাতে দুটো পদ্মফুল এঁকেছি সোনাবাবু। দেখেন কী রকম দেখতে।

    —বাড়িতে বসে-বসে বুঝি এই করিস?

    —নোখে লাল রং দিয়েছি আপনি দেখবেন বলে।

    কী অকপট আর সরল ওরা। ওদের এই ভালো লাগার ব্যাপার গাছের নিচে দুটো ছোট্ট পাখির মতো, অবিরাম কাছাকাছি থাকা, একটু দেখা, তারপর ছোটা, ছুটে-ছুটে সেই মানুষটাকে খোঁজা, যে বনের ভিতর ভালোবাসার খোঁজে নিখোঁজ হয়ে গেছে।

    সোনা বলল, এ বনে জ্যাঠামশাই নেই। হাসান পীরের দরগায় যাবি?

    —চলেন।

    —ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।

    —তা হউক।

    ওরা দরগার মাটিতেও পাগল জ্যাঠামশাইকে খুঁজেছিল। কোথাও কেউ সাড়া দিচ্ছে না। সে কবরের পাশে পাশে ডেকে গেল, না কোনও সাড়া নেই। ওরা দেখল তখন কিছু কালো মেঘে আকাশ সহসা ছেয়ে গেল। এবং বৃষ্টি পড়তে থাকল। বর্ষা এসে গেছে এদেশে। একটা লোক দূর দিয়ে যাচ্ছে। সে বলতে-বলতে যাচ্ছে, বাংলাদেশ ভাগ হয়ে যাচ্ছে। ওর মাথায় এক অদ্ভুত রঙের নিশান। সে একা। সে বলতে-বলতে যাচ্ছে, আমরা বাংলাদেশের মানুষ এবার আলাদা হয়ে যাব।

    সোনা বলল, কী বলছে রে লোকটা?

    ফতিমা এ-সব ব্যাপারে সোনার চেয়ে বেশি খবর রাখে। সে অসহায় চোখে সোনার দিকে তাকিয়ে থাকল। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি। ওরা সেই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ভিজছে আর অনবরত একজন মানুষকে খুঁজছে—যিনি এক অদ্ভুত ভালোবাসার মায়ায় এই সব গাছপালা পাখির ভিতর নীলকণ্ঠ পাখি খুঁজে বেড়াতেন।

    সোনা সেই রাতে বাড়ি ফিরে এসে সব শুনেছিল। শশীভূষণ কাগজ পড়ে সবাইকে শোনাচ্ছেন। ভূপেন্দ্রনাথ মুড়াপাড়া থেকে কাগজ নিয়ে এসেছেন—তাতে লেখা, লর্ড মাউন্টব্যাটেনের বেতার বক্তৃতা—আমার আলোচনার মধ্যে প্রথম প্রচেষ্টা ছিল, মন্ত্রী মিশনের ১৯৪৬ সালের ১৬ই মে তারিখের প্রস্তাবটি সম্পূর্ণভাবে গ্রহণের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা। ঐ প্রস্তাবটিকে অধিকাংশ প্রদেশের প্রতিনিধিরাই মেনে নিয়েছেন এবং আমার মনে হয়, ভারতের সমস্ত সম্প্রদায়ের স্বার্থের পক্ষে এরচেয়ে ভালো ব্যবস্থা আর কিছুই হতে পারে না। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, মন্ত্রী-মিশনের কিংবা ভারতের ঐক্যরক্ষার অনুকূলে অন্য কোনও পরিকল্পনা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হল না। কিন্তু কোনও একটি বৃহৎ অঞ্চল, যেখানে এক সম্প্রদায়ের লোকেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সে অঞ্চলে তাদের বলপ্রয়োগে অন্য সম্প্রদায়ের প্রাধান্যবিশিষ্ট গভর্নমেন্টের অধীনে বাস করতে বাধ্য করবার কোনও প্রশ্ন উঠতে পারে না। বলপ্রয়োগে বাধ্য না করবার যে উপায় আছে, সেটা হল অঞ্চল বিভক্ত করে দেওয়া।

    শশীভূষণ বললেন, শেষপর্যন্ত পার্টিশানই ঠিক হল?

    শচীন্দ্রনাথ অন্যমনস্ক ছিলেন। বললেন, কিছু বললেন?

    —তা হলে কপালে পার্টিশান আমাদের।

    —তাই মনে হয়। শচীন্দ্রনাথকে বড় ক্লান্ত এবং বিষণ্ণ দেখাচ্ছে।

    সোনা যে সারাদিন বাড়ির বাইরে ছিল কারও খেয়াল নেই। কারণ, দুপুরেই এসব খবর নিয়ে এসেছিলেন ভূপেন্দ্রনাথ। শচীন্দ্রনাথ বাড়ি ছিলেন না। শচীন্দ্রনাথ বাড়ি এলে শশীভূষণ পড়ে-পড়ে শোনালেন। সারাটা দিন বাড়িতে এ-নিয়ে একটা উত্তেজনা গেছে। ঈশম বসে বসে কেবল শুনছে। সে ঠিক যেন বুঝতে পারছে না। সে এইটুকু বোঝে, দেশ ভাগ হলে, এ-দেশটার নাম পাল্টে যাবে। পাকিস্তান হবে। বাংলাদেশের নাম পাকিস্তান—ঈশমের কষ্ট হয় ভাবতে। আর একটা অংশ হিন্দুস্থানে চলে যাবে। এটাও ওর মনে কেমন একটা দুঃখের ছাপ বহন করছে। এত বড় বাংলাদেশের নিজস্ব বলতে কিছু থাকবে না। এটা সামু করছে। ওর সঙ্গে দেখা হয় না। দেখা হলে যেন সে বলত, কী লাভ তর, দেশটারে ভাগ করে দুই দেশের কাছে ইজারা দিলি!

    বিষয়টা সোনা ঠিক বুঝতে না পেরে সে কিছুটা শুনে উঠে গেল। ওর এ-সব শুনতে ভালো লাগে না। ছোটকাকার মুখ কী গম্ভীর! মেজ জ্যাঠামশাই সারাদিন কারও সঙ্গে কোনও কথা না বলে মুখ গুঁজে পড়ে আছেন বিছানায়। গ্রামের লোকজন সব আসছে যাচ্ছে। ওদের মুখ ভীষণ গম্ভীর দেখাচ্ছে।

    মা বলল, সোনা, তর বঁড়শি কই? মাছ পাইলি?

    সে বঁড়শি নিয়ে গেছে, সঙ্গে একটা পেতলের ঘটি ছিল মাছ রাখার—সে এখন এসব কোথায় ফেলে এসেছে মনে করতে পারে না। তবু যতটা মনে পড়ছে ফতিমাদের বাড়িতে সে ঘটি এবং বঁড়শি রেখে গল্প করছিল। ওদের বাড়িতে থাকতে পারে। কাল সকালে সে অথবা ঈশম গিয়ে নিয়ে আসবে। সে মাকে বলল, মা, মাছ পাই নাই। ফতিমাদের বাড়ি গেছিলাম। ওর নানীর খুব অসুখ। দেখতে গেছিলাম। সোনার আজকাল কারণে-অকারণে দুটো একটা মিথ্যা কথা বলার অভ্যাস হয়েছে। ধনবৌ সোনাকে আর কিছু বলল না। কারণ তারও মনটা ভালো নেই।

    পরদিন ফতিমা নিজেই এসেছিল ঘটি এবং বড়শি নিয়ে। সোনা ওর সঙ্গে কথা বলতে-বলতে অর্জুন গাছটার নিচে চলে গেছে। সে বলল, দেশ ভাগ হলে আমরা চলে যাব!

    —কোনখানে যাইবেন?

    —তা জানি না। মাস্টারমশয় কইছে ওদের দেশটা হিন্দুস্থানে পড়বে। বাবা জ্যাঠামশাই কেউ থাকবেন না।

    —কেন থাকবেন না। ফতিমার বুকটা কেমন কেঁপে উঠল।

    —জ্যাঠ্যামশাই খেতে বসে বলেছেন, এদেশে থাকলে নাকি আমাদের মান-সম্ভ্রম থাকবে না।

    ওরা আর উভয়ে কোনও কথা বলতে পারল না। গাছের নিচে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। সামনে সেই ফসলের জমি, জমিতে শুধু পাট গাছ—কী সজীব! আর এই পরিচিত পুকুর, শাপলা ফুল, অর্জুন গাছ, ঠাকুরদার চিতার উপর শানবাঁধানো বেদী এবং বর্ষাকালে নদীর জল সোনাবাবুর বড় প্রিয়। শীতের মাঠ, তরমুজের জমি সব ফেলে চলে যেতে পারবেন সোনাবাবু! কষ্ট হবে না! মায়া হবে না এসব ভালোবাসার সামগ্রী ফেলে যেতে! ফতিমার চোখ দেখলে এখন শুধু এমনই মনে হবে। সে এমনই যেন সোনাকে বলতে চায়।

    সোনার ইচ্ছা করছিল না কথা বলতে। সোনার ভারি অভিমান হচ্ছে ফতিমার উপর। দেশভাগের জন্য ফতিমার বাবাই যেন দায়ী। সে বলল, আমার কেবল জ্যাঠামশাইর জন্য কষ্ট হবে। তিনি এখনও এলেন না। কোথায় যে গেলেন। তাঁকে ফেলে আমরা কোথায় যাব! আমরা চলে গেলে যদি তিনি আসেন, তুই বলে দিস আমরা হিন্দুস্থানে চলে গেছি। বলবি ত?

    ফতিমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। কেবল জ্যাঠামশাইর জন্য সোনাবাবুর কষ্ট হবে। ওর জন্য কষ্ট হবে না সোনাবাবুর। কিন্তু চোখ ঝাপসা বলে সে সোনাবাবুর দিকে মুখ তুলে তাকাচ্ছে না। তাকালেই ধরা পড়ে যাবে। ধরা পড়লে তিনি নির্বিকার থাকবেন। খুব বেশি বললে হয়তো বলবেন, তোর আবার কান্নার কি হল! সুতরাং সে মুখ ফিরিয়ে রাখল। এবং নদীর জল পাটের জমি দেখতে দেখতে বলল, জ্যাঠামশাই ফিরে এলে আমরা তাঁকে ঠিক পৌঁছে দেব সোনাবাবু। তাঁকে আমরা আটকে রাখব না।

    তারপরই দেশভাগের ছবি চারাপাশে ফুটে উঠতে থাকল—বর্ষাকাল এসে গেল। চারপাশে সব বড় বড় নৌকায় লাল নীল রঙের পতাকা, কত রঙ বেরঙের চাঁদমালা, কাগজের ফুল, নতুন লুঙ্গি পরে, নতুন জামা গায়ে মাথায় ফেজ টুপি পরে ছেলেরা, মেয়েরা নাকে নোলক পরে, নদীর চরে নৌকা ভাসিয়ে সারি সারি চলে গেল—ওরা চলে গেল। সোনা মার হাত ধরে অজুর্ন গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকল। মেজদা বড়দা চুপচাপ খেজুর গাছটার নিচে বসে দেখছে। জ্যেঠিমা দাঁড়িয়ে আছেন তেঁতুলগাছের নিচে। নরেন দাস, শোভা আবু, দীনবন্ধুর দুই বউ এবং হারান পাল সবাই নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। মুখ বেজার। শচীন্দ্রনাথ বাড়ির ভিতর। তিনি এই উৎসবের দিনে চুপচাপ শুয়ে আছেন। মাস্টারমশাই বসে বসে দুঃখী মানুষের মতো একটা দেশাত্মবোধক গান গাইছিলেন—বঙ্গ আমার জননী আমার। মনে হয় তিনি বসে বসে বাংলাদেশের জন্য গানটা গাইতে গাইতে শোক করছিলেন। সোনা চোখ বুজে গানটা শুনছিল আর মাস্টারমশাইর মুখ, বড় জ্যাঠামশাইর মুখ মনে পড়ছিল। এবং বাংলাদেশ ভাবতে সে বোঝে ঈশম, ফতিমা, পাগল জ্যাঠামশাই আর সে নিজে, এই দেশ যখন বাংলাদেশ, তবে ভাগ কেন! সোনার চোখেও জল এসে গেল।

    ঈশম দাঁড়িয়েছিল। সে নির্বিকার। সে সকাল থেকে কোনও কথা বলছে না। সারা সকাল আশ্বিনের কুকুর ঘেউঘেউ করে ডাকছে। কুকুরটা কেন জানি সকাল থেকেই ঈশমের সঙ্গ ছাড়ছে না। কুকুরটা এর ভিতর কিছু টের পেয়ে গেছে।

    আর মাটির নিচে দুই মানুষ। জলের নিচে দুই মানুষ। পাগল মানুষ আর ফেলু। ওরা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ওদের কঙ্কাল মাটিতে ঢেকে গেছে। কী সাদা আর ধবধবে কঙ্কাল এই মানুষের। বেঁচে থাকতে তা কিছুতেই টের পাওয়া যায় না। বড়বৌ জানালা খুলে এখনও দাঁড়িয়ে থাকে। নিরুদ্দেশ থেকে মানুষটা তার আজ হোক কাল হোক ফিরবেনই।

    দেশভাগের কিছুদিন পর মুড়াপাড়া থেকে ভূপেন্দ্রনাথ ফিরে এলেন। সেটা ছিল এক আশ্বিনের সকাল। মুড়াপাড়া থেকে নৌকা এলেই এ-সংসারের জন্য কিছু-না-কিছু চাল ডাল তেল নুন সবজি মাছ আসে। বড় মাছ নিয়ে আসেন ভূপেন্দ্রনাথ! আখের দিন আখ, আনারসের দিন আনারস। বাড়ির ছেলেপেলেরা নৌকা এলেই ঘাটে চলে যাবার স্বভাব। সব কিছুর ভিতর তাদের চোখ সেই আখ অথবা আনারসের দিকে। সুতরাং এই ভেবে সবাই ছুটে গেলে দেখল ভূপেন্দ্রনাথ নৌকা থেকে ধীরে ধীরে নামছেন। কিছুই তিনি এবার সঙ্গে আনেন নি। খালি নৌকা। তিনি নেমেই বললেন, তোমরা ভাল আছ? কেমন রোগা দেখাচ্ছে তাঁকে। ক্লান্ত এবং বিষণ্ণ মুখ। জীবনের সব শান্তি যেন কারা কেড়ে নিয়েছে। দুশ্চিন্তার ছাপ চোখে মুখে এবং বিষণ্ণ মুখ দেখলেই বোঝা যায় দিনের পর দিন মানুষটা অনিদ্রায় ভুগছেন।

    তিনি এসে সকাল সকাল স্নান করে সন্ধ্যাআহ্নিক করলেন। তারপর সামান্য জলযোগ করার সময় শচীকে ডেকে পাঠালেন।

    শচী এলে বললেন, তোমারে একটা কথা কই। বাবুগ লগে পরামর্শ করলাম। তারা বলল, যত তাড়াতাড়ি পার দেশ ছাইড়া পালাও। তোমার কী মনে লয়?

    শচী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তিনি জানেন তাঁর মানসম্ভ্রম, পারিবারিক মানসম্ভ্রম আর থাকছে না। তবু এই দেশ এবং মাটির জন্য সবার মতো ভিতরে একটা ভীষণ হাহাকার আছে। ছেড়ে যেতে যে কী কষ্ট! ভূপেন্দ্রনাথ শচীর মুখ দেখে সব টের পাচ্ছেন। তিনি বললেন, তোমার কষ্ট হইব জানি। বিদেশবিভূঁইয়ে কী কইরা আহার সংগ্রহ করবা সেটাই বড় চিন্তা। তবে কী জান, গঙ্গার পারে অনাহারে মরলেও শান্তি। তোমরা অন্তত এই শরীরটা গঙ্গার পারে দাহ করতে পারবা।

    শচী বললেন, মাস্টারমশাই বলেছিলেন, ওদের দেশে জমি জায়গা কিছু রাইখা দিতে।

    সুতরাং ভূপেন্দ্রনাথ বললেন, তবে তোমার মত আছে দেখছি। চন্দ্রনাথের মতও তাই। দুশ্চিন্তা নিয়া বেশিদিন বাঁচা যায় না। হাজিসাহেবের বেটাদের খবর দ্যাও। জমি জায়গা বাড়ি-ঘর সব বিক্রি কইরা দিমু।

    খুব স্থির গলায় এসব বলছিলেন ভূপেন্দ্রনাথ। গলা এতটুকু কাঁপছিল না। গলা কাঁপলে ভিতরে ভিতরে তিনি যে কত দুর্বল হয়ে পড়ছেন ধরা পড়ে যাবেন। ধরা পড়ে গেলেই যেন তিনি আর ভূপেন্দ্রনাথ থাকবেন না। সোনার মতো বালক হয়ে যাবেন। তাঁর কথার তখন কেউ দাম দেবে না। তিনি নিজেকে খুব শক্ত করে রাখলেন।

    এই বিক্রিবাট্টার খবর শুনে দীনবন্ধু ছুটে এল। মাইজাভাই, আপনারা চইলা যাইবেন হিন্দুস্থানে?

    —আর কি করা!

    —আমরা-অ তবে যামু।

    —তুই যাইবি! ল তবে।

    —এখানে থাকলে অভক্ষ্য ভক্ষণ করতে হইব। জাত-মান থাকব না।

    ভূপেন্দ্রনাথ বললেন, আমরা যাইতেছি নবদ্বীপ। শশীমাস্টার সব ব্যবস্থা করব। নবদ্বীপ যাইতে তর অমত নাই ত?

    দীনবন্ধু এসেই হাঁকডাক করতে থাকল—আর অমত। এখন পালাতে পারলে বাঁচি। নরেন দাস শুনে ছুটে এল। সে বলল, আপনেরা চইলা গেলে আমরা থাকি কি কইরা?

    মাঝিবাড়ি থেকে এল শ্রীশ চন্দ্র। প্রতাপচন্দের দুই ছেলে ছুটে এসে বলল, দেশ ছাইড়া গিয়া কি ভাল হইব?

    দীনবন্ধু বলল, থাকতে গেলে হিন্দু হইয়া থাকন যাইব না। মুসলমান হইতে হইব। যদি তা পার থাক।

    এ ভাবে প্রায় বার্তা রটি গেল গ্রামে-সবাই এসে খবর নিল। জলের দরে জমি বিক্রি করে দিচ্ছে ঠাকুরবাড়ির ভূপেন্দ্রনাথ। খবর পেয়ে যারা কিনবে তারা চলে এল। প্রতাপচন্দ্রের ছোট ছেলে এসে বলল, আপনে জমিজমা যারে খুশি বিক্রি করেন, বাড়িটা কইরেন না। যা দাম হয় আমরা কিনা রাখমু। শত হলেও বামুনের বাড়ি। বাড়িতে জাগ্রত বিগ্রহ—এ-বাড়ি মুসলমানরে বেইচেন না।

    শচীর তাই ইচ্ছা। দাম কম হলেও এ-বাড়ি তিনি কখনও মুসলমানের কাছে বিক্রি করতে পারেন না। যেন বিক্রি করলেই যেখানে ঠাকুরঘর সেখানে মসজিদ উঠবে, যেখানে মাঘ-মণ্ডলের ব্রতকথা বলত ছোট ছোট বালিকারা সেখানে কোরবানী হবে—এইসব ভাবতেই তার চোখমুখে এক তীব্র আক্রোশ ফুটে উঠল। তিনি বললেন, তাই হবে। হলও তাই। প্রতাপচন্দ্র ওদের বাড়ি পুকুর এবং সেরা দশ বিঘা জমি হাজার পনের টাকায় কিনে নিল। কিছু টাকা সঙ্গে দেবে—বাকি হুণ্ডি করে পাঠাবে। বর্ডারে বড় কড়াকড়ি। এত টাকা সঙ্গে নিয়ে যেতে দেবে না। ভূপেন্দ্রনাথ তাতেই রাজী হয়ে গেলেন।

    সোনা দেখল এক সকালে কিছু মানুষজন এসে ঘরগুলির ওপর উঠে টিনের স্ক্রু খুলে দিচ্ছে। আর টিনগুলো রাখছে আলাদা করে। ওর বার বার মনে হয়েছে জ্যাঠামশাই শেষ পর্যন্ত তার মত পাল্টাবে। কিন্তু যখন দেখল টিনগুলি খুলে নেওয়া হচ্ছে, একটা ঘরে সব আসবাবপত্র নিয়ে আসা হয়েছে, কিছু কিছু বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে তখন সে নিজেও কেমন একা একা ঘুরে বেড়াতে লাগল বাড়িটার চারপাশে। অর্জুন গাছটা তাকে বার বার হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ঘর ভাঙা হচ্ছে বলেই গরিব কিছু মানুষজন সকাল থেকে বাড়ির চারপাশে ভিড় করে আছে। যা পারছে ফাঁক পেলে তুলে নিয়ে পালাচ্ছে। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারছে না। ঈশমদা ধরে আনছে ঘাড় ধরে। চোখে মানুষটা কম দেখে আজকাল, অথচ একটা সামান্য জিনিস কেউ না বলে নিয়ে গেলে ঠিক ধরে আনছে। এতসব যখন হচ্ছে, মা যখন বড় বড় বস্তার ভিতর তার সব প্রিয় জিনিস ভরে ফেলছে, যে কোনওদিন মুড়াপাড়া থেকে নৌকা চলে আসতে পারে বড় বড়, এবং সব সামগ্রী নিয়ে রওনা দিতে পারে—তখন সে সারাটা সকাল খেয়ে না খেয়ে সেই অর্জুন গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকল।

    হাতে ওর একটা ধারালো ছুরি। সে প্রথম ঠিক ওর বুক সমান উঁচু জায়গায় গাছের কাণ্ডের ছালবাকল কেটে কেটে তুলে ফেলল। প্রথম ফোঁটা ফোঁটা কষ বের হচ্ছে। সাদা রঙের দুধের মতো কষ গা বেয়ে নেমে যাচ্ছে। বাবা, জ্যাঠামশাই পুকুরপাড়ে বসে আছেন। উত্তরের ঘর দক্ষিণের ঘর এক এক করে, ভেঙে ফেলা হচ্ছে। কেউ দুটো জানালা কিনে মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছে, কেউ একটা দরজা কিনতে এসেছে। আলাদা আলাদা দাম দিয়ে যাচ্ছে সবাই। কেবল মনজুর পুবের ঘরটা আস্ত কিনেছে। দরজা জানালা এবং টিন-কাঠের বেড়া এইসব সে একসঙ্গে কিনছে বলে খাবারদাবার এবং অন্যান্য তৈজসপত্র সে ঘরে তুলে রাখা হয়েছে। ওরা বাড়ি ছেড়ে দিলে কথা আছে মনজুর ঘরটা ভেঙে নিয়ে যাবে।

    এক একটা টিন যখন খুলছে তখনই মনে হচ্ছে ভূপেন্দ্রনাথের এক একটা পাঁজর বুক থেকে কেউ তুলে নিচ্ছে। ওঁরা সেদিকে তাকাতে পারছেন না বলেই পুকুরপাড়ে এসে বসে আছেন। ঈশমই সব দেখাশোনা করছে। এবং দরদাম করে গুনে গুনে টাকা দিয়ে যাচ্ছে ভূপেন্দ্রনাথের হাতে। তিনি টাকা গুনে নিচ্ছেন না। গুনতে তার ভালো লাগছে না। গ্রামের কেউ কেউ চারপাশে গোল হয়ে বসে আছে। অন্যমনস্ক হবার জন্য তাদের সঙ্গে ভূপেন্দ্রনাথ তাঁর ছোটবেলার গল্প করছেন।

    আর সোনা সেই সকাল থেকে গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে কী যে করছে কেউ টের পাচ্ছে না। লালটু তাকে দু’বার খেতে ডেকেছে, সে খেতে আসেনি। সে নিবিষ্ট মনে কিছু করে যাচ্ছে।

    ভূপেন্দ্রনাথও ব্যাপারটা লক্ষ করছেন। যখন বাড়িঘর বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বলে সবাই বিমর্ষ হয়ে আছে তখন সোনা অনবরত গাছের কাণ্ডে খুঁটে খুঁটে কী লিখে যাচ্ছে। শশীভূষণ খড়ম পায়ে বাইরে বের হয়ে এলেন। তিনি স্কুলে যাবেন আজ একবার। চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। সেক্রেটারিকে চার্জ বুঝিয়ে দিতে হবে। এখন আশ্বিন মাস বলে পূজার বন্ধ। জল চারপাশে। পাট কাটা হয়ে গেছে সব। আর কিছুদিন পরই যখন হেমন্তকাল আসবে সব জল নেমে যাবে মাঠ থেকে। মাঠে জল থাকতে থাকতে এদেশ থেকে রওনা হতে হবে। শশীভূষণ ডাকলেন, লালটু আছিস!

    লালটু এলে বললেন, একটু তেল নিয়ে আয়। মাখি। আজ তিনি সবার সঙ্গে স্নান করলেন না। রান্না হতে দেরি হবে। তিনি স্কুল থেকে এসেই খাবেন। ঘাটে স্কুলের নৌকা লেগে রয়েছে। তিনি সোজা সেক্রেটারির কাছে গিয়ে চার্জ বুঝিয়ে আসবেন। শশীভূষণ মনে মনে অস্থির হয়ে উঠেছেন।

    এ সংসারে শুধু একজন একেবারেই কোনও কথা বলতে পারছে না। সে সবার অলক্ষ্যে কাঁদছে। সে হচ্ছে বড়বৌ। এই দেশ ছেড়ে চলে গেলে মানুষটা যদি ফিরে আসেন তখন তিনি কোথায় যাবেন। এসে চিনতেই পারবেন না—এই বাড়ি তাঁর। ঘরবাড়ি কিছু নেই। শুধু কিছু পরিচিত গাছ। অর্জুন-গাছটা দেখলেই চিনতে পারবেন তিনি ঠিকমতো পথ চিনে উঠে এসেছেন। কিন্তু যখন দেখবেন ঘর বলতে কিছু নেই, পুবের ঘর বলতে শুধু মাটি আর একটা কামরাঙা গাছ তখন তিনি নিশ্চয়ই ভাববেন কোন জাদুবলে তিনি এসব দেখছেন। যেমন তিনি স্মৃতির ভিতর মাঝে মাঝে এক অদ্ভুত জাদুবলে দেখতে পান শূন্য এক র‍্যামপার্ট এবং কিছু ইংরেজ সৈন্য কুচকাওয়াজ করছে মাঠে, তিনি তেমনি দেখতে পাবেন সেই পুবের ঘর, ঘরের দরজায় বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে বড়বৌ, বাড়িতে পিঠে-পায়েস হয়েছে। যত্ন করে বড়বৌ সব ভিন্ন ভিন্ন পাথরের থালায় রেখে দিয়েছে। দেখতে পাবেন তসরের জামা গায়ে দিয়ে দিচ্ছে বড়বৌ, ধুতি কুঁচি দিয়ে পরিয়ে দিচ্ছে এবং নাভির মতো কোমল অংশে হাত রাখতে রাখতে চোখ বুজে ফেলছেন। এসব দেখলেই তিনি এই বাড়ির চারাপাশে ঘুরে বেড়াবেন… কোথাও তাঁকে যে যেতে হবে সে কথা মনে থাকবে না। তখন এই মাঠে ঘাসে অথবা ফুলে মানুষটা বুঝি বন্দী হয়ে যাবেন!

    সোনা তখনও লিখছিল। কী যে লিখছিল তখনও কেউ জানে না। সে বড়-বড় টান দিচ্ছে ছুরির ধারালো ডগা ধরে। তারপর খুঁটে খুঁটে তুলে ফেলছে কাঠ। সে গাছটায় ক্রমান্বয়ে সব গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে যাচ্ছে। ক্ষতস্থান থেকে রক্তপাতের মতো কষ নেমে মাটি এবং ঘাস ভিজিয়ে দিচ্ছে। এই ক্ষতস্থান ঝড়-বৃষ্টি অথবা কোনও মানুষ শত চেষ্টা করেও যেন মুছে না দিতে পারে। ওর হাত লাল হয়ে গেছে। জায়গায়-জায়াগয় হাত ওর সামান্য কেটে গেছে। রক্ত পড়ছে হাত দিয়ে। সে কিছু ভ্রূক্ষেপ করছে না। গাছের মাথায় এক সেই নীলবর্ণ পাখি। মেজজ্যাঠামশাই সেই নীলবর্ণের পাখির সন্ধানে যাচ্ছেন সীমান্তের ওপারে। ওখানে গেলেই সব তিনি পেয়ে যাবেন। যা তিনি এদেশে হারিয়েছেন বর্ডার পার হয়ে গেলেই তিনি আবার বুঝি তা খুঁজে পাবেন। কিন্তু সোনার মনে কী যে এক অহেতুক ভয়। পাগল জ্যাঠামশাই ফিরে এলে তারা যে এখানে নেই জানবেন কী করে! জ্যাঠামশাই ফিরে এলে কী করে বুঝতে পারবেন ওরা হিন্দুস্থানে চলে গেছে। তিনি কারও সঙ্গে কথা বলেন না। কারও কথা তিনি বুঝতেও পারেন না। একমাত্র সে জানে সে অথবা বড় জ্যেঠিমা কিছু বললে তিনি বুঝতে পারেন। সেজন্য সে সেই সকাল থেকে লিখে চলেছে। কপালে ঘাম। মুখে এসে সূর্যের তাপ লাগছে। মুখ লাল হয়ে গেছে। সে সেই এক নীল রঙের জামা গায়ে দিয়ে আছে। নীল রঙের জামা ওর খুব পছন্দ। আর এক নীলবর্ণ পাখি মাথার ওপর দেখছে, সোনা লিখছে, সুন্দর হস্তাক্ষরে, কত মায়ায় সে তার ভালোবাসার কথা লিখে যাচ্ছে। সে বড় বড় করে লিখে রাখছে। জ্যাঠামশাই উঠে এলে যখন দেখতে পাবেন বাড়ি বলতে কিছু নেই, সব খালি, শূন্য খাঁ খাঁ করছে উঠান, যেন কোনও প্লাবন এসে সব ধুয়ে-মুছে নিয়েছে তখন তিনি নিশ্চয় একবার এই অর্জুন গাছের নিচে এসে দাঁড়াবেন। দাঁড়ালেই দেখতে পাবেন—বড়-বড় হস্তাক্ষরে লেখা। সোনা লিখে রেখে গেছে—জ্যাঠামশাই, আমরা হিন্দুস্থানে চলিয়া গিয়াছি, ইতি সোনা। নিরুদ্দিষ্ট জ্যাঠামশাইর জন্য সে অর্জুন গাছের কাণ্ডে তাদের ঠিকানা রেখে গেল।

  • আট

    আট

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    আট

    “কল্লোল”কে নিয়ে যে প্রবল প্রাণোচ্ছাস এসেছিল তা শুধু ভাবের দেউলে নয়, ভাষারও নাটমন্দিরে। অর্থাৎ “কল্লোলে”র বিরুদ্ধতা শুধু বিষয়ের ক্ষেত্রেই ছিল না, ছিল বর্ণনার ক্ষেত্রে। ভঙ্গি ও আঙ্গিকের চেহারায়। রীতি ও পদ্ধতির প্রকৃতিতে। ভাষাকে গতি ও ভাবকে দ্যুতি দেবার জন্যে ছিল শব্দসৃজনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। রচনাশৈলীর বিচিত্রতা। এমন কি, বানানের সংস্করণ। যারা ক্ষুদ্বপ্ৰাণ, মূঢ়মতি, তারাই শুধু মামুলি হবার পথ দেখে—আরামরমণীয় পথ–যে পথে সহজ খ্যাতি বা কোমল সমর্থন মেলে, যেখানে সমালোচনার কাঁটা-খোঁচা নেই, নেই বা নিন্দার অভিনন্দন। কিন্তু “কল্লোলে”র পথ সহজের পথ নয়, স্বকীয়তার পথ।

    কেননা তার সাধনাই ছিল নবীনতার, অনন্যতার সাধনা। যেমনটি আছে তেমনটিই ঠিক আছে এর প্রচণ্ড অস্বীকৃতি। আছে তার ছেয়েও আরো কিছু আছে, বা যা হয়েছে তা এখনো পুরোপুরি হয়নি তারই নিশ্চিত আবিষ্কার।

    এই আবিষ্কারের প্রথম সহায় হলেন প্রমথ চৌধুরী। সমস্ত কিছু সবুজ ও সজীবের যিনি উৎসাহস্থল। মাঝে-মাঝে সকালবেলা কেউ কেউ যেতাম আমরা তার বাড়িতে, মে-ফেয়ারে। “কল্লোলে”র প্রতি অত্যন্ত প্রসন্নপ্রশ্রয় ছিলেন বলেই যখনই যেতাম, সম্বর্ধিত হতাম। প্রতিভাভাসিত মুখ মেহে সুকোমল হয়ে উঠত। বলতেন, প্রবাহই হচ্ছে পবিত্রতা—স্রোত মানেই শক্তি। গোড়ায় আবিলতা তো থাকবেই, স্রোত যদি থাকে তবে নিশ্চয়ই একদিন খুঁজে পাবে নিজের গভীরতাকে।

    মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করতাম, লিখে যাব আমরণ। অমন বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে বসে অমন প্রতিজ্ঞা করার সাহস আসত।

    বলতেন, ‘এমন ভাবে লিখে যাবে যেন তোমার সামনে আর কেউ দ্বিতীয় লেখক নেই। কেউ তোমার পথ বন্ধ করে বসে থাকেনি। লেখকের সংসারে তুমি একা, তুমি অভিনব।’

    ‘আমার সামনে আর কেউ বসে নেই?’ চমকে উঠতাম।

    ‘না।’

    ‘রবীন্দ্রনাথ?’

    ‘রবীন্দ্রনাথও না! তোমার পথের তুমিই একমাত্র পথকার। সে তোমারই একলার পথ। যতই দল বাঁধো প্রত্যেকে তোমরা একা।’

    মনে বোমাঞ্চ হত। কথাটার মাঝে একটা আশীর্বাদের স্বাদ পেতাম।

    বলেই ফের জের টানতেন : ‘নিত্য তুমি খেল যাহা, নিত্য ভাল নহে তাহা, আমি যা খেলিতে বলি সে খেলা খেলাও হে।’ এ কথা ভারতচন্দ্র লিখেছিল। চাই সেই শক্তিমান সৃষ্টিকর্তার কর্তৃত্ব, সেই অনন্যপূর্বতা। যদি সর্বক্ষণ মনে কর, সামনে রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন, তবে নিজের  কথা আর বলবে কি করে? তবে তো শুধু রবীন্দ্রনাথেরই ছায়ানুসরণ করবে। তুমি ভাববে তোমার পথ মুক্ত, মন মুক্ত, তোমার লেখনী তোমার নিজের আজ্ঞাবহ।

    রবীন্দ্রনাথ থেকে সরে এসেছিল “কল্লোল”। সরে এসেছিল অপজাত ও অবজ্ঞাত মনুষ্যত্বের জনতায়। নিম্নগত মধ্যবিত্তদের সংসারে। কয়লাকুঠিতে, খোলার বস্তিতে, ফুটপাতে। প্রতারিত ও পরিত্যক্তের এলেকায়।

    প্রমথ চৌধুরী প্রথম এই সরে-আসা মানুষ। বিষয়ের দিক থেকে না হোক, মনোভঙ্গি ও প্রকাশভঙ্গির দিক থেকে। আর দ্বিতীয় মানুষ নজরুল।

    যেমন লেখায় তেমনি পোশাকে-আশাকেও ছিল একটা রঙিন উচ্ছৃঙ্খলতা। মনে আছে, অভিনবত্বের অঙ্গীকারে আমাদের কেউ-কেউ তখন কোঁচা না ঝুলিয়ে কোমরে বাঁধ দিয়ে কাপড় পরতাম—পাড়-হীন খান ধুতি—আর পোশাকের পুরাতন দারিদ্র্য প্রকট হয়ে থাকলেও বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হতাম না। নৃপেন তো মাঝে মাঝে আলোয়ান পরেই চলে আসত। বস্তুত পোশাকের দীনতাটা উদ্ধতিরই উদাহরণ বলে ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু নজরুলের ঔদ্ধত্যের মাঝে একটা কবিতার সমারোহ ছিল, যেন বিহ্বল, বর্ণাঢ্য কবিতা। গায়ে হলদে পাঞ্জাবি, কাঁধে গেরুয়া উড়ুনি। কিংবা পাঞ্জাবি গেরুয়া, উড়ুনি হলদে। বলত, আমার সম্ভ্রান্ত হবার দরকার নেই, আমার বিভ্রান্ত করবার কথা। জমকালো পোশাক না পরলে ভিড়ের মধ্যে লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করব কি করে?

    মিথ্যে কথা। পোশাকের প্রগলভতার দরকার ছিল না নজরুলের। বিস্তীর্ণ জনতার মাঝেও সহজে চিহ্নিত হত সে, এত প্রচুর তার প্রাণ, এত রোধবন্ধহীন তার চাঞ্চল্য। সব সময়ে উচ্চরোলে হাসছে, ফেটে পড়ছে উৎসাহের উচ্ছৃঙ্খলতায়। বড়-বড় টানা চোখ, মুখে সবল পৌঁরুষের সঙ্গে শীতল কমনীয়তা। দূরে থাকলেও মনে করিয়ে দেবে অন্তরের চিরন্তন মানুষ বলে। রঙ শুধু পোশাকে কি, রঙ তার কথায় তার হাসিতে তার গানের অজস্রতায়।

    হরিহর চন্দ্র তখন ‘বিশ্বভারতী’র সহ-সম্পাদক, কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে তার আপিসের দোতালায় ফোর আর্টস ক্লাবের বার্ষিক উৎসব হচ্ছে। হরিহর আর “কল্লোল” প্রায় হরিহর আত্মার মত। সুগৌর সুন্দর চেহারা–পরিহাসচ্ছলে কেউ-কেউ বা ডাকত তাকে রাঙাদিদি বলে। তার শ্ৰী অশ্রু দেবী আসলে কিন্তু আনন্দ দেবী। স্বামী-স্ত্রীতে মিলে ‘আনন্দ মেলা’ নিয়ে মেতে থাকত। ছোট বড় ছেলেমেয়েদের নিয়ে খেলাধুলা ও নাচগানের আসরই নামান্তরে ‘আনন্দ মেলা’। ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে, রামমোহন লাইব্রেরিতে বা মার্কাস স্কোয়ারে এই মেলা বসত, কল্লোলের দল নিমন্ত্রিতদের প্রথম বেঞ্চিতে। কেননা হরিহর “কল্লোল”-দলের প্রথমাগতদের একজন, তাই “কল্লোল” প্রথমাত্মীয় নামধেয়। গ্রাহক ও বিজ্ঞাপন জোগাড় করে, প্রুফ দেখে দিয়ে কত ভাবে যে দীনেশ-গোকুলকে সাহায্য করত ঠিক-ঠিকানা নেই। ব্যবহারে প্রীতির প্রলেপ, সৌজন্যের স্নিগ্ধতা—একটি শান্ত, দৃঢ়, সুস্থ মনের সৌরভ ছড়াত চারদিকে।

    সেই হরিহরের ঘরে সভা বসেছে। দীর্ঘদীপিতদেহা কয়েকজন সুন্দরী মহিলা আছেন। গান হচ্ছে মধুকণ্ঠে। এমন সময় আবির্ভাব হল নজরুলের। পরনে সেই রঙের ঝড়ের পোশাক। আর কথা কি, হার্মোনিয়ম এবার নজরুলের একচেটে। নজরুল টেনে নিল হার্মোনিয়ম, মহিলাদের উদ্দেশ করে বললে, ‘ক্ষমা করবেন, আপনারা সুর, আমি অসুর।’

    হেসে উঠল সবাই। অসুরের সুরে ঘর ভরে উঠল।

    যতদূর মনে পড়ে সেই সভায় উমা গুপ্ত ছিলেন। যেমন মিঠে চেহারা তেমনি মিঠে হাতে কবিতা লিখতেন তিনি। তিনি আর নেই এই পৃথিবীতে। জানি না তার কবিতা ক’টিও বা কোনখানে পড়ে আছে।

    এই অস্থির এলোমেলেমি নজরুলের শুধু পোশাকে-আশাকে নয়, তার লেখায়, তার সমস্ত জীবনযাপনে ছড়িয়ে ছিল। বন্যার তোড়ের মত সে লিখত, চেয়েও দেখত না সেই বেগ-প্রাবল্যে কোথায় সে ভেসে চলেছে। যা মুখে আসত তাই যেমন বলা তেমনি যা কলমে আসত তাই সে নির্বিরোধে লিখে যেত। স্বাভাবিক অসহিষ্ণুতার জন্যে বিচার করে দেখত না বর্জন-মার্জনের দরকার আছে কি না। পুনর্বিবেচনায় সে অভ্যস্ত নয়। যা বেরিয়ে এসেছে তাই নজরুল, ‘কুবলা খান’—এ যেমন কোলরিজ। নিজের মুখে কারণে অকারণে সে স্নো ঘসত খুব, কিন্তু তার কবিতার এতটুকু প্রসাধন করতে চাইত না। বলত, অনেক ফুলের মধ্যে থাক না কিছু কাঁটা, কণ্টকিত পুষ্পই ত নজরুল ইসলাম। কিন্তু মোহিতলাল তা মানতে চাইতেন না। নজরুলের গুরু ছিলেন এই মোহিতলাল। গজেন ঘোষের বিখ্যাত আড্ডা থেকে কুড়িয়ে পান নজরুলকে। দেখেন উদ্বেলতা যেমন আছে আবিলতাও কম নয়। স্রোতশক্তিকে ফলদায়ী করতে হলে তীরের বন্ধন আনতে হবে, আনতে হবে সৌন্দর্য আর সংযম, জাগ্রত বুদ্ধির বশে আনতে হবে ভাবের উদ্দামতাকে। এই বুদ্ধির দীপায়নের জন্যে চাই কিছু পড়াশোনা–অনুভূতির সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ। নিজের পরিবেষ্টনের মাঝে নিয়ে এলেন নজরুলকে। বললেন, পড়ো শেলি-কীটস, পড়ো বায়রন আর ব্রাউনিং। দেখ কে কি লিখেছে, কি ভাবে লিখেছে, মনে স্থৈর্য আনো, হও নিজে নিজের সমালোচক, কল্পনার সোনার সঙ্গে চিন্তার সোহাগ মেশাও। “দে গরুর গা ধুইয়ে”–নজরুল থোড়াই কেয়ার করে লেখাপড়া। মনের আনন্দে লিখে যাবে সে অনর্গল, পড়বার বা বিচার করবার তার সময় কই। খেয়ালী সৃষ্টিকর্তা মনের আনন্দে তৈরি করে ছেড়ে দিয়েছে গ্রহ-নক্ষত্রকে, পড়ুয়া জ্যোতিষীরা তার পর্যালোচনা করুক। সেও সৃষ্টিকর্তা।

    ভাবের ঘরে অবনিবনা হয়ে গেল। কোনো বিশেষ এক পাড়া থেকে নজরুল-নিন্দা বেরুতে লাগল প্রতি সপ্তাহে। ১৩৩২-এর কার্তিকের “কল্লোলে” নজরুল তার উত্তর দিলে কবিতায়। কবিতার নাম সর্বনাশের ঘণ্টা :

    “রক্তে আমার লেগেছে আবার সর্বনাশের নেশা,

    রুধির-নদীর পার হতে ঐ ডাকে বিপ্লব-হ্রেষা।

    হে দ্রোণাচাৰ্য্য! আজি এই নব জয়-যাত্রার আগে

    দ্বেষ-পঙ্কিল হিয়া হতে তব শ্বেত পঙ্কজ মাগে

    শিষ্য তোমার; দাও গুরু দাও তব রূপ-মসী ছানি

    অঞ্জলি ভরি শুধু কুৎসিত কদর্যতার গ্লানি।…

    চিরদিন তুমি যাহাদের মুখে মারিয়াছ ঘৃণা-ঢেলা

    যে ভোগানন্দ দাসেদের গালি হানিয়াছ দুই বেলা,

    আজি তাহাদের বিনামার তলে আসিয়াছ তুমি নামি,

    বাঁদরেরে তুমি ঘৃণা করে ভালবাসিয়াছ বাঁদরামি।

    হে অস্ত্র-গুরু! আজি মম বুকে বাজে শুধু এই ব্যথা,

    পাণ্ডবে দিয়া জয়-কেতু হলে কুক্কুর-কুরু নেতা।

    ভোগ-নরকের নারকীর দ্বারে হইয়াছ তুমি দ্বারী

    ব্রহ্ম অস্ত্র ব্রহ্মদৈত্যে দিয়া হে ব্রহ্মচারী!

    তোমার কৃষ্ণ রূপ-সরসীতে ফুটেছে কমল কত,

    সে কমল ঘিরি নেচেছে মরাল কত সহস্র শত,

    কোথা সে দীঘির উচ্ছল জল কোথা সে কমল রাঙা,

    হেরি শুধু কাদা, শুকায়েছে জল, সরসীর বাঁধ ভাঙা।…

    মিত্র সাজিয়া শত্রু তোমারে ফেলেছে নরকে টানি

    ঘৃণার তিলক পরাল তোমারে স্তাবকের শয়তানী!

    যাহারা তোমারে বাসিয়াছে ভালো করিয়াছে পূজা নিতি

    তাহাদের হানে অতি লজ্জায় ব্যথা আজ তব স্মৃতি।…

    আমারে যে সবে বাসিয়াছে ভালো, মোর অপরাধ নহে,

    কালীয়দমন উদিয়াছে মোর বেদনার কালীদহে–

    তাহার দাহ তো তোমারে দহেনি, দহেছে যাদের মুখ

    তাহারা নাচুক জুলুনীর চোটে। তুমি পাও কোন সুখ

    দগ্ধমুখ সে রাম-সেনাদলে নাচিয়া হে সেনাপতি,

    শিবসুন্দর সত্য তোমার লভিল এ কি এ গতি?…

    তুমি ভিড়িওনা গো-ভাগাড়ে-পড়া চিল শকুনের দলে

    শতদলদলে তুমি যে মরাল শ্বেত সায়রের জলে।

    ওঠ গুরু, বীর, ঈর্ষা-পঙ্ক-শয়ন ছাড়িয়া পুনঃ,

    নিন্দার নহ নান্দীর তুমি, উঠিতেছে বাণী শুন–

    উঠ গুরু উঠ, লহ গো প্রণাম বেঁধে দাও হাতে রাখী,

    ঐ হের শিরে চক মারে বিপ্লব-বাজপাখী!

    অন্ধ হয়ো না, বেত্র ছাড়িয়া নেত্র মেলিয়া চাহ

    ঘনায় আকাশে অসন্তোষের বিদ্রোহ-বারিবাহ।

    দোতলায় বসি উতলা হয়ো না শুনি বিদ্রোহ-বাণী

    এ নহে কবির, এ কাঁদন ওঠে নিখিল-মৰ্ম হানি।…

    অর্গল এঁটে সেথা হতে তুমি দাও অনর্গল গালি,

    গোপীনাথ ম’ল? সত্য কি? মাঝে মাঝে দেখো তুলি জালি

    বরেন ঘোষের দ্বীপান্তর আর মির্জাপুরের বোমা

    লাল বাংলার হুমকানী—ছি ছি এত অসত্য ওমা,

    কেমন করে যে রটায় এ সব ঝুটা বিদ্রোহী দল!

    সখী গো আমায় ধর ধর! মাগো কত জানে এরা ছল!…

    এই শয়তানী ক’রে দিনরাত বল আর্টের জয়,

    আর্ট মানে শুধু বাঁদরামি আর মুখ-ভ্যাঙচানো নয়।…

    তোমার আর্টের বাঁশরীর সুরে মুগ্ধ হবে না এরা

    প্রয়োজন-বাঁশে তোমার আর্টের আর্টশালা হবে নেড়া।…

    যত বিদ্রূপই কর গুরু তুমি জান এ সত্য বাণী

    কারুর পা চেটে মরিব না, কোনো প্রভু পেটে লাথি হানি

    ফাটিবে না পিলে, মরিব যেদিন মরিব বীরের মত

    ধরা মার বুকে আমার রক্ত রবে হয়ে শাশ্বত।

    আমার মৃত্যু লিখিবে আমার জীবনের ইতিহাস

    ততদিন গুরু সকলের সাথে করে নাও পরিহাস!”

    মনে আছে এই কবিতা নজরুল কল্লোল-আপিসে বসে লিখেছিল এক বৈঠকে। ঠিক কল্লোল-আপিসে হয়তো নয়, মণীন্দ্রর ঘরে। মণীন্দ্র চাকী “কল্লোলে”র একক কর্মচারী। নীরব, নিঃসঙ্গ। মুখে একটি হ্রস্ব নির্মল হাসি, অন্তরে ভাবের স্বচ্ছতা। ঠিকমত মাইনে-পত্র পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন অভাবের রুক্ষ রাজপথ দিয়ে হাঁটছে। অথচ এক বিন্দু অভিযোগ নেই, অবাধ্যতা নেই। ভাবখানা এমনি, “কল্লোলের” জন্যে সেও তপশ্চারণ করছে, হাসিমুখে মেনে নিচ্ছে দারিদ্রের নির্দয়তাকে। লেখকরা যেমন এক দিকে সেও তেমনি আরেক দিকে। সে কম কিসে! সে লেখে না বটে কিন্তু কাজ করে, সেবা করে। সেও তো এক নৌকার সোয়ারি।

    খোলার চালে ঘুপসি একখানা বিচ্ছিন্ন ঘর ওই মণীন্দ্রর। কল্লোল-আপিসের সঙ্গে শুধু একফালি ছোট্ট একটা গলির ব্যবধান। মণীন্দ্রর ঘর বটে, কিন্তু যে-কাউকে সে যে-কোনো সময় তা ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। নিয়মিত সময়ে নজরুল কবিতা লিখে দিচ্ছে না, বন্ধ করো তাকে সেই ঘরে, কবিতা শেষ হলে তবে খুলে দেয়া হবে ছিটকিনি। কাশী থেকে দৈবাৎ সুরেশ চক্রবর্তী এসে পড়েছে, থাকবার জায়গা নেই, চলে এস মণীন্দ্রর ঘরে। প্রেমেন এসেছে ছুটিতে, মেসের দরজা বন্ধ তো মণীন্দ্রর দরজা খোলা। দুপুরবেলা ব্রে খেলতে চাও—সেই কালো বিবি-গছানো কালান্তক খেলা—চলে যাও মণীন্দ্রর আস্তানায়। চারজনের মামলায় ষোলোজন মোক্তারি করে হুল্লোড় বাধাও গে। কখন হঠাৎ শুনতে পাবে তোমার পাশের থেকে আশু ঘোষ লাফিয়ে উঠেছে তারস্বরে : ‘আহাহাহা, করস কি, দুরির উপর তিনি মারিয়া দে–’

    গুপ্ত ফ্রেণ্ডস-এর আশু ঘোষ! কি সুবাদে যে “কল্লোলে” এল কে বলবে। কিন্তু তাকে ছাড়া কোনো আড্ডাই যেন দানা বাঁধে না। একটা নতুন স্বাদ নিয়ে আসত, ঋজু ও দৃপ্ত একটা কাঠিন্যের স্বাদ। নির্ভীক সারল্যের দারুচিনি। আশুকে কোনোদিন পাঞ্জাবি গায়ে দিতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না–শার্ট-কোট তো সুদূরপরাহত। চিরকাল গেঞ্জি-গায়েই আনাগোনা করল, খুব বেশি শালীনতার প্রয়োজন বোধ করলে পাঞ্জাবিটা বড়জোর কাঁধের উপর স্থাপন করেছে। আদর্শের কাছে অটলপ্রতিজ্ঞ আশু ঘোষ, পোশাকেও দৃঢ়পিনদ্ধ। অল্পেই সন্তুষ্ট তাই পোশাকেও যথেষ্ট। তার প্রীতির উৎসারই হচ্ছে তিরস্কারে—আর সে কি ক্ষমাহীন নির্মম তিরস্কার! কিন্তু এমন আশ্চর্য, তার কশাঘাতকে কশাঘাত মনে হত না, মনে হত রসাঘাত,–যেন বিদ্যুতের চাবুক দিয়ে মেঘ তাড়িয়ে রোদ এনে দিচ্ছে। খাঁটি, শক্ত ও অটুট মানুষের দরকার ছিল “কল্লোলে”।

    আশু ঘোষের গেঞ্জিও যা, দীনেশরঞ্জনের ফ্রিল-দেয়া হাতা-ওয়ালা পাঞ্জাবিও তাই। দুইই এক দুদিনের নিশানা। আমাদের তখন এমন অবস্থা, একজনে এক পুরো আস্ত একটা সিগারেট খাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। কাঁচি, এবং আরো কাঁচি চললে পাসিং শো। সিগারেট বেশির ভাগ জোগাত অজিত সেন, জলধর সেনের ছেলে। “কল্লোলে”র একটি নিটুট খুঁটি, তক্তপোশের ঠিক এক জায়গায় গ্যাঁট-হয়ে বসা লোক। কথায় নেই হাসিতে আছে, আর আছে সিগারেট বিতরণে। কুণ্ঠা আছে একটু, কিন্তু কৃপণতা নেই। সবাই দাদা বলতাম তাকে। আশ্চর্য, জলধর সেনকেও দাদা বলতাম। আই-সি-এসের ছেলে আই-সি-এস হয়েছে একাধিক, কিন্তু দাদার ছেলের দাদা হওয়া এই প্রথম। যেমন কুলগুরুর ছেলে কুলগুরু। নিয়ম ছিল সিগারেট টানতে গিয়ে যেই গায়ের লেখার প্রথম অক্ষরটুকু এসে ছোঁবে অমনি আরেকজনকে বাকি অংশ দিয়ে দিতে হবে। পরবর্তী লোক জিতল বলে সন্দেহ করার কারণ নেই, কারণ শেষ দিকে খানিকটা ফেলা যাবে অনিবার্য। তবে পরবর্তী লোক যদি পিন ফুটিয়ে ধরে টানতে পারে শেষাংশটুকু, তবে তার নির্ঘাৎ জিত।

    এ দিনের দৈন্যের উদাহরণস্বরূপ দুটো চিঠির টুকরো তুলে দিচ্ছি। একটা প্রেমেনের, আমাকে লেখা :

    “কিন্তু সুখের বা দুঃখের বিষয় হোক, Testএ পাশ হয়ে গেছি সসম্মানে। এখন ফি-এর টাকা জোগাড় করে উঠতে পারছি না। তাই আজ সকালে তোকে চিঠি লিখতে বসব এমন সময় তোর চিঠি এল। এবার তুই কোন ওজর দেখাতে পাবি না। যা করে হোত, দশটা টাকা আমাকে পাঁচ দিনের মধ্যে পাঠিয়ে দিবি। আমি পরে কলকেতায় গিয়ে শোধ করব। সত্যি জানিস Testএর ফি দিতে পারছি না। কলকেতায় দিদিমার কাছে একটি পয়সা নেই, এখন বুড়িকে বিড়ম্বিত করাও যায় না। এ সম্বন্ধে আর বেশী কিছু লিখলাম না, তোর যা সাধ্য তা তুই করবি জানি। তোর ভরসায় রইলাম।

    Finalএ পাশ হব কি না জানি না, কিন্তু ছুটি যে একেবারে নেব, খাব কি? একটা  কথা আমি ভালোরকমেই জানি যে দারিদ্র সমস্ত idealismকে শুকিয়ে মারতে পারে। আমি বড়লোক হতে মোটেই চাই না, কিন্তু অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম আর সাহিত্যসৃষ্টি এই দুকাজ একসঙ্গে করবার মত প্রচুর শক্তি আমার নেই। সে আছে যার সেই মহাপুরুষ শৈলজাকে আমি মনে-মনে প্রায় প্রণাম করে থাকি।

    এবার কলকেতায় গিয়ে যদি গোটা ত্রিশ টাকা মাইনের এমন একটা কাজ পাই যাতে অতিরিক্ত একঘেয়ে খাটুনি নেই, তা হলে আমি তাতেই লেগে যাব এবং তাহলে আমার একরকম চলে যাবে। কোনো স্কুলের Librarian-মত হতে পারলে মন্দ হয় না। অবশ্য কেরানীগিরি আমার পোষাবে না।

    শরীর ভালো নয়। ঢাকার জল হাওয়া মাটি মানুষ কিছুই ভালো লাগছে না। হয়তো জীবনের উপরই বিতৃষ্ণার এই সূচনা।”

    আরেকটা শৈলজার চিঠি, দীশেরঞ্জনকে লেখা :

    বৃহস্পতিবার, বারবেলা

    “দাদা দীনেশ,

    …দু দিন আমি পটুয়াটোলার মোড় থেকে ফিরে এসেছি। জানি, এতে আমার নিজের দোষ কিছু নেই, কিন্তু যে পরাজয়ের লজ্জা আমার অষ্টাঙ্গ বেষ্টন করে ধরেছে তার হাত থেকে আজ পর্যন্ত নিষ্কৃতি পাচ্ছি না যে। আমার মত লোকের বই ছাপানো যে কত দূর অন্যায় হয়েছে তা আমি বেশ বুঝতে পেরেছি। তাই সমস্ত বোঝার ভার আপনার ঘাড়ে চড়িয়ে দিয়ে আমি একটুখানি সরে দাঁড়াতে চাই।

    এখন কি হয়েছে শুনুন। কাবলিওয়ালার মত তাগাদা দিয়ে রায়-সাহেবের কাছে ‘হাসি’ ‘লক্ষ্মী’র জন্য ৫০০ পাঁচ শ টাকা আদায় করেছি, তার পরেও শ খানেক টাকা বাকী ছিল। এখন তিনি সে টাকা দিতে অস্বীকার করেছেন। কাজেই বোঝা এসে পড়েছে আমার ঘাড়ে। এ নিঃস্ব ভিখারীর পক্ষে শ খানেক টাকার বোঝাও যে ভারী দাদা। কিন্তু এখন আমি করি কি? গত দু’দিন আমি বই লিখে প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে উপযাচকের মত একশটি টাকার জন্যে ঘুরে বেড়িয়েছি, কিন্তু এ অভাগার দুর্ভাগ্য, কারও কাছ থেকে একটা আশ্বাসের বাণীও আমার ভাগ্যে জোটেনি। …আমি এ অন্ধকার আবর্তের মধ্যে পড়ে ভাববার কোনও পথ খুঁজে পাচ্ছি না।

    আমায় একবার এ সব দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি দিন। লোটা কম্বল সম্বল করে ‘বোম কেদারনাথ’ বলে আমি একবার বেরিয়ে পড়তে চাই। এ সব সর্বনাশ আবর্জনার মধ্যে প্রাণ আমার সত্যসত্যই ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে।….

    ‘হাসি’ ‘লক্ষ্মী’র আবেষ্টনের মধ্যে হাত-পা যেন বাধা হয়ে রয়েছে, তাই ‘কুছ পরোয়া নেই’ বলতে কেমন যেন সঙ্কোচ হচ্ছে। এ বন্ধন থেকে যদি শনিবার দিন মুক্তি পাই তাহলে বুক ঠুকে বলছি–কুছ পরোটা নাই! তাহলে–

    সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে

    মুখ হাসে মোর চোখ হাসে আর টগবগিয়ে খুন হাসে।

    লিখেছেন,–হাসছ তো শৈলজা? আঃ, কি আর বোলব ভাই, এমন সান্ত্বনার বাণী অনেকদিন শুনিনি। আজ আমার মনে পড়ছে— সে আজ বহুদিনের কথা—আর একজন, তার নিজের বেদনা বক্ষের গাঢ় রক্তাক্ত ক্ষতমুখ দু’হাত দিয়ে বজ্রমুষ্টিতে চেপে ধরে কয়েছিল মেয়েদের মত তোমার এ কান্না সাজে না, তুমি কেঁদো না।…

    সে কথা হয়ত আজ ভুলে ছিলুম, তাই আমার ক্ষণে-ক্ষণে মনে হয়–

    হাসি? হায় সখা, এ তো স্বর্গপুরী নয়,

    পুষ্পে কীট সম হেথা তৃষ্ণা জেগে রয়

    মৰ্মমাঝে।

    আশা করি সকলেই কুশলে আছেন। আমার ভালোবাসা গ্রহণ করুন। শনিবার দিন রিক্তহস্তে এ দীন দীনেশের দরজায় গিয়ে দাঁড়াবে—তাঁর অন্তরের বিরাট ক্ষুধা একটুখানি সহানুভূতির নিবিড় করুণা চাওয়ার প্রত্যাশী!”

    এই সময় আমি এক টেক্সট-বুক প্রকাশকের নেকনজরে পড়ি। সেই আমার পুস্তক প্রকাশকের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎকার। অনুরোধ হল, নিচু ক্লাশের স্কুলের ছাত্রদের জন্যে বাঙলায় একখানা রচনা-পুস্তক লিখে দিতে হবে—হাতি-ঘোড়া, উষ্ট্র-ব্যাঘ্র নিয়ে রচনা। তন্‌খা পঞ্চাশ টাকা। সানন্দচিত্তে রাজি হয়ে গেলাম, প্রায় একটা দাও পাওয়ার মত মনে হল। লেখা শেষ করে দিলাম অল্প কয়েক দিনের মধ্যে—লেখার চেয়েও লেখা শেষ করতে পারাটাই বেশি পছন্দ হল প্রকাশকের। টাকার জন্যে হাত বাড়ালে প্রকাশক মাত্র একটি টাকা দিয়েই ক্ষান্ত হলেন। বললাম—বাকিটা? আস্তে-আস্তে দেব, বললেন প্রকাশক, একসঙ্গে একমুষ্টে সব টাকা দিয়ে দিতে হবে পষ্টাপষ্টি এমন  কথা হয়নি। ভালোই তো, অনেক দিন ধরে পাবেন। কিন্তু একদিন এই অনেক দিনের সান্ত্বনাটা মন মেনে নিতে চাইল না। হন্তদন্ত হয়ে দোকানে ঢুকে বললাম, টাকা দিন। প্রকাশক মুখের দিকে চেয়ে থেকে বললেন, এত হন্তদন্ত হয়ে চলেছেন কোথায়? বললাম, খেলা দেখতে। খেলা দেখতে? যেন আশ্বস্ত হলেন প্রকাশক। সরবে হিসেব করলেন শুনিয়ে-শুনিয়ে গ্যালারি চার আনা আর ট্রাম ভাড়া দশ পয়সা। সাড়ে ছ আনাতেই হবে, সাড়ে ছ আনাই নিয়ে যান! বলে সত্যি-সত্যি সাড়ে ছ আনা পয়সাই গুনে দিলেন।

    বাঙলা দেশের প্রকাশকের পক্ষে তখন এও সম্ভব ছিল!

  • নয়

    নয়

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    নয়

    সান-ইয়াৎ-সেন আসত “কল্লোলে”। সান-ইয়াৎ-সেন মানে আমাদের সনৎ সেন। সনৎ সেনকে আমরা সান-ইয়াৎ-সেন বলতাম। ‘অৰ্ধাঙ্গিণী’ নামে একখানা উপন্যাস লিখেছিল বলে মনে পড়ছে। আধপোড় চুরুট মুখে দিয়ে প্রায়ই আসত আড্ডা দিতে, প্রসন্ন চোখে হাসত। দৃষ্টি হয়তো সাহিত্যের দিকে তত নয় যত ব্যবসার দিকে। ‘বাণিজ্যে বাঙ্গালীর স্থান’ বলে কিছু একটা লিখেওছিল এ বিষয়ে। হঠাৎ একদিন ‘ফাঁসির গোপীনাথ’ বলে বই বের করে কাণ্ড বাধালে। কল্লোল-আপিসেই কাণ্ড, কেননা “কল্লোল”ই ছিল ঐ বইয়ের প্রকাশক। একদিন লাঠি ও লালপাগড়ির ঘটায় কল্লোল-আপিস সরগরম হয়ে উঠল। জেলে গোপীনাথের যেমন ওজন বেড়েছিল বইএর বিক্রির অঙ্কটা তেমনি ভাবে মোটা হতে পেল না। সরে পড়ল সান-ইয়াৎ সেন। পষ্টাপষ্টি ব্যবসাতে গিয়েই বাসা নিলে।

    কিন্তু বিজয় সেনগুপ্তকে আমরা ডাকতাম ‘কবরেজ’ বলে। শুধু বদ্যি বলে নয়, তার গায়ের চাদর-জড়ানো বুড়োটে ভারিক্কিপনা থেকে। এককোণে গা-হাত-পা ঢেকে জড়সড় হয়ে বসে থাকতে ভালবাসত, সহজে ধরা দিতে চাইত না। কিন্তু অন্তরে কাষ্ঠ কার্পণ্য নিয়ে “কল্লোলের” ঘরে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারে এমন তোমার সাধ্য কি। আস্তে-আস্তে সে ঢাকা খুললে, বেরিয়ে এল গাম্ভীর্যের কোটর থেকে। তার পরিহাস-পরিভাষে সবাই পুলকম্পন্দিত হয়ে উঠল। একটি পরিশীলিত সূক্ষ্ম ও স্নিগ্ধ মনের পরিচয় পেলাম। তার জমত বেশি সুকুমার ভাদুড়ির সঙ্গে। হয়তো দুজনেই কৃষ্ণনগরের লোক এই সুবাদে। বিজয় পড়ছে সিকস্‌থ ইয়ার ইংরিজি, আর সুকুমার এম এস-সি আর ল। দুজনেই পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট। কিংবা হয়তো আরও গভীর মিল ছিল যা তাদের রসস্ফুর্ত আলাপে প্রথমে ধরা পড়ত না। তা হচ্ছে দুজনেরই কায়িক দিনযাপনের আর্থিক কৃচ্ছ।

    কষ্টে-ক্লেশে দিন যাচ্ছে, পড়া-থাকার খরচ জোগানো কঠিন, অবন্ধু সংসারের নির্দয় রুক্ষতায় পদে পদে বিপন্ন, কিন্তু সরসবচনে সুখসৃষ্টিতে আপত্তি কি।

    বিজয় হয়তো বললে, ‘সুকুমারটা একটা ফল্‌স্‌।’

    সুকুমার পালটা জবাব দিলে, ‘বিজয়টা একটা বোগাস।’

    হাসির হল্লোড় পড়ে যেত। ঐ সামান্য দুটো কথায় এত সবার কি ছিল আজকে তা বোঝানো শক্ত। অবিশ্যি উক্তির চেয়ে উচ্চারণের কারুকার্যটাই যে বেশি হাসাত তাতে সন্দেহ নেই। তবু আজ ভাবতে অবাক লাগে তখনকার দিনে কত তুচ্ছতম ভঙ্গিতে কত মহত্তম আনন্দলাভের নিশ্চয়তা ছিল। দুটি শব্দ—‘ইয়ে’, আর ‘উঁহু’—বিজয় এমন অদ্ভুতভাবে উচ্চারণ করত যে মনে হত এত সুন্দর রসাত্মক বাক্য বুঝি আর সৃষ্টি হয়নি। নৃপেনকে দেখে ‘নেপোয় মারে দই’ কিংবা আফজলকে দেখে কেউ যদি বলত ‘ডাবজল’, নামত অমনি হাসির ধারাবর্ষণ। আজকে ভাবতে হাসি পায় যে হাসি নিয়ে জীবনে তখন ভাবনা ছিল না। বুদ্ধি-বিবেচনা লাগত না যে হাসিটা সত্যিই বুদ্ধিমানের যোগ্য হচ্ছে কিনা। অকারণ হাসি, অবারণ হাসি। কবিতার একটা ভাল মিল দিতে পেরেছি কিংবা মাথায় একটা নতুন গল্পের আইডিয়া এসেছে এই যেন যথেষ্ট সুখ। প্রাণবহনের চেতনায় প্রতিটি মুহূর্ত স্বর্ণঝলকিত। কোন দুর্গম গলির দুর্ভেদ্য বাড়িতে নিভৃত মনের বাতায়নে উদাসীনা প্রেয়সী অবসর সময়ে বসে আছেন এই ম্লান দিগন্তের দিকে চেয়ে—এই যেন পরম প্রেরণা। আয়োজন নেই, আড়ম্বর নেই, উপচার-উপকরণ নেই–একসঙ্গে এতগুলি প্রাণ যে মিলেছি এক তীর্থসত্রে, জীবনের একটা ক্ষুদ্র ক্ষণকালের কোঠায় খুব ঘেঁসাঘেঁসি করে যে বসতে পেরেছি একাসনে–এক নিমন্ত্রণে—এই আমাদের বিজয়-উৎসব।

    সুকুমারের গল্পে নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসারের সংগ্রামের আভাস ছিল, বিজয়ের গল্প বিশুদ্ধ প্রেম নিয়ে। যে প্রেমে আলোর চেয়ে ছায়া, ঘরের চেয়ে ঘরের কোণটা বেশি স্পষ্ট। যেখানে কথার চেয়ে স্তব্ধতাটা বেশি মুখর। বেগের চেয়ে বিরতি বা ব্যাহতি বেশি সক্রিয়। এক কথায় অপ্রকট অথচ অকপট প্রেম। অল্প পরিসরে সংযত কথায় সূক্ষ্ম আঙ্গিকে চমৎকার ফুটিয়ে তুলত বিজয়। দুটি মনের দুদিকের দুই জানালা কখন কোন হাওয়ায় একবার খুলছে আবার বন্ধ হচ্ছে তার খেয়ালিপনা। দেহ সেখানে অনুপস্থিত, একেবারে অনুপস্থিত না হলেও নিরুচ্চার। শুধু মনের টেউয়ের ঘূর্ণিপাক। একটি ইচ্ছুক মনের অদ্ভুত ঔদাসীন্য, হয়তো বা একটি উদ্যত মনের অদ্ভুত অনীহা। তেরোশ তিরিশের প্রায় গোড়া থেকেই বিজয় এসেছে “কল্লোলে”, কিন্তু তার হাত খুলেছে তোরেশ একত্রিশ থেকে। তেরোশ একত্রিশ-বত্রিশে কটি অপূর্ব প্রেমের গল্প সে লিখেছিল। যে প্রেম দূরে-দূরে সরে থাকে তার শূন্যতাটাই সুন্দর, না, যে প্রেম কাছে এসে ধরা দেয় তার পূর্ণতাটাই চিরস্থায়ী—এই জিজ্ঞাসায় তার গল্প গুলি প্রাণস্পন্দী। একটি ভঙ্গুর প্রশ্নকে মনের নানান আঁকাবাঁকা গলিঘুঁজিতে সে খুঁজে বেড়িয়েছে। আর যতই খুঁজেছে ততই বুঝেছে এ গোলকধাঁধার পথ নেই, এ প্রশ্নের জবাব হয় না।

    বিজয় কিন্তু আসে মণীশ ঘটকের সঙ্গে। দুজনে বন্ধু ছিল কলেজে, সেই সংসর্গে। একটা বড় রকম অমিল থেকেও বোধহয় বন্ধুত্ব হয়। বিজয় শান্ত, নিরীহ; মণীশ দুর্ধর্ষ, উদ্দাম। বিজয় একটু বা কুনো, মণীশ নির্বারিত। ছ-ফুটের বেশি লম্বা, প্রস্থে কিছুটা দুঃস্থ হলেও বলশালিতার দীপ্তি আছে তার চেহারায়। অতখানি দৈর্ঘ্যই তো একটা শক্তি। “কল্লোলে” আত্মপ্রকাশ করে সে যুবনাশ্বের ছদ্মনাম নিয়ে। সেদিন যুবনাশ্বের অর্থ যদি কেউ করত ‘জোয়ান ঘোড়া’, তাহলে খুব ভুল করত না, তার লেখায় ছিল সেই উদ্দীপ্ত সবলতা। কিন্তু এমন বিষয় নিয়ে সে লিখতে লাগল যা মান্ধাতার বাপের আমল থেকে চলে এলেও বাংলাদেশের ‘সুনীতি সংঘের’ মেম্বাররা দেখেও চোখ বুজে থাকছেন। এ একেবারে একটা নতুন সংসার, অধন্য ও অকৃতার্থের এলাকা। কাণা খোঁড়া ভিক্ষুক গুণ্ডা চোর আর পকেটমারের রাজপাট। যত বিকৃত জীবনের কারখানা। বলতে গেলে, মণীশই “কল্লোলে”র প্রথম মশালচী। সাহিত্যের নিত্যক্ষেত্রে এমন সব অভাজনকে সে ডেকে আনল যা একেবারে অভূতপূর্ব। তাদের একমাত্র পরিচয় তারাও মানুষ, জীবনের দরবারে একই সই-মোহর-মারা একই সনদের অধিকারী। মানুষ? না, মানুষের অপচ্ছায়া? কই তাদের হাতে সেই বাদশাহী পাঞ্জার ছাপ-তোলা সনদ? তারা যেসব বিনা টিকিটের যাত্রী। আর, সত্যি করে বলো এটা কি দরবার, না বেচাকেনার মেছোহাটা? তারা তো সব সস্তায় বিকিয়ে যাওয়া ভুষিমাল।

    যুবনাশ্বের ঐ সব গল্পে হয়তো আধুনিক অর্থে কোনো সক্রিয় সমাজসচেতনতা ছিল না, কিন্তু জীবন সম্বন্ধে ছিল একটা সহজ বিশালতাবোধ। যে মহৎ শিল্পী তার কাছে সমাজের চেয়েও জীবনই বেশি অর্থান্বিত। যে জীবন ভগ্ন, রুগ্ন, পর্যদস্ত, তাদেরকে সে সরাসরি ডাক দিলে, জায়গা দিলে প্রথম পংক্তিতে। তাদের নিজেদের ভাষায় বলালে তাদের যত দগদগে অভিযোগ, জীবনের এই খলতা এই পঙ্গুতার বিরুদ্ধে কশায়িত তিরস্কার। দেখালে তাদের ঘা, তাদের পাপ, তাদের নির্লজ্জতা। সমস্ত কিছুর পিছনে দয়াহীন দারিদ্র। আর সমস্ত কিছু সত্ত্বেও একটি নিষ্পঙ্ক ও নীরোগ জীবনের হাতছানি।

    ভাবতে অবাক লাগে যুবনাশ্বের সেই সব গল্প আজও পর্যন্ত পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়নি। চব্বিশ বছর আগে বাংলাদেশে এমন প্রকাশক অবিশ্যি ছিল না যে এ গল্পগুলি প্রকাশ করে নিজেকে সম্ভ্রান্ত মনে করতে পারত। কিন্তু আজকে অনেক দৃষ্টিবদল হলেও এদিকে কারু চোখ পড়ল না। ভয় হয়, অগ্রনায়ক হিসেবে যুবনাশ্বের নাম না একদিন সবাই ভুলে যায়। অন্তত এই অগ্রদৌত্যের দিক থেকে এই গল্পগুলি সাহিত্যের ইতিহাসে গণনীয় হয়ে থাকবে। এরাই বাংলা সাহিত্যে নতুন আবাদের বীজ ছড়ালে। বাস্তবতা সম্বন্ধে সরল নির্ভীকতা ও অপধ্বস্ত জীবনের প্রতি সশ্রদ্ধ সহানুভূতি এই দুই মহৎ গুণ তার গল্পে দীপ্তি পাচ্ছে।

    ‘কালনেমি’-র ডাকু জোয়ান মরদ—রেলে কাটা পড়ে কাজের বার হয়ে যায়। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে স্ত্রী ময়নাকে নিয়ে পটলডাঙার ভিখিরিপাড়ায় এসে আস্তানা নেয়। ডাকুকে রোজ রাস্তার মোড়ে বসিয়ে দিয়ে ময়না দলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে ভিক্ষের সন্ধানে, ফিরে এসে আবার স্বামীকে তুলে নিয়ে যান। কিন্তু সেই ভিখিরিপাড়ায় স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের কোনো অস্তিত্ব নেই, নিয়ম নেই থাকবার। সেখানে প্রতি বছরই ছেলে জন্মায়, কিন্তু বাপ-মার ঠিক-ঠিকানা জানবার দরকার হয় না। কেউ কারু একলার নয়। ময়না এ জগতে একেবারে বিদেশী, কিছুতেই খাপ খাওয়াতে পারে না। এই বিরুদ্ধ পরিবেশের সঙ্গে। তাই একদিন রতনার আক্রমণে সে রুখে ওঠে।

    স্বামীকে গিয়ে বলে—তু একটা বিহিত করবিনে?

    একটু চুপ করে থেকে ডাকু তাকে বুকে সাপটিয়ে ধরে। বলে—তা হোকগে। থাকতেই হবে যখন হেতায় তখন কি হবে আর ঘাঁটিয়ে?—আয় তুই …।

    ময়না চারিদিকে তাকিয়ে আশ্রয় খোঁজে। গা ঝাড়া দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় স্বামীর কবল থেকে।

    ডাকু বলে—চললি কোতা?

    রতনার কাছে।

    কিন্তু ডাকু তাতে দমে না। বলে—দোহাই তোর, আমাকে একেবারে ফাঁকি দিসনে। একটিবার আসিস রেতে—

    ‘গোষ্পদ’ গল্পে অন্য রকম সুর। একটি ক্ষণকালিক সদিচ্ছার কাহিনী। খেঁদি-পিসি পটলডাঙার ভিখিরিদলের মেয়ে-মোড়ল। একদিন পথে ভঘরের একটি বিবর্জিত বউকে কুড়িয়ে পায়। তাকে নিয়ে আসে বস্তিতে। প্রথমেই তো সে ভিক্ষুকের ছাড়পত্র পেতে পারে না, সেই শেষ পরিচ্ছেদের এখনো অনেক পৃষ্ঠা বাকি। তাই প্রথমে খেঁদি ধমক দিয়ে উঠল। বললে, আমাদের দলে যাদের দেখলে, সবই ত ওই করত এককালে। পরে, বুড়ো হয়ে, কেউ ব্যায়রামে পড়ে পথে বেরিয়েছে। তোমার এই বয়সে অমন চেহারা—তা বাপু, নিজে বোঝ—

    মেয়েটি ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

    এবার আর খেঁদি কান্না শুনে খিটখিট করে উঠল না। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে কি ভাবল। হয়তো ভাবল এই অবুঝ মেয়েটাকে বাঁচানো যায় কিনা। যায় না, তবু যত দিন যায়। তাই সে একটা নিশ্বাস ফেলে বলল,—আচ্ছা থাকো। কিন্তু এ চেহারা নিয়ে কলকাতা হেন জায়গায় কি সামলে থাকতে পারবে? আমার খবরদারিতে যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ অবিশ্যি ভয় নেই। কিন্তু সব সময় কি আমি চোখ রাখতে পারব?

    না, ভয় নেই। থাকো, কোথায় যাবে এই জঙ্গলে? যতক্ষণ ঘরে খেঁদি আছে ততক্ষণ, ততটুকু সময় তো মেয়েটি নিরাপদ।

    ‘মৃত্যুঞ্জয়’ প্রেমের গল্প—গোবরগাদায় পদ্মফুল। ও-তল্লাটে চঞ্চু সবচেয়ে ঝানু বদমাইস, হৃদয়হীন জানোয়ার। থাকত ক্ষ্যান্তর ঘরে— ক্ষ্যান্ত হচ্ছে খেঁদির ডান-হাত। দলের সেরা হচ্ছে চঞ্চু, তাই তার ডেরাও মজবুত—ক্ষ্যান্তর ঘর। এ হেন চঞ্চু একদিন ময়লা, রোগা আর বোবা এক ছুঁড়িকে নিয়ে এসে দলে ভর্তি করে দিলে। কিন্তু সেই থেকে, কেন কে জানে, তা আর ভিক্ষেয় বেরোতে মন ওঠে না। শুধু তাই নয়, সেদিন সে পটলাকে চড়িয়ে দিয়েছে একটা মেয়ের হাত থেকে বালা ছিনিয়ে নেবার সময় তার আঙুল মুচড়ে ভেঙে দিয়েছে বলে। চঞ্চুর এই ব্যাপার দেখে সবাই খাপ্পা হয়ে খেঁদিকে গিয়ে ধরল। বললে,— ‘এর একটা বিহিত তোকে আজই করতে হবে পিসি। নইলে সব যে যেতে বসেছে। ড্যাকরার কি যে হয়েছে কদিন থেকে সাধুগিরি ফলাতে শুরু করেছে মাইরি।’

    খেঁদি গিয়ে পড়ল চঞ্চুকে নিয়ে। মুখিয়ে উঠল : ‘বল মুখপোড়া, তুই ভেবেছিস কি? দলের নাম ডোবাতে বসেছিস রে।’

    চঞ্চু হাঁ-না কোনো জবাব দিল না।

    একজন বলল ‘অরে, ও তো এমন ছেল না। ওই শুঁটকি মাগী। এসেই তো ওকে বিগড়েছে! ওকে না তাড়ালে চঞ্চুকে ফেরাতে পারবি না—’

    খেঁদি বলল, ‘সত্যি করে বল তুই, ও-মাগী তোর কে? আমি কেন, দশজনে দেখছে, ওই তোকে সারছে। ও কে তোর?’

    বোবা মেয়েটাও ইতিমধ্যে এসে পড়েছে ঘরের মধ্যে। চঞ্চু তার দিকে তাকিয়ে রইল স্পষ্ট করে। বললে, ‘ও আমার বোন।’

    বোন? খেঁদির দলে বোন? মা-বোনের ছোঁয়াচ তো ঢের দিনই সবাই এড়িয়ে এসেছে।

    — ‘শোন, এই তোকে বলছি’—খেঁদি খেঁকিয়ে উঠল—‘ও মাগীকে তোর ছাড়তে হবে। যেখান থেকে ওকে কুড়িয়ে পেয়েছি, কাল গে সেইখানে রেখে আসবি নইলে—’

    চঞ্চু তাকাল খেঁদির দিকে।

    —‘নইলে দল ছাড়তে হবে তোকে। আগেকার মত যদি হতে পারিস তবেই থাকতে পারবি, নইলে আর নয়। বুঝেছিস?’

    ভোর রাতের আবছা আলোয় খেঁদি পিসির আস্তানা থেকে বেরিয়ে এল চঞ্চু, সেই বোবা মেয়েটার হাত-ধরা। অনেক দিন চলে গেল, আর তাদের হদিস নেই।

    রতন টিপ্পনি কাটল,— ‘বলেছিনু কিনা। শক্ত একটা কিছু বেঁধেছে বাবা। নইলে চঞ্চুর মত স্যায়ন ঘাগী—’

    তেরোশ বত্রিশের “কল্লোলে” যুবনাশ্ব তিনটি গল্প লেখে— ‘মন্থশেষ’, ‘ভুখা ভগবান’ আর ‘দুর্যোগ’। এর মধ্যে ‘দুর্যোগ’ অপরূপ। পটলডাঙার গল্প নয়, পদ্মার উপরে ঝড় উঠেছে—তার মধ্যে যাত্রীবাহী স্টিমার—‘বাজার্ডে’র গল্প। জোরালো হাতে লেখা। কলম যেন ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে।

    ‘গতিক বড় সুবিদার না জোগন্নাথ, ঝোরি-বিষ্টি আইব মনে হয়। বুচি লো, চুন দে দেহি এট্টু—’

    সতরঞ্চির ওপর হুঁকো ও গামছা-বাঁধা জলতরঙ্গ টিনের তোরঙে ঠেস দিয়ে আজানু গোলাপী পাঞ্জাবি ও তদুপরি নীল স্ট্রাইপ-দেওয়া টুইলের গলফ-কোট গায়ে একটি বছর সাতাশ-আটাশের মদনমোহন শুয়েছিল। বোধ করি তারই নাম জগন্নাথ। সে চট করে কপালের লতায়িত কেশগুচ্ছের ওপর হাত বুলিয়ে নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললে,—

    ‘ডাইল! হালায় আপনের যত গাজাখুরি কথা। হুদাহুদি ঝরি আইব ক্যান? আর আহেই যদি হালার ডর কিসের? আমরা ত হালার জাইল্যা ডিঙিতে যাইত্যাছি না।’

    আকাশের দিকে চেয়ে মনে হল, ঝড় আসা বিচিত্র নয়। সমস্ত আকাশের রং পাংশু-পিঙ্গল, ঈশান কি নৈঋত কি একটা কোণে হিংস্র শ্বাপদের মত একরাশ ঘোর কালো মেঘ শিকারের ওপর লাফিয়ে পড়বার আগের মুহূর্তের মতই ওৎ পেতে বসেছে। তীরে গাছের পাতা স্পন্দহীন, কেবল ষ্টিমারের আশপাশ ঘুরে গাংচিলের ওড়ার আর বিরাম নেই! চারদিকে কেমন একটা অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা থমথম করছে।

    হঠাৎ চোখে পড়ল একটি লোক আমার পাশ কাটিয়ে ফিমেল-কম্পার্টমেণ্টের ধারে গিয়ে আপাদগ্রীবা সতরঞ্চি মুড়ি দিয়ে উবু হয়ে বসল। বসে সন্তর্পণে একবার কপালের কেয়ারিতে হাত বুলাতেই চিনতে পারলাম সে পুর্বোক্ত শ্রীমান জগন্নাথ। হাবভাবে বুঝলাম, শ্ৰীমান ভীত হয়েছেন।

    বাইরে তাকিয়ে দেখি কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব ওলটপালট হয়ে গেছে। আকাশ-কোণের শ্বাপদজন্তুটা দেহ-বিস্তার করে আকাশের অর্ধেকের বেশি গ্রাস করে ফেলেছে। অন্ধকারে কিছু চোখে পড়ে না, থেকে-থেকে চারদিক মৃদু আলোক-কম্পনে চমকে-চমকে উঠছে। সে আলোয় ধূসর বৃষ্টি-ধারা ভেদ করে দৃষ্টি চলে না, একটু গিয়েই প্রতিহত হয়ে ফিরে আসে। শিকার কায়দায় পেয়ে ক্ষুধার্ত বাঘ যেমন উদ্বিগ্ন আনন্দে গোংরাতে থাকে, সমস্ত আকাশ জুড়ে তেমনি শব্দ হচ্ছে…।

    ‘যান যান, আপন-আপন জায়গায় যান। গাদি করবেন না এক মুড়ায়—দ্যাহেন না হালার জা’জ কাইত অইয়া গেছে—’

    উপদেশ শোনা ও তদনুসারে কাজ করবার মত স্থান ও কাল সেটা নয়, তাই নিজ-নিজ জায়গার ওপর কারো বিশেষ আকর্ষণ দেখা গেল না; যিনি পরামর্শ দিচ্ছিলেন, তাঁরও না।

    বাহিরে অষ্ট দিকপালের মাতামাতি সমানে চলছে। অবিরল বৃষ্টি, অশ্রান্ত বিদ্যুৎ, আকাশের অশান্ত সরব আস্ফালন, সমস্ত ডুবিয়ে উন্মত্ত বায়ুর অধীর হুহুঙ্কার। তারই ভেতর দিয়ে আমাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল, ‘বাজার্ড’ ষ্টিমার বায়ুতাড়িত হয়ে কোন এক ঝড়ের পাখীর মতই সবেগে ছুটে চলেছে।

    হঠাৎ মনে হল কে যেন ডাকছে। কাকে, কে জানে। ওকি,—আমাকেই—

    ‘শুনুন একবার এদিকে—’

    চেয়ে দেখি মেয়ে-কামরার দরজার কাছে দাড়িয়ে বছর কুড়িবাইশের একটি সাদাসিধে হিন্দু ঘরের মেয়ে। আমি এগিয়ে যেতেই তিনি ব্যগ্রভাবে বললেন—‘অবি—অবিনাশবাবুকে ডেকে দেবেন একটু? অবিনাশ বোস। অনেকক্ষণ হল নীচে গেছেন, ফেরেন নি। তিনি আমার স্বামী।’

    বিধ্বস্ত জনসংঘের মধ্যে হাতড়ে-হাতড়ে অনেক কষ্টে অবিনাশবাবুর সন্ধান পাওয়া গেল। ডেক, সেলুন, হস্পিটাল কোথাও তিনি নেই–জাহাজ ডুবছে—এই মহামারণ দুর্যোগে তিনি শুঁটকি মাছের চ্যাঙারির মধ্যে বসে আছেন নিশ্চিন্ত হয়ে। নিশ্চিন্ত হয়ে? হ্যাঁ, ঘাড় দাবিয়ে উবু হয়ে বসে বিপন্না অপরিচিতার স্বামী অবিনাশ বেসি পাশের একটি অর্ধনগ্ন জোয়ান কুলি-মেয়ের দিকে তাকিয়ে কাব্যচর্চা করছেন।” নিশ্চিন্ততা, না, দুর্যোগ?

    মণীশের চেয়েও দীর্ঘকায় আরো একজন সাহিত্যিক ক্ষণকালের জন্যে এসেছিল “কল্লোলে”, গল্পলেখার উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতি নিয়ে। নাম দেবেন্দ্রনাথ মিত্র। কত দিন পরে চলে গেল সার্থক জীবিকার সন্ধানে, আইনের অলি গলিতে। দেবীদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও ওকালতিতে গেল বটে, কিন্তু টিকে ছিল শেষ পর্যন্ত, যত দিন “কল্লোল” টিকে ছিল। মণীশের সঙ্গেই সে আসে আর আসে সেই উদ্দাম প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে। ছাত্র হিসাবে কৃতী, রসবোধের ক্ষেত্রে প্রধী, চেহারায় সুন্দর-সুঠাম— দেবীদাস “কল্লোলে”র বীণার একটি প্রধান তন্ত্রী ছিল। উচ্চ তানের তন্ত্রী সন্দেহ নেই। ঝড়ের ঝংকার নিয়ে আসত, দুর্নিবার আনন্দের ঝড়। নিয়ে আসত অনিয়মের উন্মাদনা। উজরোল, উতরোল, হুল্লোড় পড়ে যেত চারদিকে। দেবীদাস কিন্তু রবাহূত হয়ে আসেনি। এসেছে স্বাধিকারবলে, সাহিত্যিকের ছাড়পত্র নিয়ে। “কল্লোলে” একবার গল্পপ্রতিযোগিতায় দেবীদাসের গল্পই প্রথম পুরস্কার পায়। যত দূর মনে পড়ে, এক কুষ্ঠরোগী নিয়ে সে গল্প। একটা কালো আতঙ্কের ছায়া সমস্ত লেখাটাকে ঢেকে আছে। সন্দেহ নেই, শক্তিধরের লেখনী।

    “কল্লোলে” ভিড় যত বাড়ছে ততই মেজবৌদির রুটির পাঁজা শীর্ণ হয়ে আসছে—সে জঠরারণ্যের খাণ্ডবদাহ নিবৃত্ত করবার সাধ্য নেই কোনো গৃহস্থের। চাঁদা দাও, কে-কে অপারগ হাত তোল, চাঁদায় না কুলোয় ধরো কোনো ভারী পকেটের খদ্দেরকে। এক পয়সায় একখানা ফুলকো লুচি, মুখভরা সন্দেশ একখানা এক আনা, কাছেই পুঁটিরাম মোদকের দোকান, নিয়ে এস চ্যাঙারি করে। এক চ্যাঙারি উড়ে যায় তো আরেক চ্যাঙারি। অতটা রাজাহার না জোটে, রমানাথ মজুমদার স্ট্রিটের মোড়ে বুড়ো হিন্দুস্থানীর দোকান থেকে নিয়ে এস ডালপুরি। একটু দগ্ধভক্ষ খাবে নাকি, যাবে নাকি অশাস্ত্রের এলাকায়? অশাসনের দেশে আবার শাস্ত্র কি, শেয়ালদা থেকে নিয়ে এস শিককাবাব। সঙ্গে ছন্দ রেখে মোগলাই পরোটা!

    আর, তেমন অশন-আচ্ছাদনের ব্যবস্থা যদি না জোটাতে পারে, চলে যাও ফেভরিট কেবিনে, দু’ পয়সার চায়ের বাটি মুখে করে অফুরন্ত আড্ডা জমাও।

    মির্জাপুর স্ট্রিটে ফেভরিট কেবিনে কল্লোলের দল চা খেত। গোল শ্বেতপাথরের টেবিল, ঘন হয়ে বসত সবাই গোল হয়ে। দোকানের মালিক, চাটগেঁয়ে ভদ্রলোক, নাম যতদূর মনে পড়ে, নতুনবাবু, সুজনসুলভ স্নিগ্ধতায় আপ্যায়ন করত সবাইকে। সে সম্বর্ধনা এত উদার ছিল যে চা বহুক্ষণ শেষ হয়ে গেলেও কোনো সঙ্কেতে সে যতিচিহ্ন আঁকত না। যতক্ষণ খুশি আজ্ঞা চালিয়ে যাও জোর গলায়। কে জানে হয়তো আড্ডাই আকর্ষণ করে আনবে কোনো কৌতূহলীকে, তৃষার্তচিত্তকে। পানের অভাব হতে পারে কিন্তু স্থানের অভাব হবে না। এখুনি বাড়ি পালাবে কি, দোকান এখন অনেক পাতলা হয়েছে, এক চেয়ারে গা এলিয়ে আরেক চেয়ারে পা ছড়িয়ে দিয়ে বোস। শাদা সিগারেট নেই একটা? অন্তত একটা খাকি সিগারেট?

    বহু তর্ক ও আস্ফালন, বহু প্রতিজ্ঞা ও ভবিষ্যচিত্রন হয়েছে সেই ফেভরিট কেবিনে। “কল্লোল” সম্পূর্ণ হত না যদি না সেদিন ফেভরিট কেবিন থাকত।

    এক-একদিন শুকনো চায়ে মন মানত না। ধোঁয়া ও গন্ধ-ওড়ানো তপ্ত-পক্ক মাংসের জন্যে লালসা হত। তখন দেলখোস কেবিনের জেল্লাজমক খুব, নাতিদূরে ইণ্ডোবৰ্মার পরিচ্ছন্ন নতুনত্ব। কিন্তু খুব বিরল দিনে খুব সাহস করে সে-সব জায়গায় ঢুকলেও সামান্য চপ-কাটলেটের বেশি জায়গা দিতে পকেট কিছুতেই রাজি হত না। পেট ও পকেটের এই অসামঞ্জস্যের জন্যে ললাটকে দায়ী করেই শান্ত হতাম। কিন্তু সাময়িক শান্তি অর্থ চিরকালের জন্যে ক্ষান্ত হওয়া নয়। অন্তত নৃপেন জানত না ক্ষান্ত হতে। তার একমুখো মন ঠিক একটা না-একটা ব্যবস্থা করে উঠতই।

    একদিন হয়তো বললে, ‘চল কিছু খাওয়া যাক পেট ভরে। বাঙালি পাড়ায় নয়, চীনে পাড়ায়।’

    উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। ‘পয়সা?’

    ‘পয়সা যে নেই তুইও জানিস আমিও জানি। ও প্রশ্ন করে লাভ নেই।’

    ‘তবে?’

    ‘চল, বেরিয়ে পড়া যাক একসঙ্গে। বেগ-বরো-অর-ষ্টিল, একটা হিল্লে নিশ্চয়ই কোথাও হবে। আশা করি চেয়ে-চিন্তে ধারধুর করেই জুটে যাবে। শেষেরটার দরকার হবে না।’

    দু’জনে হাঁটতে সুরু করলাম, প্রায় বেলতলা থেকে নিমতলা, সাহাপুর থেকে কাশীপুর। প্রথম প্রথম নৃপেন মোল আনা চেনা বাড়িতে ঢুকতে লাগল, শেষকালে দু-আনা এক-অনা চেনায়ও পেছপা হল না। মুখচেনা নামচেনা কিছুতেই তার উদ্যম-ভঙ্গ নেই। আমাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে একেকটা বাড়িতে গিয়ে ঢোকে আর বেরিয়ে আসে শূন্য মুখে, বলে, কিছুই হল না, কিংবা বাড়ি নেই কেউ, কিংবা ছোট একটি অভিশপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে দুচরণ মেঘদূত আওড়ায়। এমনিতে স্থির হয়ে বসে থাকতে যা হত হাঁটার দরুন খিদেটা বহুগুণ চনচনে হয়ে উঠল। যত তীব্র তোমার ক্ষুধা তত দূর তোমার যাত্রা। সুতরাং থামলে চলবে না, না-থামাটাই তো তোমার খিদে-পাওয়ার সত্যিকার সাক্ষ্য। কিন্তু রাত সাড়ে আটটা বাজে, ডিনার টাইম প্রায় উত্তীর্ণ হয়ে গেল, আর মায়া বাড়িয়ে লাভ কি, এবার ভাল ছেলের মত বাড়ি ফিরে যৎ প্রাপ্তং তৎ ভক্ষিতং করি গে। হাত ধরে বাধা দিলাম নৃপেনকে, বললাম, ‘এ পর্যন্ত ঠিক কত পেয়েছিস বল সত্যি করে?’

    হাতের মুঠ খুলে অম্লান মুখে নৃপেন বললে, ‘মাইরি বলছি, মাত্র দু’টাকা।’

    দু’ টাকা! দু’টাকায় প্রকাণ্ড খ্যাঁট হবে। ঈষদূন খাওয়া যাবে আকণ্ঠ। তবে এখনো চীন দেশে না গিয়ে শ্যামরাজ্যে আছি কেন?

    হতাশমুখে নৃপেন বললে, ‘এ দু’টাকায় কিছুই হবে না, এ দু’টাকা আমার কালকের বাজার-খরচ।’

    এই আমাদের রোমাণ্টিক নৃপেন, একদিকে বিদ্রোহী, অন্যদিকে ভাবানুরাগী। ভাগ্যের রসিকতায় নিজেও ভাগ্যের প্রতি পরিহাসপ্রবণ। বস্তুত কল্লোল যুগে এ দুটোই প্রধান সুর ছিল, এক, প্রবল বিরুদ্ধবাদ; দুই, বিহ্বল ভাববিলাস। একদিকে অনিয়মাধীন উদ্দামতা, অন্যদিকে সর্বব্যাপী নিরর্থকতার কাব্য। একদিকে সংগ্রামের মহিমা, অন্যদিকে ব্যর্থতার মাধুরী। আদর্শবাদী যুবক প্রতিকূল জীবনের প্রতিঘাতে নিবারিত হচ্ছে—এই যন্ত্রণাটা সেই যুগের যন্ত্রণা। শুধু বন্ধ দরজায় মাথা খুঁড়ছে, কোথাও আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছে না, কিংবা যে জায়গায় পাচ্ছে তা তার আত্মার আনুপাতিক নয়—এই অসন্তোষে এই অপূর্ণতায় সে ছিন্নভিন্ন। বাইরে যেখানে বা বাধা নেই সেখানে বাধা তার মনে, তার স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের অবনিবনায়। তাই একদিকে যেমন তার বিপ্লবের অস্থিরতা, অন্যদিকে তেমনি বিফলতার অবসাদ।

    যাকে বলে ‘ম্যালাডি অফ দি এজ’ বা যুগের যন্ত্রণা তা “কল্লোলে”র মুখে স্পষ্টরেখায় উৎকীর্ণ। আগে এর প্রচ্ছদপটে দেখেছি একটি নিঃসম্বল ভাবুক যুবকের ছবি, সমুদ্র পাবে নিঃসঙ্গ ঔদাস্যে বসে আছেকেন—উত্তাল তরঙ্গশৃঙ্গটা তার থেকে তখনও অনেক দূরে। তেরোশ একত্রিশের আশ্বিনে সে-সমুদ্র একেবারে তীর গ্রাস করে এগিয়ে এসেছে, তরঙ্গতরল বিশাল উল্লাসে ভেঙে ফেলছে কোন পুরোনো না পোড়ো মন্দিরের বনিয়াদ। এই দুই ভাবের অদ্ভুত সংমিশ্রণ ছিল “কল্লোলে”। কখনো উন্মত্ত, কখনো উন্মনা। কখনো সংগ্রাম, কখনো বা জীবনবিতৃষ্ণা। প্রায় টুর্গেনিভের চরিত্র। ভাবে শেলীয়ান, কর্মে হ্যামলেটিশ।

    এ সময়টায় আমরা মৃত্যুর প্রেমে পড়েছিলাম। বিপ্লবীর জন্যে সে সময় মৃত্যুটা বড়ই রোমাণ্টিক ছিল—সে বিপ্লব রাজনীতিই হোক বা সাহিত্যনীতিই হোক। আর, সঙ্গ বা পরিপার্শ্ব অনুসারে রাজনীতি না হয়ে আমাদের ভাগে সাহিত্য। নইলে দুই ক্ষেত্রেই এক বিদ্রোহের আগুন, এক ধ্বংসের অনিবার্যতা। এক কথায়, একই যুগ-যন্ত্রণা। তাই সেদিন মৃত্যুকে যে প্রেয়সীর সুন্দর মুখের চেয়েও সুন্দর মনে হবে তাতে আর বিচিত্র কি।

    সেই দিন তাই লিখেছিলাম:

    নয়নে কাজল দিয়া

    উলু দিও সখি, তব সাথে নয়, মৃত্যুর সাথে বিয়া।

    আর প্রেমেন লিখেছিল :

    আজ আমি চলে যাই

    চলে যাই তবে,

    পৃথিবীর ভাই বোন মোর

    গ্রহতারকার দেশে,

    সাক্ষী মোর এই জীবনের

    কেহ চেনা কেহ বা অচেনা।

    তোমাদের কাছ হতে চলে যাই তবে।

    যে কেহ আমার ভাই যে কেহ ভগিনী,

    এই উর্মি-উদ্বেলিত সাগরের গ্রহে

    অপরূপ প্রভাত-সন্ধ্যার গ্রহে এই

    লহ শেষ শুভ ইচ্ছা মোর,

    বিদায়পরশ, ভালোবাসা;

    আর তুমি লও মোর প্রিয়া

    অনন্তরহস্যময়ী,

    চিরকৌতূহল-জ্বালা—

    অসমাপ্ত চুম্বনখানিরে

    তৃপ্তিহীন।…

    যত দুঃখ সহিয়াছি

    বহিয়াছি যত বোঝা, পেয়েছি আঘাত

    কাটায়েছি স্নেহহীন দিন

    হয়ত বা বৃথা,

    আজ কোনো ক্ষোভ নাই তার তরে

    কোনো অনুতাপ আজ রেখে নাহি যাই—

    আর নৃপেনের গলায় রবীন্দ্রনাথের প্রতিধ্বনি :

    মৃত্যু তোর হোক দূরে নিশীথে নির্জনে,

    হোক সেই পথে যেথা সমুদ্রের তরঙ্গগর্জনে,

    গৃহহীন পথিকেরি

    নৃত্যচ্ছন্দে নিত্যকাল বাজিতেছে ভেরী

    অজানা অরণ্যে যেথা উঠিতেছে উদাসমর্মর

    বিদেশের বিবাগী নির্ঝর

    বিদায় গানের তালে হাসিয়া বাজায় করতালি,

    যেথায় অপরিচিত নক্ষত্রের আরতির থালি

    চলিয়াছে অনন্তের মন্দিরসন্ধানে,

    পিছু ফিরে চাহিবার কিছু যেথা নাই কোনোখানে।

    দুয়ার রহিবে খোলা, ধরিত্রীর সমুদ্রপর্বত

    কেহ ডাকিবে না কাছে, সকলেই দেখাইবে পথ।

    শিয়রে নিশীথরাত্রি বহিবে নির্বাক,

    মৃত্যু সে যে পথিকেরে ডাক।

    পথিকেরা সেই ডাক যেন তখন একটু বেশি-বেশি শুনছিল। পথিকদের তার জন্যে খুব দোষ দেয়া যায় না। তাদের পকেট গড়ের মাঠ, ভবিষ্যৎ অনির্ণেয়। অভিভাবক প্রতিকুল, সমালোচক যমদূতের প্রতিমূর্তি। ঘরেবাইরে সমান খড়গহস্ততা। এক ভরসাস্থল প্রণয়িনী, তা তিনিও পলায়নপর, বামলোচন। আর তাঁর যারা অভিভাবক তারা আকাট গুণ্ডামার্কা। এই অসম্ভব পরিস্থিতিতে কেউ যদি মরণকে “শ্যামসমান” বলে, মিথ্যে বলে না।

  • দশ

    দশ

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    দশ

    জিজ্ঞাসা ও নৈরাশ্য, সংগ্রাম ও অপূর্ণতা এই দুই যতির মধ্যে দুলছে তখন “কল্লোলে”র ছন্দ। সে সময়কার প্রেমেনের দুটো চিঠি—প্রথমটা এই—

    “অচিন, আমি অধঃপাতে চলেছি। তাও যদি ভালো ভাবে যেতে পারতুম! জীবন নিয়ে কি করতে চাই ভালো করে বুঝি না, যা বুঝি তাও করতে পারি না। মাঝে-মাঝে ভাবি, বোঝবার দরকার কিছু আছে কি? এই যে দার্শনিক কবি মানবহিতৈষী মহাপুরুষেরা মাথা ঘামিয়ে মরছেন এ ঘর্ম বোধ হয় একেবারেই নিরর্থক। জীবনটাকে যে বেঁকিয়ে দুমড়ে বিকৃত করে ছেড়ে গেল, আর যে প্রাণপণ শক্তিতে জীবনকে কবিতা করার চেষ্টা করলে, দুজনেই বাজে কাজে হয়রান হল সমানই। তুমি বলবে আনন্দ আর দুঃখ—আমি বলি, তার চেয়ে ছেড়ে দাও, যার আদি বুঝি না অন্ত বুঝি না, ছেড়ে দাও তাকে নিজের খেয়ালে। হাসি পেলে হাস, আর যেদিন শ্রাবণের আকাশ অন্ধকারে আর্দ্র হয়ে উঠবে সেদিন জেনো ও মেনো কাঁদতে পাওয়াটাই পরম সৌভাগ্য। কোন দিন যদি খুশী হয়, নিজের সমস্ত সত্যকে মিথ্যার খোলসে ঢেকে নিজের সঙ্গে খুব বড় একটা পরিহাস কোরো, কোন ক্ষতি হবে না।

    আমরা ছোট মানুষ, কুয়োর ব্যাঙ, কিছু জানি না, তাই ভাবি আমরা মস্ত একটা কিছু। নিজেদের জগতে চলাফেরা করি, ছোট্ট চেতনার আলোকে নিজের ঘরে নিজের সত্তার প্রকাণ্ড ছায়াটা দেখি আর মনে মনে ‘বড়-বড়’ খেলা করি। কিন্তু ভাই আজ যদি এই পৃথিবীর গায়ের চুলকানির কীটের মত এই সমস্ত মানুষ জাতটার সবাই মিলে পণ করে উচ্ছন্নে যাই, এই বিপুল নিখিলে এই বিরাট আকাশে কোনখানে এতটুকু কান্না জাগবে না, উল্কাপাত হবে না, অগ্নি বৃষ্টি হবে না, প্রলয় হবে না, বিরাট নিখিলে একটি চোখের পালক খসবে না।

    তবে যদি মানুষকে একটা কথা শেখাতে চাও, আমি তোমার মতে—যদি এই নির্বোধ মানুষ জাতটাকে শেখাও শুধু স্ফূর্তির, নিছক স্ফুর্তির উপাসনা—এই দেবতা-ঠাকুরকে দূর করে দিয়ে, ঝেঁটিয়ে ফেলে সব সমাজশাসন সব নীতির অনুশাসন—শুধু জীবনটাকে আনন্দের সরাবখানায় অপব্যয় করতে—তবে রাজী আমি।

    কিন্তু আনন্দ, সত্যকারের আনন্দ পেতে হলে চাই আবার সেই বন্ধন, চাই আবার সেই সমাজশাসন, যদিও উদারতর; চাই সত্যের ভিৎ, যদিও দৃঢ়তর—চাই সচেতন সৃষ্টি প্রতিভা, চাই বিভিন্ন জীবনপ্রেরণার এমন সংযম ও সংযোগ যা সঙ্গীত।

    সুতরাং এতক্ষণ সব বাজে বকেছি—বাজে বকব বলেই বাজে বকেছি। কারণ চিঠি লেখার চরম উদ্দেশ্য জীবনের নির্মম বাস্তবতাকে কিছুক্ষণের জন্যে অপদস্থ করে হাস্যাস্পদ করা।

    আজ এখানে বেজায় বাদল, কাল থেকেই শুরু হয়েছে। শাল মুড়ি দিয়ে এলোমেলো বিছানায় বসে চিঠি লিখছি। এখন রাত সাড়ে সাতটা হবে। খুব সম্ভব তুই এখন গল্প লিখছিস—লিখছিস হয়ত বিরহী নায়ক তার প্রিয়ার ঘরের প্রদীপের আলোকে নিজের ব্যর্থ কামনার মৃত্যু দেখছে। হয়ত কোন ব্যথিত প্রণয়ী তোর হৃদয়ের কান্নার উৎসে জন্ম নিয়ে আজ চলল মানুষের আনন্দলোকের অবিনাশী মহাসভায়—যেখানে কালিদাসের যক্ষ আজো বিলাপ করছে, যেখানে পৃথিবীর সমস্ত মানস্রষ্টার সৃষ্টি অমর হয়ে আছে।

    একদিন নাকি পৃথিবীতে কান্না থাকবে না, কাঁদবার কিছু থাকবে না। সেদিনকার হতভাগ্য মানুষেরা হয়ত শখ করে তোদের সভায় কাঁদতে আসবে আর আশীর্বাদ করবে এই তোদের, যারা তাদের ক্রন্দনহীন জীবনের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিবি।”

    দ্বিতীয় চিঠি:

    “বড় দুঃখ আমার এই যে কোন কাজই ভাল করে করতে পারলুম না। জীবনের মানেও বুঝতে পারি না। জানি শক্তিসংগ্রহে সুখ, পূর্ণ উপভোগ সুখ। কিন্তু সুখ আর কল্যাণ কোথায় এক হচ্ছে বুঝতে পারি না।

    জীবনটা যখন চলা তখন একটা দিকে ত চলা দরকার, চার দিকে সমানভাবে দৌড়াদৌড়ি করলে কোন লাভ হবে না নিশ্চয়ই। সেই পথের লক্ষ্যটা একমাত্র আনন্দ ছাড়া আর কি করা যেতে পারে ভেবে পাচ্ছি না।…

    আনন্দ কল্যাণের সঙ্গে না মিশলেই যায় সব ভেঙে। অনেক ধনী হয়ে অনেক টাকা বাজে অপব্যয় করার আনন্দ আছে, খুব ব্যভিচারী লম্পট হওয়াতেও আনন্দ আছে, সর্বত্যাগী বৈরাগী তপন্থী সন্ন্যাসী হওয়াতে আনন্দ আছে, কিন্তু কল্যাণের সঙ্গে আনন্দ মেশে না, তাই গোল। এগিয়েও ভুল করতে পারি, পেছিয়েও। পাল্লা সমান রেখে কেমন করে চলা যায় তাও ত ভেবে পাই না।

    আমার মনে হয় আনন্দ আমার কাছে আনন্দ আর দুঃখ দুঃখ, শুধু এই জন্যেই যে, আনন্দ জীবনের সার্থকতার প্রমাণ আর দুঃখ মৃত্যুর ভ্রূকুটি। কথাটা একটু হেঁয়ালি ঠেকছে। আর যখন দেখা যায় আনন্দ জীবনের মূলচ্ছেদেও মাঝে মাঝে পাওয়া যায় তখন আরো হেঁয়ালি দাঁড়ায় বটে কথাটা। তবু আমার মনে হয় কথাটা সত্যি।

    আর এ ছাড়াও, অর্থাৎ এ যদি সত্যি না হয়, তবু আনন্দ ছাড়া জীবনের পথের পাতা আর আমাদের কেউ নেই। যারা কর্তব্য-কর্তব্য বা বিবেক-বিবেক বলে চেঁচিয়ে মরে তারা আমার মনে হয় একেবারে অন্ধ, না হয় একেবারে পাগল। কি কর্তব্য আর বিবেক কি বলে এটা যদি ঠিক করতেই পারা যাবে তাহলে আর এত গোল কেন? জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তো বিবেক তৈরি হয়েছে আর কর্তব্য-অকর্তব্য প্রাণ পেয়েছে।

    এই যে পাণ্ডাটি আমাদের, এ মাঝে-মাঝে ভুল করে, কিন্তু নাচার হয়ে আমাদের তাকেই সঙ্গে নিতে হবে পথ দেখাতে।

    এমনিতর অনেক কথা ভাবি কিন্তু কিছু ঠিক করতে পারি না। ছেলেবেলা একটা সহজ idealism ছিল, ভালো মন্দ বেশ সুস্পষ্টভাবে মনে বিভক্ত হয়ে থাকত। মনে হত পথটা জানি চলাটাই শক্ত—এখন দেখছি চলার চেয়ে পথটা জানা কম কথা নয়।

    এই ধর জীবনের একটা programme দিই। বিদ্যা জ্ঞান স্বাস্থ্য শক্তি সৌন্দর্য শিল্পসাধনা গেল প্রথম। দ্বিতীয় ভালবাসা পাবার। ধর পেলুম কি পেলুম না। তারপর আরো সাধনা পরিপূর্ণতার জন্যে। পরের উপকার, বিশ্বমানবের জন্যে দরদ, পৃথিবীজোড়া দুঃখ দারিদ্র্য হাহাকারের প্রতিকার চেষ্টায় যথাসাধ্য নিজেকে লাগান। তৃতীয় সারা জীবন ধরেই ভূমার জন্য তপস্যা, সারাজীবন ধরে দুঃখকে অবহেলা করবার ব্যর্থতাকে তুচ্ছ করবার মৃত্যুকে উপহাস করবার শক্তি অর্জন।

    বেশ! মন্দ কি। কিন্তু যত সহজ দেখাচ্ছে ব্যাপারটা, আসলে মোটই এমনি সহজে মীমাংসা হয় না। কি যে ভূমা আর কি যে পরিপূর্ণতা, কি যে মানুষের উপকার আর কি যে শিল্প আর জ্ঞান তা কি মীমাংসা হল?…

    না। মাথা গুলিয়ে যায়। আসল কথা হচ্ছে এই যে, আফ্রিকার সব চেয়ে আদিম অসভ্য Bushman-এর একটা বিংশ শতাব্দীর সম্পূর্ণ এরোপ্লেন পেলে যে অবস্থা হয় আমাদের এই জীবনটা নিয়ে হয়েছে তাই। আমরা জানি না এটা কি এবং কেন? এর কোথায় কি তা তো জানিই না, এর সার্থকতা ও উদ্দেশ্য কি তাও জানি না। হয়ত আমাদের আনাড়ি নাড়াচাড়ায় কোন একটা কল নড়ে-চড়ে পাখাটা একবার ঘুরে উঠছে, আমরা ভাবছি হাওয়া খাওয়াই এর উদ্দেশ্য, কি হয়ত পাখা লেগে কারুর গা হাত-পা কেটে যাচ্ছে তখন ভাবছি এটা একটা উৎপীড়ন।

    উপমাটা ঠিক হল না। কারণ অবস্থা ওর চেয়ে খারাপ এবং আফ্রিকার Bushman-এর কাছে একটা এরোপ্লেন যত জটিল ও অর্থহীন, অদ্ভুত জীবনটা আমাদের কাছে তার চেয়ে ঢের বেশি। মানুষ কত কোটি বছর পৃথিবীতে এসেছে এ নিয়ে বৈজ্ঞানিকদের তর্ক আজও শেষ হয়নি, সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি, কিন্তু জীবনের অর্থ যে আজও পাওয়া যায়নি এ নিয়ে মতভেদ নেই বোধ হয়।

    কবিত্ব করা যায় বটে এই বলে যে বোঝা যায় না বলেই জীবন অপরূপ মধুর সুন্দর, কিন্তু ভাই, মন হা হা করে। কি করি এই দুর্বোধ অনধিগম্য জীবন নিয়ে? যতদিন না মৃত্যু-শীতল হাত থেকে আপনি খসে পড়বে ততদিন এমনি করে ছুটোছুটি করে মরব আর কেঁদে কাটাব?

    তা ছাড়া শুধু সুখ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবার উপায়ও যদি থাকত। তাও ত নেই। আমি হয়ত কুৎসিত আর একজন চিররুগ্ন, আর একজন নির্বোধ, আর একজন অন্ধ বা পঙ্গু, আর একজন দীন ভিখারীর মেয়ে। বলছ আনন্দ না পাও আনন্দের সাধনা কর, কেমন? কিন্তু জন্মান্ধের দেখতে পাবার সাধনা খঞ্জের নৃত্যসাধনা করা বোকামি নয় কি? স্কুল জগতে যেমন দেখছি মনের জগতেও অমনি নেই কে বলতে পারে? বোবা হয়ে গানের সাধনা তপস্যা করতে বল কি? জীবনের কোন গানের সাধনায় আমি বোবা তাত জানি না। আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ি যদি হয় ত আমার গায়েই লাগবে।”

    কি হবে এত সব জিজ্ঞাসায় জর্জরিত হয়ে, সক্রেটিসীয় দার্শনিকের মত মৃত্যুরূপী পরিপূর্ণতার প্রতীক্ষা করে? তার চেয়ে চলো, মাঠে চলো, মোহনবাগানের খেলা দেখে আসি।

    মোহনবাগান। আজকাল আর যেন তেমন করে বাজে না বুকের মধ্যে। সেই ইস্ট ইয়র্কস নেই, ব্ল্যাক-ওয়াচ ডারহামস এইচ-এল-আই ডি-সি-এল-আই নেই, সেই মোহনবাগানও নেই। আজকালকার মোহনবাগান যেন মোহন সিরিজের উপন্যাসের মতই বাসি।

    কিন্তু সেসব দিনের মোহনবাগান মৃত দেশের পক্ষে সঞ্জীবনী ছিল। বলা বাহুল্য হবে না, রাজনীতির ক্ষেত্রে যেমন ছিল বন্দেমাতরম তেমনি খেলার ক্ষেত্রে ‘মোহনবাগান’। পলাশীর মাঠে যে কলঙ্ক অর্জন হয়েছিল তার স্থান হবে এই খেলার মাঠে। আসলে, মোহনবাগান একটা ক্লাব নয়, দল নয়, সে সমগ্র দেশ—পরাভূত, পদানত দেশ, সেই দেশের সে উদ্ধত বিজয়-নিশান।

    এ কথা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না যে মোহনবাগানের খেলার মাঠেই বাঙলা দেশের জাতীয়তাবোধ পরিপুষ্ট হয়েছিল। যে ইংরেজবিদ্বেষ মনে-মনে ধূমায়িত ছিল মোহনবাগান তাতে বাতাস দিয়ে বিশুদ্ধ আগুনের সুস্পষ্টতা এনে দিয়েছে। অত্যাচারিতের যে অসহায়তা থেকে টেররিজম জন্ম নেয় হয়তো তার প্রথম অঙ্কুর মাথা তুলেছি এই খেলার মাঠে। তখনো খেলার মাঠে সাম্প্রদায়িকতা ঢোকেনি, মোহনবাগান তখন হিন্দু-মুসলমানের সমান মোহনবাগান—তার মধ্যে নেবুবাগান কলাবাগান ছিল না। সেদিন যে ‘ক্যালকাটা’ মাঠের সবুজ গ্যালারি পুড়েছিল তাতে হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে হাত মিলিয়েছিল, একজন এনেছিল পেট্রল, আরেকজন এনেছিল দিয়াশলাই। সওয়ার পুলিশের উজ্জ্বল ঘোড়ার খুলে একসঙ্গে জখম হয়েছিলে দুজনে।

    সে-সব দিনে খেলার মাঠে ঢোকার লাঞ্ছনার কথা ছেড়ে দিই, খেলা মাঠে ঢুকে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে যে অবিচার অনুষ্ঠিত হতে দেখে দেশের লোক, তাতে রক্ত ও বাক্য দুইই তপ্ত হয়ে উঠেছে ইংরেজের বিরুদ্ধে। আর এই তপ্ত বাক্য আর রক্তই ঘরে-বাইরে স্বাধীন হবার সংকল্পে ধার জুগিয়েছে। সেসব দিনের রেফারিগিরি করা ইংরেজের একচেটে ছিল, আর সেই একচোখো রেফারি পদে-পদে মোহনবাগানকে বিড়ম্বিত করেছে। অবধারিত গোল দেবে মোহনবাগান, হুইসল দিয়েছে অফসাইড বলে। ফাউল করলে ক্যালকাটা, ফাউল দিলে না, যদি বা দিলে, দিলে মোহনবাগানের বিপক্ষে। কিছুতেই মোহনবাগানকে দাবানো যাচ্ছে না, বিনামেঘে বজ্রপাতের মত বলা-কওয়া-নেই দিয়ে বসল পেনাল্টি। একেকটা জোচ্ছরি এমন দুকান-কাটা ছিল যে সাহেবদের কানও লাল না হয়ে থাকতে পারত না। একবার এমনি ক্যালকাটার সঙ্গে খেলায় মোহনবাগানের বিরুদ্ধে রেফারি হঠাৎ পেনাল্টি দিয়ে বসল। যেটা খুবই অসাধারণ, ব্যাক থেকে কলভিন না বেনেট এল শট করতে। শট করে সে-বল সে গোলের দিকে না পাঠিয়ে কয়েক মাইল দূর দিয়ে পাঠিয়ে দিলে। সেটা রেফারির গালে প্রায় চড় মারার মত—দিবালোকের মত এমন নির্লজ্জ ছিল সেই পেনাল্টি। খেলোয়াড়ের পক্ষে রেফারিকে মারা অত্যন্ত গর্হিত কর্ম সন্দেহ নেই, কিন্তু তিক্তবিরক্ত হয়ে সেদিন যে ড্যালহৌসির মাঠে বলাই চাটুজ্জে ক্লেটন সাহেবকে মেরেছিল সেটা অবিস্মরণীয় ইতিহাস হয়ে থাকবে।

    শুধু রেফারি কেন, সমস্ত শাসকবংশই মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রী ছিল। নইলে ১৩০৩ সালে মোহনবাগানকে ক্যালকাটার বিরুদ্ধে শিল্ড-ফাইন্যালে খেলানো হত না। সেদিন রাত থেকে ভুবনপ্লাবন বা, সারা দিনে এক বিন্দু বিরাম নেই। মাঠে এক হাঁটু জল, কোথাও বা এক কোমর, হেদো না থাকলে সে-মাঠে অনায়াসে ওয়াটার-পোলো খেলা চলে। ফুটবল বর্ষাকালের খেলা সন্দেহ নেই, কিন্তু বর্ষারও একটা সীমা আছে সভ্যতা আছে। মোহনবাগান তখন দুর্ধর্ষ দল, ফরোয়াডে শরৎ সিঙ্গি, কুমার আর রবি গাঙ্গুলি—তিন তিনটে অভ্রান্ত বুলেট—আর ব্যাকে সেই দুর্ভেদ্য চীনের দেয়াল—গোষ্ঠ পাল। ক্যালকাটা ভাল করেই জানে শুকনো মাঠে এই দুর্বারণ মোহনবাগানকে কিছুতেই শায়েস্তা করা যাবে না। সুতরাং বানভাসা মাঠে একবার তাকে নামাতে পারলেই সে কোনঠাসা হয়ে যাবে! শেষদিকে বৃষ্টি বন্ধ করানো গেলেও খেলা কিছুতেই বন্ধ করানো গেল না। ক্যালকাটা কর্তৃপক্ষের সে অসঙ্গত অনম্রতা পরোক্ষে দেশের মেরুদণ্ডকেই আরো বেশি উদ্ধত করে তুললে। যে করে হোক পরাভূত করতে হবে এই দম্ভদৃপ্তকে। যে সহজ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এসেও ভুলতে পারে না সে উপবিতন, সে একতন্ত্রী।

    আর, মোহনবাগানকেও বলিহরি! খেলছিস ফুটবল, ছুটতে গিয়ে যেখানে প্রতিপদে আছাড় খেতে হবে, পায়ে বুট পরে নিস না কেন? উপায় কি, বুট পরলে আর ছুট দিতে পারব না, ছেলেবেলা থেকে অভ্যেস যে। দেশে-গাঁয়ে যখন বাতাবি নেবু পিটেছি তখন থেকে, সেই সুরুর থেকেই তো খালি-পা। জুতো কিনি তার সঙ্গতি কই? স্কুল-কলেজে যাবার জন্যে এক জোড়া জোটানোই কষ্টকর, তায় মাঠে-মাঠে লাফাবার জন্যে আরেক জোড়া? মোটে মা রাঁধেন না, তপ্ত আর পান্তা। দেখ না এই খালি পায়েই কেমন পক্ষিরাজ ঘোড়া ছুটাই। কেমন দিগ্বিজয় করে আসি। ভেব না, তাক লাগিয়ে দেব পৃথিবীর। খালি পায়েই ঘায়েল করব বুটকে। উনিশশো এগারো সনে এই খালি পায়েই শিল্ড এনেছিলাম। এবার পারলাম না, কিন্তু, দেখো, আবার পারব। যে সব তোমরা।

    যাব তো ঠিক, কিন্তু দুপুরের দিকে হঠাৎ কোথা থেকে এক টুকরো কালো মেঘ ভেসে এসেছে, অমনি নিমেষে সকলের মুখ কালো হয়ে গেল। হে মা কালীঘাটের কালী, হে মা কালীতলার কালী, তোমরা কে বেশি কালো জানি না, কিন্তু এ মেঘ তোমাদের গায়ে মেখে-মেখে মুছে দাও মা, তোমাদের কালো কেশে উড়িয়ে নিয়ে যাও কৈলাসে। কত তুকতাক, কত মানৎ, কত ইষ্টম, হাওয়া উঠুক, ধুলো উডুক, মেঘ লণ্ডভণ্ড হয়ে যাক। সব সময় প্রার্থনা কি আর শোনে! মেঘের পরে মেঘ শুধু জমাটই হতে থাকে, ঘন নৈরাশ্যের পর ঘনতর মনস্তাপ। সে যে কী দুঃসময় তা কে বা বোঝে, কাকে বা বোঝাই! ঘাড় গলা উঁচু করে শুধু আকাশের দিকে তাকানো আর মেঘের অবয়ব আর চরিত্র নিয়ে গবেষণা। পশ্চিমের মেঘ যে অমোঘ হয় এই মর্ন্তুদ সত্য চার আনার সবুজ গ্যালারিতে বসেই প্রথম উপলব্ধি করেছি। ফটিকজল পাখি আছে শুনেছি, এখন দেখলাম ফটিকরোদ পাখি। যারা জল চায় না রোদ চায়, মেঘের বদলে মরুস্থলীর জন্যে হা হা করে। হেঁকে বৃষ্টি আসবার ছড়া আছে, মেঘ-মারণমন্ত্রের প্রথম ছড়া সৃষ্টি হয় এই মোহনবাগানের মাঠে!

    ওরে মেঘ দূরে

    যা শিগগির উড়ে।

    নেবুর পাতা করমচা

    রকে বসে গরম চা!

    তবু, পাহাড় সরে তো মেঘ সরে না। ব্যঙ্গের ভঙ্গিমায় নেমে আসে বাস্তব বৃষ্টি। মনে হয় না ঘনকৃষ্ণ কেশ আকুলিত করে কেউ কোনো নীপবনে ধারাস্নান করছে। বরং মনে হচ্ছে দেশের মাথার উপর ঝরে পড়ছে দোর্দণ্ড অভিশাপ। আর যেমনি জল ঝরল অমনি মোহনবাগানের জৌলুস গেল ধুয়ে। আশ্চর্য, তখন তাতে না রইল আর বাগান, না বা রইল মোহ। তখন তার নাম গোয়াবাগান বা বাদুড়বাগান রাখলেও কোন ক্ষতি নেই।

    তবু কালে-ভদ্রে এমন একেকটা রোমহর্ষক খেলা সে জিতে ফেলে যে তার উপর আবার মায়া পড়ে, মন বসে। বারেবারে প্রতিজ্ঞা করে মাঠ থেকে বেরিয়েছি ও-হতচ্ছাড়ার খেলা আর দেখব না, আবার বারেবারেই প্রতিজ্ঞা-ভঙ্গ হয়েছে। তাই তেরোশো তিরিশের হারের পরও যে আবার মাঠে যাব—কল্লোলের দল নিয়ে—তা আর বিচিত্র কি। ওরা খেলে না জিতুক, আমরা অন্তত চেঁচিয়ে জিতব। জিত আমাদের হবেই, হয় খেলায় নয় এই একত্রমেলায়।

    “কল্লোলে”র লাগোয়া পূবের বাড়িতে থাকত আমাদের সুধীনসুধীন্দ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়। আমাদের দলের সর্বকনিষ্ঠ তরুণ উৎসাহী। সুগৌর-সুন্দর চেহারা, সকলের স্নেহভাজন। দলপতি স্বয়ং দীনেশ। যৌবনের সেই যৌবরাজ্যে বয়সের কোনো ব্যবধান ছিল না, আর মোহনবাগানের খেলা এমন এক ব্যাপার যেখানে ছেলে-বুড়ো শ্বশুরজামাই সব একাকার, সকলের এক ক্ষুরে মাথা মোড়ানো। অতি উৎসাহে সামনে কারু পিঠে হয়তো চাপড় দিয়েছি, ভদ্রলোক ঘড় ফেরাতেই চেয়ে দেখি পূজ্যপাদ প্রফেসর। উপায় নেই, সব এখন এক সানকির ইয়ার মশাই, এক গ্যালারির গায়েক-গায়েন। আরো একটু টানুন কথাটা, এক সুখদুঃখের সমাংশভাগী! তাই, ঐ দেখুন খেলা, বেশিক্ষণ ঘাড় ফিরিয়ে চোখ গোল করে পেছনে তাকিয়ে থাকার কোন মানে হয় না। বলা বাহুল্য, উত্তেজনার তরলে ঐ সব ছোটখাট রাগ-দুঃখের কথা ভুলে যেতে হয়, আর দর্শকদের বহু জন্মের সুকৃতির ফলে মোহনবাগান যদি একবার গোল দেয়, তখন সেই পূজ্যপাদ প্রফেসরও হাত-পা ছুড়ে চীৎকার করেন আর ছাত্রের গলা ধরে আনন্দ-মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খান। সব আবার এক খেয়ার জল হয়ে যায়।

    বস্তুত আট আনার লোহার চেয়ারে বসে কি করে যে ভদ্রলোক সেজে ফুটবল খেলা দেখা চলে তা আমরা কল্পনাও করতে পারতাম না। এ কি ক্রিকেট খেলা, যে পাঁচ ওভার ঠুকঠাক করবার পর খুঁচ করে একটা ‘গ্লান্স’ হবে, না, সাঁ করে একটা ‘ড্রাইভ’ হবে। এর প্রতিটি মুহূর্ত উদ্বেগে উত্তেজনায় ঠাসা, বল এখন বিপক্ষের গোলের কাছে, পলক না পড়তেই আবার নিজের নিজের হৃৎপিণ্ডের দুয়ারে। সাধ্য কি তুমি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকতে পার। এই, সেণ্টার কর, ওকে পাশ দে, ঐখানে থ্রু মার্—এমনি বহু নির্দেশ-উপদেশ দিতে হবে তোমাকে। শুধু তাই? কখনো কখনো শাসন-তিরস্কারও করতে হবে বৈ কি। খেলতে পারিস না তো নেমেছিস কেন, ল্যাকপ্যাক করছিস যে মাল খেয়ে নেমেছিস নাকি, বুক দিয়ে পড় গোলের কাছে, পা দু’খানা যায় তো সোনা দিয়ে মিউজিয়মে বাঁধিয়ে রাখব। তারপর কেউ যদি গোল ‘মিস’ করে, তখন আবার উল্লম্ফন : বেরিয়ে যা, বেরিয়ে যা মাঠ থেকে, গিন্নির আঁচল ধরে থাক গে। আর যদি রেফারি একটা অমনোমত রায় দেয় অমনি আবার উচ্চঘোষ : মারো, মারো শালাকে, থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দাও। এ সব মহৎ উত্তেজনা গ্যালারি ছাড়া আর কোথায় হওয়া সম্ভব? উঠে দাঁড়াতে না পারলে উল্লাস উল্লোল হওয়া যায় কি করে? তাই গ্যালারিতেই আমাদের কায়েমী আসন ছিল, মাঝ-মাঠে সেণ্টারের কাছাকাছি, পাঁচ কি ছয় ধাপ উপরে। প্রায়ই আমরা এক সঙ্গে যেতাম কল্লোল-আপিস থেকে—দীনেশদা, সোমনাথ, গোরা, নৃপেন, প্রেমেন, সুধীন আর আমি— কোনো কোনো দিন আশু ঘোষ সঙ্গে জুটত। আরো কিছু পরে অবোধ সান্যাল। অবিশ্যি যে সব দিন এগারোটা-বারোটায় এসে লাইন ধরতে হত সে সব দিন মাঠের বাইরে আগে থেকে সবাই একত্র হওয়া যেত না, কিন্তু মাঠে একবার ঢুকতে পেরেছ কি নিশ্চিন্ত আছ তোমার নির্ধারিত জায়গা আছে। নজরুল আরো পরে ঢোকে খেলার মাঠে এবং তখনো সে বেশ সন্ত্রান্ত ও খ্যাতিচিহ্নিত। তাই সে জনগণের গ্যালারিতে না এসে বসেছে গিয়ে আট আনার চেয়ারে, কিন্তু তার উল্লাস-উড্ডীন রঙিন উত্তরীয়টি ঠিক আছে। অবিশ্যি চাদর গায়ে দিয়ে খেলার মাঠে আসতে হলে অমনি উচ্চতর পদেই আসা উচিত। আমাদের তো জামা ফর্দা-ফাঁই আর জুতো চিচিংফাঁক। বৃষ্টি নেই এক বিন্দু, অথচ তিন ঘণ্টা ধস্তাধস্তি করে মাঠে ঢুকে দেখি এক হাঁটু কাদা। ব্যাপার কি? শুনলাম জনগণের মাথার ঘাম পায়ে পড়ে-পড়ে ভূমিতল কাদা হয়ে গেছে। সঙ্গে না আছে ছাতা না বা ওয়াটারপ্রুফ—শুধু এক চশমা সামলাতেই প্রাণান্ত। কনুয়ের ঠেলায় কত লোকের চশমা যে নাসিকাচ্যুত হয়েছে তার ইতি-অন্ত নেই। আর চক্ষুলজ্জাহীন চশমাই যদি চলে যায় তবে আর রইল কি? কখনো-কখনো ভূমিপৃষ্ঠ থেকে পাদস্পর্শ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, জলে ভাসা জানি, এ দেখছি স্থলে ভাসা। নগ্ন পদের খেলা দেখতে রিক্ত হাতে শূন্য মাথায় কখনো ব নগ্ন পদেই মাঠে ঢুকেছি।

    শুধু গোকুলকেই দেখিনি মাঠে, তার কারণ “কল্লোলে”র দ্বিতীয় বছরেই তার অসুখ করে আর সে-অসুখ আর তার সারে না। কিন্তু যতদুর মনে পড়ে শৈলজা একদিন গিয়েছিল আর চুপি-চুপি জিগগেস করেছিল, ‘গোষ্ঠ পাল কোন জন?’ আরো পরে, বুদ্ধদেব বসুকে একদিন নিয়ে গিয়েছিলাম, সে বলেছিল, ‘কর্নার আবার কাকে বলে?’ শুনেছি ওরা আর দ্বিতীয় দিন মাঠে যায়নি।

    তবু তো এখন কিউ হয়েছে, আগে-আগে ঘোড়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে ঢুকতে হয়েছে, মাঝদিকে গুণ্ডার কাছ থেকে বেশি দরে টিকিট কিনে। আগে-আগে গ্যালারির বাইরে কাঁটা-তারের বন্ধন ছিল না, বাইরের কত লোককে যে কত জনে টেনে তুলেছে ভিতর থেকে তার লেখাজোখা নেই। যাকে টেনে তুলছে সে যে সব সময়ে পরিচিত বা আত্মীয়বন্ধু তার কোনো মানে নেই, দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে তাও বলা যায় না, তবু নিঃস্বার্থভাবে পরোপকার করা—এই একটা নিষ্কাম আনন্দ ছিল। এখন কাঁটাতারের বড় কড়াকড়ি, এখন কিউর লাইন এসে দাঁড়ায় হল-য়্যাণ্ড-য়্যাণ্ডার্সন পর্যন্ত, খেলা দেখায় আর সেই পৌরুষ কই।

    নরক গুলজার করে খেলা দেখতাম সবাই। উল্লাসজ্ঞাপনের যত রকম রীতিপদ্ধতি আছে সব মেনে চলতাম। এমন কি পাশের লোকের হাত থেকে কেড়ে ছাতা ওড়ানো পর্যন্ত। বৃষ্টি যদি নামত তো চেঁচিয়ে উঠতাম সবার সঙ্গে : ছাতা বন্ধ, ছাতা বন্ধ। ঘাড় সোজা রেখে ভিজতাম। শেষকালে যখন চশমার কাচ মুছবার জন্যে আর কোনো কাপড় থাকত না তখনই বাধ্য হয়ে কারু ছাতার আশ্রয়ে বসে পড়তে হত। খেলা যদি দেখতে চাও তো বসে থাকো ভিজে বেরাল হয়ে। মনে আছে এমনি এক বর্ষার মাঠে হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে এক ছাতার তলায় গুড়ি মেরে বসেছিলাম সারাক্ষণ। বৃষ্টির জলের চেয়ে পার্শ্ববর্তী ছাতার জলই যে বেশি বিরক্তিকর মর্মে মর্মে বুঝেছিলাম সেদিন।

    কিন্তু যদি আকাশভরা সোনার রোদ থাকে, মাঠ শুকনো খটখটে, তবে সব কষ্ট সহ্য করবার দায়ধারী আছি। আর সে গগনদাহন গ্রীষ্মের কষ্টই কি কম! তারপর যদি দুপুর থেকে বসে থেকে মাথার রোদ ক্রমে-ক্রমে মুখের উপর তুলে আনতে হয়। কিন্তু, খবরদার, ভুলেও জল চেও না, জল চাইতে না মেঘ এসে উদয় হয়! যা দেবী সর্বভূতেষু তৃষ্ণারূপেন সংস্থিতা তার ধ্যান কর। বরফের টুকরো বা কাটা শশা। বা বাতাবিনেবু না জোটে তো শুকনো চীনেবাদাম খাও। আর যদি ইচ্ছে করো আলগোছে কারো শূন্য পকেটে শুকনো খোসাগুলো চালান করে দিয়ে বকধার্মিক সাজো।

    যেমনি দুই দিক থেকে দুই দল শূন্যে বল হাই কিক মেরে মাঠে নামল অমনি এক ইঙ্গিতে সবাই উঠে দাঁড়াল গ্যালারিতে। এই গ্যালারিতে উঠে দাঁড়ানো নিয়ে বন্ধুবর শচীন করকে একবার কোন সাপ্তাহিকে আক্ষেপ করতে দেখেছিলাম। যতদূর মনে পড়ে তার বক্তব্য ছিল এই, যে, গ্যালারিতে যে যার জায়গাই বসেই তো দিব্যি খেলা দেখা যায়, তবে মিছিমিছি কেন উঠে দাঁড়ানো? শুধু যে যোগ্য উত্তেজনা দেখানোর তাগিদেই উঠে দাঁড়াতে হচ্ছে তা নয়, উঠে দাঁড়াতে হচ্ছে আট আনার চেয়ার ও চার আনার গ্যালারির মধ্যেকার জায়গায় লোক দাঁড়িয়েছে বলে। বাধ্য হয়েই তাই গ্যালারির প্রথম ধাপের লোককে দাঁড়াতে হচ্ছে এবং তার ফলে একে-একে অন্যান্য ধাপ। তাছাড়া বসে বসে বড় জোর হাততালি দেওয়ার মত খেলা তো এ নয়। উঠে দাঁড়াতেই হবে তোমাকে, অন্তত মোহনবাগান যখন গোল দিয়েছে। কখনো-কখনো সে চীৎকার নাকি বালি থেকে বালিগঞ্জ পর্যন্ত শোনা গেছে। সে চীৎকার কি বসে-বসে হয়?

    তবু এত করেও কি প্রত্যেক খরার দিনেই জেতাতে পেরেছি মোহনবাগানকে? একেবারে ঠিক চূড়ান্ত মুহূর্তে অত্যন্ত অনাবশ্যক ভাবে হেরে গিয়েছে দুর্বলতর দলের কাছে। কুমোরটুলি এরিয়ান্স হাওড়া ইউনিয়নের কাছে। ঠিক পারের কাছে নিয়ে এসে বানচাল করে দিয়েছে নৌকো। সে সব দুর্দৈবের কথা ভাবতে আজো নিজের জন্যে দুঃখ হয়—সেই ঝেড়ো কাক হয়ে ম্লান মুখে বাড়ি ফিরে যাওয়া। চলায় শক্তি নেই, রেস্তরাঁয় ভক্তি নেই—এত সাধের চীনেবাদামে পর্যন্ত স্বাদ পাচ্ছি না—সে কি শোচনীয় অবস্থা! ওয়ালফোর্ডের ছাদ-খোলা দোতলা বাস-এ সান্ধ্যভ্রমণ তখন একটা বিলাসিতা, তাতে পর্যন্ত মন ওঠে না, ইচ্ছে করে ট্রামের সেকেণ্ড ক্লাশে উঠে মুখ লুকোই। কে একজন যে মোহনবাগানের হেরে যাওয়ায় আত্মহত্যা করেছিল তার মর্মবেদনাটা যেন কতক বুঝতে পারি। তখনই প্রতিজ্ঞা করি আর যাব না ঐ অভাগ্যের এলাকায়। কিন্তু হঠাৎ আবার কোন সুদিনে সমস্ত সংকল্প পিটটান দেয়। আবার একদিন পাঞ্জাবির ঘড়ির পকেটে গুনে-গুনে পয়সা গুঁজি। বুঝতে পারি মোহনবাগান যত না টানে, টানে সেন্টারের কাছাকাছি সেই কল্লোলের দল।

    আচ্ছা, এরিয়ান্স হাওড়া ইউনিয়ন—এরাও তো দিশি টিম, তবে এরা জিতলে খুশি হই না কেন, কেন মনে-মনে আশা করি এরা মোহনবাগানকে ভালবেসে গোল ছেড়ে দেবে, আর গোল ছেড়ে না দিলে কেন চটে যাই? যখন এরা সাহেব টিমের সঙ্গে খেলছে তখন অবিশ্যি আছি আমরা এদের পিছনে, কিন্তু মোহনবাগানের সঙ্গে খেলতে এসেছ কি খবরদার, জিততে পাবে না, লক্ষ্মী ছেলের মত লাড্ডু খেয়ে বাড়ি ফিরে যাও। মোহনবাগানের ঐতিহ্যকে নষ্ট কোনো না যেন।

    রোজ-বোজ খেলা দেখার ভিড় ঠেলার চেয়ে মোহনবাগানের মেম্বর হয়ে যাওয়া মন্দ কি। কিন্তু মেম্বর হয়েও যে কি দুর্ভোগ হতে পারে তারও দৃষ্টান্ত দেখলাম। একদিন কি একটা খবরের কাগজের স্তম্ভকাপানো বিখ্যাত খেলায় দেখতে পেলাম তিন-চারজন মেম্বর মাঠে না ঢুকে বাইরে বসে সিগারেট ফুঁকছে, তাদের ঘিরে ছোট্ট একটি ভিড়। বিশ্বসাতীত ব্যাপার—ভিতরে ঐ চিত্ত-চমকানো খেলা, আকাশঝলসানো চীৎকার—অথচ এ কয়জন জাঁদরেল মেম্বর বাইরে ঘাসের উপর বসে নির্লিপ্ত মুখে সিগারেট খাচ্ছে আর মন্দ মন্দ পা দোলাচ্ছে। ভিড়ের থেকে একজন এগিয়ে গিয়ে বিস্মিত স্বরে জিগগেস করলে, ‘এ কি, আপনারা মাঠে ঢোকেন নি যে?’ ভদ্রলোকের মধ্যে একজন বললে: ‘আমরা তো কেউ মাঠে ঢুকি না, বাইরেই বসে থাকি চিরদিন। আমরা non-seeing মেম্বর।’ তার মানে? তার মানে, আমরা অপয়া, অনামুখো, অলক্ষুণে, আমরা মাঠে ঢুকলেই মোহনবাগান নির্ঘাৎ হেরে যায়, মেম্বর হয়েও আমরা তাই খেলা দেখি না, বাইরে বসে যাতে ঘাস কাটি আর চীৎকার শুনি।

    এই অপূর্ব স্বার্থশূন্যতার কথা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার যোগ্য। বাড়িতে বা অন্য কোথাও গেলে বা বসে থাকলে চলবে না, খেলার মাঠে আসতে হবে ঠিক, আর খেলার মাঠে অনায়াসে ঢোকবার হকদার হয়েও ঢুকবে না কিছুতেই, বাইরে বসে থাকবে এককোণে—এমন আত্মত্যাগের কথা এ যুগের ইতিহাসে বড় বেশি শোনা যায়নি। আরো একটা উদাহরণ দেখেছি স্বচক্ষে একটি খঞ্জ ভদ্রলোকের মাধ্যমে। কি হল, পা গেল কি করে? গাড়ি-চাপা? ভদ্রলোক কঠিন মুখে করুণ ভাবে হাসলেন। বললেন, ‘না। ফুটবল-চাপা।’ সে কি কথা? আর কথা নয়, কাজ ঠিক আদায় করে নিয়েছেন ষোল আনা। শুধু আপনাকে বলছি না, দেশের লোককে বলছি। সবাই বলেছিলেন ফুটবল মাঠে পা-খানা রেখে আসতে, আপনাদের কথা শুনে তাই রেখে এসেছি। কই এখন সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে রাখবেন না যাদুঘরে?

  • এগার

    এগার

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    এগার

    ফুটবল খেলার মাঠে দু’জন সাহিত্যিককে আমরা আবিষ্কার করি। শিবরাম চক্রবর্তী সেন্টারের কাছে গ্যালারির প্রথম ধাপে দাঁড়াত—তাকে টেনে আনতে দেরি হত না আমাদের দশচক্রে। গোলগাল নধরকান্তি চেহারা, লম্বা চুল পিছনের দিকে ওলটানো। সমস্তটা উপস্থিতি রসে-হাস্যে সমুজ্জল। তার মধ্যে শ্লেষ আছে কিন্তু দ্বেষ নেই—সে সরসতা সরলতারই অন্য নাম। “ভারতী”তে অদ্ভুত কত গুলো ছোট গল্প লিখে অস্বাভাবিক খ্যাতি অর্জন করেছে, আর তার কবিতাও স্পষ্টস্পর্শ প্রেমের কবিতা—আর সে-প্রেম একটু জ্বর হলেও জল-বার্লি-খাওয়া প্রেম নয়। শিবরামের সত্যিকারের আবির্ভাব হয় তার একান্ত নাটিকায়—“যেদিন তারা কথা বলবে” আজকালকার গণসাহিত্যের নির্ভুল পূর্বগামী। সেই স্তব্ধতার দেশে বেশি দিন না থেকে শিবরাম চলে এল উজ্জ্বল-উচ্ছল মুখরতার দেশে। কলহাস্যের মুখরতা। শিবরাম হাসির গল্পে কায়েমী বাসা বাঁধলে। বাসা যেমন পাকা, স্বত্ব তেমনি উঁচুদরের।

    হাসির প্রাণবন্ত প্রস্রবণ এই শিবরাম। সব চেয়ে সুন্দর, সবাইকে যখন সে হাসায় তখন সেই সঙ্গে সঙ্গে নিজেও সে হাসে এবং সবাই চেয়ে বেশি হাসে। আর, হাসলে তাকে অত্যন্ত সুন্দর দেখায়। গালে কমনীয় টোল পড়ে কিনা জানি না, কিন্তু তার মন যে কী অগাধ নির্মল, তার পরিচ্ছন্ন ছায়া তার মুখের উপর ভেসে ওঠে। পরকে নিয়ে হয়ত হাসছে তবু সর্বক্ষণ সেই পরের উপর তার পরম মমতা! শিবরামের কোন দল নেই দ্বন্ধও নেই। তার হাসির হাওয়া জন্যে প্রত্যেকের হৃদয়ে উন্মুক্ত নিমন্ত্রণ। শিবরামই বোধ হয় একমাত্র লোক যে লেখক হয়েও অন্যের লেখার অবিমিশ্র প্রশংসা করতে পারে। আর সে-প্রশংসায় এতটুকু ফাঁক বা ফাঁকি রাখে না। আজকালকার দিনে লেখক, লেখক হিসেবে যত না হোক, সমালোচক হিসেবে বেশি বুদ্ধিমান। তাই অন্য লেখককে পরিপূর্ণ প্রশংসা করতে তার মন ছোট হয়ে আসে। হয়ত ভাবে, অন্যকে প্রশংসা করলে নিজেই ছোট হয়ে গেলাম। আর যদি বা প্রশংসা করতে হয় এমন কটা ‘কিন্তু’ আর ‘যদি’ এনে ঢোকাতে হবে যাতে বোঝা যাবে লেখক হিসাবে তুমি বড় হলেও বোদ্ধা হিসেবে আমি আরো বড়। মানে প্রশংসা করতে হলে শেষ পর্যন্ত আমিই যেন জিতি, পাঠকেরা আমাকেই যেন প্রশংসা করে। বুদ্ধির সঙ্গে এমন সংকীর্ণ আপোষ নেই শিবরামের। যদি কোনো লেখা তার মনে ধরে সে মন মাতিয়ে প্রশংসা করবে। আর প্রশংসা করবে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, নিজের জন্যে এতটুকু সুখ-সুবিধে না রেখে। এই প্রশংসায় তার নিজের বাজার উঠে গেল কিনা তার দিকে না তাকিয়ে। যতদূর দেখেছি, শিবরামই তাদের মধ্যে এক নম্বর, যারা লেখক হয়েও অন্য লোকের লেখা পড়ে, ঠিকঠাক মনে রাখে ও গায়ে পড়ে ভালো লেখার সুখ্যাতি করে বেঁড়ায়।

    কিন্তু এক বিষয়ে সে নিদারুণ গম্ভীর। অন্তত সে-সব দিনে থাকত। হাইকোর্টের আদিম বিভাগে কি এক মহাকায় মোকদ্দমা হচ্ছে তার ফলাফল নিয়ে। অবিশ্যি অফল নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই, কেননা অফলে যেমনটি আছে তেমনটিই থাকবে—মুক্তারামবাবুর স্টিটে মেসে সেই ‘তক্তারামে’ শোওয়া আর ‘শুক্তারাম ভক্ষণ—এ তার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। কিন্তু ফল হলেই বিপদ। তখন নাকি অর্ধেক বা আর সেই সঙ্গে আস্ত একটি অর্ধাঙ্গিনী জুটে যাবার ভয়। মোকদ্দমায় যে ফল হয়নি তা শিবরামকে দেখলেই বোঝা যায়। কেননা এখনো সে ঐ একই আছে, দেড় হয়নি; আর মুক্তির আরামে আছেও সেই মুক্তারামবাবুর মেসে। সারাজীবনে যে একবারও বাসা বদল করে না সে নিঃসন্দেহ খাঁটি লোক।

    মাঠে ফুটবল খেলা হচ্ছে, আর শিবরামের মুখে চলেছে শব্দের খেলা। কুমার হয়তো একটা ভুল পাশ দিলে, অমনি বলে উঠল ‘কু-মার’; কিংবা গোষ্ঠর সঙ্গে প্রবল ধাক্কা লেগে ছিটকে পড়ল বিপদের খেলোয়াড়, অমনি বলে উঠল : ‘এ বাবা, শুধু গোষ্ঠ নয়—গোস্ত’। মাঠের বাইরেও এমনি খেলা চালাত অবিরাম। জুৎসই একটা নাম পেলেই হল—শত্রু-মিত্র আসে যায় না কিছু। নিজের নামের মধ্যে কি মজার pun রয়েছে শুধু সেই সম্বন্ধেই উদাসীন।

    আরেক আবিষ্কার আমাদের বিশুদা-বিশ্বপতি চৌধুরী। একখানা বই লিখে যে বাংলা সাহিত্যে জায়গা করে নিয়েছে। ‘ঘরের ডাক’-এর কথা বলছি—খেলার মাঠেও তার সেই ঘরের ডাক, হৃদয়ের ডাক। সহজেই আমাদের দলের মধ্যে এসে দাঁড়াত আর হাসাত অসম্ভব উচ্চ গ্রামে। হাত অথচ নিজে এতটুকু হাসত না—মুখ-চোখ নিদারুণ নিলিপ্ত ও গম্ভীর করে রাখত। সমস্ত হাসির মধ্যে বিশুদার সেই গাম্ভীর্যটাই সব চেয়ে বেশি হাস্যোদ্দীপক। শিবরাম শুধু বক্তা, কিন্তু বিশুদা অভিনেতা। শিবরামের গল্প বাস্তব কিন্তু বিশুদার গল্প একদম বানানো। অথচ, এ যে বানানো তা তার চেহারা দেখে কারু সন্দেহ করার সাধ্য নেই। বরং মনে হবে, এ যেন সদ্য-সদ্য ঘটেছে আর বিশুদা স্বয়ং প্রত্যক্ষদর্শী। এমন নিষ্ঠুর ও নিখুঁত তার গাম্ভীর্য। উদ্দাম কল্পনার এমন মৌলিক গল্প রচনার মধ্যেও বাহাদুরি আছে। আর সব চেযে কেরামতি হচ্ছে, সে-গল্প বলতে গিয়ে নিজে এতটুকু না-হাসা। মনে হয়, এ যেন মোহনবাগান গোল দেবার পর গো–ল না-বলা। শুনলে হয়তো সবাই আশ্চর্য হবে, মোহনবাগান গোল দেয়ার পরেও বিশুদা গম্ভীর থেকেছে।

    তার গাম্ভীর্যটাই কত বড় হাসির ব্যাপার, একদিনের একটা ঘটনা স্পষ্ট মনে আছে। খেলার শেষে মাঠ পেরিয়ে বাড়ি ফিরছি, সঙ্গে বিশুদা। সেদিন মোহনবাগান হেরে গেছে যেন কার সঙ্গে, সকলের মন-মেজাজ অত্যন্ত কুৎসিত। বিশুদা যেমন-কে-তেমন গম্ভীর। কতদূর এগোতেই সামনে দেখি কতকগুলো ছোকরা দুই দলে ভিন্ন হয়ে গিয়ে একে-অন্যকে নৃশংসভাবে গালাগাল করছে। আর এমন সে গালাগাল যে কালাকাল মানছে না। তার মানে, একাল নিয়ে তত নয়, যত পূর্বপুরুষদের কাল নিয়ে তাদের মতান্তর। প্রথম দলের দিকে এগিয়ে গেল বিশুদা। স্বাভাবিক শান্ত গলায় বললে, ‘কি বাবা, গালাগাল দিচ্ছ কেন?’ বলেই বলা-কওয়া নেই কতকগুলি চান্ত গালাগাল বিশুদা তাদের লক্ষ্য করে ছুড়ে মারল। তারা একদম ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল—কে এই লোক! পরমুহূর্তেই অপর দলকে লক্ষ্য করে বিশুদা বললে, ‘সব ভদ্রলোকের ছেলে তোমরা, গালাগাল করবে কেন?’ বলেই ওদের দিকে কতকগুলো গালাগাল ঝাড়লে। প্রথম দল তেড়ে এল বিশুদার দিকে : ‘আপনি কে মশাই আমাদের গালাগাল দেন?’ দ্বিতীয় দলও মারমুখো : ‘আপনি গালাগাল করবার কে? আপনাকে কি আমরা চিনি, না, দেখেছি?’ দেখতে দেখতে দু দল একত্র হয়ে বিশুদাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হল। বিশুদার গম্ভীর মুখে দুষ্টু একটু হাসি। করজোড় করে বললে, ‘বাবারা, আর কেন? যে ভাবেই হোক, দু দলকে মিলিয়ে দিয়েছি তো! যাও বাবারা বাড়ি যাও। এমনি একত্র হয়ে থাক—মাঠের খেলায় দেশের খেলায় সব খেলায় জিততে পারবে। আমার শুধু মিলিয়ে দেওয়া কথা। নইলে, আমি কেউ না।’

    ছেলে দল শুদ্ধু হেসে উঠল। বিশুদার ধোপে কোথাও যায় এতটুকু ঝগড়াঝাটি রইল না।

    বিশ্বপতি আর শিবরাম “কল্লোলে” হয়তো কোনোদিন লেখেনি কিন্তু দু জনেই “কল্লোলে”র বন্ধু ছিল নিঃসংশয়। মনোভঙ্গির দিক থেকে শিবরাম তো বিশেষ সমগোত্র। কিন্তু এমন একজন লোক আছে যে আপাতদৃশ্যে “কল্লোলে”র প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও প্রকৃতপক্ষে “কল্লোলে”র স্বজনসুহৃদ। সে কাশীর সুরেশ চক্রবর্তী—“উত্তরা”র উত্তরসাধক।

    আমরা তার নাম রেখেছিলাম ‘চটপটি’। ছোটখাটো মানুষটি, মুখে অনর্গল কথা, যেন তপ্ত খোলায় চড়বড় করে খই ফুটছে—একদণ্ড এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে নারাজ, হাতে-পায়ে অসামান্য কাজকে সংক্ষিপ্ত করার অসম্ভব ক্ষিপ্রতা। এক কথায় অদম্য কর্মশক্তির অন্য প্রতিমান। একদিন “কল্লোলে”র কনওয়ালিশ স্ট্রিটের দোকানে এসে উপস্থিত—সেই সর্বত্রগামী পবিত্রর সঙ্গে। কি ব্যাপার? প্রবাসী বাঙালিদের তরফ থেকে দুর লক্ষ্ণৌ থেকে মাসিকপত্রিকা বের করা হয়েছে—চাই “কল্লোলে”র সহযোগ। সম্পাদক কে? সম্পাদক লক্ষৌর সার্থকনামা ব্যারিস্টার—এ পি সেন—মানে, অতুলপ্রসাদ সেন আর প্রথিতযশা প্রফেসর রাধাকমল মুখোপাধ্যায়। তবে তো এ মশাই প্রৌঢ়পন্থী কাগজ, এর সঙ্গে আমাদের মিশ খাবে কি করে? আমরা যে আধুনিক, অমল হোমের প্রশস্তি-অনুসারে “অতি-আধুনিক”। আমরা যে উগ্রজ্বলন্ত নবীন।

    কোনো দ্বিধা নেই। “উত্তরা” নিরুত্তর থাকবে না তোমাদের তারুণ্যের বাণীতে। যেমন আমি, সুরেশ চক্রবর্তী, ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের বন্ধুর ডাকে নিমেষেই সাড়া দিয়ে উঠেছি। কে তোমাদের পথ আটকাবে, কে মুখ ফিরিয়ে নেবে অস্বীকারে? আর যা আন্দাজ করেছ তা নয়। অতুলপ্রসাদ অবিশ্যি ভালোমানুষ, বাংলা সাহিত্যের হালচাল সম্বন্ধে বিশেষ ওয়াকিবহাল নন। মোটা আয়ের প্র্যাকটিস, তাই নিয়ে মেতে থাকেন। যখন এক-আধটু সময় পান, হালকা গান বাঁধেন। (হালকা মানে গড়ন-পিটনটা হালকা, কিন্তু সে গভীরসঞ্চারী। সে সোজা হৃদয়ের থেকে উঠেছে বলেই বোঝা যায় তার হৃদয়ও কত গভীর আর কত গাঢ়।) তিনি শুধু নাম দিয়েই খালাস। প্রবাসী বাঙালির উন্নতি চান, আর তার মতে উন্নতির প্রথম সোপানেই মাতৃভাষায় একখানি পত্রিকা দরকার। তাকে তোমরা বিশেষ ধোরো না। আর রাধাকমল? বয়সে তিনি প্রবীণ হলেও জেনে রাখো, তিনি সাহিত্য-প্রগতিতে বিশ্বাসী, নতুন লেখকদের সমর্থনে উদ্যতাস্ত্র। তাকে আপন লোক মনে কোরো। আর অত উচ্চদৃষ্টি কেন? সামনে এই বেঞ্চিতে যে সশরীরে বসে আছি আমি, তাকে দেখ। যে আসল কর্ণধার, যে মূলকারক।

    সুরেশ চক্রবর্তী কি করে এল সাহিত্যে, কবে কখন কি লিখল, বা আদৌ কিছু লিখেছে কিনা, প্রশ্ন করার কথাই কারু মনে হল না। সাহিত্যে তার আবির্ভাবটা এত স্বভাবসিদ্ধ। সাহিত্য তার প্রাণ, আর সাহিত্যিকরা তার প্রাণের প্রাণ। সব সাহিত্য আর সাহিত্যিকের খবর-অখবর তার নখদর্পণে। সে যে বিশেষ করে অতি-আধুনিকদের নিমন্ত্রণ করেছে এতেই তো প্রমাণ হচ্ছে তার উদার ও অগ্রসর সাহিত্যবুদ্ধির। যদিও কাশীতে সে থাকে, আসল কাশীবাস তো সৎসঙ্গে। আমাদের যখন ডাকছে, বললাম সুরেশকে, তার কাশীবাস এতদিনে সফল হল।

    ‘শেষকালে কাশীপ্রাপ্তি না ঘটে।’ আমাদের মধ্যে থেকে কে টিপ্পনি কাটলে।

    না, তেরোশ বত্রিশে যে “উত্তরা” বেরিয়েছিল তা এখনো টিকে আছে। “কল্লোলে-কালিকলম-প্রগতি” আর নেই, কিন্তু “উত্তরা” এখনো চলছে। এ শুধু একটা আশ্চর্য অনুষ্ঠান নয়, সুরেশ চক্রবর্তীই একটা আশ্চর্য প্রতিষ্ঠান। সাহিত্যের কত হাওয়া-বদল হল, কত উত্থান-পতন, কিন্তু সুরেশের নড়চড় নেই, বিচ্ছেদ-বিরাম নেই। ঝড়ের রাতেও নির্ভীক দীপস্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে উপেক্ষিত নিঃসঙ্গতায়।

    “উত্তরা”র দু’জন নিজস্ব লেখক ছিল; যদিও তারা মার্কামারা নন, মননে-চিন্তনে তারা তর্কাতীত আধুনিক, আর আধুনিক মানেই প্রগতিপন্থী। প্রগতি মানে প্রচলিত মতানুগত না হওয়া। দুজনেই পণ্ডিত, শিক্ষাদাতা; কিন্তু শুনতে যেমন জবড়জং শোনাচ্ছে, তাদের মনে ও কলমে কিন্তু একটুকুও জং ধরেনি। রূপালি রোদে ঝিলিক-মারা ইস্পাতের মত তাতে যেমন বুদ্ধির ধার তেমনি ভাবের জেল্লা। এক হচ্ছেন লক্ষ্ণৌর ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, আর হচ্ছেন কাশীর মহেন্দ্র রায়। একজন বাক্যকুশল, আরেকজন সুমিতাক্ষর। কিন্তু দুজনেই আসর-জমানো মজলিসী লোক—আধুনিকতার পৃষ্ঠপোষক। একে একে সবাই তাই ভিড়ে গেলাম সে-আসরে। নজরুল, জগদীশ গুপ্ত, শৈলজা, প্রেমেন, প্রবোধ, বুদ্ধদেব, অজিত। ঝকঝকে কাগজে ঝরঝরে ছাপা—“উত্তরা” সাজসজ্জায়ও উত্তমা। সবাইরই মন টানল।

    সব চেয়ে বড় ঘটনা, সাহিত্যের এই আধুনিকতা প্রথম প্রকাশ্য অভিনন্দন পায় এই প্রবাসী “উত্তরা”য়। সেই উদ্যোগ-উদ্ভবের গোড়াতেই। আর, স্বয়ং রাধাকমলের লেখনীতে। দুঃসাহসিক আন্তরিকতায় তার সমস্ত প্রবন্ধটা অত্যন্ত স্পষ্ট ও সত্য শোনাল। শুধু ভাবের নবীনতাই নয়, ভাষার সজীবতাকেও তিনি প্রশংসা করলেন। চারিদিকে হৈ-চৈ পড়ে গেল। আমরা মেতে উঠলাম আর আমাদের বিরুদ্ধ দল তেতে উঠল। যার শক্তি আছে তার শত্রুও আছে। শত্রুতাটা হচ্ছে শক্তিপূজার নৈবেদ্য। আমাদের নিন্দা করার মানেই হচ্ছে আমাদের বন্দনা করা।

    মোহিতলালকে আমরা আধুনিকতার পুরোধা মনে করতাম। এক কথায়, তিনিই ছিলেন আধুনিকোত্তম। মনে হয়, যজন-যাজনের পাঠ আমরা তার কাছে থেকেই প্রথম নিয়েছিলাম। আধুনিকতা যে অর্থে বলিষ্ঠতা, সত্যভাষিতা বা সংস্কারসাহিত্য তা আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম তার কবিতায়। তিনি জানতেন না আমরা তাঁর কবিতার কত বড় ভক্ত ছিলাম, তার কত কবিতার লাইন আমাদের মুখস্ত ছিল।

    “হে প্রাণ-সাগর! তোমাতে সকল প্রাণের নদী

    পেয়েছে বিরাম, পথের প্লাবন-বিরোধ রোধি’!

    হে মহামৌনি, গহন তোমার চেতনতলে

    মহাবুভুক্ষাবারণ তৃপ্তি-মন্ত্র জ্বলে!

    ধন্বন্তরি! মন্বন্তর-মন্থ-শেষ–

    তব করে হেরি অমৃতভাণ্ড-অবিদ্বেষ!”

    কিংবা

    “পাপ কোথা নাই—গাহিয়াছে ঋষি, অমৃতের সন্তান–

    গেয়েছিল আলো বায়ু নদীজল তরুলতা—মধুমান!

    প্রেম দিয়ে হেথা শোধন-করা যে কামনার সোমরস,

    সে রস বিরস হতে পারে কভু? হবে তার অপযশ?”

    ফুটপাতের উপর গ্যাসপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি যখন আমাদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কবিতা পড়িয়ে শোনাতেন তখন আবৃত্তির বিহ্বলতায় তার দুই চোখ বুজে যেত। আমরা কে শুনছি বা না শুনছি, বুঝছি বা না বুঝছি, এটা রাস্তা না বাড়ি, সে-সব সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ছিল, তিনি যে তদশতচিত্তে আবৃত্তি করতে পারছেন সেইটেই তার বড় কথা। কিন্তু যদি মুহূর্তমাত্র চোখ মেলে দেখতেন সামনে, দেখতে পেতেন আমাদের মুখে লেশমাত্র বিরক্তি নেই, বরং ভক্তির নম্রতায় সমস্ত মুখ-চোখ গদ্গদ হয়ে উঠেছে। স্থান ও সময়ের সীমাবোধ সম্বন্ধে তিনি কিঞ্চিৎ উদাসীন হলেও তার কবিতার চিত্তহারিতা সম্বন্ধে আমরা বিন্দুমাত্র সন্দিহান ছিলাম না।

    তিনি নিজেও সেটা বুঝতেন নিশ্চয়। তাই একদিন পরমপ্রত্যাশিতের মত এলেন আমাদের আস্তানায়, শোপেনহাওয়ার-এর উদ্দেশে লেখা তার বিখ্যাত কবিতা “পান্থ” সঙ্গে নিয়ে। সেই কবিতা “আধুনিকতায়” দেদীপ্যমান। “কল্লোলে” বেরিয়েছিল তেরোশ বত্রিশের ভাদ্র সংখ্যায়। আর এ কবিতা বের করতে পারে “কল্লোল” ছাড়া আর কোনো কাগজ তখন ছিল না বাংলাদেশে।

    “সুন্দরী সে প্রকৃতিরে জানি আমি—মিথ্যা সনাতনী!

    সত্যেরে চাহি না তবু, সুন্দরের করি আরাধনা–

    কটাক্ষ-ঈক্ষণ তার–হৃদয়ের বিশল্যকরণী।

    স্বপনের মণিহারে হেরি তার সীমন্ত-রচনা!

    নিপুণা নটিনী নাচে, অঙ্গে অঙ্গে অপূর্ব লাবণি!

    স্বর্ণপাত্রে সুধারস, না সে বিষ?—কে করে শোচনা!

    পান করি সুনির্ভয়ে, মুচকি হাসে যবে ললিত-লোচনা!

    জানিতে চাহি না আমি কামনার শেষ কোথা আছে,

    ব্যথায় বিবশ, তবু হোম কবি জ্বালি কামানল!–

    এ দেহ ইন্ধন তায়—সেই সুখ! নেত্রে মোর নাচে

    উলঙ্গিনী ছিন্নমস্তা! পাত্রে ঢালি লোহিত গরল!

    মৃত্যু ভৃত্যরূপে আসি ভয়ে-ভয়ে পরসাদ যাচে!

    মুহূর্তের মধু লুটি—ছিন্ন করি হৃদ্‌পদ্মদল!

    যামিনীর ডাকিনীরা তাই হেরি একসাথে হাসে খল-খল!

    চিনি বটে যৌবনের পুরোহিত প্ৰেম-দেবতারে,–

    নারীরূপা প্রকৃতিরে ভালোবেসে বক্ষে লই টানি;

    অনন্তরহস্যময়ী স্বপ্নসখী চির-অচেনারে

    মনে হয় চিনি যেন-এ বিশ্বের সেই ঠাকুরানী।

    নেত্র তার মৃত্যু-নীল।—অধরের হাসির বিথারে

    বিস্মরণী রশ্মিরাগ! কটিতলে জন্ম-রাজধানী।

    উরসের অগ্নিগিরি সৃষ্টির উত্তাপ-উৎস! জানি তাহা জানি।”

    অবিস্মরণীয় কবিতা। বাংলা সাহিত্যের অপূর্ব ঐশ্বর্য। তারপর তার “প্রেতপুরী” বেরোয় অগ্রহায়ণের “কল্লোলে”।

    “হেরি উরসের যুগ্ম যৌবনমঞ্জরী

    যে-অনল সর্ব-অঙ্গে শিরায় সঞ্চরি

    মৰ্ম্ম গ্রন্থি মোর

    দাহ করি গড়ে পুনঃ সোহাগের স্নেহ-হেম ডোর–

    সে-অনল পরশের আশে

    মোর মত দেখি তারা ঘুরে ঘুরে আশে তব পাশে।

    বিলোল কবরী আর নীবিবন্ধু মাঝে

    পেলব বঙ্কিম ঠাঁই যেথা যত রাজে–

    খুঁজিয়া লয়েছে তারা সর্ব-অগ্রে ব্যগ্র জনে-জনে,

    অতনুর তনু-তীর্থে–লাবণ্যের লীলা নিকেতনে।

    যত কিছু আদর-সোহাগ

    শেষ করে গেছে তার! মোর অনুরাগ,

    চুম্বন আশ্লেষ—সে যে তাহাদেরি পুরাতন রীতি,

    বহুকৃত প্রণয়ের হীন অনুকৃতি!…

    আজি এ নিশায়—

    মনে হয়, তারা সব রহিয়াছে ঘেরিয়া তোমায়!

    তোমার প্রণয়ী, মোর সতীর্থ যে তারা!

    যত কিছু পান করি রূপরসধারা–

    তারা পান করিয়াছে আগে।

    সর্বশেষ ভাগে

    তাদেরি প্রসাদ যেন ভুঞ্জিতেছি হায়!

    নাহি হেন ফুল-ফল কামনার কল্প-লতিকায়,

    যার পরে পড়ে নাই আর কারো দর্শনের দাগ,

    —আর কেহ হরে নাই যাহার পরাগ।

    ওগো কাম-বধূ!

    বল, বল, অনুচ্ছিষ্ট আছে আর এতটুকু মধু?

    রেখেছ কি আমার লাগিয়া সযতনে

    মনোমঞ্জুষায় তব পীরিতির অরূপরতনে?

    আমারো মিটেছে সাধ

    চিত্তে মোর নামিছে বহুজনতৃপ্তি-অবসাদ।

    তাই যবে চাই তোমাপানে–

    দেখি ওই অনাবৃত দেহের শ্মশানে।

    প্রতি ঠাঁই আছে কোনো কামনার সদ্য বলিদান!

    চুম্বনের চিতাভস্ম, অনজের অঙ্গার-নিশান!

    বাঁধিবারে যাই বাহুপাশে

    অমনি নয়নে মোর কত মৌনী ছায়ামূর্তি ভাসে।

    দিকে দিকে প্রেতের প্রহরা!

    ওগো নারী, অনিন্দিত কান্তি তব!–মরি মরি রূপের পসরা!

    তবু মনে হয়

    ও সুন্দর স্বর্গখানি প্রেতের আলয়!

    কামনা-অঙ্কুশ-ঘাতে যেই পুনঃ হইনু বিকল

    অমনি বাহুতে কারা পরায় শিকল!

    তীব্র সুখ-শিহরণে ফুকারিয়া উঠি যবে মৃদু আর্তনাদে–

    নীরব নিশীথে কারা হাহারে উচ্চকণ্ঠে কাঁদে।

    মোহিতলালও এলেন “উত্তরা”য়—এলেন আমাদের পুনরাবর্তী হয়ে। “কল্লোলে”র সঙ্গে সঙ্গে “উত্তরা”ও সরগরম হয়ে উঠল। কিন্তু কত দিন যেতে-না-যেতে কেমন বৈসুর ধরল বাজনায়! মতে বা মনে কোন অমিল নেই, তবু কেন কে জানে, মোহিতলাল বেঁকে দাঁড়ালেন—কল্লোলের দলের যে সব লেখক তোমার কাগজে লেখে তাদের সংশ্রব যদি না ত্যাগ করো তবে আমি আর “উত্তরা”য় লিখব না! সুরেশ মেনে নিতে চাইল না এ শর্ত। ফলে, মোহিতলাল বর্জন করলেন “উত্তরা”। সুরেশ আরো দুর্দম হয়ে উঠল। এত প্রাখর্য যেন সইল না অতুলপ্রসাদের। তিনি সরে দাঁড়ালেন। তবু সুরেশ অবিচ্যুত। রাধাকমল আছেন, যিনি “সাহিত্যে অশ্লীলতা” নামক প্রবন্ধে রায় দিয়েছেন আধুনিকতার স্বপক্ষে। কিন্তু অবশেষে রাধাকমলও বিযুক্ত হলেন। সুরেশ, একা পড়ল। তবু সে দমল না, পিছু হটল না। প্রতিজ্ঞার পতাকা খাড়া করে রাখল।

    তবু, কেন জানি না, “কল্লোলের” সঙ্গে শুধু “কালি-কলমের” নামটাই লোকে জুড়ে দেয়—“উত্তরা”র কথা দিব্যি ভুলে থাকে। এ বোধ হয় শুধু অনুপ্রাসের খাতিরে। নইলে, একই লেখকদল এই তিন কাগজে সমানে লিখেছে—সমান স্বাধীনতায়। “কালি-কলমের” মত “উত্তরা”ও এই আধুনিক ভাবের তন্ত্রধারক ছিল। বরং “কালি-কলমের” আগে আবির্ভাব হয়েছিল “উত্তরা”র। “কালি-কলমের” জন্মের পিছনে হয়তো খানিকটা বিক্ষোভ ছিল, কিন্তু “উত্তরা”য় শুধু সৃজন-সুখের মহোল্লাস। “কল্লোল”–“কালি-কলমে”র বহু অসম্পূর্ণ কাজ “উত্তরা” করে দিয়েছে। যেমন আরো বহু পরে করেছে “পূর্বাশা”।

    নিজে লেখেনি, অকণ্টক সূযোগ থাকলেও কোনদিন প্রতিষ্ঠা করতে চায়নি নিজের সাহিত্যিক অহমিকা, অবিচল নিষ্ঠায় সাহিত্যের ব্রতোদ্‌যাপন করেছে, প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে শুধু সাহিত্যিকের সুকীর্তি। এ চিরসংগ্রামশীল দুর্জয় ব্যক্তিত্বকে কি বলে অভিহিত করব? সুরেশকে নিশ্চয় সাহিত্যিক বলব না, বলব সাহিত্যের শক্তিদীপ্ত ভাস্কর। রূপদক্ষ কারুকার।

    মোহিতলালের মত যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তও আমাদের আরাধনীর ছিলেন—ভাবের আধুনিকতার দিক থেকে যতীন্দ্রনাথের দুঃখবাদ বাংলাসাহিত্যে এক অভিনব অভিমত। আমারে তদানীন্তন মনোভাবের সঙ্গে চমৎকার মিলে গিয়েছিল। দুঃখের মধ্যে কাব্যের যে বিলাস আছে সেই বিলাসে আমরা মশগুল ছিলাম। তাই নৈরাশ্যের দিনে ক্ষণে-ক্ষণে আবৃত্তি করতাম ‘মরীচিকা’। এমনি টুকরো-টুকরো লাইন :

    “চেরাপুঞ্জির থেকে

    একখানি মেঘ ধার দিতে পার গোবি-সাহারার বুকে?”

    “তুমি শালগ্রাম শিলা

    শোয়া-বসা যার সকলি সমান, তারে নিয়ে রাসলীলা!”

    “মরণে কে হবে সাথী,

    প্রেম ও ধর্ম জাগিতে পারে না বারোটার বেশী রাতি!”

    “মিছে দিন যায় বয়ে

    উপরে ও নীচে ঘুমের তুলসী—এই শালগ্রাম হয়ে।”

    “চারিদিক দেখে চারিদিক ঠেকে বুঝিয়াছি আমি ভাই,

    নাকে শাঁক বেঁধে ঘুম দেওয়া ছাড়া অন্য উপায় নাই।

    ঝিম ঝিম নিশ্চিন্ত–

    নাকের ডগায় মশাটা মশাই আস্তে উড়িয়ে দিন ত।”

    যতীন্দ্রনাথও নিমন্ত্রণ নিয়েছিলেন “কল্লোলে”র। যতদূর মনে পড়ে তার প্রথম কবিতা বেরোয় “কল্লোলে”র দ্বিতীয় বছরে মাঘমাসে। কবিতার নাম অন্ধকার:

    “নিদ্রিতা জননীবক্ষে সুপ্তোখিত শিশু

    খেলা করে লয়ে কণ্ঠহার।

    কোন মহাশিশু ক্রীড়ামুখে

    তব বুকে

    ঘুরাইছে জ্যোতিৰ্ম্মালা বিশ্ব শৃঙ্খলার?

    অন্ধকার, মহা অন্ধকার!”

    এর পরে আরো কয়েকটি কবিতা তিনি লিখেছিলেন—তার মধ্যে তার “রেল-ঘুম”টা উল্লেখযোগ্য। চলন্ত ট্রেনের অনুসরণ করে কবিতার ছন্দ বাঁধা হয়েছিল। সত্যেন দত্তের পালকি বা চরকার কবিতার মত। আমাদের কাছে কেমন কৃত্রিম মনে হয়েছিল, কেমন আন্তরিকতাবর্জিত। মনে আছে, প্রমথ চৌধুরীকে পড়িয়ে শোনানো হয়েছিল কবিতাটা। তিনি বলেছিলেন, ‘মরীচিকা’র কবির কোনো কবিতাই অপাঙক্তেয় হতে পারে না! এর মোটে বছর খানেক আগে ‘মরীচিকা’ বেরিয়েছে। একখানা ছোট কবিতার বইয়ে এরি মধ্যে যতীন্দ্রনাথ বিদগ্ধজনমনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।

    যতীন্দ্রনাথের মিতা যতীন্দ্রমোহন বাগচিও কি তাই না এসে পারেন “কল্লোলে”? আর তিনি এলেন, ভাবতে অদ্ভুত লাগছে, একেবারে মদিরযৌবনের বেশে, কবিতার নামও “যৌবন-চাঞ্চল্য”।

    “সহজ স্বচ্ছন্দ মনোরথ–

    ভুটিয়া যুবতী চলে পথ।

    টসেটসে রস-ভরপুর

    আপেলের মত মুখ

    আপেলের মত বুক

    পরিপূর্ণ প্রবল প্রচুর

    যৌবনের রসে ভরপুর।

    মেঘ ডাকে কড় কড়

    বুঝিবা আসিবে ঝড়,

    তিলেক নাহিক ভর তাতে।

    উঘারি বুকের বাস

    পূরায় মনের আশ

    উরস পরশ করি হাতে;

    অজানা ব্যথায় সুমধুর

    সেথা বুঝি করে গুরগুর।

    যুবতী একেলা পথ চলে

    পাশের পলাশ বনে

    কেন চায় ক্ষণে-ক্ষণে

    আবেশে চরণ যেন টলে

    পায়ে-পায়ে বাধিয়া উপলে।

    আপনার মনে যায়

    আপনার মনে গায়

    তবু কেন আন-পানে টান!

    করিতে রসের সৃষ্টি

    চাই কি দশের দৃষ্টি?

    স্বরূপ জানেন ভগবান!”

    “কল্লোলে”র যৌবন-চাঞ্চল্য তা হলে খালি “কল্লোলে”রই একচেটে নয়!

    না, কি “কল্লোলে”র সুর আরো উচ্চরোলে বাঁধা? তার চাঞ্চল্য আরো বেগবান? তার যাত্রা আরো দুরান্বেষী?

    “বৃন্তবন্ধহারা

    যাব উদ্দামের পথে, যাব আনন্দিত সর্বনাশে,

    রিক্তবৃষ্টি মেঘসাথে, সৃষ্টিছড়া ঝড়ের বাতাসে,

    যাব, যেথা শঙ্করের টলমল চরণ-পাতনে

    জাহ্নবী তরঙ্গমমুখরিত তাণ্ডব-মাতনে

    গেছে উড়ে জটাভ্রষ্ট ধুতুরার ছিন্নভিন্ন দল,

    কক্ষচ্যুত ধূমকেতু লক্ষ্যহারা প্রলয়-উজ্জ্বল

    আত্মঘাতমদমত্ত আপনারে দীর্ণ কীর্ণ করে

    নির্মম উল্লাসবেগে, খণ্ড খণ্ড উল্কাপিণ্ড ঝরে,

    কণ্টকিয়া তোলে ছায়াপথ—

    তাই কি চলেছি আমরা?

  • বার

    বার

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    বার

    রবীন্দ্রনাথকে প্রথম কবে দেখি?

    প্রথম দেখি আঠারোই ফাল্গুন, শনিবার, ১৩৩০ সাল। সেবার বি-এর বছর, ঢুকিনি তখন “কল্লোলে”। রবীন্দ্রনাথ সেনেট হলে কমলা-লেকচার্স দিচ্ছেন। ভবানীপুরের ছেলে, কলকাতার কলেজে গতিবিধি নেই, কোণঠাসা হয়ে থাকবার কথা। কিন্তু গুরুবলে ভিড় ঠেলে একেবারে মঞ্চের উপর এসে বসেছি।

    সেদিনকার সেই দৈবত আবির্ভাব যেন চোখের সামনে আজও স্পষ্ট ধরা আছে। সুষুপ্তিগত অন্ধকারে সহসোত্থিত দিবাকরের মত! ধ্যানে সে-মূর্তি ধারণ করলে দেহ-মন রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। ‘বাঙ্মমনশ্চশ্রোত্রঘ্রাণপ্রাণ’ নতুন করে প্রাণ পায়। সে কি রূপ, কি বিভা, কি ঐশ্বর্য! মানুষ এত সুন্দর হতে পারে, বিশেষত বাংলাদেশের মানুষ, কল্পনাও করতে পারতুম না। রূপকথার রাজপুত্রের চেয়েও সুন্দর। সুন্দর হয়ত দুর্লভদৰ্শন দেবতার চেয়েও।

    বাংলাদেশে এক ধরনের কবিয়ানাকে ‘রবিয়ানা’ বলত। সে আখ্যাটা কাব্য ছেড়ে কাব্যকারের চেহারায়ও আরোপিত হত। যাদের লম্বা চুল, হিলহিলে চেহারা, উড়ুউড়ু ভাব, তাদের সম্পর্কেই বলা হত এই কথাটা। রবীন্দ্রনাথকে দেখে মনে হল ওরা রবীন্দ্রনাথকে দেখেনি কোনোদিন। রবীন্দ্রনাথের চেহারায় কোথাও এতটুকু দুর্বলতা বা রুগ্নতার ইঙ্গিত নেই। তার চেহারায় লালিত্যের চেয়ে বলশালিতাই বেশি দীপ্যমান। হাতের কবজি কি চওড়া, কি সাহসবিস্তৃত বিশাল বক্ষপট! ‘শ্লথপ্রাণ দুর্বলের স্পর্ধা আমি কভু সহিব না’ এ শুধু রবীন্দ্রনাথের মুখেই ভাল মানায়। যিনি সাঁতরে নদী পার হয়েছেন, দিনের বেলায় ঘুমুননি কোনোদিন, ফ্যান চালাননি গ্রীষ্মকালের দুপুরে।

    পরনে গরদের ধুতি, গায়ে গরদের পাঞ্জাবি, কাঁধে গরদের চাদর, শুভ্র কেশ আর শ্বেত শ্মশ্রু–ব্যক্তমূর্তি রবীন্দ্রনাথকে দেখলাম। এত দিন তার রচনায় তিনি অব্যক্তমূর্তিতে ব্যাপ্ত হয়ে ছিলেন, আজ চোখের সামনে তাঁর বাস্তবমূর্তি অভিদ্যোতিত হল। কথা আছে, যার লেখার তুমি ভক্ত কদাচ তাকে তুমি দেখতে চেও না। দেখেছ কি তোমার ভক্তি চটে গিয়েছে। দেখে যদি না চটো, চটবে কথা শুনে। নির্জন ঘরে নিশব্দ মূর্তিতে আছেন, তাই থাকুন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বেলায় উলটো। সংসারে রবীন্দ্রনাথই একমাত্র ব্যতিক্রম, যার বেলায় তোমার কল্পনাই পরাস্ত হবে, চূড়ান্ততম চূড়ায় উঠেও তাঁর নাগাল পাবে না। আর কথা—কণ্ঠস্বর? এমন কণ্ঠস্বর আর কোথায় শুনবে?

    যত দূর মনে পড়ে, রবীন্দ্রনাথ মুখে-মুখে বক্তৃতা দিয়েছিলেন—পর-পর তিন দিন ধরে। পরে সে বক্তৃতা লিপিবদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ভাবছিলুম, যে ভাল লেখে সে ভাল বলতে পারে না—যেমন শরৎচন্দ্র, প্রমথ চৌধুরী, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বেলায় কিছুই অনিয়ম নয়। অলোকসম্ভব তাঁর সাধনা, অপারমিতা তার প্রতিভা। প্রথম দিন তিনি কি বলেছিলেন তা আবছা-আবছা এখনো মনে আছে। তিনি বলেছিলেন, মানুষের তিনটি স্পৃহা আছে—এক, টিকে থাকা, I exist; দুই, জানা, I know, তিন, প্রকাশ করা, I express। অদম্য এই আকাঙ্ক্ষা মানুষের। নিজের স্বার্থের জন্যে শুধু টিকে থেকেই তার শেষ নেই; তার মধ্যে আছে ভূমা,বহুলতা। যো বৈ ভূমা তদমৃতং, অথ যদল্পং তৎ মর্ত্যং। যেখানে অন্ত সেখানেই কৃপণতা, যেখানে ঐশ্বর্য সেখানেই সৃষ্টি। ভগবান তো শক্তিতে এই ধরিত্রীকে চালনা করছেন না, একে সৃষ্টি করেছেন আনন্দে। এই আনন্দ একটি অসীম আকুতি হয়ে আমাদের অন্তর স্পর্শ করছে। বলছে, আমাকে প্রকাশ করো, আমাকে রূপ দাও। আকাশ ও পৃথিবীর আলো এক নাম “রোদসী”। তারা কাঁদছে, প্রকাশের আকুলতায় কাঁদছে।

    রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনের বক্তৃতার সারাংশ আমার ডায়রিতে লেখা আছে এমনি : “বিধাতা দূত পাঠালেন প্রভাতের সূৰ্য্যালোকে। বললে দূত, নিমন্ত্রণ আছে। দ্বিপ্রহরে দূত এসে বললে রুদ্র তপস্বীর কণ্ঠে, নিমন্ত্রণ আছে। সন্ধ্যায় সূৰ্যাস্তচ্ছটায় গেরুয়াবাস উদাস দূত বললে, তোমার যে নিমন্ত্রণ আছে। তারপর দেখি নীরব নিশীথিনীতে তারায়-তারায় সেই লিপির অক্ষর ফুটে উঠেছে। চিঠি তো পেলাম, কিন্তু সে-চিঠির জবাব দিতে হবে না? কিন্তু কি দিয়ে দেব? রস দিয়ে বেদনা দিয়ে—যা সব মিলে হল সাহিত্য, কলা, সঙ্গীত। বলব, তোমার নিমন্ত্রণ তো নিলাম, এবার আমার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করো।”

    নিভৃত ঘরের জানলা থেকে দেখা অচেনা আকাশের নিঃসঙ্গ একটি তারার মতই দূর রবীন্দ্রনাথ। তখন ঐ মঞ্চের উপর বসে তার বক্তৃতা শুনতে-শুনতে একবারও কি ঘূণাক্ষরে ভেবেছি, কোনদিন ক্ষণকালের জন্যে হলেও তাঁর সঙ্গে পরিচিত হবার যোগ্যতা হবে? আর, কে না জানে, তার সঙ্গে ক্ষণকালের পরিচয়ই একটা অনন্তকালের ঘটনা।

    ভাবছিলুম, কত বিচিত্রগুণান্বিত রবীন্দ্রনাথ। যেখানে হাত রেখেছেন সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন। সাহিত্যের কথা ছেড়ে দিই, হেন দিক নেই যেদিকে তিনি যাননি আর স্থাপন করেননি তার প্রভুত্ব। যে কোনো একটা বিভাগে তাঁর সাফল্য তাকে অমরত্ব এনে দিতে পারত। পৃথিবীতে এমন কেউ লেখক জন্মায়নি যার প্রতিভা রবীন্দ্রনাথের মত সর্বদিঙ্মুখী। তা ছাড়া, যেখানে মেঘলেশ নেই সেখানে বৃষ্টি এনেছেন তিনি, যেখানে কুসুমলেশ নেই সেখানে পর্যাপ্তফল। “অপমেঘোদয়ং বর্ষং, অদৃষ্টকুসুমং ফলৎ।” আচ্ছন্নপ্রবাহা গঙ্গার মত তার কবিতা—তার কথা ছেড়ে দিই, কেননা কবি হিসেবেই তো তিনি সর্বাগ্রগণ্য। ধরুন, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রহসন। ধরুন, প্রবন্ধ। কত, বিচিত্র ও বিস্তীর্ণক্ষেত্রে তার প্রসার—ব্যাকরণ থেকে রাজনীতি। অনেকে তো শুধু ভ্রমণকাহিনী লিখেই নাম করেন। রবীন্দ্রনাথ এ অঞ্চলেও একচ্ছত্র। তারপর, চিঠি। পত্রসাহিত্যেও রবীন্দ্রনাথ অপ্রতিরথ। কত শত বিষয়ে কত সহস্র চিঠি, কিন্তু প্রত্যেকটি সজ্ঞানসৃজন সাহিত্য। আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা বলতে চান? তাতেও রবীন্দ্রনাথ পিছিয়ে নেই। তার “জীবন স্মৃতি” আর “ছেলেবেলা” অতুলনীয় রচনা। কোথায় তিনি নেই? যেখানেই স্পর্শ করেছেন, পুষ্পপূর্ণ করেছেন। আলটপকা অটোগ্রাফ লিখে দিয়েছেন ছুটকো-ছাটকা—তাই চিরকালের কবিতা হয়ে রয়েছে। তবু তো এখনো গানের কথা বলিনি। প্রায় তিন হাজার গান লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ, আর প্রত্যেক গানে নিজস্ব সুরসংযোগ করেছেন। এটা যে কত বড় ব্যাপার, স্তব্ধ হয়ে উপলব্ধি করা যায় না। মানুষের সুখ-দুঃখের এমন কোনো অনুভূতি নেই যা এই গানে সুরসুমধুর হয়নি। প্রকৃতির এমন কোনো হাবভাব নেই যা রাগরঞ্জিত হয়নি। শুধু তাই? এই গানের মধ্য দিয়েই তিনি ধরতে চেয়েছেন সেই অতীন্দ্রিয়কে, সে শ্রোতস্য শ্রোত্রং, মনসা মনঃ, চক্ষুষ চক্ষুঃ। যে সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাস অথচ সর্বেন্দ্ৰিয়বিবর্জিত। এই গানের মধ্য দিয়েই উদ্ঘাটিত করেছেন ভারতবর্ষের তপোমূর্তি। এই গানের মধ্য দিয়ে জাগাতে চেয়েছেন পরপদানত দেশকে।

    ঢেউ গুনে-গুনে কি সমুদ্র পার হতে পারব? তবু ঢেউ গোনা না হোক, সমুদ্রস্পৰ্শ তো হবে।

    সাহিত্যে শিশুসাহিত্য বলে একটা শাখা আছে। সেখানেও রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়রহিত। তারপর, ভাবুন, বিদেশীর পক্ষে ইংরেজের ইংরিজি লেখা সহজসাধ্য নয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ অতিমর্ত্য। ইংরিজিতে তিনি শুধু তাঁর বাংলা রচনাই অনুবাদ করেন নি, মৌলিক প্রবন্ধ লিখেছেন এবং দেশে-দেশে বক্তৃতা দিয়ে এসেছেন বহুবার। সে ইংরিজি একটা প্রদীপ্ত বিস্ময়। তাঁর নিজের হাতে বাজানো বাজনার সুর।

    যে লেখক, সে লেখার বাইরে শুধু বক্তৃতাই দিচ্ছে না, গান গাইছে। আর যার সাহিত্য হল, সঙ্গীত হল, তার চিত্র হবে না? রবীন্দ্রনাথ পট ও তুলি তুলে নিলেন। নতুন রূপে প্রকাশ করতে হবে সেই অব্যক্তরূপকে। সর্বাঙ্গসুন্দর রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখাটিও সুন্দর। কবিতা লিখতে কাটাকুটি করেছেন, তার মধ্য থেকে ব্যঞ্জনাপূর্ণ ছবি ফুটে উঠেছে—তার কাটাকুটিও সুন্দর। আর এমন কণ্ঠের যিনি অধিকারী তিনি কি শুধু গানই করবেন, আবৃত্তি করবেন না, অভিনয় করবেন না? অভিনয়ে-আবৃত্তিতে রবীন্দ্রনাথ অসামান্য।

    বক্তৃতা শুনতে শুনতে এই সব ভাবতুম বসে বসে। ভাবতুম, রবীন্দ্রনাথই বাংলা সাহিত্যের শেষ, তাঁর পরে আর পথ নেই, সংকেত নেই। তিনিই সব-কিছুর চরম পরিপূর্ণতা। কিন্তু “কল্লোলে” এসে আস্তে আস্তে সে-ভাব কেটে যেতে লাগল। বিদ্রোহের বহ্নিতে সবাই দেখতে পেলুম যেন নতুন পথ, নতুন পৃথিবী। আরো মানুষ আছে, আরো ভাষা আছে, আছে আরো ইতিহাস। সৃষ্টিতে সমাপ্তর রেখা টানেননি রবীন্দ্রনাথ–তখনকার সাহিত্য শুধু তারই বহুকৃত লেখনের হীন অনুকৃতি হলে চলবে না। পত্তন করতে হবে জীবনেব আরেক পরিচ্ছেদ। সেদিনকার কল্লোলের সেই বিদ্রোহ-বাণী উদ্ধতকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলুম কবিতায় :

    এ মোর অত্যুক্তি নয়, এ মোর যথার্থ অহঙ্কার,

    যদি পাই দীর্ঘ আয়ু, হাতে যদি থাকে এ লেখনী,

    কারেও ডরি না কভু; সুকঠোর হউক সংসার,

    বন্ধুর বিচ্ছেদ তুচ্ছ, তুচ্ছতর বন্ধুর সরণি।

    পশ্চাতে শত্রুরা শর অগণন হানুক ধারালো,

    সম্মুখে থাকুন বসে পথ রুধি ববীন্দ্র ঠাকুর,

    আপন চক্ষের থেকে জ্বালিব যে তীব্র তীক্ষ্ণ আলো

    যুগ-সূৰ্য ম্লান তার কাছে। মোর পথ আরো দূর!

    গভীর আত্মোপলব্ধি—এ আমার দুর্দান্ত সাহস,

    উচ্চকণ্ঠে ঘোষিতেছি নব-নর-জন্ম-সম্ভাবনা;

    অক্ষরতুলিকা মোন হস্তে যেন নহে অনলস,

    ভবিষ্যৎ বৎসরের শঙ্খ আমি–নবীন প্রেরণা!

    শক্তির বিলাস নহে, তপস্যায় শক্তি আবিষ্কার,

    শুনিয়াছি সীমাশূন্য মহা-কাল-সমুদ্রের ধ্বনি

    আপন বক্ষের তলে; আপনারে তাই নমস্কার!

    চক্ষে থাক আয়ু-ঊর্মি, হস্তে থাক অক্ষয় লেখনী॥

    সেই কমলা-লেকচার্সের সভায় আরেকজন বাঙালি দেখেছিলাম। তিনি আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। চলতি কথায়, বাংলার বাঘ, শূর-শার্দুল। ধী, ধূতি আর দার্ঢ্যের প্রতিমূর্তি। রবীন্দ্রনাথ যদি সৌন্দর্য, আশুতোষ শক্তি। প্রতিভা আর প্রতিজ্ঞা। এই দুই প্রতিনিধি—অন্তত চেহারার দিক থেকে—আর পাওয়া যাবে না ভবিষ্যতে। কাব্য ও কর্মের প্রকাশাত্মা।

    সাউথ সুবার্বন ইস্কুলে যখন পড়ি, তখন সরস্বতী পূজার চাঁদার খাতা নিয়ে কয়েকজন ছাত্র মিলে একদিন গিয়েছিলাম আশুতোষের বাড়ি। দোতলায় উঠে দেখি সামনের ঘরেই আশুতোষ জলচৌকির উপর বসে স্নানের আগে গায়ে তেল মাখাচ্ছেন। ভয়েভয়ে গুটি-গুটি এগিয়ে এসে চাঁদার খাতা তার সামনে বাড়িয়ে ধরলাম। আমাদের দিকে পা বাড়িয়ে দিয়ে তিনি হুঙ্কার করে উঠলেন : পেন্নাম করলিনে? আমরা খাতাটাতা ফেলে ঝুপঝুপ করে প্রণাম করতে লাগলাম তাকে।

    তেরোশ বত্রিশ সাল—“কল্লোলে”র তৃতীয় বছর—বাংলাদেশ আর কল্লোল দুয়ের পক্ষেই দুর্বৎসর। দোসরা আষাঢ় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন মারা যান দার্জিলিঙে। আর আটই আশ্বিন মারা যায় আমাদের গোকুল, সেই দার্জিলিঙেই। শুধু গোকুলই নয়, পর-পর মারা গেল বিজয় সেন গুপ্ত আর সুকুমার ভাদুড়ি।

    মঙ্গলবার, বিকেল ছটার সময়, খবর আসে কলকতায়—চিত্তরঞ্জন নেই। আমরা তখন কল্লোল-আপিসে তুমুল আড্ডা দিচ্ছি, খবর শুনে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। দেখি সমস্ত কলকাতা যেন বেরিয়ে পড়েছে সর্বস্বহারার মত। কেউ কারু দিকে তাকাচ্ছে না, কার মুখে কোনো কথা নেই, শুধু লক্ষ্যহীন বেদনায় এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পরদিন শোনা গেল, বৃহস্পতিবার ভোরে স্পেশ্যাল ট্রেনে চিত্তরঞ্জনের মৃতদেহ নিয়ে আসা হবে কলকাতায়। অত ভোরে ভবানীপুর থেকে যাই কি করে ইষ্টিশানে? ট্রাম-বাস তো সব বন্ধ থাকবে। সমবায় ম্যানসনসের ইঞ্জিনিয়র সুকুমার চক্রবর্তীর ঘরে রাত কাটালাম। আমি, সুকুমারবাবু আর দীনেশদা। সুকুমারবাবু দীনেশদার বন্ধু, অতএব “কল্লোলে”র বন্ধু, সেই সুবাদে আমাদের সকলের আত্মজন। দরদী আর পরোপকারী। জীবনযুদ্ধে পর্যুদস্ত হচ্ছেন পদে-পদে, অথচ মুখের নির্মল হাসিটি অস্ত যেতে দিচ্ছেন না। বিদেশিনী মেয়ে ফ্রেডাকে বিয়ে করেন কিন্তু অকালেই সে-মিলনে ছেদ পড়ল। এসে পড়লেন একেবারে দৈন্য ও শূন্যতার মুখোমুখি। ক্ষমাহীন সংগ্রামের মাঝখানে। তাই তো বেনামী বন্দরে, ভাঙা জাহাজের ভিড়ে, “কল্লোলে” তিনি বাসা নিলেন। এমনি অনেকে সাহিত্যিক না হয়েও শুধু আদর্শবাদের খাতিরে এসেছে সেই যৌবনের মুক্ততীর্থে। সেই বাসা ভেঙে গিয়েছে, আর তিনিও বিদায় নিয়েছেন এক ফাঁকে।

    রাত থাকতেই উঠে পড়লাম তিন জনে। হাঁটা ধরলাম শেয়ালদার দিকে। সে কি বিশাল জনতা, কি বিরাট শোভাযাত্রা—তা বর্ণনা সুরু করলে শেষ করা যাবে না। “কৃষাণের বেশে কে ও কৃশতনু কৃশানু পুণ্যছবি”—স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী একজন শববাহী। আট ঘণ্টার উপর সে শোভাযাত্রার অনুগমন করেছিলাম আমরা—নৃপেন সহ আরো অনেক বন্ধু, নাম মনে পড়ছে না—দিনের ও শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত। কলকাতা শহরে আরো অনেক শোভাযাত্রা হয়েছে কিন্তু এমন আর একটাও নয়। অন্তত আর কোনো শোভাযাত্রায় এত জল আর পাখা বৃষ্টি হয়নি!

    শ্রবণ সংখ্যায় “কল্লোলে” চিত্তরঞ্জনের উপর অনেক লেখা বেরোয়, তার মধ্যে অতুল গুপ্তের দেশবন্ধু প্রবন্ধটা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি:

    “জুলাই মাসের মডার্‌ন্‌ রিভিউতে অধ্যাপক যদুনাথ সরকার চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যু সম্বন্ধে যা লিখেছেন তার মোটা কথা এই যে, চিত্তরঞ্জনের প্রভাবের কারণ তার দেশবাসীরা হচ্ছে কৰ্ত্তাভজার জাত। তাদের গুরু একজন চাইই যার হাতে নিজেদের বুদ্ধি-বিবেচনা তুলে দিয়ে তারা নিশ্চিন্ত হতে পারে। অধ্যাপক মহাশয়ের মতে দেশের লোকের উপর চিত্তরঞ্জন দাসের প্রভাবের স্বরূপ আমাদের জাতীয় দুর্বলতার প্রমাণ। কারণ সে প্রভাবের একমাত্র কারণ ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ, ইউরোপের মত কাটা-ছাঁটা অপৌরুষেয় তত্ত্বপ্রচারের ফল নয়।…

    লোকচিত্তের উপর চিত্তরঞ্জনের যে প্রভাব তা কোনও নিগূঢ় তত্ত্বের বিষয় নয়। তা সূর্যের মত প্রকাশ। চোখ না বুজে থাকলেই দেখা যায়। পরাধীন ভারতবর্ষে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগছে। আমাদের এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা চিত্তরঞ্জনে মূর্ত হয়ে প্রকাশ হয়েছিল। সেই মুক্তির জন্যে যে নির্ভীকতা, যে ত্যাগ, যে সৰ্বস্বপণ আমরা অন্তরে-অন্তরে প্রয়োজন বলে জানছি, কিন্তু ভয়ে ও স্বার্থে জীবনে প্রকাশ করতে পারছি না, সেই নির্ভীকতা, সেই ত্যাগ ও সেই পণ সমস্ত বাধামুক্ত হয়ে চিত্তরঞ্জনে ফুটে উঠেছিল। চিত্তরঞ্জনের ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ ও জনসাধারণের উপর তার প্রভাব দু-এরই এই মূল। আইন-সভায় যারা চিত্তরঞ্জন উপস্থিত না থাকলে একরকম ভোট দিত, তার উপস্থিতিতে অন্য রকম দিত, তারা দেশের মুক্তিকামী এই ত্যাগ ও নির্ভীকতার মূর্তির কাছেই মাথা নোয়ত। চিত্তরঞ্জনের সম্মুখে দেড়শ বছরের ব্রিটিশ শান্তির ফল প্রভু-ভয় ও স্বার্থভীতি ক্ষণেকের জন্য হলেও মাথা তুলতে পারত না। এই যদি কর্তাভজা হয়, তবে ভগবান যেন এ দেশের সকলকেই কর্তাভজা করেন, অধ্যাপক যদুনাথ সরকারের অপৌরুষের তত্ত্বের ভাবুক না করেন।…

    ডেমোক্রেটিক শাসন অর্থাৎ ‘গুরু’দের শাসন। তার ফল ভাল হবে কি মন্দ হবে তা নির্ভর করে কোন ‘ডেমস’ কাকে গুরু মানে তার উপর। ভারতবর্ষের ‘ডেমস’ যে গুরুর খোঁজে শবরমতীর আশ্রমে কি দেশবন্ধুর বিশ্রাম-আবাসেই যায়, দৈনিক কাগজের সম্পাদকের অফিসে নয়, এটা আশার কথা, মোটেই ভয়ের কথা নয়। অধ্যাপক সরকার যাকে ডেমক্রেটিক বলে চালাতে চাচ্ছেন সে হচ্ছে সেই aristocratic শাসন, যা ইউরোপের শাসকসম্প্রদায় এতকাল ডেমক্রেটিক বলে চালিয়ে আসছে।

    পণ্ডিতে না চিনুক দেশের জনসাধারণ চিত্তরঞ্জনকে যথার্থ চিনেছিল। তারা তাই তার নাম দিয়েছিল ‘দেশবন্ধু’। ঐ নাম দিয়ে তারা জানিয়েছে তাদের মনের উপরে চিত্তরঞ্জনের প্রভাবের উৎস কোথায়। পণ্ডিতের চোখে এটা না পড়তে পারে, কারণ এক শ্রেণীর পাণ্ডিত্য পৃথিবীর কোনও যুগে কোনও দেশেই সমসাময়িক কোনও মহত্বকে চিনতে পারে নাই, কেন না তার কথা পুঁথিতে লেখা থাকে না।”

    তেরোশ একত্রিশ সালের শেষ দিকেই গোকুলের জ্বর শুরু হয়। ছবি এঁকে আয়ের সুবিধে বিশেষ করতে পারেনি—অথচ আয় না করলেও নয়। প্রত্নতত্ত্বের রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধীনে চাকরি নিয়ে একবার পুনাতে চলে যায়। বছর খানেক চাকরি করবার পর বম্বেতে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে—দিন-রাত একটুও ঘুমুতে পারত না। বম্বের সলিসিটর কথঙ্কর ও তার স্ত্রী গোকুলকে তাদের বাড়িতে নিয়ে এসে সেবা-যত্ন করে সুস্থ করে তোলেন, কিন্তু চাকরি করার মত সক্ষম আর হল না। কলকাতায় ফিরে আসে গোকুল। কথঙ্কর ও তার স্ত্রী মালিনীর প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার তার শেষ ছিল না। মালিনী গোকুলকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন ও গোকুলের জন্মদিনে বম্বে থেকে কোনো না-কোনো উপহার পাঠাতেন। তারই দেওয়া কালো ডায়েলের ওমেগা রিস্টওয়াচ গোকুলের হাতে শেষ পর্যন্ত বাঁধা ছিল।

    গোকুল তার মামার বাড়িতে ছিল, অনেক বিধি-বাধার মাঝখানে। শরীর-মন দুর্বল, তার উপরে অর্থাগম নেই। না এঁকে না লিখে কিছুতেই স্বাধীনভাবে জীবিকার্জন হবার নয়। এমন অবস্থায় গোকুলের দিদিমণি (বড় বোন) বিধবা হয়ে চারটি ছোট-ছোট নাবালক ছেলে নিয়ে গোকুলের আশ্রয়ে এসে পড়েন। কালিদাস নাগ গোকুলের দাদা, তখন ইউরোপে। অনেক বাধা-বিপদ ঠেলে অনেক ঝড়-জল মাথায় করে বিদেশে গিয়েছেন উপযুক্ত হয়ে আসতে। কালিদাসবাবুর অনুপস্থিতিতে গোকুল বিষম বিব্রত হয়ে পড়ে, কিন্তু অভাবের বিরুদ্ধে লড়তে মোটেই তার অসম্মতি নেই। ভবানীপুরে কুণ্ডু রোডে ছোট একটি বাড়ি ভাড়া করে দিদি ও ভাগ্নেদের নিয়ে চলে আসে। এই ভাগ্নেদের মধ্যেই জগৎ মিত্র কথাশিল্পীর ছাড়পত্র নিয়ে পরে এসে ভিড়েছিল “কল্লোলে”। শিবপুরের একটা বাড়িতে দিদিমণির অংশ ছিল। দিদিমণির স্বামীর মৃত্যুর পর, যা সচরাচর হয়, দিদিমণির শরিকরা তা দখল করে বসে। অনেক ঝগড়া-বিবাদের পর শরিকদের কবল থেকে দিদিমণির সে-অংশ উদ্ধার করে গোকুল। সে-বাড়িতে দখল নিতে গোকুলকে কত ভাবে যে অপমানিত হতে হয়েছে তার আর সীমা সংখ্যা নেই। সেই অংশটা ভাড়া দিয়ে দিদিমণির কিছু আয়ের ব্যবস্থা হয়, কিন্তু পুরোপুরি সংসার চলে না। মামার বাড়িতে থাকতে পাবলিক স্টেজে থিয়েটার দেখার সাহস করতে পারত না গোকুল। সেই গোকুল ভয়ে-ভয়ে অহীন্দ্র চৌধুরীদের Photoplay syndicateএ এসে যোগ দেয়। তখনকার দিনে ফিল্মে যোগ দেওয়া মানেই একেবারে বকে যাওয়া। কিন্তু একেবারে না খেতে পাওয়ার চেয়ে সেটা মন্দ কি? স্টুডিয়োতে আর্টিস্টের কাজ, মইয়ের উপরে উঠে সিন আঁকা, স্টেজ সাজানো—নানারকম শারীরিক ক্লেশের কাজ করতে হত তাকে। শরীর ভেঙে পড়ত, কিন্তু ঘুম হত রাত্রে। বলত, আর কিছু উপকার না হোক, ঘুমিয়ে বাঁচছি।

    কালিদাসবাবু ডক্টরেট নিয়ে ফিরলেন বিদেশ থেকে। গোকুল যেন হাতে চাঁদ কপালে সুয্যি পেয়ে গেল। মা-বাপ হারা ভাইয়ে-ভাইয়ে জীবনের নানা সুখ-দুঃখ ও ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অপূর্ব বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। বিদেশে দাদার জন্যে তার উদ্বেগের অন্ত ছিল না। যেমন ভালবাসত দাদাকে তেমনি নীরবে পূজা করত। দাদা ফিরে এলে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। দাদাকে কুণ্ডু লেনের বাড়ি ছেড়ে দিয়ে সে দিদিমণি ও তার ছেলেদের নিয়ে চলে এল তাদের শিবপুরের বাড়িতে। সেই শিবপুরের বাড়িতে এসেই সে অসুখে পড়ল।

    জ্বরের সঙ্গে পিঠে প্রবল ব্যথা। সেই জ্বর ও ব্যথা নিয়েই সে ‘পথিকের’ কিস্তি লিখেছে, করেছে ‘জাঁ ক্রিস্‌তফের’ অনুবাদ। ক’দিন পরেই রক্তবমি করলে, ডাক্তার পরীক্ষা করে বলে দিলে, যক্ষ্মা।

    শিবপুরের বাড়িতে আমরা, “কল্লোলে”র বন্ধুরা, প্রায় রোজই যেতাম গোকুলকে দেখতে, তাকে সঙ্গ দিতে, সাধ্যমত পরিচর্যা করতে।

    অনেক শোকশীতল বিষণ্ণ সন্ধ্যা আমরা কলহাস্যমুখর করে দিয়ে এসেছি। গোকুলকে এক মুহূর্তের জন্যেও আমরা বুঝতে দিই নাই যে আমরা তাকে ছেড়ে দেব। কতদিন দিদিমণির হাতের ডাল-ভাত খেয়ে এসেছি তৃপ্তি করে। দিদিমণি বুঝতে পেরেছেন ঐ একজনই তাঁর ভাই নয়।

    একদিন গোকুল আমাকে বললে, ‘আর সব যাক, আর কিছু হোক থোক, স্বাস্থ্যটাকে রেখো, স্বাস্থ্যটাকে ছেড়ে দিও না।’

    তার স্নেহকরুণ মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

    ‘যার স্বাস্থ্য আছে তার আশা আছে।’ নিশ্বাস ফেলল গোকুল : ‘আর যার আশা আছে তার সব আছে।’