Category: হুমায়ূন আহমেদ

  • নন্দিত নরকে

    নন্দিত নরকে

    নন্দিত নরকে

    হুমায়ূন আহমেদ

    নন্দিত নরকে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস। এর রচনাকাল ১৯৭০ এবং প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে অধ্যয়নকালে হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসটি রচনা করেন। এ সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।

  • মিসির আলি অমনিবাস

    মিসির আলি অমনিবাস

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book-name]

    সমকালীন কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন, এখনও আছেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। গ্রন্থজগতের পরিসংখ্যান বিগত কয়েক বৎসর যাবৎ এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করছে। এই কথাশিল্পীর সৃজনশীলতার ক্ষমতা ইতোমধ্যেই প্রায় কিংবদন্তীতুল্য।

    কিশোর থেকে বৃদ্ধ, স্বল্পশিক্ষিত থেকে বুদ্ধিজীবী পণ্ডিত—সকলেই তাঁর উপন্যাসের আগ্রহী পাঠক, অথবা টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর কাহিনীর নাট্যরূপায়ণের বিমুগ্ধ দর্শক। কোন ক্ষমতায় এভাবে সকলকে কাছে টানেন হুমায়ূন আহমেদ? চিত্রল গতিময় সহজ ভাষাবিন্যাস। অভাবনীয় ঘটনা বিশ্বাসযোগ্যভাবে ঘটানোর মনোহারী কৌশল। কল্পনা হার মেনে যায় এমন অকল্পনীয় বিদ্যুন্নিভ সংলাপ। এবং তাঁর কাহিনীতে ছড়ানো জীবন কখনোই আমাদের চেনা মধ্যবিত্ত সমাজসত্যের বাইরে ছোটাছুটি করে না। মধ্যবিত্ত-জীবনের আশা-নিরাশা, অনিশ্চিতি এবং দোলাচলপ্রবণ মূল্যবোধ, তার সামান্য লাভ ও সামান্য ক্ষতির বন্ধনে আততিময় অস্তিত্ব। হুমায়ূন আহমেদের যে-কোন উপন্যাস ধারণ করে আছে তাঁর সৃজনীসত্তার মনন-কল্পনার এ-সকল উপাদান। সাধারণ মানুষের কাতর জীবন চূর্ণকণায় ছড়িয়ে থাকে তাঁর লেখায়।

    যখন প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ বেরোয়, তখন প্রথিতযশা অধ্যাপক ডক্টর আহমদ শরীফ লিখেছিলেন, “হুমায়ূন আহমেদ বয়সে তরুণ, মনে প্রাচীন দ্রষ্টা, মেজাজে জীবনরসিক, স্বভাবে রূপদর্শী, যোগ্যতায় দক্ষ রূপকার। ভবিষ্যতে তিনি বিশিষ্ট জীবনশিল্পী হবেন এই বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করব।” এভাবেই যাত্রা শুরু হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের। তারপর ক্রমাগত পথচলার প্রবাহে একের পর এক সাহিত্যকর্ম উপহার দিয়ে চলেছেন এ-দেশের পাঠকসমাজকে। পণ্ডিত সমালোচক ও হৃদয়বান গল্পপ্রেমিক উভয়েরই প্রত্যাশা তিনি পূরণ করে চলেছেন।

    একই সঙ্গে অতিপ্রজ অথচ শিল্পরুচিময় লেখক তাঁর মতো আর কেউ এই মুহূর্তে আছেন কিনা সন্দেহ। প্রতি বৎসর অব্যাহত গতিতে তাঁর ফসলের ডালা ভরে উঠছে।

    হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ময়মনসিংহের মোহনগঞ্জ গ্রামে, ১৯৪৮ সালের ১৩ই নভেম্বর তারিখে। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিমার কেমিস্ট্রিতে গবেষণা করে ১৯৮২ সালে পি-এইচ. ডি. ডিগ্রী অর্জন করেছেন, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রসায়নশাস্ত্রে অধ্যাপনারত। লেখক-জীবনে সাফল্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি পেয়েছিলেন অপেক্ষাকৃত নবীন বয়সে, ১৯৮১ সালে, ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’ প্রাপ্তির মাধ্যমে। এ ছাড়াও তিনি পেয়েছেন শিশু একাডেমী ও লেখক শিবির পুরস্কারসহ আরও অনেক পুরস্কার।

    ২০১১ সালের সেপ্টেম্বের মাসে তার মলাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। তিনি নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটরিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। ১২ দফায় তাকে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর তার কিছুটা শারীরিক উন্নতি হলেও, শেষ মুহূর্তে শরীরে অজ্ঞাত ভাইরাস আক্রমণ করায় তার অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায়। কৃত্রিমভাবে লাইভ সাপোর্টে রাখার পর ১৯শে জুলাই ২০১২ তারিখে তিনি নিউ ইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হয়।

    সিরিজ পরিচয়

    ‘মিসির আলি’, বাংলাদেশের প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ সৃষ্ট একটি জনপ্রিয় চরিত্র। মিসির আলি কাহিনীগুলো রহস্যমাত্রিক। মিসির আলির কাহিনীগ‌ুলো ঠিক গোয়েন্দা কাহিনী নয়, কিংবা ‘ক্রাইম ফিকশন’ বা ‘থ্রিলার’-এর মতো খুনি-পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা-ধাওয়া নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক, বিজ্ঞাননির্ভর এবং যুক্তিনির্ভর কাহিনীর বুনটে বাঁধা। অনেক ক্ষেত্রে একে রহস্যগল্প বলা চলে। চারিত্রিক দিক দিয়ে মিসির আলি চরিত্রটি হুমায়ূন আহমেদের আরেক অনবদ্য সৃষ্টি হিমু চরিত্রটির পুরোপুরি বিপরীত। তরুণ হিমু চলে প্রতি-যুক্তির (anti-logic) তাড়নায়, অপরপক্ষে বয়োজ্যেষ্ঠ মিসির আলি অনুসরণ করেন বিশ‌ুদ্ধ যুক্তি (pure-logic)। এই যুক্তিই মিসির আলিকে রহস্যময় জগতের প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটনে সাহায্য করে। সেসব কাহিনীর প্রতিফলন ঘটেছে মিসির আলি সম্পর্কিত প্রতিটি উপন্যাসে।1

    চরিত্র রূপায়ণ

    ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণের সময়ে নর্থ ডাকোটার ফার্গো শহরে স্ত্রীর সাথে গাড়িতে ভ্রমণের সময় মিসির আলি চরিত্রটির ধারণা মাথায় আসে।2 এই ঘটনার অনেকদিন পরে তিনি মিসির আলি চরিত্রের প্রথম উপন্যাস ‘দেবী’ রচনা করেন।3

    চরিত্রের স্বরূপ

    উপন্যাসের কাহিনী অনুসারে মিসির আলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের “অস্বভাবী মনোবিজ্ঞান” (Abnormal Psychology) বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক4 (খণ্ডকালীন)5। শুধুমাত্র একজন শিক্ষক হিসেবেই নন, তার অনুসারীদের কাছেও তিনি বেশ মর্যাদাবান একজন চরিত্র হিসেবে উল্লিখিত। সেজন্য উপন্যাস বা বড় গল্পে, মিসির আলিকে বোঝাতে লেখক ‘তার’ লেখার পরিবর্তে সম্মানসূচক ‘তাঁর’ শব্দটির ব্যবহার করে থাকেন।

    মিসির আলির বয়স ৪০-৫০-এর মধ্যে। তার মুখ লম্বাটে। সেই লম্বাটে মুখে এলোমেলো দাড়ি, লম্বা উসকো-খুসকো কাঁচা-পাকা চুল। প্রথম দেখায় তাকে ভবঘুরে বলে মনে হতে পারে; কিছুটা আত্মভোলা। তার হাসি খুব সুন্দর, শিশুসুলভ। মিসির আলির স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো।6

    তিনি মানুষের মন, আচরণ, স্বপ্ন এবং নানাবিধ রহস্যময় ঘটনা নিয়ে অসীম আগ্রহ রাখেন। হুমায়ূন আহমেদের নিজের ভাষ্যে7:

    “মিসির আলি এমন একজন মানুষ, যিনি দেখার চেষ্টা করেন চোখ বন্ধ করে। যে পৃথিবীতে চোখ খুলেই কেউ দেখে না, সেখানে চোখ বন্ধ করে দেখার এক আশ্চর্য ফলবতী চেষ্টা।”

    চরিত্রটির পরিচিতি দিতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বলছেন:8

    “মিসির আলি একজন মানুষ, যাঁর কাছে প্রকৃতির নিয়ম-শৃঙ্খলা বড় কথা, রহস্যময়তার অস্পষ্ট জগৎ যিনি স্বীকার করেন না।”

    মিসির আলি চরিত্রে হুমায়ূন আহমেদ, পরস্পর বিপরীতধর্মী দুটি বৈশিষ্ট্য ‘যুক্তি’ এবং ‘আবেগ’কে স্থান দিয়েছেন।9

    মিসির আলি একজন ধূমপায়ী। তিনি ‘ফিফটি ফাইভ’ ব্র্যান্ডের সিগারেট খান। তবে তিনি প্রায়ই সিগারেট ছেড়ে দেবার চেষ্টা করেন। তার শরীর বেশ রোগাটে আর রোগাক্রান্ত। নানারকম রোগে তার শরীর জর্জরিত: লিভার বা যকৃৎ প্রায় পুরোটাই অকেজো, অগ্ন্যাশয়ের কার্যকারিতা হ্রাস পেয়েছে, রক্তের উপাদানে গড়বড়, হৃৎপিণ্ড ড্রপ বিট দেয়।10 এজন্য কঠিন এসব রোগের পাশাপাশি সাধারণ যেকোনো রোগই তাকে বেশ কাহিল করে ফেলে। ফলে প্রায়ই অসম্ভব রোগাক্রান্ত হয়ে তাকে হাসপাতালে থাকতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন।

    মিসির আলি যুক্তিনির্ভর একজন মানুষ বলেই অনেক সাহসী। ভূতাশ্রিত স্থানেও রাত কাটাতে তিনি পিছপা হোন না, বরং এজন্য থাকেন যে, তাতে তিনি রহস্যময়তার ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারবেন। মিসির আলির অনেকগ‌ুলো পারঙ্গমতার মধ্যে অন্যতম হলো তিনি যে কাউকে, বিশেষ করে ঠিকানাওয়ালা মানুষকে, খুব সহজে অজানা স্থানেও খুঁজে বের করতে পারেন। এজন্য তিনি টেলিফোন ডিরেক্টরি, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর, টিভি-বেতার-এর লাইসেন্স নম্বর11, পুলিশ কেস রিপোর্ট, হাসপাতালের মর্গের সুরতহাল (পোস্টমোর্টেম) রিপোর্ট12 ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে থাকেন। মিসির আলি প্রকৃতির বিস্ময়ে বিস্মিত হলেও প্রচণ্ড যুক্তির বলে বিশ্বাস করেন প্রকৃতিতে রহস্য বলে কিছু নেই।13 মিসির আলি ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে একজন নাস্তিক। মিসির আলি সিরিজের প্রথম উপন্যাস “দেবী”-এর ষষ্ঠ অধ্যায়ে তিনি নিজেকে নাস্তিক বলে অভিহিত করেছেন। তবে কিছু জায়গায় তাকে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী অর্থাৎ একজন আস্তিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।14

    মিসির আলি মূলত নিঃসঙ্গ একজন মানুষ, মোটামুটি সব উপন্যাসে তাকে এভাবেই রূপায়িত করা হয়। কিন্তু “অন্য ভুবন” উপন্যাসে মিসির আলি বিয়ে করে ফেলেন বলে উল্লেখ আছে। তিনি বিয়ে করেন নীলুফারকে, যার প্রথম আবির্ভাব ঘটে দেবী উপন্যাসে। পরবর্তীতে “নিশীথিনী” উপন্যাসে লেখক মিসির আলির প্রতি নীলুফারের আবেগ দেখিয়েছেন। পরের অনেক উপন্যাসে এই সাময়িক আবেগ দেখা গেলেও মিসির আলি সব আবেগ, ভালোবাসার ঊর্ধ্বে নিজেকে স্থাপন করেছেন।‌ তাই পরবর্তী উপন্যাসগুলিতে আবার তাকে নিঃসঙ্গ একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এপ্রসঙ্গে লেখক নিজেই স্বীকার করেন যে, “এটি বড় ধরনের ভুল” ছিল। মিসির আলির মতো চরিত্র বিবাহিত পুরুষ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। আর সেই ভুল শোধরে পরবর্তী উপন্যাসগুলোতে আবার মিসির আলিকে নিঃসঙ্গ হিসেবে উপস্থাপন করেন লেখক। ফলে মিসির আলি চরিত্রটি যা দাঁড়ায়: মিসির আলি ভালবাসার গভীর সমুদ্র হৃদয়ে লালন করেন, কিন্তু সেই ভালবাসাকে ছড়িয়ে দেবার মত কাউকেই কখনও কাছে পান না। ভালবাসার একাকিত্বে জর্জরিত মিসির আলির নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে বিভিন্ন সময় কিশোরবয়সী কাজের লোকের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন: “আমি এবং আমরা” উপন্যাসে “বদু” নামের একটি, ১৫-১৬ বছরের কাজের ছেলের উল্লেখ রয়েছে। “দেবী” ও “নিশীথিনী” গল্পে হানিফা নামে একটা কাজের মেয়ে ছিল। এরকম কাজের লোককে মিসির আলি লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করেন। আবার “অন্য ভূবন” উপন্যাসে “রেবা” নামের একটি কাজের মেয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়।

    মিসির আলির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগত সারমর্ম করতে হুমায়ূন আহমেদই লিখেন: মিসির আলি নিঃসঙ্গ, হৃদয়বান, তীক্ষ্ণ ধীশক্তির অধিকারী।15 কাহিনী অনুসারে তিনি অকৃতদার। চরিত্রটি লেখকেরও, প্রিয় চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।

    মিসির আলি চরিত্রটি এতটাই পাঠক জনপ্রিয়তা পেয়েছে যে, অনেকেই তাকে রক্তমাংসের মানুষ ভাবতে শুরু করেছেন। হুমায়ূন আহমেদ প্রায়ই জিজ্ঞাসিত হন যে, মিসির আলি কি কোনো বাস্তব চরিত্রকে দেখে লেখা কিনা। এর নেতিবাচক উত্তর পেয়ে অনেকেই আবার মিসির আলি চরিত্রটির মধ্যে লেখকেরই ছায়া খুঁজে পান। এপ্রসঙ্গে স্বয়ং হুমায়ূন আহমেদই উত্তর করেন:16

    “না, মিসির আলিকে আমি দেখিনি। অনেকে মনে করেন লেখক নিজেই হয়তো মিসির আলি। তাঁদেরকে বিনীতভাবে জানাচ্ছি— আমি মিসির আলি নই। আমি যুক্তির প্রাসাদ তৈরি করতে পারি না এবং আমি কখনও মিসির আলির মতো মনে করি না প্রকৃতিতে কোনো রহস্য নেই। আমার কাছে সব সময় প্রকৃতিকে অসীম রহস্যময় বলে মনে হয়”

    কিন্তু এই অভয়বাণী সত্ত্বেও নলিনী বাবু B.Sc উপন্যাসে লেখককেই মিসির আলির ভূমিকায় দেখা যায়, এবং তিনি যে মিসির আলি থেকে আলাদা কিন্তু তার স্রষ্টা তার স্পষ্ট উল্লেখ করেন:

    “আমি (লেখক) এই ভেবে আনন্দ পেলাম যে, সালেহ চৌধুরী (লেখকের সফরসঙ্গী) মিসির আলিকে উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে দেখছেন না। অতি বুদ্ধিমান মানুষও মাঝে মাঝে বাস্তব-অবাস্তব সীমারেখা মনে রাখতে পারেন না।17

    গণমাধ্যমে মিসির আলি

    বাংলাদেশ টেলিভিশন

    ১৯৮৭ সালে ছোটপর্দায় মিসির আলীর প্রথম আবির্ভাব। তখন হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলীকে নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাস দেবীর বয়স হয়েছিল মাত্র দুই বছর। জনপ্রিয় চরিত্রটির ভূমিকায় আবুল হায়াত প্রথম অভিনয় করেন। অন্য ভুবনের সে এবং পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে অন্য ভুবনের ছেলেটা, মোট দুটি নাটকের মিসির আলী চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এছাড়া, প্রয়াত অভিনেতা আবুল খায়ের একবার এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

    বেসরকারি টেলিভিশন

    বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগ‌ুলোর মধ্যে, এনটিভিতে মিসির আলিকে নিয়ে অনিমেষ আইচ তিনটি নাটক নির্মাণ করেন। “বৃহন্নলা” উপন্যাস অবলম্বনে একই নামে নির্মিত প্রথম নাটকে মিসির আলির ভূমিকায় শতাব্দী ওয়াদুদ অভিনয় করেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে একই নির্মাতার পরবর্তী নাটক নিষাদ এ মিসির আলী চরিত্রে অভিনয় করেন আশীষ খন্দকার। মিসির আলীকে নিয়ে লেখা ছোটগল্প স্বপ্ন সঙ্গিনী অবলম্বনে অনিমেষ আইচের তৃতীয় নাটকে হুমায়ুন ফরিদী অভিনয় করেন। নির্মাতা রেদোয়ান রনির নাটকেও একবার মিসির আলী চরিত্রের দেখা মিলেছিল।

    বাংলা চলচ্চিত্রে

    ২০১৮ সালে মিসির আলিকে প্রথম বড় পর্দায় আনেন অনম বিশ্বাস তার দেবী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এটি হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলিকে নিয়ে প্রথম উপন্যাস দেবী অবলম্বনে নির্মিত হয়। চলচ্চিত্রটিতে চঞ্চল চৌধুরী মিসির আলি চরিত্রে অভিনয় করেন।

    প্রকাশনা

    মিসির আলি সংক্রান্ত উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ প্রথম পর্যায়ে আলাদা আলাদা বই আকারে বের হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা চরিত্রটির পাঠক সমাদর বিবেচনা করে তা সংকলিত আকারেও প্রকাশ করে। এরকম সংকলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রতীক প্রকাশনা সংস্থার “মিসির আলি অমনিবাস” নাম তিন খণ্ডে মিসির আলির সকল উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করে। এছাড়াও মিসির আলির সমস্ত উপন্যাস নিয়ে (মিসির আলি UNSOLVED, “মিসির আলি আপনি কোথায়?”, “পুফি” এবং “যখন নামিবে আঁধার” ব্যতীত) অনন্যা প্রকাশনা সংস্থা মিসির আলি সমগ্র নামে একটি বই প্রকাশ করে। বইটি ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে প্রকাশিত হয়। কলকাতার কাকলি প্রকাশনী দুই খণ্ডে সম্প্রতি মিসির আলি সমগ্র প্রকাশ করেছে।

    মিসির আলি অমনিবাস

    ক্রম

    শিরোনাম প্রথম প্রকাশ

    প্রকাশক

    দেবী জুন ১৯৮৫

    অবসর প্রকাশনা, ঢাকা

    নিশীথিনী ১৯৮৮

    প্রতীক প্রকাশনী

    নিষাদ ১৯৮৯

    প্রতীক প্রকাশনী

    অন্যভুবন ১৯৮৭

    অনন্যা প্রকাশন

    বৃহন্নলা আগস্ট ১৯৮৯

    প্রতীক প্রকাশনী

    ভয় (গল্পগ্রন্থ) মে ১৯৯১

    আফসার ব্রাদার্স, ঢাকা

    বিপদ ১৯৯১

    শিখা প্রকাশনী, ঢাকা

    অনীশ মে ১৯৯২

    অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা

    মিসির আলি অমনিবাস-১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩

    প্রতীক প্রকাশনী

    ১০

    মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬

    সময় প্রকাশন, ঢাকা

    ১১

    আমি এবং আমরা ১৯৯৩

    প্রতীক প্রকাশনী

    ১২

    হিমুর দ্বিতীয় প্রহর18 ১৯৯৭

    কাকলী প্রকাশনী

    ১৩

    তন্দ্রাবিলাস ২০০৯

    অন্বেষা প্রকাশন

    ১৪

    আমিই মিসির আলি ফেব্রুয়ারি ২০০০

    অন্যপ্রকাশ, ঢাকা

    ১৫

    বাঘবন্দী মিসির আলি জুন ২০০১

    অনন্যা

    ১৬

    কহেন কবি কালিদাস ২০০৫

    দিব্যপ্রকাশ

    ১৭

    মিসির আলি অমনিবাস-২ ফেব্রুয়ারি ২০০৬

    প্রতীক প্রকাশনী

    ১৮

    হরতন ইশকাপন ২০০৮

    ১৯

    মিসির আলির চশমা ফেব্রুয়ারি ২০০৮

    অন্যপ্রকাশ, ঢাকা

    ২০

    মিসির আলি!আপনি কোথায়? ফেব্রুয়ারি ২০০৯

    সময় প্রকাশন, ঢাকা

    ২১

    মিসির আলি UNSOLVED জুলাই ২০০৯

    কাকলী প্রকাশনী, ঢাকা

    ২২

    হিমু মিসির আলি যুগলবন্দি ২০১১

    আফসার ব্রাদার্স ঢাকা

    ২৩

    পুফি ২০১১

    অনন্যা

    ২৪

    যখন নামিবে আঁধার ২০১২

    অন্যপ্রকাশ

    ২৫

    মিসির আলী অমনিবাস-৩ ২০১৩

    প্রতীক প্রকাশনী

  • প্রথম খণ্ড

    প্রথম খণ্ড

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book-name]

    সমকালীন কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন, এখনও আছেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। গ্রন্থজগতের পরিসংখ্যান বিগত কয়েক বৎসর যাবৎ এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করছে। এই কথাশিল্পীর সৃজনশীলতার ক্ষমতা ইতোমধ্যেই প্রায় কিংবদন্তীতুল্য।

    কিশোর থেকে বৃদ্ধ, স্বল্পশিক্ষিত থেকে বুদ্ধিজীবী পণ্ডিত—সকলেই তাঁর উপন্যাসের আগ্রহী পাঠক, অথবা টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর কাহিনীর নাট্যরূপায়ণের বিমুগ্ধ দর্শক। কোন ক্ষমতায় এভাবে সকলকে কাছে টানেন হুমায়ূন আহমেদ? চিত্রল গতিময় সহজ ভাষাবিন্যাস। অভাবনীয় ঘটনা বিশ্বাসযোগ্যভাবে ঘটানোর মনোহারী কৌশল। কল্পনা হার মেনে যায় এমন অকল্পনীয় বিদ্যুন্নিভ সংলাপ। এবং তাঁর কাহিনীতে ছড়ানো জীবন কখনোই আমাদের চেনা মধ্যবিত্ত সমাজসত্যের বাইরে ছোটাছুটি করে না। মধ্যবিত্ত-জীবনের আশা-নিরাশা, অনিশ্চিতি এবং দোলাচলপ্রবণ মূল্যবোধ, তার সামান্য লাভ ও সামান্য ক্ষতির বন্ধনে আততিময় অস্তিত্ব। হুমায়ূন আহমেদের যে-কোন উপন্যাস ধারণ করে আছে তাঁর সৃজনীসত্তার মনন-কল্পনার এ-সকল উপাদান। সাধারণ মানুষের কাতর জীবন চূর্ণকণায় ছড়িয়ে থাকে তাঁর লেখায়।

    যখন প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ বেরোয়, তখন প্রথিতযশা অধ্যাপক ডক্টর আহমদ শরীফ লিখেছিলেন, “হুমায়ূন আহমেদ বয়সে তরুণ, মনে প্রাচীন দ্রষ্টা, মেজাজে জীবনরসিক, স্বভাবে রূপদর্শী, যোগ্যতায় দক্ষ রূপকার। ভবিষ্যতে তিনি বিশিষ্ট জীবনশিল্পী হবেন এই বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করব।” এভাবেই যাত্রা শুরু হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের। তারপর ক্রমাগত পথচলার প্রবাহে একের পর এক সাহিত্যকর্ম উপহার দিয়ে চলেছেন এ-দেশের পাঠকসমাজকে। পণ্ডিত সমালোচক ও হৃদয়বান গল্পপ্রেমিক উভয়েরই প্রত্যাশা তিনি পূরণ করে চলেছেন।

    একই সঙ্গে অতিপ্রজ অথচ শিল্পরুচিময় লেখক তাঁর মতো আর কেউ এই মুহূর্তে আছেন কিনা সন্দেহ। প্রতি বৎসর অব্যাহত গতিতে তাঁর ফসলের ডালা ভরে উঠছে।

    হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ময়মনসিংহের মোহনগঞ্জ গ্রামে, ১৯৪৮ সালের ১৩ই নভেম্বর তারিখে। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিমার কেমিস্ট্রিতে গবেষণা করে ১৯৮২ সালে পি-এইচ. ডি. ডিগ্রী অর্জন করেছেন, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রসায়নশাস্ত্রে অধ্যাপনারত। লেখক-জীবনে সাফল্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি পেয়েছিলেন অপেক্ষাকৃত নবীন বয়সে, ১৯৮১ সালে, ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’ প্রাপ্তির মাধ্যমে। এ ছাড়াও তিনি পেয়েছেন শিশু একাডেমী ও লেখক শিবির পুরস্কারসহ আরও অনেক পুরস্কার।

    ২০১১ সালের সেপ্টেম্বের মাসে তার মলাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। তিনি নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটরিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। ১২ দফায় তাকে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর তার কিছুটা শারীরিক উন্নতি হলেও, শেষ মুহূর্তে শরীরে অজ্ঞাত ভাইরাস আক্রমণ করায় তার অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায়। কৃত্রিমভাবে লাইভ সাপোর্টে রাখার পর ১৯শে জুলাই ২০১২ তারিখে তিনি নিউ ইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হয়।

    উৎসর্গ

    ‘মিসির আলি অমনিবাস’ আমার অতি প্রিয় গ্রন্থের একটি। প্রিয় গ্রন্থের সঙ্গে প্রিয়জনের নাম যুক্ত থাকাই বাঞ্ছনীয়। মিসির আলির লজিক এই কথাই বলে। কাজেই বইটি গুলতেকিনের জন্যে।

    মিসির আলির কথা

    ‘মিসির আলির কথা’ শিরোনামে নিজের কথা বলে নিই আমি। তখন থাকি নর্থ ডেকোটার ফার্গো শহরে। এক রাতে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি মন্টানায়। গাড়ি চালাচ্ছে আমার স্ত্রী গুলতেকিন। পেছনের সীটে আমি আমার বড় মেয়েকে নিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছি। গুলতেকিন তখন নতুন ড্রাইভিং শিখেছে, হাইওয়েতে এই প্রথম বের হওয়া, কাজেই কথাবার্তা বলে তাকে বিরক্ত করছি না। চুপ করে বসে আছি এবং খানিকটা আতঙ্কিত বোধ করছি। শুধু মনে হচ্ছে অ্যাকসিডেন্ট হবে না তো? গাড়ির রেডিও অন করা। কান্ট্রি মিউজিক হচ্ছে। ইংরেজি গানের কথা মন দিয়ে শুনতে ইচ্ছে করে না। কিছু শুনছি, কিছু শুনছি না এই অবস্থা। হঠাৎ গানের একটা কলি শুনে চমকে উঠলাম—

    Close your eyes and try to see

    বাঃ, মজার কথা তো! আমি নিশ্চিত, মিসির আলি চরিত্রের ধারণা সেই রাতেই আমি পেয়ে যাই। মিসির আলি এমন একজন মানুষ, যিনি দেখার চেষ্টা করেন চোখ বন্ধ করে। যে পৃথিবীতে চোখ খুলেই কেউ দেখে না, সেখানে চোখ বন্ধ করে দেখার এক আশ্চর্য ফলবতী চেষ্টা।

    তারো অনেক দিন পর ‘দেবী’ লিখি। মিসির আলি নামের অতি সাধারণ মোড়কে একজন অসাধারণ মানুষ তৈরির চেষ্টা ‘দেবী’তে করা হয় – একজন মানুষ, যাঁর কাছে প্রকৃতির নিয়ম-শৃঙ্খলা বড় কথা, রহস্যময়তার অস্পষ্ট জগৎ যিনি স্বীকার করেন না। সাধারণত যুক্তিবাদী মানুষরা আবেগবর্জিত হন। যুক্তি এবং আবেগ পাশাপাশি চলতে পারে না। মিসির আলির ব্যাপারে একটু ব্যতিক্রমের চেষ্টা করলাম, যুক্তি ও আবেগকে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে দিলাম। দেখা যাক কি হয়।

    যা হল তা অভাবনীয়! পাঠকরা মিসির আলিকে গ্রহণ করলেন গভীর ভালবাসায়। তাঁদের কাছে মিসির আলি শুধু গল্পের চরিত্র হয়ে থাকল না, হয়ে গেল রক্তমাংসের একজন — বিপদে যার কাছে ছুটে যাওয়া যায়।

    আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করা হয়, মিসির আলি বলে কি আসলেই কেউ আছে? এই চরিত্রটি কি আমি কাউকে দেখে তৈরি করেছি? তাঁদের অবগতির জন্যে বিনীত ভাবে জানাই – না, মিসির আলিকে আমি দেখি নি। অনেকে মনে করেন লেখক নিজেই হয়তো মিসির আলি। তাঁদেরকেও বিনীতভাবে জানাচ্ছি – আমি মিসির আলি নই। আমি যুক্তির প্রাসাদ তৈরি করতে পারি না এবং আমি কখনো মিসির আলির মতো মনে করি না প্রকৃতিতে কোনো রহস্য নেই। আমার কাছে সব সময় প্রকৃতিকে অসীম রহস্যময় বলে মনে হয়।

    মিসির আলিকে নিয়ে বেশ কিছু লেখা লিখেছি। কিছু ভুলভ্রান্তি ও করেছি। যেমন ‘অন্য ভুবনে’ মিসির আলিকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এটি বড় ধরনের ভুল, এই চরিত্রটি বিবাহিত পুরুষ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। মিসির আলিকে একজন নিঃসঙ্গ মানুষ হিসেবেই মানায়, যিনি ভালবাসার গভীর সমুদ্র হৃদয়ে লালন করেন, কিন্তু সেই ভালবাসাকে ছড়িয়ে দেবার মতো কাউকেই কখনো কাছে পান না।

    ভুলত্রুটি সত্ত্বেও আমার প্রিয় চরিত্রের একটি হচ্ছে মিসির আলি। মিসির আলিকে নিয়ে লিখতে আমার সব সময়ই ভালো লাগে। এই নিঃসঙ্গ, হৃদয়বান, তীক্ষ্ণ ধীশক্তির মানুষটি আমাকে সব সময় অভিভূত করেন। যতক্ষণ লিখি ততক্ষণ তাঁর সঙ্গ পাই, বড় ভালো লাগে।

    হুমায়ূন আহমেদ

    এলিফেন্ট পার্ক

    ফেব্রুয়ারি ‘৯৩

    সূচীপত্র

  • দেবী

    দেবী

    মাঝরাতের দিকে রানুর ঘুম ভেঙে গেল।

    তার মনে হল ছাদে কে যেন হাঁটছে। সাধারণ মানুষের হাঁটা নয়, পা টেনে-টেনে হাঁটা। সে ভয়ার্ত গলায় ডাকল, ‘এই, এই।’ আনিসের ঘুম ভাঙল না। বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। অল্প-অল্প বাতাস। বাতাসে জামগাছের পাতায় অদ্ভুত এক রকমের শব্দ উঠছে। রানু আবার ডাকল, ‘এই, একটু ওঠ না। এই।’

    ‘কী হয়েছে?’

    ‘কে যেন ছাদে হাঁটছে।’

    ‘কী যে বল! কে আবার ছাদে হাঁটবে? ঘুমাও তো।’

    ‘প্লীজ, একটু উঠে বস। আমার বড় ভয় লাগছে।’

    আনিস উঠে বসল। প্রবল বর্ষণ শুরু হল এই সময়। ঝমঝম করে বৃষ্টি।  জানালার পর্দা বাতাসে পতপত করে উড়তে লাগল। রানু হঠাৎ দেখল, জানালার শিক ধরে খালিগায়ে একটি রোগামতো মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটির দু’টি হাতই অসম্ভব লম্বা। রানু ফিসফিস করে বলল, ‘ওখানে কে?’

    ‘কোথায় কে?’

    ‘ঐ যে জানালায়।’

    ‘আহ্, কী যে ঝামেলা কর! নারকেল গাছের ছায়া পড়েছে।’

    ‘একটু বাতিটা জ্বালাও না।’

    ‘রানু, তুমি ঘুমোও তো।’

    আনিস শোবার উপক্রম করতেই ছাদে বেশ কয়েক বার থপথপ শব্দ হল। যেন কেউ-একজন ছাদে লাফাচ্ছে।

    রানু চমকে উঠে বলল, ‘কিসের শব্দ হচ্ছে?’

    ‘বানর। এ জায়গায় বানর আছে। কালই তো দেখলে ছাদে লাফালাফি করছিল।‘

    ‘আমার বড় ভয় করছে। একটু উঠে গিয়ে বাতি জ্বালাও না। পায়ে পড়ি তোমার।’

    আনিস বাতি জ্বালাল। ঘড়িতে বাজে দেড়টা। ছাদে আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। তবু রানুর ভয় কমল না। সে কেঁপে-কেঁপে উঠতে লাগল। আনিস বিরক্ত স্বরে বলল, ‘এ-রকম করছ কেন?’

    ‘কেন জানি অন্য রকম লাগছে আমার। একটা খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছি।’

    ‘কী স্বপ্ন?’

    ‘দেখলাম আমি যেন …’

    কথার মাঝখানে হঠাৎ রানু থেমে গেল। কে যেন হাসছে। ভারি গলায় হাসছে। রানু কাঁপা স্বরে বলল, ‘হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছ? কে যেন হাসছে।’

    ‘কে আবার হাসবে! বানরের শব্দ। কিংবা কেউ হয়তো জেগে উঠেছে দোতলায়।’ আনিস লক্ষ করল, রানু খুব ঘামছে। চোখ-মুখ রক্তশূন্য। বালিশের নিচ থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। দেশলাই জ্বালাতে-জ্বালাতে বলল, ‘কী স্বপ্ন দেখছিলে?’

    ‘দিনের বেলা বলব।’

    ‘কী যে সব কুসংস্কার তোমাদের। এখনো ভয় লাগছে?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘ভয়টা কিসের? চোর-ডাকাতের, না ভূতের?’

    ‘বুঝতে পারছি না।’

    ‘ঠিক আছে, বাতি জ্বালানোই থাক। বাতি জ্বালিয়েই ঘুমাব আজকে। এখন বল দেখি, কী স্বপ্ন দেখলে।’

    ‘দিনের বেলা বলব।’

    ‘আহ্, বল না! বললেই ভয় কেটে যাবে।’

    রানু আনিসের বাঁ হাত শক্ত করে চেপে ধরল। থেমে থেমে বলল, ‘দেখলাম, একটা ঘরে আমি শুয়ে আছি। একটা বেঁটে লোক এসে ঢুকল। তারপর দেখলাম, সে আমার শাড়ি টেনে খুলে ফেলার চেষ্টা করছে।’

    আনিস শব্দ করে হাসল।

    রানু বলল, ‘হাসছ কেন?’

    ‘হাসব না? এটা কি একটা ভয় পাওয়ার স্বপ্ন?’

    ‘তুমি তো সবটা শোন নি।’

    ‘সবটা শুনতে হবে না। পরে কী হবে তা আমার জানা। তুমি যা দেখেছ তা হচ্ছে একটা সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি। যুবক-যুবতীরা এ-রকম স্বপ্ন প্রায়ই দেখে।’

    ‘আমি দেখি না।’

    ‘তুমিও দেখ। মনে থাকে না তোমার।’

    ‘আমি স্বপ্ন খুব কম দেখি। যা দেখি তা সব সময় সত্যি হয়। তোমাকে তো বলেছি অনেক বার।’

    আনিস চুপ করে রইল। রানু এই কথাটি প্রায়ই বলে। বিয়ের রাতে প্রথম বার বলেছিল। আনিস সেবারও হেসেছে। রানু অবাক হয়ে বলেছে, ‘আপনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন না, না?’

    ‘নাহ্।’

    ‘আমি আপনার গা ছুঁয়ে বলছি, বিশ্বাস করুন আমার কথা।’

    রানু এমনভাবে বলল, যেন আনিসের বিশ্বাসের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। আনিস শেষ পর্যন্ত হাসিমুখে বলল, ‘ঠিক আছে বিশ্বাস করলাম, এখন দয়া করে আপনি-আপনি করবে না।’ রানু ফিসফিস করে বলল, ‘আপনার সঙ্গে যে আমার বিয়ে হবে, সেটাও আমি জানতাম।’

    ‘এটাও স্বপ্নে দেখেছিলে?’

    ‘হুঁ। দেখলাম, একটি লোক খালিগায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পেটের কাছে একটা মস্ত কাটা দাগ। লোকটিকে দেখেই মনে হল, এর সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। আমি তাকে বললাম, কেটেছে কীভাবে? আপনি বললেন, ‘সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছিলাম।’

    আনিস সে-রাতে দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বলতে পারে নি। তার পেটে একটা কাটা দাগ সত্যি-সত্যি আছে, এই মেয়েটির সেটা জানার কথা নয়। তবে সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে কাটে নি। জামগাছ থেকে পিছলে পড়ে কেটেছে। ব্যাপারটা কাকতালীয়, বলাই বাহুল্য। মাঝে-মাঝে এমন দু’-একটা জিনিস খুব মিলে যায়। তবুও কোথায় যেন একটা ক্ষীণ অস্বস্তি থাকে।

    বাইরে বৃষ্টি খুব বাড়ছে। ঝড় হবে বোধহয়। শোঁ-শোঁ আওয়াজ হচ্ছে জানালায়। একটি কাঁচ ভাঙা। প্রচুর পানি আসছে ভাঙা  জানালা দিয়ে, শীত-শীত করছে।

    ‘রানু, চল ঘুমিয়ে পড়ি।’

    ‘সিগারেট শেষ হয়েছে?’

    ‘হ্যাঁ।’

    বিছানায় ওঠামাত্র প্রবল শব্দে বিদ্যুৎ চমকাল। বাতি চলে গেল সঙ্গে-সঙ্গে। শুধু এ-অঞ্চল নয়, সমস্ত ঢাকাই বোধ করি অন্ধকার হয়ে গেল। আনিস বলল, ‘ভয় লাগছে রানু?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘আচ্ছা, হাসির গল্পটল্প কর। এতে ভয় কমে যায়। বল একটা গল্প।’

    ‘তুমি বল।’

    আনিস দীর্ঘ সময় নিয়ে এক জন পাদ্রী ও তিনটি ইহুদি ও তিনটি মেয়ের গল্প বলল। গল্পের এক পর্যায়ে শ্রোতাকে জিজ্ঞেস করতে হয়—পাদ্রী তখন কী বলল? এর উত্তরটি হচ্ছে পাঞ্চ লাইন। কিন্তু কিচ্ছু জিজ্ঞেস করল না রানু। সে কি শুনছে না? আনিস ডাকল, ‘এই রানু, এই!’ রানু কথা বলল না। বাতাসের ঝাপ্টায় সশব্দে  জানালার একটি পাল্লা খুলে গেল। আনিস বন্ধ করবার জন্যে উঠে দাঁড়াতেই রানু তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বলল, ‘তুমি যেও না। খবরদার, যেও না!’

    ‘কী আশ্চর্য, কেন?’

    ‘একটা-কিছু জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে।’

    ‘কী যে বল!’

    ‘প্লীজ, প্লীজ।’

    রানু কেঁদে ফেলল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, ‘তুমি গন্ধ পাচ্ছ না?’

    ‘কিসের গন্ধ?’

    ‘কর্পূরের গন্ধের মতো গন্ধ।‘

    এটা কি মনের ভুল? সূক্ষ্ম একটা গন্ধ যেন পাওয়া যাচ্ছে ঘরে। ঝন্‌ঝন্ করে আরেকটা কাঁচ ভাঙল। রানু বলল, ‘ঐ জিনিসটা হাসছে। শুনতে পাচ্ছ না?’ বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আনিস কিছু শুনতে পেল না।

    ‘তুমি বস তো। আমি হারিকেন জ্বালাচ্ছি।’

    ‘না, তুমি আমাকে ধরে বসে থাক।’

    আনিস অস্বস্তির সঙ্গে বলল, ‘তুমি ঐ জানালাটার দিকে আর তাকিও না তো!’

    আনিস লক্ষ করল, রানু থরথর করে কাঁপছে, ওর গায়ের উত্তাপও বাড়ছে। রানুকে সাহস দেবার জন্যে সে বলল, ‘কোনো দোয়া-টোয়া পড়লে লাভ হবে? আয়াতুল কুর্সি জানি আমি। আয়াতুল কুর্সি পড়ব?’

    রানু জবাব দিল না। তার চোখ বড়-বড় হয়ে উঠেছে। মুখ দিয়ে ফেনা ভাঙছে নাকি? শ্বাস ফেলছে টেনে-টেনে।

    ‘এই রানু, এই।’

    কোনোই সাড়া নেই। আনিস হারিকেন জ্বালাল। রান্নাঘর থেকে খুটখুট শব্দ আসছে। ইঁদুর, এতে সন্দেহ নেই। তবু কেন জানি ভালো লাগছে না। আনিস বারান্দায় এসে ডাকল, ‘রহমান সাহেব, ও রহমান সাহেব।’ রহমান সাহেব বোধহয় জেগেই ছিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে বেরুলেন।

    ‘কী ব্যাপার?’

    ‘আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।’

    ‘কী হয়েছে?’

    ‘বুঝতে পারছি না।’

    ‘হাসপাতালে নিতে হবে নাকি?’

    ‘বুঝতে পারছি না।’

    ‘আপনি যান, আমি আসছি। এক্ষুণি আসছি।’

    আনিস ঘরে ফিরে গেল। মনের ভুল, নিঃসন্দেহে মনের ভুল। আনিসের মনে হল, সে ঘরের ভেতর গিয়ে দাঁড়ানোমাত্র কেউ-একজন যেন দরজার আড়ালে সরে পড়ল। রোগা, লম্বা একটি মানুষ। আনিস ডাকল, ‘রানু।’ রানু তৎক্ষণাৎ সাড়া দিল, ‘কি?’

    ইলেকট্রিসিটি চলে এল তখনই। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই রহমান সাহেব এসে উপস্থিত হলেন। উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, ‘এখন কেমন অবস্থা?’ রানু অবাক হয়ে বলল, ‘কিসের অবস্থা? কী হয়েছে?’

    রহমান সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন। আনিস বলল, ‘তোমার শরীর খারাপ করেছিল, তাই ওঁকে ডেকেছিলাম। এখন কেমন লাগছে?’

    ‘ভালো।’

    রানু উঠে বসল। রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, ‘এখন আমি ভালো।’

    রহমান সাহেব তবুও মিনিট দশেক বসলেন। আনিস বলল, ‘আপনি কি ছাদে দাপাদাপি শুনেছেন?’

    ‘সে তো রোজই শুনি। বাঁদরের উৎপাত।’

    ‘আমিও তাই ভাবছিলাম।’

    ‘খুব জ্বালাতন করে। দিনে-দুপুরে ঘর থেকে খাবারদাবার নিয়ে যায়।’

    ‘তাই নাকি?’

    ‘জ্বি। নতুন এসেছেন তো! কয়েক দিন যাক, টের পাবেন। বাড়িঅলাকে বলেছিলাম গ্রিল দিতে। তা দেবে না। আপনার সঙ্গে দেখা হলে আপনিও বলবেন। সবাই মিলে চেপে ধরতে হবে।’

    ‘জ্বি, আমি বলব। আপনি কি চা খাবেন নাকি এক কাপ?’

    ‘আরে না না। এই রাত আড়াইটার সময় চা খাব নাকি, কী যে বলেন! উঠি ভাই। কোনো অসুবিধা দেখলে ডাকবেন।’

    ভদ্রলোক উঠে পড়লেন। রানু চাপা স্বরে বলল, ‘এই রাত-দুপুরে ভদ্রলোককে ডেকে আনলে কেন? কী মনে করলেন উনি।’

    ‘তুমি যা শুরু করেছিলে! ভয় পেয়েই ভদ্রলোককে ডাকলাম।’

    ‘কী করেছিলাম আমি?’

    ‘অনেক কাণ্ড করেছ। এখন তুমি কেমন, সেটা বল।‘

    ‘ভালো।’

    ‘কী রকম ভালো?’

    বেশ ভালো।’

    ‘ভয় লাগছে না আর?’

    ‘নাহ্।’

    রানু বিছানা থেকে নেমে পড়ল। সে বেশ সহজ ও স্বাভাবিক। ভয়ের কোনো চিহ্নও নেই চোখে-মুখে। শাড়ি কোমরে জড়িয়ে ঘরের পানি সরাবার ব্যবস্থা করছে।

    ‘সকালে যা করবার করবে। এখন এসব রাখ তো।’

    ‘ইস্, কী অবস্থা হয়েছে দেখ না!’

    ‘হোক, এস তো এদিকে।’

    রানু হাসি-হাসি মুখে এগিয়ে এল।

    ‘এখন আর তোমার ভয় লাগছে না?’

    ‘না।’

    ‘জানালার পাশে কে যেন দাঁড়িয়ে ছিল বলেছিলে?’

    ‘এখন কেউ নেই। আর থাকলেও কিছু যায় আসে না।’

    আনিস দ্বিতীয় সিগারেটটা ধরাল। হালকা গলায় বলল, ‘এক কাপ চা করতে পারবে?’

    ‘চা, এত রাতে!’

    ‘এখন আর ঘুম আসবে না, কর দেখি এক কাপ।’

    রানু চা বানাতে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পানি ফোটার শব্দ হল। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে ঝমঝম করে। রানু একা-একা রান্নাঘরে। কে বলবে এই মেয়েটিই অল্প কিছুক্ষণ আগে ভয়ে অস্থির হয়ে গিয়েছিল! ছাদে আবার ঝুপঝুপ শব্দ হচ্ছে। এই বৃষ্টির মধ্যে বানর এসেছে নাকি? আনিস উঠে গিয়ে রান্নাঘরে উঁকি দিল। হালকা গলায় বলল, ‘ছাদে বড় ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে।’ রানু জবাব দিল না।

    আনিস বলল, ‘এই বাড়িটা ছেড়ে দেব।’

    ‘সস্তায় এ-রকম বাড়ি আর পাবে না।’

    ‘দেখি পাই কি না।’

    ‘চায়ে চিনি হয়েছে তোমার?’

    ‘হয়েছে। তুমি নিলে না?’

    ‘নাহ্, রাত-দুপুরে চা খেলে আমার আর ঘুম হবে না।’

    রানু হাই তুলল। আনিস বলল, ‘এখন বল তো তোমার স্বপ্ন-বৃত্তান্ত।’

    ‘কোন স্বপ্নের কথা?’

    ‘ঐ যে স্বপ্ন দেখলে! একটা বেঁটে লোক।’

    ‘কখন আবার এই স্বপ্ন দেখলাম? কী যে তুমি বল।’

    আনিস আর কিছু বলল না। চা শেষ করে ঘুমুতে গেল। শীত-শীত করছিল। রানু পা গুটিয়ে বাচ্চা মেয়ের মতো শুয়েছে। একটি হাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে আনিসকে। তার ভারি নিঃশ্বাস পড়ছে। ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয়। জানালায় নারকেল গাছের ছায়া পড়েছে। মানুষের মতোই লাগছে ছায়াটাকে। বাতাসে গাছের পাতা নড়ছে। মনে হচ্ছে মানুষটি হাত নাড়ছে। ঘরের ভেতর মিষ্টি একটা গন্ধ। মিষ্টি, কিন্তু অচেনা।

    আনিস রানুকে কাছে টেনে আনল। রানুর মুখে আলো এসে পড়েছে। কী যে মায়াবতী লাগছে! আনিস ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল। ওদের বিয়ে হয়েছে মাত্র ছ’ মাস। আনিস এখনো অভ্যস্ত হয়ে ওঠে নি। প্রতি রাতেই রানুর মুখ তার কাছে অচেনা লাগে। অপরূপ রূপবতী একটি বালিকার মুখ, যাকে কখনো পুরোপুরি চেনা যায় না। আনিস ডাকল, ‘রানু, রানু।’ কোনো জবাব পাওয়া গেল না। গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন রানু। আনিসের ঘুম এল না। শুয়ে শুয়ে ঠিক করে ফেলল, রানুকে ভালো এক জন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যেতে হবে। অফিসের কমলেন্দুবাবু এক ভদ্রলোকের কথা প্রায়ই বলেন, খুব নাকি গুণী লোক। মিসির সাহেব। দেখালে হয় এক বার মিসির সাহেবকে।

    রানু ঘুমের ঘোরে খিলখিল করে হেসে উঠল। অপ্রকৃতিস্থ মানুষের হাসি শুনতে ভালো লাগে না, গা ছমছম করে।

  • নিশীথিনী

    নিশীথিনী

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book-name]

    নিশীথিনী

    মিসির আলির ধারণা ছিল, তিনি সহজে বিরক্ত হন না। এই ধারণাটা আজ ভেঙে যেতে শুরু করেছে। ঠিক এই মুহূর্তে তিনি অসম্ভব বিরক্ত। যে-রিকশায় তিনি উঠেছেন, তার সীটটা ঢালু। বসে থাকা কষ্টের ব্যাপার। তার চেয়েও বড় কথা, দু’ মিনিট পরপর রিকশার চেইন পড়ে যাচ্ছে।

    এখন বাজছে দশটা তেইশ। সাড়ে দশটায় থার্ড ইয়ার অনার্সের সঙ্গে তাঁর একটা টিউটরিআল আছে। এটা কোনোক্রমেই ধরা যাবে না। যে হারে রিকশা এগুচ্ছে, তাতে ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছতে তাঁর আরো পনের মিনিট লাগবে। এ-কালের ছাত্ররা এতক্ষণ তাদের টীচারদের জন্যে  অপেক্ষা করে না।

    মিসির আলি তাঁর বিরক্তি ঢাকবার জন্যে একটা সিগারেট ধরালেন। ঠিক তখন পঞ্চম বারের মতো রিকশার চেইন পড়ে গেল। রিকশাওয়ালার ভাব-ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে চেইন পড়ার ব্যাপারটায় সে আনন্দিত। গদাইলশকরী চালে সে নামল এবং সামনের চাকাটা তুলে ঝাঁকাঝাঁকি করতে লাগল!

    চেইন পড়ে গেলে কেউ চাকা তুলে ঝাঁকাঝাঁকি করে বলে তাঁর জানা ছিল না। রুক্ষ গলায় বললেন, ‘এ রকম করছ কেন?’

    রিকশাওয়ালা জবাব দিল না। গরম চোখে তাকাল এবং মিসির আলিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে একটা বিড়ি ধরাল। মিসির আলি রাগ সামলাবার চেষ্টা করতে লাগলেন। কুড়ি থেকে এক পর্যন্ত উল্টো দিকে গুনলেন। জীবনানন্দ দাশের ‘মনে হয় একদিন’ কবিতার প্রথম চার লাইন মৃদু স্বরে আওড়ালেন। মিসির আলির ধারণা, কিছু-কিছু কবিতা মানুষের অস্থিরতা কমিয়ে দেয়। ‘মনে হয় একদিন’ এমন একটি কবিতা।

    কিন্তু আজ তাঁর রাগ কমছে না। রিকশাওয়ালা কঠিন মুখ করে নির্বিকার ভঙ্গিতে বিড়ি টানছে। মিসির আলির দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।

    মিসির আলি নিজেকে সামলাবার জন্যেই ভাবতে লাগলেন—তিনি নিজে যদি সিগারেট ধরাতে পারেন, তাহলে এই লোকটি পারবে না কেন? জুন মাসের প্রচণ্ড গরমে বেচারা ক্লান্ত ও বিরক্ত। এক জন ক্লান্ত ও বিরক্ত মানুষের নিশ্চয়ই বিশ্রাম করার অধিকার আছে। তিনি হালকা গলায় বললেন, ‘নাম কি তোমার?’

    ‘সামসু।’

    ‘বাড়ি কোথায় তোমার সামসু?’

    ‘বাড়ি-ঘর নাই।’

    ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার। সামসু, রিকশা চালাও। ক্লাস মিস হবে।’

    সামসু কোনো পাত্তাই দিল না। রাস্তার পাশে পেচ্ছাব করতে বসে গেল। তার বসার ভঙ্গি থেকেই বোঝা যাচ্ছে সে সহজে উঠবে না, বসেই থাকবে। এই লোকটি কি কোনো-একটি অজ্ঞাত কারণে তাঁর সঙ্গে ঝগড়া বাধাবার চেষ্টা করছে?

    মিসির আলি রিকশা থেকে নেমে পড়লেন। পাঁচ টাকা ভাড়া ঠিক করা ছিল, তিনি ছ’টাকা দিলেন। সহজ স্বরে বললেন, ‘নাও, ভাড়া নাও। আমি হেঁটে চলে যাব।’

    সাধারণত রিকশাওয়ালাদের সবচেয়ে ময়লা ন্যাতন্যাতে নোটগুলো দেয়া হয়। মিসির আলি তাকে দিয়েছেন কচকচে নতুন নোট। এটা তিনি করলেন এই আশায়, যাতে সামসু নামের এই উদ্ধত যুবকটি তাঁর আচরণের জন্যে লজ্জিত বোধ করে।

    এ-রকম কাণ্ডকারখানা মিসির আলি সাহেব করে থাকেন। একবার বাসে তাঁর পাশে সুখী-সুখী চেহারার এক বুড়ো বসল। দু’ জনের সীট। কিন্তু বুড়ো অকারণে পা ফাঁক করে তাঁকে চাপ দিতে লাগল। বিশ্রী কাণ্ড! মিসির আলি খানিকক্ষণ চাপ সহ্য করলেন, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘আপনার বোধহয় অল্প জায়গায় বসার অভ্যেস নেই, আপনি বরং একাই এখানে আরাম করে বসুন।’

    মিসির আলি ভেবেছিলেন, লোকটি এতে লজ্জিত ও বিব্রত হবে। সে-রকম কিছু হল না। লোকটি নির্বিকার ভঙ্গিতে দু’ জনের জায়গা দখল করে পা দোলাতে লাগল। এরা অসুখী মানুষ। নিজেদের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা এরা—অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করে। ঢাকা শহরে অসুখী মানুষের সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ছে কেন ভাবতে ভাবতে মিসির আলি দ্রুত হাঁটতে লাগলেন। মাথার ওপর জুন মাসের গনগনে আকাশ। রাস্তাঘাট তেতে উঠেছে। বাতাসের লেশমাত্রও নেই। এ-বছর অসম্ভব গরম পড়েছে। এই অসহ্য গরমে রিকশাওয়ালারা মানুষ টানে কীভাবে কে জানে! মিসির আলি সামসু নামের উদ্ধত যুবকটির জন্যে এক ধরনের মায়া অনুভব করলেন।

    ক্লাস ফাঁকা। আসমানী রঙের জামদানি শাড়ি পরা একটি মেয়ে শুধু সেকেন্ড বেঞ্চে বসে আছে। মেয়েটির মাথায় ঘোমটা। এটা একটা নতুন ব্যাপার। ইউনিভার্সিটির মেয়েরা মাথায় ঘোমটা দেয় শুধু আজানের সময়।

    মিসির আলি ঢুকতেই মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। তিনি অপ্রস্তুত স্বরে বললেন, ‘দেরি করে ফেললাম। সবাই চলে গেছে নাকি?’

    ‘জ্বি স্যার।’

    ‘তুমি বসে আছ কেন? তুমি কেন ওদের সঙ্গে গেলে না?’

    মেয়েটি মৃদু স্বরে বলল, ‘স্যার, আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন না?’

    ‘হ্যাঁ, চিনতে পারছি। তোমার নাম নীলু।’

    ‘জ্বি।’

    ‘তুমি তো এই ক্লাসের নও।’

    ‘জ্বি-না।’

    ‘তাহলে?’

    ‘আমি স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে বসে আছি। আমি রুটিনে দেখেছি, আজ আপনার এখানে ক্লাস।’

    মিসির আলি ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘তোমার কি বিয়ে হয়েছে? মাথায় ঘোমটা, তাই বললাম। নতুন বিয়ে-হওয়া মেয়েরা প্রথম দিকে ঘোমটা পরে।’

    ‘আমার বিয়ে হয় নি।

    ‘ও, আচ্ছা।’

    ‘আপনার সঙ্গে আমার খুব একটা জরুরি কথা আছে স্যার।’

    ‘বল।’

    ‘আমি স্যার অনেকটা সময় নিয়ে কথাটা আপনাকে বলতে চাই। আমি কি স্যার আপনার বাসায় যেতে পারি?’

    ‘বাসায় আমার কিছু ঝামেলা আছে।’

    ‘তাহলে স্যার, আপনি কি আমাদের বাসায় একটু আসবেন? আমার খুব দরকার।’

    ‘ঠিক আছে, যাব।’

    ‘আমাদের বাসার ঠিকানা কি আপনার মনে আছে? এক বার গিয়েছিলেন আমাদের বাসায়। আমাদের বাসার দোতলায় আপনার এক জন পরিচিত মহিলা থাকতেন। রানু নাম।’

    ‘আমার মনে আছে।’

    ‘স্যার, আপনি কি আজই আসবেন? আমার খুব দরকার।’

    মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন মেয়েটার দিকে। এই মেয়ের নাম নীলু, কিন্তু কোনো-এক বিচিত্র কারণে তাকে অবিকল রানুর মতো দেখাচ্ছে।

    ‘স্যার, আপনি কি আজই যাবেন?’

    ‘ঠিক আছে রানু।’

    ‘আমার নাম কিন্তু স্যার নীলু।’

    মিসির আলি লক্ষ করলেন, মেয়েটা হাসছে। যেন তাকে রানু বলায় সে খুশি। এটাই যেন আশা করছিল।

    ‘আমাদের বাসার ঠিকানা কি লিখে দেব?’

    ‘লিখে দিতে হবে না। আমার মনে আছে।’

    ‘আসবেন কিন্তু স্যার।’

    ‘আসব। আমি আসব।’

    ‘যাই স্যার, স্লামালিকুম।’

    নীলু উঠে দাঁড়াল। এত সুন্দর মেয়েটি। শ্যামলা গায়ের রঙ। চোখে-মুখে তেমন কোনো বিশেষত্ব নেই। কিন্তু তবু এমন মায়া জাগিয়ে তুলছে কেন? মিসির আলি লজ্জিত বোধ করলেন। তাঁর বয়স একচল্লিশ। এই বয়সের এক জন মানুষের মনে এ-জাতীয় তরল ভাব থাকা উচিত নয়। তা ছাড়া এই মেয়েটি তাঁর ছাত্রী।

    মিসির আলি শূন্য ক্লাসে দীর্ঘ সময় বসে রইলেন। একসঙ্গে বেশ কয়েকটা জিনিস নিয়ে তিনি ভাবছেন। মেয়েটির মাথায় ঘোমটা কেন? এই মেয়েটি দীর্ঘদিন ধরেই ক্লাসে আসছে না কেন? মেয়েটি চলে যাবার সময়ও একটা অস্বাভাবিক আচরণ করেছে। সোজাসুজি হেঁটে গেছে, এক বারও পেছনে ফিরে তাকায় নি। মেয়েরা সাধারণত পেছন ফিরে তাকায়।

    সবচেয়ে রহস্যময় ব্যাপারটি হচ্ছে, একটি মৃতা মেয়ের ছাপ আছে নীলুর মধ্যে। যেভাবেই হোক আছে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। প্রকৃতি রহস্য পছন্দ করে না।

    তিনি সিগারেট ধরালেন।

    প্রকৃতি রহস্য পছন্দ করে না—কথাটা কি সত্যি? তাঁর মনে হল, সত্যি নয়। প্রকৃতির কাজই হচ্ছে নানান রকম রহস্য সৃষ্টি করা—মানুষের কাজ হচ্ছে সেই রহস্যের কুয়াশা সরিয়ে দেয়া। এমন একদিন কি আসবে, যখন কেউ বলবে না—দেয়ার আর মেনি থিংকস ইন হেভেন্‌ অ্যাণ্ড আর্থ…।

    ‘আরে, মিসির আলি সাহেব না? এখানে কী করছেন? একা-একা ক্লাসে বসে আছেন কেন?’

    তিনি দাড়িওয়ালা এই লোকটাকে চিনতে পারলেন না। হাতে রেজিস্ট্রি খাতা, কাজেই অধ্যাপক হবেন! মুখখানা হাসি-হাসি। পান খেয়ে দাঁত লাল করে ফেলেছেন। পান-খাওয়া লোকজন কি কিছুটা নম্র স্বভাবের হয়? মিসির আলির মনে হল, পান এবং স্বভাবের ভেতর কোনো-একটা সম্পর্ক আছে। তিনি যে ক’ জন পানবিলাসী লোককে চেনেন, তাদের সবাই সদালাপী।

    ‘কি, কথা বলছেন না কেন? কিছু ভাবছেন নাকি?’

    মিসির আলি উঠে দাঁড়ালেন। শান্ত ও নরম স্বরে বললেন, ‘জ্বি-না, কিছু ভাবছি না।’

    ‘আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন না?’

    ‘জ্বি-না।’

    দাড়িওয়ালা অধ্যাপক অত্যন্ত বিস্মিত হলেন। মিসির আলি বিব্রত বোধ করলেন। কাউকে চিনতে পারছি না বলা—তাকে প্রায় অপমান করার শামিল। বিশেষ করে অধ্যাপক শ্রেণীর মানুষরা এ ব্যাপারে খুব স্পর্শকাতর।

    ‘সত্যি চিনতে পারছেন না?’

    ‘জ্বি না। আমার একটা প্রবলেম আছে, কিছুই মনে থাকে না।’

    ‘মাসখানেক আগে আমি আপনার কাছে এক জন রোগী নিয়ে গিয়েছিলাম—ফিরোজ নাম। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র।’

    ‘ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আপনি ফিরোজের দুলাভাই।’

    ‘হ্যাঁ দুলাভাই।’

    ‘এবং আপনার নাম হচ্ছে নাজিমুদ্দিন। হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট।’

    ‘এই তো চিনতে পারছেন।’

    ‘চিনতে পারছি এসোসিয়েশন থেকে। একটা মনে পড়লে, অন্যগুলো মনে পড়তে থাকে। এসোসিয়েশন অব আইডিয়াস।’

    ‘ফিরোজ তো অনেকখানি ইমপ্রুভ করেছে। এত অল্প সময়ে যে আপনি এতটা করবেন, আমরা কেউ কল্পনাও করি নি। দারুণ ব্যাপার।’

    মিসির আলি কিছু বললেন না। ফিরোজ আজ বিকেলে তাঁর কাছে আসবে। প্রতি সোমবার ফিরোজের সঙ্গে তাঁর একটি সেশন হয়। অথচ নীলুকে বলে রেখেছেন, আজ যাবেন তাদের বাসায়। তাঁর কাজকর্ম ইদানীং এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কেন? বয়স বাড়ছে।

    ‘মিসির আলি সাহেব।’

    ‘জ্বি?’

    ‘চলুন, লাউঞ্জে বসে চা খাওয়া যাক।’

    ‘চলুন।’

    ‘আপনি এত গম্ভীর হয়ে আছেন কেন? কী ভাবছেন এত?’

    ‘কিছু ভাবছি না।’

    তিনি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। দীর্ঘনিঃশ্বাসটি কেন ফেললেন, এই নিয়ে ভাবতে চেষ্টা করলেন। অকারণে তো কেউ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে না। সবকিছুর পেছনেই কারণ থাকে। এই জগতে কার্যকারণ ছাড়া কিছুই হয় না, সবই লজিক। জটিল লজিক। জটিল কিন্তু অভ্রান্ত। লজিকের বাইরে এক চুলও কারোর যাবার ক্ষমতা নেই।

  • নিষাদ

    নিষাদ

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    মিসির আলি আগ্রহ নিয়ে তাকে দেখছেন। রোগা লম্বা এক জন মানুষ। মুখ দেখা যাচ্ছে না, কারণ লোকটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই গরমেও ফুল হাতা ফ্লানেলের শার্ট, ফুলপ্যান্টটি চকচকে কাপড়ের তৈরী। ছাঁটের ধরন দেখে মনে হয় সেকেণ্ডহ্যাণ্ড মার্কেট থেকে কেনা। এ ধরনের ছাঁটের প্যান্ট ঢাকায় এখন চালু নেই। পায়ের জুতা জোড়া ঝকঝক করছে। মনে হচ্ছে এখানে আসবার আগে জুতা পালিশ করেছে। মিসির আলি লোকটির বয়স আন্দাজ করবার চেষ্টা করলেন। কুড়ি থেকে পঁচিশের মধ্যে হবার কথা। এই বয়সের যুবকদের চেহারায় এক ধরনের আভা থাকে। যৌবনের আভা। এর তা নেই। অল্প বয়সে চুলও পেকেছে বলে মনে হচ্ছে। কানের পাশে রুপোলি ছোঁয়া। মিসির আলি বললেন, ‘আপনি কি আমার কাছে এসেছেন?’

    সে জবাব দিতে দেরি করছে। যেন এই প্রশ্নের জবাব তার জানা নেই। মিসির আলি আবার বললেন, ‘আপনি কি আমার কাছে এসেছেন?’

    ‘জ্বি।’

    ‘আপনি মনে হয় আগেও কয়েক বার এসেছিলেন?’

    ‘জ্বি।’

    ‘এক বার একটি চিঠি লিখে গিয়েছিলেন, তাই না? লিখেছিলেন——সোমবার সন্ধ্যায় আসব।’

    ‘জ্বি স্যার।’

    ‘আমি কিন্তু সোমবার সন্ধ্যায় আপনার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। আপনি আসেন নি।’

    ‘একটা কাজ পড়ে গিয়েছিল স্যার।’

    লোকটি খুব সহজেই স্যার বলছে। তার মানে ছোট কোনো চাকরি করে। অফিসের প্রায় সবাইকে বোধহয় স্যার বলতে হয়, যে-কারণে এটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। খারাপ অভ্যাস। মিসির আলি বললেন, ‘আপনি কী করেন?’

    ‘সামান্য একটা কাজ করি। বলার মতো কিছু না।’

    ‘আসুন। ভেতরে আসুন।’

    ‘আজ যাই স্যার। আরেক দিন আসব।’

    মিসির আলি অত্যন্ত অবাক হলেন। এই লোকটি বারবার তাঁর খোঁজে আসছে, চিঠি লিখে যাচ্ছে। আজ দেখা হল, কিন্তু সে থাকতে চাচ্ছে না। মনের ভেতর বড় রকমের কোনো দ্বিধার ভাব আছে, যা সে কাটাতে পারছে না। মিসির আলি বললেন, ‘আপনি চলে যেতে চাচ্ছেন, চলে যাবেন। কিছুক্ষণ বসে যান। আমার কাছে কেন এসেছেন, সেটা বলুন।’

    ‘অন্য আরেক দিন আসব।’

    ‘সেদিন হয়তো আমাকে পাবেন না। আমি বাসায় খুব কম থাকি। আমার অনেক ঝামেলা।’

    লোকটি খুবই অস্বস্তি নিয়ে ভেতরে ঢুকল। জুতা জোড়া নিয়ে একটু চিন্তা করছে। খুলে ফেলবে কি ফেলবে না। মিসির আলি লক্ষ করলেন, লোকটি নিজেই বসার ঘরের দরজা বন্ধ করছে। ছিটকিনি লাগানোর চেষ্টা করছে। এটাও হয়তো তার অভ্যাস। সে খুব সম্ভব তার ঘরে ঢুকেই ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। তাই যদি হয়, তাহলে লোকটি থাকে একা। যে বাড়িতে অনেকগুলি মানুষ থাকে, সে-বাড়ির কেউ ঘরে ঢুকেই ছিটকিনি লাগানোর অভ্যাস করবে না।

    মিসির আলি বললেন, ‘এ-বাড়ির ছিটকিনি লাগানোর একটা বিশেষ কায়দা আছে। আপনি পারবেন না। আপনি বসুন, আমি লাগাচ্ছি।’

    লোকটি বসল। বসার ভঙ্গি বিনীত। হাত মুঠি করে কোলের উপর রাখা। ঈষৎ কুঁজো হয়ে বসেছে। গায়ের রঙ বেশ ফর্সা। অতিরিক্ত ফর্সা হবার কারণেই বোধহয় চেহারায় খানিকটা মেয়েলি ভাব চলে এসেছে। অবশ্যি এটা জোড়া ভুরু ও পাতলা ঠোঁটের কারণেও হতে পারে। এই ধরনের ছেলেদেরকেই স্কুলে সবাই ‘মেয়ে’ বলে খেপায়। এবং উঁচু ক্লাসের কিছু বখা ছেলে বিশেষ কারণে এদের বন্ধুত্ব কামনা করে।

    মিসির আলি বললেন, ‘আপনার নাম কি?’ লোকটি জবাব দিল না। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। এখন সে তাকাচ্ছে জানালা দিয়ে। মিসির আলি অবাক হয়ে বললেন, ‘নাম বলতে কি আপনার আপত্তি আছে?’

    ‘জ্বি-না।’

    ‘তাহলে নাম বলুন। নাম দিয়েই শুরু করা যাক।’

    ‘আমার নাম রইসুদ্দিন।’

    ‘শুধু রইসুদ্দিন! নাকি রইসুদ্দিনের সঙ্গে অন্য কিছু আছে?’

    ‘মোঃ রইসুদ্দিন।’

    দেখুন ভাই, আপনি কিন্তু ঠিক নামটা বলছেন না। মিথ্যা কথা বলায় যারা অভ্যস্ত নয়, তারা যখন মিথ্যা বলে, তখন তাদের গলা কেঁপে যায়। খুব দ্রুত চোখের পাতা পড়ে এবং খানিকটা ব্লাশ করে। আপনার বেলায় এর সব ক’টি হয়েছে।’

    ‘আমার ভালো নাম মুনির। ডাক নাম টুনু।’

    ‘চা খাবেন?’

    ‘জ্বি স্যার, খাব।’

    ‘আপনি আরাম করে বসুন, আমি চা বানিয়ে আনছি। ঘরে কাজের কোনো লোক নেই। সব আমাকেই করতে হবে। আপনি আমার কাছে কি জন্যে এসেছেন তা এখন বলবেন? না চা খেয়ে বলবেন?’

    ‘স্যার আমি খুব বিপদে পড়েছি।’

    ‘বিপদে পড়লে লোকজন যায় পুলিশের কাছে। আমার কাছে কেন? আমি তো পুলিশ নই।’

    ‘অন্য রকম বিপদ। আপনি না শুনলে বুঝবেন না। আগে শুনতে হবে।’

    ‘বেশ শুনছি, তাতে লাভ হবে কি?’

    ‘আপনি অনেকের অনেক সমস্যার সমাধান করেছেন—আমি অনেক কিছু আপনার সম্পর্কে শুনেছি।’

    ‘শুনেছেন, খুব ভালো কথা। কী শুনেছেন, জানি না। তবে আপনাকে আগেভাগেই বলে রাখি, আমার দৌড় খুব সামান্য। আমি অ্যাবনরমেল সাইকোলজি নিয়ে কিছু পড়াশোনা করেছি—এই পর্যন্তই।’

    মুনির মাথা নিচু করে বসে আছে। কোনো কথা সে শুনছে বলে মনে হচ্ছে না। মিসির আলি বললেন, ‘আপনার বাসা কোথায়?’

    মুনির তার জবাব দিল না। মাথা নিচু করে ফেলল। অর্থাৎ সে তার ঠিকানা জানাতে ইচ্ছুক নয়। মিসির আলি চা বানাতে গেলেন। ঘরে কোনো খাবার নেই। বিস্কিট-টিস্কিটজাতীয় কিছু দিতে পারলে ভালো হত। লোকটি ক্ষুধার্ত। হয়তো অফিস শেষ করে সরাসরি চলে এসেছে। কিছু খাওয়া হয় নি। কিংবা বিকেলে কিছু খাবার মতো সামর্থ্য নেই। এটি হওয়াই স্বাভাবিক। নিম্ন আয়ের মানুষরা এ-দেশে পশুর জীবন-যাপন করে।

    মিসির আলি চা নিয়ে বসার ঘরে ঢুকে চমকে উঠলেন। কেউ নেই। দরজা ভেজানো। লোকটি এক ফাঁকে উঠে চলে গিয়েছে। নিঃশব্দ প্রস্থান যাকে বলে। মিসির আলি হেসে ফেললেন। এ-জীবনে তিনি অনেক বিচিত্র মানুষ দেখেছেন। তাদের অদ্ভুত আচার-আচরণের সঙ্গে তিনি পরিচিত। এই লোকটির প্রস্থান ঘটনা হিসেবে তেমন অদ্ভুত নয়, তবু বেশ মজার। তবে নিঃশব্দ প্রস্থানের এই ঘটনার ব্যাখ্যা বেশ সরল। লোকটি যে-বিপদের কথা বলতে এসেছিল, শেষ মুহূর্তে ঠিক করেছে তা সে বলবে না। এ-রকম মনে করারও অনেকগুলি কারণ হতে পারে। প্রথম কারণ—সম্ভবত মিসির আলিকে দেখে তার আশাভঙ্গ হয়েছে। মনে হয়েছে, এই লোকটিকে দিয়ে কাজ হবে না। দ্বিতীয় কারণ—বিপদটা এমন শ্রেণীর যা বলার মতো মনের জোর তার নেই।

    ‘স্যার, আসব?’

    মিসির আলি চমকে উঠলেন। লোকটি ফিরে এসেছে। তার চোখে-মুখে অপ্রস্তুত ভঙ্গি। যেন সে বড় ধরনের অপরাধ করে এসেছে। এই অপরাধের জন্যে সে লজ্জিত, অনুতপ্ত।

    ‘কোথায় গিয়েছিলেন?’

    ‘আপনার জন্যে এক প্যাকেট সিগারেট আনতে গিয়েছিলাম। বেশি কিছু দেবার সামর্থ্য স্যার আমার নেই। আমি দরিদ্র মানুষ।’

    তিনি হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেট নিলেন। বেনসন এণ্ড হেজেস, নির্ঘাৎ পঞ্চাশ টাকার মতো খরচ হয়েছে। লোকটি আগের মতো মাথা নিচু করে বসে আছে। চোখের পাতা পর্যন্ত ফেলছে না।

    ‘আমাকে কী বলতে এসেছেন, বলুন।’

    লোকটি কিছু বলল না। মিসির আলি সিগারেট ধরিয়ে হালকা স্বরে বললেন, ‘যদি বলতে না-চান বলার দরকার নেই। আসুন অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ করি। গরম কেমন পড়েছে বলুন।’

    ‘খুব গরম পড়েছে স্যার।’

    ‘এই প্রচণ্ড গরমে ফ্লানেলের শার্ট গায়ে দিয়েছেন কেন? আপনার গরম লাগছে না?’

    ‘আমার আর কোনো ভালো শার্ট নেই। আমি দরিদ্র।’

    ‘দরিদ্র হওয়াতে লজ্জাবোধ করার কিছু নেই। ধনী ব্যক্তিদের বরং লজ্জিত হওয়া উচিত। আপনার চা-টা মনে হচ্ছে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। গরম করে আনব?’

    ‘জ্বি না।’

    লোকটি ঠাণ্ডা চায়ের কাপে চুমুক দিতে লাগল। যেন সে একটি অপ্রিয় দায়িত্ব পালন করছে।

    ‘আপনি কি আমাকে সত্যি সত্যি কিছু বলবেন?

    ‘জ্বি স্যার, বলব।’

    ‘বলুন।’

    মুনির চুপ করে আছে। ইনহিবিশন বলে একটা ব্যাপার আছে। এটা হচ্ছে তাই। প্রথম বাধাটি সে কাটিয়ে উঠতে পারছে না। মিসির আলির মনে হল, লোকটি নিঃসঙ্গ প্রকৃতির। একা-একা থাকে। মানুষের সঙ্গে কথা বলার অভ্যেস নেই। যা সে বলতে চায়, তা বলার জন্যে তাকে প্রচুর সাহস সঞ্চয় করতে হবে। মিসির আলি তাকে সময় দিলেন।

    বাইরে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। আকাশ থমথমে। দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড় আসবে সম্ভবত। আসুক। এই গরম আর সহ্য করা যাচ্ছে না। ইচ্ছা করছে কোনো একটা পুকুরে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকতে।

    ঘর অন্ধকার। বাতি জ্বালান দরকার। মিসির আলি বাতি জ্বালালেন না। ইনহিবিশন কাটানোর জন্যে অন্ধকার একটা চমৎকার জিনিস।

    মুনির মূর্তির মতো বসে আছে। সে এবার ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে কথা বলা শুরু করল। তার গলার স্বর মিষ্টি। শুনতে ভালো লাগে। গলার স্বরে কোথাও যেন একটি ধাতব চরিত্র আছে। মেয়েদের গলার স্বরে তা মানিয়ে যায়। পুরুষদের সঙ্গে ঠিক মানায় না।

  • অন্যভুবন

    অন্যভুবন

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    দুপুরবেলা কাজের মেয়েটি মিসির আলিকে ডেকে তুলল। কে নাকি দেখা করতে এসেছে। খুব জরুরি দরকার।

    মিসির আলির রাগে গা কাঁপতে লাগল। কাজের মেয়েটিকে বলে দেয়া ছিল কিছুতেই যেন তাঁকে তিনটার আগে ডেকে তোলা না হয়। এখন ঘড়িতে বাজছে দু’টা দশ। যত জরুরি কাজই থাকুক, এই সময় তাঁকে ডেকে তোলার কথা নয়। মিসির আলি রাগ কমাবার জন্যে উল্টো দিকে দশ থেকে এক পর্যন্ত গুনলেন। গুন-গুন করে মনে-মনে গাইলেন—আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে এত পাখি গায়—। এই গানটি গাইলে তাঁর রাগ আপনাতেই কিছুটা নেমে যায়। কিন্তু আজ নামছে না। কাজের মেয়েটির ভাবলেশহীন মুখ দেখে তা আরো বেড়ে যাচ্ছে। তিনি গম্ভীর গলায় ডাকলেন, ‘রেবা।’

    ‘জ্বি।’

    ‘আর কোনো দিন তুমি আমাকে তিনটার আগে ডেকে তুলবে না।’

    ‘জ্বি আইচ্ছা।’

    ‘দুটো থেকে তিনটা এই এক ঘণ্টা আমি প্রতিদিন দুপুরে ঘুমিয়ে থাকি। এর নাম হচ্ছে সিয়াস্তা। বুঝলে?’

    ‘জ্বি।’

    ‘ঘড়ি দেখতে জান?’

    ‘জ্বি-না।’

    মিসির আলির রাগ দপ করে নিভে গেল। যে-মেয়ে ঘড়ি দেখতে জানে না, সে তাকে তিনটার সময় ডেকে তুলবে কীভাবে? রেবা মেয়েটি নতুন কাজে এসেছে। তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে।

    ‘রেবা।’

    ‘জ্বি?’

    ‘আজ সন্ধার পর তোমাকে ঘড়ি দেখা শেখাব। এক থেকে বার পর্যন্ত সংখ্যা প্রথম শিখতে হবে। ঠিক আছে?’

    ‘জ্বি, ঠিক আছে।’

    ‘এখন বল, যে-লোকটি দেখা করতে এসেছে, সে কেমন?’

    রেবা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মানুষ মানুষের মতোই, আবার কেমন হবে! তার এই সাহেব কী-সব অদ্ভুত কথাবার্তা যে বলে! পাগলা ধরনের কথাবার্তা!

    ‘বল বল, চুপ করে আছ কেন?’

    মিসির আলি বিরক্ত হলেন। এই মেয়েকে কাজ শেখাতে সময় লাগবে। তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘মানুষকে দেখতে হবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, বুঝতে পারছ?’

    মেয়েটি মাথা নাড়ল। মাথা নাড়ার ভঙ্গি থেকেই বলে দেয়া যায়, সে কিছুই বোঝে নি। বোঝার চেষ্টাও করে নি। সে শুধু ভাবছে, এই লোকটির মাথায় দোষ আছে। তবে দোষ থাকলেও লোকটা ভালো। বেশ ভালো। রেবা এ-পর্যন্ত দু’টি গ্লাস, একটা পিরিচ এবং একটা প্লেট ভেঙেছে। একটা কাপের বোঁটা আলগা করে ফেলেছে। সে তাকে কিছুই বলে নি। একটা ধমক পর্যন্ত দেয় নি। ভালো মানুষগুলি একটু পাগল-পাগলই হয়ে থাকে।

    মিসির আলি হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেট নিলেন। একটি সিগারেট বের করে হাত দিয়ে গুঁড়ো করে ফেললেন। তিনি সিগারেট ছাড়বার চেষ্টা করছেন। যখনই খুব খেতে ইচ্ছা করে, তিনি একটি সিগারেট বের করে গুঁড়ো করে ফেলেন, এবং ভাবতে চেষ্টা করেন একটি সিগারেট টানা হল। এতে কোনো লাভ হচ্ছে না, শুধু মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যাচ্ছে।

    ‘রেবা।’

    ‘জ্বি?’

    ‘এখন আমি তোমাকে কিছু প্রশ্ন করব, তুমি উত্তর দেবে। তোমার উত্তর থেকে আমি ধারণা করতে পারব, যে-লোকটি এসেছে সে কী রকম।’

    রেবা হাসল। তার বেশ মজা লাগছে।

    ‘প্রথম প্রশ্ন, যে লোকটি এসেছে সে গ্রামে থাকে না শহরে?’

    ‘গেরামে।’

    ‘লোকটি বুড়ো না জোয়ান?’

    ‘জোয়ান।’

    ‘রোগা না মোটা?’

    ‘রোগা।’

    ‘কী কাপড় পরে এসেছে?’

    ‘মনে নাই।’

    ‘কাপড় পরিষ্কার না ময়লা?’

    ‘ময়লা।’

    ‘হাতে কী আছে? ব্যাগ বা ছাতা, এ-সব কিছু আছে?’

    ‘না।’

    ‘চোখে চশমা আছে?’

    ‘না।’

    মিসির আলি থেমে-থেমে বললেন, ‘তোমাকে যে-প্রশ্নগুলি করলাম, সেগুলি মনে রাখবে। কেউ আমার কাছে এলে, আমি এইগুলি জানতে চাই। বুঝতে পারছ?’

    ‘জ্বি।’

    ‘এখন যাও, আমার জন্যে এক কাপ চমৎকার চা বানাও। দুধ-চিনি কিচ্ছু দেবে না। শুধু লিকার। বানানো হয়ে গেলে চায়ের কাপে এক দানা লবণ ফেলে দেবে।’

    ‘লবণ?’

    ‘হ্যাঁ, লবণ!’

    মিসির আলি উঠে দাঁড়ালেন। বসার ঘরে যে-লোকটি এসেছে তাকে দেখা দরকার। রেবার কথামতো লোকটি হবে গ্রামের, ময়লা কাপড় পরে এসেছে। জোয়ান বয়স। হাতে কিছুই নেই। এই ধরনের এক জন লোকের তাঁর কাছে কী প্রয়োজন থাকতে পারে?

    বসার ঘরে যে লোকটি বসে ছিল, সে রোগা নয়। পরনে গ্যাভার্ডিনের স্যুট। হাতে চামড়ার একটি ব্যাগ। বয়স পঞ্চাশের উপরে। চোখে চশমা। মিসির আলি মনে-মনে একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। রেবা মেয়েটির পর্যবেক্ষণশক্তি মোটেই নেই। একে বেশি দিন রাখা যাবে না। মিসির আলি বসে-থাকা লোকটিকে তীক্ষ্ণ চোখে দেখতে লাগলেন।

    তিনি ঘরে ঢোকার সময় লোকটি উঠে দাঁড়ায় নি। দাঁড়াবার মতো ভঙ্গি করেছে। বসে থাকার মধ্যেও একটা স্পর্ধার ভাব আছে। লোকটি তাকিয়ে আছে সরু চোখে। যেন সে কিছু একটা যাচাই করে নিচ্ছে। মিসির আলি বললেন, ‘ভাই, আপনার নাম?’

    ‘আমার নাম বরকতউল্লাহ্। আমি ময়মনসিংহ থেকে এসেছি।’

    ‘কোনো কাজে এসেছেন কি?’

    ‘হ্যাঁ, কাজেই এসেছি। আমি অকাজে ঘোরাঘুরি করি না।’

    ‘আমার কাছে এসেছেন?’

    ‘আপনার কাছে না-এলে, আপনার ঘরে বসে আছি কেন?’

    ‘ভালোই বলেছেন। এখন বলুন, কী ব্যাপার। অল্প কথায় বলুন।’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব থমথমে গলায় বললেন, ‘আমি কথা কম বলি। আপনাকে বেশিক্ষণ বিরক্ত করব না।’

    তিনি লক্ষ করলেন, লোকটি আহত হয়েছে। তার চোখ-মুখ লাল। মিসির আলি খুশি হলেন। লোকটি বড় বেশি স্পর্ধা দেখাচ্ছে।

    ‘বরকতউল্লাহ্ সাহেব, চা খাবেন?’

    ‘জ্বি না, আমি চা খাই না। আমার যা বলার তা আমি খুব অল্প কথায় বলে চলে যাব।’

    মিসির আলি হাসতে-হাসতে বললেন, ‘অল্প কথায় কিছু বলতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আপনার অভ্যাস হচ্ছে বেশি কথা বলা। আপনি চা খাবেন কি না, তার জবাব দিতে গিয়ে একটি দীর্ঘ বাক্য বলেছেন। আপনি বলেছেন—জ্বি না, আমি চা খাই না। আমার যা বলার তা আমি খুব অল্প কথায় বলে চলে যাব। এই বাক্যটিতে সতেরটি শব্দ আছে।’

    বরকতউল্লাহ সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন। তাঁর ভ্রু কুঞ্চিত হল। মিসির আলি মনে-মনে হাসলেন। কাউকে বুদ্ধির খেলায় হারাতে পারলে তাঁর খুব আনন্দ হয়।

    ‘বরকতউল্লাহ্ সাহেব, আপনি কী চান?’

    ‘আপনার সাহায্য চাই। তার জন্যে আমি আপনাকে যথাযথ সম্মানী দেব। আমি ধনাঢ্য ব্যাক্তি না-হলেও দরিদ্র নই! আমি চেকবই নিয়ে এসেছি।’

    ভদ্রলোক কোটের পকেটে হাত দিলেন। মিসির আলির খানিকটা মন-খারাপ হয়ে গেল। ধনবান ব্যক্তিরা দরিদ্রের কাছে প্রথমেই নিজেদের অর্থের কথা বলে কেন ভাবতে লাগলেন।

    বরকতউল্লাহ্ বললেন, ‘আমি কি আমার সমস্যাটার কথা আপনাকে বলব?’

    মিসির আলি বললেন, ‘তার আগে জানতে চাই, আপনি আমার নাম জানলেন কী করে? আমি এমন কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নই যে, ময়মনসিংহের এক জন লোক আমার নাম জানবে।’

    বরকতউল্লাহ্ নিচু স্বরে বললেন, ‘আমি খুঁজছি এক জন ভালো সাইকিয়াটিস্ট, যাঁর কাছে আমি অকপটে আমার কথা বলতে পারব। যে আমার কথায় লাফিয়ে উঠবে না, আবার অবিশ্বাসের হাসিও হাসবে না। আমি জানি, আপনি সে-রকম এক জন মানুষ। কী করে জানি, তা তেমন জরুরি নয়।’

    মিসির আলির মনে হল লোকটা বেশ বুদ্ধিমান, গুছিয়ে কথা বলতে জানে। যার মানে হচ্ছে, গুছিয়ে কথা বলার অভ্যেস তার আছে। লোকটি সম্ভবত এক জন ব্যবসায়ী। সফল ব্যবসায়ীদের নানান ধরনের লোকজনের সঙ্গে খুব গুছিয়ে কথা বলতে হয়।

    ‘বরকতউল্লহ্ সাহেব, আপনি কি এক জন ব্যবসায়ী?’

    ‘হ্যাঁ, আমি এক জন ব্যবসায়ী।’

    ‘কত দিন ধরে ব্যবসা করছেন?’

    ‘প্রায় দশ বছর। এখন করছি না।’

    ‘কিসের ব্যবসা?’

    ‘আপনি আমাকে জেরা করছেন কেন বুঝতে পারছি না।’

    ‘আপনার সমস্যা নিয়ে আমি মাথা ঘামাব কি না, তা জানার জন্যে জেরা করছি। যদি আপনাকে আমার পছন্দ হয়, তবেই আপনার কথা শুনব। সবার সমস্যা নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না।’

    ‘যথেষ্ট পরিমাণ টাকা পেলেও না?’

    ‘না। আমার সম্পর্কে ভালোরকম খোঁজখবর আপনি নেন নি। যদি নিতেন, তাহলে জানতেন যে, আমি টাকা নিই না।’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব দীর্ঘ সময় চুপ করে রইলেন। তিনি তাঁর সামনে বসে থাকা রোগাটে লোকটিকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। কথাবার্তা বলছে অহঙ্কারী মানুষের মতো, কিন্তু বলার ভঙ্গিটি সহজ ও স্বাভাবিক।

    ‘আপনি টাকা নেন না কেন, জানতে পারি কি?’

    ‘নিশ্চয়ই পারেন। টাকা নিলেই এক ধরনের বাধ্যবাধকতা এসে পড়ে। আমি তার মধ্যে যেতে চাই না। অন্যের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা আমার পেশা নয়, শখ। শখের ব্যাপারে কোনোরকম বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়। কি বলেন?’

    ‘ঠিকই বলছেন। আমি আপনার সব প্রশ্নের জবাব দেব। কী জানতে চান বলুন?’

    ‘আপনার পড়াশোনা কতদূর?’

    ‘এম এ পাশ করেছি। পলিটিক্যাল সায়েন্স।’

    ‘আপনি বলছেন ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন, কেন?’

    ‘এই প্রশ্নের জবাব আপনাকে পরে দেব। অন্য প্রশ্ন করুন।’

    ‘আপনি বিবাহিত?’

    ‘হ্যাঁ। আমার ন’ বছর বয়েসী একটি মেয়ে আছে।’

    ‘আপনার সমস্যা এই মেয়েকে নিয়েই, নয় কি?’

    ‘জ্বি হাঁ। কী করে বুঝলেন?’

    মেয়ের কথা বলার সময় আপনার গলার স্বর পাল্টে গেল, তা থেকেই আন্দাজ করছি। আপনার স্ত্রী মারা গেছেন কত দিন হল?

    ‘প্রায় নয় বছর হল। স্ত্রী মারা গেছেন, সেটা কী করে বলতে পারলেন?’

    ‘বাচ্চাদের কোনো সমস্যা হলে মা নিজে আসেন। এ ক্ষেত্রে আসেন নি দেখে সন্দেহ হয়েছিল। তা ছাড়া বিপত্নীক মানুষদের দেখলেই চেনা যায়।’

    ‘আমি কি এবার আমার ব্যাপারটা বলব?’

    ‘বলুন।’

    ‘সংক্ষেপে বলতে হবে?’

    ‘না, সংক্ষেপে বলার দরকার নেই। চা দিতে বলি?’

    ‘জ্বি-না, আমি চা খাই না। এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি দিতে বলুন, খুব ঠাণ্ডা। তৃষ্ণা হচ্ছে।’

    ‘আমার ঘরে ফ্রীজ নেই। পানি খুব ঠাণ্ডা হবে না।’

    ভদ্রলোক তৃষ্ণার্তের মতোই পানির গ্লাস শেষ করে দ্বিতীয় গ্লাস চাইলেন। মিসির আলি বললেন, ‘আরেক গ্লাস দেব?’

    ‘আর লাগবে না।’

    ‘আপনি তাহলে শুরু করুন। আপনার মেয়ের নাম কি?’

    ‘তিন্নি।’

    ‘বলুন তিন্নির কথা।’

    ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। সম্ভবত মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছেন। কিংবা বুঝে উঠতে পারছেন না, ঠিক কোন জায়গা থেকে শুরু করবেন। মিসির আলি লক্ষ করলেন, ভদ্রলোকের কপালে সূক্ষ্ম ঘামের কণা জমতে শুরু করেছে। মিসির আলি ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, ন’ বছর বয়েসী একটি মেয়ের এমন কী সমস্যা থাকতে পারে যা বলতে গিয়ে এমন অস্বস্তির মধ্যে পড়তে হয়।

    ‘বলুন, আপনার মেয়ের কথা বলুন।’ ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন।

    ‘আমার মেয়ের নাম তিন্নি।…

    ওর বয়স ন’ বছর। মেয়ের জন্মের সময় ওর মা মারা যায়। মেয়েটিকে আমি নিজেই মানুষ করি। আমি মোটামুটিভাবে এক জন স্বচ্ছল মানুষ। কাজেই আমার পক্ষে বেশ কিছু কাজের লোকজন রাখা কোনো সমস্যা ছিল না। তিন্নিকে দেখাশোনার জন্যে অনেকেই ছিল। কিন্তু তবু মেয়েটির বেশির ভাগ দায়িত্ব আমিই পালন করেছি। দুধ বানানো, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো—সবই আমি করতাম। বুঝতেই পারছেন, মেয়েটি আমার খুবই আদরের। সব বাবার কাছেই তাদের ছেলেমেয়ের আদর থাকে, কিন্তু আমার মধ্যে বাড়াবাড়ি রকমের ছিল।’

    মিসির আলি বললেন, ‘আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, এখন নেই?’

    ভদ্রলোক এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। তাঁর মেয়ের কথা বলে যেতে লাগলেন। তিনি এমন একটি ভঙ্গি করলেন, যেন প্রশ্নটি শুনতে পান নি।

    ‘তিন্নির বয়স যখন এক বৎসর, তখন লক্ষ করলাম, ও অন্যান্য শিশুদের মতো নয়। সাধারণত এক বৎসর বয়সেই শিশুরা কথা বলতে শুরু করে। তিন্নির বেলা তা হল না। সে কথা বলা শিখল না। বড়-বড় ডাক্তাররা সবাই দেখলেন। তাঁরাও কোনো কারণ বের করতে পারলেন না। মেয়েটি কানে শুনতে পায়। তার ভোকাল কর্ড ঠিক আছে। কিন্তু কথা বলে না! কেউ কিছু বললে মন দিয়ে শোনে–এই পর্যন্তই।

    ‘ই এন টি স্পেশালিস্ট প্রফেসর আলম বললেন, অনেক বাচ্চাই দেরিতে কথা শেখে। এর বেলাও তাই হচ্ছে। দেরি হচ্ছে। আপনি আপনার মেয়ের সঙ্গে দিন-রাত কথা বলবেন। ও শুনে-শুনে শিখবে।…

    ‘আমি প্রফেসর আলমের পরামর্শমতো প্রচুর কথা বলতাম। গল্প পড়ে শোনাতাম। সিনেমায় নিয়ে যেতাম। কিন্তু কোনো লাভ হল না। মেয়েটি একটি কথাও বলল না।…

    ‘ওর যখন ছ’ বছর বয়স তখন একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল। দিনটি আমার পরিষ্কার মনে আছে–জুলাই মাসের তিন তারিখ, শুক্রবার। আমি দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর ঘুমুচ্ছি। শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। জ্বরজ্বর ভাব। হঠাৎ তিন্নি আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে জাগাল, এবং পরিষ্কার গলায় বলল, “বাবা, অসময়ে ঘুমুচ্ছ কেন?”…

    ‘আপনি বুঝতেই পারছেন আমি স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম। প্রথমে ভাবলাম স্বপ্ন দেখছি। তিন্নি কথা বলেছে। একটি দু’টি শব্দ নয়, পুরো বাক্য বলেছে। অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেছে। কোনো রকম জড়তা নয়, অস্পষ্টতা নয়। বিস্ময় সামলাতে আমার দীর্ঘ সময় লাগল। আমি এক সময় বললাম, ‘তুই কথা বলা জানিস?’

    ‘তিন্নি হাসি মুখে বলল, “হ্যাঁ। কেন জানব না?”…

    “এত দিন কথা বলিস নি কেন?”…

    ‘তিন্নি তার জবাব দিল না। ঠোঁট টিপে হাসতে লাগল, যেন সে খুব মজা পাচ্ছে। এটা যেন চমৎকার একটা রসিকতা, কথা না-বলে বাবাকে বোকা বানানো।…

    ‘মিসির আলি সাহেব, আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, নতুন এই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে উঠতে আমার সময় লাগল। তবে আমি ঠাণ্ডা ধরনের মানুষ। আমি কোনো কিছু নিয়েই হৈচৈ শুরু করি না। প্রথমে নিজে বুঝতে চেষ্টা করি। কিন্তু তিন্নির ব্যাপারটা আমি কিছুই বুঝলাম না। হঠাৎ করে কথা বলা শুরু করা ছাড়াও তার মধ্যে অনেক বড় ধরনের অস্বাভাবিকতা ছিল।’

    এই পর্যন্ত বলেই বরকতউল্লাহ্ সাহেব থামলেন। পানি খেতে চাইলেন। মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। বরকতউল্লাহ্ সাহেব নিচু গলায় আবার কথা শুরু করলেন।

    ‘আমি লক্ষ করলাম, তিন্নি সব প্রশ্নের জবাব জানে।’

    মিসির আলি বললেন, ‘আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না। সব প্রশ্নের জবাব জানে মানে?’

    ‘আপনাকে উদাহরণ দিলে ভালো বুঝবেন। ধরুন, আমি তিন্নিকে জিজ্ঞেস করলাম, ষোলর বর্গমূল কত? সে এক মুহূর্ত ইতস্তত না-করে বলবে ‘চার’ – যদিও সে অঙ্কের কিছুই জানে না। যে-মেয়ে কথা বলতে পারে না, তাকে অঙ্ক শেখানোর প্রশ্নই ওঠে না।

    ‘আপনাকে আরেকটি উদাহরণ দিই। এক দিন বাসায় ফিরে তিন্নিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বল তো মা আজ নয়াবাজারে কার সঙ্গে দেখা হয়েছে?’ সে সঙ্গে-সঙ্গে বলল, ‘হালিম সাহেবের সঙ্গে।’

    ‘হালিম আমার বাল্যবন্ধু। তিন্নি তাকে চেনে না। তার সঙ্গে আমার মেয়ের কোনো দিন দেখা হয় নি। হালিমের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, এটা তিন্নির জানার কোনো কারণ নেই। মিসির আলি সাহেব, বুঝতেই পারছেন, আমি খুব চিন্তিত হয়ে পড়লাম। তার কিছুদিন পর আরেকটি অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।…

    ‘রাতের বেলা তিন্নিকে নিয়ে খেতে বসেছি। হঠাৎ ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। আমি হারিকেন জ্বালানোর জন্যে বললাম। কেউ হারিকেন খুঁজে পেল না। প্রয়োজনের সময় কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। টর্চ আনতে বললাম–তাও কেউ পাচ্ছে না। আমি বিরক্ত হয়ে ধমকাধমকি করছি। তখন তিন্নি বলল, ‘বাতি চলে গেলে সবাই এত হৈচৈ করে কেন?’…

    আমি বললাম, “অন্ধকার হয়ে যায়, তাই।”…

    “অন্ধকার হলে কী অসুবিধা?”

    “অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না, সেটাই অসুবিধা।”

    “তুমি দেখতে পাও না?” …

    “শুধু আমি কেন, কেউই পায় না। আলো ছাড়া কিছুই দেখা যায় না মা।”

    ‘তিন্নি খুবই অবাক হল, বিস্মিত গলায় বলল, “কিন্তু আমি তো অন্ধকারেও দেখতে পাই। আমি তো সব কিছু দেখছি।”

    ‘প্রথম ভাবলাম, সে ঠাট্টা করেছে। কিন্তু না, ঠাট্টা নয়। সে সত্যি কথাই বলছিল। সে অন্ধকারে দেখে। খুব পরিষ্কার দেখে।’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব থামলেন। রুমাল বের করে চশমার কাঁচ পরিষ্কার করতে লাগলেন। মিসির আলি বললেন, ‘আপনার মেয়ের প্রসঙ্গে আরো কিছু কি বলবেন?’ তিনি না-সূচক মাথা নাড়লেন।

    ‘আর কিছুই বলার নেই?’

    ‘আছে। কিন্তু এখন আপনাকে বলতে চাই না।’

    ‘কখন বলবেন?’

    ‘প্রথম আপনি আমার মেয়েকে দেখবেন। ওর সঙ্গে কথা বলবেন। তারপর আপনাকে বলব।’

    ‘ঠিক আছে। আপনার মেয়ের এখন বয়স হচ্ছে নয়। মেয়ের অস্বাভাবিকতাগুলি তো আপনার অনেক আগেই চোখে পড়েছে। কোনো ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছেন?’

    ‘না। ডাক্তার এর কী করবে?’

    ‘কোনো সাইকিয়াট্রিস্ট?’

    ‘না। আপনিই প্রথম ব্যক্তি, যাঁর কাছে আমি এসেছি।’

    ‘মেয়ের এই ব্যাপারগুলি আপনি মনে হচ্ছে লুকিয়ে রাখতে চান।’

    ‘হ্যাঁ, চাই। কেন চাই, তা আপনি আমার মেয়ের সঙ্গে কথা বললেই বুঝবেন।’

    ‘আপনি মেয়ের মা সম্পর্কে কিছু বলুন।’

    ‘কী জানতে চান?’

    ‘জানতে চাই তিনি কেমন মহিলা ছিলেন। তাঁর মধ্যে কোনো রকম অস্বাভাবিকতা ছিল কি না।’

    ‘না, ছিল না। তিনি খুবই স্বাভাবিক মহিলা ছিলেন।’

    ‘আপনি ভালোমতো জানেন?’

    ‘হ্যাঁ, ভালোমতোই জানি। আমি এগার বছর আমার স্ত্রীর সঙ্গে কাটিয়েছি। তিন্নি আমাদের শেষ বয়সের সন্তান। এগার বছরে এক জন মানুষকে ভালোমতো জানা যায়।’

    ‘তা জানা যায়। আচ্ছা, আপনার মেয়ের এই ব্যাপারগুলি কি বাইরের অন্য কাউকে বলেছেন?’

    ‘না, কাউকেই বলি নি। আপনি বুঝতেই পারছেন, এটা জানাজানি হওয়ামাত্রই একটা হৈচৈ শুরু হবে। পত্রিকার লোক আসবে, টিভির লোক আসবে। আমি ভাবলাম, কিছুতেই এটা করতে দেওয়া উচিত হবে না। এখন মিসির আলি সাহেব, দয়া করে বলুন—আপনি কি আমার মেয়েটাকে দেখবেন?’

    ‘হ্যাঁ, দেখব।’

    ‘কবে যাবেন ময়মনসিংহ?’

    ‘আপনি কবে যাবেন?’

    ‘আমি আগামীকাল রাতে যাব। রাত দশটায় একটা ট্রেন আছে—নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেস।’

    মিসির আলি সহজ স্বরে বললেন, ‘আমি আপনার সঙ্গেই যাব।’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব অবাক হয়ে বললেন, ‘আমার সঙ্গে যাবেন!’

    ‘হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে যাব। কোনো অসুবিধে হবে?’

    বরকতউল্লাহ্ সাহেব মাথা নাড়লেন। কোনো অসুবিধা হবে না। এই লোকটিকে তিনি ঠিক বুঝতে পারছেন না। যে প্রথমে তাঁর কথাই শুনতে চায় নি, সে এখন…। কত বিচিত্র স্বভাবের মানুষ আছে এই পৃথিবীতে!

  • বৃহন্নলা

    বৃহন্নলা

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    অতিপ্রাকৃত গল্পে গল্পের চেয়ে ভূমিকা বড় হয়ে থাকে।

    গাছ যত-না বড়, তার ডালপালা তার চেয়েও বড়। এই গল্পেও তাই হবে। একটা দীর্ঘ ভূমিকা দিয়ে শুরু করব। পাঠকদের অনুরোধ করছি তাঁরা যেন ভূমিকাটা পড়েন। এর প্রয়োজন আছে।

    আমার মামাতো ভাইয়ের বিয়ে।

    বাবা-মা’র একমাত্র ছেলে, দেখতে রাজপুত্র না হলেও বেশ সুপুরুষ। এম. এ পাস করেছে। বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করা এবং গ্রুপ থিয়েটার করা—এই দুইয়ে তার কর্মকাণ্ড সীমিত।

    বাবা-মা’র একমাত্র ছেলে হলে যা হয়—বিয়ের জন্যে অসংখ্য মেয়ে দেখা হতে লাগল। কাউকেই পছন্দ হয় না। কেউ বেশি লম্বা, কেউ বেশি বেঁটে, কেউ বেশি ফর্সা, কেউ বেশি কথা বলে, আবার কেউ-কেউ দেখা গেল কম কথা বলে। নানান ফ্যাঁকড়া।

    শেষ পর্যন্ত যাকে পছন্দ হল, সে-মেয়ে ঢাকা ইডেন কলেজে বিএ পড়ে— ইতিহাসে অনার্স। মেয়ের বাবা নেই। মা’র অন্য কোথায় বিয়ে হয়েছে। মেয়ে তার বড়চাচার বাড়িতে মানুষ। তিনিই তাকে খরচপত্র দিয়ে বিয়ে দিচ্ছেন।

    আমার মামা এবং মামী দু’ জনের কেউই এই বিয়ে সহজভাবে নিতে পারলেন না। যে-মেয়ের বাবা নেই, মা আবার বিয়ে করেছে—পাত্রী হিসেবে সে তেমন কিছু না। তা ছাড়া সে খুব সুন্দরীও না। মোটামুটি ধরনের চেহারা। আমার মামাতো ভাই তবু কেন জানি একবারমাত্র এই মেয়েকে দেখেই বলে দিয়েছে—এই মেয়ে ছাড়া আর কাউকে সে বিয়ে করবে না। মেয়ের বাবা নেই তো কী হয়েছে? সবার বাবা চিরকাল থাকে নাকি? মেয়ের মা’র বিয়ে হয়েছে, তাতে অসুবিধাটা কী? অল্প বয়সে বিধবা হয়েছেন, তাঁর তো বিয়ে করাই উচিত। এমন তো না যে, দেশে বিধবাবিবাহ নিষিদ্ধ।

    মামা-মামীকে শেষ পর্যন্ত মত দিতে হল, তবে খুব খুশিমনে মত দিলেন না, কারণ মেয়ের বড়চাচাকেও তাঁদের খুবই অপছন্দ হয়েছে। লোকটা নাকি অভদ্রের চূড়ান্ত। ধরাকে সরা জ্ঞান করে। চামার টাইপ।

    বিয়ের দিন তারিখ হল।

    এক মঙ্গলবার কাকডাকা ভোরে আমরা একটা মাইক্রোবাস এবং সাদা রঙের টয়োটায় করে রওনা হলাম। গন্তব্য ঢাকা থেকে নব্বই মাইল দূরের এক মফস্বল শহর। মফস্বল শহরের নামটা আমি বলতে চাচ্ছি না। গল্পের জন্যে সেই নাম জানার প্রয়োজনও নেই।

    তেত্রিশ জন বরযাত্রী। অধিকাংশই ছেলেছোকরা। হৈচৈয়ের চূড়ান্ত হচ্ছে। এই মাইক বাজছে, এই মাইক্রোবাসের ভেতর ব্রেক ডান্স হচ্ছে, এই পটকা ফুটছে। ফাঁকা রাস্তায় এসে মাইক্রোবাসের গিয়ারবক্সে কী যেন হল। একটু পরপর বাস থেমে যায়। সবাইকে নেমে ঠেলতে হয়। বরযাত্রীদের উৎসাহ তাতে যেন আরো বাড়ল। শুধু আমার মামা অসম্ভব গম্ভীর হয়ে পড়লেন। আমাকে ফিসফিস করে বললেন, ‘এটা হচ্ছে অলক্ষণ। খুবই অলক্ষণ। রওনা হবার সময় একটা খালি জগ দেখেছি, তখনি মনে হয়েছে একটা কিছু হবে। গিয়ারবক্স গেছে, এখন দেখবি চাকা পাংচার হবে। না হয়েই পারে না।’

    হলও তাই। একটা কালভার্ট পার হবার সময় চাকার হাওয়া চলে গেল। মামা বললেন, ‘কি, দেখলি? বিশ্বাস হল আমার কথা? এখন বসে বসে আঙুল চোষ।’

    স্পেয়ার চাকা লাগাতেও অনেক সময় লাগল। মামা ছাড়া অন্য কাউকে বিচলিত হতে দেখলাম না।

    বরযাত্রীদের উৎসাহ মনে হল আরো বেড়েছে। চিৎকার হৈচৈ হচ্ছে। একজন গান গাওয়ার চেষ্টা করছে। শুধুমাত্র বিয়েবাড়িতে পৌঁছানোর পরই সবার উৎসাহে খানিকটা ভাটা পড়ল।

    মফস্বল শহরের বড় বাড়িগুলি সাধারণত যে-রকম হয়, সে-রকম একটা পুরনো ধরনের বাড়ি। এইসব বাড়িগুলি এমনিতেই খানিকটা বিষণ্ণ প্রকৃতির হয়। এই বাড়ি দেখে মনে হল বিরাট একটা শোকের বাড়ি। খাঁ-খাঁ করছে চারদিক। লোকজন নেই। কলাগাছ দিয়ে একটা গেটের মতো করা হয়েছে, সেটাকে গেট না-বলে গেটের প্রহসন বলাই ভালো। একদিকে রঙিন কাগজের চেইন, অন্য দিকে খালি। হয় রঙিন কাগজ কম পড়েছে, কিংবা লোকজনের গেট প্রসঙ্গে উৎসাহ শেষ হয়ে গেছে। আমার মামা হতভম্ব। বরযাত্রীরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। ব্যাপারটা কি?

    হাফশার্ট-পরা এক চ্যাংড়া ছেলে এসে বলল, ‘আপনারা বসেন। বিশ্রাম করেন।’

    আমি বললাম, ‘আর লোকজন কোথায়? মেয়ের বড়চাচা কোথায়?’

    সেই ছেলে শুকনো গলায় বলল, ‘আছে, সবাই আছে। আপনারা বিশ্রাম করেন।’

    আমি বললাম, ‘কোনো সমস্যা হয়েছে?’

    সেই ছেলে ফ্যাকাসে হাসি হেসে বলল, ‘জ্বি-না, সমস্যা কিসের?’ এই বলেই সে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল। আর বেরুল না!

    বসার ঘরে চাদর পেতে বরযাত্রীদের বিশ্রামের ব্যবস্থা। বারান্দায় গোটা দশেক ফোল্ডিং চেয়ার। বিয়েবাড়ির সজ্জা বলতে এইটুকুই।

    মামা বললেন, ‘বলেছিলাম না অলক্ষণ? এখন বিশ্বাস হল? কী কাণ্ড হয়েছে কে জানে! আমার তো মনে হয় বাড়িতে মেয়েই নেই। কারোর সঙ্গে পালিয়েটালিয়ে গেছে। মুখে জুতোর বাড়ি পড়ল, স্রেফ জুতোর বাড়ি।’

    মামা অল্পতেই উত্তেজিত হন। গত বছর তাঁর ছোটখাটো স্ট্রোক হয়ে গেছে। উত্তেজনার ব্যাপারগুলি তাঁর জন্যে ক্ষতির কারণ হতে পারে। আমি মামাকে সামলাতে চেষ্টা করলাম। হাসিমুখে বললাম, ‘হাত-মুখ ধুয়ে একটু শুয়ে থাকুন তো মামা। আমি খোঁজ নিচ্ছি কী ব্যাপার।’

    মামা তীব্র গলায় বললেন, ‘হাত-মুখটা ধোব কী দিয়ে, শুনি? হাত-মুখ ধোবার পানি কেউ দিয়েছে? বুঝতে পারছিস না? এরা বেইজ্জতির চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে।’

    ‘কী যে বলেন মামা!’

    ‘কথা যখন অক্ষরে-অক্ষরে ফলবে, তখন বুঝবি কী বলছি। কাপড়চোপড় খুলে ন্যাংটো করে সবাইকে ছেড়ে দেবে। পাড়ার লোক এনে ধোলাই দেবে। আমার কথা বিশ্বাস না-হয়, লিখে রাখ।’

    মামার কথা শেষ হবার সঙ্গে-সঙ্গেই খালিগায়ে নীল লুঙ্গি-পরা এক লোক প্লাস্টিকের বালতিতে করে এক বালতি পানি এবং একটা মগ নিয়ে ঢুকল। পাথরের মতো মুখ করে বলল, ‘হাত-মুখ ধোন। চা আইতাছে।’

    মামা বললেন, ‘খবরদার কেউ চা মুখে দেবে না, খবরদার! দেখি ব্যাপার কী।’

    ভেতরবাড়ি থেকে কান্নার শব্দ আসছে। বিয়েবাড়িতে কান্না কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু এই কান্না অস্বাভাবিক লাগছে। মধ্যবয়স্ক এক লোক এক বিশাল কেটলিতে করে চা নিয়ে ঢুকল।! আমি তাঁকে বললাম, ‘ব্যাপার কী বলেন তো ভাই?’ সেই লোক বলল, ‘কিছু না।’

    ভেতরবাড়ির কান্না এই সময় তীব্র হল। কান্না এবং মেয়েলি গলায় বিলাপ। কান্না যেমন হঠাৎ তুঙ্গে উঠেছিল, তেমনি হঠাৎই নেমে গেল। তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই মেয়ের বড়োচাচা ঢুকলেন। ভদ্রলোককে দেখেই মনে হল তাঁর ওপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে। তিনি নিচু গলায় যা বললেন, তা শুনে আমরা স্তম্ভিত। কী সর্বনাশের কথা! জানলাম যে কিছুক্ষণ আগেই তাঁর বড়ছেলে মারা গেছে। অনেক দিন থেকেই অসুখে ভুগছিল। আজ সকাল থেকে খুব বাড়াবাড়ি হল। সব এলোমেলো হয়ে গেছে এই কারণেই। তিনি তার জন্যে লজ্জিত, দুঃখিত ও অনুতপ্ত। তবে যত অসুবিধাই হোক— বিয়ে হবে। আজ রাতে সম্ভব হবে না, পরদিন।

    এই কথা বলতে-বলতে তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।

    আমার মামা খুবই আবেগপ্রবণ মানুষ। অল্পতে রাগতেও পারেন, আবার সেই রাগ হিমশীতল পানিতে রূপান্তরিত হতেও সময় লাগে না। তিনি মেয়ের বড়চাচাকে জড়িয়ে ধরে নিজেও কেঁদে ফেললেন। কাতর গলায় বললেন, ‘আপনি আমাদের নিয়ে মোটেও চিন্তা করবেন না। আমাদের কিচ্ছু লাগবে না, আপনি বাড়ির ভেতরে যান বেয়াই সাহেব।’

    অদ্ভুত একটা অবস্থা! এর চেয়ে যদি শুনতাম মেয়ে পালিয়ে গেছে, তাও ভালো ছিল। কারো ওপর রাগ ঢেলে ফেলা যেত।

    আমরা বরযাত্রীরা খুবই বিব্রত বোধ করছি। স্থানীয় লোকজন এখন দেখতে পাচ্ছি।

    তারা বোধহয় এতক্ষণ ভেতরের বাড়িতে ছিলেন। আমরা বসার ঘরেই আছি। খিদেয় একেক জন প্রায় মরতে বসেছি। খাবার কোনো ব্যবস্থা হচ্ছে কি না বুঝতে পারছি না। এই পরিস্থিতিতে খাবারের কথা জিজ্ঞেসও করা যায় না। একজন মামাকে কানে-কানে এই ব্যাপারে বলতেই তিনি রাগী গলায় বললেন, ‘তোমাদের কি মাথাটাথা খারাপ হয়েছে—এত বড় একটা শোকের ব্যাপার, আর তোমরা খাওয়ার চিন্তায় অস্থির! ছিঃ ছিঃ ছিঃ। এক রাত না খেলে হয় কী? খবরদার, আমার সামনে কেউ খাবারের কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করবে না।’

    আমরা চুপ করে গেলাম। বার-তের বছরের ফুটফুটে একটি মেয়ে এসে পানভর্তি একটা পানদান রেখে গেল। কাঁদতে-কাঁদতে মেয়েটি চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। এখনও কাঁদছে।

    মামা মেয়েটিকে বললেন, ‘লক্ষ্মী সোনা, তোমাদের মোটেই ব্যস্ত হতে হবে না। আমাদের কিছুই লাগবে না।’

    রাত আটটার দিকে থাকা এবং খাওয়ার সমস্যার একটা সমাধান হল। স্থানীয় লোকজন ঠিক করলেন, প্রত্যেকেই তাঁদের বাড়িতে একজন-দু’জন করে গেস্ট নিয়ে যাবেন। বিয়ে হবে পরদিন বিকেলে।

    আমাকে যিনি নিয়ে চললেন, তাঁর নাম সুধাকান্ত ভৌমিক। ভদ্রলোকের বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে। বেঁটেখাটো মানুষ। শক্তসমর্থ চেহারা। এই বয়সেও দ্রুত হাঁটতে পারেন। ভদ্রলোক মৃদুভাষী। মাথার চুল ধবধবে সাদা। গেরুয়া রঙের একটা চাদর দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন বলেই কেমন যেন ঋষি-ঋষি লাগছে।

    আমি বললাম, ‘সুধাকান্তবাবু, আপনার বাসা কত দূর?’

    উনি বললেন, ‘কাছেই।’

    গ্রাম এবং মফস্বলের লোকদের দূরত্ব সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তাদের ‘কাছেই’ আসলে দিল্লি হনুজ দূর অস্তের মতো। আমি হাঁটছি তো হাঁটছিই।

    অগ্রহায়ণ মাস। গ্রামে এই সময়ে ভালো শীত থাকে। আমার গায়ে পাতলা একটা পাঞ্জাবি। শীত ভালোই লাগছে।

    আমি আবার বললাম, ‘ভাই, কত দূর?’

    ‘কাছেই।’

    আমরা একটা নদীর কাছাকাছি এসে পড়লাম। আঁতকে উঠে বললাম, ‘নদী পার হতে হবে নাকি?’

    ‘পানি নেই, জুতো খুলে হাতে নিয়ে নিন।’

    রাগে আমার গা জ্বলে গেল। এই লোকের সঙ্গে আসাই উচিত হয় নি। আমি জুতো খুলে পায়জামা গুটিয়ে নিলাম। হেঁটে নদী পার হওয়ার কোনো আনন্দ থাকলেও থাকতে পারে। আমি কোনো আনন্দ পেলাম না, শুধু ভয় হচ্ছে কোনো গভীর খানাখন্দে পড়ে যাই কি না। তবে নদীর পানি বেশ গরম।

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আপনাকে কষ্ট দিলাম।’

    ভদ্রতা করে হলেও আমার বলা উচিত, ‘না, কষ্ট কিসের!’ তা বললাম না। নদী পার হয়ে পায়জামা নামাচ্ছি, সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আপনি ছেলের কে হন?’

    ‘ফুপাতো ভাই।’

    ‘বিয়েটা না-হলে ভালো হয়। সকালে সবাইকে বুঝিয়ে বলবেন।’

    ‘সে কী!’

    ‘মেয়েটার কারণে ছেলেটা মরল। এখন চট করে বিয়ে হওয়া ঠিক না। কিছুদিন যাওয়া উচিত।’

    ‘কী বলছেন এ-সব!’

    ‘ছেলেটা সকালবেলা বিষ খেয়েছে। ধুতরা বীজ। এই অঞ্চলে ধুতরা খুব হয়।’

    ‘আপনি বলছেন কী ভাই?’

    ‘ছেলের বাবা রাজি হলেই পারত। ছেলেটা বাঁচত। গোঁয়ারগোবিন্দ মানুষ। তার “না” মানেই না।’

    ‘ছেলে-মেয়ের এই প্রেমের ব্যাপারটা সবাই জানে নাকি?’

    ‘জানবে না কেন? মফস্বল শহরে এইসব চাপা থাকে না। আপনাদের শহরে অন্য কথা। আকছার হচ্ছে।’

    আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। এ কী সমস্যা! বাকি পথ দু’ জন নীরবে পার হলাম।

    পুরোপুরি নীরব বলাটা বোধহয় ঠিক হল না। ভদ্রলোক নিজের মনেই মাঝে-মাঝে বিড়বিড় করছিলেন। মন্ত্রটন্ত্র পড়ছেন বোধহয়।

    ভদ্রলোকের বাড়ি একেবারে জঙ্গলের মধ্যে। একতলা পাকা দালান। প্রশস্ত উঠোন। উঠোনের মাঝখানে তুলসী মঞ্চ। বাড়ির লাগোয়া দু’টি প্রকাণ্ড কামিনী গাছ। একপাশে কুয়া আছে। হিন্দু বাড়িগুলো যেমন থাকে, ছবির মতো পরিচ্ছন্ন। উঠোনে দাঁড়াতেই মনে শান্তি-শান্তি একটা ভাব হল। আমি বললাম, ‘এত চুপচাপ কেন? বাড়িতে লোকজন নেই?’

    ‘না।’

    ‘আপনি একা নাকি?’

    ‘হুঁ।’

    ‘বলেন কী! একা-একা এত বড় বাড়িতে থাকেন!’

    ‘আগে অনেক লোকজন ছিল। কিছু মরে গেছে। কিছু চলে গেছে ইণ্ডিয়াতে। এখন আমি একাই আছি। আপনি স্নান করে ফেলুন।’

    ‘স্নান—ফান লাগবে না। আপনি কিছু খাবারের ব্যবস্থা করুন, তাহলেই হবে।’

    ‘একটু সময় লাগবে, রান্নার জোগাড় করতে হবে।’

    ‘আপনি কি এখন রান্না করবেন?’

    ‘রান্না না করলে খাবেন কী? বেশিক্ষণ লাগবে না।’

    ভদ্রলোক গামছা, সাবান এবং একটা জলচৌকি এনে কুয়ার পাশে রাখলেন।

    ‘স্নান করে ফেলুন। সারা দিন জার্নি করে এসেছেন, স্নান করলে ভালো লাগবে। কুয়ার জল খুব ভালো। দিন, আমি জল তুলে দিচ্ছি।’

    ‘আপনাকে তুলতে হবে না। আপনি বরং রান্না শুরু করুন। খিদেয় চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে।’

    ‘এই লুঙ্গিটা পরুন। ধোয়া আছে। আজ সকালেই সোডা দিয়ে ধুয়েছি। আমার আবার পরিষ্কার থাকার বাতিক আছে, নোংরা সহ্য করতে পারি না।’

    ভদ্রলোক যে নোংরা সহ্য করতে পারেন না, তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। তিনি রান্না করতে বসেছেন উঠোনে। উঠোনেই পরিষ্কার ঝকঝকে দুটো মাটির চুলা। সুধাকান্তবাবু চুলার সামনে জলচৌকিতে বসেছেন। থালা, বাটি, হাঁড়ি সবই দেখি দু’ বার তিন বার করে ধুচ্ছেন।

    ‘সুধাকান্তবাবু?’

    ‘বলুন।’

    ‘আপনি বিয়ে করেন নি?’

    ‘না।’

    ‘চিরকুমার?’

    ‘ঐ আর কি।’

    ‘আপনি করেন কী?’

    ‘শিক্ষকতা করি। হাই স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক। মনোহরদি হাই স্কুল।’

    ‘রান্নাবান্না আপনি নিজেই করেন?’

    ‘হ্যাঁ, নিজেই করি। এক বেলা রান্না করি। এক বেলা ভাত খাই, আর সকালে চিঁড়া, ফলমূল—এ-সব খাই।’

    ‘কাজের লোক রাখেন না কেন?’

    ‘দরকার পড়ে না।’

    ‘খালি বাড়ি পড়ে থাকে, চুরি হয় না?’

    ‘না। চোর নেবে কী? আমি এক জন দরিদ্র মানুষ। আপনি স্নান করে নিন। স্নান করলে ভালো লাগবে।’

    অপরিচিত জায়গায় ঠাণ্ডার মধ্যে গায়ে পানি ঢালার আমার কোনোই ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু সুধাকান্তবাবু মনে হচ্ছে আমাকে না ভিজিয়ে ছাড়বেন না। লোকটি সম্ভবত শুচিবাইগ্রস্ত।

    কুয়ার পানি নদীর পানির মতো গরম নয়, খুব ঠাণ্ডা। পানি গায়ে দিতেই গা জুড়িয়ে গেল। সারা দিনের ক্লান্তি, বিয়েবাড়ির উদ্বেগ, মৃত্যুসংক্রান্ত জটিলতা—সব ধুয়ে-মুছে গেল। চমৎকার লাগতে লাগল। তা ছাড়া পরিবেশটাও বেশ অদ্ভুত। পুরনো ধরনের একটা বাড়ি। ঝকঝকে উঠোনের শেষ প্রান্তে শ্যাওলা ধরা প্রাচীন কুয়া। আকাশে পরিষ্কার চাঁদ। কামিনী ফুলের গাছ থেকে ভেসে আসছে মিষ্টি গন্ধ। এক ঋষির মতো চেহারার চিরকুমার বৃদ্ধ রান্না বসিয়েছেন। যেন বিভূতিভূষণের উপন্যাসের কোনো দৃশ্য।

    ‘সুধাকান্তবাবু?’

    ‘বলুন।’

    ‘রান্নার কত দূর?’

    ‘দেরি হবে না।’

    ‘একা-একা থাকতে আপনার খারাপ লাগে না?’

    ‘না, অভ্যেস হয়ে গেছে।’

    ‘বাসায় ফিরে আপনি করেন কী?’

    ‘তেমন কিছু করি না। চুপচাপ বসে থাকি।’

    ‘ভয় লাগে না?’

    সুধাকান্তবাবু এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না।

    খাবার আয়োজন সামান্য, তবে এত চমৎকার রান্না আমি দীর্ঘদিন খাই নি। একটা কিসের যেন ভাজি, তাতে পাঁচফোড়নের গন্ধ—খেতে একটু টক-টক। বেগুন দিয়ে ডিমের তরকারি, তাতে ডালের বড়ি দেওয়া। ডালের বড়ি এর আগে আমি খাই নি। এমন একটা সুখাদ্য দেশে প্রচলিত আছে তা-ই আমার জানা ছিল না। মুগের ডাল। ডালে ঘি দেওয়াতে অপূর্ব গন্ধ।

    আমি বললাম, ‘সুধাকান্তবাবু, এত চমৎকার খাবার আমি আমার জীবনে খাই নি। দীর্ঘদিন মনে থাকবে।’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আপনি ক্ষুধার্ত ছিলেন, তাই এত ভালো লেগেছে। রুচির রহস্য ক্ষুধায়। যেখানে ক্ষুধা নেই, সেখানে রুচিও নেই।’

    আমি চমৎকৃত হলাম।

    লোকটির চেহারাই শুধু দার্শনিকের মতো না, কথাবার্তাও দর্শনঘেঁষা।

    সুধাকান্তবাবু উঠোনে পাটি পেতে দিলেন। খাওয়াদাওয়ার পর সিগারেট হাতে সেখানে বসলাম। কিছুক্ষণ গল্পগুজব করা যেতে পারে। সুধাকান্তবাবুকে অবশ্যি খুব আলাপী লোক বলে মনে হচ্ছে না। এই যে দীর্ঘ সময় তাঁর সঙ্গে আছি, তিনি এর মধ্যে আমার নাম জানতে চান নি। আমি কী করি তাও জানতে চান নি। আমি এই মানুষটির প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ বোধ করছি, কিন্তু এই লোকটা আমার প্রতি কোনো আগ্রহ বোধ করছে না। অথচ আমি আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, যারা মাস্টারি করে, তারা কথা বলতে খুব পছন্দ করে। অকারণেই কথা বলে।

    প্রায় মিনিট পনের আমরা চুপচাপ বসে থাকার পর সুধাকান্তবাবু আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘আপনি জিজ্ঞেস করছিলেন একা-একা আমি এই বাড়িতে থাকতে ভয় পাই কি না, তাই না?’

    আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, তাই।’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘ভয় পাই। প্রায় রাতেই ঘুমুতে পারি না, জেগে থাকি। ঘরের ভেতর আগুন করে রাখি। হারিকেন জ্বালান থাকে। ওরা আগুন ভয় পায়। আগুন থাকলে কাছে আসে না।’

    আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কারা?’

    তিনি জবাব দিলেন না।

    আমি বললাম, ‘আপনি কি ভূতপ্রেতের কথা বলছেন?’

    ‘হ্যাঁ।’

    আমি মনে-মনে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললাম। পৃথিবী কোথায় চলে গিয়েছে এই বৃদ্ধ তা বোধহয় জানে না। চাঁদের পিঠে মানুষের জুতোর ছাপ পড়েছে, ভাইকিং উপগ্রহ নেমেছে মঙ্গলের মরুভূমিতে, ভয়েজার ওয়ান এবং টু উড়ে গেছে বৃহস্পতির কিনারা ঘেঁষে, আর এই অঙ্কের শিক্ষক ভূতের ভয়ে ঘরে আগুন জ্বালিয়ে রাখছে। কারণ, অশরীরীরা আগুন ভয় পায়।

    আমি বললাম, ‘আপনি কি ওদের দেখেছেন কখনো?’

    ‘না।’

    ‘ওদের পায়ের শব্দ পান?’

    ‘তাও না।’

    ‘তাহলে?’

    ‘বুঝতে পারি।’

    ‘বুঝতে পারেন?’

    ‘জ্বি। আপনি যখন আছেন, আপনিও বুঝবেন।’

    ‘ওদের কাণ্ডকারখানা দেখতে পাব, তাই বলছেন?’

    ‘হুঁ, তবে ওদের না, এক জন শুধু আসে।’

    ‘তাও ভালো যে এক জন আসে। আমি ভেবেছিলাম দলবল নিয়ে বোধহয় চলে আসে। নাচ গান হৈ-হল্লা করে।’

    ‘আপনি আমার কথা একেবারেই বিশ্বাস করছেন না?’

    ‘ঠিকই ধরেছেন, বিশ্বাস করছি না। অবশ্যি এই মুহূর্তে আমার গা ছমছম করছে। কারণ, আপনার পরিবেশটা ভৌতিক।’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘ওরা কিন্তু আছে।’

    আমি চুপ করে রইলাম। এই বৃদ্ধের সঙ্গে ভূত আছে কি নেই, তা নিয়ে তর্ক করার কোনো অর্থ হয় না। থাকলে থাকুক।

    ‘আমার কাছে যে আসে, সে একটা মেয়ে।’

    ‘তাই নাকি?’

    ‘জ্বি, এগার-বার বছর বয়স।’

    ‘বুঝলেন কী করে তার বয়স এগার-বার? আপনাকে বলেছে?’

    ‘জ্বি-না। অনুমান করে বলছি।’

    ‘তার নাম কি? নাম জানেন?’

    ‘জ্বি না।’

    ‘সে এসে কী করে?’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘মেয়েটি যে আসছে এই কি যথেষ্ট নয়? তার কি আর কিছু করার প্রয়োজন আছে?’

    আমি চুপ করে গেলাম। আসলেই তো, অশরীরী এক বালিকার উপস্থিতিই তো যথেষ্ট। সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আপনি নিজেও হয়তো দেখতে পারবেন।’ আমি চমকে উঠলাম। ভদ্রলোক সহজ স্বরে বললেন, ‘আমি ছাড়াও অনেকে দেখেছে।’

    সুধাকান্তবাবু ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেললেন এবং তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে বিকট একটা হাসি শুনলাম। উঠোন কাঁপিয়ে গাছপালা কাঁপিয়ে হো-হো করে কে যেন হেসে উঠল। সুধাকান্তবাবু পাশে না থাকলে অজ্ঞানই হয়ে যেতাম। আমি তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘কে, কে?’

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘ওটা কিছু না।’

    আমি ভয়-জড়ানো গলায় বললাম, ‘কিছু না মানে?’

    ‘ওটা খাটাশ। মানুষের মতো শব্দ করে হাসে।’

    ‘বলেন কী। খাটাশের নাম তো এই প্রথম শুনলাম। এ তো ভূতের বাবা বলে মনে হচ্ছে। এখনো আমার গা কাঁপছে।’

    ‘জল খান। জল খেলে ভয়টা কমবে।’

    সুধাকান্তবাবু কাঁসার গ্লাসে করে পানি নিয়ে এলেন। খাটাশ নামক জন্তুটি আরেক বার রক্ত হিম করা হাসি হাসল। সুধাকান্তবাবু যদি কিছু না বলতেন তাহলে ভূতের হাসি শুনেছি, এই ধারণা সারা জীবন আমার মনের মধ্যে থাকত।

    লোকটার প্রতি এই প্রথম আমার খানিকটা আস্থা হল। আজগুবি গল্প বলে ভয় দেখান এই লোকের ইচ্ছা নয় বলেই মনে হল। এ-রকম ইচ্ছা থাকলে, এই ভয়ংকর হাসির কারণ সম্পর্কে সে চুপ করে থাকত।

    সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘ঐ মেয়েটার কথা শুনবেন?’

    ‘হ্যাঁ, শোনা যেতে পারে। তবে আমি নিজে অবিশ্বাসী ধরনের মানুষ, কাজেই গল্পের মাঝখানে যদি হেসে ফেলি কিছু মনে করবেন না।’

    ‘এই গল্পটা কাউকে বলতে ভালো লাগে না। অবশ্যি অনেককে বলেছি। এখানকার সবাই জানে।’

    ‘আপনার গল্প এখানকার সবাই বিশ্বাস করেছে?’

    সুধাকান্তবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আমি যদি এখানকার কাউকে একটা মিথ্যা কথাও বলি, এরা বিশ্বাস করবে। এরা আমাকে সাধুবাবা বলে ডাকে। আমি আমার এই দীর্ঘ জীবনে কোনো মিথ্যা কথা বলেছি বলে মনে পড়ে না। আমি থাকি একা-একা। আমার প্রয়োজনও সামান্য। মানুষ মিথ্যা কথা বলে প্রয়োজন এবং স্বার্থের কারণে। আমার সেই সমস্যা নেই। এইসব থাক, আমি বরং গল্পটা বলি।’

    ‘বলুন।’

    ‘ভেতরে গিয়ে বসবেন? এখানে মনে হচ্ছে একটু ঠাণ্ডা লাগছে। অগ্রহায়ণ মাসে হিম পড়ে।’

    ‘আমার অসুবিধা হচ্ছে না, এখানেই বরং ভালো লাগছে। গ্রামে তেমন আসা হয় না। আপনি শুরু করুন।’

    সুধাকান্তবাবু গল্প শুরু করতে গিয়েও শুরু করলেন না। হঠাৎ যেন একটু অন্য রকম হয়ে গেলেন। যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছু দেখতে চেষ্টা করছেন। খসখস শব্দ হল। নতুন কাপড় পরে হাঁটলে যেমন শব্দ হয়, সে-রকম। তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই কাঁচের চুড়ির টুং-টুং শব্দের মতো শব্দ। আমি বললাম, ‘কী ব্যাপার বলুন তো?’

    সুধাকান্তবাবু ফ্যাকাসে মুখে হাসলেন। আমি বললাম, ‘কিসের শব্দ হল?’

    তিনি নিচু গলায় বললেন, ‘ও কিছু না, আপনি গল্প শুনুন। আজ ঘুমিয়ে কাজ নেই, আসুন গল্প করে রাত পার করে দিই।’

    গা-ছমছমে পরিবেশ। বাড়ির লাগোয়া ঝাঁকড়া কামিনী গাছ থেকে কামিনী ফুলের নেশা-ধরান গন্ধ আসছে। কুয়ার আশেপাশে অসংখ্য জোনাকি জ্বলছে নিভছে। উঠোনের চুলা থেকে ভেসে আসছে পোড়া কাঠের গন্ধ। আকাশ-ভরা নক্ষত্রবীথি।

    সুধাকান্তবাবু গল্প শুরু করলেন।

  • ভয়

    ভয়

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book-name]
    [book]

    একটা মজার ঘটনার কথা বলি।

    ক্লাস নিচ্ছি, পড়াচ্ছি থার্মোডিনামিক্স। একটি ছেলেকে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম সে উত্তর দিতে পারল না। বিরক্ত হয়ে বললাম, নাম কি তোমার? সে উঠে দাঁড়াল কিন্তু নাম বলল না। ক্লাসের সব ছেলেমেয়েরা হাসতে শুরু করল। আমি বিস্মিত। তাদের হাসির কারণ ধরতে পারছি না। আবার বললাম, নাম কি তোমার? ছাত্র-ছাত্রীরা আবারও হেসে উঠল। ছেলেটির পাশে বসা একজন বলল, স্যার সে নাম বলবে না। কারণ তার নাম— মিসির আলি।

    ঘটনাটা ক্ষুদ্র। কিন্তু এই ক্ষুদ্র ঘটনা আমার মন আনন্দে পূর্ণ করল। মিসির আলি নামের চরিত্রটি আমি তাহলে অনেকের কাছেই পৌঁছে দিতে পেরেছি। একজন লেখকের কাছে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে?

    আমি বিব্রত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে বললাম, তুমি অস্বস্তি বোধ করছ কেন? মিসির আলি চরিত্রটি কি তুমি পছন্দ কর না?

    সে মাথা নীচু করে রইল, অন্য একজন পেছন থেকে বলল, স্যার ওর নামটাই মিসির আলি, বুদ্ধি শুদ্ধি খুব কম।

    আবার সবাই হেসে উঠল।

    ঐ দিনের ক্লাসের ঘটনাটি আমার জীবনের আনন্দময় ঘটনার একটি।

    মিসির আলিকে নিয়ে আরো তিনটি গল্প লেখা হল। এই আনন্দময় ঘটনার উল্লেখ সেই কারণেই করলাম। হয়ত এতে খুব সূক্ষ্ম ভাবে হলেও সামান্য অহংকার প্রকাশ করা হয়েছে। পাঠক-পাঠিকা আমার এই মানবিক ত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন এই বিনীত কামনা।

    হুমায়ূন আহমেদ

    শহীদুল্লাহ হল

  • বিপদ

    বিপদ

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    ভূমিকা

    মিসির আলির আরো একটি গল্প। আমার ধারণা, অদ্ভুত এই গল্প পাঠক-পাঠিকারা এক কথায় উড়িয়ে দেবেন। তাতে ক্ষতি নেই, তবু আমি অনুরোধ করব উড়িয়ে না দিতে। এ জগৎ বড়ই রহস্যময়। প্রকৃতি মাঝে মাঝে কিছু রহস্য ভাঙ্গতে চেষ্টা করে, আবার পরমুহূর্তেই সচেতন হয়ে আরো কঠিন রহস্যে নিজেকে ঢেকে ফেলে। সেই রহস্যের জট ছড়ানো মিসির আলির ক্ষমতার বাইরে।

    হুমায়ূন আহমেদ

    শহীদুল্লাহ হল

    ১৬ই নভেম্বর ১৯৯১

  • অনীশ

    অনীশ

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    হাসপাতালের কেবিন ধরাধরি ছাড়া পাওয়া যায় না, এই প্রচলিত ধারণা সম্ভবত পুরোপুরি সত্যি নয়। মিসির আলি পেয়েছেন, ধরাধরি ছাড়াই পেয়েছেন। অবশ্যি জেনারেল ওয়ার্ডে থাকার সময় একজন ডাক্তারকে বিনীতভাবে বলেছিলেন, ‘ভাই একটু দেখবেন—একটা কেবিন পেলে বড় ভালো হয়।’ এই সামান্য কথাতেই কাজ হবে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। আজকাল কথাতে কিছু হয় না। যে-ডাক্তারকে অনুরোধ করা হয়েছিল, তিনি বুড়ো। মুখের ভঙ্গি দেখে মনে হয় সমগ্র মানবজাতির ওপরই তিনি বিরক্ত। কোনো ভয়ংকর দুর্ঘটনায় মানবজাতি নিঃশেষ হয়ে আবার যদি এককোষী এ্যামিবা থেকে জীবনের শুরু করে তাহলে তিনি খানিকটা আরাম পান। তাঁকে দেখে মনে হয় নি তিনি মিসির আলির অনুরোধ মনে রাখবেন। কিন্তু ভদ্রলোক মনে রেখেছেন। কেবিন জোগাড় হয়েছে পাঁচতলায়। রুম নাম্বার চার শ নয়।

    সব জায়গায় বাংলা প্রচলন হলেও হাসপাতালের সাইনবোর্ডগুলি এখনো বদলায় নি। ওয়ার্ড, কেবিন, পেডিয়াট্রিকস—এ-সব ইংরেজিতেই লেখা। শুধু রোমান হরফের জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে বাংলা হরফ। হয়তো এগুলির সুন্দর বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া যায় নি। কেবিনের বাংলা কী হবে? কুটির? জেনারেল ওয়ার্ডের বাংলা কি ‘সাধারণ কক্ষ’?

    যতটা উৎসাহ নিয়ে মিসির আলি চার শ’ ন’ নম্বর কেবিনে এলেন ততটা উৎসাহ থাকল না। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তিনি আবিষ্কার করলেন—বাথরুমের ট্যাপ বন্ধ হয় না। যত কষেই প্যাচ আটকানো যাক, ক্ষীণ জলধারা ঝরনার মতো পড়তেই থাকে। কমোডের ফ্ল্যাশও কাজ করে না। ফ্ল্যাশ টানলে ঘড়ঘড় শব্দ হয় এবং কমোডের পানিতে সামান্য আলোড়ন দেখা যায়। এই পর্যন্তই। তার চেয়েও ভয়াবহ আবিষ্কারটা করলেন রাতে ঘুমোতে যাবার সময়। দেখলেন বেডের পাশে সাদা দেয়ালে সবুজ রঙের মার্কার দিয়ে লেখা—

    “এই ঘরে যে থাকবে

    সে মারা যাবে।

    ইহা সত্য। মিথ্যা নয়॥’

    মিসির আলির চরিত্র এমন নয় যে এই লেখা দেখে তিনি আঁৎকে উঠবেন এবং জেনারেল ওয়ার্ডে ফেরত যাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। তবে বড় রকমের অসুখবিসুখের সময় মানুষের মন দুর্বল থাকে। মিসির আলির মনে হল তিনি মারাই যাবেন। সবুজ রঙের এই ছেলেমানুষি লেখার কারণে নয়, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক নিয়মে। তাঁর লিভার কাজ করছে না বললেই হয়! মনে হচ্ছে লিভারটির আর কাজ করার ইচ্ছেও নেই। শরীরের একটি অঙ্গ নষ্ট হয়ে গেলে অন্য অঙ্গগুলিও তাকে অনুসরণ করে। একে বলে সিমপ্যাথেটিক রিঅ্যাকশন। কারো একটা চোখ নষ্ট হলে অন্য চোখের দৃষ্টি কমতে থাকে। তাঁর নিজের বেলাতেও মনে হচ্ছে তাই হচ্ছে। লিভারের শোকে শরীরের অন্যসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলিও কাতর। একসময় ফট করে কাজ বন্ধ করে দেবে। হৃৎপিণ্ড বলবে—কী দরকার গ্যালন গ্যালন রক্ত পাম্প করে? অনেক তো করলাম। শুরু হবে অনির্দিষ্টের পথে যাত্রা। সেই যাত্রা কেমন হবে তিনি জানেন না। কেউই জানে না। প্রাণের জন্ম-রহস্য যেমন অজানা, প্রাণের বিনাশ-রহস্যও তেমনি অজানা।

    তিনি শুয়ে পড়লেন। প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। বেল টিপে নার্সকে ডাকলেই সে কড়া কোনো ঘুমের অষুধ খাইয়ে দেবে। মিসির আলির ধারণা, এরা ঘুমের ট্যাবলেট এ্যাপ্রনের পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। রুগীর সামান্য কাতরানির শব্দ কানে যাওয়ামাত্র ঘুমের ট্যাবলেট গিলিয়ে দেয়। কাজেই ওদের না-ডেকে মাথার যন্ত্রণা নিয়ে শুয়ে থাকাই ভালো। শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর পরের জগৎ নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে।

    ধরা যাক মৃত্যুর পরে একটি জগৎ আছে। পার্টিকেলের যদি অ্যান্টি-পার্টিকেল থাকতে পারে, ইউনিভার্সের যদি অ্যান্টি-ইউনিভার্স হয়, তাহলে শরীরের এ্যান্টি-শরীর থাকতে সমস্যা কী? যদি মৃত্যুর পর কোনো জগৎ থাকে কী হবে সেই জগতের নিয়ম-কানুন? এ-জগতের প্রাকৃতিক নিয়ম-কানুন কি সেই জগতেও সত্যি? এখানে আলোর গতি সেকেণ্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল, সেখানেও কি তাই? নিউটনের গতিসূত্র কি সেই জগতের জন্যেও সত্যি? হাইজেনবার্গের আনসার্টিনিটি প্রিন্সিপ্‌ল? একই সময়ে বস্তুর গতি এবং অবস্থান নির্ণয় করা অসম্ভব। পরকালেও কি তাই? নাকি সেখানে এটি খুবই সম্ভব?

    মিসির আলি কলিং বেলের সুইচ টিপলেন। প্রচণ্ড বমি ভাব হচ্ছে। বমি করে বিছানা ভাসিয়ে দিতে চাচ্ছেন না, আবার একা-একা বাথরুম পর্যন্ত যাবার সাহস ও পাচ্ছেন না। মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে বাথরুমের দরজায় পড়ে যাবেন।

    অল্পবয়েসী একজন নার্স ঢুকল। তার গায়ের রঙ কালো, মুখে বসন্তের দাগ, তার পরেও চেহারায় কোথায় যেন একধরনের স্নিগ্ধতা লুকিয়ে আছে। মিসির আলি বললেন, এত রাতে আপনাকে ডাকার জন্যে আমি খুব লজ্জিত। আপনি কি আমাকে বাথরুম পর্যন্ত নিয়ে যাবেন? আমি বমি করব।

    ‘বাথরুমে যেতে হবে না। বিছানায় বসে-বসেই বমি করুন—আপনার খাটের নিচে গামলা আছে।’

    সিস্টার মিসির আলিকে ধরে-ধরে বসালেন। আশ্চর্যের ব্যাপার, বমি ভাব সঙ্গে-সঙ্গে কমে গেল। মিসির আলি বললেন, ‘সিস্টার, আপনার নাম জানতে পারি?’

    ‘আমার নাম সুস্মিতা। আপনি কি এখন একটু ভালো বোধ করছেন?’

    ‘বমি গলা পর্যন্ত এসে থেমে আছে। এটাকে যদি ভালো বলেন তাহলে ভালো।’

    ‘আপনার কি মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে?’

    ‘হচ্ছে।’

    ‘খুব বেশি?’

    ‘হ্যাঁ, খুব বেশি।’

    ‘আপনি শুয়ে থাকুন। আমি রেসিডেন্ট ফিজিসিয়ানকে ডেকে নিয়ে আসছি। তিনি হয়তো আপনাকে ঘুমের কোনো অষুধ দেবেন। তা ছাড়া আপনার গা বেশ গরম। মনে হচ্ছে টেম্পারেচার দুই-এর উপরে।’

    সুস্মিতা জ্বর দেখল। এক শ’ দুই পয়েন্ট পাঁচ। সে ঘরের বাতি নিভিয়ে ডাক্তারকে খবর দিতে গেল।

    মিসির আলি লক্ষ করছেন, তাঁর মাথার যন্ত্রণা ক্রমেই বাড়ছে। ঘর অন্ধকার, তবু চোখ বন্ধ করলেই হলুদ আলো দেখা যায়। চোখের রেটিনা সম্ভবত কোনো কারণে উত্তেজিত। ব্যথার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি? আচ্ছা—জ্বর মাপার যন্ত্র আছে থার্মোমিটার! ব্যথা মাপার যন্ত্র এখনো বের হল না কেন? মানুষের ব্যথা-বোধের মূল কেন্দ্র—মস্তিষ্ক। স্নায়ু ব্যথার খবর মস্তিষ্কে পৌছে দেয়। যে-ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল ব্যথার পরিমাপক, সেই সিগন্যাল মাপা কি অসম্ভব?

    ব্যথা মাপার একটা যন্ত্র থাকলে ভালো হত। প্রসববেদনার তীব্রতা নাকি সবচেয়ে বেশি। তার পরেই থার্ড ডিগ্রী বার্ন। তবে ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতাও একেক মানুষের একেক রকম। কেউ-কেউ অতি তীব্র ব্যথাও শান্তমুখে সহ্য করতে পারে। মিসির আলি পারেন না। তাঁর ইচ্ছা করছে দেয়ালে মাথা ঠুকতে। ব্যথা ভোলবার জন্যে কী করা যায়? মস্তিষ্ককে কি কোনো জটিল প্রক্রিয়ায় ফেলে দেওয়া যায় না? উল্টো করে নিজের সঙ্গে কথা বললে কেমন হয়? কিংবা একই বাক্য চক্রাকারে বলা যায় না?

    শিবে বখু কি থাব্য?

    শিবে বখু কি থাব্য?

    শিবে বখু কি থাব্য?

    নার্স ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকল। বাতি জ্বালাল। ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘কী ব্যাপার?’

    মিসির আলি বললেন, ‘আমার ডেলিরিয়াম হচ্ছে। একটি বাক্য বারবার উল্টো করে বলছি। “ব্যথা কি খুব বেশি’’—এই বাক্যটিকে আমি উল্টো করে বলছি, ‘শিবে বখু কি থাব্য?’

    ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘কোনো রুগীর যখন ডেলিরিয়াম হয়, সে বুঝতে পারে না যে ডেলিরিয়াম হচ্ছে।’

    ‘আমি বুঝতে পারি। কারণ আমার কাজই হচ্ছে মানুষের মনোজগৎ নিয়ে। ডাক্তার সাহেব, আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিন। সম্ভব হলে খানিকটা অক্সিজেন দেবারও ব্যবস্থা করুন। আমার মস্তিষ্কে অক্সিজেন ডিপ্রাইভেশন হচ্ছে। আমার হেলুসিনেশন হচ্ছে।’

    ‘কি হেলুসিনেশন?’

    ‘আমি দেখছি আমার হাত দুটো অনেক লম্বা হয়ে গেছে। এখনো লম্বা হচ্ছে।’

    মিসির আলি গানের সুরে বলতে লাগলেন—

    “ম্বাল তক তহা রমাআ।

    ম্বাল তক তহা রমাআ।

    ম্বাল তক তহা রমাআ।”

    ডাক্তার সাহেব নার্সকে প্যাথিড্রিন ইনজেকশান দিতে বললেন।

    মিসির আলির ঘুম ভাঙল সকাল ন’টার দিকে।

    ট্রে-তে করে হাসপাতালের নাশতা নিয়ে এসেছে। দু’ স্লাইস রুটি, একটা ডিম সেদ্ধ, একটা কলা এবং আধ গ্লাস দুধ। বিশ্বের দরিদ্রতম দেশের একটির জন্যে বেশ ভালো খাবার—স্বীকার করতেই হবে। তবু বেশির ভাগ রুগী এই খাবার খায় না। তাদের জন্যে টিফিন ক্যারিয়ারে ঘরের খাবার আসে। ফ্লাস্কে আসে দুধ।

    জেনারেল ওয়ার্ডের অবস্থা অবশ্য ভিন্ন। সেখানকার রুগীরা হাসপাতালের খাবার খুব আগ্রহ করে খায়। যারা খেতে পারে না, তারা জমা করে রাখে। বিকেলে তাদের আত্মীয়স্বজনরা আসে। মাথা নিচু করে লজ্জিত মুখে এই খাবারগুলি তারা খেয়ে ফেলে। সামান্য খাবার, অথচ কী আগ্রহ করেই-না খায়! বড়ো মায়া লাগে মিসির আলির। কতবার নিজের খাবার ওদের দিয়ে দিয়েছেন। ওরা কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়েছে।

    আজকের নাশতা মিসির আলি মুখে দিতে পারলেন না। পাউরুটিতে কামড় দিতেই বমি ভাব হল। এক চুমুক দুধ খেলেন। কলার খোসা ছাড়ালেন, কিন্তু মুখে দিতে পারলেন না। শরীর সত্যি-সত্যি বিদ্রোহ করেছে।

    খাবার নিয়ে যে এসেছে, সে তাকিয়ে আছে তীক্ষ্ণ চোখে। রুগী খাবার খেতে পারছে না, এই দৃশ্য নিশ্চয়ই তার কাছে নতুন নয়। তবু তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে দুঃখিত। লোকটি স্নেহময় গলায় বলল, ‘কষ্ট কইরা খান। না-খাইলে শরীরে বল পাইবেন না।’

    মিসির আলি শুধুমাত্র লোকটিকে খুশি করবার জন্যে পাউরুটি দুধে ভিজিয়ে মুখে দিলেন। খেতে কেমন যেন ঘাসের মতো লাগছে।

    আজ শুক্রবার।

    শুক্রবারে রুটিন ভিজিটে ডাক্তাররা আসেন না। সেটাই স্বাভাবিক। তাঁদের ঘর-সংসার আছে, পুত্র-কন্যা আছে। জন্মদিন, বিয়ে, বিবাহবার্ষিকী আছে। একটা দিন কি তাঁরা ছুটি নেবেন না? অবশ্যই নেবেন। মিসির আলি ধরেই নিয়েছিলেন তাঁর কাছে কেউ আসবে না। কিন্তু তাঁকে অবাক করে দিয়ে এ্যাপ্রন গায়ে মাঝবয়েসী এক ডাক্তার এসে উপস্থিত। ডাক্তার আসার এটা সময় নয়। প্রথমত শুক্রবার, দ্বিতীয়ত দেড়টা বাজে, লাঞ্চ ব্রেক। ডিউটির ডাক্তাররাও এই সময় ক্যান্টিনে খেতে যান।

    ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘কেমন আছেন?’

    মিসির আলি হেসে ফেলে বললেন, ‘ভালো থাকলে কি হাসপাতালে পড়ে থাকি?’

    ‘আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে ভালো আছেন। কাল রাতে খুব খারাপ অবস্থায় ছিলেন। প্রবল ডেলিরিয়াম।’

    ‘আপনি রাতে এসেছিলেন?’

    ‘জ্বি।’

    ‘চিনতে পারছি না। মাথা এলোমেলো হয়ে আছে। গত রাতে কী ঘটেছে কিচ্ছু মনে নেই।’

    ডাক্তার সাহেব চেয়ারে বসলেন। তাঁর শরীর বেশ ভারি। শরীরের সঙ্গে মিল রেখে গলার স্বর ভারি। চশমার কাঁচ ভারি। সবই ভারি ভারি, তবুও মানুষটির কথা বলার মধ্যে সহজ হালকা ভঙ্গি আছে। এ-জাতীয় মানুষ গল্প করতে এবং গল্প শুনতে ভালবাসে। মিসির আলি বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব, আমি আপনার জন্যে কী করতে পারি বলুন।’

    ‘একটা সমস্যার সমাধান করতে পারেন। এই কেবিনটা ছেড়ে অন্য একটা কেবিনে চলে যেতে পারেন। একজন মহিলা এই কেবিনে আসতে চাচ্ছেন।’

    মিসির আলি হাসতে-হাসতে বললেন, ‘আমি এই মুহূর্তে কেবিন ছেড়ে দিচ্ছি।’

    ‘এই মুহূর্তে ছাড়তে হবে না। কাল ছাড়লেও হবে।’

    ডাক্তার সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। মিসির আলি বললেন, ‘ভদ্রমহিলা বিশেষ করে এই কেবিনে আসতে চাচ্ছেন কেন?’

    ‘তাঁর ধারণা, এই কেবিন খুব লাকি। কেবিনের নম্বর চার শ’ নয়। যোগ করলে হয় তের। তের নম্বরটি নাকি তাঁর জন্যে খুব লাকি। সৌভাগ্য-সংখ্যা। নিউমোরলজি’-র হিসাব।’

    ‘কী অদ্ভুত কথা!’

    ডাক্তার সাহেব হালকা স্বরে বললেন, ‘অসুস্থ অবস্থায় মন দুর্বল থাকে। দুর্বল মনে তের নম্বরটি ঢুকে গেলে সমস্যা।’

    ‘মনের মধ্যে যা ঢুকেছে তা বের করে দিন।’

    ডাক্তার সাহেব হেসে ফেলে বললেন, ‘এটা তো কোনো কাঁটা না রে ভাই, যে, চিমটা দিয়ে বের করে নিয়ে আসব। এর নাম কুসংস্কার। কুসংস্কার মনের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে শিকড় ছড়িয়ে দেয়। কুসংস্কারকে তুলে ফেলা আমার মতো সাধারণ মানুষের কর্ম নয়। যাই ভাই। আপনি তাহলে কাল ভোরে কেবিন নম্বর চার শ’ পাঁচে চলে যাবেন। কেবিনটা সিঁড়ির কাছে না, কাজেই হৈ-চৈ হবে না। তা ছাড়া জানালার ভিউ ভালো। গাছপালা দেখতে পারবেন।’

    মিসির আলি গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না। আমি এই রুম ছাড়ব না। এখানেই থাকব।’

    ডাক্তার সাহেব বিস্মিত হয়ে তাকালেন। কি একটা বলতে গিয়েও বললেন না। মিসির আলি বললেন, ‘রুম ছাড়ব না, কারণ ছাড়লে কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। আমি এই জীবনে কুসংস্কার প্রশ্রয় দেবার মতো কোনো কাজ করি নি। ভবিষ্যতেও করব না।’

    ‘ও, আচ্ছা।’

    ‘আপনি যদি অন্য কোনো কারণ বলতেন, রুম ছেড়ে দিতাম। আমার কাছে চার শ’ নয় নম্বর যা, চার শ’ পাঁচ-ও তা। তফাত মাত্র চারটা ডিজিটের।’

    ডাক্তার সাহেব বিব্রত গলায় বললেন, ‘আপনি কি ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলবেন? অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ভদ্রমহিলা এ-ঘরে না-আসা পর্যন্ত অপারেশন করাবেন না। অপেক্ষা করবেন। অথচ অপারেশনটা জরুরি।’

    ‘ওঁর অসুবিধা কী?’

    ‘কিডনির কাছাকাছি একটা সিস্টের মতো হয়েছে। আপনি যদি তাঁর সঙ্গে কথা বলেন তাহলে ভালো হয়। ভদ্রমহিলাকে আপনি চেনেন।’

    ‘তাই নাকি?’

    ‘হ্যাঁ। ভালো করেই চেনেন। উনি অনুরোধ করলে না বলতে পারবেন না।’

    ‘নাম কি তাঁর?’

    ‘আমি ওঁকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি কথা বলুন।’

    মিসির আলি তাকিয়ে আছেন।

    দরজা ধরে যে-মহিলা দাঁড়িয়ে, তাঁর বয়স ত্রিশের কাছাকাছি হলেও তাঁকে দেখাচ্ছে বালিকার মতো। লম্বাটে মুখ, কাটা-কাটা চেহারা। অসম্ভব রূপবতী। সাধারণত রূপবতীরা মানুষকে আকর্ষণ করে না—একটু দূরে সরিয়ে রাখে। এই মেয়েটির মধ্যে আকর্ষণী ক্ষমতা প্রবল। মিসির আলি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন। মেয়েটি বলল, ‘আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন?’

    ‘না।’

    ‘সে কী, চেনা উচিত ছিল তো! আপনি সিনেমা দেখেন না নিশ্চয়ই?’

    ‘না।’

    ‘টিভি? টিভিও দেখেন না? টিভি দেখলেও তো আমাকে চেনার কথা!’

    ‘আমার টিভি নেই। বাড়িওয়ালার বাসায় গিয়ে অবশ্যি মাঝে-মাঝে দেখি। আপনি কি কোনো অভিনেত্রী?’

    ‘হ্যাঁ। এলেবেলে টাইপ অভিনেত্রী নই। খুব নামকরা। রাস্তায় বের হলে ‘ট্রাফিক জ্যাম’ হয়ে যাবে।’

    মেয়েটির কথা বলার ভঙ্গিতে মিসির আলি হেসে ফেললেন। মেয়েটিও হাসল। অভিনেত্রীর মাপা হাসি নয়, অন্তরঙ্গ হাসি। সহজ-সরল হাসি।

    ‘আপনি কিন্তু এখনো আমার নাম জিজ্ঞেস করেননি।’

    ‘কী নাম?’

    ‘আসমানী। এটা আমার আসল নাম। সিনেমার জন্যে আমার ভিন্ন নাম আছে। সেই নাম আপনার জানার দরকার নেই। ভেতরে আসব?’

    ‘আসুন।’

    মেয়েটি ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসল। গলার স্বর খানিকটা গম্ভীর করে বলল, ‘শুনলাম আপনি নাকি কুসংস্কার সহ্য করতে পারেন না।’

    ‘ঠিকই শুনেছেন। সহ্য করি না এবং প্রশ্রয় দিই না।’

    ‘কুসংস্কার-টুসংস্কার কিছু না। আপনি আপনার ঘরটা আমাকে ছেড়ে দিন। আমার এই কেবিনটা খুব পছন্দ। আমি আপনার কাছে হাতজোড় করছি। প্লীজ।’

    মেয়েটি সত্যি-সত্যি হাতজোড় করল। মিসির আলি লজ্জায় পড়ে গেলেন। এ কী কাণ্ড!

    ‘আমি এক্ষুণি ছেড়ে দিচ্ছি। হাতজোড় করতে হবে না।’

    ‘থ্যাংকস!’

    ‘থ্যাংকস বলারও প্রয়োজন নেই, তবে আমার ধারণা, এই কেবিনটিতেও শেষ পর্যন্ত আপনি থাকতে রাজি হবেন না।’

    ‘এ-রকম মনে হবার কারণ কী?’

    ‘আপনি রাতে যখন ঘুমুতে যাবেন তখন হঠাৎ করে দেয়ালের একটা লেখা আপনার চোখে পড়বে—সবুজ মার্কারে কাঁচা-কাঁচা হাতে লেখা—

    “এই ঘরে যে থাকবে

    সে মারা যাবে।

    ইহা সত্য, মিথ্যা নয়।”

    লেখা পড়েই আপনি আঁৎকে উঠবেন। যেহেতু আপনার মন খুব দুর্বল, সেহেতু আপনি আর এখানে থাকবেন না।’

    আসমানী বলল, ‘কোথায় লেখাটা—দেখি।’

    তিনি লেখাটা দেখালেন। আসমানী বলল, ‘কে লিখেছে?’

    মিসির আলি থেমে-থেমে বললেন, ‘যে লিখেছে তার সঙ্গে আমার দেখা হয় নি, তবে আমি অনুমান করতে পারি, একটি বাচ্চা মেয়ের লেখা। মেয়েটির উচ্চতা চার ফুট দু’ ইঞ্চি। এবং মেয়েটি এই ঘরেই মারা গেছে।’

    আসমানী ভুরু কুঁচকে বলল, ‘এ-সব আপনার অনুমান?’

    ‘জ্বি, অনুমান। তবে যুক্তিনির্ভর অনুমান।’

    ‘যুক্তিনির্ভর অনুমান মানে?’

    ‘এক-এক করে বলি। এটা একটা মেয়ের লেখা তা অনুমান করছি দেয়ালে আঁকা কিছু ছবি দেখে। সবুজ মার্কারে আঁকা বেশ কিছু ছবি আছে, সবই বেণী-বাঁধা বালিকাদের ছবি। মেয়েরা একটা বয়স পর্যন্ত শুধু মেয়েদের ছবি আঁকে।’

    ‘তাই বুঝি?’

    ‘হ্যাঁ, তাই।’

    ‘আর মেয়েটির উচ্চতা কীভাবে আঁচ করলেন?’

    ‘মেয়েটির উচ্চতা আঁচ করেছি আরো সহজে। আমরা যখন দেয়ালে কিছু লিখি, তখন লিখি চোখ বরাবর। মেয়েটি বিছানায় বসে-বসে লিখেছে। সেখান থেকে তার উচ্চতা আঁচ করলাম।’

    ‘দাঁড়িয়েও তো লিখতে পারে। হয়তো মেঝেতে দাঁড়িয়ে লিখেছে।’

    ‘তা পারে। তবে মেয়েটি অসুস্থ। বিছানায় বসে-বসে লেখাই তার জন্যে যুক্তি-সঙ্গত।’

    আসমানী গম্ভীর গলায় বলল, ‘মেয়েটি যে বেঁচে নেই তা কী করে অনুমান করলেন? কাউকে জিজ্ঞেস করেছেন?’

    ‘না, কাউকে জিজ্ঞেস করি নি। এটাও অনুমান। বাচ্চারা দেয়ালে লেখার ব্যাপারে খুবই পার্টিকুলার। যা বিশ্বাস করে তা-ই সে দেয়ালে লেখে। যদি বাচ্চাটি সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে যেত তাহলে অবধারিতভাবে এই লেখার জন্যে সে লজ্জিত বোধ করত এবং হাসপাতাল ছেড়ে যাবার আগে লেখাটি নষ্ট করে যেত।’

    ‘আপনি কী করেন জানতে পারি?’

    ‘মাস্টারি করতাম, এখন করি না। পার্ট টাইম টীচার ছিলাম। অস্থায়ী পোস্ট। চাকরি চলে গেছে।’

    ‘আপনি আমাকে দেখে কি আমার সম্পর্কে কিছু বলতে পারেন?’

    ‘একটা সামান্য কথা বলতে পারি—আপনার আসল নাম আসমানী নয়। অন্য কিছু।’

    ‘এ-রকম মনে হবার কারণ কী?’

    ‘আসমানী নামটি আপনি এমনভাবে বললেন যাতে আমার কাছে মনে হল অচেনা একটি শব্দ বলছেন। তার চেয়েও বড় কথা আপনার পরনে আসমানী রঙের একটি শাড়ি। শাড়িটি পরার পর থেকেই হয়তো আসমানী নামটা আপনার মাথায় ঘুরছে। প্রথম সুযোগে এই নামটি বললেন।’

    ‘আমার ডাক নাম “বুড়ি”।’

    মিসির আলি কিছু বললেন না। তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। বুড়ি বলল, ‘আপনি অনুমানগুলি কীভাবে করেন?’

    ‘লজিক ব্যবহার করে করি। সামান্য লজিক। লজিক ব্যবহার করার ক্ষমতা সবার মধ্যেই আছে। বেশির ভাগ মানুষই তা ব্যবহার করে না। যেমন আপনি ব্যবহার করছেন না। ভেবে বসে আছেন চার শ’ নয় নম্বর ঘরটি আপনার জন্যে লাকি। এ-রকম ভাবার পিছনে কোনো লজিক নেই।’

    ‘লজিকই কি এই পৃথিবীর শেষ কথা?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘আপনি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে লজিকই হচ্ছে পৃথিবীর শেষ কথা—। লজিকের বাইরে কিছু নেই? পৃথিবীর সমস্ত রহস্যের সমাধান আছে লজিকে, পারবেন বলতে?’

    ‘পারব।’

    ‘ভালো কথা। শুনে খুশি হলাম। আমি কি আপনার নাম জানতে পারি?’

    ‘আমার নাম মিসির আলি। আপনি কি কাল ভোরে এই কেবিনে আসতে চান? না মত বদলেছেন?’

    ‘আমি কাল ভোরে চলে আসব। যাই মিসির আলি সাহেব। স্লামালিকুম।’

    মেয়েটি নিজের কেবিনে ফিরে গেল। রাত দশটার ভেতর সে চার শ’ নয় নম্বর কেবিনে আগের রুগীর যাবতীয় তথ্য জোগাড় করল। এই কেবিনে ‘লাবণ্য’ নামের দশ বছর বয়সী একটি মেয়ে থাকত। হার্টের ভাল্বের কী একটি জটিল সমস্যায় সে দীর্ঘদিন এই ঘরটিতে ছিল। মারা গেছে মাত্র দশ দিন আগে। তার ওজন তেষট্টি পাউণ্ড। উচ্চতা চার ফুট এক ইঞ্চি।

    মিসির আলি সাহেব সামান্য ভুল করেছেন। তিনি বলেছেন চার ফুট দু’ ইঞ্চি। এইটুকু ভুল বোধহয় ক্ষমা করা যায়।

  • মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য

    মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    ‘আপনি কি ভূত দেখেছেন স্যার? ইংরেজিতে যাকে বলে spirit, ghost, astral body মানে প্রেতাত্মার কথা বলছি, অশরীরী……’

    মিসির আলি প্রশ্নটির জবাব দেবেন কি না বুঝতে পারছেন না। কিছু মানুষ আছে যারা প্রশ্ন করে, কিন্তু জবাব শুনতে চায় না। প্রশ্ন করেই হড়বড় করে কথা বলতে থাকে। কথার ফাঁকে-ফাঁকে আবার প্রশ্ন করে, আবার নিজেই জবাব দেয়। মিসির আলির কাছে মনে হচ্ছে তাঁর সামনের চেয়ারে বসে থাকা এই মানুষটি সেই প্রকৃতির। ভদ্রলোক মধ্যবয়স্ক। গোলাকার মুখে পুরুষ্ট গোঁফ। কুস্তিগির-কুস্তিগির চেহারা। কথার মাঝখানে হাসার অভ্যাস আছে। হাসার সময় কোনো শব্দ হয় না, কিন্তু সারা শরীর দুলতে থাকে। ওসমান গনি নামের এই মানুষটির প্রধান বৈশিষ্ট্য অবশ্য নিঃশব্দে হাসার ক্ষমতা নয়; প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাঁর নিচের পাটির একটি এবং ওপরের পাটির দু’টি দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো। যে-যুগে রুট ক্যানালিং-এর মতো আধুনিক দন্ত চিকিৎসা শুরু হয়েছে, সে-যুগে কেউ সোনা দিয়ে দাঁত বাঁধায় না। এই ভদ্রলোক বাঁধিয়েছেন। ধবধবে সাদা দাঁতের মাঝে ঝকঝকে তিনটি সোনালি দাঁত।

    ‘কথা বলছেন না কেন স্যার, ভূত কি কখনো দেখেছেন?’

    ‘জ্বি না।’

    ‘না-দেখাই ভালো। আমি একবার দেখেছিলাম, এতেই অবস্থা কাহিল। ঘাম দিয়ে জ্বর এসে গিয়েছিল। এক সপ্তাহের উপর ছিল জ্বর। পায়ের পাতা চুলকাত। ডাক্তার পরীক্ষা করে বলল—অ্যালার্জি। ডাক্তারদের কারবার দেখুন, আমি বললাম, ভূত দেখে জ্বর এসে গেছে। তার পরেও ডাক্তার বলে অ্যালার্জি। অ্যান্টি হিস্টামিন দিয়েছিল। অ্যান্টি হিস্টামিন কি ভূতের অষুধ, আপনি বলুন?’

    মিসির আলি বললেন, ‘আজ আমার একটু কাজ ছিল। বাইরে যাব। আপনি বরং অন্য একদিন আসুন, আপনার গল্প শুনব।’

    ‘দশ মিনিট লাগবে স্যার। ভূতের গল্পটা বলেই চলে যাব। আমার সঙ্গে একটা মাইক্রোবাস আছে, আপনি যেখানে যেতে চান আপনাকে নামিয়ে দিয়ে যাব। রিকন্ডিশান্ড মাইক্রোবাস। গত আগস্ট মাসে কিনেছি। দু’ লাখ পঁচিশ নিয়েছে।’

    মিসির আলি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আপনি কি খুব অল্পকথায় আপনার ভূত দেখার গল্প বলতে পারবেন? যদি পারেন তাহলে বলুন, গল্প শুনব। খুব যে আগ্রহ নিয়ে শুনব তা না। অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়েরা ভূতের গল্প খুব আগ্রহ করে শোনে। আমার বয়স একান্ন। তার চেয়েও বড় কথা ভূত-প্রেতের ব্যাপারে আমার উৎসাহ কম।’

    ‘আমারো কম। খুবই কম। গল্পটা বলে চলে যাই স্যার।’

    ‘আচ্ছা বলুন। আপনি কি এই গল্প শোনাতেই এসেছেন?’

    ‘দ্যাটস কারেক্ট স্যার। আপনার ঠিকানা পেয়েছি আমার ভাগ্নির কাছ থেকে। সে বইটই পড়ে। বই পড়ে তার ধারণা হয়েছে আপনি দারুণ বুদ্ধিমান। অনেক বড় বড় সমস্যা নাকি সমাধান করেছেন। তখন ভাবলাম, যাই, ভদ্রলোককে দেখে আসি বুদ্ধিমান লোকের সঙ্গে কথা বলেও আনন্দ। গাধা টাইপের লোকের সঙ্গেও অবশ্যি কথা বলে আনন্দ পাওয়া যায়। যাদের বুদ্ধি মাঝামাঝি, এদের সঙ্গে কথা বলে কোনো আনন্দ নেই। আমি আসায় বিরক্ত হন নি তো?’

    ‘না, বিরক্ত হই নি। আপনার কি কোনো সমস্যা আছে?’

    ‘না, কোনো সমস্যা নেই। প্রথম দিন ভূত দু’টাকে দেখে ভয় পেয়ে জ্বর হয়েছিল। এখন আর হয় না।’

    ‘প্রায়ই দেখেন?’

    ‘জ্বি-না। প্রায়ই দেখি না। ধরেন মাসে, দু’মাসে একবার।’

    ‘এরা আপনাকে ভয় দেখায়?’

    ‘না, ভয় দেখায় না। গল্পটা তাহলে বলি—’

    ‘সংক্ষেপ করে বলুন, আমার এক জায়গায় যেতে হবে।’

    ‘আপনি স্যার কোনো চিন্তা করবেন না। আমার মাইক্রোবাস আছে। গত আগস্ট মাসে কিনেছি। নাইনটিন এইটি মডেল……’

    ‘মাইক্রোবাসের কথা আগে একবার শুনেছি। ভূতের কথা কি বলতে চাচ্ছিলেন বলুন।’

    ‘ও হ্যাঁ—আমার হচ্ছে স্যার বিরাট ফ্যামিলি। পাঁচ মেয়ে। সব ক’টার চেহারা খারাপ। মা’র মতো মোটা, কালো, দাঁত উঁচু। একটারও বিয়ে হয় নি। এদিকে আবার আমার ছোট বোনটি মারা গেছে—তার তিন মেয়ে এক ছেলে উঠে এসেছে আমার বাড়িতে। গোদের উপর বিষফোঁড়া। আমার মা, এক খালাও সঙ্গে থাকেন। বাড়িভর্তি মেয়ে। একগাদা মেয়ে থাকলে যা হয়, দিন-রাত ক্যাঁচ-ক্যাঁচ—ক্যাঁচ-ক্যাঁচ। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় ভিসিআর। রোজ রাতে এরা দু’টা করে ছবি দেখে। আমার মা চোখে কিছুই দেখেন না, তিনিও ভিসিআর-এর সামনে বসে থাকেন। শব্দ শোনেন। শব্দ শুনেই হাসেন—কাঁদেন। গলার আওয়াজ শুনে বলতে পারেন কে শ্রীদেবী, কে রেখা। এই হল স্যার বাড়ির অবস্থা।’

    মিসির আলি হতাশ গলায় বলেন, ‘আপনি মূল গল্পটা বলুন। আপনি অপ্রয়োজনীয় কথা বেশি বলছেন।’

    ‘মূল গল্পটা তাহলে বলি। বাড়ির মেয়েগুলির যন্ত্রণায় আমি রাতে ঘুমাই ছাদের চিলেকোঠায়। ছোট্ট ঘর। খাট আছে, ড্রেসিং টেবিল আছে, শুধু বাথরুম নেই—এই একটা অসুবিধা। আমার আবার ডায়াবেটিস আছে, কয়েকবার প্রস্রাব করতে হয়। ছাদে প্রস্রাব করি। কাজের ছেলেটা সকালে এক বালতি পানি দিয়ে ধুয়ে দেয়। কাজের ছেলেটার নাম হল ইয়াসিন।’

    ‘প্লীজ, গল্পটা তাড়াতাড়ি শেষ করুন।’

    ‘জ্বি স্যার, শেষ করছি। গত বৎসর চৈত্র মাসের ছয় তারিখের কথা। রাতে ঘুমাচ্ছি, প্রস্রাবের বেগ হওয়ায় ঘুম ভেঙে গেল। মাথার কাছে টেবিল ল্যাম্প ছিল। টেবিল ল্যাম্প জ্বালালাম। তখনি দেখি ঘরের কোণায় দু’টা ভূত। খুব ছোট সাইজ, লম্বায় এই ধরেন এক ফুটের মতো হবে। গজ-ফিতা দিয়ে মাপি নি। চোখের আন্দাজ। দু’-এক ইঞ্চি এদিক-ওদিক হতে পারে।’

    ‘তারা করছে কী?’

    ‘বই নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। একজনের হাতে সবুজ মলাটের ময়লা একটা বই, অন্যজন সেই বই কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। খিচ-খিচ, খিচ-খিচ করে কথা বলছে। আমি ওদের দিকে তাকাতেই কথা বন্ধ করে ফেলল। আমি তখনো ভয় পাই নি। কারণ হঠাৎ ঘুম ভেঙেছে তো, এরা যে ভূত এইটাই বুঝি নি। কাজেই ধমকের মতো বললাম, ‘এ্যাই, এ্যাই।’

    ‘তখন কী হল?’

    ‘ধমক শুনে হাত থেকে বই ফেলে দিল। তারপর মিলিয়ে গেল। তখন বুঝলাম, এরা ভূত। ছোট সাইজের ভূত। তখন ভয় লাগল। জ্বর এসে গেল।’

    ‘এই আপনার গল্প?’

    ‘জ্বি।’

    ‘আচ্ছা ঠিক আছে। চলুন এখন উঠি।’

    ‘ইন্টারেস্টিং লাগছে না স্যার?’

    ‘জ্বি, ইন্টারেস্টিং।’

    ‘ভূত এত ছোট সাইজের হয়, তা-ই জানতাম না। একটার আবার থুতনিতে অল্প দাড়ি, ছাগলা দাড়ি।’

    ‘আসুন, আমরা উঠি।’

    ওসমান গনি উঠলেন। মনে হল খুব অনিচ্ছায় উঠলেন। তাঁর আরো কিছুক্ষণ বসার ইচ্ছা ছিল। মিসির আলি ঘরে তালা দিতে-দিতে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। ওসমান গনির কথাবার্তা থেকে পরিষ্কার হয়ে গেছে—এই লোক তার ‘ছোট ভূতের’ গল্প বলার জন্য বারবার আসবে। নানানভাবে তাঁকে বিরক্ত করবে। একদল মানুষ আছে, যারা অন্যদের বিরক্ত করে আনন্দ পায়। ইনিও মনে হচ্ছে সেই দলের।

    ‘স্যার।’

    ‘বলুন।’

    ‘ভূতদের ঐ বইটা ড্রয়ারে তালাবন্ধ করে রেখে দিয়েছি।’

    ‘খুব ভালো করেছেন। এই বই তালাবন্ধ থাকাই ভালো।’

    ‘একদিন আপনাকে দেখাতে নিয়ে আসব।’

    ‘কোনো প্রয়োজন নেই। মানুষের বইয়ে আমার আগ্রহ আছে। ভূতের বইয়ের প্রতি আমার আগ্রহ নেই।’

    ‘আমারও নেই। এই জন্যে ড্রয়ারে তালাবন্ধ করে রেখে দিয়েছি। উল্টেও দেখি নি। তার উপর স্যার বইটা থেকে দুর্গন্ধ আসে। গো-মূত্রের গন্ধের মতো গন্ধ।’

    ভদ্রলোক আনন্দিত ভঙ্গিতে হাসলেন। মনে হচ্ছে বইটি থেকে গো-মূত্রের গন্ধ আসায় তিনি আনন্দিত। মিসির আলি মনে বিরক্তি চেপে রাখতে পারলেন না। কঠিন গলায় বললেন, ‘চলুন রওনা হওয়া যাক। আমার জরুরি কাজ আছে।’

    ‘জ্বি আচ্ছা। কাজের সঙ্গে আপোস নাই। আগে কাজ, তারপর অন্য কথা। আমি তাহলে কাল আসি?’

    ‘কাল আসার কি দরকার আছে?’

    ‘দরকার আছে স্যার। ভূতের গল্পটা ভালোমতো বলা হয় নাই। ওরা আমার সঙ্গে কী-সব কথাবার্তা বলে—একটা আছে ফাজিল ধরনের, আমাকে ডাকে ছোট মামা।’

    ‘ভাই শুনুন, আমার কাছে আসার আর দরকার নেই। আমি নিজে অসুস্থ। বিশ্রাম করছি।’

    ‘আপনি তো স্যার বিশ্রামই করবেন। বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে থাকবেন। আমি পাশে বসে গল্প বলব—’

    ‘আপনি দয়া করে আর আসবেন না। আমি একা-একা বিশ্রাম করতে পছন্দ করি।’

    ‘জ্বি আচ্ছা, আসব না। শুধু যদি স্যার আমাকে একটা উপদেশ দেন। কাগজে লিখে দেন, তাহলে খুব ভালো। উপদেশটা মানিব্যাগে রেখে দেব।’

    মিসির আলি হতভম্ব গলায় বললেন, ‘কী উপদেশ?

    ‘লিখবেন— “ওসমান গনি, আপনার মৃত্যু হবে পানিতে ডুবে। খুব সাবধান। খুব সাবধান।” এই লিখে আপনার নামটা সই করবেন।’

    ‘আমি আপনার কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারছি না। এ-সব কথা আমি কেন লিখব?’

    ‘অকারণে লিখতে বলছি না স্যার। কারণ আছে। যে-ভূতটা আমাকে ছোট মামা ডাকে, সে আমাকে বলেছে—আমার মৃত্যু হবে পানিতে ডুবে। আমাকে সাবধান করে দিয়েছে। ভূতের কথা কে বিশ্বাস করে বলেন? কেউ বিশ্বাস করে না। আমিও করি না। এখন যদি আপনি দয়াপরবশ হয়ে লিখে দেন—’

    ‘দেখুন ওসমান গনি সাহেব—এ-জাতীয় কথা আমি কখনো লিখব না। চলুন, আমরা ঘর থেকে বের হই। আকাশের অবস্থা ভালো না—ঝড়-বৃষ্টি হবে।’

    ‘লেখাটা না দিলে আমি স্যার যাব না। লিখে দিলে আর কোনোদিন এসে বিরক্ত করব না। আমি স্যার এককথার মানুষ। মানিব্যাগটা খুললেই আপনার লেখাটা চোখে পড়বে। তখন সাবধান হয়ে যাব। পানির ধারেকাছে যাব না।’

    ‘এটা লিখে দিলে আপনি চলে যাবেন?’

    ‘জ্বি।’

    ‘আর কোনোদিন আসবেন না?’

    ‘বললাম তো স্যার, আমি এককথার মানুষ।’

    ‘বেশ, বসুন। লিখে দিচ্ছি।’

    ‘চা খেতে ইচ্ছা করছে। চিনি ছাড়া এক কাপ চা কি হবে?’

    ‘চা হবে না।’

    ‘আপনার কি প্যাড আছে স্যার? প্যাডে লিখে দিলে ভালো হয়।’

    ‘না, আমার প্যাড নেই।’

    ‘তাহলে নাম সই করে ঠিকানা লিখে দেবেন। আর টেলিফোন নাম্বার, যদি টেলিফোন থাকে।’

    ‘ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। টেলিফোন নেই।’

    ‘টেলিফোন না-থাকাই ভালো। বড়ই যন্ত্রণা। এমন সব আজেবাজে টেলিফোন আসে! এই পর্যন্ত আছাড় দিয়ে আমি ক’টা টেলিফোন ভেঙেছি বলুন তো স্যার?’

    মিসির আলি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘এই নিন আপনার কাগজ। এখন চলুন, যাওয়া যাক। দয়া করে আবার এসে আমাকে বিরক্ত করবেন না।’

    ‘স্যার থ্যাংকস। খুব উপকার করেছেন।’

    ওসমান গনি রাস্তায় নেমে বিস্মিত হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন। কোনো মাইক্রোবাস দেখা যাচ্ছে না। মিসির আলি বললেন, ‘আপনার মাইক্রোবাস কোথায়?’ ওসমান গনি খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘নতুন ড্রাইভার। বাস নিয়ে পালিয়ে গেছে বোধহয়। আপনি কী বলেন স্যার?’

    মিসির আলি কী বলবেন ভেবে পেলেন না। যে-চায়ের দোকানের সামনে মাইক্রোবাসটি দাঁড়িয়ে ছিল, সেই চায়ের দোকানিকে জিজ্ঞেস করা হল। সে বলল, তার দোকানের সামনে কখনোই কোনো মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে ছিল না।

    ওসমান গনি চিন্তিত গলায় বললেন, ‘বিরাট সমস্যা হয়ে গেল। আমি এখন বাসায় যাব কী করে? আমার তো বাসার ঠিকানা মনে নেই।’

    ‘আমি আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। বাসার ঠিকানা মনে নেই মানে?’

    ‘আমার কিছু মনে থাকে না। ও, আচ্ছা আচ্ছা, নোটবুকে ঠিকানা লেখা আছে। স্যার, আপনি আমাকে একটা রিকশা ঠিক করে দিন। আর নোটবই দেখে ঠিকানাটা রিকশাওয়ালাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিন। কী যন্ত্রণার মধ্যে পড়লাম দেখুন তো!’

    মিসির আলি নোটবই খুললেন। সেখানে প্রথমে বাংলা এবং পরে ইংরেজিতে লেখা—

    “ইনি মানসিকভাবে অসুস্থ।

    দয়া করে তাঁকে সাহায্য করুন। তাঁর বাসার ঠিকানা………….”

    ‘স্যার, ঠিকানাটা লেখা আছে না?’

    ‘আছে।’

    ‘পরের পৃষ্ঠায় ডায়াগ্রাম আছে। ডায়াগ্রাম দেখে রিকশাওয়ালাকে বুঝিয়ে দিন, ও নিয়ে যাবে।’

    মিসির আলি নোটবই হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন। এ-জাতীয় ঝামেলায় তিনি আগে পড়েন নি। ওসমাস গনি নিজেই রিকশা ডেকে আনলেন। তাঁকে বেশ উৎফুল্ল মনে হল। মিসির আলি রিকশাওয়ালাকে বুঝিয়ে দিলেন কীভাবে যেতে হবে। ওসমান গনি বললেন, ‘স্যার, তাহলে যাই। আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল। কারো সঙ্গে কথা বলে আজকাল আরাম পাই না। এই জন্যেই ছাদের ঘরে একা-একা থাকি। বড় ভালো লাগল স্যার। তবে সব ভালো দিকের যেমন মন্দ দিক আছে—এটারও আছে। মাইক্রোবাসটা চুরি হয়ে গেল। বাসায় ফিরেও শান্তি নেই। থানা-পুলিশ করতে হবে।’

    মিসির আলি বললেন, ‘আমি কি আসব আপনার সঙ্গে?’

    ওসমান গনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘না না না। কোনো প্রয়োজন নেই। এ-রকম আগেও হয়েছে, রিকশা করে চলে গেছি। আচ্ছা স্যার, যাই। আপনিও বাসায় চলে যান। রাত অনেক হয়ে গেছে। এত রাতে কোথাও যাওয়া ঠিক না। তা ছাড়া আমার মনে হয় আপনার আসলে কোথাও যাবারও কথা না। আমার হাত থেকে বাঁচার জন্য বলেছেন— ‘কাজ আছে।’ বুদ্ধিমান লোকেরা এ-রকম করে। আপনি স্যার আসলেই বুদ্ধিমান।’ ওসমান গনি নিঃশব্দে গা দুলিয়ে হাসতে লাগলেন।

    মিসির আলি ঘরে ফিরলেন খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে। বিভ্রান্তির অনেকগুলি কারণ। প্ৰথম কারণ—ওসমান গনিকে মানসিক রুগী বলে মনে হচ্ছে না। যে-মানুষ খুঁজে খুঁজে তার ঠিকানা বের করতে পারে, সে নোট বইয়ে লেখা পড়ে বাসায় ফিরে যেতে পারে না, তা হয় না।

    লোকটি যে পাগল সাজার ভান করছে তাও না। যে ভান করবে, সে সারাক্ষণই করবে। আসল পাগলের চেয়ে নকল পাগল অনেক বেশি পাগলামি করে। মিসির আলি যে তাকে বিদেয় করবার জন্যে বলছেন—‘তাঁর কাজ আছে’, এই ব্যাপারটি ওসমান গনির কাছে ধরা পড়েছে। নকল পাগল হলে তা সে কখনো স্বীকার করত না। চেপে যেত। তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? রাতে ঘুমুতে যাবার সময় মিসির আলি বালিশের কাছে রাখা খাতায় পেনসিলে অস্পষ্টভাবে লিখলেন—

    নাম : ওসমান গনি।

    বয়স : পঞ্চাশের কাছাকাছি।

    বিশেষত্ব : তিনটি সোনাবাঁধানো দাঁত। হাসেন কোনো রকম শব্দ না করে।

    (১) কেন এসেছিলেন? বুঝতে পারা যাচ্ছে না।

    (২) অন্যরা দাবি করছে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ। তিনি নিজে দাবি করছেন না।

    (৩) তবে তিনি যে ভৌতিক গল্পের কথা বলছেন, তা মানসিক অসুস্থতার দিকেই ইঙ্গিত করে।

    (৪) লোকটি বিত্তবান বলেই মনে হল। কারণ তিনি যে-তেতলা বাড়ির কথা বললেন, সেই বাড়িটি তাঁর হওয়ারই সম্ভাবনা। নোটবইয়ের ঠিকানায় গুলশানের কথা লেখা। গুলশান বিত্তবানদের এলাকা।

    (৫) ভদ্রলোকের হাতে পাথর-বসানো তিনটি আঙটি, ব্যবসায়ীরা সাধারণত পাথর-টাথরে বিশ্বাসী হয়। তিনি সম্ভবত একজন ব্যবসায়ী।

    রাত এগারটা পাঁচ মিনিটে মিসির আলি বাতি নিভিয়ে ঘুমুতে গেলেন। কঠিন নিয়মে তিনি এখন নিজেকে বাঁধার চেষ্টা করছেন। ঘুম আসুক না-আসুক, রাত এগারটা বাজতেই বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়বেন। ঘুম আনানোর যে-সব প্রক্রিয়া আছে সেগুলি প্রয়োগ করবেন। তার পরেও যদি ঘুম না আসে কোনো ক্ষতি নেই। বিছানায় গড়াগড়ি করবেন। উঠবেন ভোর পাঁচটায়। ঘুম পাড়িয়ে দেবার কোনো যন্ত্র আবিষ্কৃত হয় নি, কিন্তু ঘুম ভাঙানোর যন্ত্র আছে। তিনি দু’ শ’ ত্রিশ টাকা দিয়ে একটি অ্যালার্ম-ঘড়ি কিনেছেন। এই ঘড়ি ভোর পাঁচটায় এমন হৈচৈ শুরু করে যে, কার সাধ্য বিছানায় শুয়ে থাকে! বিজ্ঞানের এই সাফল্যের দিনে ঘুম আনার যন্ত্র বের হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। অ্যালার্ম-ঘড়ি যে-হারে বিক্রি হয়, ঘুম-ঘড়িও সেই হারে বিক্রি হবে।

    ঘুম আনানোর প্রক্রিয়াগুলি কাজ করছে না। মিসির আলি সাত শ’ ভেড়া গুনলেন। এই গুণন প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের ক্লান্ত হয়ে যাবার কথা। ক্লান্ত হবার পরিবর্তে মস্তিষ্ক আরো উত্তেজিত হল। মনে-মনে গল্প বললেও নাকি ঘুম আসে। গল্প বলার সময় ভাবতে হয়, এক দল ঘুম-ঘুম চোখের শিশুরা গল্প শুনছে। মিসির আলি গল্প শুরু করলেন। সব গল্প শুরু হয় এইভাবে—এক দেশে ছিল এক রাজা। তাঁর গল্পটা একটু অন্য রকম হল—এক দেশে ছিল এক রানী। রানীর দুই রাজা। সুয়োরাজা এবং দুয়োরাজা। সুয়োরাজাটা বড়ই ভালো………।

    কল্পনার শিশুদের একজন প্রশ্ন করল, ‘সুয়োরাজার নাম কি?’

    ‘সুয়োরাজার নাম হচ্ছে ওসমান গনি। মোটাসোটা একজন মানুষ, পঞ্চাশের মতো বয়স। হাতে তিনটা আঙটি। এর মধ্যে একটা আঙটি হচ্ছে নীলার। সুয়োরাজার তিনটা দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো……’

    কল্পনার শিশুটি বলল, ‘এ আবার কেমন রাজা?’

    মিসির আলি বিছানা থেকে উঠে পড়লেন। বাতি জ্বালালেন না, অন্ধকারেই বাথরুমে ঢুকে চোখে-মুখে পানি ঢাললেন। বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে সিগারেট ধরালেন, যদিও তাঁর বর্তমান নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন পদ্ধতিতে রাত এগারটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত কোনো সিগারেট খাবার ব্যবস্থা নেই। তিনি একধরনের অস্বস্তি বোধ করছেন, একধরনের বিভ্রান্তি—যা ওসমান গনি নামের মানুষটি তৈরি করে গেছেন। মাথা থেকে বিভ্রান্তি তাড়াতে পারছেন না। স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে আছে। বারান্দায় প্রচুর হাওয়া, আকাশ মেঘলা। শ্রাবণের ধারাবর্ষণ সম্ভবত শুরু হবে। তাঁর শীত-শীত লাগছে। জ্বলন্ত সিগারেট হাতে নিয়েই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। সিগারেট পুড়তে পুড়তে একসময় তাঁর হাতেই নিভে গেল। তাঁর ঘুম ভাঙল ভোর পাঁচটায়। দু’ শ’ ত্ৰিশ টাকায় কেনা অ্যালার্ম-ঘড়ি তাঁকে যথাসময়ে ডেকে তুলল।

    তিনি হাতমুখ ধুলেন। কেরোসিন কুকারে চা বানিয়ে খেলেন। খানিকক্ষণ ফ্রী-হ্যান্ড একসারসাইজ করলেন। এও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন পদ্ধতির অংশ। ডাক্তার বিশেষভাবে বলে দিয়েছেন। পাথরের মতো মুখ করে বলেছেন, ‘মিসির আলি সাহেব, আপনার শরীরের কলকব্জা সবই নষ্ট হয়ে গেছে। এটা কি আপনি জানেন?’

    মিসির আলি হাসতে-হাসতে বললেন, ‘জানি।’

    ‘আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে চান, না এখনি মরে যেতে চান?’

    ‘অল্প কিছুদিন বাঁচতে চাই।’

    ‘কতদিন?’

    ‘এই ধরুন এক বৎসর।’

    মিসির আলি ভেবেছিলেন ডাক্তার বলবেন, এক বৎসর কেন? ডাক্তার সে-প্রশ্ন করলেন না, খসখস করে প্রেসক্রিপশনে একগাদা কথা লিখতে লাগলেন।

    ভোরবেলা খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে পনের মিনিট ফ্রী-হ্যান্ড একসারসাইজ হচ্ছে তার একটি। একসারসাইজের পর এক ঘণ্টা প্রাতঃভ্রমণের ব্যাপার আছে। ডাক্তার সাহেব লিখে দিয়েছেন—ঝড় হোক, টাইফুন হোক, ভূমিকম্প হোক—এক ঘণ্টা হাঁটতেই হবে।

    এখন ঝড়, টাইফুন বা ভূমিকম্প কোনোটাই হচ্ছে না। টিপটিপ করে বৃষ্টি অবশ্যি পড়ছে। সেই বৃষ্টি অগ্রাহ্য করে বের হওয়া যায়। ছাতা মাথায় প্রাতঃভ্রমণ মন্দ নয়। সকালবেলা এই বেড়ানোটা তাঁর খারাপ লাগে না। বিচিত্র সব চরিত্র দেখা যায়। একদল মানুষ প্রাতঃভ্রমণকে প্রায় উপাসনার পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। উপাসনার যেমন কিছু নিয়ম আছে, এদেরও আছে। আরেক দল আছে ‘খাদক’ জাতীয়। ভ্রমণের এক পর্যায়ে বিশাল টিফিন-ক্যারিয়ার খুলে হাউহাউ করে পরোটা-গোস্ত যেভাবে গিলতে থাকেন, তাতে মনে হয় তাঁদের সৃষ্টি করা হয়েছে খোলা মাঠে বসে গোস্ত-পরোটা খাবার জন্যে।

    মিসির আলি বেরুবার মুখে বাধা পেলেন। গেটের কাছে আসতেই ত্ৰিশ পঁয়ত্রিশ বছর বয়েসী এক ভদ্রলোক এসে শীতল গলায় বললেন, ‘আপনি কি বেরুচ্ছেন?’

    মিসির আলি বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ।’

    ‘কাল রাতে ওসমান গনি নামের কেউ কি আপনার কাছে এসেছিলেন?’

    ‘এসেছিলেন।’

    ‘ঐ বিষয়ে আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলব। আমি পুলিশের লোক। ইন্সপেক্টর অব পুলিশ। আমার নাম রকিবউদ্দিন।’

    মিসির আলি সহজ গলায় বললেন, ‘ওসমান গনি কি মারা গেছেন?’

    ‘হ্যাঁ, মারা গেছেন। আপনি কী করে জানলেন?’

    ‘অনুমান করেছি। আমার অনুমানশক্তি ভালো।’

    ‘অনুমানশক্তি ভালো থাকাই ভালো। আসুন, কথা বলি। বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হোম মিনিস্টার নিজেই ইন্টারেস্ট দেখিয়েছেন। বেশিক্ষণ আমি আপনাকে বিরক্ত করব না। প্রাথমিকভাবে আধ ঘণ্টার মতো কথা বলব। পরে আবার আসব।’

    ‘রকিবউদ্দিন সাহেব, এখন তো আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারব না। এখন মর্নিং-ওয়াকে যাচ্ছি। এক ঘণ্টা মর্নিং-ওয়াক করব। আপনাকে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে।’

    ‘এক ঘণ্টা অপেক্ষা করা সম্ভব নয়, আপনাকে এক্ষুণি কথা বলতে হবে।’

    ‘এমন কোনো আইন কি আপনাদের আছে যে পুলিশ যখন কথা বলতে চাইবে তখনি কথা বলতে হবে?’

    ‘আইনের বিষয় নয়, হোম মিনিস্টার নিজে বলেছেন। তিনি বিষয়টায় খুব আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’

    ‘আমি এই মুহূর্তে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছি না। কাজেই আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। আমি আমার ঘরের চাবি দিয়ে দিচ্ছি, আপনি আমার ঘরে অপেক্ষা করতে পারেন। তবে আপনার যদি ধারণা হয় আমি পালিয়ে যেতে পারি, তাহলে আপনি আমার সঙ্গেও আসতে পারেন।’

    ‘ঠিক আছে, আমি অপেক্ষা করব। আপনি দেরি করবেন না। দিন, ঘরের চাবি দিন।’

    মিসির আলি চাবি দিয়ে গেট খুলে রওনা হলেন। রাস্তার মোড় পর্যন্ত গিয়ে একবার পিছনে ফিরলেন। ইন্সপেক্টর সাহেব আগের জায়গায় চাবি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। ভদ্রলোকের মুখ শ্রাবণ মাসের আকাশের চেয়েও মেঘলা।

    বৃষ্টি জোরেসোরে পড়া শুরু করেছে। রাস্তায় নোংরা পানি। পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ময়লা পানিতে ডুবিয়ে প্রাতঃভ্রমণে যাবার কোনো মানে হয় না—তবু মিসির আলি যাচ্ছেন। ঝড় হোক, টাইফুন হোক, ভূমিকম্প হোক—তাঁকে এক ঘণ্টা হাঁটতে হবে। সকালের খোলা হাওয়া গায়ে লাগাতে হবে। এক বৎসর তাঁকে বেঁচে থাকতে হবে। দেখা যাক, ডাক্তারের উপদেশ মেনে কতদূর কি হয়।

    আজ শরীর অন্যদিনের চেয়েও বেশি খারাপ লাগছে। চোখ জ্বালা করছে, কোনো কিছুর দিকেই বেশি সময় তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না। শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নষ্ট হতে শুরু করেছে। শুধু শরীর নয়—মনও নষ্ট হতে শুরু করেছে। ওসমান গনির মৃত্যুসংবাদ তাঁকে বিচলিত করে নি। করা উচিত ছিল। খ্রিস্টানরা মৃত্যুসংবাদে গির্জায় ঢং-ঢং করে ঘণ্টা বাজায়। নিয়মটা সুন্দর। সবাইকে জানিয়ে দেয়া—শোন, তোমরা শোন।! তোমাদের একজন চলে গিয়েছে—ঢং ঢং ঢং……

    ‘কেমন আছেন মিসির আলি সাহেব?’

    মিসির আলি তাকালেন—অপরিচিত একজন মানুষ। অপরিচিত মানুষদের প্রশ্নের জবাব খুব অল্প কথায় দিতে হয়, কিন্তু মিসির আলি একটি দীর্ঘ বাক্য বললেন, ‘আমি ভালো না। শরীর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—মনও নষ্ট হচ্ছে। অপেক্ষা করছি ঘণ্টার জন্যে, ঢং ঢং ঢং। ভাই যাই।’

    অপরিচিত ভদ্রলোক অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। তিনি এতটা অবাক হচ্ছেন কেন তাও মিসির আলি ধরতে পারলেন না।

  • দ্বিতীয় খণ্ড

    দ্বিতীয় খণ্ড

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book]

    দ্বিতীয় খণ্ড

    ‘মিসির আলি অমনিবাস’ দ্বিতীয় খণ্ড; প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ২০০৬; প্রচ্ছদ : প্রতীক ডট ডিজাইন। প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা ৪৬/২ হেমেন্দ্র দাস রোড, সূত্রাপুর, ঢাকা-১১০০-‘র পক্ষে এফ. রহমান কর্তৃক প্রকাশিত এবং নিউ পূবালি মুদ্রায়ণ, ৪৬/১ হেমেন্দ্র দাস রোড সূত্রাপুর, ঢাকা-১১০০ কর্তৃক মুদ্রিত। একমাত্র পরিবেশক : অবসর প্রকাশনা সংস্থা; বিক্রিয় কেন্দ্র : ৩৮/২ক বাংলাবাজার (দোতলা), ঢাকা-১১০০। ‘মিসির আলি অমনিবাস’ দ্বিতীয় খণ্ডে যে সকল উপন্যাস আছে—

      উৎসর্গ

      জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

      প্রিয় মানুষ ও প্রিয় অভিনেতা

      মিসির আলির কথা

      আমি একবার এক বিয়ের দাওয়াতে গেছি। বিয়ের দাওয়াত মানে খাসির রেজালা, রোস্ট-পোলাও নিয়ে হৈচৈ। এতবড় একটা অনুষ্ঠান কী করে শুধুমাত্র খাওয়া-নির্ভর হয় আমি জানি না। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। যাই হোক আমি বসে আছি এক কোনায়; নিমন্ত্রিত অতিথিরা আসছেন, দ্রুত টেবিলের দিকে ছুটে যাচ্ছেন। সে এক দৃশ্য। এক পর্যায়ে আমিও ছুটে গেলাম। ‘যস্মিন দেশে যদাচার’। খেতে বসে মেজাজ খুব খারাপ হল। পোলাও ঠাণ্ডা, রোস্ট ঠাণ্ডা, খাসির রেজালায় সরের মতো চর্বি জমে আছে। ঠাণ্ডা খাবার দেখে নিমন্ত্রিতরা কেউ বিচলিত হলেন না। প্লেটের পর প্লেট নেমে যেতে লাগল। এর মধ্যে শুরু হল আরেক ঝামেলা; নিমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে দু’জন মিসির আলিকে নিয়ে বিরাট তর্কযুদ্ধে নেমে গেলেন। (তাদের উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই আমাকে শুনানো তবে তারা কেউই আমাকে চিনেছেন এমন ভাব দেখালেন না)। একজন বলছেন মিসির আলিকে যতটা বুদ্ধিমান মনে হয় ততটা বুদ্ধিমান তিনি না। অন্য জন বলছেন তিনি যথেষ্টই বুদ্ধিমান তবে তিনি আবেগ-নির্ভর মানুষ বলেই বুদ্ধিটা স্পষ্ট হয় না। আমি অপেক্ষা করছি কখন তাঁরা আমাকে সালিশ মানবেন তার জন্যে। উত্তরে কী বলব ভেবে রাখা দরকার। মাথায় কিছু আসছে না। তখন একটা ঘটনা ঘটল, নতুন রেজালার বাটি নিয়ে উর্দি পরা বয় এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ আলোচনা শুনল এবং আমাকে বিস্মিত করে ঘোষণা করল, মিসির আলি সাহেবের বুদ্ধির কোনো তুলনা নাই।

      মুহূর্তের মধ্যে আমার মন ভালো হয়ে গেল। বিয়ে বাড়ির কোলাহল সংগীতের মতো মনে হল। ঠাণ্ডা খাবার যথেষ্ট আনন্দ নিয়ে খেলাম। মিসির আলি নামের মানুষটার প্রতি খানিকটা ঈর্ষাও বোধ করলাম।

      মিসির আলি অমনিবাসের দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হচ্ছে। অভিনন্দন মিসির আলিকে, অভিনন্দন প্রতীক প্রকাশনীকে।

      হুমায়ূন আহমেদ

      দখিন হাওয়া, ধানমণ্ডি

      ১৮-১২-২০০৫

    • আমি এবং আমরা

      আমি এবং আমরা

      হুমায়ূন আহমেদ

      [book]

      মিসির আলি দু শ গ্রাম পাইজং চাল কিনে এনেছেন। চাল রাখা হয়েছে একটা হরলিক্সের কৌটায়। গত চারদিন ধরে তিনি একটা এক্সপেরিমেন্ট করছেন। চায়ের চামচে তিন চামচ চাল তিনি জানালার পাশে ছড়িয়ে দেন। তারপর একটু আড়াল থেকে লক্ষ করেন—কী ঘটে। যা ঘটে তা বিচিত্র। অন্তত তাঁর কাছে বিচিত্র বলেই মনে হয়। দুটা চড়ুই পাখি চাল খেতে আসে। একটি খায়, অন্যটি জানালার রেলিঙে গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে থাকে। ব্যাপারটা রোজই ঘটছে। পক্ষী সমাজে পুরুষ স্ত্রী পাখির চেয়ে সুন্দর হয়, কাজেই ধরে নেওয়া যায় যে পাখিটি চাল খাচ্ছে সেটা পুরুষ পাখি। গম্ভীর ভঙ্গিতে যে বসে আছে, সে তার স্ত্রী কিংবা বান্ধবী। পক্ষী সমাজে বিবাহ প্রথা চালু আছে কিনা মিসির আলি জানেন না। একটি পুরুষ পাখি একজন সঙ্গিনী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে, না সঙ্গিনী বদল করে—এই ব্যাপারটা মিসির আলির জানতে ইচ্ছা করছে। জানেন না। পক্ষী বিষয়ক প্রচুর বই তিনি যোগাড় করেছেন। বইগুলোতে অনেক কিছুই আছে, কিন্তু এই জরুরি বিষয়টা নেই।

      পাবলিক লাইব্রেরিতে পুরোনো একটি বই পাওয়া গেল—ইরভিং ল্যাংস্টোনের ‘The Realm of Birds’. সেখানে পাখিদের বিচিত্র স্বভাবের অনেক কিছুই লেখা, কিন্তু কোথাও নেই একটি পাখি খাবে, অন্যটি দূরে দাঁড়িয়ে দেখবে। রহস্যটা কী? এই পাখিটির কি খিদে নেই? নাকি সে এক ধরনের উপবাসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে? পক্ষী বিশারদরা কী বলেন? বিশারদদের ব্যাপারে মিসির আলির এক ধরনের এ্যালার্জি আছে। বিশেষজ্ঞদের কিছু জিজ্ঞেস করলেই তাঁরা এমন ভঙ্গিতে তাকান যেন প্রশ্নকর্তার অজ্ঞতায় খুব বিরক্ত হচ্ছেন। প্রশ্ন পুরোপুরি না শুনেই জবাব দিতে শুরু করেন। সেই জবাব বেদবাক্যের মতো গ্রহণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের জবাবের ওপর প্রশ্ন করা যাবে না। বিনয় নামক সদ্গুণটি বিশেষজ্ঞদের নেই। দীর্ঘদিন পড়াশোনা করে তাঁরা যা শেখেন তার চেয়ে অনেক বেশি শেখেন—অহংকার প্রকাশের কায়দাকানুন। পাখির ব্যাপারটাই ধরা যাক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একজন অধ্যাপকের কাছে গিয়েছিলেন। সেই ভদ্রলোক সমস্যা পুরোপুরি না শুনেই বললেন, এটা কোনো ব্যাপার না। খিদে নেই তাই খাচ্ছে না, পশু ও প্রাণিজগতের নিয়ম হল খিদেয় খাদ্য গ্রহণ করা একমাত্র মানুষই খিদে না থাকলেও লোভে পড়ে খায়।

      মিসির আলি বললেন, প্রতিদিন একটা পাখির খিদে থাকবে না, অন্য একটার থাকবে—এটা কি যুক্তিযুক্ত?

      ‘একটা বিশেষ পাখিই যে খাচ্ছে না তাইবা আপনি ধরে নিচ্ছেন কেন? সব পাখি দেখতে এক রকম। একদিন একটা খাচ্ছে, অন্যদিন আরেকটা খাচ্ছে।’

      ‘আমি পাখি দুটাকে চিনি। খুব ভালো করে চিনি। অসংখ্য চড়ুই পাখির মধ্যেও আমি এদের আলাদা করতে পারব।’

      অধ্যাপক ভদ্রলোক অনেকক্ষণ গা দুলিয়ে হাসলেন। তারপর ছোট শিশুকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন—একটা মশা আপনার গায়ে কামড় দিল, তারপর সেটা উড়ে গিয়ে অন্য মশাদের সঙ্গে মিশল। আপনি কি সেই মশাটা আলাদা করতে পারবেন?

      ‘না।’

      ‘যদি না পারেন তা হলে চড়ুই পাখিও আলাদা করতে পারবেন না। পুরুষ চড়ুই এবং মেয়ে চড়ুই দেখতে এক রকম। ভাই, এখন আপনি যান। এগারোটার সময় আমার ক্লাস, আমি কিছুক্ষণ পড়াশোনা করব।’

      ভদ্রলোক মিসির আলিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ডিকশনারি সাইজের এক বই খুলে পড়তে শুরু করলেন। ভাবটা এরকম যে আজেবাজে লোকের সঙ্গে কথা বলে নষ্ট করার মতো সময় তাঁর নেই। দেখা যাচ্ছে, সবাই ব্যস্ত। সবারই সময়ের টানাটানি। একমাত্র তাঁরই অফুরন্ত সময়। সময় কাটানোই তার সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুই করার নেই। মিসির আলির ডাক্তার তাঁকে বলেছেন—একজন মানুষের শরীরে যত ধরনের সমস্যা থাকা সম্ভব তার সবই আপনার আছে। লিভারের প্রায় পুরোটাই নষ্ট করে ফেলেছেন। অগ্ন্যাশয় থেকে সিক্রেশন হচ্ছে না। রক্তে ডাবলিউ বিসি-র পরিমাণ খুব বেশি। আপনার হার্টেরও সমস্যা আছে, ড্রপ বিট হচ্ছে। আপনাকে যা করতে হবে তা হল—দিনের পর দিন বিছানায় শুয়ে থাকা। বুঝতে পারছেন?

      ‘পারছি।’

      ‘সিগারেট ছেড়েছেন?’

      ‘এখনো ছাড়ি নি তবে শিগগিরই ছাড়ব।’

      ‘উপদেশ দিতে হয় বলে দিচ্ছি। মনে হয় না আপনি আমার উপদেশের প্রতি কোনো রকম গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারপরেও বলি—মন থেকে সমস্ত সমস্যা ঝেঁটিয়ে দূর করুন। যা করবেন তা হল বিশ্রাম। গান শুনবেন, পার্কে বেড়াবেন, হালকা বইপত্র পড়তে পারেন। রাত জাগা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মনে থাকবে?’

      ‘জি থাকবে।’

      ‘আমি জানি আপনি এর কোনোটাই করবেন না।’

      মিসির আলি হেসে ফেললেন। হাসতে হাসতে বললেন, আমি আপনার উপদেশ মেনে চলব। দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার জন্যে যে উপদেশ মানব তা না। শরীরটা সত্যি সত্যি সারাতে চাচ্ছি। অসুস্থতা অসহ্য বোধ হচ্ছে।

      ডাক্তার সাহেব বললেন, আপনি মুখে বলছেন কিন্তু আসলে কিছুই করবেন না। কিছু কিছু মানুষ আছে অন্যের উপদেশ সহ্য করতে পারে না। আপনি সেই দলের।

      ডাক্তারের কথা ভুল প্রমাণিত করে মিসির আলি ডাক্তারের উপদেশ মতোই চলছেন। রাত নটার মধ্যেই ভাত খান, দশটা বাজতেই শুয়ে পড়েন। সমস্যা হল—ঘুম আসে না। মানুষ কম্পিউটার না। নির্দিষ্ট সময়ে তাকে ঘুম পাড়ানো সম্ভব না। মিসির আলি গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন। এক এক রাতে এক এক ধরনের বিষয় নিয়ে ভাবেন। ইচ্ছে করে যে ভাবেন তা না। ভাবনাগুলোর যেন প্রাণ আছে, তারা নিজেরাই আসে। মিসির আলিকে বিরক্ত করে তারা যেন এক ধরনের আনন্দ পায়। ইদানীং তিনি চড়ুই পাখি নিয়ে ভাবেন। পাখি মানুষ চিনতে পারে কি পারে না এই তাঁর রাতের চিন্তার বিষয়। কোনো মানুষ যদি রোজ রোজ পাখিকে খাবার দেয় তা হলে সেই পাখিগুলো কি ঐ মানুষটিকে চিনে রাখবে?

      রাতে ঘুমের ঠিক না থাকলেও তাঁর ঘুম ভাঙে খুব ভোরে। ঘুম ভেঙে পার্কে বেড়াতে যান। দুপুরে খাওয়ার পর দরজা-জানালা বন্ধ করে শুয়ে পড়েন। বিকেলে পার্কে গিয়ে বসেন। তার বসার নির্দিষ্ট বেঞ্চ আছে। পা তুলে বেঞ্চিতে বসে তিনি গাছপালার সৌন্দর্য দেখতে চেষ্টা করেন, যদিও গাছপালা তাকে কখনোই আকৃষ্ট করে না। ডাক্তার হালকা বই পড়তে বলেছে। তিনি ‘হাসি হাসি হাসি’ এই নামে একটা তিন শ পৃষ্ঠার বই কিনে এনেছেন। বইটিতে দু হাজার একটি ‘জোক’ আছে। তিনি প্রথম পৃষ্ঠা থেকে পড়ে পড়ে এখন তেত্রিশ পৃষ্ঠায় এসেছেন—এখনো তাঁর হাসি আসে নি। এই বইটির দাম পড়েছে এক শ টাকা। মনে হচ্ছে এক শ টাকাই পানিতে গেছে।

      আরেকটি বই ফুটপাত থেকে কিনেছেন দু টাকা দিয়ে। বইটির নাম বেহুলার বাসরঘরের ইতিহাস। এই বইটি বরং ভালো। অনেক চিন্তাভাবনা করার ব্যাপার আছে। যেমন লখিন্দরের বাবার নাম চাঁদ সদাগর। চাঁদ সদাগর সম্পর্কে বলা হচ্ছে—

      কালীদহে পড়ে চাঁদ পান করে জল

      ক্ষণকাল যায় ভেসে ক্ষণে হয় তল।

      সপ্তদিন নবম রাত্রি ভাসিল সাগরে

      ইচামাছ বাসা বাঁধে দাড়ির ভিতরে…।

      অর্থাৎ চাঁদ সদাগরের দাড়িতে ইচামাছ বাসা বেঁধেছে। সাগরের ইচামাছ হচ্ছে গলদা চিংড়ি। এরা কী করে দাড়ির ভেতর বাসা বাঁধবে? রূপক অর্থে বলা হচ্ছে? রূপকের চিত্রকল্প তো বাস্তব হওয়া উচিত। অবাস্তব চিত্রকল্প দিয়ে রূপক তৈরি করার মানে কী? তা ছাড়া ‘সপ্তদিন নবম রাত্রি ভাসিল সাগরে’ বাক্যটির মানেই বা কী? সপ্তদিন সাগরে ভাসলে সপ্তরাতও ভাসতে হবে। অবিশ্যি শুরুতে এক রাত ভেসেছে এবং শেষে এক রাত ভেসেছে এই ভাবে ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। তাতেও শেষ রক্ষা হয় না, কারণ চাঁদ সদাগরের নৌকাডুবি রাতে হয় নি। হয়েছে দিনে।

      মিসির আলি পার্কে তাঁর নির্দিষ্ট বেঞ্চিতে বসে আছেন। তাঁর পাশে দুটি বই। একটি হল বেহুলার বাসরঘরের ইতিহাস, অন্যটি— The Birds, Their habits. তিনি বই পড়ছেন না। বেশ আগ্রহ নিয়ে খেলা দেখছেন। বাচ্চারা ফুটবল খেলছে। ফুটবল খেলার মতো ফাঁকা জায়গা এই পার্কে নেই। চারদিকে গাছগাছালি। এর মধ্যেই বাচ্চারা খেলছে। কে কোন দলে খেলছে এটা বের করাই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছেলেরাও যার যেদিকে ইচ্ছা বলে কিক বসাচ্ছে। নির্ধারিত কোনো গোলপোস্ট আছে বলেও মনে হচ্ছে না। গোলকিপার যে দুটি গোলপোস্টের মাঝখানে দাঁড়াচ্ছে সেটাই গোলপোস্ট। বলের সঙ্গে সঙ্গে গোলপোস্টের স্থান বদল হচ্ছে।

      ‘স্লামালিকুম স্যার।’

      মিসির আলি না তাকিয়েই বললেন, ‘ওয়ালাইকুম সালাম।’

      ‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারি স্যার?’

      ‘এখন বলতে পারেন না। এখন আমি খেলা দেখছি।’

      ‘স্যার, আমি বসি না হয়।’

      ‘বসুন।’

      অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত খেলা চলল। কে জিতল কে হারল কিছু বোঝা গেল না। মনে হচ্ছে দু’ দলই জিতেছে। এও এক অসাধারণ ঘটনা। একসঙ্গে দুটি দলকে জিততে প্রায় কখনোই দেখা যায় না।

      ‘স্যার, আমি অনেকক্ষণ বসে আছি।’

      মিসির আলি তাকালেন। তাঁর ভুরু কুঞ্চিত হল। মানুষের সঙ্গ তাঁর কাছে কখনোই বিরক্তিকর ছিল না। অতি সাধারণ যে মানুষ তার চরিত্রেও অবাক হয়ে লক্ষ করার মতো কিছু ব্যাপার থাকে। কিন্তু ইদানীং মানুষ তাঁর কাছে অসহ্য বোধ হচ্ছে। বরং চড়ুই পাখির ব্যাপার তাকে অনেক বেশি আকৃষ্ট করছে। তাঁর পাশে বসে থাকা চশমা পরা মানুষটি মাঝে মাঝেই তাঁকে বিরক্ত করছে। তাকে এই পার্কেই দেখা যায়। সবদিন না, কয়েকদিন পরপর। এই লোক তাঁকে একটা গল্প বলতে চায়। তাও প্রেমের গল্প। পার্কে বসে প্রেমের গল্প শোনার মতো ধৈর্য এবং ইচ্ছা কোনোটাই তাঁর নেই। এ লোককে সে কথা অনেকবারই বলা হয়েছে। মিসির আলি ঠিক করলেন, আজ আরেক বার বলবেন। প্রথমে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করবেন—তারপর কঠিন এবং রূঢ়ভাবে বলবেন।

      মিসির আলি বললেন, ‘হ্যাঁ, এখন বলুন কেমন আছেন?’

      কঠিন কথা বলার আগে সহজভাবে শুরু করা। বুদ্ধিমান লোক হলে বুঝে ফেলা উচিত যে প্রস্তাবনা মূল বইয়ের মতো নয়।

      ‘জি স্যার, ভালো আছি।’

      ‘গল্প শোনাতে চাচ্ছেন তো? কিছু মনে করবেন না। গল্প শুনতে ইচ্ছে করছে না।’

      ‘আপনার চড়ুই পাখি দুটি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলাম।’

      ‘চড়ুই পাখি?’

      ‘জি স্যার, পরশুদিন আপনার কাছে এসেছিলাম। আপনি বলেছিলেন, আপনি আমার কোনো কথা শুনতে পারবেন না। চড়ুই পাখি নিয়ে ব্যস্ত। পাখি দুটি কি ভালো আছে?’

      ‘হ্যাঁ, ভালো আছে।’

      ‘এখনো কি পুরুষ পাখিটা খাচ্ছে এবং মেয়ে পাখি দূরে বসে দেখছে?’

      ‘হ্যাঁ।’

      ‘স্যার, আমি ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করেছি। আমার মনে হয় পাখি দুটাকে যদি আমরা খাঁচায় আটকে ফেলতে পারি তা হলে বোঝা যাবে ব্যাপারটা কী? খাঁচায় চাল দেওয়া থাকবে—ক্রমাগত চব্বিশ ঘণ্টা মনিটর করা হবে। যদি দেখা যায় খাঁচার ভেতর ও মেয়ে পাখিটা কিছুই খাচ্ছে না—তখন বুঝতে হবে…’

      মিসির আলি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘খাঁচায় এদের ঢোকাব কী করে?’

      ‘খাঁচায় ঢোকানো সমস্যা হবে না, স্যার। চাল খাইয়ে খাইয়ে আপনি এদের অভ্যস্ত করে রেখেছেন— খাঁচার দরজা খুলে আপনি যদি এর ভেতর চাল দিয়ে দেন—পাখি দুটা খাঁচায় ঢুকবে।’

      মিসির আলি আগ্রহ নিয়ে বললেন, ‘খাঁচা কোথায় পাওয়া যায়?’

      ‘নীলক্ষেতে ইউনিভার্সিটি মার্কেট নামে একটা নতুন মার্কেট হয়েছে। রঙিন মাছ, পাখি, পাখির খাঁচার অসংখ্য দোকান।’

      ‘খাঁচার কী রকম দাম?’

      ‘আপনি যদি বেয়াদবি না নেন—আমি আপনার জন্যে বড় একটা খাঁচা কিনেছি। আপনার বাসায় যে কাজের ছেলেটি আছে তাকে দিয়ে এসেছি।’

      ‘কেন করলেন?’

      ‘আপনার ভেতর কৌতূহল জাগানোর জন্যে করেছি। আমি বেশ কিছুদিন ধরে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি। আপনি কোনোরকম আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এমনকি আমার নাম পর্যন্ত জানতে চাচ্ছেন না। আমার ধারণা হয়েছে খাঁচাটা পেলে হয়তোবা আপনি কৌতূহলী হবেন। আমার নাম জানতে চাইবেন।’

      ‘আপনার নাম কী?’

      ‘আমার ডাকনাম তন্ময়। ভালো নাম মুশফেকুর রহমান।’

      ‘আপনি আমার কাছে কী চান?’

      ‘আমি আপনাকে একটা গল্প বলতে চাই।’

      ‘প্রেমের গল্প?’

      ‘প্রেমের গল্প বলা যেতে পারে।’

      মিসির আলি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমাকে দেখে কি আপনার মনে হয়— আমি প্রেমের গল্প শোনার ব্যাপারে খুব আগ্রহী?’

      ‘হ্যাঁ, মনে হয়। আমার মনে হয় গল্প শুরু করলে আপনি খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতে শুরু করবেন। আমার দরকার অসম্ভব মনোযোগী একজন শ্রোতা। যে গল্প শুনে যাবে। একটি প্রশ্নও করবে না। গল্প শুনে হাসবে না, ব্যথিত হবে না।’

      ‘এমন শ্রোতা তো প্রচুর আছে। এই পার্কেই আছে।’

      ‘আপনি কী বলতে চাচ্ছেন আমি বুঝতে পারছি। আপনি বলতে চাচ্ছেন—এই পার্কে প্রচুর গাছ আছে। গাছগুলো আমার গল্পের মনোযোগী শ্রোতা হতে পারে। আপনি কি তাই বোঝাতে চাচ্ছেন না?’

      ‘হ্যাঁ।’

      ‘গাছকে আমি আমার গল্প শুনিয়েছি। গাছরা আমার গল্প মন দিয়ে শুনেছে এবং গল্পের মাঝখানে প্রশ্ন করে আমাকে বিরক্ত করে নি। কিন্তু ওরা আমার গল্প বুঝতে পেরেছে কি না তা আমি জানতে পারছি না।’

      ‘আপনার গল্প বোঝা কি গাছদের জন্যে জরুরি?’

      ‘গাছের জন্যে জরুরি নয়। আমার জন্যে জরুরি। খুবই জরুরি।’

      ‘প্রেমের গল্পটি কি দীৰ্ঘ?’

      ‘গল্প বেশ দীর্ঘ। তবে গল্পের মূল লাইনটি যাকে বটম লাইন বলা হয় তা ছোট। স্যার, বটম লাইনটি বলব?’

      ‘বলুন।’

      ‘আমি আপনাদের মনোবিদ্যার ভাষায় একজন সাইকোপ্যাথ। আমি এ পর্যন্ত দুটি খুন করেছি। খুব ঠাণ্ডা মাথায় করেছি। খুব ভেবেচিন্তে করা। এই খুন দুটি করার জন্যে আমার মনে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। আমি তৃতীয় খুনটির প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছি। প্রস্তুতিপর্ব আপনাকে বলতে চাচ্ছি। প্রস্তুতিপর্বে প্রেমের ব্যাপার আছে। এই জন্যেই বলছি প্রেমের গল্প।’

      ‘দুটি খুন করেছেন। তৃতীয়টি করবেন। করে ফেলুন। আমাকে বলার দরকার কী? আমার অনুমতি নেওয়ার ব্যাপার তো নেই।’

      ‘স্যার, আপনি কি আমার গল্প বিশ্বাস করেছেন?’

      ‘হ্যাঁ করেছি।

      ‘আমি তো আপনাকে একটা ভয়াবহ কথা বললাম। আপনি সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করলেন?’

      ‘হ্যাঁ করলাম।’

      ‘কেন করেছেন?’

      ‘আমি মানুষকে কখনোই অবিশ্বাস করি না। তা ছাড়া একজন মানুষ অকারণে কেন আমাকে এসে বলবে আমি দুটা খুন করেছি, তৃতীয়টি করব? এখন বলুন কেমন লাগে মানুষ খুন করতে?’

      ‘ভালো লাগে স্যার।’

      লোকটি হেসে ফেলল। সুন্দর হাসি। কিন্তু মিসির আলি শিউরে উঠলেন। লোকটির জিহ্বা কুচকুচে কালো। সে যখন হেসে উঠল মিসির আলি ব্যাপারটা তখনই লক্ষ্য করলেন।

      লোকটি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আমি আপনার ভেতর কৌতূহল জাগ্রত করতে পেরেছি। কাজেই আমি জানি আপনি এখন আমার কথা শুনবেন। আর স্যার, আপনি আমার জিহ্বা দেখে যেভাবে চমকে উঠেছেন সেভাবে চমকে ওঠার কিছু নেই। খুব ছোটবেলায় আমার অসুখ হয়েছিল। কালাজ্বর। ব্রহ্মচারী ইনজেকশন নিতে হয়েছে। সেইসঙ্গে আয়ুর্বেদি এক ওষুধ খেয়ে জিহ্বা পুড়িয়ে ফেলেছিলাম। স্যার যাই। খুব শিগগিরই আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে। ও ভালো কথা, স্যার এই বইটিও আমি আপনার জন্যে এনেছি। অস্ট্রেলিয়ান পাখিদের ওপর একটা বই। পাখিদের সম্পর্কে কিছু তথ্য এই বইটিতে পেতে পারেন।

      ‘আপনার ভালো নাম কী যেন বললেন? মুশফেকুর রহমান?’

      ‘জি।’

      ‘আপনার সঙ্গে আমার কোথায় দেখা হবে? আপনার ঠিকানা কী?’

      ‘আমাকে আপনার খুঁজে বের করতে হবে না, স্যার। আমিই আপনাকে খুঁজে বের করব।’

    • তন্দ্রাবিলাস

      তন্দ্রাবিলাস

      হুমায়ূন আহমেদ

      [book]

      ভোরবেলায় মানুষের মেজাজ মোটামুটি ভালো থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খারাপ হতে থাকে, বিকালবেলায় মেজাজ সবচে বেশি খারাপ হয়, সন্ধ্যার পর আবার ভালো হতে থাকে। এটাই সাধারণ নিয়ম।

      এখন সকাল এগারটা, মেজাজের সাধারণ সূত্র মতে মিসির আলির মেজাজ ভালো থাকার কথা। কিন্তু মিসির আলির মন এই মুহূর্তে যথেষ্টই খারাপ। তিনি বসার ঘরে বেতের চেয়ারে পা তুলে বসে আছেন। তাঁর ভুরু কুঁচকে আছে। তাঁর মেজাজ খারাপের দুটি কারণের প্রথমটা হল—একটা মাছি। অনেকক্ষণ থেকেই মাছিটা তাঁর গায়ে বসার চেষ্টা করছে। সাধারণ মাছি না—নীল রঙের স্বাস্থ্যবান ডুমো মাছি। আম-কাঁঠালের সময় এই মাছিগুলিকে দেখা যায়। এখন শীতকাল—এই মাছি এল কোত্থেকে? মাছিটা তার গায়েই বারবার বসতে চাচ্ছে কেন? তাঁর সামনে বসে থাকা মেয়েটির গায়ে কেন বসছে না?

      মিসির আলির মেজাজ খারাপের দ্বিতীয় কারণ এই মেয়েটি। তাঁর ইচ্ছা করছে মেয়েটিকে একটা ধমক দেন। যদিও ধমক দেবার মতো কোনো কারণ ঘটে নি। মেয়েটি তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। দেখা করতে আসার অপরাধে কাউকে ধমক দেয়া যায় না। ধমক দেয়ার বদলে মিসির আলি শব্দ করে কাশলেন। প্রচণ্ড শব্দে কাশলে, কিংবা কুৎসিত শব্দে নাক ঝাড়লে মনের রাগ অনেকখানি কমে। মিসির আলির কমল না বরং আরো যেন বাড়ল। মাছিটাও মনে হচ্ছে এই শব্দে উৎসাহ পেয়েছে। এতক্ষণ গায়ে বসতে চাচ্ছিল এখন উড়ে ঠোঁটে বসতে চাচ্ছে। কী যন্ত্রণা!

      স্যার, আমার নাম সায়রা বানু। সায়রা বানু নামটা কি আপনার মনে থাকবে?

      মিসির আলি বললেন, মনে থাকার প্রয়োজন কি আছে?

      অবশ্যই আছে। আমি এত আগ্রহ করে আমার নামটা আপনাকে কেন বলছি, যাতে মনে থাকে সেই জন্যেই তো বলছি।

      মিসির আলি রোবটের গলায় বললেন, মানুষের নাম আমার মনে থাকে না।

      মেয়েটি তাঁর রোবট গলা অগ্রাহ্য করে হাসিমুখে বলল, আমারটা মনে থাকবে। কারণ একজন বিখ্যাত সিনেমা অভিনেত্রীর নাম সায়রা বানু।

      মিসির আলি ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। এখন তাঁর মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। অর্থহীন কথা শুনতে ভালো লাগছে না। তা ছাড়া শীতও লাগছে। চেয়ারটা টেনে রোদে নিয়ে গেলে হয়। তাতে কিছুক্ষণ আরাম লাগবে তারপর আবার রোদে গা চিড়বিড় করতে থাকবে। শীতকালের এই এক যন্ত্রণা। ছায়া বা রোদ কোনোটাই ভালো লাগে না। মিসির আলি মাছিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মাছিটার কারণে নিজেকে এখন কাঁঠাল মনে হচ্ছে।

      মেয়েটি খানিকটা মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, আপনি দিলীপ কুমার, সায়রা বানু এদের নাম শোনেন নি?

      দিলীপ কুমারের নাম শুনেছি।

      সায়রা বানু হচ্ছে দিলীপ কুমারের বউ। আমার বন্ধুরা অবিশ্যি আমাকে সায়রা বানু ডাকে না, তারা ডাকে এস বি। সায়রার এস, বানুর বি―এস বি। এস বি-তে আর কী হয় বলুন তো?

      বলতে পারছি না।

      এস বি হচ্ছে স্পেশাল ব্রাঞ্চ। আমার বন্ধুদের ধারণা আমার চেহারায় একটা স্পাই স্পাই ভাব আছে। এই জন্যেই তারা আমাকে এস বি ডাকে। আচ্ছা আপনারও কি ধারণা আমার চেহারায় স্পাই স্পাই ভাব? ভালো করে একটু আমার দিকে তাকান না। আপনি সারাক্ষণ এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন কেন?

      মিসির আলি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন না। মাছিটার দিকে তাকিয়ে আছেন। মাছিটা এদিক-ওদিক করছে বলেই এদিক-ওদিক তাকাতে হচ্ছে। আচ্ছা পৃথিবীতে মোট কত প্রজাতির মাছি আছে?

      এই যে শুনুন। তাকান আমার দিকে।

      মিসির আলি মেয়েটির দিকে তাকালেন। অতিরিক্ত ফর্সা একটি মেয়ে। বাঙালি মেয়েদের গায়ের রঙের একটা মাত্রা আছে। কোনো মেয়ে যদি সেই মাত্রা অতিক্রম করে যায় তখন আর ভালো লাগে না। তার মধ্যে বিদেশী বিদেশী ভাব চলে আসে। তাকে তখন আর আপন মনে হয় না। সায়রা বানুর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাকে পর পর লাগছে। মেয়েটির মাথা ভরতি চুল। সেই চুলেও লালচে ভাব আছে। অতিরিক্ত ফর্সা মেয়েদের ক্ষেত্রে তাই হয়। তাদের গায়ের রঙের খানিকটা এসে চুলে লেগে যায়। চুল লালচে দেখায়—খানিকটা এসে লাগে চোখে। চোখ তখন আর কালো মনে হয় না। মেয়েটির মুখ লম্বাটে। একটু বোঁচা ধরনের নাক। বোঁচা নাক থাকায় রক্ষা—বোঁচা নাকের কারণেই মেয়েটিকে বাঙালি মনে হচ্ছে। খাড়া নাক হলে মেডিটেরিনিয়ান সমুদ্রের পাশের গ্রিককন্যা বলে মনে হত। বয়স কত হবে? উনিশ থেকে পঁচিশের ভেতর। মানুষের বয়স চট করে ধরতে পারার কোনো পদ্ধতি থাকলে ভালো হত। গাছের রিং গুনে বয়স বলা যায়। মানুষের তেমন কিছু নেই। মানুষের বয়স তার মনে বলেই বোধ হয়। আচ্ছা, একটা মাছি কতদিন বাঁচে?

      স্যার কথা বলছেন না কেন? আমাকে কি স্পাই মেয়ে বলে মনে হচ্ছে?

      স্পাই মেয়েদের চেহারা আলাদা হয় বলে আমি জানি না।

      একটু আলাদা হয়। স্পাই মেয়েদের মুখ দেখে এদের মনের ভাব বোঝা যায় না।

      এদের মুখে এক রকম ভাব মনের ভেতর আরেক রকম।

      তোমারও কি তাই?

      জি। ও আপনাকে বলতে ভুলে গেছি এস বি ছাড়াও আমার আরেকটা নাম আছে। নাম ঠিক না খেতাব। নববর্ষে পাওয়া খেতাব। আমাদের কলেজে পহেলা বৈশাখে খেতাব দেয়া হয়। আমার খেতাবটা হচ্ছে সাদা বাঘিনী। এস বি-তে সাদা বাঘিনীও হয়। সাদা বাঘিনী টাইটেল কেন পেয়েছিলাম শুনতে চান? খুবই মজার গল্প।

      মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন। তাঁর কিছুই শুনতে ইচ্ছা করছে না। মাথার যন্ত্রণা এবং শীত ভাব দুইই বাড়ছে। গায়ে পাতলা একটা চাদর দিয়ে শীত ভাবটা কমানো যেত। চাদরটা ধুপিখানায় দিয়েছেন। ধোয়া নিশ্চয়ই হয়ে গেছে, স্লিপের অভাবে আনতে পারছেন না। স্লিপটা কোথাও খুঁজে পাচ্ছেন না। কড়া এক কাপ চা খেলেও শীতটা কমত। ঘরে চায়ের পাতা আছে, চিনি, দুধও আছে। গতকালই কিনে এনেছেন। কিন্তু গ্যাসের চুলায় কী একটা সমস্যা হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগুন জ্বলেই হুস করে নিভে যায়। মিস্ত্রি ডাকিয়ে চুলা ঠিক করা দরকার। গ্যাস মিস্ত্রিরা কোথায় থাকে কে জানে?

      সায়রা বানু মেয়েটি হড়বড় করে কথা বলে যাচ্ছে, তার কথা তিনি মন দিয়ে শুনছেন না। মাথায় দুশ্চিন্তা নিয়ে অন্য কিছুতে মন বসানো বেশ কঠিন। তবে মাছিটা এখন শান্ত হয়েছে। টেবিলের উপর চুপ করে বসে আছে। ডিম পাড়ছে না তো?

      ‘আমার সাদা বাঘিনী টাইটেল পাওয়ার ঘটনাটা খুব ইন্টারেস্টিং। শুনলে আপনি খুব মজা পাবেন। বলব?’

      মিসির আলি কিছুই বললেন না। তিনি খুব ভালো করেই জানেন মেয়েটি তার গল্প বলবেই। তিনি বলতে বললেও বলবে, বলতে না বললেও বলবে।

      ‘হয়েছে কী শুনুন—সায়েন্স ল্যাবরেটরির সামনে দিয়ে আমি যাচ্ছি। আমার সঙ্গে আমার এক বন্ধু, রাকা। রাকা হচ্ছে বোরকাওয়ালী। বোরকা পরে। সউদি বোরকা। বেশ কয়েক টাইপ বোরকা পাওয়া যায় তা কি আপনি জানেন? সউদি বোরকা, পাকিস্তানি বোরকা। সউদি বোরকা ভয়াবহ, শুধু চোখ দুটো বের হয়ে থাকে। এমনিতে সে অবিশ্যি খুব স্টাইলিস্ট। বোরকার নিচে স্লিভলেস ব্লাউজ পরে। যাই হোক বোরকাওয়ালী রাকা হঠাৎ বলল, সে একটা পেনসিল কিনবে। আমি তাকে নিয়ে একটা দোকানে ঢুকলাম পেনসিল কিনতে। স্টেশনারির দোকান তবে তার সঙ্গে কনফেকশনারিও আছে। চা বিক্রি হচ্ছে। কেক বিক্রি হচ্ছে। দোকানটায় বেশ ভিড়। ভিড়ের সুযোগ নিয়ে এক লোক করল কী বোরকাওয়ালীর গায়ে হাত দিল। গায়ে মানে কোথায় তা আপনাকে বলতে পারব না। আমার লজ্জা লাগবে। বোরকাওয়ালী এমন ভয় পেল যে প্রায় অচেতন হয়ে পড়ে যাচ্ছিল। আমি বোরকাওয়ালীকে ধরে ফেললাম। তারপর বদমাশ লোকটার দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনি ওর গায়ে হাত দিলেন কেন? ষণ্ডাগণ্ডা টাইপের লোক। লাল চোখ। গরিলাদের মতো লোম ভরতি হাত। সে এমন ভাব করল যে আমার কথাই শুনতে পায় নি। দোকানদারের দিকে তাকিয়ে হাই তুলতে তুলতে বলল—দেখি একটা লেবু চা। তখন আমি খপ করে তার হাত ধরে ফেললাম। সে ঝটকা দিয়ে তার হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করল কিন্তু তার আগেই আমি তার হাত কামড়ে ধরলাম। যাকে বলে কচ্ছপের কামড়। কচ্ছপের কামড় কী তা নিশ্চয়ই আপনি জানেন। কচ্ছপ একবার কামড়ে ধরলে আর ছাড়ে না, আমিও ছাড়লাম না। আমার মুখ রক্তে ভরে গেল। লোকটা বিকট চিৎকার শুরু করল। ব্যাপারস্যাপার দেখে বোরকাওয়ালী অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এর পর থেকে আমার টাইটেল হয়েছে সাদা বাঘিনী।’

      গল্প শেষ করে সায়রা বানু খিলখিল করে হাসছে। মিসির আলি মেয়েটির হাসির মাঝখানেই বললেন, তুমি আমার কাছে কেন এসেছ?

      ‘গল্প করার জন্যে এসেছি। বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে গল্প করতে আমার খুব ভালো লাগে।’

      ‘আমি বিখ্যাত মানুষ?’

      ‘অবশ্যই বিখ্যাত। আপনাকে নিয়ে কত বই লেখা হয়েছে। আমি অবিশ্যি একটা মাত্র বই পড়েছি। ওই যে সুধাকান্ত বাবুর গল্প। একটা মেয়ে খুন হল আর আপনি কেমন শার্লক হোমসের মতো বের করে ফেললেন—সুধাকান্ত বাবুই খুনটা করেছেন। বই পড়ে মনে হচ্ছিল আপনার খুব বুদ্ধি কিন্তু আপনাকে দেখে সেরকম মনে হচ্ছে না।’

      ‘আমাকে দেখে কেমন মনে হচ্ছে?’

      ‘খুব সাধারণ মনে হচ্ছে। আপনার মধ্যে একটা গৃহশিক্ষক গৃহশিক্ষক ব্যাপার আছে। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি নিয়মিত বেতন পান না এমন একজন অংকের স্যার। আপনি রোজ ভাবেন আজ বেতনের কথাটা বলবেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহস করে বলতে পারেন না। আচ্ছা আপনি এমন গম্ভীর মুখে বসে আছেন কেন? মনে হচ্ছে আপনি আমার কথা শুনে মজা তো পাচ্ছেনই না উল্টো বিরক্ত হচ্ছেন। সত্যি করে বলুন আপনি কি বিরক্ত হচ্ছেন?’

      ‘কিছুটা হচ্ছি।’

      ‘মাছিটা তো এখন আর বিরক্ত করছে না। কেমন শান্ত হয়ে টেবিলে বসে আছে। তারপরেও আপনি এত বিরক্ত কেন বলুন তো?’

      ‘তুমি অকারণে কথা বলছ এই জন্যে বিরক্ত হচ্ছি। অকারণ কথা আমি নিজেও বলতে পারি না অন্যের অকারণ কথা শুনতেও ভালো লাগে না।’

      ‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে হলে সব সময় একটা কারণ লাগবে? তা হলে তো আপনি খুবই বোরিং একটা মানুষ। এত কারণ আমি পাব কোথায় যে আমি রোজ রোজ আপনার সঙ্গে কথা বলব?’

      মিসির আলি বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘তুমি রোজ রোজ আমার সঙ্গে কথা বলবে?’

      ‘হুঁ।’

      ‘সে কী, কেন?’

      সায়রা বানু খুব সহজ ভঙ্গিতে হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘এক বাড়িতে থাকতে হলে কথা বলতে হবে না?’

      ‘এক বাড়িতে থাকবে মানে? আমি বুঝতে পারছি না।’

      ‘আমি আপনার সঙ্গে কয়েকটা দিন থাকব। কদিন এখনো বলতে পারছি না। দু দিনও হতে পারে আবার দু মাসও হতে পারে। আবার দু বছরও হতে পারে। সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আপনার উপর।’

      মিসির আলি চেয়ার থেকে পা নামিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকালেন। হচ্ছেটা কী? এই যুগের টিনএজার মেয়েদের ভাবভঙ্গি, কাণ্ডকারখানা বোঝা মুশকিল। তারা যে কোনো উদ্ভট কিছু হাসিমুখে করে ফেলতে পারে। মেয়েটি হয়তো অতি তুচ্ছ কারণে রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে। কিংবা তাকে ভড়কে দেবার জন্যে গল্প ফেঁদেছে। পরে কলেজে বন্ধুদের কাছে এই গল্প করবে। বন্ধুরা মজা পেয়ে একে অন্যের গায়ে হেসে গড়িয়ে পড়বে। —ও মাগো বুড়োটাকে কী বোকা বানিয়েছি! সে বিশ্বাস করে ফেলেছিল যে আমি থাকতে এসেছি।

      মিসির আলি নিজের বিস্ময় গোপন করে সহজভাবে বললেন, ‘তুমি এ বাড়িতে থাকবে?’

      ‘জি।’

      ‘বিছানা বালিশ নিয়ে এসেছ?’

      ‘বিছানা বালিশ আনি নি। আজকাল তো আর বিছানা বালিশ নিয়ে কেউ অন্যের বাড়িতে থাকতে যায় না। শুধু একটা স্যুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগ এনেছি। আর একটা পানির বোতল।’

      ‘স্যুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগ কোথায়?’

      ‘বারান্দায় রেখে এসেছি। শুরুতেই আপনি আমার স্যুটকেস দেখে ফেললে ঢুকতে দিতেন না। যাই হোক আমি এখন আমার স্যুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে আসছি। আচ্ছা আপনি এমন ভাব করছেন যেন আকাশ থেকে পড়েছেন। আকাশ থেকে পড়ার মতো কিছু হয় নি। বিপদগ্রস্ত একজন তরুণীকে কয়েকদিনের জন্যে আশ্রয় দেয়া এমন কোনো বড় অন্যায় না। আমি নিশ্চিত এরচে অনেক বড় বড় অন্যায় আপনি করেছেন।’

      ‘তুমি সত্যি সত্যি আমার এখানে থাকার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছ?’

      ‘জি।’

      মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন। এই মুহূর্তে তাঁর ঠিক কী করা উচিত তা মাথায় আসছে না। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে মেয়েটির কাণ্ডকারখানা দেখাই মনে হয় সবচে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মেয়েটি বুদ্ধিমতী। এই পরিস্থিতিতে তিনি কী করবেন বা করতে পারেন সেই সম্পর্কে চিন্তাভাবনা সে নিশ্চয়ই করেছে। নিজেকে সম্ভাব্য সব রকম পরিস্থিতির জন্যে সে প্রস্তুত করে রেখেছে। মিসির আলির এমন কিছু করতে হবে যার সম্পর্কে মেয়েটির প্রস্তুতি নেই। সে কেন বাড়ি ছেড়ে এসেছে এই মুহূর্তে তা তাকে জিজ্ঞেস করা যাবে না। কারণ এই প্রশ্নটি স্বাভাবিক এবং সঙ্গত প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর মেয়েটি তৈরি করে রেখেছে। তাঁর বিস্মিত হওয়াও ঠিক হবে না। তাঁকে খুব সহজ এবং স্বাভাবিক থাকতে হবে। যেন এমন ঘটনা প্রতি সপ্তাহেই দুটা-একটা করে ঘটছে।

      সায়রা বানু স্যুটকেস, হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে ঘরে ঢুকল। মিসির আলি বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন সে গুনগুন করে কী একটা গানের সুরও যেন ভাজছে। কত সহজ স্বাভাবিক তার আচরণ।

      ‘কেক খাবেন?’

      ‘কেক?’

      ‘হুঁ। আমার নিজের বেক করা, ডিমের পরিমাণ বেশি হয়েছে বলে একটু ডিম ডিম গন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে ডিমের গন্ধ একেবারে সহ্য করতে পারে না। আমার কাছে অবিশ্যি খারাপ লাগে না। দেব আপনাকে এক পিস কেক?’

      ‘না।’

      ‘আপনাকে একটু বাজারে যেতে হবে, কয়েকটা জিনিস কিনতে হবে। আমি অতি দ্রুত চলে এসেছি তো কাজেই অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস আনা হয় নি। টুথপেস্ট এনেছি, টুথব্রাশ আনি নি। আমার অভ্যাস হচ্ছে রাতে শোবার সময় কুটকুট করে কয়েকটা লবঙ্গ খাওয়া। লবঙ্গ খেলে শরীরের রক্ত পরিষ্কার থাকে, কখনো হার্টের অসুখ হয় না। সেই লবঙ্গ আনা হয় নি। আপনাকে লবঙ্গ আনতে হবে। পারবেন? আমি আপনাকে টাকা দিয়ে দেব। আমি সঙ্গে করে অনেক টাকা নিয়ে এসেছি। বলুন তো কত এনেছি?’

      ‘বলতে পারছি না।’

      ‘অনুমান করুন। আপনি হচ্ছেন বিখ্যাত মিসির আলি। আপনার অনুমান হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনুমান। বলুন আমার সঙ্গে কত টাকা আছে।’

      ‘পাঁচ হাজার টাকা।’

      ‘হয় নি। আমার সঙ্গে আছে মোট একান্ন হাজার টাকা। পাঁচ শ টাকার একটা বান্ডিল এনেছি আর এনেছি দশ টাকার একটা বান্ডিল। সেখান থেকে কিছু খরচ করেছি। বেবিট্যাক্সি ভাড়া দিয়েছি তিরিশ টাকা। ঠিক এই মুহূর্তে আমার কাছে আছে পঞ্চাশ হাজার নয় শ সত্তর টাকা। আপনাকে টুকটাক বাজারের জন্যে পাঁচ শ টাকা দিচ্ছি, যা লাগে খরচ করবেন বাকিটা ফেরত দেবেন। এই নিন।’

      সায়রা বানু তার কাঁধে ঝুলানো কালো ব্যাগ খুলে টাকা বের করল। মিসির আলি টাকাটা নিলেন। মেয়েটি এক ধরনের খেলা শুরু করেছে। মিসির আলির মনে হল মেয়েটিকে সেই খেলা তার মতোই খেলতে দেয়া উচিত। এই মুহূর্তে এমন কিছু করা ঠিক হবে না যাতে খেলা বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি মেয়েটিকে আগ্রহ নিয়ে দেখতে শুরু করেছেন—তার তাকানোর ভঙ্গি, হাঁটার ভঙ্গি, বসার ভঙ্গি। আপাতদৃষ্টিতে এইসব খুবই ছোটখাটো ব্যাপার থেকে অনেক কিছু জানা যায়।

      সায়রা বানু চেয়ারে বসতে বসতে বলল, আমার খাওয়া নিয়ে আপনি মোটেই চিন্তা করবেন না। যা খাওয়াবেন আমি তাই খাব। শুধু মাছ ছাড়া। মাছ আমি খেতে পারি না—গন্ধ লাগে। অবিশ্যি চিংড়ি মাছ খাই। চিংড়ি মাছ কেন খাই বলুন তো?

      ‘বলতে পারছি না।’

      ‘চিংড়ি মাছ খাই কারণ চিংড়ি মাছ হচ্ছে আসলে এক ধরনের পোকা। পোকা বলেই চিংড়ি মাছে আঁশটে গন্ধ নেই। ও আচ্ছা বলতে ভুলে গেছি। আরেকটা জিনিস খুব পছন্দ করে খাই। ইলিশ মাছের ডিম।’

      ‘মাছের ডিমেরও তো আঁশটে গন্ধ থাকে।’

      ‘ইলিশ মাছের ডিমে থাকে না। আপনি কেভিয়ার খেয়েছেন?’

      ‘না।’

      ‘কেভিয়ার হচ্ছে পৃথিবীর সবচে দামি খাবার। কালো রঙের মাছের ডিম। স্বাদ কী রকম জানেন?’

      ‘যেহেতু খাই নি স্বাদ কেমন তা তো জানার কথা না।’

      ‘স্বাদ কেমন আপনি জানেন। অনেকটা আমাদের শিং মাছের ডিমের মতো। তবে আঁশটে গন্ধ অনেক বেশি। নাক চেপে ধরে আমি একবার খানিকটা খেয়েছিলাম তারপর বমিটমি করে একাকার।’

      মিসির আলি পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেট বের করলেন। সঙ্গে দেয়াশলাই নেই। দেয়াশলাইয়ের খোঁজে রান্নাঘরে যেতে হবে। চেয়ার ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না। মেয়েটাকে কি বলবেন দেয়াশলাই এনে দিতে? মিসির আলিকে কিছু বলতে হল না। তার আগেই সায়রা বানু বলল, ‘আপনার লাইটার লাগবে?’

      ‘আছে তোমার কাছে?’

      ‘আছে। আপনি সিগারেট মুখে দিন আমি ধরিয়ে দিচ্ছি।’

      মেয়েটা যে ভঙ্গিতে লাইটার ধরাল তাতে মনে হল সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে তার অভ্যাস আছে। সে নিজে সিগারেট খায় না তো? না খায় না, সিগারেটের ধোঁয়ায় সে নাক কুঁচকাচ্ছে।

      ‘এই লাইটারটা আপনি রেখে দিন। লাইটারটা আমি আপনার জন্যে এনেছি।’

      ‘থ্যাংক য়্যু।’

      ‘আর এক প্যাকেট সিগারেটও এনেছি। আপনার একটা বইয়ে পড়েছিলাম একজন কে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসত। যেদিনই আসত আপনার জন্যে এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আসত।’

      মিসির আলি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন, ‘একটু আগে বলেছিলে তুমি আমার একটা বইই পড়েছ।’

      ‘মিথ্যা কথা বলেছিলাম। অনেকগুলি বই পড়েছি। সুধাকান্ত বাবুর উপর লেখা বইটা সবচে ভালো লেগেছে। ওইটা আমি পড়েছি তিনবার। না তিনবার না। আড়াইবার পড়েছি। দুবার পড়েছি পুরোটা। শেষ বার পড়েছি শুধু শেষের কুড়ি পাতা।’

      ‘ভালো।’

      ‘মিথ্যা কথা বললে কি আপনি রেগে যান?’

      ‘না।’

      ‘আমাকে কেউ মিথ্যা কথা বললে আমি অবিশ্যি খুব রেগে যাই। আর আমার এমনই কপাল যে সবাই শুধু আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলে। তবে আপনি বলবেন না সেটা আমি জানি। আপনার চেহারা দেখেই বোঝা যায় আপনি মিথ্যা কথা বলতে পারেন না। আপনি কি জানেন যারা সব সময় মিথ্যা কথা বলে তাদের চেহারায় একটা মাইডিয়ার ভাব থাকে।’

      ‘তাই নাকি?’

      ‘জি।’

      ‘যেসব মেয়েকে দেখবেন খুব মায়া মায়া চেহারা, আপনি ধরেই নিতে পারেন তারা প্রচুর মিথ্যা কথা বলে।’

      ‘এই তথ্য জানতাম না।’

      ‘আপনি মিসির আলি আর আপনি এই সাধারণ তথ্য জানেন না? অথচ বইয়ে কত আশ্চর্য আশ্চর্য কথা যে আপনার সম্পর্কে লেখা হয়। যেমন কাউকে এক পলক দেখেই আপনি তার সম্পর্কে হড়বড় অনেক কথা বলে দিতে পারেন। আসলেই কি পারেন?’

      ‘না। পারি না।’

      ‘আচ্ছা চেষ্টা করে দেখুন না। আমার সম্পর্কে বলুন।’

      ‘কী বলব?’

      ‘আমাকে দেখে কী মনে হচ্ছে। এইসব। দেখি আপনার পাওয়ার অব অবজারভেশন।’

      ‘দেখ সায়রা বানু, আমি পরীক্ষা দেই না।’

      ‘পরীক্ষা ভাবছেন কেন? ভাবেন একটা খেলা। বলুন আমার সম্পর্কে বলুন।’

      মিসির আলি হাতের সিগারেট ফেলে দিলেন। আরেকটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছা করছে। তিনি নিজের ওপর একটু বিরক্ত হচ্ছেন কারণ তাঁর টেনশান হচ্ছে। টেনশান হলেই একটা সিগারেট শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছা করে। তাঁর শরীর ভালো না। এখন কিছুদিন টেনশান ফ্রি জীবন যাপন করতে চান। অজানা-অচেনা একটা মেয়ে হুট করে উপস্থিত হয়ে তাতে বাধা দিচ্ছে।

      মেয়েটি আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘কী হল কিছু বলছেন না কেন?’

      মিসির আলি খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘তোমার সম্পর্কে আমার প্রথম অবজারভেশন হচ্ছে তোমার নাম সায়রা বানু নয়।’

      ‘এরকম মনে হবার কারণ কী?’

      ‘মনে হবার কারণ হচ্ছে—সায়রা বানু যদি তোমার নাম হত তা হলে সায়রা বানু ডাকলে তুমি সহজ ভাবে রেসপন্স করতে। একটু আগে আমি বললাম, দেখ সায়রা বানু পরীক্ষা আমি দেই না। বাক্যটা আমি একবারে বলি নি। দেখ সায়রা বানু, বলে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করেছি। যখন দেখলাম তুমি হঠাৎ চমকে উঠলে তখনই আমি বাক্যটা শেষ করলাম। তোমার চমকে ওঠার কারণ হচ্ছে সায়রা বানু বলে যে তোমাকে সম্বোধন করা হচ্ছে তা তুমি শুরুতে বুঝতে পার নি। যখন বুঝতে পেরেছ তখনই চমকে উঠেছ। তোমার নাম কী?’

      ‘আমার নাম চিত্রা।’

      ‘তোমার সম্পর্কে আমার দ্বিতীয় অবজারভেশন হচ্ছে তোমাকে দীর্ঘদিন একটা ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেই ঘরের জানালা পর্যন্ত বন্ধ ছিল। আলোহীন একটা ঘরে দীর্ঘদিন থাকলে গায়ের চামড়া ফ্যাকাসে হয়ে যায়। তোমার তাই হয়েছে। তুমি আলোর দিকে ঠিকমতো তাকাতেও পারছ না। যতবার তাকাচ্ছ ততবার চোখের মণি ছোট হয়ে আসছে। ভুরু কুঁচকে যাচ্ছে। আবার জানালা থেকে তুমি চোখ ফিরিয়েও নিতে পারছ না। বারবার বিস্মিত চোখে জানালা দিয়ে তাকাচ্ছ। কারণ অনেকদিন পরে তুমি জানালায় খোলা আকাশ দেখছ।’

      ‘আরো কিছু বলবেন?’

      ‘দীর্ঘদিন ধরে তুমি ক্রমাগত মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছ। যে কোনো কারণেই হোক তোমাকে মিথ্যা কথা বলতে হচ্ছে। স্টোরি তৈরি করতে হচ্ছে। মিথ্যা বলাটা তোমার অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি কি ঠিক বলেছি?’

      ‘হ্যাঁ।’

      ‘তোমার হাত বাঁধা ছিল। মণিবন্ধে কালো দাগ পড়ে গেছে।’

      ‘হুঁ।’

      ‘তোমার ঘ্রাণশক্তি অতি প্রবল। তুমি কিছুক্ষণ পরপরই নাক কুঁচকাচ্ছ। এবং তাকাচ্ছ ঘরের দক্ষিণ দিকে। দক্ষিণ দিক থেকে নর্দমার দুর্গন্ধ আসছে। সেটা এত প্রবল না যে এমনভাবে নাক কুঁচকাতে হবে। এর থেকে মনে হয়–হয় তোমার ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত প্রবল আর নয়তো তোমাকে অনেক উঁচু কোনো ঘরে আটকে রাখা হয়েছে, ছ তলা-সাত তলায় যেখানে রাস্তার নর্দমার গন্ধ পৌঁছে না।’

      চিত্রা চুপ করে রইল। সে খুব একটা বিস্মিত হল বলে মনে হল না। মিসির আলি বললেন, ‘এখন বল, তোমার ব্যাপারটা কী?’

      ‘আপনি তো কিছু না জেনেই অনেক কিছু বলতে পারেন। আপনি নিজেই বলুন।’

      ‘না আমি বলতে পারছি না।’

      ‘অনুমান করুন। দেখি আপনার অনুমানশক্তি আমার ঘ্রাণশক্তির মতো কি না।’

      ‘আমার ধারণা তুমি অসুস্থ। অসুস্থতাটা এমন যে রোগীকে ঘরে আটকে রাখতে হয়। তুমি কোনোক্রমে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে এসেছ।’

      ‘আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে আমি পাগল তাই আমাকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল? না আমি পাগল না। সুস্থ। ছিটেফোঁটা পাগলামি যা অন্যদের মধ্যে থাকে আমার তাও নেই। তবে আমাকে ঘরে আটকে রাখা হচ্ছিল তা ঠিক। ছাব্বিশ দিন হল ঘরে তালাবন্ধ। আমাকে সবাই মিলে ঘরে তালাবন্ধ করে রেখেছে। কারণটাও খুব সাধারণ এবং আপনার মতো বুড়োর কাছে হয়তো বা হাস্যকর। কারণটা বলব?’

      মিসির আলি হ্যাঁ-না কিছুই বললেন না। মেয়েটির স্বভাব যা তাতে তিনি যদি বলেন হ্যাঁ বল—তা হলে সে নিশ্চিতভাবেই বলবে—না বলব না। তারচে চুপ করে থাকাই ভালো।

      ‘ব্যাপারটা প্রেমঘটিত। আমি একটা ছেলেকে বিয়ে করতে চাই। দরিদ্র ফালতু টাইপ ছেলে। কিছুই করে না। তার প্রেমে পড়ার কারণ নেই। তারপরেও আমি পড়ে গেছি এবং এবং…’

      ‘এবং কী?’

      ‘গোপনে বিয়ে করার জন্যে তার সঙ্গে পালিয়েও গিয়েছিলাম। আমাকে ধরে আনা হয়। আমি তো খুব জেদি মেয়ে, কাজেই আমি সবাইকে বলি—আমি আবারো পালিয়ে যাব। তোমাদের কোনো সাধ্য নেই আমাকে ধরে রাখার।’

      ‘ছেলেটার নাম কী?’

      ‘ছেলেটার নাম দিয়ে আপনার দরকার কী?’

      ‘কোনো দরকার নেই। কৌতূহল বলতে পার।’

      ‘উনার নাম ফরহাদ।’

      ‘শুধুই ফরহাদ?’

      ‘ফরহাদ খান।’

      ‘তারপর?’

      ‘তারপর আবার কী?’

      ‘তোমার কাছ থেকে এই কথা শোনার পর তারা তোমাকে তালাবন্ধ করে রাখল?’

      ‘তাই তো রাখবে। যে মেয়ে এ জাতীয় কথা বলে তাকে নিশ্চয়ই কেউ কোলে করে ঘুরে বেড়াবে না। ঘুমপাড়ানি গান গাইয়ে ঘুম পাড়াবে না।’

      ‘আজ তুমি ছাড়া পেয়েছ, আমার কাছে না এসে ওই ছেলেটির কাছে চলে যাচ্ছ না কেন?’

      ‘যাব তো বটেই। আপনার কি ধারণা আমি চিরকালের জন্যে আপনার সঙ্গে থাকব?’

      ‘মিসির আলি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, চিত্রা তুমি আবারো মিথ্যা কথা বলছ।’

      ‘বুঝলেন কী করে?’

      ‘ছেলেটার নাম কী বল জিজ্ঞেস করার পর—থতমত খেয়ে গেলে। চট করে বলতে পারলে না। একটা কোনো নাম ভাবার জন্যে সময় নিলে। তারপর বললে উনার নাম ফরহাদ। উনি বললে—যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছ তার প্রসঙ্গে উনি বলবে কেন? বলবে ওর নাম ফরহাদ।’

      ‘তা হলে কি সত্যি কথা শুনতে চান?’

      ‘আমি এখন সত্যি-মিথ্যা কোনো কথাই শুনতে চাই না। তুমি আমার সাহায্য চাচ্ছ। যদি সত্যি চাও আমি তোমাকে সাহায্য করি, তা হলে তোমাকে সত্যি কথা বলতে হবে। তা তুমি পারবে না। মিথ্যা বলাটা তোমার রক্তের মধ্যে ঢুকে গেছে। কিছুক্ষণ সত্যি বলার পর আবার মিথ্যা শুরু করবে।’

      ‘তাতে অসুবিধা কী? যেই মুহূর্তে আমি মিথ্যা বলব আপনি ধরে ফেলবেন। আপনার তো সেই ক্ষমতা আছে।’

      মিসির আলি আরেকটি সিগারেট ধরিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন—‘চিত্রা শোন আমার পক্ষে তোমাকে এ বাড়িতে রাখা সম্ভব না। তোমাকে চলে যেতে হবে। এবং কিছুক্ষণের মধ্যে চলে যেতে হবে।’

      ‘আমার সমস্যা আপনি সমাধান করবেন না?’

      ‘মানুষের বেশিরভাগ সমস্যাই এরকম যে তা তারা নিজেরাই সমাধান করতে পারে। আমার ধারণা তোমার সমস্যার সমাধান তুমিই করতে পারবে।’

      ‘আমি আপনার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলেছি বলে কি আপনি রাগ করেছেন?’

      ‘রাগ করার প্রশ্ন আসছে না। মিথ্যা কথা বলাটাকে সবাই যতবড় অন্যায় মনে করে আমি তা করি না। আমার কাছে মনে হয় মানুষের অনেক অদ্ভুত ক্ষমতার একটি হচ্ছে মিথ্যা বলার ক্ষমতা। কল্পনাশক্তি আছে বলেই সে মিথ্যা বলতে পারে। যে মানুষ মিথ্যা বলতে পারে না সে সৃষ্টিশীল মানুষ না—রোবট টাইপ মানুষ।’

      ‘আপনি কি মিথ্যা বলেন?’

      ‘না বলি না। মানুষ হিসেবে আমি রোবট টাইপের। শোন চিত্রা, তুমি এখন চলে যাও।’ চিত্রা বিস্মিত গলায় বলল, ‘চলে যাব?’

      ‘হ্যাঁ চলে যাবে।’

      ‘আপনি আমাকে খুব অপছন্দ করেছেন তাই না?’

      ‘আমি তোমাকে অপছন্দও করি নি আবার পছন্দও করি নি।’

      ‘আমার বিষয়ে আপনার কোনো কৌতূহলও হচ্ছে না?’

      ‘লোকজনের ধারণা আমার কৌতূহল খুব বেশি, আসলে তা না। আমার কৌতূহল কম। অনেক কম।’

      ‘নীল রঙের মাছিটার দিকে আপনি যতটা কৌতূহল নিয়ে তাকিয়েছেন আমার দিকে তাও তাকান নি। আমি কি মাছির চেয়েও তুচ্ছ?’

      মিসির আলি চুপ করে রইলেন।

      চিত্রা ক্লান্ত গলায় বলল, আচ্ছা আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু আপনি দয়া করে গম্ভীর হয়ে থাকবেন না। যাবার আগে হাসিমুখে থাকুন। আপনার হাসিমুখ দেখে যাই।

      মিসির আলি হাসলেন। চিত্রা বলল, বাহ আপনার হাসি তো সুন্দর। যারা গম্ভীর ধরনের মানুষ তাদের হাসি খুব সুন্দর হয়। এরা হঠাৎ হঠাৎ হাসে তো এই জন্যে। আর যারা সব সময় হাসিমুখে থাকে তাদের হাসি হয় খুব বিরক্তিকর। তাদের কান্না হয় সুন্দর। আচ্ছা আমি তা হলে এখন উঠি।

      চিত্রা উঠে দাঁড়াল। মেয়েটা এত সহজে চলে যেতে রাজি হবে তা মিসির আলি ভাবেন নি। তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।

      ‘আচ্ছা শুনুন, আমি আমার ব্যাগগুলি রেখে যাই। ব্যাগ হাতে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আশ্রয় খোঁজার তো কোনো মানে হয় না, তাই না?’

      ‘বিছানা বালিশ নিয়ে যাওয়াই তো ভালো, সবাই ভাববে এই মেয়ের আসলেই আশ্রয় প্রয়োজন।’

      ‘আপনি কিন্তু সেরকম ভাবেন নি। আপনি আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন। যাই হোক আমি জিনিসপত্র রেখে যাচ্ছি। একসময় এসে নিয়ে যাব।’

      ‘আচ্ছা।’

      ‘আপনি আসলেই রোবট টাইপ মানুষ। যাই কেমন?’

      ‘তুমি কি তোমার বাড়ির টেলিফোন নাম্বারটি দিয়ে যাবে?’

      ‘কেন? আচ্ছা দিচ্ছি। কাগজে লিখে দিচ্ছি। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে টেলিফোন করবেন না। আর যদি করেন আপনি ভয়াবহ বিপদে পড়ে যাবেন। এইবার কিন্তু আমি সত্যি কথা বলছি—কি বলছি না?’

      ‘মনে হচ্ছে বলছ।’

      চিত্রা তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে কাগজ নিয়ে টেলিফোন নাম্বার লিখল। ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলল, এই নিন নাম্বার। আবারো বলছি নিতান্ত প্রয়োজন না হলে টেলিফোন করবেন না।

      ‘নিতান্ত প্রয়োজন বলতে তুমি কী বুঝাচ্ছ?’

      ‘ধরুন আমি আপনার ঘর থেকে বের হলাম। আর হঠাৎ একটা ট্রাক এসে আমার গায়ের উপর দিয়ে চলে গেল তখন আপনি বাসায় টেলিফোন করে বলবেন—–চিত্রা মারা গেছে।’

      ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’

      চিত্রা বেশ সহজ ভঙ্গিতেই বের হল। মিসির আলি উঠে দরজা বন্ধ করে দিলেন। তিনি আজ আর ঘর থেকে বের হবেন না। তিনি জানেন ঘণ্টা দু-একের ভেতর চিত্রা ফিরে আসবে, তার জিনিসপত্র নিয়ে যাবে। মেয়েরা তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কোথাও রেখে স্বস্তি পায় না। কাজেই অপেক্ষা করাই ভালো।

      খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার মেয়েটি চলে যাবার পর মিসির আলির একটু মন খারাপ হয়ে গেল। পাখি উড়ে যাবার পর পাখির পালক পড়ে থাকে। মেয়েটা চলে গেছে তার পরেও কিছু যেন রেখে গেছে। স্যুটকেস এবং হ্যান্ডব্যাগ নয়, অন্য কিছু।

      মেয়েটির রেখে যাওয়া ৫০০ টাকার নোটটা পকেটে। টাকাটা ফেরত দিতে ভুলে গেছেন। আশ্চর্য কাণ্ড—মেয়েটি তার কালো ব্যাগও ফেলে গেছে। তার সব টাকা তো ওই ব্যাগে। বেবিট্যাক্সি নিয়ে যদি কোথাও যায় ভাড়া দিতে পারবে না।

      মিসির আলি অস্বস্তি বোধ করছেন। মেয়েটাকে মাথা থেকে তাড়াতে পারছেন না। মাছিটা এখনো টেবিলে বসে আছে। মারা গেছে নাকি? না মারা যায় নি। কীট এবং পতঙ্গ জগতের নিয়ম হল মৃত্যুর পর উল্টো হয়ে থাকা। পিঠ থাকবে মাটিতে পা থাকবে শূন্যে। মাছির বেলাতেও নিশ্চয়ই সেই নিয়ম। মিসির আলি তার লাইব্রেরির দিকে এগুলেন—মাছি সম্পর্কে জানার জন্যে কোনো বই কি আছে লাইব্রেরিতে? থাকার তো কথা।

      মাছি সম্পর্কে মিসির আলি তেমন কোনো তথ্য যোগাড় করতে পারলেন না। শুধু জানলেন পৃথিবীতে মোট ৮৫,০০০ প্রজাতির মাছি আছে। মৌমাছি যেমন মাছি, ড্রাগন ফ্লাইও মাছি। সবচে ছোট মাছি প্রায় অদৃশ্য আর সবচে বড় মাছি চড়ুই পাখি সাইজের। এদের সবারই দু জোড়া পাখা থাকে। এক জোড়া তারা ওড়ার কাজে ব্যবহার করে অন্য জোড়া ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যবহার করে। বেশিরভাগ প্রজাতির মাছিই মানুষের পরম বন্ধু—শুধু হাউস ফ্লাই নয়। এদের প্রধান কাজ অসুখ ছড়ানো।

    • হিমু সমগ্র

      হিমু সমগ্র

      হুমায়ূন আহমেদ

      [book]

      ‘হিমু’ নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ সৃষ্ট একটি জনপ্রিয় চরিত্র। হিমু মূলত একজন বেকার যুবক; যার আচরণে বেখেয়ালী, জীবনযাপনে ছন্নছাড়া ও বৈষয়িক ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন ভাব প্রকাশ পায়। চাকরির সুযোগ থাকলেও সে চাকরি কখনো করে না বলেই সে বেকার। তার অস্বাভাবিক চরিত্রের মধ্যে সে হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে রাস্তাঘাটে দিন-রাত ঘুরে বেড়ায় এবং মাঝে মাঝে ভবিষ্যদ্বাণী করে মানুষকে চমকে দেয়।

      ‘হিমু’ ধারাবাহিকের প্রথম উপন্যাস ‘ময়ূরাক্ষী’ প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে ঢাকার অন্যন্যা পাবলিকেশন থেকে। প্রাথমিক সাফল্যের পর হিমু চরিত্র বিচ্ছিন্নভাবে হুমায়ুন আহমেদের বিভিন্ন উপন্যাসে প্রকাশিত হতে থাকে। হিমু ও মিসির আলি হুমায়ুন আহমেদ সৃষ্ট সর্বাধিক জনপ্রিয় দু’টি চরিত্র। উদাসীন হিমু একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের বাঙালি তরুণদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

      হিমুর প্রকৃত নাম হিমালয়। এ নামটি রেখেছিলেন তার বাবা যেন তার পুত্র হিমালয় পর্বতের ন্যায় মহত্ব প্রকাশ করে। হিমুর বাবা তাকে একজন মহাপুরুষ হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি তার ছেলের এমন নাম রেখেছিলেন। পরবর্তীতে ছাত্রজীবনে এই নাম নিয়ে হিমুকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তার পিতামহ তার অন্য নাম রাখতে চেয়েছিলেন— চৌধুরী ইমতিয়াজ টুটুল। কিন্তু হিমু তার বাবার দেয়া নামই গ্রহণ করে। লেখক হিমুর বাবাকে বর্ণনা করেছেন একজন বিকারগ্রস্ত মানুষ হিসেবে; যার বিশ্বাস ছিল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যদি প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা যায় তবে একইভাবে মহাপুরুষও তৈরি করা সম্ভব। তিনি মহাপুরুষ তৈরির জন্য একটি বিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন যার একমাত্র ছাত্র ছিল তার সন্তান হিমু। হিমুর পোশাক হল পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবী। হলুদ বৈরাগের রঙ বলেই পোশাকের রং হলুদ নির্বাচিত করা হয়েছিল। ঢাকা শহরের পথে-পথে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো তার কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম। উপন্যাসে প্রায়ই তার মধ্যে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার প্রকাশ দেখা যায়। যদিও হিমু নিজে তার কোন আধ্যাত্মিক ক্ষমতার কথা স্বীকার করে না। হিমুর আচার-আচরণ বিভ্রান্তিকর। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার প্রতিক্রিয়া অন্যদেরকে বিভ্রান্ত করে, এবং এই বিভ্রান্ত সৃষ্টি করা হিমুর অত্যন্ত প্রিয় একটি কাজ। প্রেম ভালবাসা উপেক্ষা করা হিমুর ধর্মের মধ্যে পড়ে। কোন উপন্যাসেই কোন মায়া তাকে কাবু করতে পারে নি। মায়াজালে আটকা পড়তে গেলেই সে উধাও হয়ে যায়।

      হিমু উপন্যাসে সাধারণত হিমুর কিছু ভক্তশ্রেণীর মানুষ থাকে যারা হিমুকে মহাপুরুষ মনে করে। এদের মধ্যে হিমুর ফুপাতো ভাই বাদল অন্যতম। মেস ম্যানেজার বা হোটেল মালিক- এরকম আরও কিছু ভক্ত চরিত্র প্রায় সব উপন্যাসেই দেখা যায়। এছাড়াও কিছু বইয়ে বিভিন্ন সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী ও খুনি ব্যক্তিদের সাথেও তার সু-সম্পর্ক ঘটতে দেখা যায়। হিমুর একজন বান্ধবী রয়েছে, যার নাম রূপা; যাকে ঘিরে হিমুর প্রায় উপন্যাসে রহস্য আবর্তিত হয়। নিরপরাধী হওয়া সত্ত্বেও সন্দেহভাজন হওয়ায় হিমু অনেকবার হাজতবাস করেছে এবং বিভিন্ন থানার ওসি ও সেকেন্ড অফিসারের সাথে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে।

      হিমু ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষানবিশ— উপন্যাসে এমনটিই বলা হয়েছে; পাশ করেছে কিনা তা উল্লেখ করা হয়নি। তবে তার সাধারণ জ্ঞান ভালো।

      হিমুর বয়স ২৫-২৮ বছরের মধ্যে। তার পোশাক ও চাল-চলন কিছু কিছু মানুষের কাছে বিরক্তিকর। সে খুব একটা সুদর্শন না হলেও তার চোখ ও হাসি খুব সুন্দর বলা হয়েছে। সে সবসময় হলুদ রঙের পাঞ্জাবি (অধিকাংশ সময়ে যেটার পকেট থাকে না) পরে। বেশিরভাগ সময় সে খালিপায়ে চলাফেরা করে। শীতকালে সে রুপার দেওয়া কাশ্মীরি শাল ব্যবহার করে। তার চুল ও দাড়ি সবসময় বড়বড় রাখে। রাতের বেলায় রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে। তার খালাতো ভাই বাদল তার অন্ধভক্ত। যে তার আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতি নিঃসন্দিহান এবং তাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করে। হিমু মাঝে মাঝে ভবিষ্যতবাণী করে যা প্রায় সময়েই মিলে যায়। সে তার যুক্তি-বিরোধী মতানুসারে কাজ করে, এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করে দেয়। প্রায় সময়ই হিমুকে পরোপকার করতে দেখা যায় (যদিও তাতেও কিছু বিভ্রান্তি মিশ্রিত থাকে)।

      হিমুর জীবন যাপন অদ্ভুত। তার জীবন বাউন্ডুলে ছন্নছাড়া ধরনের। সে মেসে থাকে। মাঝে মাঝে রাস্তায় ও পার্কেও রাত কাটায়। তার প্রধান কাজ হেঁটে, খালি পায়ে রাস্তায় ঘুরে বেরানো। তার কোনো পেশা নেই। হিমুর বেশকিছু বিত্তবান আত্মীয় রয়েছে। হিমু প্রায়ই তার বিত্তবান আত্মীয়দের কাছ থেকে উপহার এবং অর্থসাহায্য পায়। তবে সে মানুষের কল্যাণের জন্য অনেক কাজ করেছে । তার জীবন যাপনে তাকে প্রায়ই আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে দেখা যায়।

      হিমু স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সে প্রায়ই যুক্তি-বিরোধী মতানুসারে আচরণ করে এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং তার এরকম অযৌক্তিক ব্যক্তিত্বের কারণে সে অনেক সম্ভাব্য বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে যায়। তার লোভ, লালসা, ঈর্ষা, ভয় নেই। তার এরূপ আচরণ অনেক মানুষকে তাকে মহাপুরুষ ভাবতে প্রভাবিত করে। হিমু যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও রসবোধসম্পন্ন ব্যক্তি।

      ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে ‘হিমু সমগ্র’ প্রকাশিত হয়; প্রকাশক মনিরুল হক, অনন্যা, ৩৮/২ বাংলাবাজার ঢাকা। গ্রন্থস্বত্ব লেখকের। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছিলেন ধ্রুব এষ। ‘হিমু সমগ্রে’ সঙ্কলিত গ্রন্থসমূহের নাম হচ্ছে—

      ‘হিমু সমগ্রে’র উৎসর্গ পাতায় লেখা ছিল—

      উৎসর্গ

      এ-দেশের

      হিমুদের জন্য

      উপনার নগণ্য।

      হুমায়ূন আহমেদ ‘হিমু সমগ্রে’র একটি সংক্ষিপ্ত ভূমিকাও লিখেছিলেন—

      ভূমিকা

      হিমুকে নিয়ে কতগুলি বই লিখেছি নিজেও জানি না। মন মেজাজ খারাপ থাকলেই হিমু লিখতে বসি। মন ঠিক হয়ে যায়। বেশি লেখার ফল সব সময় শুভ হয় না। আমার ক্ষেত্রেও হয় নি। অনেক জায়গাতেই ল্যাজে গোবরে করে ফেলেছি। হিমুর পাঞ্জাবির পকেট থাকে না অথচ একটা বই-এ লিখেছি সে পকেট থেকে টাকা বের করল। হিমুর মাজেদা খালা এক বই-এ হয়ে গেল মাজেদা ফুপু। তবে হিমু যে ঠিক আছে তাতেই আমি খুশি। হিমু ঠিক আছে, হিমুর জগৎ ঠিক আছে। তার বয়স বাড়ছে না। সে বদলাচ্ছে না। এই আনন্দ সংবাদ দিয়ে ভূমিকা শেষ করছি।

      সব হিমুকে বন্দি করে যে প্রকাশক বিশাল হিমু সমগ্র বের করলেন তাঁকে (মনিরুল হক, অনন্যা) ধন্যবাদ।

      হুমায়ূন আহমেদ

      ১৩.১১.২০০৬

    • ময়ূরাক্ষী

      ময়ূরাক্ষী

      হুমায়ূন আহমেদ

      [book]

      ‘ময়ূরাক্ষী’ হুমায়ূন আহমেদের লেখা হিমু ধারাবাহিকের প্রথম উপন্যাস। বইটি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসের চরিত্র সমূহ হচ্ছে— চৌধুরী খালেকুজ্জামান টুটুল/চৌধুরী ইমতিয়াজ টুটুল – হিমু; মীরা – জাস্টিস এম. সোবাহানের মেয়ে; বাদল – হিমুর ফুফাত ভাই; রিনকি – বাদলের বোন; রূপা – হিমুর বান্ধবী; মজিদ – হিমুর বন্ধু প্রমুখ।

      হিমুর বাবা ছিলেন একজন বিকারগ্রস্ত মানুষ তিনি বিশ্বাস করতেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যদি প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা যায় তবে একইভাবে মহাপুরুষও তৈরি করা সম্ভব। তিনি মহাপুরুষ তৈরির জন্য একটি বিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন যার একমাত্র ছাত্র ছিল তার সন্তান হিমু। এই মহাপুরুষ তৈরির জন্যই সে তার স্ত্রীকে হত্যা করে। একসময় হিমুর বাবা অসুস্থ হয়ে মারা যান। মারা যাওয়ার আগে তিনি হিমুকে বলে যান সে যেন ১৬ বছর পর্যন্ত তার মাতৃকুল অর্থাৎ তার মামাদের কাছে থাকে। সাথে এও সতর্ক করে দিয়ে যান তার মামারা পিশাচ প্রকৃতির। পিশাচ শ্রেণির মানুষের সংস্পর্শে না এলে মানুষের সৎ গুণ সম্পর্কে ধারণা হবে না।

      একসময় হিমু বড় হয়। মেট্রিক পাসের পর তার ফুফুর বাড়িতে আসে। সেখানেও এক সমস্যা হয়। তার ফুফাতো ভাই তার সংস্পর্শে এসে তার ভক্ত হয় এবং ৩ বার ইণ্টারমিডিয়েটে ফেল করে। বাদল হিমুকে মহাপুরুষ মনে করে। হিমুর প্রতি রয়েছে তার অগাধ বিশ্বাস।

      ইউনিভার্সিটিতে পড়ার ২ বছর পর প্রথম কথা হয় রূপার সাথে। একসময় সে ভালোবেসে ফেলে হিমুকে কিন্তু হিমু তাকে ধরা দেয় না ঠিক তেমনিই চলেও যায় না সে। সে যে মহাপুরুষ হওয়ার সাধনা করছে সে কেমন করে স্বাভাবিক হয়ে রূপার কাছে যাবে।

    • দরজার ওপাশে

      দরজার ওপাশে

      হুমায়ূন আহমেদ

      দরজার ওপাশে

      ‘দরজার ওপাশে’ নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ রচিত হিমু ধারাবাহিকের দ্বিতীয় উপন্যাস। নব্বই দশকে হিমুর প্রথম উপন্যাস ময়ূরাক্ষী প্রকাশিত হয়। প্রাথমিক সাফল্যের পর হিমু চরিত্র বিচ্ছিন্নভাবে হুমায়ুন আহমেদের বিভিন্ন উপন্যাসে প্রকাশিত হতে থাকে। ‘দরজার ওপাশে’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালের মে মাসে জ্ঞানকোষ প্রকাশনী, ৩৮/ক বাংলাবাজার, ঢাকা থেকে।

      হিমুর বন্ধু রফিককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে। চাকরি রক্ষা করতে রফিক হিমুর কাছে আসে। হিমুর এক বন্ধু জহির, তার পিতা একজন মন্ত্রী, হিমু ঠিক করে তার কাছেই যেতে হবে। এজন্য প্রথমে সে মন্ত্রীর নজর কাড়ার ব্যবস্থা করে যা থেকে বহু ঘটনা জন্ম নেয়।

      এভাবেই দরজার ওপাশের কাহিনী এগিয়ে চলে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী মোবারক হোসেন, কাহিনীচক্রে যিনি মন্ত্রিত্ব হারান; তার পালিয়ে যাওয়া পুত্র জহির; হিমুর চাকরি হারানো বন্ধু রফিক ও তার স্ত্রী যুথী; পুলিশের ওসি মোহাম্মদ সিরাজুল করিম ও তার অসুস্থ স্ত্রী; এবং হিমুর ছোট মামাকে নিয়ে। এছাড়া হিমু তো আছেই, সঙ্গে আছে হিমু ধারাবাহিকের নিময়িত চরিত্র বড় ফুপা, বড় ফুপু এবং বাদল।

      প্রস্তাবনা

      তার ডাক নাম হিমু। ভাল নাম হিমালয়। বাবা আগ্রহ করে হিমালয় নাম রেখেছিলেন, যেন বড় হয়ে সে হিমালয়ের মত হয়—বিশাল ও বিস্তৃত, কিন্তু ধরা-ছোঁয়ার বাইরে নয়। হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায়। ইচ্ছে করলে তিনি ছেলের নাম সমুদ্র রাখতে পারতেন। সমুদ্রও বিশাল এবং বিস্তৃত। সমুদ্রকে হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায়। তার চেয়েও বড় কথা, সমুদ্রে আকাশের ছায়া পড়ে। কিন্তু তিনি সমুদ্র নাম না রেখে রাখলেন হিমালয়। কঠিন মৌন পর্বতমালা, যার গায়ে আকাশের ছায়া পড়ে না ঠিকই কিন্তু সে নিজেই আকাশ স্পর্শ করতে চায়। হিমুর বাবা চেয়েছিলেন হিমু একজন মহাপুরুষ হবে যে মহাপুরুষ পরম সত্য জানেন। কিন্তু হিমু কি চেয়েছিল? আমরা তার বাবার আকাঙ্ক্ষার কথা জানি, হিমুর আকাঙ্ক্ষা জানি না। সে কিসের সন্ধান করে বা আসলেই সে কোন কিছুর সন্ধান করে কি-না তা নিয়েই লেখা হল ‘দরজার ওপাশে’। যদিও আমি খুব গুরুত্বের সঙ্গে লেখাটি লিখেছি তবু বিনীত অনুরোধ করছি কেউ যেন গুরুত্বের সঙ্গে লেখাটি গ্রহণ না করেন। মিসির আলী নামে আমার একটি চরিত্র আছে। সে কাজ করে লজিক নিয়ে। তার চিন্তাভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা যায় কিন্তু হিমু কাজ করে ‘এন্টি-লজিক’ নিয়ে। আমাদের এই জগতে ‘এন্টি-লজিকে’র স্থান নেই।

      ৫ই মে ১৯৯২
      হুমায়ূন আহমেদ