Category: পাঁচকড়ি দে

  • পাঁচকড়ি দে রচনাবলী

    পাঁচকড়ি দে রচনাবলী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    সম্পাদনা : বারিদবরণ ঘোষ

    করুণা প্রকাশনী, কলকাতা

    প্রথম প্রকাশ : ১লা বৈশাখ, ১৪১৭

    প্রচ্ছদ : ইন্দ্রনীল ঘোষ

    ॥ রোমাঞ্চন ॥

    বাংলা রহস্যকাহিনির একটা পর্বের ইতিবৃত্ত লিখতে গিয়ে বড়ো ধন্দে পড়া গেছে। কাকে রহস্য কাহিনি বলা যাবে? সংস্কৃত মতে, এমনকি বাংলা মতেও ‘রহস্য’ অনেকটা ঠাট্টা বিদ্রুপের দলে পড়ে, যেমন গোপাল ভাঁড়ের রহস্য। ইংরেজি মতে আবার রহস্যের নানা ব্যাখ্যান–এডভেঞ্চার, থ্রিলার, শিকার, ক্রাইম, ডিটেকটিভ, মিস্ট্রি, স্পাই—নানান শব্দের ফাঁকে-ফোঁকরে রহস্য ছড়িয়ে আছে। আমরা এই শেষের দিকের সবধরনের রচনাকে একত্র করে ভেবে নিচ্ছি। এছাড়া উপায় নেই। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে শূদ্রকের মৃচ্ছকটিকে শর্বিলক-এর চুরি করতে যাওয়ার মধ্যে রোমাঞ্চের গন্ধ আছে—কিন্তু তাকে কোনোক্রমেই গোয়েন্দা-কাহিনি বলা যাবে না। বাংলা গোয়েন্দা কাহিনি ইংরেজি গোয়েন্দা রচনার অনুবাদের হাত ধরে এসেছে। অতএব ইংরেজি মতগুলোকে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

    ইংরেজি মতের কথা মনে হলেই এডগার অ্যালেন পো-এর কথা আগে মনে পড়ে যাবে। তাঁর The Murders in the Rue Morgue- পৃথিবীর প্রথম ডিটেকটিভ গল্প (১৮৪১ খ্রি.)। এর পরে নাম করতে হয় উইলকি কলিন্স-এর। তাঁর মুন স্টোন অথবা দি উওম্যান ইন্‌ হোয়াইট-এর ইন্সপেক্টর বাকেট ছিলেন ডিটেকটিভদের প্রথম সেরা মানুষ। তারপরে এসেছেন শার্লক হোমস্ আর ওয়াটসন নিয়ে আর্থার কোনান ডয়েল। আগাথা ক্রিস্টির এরকুল পোয়রোর কথা রসিকমাত্রেই জানেন। জেমস্ বন্ড, হ্যাডলি চেজ তো হাল আমলের ব্যাপার। নইলে Mystries of the Court of London (বাংলায় ‘লণ্ডন রহস্য’ নামে কয়েকখণ্ডে অনূদিত) পুরনো আমলে কম সাড়া জাগায়নি। এসব নামের উল্লেখ এজন্যে যে বাংলা রহস্য কাহিনি এগুলির কাছে সবচেয়ে ঋণী। পাঁচকড়ি দে মশাই কি গোবিন্দরাম বা দেবেন্দ্রবিজয় নির্মাণ করতে পারতেন, যদি না পুলিস ইন্সপেক্টর বাকেট তাঁর চোখের সামনে ঘোরাফেরা না করতেন?

    ॥২॥

    কাজেই বাংলা সাহিত্যে ডিটেকটিভ রচনার আবির্ভাব হতে দেরি হয়েছিলো। ভালো ডিটেকটিভ গল্প লেখা খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। হত্যা, খুন, রাহাজানি, জোচ্চুরি এসব কাজের মধ্যে একটা অপরাধজনক মৌজ আছে। এর গল্পকে হতে হয় ঘামছোটানো ঘুম-তাড়ানো চরিত্র। আমাদের মধ্যে গোপন অপরাধ-বোধকে জাগ্রত করে তাতে সুড়সড়ি দিতে হবে—গল্পটা হবে পো-এর ভাষায় ‘Somewhat Peculiar Narrative.’ লেখককে হতে হবে একইসঙ্গে নাট্যকার, সাংবাদিক, ঐতিহাসিক, মনস্তাত্ত্বিক, বিজ্ঞানী এবং শিল্পীও। চাই কৌতূহল শেষ অবধি জিইয়ে রাখার দুঃসাধ্য সংযম এবং আর্ট। রহস্যময়তাকে বজায় রাখতে হবে আদ্যোপান্ত। ভারতের আপাত নিস্তরঙ্গ জীবনে এতোগুলো বিপ্লব একসঙ্গে ঘটেনি। ঘটলো ইংরেজ আগমনের পর অপরাধ প্রবণতার বিচিত্র পরিবেশ সৃষ্টির ফলে। ইংরেজি সাহিত্য এবং ব্রিটিশ সরকার দুই হাত ধরে অতএব রহস্যকাহিনি বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় এসে পড়ল। এর মধ্যে ছোট গল্পের যথার্থ একটা কাঠামোর সঙ্গে বাঙালি রসিক পরিচিত হবার সুযোগ পেয়েছেন। কারণ তখনি আবির্ভূত হচ্ছেন বাংলা ছোটগল্পের জন্মদাতা, পালয়িতা এবং অভিভাবক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অভিযোগ, তাঁর রহস্যময় গল্পের পিছনে ছিলো অ্যালেন পো-র রহস্যময়তার ছায়া। রবীন্দ্রনাথকে অভিযুক্ত করবো কি, স্বয়ং কোনান ডয়েল শার্লক হোমসের চরিত্র কি আঁকতে পারতেন যদি না সামনে পোর ডিটেকটিভ Dupin প্রত্যক্ষ না থাকতেন! তাঁর প্রভাবেই ডয়েল Professor Challenger-কে নিয়ে Science fiction লেখেননি?

    অতএব সত্যেন্দ্রনাথের লাইব্রেরি থেকে পো নিয়ে রবীন্দ্রনাথ মগ্ন হলেন এবং Golden Bag এবং গুপ্তধন, The Cask of Amontillado আর The Tell – Tale-Heart ও সম্পত্তি সমৰ্পণ, Premature Burial এবং জীবিত ও মৃত ইত্যাদি মিতালি পাতিয়ে বসলো। কঙ্কাল, নিশীথে, ক্ষুধিত পাষাণ, ডিটেকটিভ গল্পগুলি অচিরে স্বকীয়তায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

    ॥৩॥

    একটু আগে যে ব্রিটিশ রাজত্বের কথা বলছিলাম। তার একটা কারণ চোর-ডাকাতের প্রাধান্য যেমন বেড়েছিল, তেমনি ধনীদের অত্যাচারও বেড়েছিলো। বেন্টিকের আমলে শ্লিম্যানের চেষ্টায় ঠগিদমন হলেও অপরাধীর সংখ্যা কমেনি। “থানাদার” স্থলে ‘দারোগা’রা এলেন। এমনি এক দারোগা ছিলেন গিরিশচন্দ্র বসু (এ পদে যোগ দেন ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে)। ডাকাতি দমনে তাঁর পটুত্ব ছিল। তাঁর চোখে দেখা অপরাধীদের অপরাধ ও তার দমনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁর ঝুলিতে ছিল। তাই দিয়ে তিনি লিখে বসলেন ‘সেকালের দারোগার কাহিনী’–বিশ্বস্ত এবং রোমাঞ্চকর আত্মজীবনীর ভঙ্গিতে। প্রকাশিত হলো ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে। সত্যি কথা বলতে বাংলার মাটিতে অপরাধ ও তার দমনের একটা বিশ্বাসযোগ্য চিত্র প্রথম পেলাম এই বইটিতে। একে গোয়েন্দাকাহিনি কেউ বলবো না—কিন্তু তার সূত্রপাত তো বলতেই পারি।

    সঠিক গোয়েন্দা কাহিনি পাবার জন্যে আমাদের আরও সাত-আট বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।১৮৯৬। তার আগেই অবশ্য আমরা ক্রাইম-এর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম বঙ্কিমচন্দ্রের বিভিন্ন রচনায়—ইংরেজি রাজমোহনস্ ওয়াইফ, কৃষ্ণকান্তের উইল প্রভৃতিতে। কিন্তু রীতিমতো রহস্য-রোমাঞ্চ নিয়ে প্রথম আবির্ভূত হলেন প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় এবং বাঁকাউল্লার দপ্তরের লেখক বরকতুল্লা (?)। দুজনকেই ব্রাকেটে প্রথম বলা যেতে পারে বই প্রকাশের দিক থেকে।

    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৫৫-১৯১৭) আদরিণী (১৮৮৭), ডিটেকটিভ পুলিস-১ম কাণ্ড (১৮৮৭) পাহাড়ে মেয়ে (১৮৮৯), বনমালীদাসের হত্যা (১৮৯১) প্রভৃতি গ্রন্থের রচয়িতা হলেও তিনি খ্যাতি পেয়েছিলেন ‘দারোগার দপ্তর’ লিখে। এটি ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে (১ম সংখ্যা) ধারাবাহিকভাবে পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হতে আরম্ভ করে। ৪০-৪৮ পৃষ্ঠার এই পুস্তিকাগুলি বিভিন্ন নামে অবশ্য প্রকাশিতহত। যেমন ১৭৯ সংখ্যার নাম ছিল ‘প্রতিশোধ’। ১৫৯ সংখ্যার নাম ছিল ‘দীর্ঘকেশী’। ১৫৭ সংখ্যার নাম (১৪ বর্ষ ১৩১৩ব.) “ভীষণ হত্যা অর্থাৎ একটি স্ত্রীলোক হত্যার ভীষণ রহস্য”। ‘দারোগার দপ্তর’ এর প্রচার সংখ্যা ছিল প্রচুর। খুব লক্ষ্য করার ব্যাপার ইংল্যান্ডে ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে শার্লক হোমস্-এর আবির্ভাবের মাত্র এক বছর পরে প্রিয়নাথের ‘ডিটেকটিভ পুলিস’ বাজার মাত করে দেয়। Indian Mirror পত্রিকা (২৫ জানুয়ারি ১৮৮৮) এর প্রশংসা করে লিখেছিল :

    We have also read with attention another book composed by the same author, and styled. ‘Detective Police’. The book has also been written by following the story of a man who was actually tried by the High Court of Calcutta on the most serious charges and is up to date undergoing the term of punishment in the criminal jail of Alipore.

    ১৪নং হুজুরি মলস্ লেন বৈঠকখানা ‘দারোগার দপ্তর’ কার্যালয় থেকে (সুকুমার সেন জানিয়েছেন ১৬২ নং বহুবাজার স্ট্রিট এর কার্যালয় ছিল। তবে কি ঠিকানার পরিবর্তন হয়েছিল?) উপেন্দ্রভূষণ চৌধুরি কর্তৃক প্রকাশিত হয়ে ‘দারোগার দপ্তর’ খণ্ডে খণ্ডে আত্মপ্রকাশ করত।

    এই সময়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল ‘বাঁকাউল্লার দপ্তর’। এর দারোগা মশায়ের নাম ছিল বরকাতুল্লা—‘শ্রীযুক্ত কোতোয়া, বরকতুল্লা নাম’। একদা সুকুমার সেন অনুমান করেছিলেন বইটির ‘সম্ভাব্য লেখক’ প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়। এই অনুমান অবশ্য তথ্যসমর্থিত নয়। তবে বরকতুল্লা নামটি লোকমুখে বকাউল্লা থেকে বাঁকাউল্লায় পরিণত হয়েছিল সম্ভবত। এর কাহিনির মূল ছিলো ইংরেজি পরে বাংলায় রূপান্তরিত হয়ে ‘বাঁকাউল্লার দপ্তর’, নাম পায়। বারোটি অধ্যায়ে বিভক্ত এর প্রতিটি অধ্যায়ের নামকরণ ছিল লোমহর্ষক। এইভাবে গিরিশচন্দ্র-বঙ্কিমচন্দ্র-প্রিয়নাথদের দিয়ে বাংলা সাহিত্যের পাঠক ফাঁড়ি-দারোগা-থানা-পুলিশের একটা রোমাঞ্চিত স্বাদ পেতে শুরু করেছিল। বাঁকাউল্লার দপ্তরের মধ্যেই নারীরা ডিটেকটিভ কাহিনীর অনিবার্য চরিত্রে পরিণত হতে শুরু করেছিল।

    এই নারী-হত্যা-নারীহরণ-ডাকিনীবিদ্যা প্রত্যক্ষভাবে এসে গিয়েছিল ‘বিলাইতি’ রহস্যরস আর দেশি কাহিনির জারজসন্তান হিসেবে ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের (১৮৪২-১৯১৯) কলম মারফৎ। রেনল্ডসের Joseph Wilmot-এর ছায়া অবলম্বনে এই এক নূতন! আমার গুপ্তকথা (১৮৭০-৭৩) নামে ৮৭০ পৃষ্ঠার এই বিশাল খিচুড়িরসের বইটির অনুক্রম হিসেবে ১৮৭৩-৭৯ সালে ছয় বছর ধরে ‘আমার গুপ্তকথা।—আশ্চর্য!!!’ নামে ধারাবাহিক প্রকাশের পর তিনখণ্ডে মোট ৪৯৬ পৃষ্ঠার ‘তুমি কি আমার’ গ্রন্থনামে পরবর্তী বইটি প্রকাশিত হল। আর ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ৬৪৪ পৃষ্ঠার আর একটি ঢাউস ‘নবন্যাস’ প্রকাশিত হল ‘আর এক নতুন! হরিদাসের গুপ্তকথা’। আসলে এই ‘গুপ্তকথা’ প্রকাশ্য করেই ভুবনচন্দ্র খ্যাতিমান হয়ে পড়লেন। অবশ্য রেনল্ডস-এর বইটির বঙ্গানুবাদ দুখণ্ডে মোট (৭৪৫+৭৮৪) ১৫২৯ পৃষ্ঠায় প্রকাশকালে নাম ছিল ‘বিলাতি গুপ্তকথা’। কিন্তু প্রত্যক্ষ ডিটেকটিভ বইগুলির মধ্যে ছিল চার খণ্ড ‘মার্কিন পুলিস কমিশনার’ (১ম খণ্ড হারাধনের অনুসন্ধান : ১৮৯৬, পৃ. ৬৪, ২য় খণ্ড মেয়ে চুরি : ১৮৯৬, পৃ. ৬০;৩-৫ খণ্ড—অপূর্ব নারী ডিটেকটিভ : ১৮৯৬, পৃ. ২৬৮ এবং ৬ষ্ঠ খণ্ড জলবিবি : ১৮৯৬, পৃ. ৬০) গুপ্তচর (১৮৯৮), ইউজিন সু রচিত ওয়াণ্ডারিং জু অবলম্বনে রচিত চারখণ্ডে ঠাকুরবাড়ীর দপ্তর। অভিশপ্ত য়িহুদী (১৯০০), নন্দনকানন সিরিজের তৃতীয় বল্লরী চন্দ্রমুখী (১৯০২), ঐ সিরিজের মারী কোরেলির Sorrows of Satan এর বঙ্গানুবাদ ‘সন্তপ্ত সয়তান’ (১৯০৩-৪), সয়তানী (১৯০৬), ডিউক তারাচাঁদ (১৯২০), গোয়েন্দার গল্প (মাইকেল মোহনচাঁদ) প্রভৃতি। তাঁর খ্যাতির অন্য আর একটি কারণ ছিলো রেনল্ডস-এর বিখ্যাত Mysteries of Court of London-এর খণ্ডশ অনুবাদ ‘লণ্ডন রহস্য’ (১৯১২-১৪)।

    এই ফাঁকে একজন কৃতী লেখকের কথা বলে নিই। ভদ্রলোক যে কেন আর রহস্য কাহিনি লিখলেন না জানিনা, লিখলে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হতো। কারণ তাঁর আগে ‘ভদ্রস্থ’ কোনো লেখক এপথে পা বাড়াননি। তিনি নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ‘তপস্বিনী’ উপন্যাস লিখে যিনি খ্যাতি-অখ্যাতি দুই-ই কুড়িয়েছিলেন। ‘ভারতী ও বালক’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পটি ছিল ‘চুরি না বাহাদুরি’। রহস্যজনক গোয়েন্দা গল্পের যথার্থ স্রষ্টা তাকে বলা চলতো যদি তিনি এপথে থাকতেন। রোমাঞ্চকর পরিবেশ সৃষ্টি, ভৌতিক আবেশ রচনা ও শেষাবধি কৌতূক নির্মাণে সিদ্ধহস্ত লেখক ট্রেনের মধ্যে দুই ভদ্রলোকের চুরি ও গোয়েন্দাদের ব্যর্থতার একটা ঠাসবুনুনিতে পাঠকদের অভিভূত করে রাখেন। শেষ অবধি চোর টাকা পয়সা দিয়ে যায় এক অদ্ভুত কৌশলে। গল্পে হয়তো চমৎকারিত্ব নেই, কিন্তু আছে পরিবেশ রচনার কৃতিত্ব। প্রিয়নাথের ‘Detective Story গুলি বঙ্গভাষায় মৌলিক Sensational novel-রূপে পরিগণিত হইবার উপযোগী’ বলে সাহিত্য সমালোচক মন্তব্য করলেও এগুলিকে সাহিত্য পর্যায়ভুক্ত করা যাবে কিনা বলা মুস্কিল। সেদিক থেকে নগেন্দ্রনাথের রচনাটি সাহিত্যরসে টইটম্বুর।

    সাহিত্যরস থাকুক না থাকুক গোয়েন্দারহস্য একালের পাঠকদের রুচি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছিল। আসলে নতুন স্বাদের এই রচনা পাঠককে অভিভূত করতে সমর্থ হচ্ছিল। শরচ্চন্দ্ৰ দেব (সরকার)-এর ক্রাইম কাহিনিগুলির বিক্রির হিসেব থেকে এটা সহজে বোঝা যায়। শরচ্চন্দ্র সরকার ‘সংকলিত গোয়েন্দা কাহিনি নামে ডিটেকটিভ গল্প মাঝে মাঝে প্রকাশিত হত। প্রত্যেক খণ্ড সপ্তাহে দুদিন করে সাময়িকপত্রের মতো ফর্মা ধরে বিক্রি হত। এ-সম্পর্কিত একটি বিজ্ঞাপনের বয়ান থেকে জানতে পারি, “গোয়েন্দা কাহিনী” এপর্যন্ত প্রায় পাঁচ লক্ষ ফর্মা বিক্রীত হইয়াছে।’ শরচ্চন্দ্র তীর্থে বিভ্ৰাট অথবা গুমখুন নামে বইপত্রও লিখেছিলেন। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, ‘ভাল ভাল লোকে ও যে গোয়েন্দা কাহিনি পড়তে শুরু করেছিলেন তার প্রমাণ লেখকেরা অনেক সময় এই সব ভালো ভালো লোককে বই উৎসর্গ করতেন। সুকুমার সেন এঁদের কয়েকজনের নাম জানিয়েছেন—মহেন্দ্ৰনাথ বিদ্যানিধি, নগেন্দ্রনাথ ঘোষ, কালীপ্রসাদ ঘোষ, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রাজনারায়ণ বসু, দামোদর মুখোপাধ্যায়, চন্দ্রনাথ বসু, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বিনয় কৃষ্ণ দেব, সারদাচরণ মিত্র প্রভৃতি। গল্পগুলির সঙ্গে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে এ সময়ে আসতে শুরু করেছিল ভালো ভালো ছবির আকর্ষণও। গোয়েন্দা কাহিনি চরিত্র হয়ে প্রকাশিত হতে আরম্ভ করেছিল প্রথমযুগের ঠিক অব্যাবহিত পরেই। ‘রঘু ডাকাত’ ছিল এদের মধ্যে অগ্রগণ্য।

    এসময়ে অনেক অকিঞ্চিৎকর লেখকের আবির্ভাব ঘটেছিল, তাদের কথা আমরা তেমন করে বলতে চাইছি না।

    ॥ 8 ॥

    বাংলা ডিটেকটিভ উপন্যাসের দ্বিতীয় ভূবন নির্মাণে এগিয়ে এসেছিলেন তিন বিখ্যাত রহস্যরসিক পাঁচকড়ি দে, দীনেন্দ্রকুমার রায় এবং সুরেন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য। আর একজনেরও নাম করতে পারি হরিসাধন মুখোপাধ্যায়।

    পাঁচকড়ি দে (১৮৭৩-১৯৪৫) এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন। বঙ্গ-বিহার- উড়িষ্যা-আসাম পর্যন্ত তিনি খ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। ছোটোগল্প লেখার তেমন চেষ্টা তিনি করেন নি—কিন্তু ছোটো আকারের রহস্য কাহিনী লিখেছিলেন। পাঁচকড়ির খ্যাতি শুধু গল্পের প্লটের জন্য নয়, তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথম দুটি গোয়েন্দাকে আমদানি করলেন ইংরেজি অনুকরণে। এঁরা হলেন দেবেন্দ্রবিজয় ও তাঁর সহায়ক-কাম-গুরু অরিন্দম। আগেই বলেছি পুলিশ ইন্সপেক্টর বাকেট সাহেব ছিলেন তাঁর আদর্শ।

    শরচ্চন্দ্র দেবের জনপ্রিয়তার কথা আগেই বলে এসেছি। কিন্তু যার বই নিয়ে প্রথম কাড়াকাড়ি প’ড়ে গেল লাইব্রেরিতে লাইন পড়লো, সংস্করণের পর সংস্করণ ছাপা হতে শুরু করলো—তিনি পাঁচকড়ি দে। তাঁর হাতের কাছে আছে শার্লক হোমস আর আছে ‘যমুনা পত্রিকা’। যমুনা পত্রিকা মানে ফণীন্দ্রনাথ পাল আর তাঁর দাদা যতীন্দ্র পাল। দুই পাল-ভাই আর পাঁচকড়ি মিলে যেন বই লেখার প্রতিযোগিতায় নামলেন। যতীনবাবু লিখলেন কুলবধূ, গৃহিণী, ঘরের লক্ষ্মী, ধর্মপত্নী নাম দিয়ে অজস্র বই। তাঁর ভাই লিখলেন ইন্দুমতী, ছোট বৌ, বন্ধুর বৌ, মধুমিলন প্রভৃতি। আর বন্ধু পাঁচকড়ি বাজার সরগরম করে ফেললেন মায়াবী, মায়াবিনী, হত্যাকারী কে? নীলবসনা সুন্দরী দিয়ে। ‘যমুনা’ আর ‘জাহ্নবী’তে জোয়ার বইতে লাগল তাই নিয়ে। পাঁচকড়ি কলকাতার তিন জায়গায় তিনটে প্রাসাদ নির্মাণ করলেন। হবেই না বা কেন? ১০০,০০০ লক্ষাধিক বিক্রি হয় তাঁর বই—মায়াবী, মনোরমা, মায়াবিনী, পরিমল, জীবনস্মৃত রহস্য, হত্যাকারী কে? লক্ষ টাকা, হত্যারহস্য, ভীষণ প্রতিশোধ, ভীষণ প্রতিহিংসা, কালসর্পী, নীলবসনা সুন্দরী, গোবিন্দ রাম, রহস্য বিপ্লব, মৃত্যু বিভীষিকা, পরিতজ্ঞা পালন, বিষম বৈসূবন, জয় পরাজয়, নরবলি, মৃত্যুরঙ্গিনী, শক দুহিতা, হরতনের নওলা, সুহাসিনী, মরিয়ম প্রভৃতি। ‘বিশেষ সুবিধা—একত্রে ৫ কিংবা তদূর্ধ্ব মূল্যের এই উপন্যাস লইলে মাশুল লাগে না।’ উপরন্তু ‘সতী শোভনা’ সঙ্গে ফ্রি। সমস্ত বই অনুবাদিত হয়ে চলেছে হিন্দি, উর্দু, তামিল, তেলেগু, ‘কেনেদী’, মারাঠি, গুজরাটি, সিংহলি, ইংরেজি—দেশি-বিদেশি ভাষায়। ছাপা ভালো, ছবিও সব মনোরম। বই পড়ে কখনও হিতবাদী লেখে “রচনাচাতুর্য চরিত্র অঙ্কনে তিনি বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করিয়াছেন, কখনও Statesman লেখে- This is a sensational Hypnotic Novel in Bengali’ তাঁর জনপ্রিয়তা রবীন্দ্রনাথকে পর্যন্ত ধাওয়া করেছে। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজের বছরে (১৯১৩) পাঁচকড়ি তাঁকে উৎসর্গ করেছেন ‘জীবমৃত-রহস্য’–’শ্রদ্ধাস্পদ কবিবর/শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/মহাশয় করকমলেষু’। সুকুমার সেন অনুমান করেছেন রবীন্দ্রনাথের ‘নিশীথে’ পড়ে তিনি ‘শ্রীমতী শোভনা’ লিখেছিলেন।

    খুব মজার একটা কাকতলীয় ব্যাপার ঘটে গেলো পাঁচকড়ির শেষ জীবনে। হঠাৎ বন্ধু যতীন্দ্রনাথ পাল মারা গেলেন। যতীন্দ্রনাথ পাল সাহিত্যিক ধীরেন্দ্রনাথ পালের পুত্র। মাত্র ৩৬/৩৭ বছর বয়সের মধ্যেই ছোটোবড়ো মিলিয়ে প্রায় ২০০ খানা বইয়ের লেখক। তাঁর মৃত্যুতে পাঁচকড়ি ‘জীবনৃত’ হয়ে গেলেন। তাঁর রহস্যকাহিনির ‘উৎস’টি গেল শুকিয়ে। বন্ধুর মৃত্যুর পর আড়াই দশকের বেশি বেঁচে রইলেন তিনি—কিন্তু আর কোনো বই লিখতে পারলেন না। কু-লোকে নানা কথা বলে। বলেন—তাঁর রচনায় নাকি শরৎচন্দ্র সরকার, ধীরেন্দ্রনাথ পাল এবং রাজানারায়ণ বসুর পুত্র মনীন্দ্রনাথ বসুর হাতের গন্ধ পান তাঁরা।

    ॥ ৫ ॥

    পাঁচকড়ি দে-র জন্ম ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে। বাবার নাম কেদারনাথ দে। বাল্য শিক্ষার সূচনা ভবানীপুরের একটি স্কুলে। খুব বেশি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনো করেছিলেন বলে বলা যায় না। দেখতে বেশ সুরুপুষ। শুধু রহস্য উপন্যাস লিখেই যা উপার্জন করে গেছেন তা তিন পুরুষে ভোগ করার উপযুক্ত। জোড়া সাঁকোর ৭নং শিবকৃষ্ণ দাঁ লেনে তাঁর একটি বইয়ের দোকান ছিল—”পাল ব্রাদার্স”। তিনি দে দোকান কেন পাল ব্রাদার্স হল ভাবতে গেলে মনে হয়- তিনি সম্ভবত ধীরেন্দ্রনাথ পাল যতীন্দ্রনাথ পালেদের বকলমা নিয়েছিলেন। একটি, ছাপাখানারও তিনি মালিক হন বাণী প্রেস।

    পাঁচকড়ির জনপ্রিয়তার একটা দৃষ্টান্ত দিই। হিতবাদী পত্রিকা সে সময়ে মন্তব্য করেছিলেন—”রচনা চাতুর্যে চরিত্র অঙ্কনে তিনি বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। আমরা দেওয়ান গোবিন্দরাম পাঠে প্রকৃতই পরম প্রীতি লাভ করিয়াছি। এই জনপ্রিয়তার মূলে ছিল তাঁর বিদেশি রোমাঞ্চ সাহিত্যের আত্মকরণ। তার প্রমাণ তিনি অনেক বইতে রেখে গেছেন। একটি বইয়ের পাদটীকায় তিনি লিখে গেছেন—”সঞ্জীবচন্দ্রই এরূপ একটা ক্ষমতাপ্রাপ্ত দেখিয়া কেহ কেহ বিস্মিত হইবেন সন্দেহ নাই। এই বিদ্যা অতিশয় ধৈর্য্য এবং বিপুল অধ্যবসায় সাপেক্ষ। ইহা আমাদিগের দেশীয় বিদ্যা নহে, ইউরোপীয়। এখন আমাদের দেশে অল্পসংখ্যক ব্যক্তি এই বিদ্যা শিক্ষা করিয়াছেন। ইহার নাম (Ventroquilism) ভেন্ট্রোকুইলিজম। কেবল অপরের স্বর অনুকরণে সক্ষম হইলে ভেন্ট্রোকুইলিস্ট হইতে পারা যায় না—শব্দকে ইচ্ছামত স্থানে উত্তেজিত করা প্রয়োজন। আমরা বৃহৎ অট্টালিকা মধ্যে, প্রান্তরে, নদীতটে, অথবা কোন নির্জন স্থানে দাঁড়াইয়া কোন শব্দ করিবামাত্র চারিদিক হইতে প্রতিধ্বনি শুনতে পাই;যিনি নিজের স্বর অব্যক্ত রাখিয়া কেবলমাত্র সেই প্রতিধ্বনিতে ইচ্ছামত দূরে সুস্পষ্টরূপে উত্তেজিত করিতে পারেন, তিনি প্রকৃত ভেস্ট্রোকুইলিস্ট।’

    তাঁর সময়ে উপন্যাস রাজত্বে সম্রাটের স্থানে আসীন বঙ্কিমচন্দ্র। সেকারণে ভাষার ভঙ্গিমায় তিনি বঙ্কিমচন্দ্রকে অনুসরণ করেছেন—’প্রভাত হইলে কাহার? বিষাদ, আনন্দ কাহার উত্তমর্ণের, তাহার একদিনের সুদ বাড়িল। আর কাহার, কয়েদী তস্করের; তাহার একদিনের মেয়াদ কমিল।’

    আমরা এই খণ্ডে পাঁচকড়ি দে-রচিত পাঁচটি রহস্য উপন্যাসের সংকলন ঘটিয়েছি। পরবর্তী খণ্ডগুলিও একে একে প্রকাশিত হবে। সেখানে পাঁচকড়ির রচনা-বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমরা আরও কথা বলবো—যেমন তাঁর রচিত গোয়েন্দা চরিত্র, সহকারী গোয়েন্দা-চরিত্র, পুলিশের ভূমিকা ইত্যাদি প্রকাশ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হবে। এখন সংকলিত উপন্যাস-পঞ্চকের মধ্যে তিনটি উপন্যাস সম্পর্কে সমসাময়িক কালের বক্তব্য তুলে দিয়ে তৎকালীন প্রতিক্রিয়ার কথা একালের পাঠকের সমীপে নিবেদন করি—

    মায়াবিনী উপন্যাসের আগে তিনি ‘মনোরমা’ উপন্যাস লেখেন। এই মায়াবী যখন ‘গোয়েন্দার গ্রেপ্তার’ সাময়িকপত্রে ধারাবাহিকভাবে বের হচ্ছিল—তখন এর নাম ছিল ‘জুমেলিয়া’। তিনফর্মা ছাপা হয়েছিল, পরে বাকি অংশটি লিখে তিনি একেবারে বই আকারে যখন প্রকাশ করলেন—তখনই নাম বদলে হয় ‘মায়াবিনী’। তিনি চেষ্টা করতেন প্রতি পুনর্মুদ্রণে বইকে পরিমার্জিত করার। যেমন দ্বিতীয়বার ছাপার সময় মায়াবিনী উপন্যাসের ভূমিকায় লেখেন—’এখানে ইহার অনেকাংশ পরিবর্ধিত হইয়াছে, অনেকাংশ পরিত্যাগ করা গিয়াছে, এবং কোন কোন স্থান পুনর্বার লিখিত হইয়াছে। মুদ্রাঙ্কণকার্যও পূর্বাপেক্ষা সুসম্পাদিত করা গেল এবং তিনখানি ছবি দেওয়া হইল।’

    মায়াবিনীর আগে যে ‘মায়াবী’ রহস্যন্যাস লেখা হয়েছিল—সেটি সম্পর্কে ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকা ২ জ্যৈষ্ঠ ১৩১২ তারিখে মন্তব্য করেছিলেন—

    “আমরা অন্যান্য অনেক লেখকের ও অনেক ডিটেকটিভ উপন্যাস পড়িয়াছি কিন্তু তন্মধ্যে কোনখানি শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বাবু লিখিত উপন্যাসের ন্যায় হৃদয়গ্রাহী নয় নাই। হয়ত সেগুলিতে নানা রকমের বীভৎস ঘটনার দ্বারা কেবল একটা গল্প তৈয়ারী করা হইয়াছে মাত্র, কিন্তু বাঁধন নাই, গল্প সাজাইবার যে একটা কৌশল থাকা দরকার তাহাও নাই। নতুবা হয়ত কোন একখানি ইংরাজি বা ফরাসী উপন্যাসের ধারাবাহিক অক্ষম অনুবাদ। ‘মায়াবী’র ঘটনা সর্ব্বাঙ্গসুন্দর। ভাষাও গ্রন্থকারের নিজস্ব; যেমন প্রাঞ্জল তেমনি মধুর। গ্রন্থকারের গল্প সাজাইবার বেশ হাত আছে—রহস্য বিন্যাসের ক্ষমতাও অতুলনীয়। একবার পড়িতে আরম্ভ করিলে শেষ পৃষ্ঠার শেষ পংক্তি পর্যন্ত পাঠককে বিপুল আগ্রহে অগ্রসর হইতে হয়।”

    এবার ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘নীলবসনা সুন্দরী’ বইটি সম্পর্কে কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন ‘জাহ্নবী’ পত্রিকায় প্রথম বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যায় যে সমালোচনাটি করেছিলেন—তা উদ্ধার করে দিই—

    “নীল বসনা সুন্দরী, হত্যাকারী কে? শ্রী পাঁচকড়ি দে প্রণীত। এই দুইখানি ডিটেকটিভ উপন্যাস আমরা স্বীকার করতে বাধ্য, আমরা সচরাচর ইংরাজি ও ফরাসীস্ লেখকদিগের রচিত যেসব ডিটেকটিভ উপন্যাস পাঠ করি, তদপেক্ষা সমালোচ্য উপন্যাস দুখানি কোন অংশে হীন নহে। ভাষা বেশ সরল, সুন্দর যেন জলধারার মত বহিয়া যাইতেছে। লেখক সুনিপুণ কৌশলে, মুন্সিয়ানার সহিত, ওস্তাদির সহিত পাঠককে গ্রন্থের প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করিতে বাধ্য করেন। কৌতূহল চরিতার্থ করিবার জন্য এক দুর্দমনীয় ব্যাকুলতা জন্মে। লেখকের পক্ষে ইহা কম বাহাদুরীর বিষয় নহে।”

    ‘বঙ্গভূমি’ পত্রিকা (১৯ মাঘ ১৩১১) পাঁচকড়ির সবচেয়ে সাড়াজাগানো রচনা ‘নীলবসনা সুন্দরী’ সম্পকে লিখেছিলেন :

    “নীলবসনা সুন্দরী বঙ্গ সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ডিটেকটিভ ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি দে প্রণীত। ইনি সাহিত্য সমাজে সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। আমরা এই পুস্তক অত্যন্ত আগ্রহের সহিত পাঠ করিয়াছি। পূর্বে বাংলায় ভালো ডিটেকটিভ উপন্যাস ছিল না, শ্রীযুক্ত পাঁচকড়িবাবু বঙ্গীয় পাঠকগণের সে অভাব পূরণ করিয়াছেন। আমরা তাঁহার ডিটেকটিভ উপন্যাসের সমাদর করি। তাঁহার ন্যায় প্রতি পরিচ্ছেদে এমন নব নব কৌতূহল সৃষ্টি করিবার ক্ষমতা কাহারও দেখি না। যদি এমন উপন্যাস পড়িতে চাহেন, যাহা একবার পড়িয়া তৃপ্তি হয় না, দশবার পড়িয়া দশ জনকে শুনাইতে ইচ্ছা করে তবে এই ‘নীলবসনা সুন্দরী’ পাঠ করুন। পড়িতে পড়িতে যেন এই উপন্যাস চুম্বকের আকর্ষণে পাঠককে টানিয়া লইয়া যায়। ঘটনা কৌতূহলজনক, ভাষাও তেমন সরল ও তরল, যেন নির্ঝরিণীর ন্যায় তরতর বেগে বহিয়া যাইতেছে। শব্দচ্ছটাও অতি সুন্দর। বঙ্গ সাহিত্যে গ্রন্থকারের ডিটেকটিভ উপন্যাস যথেষ্ট সমাদর লাভ করিবে।”

    “হত্যাকারী কে?” (দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯০৭) সম্পর্কে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় (৩ বর্ষ ১ সংখ্যা) বিখ্যাত সমালোচক চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায় মন্তব্য করেছিলেন :

    “হত্যাকারী কে? পাঁচকড়ি দে প্রণীত একখানি ডিটেকটিভ গল্প এবং সে হিসাবে ইহাতে বিবৃত ঘটনার সমাবেশ এবং অনুসন্ধানের প্রণালীতে কারিকুরীর পরিচয় পাওয়া যায়। অক্ষয়বাবু যে একজন সুদক্ষ ডিটেকটিভ ইহা গ্রন্থকার দেখাইতে সমর্থ হইয়াছেন। ভাষাও প্ৰশংসার্হ।”

    আর ১৯ ভাদ্র ১৯১০ তারিখের ‘বসুমতী’ মন্তব্য করেছিলেন—

    “গল্পটি বেশ হইয়াছে, গল্পটি আদ্যোপান্ত পাঠ করিবার পর সত্য সত্যই জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা করে হত্যাকারী কে? ইহাতে লেখকের বাহাদুরী প্রকাশ পাইয়াছে। যে পাঠকগণ ডিটেকটিভ গল্প পাঠ করিতে বিশেষ উৎসুক, এই পুস্তকখানি তাঁহাদের নিশ্চয়ই ভালো লাগিবে।”

    পাঁচকড়ির বই ইংরেজির মতও বহু ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়ে তাঁর জনপ্রিয়তার পরিসরকে বহুধাবিস্তৃত করেছিল। সেই প্রবাহকে একালেও বহমান রাখার জন্যে আমাদের খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশের এই আয়োজন।

    দোলযাত্রা ১৪১৬
    বারিদবরণ ঘোষ

    সূচি

    • নীলবসনা সুন্দরী
      ‘নীল বসনা সুন্দরী’ পাঁচকড়ি দে’র একটি সাড়া জাগানো উপন্যাস। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে। ১৩১১ বঙ্গাব্দের ১৯শে মাঘ ’বঙ্গভূমি’ পত্রিকায় উপন্যাসটি সম্বন্ধে লেখা হয়েছে— “‘নীলবসনা সুন্দরী’ বঙ্গ সাহিত্যের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ডিটেক্টিভ ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি দে প্রণীত। ইনি সাহিত্য সমাজে সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। আমরা এই পুস্তক অত্যন্ত আগ্রহের সহিত পাঠ করিয়াছি। পূর্ব্বে বাংলায় ভালো ডিটেক্টিভ উপন্যাস ছিল …
    • পাঁচকড়ি দে রচনাবলী
      সম্পাদনা : বারিদবরণ ঘোষ করুণা প্রকাশনী, কলকাতা প্রথম প্রকাশ : ১লা বৈশাখ, ১৪১৭ প্রচ্ছদ : ইন্দ্রনীল ঘোষ ॥ রোমাঞ্চন ॥ বাংলা রহস্যকাহিনির একটা পর্বের ইতিবৃত্ত লিখতে গিয়ে বড়ো ধন্দে পড়া গেছে। কাকে রহস্য কাহিনি বলা যাবে? সংস্কৃত মতে, এমনকি বাংলা মতেও ‘রহস্য’ অনেকটা ঠাট্টা বিদ্রুপের দলে পড়ে, যেমন গোপাল ভাঁড়ের রহস্য। ইংরেজি মতে আবার রহস্যের নানা ব্যাখ্যান–এডভেঞ্চার, থ্রিলার, শিকার, ক্রাইম, …
    • মায়াবিনী
      বিজ্ঞাপন প্রথম বার। গতবর্ষে “গোয়েন্দার গ্রেপ্তার” নমাক সাময়িক পত্রিকায় “জুমেলিয়া” নামে এই পুস্তকের ৩ ফর্ম্মা বাহির হইয়াছে। এক্ষণে অবশিষ্ট ফৰ্ম্মাগুলি মুদ্রাঙ্কিত করিয়া পুস্তক সম্পূর্ণ করা গেল। “জুমেলিয়া” নামের পরিবর্ত্তে “মায়াবিনী” নামে সম্পূর্ণ পুস্তক স্বতন্ত্র আকারে বাহির হইল। দ্বিতীয় বার। এক্ষণে ইহার অনেকাংশ পরিবর্তিত হইয়াছে, অনেকাংশ পরিত্যাগ করা গিয়াছে, এবং কোন কোন স্থানে পুনর্ব্বার লিখিত হইয়াছে। মুদ্রাঙ্কণকার্য্যেও পূৰ্ব্বাপেক্ষা সুসম্পাদিত করা …

    নীলবসনা সুন্দরী
    মায়াবিনী
    মায়াবী
    হত্যা রহস্য
    হত্যাকারী কে

  • নীলবসনা সুন্দরী

    নীলবসনা সুন্দরী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    ‘নীল বসনা সুন্দরী’ পাঁচকড়ি দে’র একটি সাড়া জাগানো উপন্যাস। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে। ১৩১১ বঙ্গাব্দের ১৯শে মাঘ ’বঙ্গভূমি’ পত্রিকায় উপন্যাসটি সম্বন্ধে লেখা হয়েছে— “‘নীলবসনা সুন্দরী’ বঙ্গ সাহিত্যের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ডিটেক্টিভ ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি দে প্রণীত। ইনি সাহিত্য সমাজে সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। আমরা এই পুস্তক অত্যন্ত আগ্রহের সহিত পাঠ করিয়াছি। পূর্ব্বে বাংলায় ভালো ডিটেক্টিভ উপন্যাস ছিল না, শ্রীযুক্ত পাঁচকড়িবাবু বঙ্গীয় পাঠকগণের সে অভাব পূরণ করিয়াছেন। আমরা তাঁহার ডিটেকটিভ উপন্যাসের সমাদর করি। তাঁহার ন্যায় প্রতি পরিচ্ছেদে এমন নব নব কৌতূহল সৃষ্টি করিবার ক্ষমতা কাহারও দেখি না। যদি এমন উপন্যাস পড়িতে চাহেন যাহা একবার পড়িয়া তৃপ্তি হয় না, দশবার পড়িয়া দশজনকে শুনাইতে ইচ্ছা করে তবে এই ‘নীল বসনা সুন্দরী’ পাঠ করুন। পড়িতে পড়িতে যেন এই উপন্যাস চুম্বকের আকর্ষণে পাঠককে টানিয়া লইয়া যায়। ঘটনা কৌতূহলজনক, ভাষাও তেমন সরল ও তরল, যেন নির্ঝরিণীর ন্যায় তরতর বেগে বহিয়া যাইতেছে। শব্দচ্ছটাও অতি সুন্দর। বঙ্গ সাহিত্যে গ্রন্থকারের ডিটেকটিভ উপন্যাস যথেষ্ট সমাদর লাভ করিবে।”

    নলিনী রঞ্জন পণ্ডিত সম্পাদিত ‘জাহ্ণবী’ মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে। পত্রিকাটির প্রথম বর্ষের ষষ্ঠ সংখ্যায় কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন পাঁচকড়ি দে’র দুটি উপন্যাস সম্বন্ধে লিখেছেন— “’নীল বসনা সুন্দরী’, ‘হত্যাকারী কে?’ শ্রী পাঁচকড়ি দে প্রণীত। এই দুইখানি ডিটেকটিভ উপন্যাস আমরা স্বীকার করিতে বাধ্য, আমরা সচরাচর ইংরাজী ও ফরাসীয় লেখকদের রচিত যে সব ডিটেকটিভ উপন্যাস পাঠ করি, তদপেক্ষা সমালোচ্য উপন্যাস দুখানি কোন অংশে হীন নহে। ভাষা বেশ সরল, সুন্দর যেন জলধারার মত বহিয়া যাইতেছে। লেখক সুনিপুণ কৌশলে, মুন্সিয়ানার সহিত, ওস্তাদির সহিত পাঠককে গ্রন্থের প্রথম হইতে শেষ পর্য্যন্ত পাঠ করিতে বাধ্য করেন। কৌতূহল চরিতার্থ করিবার জন্য এক দুর্দ্দমনীয় ব্যাকুলতা জন্মে। লেখকের পক্ষে ইহা কম বাহাদুরীর বিষয় নহে।”

    সাহিত্যিক ধীরেন্দ্রনাথ পালের পুত্র যতীন্দ্রনাথ পালের আকস্মিক মৃত্যুতে দীনেন্দ্রনাথ অত্যন্ত শোকগ্রস্ত হন। যতীন্দ্রনাথ ছিলেন পাঁচকড়ির বিশেষ বন্ধু। তার নামানুসারেই জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ লেনে পাঁচকড়ির বইয়ের দোকানের নাম ছিল ‘পাল ব্রাদার্স’। বন্ধুর মৃত্যুর পর তিনি আর কোন লেখা লেখেন নি। ১৯৪৫ খৃষ্টাব্দের ২০শে নভেম্বর তার মৃত্যু হয়।

    সৰ্ব্বসদ্‌গুণালঙ্ক তহৃদয়

    সুহৃদ্বর

    শ্রীযুক্ত অভয়চরণ পাল বি.এ., বি. এল.,

    বৈবাহিক মহাশয়ের নামে এই গ্ৰন্থ

    সাদরে

    উৎসর্গীকৃত হইল।

  • প্রথম খণ্ড : নিয়তি—লীলাক্ষেত্র

    প্রথম খণ্ড : নিয়তি—লীলাক্ষেত্র

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    প্রথম খণ্ড : নিয়তি—লীলাক্ষেত্র

    Cas. Vengeance, lie still, thy cravings shall be stated

    Death roams at large, the furies are unchain’d,

    and murder plays her mighty master-piece.

    Nathaniel Lee-Alexander-The Great, Act. V. Scene II.

  • দ্বিতীয় খণ্ড : নিয়তি—লীলাময়ী

    দ্বিতীয় খণ্ড : নিয়তি—লীলাময়ী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    দ্বিতীয় খণ্ড : নিয়তি—লীলাময়ী

    Coun                                      This suspense,

    This horrid fear-I can no longer bear it

    For heaven’s sake, tell me, what has taken place.”

    Coleridge :— The death of Walleustein, Act I Seene IX.

  • তৃতীয় খণ্ড : নিয়তি—রহস্যময়ী

    তৃতীয় খণ্ড : নিয়তি—রহস্যময়ী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    তৃতীয় খণ্ড : নিয়তি—রহস্যময়ী

    Mme-de Mon [aside], A clue—another clue-that I will follow,

    Until it lead to the throne!

    Lord Lytton— The Duchess de la Vulliere. Act III, Scene III.

  • চতুর্থ খণ্ড : নিয়তি—ছদ্মবেশা

    চতুর্থ খণ্ড : নিয়তি—ছদ্মবেশা

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    চতুর্থ খণ্ড : নিয়তি—ছদ্মবেশা

    “Nature naver made

    A heart all marble, but all in its fissures sows

    The wild flower Love; from whose rich seeds spring forth

    A word of mercies and sweet charities.”

    Barry Cornwall.

  • পঞ্চম খণ্ড : নিয়তি—রাক্ষসী

    পঞ্চম খণ্ড : নিয়তি—রাক্ষসী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    পঞ্চম খণ্ড : নিয়তি—রাক্ষসী

    “This is the man should do the bloody deed;

    The image of a wicked heinous fault

    Lives in his eye; that close aspect of his

    Does show the mood of a much-troubled breast.”

    Dodd’s “Beauties of Shakespeare.”

  • মায়াবিনী

    মায়াবিনী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    বিজ্ঞাপন

    প্রথম বার।

    গতবর্ষে “গোয়েন্দার গ্রেপ্তার” নমাক সাময়িক পত্রিকায় “জুমেলিয়া” নামে এই পুস্তকের ৩ ফর্ম্মা বাহির হইয়াছে। এক্ষণে অবশিষ্ট ফৰ্ম্মাগুলি মুদ্রাঙ্কিত করিয়া পুস্তক সম্পূর্ণ করা গেল। “জুমেলিয়া” নামের পরিবর্ত্তে “মায়াবিনী” নামে সম্পূর্ণ পুস্তক স্বতন্ত্র আকারে বাহির হইল।

    দ্বিতীয় বার।

    এক্ষণে ইহার অনেকাংশ পরিবর্তিত হইয়াছে, অনেকাংশ পরিত্যাগ করা গিয়াছে, এবং কোন কোন স্থানে পুনর্ব্বার লিখিত হইয়াছে। মুদ্রাঙ্কণকার্য্যেও পূৰ্ব্বাপেক্ষা সুসম্পাদিত করা গেল এবং তিনখানি ছবি দেওয়া হইল।

    গ্রন্থকার

  • প্রথম খণ্ড : নারী না পরী

    প্রথম খণ্ড : নারী না পরী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    প্রথম খণ্ড : নারী না পরী


    প্রথম পরিচ্ছেদ – নূতন সংবাদ

    একদিন অতি প্রত্যুষে দেবেন্দ্রবিজয় স্থানীয় থানায় আসিয়া ইনস্পেক্টর রামকৃষ্ণ বাবুর সহিত দেখা করিলেন।

    যাঁহারা আমার “মনোরমা” নামক উপন্যাস পাঠ করিয়া আমাকে অনুগৃহীত করিয়াছেন, তাঁহাদিগকে দেবেন্দ্রবিজয় মিত্রের পরিচয় আর নূতন করিয়া দিতে হইবে না। যে সময়কার ঘটনা বলিতেছি, তখনকার ইনি একজন সুপ্রসিদ্ধ, সুদক্ষ ও শ্রেষ্ঠ ডিটেক্‌টিভ। তাঁহার ভয়ে তখন অনেক চোর চুরি ছাড়িয়াছিল, অনেক ডাকাত ডাকাতি ছাড়িয়াছিল, অনেক জালিয়াৎ জালিয়াতী ছাড়িয়াছিল; স্ব স্ব ব্যবসায়ে এরূপ একটা অপরিহার্য্য ব্যাঘাত ঘটায় সকলে কায়মনোবাক্যে অহর্নিশ ইষ্টদেবতার নিকটে দেবেন্দ্রবিজয়ের মরণ আকাঙ্খা করিত। সকলেই ভয় করিত; ভয় করিত না—গর্বিত জুমেলিয়া। সে ইষ্টদেবতার নিস্ফলসহায়তার প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করিয়া, সেই সময়ে স্বহস্তে দেবেন্দ্রবিজয়কে খুন করিবার জন্য ‘মরিয়া’ হইয়া উঠিয়াছিল। সে তাঁহাকে আন্তরিক ঘৃণা করিত। দেবেন্দ্রবিজয় যদি তেমন একজন ক্ষমতাবান, বুদ্ধিমান লোক না হইয়া একটি ক্ষুদ্র পিপীলিকা হইতেন, তাহা হইলে সে তাঁহাকে পদতলে দলিত করিয়া মনের সাধ মিটাইতে পারিত। তা’ না হইয়। দেবেন্দ্র কি না প্রতিবারেই তাহাকে হতদর্প করিল—ছিঃ—ছিঃ—ধিক্ ধিক্‌; এই সব ভাবিয়া জুমেলিয়া আরও আকুল হইয়া উঠিত। এই বর্তমান আখ্যায়িকা পাঠ করিবার পূৰ্ব্বে পাঠকের ‘মনোরমা’ নামক পুস্তকখানি পাঠ করিলে ভাল হয়; এখানিকে মনোরমা পুস্তকের পরিশিষ্ট বলিলেও চলে।

    যখন দেবেন্দ্রবিজয় রামকৃষ্ণ বাবুর সহিত দেখা করিলেন, তখন তিনি নিশ্চিন্তমনে বাঁশের সংক্ষিপ্ত সংস্করণের ন্যায় একটি চুরুট দন্তে চাপিয়া ধুমপান করিতেছিলেন; তেমনি পরম নিশ্চিন্তমনে দেখিতেছিলেন, সেই ধূমগুলি কেমন কুণ্ডলীকৃত হইয়া, উন্মুক্ত বাতায়ন পথ দিয়া, দল বাধিয়া বাহির হইয়া যাইতেছিল। তেমন প্রত্যুষে দেবেন্দ্রবিজয়কে সহস৷ সেই কক্ষমধ্যে প্রবিষ্ট হইতে দেখিয়া তিনি কিছু বিস্মিত হইলেন। সসম্মানে তাহাকে নিজের পার্শ্বস্থিত চেয়ারে বসাইয়া বলিলেন, “কি হে, ব্যাপার কি? আমাকে দরকার না কি? এত সকালে যে?”

    দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, “ব্যাপার বড় আশ্চৰ্য্য; শুনলেই বুঝতে পারবে, ব্যাপারটা কতদূর অলৌকিক; তেমন অলৌকিক ঘটনা কেউ কখনও দেখে নাই—শুনে নাই।”

    রাম। এমন কি ঘটনা হে?

    দেবেন্দ্র। বড়ই অলৌকিক—একেবারে ভৌতিক-কাণ্ড–তুমি শুনলে তোমারও বিস্ময়ের সীমা থাকবে না।

    রাম। বেশ, আমিও বিস্মিত হইতে চাই। প্রায় দশ বৎসরের মধ্যে আমি একবারও বিস্ময়ান্বিত হইয়াছি কি না সন্দেহ; তোমার কথায় যদি এখন তা ঘটে, সে বিস্ময়টায় কিছু-না-কিছু নূতনত্ব আছেই।

    দেবেন্দ্র। ফুলসাহেবকে তোমার স্মরণ আছে?

    রাম। বিলক্ষণ!

    দেবেন্দ্র। জুমেলিয়াকে? যে এতদিন জাল-মনোরমা সেজে নিজের বাহাদুরী দেখাইতেছিল, শেষে হাজরার বাগান-বাড়ীতে আত্মহত্য করে, তাকে স্মরণ আছে কি?

    রাম। হা, সেই পিশাচী ত?

    দেবেন্দ্র। সত্যই সে পিশাচী বটে!

    রাম। তার কি হয়েছে?

    দেবেন্দ্র। তার মৃত্যুর বিবরণটা কি এখন তোমার বেশ স্মরণ আছে?

    রাম। বেশ আছে!

    দে। জুমেলিয়ার দেহ যতক্ষণ না কবরস্থ করা হয়েছিল, ততক্ষণ আমি তৎপ্রতি সতর্ক-দৃষ্টি রেখেছিলাম ব’লে, তুমি আর কালীঘাটের থানার ইনস্পেক্টর হেসেই অস্থির।

    রাম। শুধু কবরস্থ নয়—সেই শবদেহ কবরস্থ ক’রে কবর-স্মৃত্তিক পূর্ণ করা পৰ্য্যন্ত তোমার সতর্ক দৃষ্টি সমভাবে ছিল। ইহা ত হাসিবারই কথা, দেবেন্দ্র বাবু! [ হাস্য ]

    দেবেন্দ্র। এখন সেই ঘটনা, আমার সে সতর্কতা যে বৃথা নয়, তা’ প্রমাণ করেছে। তবু যতদুর সতর্ক হওয়া আবশ্যক, তা আমি হ’তে পারি নি; আরও কিছুদিন সেই কবরের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখাই আমার উচিত ছিল।

    রা। অ্যাঁ—বল কি হে! তোমার মাথাটা নিতান্ত বিগড়াইয়। গিয়াছে দেখছি। কবরের উপর এত সাবধানত কেন? তার পর তুমি জুমেলিয়ার কবরের উপর আর পাহারী দিয়াছিলে কি?

    লে। হ্যাঁ, এক সপ্তাহ।

    রা। যে লোক ম’রে গেছে—যাকে পাঁচ হাত মাটির নীচে কবর দেওয়া হয়েছে—তার উপর তুমি এক সপ্তাহ নজর রেখেছ; এখনও আবার বল্‌ছ যে, আরও কিছুদিন নজর রাখতে পারলে ভাল হ’ত, –এ সব কথার অর্থ কি? মাটির নীচে—এক সপ্তাহ—তবু যে কোন মানুষ বাঁচতে পারে, তা আমার বুদ্ধির অগম্য।

    দে। তা’ মিথ্যা বল নাই, এরূপ স্থলে সাধারণ লোকের পক্ষে জীবিত থাকা অসম্ভব।

    রা। দেবেন্দ্র বাবু, মৃত্যুর কাছে আবার সাধারণ আর অসাধারণ কি?

    দে। তুমি কি আরবদেশের ফকিরদিগের এরূপ পুনরুখান সংক্রান্ত কোন ঘটনার কথা কখনও শোন নাই?

    রা। অনেক সময়ে অনেক শুনেছি।

    দে। তারা কি করে জান?

    রা। হ্যাঁ, কিছু কিছু।

  • দ্বিতীয় খণ্ড : শঠে শাট্যং সমাচরেৎ

    দ্বিতীয় খণ্ড : শঠে শাট্যং সমাচরেৎ

    দ্বিতীয় খণ্ড – শঠে শাট্যং সমাচরেৎ

    প্রথম পরিচ্ছেদ
    সন্ধানে

    রেবতী যতই কেন বুদ্ধিমতী হউন না, জুমেলিয়ার প্রতারণ-জলে ছিন্ন করা তাহার সাধ্যাতীত। যে লোক সংবাদ আনিয়াছিল, সে পাহারাওয়াল-পুলিশের লোক—বিশেষতঃ সেখানকার থানার ও রামকৃষ্ণ বাবুর তাঁবের; তাহাকে রেবতী কি প্রকারে সন্দেহ করিবেন? যদি সন্দেহের কিছু পাকিত, শচীন্দ্র পূৰ্ব্বেই চুটিয়া আসিয়া তাহাকে প্রকৃত সংবাদ জানাইত; কিন্তু তাহা না করিয়া সেই শচীন্দ্রই যখন তাঁহাকে যাইবার জন্য পত্র লিথিয়াছে, তখন আর রেবতীর অবিশ্বাসের
    কারণ কোথায়?
    আরও একটা বিশেষ চিন্ত দেবেন্দ্রবিজয়ের মস্তষ্ক একেবারে অস্থির করিয়া তুলিল; শচীন্দ্র এখনও ফিরিল না কেন, জুমেলিয়া কি প্রকারে তাহার প্রত্যাগমনে বাধা ঘটাইল?
    পত্ৰখানি—যাহা শচীন্দ্রের লিখিত বলিয়া স্থিরীকৃত, সম্পূর্ণরূপে জাল; অবিকল শচীন্দ্রের হস্তলিপি, বেবতী তাহাতে সহজেই প্রবঞ্চিত হইয়াছেন। যাহাতে সামান্তমাত্র সন্দেহের সম্ভাবনা না থাকে, এইজন্য ষড়যন্ত্রকারীরা শচীন্দ্রের প্রস্থানের পর আরও একঘণ্টা সময় অপেক্ষা করিয়া, শচীন্দ্রের নামে জাল পত্র লিখিয়া আনিয়া রেবতীর হস্তে অর্পণ করিয়া থাকিবে।
    কি ভয়ানক জটিল চাতুরী! এখন—এমন –সময়ে—এই বিপৎকালে দেবেন্দ্রবিজয় অপেক্ষা করিয়া থাকা ভিন্ন আর কি করিবেন? গায়ের জোরে রাস্তার ছুটিয়া বাহির হইলেই বা কি হইবে – কি উপকার দর্শিবে? কাহাকে উপায় জিজ্ঞাসিবেন? দেবেন্দ্রবিজয় অপেক্ষা আর কে এ
    সম্বন্ধে বিশেষ জ্ঞাত আছে?
    কাজেই তখন তাঁহাকে অপেক্ষা করিতে এবং কি করিবেন, তাহাই ভাবিয়া ঠিক করিয়া লইতে হইল।
    দেবেন্দ্রবিজয় ভাবিতে লাগিলেন, “অসম্ভব। শচীন্দ্রকে জুমেলিয়া এই দিনের বেলায় কখনই নিজের করায়ত্ত করিতে সক্ষম হয় নাই, অন্ত কোন কৌশলে তাকে মিথ্যানুসরণে দুরে ফেলেছে; তাই সে এখনও ফিরে নাই; পিশাচী জুমেলিয়া সহজে স্বকাৰ্য্য সমাধা করেছে; আপাততঃ কোন সুবিধার অপেক্ষায় থাকা আমার কর্তব্য।”
    কিয়ৎক্ষণ পরে শ্ৰীশচন্দ্র ৩৫নং পাহারাওয়ালাকে সমভিব্যাহারে লইয়া উপস্থিত হইল।
    দেবেন্দ্রবিজয় সেই পাহারাওয়ালাকে “তুমি এইখানে বস; এখনই আমি আসছি, বলিয়৷ শ্ৰীশচন্দ্রকে লইয়া কক্ষান্তরে গমন করিলেন। দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসিলেন, “শ্ৰীশ, কি বুঝলে?”
    “এ সে লোক নয়।”
    “আমিও তা জানি।”
    “এর নাম আবদুল।”
    “তুমি একে চেন কি ?”
    “ভাল রকম চিনি, ছেলেবেলা থেকে ওকে দেখে আসছি।”
    “চেষ্টা করলে তোমার উপরে কিছু চালাকি চালাতে পারে কি?”
    “না।“
    * * * * *
    দেবেন্দ্রবিজয় বৈঠকখানাগৃহে তখনই ফিরিলেন। পাহারাওয়ালাকে জিজ্ঞাসিলেন, “আবদুল, আড়াইঘণ্টা পূৰ্ব্বে তুমি কোথায় ছিলে?”
    পাহারাওয়ালা বলিল, “বাড়ীতে মশাই।”
    “কোথায় তোমার বাড়ী?”
    “এই রাজার বাগানে ৷”
    “আজ কোন জিনিষ তুমি হারিয়েছ?”
    “ই মহাশয়, আমার চাপ্‌রাসখানা।”
    “কখন—কেমন ক’রে হারালে?”
    “তখন আমি ঘুমুচ্ছিলেম, একজন লোক এসে আমার স্ত্রীর নিকটে চাপ্‌রাসখানা চায়, তাতে আমার স্ত্রী তাকে জিজ্ঞাসা করে, কোন চাপ্‌রাস?”
    “যেখানা পাহরাওয়ালা সাহেব মেরামত করতে দিবে বলেছিল।”
    “তিনি এখন ঘুমাচ্ছেন’, আমার স্ত্রী তাকে বলে।”
    “তাতে সে বলে ‘আজ আমার হাত খালি আছে, চাপ্‌রাসথান ঠিকঠাক ক’রে ফেলব; এর পর পেরে উঠব না; আজ সন্ধ্যার পরেই অনেক কাজ আসবে; চাপ্‌রাস কি—একমাস আমি আর কোন কাজ হাতে করতে পারব না; যদি পার, খুঁজে বের করে এনে দাও, ছ’ঘণ্টার মধ্যে আমি ঠিক ক’রে দিয়ে যাব।’ আমার স্ত্রী তাকে তখন আমার চাপ্‌রাস খানা বের ক’রে দেয়।”
    দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “ইহার মধ্যে তুমি কোন লোককে তোমার চাপ্‌রাস মেরামতের কথা বলেছিলে?”
    পাহারাওয়ালা! হাঁ। এ বড় মজার কথা দেখছি।
    দেবেন্দ্র। কি রকম?
    পা। তার পর যখন আমার ঘুম ভাঙে, আমার স্ত্রী আমাকে সকল কথাই বললে। কিছুদিন হ’ল, আমি নীলু মিস্ত্রীকে আমার চাপ্‌রাসটা পালিস করে দিতে বলেছিলেম, তাতে ভাবলেম, নীলু মিস্ত্রীই চাপ্‌রাসখানা নিয়ে গেছে।
    দে। ভাল, তার পর?
    পা। আমি তখনই নীলু মিস্ত্রীর কাছে যাই, সে আমার কথা শুনে একেবারে আশ্চৰ্য্য হ’য়ে গেল; চাপরাসের কথা সে কিছুই জানে না।
    দে। যে লোকটা তোমার স্ত্রীর কাছ থেকে চাপ্‌রাসখানা নিয়ে গিয়ে ছিল, তার চেহারা কেমন—তোমার স্ত্রী সে বিষয়ে কিছু বলতে পারে?
    পা। তাই ত বলছি মশাই, বড়ই মজার কথা! আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সে যে চেহারার কথা বললে, তাতে নীলু মিস্ত্রীকেই বেশ বুঝায়।
    দে। তুমি এখন কি বুঝছ?
    পা। বুঝব আর কি? আমি দশ বৎসর নীলু মিস্ত্রীকে দেখে আসছি, সে খুব ভাল লোক; সে যেকালে কালীর দোহাই দিয়ে, ধৰ্ম্মের দোহাই দিয়ে বললে, সে আমার চাপ্‌রাসের কথা কিছুই জানে না, তাতে তার কথা আমি কি ক’রে অবিশ্বাস করি?
    দে। তোমার স্ত্রীর নিকট হ’তে চাপ্‌রাসখানা কেউ ফাকি দিয়ে নিয়েছে ব’লে বোধ হয় কি?
    পা। হাঁ, তাই এখন আমার বেশ বোধ হচ্ছে।

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
    শচীন্দ্রের প্রবেশ

    দেবেন্দ্রবিজয় তখনই অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইবার নিমিত্ত বন্দোবস্ত করিতে লাগিলেন; বুঝিলেন, শচীন্দ্রের অপেক্ষায় আর বিলম্ব করা শ্রেয়ঃ নহে। যখন তিনি আবশ্যক মত ছদ্মবেশ পরিধান করিয়া গমনোদ্যত হইয়াছেন, বহির্দ্বারে বানাৎ করিয়া কি একটা শব্দ হইল; কে যেন সজোরে দ্বার উন্মুক্ত করিয়া ফেলিল—তৎপরে অতিদ্রুত পদশব্দ। দেবেন্দ্রবিজয় বুঝিলেন, সে পদশব্দ শচীন্দ্রের। তখন শচীন্দ্র অতিদ্রুত সোপানারোহণ করিতেছে। দেবেন্দ্রবিজয় তাহার দুই হস্ত ধরিয়া টানিয়া লইয়া শয়নকক্ষে প্রবিষ্ট হইলেন; জিজ্ঞাসিলেন, “শচীন্দ্র, ব্যাপার কি! কি হয়েছিল তোমার?”
    শচীন্দ্র। এতক্ষণ আমি অজ্ঞান হ’য়ে পড়েছিলাম; একটা লোক পিছন দিক থেকে আমায় লাঠী মারে।
    দেবেন্দ্র। কখন, কোথায়?
    শ। পদ্মপুকুরের বড় রাস্তা ছেড়ে যেমন জেলে-পাড়ার ভিতর ঢুকেছি।
    দে। কোথায় লাঠী মেরেছে?
    শ। মাথার উপরে। ,
    দে। কে মেরেছে, জান?
    শ। আমি তাকে দেখি নি, তখুন সেখানে যারা ছিল, তাদের মুখে শুনলেম, একজন মুসলমান।
    দে। সে পালিয়েছে?
    শ। হাঁ।
    দে। কোথায় লাঠী মেরেছে দেখি, মাথা ফেটে যায় নাই ত?
    শ। না, উপরকার একটু চামড়া কেটে গিয়ে খানিকট রক্ত বেরিয়ে গেছে। আঘাত সাঙ্ঘাতিক নয়—ব্রজেন্দ্র ডাক্তারের ডিস্পেন্সারীর সম্মুখে অজ্ঞান হ’য়ে পড়ি; ডাক্তার-বাবু তখন তথায় ছিলেন। আমাকে তখনই তার ডিস্পেন্সারীতে তুলে নিয়ে গিয়ে যেখানটা কেটে গিয়েছিল, সেখানটায় ঔষধ দিয়ে রক্ত বন্ধ ক’রে দিয়েছেন। ষা’ই হ’ক, মামী-মা’র জন্যই আমার সন্ধান নিতে যাওয়া —মামী-মা কোথায়? .
    দে। নাই—বাড়ীতে নাই!
    শ। সে কি!
    দে। ষড়যন্ত্রকারীরা আবার লোক পাঠিয়েছিল; তোমার নাম জাল ক’রে একখানা পত্র লিখে পাঠায়।
    শ। তবে মামী-মা কি আবার জুমেলিয়ার হাতে পড়েছে?
    দে। জুমেলিয়া ভিন্ন কে আর এমন সাহস করবে? কার সাহস হবে? কে আর দেবেন্দ্রের উপর এমন চাতুরীর খেলা খেলতে পারে? আমি এখনই চললেম।
    শ। কোথায়?
    দে। রাজার বাগানে নীলু মিস্ত্রীর বাড়ীতে।
    শ। সেখানে কেন, মামা-বাবু? কি হয়েছে—আমায় সব কথা ভেঙে বলুন।
    দে। আবদুল পাহারাওয়ালার চাপ্‌রাস চুরি গেছে। নীলু মিস্ত্রীকে সে চাপ্‌রাস পালিস করতে দিব বলেছিল; তার অজ্ঞাতে তার স্ত্রীর কাছ থেকে নীলু মিস্ত্রী সে চাপ্‌রাস চেয়ে নিয়ে যায়; এখন অস্বীকার করছে—এখন আমাকে—
    দেবেন্দ্রবিজয়ের কথা সমাপ্ত হইবার পূৰ্ব্বে সদর দরজায় আবার একটা উচ্চ শব্দে আঘাত হইল; তৎক্ষণাৎ ছুটিয়া আসিয়া শ্ৰীশচন্দ্র একখানি পত্র হস্তে সেই কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিল, পত্ৰখানি সে দেবেন্দ্র বিজয়ের হাতে দিল।

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ
    জুমেলিয়ার দ্বিতীয় পত্র

    দেবেন্দ্রবিজয় তখনই সেই পত্র পাঠ করিলেন;–
    “দেবেন্দ্রবিজয়!
    তোমার স্ত্রী এখন আমার হাতে পড়িয়াছে ৷ আমি তাহাকে ছাড়িয়া দিতে পারি কি না, তাহ এখন তোমার উপর নির্ভর করিতেছে। সে এখন আমার কোন ঔষধ—কোন দ্রব্যগুণে অচেতন হইয়া আছে; যদি যথাসময়ে ঠিক সেই ঔষধের কাটান ঔষধ দেওয়া যায়, তাহ হইলে তোমার স্ত্রীর কোন ক্ষতি হইবে না। তার জীবন ও মৃত্যু তোমার হাতে; তুমি জান—তুমি বলিতে পার, সে বাচিবে কি মরিবে।
    যদি এখন আমি তাহাকে তাহার সেই অজ্ঞান অবস্থায় তোমার হাতে দিই; কোন ডাক্তার, কোন কবিরাজ, যত নামজাদা ভাল চিকিৎসক হউক না কেন, কেহই রক্ষা করিতে পরিবে না। সকলেই তাহাকে মৃত বলিয়াই বিবেচনা করিবে—কিন্তু সে জীবিত আছে।
    তোমার নিকটে আমার এক প্রস্তাব আছে; আমি জানি, তোমার কথা তুমি ঠিক বজায় রাখিয়া থাক ও রাখিতে পার। প্রস্তাব কি—পরে জানিতে পারিবে; আমার প্রাণের ভিতরে এখন আশা ও নৈরাপ্ত উভয়ে মিলিয়া বড়ই উৎপাত করিতেছে।
    অন্তরাত্রি ঠিক এগারটার পর বালিগঞ্জের বাগান-বাড়ীতে সাক্ষাৎ করিবে; লাহিড়ীদের বাগান, বাগানের পশ্চিম প্রান্তে যে কাঠের ঘর আছে, সেইখানে সাক্ষাৎ করিবে। আসিবার সময়ে সঙ্গে কোন অস্ত্রশস্ত্ৰ আনিয়ো না; আমার সঙ্গে দেখা হইলে বিনাবাক্যব্যয়ে আমার অনুসরণ করিবে; যেখানে আমি তোমাকে লইয়া যাইব, তোমাকে যাইতে হইবে; ইচ্ছা আছে, তোমার পত্নীকে মুক্তি দিবার জন্য একটা সুপরামর্শ ও সন্ধি স্থির করিব।
    যদি তুমি অপর কাহাকেও সঙ্গে লইয়া এস, আমার সহিত সাক্ষাৎ হইবে না—আমাকে দেখিতে পাইবে না; যদি তুমি আমাকে গ্রেপ্তার করিতে কি আমার কোন ক্ষতি করিতে চেষ্টা কর, তোমার স্ত্রী অসহায় অবস্থায় অতিশয় যন্ত্রণা • পাইরা দন্ধিয়া দন্ধিয়া মরিবে; কেহই তাহাকে বাঁচাইতে পারিবে না; ইতোমধ্যে যদি তুমি আমাকে হত্যা কর, তোমার স্ত্রীর মৃত্যু অনিবাৰ্য্য হইয়া উঠিবে—তুমি আমাকে জান।
    যেখানে যখন সাক্ষাৎ করিতে লিখিলাম, আমি ঠিক সেই সময়ে তোমার সহিত একা আসিয়া দেখা করিব। তোমার নিকটে আমি যে প্রস্তাব করিব, তাহাতে যদি তুমি অসম্মত হও, শেষ ফল কি ঘটে, জানিতে পারিবে। আমি তোমার প্রতিজ্ঞা করিয়া বলিতেছি, তোমার কোন বিষয়ে কিছুমাত্র অনিষ্ট ঘটিবে না। তুমি একাকী আসিয়ে, আশঙ্কা করিবার কোন কারণ নাই। আমার যাহা অনুরোধ, তোমার নিকটে বলা হইলে, তাহাতে তুমি সন্মত হও বা না হও, স্বচ্ছন্দে তোমার নিজের বাড়ীতে তুমি ফিরিবে। যতক্ষণ না তুমি বাড়ীতে ফিরিয়া যাও, ততক্ষণ জুমেলিয়া তোমার প্রতি শক্ৰতাচরণ করিবে না। তুমি গৃহে উপস্থিত হইলে—যেমন এখন আছ—তোমার যেমন অবস্থা হইতে তোমাকে আমি ডাকিতেছি, যতক্ষণ ঠিক তেমন অবস্থায় না ফিরিবে, ততক্ষণ জুমেলিয়া চুপ করিয়া থাকিবে—তোমার কোন অনিষ্ট করিবে না। এমন কি অপর কোন শক্র কর্তৃক যদি তোমার একটি কেশের অপচয় ঘটিবার কোন সম্ভাবনা দেখে, জুমেলিয়া প্রাণপণে তাহাও হইতে দিবে না।
    তুমিই এখনও তোমার পত্নীর জীবন রক্ষা করিতে পার; কি প্রকারে পার, তাহা এখন বলিব না; রাত এগারটার পর দেখা করিলে বলিব।
    স্মরণ থাকে যেন, তোমার স্ত্রী এখন বাইশ হাত জলে পড়িয়াছে।
    তুমি আমাকে জান—
    জুমেল।”

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ
    ****

    পত্রপাঠ সমাপ্তে দেবেন্দ্রবিজয়ের মুখমণ্ডল বিবর্ণ হইয়া গেল—মলিন মুখ আরও মলিন হইয়া পড়িল; শ্রীশচন্দ্রকে দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসিলেন, “শ্রীশ, এ পত্র তুমি কোথায় পাইলে?
    শ্ৰীশ। বাড়ীর সামনে।
    দেবেন্দ্র। কে দিয়েছে?
    শ্ৰী। একটা ছোড়া।
    দে। সে কোথায় পাইল, জিজ্ঞাসা করেছিলে?
    শ্ৰী। ই, সে বললে, একটা বুড়ী এসে তার হাতে পত্ৰখানা দিয়ে আমাদের বাড়ী দেখিয়ে দেয়; বুড়ী তাকে একটা চকচকে টাকা দিয়ে গেছে।
    দে। আচ্ছ, এখন তুমি যাও।
    শ্ৰীশচন্দ্র প্রস্থান করিল।
    দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “পত্ৰখানি পড়িয়া দেখ।”
    শচীন্দ্র মনে মনে পত্ৰখানি আগাগোড়া পড়িয়া লইল। তৎপরে জিজ্ঞাসিল, “মামা-বাবু, আপনি কি তবে সেখানে যাবেন?”
    “হাঁ, যাইতে হইবে বৈকি।”
    “যাইয়া কি করিবেন?”
    “না যাইয়াই বা করিব কি?”
    “যাইয়াই বা করিবেন কি?”
    “জুমেলিয়া পত্রে সত্যকথাই লিখেছে।”
    “এ সত্য, তার অন্তান্ত সত্যের ন্যায়।”
    “আমার বিশ্বাস, এবার সে পত্রে সত্যকথাই লিখেছে।”
    “তবে আপনি যাইবেন?”
    “হাঁ।”
    “সে না প্রতিজ্ঞা করিয়াছে, আপনাকে হত্যা করিবে?”
    “হাঁ, তা? আমি জানি—মনে আছে।”
    “শুধু আপনাকে নয়, মামী-মাকে, শ্ৰীশকে আর আমাকে ৷”
    “হাঁ।”
    “মামা-বাবু, এ আবার জুমেলিয়ার নূতন ফাঁদ; এ ফাঁদে মামী-মাকে আর আপনাকে সে আগে ফেলিতে চায়।”
    “এ কথা আমি বিশ্বাস করি।”
    “তথাপি আপনি যাইবেন?”
    “তথাপি আমি যাইব।”
    “আমাকে সঙ্গে লইবেন না?”
    “না।”
    “কেন?”
    “তাহা হইলে আমার অভিপ্রায় পুর্ণ করিতে পারিব না।”
    “সে অভিপ্রায় কি?”
    “সময়ে সব জানিতে পারিবে, এখন এই যথেষ্ট; তবে এইটুকু জানিয়া রাখ, ডাকিনী আমাকে ডাকে নাই নিজের মৃত্যুকে ডাকিয়াছে—তার দিন ফুরাইয়াছে।”
    “মামা-বাবু, আপনি তার প্রস্তাবে সম্মত হবেন?”
    “কি তার প্রস্তাব, আগে জানি; তার পর সে বিষয়ের মীমাংসা হবে।”
    “আমি এখন কি করিব?”
    “কিছুই না।”
    “বড় শক্ত কাজ!”
    “তা আমি জানি; থাম—বলছি।”
    “বলুন।”
    “সন্ধ্যার একঘণ্টা পরে, তুমি ভিক্ষুকের বেশে ঐ বাগানের ভিতরে যাবে; যে কাঠের ঘরের কথা পত্রে আছে, সেই ঘরের কাছে কোন গাছের আড়ালে লুকাইয়া থাকিবে; দেখিবে, কে কি করে, কে কোথায় যায়। খুব সাবধান, কেউ যেন তোমায় দেখিতে না পায়। আমি রাত এগারটার সময় যাইব।”
    “নিরস্ত্র অবস্থায় যাবেন কি?”
    “অস্ত্রছাড়া তোমার মামা-বাবু কখনও বাড়ীর বাহির হন নাই— হবেনও না। আমি জুমেলিয়ার অনুসরণ করিব, তুমিও অলক্ষ্যে আমার অনুসরণ করিবে। কিন্তু দেখিয়ো—খুব সাবধান, যেন তোমাকে তখন সে দেখিতে না পায়। আমি যাইবার সময়ে পকেটে করিয়া কতকগুলি ধান লইয়া যাইব, যে পথে যাইব, সেই পথে আমি সেগুলি ছড়াইতে ছড়াইতে যাইব; সেগুলি ফেলিবার সময়ে বড় একটা শব্দ হ’বার সম্ভাবনা নাই; তুমি সেই ধানগুলির অনুসরণ করবে, তাহ হইলে আমার অনুসরণ করা হবে।”
    “বেশ—বেশ।”
    “জুমেলিয়া বড় সতর্ক—বড়ই চতুর; সে নিজের পথ আগে ভাল রকম পরিষ্কার না রেখে এ পথে পা দেয় নাই; আগে সে বুঝেছে, তার বিপদের কোন সম্ভাবনা নাই, তার পর আমাকে ডাকিয়ে পাঠিয়েছে। সে জানে, একবার আমার হাতে পড়িলে তাহার নিস্তার নাই; একবিন্দু দয়াও সে অামার কাছে আশা করিতে পারিবে না। তোমার এখন কাজ হইতেছে, তুমি দেখিবে, সে আত্মরক্ষার জন্য কিরূপ বন্দোবস্ত করিয়াছে; কে এখন তার সহযোগী হইয়াছে। আমার কথামত ধান দেখিয়া আমার সন্ধান লইবে; যখন সন্ধান পাইবে—যেখানে আমি থাকিব, জানিতে পরিবে, তখন তথায় অপেক্ষণ করিবে; যতক্ষণ না আমি তোমাকে ইঙ্গিতে জানাই, ততক্ষণ অপেক্ষা করিবে।”
    “কিরূপে ইঙ্গিত করিবেন?”
    “যখন উপর্যুপরি দুইবার পিস্তলের আওয়াজ হইবে, তখনই তুমি আমার নিকটে উপস্থিত হইবে। যতক্ষণ পৰ্য্যন্ত তুমি পিস্তলের শব্দ শুনিতে না পাও, ততক্ষণ তোমাকে আর কিছু করিতে হইবে না, কেবল অপেক্ষায় থাকিবে।”
    “বেশ, আমি আপনার আদেশমতই কাজ করিব।”
    “শচী! আমাদের জীবনের এ বড় সহজ উদ্যম নয়; এ উদ্যম বিফল হ’লে আমাদের মৃত্যু অনিবাৰ্য্য। এ পর্য্যন্ত আমরা যত ভয়ঙ্কর কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়াছি, সে সকলের অপেক্ষা এখন বেশি পরিশ্রম— বেশি বুদ্ধি—বেশি কৌশল আবশ্যক করে। তোমার মামী-মার জীবন ত এখন সঙ্কটাপন্ন; এমন কি আমার প্রাণও আজিকার রাত্রির কাৰ্য্যের উপর নির্ভর করিতেছে; প্রাণনাশের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা। অথচ স্বেচ্ছায় সে কাৰ্য্য আমাদিগকে যে প্রকারে হউক, মাথা পাতিয়া লইতে হইবে। আর শচী, যদি সে নারী-দানবী আমাকে পরাস্ত করে—আমার প্রাণনাশ করে, তুমি রহিলে, তুমি প্রাণপণে চেষ্টা পাইবে; তোমার হাতে তখন আমার সকল কৰ্ত্তব্য অর্পিত হইবে। যাও শচী, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। যাও শচী, আমার কথাগুলি যেন বেশ স্মরণ থাকে; সেগুলি যেন ঠিক পালন করিতে পার, আর যদি তোমায় আমায় আর এ জীবনে সাক্ষাৎ না ঘটে, ভাল —সুৰ্ব্বশক্তিমান পরমেশ্বর আছেন, তিনি তোমায় রক্ষা করিবেন—তিনি তোমার সহায় হইবেন—তিনি তোমার মঙ্গল করিবেন—যাও, শচী।”
    শচীন্দ্র স্নানমুখে—আর কোন কথা না বলিয়া—নয়নপ্রান্তের অশ্ররেখা মুছিয়া স্থান ত্যাগ করিল।

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ
    সাক্ষাতে

    সেই দিবস রাত্রি সাড়ে দশটার পর দেবেন্দ্রবিজয় বাটী হইতে বাহির হইলেন। লাহিড়ীদের উদ্যানে উপস্থিত হইতে প্রায় অৰ্দ্ধঘণ্টা অতিবাহিত হইল। এগারটা বাজিতে আর বেশি বিলম্ব নাই। দেবেন্দ্রবিজয় উদ্যানের পশ্চিম-প্রান্তের নির্দিষ্ট ঘরের সান্নিধ্যে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। কেহই তথায় নাই।
    স্থানটি সম্পূর্ণরূপে নির্জন এবং নীরব। কেবল কদাচিৎমাত্র ভগ্নবিশ্রাম কোন বিহঙ্গের পক্ষস্পন্দনশব্দ—কোথায় ক্বচিৎ শুষ্কপত্রপাতশব্দ– অতি দুরস্থ কুক্কুররব। বায়ু বহিতেছিল—দেহস্নিগ্ধকর, অতিমন্দ নিঃশব্দবায়ুমাত্র। যামিনী মধুর, পূর্ণেন্দুবিভাসিত, একান্ত শব্দমাত্রবিহীনা। মাধবী ঘামিনীর পরিষ্কৃত সুনীলগগনে স্নিগ্ধকিরণময় সুধাংশু নীরবে, ধীরে ধীরে নীলাঙ্গরসঞ্চারী ক্ষুদ্র শ্বেতাম্বুদখণ্ডগুলি উত্তীর্ণ হইতেছিল।
    বৃক্ষমূলপার্শ্বে শচীন্দ্র লুকাইয়া ছিল; দেবেন্দ্রবিজয়ের তীক্ষ্ণদৃষ্টি সৰ্ব্বাগ্রে সেইদিকে পড়িল—শচীন্দ্রও তাহার মাতুল মহাশয়কে দেখিল। উভদে উভয়কে দেখিলেন, কেহ কোন কথা কহিলেন না, আবশ্যক বোধ করিলেন না।
    কিয়ৎক্ষণপরে—ঠিক যখন রাত্রি এগারটা, দেবেন্দবিজয় জ্যোংস্নালোকে কিয়দ্দূরে এক রমণীমূৰ্ত্তি দেখিতে পাইলেন। সে মূর্তি তাঁহার দিকে অতি দ্রুতগতিতে আসিতেছে। দেবেন্দ্রবিজয় বুঝিলেন, সে মূৰ্ত্তি আর কাহারও নহে—সেই পিশাচী জুমেলিয়ার।

    জুমেলিয়া দেবেন্দ্রবিজয়কে দুর হইতে দেখিবামাত্র জিজ্ঞাসিল, “এই যে দেবেন্দ্ৰ! এসেছ তুমি?”
    দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, “হাঁ, এসেছি আমি।”
    জুমেলিয়া। মনে কিছুমাত্র ভয় হয় নাই?
    দে। না, কাহাকে ভয় করিব?
    জু। কেন, আমাকে?
    দে। তোমাকে? না।
    জু। তোমার মনে কি এখন কোন ভয় হইতেছে না?
    দে। না।
    জু। তোমার নিজের কথা বলছি না; অন্ত কাহারও জন্য তোমার ভয় হ’তে পারে হয়েছে কি?
    দে। জুমেলা, আমি তোমাকে ভয় করি না।
    জু। সঙ্গে কোন অস্ত্র আছে কি?
    দে। তুমি যে নিষেধ করিয়াছ।
    জু। ঠিক উত্তর হইল না।
    দে ৷ হইতে পারে।
    জু। তুমি কি সশস্ত্র?
    দে। তুমি?
    জু। হাঁ।
    দে। তবে আমাকেও তাহাই জানিবে।
    জু। কই, তা হ’লে তুমি আমার কথামত কাজ কর নাই।
    দে। তোমার কথামত আমি তোমার সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছি—অস্ত্র থাক বা না থাক, তোমার সে কথায় এখন প্রয়োজন কি? যখন আমার হাতে কোন অস্ত্র দেখিবে, তখন জিজ্ঞাসা করিয়ো।
    জু। তুমি সঙ্গে অস্ত্ৰ আনিয়াছ কেন?
    দে। আবশ্যক হইলে তাহার সদ্ব্যবহার হইবে বলিয়া।
    জু। নিৰ্ব্বোধ!
    দে। নির্ববুদ্ধিতা আমার কি দেখিলে?
    জু। আমি কি পূৰ্ব্বে তোমায় বলি নাই—যদি তুমি আমার আদেশ মত কাৰ্য্য না কর, তোমার স্ত্রী মরিবে?
    দে। হাঁ, বলেছিলে।
    জু। তবে কেন তোমার এ মতিভ্রম হইল? আমি যদি এখন এখান হইতে চলিয়া যাই—তুমি আমার কি করিবে?
    দে। মনে করিলেই এখন আর যাইতে পার না।
    জু। কি করিবে?
    দে! এক পা সরিলে তোমাকে আমি হত্যা করিব।
    জু! নিৰ্ব্বোধ, আবার?
    দে। আবার কি?
    জু। তোমায় নিতান্ত মতিছন্ন ধরিয়াছে দেখিতেছি—আমাকে হত্য করিলে তুমি তোমার প্রিয়তম স্ত্রীকে হত্যা করিবে, স্মরণ আছে?
    দে। তথাপি আমি তোমাকে হত্যা করিব।

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
    বনভূমিতে

    “কর, তোমার পদতলে—তোমার নিকটস্থ গুপ্ত অসির সম্মুখে এই বুক পাতিয়া দিতেছি; কোন অস্ত্র শাণিত কবিয়া আনিয়াছ—জুমেলিয়ার বুকে বসাইয়া দাও। নির্দয় দেবেন–নিষ্ঠুর দেবেন্‌! সুন্দর বক্ষ অস্ত্রে বিদ্ধ করিতে, একজন স্ত্রীলোকের বক্ষ অস্ত্রদীর্ণ করিতে যদি তুমি কিছুমাত্র কাতর না হও, তাহাতে যদি তোমার আনন্দ হয়—কর পার কর—এই তোমার সম্মুখে বুক পাতিয়া দিলাম!”
    এই বলিয়া জুমেলিয়া বক্ষের বসন ও কাঞ্চলী খুলিয়া দুরে ফেলিয়া দিল। জানু পাতিয়া বসিয়া দেবেন্দ্রবিজয়ের সমক্ষে সেই স্নিগ্ধ শশাঙ্ককরে কামদেবের লীলাক্ষেত্রতুল্য পীনোন্নত বক্ষ পাতিয়া দিল।
    পাঠক! একবার ভাবিয়া দেখুন, এ দৃশ্য কতদূর কল্পনাতীত! মাথার উপরে নীলানন্ত নিৰ্ম্মল গগনে থাকিয়া শশী অনন্তকিরণপ্লাবনে জগৎ ভাসাইয়া সুধাহাসি হাসিতেছিল; কাছে—দুরে—এখানে— ওখানে থাকিয়া নক্ষত্রগুলা ঝিকমিক্‌ করিয়া জলিতেছিল। বৃক্ষাবলীর অগ্রভাগারূঢ়পত্রগুলি ধীরে সমীরে হেলিতে-ফুলিতেছিল; নিম্নে—পার্শ্বে— পশ্চাতে—দুরে—অতিদূরে অনন্ত নিস্তব্ধতা; সেই ঘোর নীরবতার মধ্যে শশিকিরণে আভূমিপ্রণত শুামলতা নীরবে চলিতেছিল; নীরবে জ্ঞতা গুলুমধ্যে শ্বেত, পীত, লোহিত ফুল্লফুলদল বিকসিত ছিল। সেই নির্জন, নীরব উদ্যানমধ্যে দেবেন্দ্রবিজয় দণ্ডায়মান; তাঁহার সম্মুখে— দৃষ্টিতলে অদ্ধবিবস্ত্রভাবে জুমেলিয়া চন্দ্রকরোজ্জল অনাচ্ছাদিত পীনোন্নত পীবর বক্ষ পাতিয়া বসিয়া।
    দেবেন্দ্রবিজয় বিচলিত হইলেন, বারেক সৰ্ব্বাঙ্গ কঁপিয়া উঠিল; প্রত্যেক ধমনীর শোণিত-প্রবাহে যেন একটা অনুভূতপূৰ্ব্ব বৈদ্যুতিক প্রবাহ মিশিয়া সৰ্ব্বাঙ্গে অতি দ্রুতবেগে সঞ্চালিত হইতে লাগিল। কি বলিবেন,-স্থির করিতে না পারিয়া দেবেন্দ্রবিজর নীরবে রহিলেন।

    জুমেলিয়া দেবেন্দ্রবিজয়কে নীরবে এবং কিছু বা স্তম্ভিতভাবে থাকিতে দেখিয়া কহিল, “কি দেবেন, নীরব কেন? অস্ত্র বাহির কর; হাত ওঠে না কেন? ওঃ! যতদুর তোমাকে আমি নিষ্ঠুর মনে করেছিলাম, এখন বুঝিতে পারিতেছি, ততদুর তুমি নও; তবে অস্ত্র সঙ্গে আনিয়াছ কেন?”
    “সময়ে আবশ্যক হইলে সদ্ব্যবহার-করিব বলিয়া।”
    “বেশ, আপততঃ তোমার নিকটে যে-কোন অস্ত্র আছে, আমার হাতে দিতে পার?”
    “না।”
    “তবে তোমার নিকটে আমার কোন প্রস্তাব নাই; তোমার সঙ্গে তবে আমার সন্ধি হইল না।”
    “ক্ষতি কি?”
    “তবে কি দেবেন, তুমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতাচরণ করিবে?”
    “না, আমার কার্য্যসিদ্ধ করিতে আসিয়াছি।”
    দেবেন্দ্রবিজয় এই কথাগুলি স্থির ও গম্ভীরস্বরে বলিলেন। এ স্থৈর্য্য, এ গাম্ভীৰ্য্য ঝটিকাপূৰ্ব্বে প্রকৃতি যেমন স্থির ও গম্ভীরভাব ধারণ করে, তদনুরূপ।
    জুমেলিয়া ইহা বিশদরূপে বুঝিতে পারিয়া মনে মনে অত্যন্ত অস্থির হইতে লাগিল; তাহার মনের ভাব তখন বাহিরে কিছু প্রকাশ পাইল না।

    জুমেলিয়া বলিল, “থাম, আর এক কথা, এখন তুমি আমার কাছে একটা প্রতিজ্ঞা করিবে?”
    “কি, বল?”
    “তুমি আজ তোমার অস্ত্র ব্যবহার করিবে না?”
    “যদি না করিতে হয়—করিব না।”
    “কি জন্য তুমি অস্ত্র ব্যবহার করিবে, স্থির করিয়াছ?”
    “তোমার পত্রে যে সকল কথা স্থিরীকৃত আছে, সেই সকলের মধ্যে যদি একটার ও কোন ব্যতিক্রম ঘটে।”
    “এই জন্য?”
    “হাঁ, আরও কারণ আছে।”
    “কি, বল।”
    “যদি আমার স্ত্রীর জীবনরক্ষার্থে অবশ্যক হয়।”
    “আবশ্যক হইবে না, আমি বলিতেছি—কোন আবশ্যক হইবে না, তোমার অস্ত্র ব্যবহারে তোমার স্ত্রীর জীবনরক্ষার্থে তুমি কোন ফল পাইবে না।”
    “তা হ’লে অস্ত্র ব্যবহার করিব না।”
    “নিশ্চয়?”
    “নিশ্চয়।”

    সপ্তম পরিচ্ছেদ
    ভিক্ষুক-বেশী

    জুমেলিয়া। দেবেন, কেহ তোমার সঙ্গে এসেছে?
    দেবেন্দ্র। না, তোমার কথামত কাজই করা হয়েছে।
    জু। শচীন্দ্র এ সকল বিষয়ের কিছু জানে না?
    দে। তুমি ত জান সে শয্যাশায়ী হয়েছে।
    জু। হঁ, জানি।
    দে। তবে জিজ্ঞাসা করিতেছ, কেন?
    জু। তুমি যে এখানে একাকী আসিয়াছ, এ কথা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করিতে পারিতেছি না।
    দে। অবিশ্বাসের কারণ কি আছে? আমি একাকী আসিয়াছি।
    জু। দেবেন, তুমি যতই সতর্ক হও—যতই বুদ্ধিমান হও, কিছুতেই জুমেলিয়াকে ছাপাইয়া উঠিতে পরিবে না; আমি চক্ষের নিমেষে তোমায় খুন করিতে পারি।
    দে। পার যদি, করিতেছ না কেন? আমার প্রতি এত দয়া প্রকাশের হেতু কি?
    জু। আপাততঃ আমার সে ইচ্ছা নাই, আমিও প্রস্তুত নহি।
    দে। জুমেলিয়া, অনৰ্থক বিলম্বে তোমার অনর্থ ঘটিবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা ৷
    জু। [ সহাস্তে ] মাইরি!
    দে। শোন—মিথ্যা আমরা সময় নষ্ট করিতেছি, তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাইবে বলিয়া পত্র লিখিয়াছিলে না?
    জু। হাঁ।
    দে। কোথায়?
    জু। এমন কোথাও নয়; এই ঘে– [অঙ্গুলি নির্দেশে] দোতলা বাড়ীখানা দেখিতে পাইতেছ, উহার মধ্যে—ঐখানে তোমার রেবতী আছে। দেখিবে?
    দে। চল, দেখিব।
    জু। আর একটা প্রতিজ্ঞা করিতে হইবে।
    দে। কি, বল?
    জু। আমার বিনানুমতিতে এমন কি তুমি তোমার স্ত্রীকে স্পর্শও করিতে পারিবে না;
    দে। তাহাই হইবে, সম্মত হ’লেম, চল।
    জু। যথেষ্ট।
    দে। তবে চল।
    জু। এস।

    * * * * *

    দেবেন্দ্রবিজয়কে সমভিব্যাহারে লইয়া উদ্যানভূমি অতিক্রম করিয়া জুমেলিয়া ক্রমশঃ সেই অট্টালিকাভিমুখে চলিল।
    সে অট্টালিকা উদ্যানের বাহিরে নয়, উদ্যানমধ্যে—পুৰ্ব্বপ্রান্তে; বহুদিন মেরামত না ঘটায় অনেক স্থলে জীর্ণ ও ভগ্নোমুখ—অনেক স্থানে বালি খসিয়া ইট বাহির হইয়া পড়িয়াছে—কোন কোন স্থান ইট খসিয়া একেবারে ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে।

    দেবেন্দ্রবিজয় ও জুমেলিয়া যখন ক্রমশঃ সেই অট্টালিকাভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিলেন, তখন ভিক্ষুকবেশী শচীন্দ্র বৃক্ষান্তরাল হইতে বাহির হইল; কোন পথে তাঁহারা কোন দিক্ দিয়া যাইতেছেন, তাহ স্থিরদৃষ্টিতে দেখিতে লাগিল; এইরূপে প্রায় পাঁচ মিনিট কাটিল। শচীন্দ্র সেইখানে দাঁড়াইয়া রহিল।
    যখন শচীন্দ্র সেইদিকে যাইবার জন্য একপদ সম্মুখে অগ্রসর হইয়াছে, আর এক ব্যক্তিকে সে সেইদিকে আসিতে দেখিল; তখনই তাড়াতাড়ি নিজের ছিন্ন শতগ্রন্থিযুক্ত উত্তরীয় বৃক্ষতলে পাতিয়া শয়ন করিল; কৃত্রিম নিদ্রার ভানে চক্ষু নিমীলিত করিয়া নাসিকা-স্বর আরম্ভ করিয়া সেই নীরব উদ্যানের নিদ্রিত পক্ষিবৃন্দকে ক্ষণেকের জন্য অত্যন্ত চমকিত ও মুখরিত করিয়া তুলিল।
    সে লোকটা অতি শীঘ্রই শচীন্দ্রের নিকটে আসিল; আসিয়া সজোরে তাহার স্কন্ধে একটা সোহাগের চপেটাঘাত করিল।
    শচীন্দ্র নিমীলিত নেত্রে পার্শ্বপরিবর্তন করিল। আবার সেই চপেটাঘাত। নিমীলিতনেত্রেই ভিক্ষুক বেশী শচীন্দ্র বলিল, “কে বাবা তুমি, পথ দেখ না, বাবা।”
    সোহাগের সেই চপেটাঘাতের শব্দটা পূৰ্ব্বাপেক্ষ এবার কিঞ্চিৎ পরিমাণে উচ্চে উঠিল। শচীন্দ্র বলিল, “কে বাবা, পাহারাওয়ালাজী নাকি? বাবা, গাছতলায় পড়ে একপাশে ঘুমাচ্ছি, তা’ তোমার কোমল প্রাণে বুঝি আর সইল না? আদর ক’রে যে গুরুগম্ভীর চপেটাঘাতগুলি আরম্ভ ক’রে দিয়েছ, তা আমার অপরাধটা দেখলে কি?”
    আগন্তুক বলিল, “আরে না, আমি পাহারাওয়াল নই।”
    শচীন্দ্র বলিল, “কে বাবা, তবে তুমি? উপদেবতা নাকি? কেন বাবা গরীব মানুষ একপাশে পড়ে আছি, ঘাটাও কেন, বাবা? ভদ্রলোকের ঘুমটা ভেঙে দিয়ে তোমার কি এমন চতুৰ্ব্বৰ্গ লাভ হবে?”
    আগন্তুক বলিল, “আমি তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাস করতে এসেছি।”
    শচীন্দ্র বলিল, “আমাকে জিজ্ঞাসা কেন? আমার চেয়ে মাথায় বড়, ভারিক্কেদরের তালগাছ রয়েছে, কিছু জিজ্ঞাসা করবার থাকে, তাকে কর গে; এখান থেকে পথ দেখ না, চাঁদ ”
    আগন্তুক। আমি এদিকে এসে পথটা ঠাওর করতে পারছি না; যদি তুমি বলে দাও, বড় উপকার হয়।
    শচীন্দ্র ৷ পথ দেখ; সিধে লোক-সিধে পথ দেখ।
    আ। আমি পদ্মপুকুরের দিকে যাব; কোন পথ জান কি?
    শ। কি, শ্বেতপদ্মের না নীলপদ্মের? আবার কি রামরাজা এই ঘোর কলিতে দুর্গোৎসব আরম্ভ করেছে না কি?
    আ। আমাকে পদ্মপুকুরের পথটা ব’লে দাও; আমি তোমাকে একটা পয়সা দিচ্ছি।
    শ। কেন বাপু, এতদিনের পর দাতাকর্ণের নামটা আজ হঠাৎ লোপ করবে?
    আ। পাগল না কি তুমি?
    শ। পাঁচজনে মিলে আমাকে তাই করেছে, দাদা; আর খোঁয়াড়ি ধরলে পাগল ত পাগল, সকল দিকেই গোল লেগে যায়। তবে চললেম মশাই, নমস্কার; ব্রাহ্মণ হও যদি—প্রণাম।
    আ। কোথায় যাচ্ছ, তুমি?
    শ। আর কোথায় যাব, শুঁড়ি-মামার সন্দর্শনে।
    শচীন্দ্র তথা হইতে প্রস্থান করিলে অপর দিক দিয়া আগন্তুক চলিয় গেল।

    * * * * *

    কিয়ৎপরে আবার উভয়ের উদ্যানের অপর পার্শ্বে সাক্ষাৎ ঘটিল।
    আগন্তুক জিজ্ঞাসা করিল, “কই, শুড়ি-মামার কাছে গেলে না?
    শচীন্দ্র সবিস্ময়ে বলিল, “তাই ত হে কৰ্ত্তা, আবার যে তুমি! আবার ঘুরেফিরে তোমারই কাছে এসে পড়েছি যে, নিশ্চয়ই পৃথিবী বেটী গোলাকার; নইলে ঘুরতে ঘুরতে ঠিক তোমার কাছে আবার এসে উপস্থিত হ’ব কেন? আসি মশাই, নমস্কার; ব্রাহ্মণ হও যদি—প্রণাম।”
    উদ্যান হইতে বহির্গমনের পথ ধরির শচীন্দ্র তথা হইতে প্রস্থান করিল। আগন্তুক অতি তীব্রভৃষ্টিতে—যতক্ষণ তাহাকে দেখিতে পাওয়ার গেল—দেখিতে লাগিল। না, এ লোককে ভয় করার কোন কারণ নাই; মাতাল—আধ-পাগল; যাক, আগে ভেবেছিলাম, বুঝি গোয়েন্দার কোন চর-টর হবে।” এই বলিয়া যে পথ দিয়া দেবেন্দ্রবিজয় ও জুমেলিয়া গমন করিয়াছিল, সেই পথে গমন করিতে লাগিল—
    লোকটা জুমেলিয়ার চর।
    ———– ———
    তখন ভিক্ষুক-বেশী শচীন্দ্র বেশীদূরে যায় নাই। যতক্ষণ না আগন্তক একেবারে দৃষ্টিপথ অতিক্রম করিল, ততক্ষণ শচীন্দ্র নিকটস্থ একটি বৃক্ষপার্শ্বে লুকাইয়া রহিল; তাহার পর সুবিধা মত গুপ্তস্থান হইতে বাহির হইল; যে পথ দিয়া আগন্তুক চলিয়া গিয়াছিল, সেই পথ ধরিয়া চলিল।
    শচীন্দ্রের গমনকালে বারংবার হস্তস্থিত ঘষ্টি হস্তচু্যত হইয়া ভূতলে পড়িয়া যাইতে লাগিল; বারংবার সে তাহা ভূতল হইতে প্রসন্নচিত্তে হাস্তমুখে তুলিয়া লইতে লাগিল।
    এ হাসির কারণ বুঝিয়াছেন কি? দেবেন্দ্রবিজয় যে সকল ধান ছড়াইয়া নিশান করিয়া গিয়াছিলেন, ‘শচীন্দ্র এক্ষণে যষ্টি উঠাইবার ছলে, সেই সকল ধান দেখিয়া গন্তব্যপথ ধরিয়া চলিয়াছে।

  • তৃতীয় খণ্ড : পিশাচীর প্রেম

    তৃতীয় খণ্ড : পিশাচীর প্রেম

    তৃতীয় খণ্ড – পিশাচীর প্রেম

    প্রথম পরিচ্ছেদ
    আর এক ভাব

    অনতিবিলম্বে জুমেলিয়া এবং তাহার অনুবর্তী হইয়া দেবেন্দ্রবিজয় সেই অসংস্কৃত অন্ধকারময় নিভৃত অট্টালিকা-সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
    জুমেলিয়া কহিল, “এই বাড়ীর ভিতরে তোমাকে আমার সঙ্গে যাইতে হইবে।”
    “স্বচ্ছন্দে,” দেবেন্দ্রবিজয় প্রত্যুত্তরে কহিলেন।
    “রেবতী এখানে আছে।”
    “বেশ, আমাকে তার কাছে লইয়া চল।”
    “এখন নয়, সুবিধা মত; আগে তোমার সঙ্গে আমার কতকগুলি কথা আছে, এস।”

    উভয়ে সেই বাটিমধ্যে প্রবেশিলেন। দেবেন্দ্রবিজয় যেমন অন্ধকারময় প্রাঙ্গণে পড়িলেন, অমনি বস্ত্রাভ্যন্তরস্থ গুপ্তলণ্ঠন বাহির করিলেন, চতুর্দিক আলোকিত হইল; জুমেলিয়া, একবার চমকিত হইয়া উঠিল—কিছু বলিল না।
    তাহার পর উভয়ে উত্তরপার্শ্বস্থিত সোপানীতিক্রম করিয়া দ্বিতলে উঠিলেন; তথাকার একটি প্রকোষ্ঠের মধ্যে প্রবেশ করিলেন। জুমেলিয়া সেই প্রকোষ্ঠের এক কোণে একটি মোমের বাতি জালাইয়া রাখিল; রাখিয়া বলিল, “দেবেন্দ্রবিজয় জান কি, কেন আমি তোমাকে এখানে লইয়া আসিয়াছি?”
    “না—জানি না।”
    “তুমি জান, আমি প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, তোমাকে হত্যা করিব?”
    “জানি।”
    “শুধু তোমাকে নয়—তোমার সংসর্গে যারা আছে, তাদেরও?”
    “তাহাও জানি।”
    “তুমি কি বিশ্বাস কর, আমি প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করিতে পারিব?”
    “যদি পার—পূর্ণ করিবে।”
    “আমি পারি।”
    “ক্ষতি কি?”
    “কিন্তু এখন আমার সে ইচ্ছা নাই; আমি তোমার সঙ্গে একটা বন্দোবস্ত করিতে চাই।”
    “বটে! কোন বিষয়ে?”
    “তুমি সে বিষয়টা কিছু অভিনব, কিছু আশ্চৰ্য্য বোধ করিবে। আমি এখনই আমার প্রতিহিংসা হইতে তোমাকে—তোমার স্ত্রীকে — শচীন্দ্রকে মুক্তি দিতে প্রস্তুত আছি।”
    “বটে, এর ভিতরেও তোমার অবশ্যই কোন গুঢ় অভিপ্রায় আছে।” “ছ, যদি তুমি আমার কথা রাখ—আমাকে সাহায্য কর, আমি ইচ্ছা করিতেছি—যত পাপ কাজ-সমস্তই ত্যাগ করিব; এখন হইতে সৎস্বভাব হইব।”
    “সে সময় এখন আর আছে কি, জুমেলা?”
    “আছে, এখনও অনেক সময় আছে—শুধরাইবার অনেক সময় আছে।”
    “বল।”
    “দেখ দেবেন, তুমি মনে করিলে আমি যাদের প্রাণনাশ করিতে একান্ত ইচ্ছুক, সামান্ত উপায়ে তাদের তুমি আমার প্রতিহিংসা হইতে উদ্ধার করিতে পার। সে উপায় কি? তুমি আমার স্বভাবের গতি ফিরাও, আমার মতি ফিরাও—যাতে আমি এখন হইতে সচ্চরিত্ৰ হ’তে পারি—সেই পথে নিয়ে যাও। তুমি আমাকে সদা-সর্বদা ‘পিশাচী’ কখন বা ‘দানবী’ বলে থাক; সেই দানবীকে—সেই পিশাচীকে তুমি মনে করিলে দেবী করিতে পার।”
    “জুমেল, তোমার এ সকল কথার অর্থ কি?”
    “উত্তর দাও, দেবেন! আমার কথার ঠিক ঠিক উত্তর দাও। ঠিক ক’রে বল দেখি, আমি কি বড় সুন্দরী?” [মৃদুহাস্যে কটাক্ষ করিল]
    “হাঁ, তুমি সুন্দরী, এ কথা কে অস্বীকার করিবে?”
    “কেমন সুন্দরী?”
    “যদি তোমার অন্তরের জঘন্ততা তোমার মুখে প্রতিফলিত না হইত, দেখিতাম, তুমি সুন্দরী—তোমার মত সুন্দরী আমি কখনও দেখিয়াছি কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ থাকিত।”
    “মনোরমার* চেয়ে সুন্দরী?”
    “রেবতীর চেয়ে?”
    “হাঁ।”
    “তুমি কি সুন্দরীর সৌন্দৰ্য্য ভালবাস না?”
    “প্রশংসা করি বটে!”
    “যদি আমার অন্তর হতে সমস্ত পাপের কালি মুছে যায়, তা’ হ’লে আমি তোমার মনোমত সুন্দরী হ’ব কি, দেবেন?”
    “না, আমি তোমাকে অত্যন্ত ঘৃণা করি।”
    “যদি কোন স্থানে তোমার মন বাধা না থাকিত, তা হ’লে তুমি কি আজ আমাকে ভালবাসিতে পারিতে, দেবেন?”
    “না।”
    এই কথাটাই চূড়ান্ত হইল, জুমেলিয়ার হৃদয় দুর দুর করিতে লাগিল, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের গতিবিধি বন্ধ হইল, মুখমণ্ডল একবার মুহূর্তের জন্য আরক্তিম হইয়া পরক্ষণেই একেবারে কালিমাছন্ন হইয় গেল। কিয়ৎপরে প্রকৃতিস্থ হইয়া পূৰ্ব্বাপেক্ষী মৃদুস্বরে, জুমেলিয়া বলিল, “তা’ হ’লেও তুমি আমাকে ভালবাসিতে পারিতে না, দেবেন—তা’ হ’লেও না?”
    “ন!—তা’ হ’লেও না।”
    “দেবেন্দ্রবিজয়! আমার বয়স এখন ছত্রিশ বৎসর। এই ছত্রিশ বৎসরের মধ্যে আমাকে অনেকে ভালবেসেছে; কিন্তু সে সকল লোকের মধ্যে আমি এমন কাহাকেও দেখি নাই, যাহাকে আমি তার ভালবাসার প্রতিদানেও কিছু ভালবাসিতে পারি; কিন্তু তুমি—তুমি— তোমাকে দেখে আমার মন একেবারে ধৈর্য্যহীন হ’য়ে পড়েছে। তুমি আমাকে ভালবাস না—ভালবাসা ত বহুদুরের কথা—তুমি আমার শক্ৰ—পরম শত্রু; তথাপি আমার প্রাণ তোমার পায়ে আশ্রয় পাবার জন্য একান্ত ব্যাকুল। আমি পুৰ্ব্বেই জানতে পেরেছিলাম, আমার এ লালসা আশাহীন, তাই আমি তোমাকে হত্যা করিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হ’য়েছিলাম; স্থির করেছিলাম, তোমাকে হত্যা করতে পারলে হয় ত ভবিষ্যতে এক-সময়ে-ন-এক-সময়ে তোমাকে ভুলে যেতে পারব; আজ তোমাকে কেন ডেকেছি জান, দেবেন? তোমার সঙ্গে আমি একট। বন্দোবস্ত করতে চাই।”
    “কি, বল?”
    “আশা করি, তুমি আমার কথা রাখবে।”
    “হাঁ, তোমার কথা রাখতে যদি কোন ক্ষতি স্বীকার করতে না হয়, অবশ্যই রাখব।”
    “তুমি তোমার স্ত্রীকে ভালবাস?”
    “হাঁ, ভালবাসি।”
    “তুমি তার জীবন রক্ষা করতে ইচ্ছ। কর?”
    “হাঁ, করি।”
    “তার জীবন রক্ষা করতে তুমি কিছু ত্যাগ-স্বীকার করতে পার?”
    “হাঁ, পারি।”
    “তুমি তোমার ভালবাসা ত্যাগ করতে পার?”
    “আমি তোমার কথা বুঝতে পারলেম না।”
    “তুমি তোমার স্ত্রীকে পরিত্যাগ করতে পার?”
    “তাকে আমি পরিত্যাগ করিব।”
    “হাঁ, তাকে—তোমার স্ত্রীকে—তোমার সেই ভালবাসার সামগ্রীকে কেবল এক বৎসরের জন্য; এক বৎসর—বেশি দিন না—চিরকালের জন্য না;–তুমি তাকে মনে মনে যেমন ভাবেই রাখ, কিন্তু কেবল এক বৎসরের জন্য তুমি আমার হও। বৎসর ফুরালে তোমাকে আমি মুক্তি দিব; তখন অবাধে তোমার স্ত্রীর কাছে ফিরে যেতে পারবে। এক বৎসর– কেবল একটি মাত্র বৎসর; শেষে আমিও মরিব—তুমিও নিশ্চিন্ত হ’তে পারবে, আমি নিজের বিষে মরিব; তুমি তখন মুক্তি পাইবে. জুমেলিয়ার হাত হ’তে তুমি আজীবন মুক্ত থাকিবে।”
    এই বলিয়া জুমেলিয়া দেবেন্দ্রবিজয়ের দিকে একপদ অগ্রসর হইয়া, জানু পাতিয়া তাহার অতি নিকটে অতি দীনভাবে উপবেশন করিল— তখন সে প্রাণের আবেগে মহা উন্মাদিনী।
    দেবেন্দ্রবিজয় তাহার অভিনব অভিপ্রায় শুনিয়া চমকিত হইলেন। তাঁহার সৰ্ব্বাঙ্গ তখন প্রস্তর-প্রতিমুক্তির ন্যায় শীতল, নীরব ও নিশ্চল।

    ——————-
    [* জুমেলিয়ার জটিল রহস্তপূর্ণ অন্যান্য ঘটনাবলী গ্রন্থকারের “মনোরমা” ও “মায়াবী” নামক পুস্তকে লিখিত হইল। প্রকাশক।]

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
    আবেগে

    জুমেলিয়া বলিতে লাগিল,-“দেবেন, কত সুখ তাতে; মরি! মরি! মরি! আমার হও, আমার হও তুমি—এক বৎসরের জন্য। দেখ দেবেন, আমি প্রাণের মধ্যে–হৃদয়-পটে কেমন মুখের সুন্দর ছবি এঁকেছি। এ কথা মনে করতে আমার আনন্দের সীমা থাকছে না। তোমাকে ভালবাসতে হবে না—তুমি আমাকে ভালবাস কি না, সে কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই না; আমি জানি, আমি এত নিৰ্ব্বোধ নই, তুমি কখনই আমাকে ভালবাসবে না—ভালবাসতেও পারবে না। কিন্তু ছল—ছলনায় আমাকে বুঝায়ো, তুমি আমায় বড় ভালবাস; কেবল একটি বৎসরের জন্য। আমি সাধ ক’রে তোমার প্রতারণায় প্রতারিত হ’তে স্বীকার করছি—এ প্রতারণায়ও সুখ আছে। আমি জানি, আমি যা আশা করেছি, তা আশার অতীত। তুমি আমাকে ছলনায় ভুলায়ে যে, তুমি আমার ভালবাস, আর কিছু না, তাই যথেষ্ট। আমি নিজেকেই বুঝাব যে, তুমি প্রকৃতই আমাকে ভালবাস; তুমি আমার—আমার! রেবতী রক্ষা পাবে, সে তোমার বাড়ীতে নির্বিবঘ্নে পৌছিবে; সেখানে সে তোমার অপেক্ষায় থাকবে, সে কখনই জানতে পারবে না, তার জীবন-রক্ষার্থে তোমায়-আমার কি বন্দোবস্ত হয়েছে— সে তোমার এ বিষয়ের কোন প্রমাণই পাবে না। বৎসর শেষে তুমি স্বচ্ছন্দে তার কাছে ফিরে যেতে পারবে; তখন যা’ তোমার প্রাণ চায়— করিয়ো; ঘাতে তুমি সুখী হও—হইয়ো। কেবল একবার তুমি ক্ষণেকের জন্য স্বর্গের সুষমার আভাসটুকু আমায় দেখাও,—যা” আমি সারাজীবনে কখনও অনুভব করিতে পারি নাই। তোমার স্ত্রী কিছুই জানবে না, কেহই না; কেবল তুমি আর আমি। এক বৎসর পরে তুমি হাসতে হাসতে তার কাছে ফিরে যাবে; আমি মরিব, সত্যসত্যই মরিব; কেবল এ গুপ্তরহস্তা তোমারই জ্ঞাত থাকিবে—লোকের কাছে তোমাকে কলঙ্কের ভাগী হইতে হইবে না।” জুমেলিয়া উঠিল—আরও দুইপদ অগ্রসর হইয়া দেবেন্দ্রবিজয়কে বাহুবেষ্টিত করিতে চেষ্টা করিল। দেবেন্দ্রবিজয় ঘৃণাভরে তাহাকে সরাইয়া দিলেন।
    জুমেলিয়া উন্মাদিনীর ন্যায় বলিতে লাগিল—“শোন দেবেন, আমি বুঝেছি, আমি মরিব; এ কথা তুমি বিশ্বাস করতে পারছ না; আমি বৎসর ফুরালে তোমার সাক্ষাতে বিষপান করব। যখন আমি ম’রে যাব, কি সংজ্ঞাশুন্ত হ’য়ে পড়ব, তখন তুমি শতবার শাণিত ছুরিকা দিয়ে আমার বক্ষঃস্থল বিদ্ধ ক’রো, তা’ হ’লে ত তখন তোমার অবিশ্বাসের আর কোন কারণ থাকবে না। এখন আমরা একদিকে—বহুদূরে চলে যাব; কেবল এই এক বৎসরের জন্য; আমরা কামরূপেই চলে যাব। আমি যে সকল দ্রব্যগুণ জানি, তোমাকে সকলগুলিই শিখাব; শিখালে সহজেই শিখতে পারবে; ত’তে তোমার উপকার বৈ অনুপকার হবে না। তুমি যে দেশ ছেড়ে চলে যাবে, সেজন্য একটা কোন ওজর করলেই চলবে। তোমার স্ত্রীকে সদা-সৰ্ব্বদা তোমার ইচ্ছামত পত্রাদি লিখতে পারবে; কিন্তু তুমি প্রাণান্তেও তোমার স্ত্রীর নাম আমার কাছে এই এক বৎসরের জন্য ক’রো না; যাতে আমার মনে এমন একটা ধারণ হ’তে পারে যে, তুমি আমাকে ভালবাস ন—এমন কিছু আমাকে দেখিয়ে না—জানতে দিয়ে না। আমি ত বলেছি, আমি নিজেকে নিজেই প্রতারিত ক’রে রাখব; তুমি আমার হৃদয়ের রাজ্য হবে – তুমি আমার প্রাণের ঈশ্বর—তুমি আমার সৰ্ব্বস্ব! তার পর এক বৎসর কেটে গেলে আমি নরকের দিকে চ’লে যাব। তোমাকে এক বৎসর পেয়ে, তোমার বৎসরেক প্রেমালাপে আমি যে সুখ লাভ করব, ত’তে আমি হাসিমুখেই নরকের দিকে চলে যাব। এই এক বৎসর আমার জয়জয়কার, দেবেন। দেবেন—প্রাণের দেবেন্‌! তুমি কি আমার মনের কথা—প্রাণের বেদন বুঝতে পার্ছ না—আমি তোমাকে কতমতে আরাধনা করছি? তুমি মুখে আমার ভালবাস, তাতেও আমি মুখী হ’ব-আমি জোর করে বিশ্বাস ক’রে লইব, তুমি আমায় প্রকৃত ভালবাস। আমার কথার উত্তর দাও; বল-—স্বীকার পাও—প্রতিজ্ঞ কর, আমি তোমাকে যা বললেম, তা’তে তোমার আর অমত নাই; আমি এখনি তোমাকে রেবতীর কাছে নিয়ে যাচ্ছি—সে এখন মড়ার মত প’ড়ে আছে। যে ঔষধে তার জ্ঞান হবে, সে ঔষধ আমি তোমার হাতেই দিব, তুমি সেই ঔষধ তাকে খেতে দিয়ে; সেই মুহুর্তেই তা’র জ্ঞান হবে—শরীরের অবস্থা ফিরে যাবে; যেমন তাকে তুমি আগে দেখেছ, এখনও ঠিক তাকে তেমনি দেখ বে। অস্বীকার কর যদি, নিশ্চয় স্ত্রীর মৃত্যু হবে; ত’ হ’লে তোমার কাছে আমি যেমন সজলনয়নে দাঁড়িয়ে আছি—আর আমার সম্মুখে তুমি যেমন প্রস্তরপ্রতিমূৰ্ত্তির ন্যায়, নিশ্চলভাবে দাঁড়াইয়া আছ, ইহা যেমন নিশ্চয়— তেমনই নিশ্চয় তা’র মৃত্যু জানবে। জগতের কোন বিজ্ঞান তা’র চৈতন্ত সম্পাদন করতে পারবে না—কোন চিকিৎসক তার জীবন দান করতে পারবে না। যে ঔষধের প্রক্রিয়ায় সে এখন অচেতন, আমিই কেবল-তার প্রতীকারের উপায় জানি। এমন লোক দেখি না, আমার সাহায্য বিনা তাকে বাঁচাইতে পারে। যদি তুমি আমার হাত পা লোহশূঙ্খলবদ্ধ কর, এখনই এখানে সুতপ্ত লৌহখণ্ড দিয়ে আমার সৰ্ব্বাঙ্গ ঝলসিত কর, গোছায় গোছায় আমার মাথার চুলগুলি ছিড়িয়া ফেল, সাড়াশি দিয়ে এক-একটি ক’রে সকল দাত মূলোৎপাটিত কর, আমার কর্ণরন্ধে, সৰ্ব্বাঙ্গে গলিত সীসক ঢেলে দাও—ঘত প্রকার যন্ত্রণা আছে—যে সকল চিন্তার অতীত—আমাকে দাও, আমার মনের দৃঢ়তা কখনই তুমি নষ্ট করতে পারবে না; সে যাতে শীঘ্র শীঘ্র মৃত্যুমুখে পড়ে, তা আমি করব; তাতে আমি জানব, আমার প্রতিহিংসা সফল হয়েছে; তাতে তোমার মনে যে যন্ত্রণা হবে, সে যন্ত্রণার কাছে আমার শারীরিক যন্ত্রণা তুচ্ছ বিবেচনা করব। আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি, বড় বেশি কিছু নয়—দেবেন, একটি বৎসর মাত্র; এই এক বৎসরের জন্য আমার হও—কেবল আমারই। তার পর তোমার সংসারে সানন্দে তুমি ফিরে যেয়ো—সুখী হ’য়ো। সম্মত হবে কি? তুমি ত বলিয়াছ, রেবতীর প্রাণরক্ষার্থ সকলই করিতে পার; কেবল এক বৎসরের জন্য আমি তোমার কাছে তোমাকেই চাহিতেছি। উত্তর দিবার আগে বেশ ক’রে ভেবে দেখ—দেবেন, বেশ ক’রে বিবেচনা ক’রে দেখ; আমার কথা আমি কিছুতেই লঙ্ঘন হ’তে দিই নাই; আমার অভিপ্লায়ের একবিন্দু পরিবর্তিত হবে
    না।”
    জুমেলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, দেবেন্দ্রবিজয়ের সম্মুখে-সাশ্রনেত্ৰে— মানমুখে—স্থিরভাবে দাঁড়াইয়া রহিল।
    দেবেন্দ্রবিজয়ও সেইরূপ স্থিরভাবে রহিলেন। তাঁহার এখনকার মনের অতিশয় অধীরতা মুখে কিছুমাত্র প্রকাশ পাইল না।
    জুমেলিয়া জিজ্ঞাসিল, “কি বল দেবেন, সন্মত আছ?”
    দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “রেবতী কোথায়?”
    জুমেলিয়া। এইখানেই আছে।
    দেবেন্দ্র। তার কাছে আমাকে নিয়ে চল।
    জু। কি জন্য?
    দে। তোমাকে এখন কি উত্তর দিব? আমি তাকে দেখে সে সম্বন্ধে একটা বিবেচনা করতে পারব।
    জু। আমি এখনি তার কাছে নিয়ে যেতে পারি।
    দে | নিয়ে চল।
    জু। তার পর তুমি আমার কথার উত্তর দিবে?
    দে। হাঁ।
    জু। তবে আমার সঙ্গে এস, দেবেন; তুমি অবশ্যই স্বীকার পাবে : তুমি যেরূপ তাহাকে ভালবাস, তাতে তাকে দেখলে—তার মুখ দেখলে কখনই তুমি আমার প্রস্তাবে অস্বীকার করতে পারবে না—এস।

    * * * * *

    জুমেলিয়া দেবেন্দ্রবিজয়কে সঙ্গে লইয়া পার্শ্ববৰ্ত্তী কক্ষে গমন করিল। তথায় প্রকোষ্ঠতলে একথানি ছিন্ন গালিচার উপর মৃতপ্রায় রেবতী পড়িয়া।
    রেবতীর মুখমণ্ডল অতিস্নান—ঠিক মৃতের মুখের ন্যায়। দেখিয়া দেবেন্দ্রবিজয় হৃদয়ের মধ্যে একটা অননুভূতপূৰ্ব্ব, কম্পপ্রদ শৈত্য অনুভব করিলেন; তখনকার মত তাঁহার অৰ্দ্ধোন্মত্ত অবস্থা আর কখনও ঘটে নাই। তখন তাঁহার, প্রাণের ভিতরে যে কি অসহ যন্ত্রণা হইতেছিল, তাহার বর্ণনা হয় না; কিন্তু বাহিরে তাহার সকলই স্থির—প্রাণে যেন উদ্বেগের কোন কারণই নাই। অতি তীব্রভৃষ্টিতে বারেক জুমেলিয়ার মুখপানে চাহিলেন তার পর নিতান্ত রক্ষস্বরে বলিলেন, “জুমেলিয়া, আমার উত্তর, না।”

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ
    “মরে —মরিবে”

    ‘না’ এই শব্দমাত্রটাতে সম্ভব জুমেলিয়া খুব বিচলিত ও চমকিত হইয়া উঠিত; কিন্তু তখনকার ভাব জুমেলিয়া অতিকষ্টে দমন করিয়া ফেলিল; কেবল মৃদু হাসিয়া মৃদুগুঞ্জনে বলিল, “ব্যস্ত হ’রো না, দেবেন; বেশ ক’রে ভেবে দেখ।”
    বাক্যশেষে তীক্ষকটাক্ষবিক্ষেপ।
    “তেবে দেখেছি, না।”
    “তুমি তবে স্বীকৃত হবে না?”
    “না।”
    “দেবেন, তুমি না বড় বুদ্ধিমান্‌! তোমার স্ত্রীর এই দশা দেখে তুমি কি এই উত্তর স্থির করলে, দেবেন?”
    “হাঁ।”
    “কি দেখে তুমি এমন ভরসা করছ?”
    “আমার স্ত্রীর কিছুই হয় নাই, মুখমণ্ডল যদিও ম্লান, তা’ ব’লে কালিমাময় বা জ্যোতির্হীন নয়! জুমেলা, যতদূর কদৰ্য্যত ঘটতে পারে— তা তোমাতে ঘটেছে। যতই তুমি পাপলিপ্ত হও না কেন, পবিত্রতা যে কি জিনিষ, অবশ্যই তা তুমি জান। তুমি এখনও বলিতেছ, তুমি আমার ভালবাস?”
    “হাঁ, ভালবাসি, দেবেন, এখনও বলছি, তোমার জন্য আমি পাগল হইয়াছি।”
    “হ’তে পারে; কিন্তু আমি তোমাকে আন্তরিক ঘৃণা করি।”
    “দেবেন, এই কি তোমার উত্তর? কঠিন!”
    “আমি অন্যায় কিছু বলি নাই; তুমি আমার কথা ঠিক বুঝিবে কি, জানি না; যদি তুমি প্রকৃত রমণী হইতে, তাহা হইলে নিশ্চয়ই বুঝিতে পারিতে; কিন্তু বিধাতা তোমাকে যদিও রমণী করিয়াছেন, রমণী-হৃদয় দিতে সম্পূর্ণ ভুল করিয়াছেন; আচ্ছ, তুমিই মনে কর, তুমি যেন রেবতী—”
    [বাধা দিয়া] “বল – বল—দেবেন, তোমার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক; তোমার মুখে এ কথা শুনে আমার হৃদয়ে আনন্দ ধরছে না।”
    দেবেন্দ্রবিজয় বলিতে লাগিলেন, “তুমি যেন রেবতী, তোমার স্বামী তোমাকে অতিশয় ভালবাসেন, তুমি যেন কোন দুর্ঘটনায় ওখানে ঐরূপ মৃতপ্রায় পড়িয়া আছ, এমন সময়ে অন্য একটী স্ত্রীলোক তোমার এইরূপ অবস্থায় তোমার স্বামীর নিকটে এইরূপ একটা জঘন্ত অভিপ্রায় প্রকাশ করছে; অথচ তোমার সম্মুখে এখন বা যা ঘটছে, তুমি যেন তা মনে মনে জানতে পারছ; তুমি কি তখন তোমার জীবন-রক্ষার্থে তোমার স্বামীকে সেই রমণীর হাতে সমর্পণ করতে সন্মত হ’তে পার? পার কি জুমেলা?”
    “অ্যাঁ, – না—ন!—না—না! কখনই না! সহস্রবার না!”
    “তবে জুমেলা, তুমি কি তোমার প্রশ্নের উত্তর নিজে, নিজেরই মুখে পাচ্ছ না? যার প্রাণের পরিবৰ্ত্তে আমাকে তুমি চাও, সে আমাকে ছাড়িয়। তার প্রাণ চাহে না; আর আমার স্ত্রীকে যদি আমি যথার্থ হাঁ ভালবাসি, তবে তার অনভিপ্রেত কাজে আমার হস্তক্ষেপ কর ঠিক হয় না।”
    “তবে কি আমার কথার উত্তর না’? তুমি জান, তা’ হ’লে তুমিই তোমার সেই স্ত্রীরই হন্তারক হবে?”
    “তথাপি তুমি আমার মত কিছুতেই ফিরাতে পারবে না, জুমেলা।”
    “তবে তুমি আমাকে ঘৃণা কর?”
    “হাঁ, ভাল রকমে।”
    “তবে ভাল রকমে রেবতী ও মরিবে?”
    ‘মরে —মরিবে।”
    “নিশ্চয় মরিবে।”
    “তেমনি নিশ্চয়, সে একা মরিবে না।”
    “হোঃ—হোঃ—হোঃ [হাস্য] তুমি আমায় বড় ভয় দেখাচ্ছ!”
    “হাঁ।”
    জুমেলিয়া আবার হাসিল।
    সেই অমঙ্গলজনক—পৈশাচিক তীব্র অট্টহাস্য—নির্জ্জলদগগনবক্ষের গম্ভীরবজধ্বনিবৎ। জুমেলিয়া বলিল, “তোমাকে আমি ভয় করি না–করিতে শিখিও নাই।”
    দেবেন্দ্র। যদি না শিখিয়া থাক, আজ শিখিবে।
    জুমেলিয়া। কেন?
    দে। না শিখিলে আমার কাজ সফল হইবে কি প্রকারে?
    জু। তোমার কাজ?
    দে। হাঁ।
    জু। কি কাজ?
    দে। তুমি যে কাজ করিতে আমাকে বলিয়াছ।
    জু। আমি তোমায় কি কাজ করিতে বলিয়াছি – বল, তোমার কথা বুঝতে পারছি না।
    দে। তুমি তোমার জন্য পূৰ্ব্বে যে যে যন্ত্রণার উল্লেখ করেছ, সেই সকল যন্ত্রণাই তোমাকে আমি ভোগ করাইব। আমি যে মানুষ, এ কথা আমি এখন যতদুর ভুলে যেতে পারি, ভুলিব; তোমার উপযুক্ত— তোমারই মত হ’তে—পিশাচ হ’তে চেষ্টা করিব। আমি এখন একএকটি ক’রে তোমার মস্তকের সকল কেশ—যতক্ষণ না, তোমারই ওই ষড়যন্ত্রপূর্ণ মস্তক কেশলেশহীন হয়—ততক্ষণ মূলোৎপাটিত করব। তার পর আমার এই ছুরি পুড়িয়ে লাল করব, সেখান তোমার কপালে চেপে ধরব—দুই গালে চেপে ধরব—তা দিয়ে তোমার চক্ষু দুটা উৎপাটিত করব।
    জুমেলিয়া হাসিতে গেল—পারিল না।
    দেবেন্দ্রবিজয় পূৰ্ব্ববৎ বলিতে লাগিলেন, “পাছে তুমি নিজের জীবন নিজে বাহির কর, পাছে যদি তোমার কাছে কোন প্রকার বিষা থাকে, আগে তা কেড়ে নেব, তার পর তোমাকে সেই মুণ্ডিতমস্তক, ঝলসিত মুখ অবস্থা না ঘটে, ততক্ষণ তোমার কোন স্বাভাবিক অবস্থা না ঘটে, ততক্ষণ পথে পথে অনাহারে ঘুরিবে।”
    জু। [সচীৎকারে] তুমি! তুমি এই সকল করবে?
    দে। হাঁ, আমিই সব করব।
    জু। [ সচীৎকারে ] তুমি! তমি এই সকল করবে?
    জু। তুমি! দেবেন্দ্রবিজয়!
    দে। আঃ, ভুলে যাও কেন, জুমেলা, আমি কেন? দেবেন্দ্রবিজয় মরে গেছে, তার দেহে এক পিশাচের অধিষ্ঠান হয়েছে; সেই পিশাচ, যতক্ষণ না তুমি মর, ততক্ষণ তোমাকে নূতন নূতন যন্ত্রণা দেবে; যখন একটু সুস্থ হবে, আবার নূতন যন্ত্রণা।
    জু। [ সরোষে ] নিৰ্ব্বোধ! তুমি কি মনে করেছ, আমি এই সকল যন্ত্রণা সহ করবার জন্য তোমার কাছে ঠিক এমনি ভালমানুষটির মত চুপ্‌ ক’রে দাঁড়িয়ে থাকব?
    দে। কি করবে, মরবে? পারবে না। যদি তুমি আত্মহত্যা করবার জন্য কোন বিষ বাহির করিতে যাও, পিস্তলের গুলিতে তোমার হাত চুর্ণ-বিচূর্ণ ক’রে দিব; যদি পালাবার জন্য এক পা নড়বে, এখনই এই গুলিতে তোমার পা ভেঙ্গে দিব।
    জুমেলিয়া তিরস্কারব্যঞ্জক কৰ্কশ হাসি হাসিতে লাগিল।
    দেবেন্দ্রবিজয় বজ্রনাদে বলিলেন, “জুমেলা, হাসি নয়—আমি মিথ্য বলি না—শীঘ্র প্রমাণ পাবে।”
    “প্রমাণ দেখাও।”
    “দেখিবে? তোমার কাণে যে ঐ দুটা দুল আছে, ঐ দুটীর মধ্যেও তুমি কৌশলে বিষ সঞ্চয় ক’রে রেখেছ; তোমার ঐ ফুল দুটির অস্বাভাবিক গড়ন দেখেই তা বুঝতে পারছি—ও দুটি এখনই দূর করাই ভাল।”
    বাক্য সমাপ্ত হইতে-না-হইতে দেবেন্দ্রবিজয় উপর্য্যুপরি দুইবার পিস্তলের শব্দ করিলেন, জুমেলিয়ার কর্ণাভরণ দুটা পিস্তলের গুলিতে ভাঙ্গিয়া দুরে গিয়া পড়িল, এবং ঘরটি কিয়ৎকালের নিমিত্ত ধূম্রময় হইয়া উঠিল। ইত্যবসরে দেবেন্দ্রবিজয় পিস্তলটা লুকাইয়া ফেলিলেন।
    জুমেলিয়া সভয় চাৎকারে দশ পদ পশ্চাতে হটিয়া গিয়া এক কোণে দাঁড়াইল। যেমন সে হস্তোত্তোলন করিতে যাইবে, দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, “সাবধান, হাত তুলিয়ে না; এখনি আমি পিস্তলের গুলিতে তোমার হাত ভাঙিয়া দিব। জুমেলা, এ হাস্যোদীপক প্রহসন নয়, পৈশাচিক ঘটনাপূর্ণ বিয়োগান্ত নাটক।”

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ
    ধরা পড়িল

    দুবার উপর্যুপরি পিস্তলের শব্দ করিয়া দেবেন্দ্রবিজয় বুঝিতে পারিলেন, তখনই শচীন্দ্র তথায় উপস্থিত হইবে। পাঠক অবগত আছেন, দুইবার পিস্তলের শব্দ তাঁহীদের একটা নির্দিষ্ট সঙ্কেতমাত্র। শচীন্দ্র তখনই অতি নিঃশব্দে আসিয়া জুমেলিয়ার পশ্চাদ্ভাগে দাঁড়াইল। দেবেন্দ্রবিজয় তাহাকে দেখিতে পাইলেন; জুমেলিয়া কিছুই জানিতে পারিল না। এখন আর শচীন্দ্রের সে ভিক্ষুকের বেশ নাই, ইতোমধ্যে তৎপরিবর্তে পুলিশের ইউনিফর্ম ধারণ করিয়াছিল।
    দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, “জুমেলা, তুমি একদিন বলেছিলে না যে, মৃত্যুর পরেও তুমি আমার অনুসরণ করবে? যদি আমি মরিতাম, আমিও তোমার পিছু নিতাম; ভূতের মত অলক্ষ্যে তোমারও পশ্চাতে দাঁড়াতেম; তুমি কিছুই জানতে পারতে না; তার পর তোমার হাত দুটা পিছু-মোড়া করে ধরতেম, তোমার আর নড় বার শক্তি থাকত না—বুঝতে পেরেছ?
    জু। না।
    দে। এইবার?
    তখন শচীন্দ্র জুমেলিয়ার হাত দুখান পিছু-মোড়া করিয়া ধরিল। জুমেলিয়া জোর করিতে লাগিল; চীৎকার করিয়া উঠিল, কিছুতেই শচীন্দ্রের হাত হইতে মুক্তি পাইল না।
    জুমেলিয়ার সহিত দেবেন্দ্রবিজয়ের উপযুক্তি কথোপকথনের যে কথাগুলি নিম্নে কৃষ্ণরেখা দ্বারা চিহ্নিত করা হইল, দেবেন্দ্রবিজয় জুমেলিয়াকে না বলিয়া প্রকারান্তরে শচীন্দ্রকেই বলিতেছিলেন। শচীন্দ্র আদেশ পালন করিল।
    দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, “জুমেলিয়া, এইবার তুমি অসহায়— পলায়নের কোন উপায় নাই; এইবার আমি তোমার হাতে হাতকড়ী, পায়ে বেড়ী দিব; তার পর তোমারি মন্ত্রণা মত সেই সব যন্ত্রণা তোমাকেই দেওয়া হবে।”

    তখনই জুমেলিয়াকে হাতকড়ী ও বেড়ী পরাইয়া দেওয়া হইল। তাহার পর দেবেন্দ্রবিজয় তাহাকে একখানি চেয়ারে বসাইয়া চেয়ারের সহিত লৌহশৃঙ্খলে তাহাকে বন্ধন করিলেন। তখন জুমেলিয়া শচীন্দ্রকে দেখিতে পাইল—এতক্ষণ দেখিতে পায় নাই; বলিল, “পোড়ারমুখ আমার। কই, আমি ত আগে কিছুই জানতে পারি নাই।”
    শচীন্দ্র বলিল, “যাকে তুমি পাহারা দিতে বাগানে রেখেছিলে, তাকে যদি না হাত মুখ বেঁধে গাছতলায় আমি ফেলে রেখে আসতেম— জানতে পারতে, আমি এসেছি। জুমেলিয়া, এখন আমাদের দয়ার উপর তোমার পাপপ্রাণ নির্ভর করছে।”
    দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “হাঁ—জুমেলা, যাকে ভালবাস, এখন তারই দয়ার উপর তোমার জীবন নির্ভর করছে।”
    জুমেলিয়া। তবে দেবেন, তুমি তবে আমার সঙ্গে সন্ধি করতে চাও না?
    দেবেন্দ্র | সন্ধি? না—কেন করিব?
    জু। তুমি রেবতীকে রক্ষা করিবে না?
    দে। যদি পারি—করিব।
    জু। তবে কেন তুমি তাতে সাধ করিয়া ব্যাঘাত ঘটাইতেছ?
    দে। কি প্রকারে?
    জু। আমার সহিত সন্ধির কোন বন্দোবস্ত না করিয়া।
    দে। তুমি ত বলেছ, তাকে পরিত্রাণ দেবে না।
    জু। তখন আমি তোমার হাতে পড়ি নাই।
    দে। এ কথা নিশ্চয়—আমি ভুলে গেছ লেম; যাতে তার জ্ঞান হয়, এখন সে ঔষধ আমার হাতে দেবে কি?
    জু। দিতে পারি, যদি তুমি আমাকে ছেড়ে দাও—আমাকে এখান থেকে পালাবার জন্য আটচল্লিশ ঘণ্টা মাত্র সময় দাও—হাঁ, তাহা হইলে আমি দিতে পারি। .
    দে। সে আশা বৃথা।
    জু। তবে তুমি তোমার স্ত্রীর জীবন রক্ষা করতে অসম্মত?
    দে। সে যে রক্ষা পাবে না, এ বিশ্বাস আমার নাই। এবারে তোমার যন্ত্রণা আরম্ভ হবে। [ শচীন্দ্রের প্রতি ] শচী! এখনই এই ছুরি দিয়া জুমেলিয়ার চোখ দুটা উৎপাটন করিয়া ফেল।
    জু। [ সচীৎকারে ] বাঁচাও! দয়া কর!
    দে। কিসের দয়া?
    জু। আমি রেবতীকে বাঁচাতে পারি—বাঁচাব।
    দে। বাঁচাও তবে—তাকে।
    জু। ছেড়ে দাও আমায়।
    দে। সে আশা ক’রো না।
    জু। তুমি কি এখন আমার সে প্রস্তাবে সম্মত হবে?
    দে। আমি কিছুতেই সম্মত নই।
    জু। তবে আমি কখনই তাকে বাঁচাব ন—মরুক সে—চুলোয় যাক সে!
    দে। জুমেলা, বাঁচাও তাকে; সে যদি আমাকে তোমার ছেড়ে দিতে বলে, নিশ্চয় তোমাকে আমি মুক্তি দিব; মনে বুঝে দেখ, তোমার ভবিষ্যৎ তার হাতে।
    জু। রেবতীর? ভাল, যদি সে স্বীকার করে, তুমি আমাকে ছেড়ে দেবে? আমি এখনই তাকে বাঁচাব। ছেড়ে দাও আমায়; আমি মিথ্যা বলি না।
    দে। না।
    জু। তবে কি ক’রে তাকে বাঁচাতে পারি?
    দে। কি করলে তার জ্ঞান হবে, আমাকে ব’লে দাও—আমিই সে কাজগুলি করব—তুমি না। যদি তাতে তার জ্ঞান না হয়, তোমার সেই নিজের স্থিরীকৃত যন্ত্রণাগুলি তোমাকেই উপভোগ করতে হবে।
    জু। সে যদি বাঁচে, তা’ হ’লে তুমি আমাকে ছেড়ে দেবে?
    দে। যদি রেবতী স্বীকার পায়।
    জু। যে ঘরে তোমাকে আগে নিয়ে যাই, সেই ঘরে টেবিলের ভিতরে একটি ছোট কাঠের বাক্স আছে, নিয়ে এস—যেমন আছে, তেমনই নিয়ে আসবে; সাবধান, যেন খুলিয়ো না।
    তখনই দেবেন্দ্রবিজয় সেই বায়ু লইয়া আসিলেন।
    জু। ঐ বাক্সের ভিতর থেকে সতের নম্বরের শিশিট বাহির কর, পাঁচ ফোঁটা ঔষধ রেবতীকে খেতে দাও।
    দে। কোন ঔষধে তুমি রেবতীকে এখন অজ্ঞান ক’রে রেখেছ—কত নম্বর?
    জু। এ কথা জিজ্ঞাসা করছ কেন?
    দে। প্রয়োজন আছে।
    জু। নম্বর সাত।
    দে। বেশ, যদি এই সতের নম্বরের ঔষধে কিছু ফল না হয়, তোমাকে সাত নম্বরের ঔষধ জোর করিয়া খাওয়াইব।
    জু। ফল হবে।

    দেবেন্দ্রবিজয় ধীরে ধীরে রেবতীর অবসন্ন, তুষারশীতল মস্তক নিজের ক্রোড়ে গ্রহণ করিলেন। তখন তাঁহার মনে যে যন্ত্রণা হইতেছিল, তিনি তেমন যন্ত্রণা ইতিপূৰ্ব্বে কখনও ভোগ করেন নাই। তাঁহার সেই প্রাণের যন্ত্রণার কোন চিহ্ন মুখমণ্ডলে প্রকটিত হইল না। তাহার পর তিনি রেবতীর মুখ-বিবরে বিন্দু বিন্দু করিয়া সেই শিশিমধ্যস্থিত গাঢ় লোহিত বর্ণের তরল ঔষধ ঢালিতে লাগিলেন।
    মুহূর্তের পর মুহূৰ্ত্ত কাটিতে লাগিল, গৃহ নিস্তব্ধ—কোন শব্দ নাই।
    তাহার পর যখন প্রায় একদণ্ড উত্তীর্ণ হইয়া গেল, সহসা রেবতী চক্ষুরুন্মীলন করিলেন—নিতান্ত বিস্মিতের ন্যায় প্রকোষ্ঠের চতুর্দিকে চাহিতে লাগিলেন।

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ
    একি ইন্দজাল!

    চক্ষুরুন্মীলন করিয়া রেবতী যাহা দেখিলেন, তাহাতে তাঁহার বিস্ময়ের সীমা রহিল না।
    জুমেলিয়া রেবতীকে ক্লোরোফৰ্ম্ম করিয়া এখানে লইয়া আসে; সে ঘোর কাটিতে-না-কাটিতে সে আবার নিজের অমোঘ ঔষধ প্রয়োগ করে, তাহাতে রেবতী সেই অবধি সম্পূর্ণরূপে সংজ্ঞাহীন। প্রথমে তিনি দেখিলেন, তিনি যে কক্ষে শায়িত আছেন—সে কক্ষ তাহার অপরিচিত—তাহার সম্মুখে দেবেন্দ্রবিজয় দণ্ডায়মান—দেবেন্দ্রবিজয়ের পার্শ্বে ম্লানমুখে শচীন্দ্র এবং কিছুদূরে হাতে হাতকড়া, পায়ে বেড়ী দেওয়া লোহশূঙ্খলে আবদ্ধ জুমেলিয়া একখানি চেয়ারে বিনতমস্তকে বসিয়া।
    দেবেন্দ্রবিজয় রেবতীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেমন আছ?”
    রেবতী! ভাল আছি।
    দেবেন্দ্র। উঠিতে পরিবে কি?
    রে। পারিব। [ দণ্ডায়মান ]
    দে। চলিতে পারিবে?
    রে। হাঁ, কেবল মাথাটা একটু ভারি বোধ হচ্ছে।

    তাহার পর দেবেন্দ্রবিজয় দুই-একটি কথাতে অতি সংক্ষেপে এ পর্য্যন্ত যাহা যাহা ঘটিয়াছে, সকলই রেবতীকে বলিলেন; কেবল জুমেলিয়ার সেই অবৈধ প্রেম-প্রস্তাব সম্বন্ধে কোন কথার উল্লেখ করিলেন না; তজ্জন্য ডাকিনী জুমেলিয়া বারেক সন্তুষ্টনেত্রে দেবেন্দ্রবিজয়ের মুখপ্রতি দৃষ্টিপাত করিল।
    দেবেন্দ্রবিজয় রেবতীকে বলিলেন, “এখন তোমার হাতে জুমেলার ভবিষ্যতের ভালমন্দ নির্ভর করছে; আমি জুমেলার নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছি, তোমার কথামত আমি কাজ করব; তুমি উহাকে মুক্তি দিতে চাও—দিব, না চাও–না দিব, যা তোমার ইচ্ছা। স্বীকার করি, জুমেলাই তোমাকে মৃত্যুমুখ থেকে ত্রাণ করেছে; কিন্তু সেই জুমেলাই তোমাকে মৃত্যুমুথে তুলে দিয়েছিল; এখন আমি এখান হ’তে বাহিরে যাচ্ছি—এখন এখানে থাকা আমার আবশ্যক করে না; আমার সাক্ষাতে জুমেলা তোমার নিকটে কোন প্রার্থনা জানাতে লজ্জিত হবে; তুমিও কিছুই ভালরূপে মীমাংসা ক’রে উঠতে পারবে না; তবে বাহিরে যাবার আগে তোমাকে একটি কথা ব’লে রাখা প্রয়োজন। সাবধান, তুমি জুমেলিয়াকে স্পর্শ করিয়ো না!—এমন কি নিকটেও যাইয়ো না।”
    দেবেন্দ্রবিজয় শচীন্দ্রকে সঙ্গে লইয়া, তথা হইতে বহির্গত হইয়া বাহির হইতে কবাটে শিকল দিলেন। দেবেন্দ্রবিজয় ও শচীন্দ্র বাহিরে অপেক্ষায় রহিলেন।
    পনের মিনিট অতিবাহিত হইল, কোন সংবাদ নাই।

    আর দশ মিনিট কাটিল – তথাপি কোন সাড়াশব্দ নাই, একটিমাত্র ভিত্তি ব্যবধানে তাহারা দণ্ডায়মান; কোন শব্দ নাই। তখন দেবেন্দ্রবিজয় অস্থির হইতে লাগিলেন। বাহির হইতে উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন, “অরি আমি পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করিব, যা হয়, ঠিক করিয়া লও।” দেবেন্দ্রবিজয় পকেট হইতে ঘড়ী বাহির করিয়া দেখিতে লাগিলেন। সেইরূপ নিঃশব্দে আরও পাঁচ মিনিট কাটিল।
    দেবেন্দ্রবিজয় তখন সশব্দে সেই কক্ষদ্বার উদঘাটন করিলেন। যাহা দেখিলেন, তাহাতে তাঁহাকে স্তম্ভিত হইতে হইল, তাঁহার মাথা ঘুরিয়া গেল, মুখ দিয়া কথা বাহির হইতে অনেক বিলম্ব হইল।

    যে গৃহমধ্যে তিনি এই কতক্ষণ হস্তপদবদ্ধ জুমেলিয়া এবং রেবতীকে রাখিয়া বাহিরে গিয়াছিলেন, সে কক্ষ শূন্য পড়িয়া আছে।
    রেবতী নাই।
    জুমেলিয়া নাই।
    তাহাদের কোন চিহ্নও নাই।
    পাছে ভ্রম হইয়া থাকে, এই সন্দেহে নিদারুণোদ্বেগে দেবেন্দ্রবিজয় উভয় হস্তে উভয় নেত্ৰ মৰ্দ্দন করিতে লাগিলেন। একি স্বপ্ন! জুমেলিয়াকে যে চেয়ারে বন্ধন করা হইয়াছিল, সেই চেয়ারের নিকটে অগ্রসর হইলেন; দেখিলেন, যে শৃঙ্খলে জুমেলিয়া আবদ্ধ ছিল, সেটা চেয়ারের নীচে পড়িয়া রহিয়াছে; হাতকড়ী ও বেড়ী ও সেখানে আছে; তাহা অন্য চাবি দিয়া খুলিয়া ফেলা হইয়াছে í
    চেয়ারখানার উপরে এক টুকরা কাগজ পড়িয়া রহিয়াছে, তাহাতে লেখা ছিল;– .
    “কেমন মজা; বাহবা কি বাহব্বা-আবার যে-কে সেই! তুমি বোকারাম গোয়েন্দা। আমি আবার স্বাধীন—রেবতী আবার আমার হাতে পার-ক্ষমতা থাকে তাকে উদ্ধার করিয়ো।
    সেই
    জুমেলা।”
    দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, “কিরূপে পলাইল? জুমেলা বাঁধা ছিল। কেবল বাঁধা নয়—তার সম্মুখে রেবতীও ছিল। একি ব্যাপার, শচী? শচী, তুমি যে লোকটাকে বাহিরে বেঁধে রেখে এসেছ, সে ত কোন রকমে এদিকে আসতে পারে নাই?”
    শচীন্দ্র সেই সন্ধান লইবার জন্য তখনই যেমন লাফাইয়া গৃহ হইতে বাহির হইতে যাইবেন, অমনি আগুনের একটা সুতীব্র ঝটকা আসিয়া তাহাকে তথায় ফেলিয়া দিল। সেই সঙ্গেই ‘ধ্রূম’ করিয়া একটা পিস্তলের শব্দ হইল। মৃতবৎ শচীন্দ্র দেবেন্দ্রবিজয়ের পদপার্শ্বে পতিত হইল। এখন দেবেন্দ্রবিজয় কি করিবেন? এ মুহূৰ্ত্ত চিন্তার নহে—কার্য্যের। তখনই পিস্তল বাহির করিলেন, যেদিক্ হইতে আগুনের ঝটুক আসিয়াছিল, সেইদিক্‌ লক্ষ্য করিয়া পিস্তল দাগিলেন। তখনই কোন একটা ভারযুক্ত দ্রব্যের পতন শব্দ এবং মানুষের গেঙানি শুনা গেল—তবে পিস্তলের গুলিটা ব্যর্থ যায় নাই।
    তখন দেবেন্দ্রবিজয় দ্বারদেশে নিপতিত শচীন্দ্রকে উল্লঙ্ঘন করিয়া কক্ষের বাহিরে আসিলেন; যেদিক্ হইতে গেঙানি শব্দ আসিতেছিল সেইদিকে দুই-চারিপদ যাইয়াই দেখিতে পাইলেন, একটা লোক মৃতবৎ পড়িয়া রহিয়াছে; বুঝিলেন, তখনও লোকটা মরে নাই।
    দেবেন্দ্রবিজয় নীরবে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন।

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
    শেষ উদ্যম

    যখন দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, লোকটা পূৰ্ব্বাপেক্ষ অনেকটা প্রকৃতিস্থ হইয়াছে; জিজ্ঞাসিলেন, “কি হে ভদ্রলোক! আমি এখন তোমাকে যা’ যা’ জিজ্ঞাসা করব, ঠিক ঠিক তার উত্তর দেবে কি? যদি না আমার হাত থেকে সহজে নিস্তার পাবে না—তোমার জিহ্বাটা টেনে ছিড়ে ফেলে দিব।”
    সেই লোকটা ভয়ে ভয়ে বলিল, “আপনি আমাকে কি জিজ্ঞাসা করতে চান?”
    দেবেন্দ্র। জুমেলা কি প্রকারে মুক্তি পাইল?
    লোক। আমি তাকে মুক্তি দিয়েছি।
    দে। সেখানে আর একটা যে স্ত্রীলোক ছিল, সে কিছু বলে নাই?
    লো। আমি আগেই তাকে তার অলক্ষ্যে ক্লোরফৰ্ম্ম ক’রে গাড়ীতে তুলে দিয়ে আসি।
    দে! গাড়ী! কোথাকার গাড়ী?
    লো। পুৰ্ব্বদিক্কার পথের ধারে আগে একখানা গাড়ী এনে ঠিক করে রেখেছিলেম।
    দে। কার আদেশে?
    লো। জুমেলিয়ার।
    দে! কি জন্য গাড়ী এনে রেখেছিলে?
    লো। জুমেলিয়ার মুখে শুনলেম, তার সঙ্গে আপনি কোথা যাবেন বলেছিলেন।
    দে। সে গাড়ীতে আর কে আছে?
    লো। গিরিধারী নামে আমারই একজন বন্ধু—আমার সেই বন্ধুকেই আপনার সঙ্গী লোকটা নীচে বেঁধে ফেলে রেখেছিল; আমি গিয়ে তাকে উদ্ধার করি; তার পর আপনাদের এখানকার ব্যাপার চুপিসারে এসে দেখি; সুবিধাক্রমে কাজ শেষ করি—তারা এখন সব চ’লে গেছে।
    দে। তুমি গেলে না কেন? তুমি যে বড় থেকে গেলে?
    লো। আপনাকে খুন করবার জন্য।
    দে। আমাকে খুন করিয়া তোমার লাভ?
    লো। জুমেলিয়ার লাভ।
    দে। তা’তে তোমার কি?
    লো। জুমেলিয়ার লাভে আমার লাভ।
    দে। গাড়ীখানা কোথায় গেল?
    লো। দমদমার দিকে।
    দে। দমদমার কোথায়—কোন ঠিকানায়?
    লো। ঠিকানা ঠিক জানি না—তবে বেলগাছি ছাড়িয়ে যেতে হবে।
    দে। বেলগাছি ছাড়িয়ে কত দূর যেতে হবে?
    লো। শুনেছি, বেশি দূর না—দু-চারখানা বাগানের পরেই একটা গেটওয়ালা বাগান আছে, সেই বাগানের ভিতরে।
    দে। ও বুঝেছি! হরেকরামের বাগান বুঝি?
    লো। হাঁ—হাঁ—ঠিক ঠাওরেছেন।
    দে। যদি তা’ না হয়—যদি মিথ্যা ব’লে থাক—তোমায় আমি—
    বাধা দিয়া আহত ব্যক্তি বলিল, “আমি মিথ্যাকথা বলি নাই।”
    দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসিলেন, “জুমেলিয়ার সঙ্গে তোমার আর তোমার বন্ধুর কতদিন পরিচয় হয়েছে?”
    “এক সপ্তাহ হ’বে।”
    “সে বাগানে আর কেউ আছে?”
    “একজন দরওয়ান—তার নাম পাহাড় সিং।”
    “জুমেলা আর তোমার বন্ধু গিরিধারী কতক্ষণ গেছে?”
    “আমি যখন আপনার সঙ্গীকে গুলি করি, তার একটু আগে।”
    “আমাকে খুন করতে তুমি থেকে যাও, কেমন? আমাকে খুন, করবার কারণ কি? জুমেলিয়ার লাভ কি রকম?”
    “জুমেলা যাবার সময় ব’লে গেছে, আপনাকে খুন করলে সে আমাকে বিবাহ করবে।”
    “তুমি কি তাকে বিশ্বাস কর?”
    “আগে করেছিলাম বটে।”
    শচীন্দ্রের ক্রমে জ্ঞান হইতে লাগিল; অল্পক্ষণ পরে উঠিয়া বসিল। দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসিলেন, ‘শচী, চলিতে পারিবে?”
    শ। পারিব।
    দে। জুমেলা এখন কোথায় যাইবে আমি জেনেছি – আমি এখনই তার সন্ধানে চললেম; তুমি এখন এখানে থাক—যতক্ষণ না আমি ফিরে আসি, ততক্ষণ তুমি এইখানেই থাক; সুবিধামত কোন পাহারাওয়ালাকে রাস্তায় পেলে তোমার সাহায্যার্থ তাকে এখানে পাঠিয়ে দিব।
    দেবেন্দ্রবিজয় এই বলিয়া ক্ষিপ্ৰপদে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন।

    অতি অল্পক্ষণে তিনি ছুটিয়া আসিয়া জগুবাবুর বাজারের পথে পড়িলেন, তথায় দুই-একখানি ভাড়াটিয়া গাড়ী তখনও আরোহীর অপেক্ষায় ছিল। দেবেন্দ্রবিজয় লাফাইয়া একখানি- গাড়ীর কোচ বক্সে গিয়া উঠিলেন; ঘোড়ার লাগাম ও চাবুক স্বহস্তে গ্রহণ করিয়া গাড়ী জোরে হাঁকাইয়া দিলেন। গাড়োয়ান তাহার সেই অদৃষ্টপুৰ্ব্ব কাৰ্য্যকলাপ দেখিয়া অবাক হইয়া রহিল; দেবেন্দ্রবিজয়কে পাগল অনুমানে শঙ্কিত হইল।
    দেবেন্দ্রবিজয় তাহাকে বলিল, “গাড়ী দমদমায় যাবে, বিশেষ দরকার। বাধা দিয়ো না; বাধা দাও—গাড়ী থেকে ফেলে দিব; চুপ ক’রে বসে থাক; যদি দশ টাকা ভাড়া পেতে চাও- কোন কথাটি ক’রো না, চুপ্‌ ক’রে বসে থাক।”
    গাড়োয়ান অদৃষ্টের উপর নির্ভর করিয়া চুপ্‌ করিয়া বসিয়া রহিল। সে দুইদিনে কখন দশ টাকা রোজগার করিতে পারে নাই, এক রাত্রেই দশ টাকা পাইবে শুনিয়া মনে মনে অত্যন্ত আহ্লাদিত হইল।
    গাড়ী নক্ষত্ৰবেগে ছুটতে লাগিল।

    সপ্তম পরিচ্ছেদ
    উদ্যমের শেষ

    দেখিতে দেখিতে গাড়ীখানা শ্যামবাজার অতিক্রম করিয়া অতি অল্প সময়ের মধ্যে দমদমায় আসিয়া পড়িল। এখনও সেইরূপ তীরবেগে গাড়ী ছুটিতেছে।
    যখন সেই গাড়ী হরেক্‌রামের বাগানের নিকটবৰ্ত্তী হইয়াছে, তখন গাড়ীখানার সম্মুখের একখানি চাকা খুলিয়া গেল-গাড়ী দাঁড়াইল। দেবেন্দ্রবিজয় কি এখন চুপ করিয়া থাকিতে পারেন—লাফাইয়া ভূতলে পড়িলেন; নিৰ্ব্বাক্ গাড়োয়ানের হাতে একখানা দশ টাকার নোট ফেলিয়া দিয়া রুদ্ধশ্বাসে ছুটলেন।
    দেবেন্দ্রবিজয় মরুদ্বেগে ছুটিতে লাগিলেন—ক্ষণকালের মধ্যে হরেক্রামের উদ্যান-সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। উদ্যানের মধ্যে আসিয়া পশ্চিমাভিমুখে চলিলেন, কিয়দর গমন করিয়া একটা দ্বিতল অট্টালিকা দেখিতে পাইলেন, তন্মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া বামপার্শ্বস্থ সোপানীতিক্রম করিয়া উপরে উঠিলেন। বারান্দার বসিয়া পরম নিশ্চিন্তমনে পাহাড় সিং তাম্রকুটধর্ম পান করিতেছিল—দেবেন্দ্রবিজয় নিঃশব্দে তাহার পশ্চাদ্ভাগে দাঁড়াইলেন। পাহাড় সিং হুঁকার যেমন একট লম্বা টান দিতে আরম্ভ করিয়াছে, দেবেন্দ্রবিজয় উভয় হস্তে তাহার গলদেশ টিপিয়া ধরিলেন। সুখটানে বাধা পড়িল—হু কার কলিকা ফেলিয়া পাহাড় সিং গোঁ গোঁ করিতে লাগিল—ক্রমে অজ্ঞান হইয়া পড়িল, চক্ষু উল্টাইয়া গেল। তখন দেবেন্দ্রবিজয় তাহার গলদেশ ছাড়িয়া দিলেন, তাহারই পরিহিত বস্ত্রে তাহার হস্তপদ বন্ধন করিলেন ও মুখবিবরে খানিকটা কাপড় প্রবেশ করাইয়া মুখ বন্ধ করিয়া দিলেন; তাহার পর দ্রুতপদে নিম্নে অবতরণ করিলেন।

    অষ্টম পরিচ্ছেদ
    শেষ

    বৈঠকখানা গৃহে দেবেন্দ্রবিজয় প্রবিষ্ট হইলেন, তথার কেহ নাই। একপার্শ্বে একটা অৰ্দ্ধমলিন শয্যা ছিল, তাহার উপরে ক্লান্তভাবে বসিয়া পড়িলেন। অনেকক্ষণ পরে উদ্যানের বাহিরে একটা সচল গাড়ীর ঘর্ঘর ধ্বনি উঠিল। দেবেন্দ্রবিজয় গবাক্ষ দিয়া জ্যোৎস্নালোকে দেখিলেন, একখানি গাড়ী ফটক দিয়া উদ্যান-মধ্যে আসিল; বুঝিতে পারিলেন, তন্মধ্যে জুমেলিয়া ও তাহার পত্নী আছে, উপরে যে ব্যক্তি বসিয়াছিল, সে সেই গিরিধারী সামন্ত।
    গাড়ীখান ক্রমে অট্টালিকার দ্বারসমীপ্লাগত হইয়া দাঁড়াইল—লাফাইয়া গিরিধারী সামন্ত অগ্ৰে ভূতলে অবতরণ করিল।
    “পাহাড় সিং! পাহাড় সিং!” জুমেলা চীৎকার করিয়া ডাকিল। পাহাড় সিং উত্তর করিল না। কে উত্তর দিবে?
    গিরিধারী সামন্ত বলিলেন, “মরুক্‌ ব্যাটা—হতভাগা পাজী! গেল কোথায়?”
    জুমেলিয়া বলিল, “হয় ত ব্যাট সিদ্ধি গাঁজা খেয়ে, বেহুস হয়ে পড়ে আছে—মরুক সে! গিরিধারী, তুমি আমার ভগিনীকে তুলে নিয়ে যাও।”
    “ভগিনী! জুমেলিয়ার?” মৃদুগুঞ্জনে ডিটেক্‌টিভ আপনা-আপনি বলিলেন–তাঁহার আপাদমস্তক বিকম্পিত হইল।
    গিরিধারী জিজ্ঞাসিল, “ম’রে গেছে না কি?”
    ঈষদ্ধান্তে জুমেলিয়া বলিল, “মরেছে? না—এখনও মরে নি; যাও ইহাকে তুলে নিয়ে যাও।”
    গিরি। কোথায় নিয়ে রাখব?
    জু। বৈঠকখানা ঘরে।
    বৈঠকখানার ভিতরে দেবেন্দ্রবিজয় তাহাদের অপেক্ষায় ছিলেন। গিরিধারী সেই কক্ষেই আসিবে জানিয়া, দ্বারপার্শ্বে লুক্কায়িত রছিলেন। তখনই সংজ্ঞাহীন রেবতীকে লইয়া গিরিধারী তথায় প্রবিষ্ট হইল। তথায় আলো না থাকায় সে দেবেন্দ্রবিজয়কে দেখিতে পাইল না। পশ্চিমপার্শ্বস্থিত অৰ্দ্ধোন্মুক্তবাতায়নপ্রবিষ্ট জ্যোৎস্নালোকে ঘরটি অস্পষ্টভাবে আলোকিত; তৎসাহায্যেই গিরিধারী শয্যাটী দেখিতে পাইল, তদুপরি রেবতীকে রাখিয়া বহির্গমনোদ্যোগ করিল।
    এমন সময়ে দেবেন্দ্রবিজয় নিঃশব্দে তাহাকে আক্রমণ করিলেন; যেরূপে তিনি পাহাড় সিংকে বন্দী করিয়াছিলেন, সেইরূপে গিরিধারীকেও বন্দী করিলেন; কোন শব্দ হইল না; অথচ কাৰ্য্যসিদ্ধ হইল। তাহার মৃতকল্পদেহ পালঙ্কের নিম্নে রাখিয়া দিলেন।
    তৎপরেই তিনি রেবতীর নিকটস্থ হইলেন, তাঁহার মুখের নিকট মুখ লইয়া সেই অস্পষ্টীলোকে দেখিয়া বুঝিতে পারিলেন, রেবতী এখন ক্লোরফৰ্ম্মের দ্বারাই অচেতন আছে মাত্র। আশঙ্কার কোন কারণ নাই। দেবেন্দ্রবিজয় মৃদুস্বরে বলিলেন, “হতভাগিনি! তোমার দুর্দিন এইবার শেষ হইবে।”
    বাহির হইতে জুমেলিয়া ডাকিল, “গিরিধারি! গিরিধারি!”
    দেবেন্দ্রবিজয় গিরিধারীর কণ্ঠস্বর অনুকরণ করিয়া বলিল, “আবার কি –কি হয়েছে? চ’লে এস না তুমি।”
    জুমেলিয়া বাহির হইতে বলিল, “এখান থেকে ঔষধের বাক্সট আর কাপড়গুলো নিয়ে যাও।”
    পূৰ্ব্ববৎ দেবেন্দ্রবিজয়, “রেখে দাও—তোমার কাপড় আর বাক্স, আমি তোমার বোনকে নিয়ে দস্তুরমত একটা আছাড় খেয়েছি।” শুনিতে পাইলেন, জুমেলিয়া তাহার কথা শুনিয়া অত্যন্ত হাসিতেছে; গবাক্ষ দিয়া দেখিলেন, জুমেলিয়া বাটীমধ্যে প্রবেশ করিল; তাহার হস্তে সেই কিরীচ উন্মুক্ত রহিয়াছে, চন্দ্ৰকরে সেটা বিদ্যুদ্ধত ঝক ঝক করিতেছে।
    ক্রমে জুমেলিয়া বৈঠকখানা গৃহের নিকটস্থ হইল; দ্বার-সম্মুখে দাঁড়াইয়া নিম্নকণ্ঠে ডাকিল, “গিরিধারী!”
    তখন দেবেন্দ্রবিজয় তাহার গুপ্ত লণ্ঠন বাহির করিয়া স্প্রীং টিপিয়া দিলেন; উজ্জল স্বতীব্র আলোকরশ্মিমালা জুমেলিয়ার চক্ষু ধাঁধিয়া তাহার মুখের উপরে পড়িল।
    কর্কশকণ্ঠে দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “গিরিধারী এখানে নাই; তোমার অপেক্ষায় আমিই আছি, জুমেলা।”
    “দে-বে-দ্র-বি-জ-য়!” জুমেলিয়া সবিস্ময়ে বলিল।
    “হাঁ, দেবেন্দ্রবিজয়—তোমার যম—তোমার শক্ৰ—তোমার পরম শক্ৰ ৷ এক পা যদি নড়বে, এখনই তোমাকে গুলি করব—এতদিন তুমি আমাকে নাস্তানাবুদ করে তুলেছিলে; তোমার জন্য কতদিন আমার অনাহারে কেটে গেছে; এমন কি নানাপ্রকার দুর্ঘটনায় আমার মস্তিক্ষও তুমি বিকৃত ক’রে দিয়েছ; আজ তোমার নিস্তার নাই; দেবেন্দ্রের হাতে তোমার কিছুতেই নিস্তার নাই—এক পা অগ্রসর হইলেই গুলি করব।” দেবেন্দ্রবিজয় ক্রোধে উন্মত্তপ্রায় হইয়া উঠিয়াছিলেন; তাঁহার চক্ষু দিয়া তখন যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইতেছিল।
    জুমেলিয়া ভয় পাইল না; তাহার অখণ্ড প্রতাপ অক্ষুণ্ণ রাখিয়া স্মিতমুখে বলিতে লাগিল, “মাইরি! গুলি করবে? তুমি! দেবেন্দ্রবিজয়! জুমেলিয়াকে? পার না—তোমার সাধ্য নয়—তোমার হাতে মৃত্যুতেও জুমেলিয়ার কলঙ্ক আছে। দেবেন! তোমার হাতে মরব! হায়! হ’য়ে কেন মরি নাই! মাতৃস্তন্য – কেন আমার বিষ হয় নাই! যাকে ভালবাসি, তার হাতে আমি মরব! কষ্টকর— বড় কষ্টকর—সে মৃত্যু বড় কষ্টকর, দেবেন! দেবেন, এখনও বলছি, তোমাকে আমি ভালবাসি—আগে বাসতাম, এখনও বাসি— – ম’রেও ভুলতে পারব, এমন বোধ হয় না। ভালবাসি বলিয়াই ত আমি আজ না এই বিপদগ্রস্ত; নতুবা এতদিন তোমাকে আমি কোন কালে এ সংসার থেকে বিদায় দিতাম। অনেকবার মনে করেছি— পারি নাই; ঐ মুখ দেখেছি—ভুলে গেছি—সব ভুলে গেছি। আপনাকে ভুলে গেছি, আপনার কর্তব্য ভুলে গেছি, জগৎ-সংসার ভুলে গেছি। শোন দেবেন, যদি তুমি আমার প্রতিদ্বন্দী না হ’তে, তোমার অপেক্ষ সহস্ৰগুণে শ্রেষ্ঠ কোন গোয়েন্দা আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতাচরণ করিত, সে কখনই আমার কেশস্পর্শও করতে পারত না। অবলীলাক্রমে আমি তাহাকে নিহত করতেম। এই তুমি—তোমার রূপে—তোমার গুণে যদি না আমি ভুলতেম—তা’ হ’লে তুমি এতদিন কোথায় থাকতে—কি হ’ত তোমার, কে জানে? এতদিন তুমি আবার কোথায় নূতন জন্মগ্রহণুy করতে। তোমাকে ভালবাসিয়াই ত সৰ্ব্বনাশ করেছি—নিজের মৃত্যু— নিজের অমঙ্গল নিজে ডেকেছি। কি করব? মন আমার বশীভূত নয়। আমি মনের দাস। যখন তুমি তোমার গুরু অরিন্দম গোয়েন্দার সাহচৰ্য্য কর, আমার গুরুই বল, স্বামীই বল—ফুলসাহেবকে গ্রেপ্তার কর, তখন হ’তে তোমাকে আমি কি চোখে দেখেছি, তা জানি না। দেবেন, এটা যেন চিরকাল স্মরণ থাকে—যে জুমেলা তোমার পরম শক্ৰ, সেই জুমেলাই তোমার প্রেমাকাজিহ্মণী; যে জুমেলার তুমি পরম শক্ৰ, সেই জুমেলার তুমি প্রাণের রাজা। তোমার হাতে মৰ্বতে, মৃত্যুযন্ত্রণা বড় ভয়ানক হবে; নিজে মরি—দেখ—তোমার সামনে মরি—হাসতে হাসতে মরতে পারব। তুমিও জুমেলার মৃত্যু হাসিমুখে দেখতে থাক, জুমেলাও তোমাকে দেখতে দেখতে হাসিমুখে মরুক।” এই বলিয়া জুমেলিয়া সেই কিরীচ নিজের বক্ষে আমূল বিদ্ধ করিল। ভলকে ভলকে অজস্ৰ শোণিত নিঃসৃত হইতে লাগিল। বুকের ভিতরে অত্যন্ত যন্ত্রণা হইতে লাগিল, করতলে বুকের সেই ক্ষতস্থান চাপিয়া বাত্যাবিচ্ছিন্ন বল্লরীর ন্যায় জুমেলিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে গৃহতলে পড়িয়া গেল। মুখ ও দৃষ্টি সৰ্ব্বাগ্রে মৃত্যুচ্ছায়ান্ধকারমান হইয়া আসিল। তখনও সেরূপ প্রবলবেগে তাহার সৰ্ব্বাঙ্গ পরিহিত বসন ও গৃহতল প্লাবিত করিয়া শোণিতপাত হইতে লাগিল। ছিন্নবিচ্ছিন্ন বাতবিকম্পিত, রক্তচন্দনাক্ত রক্তপদ্মবং জুমেলিয়া। সেইখানে পড়িয়া লুটাইতে লাগিল—তখনই তাহার মৃত্যু হইল।
    দেবেন্দ্রবিজয়ের পরম শত্রু এইখানে এইরূপে পরাভূত ও নিহত হইল।

    সে সময়ে কেহ যদি বিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেবেন্দ্রবিজয়ের মুখের দিকে একবার চাহিয়া দেখিত, অবশ্যই সে দেখিতে প্লাইত, দেবেন্দ্রবিজয়ের চক্ষু, তখন নিরশ্রু বা শুষ্ক ছিল না। সেই সময়ে তাহার সেই বিস্ময়বিস্ফারিত চক্ষু দুটিতে দুইবিন্দু জল ছলছল করিতেছিল।

    সমাপ্ত।