Author: তাহের আলমাহদী

  • জালিয়াত

    জালিয়াত

    আমরা জালিয়াত!
    দিনে দুপুরে তোমাদেরই সই শীলমোহর জাল করি;
    হাজার হাজার মণি মানিক্যের স্বপ্ন আমাদের দু’চোখে,
    তোমাদের ওই পায়ে বেড়ি পরানো কয়েদের আতঙ্ক ভুলেছি,
    নইলে ‘পটাসিয়াম সাইয়ানাইডে’র ছোট্ট শিশিটা
    নীচের পকেটে রাখতাম না।

    কখনও বা আমরা বাদশার বাচ্চা,
    যখন জাল টাকার বাগুিলগুলো ছাপাখানায় বসে গুনি,
    অথবা জাল দলিলের দামে করি মোটা অঙ্কের বাজিমাত,
    আমরা জালিয়াত!।

    আদালতে আমরা যাই।
    যাই শুধু বটতলায় জুয়োখেলার আড্ডা জমাতেই,
    তোমাদের পকেট থেকে রেশনের দামটা
    ফাঁক করে দিতে। তোমরা নেহাত ভালমানুষ!
    আদর্শের ফাঁকা বুলি আউড়ে তৃপ্তি পাও,
    আজকের যুগে তোমাদের দুঃখ তাই সবচেয়ে বেশী;
    বন্ধু, আমরা বুঝি,
    আমাদের শরীরও রক্তে মাংসে গড়া।
    ক্ষণিকের বিষাক্ত মদের নেশা যখন কেটে যায়,
    তখন তোমাদেরই মতো হালি কাঁদি ভালবাসি,
    উপবাসী ছোট্ট ছেলেটার গালে চুমু খাই,
    তার গলা টিপে ধরতে মন চায় না।
    তবু তোমাদের কাছে আমাদের স্কুল পরিচয়:
    আমরা জালিয়াত!

  • সাংবাদিক

    সাংবাদিক

    যুদ্ধের দামামা বাজে। বাহিনী চলেছে ট্যাঙ্কে, কামান গর্জনে;
    দুরন্ত বোমারু সেনা সুকৌশলে পাক খেয়ে নেমে এসে নীচে
    কুশলী সাঁতারুর মতো অনায়াসে বোমা ফেলে যায়;
    নগর বন্দর কাঁপে, জ্বলে লোকালয়, ঘর বাড়ী,
    ভয়ঙ্কর যুদ্ধের আতঙ্কের বিভীষিকা অন্তর কাঁপায়।
    কখনও বা দিবালোকে গুপ্ত পরিখায় নেমে দ্রুত শুয়ে পড়ে
    কাঁধে বাঁধা ক্যামেরাটা তুলে ধরে রোমাঞ্চকর জ্যান্ত ছবি তুলি,
    চক্ষের নিমেষে এসে জীবন মৃত্যুর কত নাটকীয় ক্ষণ
    আকস্মিক বিস্ময়ে লেন্সে নেগেটিভে চিরবন্দী হয়ে থাকে;
    তারপর কালক্রমে ঐতিহাসিক তাকে অমরত্ব দেয়।

    এ কথা তো ইতিহাস জানে না যে, তিল তিল করে
    আমি সাংবাদিক নিত্য টেলিপ্রিণ্টারে রচি শত শত রক্তাক্ত কাহিনী;
    এই সব খণ্ড খণ্ড অভিনব ইতিবৃত্ত সঞ্চয়ের দুঃসাহসিক আশায়
    সৈনিকের উৎসাহে মারমুখো ফৌজের সঙ্গে পথ চলি।

    প্রবল বন্যায় ভাসে গ্রাম নদী খাল বিল, অসংখ্য সংসার,
    দিকে দিকে ছন্নছাড়া গৃহহারা অন্নহীন কঙ্কালের অশ্লীল মিছিল;
    গরু মোষ ছাগলের ভাসমান অগনিত গলিত শবের উপরে
    ভোজনবিলাসী কাক চিল শকুনের লোভী তীক্ষ্ণ চঞ্চু দুর্গন্ধ ছড়ায়;
    এদিকে তাকিয়ে দেখি, ঘরের টিনের চালে বিড়ালের ছানা কেঁদে মরে।

    জল, আরও জল, শুধু জল চারিদিকে। যা দেখেছি,
    সব চিত্র সব কথা যায় না তো লেখা শুধু খবরের রূপে;
    বন্যার মামুলি তথ্য পত্রিকার প্রকাশিত সংবাদ মারফত।
    ঝড় আসে। গাছ পড়ে, ঘর ভাঙে, সেই সঙ্গে গণমৃত্যু আসে।
    আকস্মিক দুর্ঘটনা আনে ক্ষয় ক্ষতি দুর্ভাবনা। দুর্ভিক্ষের প্রকোপে, অথবা
    দেশব্যাপী নিদারুণ মহামারীর দুর্জয় বিপর্জয় লীলার রোমহর্ষক কাহিনী

     

    হয়ত প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকের লেখনী লেখে না সবিস্তারে,
    প্রতিদিন টেলিপ্রিণ্টারে যায় যথারীতি নিতান্ত সংক্ষিপ্ত সমাচারে
    সাঙ্কেতিক অঙ্কের ভাষায় মৃত্যুর সংখ্যার নির্ভরযোগ্য খতিয়ান।

    গ্রীষ্মে শীতে বর্ষায় গ্রামে গঞ্জে শহরের পথে বা প্রান্তরে
    দিন কাটে রাত কাটে ছোট বড় বিচিত্র সংবাদ সংগ্রহে;
    এখানে সেখানে কত প্রেম প্রতারণা তুচ্ছ ব্যর্থ জীবনের
    সাদা কালো মুহূর্তের নগ্ন চিত্র হৃদয়ের অদৃশ্য ক্যামেরা
    মুগ্ধ বিস্ময়ে ধরে রাখে কিছুক্ষণ। খাদ্যহীন বস্ত্রহীন
    কৃষক মজুর মুটে কেরানী দালাল খুনী বেকার মাতাল,
    বৃদ্ধ পঙ্গু কুষ্ঠরোগী পুত্রহারা শোকাতুরা উন্মাদিনী মাতা,
    তাদের কথা কি কোন পত্রিকার শিরোনামা খবর হয়েছে?
    আমি সাংবাদিক। তবু আমার ডায়েরীতে তারা উজ্বল নায়ক
    পত্রিকা বা ইতিহাসে তারা থাকে চিরদিন নেপথ্য সৈনিক।

    হয়ত হাটের প্রান্তে অখ্যাত অজ্ঞাত কোন ভগ্ন কুটীরে
    দিনান্তের ক্লান্তি মুছে মাদুরে বালিশ রেখে ক্ষণিক বিশ্রাম;
    সস্তা হোটেলের ডাল ভাতে ক্ষিধে মেটে। ছোট গেলাসেতে চা।
    ষ্টেশন বিশ্রামগৃহে কখনও বা পেতে হয় স্বর্গের স্বাদ।
    দক্ষ শিকারীর চোখ নিয়ে তীক্ষ্ম অন্বেষণে কাছে কিংবা দূরে
    খবরের জাল পেতে জীবিকা খবর কুড়োই নানা প্রান্ত থেকে।

    আমি সাংবাদিক। তবু আমি জানি, যদি কোন স্তব্ধ অবসরে
    আকস্মিক আক্রমণে মৃত্যু এসে হানা দেয় আমার দ্বারে,
    সেই মর্মান্তিক শোক সংবাদের প্রতিলিপি পৌঁছবে না টেলিপ্রিণ্টারে,
    সান্ত্বনার বাণীযুক্ত ভদ্র আকৃতিতে গুণকীর্তি বর্ণনায়
    মুদ্রিত হবে না কোন বিখ্যাত পত্রিকা কিংবা স্মারকগ্রন্থে।
    বছর বছর ধরে লক্ষ লক্ষ সংবাদের বেচাকেনা হাট
    কোটি কোটি মূল্যবান সংবাদের জন্মদাতা নিজে মূল্যহীন।
    এ কথা সত্য তবু, আমি এক সাংবাদিক, সংবাদ আমার জীবিকা।

  • কুতুব মিনার

    কুতুব মিনার

    আমার উচ্চাশার মাপ ছিল তোমার অতি উচ্চতায়,
    আমার সৌথীন মনের শিল্পখচিত কারুকার্যের প্রাচীন ধারা
    তোমারই আকর্ষণীয় দীর্ঘ ছায়ায় রচিত।
    মোগল যুগের ঐতিহাসিক অক্ষয় গৌরবের শিখরে
    তুমি মহান; সামান্য আঁকশির নাগালের সীমানায়
    ছোঁয়া দিতে চাও না। পৃথিবীর দারুণ বিস্ময়!

    আমি এক নগণ্য মানুষ। নিত্য হাহাকারে জর্জরিত জীবনে
    ক্লান্ত। সকালে সন্ধ্যায় রুটির ছেঁড়া টুকরোয় ক্ষিধে মেটে না।
    গ্রাম্য মেলায় ধূলোমাখা ভঙ্গুর কাচের বাসন নিতান্ত ঠুনকো আশায়
    প্রত্যহই মিথ্যে সান্ত্বনায় বুক বেঁধে মৃত্যুর দিন গুনি।
    অপদার্থ উৎসাহ, ব্যর্থ আশা অবশেষে ধূলো আবর্জনায় মেশে,
    এবং ক্রমে অখ্যাত অজ্ঞাত বিস্মৃত কোন ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়।

    তবু আজও আমার চির তৃষ্ণার্ত দৃষ্টির প্রসারিত ছায়া
    তোমার আকাশচুম্বী শীর্ষদেশে নিরিবিলি শান্তি খুঁজে পেতে চায়।

  • বাংলা দেশ

    বাংলা দেশ

    পুতুল নাচের মঞ্চে একদিন কালো হত্যা নাটকের শেষ;
    বিশ্বগর্ভে জন্ম নিল নব রাষ্ট্র, নাম ‘বাংলা দেশ’
    কোটি শহীদের শুদ্ধ রক্তের বিনিময়ে কেনা।
    পীড়ন ধর্ষণপটু শয়তানের সন্তানেরা তবুও থামে না
    ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থেকে স্বার্থাম্বেষী কালনেমী বন্ধুদের দ্বারে
    আনবিক ধ্বংসাত্মক মরণাস্ত্রে সুসজ্জিত রণসম্ভারে
    বিষধর সর্পকুল আক্রোশভরে করে কুটিল বীভৎস ফোঁসফোঁস
    পলাতক শক্তিধর মুখের গ্রাসের জন্যে নিদারুণ জঘন্য আফশোস,
    আদিম যুগের বন্য পশুর স্বভাবে মত্ত অসভ্য অনার্যসম।
    পঙ্কিল পাপের শাস্তি দিতে আসে নিজ হাতে কালজয়ী যম,
    কাল বৈশাখীর মতো লকলকে তার লাল জিহ্বা সর্বগ্রাসী
    মুছে দিতে অন্ধকার গহ্বরের লোভী ক্রুর শয়তানী হাসি।

    অত্যাচারী রক্তিম ভূমিকা রচে পৃথিবীর আদি ইতিহাসে,
    অভিনব দৃষ্টান্তে হিটলার মুসোলিনী নাদির শাহ বুঝি হাসে।
    জালিওয়ানাবাগে সাদা প্রভুদের বিভীষিকা ভুলতে চেয়েছি,
    কিন্তু পারি নি, বন্ধু! শোষণে শাসনে আজও দেখতে পেয়েছি
    দুঃশাসনী প্রলয়ের আয়োজনে ভ্রূকুটিতে তিক্ত অবিচার,
    সভ্যতার আবরণ মুহুর্মুহু ছিন্ন করে ক্লীব অনাচার,
    নারী শিশু বৃদ্ধ রুগ্ন হত্যা নির্বিচারে
    বেনামী যুদ্ধের ভানে রক্তে মাংসে গড়া কোন সৈনিক কি পারে?

    অন্ধ মন্ত্রে ধর্মের মুখোসধারী রক্তপায়ী মাংসলোভী জীব,
    কোটি শহীদের ক্রুদ্ধ আত্মার অভিশাপ করছে নির্জীব
    তিলে তিলে তোমাদের। নরকের কালো পাঁকে অতল কবরে
    নিদারুণ যন্ত্রণায় তোমাদের প্রেতছায়া নিশিদিন কিলবিল করে।

    সোনার মাটির দানা শহীদের পবিত্র রক্তে শুদ্ধ সার পেয়ে
    সোনার ফসলে ভরে। দুনিয়ার চার দিকে চেয়ে

     

    নব রাষ্ট্র তার নব জন্মের বাস্তব খবর ছড়ায়:
    বিস্ময়ে পুলকে বিশ্ব ধীরে ধীরে বিজয়ের মুকুট পরায়
    উন্নত শিরে তার। সম্মুখে প্রসারিত উন্মুক্ত প্রশস্ত দীর্ঘ পথ
    ধ্বংসের কীটের মৃত্যু। তারপর গঠনের কঠিন শপথ।
    বীজমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ আট কোটি মৃত্যুহীন মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাণ,
    তাদের মিলিত কণ্ঠে সোনার বাংলার প্রাণতুল্য প্রিয় গান।

  • হিপি

    হিপি

    বিতৃষ্ণার তিক্ত বিষ সঞ্চিত প্রাচুর্যে ভোগে,
    সামাজিক জটিলতা নিয়মের শৃঙ্খলপাশ
    ছিন্ন করে মুক্ত প্রাণে দুরন্ত উদ্যোগে
    ব্যক্ত হয় বাউণ্ডুলে হিপিদের জীবন নির্যাস।

    নগ্ন প্রকৃতির কোলে প্রীতি প্রেমে আত্ম নিবেদনে
    আদি সভ্য মানবের যথাযথ যোগ্য বংশধর
    দীর্ঘ যৌথ ধূমপানে অনায়াসে সত্তা বিসর্জনে
    পথে প্রান্তরে তারা শুদ্ধ করে তরল অন্তর।

    আত্মভোলা হরগৌরী, সংসারের নেই প্রয়োজন,
    সঞ্চয়ে বিমুখ, অর্থের অর্থ নাহি বোঝে,
    আনন্দ পারদ প্রেমে ক্ষ্যাপা অকৃপণ
    ঈশ্বরের বরপুত্র জীবনের নব সংজ্ঞা খোঁজে।

    যত্র তত্র কুটুম্বের মতো নেয় শুভ আমন্ত্রণ,
    নিস্কৃত্রিম দর্শনের উদার উদাস ভাবধারা
    সর্ব দিকে সঞ্চারিয়া সর্ব জীবে সমজ্ঞানে করিয়া আপন
    ইস্পাতের যুগে আনে উদ্ভট বিচিত্র নব সাড়া।

    বিসদৃশ বেশভূষা আচার বিচার বহির্ভূত,
    লিপ্সাহীন নির্বিরোধ যেন যোগী অতিশয় ত্যাগী;
    সমাজের দ্বারপ্রান্তে আশ্চর্য আগস্তুক অনাহুত
    গৈরিক হৃদয় তার বোধ হয় প্রকৃতই বাউল বৈরাগী।

    তার জন্যে সমাজের কোন ঘরে কোন কোণে নেই কোন ঠাঁই,
    মুক্ত গগনতলে অনির্দিষ্ট প্রান্তে তার শাস্তির আস্তানা,
    অন্তহীন যাত্রাপথে কোন দিকে ভ্রূক্ষেপও নাই,
    ছন্নছাড়া গন্তব্যের মেলে না সঠিক ঠিকানা।

     

    পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে তবু এক রঙা নদীর মতো
    যথারীতি এসে তারা এক স্রোতে সাগরেতে মেলে,
    তাদের দেখলে কেউ হিপি বলে চেনে স্বভাবতঃ,
    অন্য কোন বিশ্ব যেন কোটি হিপি গড়ে হেসে খেলে।

  • চন্দ্রকাব্য

    চন্দ্রকাব্য

    অনন্ত কাল ধরে কাব্যে গীতে অভিনন্দিত
    চন্দ্রিমার মনোলোভা অনবদ্য সৌন্দর্য বন্দনা
    তোমার আমার মনে শৈশবে যৌবনে প্রান্তে
    চন্দ্রের বিচিত্র রূপ কত ছবি আঁকে মুগ্ধ মোহে।
    স্নিগ্ধ আলো স্মিত হাসির নিঃসীম বর্ণনা
    কবির কল্পনা তুলি আঁকে নৈশ জ্যোৎস্না অভিসারে।

    অমাবস্যা প্রতীক্ষার প্রাচীরের ওপার থেকে
    ডেকে এনে পূর্ণিমার বিচ্ছুরিত আলোক বর্তিকা
    জীব জড় স্থাবর জঙ্গমের এই বিপুল ধরায়
    বনানীকে পুলকিত করে; উদ্বেলিত আকাশ,
    আমাদের সর্ব সত্বা প্রাণমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়;
    রুদ্র দগ্ধ সূর্যতাপ পান করে সুশীতল চন্দ্রমমতা।

    বিজ্ঞানের চক্রতলে অনুগত চন্দ্রমহিমা।
    কৌতুকে কৌতুহলে আজ নব রূপে পরিচয়ে;
    রকেটে চন্দ্রযানে আমরা আজ সুসজ্জিত,
    স্বপ্নভঙ্গ বাস্তবের ঈশ্বরে ঈশ্বরে গতিরথে
    আবিস্কৃত একান্ত আপন বিশ্ব চন্দ্ররাজ্যে নেমে
    হাঁটি পা পা, বালি নুড়ি মাটির নমুনা
    যতনে কুড়োই কী যে আশ্চর্য নেশায়!
    সেই লগ্নে প্রেয়সীরা চন্দ্রকাব্য ভুলতে চেয়েছে,
    অকপট ছাড়পত্র চায় তারা চন্দ্রযান দূর পাড়ি দিতে
    মহা শূন্যে চন্দ্রপুরীর কোন এক নিশ্চিন্ত ষ্টেশনে।

    চাঁদমামা হয়ত আর আসবে না দুরন্ত শিশুদের ভালে,
    চন্দ্রালোকে চঞ্চল হবে না তো ভাবী কালে যুবক যুবতী;
    স্বপ্নের ঊর্ণনাভে রহস্যের রোমাঞ্চে সমৃদ্ধ

     

    চন্দ্রমহিমা আজ বৈজ্ঞানিকের ডায়েরীতে টেলিভিসনে।
    চন্দ্রকাব্যের চেয়ে এই শতাব্দীতে চন্দ্রযাত্রা কাম্য হল
    বিশ্বের বিকিকিনির বস্তুময় হাটের পসরায়!

  • পিঞ্জরে বন্দী

    পিঞ্জরে বন্দী

    বিহঙ্গের মুক্ত পাখা অসীম আনন্দে মহাসাগরেতে ভাসে,
    তারপর আদি রঙ মোছে তুলি ব্যর্থ সভ্যতার সর্বনাশে।
    লৌহের পিঞ্জরে তুচ্ছ পরিমিত পরিধিতে সমর্পিত প্রাণ,
    কঠিন শৃঙ্খলে বদ্ধ বন্দী পদ, বন্ধ হয় গান;
    পৃথিবীর সীমারেখা ক্রমে ক্রমে হয়েছে সঙ্কীর্ণ,
    স্থির প্রতিজ্ঞার মতো নিছক নিয়মচক্রে নিতান্ত বিদীর্ণ,
    রক্তশূন্য ধমনীতে আবেগের সঞ্চারণে নেই কোন রীতি প্রয়োজন,
    গণিতের নির্ভুল ছকে বাঁধা দিন ক্ষণ আয়ু জীবন মরণ।
    কাননের বিহঙ্গেরা দেখে না পিঞ্জরস্বপ্ন মূঢ় মত্ততায়,
    মুক্ত প্রাণে আজও তারা আকাশে সাগরে বাঁচে স্বাধীন সত্তায়,
    কিন্তু আমরা পাশাপাশি কঠিন পিঞ্জরে শৃঙ্খলে
    বদ্ধ পদে বন্ধনের যন্ত্রনায় কাতর হয়েছি পলে পলে,
    নিজেদের পরস্পর প্রতিবিম্ব দেখে দেখে অতি পরিচিত;
    রুদ্ধ দ্বার ক্ষুদ্র কক্ষে নিঃস্ব প্রাণে বিশ্বরেখা একান্ত সীমিত।

    আমাদের দেখে কেউ হবে না তো আজ আর বিমূঢ় বিস্মিত,
    মোদের স্বরূপ আজ নিয়তির শাসনেতে বিকৃত বিস্মৃত।
    আমাদের দেহ যেন সস্তা দামের মেকী মোমের পুতুল,
    হৃদয়ের প্রেমহীন পাত্রে সযতনে রাখা কাগজের ফুল।
    প্রিয়ার প্রেমের সংজ্ঞা অর্থের গূঢ়তম অর্থ খুঁজে খুঁজে
    মেলে। তাই পরিবারে প্রয়োজনে আত্মবলি চোখ মুখ বুজে,
    বাঁধা বুলি, চেনা পথ একঘেয়ে জীবনের পুনরাবৃত্তিতে
    কালচক্রে মৃত্যুর দিন গোনা বর্ষায় গ্রীষ্মে কিংবা শীতে।

    ভিন্ন ভিন্ন পিঞ্জরের অন্তরালে পরস্পর হয়ে বন্দী,
    সাদা খতে স্বীকৃত স্বাক্ষরে অনায়াসে করি সন্ধি।
    শুধু প্রয়োজন হলে, কথা কই, গান গাই, কুড়োই রুটি,
    তারপর খেলা শেষে পিঞ্জরের মঞ্চ থেকে যথারীতি ছুটি।

  • বেনামী সার্কাস

    বেনামী সার্কাস

    ময়দানে তাঁবুর বৃত্তে বসেছে সার্কাস,
    হাতি ঘোড়া বাঘ সিংহ উট পাখী হাঁস,
    ভয়াবহ ট্রাপিজ রোপ ট্রিক, কত খেলা,
    বিচিত্র তামাসা চিত্র; ক্ষণিকের মেলা।
    আলোয় উজ্জ্বল নটনটীদের পোশাক সম্ভার,
    অভিনব ক্রীড়া কৌতুকের কত অপূর্ব বাহার।
    দর্শকের ঘন ঘন হর্ষরোল উচ্চ হাততালি,
    ব্যাণ্ডের তালে দুলে নাচে ক্লাউন, মুখে চূণকালি।

    এমন সার্কাস আমি কত দেখি, সে কথা কি সব মনে থাকে!
    হাততালি চুনকালি হাসি কান্নার রঙ মাখে।
    বৃত্তাকারে শূন্য তাঁবু। আসনে দর্শক নেই বুঝি!
    নিয়মিত সার্কাসে রিং মাষ্টারের নাম খুঁজি।
    বাহবার সাথে আসে মুঠো মুঠো ঢিল তিরস্কার,
    ক্লাউনের হাস্যোজ্জ্বল চোখে ঝরে অশ্রু বঞ্চনার,
    ট্রাপিজের রড থেকে ফসকেছে অবিশ্বাসী হাত,
    ব্যাঘ্রের মুখে ঘটে ট্রেনারের মৃত্যু অপঘাত।

    প্রতিদিন সংসারে এমন ব্যর্থ কত বেনামী সার্কাস
    ভাগ্যের মুখে আঁকে কালো রঙে ব্যর্থ পরিহাস।
    সে কথা কি সব মনে থাকে?
    থাকলেও, বলি বা তা কাকে?

  • আরশি

    আরশি

    আরশি আমাকে দর্শন শেখায়। আত্মদর্শন।
    আমার দেহ ক্ষীণ কিংবা স্থুল, চক্ষু কর্ণ নাসিকা
    কিংবা অবয়বের খুঁটিনাটি তথ্যের সহজ পাঠ শেখায়।
    আমার দৌর্বল্য হীনতা ভীরুতা কপটতা
    উদারতা দাক্ষিণ্য প্রেম ভক্তি মমতা কাঠিন্য
    ক্যামেরার লেন্সের মতো আরশির পটে অবিকল চিত্র
    অবাক দৃষ্টিতে আমি দেখি। আরশি যেন কথা কয়
    স্পষ্ট স্বরে দ্বিধাহীন নির্ভীক সৈনিকের মতো কঠোর ভাষায়।
    চরিত্রবান আরশি ভান ভণিতা ভূমিকা জানে না।
    মিথ্যের বেসাতি তার ঠিকুজীতে লেখা হয় নি।
    সত্যের অকপট সাক্ষীর মতো সে আমার একক আদালতে
    প্রকৃত দৃষ্টিতে সূর্যের নির্মল আলোয় সব মামলায়
    স্পষ্ট ইঙ্গিতে নির্ভুল রায়ের নির্দেশ দেয়।

    আমার ক্ষুদ্র হৃদয় যদি আরশির পারদে মাখা
    প্রতিবিম্ব ধারণের যোগ্যতা কখনও পেত, অথবা
    আমি যদি কোনদিন সাধারণ একখানা আরশি হতে পারতাম,
    মানুষের মর্যাদায় সমাজের আকাশে তাহলে সত্যের সূর্যকে
    আঙুল দিয়ে নিঃসংশয়ে নির্ভুলভাবেই চিহ্নিত করতে পারতাম।

  • রঙের গোলাম

    রঙের গোলাম

    তাসের খেলায় রঙের গোলামের দাম।
    সাহেব বিবির চেয়ে অনেক গুণে বেশী।
    তোমাদের ধনী সমাজের নীচের তলায়
    যারা থাকে অপাংক্তেয়, নগণ্য, অবহেলিত,
    সাগরের দুর্দিনে সমাজের হাল ধরতে,
    বোঝা বইতে মাটি কাটতে গতর খাটাতে, ভৃত্যের পদে
    সেই গোলামদের একান্ত প্রয়োজন। তাদের মেহনতে
    গড়ে পথ ঘাট নগর বন্দর, গড়ে তোমাদের জীবনের বনিয়াদ।

    তাসের খেলা যখন জমে উঠে,
    রঙের তাসের আসরে সে মহামূল্য মধ্যমণি।
    তবু শেষ পর্যন্ত, গোলাম গোলামই রয়ে যায়। খেলার শেষে
    তার পদমর্যাদা বাড়ে না মূল্যের চাহিদায়।
    সাহেব বিবির আসনের তলায় তার স্থান
    নির্দিষ্ট। নিশ্চিত। অতি পরিচিত। অপরিবর্তিত।

  • শোষক মশক

    শোষক মশক

    চক্রগতি শকুনের নিন্দনীয় কৌশলে বোমারুর মতো নেমে এসে
    দেহের কোমল ত্বকে শোষনযন্ত্রের তীক্ষ সূচ বিদ্ধ করে মশকেরা।
    রক্তের আস্বাদনে ক্রুরমতি নির্দয় ব্যাধের অভ্যস্ত স্বভাবে
    বিজয়ের অভিযানে অব্যাহত গৌরবে ছিদ্রপথে নিত্য আনাগোনা।

    প্রকৃতিতে মশকেরা সাম্রাজ্যবাদী দস্যু তস্করের গোপন দালাল।
    শোষণ পেশায় বিজ্ঞ। ভাণ্ডে তার প্রভূত সঞ্চয় প্রতিদিন।
    মজুতের হার বৃদ্ধি। হীন মতলবে দীন দরিদ্রের তাজা রক্তকণা
    বিন্দু বিন্দু আহরণ করে যেন মূল্যহীন নমুণার মতো।

    মশার জীবিকা ঘৃণ্য রক্তপানে নিষ্ঠুর তামাসার খেলা;
    আদিম রিপুর বশে অতর্কিত আক্রমণে নির্মম শোষণে
    ক্ষুদ্র প্রাণে অন্তহীন আকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি সমাপ্তি কখনও
    হয় না। তবুও রক্ততৃষ্ণা মত্ত মাতালের দুরন্ত নেশার মতন।

    কিন্তু শোষক মশার বংশধারা একদিন জানি, ধ্বংস হবে
    আগামী দিনের কৃষ্ণবর্ণ কলঙ্কিত আবরণ উন্মোচনে;
    যুগান্তের সঞ্চয়ের গুপ্ত তহবিলে জমা বিন্দু বিন্দু রক্তের সাগর
    তিলে তিলে নিক্তিতে মাপা হবে অতীতের বঞ্চনার খাতে।

    সক্ষম পাখনা তার দগ্ধ হবে শোষিতের রুদ্র অভিশাপে,
    বংশে তার বাতি দিতে কোথা কেউ থাকবে না আনাচে কানাচে।
    স্পর্ধিত গুঞ্জন স্তন্ধ হবে। লাল শোণিতের স্বাদের বিস্মৃতি।
    মশকের জন্মের জীবিকার ইতিবৃত্ত কালে কালে বিলুপ্ত হবে।

  • মুক্তির নিমন্ত্রণ

    মুক্তির নিমন্ত্রণ

    গভীর রাত্তিরে আবছা কুয়াশার চাদরে ঢাকা
    প্রাচীন কালের মসজিদের পেছনে ডালিম গাছে আলো ছড়িয়ে
    সুগোল নরম চাঁদখানা যখন দেখা দিল,
    তখন সহসা মনে পড়ল তোমার কথা, কমল।
    উত্তর দিগন্ত থেকে হালকা হাওয়া এল,
    ঝিঝি পোকার ডাকও ক্ষীণতর হল,
    সবুজ ঘাসের বুক থেকে বিষণ্ণতার প্রলেপ তখন মুছে গেছে।
    হাসপাতালের তের নম্বর বেডে তুমি হয়ত যথারীতি
    রিক্ত রাত্রির তিক্ততা বুকে নিয়ে অবচেতন মনে ঘুমিয়ে রয়েছ।

    গলির মোড়ে তোমার ইদানীংকালের বাসস্থান। হাসপাতাল।
    জানালা খুললেই চোখে পড়ে গেটের দু’পাশের দুটো বড় আলো
    মহান মৃত্যুর সঙ্গে তোমার বদ্ধ ঘরের বৈদুতিক আলোর আভা
    অহেতুক যেন মিশতে চায়। ভাবছি তোমার কথা।

    বিশ্বজোড়া চাঁদের আলোর অগ্নিকুণ্ডে যে মহান প্রাণের যজ্ঞ,
    তার হোমের আগুনেই তুমি হয়ত আহুতি দিতে চলেছ
    তোমার সারা যৌবনের সব গৌরবের মণিরত্নকে!
    তোমার চোখ দুটো ছলছল, কণ্ঠ রুদ্ধ। আতঙ্কিত। করুণ।

    এই মমতাহীন পৃথিবীকে এতদিন পরে চিরতরে ছেড়ে যেতে
    তোমার খুব কষ্ট হয়, কমল। তা আমি জানি।
    কিন্তু আমি হলে, মৃত্যুকেই মেনে নিতাম! হ্যাঁ, ঠিকই বলছি!
    জন্ম নেবার সঙ্কল্প নিতাম এমন কোন অভিশাপহীন দেশে,
    যেখানে মানুষে মানুষে নেই ভেদ, ভাইয়ে ভাইয়ে নেই ক্ষেদ,
    শিশুরা যে দেশে আণবিক বোমা নিয়ে খেলা করে না,
    অথবা সভ্যতার দাবিতে জল ঘোলা করতে ভয় পায়।
    আমি ফিরে পেতে চাই দেশলাইয়ের বদলে চকমকি,
    লেখার বদলে হিজিবিজি, কথার বদলে অদ্ভূত সাঙ্কেতিক স্বর।

     

    তোমার হাসপাতালের তপ্ত বেড আমি কোন দিনই চাই না,
    আমার মৃত্যুকে আমি নিমন্ত্রণ করব কোন গাছতলায়, অথবা
    দুর্গম অরণ্যের পথ ধরে খুঁজে পাওয়া কোন গুহার অন্তরালে।
    আমি চাই, আমার এই নশ্বর কঙ্কাল তিলে তিলে মিশুক
    এই নগ্ন নিষ্কৃত্রিম কালো মাটির স্তরে মাটিরই মতো।

    তোমার কাছে মৃত্যু যখন এসে দাঁড়াবে, বন্ধু,
    জেনো তা মৃত্যু নয়, মহামুক্তি মহাবন্ধন থেকে,
    হয়ত আশীষলব্ধ মানুষের নতুন কোন দেশে
    তোমার জন্যে এসেছে ব্যগ্র নিমন্ত্রণ।
    তোমার যাত্রাপথে তাই অনায়াসে অবহেলা করে যেয়ো
    এই উগ্র পৃথিবীর বক্র উপহাস।
    তুমি যেয়ো, তবু এইখানে এই দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে
    নিশ্চয়ই তোমাকে আমার মনে পড়বে
    এমন কোন আবছা কুয়াশার চাদরে ঢাকা রাতে
    এই পরিচিত হাসপাতালের কাছে।

  • বীরবরণ

    বীরবরণ

    ইতিহাস করে না তো কভু ভুল বীর, তোমা বরণ করিতে
    তোমার বিজয় ধ্বজা উড়ায়ে যখনই আসো বরমাল্য নিতে,
    রক্তজয়ী দেশকালপাত্র হয় খেলাঘরে পুতুল তোমার,
    যুগে যুগে তুমি বীর কর্ণ অর্জুন নেপোলিয়ন হিটলার,
    বীরভোগ্যা বসুন্ধরা বিজয় মুকুট তব উন্নত মস্তকে পরায়,
    দেশে দেশে ইতিহাস যুগে যুগে তব বন্দনাগীতি গায়।

    তুমি বীর, ইউরোপ এশিয়া আফ্রিকা মহাদেশে
    সিংহের পৌরুষে কর পদানত নানা জাতি বিক্রমে অক্লেশে,
    প্রাচীন কালের সূর্য থেকে কর তেজ বীর্য অস্ত্র আহরণ,
    প্রকৃতির তনু দেয় ভাণ্ডারের অফুরন্ত শৌর্য আভরণ,
    সহস্র সমুদ্র দেয় তোমার রথের চক্রে দুরন্ত তরঙ্গ দ্রুত গতি,
    ত্রিকালের ত্রিনয়ন তব দেহে নিরস্তর সঞ্চারে শক্তিমান জ্যোতি

    মত্ত দম্ভে উত্তাপে উদ্বেলিত উন্নত বক্ষ কম্পমান,
    দুঃসাহসী পুষ্পরথে চলে তব বিজয় যাত্রার অভিযান।
    আসির ঝঙ্কারে কাঁপে থরথর মেদিনীর অন্তর বাহির,
    ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসে শিঙা দামামার তব পদধ্বনি তোল, মহাবীর।
    দেশমাতৃকার প্রিয় কুলকন্যাদের সাথে শত সহচরী
    মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে চন্দনে কুসুমে ধূপে আরতি করি
    সুগন্ধি মাল্যদানে শঙ্খ রবে সবে তোমা বরণ করে,
    তব স্তুতি কীর্তিগাঁথা কালজয়ী ইতিহাস লেখে তারপরে।

  • জলছবি

    জলছবি

    হৃদ্‌পিণ্ডের ছিদ্র থেকে পাঁজরার ফাঁকে জমা ক্রন্দন কুণ্ডলী
    কুয়াশার আকাশের বুকে যেন মেঘের পাহাড়,
    তীব্র ক্রন্দনের রোলে অন্নের বস্ত্রের দৈন্যে দাবী উচ্চারিত,
    কিন্তু তবু প্রতিবাদ প্রতিহার প্রতিরোধ নেই।

    তবে কি এই শব্দহীন ক্রন্দনের স্বর নেই, ভাষা নেই, নেই প্রতিধ্বনি,
    মূক কণ্ঠের রুদ্ধ ব্যথা বন্ধ অন্ধ আবেগে মুহ্যমান?
    দাতা যারা, করুণার ধনের মালিক সব সৌভাগ্যবান,
    হয়ত বধির, নয়ত তাচ্ছিল্য ঘৃণা উপেক্ষায়, উগ্র অহঙ্কারে মত্ত;
    শূন্য জঠরের নিষ্ঠুর তাড়না কান্নার স্রোতে নিস্তেজ নিঃশব্দ।
    অশ্রুর রঙ যদি লাল হয়ে দরদর ঝরে,
    তখনও কি ওদের উদ্ধত শ্রবণ এই কাতর প্রার্থনা
    ক্রন্দনের করুণ ভাষা মিনতির স্বর শুনতে পাবে না?

    যদি হৃদ্‌পিণ্ড ছিঁড়ে সূর্যকুণ্ডসম জ্বলে বিদ্রোহের তাপে,
    স্পন্দনের গতি ক্রমবর্ধমান উত্তাল তাণ্ডবে নৃত্য করে,
    তবুও কি সম্রাসের বিভীষিকায় কিছুমাত্র বিচলিত হবে না
    মূক বধির প্রস্তর হৃদয়ের নিছক নির্বাক জলছবিরা?

  • বিকল্প

    বিকল্প

    সুর্যের পারদে নগ্ন রুগ্ন আকৃতির সত্য স্পষ্ট ছায়া পড়ে,
    ধূলিমাখা পুরাতন পঞ্জিকার পাতায় যেমন বিজ্ঞাপনে
    ম্যালেরিয়া ব্যাধিগ্রস্ত কঙ্কালের বীভৎস চিত্র নড়ে চড়ে।

    ক্ষুধায় তৃষ্ণায় ছিন্ন মলিন বস্ত্রে ঘুরি দ্বার থেকে দ্বারে,
    অন্নের অন্বেষণে। রুক্ষ্ম কেশ, ক্লান্ত দৃষ্টি, পায়ে কেম্বিসের জুতো,
    ঘর্মসিক্ত ললাটে কুঞ্চিত রেখা, ন্যুজ দেহ হতাশায় লাঞ্ছনার ভারে।

    সংগ্রামে বিধ্বস্ত। দারিদ্র্যের কশাঘাত পেশীর শক্তি কেড়ে নেয়,
    আজন্ম দুঃখের পুরস্কার সম্বল। অভিশাপে জর্জরিত বুক।
    জন্মের ঠিকুজীতে ভুল করে বিধাতা সৌভাগ্যের ছাপ নাহি দেয়।

    জগতের হাটে ঘাটে ইতস্তত বিচরণ বিকল্প ছদ্মবেশ ধরে,
    বহুরূপী কলেবর রঙিন বন্ধলে ঢেকে মুহুর্মুহু সত্তা অপদস্থ,
    সূক্ষ্মদেহী আত্মা তবু নতুন আধার লভে ক্রমে জন্মান্তরে।

    কার হীন ষড়যন্ত্রে অসংলগ্ন এই জন্ম দুঃস্বপ্ন গহবরে?
    আমি আজ প্রতিহিংসাপরায়ণ সেই দুশমনের রাজ্যে স্বর্ণ সিংহদ্বারে
    প্রধান দ্বারীর বেশে গুপ্তচর ভূমিকায় রত রব নির্জন প্রহরে।

    মিথ্যা নীচ কলঙ্কের অপমানে অত্যাচারে তীব্র যন্ত্রণায়
    তার রত্ন সিংহাসনে নির্মম আক্রোশে মোর বজ্রসম অসি
    দ্রুতগামী হৃদ্‌পিণ্ডের বিকৃত চিত্র আঁকে ক্রুর মন্ত্রণায়।

    বর্ষার নির্মল জলে রক্তসিক্ত কালো হাত তারপর ধুয়ে নিতে হবে,
    হৃদয়ের বাসি ফুল ফেলে দিয়ে সমুদ্রের মৌসুমী বাতাসে,
    অন্য নামে পরিচয়ে অন্য কোনখানে জন্ম নিতে হবে গোপন গৌরবে।

     

    স্কুল ধনী অপদার্থ ধনীর প্রাসাদে যদি পঙ্গু দালাল হয়ে যাই,
    সুরা নারী ব্যভিচারে জঘন্য নরক গুলজারে জীবন্মৃতের মতন
    তস্করের পদক্ষেপে বোরখায় দেহ ঢেকে অন্ধ গুহায় লুকাই।

    তার চেয়ে হিমাচলে দুর্গম অঞ্চলে কোন মহর্ষির বেশে
    ঈশ্বরের ধ্যানে মগ্ন, জীবনের বেদগাঁথা আবৃত্তি আনন্দে
    সার্থক অমরত্ব জাগতিক অভিজ্ঞতাহীন ঐশী আকাঙ্ক্ষায় মেশে।

    তবু তৃপ্তিহীন যাত্রা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে,
    রথচক্র উদ্দাম গতিতে ঘোরে সার্থকতা অন্বেষণের নেশায়;
    তারপর অকস্মাৎ ক্ষান্ত হয় পথ চলা আমারই অজান্তে।

  • মুক

    মুক

    অনেক কথাই বলতে আমি চেয়েছি এই দেশে,
    তার বদলে অনেক কথাই শুনে গেলাম এসে।

    তোমারা জান বলতে কত কথা,
    গড়তে জান কত রূপকথা
    লে রূপকথা আমার কানে
    মর্মভেদী বজ্র হানে,
    কই নি কথা, মুক হয়ে সব সয়েছি দিনে রাতে
    ব্যর্থ বেদনাতে।

    তোমার সাথে আমার থাকে মিল,
    যখন মোরা গড়ি কোন মিছিল
    ‘অন্ন চাই বস্ত্র চাই’ বলে;
    আর তা না হলে,
    তুমি শাসক, শোষিত আমি; তোমার হাতের দণ্ড
    সমাজ জীবন করবে লণ্ডভণ্ড।

    তাইতে তো আমি বিস্ময়ে নির্বাক,
    পঙ্গু রুগ্ন অথবা যেন গলিত শবের পাঁক।

  • প্রতিবাদ

    প্রতিবাদ

    ধনীর প্রাসাদে দামী আসবাবের মতো
    পালিত সৌখীন কুকুর
    সকালে সন্ধ্যায় মনিবের সঙ্গে নিয়মিত ভ্রমণে বের হয়।
    প্রাসাদের সামনে পথের জঞ্জালের পাশে।
    অনাহারে কিংবা কখনও অর্ধাহারে।
    মুমূর্ষু হাঁপানী রোগীর মতে ধুঁকতে ধুঁকতে
    লম্বা জিহ্বা নাচায় পথের কুকুর;
    নির্জন দুপুরে নির্জীবের মতো ঝিমোয়।

    প্রাসাদের কুকুরের দিকে কিন্তু সে পরম কৌতুকে
    রোজই তাকিয়ে থাকে, আর ভাবে তার সৌভাগ্যের কথা।
    বিলাসী কামরায় বাস। সোহাগের ধন।
    অনায়াসে পোষা কুকুর পায় পুষ্টিকর খাদ্য।

    তার ভাগ্যে ডাষ্টবিনের ঘৃণ্য কাড়াকড়ি মারামারি,
    তারপর হয়ত কোন দিন সামান্য খাদ্য মেলে।
    কুৎসিত অবাঞ্চিত কুকুরটা অনাদরে বাঁচে;
    পথের ওপর কোনদিন সে নিশ্চয়ই মরে পড়ে থাকবে
    অনাহারের যুদ্ধের শেষে পরাজয়ের গ্লানি বুকে নিয়ে।

    পথের মানুষের দিকে তাকিয়ে সে ভাবে,
    মানুষে মানুষেও আছে এই পার্থক্য, এই অবিচার।
    বস্তুতঃ, মানুষের সমাজেই এমন ব্যবস্থার উৎপত্তি।
    একদিকে মানুষেরা বাঁচে। অন্যদিকে মানুষেরাই মরে।

    পোষা কুকুর যথাসময়ে তার মনিবের সঙ্গে
    আজও বেরিয়েছে দৈনন্দিন ভ্রমণে,
    পথের কুকুর তার চিরদুর্বল কণ্ঠকে
    হাজার গুণ সবলতর করে কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল, ‘ঘেউ’!
    পোষা কুকুর সেদিকে ভ্রূক্ষেপই করে না।

    এবার তেড়ে গিয়ে সে ডাকল, ‘ঘেউ ঘেউঘেউ!
    বিলাসী কুকুর তার মনিবের গা ঘেঁষে
    নিরাপদ আশ্রয় পেতে চাইল।
    মনিব তাঁর হাতের বাঁকা ছড়িখানা উঁচিয়ে ধরে
    বিরক্তিতে তেড়ে এলেন।

    কিন্তু পথের কুকুর বেপরোয়া।
    বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে তার চোখে।
    শুষ্ক কণ্ঠে ‘ঘেউ ঘেউ’ আর্তনাদে
    মরিয়া হয়ে ছুটে গিয়ে
    লে কামড়ে দিল পোষা কুকুরের তৈলাক্ত ঘাড়ে।
    মনিবের বাঁকা ছড়ির নির্দয় আঘাত তার হাড়সর্বস্ব পিঠে
    নির্মমভাবে দাগ কেটে দিল।

    তবু অনেক দিনের অনেক বঞ্চনার অন্যায়ের বিরুদ্ধে
    তার এই অকপট প্রতিবাদ।

  • প্রস্তরমূর্তি

    প্রস্তরমূর্তি

    ময়দানে সবুজ ঘাসে লৌহ বেষ্টনীতে হে শহীদ, তোমার প্রস্তরমূর্তি
    স্মরণ করিয়ে দেয় তোমার শৌর্য বীর্য অনুপম ত্যাগের মহিমা।
    তোমার ঐতিহাসিক কীর্তিগাঁথা প্রস্তরে খোদিত তোমার পাদদেশে
    তুমি বীর। তুমি যোদ্ধা। তুমি মানব জাতির আদর্শ নেতা।

    পথের মানুষেরা তোমার মূর্তির সামনে নত মস্তকে দাঁড়িয়ে
    তোমাকে অভিবাদন করে। বর্ষের বিশিষ্ট দিনগুলিতে
    সরকারী অনুষ্ঠানে জনসাধারণ মাল্যদান করে তোমার পাদমূলে।
    সংবাদপত্রে চিত্রসহ তার বিস্তৃত সংবাদ প্রকাশিত হয়।

    প্রখর রৌদ্রে প্রবল বর্ষণে দারুণ শীতে, বর্ষের সব ঋতুতে
    তুমি স্থির প্রস্তরমূর্তির মতোই দাঁড়িয়ে থাক।
    তুমি যে প্রকৃতই প্রস্তরমূর্তি, সে কথা ঠিক তখনই অনুভব করি
    যখন দেখি, একটা ক্লাস্ত কাক উড়ে এসে বসে
    ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত তোমার তেজী ঘোড়ার লেজের ওপর,
    আর তোমার প্রশান্ত চোখ দুটো ধুলোর আবরণে ঢেকে যায়।

  • নিরুপায়

    নিরুপায়

    তোমরা নিশ্চয়ই খবরটা শুনেছ!
    কাল রাতে যদু তার বো আর ছেলেকে খুন করে,
    তারপর নিজে আত্মহত্যা করেছে।
    খবরটা কাগজেও বেরিয়েছে।
    পুলিশের ছুটোছুটি,
    লাসকাটা ঘরে পরীক্ষণ নিরীক্ষা,
    প্রতিবেশীদের হয়রানি,
    পাড়াময় উত্তেজনা জল্পনা কল্পনা আতঙ্ক।

    কিন্তু যদু কোনদিনই রেশনের পুরো দাম সংগ্রহ করতে পারে নি,
    সে কখনও দিতে পারেনি তার বৌ ছেলেকে
    অন্ন বস্তু, রোগে ওষুধপথ্য।
    বেচারা যদু বড়ই নিরুপায়!

    কাল রাতে আকাশে ঘন কালো মেঘের জটলা,
    বিষাক্ত ষড়যন্ত্রের সর্বনাশা মন্ত্রে বাতাসের ফিসফিসানি,
    ছেলেটা জ্বরে বেহুঁস,
    বৌটা ক্ষিধের জ্বালায় কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়েছে;
    সারাটা দিন ভিখারীর মতো পথে পথে ঘুরে
    সামান্য পয়সাও পায় নি। কেউ দেয় না।

    ঝিরঝিরে বৃষ্টি এল উপহাসের মতোই।
    যদুর ছেঁড়া গেঞ্জীর পিঠ ভিজল।
    ক্লান্ত। কপালের ঘাম করছে চোখের কোণে।
    কান্না নয়। অশ্র অতীতকালে নিঃশেষিত।

    কেরোসিনের অভাবে লণ্ঠন জ্বলে নি।
    ঘরখানা অন্ধকারে খাঁ খাঁ করছে
    নিঃশব্দ শয়তানির ছলনায়। মায়া মরীচিকা।
    অগত্যা যদু নিদারুণ হতাশায় মেঝেয় বসে পড়েছে।
    ছুরিখানা হাতের কাছে কোথা থেকে এল?
    শানিত ছুরির ফলাকা চোখের দৃষ্টির মতো কঠিন।

    ঘরের কানাচে তাল গাছের মাথায় বাড়ের দাপট,
    বৃষ্টির ঝাঁক মুহুর্মুহু বর্শার মতো ছুটে আসে,
    ঘরের চালের ফুটো থেকে কয়েক ফোঁটা ময়লা জল
    যদুর কানের পাশে পড়ল। বিরক্তি

    ঘুম। এবার শান্তির ঘুম আসুক।
    বাপ বাপ দুটো কোপ। রক্তের নদী।
    তারপর পরনের কাপড়ের টুকরোটা পাকিয়ে
    চালের বাতায় বেঁধে, সে নিজে ঝুলে পড়ল।
    সমাপ্তি।
    বড় এবার থামবে।
    বৃষ্টিও নিশ্চয়ই থামবে!

  • বিনষ্ট

    বিনষ্ট

    হৃদ্‌পিণ্ডটা জমাট রক্তের দলা। কৃষ্ণবর্ণ প্রস্তরখণ্ড।
    স্পন্দনহীন হৃদয়। ক্ষতচিহ্ন বিলুপ্ত। গতির সহজ অবসান।
    উত্তাপহীন বাতাসে রক্তাক্ত রণাঙ্গনে পরিত্যক্ত কোন শব।

    বেদনার হিম চিত্র সেই অভিশপ্ত মৃতের সান্ত্বনার মতো
    আকাশের ঈশান কোণে কখনও অখ্যাত তারার ছায়ায় ফোটে,
    যখন অন্ধ আক্রোশে গুপ্ত ডিনামাইটে স্মৃতির পাহাড় ভাঙা হয়,
    আর তার গোত্রহীন বেমানান সর্বনাশা বস্তুর ঢল
    দুর্ভাবনার গহবরে অনায়াসে হারিয়ে যায় পরম উচ্ছৃঙ্খলতায়,
    ছন্নছাড়া জীবনের মতো। হৃদয়ের মুক্ত আদালতে
    অন্তহীন অবসাদে ভগ্ন যুপকাষ্ঠের ফাঁকে নিরুপায়
    অপরাহ্নবেলায় ফুঁপিয়ে কাঁদে ম্রিয়মাণ প্রেমের প্রেতমূর্তি।

    অপদার্থ অক্ষরে রচিত বিয়োগান্ত কাহিনীর বিস্মৃত পাণ্ডুলিপি
    বিনষ্ট। অপহৃত। অনিয়ত বিরতির নিঃশব্দ সীমারেখা
    তাই অস্পষ্ট রঙে ঢেকে রাখে কালের নিষ্টুর প্রহরীরা।