ক্ষেতের কাজে বর্ষায় ভিজে গায়ে কাদা মেখে জোয়ান চাষী ঘরে ফিরেছে।
গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। কাঁথায় আপাদমস্তক ঢেকে মাদুরের ওপর শুয়ে পড়েছে। সারা রাত্তিরের মধ্যে
শুধুমাত্র এক বাটি বার্লি পেটে পড়েছে। অঘোরে ঘুমোচ্ছে। জ্বরে বেহুঁস।
বৌয়ের চোখের পাতা পড়ে না। মানুষটার মুখের চেহারা যেন জ্বরের ঘোরে বদলে গেছে।
ডাকলে, সাড়া দেয় না। দরজার কপাটের মতো প্রশস্ত বুকখানা রোগের আকস্মিক আক্রমণে
অনেকখানি সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। শালের খুঁটির মতো বাহু দুখানাকে বাদুড়ের ডানার মতো গুটিয়ে শুয়ে আছে যেন জলে ভেজা শুয়োপোকা।
বৌটা শাড়ীর আঁচলে নাক মুখ ঢেকে ছলছল চোখে ঠাঁয়ে বসে রয়েছে স্বামীর মুখের দিকে চেয়ে।
অন্ধকার রাত বাড়ছে। জ্বরও বাড়ছে। অনন্ত কবিরাজের বাড়ী অনেক দূর। এত রাত্তিরে ডাকলে বুড়ো সাড়াই দেবে না।
ভালোয় ভালোয় রাতটা পোহালে যাহোক একটা কিছু ব্যবস্থা করা যাবে
ভাবতে ভাবতে রুগ্ন স্বামীর পায়ের কাছে মাথাটা রেখে কথন যেন বৌটা ঘুমিয়ে পড়েছে!
শিয়রে ঘটতে ঢাকা জল। কেরোসিনের লণ্ঠনটা টিমটিম করে জ্বলছে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস ঘরে এসে ঢুকছে।
ঘরের কানাচে কলার ঝোপে বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ ঢিমে তালে টুপটাপ ঝরে পড়ছে।
অনেকক্ষণ আগে রাত ভোর হয়েছে। বৌয়ের ঘুম ভেঙেছে। কিন্তু চাষীর ঘুম ভাঙে নি।
তার ঘুম কোনদিনই আর ভাঙবে না। হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল বৌটা। কলাঝোপে তখনও কান্নার মতো বৃষ্টির ফোঁটা ঝরছে।
শালের খুঁটির মতে সমর্থ হাত দুখানা আর তাকে সোহাগ জানাতে পারবে না, মাঠের ফসল কাটতে পারবে না, লাঙলের কাস্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
দরিদ্রের ব্যর্থ জন্ম বিধাতারই মারাত্মক ভ্রম।
মৃত্যুর নিশানা আঁকা সংহারের কালো রথে যম
ভ্রম সংশোধনে আসে। কিন্তু তার মাশুলের হার
বিধাতারই দপ্তরে নির্বাচিত গণপুরস্কার।
দরিদ্রের জন্ম মৃত্যু, মুল্যে তার হয় না তো মাপ,
অভিধানে লেখা দেখি, যুগে যুগে ক্লীব অভিশাপ।
কার জন্ম কার মৃত্যু, এ হিসাবে কিবা প্রয়োজন?
যম তার খতিয়ালে লিখে রাখে ‘ভ্রম সংশোধন’।
আমি কিছু বলতে চাই; তোমার কথা আমার কথা,
আমাদের সকলের সমাজ সংসারের কথা। সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে
অহঙ্কারী জীবনের পরম ব্যর্থতার গাঁথা, বিকৃত সমাজের
অপূর্ণ প্রবৃত্তির অসম্পূর্ণ বিকাশের সম্ভাবনার বার্তা।
আমরা গ্রহ উপগ্রহের মতো আপন আপন গতিপথে
আহ্নিক গতির বার্ষিক গতির মহড়া দিয়ে আয়ুর তহবিল
ক্রমে শূন্য করে আনি। আমরা প্রতেকটি আলাদা মানুষ,
সমাজের গ্রামে শহরে আলাদা এক একটি দুর্গের মতো
পাশাপাশি আমাদের অনিশ্চিত অবস্থান। নদীর ধারার
শুষ্ক রেখায় উপস্থিতির চিহ্ন নিতান্তই ক্ষীণতর। প্রায় শূন্য।
আমাদের অপহৃত অন্তরাত্মা নিরুপায়। প্রেতের দেহে
ক্যালেণ্ডারের পাতায় আয়ুর হিসেব রাখি। ক্রীতদাসের জীবনে
একান্ত অভ্যস্ত এই শতাব্দীর যত মধ্যবিত্ত, দরিদ্র। তোমরা। আমরা
সমাজের ইমারতের ছোট বড় স্তম্ভ। দীর্ণ বক্ষে ঝিমুনির ঘোরে
রুটি মেলে না। ইট পাথর সিমেণ্ট দেখেছি। দেখেছি গৃহ।
এই দেহ রক্ত মাংসের গৃহ অনাদরে অসম্মানে ভগ্নপ্রায়।
সংসারের রঙ্গমঞ্চে স্বামী স্ত্রী ভ্রাতা ভগ্নী মগ্ন অভিনয়ে,
আপন ভূমিকাটুকু স্বভাবতঃ শেষ করে সাজঘরে ঢোকে।
পরস্পরে পরিচিত সহযাত্রী; প্রয়োজনের সীমানার মাঝে
পরিমিত বাক্যালাপ কাষ্ঠ হাসি আদান প্রদানের পালা শেষে
খাঁচার কপাট বন্ধ। রাজনীতির নামে হুজুক। দেশপ্রেমে ভণ্ডামি!
স্বার্থসিদ্ধির সংগ্রাম। সুখের সংজ্ঞা দৈনন্দিন অভিধানে খুঁজি।
নিম্ন মধ্যবিত্তের স্তরে দরিদ্রের পা রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা।
নিম্ন থেকে উচ্চতর স্তর মধ্যবিত্তের কাম্য। তারপর আরও উচ্চে
ধনীর সোপানে গতি যত্নবান শ্রমে কৌশলে। আচারে পোষাকে
অস্বাভাবিক। ছেলেরা মিশনারী স্কুলে ভর্তি হয়। বৌয়েরা মোটরে চড়ে,
পার্টিতে যায়। শহরের হোটেলে বসে বাণিজ্যচুক্তি সম্পাদিত
মদের গেলাসে। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ মিথ্যে প্রমাণিত ফানুষের গতিতে।
সেই লোকটি ছিন্ন পোষাকে পথের ধারে
গাছের তলায় চুপ করে বসে থাকে। ললাটে দুশ্চিন্তার রেখা।
পথের ছেলেরা তাকে ঢিল ছোঁড়ে, উপহাস করে।
সে মাঝে মাঝে শুধু একটি কথা বলে, ‘ঝড় আসবে’!
তার কথায় কেউ কান দেয় না। যে যার কাজে যায়।
কেউ ভাবে, লোকটি পাগল। দয়া করে ভিক্ষের পয়সা দেয়।
সে তখন মিটিমিটি হাসে আর বলে, ‘ঝড় আসবে’!
তারপর কখনও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে চলে যায়।
কত দিন হয়ে গেল। সেই লোকটিকে আর দেখা যায় না।
কিন্তু সত্যিই ঝড় এল। দেশ জুড়ে বিপ্লবের ঝড়।
যুদ্ধের ঝড়। মহামারী দুর্ভিক্ষের ঝড়। সংগঠনের ঝড়।
সেই প্রবল ঝড়ের তাণ্ডবলীলার চিহ্ন এখনও মিলিয়ে যায় নি।
উখান পতনে নগর ধ্বংস, রাজপথ ভগ্ন, সমাজ বিধ্বস্ত।
মানুষের জীবনের রূপ বদলের পালা চলে। এ ঝড় কবে থামবে?
নদীর তীরে ওই ডালিম গাছের ধারে
ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে বাঁশের বেড়ার ফাঁকে
সেদিন সহসা সূর্যের আলো এসে পড়েছিল,
যেদিন জন্ম নিয়েছিল একটি প্রাণ
নিষ্কৃত্রিম আর্তনাদে সরবে শঙ্খ রবে।
তারপর কত কাল পার হয়ে গেছে
সেই শিশুর কৈশোর যৌবন স্মৃতি বুকে নিয়ে;
সেই কুঁড়ে ঘরে যে প্রাণের জন্ম হল,
আজ সে যেন বেঁচে রইল অন্য নামে অন্য পরিচয়ে।
কবে তার তথাকথিত মৃত্যু ঘটেছে ইঁট পাথরের ঘরে,
সে কথা ওই ডালিম গাছ আর বলতে পারবে না;
কোন প্রমাণও নেই কুঁড়ে ঘরের বাঁশের বেড়ার ফাকে,
যেখানে সূর্যের আলো আজ পথ হারিয়েছে।
আজ মনে হয়, ওই কুঁড়ে ঘর আর ডালিম গাছটা
অতল পাতালে তলিয়ে গেছে নদীর ভাঙাগড়ার খেয়ালী খেলায়।
প্রভাতের শেষে প্রখর রৌদ্রের তাপে
শিশির বিন্দু যখন বাষ্প হল, আর
ডালিমের রাঙা রঙ ফিকে হল, কিংবা
মাটির বুকে নিরস ইট কাঠ ধাতু তপ্ত হল,
তখন পুনর্জন্মের ধূসর খোলস নিয়ে কঠিন বর্মে আবৃত
কাচঘরের মতো নিদারুণ নির্মম পৃথিবীর মুখোমুখি
দৃপ্ত ভঙ্গিমায় সে দাঁড়ালে, তাকে আদৌ চেনা যায় না।
রঙ করা কাঠপুতলি বিদূষকের পোষাকে বেমানান,
বেকুবের ভূমিকা নিয়ে সে বেঁচে আছে
তোমাদেরই কাছে কাছে, যেখানে চিরমৃত্যু ঘটেছে
তার যত্নলালিত কুশপুত্তলিকার দরিদ্র জন্মস্মৃতির।
যুগ যুগ ধরে কত মণি মুক্তা রত্ন
এই দেশের মাটিতে ছড়ানো রয়েছে, তার হিসেব নেই!
এমন সোনার দেশ আর কোথাও আছে কিনা,
আমার জানা নেই।
সমুদ্রে অরণ্যে পাহাড়ে মাটিতে খনিতে সমৃদ্ধ
এই সোনা দেশের ধনী মেরুদণ্ডের বনেদি রূপরেখা
সারা পৃথিবীর বিস্মিত চোখে কী অদ্ভুত, কী সুন্দর!
আকাশে আকাশে নীলিমার স্নেহের আভাস
বাতাসে বাতাসে মুক্তিগানের আনন্দোচ্ছ্বাস
জীবনের অন্তস্তলে আনে সূর্যালোকের আশীর্বাদের ফোয়ারা।
এমন সোনার দেশ আর কোথাও আছে কিনা,
আমার জানা নেই।
এই মাটি দিয়েছে আমায় পা রাখবার স্থান,
এই মাটি দিয়েছে আমার ক্ষুধায় অন্ন জল,
এই মাটির বুকে জন্মেছি বেঁচেছি বেড়েছি;
এই মাটিই আমার জীবনে স্বর্গাদপি গরীয়সী!
আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ধনদৌলতের অফুরন্ত ভাণ্ডার,
আমার রাজকোষের সব হীরে পান্না জহরত,
আর আমার এই জীবন্ত প্রাণটার সব কটা টুকরো
এখানে এই মাটির বুকেই আমি কুড়িয়ে পেয়েছি।
এমন সোনার দেশ আর কোথাও আছে কিনা,
আমার জানা নেই।
“শকুন্তলা-রহ, “ইংরেজের জর,” “তিতুমীর,
“গান, “মহাৱাণ স্বর্ণী,” “বঙ্গে বর্গী” ও
“ভরতপুরের যুদ্ধ গ্রন্থ-প্রণেতা
বিহারিলাল সরকার
প্রণীত।
চতুর্থ সংস্করণ।
কলিকাতা, ১২ নং হরীতকী বাগান লেন, শান্ত-প্রকাশ কার্যালয় হইতে শ্রীহরিপদ চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত।
১৩২৯ সাল।
কলিকাতা, ৩০ নং হরীতকী বাগান লেন, “পশুপতি যন্ত্রে” শ্রীরাজকুমার রায় কর্তৃক মুদ্রিত।
উৎসর্গ-পত্র
যাঁহার সহায়তায় পবিত্র সাহিত্য-মন্দিরের এক প্রান্তে
প্রবেশ করিবার প্রকৃত পথ পাইয়াছিলাম,
সেই শ্রদ্ধাস্পদ সহৃদয় সুহৃদ-সহায় শ্রীযুক্ত কেদারনাথ মিত্রকে
এবং
যাঁহার সহৃদয়তায় কেদারনাথকে সুহৃদস্বরূপে পাইয়াছিলাম,
সেই প্রিয়তম মিত্র শ্রীযুক্ত নৃত্যগোপাল বসুকে
দীনের এ সামান্য সাহিত্য-সম্বল
“বিদ্যাসাগর” উৎসৃষ্ট
হইল।
বিধি বিড়ম্বনায় “বিদ্যাসাগর” যথাসময়ে প্রকাশিত হয় নাই। তিন মাস শয্যাশায়ী ছিলাম। দৌর্ব্বল্য জন্য দুই মাস “বিদ্যাসাগর” সম্বন্ধে কোন কাজ করিতে পারি নাই। ইহা অবশ্য বিড়ম্বনার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সহোদর শ্রীযুক্ত শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন মহাশয়, সর্ব্বপ্রথম বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনী প্রকাশ করেন। তাঁহার নিকট আমার সর্ব্বাগ্রে কৃতজ্ঞতা-স্বীকার কর্ত্তব্য। “বিদ্যাসাগর” প্রকাশে অনেকেই অনেক প্রকারে আমাকে সাহায্য করিয়াছেন। পুস্তকের অভ্যন্তরে তাঁহাদের নামোল্লেখ আছে। আমি তাঁহাদের নিকট চির-কৃতজ্ঞতা-পাশে বদ্ধ রহিলাম।
বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পুত্র শ্রীযুক্ত নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়, আমাকে অনেক চিঠি-পত্র দিয়া সাহায্য করিয়াছেন। তাঁহার নিকট বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবন-ঘটিত যে সমুদয় চিঠি-পত্র ছিল, সে সমুদয়ই পাইবার আশা পাইয়াছিলাম। আমার দুরদৃষ্টবশতঃ তাহার কতক হস্তান্তরিত হইয়া পড়ে। যাহা হউক, তিনি আমাকে যে সব দুর্লভ আবশ্যক চিঠি-পত্র দিয়াছেন, তাহার জন্য তাঁহার নিকট আমি চির-ঋণী।
আমি বহু কষ্টে, বহু শ্রমে এবং অর্থব্যয়ে যে সমস্ত উপকরণ সংগ্রহ করিয়াছি, হয়ত তাহাদের কাহারও কাহারও উপযুক্ত ব্যবহার করিতে পারি নাই। আশা আছে, ভবিষ্যতে আমা অপেক্ষা যোগ্যতর জীবনী-লেখকের হস্তে তাহাদের সদ্ব্যবহার হইবে। আমি যাহা সংগ্রহ করিয়াছি, তাহা যদি কোন সময়, সাধারণের সম্পত্তিরূপে, সাধারণের হিতার্থে নিয়োজিত হয়, তাহা হইলে, আমার সংগ্রহ-শ্রম সার্থক হইবে।
নানা কারণে, মূল ইংরেজি চিঠি-পত্র প্রকাশ করিতে পারিলাম না। মূলের সৌন্দর্য্য অনুবাদে রক্ষিত হয় না। তবে অনেকটা ভাবগ্রহ হইয়া থাকে। এই জন্য ইংরেজী চিঠি-পত্রাদির বাঙ্গালায় মর্ম্মানুবাদ দিয়াছি।
শ্রীযুক্ত ডিরেক্টর সাহেবের চিঠি আসিয়াছে। ৺বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনী সম্বন্ধে কলেজ হইতে যাহা অনুসন্ধান করেন, তাহা পাইতে পারেন। ইতি
ভবদীয়স্য
শ্রীমহেশচন্দ্র শর্ম্মা।
বিদ্যাসাগরকে হিন্দু যে চক্ষে দেখিয়া থাকে এবং হিন্দুর যে চক্ষে দেখা কর্ত্তব্য, বিদ্যাসাগরের কার্য্যালোচনায় তাহা বুঝাইবার প্রয়াস পাইয়াছি। সে সম্বন্ধে কতদূর কৃতকার্য্য হইয়াছি, তাহার বিচার বিজ্ঞ পাঠকগণই করিবেন।
প্রার্থনা
মানুষ অপূর্ণ। তাই মানুষের কাজ একেবারে ভ্রমবর্জ্জিত হয় না। আমি মূঢ়, প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম, “বিদ্যাসাগরকে” একেবারে ভ্রমশূন্য করিব। বিশেষতঃ ষোড়শ বর্ষাধিক কাল বাঙ্গালা ছাপাখানার সহিত কুটুম্বিতা করিয়াও যখন আমার এইরূপ স্পর্দ্ধিত প্রতিজ্ঞা, তখন আমার মূঢ়তা অপরিমেয় ও অমার্জ্জনীয়। কেবল ছাপাখানার দোহাই দিয়া আত্ম-নিষ্কৃতির প্রয়াস পাইলে, প্রত্যব্যয় হয়। ছাপাখানার ভ্রম অনেকাংশে অক্ষরগত। আমার ভ্রম বিষয়, ভাব ও ভাষা সংক্রান্ত। কেবল ভ্রম কেন, কোন কোন স্থানে ত্রুটি ও সংশয় আছে। আমার সবিনয় নিবেদন, পাঠকবর্গ অনুগ্রপূর্ব্বক অক্ষরগত ভ্রম স্বয়ং সংশোধন করিয়া লইবেন। আত্মকৃত যে ভ্রম-ত্রুটি বুদ্ধিগোচর হইয়াছে, তাহার যথাযোগ্য সংশোধন করিয়া লইতে সঙ্কুচিত নহি। আমার বুদ্ধিগোচর হয় নাই, এমন ভ্রমও থাকিতে পারে। দয়া করিয়া, কেহ তাহা দেখাইয়া দিলে, অকৃতজ্ঞতার কলঙ্কে কলুষিত হইব না।
স্বর্গীয় মহাত্মা বিহারীলাল সরকার মহাশয়ের বিদ্যাসাগর-জীবনীর ৪র্থ সংস্করণ প্রকাশিত হইল। বড়ই আক্ষেপের বিষয়, শ্রদ্ধাভাজন বিহারীবাবু তাহার বড় সাধের বর্তমান সংস্করণের প্রকাশ ভার আমার প্রতি অৰ্পণ করিয়া এই গুরুতর কার্য্য সম্পন্ন হইবার পূর্ব্বেই আমাদিগকে শোক-সাগরে ভাসাইয়া অমরধামে গমন করিষ্যছেন।
এই সংস্করণে বিদ্যাসাগরের অঙ্গ-সৌষ্ঠব সম্পাদনে তাহার সম্পূর্ণ ইচ্ছা ছিল। যথাস্থানে পরিবর্ত্তন ও পরিবর্দ্ধন করিয়া যাতে “বিদ্যাসাগর” সৰ্ব্বসাধারণের আদরণীয় হয়, তদ্বিষয়ে তিনি প্রস্তুত হইয়াছিলেন এবং আমাকে উপদেশ দান করিয়াছিলেন। কিন্তু বিধির বিধানে তাঁহার লোকান্তরের কারণ সেই সাধু সঙ্কল্প কার্য্যে পরিণত হইতে পারে নাই। স্থানে স্থানে সামান্য যাহা পরিবর্ত্তিত হইয়াছে, তাহা বিহারীবাবু নিজেই তাঁহার জীবিতাবস্থায় করিয়া গিয়াছিলেন। যথোপযুক্ত পরিবর্ত্তন ও পরিবর্দ্ধন করিয়া সৰ্ব্বাঙ্গ সুন্দরভাবে গ্রন্থখানি প্রকাশ করিবার জন্যই বিহারী বাবু আমাকে এই কার্য্যের ভার প্রদান করেন, কিন্তু হায়, তাঁহার মৃত্যুতে সেই কার্য্য অসম্পন্নই রহিয়া গেল!
বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনের একটা প্রধান কাজ বিধবাবিবাহ প্রচলন, তাহা সৰ্ব্ববাদী সম্মত না হইলেও সেই সম্বন্ধে বিদ্যাসাগর মহাশয় ও অপরাপর শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতমণ্ডলী যে বিচার ও গবেষণা করিয়া গিয়াছেন, তাহার বিস্তারিত ভাবে আলোচনাপূর্ণ মন্তব্য পাঠ করিতে আজকাল অনেকেই ইচ্ছা প্রকাশ করিয়া থাকেন। বিহারী বাবুর অভাবে তাঁহার গ্রন্থ মধ্যে ঐ বিষয়ের সমালোচনার সম্ভাবনা না থাকায় পাঠকগণের সন্তুষ্টির জন্য পরিশিষ্টে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিধবাবিবাহ নামক সম্পূর্ণ গ্রন্থখানি সন্নিবিষ্ট হইল। সুধীগণ তাহা পাঠ করিয়া বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পাণ্ডিত্য ও বিচার-কুশলতা দেখিয়া মুগ্ধ হইতে পারিবেন এবং সাধারণ পাঠকগণও বিধবাবিবাহ সম্বন্ধে স্বয়ং চিন্তা করিতে সক্ষম হইবেন। এই সংস্করণে গ্রন্থখানার বিশেষ উৎকর্ষ সাধন করিতে না পারিলেও ছাপা, কাগজ ও বাঁধাই ইত্যাদি সম্বন্ধে যত্ন, চেষ্টা ও ব্যয়ের কোনটী ত্রুটী করা হয় নাই। এক্ষণে পাঠকগণের সহানুভূতি পাইলেই এম সফল বোধ করিব। উপসংহারে আর একটী কথা উল্লেখ করা কর্ত্তব্য মনে করি।
কলিকাতা ৬২নং আমহার্ষ্ট স্ট্রীট্স্থ ‘মেসার্স পুরুষোত্তম কোম্পানীর’ প্রোপ্রাইটার শ্রীযুক্ত বাবু রাজকুমার ভট্টাচার্য্য মহাশয় বিদ্যাসাগরের জন্য সমস্ত কাগজ সরবরাহ না করিলে, ইহা প্রকাশ করিতে কত যে বিলম্ব হইত, তাহা বলা যায় না। তিনি কাগজ প্রদান করিয়াই নিশ্চিন্ত হন নাই, ইহার মুদ্রণেও যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছেন। তজ্জন্য আমি তাঁহার নিকট চিরকৃতজ্ঞ রহিলাম। ফলতঃ বর্তমান সংস্করণে শ্রদ্ধাষ্পদ রাজকুমার বাবুই এই গ্রন্থের প্রকাশক, আমি উপলক্ষ মাত্র।
দ্বিতীয় দাতা-কর্ণ এবং দয়ার সাগর অনাথ-বান্ধব বঙ্গের “বিদ্যাসাগর”, ১৮৯১ খৃঃ অব্দে ২৯শে জুলাই বা ১২৯৮ সালে ১৩ই শ্রাবণ, মঙ্গলবার রাত্রি ২টা ১৮ মিনিটে ইহলোক ত্যাগ করিয়াছেন।
বলা বাহুল্য,—“বিদ্যাসাগর” বলিলে, ৺ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকেই বুঝায়। সেই বিশ্ব-বিশ্রুত “বিদ্যাসাগর” ত্রিংশৎ বৎসর হইল, অমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছেন। এ কর্ম্মক্ষেত্রে সেই কর্ম্ম-শূর আপন কর্ম্ম সাধন করিয়া, অপেক্ষাকৃত অল্পতর ভাগ্যহীন ব্যক্তিবর্গকে কর্ম্মের শিক্ষা-দীক্ষা দিয়া, স্বস্থানে প্রত্যাবর্ত্তন করিয়াছেন। জীবমাত্রের এই অবস্থা। সেই আদ্যা শক্তি মূলা প্রকৃতির এই ব্যবস্থা। অবোধ মায়াময় জীব আমরা, মায়া-মুগ্ধ হইয়া, এ সব তত্ত্ব বুঝিয়াও, বুঝিতে পারি না। এ অনিত্য সংসারে কেবল বিয়োগবিলাপে অধীর হইয়া পড়ি। তাই বিদ্যাসাগরের স্মৃতিতে এখনও বিয়োগ-বাড়বানল প্রজ্বলিত হইয়া উঠে। যে যায়, সে ত আর আসে না। যায়, কিন্তু স্মৃতি যে জাগে! স্মৃতি ত নয়, সে যে জ্বালাময়ী জ্বালা! সে জ্বালা জুড়াইব কিসে?
এখনও চারি দিকে কত কাঙালের পর্ণ-কুটীরে পূর্ণ হাহাকার! এখনও কত অনাথাশ্রমে আকুল প্রাণের মর্ম্মভেদী গভীর চীৎকার! সে সব কথা ভাবিলে চক্ষু ফাটিয়া রক্ত বাহির হয়! সেই করুণপ্রতিম অনুপম করুণাময়ের কথা স্মরণ হইলে হৃদয়ের শোক-সাগর উথলিয়া উঠে।
বিদ্যা-বুদ্ধিতে “বিদ্যাসাগর” অপেক্ষা বড় অনেক থাকিতে পারেন; কিন্তু দয়া-দক্ষিণ্যে তাঁহা অপেক্ষা বড় অতি অল্প লোক দেখিতে পাই। এমন নিরন্নের অন্নদাতা, ভয়ার্ত্তের ভয়ত্রাতা, বিপক্ষের উদ্ধারকর্ত্তা এবং দীন-হীনের দয়াল পালক পিতা, এ কলিযুগে, এ সংসারে বড় বিরল। তিনি যে দয়ার অপূর্ব্ব অবতার! তিনি যে মুত্তিমতী দয়ার পূর্ণ পুরুষকার! হৃদয়-বলে “বিদ্যাসাগর” বঙ্গের বিরাট পুরুষ।
এক জন বড় লোক হইলে, সমগ্র দেশ বা জাতি বড় বলিয়া সম্মানিত হয়। মার্কিণ গ্রন্থকার দার্শনিক এমারসন্ বড় লোকদের কথায় বলিয়াছেন,—
“The race goes with us on their credit.”
কলুষময় কলিকালে, দানে পুর্ণ “সাত্ত্বিকতা” সুদুর্লভ; বিদ্যাসাগরের দানে কিন্তু সাত্ত্বিকতার পূর্ণ বিকাশ। তাঁহার “বিধবা-বিবাহ” প্রচলন-প্রক্রিয়া সম্বন্ধে হিন্দু-সাধারণে একমত হইতে পারে নাই সত্য, কিন্তু তাঁহার দয়া-প্রণোদিত দানের সাত্ত্বিকতা কেহ অস্বীকার করিতে পারিবেন না। দানে বিদ্যাসাগর শাস্ত্রের মর্য্যাদা রক্ষা করিয়াছেন। শাস্ত্রে আছে,—
“দাতব্যমিতি যদ্দানং দীয়তেঽনুপকারিণে।
দেশে কালে চ পাত্রে তদ্দানং সাত্ত্বিকং স্মৃতম্॥”
— গীতা ১৭।২০।
দান করিতে হইবে, ইহা মনে করিয়া দেশ কাল পত্র বিবেচনায়, অপকারীকেও যে দান করা যায়, তাহাকে সাত্ত্বিক দান কহে।
এরূপ সাত্ত্বিকভাবাপন্ন দানের পরিচয় বিদ্যাসাগরের জীবনবৃত্তান্তে পুনঃ পুনঃ পাইবেন। বিদ্যাসাগর দান করিতেন, জানিতেন কেবল দাতা ও গ্রহীতা। দানের পৌরুষ-প্রকাশে তাঁহার প্রবৃত্তি ছিল না। তিনি দান করিতেন, নামের জন্য নহে। দরিদ্রের সেবা এবং রুগ্নের শুশ্রুষা কেবলমাত্র তাঁহার অকাম-কল্পিত, নিত্য ক্রিয়া ছিল। দেনার দায়ে ঋণী জেলে যাইতে যাইতে পথে বিদ্যাসাগরকে দেখিয়া, বাষ্পাকুললোচনে কাতরভাবে তাঁহার পানে একবার তাকাইলে, চক্ষের জলে তাঁহার বুক ভাসিয়া যাইত। কপর্দ্দক হস্তে না থাকিলেও, তদ্দণ্ডে তিনি ঋণ করিয়া ঋণীর ঋণ পরিশোধ করিতেন।
এরূপ দান অবশ্য সংসারের পক্ষে সকল সময় সর্ব্বথা অনুকরণীয় ও প্রবর্ত্তনীয় নয়। ইহাতে অনেক সময় বিপদ্গ্রস্ত হইতে হয়। বিলাতী কবি গোল্ডস্মিথ্ কতকটা এইরূপ দানশীলতায় মধ্যে মধ্যে বিপদ্গ্রস্ত হইয়াছিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়কে অবশ্য কখন সেরূপ হইতে হয় নাই। হইলেও ইহা যে স্বাভাবিকী সহৃদয়তার পরিচায়ক, তাঙ্গতে সন্দেহ কি?
প্রাসাদ-বিহারী কোটিপতি হইতে “কর্ম্মটাড়ে”র পর্ণকুটির-বাসী অশিক্ষিত দীন হীন সাঁওতাল পর্য্যন্ত জানিত,—“বিদ্যাসাগর দয়ার অবতার।” এই জন্য তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, মুসলমান, শিখ, পারসিক, সর্ব্ব দেশের সর্ব্ব জাতির সমান বরণীয় এবং মাননীয়। তাঁহার বিধবা-বিবাহ-প্রচলনের কার্য্যাষ্ঠান সম্বন্ধে যাঁহার বিরুদ্ধবাদী ছিলেন, তাঁহারাও ঐ কার্য্য অতিমাত্র দয়া-প্রবণতার ফল বুঝিতে পারিয়া তাঁহার প্রতি ভক্তিহীন হন নাই। সে দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর কোথায়! সে দানবীর সর্ব্বজনসমাদৃত বিদ্যাসাগর কোথায়!
যখন শোকের দারুণ শক্তিশেল বুকের উপর, যখন যাতনার অগ্নিস্তূপ মর্ম্মের ভিতর, তখন “জন্মভূমি” পত্রিকায় এ অধম লেখকের উপর বিদ্যাসাগরের জীবনী লিখিবার ভার পড়িয়াছিল। মনে করিয়াছিলাম, জ্বালা জুড়াইলে, সম্পূর্ণ উপকরণ সংগ্রহ করিয়া, জীবনী লিখিতে প্রবৃত্ত হইব। জ্বালা জুড়াইল না; পাঠকগণ কিন্তু অধীর; কাজেই জীবনীর অসম্পূর্ণ উপকরণ লইয়া “জন্মভূমি”তে জীবনী লিখিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম। যে কারণে জন্মভূমিতে জীবনী লিখিতে বাধ্য হইয়াছিলাম, সেই কারণে জীবনী পুস্তকাকারে প্রকাশ করি।
পুস্তকের উপকরণ সম্পূর্ণ না হউক, অপেক্ষাকৃত অনেক বেশী। সে বিরাট পুরুষের জীবনীর সম্পূর্ণ উপকরণ সংগ্রহ একরূপ সাধ্যাতীত। তবে ইহাতে যথাজ্ঞাতব্য বিষয়ের অভাব যাহাতে না হয়, তাহার জন্য সাধ্যানুসারে প্রয়াস পাইয়াছি।
জীবনী লেখা হইয়াছে বটে; কিন্তু একেবারে নির্দ্দোষ হইবার সম্ভাবনা কম। কাহারও জীবনী লিখিতে হইলে, গুণাধিক্যের সঙ্গে দোষেরও সম্যক্ সমালোচনায় সমদৰ্শিতার সম্মান সংরক্ষিত হয়। মৃত ব্যক্তির গুণ ভালবাসার জিনিষ; দোষ নিন্দার্হ। কবি সাদে বলিয়াছেন,—
“Their virtues love, their faults condemn.”
বিদ্যাসাগর মহাশয় বহুগুণান্বিত হইলেও কেহ কেহ তাঁহার কোনও কোনও কার্য্যে দোষারোপ করিতেন এবং অনেকেরই বিশ্বাস যে, সেই দোষ তাঁহার ভ্রান্তবিশ্বাস-মূলক। কিন্তু তাহা সত্য হইলেও বহুগুণের সমাবেশে তাঁহার গুণের গরিমাই উজ্জ্বল হইয়া উঠে। যাহাই হউক এ সময়ে দোষের সম্যক সমালোচনা করা নানা কারণে অনুচিত। ডাক্তার জনসন্ বলিয়াছেন যে, “যাহার জীবনী লিখিতে হয়, কেবল তাঁহার চরিত্রের উজ্জ্বল ভাগই সমালোচনা করা উচিত নহে; তাহা হইলে তাঁহার অনুকরণ অসম্ভব হইয়া উঠে।” তাঁহারও কিন্তু সে সাহসে কুলায় নাই। তাঁহার সময়ে যে সব কবি ছিলেন, তাঁহাদের অনেকের অনেক কথা বলিতে তিনি কুণ্ঠিত হইয়াছিলেন। তাঁহার কথা এই ছিল,—
“Walking upon ashes under which the fire was not extinguished.”
“অনলাভ্যন্তর ভষ্মস্তূপে বিচরণ করিতেছি।”
সকল দোষত্রুটির সমালোচনা করা অসম্ভব হইলেও, আমরা বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কোন কোন কার্য্যের জনমত কিরূপ ছিল, তাহা প্রকাশ করিতে সাহসী হইয়াছি। যাহার অনুকরণে সম্প্রদায়বিশেষের মহতী ক্ষতি হইয়াছে বলিয়া অনেকে দৃঢ় মত পোষণ করেন, তাহা প্রদর্শন না করিলে প্রত্যবায়ভাগী হইতে ইহবে। গুণরাশির সমালোচনা ত অবশ্য কর্ত্তব্য; যেহেতু তাহা একান্ত অণুকরণীয়। বিদ্যাসাগর মহাশয় দরিদ্র ব্রাহ্মণের সন্তান হইয়াও, কি গুণে সম্রাট-মুকুট-লাঞ্ছন কীর্ত্তির অপুর্ব্ব জ্যোতিষ্মান্ শিরস্ত্রাণ মস্তকে ধারণ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, তাহা বর্ত্তমান কালে অনেকে অবগত নহেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনী সমালোচনায় তাহা উদ্ঘাটিত হইবে, সেই হেতু এ জীবনী বোধ হয় বর্ত্তমান ও ভবিষ্যৎ লোকসমূহের কথঞ্চিৎ উপকারক ও উপাদেয় হইতে পারিবে।
যে গুণসংঘাত জন্য লোকের জীবনী লেখা আবশ্যক হয়, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সে গুণ অনেক ছিল। যে গুণ থাকিলে, মানুষ মানুষকে ভালবাসিতে চাহে এবং যে গুণ থাকিলে, মানুষ বাহ্য জগৎ ভুলিয়া, সেই গুণবানের সম্পূর্ণ সত্তায় হৃদয় পূর্ণ করিয়া ফেলে, সে গুণ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অনেক ছিল। যিনি এক উদ্ভাবনায় চিন্তরাজ্যের সহজ পথ উন্মুক্ত করিয়া দেন, তাঁহার জীবনী লেখা আবশ্যক হয়। পাঠক! বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উদ্ভাবনাশক্তির পরিচয় পাইবেন। যিনি প্রতিভাবলে প্রকৃতির উচ্চ স্তরে দণ্ডায়মান হইয়া ইঙ্গিতে উন্নতির সহস্র পথের যে কোন পথ দেখাইয়া থাকেন, আর নিম্ন স্তরের লোকসমূহ তাঁহাকে ধরিবার জন্য স্তর বাহিয়া উঠিতে চেষ্টা করে, তাঁহার জীবনীর প্রয়োজন আছে। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনীপাঠে এ কথার সার্থকতা সম্যকরূপে প্রতিপন্ন হইবে। প্রকৃত প্রতিভায় “চৌম্বক” আকর্ষণের অসীম শক্তি। মানুষ যেখানে যত দূরেই থাকুক, আকর্ষণ এড়াইবার যো নাই। যেখানে এরূপ একটি “চুম্বক” থাকিবে, সেইখানে কোটি জীব আকৃষ্ট হইবে।
প্রতিভা স্বর্গের দেবতা। প্রতিভা পূজক সর্ব্বস্ব দিয়া প্রতিভার পূজা করিয়া থাকেন। চিন্তাশীল এমারসন্ বলিয়াছেন,—“তুমি বল,—ইংরাজ কাজের লোক;— জর্ম্মাণ সহৃদয় অতিথি-সেবক;— ভালেনসিয়ার জলবায়ু অতি মনোরম,—সক্রেমেণ্টো পাহাড়ে প্রচুর সোণা পাওয়া যায়; কথা ঠিক বটে; কিন্তু আমি-এ সব সুখশালী, ধনী এবং অতিথি সেবক লোকদিগকে দেখিতে বা নির্ম্মল জলবায়ুর সেবন করিতে অথবা বহুব্যয়ে স্বর্ণ সংগ্রহ করিতে চাহি না। তবে প্রকৃত জ্ঞানশালী ও শক্তিমান্ ব্যক্তিবর্গের আবাসভূমি দেখাইয়া দিতে পারে, এমন যদি কোন চুম্বক-প্রস্তর প্রাপ্ত হই, তাহা হইলে সর্ব্বস্ব বিক্রয় করিয়া তাহা ক্রয় করি এবং অদ্যই পথে বাহির হইয়া পড়ি।”
প্রকৃত শক্তিশালী এবং গৌরবান্বিত প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তি সর্ব্বত্রই পূজনীয়। তাঁহারা মানুষের আদর্শ। তাঁহারা প্রকৃতির সূক্ষ্ম শক্তির পরিচায়ক। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তাঁহাদের শক্তি বিসর্পিত। তাঁহাদের সহবাসে মানুষ সন্তুষ্ট ও শক্তিসম্পন্ন হয়। ভাবে বা কার্য্যে মানুষ তাঁহাদের সঙ্গে থাকিতে চাহে। আমাদের সন্তানসন্ততি বা নগর গ্রামের নামকরণ, তাঁহাদের নামে হইয়া থাকে। ভাষায় তাঁহাদের নামের ভূরি ভূরি প্রয়োগ পাইবে। তাঁহাদের প্রতিকৃতি বা গ্রন্থাদিরূপ কার্য্যাবলী আমাদের ঘরে ঘরে দেখিবে। আমাদের নৈতিক কার্য্যে তাঁহাদের প্রত্যেক কার্য্য স্মৃতিপথে জাগিয়া উঠে। তাঁহাদিগের অন্বেষণ যুবার স্বপ্ন এবং বর্ষিয়ানের জাগরণ কার্য্য। যতদূরে থাকি না, তাঁহাদিগের কার্য্যকলাপ এবং সম্ভবপর হইলে, তাঁহাদিগকে দেখিবার জন্য মন স্বতঃই ব্যাকুল হইয়া উঠে।
এইরূপ প্রতিভাশালী ব্যক্তির জীবনী প্রয়োজনীয়। এই জন্য এমারসন্ বলিয়াছেন,—
“The genius of humanity is the real subject whose biography is written in our annals.”
প্রতিভা মানবের প্রকৃত পদার্থ। প্রতিভাশালীর জীবন ইতিহাসে লিখিত হইয়া থাকে।
বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনে এমন প্রতিভার বহু পরিচয় পাইবেন। এক একটী প্রতিভাশালী ব্যক্তি যেমন এক একটী বিভাগ অধিকার করিয়া থাকেন, তেমনই বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রকৃতির এক বিশাল বিভাগ লইয়া ব্যাপৃত ছিলেন। মনোবৃত্তির উচ্চ ক্রিয়ানিবন্ধন প্রতিষ্ঠাসম্পন্ন ব্যক্তি ধ্যানমাত্রে কল্পনায় অন্য সাধারণের অলক্ষ্যে প্রকৃতির সূক্ষ্ম তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করিয়া লন। এই জন্য প্লেটো, সেক্সপিয়র, সুইনবর্ণ, গেটে প্রভৃতির এত প্রতিষ্ঠা।
মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের কার্য্যফল অব্যর্থ। জ্ঞান ও ভাবের শক্তি চিরন্তন ধ্রুব সুখদায়িনী। এ শক্তির তেজ পরীক্ষা করিতে হইলে শক্তিশালী পুরুষের জীবনী পড়িতে হয়। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বহু কার্য্যে এ শক্তির প্রমাণ আছে। বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা স্যার ওয়ালটর র্যালের সম্বন্ধে ইংলণ্ডেশ্বরী এলিজাবেথের সচিব লর্ড সিসিল বার্লে বলিয়াছিলেন,—
“I know he can toil terribly.”
ওয়ালটর ভয়ানক পরিশ্রম করিতে পারেন। এ কথা শুনিলে যেন বৈদ্যুতিক প্রভাবে সর্ব্বাঙ্গ আলোড়িত হইয়া উঠে। পাঠক! বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনী পাঠ করিলে বুঝিতে পরিবেন, বার্লের এই কথা বিদ্যাসাগর মহাশয়ে খাটে কি না। হামডেন্ সম্বন্ধে বিখ্যাত বিলাতী ইতিহাস-লেখক ক্লারেনডন্ বলিয়াছেন,—
“Who was of an industry and vigilance not to be tired out or wearied by the most laborious; and of parts not to be imposed on by the most subtle and sharp, and of a personal courage equal to his best parts.”
হামডেন্ অকাতরে পরিশ্রম করিতেন; তাঁহার সংপ্রবুদ্ধা তীক্ষ্ণদর্শিতা বিলক্ষণ ছিল। তিনি অতি পরিশ্রমে কাতর ও ক্লান্ত হইতেন না। চতুর তীক্ষ্ণবুদ্ধি লোক তাঁহাকে বিচলিত করিতে পারিতেন না। তাঁহার বুদ্ধিমত্তা ও উদ্যমশীলতা, শারীরিক সাহস ও মানসিক বল সমান ছিল।
ইংলণ্ডের প্রথম চার্লসের ভক্ত অনুচর ফক্ল্যাণ্ড সম্বন্ধেও ক্লারেনডন্ বলিয়াছেন, —
“Who was so severe an adorer of truth, that he can as easily have given himself leave to steal, as to dissemble.”
ফক্ল্যাণ্ড এমন সুদৃঢ় সত্যপরায়ণ ছিলেন যে, চুরি করা তাঁহার পক্ষে যেমন অসম্ভব, আত্মগোপন করাও তদ্রূপ অসম্ভব।
চীন দার্শনিক লু সম্বন্ধে চীন দার্শনিক মেনসয়াস্ বলিয়া ছিলেন,—
“লুর ব্যবহারের কথা শুনিলে অতি নির্ব্বোধেরও বোধের সঞ্চার হয় এবং অস্থিরচিত্তেরও একাগ্রতা উপস্থিত হয়।”
বিদ্যাসাগর-জীবনে একাধারে এই হামডেন্, ফক্ল্যাণ্ড এবং লুর চরিত্র সমাবেশিত। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনী হইতে এই সকলের শিক্ষা হয়। ইহা জীবনীর নৈতিক সার। এই জন্যই কার্লাইল্ বলিয়াছেন,—
“Not only in the common speech of men, but in all art too—which is or should be concentrated and conserved essence of what men speak and show—Biography is almost the one thing needful.”
কেবল যে মানুষের সাধারণ কথাবার্ত্তার জন্য জীবনী আবশ্যক হয়, তাহা নহে; মানুষ যাহা কথায় বলে এবং কার্য্যে দেখায়, সেই সকল বিষয়ের সার অংশটুকুর জন্য জীবনী অত্যন্ত আবশ্যক।
এই জন্য বিদ্যাসাগরের জীবনী প্রয়োজনীয়। আধুনিক জীবনী-লিখন-প্রথা বিদেশীয় অনুকরণ। বিদেশীয় শক্তিশালী বড়লোকমাত্র, বিদ্যাসাগরের প্রীতিপাত্র ছিলেন; অতএব বিদেশীয় শক্তিশালী ব্যক্তিদিগের সহিত তাঁহার তুলনা অযৌক্তিক নহে। কোন না কোন বিদেশীয় শক্তিসম্পন্ন, ব্যক্তির কোন না কোন গুণ তাঁহাতে পরিলক্ষিত হইত।
“বিদ্যাসাগর চরিত” নামে, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের স্বরচিত অসম্পূর্ণ জীবনী তদীয় পুত্র শ্রীযুক্ত নারায়ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় কর্ত্তৃক প্রকাশিত হয়। কলিকাতা সংস্কৃত কলেজে প্রবেশ করিবার পূর্ব্ববর্ত্তী ঘটনাগুলি লইয়া ইহা রচিত। নারায়ণ বাবু লিখিয়াছেন,–“যদি তাঁহার ছাত্রজীবনের ইতিহাস নিজে লিখিয়া যাইতে পারিতেন, তাহা হইলেও তাঁহার জীবন-চরিত সম্পূর্ণ করা সহজ হইত।” নিজের জীবনী নিজে লিখিলে জীবনবিবরণ যে সম্পূর্ণ হয়, তাহাতে আর সন্দেহ কি? এতদ্ব্যতীত জীবনীর বিষয়ীভূত ব্যক্তির ভাষা, মনোবৃত্তি, ধর্ম্মপ্রবৃত্তি, রীতি, নীতিপ্রভৃতির অনেক আভাস পাইবার সুবিধা ও সুযোগ হয়। জনসনের জীবনী লিখিতে বসিয়া জীবনীলেখক বসওয়েল বলিয়াছেন,—
“Had Dr. Johnson written his own life in conformity with the opinion which he has given, that every man’s life may be best written by himself; had he employed in the preservation of his own history, that clearness of narration and elegance of language in which he has embalmed so many eminent persons, the world would probably have had the most perfect example of biography that was ever exhibited.”
ডাক্তার জন্সন্ বলিতেন,—“নিজের জীবন-বৃত্তান্ত মানুষ নিজে উত্তম লিখিতে পারেন।” তিনি যে বিশদ বর্ণনায় এবং সুন্দর রচনায়, বহু সংখ্যক, কীর্ত্তিকুশল ব্যক্তির বিষয় লিপিবদ্ধ করিয়া তাঁহাদিগকে সঞ্জীবিত করিয়াছেন, তাহাতে তিনি যদি স্বয়ং নিজের ইতিহাস লিখিতেন, তাহা হইলে জগৎ তাঁহার নিকটে সর্ব্ববয়বসম্পন্ন জীবনীর উত্তম দৃষ্টান্ত লাভ করিতে পারিত।
কথাটা ঠিক বটে; কিন্তু আত্মকথার সূক্ষ্ম সমালোচনা হওয়া দুষ্কর। সে ভার বাহিরের লোককে লইতে হয়। আত্মদোষের উদ্ঘাটনে সাহস কয় জনের হইয়া থাকে? রুসোর “কনফেশন্” অর্থাৎ ক্রটী-স্বীকার, দুরন্ত দুঃসাহসিকতার কাজ। ভলটয়ার ঠিকই বলিয়াছেন,—
“There is no man, who has not something hateful in him—no man who has not some of the wild beast in him. But there are few who will honestly tell us how they manage their wild beast.”
জগতে এমন কোন মানুষ নাই, যাহার কিছু দোষ নাই, এমন মানুষ নাই, যাঁহাতে ঘৃণার্হ কিছুই একেবারেই নাই বা যাঁহার পাশববৃত্তি নাই; কিন্তু সেই প্রবল পাশববৃত্তি জীবনে কেমন করিয়া আয়ত্ত করিয়া রাখিয়াছে, কয়জন লোকে তাহা অকপটে বলিতে পারে?
মানুষের এমন দোষ ও ত্রুটী থাকিতে পারে যে, তাহা বন্ধুর নিকট প্রকাশ করিতে দ্বিধা হয়। বিখ্যাত ফরাসী গ্রন্থকার শ্যামফোঁ বলিয়াছেন, —
“It seems to me impossible, in the actual state of society, for any man to exhibit his secret heart, the details of his character as known to himself, and above all, his weaknesses and his vices, to even his best friend.”
ইহার ভাব এই—
সমাজের যে অবস্থা, তাহাতে আমার মনে হয়, মানুষ নিজের হৃদয়ের গূঢ় কথা, অথবা যাহা কেবল অন্তরাত্মাই জানেন, আপনার সেই প্রকৃত চরিত্রের গুপ্ত কথা, আপনার মানসিক দুর্ব্বলতা এবং পাপের কথা তাহার অন্তরঙ্গ অভিন্নহৃদয় বন্ধুর নিকটে ও বলিতে পারে না।
জন্ ষ্টুয়ার্ট মিলের আত্মজীবনীতে সকল সন্দেহ দূর হয় না। স্কট, মুর্ এবং সাদে আত্মজীবনী লিখিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন; কিন্তু নানাবিধ সঙ্কোচ উপস্থিত হওয়ায়, তাঁহারা তাহা পরিত্যাগ করেন। তবে বিদ্যাসাগর মহাশয় যেরূপ সত্যপরায়ণ ছিলেন তাহাতে তিনি সত্যপ্রকাশে যে অকুণ্ঠিত হইতেন, তাহাতে সন্দেহ নাই।
মহান আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশুদ্ধ সুন্নাহ উপস্থাপন করার তাওফীক যে কয়জন বান্দাকে দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে হাফিজ যাহাবী (রহ.) ও হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.)-এর পর আল্লামা নাসিরুদ্দীন (রহ.)-এর নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। তাঁর পুরো নাম আবূ ‘আবদুর রহমান মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.)।
জন্ম: যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) ১৯১৪ ঈসায়ী সনে পূর্ব ইউরোপের একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ আলবেনিয়ার রাজধানী কুদরাহতে জন্মগ্রহণ করেন। আলবেনিয়ায় জন্মগ্রহণ করার কারণে তিনি ‘আলবানী’ নামে অভিহিত হন। তাঁর পিতার নাম নূহ নাতাজী আলবানী।
শিক্ষা-দীক্ষা: দামিস্কের একটি মাদ্রাসা থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর তাঁর পিতার বন্ধু শায়খ সায়ীদ আল-বুরহানীর নিকট ফিক্হের বিভিন্ন গ্রন্থ এবং আরবী সাহিত্য ও বালাগাত প্রভৃতি গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। একবার তিনি মিশরের আল্লামা রশীদ রিয়া সম্পাদিত “আল-মানার”-এর একটি সংখ্যায় ইমাম গাযযালী (রহ.)-এর প্রবন্ধ পাঠ করেন। এই প্রবন্ধই তাঁকে হাদীস চর্চা ও রিজাল শাস্ত্রের গবেষণায় পিপাসার্ত করে তুলে। পরবর্তীতে তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে, সাধারণ মুসলিমদের সামনে আল্লাহর নাবী ﷺ-এর বিশুদ্ধ সুন্নাহ উপস্থাপন করবেন। আল্লাহ তাঁর এই ইচ্ছাকে বাস্তবরূপ দান করার তাওফীক দান করেছেন এবং তার জন্য জ্ঞানের ভাণ্ডারকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।
কর্মজীবন: আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) নিজেই বলেছেন—‘আল্লাহ আমাকে অসংখ্য সম্পদ দান করেছেন। তার মধ্যে একটি হলো, আমার পিতা আমাকে ঘড়ি মেরামত করার কাজ শিখানো।’ যৌবনের প্রথম দিকে তিনি ঘড়ি মেরামত করে জীবিকা অর্জন করেন। কিন্তু পাশাপাশি অধিকাংশ সময় তিনি হাদীস অধ্যয়ন ও গবেষণা এবং বই লেখার কাজে ব্যয় করতেন। তিনি মদীনাহ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর অধ্যাপনায় নিয়োজিত ছিলেন। কর্ম জীবনের অধিকাংশ সময়েই তিনি গবেষণা, লেখালেখি ও বক্তৃতা দানে ব্যস্ত থাকেন। হাজার বছর ধরে হাদীস শাস্ত্রের যে খিদমাত হয়নি বিংশ শতাব্দীতে তিনি তা করার তাওফীক লাভ করেন।
রচনাবলী: আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.)-এর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৩০০। তার মধ্যে কয়েকটি হলো, ১. সিলসিলাতুল আহাদীস যঈফাহ্ ওয়াল মাউযূ’আহ; ২. সিলসিলাতুল আহাদীস সহীহাহ; ৩. সহীহ ও যঈফ সুনান আবূ দাউদ; ৪. সহীহ ও যঈফ তিরমিযী; ৫. সহীহ ও যঈফ সুনান নাসাঈ; ৬. সহীহ ও যঈফ সুনান ইবনু মাজাহ; ৭. সহীহ ও যঈফ আদাবুল মুফরাদ; ৮. তাহ্ক়ীক় মিশকাতুল মাসাবীহ; ৯. সিফাতু সলাতিন্ নাবী ﷺ; ১০. সলাতুত তারাবীহ; ১১. হাজ্জ, উমরাহ ও যিয়ারাহ; ১২. কিস্সাতু মাসীহিদ্ দাজ্জাল ইত্যাদি।
আলবানী সম্পর্কে মতামত: সাউদী আরবের প্রাক্তন গ্রান্ড মুফতি শায়খ ‘আবদুল ‘আযীয বিন বায্ (রহ.) তাঁকে যুগ মুহাদ্দিস নামে অভিহিত করেছেন। ইসলামী যুবকদের বিশ্ব সংগঠন-আন্নাদওয়াতুল ‘আ-লামিয়্যাহ লিশ্শাবা-বিল ইসলামীর জেনারেল সেক্রেটারী ড. মা-নি’ ইবনু হাম্মাদ আল্জুহানী বলেন, আল্লামা আলবানী সম্পর্কে বলা যায় যে, বর্তমান যুগে আকাশের নীচে তাঁর চেয়ে বড় হাদীস বিশারদ আর কেউ নেই। ড. সুহায়িব হাসান বলেন, আলবানী বিংশ শতকের হাদীস শাস্ত্রের মু’জিযাহ (অলৌকিক ঘটনা)।
মৃত্য: ১৯৯৯ ঈসায়ী সনের ২ অক্টোবর আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) জর্দানের রাজধানী আম্মানে ৮৬ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। হাদীস শাস্ত্রে তাঁর অবদানের জন্য বিশ্ববাসী তাঁকে স্মরণ করে রাখবে। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন—আমীন।
সকল প্রশংসা মহান রব্বুল ‘আলামীনের জন্য এবং দরূদ ও সালাম জানাই নাবী মুহাম্মদ ﷺ-এর প্রতি।
যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.)-এর ‘মাসীহ দাজ্জালের কিস্সা’ পুস্তকটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করতে পেরে সর্বপ্রথম মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাই। পৃথিবীর বুকে যত ফিতনা ঘটেছে এবং ক়িয়ামাতের পূর্ব পর্যন্ত ঘটবে তার মধ্যে কানা দাজ্জালের ফিতনাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। তাই সমস্ত নাবী-রাসূলগণ স্বীয় উম্মাতকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করে গেছেন। কাজেই মুসলিমদের এ বিষয়ে সঠিক ও স্বচ্ছ ধারণা থাকা একান্তই জরুরি। অত্র পুস্তকে আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) প্রথমে দাজ্জাল সম্পর্কে আবূ উমামাহ্ (রা.) বর্ণিত একটি বৃহৎ হাদীস উল্লেখ করেন। অতঃপর তিনি হাদীসের বক্তব্যগুলোকে মোট ৪৯টি অংশে ভাগ করেন এবং প্রতিটি অংশকে এক একটি অনুচ্ছেদ ধারা গণ্য করে তার সমর্থনে অন্যান্য সাহাবায়ি কিরামগণের থেকে যে সব হাদীস বর্ণিত হয়েছে সে সব হাদীস একত্রিত করে তাহক়ীক়ের মাধ্যমে হাদীসগুলোর অবস্থান তুলে ধরেন। পরিশেষ তিনি দাজ্জাল সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসসমূহ থেকে যা কিছু সহীহভাবে বর্ণিত হয়েছে তা ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করেন। শায়খ আলবানী যেভাবে তাঁর লিখনীকে সাজিয়েছেন তা সত্যিই বিস্ময়কর। পুস্তকটি পাঠের মাধ্যমে দাজ্জাল সম্পর্কে যেমন সঠিক জ্ঞান অর্জন করা যাবে, অপরদিকে দাজ্জাল সম্পর্কে যে সব ভুল ধারণা ছিল এবং যঈফ ও ভিত্তিহীন বর্ণনা রয়েছে তাও অবগত হওয়া যাবে। এই গবেষণামূলক চমৎকার লিখনীর জন্য আমরা সম্মানিত শায়খের প্রতি কৃতজ্ঞ।
পুস্তক প্রকাশ, অনুবাদ ও প্রুফ সংশোধনে যারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন এবং উৎসাহ দিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বিশেষ করে দীনী ভাই ঈসা মিঞা, জাহাঙ্গীর আলম, মোহাম্মদ আলী, সাজিদুর রহমান ও মোশারফ হোসেনের প্রতি। আল্লাহ সকলকে উত্তম প্রতিদান দান করুন—আমীন।
পরিশেষে সম্মানিত পাঠকের প্রতি অনুরোধ রইলো, অনুবাদের কাজে কোথাও কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে আমাদেরকে জানাবেন। ইনশাআল্লাহ পরবর্তীতে তা সংশোধন করা হবে।
আবূ উমামাহ্ বর্ণিত হাদীসের প্রত্যেকটি (৪৯টি) অংশের সমর্থনে বর্ণিত বিভিন্ন শাহিদ হাদীসসমূহ। এ অধ্যায়ে আবূ উমামাহ্ বর্ণিত হাদীসের প্রতিটি অংশকে এক একটি অনুচ্ছেদ হিসেবে পৃথক করে তার সমর্থনে বর্ণিত হাদীস সহ ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হবে।1
(আবূ উমামাহ্ বর্ণিত হাদীসের সানাদ যদিও দুর্বল) কিন্তু হাদীসটি সহীহ পর্যায়ের। হাদীসের অংশগুলো পৃথক পৃথকভাবে বহু হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। অবশ্য কিছু অংশ বাদে, যার শাহিদ বর্ণনা অথবা শক্তিশালী করার মতো কিছু আমি পাইনি, যেমন এর বর্ণনা অচিরেই আসছে। পাঠকদের সহজে বুঝার জন্য এর ব্যাখ্যা ও তাখরীজ আমি যথাস্থানে ধারাবাহিকভাবে ক্রমিক নম্বরসহ উল্লেখ করবো। সুতরাং আমি বলব:
অনুচ্ছেদ ১
এ অংশের অনেকগুলো হাদীস রয়েছে:
প্রথম: হিশাম ইবনু ‘আমির হতে মারফূভাবে বর্ণিত এ শব্দে:
ما بين خلق آدم إلى قيام الساعة خلق أكبر من الدجال (وفي رواية: فتنة أكبر من فتنة الدجال)
“আদম সৃষ্টি হতে ক়িয়ামাত ক়ায়িম হওয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দাজ্জালের চেয়ে অধিক ভয়ানক সৃষ্টি আর নেই। (অন্য বর্ণনায় রয়েছে: অধিক বড় ফিতনা আর নেই)।”
মুসলিম (৮/২০৭), হাকিম (৪/৫২৮), আহমাদ (৪/২০১২১)। এর অন্য বর্ণনার একটি হচ্ছে হাকিমের বর্ণনা, তাতে অতিরিক্ত রয়েছে:
“আল্লাহ নিকট।” হাকিম বলেন: বুখারীর শর্তে সহীহ। তবে বুখারী এটি বর্ণনা করেননি। তিনি যেরূপ বলেছেন। সম্ভবত তার শব্দের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। অন্যথায় মুসলিম এটি বর্ণনা করেছেন, যেমন আমি উল্লেখ করেছি। এছাড়া আদ-দানী (১৭৬/২, ১৭৭/১) এবং তিনি বৃদ্ধি করেছেন:
(قد أكل الطعام ومشى في الأسواق)
“যে খাদ্য খাবে এবং বাজারে চলাফেরা করবে।”
দ্বিতীয়: ‘আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফ্ফাল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
(ما أهبط الله تعالى إلى الأرض – منذ خلق آدم إلى أن تقوم الساعة – فتنة أعظم من فتنة الدجال وقد قلت فيه قولا لم يقله أحد قبلي: إنه آدم جعد ممسوح عين اليسار على عينه ظفرة غليظة وإنه يبرئ الأكمه والأبرص ويقول: أنا ربكم . فمن قال: ربي الله فلا فتنة عليه ومن قال: أنت ربي . فقد افتتن يلبث فيكم ما شاء الله ثم ينزل عيسى ابن مريم مصدقا بمحمد صلى الله عليه و سلم على ملته إماما مهديا وحكها عدلا فيقتل الدجال) فكان الحسن يقول: ونرى ذلك عند الساعة
“মহান আল্লাহ আদমকে (আ.) সৃষ্টি থেকে ক়িয়ামাত পর্যন্ত দাজ্জালের চাইতে অধিক বড় ফিতনা অবতীর্ণ করেননি। আর আমি দাজ্জাল সম্পর্কে এমন কথা বলেছি যা আমার পূর্বে কেউ বলেননি। সে হবে কোঁকড়ানো চুল বিশিষ্ট লোক। তার বাম চোখ এমনভাবে মিশানো হবে যে, এর উপর মোটা চামড়ায় ঢাকা হবে। সে অন্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য করবে। সে বলবে: আমি তোমাদের রব্ব। জবাবে যে ব্যক্তি বলবে, আমার রব্ব হচ্ছেন আল্লাহ, তার উপর কোন ফিতনা নেই। আর যে ব্যক্তি বলবে, তুমিই আমার রব্ব, সে তো ফিতনায় পতিত হলো। আল্লাহ যতদিন চাইবেন দাজ্জাল তোমাদের মাঝে অবস্থান করবে। অতঃপর ঈসা ইবনু মারইয়াম অবতরণ করবেন মুহাম্মাদ (সা.)-কে সত্যায়নকারী হিসেবে তাঁরই মিল্লাতের একজন হিদায়াতপ্রাপ্ত ইমাম ও ন্যায়পরায়ন শাসকরূপে। অতঃপর তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন।”
হাসান বলতেন: আমরা তা প্রত্যক্ষ করব ক়িয়ামাতের সন্নিকটে।
হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তাবারানী ‘কাবীর’ ও ‘আওসাত’ গ্রন্থে এবং এর রিজাল সিক়াত। এর কতিপয়ের বৈপরিত্যে কোন সমস্যা নেই। যেমন বলেছেন “মাজমাউয যাওয়ায়িদ” গ্রন্থে (৭/৩৩৬)।
আর চোখের বাক্যটির শাহিদ বর্ণনা রয়েছে আনাস বর্ণিত হাদীসে এ শব্দে:
(إن الدجال أعور العين الشمال عليها ظفرة غليظة مكتوب بين عينيه: كافر )
“দাজ্জালের বাম চোখ হবে কানা। তার চোখের উপর মোটা চামড়ায় ঢাকা হবে। তার দুই চোখের মধ্যবর্তী স্থানে লিখা থাকবে: কাফির।” আহমাদ (৩/১১৫, ২০১) সহীহ সানাদে।
তৃতীয়: হুযাইফাহ হতে। তিনি বলেন:
ذكر الدجال عند رسول الله صلى الله عليه و سلم فقال: (لأنا لفتنة بعضكم أخوف عندي من فتنة الدجال ولن ينجو أحد مما قبلها إلا نجا منها وما صنعت فتنة منذ كانت الدنيا – صغيرة ولا كبيرة – إلا لفتنة الدجال)
‘একদা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট দাজ্জালের উল্লেখ করা হলে তিনি বলেন: “অবশ্যই আমি তোমাদের পরষ্পরের ফিতনাকে দাজ্জালের ফিতনার চেয়েও অধিক ভয় করি। যে ব্যক্তি পূর্ববর্তী ফিতনাসমূহ থেকে নিরাপত্তা লাভ করবে সে দাজ্জালের ফিতনা থেকেও নিরাপত্তা পাবে। দুনিয়ার সূচনা হতে ছোট বড় যত ফিতনা হয়েছে তা দাজ্জালের ফিতনার জন্যই সংঘটিত হয়েছে।”
আমি বলি: এর সানাদ সহীহ এবং রিজাল সিব্বাত, বুখারী ও মুসলিমের রিজাল। আল্লামা হায়সামী বলেন (৭/৩৩৫): ‘হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আহমাদ, বায্যার এবং এর রিজাল সহীহ।’
চতুর্থ: জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, তার হাদীস সামনে আসবে।
অনুচ্ছেদ ২
এ অংশের সমর্থনে কয়েকটি হাদীস রয়েছে:
প্রথম: ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) লোকদের মাঝে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করলেন। অতঃপর দাজ্জালের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন:
(إني لأنذركموه وما من نبي إلا وقد أنذره قومه [ لقد أنذره نوح قومه ] ولكني سأقول لكم فيه قولا لم يقله نبي لقومه: [ تعلموا ] أنه أعور وإن الله ليس بأعور)
“আমি তোমাদেরকে দাজ্জালের ব্যাপারে সতর্ক করছি। এমন কোন নাবী নেই যিনি স্বীয় জাতিকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক না করেছেন। [নূহ (আ)] তাঁর কওমকে সতর্ক করেছেন। কিন্তু আমি শীঘ্রই তার ব্যাপারে এমন কথা বলবো যা অন্যান্য নাবী তার কওমকে বলেননি। তোমরা জেনে রাখ, সে হবে কানা। আর আল্লাহ কানা নন।”
‘আবদুর রাযযাক ‘মুসান্নাফ’ ( ১১/৩৯০/২০৮২০), এবং তার থেকে আহমাদ (২/১৪৯)।
(إن المسيح الدجال أعور العين اليمني كأن عينه عنبة طافية )
দ্বিতীয়: আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
( ما من نبي إلا وقد أنذر أمته الأعور الكذاب ألا إنه أعور وإن ربكم ليس بأعور مكتوب بين عينيه: ك ف ر [ يقرؤه كل مسلم ])
“এমন কোন নাবী নেই যিনি স্বীয় উম্মাতকে মিথ্যাবাদী কানা দাজ্জাল সম্পর্কে সাবধান না করেছেন। জেনে রাখ, সে হবে কানা, আর তোমাদের রব্ব কানা নন। তার দুই চোখের মাঝখানে লিখা থাকবে: কাফ, ফা, র। [যা প্রতিটি মুসলিম পড়তে পারবে]।”
বুখারী (১৩/৮৫), মুসলিম (৮/১৯৫), আবূ দাঊদ (২/২১৩), তিরমিযী (২২৪৬) তিনি একে সহীহ বলেছেন, আহমাদ (৩/১০৩, ১৭৩, ২৭৬, ২৯০), হাম্বাল (ক়াফ ৫১/২), ইবনু খুযাইমাহ্ ‘আত্-তাওহীদ’ (৩২ পৃ.), ইবনু মানদাহ (৯৭/১), অতিরিক্ত অংশটুকু মুসলিম, আহমাদ ও অন্যান্য। অন্য অনুচ্ছেদে আবূ সাঈদ আল-খুদরী হতে ‘মাজমাউয যাওয়ায়িদ’ (৭/৩৩৬-৩৩৭) এবং আসমা বিনতু ইয়াযীদ আনসারিয়্যাহ হতে, যা সামনে আসবে। এছাড়া ‘আয়িশাহ্ ও উম্মু সালামাহ্ হতে, যা সামনে আসছে।
অনুচ্ছেদ ৩
এ অংশটি পৃথকভাবে দুই বা ততোধিক হাদীসে এসেছে:
প্রথম: আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন:
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: (قلت: وذكر حديث فضل الصلاة في مسجده صلى الله عليه وسلم) (فإني آخر الأنبياء وإن مسجدي آخر المساجد)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: (তিনি মাসজিদে নাব্ববীতে সলাত আদায়ের ফাযীলাতের কথা উল্লেখ করেন) “আমিই নাবীদের মধ্যে সর্বশেষ আর মাসজিদ সমূহের মধ্যে আমার এ মাসজিদ হলো সর্বশেষ মাসজিদ।”
মুসলিম (৪/১৩৫) এর অসংখ্য শাহিদ বর্ণনা রয়েছে। যেমন, একটি প্রসিদ্ধ হাদীস ‘আলী (রাযি.) সম্পর্কে: তুমি আমার কাছে মূসার নিকট হারূনের অবস্থানের মতো। তবে একথা ভিন্ন যে, আমার পরে কোন নাবী নেই!” এটি বর্ণনা করেছেন আহমাদ, শাইখাইন ও অন্যান্যরা অনেকগুলো সূত্রে।
দ্বিতীয়: ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণিত। নাবী (সা.) বলেছেন:
(نحن آخر الأمم وأول من يحاسب يقال: أين الأمة الأمية ؟ فنحن الآخرون الأولون)
“উম্মাতসমূহের মধ্যে আমরাই সর্বশেষ উম্মাত। তবে আমাদের হিসাব হবে সবার আগে। বলা হবে: উম্মী উম্মাত কোথায়? আবির্ভাবে আমরাই সর্বশেষ। জান্নাতে প্রবেশে আমরাই সর্বাগ্রে।”
ইবনু মাজাহ (২/৫৭৫)।
আমি বলি: এর সানাদ সহীহ, যেমন আল্লামা বুসাইরী বলেছেন তার ‘আয-যাওয়ায়িদ’ গ্রন্থে (২৬৫/১)।
তৃতীয়: মু‘আবিয়্যাহ্ ইবনু হাইদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি:
(إنكم وفيتم سبعين أمة أنتم آخرها وأكرمها على الله عز و جل)
“তোমরা সত্তরটি উম্মাত পূর্ণ করেছ। তোমরাই হলে সর্বশেষ এবং মহান আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত (উম্মাত)।”
দারিমী (২/৩১৩), আহমাদ (৫/৩, ৫)।
আমি বলি: এর সানাদ হাসান। এটি রয়েছে মিশকাত (৬২৯৪)।
অনুচ্ছেদ ৪
এ অংশের সমর্থনে হুবহু শব্দে আমি হাদীস পাইনি। তবে এর কাছাকাছি পেয়েছি আবূ হুরাইরাহ বর্ণিত হাদীসে। তিনি বলেন: আমি সত্যবাদী ও সত্যায়িত আবূল কাসিমকে বলতে শুনেছি:
(يخرج أعور الدجال مسيح الضلالة قبل المشرق في زمن اختلاف الناس وفرقة فيبلغ ما شاء الله أن يبلغ من الأرض في أربعين يوما – الله أعلم ما مقدارها – فيلقى المؤمنون شدة شديدة ثم ينزل عيسى ابن مريم صلى الله عليه وسلم من السماء فيؤم الناس ( ۱ ) فإذا رفع رأسه من ركعته قال: سمع الله لمن حمده قتل الله المسيح الدجال وظهر المسلمون)
“পথভ্রষ্টকারী কানা মাসীহ দাজ্জাল বের হবে পূর্বদেশ থেকে মানুষের মতভেদ ও দলাদলির যুগে। আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী যে চল্লিশ দিনে পৃথিবীর যেখানে পৌঁছার পৌঁছবে। এর পরিমাণ সম্পর্কে আল্লাহই অধিক জ্ঞাত। তখন মু’মিনরা খুবই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে। অতঃপর ঈসা ইবনু মারইয়াম (আ.) আকাশ থেকে অবতরণ করবেন এবং লোকদের ইমামতি করবেন (নেতৃত্ব দিবেন)।3 তিনি যখন রুকূ থেকে মাথা উঠাবেন তখন বলবেন: সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ। আল্লাহ মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করেছেন এবং মুসলিমদের বিজয়ী করেছেন।”
আল্লামা হায়সামী বলেন (৭/৩৪৯): হাদীসটি বর্ণনা করেছেন বাযযার। এর রিজাল সহীহ রিজাল। তবে ‘আলী ইবনুল মুনযিব সিক়াহ রাবী। আর হাফিয বলেন: (১৩/৮৫): এর সানাদ জাইয়্যিদ।’ দেখুন মাওয়ারিদুয যামআন (১৮৯৮)।
দাজ্জাল বের হওয়া সংক্রান্ত স্পষ্ট হাদীসাবলীর সংখ্যা প্রচুর। যার কিছু শীঘ্রই আসছে ইনশাআল্লাহ তা‘আলা। কিন্তু তাতে দৃঢ় অর্থবোধক শব্দ নেই, যেমন তার উক্তি: (لامحالة) অথবা (إنه لحق)। বরং দাজ্জাল সম্পর্কিত হাদীসসমূহের প্রত্যেকটি তার বের হওয়ার বিষয়টি জোরদার করেছে, তাকিদ দিয়েছে। আর নাবী (সা.)-এর হাদীসের প্রত্যেকটিই সত্য, হাক়। তিনি সবই সত্য বলেছেন চাই তা সীগায়ে তাকিদ (জোরালো শব্দে) বর্ণিত হোক বা না হোক। “তিনি (মুহাম্মাদ) নিজের পক্ষ হতে খেয়াল মতো কথা বলেন না, তার নিকট যা কিছু ওয়াহী করা হয় তিনি শুধু তা-ই বলেন।” (সূরাহ্ আল-নাজম: ৩, ৪ )
হ্যাঁ, আদ-দানী ‘আল-ফিতান’ গ্রন্থে (১৪১/১) হাসান হতে মুরসালভাবে ঈসা (আ) সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন:
(وإنه نازل لا محالة فإذا رأيتموه فاعرفوه …)
“তিনি অবশ্যই অবতরণ করবেন: তোমরা তাকে দেখেই চিনতে পারবে …।”
হাদীসটি আরো বর্ণনা করেছেন ইবনু হিব্বান (১৯০৪) সালিহ ইবনু ‘উমার হতে, ‘আসিম ইবনু কুলাইব থেকে তার পিতার মাধ্যমে আবূ হুরাইরাহ সূত্রে। তবে তাতে এ কথাটি নেই: “আমি শপথ করে বলছি, নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন …।”
এর সানাদ সহীহ।
আর ক্রোধান্বিত হওয়ার বাক্যটি রয়েছে মুসলিম (৮/১৯৪), ইবনু হিব্বান (৬৭৫৫), আহমাদ (৫/২৮৪)।
মাসীহ দাজ্জালের কিসসা, ঈসা (আ.)-এর অবতরণ এবং দাজ্জালকে হত্যা করা সম্পর্কে আবূ উমামাহ্ (রাযি.) বর্ণিত হাদীসকে ঘিরে এ সম্পর্কে অন্যান্য সাহাবীগণের (রাযি.) সূত্রে যা কিছু সহীহভাবে বর্ণিত হয়েছে:
হে লোক সকল! আল্লাহ যেদিন থেকে আদম সন্তানাদি সৃষ্টি করেছেন তখন থেকে যমীনের উপর দাজ্জালের ফিতনার চেয়ে ভয়ঙ্কর ফিতনা আর নেই [এবং ক়িয়ামাত পর্যন্ত হবেও না। যে ব্যক্তি পূর্ববর্তী ফিতনাসমূহ থেকে নাজাত পাবে সে দাজ্জালের ফিতনা থেকেও নাজাত পাবে। [আর সে মুসলিমদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না]।
নিশ্চয়ই আল্লাহ যত নাবী পাঠিয়েছেন তারা প্রত্যেকেই স্বীয় উম্মাতকে [কানা] দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। আমিও তোমাদেরকে তার ব্যাপারে সাবধান করছি।
আমি নাবীদের মধ্যে সর্বশেষ নাবী এবং তোমরা উম্মাতসমূহের মধ্যে সর্বশেষ উম্মাত।
সে (দাজ্জাল) অবশ্যই তোমাদের মাঝে প্রকাশ পাবে। এটা অবশ্যই সত্য, এবং তা অতি নিকটেই, আর যা কিছুই ঘটবে তা অতি নিকটে। [দাজ্জাল সর্বপ্রথম ক্রোধের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করবে]। [সে বের হবে না যতক্ষণ না অবস্থা এরূপ হয় যে, মীরাস বণ্টন করা হবে না এবং গণীমাত পেয়ে কোন আনন্দ প্রকাশ করা হবে না]।
আমি তোমাদের মাঝে বর্তমান থাকাবস্থায় যদি সে বের হয়, তাহলে আমি প্রত্যেক মুসলিমের পক্ষে যুক্তি উত্থাপন করবো (তাকে দোষারোপ করব)। আর যদি সে আমার পরে বের হয়, তাহলে প্রত্যেককে নিজের পক্ষে দলীল পেশ করতে হবে। তখন মহান আল্লাহ প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আমার খলীফাহ স্বরূপ হবেন (অর্থাৎ তিনি মুসলিমদের দাজ্জাল থেকে রক্ষা করবেন)। উম্মু সালামাহ্ হাদীসে রয়েছে: সে যদি আমার মৃত্যুর পরে বের হয় তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে নেককার লোকদের দ্বারা রক্ষা করবেন।
নিশ্চয়ই দাজ্জাল বের হবে [পূর্ব দেশ থেকে] যাকে ‘খুরাসান’ বলা হয়। [আসবাহানের ইয়াহুদীদের মাঝে] তাদের চেহারা হবে ভাঁজযুক্ত। (দাজ্জাল আত্নপ্রকাশ করবে) সিরিয়া ও ইরাকের ‘খাল্লা’ নামক স্থান হতে। আর সে তার ডান ও বামে সর্বত্র বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা ঈমানের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে (তিনবার)।
কেননা, আমি তোমাদের কাছে তার এমন অবস্থা বর্ণনা করব, যা আমার পূর্বে কোন নাবী স্বীয় উম্মাতের কাছে বর্ণনা করেননি। (“উবাদাহ্ হাদীসের রয়েছে : আমি তোমাদের কাছে দাজ্জাল সম্পর্কে অনেক হাদীস বর্ণনা করেছি। এতদসত্ত্বেও আমার ভয় হয়, তোমরা তাকে চিনতে পারবে না)।
প্রথমে সে বলবে, আমি নাবী এবং আমার পরে কোন নাবী নেই।
অতঃপর সে দাবী করে বলবে, আমি তোমাদের রব! অথচ তোমরা তোমাদের রব্বকে মৃত্যুর পূর্বে দেখবে না।
আর সে হবে কানা। [তার বাম চোখ হবে মিশানো] [যার উপর মোটা চামড়ায় ঢাকা হবে]। [তা যেন উজ্জ্বল নক্ষত্র] [তার ডান চোখ যেন জ্যোতিহীন, আঙ্গুর সদৃশ গোল]। যা উপরে উঠে থাকবে না এবং নীচে থাকবে না।] [সে কোঁকড়ানো চুল বিশিষ্ট হবে]। [সাবধান! দাজ্জালের বিষয় তোমাদের কাছে গোপন নয়। আর তোমাদের কাছে গোপন নয় যে, তোমাদের রব্ব কানা নন। দাজ্জালের বিষয় তোমাদের কাছে গোপন নয়। আর তোমাদের কাছে গোপন নয় যে, তোমাদের রব্ব কানা নন।] [তিনবার]। [তোমরা মৃত্যুর আগে তোমাদের রব্বকে দেখবে না]।
সে পৃথিবীতে বিচরণ করবে। আর আকাশ ও যমীন তো আল্লাহ্ই।
[সে হবে বেঁটে, তার পদক্ষেপ হবে দীর্ঘ, মাথার চুল হবে কুঞ্চিত] [সে হবে খুঁতযুক্ত]।
সে হবে কোঁকড়ানো চুল বিশিষ্ট লোক। [কুঞ্চিত চুল]।
তার দুই চোখের মাঝে (কপালে) লেখা থাকবে ‘কাফির’। এই লেখা পড়তে পারবে [যারা তার কার্যকলাপ অপছন্দ করবে] অথবা প্ৰত্যেক মু‘মিন ব্যক্তিই পড়তে পারবে, চাই সে অক্ষর হোক বা নিরক্ষর।
তার অন্যতম ফিতনা হলো, তার সাথে থাকবে জান্নাত ও জাহান্নাম [নদী ও পানি] এবং [রুটির পাহাড়]। [সে আত্মপ্রকাশ করবে সাথে জান্নাত ও জাহান্নাম সদৃশ বস্তু নিয়ে]। ‘তার জাহান্নাম হলো জান্নাত আর জান্নাত হলো জাহান্নাম।’ [মুগীরাহ ইবনু শু‘বাহকে দাজ্জাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমি বললাম, লোকেরা বলাবলি করছে যে, তার সাথে নাকি রুটি ও গোশতের পাহাড় এবং পানির নহর থাকবে? তিনি বলেন: আল্লাহর পক্ষে তো তা এর চাইতে অধিক সহজ] (আরেক হাদীসে এসেছে: [দাজ্জালের সাথে থাকবে দুটি প্রবাহিত নহর। তার একটি বাহ্যিক চোখে দেখা যাবে সাদা পানি আর দ্বিতীয়টি বাহ্যিক চোখে দেখা যাবে জ্বলন্ত আগুন]। [তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ঐ যুগ পাবে, তার উচিত হবে সে যেন সেটা থেকেই পান করে যেটাকে আগুন মনে করবে]। এবং চক্ষু বন্ধ করবে অতঃপর মাথা নত করে পান করবে। কেননা তা হবে প্রকৃতপক্ষে পানি [শীতল মিঠা পানি] [উত্তম পানি] [কাজেই সাবধান! তোমরা (ধোঁকায় পড়ে) নিজেদের ধবংস করো না। (অন্য বর্ণনায় রয়েছে: যে ব্যক্তি তার নহরে (জান্নাতে) প্রবেশ করবে তার সওয়াব বিনষ্ট হবে এবং পাপ সাব্যস্ত হবে। আর যে ব্যক্তি তার জাহান্নামে প্রবেশ করবে তার জন্য সওয়াব সাব্যস্ত হবে এবং পাপ মোচন হবে)।
যে ব্যক্তি তার আগুনের দ্বারা পরিক্ষিত হবে, সে যেন আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং সূরাহ কাহ্ফ-এর প্রথমাংশ তিলাওয়াত করে। [কেননা তা পাঠ করলে তোমরা তার ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে।]
দাজ্জালের অন্যতম ফিতনা হচ্ছে এই, সে জনৈক বেদুইনকে বলবে: আমি তোমার জন্য তোমার পিতা-মাতাকে জীবিত করে দিতে পারলে তুমি কি সাক্ষ্য দিবে যে, নিশ্চয় আমি তোমার রব্ব! তখন সে বলবে: হ্যাঁ, তখন তার জন্য দু’টি শয়তান তার পিতা ও মাতার আকৃতি ধারণ করবে। তারা বলবে: হে বৎস! তার আনুগত্য কর। নিশ্চয় সে তোমার প্রতিপালক।
দাজ্জালের আরেকটি ফিতনা হল, সে এক ব্যক্তিকে পরাভূত করে তাকে হত্যা করবে। এমনকি তাকে করাত দিয়ে দুই টুকরা করে নিক্ষেপ করবে।
দাজ্জালের আরেকটি ফিতনা হলো, সে একটি গোত্রের পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে, [তাদেরকে সে আহবান করবে] কিন্তু তারা তাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করবে। [সে তাদের থেকে সরে যাবে] ফলে তাদের গৃহপালিত পশু ধ্বংস হয়ে যাবে।
দাজ্জালের আরেকটি ফিতনা হলো, সে অন্য আরেকটি গোত্রের পাশ দিয়ে যাবে। [সে তাদেরকে আহ্বান করবে] তখন তারা তাকে সত্য বলে মেনে নিবে [তার ডাকে সাড়া দিবে]। ফলে সে আকাশকে বৃষ্টি বর্ষণের নির্দেশ দিবে এবং আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে। অতঃপর সে যমীনকে শস্য উৎপাদনের নির্দেশ দিলে যমীন শস্য উৎপাদন করবে। যমীন ফসলাদি এমনভাবে উৎপন্ন করবে যে, তাদের পশুগুলো সেদিন সন্ধ্যায় খুব মোটাতাজা এবং পেট ভর্তি করে স্তন ফুলিয়ে প্রত্যাবর্তন করবে।
দাজ্জাল একটি বিরান (পুরাতন) স্থানে গিয়ে তাকে আদেশ করবে, তোমার গুপ্ত ধনরাশি বের করে দাও। তখন এর ধনরাশি এভাবে তার কাছে এসে পুঞ্জীভূত হবে যেরূপ মৌমাছির ঝাঁক দলে দলে এসে এক জায়গায় একত্রিত হয়।
সে বের হবে [মানুষের মতভেদ ও দলে দলে বিভক্ত হওয়ার যুগে]। [তখন মানুষ পরষ্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে, ধর্মকে কিছুই মনে করবে না, এবং আপোষে খারাপ আচরণ করবে। অতঃপর (দাজ্জাল) সকল নদীর ঘাটে আগমন করবে। যমীন তার জন্য এমনভাবে সংকোচন করে দেয়া হবে তা যেন মেষের একটি চামড়া]।
সে বের হবে না যতক্ষণ এ নিদর্শন প্রকাশ না পাবে যে, রোমকরা (সিরিয়ার) আ‘মাক় ও দায়িক় নামক নহরের কাছে অবতীর্ণ হবে। [একদল দুশমন ইসলামপন্থীদের উদ্দেশে একত্রিত হবে এবং একদল ইসলামপন্থীও তাদের উদ্দেশে একত্রিত হবে] অতঃপর মাদীনাহ্ থেকে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনী তাদের মোকাবিলার উদ্দেশে রওয়ানা হবে। সেখানে পৌঁছে যখন তাঁরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে, তখন রোমকরা বলবে: আমাদেরকে এবং আমাদের মধ্যকার যারা বন্দী হয়েছে উভয়কে মিলিত হওয়ার সুযোগ দাও, আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। তখন মুসলিমরা বলবে: মনে রেখ, আল্লাহর শপথ! আমরা তোমাদের বন্দীদেরকে ছাড়ব না বা যারা তাদেরকে বন্দী করেছে তাদের সাথে তোমাদেরকে মিলিত হতে দিব না। অতঃপর মুসলিমদের সাথে তাদের তুমুল লড়াই হবে। ঐ যুদ্ধে (উভয় পক্ষের) প্রতিরোধ ব্যবস্থা খুবই প্রবল হবে। মুসলিম বাহিনী একদল মুজাহিদকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত রাখবে, যারা বিজয়ী না হওয়ার পূর্বে কিছুতেই ফিরবে না। অতঃপর তারা সারাদিন যুদ্ধে লিপ্ত থাকবে যে পর্যন্ত রাত তাদের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি না করে। রাত হলে এই দল ঐ দল সকলেই এভাবে ফিরে আসবে যে, কেউই বিজয়ী হতে পারেনি। এদিকে মৃত্যুর জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দলটি শেষ হয়ে যাবে। অতঃপর মুসলিমরা মৃত্যুর জন্য আরেকটি দল প্রস্তুত করবে যারা বিজয়ী না হয়ে ফিরবে না। এরাও রাত এসে অন্তরায় সৃষ্টি না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। অবশেষে রাত এসে গেলে এই দল ঐ দল সবাই অবিজয়ী হয়ে ফিরে আসবে। আর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দলটিও শেষ হয়ে যাবে। অতঃপর মুসলিমরা আরেকটি দলকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করবে যারা বিজয়ী না হয়ে ফিরে আসবে না। এরাও রাত এসে অন্তরায় সৃষ্টি না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। অবশেষে রাত এসে গেলে এই দল ঐ দল সবাই অবিজয়ী হয়ে ফিরে আসবে। আর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দলটিও শেষ হয়ে যাবে। যখন চতুর্থ দিন আসবে তখন অবশিষ্ট মুসলিম বাহিনী শত্রুবাহিনীর দিকে অগ্রসর হবে]। যুদ্ধে মুজাহিদদের এক তৃতীয়াংশ পরাজয় বরণ করবে, যাদের তাওবাহ আল্লাহ কবূল করবেন না। আর এক তৃতীয়াংশ শাহাদাত বরণ করবে, [এরা] আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম শহীদ গণ্য হবে। আর এক তৃতীয়াংশ জয়ী হবে যারা কখনো পর্যুদস্ত হবে না। [অতঃপর এদেরকেও আল্লাহ পরাজয়ের সম্মুখীন করবেন অথবা চরম অবস্থায় সম্মুখীন করবেন অথবা ধ্বংসের মুখোমুখি পৌঁছাবেন। যাতে এরাও এমন প্রাণপণে যুদ্ধ করবে যার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না বা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি পাখি যখন তাদের আশেপাশে উড়ে যাবে, তখন তাদেরকে অতিক্রম করতে সক্ষম হবে না। অতিক্রম করতে গেলে মরে মাটিতে পড়ে যাবে। যুদ্ধশেষে কোন পিতার সন্তানদেরকে যাদের সংখ্যা একশো গণনা করা হবে কিন্তু মাত্র একজন ব্যতীত তাদের আর কাউকে জীবিত পাওয়া যাবে না। তাহলে কিসের গণীমাতে আনন্দ হবে? বা কোন মীরাস বণ্টন করা হবে? কাদের মাঝে বণ্টন করা হবে?]। অবশেষে এরাই কুসতুনতুনিয়া জয় করবে। বিজয় লাভের পর তারা তাদের তরবারিসমূহ যাইতূন গাছের সাথে ঝুলিয়ে রেখে গণীমাত বণ্টন করতে থাকবে। এমন সময় হঠাৎ তাদের মধ্যে শয়তান চিৎকার দিয়ে বলে উঠবে: “শুনো, মাসীহ (দাজ্জাল) তোমাদের পরিবার-পরিজনের মধ্যে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে।” এ সংবাদ শুনামাত্র সবাই [হয়রান পেরেশান হয়ে তাদের হাতে যা কিছু আছে, সব পরিত্যাগ করে] কুসতুনতুনিয়া থেকে বেরিয়ে আসবে। এসে দেখবে, কিছুই হয়নি, একটা গুজব মাত্র। [তাদের আগে আগে দশ জন অশ্বারোহী পাঠিয়ে দেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ঐসব অশ্বারোহীর নাম ও তাদের পিতার নাম, এমনকি তাদের ঘোড়ার রঙ পর্যন্ত আমার জানা আছে। তারা তৎকালীন পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে উত্তম অশ্বারোহী বা সেরা অশ্বারোহীদের অন্যতম হবে]। [অতঃপর তারা সিরিয়ায় পৌঁছলে শয়তান (দাজ্জাল) আত্নপ্রকাশ করবে]।
সমগ্র পৃথিবীর তার জন্য সংকোচন করে দেয়া হবে এবং সে তার উপর বিজয়ী হবে। তবে [চারটি মাসজিদ ব্যতীত : মাসজিদুল হারাম, মাদীনাহ্র মাসজিদ, তূর এবং মাসজিদে আকসা]।
দাজ্জালের সময়কাল হবে চল্লিশ দিন। তবে প্রথম দিন হবে এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিন এক মাসের সমান, তৃতীয় দিন এক সপ্তাহের সমান এবং বাকী দিনগুলো তোমাদের এই দিনগুলোর সমান হবে। সাহাবীগণ বললেন, যে দিনটি এক বছরের সমান হবে তাতে কি বর্তমান এক দিনের সলাত আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে? তিনি বললেন: না, তোমরা অনুমান করে সময় নির্ধারণ করবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, যমীনে তার গতি কেমন হবে? তিনি বললেন: মেঘের গতি যাকে প্রবল বাতাস পিছন থেকে হাঁকিয়ে নিয়ে যায়।
দাজ্জালের আবির্ভাবের তিন বছর পূর্বে দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে। তখন মানুষ চরমভাবে ক্ষুধায় কষ্ট পাবে। প্রথম বছর মহান আল্লাহ আকাশকে তিন ভাগের একভাগ বৃষ্টি আটকে রাখার নির্দেশ দিবেন। আর যমীনকে নির্দেশ দিবেন, ফলে সে তিন ভাগের একভাগ ফসল উৎপন্ন করবে। অতঃপর তিনি আসমানকে দ্বিতীয় বছর একই নিদের্শ দিবেন। তখন তা দুই তৃতীয়াংশ বৃষ্টি বন্ধ রাখবে এবং যমীনকে নির্দেশ দিবেন, ফলে যমীন দুই তৃতীয়াংশ ফসল কম উৎপন্ন করবে। অতঃপর মহান আল্লাহ তৃতীয় বছর একই নির্দেশ দিবেন, তখন সে সম্পূর্ণরূপে বৃষ্টিপাত বন্ধ করে দিবে। ফলে যমীনে কোন ঘাস জন্মাবে না, কোন সবজি অবশিষ্ট থাকবে না। বরং তা ধ্বংস হয়ে যাবে। তবে আল্লাহ যা চাইবেন।
সে মাক্কাহ্ ও মাদীনাহ্য় আসা মাত্রই এর প্রত্যেক প্রবেশ পথে খোলা তরবারি হাতে ফিরিশতাদের দেখতে পাবে।
এমন কোন শহর বাদ থাকবে না যেখানে মাসীহ (দাজ্জালের) আতঙ্ক না ছড়াবে। তবে মাদীনাহ্ ব্যতীত। [সেদিন মাদীনার সাতটি দরজা থাকবে] এর প্রত্যেকটি প্রবেশ পথে দুইজন করে ফিরিশতা নিযুক্ত থাকবেন যারা মাসীহ দাজ্জালের ভয় থেকে একে নিরাপদ রাখবে।”
এমনকি সে তৃণলতা শূণ্য জায়গা [সাইহানাতুল জুরুফ] নামক স্থানে এসে পৌঁছবে। [যা উহুদ পাহাড়ের পিছনে অবস্থিত]। [সে সেখানে তার আসন গাড়বে]।
এরূপ অবস্থায় মাদীনাহ্ তার অধিবাসীদের নিয়ে তিনবার প্রকম্পিত হবে। তখন প্রতিটি মুনাফিক পুরুষ ও নারী মাদীনাহ্ থেকে বেরিয়ে দাজ্জালের কাছে চলে যাবে। অতঃপর মাদীনাহ্ থেকে মন্দ (পাপী লোকেরা) দূরীভূত হবে যেমন হাফর লোহার ময়লা দূর করে থাকে। আর এটাই হলে নাজাত দিবস। [যারা বেরিয়ে দাজ্জালের কাছে যাবে তাদের অধিকাংশ হবে মহিলা]।
দাজ্জাল বের হলে একজন (বিশিষ্ট) ঈমানদার ব্যক্তি তার দিকে রওয়ানা হবে। সংবাদ পেয়ে দাজ্জালের পক্ষ থেকে তার অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা গিয়ে তাঁর সাথে মিলিত হবে। তারা তাকে জিজ্ঞেস করবে, তুমি কোথায় যাওয়ার ইচ্ছা করেছ? তিনি বলবেন, ঐ ব্যক্তির কাছে যে আবির্ভূত হয়েছে। তখন তারা বলবে, তুমি কি প্রভূর প্রতি ঈমান আনবে না? তিনি বলবেন, আমাদের প্রভূর ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। এরপর তারা পরস্পরে বলবে, একে হত্যা কর। তারপর একে অপরকে বলবে, তোমাদের প্রভূ নিষেধ করেছেন যে, তোমরা তাকে না দেখিয়ে কাউকে হত্যা করবে না। অতঃপর তারা তাঁকে দাজ্জালের নিকট নিয়ে যাবে। যখন ঈমানদার ব্যক্তি দাজ্জালকে দেখতে পাবেন তখন বলবেন, হে জনগণ! [আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি] এই তো সেই দাজ্জাল যার কথা রাসূলুল্লাহ (সা.) উল্লেখ করেছেন (অন্য বর্ণনায় রয়েছে: আলোচনা করেছেন)। এরপর দাজ্জালের নির্দেশে তাঁর চেহারা ক্ষতবিক্ষত করা হবে। বলা হবে, একে ধরে চেহারা ক্ষতবিক্ষত করে দাও। অতঃপর তাঁর পেট ও পিঠকে পিটিয়ে বিছিয়ে ফেলা হবে। তারপর দাজ্জাল জিজ্ঞেস করবে, আমার প্রতি ঈমান আনবে না? তিনি বলবেন, তুই তো মিথ্যাবাদী। মাসীহ দাজ্জাল বলবে, তোমাদের কি ধারণা, আমি যদি একে হত্যা করার পর জীবিত করি তাহলে কি তোমরা আমার কাজের ব্যাপারে সন্দিহান হবে? তখন তারা বলবে, না]। তখন তাঁকে কুড়াল দিয়ে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলার জন্য আদেশ করা হবে। তার আদেশে প্রথমে তাকে দুই পা আলগা করে খণ্ড করা হবে [তাকে হত্যা করা হবে]। (নাওয়াস বর্ণিত হাদীসে রয়েছে: তাকে তলোয়ার দিয়ে জোরে আঘাত করবে এবং তাকে দুই টুকরো করে ফেলবে। প্রত্যেকটি টুকরো দুই ধনুকের ব্যবধানে চলে যাবে)। তিনি বলেন, অতঃপর দাজ্জাল খণ্ডিত টুকরাদ্বয়ের মাঝখানে এসে তাকে লক্ষ্য করে বলবে, উঠ! তৎক্ষণাৎ তিনি উঠে দাঁড়াবেন। তিনি বলেন : [অতঃপর তাকে ডাকবে। ডাকা মাত্র সে জীবিত হয়ে তার কাছে আসবে। তখন তার চেহারা হবে উজ্জ্বল, চমকপ্রদ ও হাস্যময়] অতঃপর দাজ্জাল তাকে আবার জিজ্ঞেস করবে, এবার আমার প্রতি ঈমান আনবে কি? তখন তিনি বলবেন, [আল্লাহর শপথ!] আমি তো তোমার সম্পর্কে আরো অধিক অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। অতঃপর তিনি উপস্থিত জনতাকে লক্ষ্য করে বলবেন, হে লোক সকল! মনে রেখ, দাজ্জাল আমার পরে আর কোন মানুষের উপর কর্তৃত্ব চালাতে পারবে না। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর দাজ্জাল তাঁকে জবাই করার জন্য ধরবে এবং গলা ও ঘারে তামা জড়িয়ে দিতে চেষ্টা করবে। কিন্তু এ পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হবে না। অতঃপর তাঁর হাত পা ধরে তাঁকে নিক্ষেপ করবে। মানুষ ধারণা করবে বুঝি আগুনে ফেলে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তাঁকে জান্নাতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীনের নিকট এই ব্যক্তি বড় শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবেন।”
অতঃপর ফিরিশতারা দাজ্জালের মুখকে সিরিয়ার দিকে ঘুরিয়ে দিবেন। [অতঃপর সে ‘ইলিয়া’ পাহাড়ে আসবে। সেখানে এসে সে একদল মুসলিমকে অবরোধ করে রাখবে]। মুসলিমরা তখন কঠিন অবস্থার সম্মুখিন হবে]। [মানুষ দাজ্জাল থেকে পলায়ন করে পাহাড়ে আশ্রয় নিবে। উম্মু শুরাইক বিনতু আবুল আকর বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তখন আরবগণ (মাক্কাহ্ ও মাদীনাবাসী) কোথায় থাকবে? তিনি বললেন: তাদের সংখ্যা খুবই কম হবে]।
তাদের ইমাম হবেন একজন সৎ ব্যক্তি। [রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: মাহদী আমাদের আহলে বাইতের মধ্য থেকে হবেন [ফাত়িমার বংশধর থেকে]। আল্লাহ তাঁকে এক রাতে খিলাফাতের যোগ্য করে দিবেন]। [তার নাম হবে আমার নামের মত এবং তার পিতার নাম হবে আমার পিতার নামের মত] [তার ললাট প্রশস্ত ও নাক উঁচু হবে]। [তিনি পৃথিবীকে ন্যায়-ইনসাফ দ্বারা এরূপ পরিপূর্ণ করবেন, যেরূপ তা যুলুম ও পাপাচারে পরিপূর্ণ ছিল] [তিনি সাত বছর রাজত্ব করবেন]। নাবী (সা.) বলেছেন: (আমার উম্মাতের দু’টি দলকে আল্লাহ জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিবেন: একদল যারা হিন্দুস্থানের জিহাদে অংশ গ্রহণ করবে এবং অপর দলটি হলো যারা ঈসা ইবনু মারইয়ামের সঙ্গী হয়ে দাজ্জালের বিরুদ্ধে লড়বে) এবং তিনি (সা.) বলেন: তোমাদের কেউ এদের দেখা পেলে তাকে আমার পক্ষ থেকে সালাম জানাবে)।
তাদের ইমাম যখন এগিয়ে গিয়ে তাদেরকে নিয়ে ফাজরের সলাত আদায় করতে থাকবেন এমন সময় ঈসা ইবনু মারইয়াম (আকাশ থেকে) ভোর বেলায় অবতরণ করবেন। তিনি দামিস্কের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত সানা মিনারায় অবতরণ করবেন। এ সময় তিনি ওয়াস ও জাফরান রঙের দুটি বস্ত্র পরিহিত অবস্থায় থাকবেন। দু’জন ফিরিশতার পাখায় দু’হাত রেখে অবতরণ করবেন। যখন তিনি মাথা নীচু করবেন হালকা বৃষ্টি হবে আর যখন মাথা উঁচু করবেন, তখন দেহ থেকে মুক্তার বিন্দুর ন্যায় ফোটা গড়িয়ে পড়বে। তাঁর নিশ্বাসের বাতাস পেলে একটি কাফিরও বাঁচতে পারবে না, সব মরে যাবে। এবং তাঁর শ্বাস তাঁর শেষ দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।
[আমার এবং তার (ঈসার) মাঝে কোন নাবী আসবে না। অবশ্য তিনি (আকাশ থেকে) অবতরণ করবেন। তোমরা যখন তাঁকে দেখবে, তখন তাঁকে এভাবে চিনবে যে, ‘তিনি হবেন মধ্যম আকৃতির, তার দেহের রঙ হবে লাল-সাদা মিশ্রিত, তার পরিধানের কাপড় হবে হালকা হলুদ রঙ বিশিষ্ট দু’খানি চাঁদর এবং তার মাথার চুল ভিজে না থাকা সত্ত্বেও সেখান থেকে ফোটায় ফোটায় পানি ঝরতে থাকবে। তিনি ইসলামের জন্য লোকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবেন, ক্রশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শুকর নিধন করবেন এবং জিযিয়া কর রহিত করবেন। মহান আল্লাহ তাঁর সময়ে ইসলাম ছাড়া অন্য সব মতবাদকে ধ্বংস করে দিবেন)। এবং তিনি বলেন: (তখন কেমন হবে যখন ঈসা ইবনু মারইয়াম (আকাশ থেকে) তোমাদের মাঝে অবতরণ করবেন, আর ইমাম হবেন তোমাদের থেকে। (আরেক বর্ণনায় রয়েছে: তোমাদের থেকেই তোমাদের ইমাম হবে)। ইবনু আবূ যি’ব (এক বর্ণনায়) বলেন: “তোমাদের থেকেই তোমাদের ইমাম হবে।”- এর অর্থ সম্পর্কে তুমি জানো কি? আমি বললাম: আমাকে অবহিত করুন। তিনি বলেন: তোমাদের মহান পরাক্রমশালী বরকতময় আল্লাহর কিতাব ও তোমাদের নাবী (সা.)-এর সুন্নাতের অনুসারী হয়েই তিনি তোমাদের ইমাম হবেন]।
ঈসা (আ.)-কে দেখে উক্ত ইমাম পিছনে সরে যাবেন যেন ঈসা ইবনু মারইয়াম (আ.) সামনে গিয়ে লোকদের সলাতে ইমামতি করতে পারেন। [ইমাম বলবেন, আপনি এগিয়ে এসে আমাদের সলাতে ইমামতি করুন] তখন ঈসা (আ.) তাঁর হাত উক্ত ইমামের দুই কাঁধের উপর রেখে বলবেন: [না, আপনারা একে অন্যের আমীর। আল্লাহর পক্ষ থেকে এটা উম্মাতের মর্যাদা] আপনি সামনে যান এবং সলাতের ইমামতি করুন। ফলে তাদের ইমাম তাদের নিয়ে সলাত আদায় করবেন।
অতঃপর দাজ্জাল (ইলিয়া) পাহাড়ে আসবে এবং মুসলিমদের একটি দলকে ঘেরাও করবে। তখন এক ব্যক্তি অবরুদ্ধ মুসলিমদের বলবে, তোমরা এই তাগুতের অপেক্ষায় না থেকে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর সাথে মিলিত হও (শাহাদাত বরণ করো) অথবা আল্লাহ তোমাদেরকে বিজয়ী করেন? অতঃপর তারা তার আদেশ মোতাবেক সকালবেলায় দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।
[যখন মুসলিমরা তার মুকাবিলার উদ্দেশে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিবে এবং সমানভাবে সারিবদ্ধ হবে। এমন সময় সলাতের আযান হবে] [ফাজর সলাতের] [তারা সকাল করবেন এমন অবস্থায় যে, তখন ঈসা (আ.) তাদের সাথেই আছেন]। [অতঃপর তিনি লোকদের ইমামতি করবেন। তিনি যখন রুকু‘ থেকে মাথা উঠাবেন তখন বলবেন: সামিআল্লাহু লিমান হামীদাহ, আল্লাহ মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করেছেন এবং মুসলিমদের বিজয়ী করেছেন]। অতঃপর সলাত শেষে ঈসা ইবনু মারইয়াম বলবেন : দরজা খুলে দাও। তখন দরজা খুলে দেয়া হবে। আর দরজার পিছনে থাকবে দাজ্জাল। তার সঙ্গে থাকবে সত্তর হাজার ইয়াহুদী। তাদের প্রত্যেকের সাথে চাঁদরে আবৃত কারুকার্য খচিত তলোয়ার থাকবে। [ঈসা (আ.) যমীনে অবতরণ করে দাজ্জালকে অনুসন্ধান করবেন]।
[অতঃপর ঈসা (আঃ) তাঁর অস্ত্র নিয়ে দাজ্জালের দিকে রওয়ানা হবেন]। যখন দাজ্জাল তাঁকে দেখবে, তখন সে এরূপ বিগলিত হয়ে যাবে যেমন পানিতে লবণ গলে যায়। [যদি তাকে এমনি ছেড়ে দেয় তবুও সে বিগলিত হয়ে হালকা হয়ে যাবে বরং আল্লাহর নাবী (ঈসা) তাকে নিজ হাতে হত্যা করবেন, এবং তিনি ঈমানদার সাথীদেরকে তাঁর বল্লমে ওর রক্ত দেখিয়ে দিবেন]। তিনি তাকে পূর্ব দিকের বাবে লুদে পাবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। [অতঃপর আল্লাহ তাকে ‘আক়াবায়ে আফীক়ের নিকটে ধ্বংস করবেন]।
আল্লাহ ইয়াহুদীদের পরাজিত করবেন। [এবং মুসলিমদেরকে তাদের উপর কর্তৃত্ব দান করবেন]। [এবং মুসলিমরা তাদেরকে হত্যা করবে]। তখন ইয়াহুদীরা আল্লাহর সৃষ্ট যেকোন বস্তুর আড়ালে লুকিয়ে থাকুক না কেন, সে বস্তুকে আল্লাহ বাকশক্তি দান করবেন, চাই তা পাথর, গাছপালা, দেয়াল অথবা কোন জন্তু হোক না। তবে একটি গাছ হবে ব্যতিক্রম, যার নাম গারকাদাহ। একে ইয়াহুদীদের গাছ বলা হয়। সে কথা বলবে না। তবে সে বলবে: হে আল্লাহর মুসলিম বান্দা! এই তো ইয়াহুদী [আমার পিছনেই আছে] তুমি এসো এবং তাকে হত্যা করো।
এর পরে মানুষ দীর্ঘ সাত বছর যাবৎ এমন শান্তিপূর্ণভাবে জীবন যাপন করবে যে, দুই ব্যক্তির মধ্যে কোন দুশমনি থাকবে না।
ঈসা ইবনু মারইয়াম (আ.) আমার উম্মাতের একজন হবেন। [মুহাম্মাদ (সা.)-কে সত্যায়ন করে এবং তার উম্মাতের একজন হয়ে আসবেন] তিনি হবেন ন্যায়পরায়ণ শাসক ও ইন্সাফকারী হিদায়াতপ্ৰাপ্ত ইমাম। [তিনি ইসলামের জন্য লোকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবেন] ক্রশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শুকর নিধন করবেন, [তাঁর জন্য সলাতকে একত্র করা হবে], তিনি জিযিয়া কর রহিত করবেন এবং সদাক়াহ উসূল বন্দ করবেন! বকরী ও উটের উপর যাকাত ধার্য বন্ধ হবে এবং লোকদের মাঝে পারষ্পরিক হিংসা বিদ্বেষ ও ক্রোধের অবসান ঘটবে। [তখন মাল-সম্পদ গ্রহণ করার মত লোক পাওয়া যাবে না]। [এমনকি তখন একটিমাত্র সাজদাহ্ দুনিয়া ও এর মধ্যকার সমগ্র বস্তু থেকে উত্তম হবে]। [তখন দা‘ওয়াত হবে একমাত্র রাব্বুল ‘আলামীনের জন্য (অর্থাৎ সবাই একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করবে)]। — [ঐ সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! ইবনু মারইয়াম অবশ্যই রাওহার গিরিপথে তালবিয়া পাঠ করবেন এবং সেখান থেকে হাজ্জ বা ‘উমরাহ করবেন অথবা দুটোই একত্রে করবেন]।
অতঃপর এক সম্প্রদায় লোক ঈসা (আ)-এর সমীপে আসবে যাদেরকে মহান আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন। ঈসা (আ) তাদের চেহারায় হাত বুলিয়ে দিবেন এবং জান্নাতে তাদের জন্য নির্ধারিত স্থান সম্পর্কে তাদেরকে জানিয়ে দিবেন। তিনি এ আলোচনারত অবস্থায় থাকতেই মহান আল্লাহ তাঁর কাছে ওয়াহী নাযিল করবেন: “আমি আমার একদল বান্দাকে বের করে দিয়েছি যাদের সাথে যুদ্ধ করার কারোর ক্ষমতা নেই। সুতরাং আপনি আমার ঈমানদার বান্দাদেরকে তূর পাহাড়ের দিকে নিয়ে একত্র করুন।” এদিকে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াজুজ মাজুজকে ছেড়ে দিবেন। তারা ছাড়া পেয়ে পৃথিবীর সব প্রান্তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। তাদের প্রথম দলগুলো বুহাইরায়ে তাবারিয়া (ভূমধ্যসাগর) উপকূলে এসে পৌঁছবে এবং তাতে যত পানি আছে সব খেয়ে নিঃশেষ করবে। এরপর শেষ দল এসে বলবে, (পানি কোথায়?) এখানে তো কোন সময় পানি ছিল। [অতঃপর তারা (ইয়াজুজ মাজুজ) ঘুরতে ঘুরতে ‘জাবালে খামার’ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। সেটা বাইতুল মুক়াদ্দাসে অবস্থিত একটি পাহাড়। সেখানে পৌঁছে তারা বলবে, আমরা তো যমীনের বাসিন্দাদের মেরে ফেলেছি, এবার চলো আসমানের বাসিন্দাকে হত্যা করবো। এই বলে তারা আকাশের দিকে তীর ছুঁড়তে থাকবে। অবশেষে মহান আল্লাহ তাদের তীরকে রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের কাছে ফিরিয়ে দিবেন]। এদিকে আল্লাহর নাবী ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীগণ অবরুদ্ধ অবস্থায় অতিকষ্টে কাল যাপন করবেন। এমনকি একটা গরুর মাথাও তাদের কাছে বর্তমানের একশো স্বর্ণমুদ্রার চেয়ে অধিক শ্রেয় মনে হবে। এরপর আল্লাহর নাবী ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীরা প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাদের (ইয়াজুজ মাজুজের) গর্দানে এক প্রকার বিষাক্ত কীট সৃষ্টি করবেন, যার ফলে তারা এক নিমিষে সব মরে যাবে। তারপর আল্লাহর নাবী ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীগণ যমীনের বুকে নেমে আসবেন। এসে দেখবেন যমীনে এক বিঘত জায়গাও খালি নেই বরং ইয়াজুজ মাজুজের লাশের পঁচাগলা ও তীব্র দুর্গন্ধে যমীন ভরে গেছে। তখন আল্লাহর নাবী ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীরা আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলে আল্লাহ একদল পাখি পাঠিয়ে দিবেন, যাদের গর্দান হবে উটের গর্দানের ন্যায়। তারা এগুলো বহন করে আল্লাহর যেখানে ইচ্ছা সেখানে ফেলে দিয়ে আসবে। অতঃপর মহান আল্লাহ প্রবল বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, যা পৃথিবীর আনাচে কানাচে কোন ঘর দুয়ারে না পৌঁছে থাকবে না। তা সমগ্র যমীনকে বিধৌত করে আয়নার মত পরিষ্কার করে দিবে। অতঃপর যমীনকে আদেশ করা হবে—“তোমার ফলমূল শস্যাদি উৎপন্ন করো এবং বরকত ফিরিয়ে দাও।” ঐ সময় বিরাট জনগোষ্ঠি একটিমাত্র আনার ফল খেয়ে পরিতৃপ্ত হবে এবং একটি আনারের ছালের নীচে ছায়া গ্রহণ করবে। পশুর দুধে যথেষ্ট বরকত হবে। এমনকি একটি দুগ্ধবতী উষ্ট্রী এক বিরাট জনগোষ্ঠির জন্য যথেষ্ট হবে, একটি দুগ্ধবতী গাভী একটি গোত্রের জন্য যথেষ্ট হবে এবং একটি দুগ্ধবতী বকরী একটি ছোট গোত্রের জন্য যথেষ্ট হবে]। তখন বদল গরু হবে এই এই মুল্যের এবং ঘোড়া স্বল্প মূল্যে বিক্রি হবে। [তিনি (সা.) বলেন: (মাসীহ্ এর পরে যারা বেঁচে থাকবে তাদের জন্য সুসংবাদ, মাসীহ্ এর পরে যারা বেঁচে থাকবে তাদের জন্য সুসংবাদ। তখন আকাশকে আদেশ দেয়া হবে বৃষ্টি বর্ষণ করতে এবং যমীনকে আদেশ দেয়া হবে ফসলাদী উৎপন্ন করতে। তখন যদি তুমি সাফা (পাহাড়ের) উপরও তোমার বীজ বপন করো তাতে ফসল উৎপন্ন হবে। তখন পরস্পরের মাঝে কোন কৃপণতা, হিংসা ও ক্রোধ থাকবে না]।
প্রতিটি বিষাক্ত জন্তুর বিষ দূরীভূত হবে। [পৃথিবীতে শান্তি-নিরাপত্তা আসবে, তখন সিংহ উটের সাথে চরবে, চিতাবাঘ গরুর সাথে এবং বাঘ বকরীর সাথে চরে বেড়াবে, শিশুরা সাপ নিয়ে খেলা করবে কিন্তু এসব তাদের কোন ক্ষতি করবে না] এমনকি দুধের শিশু তার হাত সাপের মুখে ঢুকিয়ে দিবে কিন্তু সে তার কোন ক্ষতি করবে না। একজন ক্ষুদ্র মানব শিশু সিংহকে তাড়া করবে। সেও তার কোন ক্ষতি করবে না। নেকড়ে বকরীর পালে এমনভাবে থাকবে যে, যেন সে তার (রক্ষক) কুকুর। পৃথিবী শান্তিপূর্ণ হয়ে যাবে। যেমন পানিতে পাত্র পরিপূর্ণ হয়। তখন সকলের কালেমা এক হবে। আল্লাহ ছাড়া কারোর ইবাদাত করা হবে না। যুদ্ধ-বিগ্রহ তার সরঞ্জাম রেখে দিবে। কুরাইশদের রাজত্বের অবসান হবে। যমীন রূপার তৈরি তশতরীর মত হয়ে যাবে। সে এমন ফসল উৎপন্ন করবে যেমন আদম (আ.) এর যুগে উৎপন্ন হতো।
এরপর ঈসা (আ.) পৃথিবীতে চল্লিশ বছর জীবিত থাকার পর ইন্তিকাল করবেন এবং মুসলিমরা তাঁর জানাযার সলাত আদায় করবেন।
তারা যখন এ অবস্থায় থাকবে তখন আল্লাহ [সিরিয়ার দিক থেকে একটা শীতল বাতাস ছেড়ে দিবেন। এ বাতাস তাদের বগলের নীচে প্রভাব ফেলবে (বুক স্পর্শ করবে) এবং তা প্রতিটি মু‘মিন ও প্রতিটি মুসলিমের রুহ কবয করবে। (আর ইবনু ‘উমারের হাদীসে আছে: শীতল বাতাসের স্পর্শ লেগে যমীনের বুকে এমন একটি লোকও জীবিত থাকবে না যার অন্তরে অণু পরিমাণও ঈমান আছে, বরং সবাই প্রাণ ত্যাগ করবে। এমনকি কেউ কোন পাহাড়ের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকলেও সেখানে বাতাস প্রবেশ করে তার জান কবয করবে) এরপর পৃথিবীতে কেবল মন্দ পাপী লোকেরাই জীবিত থাকবে [যাদের ফিতনা পাখির ন্যায় তড়িৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়বে এবং যাদের স্বভাব পশুর স্বভাব তুল্য হবে। যারা কোন ভাল কাজ চিনবে না এবং মন্দ কাজকে মন্দ বলে জানবে না। অতঃপর শয়তান তাদের কাছে ছবি ধরে এসে বলবে, তোমরা কি আমার কথা শুনবে না? তখন তারা বলবে, আমাদেরকে কি আদেশ করবেন করুন। এরপর সে মানুষকে মূর্তিপূজার আদেশ করবে। এ সময় তাদের কাছে প্রচুর খাদ্য সম্ভার মজুদ থাকবে, তাদের জীবন সুখ সাচ্ছন্দে কাটবে]। [নারী-পুরুষ গাধার মত প্রকাশে সঙ্গমে লিপ্ত হবে। আর তাদেরই উপরই ক়িয়ামাত ক়ায়িম হবে]।
তারপর এক সময় সিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। এর বিকট শব্দ যে শুনবে সে একবার ঘাড় নোয়াবে একবার উপরে উঠাবে। সর্বপ্রথম ঐ শব্দ এমন ব্যক্তি শুনবে, যে তার উটকে পুকুরে গোসল করাতে পানি ঘোলাটে করছে। সিঙ্গার আওয়ায শুনে সে বেহুঁশ হয়ে যাবে। এরপর সব মানুষ বেহুঁশ হয়ে যাবে। এরপর মহান আল্লাহ বৃষ্টি ছেড়ে দিবেন অথবা বলেছেন বারিধারা বর্ষণ করবেন যেন তা কুয়াশা বা ছায়া— এ দুইয়ের মধ্যে বর্ণনাকারী সন্দিহান। এ বৃষ্টির ফলে যমীন থেকে মানুষের দেহসমূহ উত্থিত হতে থাকবে। “অতঃপর দ্বিতীয়বার সিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। এ ফুঁকের পর সকল মানুষ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকবে”— (সূরাহ আয-যুমার : ৬৮)। অতঃপর বলা হবে, হে সমবেত মানবগোষ্ঠী! আস তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সামনে। আর ফিরিশতাদের বলা হবে, “এদেরকে দাঁড় করাও এদের হিসাব নেয়া হবে”— (সূরাহ আস-সাফফাত : ২৪) আবার বলা হবে, জাহান্নামের দলকে বের কর। জিজ্ঞেস করা হবে, কত সংখ্যা থেকে কত? বলা হবে, প্রতি হাজার থেকে নয়শো নিরানব্বই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “এটাই সেই দিন যেদিন তরুণ বালকদের বুড়ো করে দিবে।” (সূরাহ আল-মুয্যাম্মিল : ১৭) “এটাই সেই দিন, যে দিন পায়ের নালাকে অনাবৃত করে ফেলবে।” (সূরাহ আল-কুলাম : ৪২)
জন্মস্থান, পুর্ব্ব-বংশ, পিতৃ-পরিচয়, মাতৃ-পরিচয়, পিতামহমাহাত্ম্য, মাতৃব্যাধি ও গর্ভ-লক্ষণে জ্যোতিষী।
মেদিনীপুর জেলার অন্তর্বর্ত্তী বীরসিংহ গ্রাম বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মস্থান। পূর্ব্বে ইহা হুগলী জেলার অন্তর্ভূক্ত ছিল। ভূতপূর্ব্ব বঙ্গেশ্বর স্যার জর্জ কাম্বেলের সময় ইহা মেদিনীপুরের অন্তর্ভূক্ত হয়। সার জর্জ কাম্বেলের শাসন-কাল,—১৮৭১–১৮৭৪ খৃষ্টাব্দ। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। বীরসিংহ গ্রাম কলিকাতা হইতে ২৬ ক্রোশ দূরবর্তী। কলিকাতা হইতে জলপথে বীরসিংহ গ্রামে যাইতে হইলে গঙ্গা, রূপনারায়ণ নদীপ্রভূতি বহিয়া গিয়া ঘাটালে উপস্থিত হইতে হয়। ঘাটাল হইতে বীরসিংহ গ্রাম আড়াই ক্রোশ।4
বীরসিংহ গ্রাম বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মস্থান বটে; কিন্তু তাঁহার পিতৃপিতামহ বা তৎপূর্ব্ব-পুরুষদিগের জন্মস্থান নহে। তাঁহাদের জন্মস্থান হুগলী জেলার অন্তর্গত বনমালিপুর গ্রাম। এই গ্রাম তারকেশ্বরের পশ্চিমে ও জাহানাবাদ মহকুমার পুর্ব্বে চারি ক্রোশ দূরে অবস্থিত। এখন ইঁহাদের কিঞ্চিৎ পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। ইঁহাদের অবস্থা-তুলনায় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনীর গুরুত্ব সবিশেষরূপে উপলব্ধি হইবে। এতৎসম্বন্ধে বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বয়ং যাহা লিখিয়াছেন, তাহা উদ্ধৃত হইল।
“প্রপিতামহ-দেব ভুবনেশ্বর বিদ্যালঙ্কারের পাঁচ সন্তান। জ্যেষ্ঠ নৃসিংহরাম, মধ্যম গঙ্গাধর, তৃতীয় রামজয়, চতুর্থ পঞ্চানন, পঞ্চম রামচরণ। তৃতীয় রামজয় তর্কভূষণ আমার পিতামহ। বিদ্যালঙ্কার মহাশয়ের দেহত্যাগের পর, জ্যেষ্ঠ ও মধ্যম, সংসারে কর্ত্তৃত্ব করিতে লাগিলেন। সামান্য বিষয় উপলক্ষে, তাঁহাদের সহিত রামজয় তর্কভূষণের কথান্তর উপস্থিত হইয়া, ক্রমে বিলক্ষণ মনান্তর ঘটিয়া উঠিল। * * * তিনি কাহাকেও কিছু না বলিয়া এক কালে, দেশত্যাগী হইলেন।
“বীরসিংহ গ্রামে উমাপতি তর্কসিদ্ধান্ত নামে এক অতি প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ছিলেন। * * * রামজয় তর্কভূষণ এই উমাপতি তর্কসিদ্ধান্তের তৃতীয়া কন্যা দুর্গা দেবীর পাণিগ্রহণ করেন। দুর্গা দেবীর গর্ভে তর্কভূষণ মহাশয়ের দুই পুত্র ও চারি কন্যা জন্মে। জ্যেষ্ঠ ঠাকুরদাস, কনিষ্ঠ কালিদাস; জ্যেষ্ঠ মঙ্গল, মধ্যম কমল, তৃতীয় গোবিন্দমণি, চতুর্থ অন্নপূর্ণা। জ্যেষ্ঠ ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় আমার জনক।
“রামজয় তর্কভূষণ দেশত্যাগী হইলেন; দুর্গা দেবী পুত্রকন্যা লইয়া বনমালিপুরের বাটীতে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। অল্প দিনের মধ্যেই দুর্গা দেবীর লাঞ্ছনাভোগ ও তদীয় পুত্রকন্যাদের উপর কর্ত্তৃপক্ষের অযত্ন ও অনাদর, এত দূর পর্য্যন্ত হইয়া উঠিল যে, দুর্গা দেবীকে পুত্রদ্বয় ও কন্যাচতুষ্টয় লইয়া, পিত্রালয়ে যাইতে হইল। * * * কতিপয় দিবস অতি সমাদরে অতিবাহিত হইল। দুর্গাদেবীর পিতা, তর্কসিদ্ধান্ত মহাশয়, অতিশয় বৃদ্ধ হইয়াছিলেন; এজন্য সংসারের কর্ত্তৃত্ব তদীয় পুত্র রামসুন্দর বিদ্যাভূষণের হস্তে ছিল।
****
“কিছু দিনের মধ্যেই, পুত্রকন্যা লইয়া, পিত্রালয়ে কালযাপন করা দুর্গা দেবীর পক্ষে বিলক্ষণ অসুখের কারণ হইয়া উঠিল। তিনি ত্বরায় বুঝিতে পারিলেন, তাঁহার ভ্রাতা ও ভ্রাতৃভার্য্যা তাঁহার উপর অতিশয় বিরূপ। * * অবশেষে দুর্গ দেবীকে পুত্রকন্যা লইয়া, পিত্রালয় হইতে বহির্গত হইতে হইল। তর্কসিদ্ধান্ত মহাশয় সাতিশয় ক্ষুব্ধ ও দুঃখিত হইলেন এবং স্বীয় বাটীর অনতিদুরে এক কুটীর নির্ম্মিত করিয়া দিলেন। দুর্গা দেবী পুত্রকন্যা লইয়া, সেই কুটীরে অবস্থিত ও অতি কষ্টে দিনপাত করিত্বে লাগিলেন।
ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
“ঐ সময়ে, টেকুয়া ও চরকায় সুতা কাটিয়া, সেই সুতা বেচিয়া অনেক নিঃসংশয় নিরুপায় স্ত্রীলোক আপনাদের দিন গুজরান করিতেন। দুর্গা দেবী সেই বৃত্তি অবলম্বন করিলেন। * * তাদৃশ স্বল্প আয় দ্বারা নিজের, দুই পুত্রের ও চারি কন্যার ভরণপোষণ সম্পন্ন হওয়া সম্ভব নহে। তাঁহার পিতা সময়ে সময়ে, যথাসম্ভব সাহায্য করিতেন; তথাপি তাঁহাদের আহারাদি সর্ব্ববিষয়ে ক্লেশের পরিসীমা ছিল না। এই সময়ে জ্যেষ্ঠ পুত্র ঠাকুরদাসেব বয়ঃক্রম ১৪/১৫ বৎসর। তিনি মাতৃদেবীর অনুমতি লইয়া, উপার্জ্জনের চেষ্টায় কলিকাতা প্রস্থান করিলেন।
“সভারাম বাচস্পতি নামে আমাদের এক সন্নিহিত জ্ঞাতি কলিকতায় বাস করিয়াছিলেন। তাঁহার পুত্র জগন্মোহন ন্যায়ালঙ্কার, সুপ্রসিদ্ধ চতুর্ভূজ ন্যায়রত্নের নিকট অধ্যয়ন করেন। ন্যায়ালঙ্কার মহাশয়, ন্যায়রত্ন মহাশয়ের প্রিয় শিষ্য ছিলেন, তাঁহার অনুগ্রহে ও সহায়তায় তিনি, কলিকাতায় বিলক্ষণ প্রতিষ্ঠাপন্ন হয়েন। ঠাকুরদাস, এই সন্নিহিত জ্ঞাতির আবাসে উপস্থিত হইয়া, আত্মপরিচয় দিলেন এবং কি জন্য আসিয়াছেন, অশ্রুপূর্ণলোচনে তাহা ব্যক্ত করিয়া, আশ্রয় প্রার্থনা করিলেন। ন্যায়ালঙ্কার মহাশয়ের সময় ভাল, তিনি অকাতরে অন্ন-ব্যয় করিতেন, এমন স্থলে, দুর্দ্দশাপন্ন আসন্ন জ্ঞাতিসন্তানকে অন্ন দেওয়া দুরূহ ব্যাপার নহে। তিনি সাতিশয় দয়া ও সবিশেষ সৌজন্য প্রদর্শনপূর্ব্বক, ঠাকুরদাসকে আশ্রয় প্রদান করিলেন।
“ঠাকুরদাস, প্রথমতঃ বনমালিপুরে, তৎপরে বীরসিংহে; সংক্ষিপ্তসার ব্যাকরণ পড়িয়াছিলেন। এক্ষণে তিনি, ন্যায়ালঙ্কার মহাশয়ের চতুষ্পাঠীতে, রীতিমত সংস্কৃত বিদ্যার অনুশীলন করিবেন, প্রথমতঃ এই ব্যবস্থা স্থির হইয়াছিল এবং তিনিও তাদৃশ অধ্যয়ন-বিষয়ে, সবিশেষ অনুরক্ত ছিলেন; কিন্তু, যে উদ্দ্যেশ্যে, তিনি কলিকাতায় আসিয়াছিলেন, সংস্কৃতপাঠে নিযুক্ত হইলে, তাহা সম্পন্ন হয় না। তিনি, সংস্কৃত পড়িবার জন্য, সবিশেষ ব্যাগ্র ছিলেন, যথার্থ বটে, এবং সর্ব্বদাই মনে মনে প্রতিজ্ঞ করিতেন, যত কষ্ট, যত অসুবিধা হউক না কেন, সংস্কৃতপাঠে প্রাণপণে যত্ন করিব; কিন্তু, জননীকে ও ভাই, ভগিনীগুলিকে কি অবস্থায রাখিয়া অসিয়াছেন, যখন তাহা মনে হইত, তখন সে ব্যগ্রতা ও সে প্রতিজ্ঞা, তদীয় অন্তঃকরণ হইতে, একেবারে অপসারিত হইত। যাহা হউক, অনেক বিবেচনার পর, অবশেষে ইহাই অবধারিত হইল, যাহাতে তিনি শীঘ্র উপাৰ্জ্জনক্ষম হন, সেরূপ পড়া-শুনা করাই কর্ত্তব্য।
“এই সময়ে, মোটামুটি ইঙ্গরেজী জানিলে, সওদাগর সাহেবদিগের হৌসে, অনায়াসে কর্ম্ম হইত। এজন্য সংস্কৃত না পড়িয়া, ইঙ্গরেজী পড়াই, তাহার পক্ষে, পরামর্শসিদ্ধ স্থির হইল। কিন্তু, সে সময়ে, ইঙ্গরেজী পড়া সহজ ব্যাপার ছিল না। তখন, এখনকার মত, প্রতি পল্লীতে ইঙ্গরেজী বিদ্যালয় ছিল না। তাদৃশ বিদ্যালয় থাকিলেও, তাঁহার ন্যায় নিরুপায় দীন বালকের তথায় অধ্যয়নের সুবিধা ঘটিত না। ন্যায়ালঙ্কার মহাশয়ের পরিচিত এক ব্যক্তি কার্য্যোপযোগী ইঙ্গরেজী জানিতেন। তাঁহার অনুরোধে; ঐ ব্যক্তি ঠাকুরদাসকে ইঙ্গরেজী পড়াইতে সম্মত হইলেন। তিনি বিষয়কর্ম্ম করিতেন; সুতরাং, দিবাভাগে, তাঁহার পড়াইবার অবকাশ ছিল না। এজন্য, তিনি ঠাকুরদাসকে সন্ধ্যার সময় তাঁহার নিকটে যাইতে বলিয়া দিলেন। তদনুসারে, ঠাকুরদাস, প্রত্যহ সন্ধ্যার, পর তাঁহার নিকটে গিয়া ইঙ্গরেজী পড়িতে আরম্ভ করিলেন।
“ন্যায়ালঙ্কার মহাশয়ের বাটীতে, সন্ধ্যার পরেই, উপরি লোকের আহারের কাণ্ড শেষ হইয়া যাইত। ঠাকুরদাস ইঙ্গরেজী পড়ার অনুরোধে সে সময় উপস্থিত থাকিতে পারিতেন না; যখন আসিতেন, তখন আর আহার পাইবার সম্ভাবনা থাকিত না; সুতরাং তাঁহাকে রাত্রিতে অনাহারে থাকিতে হইত। এইরূপে নক্তস্তন আহারে বঞ্চিত হইয়া তিনি দিন দিন শীর্ণ ও দুর্ব্বল হইতে লাগিলেন। একদিন তাঁহার শিক্ষক জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি এমন শীর্ণ ও দুর্ব্বল হইতেছ কেন? তিনি কি কারণে সেরূপ অবস্থা ঘটিতেছে, অশ্রুপূর্ণনয়নে তাহার পরিচয় দিলেন। ঐ সময়ে সেই স্থানে শিক্ষকের আত্মীয় শূদ্রজাতীয় এক দয়ালু ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া তিনি অতিশয় দুঃখিত হইলেন এবং ঠাকুরদাসকে বলিলেন, যেরূপ শুনিলাম, তাহাতে আর তোমার ওরূপ স্থানে থাকা কোনও মতে চলিতেছে না। যদি তুমি রাঁধিয়া খাইতে পার, তাহা হইলে আমি তোমায় আমার বাসায় রাখিতে পারি। এই সদয় প্রস্তাব শুনিয়া, ঠাকুরদাস, যার-পর-নাই আহ্লাদিত হইলেন এবং পর দিন অবধি তাঁহার বাসায় গিয়া অবস্থিতি করিতে লাগিলেন।
“এই সদাশয় দয়ালু মহাশয়ের দয়া ও সৌজন্য যেরূপ ছিল, আয় সেরূপ ছিল না। তিনি দালালি করিয়া, সামান্যরূপ উপার্জ্জন করিতেন। যাহা হউক, এই ব্যক্তির আশ্রয়ে আসিয়া, ঠাকুরদাসের, নির্বিঘ্নে, দুই বেলা আহার ও ইঙ্গরেজী পড়া চলিতে লাগিল। কিছু দিন পরে, ঠাকুরদাসের দুর্ভাগ্যক্রমে তদীয় আশ্রয়দাতার আয় বিলক্ষণ খর্ব্ব হইয়া গেল; সুতরাং, তাঁহার নিজের ও তাঁহার আশ্রিত ঠাকুরদাসের অতিশয় কষ্ট উপস্থিত হইল। তিনি প্রতিদিন, প্রাতঃকালে বহির্গত হইতেন এবং কিছু হস্তগত হইলে, কোনও দিন দেড় প্রহরের, কোনও দিন দুই প্রহরের, কোনও দিন আড়াই প্রহরের সময়, বাসায় আসিতেন; যাহা আনিতেন, তাহা দ্বারা, কোনও দিন বা কষ্টে, কোনও দিন সচ্ছন্দে, নিজের ও ঠাকুরদাসের আহার সম্পন্ন হইত। কোনও কোনও দিন, তিনি দিবাভাগে বাসায় আসিতেন না। সেই সেই দিন, ঠাকুরদাসকে সমস্ত দিন উপবাসী থাকিতে হইত।
“ঠাকুরদাসের সামান্যরূপ একখানি পিতলের থালা ও একটী ছোট ঘটী ছিল। থালাখানিতে ভাত ও ঘটীটিতে জল খাইতেন। তিনি বিবেচনা করিলেন, এক পয়সার সালপাত কিনিয়া রাখিলে, ১০/১২ দিন ভাত খাওয়া চলিবেক; সুতরাং থালা না থাকিলে, কাজ আটকাইবেক না, অতএব, থালাখানি বেচিয়া ফেলি; বেচিয়া যাহা পাইব, তাহা আপনার হাতে রাখিব। যে দিন, দিনের বেলায় আহারের যোগাড় না হইবেক, এক পয়সার কিছু কিনিয়া খাইব। এই স্থির করিয়া, তিনি সেই থালাখানি, নূতন বাজারে, কাঁসারিদের দোকানে বেচিতে গেলেন। কাঁসারিরা বলিল, আমরা অজানিত লোকের নিকট হইতে পুরাণ বাসন কিনিতে পারিব না, পুরাণ বাসন কিনিয়া কখনও, কখনও বড় ফেসাতে পড়িতে হয়। অতএব আমরা তোমার থালা লইব না। এইরূপে কোনও দোকানদারই সেই থালা কিনিতে সম্মত হইল না। ঠাকুরদাস, বড় আশা করিয়া, থালা বেচিতে গিয়াছিলেন; এক্ষণে, সে আশায় বিসর্জ্জন দিয়া, বিষন্ন মনে বাসায় ফিরিয়া আসিলেন।
“এক দিন, মধ্যাহ্ন সময়ে ক্ষুধায় অস্থির হইয়া, ঠাকুরদাস বাসা হইতে বহির্গত হইলেন এবং অন্যমনস্ক হইয়া, ক্ষুধার যাতনা ভুলিবার অভিপ্রায়ে, পথে পথে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ ভ্রমণ করিয়া, তিনি অভিপ্রায়ের সম্পূর্ণ বিপরীত ফল পাইলেন। ক্ষুধার যাতনা ভুলিয়া যাওয়া দূরে থাকুক, বড়বাজার হইতে ঠনঠনিয়া পর্য্যন্ত গিয়া, এত ক্লান্ত এবং ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় এত অভিভূত হইলেন যে, আর তাঁহার চলিবার ক্ষমতা রহিল না। কিঞ্চিৎ পরেই, তিনি এক দোকানের সম্মুখে উপস্থিত ও দণ্ডায়মান হইলেন; দেখিলেন এক মধ্যবয়স্কা বিধবা নারী ঐ দোকানে বসিয়া মুড়ি মুড়কি বেচিতেছেন। তাঁহাকে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া, ঐ স্ত্রীলোক জিজ্ঞাসা করিলেন, বাপাঠাকুর, দাঁড়াইয়া আছ কেন। ঠাকুরদাস, তৃষ্ণার উল্লেখ করিয়া পানার্থে জল প্রার্থনা করিলেন। তিনি, সাদর ও সস্নেহ বাক্যে, ঠাকুরদাসকে বসিতে বলিলেন এবং ব্রাহ্মণের ছেলেকে শুধু জল দেওয়া অবিধেয়, এই বিবেচনা করিয়া, কিছু মুড়কি ও জল দিলেন। ঠাকুরদাস যেরূপ ব্যগ্র হইয়া, মুড়কিগুলি খাইলেন, তাহা এক দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করিয়া, ঐ স্ত্রীলোক জিজ্ঞাসা করিলেন, বাপাঠাকুর আজ বুঝি তোমার খাওয়া হয় নাই। তিনি বলিলেন, না মা আজ আমি, এখন পর্য্যন্ত, কিছুই খাই নাই। তখন, সেই স্ত্রীলোক ঠাকুরদাসকে বলিলেন, বাপাঠাকুর জল খাইও না, একটু অপেক্ষা কর। এই বলিয়া নিকটবর্ত্তী গোয়ালার দোকান হইতে, সত্বর, দই কিনিয়া আনিলেন এবং আরও মুড়কি দিয়া, ঠাকুরদাসকে পেট ভরিয়া ফলার করাইলেন; পরে তাঁহার মুখে সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া, জিদ করিয়া বলিয়া দিলেন, যে দিন তোমার এরূপ ঘটিবেক, এখানে আসিয়া ফলার করিয়া যাইবে।”5
****
“যে যে দিন, দিবাভাগে আহারেব যোগাড় না হইত; ঠাকুরদাস সেই সেই দিন, ঐ দয়াময়ীর আশ্বাসবাক্য অনুসারে তাঁহার দোকানে গিয়া, পেট ভরিয়া ফলার করিয়া আসিতেন।
“কিছুদিন পরে ঠাকুরদাস, আশ্রয়দাতার সহায়তায় মাসিক দুই টাকা বেতনে, কোনও স্থানে নিযুক্ত হইলেন। এই কর্ম্ম পাইয়া, তাঁহার আর আহ্লাদের সীমা রহিল না। পূর্ব্ববৎ আশ্রয়দাতার আশ্রয়ে থাকিয়া, আহারের ক্লেশ সহ্য করিয়াও, বেতনের দুইটি টাকা, যথানিয়মে জননীর নিকট পাঠাইতে লাগিলেন। তিনি বিলক্ষণ বুদ্ধিমান ও যার-পর-নাই পরিশ্রমী ছিলেন, এবং কখনও কোনও ওজর না করিয়া সকল কর্ম্মই সুন্দররূপে সম্পন্ন করিতেন; এজন্য, ঠাকুরদাস যখন যাঁহার নিকট কর্ম্ম করিতেন, তাঁহারা সকলেই তাঁহার উপর সাতিশয় সন্তুষ্ট হইতেন।
“দুই তিন বৎসরের পরেই, ঠাকুরদাস মাসিক পাঁচ টাকা বেতন পাইতে লাগিলেন। তখন তাঁহার জননীর ও ভাইভগিনীগুলির অপেক্ষাকৃত অনেক অংশে কষ্ট দূর হইল। এই সময়ে, পিতামহদেবও দেশে প্রত্যাগমন করিলেন। তিনি প্রথমতঃ বনমালিপুরে গিয়াছিলেন; তথায় স্ত্রী পুত্র কন্যা দেখিতে না পাইয়া, বীরসিংহ আসিয়া পরিবারবর্গের সহিত মিলিত হইলেন। সাত আট বৎসরের পর, তাঁহার সমাগমলাভে, সকলেই আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইলেন। শ্বশুরালয়ে, বা শ্বশুরালয়ের সন্নিকটে, বাস করা তিনি অবমাননা জ্ঞান করিতেন; এজন্য কিছু দিন পরেই, পরিবার লইয়া, বনমালিপুরে যাইতে উদ্যত হইয়াছিলেন। কিন্তু দুর্গা দেবীর মুখে ভ্রাতাদের আচরণের পরিচয় পাইয়া সে উদ্যম হইতে বিরত হইলেন, এবং নিতান্ত অনিচ্ছাপূর্ব্বক বীরসিংহে অবস্থিতি বিষয়ে সম্মতি প্রদান করিলেন। এইরূপে, বীরসিংহগ্রামে আমাদের বাস হইয়াছিল।
“বীরসিংহে কতিপয় দিবস অতিবাহিত করিয়া, তর্কভূষণ মহাশয়, জ্যেষ্ঠ পুত্র ঠাকুরদাসকে দেখিবার জন্য কলিকাতা প্রস্থান করিলেন। ঠাকুরদাসের আশ্রয়দাতার মুখে, তদীয় কষ্টসহিষ্ণুতা প্রভৃতির প্রভূত পরিচয় পাইয়া, তিনি যথেষ্ট আশীর্ব্বাদ ও সবিশেষ সন্তোষ প্রকাশ করিলেন। বড়বাজারের দয়েহাটায় উত্তর-রাঢ়ীয় কায়স্থ ভাগবতচরণ সিংহ নামে এক সঙ্গতিপন্ন ব্যক্তি ছিলেন। এই ব্যক্তির সহিত তর্কভূষণ মহাশয়ের বিলক্ষণ পরিচয় ছিল। সিংহ মহাশয় অতিশয় দয়াশীল ও সদাশয় মনুষ্য ছিলেন। তর্কভূষণ মহাশয়ের মুখে তদীয় দেশত্যাগ অবধি যাবতীয় বৃত্তান্ত অবগত হইয়া, প্রস্তাব করিলেন, আপনি অতঃপর ঠাকুরদাসকে আমার বাটীতে রাখুন, আমি তাহার আহার প্রভৃতির ভার লইতেছি; সে যখন স্বয়ং পাক করিয়া খাইতে পারে, তখন আর তাহার কোনও অংশে অসুবিধা ঘটিবেক না।
“এই প্রস্তাব শুনিয়া, তর্কভূষণ মহাশয়, সাতিশয় আহ্লাদিত হইলেন; এবং ঠাকুরদাসকে সিংহ মহাশয়ের আশ্রয়ে রাখিয়া, বীরসিংহে প্রতিগমন করিলেন। এই অবধি ঠাকুরদাসের আহারক্লেশের অবসান হইল। যথাসময়ে আবশ্যকমত, দুই বেলা আহার পাইয়া তিনি পুনর্জন্ম জ্ঞান করিলেন। এই শুভ ঘটনার দ্বারা, তাঁহার যে কেবল আহারের ক্লেশ দূর হইল, এরূপ নহে, সিংহ মহাশয়ের সহায়তায় মাসিক আট টাকা বেতনে এক স্থানে নিযুক্ত হইলেন। ঠাকুরদাসের আট টাকা মাহিয়ানা হইয়াছে শুনিয়া তদীয় জননী দুর্গা দেবীর আহ্লাদের সীমা রহিল না।
“এই সময়ে ঠাকুরদাসের বয়ঃক্রম তেইশ চব্বিশ বৎসর হইয়াছিল। অতঃপর তাঁহার বিবাহ দেওয়া আবশ্যক বিবেচনা করিয়া তর্কভূষণ মহাশয় গোঘাট-নিবাসী রামকান্ত তর্কবাগীশের দ্বিতীয় কন্যা ভগবতী দেবীর সহিত, তাঁহার বিবাহ দিলেন।6 এই ভগবতী দেবীর গর্ভে আমি জন্ম গ্রহণ করিয়াছি। ভগবতী দেবী, শৈশবকালে মাতুলালয়ে প্রতিপালিত হইয়াছিলেন।”
রামকান্ত তর্কবাগীশ শব-সাধনায় সিদ্ধ হইতে গিয়া উন্মাদগ্রস্ত হইয়া যান। এই জন্য পাতুলগ্রাম-নিবাসী তদীয় শ্বশুর পঞ্চানন বিদ্যাবাগীশ মহাশয় তাহাকে সস্ত্রীক নিজ ভবনে আনিয়া রাখেন। বহুবিধ চিকিৎসাতে তর্কবাগীশ মহাশয় আরোগ্য লাভ করেন নাই। মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি উন্মাদগ্রস্ত ছিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জননী ভগবতী সেই জন্য মাতুলালয়ে প্রতিপালিত হন। তর্কবাগীশ মহাশয়ের দুই কন্যা। ভগবতী দেবী কনিষ্ঠা। ভগবতী দেবীর জননীর নাম গঙ্গা দেবী। ইনি পঞ্চানন বিদ্যাবাগীশ মহাশয়ের জেষ্ঠ কন্যা। বিদ্যাবাগীশ মহাশয়ের চারি পুত্র ও আর একটি কন্যা ছিল।
বিদ্যাসাগর জননী ভবগতী দেবী
বিদ্যাসাগর মহাশয়ের তেজস্বিতা, স্বাধীনতা-প্রিয়তা, সত্যবাদিতা ও সরলতা চির-প্রসিদ্ধ। তিনি এই সব গুণ পিতা ও পিতামহের নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছেন বলিয়া মনে হয়। পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ অসীম তেজস্বী পুরুষ ছিলেন। তিনি কাহারও মুখাপেক্ষা করিতেন না এবং পর-শ্রীকাতর ব্যক্তিবর্গের ভ্রূভঙ্গীতে ভীত হইতেন না। তিনি এইরূপ স্বাধীন-প্রকৃতি লোক ছিলেন বলিয়া তাঁহার শ্যালক ও তৎপক্ষীয় লোক তাঁহার বিপক্ষ ছিলেন। তাঁহার মতে দেশে মানুষ ছিল না, সবই গরু। তিনি যেমন সৎসাহসী, তেমনই নিরহঙ্কার ও সত্যবাদী ছিলেন। ভট্টাচার্য্য ব্রাহ্মণের একটু শ্লেষাত্মক রসিকতার পরিচয় লউন। এক দিন তিনি গ্রামের পথ দিয়া যাইতেছিলেন; এক জন বলিল,—“ও পথ দিয়া যাইবেন না; বড় বিষ্ঠা।” ব্রাহ্মণ উত্তর করিলেন,—“বিষ্ঠা কৈ? সবই তো গোবর, এ দেশে মানুষ কৈ, সবই তো গরু।” কথিত আছে, তিনি যখন গৃহত্যাগ করিয়া তীর্থ পর্য্যটন করেন, তখন এক দিন রাত্রিকালে স্বপ্ন দেখেন,—“তোমার পরিবার তোমার জন্মস্থান বনমালিপুর পরিত্যাগ করিয়া বীরসিংহ গ্রামে বাস করিতেছে। তাহাদের এখন কষ্টের একশেষ।” ইহার পর তিনি বীরসিংহে প্রত্যাগমন করিয়া পুনরায় পরিবারবর্গের ভার গ্রহণ করেন।
বীরসিংহ গ্রামের ভূস্বামী তাঁহাকে তাঁহার বাস্তুভিটার ভূমিটুকু নিষ্কর ব্রহ্মোত্তর করিয়া দিতে চাহেন এবং তাঁহার আত্মীয়-স্বজন তাঁহাকে তদগ্রহণার্থ অনুরোধ করেন। তেজস্বী রামজয়ের বিশ্বাস ছিল যে, নিষ্কর ভূমিতে বাস করিলে ভূস্বামী তাঁহার পুণ্যাংশ গ্রহণ করিবেন এবং তাঁহার অহঙ্কার বাড়িবে। এই জন্য তিনি নিষ্কর ভূমি লইতে সন্মত হন নাই। বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বরচিত চরিতে পিতামহ সম্বন্ধে এইরূপ লিখিয়াছেন,—
“তিনি কখন, পরের উপাসনা বা আনুগত্য করিতে পারেন নাই। তাঁহার স্থির সিদ্ধান্ত ছিল, অন্যের উপাসনা বা আনুগত্য অপেক্ষা প্রাণ ত্যাগ করা ভাল। তিনি একাহারী, নিরামিষাশী, সদাচারপূত ও নৈমিত্তিক কর্ম্মে সবিশেষ অবহিত ছিলেন।”
রামজয়ের বিপুল হৃদয়-বলের ন্যায় শারীরিক বল ছিল। মনের বল থাকিলে, দেহের বল যেন আপনি আসিয়া পড়ে। দেহ-মনের এমনই নিত্য নিকট সম্বন্ধ। বিদ্যাসাগর মহাশয়ে ইহা আমরা প্রত্যক্ষ করিয়াছি; পিতামহ রামজয়ের কথা শুনিয়াছি। রামজয় সর্ব্বদাই লৌহদণ্ড হস্তে নির্ভীকচিত্তে ভ্রমণ করিতেন। এক সময় তিনি বীরসিংহ হইতে মেদিনীপুরে যাইতেছিলেন, পথের মধ্যে এক ভল্লুক তাঁহাকে আক্রমণ করে। তিনি ভল্লুককে দেখিয়াই এক বৃক্ষের অন্তরালে দণ্ডায়মান হন। ভল্লুকও তাঁহাকে ধরিবার চেষ্টা করে। ভল্লুক যেমন দুইটি হস্ত প্রসারণ করিয়া ধরিতে যাইল, তিনি অমনই তাঁহার দুইটি হাত ধরিয়া বৃক্ষে ঘর্ষণ করিতে লাগিলেন। ভল্লুক তখনই মৃতপ্রায় হইয়া পড়িল। রামজয় তাঁহাকে মৃতপ্রায় দেখিয়া চলিয়া যাইবার উপক্রম করিলেন। ভল্লুক কিন্তু তাঁহার পশ্চাদভাগে নখরাঘাত করে। রামজয় অনন্যোপায় হইয়া হস্তস্থিত লৌহদণ্ড-আঘাতে তাঁহার প্রাণনাশ করেন। তাঁহাকে প্রায় মাসাধিক নখরাঘাতের ক্ষতজনিত ক্লেশ ভোগ করিতে হইয়াছিল। মৃত্যুকাল পর্য্যন্ত নখরাঘাতের চিহ্ন ছিল।
ঠাকুরদাস কার্যক্ষম হইলে রামজয় পুনরায় তীর্থভ্রমণে বহির্গত হন। বিদ্যাসাগরের জন্মগ্রহণ করিবার পূর্ব্বে তিনি আবার ফিরিয়া আসেন।
রামজয় যখন বীরসিংহ গ্রামে প্রত্যাগমন করেন, তখন তাঁহার পুত্রবধু ভগবতী দেবী গর্ব্ভবতী; কিন্তু উন্মাদগ্রস্তা।7 ভগবতী দেবী ঈশ্বরচন্দ্রকে গর্ভে ধারণ করিয়া অবধি উন্মাদগ্রস্তা হন। দশ মাস কাল এই উন্মাদ-অবস্থাই ছিল। বিচিত্র ব্যাপার! দশ মাস কাল নানা চিকিৎসায় কোন ফলোদয় হয় নাই; কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রকে প্রসব করিবার পরেই ভগবতী দেবী রোগমুক্তা হন। তিনি আর কখনও এরূপ রোগে আক্রান্ত হন নাই। চিরকালই তিনি অটুট অবস্থাতেই দীনহীন কাঙ্গলকে অন্ন-বস্ত্র বিতরণ করিতেন; পরন্তু স্বয়ং রন্ধন এবং পরিবেশনাদি করিয়া দিবা-রাত্র অতিথি-অভ্যাগত জনকে ভোজন করাইতেন। বিদ্যাসাগরের জননীর মত দয়া-দক্ষিণ্যবতী রমণী প্রায় দেখা যায় না। এই অন্নপূর্ণা স্বর্ণগর্ভা জননীর পরিচয় পাঠক পরে পাইবেন। এই করুণাময়ীরই করুণা-কণা পাইয়া, অতুল মাতৃভক্তিবলে বিদ্যাসাগর মহাশয় জগতে করুণাময় নাম রাখিয়া গিয়াছেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় বলিতেন, যদি আমার দয়া থাকে ত মা’র নিকট হইতে পাইয়াছি, বুদ্ধি থাকে ত বাবার নিকট হইতে পাইয়াছি। ইংরেজী শিক্ষিত যুবক! যদি জর্জ হার্বটের সেই বাণীর সার্থকতা দেখিতে চাও, একমাত্র জননীই শত শিক্ষকের সমান দেখিতে পাইবে, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জননী-জীবনেও—“One good mother is worth a hundred school-masters.”
আজকাল অনেক জ্যোতিষ-ব্যবসায়ীর প্রতি লোকে নানা কারণে বীতশ্রদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে; কিন্তু পূর্ব্বে এরূপ ছিল না। পুর্ব্বে জ্যোতিষীর গণনার ফল প্রায়ই মিথ্যা হইত না। বিদ্যাসাগর মহাশয় জন্মগ্রহণ করিবার পূর্ব্বে, তদানীন্তন জ্যোতিষী ভবানন্দ ভট্টাচার্য্য মহাশয় গণনা করিয়া বলিয়াছিলেন,—“ভগবতী দেবীর গর্ভে দয়ার অবতার জন্মগ্রহণ করিবেন। ইনি জন্মগ্রহণ করিলে ভগবতী দেবীর রোগ সারিয়া যাইবে।” হইলও তাহাই। ভবানন্দের অব্যর্থ বাণী প্রত্যক্ষীভূত হইল। এইজন্যেই হউক বা অন্য কারণেই হউক, বিদ্যাসাগর মহাশয় জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি চিরকালই ভক্তিমান ছিলেন।