Author: তাহের আলমাহদী

  • পানাপুকুরের রত্ন

    পানাপুকুরের রত্ন

    ভূতোর লজ্জা করছে। খুবই লজ্জা করছে।

    ফোঁস ফোঁস করে দম ফেলে বিশাল চেহারার ট্রেন ঢুকছে পানাপুকুর রেলস্টেশনে। ভূতো দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। দুটো হাত দিয়ে শক্ত করে হাতল ধরা। মুখে লাজুক হাসি।

    পানাপুকুরের মতো অজ পাড়াগাঁয়ের রেলস্টেশনে এত বড় গাড়ি আগে কখনও দাঁড়ায়নি। সারাদিনে দুটো মাত্র লোকাল ট্রেন আসে-যায়। একটা সকালে, একটা সন্ধের পর। কর্ড লাইনে গোলমাল থাকলে সন্ধেরটা কোনও কোনওদিন বাতিল হয়ে যায়। পানাপুকুরের মানুষ তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। বড় বড় মেল, এক্সপ্রেস, সুপারফাস্ট পানাপুকুরকে হরদম তাচ্ছিল্য করে চলে যায়। যাওয়ার সময় বিদ্রূপ করে হুইশলও দেয়। সেই হুইশলের আওয়াজ শোনা যায় অনেক দূর পর্যন্ত। ঠিকই করে। তাচ্ছিল্য করার জিনিসকে তাচ্ছিল্য করবে না তো কী করবে?

    কিন্তু, আজ এই ট্রেন এসেছে। এর কারণ, আজ একটা বিশেষ দিন। এই ট্রেনও একটা বিশেষ ট্রেন। রেল কর্তৃপক্ষ নিজে এই ট্রেনের ব্যবস্থা করেছেন। প্ৰথমে ঠিক হয়েছিল গাড়ির কনভয় হবে। সাতাশটা গাড়ির কনভয় ছাড়বে কলকাতা থেকে। দু-একটা বাড়তেও পারে। পরে সেই সিদ্ধান্ত বদল হল। রাস্তা মোটে ভাল নয়। দুদিনের মধ্যে অতটা রাস্তা সারানো অসম্ভব। তার ওপর পানাপুকুর পর্যন্ত যেতে সময় নেবে অনেকটা। তাই, ট্রেনের ব্যবস্থা। শুধু ব্যবস্থা হয়নি, গোটা ট্রেনটাই সাজানো হয়েছে। গাঁদা ফুলের মালা দুলছে। বড় বড় রঙিন রাংতার বল উড়ছে।

    শুধু ট্রেন নয়, পানাপুকুর স্টেশনও সাজানো হয়েছে। সরস্বতীর পুজোর মতো রঙিন কাগজের চেন, কাগজের পতাকা পতপত করে উড়ছে। আলোর স্টাণ্ডগুলোতে ফুলের রিং। জীৰ্ণ টিকিট কাউন্টারের গায়ে লাল, নীল, হলুদ কাপড়। বড় বড় কাপড়ের ব্যানার স্টেশন ভর্তি। কোনওটায় লেখা— “শ্ৰীমান ভূতোকে স্বাগতম।” কোনওটায় লেখা— “পানাপুকুরে প্রাণের ছেলে ভুতো। জিন্দাবাদ।” কোনওটায় লেখা— “ভূতোকে গ্রামের বড়দের আশীর্বাদ, ছোটদের ভালবাসা।” কোনটায় লেখা— ‘‘ভূতো তোমারে সেলাম।”

    প্ল্যাটফর্মের এক পাশে ব্যাণ্ডপার্টির দল। ঝলমলে পোশাকে বুড়ো লোকগুলো গায়ের সব জোর দিয়ে স্যাক্সোফোন, ক্ল্যারিওনেট আর ড্রাম বাজাচ্ছে।

    ভূতো অবাক হল। ব্যাণ্ডপার্টি এল কোথা থেকে! কলকাতা থেকে নাকি? পানাপুকুরে মাঠ আছে, খেত আছে, পুকুর আছে। ব্যাণ্ডপার্টি নেই!

    ট্রেন পুরোপুরি থামার আগেই স্টেশনে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। ভূতোকে দেখতে পেয়ে শ’য়ে শ’য়ে মানুষ পড়িমড়ি করে গাড়ির পাশে পাশে ছুটছে। বেশ কয়েকজন আছাড় খেয়ে পড়ল। ওই তো মনাদা, সেনকাকু, বলাই… ওই তো বিশ্বম্ভর, হানিফ, কল্যাণ-মাস্টার। আরে জগাই, পটল, পল্টুও ছুটছে যে। ছুটছে আর তার দিকে হাত নাড়ছে। গাড়ি থামার তর সইছে না যেন।

    ভূতো শুনতে পেল স্টেশন জুড়ে গর্জন উঠেছে—

    “ওই তো ভূতো, আমাদের ভূতো।” লজ্জায় আরও খানিকটা লাল হয়ে উঠল। ভূতো। ছিছি। কী কাণ্ড! কোন মানে হয়? তাকে নিতে গোটা গ্রাম যে স্টেশনে ভেঙে পড়েছে!

    মনে পড়ল, যাওয়ার দিনটা ছিল অন্যরকম। সন্ধেবেলার গাড়ি ছিল। সারাদিন ধরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। ঠিক সন্ধেতেই ঝেঁপে নামল। কাঁধে ঝুলিয়ে একাই এসেছিল ভূতো। ফুটোফাটা ছাতা খুলে কোনও লাভ না। ভিজে একসা হতে হল। নির্জন, প্ৰায় অন্ধকার স্টেশনে দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপছিল ভূতো।

    মনাদা ক’দিন আগেও তাকে কত ধমক-ধামক দিল।

    “কাজকর্ম কিছু নেই? দিনরাত শুধু মাঠেঘাটে ছোটাছুটি করলেই হবে?” রেগে গেলে মনাদার ‘ঠ”গুলো সব ‘ট’ হয়ে যায়। বকুনি খেয়ে ভূতো গলা নামিয়ে বলল, “একটু প্র্যাকটিস করছিলাম মনাদা।”

    “প্র্যাকটিস! কীসের প্র্যাকটিস?”

    “দৌড়ের প্র্যাকটিস। কদিন পরে…।” মনাদা হুঙ্কার দিলেন। চোখ পাকিয়ে বললেন, “চোপ। দৌড়ের আবার প্র্যাকটিস কীসের? অ্যা! কী হবে প্র্যাকটিস করে? তুমি কি ঘোড়া রেসের মাঠে কাজ পাবে?”

    ভূতো আমতা আমতা করে বলে, “সে-দৌড় নয় মনাদা, এ দৌড় হল….।”

    “বাজে বোকো না ছোকরা। দৌড়ের আবার এ-দৌড়, সে-দৌড় কী হে? অ্যা! যাও যাও কথা না-বাড়িয়ে বাড়ি গিয়ে চাকরির পরীক্ষার জন্য প্র্যাকটিস কর। আজকাল কত সব পরীক্ষা হয়েছে। রেল, পোস্টাপিস। বয়স বাড়ছে। এরপর পা ধরে সাধাসাধি করলেও আর কেউ সরকারি চাকরি দেবে?”

    সেই মনাদাও ট্রেনের পাশে আজ দৌড়োচ্ছে!

    সেনকাকু হোঁচটও খেলেন। ভূতো হাত বাড়িয়ে কিছু একটা বলতে গেল, স্টেশন ভরা মানুষের উচ্ছাস আর গর্জনে কিছুই শোনা গেল না। সেনকাকু পায়ের চটি ফেলেই ছুটছেন। খুবই লজ্জার বিষয় এটা। গুরুজন মানুষ, তিনি কেন খালি পায়ে ছুটবেন? এটা ঠিক নয়। মানুষটা আবার বেদম রাগীও। তবে, মনাদার মতো ভূতোকে অমন ধমক-ধামক দেননি কখনও। যেটুকু রাগারাগি করার ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের ঢঙেই করেছেন।

    মাস তিনেক আগে সেনকাকার সঙ্গে ভূতোর দেখা হল বাজারে। ঠোঁটের কোণে হেসে বললেন, “এই যে ছেলে, শুনছি তুমি নাকি ছোটাছুটি নিয়ে অতি ব্যস্ত হয়ে পড়েছ? তোমার কাকা সেদিন বলছিল।”

    “খেলাধুলো! ছোটাছুটির আবার খেলাধুলো আছে নাকি! সে তো শুনেছি ক্যাঙারুরা করে। অস্ট্রেলিয়ার ক্যাঙারু। তুমি তো বাছা ক্যাঙারু নয়, পানাপুকুরও অষ্ট্রেলিয়া বলে মনে হচ্ছে না।”

    বাজার ভর্তি লোকের সামনে এই অপমান গায়ে লাগার মতো। ভূতো অবশ্য গায়ে নিল না। বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ।

    সেনকাকা হেসে বললেন, “না না চিন্তা নেই। ছোটাছুটির খেলা চালিয়ে যাও ভূতো। জোরকদমে চালিয়ে যাও। তবে, কাঁধে একটা ভারী ব্যাগ আর হাতে একটা লাঠি নিও।”

    “লাঠি?”

    “অবশ্যই লাঠি। শুনেছি আমাদের দেশে এখনও কোথাও কোথাও ডাকহরকরা সিস্টেম চালু আছে। মনে হচ্ছে সেই কাজ তোমার কপালে ঝুলছে বাছা। রানার চলেছে তাই ঝুম ঝুম, ঘণ্টা বাজছে রাতে…হা হা। নিজের জীবনে তো ইতিমধ্যেই ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছ দেখছি।”

    বেচারি মানুষটার এখন কী বিচ্ছিরি অবস্থা! খালি পায়ে ছুটছেন। কল্যাণমাস্টারই বা কম কীসের? তবে, অল্পবয়সীদের সঙ্গে তিনি ছোটাছুটিতে পাল্লা দিতে পারছেন না। সম্ভবত সেই কারণে ব্যাণ্ডপার্টি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন। দু’হাত মাথার ওপর তুলে, নামিয়ে বাজনদারদের হুকুম দিচ্ছেন। সেই মতো গলার শিরা ফুলিয়ে, হাতের পেশি নাড়িয়ে তারা কেলেঙ্কারি কাণ্ড করছে। ভুতো একটু মজাই পেল। কল্যাণ-মাস্টারের সঙ্গে গান-বাজনার কোনও সম্পর্ক নেই। পানাপুকুরের বয়েজ স্কুলের তিনি অঙ্কের শিক্ষক। যেমন-তেমন শিক্ষক নয়। কড়া ধরনের শিক্ষক। ওঠবোস আর নীলডাউনে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। পাটীগণিতে গোলমাল করার জন্য ছেলেবেলায় ভুতো এই মাস্টারের কাছে কতবার যে কানমলা খেয়েছে তার ঠিক নেই।

    অঙ্ক ভুল হলে কল্যাণ-মাস্টার সাধু-চলিত গুলিয়ে ফেলতেন।

    “গর্দভ ভুতো তোমার জীবনে কিছুই হইবে না। পানাপুকুরের ঘাটে তুমি কচুরি পানার ন্যায় পড়িয়া থাকিবে।”

    আজ যে-মানুষটা ভূতোর কারণে ব্যাণ্ডপার্টির বাজনা নিয়ে চরম মাতামাতি করছেন, সেই মানুষটাই এক বার ক্লাস নাইনে ‘ব্যাঙ কটকটি’ বাজানোর অপরাধে ভূতোকে রোদে এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন পাক্কা কুড়ি মিনিট। ভূতো মুখ লুকিয়ে হাসল।

    কিছু বোঝার আগেই চলন্ত ট্রেনে গাদাখানেক লোক লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে উঠে পড়ল। গলায় মণখানেক ওজনের গাঁদা ফুলের মালা পরিয়ে দিল চটপট। ভূতোর দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। ভিড়ের মধ্যে সবাইকে চিনতেও পারছে না। তবে, বলাইকে দেখতে পেল। ঘোষ পাড়ার গুণ্ডা বলাই। গুণ্ডা বলাই তার মুখে খানিকটা সন্দেশ গুঁজে দিতে দিতে বলল, “ভাই ভুতো আমার হাতেই আজ তোর প্রথম মিষ্টিমুখ হোক। কিছুতেই না শুনব না, মুখ খোল, মুখ খোল ভাই আমার।”

    নিমেষে পুরনো দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল ভূতোর।

    তখন প্রতি বছর শীতের সময় গাঁয়ে মেলা বসত। মেলার মাঠেই খেলাধুলোর আসর। বস্তারেস, দড়িটানাটানি, যেমন-খুশি-সাজো। সেবছর ছিল ম্যারাথন দৌড়ের কম্পিটিশন। গোটা মাঠ ঘিরে দশ পাক দৌড়। দৌড় শেষ করলে একশো এক টাকা প্ৰাইজ। দশ পাক দৌড় ভূতোর কাছে কোনও ব্যাপারই নয়। দশ কেন, ইচ্ছে করলে পঁচিশ পাকও মেরে দিতে পারে সে। নিশ্চিন্ত মনে দৌড় শুরু করল। কিন্তু, তিন পাকের মাথায় বিশাল চেহারার বলাই তাকে ল্যাং মেরে ছিটকে ফেলল বিচ্ছিরিভাবে। মুখ থুবড়ে পড়ল ভূতো। থুতনি ফেটে রক্তারক্তি। দৌড় শেষে ভুতো বলল, “এটা কী হল বলাই?”

    গুণ্ডা বলাই চোখ পাকিয়ে বলল, “যা হল ঠিক হল। এর পর কোনওদিন যদি আমার সঙ্গে কম্পিটিশনে নেমেছিস তা হলে দাঁতগুলোও ভেঙে দেব। তার পর জুতোর মালা পরিয়ে গাঁয়ে ঘোরাবা।”

    সেই বলাই তাকে আজ ফুলের মালা পরাচ্ছে!

    উঁচু গাড়ি বলে প্ল্যাটফর্ম অনেকটা নিচু। সাবধানে নামতে হয়। তবে, ভূতোকে সাবধানে নামতে হল না। অনেকে মিলে তাকে কোলে লুফে নিল। তারপর মাথার ওপর তুলে শুরু হল লাফালাফি।

    ভূতো তো ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। কী বিপদ রে বাবা! পড়ে যাবে যে। বাড়ির কেউ আসেনি? এলেও এই ভিড়ে খুঁজে বের করা অসম্ভব। শুধু মানুষের মাথা আর মাথা।

    ওই তো ছোটকা? ওই তো গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। ভূতো গলা তুলে ডাকল। হইচইতে সেই ডাক মিলিয়ে গেল। ছোটকার টাকাটা আজই শোধ করে দিতে হবে। নিজে করার দরকার নেই। ককিমাকে দিয়ে করাতে হবে। “এই নাও কাকিমা ছোটকার টাকাটা রাখ।”

    “কোন টাকা?”

    “বাঃ, সেবার একটা স্টপ ওয়াচ কেনার জন্য নিয়েছিলাম, মনে নেই?”

    কাকিমা বলবে, “থাক না, এত তাড়া কীসের।”

    “না কাকিমা তুমি আজই দিয়ে দেবে। অনেক কষ্ট করে ছোটকা জোগাড় করেছিল।”

    ওই সামান্য ক’টা টাকা জোগাড় করতে মোটেও কষ্ট করতে হয়নি ছোটকাকে। কিন্তু, ভাইপোকে দেওয়ার সময় অনেক কষ্ট হয়েছিল। কাকিমাকে কথাও শুনিয়েছিল এক গাদা।

    “অনেক হয়েছে ওই ছেলেকে এবার থামাও। এইভাবে টাকা খরচ করার মতো অবস্থা তার নয়। মা-বাবা মরা ছেলে। কাকা-কাকিমার ঘাড়ে বসে খাচ্ছে। এবার নিজের হাল নিজেকে ধরতে বল।” কাকিমা মুখ নামিয়ে বলেছিল, “বলি তো, শোনে না। ছোট থেকেই ছেলেটার খেলাধুলোর শখ।”

    ছোটকা গলা তুলে বলেছিল, “শখ! এটা কোনও শখ হল? তাও ক্রিকেট, ফুটবল হলে বুঝতাম। ও-সবে চাকরি-বাকরির সুযোগও থাকে। দৌড় একটা খেলাধুলো হল! ব্যাঙের মাথা হল। ফ্রগস হেড। কী হবে দৌড়ে? দৌড়তে যদি হয় কেরিয়ারের পেছনে দৌড়তে বল।” কাকিমা বলল, “এতবড় ছেলে যদি নিজের ভালমন্দ না বোঝে…..।”

    “না-বুঝলে বকে বোঝাতে হবে। দেখ, কথাটা কঠিন, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, ভূতো যা শুরু করেছে তাতে কঠিন কথা শোনানোর সময় এসেছে। অনেকদিন হল আমি ওকে টানছি সেই দাদা মারা যাওয়ার পর থেকেই। তার পর বউদিও চলে গেল। খাওয়া, পরা, লেখাপড়া সবই তো করালাম। কিন্তু, আর কতদিন? আর যখন-তখন টাকা-পয়সা চাইতে বারণ কর।”

    মাথা থেকে নামানো হয়েছে ভূতোকে। হাতে পেন, নোটবই, ক্যামেরা বাগিয়ে চারদিক থেকে ছুটে এল সাংবাদিক আর ফোটোগ্রাফাররা। এরা সব কোথা থেকে এল! নিশ্চয় কলকাতা থেকে এই ট্রেনেই এসেছে। পানাপুকুরের মানুষ অনেক কিছু দেখেনি। অভাব, অনটন, গা-ছিমছমে অন্ধকার রাত। কিন্তু, সাংবাদিক বিশেষ দেখেনি। শুধু ভোটের সময় কালেভদ্রে এক-আধজন আসে। বাজারের কাছে চায়ের দোকানে বসে চা খায়, সিগারেট ফোঁকে। ফের গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যায়। তা-ও প্রতি ভোটে আসে না। আজ একেবারে প্ল্যাটফর্ম ছেয়ে গেছে। হাতে টেপ রেকর্ডার, টিভির বুম। সবাইকে ঠেলে, কনুই দিয়ে গুঁতিয়ে তারা ভূতোর জামা-প্যান্ট ধরে ঝুলোঝুলি শুরু করল।

    “স্যার নিজের গ্রামে এসে আপনার কেমন লাগছে?”

    “আপনার এই সাফল্যের পেছন পানাপুকুরের অবদান কতখানি?”

    “ভূতোবাবু, গ্রামের কোন জায়গা আপনার সব থেকে প্রিয়?”

    “ভূতো, তুমি নিজের গ্রামের জন্য কি কিছু করার কথা ভাবছ?”

    “তুমি গায়ের কোন মানুষটাকে সব থেকে বেশি ভালবাস?”

    “পানাপুকুরের জন্য তুমি কি গর্বিত?” “গ্রামের কোন খাবার তোমার প্রিয়?” ভুতো কোনও কথারই উত্তর দিতে পারল না। হানিফ, পল্টু, বিমলরা তাকে টানতে টানতে নিয়ে চলল। স্টেশনের বাইরে ছোট একফালি মঞ্চ। মঞ্চের পেছনে কাপড়ে বড় বড় করে লেখা—

    “পানাপুকুরের রত্ন শ্ৰীমান ভূতোর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।”

    সবাই মিলে ঠেলে ভূতোকে মঞ্চে তুলল। মঞ্চে ওঠবার সময় ভূতো একঝলক দেখতে পেল মেয়েরা লাল পাড় শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে সারি দিয়ে। তারা শাঁখ বাজাচ্ছে। ভূতোর গায়ে ছুড়ছে ফুলের পাপড়ি। গাল দুটো নিজের অজান্তেই লাল হয়ে গেল ভূতোর। লাল হয়ে যাওয়ারই কথা। এই ফুটফুটে মেয়েরা সব পানাপুকুর গার্লস হাইস্কুলের মেয়ে।

    মঞ্চে ভূতোর চেয়ারটা যেন বিয়েবাড়ির বরের চেয়ার। সিংহাসনের মতো। সেখানে বসতে ভূতোর যে কী অস্বস্তি হল তা বলার নয়। বাপ রে, সামনে কত মানুষ! গোটা পানাপুকুরের সব মানুষ কি আজ এখানে? তারা লাফাচ্ছে, হাসছে। হাত তুলে নাড়াচ্ছে আর চিৎকার করছে—”ভূতো, ভূতো, ভূতো।”

    মাইকে গান হচ্ছে। আমাদের যাত্রা হল শুরু এখন, ওগো কৰ্ণধার তোমারে করি নমস্কার…..।

    মাঝপথে গান থামিয়ে রেখে কে যেন জলদগম্ভীর গলায় ঘোষণা করে উঠল,“এবারে আমাদের সামনে বক্তব্য রাখবেন পানাপুকুরের সবার প্রিয়, সবার আপন, আমাদের নেতা শ্ৰীশ্ৰী কালীপদ সামন্ত।”

    ভূতো সামান্য চমকে উঠল। সেই কালীপদ! সবাই বলেছিল, “একবার কালীপদ সামন্তর কাছে যা না। খেলাধুলো করলে তো কতরকম চাকরি-বাকরি পাওয়া যায়। যা না একবার চেষ্টা করে দেখ।”

    ভূতো আড়চোখ তাকাল। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন পানাপুকুরের নেতা। পাটভঙা ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবিতে সৌম্যদর্শন মানুষটাকে বড় সুন্দর দেখাচ্ছে। সুন্দর মানুষকে সুন্দরই তো দেখাবে।

    “আজ আমাদের আনন্দের দিন। আজ আমাদের গর্বের দিন। শ্ৰীমান ভুতো আজ আমাদের পানাপুকুরের নাম গোটা দুনিয়ার সামনে তুলে ধরেছে। তাকে আমার স্নেহ, ভালোবাসা, আশীর্বাদ।”

    এক রবিবারের সকালে কালীপদ সামন্তর কাছে ভূতো গিয়েছিল। না গিয়ে উপায় ছিল না। সংসারের অভাব তখন ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে ছোটকা হাত গুটিয়ে নিচ্ছে। ঘরে দশটা টাকাও থাকে কি না সন্দেহ। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর মতো অবস্থা। এক সকালে ভয়ে ভয়ে গিয়ে হাজির হল সে।

    “কী খেলাধুলো করা হয় বাছার?”

    “দৌড়।’ ঢোঁক গিলে বলল ভূতো।

    নাক-মুখ কুঁচকে কালীপদ সামন্ত বললেন, “কী? কী বললে?”

    দৌড়ই স্যার। রেস।

    কালীপদ সামন্তর তখন সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে শম্ভু মদন, বেচা, বিমলবাবু, সুধীর পালিত। তাদের দিকে তাকিয়ে কালীপদ ভুরু তুলে বললেন, “ছোকরা কী বলে শুনলি? শুনলি তোরা? কানে গেছে? বলে কিনা দৌড় দৌড় খেলি! হা হা।”

    সবাই ঘর ফাটিয়ে হেসে উঠল। লজ্জায়, দুঃখে মাথা নামাল ভূতো।

    “বাছা, শুধু দৌড় দেখিয়ে চাকরি চাইতে এসেছ! তোমার জন্য রেকমেণ্ডশনের চিঠিতে কী লিখব বাপু? এই ছেলেটি খুব জোর দৌড়তে পারে, দয়া করে একে একটি কাজকর্মের ব্যবস্থা করে দিন। তবে, এর জন্য অফিসে কোনও চেয়ার-টেবিলের প্রয়োজন নেই পানাপুকুরের ভূতোবাবু ছুটে ছুটে ফাইল দেখবেন, ছুটে ছুটে চিঠি লিখবেন, ছুটে ছুটে হিসেব কষবেন। ইনি হবেন আপনার অফিসে একজন ছুটন্ত কর্মী। হা হা।”

    দম বন্ধ করে হাসতে লাগলেন নেতা। বাকিরা গড়িয়ে পড়ল। শম্ভু আর বেচা তো চিত হয়ে শুয়ে হাত-পা ছুঁড়ে হাসতে লাগল।

    সেদিন মুখ কালো করে কোনওরকমে পালিয়ে বেঁচেছিল ভূতো।

    মাইকে গদগদ গলায় কালীপদ সামন্ত বলে চলেছেন, “এই ছেলেকে আমি অনেকদিন আগেই চিনেছিলাম। অনেক আগেই বুঝেছিলাম। বুঝেছিলাম ভূতোর মধ্যে ক্ষমতা আছে। দৌড়তে দৌড়তে সে একদিন পৌঁছে যাবে অনেকদূর। সবাইকে ছাড়িয়ে, সবাইকে হারিয়ে লক্ষ্য ছোঁবে। আজ তাই আমি পঁচিশ হাজার টাকার একটা চেক প্রদান করব। অ্যাই ভুতো মুখ নামিয়ে বসে আছিস কেন? মুখ তোল, তোল মুখ। সবাই তোর উজ্জ্বল খুশি মুখ দেখতে চায় রে বেটা।”

    ভুতো মুখ তুলল। জনসমুদ্র থেকে আওয়াজ উঠল আবার।

    “ভূতো, ভূতো, ভূতো…”

    সবাই ভাবছে ভূতো তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তা কিন্তু মোটেও না, ভিড়ের মাঝে ভূতো অন্য একটা মানুষকে খুঁজছে। মৃত মানুষ। এই মানুষটি বছরের পর বছর তাকে কাকভোরে ঘুম থেকে তুলছে। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ভূতোর গলায় বলছে, “নে এবার ওঠ, ওঠ ভূতো।” ভূতো পাশ ফিরে বলত, আঃ, আর একটু ঘুমোই, আর একটু পরে উঠব।”

    “না, আর একটু পরে না। এখনই উঠে পড় রোদ উঠে গেলে আর দৌড় পারবি না সোনা।”

    “প্লিজ, আর দশ মিনিট ঘুমোই।”

    “না, এক মিনিটও নয়। তোকে কত প্র্যাকটিস করতে হবে না? তুই নিজে তো বলেছিলি। বলিসনি? লক্ষ্মী বাছা আমার। গরিবের ঘরে দৌড় চাট্টিখানি জিনিস?”

    আজ ভুতো তার সেই মৃত মাকে খুঁজছে।

  • বক্সার মুক্তো

    বক্সার মুক্তো

    জিতেও মুক্তো অনেক রাত পর্যন্ত কাঁদল।

    ঠিক কান্না নয়, ফোঁপানির মতো। আমি চাপা গলায় বললাম, অ্যাই মুক্তো, মুক্তো চুপ কর। চুপ কর বলছি! তোর মা কিন্তু শুনতে পেলে ঘুম থেকে উঠে এসে আবার মারবে।”

    মুক্তো একটুখানি চুপ করে রইল। কিন্তু বেশিক্ষণ পারল না। ফোঁপাতে লাগল। একঘেয়ে, একটানা সেই ফোঁপানি শুনতে শুনতে একটা সময় আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন ঘুম ভাঙল, চোখ খুলে দেখি সকাল! মাথার পাশ থেকে সাঁই সাঁই করে গাড়ি ছুটছে। রোজ যেমন ছোটে। মুখ ঘুরিয়ে দেখি ভূজিয়া, পাতলুনরা কেউ নেই। ফুটপাথ ফাঁকা। শুধুও পাশে গুঁড়িসুড়ি মেরে শুয়ে আছে মুক্তো। পার্কের রেলিঙের দিকে মাথা করে। মেয়েটা নিশ্চয় অনেক রাত পর্যন্ত কেঁদেছে। গায়ের কাঁথাটা টেনে দিতে গিয়ে দেখি, তখনও ফোঁপাচ্ছে। মেয়েগুলোর এই এক দোষ। এরা কান্না থামালেও ফোঁপানি থামাতে পারে না। আমি ফিরে এসে বিছানা গোটাতে লাগলাম। ফুটপাথের বিছানার মজা হল, পাততে গোটাতে একদম সময় লাগে না।

    মুক্তোর কান্নাকাটির কারণ কালকের ঘটনা।

    কাল রাতে পার্কে আমি, ভুজিয়া, পাতলুন আর মুক্তো মারপিট মারপিট খেলছিলাম। এটা আমাদের প্রিয় খেলা। সুবিধের কথা হল, এই খেলাতে বল-ব্যাট লাগে না। খরচ নেই। দিনে-রাতে যে কোনও সময় খেলা যায়। এই কারণেই আমাদের প্রিয়।

    কালকের মারপিট খেলাটা ছিল একটু অন্যরকম। খেলা হয়েছে তিন কায়দায়। শুয়ে, বসে এবং ছুটে ছুটে। আমি ছুটে খেলায় খুব ওস্তাদ। তবে সব ধরনের মারপিটে আসল ওস্তাদ হল আমাদের মুক্তো। ও জিতবেই। কালও জিতেছে। মুক্তোর বয়স মোটে সাত। রোগা, পিংলে, হাড় জিরজিরে চেহারা। মাথায় গাদাখানেক জট পাকানো চুলের জন্য আরও রোগা দেখায় মেয়েটাকে। কিন্তু তা হলে কী হবে, লড়তে পারে সাঙ্ঘাতিক! ওই চেহারাতেই অনেক জোর। কোথা থেকে যে পায়? দু’হাতে মুঠি পাকিয়ে যখন ঘুষি চালায়, তখন আমরা ছুটে পালাই। পালানো ছাড়া উপায় থাকে না কোনও। ঘুষি ছাড়া মারপিটের আরও অনেক কায়দা জানে মুক্তো। চুল খামচানো, চিমটি, কাতুকুতু। সেগুলো ও অবশ্য মারপিট খেলায় কাজে লাগাতে চায় না। জাপটে বা চেপে ধরলে তবেই খামচি মারে। মুক্তোর সবথেকে পছন্দ ঘুষি। রোগা হাত ছুড়বে সাঁই সাঁই করে। ওপরে, নিচে, দু’পাশে। মাথা নামিয়ে জাপটে ধরতে গেলে খামচি দেবে কাঁধে। মুখে বলবে, ‘ধুয়ো, হেরো। ঘুষিতে পারে না, তাই ধরতে আসে। সাহস থাকলে আয় না দেখি।” বলে ঘুষি দেখায়। কী আর করা? লজ্জায় আমরাও ঘুষি বাগাই। পুঁচকে মেয়েটা এ পাশে ও পাশে, ধাই ধুই করে ছুট লাগায়। খেলায় জিতে যায়। আমরা, ছেলেরা হেরে ভূত হয়ে যাই।

    সেদিন পাতলুন বলল, “দেখবি মুক্তো বড় হয়ে ঘুষিওয়ালি হবে।’

    ভুজিয়া বলল, ‘ঘুষিওয়ালি। সেটা আবার কী?”

    আমি বললাম, “তুই একটা গাধা। এগারো বছর বয়স হয়ে গেল এটা বুঝিস না? টিসুম টিসুম।”

    আমি ডান হাতটা মুঠো করে ভুজিয়ার নাকের কাছে নিয়ে ঘুষি মারবার ভান করলাম।

    ভুজিয়া রেগে বলল, “বেশি পণ্ডিত। তুই কোথা থেকে জানলি?”

    আমি বললাম, “সে আছে।”

    পাতলুন, বলল, “কে, তোর নন্দদা?” আমি মুখ ভেংচে বললাম, জানি না। তোর কী . তবে যতই মুখ ভেংচাই না কেন, কথাটা ঠিক বলেছে পাতলুন। জানাজানির কিছু হলে নন্দদাই আমার ভরসা। নন্দদার কলেজ টাইমে আমি মাঝেমধ্যে গলির মুখে দাঁড়াই। নন্দদা এলে সঙ্গে সঙ্গে যাই। একেবারে সেই বাস স্ট্যাণ্ড পর্যন্ত।

    প্রথম দিন মজার ঘটনা হয়েছিল। গলির মোড় থেকে আমি তো নন্দদার পিছন পিছন যাচ্ছি। ভয়ে বুক ধুকপুক করছে। ভয় অন্য কোনও কারণে নয়, ময়লা ছেঁড়া জামা পরে আছি বলে ভয়। এরকম পোশাকের কেউ কাছাকাছি থাকলে সবাই ধমক লাগায়। দেখছিলাম এই মানুষটাও দেয় কিনা। এটাও আমার একটা খেলা। বকুনি খাওয়া বকুনি খাওয়া খেলা। একা একা খেলি। ‘পরিষ্কার জামা, চকচকে জুতো’ পরা কাউকে দেখলে পিছন পিছন যাই। ‘পরিষ্কার জামা, চকচকে জুতো’ বকুনি দিলে হাসতে হাসতে ছুটে পালাই। সেদিনও এরকম একজনের পিছু পিছু যাচ্ছিলাম। সেই মানুষটাই নন্দদা। নন্দদা হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে মুচকি হেসে বলল, “কী রে ছেলে, পয়সা চাই?” আমি মাথা নাড়লাম। নন্দদা তখন বলল, টিফিন খাবি?” আমি তখন জোরে জোরে মাথা নাড়লাম। নন্দদা এবার চোখ পাকিয়ে বলল, “তা হলে? অন্য মতলব নেই তো?” আমি মিনমিন করে বললাম, না, এমনি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি।”

    ব্যস, সেই থেকে ভাব। ইচ্ছে হলেই সঙ্গে সঙ্গে যাই। এটা-সেটা কথা বলি। নন্দদা মোটে রাগ করে না। যা জানতে চাই বলে দেয়। হয় তখনই নয়ত পরে জেনে নিয়ে বলে। নন্দদা আমাকে ওদের বাড়িতে যেতেও বলে। আমার সাহস হয় না। ফুটপাথের ছেলেরা কারও বাড়ি যায় না।

    ভুজিয়া বলল, “দূর, মেয়েরা কখনও ঘুষি মারতে পারে?”

    আমি বললাম, ‘কেন? আমাদের সঙ্গে মারপিটের সময় তো পারে। ওইটুকু মেয়ে তোকে কম ধোলাই দিয়েছে? বল তুই। সত্যি কথা বল।’

    ভুজিয়া বলল, “আচ্ছা, তাই না হয় হল। এবার তুই একটা মেয়ে ঘুষিওলার নাম বল তো দেখি।”

    আমি চুপ করে গেলাম। সত্যি তো। আমি তো কোনও মেয়ে ঘুষিওলার নাম জানি না। মেয়ে ঘুষিওলা আবার হয় নাকি? আমি কথা ঘুরিয়ে বললাম, ‘অ্যাই ভুজিয়া, ঘুড়ি ওড়াবি?”

    “ঘুড়ি কোথায় পাব। ধরেছিস?”

    ‘না, ধরব। ধরে ওড়াব। চল ফড়েপুকুরে ঘুড়ি ধরতে যাই।’

    পাতলুন বলল, “তোরা যা, আমি যাব না।’

    আমি হেসে বললাম, ‘কেন, যাবি না কেন? তোর কি স্কুলে পরীক্ষা?’

    কথাটা বলেই আমরা তিনজনে খুব জোরে হেসে উঠলাম। হাসবই তো। আমাদের তো স্কুলই নেই। স্কুল থাকলে তো পরীক্ষা। হি হি।

    যাই হোক, এবার মুক্তোর কান্নার ব্যাপারটা বলি।

    আমাদের সঙ্গে মারপিট খেলায় যতই জিতুক না কেন মুক্তো, ওর প্রাইজ একটাই। মায়ের কিল। একটা-দুটো কিল নয়, অনেকগুলো কিল। কিলের সঙ্গে মাথার চুল ধরে ঝাঁকানি। মুক্তোর মা খুব ভাল চুল ঝাঁকানি দিতে পারে। আমার মনে হয় ফুটপাথে সবার মধ্যে এক নম্বর। খেলায় ঘুষি মেরে ধরা পড়লেই মুক্তোর চুল ধরে বলে, ‘বল, বল আর করবি? আর করবি বল?’

    মুক্তো কাতরে ওঠে। বলে ‘করব না মা, আর কোনওদিন করব না।’

    “ছিছি। ছেলেদের মতো ঘুষোঘুষি! এ আবার কী? আঁ্যা, এতদিন বারণ করেছি, কথা কানে যায় না? আজ তোর পিঠ ভাঙব। দেখবি ঘুষি কাকে বলে।’

    মুক্তো আরও জোরে কাতরায়। কিলের দাপটে পিঠ বেঁকে যায় তার। কঁকিয়ে ওঠে।

    “আর ঘুষি মারব না মা। ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও তোমার পায়ে পড়ি।”

    মুক্তোর মা ছাড়ে না। বলে, “বলেছি না, মেয়ে হয়েছিস, মেয়েদের মতো থাকবি, মেয়েদের সঙ্গে খেলবি। বলিনি? বল বলেছি কিনা?”

    মুক্তো কাঁদতে কাঁদতে বলে, “বলেছ মা, অনেকবার বলেছ। হাজারবার বলেছ।”

    “তা হলে? এ কেমন জিনিস? অ্যা! ঘুষি পাকিয়ে তেড়ে যাওয়া! ছি ছি।

    ‘আর খেলব না মা। আর কখনও খেলব না।’

    খেলব না বলার পরও মুক্তোর মা মুক্তোকে ছাড়ে না। আরও কয়েক ঘা মারে। কাল রাতেও মেরেছে। এটা প্রায়ই হয়।

    মুক্তোর ঘুষির লড়াই ওর মায়ের চোখে পড়লেই হল। মুক্তোটাও তেমনি। খেলার সময় হাত দুটো মুঠো পাকিয়ে এমন করবে যে ওর মার দূর থেকে ঠিক নজরে পড়ে। আবার ঘুষি! চুলের ঝুঁটি ধরে টেনে নিয়ে যায় ফুটপাথ বাড়িতে।

    আমরা মুক্তোকে অনেক বারণ করি। আমি বলেছি, “তুই আমাদের সঙ্গে আর আসিস না মুক্তো।”

    ভুজিয়া শান্ত গলায় বলে, “তোর তো অনেক খেলা আছে। যা না, ও তো রাস্তার ওপাশে চুমকি,ঝুমা, টুসিরা দাগ কেটে খেলছে। একাদোক্কা না কী যেন। ওখানে ভাগ।”

    মুক্তো জিভ দেখিয়ে বলে, তুই যা। ছ্যা, ওটা আবার খেলা নাকি।”

    আমি শান্ত করার জন্য বললাম, তা হলে পার্কে ঢুকে দোলনা চড় গে। স্কিপিং করতে পারিস? করবি? আমারটা দেব?”

    মুক্তো আরও তেজ দেখায়। বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলে, ‘বয়ে গেছে তোরটা নিতে। আমার নিজের দড়ি আছে। আমার ওসব খেলা ভাল লাগে না।’

    ভুজিয়া রেগে গিয়ে বলে, “তা হলে কী ভাল লাগে? কোন খেলা?” মুক্তো ছোট ছোট দাঁত বের করে হাসে। মাথা ঝাঁকিয়ে দু’হাত মুঠো পাকিয়ে বলে, ‘ঘুষি। এমন মারব তোর মাথা বোঁ করে ঘুরবে। হি হি।” কথা বলে সে নিজেই এক চক্কর মারে আনন্দে। লড়াইয়ের আনন্দে চোখ-মুখ যেন জ্বলজ্বল করে ওঠে তার! মাথা ঝাঁকানোর সময় কানের দুল দুটো দুলে ওঠে। কদিন হল মুক্তোর মা মেয়ের কান বিঁধিয়েছে। কোথা থেকে দুটো চকচকে রিং এনে পরিয়ে দিয়েছে কানে। বেশ লাগে। কালো মুখে একটুখানি চকচকানি।

    মুশকিল হল আমরা এত বারণ করার পরও মুক্তো আমাদের ছেড়ে যায় না। মায়ের হাতে মার খেয়েও শিক্ষা হয় না। তার। আবার এই কাজ করে। ঘুষি তাকে টানে। সেই টানে মারপিট খেলায় মেতে ওঠে ফের। ওইটুকু চেহারায় নেচে কুঁদে হাত ছোঁড়ে এমনভাবে যেন সত্যি সত্যি বিরাট ঘুষিওয়ালি এসেছে একটা। আমাদের ফুটপাথের লড়াইবাজ! খুঁটে খাওয়া আধাপেটায় কোথা থেকে যে এত শক্তি পায়!

    নন্দদাকে ঘুষিওয়ালির কথা বলতে বলল, “ঘুষিওয়ালি! সেটা আবার কী? মেয়ে বক্সারের কথা বলছিস?”

    আমি মাথা নাড়লাম।

    নন্দদা হেসে বলল, ‘ওমা, কেন থাকবে না? অনেক আছে। কালই তোকে ইন্টারনেট ঘেঁটে বলে দেব।”

    আমি অবাক হয়ে বললাম, কী নেট!” নন্দদা হেসে বলল, “কম্পিউটার। ওই যে দোকানে দেখিস না? আচ্ছা, বাড়িতে আসিস, কম্পিউটার দেখাব। ও, তুই তো আবার বাড়িতে আসতে ভয় পাস। ঠিক আছে আমি গিয়ে একদিন নিয়ে আসব।”

    আমি বললাম, নন্দদা, মেয়েরা ঘুষোঘুষি করে কেন? মেয়েদের কি মারপিট মানায়? ওরা পুতুল খেলবে। তাই না?”

    নন্দদা আমার কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, “দূর বোকা, বক্সিং মানে কি মারপিট? বক্সিং একটা স্পোর্টস। খেলা। লড়াইয়ের খেলা। খেলায় আবার ছেলেমেয়ে কী? আজকাল মেয়েদের ক্রিকেট, ফুটবল সবই তো হচ্ছে। মহাকাশেও মেয়েরা যাচ্ছে। সেটাও খেলা। অ্যাডভেঞ্চারের মজায় বিজ্ঞান নিয়ে সিরিয়াস খেলা।”

    পুরোটা বুঝতে না পারলেও, নন্দদার কথা আমার খুব ভাল লাগল।

    উস, মুক্তোর মা শুনলে আরও ভাল হত। বুঝতে পারত, তার মেয়ে শুধু মারপিট করে না। এটা একটা খেলা। ভেবেছিলাম মেয়ে ঘুষিওয়ালাদের নাম জানলে পাতলুন আর ভুজিয়াকে বলব। এখন মনে হচ্ছে মুক্তোর মাকেও বলা দরকার। আমাকে ধমক দেবে না তো? মনে হচ্ছে দেবে। যা রাগী। আচ্ছা, আমায় যদি জিগ্যেস করে তোর কী রে? তুই কি চাস মুক্তো মারকুটে হোক? সত্যি তো। কী বলব তখন? আমি কী চাই? আচ্ছা একটা কাজ করলে কেমন হয়? নন্দদা বাসে উঠে যেতেই আমি পাতলুন আর ভুজিয়ার খোঁজে ছুটলাম। এই সময়টা ওরা গুলি খেলে। পরদিন নন্দদার সঙ্গে যখন দেখা করলাম তখন আমার সঙ্গে পাতলুন, ভূজিয়া দুজনেই আছে। মুক্তোও আসতে চেয়েছিল।

    আমি বললাম, ‘একটা চড় খাবি। এটা ছেলেদের ব্যাপার।’

    নন্দদা আমাদের দেখে হেসে বলল, ‘ওরে বাবা একেবারে ব্যাটেলিয়ান নিয়ে এসে গেছিস! ব্যাপারটা কী বলত?”

    আমি বললাম, “তুমি নামগুলো এনেছ? ওই যে মেয়েদের? যারা ঘুষি মারে।”

    পকেট থেকে কাগজ বের করে বলল, “বেশি বলব না। মাত্র পাঁচটা বলছি। আছে আরও অনেক। তবে অতি খটমটে নাম শুনে ঘাবড়ে যাবি।”

    আমি বললাম, ‘তাই বল।’

    ক্রিস্টি মার্টিন, ডেলিয়া গঞ্জলেস, মিয়া সেন্ট জন, লায়লা আলি আর ডেইড্রে গগার্টি। এই হল দুনিয়া কাঁপানো পাঁচ মেয়ে বক্সার। তোদের কথায় ঘুষিওয়ালি।”

    ভুজিয়া বলল, ‘ওরে বাবা!’

    নন্দদা হেসে বলল, “আগেই বলেছিলাম না? খটমটে লাগবে। মেয়ে হলে কী হবে এরা কিন্তু সব পৃথিবীর নাম করা বক্সার। লায়লা আলি তো মহম্মদ আলির মেয়ে।”

    পাতলুন বলল, “মহম্মদ আলি কে?” তিনিও একজন বিরাট বক্সার। তাঁর মেয়ে ঘুষির লড়াইতে যে কতজনকে চিৎপটাং করেছে ভাবতে পারবি না। আর কয়েকজন মেয়ে বক্সারের নাম শুনবি নাকি?”

    পাতলুন তাড়াতাড়ি বলল, “না, না, দরকার নেই, এতেই হবে।”

    নন্দদা বলল, “তাও শুনে রাখ। সুমিয়া আনানি, ক্যারেন বিল,

    বেকি গার্সিয়া। আর চাই?”

    আমাদের দারুণ লাগছে। এত মেয়ে লড়াই করে! বাপরে। আমি বললাম, ‘এতেই হবে। নন্দদা, ঘুষি খেলায় টাকা-পয়সা হয়?’

    ‘টাকা-পয়সা মানে! বলিস কী? একেবারে কাঁড়ি কাঁড়ি পুরস্কার।’

    আমি বললাম, “তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে নন্দদা।”

    “চটপট বলে ফেল। আমার কিন্তু কলেজে দেরি হয়ে যাবে। অনেক বকিয়েছিস তোরা।”

    ভুজিয়া বলল, “আমাদের মুক্তো দারুণ ঘুষি মারে। ওর যদি একটা কিছু করা যায়…।”

    নন্দদা ভুরু কুঁচকে বলল, ‘মুক্তো! মুক্তোটা আবার কে? ঘুষি মারে মনে?’

    আমি তাড়াতাড়ি বললাম, মুক্তো আমাদের ফুটপাথে থাকে। ছোট মেয়ে। কিন্তু ছোট হলে কী হবে মেয়েটা ঘুষিতে খুব ওস্তাদ। আমাদের সঙ্গে মারপিট খেলায় দুম দুম করে এমন হাত চালায় যে পালিয়ে বাঁচি না। তুমি যদি দেখতে নন্দদা…।”

    “তাই নাকি!”

    “আমাদের খুব ইচ্ছে বেচারি ঘুষি শিখুক। কিন্তু ভাবতাম মেয়েরা আবার এসব পারবে নাকি। তোমার মুখে এতজনের নাম শুনে নিশ্চিন্ত হলাম। এতগুলো মেয়ে যখন পেরেছে মুক্তোও পারবে না কেন? দাও না নন্দদা, কোথাও একটা ব্যবস্থা করে দাও। শুনেছি অনেক জায়গায় নাকি বালির বস্তা ঝুলিয়ে ঘুষি মারা শেখায়। মুক্তোও মারতে শিখুক।” নন্দদা একটুখানি সময় কী যেন ভাবল। তারপর বলল, “ওরে বাবা, তোরা দেখছি তোদের ওই মুক্তোকে বক্সার না বানিয়ে ছাড়বি না। দেখ, আমার এক কাকা এরকম একটা ক্লাবের সঙ্গে আছে। সেক্রেটারি না প্রেসিডেন্ট। ক্লাবটাও তোদের ওখান থেকে বেশি দূরে নয়। সেখানে বক্সিং, কুস্তি, মুগুর ভাঁজা সবই শেখানো হয়। কিন্তু মেয়েদের হয় কিনা তা বলতে পারব না। তাছাড়া অত ছোট মেয়ে….তবে আমি একবার বলে দেখব। কিন্তু ওর বাবা-মা কি রাজি হবে?”

    পাতলুন বলল, “ওটা নিয়ে ভাববেন না দাদা। মুক্তোর বাবা নেই। মাকে আমরা সবাই মিলে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করাব ঠিক।”

    ভুজিয়া গলায় জোর এনে বলল, করাবই।”

    নন্দদা হেসে বলল, ‘ঠিক আছে, আমি খোঁজ নিচ্ছি। কাকার ওখানে যদি ব্যবস্থা থাকে তা হলে পয়সাকড়ি ম্যানেজ করার দায়িত্ব আমার। যা পালা এখন।’

    আমরা পালাবার আগে নন্দদা আর একটা কাজ করল। ব্যাগ থেকে একটা ঝলমলে রঙিন ছবি বের করে আমার হাতে দিল। একটা মেয়ের ফটো। বলল, ইস, দিতেই ভুলে যাচ্ছিলাম। এর নাম ক্যাথি ডেভিস। ইনি একজন দারুণ বক্সার। ওনার এই ফটো বেরিয়েছিল রিং পত্রিকায়। রিং পত্রিকা কী জানিস? ওখানে শুধুমাত্ৰ বক্সিং নিয়েই লেখা থাকে। কালই তোর জন্য ইন্টারনেট থেকে ছবিটা নামিয়েছি। যা, ভালই হল, ছবিটা তোদের মুক্তোকে দিয়ে দিস। খুশি হবে।”

    কথা শেষ করে নন্দদা টক করে সামনের বাসটায় উঠে পড়ল। আমরা কিছুই বুঝতে না পেরে থ’ হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলাম খানিকক্ষণ। হাতে ছবি। ছবিতে হাসিমুখের একটা মেয়ে। হাতে লাল রঙের ইয়া বড় দুটো গ্লাভস। গ্লাভস কাকে বলে আমরা তিনজনই জানি। আমাদের ফুটপাথের পিছনে একটা গ্লাভস তৈরির কারখানা আছে। বড় কিছু নয়, ছোট কারখানা।

    পাতলুন বলল, “মুক্তোর মাকে এই ছবিটা দেখালেই কাজ হয়ে যাবে। বলব, এই দেখ, মেয়েরাও ঘুষি মারে।”

    ভুজিয়া বলল, “এখন কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। আগে নন্দদা ব্যবস্থা করুক।’

    আমি বললাম, ঠিক কথা। মুক্তোও যেন কিছু জানতে না পারে।”

    খাটের স্বপ্ন কেমন আমার জানা নেই, কিন্তু ফুটপাথের স্বপ্নে শুধু খাবার থাকে। ভাল খাবার কিছু নয়, এই ভাত, ডাল, তরকারি এই সব। তবে পরিমাণে অনেকটা। অনেকটা আর গরম। আমরা প্রায়ই সেই সব স্বপ্ন দেখি। সেদিন আমি খাবারের বদলে মুক্তোর ঘুষির স্বপ্ন দেখলাম। মুক্তো নন্দদার দেওয়া ছবির মেয়েটার মতো বড় বড় দুটো গ্লাভস পরে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে একটু নিচু হয়ে। পা দুটো সামান্য ফাঁক। মাথাটা তোলা। চোখগুলো জ্বলজ্বলে। মনে হচ্ছে, এখুনি ঘুষি চালাবে। মারবে ভীষণ জোরে!

    নন্দদার খবর দিতে একটু দেরি হল। ঠিক পাঁচদিন। তবে দেরি হলেও ভাল খবরই দিল নন্দদা। ওর কাকার ক্লাবে মেয়েদের বক্সিং শেখানো হয় না। তবে কাকা বলায় ও ওখানকার একজন ঘুষি মাস্টার মুক্তোকে আলাদা করে শেখাতে রাজি হয়েছে। বলেছে সপ্তাহে একদিন করে দেখিয়ে দেবে বিনি পয়সায়। কিন্তু আগে মেয়ের বাবা-মাকে দেখা করতে হবে।

    খবরটা দিয়ে নন্দদা বলল, “যাঃ, আমি তো অনেকটা করে দিলাম। এবার তোদের কাজ।”

    না, আমাদের কোন কাজই নেই। নন্দদাকে কিছু বলিনি আমি। মাথা নেড়ে চলে এসেছি। মুক্তো, মুক্তোর মাকে কিছু বলতে হবে না। তারা আমাদের এই ফুটপাথ থেকে চলে গেছে তিনদিন হয়ে গেল। এটা অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। ফুটপাথের মানুষজন বেশিদিন এক জায়গায় থাকে না। আমিও চলে যাব। ভুজিয়া, পাতলুনরাও যাবে। হঠাৎ একদিন ভোরে, কারও ঘুম ভাঙার আগেই পোঁটলা নিয়ে হাঁটা মারবে। এটাই নিয়ম। ভূজিয়া আর পাতলুন নন্দদার খবর শুনে খুব দুঃখ করল। ইস, এতদূর হয়েও হল না। মেয়েটা কোথায় গেল তাও যদি জানা যেত।

    আমি এসব ভাবছি না। কারণ আমার মন বলছে মুক্তো যেখানেই থাকুক, সে নিশ্চয় লড়বে। একদিন সেও মস্ত বক্সার হবে। আমরা হয়ত চিনতে পারব না।

    সব বক্সারকে কি আমরা চিনতে পারি?

  • ভূত তাড়ুয়া

    ভূত তাড়ুয়া

    আমরা দুই ভাই বোন পর্দার আড়ালে যেন বরফের মতো জমে গেছি! নড়তে পারছি না। এসব কী কথা! মতিলালকে দেখে কারা পালায়? কেন পালায়? কীসের মন্ত্র জানার কথা বলছেন বড় মামা? চোরডাকাত আবার তাড়াতে মন্ত্র লাগে নাকি?

    লোকটার চেহারা চিমসে প্যাটার্নের। গায়ের রঙ কালো। হাঁটু পর্যন্ত ধুতি আর ফতুয়া। দুটোই ফ্যাটফ্যাটে সাদা। যেন আসল সাদার ওপর আরও এক পোঁচ সাদা রঙ বোলানো হয়েছে। ফলে গায়ের রঙ হয়ে গেছে আরও কালো। একেবারে মিশমিশে। ঝাঁকড়া চুলে কষে তেল মেখেছে। যে কোনও সময় সেই তেল কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে পারে। বারান্দার সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে হাতদুটো জড়ো করে। প্ৰণামের ভঙ্গি। মানুষটার চেহারায় আরও কোনও গোলমাল রয়েছে। সেটা চোখের সামনেই আছে, কিন্তু ঠিক ধরতে পারছি না। চোখের সামনে কিছু থাকা সত্ত্বেও ধরতে না পারলে অস্বস্তি হয়।

    আমাদেরও হচ্ছে।

    বড় মামা দু’বার গলা খাঁকারি দিলেন। বললেন, “মতিলাল, ভবানী যো বোলা কেয়া ও সাচ্ হ্যায়? সত্যি কথা বলছে?” লোকটা চুপ করে রইল। ভবানীদা এবার ধমক দিল, “বোল, চুপ কিঁউ হো? ও সাচ্ হায় না?” মতিলাল দুটো হাত কচলাতে কচলাতে কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বলল, “সাচ্ হ্যায়।” লোকটার গলাটা কেমন যেন। পরিষ্কার নয়, আবার জড়ানোও নয়। ফ্যাস ফ্যাসে। বড় মামা চমকে দিয়ে ‘হো হো’ আওয়াজ করে হেসে উঠলেন। তারপর চেয়ার থেকে ঝুঁকে পরে বললেন, ‘সত্যি, তুমি তাড়াতে জান?” মতিলাল ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলল, “নেহি বাবু হাম কুছ নেহি জানি। ওরাই হামাকে দেখে ভাগে।”

    “ভাগে! তোমাকে দেখে পালায়? কিউ? ওদের ভাগানোর জন্য তুমহারা পাস কুছ তন্ত্র মন্ত্র হ্যায়?”

    বড় মামার মুখে হাসি। বোঝাই যাচ্ছে তিনি মজা পেয়েছেন। মতিলাল ফিসফিস করে বলল, “নেহি, কুছু নেহি। ফিরভি ও ভাগতা হ্যায়। লেকিন কিউ ইয়ে হাম নেহি জানতা বাবু! ও ভাগতা হ্যায়।”

    টক টক টক।

    কোথাও একটা তক্ষক ডেকে উঠল। বিকেলবেলা তক্ষক ডাকে? কে জানে ডাকে হয়তো। এটা তো কলকাতা নয় যে সবকিছু নিয়ম এমন চলবে। জায়গাটা অনেকটা একটা পাড়াগাঁয়ের মতো। তাও আবার আমাদের চেনাজােনা পাড়াগাঁ নয়, বিহারের পাড়াগাঁ। মধুপুর থেকে কিছুটা দূরে। রেল স্টেশনে নামার পর টাঙায় আধঘণ্টার পথ। আমাদের অবশ্য আরও বেশি সময় লেগেছে। কারণ যে ঘোড়াটা টাঙা টানছিল তার অবস্থা একেবারেই ভাল ছিল না। মনে হয়, বেচারির রাতে ঠিক মতো ঘুম হয়নি। ছোটার মাঝখানেই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছিল। ঘোড়ার ওপর ভবানীদা বেজায় খাপ্পা হয়ে গেল। দেহাতি হিন্দিতে টাঙাওলাকে এই মারেতো সেই মারে। আর বিড়বিড় করে নিজের মনে খালি বলতে লাগল, “ইস দেরি হয়ে গেল। ইস দেরি হয়ে গেল।”

    আমি বললাম, “কীসের দেরি ভবানীদা?”

    ভবানীদা বিরক্ত গলায় বলল, “তোমাদের বড়মামা বাড়ি পাহারার জন্য নতুন দারোয়ান খুঁজছেন। আজ বিকেলে একজনকে আসতে বলেছি। তার ইন্টারভিউ হবে। তারপর ফাইনাল করব।”

    আমি বললাম, আজই বললে?” ভবানীদা রাগী গলায় বলল, “আমি কি ছাই জানতাম যে ট্রেন লেট হবে? তারওপর এই হতচ্ছাড়া ঘোড়াটা…।”

    কথা শেষ করে ভবানীদা আবার ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। নিজেই ঝিমিয়ে পড়া ঘোড়াকে বলতে লাগলেন, “হ্যাট হ্যাট্। জলদি চল!” ঘোড়া ‘চিঁহি’ ধরনের একটা ডাক দিয়ে আরও স্পিড কমিয়ে দিল। মধুপুর, দেওঘর, জসিডিতে একটা সময় অনেক বাঙালি থাকত। এখনও কম কিছু নেই। তারওপর আসা যাওয়া তো লেগেই আছে। তাই এখানকার স্থানীয় মানুষরাও সুন্দর বাংলা বলতে পারে। যেমন এই ভবানীদা। তার কথা শুনলে কে বলবে মানুষটা বাঙালি নয়? দেহাতি টাঙাওলাও তেমনি। হিন্দি-বাংলা মিশিয়ে গড়গড় করে বলল, “ঘোড়াকে আপনি কিছু বলেন না কত্তা। রাগ করে দাঁড়িয়ে যাবে। তখন মাঝপথে সমস্যা আছে। আপনি অত চিন্তা করবেন না। আমি ঠিক নিয়ে যাব।”

    গুঞ্জা মুখে হাত চাপা দিয়ে হেসে উঠল। ভবানীদা টাঙাওলাকে ধমক দিল, “চোপ। একদম চোপ। আমি কী এমনি চিন্তা করি? শুধু দারোয়ান হলে ভাবতাম থোড়াই। অন্য ব্যাপার আছে। লোকটা হাতছাড়া হয়ে গেলে বিরাট ক্ষতি। অনেক কষ্টে এর খোঁজ পেয়েছি। তুমি বকবক না করে তাড়াতাড়ি চল দেখি।”

    আমি অবাক হয়ে বললাম, “আর কী ব্যাপার?”

    ভবানীদা মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। চোখ দুটো চকচকে করে বলল, “শুধু বাড়ি পাহারা নয়, শুনেছি এ লোকের আরও ক্ষমতা আছে। তোমাদের বড় মামাকে সেই ক্ষমতার কথা বলেছি। উনি তো বিশ্বাসই করেন না। বললেন, দূর যতসব বানানো কথা। আমি অনেক জোরজার করলাম। বললাম, একবার দেখতে ক্ষতি কী? তখন রাজি হলেন।”

    গুঞ্জা তার গলায় ঝোলানো দূরবীন চোখে লাগিয়ে চারপাশ দেখছে। ট্রেনে ওঠার পর থেকেই এই কাণ্ড শুরু করছে। চোখ থেকে দূরবীন সরাচ্ছে না। দূরবীন চোখেই ভবানীদার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী ক্ষমতা?”

    ভবানীদা একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “অত বলা যাবে না।”

    সেই লোকেরই এখন ইন্টারভিউ চলছে। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে আমরা শুনছি।

    বছর দুই হল বড়মামা এখানে একটা দারুণ রেস্ট হাউস কিনেছেন। বিরাট বাগানের মাঝখানে ব্রিটিশ আমলের ছোট্ট একটা বাংলো। বাংলোর রঙ পোড়া ইঁটের মতো। ভারি চমৎকার। সারিয়ে সুরিয়ে নিয়ে সেটাকে আরও চমৎকার করা হয়েছে। মনে হয় সত্যি নয়, আঁকা ছবি। সামনে ফুলের বাগান। পাশে সবজি। যাকে বলে কিচেন গার্ডেন। পিছনে আম, জারুল, সিলভার ওকের মতো বড় বড় সব গাছ ভিড় করে আছে দেওয়ালের মতো। একদিকে পুকুর। সেখানে বাঁধানো ঘাট। দক্ষিণের কাঁচের আউট হাউসটাও কম যায় না। রঙিন কাঁচগুলো ছিল ভাঙা, বড়মামা কলকাতা থেকে অনেক খুঁজে নিয়ে এসে সেসব বদলেছেন। কত মানুষ যে এখন এই বাড়িটা কেনার জন্য বড়মামাকে ধরে তার ঠিক নেই। মোটা টাকার কথাও বলে। বড়মামা পাত্তা দেন না।

    আমরা এসে পৌঁছেছি বেশিক্ষণ হয়নি। কিন্তু তার মধ্যেই এক চক্কর ঘোরা হয়ে গেছে। বাংলোর চারপাশে জঙ্গল না থাকলেও বেশ জঙ্গল জঙ্গল একটা ভাবও রয়েছে। এটা একটা বাড়তি মজা। বড়মামা বিয়ে থা করেননি। ঝাড়া হাত পা’র মানুষ। ব্যবসাপাতি থেকে ছুটি নিয়ে বছরে দুতিন বার বিশ্রাম নিতে এখানে পালিয়ে আসেন। এবার ঠিক হয়েছিল বাবা, মা আর আমরা দুভাই বোনও আসব। গোছগাছ শেষ এমন সময় বাবার অফিসে হঠাৎ জরুরি কাজ পড়ল। বেড়ানো পণ্ড। গুঞ্জা তো কেঁদেই ফেলল। মা বড় মামাকে খবর দিল, যাওয়া ক্যানসেল। তখন বড় মামাই ব্যবস্থা করেছেন। ভবানীদাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সেই আমাদের দুই ভাই বোনকে নিয়ে আজ সকালে ট্রেনে উঠেছে।

    কথা ছিল দুপুর গড়াতে না গড়াতে মধুপুরে নামৰ। ট্রেন লেট করল। পৌঁছোতে বিকেল হয়ে গেছে। বেলা বারোটায় হটকেস খুলে মার দেওয়া লুচি, আলুর দম আর দরবেশ দিয়ে লাঞ্চ করেছি। লুচি গরম ছিল। তারপর আর কিছু খাওয়া হয়নি। তবে বেড়ানোর আনন্দে খিদে ভুলে গেছি। ঠিক হয়েছে, বাবার অফিসের কাজ শেষ হলে তিনদিন পর বাবা মাও চলে আসবে। ততদিন আবার দুই ভাই বোন একেবারে স্বাধীন।

    কিন্তু প্রথম দিনই যে এরকম একটা কাণ্ড হবে কে ভাবতে পেরেছিল?

    বারান্দার ওপাশের ঝোপঝাড় দিয়ে কিছু চলে গেল। আওয়াজ হল, সরসর সর…। গুঞ্জা ফিসফিস করে বলল, “দাদা, ভয় করছে।” গুঞ্জা খুবই ভীতু প্রকৃতির একটা মেয়ে, হুটহাট ভয় পাওয়া তার অভ্যেস। ভেবেছিলাম, ক্লাস সিক্সে উঠলে মেয়েটার ভয় কমবে। কমেনি, বরং বেড়েছে। অথচ আমি ওর থেকে মোটে দু’বছরের বড় হলে কী হবে যথেষ্ট সাহসী। কিন্তু এখন যেন কেমন হচ্ছে! মতিলাল নামের লোকটার সঙ্গে বড় মামার কথা শোনার পর থেকে এটা হচ্ছে। কী হচ্ছে?

    আমি হাত বাড়িয়ে গুঞ্জাকে একটা চিমটি দিলাম। বড় মামা আমাদের কথা শুনতে পেলে কেলেঙ্কারি। একটু আগেই তিনি বলেছেন, “অর্ঘ, গুঞ্জা তোমরা ট্রেনে এতটা পথ এসেছে, এখন আর ঘর থেকে একদম বেরোবে না। খাওয়া দাওয়া করে বিশ্রাম নাও। সেই ফাঁকে আমি একটা জরুরি কাজ সেরে ফেলি। সন্ধেবেলা তোমাদের সঙ্গে আবার জমিয়ে গল্প হবে।” আমরা ভাই বোনে হাত পা ধুয়ে খাওয়া দাওয়া করেছি, কিন্তু বড়মামার বিশ্রাম নেওয়ার কথা শুনিনি। ঘর থেকে বেরিয়ে পা টিপে টিপে চলে এসেছি বারান্দায়। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে ‘দারোয়ান’ চাকরির ইন্টারভিউ শুনছি।

    বেতের চেয়ারে বড়মামা বসে আছেন। তার ভুরুদুটো কোঁচকানো। ভবানীদা দাঁড়িয়ে আছে পাশে। তারও ভুরুদুটো কোঁচকানো। লক্ষ্য করছি ভবানীদার এই এক স্বভাব। বড়মামার কাছে থাকলে তার মতো আচরণ করবে। এখনও তাই করছে। বড়মামার দেখাদেখি ভুরু কুঁচকে আছে।

    বড়মামা ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, “ভবানী এই সেই লোক? এর কথাই তুমি বলছিলে?”

    ভবানীদা ঘাড় নিচু করে বলল, “হ্যাঁ বড়বাবু, এই সেই লোক।” বড়মামা গলা তুলে বললেন, “তুমহারা নাম কেয়া হ্যায়? নাম কী?

    ভবানীদাও গলা তুলে বলল, “কেয়া হ্যায়?”

    ভবানীদা বেশ কয়েক বছর ধরে এ বাড়িতে আছে। সে এই বাড়ির কেয়ারটেকার। আগে কেয়ারটেকার আর দারোয়ান দুটো পোস্টেই কাজ করত। এখন শুধু কেয়ারটেকার। এর পিছনে একটা মজার গল্প আছে। ট্রেনে আসতে আসতে ভবানীদা নিজেই আমাদের সেই গল্প বলেছে। গত বর্ষায় তার নাকি জ্বর হয়েছিল। ছোটখাটো জ্বর নয়, একেবারে তেড়েফুড়ে জ্বর। গোটা শরীর থেকে যেন ধোঁয়া বের হতো! মাথায় পুকুরের ঠাণ্ডা জল বালতি বালতি ঢেলেও টেম্পারেচার কমছিল না। গুনে গুনে সাত দিন বাদে জ্বর গেল কিন্তু এখানে শুরু হল বিচ্ছিরি এক ঝামেলা। দিনের বেলা সব ঠিক থাকে, কিন্তু রাত হলে কেন জানি দুটো কানেই তালা পরে যায়! কিছুই শুনতে পায় না ভবানীদা। অনেক ডাক্তার বদ্যি হল, দেওঘরের কাছে কোন গ্রামে গিয়ে ওঝা পর্যন্ত দেখিয়ে এলো ভবানীদা। ওঝা বলল, “কোন ব্যাপার নয়। এক ধুনুচি ধোঁয়া দিলেই রোগ পালাবে। তবে খরচাপাতি আছে।” বেচারি ভবানীদার উপায় কী? খরচায় রাজি হয়ে গেল। ওঝা কানে ধোঁয়া দিল। এক ধুনুচির বদলে তিন ধুনুচি। খরচও হল তিনগুণ। কিন্তু তাতেও কোনও লাভ হল না। কানের গোলমাল রয়েই গেল। যে মানুষ রাতে কানে শুনতে পায় না তাকে আর যাই হোক বাড়ি পাহারার কাজে রাখা যায় না। এই কারণেই ভবানীদার দারোয়ান পোস্ট চলে গেছে। তবে আমরা মাত্র কয়েক ঘণ্টাতেই বুঝেছি, পোস্ট চলে গেলেও ভবানীদা মানুষটা ভাল। আমাদের সঙ্গে অনেক গল্প করেছে। বলেছে একদিন সাইকেলে চাপিয়ে ডুংরা পাহাড়েও নিয়ে যাবে। আমি কেরিয়ারে বসব, গুঞ্জা বসবে সামনের রডে। বড়মামার রেস্ট হাউসের পাশে ডুংরা একটা ছোট পাহাড়। টিলার থেকে খানিকটা বড়। পাহাড়টায় একটা মজা আছে। ওখানে একটা ঝরনা রয়েছে। সেটার নামও ডুংরা। পাহাড়ের নামে ঝরনা না ঝরনার নামে পাহাড় সেটা কেউ জানে না। রাতে এই নিয়ে পাহাড় আর ঝরনার মধ্যে নাকি ঝগড়া হয়। ঘর থেকে বেরিয়ে হাওয়ায় কান পাতলে সেই ঝগড়া শোনা যাবে। তবে সবদিন শোনা যায় না। যেদিন যেদিন খুব চাঁদের আলো ফোটে সেদিন শোনা যায়।

    গুঞ্জা হাততালি দিয়ে বলল, “না, শুনবে না। রাতে ঘর থেকে বেরনোয় সমস্যা আছে।”

    আমি বললাম, “কী সমস্যা?”

    ভবানীদা উত্তর না দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। যেন কথাটা শুনতেই পায়নি।

    ভবানীদার কান বন্ধ হওয়ার পর বড়মামা এই প্রথম এখানে এলেন। তাই এখন পাহারার জন্য নতুন লোকের খোঁজ চলছে। এর মধ্যে পাঁচ জনের ইন্টারভিউ হয়ে গেছে। একজনকেও পছন্দ হয়নি। এই মানুষটাকে নাকি ভবানীদা নিজে অনেক খুঁজে টুজে জোগাড় করেছে।

    বাগানের ডুমুর গাছটা থেকে ঝটপটানি দিয়ে একটা পাখি উড়ে গেল। পেঁচা নয়তো? হতে পারে। এখানে দিনের আলোতেও হয়তো পেঁচা ওড়ে। চমকে উঠে গুঞ্জা আরও খানিকটা সরে এলো এদিকে। আমার ডান হাতের কনুইটা চেপে ধরল।

    শুরু থেকেই দেখছি, লোকটা হাসছে। মুখে খয়েরি দাঁতের সারি। এটা কোন আশ্চর্য ব্যাপার নয়। অনেকেই পান দোক্তা বেশি খেয়ে দাঁত খয়েরি করে ফেলে। এরও হয়তো সেটা হয়েছে। আশ্চর্য ব্যাপার হল, লোকটার হাসি যেন মুখের থেকেও বড়! দুটো গাল ছাড়িয়ে চলে এসেছে অনেকটা বাইরে! দেখলে কেমন যেন লাগে। গা ছমছমে একটা অস্বস্তি। আমি পর্দার আরও আড়ালে সরে এলাম।

    লোকটা ফ্যাস ফ্যাসে গলায় নিজের নাম বলল, “মতি বাবু। হামারা নাম মতি। মতিলাল।”

    এরপরই বড় মামা মতিলালকে মন্ত্রর কথা জিগ্যেস করেন। আমরাও ঘাবড়ে যাই। মন্ত্র! কীসের মন্ত্র? কাদের তাড়ানোর কথা বলছে ও? গুঞ্জা কোনও রকমে হাত বাড়িয়ে আমার কব্জিটা ধরল। ছাড়াতে গিয়েও আমি পারলাম না। বরফের মতো জমে গেছি যেন!

    আমরা ঘাবড়ে গেলে কী হবে, বড়মামা কিন্তু হাসলেন। হাসতে হাসতেই উঠে দাঁড়ালেন। ভবানীদার দিকে ফিরে বললেন, “ঠিক আছে ভবানী, তুই মতিলালের সঙ্গে ফাইনাল কথা বলে নে। আজ থেকেই ও কাজে নেমে পড়ুক। কদিন ওর কাজকর্ম দেখে মাইনে পত্তর ঠিক করব না হয়। আর ওকে বলে দে ওসব আজগুবি কাণ্ডকারবারে আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই। শুধু চোর ডাকাত তাড়ালেই চলবে। আর কাউকে এখান থেকে তাড়াতে হবে না। ও বরং আজ রাত থেকে ডিউটি শুরু করে দিক। দেখ বাপু, রাতে আবার পুকুর ঘাটে শুয়ে ঘুমিয়ে পড় না।”

    “বাবু, হাম রাত মে সোনে নেহি।”

    বড়মামা বললেন, “ওরকম সবাই বলে। পরে দেখা যাবে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছ। আর চোরে এসে আমার বাগানের সবজি, পুকুরের মাছ সব নিয়ে পালিয়েছে।”

    “নেহি বাবু হাম ঝুট নেহি বোলতে।”

    রাত দশটার পর এখানে প্ৰায় কোনদিনই আলো থাকে না। অন্য সময়ও না থাকার মতো। ভোল্টেজ কম। টিউব লাইটের তো কোনও প্রশ্নই ওঠে না, বাল্বগুলো জ্বলে টিমটিম করে। এখনও সেই অবস্থা। দারুণ লাগছে। বেশ একটা অ্যাডভেঞ্চারের মতো। সন্ধের পর বসার ঘরে ক্যারম খেলছি। আমরা আসব বলে বড়মামা ক্যারম বোর্ডের ব্যবস্থা করেছেন। খুব জমিয়ে খেলা চলছে। শুধু মনের মধ্যে কেমন একটা খচ খচে ভাব। মতিলালের ঘটনাটা পরিষ্কার হওয়া দরকার। সুযোগ পেয়ে ভবানীদাকে দু-একবার জিগ্যেস করেছিলাম, উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গেছে।

    বড় মামাকে প্রথমে চেপে ধরল গুঞ্জা। তারপর আমি। বড় মামা প্রথমটায় চুপ করে রইলেন। তারপর স্ট্রাইকারের আলতো ছোঁয়ায় ‘রেড’ ফেলে বললেন, “দূর ও কিছু নয়। ভীতুর কাণ্ড। তোরা ছাড় তো এসব। ইস্ কতবছর যে ক্যারম খেলিনি। কত বছর হবে? তিরিশ? চল্লিশ? বেশিও হতে পারে। ভাগ্যিস তোরা এলি। চল্লিশ বছর পরেও হাতে কেমন টিপ দেখেছিস? দেখ এবার ওই গুটিটা ফেলব।”

    আমি বললাম, “খুব ভাল টিপ। এবার বল কে ভীতু?”

    বড় মামা মুচকি হেসে বললেন, “কে আবার? ওই ভবানীটা।”

    ভবানীদা ভীতু শুনে গুঞ্জা আর আমি মুখের দিকে তাকালাম।

    গুঞ্জা বলল, “মানে!”

    বড়মামা তখন গুছিয়ে সবটা বললেন। “এবার এখানে এসে থেকেই দেখছি ভবানী কেমন যেন হয়ে গেছে। একেই তো গত বর্ষার জ্বরে শরীরটা ভেঙে গেছে, তারওপর দেখলাম মনটাও ভেঙেছে। প্রথমদিনই বলল, বাবু, দিনের সব কাজ পারব। কিন্তু রাতে আমায় ছেড়ে দিন। রাতে এখানে থাকতে পারব না। আমার তো মাথায় হাত। কী মুশকিলের কথা। এত বড় বাড়ি, এত জিনিস। রাতে পাহারা না দিলে চলে? ভবানীর মতো বিশ্বাসী মানুষ পাওয়াটাও তো সহজ কথা নয়। আমি ওকে বললাম, তোমার আবার কী হল? ঠিক আছে মাইনে না হয় কিছুটা বাড়িয়ে দিচ্ছি। ও বলল না, মাইনে নয়, অন্য সমস্যা আছে। আমি বললাম, অন্য সমস্যা! সেটা আবার কী!” কথা থামিয়ে বড় মামা ঝুঁকে পরে একটা গুটি ফেললেন। আমি আড় চোখে তাকিয়ে দেখি গুঞ্জার চোখ বড় হয়ে গেছে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “তারপর?” ভীতুদের নিয়ে এই এক মুশকিল। ভয়ও পাবে আবার ভয়ের গল্প শুনতেও চাইবে। বড় মামা বলতে লাগলেন—

    “ভবানী তখন বলল, সে নাকি আজকাল রাতে এই বাড়ির আশেপাশে নানা রকম আওয়াজ পায়। আমি বললাম, কী রকম আওয়াজ? বলল, কারা যেন কথা বলছে, কে যেন হাঁটছে—এই সব আওয়াজ। বুঝলাম ডাহা মিথ্যে কথা। বেটা কোনও কারণে ভয় পেয়েছে।”

    এবার আমি নড়ে চড়ে বসলাম। ভবানীদা রাতে আওয়াজ পায়! তাহলে যে আমাদের বলেছিল, জ্বরের পর রাতে কানে শুনতে পায় না! কোনটা সত্যি? কথাটা বলতে গিয়েও চুপ করে গেলাম।

    বড় মামা বললেন, “বুঝলি অর্ঘ অনিচ্ছুক মানুষকে দিয়ে সব কাজ করানো যায়, কিন্তু পাহারার কাজ করানো যায় না। বাধ্য হয়ে একজন দারোয়ান খুঁজতে শুরু করলাম। দু-একজনকে দেখলাম, মনোমত হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত এই লোকটাকে ভবানীই এনে দিল।

    এই যে ভবলাল না মতিলাল কী নাম যেন।” এরপর বড় মামা মুখ তুলে তাকালেন। হেসে বললেন, “বাড়ি পাহারা ছাড়াও এই মতিলালবাবুর নাকি আরও একটা ক্ষমতা আছে। মিস্টিরিয়াস পাওয়ার। রহস্যময় ক্ষমতা।”

    “মিস্টিরিয়াস পাওয়ার!”

    আমরা দুজনেই একসঙ্গে বললাম।

    বড় মামা প্ৰথমে একচোট হেসে নিলেন। তারপর হাসতে হাসতেই বলতে লাগলেন।

    “ভবানী বলছিল, লোকটা নাকি বাড়ি ঘর থেকে ভূত তাড়াতে পারে। হা হা। গ্রামের দিকে অনেকেই নাকি ভূত তাড়াবার জন্য মতিকে ডেকে নিয়ে যায়। দু’চার রাত সেই বাড়িতে থাকলেই ব্যস, তাতেই কেল্লা ফতে। আর কিছু লাগে না। ভূত বাবাজী এমনই বাপ বাপ বলে পালায়। বোঝ কাণ্ড। হা হা। আজ বিকেলে মতিলালকে মজা করে কথাটা আমি জিগ্যেস করলাম। ঘটনা সত্যি কিনা জানতে চাই। লোকটা কী বলল জানিস? বলল, ঘটনা সত্যি! ভূত নাকি ওকে দেখলে পালায়! কোন মন্ত্র টন্ত্র লাগে না, এমনিই চম্পট দেয়। হা হা। প্ৰথমে ভেবেছিলাম, লোকটাকে রাখব না। একটা মিথ্যেবাদীকে বাড়িতে ঢোকানো ঠিক হবে না। তারপর ভেবে দেখলাম, অসুবিধে কী? মিথ্যেটা তো ক্ষতির কিছু নয়, বরং মজার। কটা দিন দেখি না। তাছাড়া…।” এতটা পর্যন্ত বলে বড় মামা থামলেন।

    আমি বললাম, “তাছাড়া কী?”

    “তাছাড়া ভবানীটাও কদিন ধরে খুব চাইছিল লোকটাকে যেন রাখি।”

    “কেন? ভবানীদা চাইছিল কেন?” গুঞ্জা জিগ্যেস করল।

    বড় মামা আবার হাসলেন। বললেন, “কেন আবার, একটা কাউকে না রাখলে ভবানীরই তো সব থেকে মুশকিল। ওকেই রাতে পাহারা দিতে হবে। আরও একটা কারণ হতে পারে। হয়তো লোকটা ভবানীর পরিচিত। গরিব মানুষ। বেচারি কাজকর্ম পাচ্ছে না, এই সব বানানো কথা বলে চাকরিটা করিয়ে দিতে চাইছে ভবানী। তবে ভবানী এ বাড়ির ভালই চাইবে। সে আমার অনেকদিনের পরিচিত। এই সব ভেবে মতিলালকে রেখেই দিলাম। দেখি না কটা দিন। অনেক বাড়িতে তো কাকতাড়ুয়া থাকে, আমার এখানে না হয় একটা ভূততাড়ু়য়া রইল। হা হা। তোরা ফিরে গিয়ে বন্ধুদের বলবি, বড় মামার রেস্টহাউসে একটা ভূত তাড়ুয়া আছে। তার গায়ের রঙ কুচকুচে কালো আর জামাকাপড় ফট্ফট সাদা। হা হা।”

    বড়মামা একেবারে গলা খুলে হাসতে লাগলেন। ‘ভূত তাডুয়া” কথাটা শুনে আমাদেরও খুব মজা লাগল। সব ভয় টয় পালালো। আমরাও হাসতে শুরু করলাম। ভীতু গুঞ্জাটা পর্যন্ত এতো হাসল যে ওরা হেঁচকি ওঠার মতো অবস্থা। বড় মামা মাথায় চাপড় দিয়ে সামলালেন।

    রাতে বোধহয় বৃষ্টি হয়েছিল। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ঘুম হল চমৎকার। একেবারে একঘুমে রাত কাবার। শুরুতে আউটহাউসের দিক থেকে শুধু একবার তীক্ষ একটা হুইশলের আওয়াজ পেলাম। পাহারাদারের হুইশল। ভূত তাড়ু়য়া কি মাথায় ছাতা নিয়ে পাহারা দিচ্ছে? নাকি রেনকোট গায়ে দিয়েছে? ভূত কি রেনকোট দেখলে ভয় পালায়? এই সব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরলাম আবার। সকালে উঠে দেখি, চারপাশ একেবারে আলোয় ঝলমলে। ঘর থেকে বেরিয়ে শুনি হইচই হচ্ছে। বড় মামা অর্ডার দিয়েছেন বাড়ির পিছনে সিলভার ওক গাছটায় দড়ির দোলনা টাঙাতে হবে। আমি আর গুঞ্জা নাকি আজ সেই দোলনায় বসে ব্রেকফাস্ট করব। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলাম, ভবানীদা দোলনা নিয়ে ছোটাছুটি করছে।

    ইস কী মজা!

    মজা চলল পরের কটা দিন। অনেকরকম মজা। শুধু ঘরে বসে ক্যারম নয়, মাছ ধরা, গাছে ওঠা, পিকনিক, ক্যাম্প ফায়ার অনেক কিছু। সব থেকে মজা হল, বাবা তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ফেলায় তিন দিনের বদলে দেড়দিনের মাথায় মাকে নিয়ে চলে এল সোজা গাড়ি নিয়ে। তারপর থেকে আমরা গাড়িতেই বেড়াতে লাগলাম। দেওঘর গেলাম। ডুংরা পাহাড়েও গেলাম। হইচইতে এতো মেতে উঠলাম যে ভবানীদা আসছে না সেটাও খেয়াল করলাম না। ভূত তাডুয়া মতিলালের সঙ্গেও আর দেখা হয়নি। সে রাত করে আসে। পাহারা সেরে ফিরে যায় ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে। বাবা-মাকে গল্পটা বলেছি। বাবা বলেছে, একদিন রাতে ডেকে কথা বলবে। মা বলল, “না, বাবা ওসব ভুত টুতের ব্যাপার। খবরদার রাতে আমার সামনে ডাকবে না। বড়দা যে কী কাণ্ড করে। কাদের সব ধরে আনে।”

    মায়ের কথা শুনে আমরা খুব হাসলাম। বড়মামা বলল, “আমি কী করেছি। করেছে তো ভবানী। সেই তো লোকটাকে এনেছে। এনে এখন কামাই করছে। মনে হয় বেচারি আবার জ্বরে পড়েছে। ভাবছি এবার কলকাতায় ফেরবার আগে একবার ওর গ্রামের বাড়িতে যাব। গতবার অসুখের সময় আমি এখানে ছিলাম না। এবার না গেলে খুবই খারাপ হবে। সমস্যা হল, গ্রামের নামটা বলেছিল, কিন্তু এখন ঠিক মনে পড়ছে না। যাই হোক খুঁজে নিতে হবে। ওই আজগুবি মতিলাল নিশ্চয় ঠিকানা বলতে পারবে।”

    আমি আর গুঞ্জা দুজনেই একসঙ্গে বললাম, “আমরাও তোমার সঙ্গে যাব বড়মামা। বেশ আর একটা আউটিং হবে। ভবানীদাও খুশি হবে।”

    বড়মামা বলেন, “না, আমি একাই যাব। আজ বিকেলেই চট করে একবার ঘুরে আসব।”

    সাতদিনের বদলে পাঁচদিনের মাথায় আমরা কলকাতায় ফিরে এসেছি। বড় মামাও তার চমৎকার রেস্টহাউসে বড় একটা তালা ঝুলিয়ে চলে এসেছেন আমাদের সঙ্গে। উনি বাড়ি বিক্রি করে দেবেন। ইতিমধ্যেই ওখানে যারা একসময় বাড়ি কিনব বলে উৎসাহ দেখিয়েছিল তাদের দু-একজনের সঙ্গে কথা বলে এসেছেন।

    এ ছাড়া অন্য কোন পথ নেই। যে ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে তাতে ওখানে আর থাকা যায় না।

    ঘটনা এরকম—

    সেদিন বড়মামা যখন ঠিকানা খুঁজে ভবানীদার গ্রামে পৌঁছোলেন তখন কড়া দুপুর। সূর্য একেবারে মাথার ওপর। গ্রামের মুখে বন্ধ চায়ের দোকানে বসে কটা লোক তাস খেলছিল। বড়মামা গাড়ি থেকে নামতে নিজেরাই এগিয়ে এল। তারপর ভবানীদার কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়ল! গতবর্ষায় সাতদিনের জ্বরে যে মানুষটা মারা গেছে তার আবার খোঁজ কীসের! সে তো অনেকদিন হয়ে গেছে। এরপর আর এই বাড়ি রেখে দেওয়া যায়?

    এই ঘটনার বেশ কয়েকমাস পরে গুঞ্জা একদিন আমাকে জিগ্যোস করল, “আচ্ছা দাদা, ভবানীদা যখন নিজেই ভূত তখন একজন ভূত তাড়ুয়াকে ডেকে আনতে গেল কেন?”

    আমি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি। কারণ ঠিক উত্তর আমি জানি না। হতে পারে, মারা যাওয়ার পরও ভবানীদা দায়িত্ব ছেড়ে চলে যেতে পারছিল না। বড়মামা আর ওই বাড়ির মায়া কাটাতে পারছিল না কিছুতেই। হয়তো তাই ভূত তাড়ু়য়া মতিলালকে এনে চলে যাওয়ার একটা উপায় বের করেছিল। আবার এগুলো সব মিথ্যেও হতে পারে। চমৎকার রেস্টহাউসটা যাতে বড়মামা বিক্রি করে দেন তার জন্য ফন্দি। বর্ষায় জ্বর, রাতে কানে শুনতে না পাওয়া থেকে শুরু করে, ভূত তাড়ুুয়া মতিলালকে নিয়ে আসা, গ্রামের কটা লোককে দিয়ে মৃত্যু সংবাদ দেওয়া—সবকিছু বানানো।

    কোনটা সত্যি কে জানে?

  • আশ্চর্য পুকুর

    আশ্চর্য পুকুর

    চমৎকার পুকুর

    ভুবনপুরের পুবদিকে বোসদের বাগান। বাগান না বলে ওটাকে এখন জঙ্গলই বলা উচিত। কতবছর যে ঐ বাগানে মালি ঢোকেনি তার কোনও ঠিক নেই। বছরের পর বছর ওখানকার আগাছাও পরিষ্কার করা হয় না, ঘাস ছাঁটাও হয় না। বাগানটার যারা মালিক সেই বোসদেরও ভুবনপুরের কেউ চোখে দেখেনি। একজন, দু’জন দেখে থাকতে পারেন, কিন্তু তাঁরা এত বুড়ো হয়ে গেছেন যে কানে কিছু শুনতে পান না। সুতরাং তাদের এসম্পর্কে প্রশ্ন করে কোনও লাভ নেই।

    বাগান কিন্তু অনেক বড়। ভাঙাচোরা নোনা ধরা ইটের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। অবশ্য ভেতরকার গাছগুলো যে সব জংলি এমন নয়। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, আমলকির মত জিভে জল আনা সব ফলের গাছ আছে। আছে করবী, নয়নতারা, কৃষ্ণচুড়া, চাঁপা, টগরের মত সুন্দর সুন্দর ফুলের গাছ। আর আছে চমৎকার একটা পুকুর। বাগানের একদম মাঝখানে। একদিকে কলাগাছের ঝাড়, অন্যদিকে তাল আর নারকেল গাছের সারি যেন পুকুরটাকে ঘিরে জায়গাটাকে ঠান্ডা ঠাণ্ডা করে রেখেছে। পুকুরের উত্তর আর দক্ষিণ দুদিকে দুটো লাল রঙের ঘাট। সেই ঘাটের বেশিরভাগ সিঁড়িই আজ ভেঙে পড়েছে। সিঁড়ির ফাটল থেকে বটগাছের চারা মাথা তুলেছে। তবে পুকুরের জলটা কিন্তু আজও খুব ভাল আছে। টলটলে, পরিষ্কার। কাঁচের মত। জলের একদিকে শালুক ফুল ফুটে ভাসছে, একদিকে পাতিহাঁস প্যাক প্যাক করে সাঁতরে বেড়াচ্ছে আর মন দিয়ে গুগলি খুঁজছে। কখনও সখনও তালগাছ থেকে পাকা তাল হয়ত ঝুপুং করে জলে পড়ল, কখনও বা ইয়া বড় কোনও কাতলা মাছ ঘাই দিল ঘুপুত করে।

    বোসদের এই বাগানে কারোর ঢোকার সাধ্যি নেই। ঢুকবে কী করে? একবার বড়দিনের ছুটিতে ভুবনপুর তরুণ সংঘ ক্লাবের ছেলেরা এই বাগানে ঢুকে পিকনিক করছিল। মাইক বাজিয়ে তারা বেজায় শোরগোল পাকিয়েছিল। তারপর বীরত্ব দেখিয়ে যেই তারা একটা মৌচাক ভেঙে মধু নিতে গিয়েছিল অমনি কয়েক’শ মৌমাছি তাদের এমন কামড় দেয় যে, এক একজনের চোখ মুখ হাঁড়ির মত ফুলে ওঠে। শুধু তাই নয়, জ্বালার চোটে পিকনিক পার্টি এক হাঁড়িতেই মাংস, ডাল, চাটনি রান্না করে এবং সেই অদ্ভুত খিচুড়ি খেয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে আসে। এরপর আর কেউ ওখানে পিকনিক করতে যায়নি। তবে দত্তবাড়ির মেজ ছেলে একবার সিনেমার ভিলেনদের মত জুতোজামা পরে, কাঁধে এয়ারগান ঝুলিয়ে বোসবাগানে খরগোস শিকারে গিয়েছিল। সেবার গর্তে পড়ে, পা ভেঙে তাকে ফিরতে হল। অনেকেই তাকে গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করেছিল, শুনলাম বোসবাগানে শিকার করতে গিয়ে তুমি নাকি নিজেই জন্তুদের জন্য পাতা ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলে?

    এই অপমানের পর দত্তবাড়ির মেজ ছেলে আর কোনওদিন এয়ারগান ধরেনি।

    ঘনাই কাণ্ড

    ছ’ফুট তিন ইঞ্চি উচু পাঁচিলটা টপকে টুপ করে বোসবাগানে এসে পড়ল ঘনাই। তার কাঁধে একটা ভারী থলে। সে হাঁপাচ্ছে।

    মাকড়সার জাল আর শেয়ালকাঁটা ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল ঘনাই। গতরাতে খানিকটা বেশি হয়েছে। পরপর পাঁচটা বাড়িতে চুরি তো কম কথা নয়। কোনটাতে সিঁদ কেটে, কোনটাতে গরাদ ভেঙে, কোনটাতে আবার পাইপ বেয়ে। শেষের বাড়িটায় তো ধরা পড়ে যাচ্ছিল বলে। দারোয়ান ব্যাটা কাঁধটা খামচেও ধরেছিল। খুব বাঁচোয়া ভাল করে তেল মাখা ছিল। তাই হড়াৎ করে ফসকে আসতে পেরেছে। অবশ্য ধরা পড়লেও ঘনাইয়ের খুব কিছু এসে যেত না। আশেপাশের চৌদ্দটা পুলিশথানার সঙ্গে তার খুবই চেনা জানা। অনেক থানার বড়বাবুর বাড়িতেই সে বিজয়ার দিন সন্দেশের বাক্স নিয়ে প্ৰণাম করতে যায়। সে চোর হলে কী হবে, পুলিশ মহলে সবাই তাকে বিশ্বাস করে। সে যখনই ধরা পড়ে কোনও থানায় গেছে, তখনই সে ঘরের ছেলের মতই খাতির পেয়েছে।

    পুব আকাশে একটু একটু করে আলো ফুটছে। ঘনাই ভাবল, এখন যদি ভাল মত একটা স্নান করা যেত। আর পেটটা পুরে খাবার পাওয়া যেত তাহলে ক্লান্তিটা একদম দূর হত! এই কথা ভাবতে ভাবতে ঘনাই এসে পৌঁছালে বোসপুকুরের ঘাটে।

    ভোরের নরম আলোয় পুকুরটা যেন হাসছে। শিশির ভেজা ঠাণ্ডা হাওয়া ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ তুলেছে। একমিনিটও দেরি করল না ঘনাই। থলেটাকে ফেলে রেখে গুনে গুনে ঠিক বারো পা দূর থেকে ছুটে এসে ঝাঁপ দিল ঝপাং।

    বাগান জুড়ে ডেকে উঠল পাখি। পাতিহাঁসদুটো ল্যাগব্যাগ করে ছুটল। এমন কাণ্ড তারা দেখেনি কখনও! বোসপুকুরে মানুষ নেমেছে! ঘনাইও হড়াশ ফড়াশ করে উল্টো সাঁতার, চিত সাঁতার আর ডুব সাঁতার কাটল টানা আধঘণ্টা। এমন আরামের স্নান বহুদিন করেনি সে। তারপর জল থেকে উঠে মাথা মুছে গাছ থেকে একটা বড় কাঁঠাল পেড়ে, সেটা ভেঙে পা ছড়িয়ে বসল ছায়ায়।

    গুড়ের থেকেও মিষ্টি এক একটা কোয়া মুখে ফেলতে লাগল আর চোখ বুজে ভাবতে লাগল, সামনের সাতদিন কোথায় কোথায় যেতে হবে।

    মিত্তিরদের সিন্দুকটা আছে শোবার ঘরে। পরশুই একবার ঢু মারতে হবে সেখানে। জগদীশের গুদাম থেকে এক বস্তা আলু সরাতে হবে কালই। হরিহর পাড়ায় সতেরো আর উনিশ নম্বর বাড়িতে নতুন বাসন কোসন কেনা হয়েছে বলে খবর এসেছে। দু’একদিনের মধ্যেই যেতে হবে।

    ভাবতে ভাবতে চোখ বুজে এল ঘনাইয়ের। ঢুলুনি এল। এমন সময় হঠাৎ তার মাথার মধ্যে একটা কী যেন হল! যেন একসঙ্গে জ্বলে উঠল একশ তুবড়ি! ফেটে উঠল পাঁচশ কালীপটকা!

    ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল ঘনাই। দরদর করে ঘামছে। চোখ দুটো বড় বড় আর লাল। মাথার চুলগুলো খাড়া হয়ে গেছে। এ তার কী হল!

    ফিসফিস করে আপন মনে বলল, “ছি ছি, এ আমি কী করছি? চুরি করা তো পাপ। আমি কিনা সে কাজটাই করছি? কী লজ্জা! কী লজ্জা! আজ থেকেই ওসব ছাড়লাম।”

    এই বলে চুরি করা মাল ভর্তি থলেটাকে কঁধে ফেলে ঘনাই হনহন করে থানার দিকে হাঁটতে লাগল। হাঁসদুটো আবার হেলতে দুলতে এসে বোসপুকুরে নেমে পড়ল।

    বড়বাবুর দুঃখ

    ভুবনপুর পুলিস থানার বড়বাবুর মনটা আজ সকাল থেকে বিগড়ে আছে। আসলে হয়েছে কী, গিন্নি আজ ধরে ফেলেছে যে তিনি থলে ভর্তি করে বাজার করে আনেন বটে। কিন্তু একটা কানাকড়িও খরচ করেন না। অথচ রোজ গিন্নির কাছ থেকে গুনে গুনে সাঁইত্রিশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা হাত পেতে নেন বাজার খরচ বাবদ। মুশকিলটা হল আলুওলা, বেগুনওলা, মাছওলা, ফুলকপিওয়ালা, কাঁচালঙ্কাওলা প্রত্যেকেই তাদের থানার বড়বাবুকে শ্রদ্ধা ভক্তি করে। কিছুতেই পয়সা নিতে চায় না। এখন গিন্নি কড়া হুকুম দিয়েছে, এক বছরের বাজার খরচ ফেরত দিতে হবে। সাঁইতিরিশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা ইনটু, তিনশো পয়ষট্টি! কত টাকা! বাপরে! কে তাকে শ্রদ্ধা ভক্তি করে এই টাকা এখন দেবে? এরপরেও কারোর মন ভাল থাকে? এইরকম একটা সময় ঘনাই এসে ঘরে ঢুকল। পিঠের থলেটাকে টেবিলের ওপর রাখল।

    বলল, “স্যার, আমাকে গ্রেপ্তার করুন।”

    বড়বাবু মুখটাকে এমন করেছিলেন যেন এখুনি তিনি রসগোল্লার বদলে ভুল করে গোটা কতক উচ্ছে সেদ্ধ খেয়ে ফেলেছেন। সেই ব্যাজার মুখেই বললেন, “ঘনাই ইয়ার্কি মারিসনি। মন মেজাজ আজ একেবারেই ভাল নেই। ঐ থলেতে নতুন শাড়ি টাড়ি কিছু থাকলে বউদির জন্য রেখে কেটে পড়।”

    ঘনাই এবার চেয়ারে গ্যাট হয়ে বসে বলল, “ছি ছি স্যার, ওকথা মুখে আনবেন না। আপনি পুলিশ। দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। আপনি কেন চুরির মালের ভাগ নেবেন? নাঃ আপনাকেও দেখছি একবার পুকুরে ডুব দিয়ে আনতে হবে।”

    “কী বলছিস যা-তা? সকালেই সিদ্ধি গিলেছিস নাকি! যত্তসব অ্যান্টিসোশাল এলিমেন্ট কোথাকার।”

    “না স্যার, যা-তা বলছি না। আমি কি কখনও ভুল খবর দিয়েছি? ঐ বোসবাগানের পুকুরে একবার ডুব দিয়ে দেখুন না, আপনার ভেতরকার সব খারাপ জিনিসগুলো একেবারে ধুয়ে মুছে যাবে। আমি আজই একেবারে হাতেনাতে টের পেয়েছি।”

    বড়বাবুর এবার যেন কেমন সন্দেহ হল। সত্যি তো, ঘনাই তো কখনও ভুল খবর দেয় না! অন্তত এতদিন ধরে দুজনে কাছাকাছি আছে কখনও তো ঠকায়নি। তবে? সত্যি বোসবাগানের পুকুর খারাপকে ভাল করে দিচ্ছে নাকি! “স্যার, অত ভাববেন না। নিজে পরীক্ষা করে। দেখে আসুন কথাটা সত্যি কি মিথ্যে। তার আগে সেপাইকে ডেকে আমাকে হাজতে পুরুন। আমি আত্মসমর্পণ করতে এসেছি। আমি পাপের শাস্তি পেতে চাই” বলল ঘনাই।

    বড়বাবু বললেন, “যা যা, মেলা ফ্যাচফাচ করিসনি। আমি এখনই বোসবাগানে তদন্তে যাব। গিয়ে যদি দেখি তোর কথা মিথ্যে, তাহলে তো বুঝতেই পারছিস—।”

    তিনি সেপাই শিউচরণকে ডেকে বললেন, “ঘনাইকে হাজতে পুরে দে।”

    নির্বাচিত কমিশনার

    বড়বাবুর জিপ গাড়িটা যে বাড়িটার সামনে এসে নিরাপদে দাঁড়াল সেই বাড়ির মালিক হলেন প্রিয়নাথ রায়। ভুবনপুর মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার। খুবই নামডাক আছে। গতবারের ইলেকশনে তিনি পাঁচশ সতেরো ভোটে জেতেন। তারপরই তিনি আস্তে আস্তে এই বাড়িটা তৈরি করে ফেলেছেন। বাড়ির নাম ‘কষ্ট করে’। সত্যি, বাইরে থেকে ‘কষ্ট করে’কে একেবারে কুঁড়েঘরের মতই দেখতে। ভাঙা টালির ছাদ, ঘুনধরা জানলা-দরজা, মাটির দাওয়া, বাঁশের খুঁটি। কেউ দেখা করতে এলে প্রিয়নাথবাবু এই মাটির দাওয়া বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসেন।

    ‘কষ্ট করে’র ভেতরটা কিন্তু অন্যরকম। দামি সোফা, কার্পেট, পর্দা, এয়ারকন্ডিশন মেশিন। তবে ভেতরের কথা তো সবাই জানে না। বিশেষ বিশেষ দু-একজনেরই শুধু ভেতরে ঢোকার অনুমতি আছে। বড়বাবু গাড়ি থেকে নেবে, এদিক ওদিক দেখে টুপিটা দিয়ে মুখটা ঢেকে টুক করে ভেতরে ঢুকে পড়লেন।

    প্রিয়নাথবাবু তখন বাড়ির দোতলার প্ল্যান বানাচ্ছিলেন আর মনে মনে ভাবছিলেন, “আর কতদিনই বা কমিশনার রয়েছি। পরের বারের ইলেকশনে ভোটাররা হারিয়ে দিলেই তো হয়েছে। তাই এখনই বাড়ির দোতলাটা বানিয়ে ফেলতে হবে। আর নিজের পকেটের পয়সা তো খরচ হচ্ছে না। ভুবনপুরের রাস্তা তৈরি, হাসপাতাল বানানো, দু’তলা বাড়ি মেরামতের জন্য মিউনিসিপালিটির কতই না ইঁট, বালি, চুন, সুরকি, সিমেন্ট আছে। সেখান থেকেই কিছু কিছু সরিয়ে নিতে হবে।” এই কথা ভেবে প্রিয়নাথবাবু একটা লম্বা কাগজে লিখতে শুরু করলেন: ইঁট—রাস্তার। সুরকি-স্কুলবাড়ির। সিমেন্ট— হাসপাতালের। এমন সময় বড়বাবু ঘরে ঢুকে সোফায় বসে পড়ে হাঁপাতে শুরু করলেন। কাগজটা তাড়াতাড়ি গোল্লা পাকিয়ে মুখের মধ্যে ফেলে দিয়ে পানের মত চিবোতে চিবোতে প্রিয়নাথবাবু বললেন, “পান খাবেন বড়বাবু? মিঠে পান। চুন, খয়ের, সুপুরি, দোক্তা, এলাচ, জর্দা চারশ বিশ। দেব একটা বানিয়ে?”

    “রাখুন আপনার পান।” ধমকে উঠলেন বড়বাবু। “এদিকে আমাদের প্রাণ যাওয়ার জোগাড়, আর আপনি সাতসকালে উঠে পান চিবোচ্ছেন।”

    “কেন স্যার, কী হল?”

    “ঘনাই যে খবরটা বলল, তা যদি সত্যি হয় তাহলে আমার আপনার সকলেরই প্ৰাণ নিয়ে টানাটানি হবে।”

    “এ আবার কী অলুক্ষুণে কথা বলছেন বড়বাবু? দাঁড়ান, সদর দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আসি, তারপর সবটা শুনতে হবে।” দরজা বন্ধ করে এলেন প্রিয়নাথবাবু।

    প্রিয়নাথবাবু বড়বাবুকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন। দুচোখ ফেটে জল! বড়বাবু বললেন, “আরে মশাই, আপনার তো চোখে জল আসছে। আর আমি ইতিমধ্যেই একদফা কেঁদে নিয়েছি। প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর। তবে আমার মনে হয়, এখনই আমাদের একবার গিয়ে বোসবাগানের পুকুরটা সরেজমিনে পরীক্ষা করা উচিত। ঘনাইয়ের কথা সত্যি কি না, নিজেদের দেখতে হবে। তবে এর জন্য দরকার ভালরকমের খারাপ লোক, যাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আমরা বোসবাগানের পুকুরে ফেলে দেব। তারপর দেখব সত্যি সে ভাল হয়ে যায় কি না। এরকম কাউকে আপনি চেনেন নাকি?”

    প্রিয়নাথ রায় দু’মিনিট ভাবলেন। তারপর লাফ দিয়ে উঠলেন, “ইউরেকা! পাওয়া গেছে। ব্যাটার ওপর আমার অনেক দিনের রাগ।

    এবার বদলা নেব। চলুন বড়বাবু।”

    অটলেশ্বর বাবা

    ভুবনপুর চৌমাথায় বিরাট দোকান। দোকানের মাথায় আরও বড় সাইনবোর্ড কীর্তনিয়া শ্ৰীশ্ৰীঅটলেশ্বর বাবার দোকান। পিওর জিনিস সুলভে পাওয়া যায়। শনি, রবি ফ্রি’তে কীর্তন শোনানো হয়।

    ক্যাশব্যাক্সের ঠিক পাশটিতে অটলেশ্বর বাবা বসে আছেন। কপালে চন্দনের তিলক। খালি গা। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। পরনে গেরুয়া ধুতি। চোখদুটো বোঁজা।

    মানুষটা গুণী। যেমন ভাল কীর্তন গাইতে পারেন, তেমনি ভাল জিনিসে ভেজাল মেশাতে পারেন। ধরবার উপায় নেই। ভাল কীর্তন বা কৃষ্ণ কীৰ্তন গাইতে গাইতে তিনি এক কেজি ময়দাকে ভেজাল মিশিয়ে দু’কেজি করে দেন। এক শিশি ঘি তিন শিশি হয়ে যায় স্রেফ তার হাতগুণে। ঐ শনি, রবিবার সেদিন ফ্রি’তে খদ্দেরদের কীর্তন শোনানো হয়, সেই দিনদুটোই হল ভেজাল মেশানোর দিন। এসব কথা পুলিশও জানে না। অটলেশ্বর বাবার আরও একটা শখ আছে, শখ না বলে স্বপ্ন বলাই ভাল। সেটা হল ইলেকশনে দাঁড়িয়ে প্রিয়নাথ রায়কে হারিয়ে ভুবনপুর মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার হওয়া। গতবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু হেরে গেলেন। ইচ্ছে আছে সামনের বারে আবার দাঁড়াবেন। নুড়ি-পাথর মেশানো এক ঠোঙা চিনি দাঁড়িপাল্লায় তুলতে তুলতে অটলেশ্বর গান গাইছিলেন।

    এমন সময় দোকানের সামনে এসে পুলিশের জিপটা থামল। একদিক থেকে নামলেন বড়বাবু, অন্যদিক থেকে নামলেন প্রিয়নাথবাবু। হাতজোড় করে, একগাল হাসি নিয়ে ছুটে গেলেন অটলেশ্বর বাবা। গদগদ কণ্ঠে বললেন, “দীন কুটিরে আজ কার চরণ স্পর্শ পড়ল? এ দেখছি ভগবান কৃষ্ণ অর্জুনের রথের সারথি হয়েছেন! আসুন আসুন। মরম আমার আকুল হল!”

    প্রিয়নাথবাবু বললেন, “তা ভাল কথা। কিন্তু আপনি তো এটা জানেন না যে, আমাদের বড়বাবু খুব কীর্তনের ভক্ত। উনি আপনার নাম শুনেছেন। কিন্তু গান শোনেননি। তাই ওনার অনুরোধ আপনি ওঁকে একদিন মন ভরিয়ে কীর্তন শুনিয়ে দিন।”

    অটলেশ্বর মহা ব্যস্ত হয়ে বললেন, “নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। আজই আসুন না। এখনই না হয় দু’কলি শুনিয়ে দিতাম।” এবার মুখ খুললেন বড়বাবু। বললেন, “না না। এখন নয়। আমি একা নিরিবিলিতে বসে শুনতে চাই। এই ধরুন আজ সন্ধের পরে যদি হয়? আমার গাড়ি এসে আপনাকে নিয়ে যাবে। তারপর কোথাও বসে, চাঁদের আলোয় আপনার কীর্তন শুনব। অবশ্য আপনার যদি আপত্তি না থাকে।”

    একটু ভাবলেন অটলেশ্বর। প্রস্তাবটা মন্দ নয়। এইভাবে যদি থানার বড়বাবুটাকে হাতে আনা যায়, তাহলে সামনের বারের ইলেকশনে জিততে সুবিধেই হবে। প্রিয়নাথটা দেখেছি ওকে খুব কব্জা করেছে। দাঁড়াও, মজা দেখাচ্ছি।

    রাজি হয়ে গেলেন। অটলেশ্বর বাবা।

    তারপর যা ঘটল

    পুকুরের দক্ষিণ দিকের ঘাটে সাদা ফরাস পাতা হয়েছে। সাজানো রয়েছে তিনটে তাকিয়া। খঞ্জনি, হারমোনিয়াম, তানপুরা সব রয়েছে। যে কীর্তনের সঙ্গে যেটা লাগবে। ফরাসের এককোণে ধূপধানিতে ধূপ জুলছে। বিকেল বিকেল থানা থেকে এসে সেপাই শিউচরণ সব সাজিয়ে গুছিয়ে রেখে গেছে।

    চাঁদের আলোয় আর ধূপের গন্ধে বোসবাগান জুড়ে বেশ একটা ভক্তি ভক্তি ব্যাপার এসে গেছে। অন্ধকার আর একটু গাঢ় হতেই বনবাদাড় ঠেলে খটর মটর শব্দ তুলে বড়বাবু প্রিয়নাথ রায় আর অটলেশ্বর বাবা এসে পৌঁছলেন। তিনজনে এসে ফরাসের ওপর বসলেন। অটলেশ্বর বাবা বললেন, ‘সত্যিই সুন্দর! কীর্তনের উপযুক্ত পরিবেশ! শান্ত নির্জন। সম্মুখে সরোবর। তথায় শালুক প্রস্ফুটিত! চন্দ্ৰকিরণ যেন তাঁরই মহিমা!”

    প্রিয়নাথবাবুর সঙ্গে বড়বাবুর চোখে চোখে কথা হয়ে গেল। প্রিয়নাথবাবু বললেন, “ঠিকই বলেছেন বাবাজী, তবে আজ বড় গরম। এখন যদি একটু স্নান করতে পারতাম, তাহলে বোধহয় কীর্তনের আসরটা আরও মধুর হত। কী বলেন বড়বাবু?”

    বড়বাবুর মুখে যেন উত্তরটা ঝুলছিল। বললেন, “ঠিক কথা। তা সে আর অসুবিধের কী আছে? আসুন না, সবাই মিলে পুকুরে একটা করে ডুব দিয়ে নিই? জলটা তো দেখে মনে হচ্ছে চমৎকার। কী বাবাজী, আপনি কী বলেন?”

    এতক্ষণ খঞ্জনিতে টুংটুং আওয়াজ তুলছিলেন আর চোখ বুজে ঘাড় নাড়াচ্ছিলেন অটলেশ্বর। বড়বাবুর পুকুরে ডুব দেওয়ার প্রস্তাব শুনে খঞ্জনি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এবার তিনি দাঁড়িয়ে উঠলেন। কোথায় গেল সেই একগাল হাসি আর গদগদ ভাব? রাগে যেন চোখ দুটো জ্বলছে! কোমরে হাত দিয়ে বললেন, “‘বলি ব্যাপারটা কী? আমি কী কিছু জানি না? আপনার শিউচরণ কীৰ্তন শুনতে এসে আমাকে সব বলে দিয়েছে। ঘনাই চোরের আজ কতটা দুৰ্দশা হয়েছে আমার জানা নেই ভেবেছেন? আমি ভাল হয়ে গেলে আমার ব্যবসা যে লাটে উঠবে। সেকথা আপনারা জানেন? বুঝেছি, কীর্তন শুনব বলে নিয়ে এসে আমাকে ‘ভাল’ বানানোর ফাঁদ পাতা হয়েছে?”

    বড়বাবু খপ করে বেল্ট থেকে রিভলবারটা খুলে বাবাজীর দিকে তাক করে বললেন, “অতশত জানি না, আপনাকে পুকুরে ডুব দিতেই হবে। আমি পুলিশ। আমার হুকুম আপনাকে মানতে হবে। আমি দেখতে চাই ঘনাইয়ের কথা সত্যি না মিথ্যে।”

    এদিকে রিভলবার দেখে প্রিয়নাথবাবু বেজায় ঘাবড়ে গেলেন। তিনি তানপুরাটা বন্দুকের নলের মত অটলেশ্বর বাবার দিকে বাগিয়ে ধরে একটা গাছের আড়ালে সরে যেতে লাগলেন, “ঠিক কথা। পুকুরে নামতে হবে। খারাপ থাকা বের করে দেব। আমার বিরুদ্ধে যখন ইলেকশনে দাঁড়িয়েছিলেন তখন মনে ছিল না? অ্যান্টিসোশ্যাল এলিমেন্ট কোথাকার।”

    অটলেশ্বর বাবারও এখন করার কিছু নেই। সামনে রিভলবারের নল, পেছনে তানপুরা। পালাবার পথ নেই। তার ধুতির কোঁচা খুলে গেছে। রাগে মাথার চুলগুলোও খাড়া হয়ে গেছে। “ইস! ব্যাটা প্রিয়নাথের কাছে কিনা শেষপর্যন্ত এতটাই ঠকতে হল?” ভাবতে ভাবতে দু’হাত তুলে গুটি গুটি পায়ে পুকুরের দিকে এগোতে লাগলেন তিনি।

    হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। বললেন, “বড়বাবু, ভাল যখন হতেই হচ্ছে, তখন শেষ একটা ইচ্ছেপূরণ করতে দেবেন?”

    বড়বাবু রিভলবার নাচাতে নাচাতে বললেন, “এটা পুলিশের এথিক্স। ফাঁসি দেওয়ার আগে আমরা অপরাধীর শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে দিই। আপনার কী ইচ্ছে চটপট বলে ফেলুন।”

    “আমি হারমোনিয়াম বাজিয়ে কীৰ্তন গাইতে গাইতে পুকুরে ডুব দিতে চাই।”

    “ঠিক আছে, রাজি।”

    অটলেশ্বর গদগদ মুখে হারমোনিয়ামটা গলায় ঝুলিয়ে গান গাইতে গাইতে ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলেন। ঠিক শেষ সিঁড়িতে পৌঁছেই সটান ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি। দু’হাত দিয়ে হারমোনিয়ামটা ছুড়ে মারলেন বড়বাবুর দিকে। বড়বাবু কিছু বুঝতে না পেরে রিভলবারের নলটা আকাশের দিকে করে ট্রিগারটা দিলেন টিপে। গুড়ুম! তারপরই হারমোনিয়ামের আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে দিলেন এক লাফ। গিয়ে পড়লেন অটলেশ্বরের কাঁধে! দু’জনেই ঝপাং করে পড়লেন একদম পুকুরে।

    মজা দেখবেন বলে আগে থেকেই প্রিয়নাথবাবু গাছের ডালে উঠে বসেছিলেন। গুলির শব্দে তিনিও চমকে গিয়ে ডাল ভেঙে পাতাটাতা নিয়ে একদম পুকুরের জলে এসে পড়লেন। হাঁচোর প্যাচোর করতে করতে তিনজন যখন পুকুর থেকে উঠে এলেন, তখন সে এক দেখবার মত দৃশ্য। বড়বাবুর মাথার টুপি অটলেশ্বর বাবার মাথায়, অটলেশ্বর বাবার রুদ্রাক্ষের মালা প্রিয়নাথ রায়ের কপালে। তিনজনেরই গা থেকে জল করছে।

    একদম শেষে

    ভুবনপুর পুলিশ থানার বড়বাবুর দাপটের কথা তখন আশেপাশের এলাকার মানুষও জানেন। বড়বাবুর ভয়ে ভুবনপুরে চুরি ডাকাতি একদম বন্ধ। এখন কেউ আর ভয় দেখিয়ে বাজারে মাছওলার কাছ থেকে মাছটা, আলুওলার কাছ থেকে আলুটা জোর জবরদস্তি নিতে পারে না। তেমনি কাজ করছেন বটে ভুবনপুর মিউনিসিপ্যালিটির নির্বাচিত কমিশনার প্ৰিয়নাথ রায়। রাস্তা তৈরির কাজ শেষ, হাসপাতাল বানানোর কাজ চলছে, স্কুল বাড়িটারও মেরামত হয়ে গেছে। আর প্রিয়নাথবাবু নিজের বাড়িটা মিউনিসিপ্যালিটির নামে লিখে দিয়েছেন। সেখানে একটা লাইব্রেরি হচ্ছে। ওহো! ‘কীৰ্তনিয়া শ্ৰীশ্ৰীঅটলেশ্বর বাবার দোকান’-এর কথা তো বলাই হল না। ভূবনপুরে খাঁটি জিনিস কম দামে পেতে হলে, ঐ দোকানেই এখন যেতে হবে। গরিব মানুষকে উনি ধারেও জিনিস দেন। আর হ্যা, গত কয়েকদিন হল শনি রবিবার বিকেলে উনি ফ্রি’তে কীর্তন শেখাচ্ছেন। প্রথম মাসে কালী কীর্তন, পরের মাসে শ্ৰীকৃষ্ণ কীৰ্তন।

    আর বোসবাগানের আশ্চর্য পুকুর? সেই একইরকম আছে। টলটলে চমৎকার জল। শান্ত। নির্জন। বোসবাগানে যেতে কোনও ঝামেলা নেই। এই তো সকালবেলার ট্রেনে উঠে–।

    ⌘ সমাপ্ত ⌘

  • আল-কুরআনের শিক্ষা

    আল-কুরআনের শিক্ষা

    আল-কুরআ’নের শিক্ষা, উর্দু ভাষায় লিখিত তাফহীমুস্‌ সুন্নাহ সিরিজের ২২তম সংখ্যা। মূল লেখক মুহাম্মদ ইকবাল কীলানী, বাংলায় অনুবাদ করেছেন আবুদুল্লাহিল হাদী মুহাম্মদ ইউসুফ। গ্রন্থটির প্রকাশ করেছে ‘মাকতাবা বাইতুস্‌সালাম’, রিয়াদ সাউদী আরব।

    আল-কুরআনের শিক্ষা : বিষয় সূচী।

  • অনুবাদকের আরয

    অনুবাদকের আরয

    সমস্ত প্রশংসা সেই মহান আল্লাহ্ তা’য়ালার জন্য যিনি মহাগ্রন্ত আল-ক়োরআ’নকে মানব জাতির জন্য পথ প্রদর্শক হিসেবে অবতীর্ণ করেছেন, আর অসংখ্য দরূদ ও সালাম বর্ষিত বর্ষিত হোক ঐ মহামানবের প্রতি যার চরিত্র ছিল ক়োরআ’নের বাস্তব নমুনা। মূলতঃ আল-ক়োরআ’ন মানব জাতির জন্য একটি সংবিধান এবং তাদের মুক্তির দিশারী, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, এই আল-ক়োরআ’ন আজ বহু মুসলমানের নিকট শুধু একটি ধর্মীয় গ্রন্থ মাত্র, তাই তারা সময়ে সুযোগে আচার অনুষ্ঠানে বরকত স্বরূপ তা তেলাওয়াত করে থাকে। অথচ বাস্তবতা হল এই যে, এই মহাগ্রন্থকে আমলে এনে ইতিহাস স্বীকৃত জাহেলিয়াতের যুগের লোকেরা মহামানব মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ও সাল্লামের) স্বীকৃত সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিল, এমন কি এই ক়োরআ’ন অবতীর্ণের পনেরশ বছর পরেও বহু অমুসলিম এই আল-ক়োরআ’ন গবেষণা করে তাঁর সত্যতায় অভিভূত হয়ে শান্তির দ্বীন ইসলাম গ্রহণে নিজেকে ধন্য করছে, অথচ আমাদের অনেক মুসলমান আজ এই আল-ক়োরআ’নকে যথাযথভাবে আমলে না আনার কারণে তারা তাঁর যথাযথ সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

    উর্দুভাষী সুলেখক জনাব ইকবাল কীলানী সাহেব তাঁর লিখিত ‘তালিমাত ক়োরআ’ন মাজীদ’ নামক গ্রন্থে আল-ক়োরআ’নের বিভিন্ন বিষয়সমূহকে দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে সুন্দর ভাবে আলোচনা করেছেন যা পাঠে একজন মানুষ আল-ক়োরআ’নের শিক্ষণীয় বিষয় সমূহকে সহজে বুঝতে পারবে এবং আল-ক়োরআ’ন অনুযায়ী জীবন গঠনে আগ্রহী হবে।

    আর এই মূল্যবান গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদের দায়িত্ব আমি নগন্যের উপর অর্পিত হলে, একাজে আমার কাঁচা হাত হওয়া সত্বেও আমি তার অনুবাদের কাজ শুরু করি এই আশায় যে, এই গ্রন্থ পাঠে বাংলাভাষী মুসলমান মহাগ্রন্থ আল-ক়োরআ’ন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান আহরণ করে যথাযথ আমলের মাধ্যমে তারা তাদের ইহকাল এবং পরকালে উপকৃত হবে, আর এই উসীলায় মহান আল্লাহ্ এই গোনাহগারের প্রতি সদয় হয়ে তাকে ক্ষমা করবেন।

    পরিশেষে সুহৃদ পাঠকবর্গের প্রতি এই আবেদন থাকল যে, এই গ্রন্থ পাঠান্তে কোন প্রকার ভুলভ্রান্তি তাদের দৃষ্টিগোচর হলে, আর তারা তা আমাকে অবগত করালে আমি পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধন করার জন্য চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ্।

    ১৪/০৭/২০১০

    পি. ও. বক্স -৭৮৯৭ (৮২০)

    রিয়াদ – ১১১৫৯, কে. এস. এ.

    ফকীর ইলা আফভী রাব্বিহি

    আবদুল্লাহিল হাদী মু. ইউসুফ

    মোবাইল : ০৫০৪১৭৮৬৪৪

  • আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষারত

    আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষারত

    إِنِّي مَعَكُمْ مِنَ الْمُنْتَظِرِينَ ٧١

     “তোমরা অপেক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমানদের অন্তর্ভুক্ত।” — (সূরা আ’রাফ-৭১)

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের জন্য, আমরা তাঁর প্রশংসা করছি তাঁর নিকট সাহায্য চাচ্ছি, তাঁর নিকট আমাদের পাপসমূহের জন্য ক্ষমা চাচ্ছি, নিজের মনের কুপ্রবঞ্চনা এবং নিজের অপকর্মসমূহ থেকে আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যাকে আল্লাহ্ হেদায়েত দেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারবে না, আর যাকে আল্লাহ্ পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ হেদায়েত দিতে পারে না। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত সত্য কোন মা’বুদ নেই, তিনি এক তাঁর কোন শরীক নেই, আর আমি আরও সাক্ষী দিচ্ছি মুহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দা এবং রাসূল।

    অতঃপর আল্লাহ্‌র বাণী:

    الر ۚ كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَىٰ صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ

    অর্থ: “এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে বের করে আনেন, পরাক্রান্ত, প্রশংসার যোগ্য পালনকর্তার নির্দেশে তাঁরই পথের দিকে।” (সূরা ইবরাহীম-১)

    অতএব আল্লাহ্‌র নাযিলকৃত কুরআ’ন মাজীদের সমস্ত বিধি-বিধান অন্ধকার থেকে বের কারী এবং আলো দানকারী, বা আলোকিত চিন্তা দানকারী।

    অতএব, হে আমাদের রব আমরা একথার প্রতি ঈমান রাখি যে,

    • পর্দার বিধান একটি আলোকিত চিন্তা (সূরা আহযাব-৫৩)
    • পুরুষদেরকে নারীদের উপর কর্তৃত্ব দেয়া একটি আলোকিত চিন্তা (সূরা নিসা-৩৪)
    • ইসলামী দণ্ডবিধি আইনের প্রতি আমল করা একটি আলোকিত চিন্তা (সূরা মায়েদা-৩৩, সূরা নূর-২,৪)
    • একাধিক বিয়ে করার বিধান আলোকিত চিন্তা (সূরা নিসা-৩৩)
    • হত্যার বদলে হত্যা একটি আলোকিত চিন্তা (সূরা বাকারা-১৭৮)
    • ইহুদী নাসারাদের সাথে বন্ধুত্ব না রাখার বিধান একটি আলোকিত বিধান (সূরা নিসা-১৪৪)
    • ইসলামের শত্রু কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বিধান একটি আলোকিত চিন্তা (সূরা আনফাল-৬০)
    • গান-বাজনা হারাম হওয়ার বিধান আলোকিত চিন্তা (সূরা লোকমান-৬,৭)
    • দাড়ি রাখার বিধান একটি আলোকিত চিন্তা (সূরা ত়-হ়া-৯৪)

    ধর্ম নিরপেক্ষতার পতাকাবাহীরা! বাক স্বাধীনতার পক্ষাবলম্বীগণ! তোমাদের নিকট —

    • পর্দার বিধান পশ্চাদপদতার আলামত।
    • পুরুষদের নারীর উপর কর্তৃত্ববান করার বিধান নারী স্বাধীনতা বিরোধী।
    • ইসলামী দণ্ড বিধি আইন অমানবিক এবং অত্যাচারমূলক শাস্তি।
    • একাধিক বিয়ে করার বিধান নারীদের প্রতি যুলুম করা।
    • হত্যার বদলা হত্যা মানবতা বিরোধী।
    • ইহুদী নাসারাদের সাথে বন্ধুত্ব সম্মান ও আত্মতৃপ্তি।
    • কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সন্ত্রাসবাদ।
    • গান বাজনা মনের প্রশান্তি।
    • দাড়ি রাখা পশ্চাদপদতা।

    নিঃসন্দেহে আমাদের এবং তোমাদের মাঝে এ দ্বন্ধের সমাধান খুব শীঘ্রই হবে, যখন সূর্য এক মাইল দূরত্বে অবস্থান করবে, পৃথিবী আগুনের ন্যায় উত্তপ্ত হবে, আর প্রত্যেক মানুষ ঘামের মাঝে হাবুডুবু খাবে।

    • তোমরাও খালি পা এবং উলঙ্গ শরীরে থাকবে এবং আমরাও খালি পা ও উলঙ্গ শরীরে থাকব।
    • তোমরাও আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াবে এবং আমরাও আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াব।
    • তোমাদের কাছেও কোন অনুবাদক থাকবে না, আর আমাদের কাছেও কোন অনুবাদক থাকবে না।
    • তোমাদের কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না এবং আমাদেরও কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না।
    • তোমরাও কোন বেচাকেনা করতে পারবে না আর আমরাও না।
    • রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তোমাদের কাছেও থাকবে না এবং আমাদের কাছেও থাকবে না।
    • আদালত স্থাপিত হবে।
    • আল্লাহ্ তা’য়ালা তাঁর আসনে আসীন হবেন।
    • ফেরেশ্‌তাগণ সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত হবে।
    • নবীগণের সর্দার, নবীগণের ইমাম, সত্যবাদী, সম্মানিত, অনুগ্রহ পরায়ন, বিশ্বস্ত রাসূল মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাক্ষ্য হবেন।
    • মামলা পেশ হবে … … এবং এরপরে!
    • আলোকিত চিন্তাধারার ধারক ও বাহক এবং পশ্চাদমুখী চিন্তাধারার ধারক ও বাহকদের মাঝে যথাযথ ফায়সালা করা হবে।
    • ফায়সালার পর তোমরা তোমাদের রাস্তা অবলম্বন করবে, আর আমরা আমাদের রাস্তা অবলম্বন করব।
    • অতএব ফাসসালার সময় আসা পর্যন্ত তোমরাও অপেক্ষা করতে থাক, আর আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষা করতে থাকি।

    إِنِّي مَعَكُمْ مِنَ الْمُنْتَظِرِينَ ٧١

     “তোমরা অপেক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমানদের অন্তর্ভুক্ত।” — (সূরা আ’রাফ-৭১)

    وصلى الله على نبينا محمد صلى الله عليه وسلم وآله واصحابه اجمعين

  • লেখকের আরয

    লেখকের আরয

    بسم الله الرحمن الرحيم

    الحمد الله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، والعاقبة للمتقين، اما بعد!

    কোরআ’ন অবতীর্ণের পূর্বে আরবের সামাজিক অবস্থা, সামাজিকতা, চারিত্রিক, রাজনৈতিক, সর্বদিক থেকে অন্ধকার এবং বর্বরতার অতলতলে নিমজ্জিত ছিল। সর্বত্র শিরক, মূর্তিপুজার সয়লাভ ছিল, মানুষ একে অপরের রক্ত পিপাসু এবং একে অপরের সম্পদ ও সম্মান লুণ্ঠনে ব্যস্ত ছিল, প্রতিশোধের বদলে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য যুগ যুগ ধরে যুদ্ধ চলত, কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত প্রথিতকরণ সাধারণ বিষয় ছিল। অসংখ্য নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করাকে গৌরবের বিষয় মনে করা হত। মদপান, জুয়া, ব্যভিচার তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল। উলঙ্গপনার অবস্থা ছিল এই যে, নারী ও পুরুষরা উলঙ্গ হয়ে বাইতুল্লাহ (কাবা ঘরের) ত্বাওয়াফ করাকে সওয়াবের কাজ বলে মনে করত। গরীব, মিসকীন, বিধবা, ইয়াতীমদের দেখার মত কেউ ছিল না। এমতাবস্থায় যখন কোরআ’ন অবতীর্ণ হল তখন মাত্র কয়েক বছরের অল্প সময়ে কোরআ’নের শিক্ষা আশ্চর্যজনক ভাবে আরবদের এদৃশ্য পট পরিবর্তন করে দিল, মাওলানা আলতাফ হোসাইন হালী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

    ঐটা কি বিজলীর গর্জন না মহান পথ প্রদর্শকের আওয়াজ ছিল

    যা আরব ভূমিকে পরিপূর্ণরূপে পরিবর্তন করে দিয়েছিল।

    যে সমস্ত লোকেরা নিজের কন্যা সন্তানকে জীবন্ত প্রথিতকরণকে সাধারণ কিছু বলে মনে করত, স্বয়ং তারা রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) খেদমতে উপস্থিত হয়ে তাদের অপরাধ স্বীকার করে তাদের কৃতকর্মের জন্য নয়নাশ্রু ঝরাচ্ছিল, এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে আবেদন করল হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমার এক মেয়ে ছিল যে আমার নিকট অত্যন্ত আদরের ছিল, আমি তাকে ডাকলে সে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আমার নিকট আসত, একদিন আমি তাকে ডাকলাম এবং সাথে নিয়ে চললাম, পথিমধ্যে একটি কুয়া পেয়ে আমি তাকে সেখানে নিক্ষেপ করলাম, তার সর্বশেষ আওয়াজ আমার কানে আসছিল আর সে বলতে ছিল ‘ও আব্বা ও আব্বা’। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) নয়নাশ্রু ঝরাতে লাগলেন, লোকেরা ঐ ব্যক্তিকে কথা বলতে নিষেধ করতে চাইল, তিনি বললেন: তাকে বাধা দিওনা, যে বিষয় সম্পর্কে তার জানার যথেষ্ট অনুভুতি আছে, তাকে সে বিষয়ে প্রশ্ন করতে দাও। ঘটনা শোনার পর তিনি বললেন: জাহেলিয়াতের যুগে যা কিছু হয়েছে ইসলাম গ্রহণ করার ফলে আল্লাহ্ তা ক্ষমা করে দিয়েছেন, এখন নুতন করে জীবন যাপন শুরু কর। (দারেমী)।

    ঐ ব্যক্তি যে ধন-সম্পদের জন্য ডাকাতি করত, লুটপাট করত, কোরআ’নের শিক্ষা তাকে পৃথিবীর ধন-সম্পদের লোভ থেকে এত অনাগ্রহী করেছে যে, ধন-সম্পদের চেয়ে তুচ্ছ আর কোনকিছু তার কাছে ছিল না! একদা ত্বালহা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তার ঘরে আসল, চেহারায় চিন্তার ছাপ স্পষ্ট ছিল, স্ত্রী এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে সে উত্তরে বলল: আমার নিকট কিছু সম্পদ জমা হয়ে গেছে এজন্য আমি চিন্তা করছি, স্ত্রী বলল: তাতে চিন্তিত হওয়ার কি আছে? স্বামী-স্ত্রী পরামর্শ করে লোকদেরকে ডেকে আনল এবং ত্বালহা তার জমাকৃত সম্পদ চার লক্ষ দিরহাম লোকদের মাঝে বণ্টন করে দিল। (ত্বাবারানী)।

    ঐ সমস্ত লোক যারা দিন-রাত মদ, পানির মত ব্যবহার করত তারা মদ হারাম হওয়ার বিধান অবতীর্ণ হলে (সূরা মায়েদা-৯০) এমনভাবে মদ পরিহার করল যেন মদের ব্যাপারে তাদের কোন ধারণাই ছিল না।

    বুরাইদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর পিতা বলেন: “আমরা একটি টিলার উপর বসে মদ পান করছিলাম, ওখান থেকে আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হলাম, তখন মদ হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হল, আমি দ্রুত ফিরে এসে আমার সাথীদেরকে আয়াতটি শোনালাম, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ মদ পান করা শেষ করেছিল আবার কেউ পেয়ালা মুখে লাগিয়ে মদ পান করছিল, কেউ হাতে পেয়ালা ধরে ছিল, আমার আওয়াজ শোনামাত্র সবাই মদের পেয়ালা মাটিতে ঢেলে দিল, আর যখন আমি আয়াতের শেষ অংশ অর্থাৎ—

    অর্থ: “তোমরা কি মদ পান করা থেকে বিরত থাকবে?” সবাই সমস্বরে বলে উঠল:

    অর্থ: হে আমাদের রব আমরা বিরত থাকলাম। (ইবনু কাসীর)

    ঐ সমাজ যেখানে উলঙ্গপনা এবং বেহায়াপনার সয়লাভ চলছিল, একজন নারীকে দশ দশজন পুরুষের সাথে সম্পর্ক রাখা বৈধ বিয়ের মর্যাদা ছিল, সেখানে কোরআ’নের শিক্ষা নারীদের মধ্যে এত লজ্জাবোধের অনুভুতি সৃষ্টি করতে পেরেছিল যে, যখন কোরআ’নে পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হল তখন যে সমস্ত নারীদের কাছে পর্দা করার মত কাপড় ছিল না তারা তাদের পরিধানের কাপড় ছিড়ে উড়না বানিয়েছিল।

    আয়শা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন: আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেন ঐ সমস্ত নারীদের প্রতি যারা—

    وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ ۖ

    অর্থ: “এবং তারা যেন তাদের মাথার উড়না তাদের বক্ষদেশে ফেলে রাখে।” (সূরা নূর-৩১)—

    এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়া মাত্রই তারা তাদের পরিধানের বস্ত্র ছিড়ে তা দিয়ে উড়না বানিয়েছিল। (বোখারী)

    কোরআ’ন মাজীদ বান্দাদেরকে তাদের রবের সাথে এত গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে তুলেছে যে, তার সামনে পৃথিবীর বড় বড় নে’মতসমূহও সাধারণ এবং মূল্যহীন মনে হয়েছে।

    আবু ত্বলহা নিজের আঙ্গুর এবং খেজুরের সুন্দর সাজানো ঘন সবুজ বাগানে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করছিল, নামাযরত অবস্থায় মন আল্লাহর দিক থেকে ফিরে বাগানের দিকে চলে আসল এবং সে ভুলে গেল যে কত রাকাত নামায আদায় করেছে, আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এতটুকু বাধা হওয়ার রাগে নামায শেষ করেই রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) নিকট আসল এবং আবেদন করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ এ বাগান আমাকে নামাযের সময় আল্লাহর দিক থেকে অন্যমনস্ক করে দিয়েছে, তাই আমি তা দান করে দিলাম তা আপনি যেখানে খুশী সেখানে ব্যবহার করুন।

    ঐ সমাজ যেখানে মানুষের মধ্যে পরকালের জওয়াবদিহিতা এবং আল্লাহর ভয় থেকে পরিপূর্ণরূপে গাফেল করে দিয়েছিল, তাদেরকে সর্বপ্রকার পাপকাজে নিমজ্জিত করে দিয়েছিল, কোরআ’নের শিক্ষা তাদের অন্তরে পরকালের এতটা ভয় সৃষ্টি করেছিল যে, তারা প্রতি মুহূর্তে পরকালকেই অগ্রাধিকার দিত। মায়েয বিন মালেক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে নিজে স্বীকার করল যে, সে পাপে লিপ্ত হয়েছে এবং তাকে ঐ পাপ থেকে মুক্ত করা হোক। তিনি মায়েয রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তার পাপের কথা স্বীকার করা সত্বেও কিছু প্রশ্ন করে তাকে তার অবস্থান থেকে হটাতে চাইলেন, কিন্তু মায়েয (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নাছোড়বান্দার ন্যায় বলতে লাগল যে, আমাকে এ পাপ থেকে মুক্ত করুন। তাই তিনি রায় দিলেন এবং মায়েয (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে পাথর মেরে হত্যার মাধ্যমে শাস্তি কার্যকর করা হল। (মুসলিম)।

    যে সমাজে নিকট আত্মীয়দের মৃত্যুতে মৃতদের জন্য মাতাম করা, চেহারা ক্ষত করা, উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করা, বছর কি বছর ধরে শোক পালন করা, গৌরবের বিষয় মনে করা হত, ঐ সমাজের এক একজন ব্যক্তি এমন ধৈর্য এবং নিয়মানুবর্তীতায় অভ্যস্ত হল যে, পুরুষ তো বটেই এমনকি নারীরাও ধৈর্যের দৃষ্টান্ত হয়ে গেল।

    উম্মে আতীয়া বাসরায় স্বীয় ছেলের অসুস্থতার কথা মদীনায় বসে জানতে পারলেন, তাই তিনি বাসরা সফর করার দৃঢ় সংকল্প করলেন, বাসরা পৌঁছে তিনি জানতে পারলেন যে, দুদিন পূর্বে তার ছেলে মৃত্যুবরণ করেছে, উম্মে আতীয়া দুঃখ ভরাক্রান্ত হৃদয় হলেন বটে, কিন্তু মুখ দিয়ে শুধু বলছিলেন ‘ইন্না লিল্লাহ্ ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’, এটা ব্যতীত তার মুখ দিয়ে অন্য আর কোন শব্দ বের হয় নাই।

    এরপর চতুর্থ দিন আতর তলব করে তা ব্যবহার করলেন এবং বললেন: রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বামী ব্যতীত অন্য কারো মৃত্যুতে তিন দিনের অধিক শোক পালন করতে নিষেধ করেছেন।

    যে সমাজে নারীর মর্যাদা বা সম্রমের কোন লেশমাত্রও ছিল না, কোরআনের শিক্ষা পুরুষদের অন্তরে এমন পরিবর্তন এনে দিয়েছিল যে, তারা নিজেরাই নারীর সম্মান এবং সম্ভ্রমের রক্ষক হয়ে গেল, এক মহিলা মসজিদ থেকে বের হচ্ছিল, আবু হুরাইরা অনুভব করল যে, সে সুগন্ধি ব্যবহার করেছে, আবু হুরাইরা মহিলাকে ওখানে থামিয়ে জিজ্ঞেস করল— হে আল্লাহর বান্দী তুমি কি মসজিদে যাচ্ছ? সে বলল: হাঁ। আবু হুরাইরা বলল: আমি আমার প্রিয় নবী আবুল কাসেম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন: যে নারী মসজিদে সুগন্ধি ব্যবহার করে আসে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার নামায কবুল হবে না যতক্ষণ না সে তার ঘরে ফিরে গিয়ে গোসল করে আসে। (আহমদ)

    ঐ লোকেরা যারা সর্বদা একে অপরের রক্ত পিপাসু ছিল, যাদের নিকট মানবাত্মার কোন মূল্য ছিল না, কিতাব ও সুন্নাতের শিক্ষা তাদেরকে শুধু নিজেদেরই নয় বরং অন্যদের জীবন রক্ষক বানিয়ে দিয়েছে।

    খোবাইব আনসারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে তার বংশের লোকেরা ধোঁকায় ফেলে গ্রেপ্তার করে মক্কার মোশরেকদের নিকট বিক্রি করে দিয়েছিল, মোশরেকরা তার কাছ থেকে বদরের যুদ্ধে নিহতদের বদলা নিতে চাচ্ছিল, সেটা ছিল যুদ্ধ বিগ্রহ নিষিদ্ধ মাস, তাই তারা তাকে হত্যা করার সময় পিছিয়ে দিল, আর খোবাইব আনসারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে বেড়ি পরিধান করে এক ঘরে বন্দী করে রাখল, নিষিদ্ধ মাস শেষ হয়ে গেলে মক্কার কোরাইশরা খোবাইব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে হত্যার তারিখ নির্ধারণ করল। খোবাইব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নিহত হওয়ার আগে পবিত্র হওয়ার জন্য বন্দীশলার কর্তার নিকট ক্ষুর চাইল, কর্তা তার কম বয়সী বাচ্চার মাধ্যমে ক্ষুর দিয়ে পাঠাল। কিন্তু পরে সে চিন্তায় পড়ে গেল যে, আমি কি বোকামী করলাম, হত্যার আসামীর নিকট নিজের সন্তানের হাতে ক্ষুর দিয়ে পাঠালাম। কর্তা পেরেশান অবস্থায় দৌঁড়ে আসল এবং দেখল খোবাইব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ক্ষুর হাতে নিয়ে বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করছে, হে ছেলে তোমার মা তোমার হাতে ক্ষুর পাঠানোর সময় আমাকে ভয় করে নাই? কর্তা সাথে সাথে ঐ পেরেশান অবস্থায় বলে উঠল, হে খোবাইব আমি এ বাচ্চা তোমার নিকটে আল্লাহ্‌র নিরাপত্তায় পাঠিয়েছি, খোবাইব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বাচ্চার মায়ের চিন্তা দূর করার জন্য বলল: চিন্তা করবে না, আমি এ নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করব না, আমাদের ধর্মে অত্যাচার, ওয়াদা ভঙ্গ করা জায়েজ নয়। যে ব্যক্তিকে আগামী দিন অন্যায়ভাবে নিহত হতে হবে, সে নিজেই কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা ঠিক মনে করে নাই। ঐ সমস্ত লোক যারা জাহেলিয়াতের যুগে হালাল ও হারামের মধ্যে কোন পার্থক্য করত না, কোরআ’নের শিক্ষা তাদেরকে আমানতদারী এবং ধার্মিকতার এমন স্তরে নিয়ে এসেছে যে, কারো কাছ থেকে একটি পয়সা হারাম ভাবে নেওয়া তারা মোটেও পছন্দ করত না। সা’দ বিন ওবাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন বংশের কাছ থেকে যাকাত আদায়ের দায়িত্ব দিলেন এবং সাথে সাথে এ উপদেশ দিলেন যে, দেখ! কিয়ামতের দিন যেন এমন না হয় যে, তোমার কাঁধে বা পিঠে যাকাতের উঠ চিল্লাতে থাকে। সা’দ বিন উবাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলল: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ আমি এধরণের দায়িত্ব থেকে অবসর চাচ্ছি। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার স্থলে অন্য একজনকে দায়িত্ব দিলেন। (ত্বাবরানী)।

    যে সমাজে ব্যক্তি স্বার্থ, নির্দয় আচরণ, লুটপাট সাধারণ বিষয় ছিল, কিতাব ও সুন্নাতের শিক্ষা তাদেরকে অল্প কয়েক বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে সমবেদনা পরায়ণ, একে অপরের কল্যাণকামী, আত্মত্যাগী করে তুলেছিল।

    ইয়ারমুকের যুদ্ধে কতিপয় সাহাবা প্রচণ্ড গরমের তাপে আহত অবস্থায় পিপাসায় কাতরছিল, ইতিমধ্যে একজন মুসলমান পানি নিয়ে আসল এবং আহতদেরকে তা পান করাতে চাইল, তাদের প্রথম ব্যক্তি বলল, দ্বিতীয় ব্যক্তিকে পানি পান করাও। যখন দ্বিতীয় ব্যক্তিকে পানি পান করাতে গেল তখন সে বলল, তৃতীয় জনকে পানি পান করাও। পানি পরিবেশনকারী তখনও তৃতীয় জনের নিকট পৌঁছে নাই, এতিমধ্যেই প্রথম ব্যক্তি শহিদ হয়ে গেছেন, তখন সে দ্বিতীয় জনের নিকট আসল, ততক্ষণে সেও তার মালিকের ডাকে সাড়া যুগিয়েছে, আর যখন তৃতীয় জনের নিকট পৌঁছল, তখন সেও পানি পান না করে শাহাদাতবরণ করেছে। (ইবনু কাসীর)

    মূল বিষয় হল এই যে, কোরআ’ন মাজীদ অত্যন্ত অল্প সময়ে একত্ববাদের বিশ্বাসের সাথে সাথে মানুষের চরিত্র এবং কর্মের দিক থেকে এমন এক উন্নতমানের মানুষ তৈরী করেছে, ইতিহাসে যার কোন তুলনা নেই, শুধু এতটুকু বুঝে নিন যে কোরআন মাজীদ ২৩ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে কয়লাকে স্বর্ণে পরিণত করেছে।

    আল্লাহ্ তা’য়ালা কোরআ’ন অবতীর্ণের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন—

    الر ۚ كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَىٰ صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ ١

    অর্থ— “এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি অবতীর্ণ করেছি আপনার প্রতি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে বের করে নিয়ে আসেন, পরাক্রান্ত প্রশংসার যোগ্য পালনকর্তার নির্দেশে তারই পথের দিকে। (সূরা ইবরাহীম-১) ।

    সুরা ইবরাহীমের উল্লেখিত আয়াত থেকে নিন্মোক্ত দু’টি বিষয় স্পষ্ট হয়—

    1. কোরআনের শিক্ষাই মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনার ক্ষমতা রাখে, বা অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে, মানুষকে অন্ধকারচ্ছন্ন চিন্তা চেতনা থেকে আলোকিত চিন্তা চেতনার পথে আনতে পারে।
    2. কোরআ’ন অবতীর্ণের আগে সমস্ত জাহেলী কর্মকাণ্ড যেমন— শির্‌ক, কুফর, মদ, জুয়া, ব্যভিচার, খারাপকাজ, উলঙ্গপনা, পর্দাহীনতা, বেহায়াপনা, গানবাজনা, রক্তপাত, মিথ্যা, ধোঁকাবাজি, চক্রান্ত, চুরি, ডাকাতি, লুটপাট, মারামারি ইত্যাদিকে আল্লাহ্ অন্ধকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অথচ কোরআন অবতীর্ণের পরে উল্লেখিত পাপকাজসমূহ থেকে পাক পবিত্র হয়ে তাওহীদে (একত্ববাদে) বিশ্বাসী হয়ে নামায, রোযা, যাকাত, হজ্ব, আমানতদারী, ধর্মভীরুতা, সত্যবাদীতা, সহনশীলতা, কল্যাণকামিতা, আত্মত্যাগ, নেকী, আল্লাহভীতি, সততা, লজ্জাশীলতা, পর্দা ইত্যাদির ন্যায় উন্নত গুণাবলীকে আল্লাহ্ তা’য়ালা আলো বলে আখ্যায়িত করেছেন।

    অতএব আলো এবং আলোকিত চিন্তা চেতনা শুধু তাই যা আল্লাহ তা’য়ালা আলো বলে আখ্যায়িত করেছেন, যদি সমস্ত পৃথিবীও ঐ আলোকে অন্ধকার বলে আখ্যায়িত করতে থাকে, তবুও তা আলো হিসেবেই থাকবে, অন্ধকার বলে বিবেচিত হবে না; আর যাকে আল্লাহ্ অন্ধকার বলেছেন তা অন্ধকার হিসেবেই থাকবে, যদিও সমস্ত পৃথিবী তাকে আলো বলতে শুরু করে, অবশ্য আলোকে অন্ধকার বলে বিবেচনাকারী এবং অন্ধকারকে আলো বলে বিবেচনাকারীরা নিজেরাই নিষ্ফল হবে।

    অতএব আমাদের এ দৃঢ় ঈমান আছে যে নারীকে পর্দা করে সমাজকে ফেতনা ফাসাদ থেকে রক্ষা করা, পুরুষকে নারীদের উপর কর্তৃত্বকারী হিসেবে মানা, পারিবারিক নিয়মকে আইনে পরিণত করা, ইসলামী দণ্ডবিধি আইন বাস্তবায়ন করা, সমাজকে মদ, ব্যভিচার, অন্যায়ের মত নিকৃষ্ট অপরাধ থেকে পাক পবিত্র করা, চোর এবং ডাকাত থেকে সমাজকে সংরক্ষণ করা, হত্যার বিনিময়ে হত্যার আইন বাস্তবায়ন করে, হত্যা এবং রক্তপাত দূর করা, একাধিক বিয়ে প্রথাকে মেনে নিয়ে সমাজকে গোপন প্রেম, বাড়ী থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া, আদালতের বিয়ের ন্যায় বেহায়া এবং অশ্লীলতা থেকে পবিত্র করে, মিথ্যা অপবাদের আইন বাস্তবায়ন করে নারীকে সম্মান এবং তার সম্ভ্রম রক্ষা করা, ইসলামের দুশমন কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা স্বয়ং আলোকিত চিন্তা চেতনা।

  • অপশক্তিধরদের আলোকিত চিন্তা চেতনা

    অপশক্তিধরদের আলোকিত চিন্তা চেতনা

    বর্তমান পৃথিবীর বড় অপশক্তি আমেরিকা কখনো ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’, ‘গ্লোব্লাইজেশন’ নামে নিজেদের বস্তুবাদী নাস্তিকতাবাদী সংস্কৃতিকে আলোকিত চিন্তা চেতনা বলে আখ্যায়িত করে জোরপূর্বক সমগ্র বিশ্বের উপর তা চাপিয়ে দিতে চায়, দুঃখের বিষয় হল এই যে, স্বয়ং মুসলমানদের মধ্যে কিছু লোক অপশক্তিধরের ভয়ে অথবা দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ হওয়ার কারণে অপশক্তিধরের সংস্কৃতিকে উন্নত, নিরপেক্ষ এবং আলোকিত চিন্তার ধারক বলে মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেয়ার জন্য চেষ্টা করছে। প্রিয় জন্মভূমি (লেখকের) ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানেও এ ভাল কাজটিকে বড় জিহাদের চেতনা মনে করে কাজ করা হচ্ছে, এর কিছু দৃষ্টান্ত দ্রষ্টব্য।

    1. পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট তার এক বক্তব্য বলেছেন— চরমপন্থী মৌলভীদের ইসলামের আমাদের দরকার নেই, যদি কারো কাছে বোরকা এবং দাড়ি পছন্দ হয় তাহলে সে যেন তা তার ঘরে সীমাবদ্ধ রাখে, আমরা তাদের এ বোরকা এবং দাড়ি রাষ্ট্রের উপর চাপিয়ে দিতে দিব না।1
    2. লণ্ডনে প্রেস কনফারেন্সে বক্তব্য দিতে গিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী তার চিন্তা চেতনার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন— “কিছু মৌলবাদী সংগঠন আমাদেরকে কয়েক শতাব্দী পিছনে নিয়ে যেতে চায়, আমাদেরকে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, ধর্মীয় অন্ধত্ব চায় যে আমি চোরের হাত কেটে দেই, আমি কি সমস্ত গরীবদের হাত কেটে তাদেরকে টুণ্ডা করে দেব? না তা কখনো হতে পারে না। চরমপন্থী গ্রুপ আমাদের উপর তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে চায়, কিন্তু এ সল্প লোকদের জানা থাকা উচিত যে, আমরা একবিংশ শতাব্দীতে বেঁচে আছি, আমরা চরমপন্থীদেরকে তাদের চিন্তা চেতনা প্রকাশ করতে অনুমতি দেব না।2
    3. বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী বলেন—নারীদেরকে ঘরে বন্দী রাখা একটি পশ্চাদমুখী চিন্তা, পর্দায় লুকিয়ে থাকা নারীরা ইসলামের পশ্চাদমুখীতার চিত্র প্রকাশ করছে, কিছু লোক নারীদেরকে ঘরের মধ্যে বন্দী রাখতে এবং তাদেরকে পর্দা করাতে চায়, যা একেবারেই ভুল।3
    4. কোহাটে এক বৈঠকে আলোচনা করতে গিয়ে পাকিস্তানের প্রধান বলেছেন— ইসলামের পশ্চাদ পদতা রাষ্ট্রের উন্নতির পথে বাধা, কেউ দাড়ি রেখেছে তো ভাল, কিন্তু আমাকে বলবে না যে, আমি দাড়ি রাখব বা না রাখব। ফিল্মি পোষ্টার, গান বাজনা, দাড়ি না-রাখা, মহিলাদেরকে বোরকা পরিধান না করানো, সেলওয়ার, কামিজ, পেন্ট এবং এল এফ, এগুলো ছোট খাট বিষয়। অতএব এগুলোকে ইস্যু বানাবে না, এগুলো ছোট চিন্তার লোকদের কাজ, পাকিস্তান বিরাট চেলেঞ্জের মুখে আছে, ইস্যু হল এই যে, দেশে কার আইন চলবে? আমরা উন্নত ইসলাম চাই, যা কায়েদে আযম এবং আল্লামা ইকবালের চিন্তায় ছিল, উন্নয়নশীল পাকিস্তান, কোন ধর্মীয় রাষ্ট্র নয়, ইসলাম বাস্তবায়নের জন্য মানুষের চিন্তা চেতনার মধ্যে পরিবর্তন দরকার, সমগ্র জাতি গ্রহণযোগ্য সংস্কৃতি চায়, ইসলামে সকলের অধিকার সংরক্ষণ করা হয়েছে, তার মর্যাদা বুঝুন।4

    পাকিস্তানের প্রধানের আরো কিছু বক্তব্য

    1. সেকেলে চিন্তা-চেতনা এবং প্রাচীন বর্ণনাসমূহের উন্নতির এ যুগে মোটেও কোন দরকার নেই, বর্তমান যুগ উন্নতির এমন স্তরে এসে পৌঁছেছে যে অতীতের সাথে তার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। সাইন্স, টেকনোলজী এবং উন্নত জীবনযাপনের দ্রুততায় ধর্ম কালের সাথী হতে পারবে না, চাদর, চার দেয়াল, পর্দা, স্কার্ফ, দাড়ি মোল্লাদের ধর্ম এবং পশ্চাদপদতার নিদর্শন। তলওয়ার দিয়ে যুদ্ধ করার যুগ শেষ হয়ে গেছে, এখন এর পরিবর্তে ডিবলোমাসীর মাধ্যমে কাজ করা হয়, অপরাধ, ডাকাতি ইত্যাদির শাস্তি ইসলামী বিধান পরিহার করে যুগোপযুগী বিধান আবিষ্কার করতে হবে, চোরের হাত কেটে জাতিকে টুণ্ডা করা যাবে না।5

    রাষ্ট্র প্রধানের বক্তব্যের সারমর্ম হল এই—

    ক) দাড়ি, পর্দা চরমপন্থী মৌলভীদের ইসলাম।

    খ) চোরের হাতকাটা ধর্মীয় পাগলামীর বহিঃপ্রকাশ।

    গ) ধর্ম কালের সাথে তাল মেলাতে পারবে না।

    ঘ) জিহাদের যুগ শেষ হয়ে গেছে, এখন জিহাদ পরিহার করতে হবে।

    ঙ) গবেষণার মাধ্যমে ইসলামী দণ্ডবিধিতে পরিবর্তন আনতে হবে।

    পর্দা, দাড়ি, স্কার্ফ, জিহাদ, ইসলামী দণ্ডবিধির কথা আলোচনা করার আগে রাষ্ট্রপ্রধান এও বলেছেন— সেকেলে চিন্তা চেতনা এবং প্রাচীন বর্ণনাসমূহের উন্নতির এ যুগে মোটেও কোন দরকার নেই।

    যেন উল্লেখিত অনৈসলামী কানুনসমূহ আলোকিত চিন্তা-চেতনা এবং উন্নতির সাথে সম্পর্ক রাখে, সম্ভবত এটাই কারণ যে, রাষ্ট্র প্রধান ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের সমস্ত ইসলামী গৌরবকে খতম করার এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে দেশের উপর চাপিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, দাড়ি, পর্দার বিরোধিতা, ইসলামী দণ্ডবিধিতে অসন্তুষ্টি, আল্লাহর পথে জিহাদের বিরোধিতা, খেলাফত (ইসলামী আইন)-এর প্রতি অসন্তুষ্টি6, সিনেমা, গান-বাজনার সমর্থন, নিজের গৌরবময় অতীত ইতিহাস থেকে পিছপা। হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি এবং নারী পুরুষের সম্মিলিত মেরাথন, ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর নযরদারী, বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য পাকিস্তানী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দরজা বন্ধ, গোত্রীয় অঞ্চলসমূহে সঠিক আক্বীদা বিশ্বাসী লোকদের রক্তপাত করা, শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে কোরআ’নের সূরা এবং আয়াতসমূহ ছাটাই করা, মুসলিম বিজয়ীদের কর্মকাণ্ড সম্বলিত বিষয়সমূহ খতম করা, সাহাবাগণের ব্যাপারে ‘শহীদ’ শব্দটি উঠিয়ে দিয়ে ‘নিহত’ শব্দ ব্যবহার করা, গৌরবজনক নিদর্শনসমূহের কথা শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূর করা, হিন্দু সংস্কৃতি এবং হিন্দু শাসকদের ইতিহাস শিক্ষাব্যবস্থায় চালু করা, ক্লাস ওয়ান থেকে ইংরেজী শিখানোর সিদ্ধান্ত নেয়া, মুসলমানদের চিরস্থায়ী শত্রু ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাঈলের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করার ব্যাপারে সৌখিনতা প্রকাশ করা। এমনিভাবে অন্যান্য ইসলামী ঘটনাবলী, ইসলামী বিধিবিধান এবং ইসলামী সংস্কৃতি আলোহীন এবং অনুন্নত মনে করার ফল।7

    ইতিহাস সাক্ষী যে মুসলিম শাসকদের দ্বীন থেকে দূরে থাকা এবং দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতাই মুসলমানদেরকে সর্বদা অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে, তুর্কীতে মোস্তফা কামাল পাশা সাধারণ জনসাধারণকে ‘নুতন উন্নত তুর্কী’ সুন্দর শ্লোগান দিয়ে সর্ব প্রথম ইসলামী খেলাফতের প্রতি হস্তক্ষেপ করেছে এবং তা শেষ করেছে ইসলামী খেলাফত শেষ করার পর, আরবী ভাষা এবং আরবী লিখনীর প্রতি কঠোরতা আরোপ করেছে, ইসলামী ইবাদত, নামায, আযানের জন্য আরবী ভাষার পরিবর্তে তুর্কীভাষায় চালু করেছে। জোরপূর্বক মুসলমানদের দাড়ি মুণ্ডন করিয়েছে, বোরকা পরহিতা নারীদেরকে জোরপূর্বক বোরকা খুলে দিয়েছে, টুপির স্থলে হেট বা ইংলিশ পোষাক পরতে বাধ্য করেছে, শিক্ষা বোর্ড থেকে আরবী, ফার্সি ভাষা তুলে দিয়েছে। আরবী গ্রন্থ এবং দুর্লভ পাণ্ডুলিপিসমূহ বিক্রি করে দিয়েছে, ওক্‌ফ সম্পত্তি বিলীন করে দিয়েছে, মসজিদসমূহে তালা ঝুলিয়েছে, আয়া সুফিয়ার প্রসিদ্ধ মসজিদকে জাদুঘরে পরিণত করেছে, সুলতান মোহাম্মদ ফাতেহ মসজিদকে গুদামে পরিণত করেছে, দেশ থেকে ইসলামী বিধানসমূহ অকার্যকর করে দিয়েছে, ইউরোপের স্কলারদেরকে সারাদেশে নিয়োগ করেছে, মোস্তফা কামালের উল্লেখিত ভূমিকার ফলে তুর্কির ইসলামী কর্মকাণ্ড পরিপূর্ণ রূপে বিনষ্ট হয়ে গেছে, বর্তমানে তুর্কি একটি সেকুলার রাষ্ট্র হিসেবে আছে, কিছু দিন আগে সংবাদপত্রের আলোচিত একটি সংবাদ দ্রষ্টব্য।

    তুর্কির শহর আনাতুলের আদালত দু’জন কোরআ’নের শিক্ষকের ব্যাপারে সাড়ে আট বছর বন্দী থাকার ফায়সালা করেছে, কেননা তারা ১৯৯৪ সালে যখন তাদের বয়স ১১ বছর ছিল তখন দু’জন বাচ্চাকে নিয়ম বহির্ভুতভাবে এক মসজিদে কোরআ’ন শিখানোর অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল। যেহেতু এ মামালাটির অনেকদিন পর্যন্ত শুনানী চলছিল তাই দীর্ঘদিন পর এর রায় ঘোষণা করা হল।8

    আমাদের সামনে আরও একটি উদাহরণ, উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তানের বড় মোগল, যে ইতিহাসে জালালুদ্দীন আকবর নামে পরিচত, জালালুদ্দীন আকবর আল্লাহ্‌র দ়ীনের ভিত্তি এ দর্শনের উপর রেখেছে যে, ইসলাম ১৪শত বছরের পুরাতন ধর্ম, এখন আমাদের একটি নূতন উন্নত ধর্ম দরকার, তাই বাদশাহ্ সালামত একটি নূতন দিন আবিষ্কার করল, যার কালেমা ছিল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ আকবর খলিফাতুল্লাহ্‌’। ভারতে যেহেতু বিভিন্ন ধর্মের লোকদের বসবাস ছিল তাই এধর্মে মুসলমান ব্যতীত সমস্ত দলসমূহের সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখা হল, অগ্নিপূজকদের সন্তুষ্ট রাখার জন্য শাহী মহলে পৃথকভাবে আগুন জ্বালিয়ে আলোকিত রাখা হত এবং তার পূজা করা হত, তাদের ধর্মীয় উৎসবসমূহ সরকারীভাবে পালন করা হত, খৃষ্টানদেরকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য ঈসা (আ.) এবং মারইয়ামের মূর্তি তৈরি করে তার সামনে আকবর সম্মান জানাতে দাঁড়াত, আবার চার্চেও উপস্থিত হত। হিন্দুদেরকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য হিন্দুদের মূর্তি এবং তাদের বিভিন্ন উৎসব সরকারীভাবে পালন করা হত, আকবর নিজে মাথায় তিলক ব্যবহার করত, গাভী কোরবানী করা নিষেধ করেছিল, তার মহলে বানর ও কুকুর পালিত হত,  বানরকে পবিত্র প্রাণীর মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, মহলে নিয়মিত জুয়ার আসর বসত, জীনভূতের অনুসারীদেরকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য আকবর শুধু শিকার করাই ত্যাগ করে নি, বরং মাংস খাওয়াও পরিহার করেছিল। ইসলামী বিধি-বিধানসমূহকে প্রকাশ্যে বিদ্রুপ করা হয়েছে, সূদ, জুয়া, মদ পান হালাল করে দেওয়া হয়েছিল, দাড়ি মুণ্ডাতে উৎসাহিত করার জন্য আকবর নিজের দাড়ি মুণ্ডন করেছিল। মোহাম্মদ, আহমদ, মোস্তফা ইত্যাদি নাম রাখা নিষেধ করা হয়েছিল, নূতন মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা জারি করা হয়েছিল, পুরাতন মসজিদসমূহ ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিল, আযান, নামায, রোযা, হজ্ব ইত্যাদি ইবাদতের ক্ষেত্রে বাধ্য বাধকতা ছিল, বার বছরের আগনে খতনা করা নিষেধ ছিল। এরপর মেয়েদর স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল যে, তারা চাইলে খতনা করতে পারবে আর না চাইলে করবে না। একাধিক বিয়ে নিষেধ করা হয়েছিল, ইসলামী শিক্ষা-ব্যবস্থাকে পঙ্গু করা হয়েছিল। অথচ, বিজ্ঞান, দর্শন, গণিত, ইতিহাস ইত্যাদি শিক্ষা ব্যবস্থা সরকারী ছত্রছায়ায় চলত। বায়তুল্লাহ্‌কে অবমাননা করার ইচ্ছা নিয়ে আকবর রাতে কেবলার দিকে পা দিয়ে রাত্রি যাপন করত, আকবের এ নূতন উন্নত ধর্ম যদি পরিপূর্ণভাবে বিস্তারের সুযোগ পেত তাহলে আজ সমগ্র হিন্দুস্থান কুফরস্থানে পরিণত হত। কিন্তু আল্লাহ্‌র ইচ্ছা সবকিছুর উপর বিজয়ী। ঐ সময়ে আল্লাহ্‌ শাইখ আহমদ সেরহিন্দি রাহিমাহুল্লাহের মাধ্যমে এ কুসংস্কারকে সমূলে উৎপাটনের জন্য ভূমিকা রাখলেন, যার সুন্দর পক্ষেপের ফলে আবুল আলা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহের ভাষায়, ‘শুধু হিন্দুস্তানকেই কুফরীর অতলতলে যাওয়া থেকে বাঁচান নি, বরং এ বিশাল ফিতনা মুখথুবড়ে পড়ে গিয়েছিল। যদি তা কামিয়াব হতে পারত, তাহলে আজ থেকে ৩/৪শ’ বছর আগেই এখান থেকে ইসলামের নাম নিশানা মিটে যেত।9

    মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের রেখে যাওয়া সংস্কার ‘নূতন উন্নত ধর্ম’ আকবরের রেখে যাওয়া সংস্কার ‘নূতন উন্নত ধর্ম’, আর মোশাররফের রেখে যাওয়া সংস্কার ‘আলোকিত চিন্তা’, এ তিনটি পন্থাই সাধারণ মানুষের জন্য দৃষ্টি আকর্ষক হলেও ইসলামের জন্য তা বিষাক্ত।

    বর্তমান যুগের আলোকিত চেতনার মূল আলোকিত চেতনা নয় বরং তা হল ঐ অন্ধকার এবং যুলম যে পথে শয়তান তার বন্ধুদের আনতে চায়। যেমন স্বয়ং আল্লাহ্ বলেছেন—

    اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ ۖ وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُمْ مِنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ ۗ أُولَٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ ٢٥٧

    অর্থ: “আর যারা কুফরী করে তাদের অভিভাক হচ্ছে তাগুত (শয়তান) তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়, এরাই হল জাহান্নামী, চিরকাল তারা সেখানেই থাকবে। (সূরা বাকারাহ-২৫৭)

    অতএব আলেমদের উচিত হল সর্ব সাধারণকে এ আলোকিত চেতনা সম্পর্কে অবগত করানো এবং তাদেরকে বুঝানো যে আমাদের অতীত মোটেও অনুজ্জ্বল নয় বরং অন্যান্য সমস্ত উম্মতদের তুলনায় আমাদের অতীত সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং আলোকিত যাতে আমাদের গৌরব রয়েছে, আমরা ১৪শত বছরের পুরানো শরীয়তে মোহাম্মদীকে আমাদের জীবনের চেয়েও অধিক ভালবাসি। এরই উপর মৃত্যুবরণ করা এবং এরই উপর পুনরুত্থিত হওয়া আমাদের জীবনের লক্ষ্য। এর বিপরীতে শয়তানের সংস্কৃতি, আলোকিত চেতনা, নিরপেক্ষতা, আমার ঘৃণাকরি এবং এ থেকে আমরা মুক্ত। আমাদেরকে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে—

    أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا ٦٠

    অর্থ: “আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আমার সে বিষয়ের উপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে। তারা বিরোধীয় বিষয়কে শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে যাতে তারা ওকে মান্য না করে, পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়। (সূরা নিসা-৬০)

  • আল্লাহ্ কি হিংস্রতা এবং জুলম করেন?

    আল্লাহ্ কি হিংস্রতা এবং জুলম করেন?

    ইসলাম সাধারণ মানুষের জন্য যেমন শান্তি ও নিরাপত্তার দ্বীন, এমনিভাবে সমগ্র সমাজের জন্যও একটি শান্তি ও নিরাপত্তার দ্বীন। আল্লাহ্ যেমন সাধারণ মানুষের হেদায়েতের জন্য কোরআন মাজীদে কিছু কিছু বিধান অবতীর্ণ করেছেন এমনিভাবে সামাজিক নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য কিছু কিছু অপরাধের শাস্তির বিধানও রেখেছেন, যে বিধানগুলো ঐ রকম অপরিবর্তনীয়— যেমন নামায, রোযা, যাকাত ও হজ্বের বিধানগুলো অপরিবর্তনীয়। আল্লাহ্‌র নির্ধারণকৃত শাস্তি যাকে ইসলামের পরিভাষায় “হুদূদ”(দণ্ডবিধি) বলা হয় তা নিন্মরূপ—

    1. চুরীর শাস্তি— চোরের শাস্তি হল তার হাত কেটে দেয়া। (৫ : ৩৮)।
    2. ডাকাতির শাস্তি— সশস্ত্র ডাকাতদল যদি ডাকাতি করার সময় কাউকে হত্যা করে কিন্তু সম্পদ লুট না-করে তাহলে তার শাস্তি হল হত্যার বিনিময়ে হত্যা।
      আর ডাকাতি করার সময় যদি হত্যা করে এবং সম্পদও লুট করে, তাহলে তার শাস্তি শূলিতে চড়ানো, আর ডাকাতি করার সময় যদি শুধু সম্পদ লুট করে হত্যা না করে তাহলে তার শাস্তি হল তাদের হস্ত ও পদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কাটা। (৫ : ৩৩)।
    3. সত্বী-সাধ্বী নারীদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেয়ার শাস্তি— সতী-সাধ্বী নারীদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেয়ার শাস্তি ৮০টি বেত্রাঘাত।(২৪ : ৪)।
    4. অবিবাহিত নর-নারীর যিনার (ব্যভিচারের) শাস্তি— একশত বেত্রাঘাত ।(২৪ : ২)। যদি নর ও নারী উভয়ের সম্মতিতে যিনা (ব্যভিচার) হয়ে থাকে, তাহলে উভয়েরই উক্ত শাস্তি হবে, আর যদি কোন একজনের ইচ্ছায় জোরপূর্বক যিনা (ব্যভিচার) হয়ে থাকে, তাহলে যে জোর করে যিনা (ব্যভিচার) করেছে তার এ শাস্তি হবে।
    5. বিবাহিত নর-নারীর যিনার (ব্যভিচার) শাস্তি— তাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করা। (বোখারী ও মুসলিম)। উল্লেখ্য, বিবাহিত নর-নারীর যিনার (ব্যভিচারের) শাস্তি পাথর মেরে হত্যা করা, এসংক্রান্ত আয়াতটি কোরআ’ন মাজীদের সূরা আহযাবে অবতীর্ণ হয়েছিল, কিন্ত পরবর্তীতে আল্লাহ্ তা’য়ালা ঐ আয়াতের বিধান কার্যকর রেখে তার তেলওয়াত রহিত করে দেন, এ বিধানের উপর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমল করেছেন, তাঁর মৃতুর পর খোলাফায়ে রাশেদীনগণ আমল করেছেন। (আশরাফুল হাওয়াসী, ফুটনোট নং—৯ পৃঃ ৪১৮)।
    6. মদ পানের শাস্তি— নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগে এবং আবুবকর সিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহুর) যুগে মদ পানের শাস্তি ছিল ৪০টি বেত্রাঘাত, ওমর ফারুক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর শাসনামলে সাহাবাগণের পরামর্শ ক্রমে মদপানের শাস্তি নির্ধারণ করেন ৮০টি বেত্রাঘাত, এব্যাপারে আবদুর রহমান বিন আউফ (রাযিয়াল্লাহু আনহুর) পরমার্শ ছিল দণ্ডবিধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম শাস্তি হল মিথ্যা অপবাদের শাস্তি, তাই মদ পানের শাস্তিও কম পক্ষে তার সমপর্যায়ের হওয়া উচিত। তাই মদ পানের শাস্তি তখন ৮০টি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করা হল, এব্যাপারে সমস্ত সাহাবাগণের ঐক্যমত ছিল এবং এর উপর আমলও শুরু হল।

    আমাদের এটা দৃঢ় বিশ্বাস যে আল্লাহ্‌র নির্ধারণ কৃত শাস্তির বিধানে আল্লাহ্‌র দৃষ্টিতে মানুষের প্রতি দয়ারই বহিঃপ্রকাশ, আর এ শাস্তির বিধান বাস্তবায়ন করার মধ্যে আদম সন্তানের জন্য কল্যাণ রয়েছে, আর তা বাস্তবায়ন ব্যতীত কোন সমাজ ব্যবস্থাতেই মানুষের জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব নয়।

    নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং সাহাবাগণের যুগে ইসলামের বিজয়ের মাধ্যমে যে সমস্ত এলাকাগুলো ইসলামী সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, সেখানে যখন ইসলামী আইন কার্যকর করা হল, তখন ঐসমস্ত এলাকাসমূহে শান্তি ও নিরাপত্তার দৃষ্টান্ত স্থাপন হল।

    নজদের শাসক আদী বিন হাতেম নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে দ্বিধা সংকোচ করছিল, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন— আদী হয়ত তুমি মুসলমানদের স্বল্পতা এবং কাফেরদের আধিক্য দেখে ইসলাম গ্রহণ করা থেকে বিরত আছ, আল্লাহ্‌র কসম! অতিশীঘ্রই সমগ্র আরবে ইসলামের পতাকা বিজয়ী দেখতে পাবে, আর শান্তি ও নিরাপত্তার এমন এক দৃষ্টান্ত কায়েম হবে যে, একজন মহিলা একা একা যানবাহনে আরোহণ করে কাদেসিয়া (ইরানের একটি শহর) থেকে রওয়ানা হয়ে নির্ভয়ে সফর করে মদীনায় পৌঁছে যাবে, সফরকালে তার মধ্যে শুধু আল্লাহ্‌র ভয় থাকবে। একথা শুনে আদী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ইসলাম গ্রহণ করল এবং নিজের মৃত্যুর পূর্বে একথার সাক্ষ্য দিলেন যে, আল্লাহ্‌র কসম! রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী সত্যে পরিণত হয়েছে, আমি স্বচোখে দেখেছি যে একজন মহিলা একা একা নিজের যানবাহনে আরোহণ করে কাদেসিয়া থেকে নির্ভয়ে সফর করে মদীনায় পৌঁছেছে। বিশাল আয়তন বিশিষ্ট ইসলামী সম্রাজ্যে জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা একমাত্র ইসলামী দণ্ডবিধি কার্যকর থাকার কারণেই সম্ভব হয়েছে।

    আজকের এই অশান্তির যুগে পৃথিবীর সভ্য এবং উন্নত দেশসমূহে দৃষ্টি দিয়ে দেখুন যে যদি পৃথিবীর কোথাও এমন কোন দেশ থাকে যেখানে দিন ও রাতের যেকোন সময় মানুষ নির্ভয়ে সফর করতে পারবে তাহলে সেটা সৌদী আরব, যেখানে না শোয়ার কোন ভয় আছে না জীবনের না ইজ্জতের। নিরাপত্তা ও শান্তির এ পরিবেশ ইসলামী দণ্ডবিধি কার্যকর করার কারণে যদি না হয় তাহলে আর কি কারণে?

    মরোক্কোতে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ওলফ্রেড হুফ মীন ইসলাম গ্রহণ করার পর ইসলামী দণ্ডবিধি সম্পর্কে একটি গ্রন্থ রচনা করে, যেখানে সে চোরের হাত কাটা, হত্যার বিনিময়ে হত্যাকারীকে হত্যা করা, যিনা (ব্যভিচারকারীকে) পাথর মেরে হত্যা করা সম্পর্কে বিশেষভাবে আলোচনা করেছে, সেখানে সে একথা প্রমাণ করেছে যে মানবতাকে শান্তি ও নিরাপত্তা দেয়ার জন্য এদণ্ডবিধি কায়েম করা ব্যতীত আর কোন উপায় নেই।2

    প্রিয় জন্মভূমিতে (লেখকের) যখন থেকে আধুনিক ইসলামের ধারক এবং আলোকিত চিন্তার সরকার এলো তখন থেকেই ইসলামী বিধানাবলী এবং ইসলামী নিদর্শনসমূহের প্রতি ঠাট্টার ধারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে চালু হল, আর তখন নুতন করে ইসলামী দণ্ডবিধি আইনে কিছু বিশেষ নযরধারী শুরু হয়, ফলে খোলাখুলিভাবে পরিষ্কার ভাষায় ইসলামী দণ্ডবিধিকে হিংস্র এবং জুলুম বলে আখ্যায়িত করা হল, যার পরিষ্কার অর্থ দাঁড়ায় এ শাস্তির বিধান প্রবর্তনকারী সত্বা (আল্লাহ্ মাফ করুন, আবারো আল্লাহ্ মাফ করুন) হিংস্র এবং জালেম।

    চিন্তা করুন

    • যে মহান সত্বা তাঁর নিজের জন্য দয়ালু, করুনাময়, ক্ষমাশীল এধরণের গুণাবলী বেছে নিয়েছেন তিনি কি হিংস্র এবং জালেম হতে পারেন?
    • ঐ সত্বা যিনি সর্বধা স্বীয় বান্দাদের গোনাহ্ মাফ করে তাদেরকে স্বীয় নে’মত দান করে থাকেন, তিনি কি হিংস্র ও জালেম হতে পারেন?
    • ঐ সত্বা যিনি তাঁর আরশে একথা লিখে রেখেছেন যে, আমার রহমত আমার রাগের উপর বিজয়ী (বোখারী ও মুসলিম) তিনি কি হিংস্র এবং জালেম হতে পারেন?
    • ঐ সত্বা যিনি তার রহমতের ৯৯ ভাগ কিয়ামতের দিন তাঁর বান্দাদেরকে ক্ষমা করার জন্য রেখে দিয়েছেন (বোখারী ও মুসলিম) তিনি কি জালেম হতে পারেন?
    • ঐ সত্বা যার সমস্ত ফায়সালা বিজ্ঞানময়, যার সমস্ত ফায়সালা সর্বপ্রকার ত্রুটিমুক্ত, যার সমস্ত ফায়সালা প্রশংসার দাবী রাখে, তিনি কি তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে হিংস্র এবং অবিচার করতে পারেন?
    • ঐ সত্বা যিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি জুলুম না-করার ওয়াদা করেছেন (৫০:২৯) তিনি কি তাঁর বান্দাদের প্রতি হিংস্র এবং জুলম মূলক ফায়সালা করতে পারেন?
    • অতএব হে আমার জাতির নেতা, সরকারের সর্বোচ্চ মসনদে বসে আল্লাহ্ তা’য়ালাকে গালি দিবে না। দয়াময়, অনুগ্রহশীল, অত্যন্ত ধৈর্যশীল, মহাজ্ঞানী সত্বার শ্রেষ্টত্ব এবং তাঁর মর্যাদার ব্যাপারে বেয়াদবী করা থেকে বিরত থাক। তাঁর শাস্তি ও পাকড়াওকে ভয় কর, স্বীয় গোনাহের জন্য তাঁর নিকট তাওবা কর।
    • যাতে এমন না হয় যে এ সর্বোচ্চ মসনদ থেকে ছিটকে পড়।
    • যেন এমন না হয় যে, আকাশ থেকে পাথর বৃষ্টি বর্ষিত হতে শুরু করে।
    • যেন এমন না হয় যে, আকাশ থেকে ফেরেশ্তাগণকে অবতরণ করার হুকুম দেওয়া হয়।
    • এমন যেন না হয় যে পৃথিবীর নীচের অংশ উপর এবং উপরের অংশ নীচে করে দেওয়া হয়।
    • এমন যেন না হয় যে আকাশ ও যমিনের মুখগহ্বর উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে আর এ উভয়ের পানি মিলিত হয়ে সবকিছুকে একাকার করে দিবে।
    • এমন যেন না হয় যে, চরম ক্ষুধা এবং করুণ অভাব ও লাঞ্ছনা আর অপমান আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
    • এমন যেন না হয় যে ভূমি ধ্বস, ভূমিকম্প, চেহারার বিকৃতি, পাথর বৃষ্টি আমাদের উপর বর্ষণ না হয়।

    এর পর আমরা আশ্রয় খুঁজব অথচ কোথাও আশ্রয় পাব না, তাওবা করতে চাইব হয়ত তাওবা করার সুযোগ পাব না, অতএব হে জাতির প্রধান! কোরআনের এ হুশিয়ারী বাণী কান খুলে শোন—

    أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ ١٦ أَمْ أَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا ۖ فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرِ ١٧ وَلَقَدْ كَذَّبَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَكَيْفَ كَانَ نَكِيرِ ١٨

    অর্থ— “তোমরা কি ভাবনা মুক্ত হয়ে গেছ যে, আকাশে যিনি আছেন তিনি তোমাদেরকে ভূগর্ভে বিলীন করে দেবেন, অতঃপর তা কাঁপতে থাকবে, না তোমরা নিশ্চিত হয়ে গেছ যে, আকাশে যিনি আছেন তিনি তোমাদের উপর প্রস্তর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, অতঃপর তোমরা জানতে পারবে কেমন ছিল আমার সতর্ক বাণী। তাদের পূর্ববর্তীরা মিথ্যারোপ করেছিল, অতঃপর কত কঠোর হয়েছিল আমার অস্বীকৃতি। (সূরা মুলক-১৬-১৮)

  • মানবাধিকার ও আমেরিকা

    মানবাধিকার ও আমেরিকা

    আমেরিকা এবং পাশ্চাত্যদেশ সমূহ নিজেদেরকে মানবাধিকারের ঝাণ্ডাবাহী এবং রক্ষক হিসেবে এতটা প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে যে, এর ফলে আমাদের এখানকার মুক্তচিন্তাশীল এবং আধুনিক চিন্তাশীলরা বাস্তবেই মনে করে যে, আমেরিকা এবং পাশ্চাত্য মানবাধিকারের বড় রক্ষক। আসুন ইতিহাসের আয়নায় তা যাচাই করুন যে বাস্তবেই কি তা ঠিক আছে? সর্বপ্রথম আমেরিকার অতীত ইতিহাসে একটু দৃষ্টি দেয়া যাক।

    1. খৃষ্টীয় ১৮ শতাব্দীতে আমেরিকার শ্বেতাঙ্গরা নুতন শক্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজেদের “নুতন পৃথিবী” আবাদ করার জন্য ৭০ লক্ষ রেড ইণ্ডিয়ানকে হত্যা করেছিল, আফ্রিকা মহাদেশের কৃষ্ণাঙ্গদেরকে জন্তুর ন্যায় ধরে ধরে নিজেদের ক্রীতদাসে পরিণত করেছিল, জাহাজসমূহে জন্তুর ন্যায় ভরপুর করে আমেরিকায় নিয়ে এসেছিল এবং তাদেরকে বেচা-কিনা করেছিল। এই কৃষ্ণাঙ্গরা আজও আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গদের ন্যায় মর্যদা পায় না। যখনই কৃষ্ণাঙ্গরা আমেরিকার সংবিধানে লিখিত মানবাধিকারের দাবী করেছে তখন তাদেরকে অত্যন্ত নির্মম ভাবে শেষ করে দেয়া হয়েছে।3
    2. ১৮৯০ খৃষ্টাব্দে দক্ষিণ ডকুটা এবং আর্জেনটাইনের উপর অ্যামেরিকা আক্রমণ করে;
    3. ১৮৯১ খৃষ্টাব্দে চিলির উপর আক্রমণ করে;
    4. ১৮৯২ খৃষ্টাব্দে আওয়হুর উপর আক্রমণ করে;
    5. ১৮৯৩ খৃষ্টাব্দে হুয়াইয়ের উপর আক্রমণ করে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহকে শেষ করে দেয়;
    6. ১৮৯৪ খৃষ্টাব্দে কোরিয়ার উপর;
    7. ১৮৯৫ খৃষ্টাব্দে পানামার উপর;
    8. ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে নাকানা গোয়ার উপর আক্রমণ;
    9. ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দে ফিলিপাইনের উপর আক্রমণ— এ যুদ্ধ ১৯১০ পর্যন্ত (অর্থাৎ ১২ বছর পর্যন্ত) চলছিল, এর ফলে ৬ লক্ষ ফিলিপাইনী মারা যায়;
    10. ১৯১২ খৃষ্টাব্দে কিউবার উপর হামলা;
    11. ১৯১৩ খৃষ্টাব্দে মেক্সিকোর উপর আক্রমণ;
    12. ১৯১৪ খৃষ্টাব্দে হাইতির উপর আক্রমণ;
    13. ১৯১৭-১৯১৮ খৃষ্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে;
    14. ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে হোল্ডরিজের উপর আক্রমণ করে;
    15. ১৯২০ খৃষ্টাব্দে গোয়েটির উপর আক্রমণ করে;
    16. ১৯২১ খৃষ্টাব্দে পশ্চিম অর্জিনিয়ার উপর আক্রমণ করে।
    17. ১৯৪১-৪৫ খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে, এতে চার কোটি লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এতে অ্যামেরিকা অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে এবং তাদের এক কোটি ৬০ লক্ষ সৈন্য তাতে অংশ গ্রহণ করে। হিরুশিমা এবং নাগাসাকীর উপর এটমবোমা নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের মধ্যে মানবাধিকারের পতাকাবাহী অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট টারোমীন এবং সভ্য বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার উন্সটন চার্চেলও ছিল।
    18. ১৯৪৩ খৃষ্টাব্দে ডিউটোরিটে কৃষ্ণাঙ্গদের বিদ্রোহকে দমন করার জন্য অ্যামেরিকা সেনা আক্রমণ করে;
    19. গ্রীসের যুদ্ধস্থান (১৯৪৭-৪৯ খৃষ্টাব্দে ) কমান্ডো আক্রমণ করে;
    20. ১৯৫০ খৃষ্টাব্দে পোরটোএকোরে আক্রমণ করে;
    21. ১৯৫৩ খৃষ্টাব্দে সেনা আক্রমণের মাধ্যমে ইরানের সরকার পরিবর্তন করে।
    22. ১৯৫৪ খৃষ্টাব্দে গোয়েটেমালার উপর বোমা নিক্ষেপ করে।
    23. ১৯৬০ খৃষ্টাব্দে থেকে ১৯৭৫ খৃষ্টাব্দে অ্যামেরিকা ১৫ বছর পর্যন্ত ভিয়েতনামের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, যার ফলে ১০লক্ষ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
    24. ১৯৬৫ খৃষ্টাব্দে অ্যামেরিকা ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান সোহর্তোর বিরোধী পক্ষের ১০লক্ষ লোককে মারার জন্য সহযোগিতা করেছিল।
    25. ১৯৬৯ খৃষ্টাব্দে থেকে১৯৭৫ খৃষ্টাব্দে পর্যন্ত (৬ বছর) কম্বোডিয়ার সাথে যুদ্ধ করেছিল। এতে ২০ লক্ষ লোককে হত্যা করেছে।
    26. ১৯৭১-৭৩ খৃষ্টাব্দে লাউসে বোমা নিক্ষেপ করেছে।
    27. ১৯৭৩ খৃষ্টাব্দে দক্ষিণ ঢেকোটার উপর সেনা আক্রমণ করে।
    28. ১৯৭৩ খৃষ্টাব্দে চিলির উপর সেনা আক্রমণ করে সরকার পরিবর্তন করে।
    29. ১৯৭৬-১৯৯২ খৃষ্টাব্দে এন্‌গোলায় দক্ষিণ আফ্রিকার সহযোগিতায় সংঘঠিত বিদ্রোহীদেরকে সহযোগিতা করে।
    30. ১৯৮১- ৯০ খৃষ্টাব্দে নাকারাগোয়ার উপর সেনা আক্রমণ করে।
    31. ১৯৮২- ৮৪ খৃষ্টাব্দে পর্যন্ত লেবাননের মুসলিম অঞ্চলসমূহে বোমাবাজী করেছে।
    32. ১৯৮৪ খৃষ্টাব্দে পারস্য সাগরে দু’টি ইরানী বিমান ধ্বংস করেছে।
    33. ১৯৮৬ খৃষ্টাব্দে সরকার পরিবর্তনের জন্য লিবিয়ার উপর আক্রমণ করে।
    34. ১৯৭৯ খৃষ্টাব্দে ইরাক অ্যামেরিকার সৈন্যদের সহযোগিতায় ইরানের উপর আক্রমন করে। এ যুদ্ধ ৮ বছর পর্যন্ত চলেছে যার ফলে উভয় পক্ষের লক্ষ লক্ষ লোক ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছে।
    35. ১৯৮৯ খৃষ্টাব্দে ফিলিপাইনে সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ হয়, অ্যামেরিকা এ বিদ্রোহ দমন করার জন্য ফিলিপাইনকে আকাশ সীমা দিয়ে সহযোগীতা করেছে।
    36. ১৯৮৯ খৃষ্টাব্দে সেনা আক্রমনের মাধ্যমে পানামার সরকার পরিবর্তন করেছে, যার ফলে ২ হাজার লোক মৃত্যুবরণ করেছে।
    37. ১৯৮৯ খৃষ্টাব্দে আলজেরিয়ার ইসলামিক সালভেশন ফ্রন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে, যারা দেশে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেল, ইসলামী বিপ্লবকে প্রতিরোধ করার জন্য অ্যামেরিকার সাহায্যে সেনা আক্রমণ চালানো হয়, যার ফলে ৮০ হাজার লোক নিহত হয়েছে।
    38. ১৯৯০ খৃষ্টাব্দে ইরাককে কুয়েতের উপর আক্রমণ করার জন্য উৎসাহিত করে এবং ১৯৯১ খৃষ্টাব্দে ডিজারেট স্টার্ম অপারেশনের আদলে নিজেই ইরাকের উপর আক্রমণ করে, যার ফলে হাজার হাজার ইরাকী মৃত্যুবরণ করে।
    39. ১৯৯০ খৃষ্টাব্দে হাইতির সরকার পরিবর্তন করানোর জন্য সেনা আক্রমন করে।
    40. ১৯৯৬ খৃষ্টাব্দে ইরাকের উপর আক্রমণ করে এবং গুরুত্বপূর্ণ সেনা আস্তানাসমূহে মিসাইল নিক্ষেপ করে। ১৯৯৮ খৃষ্টাব্দে সুদানের দু’টি অস্ত্র কারখানার উপর আক্রমণ করে।
    41. ১৯৯৮- খৃষ্টাব্দে আফগাস্তিানে সি, আই, এর প্রতিষ্ঠিত জিহাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্ৰসমূহে মিজাইল হামলা চালায়;
    42. ১৯৯৮ খৃষ্টাব্দে ইরাকের উপর আবার একাধারে চার দিন মিসাইল আক্রমণ করতে থাকে।
    43. ১৯৯০ খৃষ্টাব্দে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার উপর বিদ্রোহ করায়, খৃষ্টানদেরকে সহযোগিতা করে, লাখ লাখ মুসলমানকে হত্যা করেছে, পরিশেষে পূর্ব তৈমুরকে একটি খৃষ্টান রাষ্ট্র হিসেবে কায়েম করে।48
    44. সোভিয়েত ইউনিয়নের জোর পূর্বক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্তির জন্য দশ লক্ষ শহীদের কোরবানীর রক্ত না শুকাতেই আফগানিস্তানের উপর ২০০১ খৃষ্টাব্দে বিমান এবং মিসাইল থেকে বোমাবাজী শুরু করে, যার ফলে ২৫ হাজার নিরপরাধ মানুষ শাহাদাত বরণ করে। ৭হাজার মানুষকে বন্দী করা হয়, আর তালেবানের স্থানে উত্তারঞ্চলীয় জোটের পুতুল সরকার কায়েম করা হয়।
    45. ইরাকে পরমানবিক অস্ত্র থাকার বাহানা দিয়ে ২০ মার্চ ২০০৩ খৃষ্টাব্দে অ্যামেরিকা ইরাকের উপর আক্রমণ করে, যার ফলে হাজার হাজার নিরপরাধ লোক নিহত হয়েছে, ইরাকে অ্যামেরিকার নিয়ন্ত্রণ লাভের পর ফালুজা শহরের ঘণবসতিপূর্ণ এলাকায় অ্যামেরিকান সৈন্যরা বিষাক্ত গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং রাসায়নিক অস্ত্রও ব্যবহার করেছে, যা ব্যবহারে জাতিসঙ্গের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
    46. ২০০৬ খৃষ্টাব্দে জানুয়ারিতে ফিলিস্তিনের সাধারণ নির্বাচনে হামাস বিজয় লাভ করে, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের পতাকাবাহী অ্যামেরিকা হামাসের সরকারকেই মেনে নিতে অস্বীকার করে নি বরং তাদেরকে খতম করার জন্য একের পর এক পরিকল্পনাও নিতে থাকে।
    47. ইরানে আহমদ নাযাদের সরকার যেহেতু অ্যামেরিকাকে নিজের মনিব হিসেবে দেখছে না, তাই অ্যামেরিকা এখন রাত দিন সেখানে হামলা করার বাহানা খোঁজছে।
    48. নামে মাত্র সন্ত্রাসবাদ খতম করার অজুহাতে পাকিস্তান অ্যামেরিকার বন্ধু হওয়া সত্বেও ডজন বারের বেশি পাকিস্তানের আকাশ সীমা পাকিস্তানের বিপক্ষে ব্যবহার করে পাকিস্তানের স্বাধীনতাকে চেলেঞ্জ করেছে।

    আসুন একবার ১৪ শত বছর আগের মানবাধিকার সম্পর্কে ইসলামের দিকনির্দেশনার কিছু দৃষ্টান্ত নেয়া যাক, এরপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন যে, মানবাধিকারের দাবীতে কে সত্যবাদী আর কে মিত্যাবাদী?

    1. বিদায় হজ্বের সময় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভাষণ দিতে গিয়ে, মানুষকে মানবাধিকার সম্পর্কে বলতে গিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যাপক অর্থবোধক এক বক্তব্য পেশ করেছেন যে, কিয়ামত পর্যন্ত এর বিকল্প কিছু পাওয়া সম্ভব নয়। অ্যামেরিকা এবং প্রাচ্যবাসীরা যখন একান্তচিত্তে কোন সময় তা অধ্যায়ন করবে এবং এ অনুযায়ী আমল করার সিদ্ধান্ত নিবে, তাহলে নিঃসন্দেহে ঐ দিন থেকেই বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তার সয়লাভ হয়ে যাবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন— হে মানব মণ্ডলী! নিশ্চয় তোমাদের রব একক, তোমাদের পিতাও একজন।

      শুনে রাখ কোন আরাবীর অনারবীর উপর এবং কোন অনারবীর কোন আরাবীর উপর কোন বিশেষ মর্যাদা নেই, না কোন লাল বর্ণের অধিকারী কোন কৃষ্ণাঙ্গের উপর, না কোন কৃষ্ণাঙ্গের কোন লাল বর্ণের অধিকারীর উপর কোন বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, তবে (তাদের মাঝে) মর্যাদার (মাপকাঠি) হবে তাকওয়ার ভিত্তিতে। (মুসনাদ আহমদ)

      তিনি অন্যত্র আরেকটি বক্তব্যে বলেছেন— হে মানব মণ্ডলী! তোমাদের রক্ত, সম্পদ, সম্মান একে অপরের উপর সর্বদাই হারাম, এ বিষয়গুলো তোমাদের জন্য এমনি মর্যাদাবান যেমন আজকের দিন (১০ যিলহাজ্জ্ব) এবং যেমন এই শহর (মক্কা) তোমাদের নিকট মর্যাদাবান। (বোখারী, আবুদাউদ, নাসায়ী)।

    2. মানুষের জানের নিরাপত্তাকে সুদৃঢ় করার জন্য এতটুকু সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, যে ব্যক্তি লোহার অস্ত্র দিয়ে তার ভাইয়ের প্রতি ইঙ্গিত করবে তার উপর ফেরেশ্তা ততক্ষণ পর্যন্ত অভিসম্পাত করতে থাকবে যতক্ষণ না সে তা থেকে বিরত হবে। চাই সে তার আপন ভাই হোক বা যে ধরণের ভাই হোক না কেন। (মুসলিম)
    3. অমুসলিমদের জীবনের নিরাপত্তা বিধানকে নিশ্চিত করতে গিয়ে বলা হয়েছে— যে ব্যক্তি কোন যিম্মীকে (ইসলামী রাষ্ট্রে বিধর্মী প্রজা) বিনা কারণে হত্যা করল, সে জান্নাতের সুঘ্রাণ পাবে না। (বোখারী)
    4. যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাগণকে এ নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন যেন নিহতদেরকে মোসলা (নাক, কান) কর্তন না করা হয়। শত্রুকে ধোঁকা দিয়ে হত্যা করা যাবে না; শত্রুকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে হত্যা করা যাবে না; শত্রুকে নিরাপত্তা দেয়ার পর তাকে হত্যা করা যাবে না; নারী, শিশু, শ্রমিক, ইবাদতকারীদেরকে হত্যা করা যাবে না; ফলবান বৃক্ষ কাটা যাবে না; চতুপদ জন্তু হত্যা করা যাবে না; অঙ্গীকার ভঙ্গ করা যাবে না; যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের জান মালের নিরাপত্তা ঐভাবে দিতে হবে যেভাবে মুসলমানদের জানমালের নিরপত্তা বিধান করা হয়ে থাকে। ( বোখারী, মোয়ত্বা, আবুদাউদ, ইবনু মাযা)

    ইসলামের এ দিক নির্দেশনা শুধু মৌখিকই ছিল না বরং মুসলমানরা সর্বকালে যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে এ দিক নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছে।

    আমরা এখানে উদাহরণ সরূপ কিছু ঘটনা উল্লেখ করতে চাই—

    1. ৮ম হিযরীর শা’বান মাসে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খালেদ বিন ওলীদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে এক কাবিলা (বংশের) লোকদেরকে দাওয়াত দেয়ার জন্য পাঠালেন, ভুল বুঝাবুঝির ভিত্তিতে কিছু সংখ্যক লোককে কাফের মনে করে হত্যা করা হল, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন বিষয়টি জানতে পারলেন তখন উভয় হাত তুলে দোয়া করলেন “হে আল্লাহ্ খালেদ যা করেছে তা থেকে আমি দায়িত্ব মুক্ত। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিহতদের রক্ত পণ এবং অন্যান্য ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন।
    2. ৪র্থ হিযরীর সফর মাসে বি’রে মাউনার বেদনাদায়ক ঘটনার পর, যেখানে আমর বিন উমাইয়া জমেরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন, মদীনায় ফিরে আসার সময় রাস্তায় কিলাব বংশের দু’ব্যক্তিকে শত্রু পক্ষের লোক মনে করে হত্যা করেছিল, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ঘটনা জানতে পেরে তিনি তাদের উভয়ের রক্তপণ আদায় করেন।
    3. ২য় হিযরীর রজব মাসে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি গোয়েন্দা দল সংবাদ সংগ্রহের জন্য পাঠালেন, যাদের কোরাইশদের একটি গ্রুপের সাথে সংঘর্ষ হল, সাহাবাগণ নিজেদের মাঝে পরামর্শক্রমে কোরাইশদের গ্রুপটির উপর আক্রমণ করল, ফলে কোরাইশদের এক ব্যক্তি নিহত হল, দু’জন গ্রেফতার হল, একজন পালিয়ে গিয়েছিল, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ঘটনা জানতে পেরে বললেন— আমি তোমাদেরকে হারাম (নিষিদ্ধ মাসে) যুদ্ধ করার অনুমতি দেই নি, ফলে তিনি দু’জন বন্দীকেই মুক্তি দিয়ে দিলেন এবং নিহত ব্যক্তির রক্তপণ আদায় করলেন।
    4. বদরের যুদ্ধে মক্কার মোশরেকদের ৭০জন লোক বন্দী হয়েছিল, এরা মুসলমানদের জানের শত্রু ছিল, মুসলমানদেরকে পৃথিবী থেকে চির বিদায় করে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু যখন বন্দী হয়ে আসল, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাগণকে নির্দেশ দিলেন যে বন্দীদের সাথে ভাল আচরণ করবে, তাই সাহাবাগণ নিজেরা খেজুর খেত, আর বন্দীদেরকে ভাল খাবার পরিবেশন করত, যে সমস্ত বন্দীদের কাপড় ছিল না তাদের জন্য কাপড়ের ব্যবস্থা করা হল, বন্দীদের মধ্যে এক ব্যক্তির নাম ছিল সুহাইল বিন আমর, যে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে রক্ত গরম করা বক্তব্য দিত, ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) পরামর্শ দিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ তার সামনের দু’টি দাঁত ভেঙ্গে দিন, যাতে আর কোন দিন আপনার বিরুদ্ধে কিছু বলতে না পারে। শাস্তি দেয়ার উপযুক্ত পরামর্শ ছিল, সামনে কোন বাধাও ছিল না, বিশ্ববাসীর প্রতি রহমতের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-র পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করে বন্দীদের সাথে সদাচারণের এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন যা পৃথিবীতে আজও অতুলনীয়।
    5. বদরের যুদ্ধের বন্দীদের মাঝে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জামাতা আবুল আসও ছিল, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মেয়ে যায়নাব (রাযিয়াল্লাহু আনহা) আবুল আসের মুক্তির জন্য কিছু সম্পদ পাঠাল, যার মধ্যে একটি হারও ছিল যা খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তার মেয়েকে বিদায় দেওয়ার সময় দিয়েছিল, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঐ হার দেখা মাত্র মন নরম হয়ে গেল, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাগণকে বললেন— যদি তোমরা অনুমতি দাও তাহলে আবুল আসকে বিনা মুক্তিপণে মুক্তি দিতে চাই, সাহাবাগণ সন্তুষ্ট চিত্তে অনুমতি দিলে, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবুল আসকে মুক্তি দিয়ে দিলেন।
    6. হুনাইনের যুদ্ধে ৬ হাজার লোক মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের সবাইকে শুধু বিনা মুক্তিপণেই মুক্তি দেন নি বরং তাদের প্রত্যেককে একটি করে মিশরীয় চাদরও উপহার হিসেবে দিলেন। আজ সমগ্র বিশ্বে যারা নিজেদের বড়ত্ব, সভ্যতা ও মানবতাবাদের দাবী করে বেড়াচ্ছে, তারা তাদের শতবছরের ইতিহাসে এধরণের কোন দৃষ্টান্ত খুঁজে পেলে তা পেশ করুক!
    7. গামেদী বংশের এক মহিলা রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল— ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে পবিত্র করুন, সাথে সাথে একথাও স্বীকার করল যে আমি অবৈধভাবে গর্ভধারণ করেছি, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন— তুমি ফিরে চলে যাও, সন্তান প্রসবের পর আসবে, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার শাস্তি এজন্য দেরী করলেন, যেন নির্দোষ শিশু সন্তানটির ক্ষতি না হয়, সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর ঐ মহিলা আবার আসলে তিনি বললেন— যাও এখন গিয়ে তাকে দুধ পান করাও, দুধ পানের বয়স শেষ হলে আসবে, মহিলাটি আবার ফিরে চলে গেল, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দ্বিতীয় বার তার শাস্তি এজন্য দেরী করলেন যেন একটি মা’সুম বাচ্চা তার মায়ের দুধ পান এবং স্নেহ বঞ্চিত না হয়। দুধপানের বয়স শেষ হওয়ার পর মহিলা আবার আসল, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার উপর শাস্তি কার্যকর করলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুধু মায়ের পেটেই সন্তানের নিরাপত্তার প্রতি গুরুত্ব দেন নি বরং সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পরও তাকে মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করা পছন্দ করেন নি।
    8. ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর শাসনামলে ইসলামী সেনাদল এক যিম্মীর (ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম প্রজার) জমির ফসল বিনষ্ট করে দিল, ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তখন বাইতুল মাল থেকে জমির মালিককে দশ হাজার দিরহাম ক্ষতিপূরণ দিলেন।9

    বাস্তবতা হল এই যে, ইসলাম আজ থেকে ১৪ শত বছর আগে যেভাবে মানবাধিকারকে সংরক্ষণ করেছে, পাশ্চাত্য তার সমস্ত উন্নতি, অগ্রগতি ও মুক্তচিন্তার অধিকার থাকা সত্বেও এধরণের মানবাধিকারের কল্পনাও করতে পারবে না।

    জাতি সঙ্ঘের জেনারেল এসেম্বলীতে ১০ ডিসেম্বর ১৯৪৮ খৃষ্টাব্দে মানবাধিকার সম্পর্কে ৩০ দফা সম্বলিত যে ঘোষণা পেশ করা হয়, তা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করলে দেখা যাবে যে এখানে মানবাধিকারের শুধু রেফারেন্সই রয়েছে, কিন্তু ইসলাম যেভাবে মানব জীবনের সকল স্তরে পৃথক পৃথক অধিকার নির্ধারণ করেছে, যেমন— পিতা-মাতার অধিকার, সন্তানদের অধিকার, স্বামীর অধিকার, স্ত্রীর অধিকার, প্রতিবেশীর অধিকার, এতীমের অধিকার, মিসকীন ও অভাবীদের অধিকার, ভিক্ষুকের অধিকার, মুসাফিরের অধিকার, বন্দীর অধিকার, ক্রীতদাসের অধিকার, অমুসলিমের অধিকার, এমনকি কিছুক্ষণের জন্য কারো নিকট অবস্থানকারীর অধিকার, পাশ্চাত্যের এধরণের অধিকার প্রতিষ্ঠার চিন্তা কিয়ামত পর্যন্ত আসবে না।

    পাশ্চাত্যবাসীদের নিকট নারী অধিকারের যথেষ্ট বলিষ্ট কণ্ঠ শোনা যায়, কিন্তু সত্য কথা হল এই যে, পাশ্চাত্যবাসীরা নারী অধিকারের নামে নারীকে শুধু উলঙ্গই করেছে, এছাড়া আর কোন অধিকার যদি তারা নারীকে দিয়ে থাকে, তাহলে তাদের তা পরিষ্কার করা উচিত, অথচ ইসলাম নারীকে শুধু সম্ভ্রম এবং সম্মানই রক্ষা করে নি বরং তাকে সমাজে একজন সম্মানীতা এবং মানানসই স্থানও দিয়েছে, মা হিসেবে তাকে পিতার চেয়েও অধিক ভাল আচরণ পাওয়ার অধিকার দিয়েছে, স্ত্রী হিসেবে তার জন্য আলাদা অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে, মেয়ে এবং বোন হিসেবেও তাকে তার অধিকার দেওয়া হয়েছে, যদি বিধবা হয় তাহলে সে ক্ষেত্রেও তার অধিকার দেয়া হয়েছে, যদি ত্বালাক প্রাপ্তা হয়, তাহলে ঐ ক্ষেত্রেও তার অধিকার তাকে দেয়া হয়েছে। উন্নতী ও অগ্রগতি সম্পন্ন এবং মুক্তচিন্তার পাতাকাবাহী পাশ্চাত্য সমাজ আদৌ কি নারীকে এ অধিকার দিতে প্রস্তুত আছে? কিন্তু পাশ্চাত্যবাসীদের চক্রান্তের কি ধারণা যে, মায়ের পেটে শিশুর জীবনের নিরাপত্তা বিধানকারী ইসলামের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সন্ত্রাসী, রক্তপাতকারী, হত্যাকারী নবী ছিলেন? (নাউজুবিল্লাহ্)।

    আর শুধু একটি রাষ্ট্র ইরাকের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে ৫ লক্ষ মা’সুম বাচ্চাকে মৃত্যু মুখে পতিত কারী অ্যামেরিকা এবং পাশ্চাত্যবাসীরা সবচেয়ে বড় মানবাধিকার রক্ষা কারী?

  • ইসলাম ও কুফুরীর দ্বন্ধ

    ইসলাম ও কুফুরীর দ্বন্ধ

    ইসলাম এবং কুফরীর দন্দ্ব ঐ দিন থেকে শুরু হয়েছে যেদিন ইবলীস আল্লাহ্‌র নির্দেশ অমান্য করে আদম (আ.)-কে সেজদা করতে অস্বীকার করেছিল এবং বিতাড়িত হয়েছিল, বিতাড়িত হওয়ার পর সে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিল যে,

    قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ ١٦ ثُمَّ لَآتِيَنَّهُمْ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَائِلِهِمْ ۖ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ  ١٧

    অর্থ— সে বলল, আপনি আমাকে যেমন উদ্‌ভ্রান্ত করেছেন, আমিও অবশ্যই তাদের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব। এরপর তাদের নিকট আসব তাদের সামনের দিক থেকে, পেছন দিক থেকে, ডান দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে। (সূরা আ’রাফ-১৬,১৭)

    ইবলীসের এ প্রতীজ্ঞার পর থেকে মানব ইতিহসের রাত ও দিন কখনো ইসলাম ও কুফুরের দন্দ্ব থেকে মুক্ত ছিল না, কখোনো এ দন্দ্ব নূহ (আ.) এবং তাঁর কাউমের সরদারদের মাঝে ছিল, কখনো ইবরাহীম (আ.) এবং নমরূদের মাঝে ছিল, আবার কখনো হুদ (আ.) এবং তাঁর কাউমের সরদারদের মাঝে ছিল, আবার কখনো সালেহ (আঃ) এবং তাঁর কাউমের সরদারদের মাঝে ছিল, সর্বশেষে এ দন্দ্ব মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং কোরাইশদের সরদারদের মাঝে সংঘটিত হয়েছিল।

    আল্লাহ্ তা’য়ালা কোরআ’ন মাজীদে সম্মানীত নবীগণের সাথে কাফের নেতাদের দন্দ্বের কথা বিভিন্ন স্থানে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, যা অধ্যায়নে কাফেরদের ইসলামের সাথে শত্রুতা, সত্যের প্রতি উগ্রমনভাব, ঈমানদারদের বিরুদ্ধে যোগসাজেস এবং চক্রান্ত, ঈমানদারদের প্রতি যুলম, তাদেরকে কষ্ট দেয়া, তাদেরকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা, এর বিপরীতে ঈমানদারগণের দৃঢ়মনোভাব এবং ধৈর্য, ঈমানদারদের জন্য আল্লাহ্‌র সাহায্য এবং সংরক্ষণ, সর্বশেষে কাফেরদের দৃষ্টান্তমূলক পরিণতি ইত্যাদি থেকে বস্তবতাকে বুঝা অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। এবাস্তব সত্য থেকে দু’টি বিষয় স্পষ্ট হয়—

    ১ম, ইসলাম এবং কুফরের মাঝে দন্দ্ব আবহমানকাল থেকেই শুরু হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে, আল্লামা ইকবাল বলেছেন—

    ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দন্দ্ব আবহমানকাল থেকে আজ পর্যন্ত চলে আসছে, মোস্তফার (ইসলামের) আলোর সাথে আবু লাহাবের দন্দ্ব।

    ২য়, ইসলাম এবং কুফরের মাঝের দন্দ্বের মূল কারণ আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনা।

    “তা’লিমাত কোরআ’ন” বিষয়টি এত ব্যাপক যে, কয়েকশ পৃষ্ঠার গ্রন্থে তা আলোচনা করা সম্ভব ছিল না, আমি বর্তমান আবস্থার আলোকে শুধু ঐ সমস্থ শিক্ষাগুলোর উপরে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি যে, যে বিষয়গুলো ইসলামের শত্রুরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঠাট্টা বিদ্রুপের নিদর্শনে পরিণত করেছে। উল্লেখিত শিক্ষাগুলো ছাড়াও আক্বীদা, গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ এবং নিষেধাবলীর উল্লেখ করা হয়েছে, আশা করছি এতে এ গ্রন্থ থেকে উপকার হাসিলে আরো অধিক সুবিধা হবে, ইন্‌শাআল্লাহ্।

    এগ্রন্থের ভাল দিকগুলো আল্লাহ্ তা’য়ালার দয়া এবং আনুগ্রহের ফল, আর ভুলভ্রান্তিসমূহ আমার নিজের গোনাহের কারণে। আমি আল্লাহ্ তা’য়ালার নিকট দোয়া করছি যে, তিনি যেন আমার জীবনের গোনাহ এবং অকল্যাণসমূহ স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহে আবৃত করে দেন, নিশ্চয় তিনি অত্যন্ত অনুগ্রহকারী এবং ক্ষমাশীল ও দয়াকারী।

    এ গ্রন্থ প্রস্তুতির ব্যাপারে সহযোগিতাকারী উলামাগণের জন্য উদার মনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যে, আল্লাহ্ তাদের ইলম ও আমলে বরকত দিন, দুনিয়া এবং আখেরাতে তাদেরকে তাঁর অসীম রহমতে রহম করুন আমীন!

    বিজ্ঞজনের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা যে, তাদের চোখে এ গ্রন্থের যেখানেই কোন ভুল দৃষ্টি গোচর হবে উদার চিত্তে তারা তা আমাকে অবগত করাবেন, আমি তাদের জন্য দোয়া করব এবং পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধন করে আমি আনন্দ উপভোগ করব। (আল্লাহ্ তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দিন।)

    আমার মোহতারাম বন্ধু জনাব সেকান্দার আব্বাসী সাহেব, (হায়দারাবাদ সিন্দ)-এর জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞাতার হকদার এজন্য যে, সে তাফহিমুসসুন্নাহ্ সিরিজের সমস্ত বই অত্যন্ত কষ্ট স্বীকার করে এবং যথেষ্ট যত্নসহকারে শুধু সিন্ধী ভাষায় অনুবাদই করে নি বরং তার প্রকাশনা এবং বণ্টেনের দায়িত্বও পালন করছে, আল্লাহ্ তার সুস্থতা এবং জীবনে বরকত দিন, তিনি তাকে আরো একনিষ্ঠ এবং দৃঢ়তার সাথে হাদীস প্রচার এবং প্রসারের তাওফিক দিন, আমীন!

    ভাই আযীয খালেদ মাহমুদ কিলানী, হাদীস পাবলিকেশন্সের ম্যানেজার এবং ভাই আযীয হারুনুর রশীদ কিলানী ডিজাইনার, তারা তাদের নিজ দায়িত্বের চেয়ে আরো অধিক গুরুত্ব দিয়ে নিষ্ঠার সাথে কাজ করায় আমার অগ্রহ আরো জোরদার হয়েছে। এ দু’ভাইয়ের রাতদিনের পরিশ্রমে গ্রন্থসমূহ যথাযথ নিয়মে প্রকাশিত হচ্ছে। আল্লাহ্ তা’য়ালা এ ভাতৃদ্বয়কে দুনিয়া এবং আখেরাতে কল্যাণ দান করুন। তাদের ধন-সম্পদ এবং পরিবার পরিজনে বরকত দান করুন। আমীন!

    সাউদী আরবে তাফহিমুসসুন্নাহ্ প্রকাশ ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী হাফেজ আবেদ এলাহী সাহেব (মুদীর, মাক্তাবা বাইতুস্‌সালাম) অত্যন্ত কষ্ট স্বীকার করে এ দায়িত্বে আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন, দোয়া করছি যে, আল্লাহ্ তাঁকে দুনিয়া ও আখেরাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমীন!

    আমি আমার ঐ সমস্ত বন্ধুদেরর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যারা তাফহিমুস্‌সুন্নার প্রকাশনার জন্য গত বিশ বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠা এবং দৃঢ়তার সাথে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে, বিশেষ করে প্রিয় পাঠকগণেরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যারা এহাদীস গ্রন্থসমূহ থেকে উপকৃত হওয়ার পর আমার জন্য কল্যাণের দোয়া করছে, আল্লাহ্ তাদের সকলকে দুনিয়া ও আখেরাতে উচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমীন!

    হে বিশ্ব প্রতিপালক! হাদীস প্রচারণার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে তুমি অনুগ্রহ করে কবুল কর, এটাকে তুমি আমার জন্য, আমার পিতা-মাতার জন্য, অনুবাদকদের জন্য, প্রকাশকদের জন্য, সহযোগিতাকারীদের জন্য, পাঠকদের জন্য, সাদকা জারিয়া কর এবং ঐ দিন তোমার রহমত হাসিলের যারিয়া কর যেদিন তোমার রহমত ব্যতীত মাগফিরাতের আর কোন রাস্তা থাকবে না।

    وصلى الله على نبينا محمد صلى الله عليه وسلم وآله واصحابه اجمعين، برحمتك يا ارحم الراحمين.

    ১৬ রবিউস্‌সানী ১৪২৭হিঃ,

    মোতাবেক ১৪ মে ২০০৬ইং।

    মোহাম্মদ ইকবাল কিলানী (আফাল্লাহু আনহু)

    রিয়াদ, সাউদী আরব

  • কোরআন সংরক্ষণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

    কোরআন সংরক্ষণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

    কোরআ’ন মাজীদ অবর্তীর্ণের সূত্রপাত হয়েছিল লাইলাতুল কদর, ২১ রমযান, ১০ আগষ্ট ৬১০ খৃষ্টাব্দ, সোমবার।10

    ঐ সময়ে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বয়স ছিল চন্দ্র বছর হিসেবে ৪০ বছর, ৬ মাস, ১২ দিন। আর সৌর বছর হিসেবে ৩৯ বছর তিন মাস ২২ দিন।11

    অহী অবতীর্ণের প্রারাম্ভে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এভয়ে থাকতেন যে নাজানি তিনি অহীর কথাগুলো ভুলে যান, জিবরীল (আ.)-এর সাথে সাথে অহীর কথগুলো বার বার দোহরাতেন, ফলে আল্লাহ্ এ নির্দেশ দিলেন যে,

    لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ ١٦

    অর্থ: “তাড়াতাড়ি শিখে নেয়ার জন্য আপনি দ্রুত অহী আবৃত্তি করবেন না।” (সূরা ক্বিয়ামা-১৬)

    সাথে সাথে এ নিশ্চয়তাও দিলেন যে, এ অহী স্মরণ রাখা এবং পড়ানো আমার দায়িত্ব। আল্লাহ্‌র বাণী:

    إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ ١٧ فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ ١٨

    অর্থ: “এর সংরক্ষণ ও পাঠ আমারই দায়িত্ব, অতঃপর আমি যখন তা পাঠ করি তখন আপনি ঐ পাঠের অনুসরণ করুন। (সূরা কিয়ামা-১৭,১৮)

    আল্লাহ্‌র এবাণী থেকে একথা পরিষ্কার ভাবে স্পষ্ট হয় যে, কোরআন মাজীদের এক একটি আয়াত, এক একটি শব্দ স্বয়ং আল্লাহ্ তা’লা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অন্তরে সংরক্ষিত করে দিয়ে ছিলেন। আরো সতর্কতার জন্য রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি বছর রমযান মাসে কোরআন মাজীদের ততটুকু শোনাতেন যতটুকু অবতীর্ণ হয়েছিল। যে বছর তিনি মৃত্যুবরণ করেন ঐ বছর জিবরীল (আঃ) কে দু’বার কোরআ’ন শুনিয়েছেন। যেন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অন্তরে কোরআন মাজীদ এমনভাবে সংরক্ষিত ছিল যে সামান্য ভূল ত্রুটি বা সামান্য হেরফেরের কোন প্রকার কোন সম্ভবনা ছিল না।

    সাহাবা কেরামগণের মাঝে শিক্ষিত অশিক্ষিত সর্বপ্রকার লোকই ছিল, শিক্ষিত লোকদের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল, তাই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোরআ’ন সংরক্ষণের জন্য কোরআ’ন মুখস্ত করা এবং লিখিত ভাবে রাখা উভয় পদ্ধতিই তিনি অবলম্বন করেছেন।

    উভয় পদ্ধতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নীচে উল্লেখ করা হল:

    কোরআ’ন মুখস্ত করা:

    কোরআ’ন মাজীদের অবতীর্ণ যেহেতু শাব্দিক ভাবে হয়েছিল অতএব জিবরীল (আ.) শব্দ এবং আয়াতের ধারাবাহিকতার সাথে সাথে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তার বিশুদ্ধ উচ্চারণও শিখাত, আর ঐ শাব্দিক ভাবেই উম্মত পর্যন্ত পৌঁছানো জরুরী ছিল, তাই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সার্বিক প্রচেষ্টা কোরআ’ন মুখস্ত করার ক্ষেত্রে ব্যয় করেছেন।

    মদীনায় হিযরত করার পর তিনি সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণ করেছেন, এরপর মসজিদের এক পাশে সামান্য উঁচু করে “সুফ্‌ফা” তৈরী করে তাকে মাদ্রাসায় রূপ দিয়েছেন, যেখনে উস্তাদগণ তাদের ছাত্রদেরকে কোরআ’ন শিক্ষা দিত। ওবাদা বিন সামেত (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: যখন কোন ব্যক্তি হিজরত করে মদীনায় আসত তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে আমাদের আনসারদের মধ্য থেকে কারো নিকট পাঠিয়ে দিতেন, যেন তাকে কোরআ’ন শিখানো হয়। মসজিদ নববীতে কোরআ’ন মাজীদ তেলাওয়াত করা এবং শিক্ষা দেয়ার আওয়াজ এত বেশি হত যে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন যে, হে লোকেরা তোমরা তোমাদের আওয়াজ সংযত রাখ।

    কোরআন মুখস্ত করার প্রতি তাড়াহুড়া এবং বেশি গুরুত্ব দেয়ার দ্বিতীয় কারণ এই যে, আরবদের ছিল যথেষ্ট মুখস্ত শক্তি, যারা তাদের বংশধারাতো বটেই এমনকি তারা তাদের ঘোড়ার বংশধারাও পরিষ্কার করে জানত।

    কোরআ’ন মুখস্তের প্রতি গুরুত্ব দেয়ার তৃতীয় কারণ ছিল এই যে, প্রত্যেক মুসলমানের জন্য নামাযে কিছু না কিছু তেলওয়াত করা অপরিহার্য, ফরয নামায ব্যতীত নফল নামায, বিশেষ করে তাহাজ্জুদ নামাযের ফযিলত সাহাবা কেরামগণের মাঝে কোরআ’ন মুখস্তের আগ্রহকে আরো বৃদ্ধি করেছে।

    রমযান মোবারকের পূর্ণ মাস কোরআ’ন মাজীদ তেলওয়াত, শ্রবণ, মুখস্ত, শিখা, শিখানোর বিশেষ সময়, এতদ্ব্যতীত কোরআন মাজীদের অসংখ্য ফযিলত এবং কল্যাণের প্রতি দৃষ্টি রেখে কোরআন মুখস্ত করার ব্যাপারে সাহাবা কেরামগণ একে অপরের চেয়ে অগ্রগামী থাকার জন্য চেষ্টা করত।

    ৪র্থ হিযরীতে বিরে মাউনার বেদনাদায়ক ঘটনায় ৭০ জন সাহাবীর ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে যে তারা সবাই ভাল কোরআ’ন তেলওয়াতকারী ছিল, তারা দিনের বেলায় কাঠ কেটে আহলে সুফ্‌ফার লোকদের জন্য খাবার সংগ্রহ করত এবং কোরআন শিখত ও শিখাত, আর রাতে আল্লাহ্‌র নিকট দোয়া করা ও নামায আদায়ে ব্যস্ত থাকত।12

    সাহাবা কেরামগণের এ আগ্রহের ফলাফল এই ছিল যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবদ্দশায়ই হাফেযগণের একটি বড় দল গড়ে উঠেছিল, ঐদলের মধ্যে আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু), ওমার ফারুক (রযিয়াল্লাহু আনহু), ওসমান গনী (রযিয়াল্লাহু আনহু), আলী (রযিয়াল্লাহু আনহু), তালহা (রযিয়াল্লাহু আনহু), সা’দ (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ্ বিন মাসউদ (রযিয়াল্লাহু আনহু), হুযাইফা বিন ইয়ামান (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবু হুযাইফা (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর গোলাম সালেম (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবু হুরাইরা (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ্ বিন ওমার (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ্ বিন আব্বাস (রযিয়াল্লাহু আনহু), আমর বিন আস (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ্ বিন আমর (রযিয়াল্লাহু আনহু), মোয়াবীয়া (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ্ বিন যুবাইর (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ্ বিন সায়েব (রযিয়াল্লাহু আনহু), আয়শা (রাযিয়াল্লাহু আনহা), হাফসা (রাযিয়াল্লাহু আনহা), উম্মু সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-গণের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ যোগ্য।13

    রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মৃত্যুর সাথে সাথেই ১১ হিযরীতে সংঘটিত ইয়ামামার যুদ্ধে ৭০০ হাফেযে কোরআ’নের শাহাদাত বরণ একথা স্পষ্ট করে প্রমাণ করে যে ঐ সময় পর্যন্ত যথেষ্ট পরিমাণ হাফেয গড়ে উঠেছিল, মুখস্ত করার মাধ্যমে কোরআন মাজীদ সংরক্ষণের এ ধারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত বিদ্ধমান আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা চালু থাকবে, ইনশাআল্লাহ্।

    কোরআন লিখন:

    কোরআন মুখস্ত করার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া সত্বেও কোরআন লিখে রাখার গুরুত্বের কথা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মোটেও ভুলে যান নি। এ উদ্দেশ্যে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিক্ষিত সাহাবাগণকে এ দায়িত্ব দিয়ে ছিলেন যে, ওহী নাযিল হওয়া মাত্রই তারা তা লিখে রাখবে। যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর নিদৃষ্ট ওহীর লিখক ছিল, এছাড়াও সরকারী অন্যান্য বিষয়াবলী লিখে রাখার দায়িত্বও তার ছিল। স্বয়ং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বিদেশী ভাষা শিখার এবং লিখার জন্য দিক নিদের্শনা দিয়ে ছিলেন। এছাড়া অন্যান্য উল্লেখ যোগ্য ওহী লিখকগণের নাম নিম্ন রূপ:

    1. আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    2. ওমার ফারুক (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    3. ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    4. আলী (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    5. ওবাই বিন কা’ব (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    6. যুবাইর বিন আওয়াম (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    7. মোয়াবিয়া বিন সুফিয়ান (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    8. মুগীরা বিন শো’বা (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    9. খালেদ বিন ওলীদ (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    10. সাবেত বিন কায়েস (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    11. আবান বিন সাঈদ (রযিয়াল্লাহু আনহু);
    12. আবদুল্লাহ্ বিন সাঈদ বিন আস (রযিয়াল্লাহু আনহু)।14

    জাহেলিয়াতের যুগেও লিখক হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে নির্দেশ দিয়ে রেখে ছিলেন যে, সে যেন সাহাবা কেরামগণকে লিখা শিখায়, বলা হয়ে থাকে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগে ওহী লিখকগণের সংখ্যা ৪০ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে ছিল।15

    রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখনই কোরআ’ন কারীমের কোন আয়াত অবতীর্ণ হত তখন তিনি ওহী লিখকদেরকে পরিপূর্ণভাবে নির্দেশ দিতেন যে, এ আয়াতটি ওমুক ওমুক সূরায় ওমুক ওমুক আয়াতের পরে লিখ, তখন ওহী লিখকগণ পাথর, চামড়া, খেজুরের ডাল, গাছের পাতা, হাড্ডি বা কোন কিছুর উপর লিখে রাখত, এভাবে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে কোরআন কারীমের এমন একটি কপি প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল যা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের তত্ত্বাবধানে লিখিয়েছেন। এছাড়াও অনেক সাহাবী এমন ছিলেন যে, তারা নিজের ইচ্ছা ও আগ্রহে কোন কোন সূরা বা আয়াত নিজের নিকট লিখে রাখত, যেমন ওমার (রযিয়ল্লাহু আনহু) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাঁর বোন এবং ভগ্নিপতি একটি পুস্তিকায় সূরা ত্বা-হা এর কিছু আয়াত লিখে রেখেছিল, তাই বলা হয়ে থাকে যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত অগোছানো ভাবে ১৭টির অধিক মোসহাফের (কোরআ’নের কপি) সন্ধান পাওয়া যায়।16

    লিখনীর মাধ্যমে কোরআন সংরক্ষণের ধারা আজও মুখস্তের মাধ্যমে কোরআ’ন সংরক্ষণের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি পরিমাণে শুধু জারিই নেই বরং তা দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে, মোটামুটি শতাধিক ভাষায় কোরআন মাজীদের অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে, শুধু মদীনায় প্রতিষ্ঠিত “বাদশাহ ফাহাদ আল কোরআ’ন একাডেমী” থেকে প্রতি বছর ২কোটি ৮০ লক্ষ কোরআন মাজীদের কপি ছেপে বিশ্ব ব্যাপী বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়। (তাঁকে আল্লাহ্ ইসলাম এবং মুসলমানদের পক্ষ থেকে সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন)।

    উল্লেখ্যঃ প্রেস আবিষ্কারের পরে সর্বপ্রথম ১১১৩ হি. জার্মানীর হামবুর্গ প্রেসে কোরআন মাজীদ ছাপানো হয় যার একটি কপি আজও দারুল কুতুব মিশরিয়াতে বিদ্ধমান আছে।17

    আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়ল্লাহু আনহু)-এর যুগে কোরআন মাজীদ একত্রিত করণ:

    ইয়ামামার যুদ্ধে যখন হাফেজগণের একটি বড় দল শহিদ হয়ে গেল তখন সর্বপ্রথম ওমার ফারুক (রযিয়ল্লাহু আনহু) কোরআ’ন মাজীদ লিখিত ভাবে একত্রিত করার প্রয়োজন অনুভূত করেন, তাই তিনি আমীরুল মুমেনীন আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট এসে বলল, ইয়ামামার যুদ্ধে হাফেজদের একটি বড়দল শহিদ হয়ে গেছে, যদি যুদ্ধসমূহে এভাবে হাফেযগণ শহিদ হতে থাকে তাহলে আশঙ্কা রয়েছে যে কোরআ’ন মাজীদের একটি বড় অংশ বিনষ্ট হয়ে যাবে, তাই তুমি কোরআ’ন মাজীদ একত্রিত করার প্রতি গুরুত্ব দাও।

    আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়ল্লাহু আনহু) বললেন, যেকাজ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর জিবদ্দশায় করে নি সেকাজ আমি কি করে করতে পারি?

    ওমার (রযিয়াল্লাহু আনহু) উত্তরে বললেন, আল্লাহ্‌র কসম এটা খুবই ভাল কাজ! এরপর আল্লাহ্ তা’লা একাজের জন্য আবুবকর (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর অন্তর খুলে দিলেন, তখন তিনি যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু)-কে ডেকে বললেন, তুমি যুবক এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তি। তোমার ব্যাপারে কারো কোন খারাপ ধারণা নেই, তুমি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অহীর লিখক ছিলে তাই তুমি কোরআন মাজীদের আয়াতসমূহ খুঁজে তা একত্রিত কর। যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু) বলল, যদি তারা (আবুবকর এবং ওমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) আমাকে কোন পাহাড় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করতে বলত তাহলে তা আমার জন্য এতটা দুষ্কর হত না যতটা দুষ্কর কোরআ’ন মাজীদ একত্রিতকরণ। আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু) যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু)-কে একাজের জন্য বার বার বলতে থাকলেন, এমন কি এক সময়ে আল্লাহ্ যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর অন্তরকে একাজের জন্য খুলে দিলেন ফলে তিনি একাজ করতে শুরু করলেন।18

    যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু) কত কষ্ট স্বীকার করে একাজে আঞ্জাম দিয়েছেন তা একথা থেকে অনুমান করা যাবে যে, যখন কোন ব্যক্তি কোন আয়াত নিয়ে যায়েদ (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট আসত তখন তিনি নিম্ন উল্লেখিত চারটি পদ্ধতিতে তা যাচাই বাছাই করতেন,

    1. যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু) নিজে হাফেজ ছিলেন তাই প্রথমে নিজের মুখস্তের আলোকে তা যাচাই করতেন।
    2. ওমার ফারুক (রযিয়াল্লাহু আনহু) ও যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে কোরআ’ন একত্রিত করার কাজে জড়িত ছিলেন, তিনিও কোরআ’নের হাফেজ ছিলেন তাই তিনিও নিজের মুখস্তের আলোকে তা যাচাই করতেন।
    3. যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু) ততক্ষণ একটি আয়াতকে গ্রহণ করতেন না যতক্ষণ না দু’জন গ্রহণ যোগ্য ব্যক্তি এ সাক্ষ্য না দিত যে, হাঁ এ আয়াতটি সত্যিই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে লিখা হয়েছে।
    4. পরিশেষে পেশকৃত আয়াতটিকে অন্যান্য সাহাবাগণের লিখিত আয়াতের সাথে মেলানো হত, যে আয়াতটি এ চারটি শর্ত অনুযায়ী সঠিক হত তা গ্রহণ করা হত। এত গুরুত্বের সাথে যায়েদ (রযিয়াল্লাহু আনহু) কোরআন একত্রিকরণের এগুরুত্বপূর্ণ কাজটি আঞ্জাম দিয়েছেন।

    যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু) একত্র কৃত এ কপিটিকে “উম্ম” বলা হত, এ উম্মের ৩টি বিশেষ বৈশিষ্ট ছিল —

    ক) সমস্ত সূরাসমূহের আয়াতগুলোকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিদের্শিত বিন্যাস অনুযায়ী বিন্যস্ত করা হয়েছে।

    খ) ঐ কপিতে কেরআতের (তেলওয়াত পদ্ধতির) ৭টি পদ্ধতিই বিদ্ধমান ছিল, যাতে করে যে ব্যক্তি যে পদ্ধতিতে সুবিধামত কোরআন তেলওয়াত করতে পারবে সে ঐভাবে তা করবে।

    গ) সূরাসমূহ ধারাবাহিক ভাবে সাজানো হয়নি বরং প্রত্যেকটি সূরা পৃথক পৃথক ভাবে সহিফার (পুস্তিকার) আকৃতিতে বিন্যস্ত করা হয়েছিল।

    আবুবকর সিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাসনামলে ঐ কপিটি আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট সংরক্ষিত ছিল, আবুবকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মৃত্যুর পর ওমার ফারুক (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগে এ কপিটি ওমার ফারুক (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট ছিল, ওমার ফারুক (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাহাদাত বরণের পর এক কপিটি উম্মুল মুমেনীন হাফসা বিনতু ওমার (রাযিয়াল্লাহু আনহার) নিকট সংরক্ষিত ছিল।

  • কুরআন মাজীদের সাত ক়েরাত

    কুরআন মাজীদের সাত ক়েরাত

    মূলত কোর’আন মাজীদ কোরাইশদের তেলওয়াত পদ্ধতি (তাদের ভাষায়) অবতীর্ণ হয়েছিল, কিন্তু বিভিন্ন বংশের বিভিন্ন রকমের স্থানীয় ভাষা এবং উচ্চারণ পদ্ধতির কারণে উম্মুতে মোহাম্মাদীকে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ৭টি স্থানীয় ভাষায় কোর’আন তেলওয়াতের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। জিবরীল (আ.) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ নির্দেশ পৌঁছাল যে, আপনি আপনার উম্মতকে একটি স্থানীয় ভাষায় কোর’আন শিক্ষা দিন। তিনি বললেন, আমি এ থেকে আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি, আমার উম্মত এ ক্ষমতা রাখে না। জিবরীল (আ.) দ্বিতীয় বার আসল এবং বলল, আল্লাহ্ তা’লা আপনাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনার উম্মতদেরকে স্থানীয় দু’টি ভাষায় কোর’আন শিক্ষা দিন। তিনি বললেন, আমি এ থেকে আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি, আমার উম্মত এ ক্ষমতা রাখে না। জিবরীল (আ.) তৃতীয় বার আসল এবং বলল, আল্লাহ্ তা’লা আপনাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনার উম্মতদেরকে স্থানীয় ৩টি ভাষায় কোর’আন শিক্ষা দিন। তিনি বললেন, আমি এ থেকে আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি, আমার উম্মত এ ক্ষমতা রাখে না। জিবরীল (আ.) চতুর্থ বার আসল এবং বলল, আল্লাহ্ তা’লা আপনাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনার উম্মতদেরকে স্থানীয় ৭টি ভাষায় কোর’আন শিক্ষা দিন, এ সাতটি স্থানীয় ভাষার মধ্যে মানুষ যে ভাষায় কোর’আন তেলওয়াত করবে তা সঠিক হবে।13

    উল্লেখ্য, ৭টি ভাষার উদ্দেশ্য হল কোথাও উচ্চারণের পার্থক্য, যে এক কেরাতে (পদ্ধতিতে) পড়া হয় মূসা অন্য ক্বেরাতে মূসায়ু, আবার কোথাও যের যবর পেশের পার্থক্য যেমন— এক কেরাতে যুল আরসিল মাজীদু (দালের উপর পেশ দিয়ে) আবার অন্য কেরাতে যুল আরসিল মাজীদি (দালের নিচে যের দিয়ে)। আবার কোথাও এ পার্থক্য হয় এক বচন, দ্বিবচন এবং বহুবচনে, বা পুং লিঙ্গ এবং স্ত্রী লিঙ্গের পার্থক্য। যেমন এক ক্বেরাতে তাম্মাতু কালিমাতু রাব্বিক আবার অন্য ক্বেরাতে তাম্মাত কালিমাত রাব্বুক। আবার কোথাও এ পার্থক্য হয়ে থাকে ক্রিয়ার মধ্যে, যেমন এক ক্বেরাতে ওমান তাত্বাওয়া খাইরান, আবার অন্য কেরাতে মান ইয়ত্বাওয়া খাইরান। কিন্তু একথা পরিষ্কার যে, এ সাত কেরাতের তেলওয়াতের মাধ্যমে অর্থের মধ্যে কোন পার্থক্য হয় না। এটা এধরণের পার্থক্য যেমন মিশরের অধিবাসীরা আরবী ‘জ্বিম’ অক্ষরটিকে বাংলা ‘গ’ এর ন্যায় উচ্চারণ করে, যেমন ‘জানাযা’ শব্দটিকে তারা ‘গানাযা’ উচ্চারণ করে থাকে, ইরানের অধিবাসীরা আরবী ‘কাফ’ অক্ষরটিকে বাংলা ‘চ’-এর ন্যায় উচ্চারণ করে থাকে, যেমন ‘আল্লাহু আকবার’কে তারা ‘আল্লাহু আচ্চার’ উচ্চারণ করে। ভারতের হায়দারাবাদ এলাকার লোকেরা আরবী ‘কাফ’ অক্ষরটিকে বাংলা ‘খ’-এর ন্যায় উচ্চারণ করে, যেমন ‘সন্দুক’কে তারা ‘সন্দুখ’ উচ্চারণ করে থাকে। কিন্তু এ ভিন্নতার কারণে কোথাও অর্থের মধ্যে কোন পরিবর্তন করে না। ঠিক এমনিভাবে কোর’আন মাজীদের ভিন্ন ভিন্ন সাত ক্বেরাতের বিষয়টিও অনুরূপই।

    ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু)-র কোর’আন মাজীদকে এক ক়েরাতে (তেলওয়াত পদ্ধতিতে) একত্রিতকরণ এবং সূরা সমূহের বিন্যাস:

    ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাসনামলে (২৫-০৩৫) হি. জিহাদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে গমনকারী সাহাবাগণ বিজিত অঞ্চলসমূহে নিজ নিজ শিক্ষা অনুযায়ী কোর’আন মাজীদ তেলওয়াত করত, যতদিন পর্যন্ত মানুষ ৭ ক্বেরাত (তেলওয়াত পদ্ধতি) সম্পর্কে অবগত ছিল ততদিন কোন প্রকার প্রশ্ন দেখা দেয়নি, কিন্তু সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে ইসলাম দূর দূরান্তের অঞ্চলসমূহে পৌঁছার পর ক্বেরাত (তেলওয়াত পদ্ধতি) সম্পর্কে মানুষের ধারণা কমতে লাগল, ফলে ভিন্ন জন ভিন্ন পদ্ধতিতে তেলওয়াত করার কারণে মানুষের মাঝে একজন আরেক জনের তেলওয়াতকে ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করতে লাগল, হুযাইফা বিন ইয়ামেন (রযিয়াল্লাহু আনহু) আরমেনিয়া এবং আজারবাইজানের যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর ওসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, হে আমীরুল মুমেনীন এ উম্মত আল্লাহ্‌র কিতাব নিয়ে মতভেদে লিপ্ত হওয়ার আগে তার একটা সুরাহা করুন। ওমসান (রযিয়াল্লাহু আনহু) জিজ্ঞেস করলেন যে, কি হয়েছে? হুযাইফা (রযিয়াল্লাহু আনহু) বলল, যুদ্ধ চলাকালে দেখলাম যে সিরিয়ার লোকেরা উবাই বিন কা’ব (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর তেলওয়াত পদ্ধতিতে কোর’আন তেলওয়াত করছে, যা ইরাক বাসীরা শোনেনি, আর ইরাকবাসীরা আবদুল্লাহ্ বিন মাসউদ (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর তেলওয়াত পদ্ধতিতে কোর’আন তেলওয়াত করছে যা সিরিয়াবাসীরা শোনেনি, ফলে একে অপরকে কাফের ফতোয়া দিচ্ছে। ইতিপূর্বে ওসমান (রযিয়ল্লাহু আনহু)-এর নিকট এ ধরনের অভিযোগ এসেছিল, তাই তিনি সম্মানিত সাহাবাগণকে একত্রিত করে বিষয়টি নিয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করলেন যে, এ বিষয়ে আপনাদের কি পরামর্শ? সাহাবাগণ ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু)-কে জিজ্ঞেস করল, আপনি এ ব্যাপারে কি চিন্তা করেন? ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু) বলল, আমার পরামর্শ হল এই, যে সমস্ত মুসলমানদেরকে এক ক্বেরাত (তেলওয়াত পদ্ধতির) উপর একমত করে দেই, যাতে কোন মতভেদ না থাকে। সাহাবাগণ ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু)-র এ পরামর্শকে পছন্দ করল এবং এটাকে তারা সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করল। এ সম্মিলিত সিদ্ধান্তের উপর কাজ করার জন্য ওসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) চারজন সাহাবার সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করলেন, এ কমিটির মধ্যে ছিল যায়েদ বিন সাবেত (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ্ বিন যোবাইর (রযিয়াল্লাহু আনহু), সা’ঈদ বিন আস (রযিয়াল্লাহু আনহু), আবদুর রহমান বিন হারেস (রযিয়াল্লাহু আনহু)। এ কমিটিকে সহযোগীতা করার জন্য পরে আরো অন্যান্য সাহাবীগণ তাদের সাথে শামীল হয়ে ছিলেন। এ কমিটিকে এ দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল যে, তারা আবুবকর এবং ওমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমার) একত্রিতকৃত কপি থেকে এমন একটি কপি প্রস্তুত করবে যা শুধু একটি ক্বেরাত (তেলওয়াত পদ্ধতিতে) হবে, আর যদি কোন শব্দ বা আয়াতের ব্যাপারে মত ভেদ হয় যে, এটা কিভাবে লিখা হবে তখন তা কোরাইশদের তেলওয়াত অনুযায়ী লিখতে হবে, কেননা কোর’আন কারীম তাদের ভাষায়ই অবতীর্ণ হয়েছে। সাহাবাগণের একমিটি ‘উম্ম’কে সামনে রেখে যে গুরুত্বপূর্ণ কজে আঞ্জাম দিয়ে ছিল তা ছিল নিম্নরূপ:

    1. রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সময়ে সাহাবাগণের নিকট যতগুলো সহীফা ছিল তা আবার তলব করা হল এবং এগুলোকে নুতন করে ‘উম্ম’-এর সাথে মেলানো হল, ততক্ষণ পর্যন্ত একটি আয়াত নুতন মোসহাফে (কোর’আনে) অন্তর্ভুক্ত করা হয় নাই যতক্ষণ না সাহাবাগণের ভিন্ন ভিন্ন সহিফার সাথে মেলানো হয়েছে।
    2. আয়াতসমূহকে যের যবর পেশহীনভাবে এমনভাবে লিখা হল যেন সমস্ত ক্বেরাত (তেলওয়াত পদ্ধতি) এক হয়ে যায়, যেমন: কিয়ামতের দিনের মালিক ও কিয়ামতের দিনের বাদশাহ। এ দু’টি পদ্ধতিকে নুতন মোসহাফে (কোর’আনে) এমন ভাবে লিখা হল, এতে উভয় ক্বেরাত (তেলওয়াত পদ্ধতি) লিখার মধ্যে এসে গেছে, কিন্তু এর অর্থের মধ্যে কোন রূপ পরিবর্তন হয় নাই।
    3. ‘উম্ম’-এর মধ্যে সমস্ত সূরাসমূহ পৃথক পৃথক সহিফায় (পুস্তকে) অগোছালোভাবে বিদ্ধমান ছিল, এ কমিটি চিন্তাভাবনা করে সমস্ত সূরাগুলোকে ধারাবহিকভাবে সাজিয়ে একত্রিক করে দিল।
    4. ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু) সকলের ঐক্যমতে প্রস্তুতকৃত কোর’আনের এ কপি বিভিন্ন স্থানে পাঠলেন, তার মধ্যে একটি কপি মক্কায়, একটি সিরিয়ায়, একটি ইয়ামেন, একটি বাসরায়, একটি কুফায় পাঠালেন আর একটি কপি মদীনায় সংরক্ষণ করলেন।
    5. কোর’আন মাজীদের এ কপি বিভিন্ন ইসলামী কেন্দ্রগুলোতে পাঠানোর সাথে সাথে ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু) একজন বিশেষজ্ঞ এবং কারীও ঐ সমস্ত ইসলামী কেন্দ্রগুলোতে পাঠিয়েছেন, যারা লোকদেরকে সকলের ঐক্যমতে প্রস্তুতকৃত কোর’আনের তেলওয়াত পদ্ধতি মোতাবেক যথাযথভাবে লোকদেরকে কোর’আন শিক্ষা দিত। তাদের মধ্যে যায়েদ (রযিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন মদীনায়, আর আবদুল্লাহ্ বিন সায়েব (রযিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন মক্কায়।

    এসমস্ত কর্মগুলো শেষ করার পর ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু) সাহাবাগণের নিকট বিদ্ধমান ভিন্ন ভিন্ন তেলওয়াত পদ্ধতি সম্বলিত কপিগুলো আগুন দিয়ে পুরিয়ে দিলেন। আর ‘উম্ম’ হাফসা (রাযিয়াল্লাহু আনহার) নিকট ফেরত দিলেন, যা হাফসা (রাযিয়াল্লাহু আনহার) মৃত্যুর পর মারওয়ান আগুন দিয়ে পুরিয়ে দিয়েছিল।

    এ সাত কোরাতকে (তেলওয়াত পদ্ধতিকে) একটি পদ্ধতি একটি মোসহাফে (কোর’আনে) সমবেত করার মধ্যে ওসমান (রযিয়াল্লাহু আনহু) কোর’আন মাজীদের ঐ বিরাট খেদমতে আঞ্জাম দিলেন যার ফলে আজ বিশ্বব্যাপী মুসলমানেরা ঐ পদ্ধতিতেই কোর’আন মাজীদ তেলওয়াত করছে, যে তেলওয়াত পদ্ধতিতে কোর’আন মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। সাহাবা কেরামগণের এ কষ্টের পর আল্লাহ্‌র দয়া ও অনুগ্রহে কোর’আন মাজীদের এক একটি অক্ষর, এক একটি শব্দ, এক একটি আয়াত কিভাবে কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত করে রেখেছেন তার কিছু উদাহরণ নিচে পেশ করা হল:

    1. কোর’আন মাজীদে ইবরাহীম শব্দটি ৬৯ বার এসেছে এর মাধ্যে সূরা বাক্বারার সর্বত্র এ শব্দটি ‘ইয়া’ ব্যতীত লিখা হয়েছে। যেমন, إِبْرَٰهِـۧمَ; আবার অন্যান্য সূরাসমূহে ইবরাহীম শব্দটি ‘ইয়া’ অক্ষরসহ লিখা হয়েছে। যেমন, إِبْرَاهِيمُ। কোর’আন মাজীদ লিখার ক্ষেত্রে এ পার্থক্য কোর’আন মাজীদের প্রতিটি কপিতে ১৪শত বছর থেকে চলে আসছে যা আজ পর্যন্ত কোন মুসলমান বা অমুসলিম প্রকাশক তা পরিবর্তন করতে পারে নাই, না কিয়ামত পর্যন্ত তা করতে পারবে।
    2. সামূদ শব্দটি কোর’আন মাজীদে দুইভাবে লিখা হয়েছে, যেমন, প্রথম আরবী ‘দাল’ অক্ষরটিতে যবর দিয়ে ثَمُودَ — সূরা হুদ ৬১ নং আয়াত, আবার কোর’আন মাজীদের চারস্থানে এই শব্দটি আলিফ যোগে এভাবে লিখা হয়েছে, ثَمُودَاْ সূরা হুদ ৬৮ নং আয়াত। ১৪শত বছর থেকে কোর’আন মাজীদের চারটি স্থানে সামূদ শব্দটি আলিফ যোগে লিখিত আছে, যেমন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে লিখা হয়েছিল, আজও পৃথিবীর সমস্ত মোসহাফে (কোরআনে) এভাবেই লিখিত আছে, কোন প্রকাশকই সামূদ শব্দ অতিরিক্ত আলিফ অক্ষরটি উঠিয়ে দিতে পারে নাই এবং কিয়ামত পর্যন্ত পারবেও না।
    3. ‘কাওয়ারীর’ শব্দটিও কোরআনে দু’ভাবে লিখিত হয়েছে— একস্থানে আরবী ‘রা’ অক্ষরটির উপর যবর দিয়ে— যেমন, সূরা নামলের ৪৪ নং আয়াতে قَوَارِيرَ; আবার অন্য এক স্থানে সূরা ইনসানের ১৫ নং আয়াতে “রা” অক্ষরের পরে আলিফ যোগে লিখা হয়েছে, قَوَارِيرَا۠ — কিন্তু নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে যেখানে ‘কাওয়ারিরা’ শব্দটি ‘আলিফ’ অক্ষর ব্যতীত লিখা হয়েছিল আজও প্রতিটি মোসহাফে (কোরআনে) আলিফ ব্যতীতই লিখা হচ্ছে, আর যেখানে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে ‘আলিফ’ যোগে লিখা হয়েছিল ওখানে আজও ‘আলিফ’ অক্ষর যোগেই লিখা হচ্ছে। অবশ্য তেলওয়াত কারীদের সুবিধার্থে ‘আলিফ’ অক্ষরের উপর একটি গোল ( ۟ ) চিহ্ন ব্যবহার করা হচ্ছে। আর শিক্ষকগণ তাদের ছাত্রদেরকে শিখিয়ে দেন যে এ ‘আলিফ’টি অতিরিক্ত যা পড়ার সময় উচ্চারণ হবে না।
    4. কোর’আন মাজীদে لِشَىْءٍ শব্দটি উপরে উল্লেখিত পদ্ধতিতে দুই শ’য়ের অধিক স্থানে লিখিত হয়েছে শুধু একস্থানে এ শব্দটির সাথে ‘আলিফ’ অক্ষর যোগে সূরা কাহাফের ২৩ নং আয়াতে لِشَاْيۡءٍ এভাবে লিখিত হয়েছে, যা আরবী লিখন পদ্ধতি অনুযায়ী সঠিক নয়, কিন্তু সমস্ত মোসহাফে (কোরআনে) আজও এভাবেই বিদ্ধমান আছে, যেমন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে লিখা হয়েছিল। আজ পর্যন্ত কোন প্রকাশক তা সংশোধন করার মত সাহস দেখাতে পারে নাই।
    5. সূরা নামলের ২১ নং আয়াতে أَوۡ لَيَأۡتِيَنِّي শব্দটি এভাবে লিখা হয়েছে যার অর্থ হয়, কিংবা আমি তাকে হত্যা করব। এ শব্দটিতে ‘জালে’র পূর্বে ‘আলিফ’ অক্ষরটি অতিরিক্ত যা শুধু লিখার নিয়ম অনুযায়ীই অশুদ্ধ নয়, বরং অনুবাদ করার ক্ষেত্রেও মারাক্তক ভুলের কারণ হতে পারে যদি ঐ ‘আলিফ’ অক্ষরটি তেলওয়াতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে তার অর্থ সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যাবে আর তাহবে এই যে, কিংবা আমি তাকে হত্যা করব না। আশ্চর্য বিষয় হল যখন কোর’আন মাজীদে যের, যবর, পেশ ছিল না, নক্তা (ফোটা) ছিল না তখন আয়াতের এ অংশটি অতিরিক্ত (আলিফ) সহ অপরিবর্তিত অর্থ নিয়ে ইসলামের শত্রুদের হাতে কিভাবে নিরাপদ ছিল? অথচ সর্বকালেই কাফেরার কোর’আন মাজীদে পরিবর্তনের অপচেষ্টা চালিয়ে ছিল।
    6. এ বাক্যটি কোর’আন মাজীদে দু’বার এসেছে, প্রথম সূরা আনকাবুতে দ্বিতীয় সূরা যুমারে। সূরা আনকাবুতে শব্দটি ‘ইয়া’ অক্ষরসহ লিখিত হয়েছে, যেমন— يَٰعِبَادِيَ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِنَّ أَرۡضِي وَٰسِعَةٞ فَإِيَّٰيَ فَٱعۡبُدُونِ ٥٦ — আয়াত নং-৫৬। আবার সূরা যুমারে এ বাক্যটি ‘ইয়া’ অক্ষর ব্যতীত এভাবে লিখিত হয়েছে, قُلۡ يَٰعِبَادِ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ رَبَّكُمۡۚ لِلَّذِينَ أَحۡسَنُواْ فِي هَٰذِهِ ٱلدُّنۡيَا حَسَنَةٞۗ  وَأَرۡضُ ٱللَّهِ وَٰسِعَةٌۗ إِنَّمَا يُوَفَّى ٱلصَّٰبِرُونَ أَجۡرَهُم بِغَيۡرِ حِسَابٖ ١٠  — আয়াত নং-১০। উভয় পদ্ধতির অর্থের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, লিখার এ পার্থক্য ১৪শত বছর থেকে কোর’আন মাজীদের প্রতিটি কপিতে এভাবেই বিদ্ধমান আছে। ‘ইয়া’ অক্ষরের এ সাধারণ পার্থক্যটি আজ পর্যন্ত কোন মুসলমান বা অমুসলিম কোন প্রকাশক পরিবর্তন করতে পারেনি এবং কিয়ামত পর্যন্ত বদলাতেও পারবে না।
    7. কোর’আন মাজীদে ‘লাইল’ শব্দটি ৭৪টি স্থানে উল্ল্যেখ হয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী ‘লাইল’ শব্দটিকে তার পূর্ববর্তী শব্দের সাথে মিলাতে হলে আরেকটি ‘লাম’ অক্ষর যোগ করতে হয়, যেমন— … যেমন কোর’আন মাজীদের অন্যান্য শব্দগুলো ‘লাম’ অক্ষর যোগ করা হয়েছে, যেমন— قَالُوٓاْ أَجِئۡتَنَا بِٱلۡحَقِّ أَمۡ أَنتَ مِنَ ٱللَّٰعِبِينَ٥٥ — সূরা আম্বীয়া-৫৫ বা لَّا ظَلِيلٖ وَلَا يُغۡنِي مِنَ ٱللَّهَبِ ٣١ — সূরা মুরসালাত-৩১। কিন্তু ‘লাইল’ শব্দটি সমস্ত কোর’আনে একটি ‘লাম’ যোগে ব্যবহার হয়েছে। যা লিখার পদ্ধতি অনুযায়ী সঠিক নয়, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি কোর’আন মাজীদে ‘লাইল’ শব্দটিতে আরেকটি ‘লাম’ যোগ করতে পারেনি।
    8. কোর’আন মাজীদের সূরাসমূহের শুরুতে بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ দ্বারা শুরু করা হয়েছে, কিন্তু সূরা তাওবার শুরুতে بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ উল্লেখ নেই, তার কারণ হল, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ সূরা লিখানোর সময় তার শুরুতে بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ লিখাননি। তাই ১৪শত বছর থেকে পৃথিবীর সমস্ত মোসহাফ (কোর’আন)-এ সূরাটি بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ ব্যতীতই লিখিত হয়ে আসছে, কোন বন্ধু বা শত্রুর সাহস হয়নি যে, তারা সূরা তাওবার শুরুতে بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ লিখবে।
    9. সূরা ক়াহাফে সূসা (আ.) এবং খিজির (আ.)-এর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, যে তাঁরা উভয়ে একটি এলাকাতে পৌঁছার পর সেখানকার লোকদের নিকট খাবার চাইল, কিন্তু তারা খাবার দিতে অস্বীকার করল। কুরআন মাজীদের ভাষায় … অর্থাৎ, ‘তারা অস্বীকার করল’।খলীফা ওলীদ বিন আবদুল মালেকের সময়ে যখন কোরআন মাজীদে নোক্তা (ফোটা) যোগ করা হল, তখন কেউ কেউ … এর পরিবর্তে … শব্দ লিখার পরামর্শ দিল, যার অর্থ হয়, তারা খাবার দিল। যাতে করে আপ্যায়ন করাতে অস্বীকার করার স্থলে আপ্যায়ন করাল, আর এলাকাবাসীরা তাদের বদনাম থেকে বেঁচে যাবে। তখন ওলীদ বিন আবদুল মালেক বললেন, ‘কোরআন মাজীদ তো অন্তর থেকে অন্তরে স্থানান্তিত হয়।’ (অর্থাৎ, যা হাফেজদের অন্তরে সংরক্ষিত থাকে এবং তারা তাদের ছাত্রদের অন্তরে শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে স্থানান্তরিত করে। অতএব, কাগজের পরিবর্তনে কোন কাজ হবেনা।14 তাই তা যেমন ছিল তেমনই থাকতে দাও। গত ১৪শত বছর থেকে কাফেরদের সর্বপ্রকার শত্রুতা এবং কুচক্রান্ত থাকা সত্ত্বেও কোন কট্টরপন্থী কাফেরও কোরআন মাজীদের কোন একটি শব্দ বা অক্ষর বা কোন যের বা যবর এমনকি ফোটার কোন পরিবর্তন আনতে পারেনি, আর কিয়ামত পর্যন্ত কোনদিন পারবেও না। আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন, إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩ অর্থাৎ, ‘আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।’ আর এই বাণীর কার্যকারিতা বিগত ১৪শত বছর থেকে চলে আসছে।

    আব্বাসী খলীফা মামুনুর রশীদের শাসনামলে কোরআন সংরক্ষণ সংক্রান্ত ঘটনাবলী নিঃসন্দেহে পাঠকদের মনঃপুত হবে।

    মামুনুর রশীদ তার শাসনামলে জ্ঞান চর্চার মূল্যায়ন করতেন, যেখানে সকলেরই প্রবেশাধিকার ছিল। একটি বৈঠকে একজন ইহুদী উপস্থিত ছিল, তার জ্ঞানগর্ব এংব সাহিত্যকতাপূর্ণ আলোচনায় আকৃষ্ট হয়ে তাকে খলীফা মামুন ইসলাম গ্রহণ করার জন্য দাওয়াত দিলেন। কিন্তু ইহুদী তা প্রত্যাখ্যান করল। এক বছর পর ঐ ইহুদী আবার ঐ বৈঠকে উপস্থিত হল কিন্তু এই সময়ে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে। এ ব্যাপারে মামুনুর রশীদ তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, আমার হাতের লেখা সুন্দর, আমি বই লিখে বিক্রি করি, আমি পরীক্ষামূলকভাবে তাওরাতের তিনটি কপি লিপিবদ্ধ করেছি, সেখানে বহুস্থানে আমি আমার নিজের পক্ষ থেকে কম বেশি করেছি এবং এ কপি নিয়ে ইহুদীদের গীর্জায় গিয়েছি। ইহুদীরা যথেষ্ট আগ্রহ নিয়ে তা ক্রয় করেছে। এরপর ইঞ্জিলের তিনটি কপি পরিবর্তন করে লিখে তা চার্চে নিয়ে গেলাম এবং খৃষ্টানদের নিকট তা বিক্রি করলাম। এরপর কোরআন মাজীদের তিনটি কপি নিলাম এবং এখানেও ঐভাবে কম বেশি করে লিখলাম এবং মসজিদে নিয়ে গিয়ে তা মুসলমানদের নিকট বিক্রি করে দিলাম। কিন্তু এই তিনটি কপিই খুব তাড়াতাড়ি আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হল এই বলে যে, এটাতে পরিবর্তন করা হয়েছে। অথচ, তাওরাত ও ইঞ্জিলের সমস্ত কপি গৃহিত হয়েছে এবং কোন কপিই ফেরত আসেনি। এ ঘটনার পর আমার বিশ্বাস জন্মাল যে, সত্যিই কোরআন মাজীদ সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহ্ নিয়েছেন, তাই আমি মুসলমান হয়ে গেলাম।15

    ওসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাসনামলের পর:

    ওসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কোরআন মাজীদের যে কপিটি প্রস্তুত করিয়েছিলেন তা ছিল যের, যবর, পেশ ও নোক্তা বা ফোটা বিহীন। আরবী ভাষীদের জন্য এ ধরনের কোনআন তেলওয়াত করা ততটা কঠিন ছিল না, কিন্তু অনারবদের জন্য তা যথেষ্ট কষ্টকর ছিল। বলা হয়ে থাকে যে, সর্বপ্রথম বসরার গভর্ণর যিয়াদ বিন আবু সুফিয়ান একজন আলেম আবুল আসওয়াদ আদদুয়ালীকে এ বিষয়ে একটি সমাধান খোঁজার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি অক্ষরগুলোতে নোক্তা বা ফোটা দেওয়ার পরামর্শ দিলেন এবং তাই করা হল। আবদুল মালেক বিন মারওয়ান (৬৫-৮৬ হি.) তার শাসনামলে ইরাকের শাসনকর্তা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কোরআন তেলওয়াতকে আরও সহজতর করার জন্য ইয়াহইয়া বিন ইয়ামার, নাসার বিন আসেম লাইসী ও হাসান বাসরী (রাহিমাহুমুল্লাহ্)-এর পরামর্শ ক্রমে যের, যবর, পেশ সংযোগ করেছেন। আবার বলা হয়ে থাকে যে হাযমা এবং তাশদীদের আলামতসমূহ খালীল বিন আহমদ (রাহিমাহুল্লাহ্) স্থাপন করেছেন। এই বিষয়ে আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন।

    সাহাবা এবং তাবেয়ীনগণের অভ্যাস ছিল যে, তারা সপ্তাহে একবার কোরআন মাজীদ খতম করতেন, এ উদ্দেশ্যে তারা পূর্ণ কোরআন মাজীদকে সাত ভাগে ভাগ করেছিলেন, যাকে হিযব বা মাঞ্জিল বলা হয়। মূলত এই হিযব বা মাঞ্জিলের ভাগ সাহাবা কেরামগণের যুগে হয়েছিল। অবশ্য কোরআন মাজীদকে ত্রিশ পারায় ভাগ করা, প্রত্যেক পারাকে চার ভাগে ভাগ করা, অর্থাৎ, চতুর্থাংশ, অর্ধেক, তৃতীয়াংশ, এমন কি রুকুর আলামত, আয়াত নাম্বার, ওয়াক্‌ফ (যতি চিহ্ন) যোগ করা ইত্যাদি মোসহাফ উসমানী (উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর যুগে একত্রিকৃত কোরআন)-এর পরে করা হয়েছে। যার সংযোজন একমাত্র কোরআন মাজীদের তেলওয়াত এবং মুখস্ত করাকে সহজ করার জন্য করা হয়েছে। কোরআন মাজীদ অবতীর্ণের সময়কালের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই এবং শরীয়তের দৃষ্টিতেও এর কোন বিশেষ বিধান নেই। এই বিষয়ে মহান আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন।

  • নে’মতের বহিঃপ্রকাশ

    নে’মতের বহিঃপ্রকাশ

    কোরআন লিখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগ থেকেই কোর’আন সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ছিল। গত ১৪শত বছরের মধ্যে কোরআন মাজীদ লিখনের উন্নতির স্তরসমূহের প্রতি একবার দৃষ্টি দিলে তা দেখে মানব বিবেক আশ্চর্য হয় যে, প্রতিটি যুগের মানুষের মধ্যে আল্লাহ্ তা’লা কোরআন মাজীদকে অত্যন্ত সুন্দর করে লিখার ব্যাপারে কত ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। শতাব্দীর উন্নত স্তরসমূহ অতিক্রম করার পর আজ আমাদের সামনে পূর্ণাজ্ঞ যের, যবর, পেশ এবং ওয়াকফ (বিরাম) চিহ্নসহ অত্যন্ত সুন্দর এবং সহজতর লিখনীর মাধ্যমে এমন একটি মোসহাফ (কোরআন) বিদ্ধমান যা বিশ্ব ব্যাপী অত্যন্ত সহজভাবে শিখা এবং শিখানো হয়। মূলত এ সমস্ত কর্মকাণ্ড আল্লাহ্ তা’লার পরিপূর্ণ হিকমত এবং সর্বময় ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ, যার মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’লা কোর’আন মাজীদ সংরক্ষণের ওয়াদা করে রেখেছেন। নে’মতের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এ বাস্তবতা প্রকাশ করা আমার (লিখকের) জন্য আনন্দের বিষয় যে, কীলানী বংশকেও আল্লাহ্ তা’লা কোর’আন লিখার সুভাগ্য দান করেছেন, যার শুরু সম্মানিত পিতা হাফেজ মোহাম্মদ ইদরীস কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) পূর্ব পুরুষ মৌলবী মোহাম্মদ বখস (রাহিমাহুল্লাহ্) (মৃত ১৮৬১ইং)14 মৌলবী মোহাম্মদ বখশ (রাহিমাহুল্লাহ্‌র) ছেলে মৌলবী ইমামুদ্দীন কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) (মৃত ১৯১৯ইং) তার নাতী মৌলবী নূর এলাহী কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) (মৃত১৯৪৩ইং) এরপর তার পৌত্র হাফেজ মোহাম্মদ ইদরীস কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) (মৃত১৯৯২ইং) ব্যতীত কীলানী বংশের আরো কিছু সুভাগ্যবান ব্যক্তিকেও আল্লাহ্ তা’লা এ সুভাগ্য দান করেছেন যাদের নাম এবং তাদের লিখিত কোরআন মাজীদের বিস্তারিত বর্ণনা নিম্নরূপ:

    1. মৌলবী মোহাম্মদ বখশ কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) তিনি বেশ কিছু কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    2. মৌলবী ইমামুদ্দীন কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) তাফসীর ওহীদী (নওয়াব ওয়াহিদুজ্জামান হায়দারাবাদী রাহিমাহুল্লাহ্‌) ও আরো কিছু কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    3. মৌলবী মোহাম্মদ দীন কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্‌) তাফসীর ওহীদী (নওয়াব ওয়াহিদুজ্জামান হায়দারাবাদী রাহিমাহুল্লাহ) ছাড়াও আরো কিছু কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।15
    4. মৌলবী নূও এলাহী কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ) তিনি সাধারণ কোরআন লিপিবদ্ধ করেছেন যার সংখ্যা ১৫টি।17
    5. মোহাম্মদ সুলাইমান কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) তাফসীর আবুল হাসানাতের ২৬তম পারা পর্যন্ত লিখেছেন, বাকী চার পারা অসুস্থতার কারণে লিখতে পারেন নি।
    6. হাফেজ ইদরীস কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) তাফসীর সানায়ী (মাওলানা সানাউল্লাহ্ অমৃতসরী রাহিমাহুল্লাহ) এবং তাফসীর আহসানুত্তাফাসীর (ডেপুটি সায়্যেদ আহমদ হাসান দেহলভী রাহিমাহুল্লাহ্ লিখিত) লিপিবদ্ধ করেছেন।18
    7. আবদুররহমান কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) আশরাফুল হাওয়াসী (মাওলানা মোহাম্মদ আবদুহ লিখিত) লিপিবদ্ধ করেছেন। এছাড়া ফিরোজ সানায এবং তাজ কোম্পানীর বেশ কিছু সাধারণ কোর’আন তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন।19
    8. আবদুল গাফুর কীলানী মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী লিখিত তাদাব্বুর কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন। এছাড়াও পারা পারা অনুবাদ কৃত কোর’আনও লিপিবদ্ধ করেছেন।
    9. আবদুল গাফ্‌ফার কীলানী (রাহিমহুল্লাহ্) তাফহিমুল কোর’আনের ১ম খণ্ড এবং বিভিন্ন সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    10. মোহাম্মদ ইউসুফ কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ্) মাওলানা সায়্যেদ আবুল আলা মাওদুদী লিখিত তাফহিমুল কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন, এছাড়াও বেশ কিছু সাধারণ কোরআন মাজীদও লিপিবদ্ধ করেছেন।
    11. খুরসীদ আহমদ কীলানী (রাহিমাহুল্লাহ) পারা পারা অনুবাদ কৃত কোর’আনও লিপিবদ্ধ করেছেন।
    12. রিয়ায আহমদ কীলানী ময়ীনউদ্দীন সাফেয়ী লিখিত আরবী তাফসীর জামেউল বায়ান লিপিবদ্ধ করেছেন।
    13. মোহাম্মদ ইয়াকুব কীলানী তাফসীর মাযহারী ছাড়াও বেশ কিছু সাধারণ কোরআন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    14. এনায়েতুল্লাহ্ কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    15. আবদুর রউফ কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    16. খালীলুর রহমান কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    17. মোহাম্মদ সাঈদ কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    18. আবদুল ওয়াহীদ কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    19. আবদুল ওয়াকীল কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    20. আবদুল মুয়েদ কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।
    21. আবদুল মুগীস কীলানী সাধারণ কোর’আন লিপিবদ্ধ করেছেন।

    কোর’আন লিখন কোন অতিরঞ্জন ছাড়াই বলা যায় যে, একটি বড় সুভাগ্যের ব্যাপার; কীলানী বংশে এর কল্যাণকর ধারা আলহামদুলিল্লাহ্ আজও আছে, কিন্তু আফসোসের বিষয় হল কম্পিউটারের যুগে কীলানী বংশসহ সমস্ত কোর’আন লিখকদেরকে এ সুভাগ্য থেকে বঞ্চিত করেছে, যদিও কিছু কিছু পুরাতন প্রকাশক টেকনিকেল সৌন্দর্যের জন্য আজও হাতের লিখনীকে কম্পিউটারের উপর অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম। মূল কথা কোর’আন মাজীদের প্রকাশনা এবং প্রচারণা আলহামদুলিল্লাহ্ দিন দিন বেড়ে চলছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা চালু থাকবে। অতএব, আল্লাহ্‌র জন্য অসংখ্য প্রশংসা।

  • কোরআন মাজীদের চেলেঞ্জ কি?

    কোরআন মাজীদের চেলেঞ্জ কি?

    কোর’আন মাজীদ সম্পর্কে কাফেরদের দাবী ছিল এই যে, এটা আল্লাহ্‌র নাযিলকৃত কিতাব নয়, বরং মোহাম্মদের নিজস্ব আবিষ্কার। আল্লাহ্ তা’লা কোরআন মাজীদে এর উত্তর দিয়েছেন যে, যদি কোর’আন মাজীদ মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিজস্ব আবিষ্কার হয় তাহলে তার অনুরূপ একটি সূরা বা একটি কথা তোমরাও আবিষ্কার করে দেখাও। আল্লাহ্‌র বাণী—

    أَمۡ يَقُولُونَ ٱفۡتَرَىٰهُۖ قُلۡ فَأۡتُواْ بِعَشۡرِ سُوَرٖ مِّثۡلِهِۦ مُفۡتَرَيَٰتٖ وَٱدۡعُواْ مَنِ ٱسۡتَطَعۡتُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ ١٣

    অর্থ: ‘তবে কি তারা বলে যে, ওটা সে নিজেই রচনা করেছে? তুমি বলে দাও, তাহলে তোমরাও ওর অনুরূপ রচিত দশটি সূরা আনয়ন কর, আর যদি তোমরা সত্যবাদী হও তাহলে (তোমাদের সাহায্যার্থে) আল্লাহ্ ব্যতীত যাদেরকে ডাকতে পার তাদেরকে ডেকে আন।’ (সূরা হুদ-১৩)।

    দশটি সূরার পর আল্লাহ্ একটি সূরারও চেলেঞ্জ দিয়েছেন, আল্লাহ্ বাণী—

    وَإِن كُنتُمۡ فِي رَيۡبٖ مِّمَّا نَزَّلۡنَا عَلَىٰ عَبۡدِنَا فَأۡتُواْ بِسُورَةٖ مِّن مِّثۡلِهِۦ وَٱدۡعُواْ شُهَدَآءَكُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ ٢٣

    অর্থ: ‘এবং আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি, যদি তোমরা তাতে সন্দিহান হও তবে তার অনুরূপ একটি সূরা আনয়ন কর এবং আল্লাহ্ ব্যতীত তোমাদের সাহায্যকারীদেরকে ডেকে নাও যদি তোমরা সত্য বাদী হও।’ (সূরা বাকারা-২৩)।

    একটি সূরার পর আল্লাহ্ একটি আয়াতের চেলেঞ্জও দিয়েছেন, যে একটি সূরা তো অনেক দূরের কথা তোমরা এর অনুরূপ একটি আয়াতও তৈরী করতে পারবে না। আল্লাহ্‌র বাণী—

    أَمۡ يَقُولُونَ تَقَوَّلَهُۥۚ بَل لَّا يُؤۡمِنُونَ ٣٣ فَلۡيَأۡتُواْ بِحَدِيثٖ مِّثۡلِهِۦٓ إِن كَانُواْ صَٰدِقِينَ ٣٤

     অর্থ: ‘তারা কি বলে, এ কোর’আন তাঁর নিজের রচনা? বরং তারা অবিশ্বাসী। তারা যদি সত্যবাদী হয় তাহলে এর অনুরূপ কোন রচনা উপস্থিত করুক না।’ (সূরা তূর-৩৩, ৩৪)

    সূরা বানী ইসরাইলে আল্লাহ্ এত কঠোর চেলেঞ্জ করেছেন যা অন্য আর কোথাও করেন নি। আল্লাহ্‌র বাণী—

    قُل لَّئِنِ ٱجۡتَمَعَتِ ٱلۡإِنسُ وَٱلۡجِنُّ عَلَىٰٓ أَن يَأۡتُواْ بِمِثۡلِ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانِ لَا يَأۡتُونَ بِمِثۡلِهِۦ وَلَوۡ كَانَ بَعۡضُهُمۡ لِبَعۡضٖ ظَهِيرٗا ٨٨

    অর্থ: ‘হে মোহাম্মদ! তুমি বলে দাও যদি এই কোর’আনের অনুরূপ কোর’আন আনয়নের জন্য মানুষ ও জ্বিন সমবেত হয় এবং তারা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করে, তবুও তারা এর অনুরূপ কোর’আন আনয়ন করতে পারবে না।’ (সূরা বনী ইসরাইল-৮৮)

    প্রশ্ন হল এই যে, গত ১৪ শত বছর থেকে আরব এবং অনারবে বিদ্ধমান কোর’আন মাজীদের ঘোর-দুশমনদের কেউ এ চেলেঞ্জ গ্রহণ করেনি।

    বাস্তবতা হল এই যে, কিছু উদাহরণ ইতিহাসের পাতায় লিখিত হয়েছে। ইসলামের শত্রুদের কেউ কেউ কোর’আনের সাথে মিল রেখে সূরা তৈরীর চেষ্টা করেছে। যেমন—

    1. মুসাইলাম কাজ্জাব রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগেই নবুয়তের দাবী করেছিল এবং বলেছিল যে আমার উপর ওহী অবতীর্ণ হয়েছে, প্রমাণ হিসেবে নিম্নের সূরাটি পেশ করেছিল। যার অর্থ, হে ঘেনর ঘেনরকারী ব্যাঙ তুমি যতই ঘেনর ঘেনর কর তুমি কাউকে পানি পান করা থেকে বিরত রাখতে পারবে না, আর না পানিকে নোংরা করতে পারবে।
    2. মুসাইলামা কাজ্জাবের দাবী কৃত আরেকটি সূরার অর্থ— হাতী, হাতী কি? তুমি কি জান হাতী কি? তার লেজটি ছোট আর শুঁড়টি বড়।
    3. শিয়াদের একটি দলের দাবী সূরা ‘বেলায়েত’ কোর’আন মাজীদের অন্তর্ভুক্ত— অর্থ, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম, হে লোকেরা যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছ, তোমরা ঈমান আন নবী এবং তাঁর ওলী প্রতি, যাকে আমি প্রেরণ করেছি, তারা উভয়ে তোমাদেরকে সঠিক পথের প্রতি আহ্বান করে। নবী এবং ওলী (নবীর বন্ধু) একে অপরের পরিপূরক, আর আমি সবকিছু জানি এবং সবকিছু সম্পর্কে অবগত। নিশ্চয় যারা আল্লাহ্‌র অঙ্গিকার পূর্ণ করে, তাদের জন্য রয়েছে নে’মত ভরপূর জান্নাত, আর যারা মিথ্যায় প্রতিপন্ন করে আমার আয়াতসমূহকে যখন তা তাদের নিকট তেলওয়াত করা হয়, নিশ্চয় তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামে বেদনাদায়ক স্থান। যখন কিয়ামতের দিন তাদেরকে ডাকা হবে যে কোথায় জালেম এবং রাসূলগণকে মিথ্যায় প্রতিপন্নকারীরা, তিনি রাসূলদেরকে সত্য সহকারে সৃষ্টি করেছেন, একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আল্লাহ্ তাদেরকে বিজয়ী করবেন। আর স্বীয় রবের তাসবীহ পাঠ কর তাঁর প্রশংসা সহ, আর আলী সাক্ষী দাতাদের অন্তর্ভুক্ত।20
    4. ১৯৯৯ খৃষ্টাব্দে ফিলিস্তিনের একজন ইহুদী ড. আনীস সুরস নিন্মোক্ত চারটি সূরা তৈরী করে ছিল। (১) সূরা আল মুসলিমুন, (১১ আয়াত বিশিষ্ট) (২) সূরা আত্ তাজাস্‌সুদ (১৫ আয়াত বিশিষ্ট) (৩) সূরা আল ঈমান (১০ আয়াত বিশিষ্ট) (৪) সূরাতুল ওসায়া (১৬ আয়াত বিশিষ্ট) এবং সে এ দাবী করেছিল যে আমি কোর’আন মাজীদের চেলেঞ্জ গ্রহণ করে এ সূরাগুলো তৈরী করেছি।21 এর মধ্যে সূরা মুসলিমুনের কিছু আয়াত নিচে উল্লেখ করা হল— অর্থাৎ, ‘আলিফ, লাম, সোয়াদ, মীম। বল, হে মুসলমান নিশ্চয় তোমরা পথভ্রষ্টতার মাঝে পতিত আছ, নিশ্চয় যারা আল্লাহ্ এবং তাঁর মাসীহ (ঈসা আ.)কে অস্বীকার করে তাদের জন্য পরকালে রয়েছে জাহান্নামের আগুন এবং বেদনাদায়ক শাস্তি, ঐ দিন কিছু কিছু চেহারা লাঞ্ছিত এবং কালো হবে, আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা চাও, কিন্তু আল্লাহ্ যা চান তিনি তাই করেন।
    5. ২০০৫ সালের শুরুতে ইহুদী এবং খৃষ্টানরা মিলে অ্যামেরিকায় “ফোরকানুল হক” নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিল, যেখানে কোর’আন মাজীদের অনুকরণে ৭৭টি সূরা লিখেছিল। ঐ সূরাসমূহের কিছু কিছু আয়াত এ গ্রন্থের উপযুক্ত আলোচনায় পাঠকরা পেয়ে যাবেন।

    কোরআন মাজীদের অনুকরণে আয়াত এবং সূরা তৈরী করার এ সমস্ত উদাহরণ থেকে পরিষ্কারভাবে একথা প্রমাণিত হয় যে, কোরআন মাজীদ আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে হওয়ার দাবী (নাউজু বিল্লাহ্) একটি বাতেল দাবী।

    বাস্তবতা হল এই যে, কোরআন মাজীদে যে বিষয়টিকে চেলেঞ্জ করা হয়েছে তা এরকম নয় যে, কোন ব্যক্তি আরবী ভাষার শব্দ বা অক্ষর ব্যবহার করে এ ধরণের কিছু লাইন কখনো তৈরী করতে পারবে না, যেমন কোরআন মাজীদে আছে। চিন্তা করুন! যে সমাজে বিশুদ্ধ সাহিত্যিকতা পূর্ণ আরবী ভাষার স্বনামধন্য সাহিত্যিকরা ছিল, এমনকি ইমরুল কায়েসের মত বাকপটু কবি বিদ্ধমান ছিল, তাদের জন্য আরবী ভাষায় কয়েকটি  লাইন তৈরী করা কি এমন কঠিন কাজ ছিল? মূলত কোরআন মাজীদ যে বিষয়ের চেলেঞ্জ করেছিল তা ছিল এই যে, কিয়ামত পর্যন্ত কোন মানুষ একটি সূরা তো দূরের কথা এমনকি একটি আয়াতও তৈরী করতে পারবে না, যা বিশুদ্ধতা, সাহিত্যিকতা, শ্রুতিমধুরতা, আকৃষ্টিতা, মানুষের নিকট গ্রহণ যোগ্যতা ইত্যাদি দিক থেকে কোরআন মাজীদের আয়াতের ন্যায় সমমানের হবে। এ চেলেঞ্জের সামনে সমগ্র আরব বিশ্ব অপারগ হয়ে লাজওয়াব হয়ে গিয়েছিল এবং অকপটে স্বীকার করে নিয়ে ছিল যে, এ কোর’আন কোন মানুষের কথা নয়। নিচে এর কিছু উদাহরণ পেশ করা হল—

    1. জিমাদ আজদী (রযিয়াল্লাহু আনহু) যখন সর্ব প্রথম কোর’আন মাজীদের তেলওয়াত শুনল তখন সাথে সাথে বলে উঠল, আমি এধরণের কথা কখনো শুনিনি, আমি গণকদের কথা শুনেছি, কবিদের কথা শুনেছি, যাদুকরদের কথা শুনেছি, কিন্তু এ বাণী সমুদ্রের অতল তলে পৌঁছে যাবে।
    2. ওমার (রযিয়াল্লাহু আনহু) সূরা ত্বা-হার আয়াতসমূহ শ্রবণে তার সমস্ত রাগ নিমিষে নিঃশেষ হয়ে গেল আর বলতে লাগল ‘কত উন্নত এবং উত্তম একথা’।
    3. বানী আবদুল আসহাল বংশের সর্দার উসাইদ বিন হুজাইর (রযিয়ল্লাহু আনহু) যখন মোসআব বিন ওমাইর (রযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মুখে কোর’আন মাজীদ শুনতে পেল তখন বলতে লাগল, ‘আহ! কত উত্তম এবং উন্নত বাণী’।
    4. হজ্বের সময়ে কোরাইশ সর্দারদের একটি পরামর্শ বৈঠক দারুন নাদওয়ায় অনুষ্ঠিত হল, যেখানে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে তাঁকে যাদুকর বা পাগল বা কবি বা গণক বলে আখ্যায়িত করে হাজীদেরকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হল। লোকদের বিভিন্ন পরামর্শের আলোকে সভায় ইসলামের নিকৃষ্ট দুশমন ওলীদ বিন মুগীরা এ সিদ্ধান্ত দিল যে, মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গণক, পাগল, কবি, জাদুকর নয়, আল্লাহ্‌র কসম! তাঁর কথা অত্যন্ত সুন্দর, তাঁর মূল অত্যন্ত সুদৃঢ়, আর ডাল পালা ফলবান, তার ব্যাপারে খুব বেশি বললে যে কথা বলা যায় তাহল, এই যে, সে জাদুকর, তাঁর কথা শুনে বাপ-ছেলে, ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় এবং একথার উপর সবাইকে একমত করতে হবে।
    5. কোরাইশ সর্দার ওতবা বিন রাবীয়া রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মুখে সূরা হা-মীম সাজদার আয়াত শুনে এসে কোরাইশ নেতাদেরকে বলল, আল্লাহ্‌র কসম! আমি এমন এক বাণী শুনেছি যা ইতিপূর্বে আর কখনো শুনিনি। এ বাণী না কোন কবির বাণী না কোন জাদুকরের বাণী। আমার পরামর্শ এই যে, তাঁকে তার অবস্থা মত থাকতে দাও, আল্লাহ্‌র কসম! এ বাণীর মাধ্যমে বিরাট যুদ্ধ সংঘটিত হবে, যদি সে আরবদের উপর বিজয়ী হয় তাহলে সরকার তোমাদের সরকার হবে, তাঁর সম্মান তোমাদের সম্মান হবে, আর আরবরা যদি তাঁকে হত্যা করে তাহলে বিনা বদনামীতে তোমাদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যাবে।
    6. আল্লাহ্‌র দুশমন আবুজাহাল এবং তারা অপর দুই সাথী আবু সুফিয়ান এবং আখনাস বিন শারীক, এ তিন জন রাতের আঁধারে পৃথক পৃথক ভাবে মক্কার হারামে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মুখে কোর’আন মাজীদ শুনতে গেল। দ্বিতীয় দিনও শুনল এরপর তৃতীয় দিনও শুনল। তৃতীয় দিন আখনাস বিন শারীক আবু সুফিয়ানের ঘরে গেল এবং জিজ্ঞেস করল যে, বল মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তেলওয়াতকৃত বাণী সম্পর্কে তোমার কি অভিমত? আবু সুফিয়ান নির্দ্বিধায় বলে ফেলল এটা কোন মানুষের মুখের বাণী হতে পারে না। আখনাস বলল, আমারও একই অভিমত, এরপর আখনাস আবু জাহালের নিকট গেল এবং জিজ্ঞেস করল মোহাম্মদের তেলওয়াতকৃত বাণী কেমন? আবুজাহাল বলল, আমাদের বংশ এবং বনী আবদে মানাফের সাথে দীর্ঘকাল ধরে প্রতিযোগীতা চলছে, নেতৃত্ব এবং উদারতায় আমরা উভয়ে সমান, এখন তারা দাবী করছে যে, আমাদের বংশে নবী জন্মগ্রহণ করেছে। এর প্রতিরোধ আমরা কিভাবে করব? তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমরা কখনো তার প্রতি ঈমান আনব না।
    7. হাবশায় হিযরত করার সময় আবু বকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু)ও হিজরত করার ইচ্ছা পোষণ করে বের হয়েছিলেন, কিন্তু ইবনে দাগীনা তাকে মক্কায় ফিরিয়ে আনল এবং মক্কার হারামে এসে আবু বকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু)-কে নিরাপত্তা দেওয়ার ঘোষণা দিল। কোরাইশ সর্দাররা বলল, ‘ইবনে দাগিনা! আমরা তোমার নিরাপত্তা দেওয়াকে ভঙ্গ করছি না, কিন্তু তুমি আবু বকরকে বলে দাও যে, সে যেন ঘরের ভিতরে থেকে নামায আদায় করে এবং কোর’আন তেলওয়াত করে। সে যদি উঁচু কণ্ঠে নামায আদায় করে এবং কোর’আন তেলওয়াত করে তাহলে আমাদের বাচ্চারা এবং মহিলারা ফেতনায় পড়ে যাবে। আবু বকর সিদ্দীক (রযিয়াল্লাহু আনহু) কিছু দিন নিচু আওয়াজে কোর’আন মাজীদ তেলওয়াত করলেন, এরপর আবার উঁচু আওয়াজে কোর’আন তেলওয়াত করতে শুরু করলেন। যখন তিনি উঁচু আওয়াজে কোরআন তেলওয়াত করতেন তখন মোশরেকদের বাচ্চা, বৃদ্ধবনিতা কোর’আন শোনার জন্য একত্রিত হয়ে যেত, এতে মক্কার মোশরেকরা পেরেশান হয়ে গেল। ইবনে দাগিনাকে ডেকে তার নিকট অভিযোগ করল। ইবনে দাগিনা আবুবকর (রযিয়াল্লাহু আনহু)-কে উঁচু আওয়াজে কোর’আন তেলওয়াত করতে নিষেধ করল। তখন আবুবকর (রযিয়াল্লাহু আনহু) ইবনে দাগিনাকে তার দেওয়া নিরাপত্তা ফেরত দিল এবং বলল, আমি তোমার দেওয়া নিরাপত্তা তোমাকে ফেরত দিলাম এবং আল্লাহ্ দেওয়া নিরাপত্তায় আমি সন্তুষ্ট। (বোখারী)
    8. নবুয়তের পঞ্চম বছরের ঘটনা। একদিন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হারামে বসে উচ্চ স্বরে সূরা নজম তেলওয়াত করছিলেন, শ্রবণকারীদের মধ্যে মুসলমান কাফের উভয়েই উপস্থিত ছিল। কোরআন মাজীদের প্রতিক্রিয়ার এ অবস্থা ছিল যে, সমস্ত শ্রোতারা পিনপতন নিরব হয়ে কোরআন মাজীদ শুনছিল; সূরা তেলওয়াত শেষ করে যখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেজদা করছিলেন তখন সমস্ত শ্রোতারা নিজেদের অজান্তেই সিজদা করে ফেলেছিল, কাফেরদের একথা স্মরণই ছিল না যে, তারা কি করছে। সেজদা করার পর কাফেররা তাদের এ কর্মের জন্য লজ্জিত হল। কোরআন মাজীদ তেলওয়াতের এ অলৌকিক প্রতিক্রিয়া তো ছিল আরবীভাষীদের উপর, কিন্তু তার প্রতিক্রিয়ার আরো আশ্চর্যজনক দিক হল যে এ কোর’আন আরবদের উপর যেমন প্রভাব ফেলে এমনিভাবে অনারবদের মন মস্তিষ্কের উপরও যথেষ্ট প্রভাব ফেলার যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে।

    কোর’আন মাজীদের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার রাষ্ট্র প্রধান খরোশিফের এ ঘটনাটি পাঠকদেরকে অভিভূত করবে যে, মিশরের রাষ্ট্রপ্রধান জামাল আবদুন নাসের রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান খরোশীফের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য গেল। আর সাথে করে মিশরের প্রখ্যাত ক্বারী আবদুল বাসেতকেও নিয়ে গেল। সাক্ষাতে জামাল আবদুন নাসের কারী আবদুল বাসেতকে পরিচয় করিয়ে দিল এবং তার মুখ থেকে কালামুল্লাহ্ (আল্লাহ্‌র বাণী) শোনার জন্য নিবেদন করল। খরোশীফ বলল, আমি তো আল্লাহকেই মানি না, তাহলে তাঁর বাণী কি করে শোনব? নাসেরের বারংবারের নিবেদনে খোরশীফ কোর’আন শুনতে আগ্রহ প্রকাশ করল। কারী আবদুল বাসেত সূরা ত্বা-হার ঐ আয়াতসমূহ তেলওয়াত করতে লাগল যা শ্রবণে ওমার (রযিয়াল্লাহু আনহু) ইসলাম গ্রহণ করে ছিলেন। সূরা ত্বা-হার তেলওয়াত শুনে খোরশীফের চোখ অশ্রুসজল হয়ে গেল। তেলওয়াত শেষ হলে নাসের খোরশীফকে জিজ্ঞেস করল, আপনি তো আল্লাহকে মানেন না তাহলে আপনার চোখ কেন অশ্রুসজল হল? খোরশীফ বলল, আমি সত্যিই আল্লাহকে মানি না কিন্তু এ বাণী শোনে অশ্রু নিয়ন্ত্রন করতে পারি নি, তার কারণ আমি বুঝতে পারছি না।22

    খোরশীফ সত্যিই দুর্ভাগ্যবান মানুষ ছিল, তার মন মস্তিষ্কে মোহর লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল, তাই সে তা বিবেচনা করার চিন্তাও করে নি, যে তার চোখে পানি আসার কারণ কি? কিন্তু এ ধরণের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যে, লোকেরা কুফরী অবস্থায়ও কোর’আন মাজীদের অর্থ না জেনেই শুধু তেলওয়াত শুনেই চোখে পানি এসে গেছে, তার অন্তরে ঢেউ সৃষ্টি হয়ে গেছে, মনমস্তিষ্ক জয় হয়ে গেছে, এরপর তখনই মস্তিষ্ক তৃপ্তি লাভ করেছে যখন ইসলাম গ্রহণ করেছে।

    ঈমানদারদের বিষয়টি তো ভিন্ন যে, মক্কা এবং মদীনার হারামে রামযান মাসে কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুদের নামাযে) কোন অতিরঞ্জন ছাড়াই বলা যায় যে, হাজার নয় বরং লক্ষ লক্ষ মুসলমান উপস্থিত থাকে যাদের মধ্যে কোরআন মাজীদের আয়াতের অর্থ বুঝার মত লোক কমই থাকে। কিন্তু ইমামগণের সুললিত কণ্ঠে যখন কোর’আন শুনে তখন চোখে অশ্রু ঝরতে থাকে, মনে দুনিয়ার সুখ সমৃদ্ধির কথা থাকে না, কান্না থামানো যায় না। আর যারা কোরআন মাজীদ বুঝে তেলওয়াত করে তাদের বিষয়টি তো আরো ভিন্ন, তেলওয়াত করার সময় তাদের মন এত নরম হয় যে শব্দের উচ্চারণ করতে অনেক সময় তাদের কষ্ট হয়। শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যায়, অন্তর নরম হয়ে যায়, তেলওয়াত শোনার আগ্রহ আরো বৃদ্ধি পায়, মন-মানসিকতা এমন হয় যে, মানুষ দুনিয়ার চাওয়া পাওয়া থেকে একেবারেই বিমুখ হয়ে যায়। মক্কার হারামের ইমাম শেখ সউদ আশ-শুরাইমের (হাফিযাহুল্লাহ্) পেছনে নামায আদায়কারীরা জানে যে, নামাযে সূরা তেলওয়াত করার সময় তাঁর অবস্থা এই হয় যে, কোন কোন সময়ে তিনি সূরা ফাতেহার তেলওয়াত পূর্ণ করতে পারেন না, কণ্ঠ নিচু হয়ে যায়, নিজের অজান্তেই কান্নায় ভেংঙ্গে পড়েন। এটাই ঐ চেলেঞ্জ যা কোরআন মাজীদে কিয়ামত পর্যন্ত আগত সমস্ত জ্বিন ও ইনসানকে দেয়া হয়েছে, যদি তোমরা এটা বুঝ যে, কোরআন মাজীদ মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্বরচিত তাহলে তোমরাও এ ধরণের একটি সূরা বা কমপক্ষে একটি আয়াত রচনা করে দেখাও যা পাঠ করে মৃত অন্তর জাগ্রত হবে, যা শ্রবণে চোখ অশ্রুসজল হবে, শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যাবে, অন্তর নরম হয়ে যাবে, যা মানুষের মন থেকে দুনিয়ার চাওয়া পাওয়ার চিন্তাকে দূর করে দিবে, যা বারবার তেলওয়াত করলে তেলওয়াত করার বা শ্রবণ করার আগ্রহ আরো বৃদ্ধি পাবে, মানুষের অন্তর তার অজান্তে বলে উঠবে যে এ বাণীতো শুধু আমার জন্যই অবতীর্ণ হয়েছে, এর অপেক্ষায়ই আমি ছিলাম, এটা ব্যতীত আমার জীবন বৃথা ছিল, এর প্রতি ঈমান এনে আমি আমার জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য খোঁজে পেয়েছি।

    কোরআন মাজীদের সাহিত্যিকতা ছাড়াও তার বিস্ময়কর আরো অনেক দিক রয়েছে23, আর এর প্রতিটিই চেলেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত। এসমস্ত বিশ্বয়কর বিষয়সমূহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বয়কর বিষয় হল এই যে, অল্পবয়সী বাচ্চাদের পরিপূর্ণ কোরআ’ন এমনভাবে মুখস্ত করে নেয়া যে, কোথাও একটি যের, যবর, পেশের ত্রুটি থাকে না, এথচ এবাচ্চা স্পষ্ট আরবীতো দূরের কথা সাধারণ আরবী শব্দসমূহের অর্থ সম্পর্কেও অবগত নয়, ঐ বাচ্চাকে যদি তার মাতৃ ভাষার কোন বইয়ের কয়েকটি পৃষ্ঠা মুখস্ত করতে দেয়া হয়, তাহলে সেতা মুখস্ত করতে পারবে না, আর যদি মুখস্ত করেও তাহলে বেশি দিন পর্যন্ত তা মুখস্ত রাখতে পারবে না। অথচ কোরআন মাজীদ মুখস্তকারী হাফেজরা আজীবন তা পড়ে এবং পড়ায়, তা শুনে এবং শোনায়।24

    অল্প বয়সে, দশ বার বছর বয়সে কোরআন মাজীদ মুখস্ত করে নেওয়া তো সাধারণ বিষয়, কিন্তু এর চেয়েও কম বয়সে কোর’আন মাজীদ মুখস্ত করার উদাহরণও রয়েছে।25

    অল্প বয়স ছাড়াও বয়স্ক হয়ে কোরআন মাজীদ মুখস্ত করার উদাহরণও আছে, অথচ এ বয়সে মুখস্ত শক্তি লোপ পেতে থাকে।26 পরিশেষে কি কারণ আছে যে, আজ পৃথিবীতে তাওরাত, ইঞ্জিলের অনুসারীও যথেষ্ট রয়েছে কিন্তু এদের মধ্যে তাওরাত বা ইঞ্জিলের হাফেজ একজনও নেই, অথচ কোরআন মাজীদের হাফেজ কোন অতিরঞ্জন ছাড়া বলা যেতে পারে যে, কোটি কোটি। মন ও মস্তিষ্কে এত সহজে রেখাপাতকারী এবং মুখস্ত হওয়ার উপযুক্ত আয়াত যদি কেউ তৈরী করতে পারে তাহলে তৈরী করে দেখাক। ইহুদী স্কলার ডক্টর আনীস যে, ‘ফোরকানুল হক’ লিখেছে তার প্রথম শব্দটিই এত অসমাঞ্জস্য এবং অস্পষ্ট যে, তা সহজে মুখে উচ্চারণ করা যায় না এবং মানবিক স্বভাবও তা গ্রহণ করতে আগ্রহী নয়।27 মূলত কাফেরদের কোর’আনের সাথে দুশমনীর মূল কারণ, এ চেলেঞ্জটি যা ১৪ শত বছর থেকে তাদেরকে অপারগ এবং লা-জওয়াব করে রেখেছে। হিংসা ও বিদ্বেষের কারণে তারা সবসময় অস্থিরতায় ভোগছে কিন্তু কিছুই করতে পারছে না, যার বহিঃপ্রকাশ তাদের মৌখিক ঠাট্টা বিদ্রূপের মাধ্যমে হয়ে থাকে; আবার কখনো কখনো কোরআন মাজীদকে বাস্তবে অবমাননা এবং বেয়াদবীর মাধ্যমেও করে থাকে।

    অতএব, কোন মুসলমানের ‘ফোরকানুল হক’ বা অনুরূপ কোন লিখনী দেখে এ ভুলে পতিত হওয়া ঠিক হবে না যে, কোরআন মাজীদে দেয়া চেলেঞ্জ গ্রহণ করা হয়েছে, বা তার গুরুত্ব কমে গেছে, ঐ চেলেঞ্জ আজও আলহামদুলিল্লাহ্ ঐ ভাবেই বিদ্ধমান আছে যেমন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে বিদ্ধমান ছিল এবং কিয়ামাত পর্যন্ত এভাবেই বিদ্ধমান থাকবে।

    لَّا يَأۡتِيهِ ٱلۡبَٰطِلُ مِنۢ بَيۡنِ يَدَيۡهِ وَلَا مِنۡ خَلۡفِهِۦۖ تَنزِيلٞ مِّنۡ حَكِيمٍ حَمِيدٖ ٤٢

    অর্থ, ‘কোন মিথ্যা এতে অনুপ্রবেশ করবে না—অগ্র হতেও নয়, পশ্চাত হতেও নয়, এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসার্হ আল্লাহ্‌র নিকট হতে অবতীর্ণ। (সূরা হা-মীম সাজদাহ/ফুসসিলাত-৪২)।

  • ফোরকানুল হকের ফেতনা

    ফোরকানুল হকের ফেতনা

    কাফের মোশরেকদের কোরআনের সাথে দুশমনী এখন কোন গোপন বিষয় নয়, আর সময় অতিক্রমের সাথে সাথে এ দুশমনী আরো বৃদ্ধি পেতে থাকবে। নিকট অতীত এবং বর্তমানের মোশরেক ও ইহুদী-নাসারাদের কোরআনের সাথে দুশমনীর কিছু উদাহরণ নিচে পেশ করা হল:

    1. বৃটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম ই গালডিসটোন সংসদে এ বক্তব্য পেশ করেছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোরআন মুসলমানদের হাতে, বা তাদের অন্তরে বা মাথায় থাকবে, ততক্ষণ ইউরোপ মুসলিম দেশসমূহে নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না, আর যদি প্রতিষ্ঠিত করেও তাহলে তা স্থায়ী করতে সফল হবে না। এমনকি ইউরোপ নিজে টিকে থাকাও নিরাপদ হবে না।1
    2. ১৯০৮ খৃষ্টাব্দে বৃটেনের মন্ত্রী নোআবাদিয়াত এ বক্তব্য পেশ করেছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলমানদের নিকট কোরআন মাজীদ থাকবে, ততক্ষণ তারা আমাদের পথ আগলে থাকবে, আমাদের উচিত কোরআনকে তাদের জীবন থেকে দূর করে দেয়া।2
    3. অবিভক্ত ভারতের ইউপির গভর্ণর স্যার উইলিয়াম মিউর কোরআন মাজীদ সম্পর্কে তার কুমনোভাবকে এভাবে প্রকাশ করেছে যে, দু’টি জিনিস মানবতার দুশমন, মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তলোয়ার এবং মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কোরআন।3
    4. আলজিরিয়ার উপর ফ্রান্সের উপনিবেশিক শাসনের শত বছর পূর্তিতে ফ্রান্সের রাষ্ট্রনায়ক তার এক বক্তব্য বলেছে, মুসলমানদের রাত দিন থেকে কোরআন বের করা এবং আরবী ভাষার সাথে তাদের সম্পর্ক নষ্ট করা জরুরী। যাতে করে আমরা সহজে তাদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারি।4
    5. ১৯৮৪ খৃষ্টাব্দে ভারতে হিন্দুরা নিয়মিত একটি আন্দোলন শুরু করেছে যে, হয় কোরআন ছাড় না হয় ভারত ছাড়। ১৯৮৯ খৃষ্টাব্দে কলকাতার একটি আদালতে হিন্দুরা মামলা করেছে যে, কোরআন মাজীদের উপর নিয়মানুবির্তিতা আরোপ করতে হবে।22
    6. নেদারল্যান্ডের এক ফ্লিম নিৰ্মাতা ‘এত্বায়াত’ নামে একটি ফ্লিম তৈরী করে, সেখানে একজন পতিতার পেটে সূরা নূরের এ আয়াতটি লিখে দিয়েছে— ٱلزَّانِيَةُ وَٱلزَّانِي فَٱجۡلِدُواْ كُلَّ وَٰحِدٖ مِّنۡهُمَا مِاْئَةَ جَلۡدَةٖۖ وَلَا تَأۡخُذۡكُم بِهِمَا رَأۡفَةٞ فِي دِينِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۖ وَلۡيَشۡهَدۡ عَذَابَهُمَا طَآئِفَةٞ مِّنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٢ — অর্থ: ‘ব্যভিচারী ব্যভিচারিণী তাদের প্রত্যেককে একশ বেত্রাঘাত করবে, আল্লাহ্‌র বিধান কার্যকরীকরণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ্ এবং পরকালে বিশ্বাসী হও, মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ (সূরা নূর – ২)। এর সাথে একজনের পিঠে বেত্রাঘাতের জখম অবস্থায় দেখানো হয়েছে, এ ফ্লিমের মূল উদ্দেশ্য হল এই যে, ইসলামের এ শাস্তি একটি অবিচার, জুল্‌ম।
    7. বর্তমান সময়েও অ্যামেরিকান এক বুদ্ধিজীবী ওয়াশিংটন টাইমে কোরআন মাজীদ সম্পর্কে তার কুমনোভাব এভাবে প্রকাশ করেছে যে, মুসলমানদের সন্ত্রাসবাদীতার মূল হল স্বয়ং কোরআন মাজীদের শিক্ষা। একথা বলা ঠিক নয় যে, মুসলমানদের মধ্যে একজন সন্ত্রাসী এবং অল্প সংখ্যক উচ্চাভিলাষী সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদেরকে বন্দী করে রেখেছে। বরং মূল বিষয়টি কোরআনী শিক্ষার ফল। এ সমস্যার সমাধান এটাই যে, মধ্যমপন্থী মুসলমানদেরকে কোরআন মাজীদের শিক্ষা পরিবর্তন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা।23
    8. ৭ জুলাই ২০০৫ খৃষ্টাব্দে লণ্ডনে ঘটে যাওয়া বোমাবাজীর উপর কথা বলতে গিয়ে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী এ বক্তব্য পেশ করেছে যে, ইসলামী সন্ত্রসীরা ইরাকে ক্ষমতা দখলের জন্য পাশ্চাত্য পরিকল্পনার পরিবর্তে শয়তানী দর্শন এ হামলায় উদ্বুদ্ধ করেছে। (হে আল্লাহ্ তুমি তাদের উপর অভিসম্পাত কর)।24
    9. ইটালীর প্রসিদ্ধ সাংবাদিক খাতুন এবং ইয়ানা ফালাসী এ বক্তব্য রেখেছে যে, মুসলমানদের পবিত্র কিতাব কোরআন, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের সাথে কোন সম্পর্ক রাখে না; একথা বলা ভুল হবে যে সন্ত্রাসী অল্প কিছু মুসলমান বরং সমস্ত মুসলমানই এ চেতনা রাখে।25

    কোরআনের সাথে দুশমনির এ কথাগুলোতো কাফের নেতাদের মুখ দিয়ে বের হয়েছে কিন্তু যে দুশমনী তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে তা আরো মারাত্বক।

    يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ بِطَانَةٗ مِّن دُونِكُمۡ لَا يَأۡلُونَكُمۡ خَبَالٗا وَدُّواْ مَا عَنِتُّمۡ قَدۡ بَدَتِ ٱلۡبَغۡضَآءُ مِنۡ أَفۡوَٰهِهِمۡ وَمَا تُخۡفِي صُدُورُهُمۡ أَكۡبَرُۚ قَدۡ بَيَّنَّا لَكُمُ ٱلۡأٓيَٰتِۖ إِن كُنتُمۡ تَعۡقِلُونَ ١١٨

    অর্থ, ‘তাদের মুখ থেকেই শত্রুতা প্রকাশিত হয় আর তাদের মনে যা গোপন রাখে তা গুরুতর। (সূরা আল ইমরান-১১৮)।

    নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে হিংসা ও বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে কোরআন মাজীদের বিরুদ্ধে প্রচার প্রোপাগাণ্ডার ক্ষেত্রে কাফেরদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই যে, এ কোরআন আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে নাযিলকৃত নয় বরং মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই তা রচনা করেছে। আজও কাফেরদের মূল লক্ষ্য এ বিষয়েই যে, এ কোরআন মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিজস্ব রচনা বলে প্রমাণ করা, যাতে করে ইসলামের সবকিছু নিজে নিজেই নষ্ট হয়ে যায়।

    এ উদ্দেশে কোরআন মাজীদে বার বার পরিবর্তন করার জন্য চেষ্টা করা হয়েছে, প্রথমে আরবী ভাষায় পরিবর্তনকৃত কোরআন প্রকাশ করা হয়েছে, এর পর হিব্রু ভাষায় পরিবর্তন কৃত কোরআন প্রকাশ করা হয়েছে, ইহুদী নাসারাদের এই কামনাকে নস্যাত করার জন্য সাউদী আরব সরকার আজ থেকে ২১ বছর আগে ১৪০৫ হিজরী বাদশাহ ফাহাদ কোরআন একাডেমী নামে একটি বিরাট প্রকল্প স্থাপন করেছে, যা প্রতি বছর তিন কোটি কোরআন মাজীদ ছেপে সমগ্র বিশ্বে ফ্রি বণ্টন করার সুভাগ্য লাভ করেছে।27 এই বাদশাহ্ ফাহাদ কোরআন একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ইহুদী নাসারাদের উদ্দেশ্য ধূলোলুণ্ঠিত হল।

    ইহুদী নাসারারা তাদের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের জন্য এখন একটি নুতন পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, আজ থেকে মোটামুটি দশ বছর পূর্বে (৯/১১ ঘটনার পাঁচ ছয় বছর পূর্বে দু’জন ফিলিস্তিনী ইহুদী আল-মাহদী এবং সাফী আরবী ভাষায় কোরআন মাজীদের আদলে একটি কিতাব রচনা করে, তার নামসমূহ কোরআন মাজীদের সূরাসমূহের নামের অনুরূপ করে রাখা হয়েছে, যেমন— সূরা ফাতেহা, সূরা সালাম, সূরা নূর, সূরাতুল ঈমান, সূরাতুত তাওহীদ, সূরাতুল মাসীহ, সূরাতুন নিসা, সূরাতুন নিকাহ, সূরাতু তালাক, সূরাতুস সিয়াম, সূরাতুস্ সালা ইতাদি। এ সূরাসমূহে কোরআন মাজীদের সূরাসমূহের আদলে ছোট ছোট আয়াত লিখা হয়েছে, ৯০% শব্দ এবং বাক্য কোরআন মাজীদ থেকে নেয়া হয়েছে। কিতাবটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ফোরকানুল হক’। প্রথম প্রকাশনায় আরবী এবং ইংরেজী ভাষাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, প্রতি পৃষ্ঠার অর্ধেক আরবী আর অর্ধেক ইংরেজী অনুবাদ। ১৫×20 সে. মি. আকারে ৩৬৬ পৃ.। কিতাবটি অ্যামেরিকান ইহুদী কোম্পানী “project omega 2001”, এবং “Wise press” প্রকাশ করেছে, যার বিক্রয় মূল্য ১৯.৯৯ ডলার। প্রকাশকের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, এটা ফোরকানুল হকের প্রথম পারা এরপর আরো ১১ পারা প্রকাশিত হবে, ফোরকানুল হকের এ সংক্ষিপ্ত পরিচিতির পর আমরা তার বিভিন্ন দিক নিয়ে কিছু আলোকপাত করতে চাই।

    ফোরকানুল হকের বিভিন্ন দিক

     ফোরকানুল হকের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করার আগে এ বিষয়টি বর্ণনা করা জরুরী যে, ফোরকানুল হককে আল্লাহ্ পক্ষ থেকে ওহীকৃত কিতাবের আদলে পেশ করা হয়েছে, উদাহরণ স্বরূপ, এক স্থানে লিখা হয়েছে— ‘আমি এই ফোরকানুল হকেকে ওহী হিসেবে অবতীর্ণ করেছি। (সূরাতুত তানযিল-৪)।

    অপর এক স্থানে লিখা হয়েছে— ‘ফোরকানুল হককে আমি অবতীর্ণ করেছে যাতে করে পথভ্রষ্টদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর পথে নিয়ে আসি।’ (সূরা মাসীহ্-৬)।

    উল্লেখিত আয়াত সমূহের আলোকে ফোরকানুল হকের লেখকদের নিম্নোক্ত দাবীসমূহ প্রমাণিত হচ্ছে, চাই তারা তা বাস্তবে করে থাকুক আর নাই করুক—

    1. বক্তা আল্লাহ্ নবী।
    2. জীবরীল ওহী নিয়ে তার নিকট আসে।
    3. ফোরকানুল হকে যা কিছু লিখা হয়েছে তা সবই আল্লাহ্ পক্ষ থেকে।

    কোরআন মাজীদের আলোকে এ তিনটি দাবীর বিধান এ রকম—

    وَمَنۡ أَظۡلَمُ مِمَّنِ ٱفۡتَرَىٰ عَلَى ٱللَّهِ كَذِبًا أَوۡ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمۡ يُوحَ إِلَيۡهِ شَيۡءٞ وَمَن قَالَ سَأُنزِلُ مِثۡلَ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُۗ وَلَوۡ تَرَىٰٓ إِذِ ٱلظَّٰلِمُونَ فِي غَمَرَٰتِ ٱلۡمَوۡتِ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ بَاسِطُوٓاْ أَيۡدِيهِمۡ أَخۡرِجُوٓاْ أَنفُسَكُمُۖ ٱلۡيَوۡمَ تُجۡزَوۡنَ عَذَابَ ٱلۡهُونِ بِمَا كُنتُمۡ تَقُولُونَ عَلَى ٱللَّهِ غَيۡرَ ٱلۡحَقِّ وَكُنتُمۡ عَنۡ ءَايَٰتِهِۦ تَسۡتَكۡبِرُونَ ٩٣

    অর্থ, ‘আর ঐ ব্যক্তির চেয়ে বড় জালেম কে হতে পারে যে আল্লাহ্‌র প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছে? অথবা এরূপ বলে, আমার উপর ওহী নাযিল করা হয়েছে অথচ প্রকৃত পক্ষে তার উপর কোন ওহী নাযিল করা হয় নি। (সূরা আন‘আম-৯৩)।

    অতএব,ফোরকানুল হকে যা কিছু লিখা হয়েছে তা পরিষ্কার মিথ্যা, অপবাদ এবং বাতেল। এ সমস্ত ইবলিসী কথাবার্তা এখানে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হল এই যে, হয়তবা এর মাধ্যমে ইহুদী নাসারাদেরকে নিজেদের বন্ধু এবং সমমনের বলে বিশ্বাসকারীদের চোখ খুলে যাবে এবং তাদের অনুভূতি হবে যে, যারা আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের দুশমন তারা কখনো মুসলমানদের বন্ধু হতে পারে না?

  • ফোরকানুল হকের শয়তানি

    ফোরকানুল হকের শয়তানি

    ১. শিরকী দিক—

     ফোরকানুল হকের প্রতিটি সূরার শুরু নিম্নোক্ত বাক্যের দ্বারা শুরু হয়েছে। (অর্থ) আমি শুরু করছি বাপের নামে, কালিমার নামে এবং রুহুল কুদুসের নামে যে শুধু একমাত্র ইলাহ। এটাই তত্ত্ববাদের আক্বীদা (বিশ্বাস) যা এত অস্পষ্ট এবং বুঝার অনুপযুক্ত যে, আজও কোন বড় খৃষ্টান আলেমও এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারে নাই।

    ২. আল্লাহ্‌র অবমাননা—

     ফোরকানুল হকের বিভিন্ন স্থানে কোর‘আন মাজীদ এবং বিধি-বিধানের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আল্লাহ্ তা’লাকে মারাক্তকভাবে অবমাননা করা হয়েছে, উদাহরণ স্বরূপ এক স্থানে লেখা আছে — (অর্থ) ‘এবং যখন শয়তান বলল, (নাউযুবিল্লাহ্) হে মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমি তোমাকে আমার রিসালাত এবং ওহীর জন্য সমস্ত লোকদের মধ্য থেকে বাছাই করেছি, অতএব, আমি তোমাকে যা দিচ্ছি সে অনুযায়ী আমল কর, আর আমার নে’মতসমূহকে স্মরণ কর এবং তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশে অপারগতা প্রকাশ কর। (সূরা আল গারানিক-৯)। উল্লেখ্য সূরা আ’রাফের ১৪৪ নং আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা মূসা (আ.)-কে সম্বোধন করে বলেছেন— قَالَ يَٰمُوسَىٰٓ إِنِّي ٱصۡطَفَيۡتُكَ عَلَى ٱلنَّاسِ بِرِسَٰلَٰتِي وَبِكَلَٰمِي فَخُذۡ مَآ ءَاتَيۡتُكَ وَكُن مِّنَ ٱلشَّٰكِرِينَ ١٤٤ — অর্থ, ‘আমি তোমাকেই আমার রিসালাত ও আমার সাথে বাক্যালাপের জন্য লোকদের মধ্যে হতে মনোনীত করেছি, অতএব, এখন আমি তোমাকে যা কিছু দেই তা তুমি গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।’

    ৩. নবীগণের অপমান—

     নবীগণের সাথে ঠাট্টা বিদ্রুপ, তাদেরকে অবমাননা, তাদেরকে হত্যা করা ইহুদীদের এমন এক অপরাধ যার কথা কোরআন মাজীদে বারবার বর্ণনা করা হয়েছে, আর এর একটি জীবন্ত উদাহরণ ফোরকানুল হক। যার একটি আয়াত এই— ‘আর যখন মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শয়তানের সাথে একাকী হল, তখন বলল, আমি তোমার সাথে আছি, অতএব মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে পরিত্যাগ করে শয়তানকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করল।’ (সূরা আল গারানিক-৮)। অন্য এক স্থানে লেখা হয়েছে—‘এক নিরক্ষর কাফের ব্যক্তি (নাউজুবিল্লাহ্) নিরক্ষরদেরকে শিক্ষা দিয়েছে ফলে তাদের অজ্ঞতা এবং মূর্খতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।’ (সূরা আশশাহাদাত-৪)।

    ৪. জিবরীল (আ.) এর অবমাননা—

    কোরআন অবতীর্ণের সময়কাল থেকেই আহলে কিতাব (ইহুদী-নাসারারা) জিবরীল (আ.)-এর দুশমন ছিল। তাদের দাবী হল জিবরীল (আ.) ইসহাকের বংশ ছেড়ে ইসমাঈলের বংশে কেন গেল? তাই তারা ফোরকানুল হকে নিজেদের হিংসা ও বিদ্বেষের কথা এভাবে প্রকাশ করেছে। — ‘মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট মিথ্যা ও চক্রান্তমূলক ওহী করা হয়েছে যা শয়তান তার নিকট নিয়ে এসেছে।’ (সূরাতুল গারানিক-১৫)। এ শয়তানী আয়াতে জিবরীল (আ.)-কে শয়তান (নাউযু বিল্লাহ্) এবং কোরআনুল কারীমকে মিথ্যা এবং চক্রান্ত বলে আক্ষ্যায়িত করা হয়েছে (নাউযু বিল্লাহ্)।

    ৫. জিহাদ হারাম—

     নিঃসন্দেহে জিহাদ শব্দটি আজ সমগ্র বিশ্বে কাফেরদের জন্য জীবন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, জিহাদ কাফেরদের ঘুমকে হারাম করে দিয়েছে। মনে হচ্ছে যেন ফোরকানুল হক লেখার মূল উদ্দেশ্যই হল মুসলমানদেরকে জিহাদ থেকে নিরুৎসাহিত করা।

    এ সম্পর্কে কিছু ইবলীসী অনর্থক কথাবার্তা দেখুন—‘তারা আমাদের দিকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে যে আমি মুমেনদের কাছ থেকে জান্নাতের বিনিময়ে তাদের জীবন ক্রয় করে নিয়েছি, আর আমার পথে যুদ্ধ করবে, ইঞ্জিলের আলোকে এ অঙ্গিকার পূর্ণ করা আমার দায়িত্ব, সাবধান হও, এ ধরনের অপবাদ দাতারা মিথ্যুক।’ পরে আরো বলা হয়েছে— ‘আমি পাপিষ্ঠদের জীবন ক্রয় করি না, পাপিষ্ঠদের জীবন মারদুদ শয়তান ক্রয় করে।’

    আরো একটি উদাহরণ— ‘তোমরা কি ধারণা করছ যে, আমি বলেছি, আল্লাহ্‌র পথে যুদ্ধ কর আর মুমেনদেরকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত কর25, অথচ আমার পথে কোন যুদ্ধ নেই, আর না আমি মুমেনদেরকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করেছি। বরং পাপিষ্ঠদেরকে মারদুদ শয়তান যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করেছে। (নাউযুবিল্লাহ্) (সূরা আল-মাওয়েজা-২)।

    অন্য এক স্থানে লিখেছে— ‘আর বিজয়ী হয়ে গেছে (আহলে কিতাবদের জান্নাত) মুসলমানদের ঐ জান্নাতের উপর যার অঙ্গীকার তাদের সাথে করা হয়েছে এবং যার জন্য তারা আনন্দ এবং সুস্বাদ অনুভব করে, ঐ পথে জীবন দেয়, মূলত সেটা ব্যভিচারী এবং পাপিষ্ঠদের জান্নাত। (সূরা রূহ-৩)।

    ৬. গণীমতের মালের নিন্দা—

    জেহাদের মাধ্যমে অর্জিত গণিমতের মালের বিষয়টিও কাফেরদের জন্য বেদনাদায়ক, এটাকে তারা কোথাও ডাকাতি, কোথাও চুরি, কোথাও লুট, কোথাও জুলম বলে আখ্যায়িত করেছে। শুধু একটি উদাহরণ দেখুন— ‘আর তোমাদেরকে বলা হয়েছে যারা আল্লাহ্ প্রতি ঈমান রাখে না তাদের সাথে যুদ্ধ কর, আর গণিমতের মাল হিসেবে যা পাও তা ভক্ষণ কর, তা হালাল এবং পবিত্র, এটা জালেমদের কথা।’ (নাউজুবিল্লাহ্) (সূরা আল- আতা-৭)।

    ৭. কোরআন মাজীদের অবমাননা—

    ইহুদী নাসারারা মৌখিক এবং লিখিত কোন পন্থা অবলম্বন করতে কোন প্রকার ত্রুটি করে নি, ফোরকানুল হকের ইবলিসী কথা বার্তা তার মুখ দিয়ে বের হয়েছে বলে এক স্থানে প্রমাণিত হয়েছে, তাই সে একস্থানে লিখেছে— ‘হে লোকেরা! তোমাদের নিকট শয়তানের পথভ্রষ্টমূলক আয়াত পড়ে শোনানো হচ্ছে, যাতে করে সে তোমাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারে নিয়ে যেতে পারে, অতএব, তোমরা শয়তানের নিদের্শ অনুসরণ করবে না এবং তাকে তোমাদের নিকৃষ্ট দুশমন হিসেবে জান।’ (সূরা আল-আতা-১৫)

    ৮. কোরআন মাজীদে পরিবর্তন—

    আহলে কিতাবদের মধ্যে আসমানী কিতাবসমূহে পরিবর্তনের একটি স্বাভাবিক অপরাধ পরায়ণতা আছে। তাওরাত এবং ইঞ্জিলের পর কোরআন মাজীদে তারা নিকৃষ্টতম পরিবর্তনের অপরাধে লিপ্ত হয়েছে, শাব্দিক পরিবর্তনে উদাহরণ তো পাঠ করা ইতিপূর্বে দেখেছেন, আর বিধি-বিধানে পরিবর্তনের একটি উদাহরণ আমরা এখানে পেশ করলাম— ‘তোমরা আমার প্রতি মিথ্যারোপ করেছ যে, আমি নিষিদ্ধ মাসসমূহে যুদ্ধ হারাম করেছি, আমি যা হারাম করেছিলাম তা আমি রহিত করে দিয়েছি, অতএব, এখন আমি হারাম মাসসমূহে বড় যুদ্ধ করা হালাল করে দিয়েছি।’ (সূরা আস্‌সালাম-১১)

    ৯. মুসলমানদের সাথে শত্রুতা—

    ফোরকানুল হকে মুসলমানদেরকে কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে পথভ্রষ্ট লোকেরা’ (সূরা আস্সালাম-১); আবার কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে কাফেররা’ (সূরা তাওহীদ)। আবার কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে মুনাফেকরা’ (সূরা মাসীহ্-১)। আবার কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে মোশরেকরা’ (সূরা সালুস-১)। আবার কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে অপরাধীরা’ (সূরা আল মাওয়েজা-১)। আবার কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে মিথ্যা আরোপকারীরা’ (সূরা আল ইফক-১৭)। আবার কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে অজ্ঞ লোকেরা’ (সূরা আল খাতাম-১)। আবার কোথাও বলা হয়েছে— ‘হে পরিবর্তনকারীরা’ (সূরা আল আসাতীর-১)।

    আর আহলে কিতাবদেরকে সর্বত্র — ‘হে ঈমানদাররা।’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে, কোরআ’ন মাজীদে যেভাবে বানী ইসরাঈলদেরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এমনিভাবে ফোরকানুল হকে মুসলমানদের উপর অসংখ্য অপবাদ দেয়া হয়েছে, আর যে, বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি বড় করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে তা হল এই যে, মুসলমানরা হত্যাকারী, ডাকাত, চোর, সন্ত্রাসী এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী। কিছু উদাহরণ নিচে পেশ করা হল—

    ক) ‘তোমরা গীর্জা এবং উপসানালয়সমূহ বিনষ্ট করেছ, যেখানে আমার নাম স্মরণ করা হত, আর তোমরা আমাদের ঐ মোমেন বান্দাদের উপসানালয়সমূহ বিনষ্ট করেছ যারা তোমাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে, তোমাদের সাথে সদ্ব্যবহার করেছে, তোমাদেরকে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছে, তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করেছ, অতএব, তোমরা যুলুমকারী।’ (সূরা আল আসাত্বীর-৪)।

    খ) ‘তোমরা বলেছ, দ্বীনের মধ্যে জবরদস্তি নেই, কিন্তু আমার মুমেন বান্দাদের উপর কুফরী চাপিয়ে দেয়ার জন্য জবরদস্তি করছ, যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছে সে নিরাপত্তা লাভ করেছে, আর যে ব্যক্তি সত্য দ্বীনের উপর অটল ছিল তাকে পাপিষ্ঠদের ন্যায় হত্যা করা হয়েছে।’ (সূরাতুল মূলুক-১)

    গ) ‘তোমাদের কর্ম পদ্ধতি, কুফরী করা, শিরক করা, ব্যভিচার করা, যুদ্ধ করা, হত্যা করা, লুটপাট করা, নারীদেরকে বন্দী করা, অজ্ঞতা এবং নাফরমানী করা।’ (সূরা আল কাবায়ের- ৩, পৃ. ২৪৯)।

    উল্লেখিত ইবলিসী কথাবার্তাসমূহে যেভাবে মুসলমানদের প্রতি ঈর্ষা প্রকাশ করা হয়েছে ফোরকানুল হকের অধিকাংশ অংশে এ ধরনের ইবলিসী কথাবার্তায় ভরপুর।

    ১০. সত্য গোপন করা—

    আহলে কিতাবদের অপরাধসমূহের মধ্যে একটি অপরাধ হল সত্য গোপন করা, ফোরকানুল হকেও এ উদাহরণ বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায়। একটি উদাহরণ —

    সূরা নিসার মধ্যে আল্লাহ্ তা’লা এরশাদ করেছেন—

     وَإِنۡ خِفۡتُمۡ أَلَّا تُقۡسِطُواْ فِي ٱلۡيَتَٰمَىٰ فَٱنكِحُواْ مَا طَابَ لَكُم مِّنَ ٱلنِّسَآءِ مَثۡنَىٰ وَثُلَٰثَ وَرُبَٰعَۖ فَإِنۡ خِفۡتُمۡ أَلَّا تَعۡدِلُواْ فَوَٰحِدَةً أَوۡ مَا مَلَكَتۡ أَيۡمَٰنُكُمۡۚ ذَٰلِكَ أَدۡنَىٰٓ أَلَّا تَعُولُواْ ٣

     অর্থ— ‘তবে নারীদের মধ্যে তোমাদের পছন্দমত দু’টি, তিনটি ও চারটি বিয়ে করো। কিন্তু যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে ন্যায় বিচার করতে পারবে না তবে মাত্র একটি অথবা তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যার অধিকারী (ক্রীতদাসীকে বিয়ে করো) এটা অবিচার না করার নিকটবর্তী।’ (সূরা নিসা-৩)।

    ফোরকানুল হকের লেখক কোরআন মাজীদের এ আয়াতটিকে এভাবে লিখেছে— ‘তোমরা বিয়ে কর দু’টি, তিনটি, চারটি, অথবা ক্রীতদাসীদেরকে।’

    ‘যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে ন্যায় বিচার করতে পারবে না’— এই অংশটুকু বাদ দিয়েছে।

    যেখানে একাধিক বিয়ের জন্য অপরিহার্য শর্ত ‘ন্যায় বিচার’ এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, ন্যায় বিচার ব্যতীত দুই বা তিন বা চার বিয়ের কথা উল্লেখ করে তারা বুঝাল যে, মুসলমানদের শরীয়ত একটি অবিচার মূলক শরীয়ত।

    ১১. ভালবাসা এবং নিরাপত্তার চক্রান্ত—

    ফোরকানুল হকে ইহুদী নাসারাদেরকে ‘হে ঈমানদাররা’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে।26 আর ফোরকানুল হকের দিকনির্দেশনাকে ‘সত্য দীন’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।27 এবং বিভিন্ন স্থানে এ দাবী করা হয়েছে যে, ইহুদী নাসারারা ভালবাসা, ন্যায় বিচার, শান্তি ও নিরাপত্তার ধারক ও বাহাক। যেমন— ‘হে মানবমণ্ডলী! আমি ভালবাসা, দয়া, অনুগ্রহ, ন্যায়বিচার এবং নিরাপত্তার নির্দেশ দিয়ে থাকি।’ (সূরা আল কতল-৩)। অন্য এক স্থানে বলা হয়েছে— ‘নিশ্চয় দ্বীনে হকই ভালবাসা, ভাতৃত্ব, দয়া ও শান্তির দ্বীন।’ (সূরা আল আজহা-৫)।

    ভালবাসা, ভাতৃত্ব, দয়া ও শান্তিরধারকেরা আফগানিস্তান ও ইরাকে সাধারণ জনতার উপর যে ভালবাসা, ভাতৃত্ব, দয়া ও নিরাপত্তার সাথে যেমন আক্রমণ করেছে বা আফগানিস্তান ও ইরাকের জেলসমূহ এবং কিউবার বন্দীশলায় মুসলমান বন্দীদের সাথে যে ভালবাসা, ভাতৃত্ব ও নিরাপত্তামূলক আচরণ করা হচ্ছে তা সমগ্র বিশ্ব অবলোকন করছে।

    ১২. ফোরকানুল হকের সাম্প্রদায়িকতা

    সমগ্র পৃথিবীর সামনে আজ আলোকিত চিন্তা, নিরপেক্ষতা এবং ক্ষমতার বড়াইকারী ‘উন্নত বিশ্ব’ ভিতরে ভিতরে কতটা দলীয় গোঁড়ামীর অন্ধত্ব এবং উন্মাদনায় মত্ত। তার অনুমান ফোরকানুল হকের এ দু’টি লাইন থেকে অনুমান করুন— এক. ‘সত্য ইঞ্জিল এবং সত্য ফোরকানুল হকই সত্য দ্বীন, আর যে ব্যক্তি এ দ্বীন ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন অন্বেষণ করবে তা তার কাছ থেকে কখনো গ্রহণ করা হবে না।’ (সূরা আল জুযিয়াহ-১৩)। দুই. ‘আমি সত্য দ্বীনের কথা স্মরণ করানোর জন্য ফোরকানুল হক অবতীর্ণ করেছি, যা সত্য ইঞ্জিলের সত্যায়নকারী, যাতে করে তাকে অন্যান্য সমস্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী করতে পারি, যদিও কাফেররা (মুসলমানরা) তা অপছন্দ করে।’ (সূরা আর আযহা-৬)।

    দ্বিতীয় আয়াত থেকে শুধু এ কথাই প্রমাণিত হয় না যে, ইহুদী নাসারারা তাদের দলীয় ব্যাপারে কত গোঁড়ামী এবং উন্মাদনায় মত্ত আছে, বরং এ কথাও বুঝা যায় যে, তারা সর্বশক্তি প্রয়োগে ইসলামকে পরাজিত এবং ইহুদী ও নাসারাদেরক বিজয়ী করার দৃঢ় প্রত্যয়ী।

    এখন ফোরকানুল হকের আলোকিত চিন্তাসম্পন্ন কিছু দিক নিদের্শনার উল্লেখ এখানে করতে চাই যাতে পাঠকরা বুঝতে পারে যে বর্তমান যুগের আলোকিত চিন্তার মূল উৎস কোথায়?

    ক) পর্দা নারীজাতির জন্য একটি লাঞ্ছনা এবং অবমাননা— ‘আল মাহদী’ ফোরকানুল হকে লিখেছে— ‘তোমরা তোমাদের নারীদের মাঝে এ বলে প্রচ্ছন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছ যে, যখন কেউ কোন প্রশ্ন করবে তখন পর্দার আড়াল থেকে প্রশ্ন করবে, আর এটা আমার সৃষ্টিকে লাঞ্ছনা এবং অবমাননা করা।’ (সূরা নিসা-১০)।

    খ) নারীদেরকে ঘরে বসিয়ে রাখা অবিচার— ঐ সূরায় পরবর্তীতে লিখা হয়েছে— ‘তোমরা নারীদেরকে তোমাদের একথা দিয়ে বন্দী করে রেখেছ যে,“তোমরা তোমাদের ঘরে থাক” সতর্ক হও ঘরে বসে থাকার নিদের্শ নিকৃষ্ট নিদের্শ, যা জালেমরা দিয়েছে।’ (সূরা নিসা-১১)।

    গ) পুরুষদেরকে শাসক নির্ধারণ করা জান্তব এবং হিংস্রতা— ‘তোমরা বল যে পুরুষ নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল, আর যে সমস্ত নারীদের ব্যাপারে তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা করো তাদেরকে উপদেশ দাও, তাদেরকে বিছানা থেকে পৃথক করে দাও, তাদেরকে প্রহার কর, তাহলে মানুষ, বন্য পশু, হিংস্র প্রাণী এবং চতুষ্পদ জন্তুর মাঝে পার্থক্য কি থাকল?’ (সূরা নিসা-৪)।

    ঘ) উত্তরাধিকারে নারীকে অর্ধেক সম্পদ দেয়া, দুইজন নারীর সাক্ষীকে একজন পুরুষের সাক্ষীর সমান নির্ধারণ করা সম্পর্কে— ‘তোমাদের শরীয়তে নারী পূরুষের অর্ধেক সম্পদ পায়, কেননা (কোরআনে বলা হয়েছে) পুরুষ নারীর দ্বিগুণ সম্পদ পাবে, তোমাদের শরীয়তে নারীর সাক্ষীও পুরুষের অর্ধেক, কেননা (কোরআনে বলা হয়েছে) যদি দু’জন পুরুষ সাক্ষী না পাওয়া যায় তাহলে দু’জন নারী এবং একজন পুরুষ সাক্ষ্য দিবে, তাহলে নারীর উপর পুরুষের একগুণ মর্যাদা বেশি, আর এটা জালেমদের ন্যায় বিচার।’

    ঙ) ত্বালাক হারাম— ‘আর আমি বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছি ত্বালাক এবং ব্যভিচারের নিকটবর্তীও হবে না।’ (সূরা আতুহুর-৯)।

    চ) ত্বালাকপ্রাপ্তা নারীকে বিয়ে করা ব্যভিচার এবং কুফর— ‘যে ব্যক্তি কোন তালাকপ্রাপ্তা মহিলাকে বিয়ে করল সে ব্যভিচার করল, আর তার এ কাজটি কুফরী এবং পাপ কাজ।’ (সূরা আত্বালাক-৩)।

    ছ) একাধিক বিয়ে ব্যভিচার— ‘তোমরা বলেছ যে বিয়ে করো ঐ সমস্ত নারীদেরকে যাদেরকে তোমাদের পছন্দ হয়, দুই, তিন, চারটি পর্যন্ত, অথবা ঐ সমস্ত কৃতদাসীদেরকে যারা তোমাদের অধীনস্ত। একথা বলে তোমরা বর্বরতার অভ্যাস ব্যভিচারের অবর্জনা এবং পাপের দিকে প্রত্যাবর্তন করেছ, তাই তোমরা পবিত্র হতে পারবে না।’ (সূরা আল মিযান-৯)

    জ) নারী পুরুষের পার্থক্য পূর্ণ অধিকারের দুর্নাম— ফোরকানুল হকের ইবলিসী কথাবার্তাসমূহে শুধু বিয়েকে গোলামী হিসেবেই দেখায়নি বরং নারী পুরুষের পার্থক্য পূর্ণ অধিকারকে সরাসরি যুলুম হিসেবেও পেশ করা হয়েছে, যেহেতু পুরুষরা চার জন স্ত্রী রাখতে পারবে তাহলে নারী কেন চার জন স্বামী রাখতে পারবে না।

    ‘তোমরা নারীদেরকে তোমাদের যৌনকামনা পূরণের মাধ্যম করে রেখেছ। তোমরা যেভাবে খুশি সেভাবে তাকে চাও, কিন্তু নারী তোমাদেরকে যেভাবে খুশী সেভাবে চাইতে পারে না। তোমরা নারীকে যখন খুশী তখন ত্বালাক দিতে পার, অথচ তারা তোমাদেরকে ত্বালাক দিতে পারে না। তোমরা তাদেরকে ভিন্ন করে রাখতে পার, কিন্তু তারা তোমাদেরকে ভিন্ন করে রাখতে পারবে না। তোমরা তাদেরকে প্রহার করতে পার, কিন্তু তারা তোমাদেরকে মারতে পারবে না। তোমরা একজন নারীর সাথে দু’জন, তিন জন, চার জন বা একজন কৃতদাসী রাখতে পার, কিন্তু তারা দ্বিতীয় স্বামী রাখতে পারে না। তোমরা তাদের উপর কর্তৃত্বশীল, কিন্তু তারা তোমাদের উপর কর্তৃত্বশীল নয়, এমন কি তারা তাদের নিজেদের কোন বিষয়েও ভাল সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।’ (সূরা নিসা ৮, ৯)।

    ঝ) খুনের বদলা খুন একটি ধ্বংসাত্বক কাজ— কোরআন মাজীদে আল্লাহ্ তা’লা বলেছে—

    وَلَكُمۡ فِي ٱلۡقِصَاصِ حَيَوٰةٞ يَٰٓأُوْلِي ٱلۡأَلۡبَٰبِ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٧٩

    অর্থ— ‘হে জ্ঞানবান লোকেরা! (কেসাসের মধ্যে) প্রতিশোধ গ্রহণে তোমাদের জন্য জীবন আছে।’ (সূরা আল বাকারা-১৭৯)।

    এর অর্থ হল এই যে, হত্যাকারীকে হত্যার বিনিময়ে হত্যা করতে হবে, অথচ পাশ্চাত্যে কেসাসের (হত্যার বিনিময়ে হত্যাকারীকে হত্যা করা) বিধান না থাকায় আলোকিত চিন্তার বহিঃপ্রকাশ করতে গিয়ে ফোরকানুল হকের লেখক লিখেছে— ‘আমি তোমাদেরকে কেসাসের (হত্যার বিনিময়ে হত্যা করার নিদের্শ) দেই নি, হে জ্ঞানী ব্যক্তিরা তোমাদের জন্য কেসাসে (হত্যার বিনিময়ে হত্যার মধ্যে) রয়েছে ধ্বংস ও বরবাদ।’ (সূরা আল মোহতাদীন -৭)।

    ফোরকানুল হকের ইবলিসী কথাবর্তা পড়ার পর এ অনুমান করা দুষ্কর নয় যে, মূলত ইহুদী নাসারারাদের অন্তরে কোরআন মাজীদের বিরুদ্ধে সুপ্ত হিংসা বিদ্বেষ গ্রন্থাকারে বের হয়েছে।

    সমস্ত ইবলিসী কথাবার্তা সম্পর্কে আমরা পাঠকদেরকে যেদিকে দৃষ্টি ফেরাতে চাই তা হলো এই যে, আল্লাহ্ তা’লাকে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিবরীল (আ.)-কে (নাউজুবিল্লাহ্ আবারও নাউজুবিল্লাহ্) বার বার শয়তান বলে আখ্যাকারী ইহুদী নাসারা কি মুসলমানদের বন্ধু হতে পারে? (নাউজু বিল্লাহ্) কোরআন মাজীদেকে শয়তানের আয়াত হিসেবে উল্লেখকারী অভিশপ্ত ইহুদী নাসারারা কি মুসলমানদের বন্ধু হতে পারে? ফোরকানুল হকের শয়তানী আয়াতসমূহ বিশ্বাসকারী ইহুদী নাসারা এবং কোরআন মাজীদে আল্লাহ্‌র অবতীর্ণ আয়াতসমূহের প্রতি বিশ্বাসকারী মুসলমানদের উদ্দেশ্য কি এক হতে পারে? সূর্য আলোহীন হতে পারে, চাঁদ টুকরা টুকরা হতে পারে, আকাশ বিদীর্ণ হতে পারে, পৃথিবী ফাটতে পারে কিন্তু মুসলমান এবং কাফেরদের মাঝে বন্ধুত্ব হতে পারে না।

    উল্লেখ্য, ইহুদী নাসারাদের মুসলমানদের সাথে দুশমনির বিষয়টি প্রাকশিত এ কয়েকটি আয়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আরো বিস্তৃত।

  • ফোরকানুল হকের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা

    ফোরকানুল হকের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা

    মিশরীয় সংবাদপত্র ‘আল উসবু’ ইহুদী নাসারাদের গোপন দলিল সমূহের উদ্ধৃতিতে ফোরকানুল হক লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোচনা করেছে, আমি সংক্ষিপ্তাকারে সেই বিষয়ে আলোকপাত করছি—

    1. মুসলমানদেরকে এ বিশ্বাস করানো যে কোরআন মাজীদ আসমানী কিতাব নয় বরং মানব রচিত গ্রন্থ।
    2. পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিসমূহকে একথা বিশ্বাস করানো যে, কোরআন মাজীদ নীতিবাচক দৃষ্টিসম্পন্ন একটি গ্রন্থ যা মানব সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তার বিরোধী। আর ফোরকানুল হক ইতিবাচক দৃষ্টি সম্পন্ন একটি গ্রন্থ যেখানে মানবাধিকার, নারীর অধিকার গণতন্ত্রকে সুস্পষ্ট করা হয়েছে।
    3. পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিসমূহকে একথা বিশ্বাস করানো যে ফোরকানুল হক ভালবাসা, ভাতৃত্ব এবং নিরাপত্বার ধারক বাহক।
    4. পৃথিবীতে মুসলমানদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়াকে প্রতিরোধ করা।
    5. ইহুদী নাসারাদের সম্মিলিত সংস্কৃতিকে সমগ্র বিশ্বে বিজয়ী করা।

    এ হল ঐ সমস্ত নিকৃষ্ট উদ্দেশ্য যে উদ্দেশ্য ‘ফোরকানুল হক’ লিখা হয়েছে, এ সমস্ত উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য গোপন দলীলসমূহে দেয়া বিষয়গুলো নিম্নরূপ—

    1. প্রথমে ফোরকানুল হক ইউরোপ এবং ইসরাঈলে বণ্টন করা হবে এরপর আস্তে আস্তে অন্যান্য দেশসমূহে বণ্টন করা হবে।1
    2. জন্মসূত্রে মুসলমানদেরেকে বাধ্য করা হবে তারা যেন কোরআন মাজীদ পরিত্যাগ করে ফোরকানুল হককে দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করে, আর যারা তা গ্রহণ করতে না চাইবে তাদের উপর যুলম ও নির্যাতনের সমস্ত পন্থা অবলম্বন করা হবে।
    3. তিন চার বছর পর ইউরোপ, অ্যামেরিকা এবং ইসরাঈলের সেনারা মুসলিম দেশসমূহকে আবরোধ করবে যাতে করে মুসলিম দেশসমূহ ফোরকানুল হকের উপর আমল করতে বাধ্য হয়।
    4. আগামী বিশ বছরে পৃথিবীকে ইসলাম মুক্ত করা হবে, যাতে করে একজন মুসলমান ও এমন না থাকে যার চিন্তা চেতনায় ইসলাম থাকবে।28

    لَآ إِكۡرَاهَ فِي ٱلدِّينِۖ قَد تَّبَيَّنَ ٱلرُّشۡدُ مِنَ ٱلۡغَيِّۚ فَمَن يَكۡفُرۡ بِٱلطَّٰغُوتِ وَيُؤۡمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسۡتَمۡسَكَ بِٱلۡعُرۡوَةِ ٱلۡوُثۡقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَاۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ٢٥٦

    অর্থ— ‘আল্লাহ্ই হচ্ছেন মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যান, আর যারা অবিশ্বাস করেছে শয়তান তাদের পৃষ্ঠপোষক, সে তাদেরকে আলো হতে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।’ (সূরা আল-বাক্বারা-২৫৬)

  • পালামৌ

    পালামৌ

    ভ্রমণ-নেশার মায়ার খেলা যুগ যুগ ধরেই মানুষের ভেতরে বাস করে এসেছে। পালামৌ গল্পে লেখক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এমনই এক মায়ার বাঁধনে বাঁধা পড়ার অভিজ্ঞতা শুনিয়েছেন। যদিও এই ভ্রমণকাহিনী যতটা না কাহিনী, তার চেয়ে মানবিক উপাখ্যানের গল্প হিসেবেই ধরা দিবে পাঠকের হৃদয়ে।

    পালামৌ সর্বপ্রথম ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রমথনাথ বসু ছদ্মনামে প্রকাশিত হয়। মোট ছয় কিস্তিতে প্রকাশিত এই লেখা পরবর্তীতে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়।

    বইটি খানিকটা ভ্রমণকাহিনী, খানিকটা স্মৃতিচারণমূলক লেখা। সদ্য ঘটা ভ্রমণের না, অর্ধবিস্মৃত যৌবনের স্মৃতি বৃদ্ধবয়সের পরিণত চোখে আবার দেখে লেখা। এই বইয়ের সমালোচনা লেখার বড় সমস্যা হচ্ছে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন একবার। মোটামুটি বইটার মান সম্পর্কে ভালো ধারণা তার সমালোচনাতেই পাওয়া যাবে।

    ছোট একটি বই পাঠকের জানাশোনার কয়েকটা জানলা একসাথে খুলে দিলো। লেখার ধরণে তিনি বঙ্কিমের চেয়ে অনেক স্বচ্ছল, রসবোধ এবং কবিত্বেও কমতি নেই। বইটা থেকে বেশকিছু জায়গা হয়ত উদ্ধৃতি দেওয়া যেত তবে তার মেধা ও প্রজ্ঞা এবং তার সাথে লেখার স্বচ্ছলতা বোঝাতে নীচে একটু উদ্ধৃতি দিলাম। এখানে ‘পট’-কে আমরা দৃশ্যকল্প বলতে পারি—

    “কোন পটের বন্ধনী কী, তাহা নির্ণয় করা অতি কঠিন; যিনি তাহা করিতে পারেন, তিনিই কবি। তিনিই কেবল একটি কথা বলিয়া পটের সকল অংশ দেখাইতে পারেন, রূপ গন্ধ স্পর্শ সকল অনুভব করাইতে পারেন। অন্য সকলে অক্ষম, তাহারা শত কথা বলিয়াও পটের শতাংশ দেখাইতে পারে না।”

    বন-জঙ্গল, পাহাড়, পশু-পাখি অপরূপ প্রকৃতির এমন বর্ণনা সত্যি মনোমুগ্ধকর, একদম প্রকৃতির কাছে নিয়ে যায়। কোন কিছুই বিস্তারিত বলেন নি কিন্তু ভালোলাগাটুকু দিয়েই পাঠকমনকে আকর্ষণ করতে পেরেছেন লেখক সঞ্জীব চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

    কিছু কিছু জায়গার লেখকের প্রকৃতির বর্ণনা এবং সেটাকে জীবনের নানান কোণ থেকে মিলিয়ে দেখাতে পারা— রীতিমতো দুর্দান্ত! যেমন, এক জায়গায় রুক্ষ মৃত্তিকাশূন্য পাথরের ফাঁকে বেড়ে উঠা অশ্বত্থগাছ দেখে উনি লিখেছেন,—

    “তখন মনে হইয়াছিল, অশ্বত্থবৃক্ষ বড় রসিক, এই নীরস পাষাণ হইতেও রস গ্রহণ করিতেছে। কিছু কাল পরে আর একদিন এই অশ্বত্থগাছ আমার মনে পড়িয়াছিল, তখন ভাবিয়াছিলাম বৃক্ষটি বড় শোষক, ইহার নিকট নীরস পাষাণেরও নিস্তার নাই। এখন বোধহয় অশ্বত্থগাছটি আপন অবস্থানুরূপ কার্য্য করিতেছে; সকল বৃক্ষই যে বাঙ্গালার রসপূর্ণ কোমল ভূমিতে জন্মগ্রহণ করিয়া বিনা কষ্টে কাল যাপন করিবে, এমত সম্ভব নহে। যাহার ভাগ্যে কঠিন পাষাণ, পাষাণই তাহার অবলম্বন।”

    সাহিত্যরসিকদের মাঝে এই বইকে নিয়ে একধরনের মুগ্ধতার আঁচ টের পাওয়া যায়, বলা হয়ে থাকে, এটা বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল ভ্রমণ কাহিনী।