Category: অজিত গঙ্গোপাধ্যায়

  • থানা থেকে আসছি

    থানা থেকে আসছি

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায়

    থানা থেকে আসছি

    B. Priestleyর “An Inspector Calls” নাটক-অনুপ্রাণিত

    “থানা থেকে আসছি” স্বনামধন্য নাট্যকার Mr. J. B. Priestleyর “An Inspector Calls” নাটকের অনুসরণে রচিত। ঋণ স্বীকার করবার অনুমতি দিয়ে Mr. J. B. Priestley আমাকে কৃতজ্ঞতার ঋণে ঋণী করে রেখেছেন। মুখের কথায় ধন্যবাদ জানিয়ে সে ঋণ পরিশোধ করা যায় না। তাঁর কাছে আমি ঋণী হয়েই থাকলাম। বাংলা নাটক “থানা থেকে আসছি”র যা কিছু দোষত্রুটি তার দায়িত্ব আমার। এর গুণগত বৈশিষ্ঠ্যের জন্য প্রশংসা মূল নাট্যকার Mr. J. B. Priestleyর প্রাপ্য।

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায়

    উৎসর্গ

    শ্রী উৎপল দত্ত

    সুহৃদবরেষু

    ‘থানা থেকে আসছি’ প্ৰসঙ্গে

    এ নাটক মঞ্চস্থ করতে গিয়ে নাট্য-আন্দোলনের বয়ঃকনিষ্ঠ পরিচালকরা একাধিক সমস্যার সম্মুখীন হবেন। এদিকে লিটু থিয়েটার গ্রুপও এ নাটকের মহড়া দিয়েছেন এবং প্রয়োগপদ্ধতি সম্বন্ধে আমরা কিছু চিন্তা করেছি। ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনদের কিছুটা লাভ হতে পারে এই আশায় আমাদের বক্তব্য এখানে উপস্থিত করছি।

    এ নাটকে অন্ততঃ একটি জটিল তত্ত্ব কাহিনীর মধ্যে জড়িয়ে আছে। অলাতচক্রের মত সময়ের গতি; কোনো এক মুহূর্তে মশাল নিভিয়ে দিলেও সে অলাতচক্রের আভাস অন্ধকারের বুকে কিছুক্ষণ জেগেই থাকে। একটি সুখী পরিবারের চায়ের আসরেও এমনি দপ করে কৃত্রিম আনন্দের মশাল নিভিয়ে দেওয়া যাক। কি দেখতে পাব? তাদের জীবনের বৃত্ত আরো কয়েক পাক ঘুরে গেল, প্রায় অবাস্তব আলেয়ার আলোর মত। আর সেই অস্পষ্ট আলোয় যে মুখগুলি দেখতে পাচ্ছি, সেগুলি বড় ভীষণ। আবার মশাল জ্বলতেই সেই আনন্দোচ্ছল সুখী পরিবার। “Time moves in & spiral” বলেছেন জনৈক ইংরাজ মনীষী; তাই সেই ঘুরানো সিঁড়ির যে কোনো ধাপই নিন না কেন তার থেকে একটা লম্ব মাটিতে টানলে তার তলার অসংখ্য ধাপ এক লাইনে গাঁথা হয়ে যাবে। অতএব, একই ঘটনা বার বার ঘুরে আসে সময়ের বৃত্তাকার ঊর্ধ্বারোহণে, যদিও প্রতিবারই সে আরো উন্নত রূপ পরিগ্রহ করতে থাকে। তাই বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মাঝে যে দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর আমরা কল্পনা করে থাকি, বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। অতএব ধরা যাক কোনো অভাবনীয় উপায়ে (এ ক্ষেত্রে এক পুলিস অফিসারের মাধ্যমে) আগামী ঘটনার একটা ছায়াময় পুর্বাভিনয় বর্তমানেই ঘটে গেল; অবস্থাটা কি দাঁড়ায়?

    কিন্তু নাটক মঞ্চস্থ করতে গেলে তত্ত্বের অংশটি সচেষ্ট হয়ে বাদ না দিলেও অন্ততঃ অবহেলা করা উচিত। কারণ ও তত্ত্বটা গৌণ হয়ে গেছে; মুখ্য হয়ে উঠেছে কাহিনীর বিন্যাস এবং বিষয়বস্তু। শুধুমাত্র ঐ ধরনের সুক্ষ্ম তত্ত্ব বিচারে নিমজ্জিত থাকলে নাটক নাটকই হোত না।

    তবে ইনস্পেক্টর্ কে? পুর্ববর্ণিত লম্ব বেয়ে তিনি উপরের ধাপ থেকে সময়-বৃত্তের নীচের ধাপে নেমে আসতে পারেন, কিন্তু বাস্তব জীবনের কঠিন পরিবেশে তিনি কি অবলম্বন করে আসবেন? ভৌতিক অফিসার হলে আবার প্রশ্ন থাকে তিনি এত সত্য কথা জানলেন কি করে? প্ল্যানচেটে মর্ত্যে আহুত হয়ে তিনি যে সমাজের স্তম্ভস্বরূপ ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে রিসার্চ চালাবার সময় পাবেন তা তো মনে হয় না ৷ তবে তিনকড়ি হালদার কে?

    এমনও হতে পারে তিনকড়ি হালদার চন্দ্র মাধববাবুদের বিবেক। এবং এই সকল বড়লোকদের বিবেকের গায়ে যে পুলিসের উর্দি থাকবে এটা তো সহজেই অনুমেয়। ভয় তাঁরা করেন একমাত্র পুলিসকে, কোর্টকে, সংবাদপত্রকে। আদর্শের বা প্রতিবেশী মানুষের প্রতি মমত্ব বোধের পাট তাঁরা অনেক আগেই চুকিয়ে দিয়েছেন; না দিলে হয়তো তিনকড়িবাবু আবার ক্রসে ঝুলে তাঁদের চক্ষু উন্মীলিত করতে চেষ্টা করতেন। কিন্তু পিতঃ ইহাদিগকে ক্ষমা করিলে এঁরা আজকাল হেসে বলেন—যাক ধরতে পারে নি। তিনকড়িবাবু কৌপীন পরে নদীয়ার পথে চন্দ্রমাধববাবুর ড্রয়িং রুমে পৌঁছুলে কলসির কানাই পেতেন. প্রেম দেওয়া আর হয়ে উঠত না। কিন্তু এঁরা ঢিট হয়ে গেলেন ঐ চামড়ার বেল্ট, টুপী আর খাকী পোষাকের সামনে। বাস্তব জীবনে পুলিস হিসাবের খাতা দেখতে চাইলে কয়েকটি টাকা গুঁজে দিয়ে, এবং দাতব্য হাসপাতালে কিছু দান করে হাসিমুখে চায়ে চুমুক দেওয়া যায়; কল্পনার তিনকড়িবাবু ডিউটিতে সিগারেটও খান না। এ হেন কুলিস কঠিন পুলিস অফিসারকে অনেক ধনীই রাত্রে নিভৃত দুঃস্বপ্নে দেখেন, আঁতকে ওঠেন, এবং পরদিন অনিদ্রা রোগের ঔষধের চাহিদা বাড়ে—এটা বর্তমান যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাই সেই দুঃস্বপ্নই মূর্তিমান কায়াময় হয়ে থানা থেকে এসে হাজির হয়েছে— ট্যাক্‌স্‌ ফাঁকি থেকে সুরু করে নারীহত্যা পর্যন্ত সব তাঁর নখদর্পণে। নাট্যকার এইখানেই তাঁর মননশীলতার সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ দিয়েছেন। এদিক থেকে তিনকড়ি হালদার আমাদের যাত্রার বিবেকের নব্যতান্ত্রিক রূপ, উত্তরাধিকারী, এবং সে শুধু নাটকের মূল বক্তব্যকে তুলে ধরে না, সে অভিযুক্ত করে অপরাধীদের, সে যুগধর্ম্ম পালন করে।

    এটুকু স্পষ্ট হয়ে গেলে পরবর্তী কাজ অত্যন্ত সহজ। আমরা যতদূর ভেবেছি—তাতে মনে হয়েছে একটি হঠাৎ বড়লোকের উগ্র রুচির ছাপ থাকা উচিত ড্রয়িং-রুমের দেয়ালে, পিয়ানোয়, আসবাবে, রেডিওগ্রামে। প্রথমাংশে অভিনয়ও হওয়া উচিত সাবলীল, স্বাভাবিক। তার যে মুহূর্তে ভৃত্য ঘোষণা করে— “থানা থেকে ইন্‌পেক্টরবাবু এসেছেন।”—সে মুহূর্ত থেকে আলো যেন কেমন কমে আসে, চন্দ্রমাধববাবুদের হাঁটাচলা, কথা বলায় আসে কেমন একটা মাদকতা, একটা সম্মোহিতের ভাব। তিনকড়িবাবু ভাবেভঙ্গীতে হবেন পুরোদস্তুর পুলিস অফিসার, এবং বোধহয় তাঁর বসা উচিত দর্শকের দিকে পেছন ফিরে, নীচুধরনের কোনো আসনে আর তাঁর সামনে অর্ধ বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে থাকবে অভিযুক্তের দল।

    আবার আরো স্পর্ধিত পরীক্ষা চাল। বারও অনেক সুযোগ রয়েছে, যেহেতু পুরো জিনিষটাই কয়েক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখছেন বলা চলে। অতএব অত্যন্ত রংচঙে কিছু সার্কাস-মার্কা ক্লাউন যদি একটা বিষম রঙীন পর্দার সামনে লাফাঝাঁপি করতে থাকেন, তাহলেও চন্দ্রমাধববাবুদের চায়ের আসরের প্রকৃত রূপ ধরা পড়ে না কি? আবার তিনকড়িবাবু টেনে টেনে তাঁদের এনামেল করা চকচকে মুখোসগুলো খুলে দিলে বীভৎস কঙ্কালসার কতকগুলি অবয়ব বেরিয়ে পড়লেই বা কেমন হয়?

    এক কথায় পরিচালক অনেক কিছুই করতে পারেন এ নাটক নিয়ে। উপরের কথাগুলি তাঁদের কল্পনাশক্তিকে পুর্বনির্ধারিত কোনো পরিকল্পনার গণ্ডীর মধ্যে বেঁধে ফেলার জন্যে বলা হয়নি; তাঁদের কল্পনাকে আরো উদ্বুদ্ধ করার জন্যেই বলা হোলো । এমনও হতে পারে শক্তিমান যুবক পরিচালক উপরোক্ত মন্তব্য পড়ে হেসে উড়িয়ে দিয়ে নিজস্ব ধারায় নাটকটিকে ঢালবেন। সেটাই আমাদের কাম্য। তবে প্রগতিশীল সংগঠনের কাছে আমাদের একটি আবেদন : তিনকড়ি হালদারের শেষ ক’টি লাইন অনুধাবন করুন। শ্রী অজিত গঙ্গোপাধ্যায় বহুবার প্রমাণ করেছেন যে তিনি প্রগতিশীল নাট্য-আন্দোলনের একজন শক্তিমান লেখক ৷ এ নাটকেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। যে ইংরাজি নাটক দ্বারা এ নাটক অনুপ্রাণিত, সে নাটকের প্রথম অভিনয় ইংলণ্ডে হয়নি, হয়েছিল প্রগতির যাঁরা শিখরে উঠেছেন—সেই সোবিয়েৎ ইউনিয়নে।

    — উৎপল দত্ত।

    বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে বিভিন্ন পেশাদারী নাট্যসংস্থা এই নাটকটি মঞ্চে সফল উপস্থাপনা করেছে যেমন: চতুর্মুখ, মাস থিয়েটার্স ইত্যাদি।

    এই নাটকটি দুইবার চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে।

    ‘থানা থেকে আসছি’-র প্রথমবার চলচ্চিত্র হয় ১৯৬৫ সালে।

    সুর সংযোজনা— তিমিরবরণ, পরিচালনা— হীরেন নাগ, পরিবেশনা— চণ্ডীমাতা ফিল্মস প্রাঃ লিঃ। রূপায়ণে— উত্তম কুমার, ছায়াদেবী, কমল মিত্র, দিলীপ মুখার্জী, জহর রায়, অঞ্জনা ভৌমিক ও মাধবী মুখার্জী।

    ‘থানা থেকে আসছি’-র দ্বিতীয়বার চলচ্চিত্র হয় ২০১০ সালে।

    পরিচালনা— সারণ দত্ত, পরিবেশনা— মরফিউস মিডিয়া ডেনচার।

    রূপায়ণে— সব্যসাচী, পাওলি, পরমব্রত, রুদ্রনীল, দুলাল ইত্যাদি।

    ‘থানা থেকে আসছি’-র মঞ্চে পেশাদার প্রযোজনা ১৯৭৮ সালে অগাস্ট মাসে। আলো— তাপস সেন, পরিচালনা– শ্যামল সেন, অভিনয়ে– অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃপ্তি মিত্র, এন বিশ্বনাথন, দেবরাজ রায় ইত্যাদি।

    ‘থানা থেকে আসছি’-র মঞ্চে স্বপ্ন সন্ধানীর প্রযোজনা ২০১৩ সালের মে মাসে। পরিচালনা— কৌশিক সেন। অভিনয়ে— কাঞ্চন মল্লিক, কৌশিক সেন, রেশমি সেন ইত্যাদি।

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা নাট্যজগতের এক স্বনামধন্য পুরুষ। জন্ম— কলিকাতায়, ২৮শে জুন, ১৯২১ । শিক্ষা— কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়– অর্থনীতির ও গণিতের ছাত্র। গভীর জীবনবোধ, কাব্যময় সংলাপ, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, বাস্তব মনস্তত্ত্বের চুলচেলা বিচার এঁর প্রত্যেক নাটকের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য মৌলিক নাটক— নচিকেতা, মৃত্যু, পোষ্টমাস্টারের বৌ, সূর্যের মত সমুদ্র, এই সব স্বগোতক্তি ইত্যাদি। বিদেশী নাটক এবং উপন্যাস অনুসরণে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান— শকুন্তলা রায় (হেড্ডা গাবলার) নির্বোধ (ইডিয়ট), আকাশ বিহঙ্গী, (সীগার্ল) মালবাজারের মা মালতী (ডি হাইলিশে ইয়োহান্না ডের সলাখট হফে), থানা থেকে আসছি (এ্যান ইন্সপেক্টর কলস) প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথের ‘যে’ ও ‘ঘরে বাইরে’ এবং বঙ্কিমচন্দ্রের ‘মুচিরাম গুড়’-এর নাট্যরূপ তাঁর বিস্ময়কর কৃতিত্ব। এই নাট্যকার কৃত শেক্সপীয়রের হ্যামলেট ও রিচার্ড দি থার্ড’-এর বঙ্গানুবাদ বিশেষ সুপ্রসিদ্ধি পেয়েছে। অজিতবাবুর নাটক সম্বন্ধে বহু বিদ্বজন বিভিন্ন সময়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এঁর হ্যামলেটের বঙ্গানুবাদকে আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘পাস্তেরনাকের’ রুশ ভাষায় অনুবাদের সঙ্গে সমতুলনা করেছেন। সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশী বলেছেন— ‘ইব সেনের হেড্ডাগাবলার অজিতের হাতে হয়ে উঠেছে সার্থক রক্ত মাংসের শকুন্তলা রায়। নাট্যবিদ উৎপল দত্ত বলেছেন— ‘নাটকে সাহিত্য রস সঞ্চরিত করার কাজে অজিত ছিলেন বর্তমান নাট্যজগতে অনন্য। প্রতিটি বাক্যের ব্যাকরণগত সঠিকতার সঙ্গে যোজিত হত ধ্বনিগত মাধুর্য। যেমন— নচিকেতা নাটক, গ্রীক নাট্যশৈলীকে, খাঁটি দেশজ ভাবের বাহন করেছে নচিকেতা।” বহুরূপী থেকে রূপকার, এলটিজি থেকে নান্দীকার, চতুর্মুখ থেকে চতুরঙ্গ— প্রমুখ নাট্যসংস্থা এঁর বিবিধ নাটক মঞ্চে সফল উপস্থাপনা করেছে। অজিতবাবুর অকাল প্রয়াণ (৫ জুলাই, ১৯৮৪)। বাংলা নাট্যজগত এক দেদীপ্যমান জ্যোতিষ্ককে হারাল।

    চরিত্রলিপি

    চন্দ্রমাধব সেন বিখ্যাত ধনী, কয়েকটি বাণিজ্য-প্রতিষ্ঠানের অংশীদার ও ডিরেক্টর
    রমা সেন চন্দ্রমাধব সেনের স্ত্রী
    শীলা সেন ঐ কন্যা
    তাপস সেন ঐ পুত্র
    গোবিন্দ ঐ ভৃত্য
    অমিয় বোস চন্দ্রমাধব সেনের বন্ধুপুত্র
    তিনকড়ি হালদার পদ্মপুকুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর
    স্থান পদ্মপুকুরে চন্দ্রমাধব সেনের ড্রয়িং-রুম
    কাল ১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহের এক সন্ধ্যা
  • প্রথম অঙ্ক

    প্রথম অঙ্ক

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায়

    [book]

    প্রথম অঙ্ক

    [চন্দ্রমাধব সেনের বাড়ি। সুসজ্জিত ড্রয়িং-রুম। পর্দা উঠিলে দেখা গেল সোফা, কাউচ ইত্যাদিতে বসিয়া চন্দ্রমাধব সেন, শ্রীমতী রমা, শীলা, তাপস ও অমিয় গল্প করিতেছেন। সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। ঘড়িতে সাতটা বাজে]

    চন্দ্রমাধব॥ আচ্ছা শীলা বল তো, আজকের টি-পার্টির সবচেয়ে remarkable ব্যাপারটা কি?

    শীলা॥ কি বাবা?

    চন্দ্রমাধব॥ বাঃ —আজকের কাটলেট থেকে আরম্ভ করে পুড়িং পর্যন্ত সবই তো তোর মার হাতের তৈরি। করিমের তো আজ সারাদিন ছুটি।

    অমিয়॥ তাই নাকি! তাই প্রত্যেকটা আইটেম অত চমৎকার হয়েছিল—

    রমা॥ (মৃদু তিরস্কারের ভঙ্গিতে) আচ্ছা, তুমি কি বল তো? শীলা-তাপসের সামনে না হয় যা ইচ্ছে তাই বললে— কিন্তু তাই বলে— (মৃদু হাসিয়া অমিয়র দিকে ইঙ্গিত করিলেন)

    চন্দ্রমাধব॥ ও অমিয়? তা অমিয়র সামনে লজ্জা কিসের? ও তো ঘরের ছেলে!

    অমিয়॥ না কাকীমা, এ আপনার ভারী অন্যায়। আপনি এখনও আমাকে পর বলে মনে করেন?

    তাপস॥ সত্যি মা, এ তোমার ভারী অন্যায়! শেখরকাকার টেলিগ্রাম, চিঠি, দুই-ই এসে গেছে—

    শীলা॥ বাঃ শুধুই তাই? আজ বিলিতি মতে এনগেজমেন্ট হয়ে গেল—সাতদিন বাদে দিশী মতে পাকা-দেখা—

    তাপস॥ শুধু পাখা-দেখা? এক মাস বাদে বিয়ে—

    অমিয়॥ না না তাপস,—বাবার চিঠি, টেলিগ্রাম, বিয়ের দিন ঠিক হওয়া, এসব না হয় আজকালের ব্যাপার। আগের কথাটা ধর। কাকাবাবু বাবার ছোটবেলার বন্ধু, ছোটবেলা থেকে আমার এখানে আসা-যাওয়া। মাঝে যে ক’বছর বিলেতে ছিলাম, সেই ক’বছরই যা আসতে পারিনি। নইলে দেখ, ফিফটি ওয়ানের ডিসেম্বরে ফিরেছি—আজ তিন বছর হতে চলল—নিয়মমতো এ বাড়িতে আমার আসা যাওয়া—

    শীলা॥ উঁহু—অঙ্কে ভুল হয়ে গেল! ফিফ্‌টি-থ্রির মে-জুন-জুলাই, এ বাড়িতে তোমার টিকিটি দেখতে পাওয়া যায়নি—

    অমিয়॥ বাঃ রে, আমি তোমাকে বলিনি—ফ্যাক্‌ট্রিতে ভীষণ কাজ পড়েছিল—

    শীলা॥ না না—বলনি—সে কথা কি আমি একবারও বলেছি? দেখলাম হিসেবে ভুল করছ—তাই মনে করিয়ে দিলাম।

    রমা॥ এ তোর ভারী অন্যায়, শেলী! বেচারীকে ভাল-মানুষ পেয়ে শুধু শুধু জ্বালাতন করা! কাজের চাপে দু-তিন মাস যদি না-ই আসতে পারে! পুরুষ-মানুষের কাজের তুই বুঝিসটা কি? ওদের কত কাজ—

    চন্দ্রমাধব॥ নিশ্চয়। শেখর তো আজ দু-বছর হলো সব ওরই ওপর ছেড়ে দিয়েছে।

    রমা॥ তবে? (শীলা বলিতে আরম্ভ করিয়াছিল — ‘কিন্তা মা’— তাহাকে বাধা দিয়া) আচ্ছা, তুই কি ভাবিস বল তো শীলা? বিয়ের পর দিনরাত ও তোর আঁচল ধরে ঘরে থাকবে? ও একজন বিজনেসম্যান! সময় সময় দেখবি কাজের চাপে, বাড়িঘর কোন কথাই ওর মনে নেই! না না, তুই ধারণা বদলাতে চেষ্টা কর শেলী—

    শীলা॥ চেষ্টা করে দেখেছি মা—পারিনি! আর কোন দিন যে পারব তাও মনে হয় না! অতএব অমিয়বাবু, তুমি এখন থেকে সাবধান! (তাহার এই শেষের কথাগুলি শুনিয়া, দুই রকমই মনে হইতে পারে। মনে হতেই পারে, হয়তো সে অমিয়র সহিত রসিকতা করিতেছে—হয়তো সত্য সত্যই তাহাকে সাবধান হইতে বলিতেছে।)

    অমিয়॥ না না, তুমি দেখে নিও শীলা—ঐ একবারই যা হয়ে গেছে— (কোথাও কিছু নাই অমিয়র কথা শুনিয়া তাপস হঠাৎ জোরে হাসিয়া উঠিল। মিঃ ও মিসেস সেন বিস্মিত হইয়া তাহার দিকে তাকাইলেন।)

    শীলা॥ উঃ হেসে লুটিয়ে পড়লেন একেবারে! কেন, কিসের এত হাসি শুনি?

    তাপস॥ (তখন অল্প হাসিতে হাসিতে) তা তো জানি না— হঠাৎ কি রকম হাসি পেয়ে গেল—

    শীলা॥ (ক্রুদ্ধ স্বরে) তা তো পাবেই! হাসি পাবার মত কথা বললাম আমরা— আর উনি হেসে আমাদের তুড়িতে ফুঁ করে দিলেন!

    তাপস॥ না, কক্ষনো না—আমি কোন কিছু ভেবে হাসিনি—

    রমা॥ আঃ— আবার দু’জনে ঝগড়া আরম্ভ করলি? আর শীলা, তোকেও বলি। কি সব কথাবার্তা বলছিস আজকাল? তুড়িতে ফুঁ করে দিলেন!—কোত্থেকে শিখেছিস এসব?

    তাপস॥ তুমি বোধহয় ওর কথাবার্তা বিশেষ কান করে শোনো না মা—আজকাল ও ওই রকম কথাই তো বলে—

    শীলা॥ দেখ মা—আমি কারুর মান-টান রেখে কথা বলতে পারব না বলে দিচ্ছি! ছোড়দাকে ও রকম গাধার মত কথা বলতে বারণ করে দাও—

    তাপস॥ দেখ শীলা —

    রমা॥ (বাধা দিয়া) আঃ তোরা থামবি কিনা! দু’জনে দেখা হবার জো নেই একেবারে! দেখা হলেই ঝগড়া! (শীলাকে) আর ঝগড়া তো খুব করছিস? আজকের দিনে বাবাকে একটা প্রণাম করতে হয়, সে কথাটা মনে আছে কি?

    শীলা॥ ঐ যাঃ — একেবারে ভুলে গেছি! (উঠিয়া মিঃ ও মিসেস সেনকে প্রণাম করিল—সেই সঙ্গে সঙ্গে অমিয়ও প্রণাম করিবার সময় মিঃ সেনকে ‘থাক বাবা থাক, হয়েছে’—বলিতে শোনা গেল।)

    চন্দ্রমাধব॥ (রমাকে) বুঝলে, ওরা ভাবছে, আজ ওদেরই দিন। তোমার আমার কথাটা তো জানে না! শীলার সঙ্গে অমিয়র বিয়ে—এ আমাদের কতদিনের ইচ্ছে! অমিয় যখন বিলেতে, তখন থেকে কথাবার্তা চলছে। এ বছর হবে সমস্ত ঠিক! এমন সময় শেখর বৌকে নিয়ে চলে গেল বম্বে। ভাবলাম এ বছরও হলো না। তারপর হঠাৎ কাল শেখরের টেলিগ্রাম—সামনের শনিবার পাকা-দেখা, সব ব্যবস্থা কর, আমি যাচ্ছি।

    রমা॥ ওঃ—কাল যদি টেলিগ্রাম পাবার পর আমাদের অবস্থা দেখতে। কি যে করব, কাকে যে বলব, যেন কিছু ভেবে পাচ্ছিলাম না! আমি তো বলেছিলাম, আমাদের সার্কেলের সবাইকে আজকের পার্টিতে বলা হোক—

    চন্দ্রমাধব॥ সেটা আমিই বারণ করেছিলাম অমিয়! আচ্ছা তুমিই বল, আজকের এই যে ঘরোয়া ব্যাপার—এটাই বেশ চমৎকার হলো না?

    অমিয়॥ না না কাকীমা, এটা খুব ভাল হয়েছে। শনিবার একটা পাবলিক কিছু করলেই হবে।

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ, তারপর কি যেন বলছিলাম—? ও, শেখর আর আমি— আজই আমরা ফ্রেণ্ডলি রাইভ্যালস—কিন্তু একমাস বাদে? তখন আমরা আত্মীয়। সত্যি, আজ আমি স্বপ্ন দেখি—অমিয়, শেখর আর আমি এক হয়ে গেছি। অবিশ্যি শেখরের কনসার্ন আমার চেয়ে অনেক বড়, অনেক পুরোনো—তা হোক, তবু আমার মনে হয় দুইএ মিলে এক হবেই! বিরাট বিজনেস ট্রাস্ট গড়ে উঠবে—নাম হবে ধর, চন্দ্রশেখর নগর, কি শেখর-মাধব নগর—ট্রেডমার্ক হবে এনভিল আর হ্যামার। (উত্তেজিত হইয়া) তখন আর আমরা রাইভ্যালস নয় অমিয়, তখন আমরা এক হয়ে কাজ করছি, for lower costs and higher prices!

    অমিয়॥ And for more profits! আমার মনে হয় বাবাও এতে রাজী হলেন কাকাবাবু।

    রমা॥ আচ্ছা, তুমি যেন কি! আজকের দিনে আর কথা পেল না? সেই বিজনেস, বিজনেস আর বিজনেস।

    শীলা॥ সত্যি বাবা— কোথায় সানাই বাজবে, না তোমরা দু’জনে খেরো খাতা নিয়ে বসলে!

    চন্দ্রমাধব॥ না না, ও আমি এমনি কথায় কথায় বলছিলাম। কিন্তু যাই বল রমা— শীলা, অমিয়, এরা সত্যিই ফরচুনেট—

    অমিয়॥ (শীলার দিকে চাহিয়া মৃদু হাসিয়া) অন্তত আমি যে ফরচুনেট এ বিষয়ে তো কোন সন্দেহ নেই!

    রমা॥ (অল্প তর্জনের সুরে) কিন্তু শীলা—

    শীলা॥ কি হলো মা? আবার কি করলাম!

    রমা॥ বাঃ—কি করলাম মানে? (তাপসের দিকে ইঙ্গিত করিলেন)

    শীলা॥ (ইঙ্গিত বুঝিতে পারিয়া) ঐ দেখ এক্কেবারে ভুলে গিয়েছিলাম! (তাপসকে প্রণাম করিয়া) আজকের দিনে তুই আমায় মাফ কর ছোড়দা—

    তাপস॥ (শীলার হাত ধরিয়া উঠাইয়া) দূর পাগলি! মাফ কিসের? তুই কি কোন দোষ করেছিস যে মাফ করব? বুঝলে অমিয়— শীলা একটু বদ-মেজাজি বটে, কিন্তু এরকম মেয়ে হয় না—

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁগো, শীলার এ আংটিটা নতুন গড়ালে বুঝি? বেশ চমৎকার হয়েছে তো!

    রমা॥ আমি গড়াব কেন? ওটা যে অমিয় আজ শেলীকে প্রেজেন্ট করেছে—

    চন্দ্রমাধব॥ বাঃ বেশ হয়েছে! শেলী— মাই গার্ল! সত্যি এ একটা বিয়ের মতো বিয়ে হচ্ছে, কি বল, আমার মেয়ে শেখরের ছেলে! পরে তুমি আমার কথা মিলিয়ে নিও—এ বিয়েতে ওরা দু’জনেই খুব খুশি হবে। হ্যাঁ, কিন্তু একটা কথা (শীলাকে তখনও আঙুলের আংটির দিকে তাকাইয়া থাকিতে দেখিয়া) ওরে শোন শোন, কথাগুলো শুনে রাখা তোরও দরকার— আজ বাদে কাল একটা ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টের বউ হতে চলেছিস—

    শীলা॥ না না, তুমি বল বাবা—আমি শুনছি—

    চন্দ্রমাধব॥ না—মানে ঐ যে বলছিলাম না—সত্যিই তোরা খুব সুখী হবি! আর কেন হবি না বল? সত্যিই খুব ভাল সময়ে তোদের বিয়ে হচ্ছে। তুমি বল না অমিয়, সময়টা কি এমন খারাপ! বাইরের অবিশ্যি দু-চারজন লোকের মুখে সব সময়েই শুনতে পাবে— বাজার মন্দা, সময়টা বড্ড খারাপ! কিন্তু আমিও তো একজন দুঁদে বিজনেসম্যান? আমি তোমায় বলছি অমিয়, ওসব কথার কোন মানেই হয় না! যারা কোন কালে কিছু করতে পারে না তারাই ঐ সব কথা বলে! আরে—এখন তো সময় ভাল যাচ্ছেই, এরপর আরো ভাল সময় আসছে। বাইরে অবিশ্যি ঐরকম দু-চারজনের মুখে শুনতে পাবে— কোথায় সময় ভাল? আজ অমুক মিলে স্ট্রাইক, কাল তমুক ফ্যাক্টরিতে কাজ বন্ধ। ঐ যে—ওমাসে জেনারেল স্ট্রাইক না কি একটা হলো না—আরে সে কি হৈ-চৈ। এইবার লেবার-ট্রাবল আরম্ভ হলো—আর রক্ষে নেই—হেন-তেন সাত-সতের সে সব আরো কত কি! আরে, যতই যাই হোক — ফরটি-সিক্সের মত তো আর হবে না! কিন্তু কই, কিছু হলো কি? রায়ট বাধার সঙ্গে সঙ্গে কোথায় ভেসে গেল ইনকিলাব-জিন্দাবাদের দল! তারপর আমরা এমপ্লয়াররাও তো কিছু চুপ করে বসে নেই! আমরাও দেখছি যাতে ক্যাপিটালের ইন্টারেস্ট প্রপারলি প্রটেক্টেড হয়। আমি তোমায় বলছি অমিয়, আমাদের এখন ধনস্থানে বৃহস্পতি— ফল সম্ভোগ, অর্থ-বৃদ্ধি—বুঝলে—

    অমিয়॥ আমারও তাই মনে হয় কাকবাবু—

    তাপস॥ আর পাঁচজনে কিন্তু অন্য কথা বলছে বাবা। তারা বলছে বিপ্লব, শ্রেণী-সংগ্রাম, ইনকিলাব জিন্দাবাদ—আরো সব কত কি!

    চন্দ্রমাধব॥ থামো থামো! বিপ্লব, শ্রেণী সংগ্রাম! সব অত সস্তা কিনা। মাঠে ময়দানে, দু-চারটে মিটিঙে লাল ঝাণ্ডা নিয়ে ইনকিলাব ইন-কিলাব করলে যদি বিপ্লব আসত, তাহলে আর ভাবনা থাকত না। আগে দেখ লোক কি চায়? এদেশের লোকের প্যাসিভ নেচার! তারা ওসব ঝঞ্ঝাটের মধ্যে যাবে কেন? ওসব হাঙ্গামায় তাদের লাভটা কি? আর বুদ্ধিমান লোক তো মোটেই ওসবের মধ্যে যাবে না। তারা এ বাজারে বেশ দু-পয়সা করে খাচ্ছে! তোমার আমার মতো নরম্যাল লোকের ওসব ঝঞ্ঝাট করে লাভ তো কিছুই হবে না—বরং লোকসান! এক লাভ হতে পারে কাদের—যারা অ্যাবনরম্যাল অকর্মা, বোকা, তাদের। কিন্তু তাদের সে শক্তি কই?—সে ক্ষমতা কোথায়?

    তাপস॥ সব বুঝলাম— কিন্তু তবু—

    চন্দ্রমাধব॥ আবার তবু কিসের শুনি, তবু কিসের? তোদের ধরনই এই! জানিস তো কত—কিন্তু তবু দেখ সব কথায় একটা করে তবু-কেন-কিন্তুর ফোড়ন আছেই। ওরে বাবা, আমিও তো একটা দুঁদে বিজনেসম্যান, আমার কথারও তো একটা দাম আছে। দুনিয়াটার দিকে তাকিয়ে দেখ— দেখ how fast it is developing। যারা একটু বুদ্ধিমান, একটু চিন্তা করে, তাদের এখন ওসব কথা ভাববার সময় কই? এটা কি উনিশ শো আঠারো সাল—না রাশিয়া! জীবনের কমফর্টস লাক্সারি কত বেড়ে গেছে এখন! এই চোখের ওপর দুর্গা মিত্তিরকেই দেখছি! ছিল একটা পেটি বিজনেসম্যান! যুদ্ধের বাজারে দুটো পদে ব্যবসা আরম্ভ করলে, দেশী পদে চাল আর পুরনো লোহা, আর বিলিতি পদে বীফ! দু’দিনে একেবারে আঙুল ফুলে কলাগাছ। যা একটু বাকি ছিল, ব্যাঙ্কট্যাকে ফেল করিয়ে তাও পুষিয়ে নিলে। প্রথম প্রথম সবাই নাক সেঁটকাতে। আজ? আজ সে আমাদেরই একজন। কে বলবে সে একদিন বীফের ব্যবসা করত! গোহত্যা নিরোধের আজ সে একজন বড় পাণ্ডা! এই তো পরশু প্রসেশনের সঙ্গে মোটরে করে গেল, আবার মোটর থেকে নেমে গিয়ে পুলিশের লাঠি খেলে। আগে একখানা ভাঙা ফোর্ড ছিল — এখন দেখ চারখানা নতুন মডেলের গাড়ি। আগে কোন রকমে সেকেণ্ড ক্লাসে ট্রাভেল করত, এখন প্লেন ছাড়া কথা বলে না। এই তো কালই বলছিল— ছাতে প্লেন নামাতে পারলে ভারী সুবিধে হয়! আরে এখন কি দেখছিস? আবার তোদের ছেলেমেয়ের বিয়েতে যখন পার্টি দিবি, তখন দেখবি—লোকে দিব্যি আরামে রয়েছে, চারধারে র‍্যাপিড প্রগ্রেস, মালিকেরা সব এক জোট, লেবার ট্রাবলের কোন চিহ্নই নেই! দেখবি প্রত্যেকটা দেশ তখন আমেরিকার সঙ্গে সমান তালে পা ফেলে এগিয়ে চলেছে—অবিশ্যি রাশিয়া চীন-ফিন বাদে! ওসব জায়গায় আজও ব্যক্তিস্বাধীনতা নেই, সেদিনও থাকবে না—কাজেই নো প্রগ্রেস।

    রমা॥ (বিরক্ত হইয়া) আচ্ছা, তোমার আজ কি হয়েছে বল তো? আবার আজকের দিনে ঐ সব বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করলে—

    চন্দ্রমাধব॥ না, মানে—

    রমা॥ না, কোন মানে নয়, চুপ একেবারে।

    চন্দ্রমাধব॥ আচ্ছা আচ্ছা, এই চুপ করলাম—হয়েছে তো! কিন্তু না বলেই বা কি করি বল? বাইরে তো ঘুরতে হয় না, ঘুরলে দেখতে পেতে! যত ব্যাটা হতভাগা, অকর্মার দল! কেউ নাটক লেখেন, কেউ লেখেন গল্প-কবিতা, কেউবা খুচরো পলিটিক্স করেন! আর সব কথা বলছে কি! শুনলে মনে হবে দেশের নাড়ীনক্ষত্র সব কিছু জেনে বসে আছে একেবারে! আরে—দেশের বুঝিসটা কি? জীবনের দেখলি কি? ক্যাপিটাল আমাদের, বিজনেস আমাদের! যেটুকু বোঝবার, সেটুকু তো আমরাই বুঝি! তুমি কথা বলার কথা বলছ? এতদিন তো চুপ করেই ছিলাম। আজ ওরা আবোল-তাবোল বকছে বলেই না আমরা একটু-আধটু বলছি! অন্তত এটা তো ঠিক কথা— আমরা যেটুকু বলব, তা সলিড এক্সপিরিয়েন্স থেকেই বলব— ওদের মতো আবোল-তাবোল নয়!

    (গোবিন্দর প্রবেশ)

    গোবিন্দ॥ মা, স্যাকরা এসেছে, তাকে কি এখানে নিয়ে আসব?

    রমা॥ না, ভেতরের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসা, আমি যাচ্ছি। শীলা, প্যাটার্ন আর ডিজাইনটা পছন্দ করে দিবি চল—অমিয়, চলে যেও না যেন বাবা, এখুনি আসছি—(অমিয় ‘না না আমি আছি কাকীমা’ বলিলে, মিসেস সেন ও শীলা উঠিয়া দরজার দিকে অগ্রসর হইলেন! বাহিরে যাইতে যাইতে তাপসকে) তুই একটু আয় তো তাপস, দরকার আছে! (তাঁহাদের পশ্চাতে তাপসের প্রস্থান।)

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ, একটা কথা অমিয়, অবিশ্যি তোমার আমার মধ্যে! আমি যতদূর জানি, তোমার মার বোধহয় বিশেষ মত ছিল না এ বিয়েতে—তাঁর বোধহয় ইচ্ছে ছিল স্যার এ এনের নাতনীর সঙ্গে তোমার বিয়ে হয়—তাই না? (অমিয়কে ‘না মানে না মানে’ বলিতে দেখিয়া) না না, আমি বলছি না তাঁর অন্যায়। শেখর আমার বন্ধু হতে পারে—কিন্তু ঘর হিসেবে তোমরা আমার চেয়ে অনেক বড়। বিশেষ করে তোমার মা তো স্যার বীরেন মিত্তিরের মেয়ে। তবে আমারও পোজিশন খুব একটা নিচু এখন নয়! বার দুয়েক বিলেতেও ঘুরে এসেছি— আর অনার্স-লিস্ট এখন নেই তাই—থাকলে স্যার না হলেও একটা রায় বাহাদুর অন্তত হতাম। তবে একটা ভরসা আভাসে তোমার মাকে দিতে পার… এবার বোধহয় অ্যাসেম্বলিতে যাচ্ছি—

    অমিয়॥ তাই নাকি?

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ, রিসেন্টলি ভুপেন মিত্তিরের সিটটা খালি হয়েছে না? ঐ সিটে—

    অমিয়॥ বাঃ— ফিরে এলেই মাকে আমি খবরটা দেব—

    চন্দ্রমাধব॥ না না, এখনও সেন্ট পারসেন্ট সারটেন নয়—তবে তুমি তোমার মাকে বলতে পার। নমিনেশনটাও জাঁদরেল ব্লকের, আর এলাকাটাও ভাল। বেশির ভাগ ভোটারই ব্যবসাদার—খালি গোটা দুয়েক বস্তি আছে। কিছু যদি ভাঙতে পারি, আর মনে হয় পারব— তাহলে আর দেখতে হবে না—ইলেকশন সারটেন!

    অমিয়॥ তাহলে মাকে খবরটা পরিষ্কার জানিয়েই দিই, কি বলেন?

    চন্দ্রমাধব॥ না না, বলা কি যায়। ধর শেষ পর্যন্ত একটা স্ক্যান্ডালই হয়ে গেল—কোর্ট ঘর করতে হলো—

    অমিয়॥ শুধু শুধু স্ক্যাণ্ডলই বা হতে যাবে কেন?

    চন্দ্রমাধব॥ তা কি বলা যায়? চারদিকে কত পুয়োর রিলেশন্স। কখন যে কি কুকর্ম করে বসে তার ঠিক কি? তুমি বরং তোমার মাকে একটা হিন্ট দিয়ে রেখ—(তাপসকে প্রবেশ করতে দেখিয়া) কিরে, তোকে যে তোর মা দরকার বলে ডেকে নিয়ে গেল?

    তাপস॥ দরকার না ছাই! স্যাকরা ডিজাইন-বুক দিয়ে চলে গেল, আর ওঁরা শাড়ি জর্জেটের কথা আরম্ভ করলেন। আমায় যে দরকার বলে ডেকে এনেছে, সে হুঁশই নেই কারুর! আমি একটা মজা দেখেছি বাবা, মেয়েরা কাপড় আর গয়নার কথা যখন আরম্ভ করে তখন বিশ্বসংসার ভুলে যায়!

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু কাপড় আর গয়নাটা তোদের কাছে তুচ্ছ বলে মনে হতে পারে— তবে ওদের কাছে নয়। তুই কি ভাবিস, মেয়েরা তাদের সুন্দর দেখাবে বলেই ওসব নিয়ে এত মাথা ঘামায়? কাপড় আর গয়না ওদের সেলফ-রেসপেক্টের একটা চিহ্ন— তা জানিস!

    অমিয়॥ ঠিক বলেছেন আপনি —

    তাপস॥ (ব্যস্তভাবে) হ্যাঁ হ্যাঁ আমারও মনে পড়েছে, (একটু থামিয়া) না মানে—

    চন্দ্রমাধব॥ (বাধা দিয়া) না মানে? না মানে কি? তোর কি মনে পড়েছে?

    তাপস॥ (অপ্রতিভ হইয়া) না, মানে—ও কিছু নয়—এমনি বলছিলাম—

    অমিয়॥ (ঠাট্টা করিয়া) উঁহু তাপস, ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক বলে মনে হচ্ছে—

    চন্দ্রমাধব॥ তা যা বলেছ—কিছু বিশ্বাস নেই এদের! হাতে অবসরও প্রচুর, টাকাও প্রচুর। কাজেই কখন যে কি করতে পারে, আর কি করতে পারে না— তা জোর করে কিছু বলা যায় না। অথচ আমাদের ছেলেবেলার কথা মনে আছে—বাড়িতে এক মিনিট বসে থাকতে সময় পেতাম না। কিছু না থাকলে ঘরে কাজ করতে হতো। আর টাকা-পয়সা? মনে আছে যখন প্রেসিডেন্সিতে পড়তে যেতাম তখন বাসভাড়া আর জলখাবার মিলিয়ে দশটা করে পয়সা পেতাম। কিন্তু কেমন চলে যেত আমাদের—আবার ওরই মধ্যে একটু-আধটু আমোদ-আহ্লাদও করেছি—

    অমিয়॥ তা তো করতেই হবে একটু আমোদ-আহ্লাদ, না করলে চলবে কেন?

    চন্দ্রমাধব॥ সেই কথাই তো বলছি! তাপস ভাবছে, আমি আবার হয়তো বক্তৃতা শুরু করব। কিন্তু বক্তৃতা কোথায়—এটা একটা দরকারী কথা। কথাটা তোমাদের কারুই মনে থাকে না—বোঝও না বোধহয় তোমরা। আজকে তোমরা যা পাচ্ছ—এ তো তৈরি জিনিস। আমরা তা পাইনি—আমাদের তৈরি করে নিতে হয়েছে। তোমাদের এগিয়ে যাওয়া কত সহজ—কিন্তু পারছ কই তোমরা আমাদের মতো এগুতে? কেন পারছ না জান? ঐ দরকারী কথাটা কেউ বোঝ না বলে। জানবে আজকের দিনে বড় হতে গেলে দুনিয়ায় নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দেখার নেই। জেনে রেখ— first you yoruself, second you yourself, and last you yoruself! তবে ফ্যামিলি থাকলে ফ্যামিলির কথাটাও কনসিডার করতে হবে। এই সেলফের নীতি-কথাটি যদি মনে থাকে, তবেই দেখবে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছ। আর নইলে বাইরের ঐ সব মাথা খারাপ হতচ্ছাড়াদের কথায় কান দিয়েছ কি মনে হবে—উঁহু, সেলফ তো ঠিক কথা নয়, সমাজের সকলের সুখ-দুঃখ দেখতে হবে। আর যত সব ননসেন্স কথা মনে আসবে, — সমাজ রাষ্ট্র, কো-অপারেশন, ব্রাদারফিলিং! —আর ঐ সব মনে হয়েছে কি তলিয়ে গেছ! আরে বাবা— আমি একাট দুঁদে বিজনেসম্যান, অভিজ্ঞতার পাঠশালায় আমার পাঠ নেওয়া! আমি তোমাদের বলছি—দুনিয়ার কোন লোকের জন্য এতটুকু দায় তোমাদের নেই! খালি নিজেকে দেখ, নিজের ফ্যামলিকে দেখ। আর তেল যদি দেবার দরকার হয়— দাও তেল—কিন্তু নিজের চরকায়।

    (গোবিন্দর প্রবেশ)

    গোবিন্দ॥ আজ্ঞে, থানা থেকে সাব-নেসপেক্‌টার বাবু এসেছেন—

    চন্দ্রমাধব॥ কে এসেছে?

    গোবিন্দ॥ আজ্ঞে সাব-নেসপেকটার বাবু—

    চন্দ্রমাধব॥ (বিরক্তির সহিত) সাব-ইন্‌স্‌পেক্‌টর? কিসের?

    গোবিন্দ॥ আজ্ঞে পুলিসের। পদ্মপুকুর থানা থেকে আসছেন। নাম বললেন তিনকড়ি হালদার।

    চন্দ্রমাধব॥ তিনকড়ি হালদার! (বোধহয় মনে করিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু ও নামে কাহাকেও মনে পড়িল না।)— তা চায় কাকে?

    গোবিন্দ॥ আজ্ঞে বললেন, আপনার সঙ্গে জরুরী দরকার।

    চন্দ্রমাধব॥ আমার সঙ্গে? নন্‌সেন্স্! (উঠিবার উপক্রম করিয়া) আচ্ছা, বাইরের ঘরে বসা, আমি—(পুনরায় বসিয়া পড়িয়া) আচ্ছা, থাক, এখানেই পাঠিয়ে দে। (গোবিন্দর প্রস্থান)—ও হয়েছে— বুঝলি, রমেশ বোধহয় কোন দরকারে পাঠিয়েছে। (অমিয়কে) আমার ভাগ্নে রমেশ, সাউথের ডিসি, থাকেও পদ্মপুকুর থানার ওপরে, তাই বোধহয়—

    অমিয়॥ (ঠাট্টার ছলে) কিংবা হয়তো দেখুন, আমাদের তাপস কিছু করে-টরে বসেছে কিনা!

    চন্দ্রমাধব॥ (ঐ একই সুরে) তা হতে পারে! তোমাদের—মানে আজকালকার ছেলেদের বিশ্বাস নেই কিছু!

    তাপস॥ (অস্বস্তির সহিত অমিয়কে) তার মানে? কি বলতে চাও তুমি?

    অমিয়॥ (হাসিয়া উঠিয়া) কি মুশকিল! কিচ্ছু বলতে চাই না! আচ্ছা পাগলকে নিয়ে পড়া গেছে যাহোক! ঠাট্টা বোঝে না?

    তাপস॥ (পূর্ববৎ, অস্বস্তির সহিত) না, ঠাট্টা যদি ওরকম হয় তাহলে বুঝি না!

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধ স্বরে) তাপস! আজ তোর কি হয়েছে বলতো?

    তাপস॥ (উদ্ধত স্বরে) হবে আর কি? কিচ্ছু নয়!

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধ স্বরে) তাপস! (আরও কি যেন বলিতে যাইতেছিলেন, এমন সময় সাবইন্সপেক্টর তিনকড়ি হালদারের প্রবেশ। তাঁহার পরিধানে সাবইন্সপেক্টরের পরিচ্ছদ। গুরুত্ব আরোপ করিয়া কথা বলার অভ্যাস, এবং কথা বলেন খুব সাবধানে, যেন কোথাও ফাঁক না থাকিয়া যায়, অথবা কোন অপ্রয়োজনীয় কথা না বলিয়া ফেলেন! লক্ষ্য করিবার মতো আরও একটি বিশেষত্ব আছে। কাহারও সহিত কথা বলিবার সময় তাঁহার অপ্রীতিকর প্রখর দৃষ্টি উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে রীতিমত বিচলিত করিয়া তোলে।)

    তিনকড়ি॥ নমস্কার, আপনিই মিস্টার চন্দ্রমাধব সেন?

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ, আপনি?

    তিনকড়ি॥ সাব-ইন্সপেক্টর তিনকড়ি হালদার— পদ্মপুকুর থানা থেকে আসছি।

    চন্দ্রমাধব॥ (চেয়ার দেখাইয়া দিয়া) বসুন—(তিনকড়িবাবু বসিলে, সিগারেট কেস খুলিয়া সম্মুখে ধরিলেন) সিগারেট?

    তিনকড়ি॥ নো, থ্যাঙ্কস।

    চন্দ্রমাধব॥ (নিজে সিগারেট ধরাইতে ধরাইতে) আপনি বুঝি সিগারেট খান না?

    তিনকড়ি॥ খাই তবে অন ডিউটি নয়!

    চন্দ্রমাধব॥ (তিনকড়ির মুখের দিকে তাকাইয়া) আপনি পদ্মপুকুরে নতুন এসেছেন, না?

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ নতুনই, আজ নিয়ে পাঁচদিন।

    চন্দ্রমাধব॥ আমারও মনে হচ্ছিল। আমার ভাগ্নে রমেশ, মানে আপনাদের সাউথের ডি-সি, ও তো থাকে ঐ থানার ওপরেই। ওর ওখানে প্রায়ই যাই তো— কিন্তু আপনাকে কখনও…

    তিনকড়ি॥ (বাধা দিয়া) না, আমাকে আর দেখবেন কি করে—আমি তো মোটে পাঁচদিন হলো এসেছি।

    চন্দ্রমাধব॥ না, মানে আমিও তাই বলছিলাম। কিন্তু আপনি এ সময়ে,— রমেশ কোন দরকারে পাঠিয়েছে নিশ্চয়?

    তিনকড়ি॥ না মিস্টার সেন।

    চন্দ্রমাধব॥ (অসহিষ্ণু হইয়া) তবে?

    তিনকড়ি॥ আমি এসেছি দু-একটা খবর জানতে। অবশ্য আপনি যদি কিছু মনে না করেন।

    চন্দ্রমাধব॥ খবর জানতে? এখানে?

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ। আজ বিকেলে একটি মেয়ে কার্বলিক অ্যাসিড খেয়ে মারা গেছে। হসপিটালে পাঠানো হয়েছিল সঙ্গে সঙ্গে, কিন্তু কিছুতেই বাঁচানো গেল না, ভেতরটায় কিচ্ছু ছিল না— সমস্ত জ্বলে গিয়েছিল!

    তাপস॥ (শিহরিয়া উঠিয়া) উঃ! বলেন কি?

    তিনকড়ি (তাপসকে) হ্যাঁ, সে বড় ভীষণ যন্ত্রণা, চোখে দেখা যায় না! (চন্দ্রমাধবকে) বুঝতেই পারছেন—সুইসাইড—

    চন্দ্রমাধব॥ সে তো বুঝতেই পারছি—it’s a horrible business! কিন্তু আমার সঙ্গে এসবের সম্পর্ক কি?

    তিনকড়ি॥ মেয়েটি যেখানে থাকত সেখানে আমি গিয়েছিলাম। তার একটা চিঠি আর ডায়েরি আমি পেয়েছি। জানেন তো, অভিবাবকহীন অবস্থায় বিপদে-আপদে পড়লে মেয়েরা অনেক সময় অন্য নাম নেয়? এ মেয়েটিও নিয়েছিল। আমি অবশ্য আসল নামটা ডায়েরি থেকে বার করে নিয়েছি— সন্ধ্যা চক্রবর্তী—

    চন্দ্রমাধব॥ সন্ধ্যা চক্রবর্তী?

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ, সন্ধ্যা চক্রবর্তী। মেয়েটিকে মনে আছে আপনার?

    চন্দ্রমাধব॥ (ধীরে ধীরে) না—মানে—নামটা যেন কিরকম শোনা শোনা বলে মনে হচ্ছে—কোথায় যেন শুনেছি! কিন্তু সে যাই হোক—এসবের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কি?

    তিনকড়ি॥ আপনাদেরই একটা কনসার্ন—দয়াময়ী কুটীরশিল্প প্রতিষ্ঠান— মেয়েটি সেখানে এক সময় কাজ করত।

    চন্দ্রমাধব॥ ও তাই বলুন। কিন্তু সেখানে তো একটা মেয়ে কাজ করে না। আর যারা করে তাদেরও কেউ পারমানেন্টলি নেই—আজ দুজন আসছে, কাল দুজন যাচ্ছে।

    তিনকড়ি॥ এ-মেয়েটি খুব একটা সাধারণের পর্যায় পড়ে না মিস্টার সেন। আমি তার বাসা থেকে একটা ছবিও জোগাড় করেছি—আপনি হয়তো ছবিটা দেখলে চিনতে পারবেন। (তিনকড়ি হালদার একটি পোস্ট-কার্ড সাইজের ছবি পকেট হইতে বাহির করিয়া মিস্টার সেনের নিকট গেলেন। অমিয় ও তাপস দুইজনেই ছবিটি দেখিতে গেল। কিন্তু তিনকড়িবাবু ছবিটিকে আড়াল করিয়া ধরায় তাহারা দেখিতে সক্ষম হইল না। তিনকড়িবাবুর এইরূপ ব্যবহারে তাহারা বিস্মিত তো হইয়াছিলই, বিরক্তও হইল। দেখা গেল মিস্টার সেন ছবিটি খুব ভাল করিয়া দেখিতেছেন, এবং মনে হইল যেন চিনিতেও পারিয়াছেন। তিনকড়িবাবু ছবিটিকে পকেটে রাখিয়া স্বস্থানে ফিরিয়া আসিলেন।)

    অমিয়॥ (বিরক্তির সহিত) আচ্ছা তিনকড়িবাবু, ছবিটা আমাকে দেখতে দিলেন না কেন? বিশেষ কোন কারণ আছে কি?

    তিনকড়ি॥ (শান্ত অথচ কঠোর দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া) হয়তো আছে।

    তাপস॥ আমার বেলায়ও কি তাই, তিনকড়িবাবু?

    তিনকড়ি॥ নিশ্চয়। আপনি কি ভাবছিলেন আপনার জন্যে একটা আলাদা কিছু হবে?

    অমিয়॥ কিন্তু কারণটা কি?

    তাপস॥ সেটা তো আমার মাথাতেও ঢুকছে না—

    চন্দ্রমাধব॥ তিনকড়িবাবু আমিও কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছি না, কেন আপনি ওদের…

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে, আমার কাজ করার রীতিই এই। এক-একবারে এক-একজন। নইলে, সকলকে একসঙ্গে ধরলে বড় গণ্ডগোল হয়।

    চন্দ্রমাধব॥ (কিছুটা চঞ্চল হইয়া) তাহলে অবিশ্যি বলবার কিছু নেই!

    তিনকড়ি॥ (চন্দ্রমাধবের এই চাঞ্চল্য তিনি লক্ষ্য করিয়াছিলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন করিলেন) আপনি তাহলে মেয়েটিকে চিনতে পেরেছেন, কি বলেন মিস্টার সেন?

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ, এখন মনে পড়েছে। মেয়েটি দয়াময়ীতে কাজ করত—আমরা তাকে বরখাস্ত করি—

    তাপস॥ (উত্তেজিত হইয়া) বাবা, তাহলে কি সেইজন্যেই মেয়েটি…

    চন্দ্রমাধব॥ তাপস! চুপ করে বসতে পারিস বস—নইলে এ ঘর থেকে যা। (তিনকড়িবাবুকে) কিন্তু এ আজ দু’বছর আগের কথা তিনকড়িবাবু, ফিপটি-টুর সেপ্টেম্বরের শেষে।

    অমিয়॥ আমি এখন তাহলে বাইরে যাই, কি বলেন কাকা?

    চন্দ্রমাধব॥ না না, বাইরে যাবার মতো হয়েছেটা কি!—কি তিনকড়িবাবু, অমিয়র এ ঘরে থাকাতে আপনার নিশ্চয়ই কোন আপত্তি নেই? (হয়তো আপত্তি থাকিতে পারে এই মনে করিয়া তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিলেন)—মানে, আমার বন্ধু বোস ইনডাসট্রিজ-এর শেখর বোস—নাম শুনেছে নিশ্চয়? বাংলাদেশের একটা অতবড় বিজনেস ম্যাগনেট! অমিয় তাঁরই ছেলে—

    তিনকড়ি॥ কি বললেন? অমিয় বসু—না?

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ—মানে, অমিয় আর আমার শীলা—সামনের মাসেই ওদের বিয়ে। তাই আজ একটু—

    তিনকড়ি॥ (চিন্তা করিতে করিতে অমিয়কে) ও, আপনি আর শ্রীমতী শীলা—আপনাদের এই সামনের মাসেই বিয়ে, না?

    অমিয়॥ (মৃদু হাসিয়া) এখনো অবধি আশা তো সেই রকমই, তবে—

    তিনকড়ি॥ (গম্ভীরভাবে) না অমিয়বাবু, তাহলে আপনার বাইরে না যাওয়াই ভাল। আপনি বরং এ ঘরেই থাকুন।

    অমিয়॥ (বিস্মিত হইয়া) আশ্চর্য! তা না হয় রইলাম, কিন্তু—

    চন্দ্রমাধব॥ (অধৈর্য হইয়া) দেখুন তিনকড়িবাবু, আপনি যে ভাবছেন মিষ্টিরিয়াস কেলেঙ্কারি গোছের একটা কিছু হয়েছিল—তা মোটেই হয়নি, এর মধ্যে বাঁকা-চোরা কিছু নেই। স্ট্রেট কেস! তাও হয়েছে কবে?—না দু’বছর আগে। তার সঙ্গে এ সুইসাইডের সম্পর্কটা কি?—কিছুই নয়!

    তিনকড়ি॥ না মিস্টার সেন, আমি আপনার কথা মেনে নিতে পারছি না।

    চন্দ্রমাধব॥ কেন পারছেন না?

    তিনকড়ি॥ কারণ খুব সোজা। চাকরি যাওয়ার পর যা কিছু ঘটেছে, তা হয়তো ঘটত না, যদি না তার ঐ চাকরিটা যেত। হয়তো ঐ পরের ঘটনাগুলোই তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে। দেখুন—হয়তো ঐ চাকরি যাওয়া থেকে তার আত্মহত্যা অবধি সব এক চেনে বাঁধা!

    চন্দ্রমাধব॥ আপনি যদি ওভাবে বলেন, তাহলে অবশ্য আপনার কথা খানিকটা ঠিক। কিন্তু আমি ওভাবে বলি না—কাজেই এ ব্যাপারে আমার কোন দায়িত্ব আছে বলে আমি মনে করি না। আপনি যা বলছেন ও তো একটা কথার কথা! ওভাবে কাজ করতে গেলে কি চলে? চলে না। কত লোকের সঙ্গে আমাদের কাজ! আপনি কি বলতে চান তাদের জীবনে যা কিছু ঘটেছে সব দায়-দায়িত্ব আমাদের? বলুন না—আপনিই বলুন—কথাটা কি খুব অকওয়ার্ড নয়?

    তিনকড়ি॥ নিশ্চয়, অকওয়ার্ড বইকি, খুবই অকওয়ার্ড।

    চন্দ্রমাধব॥ আমাদের অবস্থাটা কি হবে একবার ভাবুন দেখি? কি রকম একটা ইমপসিবল সিচুয়েশনের মধ্যে গিয়ে পড়ব বলুন তো?

    তাপস॥ ঠিক বলেছ বাবা। তুমি তো একটু আগেই বলছিলে, আগে নিজে তারপর অন্য কেউ—

    চন্দ্রমাধব॥ যাকগে, ওসব বাজে কথা এখন থাক—

    তিনকড়ি॥ কি কথা মিস্টার সেন?

    চন্দ্রমাধব॥ ও কিছু নয়। আপনি আসবার আগে আমি এদের দু’একটা গুড অ্যাডভাইস দিচ্ছিলাম। যাকগে ওসব কথা, এখন কাজের কথায় আসা যাক। হ্যাঁ, কি যেন নাম বলছিলেন মেয়েটির?—ও মনে পড়েছে, সন্ধ্যা চক্রবর্তী। হ্যাঁ, মেয়েটি আমাদের দয়াময়ীতে কাজ করত—এমব্রয়ডারি সেকশনে। বেশ চালাক চতুর, দেখতে শুনতেও ভাল। হাতের কাজও চমৎকার। বোর্ড-মিটিঙে তো আমরা ঠিকই করেছিলাম—ওকে সেকশন-ইন-চার্জ করে দেব। কিন্তু হঠাৎ গোলমাল বাধল পুজোর বন্ধের ঠিক পরেই। সকলে মিলে স্ট্রাইক করে কাজ বন্ধ করলে! কি? না, প্রত্যেকের পাঁচ টাকা করে মাইনে বাড়িয়ে দিতে হবে। বুঝতেই পারছেন—আমরা refuse করলাম—

    তিনকড়ি॥ না, ঠিক বুঝতে পারলাম না। কেন, refuse করলেন কেন?

    চন্দ্রমাধব॥ (বিস্মিত হইয়া) কেন refuse করলাম?—মানে?

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ, refuse কেন করলেন?

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধ হইয়া) দেখুন তিনকড়িবাবু, business আমার, আমার ইচ্ছে মতো সেটা আমি চালাই। এ নিয়ে আপনার মাথা ঘামাবার দরকার আছে বলে আমার তো মনে হয় না।

    তিনকড়ি॥ আপনি কি করে জানলেন? দরকার হয়তো সত্যিই আছে, তাই মাথা ঘামাচ্ছি।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু আপনি ওরকম চোখ রাঙিয়ে কথা বলছেন কাকে?

    তিনকড়ি॥ তা যদি আপনার মনে হয়, তাহলে I am sorry। আমি আপনার প্রশ্নের জবাব দিয়েছি মাত্র।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু আমি যা বলছি তা যুক্তিসঙ্গত—আর আপনি যা বকছেন, তা অবান্তর!

    তিনকড়ি॥ কিন্তু আমি আপনাকে যা জিজ্ঞেস করেছি, তা আমার ডিউটির মধ্যে বলেই করেছি, নইলে করতাম না।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু একটা কথা ভুলে যাচ্ছেন। চাকরির দিক থেকে আপনারও যেমন একটা ডিউটি আছে, ব্যবসার দিক থেকে আমারও তেমনি একটা ডিউটি আছে!

    তিনকড়ি॥ সেটা কি, জানতে পারি?

    চন্দ্রমাধব॥ কেন পারেন না, নিশ্চয় পারেন? আমার ডিউটি হল labour costকে যতটা সম্ভব কমের মধ্যে রাখা। আমরা ওদের মাসে তিরিশ টাকা করে দিচ্ছিলাম। সেই জায়গায় যদি পঁয়ত্রিশ টাকা করে দিতে হত, তাহলে labour cost কত বাড়ত জানেন? Sixteen percent-এর উপর! এবার আপনার কেনর উত্তর নিশ্চয়ই পেয়েছেন? সব জায়গায় যা দেয়, আমরাও তাই দিচ্ছিলাম। তাদের পছন্দ হয় কাজ করুক, না হয় অন্য কোথাও যাক! আমি তো তাদের বলেই দিয়েছিলাম—it is a free country–এখানে না পোষায়, অন্য কোথাও যাও। আমি তো আর কাউকে ধরে রাখিনি।

    তাপস॥ তাহলে এটা free country নয়! এ দেশে অন্য কোথাও যেতে চাইলেই কি যাওয়া যায়—না গেলেই কাজ পাওয়া যায়?

    তিনকড়ি॥ ঠিক কথা।

    চন্দ্রমাধব॥ (তাপসকে) আচ্ছা, তোর কি সব ব্যাপারে কথা বলা চাই! আমি তো তোকে বলেছি তাপস—চুপ করে বসে থাকতে পারিস বস, নইলে যা। সব তাতে কথা! (তিনকড়িবাবুকে) হ্যাঁ, কি বলছিলাম যেন? ও, স্ট্রাইকের কথা। স্ট্রাইক অবশ্য বেশিদিন চলেনি—

    অমিয়॥ তা কখনো চলে! পুজোর বন্ধের পরই যে! হাতে তো কারো একটি পয়সা নেই, অফিস থেকে লোন না পেলে খাবে কি?

    চন্দ্রমাধব॥ হলও ঠিক তাই! চারদিন পেরিয়ে পাঁচদিন গেল না, স্ট্রাইকও শেষ! আমরা অবশ্য কোন স্টেপ নিইনি। সকলকেই নিলাম—তবে হ্যাঁ, তিন-চারজন রিংলিডার বাদে। তা আপনার ঐ সন্ধ্যা চক্রবর্তী—তিনি ঐ তিন-চারজনেরই একজন! অনেকদূর এগিয়েছিলেন কিনা—তাই চাকরিটা গেল!

    অমিয়॥ তা তো যাবেই! চাকরি এখানে থাকে কি করে?

    তাপস॥ কেন থাকবে না? বাবা ইচ্ছে করলেই থাকত। বাবার ইচ্ছে ছিল না, তাই তার চাকরিও রইল না! বাবা তো তাড়িয়েই খালাস—মেয়েটার অবস্থাটা ভাব তো একবার—

    চন্দ্রমাধব॥ রাবিশ! তুই এসব ব্যাপারের জানিস কতটুকু? আজ পাঁচ টাকা দে, কাল দশ টাকা চেয়ে বসবে! দে আবার দশ টাকা—দেখবি, পরদিনই বলছে, গোটা দুনিয়াটা আমাদের দাও!

    অমিয়॥ ঠিক কথা।

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ, তা ঠিক কথা—তবে ঐ চাইবে, ঐ পর্যন্ত—নিয়ে বসবে না।

    চন্দ্রমাধব॥ (তিনকড়িবাবুর দিকে এক দৃষ্টিতে দেখিয়া) আচ্ছা কি যেন বললেন আপনার নামটা?

    তিনকড়ি॥ তিনকড়ি হালদার।

    চন্দ্রমাধব॥ ও, তিনকড়ি হালদার—না! আচ্ছা রমেশের সঙ্গে আপনার দেখা-সাক্ষাৎ হয়? রমেশ—মানে—আমাদের ডি সি?

    তিনকড়ি॥ ডি সি যখন, তখন দেখা-সাক্ষাৎ হয় বই কি। তবে খুব বেশি নয়—

    চন্দ্রমাধব॥ আপনি বোধ হয় জানেন না— রমেশ আমার ভাগ্নে। এখানে তো আসেই—তাছাড়া প্রায় রোজই ক্লাবে আমাদের দেখা হয়। আমিও আপনাদের পুলিস ক্লাবে টেনিস খেলতে যাই কিনা—

    তিনকড়ি॥ কি করে জানব বলুন?—আমি টেনিস খেলিও না আর খেলা দেখিও না।

    চন্দ্রমাধব॥ (বিরক্তি-মিশ্রিত স্বরে) আঃ—কে বলছে যে আপনি টেনিস খেলেন বা দেখেন! আপনি যে টেনিস খেলেন না তা আমিও জানি—কিন্তু—

    তাপস॥ (হঠাৎ উত্তেজিত হইয়া) কিন্তু যাই বল বাবা, এটা খুবই লজ্জার কথা—

    তিনকড়ি॥ কেন, লজ্জার কি আছে এতে? আমি খেলা জানি না, তাই খেলি না, আর দেখতে ভাল লাগে না, তাই দেখি না।

    তাপস॥ না না, খেলা নয়—আমি ঐ মেয়েটির কথা বলছি, মানে ঐ সন্ধ্যা চক্রবর্তী! কেনই বা সে বেশি মাইনের জন্য চেষ্টা করবে না? আমরা চেষ্টা করি না, আমাদের জিনিস যাতে বাজারে বেশি দামে কাটে? আর পাঁচটা মেয়ের চেয়ে সে একটু বেশি স্পিরিটেড, কিন্তু তাই বলে তার চাকরিটা যাবে? (চন্দ্রমাধবকে) তুমি তো নিজেই বলছিলে বাবা, মেয়েটি কাজ করত ভালই! তাই যদি হয়, তবে তাঁকে ছাঁটাই-ই বা করলে কেন? কি জানি বাবা, আমি তো এর কোন যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না! আমি হলে তো রেখেই দিতাম!

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধ স্বরে) তুই চুপ করবি কিনা! উঃ, আমি হলে তো রেখেই দিতাম! আরে রাখবি কোত্থেকে?—সে ক্ষমতা আছে তোর? অমুককে রাখব, তমুককে ছাঁটাই করব, এসব করতে গেলে মাথার দরকার—তোমার ঐ মোটা মাথার কর্ম ওটা নয়! আশ্চর্য, এত পয়সা খরচ করে লেখাপড়া শেখালাম, এতটুকু বুদ্ধি হল না তোর! যে গাধা সেই গাধাই রয়ে গেলি!

    তাপস॥ (ক্ষুব্ধ স্বরে) এসব কথা কি তিনকড়িবাবুর সামনে না বললেই নয় বাবা?

    চন্দ্রমাধব॥ তিনকড়িবাবুর সামনে আমার আর কোন কথা বলারই দরকার নেই! বলবার আছেই বা কি? ঐ সব ইনকিলাব জিন্দাবাদ আমাদের পছন্দ হয়নি, তাই তাকে ছাঁটাই করেছিলাম! তারপর তার কি হয়েছিল না হয়েছিল, তার কোন খবরই আমি রাখি না। কি হয়েছিল তিনকড়িবাবু? Did she get into trouble?

    তিনকড়ি॥ (ধীর স্বরে) ট্রাবল—মানে হ্যাঁ ট্রাবলও বলতে পারেন— (শীলার প্রবেশ)

    শীলা॥ (প্রবেশ করিতে করিতে লঘু স্বরে) ট্রাবল? কিসের ট্রাবল বাবা—পেটের নাকি? (তিনকড়িবাবুকে দেখিয়া) Oh sorry! আমি জানতাম না, আপনি এখানে আছেন! হ্যাঁ বাবা—মা জিজ্ঞেস করে পাঠালেন, তোমাদের কি খুব দেরি হবে? তাহলে না হয়—

    চন্দ্রমাধব॥ না, না দেরি কিসের? কথাবার্তা আমাদের শেষ হয়ে গেছে—(তিনকড়িবাবুকে দেখাইয়া দিয়া) এবার উনি উঠবেন—

    তিনকড়ি॥ কিন্তু আমি তো এখন উঠব না।

    চন্দ্রমাধব॥ তার মানে?

    তিনকড়ি॥ কথাবার্তা তো আমাদের এখনও শেষ হয়নি।

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধ স্বরে) তার মানে? যা জানি সবই তো আপনাকে বললাম!

    শীলা॥ (কৌতূহলী হইয়া) কি হয়েছে বাবা?

    চন্দ্রমাধব॥ কিছু হয়নি। তুই এখন এঘর থেকে একটু যা তো শীলা—আমরা এক্ষুনি আসছি।

    তিনকড়ি॥ কিন্তু আমার যে ওঁকেও দরকার মিস্টার সেন।

    চন্দ্রমাধব॥ তার মানে?

    তিনকড়ি॥ মানে, ওঁকেও আমার দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করবার আছে—

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধ ও উত্তেজিত কণ্ঠস্বরে) না—ওকে আপনার কোন কথা জিজ্ঞেস করবার নেই! দেখুন তিনকড়িবাবু, যেটুকু ডিউটি সেটুকু করুন! তার বাইরে এভাবে ওপর-পড়া হয়ে কথাবার্তা বললে—আমি আপনার নামে রিপোর্ট করব! যেটুকু বলবার তো তো আমিই আপনাকে বললাম! তারপর তার কি হল না হল, তার সঙ্গে আমার কি? এরকম একটা বেয়াড়া ব্যাপারের মধ্যে আমার মেয়েকে টেনে আনবার কি অধিকার আছে আপনার?

    শীলা॥ কি হয়েছে বাবা? ইনি তো দেখছি পুলিসের লোক। কোত্থেকে আসছেন ইনি?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে, আমি আসছি পদ্মপুকুর থানা থেকে। ওখানকার সাব-ইন্সপেক্টর—নাম তিনকড়ি হালদার।

    শীলা॥ কিন্তু আপনি এখানে—মানে—

    তিনকড়ি॥ আমি একটু এনকোয়ারিতে এসেছি। আজ বিকেলে একটি মেয়ে কার্বলিক অ্যাসিড খেয়ে মারা গেছে—

    শীলা॥ কী সর্বনাশ! কার্বলিক অ্যাসিড?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ। মরবার আগে সে কি যন্ত্রণা!

    শীলা॥ (অসহায়র কণ্ঠস্বরে) কিন্তু কেন খেল বলুন তো?

    তিনকড়ি॥ কি জানি? বোধহয় মনে হয়েছিল আর বেঁচে থাকার কোন মানে হয় না।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু তাই বলে আপনি বলতে চান—দু’বছর আগে তাকে ছাঁটাই করেছিলাম বলে, আজ দু’বছর পরে সে আত্মহত্যা করেছে?

    তাপস॥ কিন্তু বাবা, হয়তো ওই ছাঁটাই থেকেই তার দুঃখের শুরু—

    শীলা॥ সত্যি বাবা? তুমি তাকে ছাঁটাই করেছিলে?

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ, করেছিলাম। মেয়েটা দয়াময়ীতে কাজ করত। খুব গণ্ডগোল আরম্ভ করেছিল, তাই তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। অন্যায় কিছু আমি করিনি—

    অমিয়॥ না, অন্যায় কিসের? আমাদের হলে আমরাও তাই করতাম। (শীলাকে অতিমাত্রায় বিচলিত দেখিয়া) কিন্তু তুমি এত moved হচ্ছ কেন? সে তো তোমার কেউ নয়—

    শীলা॥ কি জানি—তা তো জানি না। আমার খালি মনে হচ্ছে—আমরা যখন এখানে এত হাসি-ঠাট্টা করছি, তখন আর একজন কার্বলিক অ্যাসিড খেয়ে হসপিটালে যন্ত্রণায় ছটফট করছে! (তিনকড়িবাবুকে) আচ্ছা কত বয়স হবে মেয়েটির? খুব বেশী নিশ্চয় নয়?

    তিনকড়ি॥ না না, খুব বেশী কোথায়? তেইশ-চবিবশের মধ্যে—একেবারে ফোটা-ফুলের মতো দেখতে। তবু তো আজ আমি তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখিনি। যখন গেছি তখন সে যন্ত্রণায় ছটফট করছে!

    চন্দ্রমাধব॥ আচ্ছা তিনকড়িবাবু, এখনও কি যথেষ্ট হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না আপনার?

    অমিয়॥ আমি তো কিছুতেই বুঝতে পারছি না—এভাবে এনকোয়ারি করে আপনার লাভটা কি? আপনার জানা দরকার—দয়াময়ী থেকে চাকরি যাওয়ার পর যা যা হয়েছিল। কিন্তু আমরা তার কি জানি বলুন?

    তিনকড়ি॥ একেবারেই কি কিচ্ছু জানেন না মিস্টার বোস?

    চন্দ্রমাধব॥ (অমিয় ও শীলার দিকে ইঙ্গিত করিয়া, বিস্মিত কণ্ঠস্বরে) তার মানে? আপনি বলতে চান — হয় এ, নয় ও মেয়েটির সম্বন্ধে কিছু না কিছু জানে?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ!

    চন্দ্রমাধব॥ আপনি তাহলে শুধু আমার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে এখানে আসেন নি?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে না।

    চন্দ্রমাধব॥ (নরম সুরে) এ কথাটা আগে বললেই পারতেন কোন গণ্ডগোলই হত না! আমি কি করে জানব বলুন? আমি ভাবছি, আমার যা বলার সবই তো আমি বলেছি—তবে কেন শুধু শুধু আপনি আমাদের উত্যক্ত করছেন। কিন্তু আপনি সব fact পেয়েছেন তো?

    তিনকড়ি॥ কিছু কিছু পেয়েছি বই কি!

    চন্দ্রমাধব॥ খুব একটা মারাত্মক কিছু নয়—কি বলেন?

    তিনকড়ি॥ মানে—একটি মেয়ে কার্বলিক অ্যাসিড খেয়ে মারা গেছে। এটা যদি মারাত্মক কিছু হয় তবে মারাত্মক—নইলে নয়।

    শীলা॥ তার মানে? আপনি বলতে চান ঐ মেয়েটির মৃত্যুর জন্যে আমরা দায়ী?

    চন্দ্রমাধব॥ তুই চুপ কর দেখি—যা বলবার আমি বলছি। (নরম সুরে তিনকড়িকে) আচ্ছা তিনকড়িবাবু তার চেয়ে আসুন না—আমি আর আপনি—মানে একটু নিরবিলিতে বসে ব্যাপারটা সেটল করে ফেলি?

    শীলা॥ কিন্তু বাবা, তুমিই বা কথা বলবে কেন? ওঁর তো তোমার কাছে এনকোয়ারি শেষ হয়ে গেছে। এখন তো উনি বলছেনই, হয় অমিয় না হয় আমি—

    চন্দ্রমাধব॥ আরে, তোরা ছেলেমানুষ এসবের বুঝিস কি? আমি তোদের হয়ে কথাবার্তা বলে যা হোক একটা কিছু ঠিক করে নিচ্ছি—

    অমিয়॥ কিন্তু আমার তরফ থেকে ঠিক করার কিছু নেই কাকাবাবু। সন্ধ্যা চক্রবর্তী বলে কাউকে আমি চিনিই না।

    তাপস॥ ও নামে আমিও তো কাউকে চিনি না।

    শীলা॥ কি নাম বললে? সন্ধ্যা চক্রবর্তী?

    অমিয়॥ হ্যাঁ—

    শীলা॥ আমি তো শুনিই নি কোনদিন—

    অমিয়॥ (ব্যঙ্গের হাসি হাসিয়া) এখন কি রকম মনে হচ্ছে তিনকড়িবাবু?

    তিনকড়ি॥ কেন? ঠিক আগে যেমন মনে হচ্ছিল। আমি তো আগেই আপনাদের বলেছি, মেয়েরা বিপাকে পড়লে অনেক সময় নাম পালটায়। এ মেয়েটিও পালটেছিল। তিরিশ টাকার জায়গায় পঁয়ত্রিশ টাকা চাওয়ার জন্যে মিস্টার সেন যখন তাকে ছাঁটাই করলেন তখন হয়তো তার মনে হল সন্ধ্যা চক্রবর্তী নামটা অপয়া—তাই সে নতুন একটা নাম নিলে—

    তাপস॥ খুবই স্বাভাবিরক—

    শীলা॥ পাঁচটা টাকা বাড়ালে কী এমন ক্ষতি হত বাবা? হয়ত সেজন্যেই—

    চন্দ্রমাধব॥ রাবিশ! চাকরি গেছে দু’বছর আগে, আর আত্মহত্যা করেছে সে আজ। তার জন্যে কি আমি দায়ী? আচ্ছা তিনকড়িবাবু চাকরি যাওয়ার পর কি হয়েছিল, কিছু জানেন আপনি?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ। মাস-দুয়েক চাকরি ছিল না। বাপ-মা মরা মেয়ে, কাজেই যাবারও কোন জায়গা ছিল না। দয়াময়ীতে চাকরি করত, কাজেই বুঝতেই পারছেন, জমাতেও কিছু পারেনি। দু’মাস বেকার অবস্থায় কাটাবার পর, অবস্থা যা হবার ঠিক তাই হল। আত্মীয়-স্বজন নেই যে কারো কাছে চলে যায়, তেমন বন্ধু-বান্ধব নেই যে তাকে সাহায্য করে, হাতে এমন পয়সা নেই যে দু’দিন বসে খায়। কাজেই অবস্থাটা তো বুঝতেই পারছেন। প্রথম ক’দিন চলে অর্ধাহার, তারপর প্রায় অনাহার! এর চেয়ে ডেসপারেট অবস্থা আর কি হতে পারে বলুন?

    শীলা॥ এর চেয়ে ডেসপারেট অবস্থা তো ভাবাই যায় না। সত্যিই বড় লজ্জার কথা! এভাবে যদি একটি মেয়েকে আত্মহত্যা করতে হয়—

    তিনকড়ি॥ শুধু একটি মেয়ে কেন? আজকের দিনে কলকাতার মত প্রত্যেকটা শহরে গিয়ে আপনি দেখুন—দেখবেন, হাজার হাজার ছেলেমেয়ে ঠিক এইভাবে দিন কাটাচ্ছে। তাই যদি না হবে—তবে আজকের দিনে এমপ্লয়ারের সাধ্য কি যে, যে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ টাকায় একটা কুকুর-বেড়াল পোষা যায় না, সেই তিরিশ-পঁয়ত্রিশ টাকায় একটা মানুষ রেখে কাজ করায়! হাজার হাজার বেকার সন্ধ্যা চক্রবর্তী আত্মহত্যার দিন গুনছে বলেই না আজ মালিকদের এত সুবিধে। আজ তারা বেশ ভাল করে জানে— কোথায় গেলে তারা cheap labour পাবে। আমার কথা বিশ্বাস না হয়, আপনার বাবাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন—

    শীলা॥ কিন্তু এই সন্ধ্যারা তো cheap labour নয় — এরা যে আস্ত মানুষ তিনকড়িবাবু।

    তিনকড়ি॥ আমারও তো মাঝে মাঝে তাই মনে হয়। মনে হয় আমরা যদি মাঝে মাঝে ওদের ছেঁড়া কাঁথার ওপর যাই, আর ওরা যদি আমাদের এই সোফা-কৌচের ওপর আসে, তাহলে আর কারো কিছু হোক আর না হোক আমাদের অন্তত কিছুটা ভাল হয়।

    শীলা॥ তা যা বলেছেন। আচ্ছা তারপর কি হল?

    তিনকড়ি॥ ওই এক ভাবেই চলছিল—আর চলতও তাই। কিন্তু মাসখানেক কাটার পর মনে হল, বোধহয় তার সুদিন আবার ফিরে আসছে। ধর্মতলার ঐ বড় চেন স্টোরটা আছে? ওখানে তার একটা চাকরি জুটে গেল— ক্লোদিং সেকশনের কাউন্টার গার্ল।

    শীলা॥ চেন স্টোর! আমাদের জিনিসপত্রও তো সব ওখান থেকেই আসে! ওখানকার কাজ তো বেশ ভাল কাজ। ওদের মাইনেও ভাল, বেশ লাকি বলতে হবে।

    তিনকড়ি॥ তারও নিজেকে খুব লাকি বলেই মনে হয়েছিল। আগের কাজটা ছিল ছোট একটা ঘরের মধ্যে। ঘিঞ্জির মধ্যে বসে সারাদিন শুধু ছুঁচের কাজ। এ ধরুন, বড় জায়গা, চারধারে দিনের বেলায় নিওন লাইটের আলো, মাইনেও সামান্য একটু বেশি। তার ওপর আবার ডিপার্টমেন্টটাও পোশাকের। জানেই তো মেয়েরা একটু শাড়ি-টাড়ি নাড়াচাড়া করতে বেশী ভালবাসে! মনে মনে ঠিক করলে, জীবনটাকে বেশ গুছিয়ে নিয়ে নতুন করে আরম্ভ করতে হবে। মানে, কি বলব, আপনি তো খানিকটা বুঝতেই পারছেন তার মনের ভাব-ভাবনাটা!

    চন্দ্রমাধব॥ তারপর, ওখানেও আবার গণ্ডগোল বাধল বুঝি?

    তিনকড়ি॥ মাস-দুয়েক বেশ কেটে গেল। দু’মাস পর সবে একটু স্থিতু হয়ে বসতে আরম্ভ করেছে—ম্যানেজারের হুকুমনামা সই হয়ে এল—চাকরি নেই।

    চন্দ্রমাধব॥ নিশ্চয় কাজকর্ম সুবিধেমত করত না—

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে না—দোকানে জিজ্ঞেস করলে তো উল্টোটাই শোনা যেত!

    চন্দ্রমাধব॥ একটা কিছু গণ্ডগোল নিশ্চয় হয়েছিল—

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে শোনা তো কিছু যায়নি। সে শুধু খবর পেয়েছিল কোন কাস্টমার নাকি তার নামে কমপ্লেন করেছে, আর চাকরি যাওয়ার কারণই নাকি তাই!

    শীলা॥ (উত্তেজিত ও ব্যাকুল কণ্ঠস্বরে) কবে হয়েছিল ব্যাপারটা বলতে পারেন?

    তিনকড়ি॥ গেল বছর জানুয়ারির শেষে—

    শীলা॥ মেয়েটিকে কি রকম দেখতে?

    তিনকড়ি॥ (উঠিয়া, পকেট হইতে ছবি বাহির করিয়া) আপনি যদি একটু এদিকে আসেন—(শীলা তিনকড়িবাবুর নিকটে আসিলে, তিনি সকলকে আড়াল করিয়া অতি সাবধানে আলোর দিকে রাখিয়া ছবিখানি শীলাকে দেখাইলেন। ভাল করিয়া দেখিবার পর শীলার মুখ-চোখের ভাব পরিবর্তিত হইয়া গেল। বোঝা গেল ছবিটি দেখিয়া সে চিনিতে পারিয়াছে। চিনিতে পারিবামাত্র সে অশ্রুরুদ্ধ অস্ফুট চীৎকার করিয়া দ্রুত ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। তিনকড়িবাবু ছবিটি যথাস্থানে রাখিয়া শীলার গমনপথের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। দেখিয়া মনে হইল কি যেন চিন্তা করিতেছেন। বাকি তিনজনের চোখে-মুখে বিস্ময়, অবস্থা হতভম্বের ন্যায়।)

    চন্দ্রমাধব॥ (তিনকড়িবাবু আসন গ্রহণ করিবার পর) কি আশ্চর্য! শীলার হল কি?

    তাপস॥ বোধহয় ছবিটা দেখে চিনতে পেরেছে শীলা। তাই না তিনকড়িবাবু?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ।

    চন্দ্রমাধব॥ যত নষ্টের মূল তো আপনি! কেন আপনি মেয়েটাকে এভাবে আপসেট করে দিলেন?

    তিনকড়ি॥ ভুল করছেন। আমি আপসেট করিনি—উনি নিজেই আপসেট হয়ে গেলেন।

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধ স্বরে) সেইটাই তো জিজ্ঞেস করছি— কেন?

    তিনকড়ি॥ আবার ভুল করছেন। কেন যে আপসেট হলেন তা তো আমি এখনও জানতে পারিনি। ওটা জানতেই তো আমার এখানে আসা।

    চন্দ্রমাধব॥ বেশ, তাহলে আগে আমিই জেনে আসি—

    অমিয়॥ চলুন, আমিও বরং আপনার সঙ্গে যাই কাকাবাবু, দেখি শীলাকে জিজ্ঞেস করে—

    চন্দ্রমাধব॥ (উঠিয়া) না না, আগে আমিই দেখি ব্যাপারটা কি হল। তারপর তোমার কাকীমাকেও তো বলা দরকার। দেখি তিনি কি বলেন। (বাহির হইয়া যাইতে যাইতে তিনকড়িবাবুকে ক্রুদ্ধস্বরে) আশ্চর্য! একটা এতবড় আনন্দের দিন। কেমন ছিলাম সন্ধ্যেবেলা, আর কোথা থেকে শনি এসে জুটলেন আপনি, সমস্ত আমোদটা পণ্ড হয়ে গেল একেবারে।

    তিনকড়ি॥ (এতটুকু বিচলিত না হইয়া) আজ পাণ্ডে হসপিটালে ডেডবডিটার দিকে দেখতে দেখতে আমারও ওই একটা কথা কেবলি মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল—কত আমোদ আহ্লাদ, কি সুন্দর ফুটফুটে একটি জীবন—কোথা থেকে কারা এসে কি বিশ্রীভাবে পণ্ড করে দিয়ে গেল। (মিস্টার সেন যাইতে যাইতে উত্তর দিবার জন্য ফিরিয়া দাঁড়াইলেন। পরে হয়তো মনে হইল কিছু না বলাই ভাল, তাই কিছু না বলিয়াই বাহির হইয়া গেলেন। তাপস ও অমিয়র অস্বস্তিভরা দৃষ্টি পরস্পরের প্রতি নিবদ্ধ। তিনকড়িবাবু কিন্তু এসব কিছু গ্রাহ্যের মধ্যেই আনিলেন না।)

    অমিয়॥ এবার ছবিটা আমি একটু দেখতে চাই তিনকড়িবাবু।

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে না। সময় হলেই আপনাকে আমি দেখাব।

    অমিয়॥ আশ্চর্য! আমি তো বুঝতে পারছি না, কেন আপনি—

    তিনকড়ি॥ (বাধা দিয়া গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বরে) দেখুন আমি তো আগেই একবার বলেছি—আমার এনকোয়ারি করার রীতিই এই রকম। আমি দেখেছি, সবাইকে একসঙ্গে ধরলে বড় গণ্ডগোল হয়। আপনাকেও আমি একটু পরেই ধরব। তখন আপনার যা বলার আছে বলবেন।

    অমিয়॥ (অস্বস্তির সহিত) না না, মানে—বলবার আমার কিছু নেই, মানে—

    তাপস॥ (হঠাৎ উঠিয়া দাঁড়াইয়া তিনকড়িবাবুকে) দেখুন মশাই, আমি আর পারছি না—

    তিনকড়ি॥ (গম্ভীরভাবে) না পারাটাই স্বাভাবিক।

    তাপস॥ না—মানে—আজ আমাদের এখানে একটা ছোটখাট পার্টি গোছের ছিল। আর কি জানেন? মানে, ঐ পার্টি জিনিসটা একেবারেই আমার ধাতে সয় না। আমার এখানে থাকা মানেই আপনাদের কাজের অসুবিধে। তাছাড়া মাথাটা বড্ড ধরেছে। তাই বলছিলাম কি—মানে আপনি যদি কিছু মনে না করেন—তাহলে আমি এখন বরং ভেতরেই যাই—কি বলেন?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে না, আমি তা বলি না।

    তাপস॥ বলেন না? মানে? কি বলেন না?

    তিনকড়ি॥ ওই আপনাকে ভেতরে যেতে।

    তাপস॥ (প্রায় চিৎকার করিয়া) কিন্তু কেন?

    তিনকড়ি॥ তাতে আপনার কষ্টটা কম হত। ধরুন, আপনি এখন ভেতরে গেলেন, কিন্তু হয়ত একটু পরেই আপনাকে আবার এ ঘরে আসতে হবে। এ ঘরে থাকলে এই যাওয়া-আসার কষ্টটা হত না।

    অমিয়॥ আপনার কথাবার্তাটা কি একটু বেশি কড়া হয়ে যাচ্ছে না?

    তিনকড়ি॥ হয়ত হচ্ছে। আপনারা সহজভাবে কইলে, আমিও সহজভাবেই কইব।

    অমিয়॥ না—মানে—আমরা তো আর ক্রিমিনাল নই, রেসপেকটেবল সিটিজেনস—

    তিনকড়ি॥ দেখুন—এই ক্রিমিনাল আর রেসপেকটেবল সিটিজেনস—এ দুটোর মধ্যে তফাতটা কি খুব পরিষ্কার? আমার তা মনে হয় না। কতটা অবধি রেসপেকটেবল, আর কোনখান থেকে ক্রিমিনাল, এ যদি আমাকে কেউ বলতে বলে, আমি তো বলতে পারব না।

    অমিয়॥ অবশ্য আপনাকে কেউ বলতে বলেও না—তাই না?

    তিনকড়ি॥ না, ঠিক তা নয়। সবটা না বলতে বললেও খানিকটা বলতে বলে। এই ধরুন আজকের এই এনকোয়ারির ব্যাপারটা—এটা তো আমার মতো লোকেই করে। (শীলার প্রবেশ। মুখ দেখিয়া মনে হয়, খুব খানিকটা কাঁদিয়াছে। ভিতরে আসিয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিল।)

    শীলা॥ (তিনকড়িবাবুকে) আচ্ছা এর মধ্যে আমি যে আছি, এ বোধহয় আপনি গোড়া থেকেই জানতেন—না?

    তিনকড়ি॥ মেয়েটির লেখা ডায়েরিটা পড়ে মনে হয়েছিল, হয়ত আপনি আছেন।

    শীলা॥ আমি বাবাকে সব বলেছি। তিনি তো বেশ বললেন— ও কিছু নয়, ও নিয়ে মন খারাপ করার কোন মানেই হয় না। কিন্তু আমার মন মানছে কই? এত বিশ্রী লাগছে যে কি বলব আপনাকে! আচ্ছা সত্যি বলুন তো, ওখান থেকে চাকরি যাওয়ার পর অবস্থাটা কি বড্ড খারাপ হয়ে পড়েছিল?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ, দুরবস্থার একেবারে চরম। চাকরিটা গেল অকারণে। তারপর এধার-ওধার চেষ্টা যে করেনি তা নয়—করেছিল। কিন্তু কিচ্ছু হয়নি। কাঁহাতক আর মানুষ না খেয়ে থাকে বলুন? ভাবলে, ভাল রকমে যখন হল না, তখন দেখা যাক একটু রকমফের করেছি পেটটা অন্তত ভরে।

    শীলা॥ (অসহায় কণ্ঠস্বরে) সত্যি,আমিই তাহলে দায়ী, তাই না?

    তিনকড়ি॥ না না, একেবারে আপনি দায়ী বললে ভুল বলা হবে। চেন স্টোরের চাকরি যাওয়ার পরেও তো কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবে হ্যাঁ, আপনি আর আপনার বাবা—আপনারা খানিকটা দায়ী তো বটেই।

    তাপস॥ কিন্তু শীলা করেছিলটা কি?

    শীলা॥ করেছিলাম যা, তা খুবই অন্যায়। ম্যানেজারের কাছে মেয়েটির নামে কমপ্লেন করেছিলাম।

    তাপস॥ কিন্তু ম্যানেজারই বা কি রকম লোক? তুই গিয়ে বললি, আর মেয়েটাকে ওরা ছাড়িয়ে দিলে?

    শীলা॥ ওদের ম্যানেজার হীরেনবাবু যে ভয়ানক ভীতু লোক। তার ওপর দোকানের মালিক তো এক রকম অনন্ত জ্যাঠা। হীরেনবাবু তো জানে, অনন্ত জ্যাঠা শেলী-মা বলতে অজ্ঞান।

    তাপস॥ কিন্তু তা হলেও—

    শীলা॥ না না, তা হলেও নয়। কমপ্লেনটা আমি খুব সাধারণ কমপ্লেন করিনি। সোজা গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম—মেয়েটিকে পেলেন কোত্থেকে? হীরেন বাবু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন— কেন, কিছু করেছে টরেছে নাকি? আমি বললাম— করেছে মানে? আমার দিকে তাকিয়ে অসভ্য ইঙ্গিত করেছে, অশ্লীল রসিকতা করেছে! কাল যদি এসে ওকে এখানে দেখতে পাই তো আপনার নামে জ্যাঠার কাছে রিপোর্ট করব—বলব, আপনি বিশেষ সুবিধে পাবার জন্যে যত সব খারাপ মেয়েছেলে এনে দোকানে ঢোকাচ্ছেন।

    তিনকড়ি॥ কিন্তু কেন বললেন আপনি এসব কথা?

    শীলা॥ আপনি বিশ্বাস করুন তিনকড়িবাবু—রাগে তখন আমার মাথার ঠিক ছিল না!

    তিনকড়ি॥ কিন্তু সে কি এমন করেছিল যাতে আপনার মাথাটা ঐরকম বেঠিক হয়ে গেল?

    শীলা॥ আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখি— মেয়েটি আমার দিকে চেয়ে মুচকি হাসছে। মনটা সেদিন এমনিই খারাপ ছিল। ঐ মুচকি হাসিটুকুতে—কি বলব—সর্বাঙ্গ রাগে যেন একেবারে জ্বলে উঠল!

    তিনকড়ি॥ কিন্তু সেটা কি তার দোষ?

    শীলা॥ না না, তার দোষ হবে কেন? দোষ আমার নিজেরই! (হঠাৎ অমিয়কে) কি অমিয়, চোখ যে আর নামাতে পারছ না! বড় মান্ বলে মনে হচ্ছে আমাকে—না? আরে আমি তবু তো সত্যি কথা বলবার চেষ্টা করছি, কিন্তু তুমি? তুমি কি বলতে চাও লজ্জা পাবার মতো কোন কাজ কোনদিন তুমি করনি?

    অমিয়॥ (বিস্মিত হইয়া) করিনি—আমি বলেছি কি একবারও? আমি তো বুঝতে পারছি না, কেন তুমি আমাকে শুধু শুধু—

    তিনকড়ি॥ (অমিয়কে থামাইয়া দিয়া) থাক, আপনাদের ও ব্যাপারটা পরে সেটল করে নেবেন। (শীলাকে) হ্যাঁ, কি হয়েছিল সব বলুন তো?

    শীলা॥ আমি সেদিন ওখানে গিয়েছিলাম একটা লং কোট ট্রাই করতে। কোটটা নিয়ে এসে হেড-অ্যাসিস্ট্যান্ট বলল, এই কাটটা বোধহয় আপনাকে ঠিক ফিট করবে না, এটা এই রকম গড়নে ভাল ফিট করে। এই বলে ওই মেয়েটির কাছে গিয়ে তার কাঁধের সঙ্গে লাগিয়ে আমাকে দেখালে। দেখলাম সুন্দর ফিট করেছে। কিন্তু আমারও কি জানি কেমন জেদ চেপে গেল। বললাম, না ঐ কোটটাই আমি নেব। কিন্তু পরে দেখি, একেবারে মানায় নি, বিশ্রী দেখাচ্ছে। ঠিক সেই সময় আয়নার ওপর চোখ পড়ল। দেখি মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। মনে হল, যেন বলতে চাইছে, মেয়েটাকে কি বিশ্রী দেখাচ্ছে দেখ। রাগে পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে উঠল। কোটটা হেড-অ্যাসিসট্যান্টের গায়ের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ছুটে চলে এলাম ম্যানাজারের কাছে। তারপর—তারপর যা হয়েছে সবই তো আপনাকে বলেছি। (অসহায় কণ্ঠস্বরে) না—জানেন, যদি মেয়েটিকে দেখতে একটা মন্দ-নয়-গোছেরও কিছু হত, তাহলে হয়ত আমি কমপ্লেনই করতাম না। কিন্তু ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল মেয়েটিকে! এতটুকু অসহায় বলে মনে হয়নি, তাই কমপ্লেন করে দুঃখও এতটুকু হয়নি।

    তিনকড়ি॥ আপনার তাহলে বেশ একটু হিংসে হয়েছিল—কেমন?

    শীলা॥ (অসহায়ভাবে) তাই হবে বোধহয়। তা নইলে, আমিই বা কেন কমপ্লেন করলাম—

    তিনকড়ি॥ আর হিংসে হয়েছিল বলেই, অনন্ত জ্যাঠার ভাইজি হিসেবে, আর আপনার বাবার মেয়ে হিসেবে আপনার যেটুকু ক্ষমতা আছে, তা প্রয়োগ করলেন একটা নিরীহ মেয়ের ওপর। — ফলে তার চাকরিটা গেল! আর এত কাণ্ড করার কারণটা কি? না তার একটু মুচকি হাসি আপনার মাথাটাকে বেঠিক করে দিয়েছিল—এই তো?

    শীলা॥ হ্যাঁ। কিন্তু আপনি বুঝে দেখুন—ব্যাপারটা যে এত সাংঘাতিক হতে পারে, তা আমার মাথাতেই আসেনি তখন! এখন আমি বুঝেছি! এখন যদি তার সাহায্যের দরকার হত, আমি তাকে যথাসাধ্য সাহায্য করতাম!

    তিনকড়ি॥ (রূঢ়স্বরে) হ্যাঁ, বুঝেছেন ঠিক, কিন্তু বড্ড দেরী করে বুঝেছেন! এখন কোথায় পাবেন তাকে যে সাহায্য করবেন। সে তো আর বেঁচে নেই?

    তাপস॥ মাই গড। ব্যাপারটা বেশ জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে—

    শীলা॥ (ঝড়ের বেগে) You shut up ছোড়দা! ব্যাপারটা যে বেশ জটিল, তা কি তোকে বলে দিতে হবে নাকি? আমি বুঝি না, কত বড় অন্যায় আমি করেছি? আপনি বিশ্বাস করুন তিনকড়িবাবু, ব্যাপারটার গুরুত্ব আমি বুঝেছি! যা করেছি, তা এই একবারই করেছি, আর কখনও করব না। আজ বিকেলে আমি চেন স্টোরে গিয়েছিলাম। তখন গ্রাহ্যের মধ্যে আনিনি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ওখানে ক’জন যেন আমার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিল। বোধহয় আমাকে দেখে ওই মেয়েটির কথা তাদের মনে পড়ে গিয়েছিল! (দুইহাতে মুখ ঢাকিয়া) ওঃ কি লজ্জা! কোনদিন আমি আর ও পথ মাড়াতে পারব না! ওঃ—কেন এমন অঘটন ঘটল বলতে পারেন?

    তিনকড়ি॥ (কঠোর স্বরে) আজ পাণ্ডে হসপিটালে, মেয়েটির মৃত্যুশয্যার পাশে দাঁড়িয়ে, আমিও নিজেকে ঠিক ঐ প্রশ্নটাই করেছিলাম। মনে মনে বলেছিলাম, বুঝতে চেষ্টা কর তিনকড়ি, কেন ব্যাপারটা ঘটল, এ অঘটন না ঘটলে কি চলত না! তাই বুঝতেই আমার এখানে আসা—আর না বুঝে আমি এখান থেকে যাবও না।—কি কি Facts আমি পেয়েছি? দয়াময়ী কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠান আপনার বাবার একটা কনসার্ন। সন্ধ্যা চক্রবর্তী নামে একটি মেয়ে সেখানে কাজ করত। মাসে মাইনে পেত তিরিশ টাকা। পঁয়ত্রিশ টাকা মাইনে চেয়ে তারা স্ট্রাইক করে। স্ট্রাইক ফেল করার সঙ্গে সঙ্গে আপনার বাবা সন্ধ্যাকে ছাঁটাই করেন। ভয়, পাছে ও থাকলে আবার ঐ রকম স্ট্রাইক হয়। মাস-দুয়েক বেকার বসে থাকার পর ধর্মতলায় চেন স্টোরে আবার একটা চাকরি সে যোগাড় করে। এই নতুন চাকরিতে যখন সবে সে স্থিতু হয়ে বসতে আরম্ভ করেছে, ঠিক সেই সময় আবার তার চাকরি চায়। কারণ কি? না, লংকোটটা মানাচ্ছে না বলে আপনি নিজের ওপর বিরক্ত হয়েছিলেন। সেই বিরক্তির জের গিয়ে পড়ল তার ওপর। ফলে এ চাকরিটাও তার গেল। এর পরেও এধার-ওধার চাকরির চেষ্টা সে করেছিল, পায়নি। কিন্তু বাঁচতে তো হবে? কাজেই ঠিক করলে একটু রকম-ফের করে দেখবে। কিন্ত রকমটার নেচারটা খুব ভাল নয়। কাজেই নামটা বদলাতে হল। প্রথমে ছিল সন্ধ্যা চক্রবর্তী, মাঝে চেন স্টোরে কি ছিল তা আমার জানা নেই, এবার নাম বদলে হল ঝরনা রায়।

    অমিয়॥ (ভীষণভাবে চমকিত হইয়া) কি, কি নাম বললেন?

    শীলা॥ (কঠোর দৃষ্টিতে অমিয়কে দেখিতে দেখিতে) ঝরনা রায়। (দেখা গেল শীলা একদৃষ্টিতে অমিয়র দিকে চাহিয়া রহিয়াছে।)

    অমিয়॥ (শীলার দিকে চোখ পড়িতে থতমত অবস্থায়) না—মানে—শীলা মানে—

    তিনকড়ি॥ (উঠিয়া) আপনার বাবা কোথায় গেলেন মিস সেন?

    শীলা॥ বাবা? বাবা ভেতরের ড্রয়িংরুমে মার সঙ্গে কথা কইছেন। আপনি যাবেন তাঁর কাছে? (তাপসকে) ছোড়দা, এঁকে একটু ভেতরে নিয়ে যা তো।

    (তাপস উঠিয়া ‘আসুন তিনকড়িবাবু’ বলিলে, তিনকড়িবাবু একবার শীলার মুখের দিকে, আর একবার অমিয়র মুখের দিকে তাকাইলেন। তারপর ‘চলুন’ বলিয়া তাপসের সঙ্গে বাহির হইয়া গেলেন।)

    শীলা॥ তারপর অমিয়?

    অমিয়॥ কি বল?

    শীলা॥ সন্ধ্যা চক্রবর্তীকে তাহলে তুমি জানতে?

    অমিয়॥ না।

    শীলা॥ মানে ঐ ঝরনা রায়কে? একই তো ব্যাপার—

    অমিয়॥ ঝরনা রায়কেই বা আমি জানতে যাব কেন?

    শীলা॥ বোকার মতো কথা বোলো না অমিয়! হাতে আমাদের খুব বেশি সময় নেই। তিনকড়িবাবুর মুখ থেকে ঝরনা রায় নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে তোমার মুখের চেহারা পাল্টে অন্য রকম হয়ে গিয়েছিল!

    অমিয়॥ আচ্ছা বেশ—জানতাম। কিন্তু এ কথার এখানেই শেষ হোক।

    শীলা॥ কিন্তু কি করে এখানে শেষ হবে— সেটা বল?

    অমিয়॥ কিন্তু শীলা, তুমি বুঝতে পারছ না—

    শীলা॥ (বাধা দিয়া) আমি খুব বুঝতে পারছি। তুমি শুধু তাকে চিনতে না, খুব ভাল করে চিনতে! তাই নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই তোমার সঙ্গেই মুখ কালো হয়ে উঠেছিল। নিশ্চয় চেন স্টোর ছাড়ার পর তোমার সঙ্গে তার আলাপ হয়েছিল। তখন সে নাম বদলে ঝরনা রায়, একটু রকমফের করে দেখছে, বাঁচতে পারে কি না! আজ আমি বুঝতে পারছি, গেলো বছর মে-জুন-জুলাইতে কেন তুমিএদিক মাড়াওনি। এখানে ওখানে দেখা হলে বলতে, ভয়ানক কাজ। ওই তিন মাস তুমি ওর সঙ্গেই ছিলে!

    অমিয়॥ কিন্তু শীলা, সে ঐ তিন মাসেই শেষ হয়ে গেছে। তারপর এতদিন কেটে গেছে, একবারও তার সঙ্গে দেখা হয়নি আমার। সত্যি বলছি শীলা, তুমি বিশ্বাস কর, এ আত্মহত্যার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই!

    শীলা॥ আধঘন্টা আগে আমারও ঐ ধারণা ছিল। আমারও মনে হয়েছিল, এ ব্যাপারের সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই!

    অমিয়॥ সম্পর্ক তো নেই। কিন্তু দোহাই তোমার, এসব কথা যেন ঐ সাব-ইন্সপেক্টরটাকে বলো না।

    শীলা॥ কি কথা বল তো? তুমি মেয়েটিকে জানতে, এই?

    অমিয়॥ হ্যাঁ, ওটা তোমার আমার মধ্যেই থাক—

    শীলা॥ (অদ্ভুতভাবে হাসিয়া উঠিয়া) তুমি কি বোকা অমিয়! সাব-ইন্সপেক্টর এ সমস্ত কথা জানে! আর শুধু এটুকু কেন? হয়ত দেখ—এমন অনেক কথা জানে, যা আজও আমরাই জানি না! দেখে নিও তুমি — এ যদি ঠিক না হয় তো কি বলেছি! (এতক্ষণ অমিয়র কাছে নিজেকে বড় ছোট মনে হইতেছিল। এবার অমিয়র মুখ শুকাইয়া গিয়াছে দেখিয়া তাহার মুখে বেশ একটু হাসিও ফুটিয়া উঠিল। ঠিক এমন সময় দরজা খুলিয়া সাব-ইন্সপেক্টরের আবির্ভাব।)

    তিনকড়ি॥ (দুইজনের মুখের উপর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া অমিয়কে প্রশ্ন করিলেন) তারপর মিষ্টার বোস?

    (এই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে পর্দাও নামিয়া আসিল।)

  • দ্বিতীয় অঙ্ক

    দ্বিতীয় অঙ্ক

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায়

    [book]

    দ্বিতীয় অঙ্ক

    (প্রথম অঙ্কের শেষই দ্বিতীয় অঙ্কের আরম্ভ। ঘরের ভিতর শীলা ও অমিয়। দরজার নিকট তিনকড়িবাবু।)

    তিনকড়ি॥ (শীলা ও অমিয়র মুখের উপর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া, দরজা খোলা রাখিয়া অমিয়র দিকে অগ্রসর হইয়া আসিতে আসিতে) — তারপর, মিস্টার বোস?

    শীলা॥ (বিকারগ্রস্তের ন্যায় হাসিয়া উঠিয়া) দেখেছ অমিয়? আমি ঠিক বলেছি—

    তিনকড়ি॥ (শীলাকে) কিছু বলেছেন বুঝি ওঁকে? কি বলেছেন বলুন তো?

    অমিয়॥ দেখুন তিনকড়িবাবু—মানে আমি বলছিলাম কি, (বেশ চেষ্টা করিয়া নিজেকে আয়ত্তের মধ্যে আনিয়া) আমি বলছিলাম কি, মিস সেনকে এসবের মধ্যে টেনে আনাটা আর উচিত হবে না। আপনাকে যা বলবার ছিল, তা তো উনি বলেই দিয়েছেন। আজ সারাদিন ওঁর ঘোরাঘুরিও বড় কম হয়নি। তার ওপর সন্ধ্যেবেলা আজ এখানে একটা পার্টি গোছের ছিল। এর চেয়ে বেশি স্ট্রেন ওঁর নার্ভে সইবে বলে আমার তো মনে হয় না। আর আপনিও তো দেখছেন—মানে ধরুন যদি—

    শীলা॥ (হাসিয়া) মানে, উনি বলছেন আমি যদি অজ্ঞান-টজ্ঞান হয়ে যাই—

    তিনকড়ি॥ হবেন বলে মনে হচ্ছে নাকি?

    শীলা॥ ঠিক বলতে পারছি না। হলেও হতে পারি!

    তিনকড়ি॥ তাহলে আপনি যেতে পারেন। আমার আর আপনাকে কোনো প্রয়োজন নেই।

    শীলা॥ কিন্তু আপনার এনকোয়ারি তো এখনও শেষ হয়নি?

    তিনকড়ি॥ না।

    শীলা॥ (অমিয়কে) দেখেছ, আমি বলেছিলাম। (তিনকড়িকে) কিন্তু তাহলে তো আমি যাব না—আমি এখানেই থাকব।

    অমিয়॥ কিন্তু কেন? এসব unpleasant ব্যাপারের মধ্যে থেকে লাভটা কি?

    তিনকড়ি॥ ও, আপনিও তাহলে এই কথাই বলেন? মেয়েদের এসব unhpleasant ব্যাপার থেকে দূরে সরিয়ে রাখাই ভালো?

    অমিয়॥ যদি সম্ভব হয় নিশ্চয় ভালো।

    তিনকড়ি॥ আমরা সবাই কিন্তু একটি মেয়েকে জানি — যাকে খুবই unpleasant কতকগুলো ব্যাপার থেকে দূরে সরিয়ে রাখার কোনো চেষ্টাই করা হয়নি।

    অমিয়॥ এটা বোধহয় আমার পাওনা ছিল, কি বলেন তিনকড়িবাবু?

    শীলা॥ কিন্তু সাবধান অমিয়—এর পরের পাওনাটা হয়তো আর সহ্য করতে পারবে না।

    অমিয়॥ কিন্তু শীলা, আমি বলছিলাম এখানে থেকে সত্যিই তোমার কোনো লাভ হবে না। এখন তো খারাপ লাগছেই — পরে আরও খারাপ লাগবে।

    শীলা॥ কিন্তু যা হয়েছে— তার থেকে আর খারাপ কি হবে? বরং এখানে থাকলে হয়তো একটু ভালো হলেও হতে পারে।

    অমিয়॥ (তিক্তস্বরে) ও, বুঝেছি—

    শীলা॥ কি বুঝলে?

    অমিয়॥ তোমার নিজের এনকোয়ারি হয়ে গেছে, এখনতুমি দেখতে চাও আমার অবস্থাটা কি হয়!

    শীলা॥ (তিক্ত স্বরে) ও, আমার সম্বন্ধে তাহলে তোমার এই ধারণা! যাক, ভালোই হল — সময় থাকতে জানিয়ে দিয়ে ভালোই করলে।

    অমিয়॥ না না, আমি ওকথা মীন করিনি—

    শীলা॥ (বাধা দিয়া) মীন করোনি মানে? নিশ্চয় মীন করেছ! যদি তুমি সত্যিই আমাকে ভালোবাসতে, তাহলে বলতে পারতে ওকথা? কখখনো বলতে পারতে না! বেশ একটা মজার গল্প শুনেছ-শুনেছ যে আমি একটা মেয়ের চাকরি খেয়েছি। এখন আমাকে কত কি বলে মনে হবে! মনে হবে আমি একটা ইতর—আমি একাট ছোটলোক—আমি একটা স্বার্থপর!

    অমিয়॥ কখ্‌খনো না, ওসব কথা আমার মনেই হয়নি।

    শীলা॥ নিশ্চয় হয়েছিল! তাই যদি না হবে, তবে কেন ওকথা বললে? — আমার হয়ে গেছে বলে আমি তোমার অবস্থা দেখে মজা পাব?

    অমিয়॥ বেশ, ভালো কথা! I am sorry।

    শীলা॥ হ্যাঁ সরি ঠিকই—কিন্তু ঐ সরি পর্যন্তই। আমার কথা তুমি মোটেই বিশ্বাস করোনি—

    তিনকড়ি॥ (গম্ভীর স্বরে) মিস সেন! (শীলাকে থামিতে ইঙ্গিত করিয়া, অমিয়কে) আমি আপনাকে বলতে পারি কেন উনি এখানে থাকতে চেয়েছেন, আর কেনই বা উনি বললেন—এখানে থাকলে হয়তো ওঁর মনটা একটু ভালো হলেও হতে পারে। একটি মেয়ে আজ একটু মারা গেছে। সুন্দর ফুটফুটে একটি মেয়ে—কারো এতটুকু ক্ষতি সে কোনদিন করেনি। কিন্তু তবু তাকে মরতে হল যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে। ঘেন্নায়, লজ্জায় নিজেকে শেষ করে দিতে হল!

    শীলা॥ (কাতর স্বরে) দোহাই আপনার, আর বলবেন না! আমি এমনিতেই ভুলতে পারছি না!

    তিনকড়ি॥ (শীলার কথা গ্রাহ্য না করিয়া) কিন্তু একটু আগে, মিস সেন জানতে পেরেছেন, এই আত্মহত্যার খানিকটা দায়িত্ব তাঁর ওপরও গিয়ে পড়েছে। এখন যদি তিনি এ ঘরে না থাকেন, যদি আমার এনকোয়ারির বাকিটা না শোনেন, তাহলে তাঁর মনে হবে, হয়তো সমস্ত দোষটা তাঁরই। এ শুধু আজ বলে নয়, দিনের পর দিন — যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন, ততদিন এ দায়িত্বের গুরুভার তাঁকেই বয়ে বেড়াতে হবে।

    শীলা॥ (ব্যাকুলস্বরে) হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন! আমি জানি দোষ আমারও আছে—কিন্তু তাই বলে সবটা নয়! মেয়েটির আত্মহত্যার জন্যে আমিও দায়ী। কিন্তু দায়িত্বটা কি শুধু আমার একারই? কখখনো না—এ আমি বিশ্বাস করি না!

    তিনকড়ি॥ (দু’জনকেই কঠোরভাবে) এখন বুঝতে পারছেন—’আমি একা’ বলে কিছু নেই—আমরা সবাই সবায়ের ভাগীদার? ভাগ করার যদি কিছুও না থাকে, তাহলে অন্তত অপরাধের দায়-দায়িত্বটাও ভাগ করে নিতে হয়!

    শীলা॥ (একদৃষ্টিতে সাব-ইন্সপেক্টরকে দেখিতে দেখিতে) হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। কিন্তু দেখুন—আমি আপনাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না—

    তিনকড়ি॥ অকারণে আমাকেই বা বুঝতে যাবেন কেন? (তিনকড়িবাবুর শান্ত দৃষ্টি গিয়া পড়িল শীলার মুখের উপর। শীলার মুখে চোখে ফুটিয়া উঠিল বিস্ময় ও সন্দেহ। ঠিক এমন সময় রমা সেনের প্রবেশ। তাঁহার মুখে চোখে একটা আত্মপ্রত্যয়ের ভাব। যে ঘটনা এখানে ঘটিতেছে তাহার পটভূমিকায় তাঁহাকে যে একেবারেই মানাইতেছে না, ইহা বুঝিতে শীলার বিশেষ দেরি হইল না।)

    রমা॥ (মুখে হাসি ফুটাইয়া) ও, আপনি এসেছেন থানা থেকে? নমস্কার।

    তিনকড়ি॥ (নমস্কার করিয়া) আজ্ঞে হ্যাঁ। পদ্মপুকুর  থানা থেকে আসছি, নাম তিনকড়ি হালদার—সাব-ইন্সপেক্টর।

    রমা॥ দেখুন তিনকড়িবাবু—আমার স্বামী—মানে মিস্টার সেনের কাছ থেকে আমি সব ব্যাপারটা শুনলাম। অবশ্য আপনাকে সাহায্য করতে পারলে আমি নিশ্চয়ই করতাম—কিন্তু এ ব্যাপারে আমাদের কিছু করবার আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।

    শীলা॥ (শঙ্কিত কণ্ঠস্বরে) মা!

    রমা॥ (অতিমাত্রায় বিস্মিত হইয়াছেন এইরূপ ভান করিয়া) কি রে, কি হল?

    শীলা॥ (ইতস্তত করিতে করিতে) না—মানে—

    রমা॥ মানে? মানে কিসের?

    শীলা॥ মানে আর কি? একেবারে গোড়াতেই তুমি ভুল করছ কিনা, তাই বলছি। শেষকালে দুমদাম করে কোথায় কি বলে বসবে—পরে যখন হুঁশ হবে, তখন দেখবে, আর হায় হায় করেও কোনো কুল পাচ্ছ না!

    রমা॥ (শীলাকে) কি সব আবোলতাবোল বকছিস বল তো?

    শীলা॥ আমরাও ঠিক ঐ ভুলটাই করেছিলাম মা। ভেবেছিলাম, কোথায় কি হল না হল তাতে আমাদের কি! কিন্তু যেই উনি মুখ খুললেন—সব বদলে গেল!

    রমা॥ (তিনকড়িবাবুকে) আপনি দেখছি আমার মেয়ের মনে বেশ একটা ছাপ ধরিয়ে দিয়েছেন!

    তিনকড়ি॥ ওটা কিন্তু আপনার মেয়ে বলে নয়—ঐ বয়সী প্রায় মেয়েদের বেলাই হয়। ওঁদের তো ছাপ নেবারই বয়স। (দেখা গেল, তিনকড়িবাবুরও মিসেস সেনের দৃষ্টি পরস্পরের মুখের উপর নিবদ্ধ, কিন্তু সে বোধহয় মুহূর্তের জন্য।)

    রমা॥ (শীলাকে) আচ্ছা, এখন এসব আবোলতাবোল কথা ছেড়ে শুতে যা দেখি। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে—

    শীলা॥ না মা, তা হয় না। একটু আগে তিনকড়িবাবুও আমাকে এঘর থেকে যেতে বলেছিলনে। কিন্তু আমি যাইনি। কেন মেয়েটিকে মরতে হল তা আমায় জানতেই হবে। না জেনে এঘর থেকে যাওয়া আমার হতেই পারে না!

    রমা॥ আশ্চর্য! এই বাজে কৌতূহলের কোনো মানে হয়!

    শীলা॥ না মা, এটা মোটেই বাজে কৌতূহল নয়—

    রমা॥ মুখের ওপর চোপা করিস না শীলা! আমি বলছি, তোর এঘরে থাকার কোনো মানেই হয় না! আর তাছাড়া, মেয়েটা কেন অ্যাসিড খেয়েছে, তা আমরা কি করে জানব? ওসব মেয়েদের আবার…

    শীলা॥ (বাধা দিয়া) তুমি কি কিছুতেই শুনবে না মা? কেন তুমি এইসব কথাবার্তা বলছ?

    রমা॥ (বিরক্ত হইয়া) কি সব কথাবার্তা বলছি? দেখ শীলা—!

    শীলা॥ তুমি ভাবছ—আমরা আলাদা আর মেয়েটি আলাদা। কিন্তু তা হচ্ছে না মা! তোমার ও দেওয়ালের আড়াল বেশিক্ষণ থাকছে না, তিনকড়িবাবুর একটি কথায় এক্ষুনি চুরমার হয়ে যাবে!

    রমা॥ কি বলছিস তুই? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না! (তিনকড়িবাবুকে) আপনি পারছেন?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ — উনি ঠিক কথাই বলছেন।

    রমা॥ (ক্রুদ্ধ স্বরে) তার মানে?

    তিনকড়ি॥ মানে—আমি ওঁর কথা বেশ ভালোই বুঝতে পারছি। উনি ঠিক কথাই বলেছেন।

    রমা॥ দেখুন—যদি কিছু মনে না করেন, আপনার কথাবার্তার ধরনটা আমার কিন্তু বেয়াড়া বলে মনে হচ্ছে। (শীলা হাসিয়া উঠিলে) হেসে উঠলি যে বড়—হাসির কথাটা কি হল শুনি?

    শীলা॥ কি জানি মা, তোমার ঐ বেয়াড়া কথাটা বড় বেখাপ্পা শোনাল—তাই হেসে ফেললাম—

    রমা॥ অবশ্য উনি যদি কিছু মনে করেন — তাহলে—

    তিনকড়ি॥ (শান্ত কণ্ঠস্বরে) আজ্ঞে না। মনে করাটা আমার ডিউটির বাইরে।

    রমা॥ অবশ্য মনে করার কথা আমাদেরই।

    তিনকড়ি॥ দেখুন—ও মনে করা-করির ব্যাপারটা বাদ দিলে হয় না?

    অমিয়॥ আমি তাই বলি—

    রমা॥ না—মানে—

    শীলা॥ থাক না মা ও কথা—

    রমা॥ আচ্ছা, কথা হচ্ছে ওঁতে আমাতে—তোরা কেন কথা বলছিস বল তো? দেখুন, আপনি বললেন, আপনি এখানে এসেছেন একটা এনকোয়ারি করতে। কিন্তু যা শুনলাম, আর যা দেখছি—তাতে আপনার এনকোয়ারির ধরনটা খুবই বেয়াড়া বলে মনে হচ্ছে। আপনি বোধহয় আমার স্বামীকে—মানে, মিস্টার সেনকে খুব ভালো করে জানেন না। এমনিতে তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি তো যথেষ্ট আছেই, তার ওপর আবার হয়তো দু-পাঁচ মাসের মধ্যে মিনিস্টার-টিনিস্টারও হয়ে যেতে পারেন—অন্তত এম.এল.এ যে হবেন, তাতে তো কোনো সন্দেহই নেই! আর রমেশ—রমেশকে তো জানেনই—সে আবার আমাদের ভাগনে—

    শীলা॥ (শঙ্কিত কণ্ঠস্বরে) কি পাগলের মতো যা তা বকছ মা! দোহাই তোমার, একটু চুপ করো—

    তিনকড়ি॥ (মিসেস সেনকে) আপনি যা যা বললেন, সবই আমি জানি। এখন মিস্টার সেনকে যদি একটু খবর পাঠান, তাহলে বড় ভালো হয়।

    রমা॥ তিনি এক্ষুনি আসছেন। আমার ছেলে—মানে তাপস—মানে— (থামিয়া গেলেন)

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ বলুন—কি হয়েছে তাঁর?

    রমা॥ না, মানে হয়নি কিছু—সারাদিন ঘোরাঘুরি গেছে—তার ওপর সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে একটা ছোটখাট পার্টি গোছের ছিল, তাই…

    তিনকড়ি॥ (বাধা দিয়া) আচ্ছা—তাপসবাবু মদ খান তো?

    রমা॥ মদ? তাপস? কি বলছেন আপনি? ঐটুকু বাচ্চা ছেলে মদ খাবে কি?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে না, বাচ্চা তো নয়। বছর পঁচিশেক বয়স হবে। ও বয়সের অনেক ছেলেকে আমি বোতল-বোতল মদ খেতে দেখেছি!

    শীলা॥ ছোড়দা তাদেরই মধ্যে একজন তিনকড়িবাবু।

    রমা॥ শীলা!

    শীলা॥ আচ্ছা মা, এ না জানার ভান করে লাভটা কি? এটা কি তোমার মিসেস তলাপাত্রর বাড়ির পার্টি — যে রেখে-ঢেকে কথা বলছ? এখানে যত ঢাকবে, বিপদ তত বাড়বে। আর একটু পরেই হয়তো দেখবে ছোড়দা এমন জালে জড়িয়ে আছে আর বিন্দু-বিসর্গও আমরা কেউ জানি না। (তিনকড়িকে) না তিনকড়িবাবু— ছোড়দা আজ বছর ছয়েক ধরে ড্রিঙ্ক করছে আর বেশ রীতিমতো ভাবেই করছে। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে এক একদিন রাতে বেশ মাতাল হয়েই বাড়ি ফেরে। আমি দরজা খুলে দিই কিনা।

    রমা॥ কখ্‌খনো না—মিথ্যে কথা। আচ্ছা, তুমিই বলো অমিয়—তাপস মদ খায়?

    অমিয়॥ দেখুন সত্যি কথা বলতে কি—আমার চোখে বড় একটা পড়েনি। তবে বাইরে যা শুনি—তাতে তো মনে হয় আজকাল ডিঙ্কের মাত্রাটা খুবই বাড়িয়েছে।

    রমা॥ (তিক্তস্বরে) এ কথাটা কি এখানে না বললে চলত না বাবা?

    শীলা॥ না মা, না বললে সত্যিই চলত না! এ কথাটা বলার এইটাই তো ঠিক সময়। এইজন্যেই তো তোমাকে বলেছিলাম, দেয়াল তোলবার চেষ্টা করো না—ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে—

    রমা॥ কিন্তু চুরমারটা তো উনি করছেন না—সেটা তো করছিস তুই!

    শীলা॥ হ্যাঁ। কিন্তু বুঝতে পারছ না—উনি তো এখনও আরম্ভই করেননি!

    রমা॥ (নিজেকে আয়ত্তের মধ্যে আনিয়া) আরম্ভ করলে হবেটা কি শুনি? করুন না ওঁর যা জিজ্ঞেস করবার আছে—আমি তো তৈরি হয়েই আছি। আর কি জিজ্ঞেসটা করবেন উনি আমাকে? আমি জানি কিছু, যে বলব?

    তিনকড়ি॥ (গম্ভীরভাবে) হয়তো কিছু জানেন। তার হিসেবটা আপনার টার্ন এলেই নেব।

    রমা॥ (বিস্মিত ও হতভম্ব অবস্থায়) ও, তাই নাকি— (মিস্টার সেন প্রবেশ করিয়া দরজাটা আবার বন্ধ করিয়া দিলেন।)

    চন্দ্রমাধব॥ (কণ্ঠস্বরে বিরক্তির আভাস) তাপসটাকে পঞ্চাশবার বললাম শুতে যা, কিছুতে গেল না! বলে, আপনি নাকি তাকে জেগে থাকতে বলেছেন?

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ।

    চন্দ্রমাধব॥ কারণটা জানতে পারি কি?

    তিনকড়ি॥ নিশ্চয় পারেন। তাঁকে আমার দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করবার আছে।

    চন্দ্রমাধব॥ তাপসকেও আপনার কথা জিজ্ঞেস করবার আছে? আশ্চর্য। আমার তো মাথাতেই আসছে না, তাপসের সঙ্গে আপনার কি কথা থাকতে পারে।

    তিনকড়ি॥ আপনার মাথাতে তো আসবে না। জিজ্ঞেস করব তো আমি।

    চন্দ্রমাধব॥ (গরম সুরে) তাহলে দয়া করে সেটা এখন করে নিন—করে ছেলেটাকে ছেড়ে দিন।

    তিনকড়ি॥ কিন্তু এখন তা নয়। I am sorry—তাঁকে ওয়েট করতেই হবে।

    চন্দ্রমাধব॥ দেখুন তিনকড়িবাবু—

    তিনকড়ি॥ আমি তো বলে দিয়েছি—তাঁর টার্ন না এলে নয়।

    শীলা॥ (মিসেস সেনকে) দেখলে তো মা?

    রমা॥ না, আমি কিচ্ছু দেখিনি! তুই থামবি!

    চন্দ্রমাধব॥ দেখুন তিনকড়িবাবু আমি আগেও আপনাকে বলেছি, এখনও বলছি—কি আপনার কথাবার্তা, কি আপনার এনকোয়ারি, কোনোটাই আমার পছন্দ নয়। আমি এতক্ষণ আপনাকে চান্স দিয়েছি কিন্তু আর নয়।

    শীলা॥ (কিছুটা অপ্রকৃতিস্থের ন্যায় হাসিয়া উঠিয়া) তুমি ভুল করলে বাবা, চান্স তো উনিই আমাদের দিচ্ছেন! আমাদের লজ্জা পাবার কোনো চান্সই তো কোনোদিন ছিল না, সেটা উনিই করে দিচ্ছেন!

    চন্দ্রমাধব॥ শীলার কি হয়েছে বলো তো?

    রমা॥ হবে আবার কি? মাথা গরমের ধাত! ও তো বরাবরই ঐরকম। কোথাও একটু কিছু শুনল তো মেয়ের একেবারে খাত ছেড়ে গেল। বলছি তখন থেকে — ওরে শুতে যা, তো কে কার কথা শোনে! (হঠাৎ তিনকড়িবাবুর দিকে ফিরিয়া ক্রুদ্ধস্বরে) আপনি চুপ করে শুনছেন কি? বলুন, আপনার কি জানবার আছে?

    তিনকড়ি॥ (গম্ভীরভাবে, এতটুকু বিচলিত না হইয়া) গেল বছর জানুয়ারির শেষে এই সন্ধ্যা চক্রবর্তীর আবার চাকরি যায়। কেন? না, মিস সেন নিজের ওপর একটু বিরক্ত হয়েছিলেন বলে। এর পরেও এধার ওধার চাকরির চেষ্টা সে করেছিল কিন্তু পায়নি। তখন ঠিক করলে নামটা বদলে একটু রকমফের করে দেখবে। (হঠাৎ অমিয়র দিকে ফিরিয়া) সন্ধ্যা চক্রবর্তীর নাম বদলে হল

    অমিয়॥ (ফস করিয়া বলিয়া ফেলিল) ঝরনা রায়। (শীলা উচ্চহাস্য করিয়া উঠিল, অমিয়র থতমত অবস্থা।)

    তিনকড়ি॥ আজ্ঞে হ্যাঁ। এখন বলুন তো মিস্টার বোস, এই ঝরণা রায়ের সঙ্গে কবে আপনার প্রথম দেখা হয়েছিল?

    অমিয়॥ (নিজেকে আয়ত্তে আনিবার চেষ্টা করিয়া) না মানে—

    শীলা॥ মিছিমিছি সময় নষ্ট করে কোনো লাভ নেই অমিয়—

    অমিয়॥ বেশ, তাহলে শনুন। ঝরনার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় গেল বছর মার্চ মাসে প্যালেস ম্যাসেজ ক্লিনিকে, মানে পার্ক স্ট্রীটের ঐ ম্যাসজে ক্লিনিকটা—

    শীলা॥ ওটা যে পাক স্ট্রীটে, শ্যামবাজারে নয় তা বোধহয় উনি জানেন অমিয়—

    অমিয়॥ থ্যাঙ্কস শীলা। (হঠাৎ চটিয়া উঠিল) আচ্ছা শীলা, তোমার যা বলার ছিল, তা তো বলা হয়ে গেছে। এখন এখানে থেকে লাভটা কি? এসব কথা তোমার খুব ভালোও লাগবে না—

    শীলা॥ ভালো না লাগলেও আমাকে এখানে থাকতে হবে অমিয়।

    অমিয়॥ (অসহিষ্ণু হইয়া) কিন্তু কেন?

    শীলা॥ বাঃ, খুব কাজ ছিল বলে, গেল বছর মে-জুন-জুলাই তুমি একেবারে এদিক মাড়াওনি! এরপর যখন এ রকম হবে, তখন অন্তত বুঝব যে তোমার একটা কাজ আছে, আর সে কাজটাও যে কি রকম তারও একটা আন্দাজ পাব!

    তিনকড়ি॥ (শীলাকে থামাইয়া দিয়া) আচ্ছা থাক ও কথা— আপনাদের ঝগড়াটা না হয় পরেই সারবেন। (অমিয়কে) তারপর মিস্টার বোস? প্যালেস ম্যাসেজ ক্লিনিকে আপনার সঙ্গে ঝরনা রায়ের প্রথম দেখা— কেমন?

    অমিয়॥ (অল্প ইতস্তত করিতে করিতে)—মানে—ওসব জায়গায় আমি এমনিতে বড় একটা—

    তিনকড়ি॥ বুঝেছি অমিয়বাবু—আপনি ওসব জায়গায় এমনিতে বড় একটা যান না। কিন্তু সেদিন গিয়েছিলেন—

    অমিয়॥ হ্যাঁ—মানে, শরীরটা ঠিক ফিট মনে হচ্ছিল না। তাই মনে হল একবার ঘুরেই আসি। ম্যাসেজের পর ঘর থেকে বেরিছি এমন সময় মানে—জানেনই তো—ওসব জায়গায় ঐ টাইপের মেয়েই বেশি আসে—

    রমা॥ (কৌতূহলী হইয়া) ঐ টাইপের মেয়ে—?

    তিনকড়ি॥ যাকগে, টাইপটা এখন নাই বা আলোচনা করলেন। বিশেষ করে ওঁর সামনে—(শীলাকে দেখাইয়া দিলেন)

    রমা॥ (চটিয়া উঠিয়া) আমি যে তখন থেকে বলছি — শীলা, তুই এঘর থেকে যা!

    শীলা॥ তুমি ভুলে যাচ্ছ মা—আজ বাদে কাল অমিয়র সঙ্গে আমার বিয়ে!—তারপর অমিয়? ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছ, এমন সময় জানতে পারলে ওখানে ঐ টাইপের মেয়েরাই বেশি আসে—তারপর?

    অমিয়॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) খুব মজা লাগছে শুনতে—না শীলা! আচ্ছা শীলা, তোমার এতটুকু লজ্জা করছে না—

    তিনকড়ি॥ (বাধা দিয়া) Come along মিস্টার বোস, তারপর?

    অমিয়॥ না—মানে বেরিয়ে এসেছি—এমন সময় দেখি—মানে—ঐ মেয়েটি—মানে ঝরনা—একেবারে সামনে—(কিছুটা আত্মবিস্মৃতের ন্যায়) রঙ ফরসা, ঘন কালো চুল, টানা চোখ—(হঠাৎ থামিয়া গিয়া)—My god!

    তিনকড়ি॥ কি হল মিস্টার বোস?

    অমিয়॥ না, মানে—আমার ঠিক মনে ছিল না—

    তিনকড়ি॥ (রূঢ়স্বরে) যে মেয়েটি একটু আগে মারা গেছে, এই তো সে?

    শীলা॥ আর আমরাই তাকে মেরেছি, তাই না?

    রমা॥ শীলা!

    শীলা॥ তুমি চুপ করো মা!

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ, ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখেন ঐ মেয়েটি—তারপর?

    অমিয়॥ দেখি আমাদের ধীরেশ তার একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরেছে। আর মেয়েটি প্রাণপণ চেষ্টা করছে তাকে বাধা দেবার। তার মুখ চোখের ভাব দেখে মনে হল, ম্যাসাজ ক্লিনিকে খুব বেশি দিন সে আসেনি—

    রমা॥ কিন্তু ধীরেশ? কোন ধীরেশ, অমিয়?

    অমিয়॥ আমাদের ধীরেশ, কাকিমা—এস, এন-এর ছেলে—

    রমা॥ সত্যি?

    শীলা॥ হ্যাঁ মা, সত্যি। তুমি ভাব, বোকা-বোকা মুখ করে খোনে আসে, তোমাকে কাকীমা-কাকীমা করে, চা-টা খায়—অয়ন ছেলে আর হয় না। আমরা তো এসব ব্যাপার বহুদিন জানি! পাশের বাড়ির প্রতিভাদিকে চেনো?

    রমা॥ কে প্রতিভা! ও—ঐ স্কুল-মিস্ট্রেস?

    শীলা॥ হ্যাঁ। প্রতিভাদি ধীরেশের ছোট বোনকে পড়াত। দু-মাস পরে টিউশান ছেড়ে দিতে হল। কেন জানো? তোমাদের ঐ এস, এন-এর ছেলে দীরেশ দু-একদিন তার হাত ধরে—

    চন্দ্রমাধব॥ (জোর ধমক দিয়া উঠিলেন) শীলা! (শীলা থামিয়া গেল)

    তিনকড়ি॥ (অমিয়কে) আপনি থামলেন কেন? বলে যান—

    অমিয়॥ মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে আমার যেন কি রকম মায়া হল। ধীরেশের হাত থেকে ছাড়িয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তাকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম—

    তিনকড়ি॥ সেদিন কোথায় উঠলেন?

    অমিয়॥ পাশের রয়াল হোটেলে।

    তিনকড়ি॥ কিছু কথাবার্তা হয়নি?

    অমিয়॥ হয়েছিল—তবে অল্প। নাম বললে ঝরনা রায়। কথায়-কথায় জানতে পারলাম, বাপ-মা কেউ নেই। আগে চাকরি করত, দু-দু’বার চাকরি যাওয়ায় কোথাও কিছু না পেয়ে, শেষে এই ম্যাসাজ ক্লিনিকে চাকরি নেয়। ম্যাসাজ ক্লিনিকের ব্যাপার যে খানিকটা জানত না তা নয়—জানত। কিন্তু অন্য কিছু না পেয়ে ওখানে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এদিকে কথা বলে খুব কম। আমাকে তো আগের কথা কিছু বললেই না—আমিও অবশ্য জোর করিনি। তবে কথার ফাঁকে শুধু এইটুকু জানতে পারলাম—হাতে টাকা-পয়সা কিচ্ছু নেই। না আছে আত্মীয়স্বজন, না আছে বন্ধুবান্ধব। কি জানি কেন বড্ড মায়া হল। হাতে কিছু টাকা দিয়ে আর ঐ হোটেলেই দিন পনেরো থাকবার ব্যবস্থা করে দিয়ে সেদিনের মতো আমি চলে এলাম।

    তিনকড়ি॥ তারপর—দিন পনেরো বাদে আপনি ঠিক করলেন—মেয়েটিকে আপনার নিজের কাছেই রাখবেন—এইতো?

    রমা॥ অমিয়!

    শীলা॥ এতে অবাক হওয়ার কিছু তো নেই, মা! গল্পের গোড়া দেখলেই তো শেষটা বোঝা যায়।—যাকগে অমিয়, তুমি বলো—মা তো একটু চমকাবেই!

    অমিয়॥ পনেরো দিন বাদে আবার আমাদের দেখা হয়। সেদিন কি জানি কেন মনে হল, একা এই নিঃসঙ্গ অবস্থায় তাকে ছেড়ে যাওয়া খুবই অন্যায়। সে-সময় আমার এক বন্ধু মাস-পাঁচেকের জন্যে বম্বে গিয়েছিলেন। তাঁর ফ্ল্যাটের চাবিটা আমার কাছে ছিল।আমি তাকে ঐ ফ্ল্যাটটায় এনে রাখলাম। কিন্তু বিশ্বাস করুন তিনকড়িবাবু, কোনো অভিসন্ধি আমার ছিল না। আমি শুধু তার একটু উপকার করতেই চেয়েছিলাম—কোনো প্রতিদান আমি চাইনি—

    তিনকড়ি॥ ও—

    শীলা॥ (নিজের দিকে ইঙ্গিত করিয়া) দেখ অমিয়—কাকে বলার কথা, আর কাকে বলছ—

    অমিয়॥ I am sorry শীলা, মানে—

    শীলা॥ না না, মানে আমি বুঝি অমিয়—তুমি তো বলছ না, উনি তোমাকে দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছেন—

    তিনকড়ি॥ আচ্ছা, তারপর থেকে ঝরনা আপনার সঙ্গেই রয়ে গেল — কেমন?

    অমিয়॥ (হঠাৎ ক্রদ্ধস্বরে) সেটাও কি আপনাকে জিজ্ঞেস করে জানতে হবে? কিচ্ছু বোঝেন না আপনি?

    তিনকড়ি॥ বুঝি বই কি, তার দিকটা বেশ ভালো করেই বুঝি। একা অসহায় স্ত্রীলোক। আপনিই বোধহয় তার জীবনের প্রথম বন্ধু! কিন্তু আপনি? আপনি কি সত্যিই তাকে ভালবেসেছিলেন?

    চন্দ্রমাধব॥ দেখুন তিনকড়িবাবু,—আমি চাই না, আমার বাড়িতে এসব কথাবার্তা হয়—

    তিনকড়ি॥ কিন্তু, আপনি না চাইলেও হচ্ছে। মেয়েটিকে আপনিই প্রথম তাড়িয়েছিলেন।

    চন্দ্রমাধব॥ সেটা শুধু আমি নয়, আমার মত যে কোনো এমপ্লয়ারই তাকে তাড়িয়ে দিত। যাকগে সে কথা। আমি চাই না আমার বাড়িতে, আমারই মেয়ের সামনে, এ ধরনের অভব্য কথাবার্তা হয়।

    তিনকড়ি॥ আপনার মেয়ে কিছু চাঁদের দেশে নেই—ইঁটকাঠের দুনিয়ায় তাকে পা ফেলে চলতে হয়!—হ্যাঁ, তারপর মিস্টার বোস—আপনি কি সত্যিই মেয়েটিকে ভালবেসেছিলেন?

    অমিয়॥ না—মানে, সে আমাকে—

    তিনকড়ি॥ না না, তার কথা আমি জানি। সে আপনাকে ভালবেসেছিল—কিন্তু আপনি?

    অমিয়॥ আমার একটা মোহ থাকা খুব অস্বাভাবিক কি?

    শীলা॥ আর এই মোহটা বোধহয় তোমার মাস তিনেক ছিল, না অমিয়? তাই বোধহয় তিন মাস এখানে আসতে পারোনি? ঐ যে, গেল বছরের মে-জুন-জুলাই?

    অমিয়॥ কিন্তু শীলাআমি তোমাকে মিথে কথা বলিনি। ঐ তিন মাস সত্যিই আমার কাজ খুব বেশি ছিল।

    শীলা॥ কিন্তু ওখানে বোধহয় তুমি রোজই যেতে?

    অমিয়॥ না, মোটেই যেতাম না—

    তিনকড়ি॥ কিন্তু প্রায়ই যেতেন তো?

    অমিয়॥ হ্যাঁ—

    রমা॥ ছিঃ অমিয়—যত সব ডিসগাস্টিং ব্যাপার—

    অমিয়॥ কিন্তু কাকীমা—আপনি ঠিক বুঝতে পারছেন না—

    রমা॥ তার মানে?

    তিনকড়ি॥ মানে, ব্যাপারটা আপনার কাছে ডিসগাস্টিং হলেও ওঁর কাছে নয়।

    অমিয়॥ আপনার আর কিছু জিজ্ঞেস করবার আছে?

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ—শেষে কি হল?

    অমিয়॥ অগস্টের শেষে হপ্তা দুয়েকের জন্যে আমার বাইরে যাবার কথা হয়। যাবার আগে বেশ ভালো করে ভেবে দেখলাম—দেখলাম আর জের টানার কোনো মানেই হয় না। আমার আসা-যাওয়া কম দেখে ঝরনাও বুঝতে পেরেছিল। একদিন তাকে সব খুলে বললাম—

    তিনকড়ি॥ কিভাবে নিলে সে?

    অমিয়॥ খুব সহজভাবে। আশ্চর্য এত সহজভাবে যে নেবে সে, তা ভাবতেই পারিনি!

    শীলা॥ (বঙ্গের সুরে) তোমার তো খুব ভালোই হল—

    অমিয়॥ তুমি কত কম বোঝ শীলা, অথচ কথাবলো কত বেশী! সে আমায় কি বলেছিল জানো? বলেছিল, এত সুখ সে জীবনে কোনোদিন পায়নি। জানো শীলা, ঝরনা আমার ওপর এতটুকু রাগ করেনি। জিজ্ঞেস করতে বলেছিল—রাগ করতে যাব কেন? আমি তো গোড়া থেকেই জানি এ-সুখ আমার সইবে না! (দুই হাতে চোখ ঢাকিয়া অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠস্বরে) ওঃ, আজ যদি সে একবারও ফিরে এসে বলে যেত—যত দোষ, সব তোমার অমিয়, যত দোষ সব তোমার!—তাহলে বোধহয় আমি বেঁচে যেতাম শীলা!

    তিনকড়ি॥ তারপর অমিয়বাবু—ঝরনাকে ঐ ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিতে হল, কেমন?

    অমিয়॥ হ্যাঁ, অবশ্য যাবার আগে আমি তাকে কিচু টাকা দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে নেয় নি। বললে—আমি যা দিতাম, তা থেকেই কিছু তার হাতে পড়ে আছে। আমি অনেক বললাম। কিছুতেই রাজী হল না। বলল, দু-একটা মাস, কোনো রকমে চলে যাবে—তার মধ্যে একটা-না-একটা কিছু জুটে তার যাবেই—

    তিনকড়ি॥ কোথায় যাবে, কিন্তু বলেছিল আপনাকে?

    অমিয়॥ না, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি। তবে কথার আভাসে মনে হয়েছিল বোধহয় কলকাতায় থাকবে না। — আপনি জানেন কিছু?

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ—মাসখানেকের জন্যে সে কলকাতার বাইরে চলে গিয়েছিল—নির্জন ছোট্ট একটা জায়গায়—

    অমিয়॥ একা?

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ, একা থাকবার জন্যেই তো গিয়েছিল। ছোট্ট নির্জন একটা জায়গা—বসে বসে সারাদিন ভাবত আপনার কথা, তার নিজের কথা—আর মনে রাখবার মতোঐ মে-জুন-জুলাইয়ের কথা—

    অমিয়॥ কিন্তু আপনি এসব কথা জানলেন কি করে?

    তিনকড়ি॥ ঐ যে বললাম—সে একটা ডায়েরি রেখে গেছে। সুদিনের খতা কে না মনে রাখতে চায় বলুন? দেখলে, সামনেই তার সময় খারাপ। তাই মনে রাখতে চায় বলুন? দেখলে, সামনেই তার সময় খারাপ। তাই সামনে না তাকিয়ে ঐ একটা মাস শুধু পেছনের কথাই ভাবলে—পেছনের ঐ তিনটে মাস।

    অমিয়॥ ও—কিন্তু এর পরের খবর তো আমি রাখি না—

    তিনকড়ি॥ আপনার কাছ থেকে এই খবরটাই আমি চেয়েছিলাম—এর পরেরটা নয়।

    অমিয়॥ দেখুন—তাহলে—মানে—আমি যদি এখন একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি—(তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল) অবশ্য আপনার যদি কোনো আপত্তি না থাকে—

    তিনকড়ি॥ কোথায় যাবেন? বাড়ি?

    অমিয়॥ না না, বাড়ি নয়—এই বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসব। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, আমি ঠিক ফিরে আসব।

    রমা॥ তার মানে? এখানেই তাহলে শেষ নয়?

    অমিয়॥ কি জানি কাকিমা, আমার তো মনে হয়— না। তারপর—উনি জানেন—(তিনকড়ির দিকে ইঙ্গিত করিয়া বাহির হইয়া গেল।)

    শীলা॥ কিন্তু তিনকড়িবাবু, আপনি তো ছবিটা অমিয়কে দেখালেন না?

    তিনকড়ি॥ দরকার মনে করলাম না—মনে হল, না দেখানোই ভালো।

    রমা॥ আপনার কাছে মেয়েটার ছবি আছে নাকি?

    তিনকড়ি॥ আছে। একবার দেখবেন নাকি?

    রমা॥ আমি কেন দেখতে যাব? দরকারটা কি আমার?

    তিনকড়ি॥ না, দরকার কিছু নেই। তবু একবার দেখলে পারতেন?

    রমা॥ আচ্ছা, কই দেখি—নিয়ে আসুন—(তিনকড়িবাবু মিসেস সেনের নিকট আসিয়া পকেট হইতে ছবি বাহির করিলেন। মিসেস সেনের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। মনে হইল খুব ভালো করিয়া ছবিটি দেখিতেছেন।)

    তিনকড়ি॥ (ছবিটি যথাস্থানে রাখিয়া) চিনতে পারছেন নিশ্চয়?

    রমা॥ তার মানে? আমি কি করে চিনব?

    তিনকড়ি॥ সে কি? ছবিটা অবশ্য আগেকার তোলা। মুখের চেহারা একটু-আধটু বদলাতেও পারে। কিন্তু তাই বলে এত বদলে গেল যে, একেবারে চিনতেই পারলেন না!

    রমা॥ দেখুন, আমি আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না। কি বলতে চান আপনি?

    তিনকড়ি॥ বুঝতে পারছেন না—না, বুঝতে চাইছেন না?

    রমা॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) তার মানে?

    তিনকড়ি॥ মানে, আপনি মিথ্যে কথা বলছেন।

    রমা॥ তিনকড়িবাবু, ভদ্রভাবে কথা বলতে চেষ্টা করুন—

    চন্দ্রমাধব॥ তার মানে? আগে উনি তোমার কাছে মাফ চাইবেন, তারপর অন্য কথা।

    তিনকড়ি॥ কিন্তু ভুল করছেন—যা করছি, তা আমার ডিউটি, তার জন্যে মাফ চাইব কেন?

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু গালাগাল দেওয়াটা আপনার ডিউটি নয়। আপনি আমাদের রাম-শ্যাম-যদু-মধু পেয়েছেন নাকি? আমরা শহরের একটা নামজাদা ফ্যামিলি, তা জানেন?

    তিনকড়ি॥ কিন্তু একটা কথা ভুলে যাচ্ছে মিস্টার সেন, নামজাদা হিসেবে আপনাদের যেমন সুবিধেও আছে, তেমনি দায়িত্বও কিছু আছে।

    চন্দ্রমাধব॥ তা হয়তো আছে। কিন্তু আপনাকে এখানে পাঠানো হয়েছে কি জন্যে? দায়িত্বের কথাটা আমাকে মনে করিয়ে দেবার জন্যে?

    শীলা॥ খুব ঠিক করে কিন্তু বলা যায় না বাবা—হয়তো তা হলেও হতে পারে—

    রমা॥ শীলা!

    শীলা॥ আচ্ছা মা, তোমরা যে এই বড়মানুষী ভড়ং দিয়ে ব্যাপারটাকে ঢাকবার চেষ্টা করছ, কোনো মানে হয় এর? পাঁচটা টাকা বেশি মাইনে চেয়েছিল বলে বাবা তাকে তাড়িয়ে দিলেন। আমার চেয়ে দেখতে ভালো বলে, আমি রেগে গিয়ে তার চেন স্টোরের চাকরিটা খেলাম। অমিয় তার খেয়ালখুশিমতো তাকে নিজের কাছে এনে রাখলে—আর যেই দরকার ফুরোল, তাকে বিদায় করে দিলে। আর তুমি? তুমি ছবিটা নিয়ে দেখলে! পরিষ্কার বোঝা গেল, তুমি চিনতে পেরেছ! তুমি চিনতে পেরেও বললে — চিনি না, অথচ ওঁকে বলছ মাফ চাইতে! কেন উনি মাফ চাইবেন?

    রমা॥ শীলা, তুই চুপ করবি! আমি যা ভালো বুঝেছি তাই বলেছি!

    শীলা॥ কিন্তু ভালো যে তুমি বোঝ নি মা। তোমার এ মিথ্যে ভড়ঙে ব্যাপারটা যে ক্রমশঃ খারাপের দিকে যাচ্ছে— (সদর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শোনা গেল)

    চন্দ্রমাধব॥ আঃ—আবার কে এল—?

    রমা॥ বোধহয় অমিয় ফিরে এল—

    তিনকড়ি॥ কিংবা দেখুন, হয়তো তাপসবাবু বাইরে গেলেন —

    চন্দ্রমাধব॥ আমি দেখে আসি, বুঝলে? (দ্রুত বাহির হইয়া গেলেন)

    তিনকড়ি॥ (রমাকে) আচ্ছা মিসেস সেন, আপনি তো নারীসহায়ক সমিতির প্রেসিডেন্ট—না? (মিসেস সেন চুপ করিয়া রহিলেন)

    শীলা॥ বলো মা—চুপ করে রইলে কেন? এটাতে তো হ্যাঁ বলতে কোনো বাধা নেই! (তিনকড়িকে) হ্যাঁ, উনি প্রেসিডেন্ট, কিন্তু কেন বলুন তো?

    তিনকড়ি॥ আচ্ছা, শুনেছি মেয়েরা বিপদে-আপদে পড়লে, আপনাদের কাছে আবেদন-টাবেদন করে—আপনারা নাকি নানারকম সাহায্য টাহায্য করে থাকেন—সত্যি?

    রমা॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) সাহায্য-টাহায্য নয়—দরকার হলে রীতিমতো টাকা পয়সাও দিই—এমন অনেক কেসে আমরা দিয়েছি!

    তিনকড়ি॥ আচ্ছা, হপ্তা-দুয়েক আগে আপনাদের একজিকিউটিভ কমিটির একটা মিটিং হয়ে গেছে, না?

    রমা॥ আপনি যখন বলছেন,—তখন হয়েছে নিশ্চয়—

    তিনকড়ি॥ (দৃঢ়স্বরে) আমি বলছি বলে নয়, আপনিও জানেন—হয়েছে। সে মিটিঙে আপনিই ছিলেন প্রেসিডেন্ট—

    রমা॥ যদি থাকিই প্রেসিডেন্ট, তাতে আপনার কি?

    তিনকড়ি॥ (কঠোর স্বরে) সাদা কথায় বলব আপনাকে? সহ্য করতে পারবেন?

    (চন্দ্রমাধবের প্রবেশ)

    চন্দ্রমাধব॥ বুঝলে, তাপসই—

    রমা॥ আশ্চর্য—কোথায় গেল বলো তো! এই বলছিল শরীরটা খারাপ—

    চন্দ্রমাধব॥ আরে শরীর খারাপ কি? তখন দেখলাম আবোল-তাবোল বকছে। বললাম — শুতে যা—তো কে কার কথা শোনে! বললে—ইন্সপেক্টর আমাকে জেগে থাকতে বলেছেন! আমি তবু বললাম—বলুক ইন্সপেক্টর—আমি বলছি, তোকে দরকার হবে না—

    তিনকড়ি॥ আপনি ভুল বলেছেন, মিস্টার সেন — তাঁকে আমার সত্যিই দরকার। আর তিনি যদি শিগগির না ফেরেন, তাহলে আমাকেই গিয়ে খুঁজে-পেতে নিয়ে আসতে হবে—(মিস্টার ও মিসেস সেন ভীতবাবে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিলেন)

    শীলা॥ (তিনকড়িকে) না না, ব্যস্ত হবার কিছু নেই। এখানেই কোথাও আছে—এক্ষুনি আসবে।

    তিনকড়ি॥ এলেই ভাল।

    রমা॥ কেন—ভাল কেন?

    তিনকড়ি॥ আগে আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিন, তারপর আমি আপনারটার দেব।

    চন্দ্রমাধব॥ আর যদি উনি না দেন—

    তিনকড়ি॥ উত্তর দিতে উনি বাধ্য—

    চন্দ্রমাধব॥ কেন—জানতে পারি কি?

    তিনকড়ি॥ নিশ্চয় জানতে পারেন। একটু আগে মিস্টার বোস বলে গেলেন, সেপ্টেম্বর মাস থেকে তাঁর সঙ্গে সন্ধ্যার আর দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। আমার মনে হয় কথাটা তিন মিথ্যে বলেন নি। কিন্তু মাত্র দু-হপ্তা আগে—(মিসেস সেনকে দেখাইয়া) ওঁর সঙ্গে তার দেখা হয়েছে—আর শুধু দেখাই হয়নি, কথাবার্তাও হয়েছে!

    শীলা॥ মা—!

    চন্দ্রমাধব॥ সত্যি রমা?

    রমা॥ (এক মুহূর্ত চুপ করিয়া থাকিয়া) হ্যাঁ।

    তিনকড়ি॥ সে এসে আপনাদের সমিতির কাছে সাহায্য চেয়েছিল?

    রমা॥ হ্যাঁ।

    নতকিড়ি॥ কিন্তু সন্ধ্যা চক্রবর্তী নামে নয়।

    রমা॥ না—ঝরনা রায় নামেও নয়।

    তিনকড়ি॥ তবে কি নামে?

    রমা॥ রেবা সেন।

    তিনকড়ি॥ আর কিছু বলেনি—বিয়ে হয়েছে, কি হয়নি—?

    রমা॥ প্রথমে তো বলেছিল—বিয়ে হয়েছে। সিঁথিতে সিঁদুরও ছিল।

    তিনকড়ি॥ তার স্বামীর নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন?

    রমা॥ কিন্তু বিয়ে তার মোটেই হয়নি—

    তিনকড়ি॥ যা জিজ্ঞেস করছি তাই বলুন। তার স্বামীর নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন?

    রমা॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) করেছিলাম কিন্তু বলেনি—

    তিনকড়ি॥ কোথায় বিয়ে হয়েছিল, জিজ্ঞেস করেছিলেন?

    রমা॥ করেছিলাম—

    তিনকড়ি॥ কি বলেছিল সে?

    রমা॥ কিন্তু বিয়ে তার—

    তিনকড়ি॥ (বাধা দিয়া) কি বলেছিল সে?

    রমা॥ প্রথমে সে কিছুই বলেনি। তারপর যখন তাকে বললাম, সমস্ত ঠিকানা না দিলে হবে না, তখন সে বললে — তার স্বামীর ঠিক নাম সে জানে না—তবে তার স্বামী কথায় কথায় একদিন বলেছিলেন যে, তিনি নাকি ঘুঘডাঙার সেন-বাড়ির ছেলে।

    চন্দ্রমাধব॥ সে কি?

    তিনকড়ি॥ (চন্দ্রমাধবকে) ঘুঘুডাঙার সেনেদের আপনি চেনেন নাকি?

    শীলা॥ আমরাই ঘুঘুডাঙার সেন, তিনকড়িবাবু।

    রমা॥ আরে—ঐ শুনেই তো আমার রাগ হয়ে গেল! মিথ্যে কথা কেন বললে?

    তিনকড়ি॥ আপনি তাহলে গোড়া থেকেই তার ওপর রেগে ছিলেন?

    রমা॥ রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক!

    তিনকড়ি॥ কিন্তু সেদিন কমিটিতে আপনি হ্যাঁ বললে সে নিশ্চয় সাহায্য পেত তাই না?

    রমা॥ তা হয়তো পেত।

    তিনকড়ি॥ হয়তোর কথা হচ্ছে না। আপনি হ্যাঁ বললে সে সাহায্য পেত কি না?

    রমা॥ হ্যাঁ, পেত। কিন্তু কেন হ্যাঁ বলব! প্রথমত সে মিথ্যে কথা বলেছিল—

    তিনকড়ি॥ কি করে জানলেন?

    রমা॥ জেরা করতে নিয়েই বলে ফেললে। তখন শুনলাম, তার বিয়েই হয়নি—আর ঘুঘুডাঙার সেন-বাড়ির নামটা তার প্রথমেই মনে এসেছিল, তাই বলেছিল!

    তিনকড়ি॥ সে সাহায্যটা চেয়েছিল কেন?

    রমা॥ সেটা তো আপনি নিজেও জানেন—

    তিনকড়ি॥ হ্যাঁ, আসল কারণটা জানি, কিন্তু আপনাদের ওখানে সে কি বলেছিল?

    রমা॥ এখানে সেটা আলোচনা করবার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না।

    তিনকড়ি॥ আপনি না মনে করতে পারেন, কিন্তু আলোচনা আপনাকে করতেই হবে!

    রমা॥ আমার সঙ্গে ওভাবে কথা বলে কোন লাভ হবে না, তিনকড়ি বাবু। একটা ব্যাপারে আপনি গোড়া থেকেই ভুল করছেন। লজ্জা পাবার মতো কোন কিছু আমি করিনি। মেয়েটি সাহায্যের জন্যে আমার কাছে এসেছিল। সোজা এসে সত্যি কথা বললে, হয়তো সে সাহায্য পেত। কিন্তু তা সে বলেনি। তাই কমিটি যাতে তাকে সাহায্য না করে, সেই ব্যবস্থাই আমি করেছিলাম। পরে হয়তো মেয়েটি আত্মহত্যা করতে পারে। কিন্তু তার জন্যে আমার লজ্জা পাবার কোন কারণই নেই! কাজেই, বুঝতে পারছেন — আমি যদি আর কথা বলব না বলে ঠিক করি, আপনার সাধ্য নেই আমাকে দিয়ে কথা বলান!

    তিনকড়ি॥ আমি কিন্তু আপনাকে দিয়ে কথা বলাতে পারি, সে ক্ষমতা আমার আছে।

    রমা॥ না, নেই! আমি কোন অন্যায় কাজ করিনি, কাজেই আপনার কোন জোর আমার ওপর খাটবে না।

    তিনকড়ি॥ কিন্তু ওখানেই আপনার ভুল, মিসেস সেন। আপনি যে শুধু অন্যায় করেছেন তাই-ই নয়—এমন একটা অন্যায় করেছেন, যার জন্যে সারা জীবন আপনাকে অনুতাপ করতে হবে। আজ যদি আপনি আমার সঙ্গে হসপিটালে যেতেন, তাহলে দেখতেন —

    শীলা॥ তিনকড়িবাবু—দোহাই আপনার, ও কথাটা না হয় থাক—

    তিনকড়ি॥ কিন্তু আপনি থাক বললেই কথাটা থাকছে না, মিস সেন। মেয়েটি মা হতে চলেছিল—

    শীলা॥ (আর্তস্বরে) তিনকড়িবাবু—কি বলছেন আপনি—(দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া) না, তিনকড়িবাবু, বলুন—বলুন, একথা সত্যি নয়! ওঃ—কি করে সে অ্যাসিড খেল!

    তিনকড়ি॥ কি করবে বলুন? এখান থেকে তাড়ায় ওখানে যায়, ওখান থেকে তাড়ায় এখানে আসে—এর শেষই তো এই!

    শীলা॥ তুমি জানতে মা?

    তিনকড়ি॥ নিশ্চয় জানতেন। ওই জন্যেই তো মেয়েটি ওঁদের কাছে গিয়েছিল।

    চন্দ্রমাধব॥ দেখুন—মানে, এর মধ্যে আমাদের অমিয় নেই তো?

    তিনকড়ি॥ না। তার সঙ্গে এ ব্যাপারের কোন সম্পর্কই নেই।

    চন্দ্রমাধব॥ (স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়া) যাক তবু ভাল—

    শীলা॥ এটুকু ভাল নাই বা হ’ত বাবা—

    তিনকড়ি॥ (মিসেস সেনকে) আপনার তাহলে আর কিছু বলবার নেই—কি বলেন?

    রমা॥ তাকে যা বলেছিলাম, আপনাকেও ঠিক তাই বলব। এ ব্যাপারে সত্যিই যার দায়িত্ব, তার খোঁজ করুন—সেই লোকটার—

    তিনকড়ি ) কিন্তু দায়িত্বটা কি আপনারও কিছু কম মিসেস সেন। আপনার কাছে সে কখন সাহায্য চাইতে গিয়েছিল ভেবে দেখুন। কিন্তু আপনি নিজে তো তাকে না বললেনই, তার ওপর এমনভাবে কেসটা প্রেজেন্ট করলেন—যাতে কমিটির আর সকলে তাকে না বলে। আপনার নিজেরও ছেলেমেয়ে আছে—মা হওয়া যে কি, তা আপনি বেশ ভাল করেই বোঝেন! একবারও ভাবলেন না—সে অসহায়, নিঃসম্বল। আপনি তাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারতেন, নিজের মেয়ের মতো উপদেশ দিতে পারতেন—বন্ধু হিসেবে তাকে কাছে টেনে নিতে পারতেন। কিন্তু আপনি সোজা তার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলেন!

    শীলা॥ ছিঃ—মা—

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু রমা, ব্যাপারটা করোনারেই গোলমেলে দাঁড়াতে পারে—আর কাগজওলাদের তো কথাই নেই—

    রমা॥ চুপ করবে তোমরা! আচ্ছা, তোমরা আমাকে দোষ দাও কি করে? দয়াময়ী থেকে তাকে তাড়িয়েছিলে তুমি! চেন স্টোর থেকে তাকে তাড়াল শীলা! (তিনকড়ির দিকে ফিরিয়া) আমি তো এখনও বলছি—আমি কোন অন্যায় করিনি! মেয়েটা তো আরম্ভই করলে মিথ্যে দিয়ে! তারপর দেখলাম—আসল লোকটাকে সে ভাল করেই জানে। তখন আমি তাকে বললাম—সেই লোকটার কাছে যেতে! বিয়ে না করুক, সে অন্তত টাকাকড়ি দিয়ে সাহায্য করতে পারত!

    তিনকড়ি॥ কি বললে সে?

    রমা॥ যত সব বাজে কথা—

    তিনকড়ি॥ সেটা কী তাই বলুন না?

    রমা॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) কি বলব কী? আমার ভাল মনে নেই! ন্যায় অন্যায় বিবেক—সে সব বড়ো বড়ো কথা কি? আরে তোর মতো মেয়েদের মুখে আবার ওসব কথা কেন?

    তিনকড়ি॥ (রুঢ়স্বরে) কার মতো মেয়ে মিসেস সেন? মড়া-কাটা টেবিলে আজ যে শুয়ে আছে—তার মতো? (চন্দ্রমাধব যেন প্রতিবাদে কি বলিতে চাইতেছিলেন — তাঁহাকে বাধা দিয়া) চুপ করুন—তখন থেকে বাজে বক-বক করছেন আপনি! জানবেন—আমারও ধৈর্য্যের একটা সীমা আছে! (মিসেস সেনকে) হ্যাঁ, কি বলেছিল সে?

    রমা॥ (ভীতস্বরে) মানে—বলেছিল, লোকটার বয়স অল্প—তার ওপর মদ বড্ড বেশি খায়, বিয়ে হলে কারুরই ভাল হত না—

    তিনকড়ি॥ লোকটা তাকে টাকাকড়ি দিত না?

    রমা॥ হ্যাঁ, আগে দিত, কিন্তু পরে নিতে রাজী হয়নি—

    তিনকড়ি॥ কেন, জিজ্ঞেস করেছিলেন?

    রমা॥ হ্যাঁ, করেছিলাম। কিন্তু উত্তরে যা বলেছিল, তা মোটেই বিশ্বাস করা যায় না।

    তিনকড়ি॥ আপনি বিশ্বাস করেছেন কি না, তা আমি জিজ্ঞেস করিনি। সে কি বলেছিল তাই বলুন। কেন সে ঐ লোকটার কাছ থেকে টাকা নিতে রাজী হয়নি?

    রমা॥ বলছি তো, যা বলেছিল তা মিথ্যে! দেখেছেন কখনও—ঐ টাইপের মেয়েরা টাকা দিতে এলে নিচ্ছে না!

    তিনকড়ি॥ (অত্যন্ত রূঢ়স্বরে) দেখুন, এই টাইপের খথা বলছেন যত, কেস তত খারাপ হচ্ছে! যা জিজ্ঞেস করছি, তাই বলুন। কেন মেয়েটি টাকা নিতে রাজী হয়নি?

    রমা॥ ছেলেটা নাকি একদিন মদের ঘোরে বলেছিল—টাকাটা তার নিজের নয়!

    তিনকড়ি॥ তবে কার?

    রমা॥ চুরির—

    তিনকড়ি॥ তাহলে দেখুন, চুরির টাকা নেবে না বলেই সে আপনাদের কাছে গিয়েছিল—

    রমা॥ কিন্তু বুঝতে পারছেন না, প্রথমে সে এক রকম বললে, তারপর আর এক রকম। প্রথমটা যদি মিথ্যে হতে পারে তো পরেরটাই বা হবে না কেন?

    তিনকড়ি॥ কিন্তু ধরুন ব্যাপারটা সত্যি—ছেলেটা চুরির টাকাই এনে দিত। তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে বুঝতে পারছেন? ছেলেটা যাতে বিপদে না পড়ে, সেই জন্যেই মেয়েটি আপনাদের সমিতিতে গিয়েছিল।

    রমা॥ হয়তো তাই। কিন্তু ওরকম অবান্তর কথাই বা আমি ধরব কেন? আমার কাছে ব্যাপারটা সাজানো বলে মনে হয়েছিল, তাই আমি কমিটিকে দিয়ে না বলিয়েছিলাম—

    তিনকড়ি॥ ও, তাহলে মেয়েটি অ্যাসিড খেয়ে মরেছে বলে আপনার কোন দুঃখ নেই?

    রমা॥ দুঃখ থাকবে না কেন? ওভাবে কেউ মরেছে শুনলে সকলেরই দুঃখ হয়—কিন্তু তার জন্যে আমি কোন দোষে দোষী নই।

    তিনকড়ি॥ দোষটা তাহলে কার?

    রমা॥ প্রথমত তার নিজের—

    শীলা॥ কি করে হল মা? একবার চাকরি খেল বাবা, আর একবার আমি—আর দোষটা হল তার?

    রমা॥ (শীলার খথা কানে না তুলিয়া) আরে—দোষ সেই ছেলেটার! মেয়েটা যা বলেছিল, তা যদি সত্যি হয়, তাহলে ঐ রকম অকর্মা মাতালের শাস্তি হওয়াই উচিত। মেয়েটার আত্মহত্যার জন্যে যদি কাউকে দায়ী করতে হয়, তবে দায়ী করুন তাকে, দায়িত্ব তার।

    তিনকড়ি॥ তাহলে আপনি বলছেন, যদি মেয়েটার কথা সত্যি হয়, যদি ছেলেটা চুরির পয়সা—

    রমা॥ হ্যাঁ, যদি হয়। কিন্তু তা তো নয়! তখন থেকে তো বলছি, কথাটা মিথ্যে—

    তিনকড়ি॥ কিন্তু যদি কথাটা মিথ্যে না হয়—

    রমা॥ (ধৈর্যচ্যুত হইয়া) তাহলে বলছি তো ছেলেটা দায়ী। ছেলেটার জন্যেই মেয়েটার ঐ অবস্থা। আর ঐ অবস্থায় পড়েছিল বলেই সে আমাদের কাছে এসেছিল, নইলে আসত না—

    তিনকড়ি॥ তাহলে যত দায় ঐ ছেলেটির — কি বলেন?

    রমা॥ ধরে তাকে এমন শাস্তি দিন যাতে চিরকাল মনে থাকে—

    সীলা॥ (হঠাৎ শঙ্কিত হইয়া) মা—কি বলছ কি!

    চন্দ্রমাধব॥ শীলা!

    শীলা॥ কিন্তু বাবা, তুমি বুঝতে পারছ না—

    রমা॥ (বাধা দিয়া) দেখ শীলা, চুপ করে থাকতে পারিস তো থাক, নয়তো শুতে যা! (তিনকড়ির দিকে ফিরিয়া) আশ্চর্য, আপনি এখনও এখানে দাঁড়িয়ে রইলেন? এখানে সময় নষ্ট করে লাভটা কি? তারচেয়ে বরং ছেলেটাকে ধরবার চেষ্টা করুন, আর যদি ধরতে পারেন, তো কোর্টে উঠিয়ে দিন। সেটাই আপনার ডিউটি।

    তিনকড়ি॥ আপনার কিচ্ছু ভাবনা নেই মিসেস সেন, আমার ডিউটি আমি ঠিকই করব। (হাতঘড়ি দেখিতে দেখিতে) তাহলে বলছেন—রেখে-ঢেকে কোন লাভ নেই, সোজা কোর্টে উঠিয়ে দেওয়াটাই ঠিক—

    রমা॥ নিশ্চয়, আপনার ডিউটিই তো তাই! তাহলে এখন আসুন— নমস্কার—(হাত তুলিলেন)

    তিনকড়ি॥ কিন্তু আমাকে তো এখন এখানেই থাকতে হবে মিসেস সেন—

    রমা॥ এখানেই থাকতে হবে?—কেন?

    তিনকড়ি॥ ঐ যে আপনি বললেন, আমার ডিউটি—

    শীলা॥ (ভীতস্বরে) মা!

    রমা॥ (এতক্ষণে বুঝিতে পারিয়া) কিন্তু—মানে, না কখনো না! এ কি বলছেন আপনি—(চোখ তুলিতে স্বামীর সহিত তাঁহার দৃষ্টি-বিনিময় হইল। উভয়েরই শঙ্কিত দৃষ্টি।)

    চন্দ্রমাধব॥ (ভীতস্বরে) কিন্তু তিনকড়িবাবু—মানে আপনি বলতে চান—মানে—তাপস—

    তিনকড়ি॥ ধরুন যদি তাপসবাবুই হন, তাহলে করতে যে কি হবে তা তো উনি বলেই দিয়েছেন—

    রমা॥ (উত্তেজিত স্বরে) না, কখনো না, — তাপস হতেই পারে না— আপনি মিথ্যে কথা বলেছেন—বুঝলেন, আমি আপনার কথা বিশ্বাস করি না—

    শীলা॥ তখন যদি আমার কথা শুনতে মা, কথা যদি না বাড়াতে…

    (তিনকড়িবাবু হাত তুলিয়া সকলকে চুপ করিতে বলিলেন। সদর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শোনা গেল। সকলে ঘরের দরজার দিকে চাহিলেন। দেখা গেল তাপস প্রবেশ করিতেছে, তাহার মুখ-চোখ শুকাইয়া গিয়াছে। ঘরে প্রবেশ করিয়া দেখিল সকলের অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি তাহার মুখের উপর নিবদ্ধ। পর্দাও এই সঙ্গে নামিয়া আসিল।)

  • তৃতীয় অঙ্ক

    তৃতীয় অঙ্ক

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায়

    [book]

    তৃতীয় অঙ্ক

    (ঐ একই ঘর। দ্বিতীয় অঙ্কের যেখানে শেষ, তৃতীয় অঙ্কের সেখানে আরম্ভ। তাপসের দিকে সকলে তাকাইয়া আছেন)

    তাপস॥ আপনি বোধহয় এতক্ষণে সবই জানতে পেরেছেন—না?

    তিনকড়ি॥ শুধু আমি নয় তাপসবাবু—এঁরা সবাই— (তাপস দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া অগ্রসর হইয়া আসিল।)

    রমা॥ তাপস, কি বলছিস তুই! এখানে কি কথা হয়েছে, তা তুই জানিস?

    শীলা॥ না জেনেছে, ভালই হয়েছে মা—

    তাপস॥ কেন?

    শীলা॥ এইমাত্র মা তিনকড়িবাবুকে বলছিল, মেয়েটির ঐ অবস্থার জন্যে যে দায়ী, তাকে সোজা নিয়ে গিয়ে আদালতে তুলতে—

    তাপস॥ মা!

    রমা॥ আমি কি করে জানব বল? আমি স্বপ্নেও ভাবিনি তুই এ-কাজ করতে পারিস তাপস। তাছাড়া শুনলাম—লোকটা মাতাল—

    শীলা॥ ছোড়দাও তো মদ খায় মা, আমি তো তোমায় একটু আগেই বললাম।

    তাপস॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) কেন বললি তুই?

    শীলা॥ তুই মিথ্যে রাগ করছিস ছোড়দা। এতদিন কি কিছু বলেছি? আজ দেখলাম—আমি বলি আর না বলি, জানতে সকলে পারবেই! তাই মাকে আগে থাকতে জানিয়ে দিলাম! আর তুই কি ভাবছিস আমি পার পেয়েছি,—আমিও পার পাইনি।

    রমা॥ শীলা, তোর ভাবটা কি বলতো—

    চন্দ্রমাধব॥ কি জানি! আমি রইলাম, তোর মা রইল—তাপস তোর ছোড়দা—

    তিনকড়ি॥ (মিসেস সেনকে) দেখুন, আপনাদের এই ঘরোয়া ঝগড়াটা না হয় পরেই সারবেন! এখন দয়া করে একটু চুপ করুন। (তাপসকে দেখাইয়া দিয়া) ওঁর কি বলবার আছে শুনতে দিন। (পকেট হইতে সিগারেট কেস ও দেশলাই বাহির করিয়া তাপসের দিকে বাড়াইয়া দিলেন) নিন, ধরান—

    (তাপস হাত বাড়াইয়াছিল, কিন্তু পিতার মুখের দিতে তাকাইয়া ইতস্তত করিয়া হাত সরাইয়া লইল।)

    চন্দ্রমাধব॥ (ধমকের সুরে) তাপস, তেরা কি কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই! আমি রয়েছি, তোর মা রয়েছেন—

    তিনকড়ি॥ (এইবার তাঁহার ধৈর্যচ্যুতি হইয়াছে) দেখুন মশাই—সিগারেট তো ছোট কথা, তাপসবাবু মদ খান—তিনি একটি পাকা মাতাল। আপনার সামনে একটা সিগারেট খেলে মহাভারতটা এমন কিছু অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। দেখতে পাচ্ছেন, ওঁর কপালসুদ্ধ ঘেমে উঠেছে, সিগারেট এখন ওঁকে অনেক হেল্প করবে। (তাপস ইতস্তত করিতেছে দেখিয়া) নিন নিন—আমি বলছি, আপনি ধরান না—(জোরে ধমক দিয়া উঠিলেন) — আবার বসে থাকে! ধরান—

    (তাপস একবার তিনকড়িবাবুর মুখের দিকে তাকাইয়া সত্যিই কেস হইতে একটি সিগারেট লইয়া ধরাইল।)

    তাপস॥ (তিনকড়িবাবু সিগারেট কেস পকেটে পুরিলেন) আপনি?

    তিনকড়ি॥ আমি অন ডিউটি স্মোক করি না।

    তাপস॥ (ধোঁয়া ছাড়িয়া) দেখুন, একটু আগে আপনার অনেক কথা বুঝতে পারিনি, কিন্তু এখন বেশ পরিষ্কার মনে হচ্ছে—

    তিনকড়ি॥ (রূঢ়স্বরে) আগের কথা আগে হয়ে গেছে, তাপসবাবু, এখন আপনার কথা বলুন। মেয়েটির সঙ্গে আপনার প্রথম দেখা হয়েছিল কবে?

    তাপস॥ গেল বছর নভেম্বর মাসে—

    তিনকড়ি॥ কোথায়? (তাপস নিরুত্তর) শুনতে পাচ্ছেন না—কোথায় দেখা হয়েছিল?

    তাপস॥ (সিগারেটটা ফেলিয়া দিয়া, একবার চন্দ্রমাধব আর মিসেস সেনের মুখের দিকে তাকাইল। এরপর তিনকড়িবাবুর মুখের দিকে চাহিয়া মরিয়া হইয়া বলিয়া ফেলিল) চিৎপুরে একটা মদের দোকানের পাশে—

    তিনকড়ি॥ তারপর? থামলেন কেন? বলে যান—

    তাপস॥ দোকান থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সিতে উঠেছি, এমন সময় দেখি একটি মেয়ে! নেমে গিয়ে কথাবার্তা কইলাম, বললাল ট্যাক্সিতে উঠে আসতে। রাজী হল না—

    তিনকড়ি॥ রাত তখন ক’টা?

    তাপস॥ ঠিক মনে নেই—তবে দশটা বেজে গিয়েছিল।

    তিনকড়ি॥ মেয়েটি কি বললে?

    তাপস॥ খুব ভাল মনে নেই। কি যেন বললে—তার থাকবার জায়গা নেই না কি—আগে যে ম্যাসাজ ক্লিনিকে কাজ করত, সেখানকার একটি মেয়ে নাকি তাকে ওখানে অপেক্ষা করতে বলেছে—

    তিনকড়ি॥ ও, তারপর সে বুঝি আপনার গাড়িতে উঠে এল?

    তাপস॥ প্রথমে রাজী হয়নি, তারপর পুলিশের ভয় দেখাতে উঠে এল—

    তিনকড়ি॥ তাহলে, মেয়েটি যে ও-রাস্তায় নতুন—তা বেশ বুঝতে পেরেছিলেন?

    তাপস॥ হ্যাঁ, কি জানি কেন দেখেই মনে হয়েছিল—একেবারে সাধারণ রাস্তায়-দাঁড়ানো মেয়ে এ নয়।

    তিনকড়ি॥ কোথায় নিয়ে তুললেন তাকে?

    তাপস॥ কাছাকাছি—আমারই এক চেনা বাড়িতে, দু’খানা ঘর খালি ছিল, তারই একটাতে—

    তিনকড়ি॥ তারপর, তখন বাড়ি ফিরে এলেন? (তাপসকে নিরুত্তর দেখিয়া উত্তর দিচ্ছেন না যে, বলুন তখনি কি বাড়ি ফিরে এলেন?

    তাপস॥ না।

    তিনকড়ি॥ তবে কখন?

    তাপস॥ (মুখ নীচু করিয়া) প্রায় ঘন্টা দুয়েক বাদে। (ব্যাকুল কণ্ঠস্বরে) তিনকড়িবাবু, মেয়েটির হয়ে আপনি আমাকে ক্ষমা করে যান—আমি অতি হতচ্ছাড়া!

    তিনকড়ি॥ (এতটুকু বিচলিত না হইয়া) কেন, আপনার মতো লোকেরা তো এই রকমই করে থাকে—

    তাপস॥ না না, আপনি বুঝতে পারছেন না—আমি লম্পট, আমি বদমায়েশ—কিন্তু সেদিনের মতো জঘন্য কাজ আমি কোনদিন করিনি! জানেন, সে রাতে তার ঘরে ঢুকে—কি করেছি না করেছি, কিচ্ছু আমার মনে ছিল না। তখন আমি কাণ্ডজ্ঞানহীন, চূড়ান্ত মাতাল—(দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া) ওঃ how stupid it all is!

    রমা॥ (শিহরিয়া উঠিয়া) তাপস—এ তুই কি করেছিস—

    চন্দ্রমাধব॥ (শীলাকে দেখাইয়া দিয়া) শুনছ তোমরা একটু ভেতরে যাও তো—

    শীলা॥ কিন্তু বাবা—

    চন্দ্রমাধব (জোরে ধমক দিয়া উঠিলেন) শীলা, যা বলছি তাইশোন, — তোর মাকে নিয়ে ভেতরে যা—(চন্দ্রমাধব দরজা খুলিয়া ধরিলেন। শীলা মাকে লইয়া বাহির হইয়া গেল।)

    তিনকড়ি॥ তারপর, আবার কবে দেখা হল আপনাদের?

    তাপস॥ প্রায় দিন চোদ্দ বাদে—

    তিনকড়ি॥ আপনি কি ওঁর কাছেই যাবার জন্যে বেরিয়েছিলেন?

    তাপস॥ না, আমার ভাল মনেই ছিল না। ওখান দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল। দেখলাম সেই ঘরটাতেই আছে—আমি যা টাকা দিয়ে এসেছিলাম, তাতেই চলছে—

    তিনকড়ি॥ সেদিনও বোধহয় খুব প্রকৃতিস্থ ছিলেন না?

    তাপস॥ সেদিন তখনও মদ খাইনি—

    তিনকড়ি॥ কি কথাবার্তা হল সেদিন?

    তাপস॥ প্রথমে সে আরম্ভ করল—তার নিজের কথা। তার বাপ-মা নেই—আগে চাকরি করত, তারপর চাকরি যায়। শেষে ম্যাসাজ ক্লিনিক, তারপর রাস্তায়—

    তিনকড়ি॥ কত রাত অবধি ছিলেন সেদিন?

    তাপস॥ ঠিক মনে নেই—তবে ফিরতে বারোটা পেরিয়ে গিয়েছিল—

    তিনকড়ি॥ আচ্ছা আপনি যে এত রাত করে বাড়ি ফেরেন, বাড়িতে কেউ কিছু সন্দেহ করে না?

    তাপস॥ না, বাড়িতে জানে আমি ক্লাবে থাকি —

    তিনকড়ি॥ (চন্দ্রমাধবের দিকে দেখিয়া) ও, তা বেশ!—(তাপসের দিকে ফিরিয়া) হ্যাঁ তারপর—সেদিন কি মনে হল, মেয়েটিকে আপনি ভালবেসে ফেলেছেন?

    তাপস॥ দেখুন—মানে—ভালো তাকে আমি সেদিনও বাসিনি—তার পরেও না।

    তিনকড়ি॥ তবে?

    তাপস॥ মানে — কি বলব —মানে — কি রকম একাট চোখে লেগে গিয়েছিল —

    তিনকড়ি॥ ও, যেই না চোখে লেগে যাওয়া, অমনি তার ঘরে রাত কাটাতে আরম্ভ করলেন, কেমন?

    তাপস॥ (ক্ষুব্ধ স্বরে) হ্যাঁ করলাম—দেখে বুঝতে পারছেন না আমারও বিয়ের বয়স হয়েছে—

    তিনকড়ি॥ ও, তাহলে আপনাদের বিয়ের বয়স হলেই একটি করে মেয়েকে কার্বলিক অ্যাসিড খেতে হবে—কেমন?

    তাপস॥ (লজ্জিত হইয়া) না—মানে—

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু বিয়ে যদি করবার ইচ্ছেই হয়েছিল, তো আমাকে বলিসনি কেন হতভাগা?

    তাপস॥ (ক্ষুব্ধস্বরে) তোমাকে কি বলল বাবা, তুমি এমনিতেই তো গাধা-বাঁদর ছাড়া কথা বল না। বিয়ের কথা বললে তো বাড়ি থেকে তাড়িয়েই দিতে—

    চন্দ্রমাধব॥ (গর্জন করিয়া) তুই বলে দেখিসনি কেন?

    তিনকড়ি॥ (তাপস কি বলিতে যাইতেছিল, বাধা দিয়া চন্দ্রমাধবকে) থাক, ছেলের পাকা-দেখাটা না হয় আমি যাওয়ার পরই সেটল করে নেবেন। (তাপসকে) হ্যাঁ, তারপর থেকে রোজই যেতে আরম্ভ করলেন, কেমন?

    তাপস॥ হ্যাঁ।

    তিনকড়ি॥ তারপর, আসল খবরটা কবে জানতে পারলেন?

    তাপস॥ তখন বোধহয় মার্চের লাস্ট উইক। একদিন গিয়ে শুনলাম— মানে—(পিতার দিকে চাহিয়া থামিয়া গেল)

    তিনকড়ি॥ যে, you are going to be a father, এই তো?

    তাপস॥ (মুখ নীচু করিয়া) হ্যাঁ।

    তিনকড়ি॥ তার মনের অবস্থাটা কি রকম দেখলেন?

    তাপস॥ দেখলাম খুব ভাবনায় পড়েছে! আমার ভাবনাটাও অবিশ্যি কম হয়নি—

    তিনকড়ি॥ সে আপনাকে বিয়ের কথা কিছু বলেছিল?

    তাপস॥ না। তাকে বিয়ে করার ইচ্ছে আমার নিজেরও ছিল না— তবে বললে কি করতাম বলা যায় না। সে কিন্তু একবারও বলেনি।

    তিনকড়ি॥ আপনি একবারও বলেন নি?

    তাপস॥ না।

    তিনকড়ি॥ আচ্ছা, কেন সে বলেনি, বলতে পারেন?

    তাপস॥ না—ঠিক বলতে পারি না। তবে তার কথায়-বার্তায় মনে হত—সে যেন আমাকে কি রকম ছেলেমানুষ বলে মনে করে—

    তিনকড়ি॥ তারপর, আপনি কি করবেন বলে ঠিক করলেন?

    তাপস॥ আমি আর কি করতে পারি বলুন? তবে দেখলাম, তার চাকরি-বাকরি নেই, আর চেষ্টা করে বোধহয় কিছু পাবেও না— তাই মাঝে মাঝে কিছু টাকা দিয়ে আসতাম। শেষ পর্যন্ত তাও আর সে নিতে রাজী হল না।

    তিনকড়ি॥ সবশুদ্ধ কত টাকা দিয়েছিলেন তাকে?

    তাপস॥ একবার দেড়’শ, আর একবার দু’শ—সবশুদ্ধ সাড়ে-তিন’শ। এর পরেও একবার দু’শ টাকা নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু সে নিতে রাজী হয়নি।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু ওই এক-একবারে দেড়’শ-দু’শ করে টাকা পেতিস কোত্থেকে তুই?

    তিনকড়ি॥ (তাপসকে নিরুত্তর দেখিয়া) বলুন তাপসবাবু, কোত্থেকে পেতেন?

    তাপস॥ (মুখ নীচু করিয়া) অফিস থেকে…

    চন্দ্রমাধব॥ অফিস থেকে? মানে—আমার অফিস থেকে?

    তাপস॥ হ্যাঁ।

    চন্দ্রমাধব॥ তার মানে—টাকাটা তুই চুরি করতিস?

    তাপস॥ না, মানে ঠিক চুরি নয়—

    চন্দ্রমাধব॥ তার মানে? চুরি ছাড়া আর কি বলব ওকে?

    (শীলা ও মিসেস সেনের প্রবেশ)

    শীলা॥ আমার কিন্তু কোন দোষ নেই বাবা—

    রমা॥ (ব্যাকুল স্বরে) সত্যি, আমি আর থাকতে পারলাম না—তার পর কি হল গো!

    চন্দ্রমাধব॥ কি হয়েছে শুনবে? মেয়েটার ঐ অবস্থার জন্যে দায়ী তোমার ঐ গুণধর ছেলে! আবার এলেম কত? উনি আবার অফিস থেকে টাকা চুরি করে তার হাতে দিয়ে আসতেন!

    রমা॥ তাপস—তুই চুরি করতিস!

    তাপস॥ টাকা আমি পরে শোধ করে দিতাম—

    চন্দ্রমাধব॥ ও গল্প আমরা অনেক শুনেছি! কোত্থেকে শোধ করতে শুনি?

    তাপস॥ সে আমি যেখান থেকে হোক শোধ করে দিতাম।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু এই যে খেপে খেপে তুই টাকা নিতিস—কেউ জানতে পারেনি?

    তাপস॥ না। এগুলো ছোটখাট অ্যাকাউন্ট—আমি নিজেই কালেক্ট করে অফিসিয়াল রিসিট দিয়ে দিতাম।

    চন্দ্রমাধব॥ বেশ করতে! এখন দয়া করে ওগুলোর একটা লিস্ট আমাকে দিও, আমায় দেখতে হবে তো কোথায় কি করে বসেছ। ওঃ—এত কাণ্ড করার আগে তুই আমার কাছে আসিসনি কেন হতভাগা!

    তাপস॥ কি জানি বাবা—অনেকবার অনেক মুশকিলে পড়েছি, কিন্তু কখনো মনে হয়নি তোমার কাছে যাই!

    চন্দ্রমাধব॥ তা মনে হবে কেন? এখন যে রাস্তার লোক এসে দাঁড়িয়েছে তোমার জন্যে? তোমার আসল মুশকিলটা কোথায় জান? আদরে আদরে একটি বাঁদর তৈরি হয়েছ!

    তিনকড়ি॥ (রূঢ়স্বরে) দেখুন, আমিও বড়ো মুশকিলে পড়েছি—আমার হাতে আর সময় বেশি নেই। কে কতটা বাঁদর তৈরি হয়েছে সে হিসেবটা না হয় আমি চলে গেলেই করবেন! আমার আর একটাই প্রশ্ন আছে তাপসবাবু—মেয়েটি কি জানতে পেরেছিল, আপনি যে টাকাটা দিচ্ছেন, সেটা আপনার নিজের নয়—চুরির?

    তাপস॥ হ্যাঁ, কি জানি কেন, তার মনে হয়েছিল—টাকাটা আমার নিজের নয়। ওঃ—আজ আমার নিজেকে এত ছোট বলে মনে হচ্ছে! যেদিন জানতে পারল — টাকাটা তো নিলই না—উলটে আমাকে পর্যন্ত যেতে বারণ করে দিল—পরদিন গিয়ে আর তার কোন খোঁজই পেলাম না। কিন্তু আপনি—আপনি কি করে জানলেন? সে আপনাকে বলেছে?

    তিনকড়ি॥ না তাপসবাবু।—আমার সঙ্গে যখন তার দেখা হয়েছে তখন সে জ্যান্ত নয়, লাস।

    শীলা॥ মেয়েটি মার কাছে এসেছিল ছোড়দা—

    রমা॥ শীলা!

    শীলা॥ চেপে রাখার কথা ওটা নয় মা। ছোড়দারও জানা দরকার।

    তাপস॥ সে তোমার কাছে এসেছিল মা?— তোমার কাছে? এখানে? কিন্তু এখানকার ঠিকানা তো সে জানত না! (মিসেস সেনকে নিরুত্তর দেখিয়া) চুপ করে ওভাবে তাকিয়ে আছে কেন মা? বল—যাহোক কিছু বল—কী হয়েছিল কি—(চীৎকার করিয়া) মা!

    তিনকড়ি॥ আমি আপনাকে বলছি তাপসবাবু। মেয়েটি নারী-স,হায়ক সমিতির কাছে গিয়েছিল সাহায্য চাইতে। আপনার মা ঐ সমিতির প্রেসিডেন্ট। উনি কমিটিকে দিয়ে না-বলিয়ে দিয়েছিলেন।

    তাপস॥ (স্রোধে, ক্ষোভে, লজ্জায় ভাঙিয়া পড়িয়া) তাহলে তুমি—তুমিই তাকে মেরেছ মা! আমাকে আড়াল করবার জন্যে সে তোমাদের সমিতির কাছে গিয়েছিল—তুমি তাকে তাড়িয়ে দিলে মা! তুমি নিজে সন্তানের মা—একবার ভাবলে না—সেও সন্তানের মা হতে চলেছে, ছিঃ মা ছিঃ—

    রমা॥ (ব্যথিত স্বরে) আমি জানতাম না তাপস, সে তোর-মানে আমি বুঝতে পারিনি—ওরে, সত্যি আমি বুঝিনি!

    তাপস॥ কোন জিনিসটা কবে তুমি বুঝতে পেরেছ বলতে পার? কি করে বুঝবে? বুঝতে চেয়েছ কোনদিন? (সমস্ত ভুলিয়া গিয়া রমাদেবীর দিকে অগ্রসর হইয়া আসিতে আসিতে) কি বলব তোমাকে—

    শীলা॥ (ভীতস্বরে) ছোড়দা—ছোড়দা—

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধস্বরে তাপসের সম্মুখে গিয়া) গাধার মত চেঁচাতে তোর লজ্জা করছে না হতচ্ছাড়া? আর একটা কথা তোর মুখ দিয়ে বার হোক! দেখ—তোকে আমি কি করি—

    তিনকড়ি॥ (সকলের কণ্ঠস্বরকে চাপা দিয়া) চুপ, চুপ সকলে। কারো মুখ থেকে আর একটাও কথা আমি শুনতে চাই না। (তিনকড়িবাবুর বলার ভঙ্গীতে সকলে চুপ করিয়া তাঁহার মুখের দিকে তাকাইল) হ্যাঁ, শুনুন—আমার এনকোয়ারি শেষ হয়ে গেছে, আমি এখন যাচ্ছি। আজ একটি মেয়ে কার্বলিক অ্যাসিড খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। আপনারা কেউ তাকে সাক্ষাৎভাবে খুন করেন নি ঠিক কথা। কিন্তু আপনারা তাকে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দিয়েছেন। (প্রত্যেকের মুখের দিকে দেখিতে দেখিতে) আপনি মিসেস সেন—যখন তার সাহায্যের সবচেয়ে বেশি দরকার, তখন সে গিয়েছিল আপনাদের কমিটির কাছে। আপনি যে শুধু নিজে না বলেছিলেন তাই নয়, কমিটিও যাতে না বলে সে ব্যবস্থাও করেছিলেন। আর তাপসবাবু—যতদিন বাঁচবেন, ততদিন মনে রাখবেন—কাণ্ডজ্ঞানহীন মাতাল অবস্থায়, নেশার ঝোঁকে, আপনি একটি মেয়ের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে আরম্ভ করেছিলেন। নেশায় মজা পাবেন বলে তাকে ট্যাক্সিতে তুলেছিলেন। আপনার কাছে সে ছিল একটা ভালো-দেখতে মেয়েমানুষ—যাকে নেশার ঘোরে পাশে শোয়ানো যায়, কিন্তু বিয়ে করা যায় না। আর আপনি শীলা দেবী—

    শীলা॥ (তিক্তস্বরে) আমি জানি তিনকড়িবাবু—আমার থেকেই তো আরম্ভ—

    তিনকড়ি॥ না না, আপনি দায়ী, কিন্তু আরম্ভ আপনি করেননি। (হঠাৎ চন্দ্রমাধববাবুর দিকে ফিরিয়া, অত্যন্ত রূঢ়স্বরে) আরম্ভ করেছিলেন আপনি! মাসে মাত্র পাঁচটা টাকা বেশি চেয়েছিল, আপনি তার সমস্ত জীবনটা দাম হিসেবে ধরে নিলেন। কিন্তু, পার আপনিওপান নি—আপনার কাছ থেকে অনেক বেশি দাম সে আদায় করে নেবে!

    চন্দ্রমাধব॥ (কাতর স্বরে) তিনকড়িবাবু, টাকা আমি এক্ষুনি আপনাকে দিচ্ছি—বলুন কত টাকা লাগবে?

    তিনকড়ি॥ কিন্তু দেবার যখন দরকার ছিল মিস্টার সেন, তখন পাঁচটা টাকাও দিতে পারেননি! (নোট-বুক ইত্যাদি বন্ধ করিলেন। দেখিয়া মনে হইল, এনকোয়ারি তাঁহার শেষ হইয়াছে। নোটবুক, পেনসিল ইত্যাদি যথাস্থানে রাখিয়া, সকলের মুখের দিকে তাকাইলেন। তাঁহার মুখে ফুটিয়া উঠিয়াছে নিষ্ঠুর হৃদয়হীন এক হাসির আভাস। সকলের মুখের দিকে দেখিতে দেখিতে) না, সন্ধ্যাকে আপনারা কোনদিনই ভুলতে পারবেননা। আপনাদের ওই মিস্টার বোসও নয়! সন্ধ্যাকে—এক দেখলাম উনিই বা একুট ভালবেসেছিলেন—কিন্তু উঁহু, ওঁর পক্ষেও ভোলা সম্ভব নয়। ওয়েল মিস্টার সেন—আজ আর সন্ধ্যা চক্রবর্তী নেই—আপারা আজ আর তার কিছুই করতে পারবেন না—না ভাল —না মন্দ—

    শীলা॥ (অশ্রুরুদ্ধকণ্ঠে) সেটাই তো সবচেয়ে বড় দুঃখ তিনকড়িবাবু—

    তিনকড়ি॥ তার চেয়েও বড় দুঃখ আছে মিস সেন। একজন সন্ধ্যা নেই কিন্তু এখনও লাখে লাখে সন্ধ্যারা রয়েছে। তাদেরও আশা আছে, ভরসা আছে, ভাবনা আছে! আমার আপনার মত তাদেরও মন আছে, আঘাত সেখানে গিয়েও পৌঁছয়। একটু ভেবে দেখবেন, দেখবেন কাউকে আলাদা করতে পারছেন না, দেখবেন আপনার সুখ তাদের ওপর, তাদের সুখ আপনাদের ওপর। মনে রাখবেন—সবাই মিলে আমরা এক, কেউ আমরা আলাদা নই। যার যেকানে যা কিছু হচ্ছে সব দায় আমার, আপনার, সকলের—কেউ বাদ নেই এর থেকে! আজ হয়তো ভাবছেন, আমি একবার গেলে হয়! তবে সেদিন খুব বেশি দূর নয় যেদিন প্রত্যেকটা মানুষকে আমার এই কথাগুলো ভাবতে হবে। তখন কিন্তু হাজার মাথা খুঁড়েও আপনারা কোন পথ পাবেন না, আপনাদের চারপাশে তখন আগুন, চারধার আপনাদের রক্তে লাল! আচ্ছা—চলি আজ, গুড নাইট—(সাব ইন্সপেক্টর সোজা বাহির হইয়া গেলেন। সকলে তাঁহার গমনপথের দিকে হতচকিত ও বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাইয়া রহিলেন। দেখা গেল শীলা নিঃশব্দে কাঁদিতেছে। মিসেস সেনের আর দাঁড়াইয়া থাকিবার ক্ষমতা নাই—তিনি চেয়ারে বসিয়া পড়িয়াছেন। তাপস গালে হাত দিয়া আকাশ-পাতাল ভাবিতেছে। একমাত্র চন্দ্রমাধবেরই স্বাভাবিক অবস্থা, তিনকড়িবাবু বাহির হইয়া গেলে, ঘরের দরজার নিকট দাঁড়াইয়া তিনি সদর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনিলেন। তারপর সন্তর্পণে দরজা ভেজাইয়া দিয়া তাপসের দিকে অগ্রসর হইয়া আসিলেন।)

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) তুই হলি যত নষ্টের গোড়া—

    তাপস॥ হ্যাঁ, এখন তো আমিই—

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) না, তুমি নও, রাস্তার লোক! বুঝতে পারছিস, কি করেছিস? সমস্ত ব্যাপারটা কাগজে বেরুল বলে! চারধারে ঢি-ঢিক্কার, একটা পাবলিক স্ক্যান্ডাল, ছিঃ ছিঃ!

    তাপস॥ স্ক্যাণ্ডালে আমার আর কিছু এসে যায় না বাবা!

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) তোমার যে কিছু এসে যায় না, তা আমিও জানি! কিন্তু আমার যে এসে যাচ্ছে। ইলেকশনটা যে পণ্ড হয়ে যাবে রে হতচ্ছাড়া—অপোন্টে পার্টি ছড়া বার করবে, ছড়া।

    তাপস॥ (চন্দ্রমাধবের দিকে আঙুল দেখাইয়া অপ্রকৃতিস্থের ন্যায় হো হো করিয়া হাসিতে হাসিতে) ইলেকশন! এখনো ইলেকশন বাবা! এখন তুমি ইলেকটেড হলে আর না হলে, কি এসে যায় তাতে?

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) কি এসে যায় তাতে! তোর মত রাস্কেলের কিসে এসে যায় বলতে পারিস? মদ খেয়ে মেয়েছেলে নিয়ে বেলেল্লাপনা করতে তোর লজ্জা করে না? কাল থেকে তুই অফিসের বিনা মাইনের চাকর! আমি তোর অ্যালাওয়েন্স বন্ধ করে দিলাম। টু-দি-পাই—আমি এ টাকা আদায় করে নেব! তারপর আর একবার যদি শুনি এই সব কাণ্ড-কারখানা, তোমায় চাবকে যদি না বাড়ি থেকে বার করে দিই তো আমার নাম নেই!

    রমা॥ ছিঃ তাপস—ভাবতেও আমার লজ্জা করছে—

    তাপস॥ আমি তো লজ্জার কাজ করেইছি। কিন্তু তোমরা? তোমরা কি কিছুই করনি?

    চন্দ্রমাধব॥ আমরা যা করেছি তার যথেষ্ট গ্রাউণ্ড আছে রাস্কেল! ব্যাপারটা আনফরচুনেট টার্ন নিয়েছে তাই, নইলে—

    শীলা॥ বাঃ, চমৎকার বাবা—

    চন্দ্রমাধব॥ তার মানে?

    শীলা॥ মানে, আবার তোমরা সেই গোড়া থেকে আরম্ভ করেছ! — যেন কিছুই হয়নি—

    চন্দ্রমাধব॥ কে বলেছে কিচ্ছু হয়িন! এতেও যদি স্ক্যান্ডাল না হয়, তাহলে তো জানব খুব লাকি! ওঃ কেমন ছিলাম সন্ধ্যেবেলা— (তাপসকে দেখাইয়া) আর এই হতচ্ছাড়াটার জন্যে—

    তাপস॥ (উত্তেজনা ও ব্যঙ্গভরা স্বরে) সত্যি, সন্ধ্যেবেলা তুমি বেশ ছিলে বাবা! কি রকম সব অ্যাডভাইস দিচ্ছিলে! সেই যে, first you yoruself, second you yourself, and last you yourself, কারো দায়িত্ব আমাদের নেই, সবায়ের কথা যারা ভাবে তাদের মাথা খারাপ। আর ঠিক সেই সময় এলেন ঐ মাথা খারাপদেরই একজন (পাগলের ন্যায় হাসিতে হাসিতে) সাব-ইন্সপেক্টর তিনকড়ি হালদার! কই বাবা, তিনকড়িবাবুকে তো কিছু বললে না, তোমার থিয়োরি-টিয়োরির কথা?

    শীলা॥ আচ্ছা ছোড়দা, ঠিক ঐ সময় তিনকড়িবাবু এসেছিলেন, না?

    তাপস॥ হ্যাঁ, কেন—কি হয়েছে?

    শীলা॥ (ধীরে ধীরে) ব্যাপারটা কিন্তু বড় অদ্ভুত—

    রমা॥ (উত্তেজিত স্বরে) আমারও কিন্তু কি রকম যেন মনে হচ্ছে—

    শীলা॥ (চিন্তা করিতে করিতে) ভদ্রলোক সত্যিই সাব-ইন্সপেক্টর তো?

    চন্দ্রমাধব॥ (উত্তেজিত হইয়া) ঠিক বলেছিস, এটা তো মনে হয়নি!

    শীলা॥ কিন্তু তাতেও কিছু আর এসে যায় না বাবা—

    চন্দ্রমাধব॥ কি পাগলের মত বকছিস, একশবার এসে যায়!

    শীলা॥ কি জানি বাবা, তোমার হয়তো যায়, আমার যাচ্ছে না—

    রমা॥ কি ছেলেমানুষের মত কথা বলছিস শীলা—

    শীলা॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) ছেলেমানুষের মত আমি কথা বলছি, না তোমরা বলছ মা! যা সত্যি, তাকে কি ওভাবে আড়াল দেওয়া যায়? — যায় না।

    চন্দ্রমাধব॥ মুখের ওপর কথা বলিসনি শীলা! চুপ করে থাকতে পারিস থাক নইলে শুতে যা—

    শীলা॥ আমি এক্ষুনি যাচ্ছি বাবা! কিন্তু একটা কথা। ব্যাপারটা যদি সত্যি হয়, তাহলে এর জন্যে দায়ী আমরাই! আমি ধরলাম, ভদ্রলোক সত্যিই সাব-ইন্সপেক্টর নন—কিন্তু দায়িত্বটা আমরা অস্বীকার করি কি করে? আর ব্যাপারটা যে সত্যি তা তুমিও জান, আমিও জানি! প্রথম তাকে চাকরি থেকে তাড়াও তুমি, দ্বিতীয় চাকরিটা যায় আমার জন্যে। অমিয় নিজের খেয়াল-খুশি মত তাকে নিয়ে এল আর শখ যেই মিটে গেল অমনি দূর করে তাড়িয়ে দিলে। তারপর ছোড়দা আর শেষে মা! এরপর ভদ্রলোক সাব-ইন্সপেক্টর হলেন আর না হলেন।

    তাপস॥ কিন্তু ভদ্রলোক কি সত্যিই সাব-ইন্সপেক্টর—!

    শীলা॥ কিন্তু ছোড়দা, ভদ্রলোক যদি সাব-ইন্সপেক্টর নাই হন! সে তো আমারও মনে হচ্ছিল—ভদ্রলোকের ভাব-গতিটা ঠিক সাধারণ সাব-ইন্সপেক্টরের মত নয়—কিন্তু—

    চন্দ্রমাধব॥ (বাধা দিয়া) ঠিক কথা—আমরাও তাই মনে হচ্ছিল। (রমাকে) হ্যাঁগো, তোমার মনে হয়নি?

    রমা॥ কথাবার্তা তো মোটেই সাব-ইন্সপেক্টরের মত নয়, যেন লাটসাহেব।

    চন্দ্রমাধব॥ সত্যি সাব-ইন্সপেক্টর হলে কি আমাকে অমন করে ধমকাতে পারত! আমি কি একটা যা-তা লোক নাকি, ঘাড় ধরে বার করে দিতাম না! তার ওপর পদ্মপুকুর থানার তো হতেই পারে না, রমেশ সেখানে ও-সি, ব্যাটারা আপনি-আজ্ঞে ছাড়া কথাই বলে না—

    তাপস॥ কিন্তু বাবা, উনি সাব-ইন্সপেক্টর না হলেও কিছু এসে যাচ্ছে না।

    চন্দ্রমাধব॥ তোমার তো যথেষ্ট এসে যেত! রাস্কেল, জানিস তোকেও কোর্ট পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারত, তখন?

    শীলা॥ (কি যেন চিন্তা করিতে করিতে) কিন্তু একটা মজা দেখেছ বাবা, আমরা তিনকড়িবাবুকে কতটুকুই বা বলেছি—প্রায় সব ব্যাপারটাই তাঁর আগে থাকতে জানা—

    চন্দ্রমাধব॥ সেটা কিছু আশ্চর্য নয়। এধার-ওধার থেকে দু-একটা খবরা-খবর পেয়েছে। তারপর বাকিটা আন্দাজ! আমি তো কিছুতেই ভেবে পেলাম না, কেন তোরা সব গড় গড় করে বলতে আরম্ভ করলি!

    শীলা॥ নিজে থেকে কেউই আমরা কিছু বলিনি বাবা, উনি আমাদের বলতে বাধ্য করেছিলেন।

    রমা॥ না, কক্ষনো না! আমি এমন খুব বেশি একটা কিছু বলিনি! আমি তো মুখের ওপর বলে দিলাম, যা উচিত বলে মন হয়েছে, তাই করেছি!

    চন্দ্রমাধব॥ তবে হ্যাঁ, ধাপ্পা খানিকটা দিয়েছিল—

    রমা॥ না—কক্ষণো না, তুমি বললেই শুনব আমি—

    চন্দ্রমাধব॥ না না, তোমাকে আমাকে নয়—এদের। আরো, সে তো গোড়া থেকেই খারাপ চোখে দেখেছে আমাদের। সাব-ইন্সপেক্টর না কচু! পুলিশের লোক হলে কখনো ওরকম কম্যুনিস্টিক কথাবার্তা হয়! আর এরা কি ভীতু দেখ, কোথায় চোখ পাকিয়ে দাঁড়াবি, তা নয় ‘আমি তো আমি তো’ করেই গেল।

    তাপস॥ সেটা তো তুমি কিছু কম করলে না বাবা?

    চন্দ্রমাধব॥ কি করি বল? তোমার মত গুণধর ছেলে—কি কাণ্ডটি করে বসেছিলে! ওখানে আমি চটাচটি করলে তো হিতে-বিপরীত হত! এখন তাই মনে হচ্ছে। লোকটাকে বাইরে থেকে বিদেয় করে দিলেই হত!

    শীলা॥ কিন্তু তা হত না বাবা, ভেতরে উনি আসতেনই।

    রমা॥ (তিক্তস্বরে) কি জানি শীলা, তোর কথাবার্তা শুনে তো মনে হচ্ছে তোর বাবাকে ধরে নিয়ে গেলে তুই খুশি হতিস! (চন্দ্রমাধবকে) যাকগে, এখন কি করবে ঠিক করলে?

    চন্দ্রমাধব॥ করতে একটা কিছু হবেই—আর খুব তাড়াতাড়িই করতে হবে, নইলে তো কেলেঙ্কারির শেষ থাকবে না!

    (সদর দরাজ দিয়া কে যেন বাড়িতে প্রবেশ করিল। সকলে সচকিত হইয়া উঠিলেন। অমিয়র প্রবেশ)

    রমা॥ এই যে বাবা অমিয়—আমরা তো ভেবেছিলাম, তুমি আজ আর এলে না!

    অমিয়॥ আপনাদের জন্যেই ফিরে এলাম কাকীমা। সাব ইন্সপেক্টরটা গেল কখন?

    শীলা॥ এই তো একটু আগে। কাউকে ছেড়ে কথা কন নি—সবাইকে শেষ করে তবে গেছেন।

    রমা॥ শীলা!

    শীলা॥ বাঃ, অমিয় ছিল না তাই বলছি—

    অমিয়॥ আচ্ছা, লোকটাকে কি রকম মনে হচ্ছিল আপনাদের?

    শীলা॥ আমার তো মাঝে মাঝে বেশ ভয় করছিল।

    চন্দ্রমাধব॥ লোকটার কথাবার্তা মোটেই সুবিধের নয়, আমার তো গোড়া থেকেই কি রকম একটা সন্দেহ হচ্ছিল—

    রমা॥ কথাবার্তা তো সুবিধের নয়ই! দেখলে না, তোমার আমার সঙ্গে কি রকম চড়াচড়া কথা বলছিল? লোকটা এক নম্বরের চোয়াড়!

    অমিয়॥ (ধীরে ধীরে) ও কিন্তু পুলিশের লোক নয়!

    চন্দ্রমাধব॥ (যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করিতে পারেন নাই) সে-কি!

    রমা॥ বলছ কি অমিয়!

    অমিয়॥ আমি ঠিকই বলছি কাকীমা—এই খবরটা দেবার জন্যেই তো ফিরে এলাম।

    চন্দ্রমাধব॥ কি করে জানতে পারলে?

    অমিয়॥ আপনাদের এখান থেকে তো বেরোলাম একটু ঘুরে আসব বলে। এধার-ওধার একটু ঘুরে-ফিরে আসছি, হঠাৎ মনে হল — যাই না, থানাটা একটু ঘুরেই আসি! থানার ওখানে গিয়ে আর একজন সাব-ইন্সপেক্টরের সঙ্গে দেখা। সে ঐ পদ্মপুকুরেই রয়েছে প্রায় বছর পাঁচেকের ওপর! তাকে জিজ্ঞেস করতেই বললে — তিনকড়ি হালদার বলে কেউ নেই—কি রকম দেখতে তাও বলেছিলাম। বললে, না।

    চন্দ্রমাধব॥ এসব ব্যাপার কিছু বলনি তো?

    অমিয়॥ পাগল হয়েছেন আপনি? জিজ্ঞেস করতে বললাম — তিনকড়িকে আমি চিনতাম, শুনলাম সে এখানে সাব-ইন্সপেক্টর হয়ে এসেছে, তাই খোঁজ করতে এসেছিলাম।

    চন্দ্রমাধব॥ যাক—লোকটা তাহলে সত্যিই বাজে, কি বলো?

    রমা॥ আমি তো তখন থেকেই বলছি, পুলিশের বাপের সাধ্যি কি, আমাদের সঙ্গে ওভাবে কথা কয়।

    চন্দ্রমাধব॥ তবু একবার রমেশের ওখানে ফোন করি, কি বলো?

    রমা॥ খুব সাবধান কিন্তু—দেখো যেন আবোল-তাবোল কিছু বলে ফেলো না।

    চন্দ্রমাধব॥ আরে না না—(উঠিয়া গিয়া ফোন তুলিয়া নাম্বার বলিলেন। এদিকে মুখ ফিরাইয়া) আমি অবিশ্যি ফোন করতামই, আমার গোড়া থেকেই কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছিল —(ফোনে) হ্যালো, কে—রমেশ? কোথায়? ওপরে আছে? একবার ডেকে দিন—হ্যাঁ, হ্যাঁ, বললেই আসবে – বলুন তার বড় মামা ডাকছে—(অল্পক্ষণ পরে) কে রমেশ? শুয়ে পড়েছিলি নাকি? ও! হ্যাঁরে, পদ্মপুকুরে তিনকড়ি হালদার বলে কোন সাব-ইন্সপেক্টর আছে?—নেই, ঠিক জানিস তো—রং ময়লা, মুখখানা ভারি, গোঁফ দাড়ি কামানো।—ও, নেই? না, এমনি জিজ্ঞেস করছিলাম, একজনের সঙ্গে তর্ক হচ্ছিল—আচ্ছা ফোন রাখছি।—কাল একবার আসিস না এখানে বৌমাকে নিয়ে—(ফোন রাখিয়া চন্দ্রমাধব ফিরিয়া আসিলেন) যা বলেছি তাই, পুলিশ নয়।

    রমা॥ আমি তো গোড়া থেকেই বলছি—পুলিশ ওর কোনোখানটাই নয়।

    চন্দ্রমাধব॥ আগাগোড়া ব্যাপারটা কিন্তু অন্য রকম দাঁড়িয়ে গেল, বুঝলে অমিয়।

    শীলা॥ (ব্যঙ্গের সুরে) হ্যাঁ, আমরা আবার ভদ্রলোক হয়ে গেলাম।

    চন্দ্রমাধব॥ আবার তুই বাজে বকছিস শীলা!

    তাপস॥ খুব বাজে কিন্তু শীলা বকছে না বাবা!

    চন্দ্রমাধব॥ তুই এখনও কথা বলছিস তাবস! — আজ যদি সত্যিই লোকটা সাব-ইন্সপেক্টর হত! তোর অবস্থাটা কি হত ভেবে দেখেছিস?

    রমা॥ আঃ—চুপ কর না—কি হচ্ছে কি?

    শীলা॥ বঝলে অমিয়, তোমার আর বাকি গল্পটা শোনা হল না।

    অমিয়॥ আর শোনবার দরকারই বা কি! (চন্দ্রমাধবকে) ব্যাপারটা তাহলে পুরো ধাপ্পা কি বলেন?

    চন্দ্রমাধব॥ ধাপ্পা বলে ধাপ্পা! নিশ্চয়ই কেউ বদমায়েসি করে ব্যাটাকে এখানে পাঠিয়েছিল। শক্রুর তো অভাব নেই। তার ওপর এখন ইলেকশনে দাঁড়িয়েছি—অপোনেন্ট পার্টিরও কেউ হতে পারে। খানিকটা আঁচ আমি গোড়াতেই পেয়েছিলাম। তবে কি জান? একটা লাইট মুডে ছিলাম, ফস করে এসে আরম্ভ করলে—তাই বেশি কিছু বলতে পারলাম না, নইলে—

    রমা॥ (বাধা দিয়া) তোমরা বলে তাই! গোড়া থেকে যদি আমি এখানে থাকতাম, তাহলে দেখতে। ও জিজ্ঞেস করবার সাহস পেত? তার আগে আমি ওকে জিজ্ঞেস করতাম না—দেখতে হতভাগা পালাবার পথ পেত না।

    শীলা॥ বলা খুব সোজা মা।

    রমা॥ তার মানে? তোদের মধ্যে এক আমাকেই সে বাগে আনতে পারেনি।

    চন্দ্রমাধব॥ আচ্ছা, তুমিও ওর সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমানুষ হলে! এখন একটু মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবা দরকার। ও তো ধাপ্পা মেরে চলে গেল—কিন্তু ধাপ্পাতেই যদি এর শেষ না হয় তখন?

    অমিয়॥ ঠিক কথা, ধাপ্পাই হোক, আর যা-ই হোক—লোকটা সমস্ত ব্যাপারটা জেনেই এখান থেকে গেছে।

    চন্দ্রমাধব॥ সেই জন্যেই তো বলছি। (তাপসকে দাঁড়াতেই দেখিয়া) দাঁড়ালি কেন, বস

    তাপস॥ আমি ঠিক আছি বাবা।

    চন্দ্রমাধব॥ না, তুমি ঠিক নেই, কথাটা শোনা তোমারই সবচেয়ে বেশি দরকার, বুঝলে রাস্কেল!

    তাপস॥ আমার কিন্তু খুব দরকার বলে মনে হচ্ছে না বাবা।

    শীলা॥ ছোড়দা ঠিক কথাই বলছে বাবা।

    চন্দ্রমাধব॥ (রমাকে) আচ্ছা, এরা কি বলতো? কোত্থাকার একটা জোচ্চোর—কি না কি বলে গেল—তাই নিয়ে মাথা গরম করে মরছে।

    রমা॥ শীলা! তাপস! ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখ, বাবা ঠিক কথাই বলছেন।

    তাপস॥ (হঠাৎ যেন ফাটিয়া পড়িল) আচ্ছা মা, তোমরা কি! এ ভান করে লাভটা কি? তোমরা না বললেই না হয়ে যাবে! একটা মেয়ে একটু আগে অ্যাসিড খেয়ে জ্বলতে জ্বলতে মারা গেছে—পার তোমরা তাকে বাঁচিয়ে ফিরিয়ে আনতে? পার না! লোকটা যদি পুলিশের লোক নাই হয়, গল্পটা কি মিথ্যে হয়ে যাবে? (চন্দ্রমাধবকে) একটু আগে তুমি বলেছিলে না, আমি তোমার অফিসের টাকা ভেঙেছি—ব্যাপারটা কোর্টে উঠবে—একটা কেলেঙ্কারি হবে — একবারও মনে হল না তোমার, কথাগুলো কত বাজে, কত ছোট। না বাবা, এখন আর তোমার কথা শোনার মতো মন আমার নেই—সে ইচ্ছেও নেই!

    চন্দ্রমাধব॥ আচ্ছা, এরা স্ক্যান্ডালটার কথা কেন বুঝছে না বলতো?

    তাপস॥ (চীৎকার করিয়া) বলছি তো—তোমার স্ক্যান্ডাল হল বা না হল তাতে কিছু এসে যায় না। একটা মেয়ে কার্বলিক অ্যাসিড খেয়ে মারা গেছে—এর চেয়ে বড় কথা আর কিছু নেই বুঝলে?

    চন্দ্রমাধব॥ (চীৎকার করিয়া) চুপ! কথা বলতে তোর লজ্জা করে না? অন্য বাপ হলে তোর মত ছেলেকে লাথি মেরে বিদায় করে দিত, জানিস?

    তাপস॥ (তিক্তস্বরে) এখন এ বাড়িতে থাকলাম আর না থাকলাম, বাবা।

    চন্দ্রমাধব॥ আগে চুরির টাকাটা শোধ দে, তারপর যাবার কথা ভাবিস!

    শীলা॥ কিন্তু তাতে সন্ধ্যা চক্রবর্তী কি ফিরে আসবে বাবা?

    তাপস॥ আর আমরা যে তাকে মেরেছি, সেটাও কিছু না-হয়ে যাবে না।

    অমিয়॥ কিন্তু আগে দেখ ব্যাপারটা সত্যি কিনা, তারপর চেঁচিও।

    তাপস॥ নিশ্চয়ই সত্যি। তুমি তো এখনো শেষটা শোনই নি।

    শীলা॥ ও, তুমি তাহলে সাব-ইন্সপেক্টরকে যা বলেছ, তা একটা ঘোরে বলে ফেলেছ—কি বলো অমিয়?

    অমিয়॥ না, মোটেই না। আম যা বলেছি তা আমি সত্যিই বলেছি, আর তার জন্যে আমি তোমার কাছে ক্ষমাও চাইছি।

    শীলা॥ আমাদের চেয়েও তোমার ওপর পুলিশ ভদ্রলোকের ধারণাটা কিন্তু ভাল, বুঝলে অমিয়?

    চন্দ্রমাধব॥ (ক্রুদ্ধস্বরে)আবার বলে পুলিশ! লোকটার চোদ্দগুষ্টিতে কেউ পুলিশ নয়।

    শীলা॥ কিন্তু পুলিশি তিনি ঠিকই করে গেছেন বাবা। সন্ধ্যা চক্রবর্তী যে অ্যাসিডটা খেয়েছে সেটা তো আমাদেরই জন্যে।

    অমিয়॥ কিন্তু তার তো কোন প্রমাণ নেই।

    শীলা॥ তার মানে?

    অমিয়॥ মানে, লোকটা যে পুলিশের লোক, তারই যখন কোন প্রমাণ নেই তখন এটাই বা দাঁড়ায় কি করে?

    শীলা॥ কিন্তু এটা যে দাঁড়িয়ে গেছে, তা তুমি নিজেও বেশ বুঝতে পারছ অমিয়?

    অমিয়॥ মোটেই না। ব্যাপারটা ভাল করে ভেবে দেখ। একজন এসে স্রেফ ধাপ্পা দিয়ে বললে যে সে পুলিশের লোক, সাব-ইন্সপেক্টর! এধার-ওধার থেকে দু-একটা খবরও হয়ত পেয়েছিল— তাই দিয়ে দিব্যি এক গল্প ফেঁদে স্রেফ ব্লাফের ওপর আমাদের দিয়ে স্বীকার করিয়ে নিলে যে আমরা সবাই এ মেয়েটির ব্যাপারে জড়িয়ে আছি।

    তাপস॥ হ্যাঁ, জড়িয়ে তো আছিই!

    অমিয়॥ কিন্তু প্রত্যেক কেসে যে একই মেয়ে, তা তুমি কি করে বুঝছ—

    চন্দ্রমাধব॥ (উত্তেজিত হইয়া) দাঁড়াও-দাঁড়াও অমিয়, হয়েছে হয়েছে—উঁহু হল না—

    তাপস॥ কিন্তু তা কি করে হবে? আমরা নিজেরাই তো সব স্বীকার করে নিয়েছি—

    অমিয়॥ ঠিক কথা, তুমি একটি মেয়েকেই জানতে। কিন্তু কি করে জানলে আমার মেয়েটিই তোমার মেয়ে? (অমিয় সকলের মুখের দিকে তাকাইল। দেখিয়া মনে হইল যেন এইমাত্র একটা যুদ্ধ জয় করিয়া ফেলিয়াছে। আর সকলের তখন—হ্যাঁ, তাই তো, ভেবে দেখিনি—এই অবস্থা। কয়েক মুহূর্ত পরে চন্দ্রমাধবকে) আপনিই বলুন না কাকাবাবু, সন্ধ্যা চক্রবর্তী নামে একটি মেয়েকে আপনি বরখাস্ত করেছিলেন! মেয়েটিকে আপনার মনে ছিল না তাই লোকটা আপনাকে একটা ছবি দেখায়—তখন আপনারও মনে পড়ে, এই তো?

    চন্দ্রমাধব॥ হ্যাঁ, কিন্তু তারপর?

    অমিয়॥ তারপর শীলা ধর্মতলার চেন স্টোরের একটি মেয়ের চাকরি যাওয়ার ব্যাপারে জড়িয়ে পড়েছিল—দেখা গেল লোকটা সে ব্যাপারটা জানে। সে দিব্যি বলে বসল—চেন স্টোরের মেয়েটি আর সন্ধ্যা চক্রবর্তী আলাদা নয়! আর সেই সঙ্গে শীলাকে একটা ছবি দেখালে—

    শীলা॥ হ্যাঁ, সে একই ছবি—

    অমিয়॥ কি করে জানলে? তোমার বাবাকে যখন ছবিটা দেখিয়েছিল তখন তো আর তুমি দেখনি?

    শীলা॥ না।

    অমিয়॥ আর তোমাকে যখন ছবিটা দেখাচ্ছিল, তখন কাকাবাবুও তো দেখতে আসেননি—

    শীলা॥ না (ধীরে ধীরে) আমি বুঝেছি অমিয়, তুমি কি বলতে চাও।

    অমিয়॥ তাহলেই দেখতে পাচ্ছ—ছবি যে একটাই তার কোন প্রমাণ নেই। কাজেই বারবার যে একই মেয়ে, তারও কোন প্রমাম নেই! এই আমার কথাই ধর না—আমাকে তো সে কোন ছবিই দেখায়নি! ফস করে বললে—মেয়েটা নাম বদলে হয়েছিল ঝরনা রায়, আমিও ঘাবড়ে গিয়ে বলে ফেললাম, ঝরণা রায়কে আমি চিনি।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু ঝরনা রায়ই যে সন্ধ্যা চক্রবর্তী, তার তো এতটুকু প্রমাণ নেই! লোকটার মুখের কথাই আমরা সত্যি বলে মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি লোকটাই জাল। কাজেই কিচ্ছু বলা যায় না—হয়ত আগাগোড়াই মিথ্যে কথা বলেছে।

    অমিয়॥ হয়ত কেন, বোধহয় তাই বলেছে!—আচ্ছা তারপর আমি চলে যাওয়ার পরে কি হল?

    রমা॥ আমি কি রকম সব গণ্ডগোল করে ফেললাম।

    অমিয়॥ কেন?

    রমা॥ লোকটা যেই শুনলে তাপস বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, অমনি বলে বসল, তাপসকে তার দরকার। যদি তাপস তাড়াতাড়ি না ফেরে, তাহলে সে নিজে গিয়ে ওকে ধরে নিয়ে আসবে। ওঃ, তখন যদি তার কথা বলার ধরণটা দেখতে—সে কড়া চাউনি কি! আমিও কি রকম যেন নার্ভাস হয়ে গেলাম! তাই ফস করে যখন বলে বসল — দু’হপ্তা আগে সন্ধ্যা চক্রবর্তীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে—তখন আমিও বোকার মত বলে বসলাম—হ্যাঁ, হয়েছে।

    চন্দ্রমাধব॥ আচ্ছা, কেন বললে বলতো? মেয়েটা যে তোমাদের কমিটির কাছে হেলপের জন্যে অ্যাপলাই করেছিল—সন্ধ্যা চক্রবর্তী নাম দিয়ে তো করেনি?

    রমা॥ না। কিন্তু ঐ যে বললাম — একে তাপসটার জন্যে ভাবনা, তার ওপর ঐ রকম ফস করে জিজ্ঞেস করে বসল—আমিও সব গোলমাল করে হ্যাঁ বলে বসলাম।

    শীলা॥ কিন্তু মা, তুমি ছবি দেখে তো তাকে চিনতে পেরেছিলে?

    অমিয়॥ আর কেউ ঠিক ঐ সময় ছবিটা দেখেনি তো?

    রমা॥ না।

    অমিয়॥ তাহলেই বুঝতে পারছেন কাকীমা—এ যে একই মেয়ে তার কোন প্রমাণ নেই। আপনাদের কমিটিতে তো ওরকম কত মেয়েই অ্যাপলাই করে থাকে—তাদেরই একজনের ছবি হয়ত আপনাকে দেখিয়েছে—সে যে সন্ধ্যা কি ঝরনা, তা আমরা কি করে জানব বলুন!

    চন্দ্রমাধব॥ ঠিক—অমিয় ঠিক বলেছ! আমরা প্রত্যেকেই হয়ত আলাদা-আলাদা মেয়েরই ছবি দেখেছি।

    অমিয়॥ নিশ্চয়! হ্যাঁ তাপস, তোমাকেও কি ছবি দেখিয়েছিল নাকি?

    তাপস॥ আমার বেলায় আর ছবি দেখাবার দরকার ছিল না। মার আর আমার কেসের মেয়ে যে এক তাতে কোন সন্দেহই নেই।

    অমিয়॥ কেন?

    তাপস॥ বাঃ—কমিটিতে সে কি বলেছে দেখ, চুরির টাকা নেবে না বলেই সে কমিটিতে গিয়েছিল। আমাকেও সে ঐ বলেই আসতে বারণ করে দিয়েছিল।

    অমিয়॥ তা হোক, তবু হয়ত ব্যাপারটা আগাগোড়াই বাজে!

    তাপস॥ কি জানি ভাই! তোমরা হয়ত কেটে বেরিয়ে আসতে পারছ, — কিন্তু আমি তো পারছি না—আমিও না, মাও নয়।

    চন্দ্রমাধব॥ কেন নয়! তোদের মার সমিতিতে তো আকছার ফলস ইন্টারভিউ হচ্ছে। পুলিশের ব্যাপারটার মতো এটাও হয়ত আগাগোড়া সাজানো।

    তাপস॥ (ক্রুদ্ধস্বরে) আশ্চর্য! একটা মেয়ে যে অ্যাসিড খেয়ে মারা গেছে, সেটাও কি সাজানো?

    অমিয়॥ কিন্তু কোন মেয়ে? মেয়ে তো দেখছি একটা নয়। ব্যাপার যা দাঁড়িয়েছে তাতে তো দেখছি বোধহয় জন-চার-পাঁচ হবে।

    তাপস॥ দশজন হলেই বা আমার কী? আমি যাকে জানতাম, সে তো মারা গেছে।

    চন্দ্রমাধব॥ তাই বা কি করে জানছি—

    অমিয়॥ ঠিক বলেছেন কাকাবাবু! আজ অটা-অল কোন মেয়ে সুইসাইড করেছে কিনা দেখ! তারও তো কোন প্রমাণ নেই।

    চন্দ্রমাধব॥ ঠিক, ঠিক অমিয়! (তাপসকে) কই—এবার উত্তর দে? আরে আমি তো গোড়া থেকেই বলছি, একটা লাইট মুডে ছিলাম, লোকটা ফস করে এসে একটা শকিং ব্যাপার বলতে আরম্ভ করলে! যেই না একটু-আধটু নার্ভাস হয়ে পড়া আর অমনি ব্লাফের পর ব্লাফ—একটা মেয়ে কার্বলিক অ্যাসিড—

    তাপস॥ থাক বাবা, বার বার আর নাই বললে!

    চন্দ্রমাধব॥ তবে? আরে ব্যাপারটাই তো এই রকম, একেবারের বেশি দু’বার বললেই কি রকম নার্ভাস মনে হয়! লোকটা করলেও তো তাই! গল্পটা শুনেই সব নার্ভাস—আর যায় কোথায়? লোকটাও একটার পর একটা জিজ্ঞেস করতে আরম্ভ করলে! ওঃ, খুব বোকা বানিয়ে দিয়ে গেল যা হোক!

    তাপস॥ ওঃ! ব্যাপারটা যদি সত্যিই মিথ্যে হত?

    চন্দ্রমাধব॥ মিথ্যে তো বটেই! কে বলেছে সত্যি! পুলিশের ব্যাপারটাও মিথ্যে আর মেয়েও একটা নয়, কাজেই নো স্ক্যান্ডাল!

    শীলা॥ কিন্তু বাবা, সুইসাইড—সেটাও কি মিথ্যে?

    অমিয়॥ সেটা তো এক্ষুনি জেনে নেওয়া যায়।

    শীলা॥ কী করে?

    অমিয়॥ কেন, হসপিটালে ফোন করে।

    চন্দ্রমাধব॥ (অস্বস্তির সহিত) কিন্তু কি রকম যেন শোনাবে না—এত রাতে?

    অমিয়॥ হোক রাত তবু ফোন করব, দেখি না ব্যাপারটা সত্যি কিনা? (টেলিফোনের নিকট গিয়া ফোন তুলিয়া নাম্বার বলিল) হ্যালো, পাণ্ডে হসপিটাল? দেখুন, খুব দরকারে পড়ে রাত্তিরে আপনাদের বিরক্ত করলাম, যদি একটু হেল্প করেন দয়া করে —মানে আজ দুপুর থেকে সন্ধ্যের মধ্যে সন্ধ্যা চক্রবর্তী—হ্যাঁ সন্ধ্যা চক্রবর্তী নামে কেউ ভর্তি হয়েছে? এমারজেন্সি, কার্বলিক অ্যাসিড কেস? আচ্ছা, আমি ধরে দাঁড়িয়ে আছি—(অল্পক্ষণ পরে) কি বললেন? আজ তিনদিন হল ওরকম কোন কেসই আসেনি? আচ্ছা, মেনি থ্যাঙ্কস কষ্ট দিলাম কিছু মনে করবেন না (ফোন নামাইয়া দিল। অমিয় যতক্ষণ ফোন করিতেছিল, ততক্ষণ সকলেরই ত্রস্ত অবস্থা। চন্দ্রমাধব কপাল মুছিতেছেন, শীলা তো মাঝে মাঝে আপনা-আপনি শিহরিয়া উঠিতেছে, ইত্যাদি। এদিকে আসিয়া) পাণ্ডেতে আজ তিনদিন হল কোন সুইসাইড কেসই আসেনি।

    চন্দ্রমাধব॥ (উল্লসিত হইয়া) কেমন, এবার হল তো — সুইসাইড কেসই আসেনি। ওঃ, কি ধাপ্পাই দিয়ে গেল লোকটা—(হাসিতে হাসিতে) ওঃ, আসল ব্যাপারটাই হয়নি, যাই বল—ও বোকা নয়, একেবারে গাধা বানিয়ে দিয়ে গেছে কিন্তু!

    রমা॥ ভাগ্যিস অমিয় কথাটা ঐভাবে তুললে। নাঃ তোমার বাহাদুরি আছে অমিয়।

    অমিয়॥ ঐ জন্যেই তো বাইরে চলে গেলাম কাকীমা—মনে হল, দেখি না একটু ঘুরে ফিরে আসি যদি কিছু মাথায় খেলে যায়।

    চন্দ্রমাধব॥ বুঝলে অমিয়, ভয় যে একটু আমারও হয়নি তা নয়, হয়েছিল—তবে ঐ স্ক্যাণ্ডালটার জন্যে, নইলে নয়। (শীলাকে উৎফুল্ল না দেখিয়ে) কিরে শেলী, আবার কি হল? সব তো মিটে গেছে।

    শীলা॥ কি করে তুমি বলছ বাবা? আমরা যে নিজের মুখে সব স্বীকার করেছি, কি করে তা না হয়ে যাবে! আমাদের বরাত খুব ভালো তাই শেষেরটা না হয় হয়নি, কিন্তু সেটা হলেও হতে পারত।

    চন্দ্রমাধব॥ কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটাই যে এখন অন্য রকম দাঁড়িয়ে গেল। নে নে—আর মুখভার করে বসে থাকে না। (তিনকড়িবাবুর অনুকরণ করিয়া) ওঃ, সে আঙুল নেড়ে বলার ঘটা কি—(শীলার দিকে আঙুল দেখাইয়া হাসিতে হাসিতে) আপনারা কেউ তাকে সাক্ষৎভাবে খুন করেন নি ঠিক কথা—কিন্তু আপনারা প্রত্যেকেই তাকে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দিয়েছেন! ওঃ—তখন যদি দেখতে অমিয়, তার মুখ চোখের ভাবটা! (শীলাকে দরজার দিকে যাইতে দেখিয়া) কি রে, উঠছিস যে—

    শীলা॥ কি জানি বাবা—তোমরা কথা কইছ শুনে আমার কিন্তু কি রকম যেন ভয় করছে।

    চন্দ্রমাধব॥ দুর পাগলি, ওপরে গিয়ে ভালকরে ঘুমো দিকি—দেখবি সকালে সব পরিষ্কার হয়ে গেছে।

    শীলা॥ (ফিরিয়া উত্তেজিত কণ্ঠস্বরে) আচ্ছা বাবা—তুমি কি বলতে চাও, সব ঠিক আগের মত আছে?

    চন্দ্রমাধব॥ নিশ্চয়।

    শীলা॥ ও—তাহলে সত্যিই কিছু হয়নি? ভদ্রলোক যা বলে গেলেন তা থেকে তোমাদের তাহলে শেখবার কিছু নেই? তোমরা তাহলে ঠিক যেমন ছিলে, তেমনিই থাকলে?

    অমিয়॥ (ঠাট্টার সুরে) কেন? তুমি কিছু অন্য রকম হয়ে যাবে নাকি?

    শীলা॥ যাব নয় অমিয়, গেছি বলো। ভদ্রলোকের চেহারাটা আমার চোখের সামনে ভাসছে, তিনি আঙুল দেখিয়ে বলেছেন—সেদিন খুব বেশি দূর নয় যেদিন প্রত্যেকটা মানুষকে আমার এই কথাগুলো ভাবতে হবে! কিন্তু সেদিন হাজার মাথা খুঁড়েও আপনারা কোন পথ পাবেন না। তখন চারপাশে আপনাদের আগুন, আর চারধার আপনাদের রক্তে লাল!

    তাপস॥ তুই ঠিক বলেছিস শীলা। এদের কথাবার্তায় আমারও ভয় ভয় করছে। এরা কি!

    রমা॥ এই দেখ এরা আবার আরম্ভ করেছে।—এই! তোরা শুতে যা দেখি, যতসব মাথা খারাপের দল।

    চন্দ্রমাধব॥ আশ্চর্য, এমন একটা মজার ব্যাপার হল, অথচ এর মজাটা এরা কেউ বুঝলে না। আজকালকার ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারই এই, একেবারে না জেনে সবজান্তা হয়ে বসে আছে!

    (হঠাৎ টেলিফোনের ঘন্টা বাজিয়া উঠিল। এক মুহূর্তের জন্য সকলে চুপ। চন্দ্রমাধব উঠিয়া গিয়া ফোন ধরিলেন। শঙ্কিত কণ্ঠস্বরে) হ্যালো, হ্যাঁ আমিই চন্দ্রমাধব সেন। কি? এখানে মানে আমার এখানে— (চন্দ্রমাধবের কণ্ঠস্বর ভয়ে কম্পিত হইতেছে বলিলে কিছুই বলা হইবে না। ততক্ষণে ওদিকের ব্যক্তি ফোন ছাড়িয়া দিয়াছেন। চন্দ্রমাধব ফোন নামাইয়া এদিকে আসিলেন। তাঁহার মুখে চোখে দারুণ ভীতির আভাস। ধীর ও ভীতিপূর্ণ কণ্ঠস্বর) পুলিশ থেকে ফোন করছিল। একটু আগে একটি মেয়ে কার্বলিক অ্যাসিড খেয়ে আত্মহত্যা করেছে—একজন সাব-ইন্সপেক্টর এখানে আসছেন এনকোয়ারিতে। (হতভম্ব ও ভীত অবস্থায় আর সকলে চন্দ্রমাধবের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। পর্দাও এই সঙ্গে নামিয়া আসিল।)