Author: তাহের আলমাহদী

  • দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

    অভিজ্ঞান

    ‘ঢুকতে কষ্ট, ঢুকে কষ্ট, বেরোতে কষ্ট, বেরিয়ে কষ্ট। বল তো কী?’ অভিকে প্রশ্ন করল সাড়ে ছ’ফুট লম্বা একটা ছেলে। মানানসই রকমের চওড়া। একটু আগে যখন হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়েছিল, অভির মনে হয়েছিল ছেলেটার কবজি তার থাইয়ের মতো চওড়া।

    ‘জানি না।’ ঘাড় নাড়ল অভি। প্রথম দিন কলেজে ঢুকে এ কী বিড়ম্বনা! একেই কি ইন্ট্রো অথবা র‌্যাগিং বলে?

    ‘বলতে না পারলে আর এগোনো যাবে না গুরু। অ্যাট লিস্ট ইউ শুড ট্রাই।’ বলল সাড়ে ছফুট।

    ইংরিজি? মনে মনে খাবি খেল অভি। ক্লাস ওয়ান থেকে বাংলা মিডিয়ামে পড়াশুনা করেছে। গড়গড়িয়ে ইংরিজি পড়তে আর লিখতে পারে। বুঝতে পারাটাও সমস্যা নয়। কিন্তু ইংরিজি বলা? অসম্ভব ব্যাপার। এখন কী ভাবে উদ্ধার পাবে এই দানবের হাত থেকে?

    ‘আমাদের জীবন স্যার। আই মিন লাইফ।’ মিনমিন করে বলে অভি।

    ‘তুই আমাকে স্যার বললি?’ সরু চোখে তাকায় দানব। ‘নির্ঘাত বাংলা মিডিয়াম? লেখাপড়াই শুধু শিখেছিস। দুনিয়াদারি শিখিসনি। চল তোকে মুরগি করি।’

    এক ঝটকায় অভিকে কোলে তুলে নেয় দানব। ‘বাই দ্য ওয়ে, আমার নাম রিপুদমন কর। লোকে রিপুদা বলে ডাকে। তুই আমায় কী বলে ডাকবি?’

    ‘রিপুদা, আমায় নামিয়ে দাও। প্লিজ।’

    অভিকে কাঁধে নিয়ে কলেজ ক্যান্টিনে ঢোকে রিপু। একটা লম্বা টেবিলের চারদিকে অনেক ছেলেমেয়ে বসে। পাঁজাকোলা করে অভিকে টেবিলের মাঝখানে শুইয়ে দেয়। অভি ধড়মড় করে উঠতে যাচ্ছিল। রিপু প্রকান্ড ঘুষি পাকিয়ে বলল, ‘উঠলে থোবড়া বিলা করে দেব। শুয়ে থাক। তোর এখন ডিসেকশান হবে।’ অভি চোখ বুঁজে শুয়ে রইল।

    ‘বাড়ি কোথায়?’ পায়ের কাছ থেকে প্রশ্ন করল মোটা একটা মেয়ে।

    ‘বেলুড়।’

    ‘কোন স্কুল?’

    ‘উত্তরপাড়া গভর্নমেন্ট স্কুল।’

    ‘ইঞ্জিনিয়ারিং-এ র‌্যাঙ্ক কত?’

    ‘তিনশো চার।’

    ‘মেডিক্যাল?’

    ‘দুশো পঞ্চাশ।’

    ‘বাবা-মা কী করে?’

    ‘বাবা চাকরি। মা কিছু না।’

    ‘তার মানে ফার্স্ট জেনারেশন ডাক্তার। বল তো, ‘ঢুকতে কষ্ট, ঢুকে কষ্ট, বেরোতে কষ্ট, বেরিয়ে কষ্ট’। এটা কী? বাই দ্য ওয়ে আমার নাম আপ্পু। সবাই আমায় আপ্পুদি বলে ডাকে। তুইও তাই বলবি।’

    অনেককাল আগে, এশিয়াডের ম্যাসকট ছিল নৃত্যরত হাতি। নাম আপ্পু। এই আপ্পুর নাম যে-ই দিয়ে থাকুক, ঠিক দিয়েছে।

    অভির মাথায় আপ্পুর বলা ধাঁধাঁ ঘুরপাক খাচ্ছে। একই ধাঁধাঁ একটু আগে রিপু জিজ্ঞাসা করেছিল। তখন উত্তর দিতে পারেনি। এবার পারবে। কেন না ক্লু হিসেবে চলে এসেছে আপ্পুর ফার্স্ট জেনারেশান ডাক্তার সংক্রান্ত উক্তি।

    ‘ডাক্তারি।’ জবাব দেয় অভি। ‘মেডিক্যাল প্রফেশন। এখানে ঢুকতে যে খুব কষ্ট সেটা বোঝা হয়ে গেছে।’

    টেবিলের চারদিকে চটরপটর হাততালি, হর্ষধ্বনি, শিস ইত্যাদি শোনা যায়। রিপু চিৎকার করে বলে, ‘জীবনদা, একে একটা ডবল ডিমের মামলেট খাওয়াও।’

    অভি চোখ খুলে শবাসন থেকে উঠে বসে। এবার আপ্পু তাকে কোলে নেয়। এক ঝটকায় টেবিল থেকে মেঝেতে নামিয়ে বলে, ‘ওয়েলকাম টু ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কলেজ। বল তো, বর্ষাকালে ছাতা না থাকলে স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে কেন বেরোনো উচিৎ?’

    এই রে! এ আবার কীরকম প্যাঁচালো প্রশ্ন? মাথা-টাথা চুলকে অভি বলল, ‘জানি না।’

    ‘কেন না, ‘ইয়ে ঘন্টো তক গিলেপন কা অ্যাহেসাস ভি না হোনে দে।’ বুঝলি?’ চোখ পাকিয়ে দাবড়ানি দেয় আপ্পু।

    ‘হ্যাঁ।’ লজ্জা লজ্জা মুখে বলে অভি।

    ‘ক্যান ইউ সি ইয়োরেনাস উইথ ইয়োর নেকেড আই?’ পাশ থেকে প্রশ্ন করে আর একজন। এ আবার কে রে বাবা? অবিকল টিনটিনের মতো দেখতে। গোল মুখ, পুঁটলির মতো নাক, গুল্লি গুল্লি চোখ, মাথার চুল জেল দিয়ে ওপরে তোলা। প্রশ্ন করছে ইংরিজিতে। অভি মনে মনে এর নাম দিল টিনটিন। সে টিনটিনকে স্মার্টলি বলল, ‘নো।’

    ‘আই সে ইয়েস।’ বলে টিনটিন।

    অভি বলে, ‘হাউ?’

    অভির প্রশ্ন শুনে টেবিলের চারপাশে বসে থাকা সবাই হাসিতে ফেটে পড়ে। অভি বুঝতে পারে না কেন। সে আবার বলে, ‘হাউ?’

    ‘ইউ রিয়্যালি ওয়ান্ট টু নো?’ ফচকে হেসে টিনটিন বলে, ‘ওকে, স্টেপ ওয়ান। বেন্ড ইয়োর ওয়েস্ট অ্যাট নাইন্টি ডিগ্রি।’

    নব্বই ডিগ্রিতে কোমর বাঁকাতে হবে? এটার মধ্যে কোনও একটা ফাঁদ আছে। এতক্ষণে বুঝতে পারে অভি। সে বলে, ‘আমি ক্লাসে যাচ্ছি। পরে হবে।’

    ‘শাটাপ ইউ অ্যাস হোল। যা বলছি কর। না করলে ক্যালাব।’ টিনটিনের ধমক শুনে অভি সামনের দিকে নব্বই ডিগ্রি ঝোঁকে। ভয়ের চোটে তার বুক দুরদুর করছে।

    ‘স্টেপ টু। বেন্ড ইয়োর নি-জ বাই ফর্টি ফাইভ ডিগ্রি।’

    এই অবস্থায় হাঁটু পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি বাঁকাতে হবে। সে তো অসম্ভব ব্যাপার! তাও চেষ্টা করে অভি। পেরেও যায়। এখন সে নিজের দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে বাকিদের দেখতে পাচ্ছে।

    টিনটিন আপ্পুর কানে কী একটা বলল। আপ্পু নিজের ঝোলা থেকে গোল মতো একটা জিনিস বার করে টিনটিনের হাতে দিল। টিনটিন সেটা অভির হাতে ধরিয়ে বলল, ‘পুট দিস মিরর বিটুইন ইয়োর লেগস।’

    আপ্পুর আয়না নিজের পায়ের ফাঁকে ধরে অভি। টিনটিন বলে, ‘ক্যান ইউ সি ‘ইয়োর অ্যানাস’? না প্যান্ট খুলতে হবে?’

    তড়াক করে উঠে দাঁড়ায় অভি। আপ্পুকে আয়না ফেরত দিয়ে চোখ মোছে। আপ্পু বলে, ‘তুই কাঁদছিস? পাগল নাকি? এরপরে তো সুপারকে রিপোর্ট করবি যে র‌্যাগিং করা হয়েছে। অ্যাই টিনটিন, মাফ চা।’

    এর নাম সত্যিই টিনটিন? হেসে ফেলে অভি। জীবনদা ওমলেট নিয়ে এসে বলে, ‘একইসঙ্গে হাসছে আর কাঁদছে? আজব চিড়িয়া! একে পেলে কোথা থেকে?’

    অভি মাথা নিচু করে ওমলেটের দিকে তাকিয়ে থাকে। সব্বাই তাকে মুরগি করছে। ক্যান্টিনের ওয়েটারও।

    আপ্পু অভির মনের অবস্থা ধরতে পেরেছে। সে বলল, ‘মামলেট খেয়ে দৌড় দে। এলএলটিতে তোদের ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। প্রথম দিন দেরি করলে এনজি ঝাড় দেবে।’

    ‘এলএলটি মানে?’ ওমলেট খেতে খেতে প্রশ্ন করে অভি।

    ‘এলএলটি মানে লার্জ লেকচার থিয়েটার। এখান থেকে বেরিয়ে ডানদিকে ইটের তৈরি যে লাল বাড়িটা দেখতে পাবি, সেটাই এলএলটি। আর মাঠের ওপারে ওই যে সাদা রঙের একতলা বাড়িটা দেখছিস, ওটার নাম এসএলটি। মানে স্মল লেকচার থিয়েটার। এখন এলএলটিতে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি আর বায়োকেমিস্ট্রির এইচওডিরা তোদের জ্ঞান দেবেন। শেষ হলে সবাই মিলে এসএলটিতে আসবি। ওখানে আমরা তোদের জ্ঞান দেব। বুঝলি?’

    ‘বুঝলাম,’ ওমলেট শেষ করে অভি বলে, ‘ওমলেটের দাম কত?’

    ‘মামলেট না বলে ওমলেট বললি? তাহলে ওমলেট বানান বল।’ হুঙ্কার ছাড়ে রিপু, ‘ভুল বললে দশজনের মামলেটের দাম দিতে হবে।’

    ‘ও-এম-এল-ই-টি-টি-ই,’ জবাব দেয় ইংরিজিতে অল্পের জন্য লেটার মিস করা অভি।

    ‘ফোট।’ মাথায় রামগাঁট্টা লাগায় রিপু। ঝোলা কাঁধে এলএলটির দিকে দৌড় লাগায় অভি। ডাক্তারি পড়তে আসার প্রথম দিনে ক্লাস যেন মিস না হয়।

    এলএলটির দরজায় শাড়ি পরে দু’জন সিনিয়র দিদি দাঁড়িয়ে। হাতে গোলাপ ফুল। অভি নিতে যাবে, এমন সময় কোত্থেকে দৌড়ে এল সালোয়ার কামিজ পরা একটা মেয়ে। কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা। ঘাড় পর্যন্ত চুল। গায়ের রং ফ্যাকাশে সাদা। চোখে কালো, মোটা ফ্রেমের চশমা। শাড়ি পরা দিদির হাত থেকে গোলাপ ফুল নিয়ে, অভিকে ডজ মেরে আগে ঢুকে গেল।

    গোলাপ ফুল নিতে নিতে অভি বলে ফেলল, ‘আস্তে লেডিস! কোলে বাচ্চা!’ শাড়ি পরা দুই দিদি তার দিকে তাকিয়ে চোখ পাকাল এবং হাসল। ঝোলাওয়ালি ঘুরেও দেখল না। অভি তড়বড় করে এলএলটির ভিতরে ঢুকল।

    আলো থেকে অন্ধকার ঘরে ঢুকলে আরও অন্ধকার লাগে। অভিরও তাই হল। আবছা আঁধারে বুঝতে পারল, এটা একটা গ্যালারি। অর্ধগোলাকৃতি বিশাল হলঘর জুড়ে কাঠের গ্যালারির বিস্তৃতি। গ্যালারির সামনে স্টেজ। স্টেজে দুজন মাঝবয়সি মহিলা বসে রয়েছেন।

    ‘এদিকে আয়।’ অভির হাত ধরেছে কেউ। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, ঝোলাওয়ালি। ‘তোত-তোমার নাম কী?’ প্রশ্ন করে অভি।

    ‘তুমি আবার কী? ক্লাসমেটকে কেউ তুমি বলে? আমার নাম দময়ন্তী সেনগুপ্ত। ডাকনাম দিঠি। তোর কী নাম?’ এক হ্যাঁচকায় অভিকে গ্যালারির প্রথম ধাপে তুলে নেয় দময়ন্তী, ‘চল। একদম পিছনে বসি। ওখান থেকে ভালো দেখা যাবে।’

    পিছনের সিটে বসে অভি নিজের নাম বলে। প্রশ্ন করে, ‘তোর বাড়ি কোথায়?’

    ‘দিল্লি। কলকাতার বাড়িটা কেমন, এখনও দেখা হয়নি। ওসব ছাড়। ওই দ্যাখ কে আসছে।’ আঙুল নাড়ে দময়ন্তী।

    মূল গেট দিয়ে ঢুকছে মিলিটারির মতো গোঁফওয়ালা, কালো, মোটা একটা লোক। পরনে প্যান্ট-শার্ট। কাঁধে ঝুলছে আস্ত কঙ্কাল। হাড়গুলো তার দিয়ে জোড়া। লোকটা প্যান্টশার্টের বদলে চোগা-চাপকান পরে থাকলে তাকে এবং তার কাঁধের প্রপকে বিক্রম আর বেতালের দৃশ্য বলে চালানো যেত। স্টেজে একটা কাঠের ফ্রেম রয়েছে। সেখানে আংটার সাহায্যে কঙ্কাল ঝুলিয়ে দেওয়া হল।

    ক্লাসশুদ্ধ সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। অভি বলল, ‘ইনিই কি অ্যানাটমির এইচওডি?’

    ‘সিট ডাউন।’ স্টেজ থেকে চিল চিৎকার করলেন মাঝবয়সি এক মহিলা। আধো অন্ধকারে দেড়শো জন ছেলেমেয়ে একসঙ্গে বসে পড়ল। মোটা লোকটার বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন মহিলা। তারপর বললেন, ‘শেম অন ইউ। ওর নাম কালুয়া। ও ডোম। তোমরা ওকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে গ্রিট করলে। আমাদের দেখে একবারও ওঠোনি।’

    ‘সেটা আপনাদের সমস্যা। আমাদের নয়।’ বলল দময়ন্তী। কথাটা বলেই ডেস্কের নীচে লুকিয়ে পড়ল। ঠিক সামনের সিটে বসে থাকা একটা মেয়ে সেটা শুনে ফিশফিশ করে বলল, ‘আমিও এটাই ভাবছিলাম।’

    এলএলটি জুড়ে পিনপতনের স্তব্ধতা। ‘কে বলল? কে বলল কথাটা?’ আবার চ্যাঁচালেন মহিলা। কেউ কোনও উত্তর দিল না।

    সাদা জামা এবং সাদা প্যান্ট পরা এক ভদ্রলোক স্টেজে উঠছেন। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। কাচের ফাঁকে ঝিকমিকোচ্ছে মেধাবী দৃষ্টি। কাউকে কিছু বলতে হল না। দেড়শো ছাত্রছাত্রী এক সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাল ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমির হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট নীলাক্ষ গঙ্গোপাধ্যায় ওরফে এনজিকে।

    ‘সিট ডাউন প্লিজ।’ পোডিয়ামের মাইক্রোফোনে মুখ রেখে মৃদু গলায় বললেন এনজি। সবাই বসে পড়ল। দময়ন্তীও ডেস্কের তলা থেকে উঠে বসল। সামনের সিটের মেয়েটা মুখ ফিরিয়ে দময়ন্তীকে বলল, ‘ওয়েল সেড।’

    ‘ওয়েলকাম টু ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল, প্রিভিয়াসলি নোন অ্যাজ রবিনসন হসপিটাল। দিস কলেজ হ্যাজ গট আ চেকারড হিসট্রি অফ ওয়ান হানড্রেড অ্যান্ড ফিফটি ইয়ার্স…’

    এনজির স্বাগত ভাষণের ফাঁকে দময়ন্তী সামনের মেয়েটার কাঁধে টোকা দিল। ‘নাম কী? কোন স্কুল?’

    ‘বৃন্দা ব্যানার্জি। মডার্ন হাই স্কুল।’ মুখ ঘুরিয়ে উত্তর দিল মেয়েটা। অল্প আলোয় অভি দেখল, বৃন্দা মার্বেল পাথরের মতো ফরসা আর চকচকে। ভুরু দুটো তুলির টানে আঁকা। পাতলা লাল টুকটুকে ঠোঁট। বারবি ডলের মতো দেখতে।

    ‘এমা, তুই তো সিকনির মতো ফর্সা! লজ্জা করে না?’ বলল দময়ন্তী।

    ‘তুইও তো আমারই মতো ফ্যাকাশে। তোর লজ্জা করে না?’ জানতে চায় বৃন্দা।

    ‘আর বলিস না।’ বিরক্তি ঝরে পড়ে দময়ন্তীর গলায়, ‘কলকাতার রোদে যদি কালো হওয়া যায়।’

    এনজি-র কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘মিট ডক্টর পার্বতী মুখার্জি, হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট, ফিজিওলজি। অ্যান্ড ডক্টর আরতি মজুমদার, হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট, বায়োকেমিস্ট্রি। এমবিবিএস শব্দটার ফুল ফর্ম ব্যাচেলার অব মেডিসিন অ্যান্ড ব্যাচেলার অব সার্জারি। তোমাদের চার বছরের এমবিবিএস কোর্সে তিনবার ইউনিভার্সিটি পরীক্ষা দিতে হবে। ফার্স্ট, সেকেন্ড অ্যান্ড ফাইনাল এমবিবিএস। ফার্স্ট এমবিবিএস এক বছরের কোর্স। এতে তোমাদের তিনটে সাবজেক্ট পড়তে হবে। অ্যানাটমি, ফিজিওলজি এবং বায়োকেমিস্ট্রি। সুতরাং আগামী এক বছরের জন্য তোমাদের ভাগ্য আমাদের তিনজনের হাতে। কারও কোনও প্রশ্ন আছে?’

    ‘ইয়েস স্যার!’ ফার্স্ট বেঞ্চ থেকে একটা হাত উঠল।

    ‘স্ট্যান্ড আপ অ্যান্ড গিভ ইয়োর ক্রেডেনশিয়াল।’ বললেন এনজি।

    ছেলেটি উঠে দাঁড়াল কিন্তু কোনও কথা বলল না। সমস্যা বুঝতে পেরে এনজি বাংলায় বললেন, ‘নাম বলো। কোন স্কুলের ছাত্র সেটা বলো। তারপর প্রশ্ন বলো।’

    ‘চন্দন সরকার। স্যামিলটন হাইস্কুল। নতুনগ্রাম।’ মিলিটারি অর্ডারের কায়দায় হাঁফ পেড়ে ঘোষণা করল ছেলেটি। ক্লাসরুমে হাস্যরোল উঠল।

    ‘তোমার প্রশ্নটা কী?’ এনজি বললেন।

    ‘এমবিবিএস এর ফুল ফর্ম কী করে ‘ব্যাচেলার অব মেডিসিন অ্যান্ড ব্যাচেলার অব সার্জারি’ হয়? ‘বি-ও-এম-এ-বি-ও-এস’ নয় কেন?’

    “বোমা বস” ‘বলছ?’ হাসলেন এনজি। ‘এমবিবিএস-এর পুরো কথাটা হল, ‘মেডিসিনে বাক্কালরিয়াস বাক্কালরিয়াস চিরারজি।’ এটা ল্যাটিন কথা। যার মানে ব্যাচেলর অব মেডিসিন অ্যান্ড ব্যাচেলর অব সার্জারি। কী ম্যাডাম, আপনি কী বলেন?’

    এনজির আমন্ত্রণে উঠে দাঁড়ালেন যে মহিলা, তিনিই কিছুক্ষণ আগে চিল চিৎকার করেছিলেন। তিনি মাইকের সামনে এসে চ্যাঁচালেন, ‘আয়্যাম ডক্টর পার্বতী মুখার্জি, এইচওডি ফিজিওলজি। তোমরা এত হ্যাফাজার্ড ভাবে বসেছ কেন?’

    অভি বুঝল মহিলার স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর উচ্চগ্রামে বাধা। মাইকেও চ্যাঁচাচ্ছেন। হালকা কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি পরেছেন। বাঁহাতে সরু রিস্টওয়াচ। শাঁখা-পলা বা সিঁদুর নেই।

    ‘বয়েজ অ্যাট দ্য টপ অ্যান্ড গার্লজ অ্যাট দ্য বটম। মেয়েরা সামনের সারিতে চলে এসো। একসঙ্গে বসবে না। হারি আপ।’ চ্যাঁচালেন পার্বতী মুখার্জি বা পিএম। এই কথায় এলএলটিতে বেজায় গন্ডগোলের সৃষ্টি হল। টপ ও বটমের আইডিয়া নিয়ে খানিক হাসাহাসির মধ্যে অভি দেখল দময়ন্তী আর বৃন্দা ফার্স্ট বেঞ্চে চলে গেছে। তার পাশে এসে বসেছে ‘বোমা বস’ ওরফে চন্দন সরকার। অভি ফিসফিস করে বলল, ‘চন্দন সরকার? যে এবার উচ্চ মাধ্যমিকে ফার্স্ট হয়েছে?’

    চন্দন লাজুক মুখে ইতিবাচক ঘাড় নাড়ল।

    অভির মনে পড়ল খবরের কাগজে দেখা চন্দনের ছবিসহ ইন্টারভিউ। চন্দনের বাবা কোর্টের করণিক এবং কৃষক। মা গৃহবধূ। স্বামীকে চাষের কাজে সাহায্য করেন। খেতের কাজ সেরে দু’বেলা পড়াশুনা করতে হতো চন্দনকে।

    অভির প্রাথমিক অনুভূতি হল ঈর্ষার। সবুজ রঙের একটা ছোট্ট সাপ বুকের বাঁদিকে মৃদু ফনা দোলাচ্ছে। সে মফসসলের মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে। জীবনে কোনও ক্রাইসিস নেই, কোনও স্ট্রাগল নেই। পাঁচজন গৃহশিক্ষকের কাছে পড়া, করেসপন্ডেস কোর্স আর মকটেস্টের সাহায্যে সে যতদূর গেছে, এই চাষার ছেলেটা বিনা অস্ত্রে সেই দূরত্ব টপকেছে অনায়াসে। অভির পিছনে দারিদ্রের চালচিত্র নেই বলে সে মহান নয়? নাকি সে চন্দনের মতো যথেষ্ট প্রতিভাবান নয়? নাকি দুটোই?

    স্টেজে বক্তব্য রাখছেন আরতী মজুমদার ওরফে এএম। বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স। পোশাক-আশাক নজরকাড়া। সাদা কালো কম্বিনেশনের কটকি শাড়ি আর টকটকে লাল রঙের ব্লাউজ। গলায় রূপোর হাঁসুলি। কপালে সিঁদুরের বড় টিপ। ‘বায়োকেমিস্ট্রি সাবজেক্ট হিসেবে তোমাদের ভালো লাগবে না। ফর্মুলা, কেমিক্যালস, ল্যাবরেটরি, রিঅ্যাকশন, ইকুয়েশান—এইসব দেখে ভীষণ বোর লাগবে। বায়োকেমিস্ট্রি বিষয়টি চিকিৎসাশাস্ত্রের সঙ্গে কতটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত তা তোমরা ভবিষ্যতে একদিন বুঝতে পারবে। আজ নয়। ততদিন, কিপ অন ক্র্যামিং। পড়ে যাও!’

    প্রাথমিক সম্বোধনের পর তিনজন হেড ডিপ স্টেজ থেকে নেমে এলএলটি থেকে বিদায় নিলেন। স্টেজে লাফাতে লাফাতে উঠল একদল ছেলেমেয়ে।

    ‘বস, আমরা সেকেন্ড ইয়ার, তোমাদের ইমিডিয়েট সিনিয়র।’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল টিনটিন। ‘বাই দ্য ওয়ে, আমার নাম টিনটিন রায়। আজ ষোলই অগাস্ট। তোরা ভর্তি হলি। আগামী তিরিশে অগাস্ট তোদের ফ্রেশার্স ওয়েলকাম দেওয়া হবে। তোদের একটা কোয়েশ্চেনেয়ার বিলি করা হচ্ছে। ফিল আপ কর।’

    অভির হাতে চলে এল প্রশ্নপত্র। প্রথম দিকে মামুলি প্রশ্ন। নাম, ঠিকানা, বাবার নাম, মায়ের নাম, ইস্কুল-হ্যানাত্যানা। তারপর আস্তে আস্তে প্রিয় খাদ্য, প্রিয় পানীয়, প্রিয় নায়িকা-নায়ক, প্রিয় বই—এইসব। সব শেষে, একপাশে লেখা, আরএসভিপি।আমার আশেপাশের সেরা রেস্টুরেন্ট ফর্ম ফিল আপ করতে করতে অভি চ্যাঁচাল, ‘আরএসভিপি মানে কী?’

    ফার্স্ট বেঞ্চ থেকে দময়ন্তী চ্যাঁচাল, ‘এটা একটা ফরাসি কথা। ইংরিজি অনুবাদ হল, ”রেসপন্স ইফ ইয়ু প্লিজ”। মানে, আমরা ওই দিন আসব নাকি আসব না—সেটা জানিয়ে দিতে হবে।’

    আসার ঘরে টিক মেরে ফর্ম জমা দিল অভি। ইনট্রোডাকশান শেষ। এলএলটি পর্ব শেষ। কাঠের গ্যালারিতে দুমদাম জুতোর আওয়াজ তুলে সবাই দৌড় লাগাল স্মল লেকচার থিয়েটারের দিকে।

    স্থাপত্যগত ভাবে এসএলটি একদম আলাদা। সাদা রঙের বাড়িটিকে হঠাৎ দেখলে মেট্রো সিনেমা হলের মিনিয়েচার সংস্করণ ভেবে ভুল হয়। এখানেও গ্যালারি। তবে লোহা ও কাঠের মিশ্রণে তৈরি। লম্বা লম্বা জানলাগুলো খোলা। দিব্বি রোদ আসছে। এলএলটির কাঠের অন্দরসাজের তুলনায় অনেকটাই গেরস্থ পোষা এসএলটি।

    অভি ঢুকে দেখল অশ্বক্ষুরাকৃতি টেবিলের পিছনে একদল ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে। এদের মধ্যে দুজন তার চেনা। রিপুদা আর আপ্পুদি।

    ‘বয়েজ অ্যাট দ্য টপ অ্যান্ড গার্লস অ্যাট দ্য বটম’—এই নিয়ন্ত্রণ এখন নেই বলে সবাই মিলিয়ে মিশিয়ে বসেছে। এদিক ওদিক দেখে অভি বসল বৃন্দা আর চন্দনের মাঝখানে।

    ‘স্টুডেন্টস ইউনিয়নের পক্ষ থেকে তোদের স্বাগতম জানাই। আমি সেক্রেটারি, রিপুদমন কর। সবাই রিপুদা বলে ডাকে। আর এ হল প্রেসিডেন্ট। অপরাজিতা বক্সি। সবাই আপ্পুদি বলে ডাকে।’ রিপু একে একে আলাপ করাল অ্যাসিস্টান্ট সেক্রেটারি, ভাইস প্রেসিডেন্ট, স্পোর্টস সেক্রেটারি, কালচারাল সেক্রেটারি, কমন রুম সেক্রেটারি এবং তাদের অ্যাসিস্ট্যান্ট পোর্টফোলিও হোল্ডারদের সঙ্গে। অভি খেয়াল করল সেকেন্ড ইয়ারের টিনটিন এখানেও আছে। সে ইউনিয়নের কালচারাল সেক্রেটারি।

    ‘এখানে মোচার ইউনিয়ন, না?’ ডান পাশ থেকে প্রশ্ন করল চন্দন।

    ‘মোচা আবার কী জিনিস?’ প্রতিপ্রশ্ন বৃন্দার।

    ‘জনমোর্চার ছাত্র সংগঠন। নাম ছাত্রমোর্চা। সরকারপন্থী সংগঠন। আমি স্কুলে মোচার সাপোর্টার ছিলাম।’ চন্দন জানায়।

    ‘উচ্চ মাধ্যমিকের ফার্স্ট বয় মোচা পার্টি করত? দেশের কী হবে রে!’ হেসে ফেলে বৃন্দা।

    বৃন্দার কথার মাঝখানে ডায়াসিং শুরু করল রিপু। ‘আলাপ করিয়ে দিই কালুয়াদার সঙ্গে। কালুয়াদা আমাদের হেড ডোম।’

    এলএলটিতে দেখা কালো, বেঁটে, মোটা, মোচওয়ালা মানুষটিকে দেখে আর কেউ উঠে দাঁড়াল না।

    ‘কালুয়াদের কাছ থেকে তোরা বোন সেট কিনতে পাবি। এক সেটের দাম পড়বে বারো হাজার টাকা। বোনসেট মানে মাথার খুলি থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত সমস্ত হাড়ের স্টক বিক্রি করে কালুয়াদা।’

    সবাইকে নমষ্কার করে কালুয়া বেরিয়ে গেল। রিপু বলল, ‘একটা ইম্পর্ট্যান্ট টিপ দিই। কাজে লাগবে। তোরা যখন কলেজের জন্য ব্যাকপ্যাক বা ন্যাপস্যাক কিনবি তখন তার সাইজ কী হবে?’

    সবাই চুপ। এ আবার কী প্রশ্ন?

    বৃন্দা হাত তুলল।

    ‘উঠে দাঁড়া। নাম বল।’

    ‘বৃন্দা ব্যানার্জি ফ্রম মর্ডান হাই স্কুল।’ তুলতুলে গলায় বৃন্দা জানাল, ‘দ্য ব্যাগ সাইজ শুড বি বিগার দ্যান দ্য সাইজ অফ মাই থাই।’ গ্যালারি থেকে নেমে সবার সামনে এসে নিজের ব্যাগের কোনাকুনি দৈর্ঘ্য নিজের থাইয়ে ফেলে দেখাল সে।

    ‘হোয়াই?’ মুচকি হেসে প্রশ্ন করে রিপু।

    ‘আমাদের শরীরের সব থেকে বড় হাড়ের নাম ফিমার। ফিমার হাতে থাকলে কেউ বাসে উঠতে দেবে না। তাই এমন একটা ব্যাগ কিনতে হবে, যার মধ্যে ফিমার ঢুকে যায়।’

    ‘ইজ ইয়োর ফাদার আ ডক্টর?’ আপ্পু জিজ্ঞাসা করে।

    এই প্রশ্নে বৃন্দা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। হুড়মুড় করে গ্যালারিতে ফিরে আসার আগে বলে, ‘আমার এক আঙ্কল ডাক্তার।’

    ‘মেয়েটাকে কী সুন্দর দেখতে মাইরি। ঠিক যেন সোনাক্ষী সিনহা।’ বৃন্দাকে দেখে বলে চন্দন। অভির বুকের বাঁদিকে সবুজ সাপটা আবার মৃদু ফণা দোলায়। বৃন্দা ভালো দেখতে, তাতে তোর কী রে চাষার ব্যাটা?

    ‘বৃন্দা ঠিক বলেছে। ব্যাগ কিনবে তোমাদের ফিমারের সাইজের থেকে বড়। আর এবার তোমাদের দেওয়া হচ্ছে বুকলিস্ট।’ দশপাতার প্রিন্ট আউট সবার হাতে ধরাচ্ছে ইউনিয়নের ছেলেমেয়েরা। ‘অ্যানাটমিতে গ্রে, ফিজিওলজিতে গাইটন এবং গ্যানং, বায়োকেমিস্ট্রিতে হার্পার পড়তেই হবে। অ্যানাটমিতে ডিসেকশানের জন্য কানিংহাম পড়তে হবে। স্নেল-এর ক্লিনিকাল অ্যানাটমিও লাগবে।’

    ‘শুধু ফান্ডা ঝাড়ছে! ঢপবাজ।’ দাঁতের ফাঁকে বলে বৃন্দা। ‘অ্যানাটমিতে দাদু আর বিডি চৌরাসিয়ার নাম বলল না। ফিজিওলজিতে ডিপি বা দেবাশিস প্রামাণিকের নাম বলল না। বায়োকেমিস্ট্রিতে সত্যনারায়ণ বা বাসুদেবনের নাম বলল না। নিজেরা চোথা পড়ে পাস করেছে আর আমাদের কাছে বড়বড় বাতেলা।’

    ‘দাদুটা কে?’ আবার নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে অভি।

    ‘দাদু মানে ডক্টর মিত্র। ওনার তিন খণ্ড অ্যানাটমির বই মুখস্থ করতে পারলে, ইউ উইল বি ফার্স্ট ইন ফার্স্ট এমবিবিএস। চৌরাসিয়ার বইটাও খুব লুসিড।’

    ‘কী করে এত জানলি? তোর আঙ্কলের কাছে?’

    ‘হ্যাঁ। উনি দাদুর কাছে প্রাইভেটে পড়তেন।’

    ‘প্রাইভেট টিউশনি? আমাদের লাইনে হয় নাকি?’

    ‘সব হয়। দাদুর গোয়ালে নাকি শ’খানেক ছেলেমেয়ে পড়ে। আঙ্কল বলেছেন, দাদু পড়ান ভালো।’

    রিপু বলল, ‘তোরা মন দিয়ে পড়াশুনা করবি। আমরা চলে যাওয়ার পর এখানে উল্টোপাল্টা রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তোদের মাথা খাওয়ার জন্য ডায়াসিং করতে আসবে সিনিয়র দাদাদিদিরা। ওদের ভবিষ্যত অন্ধকার। তোরা নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করিস না।’

    সারিবদ্ধভাবে বেরিয়ে গেল রিপু, আপ্পু অ্যান্ড কোং। সারা ক্লাস দেখল, এসএলটির দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে চারটি ছেলে এবং একটি মেয়ে। এদের মধ্যে একটি ছেলেকে অভি চেনে।

    ‘নমষ্কার বন্ধুরা। আমার নাম সব্যসাচী সেন। আমি থার্ড ইয়ারে পড়ি।’ কথা বলা শুরু করল একগাল দাড়িওয়ালা, মোটা চশমা পরা, কাঁধে ঝোলা ব্যাগওয়ালা একটা ছেলে। ‘আমার বাড়ি বীরভূমের আমোদপুরে। আমার মতো তোদের অনেকেই জেলা বা মফসসল থেকে জয়েন্ট এনট্রান্সে চান্স পেয়ে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কলেজে পড়তে এসেছিস। জয়েন্ট এনট্রান্স পরীক্ষা যদি কোনও লিটমাস টেস্ট হয়, তা হলে তোরা তাতে পাস। কিন্তু এটাই একমাত্র লিটমাস টেস্ট নয়। ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল তোদের ডাক্তার হতে শেখাবে। কিন্তু মানুষ হতে শেখাবে আমাদের চারপাশে বয়ে চলা জীবন। কেন টুইন টাওয়ার আত্মঘাতী বোমার আঘাতে ভেঙে যায়, কেন আমলাশোলের মানুষ না খেতে পেয়ে মরে যায়, কেন গুজরাতে দাঙ্গা বাঁধে, কেন পেট্রল আর ডিজেলের দাম বাড়ে, কেন সরকার বদল হলেও আমাদের কোনও বদল হয় না-এইসব প্রশ্নের উত্তর শেখাবে জীবন। শুধু পড়াশুনো করলে, শুধু বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকলে, শুধু ফেসবুক আর টুইটার করলে, শুধু কানে আইপডের তার গুঁজে রাখলে, শুধু মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা দেখলে আমাদের জীবনদর্শন অসম্পূর্ণ থাকে।’ সামান্য দম নেয় সব্যসাচী, ‘আমরা একটা ছোট্ট দল। নাম প্রোগ্রেসিভ মেডিক্যাল ফোরাম বা পিএমএফ। পড়াশুনোর ফাঁকে ফাঁকে রাজনৈতিক বই পড়ি, কলকাতার বস্তিতে আর গ্রামে গিয়ে ফ্রি মেডিক্যাল চেক আপ করি। তোদের আগ্রহ থাকলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিস। কোনও চাপ নিস না। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করলে আমরা তোদের খেয়ে ফেলব না।’

    অভি হাঁ করে সব্যসাচীর কথা গিলছে। সব্যসাচী বলছে, ‘আমার সঙ্গে যারা রয়েছে, তারা তোদের একটা পুস্তিকা দেবে। তাতে আমাদের ফোন নম্বর দেওয়া আছে। ইচ্ছে হলে যোগাযোগ করিস। যদি র‌্যাগিং হয়, অবশ্যই যোগাযোগ করিস। আমরা অ্যাকটিভলি ব্যবস্থা নেব।’

    সব্যসাচীর কথা শেষ। দ্বিতীয় ছেলেটি বলল, ‘আমার নাম অনাবিল লাহিড়ী। আমি তোদের হাতে পুস্তিকা পৌঁছে দিচ্ছি।’

    অন্য দুজন ছেলে আর একটি মেয়েও নিজের পরিচয় দিচ্ছে। অভি তাদের কথা শুনছে না। সে বিলুর দিকে তাকিয়ে। দাদা যখন তার হাতে পুস্তিকা ধরাল, অভি ফিসফিস করে বলল, ‘বাড়ি গিয়েই মাকে বলছি। তুই পলিটিকস করিস।’

    বিলু পাল্টা জবাব দিল, ‘মাকে বললে একটা ক্যালানিও মাটিতে পড়বে না।’ তারপর হাসিহাসি মুখে পুস্তিকা বিলি করতে লাগল।

  • তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    অভিজ্ঞান

    মঞ্চের কেন্দ্রে এখন বৃন্দা। টিনটিন বলল, ‘তেরা নাম কেয়া হ্যায় বৃন্দা?’

    বৃন্দা পরে আছে হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি। ময়ূরকণ্ঠি রঙের ব্লাউজ। চুলে টপনট করা। স্পটলাইটের চড়া আলোয় ভুরু কুঁচকে অডিয়েন্সের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মাই নেম ইজ বন্ড-ওপাধ্যায়। বৃন্দা বন্ডোপাধ্যায়।’

    বৃন্দার মুখ গোল। টপনট করার ফলে লম্বাটে ভাব এসেছে। ঠোঁট সত্যি সত্যিই গোলাপি, না শাড়ির ছায়া পড়েছে, কে জানে! অভি কনফিউজড হয়ে যায়। এত সুন্দর কোনও মেয়ে হতে পারে? এত নিখুঁত? এত সরল? এত নিষ্পাপ?

    টিনটিন বলল, ‘দ্যাটস মোর লাইক আ বন্ড গার্ল!’

    ‘দ্যাটস, মোর লাইক বন্ড, আই প্রিজিউম!’ নিষ্পাপ চোখ অডিটরিয়ামে বিছিয়ে বলল বৃন্দা। দর্শকাসনে বসে থাকা অভির হৃদয় একটি স্পন্দন মিস করল। পুলিশ যেভাবে চোর ধরে, ডান হাত দিয়ে সেইভাবে বাঁ হাতের তালু খিমচে ধরে সে। তার জিভ গরমকালের পিচের রাস্তার মতো শুকনো। শীততাপনিয়ন্ত্রিত সেন্ট্রাল হলে বসে গরম লাগছে। ঘাড়ে, কানে, রগে ঘাম হচ্ছে বিনবিন করে।

    ‘লেটস কাট দ্য ক্র্যাপ। কী পারফর্ম করবি বল।’ টিনটিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে বৃন্দার দিকে।

    ‘পারফর্ম করব?’ ফ্যাকাশে হাসে বৃন্দা, ‘আমি তো কিছু পারি না। সাবিনা বা শ্রীপর্ণার মতো গান জানি না, জেমসির মতো নাচ জানি না…’

    ‘জেমসি নাচবে একথা বলার জন্য তোকে মঞ্চে ডাকা হয়নি। ডোন্ট বি আ স্পয়েল স্পোর্ট,’ আলতো ধমক দেয় টিনটিন। ‘কী করবি বল।’

    ‘আমি বরং একটা কবিতা বলি? কেমন?’ মিনতি করে বৃন্দা।

    ‘ঠিক হ্যায়। স্টার্ট।’ শ্রাগ করে মঞ্চের এক পাশ সরে যায় টিনটিন। মঞ্চের মাঝখানে এখন বৃন্দা। তার ওপরে পড়েছে স্পটলাইট। আলোকবৃত্তের মাঝে দাঁড়িয়ে সে কাঁপা গলায় বলে—

    ‘হাত তোলো যদি নৃত্যনাট্য

    কথা যদি বলো ছন্দ

    ভ্রুকুটিশাসনে অবশ করেছ

    শরীরের চতুরঙ্গ…’

    শঙ্খ ঘোষ! অসহায় উত্তেজনায় শিউরে ওঠে অভি। তার ধারণা হয়েছিল, যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্য না পড়ে, প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরিজিতে অনার্স না পড়ে, কবিতা-গপপো-উপন্যাসের থেকে নিরাপদ দূরত্বে চলে এসেছে সে। এখন তো দেখছে অন্য ব্যাপার। ‘স্বয়ং খোদা’ তাকে ধাওয়া করে ফিরছেন কবিতা থেকে কবিতায়।

    বৃন্দা বলছে—

    ‘শরীরে হঠাৎ ফেরে কৈশোর

    মাটিতে ছোঁয়ালে পা

    আর কোনওদিন তোমার ঘরের

    ত্রিসীমায় যাব না।’

    অভির শরীরে সত্যিই ফিরে আসছে কৈশোর। যে সাহিত্যের প্রেমে তার কিশোরবেলা কেটেছে, বাবা-মায়ের তাড়নায় তাকে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলেছিল। আজ সাহিত্য সেই অপমানের শোধ তুলছে। শোধ তুলছেন কবি। শোধ তুলছে পুতুল-পুতুল মেয়েটা। গোলাপি সারল্যে সামনের দিকে তাকিয়ে ও কাকে খুঁজছে? অভিজ্ঞানকে? না অন্য কাউকে? অভির মনে পড়ে যায় বিলুর পড়ানো ‘প্রতিহিংসা’ কবিতার লাইনগুলো—

    ‘যুবতী কিছু জানেনা, শুধু প্রেমের কথা বলে

    দেহ আমার সাজিয়েছিল প্রাচীন বল্কলে…’

    অভির মনে হয় সে এক প্রত্নগাছ, যে সৃষ্টির আদি থেকে দাঁড়িয়ে রয়েছে নির্জলা, বন্ধ্যা, প্রান্তরে। তার চারিদিকে প্রাগৈতিহাসিক লাভা টগবগ করে ফুটছে। পৃথিবী নিজের অক্ষে নিজের নিয়মে ঘুরে চলেছে। মাথার ওপরে জ্বলছে সূর্য। দিন যাচ্ছে, রাত যাচ্ছে, সপ্তাহ-মাস-বছর যাচ্ছে, দশক ও শতক যাচ্ছে। রেন ফরেস্ট তৈরি হচ্ছে, অ্যামাজন নদী গতিপথ বদলাচ্ছে, মাথা তুলছে হিমালয়, হ্যালির ধূমকেতু উড়ে যাচ্ছে বারবার। আকাশ ভরা সূর্য তারা মাথায় নিয়ে অভি একা ক্লান্তিহীন দাঁড়িয়ে। আর তাকে সন্তর্পণে ঢেকে রাখছে প্রাচীন বল্কল, বৃন্দা ব্যানার্জি।

    অভি কিছু শুনতে পাচ্ছে না। চারিদিক আউট অব ফোকাস হয়ে যাচ্ছে। শুধু গোলাপি এক দীপশিখা তার চোখের সামনে তিরতির করে কাঁপছে। অভি বুঝতে পারল, সে ওই গোলাপি মেয়েটার প্রেমে পড়ে গেছে। সহায়হীন, অবলম্বনহীন ভাবে প্রেমে পড়ে গেছে।

    চোরের মতো সেন্ট্রাল হল থেকে বেরিয়ে এল অভি। কে মিস আইএমসি হল, কে মিস্টার আইএমসির খেতাব জিতল, টিনটিনের লেখা নাটক ‘ফিফটি ফিফটি’ কেমন হল—এইসব জানার কোনও ইচ্ছেই তার নেই। জানার ইচ্ছে নেই রয়্যালের বিরিয়ানি কেমন খেতে, মদ্যপান করে নাচানাচি করতে কেমন লাগে।

    নিজের মধ্যে আকস্মিক জেগে ওঠা এই অনুভূতি তার কাছে নতুন। শরৎকালের শিউলি ফুলের মতো নতুন। গ্রীষ্মের কালবৈশাখীর মতো নতুন। বর্ষার প্রথম কদম ফুলের গন্ধের মতো নতুন। এই বুক ছাপানো নতুন অনুভূতিমালা নিয়ে অভি কী করবে?

    ন্যাপস্যাক কাঁধে ভূতগ্রস্থের মতো রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকে অভি। বিলুকে বলা উচিত ছিল, যে সে বাড়ি চলে যাচ্ছে। সেন্ট্রাল হলে বারদুয়েক বিলুকে দেখেছে। কোনও কথা বলেনি।

    অভি ফোন করার প্রয়োজন বোধ করল না। সাড়ে আটটার ডানকুনি লোকাল ধরলে রাত দশটার মধ্যে বাড়ি ঢুকে যাবে। লক্ষ্মী নিবাসে ঢুকে ফোনে জানিয়ে দিলেই হবে যে সে বাড়িতে।

    শেয়ালদা স্টেশানের দিকে দৌড়তে দৌড়তে অভি বিড়বিড় করে—

    ‘আমিও পরিবর্তে তার রেখেছি সব কথা

    শরীর ভরে ঢেলে দিয়েছে আগুন, প্রবণতা।’

    অরুণা স্কুপ টিভিতে খবর দেখছিলেন। অভিকে ঢুকতে দেখে বললেন, ‘কী হয়েছে রে? মুখ শুকনো লাগছে কেন?’

    ‘কই! না তো!’ অরুণাকে এড়িয়ে চিলেকোঠার ঘরের দিকে এগোল অভি।

    ‘ওপরে পরে যাস। আগে আমার কাছে এসে বোস। কলেজে র‌্যাগিং করেছে নাকি? বিলু ছিল না?’ অরুণা নাছোড়বান্দা।

    এখন এখান থেকে পালালে পরে নীচে নেমে কৈফিয়ত দিতে দিতে অভির কালঘাম ছুটবে। তার বদলে দু-চারটে মিথ্যে কথা বলে জিজ্ঞাসাবাদ বন্ধ করা যাক।

    ‘দাদা ছিল। আমার ওইসব ঝাঁই-ঝপাঝপ মিউজিক সহ্য হয় না। তাছাড়া ওরা খেতে দেবে অনুষ্ঠান শেষ হলে। অতক্ষণ থাকা পোষাল না। তাই পালিয়ে এলাম।’হেডফোনের সেরা অফার

    ‘দুপুর থেকে কিছু খাসনি?’ ছেলের খিদের কথা শুনে মুহূর্তের মধ্যে অরুণার প্রশ্নমালা গায়েব। ‘এখন খেয়ে নিবি? না বাবা এলে খাবি?’

    ‘বাবা এখনও ফেরেনি?’ দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকায় অভি। দশটা পনেরো বাজে। ‘বাবা তো এত রাত কখনও করে না! নাটক-ফাটক আছে নাকি?’

    ‘জানি না!’ পিড়িং পিড়িং করে রিমোট টিপে চ্যানেল চেঞ্জ করছে অরুণা, ‘ফোন করলে ফোন ধরছে না। মোবাইল বেজে যাচ্ছে।’

    ‘তুমি একটা অমলেট ভেজে দাও।’ ল্যান্ডফোনের পাশে বসে অভি বলে, ‘বাবার ব্যাপারটা আমি দেখছি।’

    অরুণা অনিচ্ছার সঙ্গে উঠে রান্নাঘরের দিকে এগোলেন। অভি প্রথমে ফোন করল বিলুকে। বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পরে বিলু ফোন ধরে বলল, ‘তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে গেলি কেন? রিপু তোর খোঁজ করছিল।’

    ‘আমার বোর লাগছিল।’ ক্যাজুয়ালি বলে অভি। তার বুকের বাঁদিকে আবার গাবগুবাগুব শুরু হয়েছে, ‘প্রোগ্রাম শেষ? কে ক্রাউন পেল?’

    ‘এদিকে বলছিস বোর লাগছিল। আবার জিজ্ঞাসা করছিস ‘কে ক্রাউন পেল?’ কী ব্যাপার রে? স্টেজে তো তোকে বেশি মুরগি করেনি!’

    ‘আহ! তুই বল না।’

    ‘মিস্টার আইএমসি হয়েছে সুরজ। মিস আইএমসি বৃন্দা।’

    ‘বৃন্দা’ নামটা শোনামাত্র অভির গাবগুবাগুব বেড়ে গেল। কান আর গাল জ্বালা করছে। গলা শুকনো। কোনও রকমে সে বলে, ‘আমি ভেবেছিলাম জেমসি হবে।’

    ‘মেয়েটার অ্যাটিটিউড প্রবলেম আছে। এত অ্যাগ্রেসিভ উত্তর দিল যে পাবলিক ব্যাপক প্যাঁক দিয়েছে। ‘বাঙালিদের গায়ে দুর্গন্ধ’—এইরকম কমেন্ট করল। তারপর অডিয়েন্স এমন খিস্তি করেছে যে মেয়েটা স্টেজেই কেঁদে ফেলল। উদুম বাওয়াল।’

    ‘প্রোগ্রাম কি শেষ? কোনও আওয়াজ পাচ্ছি না তো?’

    ‘টিনটিনের নাটকের পরে শুরু হয়েছে ধিঙ্গিনাচন। আমি হোস্টেলে চলে এসেছিলাম। পরে আবার গেলাম। তুই বাড়ি গিয়ে ঠিকই করেছিস। বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো মদ খেয়ে মাতাল হয়ে পুরো কলেজ ঘুরে বেড়াচ্ছে। লোকাল ছেলেছোকরাগুলো এই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। গত বছর একটা মেয়েকে সেন্ট্রাল হলের পিছনে মলেস্ট করেছিল। তাই নিয়ে চূড়ান্ত অশান্তি হয়।’

    ‘বৃন্দা কোথায়?’ অভির মুখ দিয়ে প্রশ্নটা বেরিয়ে গেল। ভুল সময়ে, ভুল মানুষের কাছে ভুল প্রশ্ন। প্রশ্নটা করেই জিভ কাটল অভি। কেলো করেছে! বিলু নিশ্চয়ই সব বুঝে গেল।

    বিলু কোনও রিঅ্যাকশান দেখাল না। বলল, ‘ডে-স্কলার মেয়েদের আমরা বাসে বা গাড়িতে তুলে দিয়েছি। শ্রীপর্ণা, দময়ন্তী আর বৃন্দা বাড়ি চলে গেছে। জেমসি, সাবিনাদের মতো হোস্টেলাইটদের নিয়েই চিন্তা। আকণ্ঠ ভদকা খেয়ে এখনও নাচানাচি করছে।’

    বিলুর চিন্তা শুনে অভির মনে পড়ে গেল মনোজের না ফেরা নিয়ে অরুণার দুশ্চিন্তার কথা। বিলু বলল, ‘বাবা এখনও বাড়ি ফেরেনি।’

    ‘তো? এই নিয়ে টেনশান খাওয়ার কী আছে? দেখ গিয়ে, হয় তো জীবন সংগ্রামের নাটকের রিহার্সাল দিচ্ছে। আমি ছাড়লাম।’ বিলু ফোন কেটে দিল।

    অভি ঝটপট তিনতলায় উঠে কাপড় জামা ছেড়ে বারমুডা আর টি-শার্ট গলিয়ে নীচে নেমে এল। বাথরুমে থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে দেখল, টেবিলে অমলেট রাখা। অরুণা আবার রিমোট হাতে টিভির চ্যানেল বদলাচ্ছেন। অভিকে দেখে বললেন, ‘বিলু কী বলল?’

    ‘বলল বাবা হয়তো নাটকের রিহার্সাল নিয়ে ব্যস্ত। চিন্তা করতে বারণ করল।’ এক টুকরো অমলেট মুখে পুরে অভি আবার ল্যান্ডফোনের রিসিভার তোলে। ‘বাবাকে একবার ফোন করে দেখি।’

    ফটাফট মোবাইলের দশটা নম্বর ডায়াল করে সে। মনোজের মোবাইলে গান বাজছে, ‘ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে, আলো ফুটছে, প্রাণ জাগছে…’ সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে গণসঙ্গীতটি বেজে একসময় থেমে গেল। রিসিভার ক্রেডল রেখে অভি আর একটুকরো অমলেট মুখে পুরল।

    ‘ধরল না?’ নিউজ চ্যানেল দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক গলায় বলেন অরুণা।

    ‘না,’ অমলেট শেষ করে সোফা থেকে ওঠে অভি। ‘নীচে গিয়ে একবার মানদা পিসি আর রাধাদির সঙ্গে দেখা করে আসছি।’

    ‘এক মিনিট শোন,’ বিড়বিড় করে বলে অরুণা, ‘টিভিতে দেখাচ্ছে যে ধর্মতলায় একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। দুটো সরকারি বাস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। তোর বাবা ওখানে ছিল না তো?’

    অরুণার কথা শুনে চমকে ওঠে অভি। মনোজ মাঝে মাঝে ধর্মতলায় যান। মেট্রো চ্যানেলে পথনাটক করেন। এই সম্ভাবনার কথা তার মনে হয়নি। এই জন্যই অরুণাকে এত চিন্তান্বিত লাগছে?

    ‘ভ্যাট! তোমার যত ফালতু চিন্তা!’ এক পর্দা গলা তুলে প্রতিবাদ করে অভি। ধমকটা যত না অরুণাকে, তার চেয়ে বেশি নিজেকে। দুশ্চিন্তা খুব ছোঁয়াচে রোগ। এক্ষুনি অরুণার কাছ থেকে তার কাছে চলে আসবে। অরুণাকে টিভির সামনে বসিয়ে একতলায় নেমে আসে সে।

    একতলায়, সিঁড়ির বাঁদিকের ঘরে থাকে মানদা। তার ঘরে একটা সিএফএল আলো জ্বলছে। সেই আলোয় দেখা যাচ্ছে মানদা মুখে স্নো মাখছে। দরজার বাইরে থেকে অভি বলল, ‘পিসি, আসব?’ স্নো মাখা বন্ধ রেখে একগাল হেসে মানদা বলে, ‘এসো গো! আজ মড়া কাটলে?’

    সরু খাটে বসে অভি বলে, ‘ধুস! ওসব পরের সপ্তাহ থেকে। তোমার কী খবর?’

    ‘খবর আর কী? খাটতে খাটতে জান কয়লা হয়ে গেল, তবু তোমার মায়ের মন ভরে না। বাড়িতে থাকতে দিয়েছে বলে মাথা কিনে নিয়েছে। আড়িয়াল একটা মরদ পাই, পালাব তার সঙ্গে। তোমরা খুঁজেও পাবে না।’

    মানদা পিসি মাঝে মধ্যে এমন শব্দ ব্যবহার করে যেগুলোর মানে অভি জানে না। এই যেমন সে এখন ‘আড়িয়াল’ শব্দটা শুনল। বাংলাদেশে আড়িয়াল খাঁ নামে একটা নদ আছে। নদ আর নদীর তফাত আছে। অজয় বা ব্রহ্মপুত্র হল নদ। গঙ্গা বা যমুনা, নদী।

    আড়িয়াল খাঁ হল নদ। বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে ‘আড়িয়াল’ শব্দটা মরদকে একটা বৈশিষ্ট দিচ্ছে। ডাকাবুকো বা ডানপিটে বা ওয়েল বিল্ট—এইরকম কোনও মানে হবে। বিলু একবার অভিকে বলেছিল, মানদার নাকি দু’বার বিয়ে হয়েছিল। প্রথমবার বর তাড়িয়ে দেয়, কেন না মানদা বন্ধ্যা। দ্বিতীয় বিয়ের পরেও সন্তানহীনতার সমস্যা। তবে এই বরটা বেশি শয়তান ছিল। সে মানদাকে তাড়ানোর বদলে মুম্বইতে বেচে দিয়েছিল। বন্ধ্যা যৌনকর্মীর চাহিদা বেশি, কেন না তাকে নিরোধ ব্যবহার করতে হবে না। কামাতিপুরার ঠেক থেকে মানদাকে উদ্ধার করেছিল কলকাতার এক এনজিও। মানদার পুনর্বাসনের জন্য এনজিও থেকে মহাকরণের পাশে ঘুগনির দোকান করে দিয়েছিল।

    কামাতিপুরা থেকে দালালরা এসে মানদাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। মনোজ সেদিন বাঁচিয়েছিলেন মানদাকে। থানায় গিয়ে সব খবর দিয়ে লক্ষ্মী নিবাসে নিয়ে এসেছিলেন।

    ‘আড়িয়াল’ বা এই জাতীয় সাংকেতিক ভাষা মানদা আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে শিখেছে। ওর মুখ খুব খারাপ। যাবতীয় অশালীন বিষয়ে তীব্র আগ্রহ। নিয়মিত সাজগোজ করে, ঝকমকে শাড়ি পরে সন্ধে নাগাদ পাড়ায় বেড়াতে বেরোয় আর ফিরে এসে অরুণাকে শোনায়, ‘আজ গঙ্গার ধারে একটা চিসসা মরদ দেখলাম।’

    অরুণা রাগ করে বলেন, ‘মুখ-পাতলা মেয়েছেলে!’

    ‘তুমি মুখে ওটা কী মাখছ?’ প্লাস্টিকের ডিব্বা হাতে নিয়ে বলে অভি। হাত থেকে কৌটা কেড়ে নিয়ে মানদা ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘এই সব দিকে নজর কেন?’

    যা দেখার অভি দেখে নিয়েছে। স্নোয়ের ঢাকনার ওপরে লেখা, ‘রাজারানি স্নো। নিমেষে অবাঞ্ছিত রোম তোলার সেরা উপায়।’

    হেয়ার রিমুভিং ক্রিম নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে মানদার ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির ডান দিকের ঘরে ঢোকে অভি। এই ঘরে রাধা থাকে।

    রাধার ঘরে ষাট পাওয়ারের বালব জ্বলছে। ময়লা আলোর তলায় চৌকি পাতা। চৌকির ওপরে পাতলা এবং নোংরা গদি, তেলচিটে চাদর, ল্যাতপ্যাতে বালিশ। রাধার যখন মুড ঠিক থাকে তখন সে সোডা আর সাবান দিয়ে বিছানার চাদর আর বালিশের ওয়াড় কাচে, বালিশ আর গদি রোদে শুকোতে দেয়। মুড অফ থাকলে ওসবের দিকে তাকায় না। বিলু বলে ‘তার-কাটা ফেজ’ আর ‘তার-জোড়া ফেজ’। এখন রাধার তার-জোড়া ফেজ চলছে।

    চৌকিতে বসে রাধাদি গুনগুন করে কী একটা বলছে। অভি বলল, ‘কী বলছ রাধাদি?’

    ‘শায়েরি গো শায়েরি। শুনবে নাকি?’ দরাজ গলায় বলে রাধা।

    ‘শোনাও,’ নোংরা বিছানায় বসে বলে অভি।

    গলা খাঁকরে রাধা বলে,

    ‘বাঁধলে দো-চার বোতল কফন মে

    কবর মে বৈঠকে পিয়া করেঙ্গে।’

    ‘ওয়াহ ওয়াহ!’ রাধাকে সাবাশি দেয় অভি। রাধা বলে—

    ‘বাঁধলে দো-চার বোতল কফন মে

    কবর মে বৈঠকে পিয়া করেঙ্গে।’

    ‘আগে!’ হাঁক পাড়ে অভি। মুচকি হেসে রাধা বলে—

    ‘যব মাঙ্গেগে খুদা হিসাব গুনাহ কা

    এক দো পেগ উসে ভি দিয়া করেঙ্গে।’

    ‘কেয়া খুব! কেয়া খুব!’ ওস্তাদের মতো ঘাড় নাড়ে অভি। শায়েরি শেষ করে গান ধরেছে রাধা। গানটা অভির চেনা। কেন না রাধা একটাই গান জানে। গানটা হল—

    ‘গারো পাহাড়, গারো পাহাড়।

    গারো পাহাড়ের কী যে বাহার।

    নেই কো তৃষ্ণা নেই আহার।

    গারো পাহাড়। গারো পাহাড়।’

    এই অদ্ভুত গানটা মাঝে মধ্যেই রাধা গায়। মনোজ বলেন, ‘এই গানের প্রথম লাইনটা রাধা পাগলি ঠিকঠাক গায়। বাকিটা ওর বানানো।’

    গান শেষ করে রাধা একটা বড়, রঙিন কাগজ খুব মন দিয়ে কী সব দেখতে লাগল। অভি জিজ্ঞাসা করল, ‘এত মন দিয়ে কী দেখছ রাধাদি?’

    ‘ম্যাপ!’ হাসল রাধা। সাদা থান পরিহিতা, সাদা কদমছাঁটওয়ালা বৃদ্ধাকে হলদে আলোয় রহস্যময় লাগছে।

    ‘কীসের ম্যাপ?’

    ‘আমার শ্বশুরবাড়ির।’ ঝটপট কাগজ ভাঁজ করে রাধা। অভি দেখে ওর হাতে আর্কিওলজিকাল সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার ছাপা ভারতবর্ষের ম্যাপ।

    ‘তোমার শ্বশুরবাড়ি গারো পাহাড়ে?’ নিরীহ প্রশ্ন করে অভি।

    ‘কাছাকাছি বলেছ। মেঘালয়ে। আমার জন্ম বরিশালের অশথতলা গ্রামে। বিয়ে হয়েছিল বার্মায়। আমরা তো বার্মাতে থাকতাম। গন্ডগোলের সময় যখন তোমাদের এখানে চলে আসছি, তখন টুরাতে ওর সঙ্গে দেখা।’ লজ্জালজ্জা মুখে বলে রাধা।

    ‘টুরা?’

    ‘ভূগোলেতে গোল নাকি? গারো পাহাড় মেঘালয়ের তিনটে জেলা জুড়ে। তার মধ্যে একটা টুরা। ভাবছি একবার ঘুরে আসব।’

    এই রে! রাধা পাগলি তার-কাটা ফেজে চলে গেছে। এবার ভুলভাল বকবে। কেটে পড়া বেটার। পালানোর জন্য অভি বিছানা থেকে ওঠে। রাধা তার হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে বলে, ‘আমি কিন্তু সব জানি।’

    ‘কী জানো?’ মিনমিন করে বলে অভি। পাগল নাকি এক্সট্রা-সেনসারি পারসেপশান থাকে। ইএসপি বা এক্সট্রা সেন্সরি পারসেপশান দিয়ে রাধা তার মনের অবস্থা জেনে গেল নাকি?

    ‘ইএসপি’ থেকে একটা মজার ঘটনা মনে পড়ল। বেলুড় থেকে বাসে করে ধর্মতলা বা এসপ্ল্যানেড যেতে ভরসা চুয়ান্ন নম্বর বাস। চুয়ান্ন নম্বর বাসের সামনের কাচে চুন দিয়ে, কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং হাতের লেখায় লেখা থাকে ‘ইএসপি’, যেটা আদতে এসপ্ল্যানেড বোঝাতে লেখা আছে। বিলু অনেকদিন পর্যন্ত অভিকে বুঝিয়েছিল, চুয়ান্ন নম্বর রুটের ড্রাইভাররা ‘এক্সট্রা সেন্সরি পারসেপশান’ দিয়ে বাস চালায়।

    ‘ইএসপি’ থেকে এত কথা মনে পড়ে গেল। শব্দ নিয়ে এই মোহ কবে যে যাবে অভির! নিজের ওপরে বিরক্ত হয়ে ভুরু কুঁচকে সে রাধার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কী জানে রাধা? কেন ও বলল, ‘আমি কিন্ত সব জানি?’

    ‘উনি আছেন।’ ওপর দিকে তর্জনী নির্দেশ করে রাধা। ‘উনি সব জানেন, সব দেখছেন, সব কিছুর হিসেব রাখছেন। ভুলেও ভেবো না কেউ পার পাবে। এত অনাচার চলছে, এত পাপ চারিদিকে, এত লোভ—এ জিনিস আর বেশি দিন চলবে না। আমার কাছে শুনে নাও, এন্ড ইজ নিয়ার।’

    ‘ভগবানের কথা বলছ?’ নিরীহ মুখে প্রশ্ন করে অভি।

    ‘মূর্খ মানবক! ভগবান ছাড়া আর কিছু মাথায় আসে না? অমন মাথা রাখার কী দরকার? হাড়িকাঠে দিয়ে এসো। ভগবান তো মানুষের তৈরি করা কনসেপ্ট। শূন্য থাকলে আঁক কষতে সুবিধে হয় বলে মানুষ শূন্য বানিয়েছে। ভগবান থাকলে পাপপুণ্যের দাঁড়িপাল্লায় ফেলে মানুষকে কুচিকুচি করতে সুবিধে হয়, তাই ভগবানকে বানানো হয়েছে। মোহর, কার্তুজ আর শৃংখলের মতো ভগবানও একটা যন্ত্র। কিন্তু সে কি তোমরা বুঝবে?’

    বাপরে! কী কঠিন ভাষণ! অভি বলল, ‘তাহলে তোমার উনিটা কে?’

    ‘তোমার বোঝার সময় আসেনি। সময় এলে আপনি বুঝবে। সেদিন কেঁদে কূলকিনারা পাবে না।’ বিরক্ত হয়ে বলে রাধা, ‘এখন ওপরে যাও। না হলে তোমার মা চেল্লাবে।’

    টুকটুক করে ওপরে আসে অভি। অরুণা এখনও টিভির সামনে বসে স্কুপ চ্যানেলে অ্যাকসিডেন্টের খবর দেখছেন।

    ‘খেতে দেবে না?’ জানতে চায় অভি। ‘এগারোটা বাজতে যায়।’

    ‘এদিকে আয়!’ হাত নেড়ে ছেলেকে ডাকেন অরুণা। তাঁর আহ্বানে অভি সোফায় বসে টিভির দিকে তাকায়। সঞ্চালকের বক্তব্য অনুযায়ী দুটি বাসের আগুন নিবিয়ে ফেলা হয়েছে। বাসযাত্রীরা বিপন্মুক্ত। যে দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে গন্ডগোলের সূত্রপাত, সেই পথচারী মারা গেছেন। তাঁর শরীর এতটাই থেতলে গেছে যে সনাক্তকরণ সম্ভব হচ্ছে না।

    খবর শুনে বিরক্ত হয়ে অরুণার দিকে তাকায় অভি। ‘বাসযাত্রীদের কারও কোনও ক্ষতি হয়নি। তাহলে তুমি চিন্তা করছ কেন?’

    ‘আহ! অ্যাঙ্কর কী বলল শুনলি না? মৃত পথচারীকে সনাক্ত করা যায়নি…’ ফিসফিস করে বলেন অরুণা।

    ‘মা! তুমি পাগলি হয়ে যাচ্ছ নাকি? বেছে বেছে বাবাকেই বাসে চাপা দিয়েছে—এই তোমার ধারণা?’

    ‘তাই যদি হয়? তাহলে কী হবে অভি?’ রিমোট বদলে অন্য খবরের চ্যানেলে চলে গেছেন অরুণা। এক পেট খিদে নিয়ে বিরক্ত মুখে অভি চেয়ারে বসতে যাচ্ছে, এমন সময় ঝনঝন করে ল্যান্ডফোন বেজে উঠল।

    ফোনের আওয়াজ শুনে হাত থেকে রিমোট ছুঁড়ে ফেলে এক লাফে উঠে ফোনের কাছে গেলেন অরুণা। ফোন তুলে বললেন, ‘হ্যালো, হ্যালো, কে বলছেন? পুলিশ?’

    ধুত্তেরিকা! বিরক্ত হয়ে মায়ের হাত থেকে ফোন কেড়ে নেয় অভি। বলে, ‘হ্যাঁ, বলুন।’

    ‘আসলে, আমি আপনাদের চিনি না।’ ওপাশ থেকে মেয়ের গলা শোনা যায়। মনোজদা আপনাদের ফোন করতে বললেন।’

    ‘বাবা কোথায়?’

    ‘উনি এখন স্টেজে। জীবন সংগ্রামের একটা স্ট্রিট থিয়েটার হচ্ছে আমাদের এখানে। আই মিন, মৌলালিতে। নাটকটা হঠাৎই নামল। উনি আপনাদের খবর দিতে পারেননি। আধঘণ্টা বাদে শেষ হয়ে যাবে। ওঁর বাড়ি ফিরতে রাত বারোটা বাজবে।’

    ‘থ্যাংক ইউ,’ হাঁফ ছেড়ে বাঁচে অভি। ফোন রাখার মুহূর্তে প্রশ্ন করে, ‘আপনি কে বলছেন জানতে পারি?’

    ‘আমার নাম ঋষিতা। আমি মৌলালিতেই থাকি। আমরাই স্ট্রিট থিয়েটারটা অর্গানাইজ করেছি। ফোনটা গ্রিন রুমে রাখা আছে। অনেকবার বাজল। আমি মনোজদাকে বলায় উনি আপনাদের ফোন করে দিতে বললেন।’

    ‘আচ্ছা। অনেক ধন্যবাদ।’ ফোন কাটে অভি। অরুণাকে বলে, ‘মা, খেতে দাও। বাবার ফিরতে বারোটা বাজবে। অতক্ষণ জেগে থাকতে পারব না।’

    অরুণা গজগজ করতে করতে খেতে দিলেন। কী খেল, বুঝতেও পারল না অভি। তিনতলায় এসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল, বৃন্দা ঠিকঠাক বাড়ি পৌঁছেছে তো? ও কি খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে, না বাবা-মায়ের কাছে মিস আইএমসি ক্রাউন জেতার গল্প করছে? না করো সঙ্গে মোবাইলে ফিশফিশ করে কথা বলছে? কে সেই ছেলেটা? হাতের কাছে পেলে অভি তার দাঁত উপড়ে নেবে।

    ফিক করে হেসে চিলেকোঠার ঘরে ঢোকে অভি। এত ফালতু চিন্তা না করে সোমবারই বৃন্দার সঙ্গে আলাপ জমাতে হবে। শুভস্য শীঘ্রম!

  • চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    অভিজ্ঞান

    গ্রের অ্যানাটমি কোল থেকে নামাল অভি। বাপরে! কী ওজন বইটার! কয়েকদিন বইটা তাক থেকে পাড়লে আর ওঠালে বাইসেপস, ট্রাইসেপস, ডেল্টয়ড, ল্যাটিসিমাস ডরসাই—সব আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগারের মতো হয়ে যাবে।

    এ বই পড়া যাবে না। আপন মনে বিড়বিড় করে অভি। যেমন মোটা বই, তেমন বোরিং সাবজেক্ট। দু’কলম জুড়ে থাক থাক লেখা। বই খুলতে ভয় করে। একটা চ্যাপ্টার পড়তে শুরু করলে শেষ হতে চায় না। উফ! কী কষ্ট!

    গ্রে সরিয়ে ডক্টর মিত্রর অ্যানাটমি বইয়ের রোগাপাতলা দ্বিতীয় খণ্ড হাতে নেয় অভি। এই বইটা চার খণ্ডে ভাগ করা বলে বই হাতে নিলে টেনশান কম হয়। তবে বইটার ইলাসট্রেশান ভালো নয়। জ্যাবড়া জ্যাবড়া কালির দাগওয়ালা ছবি।। পড়তে গেলে বিরক্ত লাগে।

    আগামিকাল অভির প্রথম আইটেম। অনেক কিছু এই কদিনে পড়ানো হয়ে গেছে। প্রথম আইটেম হবে ‘ডরসাম অব ফুট’ বা পায়ের পাতার সামনের দিক। হাড়, মাংসপেশি, শিরা, ধমনি, স্নায়ুর নাম মুখস্থ করতে গিয়ে নাকানি চোবানি খাচ্ছে অভি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডক্টর মিত্রর বই রাখল সে। বই হাতে নিয়ে আজ পর্যন্ত কখনও টেনশান হয়নি। আঠারো বছরের জীবনে যাবতীয় টেনশান কেটে গেছে যে কোনও বই হাতে নিলে। সেই বিশল্যকরণীই এখন গরল হয়ে দেখা দিচ্ছে।

    রাত আটটা বাজে। কলেজ থেকে ফিরে একঘণ্টা ঘুমিয়েছে অভি। রাত তিনটে অবধি পড়ে ‘ডরসাম অব ফুট শেষ’ করে দেবে, এইরকম মনোবাসনা। এখনও পর্যন্ত পড়া শুরুই করে উঠতে পারেনি। পড়া শুরু তো দূরস্থান, কী বই পড়বে এটাই বুঝতে পারেনি। বিরক্ত হয়ে চন্দনকে এসএমএস করল। ‘ডরসাম অফ ফুট কোন বই থেকে পড়ব? গ্রে না ডক্টর মিত্র?’

    উত্তর এল তৎক্ষণাৎ। ‘কোনওটাই না। ট্রাই চৌরাসিয়া।’

    চন্দন কি হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার বাঁশি শুনতে বলছে? উত্তেজিত স্নায়ু ঠান্ডা করার দাওয়াই দিচ্ছে উচ্চ মাধ্যমিকের ফার্স্ট বয়? না। মুচকি হেসে ঘাড় নাড়ে অভি। চন্দন যত বড় পড়ুয়াই হোক না কেন, চৌরাসিয়ার বাঁশি শোনার মতো অ্যান্টেনা নেই। ও চৌরাসিয়ার লেখা অ্যানাটমি বই পড়তে বলছে। গ্রে আর ডক্টর মিত্রর সঙ্গে চার খণ্ড বি ডি চৌরাসিয়ার অ্যানাটমি বই বিলুর রুম থেকে গত সপ্তাহেই অভি বাড়ি নিয়ে এসেছে। এনেছে ফিজিয়োলজি এবং বায়োকেমিস্ট্রির বই। আগামী বছরগুলোতেও তাকে কোনও বই কিনতে হবে না। দুই ভাই এক স্ট্রিমে পড়ার এই এক সুবিধে। এডিশান চেঞ্জ হলে অন্য ব্যাপার।

    বুক শেলফ থেকে চৌরাশিয়ার ভলিউম টু পাড়তে গিয়ে অভির মনে হল, গ্রে বা ডক্টর মিত্রর অ্যানাটমি বইতে কোনও আন্ডারলাইন বা হাইলাইটিং দেখেনি। অভি জানে, বিলুর স্বভাব হল বইতে দাগ দেওয়া, মার্জিনে নোট নেওয়া, লুজ কাগজে অতিরিক্ত তথ্য লিখে বইয়ের ফাঁকে গুঁজে রাখা। সেগুলো নেই মানে, গ্রে বা মিত্রর বই বিলু পড়েনি।

    চৌরাশিয়ার বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ড খুলে অভি নিশ্চিন্ত হল। হ্যাঁ, এই বইটাকেই বিলু টেক্সট হিসেবে পড়েছিল। পাতায় পাতায় লাল-নীল-হলুদ-সবুজের হাইলাইট, গুঁজে রাখা কাগজের তাড়া তাই বলছে।

    নিজের ওপরে বিরক্ত হল অভি। কলেজে ঢোকার পর থেকে বিলুর সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে। দু’সপ্তাহ আগেও রোজ কথা হতো। এখন তিনদিনে একবার হয় কিনা সন্দেহ। বিলুকে জিজ্ঞাসা করলেই আইটেম সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। চৌরাসিয়ার বইয়ের ডরসাম অফ দ্য ফুট চ্যাপ্টারটা খুলল অভি। চমৎকার ডায়াগ্রাম, ছোট্ট ছোট্ট প্যারাগ্রাফ, পয়েন্ট করে লেখা রয়েছে পা—বৃত্তান্ত। ছবি ও লেখা মিলে দশপাতা। ঘড়ির দিকে তাকাল অভি। সাড়ে আটটা বাজে। দেখা যাক, কতক্ষণে এই নরক যন্ত্রণা শেষ হয়।

    অভির ধারণা ছিল, কোনও কিছু মুখস্থ করার জন্য প্রথমবার পড়াটা সব থেকে শক্ত কাজ। প্রথমবার পড়া শেষ করে, রাতের খাওয়া খেয়ে রাত সাড়ে দশটার সময় দ্বিতীয় বারের জন্য পড়তে বসে অভির মনে হল, ধারণাটা ভুল। দ্বিতীয় পাঠ সবচেয়ে শক্ত। কেননা, প্রথম পাঠে সবটাই অজানা। ভুলে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। কিন্তু দ্বিতীয় পাঠে স্মৃতিকে পরীক্ষা দিতে হয়। অবাক হয়ে অভি দেখল, প্রথমবার পড়ার সময় সে যা যা পড়েছিল তার সবকিছু সম্পূর্ণ ভুলে মেরেছে! কী হতাশাজনক ঘটনা! আর একটু হলেই অভি কেঁদে ফেলছিল। কোনওরকমে নিজেকে সামলে অ্যানাটমির নিমোনিক্স আওড়ায় অভি। ‘টল হিমালয়াস আর নেভার ড্রাই প্লেসেস।’

    কোনও জিনিস মুখস্থ করার জন্য নিমোনিক্স খুব ভালো অস্ত্র। রামধনুর সাত রঙ মুখস্থ করার জন্য বলা হয় ‘বেনীআসহকলা’। অর্থাৎ, বেগুনি, নীল, আকাশি, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল—এই সাত রঙের আদ্যক্ষর সাজিয়ে তৈরি হয়েছে শব্দটি। অ্যানাটমিতেও নানান তালিকা মুখস্থ করতে হয়। ক্রম বজায় রেখে একগাদা নাম মুখস্থ করার জন্য আদ্যক্ষর পরপর সাজিয়ে, অদ্ভুতুড়ে এবং মজাদার বাক্য তৈরি করা হয়। হাস্যকর এবং ‘ক্যাচি’ বলে বাক্যগুলো মনে থেকে যায়। অ্যানাটমিতে এত বেশি নিমোনিক্স আছে যে শুধু নিমোনিক্স-এর জন্য একটা পকেট বই কিনতে পাওয়া যায়।

    নিমোনিক্স নিয়ে ভয়ের কারণ হল, অনেক সময় শুধু মজার বাক্যটা মনে থাকে। মূল লিস্টটা মনে পড়ে না। এখন যেমন অভির হচ্ছে। গোড়ালির এক্সটেনসর রেটিনাকুলামের ভিতর দিয়ে কোন কোন শিরা-ধমনি, স্নায়ু-পেশি গেছে, তার নিমোনিক্স হল, ‘টল হিমালয়াস আর নেভার ড্রাই প্লেসেস।’

    অভি নিজের মনে আওড়াচ্ছে। ‘ ”টল” মানে ”টিবিয়ালিস অ্যান্টিরিয়র” মাসল। ”হিমালয়াস” মানে ”এক্সটেনসর হ্যালুসিস লঙ্গাস” মাসল। ”আর” মানে ”অ্যান্টিরিয়ার টিবিয়াল আর্টারি”। ”নেভার”…মনে পড়ছে না। ”ড্রাই”…মনে পড়ছে না। ”প্লেসেস” মানে ”পেরোনিয়াল টার্শিয়াস মাসল”।’ স্বগতোক্তি শেষ করে যে দুটো জিনিস ভুলে গেছে, সেগুলো আবার দেখে নেয় অভি।

    দ্বিতীয় পাঠ শেষ। দশখানা ছবি আঁকা প্র্যাকটিস করে ঘড়ির দিকে তাকাল অভি। একটা বাজে। এখন এক কাপ কফি বা চা পেলে ভালো হতো। মা-বাবা দুজনেই ঘুমোচ্ছে। রাধা আর মানদাও ঘুমোচ্ছে। দোতলায় নেমে রান্নাঘরে ঢুকে গ্যাস জ্বালালে মনোজ-অরুণার ঘুম ভেঙে যাবে। তা ছাড়া, অভি চা বানাতে পারে না। ফ্রিজ থেকে আইসক্রিম খাবে নাকি? আইসক্রিম খেলে কি ঘুম পালায়? কে জানে! অভি ঠিক করে, কাল কলেজে যাওয়ার আগে মাকে বলবে, থার্মোফ্লাস্ক বার করে রাখতে। ফ্লাস্কে দু’কাপ চা বানিয়ে রেখে দিলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

    কিন্তু এখন ঘুম-সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে? পড়ার টেবিল থেকে উঠে ছাদে পায়চারি করতে যায় অভি। চারদিক শুনশান। আকাশে অনেক তারা। ঘাড় উঁচু করে আকাশ দেখার অভ্যাস নেই অভির। সন্ধে নাগাদ যদি বা কখনও তাকায় ধোঁয়া আর কুয়াশার কারণে নোংরা ন্যাতার মতো লাগে আকাশকে। এখন, এই গভীর রাতে, সলমা-চুমকি বসানো ওড়নার মতো লাগছে আকাশকে।

    ওড়নার আড়ালে কারও মুখ দেখা যাচ্ছে কী? টানা টানা চোখ, ফোলা ফোলা গাল, টোল ফেলা গালওয়ালা কোনও মেয়ে?

    নিজের মাথায় চাঁটি কষায় অভি। আগামিকাল প্রথম আইটেম। এখন চন্দ্রাহত হওয়ার সময় নয়। এখন ডরসাম অব দ্য ফুট নিয়ে তৃতীয়বার রগড়াবার সময়। এটাই ফাইনাল রিহার্সাল। আগামিকাল সময় পাওয়া যাবে না। ঘরে ফিরে আবার পড়ার টেবিলে বসে অভি। ডরসালিস পেডিস আর্টারির ব্রাঞ্চগুলো কী কী যেন…চৌরাসিয়ার দ্বিতীয় খণ্ড বন্ধ করে সাদা খাতায় লাল স্কেচ পেন দিয়ে ছবি আঁকতে থাকে।

    সকাল সাতটায় মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিল অভি। অরুণার ডাকাডাকিতে ঘুম ভালো সাড়ে আটটায়। কখন অ্যালার্ম বেজেছে, বুঝতে পারেনি। তৃতীয়বার রগড়ানো শেষ হল রাত তিনটের সময়। তখনও অভি কনফিডেন্ট নয়। চতুর্থ পাঠে মনে হল, এতক্ষণে পায়ের অ্যানাটমির একটা আন্দাজ পাওয়া যাচ্ছে। পঞ্চমবার পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তখন ভোর হচ্ছে।

    এক লাফে বাথরুম। নিত্যকর্মপদ্ধতি সেরে, জামাপ্যান্ট গলিয়ে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দৌড়। মনোজ দাড়ি কামাতে কামাতে বললেন, ‘চান করলি না?’

    অভি উত্তর দিল না।

    অরুণা চিৎকার করলেন, ‘রুটি-তরকারি করেছি। খেয়ে যা।’

    রাস্তায় নেমে দৌড়তে দৌড়তে অভি বলল, ‘ন’টা আঠাশের ট্রেন। এখন ওসব করা যাবে না।’

    ডানকুনি লোকালে বাদুড়ঝোলা হয়ে শিয়ালদা পৌঁছল সাড়ে দশটায়। দৌড়তে দৌড়তে যখন কলেজে ঢুকল, পৌনে এগারোটা। দশটা থেকে প্রথম থিয়োরি ক্লাস শুরু হয়েছে এসএলটিতে। সে ক্লাস শেষ হতে চলল। বায়োকেমিস্ট্রি ক্লাসে কাউকে প্রক্সি দিতে বলা ছিল না। তার মানে অ্যাটেনড্যান্স রেজিস্টারে লাল দাগ। ব্যাজার মুখ করে ক্যান্টিনে ঢুকে অভি বলল, ‘জীবনদা, ডিম-টোস্ট আর এক কাপ চা। ফটাফট।’

    জীবনদা বলল, ‘ডিমটা তুমি পাড়বে না আমি?’

    উত্তর না দিয়ে ক্যান্টিনের টেবিলে মাথা রেখে ঝিমোতে লাগল অভি। বারো ঘণ্টা পেটে কিছু পড়েনি। শরীর দুর্বল লাগছে। মাথাটাও কেমন করছে! খেয়ে-দেয়ে লাইব্রেরিতে গিয়ে আর একপ্রস্ত ঝালাতে হবে। কাল যা পড়েছে, তার কিছু মনে আছে কি? কে জানে!

    ‘অ্যাই শালা!’ কলার ধরে অভিকে শূন্যে তুলে ধরেছে রিপু। ‘ক্লাস না করে ক্যান্টিনে ঠেক মারতে এসেছিস? চল! আমাদের কলেজ ফেস্ট ”ওপিয়াম”-এর মিটিং আছে। তোকে অ্যাড তোলার কাজে লাগাব।’

    ‘আজ না রিপুদা,’ কাঁইমাই করে ওঠে অভি, ‘আজ আমার আইটেম আছে।’

    ‘তো?’ অভিকে বেঞ্চিতে বসিয়ে ভুরু নাচায় রিপু। ‘সবার আইটেম থাকে। নাথিং নিউ।’

    ‘আজ আমার ফার্স্ট আইটেম। ডরসাম অব দ্য ফুট। হেবি ভয় করছে।’

    ‘ব্যস! হয়ে গেল,’ কপাল চাপড়ায় রিপু। ‘এই জঘন্য আইটেম দিয়ে তোর ভাইভা শুরু হল? প্রথমবারের জন্য সহজ কিছু বাছতে পারলি না?’

    ‘বাছাবাছি কি আমার হাতে?’ জীবনদার দেওয়া ডিম-টোস্টে কামড় বসিয়ে অভি বলে, ‘আমাদের কলেজ ফেস্টের নাম ”ওপিয়াম” কেন? অন্যান্য কলেজ ফেস্টের নাম কত সুন্দর হয়। জাভোৎসব, মিতালি, ফেস্টাম…’

    ‘ওপিয়াম থেকে পেনকিলার মেডিসিন তৈরি হয়। ডাক্তারি-শাস্ত্রের সঙ্গে যোগসূত্র আছে। প্লাস আফিম মানে নেশাভাং, আনন্দ-ফুর্তি… এনিওয়ে তোকে এখন ঘাঁটাব না। আইটেম দিয়ে ক্যান্টিনে আসিস। মিটিং-এ থাকতে হবে।’ অভির প্লেট থেকে সিকি খাওয়া ডিম-টোস্ট মুখে পুরে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে গেল রিপু।

    দূর বাবা! খেতেও দিল না। বিরক্ত হয়ে অভি ভাবল, আর একটা ডিম-টোস্ট অর্ডার দেবে। না থাক। বারোটার সময় এনজির সামনে বসতে হবে। তার আগে একবার অ্যানাটমির জাবর কাটা প্রয়োজন। এক চুমুকে ঠান্ডা চা শেষ করে লাইব্রেরির দিকে পা বাড়ায় সে।

    ‘নাম?’

    ‘অভিজ্ঞান লাহিড়ী।’

    ‘গ্রুপ?’

    ‘এ।’

    ‘কার্ডে লেখোনি কেন?’ অভির দিকে দু’ভাঁজ করা গোলাপি কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বলেন এনজি। গ্রিটিং কার্ডের মতো দেখতে চার পৃষ্ঠার কার্ডের প্রথম পাতার ওপর দিকে নামধাম লেখার জায়গা। তার নীচে পর পর পার্ট আর আইটেমের নাম। প্রথম পৃষ্ঠায় নাম, রোল নম্বর, গ্রুপ লিখে এনজিকে কার্ড ফেরত দিল অভি।

    ‘নেম দ্য বোনস দ্যাট ফর্ম অ্যাঙ্কল জয়েন্ট।’ অভির মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন এনজি। এই রে! হাড়গোড়ের লিস্ট তো অস্টিওলজি সেকশানে আছে। সেটা পড়েনি অভি। চৌরাসিয়ার বইতে ‘ডরসাম অফ দ্য ফুট’ চ্যাপ্টারে হাড়ের নাম ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় আছে। পুরো অধ্যায় থেকে হাড়ের নামগুলো মনে করতে থাকে অভি। ‘ট্যালাস, লোয়ার এন্ড অব টিবিয়া অ্যান্ড ফিবুলা…’

    ‘থেমে থেমে বলছ কেন? পড়ে আসোনি? আমি তো ক্লাসে বলে দিয়েছি, আইটেম দেওয়ার কোনও বাঁধাধরা ডেট নেই। কনফিডেন্ট ফিল করলে তবেই আসবে। খারাপ পারফর্ম করলে ফেরত পাঠিয়ে দেব।’

    ‘না স্যার! আমি পড়েছি।’ এনজিকে থামায় অভি। একবার যদি ফেরত পাঠিয়ে দেয়, তাহলে কাল রাতের নরক যন্ত্রণা আবার সহ্য করতে হবে। বাবা গো!

    ‘ইংরিজি বলায় সমস্যা থাকলে বাংলায় উত্তর দিতে পারো।’ টুকটুক করে ঘাড় নেড়ে বলেন এনজি। ‘ডরসালিস পেডিস আর্টারির কোর্স বলো। ফাম্বল না করে, স্টেডিলি।’

    কোশ্চেন কমন পড়ে গেছে! উল্লসিত অভি গড়গড় করে পায়ের পাতার প্রধান শিরার গতিপথ বর্ণনা করতে থাকে। তাকে থামিয়ে দিয়ে এনজি বলেন, ‘ডিপ পেরোনিয়াল নার্ভের কোর্স বলো।’

    যাববাবা! প্রশ্নের উত্তর কনফিডেন্টলি দিলেই থামিয়ে দিচ্ছে! তার মানে, জানা থাকলেও একটু কুঁতোনোর অভিনয় করতে হবে। এই প্রশ্নের উত্তর যেমন অভির জানা। স্নায়ুর শুরু থেকে শেষ সে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। তাও থেমে থেমে উত্তর দেয়। হিসেব মতো এনজি পুরো উত্তর শুনলেন। মাঝপথে থামিয়ে পরের প্রশ্নে চলে গেলেন না।

    ‘মার্চ ফ্র্যাকচার কাকে বলে?’ পরের প্রশ্ন। এবং বাউন্সার। এটা চৌরাসিয়ার বইতে নেই। বিলু দুটো ছোট কাগজ ‘ডরসাম অব দ্য ফুট’ চ্যাপ্টারে গুঁজে রেখেছিল। একটা কাগজে লেখা ছিল ‘মার্চ ফ্র্যাকচার’। অভি পড়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। সেইটাই এনজি জিজ্ঞাসা করলেন? উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকে অভি।

    ‘কী বই পড়েছ?’ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করছেন এনজি। রাগে তাঁর মুখ থমথম করছে।

    কী উত্তর দেবে অভি? গ্রে বা মিত্র-র নাম না বলে চৌরাসিয়ার নাম বললে এনজি যদি খচে ফায়ার হয়ে যান? অন্যদিকে মিথ্যে কথা বলার বিপদ অনেক। দুয়েকটা প্রশ্ন করে এনজি বুঝে যাবেন, অভি কোন বই পড়েছে।

    অভি সত্যি কথা বলে, ‘চৌরাসিয়া পড়েছি স্যার।’

    ‘চৌরাসিয়া ভালো বই। কিন্তু ওতে এসব নেই। তুমি ”স্নেল”-এর ক্লিনিকাল অ্যানাটমি কেনোনি?’

    অভি যে কোনও বইই কেনেনি এটা এনজিকে বলার প্রয়োজন নেই। সে বলল, ‘না স্যার।’

    এনজি কিছু বলার আগে অভি একটা অচেনা গন্ধ পেল। ফুলেল পারফিউমের গন্ধ। এমন মেয়েলি গন্ধ কে মেখেছে? গেস করার আগে শুনতে পেল, তার পাশে দাঁড়িয়ে বৃন্দা বলছে, ‘স্যার। আইটেম।’

    ‘বসে পড়ো।’ অভির পাশের টুলের দিকে তর্জনী নির্দেশ করলেন এনজি

    অভির বুকের ওপর দিয়ে এখন রেলগাড়ি যাচ্ছে। তার সমস্ত অনুভূতিকে অবশ করে দিয়েছে অচেনা বুনো ফুলের গন্ধ। সে পড়া ভুলে যাচ্ছে। এনজি প্রশ্ন করলেন ‘বৃন্দা, তোমার কী টপিক?’

    ‘আমার আর ওর এক আইটেম। আমরা এক গ্রুপে।’ অভির দিকে আঙুল দেখায় বৃন্দা, ‘ডরসাম অব দ্য ফুট বড্ডো টাফ স্যার। কিছু মনে থাকছে না।’

    গলা খাঁকরে বলেন এনজি, ‘এই আইটেমটায় এত বেশি নাম মনে রাখতে হয় যে আমারই মাঝে মধ্যে গুলিয়ে যায়। ওই জন্যেই এই আইটেমটা ফার্স্টে রেখেছি।’

    যে এনজি এতক্ষণ ভুরু কুঁচকে দাঁত খিঁচোচ্ছিলেন, তিনি এখন অপূর্ব মখমলি কণ্ঠে কথা বলছেন! বোঝো কারবার! অভি অবাক। মেয়ে হওয়ার কী সুবিধে রে বাবা! এই রকমটা আগে জানলে সে সেক্স চেঞ্জ অপারেশন করিয়ে ডাক্তারি পড়তে ঢুকত।

    ‘অভিজ্ঞান তুমি এক কাজ করো। তুমি বৃন্দাকে প্রশ্ন করো।’ অভিকে আদেশ করেন এনজি। তথাস্তু! দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভি জানতে চায়, ‘নেম দ্য বোনস দ্যাট কনস্টিটিউট অ্যাঙ্কল জয়েন্ট।’

    ‘অ্যাঙ্কল জয়েন্ট কন্সটিটিউটস অব…’ গড়গড় করে বলতে শুরু করেছে বৃন্দা। অভি মনে মনে জিভ কাটল। সে এই প্রশ্নের উত্তর বলতে পারেনি।

    বৃন্দার জবাব শেষ হতে এনজি বৃন্দাকে বললেন, ‘এবার তুমি ওকে একটা প্রশ্ন করো।’

    ‘নেম দ্য স্ট্রাকচারস দ্যাট গো আন্ডার এক্সটেনসর রেটিনাকুলাম অফ অ্যাঙ্কল জয়েন্ট।’ মৃদু হেসে প্রশ্ন করে বৃন্দা। এই চ্যাপ্টারের সবচেয়ে কমন প্রশ্নটা করতে পেরে সে খুশি। এই প্রশ্নের উত্তরও গড়গড়িয়ে দেওয়া যাবে না। তাহলেই এনজি থামিয়ে দিয়ে পরের প্রশ্নে চলে যাবে। সন্তর্পণে এগোয় অভি। টল হিমালয়াস আর নেভার ড্রাই প্লেসেস।

    ‘নেক্সট কোয়েশ্চেন?’ অভির উত্তরদান পর্ব শেষ হলে তাকে আদেশ করলেন এনজি। অভি সহজ প্রশ্ন করল। ‘ডেসক্রাইব দ্য কোর্স অব ডরসালিস পেডিস আর্টারি।’

    বৃন্দা প্রশ্নের উত্তর দিল গড়গড় করে। তারপর প্রশ্ন করল, ‘এক্সটেনসর হ্যালুসিস লঙ্গাস মাসলের অরিজিন আর ইনসারশন কোথায়?’

    জানা প্রশ্ন। চেনা উত্তর। গড়গড় করে বলতে গিয়ে হঠাৎ আটকাল অভি। তার মাথাটা হঠাৎ খালি হয়ে গেল। চেতনার ওপরে ঝপাং করে নেমে এল সাদা পর্দা। পায়ের পেশির উৎস ও মোহনা তো দূরস্থান, সে কোথায়, কার সামনে বসে রয়েছে, পাশে কে বসে, এটা কোন কলেজ—কিছু মনে পড়ছে না। তার নিজের নাম মনে পড়ছে না। সে যেন কোনও ট্রান্সে রয়েছে। রাধা পাগলির মতো মুহূর্তের মধ্যে তার-জোড়া থেকে তার-কাটা মেন্টাল স্টেটে চলে গেছে।

    ‘কী হল? বল!’ এনজিকে লুকিয়ে অভির হাঁটুতে খোঁচা দিল বৃন্দা। অভি ভেবলুর মতো এনজির দিকে তাকিয়ে রইল।

    ‘রাতে ঘুমোওনি?’ সহৃদয় প্রশ্ন এনজির।

    ‘না স্যার।’ মিনমিন করে জবাব দেয় অভি।

    ‘সকালে কিছু খেয়েছ?’

    ‘এক কাপ চা আর ডিম টোস্ট।’ মাথা নিচু করে বলল অভি। বলতে বলতেই হঠাৎ তার মাথার থেকে কালো পর্দাটা সরে গেল। মাথা আবার কাজ করছে। সাগরের ঢেউ-এর মতো স্মৃতি ফেরত আসছে। দিব্যি মনে পড়ে যাচ্ছে এক্সটেনসর হ্যালুসিস লঙ্গাসের অরিজিন ও ইনসারশান। তার-কাটা অবস্থা থেকে তার-জোড়া অবস্থায় ফিরে এসে অভি তড়বড় করে বলতে থাকে, ‘এক্সটেনসর হ্যালুসিস লঙ্গাস ইজ অরিজিনেটেড ফ্রম…’

    ‘থাক!’ হাত তুলেছেন এনজি। ‘তোমার হাইপোগ্লাইসিমিয়া হয়েছে। ব্রেনে গ্লুকোজ কমে গেলে এরকম হয়। বৃন্দা, ওকে এক্ষুনি চিনির জল খাওয়াও। না হলে অজ্ঞান হয়ে যাবে।’ অভির আইটেম কার্ড টেনে তিনি নম্বর দিলেন, ‘চার।’ দশের মধ্যে চার পাওয়া মানে ফেল। তারপর বৃন্দার কার্ড টেনে লিখলেন, ‘আট।’

    ‘আমাকে আবার এই আইটেমটা দিতে হবে স্যার?’ ঘামতে ঘামতে বলল অভি।

    ‘হ্যাঁ। সেদিন ভালো করে খেয়ে-দেয়ে এসো।’ এনজি চেয়ার ছেড়ে উঠে নিজের ঘরে চলে গেলেন।

    আবার এই বিভীষিকা চ্যাপ্টার পড়তে হবে? আবার সেই রাত জাগা? আবার মোটামোটা বই ওলটানো? আবার ডায়াগ্রাম প্র্যাকটিস? আবার নিমোনিক্স মুখস্থ করা? এর থেকে মরে যাওয়াও ভালো। টেবিলে মাথা রেখে হুহু করে কাঁদতে থাকে অভি। বুঝতে পারে বৃন্দা তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বলছে, ‘এত তাড়াতাড়ি ধ্বস খেলে হবে? এই তো সবে শুরু। এমবিবিএস প্র্যাকটিকালের সময় এইরকম একশোটা আইটেমের যে কোনও জায়গা থেকে প্রশ্ন করবে। সেটা কে সামলাবে?’

    বিড়বিড় করে অভি নিজেকে বলল, ‘কেন এলাম এখানে? কেন? এসব আমার জন্য নয়।’ সে ঠিক করল এখনই এই কলেজ থেকে বেরোবে। আর কোনওদিন ফেরত আসবে না। টাটা ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কলেজ। গুডবাই বৃন্দা। ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে গটগট করে ডিসেকশান রুম থেকে বেরিয়ে যায় সে।

    ‘অ্যাই অভি! হনহন করে কোথায় যাচ্ছিস?’ পিছন থেকে চিৎকার করেছে বৃন্দা। অভি উত্তর না দিয়ে হাঁটা দেয়। বৃন্দা দৌড়ে এসে অভির হাত চেপে ধরে বলে, ‘কোথায় যাচ্ছিস? জবাব দে।’

    শার্টের হাতায় চোখ মুছে অভি বলে, ‘ছাড়!’

    ‘ছাড়ব না। আগে বল কোথায় যাচ্ছিস?’

    ‘বাড়ি। আমি ডাক্তারি পড়ব না। এসব আমার জন্য নয়। আমার ইনক্লিনেশান অন্য দিকে। এই লাইনে এসে আমি ভুল করেছি।’ কঠিন গলায় বলে অভি।

    ‘ঠিক আছে। পড়বি না। এই নিয়ে নাটক করছিস কেন? চল, জীবনদার ক্যান্টিনে গিয়ে এক কাপ চা খাবি। তোর ফেয়ারওয়েল ড্রিঙ্ক।’ অভির হাত ধরে ক্যান্টিনের দিকে এগোয় বৃন্দা। মাথা নিচু করে অভি ভাবে, বৃন্দার কথা শুনে ভুল হয়ে গেল। এক্ষুনি রিপুর পাল্লায় পড়তে হবে। ওকে এইসব কথা বলা যাবে না। বৃন্দা না বলে দেয়। তাহলে আর এক প্রস্ত বেইজ্জত।

    ক্যান্টিনের টেবিল চাপড়ে আপ্পু গান গাইছে, ‘মার কাটারি কচি ডাবে। শাঁস পাবে, জলও পাবে।’ রিপু ধুয়ো দিচ্ছে, ‘পাবে পাবে, পাবে পাবে।’ অভি হেসে ফেলে বলল, ‘কোথায় পাও এইসব ফালতু গান? ডাবল মিনিং-এ ভর্তি?’

    ‘হুঁহুঁ বাওয়া! এসব হল সাবঅল্টার্ন গান। কলকাতার লোকে নাক সিঁটকোবে। গ্রাম বাংলায় সুপারহিট।’

    ‘গ্রামবাংলার গানের খবর তুমি পেলে কোথা থেকে?’

    ‘ওরে, আমরা মানুষের সঙ্গে মিশি। মানুষের পালস বুঝি। আমরা এই গান জানব না তো কি তুই জানবি?’ হাসতে হাসতে হুমকি দেয় আপ্পু। অভি বলে, ‘এটা কার গাওয়া?’

    ‘জানি না। এই মিউজিক ভিডিয়োটা আমাদের সাপ্লাই করেছে উচ্চ মাধ্যমিকের ফার্স্ট বয়, কুমার চন্দন।’ মোবাইল খুলে ভিডিয়োটা অভির সামনে মেলে ধরে। অ্যামেচার ভিডিয়োতে হিরোর পোশাক আর ডান্স স্টেপ দেখে অভি পেট চেপে ধরে হাসতে লাগল।

    বৃন্দা বলল, ‘আমায় দেখা।’ তারপর অভির হাত থেকে মোবাইল কেড়ে ক্লিপিং দেখতে লাগল।

    আপ্পু বলল, ‘হিরোইনের মুভমেন্ট খেয়াল করিস।’

    পরবর্তী পনেরো মিনিট ক্যান্টিনে আর কিছু হল না। সবাই ব্লু-টুথ ডিভাইস দিয়ে ক্লিপিংটা নিজের নিজের মোবাইলে নিয়ে নিল। রিপু বলল, ‘ ”দয়াল বাবা কলা খাবা” বলে একটা গান আছে। বাড়ি ফিরে ইউটিউবে দেখে নিস। অভি তোর আইটেম কেমন হল?’

    অভি কিছু বলার আগে বৃন্দা বলল, ‘অভিকে তোমরা এখন বিরক্ত কোরো না। ও ফাউল মুডে আছে।’

    অভি ঘাবড়াল। বৃন্দা মেয়েটা এইরকম বেয়াক্কেলে? সবার সামনে বলে দেবে তার আইটেমে ঝাড়ের কথা? ধুর! ভাল্লাগে না। ক্যান্টিনে এসে মনটা ভালো হয়েছিল। আবার হেজে গেল।

    ‘কেন?’ প্রশ্ন করে আপ্পু, ‘আইটেমে ঝাড় খেয়েছে নিশ্চয়?’

    ‘ঝাড় তো খেয়েছে। সেটা কোনও ব্যাপার নয়। বেচারি ঝাড় খেল আমার জন্য। এই ভেবে আমার খারাপ লাগছে।’ করুণ মুখে বলে বৃন্দা। রিপু খচে ফায়ার হয়ে বলে, ‘তুই নির্ঘাৎ ওর আইটেমের সময়ে এনজির কাছে আইটেম দিতে গিয়েছিলি?’

    ‘হ্যাঁ।’ অবিকল অভির কায়দায় মুখ নিচু করে বলে বৃন্দা। রিপু অভিকে বলে, ‘লেসন নাম্বার ওয়ান। সুন্দরী মেয়ের পাশে বসে কখনো পরীক্ষা দিবি না। ঝাড় অবধারিত। এক্সামিনার ফিমেল হলে এই লেসন খাটবে না। স্পেশালি বায়োকেমিস্ট্রির আরতী ম্যাডাম বা প্যাথলজির রিনা ম্যাডাম হলে ওরা ফেল আমরা পাস। বৃন্দা নিশ্চয় পাস করেছে?’

    অভি উত্তেজিত হয়ে বলে, ‘ওকে আট দিল। আর আমায় চার। আবার ওই ছাইপাঁশ পড়তে হবে।’

    ‘একদম পড়বি না।’ পরামর্শ দেয় আপ্পু। ‘আগামিকাল এই প্রিপারেশান নিয়েই এনজির সামনে বসবি। দেখবি, ছয় কি সাত দিয়েছে।’

    ‘আচ্ছা,’ ঘাড় নাড়ে অভি। এবার তাকে উঠতে হবে। জীবনদার ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে মেন গেটের দিকে হাঁটছে অভি, পিছন থেকে বৃন্দা বলল, ‘কাল পপলিটিয়াল ফসার ডিসেকশান আছে। পিএম রেসপিরেটরি সিস্টেম পড়াবেন। ঠিক সময়ে আসিস।’

    ‘আচ্ছা।’ ঘাড় নাড়ে অভি। শেয়ালদা স্টেশানের দিকে যেতে যেতে মনে হয়, বৃন্দা চা খাওয়ার জন্য ক্যান্টিনে ডেকেছিল। সেটাই খাওয়া হল না।

  • পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    অভিজ্ঞান

    ‘আমার দুই ছেলে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কলেজে পড়ে, এ কথা বলতে আমার লজ্জা হয়,’ সোফার ওপরে রবিবারের আজ সকাল, বেঙ্গল নিউজ আর উইকেন্ড ছুঁড়ে বললেন মনোজ। ‘তোরা মানুষ না জানোয়ার? এইসব করিস ডাক্তারি পড়তে ঢুকে? মদ, গাঁজা, ড্রাগস, মেয়েদের ওপরে নোংরামো? ছি! ছি!’

    ‘আহা! ওদের কেন বলছ?’ আজ সকাল কাগজটা নিপুণভাবে ভাঁজ করতে করতে বলেন অরুণা। ‘ওরা কি কিছু করেছে? বিলু বরং মেয়েটাকে বাঁচিয়েছে।’

    রবিবারের সকাল। আজ জানুয়ারি মাসের ঊনত্রিশ তারিখ। নতুন বছরের গোড়ায় সেই কুৎসিত ঘটনার পরে কেটে গেছে প্রায় একমাস। কিন্তু সংবাদপত্র থেকে ঘটনাটা মিলিয়ে যায়নি। আর বছর তিনেক বাদে বিধানসভা নির্বাচন। বিরোধীপক্ষ প্রতিদিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বাজারে হালকা গুজব ছড়াচ্ছে যে জনমোর্চা পার্টির ক্ষমতায় থাকার এটাই শেষ টার্ম। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুলিশ, অ্যাডমিনিস্ট্রেশান, শিল্প—সবেতেই সরকারের প্রতিনিধিদের গয়ংগচ্ছ ভাব। এতদিন ক্ষমতায় থেকে তারা ক্লান্ত।

    মিডিয়া তার কাজ করছে। প্রতিদিন স্বাস্থ্য দপ্তরের ত্রুটির তালিকা প্রকাশিত হচ্ছে। কোথাও ওয়ার্ডে বেড়াল ঘুরছে, কোথাও হাসপাতাল চত্বরে শুয়োর চরছে, কোথাও ইঁদুর সদ্যজাতর চোখ খুবলে নিয়েছে, কোথাও চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দশজন নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। সব খবর সযত্নে প্রথম পাতায় ছবিসহ ছাপা হচ্ছে।

    এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় যে কলেজ চত্বরে কালচারাল প্রোগ্রামের সময় ডাক্তারি ছাত্রী মলেস্টেড—তা হলে তো কথাই নেই। ডাক্তারি ছাত্রছাত্রীরা কলেজে মদ-গাঁজা খেয়ে বেল্লেলাপনা করে। এরা পাস করে বেরিয়ে কীরকম ডাক্তার হবে? এই নিয়ে সাধুভাষায় রোজ সম্পাদকীয় প্রকাশিত হচ্ছে। বাঙালির অধঃপতন সম্পূর্ণ—এই ভবিষ্যতবাণীও করা হচ্ছে।

    দময়ন্তী প্রেসের কাছে মুখ খোলেনি। থানা-পুলিশ করেনি। বাড়িতে বাবা-মাকেও জানায়নি। নতুন বছরের প্রথম রাতটা লেডিজ হোস্টেলে কাটিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিল। পরদিন অ্যাজ ইউজুয়াল কলেজে এসেছে। রিপুরা সুরজকে সেই রাতে বেধড়ক মারধর করেছিল। চন্দন চেয়েছিল সুরজকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে। টিনটিনের আপত্তিতে সেটা করা যায়নি। কলকাতায় সবচেয়ে বড় কলেজের ফেস্টের শেষটা ভালো হয়নি।

    থানা-পুলিশে না যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেমেয়েরা হঠাৎ কলেজ স্ট্রাইক করে বসে। শুরু হয়েছিল নেতাবিহীন, দলবিহীন, স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন হিসেবে। মেয়েদের নিরাপত্তার দাবিতে ফার্স্ট ইয়ারের জেমসি, শ্রীপর্ণা, প্রবাল আর সঞ্জয় অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং-এর সামনে ধর্নায় বসে পড়েছিল নতুন বছরের প্রথম দিন। আস্তে আস্তে সেখানে এসে জুটল সাবিনা, দীপ, সব্যসাচী, বিলু, অভি, লাটু। ফার্স্ট ইয়ারের ধর্নায় পরবর্তী তিন ঘণ্টায় অংশ নিল দু’শো ছেলেমেয়ে। রিপু, সুব্রত, আপ্পু, বান্টি আড়াল থেকে অনেক চেষ্টা করল ধর্না তোলার জন্য। ধর্নাকারীরা খেপে গিয়ে পোস্টার লিখে সারা কলেজে সেঁটে দিল। সারারাত মোমবাতি জ্বেলে বসে রইল অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং-এর সামনে।

    খবর রটতে সময় লাগে না। বিকেল নাগাদ একাধিক টিভি চ্যানেলের ওবি ভ্যান দাঁড়িয়ে গেল। যে যা পারছে বাইট দিচ্ছে। সব্যসাচী ফটাং করে বলে বসল, ‘দোষীর শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত কলেজে আমরা স্ট্রাইক ডাকলাম।’

    ‘আমরা মানে কারা?’ জানতে চাইল সাংবাদিক।

    ‘প্রোগ্রেসিভ মেডিক্যাল ফোরাম।’ গর্বের সঙ্গে জানাল সব্যসাচী।

    এই খবর টিভিতে দেখানো মাত্র আগুনে ঘৃতাহুতি হল। জনমোর্চার ছাত্র সংগঠনের জেলা কমিটির সেক্রেটারি অধীর হালদার রিপুকে পার্টি অফিসে ডেকে বেদম ঝাড় দিলেন। ‘ছ’শো স্টুডেন্ট স্ট্রেংথওয়ালা কলেজে আমরা ইউনিয়ন চালাচ্ছি। ইউনিয়নের তেরোটা পোস্টের মধ্যে তেরোটাই আমাদের। ক্লিন সুইপ চলছে গত দশ বছর ধরে। তাহলে দুশো ছেলেমেয়ে ধর্নায় বসল কী করে?’

    ‘আমি দেখছি অধীরদা,’ মিনমিন করে রিপু। ছয়ফুটিয়া ছাত্রনেতা এখন সাড়ে পাঁচফুট, সিড়িঙ্গে চেহারার বড় নেতার সামনে ঘাড় ঝুঁকিয়ে কথা বলছে, ‘আসলে ইস্যুটা এত সেন্সিটিভ…’

    ‘সেন্সিটিভ ইস্যু নিয়ে ডিল করবে বলেই তুমি নেতা। কিউবার গণ আন্দোলনের মতো গোদা বিষয় নিয়ে দেখার জন্য পলিট ব্যুরো আছে। দুটো ছেলেমেয়ে মাল খেয়ে টেপাটিপি করছিল, এর মধ্যে সেন্সিটিভ কী দেখলে ডাক্তারবাবু?’

    রিপু গুম মেরে রইল। ডাক্তারি ফ্রন্টে রাজনীতি করার এই এক মুশকিল। ডাক্তাররা তাকে রাজনীতিবিদ ভাবে। ডাক্তারি ছাত্র হিসেবে সিরিয়াসলি নেয় না। পলিটিশিয়ানরা তাকে ডাক্তার ভাবে। পলিটিশিয়ান হিসেবে পাত্তা দেয় না। না ঘরকা না ঘাটকা।

    ‘চুপ করে থাকলে চলবে?’ ধাঁতানি দেন অধীর, ‘পিএমএফ-এর নকশালগুলো একটা স্পনট্যানিয়াস মুভমেন্টকে হাইজ্যাক করে নিল। আর তোমরা ছিঁড়লে?’

    ‘না ছিঁড়ে কী করতাম?’ রেগে গিয়ে বলে রিপু, ‘স্ট্রাইকে নেতৃত্ব দিতাম? কলেজ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বিরুদ্ধে একটা মুভমেন্ট সাপোর্ট করত আমাদের দল? সেটা ভালো দেখাত? প্রিন্সিপাল আমাদের লোক, সুপারইনটেনডেন্ট আমাদের লোক, ইউনিয়নে আমাদের লোক। নিজেরা মারামারি করে লাভ আছে?’

    ‘আছে ডাক্তারবাবু আছে,’ রিপুর পিঠ চাপড়ে বলেন অধীর। ‘মাঝে মধ্যে মক ফাইট করতে হয়। কখনও কখনও গট আপ গেম খেলতে হয়। না হলে নেপোয় এসে দই মেরে দিয়ে চলে যায়। যেমন পিএমএফ দিল। অবশ্য ওটাকে দই না বলে তোমার পশ্চাদ্দেশও বলা যেতে পারে। আমাদের তো বাড়ির মালিকদের ইউনিয়ন আছে, আবার ভাড়াটেদের ইউনিয়নও আছে। পরস্পর বিরোধী দুই শক্তিকে ব্যালানস করে চলি না? ট্রাফিক পুলিশের ইউনিয়ন আছে, অটো-ওয়ালার ইউনিয়নও আছে। লাইসেন্সবিহীন অটো সিজ করলে অটোওয়ালারা মিছিল করে। ট্রাফিক কনস্টেবলকে ট্রান্সফার করলে কনস্টেবলরা মিছিল করে। পলিটিক্স নয়, এ হল ‘রিয়্যালপলিটিক’ ডাক্তারবাবু! দেখলে হবে? খরচা আছে!’

    জেলা কমিটির সেক্রেটারির কাছ থেকে রাজনীতির পাঠ চুকিয়ে রিপু যতক্ষণে আইএমসিতে ফিরল, ততক্ষণে কলেজে নিশ্ছিদ্র স্ট্রাইক। দলের ছাপমারা পনেরো-ষোলজন ক্লাস অ্যাটেন্ড করছে, বাকিরা ধর্নামঞ্চে বসে।

    সেই স্ট্রাইক চলছে গত এক মাস। সুরজ বেপাত্তা। পুলিশ তাকে ধরার চেষ্টা করেনি। কেন না থানায় কোনও অভিযোগ নথিভুক্ত হয়নি। দময়ন্তী নিয়মিত ক্লাস করছে এবং সচেতনভাবে ধর্না মঞ্চে বসছে না বা মিডিয়ার সামনে আসছে না।

    সামনেই ফার্স্ট সেমিস্টার। ধর্নামঞ্চে উপস্থিতি কমতে শুরু করেছে। মিডিয়া থাকলে আন্দোলনে রক্ত সরবরাহ বাড়ে। কিন্তু টিভি একই খবর কতদিন দেখাবে? টিভির সাংবাদিকরা আসা বন্ধ করে দিয়েছে। খবরের কাগজের উত্তর সম্পাদকীয়তে চিকিৎসা সঙ্কট নিয়ে মাঝে মধ্যে লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। সেইসব পড়েই উত্তেজিত হয়ে খবরের কাগজ ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন মনোজ। আজ তাঁর কল শো আছে। সকাল থেকে প্রস্তুতি চলছে। ঘন ঘন চা, গার্গল, গলায় মাফলার। এসব লক্ষণ বাড়ির সদস্যদের জানা।

    ‘তোমার অসুবিধে বোধহয় মিডিয়ার অ্যান্টি গভর্নমেন্ট স্ট্যান্ড দেখে…’ কড়াইশুটির কচুরি আর শুকনো আলুর দম খেতে খেতে বলল বিলু।

    ‘এগুলো মিডিয়া?’ চোখ পাকিয়ে জানতে চান মনোজ, ‘এদের কাজ জনমোর্চাকে খিস্তি করা। এদের এডিটোরিয়াল পলিসি হল যেন তেন প্রকারেণ জনমোর্চাকে দেশ থেকে উৎখাত করা। এ সবই সিআইএ-র চক্রান্ত।’

    ‘তা বোধ হয় না।’ শান্তভাবে বলে বিলু, ‘শিল্পায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এইবারে জনমোর্চা যখন ক্ষমতায় এল, তখন সন্দীপ সামন্ত যথেষ্ট মিডিয়া সার্পোট পেয়েছিলেন। আজ সকাল, বেঙ্গল নিউজ বা স্কুপ চ্যানেল-এর মালিক মায়াকম। এটা বেসিক্যালি নন-ব্যাঙ্কিং অর্গ্যানাইজেশান। এরা চায় যে ন্যাশনালাইজড ব্যাঙ্কিং সিস্টেম ধ্বসে যাক। এরা চায় লোকের মধ্যে পোস্ট অফিসে টাকা জমানোর প্রবণতা কমুক। এরা খোলাবাজার অর্থনীতিকে সমর্থন করে। মুনাফা করার জন্য এরা আজ কাগজ আর টিভি চ্যানেল তৈরি করেছে। কাল যদি দেখে আলু-পেঁয়াজ বিক্রি করলে মুনাফা বেশি, তাহলে কাল কাগজ আর টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দিয়ে আলু-পেঁয়াজ বিক্রি করবে। তোমার জনমোর্চা যতদিন বাজার অর্থনীতিকে সমর্থন করেছে, ততদিন আজ সকাল জনমোর্চাকে সমর্থন করেছে। এখন জনমোর্চার যাবার পালা। মৃন্ময় চ্যাটার্জির নবযুগ পার্টি তোমাদের থেকেও বেশি প্রো মার্কেট। আজ সকাল তাই এখন জনমোর্চাকে ফেলছে আর নবযুগকে তুলছে। সহজ বাজারের অঙ্ক। এর মধ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জুজু দেখা বন্ধ করো।’

    মনোজ হালকা হাসলেন। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, ‘প্রগ্রেসিভ মেডিক্যাল ফোরাম। তারা কারা? তারা হল এমন একটা দল, যাদের টিকি ধরে নাড়াচ্ছে জঙ্গলমহলের মাওবাদি নেতারা। তুই ওদের সঙ্গে কী করে ভিড়লি বিলু? সেভেন্টিজে ছেলেমেয়েরা নকশাল মুভমেন্টের দিকে ঝুঁকেছিল। তার একটা ঐতিহাসিক তাৎপর্য আছে। একটা পূর্বাপর আছে। কিন্তু দুহাজার এগারো সালে বাংলা-ঝাড়খণ্ড-উড়িষ্যা-অন্ধ্রপ্রদেশের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা নেতারা তোকে কীভাবে হিপনোটাইজ করল? কীভাবে ব্রেন ওয়াশ করল?’

    ‘যেভাবে সাতসমুদ্র তেরো নদীর ওপার থেকে ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন তোমাদের জেনারেশানের ব্রেনওয়াশ করেছেন। আর তোমরা কেরানি কমিনিউজিম চালিয়ে যাচ্ছ!’ খাওয়া শেষ করে বলে রিপু।

    অরুণা এতক্ষণ ধরে খবরের কাগজ ভাঁজ করছিলেন। এটা তাঁর নতুন বাতিক। আলাদা আলাদা করে প্রতিটি পাতা নিখুঁত চার ভাঁজ করছেন। তারপর কাগজের তাড়া একটা পলিথিনের প্যাকেটে ঢুকিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখছেন। অভি মায়ের হাত থেকে প্যাকেট ছিনিয়ে নিয়ে বলল, ‘তোমার মাথা-ফাথা খারাপ হয়েছে নাকি? এখনও কেউ কাগজ পড়েনি, এর মধ্যে বেঁধেবুঁধে প্লাস্টিকের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেললে?’

    ‘গুছিয়ে রাখি বলে সব খুঁজে পাস।’ ঝংকার দিয়ে ওঠেন অরুণা। ‘আমি না থাকলে দেখবি, এই সংসারের কী হাঁড়ির হাল হয়!’

    ‘তোমার না থাকার কথা কোথা থেকে আসছে?’ অবাক হয়ে বলে অভি।

    ‘তোর মায়ের মাথাটা গেছে। একবার সাইকায়াট্রিতে দেখিয়ে নিয়ে আয় তো!’ স্ত্রীকে আওয়াজ দিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলেন মনোজ। স্নান করে বেরিয়ে বললেন, ‘আমার শো আছে কালনায়। ফিরতে রাত হবে। আগে থেকে বলে দিলাম। ফোন কোরো না। আমি ধরব না। তখন আবার তুমি উলটোপালটা চিন্তা করবে।’

    মনোজ বেরিয়ে যান। অরুণা এঁটো থালাবাসন ধুতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এটাও একটা বাতিক। বারবার বাসন মাজা, বারবার দরজা-জানলা বন্ধ করা, বারবার হাত ধোয়া—এইসব অরুণার আগে ছিল না। সম্প্রতি শুরু হয়েছে। অরুণার আচরণ দেখতে দেখতে বিলু অভিকে বলে, ‘ফার্স্ট সেমিস্টার তো এসে গেল। প্রিপারেশান কদ্দুর?’

    ‘খুব খারাপ। অ্যানাটমিটা কিছুতে সুবিধে করতে পারছি না।’

    ‘অস্টিওলজি আর সারফেস মার্কিং প্র্যাকটিস করছিস?’

    ‘সারফেস মার্কিং? সেটা কী?’

    ‘এখনও সারফেস মার্কিং জানিস না? তুই অ্যানাটমিতে সিওর ঝাড় খাচ্ছিস। কালুয়া ডোমকে তোর সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে এনজি বলবেন, ”ডরসালিস পেডিস আর্টারি আঁকো।” তখন তোকে সরু সুতো গুঁড়ো রঙে রাঙিয়ে কালুয়ার পায়ে আর্টারি আঁকতে হবে। আঁকা শেষ হলে এনজি পড়া ধরবেন। ”ডরসালিস পেডিস আর্টারির কোর্স বলো।” পারলে পাস, না পারলে ফেল। তুই এখনও এটার প্র্যাকটিস শুরু করিসনি?’

    ভয়ের চোটে অভির পেট গুড়গুড় করতে শুরু করেছে। সে কোনওরকমে খাওয়া শেষ করে তিনতলার ঘরে চলে গেল। সারা সকাল পায়ের হাড় নিয়ে মাথা ঘামানোর পরে নিচে নামল বারোটা নাগাদ। বিলু আপাতত বাড়িতে নেই। পাড়ায় আড্ডা মারতে বেড়িয়েছে। পান্নালাল রাস্তার মোড়ে পাড়ার পাঁচটা বেকার ছেলে রেগুলার ঠেক মারে। মনোজ ওদের পঞ্চপাণ্ডব বলে ডাকেন। বিলু ওদের সঙ্গে আড্ডা মারতে গেছে।

    অরুণা বাসন ধোয়া শেষ করে রাধা আর মানদার সঙ্গে গপপো করছেন। রাধা একটা পোস্টকার্ড দেখিয়ে বলছে, ‘মেজর গুরবিন্দর সিং চিঠি লিখেছে। আর কোনও চিন্তা নেই। সাহেবখালির মাঠ থেকে খানসেনাদের হটিয়ে দেওয়া হয়েছে। অশথতলা গ্রাম এখন ইন্ডিয়ায়। চলে গেলেই হল।’

    ‘ওলো রাধা!’ আদুরে গলায় আবদার করছে মানদা, ‘আমাকে নিয়ে যাবি, তোর ওই কীসেরতলা গ্রামে? একবার গুরবিন্দরকে দেখে আসতুম। আর্মির সদ্দারগুলো খুব চিসসা হয়।’

    ‘আঃহ! মানদা। বাজে কথা কেন বলো,’ বিরক্ত হয়ে বলেন অরুণা। ‘টিভির রিমোটটা দাও তো। একটু খবর শুনি। তোমাদের দাদা কালনায় কল শো করতে গেল। যেতে চার ঘণ্টা। আসতে চার ঘণ্টা। ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা বাজবে। আমাকে টেনশানে ফেলা ছাড়া লোকটার কোনও কাজ নেই।’

    ‘টেনশানের কী আছে?’ বিরক্ত হয়ে বলে মানদা। ‘এক বাস লোক যাবে। তোমার বর কি টুন্নি নাকি যে হারিয়ে যাবে?’

    ‘টুন্নি কী?’ হাসতে হাসতে বলে অভি।

    ‘ছোট খুকি গো! এটাও জানো না?’ অভিকে নতুন শব্দ শিখিয়ে নিচে চলে যায় মানদা। রাধা অরুণাকে অশথতলা গ্রামের গল্প বলতে থাকে। অরুণাকে বিরক্ত না করে অভি ব্রেকফাস্ট সেরে নেয়। অরুণার আজকাল রান্নাবান্নায় মন কম। কড়াইশুটির কচুরি আর শুকনো আলুর দম বানিয়েছেন। আলুর দমে নুন বেশি। কোনওরকমে সেটা গিলল অভি। বাটি আর চামচ সিঙ্কে রেখে তিনতলার ঘরে গিয়ে চৌরাসিয়ার বই আর ফিমার নিয়ে বসল। উফ! পরীক্ষাটা চুকলে হয়।

    বেলা দুটোর সময় পড়া থেকে প্রথম ব্রেক নিল অভি। নীচে এসে দুপুরের খাওয়া সারল। রাধা আর মানদা এখন একতলায়, নিজের ঘরে। বিলু আড্ডা মেরে এখনও ফেরেনি। অরুণা স্নান করছেন। স্নান চুকতে একঘণ্টা লাগবে।

    এটাও নতুন বাতিক। সারা দিনে অজস্রবার হাত-পা ধুয়ে ফাঙ্গাল ইনফেকশান হয়েছে। যাকে বাংলায় ‘হাজা’ বলে। অভি আর বিলু বকে বকেও অভ্যাস বন্ধ করতে পারেনি। ঘেয়ো হাতে যখন অরুণা ভাত বাড়েন, অভির ঘেন্না করে। কিন্তু হাজার হোক, মা তো! কিছু বলতে পারে না। মনোজ আজকাল মাঝে মাঝে রাতে গেস্টরুমে শোন। কারণটা অভি আন্দাজ করতে পারে। কিন্তু এ সব বিষয়ে সে নাক গলাবার কেউ নয়।

    রবিবার খেয়েদেয়ে দুপুরে ঘুমনো অভির বদভ্যাস। আজ মেনু হয়েছে ভাত, মাছের মাথা দিয়ে ডাল, বকফুল ভাজা আর পাঁঠার মাংস। নিজেই ভাত বাড়ল অভি। এক থালা ভাত সাফ করে আবার ভাত নিল। এবার একঘণ্টার পাওয়ার ন্যাপ।

    সাড়ে তিনটে থেকে আবার অ্যানাটমি নিয়ে ধস্তাধস্তি শুরু। এবারের সেশন লম্বা। শেষ হল সাড়ে ছ’টার সময়। অভি উঠত না। কিন্তু বিলু মেসেজ করেছে, ‘চা’। তার মানে বাবু আড্ডা মেরে ফিরে, খেয়েদেয়ে, এক ঘুম দিয়ে এতক্ষণে উঠেছে।

    দোতলায় নেমে অভি দেখল বিলু মুড়ি মাখছে। কুচি কুচি করে কাটা পেঁয়াজ, লঙ্কা মুড়িতে ঢেলে চানাচুর আর কাঠিভাজা ঢালল। তার ওপর ঢালল আমচুরের তেল। টকটক, ঝালঝাল! ভালো করে মেখে অভিকে বলল, ‘ধর। আমি চা করছি।’

    ‘তুই এসব পারিস?’ অভি অবাক।

    ‘আমি কী কী পারি, এই নিয়ে তোর কোনও ধারণাই নেই। সুরজকে যা কেলিয়েছিলাম না! শুয়োরের বাচ্চা আজীবন মনে রাখবে।’

    ‘ভারি সুপারম্যান এলেন একেবারে!’ বিলুকে আওয়াজ দেয় অভি। চা বানিয়ে ভাইয়ের হাতে কাপ ধরিয়ে বিলু জিজ্ঞাসা করে, ‘দিঠি ঠিক আছে তো?’

    মুড়ি চানাচুর খেতে খেতে অভি বলল, ‘গত একমাসে তুই এই প্রশ্নটা একশো সাতাশবার করেছিস। কী ব্যাপার বল তো? ওর সঙ্গে তো রোজ কলেজে তোর দেখা হয়। ওকেই জিজ্ঞাসা করলে পারিস।’

    ‘আহ! ব্যাপারটা ওরকম নয়।’ একখাবলা মুড়ি মুখে দিয়ে বলে বিলু, ‘সিনিয়র দাদা হিসেবে আমার কাছে মেয়েটা ফ্রিলি কথা বলবে না। তোরা ক্লাসমেট। তোদের কাছে বেশি ফ্রি হবে।’

    ‘দিঠি ঠিক আছে। তুই মা-কে একবার দ্যাখ।’ চা খেতে খেতে বিলুকে খোঁচায় অভি। অভি আর বিলু খেয়াল করল, অরুণা টিভির সামনে বসে বাংলা নিউজ চ্যানেলগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছেন। চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছায়া।

    ‘মারও তার কেটেছে। এনিওয়ে, আমি রাধা পাগলি আর মানদা পিসির জন্য চা করেছি। ওরা এলে দিয়ে দিস।’ অভিকে হুকুম করে নিজের ঘরে চলে গেল বিলু। সে যেতে না যেতেই চায়ের গন্ধে ওপরে এসে হাজির রাধা আর মানদা। রাধা চায়ের কাপ নিয়ে অরুণাকে বলল, ‘টিভিতে প্রেসিডেন্টের ভাষণ হয়ে গেছে?’

    ‘না,’ বিরক্ত হয়ে বলেন অরুণা।

    ‘মেজর গুরবিন্দরের?’

    ‘না।’

    ‘নেতাজির?’

    ‘ওফ! তুমি থামবে!’ মানদা ধমক দেয় রাধাকে, ‘পাগলির কথা শুনে গা জ্বালা করে।’

    ‘আমি পাগলি হলে তুই আধ-পাগলি। আর গিন্নিমা পুরো পাগলি। টিভি খুলে অ্যাক্সিডেন্টের খবর খুঁজছে।’ মানদাকে পাল্টা ধমকে অরুণাকে চায়ের পেয়ালা এগিয়ে দেয় রাধা। অরুণা রাগী চোখে রাধাকে দেখে চায়ে চুমুক দেন।

    চা-পানের বিরতি শেষ। আবার তিনতলার ঘরে ঢোকে অভি। চৌরাসিয়া খুলে মন দিয়ে পড়ছে, এমন সময় ফোন। মোবাইলের স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে, ‘বৃন্দা কলিং!’

    ‘বলুন ম্যাডাম। গোলাম আপনার জন্য কী করতে পারে?’

    ‘ধ্যাত!’ কুলকুল করে হাসছে বৃন্দা, ‘তুই আবার গোলাম কবে হলি? শোন না, একটা দরকারি কথা বলতে ফোন করলাম। অ্যানাটমির একটা থিয়োরি কোশ্চেন জানতে পেরেছি।’

    ‘কোত্থেকে পেলি?’

    ‘বয়েজ হোস্টেলের প্রবাল নাকি এনজির কাছ থেকে জেনেছে। তারপর সেটা চাউর হয়ে গেছে। ইঙ্গুইনাল ক্যানালের বাউন্ডারি আর তার ক্লিনিকাল সিগনিফিক্যান্স।’

    ‘হুম!’ আপনমনে ভাবে অভি, ‘আচ্ছা, কোশ্চেন লিক করার কোনও নেক্সাস আছে? এমবিবিএসের কোয়েশ্চেনও কি লিক হয়?’

    ‘এই শোন’, বিরক্ত হয়ে বলে বৃন্দা, ‘তোকে দেশোদ্ধার করতে হবে না। ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট হয়ে স্টিং অপারেশনও করতে হবে না। যা বললাম পড়। ইঙ্গুইনাল ক্যানাল আমাদের প্রথম ডিসেকশান ছিল। মনে আছে?’

    ‘দিব্যি মনে আছে। এনজি আমায় ঝাড় নামিয়েছিলেন। এনিওয়ে, আমার ওটা পড়া শেষ। থ্যাংকস ফর দ্য টিপ।’

    ‘উফ! খুব থ্যাংকস শিখেছে! দুদিন আগেও তো ভালো করে কথা বলতে পারতিস না! ফ্যালফ্যাল করে এদিক সেদিক তাকিয়ে থাকতিস।’

    ‘কী করি বল! মফসসলের ছেলে। কলকাতার জল গায়ে পড়েছে। একটু আধটু ট্যাঁশপনা চলে আসবেই।’

    ‘কলকাতার জল? হিহি! বাংলায় একটা কথা আছে, ‘বিয়ের জল গায়ে পড়া’। মেয়েদের সম্বন্ধে ব্যবহার করা হয়। বিয়ের জল গায়ে পড়লেই মেয়েরা নাকি বদলে যায়। ‘কলকাতার জল’ কথাটা আজ প্রথম শুনলাম, খুব কিউট!’

    ফোনে বৃন্দা কথা বলছে আর তার অদৃশ্য তরঙ্গ গরম ভাপের মতো ছড়িয়ে পড়ছে অভির কানে, গালে, ঘাড়ে। হাতের চেটো গরম হয়ে উঠছে। ভাপ ছড়িয়ে যাচ্ছে তলপেটে, দুই পায়ের ফাঁকে। শরীর মোচড়াতে মোচড়াতে অভি বলে, ‘পরীক্ষার আগে ফোনে এত বকবক করছিস, সময় নষ্ট হচ্ছে না?’

    ‘না,’ সাফ জবাব বৃন্দার। ‘এতক্ষণ বই খুলে বসে আছি। এক লাইনও পড়া হয়নি। ভাবলাম কারও সঙ্গে গপপো করি। তা হলে বোরডম কাটবে। কাকে ফোন করব ভেবে চোখ বুঁজে তোকে দেখতে পেলাম।’ শেষের কথাগুলো বলার সময় বৃন্দা ফিসফিস করে। যেন গোপন কোনও কথা বলছে।

    অভি খাটের ওপরে সোজা হয়ে বসেছে। বৃন্দা কি তাকে কিছু বলতে চাইছে? এত ক্যাজুয়ালি কোনও সিরিয়াস কথা বলা যায়? তার মতো মফসসলি, অর্ডিনারি লুকিং ছেলে এইরকম সিরিয়াস কথার যোগ্য? সে ভুল ইন্টারপ্রিটেশান করছে না তো?

    ‘কী রে? চুপ কেন?’ ওপাশ থেকে আবার ফিসফিসোচ্ছে বৃন্দা।

    ‘আম…আমি কিছু বুঝতে পারছি না। খুব কনফিউশান হচ্ছে।’ সত্যি কথাটা বলেই ফেলে অভি।

    ‘কী নিয়ে কনফিউশান?’

    ‘ম্যা…ম্যা…মানে তুই কি আমাকে কিছু বলতে চাইছিস? না, মানে, তুই আমাকে কি বললি সেটা বো…বো…বোঝার চেষ্টা করছি। মানে…’

    ‘ইঙ্গুইনাল ক্যানাল এবং তার ক্লিনিকাল সিগনিফিক্যান্স। এইটা আমাদের মন দিয়ে পড়তে হবে। এটাই আমি তোকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। মন দিয়ে পড়াশুনো কর। সেমিস্টারে ঝাড় খেলে ব্যাপক মনখারাপ হবে।’

    থতমতো খেয়ে অভি বলে, ‘ঝাড় খেলে মন খারাপ হবে বলছিস?’ তার কনফিউশান এখনও কাটেনি। বৃন্দা তাকে কী বলার চেষ্টা করল?

    ‘রাখছি।’ ফোন কেটে দিয়েছে বৃন্দা। অভিও ফোন রাখল। ফোনালাপের আফটার এফেক্ট হিসেবে পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশুনো হল না। একবার মনে হল এক্ষুনি বৃন্দার বাড়ি গিয়ে ওর পায়ের কাছে বসে প্রোপোজ করে। একবার মনে হল লুটেরা জলদস্যুর মতো চুমুতে ভিজিয়ে দেয় কমলালেবুর মতো ঠোঁট। একবার মনে হল ‘আই লাভ ইউ’ লিখে এসএমএস করে। পরমুহূর্তে নিজের বোকামোর কথা ভেবে টুকটুক করে ঘাড় নাড়ে।

    মোদ্দা কথা, অনেকক্ষণ ধরে হিজিবিজি চিন্তা করার ফলে লেখাপড়া হল না। দিবাস্বপ্ন দেখে, পড়াশুনার নামে ছেলেখেলা করে, কাগজে আঁকিবুঁকি কেটে অভি ঘড়ি দেখল। আরেঃ! রাত এগারোটা বাজে! তাকে এখনও কেউ খেতে ডাকল না কেন?

    তরতরিয়ে দোতলায় নামে অভি। ডাইনিং স্পেসে ঢুকতে গিয়ে শুনতে পায় মনোজ আর অরুণার কথোপকথন।

    ‘ঋষিতা পৌঁছে দিয়ে গেল?’

    ‘পাগলামো কোরো না। বাস সেকেন্ড ব্রিজ হয়ে বেরিয়ে গেল। আমি হাওড়া থেকে ট্যাক্সি করে ফিরলাম।’

    ‘ট্যাক্সির ভাড়া মেটালে না তো?’

    ‘আরও দুজন লোক ছিল। ওরা মিটিয়ে দেবে।’

    ‘আরও দুজন লোক না আরও একজন?’

    ‘আচ্ছা বাবা, একজন। এবার খেতে দাও। অভি আর বিলুকে ডাকো। কাল সোমবার। ওরা সকাল সকাল বেরোবে। আমারও অফিস আছে।’

    ‘তাহলে ঋষিতাই ছিল। মেয়েটার কত বয়স গো? তিরিশের কোঠায়? না আরও ছোট?’

    ‘ধ্যাত্তেরিকা! খালি বাজে কথা। খেতে দেবে কি না বলো! না হলে আমি শুচ্ছি।’

    ‘তুমি বাইরে থেকে খেয়ে এসেছ। ঋষিতার সঙ্গে। তোমার মুখ থেকে পেঁয়াজের গন্ধ আসছে। ধাবায় খুব টেস্টি খাবার পাওয়া যায়, না? কালি ডাল। কড়াই মুর্গ। লচ্ছা পরোটা। চিকেন টিক্কা মসালা! আমি ম্যাগাজিন পড়ে পড়ে শিখেছি। আমার রান্না তুমি আর খেতে চাও না। সেই থোড়-বড়ি-খাড়া, খাড়া-বড়ি-থোড়। তোমার এসব ভালো লাগে না, আমি জানি। কাল থেকে খুব টেস্টি রান্না করব। তাহলে তুমি খাবে? খুব ঝাল দেব। খুব তেল। খুব মশলা! সত্যি বলছি। তুমি খাবে গো?’

    অরুণার অসহায় অনুরোধ শুনে অভির কান্না পেয়ে গেল। সে এতক্ষণ তিনতলায় বসে বানানো প্রেমের স্বর্গে নিজের জীবনচরিত লিখছিল। একতলা নীচে নেমেই বিবাহ-পরবর্তী বাস্তবতাকে দেখতে পাচ্ছে। মানসিক রোগগ্রস্ত স্ত্রী, চাকরি আর রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত স্বামী, আর দুজনের মধ্যে এক সমুদ্র দূরত্ব। অথচ মনোজ আর অরুণার লাভ ম্যারেজ।

    ‘ধুসশালা!’ মনোজের গর্জন শুনতে পায় অভি। ‘আমি রাত্তিরে খাব না। তোমার ফালতু ছেনালি যদ্দিন না বন্ধ হচ্ছে, আমি রাতে গেস্টরুমেই শোব। তুমি আমায় ডিস্টার্ব করবে না।’

    গেস্টরুমে ঢুকে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দেয় মনোজ। আওয়াজে পুরো লক্ষ্মী নিবাস কেঁপে ওঠে। বিলু নিজের ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। অভিও ডাইনিং স্পেসে আসে। দুজনকে দেখে, কাঁদতে কাঁদতে, অরুণা শোওয়ার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন।

    ডাইনিং টেবিলে চারজনের খাবারই পড়ে রইল। আজ লক্ষ্মী নিবাসে কেউ খাবে না।

  • ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

    অভিজ্ঞান

    জীবনে এই প্রথম সময়ের অনিবার্যতা সম্পর্কে ধারণা হল অভির। উনিশ কুড়ি বছর বয়স পর্যন্ত আপন মনে ভেসে বেড়িয়েছে। কোনও দায়িত্ব নেয়নি, কারো খিদমত খাটেনি, কখনও টেনশানে ভোগেনি। কুয়োর ব্যাঙের মতো স্বাধীন ও আনন্দময় জীবন ছিল। ডাক্তারি পড়তে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কলেজে ঢুকে সব বদলে গেল।

    মফসসলের ছেলে কলকাতা শহরে পড়তে এসে দিব্যি গড্ডলিকা স্রোতে গা ভাসিয়ে চলছিল। একটু পড়া-পড়া খেলা, একটু প্রেম-প্রেম নাটক, একটু রাজনীতি-রাজনীতি ছ্যাবলামি—সব মিলিয়ে তোফা কাটছিল দিনগুলো। ‘এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না!’

    কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। কেন না, ওই যে, সময়ের অনিবার্যতা! একটা একটা করে পার্ট আর আইটেম চলে যেতে থাকে, অভি নিয়মিত এনজির কাছে ঝাড় খেতে থাকে। ফার্স্ট সেমিস্টার পার হয়ে যায়। ফিজিওলজি আর বায়োকেমিস্ট্রিতে টায়েটুয়ে পাস মার্ক থাকলেও অ্যানাটমিতে ঝাড় নামিয়ে দেন এনজি। সেমিস্টারে ঝাড় খাওয়ার কোনও প্রভাব পড়ে না কলেজ লাইফে। কেউ মনেও রাখে না, কিন্তু অভির মাথায় টিকটিক করতে থাকে দুশ্চিন্তার কাঁটা। সেকেন্ড সেমিস্টারেও এইরকম হবে না তো?

    এবং সেকেন্ড সেমিস্টার বা প্রি-টেস্ট চলে আসে। রেজাল্টের পুনরাবৃত্তি হয়। অভি জোর করে অ্যানাটমি বই নিয়ে বসে। চৌরাসিয়া আর ডক্টর মিত্রর বই বারবার পড়তে থাকে।

    অধ্যয়নই সার। মাথা থেকে সব বেরিয়ে যায়? কেন? নিজেকে হাজার প্রশ্ন করেও উত্তর পায় না। সে সিনেমা যায় না, রাজনীতি করে না, বৃন্দাকে মন থেকে মুছে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করে। তাও কেন এমন হয়?

    উত্তরটা একদিন বিলু দিল। ভাইয়ের পাগল-পাগল অবস্থা দেখে বলল, ‘বাড়িতে থেকে অ্যানাটমি পড়া যায় না। হোস্টেলে যা। গ্রুপ-স্টাডি কর। বারবার চেঁচিয়ে না পড়লে ওইসব শক্ত শক্ত নাম স্মৃতিতে থাকে না। ঘুমের মধ্যেও তুই নিজের নাম, আমার নাম বা বাবার নাম ভুলিস না। একে বলে পার্মানেন্ট মেমারি। অ্যানাটমিকে পার্মানেন্ট মেমরির সিন্দুকে ঢোকানোর একমাত্র উপায় ক্রমাগত আওড়ানো। লিখে বা এঁকে এ জিনিস হবে না।’

    দাদার কথা মেনে ফার্স্ট এমবিবিএস থিয়োরি পরীক্ষার পনেরো দিন আগে অভি বয়েজ হোস্টেলে শিফট করেছে। বিলু তাকে নিজের রুমে ঢোকায়নি। তার স্থান হয়েছে একশো চব্বিশে, টিনটিনের রুমমেট হিসেবে। হোস্টেলে এসে সমস্যা বেড়েছে বই কমেনি। নতুন জায়গায় অ্যাডজাস্ট করতে সময় লাগে। অভিরও লেগেছে। অ্যাডজাস্টমেন্ট সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরীক্ষার টেনসান। তাছাড়া গ্রুপ স্টাডি করার জন্য গ্রুপ লাগে। হোস্টেলে অলরেডি দুই, তিন বা চারজন ছেলে মিলে গ্রুপ বানিয়ে রেখেছে। এই ক্রুশিয়াল সময়ে তাকে কেউ এন্ট্রি দেয়নি। সবাই পরিষ্কার বলেছে, পরীক্ষার পনেরো দিন আগে একটা চালু সিস্টেমকে তারা ঘাঁটতে পারবে না। ফার্স্ট এমবিবিএস-এর পরে এই নিয়ে ভাবা যেতে পারে।

    হোস্টেলে এসে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় অভি ভেবেছিল বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু দোনামোনা করে যায়নি। হোস্টেলে থাকলে পরীক্ষার দিনগুলোয় বাড়ি থেকে যাতায়াত নিয়ে টেনশান করতে হবে না।

    একশো চব্বিশ নম্বরে থাকার সুবিধা হল, এই ঘরে কেউ থাকে না। টিনটিনের বাড়ি ঢাকুরিয়ায়। সে ক্লাস শেষ হলে বিকেলের দিকে আধঘণ্টার জন্য রেস্ট নেয়। তারপর বাড়ি চলে যায়। এটা মোচা-পার্টির মিটিং ঘর। পরীক্ষার চাপে মিটিং এখন বন্ধ। সারাদিন অভি ঘরে একা। পড়াশুনা করার জন্য আদর্শ ব্যবস্থা। কিন্তু পড়াশুনা হচ্ছে কই?

    অভির রুটিন খুব সহজ। ভোর পাঁচটার সময় অ্যালার্ম বাজলে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে স্নান করে পড়তে বসে। সকালে অ্যানাটমি পড়ে না। ভোরবেলা অপছন্দের সাবজেক্ট পড়তে বিবমিষা হয়। ফিজিওলজি নিয়ে বসে। চ্যাপ্টার রিভিশন দিতে আর ডায়াগ্রাম প্র্যাকটিস করতে আটটা বেজে যায়। আটটা থেকে ন’টা টিফিন ব্রেক। প্রাতঃরাশ, খবরের কাগজ পড়া, খুচরো আড্ডা চুকিয়ে আবার ঘরে ঢোকে অভি। এইবার অ্যানাটমি নিয়ে বসে। টিনটিনের সংগ্রহ করা একটা স্কেলিটন আলমারিতে ঢোকানো ছিল। অভি সেটাকে হুকে ঝুলিয়েছে। কাপালিকের মতো হাড় আর নরকঙ্কাল নিয়ে চর্চা করে অস্টিওলজি এখন সড়োগড়ো। মাসলের অরিজিন আর ইনসারশন গোলায় না। বিভিন্ন শিরা, ধমনি ও স্নায়ুতন্ত্রর গতিপথও বাগে এনে ফেলেছে। প্রবলেম করছে ভিসেরা বা মানবদেহের ভাইটাল অর্গ্যানস। যেমন হার্ট, লাং, ব্রেন, স্টম্যাক, কিডনি, লিভার। ভাইভার সময় ফর্মালডিহাইডে চোবানো এইসব ভিসেরা হাতে ধরিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করবেন এনজি। না পারলেই ঝাড়। তার ব্যাচের ছেলেরা কালুয়া ডোমের কাছ থেকে ভিসেরা কিনে বালতিতে ভরে রেখেছে। যখন যেটা পড়ে তখন সেটা বালতি থেকে বার করে নেয়। বালতি ভর্তি হৃদয়, ফুসফুস, যকৃৎ, বৃক্কের প্রদর্শনী দেখলে যে কোনও মানুষ অজ্ঞান হয়ে যাবে। অজ্ঞান বোধহয় অভিও হয়ে যাবে। তবে সেটা অ্যানাটমি প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার দিনের কথা ভেবে।

    সকাল নটা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত অ্যানাটমি নিয়ে দক্ষযজ্ঞ চলে। তারপর জেনারেল মেসে গিয়ে খাওয়া। মিনি মেস উঠে গিয়ে খুব ভালো হয়েছে। জেনারেল মেসের খাওয়াদাওয়া একদম বাড়ির মতো। পেটপুজো ক্যাটারিং এজেন্সির মালিক উৎপল রোজ লাঞ্চের সময় মেসে উপস্থিত থাকে। খাবারের কোয়ালিটি, মেসের স্টাফদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করে।

    দুপুর দুটোর সময় শুয়ে পড়ে অভি। ঘুম ভাঙে সাড়ে তিনটের সময়, টিনটিন ঢুকলে। টিনটিন নিজের খাটে রেস্ট নেয়। তার মধ্যে অভি বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে বসে যায়। সাড়ে তিনটে থেকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত ফর্মুলা মুখস্থ করে আর সমীকরণ কষে কেটে যায়। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ডিএনএ আর আরএনএ নিয়ে সাড়ে চারঘণ্টা ধস্তাধস্তি চলে। এবার গন্তব্য ক্যান্টিন।

    মুড়ি-ঘুগনি বা লুচি-তরকারি, কিছু একটা খেয়ে এককাপ চা নেয় অভি। তারপর একটা সিগারেট। হ্যাঁ, অভিও সিগারেট ধরেছে। যে অভি আজ থেকে এক বছর আগে বিলুকে সিগারেট খেতে দেখে বলেছিল যে অরুণাকে বলে দেবে, সে এখন ধূমপায়ী। নিজেকে সান্ত্বনা দেয় অভি, পরীক্ষার টেনশান কাটাতে এই সাময়িক নেশা। পরীক্ষা হয়ে গেলেই ছেড়ে দেবে। আর সে তো চন্দনের মতো দিনরাত ধোঁয়া ছাড়ে না। বিকেলে টিফিনের সময় একটা আর রাতের খাওয়ার পড়ে আর একটা।

    আটটায় আবার পড়তে বসে অভি। আবারও অ্যানাটমি। কিছুতেই মন চায় না। তাও। ব্রেনের অ্যানাটমি, হোয়াইট আর গ্রে ম্যাটার, সেন্ট্রাল আর পেরিফেরাল নার্ভাস সিস্টেম—এই সবের জটিল গোলকধাঁধায় সাড়ে দশটা অবধি কাটিয়ে রাতের খাবার খেতে ওঠে অভি। নাকে-মুখে খাবার গুঁজে এগারোটার সময় আবার পড়তে বসে। বারোটা পর্যন্ত পেপার সলভ করে। গত দশ বছরের ফার্স্ট এমবিবিএস-এর প্রশ্নপত্রের ফটোকপি জোগাড় করেছে সে। প্রতি রাতে একঘণ্টা লেখালেখি করে। তিন দিনে একটা পেপার শেষ হয়। রাত বারোটার সময় দ্বিতীয় এবং শেষ সিগারেট ধরিয়ে অভি হিসেব করে, আজ ক’ঘণ্টা পড়া হল? মাত্র ষোল ঘণ্টা। কাল থেকেই এটাকে বাড়িয়ে আঠেরো ঘণ্টা করতে হবে। তখন তার দু’চোখ ভেঙে ঘুম আসছে। আধো-জাগা, আধো-ঘুমের মাঝখানে মাথায় ছবি আঁকছে মনোজের দেরি করে বাড়ি ফেরা, অরুণার অকারণ দুশ্চিন্তা ও শুচিবাই, রাধা পাগলি আর মানদা পিসির ঝগড়া, বিলুর অতি-বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। আর এই সবের মধ্যে গালে টোল ফেলে একটা মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে…

    সারা অগাস্ট মাস জুড়ে অনর্গল বৃষ্টিপাত। আকাশের রং ধূসর। রাত বারোটা নাগাদ হাতির পালের মতো মেঘের দল বেলেঘাটা ব্রিজ পেরোচ্ছে। অ্যানাটমির ভারে ক্লান্ত অভির মাথায় নিঃশব্দে বাংলা হরফ এক্কাদোক্কা খেলতে থাকে। ঘুমের মধ্যে অভি বিড়বিড় করে,

    ‘কখন আকাশ থেকে মেঘ, কখন মেঘের থেকে জল

    কখন জলের মাঝে মেয়ে। মেয়ের দু’গালে টলোমল

    স্বেদ, নাকি বৃষ্টি ছিল রাখা। জানি না, হয়নি বলে চাখা।

    ধর্মতলাগামী বাসে চাকা, ফেটে গিয়ে এই গন্ডগোল।

    স্বাদই অপূর্ণ না শুধু। নামটাও বাকি আছে জানা।

    পদবি? তাতেও গরমিল। এছাড়াও জানি না ঠিকানা।

    কিছুই জানি না বলে শোক, করার মতন কোনও লোক

    নই আমি। তাই আজ থেকে, তার নাম বৃষ্টিদিন হোক।’

    হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় অভির। কী হল? এতক্ষণ ঘুমের মধ্যে কী বিড়বিড় করছিল সে? এই কবিতাটা কার লেখা? অন্ধকার ঘরে শুয়ে, সিলিং পাখার দিকে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকতে থাকতে অভি বুঝতে পারে, কবিতাটা কোনো নামি কবির লেখা নয়। এটা তার নিজের লেখা। এই আট লাইন নিজের থেকে তার মাথায় এসেছে। এখনও লেখা হয়নি।

    পদ্য তাকে ছাড়ছে না কেন? সে তো কবেই ও সব পাট চুকিয়ে দিয়েছে। চিলেকোঠার ঘরের লাইব্রেরিতে কবিতার বইতে ধুলো জমে আছে। একটাও কবিতা পড়েনি, সে প্রায় এক বছর হয়ে গেল। তাহলে পদ্য আসে কোথা থেকে? ছন্দ ও অন্ত্যমিল সহযোগে একটা আস্ত পদ্য? সে তো কখনও পদ্য লেখেনি। শুধু পড়েছে।চর্যাপদের যুগ থেকে সাম্প্রতিকতম নবীন কবির প্রথম কবিতার বই নিয়ে সে মাথা ঘামাত। কিন্তু সে সব তো অতীত! আজ হঠাৎ কী এমন ঘটল যে পাঠক অভি হঠাৎ করে পদ্যকার অভি হয়ে গেল? ঘুমিয়ে পড়ার আগে অভির মনে পড়ল, কাল সেই ভয়ানক দিন। কাল অ্যানাটমির থিয়োরি পরীক্ষা। বিকেলবেলা বাড়ি যাবার আগে টিনটিন বলেছে, ডাক্তাররা তাদের জীবনের চারটে রাত কখনও ভোলে না। ফুলশয্যার রাত ছাড়া অ্যানাটমি, প্যাথলজি আর মেডিসিন প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার আগের রাত।

    আজকের রাত সেই চার রাতের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু এই রাত অভির আজীবন মনে থাকবে। ইঙ্গুইনাল ক্যানালের বাউন্ডারি পড়তে গিয়ে ভেগাস নার্ভের কোর্স ভুলে যাচ্ছে। আর্চ অব ফুট পড়তে গিয়ে এমব্রায়োলজি ভুলে যাচ্ছে। গা গুলোচ্ছে, ওয়াক উঠছে, টক-ভাব মুখের ভেতরে। পরপর তিনবার তেতো বমি হল। বাথরুমে ওয়াক শব্দ শুনে চন্দন একশো পঁচিশ থেকে বেরিয়ে এসেছিল। বলল, ‘রাত একটা বাজে। এখনও শুসনি?’

    ‘শোবো। এমব্রায়োলজিটা ঝালিয়ে নিই।’

    ‘এক বছর ধরে ঝালানো হয়নি। আর ঝালিয়ে কাজ নেই। রাত্তিরে না ঘুমিয়ে পরীক্ষা দিতে গেলে কাল পরীক্ষার সময় কিসসু মনে পড়বে না। যা। ঘুমিয়ে পড়।’

    ‘এমব্রায়োলজিটা একদম পড়া হল না। কিডনি আর সুপ্রা-রেনাল গ্ল্যান্ডের ডেভেলপমেন্টটা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না। এখন ঘুমিয়ে পড়ব?’

    ‘আমাদের পরীক্ষা এগারোটা থেকে। সিট পড়েছে ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে। হাড়কাটা গলির মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে আধঘণ্টা লাগবে। আমরা সওয়া দশটা নাগাদ বেরোব। এখন একটা বাজে। তুই সকাল আটটায় ঘুম থেকে উঠলে স্নান-খাওয়া পর্ব বাদ দিয়ে দেড়ঘণ্টা হাতে পাবি এমব্রায়োলজি পড়ার জন্য। এখন চাপ নিস না।’

    চন্দনের পরামর্শ শুনে রাত একটার সময় জিভের তলায় একটা অ্যালোপাম নিয়ে শুয়ে পড়েছিল অভি। মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়েছিল সকাল সাড়ে সাতটায়। অ্যালার্মের শব্দে যখন ঘুম ভাঙল, মাথা ভার। নাক বন্ধ। গা-হাত-পা ম্যাজম্যাজ করছে। জ্বর আসার পূর্ব লক্ষণ। টলতে টলতে বাথরুমে গিয়ে দাঁত মাজল অভি। শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে পুরো দমে শাওয়ার চালিয়ে দিল। মিনিট পনেরো ধরে স্নান করার পরে শরীর হালকা হল। গা-হাত-পা মুছে, নতুন প্যান্ট-শার্ট পরে এক দৌড়ে ক্যান্টিন। আজ ব্রেড পকোড়া হয়েছে। ভারি প্রাতঃরাশ পরীক্ষার জন্য আদর্শ। চারটে ব্রেড পকোড়া আর এক কাপ চা খেয়ে, আর এক কাপ হাতে নিয়ে একশো চব্বিশে ঢোকে অভি। পৌনে ন’টা বাজে। হাতে সওয়া একঘণ্টা সময় আছে। একশো পাতা এমব্রায়োলজি পড়ার জন্য পঁচাত্তর মিনিট! চায়ে চুমুক দেয় সে।

    দশটার সময় দরজায় ঠকঠক। চন্দন নতুন প্যান্টশার্ট পড়ে রেডি। কাঁধে ব্যাগপ্যাক। অভির দিকে একপলক দেখে বলল, ‘শরীর খারাপ নাকি?’

    ‘দেখে মনে হচ্ছে?’

    ‘চোখটা ছলছল করছে।’ অভির কপালে হাত দিয়ে চন্দন বলে, ‘টেম্পারেচার আছে। একটা প্যারাসিটামল মেরে দে।’ তারপর নিজেই একটা ট্যাবলেট আর জলের জাগ এনে বলে, ‘এক গ্রাম পিসিএম দিলাম। জ্বর বাপবাপ বলে পালাবে।’

    ওষুধ খেয়ে দ্রুত ব্যাগ ঘাঁটে অভি। অ্যাডমিট কার্ড, ক্লিপবোর্ড, পেন, পেনসিল, ইরেজার, স্কেল, চোথার মাইক্রোজেরক্স…সব ঠিক আছে। চোথাগুলো টিনটিনের তৈরি। ভালোবেসে জুনিয়রকে দান করেছে। একশো চব্বিশে চাবি মেরে অভি চন্দনকে বলে, ‘চল। এগোই।’

    ‘এমব্রায়োলজি শেষ হল?’ সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলে চন্দন।

    ‘পড়তে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি।’

    ‘চল। রিকশায় যেতে যেতে পড়বি।’

    ‘রিকশা? এখন রিকশা কোথা পাবি?’

    ‘কাল রাতে উৎপলদাকে বলে রেখেছিলাম। ও একটা রিকশা হোস্টেলের সামনে এনে রাখবে থিয়োরি পরীক্ষার তিনদিন। মেডিক্যাল কলেজ এমন বিকট জায়গায়, হেঁটে যেতেও প্রবলেম, বাসে যেতেও প্রবলেম।’

    হোস্টেলের গেটের বাইরে একটা রিকশা দাঁড়িয়ে। উৎপল বিহারি রিকশাওয়ালার সঙ্গে দরদাম নিয়ে বচসা চলছে। চন্দন বলে, ‘কত নেবে?’

    ‘পচাস রুপিয়া বাবু।’ গামছা নেড়ে বলে রিকশাওয়ালা।

    ‘চল্লিশ দেগা।’ রিকশায় উঠে বসেছে চন্দন। তার দেখাদেখি অভিও। আচার্য জগদীশ্চন্দ্র বসু রোড টপকে, প্রাচী সিনেমা হলের পাশ দিয়ে ডিক্সন লেনে ঢুকল রিকশা। সরু রাস্তা। দু’পাশে পুরনো আমলের বাড়ি। ওপাশ থেকে গাড়ি এলে খুব সমস্যা হবে। গাড়ি এল না, কিন্তু রিকশা এল। তার সঙ্গে একপ্রস্ত ঝগড়া সেরে রিকশাওয়ালা নেবুতলা পার্কে পড়ল। বউবাজার থানার পাশ দিয়ে টুংটুং করতে করতে পৌঁছল বিবি গাঙ্গুলি স্ট্রিট। বউবাজারের রাস্তা দিয়ে রিকশা চালানো শক্ত। অজস্র গাড়িঘোড়া। ক্রমাগত ট্রাম যাতায়াত করছে। সামান্য দূরত্ব পেরোনোর পর ডানদিকের গলিতে ঢুকে পড়ে রিকশা।

    এতক্ষণ মন দিয়ে এমব্রায়োলজি পড়ছিল অভি। এবার আড়চোখে রাস্তার দিকে তাকাল। স্থানবদলের সঙ্গে সঙ্গে বদল ঘটছে পাত্রপাত্রীর। সরু রাস্তায় কোনও যানবাহন নেই। একটা দুটো রিকশা বা স্কুটার দাঁড়িয়ে। অফিসযাত্রীর বদলে এখানে মেয়েদের প্রাধান্য। সকাল দশটার সময় তারা রঙিন, উজ্জ্বল পোশাক পরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। পঞ্চাশোর্ধদের পোশাক শাড়ি। তিরিশ থেকে পঞ্চাশরা সালোয়ার কামিজ পড়েছে। তার নিচে সবাই জিনস বা স্কার্ট। গালে চড়া মেক আপ, চোখে মোটা দাগের কাজল, ঠোঁটে উজ্জ্বল লাল রঙের ঠোঁট রাঙানিয়া। জিনস পরা বছর কুড়ির একটা মেয়ে চার ইঞ্চির হাই হিল খটখটিয়ে রিকশার সামনে এসে অভিকে বলল, ‘তুমি বুঝি বুকওয়র্ম?’ রিকশা দাঁড়িয়ে গেল।

    ‘অ্যাঁ?’ মিনমিন করে বলল অভি। চন্দন বলল, ‘এখন ঝামেলা কোরো না। আমরা পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি।’

    ‘তোমার সঙ্গে কথা কইছি না।’ পিচ করে পানের পিক ফেলে লাল ঠোঁট বেঁকিয়ে মেয়েটা বলে, ‘এত বড় বুক-লাভার আমি কখনও দেখিনি। আমার কাছেও দুটো বুক আছে। দেখবে গো?’

    এমব্রায়োলজি মাথায় উঠেছে। লজ্জায় অভির কান লাল। সে কোনওরকমে বলল, ‘আম…আমরা ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কলেজের ছেলে। পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি।’

    ‘ডাক্তারবাবু?’ তাড়াতাড়ি সরে দাঁড়ায় মেয়েটি। ‘এক্সট্রিমলি সরি। প্লিজ কিছু মনে করবেন না স্যার। যান যান, আপনারা যান।’ রিকশাওয়ালার পিঠে থাবড়া কষায় সে। রিকশা আবার চলতে শুরু করে। অভি এমব্রায়োলজিতে মনোযোগ দেয়।

    মেডিক্যাল কলেজের যে হলঘরে পরীক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে, সেটা ফুটবল মাঠের মতো বড়। হলঘরের দু’পাশে প্রশস্ত করিডর। করিডরে বড় বড় জানলা। ঘর আলোয় ভেসে যাচ্ছে। হলঘরের দু’পাশে বেঞ্চি পাতা। প্রতি বেঞ্চিতে দু’জনের সিট পড়েছে। অ্যাডমিট কার্ড মিলিয়ে সিট নাম্বার খুঁজতে গিয়ে বৃন্দার সঙ্গে ঠোক্কর লাগল অভির।

    ‘তুই?’ অভি অবাক।

    ‘আমার রোল নাম্বার দুই। ফার্স্ট রোয়ে সিট পড়েছে। কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করার উপায় নেই। ডাহা ফেল করব।’ কাঁদো কাঁদো গলায় বলে বৃন্দা।

    ‘আমার রোল নাম্বার এক,’ প্রথম বেঞ্চিতে বৃন্দার পাশে বসে সামনের দিকে তাকায় অভি। দু’ফুট দূরে প্ল্যাটফর্মের ওপরে একটা টেবিল ও চারটে চেয়ার। ওখানেই বসবেন ইনভিজিলেটররা। ব্যাগে রাখা মাইক্রোজেরক্সের কথা ভুলে যায় অভি। ওই চোথা এখানে কোনও কাজে আসবে না। তারপর কী ভেবে ব্যাগ খুলে ক্লিপবোর্ড এবং পেনসিল বক্স বার করার ফাঁকে মাইক্রোজেরক্সের বান্ডিল মোজার মধ্যে গুঁজে রাখে। সঙ্গে থাকা ভালো। একঘণ্টা পরে বাথরুমে যেতে দেবে। একদম না পড়া কোনও টপিক এলে দেখে নেওয়া যাবে।

    বৃন্দা নিজের জায়গায়, দু’হাতের মধ্যে মুখ লুকিয়ে বসে রয়েছে। তার পাশে বসে অভি আবার এমব্রায়োলজি বই খুলল। এই এমব্রায়োলজির জন্যই সে ঝাড় খাবে। কিডনি আর সুপ্রা-রেনাল গ্ল্যান্ডের ডেভেলপমেন্টটা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না। গত দশ বছরে এমব্রায়োলজি থেকে লং কোয়েশ্চেন আসেনি। এবারও আশা করা যায় যে আসবে না। পঁচিশ নম্বরের লং কোয়েশ্চেনের উত্তর লিখতে না পারা মানে নিশ্চিত ঝাড়।

    ঢং করে ঘণ্টা পড়ল। করিডোরে ঠকঠক, মসমস করে জুতোর আওয়াজ। সারিবদ্ধ ভাবে দু’জন পুরুষ ও দু’জন মহিলা একজামিনার হলঘরে ঢুকলেন। প্রথম মহিলা একজামিনার প্ল্যাটফর্মে উঠে বললেন, ‘সাইলেন্স।’

    হলঘর জুড়ে নৈঃশব্দ নেমে এল।

    ‘পরীক্ষা শুরু হতে দশ মিনিট বাকি আছে। তার আগে নিয়মগুলো তোমাদের জানিয়ে দিই। আমি যতক্ষণ নিয়ম বলব, ততক্ষণ তিনজন স্যার ও ম্যাডাম তোমাদের টেবিলে কোয়েশ্চেন পেপার ও আনসার শিট পৌঁছে দেবেন। আমরা আশা করব, দশটা বাজার আগে তোমরা লেখা শুরু করবে না। করলে প্রশ্নপত্র কেড়ে নেওয়ার অধিকার আমাদের আছে।’

    উত্তর ও প্রশ্নপত্র বিতরণ শুরু হয়ে গেছে। অভিই প্রথম প্রাপক। কোয়েশ্চেন পেপার বা আনসার শিটের দিকে না তাকিয়ে অভি ম্যাডামের কথা শুনছে। ম্যাডাম বলছেন, ‘বাথরুম যেতে হলে এখন ঘুরে এসো। একঘণ্টার আগে বাথরুমে যাওয়া যাবে না। আর শেষ কথা, কাউকে অসাধু উপায়ে অবলম্বন করতে দেখলে আমরা তার খাতা কেড়ে নেব। ভুলে যেয়ো না, আমরাও একদিন স্টুডেন্ট ছিলাম। সো, ডোন্ট ট্রাই টু বি ওভারস্মার্ট।’

    দশটা বাজার ঘণ্টা পড়ল। প্রশ্নপত্রের প্রথম প্রশ্নের দিকে তাকাল অভি। ‘ডেসক্রাইব এমব্রায়োলজিকাল ডেভেলপমেন্ট অব কিডনি অ্যান্ড সুপ্রা-রেনাল গ্ল্যাণ্ড ইন ডিটেইল, উইদ ডায়াগ্রামস।’ পঁচিশ নম্বরের প্রথম প্রশ্ন!

    চোখ বুঁজে ফেলে অভি। এখন আর কোনও টেনশান হচ্ছে না। এখন আর কোনও শারীরিক অসুবিধে নেই। এখন বলির পাঁঠার মতো হাড়িকাঠে গলা দিয়ে প্রতিক্ষার পালা। কখন পরীক্ষা শেষ হবে। এক বছরের পরিশ্রম এইভাবে বিফলে যাবে, ভাবতে পারেনি অভি। বৃন্দার দিকে তাকায় সে। বৃন্দা মন দিয়ে প্রশ্নপত্র পড়ছে। অভির দিকে তাকিয়েও দেখল না।

    আচ্ছা, এত সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার কী আছে? অন্য প্রশ্নগুলো দেখা যাক! দ্বিতীয় প্রশ্নে চোখ রাখে অভি। আর্চ অব অ্যাওর্টা অ্যান্ড ইটস ব্রাঞ্চেস। পঁচিশ নম্বর! গুড! কিউবিটাল ফসা—ইটস বাউন্ডারি অ্যান্ড কনটেস্ট। গুড! পঞ্চাশ নম্বর কমন পাওয়া গেল। বাকি পঁচিশ নম্বরে পাঁচটা শর্ট নোট আছে। সেগুলো পড়ে অভি। ইঙ্গুইনাল ক্যানাল সহ বাকি চারটে তার জানা। নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ায় অভি। পঁচাত্তর নম্বর কমন পড়েছে। প্রথম দু’ঘণ্টায় এগুলো শেষ করা যাক। তারপরে বাথরুমে গিয়ে চোথা দেখে এমব্রায়োয়োলজির উত্তরটা কোনওরকমে মুখস্থ করে খাতায় নামিয়ে দিতে হবে। পঁচিশে যদি পাঁচ-সাত নম্বরও পায়, পাস করা কেউ আটকাতে পারবে না। তাদের পাসমার্ক ফিফটি পার্সেন্ট। অর্থাৎ পঁচাত্তর নম্বরের মধ্যে অন্তত পঁয়তাল্লিশ তাকে তুলতেই হবে। আর্চ অব অ্যাওর্টা দিয়ে উত্তর লেখা শুরু করে অভি। লাল নীল স্কেচ পেন দিয়ে ডায়াগ্রাম এঁকে ভরিয়ে দেয় প্রথম তিনপাতা। এবার বিবরণ।

    ঠিক দু’ঘন্টার মাথায় উত্তর লেখা শেষ হল অভির। এতক্ষণ হলঘরে কী ঘটে গেছে তার কোনও ধারণা নেই। খাতা আর প্রশ্নপত্র গুছিয়ে রেখে সে ভেবে নেয় চোথাটা কোন পায়ের মোজার মধ্যে রাখা আছে। সিওর হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘ম্যাডাম, একবার বাথরুম যাব।’ ম্যাগাজিন পড়তে পড়তে অন্যমনস্ক ম্যাডাম বলেন, ‘যাও। তাড়াতাড়ি আসবে।’

    বেঞ্চি থেকে উঠে বৃন্দার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অভি খেয়াল করল বৃন্দা স্কেচ পেন দিয়ে কিডনি আর সুপ্রা-রেনাল গ্ল্যান্ডের ছবি আঁকছে। হিংসেয় গা চিড়বিড় করে ওঠে অভির। মেয়েগুলো কি সাংঘাতিক স্টুডিয়াস হয়!

    বাথরুমে ঢুকে অভি দেখে ইউরিনালের সামনে, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সুরজ, প্রবাল আর দীপ শর্ট নোট নিয়ে আলোচনা করছে। ওদের পাত্তা না দিয়ে টয়লেটে ঢুকে যায় অভি। দরজা বন্ধ করে অবাক হয়ে দেখে সিস্টার্নের ওপরে পাঁজা করে বই রাখা। ক্যানিংহ্যাম, ডক্টর মিত্র, চৌরাসিয়া, স্নেল… কী নেই? এখন কোনও ইনভিজিলেটর দরজা ধাক্কালে সে চরম বেইজ্জত হবে। পরীক্ষায় না-ও বসতে দিতে পারে। হুড়মুড়িয়ে দরজা খুলে বেরোয় অভি। পাশের টয়লেটের দরজা ঠেলে উঁকি মারে। এই টয়লেটটা নোংরা। তবে কোনও বইপত্র রাখা নেই। ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে, নিচু হয়ে সে মোজার ভিতর থেকে চোথার তাড়া বের করে আনে। কিডনির এমব্রায়োলজির পাতাটা খুঁজে বার করে বাকি পাতাগুলো কমোডে ফেলে সিস্টার্ন টানে। মুহূর্তের মধ্যে সব কাগজে সাইফনের নলে অদৃশ্য হয়ে যায়। কাগজটা হাতে নিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিডনির এমব্রায়োলজি মুখস্থ করতে থাকে অভি।

    হলঘরে ঢোকার আগে অভি ঘড়ি দেখল। সে বাথরুমে ঠিক দশ মিনিট সময় কাটিয়েছে। ইনভিজিলেটর কোনও সন্দেহ করেনি তো? চোথার পাতাটা এখনও মোজার মধ্যে রাখা আছে। বলা যায় না, দশ মিনিটের মুখস্থ বিদ্যা খাতায় বমি করতে গিয়ে যদি ভুলে যায়, তাহলে আর একবার টয়লেটে যেতে হবে! এখন ইনভিজিলেটররা তার বডি সার্চ করলেই পরীক্ষা থেকে আউট!

    ধুস! এত ভয় পেলে চলে না। ভয় পেলে মুখে তার ছাপ পড়ে। ওতে পরীক্ষকদের সন্দেহ বাড়ে। ক্যাজুয়ালি বৃন্দার পাশ দিয়ে হেঁটে নিজের আসনে বসে অভি। ম্যাডাম ম্যাগাজিন পড়তে পড়তে বললেন, ‘একটু বেশি সময় লাগল মনে হল!’

    এর একটা বোম্বাস্টিং উত্তর দিতে হয়। পকেট থেকে রুমাল বের করে হাত মুছতে মুছতে অভি বলল, ‘পাইখানা গিয়েছিলাম ম্যাডাম।’

    ‘পাইখানা’ শব্দটি শুনে ম্যাডাম নাক কুঁচকে ম্যাগাজিনে চোখ রাখলেন। পাশে বসে বৃন্দা কুলকুলিয়ে হাসছে। তাকে পাত্তা না দিয়ে পেনসিল বাক্স থেকে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ স্কেচপেন বার করে অভি। একটা পঁচিশ নম্বরের লং কোয়েশ্চেন বাকি। হাতে সময় পঞ্চাশ মিনিট!

    পরীক্ষা শেষ হওয়ার আধঘণ্টা আগে অভির উত্তর লেখা শেষ হয়ে গেল। খুব যে ভালো লিখেছে তা নয়। তবে কিডনি আর সুপ্রা-রেনাল গ্ল্যান্ডের অ্যানাটমি আর ফিজিওলজি জোর করে ঢুকিয়ে উত্তরটা সাত পাতা টেনেছে। সঙ্গে গোটা পাঁচেক ডায়াগ্রাম।

    লেখালিখির পাট চুকিয়ে রিভিসন করতে বসে অভি। তিনটে লং কোয়েশ্চেন আর পাঁচটা শর্ট নোটের উত্তর পড়তে কুড়ি মিনিট সময় লাগল। এবার খাতা জমা দিতে হবে। হলঘর থেকে দেখা যাচ্ছে আকাশে আবার মেঘ করেছে। বৃষ্টি নামবে কিছুক্ষণের মধ্যে।

    ‘শেষ?’ রিভাইস করতে করতে প্রশ্ন করল বৃন্দা।

    ‘হ্যাঁ’। উত্তরপত্রগুলো সুতো দিয়ে বাঁধতে বাঁধতে অভি খেয়াল করল, একটা লুজ শিট সে ব্যবহার করেনি। এটা ম্যাডামকে ফেরত দেওয়া উচিত। আনসার শিট নিয়ে উঠতে যাবে, এমন সময় প্রচণ্ড জোরে বিদ্যুৎ চমকালো! ‘বাবা গো!’ বলে বৃন্দা বাঁদিকে লাফিয়ে অভির ডান হাত চেপে ধরল।

    ‘ভ্যাট! ভিতু কোথাকার।’ বৃন্দার হাত ছাড়িয়ে লুজ শিটটার দিকে তাকায় অভি। অনেকদিন বাদে তার মাথায় আবার কবিতা আসছে। বিদ্যুতের মতো আচমকা, বৃষ্টিধারার মতো ঝমঝম করে। পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ইনভিজিলেটাররা খাতা জমা নিতে ব্যস্ত। তার মধ্যে লুজ শিটে খসখস করে লিখতে থাকে অভি।

    ‘কখন আকাশ থেকে মেঘ, কখন মেঘের থেকে জল।

    কখন জলের মাঝে মেয়ে, মেঘের দু’গালে টলোমল…’

    ঘোরের মধ্যে কবিতা লেখা শেষ করে অভি। মেঘ ও বৃষ্টির কারণে হলঘরে আলো অপ্রতুল। ছেলেমেয়েরা খাতা জমা দিতে দিতে গজল্লা করছে। চারজন ইনভিজিলেটার খাতা গোনাগুনিতে ব্যস্ত। এর মধ্যে লুজ শিটটা প্যান্টের পকেটে ঢোকায় অভি। আজ তার বুকে দুঃসাহস ভর করেছে। দোতলার সিঁড়ি দিয়ে টকাটক করে নামতে নামতে বৃন্দার পাশে চলে আসে সে। ক্যাজুয়ালি বলে, ‘হোস্টেলে ফিরবি তো?’

    ‘না। আগামী দু’দিন ছুটি। আজকের দিনটা বাড়ি থাকব।’ জড়োসড়ো হয়ে জবাব দেয় বৃন্দা। তারা দু’জন এখন গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আশেপাশে অন্য ছেলেমেয়েরা। চন্দন ইশারায় অভিকে ডাকছে।

    ‘এখন কি মেট্রো ধরবি? ছাতা আছে?’ প্রশ্ন করে অভি। বৃন্দার জড়োসড়ো থাকার কারণ সে বুঝতে পারছে না। পরীক্ষা ভালো হয়নি নাকি?

    ‘না…মানে…দেখি…’ অসংলগ্ন উত্তর দেয় বৃন্দা। অভি আর দেরি করে না। এইটাই আইডিয়াল টাইম। নিখুঁতভাবে ভাঁজ করা লুজ শিট বৃন্দার হাতে ধরিয়ে বলে, ‘এটা তোর জন্যে।’

    বৃন্দা কিছু বলার আগে একটা কালো এসইউভি গাড়িবারান্দায় এসে দাঁড়ায়। জানলার কাচ সেন্ট্রাল লকের কেরামতিতে খুলে যায়। চালকের আসন থেকে স্যামি ব্যানার্জি বলেন, ‘বৃন্দা, উঠে আয়।’

    লুজ শিট ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে বৃন্দা গাড়িতে উঠে পড়ে। টিন্টেড গ্লাসের জানলা মসৃণভাবে উঠে যায়। গাড়িটা অভি ও তার ক্লাসমেটদের মুখের ওপরে ধোঁয়া ছেড়ে হুস করে চলে যায়।

  • সপ্তম পরিচ্ছেদ

    সপ্তম পরিচ্ছেদ

    সপ্তম পরিচ্ছেদ

    অভিজ্ঞান

    অরুণা হাঁ করে স্কুপ টিভি দেখছেন। চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসছে। ঘাড় বাঁকা, টিভির রিমোট মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরা। শ্বাস পড়ছে বলে মনে হচ্ছে না। অভির মনে হল, শ্বাস নেওয়ার কাজটা কর্মাশিয়াল ব্রেকের সময় করবে। সারা শরীর টেলিভিশনের পর্দার দিকে এগিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, একটু বাদেই বোকাবাক্সের মধ্যে ঢুকে যাবেন।

    অরুণা এত মনোযোগ দিয়ে দেখছেন একটি বাংলা মেগা সিরিয়াল। নাম ‘যদিদং হৃদয়ং মম’। আজ মেগা সিরিয়ালটির হাজারতম পর্ব টেলিকাস্ট হচ্ছে। বাংলার সেলিব্রিটি গেস্টদের নিয়ে এক ঘণ্টার স্পেশাল এপিসোড। ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট শঙ্করনাথ রায়চৌধুরীর আজ পঞ্চাশতম বিবাহবার্ষিকী। সেই উপলক্ষ্যে রায়চৌধুরী ম্যানসনের বাগানে বিশাল পার্টি অর্গানাইজ করা হয়েছে। আয়োজক দুই ছেলে অমরনাথ ও কমলনাথ এবং এক মেয়ে শালিনী। পুত্রবধূ অন্তরা, বিজয়া ও জামাতা অলোকেন্দু মজুত। শঙ্করনাথের স্ত্রী অবলাবালা নাতি-নাতনিদের নিয়ে ব্যস্ত। রায়চৌধুরী ফার্মাসিউটিকাল কোম্পানির বোর্ড মেম্বার এবং কর্মচারীরা পানভোজন করছেন, এমন সময় নাটকীয়ভাবে প্রবেশ এক কিশোরীর। পরনে গাছকোমর করে বাঁধা গোলাপি রঙের শাড়ি ও রানি রঙের ব্লাউজ। মাথায় দুই বিনুনি। পায়ে রুপোর মল ঝমঝম করছে। হাত ভরতি চুড়ি, বালা, রিস্টলেট, আর্মলেট। কপালে অদ্ভুত দেখতে টিপ। চোখে কাজল, ঘাড়ে ট্যাটু। তার দাবি, সে শঙ্করনাথের নাতনি। শঙ্করনাথের আগের পক্ষের স্ত্রী এখনও জীবিত। উত্তরবঙ্গের এক গির্জায় একান্তে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর পুত্র ড্রাগ অ্যাডিক্ট। পুত্রবধূ গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে গত দশ বছর ধরে কোমায় রয়েছে। বাবা-মায়ের চিকিৎসার জন্য মেয়েটি ঠাকুরদার কাছে টাকা চাইতে এসেছে।

    বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে গান গাইছে বাংলা ব্যান্ড ‘মাটি’। মাটির ফ্রন্টম্যান হৃষিকেশ পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়ার পরে ব্যান্ডের বাজারদর তুঙ্গে। এখন লিড সিঙ্গার টিটো নামের একটা ছেলে। সে গাইছিল, ‘আমরা হাঁটি যেথায় মাটি, সঙ্গে থাকুক হাতপাখাটি।’ টিটো নাটকীয়ভাবে গান থামিয়ে দিল। অভিনেত্রী চন্দ্রিমা সেন কবি সুদিন চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। দু’জনে অবাক হয়ে ক্যামেরার দিকে তাকালেন। চিত্রপরিচালক মনোতোষ ঘোষ ঔপন্যাসিক বিপিন দত্তর সঙ্গে গল্প করছিলেন। তাঁরাও অবাক হয়ে ক্যামেরার দিকে তাকালেন। ছোট ছোট কাটে সব্বার রিঅ্যাকশান দেখাতে দেখাতে আস্ত একটা সেগমেন্ট শেষ হল। এখন বিজ্ঞাপনের বিরতি। অরুণা হাঁফ ছেড়ে বললেন, ‘শেষে ওই বুড়োটাও! আমি এতদিন ওকে ভালো ভাবতাম। নাঃ! জগতে একজনও সৎ পুরুষ মানুষ নেই।’

    হাসতে হাসতে অভি বলল, ‘টিভি দেখে মাথা খারাপ কোরো না। এক কাপ চা খাওয়াও।’

    ‘এখন পারব না।’ হাত নাড়েন অরুণা, ‘তোর বাবা আসুক।’

    মনোজের অফিস থেকে ফেরাটা অজুহাত। মেগা-সিরিয়ালের মেগা-ধামাকা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অরুণা টেলিভিশনের সামনে থেকে উঠবেন না। মনোজ জীবন সংগ্রামের নাটক করতে গিয়ে পরিবারের পিছনে সময় দিতে পারছেন না। আর অরুণা টিভি দেখতে গিয়ে। তাহলে অরুণা কোন সাহসে মনোজকে দোষারোপ করেন?

    হঠাৎ অভির মাথায় কতগুলো শব্দ খেলা করতে শুরু করল। শব্দগুলো নিজের মর্জি মতো একে অপরের সামনে-পিছনে বসে লাইন হয়ে উঠছে। আচমকা। পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া।

    ‘মাছের কাঁটার মতো ঊর্ধ্বে মেলা কেশ

    কুটিল বিভঙ্গে দাও যৌনতা-সন্দেশ।’

    যাব্বাবা! এর মানে কী? ঘাবড়ে যায় অভি। অসহায়ভাবে খেয়াল করে, আরও নতুন লাইন ঢুকছে মাথায় মধ্যে। যেভাবে খোলা জানলা দিয়ে ঢোকে হাওয়া। মাথার মধ্যে লাইনগুলো সাজাতে সাজাতে তিনতলার চিলেকোঠার ঘরে ঢোকে অভি। কাগজ পেন টেনে নিয়ে খসখস করে লিখতে থাকে…

    ‘চোখেতে পড়েছে ছানি। হয়ে গেছে স্ট্রোক

    কচি মাথা দেখলেই টেনে মারো চোখ।

    স্তনেতে আঁশের গন্ধ, স্বাদ কিছু বাসি

    মজেছে মন্ত্রীর পিসে, ক্ষুদ্র ভাগচাষি।’

    এটা একটা পদ্য। এইটুকু বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু কী নিয়ে? অভি কনফিউজড। বৃদ্ধা বেশ্যার বর্ণনা চলে আসছে পদ্যে। যে রকম মেয়েদের অভি দেখেছে হাড়কাটা গলিতে। কিন্তু তারা পদ্যে কেন আসছে?

    এই নিয়ে ভাবা বন্ধ করে অভি। কেন না, পরের লাইনগুলো ফড়ফড় করে মাথার চারিদিকে উড়ছে। খাতায় বন্দী না করলে হারিয়ে যাবে। অভি লেখে,

    ‘নিতম্বে দাদের বৃত্ত, উকুনের ডিম

    স্পর্শে চিত্তে শিহরণ, আনন্দ অসীম।

    দামড়া মোচার মতো কোঁচকানো থাই

    সর্বস্ব বিলিয়ে দেব, যদি ওটি পাই।

    গহনার নৌকাসম সর্বগ্রাসী যোনি

    ওতেই মজেছে দিল্লি থেকে বাঁশদ্রোণি।

    ভাঁড়ে মা ভবানি হোক। উল্টোক পৃথিবী

    রাস্কেল-তন্ত্রের জয়। গেরস্থের টিভি।’

    একটানা আট লাইন লিখে থামল অভি। সব মিলিয়ে চোদ্দ লাইনের কবিতা, প্রতি লাইনে চোদ্দটি অক্ষর—তার লেখা প্রথম সনেট। যদিও ক্লাসিকাল সনেটের অন্তমিল এই সনেটে নেই, তবুও। কী করে লিখল সে? যখন শুরু করেছিল তখন জানত না যে এটা চতুর্দশপদী কবিতা হবে। তাহলে কীভাবে তার মন অক্ষর গুনল? এই অবাক কাণ্ডটা কীভাবে ঘটল? অভি কি তবে কবি হয়ে গেল?

    একা একা কিছুক্ষণ খ্যাকখ্যাক করে হাসল অভি। ‘অভি কি তবে কবি?’ নিজের মনে বার কয়েক বলল। সবচেয়ে বড় কথা, পদ্যটার উৎস অরুণার টিভি সিরিয়াল গেলা। পদ্যটা লেখার সময় সেটা অভি বুঝতেই পারেনি।

    হতভম্ব ভাব কাটিয়ে অভি পদ্য কারেকশান করতে বসল। অবশ্য কারেকশান না করলেও কোনও ক্ষতি নেই। এই পদ্য কেউ পড়তে যাচ্ছে না!

    আচ্ছা, এই পদ্যের নাম কী হতে পারে? অভি একবার লিখল, ‘কহানি ঘর ঘর কি’। সেটা কেটে দিল। ওই নামের হিন্দি মেগা-সিরিয়াল খুব জনপ্রিয়, কিন্তু বাংলা কবিতার হিন্দি নাম? নতুন নাম দিল, ‘চতুর্দশপদী খিস্তি।’ এইবার নামটা পছন্দসই হয়েছে।

    কবিতায় ছোট একটা ত্রুটি চোখে পড়ল। অতীতে টিভির অ্যান্টেনা লাগানো থাকত বাড়ির ছাদে। অ্যান্টেনাকে মাছের কাঁটার সঙ্গে তুলনা অতীতে ব্যবহৃত হয়েছে। অভি আবার ইউজ না করলেই পারত। এখন ওটা অচল। তা ছাড়া বুড়ি বেশ্যার যৌন আবেদনের সঙ্গে টিভির জনসম্মোহনী ক্ষমতাকে মেলানো ছাড়া এই কবিতায় বিশেষ কিছু নেই।

    তাও একটা নতুন কবিতা। খাতাটা বুক র‌্যাকের পিছনে রেখে দিল অভি। বিলু মাঝেমধ্যে বইয়ের খোঁজে এই ঘরে হানা দেয়। কোনওদিন চোখে পড়লে অভি আওয়াজ খেয়ে মরে যাবে।

    পরীক্ষা শেষ হয়েছে গত শুক্রবার। আজ সোমবার, সেপ্টেম্বর মাসের পাঁচ তারিখ। এখন একটানা পনেরো দিন ছুটি। বাড়িতে বসে কী করবে বুঝতে পারছে না অভি। দীর্ঘদিন হোস্টেলে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে থেকে, বাঁধনছাড়া জীবনযাপন করে, বাড়িতে এসে প্রচণ্ড একঘেয়ে লাগছে। সান্ত্বনা বলতে বৃন্দার সঙ্গে ফোনালাপ।

    বৃন্দার প্রসঙ্গ মাথায় আসতে নিজেকে সামলাল অভি। এক্ষুনি আবেগের সুনামিতে ভেসে যাওয়ার কিস্যু হয়নি। পরীক্ষার মধ্যে হঠাৎ করে হাতে পদ্য গুঁজে দিলাম, আর মেয়েটা ঢক করে ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলে দিল, জীবনে এতটা সরল নয়। কলকাতা শহরের এক নম্বর সার্জেনের মেয়ে। দ্বিতীয় প্রজন্মের চিকিৎসক। স্যামি ব্যানার্জির মতো বৃন্দাও পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান করতে বিলেত যাবে। ফিল্ম ম্যাগাজিনের গসিপ কলামের সূত্রে অভি জানে, বৃন্দার মা প্রাক্তন অভিনেত্রী মন্দিরা ব্যানার্জি। এইরকম ঘ্যামা ব্যাকগ্রাউন্ডওয়ালা মেয়ের পাশে তার মতো একটা ছেলে? মফসসলে বাড়ি, মফসসলে স্কুলিং, বাবা সরকারি করণিক, মা গৃহবধূ। যোগ্যতা বলতে দুই ভাই ডাক্তারি পড়ছে। বড় ভাই আবার অতিবাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। নাঃ! অভি কিছুতেই বৃন্দার পাশে নিজেকে বসাতে পারছে না। চূড়ান্ত মিসম্যাচ মনে হচ্ছে। তার ওপর ফার্স্ট এমবিবিএস পরীক্ষা খুব একটা ভালো হয়নি। ঝাড় খেয়ে যেতে পারে অভি। এই বাজারে প্রেম-ফ্রেমের মতো ন্যাকামি পোষায় না। এই প্রেমের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। বৃন্দা ফোন করলে ব্যাপারটা ওকে বুঝিয়ে বলতে হবে। তাছাড়া প্রেম ব্যাপারটা অভির কাছে খুব জটিল এবং রহস্যময় ব্যাপার। ও সব তার মতো ছেলেদের জন্য নয়। ও সবের জন্য ম্যাচিয়োরিটি লাগে। নিজেকে অতটা বড় বলে মনে হয় না অভির।

    তাহলে কোন সাহসে অ্যানাটমি থিয়োরি পরীক্ষার সময় সে পদ্য লিখে বৃন্দার হাতে তুলে দিয়েছিল? তখন তো মনে হয়নি, সে যথেষ্ট ম্যাচিয়োর নয়। কী ব্যাপার কে জানে বাবা!

    বৃন্দার প্রসঙ্গ ভুলে কান খাড়া করে অভি। দোতলা থেকে গোলযোগ শোনা যাচ্ছে। মানদা, রাধা আর অরুণা মিলে কথা কাটাকাটি করছে। ব্যাপারটা কী জানতে অভি নীচে নামে। তাকে দেখে মানদা বলে, ‘কী ঘণ্টার ডাক্তারি পড়ছ? রাধাকে পাগলা গারদে ঢোকাও, এ আমি বলে দিলুম। ও যে কোনওদিন এখান থেকে ভাগলবা হবে। তখন পুলিশ তোমাদের গারদে ঢোকাবে।’

    ‘আহ! আহ! লুক হুজ টকিং অ্যাবাউট পোলিস। আ হোর হু রেগুলারলি গেটস ফাকড বাই দেম…’ ঘৃণাভরে বলে রাধা।

    রাধা পাগলির ইংরিজি শুনে অনেকবার চমকেছে অভি, আজ শিউরে উঠল। ‘হোর’? ‘ফাক’? এই সব শব্দ রাধা জানল কী করে? আর, রাধার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে মানদা তো সাংঘাতিক চিজ!

    সৌভাগ্যবশত, মানদা রাধার ইংরিজি বকবকানির মানে বুঝতে পারেনি। সে অভির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ইংরিজিতে আমাকে গালাগালি দিল। তাই না?’

    ‘হ্যাঁ। আমি তোকে গালিগালাজ করেছি।’ ফ্যাঁশফ্যাঁশে গলায় বলে রাধা, ‘কেউ তো তোকে গালি দিল! কেউ তো তোকে নিয়ে মাথা ঘামাল! কেউ তো বুঝিয়ে দিল যে বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ! আমার মতো নির্বান্ধব তো তুই নোস।’

    ‘নির্বান্ধব?’ অরুণা অবাক, ‘তোমার যে একা লাগে সেটা কখনও বলোনি তো!’

    ‘কী বলব? গলায় পোস্টার ঝুলিয়ে ঘুরব? কপাল চাপড়ে চ্যাঁচাব, ‘ওগো! আমার কেউ নেই গো! আমায় দেখো!’ আয়্যাম নট আ ক্রাই-বেবি। আয়্যাম নট দ্যাট কাইন্ড অব লেডি হু হোয়াইনস অ্যাট দ্য ড্রপ অব আ হ্যাট। আমি তোমাদের মতো নই।’

    ‘তুই পাগল না সেয়ানা পাগল না পুলিশের লোক? তুই এত ইংরেজি জানলি কী করে?’ ঝাঁঝিয়ে ওঠে মানদা, ‘পঞ্চপাণ্ডব বলে, তোর সঙ্গে আমেরিকার ষড় আছে।’

    ‘পঞ্চপাণ্ডব? মানে ওই বখাটে ছোঁড়াগুলো? তোর তো ওদের সঙ্গেও আশনাই আছে। সন্ধেবেলা স্নো-পমেটম মেখে গঙ্গার ধারে যা রঙ্গ-তামাশা করিস তা আমি দেখিনি ভেবেছিস? ঢলানি মাগির রং-রলিয়া দেখে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে বৌদি।’

    ‘অ্যাই পাগলি, চুপ! আমাকে নিয়ে কোনও চুদুরবুদুর নয়! পঞ্চপাণ্ডব ঠিকই বলে, তুই আমেরিকার এজেন্ট!’

    ‘কোন শালা বলে বে? সিআইএ? কেজিবি? র? আইএসআই? মোসাদ? পেন্টাগন? এফবিআই? কোন মাই কা লাল আছে? ডেকে আন!’ গর্জে ওঠে রাধা পাগলি, ‘একমাত্র তিনিই জানেন আমি কে! আমি অন্য কারও পরোয়া করি না।’

    এতক্ষণে অরুণা নড়ে চড়ে বসেছেন। সিরিয়াল দেখা বন্ধ করে বলছেন, ‘কার কথা বলছ? তোমার এইসব কথা শুনে আমার কেমন ভয় ভয় করে।’

    ‘ভয় তো পবিত্র জিনিস। শ্রেণি ঘৃণার মতো পবিত্র। যে ভয় পায় সে ওঁর দিকে আর এক কদম এগিয়ে যায়। যেমন আমি যাচ্ছি। নেভার ফরগেট, ফিয়ার ইজ দ্য কি।’ কাঠ কাঠ গলায় বলে রাধা পাগলি।

    ‘ধুর বাবা! আজ এর তার কেটেছে।’ তড়বড়িয়ে নীচে চলে যায় মানদা পিসি। অভি আবার অরুণাকে বলে, ‘এক কাপ চা হবে?’

    ‘দিচ্ছি।’ সোফা থেকে উঠে অরুণা বলেন, ‘কটা বাজল রে?’

    ‘সাড়ে সাতটা। তোমার বরের ফিরতে আজও সাড়ে এগারোটা বাজবে।’ সবজান্তা, প্রফেটিক টোনে বলে রাধা।

    ‘তুমি কী করে জানলে?’ বিরক্ত হয়ে বলেন অরুণা, ‘চালপড়া, কলাপড়া শিখেছ নাকি?’

    ‘নাঃ! ওসব শিখিনি। তবে মানব চরিত্র সম্পর্কে এত নিখুঁত ও নির্দিষ্ট ধারণা আছে, যে এসব বলতে কোনও অসুবিধে হয় না।’

    ‘আমার বরকে নিয়ে কী ধারণা হল শুনি? সারাদিন আপিসে গাধার খাটনি খাটে। তারপর ইউনিয়নের কাজ, নাটকের রিহার্সাল, কল শো। বাড়িতে যখন ফেরে তখন শরীরে একবিন্দু এনার্জি থাকে না। লোকটাকে তুমি কিছু বোলো না তো!’

    ‘এনার্জি কোথা থেকে থাকবে?’ ফুট কাটে রাধা। অরুণা চা করতে করতে ছাঁকনি নিয়ে তেড়ে যান, ‘পাগলির মরণ, তুই আমার বরকে নিয়ে আর একটা ভুলভাল কথা বললে দেব গায়ে গরম জল ঢেলে…’

    ‘তুমি আমাকে এমন কথা বলতে পারলে?’ অবাক হয়ে অরুণার দিকে তাকিয়ে থাকে রাধা। ‘ছুঁড়ে দেওয়া তির আর বলে ফেলা কথা কখনও ফেরানো যায় না। কিন্তু না-বলা কথা বুকের মধ্যে জমে গাছ হয়। সেই গাছের শেকড় নীচে নামে। পা থেকে ছড়িয়ে যায় মাটির গভীরে। আর ডালপালা মেলতে থাকে ওপর দিকে। সবুজ পাতায় শরীর ঝলমল করে। তোমারও করবে। আজ না হোক কাল। তুমি সবুজে ঝলমলিয়ে উঠবেই। তবে কিনা ঈর্ষার রংও সবুজ হয়। তুমি যেন হিংসে-গাছ হয়ে যেও না! আগে থেকে সাবধান করে দিলাম!’

    সাদা থান শরীরে জড়িয়ে ধীর পদক্ষেপে নীচে চলে যায় রাধা। অভিকে এককাপ চা ধরিয়ে অরুণা বললেন, ‘কী বলল কিছু বুঝলি? জ্ঞানের ভড়ং আওড়াল না আমাকে অভিশাপ দিল?’

    ‘বুঝলাম না।’ সুড়ুত করে চায়ে চুমুক দিয়ে অভি বলে, ‘বাবার কোনও শো আছে?’

    ‘জগদ্দলে একটা পথনাটক আছে। ‘নতুন দিনের গল্প’ না কী যেন একটা নাম। তোর বাবার এইসব পাগলামো কবে বন্ধ হবে বল তো?’

    ‘বন্ধ হবে না। এটাই বাবার জীবন। লোকে কিছু না কিছু নিয়ে বাঁচে। বাবা নাটক নিয়ে বাঁচছে।’

    অরুণা আবার ফিরে গেছেন টিভির সামনে। ‘যদিদং হৃদয়ং মম’ শেষ হতে চলেছে। মাটি এখনও পারফর্ম করছে। টিটো গান গাইছে, ‘মাটিতেই জন্ম নিলাম, মাটি তাই রক্তে মিশেছে।’ শঙ্করনাথ বলছেন যে তাঁর দ্বিতীয় কোনও স্ত্রী নেই। ছেলে, ছেলের বউ, নাতনি তো অনেক দূরের কথা। দুই ছেলে অমরনাথ ও কমলনাথ বাবাকে সন্দেহের চোখে দেখছে। দুই মেয়ে অন্তরা আর বিজয়া বাচ্চা মেয়েটাকে জেরা করছে। সবার আড়ালে মেয়ে শালিনী আর জামাই অলোকেন্দুর চোখে চোখে ইশারা হয়ে গেল। এই মেয়েটাকে তারাই ভাড়া করে এনেছে। ঝ্যাং ঝ্যাং শব্দ করতে করতে সিরিয়ালের মেগা এপিসোড শেষ হচ্ছে। পর্দায় সবার মুখের ক্লোজ শট।

    অরুণার সিরিয়ালে আর মন নেই। তিনি বাংলা খবরের চ্যানেলে ঢুকে পড়েছেন। এই চ্যানেল ওই চ্যানেল করতে করতে আটকে গেলেন স্কুপ চ্যানেলে। নবযুগ পার্টির একটা বিশাল মিছিল যাচ্ছে আলপথ দিয়ে। চাষের জমির ফনফনে সবুজ ফসল আর হলুদ পতাকার রং মিশে গেছে। মৃন্ময় চ্যাটার্জি স্লোগান দিচ্ছেন, ‘দালাল দিয়ে, পুলিশ দিয়ে, লাঠি দিয়ে, বারুদ দিয়ে, আন্দোলন দমন করা যায়নি…’

    হাজার হাজার লোক চেঁচাচ্ছে, ‘যাবে না!’

    ক্যামেরায় স্কুপ চ্যানেলের সাংবাদিক বলছে, ‘হেলথ হাব তৈরির জন্য জমি অধিগ্রহণ করার লক্ষ্যে একদিকে যখন সরকার নোটিস দিয়েছে, অন্যদিকে তখন বিরোধী নেতা মৃন্ময় চ্যাটার্জির নেতৃত্বে নতুনগ্রাম এবং বাঁজাপলাশ গ্রামে গড়ে উঠেছে অভূতপূর্ব গণ আন্দোলন। শিবির তৈরি করে রাত পাহারার কাজ শুরু হয়েছে নতুনগ্রাম এবং পার্শবর্তী বাঁজাপলাশ গ্রামে। রাতের অন্ধকারে পুলিশবাহিনী এসে যাতে জমি দখল করতে না পারে তার জন্য পালা করে রাত জাগছে বাচ্চা থেকে বুড়ো, ছেলে থেকে মেয়ে—সবাই। মুখ্যমন্ত্রী সন্দীপ সামন্ত জানিয়েছেন, তাঁর কাছে নির্দিষ্ট তথ্য আছে যে এইসব শিবির গুলিতে অস্ত্র আসছে পার্শ্ববর্তী রাজ্য থেকে, রেড করিডোর ধরে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকেও বিপুল অস্ত্রের সম্ভার ঢুকছে জলপথে। এই শিবিরগুলিতে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল ইন্ডিয়ান পিপলস পার্টি বা আইপিপির মদতে বসছে স্বাস্থ্যশিবির। কলকাতার অতিবাম মনোভাবাপন্ন চিকিৎসকরা শিবির পরিচালনা করছেন। এক্সপ্লোসিভ এক্সপার্টরা স্থানীয় মানুষদের শেখাচ্ছেন, কীভাবে রোজকার গেরস্থালির জিনিসপত্র দিয়ে বোমা বানানো যায়। শেখাচ্ছেন অস্ত্র চালাতে। সব মিলিয়ে নতুনগ্রামের পরিস্থিতি এখন অগ্নিগর্ভ। ক্যামেরায় রাজ্যের সঙ্গে স্কুপ চ্যানেলের পক্ষে আমি, পরিমল।’

    নতুনগ্রামের খবর শেষ হতে না হতেই চ্যানেল বদলে গেল। অন্য খবরের চ্যানেল দেখাচ্ছে শেয়ালদহ শাখায় রেল দুর্ভোগের কাহিনি। জগদ্দল স্টেশনে টিকিট না কেটে ট্রেনে ওঠা এক যুবকের কাছে টিকিট দেখতে চাওয়ায় যুবক চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপ মেরেছে। স্থানীয় সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ায় পরে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর নিত্যযাত্রী ও সাধারণ মানুষ মিলে রেল লাইনে অবরোধ করেছেন। ওভারহেড তারে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে কলাপাতা। শেয়ালদহের মেন লাইনে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ।

    অরুণার ভুরু কুঁচকে গেছে। আঙুল মটকাচ্ছেন ঘন ঘন। একবার বাথরুম থেকে ঘুরে এলেন। মনোজের মোবাইলে ফোন করলেন বারচারেক। আপন মনে বিড়বিড় করলেন, ‘মোবাইল সুইচড অফ!’

    অরুণার এই খ্যাপামো অভির চেনা। ওসবে পাত্তা না দিয়ে সে ভাবল, কবিতাটা নিয়ে কী করবে? কলেজ ম্যাগাজিনে দিয়ে দেবে? নাঃ! ওখানে এই কবিতার মর্ম কেউ বুঝবে না। অন্য কোথাও? কোনও লিটল ম্যাগাজিনে?

    তাদের পাড়া থেকে একটা লিটল ম্যাগাজিন বেরোয়। নাম ‘চয়ন’। তলায় লেখা থাকে, ‘অতি অনিয়মিত ত্রৈমাসিক’। এ সব নিজেকে ‘লিটল’ প্রমাণ করার ছক। ম্যাগাজিনটির সম্পাদক এই এলাকার জনমোর্চার এমএলএ। সরকারি বিজ্ঞাপন পেয়ে ম্যাগাজিনটি শাঁসেজলে আছে। ভুলভাল লেখা ছাপা হয়।

    মনে মনে চয়নের পাশে ঢ্যাঁড়া দেয় অভি। মনোজের দফতর থেকে একটা ম্যাগাজিন বেরোয়। সেটার নাম জীবন সংগ্রাম। চয়নের সঙ্গে চরিত্রগতভাবে কোনও তফাত নেই। সরকারি বিজ্ঞাপনে ঠাসা, সরকারের স্তাবকতায় ভরা। প্রতিষ্ঠান-বিরোধী চরিত্র বজায় রাখতে নিয়ম করে সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাগজ ও পত্রিকাকে গালাগালি দেয়। জীবন সংগ্রামের পাশেও ঢ্যাঁড়া দেয় অভি।

    হঠাৎই মনে পড়ে অন্তহীন পত্রিকার কথা। কবি সুদিন চক্রবর্তীর সম্পাদনায় এই দ্বি-মাসিক কাব্যপত্রটি অনেকদিন ধরে চলছে। সুদিন আজ সকাল সংবাদপত্রের রবিবারের পাতার সম্পাদক। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পুরোদস্তুর যুক্ত। তা সত্ত্বেও নতুন কবিদের জন্য তৈরি করেছে প্ল্যাটফর্ম, অন্তহীন। বাংলাভাষার নবীন ও প্রবীন এমন কোনও কবি নেই যিনি অন্তহীনে লেখেননি। অভিও ট্রাই করবে নাকি?

    মাথায় ভূত যখন চেপেছে, তখন একটাই উপায়। কাজটা করে ফেলা। চায়ের কাপ সিঙ্কে রেখে তিনতলায় ওঠে অভি। কবিতার খাতা বার করে, সাদা কাগজে কবিতাটা কপি করে। আর একটা সাদা কাগজ নিয়ে বসে। একটা ফরওয়ার্ডিং লেটার থাকা উচিত, যাতে তার নাম, ঠিকানা, ফোন-নম্বর বা মেল আইডি থাকবে। সামান্য ভেবে সে লেখে,

    ‘শ্রী সুদিন চক্রবর্তী,

    সম্পাদক,

    অন্তহীন,

    মান্যবরেষু,’

    আচ্ছা মান্যবরেষু বানানে মূর্ধণ্য ষ, না দন্ত স? কবিতার খাতা টেনে নিয়ে দু’রকম বানানই লেখে অভি। চোখে দেখেই বোঝা যাচ্ছে ‘মান্যবরেসু’ ভুল বানান। তা হলে ‘মাননীয়াষু’ বানান কী? এখানে দন্ত স না মূর্ধণ্য ষ? কনফিউজড হয়ে অভিধান পেড়ে বানান দেখে নেয় অভি। ও হরি, মেয়েদের ক্ষেত্রে দন্ত স আর ছেলেদের ক্ষেত্রে মূর্ধণ্য ষ। তাহলে সে ঠিকই লিখেছে। খসখস করে আবার কলম চালায়।

    ‘অন্তহীন’ পত্রিকার জন্য একটি কবিতা পাঠালাম।

    আশা করি মনোনীত হবে।

    নমস্কারান্তে,

    অভিজ্ঞান লাহিড়ী।

    ৫/৯/২০১১

    ওপরে চিঠি ও তলায় কবিতার কাগজ রেখে স্টেপল করে অভি। খয়েরি খাম পাড়ে বইয়ের তাক থেকে। তিনভাঁজ করে চিঠি খামে ঢোকায়। আঠা দিয়ে খামের মুখ আটকে খামের ওপরে বড়বড় করে অন্তহীন পত্রিকার ঠিকানা লেখে। প্রেরক হিসেবে নিজের নাম-ঠিকানা লেখে। তারপর দোতলায় নেমে আসে। এখনই কুরিয়ার করে দেওয়া যাক।

    মনোজ অফিস থেকে চলে এসেছেন। মনোজকে দেখে অবাক হল অভি। সাড়ে নটার মধ্যে বাড়ি ঢুকে গেছেন? তা হলে নিশ্চয় গাড়িতে ফিরেছেন। অরুণা রান্নাঘরে আবার চা করছেন। অভি বলল, ‘মা, আর এক কাপ চা হবে নাকি?’

    অরুণা উত্তর দিলেন না। অভি সোফায় বসে রিমোটের দিকে হাত বাড়াল। অরুণা টিভি বন্ধ করে দিয়েছেন।

    টিভি চালানো মাত্র রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এলেন অরুণা। অভির হাত থেকে রিমোট কেড়ে, মাথায় চাঁটি মেরে বললেন, ‘দিনরাত টিভি আর টিভি। তোর পড়াশুনা নেই?’

    ‘যাব্বাবা! আমি আবার কখন টিভি দেখি। তুমিই তো দিনরাত মেগাগুলো গেল। আজ দেখছিলে ”যদিদং ডিংডং”, কাল দেখবে ”হৃদয়ং পিংপং”!’ প্রতিবাদ করে অভি।

    ‘তুই চুপ কর।’ অভিকে থামিয়ে অরুণা বললেন, ‘হ্যাঁ, বলো, তারপর কী হল?’

    এদের ঘাঁটিয়ে লাভ নেই। বিরক্ত হয়ে অভি ভাবে, নিচ থেকে ঘুরে আসা যাক। রাধা আর মানদার এতক্ষণে নিশ্চয় গলায়-গলায় বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। সিঁড়ির দিকে এগোয় সে।

    ‘আর বোলো না!’ খুশিয়াল গলায় বলছেন মনোজ, ‘যত বোঝাই যে আমরা স্টার নই, আমরা পলিটিকাল অ্যাকটিভিস্ট, কিছুতেই কথা শোনে না। অটোগ্রাফের খাতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। দু-একটা টিভি চ্যানেলের লোকাল করেসপন্ডেন্ট তো ইন্টারভিউও নিল। এই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়েও জনমোর্চার কথা বলার মতো চ্যালেঞ্জিং জব কী করে সামলাচ্ছি, আগেকার সেই ডেডিকেশান কী করে মেনটেন করছি… যত্তো সব বোরিং ব্যাপার। লাকিলি ঠিক সময় ট্রেনটা পেয়ে গেলাম তাই। তা না হলে সেই সাড়ে এগারোটা বাজত। আর তোমার মুখটা তেলো হাঁড়ির মতো হয়ে থাকত।’

    একতলায় নামতে গিয়ে অভি থমকে গেল। স্লো মোশানে পিছন ফিরে দেখল অরুণা রান্নাঘর থেকে আবার বেরিয়ে এসেছেন। তাঁর চোখেমুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই। ঠান্ডা গলায় তিনি বললেন, ‘তুমি স্নান করে নাও। আজ তাড়াতাড়ি খেয়ে নেব।’

    ‘আচ্ছা।’ আধখাওয়া চায়ের কাপ টেবিলে রেখে বাথরুমে ঢোকে মনোজ। অরুণা ধীরপায়ে হেঁটে এসে টিভি চালান। সাউন্ড একদম কমিয়ে দেন। অভি শুনতে পায়, স্কুপ চ্যানেল এখন রেল বিভ্রাটের কাহিনি দেখাচ্ছে। সঞ্চালক পরিমল বলছে, ‘শেয়ালদা লাইনের ট্রেন চলাচল এখনও পর্যন্ত বন্ধ। সকাল সাড়ে নটায় রেল অবরোধ শুরু হয়েছে। এখন রাত সাড়ে নটা বাজে। বারো ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। রেল দফতর এখনও এই অবরোধ তুলতে পারছেন না। এই বিষয়ে কথা বলার জন্য আমরা চলে যাচ্ছি…’

    অভি অরুণার হাত থেকে টিভির রিমোট কেড়ে নিয়ে টিভি অফ করে দেয়। সিঁড়ি বেয়ে একতলায় নামতে নামতে শুনতে পায় অরুণা বিড়বিড় করছেন, ‘পাগলের অভিশাপ! ঠিক ফলে গেল।’

  • অষ্টম পরিচ্ছেদ

    অষ্টম পরিচ্ছেদ

    অষ্টম পরিচ্ছেদ

    অভিজ্ঞান

    হইহই করে চলে এল হোস্টেল বোর্ডার্স কমিটির ইলেকশান। পুরো হোস্টেল টগবগ করে ফুটছে। খোলায় ভুট্টার দানা ভাজলে তারা যেমন টপাটপ লাফিয়ে উঠে সবাইকে চমকে দেয়, তেমনই নিত্যনতুন কোনও না কোনও ঘটনা চমকে দিচ্ছে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কলেজকে। চমকে দিচ্ছে অভিকে।

    পুজোর সময়ে বাড়ি ছিল অভি। কোনও ঠাকুর দেখেনি। পাড়ার ঠাকুরটাও নয়। চিলেকোঠার ঘরে স্বেচ্ছাবন্দী হয়ে অ্যানাটমির প্রিপারেশান নিয়েছে। সেই থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড়। সেই ডক্টর মিত্র,গ্রে, চৌরাসিয়া। কী অসহ্য পরিস্থিতি!

    বাড়ির পরিবেশ থমথমে। মনোজ আর অরুণা কেউ কারও সঙ্গে কথা বলেন না। জগদ্দল থেকে ট্রেনে ফেরার গপপোটা যেদিন মনোজ শুনিয়েছিলেন, তার পরদিন আজ সকাল খবরের কাগজের প্রথম পাতায় ‘রেল অবরোধে বিপর্যস্ত শিয়ালদা’ হেডলাইন দেখিয়ে অরুণা বলেছিলেন, ‘তুমি কাল মিথ্যে কথা বললে কেন?’

    মনোজ বলেছিলেন, ‘আমার ফেরা নিয়ে তুমি রোজ টেনশান করো। গতকাল যখন সত্যিই গন্ডগোলে পড়লাম, তখন সত্যি কথা বলে তোমার পাগলামি বাড়াতে চাইনি।’ তারপর জগদ্দল থেকে বাসে, ট্যাক্সিতে, অটোয়, ভ্যান রিক্সায়, হেঁটে হাওড়া ফেরার একটা লম্বা গপপো ফেঁদেছিলেন। অরুণা কতটা কনভিন্সড হলেন, কে জানে! তিনি রেগে গিয়ে বললেন, ‘তুমি আমাকে পাগল প্রমাণ করতে চাও? আমাকে পাগলা গারদে ঢুকিয়ে কোন মেয়েছেলেকে বাড়িতে ঢোকাবে? ওই ঋষিতা?’

    ‘ঋষিতা?’ শান্ত কণ্ঠে বলেছিলেন মনোজ। ‘সে আবার কে? কোনও সিরিয়ালের চরিত্র?’

    মনোজের প্রতিক্রিয়াহীনতায় দমে গিয়েছিলেন অরুণা। আর তাঁকে ঘাঁটাননি। দু’জনের মধ্যে সেই থেকে কথাবার্তা বন্ধ। অভি বুঝতে পারে বাড়ির পরিবেশে অস্বাভাবিক শৈত্য। আস্ত একটা পুজো চলে গেল, নতুন কাপড়জামা কেনা হল না, কোথাও বেড়াতে যাওয়া হল না, কোনও ঠাকুর দেখা হল না। গত বছরও অরুণা শ্যামবাজার থেকে মনোজ-বিলু-অভির জন্য জামাপ্যান্ট কিনে এনেছিলেন। রাধা আর মানদার জন্য শাড়ি। বিছানার চাদর, নতুন পর্দা—এসবও কিনেছিলেন।

    বিজয়া দশমীর আগে অরুণা নিমকি আর নারকেল নাড়ু বানান। দশমীর দিন লাল পাড় গরদের শাড়ি পরে পাড়ার মণ্ডপে সিঁদুর খেলতে যান। অষ্টমী আর নবমীর দিন রিকশা নিয়ে মনোজ আর অরুণা ঠাকুর দেখে আসেন। একদিন যান ডানলপ-উত্তরপাড়ার দিকে, একদিন শালকিয়া-ঘুসুড়ির দিকে। অষ্টমীর সকালে বেলুড় মঠের কুমারীপুজো দেখা তো রুটিন। এ বছর দুজনের কেউই ঠাকুর দেখতে যাননি। অরুণা ভূতগ্রস্তের মতো টিভি দেখেছেন। মনোজ পাড়ার নাটকের রিহার্সাল দিয়েছেন। অভি বাড়ি থাকলেও বিলু হোস্টেলে ছিল।

    পুজোর পরই হোস্টেলে চলে এসেছে অভি। বাড়িতে থাকলে বেফালতু টেনশান হয়। হোস্টেলে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে থাকলে নেগেটিভ মেন্টালিটি থাকে না। পড়াশুনোটা মন দিয়ে করা যায়।

    হোস্টেলে এখন পড়াশুনোর পরিস্থিতি নয়। চারটে ছাত্র সংগঠন তাদের বক্তব্য পেশ করার জন্য প্রতিটি রুমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাপ্লি পাওয়া স্টুডেন্টদের কোনও দলই বিরক্ত করছে না। কিন্তু ক্রমাগত চিৎকার চেঁচামেচিতে কার লেখাপড়া হয়?

    অভি তাই দময়ন্তীর সঙ্গে জোট বেঁধেছে। দময়ন্তীরও অ্যানাটমিতে সাপ্লি। ও অবশ্য হোস্টেলে থাকে না। ভোরবেলা লেডি আর্চার্স হোস্টেলে চলে আসে। সারাদিন হোস্টেলে পড়াশুনা করে রাত দশটা নাগাদ বাড়ি ফিরে যায়। অভি জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘রাতে থাকিস না কেন?’

    ‘বৃন্দা নেই। আমার একা থাকতে বোর লাগে।’ সোজাসাপটা উত্তর দময়ন্তীর।

    দময়ন্তীর সঙ্গে পড়ার অ্যাডভান্টেজ হল, গ্রুপ স্টাডিটা হচ্ছে লেডি আর্চার্স হোস্টেলের গেস্টরুমে। বিরক্ত করার কেউ নেই। অভি ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য সেরে, সাড়ে পাঁচটা থেকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত অস্টিওলজি পড়ে। সাড়ে সাতটায় উঠে, ব্যাগে বইপত্তর ঢুকিয়ে, জেনারেল মেসে ব্রেকফাস্ট সেরে লেডি আর্চার্স হোস্টেল চলে যায়। দময়ন্তী সওয়া সাতটার মধ্যে হোস্টেলে ঢুকে যায়। সে-ও পোশাক বদলে, ব্রেকফাস্ট সেরে, বইখাতা নিয়ে গেস্টরুমের কোনার টেবিল আর চেয়ার দখল করে রেডি থাকে। অভি ঢুকলে পড়াশুনো শুরু হয়।

    পৌনে আটটা থেকে সওয়া বারোটা। একটানা সাড়ে চার ঘণ্টা অ্যানাটমি চর্চা। সাড়ে বারোটা নাগাদ অভি যখন বয়েজ হোস্টেলে ফেরে, তখন মাথা বনবন করে ঘুরছে। দুপুরের খাওয়া সেরে একঘণ্টা ঘুম। দুটোর সময় আবার লেডি আর্চার্স হোস্টেল। দুটো থেকে ছটা, আবার চার ঘণ্টার সেশন। ছটার সময় লেডি আর্চার্স হোস্টেল থেকে বয়েজ হোস্টেলে ফিরে টিফিন সারে অভি। এর তার সঙ্গে আড্ডা মেরে, ইলেকশানের খবর নিয়ে সাতটার সময় আবার লেডি আর্চার্স হোস্টেলে। সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত আবার একটা সেশন। তারপর দময়ন্তী বাড়ি পালায়। অভি টুকটুক করে একশো চব্বিশে ফেরে। রাতের খাওয়া সেরে কয়েকটা ডায়াগ্রাম প্র্যাকটিস করে এগারোটার সময়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

    দিনের বেশির ভাগ সময় বয়েজ হোস্টেলের বাইরে কাটালেও ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ বা ডিনারের সময় মেসে গেলে সব খবর জানা হয়ে যায়। মেস হল আড্ডার এক নম্বর ঠেক। হোস্টেলের সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় নানা জিনিস চোখে পড়ে।

    এতদিন হোস্টেলে ইলেকশানে পোস্টার সাঁটার প্রথা ছিল না। নবযুগ সেটা চালু করেছে। প্রত্যেক ফ্লোরে, সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ পোস্টার মেরেছে। তাতে বড়বড় করে লেখা, ‘হোস্টেল বোফর্স কমিটি’। বোফর্স কামান নিয়ে রাজীব গাঁধীর জমানায় একটা কেলেঙ্কারি হয়েছিল। সেই রেফারেন্স টেনে হোস্টেলে বোর্ডার্স কমিটির নানান দুর্নীতি ফাঁস করার চেষ্টা করছে সুরজ অ্যান্ড কোং।

    অভির মতে ভুল স্ট্র্যাটেজি। বোফর্স কেলেঙ্কারি যখন হয়েছিল তখন অভিরা জন্মায়নি। সেই রেফারেন্স টানলে টার্গেট অডিয়েন্সের মনে কোনও অনুরণন হবে না। দুর্নীতির তালিকা দিতে গিয়ে, নেতাদের দাদাগিরি, বোর্ডারদের ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ (মানে নীল ছবি দেখতে না দেওয়া), খাবারের নিম্ন মান (মানে, মিনি মেস উঠে যাওয়া), হোস্টেলে এন্টারটেনমেন্টের অভাব (অর্থাৎ গাঁজা চাষ বন্ধ করে ব্যাডমিন্টন কোর্ট চালু করা)—এই সব বলা হয়েছে। অভি জানে এখনকার হোস্টেল বোর্ডার্স কমিটি সম্পর্কে আবাসিকদের বিশেষ কোনও অভিযোগ নেই। ক্ষমতাসীন দলই আবার ক্ষমতায় আসবে। পড়াশুনো নিয়ে ব্যতিব্যস্ত ছেলেরা চায় শান্ত পরিবেশ আর সময়মতো ঠিকঠিক খাবার। নতুন কোনও রাজনৈতিক দলের হাতে কমিটি তুলে দিয়ে তারা এক্সপেরিমেন্ট করবে না।

    সেকেন্ড এমবিবিএস-এর ক্লাস শুরু হয়ে গেছে পুজোর পর থেকে। চন্দন নিয়মিত ক্লাস করছে। সন্ধেবেলা ভোটের ক্যাম্পেনও করছে। চন্দনকে যত দেখে, তত অবাক হয়ে অভি। শুধুমাত্র একবগগা জেদ আর গোঁ নিয়ে লড়ে যাচ্ছে ছেলেটা। ফিজিওলজি আর বায়োকেমিস্ট্রি—দুটো সাবজেক্টেই গোল্ড মেডেল পেয়েছে। অ্যানাটমিরটা অল্পের জন্য ফসকে গেছে। পড়াশুনা আর পলিটিক্স দুটোই সমান তালে চালিয়ে যাচ্ছে। ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কলেজের একটা চালু প্রবাদ হল, তিনটে ‘প’ একসঙ্গে হয় না। পড়াশুনা, পলিটিকস আর প্রেম। প্রথম দুটোয় চন্দন এগিয়ে। তিন নম্বরটায় কি অভি? সেই জন্যই তার পড়াশুনা হচ্ছে না?

    বৃন্দার কথা মনে এলে ভীষণ অভিমান হয় অভির। সারা পৃথিবীর ওপরে অকারণে রাগ হয়। অভি বোঝে, অকারণ রাগ আসলে নিজের ব্যর্থতার প্রতিফলন। মানুষ তো নিজের ওপরে রাগতে পারে না! নিজেকে শাস্তিও দিতে পারে না। (সে পারে একমাত্র আত্মহত্যাকামীরা!) তাই অন্তর্গত রাগ অন্যের দিকে চ্যানেলাইজ করে সে নিজেকে সামলায়। বৃন্দা রোজ ঠিক তিনবার ফোন করে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে একবার। দুপুরে খাওয়ার পরে একবার। রাতে খাওয়ার পরে আরও একবার। বেশিক্ষণ কথা বলে না। সামান্য দুএকটা শব্দ।

    ‘ঘুম ভাঙল?’

    ‘আজকের রুটিন কী?’

    ‘দুপুরে কী মেনু ছিল?’

    ‘একদিন তোদের হোস্টেলের গ্র্যান্ড ফিস্টে যাব।’

    ‘মনমেজাজ ঠিক আছে তো?’

    ‘আর তো কদিন! কোনও মতে টেনে দে!’

    অভিও অল্প কথায় উত্তর দেয়।

    ‘হ্যাঁ। এই উঠলাম।’

    ‘আজ সারাদিন একটানা পড়ে সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম শেষ করব।’

    ‘ভাত, ডাল, আলুপোস্ত, পোনা মাছের ঝাল।’

    ‘আচ্ছা। ঠিক আছে।’

    ‘না, নেই।’

    ‘হ্যাঁ, সেই তো!’

    অল্প কথা! কিন্তু কী তীব্র অভিঘাত! সারা শরীর ঝনঝন করতে থাকে। মনে হয়, বৃন্দা এখন পাশে নেই কেন? একবার দেখতেও তো আসতে পারে! গ্রুপ স্টাডির সময়ে একবার লেডি আর্চার্স হোস্টেলের গেস্ট রুমে ঘুরে গেলে কী এমন পড়াশুনোর ক্ষতি হবে অভির? বৃন্দার কি তার জন্য মন কেমন করে না? এই কুচ্ছিত সাপ্লিটা কবে যে শেষ হবে! পরীক্ষার প্রসঙ্গ মাথায় আসা মাত্র প্রেম-প্রেম ভাব একলাফে দিগন্তের ওপারে পালিয়ে যায়।

    প্রেম ও পড়াশুনার মধ্যেই চলে এল ইলেকশানের আগের জেনারেল বডি মিটিং। যে মিটিংয়ে বিদায়ী কমিটি হিসেব নিকেশ পেশ করবে। মেসে মিটিং হচ্ছিল। অভি তখন খেতে ঢুকেছিল! বড় হলঘরে শ’খানেক ছেলে এক কোণে বেঞ্চিতে বসে বক্তব্য শুনছে। রিপু আয়-ব্যয়ের হিসেব দিচ্ছে, মোচা পার্টির ছেলেরা শুনছে, ন্যাবা পার্টির ছেলেরা হল্লা করে মিটিং ঘাঁটার চেষ্টা করছে। অভি আপন মনে খাচ্ছিল। হঠাৎ শুনতে পেল সুরজের গলা, ‘কওন হ্যায় বে?’

    চিৎকার শুনে অভি দেখল, বাইরে বেরোনোর চারটে দরজা বাইরে থেকে কেউ বা কারা বন্ধ করে দিয়েছে। হলঘরে এখন দুটি আলাদা আলাদা পক্ষের শ’খানেক ছেলে। সংখ্যায় প্রায় সমান সমান।

    বাংলায় একটা কথা আছে। ‘গণ-ক্যালাকেলি।’ আশি বা নব্বইয়ের দশকের হিন্দি সিনেমার শেষে এটা দেখা যেত। ক্লাইম্যাক্সে সবাই সবাইকে ধরে মারছে। কে হিরো, কে ভিলেন, কে হিরোর বন্ধু, কে ভিলেনের সাইড-কিক, কে পুলিশ, কে ভ্যাম্প—বোঝার উপায় নেই। যে যাকে পারছে ঘিপ-ঘাপ কেলিয়ে দিচ্ছে।

    সেই দৃশ্য চোখের সামনে ঘটতে দেখে অভির ভিরমি খাওয়ার উপক্রম। মড়ার ওপরে খাঁড়ার ঘা, পালানোর কোনও উপায় নেই। অগত্যা রান্নাঘরে ঢুকে বামুন ঠাকুরদের পিছনে লুকিয়ে পড়ে অভি। সেখান থেকেই দেখতে পেল রিপু আর চন্দন মিলে সুরজকে ধরে বেদম মারছে। চন্দনের মার চড়থাপ্পড়ের বেশি কিছু না। আনাড়ির স্ট্রিট ফাইটিং। মারপিট করতে হচ্ছে বলে বেজায় লজ্জিত সে।

    রিপুর মার কিন্তু পেশাদারি। ছ’ফুটিয়া রিপুর নির্ভুল পাঞ্চগুলো জায়গা বেছে পড়ছে। ডান-গাল, বাঁ-গাল, তলপেট। সুরজ প্রাথমিকভাবে রেজিস্ট করার চেষ্টা করল। তার একটা ঘুষি চন্দনের মুখে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে ঠোঁটে সুপুরি গজিয়ে গেল চন্দনের। তাই দেখে রিপু ঘিপিত করে ঘুষি চালাল সুরজের তলপেটে। ঘুষি খেয়ে আঁক করে সে মেঝেয় লটকে পড়ল। বান্টি, লাটু, সুব্রত, টিনটিন, প্রবালরাও ধুমধাড়াক্কা হাত-পা চালাচ্ছে। তবে সেসব চড়, থাপ্পড়, লাথি ধর্তব্যের মধ্যে নয়। যে মারছে আর যে মার খাচ্ছে, দু’জনেরই সমান লাগছে। বিলু আর সব্যসাচী খাবার টেবিলের ওপরে উঠে মারপিট থামানোর চেষ্টা করছে। অভি হঠাৎ খেয়াল করল সুরজের স্যাঙাত সঞ্জয় সুরজকে বাঁচানোর কোনও চেষ্টাই করছে না। সে টেবিলের ওপরে উঠে মোবাইলের ক্যামেরায় মারামারির ভিডিও রেকর্ডিং করছে। মারামারিতে ব্যস্ত ছেলেরা কেউ এটা খেয়াল করেনি।

    অভির প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হল, সঞ্জয়ের মোবাইলটা ভেঙে দিতে হবে। নিদেনপক্ষে কেড়ে নিয়ে ভিডিওটা ডিলিট করতে হবে। ভিডিও ক্লিপের মতো প্রমাণ অনেককে বিপদে ফেলবে। এই ক্লিপ সঞ্জয় নিউজ চ্যানেলকে দিতে পারে, ইউটিউবে আপলোড করতে পারে, সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে দিতে পারে, পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারে। একঘর ছেলে মারামারি করছে ঠিকই, কিন্তু রিপু আর চন্দন মিলে সুরজকে ব্রুটালি পেটাচ্ছে। কে মারছে আর কে মার খাচ্ছে, ভিডিওয় পরিষ্কার দেখা যাবে।

    অভির দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া হল, যা হচ্ছে হোক! চন্দন তার বন্ধু, কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু ও ফার্স্ট এমবিবিএস পাস করে গেছে। দুটো সাবজেক্টে গোল্ড মেডেল পেয়েছে। আর সে এখনও অ্যানাটমির সাপ্লি নিয়ে ঘষছে। অভি একাই কেন শাস্তি পাবে? চন্দনও পাক। তাছাড়া বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে, প্ল্যানফুলি কাউকে পেটানোটা আর যাই হোক ছাত্র রাজনীতি নয়। এইভাবে হোস্টেলে বোর্ডার্স কমিটির ইলেকশান যারা জিততে চায়, তাদের জেলে যাওয়া উচিত।

    মারামারি হঠাৎ শুরু হয়েছিল। হঠাৎই শেষ হল। কে একটা চ্যাঁচাল, ‘পুলিশ এসেছে।’

    স্যাটাস্যাট দরজাগুলো খুলে গেল। হুড়মুড় করে ছেলেরা চারটে দরজা দিয়ে বেরিয়ে নিজের নিজের ঘরের দিকে দৌড়ল। মুহূর্তের মধ্যে মেস ফাঁকা। সবার শেষে মেস থেকে বেরোল সঞ্জয়।

    অভি সঞ্জয়কে নজরে রেখেছিল। সে সঞ্জয়ের সঙ্গে বেরোল। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ওঠার সময় খেয়াল করল, হোস্টেলের কোলাপসিবল গেটের বাইরে পুলিশের জিপ দাঁড়িয়ে। সাদা ড্রেস পরা পুলিশ অফিসার গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলছেন। তার সামনে দাঁড়িয়ে রক্তাক্ত সুরজ।

    সুরজের ডানহাত সঞ্জয় বিপদের সময় বন্ধুর পাশে না দাঁড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে থাকে। অভি সঞ্জয়কে বলল, ‘তোকে মারামারিতে দেখলাম না তো?’

    ‘মেরেকো হাতাপাই করনা নেহি আতা। বঙ্গাল মে পড়নে কে লিয়ে আয়া, পলিটিক্স করনে কে লিয়ে নহি।’ জবাব দেয় সঞ্জয়। অভির কৌতুহল যায় না। বলে, ‘আমি রান্নাঘরে লুকিয়ে ছিলাম। ওখান থেকে সব দেখলাম। তুই কোথায় ছিলি?’

    ‘থা কঁহি পে। কিঁউ?’ কর্কশভাবে প্রশ্ন করে সঞ্জয়।

    ‘না। এমনিই।’ উত্তর ভারতীয় অ্যাগ্রেসনের সামনে মিইয়ে যায় অভি। সামান্য হেসে বলে, ‘তুই মোবাইলে কী ছবি তুললি? আমায় দেখাবি?’

    অভির নিরীহ প্রশ্নের ফল হল চমকপ্রদ। ডাকাবুকো, রংবাজ উত্তর ভারতীয় ছোকরা আতঙ্কিত হয়ে লম্বা লাফে তিনতলায় পৌঁছল। লম্বা পদক্ষেপে নিজের রুমে ঢুকে দরজা দড়াম করে বন্ধ করে দিল। অভি একবার ভাবল সঞ্জয়ের পিছনে ধাওয়া করে। তারপর সে চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে পাঁচতলায় উঠল।

    একশো চব্বিশ ও পঁচিশের সামনে একগাদা ছেলের ভিড়। প্রবাল বলছে, ‘রিপুদা আর চন্দন হাসপাতাল ভরতি হয়েছে। রিপুদার মাথায় আর চন্দনের মুখে চোট লেগেছে।’ অভি জিজ্ঞাসা করল, ‘আর সুরজ?’

    ‘ও ইমার্জেন্সিতে যাচ্ছে।’ জবাব দেয় প্রবাল, ‘মাইনর ইনজুরি। কিন্তু আমাদের আসল কনসার্ন পুলিশ। ওদের কে ইনফর্ম করল? নির্ঘাৎ ন্যাবারা।’

    অভি কিছু না বলে একশো চব্বিশে ঢুকে গেল। হোস্টেলে যত গন্ডগোলই হোক না কেন, ওকে এখন কেউ বিরক্ত করবে না। ঘরের আলো নিবিয়ে অভি প্রথমে ফোন করল বিলুকে।

    তুরন্ত ফোন ধরল বিলু, ‘বল।’

    ‘তুই এখন কোথায়?’

    ‘পুলিশের সঙ্গে কথা বলছি। তুই কোথায়?’

    ‘ঘরে। পুলিশ কোথা থেকে এল?’

    ‘আমিই ফোন করেছিলাম।’

    ‘তুই মার খাসনি তো?’

    ‘না। তুই পড়।’ লাইন কেটে দিয়েছে বিলু। অভি পরের ফোনটা করে রিপুকে। তার মোবাইল সুইচ অফ। এবার অভি ফোন করে চন্দনকে। চন্দনের মোবাইলে রিং হচ্ছে। চন্দন ফোন ধরে বলল, ‘বল।’

    ‘সুরজকে মারলি কেন? মাথাফাথা খারাপ নাকি? ভোটে এমনিই জিততিস। এই সব মারধোরের ফলে কেস ঘেঁটে গেল।’

    কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল চন্দন। অবশেষে বলল, ‘এটা শালা রিপুদার প্ল্যান। রিপুদাকে অধীরদা বুঝিয়েছেন যে ন্যাবার ছেলেগুলোকে বেশি বাড়তে দেওয়ার আগেই কেলিয়ে ঠান্ডা করে দিতে হবে। আমি কেন বোকার মতো রাজি হয়ে গেলাম কে জানে! আমি গাধা! আস্ত একটা গাধা!’

    ‘হাসপাতালে ভরতি হলি কেন? তোর কিসসু হয়নি। আমি সব দেখেছি।’

    ‘রিপুদা ভরতি হতে বলল। ন্যাবারা যদি এফআইআর করে তাহলে বিপদে পড়ে যাব। সেই জন্য ইমার্জেন্সি থেকে ভরতি হয়ে ইনজুরি রিপোর্ট লিখিয়েছি। সুরজ এফআইআর করতে গেলে, থানা থেকে খবর পেয়ে যাব। তখন আমরা আগে এফআইআর করব।’

    ‘থানা থেকে কীভাবে খবর পাবি যে সুরজ এফআইআর করতে গেছে? থানার কাউকে হাত করেছিস নাকি?’

    ‘এসব ট্রেড সিক্রেট। তোর না জানলেও চলবে। তুই অ্যানাটমি নিয়ে রগড়া।’ সাপ্লি পাওয়া নিয়ে অভিকে আওয়াজ দিয়ে চন্দন ফোন কেটে দিল।

    অভি চুপচাপ। তার মনে আবার মিশ্র অনুভূতি খেলা করছে। অভি নম্বর ওয়ান বলছে, ‘বন্ধুর কর্তব্য কর। চন্দনকে বলে দে, সঞ্জয় পুরো মারামারির ভিডিও রেকর্ড করে রেখেছে। সঞ্জয়ের কাছ থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে ক্লিপটা ডিলিট কর।’

    অভি নম্বর দুই বলছে, ‘চন্দনকে ভিডিওটার কথা জানিয়ে তোর লাভ? চন্দনের প্রতি তোর ব্যক্তিগত ঈর্ষা যদি বাদও দিই, তাহলেও ও যা করেছে, তা ক্ষমার অযোগ্য। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সবার সামনে বেধড়ক মারার মধ্যে কোনও কৃতিত্ব নেই। সেটাও করেছে কলেজের বাইরের এক নেতার পরামর্শে। পুলিশ দলদাস বলে ইচ্ছেমতো মাসল পাওয়ার দেখাবে? এইভাবে বিরুদ্ধ স্বরকে গুঁড়িয়ে দেবে?’

    মাথার মধ্যে অভি নম্বর ওয়ান আর দুইয়ের মধ্যে ঝগড়ার মধ্যে অভি মোবাইলে সময় দেখল। রাত বারোটা বাজে। আগামিকাল ভোর পাঁচটায় উঠতে হবে। ভোট নিয়ে মাথা খারাপ করে আবার অ্যানাটমিতে সাপ্লি পেলে ইয়ার লস হবে। ওসব ভুলে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়া যাক। আজ রাতে ডায়াগ্রাম প্র্যাকটিস করা হল না। আলো নিবিয়ে পাশ ফিরে শোয় অভি। ওমনি তার মাথার মধ্যে ঝলমল করে ওঠে কয়েকটা লাইন…

    বলা হয়ে গেছে সব কথা।

    নানা ভাবে হয়ে গেছে বলা।

    দেরিতে পয়দা হলে কেন?

    হে নতুন! চোষো তবে কলা!

    আরেঃ! পদ্য! তড়াক করে বিছানায় উঠে বসে অভি। সে আদৌ পদ্য নিয়ে ভাবছিল না। নিতান্তই সাধারণ বিষয় নিয়ে মনের মধ্যে ঘোঁট পাকাচ্ছিল। তার মধ্যে পদ্য? আরে বাঃ! চৌরাসিয়ার সেকেন্ড ভলিউম টেনে নেয় অভি। ডায়াগ্রাম আঁকার লাল স্কেচ পেন দিয়ে থার্ড কভারে লিখতে থাকে,

    পূজা, প্রেম, দেশ, ঝিঁঝিপোকা…

    যোনির মাড়ির খিলে চাপ।

    বাস স্টপে তিনমিনিট ধরে

    মেঘবালিকার প্রেমালাপ…

    আরিব্বাস! চারলাইনের মধ্যে রবি ঠাকুর, শক্তি, সুনীল, এবং জয়। দ্বিগুণ উৎসাহে অভি লিখতে থাকে,

    একার বেদনা, হামতুম,

    আমি সে ও সখা…সব শেষ!

    শিল্প কিংবা রাষ্ট্র বিরোধীতা

    বুড়োগুলো করেছে নিকেশ।

    বাংলা বাজারে আমি রুকি,

    তবে খুব পরিশ্রমী বটে।

    আদাজল খেয়ে পড়াশুনো—

    গীতা থেকে পেনসিল খুকি।

    পদ্য লিখে এ বান্দারও চাই

    ফ্ল্যাট, গাড়ি, ডিপোজিট ফিক্সড।

    ফর্ম ও কনটেন্টে মারো পোলি!

    লিখছি, লিখব-কবিতা রিমিক্সড!

    ঘোরের মধ্যে একটানা কবিতাটা লিখে অভি অবাক হয়ে যায়। অনেকদিন বাদে পদ্য লিখল সে। সাপ্লি পাওয়ার পরে পদ্য বা গপপোর বই পড়া বন্ধ হয়ে গেছে। হোস্টেলের রিডিং রুমে একগাদা খবরের কাগজ আসে। সেগুলোতে চোখ বুলোনোর ফুরসতও পাওয়া যায় না। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পনেরো-ষোল ঘণ্টা পড়াশুনো করে, অন্য কিছু ভাবার সময় পাওয়া যায় না। এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পদ্য কোথা থেকে এল?

    পদ্যটা আবার পড়ে অভি। খুব ভালো কিছু হয়নি। তবে ইংরিজি ‘রুকি’ শব্দের সংগে খুকি-র মিলটা পছন্দ হয় তার। হাসতে হাসতে বিছানা ছেড়ে উঠে ল্যাপটপ অন করে কবিতাটা টাইপ করে ঘুমিয়ে পড়ে।

    পরদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য সারার সময় অভি হোস্টেলে কোনও অস্বাভাবিকত্ব টের পেল না। কেন না কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। টের পেল সাড়ে বারোটা নাগাদ দুপুরে খাওয়ার সময়। হোস্টেলের বাইরে পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে। চন্দন সাদা ইউনিফর্ম পরা এক পুলিশ অফিসারের সঙ্গে সিগারেট খেতে খেতে গল্প করছে। অভি লোকটাকে চিনতে পারে। গতকাল দুপুরবেলা জেনারেল মেসে মারামারির ঠিক পরে এই লোকটাই হোস্টেলের কোলাপসিবল গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলছিলেন। এর সঙ্গে চন্দনের দোস্তি দেখে আন্দাজ করা যায়, সুরজ থানায় এফআইআর করতে গেলে সে খবর কীভাবে চন্দন আগে পাবে।

    দুপুরের খাওয়া চুকিয়ে অভি চুপচাপ ওপরে চলে যাচ্ছিল। চন্দন চেঁচিয়ে বলল, ‘এদিকে আয়।’

    অভি গপপো করার মুডে নেই। নেহাত কথা বলতে হয় তাই বলা। বলল, ‘গতকাল রাতে বললি যে হাসপাতালে ভরতি আছিস। আজকের মধ্যে ঠিক হয়ে গেলি?’

    ‘স্যামি ব্যানার্জি ছুটি করে দিল।’ ফিচেল হাসি হেসে বলে চন্দন। ‘হয় তো এর পিছনে বৃন্দার হাত আছে।’

    ‘আর রিপুদা?’ চন্দনের ফাঁদে পা না দিয়ে সিনিয়র দাদার প্রসঙ্গে ঢুকে পড়ে অভি।

    ‘রিপুদা এখনও ভরতি আছে। স্যামি বললেন, মাথায় কনকাসন আছে। সিটি স্ক্যান করে ছাড়বেন। রিপুদার মাথা সুরজ খাবার টেবিলে ঠুকে দিয়েছিল।’

    ‘টেবিলের সিটি স্ক্যান করতে বলেননি?’ ফিচেল হাসি চন্দনকে ফেরত দেয় অভি। থানার বড়বাবু জানেন যে এগুলো গটআপ কেস। তবে আম-পাবলিকের কাছ থেকে শুনলে খানিকটা টনক নড়বে।

    ‘অভি, তুই শালা পুলিশের সামনে আমাদের ইনসাল্ট করছিস।’ হাসতে হাসতে বলে চন্দন। বিরক্ত হয়ে অভি বলল, ‘কালকে ইলেকশান। তার আগে ঝামেলাটা না পাকালেই চলছিল না?’

    অভির কথা শুনে পুলিশ অফিসার বললেন, ‘এটাই আমি তোমাদের নেতাকে এতক্ষণ বলছিলাম। ফালতু ঝামেলা পাকালে। তোমরা মেডিক্যাল স্টুডেন্টস। ক্রিম অব দ্য সোসাইটি। তোমরা যদি জেনারেল লাইনের ছেলেপুলেদের মতো হাতাহাতি করো, সেটা কি ভালো দেখায়? হোস্টেল বোর্ডার্স কমিটির ইলেকশানের সময় পুলিশ পোস্টিং হলে কলেজের জেনারেল ইলেকশানের সময় কী করবে?’

    চন্দন বলল, ‘আলাপ করিয়ে দিই। ইনি তপন চৌধুরী। এন্টালি থানার ওসি। আমার পরিচিত।’

    হাত জোড় করে অভি বলল, ‘নমষ্কার। আমার নাম অভিজ্ঞান। চন্দনের ক্লাসমেট।’

    ‘তোমার বুঝি পলিটিক্সে আগ্রহ নেই?’ সিগারেট বাড়িয়ে বলেন তপন।

    ‘সিগারেটও নেই।’ হাত নেড়ে অভি বলে, ‘চন্দন, কাল ভোট দিয়ে হোস্টেলে থাকব? না, বাড়ি চলে যাব?’

    ‘বাড়ি চলে যাও ভাই।’ পরামর্শ দেন তপন। ‘এরা হোস্টেল দখল নিয়ে বিচ্ছিরি মারামারি শুরু করেছে। ইউনিয়নের দখল নিয়ে না জানি কী করবে।’

    ‘বাড়ি কেন যাবি? পড়াশুনোর ক্ষতি হয়ে যাবে।’ তপনকে থামিয়ে তার হাত থেকে সিগারট নেয় চন্দন। আগের সিগারেট থেকে এটা ধরায়। তপন বলেন, ‘একদম চেন স্মোকার হয়ে গেলে যে!’

    দু’জনকে টাটা করে অভি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ভাবে, সঞ্জয়ের কোনও খবর নেই কেন? রিপু ন্যাকামো করে হাসপাতালে ভরতি আছে। চন্দন আর সুরজ হোস্টেলেই রয়েছে। ভোটের আগের দিন সমস্ত ক্যাম্পেন বন্ধ। এই বাজারে ভিডিও ক্লিপটা নিয়ে সঞ্জয় করছেটা কী? ভয়ের চোটে চেপে গেল? নাকি ক্যামেরায় কোনও ছবিই ওঠেনি?

    নিজের ঘরে ঢুকে ল্যাপটপ অন করে কবিতাটা আবার পড়ে অভি। নাম দেয়, ‘কবিতা জকি’। অন্তহীন পত্রিকার সম্পাদক সুদিন চক্রবর্তীকে লেখা ফরওয়ার্ডিং লেটারের ডেট চেঞ্জ করে প্রিন্ট আউট নেয়। চিঠি আর কবিতার কাগজ দুটো স্টেপল করে খামে ভরে আঠা দিয়ে মুখ সাঁটে। আজ দুপুর দুটোর সময় যখন লেডি আর্চার্স হোস্টেলে যাবে, তখন পোস্টবক্সে ড্রপ করে দেবে। দাঁড়ের ঠিক পাশেই একটা গোব্দা লাল রঙের বাক্স আছে।

  • কল্লোল যুগ

    কল্লোল যুগ

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    কল্লোল যুগ

    ‘কল্লোল যুগ’ অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত রচিত কল্লোল যুগ বিষয়ে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। প্রথম প্রকাশ, আশ্বিন ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ; প্রকাশক, শমিত সরকার, এম. সি. সরকার অ্যাণ্ড সন্স প্রাইভেট লি., ১৪ বঙ্কিম চাটুজ্যে ষ্ট্রীট, কলিকাতা ৭৩। মুদ্রক, সাধনকুমার গুপ্ত, শ্রীরাধাকৃষ্ণ প্রিণ্টিং, ২১ বি, রাধানাথ বোস লেন, কলিকাতা ৬।

    উৎসর্গ

    দীনেশরঞ্জন দাস

    গোকুলচন্দ্র নাগের

    উদ্দেশে উৎসর্গ

  • এক

    এক

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    এক

    একই শ্লেটের দুপিঠে দুজনে একই জনের নাম লিখলাম।

    তেরো শ আটাশ সালের কথা। গিয়েছিলাম মেয়েদের ইস্কুল-হসটেলে একটি ছাত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। দারোয়ানের কাছে গেট জিম্মা আছে, তাতে কাঙ্ক্ষিতদর্শনার নামের নিচে দর্শনাকাঙ্ক্ষীর নাম লিখে দিতে হবে। আরো একটি যুবক, আমারই সমবয়সী, এধার-ওধার ঘুরঘুর করছিল। শ্লেট নিয়ে আসতেই দুজনে কাছাকাছি এসে গেলাম। এত কাছাকাছি যে আমি যার নাম লিখি সেও তার নাম লেখে।

    প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে বন্ধু হয়ে গেলাম দু’জনে।

    তার নাম সুবোধ দাশগুপ্ত। ডাক নাম, নানকু।

    হৃদ্যতা এত প্রগাঢ় হয়ে উঠল যে দুজনেই বড় চুল রাখলাম ও নাম বদলে ফেললাম। আমি নীহারিকা, সে শেফালিকা।

    তখন সাউথ সুবার্বন কলেজে—বর্তমানে আশুতোষ—আই-এ পড়ি। এন্তার কবিতা লিখি আর “প্রবাসী”তে পাঠাই। আর প্রতি খেপেই প্যারীমোহন সেনগুপ্ত (তখনকার “প্রবাসী”র সহসম্পাদক) নির্মমের মত তা প্রত্যর্পণ করেন। একে ডাক-খরচা তায় গুরু-গঞ্জনা, জীবনে প্রায় ধিক্কার এসে গেল। তখন কলেজের এক ছোকরা পরামর্শ দিলে, মেয়ের নাম দিয়ে পাঠা, নির্ঘাৎ মনে ধরে যাবে। তুই যেখানে পুরো পৃষ্ঠা লিখে পাশ করতে পারিস না, মেয়েরা সেখানে এক লাইন লিখেই ফার্স্ট ডিভিশন। দেখছিস তো—

    ওই ঠিক করে দিলে, নীহারিকা। আর, এমন আশ্চর্য, একটি সদ্যফেরৎ-পাওয়া কবিতা নীহারিকা দেবী নামে প্রবাসীতে পাঠাতেই পত্রপাঠ মনোনীত হয়ে গেল।

    দেখলাম, সুবোধেরও সেই দশা। বহু জায়গায় লেখা পাঠাচ্ছে, কোথাও জায়গা পাচ্ছে না। বললাম, নাম বদলাও। নীহারিকার সঙ্গে মিলিয়ে সে নাম রাখলে শেফালিকা। আর, সঙ্গে-সঙ্গে সেও হাতে-হাতে ফল পেল।

    লেখা ছাপা হল বটে, কিন্তু নাম কই? যেন নিজের ছেলেকে পরের বাড়িতে পোষ্য দিয়েছি। লোককে বিশ্বাস করানো শক্ত, এ আমার রচনা। গুরুজনের গঞ্জনা গুরুতর হয়ে উঠল। কেননা আগে শুধু গঞ্জনাই ছিল, এখন সে সঙ্গে মিশল এসে গুঞ্জন। নীহারিকা কে?

    অনেক কাগজ গায়ে পড়ে নীহারিকা দেবীকে কবিতা লেখবার জন্যে অনুরোধ করে পাঠাতে লাগল। নিমন্ত্রণ হল কয়েকটা সাহিত্যসভায়, দু-একজন গুণমোহিতেরও খবর পেলাম চিঠিতে। ব্যাপারটা বিশেষ স্বস্তিকর মনে হল না। ঠিক করলাম স্বনামেই ত্রাণ খুঁজতে হবে। স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ ইত্যাদি। অনেক ঠোকাঠুকির পর “প্রবাসী”তে ঢুকে পড়লাম স্বনামে, ভারতীও অনেক বাধা-বারণের পর দরজা খুলে দিল।

    গেলাম সুবোধর কাছে। বললাম, ‘পালাও। মাননীয়া সাহিত্যিকারা নীহারিকা দেবীর সঙ্গে বাড়িতে দেখা করতে আসছেন। অন্তত নিজের ছদ্মনাম থেকে পালাও। আত্মরক্ষা করো। নইলে ঘরছাড়া হবে একদিন।’

    অর্ধশস্ফুট একটি বিশেষ হাসি আছে সুবোধের। সেই নির্লিপ্ত হাসি হেসে সুবোধ বললে, ‘ঘরছাড়াই হচ্ছি সত্যি। পালাচ্ছি বাংলা দেশ থেকে।’

    কোন এক সমুদ্রগামী মালবাহী জাহাজে ওয়ারলেস-ওয়াচার হয়ে সুবোধ অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছে। পঞ্চাশ টাকা মাইনে। মুক্ত পাখির মতন খুশি। বললে, অফুরন্ত সমুদ্র আর অফুরন্ত সময়। ঠেসে গল্প লেখা যাবে। যখন ফিরব দেখা করতে এসো ডকে। অক্স-টাং খুব উপাদেয় জিনিস, খেয়ে দেখতে পারো ইচ্ছে করলে। আর এক-আধ দিন যদি রাত কাটাতে চাও, শুতে পাবে পালকের বালিশে।’

    সেই সুবোধ একদিন হঠাৎ মাদ্রাজ থেকে ঘুরে এসে আমাকে বললে, ‘গোকুল নাগের সঙ্গে আলাপ করবে?’

    জানতাম কে, তবু ঝাঁজিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে গোকুল নাগ? ওই লম্বা চুল-ওলা বেহালা-বাজিয়ের মত যার চেহারা?’

    অধস্ফুটশব্দে সুবোধ হাসল। পরে গম্ভীর হয়ে বললে, “কল্লোলে”র সহসম্পাদক। তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চান। তোমার লেখা তাঁকে পড়াব বলে বলেছি। চমৎকার লোক।’

    ব্যাপার কি—কৌতূহলী হয়ে তাকালাম সুবোধের দিকে।

    গোকুলের প্রতি, কেন জানি না, মনটা প্রসন্ন ছিল না। মাঝে-মাঝে দেখেছি তাকে ভবানীপুরের রাস্তায়, কখনো বা ট্রামে। কেমন যেন দূর ও দাম্ভিক মনে হত। মনে হত লম্বা চালের লোক, ধরাখানাকে যেন সরা জ্ঞান করছে। “প্রবাসী” “ভারতী”তে ছোট ধাঁচের প্রেমের গল্প লিখত, যাতে অর্থের চাইতে ইঙ্গিত থাকত বেশি, যার মানে, দাঁড়ি-কমার চেয়ে ফুটকিই অধিকতর। সেই ফুটকি-চিহ্নিত হেঁয়ালির মতই মনে হত তাকে।

    দুরের থেকে চোখের দেখা দেখে বা কখনো নেহাৎ কান-কথা শুনে এমনি মনগড়া সিদ্ধান্ত করে বসি আমরা। আর সে সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে এত নিঃসন্দেহ থাকি। সময় কোথায়, সুযোগই বা কোথায়, সে সিদ্ধান্ত যাচাই করি একদিন। যাকে কালো বলে জেনেছি সে চিরকাল কালো বলেই আঁকা থাক।

    সুবোধ এমন একটা কথা বললে যা কোনো দিন শুনিনি বা শুনব বলে আশা করিনি বাংলা দেশে।

    জাহাজে বসে এতদিন যত লিখেছে সুবোধ, তারই থেকে একটা গল্প বেছে নিয়ে কি খেয়ালে সে কল্লোলে পাঠিয়ে দিয়েছিল। আরো অনেক কাগজে সে পাঠিয়েছিল সেই সঙ্গে, হয় খবর এসেছে মনোনয়নের, নয় ফেরৎ এসেছে লেখা—সেটা এমন কোনো আশ্চর্যজনক কথা নয়। কিন্তু কল্লোলে কী হল? কল্লোল তার গল্প অমনোনীত করলে, সম্পাদকীয় লেপাফায় লেখা ফেরৎ গেল। কিন্তু সেই সঙ্গে গেল একটি পোস্ট কার্ড। “যদি দয়া করে আমাদের অফিসে আসেন একদিন আলাপ করতে।” তার মানে, লেখা অপছন্দ হয়েছে বটে, কিন্তু লেখক, তুমি অযোগ্য নও, তুমি অপরিত্যাজ্য। তুমি এসো। আমাদের বন্ধু হও।

    ঐ পোস্টকার্ডটিই গোকুল।

    ঐ পোস্টকার্ডটিই সমস্ত “কল্লোলে”র সুর। “কল্লোলে”র স্পর্শ। তার নীড়-নির্মাণের মূলমন্ত্র।

    খবর শুনে মন নরম হয়ে গেল। আমার লেখা বাতিল হলেও আমার মূল্য নিঃশেষ হয়ে গেল না এত বড় সাহসের কথা কোনো সম্পাদকই এর আগে বলে পাঠায়নি। যা লিখেছি তার চেয়ে যা লিখব তার সম্ভাব্যতারই যে দাম বেশি এই আশ্বাসের ইসারা সেদিন প্রথম পেলাম সেই গোকুলের চিঠিতে।

    সুবোধ বললে, ‘তোমার খাতা বের করো।’

    তখন আমি আর আমার বন্ধু প্রেমেন্দ্র মিত্র মোটা-মোটা বাঁধানো খাতায় গল্প-কবিতা লিখি। লিখি ফাউন্টেন পেনে নয়—হায়, ফাউন্টেন পেন কেনবার মত আমাদের তখন পয়সা কোথায়—লিখি বাংলা কলমে, সরু জি-মার্কা নিবে। অক্ষর কত ছোট করা যায় চলে তার অলক্ষ্য প্রতিযোগিতা। লেখার মাথায় ও নিচে চলে নানারকম ছবির কেরামতি।

    তারিখটা আমার ডায়রিতে লেখা আছে—৮ই জ্যৈষ্ঠ, বৃহস্পতিবার, ১৩৩১ সাল। সন্ধেবেলা সুবোধের সঙ্গে চললাম নিউ মার্কেটের দিকে। সেখানে কি? সেখানে গোকুল নাগের ফুলের দোকান আছে।

    যে দোকান দিয়ে বসেছে সে ব্যবসা করতে বসেনি এমন কথা কে বিশ্বাস করতে পারত? কিন্তু সেদিন একান্তে তার কাছে এসে স্পষ্ট অনুভব করলাম, চারপাশের এই রাশীভূত ফুলের মাঝখানে তার হৃদয়ও একটি ফুল, আর সেই ফুলটিও সে অকাতরে বিনামূল্যে যে-কারুর হাতে দিয়ে দিতে প্রস্তুত।

    সুবোধের হাত থেকে আমার খাতাটা সে ব্যগ্র উৎসাহে কেড়ে নিল। একটিও পৃষ্ঠা না উলটিয়ে কাগজে মুড়ে রেখে দিলে সন্তর্পণে। যেন নীরব নিভৃতিতে অনেক যত্নসহকারে লেখাগুলো পড়তে হবে এমনি ভাব। হাটের মাঝে পড়বার জিনিস তারা নয়—অনেক সদ্‌ব্যবহার ও অনেক সদ্‌বিবেচনা পাবার তারা যোগ্য। লেখক নতুন হোক, তবু সে মর্যাদার অধিকারী।

    এমনি ছোটখাটো ঘটনায় বোঝা যায় চরিত্রের বিশালতা।

    বুঝলাম কত বড় শিল্পীমন গোকুলের। অনুসন্ধিৎসু চোখে আবিষ্কারের সম্ভাবনা দেখছে। চোখে সেই যে সন্ধানের আলো তাতে তেল জোগাচ্ছে স্নেহ।

    যখন চলে আসি, আমাকে একটা ব্ল্যাকপ্রিন্স উপহার দিলে। বললে, ‘কাল সকালে আপনি আর সুবোধ আমার বাড়ি যাবেন, চা খাবেন।’

    ‘আপনার বাড়ি–’

    ‘আমার বাড়ি চেনেন না? আমার বাড়ি কোথায় চেহারা দেখে ঠাহর করতে পারেন না?’

    ‘কি করে বলব?’

    ‘কি করে বলবেন। আমার বাড়ি জু-তে, চিড়িয়াখানায়। আমার বাড়ি মানে মামার বাড়ি। কোনো ভয় নেই। যাবেন স্বচ্ছন্দে।’

    পরদিন খুব সকালে সুবোধকে নিয়ে গেলাম চিড়িয়াখানায়। দেখলাম শিশিরভেজা গাঢ়-সবুজ ঘাসের উপর গোকুল হাঁটছে খালি পায়ে। বোধহয় আমাদেরই প্রতীক্ষা করছিল। তার সেদিনের সেই বিশেষ চেহারাটি বিশেষ একটা অর্থ নিয়ে আজো আমার মনের মধ্যে বিঁধে আছে। যেন কিসের স্বপ্ন দেখছে সে, তার জন্যে সংগ্রাম করছে প্রাণপণ, প্রতীক্ষা করছে পিপাসিতের মত। অথচ, সংগ্রামের মধ্যে থেকেও সে নির্লিপ্ত, নিরাকাঙ্ক্ষ। জনতার মধ্যে থেকেও সে নিঃসঙ্গ, অনন্যসহায়।

    তার ঘরে নিয়ে গেল আমাদের। চা খেলাম। সিগারেট খেলাম। নিজের অজানতেই তার অন্তরের অঙ্গ হয়ে উঠলাম। বললে, ‘আপনার “গুমোট” গল্পটি ভালো লেগেছে। ওটি ছাপব আষাঢ়ে।

    “কল্লোলে”র তখন দ্বিতীয় বর্ষ। প্রথম প্রকাশ বৈশাখ, ১৩৩০। সম্পাদক শ্রীদীনেশরঞ্জন দাশ; সহ সম্পাদক, শ্রীগোকুলচন্দ্র নাগ। প্রতি সংখ্যা চার আনা। আট পৃষ্ঠা ডিমাই সাইজে ছাপা, প্রায় বারো ফর্মার কাছাকাছি।

    নিজের সম্বন্ধে কথা বলতে এত অনিচ্ছুক ছিল গোকুল। পরের কথা জিজ্ঞাসা করো, প্রশংসায় একেবারে পঞ্চমুখ। তবু যেটুকু খবর জানলাম মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

    গোকুল হালে সাহিত্য করছে বটে, কিন্তু আসলে সে চিত্রকর। আর্ট স্কুল থেকে পাশ করে বেরিয়েছে সে। অয়েল পেন্টিংএ তার পাকা হাত। তারপর তার লম্বা চুল দেখে যে সন্দেহ করেছিলাম, সে সত্যিই-সত্যিই বেহালা বাজায়। আর, আরো আশ্চর্য, গান গায়। শুধু তাই? “সোল অফ এ শ্লেভ” বা “বাদীর প্রাণ” ফিল্‌মে সে অভিনয়ও করেছে অহীন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে। শিল্প-পরিচালকও ছিল সে-ই।

    গোকুল ও তার বন্ধুদের “ফোর আর্টস ক্লাব” নামে একটা প্রতিষ্ঠান ছিল। বন্ধুদের মধ্যে ছিল দীনেশরঞ্জন দাশ, মণীন্দ্রলাল বসু আর সুনীতি দেবী। এরা চার জনে মিলে একটা গল্পের বইও বের করেছিল, নাম “ঝড়ের দোলা”। প্রত্যেকের একটি করে গল্প। মাসিক পত্রিকা বের করারও পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু তার আগে ক্লাব উঠে গেল।

    ‘আমার ব্যাগে দেড় টাকা আর দীনেশের ব্যাগে টাকা দুই—ঠিক করলাম “কল্লোল” বের করব।’ স্নিগ্ধ উত্তেজনায় উজ্জ্বল দুই চোখ মেলে গোকুল তাকিয়ে রইল বাইরের রোদের দিকে। বললে, ‘সেই টাকায় কাগজ কিনে হ্যাণ্ডবিল ছাপালাম। চৈত্র সংক্রান্তির দিন রাস্তায় বেজায় ভিড়, জেলেপাড়ার সং দেখতে বেরিয়েছে। সেই ভিড়ের মধ্যে দুজনে আমরা হ্যাণ্ডবিল বিলোতে লাগলাম।’ পরমুহূর্তেই আবার তার শান্ত স্বরে ঔদাস্যের ছোঁয়া লাগল। বলল, ‘তবু “ফোর আর্টস্ ক্লাব”টা উঠে গেল, মনে কষ্ট হয়।

    বললাম, ‘আপনিই তো একাধারে ফোর আর্টস। চিত্র, সঙ্গীত, সাহিত্য, অভিনয়।’

    নম্রতায় বিমর্ষ হয়ে হাসল গোকুল। বললে, ‘আসুন আপনারা সবাই কল্লোলে। কল্লোলকে আমরা বড় করি। দীনেশ এখন দার্জিলিঙে। সে ফিরে আসুক। আমাদের স্বপ্নের সঙ্গে মিশুক আমাদের কর্মের সাধনা।’

    যখন চলে আসি, গোকুল হাত বাড়িয়ে আমার হাত স্পর্শ করল। সে স্পর্শে মামুলি শিষ্টাচার নয়, তার অনেক বেশি। একটি উত্তপ্ত স্নেহ, হয়তো বা অস্ফুট আশীর্বাদ।

    তারপর একদিন “কল্লোল” আফিসে এসে উপস্থিত হলাম। ১০/২ পটুয়াটোলা লেন। মির্জাপুর স্ট্রিট ধরে গিয়ে বাঁ-হাতি।

    “কল্লোল”-আফিস!

    চেহারা দেখে প্রথমে দমে গিয়েছিলাম কি সেদিন? ছোট্ট দোতলা বাড়ি—একতলায় রাস্তার দিকে ছোট্ট বৈঠকখানায় “কল্লোল”-আফিস! বাঁয়ে বেঁকে দুটো সিঁড়ি ভেঙে উঠে হাত-দুই চওড়া ছোট একটু নোয়ক ডিঙিয়ে ঘর। ঘরের মধ্যে উত্তরের দেয়াল ঘেঁসে নিচু একজনের শোয়ার মত ছোট একফালি তক্তপোশ, শতরঞ্চির উপর চাদর দিয়ে ঢাকা। পশ্চিম দিকের দেওয়ালের আধখানা জুড়ে একটি আলমারি, বাকি আধখানায় আধা-সেক্রেটারিয়েট টেবিল। পিছন দিকে ভিতরে যাবার দরজা, পর্দা ঝুলছে কি ঝুলছে না, জানতে চাওয়া অনাবশ্যক। ফাঁকা জায়গাটুকুতে খান দুই চেয়ার, আর একটি ক্যানভাসের ডেক-চেয়ার। ঐ ভেক চেয়ারটিই সমস্ত “কল্লোল”-আফিসের অভিজাত্য। প্রধান বিলাসিতা।

    সম্পাদকী টেবিলে গোকুল নাগ বসে আছে, আমাকে দেখে সস্মিত ‘শুভাগমন’ জানালে। তক্তপোশের উপর একটি প্রিয়দর্শন যুবক, নাম ভূপতি চৌধুরী, শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ে, বাড়ির ঠিকানা ৫৭ আমহার্স্ট স্ট্রিট। আরো একটি ভদ্রলোক বসে, ছিমছাম ফিটফাট চেহারা, একটু বা গম্ভীর ধরনের। খোঁজ নিয়ে জানলাম, সতীপ্রসাদ সেন, “কল্লোলে”র গোরাবাবু। দেখতে প্রথমটা একটু গম্ভীর, কিন্তু অপেক্ষা করো, পাবে তার অন্তরের মধুরতার পরিচয়।

    ভূপতির সঙ্গে একবাক্যেই ভাব হয়ে গেল। দেখতে দেখতে চলে এল নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়।

    কিন্তু প্রথম দিন সব চেয়ে যা মন ভোলাল তা হচ্ছে ঠিক সাড়েচারটের সময় বাড়ির ভিতর হতে আসা প্লেট-ভরা এক গোছা রুটি আর বাটিতে করে তরকারি। আর মাথা-গুনতি চায়ের কাপ।

    ভাবলাম, প্রেমেনকে বলতে হবে। প্রেমেন আমার স্কুলের সঙ্গী। ম্যাট্রিক পাশ করেছি এক বছর।

  • দুই

    দুই

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    দুই

    সাউথ সুবার্বন স্কুলে ফার্স্ট ক্লাশে উঠে প্রেমেনকে ধরি। সে-সব দিনে ষোলো বছর না পুরলে ম্যাট্রিক দেওয়া যেত না। প্রেমেনের এক বছর ঘাটতি পড়েছে। তার মানে ষোলো কলার এক কলা তখন বাকি।

    ধরে ফেললাম। লক্ষ্য করলাম সমস্ত ক্লাশের মধ্যে সব চেয়ে উজ্জ্বল, সব চেয়ে সুন্দর, সব চেয়ে অসাধারণ ঐ একটিমাত্র ছাত্র–প্রেমেন্দ্র মিত্র। এক মাথা ঘন কোঁকড়ানো চুল, সামনের দিকটা একটু আঁচড়ে বাকিটা এক কথায় অগ্রাহ্য করে দেওয়া—সুগঠিত দাঁতে সুখস্পর্শ হাসি, আর চোখের দৃষ্টিতে দূরভেদী বুদ্ধির প্রখরতা। এক ঘর ছেলের মধ্যে ঠিক চোখে পড়ার মত। চোখের বাইরে একলা ঘরে হয়তো বা কোনো-কোনো দিন মনে পড়ার মত।

    এক সেকশনে পড়েছি বটে কিন্তু কোনো দিন এক বেঞ্চিতে বসিনি। যে কথা-বলার জন্যে বেঞ্চির উপর উঠে দাঁড়াতে হয়, তেমন কোনো দিন কথা হয়নি পাশাপাশি বসে। তবু দূর থেকেই পরস্পরকে আবিষ্কার করলাম।

    কিংবা, আদত কথা বলতে গেলে, আমাদের আবিষ্কার করলেন আমাদের বাংলার পণ্ডিত মশাই—নাম রণেন্দ্র গুপ্ত। ইস্কুলের ছাত্রদের মুখ-চলতি নাম রণেন পণ্ডিত।

    গায়ের চাদর ডান হাতের বগলের নিচে দিয়ে চালান করে বা কাঁধের উপর ফেলে পাইচারি করে-করে পড়াতেন পণ্ডিত মশাই। অদ্ভুত তার পড়াবার ধরন, আশ্চর্য তাঁর বলবার কায়দা। থমথমে ভারী গলার মিষ্টি আওয়াজ এখনো যেন শুনতে পাচ্ছি।

    নিচের দিকে সংস্কৃত পড়াতেন। পড়াতেন ছড়া তৈরি করে। একটা আমার এখনো মনে আছে। ব্যাকরণের সুত্র শেখাবার জন্যে সে ছড়া, কিন্তু সাহিত্যের আসরে তার জায়গা পাওয়া উচিত।

    ব্যধ্-যজ্ এদের য-কার গেল

    তার বদলে ই,

    ই-কার উ-কার দীর্ঘ হল

    ঋকারান্ত রি।

    শাস্‌-এর হল শিষ-দেওয়া রোগ

    অস্-এর হল ভূ,

    স্বপ-সাহেবের সুপ এসেছে

    হেব সাহেবের হু।

    বহরমপুরের বাদীরা সব

    বদমায়েসি ছেড়ে

    চন্দ্র পরান দয়াল হরি

    সবাই হল উড়ে॥

    একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। বাচ্যান্তর শেখাচ্ছেন পণ্ডিত মশাই— কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্য। তখন সংস্কৃত ধাতুগুলো কে কি রকম চেহারা নেবে তারই একটা সরস নির্ঘণ্ট। তার মানে ব্যধ্ আর যজ্–ধাতু য-ফলা বর্জন করে হয়ে দাঁড়াবে বিধ্যতে আর ইজ্যতে। কৃয়তে-মৃয়তে না হয়ে হবে ক্রিয়তে-ম্রিয়তে। তেমনি শিষ্যতে, ভূয়তে, সুপ্যতে, হূয়তে। বহরমপুরের বাদীরাই সব চেয়ে মজার। তারা সংখ্যায় চারজন—বচ, বপ, বদ আর বহ। কর্মবাচ্যে গেলে আর বদমায়েসি থাকবে না, সবাই উড়ে হয়ে যাবে। তার মানে, ব উ হয়ে যাবে। তার মানে উচ্যতে, উপ্যতে, উদ্যতে, উহ্যতে। তেমনি ভাববাচ্যে উক্ত, উপ্ত, উদিত, উঢ়। ছিল বক হয়ে দাঁড়াল উচ্চিংড়ে।

    বাংলার রচনা-ক্লাশে তিনি অনায়াসে চিহ্নিত করলেন আমাদের দুজনকে। যা লিখে আনি তাই তিনি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন ও আরো লেখবার জন্যে প্রবল প্ররোচনা দেন। একদিন দুঃসাহসে ভর করে তার হাতে আমার কবিতার খাতা তুলে দিলাম। তখনকার দিনে মেয়েদের গান গাওয়া বরদাস্ত হলেও নৃত্য করা গর্হিত ছিল, তেমনি ছাত্রদের বেলায় গদ্যরচনা সহ্য হলেও কবিতা ছিল চরিত্রহানিকর। তা ছাড়া কবিতার বিষয়গুলিও খুব স্বর্গীয় ছিল না, যদিও একটা কবিতা “স্বর্গীয় প্রেম” নিয়ে লিখেছিলাম। কিন্তু পণ্ডিত মশায়ের কি আশ্চর্য ঔদার্য! পঙ্গু ছন্দ, অপাঙক্তেয় বিষয়, সঙ্কুচিত কল্পনা—তবু যা একটু পড়েন, তাই বলেন চমৎকার। বলেন, ‘লিখে যাও, থেমো না, নিশ্চিতরূপে অবস্থান কর। যা নিশ্চিতরূপে অবস্থান তারই নাম নিষ্ঠা। আর, শোনো—’ কাছে ডেকে নিলেন। হিতৈষী আত্মজনের মত বললেন, ‘কিন্তু পরীক্ষা কাছে, ভুলো না—’

    ম্যাট্রিক পরীক্ষায় আমি আর প্ৰেমেন দুজনেই মান রেখেছিলাম পণ্ডিত মশায়ের। দুজনেই ‘ভি’ পেয়েছিলাম।

    রাস্তায় এক দিন দেখা পণ্ডিত মশায়ের সঙ্গে। কাঁধ চাপড়ে বললেন, আমার মান কিন্তু আরো উঁচু। নি-পূৰ্ব্বক স্থা ধাতু অ—কতৃর্বাচ্যে। মনে থাকে যেন।’

    তাঁর কথাটা মনে রেখেছি কিনা আমাদের অগোচরে তিনি লক্ষ্য করে এসেছেন বরাবর। শুনেছি পরবর্তী কালে প্রতি বৎসর নবাগত ছাত্রদের উদ্দেশ করে স্নেহ-গগদ কণ্ঠে বলেছেন—এইখানে বসত প্রেমেন আর ঐখানে অচিন্ত্য!

    ম্যাট্রিক পাশ করে প্রেমেন চলে গেল কলকাতায় পড়তে, আমি ভর্তি হলাম ভবানীপুরে। সে সব দিনে ধর্মতলা পেরিয়ে উত্তরে গেলেই ভবানীপুরের লোকেরা তাকে কলকাতায় যাওয়া বলত। হয়তো ঘুরে এলাম ঝামাপুকুর বা বড়বাগান থেকে, কেউ জিগগেস করলে বলতাম কলকাতায় গিয়েছিলাম।

    নন-কোঅপারেশনের বান-ডাকা দিন। আমাদের কলেজের দোতলার বারান্দা থেকে দেশবন্ধুর বাড়ির আঙিনা দেখা যায়—শুধু এক দেয়ালের ব্যবধান। মহাত্মা আছেন, মহম্মদ আলি আছেন, বিপিন পালও আছেন বোধ হয়—তরঙ্গতাড়নে কলেজ প্রায় টলোমলো। কি ধরে যে আঁকড়ে থাকলাম কে জানে, শুনলাম প্রেমেন ভেসে পড়েছে।

    ডাঙা পেল প্রায় এক বছর মাটি করে। এবার ভালো ছেলের মত কলকাতায় না গিয়ে ঢুকল পাড়ার কলেজে। সকাল-বিকেলের সঙ্গীকে দুপুরেও পেলাম এবার কাছাকাছি। কিন্তু পরীক্ষার কাছাকাছি হতেই বললে, ‘কী হবে পরীক্ষা দিয়ে। ঢাকায় যাব।’

    ১৯২২-সালে পুরী থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্রের চিঠি :

    “দুঃখের তপস্যায় সবই অমৃত, পথেও অমৃত, শেষেও অমৃত। সফল হও ভালই, না হও ভালই। আসল কথা সফল হওয়া না-হওয়া নেই—তপস্যা আছে কিনা সেইটেই আসল কথা। সৃষ্টি তো স্থিতির খেয়ালে তৈরী নয়, গতির খেয়ালে। যা পেলুম তাও অহরহ সাধনা দিয়ে রাখতে হয়, নইলে ফেলে যেতে হয়। এখানে কেউ পায় না, পেতে থাকে—সেই পেতে-থাকার অবিরাম তপস্যা করছি কিনা তাই নিয়ে কথা। যাকে পেতে থাকি না সে নেই।…যা পাই তাও ফেলে যাই, গাছ যেই ফুল পায় অমনি ফেলে দিয়ে যায়, তেমনি আবার ফল ফেলে দিয়ে যায় পাওয়া হলেই।…যারা পায় তাদের মতো হতভাগা আর নেই। দুঃখের ভয়ে যারা কঠিন তপস্যা থেকে বিরত হয়ে সহজ পথ খোঁজে আরামের, তাদের আরামই জোটে, আনন্দ নয়।…

    আমি পড়াশুনা একদিনও করিনি—পারা যায় না। আমার মত লোকের পক্ষে পড়ব বল্লেই পড়া অসম্ভব। হয়ত এবার একজামিন দেওয়া হবে না।

    তোর প্রেমেন্দ্র মিত্র”

    পুরী থেকে লেখা আরেকটা চিঠির টুকরো—সেই ১৯২২-এ :

    “সমুদ্রে খুব নাইছি। মাঝে-মাঝে এই প্রাচীন পুরাতন বৃদ্ধ সমুদ্র আমাদের অর্বাচীনতায় চটে গিয়ে একটু আধটু ঝাঁকানি কানমলা দিয়ে দেন—নইলে বেশ নিরীহ দাদামশাইয়ের মত আনমনা!

    ঝিনুক কুড়োচ্ছি। পড়াশোনা মোটেই হচ্ছে না—তা কি হয়?”

    সে-সব দিনে দুজন লেখক আমাদের অভিভূত করেছিল—গল্পেউপন্যাসে মণীন্দ্রলাল বসু আর কবিতায় সুধীরকুমার চৌধুরী। কাউকে তখনো চোখে দেখিনি, এবং এদেরকে সত্যি-সত্যি চোখে দেখা যায় এও যেন প্রায় অবিশ্বাস্য ছিল। কলেজের এক ছাত্র—নাম হয়তো উষারঞ্জন রায়—আমাদের হঠাৎ একদিন বিষম চমকে দিলে। বলে কিনা, সে সুধীর চৌধুরীর বাড়িতে থাকে, আর, শুধু এক বাড়িতেই নয়, একই ঘরে, পাশাপাশি তক্তপোশে! যদি যাই তো দুপুরবেলা সেই ঘরে ঢুকে বাক্স ঘেটে সুধীর চৌধুরীর কবিতার খাতা আমরা দেখে আসতে পারি।

    বিনাবাক্যব্যয়ে দুজনে রওনা হলাম দুপুরবেলা। সুধীর চৌধুরী তখন রমেশ মিত্র রোডে এক একতলা বাড়িতে থাকেন—তখন হয়তো রাস্তার নাম পাকাপাকি রমেশ মিত্র রোড হয়নি—আমরা তাঁর ঘরে ঢুকে তাঁর ডালা-খোলা বাক্স হাঁটকে কবিতার খাতা বার করলাম। ছাপার অক্ষরে যার কবিতা পড়ি স্বহস্তাক্ষরে তাঁর কবিতা দেখব তার স্বাদটা শুধু তীব্রতর নয়, মহত্তর মনে হল। হাতাহাতি করে অনেকগুলি খাতা থেকে অনেকগুলি কবিতা পড়ে ফেললাম দুজনে। একটা কবিতা ছিল “বিদ্রোহী” বলে। বোধ হয় নজরুল ইসলামের পালটা জবাব। একটা লাইন এখনও মনে আছে—“আমার বিদ্রোহ হবে প্রণামের মত।” গভীর উপলব্ধি ও নিঃশেষ আত্মনিবেদনের মধ্যেও যে বিদ্রোহ থাকতে পারে—তারই শান্ত স্বীকৃতির মত কথাটা।

    কবিতার চেয়েও বেশি মুগ্ধ করল কবিতার খাতাগুলির চেহারা। ষোলপেজী ডবল ডিমাই সাইজের বইয়ের মত দেখতে। মনে আছে পরদিনই দুইজনে ঐ আকৃতির খাতা কিনে ফেললাম।

    ১৯২২ সালের নভেম্বর মাসে বটতলা বাড়ি, পাথরচাপতি, মধুপুর থেকে প্রেমেন আমাকে যে চিঠি লেখে তা এই :

    “অচিন, তবু মনে হয় ‘আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে।’ তারা মিথ্যা বলেনি সেই সত্যের সাধকেরা, ঋষিরা। আনন্দে পৃথিবীর গায়ে প্রাণের রোমাঞ্চ হচ্ছে, আনন্দে মৃত্যু হচ্ছে, আনন্দে কান্না আনন্দে আঘাত সইছে নিখিলভুবন। নিখিলের সত্য হচ্ছে চলা, প্রাণ হচ্ছে দুরন্ত নদী—সে অস্থির, সে আপনার আনন্দের বেগে অস্থির। আনন্দভরে সে স্থির থাকতে পারে না—প্রথম প্রেমের স্বাদ পাওয়া কিশোরী। সে আঘাত যেচে খেয়ে নিজের আনন্দকে অনুভব করে। ভগবানও ওই আনন্দভরে স্থির থাকতে পারেননি, তাই সেই বিরাট আনন্দময় নিখিলভুবনে নেচে কুঁদে খেলায় মেতেছেন। সে কি দুরন্তপনা! অবাধ্য শিশুর দুরন্তপনায় তারই আভাস।

    কিন্তু মানুষ যে বড্ড বড়, সে যে ধারণাতীত—সে যে সুধীর চৌধুরী যা বলতে গিয়ে বলতে না পেরে বলে ফেলে—‘ভয়ংকর’—তাই। তাই তার সব ভয়ংকর, তার আনন্দ ভয়ংকর, তার দুঃখ ভয়ংকর, তার ত্যাগ ভয়ংকর, তার অহংকার ভয়ংকর, তার স্থলন ভয়ংকর, তার সাধনা ভয়ংকর। তাই একবার বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে যাই যখন তার সাধনার দিকে তাকাই, তার আনন্দের দিকে তাকাই। আবার ভয়ে বুক দমে যায় যখন তার দুঃখের দিকে তাকাই, তার স্খলনের দিকে তাকাই। আর শেষকালে কিছু বুঝতে না পেরে বলি—ধন্য ধন্য ধন্য।

    কাল এখানে চমৎকার জ্যোৎস্নারাত ছিল। সে বর্ণনা করা যায় না। মনের মধ্যে সে একটা অনুভূতি শুধু। ভগবানের বীণায় নব নব সুর বাজছে—কালকের জ্যোৎস্নারাতের সুর বাজছিল আমার প্রাণের তারে, তার সাড়া পাচ্ছিলুম। তারাগুলো আকাশে ঠিক মনে হচ্ছিল সুরের ফিনকি আর পথটা তন্দ্রা, পাতলা তন্দ্রা, আকাশটা স্বপ্ন। এক মুহূর্তে মনের ভেতর দিয়ে সুরের ঝিলিক হেনে দিয়ে গেল, বুঝলুম, ভয় মিথ্যা হতাশা মিথ্যা মৃত্যু মিথ্যা। কিন্তু আমার বিশ্বাস করতে হবে, প্রমাণ করতে হবে আমার জীবন দিয়ে। বলেছিলুম প্রিয়া অচেনা, আজ দেখছি আমি যে আমার অচেনা। প্রিয়া যে আমিই। এক অচেনা দেহে, আর এক অচেনা দেহের বাইরে। স্থূল জগতে একদিন আদিপ্রাণ—protoplasm—নিজেকে দুভাগ করেছিল। সেই দুভাগই যে আমরা। আমরা কি ভিন্ন? আমি পৃথিবী, প্রিয়া আকাশ—আমরা যে এক। এই এককে আমায় চিনতে হবে আমার নিজের মাঝে আর তার মাঝে। এই চেনার সাধনা অন্তহীন তপস্যা হচ্ছে মানুষের। সেই চেনার কি আর শেষ আছে? একদিন জানতুম আমি রক্তমাংসের মানুষ, ক্ষুধাতৃষ্ণাভরা আর প্রিয়া দেহসুখের উপাদান—তারপর চিনছি আর চিনছি। আজ চিনতে চিনতে কোথায় এসে পৌঁছেছি, তবু কি আনন্দের শেষ আছে। আমার আমি কি অপরূপ, কি বিস্ময়কর! এই চেনার পথে কত রৌদ্র কত ছায়া কত ঝড় কত বৃষ্টি কত সমুদ্র কত নদী কত পর্বত কত অরণ্য কত বাধা কত বিঘ্ন কত বিপথ কত অপথ।

    থামিসনি কোনোদিন থামিসনি। থামব না আমরা, কিছুতেই না। ভয় মানে থামা হতাশা মানে থামা অবিশ্বাস মানে থামা ক্ষুদ্র বিশ্বাস মানেও থামা। দেহের ডিঙা যদি তুফানে ভেঙে যায় খুঁড়িয়ে যায়, গেল তো গেল—‘হালের কাছে মাঝি আছে।’ যৌবনটা হচ্ছে রাত্রি, তখন আমার পৃথিবী অন্ধকারে ঢেকে যায়, শুধু থাকে প্রিয়ার আকাশ—যেটুকু আলো পড়ে, কখনো তারা কখনো জ্যোৎস্নার, আমার পৃথিবীর ওপর শুধু সেইটুকু। তোর সেই জীবনের রাত্রি এসেছে, কিন্তু এসেছে ঘোর ঘনঘটা করে, নিবিড় অন্ধকার করে—তা হোক, বিচিত্র পৃথিবী। বিচিত্র জীবনের কাহিনী। শুধু মনের মধ্যে মন্ত্র হোক—‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত।’ যদি কেউ ঐশ্বর্য নিয়ে সুখী হয় হোক, ক্ষুদ্র শান্তি নিয়ে সুখী হয় হতে দাও, আমরা জানি ‘ভূমৈব সুখং নাল্পে সুখমস্তি।’ অতএব ‘ভূমৈব জিজ্ঞাসিতব্য।’ সেই ভূমার খোঁজে যেন আমরা না নিরস্ত হই। আর যৌবনকে বলি, ‘বয়সের এই মায়াজালের বাঁধনখানা তোরে হবে খণ্ডিতে।’

    এর ক’দিন পরেই আরেকটা চিঠি এল প্রেমেনের সেই মধুপুর থেকে :

    “হ্যাঁ, আরেকটা খবর আছে। এখানে এসে একটা কবিতার শেষ পূরণ করেছি আর চারটে নতুন কবিতা লিখেছি। তোকে দেখাতে ইচ্ছে করছে। শেষেরটার আরম্ভ হচ্ছে ‘নমো নমো নমো।’ মনের মধ্যে একটা বিরাট ভাবের উদয় হয়েছিল, কিন্তু সব ভাষা ওই গুরুগভীর ‘নমো নমো নমো’-র মধ্যে এমন একাকার হয়ে গেল যে কবিতাটা বাড়তেই পেল না। কবিতার সমস্ত কথা ওই ‘নমো নমো নামো’-র মধ্যে অস্পষ্ট হয়ে রইল। কি রকম কবিতা লিখছিস?”

  • তিন

    তিন

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    তিন

    তেরো-শ একত্রিশ সালের পয়লা জ্যৈষ্ঠ আমি প্রেমেন আর আমাদের দু’টি সাহিত্যিক বন্ধু মিলে একটা সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করলাম। তার নাম হল “আভ্যুদয়িক”। আর বন্ধু দু’টির নাম শিশিরচন্দ্র বসু আর বিনয় চক্রবর্তী।

    যেমনটি সাধারণত হয়ে থাকে। অভিভাবক ছাড়া আলাদা একটা ঘরে জন কয়েক বন্ধু মিলে মনের সুখে সাহিত্যিকগিরির আখড়াই দেওয়া। সেই গল্প-কবিতা পড়া, সেই পরস্পরের পিঠ চুলকোনো। সেই চা, সিগারেট, আর সর্বশেষে একটা মাসিক পত্রিকা ছাপাবার রঙিন জল্পনাকল্পনা। আর, সেই মাসিক পত্রিকা যে কী নিদারুণ বেগে চলবে মুখে মুখে তার নির্ভুল হিসেব করে ফেলা। অর্থাৎ দুয়ে-দুয়ে চার না করে বাইশ করে ফেলা।

    তখনকার দিনে আমাদের এই চারজনের বন্ধুত্ব একটা দেখবার মত জিনিস ছিল। রোজ সন্ধ্যায় একসঙ্গে বেড়াতে যেতাম হয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বা উডবার্ন পার্কে, নয়তো মিন্টো স্কোয়ারে মালীকে চার আনা পয়সা দিয়ে নৌকা বাইতাম। কোনো দিন বা চলে যেতাম প্রিনসেপ ঘাট, নয়তো ইডেন গার্ডেন। একবার মনে আছে, স্টিমারে করে রাজগঞ্জে গিয়ে, সেখান থেকে আন্দুল পর্যন্ত পায়ে হাঁটা প্রতিযোগিতা করেছিলাম চারজন। আমাদের দলে তখন মাঝে-মাঝে আরো একটি ছেলে আসত। তার নাম রমেশচন্দ্র দাস। কালে ভদ্রে আরো একজন। তার নাম সুনির্মল বসু। “বলিয়া গেছেন তাই মহাকবি মাইকেল, যেওনা যেওনা সেথা যেথা চলে সাইকেল।” মনোহরণ শিশু-কবিতা লিখে এরি মধ্যে সে বনেদী পত্রিকায় প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে।

    শিশির আর বিনয়ের সাহিত্যে বিশেষ প্রতিশ্রুতি ছিল। বিনয়ের ক’টি ছোট গল্প বেরিয়েছিল “ভারতী”তে, তাতে দস্তুরমতো ভালো লেখকের স্বাক্ষর আঁকা। শিশির বেশির ভাগ লিখত “মৌচাকে”, তাতেও ছিল নতুন কোণ থেকে দেখবার উঁকিঝুকি। আমরা চার জন মিলে একটা সংযুক্ত উপন্যাসও আরম্ভ করেছিলাম। নাম হয়েছিল “চতুষ্কোণ”। অবিশ্যি সেটা শেষ হয় নি, শিশির আর বিনয় কখন কোন ফাঁকে কেটে পড়ল কে জানে। সেই একত্র উপন্যাস লেখার পরিকল্পনাটা আমি আর প্রেমেন পরে সম্পূর্ণ করলাম আমাদের প্রথম বই “বাঁকালেখা”য়। জীবনের লেখা যে লেখে সে সোজা লিখতে শেখেনি এই ছিল সেই বইয়ের মূল কথা।

    “আভ্যুদয়িকে”র বৈঠক বসত রোজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। ভালো ঘর পাইনি কিন্তু ভালো সঙ্গ পেয়েছি এতেই সকল অভাব পুষিয়ে যেত। আড্ডায় প্রথম চিড় খেল প্রেমেন ঢাকায় চলে গেলে। সেখানে গিয়ে সে “আভ্যুদয়িকে”র শাখা খুললে, শুভেচ্ছা পাঠাল এখানকার আভ্যুদয়িকদিগের :

    “আভ্যুদয়িকগণ, আমার শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।

    ঢাকায় এসেও আপনাদের ভুলতে পারছি না। আজ বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যায় সেই ছোট ঘরটিতে যখন জলসা জমে উঠবে তখন আমি এখানে বসে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলব বই আর কি করব? ঢাকার আকাশ আজকাল সর্বদাই মেঘে ঢাকা, তবু কবিতার কলাপ বিকশিত হয়ে উঠছে না। আপনাদের আকাশের রূপ এখন কেমন? কোন কবির হৃদয় আজ উতলা হয়ে উঠেছে আপনাদের মাঝে, প্রথম শ্রাবণের কাজল-পিছল (দোহাই তোমার অচিন্ত্য, চুরিটা মাফ কোরো) চোখের কটাক্ষে? কার “বাদল-প্রিয়া” এল মেঘলা আকাশের আড়াল দিয়ে হৃদয়ের গোপন অন্তঃপুরে, গোপন অভিসারে?

    এখানে কিন্তু “এ ভরা বাদর, মাহ—ভাদর নয়, শাঙন, শূন্য মন্দির মোর।” কেউ আপনারা পারেন নাকি মন্দাক্রান্তা ছন্দে দুলিয়ে এই শ্রাবণ-আকাশের পথে মেঘদূত পাঠাতে? কিন্তু ভুলে যাবেন না যেন যে আমি যক্ষপ্রিয়া নই।

    দূর থেকে এই আভ্যুদয়িকে’র নমস্কার গ্রহণ করুন। আর একবার বলি সেই প্রাচীন বৈদিক যুগের সুরে—“সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সংবো মনাংসি জানতাম—”

    আমরা যে যেখানেই থাকি না, আমরা আভ্যুদয়িক।”

    এই সময়কার প্রেমেনের তিনখানা চিঠি—ঢাকা থেকে লেখা :

    “অচিন,

    আজকালকার প্রেমের একটা গল্প শোন।

    সে ছিল একটি মেয়ে, কিশোরী—তনু তার তনুলতা, চোখের কোণে চঞ্চলতাও ছিল, আর তাদের বাড়ীর ছিল দোতলা কিম্বা তেতলায় একটা ছাদ। অবশ্য লাগাও আর একটা ছাদও ছিল। মেয়েটির নাম অতি মিষ্টি কিছু ঠাউরে নে—ভাষায় বললে তার মাধুৰ্য্য নষ্ট হয়ে যাবে। কৈশোরের স্বপ্ন তার সমস্ত তনুবল্লরীকে জড়িয়ে আছে, ফুটন্ত হাসনাহানায় চাঁদের আলোর মত। সে কাজ করে না, কিচ্ছু করে না—শুধু তার পিয়াসী আঁখি কোন সুদূরে কি খুঁজে বেড়ায়। একদিন ঠিক দুপুর বেলা, রোদ চড়চড় করছে অর্থাৎ রুদ্রের অগ্নিনেত্রের দৃষ্টির তলে পৃথিবী মুর্চ্ছিত হয়ে আছে—সে ভুল করে তার নীলাম্বরী শাড়ীখানি শুকোতে দিতে ছাদে উঠেছিল। হঠাৎ তার দূরাগত-পথ-চাওয়া আঁখির দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। ওগো জন্মজন্মান্তরের হৃদয়দেবতা, তোমায় পলকের সৃষ্টিতেই চিনেছি—এইরকম একটা ভাব। হৃদয়দেবতাও তখন লম্বা চুলে টেড়ি কাটছিলেন, সামনেই দেখলেন তীব্র জ্বালাময় আকাশের নীচে স্নিগ্ধ আষাঢ়ের পথহারা মেঘের মত কিশোরীটিকে। আর্শির রোদ ঘুরিয়ে ফেললেন তার মুখে তৎক্ষণাৎ। “ওগো আলোকের দূত এলো তোমার হৃদয় হতে আমার হৃদয়ে।” মেয়েটি একটু হাসলে যেন দূর মেঘের কোলে একটু শীর্ণ চিকুর খেলে গেল। প্রেম হল। কিন্তু পালা এইখানেই সাঙ্গ হল না। আলোকের দূত যাতায়াত করতে লাগল। লোষ্ট্রবাহন লিপিকা তারপর। একদিন লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে হৃদয়দেবতার স্থূল দেহের কপাল নামক অংশবিশেষকে আঘাত করে রক্ত বার করে দিলে ও কালশিরে পড়িয়ে দিলে। হৃদয়দেবতা লিখলেন, ‘তোমার কাছ থেকে এ দান আমার চরম পুরস্কার। এই কালো দাগ আমার প্রিয়ার হাতের স্পর্শ, এ আমার জীবন পথের পাথেয়। তোমার হাতে যা পাই তাইতেই আমার আনন্দ।’ অবশ্য প্রিয়ার হাতের স্পর্শ ও জীবনপথের পাথেয়র ওপর টিঙ্কচার আয়োডিন লাগাতে কোন দোষ নেই। জীবনদেবতা তাই লাগাতেন। এবং বাড়ীর লোক কারণ জিজ্ঞাসা করলে একটা অতি কাব্যগন্ধহীন স্থূল বিশ্রী মিথ্যা বলতে দ্বিধা করেন নি, যথা—‘খেলতে গিয়ে ইটে আছাড় খেয়েছি।’

    ওই পর্যন্ত লিখে নাইতে খেতে গেছলুম। আবার লিখছি। এখানে সাহিত্য জগতের সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা রাখবার সুযোগ নেই। লেখা তো একেবারেই বন্ধ। My Muse is mute. কোন কালে আর সে মুখ খুলবে কিনা জানি না। মাথাটায় এখন ভারী গোলমাল। মাথা স্থির না হলে ভালো আর্ট বেরোয় না, কিন্তু আমার মাথায় ঘূর্ণি চলেছে। শরীর ভালো নয়। বিনয় আর রমেশের ঠিকানা জানি না, পাঠিয়ে দিস।

    খানিক আগে ক’টা প্রজাপতি খেলছিল নীচের ঘাসের জমিটুকুর ওপর। আমার মনে হল পৃথিবীতে যা সৌন্দর্য প্রতি পলকে জাগছে, এ পর্যন্ত যত কবি ভাষার দোলনা দোলালে তারা তার সামান্যই ধরতে পেরেছে—অমৃত-সাগরের এক অঞ্জলি জল, কেউ বা এক ফোঁটা। আমরা সাধারণ মানুষ এই সৌন্দর্যের পাশ দিয়ে চলাচল করি, আর কেউ বা দাঁড়িয়ে এক অঞ্জলি তুলে নেয়। কিন্তু কিছুই হয়নি এখন। হয়ত এমন কাল আসছে যার কাব্যের কথা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। তারা এই মাটির গানই গাইবে, এই সবুজ ঘাসের এই মেঘলা দিনের কিম্বা এই ঝড়ের রাতের–কিন্তু যে সুক্ষ্মতম সুর যে পরম ব্যঞ্জনা আমরা ধরতেও পারি নি তারা তাকেই মূৰ্ত্ত করবে। আমি ভাবতে চেষ্টা কচ্ছি তখন নারীর ভেতর মানুষ কি খুঁজে পাবে। মানুষ দেহের আনন্দ নারীর ভেতর খুঁজতে খুঁজতে আজ এইখানে এসে দাঁড়িয়েছে—সেদিন যেখানে গিয়ে পৌঁছাবে তার আমরা কল্পনাও করতে পারি না। কিন্তু আছে সৃষ্টির অন্তরে অনন্ত অমৃতের পথ—তার কোথায় আজ আমরা? চাই অমৃতের জন্যে তপস্যা। মানুষ ড্রেডনটই তৈরী করুক আর ওয়ারলেসই চালাক এ শুধু বাইরের–ভেতরের সাধনা তার অমৃতের জন্যে।”

    “কিন্তু আসল কথা কি জানিস অচিন, ভালো লাগে না—সত্যি ভালো লাগে না। …বন্ধুর প্রেমে আনন্দ নেই, নারীর মুখেও আনন্দ নেই, নিখিল বিশ্বে প্রাণের সমারোহ চলেছে তাতেও পাই না কোনো আনন্দ। কিন্তু একদিন বোধ হয় পৃথিবীর আনন্দসভায় আমার আসন ছিল—অন্ধকার রাত্রে হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে আকাশের পানে চাইলে মনে হত, সমস্ত দেহ-মন যেন নক্ষত্রলোকের অভিনন্দন পান করছে—অপরূপ তার ভাষা। বুঝতে পারতুম আমার দেহের মধ্যে অমনি অপূৰ্ব রহস্য অনাদি অনন্ত আকাশের ভাষায় সাড়া দিচ্ছে। আজকাল মাঝে মাঝে জোর করেই সেই আসনটুকু অধিকার করতে যাই কিন্তু বৃথাই। ভালো লাগে না, ভালো লাগে না। আশ্চর্য হয়েই ভাবি এই দেহটার মাল মশলা সবই প্রায় তেমনি আছে। হৃৎপিণ্ড তেমনই নাচছে, শিরায় শিরায় রক্ত ছুটছে, ফুসফুস থেকে নিংড়ে নিংড়ে রক্ত বেরুচ্ছে। খাড়া হয়ে হাঁটি, গলা থেকে তেমনি স্বর বেরোয়। এই সেই দেবতার দেহটা এমন হল কেন? আর সে বাজে না। নিখিল-দেবতার এই যে দেহ সে নিখিল-দেবতাকেই এমন করে ব্যঙ্গ করে কেন? …এখানে ধারা-শ্রাবণ, কিন্তু শ্রাবণঘন-গহন মোহে কারুর গোপন চরণ-ফেলা টের পাই না। বৃষ্টিতে দেশ ভেসে গেল কিন্তু আমার প্রাণে তার দৃষ্টি পড়ল না। কেবল শুকনো তৃষ্ণার্ত মাটি—নিস্পন্দ নির্জীব। বর্ষার নৃত্যসভার গান শোনবার জন্যে দেখছি মাটি পাথর মরু ফুড়ে কোণে-কোণে আনাচে-কানাচে পৃথিবীর স্থানে-অস্থানে নব নব প্রাণ মাথা তুলে উঁকি মারছে, কিন্তু আমার জীবনের নবাঙ্কুর শুকিয়ে মরে আছে। আমার মাটি সরস হল না। সেদিন রাত্রে শ্রাবণের সারঙে একটা সুর বাজছিল, সুরটা আমার বহুদিনকার পরিচিত। ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালুম, আশা হচ্ছিল হয়ত পুরোনো বর্ষারাত্রির আনন্দকে ফিরে পাব। কিন্তু হায়, বৃষ্টি শুধু বৃষ্টি, অন্ধকার আকাশ শুধু অন্ধকার আকাশ। এই বৃষ্টি পড়াকে ব্যাখ্যা করতে পারি অনুভব করতে পারি ইন্দ্রিয় দিয়ে কিন্তু অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে পারি না। তাই মেঘের জল শুধু ঝরতে লাগল, আমার হৃদয় সাড়া দিলে না।

    সত্যি নিজেকে আর চিনতে পারি না। তোদের যে প্রেমেন বন্ধু ছিল তাকে আমার মধ্যে খুঁজে খুঁজে পাই না। মনে হয় গাছের যে ডালপালা একদিন দুবাহু মেলে আকাশ আর আলোর জন্যে তপস্যা করত, যার লোভ ছিল আকাশের নক্ষত্র, সে ডালপালা আজ যেন কে কেটেকুটে ছারখার করে দিয়েছে। শুধু অন্ধকার মাটির জীবন্ত গাছের মূলগুলো হাতড়ে-হাতড়ে অন্বেষণ করছে শুধু খাবার, মাটি আর কাদা, শুধু বেঁচে থাকা—কেঁচোর মত বেঁচে থাকা। এ প্রেমেন তোদের বন্ধু ছিল না বোধ হয়।

    বাতি নিবে গেছে। হৃদয়ের বিষাক্তবাতাসে সে কতক্ষণ বাঁচতে পারে? ‘যে প্রদীপ আলো দেয় তাহে ফেল শাস।’

    মানুষের দিকে তাকিয়ে আজকাল কি দেখতে পাই জানিস? সেই আদিম পাশব ক্ষুধা—হিংসা, বিষ, আর স্বার্থপরতা। চোখের বাতায়ন দিয়ে শুধু দেখতে পাই সুসভ্য মানুষের অন্তরে আদিম পশু উৎপেতে আছে। যে চোখ দিয়ে মানুষের মাঝে দেবতাকে দেখতুম সেটা আজ অন্ধপ্রায়। আমার যেন আজকাল ধারণা হয়েছে এই যে, লোকে বন্ধুকে ভালবাসে এটা নেহাৎ মিথ্যে—মানুষ নিজেকেই ভালবাসে। যে বন্ধুর কাছে অর্থাৎ যে মানুষের কাছে সেই নিজেকে ভালবাসার অহঙ্কারটা চরিতার্থ হয়, অর্থাৎ যার কাছ থেকে সে নিজের আত্মম্ভরিতার থোক পায় তাকেই সে ভালবাসে মনে করে। দরকার মানুষের শুধু নিজেকে, শুধু নিজেকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে সে অহঙ্কার চরিতার্থ করতে চায়। বন্ধু হচ্ছে মাত্র সেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখবার আর্শি। ওই জন্যেই তাকে ভালবাসা। যে আর্শি থেকে নিজেকে সব চেয়ে ভাল দেখায় তাকেই বলি সব চেয়ে বড় বন্ধু। বন্ধুর জন্যে বন্ধুকে মানুষ ভালবাসে না—ওটা মিথ্যা কথা—মানুষ নিজের জন্যে বন্ধুকে ভালবাসে। শুধু স্বার্থ, শুধু স্বার্থ। তাই নয় কি?

    আচ্ছা অচিন্ত্য, পড়েছিস তো, ‘এতদিনে জানলেম যে কাঁদন কাদলেন সে কাহার জন্য?’ পেরেছিস কি জানতে? সে কি প্রিয়া? সে প্রিয়াকে পাব কি মেয়েমানুষের মধ্যে? কিন্তু কই? যার জন্যে জীবনভরা এই বিরাট ব্যাকুলতা সে কি ওইটুকু? দিনরাত্রি আকাশ-পৃথিবী ছাড়িয়ে গেল যার বিরহের কান্নায় সে কি ওই চপল ক্ষুদ্র ক্ষুধায় ভরা প্রাণীটা? যাকে নিঃশেষ করে সমস্ত জীবন বিলিয়ে দিতে চাই, যার জন্যে এই জীবনের মৃত্যু-বেদনা-দুঃখ-ভয়-সংকুল পথ বেয়ে চলেছি, সে প্রিয়াকে নারীর ভেতর পাই কই ভাই! কার জন্যে কান্না জানি না বটে, কিন্তু কেন তা তো জানি—এ কথা তো জানি যে এটা দিতে চাওয়ার অশ্রান্ত কান্না। দেব, দেব—মায়ের স্তন যেমন দেবার কান্নায় ব্যথাভরা আনন্দে টলমল করে ওঠে, আমাদের সমস্ত জীবন যে তেমনি ব্যথায় কাঁপছে। কিন্তু কে নেবে ভাই? কে নেবে ভাই নিঃশেষ করে আমাকে, শিশির প্রভাতের আকাশের মত নিঃস্ব, রিক্ত, শূন্য করে, বাশির বেণুর মত নিঃসম্বল করে—কে সে অচিন?”

    “কি কথা বলতে চাই বলতে পারছি না। বুকের ভেতর কি কথার ভিড় বন্ধ ঘরে মৃগনাভির তীব্র ঘ্রাণের মত নিবিড় হয়ে উঠেছে, তবু বলতে পারছি না। কত রকমের কত কথা—তার না পাই খেই না পাই ফাঁক! হাসনাহানার বন্ধ কুঁড়ির মত টনটন করছে সমস্ত প্রাণ—কিন্তু পারছি না বলতে। কাল থেকে কতবার ছন্দে দুলিয়ে দিতে চাইলুম, পারলুম না। ছন্দ দোলে না আর। বোবা বাঁশী যেন আমি, ব্যাকুল সুরের নিশ্বাস শুধু দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে—বাজাতে পারছি না। কত কথা ভাই—যদি বলতে পারতুম!

    গলসওয়ার্দির Apple Tree পড়ছিলুম—না, পড়ে ফেলেছি আজ দুপুরে। সেই না-জানা আপেল-মঞ্জরীর সুবাস বুঝি এমন উদাস করেছে। তুই সেখানে পাস খুঁজে গলসওয়ার্দির Apple Tree গল্পটা পড়িস। Pan ছাড়া এ রকম love story পড়েছি বলে তো মনে পড়ছে না।

    না, শুধু Apple Tree নয় ভাই, এই নতুন শরৎ আমার মনে কি যেন এক নেশা ধরিয়ে দিয়েছে। মরতে চাই না, কিন্তু মরতে আর ভয়ও পাই না বোধ হয়। যে একদিন অযাচিত জীবন দিয়েছিল সেই আবার কেড়ে নেবে তাতে আর ভয় কিসের ভাই। তবে একটু সকাল-সকাল এই যা। তাতে দুঃখ আছে, ভয়ের তো কিছু দেখি না। আজ পর্যন্ত তো ভাই কোটি-কোটি মানুষ এমনি করে চলে গেছে—এমনি করে নীল আকাশ শিউলি মেঘ সবুজ ঘাস বন্ধুর ভালবাসা ছেড়ে—নিস্ফল প্রতিবাদে। তবে? জীবন কেন পেয়েছিলাম তা যথন জানি না, জানি না যখন কোন পুণ্যে, তখন হারাবার সময় কৈফিয়ৎ চাইবার কি অধিকার আছে ভাই? খোঁড়া হয়ে জন্মাই নি, অন্ধ হয়ে জন্মাই নি, বিকৃত হয়ে জন্মাইনি—মার কোল পেলাম, বন্ধুর বুক পেলাম, নারীর হৃদয় পেলাম, তা যতটুকু কালের জন্যেই হোক না—আকাশ দেখেছি, সাগরের সঙ্গীত শুনেছি, আমার চোখের সামনে ঋতুর মিছিল গেছে বার বার, অন্ধকারে তারা ফুটেছে, ঝড় হেঁকে গেছে, বৃষ্টি পড়েছে, চিকুর খেলেছে—কত লীলা কত রহস্য কত বিস্ময়! তবে জীবনদেবতাকে কেন না প্রণাম করব ভাই! কেন না বলব ধন্য আমি—নমো নমো হে জীবনদেবতা!

    যা পেয়েছি তার মান কি রাখতে পেরেছি ভাই? কত অবহেলা কত অপচয় কত অপমান না করলুম! এখনো হয়তো করছি। তাই নো কেড়ে নেবে বলে জোর করে তাকে ভর্ৎসনা করতে পারি না। জানি তুলনা করে তাকে দোষ দিয়েছি কতবার, কিন্তু কি সে যে ভুল ভাই—তার খুশির দান তাতে আমার কি বলবার আছে? কারুর গলায় হয়তো সে বেশী গান দিলে, কাউকে প্রাণ বেশী, কাউকে সে সাজিয়ে পাঠালে, কাউকে না—আমায়ও তো সে রিক্ত করে জাগায়নি।

    তাই ভাবি যখন যাব তখন ভয় কেন? এখনও শিরায় জোয়ার ভাটা চলছে, স্নায়ুতে সাড়া আছে, তবে চোখ বুজে মাথা গুঁজে পড়ব কেন? যেমন অজান্তে এসেছিলাম তেমনি অজান্তে চলে যাব—হয়ত শুধু একটু ব্যথা একটু অন্ধকার একটু যন্ত্রণা। তা হোক। এখন এই নীলাভ নিথর রাত্রি, এই কোমল জ্যোৎস্না, তন্দ্রালস পৃথিবীর গুঞ্জন—সমস্ত প্রাণ দিয়ে পান করি না কেন—এই বাতাসের ক্ষীণ শীতল ছোঁয়া—এই সব।

    এমনি সুন্দর শরতের প্রভাতে নিষ্কলঙ্ক শিশিরের মত না একদিন এসেছিলাম অপরূপ এই নিখিলে। কত বিস্ময় সে সাজিয়েছে, কত আয়োজন কত প্ৰাচুৰ্য্য। কত আনন্দই না দেখলাম। হ্যাঁ, দুঃখও দেখেছি বটে, দেখেছি বটে কদৰ্যতা। মার চোখের জল দেখেছি, গলিত কুষ্ঠ দেখেছি, দেখেছি লোভের নিষ্ঠুরতা, অপমানিতের ভীরুতা, লালসার জন্য বীভৎসতা, নারীর ব্যভিচার, মানুষের হিংসা, কদাকার অহঙ্কার, উন্মাদ, বিকলা, রুগ্ন-গলিত শব। তবু— তবু তুলনা হয় না বুঝি!

    এই যে জাপানের এতগুলো প্রাণ নিয়ে একটা অন্ধ শক্তি নির্মম খেলাটা খেললে—এ দেখেও আবার যখন শান্ত সন্ধ্যায় ঝাপসা নদীর ওপর দিয়ে মন্থর না-খানি যেতে দেখি স্বপ্নের মত পাল তুলে, যখন দেখি পথের কোল পর্যন্ত তরুণ নির্ভয় ঘাসের মঞ্জি এগিয়ে এসেছে, দুপুরের অলস প্রহরে সামনের মাঠটুকুতে শালিকের চলাফেরা দেখি, তখন বিশ্বাস হয় না আমার মত না নিয়ে আমায় এই দুঃখভরা জগতে আনা তার নিষ্ঠুরতা হয়েছে।

    একটা ছোট্ট, অতি ছোট্ট পোকা—একটা পাইকা অক্ষরের চেয়ে বড় হবে না—আমার বইয়ের পাতার উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে পাখা দুটি ছড়িয়ে–কি আশ্চর্য নয়? এইবারের পৃথিৰীতে এই জীবনের পরিচিতদের মধ্যে ও-ও একজন। ওকেও যেতে হবে। আমাকেও।

    কিন্তু এমন অপরূপ জীবন কেনই বা সে দেয়, কেনই বা কেড়ে নেয় কিছু বুঝতে পারি না—শুধু এইটুকুই বিরাট সংশয় রয়ে গেল। যদি এমন নিঃশেষ করে নিশ্চিহ্ন করে মূছেই দেবে তবে এমন অপরূপ করে বিস্ময়েরও অতীত করে দিলে কেন? কেন কে বলতে পারে? এত আশা এত বিশ্বাস এত প্রেম এত সৌন্দৰ্য্য—আমার জগতের চিহ্ন পৰ্যন্ত থাকবে না—কোনো অনাগত কালের তৃণের রস জোগাবে হয়ত আমার দেহের মাটি—অনাগত মানুষের নীলাকাশতলে তাদের রৌদ্রে তাদের বাতাসে তাদের ঝড়ে তাদের বর্ষায় থাকব ধূলা হয়ে বাষ্প হয়ে।  প্ৰীতি-বিনিময় তোর সাথে আমার, দুদিনের জীবনবুদ্বদের সঙ্গে দুদিনের জীবনবুদ্বুদের। তবু জয়তু জীবন জয়, জয় জয় সৃষ্টি—”

    কুস্তি করে সারা গায়ে মাথায় ধুলো মাটি মাখা—কাপড়ের খুঁটটা শুধু গায়ের উপর মেলে দেওয়া—সকালবেলা ভবানীপুরের নির্জন রাস্তা ধরে বাঁশের আড়বাঁশি বাজিয়ে ঘুরে বেড়াত কে একজন। কোন নিপুণ ভাস্কর্যের প্রতিমূর্তি তার শরীর, সবল, সুঠাম, সুতনু। বলশালিতা ও লাবণ্যের আশ্চর্য সমন্বয়। সে দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী। ভবিষ্যতে ভারতবর্ষের যে একজন শ্রেষ্ঠ ভাস্কর হবে, যৌবনের প্রারম্ভেই তার নিজের দেহে তার নির্ভুল আভাস এনেছে। ব্যায়ামে বলসাধনে নিজের দেহকে নির্মাণ করেছে গঠনগৌরবদৃপ্ত, সর্বসঙ্গত করে।

    ইস্কুলে যে-বছর প্রেমেনকে গিয়ে ধরি সেই বছরই দেবীপ্রসাদ বেরিয়ে গেছে চৌকাট ডিঙিয়ে। কিন্তু ভবানীপুরের রাস্তায় ধরতে তাকে দেরি হল না। শম্ভুনাথ পণ্ডিত স্ট্রিট ও চৌরঙ্গীর মোড়ের জায়গাটাতে তখন একটা একজিবিশন হচ্ছে। জায়গাটার হারানো নাম পোড়াবাজার। নামের জন্যেই একজিবিশনটা শেষ পর্যন্ত পুড়ে গিয়েছিল কিনা কে বলবে। একদিন সেই একজিবিশনে দেবীপ্রসাদের সঙ্গে দেখা—একটি সুবেশ সুন্দর ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা কইছে। ভদ্রলোক চলে গেলে জিগগেস করলাম, কে ইনি? দেবীপ্রসাদ বললে, মণীন্দ্রলাল বসু।

    এই সেই? ভিড়ের মধ্যে তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলাম। কোথাও দেখা পেলাম না। এর কত বছর পর মণীন্দ্রলালের সঙ্গে দেখা। “কল্লোল” যখন খুব জমজমাট তখন তিনি ইউরোপে। তারপর “কল্লোল” বার হবার বছর পাঁচেক পরে “বিচিত্রা”য় যখন সাব-এডিটরি করি তখন ভিয়েনা থেকে লেখা তাঁর ভ্রমণকাহিনীর প্রুফ দেখেছি।

    “আভ্যুদয়িক” উঠে গেল। তার সব চেয়ে বড় কারণ হাতের কাছে “কল্লোল” পেয়ে গেলাম। যা চেয়েছিলাম হয়তো, তৈরি কাগজ আর জমকালো আড্ডা। সে সব কথা পরে আসছে।

    একদিন দুজনে, আমি আর প্রেমেন, সকালবেলা হরিশ মুখার্জি রোড ধরে যাচ্ছি, দেখি কয়েক রশি সামনে গোকুল নাগ যাচ্ছে, সঙ্গে দুইজন ভদ্রলোক। লম্বা চুল ও হাতে লাঠি গোকুল চিনতে দেরি হয় না কখনো।

    বললাম, ‘ঐ গোকুল নাগ। ডাকি।’

    ‘না, না, দরকার নেই।’ প্ৰেমেন বারণ করতে লাগল।

    কে ধার ধারে ভদ্রতার! “গোকুলবাবু” “গোকুলবাবু” বলে রাস্তার মাঝেই উচ্চস্বরে ডেকে উঠলাম। ফিরল গোকুল আর তার দুই সঙ্গী।

    প্রেমেনের তখন দুটি গল্প বেরিয়ে গেছে “প্রবাসী”তে—“শুধু কেরাণী” আর “গোপনচারিণী”। আর, সেই দুটি গল্প বাংলা সাহিত্যের গুমোটে সজীব বসন্তের হাওয়া এনে দিয়েছে। এক গল্পেই প্রেমেনকে তখন একবাক্যে চিনে ফেলার মত।

    পরস্পরের সঙ্গে পরিচয় হল। কিন্তু গোকুলের সঙ্গে ঐ দুজন সুচারুদর্শন ভদ্রলোক কে?

    একজন ধীরাজ ভট্টাচার্য।

    আরেকজন?

    ইনি শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। সানন্দবিস্ময়ে তাকালাম ভদ্রলোকের দিকে। বাংলা সাহিত্যে ইনিই সেই কয়লাকুঠির আবিষ্কর্তা! নিঃস্ব রিক্ত বঞ্চিত জনতার প্রথম প্রতিনিধি? বাংলা সাহিত্যে যিনি নতুন বস্তু নতুন ভাষা নতুন ভঙ্গি এনেছেন? হাতির দাঁতের মিনারচূড়া ছেড়ে যিনি প্রথম নেমে এসেছেন ধুলিম্লান মৃত্তিকার সমতলে?

    বিষণ্ণ মমতায় চোখের দৃষ্টিটি কোমল। তখন শৈলজা ‘আনন্দ’ হয়নি, কিন্তু আমাদের দেখে তার চোখ আনন্দে জ্বলে উঠল। যেন এই প্রথম আলাপ হল না, আমরা যেন কত কালের পরিচিত বন্ধু।

    ‘কোথায় যাচ্ছেন?’ জিগগেস করলাম গোকুলকে।

    ‘এই রূপনন্দন না রসনন্দন মুখার্জি লেন। মুরলীবাবুর বাড়ি। মুরলীবাবু মানে ‘সংহতি’ পত্রিকার মুরলীধর বসু।’

    মনে আছে বাড়িতে মুরলীবাবু নেই—কি করা—গোকুলের লাঠির ডগা দিয়ে বাড়ির সামনেকার কাঁচা মাটিতে সবাই নিজের নিজের সংক্ষিপ্ত নাম লিখে এলাম। মনে আছে গোকুল লিখেছিল G. C.—তার নামের ইংরিজি আদ্যাক্ষর। সেই নজিরে দীনেশরঞ্জনও ছিলেন D. R.। কিন্তু গোকুলকে সবাই গোকুলই বলত, G. C. নয়, অথচ দীনেশরঞ্জনকে সবাই ডাকত, D.R.। এ শুধু নামের ইংরিজি আদ্যাক্ষর নয়, এ একটি সম্পূর্ণ অর্থান্বিত শব্দ। এর মানে সকলের প্রিয়, সকলের সুহৃৎ, সকলের আত্মীয় দীনেশরঞ্জন।

  • সেতু

    সেতু

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    সেতু

    হঠাৎ সদ্যোজাত শিশুকণ্ঠের কান্নার শব্দে ঘুম ভাঙিয়া গেল…পাশের ঘর হইতে কে যেন জলদমন্দ্র স্বরে বলিল, ‘লিখে রাখ, ৩রা চৈত্র ১টা ১৭ মিনিটে জন্ম…’

    রাত্রে এক স্বপ্ন দেখিয়াছি। কিছুতেই ভুলিতে পারিতেছি না; এত স্পষ্ট, এত অদ্ভুত। আমার সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে। অহিদত্ত রঞ্জুল, বৃদ্ধ অসিধাবক তণ্ডু, লালসাময়ী রল্লা—

    এ কি স্বপ্ন? না আমারই মগ্নচৈতন্যের স্মৃতিকন্দর হইতে বাহির হইয়া আসিল আমার পূর্বতন জীবনের ইতিবৃত্ত! পূর্বতন জীবন বলিয়া কিছু কি আছে? মৃত্যু জানি, কিন্তু সেইখানেই তো সব শেষ। আবার সেই শেষটাকে শুরু ধরিয়া নূতন কোনও জীবন আরম্ভ হয় নাকি?

    আমার স্বপ্নটা যেন তাহারই ইঙ্গিত দিয়া গেল। একটা মানুষের জীবন— সে মানুষটা কি আমি?— উল্টা দিক দিয়া দেখিতে পাইলাম; এক মৃত্যু হইতে অন্য জন্ম পর্যন্ত। বীজ হইতে অঙ্কুর, অঙ্কুর হইতে ফুল ফল আবার বীজ— ইহাই জীব-জগতের পূর্ণ চক্র। কিন্তু এই চক্র পরিপূর্ণভাবে আমাদের দৃশ্যমান নয়, মাঝখানে চক্রাংশ খানিকটা অব্যক্ত। মৃত্যুর পর আবার জন্ম— মাঝ দিয়া বিস্মরণের বৈতরণী বহিয়া গিয়াছে। আমার স্বপ্ন যেন এই বৈতরণীর উপর সেতু বাঁধিয়া দিল।

    সত্যই কি সেতু আছে? আমি বৈজ্ঞানিক, অলীক কল্পনার ধার ধারি না। আলোকরশ্মি ঋজু রেখায় চলে কি না, এই বিষয় লইয়া গত তিন বৎসর গবেষণা করিতেছি। কঠিন পরিশ্রম করিতে হইয়াছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত বোধ হয় সত্য সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছি। কাল আমার কাজ শেষ হইয়াছে। হালকা মন ও হালকা মস্তিষ্ক লইয়া শয়ন করিতে গিয়াছিলাম। তারপর ঐ স্বপ্ন! ভাবিতেছি, এ-স্বপ্ন যদি অলীক কল্পনাই হয়, তবে সে এই সকল অদ্ভুত উপাদান সংগ্রহ করিল কোথা হইতে? আমার জাগ্রত চেতনার মধ্যে তো এ-সকল অভিজ্ঞতা ছিল না! কল্পনা কি কেবল শূন্যকে আশ্রয় করিয়া পল্লবিত হয়? রক্তের মধ্যে সামান্য একটু কার্বন-ডায়ক্সাইডের আধিক্য কি নিরবয়ব ‘নাস্তি’কে মূর্ত বাস্তব করিয়া তুলিতে পারে?

    জানি না। আমার যুক্তি-বিধিবদ্ধ বুদ্ধি এই স্বপ্নের আঘাতে বিপর্যস্ত হইয়া গিয়াছে।

    যে-শিশু কাঁদিয়া উঠিল, সে কে? আমি? আর সেই জলদমন্দ্র কণ্ঠস্বর!— পুরাতন ডায়েরি খুলিয়া দেখিতেছি ৩৫ বৎসর পূর্বে ৩রা চৈত্র রাত্রি ১টা ১৭ মিনিটে আমার জন্ম হইয়াছিল।

    দেখিতেছি, আমার সম্মুখে অত্যুজ্জ্বল অঙ্গার-পিণ্ড জ্বলিতেছে। বৃহৎ অঙ্গার-চুল্লী, ভস্ত্রার ফুৎকারে উগ্র নির্ধূম প্রভায় উদ্ভাসিত হইয়া উঠিতেছে, আবার ভস্ত্রার বিরামকালে অপেক্ষাকৃত নিস্তেজ রক্তিমবর্ণ ধারণ করিতেছে। এই অগ্নির মধ্যস্থলে প্রোথিত রহিয়াছে আমার অসি-ফলক।

    কক্ষ ঈষদন্ধকার; চারিদিকে নানা আকৃতির লৌহ-ফলক বিক্ষিপ্ত রহিয়াছে। কোনটি খড়্গের আকার ধারণ করিতে করিতে সহসা থামিয়া গিয়াছে; কোনটি দণ্ডের আকারে শূল অথবা মুদ্গরে পরিণত হইবার আশায় অপেক্ষা করিতেছে। প্রাচীরগাত্রে সুসম্পূর্ণ ভল্ল অসি লৌহজালিক সজ্জিত রহিয়াছে। অঙ্গার-পিণ্ডের আলোকে ইহারা ঝলসিয়া উঠিতেছে, পুনরায় ম্লান অস্পষ্ট হইয়া যাইতেছে।

    এই দৃশ্য দেখিতে দেখিতে স্বপ্নলোকে জাগিয়া উঠিলাম। জ্বলন্ত চুল্লীর অদূরে বেত্রাসনে বসিয়া আমি করলগ্ন-কপোলে দেখিতেছি, আর অসিধাবক তণ্ডু অগ্নির সম্মুখে বসিয়া ভস্ত্রা চালাইতেছে।

    এই দৃশ্য আমার কাছে একান্ত পরিচিত, তাই বিস্মিত হইতেছি না। চেতনার মধ্যে ইহার সমস্ত পূর্ব-সংযোগ নিস্ক্রিয়ভাবে সঞ্চিত রহিয়াছে। এই ছায়ান্ধকার কক্ষটি উজ্জয়িনীর প্রসিদ্ধ শস্ত্র-শিল্পী তণ্ডুর যন্ত্রাগার। আমি দক্ষিণ মণ্ডলে উপনিবিষ্ট শক-বাহিনীর একজন পত্তিনায়ক— আমার নাম অহিদত্ত রঞ্জুল। আমি তণ্ডুর যন্ত্রাগারে বসিয়া আছি কেন? অসি সংস্কার করিবার জন্য? তণ্ডুর মতো এত বড় অসি-শিল্পী শুনিয়াছি শক-মণ্ডলে আর নাই, সে অসিতে এমন ধার দিতে পারে যে, নিপুণ শস্ত্রী তাহার দ্বারা আকাশে ভাসমান কাশ-পুষ্পকে দ্বিখণ্ডিত করিতে পারে! কিন্তু এই জন্যই কি গত বসন্তোৎসবের পর হইতে বারবার তাহার গৃহে আসিতেছি?

    চুল্লীর আলোকে তণ্ডুর মুখের প্রত্যেক রেখাটি দেখিতে পাইতেছি। শীর্ণ, রক্তহীন মুখ; গুম্ফ ও ভ্রূর রোম চুল্লীর দাহে দগ্ধ হইয়া গিয়াছে, গণ্ডের চর্ম কুঞ্চিত হইয়া হনু-অস্থিকে প্রকট করিয়া তুলিয়াছে। ললাটের দুই প্রান্ত নিম্ন। অস্থিসার বক্র নাসিকা এই জরাবিধ্বস্ত মুখের চর্মাবরণ ভেদ করিয়া বাহির হইবার প্রয়াস করিতেছে। মুখখানা দেখিলে মনে হয় মৃতের মুখ, শুধু সেই মৃত মুখের মধ্যে কোটরপ্রবিষ্ট চক্ষু দুটা অস্বাভাবিক রকম জীবিত,— ভগ্নমেরু মুমূর্ষু সর্পের চক্ষুর মতো যেন একটা বিষাক্ত জিঘাংসা বিকীর্ণ করিতেছে।

    তণ্ডু যন্ত্রচালিতের মতো কাজ করিতেছে। আমার অসি-ফলক অঙ্গার হইতে বাহির করিয়া রসায়ন-মিশ্র জলে ডুবাইতেছে, সন্তর্পণে ফলকের ধার পরীক্ষা করিতেছে, আবার তাহা অঙ্গারমধ্যে প্রোথিত করিতেছে। তাহার মুখে কথা নাই, কখনও সে সর্পচক্ষু আমার দিকে ফিরাইয়া অতর্কিতে আমাকে দেখিয়া লইতেছে, তাহার পীত-দন্ত মুখ ঈষৎ বিভক্ত হইয়া যাইতেছে, অধরোষ্ঠ একটু নড়িতেছে— যেন সে নিজ মনে কথা কহিল— তারপর আবার কর্মে মন দিতেছে।

    আমিও তাহার পানে চাহিয়া বসিয়া আছি, কিন্তু আমার মন তাহাকে দেখিতেছে না। মন দেখিতেছে— কাহাকে?— রল্লা। লালসাময়ী কুহকিনী রল্লা! আমার ঐ উত্তপ্ত অসি-ফলকের ন্যায় কামনার শিখারূপিণী রল্লা!

    একটা তীক্ষ্ণ বেদনা সূচীর মতো হৃদয়যন্ত্রকে বিদ্ধ করিল। তণ্ডুর দেহ ভাল করিয়া আপাদমস্তক দেখিলাম। এই জরাগলিত দেহ বৃদ্ধ রল্লার ভর্তা। রল্লা আর তণ্ডু! বুকের মধ্যে একটা ঈর্ষা-ফেনিল হাসি তরঙ্গায়িত হইয়া উঠিল— ইহাদের দাম্পত্য জীবন কি রূপ। নিজের দেহের দিকে দৃষ্টি ফিরাইলাম। বক্ষে বাহুতে উদ্ধত পেশী আস্ফালন করিতেছে— পঁচিশ বৎসরের দর্পিত যৌবন! তপ্ত শক-রক্ত যেন শুভ্র চর্ম ফাটিয়া বাহির হইতে চাহিতেছে। — আমি লোলুপ চোরের মতো নানা ছলে তণ্ডুর গৃহে যাতায়াত করিতেছি, আর তণ্ডু— রল্লার স্বামী!

    রল্লা কি কুহক জানে? নারী তো অনেক দেখিয়াছি, — তীব্রনয়না গর্বিতা শক-দুহিতা, মদালসনেত্রী স্ফুরিতাধরা অবন্তিকা, বিলাসভঙ্গিমগতি রতিকুশলা হাস্যময়ী লাট-ললনা। কিন্তু রল্লা— রল্লার জাতি নাই। তাহার তাম্র-কাঞ্চন দেহে নারীত্ব ছাড়া আর কিছু নাই। সে নারী। আমার সমস্ত সত্তাকে সে তাহার নারীত্বের কুহকে জয় করিয়াছে।

    একবার মাত্র তাহাকে দেখিয়াছি, মদনোৎসবের কুঙ্কুম-অরুণিত সায়াহ্নে। উজ্জয়িনীর নগর-উদ্যানে মদনোৎসবে যোগ দিয়াছিলাম। এক দিনের জন্য প্রবীণতার শাসন শিথিল হইয়া গিয়াছে। অবরোধ নাই, অবগুণ্ঠন নাই— লজ্জা নাই। যৌবনের মহোৎসব। উদ্যানের গাছে গাছে হিন্দোলা দুলিতেছে, গুল্মে গুল্মে চটুলচরণা নাগরিকার মঞ্জীর বাজিতেছে, অসম্বৃত অঞ্চল উড়িতেছে, আসব-অরুণ নেত্র ঢুলুঢুলু হইয়া নিমীলিত হইয়া আসিতেছে। কলহাস্য করিয়া কুঙ্কুমপ্রলিপ্তদেহা নাগরী এক তরুগুল্ম হইতে গুল্মান্তরে ছুটিয়া পলাইতেছে, মধ্যপথে থমকিয়া দাঁড়াইয়া পিছু ফিরিয়া চাহিতেছে, আবার পলাইতেছে। পশ্চাতে পুষ্পের ক্রীড়াধনু হস্তে শবরবেশী নায়ক তাহার অনুসরণ করিতেছে। নিভৃত লতানিকুঞ্জে প্রণয়ী মিথুন কানে কানে কথা কহিতেছে। কোনও মৃগনয়না বিভ্রমচ্ছলে নিজ চক্ষু মার্জনা করিয়া কহিতেছে— তুমি আমার চক্ষে কুঙ্কুম দিয়াছ! প্রণয়ী তরুণ সযত্নে তাহার চিবুক ধরিয়া তুলিয়া অরুণাভ নয়নের মধ্যে দৃষ্টি প্রেরণ করিতেছে, তারপর ফুৎকার দিবার ছলে গূঢ়-হাস্য-মুকুলিত রক্তাধর সহসা চুম্বন করিতেছে। সঙ্গে সঙ্গে মিলিত কণ্ঠের বিগলিত হাস্য লতামণ্ডপের সুগন্ধি বায়ুতে শিহরণ তুলিতেছে।

    শত শত নাগর-নাগরিকা এইরূপ প্রমোদে মত্ত— নিজের সুখে সকলেই নিমজ্জিত, অন্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করিবার অবসর নাই। যৌবন চঞ্চল— বসন্ত ক্ষণস্থায়ী; এই স্বল্পকাল-মধ্যে বৎসরের আনন্দ ভরিয়া লইতে হইবে। বৃহৎ কিংশুক বৃক্ষমূলে বেদীর উপর স্নিগ্ধ সুরভিত আসব বিক্রয় হইতেছে— পৈষ্ঠী গৌড়ী মাধুক— নাগরিক-নাগরিকা নির্বিচারে তাহা পান করিতেছে; অবসন্ন উদ্দীপনাকে প্রজ্বলিত করিয়া আবার উৎসবে মাতিতেছে। কঙ্কণ, নূপুর, কেয়ূরের ঝনৎকার, মাদলের নিক্কণ, লাস্য-আবর্তিত নিচোলের বর্ণচ্ছটা, স্খলিত কণ্ঠের হাস্য-বিজড়িত সঙ্গীত;— নির্লজ্জ উন্মুক্তভাবে কন্দর্পের পূজা চলিয়াছে।

    নগর-উপবনের বীথিপথে আমি একাকী ইতস্তত ঘুরিয়া বেড়াইতেছিলাম। মনের মধ্যে একটা নির্লিপ্ত সুখাবেশ ক্রীড়া করিতেছিল। এই সব রসোন্মত্ত নরনারী— ইহারা যেন নট-নটী; আমি দর্শক। সুরাপান করিয়াছিলাম, কিন্তু অধিক নয়। বসন্তের লঘু আতপ্ত বাতাসের স্পর্শে বারুণী-জনিত উল্লাস যেন আমার চিত্তকে আত্মসুখলিপ্সার ঊর্ধ্বে ভাসাইয়া লইয়া চলিয়াছিল। চারিদিকে অধীর আনন্দ-বিহ্বলতা দেখিতেছিলাম; মনে আনন্দের স্পর্শ লাগিতেছিল, আপনা আপনি উচ্চকণ্ঠে হাসিতেছিলাম, কিন্তু তবু এই ফেনোচ্ছল নর্ম-স্রোতে ঝাঁপাইয়া পড়িতে পারিতেছিলাম না। আমি সৈনিক, নাগরিক সাধারণ আমাকে কেহ চিনে না; তাই অপরিচয়ের সঙ্কোচও ছিল; উপরন্তু এই অপরূপ মধু-বাসরে বোধ করি নিজের অজ্ঞাতসারেই গাঢ়তর রসোপলব্ধির আকাঙ্ক্ষা করিতেছিলাম।

    উপবনের মধ্যস্থলে কন্দর্পের মর্মর-দেউল। স্মরবীথিকারা দেউল ঘিরিয়া নৃত্য করিতেছে, বাহুতে বাহু শৃঙ্খলিত করিয়া লীলায়িত ভঙ্গিমায় উপাস্য দেবতার অর্চনা করিতেছে। তাহাদের স্বল্পবাস দেহের মদালস গতির সঙ্গে সঙ্গে বেণীবিসর্পিত কুন্তল দুলিতেছে, চপল মেখলা নাচিতেছে। চোখে চোখে মদসিক্ত হাসির গূঢ় ইঙ্গিত, বিদ্যুৎস্ফুরণের ন্যায় অতর্কিত ভ্রূবিলাস, যেন মদনপূজার উপচাররূপে উৎসৃষ্ট হইতেছে।

    আমি তাহাদের মধ্যে গিয়া দাঁড়াইলাম। পুষ্পধন্বা মদনবিগ্রহকে প্রণাম করিয়া মদনের কিঙ্করীদের প্রতি সহাস্য দৃষ্টি ফিরাইলাম। আমাকে দেখিয়া তাহাদের নৃত্য বন্ধ হইল, তাহারা পুষ্প-শৃঙ্খলের মতো আমাকে আবেষ্টন করিয়া দাঁড়াইল। তারপর তাহাদের মধ্যে একটি বিম্বাধরা যুবতী দ্বিধা-মন্থর পদে আমার সম্মুখে আসিল। আমার মুখের পানে চাহিয়া সে চক্ষু নত করিল, তারপর আবার চক্ষু তুলিয়া একটি চম্পক-অঙ্গুলি দিয়া আমার উন্মুক্ত বক্ষ স্পর্শ করিল। দেখিলাম, তাহার কালো নয়নে কোনও অজ্ঞাত আকাঙ্ক্ষার ছায়া পড়িয়াছে।

    আমি কৌতুকভরে আমার কুঞ্চিত কেশ-বন্ধন হইতে একটি অশোক-পুষ্প লইয়া তাহার চূড়া-পাশে পরাইয়া দিলাম,— তারপর হাসিতে হাসিতে নগরবধূদের বাহুরচিত নিগড় ভিন্ন করিয়া প্রস্থান করিলাম।

    ক্ষণকালের জন্য সকলেই মূক হইয়া রহিল। তারপর আমার পশ্চাতে বহু কলকণ্ঠের হাস্য বিচ্ছুরিত হইয়া উঠিল। আমিও হাসিলাম, কিন্তু পিছু ফিরিয়া দেখিলাম না।

    ক্রমে দিবা নিঃশেষ হইয়া আসিল। পশ্চিম গগনে আবীর-কুঙ্কুমের খেলা আরম্ভ হইল। দিগ্ধধূরাও যেন মদনমহোৎসবে মাতিয়াছে।

    উদ্যানের এক প্রান্তে একটি মাধবীবিতানতলে প্রস্তরবেদীর উপর গিয়া বসিলাম। স্থান নির্জন; অদূরে একটি কৃত্রিম প্রস্রবণ হইতে বৃত্তাকার আধারে  জল ঝরিয়া পড়িতেছে। মণি-মেখলাধৃত জলরাশি সায়াহ্নের স্বর্ণাভ আলোকে টলমল করিতেছে, কখনও রবিরশ্মিবিদ্ধ চূর্ণ জলকণা ইন্দ্রধনুর বর্ণ বিকীর্ণ করিতেছে। যেন সুন্দরী রমণীর অধীর চঞ্চল যৌবন।

    আলস্যস্তিমিত অন্যমনে আলোকের এই জলক্রীড়া দেখিতেছি, এমন সময় সহসা একটি কুঙ্কুম-গোলক আমার বক্ষে আসিয়া লাগিল; অভ্র-আবরণ ফাটিয়া সুগন্ধিচূর্ণ দেহে লিপ্ত হইল। সচকিতে মুখ তুলিয়া দেখিলাম, একটি নারী লতাবিতানের দ্বারে দাঁড়াইয়া আছে।

    তাহাকে দেখিয়া ক্ষণকালের জন্য রুদ্ধবাক্‌ হইয়া গেলাম, বোধ করি হৃদ্‌যন্ত্রের স্পন্দনও কয়েক মুহূর্তের জন্য থামিয়া গেল। তারপর হৃদয় উন্মত্তবেগে আবার স্পন্দিত হইতে লাগিল। চমকিয়া উঠিয়া দাঁড়াইলাম। বিস্ফারিত নেত্র তাহার দেহের উপর নিবদ্ধ রাখিয়া তাহার সম্মুখীন হইলাম।

    তাম্রকাঞ্চনবর্ণা লোলযৌবনা তন্বী; কবরীতে মল্লীমুকুলের মালা জড়িত, মুখে চূর্ণ মনঃশিলার প্রলেপ, কিংশুক-ফুল্ল ওষ্ঠাধর হইতে যেন রতি-মাদকতার মধু ক্ষরিয়া পড়িতেছে। কর্ণে কর্ণিকার কলি গণ্ডের উত্তাপে ম্লান হইয়া গিয়াছে। পত্রলেখা-চিত্রিত উরসে লূতাজালের ন্যায় সূক্ষ্ম কঞ্চুকী, তদুপরি স্বচ্ছতর উত্তরীয় যেন কাশ্মীরবর্ণ কুহেলী দ্বারা অপূর্ণ চন্দ্রকলাকে আচ্ছাদন করিয়া রাখিয়াছে। নাভিতটে আকুঞ্চিত নিচোল; চরণ দুটি লাক্ষারস-নিষিক্ত।

    এই বিমোহিনী মূর্তি কুটিল অপাঙ্গে চাহিয়া নিঃশব্দে মৃদু মৃদু হাসিতেছে। তাহাকে আপাদমস্তক দেখিয়া আমার বুকের মধ্যে ভয়ের মতো একটা অনুভূতি গুরু গুরু করিতে লাগিল। সহসা আমার এ কি হইল? এই তো কিছুকাল পূর্বে মদন-পূজারিণীদের নীরব সঙ্কেত হাসিমুখে উপেক্ষা করিয়া আসিয়াছি! কিন্তু এখন!

    অবরুদ্ধ অস্পষ্ট স্বরে জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘তুমি কে?’

    তাহার অধরোষ্ঠ ঈষৎ বিভক্ত হইল, দশনপংক্তিতে বিজলী খেলিয়া গেল। বঙ্কিম কটাক্ষে ভ্রূ-ধনু বিলসিত করিয়া সে বলিল, ‘আমি রল্লা।’

    রল্লা! তাহার কণ্ঠস্বর ও নামোচ্চারণের ভঙ্গিতে আমার দেহে তীব্র বেদনার মতো একটা নিপীড়ন অনুভব করিলাম। আমি তাহার দিকে আর এক পদ অগ্রসর হইয়া গেলাম। ইচ্ছা হইল— কি ইচ্ছা হইল জানি না। হাসিতে চেষ্টা করিলাম, কিন্তু হাসি আসিল না।

    মদনোৎসবে অপরিচিত তরুণ-তরুণীর সাক্ষাৎকার ঘটিলে তাহারা কি করে? হাসিয়া পরস্পরের দেহে কুঙ্কুম নিক্ষেপ করে, দুই-চারিটা রঙ্গ-কৌতুকের কথা বলে, তারপর নিজ পথে চলিয়া যায়। কিন্তু আমি— মূঢ় গ্রামিকের মতো তাহার সম্মুখে দাঁড়াইয়া রহিলাম। শেষে আবার প্রশ্ন করিলাম, ‘কে তুমি?’

    এবার সে ভঙ্গুর কণ্ঠে কৌতুক ভরিয়া হাসিল, হাসিতে হাসিতে বেদীর উপর আসিয়া বসিল, অধর নয়ন এবং ভ্রূর একটি অপূর্ব চটুল ভঙ্গিমা করিয়া বলিল, ‘দেখিয়াও বুঝিতে পারিতেছ না? আমি নারী।’

    কথাগুলি যেন দৈহিক আঘাতের মতো আমার বুকে আসিয়া লাগিল। নারী— হাঁ, নারীই বটে। ইহা ভিন্ন তাহার অন্য পরিচয় নাই। পুরুষের অন্তর-গুহায় যে অনির্বাণ নারী-ক্ষুধা জ্বলিতেছে, এই নারীই বুঝি তাহাতে পূর্ণাহুতি দান করিতে পারে।

    তারপর কতক্ষণ এই লতাবিতানতলে কাটিয়া গেল জানি না। রল্লার লালসাময় যৌবনশ্রী, তাহার মাদক দেহসৌরভ অগ্নিময় সুরার মতো আমার রক্তে সঞ্চারিত হইল। আমি উন্মত্ত হইয়া গেলাম। কিন্তু তবু— তাহাকে ধরিতে পারিলাম না। ধনুকের গুণ যেমন বাণকে নিজ বক্ষে টানিয়া লইয়াই দূরে নিক্ষেপ করে, রল্লা তেমনই তাহার দেহের কুহকে বারবার আমাকে কাছে টানিয়া আবার দূরে ঠেলিয়া দিল। আমি তাহাকে স্পর্শ করিতে গেলাম, সে চপল চরণে সরিয়া গেল—

    বলিল, ‘তুমি বুঝি ব্যাধ? কিন্তু সুন্দর ব্যাধ, বল— হরিণীকে কি এত শীঘ্র ধরা যায়?’

    তপ্তস্বরে বলিলাম, ‘আমি ব্যাধ নই, তুমি নিষ্ঠুরা শবরী— আমাকে বধ করিয়াছ। তবু কাছে আসিতেছ না কেন?’

    এবারে সে কাছে আসিল। আমার স্পন্দমান বক্ষের উপর একটি উষ্ণ রক্তিম করতল রাখিয়া ছদ্ম গাম্ভীর্যে বলিল, ‘দেখি।’ তারপর যেন ত্রস্তভাবে দ্রুত সরিয়া গিয়া কহিল, ‘কই, বধ করিতে তো পারি নাই! বোধ হয় সামান্য আহত হইয়াছ মাত্র। তোমার কাছে যাইব না, শুনিয়াছি আহত ব্যাঘ্রের নিকট যাইতে নাই।’

    এই চটুলতার সম্মুখে আমি ব্যর্থ হইয়া রহিলাম।

    তখন সে আবার আমার কাছে আসিল। কজ্জল-দূষিত চক্ষে আমার সর্বাঙ্গ লেহন করিয়া একটি অর্ধ-নিশ্বাস ত্যাগ করিল। অস্ফুট স্বরে কহিল, ‘তুমি বোধ হয় ছদ্মবেশী কন্দর্প।’

    আমি তাহার দুই বাহু চাপিয়া ধরিলাম; শরীরের ভিতর দিয়া বিদ্যুৎ শিহরিয়া গেল। তাহাকে নিজের দিকে আকর্ষন করিয়া গাঢ় স্বরে বলিলাম, ‘রল্লা—’

    এই সময় যেন আমার কথার প্রতিধ্বনি করিয়া লতাবিতানের বাহিরে কিয়দ্দূরে কর্কশ কণ্ঠে আহ্বান আসিল, ‘রল্লা! রল্লা—!’

    উৎকণ্ঠ হইয়া রল্লা শুনিল; তারপর হাত ছাড়াইয়া লইল। আমার মুখের দিকে চাহিয়া এক অদ্ভুত হাসি তাহার কিংশুক-ফুল্ল অধরে খেলিয়া গেল। সে বলিল, ‘আমার মদনোৎসব শেষ হইয়াছে। আমি গৃহে চলিলাম।’

    ‘গৃহে চলিলে। — যে ডাকিল সে কে?’

    রল্লা আবার নিদাঘ-বিদ্যুতের মতো হাসিল, ‘আমার— ভর্তা।’

    অকস্মাৎ মুদগরাঘাতের মতো প্রচণ্ড আঘাত পাইয়া যেন বিমূঢ় হইয়া গেলাম। — ‘ভর্তা!’

    রল্লা লতাবিতানের দ্বারের দিকে চলিল। যাইতে যাইতে গ্রীবা ফিরাইয়া বলিল, ‘আমার ভর্তাকে দেখিবে? লতার অন্তরালে লুকাইয়া দেখিতে পার।’ তীক্ষ্ণ বঙ্কিম হাসিয়া রল্লা সহসা অদৃশ্য হইয়া গেল।

    মূঢ়বৎ কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিলাম, তারপর লতামণ্ডপের পত্রান্তরাল সরাইয়া বাহিরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলাম।

    রল্লা আর তণ্ডু মুখোমুখি দাঁড়াইয়া আছে। বৃদ্ধ তণ্ডুর সর্পচক্ষু সন্দেহে প্রখর; রল্লার রক্তাধরে বিচিত্র হাসি।

    তণ্ডু কর্কশ কণ্ঠে বলিল, ‘উৎসব শেষ হইয়াছে, গৃহে চল।’

    রল্লা ক্লান্তিবিজড়িত ভঙ্গিতে দুই বাহু ঊর্ধ্বে তুলিয়া দেহের আলস্য দূর করিল, তারপর বৃদ্ধকে বলিল, ‘চল।’

    তণ্ডু একবার লতাবিতানের দিকে কুটিল দৃষ্টিপাত করিল, একবার যেন একটু দ্বিধা করিল, তারপর বৃদ্ধ ভল্লুকের মতো বিপরীত মুখে চলিতে আরম্ভ করিল। রল্লা মন্থর পদে তাহার পশ্চাতে চলিল।

    যাইতে যাইতে রল্লা একবার নিজের কবরীতে হাত দিল; কবরী হইতে একটি রক্ত কুরুবক খসিয়া মাটিতে পড়িল।

    আমি বাহিরে আসিয়া কুরুবকটি তুলিয়া লইলাম। রল্লা তখন দূরে চলিয়া গিয়াছে, দূর হইতে ফিরিয়া চাহিল। প্রদোষের ছায়াম্লান আলোকে যেন তাহার সর্বাঙ্গ নিঃশব্দ সঙ্কেত করিয়া আমাকে ডাকিল।

    আমি দূরে থাকিয়া তাহার অনুসরণ করিলাম। জনাকীর্ণ নগরীর বহু সঙ্কীর্ণ পথ অতিক্রম করিয়া অবশেষে রল্লা নগরপ্রান্তের এক দীন গৃহের অভ্যন্তরে অদৃশ্য হইয়া গেল। দেখিলাম, গৃহের প্রাচীরে দুইটি অসি চিত্রিত রহিয়াছে।

    তারপর নানা ছুতা করিয়া অসিধাবক তণ্ডুর গৃহে আসিয়াছি। অধীর দুর্নিবার অন্তরে স্থির হইয়া বসিয়া সুযোগের প্রতীক্ষা করিয়াছি। তণ্ডুর যন্ত্রাগারের পশ্চাতে তাহার বাসগৃহ; সেখানে রল্লা আছে, দূর হইতে ক্বচিৎ তাহার নূপুরশিঞ্জন শুনিয়া চমকিয়া উঠিয়াছি; চোখে মুখে উগ্র কামনা হয়তো প্রকাশ হইয়া পড়িয়াছে। তণ্ডু কুটিল বক্র কটাক্ষে আমাকে নিরীক্ষণ করিয়াছে। কিন্তু রল্লাকে দেখিতে পাই নাই— একটা তুচ্ছ সঙ্কেত পর্যন্ত না।

    তণ্ডুর কর্কশ নীরস কণ্ঠস্বরে স্মৃতিতন্দ্রা ভাঙিয়া গেল। সচেতন হইয়া দেখিলাম, সে শীর্ণ অঙ্গুলির প্রান্তে আমার অসির ধার পরীক্ষা করিতেছে, আর কেশহীন ভ্রূ উত্থিত করিয়া শুষ্ক স্বরে কহিতেছে, ‘অসির ধার আর বনিতার লজ্জা পরের জন্য, কি বলেন পত্তিনায়ক?’

    বলিলাম, ‘অসির ধার বটে। বনিতার লজ্জার কথা বলিতে পারি না, আমি অনূঢ়।’

    ‘আমি বলিতে পারি, আমি অনূঢ় নাহি— হা হা—’ তণ্ডুর ওষ্ঠাধর তৃষ্ণার্ত বায়সের মতো বিভক্ত হইয়া গেল— ‘কিন্তু আপনি যদি অনূঢ়, তবে এত তন্ময় হইয়া কাহার ধ্যান করিতেছিলেন? পরস্ত্রীর?’

    আকস্মিক প্রশ্নে নির্বাক্‌ হইয়া গেলাম, সহসা উত্তর যোগাইল না। তণ্ডু কি সত্যই আমার মনের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়াছে? আত্মসংবরণ করিয়া তাচ্ছিল্যভরে বলিলাম, ‘কাহারও ধ্যান করি নাই, তোমার শিল্প-নৈপুণ্য দেখিতেছিলাম।’

    বিকৃত হাস্য করিয়া তণ্ডু পুনশ্চ অসি অঙ্গার মধ্যে প্রোথিত করিল, বলিল, ‘অহিদত্ত রঞ্জুল, আপনি সুন্দর যুবাপুরুষ, এই দীন অসিধাবকের কারু-নৈপুণ্য দেখিয়া আপনার কি লাভ হইবে? বরং নগর-উদ্যানে গমন করুন, সেখানে বহু রসিকা নগর-নায়িকার কলা-নৈপুণ্য উপভোগ করিতে পরিবেন।’

    আমার মনে একটু ক্রোধের সঞ্চার হইল। এই হীনজাত বৃদ্ধ আমাকে ব্যঙ্গ করিতেছে। ঈষৎ রুক্ষ স্বরে বলিলাম, ‘আমি কোথায় যাইব না-যাইব তাহা আমার ইচ্ছাধীন। তুমি সেজন্য ব্যস্ত হইও না।’

    তণ্ডু আমার পানে একটা চকিত-গুপ্ত চাহনি হানিয়া আবার কার্যে মন দিল।

    কিয়ৎকাল পরে বলিল, ‘ভাল কথা, পত্তিনায়ক, আপনি তো যোদ্ধা; শত্রুর উপর অসির ধার নিশ্চয় পরীক্ষা করিয়াছেন?’

    গম্ভীর হাসিয়া বলিলাম, ‘তা করিয়াছি। দুই বৎসর পূর্বে দেবপাদ কণিষ্ক যখন তোমাদের এই উজ্জয়িনী নগরী অধিকার করেন, তখন নাগরিকের কণ্ঠে আমার অসির ধার পরীক্ষা করিয়াছি।’

    তণ্ডুর চক্ষু দুটা ক্ষণেক আমার মুখের উপর নিষ্পলক হইয়া রহিল; তারপর শীৎকারের মতো স্বর তাহার কণ্ঠ হইতে বাহির হইল, ‘পত্তিনায়ক, আপনি বীর বটে। কিন্তু সেজন্য কৃতিত্ব কাহার?’

    ‘কাহার?’

    ‘আমার— এই হীনজন্মা অসিধাবকের। কে আপনার অসিতে ধারা দিয়াছে? আমারই মার্জিত অস্ত্রের সাহায্যে আপনারা আমার ভ্রাতা-পুত্রকে হত্যা করিয়াছেন, স্ত্রী-কন্যাকে অপহরণ করিয়াছেন।’

    আমার মুখ উত্তপ্ত হইয়া উঠিল। বলিলাম, ‘শকজাতি বর্বর নয়। তাহারা যুদ্ধ করিয়াছে কিন্তু নারীহরণ কদাপি করে নাই।’

    তণ্ডু কণ্ঠে খলতার বিষ মিশাইয়া বলিল, ‘বটে! তবে বোধ হয় শকজাতি পরস্ত্রীকে চুরি করিতেই পটু।’

    ক্রোধের শিখা আমার মাথায় জ্বলিয়া উঠিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তণ্ডুর অভিপ্রায়ও বুঝিতে পরিলাম; সে আমার সহিত কলহ করিতে চাহে— যাহাতে আমি আর তাহার গৃহে না আসি। রল্লার লালসায় আমি তাহার গৃহে আসি— ইহা সে বুঝিয়াছে। কিন্তু বুঝিল কি করিয়া?

    কষ্টে ক্রোধ দমন করিয়া বলিলাম, ‘তণ্ডু, তুমি বৃদ্ধ, তোমার সহিত বাগ্‌বিতণ্ডা করিতে চাহি না। আমার অসি যদি তৈয়ার হইয়া থাকে, দাও।’

    সে অসি  জলে ডুবাইয়া আবার অঙ্গুলির সাহায্যে ধার পরীক্ষা করিল। বলিল, ‘অসি তৈয়ার হইয়াছে।’

    তণ্ডুর সহিত কলহ করিয়া আমার লাভ নাই। তাহাকে তুষ্ট করিবার অভিপ্রায়ে আমি পাঁচটি স্বর্ণমুদ্রা তাহার সম্মুখে ফেলিয়া দিয়া বলিলাম, ‘এই লও পঞ্চ নাণক— তোমার পুরস্কার।’

    তণ্ডুর চক্ষু সহসা তাহার অঙ্গারকুণ্ডের মতোই জ্বলিয়া উঠিয়া আবার নিবিয়া গেল। সে চেষ্টাকৃত ধীর স্বরে বলিল, ‘আমার পরিশ্রমের মূল্য এক নাণক মাত্র। বাকি চার নাণক আপনি রাখুন, অন্যত্র প্রমোদ ক্রয় করিতে পরিবেন। — কিন্তু অসির ধার পরীক্ষা করিবেন না?’

    উদগত ক্রোধ গলাধঃকরণ করিয়া আমি বলিলাম, ‘করিব, দাও।’ বলিয়া হাত বাড়াইলাম।

    তণ্ডু কিন্তু অসি দিবার কোনও চেষ্টাই করিল না, তির্যক চক্ষে চাহিয়া বলিল, ‘পত্তিনায়ক, নিজের উপর কখনও নিজের অসির ধার পরখ করিয়াছেন? করেন নাই! তবে এইবার করুন।’

    বৃদ্ধের হস্তে আমার অসি একবার বিদ্যুতের মতো ঝলসিয়া উঠিল। আমার শিরস্ত্রাণের উপর একটি শিখিপুচ্ছ রোপিত ছিল, দ্বিখণ্ডিত হইয়া তাহা ভূতলে পড়িল।

    এইবার আমার অবরুদ্ধ ক্রোধ একেবারে ফাটিয়া পড়িল। এক লম্ফে প্রাচীর হইতে খড়্গ তুলিয়া লইয়া বলিলাম, ‘তণ্ডু, বৃদ্ধ শৃগাল, আজ তোর কর্ণচ্ছেদন করিব।’ জ্বলন্ত ক্রোধের মধ্যে একটা চিন্তা অকস্মাৎ সূক্ষ্ম সূচীর মতো মস্তিষ্ককে বিদ্ধ করিল— তণ্ডুকে যদি হত্যা করি তাহাতেই বা দোষ কি? বরং আমার পথ পরিষ্কার হইবে।

    কিন্তু তাহাকে আক্রমণ করিতে গিয়া দেখিলাম— কঠিন ব্যাপার। বিস্ময়ে আমার ক্রোধ ডুবিয়া গেল। জরা-শীর্ণ তণ্ডুর হস্তে অসি ঘুরিতেছে রথ-নেমির মতো, অসি দেখা যাইতেছে না, কেবল একটা ঘূর্ণ্যমান প্রভা তাহাকে বেষ্টন করিয়া রাখিয়াছে। আমি হটিয়া গেলাম।

    গরলভরা সুরে তণ্ডু বলিল, ‘পত্তিনায়ক অহিদত্ত রঞ্জুল, লতামণ্ডপে লুকাইয়া চপলা পরস্ত্রীর অঙ্গস্পর্শ করা সহজ, পুরুষের অঙ্গ স্পর্শ করা তত হজ নয়।’

    আবার তাহাকে আক্রমণ করিলাম। বুঝিতে বাকি রহিল না, তণ্ডু আরম্ভ হইতেই আমার অভিপ্রায় জানে। লতাবিতানে চুরি করিয়া আমাদের দেখিয়াছিল। কিন্তু এতদিন প্রকাশ করে নাই কেন? আমাকে লইয়া খেলা করিতেছিল?

    অসিতে অসি লাগিয়া স্ফুলিঙ্গ ঠিকরাইয়া পড়িতে লাগিল। কিন্তু আশ্চর্য বৃদ্ধের কৌশল, সে একপদ হটিল না। আমি যোদ্ধা, অসিচালনাই আমার জীবন, আমি তাহার অসি-নৈপুণ্যের সম্মুখে বিষহীন উরগের ন্যায় নিবীর্য হইয়া পড়িলাম। অপ্রত্যাশিতের বিস্ময় আমাকে আরও অভিভূত করিয়া ফেলিল।

    অকস্মাৎ বজ্র-নির্ঘোষের মতো তণ্ডুর স্বর আমার কর্ণে আসিল, ‘অহিদত্ত রঞ্জুল, শক-লম্পট, এইবার নিজ অসির ধার নিজ বক্ষে পরীক্ষা কর—’

    তারপর— কি যেন একটা ঘটিয়া গেল।

    অবাক হইয়া নিজের দিকে তাকাইলাম। দেখিলাম, অসির শাণিত ফলক আমার বক্ষপঞ্জরে প্রোথিত হইয়া আছে!

    তণ্ডু আমার পঞ্জর হইতে আসি টানিয়া বাহির করিয়া লইল। আমি মাটিতে পড়িয়া গেলাম। একটা তীব্র দৈহিক যন্ত্রণা যেন আমার চেতনাকে দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিল। আর কোনও ক্লেশ অনুভব করিলাম না। স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো অনুভব করিলাম, তণ্ডু কর্কশ উল্লাসে বলিতেছে, ‘অহিদত্ত রঞ্জুল, রল্লা তোমাকে বধ করে নাই— বধ করিয়াছে তণ্ডু— তণ্ডু— তণ্ডু—’

    আমার দেহটার সহিত আমার যেন একটা দ্বন্দ্ব চলিতেছে। সে আমাকে ধরিয়া রাখিবার চেষ্টা করিতেছে, আমি বায়ুহীন কারা-কূপে আবদ্ধ বন্দীর মতো প্রাণপণে মুক্ত হইবার জন্য ছটফট করিতেছি। এই টানাটানি ক্রমে অসহ্য হইয়া উঠিল। তারপর হঠাৎ মুক্তিলাভ করিলাম।

    প্রথমটা কিছুই ধারণা করিতে পারিলাম না। তণ্ডুর যন্ত্রগৃহে আমি দাঁড়াইয়া আছি, আমার পায়ের কাছে একটা বলিষ্ঠ রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়িয়া আছে। আর, তণ্ডু ঘরের কোণে খনিত্র দিয়া গর্ত খুঁড়িতেছে এবং ভয়ার্ত চোখে বারবার মৃতদেহটার পানে ফিরিয়া তাকাইতেছে।

    ক্রমে মনন-শক্তি ফিরিয়া আসিল। বুঝিলাম, তণ্ডু আমাকে হত্যা করিয়াছে। কিন্তু আশ্চর্য! আমি তো মরি নাই! ঠিক পূর্বের মতোই বাঁচিয়া আছি। অনির্বচনীয় বিস্ময় ও হর্ষে মন ভরিয়া উঠিল।

    অনুভব করিলাম, আরও কয়েকজন ঘরের মধ্যে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। তাঁহাদের মধ্যে কাহাকেও চিনিলাম, কাহাকেও বা চিনিতে পারিলাম না। একজন আমার কাছে আসিয়া মৃদুহাস্যে বলিল, ‘চল, এখানে থাকিয়া আর লাভ নাই।’

    রল্লার কথা মনে পড়িয়া গেল। মুহূর্তমধ্যে তাহার নিকটে গিয়া দাঁড়াইলাম। একটি বদ্ধ কক্ষে ক্ষুদ্র গবাক্ষপথে সে বাহিরের দিকে চাহিয়া আছে; শুষ্ক চোখে ছুরির ঝলক, ক্ষণে ক্ষণে তীক্ষ্ণ দশনে অধর দংশন করিতেছে। কিন্তু তাহাকে দেখিয়া, তাহার অত্যন্ত কাছে দাঁড়াইয়াও আমার লেশমাত্র বিকার জন্মিল না। সেই তপ্ত লালসা-ফেনিল উন্মত্ততা আর নাই। দেহের সঙ্গে দেহ-জাত আবিলতাও যেন ঝরিয়া গিয়াছে।

    অতঃপর আমার নূতন জীবন আরম্ভ হইল। পার্থিব সময়ের প্রায় দুই সহস্র বর্ষব্যাপী এই জীবন পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা করা সহজ নয়। আমার স্বপ্নে আমি এই দুই হাজার বৎসরের জীবন বোধ হয় দুই ঘণ্টা বা আরও অল্প সময়ের মধ্যে যাপন করিয়াছিলাম; কিন্তু তাহা বর্ণনা করিতে গেলে দুই হাজার পৃষ্ঠাতেও কুলাইবে না।

    জীবিত মানুষ স্থান এবং কালের আশ্রয়ে নিজের সত্তাকে প্রকট করে। কিন্তু প্রেতলোকে আত্মার স্থিতি কেবল কালের মধ্যে। নিরবয়ব বলিয়া বোধ করি তাহার স্থানের প্রয়োজন হয় না।

    শরীর নাই; তাই রোগ কামনা ক্ষুধা তৃষ্ণাও নাই। দেহ-বোধ প্রথম কিছুদিন থাকে, ক্রমে ক্ষয় হইয়া যায়। গতির অবাধ স্বচ্ছন্দতা আছে, অভিলাষমাত্রেই যেখানে ইচ্ছা যাওয়া যায়। সূর্যের জ্বলন্ত অগ্নি-বাষ্পের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছি, লেশমাত্র তাপ অনুভব করি নাই। শৈত্য-উত্তাপের একান্ত অভাবই এ রাজ্যের স্বাভাবিক অবস্থা।

    এখানকার কালের গতিও পার্থিব কালের গতি হইতে পৃথক। পৃথিবীর এক অহোরাত্রে এখানে এক অহোরাত্র হয় না; পার্থিব এক চান্দ্র মাসে আমাদের অহোরাত্র। এই কালের বিভিন্নতার জন্য পার্থিব ঘটনা আমাদের নিকট অতিশয় দ্রুত বলিয়া বোধ হয়।

    অবাধ স্বচ্ছন্দতায় আমার সময় কাটিতে লাগিল। কোটি কোটি বিদেহ আত্মা এখানে আমারই মতো ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। নারী আছে, পুরুষ আছে; সকলেই স্বেচ্ছানুসারে বিচরণ করিতেছে! আপাতদৃষ্টিতে কোনও প্রকার বিধি-নিষেধ লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু তবু, কোথায় যেন একটা অদৃশ্য শক্তি সমস্ত নিয়ন্ত্রণ করিতেছে। সেই শক্তির আধার কে, জানি না; কিন্তু তাহার নিঃশব্দ অনুশাসন লঙ্ঘন করা অসাধ্য।

    সময় কাটিয়া যাইতে লাগিল। এখানে জ্ঞানের পথে বাধা নাই; যাহার মন স্বভাবত জ্ঞানলিপ্সু সে যথেচ্ছ জ্ঞানলাভ করিতে পারে। মর্তলোকে যে-জ্ঞান বহু সাধনায় অর্জন করিতে পারা যায় না, এখানে তাহা সহজে অবলীলাক্রমে আসে। আমি আমার ক্ষুদ্র মানবজীবনে যে-সকল মানসিক সংস্কার ও সংকীর্ণতা সঞ্চয় করিয়াছিলাম তাহা ক্রমশ ক্ষয় হইয়া গেল। অকলঙ্ক জ্ঞান ও প্রীতির এক আনন্দময় অবস্থার মধ্যে উপনীত হইলাম।

    রবি চন্দ্র গ্রহ তারা ঘুরিতেছে, কাল অগ্রসর হইয়া চলিয়াছে। শনৈশ্চর শনিগ্রহ বোধ করি ষাট বারেরও অধিক সূর্যমণ্ডলকে পরিক্রমণ করিল। তারপর একদিন আদেশ আসিল— ফিরিতে হইবে।

    অদৃশ্য শক্তির প্রেরণায় চন্দ্রলোকে উপস্থিত হইলাম। সেখান হইতে সূক্ষ্ম চন্দ্রকর অবলম্বন করিয়া আলোকের বেগে ছুটিয়া চলিলাম।

    পৃথিবীতে ফিরিয়া আসিলাম। হরিৎবর্ণ বিপুল শস্য-প্রান্তর চন্দ্রকরে দুলিতেছে; পরমানন্দে তাহারই অঙ্গে মিলাইয়া গেলাম।

    আমার সচেতন আত্মা কিন্তু অস্তিত্ব হারাইল না— একটি আনন্দের কণিকার মতো জাগিয়া রহিল।

    তারপর এক অন্ধকারলোকে প্রবেশ করিলাম। স্থাণুর মতো নিশ্চল, আত্মস্থ— কিন্তু আনন্দময়।

    সহসা একদিন এই যোগনিদ্রা ভাঙ্গিয়া গেল। ব্যথা অনুভব করিলাম; দেহানুভূতির যে যন্ত্রণা ভুলিয়া গিয়াছিলাম তাহাই নূতন করিয়া আমাকে বিদ্ধ করিল!

    যন্ত্রণা বাড়িতে লাগিল; সেই শ্বাসরোধকর কারাকূপের ব্যাকুল যন্ত্রণা! তারপর আমার কণ্ঠ বিদীর্ণ করিয়া এই যন্ত্রণা অভিব্যক্তি লাভ করিল— তীক্ষ্ণ ক্রন্দনের সুরে।

    পাশের ঘর হইতে জলদমন্দ্র শব্দ শুনিলাম, ‘লিখে রাখ, ৩রা চৈত্র রাত্রি ১টা ১৭ মিনিটে জন্ম।’

    ১৭ চৈত্র ১৩৪৩

  • মরু ও সঙ্ঘ

    মরু ও সঙ্ঘ

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    মরু ও সঙ্ঘ

    মধ্য-এশিয়ার দিক্‌সীমাহীন মরুভূমির মাঝখানে বালু ও বাতাসের খেলা। বিরামহীন অস্থির চঞ্চল খেলা। রাত্রি নাই, দিন নাই, সমগ্র মরুপ্রান্তর ব্যাপিয়া এই খেলা চলিতেছে।

    খেলা বটে, কিন্তু নিষ্ঠুর খেলা; অবোধ শিশুর খেলার মতো প্রাণের প্রতি মমতাহীন ক্রূর খেলা। ক্ষুদ্র মানুষের সৃষ্ট ক্ষুদ্র নিয়মের এখানে মূল্য নাই; জীবনের কোনও মূল্য নাই। দয়া করুণা এখানে আপন শক্তিহীন ক্ষুদ্রতায় ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে।

    প্রকৃতির নিষ্ঠুরতায় কোনও বিধি-বিধান নাই। কখনও পঞ্চাশ বৎসর ধরিয়া বায়ু ও বালুর দুর্লক্ষ্য ষড়যন্ত্রে একটি তৃণশ্যামল নির্ঝর-নিষিক্ত ওয়েসিস ধীরে ধীরে মরুভূমির জঠরস্থ হইতেছে; আবার কখনও একটি দিনের প্রচণ্ড বালু-ঝটিকায় তেমনই শ্যামল লোকালয়পূর্ণ ওয়েসিস বালুস্তূপের গর্ভে সমাহিত হইতেছে। দূরে বহু দূরে হয়তো আর একটি নূতন ওয়েসিসের সূচনা হইতেছে। এমনই অর্থহীন প্রয়োজনহীন ধ্বংস ও সৃজনের লীলা নিরন্তর চলিতেছে।

    এই মরু-সমুদ্রের মাঝখানে ক্ষুদ্র একটি হরিদ্বর্ণ দ্বীপ— একটি ওয়েসিস। দূর হইতে দেখিলে মনে হয়, তৃষ্ণাদীর্ণ ধূসর বালুপ্রান্তরের উপর এক বিন্দু নিবিড় শ্যামলতা আকাশ হইতে ঝরিয়া পড়িয়াছে। কাছে আসিলে দেখিতে পাওয়া যায়, শতহস্তব্যাসবিশিষ্ট একটি শষ্পাঞ্চিত স্থান কয়েকটি খর্জুর বৃক্ষের ধ্বজা উড়াইয়া এখনও মরুভূমির নির্দয় অবরোধ প্রত্যাহত করিতেছে। খর্জুর-ছায়ার অন্তরাল দিয়া একটি প্রস্তরনির্মিত সঙ্ঘারামের অর্ধপ্রোথিত ঊর্ধ্বাঙ্গ দেখা যায়। মধ্য-এশিয়ার মরুভূমিতে প্রাকৃতিক নির্মমতার কেন্দ্রস্থলে মহাকারুণিক বুদ্ধ তথাগতের সঙ্ঘারাম মাথা জাগাইয়া আছে।

    একদিন এই স্থান জনকোলাহলমুখরিত সমৃদ্ধ জনপদ ছিল— দশ ক্রোশ স্থান ব্যাপিয়া নগর হাট উদ্যান চৈত্য বিরাজিত ছিল। শত ক্রোশ দূর হইতে সার্থবাহ বণিক উষ্ট্রপৃষ্ঠে পণ্য লইয়া মরুবালুকার উপর কঙ্কাল-চিহ্নিত পথ ধরিয়া এখানে উপস্থিত হইত। ক্ষুদ্র রাজ্যে একজন ক্ষুদ্র শাসনকর্তাও ছিল; কিন্তু এখন আর কিছু নাই। এমন কি, যে কঙ্কালশ্রেণী মরুপথে বহির্জগতের সহিত সংযোগ রক্ষা করিত, তাহাও লুপ্ত হইয়া গিয়াছে।

    কিঞ্চিদূন পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে বালু ও বাতাস এই স্থানটিকে লইয়া নৃশংস খেয়ালের খেলা আরম্ভ করিয়াছিল। মরু এবং ওয়েসিসের সীমান্ত চিহ্নিত করিয়া খর্জুর বৃক্ষের সারি চক্রাকার প্রাকারের মতো ওয়েসিসকে ঘিরিয়া রাখিয়াছে; এই সীমান্তভূমির উপর সূক্ষ্ম বালুকার পলি পড়িতে লাগিল। কেহ লক্ষ্য করিল না। দুই-তিন বৎসর কাটিল। সহসা একদিন একটি উৎসের জলধারা শুকাইয়া গেল। লক্ষ্য করিলেও কেহ গ্রাহ্য করিল না। আরও অনেক উৎস আছে।

    দশ বৎসর কাটিল। তারপর একদিন সকলে সত্রাসে হৃদয়ঙ্গম করিল— ওয়েসিস সঙ্কুচিত হইয়া আসিতেছে; অলক্ষিতে মরুভূমি অনেকখানি সীমানা গ্রাস করিয়া লইয়াছে।

    অতঃপর ফাঁসির দড়ি যে-ভাবে ধীরে ধীরে কণ্ঠ চাপিয়া প্রাণবায়ু রোধ করিয়া ধরে, তেমনই ভাবে মরুভূমি ওয়েসিসকে চারিদিক হইতে চাপিয়া ক্ষুদ্র হইতে ক্ষুদ্রতর করিয়া আনিতে লাগিল। প্রথমে আহার্য-পানীয়ের অপ্রতুলতা, তারপর বসবাসের স্থানাভাব হইল। যাহারা পারিল পলায়ন করিল; উষ্ট্র-গর্দভপৃষ্ঠে যথাসম্ভব ধনসম্পত্তি লইয়া অন্য বাসস্থানের উদ্দেশে বাহির হইয়া পড়িল। যাহারা তাহা পারিল না, তাহারা শঙ্কাকুলচিত্তে মরুর পানে তাকাইয়া অনিবার্য পরিসমাপ্তির জন্য প্রতীক্ষা করিতে লাগিল। জনপদের জনসংখ্যা অর্ধেকের অধিক কমিয়া গেল।

    মরুভূমির ত্বরা নাই, ব্যস্ততা নাই। নাগ-কবলিত ভেকের ন্যায় ওয়েসিস অল্পে অল্পে মরুর জঠরস্থ হইতে লাগিল।

    এক পুরুষ কাটিয়া গেল। যাহারা যুবক ছিল তাহারা এই অনির্বাণ আতঙ্ক বুকে লইয়া বৃদ্ধ হইল। কিন্তু সৃষ্টির বিরতি নাই; ধ্বংসের করাল ছায়ার তলে নবতর সৃষ্টি জন্মগ্রহণ করিয়া বর্ধিত হইয়া উঠিতে লাগিল।

    একদিন গ্রীষ্মের তাম্রতপ্ত দ্বিপ্রহরে দিগন্তরাল হইতে কৃষ্ণবর্ণ আঁধি উঠিয়া আসিল। মরুভূমির এই আঁধির সহিত তুলনা করিতে পারি পৃথিবীতে এমন কিছু নাই। মহাপ্রলয়ের দিনে শুষ্ক জীর্ণ পৃথিবী বোধ হয় এমনই উন্মত্ত বালু-ঝটিকার আবর্তে চূর্ণ হইয়া শূন্যে মিলাইয়া যাইবে।

    দুই দিন পরে আকাশ পরিষ্কার হইয়া প্রখর সূর্য দেখা দিল। বিজয়িনী প্রকৃতির সগর্ব হাসির আলোয় ওয়েসিস উদ্ভাসিত হইল। দেখা গেল ওয়েসিস আর নাই, পর্বতপ্রমাণ বালুকার তলায় চাপা পড়িয়াছে; কেবল উচ্চ ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত সঙ্ঘারামের অর্ধনিমজ্জিত চূড়া ঘিরিয়া কয়েকটি খর্জুর বৃক্ষ শোকার্তভাবে দাঁড়াইয়া এই সমাধিস্থল পাহারা দিতেছে। মানুষের চিহ্নমাত্র কোথাও নাই।

    দ্বিপ্রহরে সঙ্ঘের উপরিতলের একটি বালু-সমহিত গবাক্ষ হইতে অতি কষ্টে বালুক সরাইয়া বিবরবাসী সরীসৃপের ন্যায় দুইটি প্রাণী বাহির হইল। মানুষই বটে; একজন বৃদ্ধ, দ্বিতীয়টি বলিষ্ঠদেহ যুবা বলিয়া প্রতীয়মান হয়। যুবা বৃদ্ধিকে টানিয়া বাহির করিয়া আনিল। তারপরে উভয়ে বহুক্ষণ গবাক্ষের বাহিরে বালুর উপর পড়িয়া দীর্ঘ শিহরিত প্রশ্বাসে মুক্ত আকাশের প্রাণদায়ী বায়ু গ্রহণ করিতে লাগিল। ক্রমে তাহাদের তৃষ্ণা-বিদীর্ণ অধরোষ্ঠে কালিমালিপ্ত মুখে মানুষী ভাব ফিরিয়া আসিল। চিনিবার মতো কেহ থাকিলে চিনিতে পারিত, একজন সঙ্ঘ-স্থবির পিথুমিত্ত, দ্বিতীয় ভিক্ষু উচণ্ড। বালু-ঝটিকা আরম্ভ হইবার সময় সঙ্ঘের অন্যান্য সকলেই ভীত হইয়া বাহিরে আসিয়াছিল, তাহারা কেহ বাঁচে নাই; কেবল এই দুই জন সঙ্ঘের দ্বিতলস্থ পরিবেণে অবরুদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিলেন, দৈবক্রমে রক্ষা পাইয়াছেন।

    বালুকার স্তূপ ঢালু হইয়া সঙ্ঘের গাত্র হইতে নামিয়া গিয়াছে। উভয়ের বায়ুক্ষুধা কথঞ্চিৎ প্রশমিত হইলে তাঁহারা টলিতে টলিতে নিম্নাভিমুখে অবতরণ করিতে লাগিলেন। বাঁচিতে হইলে জল চাই। সঙ্ঘের পাদমূলে খর্জুরকুঞ্জের মধ্যে একটি প্রস্তর-গুহা হইতে প্রস্রবণ নির্গত হইত, সেখানে দুই জনে উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন, প্রস্রবণের মুখ বুজিয়া গিয়াছে বটে, কিন্তু বালুবন্ধ উৎসের স্বতঃপ্রবাহ রোধ করিতে পারে নাই; গুহামুখের বালুকা সিক্ত হইয়া উঠিয়াছে। আরও দেখিলেন, সেই সিক্ত সিকতার উপর— দুইটি মানবশিশু। প্রথমটি পাঁচ-ছয় বৎসরের বালক, নিদ্রিত অথবা মূর্ছিত হইয়া পড়িয়া আছে; তাহার মেরুসংলগ্ন জঠর ধীরে ধীরে উঠিতেছে পড়িতেছে। দ্বিতীয়টি অনুমান দেড় বৎসরের একটি বালিকা। শুভ্র নগ্নদেহে একাকিনী খেলা করিতেছে, খর্জুর বৃক্ষের চ্যুত পক্ক ফল কুড়াইয়া খাইতেছে, আর নীল নেত্র মেলিয়া আপন মনে কলস্বরে হাসিতেছে। মৃত বা জীবিত আর কেহ কোথাও নাই। প্রকৃতির দুরবগাহ রহস্য। প্রভঞ্জনের ধ্বংস-তাণ্ডবের মধ্যে এই দুইটি সুকুমার জীবন-কণিকা কি করিয়া রক্ষা পাইল?

    দুই ভিক্ষু প্রথমে বালু খনন করিয়া জল বাহির করিলেন। একদণ্ড কাল অঙ্গুলি সাহায্যে গুহামুখ খনন করিবার পর উৎসের পথ মুক্ত হইল— উভয়ে অঞ্জলি ভরিয়া জল পান করিলেন।

    প্রচণ্ড সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলিয়া পড়িয়াছে— খর্জুর বৃক্ষের ছায়া পূর্ব দিগন্তের দিকে দীর্ঘতর অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া কোন্‌ অনাদি রহস্যের ইঙ্গিত জানাইতেছে। সঙ্ঘ-স্থবির পিথুমিত্ত একবার এই সমাধিস্তূপের চারিদিকে চাহিলেন; ঊর্ধ্বে সঙ্ঘের বালু-মগ্ন শিখর, নিম্নে তরঙ্গায়িত বালুকারশি দিক্‌প্রান্তে মিশিয়াছে। তাঁহার শীর্ণ গণ্ড বাহিয়া অশ্রুর দুইটি ধারা গড়াইয়া পড়িল। শিশু দুটিকে নিজ ক্রোড়ে টানিয়া লইয়া স্খলিত কণ্ঠে বলিলেন, ‘তথাগত!’

    অতঃপর মরুভূমির একান্ত নির্জনতার মাঝখানে, বুদ্ধ তথাগতের সঙ্ঘ-ছায়ায় এই চারিটি মানবজীবনের ক্রিয়া আবার নূতন করিয়া আরম্ভ হইল। স্থবির পিথুমিত্ত বালকের নাম রাখিলেন নির্বাণ। বালিকার নাম হইল— ইতি।

    মাধবী পৌর্ণমাসীর প্রভাতে স্থবির পিথুমিত্ত সঙ্ঘের এক প্রকোষ্ঠে বসিয়া পাতিমোক্ষ পাঠ করিতেছিলেন। সঙ্ঘের একমাত্র শ্রমণ, ভিক্ষু উচণ্ড তাঁহার সম্মুখে মেরু-যষ্টি ঋজু করিয়া স্থিরভাবে বসিয়াছিলেন। শ্রোতা কেবল তিনিই।

    দীর্ঘ পঞ্চদশ বৎসর উভয়ের দেহেই কাল-করাঙ্ক চিহ্নিত করিয়া দিয়াছে। সঙ্ঘ-স্থবিরের বয়স এখন ন্যূনকল্পে সত্তর বৎসর। মুণ্ডিত মস্তকে মেদহীন চর্মের আবরণতলে করোটির আকৃতি সুস্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে, দেখিয়া শুষ্ক দাড়িম্বফলের ন্যায় মনে হয়। চক্ষুতারকা বর্ণহীন, দৃষ্টি নিষ্প্রভ— যেন মরুভূমির উষ্ণ নিশ্বাসে চোখের জ্যোতি নির্বাপিত হইয়াছে। তবু, এই জরা-বিশীর্ণ মূর্তির চারি পাশে জীবনব্যাপী সচ্চিন্তা ও শুচিতার মাধুর্য একটি সূক্ষ্ম অতীন্দ্রিয় শ্রী রচনা করিয়া রাখিয়াছে। ত্রিতাপ তাঁহার চিত্তকে স্পর্শ করিতে পারে নাই।

    ভিক্ষু উচণ্ডেরও যৌবন আর নাই; বয়ঃক্রম অনুমান পয়তাল্লিশ বৎসর। কিন্তু দেহ এখনও সবল ও দৃঢ়। সমান্তরালরেখা-চিহ্নিত ললাট-তটে ঘন রোমশ ভ্রূ দুই-একটি পাকিতে আরম্ভ করিয়াছে। চোখের দৃষ্টি কঠোর ও বৈরাগ্যব্যঞ্জক। তাঁহাকে দেখিয়া মনে হয়, প্রকৃতির সহিত নিরন্তর যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হইয়াও তিনি পরাভব স্বীকার করেন নাই; বিদ্রোহীর সদা-জাগ্রত যুযুৎসা তাঁহার ছিন্ন গলিত চীবর ভেদ করিয়া বাহির হইতেছে।

    পাতিমোক্ষ পাঠ শেষ হইল। নিদান হইতে অধিকরণ শমথ পর্যন্ত বিবৃত করিয়া পরিশেষে স্থবির বলিলেন, ‘হে মাননীয় ভিক্ষু, আপনার নিকট পারাজিক সংঙ্ঘাদিশেষ প্রভৃতি ধর্ম আবৃত্তি করিলাম। শেষবার প্রশ্ন করিতেছি, যদি কোনও পাপ করিয়া থাকেন খ্যাপন করুন, আর যদি পাপ না করিয়া থাকেন, নীরব থাকুন।’

    দীর্ঘ পাতিমোক্ষ পাঠ শুনিতে শুনিতে ভিক্ষু উচণ্ড বোধ করি আত্মস্থ হইয়া পড়িয়াছিলেন, অথবা বিষয়ান্তরে তাঁহার মন সংক্রামিত হইয়াছিল; স্থবিরের শেষ জিজ্ঞাসা কর্ণে যাইতেই তিনি চকিত হইয়া একবার নিজের উভয় পার্শ্বে দৃষ্টিপাত করিলেন। তাঁহার ললাটের ভ্রূকুটি যেন ঈষৎ গভীরতর হইল। ওষ্ঠাধর দৃঢ়বদ্ধ করিয়া তিনি মৌন হইয়া রহিলেন।

    স্থবির তখন কহিলেন, ‘হে মাননীয় ভিক্ষু, আপনার মৌনভাব দেখিয়া জানিলাম আপনি পরিশুদ্ধ আছেন।’ মনে হইল এই বাক্যের সঙ্গে সঙ্গে তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস মোচন করিলেন।

    অনুষ্ঠান শেষ হইল।

    দিবা তখনও প্রথম প্রহর অতীত হয় নাই। অলিন্দপথে তির্যক সূর্যরশ্মি প্রবেশ করিয়া কক্ষের ম্লান ছায়াচ্ছন্নতা দূর করিয়াছে। উভয়ে এই তরুণ রবিকর অনুসরণ করিয়া বাহিরের দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। স্বর্ণাভ সিকতার পটভূমিকায় কয়েকটি আন্দোলিত খর্জুরশীর্ষ চোখে পড়িল।

    উভয়ে গাত্রোত্থান করিলেন।

    সহসা উচণ্ড কহিলেন, ‘থের, একটি কথা আপনাকে বলিবার অভিলাষ করিয়াছি। নির্বাণকে উপসম্পদা দান করা কর্তব্য; তাহার বিংশ বর্ষ বয়ঃক্রম হইয়াছে।’

    স্থবির উচণ্ডের মুখের পানে চাহিলেন, তারপর ধীরে ধীরে বলিলেন, ‘নির্বাণের যথার্থ বয়ঃক্রম বিংশ বর্ষ কি না তাহা আমরা জ্ঞাত নাহি।’

    উচণ্ডের কণ্ঠস্বরে ঈষৎ অধীরতা প্রকাশ পাইল, তিনি কহিলেন, ‘এস্থলে অনুমানই যথেষ্ট।’

    স্থবির ক্ষণেক নীরব থাকিয়া বলিলেন, ‘নির্বাণ কি উপসম্পদা লইতে ইচ্ছুক?’

    উচণ্ড কহিলেন, ‘অবশ্য ইচ্ছুক। সঙ্ঘের উপাসকররূপে সে এত কাল আমার নিকট শিক্ষা গ্রহণ করিয়াছে। সঙ্ঘেই সে পালিত ও বর্ধিত, সঙ্ঘ ভিন্ন তাহার স্থান কোথায়?’

    স্থবির আবার রবিকরোজ্জ্বল বহিঃপ্রকৃতির পানে ক্ষণকাল চাহিয়া রহিলেন, শেষে বলিলেন, ‘ভাল, তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখা যাউক।’ আবার মনে হইল একটা দীর্ঘশ্বাস পড়িল।

    উচণ্ড তীক্ষ্ণ চক্ষে স্থবিরের পানে চাহিলেন; একবার যেন কিছু বলিতে উদ্যত হইলেন, কিন্তু পরক্ষণেই বাক্‌ সংযত করিয়া বলিলেন, ‘উত্তম! তাহাকে আপনার নিকট ডাকিয়া আনিতেছি।’ বলিয়া তিনি সঙ্ঘের বাহিরে চলিলেন।

    গত পঞ্চদশ বৎসরে বিহারের বহিরাকৃতির কোনও পরিবর্তন হয় নাই, বালুঝটিকার পর যেমন অর্ধপ্রোথিত ছিল তেমনই আছে। যে বিরাট বালুস্তূপ তাহাকে আবৃত করিয়াছিল তাহা হইতে মুক্ত করা দুই জন মানুষের সাধ্য নয়। উপরিতলের কয়েকটি প্রকোষ্ঠ কোনক্রমে পরিষ্কৃত হইয়াছিল, তাহাতেই ভিক্ষুদ্বয় শিশু দুইটিকে লইয়া আশ্রয় লইয়াছিলেন। সঙ্ঘের নিম্নতল চিরতরে অবরুদ্ধ হইয়া গিয়াছিল।

    সঙ্ঘ হইতে অবতরণ করিয়া উচণ্ড খর্জুরকুঞ্জের দিকে চলিলেন।

    খর্জুরকুঞ্জের ছায়ায় গুহানিঃসৃত প্রস্রবণের মন্দ স্রোত স্বচ্ছ ধারায় বহিয়া গিয়াছে। কাকচক্ষু জল, মাত্র বিতস্তিপ্রমাণ গভীর, নিম্নে বালুকার আকুঞ্চিত স্তর দেখা যাইতেছে।

    গুহামুখের সন্নিকটে নির্বাণ অধোমুখে শয়ান হইয়া মৃদুপ্রবাহিত জলধারার প্রতি চাহিয়া ছিল, দুই বাহুর উপর চিবুক ন্যস্ত করিয়া অন্যমনে কি জানি চিন্তা করিতেছিল। খর্জুরশাখার রন্ধ্রচ্যুত এক ঝলক রৌদ্র তাহার পৃষ্ঠের উপর পড়িয়া তাহার স্বর্ণাভ দেহবর্ণকে মার্জিত ধাতুফলকের ন্যায় উজ্জ্বল করিয়া তুলিতেছিল। ঋজু নাতিমাংসল দেহে কেবল একটি শুভ্র বহির্বাস, কটি হইতে জানু পর্যন্ত আবৃত। উন্মুক্ত স্কন্ধ বাহু ও বক্ষ দৃঢ় পেশীবদ্ধ। মস্তকের কৃষ্ণ কেশ সর্পশিশুর মতো মুখমণ্ডলকে বেষ্টন করিয়া আছে। যৌবনের নবারুণ ঊষালোকে নির্বাণের দেহকান্তি দেখিয়া গ্রীক ভাস্করের রচিত ভাস্কর-দেবতার মূর্তি মনে পড়ে। কিন্তু তাহার মুখে ভাস্কর-দেবতার বিজয়দৃপ্ত গর্বের ব্যঞ্জনা নাই; নবযৌবনের স্বাভাবিক পৌরুষের সহিত চিৎ-শক্তির এক অপরূপ করুণ মাধুর্য মিশিয়াছিল, গ্রীক ভাস্কর এই অপূর্ব সংমিশ্রণ পরিকল্পনা করিতে পারিতেন না।

    প্রস্রবণের দিকে চাহিয়া নির্বাণ চিন্তা করিতেছিল। কি গহন দুরবগাহ তাহার চিন্তা সে নিজেই জানে না। নিষ্পলক দৃষ্টি অগভীর জলের স্তর ভেদ করিয়া নিম্নে, আরও নিম্নে, পৃথিবীর কেন্দ্রগুহায় যেখানে কেবল নিরাসক্ত প্রাণধর্মের ক্রিয়া চলিতেছে— বোধ করি সেইখানেই উপনীত হইয়াছিল। বহিঃপ্রকৃতির প্রতি তাহার মন ছিল না। কিন্তু তথাপি, এই অন্তর্মুখী তন্ময়তার মধ্যেও তাহার চক্ষু এবং শ্রবণেন্দ্রিয় অলক্ষিতে সতর্ক উৎকর্ণ হইয়া ছিল।

    সহসা তাহার বক্ষ বিস্ফারিত করিয়া একটি গভীর নিশ্বাস নির্গত হইল।

    কিছু দিন যাবৎ নির্বাণের মনে এক ভীষণ বিপ্লব উপস্থিত হইয়াছে। যাহারা শিশুকাল হইতে একসঙ্গে বর্ধিত হয়, তাহাদের মনে পরস্পর সম্বন্ধে প্রায় কোনও মোহ থাকে না; নির্বাণের মনেও ইতি সম্বন্ধে মোহ ছিল না। বরং ইতি স্ত্রীসুলভ নমনীয়তায় নির্বাণকে পুরুষত্ব ও বয়োজ্যেষ্ঠতার মর্যাদা দিয়া সসম্ভ্রমে তাহার পিছন পিছন ঘুরিয়াছে। দু’জনে কলহ করিয়াছে, আবার গলা জড়াজড়ি করিয়া খেলা করিয়াছে। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে ইতির দেহে যৌবনের মুকুলোদগম হইয়াছে, আয়ত নীল চোখে সৃষ্টির অনাদি কুহক ফুটিয়া উঠিয়াছে, কিন্তু নির্বাণের মনে ভাবান্তর আসে নাই। ইতি যে নারী এ অনুভূতি তাহার অন্তরকে স্পর্শ করে নাই। এইভাবে পঞ্চদশ বর্ষ কাটিয়াছে। তারপর সহসা একদিন নির্বাণের মনের কৌমার্য পরিণত ফলের প্রান্ত হইতে শীর্ণ পুষ্পদলের মতো খসিয়া গেল।

    সেদিন দ্বিপ্রহরে নির্বাণ একাকী খর্জুরকুঞ্জে দাঁড়াইয়া ঊর্ধ্বমুখে একটা ভ্রমরের গতিবিধি নিরীক্ষণ করিতেছিল। ভ্রমরটা প্রতি বৎসর এই সময় কোথা হইতে আসিয়া উপস্থিত হয়, বহু দূরান্তর হইতে বোধ হয় বাতাসের মুখে বার্তা পায়— মরুর খর্জুরশাখায় ফুল ধরিয়াছে। কৃষ্ণকায় ভ্রমর, পাখায় রামধনুর বর্ণ; সে গভীর গুঞ্জন করিয়া এক পুষ্পমঞ্জরী হইতে অন্য পুষ্পমঞ্জরীতে উড়িয়া যাইতেছে, নিঃশব্দে পুষ্পপাত্রে সঞ্চিত রস পান করিতেছে, আবার উড়িয়া যাইতেছে। নির্বাণ উজ্জ্বল কৌতূহলী চক্ষে মুগ্ধ হইয়া এই দৃশ্য দেখিতেছিল।

    সহসা ইতি পিছন হইতে আসিয়া দুই বাহু দ্বারা নির্বাণের গলা জড়াইয়া ধরিল; উত্তেজনা-সংহত স্বরে তাহার কর্ণে বলিল, ‘নির্বাণ, একটা জিনিস দেখিবে?’

    ইতি স্বচ্ছন্দচারিণী, মরুভূমির যত্রতত্র ঘুরিয়া বেড়ায়; কোথায় বালুর তলে শাখাপত্রহীন মূল বা কন্দ লুক্কায়িত আছে, আহরণ করিয়া আনে। মরুর নিষ্প্রাণ বক্ষে যাহা কাহারও চক্ষে পড়ে না, তাহা ইতির চক্ষে পড়ে।

    নির্বাণ ভ্রমরের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিয়া বলিল, ‘কি?’

    ইতি দুই হস্তে সবলে তাহার মুখ নিজের দিকে ফিরাইল, বলিল, ‘এস, দেখিবে এস।’ বলিয়া তাহার হাত ধরিয়া শবরীর মতো নিঃশব্দ পদে লইয়া চলিল। নির্বাণ দেখিল, আনন্দ-উদ্দীপনায় তাহার দুই চক্ষু নৃত্য করিতেছে।

    ওয়েসিসের সীমান্ত পার হইয়া তাহারা মরুভূমির উপর বহুদূর গমন করিল। মধ্যাকাশে জ্বলন্ত সূর্য, চারিদিকে কোটি কোটি বালুকণায় তাহার তেজ প্রতিফলিত হইতেছে। দু’জনে নীরবে চলিয়াছে, মাঝে মাঝে ইতি নির্বাণের মুখের পানে প্রোজ্জ্বল চক্ষু তুলিয়া চুপি চুপি দু’-একটি কথা বলিতেছে— যেন জোরে কথা বলিলেই তাহার রহস্যময় দ্রষ্টব্য বস্তু মায়ামৃগের ন্যায় মুহূর্তে অন্তর্হিত হইবে।

    প্রায় এক ক্রোশেরও অধিক পথ চলিবার পর সম্মুখে একটা প্রকাণ্ড বালিয়াড়ি পড়িল। সেই বালিয়াড়ির কূর্মপৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া ইতি দিগন্তের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিল, ‘ঐ দেখ।’

    অঙ্গুলির নির্দেশ অনুসরণ করিয়া নির্বাণ সহসা বিস্ময়ে নিস্পন্দ হইয়া গেল। দূরে দিগন্তরেখা যেখানে আকাশে মিশিয়াছে সেইখানে একটি হরিদ্বর্ণ উদ্যান— শ্যামল তরুশ্রেণী বাতাসে আন্দোলিত হইতেছে, তৃণপূর্ণ প্রান্তরে মেষ-ছাগ চরিতেছে; এমন কি, আকাশে নানা আকৃতির পাখি উড়িতেছে, তাহাদের ক্ষুদ্র দেহ সঞ্চরমাণ বিন্দুর মতো দেখা যাইতেছে। একটি নদী এই নয়নাভিরাম শ্যামলতার বুক চিরিয়া খরধার তরবারির মতো পড়িয়া আছে।

    বিস্ময়ের প্রথম অভিভূতির পর প্রতিক্রিয়া আসিল, নির্বাণ উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া উঠিল। ইতি অপেক্ষা তাহার জ্ঞান বেশি।

    ইতি কিন্তু উত্তেজনার আতিশয্যে নির্বানের গলা বাহুবেষ্টিত করিয়া প্রায় ঝুলিয়া পড়িল, মুখের কাছে মুখ লইয়া গিয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল, ‘দেখিতেছ? নির্বাণ, দেখিতেছ? কি সুন্দর! চল, আমরা দুইজনে ঐখানে চলিয়া যাই। আর কেহ থাকিবে না, শুধু তুমি আর আমি। — চল, চল নির্বাণ!’

    স্মিতমুখে নির্বাণ তাহার পানে চাহিল। ইতির পলাশরক্ত অধর নির্বাণের এত নিকটে আসিয়াছিল যে, কিছু না বুঝিয়াই সে নিজ অধর দিয়া তাহা স্পর্শ করিল। সঙ্গে সঙ্গে তাহার মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল, হৃৎপিণ্ডের মধ্যে রক্ত তোলপাড় করিয়া উঠিল। দেহের অভ্যন্তর হইতে স্নায়ুর সীমান্ত পর্যন্ত একটা অনির্বচনীয় তীক্ষ্ণ অনুভূতি অসহ্য হর্ষ-বেদনায় তাহাকে নিপীড়িত করিয়া তুলিল। সে থরথর করিয়া কাঁপিতে লাগিল।

    প্রথম চুম্বনের স্পর্শে ইতি দংশনোদ্যতা সর্পিণীর মতো গ্রীবা পশ্চাতে আকর্ষণ করিয়া নির্বাণের মুখের পানে চাহিল। মনে হইল তাহার নীল নেত্র হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বর্ষণ হইতেছে। ক্ষণকাল এইভাবে থাকিয়া সে দুরন্ত ঝড়ের মতো আবার নির্বাণের বুকের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল। একবার দুইবার, অগণিত বার নির্বাণের অধর চুম্বন করিতে করিতে অবশেষে যেন নিজের দুর্জয় আবেগের নিকট পরাজিত হইয়া শিথিল দেহে অবনত মুখে বালুর উপর বসিয়া পড়িল। শ্রান্ত ঝড়ের অবসন্ন আক্ষেপের মতো তাহার বক্ষ হইতে এক প্রকার অবরুদ্ধ আর্তশ্বাস বাহির হইতে লাগিল।

    নির্বাণও জানু মুড়িয়া তাহার পাশে বসিয়া পড়িল। অকস্মাৎ এ কি হইয়া গেল! এই অজ্ঞাতপূর্ব অচিন্তনীয় আবির্ভাবের সম্মুখে উভয়ে যেন বিমূঢ় হইয়া রহিল।

    বহুক্ষণ দুইজনে এইভাবে অগ্নিবর্ষী আকাশের তলে বসিয়া রহিল। তারপর শুষ্ক তপ্ত চক্ষু তুলিয়া দিগন্তের পানে চাহিল। শ্যামল উপবন তখন অদৃশ্য হইয়াছে।

    অস্ফুট স্বরে নির্বাণ বলিল, ‘মরীচিকা।’

    সেই দিন হইতে নির্বাণের সহিত ইতির সহজ সরল সখ্যের অবসান হইল; নির্বাণ যেন ইতিকে ভয় করিয়া চলিতে আরম্ভ করিল। তাহাকে দূর হইতে দেখিয়া সে সঙ্কুচিত হইয়া উঠে, তাহার সহিত কথা বলিতে রসনা জড়িত হয়, মুখ উত্তপ্ত হইয়া উঠে; অথচ অন্তরের অন্তস্থল হইতে একটা দুর্নিবার আকর্ষণ তাহাকে ইতির দিকে টানিতে থাকে। ইতির তপ্ত কোমল অধর স্পর্শের স্মৃতি মাদক সুরার মতো তাহার চিত্তকে বিশৃঙ্খল করিয়া তোলে। সে এই সর্বগ্রাসী মোহের আক্রমণ হইতে দূরে নির্জনে পলায়ন করিতে চায়।

    ইতির মনোভাব কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত; এত দিন সে নির্বাণের খেলার সাথী ছিল, অনুজা সখী ছিল, আজ বিপুল নারীত্বের সঙ্গে সঙ্গে সে নির্বাণকেও যেন সম্পূর্ণ নিজস্বভাবে পাইয়াছে। নির্বাণ তাহারই, আর কাহারও নয়— নিজ অধর, দেহ, নারীত্বের নিষ্ক্রয়ে সে নির্বাণকে আপন করিয়া লইয়াছে। এই চূড়ান্ত দাবির কাছে পৃথিবীর অন্য সমস্ত দাবি মাথা নীচু করিয়া থাকিবে।

    তাহার আচরণে, এমন কি চাহনিতে ও দেহভঙ্গিমায় এই অবিসম্বাদী অধিকারের গর্ব পরিস্ফুট হইয়া উঠিতে লাগিল। নারী ও পুরুষের প্রভেদ বোধ করি এইখানে।

    ইহাদের অন্তরের এই বিপ্লব অন্য দুইজনের কাছেও গোপন রহিল না। মনুষ্যসমাজে যাহা লজ্জা নামে পরিচিত তাহা ইতি কোনও দিন শিখে নাই, তাই তাহার মনের কথাটি কুণ্ঠাহীন অলজ্জিত আনন্দে প্রকাশ পাইল। পিথুমিত্ত ও উচণ্ড সব দেখিলেন, বুঝিলেন। স্থবিরের বর্ণহীন চক্ষু করুণায় নিষিক্ত হইয়া উঠিল; এত দিন যাহা আশঙ্কিত সম্ভাবনা ছিল, আজ তাহা সত্য হইয়া উঠিয়াছে। হায় তথাগত, সঙ্ঘের বৈরাগ্যভস্মের মাঝখানে এ কোন ভঙ্গুর সুকুমার পুষ্প ফুটাইয়া তুলিলে! ভিক্ষু উচণ্ডের কঠোর ললাটে কিন্তু আঁধির অন্ধকার পুঞ্জিত হইয়া উঠিল। তিনি অন্তরমধ্যে গর্জন করিতে লাগিলেন, ‘মার প্রবেশ করিয়াছে! সঙ্ঘে মার প্রবেশ করিয়াছে!’

    প্রথম দিন হইতেই ক্ষুদ্র মানবিক ইতির প্রতি ভিক্ষু উচণ্ডের মনে একটা বিমুখতা জন্মিয়াছিল। ভিক্ষুর মনে ভেদজ্ঞান থাকিতে নাই; কিন্তু ভিক্ষু উচণ্ড নির্বাণকে কাছে টানিয়া লইলেন, ইতিকে দূরে দূরে রাখিলেন। নির্বাণ ধর্ম-বিষয়ে শিক্ষা পাইতে লাগিল, ইতি মরুবিহারিণী প্রকৃতিকন্যা হইয়া রহিল। ইতির দেহে যখন প্রথম যৌবন-লক্ষণ প্রকাশ পাইল, সবাগ্রে উচণ্ডই তাহা লক্ষ্য করিলেন। তাঁহার বিমুখতা গভীর আক্রোশে পরিণত হইল; ভিক্ষুর নিপীড়িত ব্যর্থ যৌবন যেন ইতির মূর্তি ধরিয়া নিরন্তর তাঁহাকে কশাঘাত করিতে লাগিল। জর্জরিত উচণ্ডের মস্তিষ্কে সঙ্গীতের ধ্রুবপদের ন্যায় কেবল ধ্বনিত হইতে লাগিল— মার প্রবেশ করিয়াছে! মার প্রবেশ করিয়াছে!

    নির্বাণের প্রতিও তাঁহার আচরণ কঠোর হইয়া উঠিল। তিনি দেখিলেন, ইতি সর্বদা নির্বাণের সঙ্গে ঘুরিতেছে, এক দণ্ড উভয়ে পৃথক থাকে না। তাঁহার বক্ষে অগ্নিশলাকা বিদ্ধ হইতে লাগিল। মার প্রবেশ করিয়াছে— ইতি নির্বাণকে প্রলুব্ধ করিবে! তার পর? বুদ্ধের সঙ্ঘ ব্যভিচারের আগার হইয়া উঠিবে! কখনও না— কখনও না! উচণ্ড নির্বাণকে সুকঠিন ব্রহ্মচর্য শিক্ষা দিতে আরম্ভ করিলেন। মনে হইতে লাগিল তিনি নির্বাণকে উপলক্ষ করিয়া ভিক্ষু-জীবনের পুরুষ নির্মমতা নূতন করিয়া সঙ্ঘে প্রবর্তন করিতেছেন।

    নিগৃহীত নিপীড়িত আকাঙ্ক্ষা যখন বিকলাঙ্গ মূর্তিতে বাহির হইয়া আসে, তখন তাহার স্বরূপ সকলে চিনিতে পারে না। সঙ্ঘে সত্যই মার প্রবেশ করিয়াছিল— কিন্তু কাহার দুর্বলতার ছিদ্রপথে প্রবেশ করিয়াছিল তাহা ভিক্ষু উচণ্ড জানিতে পারেন নাই।

    মরুভূমির স্বল্পায়ু বসন্ত এইভাবে নিঃশেষ হইয়া আসিল। ইতিমধ্যে নির্বাণ ও ইতির মনোভাব প্রকট হইয়া পড়িল। তখন একদিন মাধবী পূর্ণিমার প্রভাতে উচণ্ড নির্বাণকে উপসম্পদা দান করিয়া পরিপূর্ণ রূপে সঙ্ঘের নিয়মাধীন করিবার প্রস্তাব করিলেন।

    প্রস্রবণের মুকুরোজ্জ্বল জলে একটি চঞ্চল ছায়া পড়িল। দিবাস্বপ্ন ভাঙিয়া নির্বাণ উঠিয়া বসিল; ইতি আসিতেছে।

    ইতির দেহে একটি মাত্র শ্বেতবস্ত্র। পঞ্চ হস্ত পরিমিত একটি দুকূলপট্টি কটি ও নিতম্ব বেষ্টন করিয়া সম্মুখে বক্ষ আবরণপূর্বক গ্রীবার পশ্চাতে গ্রন্থিবদ্ধ রহিয়াছে; স্কন্ধ ও বাহুমূল উন্মুক্ত। তাহার রুক্ষ কেশভার সুকৃষ্ণ নহে, রৌদ্ররশ্মি পড়িয়া অঙ্গারাবৃত অগ্নিশিখার ন্যায় আরক্ত প্রভা বিকীর্ণ করিতেছে।

    লঘুপদে সঙ্কীর্ণ পয়োধারা উল্লঙ্ঘন করিয়া ইতি নির্বাণের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল; মুষ্টিবদ্ধ হস্ত পশ্চাতে রাখিয়া বলিল, ‘চক্ষু মুদিত কর।’

    নির্বাণ চক্ষু মুদিত করিল।

    ‘হাঁ কর।’

    নির্বাণ মুদিত চক্ষে মুখ ব্যাদান করিল।

    ইতি তাহার মুখে মুষ্টিধৃত গুবাক ফলের মতো একটি ক্ষুদ্র দ্রব্য পুরিয়া দিয়া হাসিতে হাসিতে তাহার পাশে বসিয়া পড়িল, বলিল, ‘এখন বল দেখি, কি খাইতেছ?’

    নির্বাণ চিবাইতে চিবাইতে চক্ষু মেলিয়া বলিল, ‘শর্করা-কন্দ। কোথায় পাইলে?’

    ইতি তখন নির্বাণের গা ঘেঁষিয়া বসিয়া কোথায় শর্করা-কন্দ পাইল তাহা বলিতে আরম্ভ করিল। বালুর নিম্নে মাটি আছে, নানা জাতীয় বিচিত্র বীজকণা সেখানে গিয়া সঞ্চিত হয়। তারপর একদিন প্রকৃতির মন্ত্র-কুহকে অঙ্কুরিত হইয়া আলোকের সন্ধানে ঊর্ধ্বে উঠিতে আরম্ভ করে। কেহ বালু ভেদ করিয়া উঠিতে পারে, কেহ পারে না। বালুকার গর্ভে তাহাদের ফল-কন্দ বর্ধিত হইয়া প্রচ্ছন্ন জীবন যাপন করে। কিন্তু ইতির চক্ষে আবরণ পড়ে নাই। সে দেখিতে পায়। বালু খুঁড়িয়া এই সব রস-পরিপুষ্ট স্বাদু উদ্ভিজ হরণ করিয়া আনে। খর্জুর ভিন্ন যাহাদের অন্য খাদ্য নাই, তাহাদের মুখে ইহা অমৃততুল্য বোধ হয়।

    সানন্দে চর্বণ করিতে করিতে নির্বাণ বলিল, ‘তুমি খাও নাই?’

    ইতির চক্ষু অর্ধনিমীলিত হইয়া আসিল, সে অধরোষ্ঠের একটি বিমর্ষ ভঙ্গিমা করিয়া বলিল, ‘আর কোথায় পাইব? একটিমাত্র পাইয়াছিলাম।’

    নির্বাণের চর্বণক্রিয়া বন্ধ হইল; সে ইতির প্রতি বিস্মিত চক্ষু ফিরাইল। ইতিও চক্ষু পাতিয়া পরম তৃপ্তিভরে নির্বাণের বিস্ময়বিমূঢ় মুখ ক্ষণেক নিরীক্ষণ করিয়া লইল, তারপর কৌতুকবিগলিত কলহাস্য করিয়া তাহার কোলের উপর লুটাইয়া পড়িল।

    নির্বাণ এতক্ষণ যেন আত্মবিস্মৃত ছিল, এখন বিদ্যুদাহতের মতো চমকিয়া শিহরিয়া উঠিল। ঠিক এই সময় পশ্চাৎ হইতে বজ্রগম্ভীর আহ্বান আসিল— ‘নির্বাণ!’

    প্রথমে নির্বাণের মনে হইল, এই ধ্বনি যেন তাহার মস্তিষ্কের মধ্যেই মন্দ্রিত হইয়াছে। তারপর সে মুখ ফিরাইয়া দেখিল, মূর্তিমান তিরস্কারের ন্যায় ভিক্ষু উচণ্ড বক্ষ বাহুবদ্ধ করিয়া অদূরে দাঁড়াইয়া আছেন।

    সভয়ে অপরাধ-কুন্ঠিত দেহে নির্বাণ উঠিয়া দাঁড়াইল। উচণ্ড অঙ্গারগর্ভ চক্ষু তাহার উপর স্থাপন করিয়া গভীর কণ্ঠে একবার বলিলেন, ‘ধিক্‌।’

    নির্বাণের মুখ হইতে সমস্ত রক্ত নামিয়া গিয়া মুখ মৃতের মতো পাণ্ডুর হইয়া গেল। সে আড়ষ্টভাবে দাঁড়াইয়া রহিল।

    উচণ্ড সঙ্ঘের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিলেন, ‘যাও! স্থবির তোমাকে আহ্বান করিয়াছেন।’

    যন্ত্রচালিতের ন্যায় নির্বাণ প্রস্থান করিল।

    ইতি এতক্ষণ নির্বাক্‌ বিভিন্ন-ওষ্ঠাধরে ভূমির উপর বসিয়া ছিল, এখন বিস্ফারিত নেত্র উচণ্ডের মুখের উপর নিবদ্ধ রাখিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল।

    নির্বাণ সঙ্ঘমধ্যে অন্তর্হিত হইয়া গেলে উচণ্ড প্রজ্বলিত চক্ষু ইতির দিকে ফিরাইলেন, তাহার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিয়া কর্কশ কণ্ঠে কহিলেন, ‘স্কন্ধ আবৃত কর।’

    ইতি চকিতে নিজ অঙ্গের প্রতি দৃষ্টি ফিরাইল, তারপর আবার উচণ্ডের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া ধীরে ধীরে কণ্ঠলগ্ন বস্ত্র স্কন্ধের উপর প্রসারিত করিয়া দিল।

    ভীষণ ভ্রূকুটি করিয়া উচণ্ড প্রশ্ন করিলেন, ‘সঙ্ঘের অলিন্দ পরিষ্কৃত করিয়াছ?’

    ‘হাঁ অজ্জ, করিয়াছি।’

    ‘জল সঞ্চয় করিয়াছ?’

    ‘হাঁ অজ্জ, করিয়াছি।’

    ‘ফল সংগ্রহ করিয়াছ?’

    ‘হাঁ অজ্জ, করিয়াছি।’

    উচণ্ড অধর দংশন করিলেন। ইতিকে শাসনাধীনে আনা অসম্ভব— সে নারী, ভিক্ষুসঙ্ঘে ভিক্ষুণীর স্থান নাই। উচণ্ড তাহার সর্বাঙ্গে একটা অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া দ্রুত সঙ্ঘের অভিমুখে চলিলেন। ইতি দুই চক্ষে দুর্জ্ঞেয় দৃষ্টি লইয়া চিত্রার্পিতের ন্যায় দাঁড়াইয়া রহিল।

    ওদিকে নির্বাণ স্থবিরের সম্মুখে উপস্থিত হইয়াছিল, তাঁহার চরণ স্পর্শ করিয়া বলিল, ‘বন্দে।’

    স্থবির তাহার পৃষ্ঠে হস্তীর্পণ করিয়া স্নেহার্দ্রস্বরে আশীর্বচন করিলেন— ‘আরোগ্য।’

    নির্বাণের অপরাধ-সঙ্কুচিত চিত্ত বোধ হয় স্থবিরের নিকট তীব্র ভর্ৎসনা প্রত্যাশা করিতেছিল, তাই তাঁহার স্নেহসিক্ত বচনে তাহার হৃদয় সহসা দ্রবীভূত হইয়া গেল, চক্ষু বাষ্পাচ্ছন্ন হইয়া উঠিল। সে স্থবিরের পদপ্রান্তে বসিয়া পড়িল।

    স্থবির তখন ধীরে ধীরে বলিলেন, ‘নির্বাণ, তোমার উপাধ্যায়ের নিকট জানিতে পারিলাম তুমি উপসম্পদা গ্রহণে অভিলাষী। ইহা সত্য?’

    নির্বাণ যেন কূল পাইল, অবরুদ্ধ স্বরে বলিল, ‘হাঁ ভদন্ত, আমাকে উপসম্পদা দান করিয়া সঙ্ঘে গ্রহণ করুন।’

    স্থবির কিছুকাল নীরব রহিলেন; তারপর বলিলেন, ‘নির্বাণ, তুমি সদ্ধর্মে শিক্ষা লাভ করিয়াছ; সঙ্ঘে প্রবেশ করিতে হইলে নশ্বর আসক্তি কামনা ত্যাগ করিয়া আসিতে হয়, ইহা নিশ্চয় তোমার অপরিজ্ঞাত নহে। সঙ্ঘের বিধি-বিধান অতি কঠোর, তুমি পালন করিতে পারিবে?’

    এই সময় উচণ্ড প্রবেশ করিয়া নীরবে এক পার্শ্বে দাঁড়াইলেন; নির্বাণ অবনত মস্তকে বলিল, ‘হাঁ ভদন্ত, পারিব।’

    ‘না পারিলে পাতিমোক্ষ দণ্ড গ্রহণ করিতে হইবে— বিনয়পাঠে অবশ্য তাহা অবগত আছ?’

    ‘আছি, ভদন্ত।’

    স্থবির তখন করুণ বচনে বলিলেন, ‘বৎস, ব্যাধতাড়িত পশু গুহার মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে, ত্রিতাপক্লিষ্ট মানব নিষ্কৃতির কামনায় ধর্মের অনুরাগী হয়। বুদ্ধের সঙ্ঘ সেরূপ স্থান নহে। যাহার অন্তরে বৈরাগ্য এবং নির্বাণ-তৃষ্ণা জন্মিয়াছে, সে-ই সঙ্ঘের অধিকারী। তুমি এই সকল বিচার করিয়া উত্তর দাও।’

    গলদশ্রু নির্বাণ যুক্তকরে বলিল, ‘আমি সঙ্ঘের আশ্রয় ভিক্ষা করিতেছি— সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি। আমাকে উপসম্পদা দান করুন।’

    গভীর নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া স্থবির বলিলেন, ‘বুদ্ধের ইচ্ছাই পূর্ণ হউক।’

    জলদগন্তীর স্বরে উচণ্ড প্রতিধ্বনি করিলেন, ‘বুদ্ধের ইচ্ছা পূর্ণ হউক।’

    অতঃপর বিধিমত প্রশ্নোত্তরদানপূর্বক ভিক্ষাপাত্র ও ত্রি-চীবর ধারণ করিয়া কেশ মুণ্ডিত করিয়া নির্বাণ ভিক্ষুধর্ম গ্রহণ করিল। সংসারে আর তাহার অধিকার রহিল না।

    ভিক্ষু উচণ্ডই নির্বাণের আচার্য রহিলেন; নাম পরিবর্তন প্রয়োজন হইল না। ছায়া পরিমাপ ইত্যাদি বিধি সমাপ্ত হইবার পর উচণ্ড বিজয়োদ্ধত কণ্ঠে কহিলেন, ‘বুদ্ধ জয়ী হইয়াছেন, মার পরাভূত হইয়াছে। ভিক্ষু, নিজ পরিবেণে গমন কর। অদ্য হইতে নারীর মুখদর্শন তোমার নিষিদ্ধ।’

    নতনেত্রে নির্বাণ নিজ পরিবেণে প্রবেশ করিল।

    স্থবির নিজ মনে বলিতে লাগিলেন, ‘হে শাক্য, হে লোকজ্যেষ্ঠ, আমাদের ভ্রান্তি অপনোদন কর, অজ্ঞানমসী দূর কর, সম্যক্ দৃষ্টি দান কর—’

    তিন দিন নির্বাণ নিজ পরিবেণ হইতে বাহির হইল না। আর ইতি! দেহবিচ্ছিন্ন ছায়ার মতো সে সঙ্ঘভূমির উপর দিবারাত্র বিচরণ করিয়া বেড়াইতে লাগিল।

    সঙ্ঘের প্রত্যেক অধিবাসীর পরিবেণ স্বতন্ত্র। সঙ্ঘারামের উপরিতলে যে-কয়টি প্রকোষ্ঠ ছিল তাহার একটিতে ইতি রাত্রিযাপন করিত; অলিন্দের অন্য প্রান্তে তিনটি বিভিন্ন কক্ষে নির্বাণ উচণ্ড ও স্থবির বাস করিতেন। স্থবিরের অনুমতি ব্যতীত একের প্রকোষ্ঠে অন্যের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল।

    নির্বাণের সহিত ইতির আর সাক্ষাৎ হয় না। ইতি সঙ্ঘের কাজ করে, আর নানা অছিলায় নির্বাণের পরিবেণের সম্মুখ দিয়া যাতায়াত করে। কখনও দেখে, নির্বাণ পুঁথি লইয়া নিমগ্নচিত্তে অধ্যয়ন করিতেছে; কখনও বা দেখিতে পায়, উচণ্ড তাহাকে উপদেশ দিতেছেন। কদাচিৎ নির্বাণ গবাক্ষের বাহিরে দৃষ্টি প্রসারিত করিয়া চিন্তায় নিমজ্জিত হইয়া থাকে। ইতির পদশব্দে তাহার চেতনা হয় না। ইতি নিশ্বাস ফেলিয়া সরিয়া যায়।

    ভিক্ষু উচণ্ডের মন কিন্তু শান্ত হইতেছে না; কোথাও যেন একটা মস্ত ভ্রান্তি রহিয়া গিয়াছে। নির্বাণ যতই কঠোরভাবে নিজেকে নিগৃহীত করিয়া সঙ্ঘ-ধর্মে আত্মনিয়োগ করিতেছে, তাঁহার অন্তরে সংশয় ও দ্বন্দ্ব ততই মাথা তুলিতেছে। নির্বাণকে সঙ্ঘের শাসনে আবদ্ধ করিয়াও তাঁহার অভীষ্ট সিদ্ধ হইল না— ইতি ও নির্বাণের মধ্যস্থিত আকর্ষণ-রজ্জু দূরত্বের ফলে দৃঢ়তর হইল মাত্র। কুশাগ্রবৎ সূক্ষ্ম ঈর্ষা ক্রমশ কণ্টক হইয়া উচণ্ডকে ক্ষতবিক্ষত করিয়া তুলিল। আপন অজ্ঞাতে নির্বাণকে তিনি নিবিড়ভাবে ঘৃণা করিতে আরম্ভ করিলেন।

    একদিন মধ্যরাত্রে চন্দ্রের আলোক গবাক্ষপথে নির্বাণের পরিবেণে প্রবেশ করিয়াছিল; অন্ধকার কক্ষে শুভ্র সূক্ষ্ম চীনাংশুকের মতো এক খণ্ড জ্যোৎস্না যেন আকাশ হইতে স্খলিত হইয়া পড়িয়াছিল। নির্বাণের চোখে নিদ্রা নাই, সে ঐ গবাক্ষের দিকে চাহিয়া ভূ-শয্যায় শয়ান ছিল।

    নিস্তব্ধ রাত্রি; সঙ্ঘের কোথাও একটি শব্দ নাই। নির্বাণ নিঃশব্দে শয্যা ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইল; তারপর ছায়ামূর্তির মতো অলিন্দ উত্তীর্ণ হইয়া সঙ্ঘের বাহিরে উপস্থিত হইল।

    খর্জুরকুঞ্জতলে জ্যোৎস্না-তরলিত স্বল্পান্ধকার যেন ইন্দ্রজাল রচনা করিয়া রাখিয়াছে। ঊর্ধ্বে খর্জুরশাখা ক্বচিৎ তন্দ্রালস মর্মরধ্বনি করিতেছে, নিম্নে প্রস্রবণের উৎসমুখে উদগত জলের মৃদু কলশব্দ। চারি দিকে অপার মরুভূমির উপর চন্দ্ররশ্মির শীতল প্রলেপ। নির্বাণের বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া একটি দীর্ঘশ্বাস পড়িল। এই দৃশ্য তাহার চিরপরিচিত; কিন্তু আজ আর ইহার সহিত তাহার কোনও সম্বন্ধ নাই— সে বহু দূরে চলিয়া গিয়াছে।

    ‘নির্বাণ!’

    প্রস্রবণের কলধ্বনির মতোই মৃদু কণ্ঠস্বর। চমকিয়া নির্বাণ ফিরিয়া চাহিল। শুভ্র বালুকার উপর বায়ুতাড়িত কাশীপুষ্পের ন্যায় ইতি তাহার পানে ছুটিয়া আসিতেছে! তাহার চরণ যেন মৃত্তিকা স্পর্শ করিতেছে না; চন্দ্রকরকুহেলির ভিতর দিয়া স্মিতক্ষুধিত মুখখানি অস্পষ্ট দেখা যাইতেছে।

    ‘না— না— না’ দুই হস্তে চক্ষু আবৃত করিয়া নির্বাণ পলায়ন করিল। ঊর্ধ্বশ্বাসে নিজ পরিবেণে প্রবেশ করিয়া অধোমুখে ভূতলে পড়িয়া ঘন ঘন নিশ্বাস ত্যাগ করিতে লাগিল।

    ফিরিবার সময় নির্বাণের পদপাত সম্পূর্ণ নিঃশব্দ হয় নাই; অন্য পরিবেণে আর একজনের নিদ্রাভঙ্গ হইয়াছিল।

    পরদিন মধ্যরাত্রে আবার চন্দ্ররশ্মি নির্বাণের গবাক্ষ-পথে প্রবেশ করিয়া দুর্নিবার শক্তিতে বাহিরের পানে টানিতে লাগিল। নির্বাণ অনেকক্ষণ নিজের সহিত যুদ্ধ করিল— কিন্তু পারিল না। মোহগ্রস্তের মতো খর্জুরছায়াতলে গিয়া দাঁড়াইল।

    ‘নির্বাণ!’

    ইতি তাহার পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। কিন্তু আজ আর নির্বাণ পলাইল না; সমস্ত দেহের স্নায়ুপেশী কঠিন করিয়া অন্য দিকে মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইয়া রহিল।

    ‘নির্বাণ, আর তুমি আমার সহিত কথা কহিবে না?’

    নির্বাণ উত্তর দিল না; কে যেন তাহার কণ্ঠ দৃঢ়মুষ্টিতে চাপিয়া ধরিয়াছে।

    ইতি সশঙ্ক লঘু হন্তে তাহার বাহু স্পর্শ করিল।

    ‘নির্বাণ, আর তুমি আমার মুখ দেখিবে না?’

    ইতির কণ্ঠস্বরে শক্তি নাই— ভাঙা ভাঙা অর্ধোচ্চারিত উক্তি। নির্বাণের স্নায়ু-কঠিন দেহ অল্প অল্প কাঁপিতে লাগিল।

    ‘নির্বাণ, একবার আমার পানে চাও’— ইতি চিবুক ধরিয়া নির্বাণের মুখ ফিরাইবার চেষ্টা করিল।

    স্নায়ুপেশীর নিরুদ্ধ বন্ধন সহসা যেন ছিঁড়িয়া গেল; জ্যা-মুক্ত ধনুর ন্যায় নির্বাণের উৎক্ষিপ্ত একটা বাহু ইতির মুখে গিয়া লাগিল। ইতি অস্ফুট একটা কাতরোক্তি করিয়া অধরের উপর হাত রাখিয়া বসিয়া পড়িল।

    নির্বাণ ব্যাকুল চক্ষে একবার তাহার পানে চাহিল। তারপর— ‘না না— আমি ভিক্ষু— আমি ভিক্ষু— আমি ভিক্ষু—’

    অন্ধের মতো, উন্মাদের মতো নির্বাণ সে স্থান ছাড়িয়া চলিয়া গেল।

    একজন অলক্ষিতে থাকিয়া এই দৃশ্য দেখিলেন। কিন্তু তাঁহার অশান্ত চিত্ত আশ্বস্ত না হইয়া আরও দুর্বার ক্রোধে আলোড়িত হইয়া উঠিল। মার পরাভূত হয় নাই। সঙ্ঘ অশুচি হইয়াছে। এ-পাপ দূর করিতে হইবে— নচেৎ বুদ্ধের ক্রোধানলে সঙ্ঘ ভস্মীভূত হইবে।

    কৃষ্ণাপঞ্চমীর ক্ষীয়মাণ চন্দ্র প্রায় মধ্যগগন অতিক্রম করিয়া গিয়াছে।

    রাত্রি শেষ হইতে আর বিলম্ব নাই।

    সঙ্ঘ নিস্তব্ধ, কোথাও কোনও শব্দ নাই; বুঝি ব্রাহ্মমুহূর্তের প্রতীক্ষায় নির্বাণ-সমাধিতে নিমগ্ন।

    ভিক্ষু উচণ্ড স্থবিরের পরিবেণে প্রবেশ করিয়া অন্ধকারে গাত্রস্পর্শ করিয়া তাঁহাকে জাগরিত করিলেন। সর্পশ্বাসবৎ স্বরে তাঁহার কর্ণে বলিলেন, ‘আমার সঙ্গে আসুন।’

    নিঃশব্দে দুইজনে ইতির প্রকোষ্ঠের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। ম্লান তির্যক কাক-জ্যোৎস্না কক্ষের মসৃণ ভূমির উপর প্রতিফলিত হইতেছে। সেই অস্পষ্ট আলোকে স্থবির দেখিলেন, ইতি একটি উচ্চ পীঠিকার উপর বসিয়া আছে; আর, বেদীমূলে প্রণতি-রত উপাসকের ন্যায় নির্বাণ নতদেহে তাহার জানুর উপর মস্তক রাখিয়া স্থির হইয়া আছে। ইতির কটি হইতে ঊর্ধ্বাঙ্গ কেবল বিস্রস্ত কেশজাল দিয়া আবৃত; শুভ্র মর্মরে রচিত মূর্তির ন্যায় তাহার যৌবন-কঠিন দেহ সগর্বে উন্নত হইয়া আছে; আর দুই চক্ষু হইতে বিজয়িনীর নির্বোধ উল্লাস ও অশ্রু একসঙ্গে ক্ষরিত হইয়া পড়িতেছে।

    স্থবির ডাকিলেন, ‘নির্বাণ!’

    নির্বাণ ত্বরিতে উঠিয়া দাঁড়াইল। দ্বার-সম্মুখে পিথুমিত্তকে দেখিয়া তাঁহার পদপ্রান্তে পতিত হইয়া রুদ্ধস্বরে কহিল, ‘থের, আমি সঙ্ঘের ধর্ম হইতে বিচ্যুত হইয়াছি। আমার যথোপযুক্ত দণ্ড বিধান করুন।’

    স্থবির কম্পিত স্বরে কহিলেন, ‘নির্বাণ, তোমার অপরাধ গুরু। কিন্তু আমার অপরাধ তোমার অপেক্ষাও অধিক। আমি সব জানিয়া-বুঝিয়া তোমাকে সঙ্ঘে গ্রহণ করিয়াছিলাম বৎস!’

    উচণ্ডের উগ্র কণ্ঠস্বরে স্থবিরের করুণাবাণী ডুবিয়া গেল, তিনি কহিলেন, ‘থের, এই পতিত ভিক্ষু নিজমুখে পাপ খ্যাপন করিয়াছে, আমরাও স্বচক্ষে উহা প্রত্যক্ষ করিয়াছি। এখন পাতিমোক্ষ অনুসারে উহার দণ্ডাজ্ঞা উচ্চারণ করুন।’

    স্থবির কোনও কথাই উচ্চারণ করিতে পারিলেন না, অপরিসীম করুণায় তাঁহার অধর থর থর কাঁপিতে লাগিল।

    উচণ্ড তখন কহিলেন, ‘উত্তম, আমি এই ভিক্ষুর উপাধ্যায় ছিলাম, আমিই তাহার দণ্ডাজ্ঞা ঘোষণা করিতেছি। ভিক্ষু, তুমি পারাজিক ও সঙ্ঘাদিশেষ পাপে অপরাধী হইয়াছ, এই জন্য তুমি সঙ্ঘ হইতে বিচ্যুত হইলে। অদ্য হইতে সঙ্ঘের সীমাভুক্ত ভূমির উপর বাস করিবার অধিকার তোমার রহিল না; সঙ্ঘাধিকৃত খাদ্য বা পানীয়ে তোমার অধিকার রহিল না। ইহাই তোমার দণ্ড— বহিষ্কার! তুমি এবং তোমার পাপের অংশভাগিনী বুদ্ধের পবিত্র সঙ্ঘভুক্তি হইতে নির্বাসিত হইলে।’

    এই দণ্ডাদেশের ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা ধীরে ধীরে সকলেরই হৃদয়ঙ্গম হইল। ইহা মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু তবু কেহ কোনও কথা কহিল না। নির্বাণ নতমস্তকে সঙ্ঘের অমোঘ দণ্ডাজ্ঞা স্বীকার করিয়া লইল। স্থবিরও মৌন রহিলেন। শুধু, পঞ্চদশ বৎসর পূর্বে নির্বাণ ও ইতিকে কোলে টানিয়া লইয়া তাঁহার শীর্ণ গণ্ডে যে অশ্রুর ধারা নামিয়াছিল, এতদিন পরে আবার তাহা প্রবাহিত হইল।

    ঊষালোক ফুটিবার সঙ্গে সঙ্গে ইতি ও নির্বাণ সঙ্ঘ হইতে বিদায় লইল। সঙ্ঘের পাদমূলে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিয়া দুইজনে হাত-ধরাধরি করিয়া নিরুদ্দেশের পথে বাহির হইয়া পড়িল। কোথায় যাইতেছে তাহারা জানে না; এ যাত্রা কিভাবে শেষ হইবে তাহাও অজ্ঞাত। কেবল, উভয়ের বাহু পরস্পর দৃঢ়নিবদ্ধ হইয়া আছে, দুস্তর মরু-পথের ইহাই একমাত্র পাথেয়।

    যত দূর দেখা গেল, প্রাচীন নির্বাপিত চোখে স্থবির সেই দিকে চাহিয়া রহিলেন। ক্রমে সূর্য উঠিল, দূরে দুইটি কৃষ্ণ বিন্দু আলোকের ধাঁধায় মিলাইয়া গেল। স্থবির ভাবিতে লাগিলেন, এই সূর্য মধ্যকাশে উঠিবে; তৃষ্ণা-রাক্ষসী প্রতীক্ষা করিয়া আছে—

    উচণ্ড আসিয়া স্থবিরের পাশে দাঁড়াইলেন, বলিলেন, ‘থের, আপনাকে উপদেশ দিবার স্পর্ধা আমার নাই। কিন্তু গৃহীজনোচিত মমত্ব কি নির্বাণ-লিপ্সু ভিক্ষুর সমুচিত?’

    স্থবির কহিলেন, ‘উচণ্ড, অদৃষ্টবিড়ম্বিতের প্রতি করুণা ভিক্ষুর পক্ষে নিন্দনীয় নহে। শাক্য সকল জীবের প্রতি করুণা করিতে বলিয়াছেন।’

    ‘সত্য। কিন্তু সেই মহাভিক্ষু শাক্যই পাপীর দণ্ডবিধান পাতিমোক্ষ সৃজন করিয়াছেন। দণ্ডবিধির মধ্যে করুণার স্থান কোথায়? থের, এই সঙ্ঘ কেবল বাস্তব পাষাণ দিয়া গঠিত নয়, ভিক্ষুগণের নির্মমত্বের কঠিনতর মর্মর পাষাণে নির্মিত। তাই সংসারের শত ক্লেদ-পঙ্কিলতার মধ্যে প্রকৃতির রুদ্র বিক্ষোভ উপেক্ষা করিয়া সঙ্ঘ আজিও অটল হইয়া আছে। সঙ্ঘের ভিত্তিমূল যদি করুণার অশ্রুপঙ্কে আর্দ্র হইয়া পড়ে, তবে ধর্ম কয় দিন থাকিবে? করুণার যূপকাষ্ঠে নীতির বলিদান কদাপি মহাভিক্ষুর অভিপ্রেত ছিল না।’

    স্থবির দীর্ঘকাল উত্তর দিলেন না; তারপর ক্লিষ্টস্বরে কহিলেন, ‘উচণ্ড, মহাভিক্ষুর অভিপ্রায় দুর্জ্ঞেয়। আমার চিত্ত বিক্ষিপ্ত হইয়াছে; কর্তব্যজ্ঞান হারাইয়া ফেলিয়াছি।’

    উচণ্ড প্রশ্ন করিলেন, ‘আপনি কি মনে করেন, পাতিমোক্ষ-মতে ভিক্ষুর দণ্ডমান অনুচিত হইয়াছে!’

    ‘জানি না। বুদ্ধের ইচ্ছা দুরধিগম্য।’

    ‘পাতিমোক্ষ কি বুদ্ধের ইচ্ছা নয়!’

    ‘তাহাও জানি না।’

    উচণ্ড তখন দুই হস্ত ঊর্ধ্বে তুলিয়া আকাশ লক্ষ্য করিয়া গভীর কণ্ঠে বলিলেন, ‘তবে বুদ্ধ নিজ ইচ্ছা জ্ঞাপন করুন। গৌতম, তুমি আমাদের সংশয় নিরসন কর। তোমার অলৌকিক শক্তির বজ্রালোকে সত্য পথ দেখাইয়া দাও।’

    সেইদিন মধ্যাহ্নেবাতাস সহসা স্তব্ধ হইয়া গেল; কেবল প্রজ্বলিত বালুকার উপর হইতে এক প্রকার শিখাহীন অগ্নিবাষ্প নির্গত হইতে লাগিল। পঞ্চাগ্নি-পরিবেষ্টিত সঙ্ঘ যেন উগ্র তপস্যারত বিভূতিধূসর কাপালিকের ন্যায় এই বহ্নিশ্মশানে বসিয়া আছে। আকাশের একপ্রান্ত হইতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত কোথাও একটি পক্ষী উড়িতেছে না। শব্দ নাই। চতুর্দিকে যেন একটা রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা।

    মধ্যাহ্ন বিগত হইল; খর্জুর বৃক্ষের ছায়া সভয়ে মূল ছাড়িয়া নির্গত হইবার উপক্রম করিল।

    ‘থের!’

    স্থবির অলিন্দে আসিয়া দাঁড়াইলেন। উচণ্ড নীরবে অঙ্গুলি-সঙ্কেত করিয়া দিক্‌প্রান্ত দেখাইলেন।

    তাম্রতপ্ত আকাশের এক প্রান্তে চক্রবালরেখার উপর মুষ্টিপ্রমাণ কজ্জলমসী দেখা দিয়াছে। চিনিতে বিলম্ব হইল না। পঞ্চদশ বৎসর পূর্বে এমনই মসী-চিহ্ন আকাশের ললাটে দেখা গিয়াছিল।

    ভয়ার্ত কণ্ঠে উচণ্ড কহিলেন, ‘থের, আঁধি আসিতেছে!’

    স্থবিরের অধর একটু নড়িল, ‘বুদ্ধের ইচ্ছা! বুদ্ধের ইচ্ছা!’

    উন্মত্তের ন্যায় স্থবিরের জানু আলিঙ্গন করিয়া উচণ্ড কহিলেন, ‘থের, তবে কি আমি কি ভুল করিয়াছি? তবে কি আমার পাপেই আজ সঙ্ঘ ধ্বংস হইবে? ইহাই কি বুদ্ধের অলৌকিক ইঙ্গিত!’

    দেখিতে দেখিতে আঁধি আসিয়া পড়িল। মরুভূমি ঝঞ্ঝাবিমথিত সমুদ্রের ন্যায় ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল; গাঢ় অন্ধকারে চতুর্দিক আচ্ছন্ন হইয়া গেল।

    এই দুর্ভেদ্য অন্ধকারের মধ্যে স্থবিরের কণ্ঠে উচ্চারিত হইতে লাগিল— ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়! তমসো মা জ্যোতির্গময়!’

    উচণ্ড চিৎকার করিয়া উঠলেন, ‘আমি যাইব। তাহাদের ফিরাইয়া আনিব— তাহাদের ফিরাইয়া আনিব—’ ক্ষিপ্তের মতো তিনি অলিন্দ হইতে নিম্নে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন; ঝড়ের হাহারবে তাঁহার চিৎকার ডুবিয়া গেল।

    বালু ও বাতাসের দুর্মদ দুরন্ত খেলা চলিতে লাগিল। পৃথিবী প্রলয়ান্ত অন্ধকারে ছাইয়া গিয়াছে। সঙ্ঘ নিমজ্জিত হইল।

    স্থবিরের শীর্ণ প্রাচীন কণ্ঠ হইতে তখনও আকুল প্রার্থনা উচ্চারিত হইতেছে; ‘হে শাক্য, হে লোকজ্যেষ্ঠ, হে গোতম, অন্তিমকালে আমাকে চক্ষু দাও। তমসো মা জ্যোতির্গময়— তমসো মা জ্যোতির্গমায়—’

    মানবজাতির শমন-ধৃত কণ্ঠ হইতে আজিও ঐ আর্ত বাণীই নিঃসৃত হইতেছে।

    ১৭ অগ্রহায়ণ ১৩৪৪

  • ভাটির দেশ

    ভাটির দেশ

    [book]

    জল-জঙ্গলের দেশ সুন্দরবন। সে দেশে জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। আর আছে বাঘ-কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা সবহারানো কিছু মানুষ। গত শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিকে এই কাদামাটি আর বাদাবনের দেশেই এক সাহেব আদর্শ সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের সেই স্বপ্নের সূত্র ধরেই লেখা শুরু হল ভাটির দেশের নতুন ইতিহাস। অলিখিত বিধি-বাঁধনের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বাদাবনের সমাজ-সংস্কৃতি। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক পিয়ালি রয় আর দিল্লির কেতাদুরস্ত ব্যবসায়ী কানাই দত্তের সেখানে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে টলমল করে ওঠে সে পটভূমির সূক্ষ্ম ভারসাম্য। কানাইয়ের মাসি নীলিমা স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার। নীলিমার স্বামী, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নির্মল ছিল প্রগতিশীল রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী। ১৯৭৯ সালে মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তু বিতাড়নের ঘটনার ঠিক পর পরই রহস্যময় পরিস্থিতে মৃত্যু হয় তার।

    পিয়া সুন্দরবনে এসেছে সেখানকার বিরল প্রজাতির ডলফিনের বিষয়ে গবেষণার জন্য। তার পথপ্রদর্শক স্থানীয় জেলে ফকির। নদীখাঁড়িতে ঘোরাঘুরির সময় পিয়ার দোভাষীর কাজ করে দেওয়ার জন্য তাদের সঙ্গ ধরল কানাই। আর তার পরেই ঘুরতে শুরু করল কাহিনির স্রোত।

    মহাকাব্যপ্রতিম এই উপন্যাসে আঠারো ভাটির দেশের জীবন আর প্রকৃতি, ইতিহাস আর লোকপুরাণকে জীবন্ত চেহারায় উপস্থিত করেছেন অমিতাভ ঘোষ।

    অমিতাভ ঘোষের ‘The Hungry Tide’ উপন্যাসের অনুবাদ করেছেন অচিন্ত্যরূপ রায়, বাংলায় নাম রেখেছেন ‘ভাটির দেশ’। প্রথম প্রকাশ ২০০৪ সালে।

    এই উপন্যাসে ব্যবহৃত সমস্ত নাম, চরিত্র, স্থান এবং ঘটনা কাল্পনিক। কোথাও কোনওভাবে যদি কোনও বাস্তবের সঙ্গে মিল ঘটে থাকে তা নিতান্তই কাকতালীয়।

    প্রথম আনন্দ সংস্করণ নভেম্বর ২০০৯; পঞ্চম মুদ্রণ এপ্রিল ২০১৯। উৎসর্গ : লীলাকে।

  • ভাটির দেশ

    ভাটির দেশ

    স্টেশনে পা দিয়েই মেয়েটাকে দেখতে পেল কানাই। ছোট করে ছাটা চুল, ঢিলে ট্রাউজার্স আর ঢোলা সাদা জামা পরা–যে কেউ দেখলেই হঠাৎ আঠারো-উনিশ বছরের ছেলে বলে ভুল করবে। কিন্তু কানাইয়ের হল জহুরির চোখ। স্টেশনের ওই চা-ওয়ালা আর চানাচুর-ওয়ালাদের ভিড়ের মধ্যেও ঠিক নজর করেছে। ব্যাপারটা ভেবে মনে মনে একটু অহংকারই বোধ করল কানাই। মেয়েদের চেনার ব্যাপারে ওর জুড়ি খুঁজে পাওয়া কঠিন। চেহারাটা মন্দ নয় মেয়েটার–সরু লম্বাটে মুখ, হাতে চুড়ি বালা কিছু নেই বটে, কপালে টিপও নেই, তবে রোদে পোড়া চামড়ার ওপর কানের রুপোলি দুলদুটো ঝকঝক করছে, এত দূর থেকেও চোখে পড়ছে সেটা।

    কিন্তু মেয়েটার ভাবভঙ্গিতে কেমন একটা অচেনা ছাঁদ রয়েছে। যে ভাবে পা দুটো ফাঁক করে লাইটওয়েট বক্সারের মতো দাঁড়িয়ে আছে–ঠিক চেনা মেয়েলি ভঙ্গি তো এটা নয়। বিদেশি কি? শুধু গায়ের রঙে আর নাকের নথে কীই বা বোঝা যায়? অথবা হয়তো জন্মসূত্রে ভারতীয়, কিন্তু বহুদিনের প্রবাসী। হতেই পারে। পার্ক স্ট্রিটের কলেজের মেয়েদের ভিড়ে ওকে দেখলে হয়তো কানাইয়ের এরকম মনে হত না, কিন্তু এই ধুলো আর জঞ্জালে ভরা ঢাকুরিয়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ওর অচেনা ভঙ্গিটা খুব বেশি করে চোখে পড়ছে। তবে বিদেশিই যদি হয় তো এইখানে কী করছে মেয়েটা? টুরিস্ট ক্যানিং যাবার এই রেলরাস্তা তো ডেইলি প্যাসেঞ্জাররাই বেশি ব্যবহার করে। টুরিস্টরা তো আজকাল সুন্দরবন যাবার জন্য কলকাতা থেকেই লঞ্চ-টঞ্চ ভাড়া করে বলে শুনেছে কানাই। তা হলে কী করছে ও এখানে?

    ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের লোকটাকে কী যেন একটা জিজ্ঞেস করল মেয়েটা। খুব লোভ হল কানাইয়ের, ও কী বলছে সেটা শোনার। আড়াল থেকে লোকেদের কথাবার্তা শুনতে ওর বেশ মজা লাগে। মানুষের কথাবার্তা, ভাষা, এইসব নিয়েই তো ওর কারবার। আর শুধু তো পেশা নয়, এটা ওর নেশাও বটে।

    ভিড়ের মধ্যে দিয়ে ঠেলেঠুলে কাছাকাছি পৌঁছে ও মেয়েটার প্রশ্নের শেষটুকু শুধু শুনতে পেল। শুধু শেষ ক’টা শব্দ–”ট্রেন টু ক্যানিং?”

    পাশে দাঁড়ানো লোকটি হাতমুখ নেড়ে ওকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু সে বলছিল বাংলায়, আর মেয়েটা তার বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারছে বলে মনে হল না কানাইয়ের। লোকটাকে থামিয়ে দিয়ে খানিকটা ক্ষমাপ্রার্থীর মতো ও বলল, “আমি বাংলা জানি না।”

    যে অদ্ভুত উচ্চারণে মেয়েটা বাংলা শব্দগুলি বলল, তাতেই কানাই পরিষ্কার বুঝতে পারল যে ও মিথ্যে বলছে না। সাধারণত সর্বত্রই বিদেশিরা যা করে, ও-ও তাই করেছে–নিজের বোধের অক্ষমতাটুকু জানিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শব্দক’টা শিখে নিয়েছে।

    এই প্ল্যাটফর্মে অবশ্য কানাইও একজন ‘বাইরের লোক’, আর বহিরাগত হিসেবে সেও যে নিত্যযাত্রীদের খানিকটা মনোযোগ আকর্ষণ করেনি তা নয়। উচ্চতায় মাঝারি, এই বিয়াল্লিশ বছর বয়সেও যথেষ্ট ঘন চুল, জুলফির উপরে অল্প পাক ধরেছে। কানাইয়ের ঘাড় হেলানো আর দাঁড়ানোর ভঙ্গির মধ্যে রয়েছে একটা নিশ্চিত ভাব, যে-কোনও পরিস্থিতির টক্কর নেওয়ার মতো একটা দৃঢ় প্রত্যয় ওর সারা শরীরে যেন ফুটে বেরোচ্ছে। মুখে বয়সের ছাপ পড়েনি বিশেষ, চোখের কোনার চামড়ায় সামান্য ভাঁজ পড়েছে মাত্র। সেটাও ওর প্রাণোচ্ছল ভাবটাই আরও বেশি করে ফুটিয়ে তুলছে। একসময়ে রোগাপাতলা থাকলেও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কোমর একটু ভারী হয়েছে, কিন্তু চলাফেরার ক্ষিপ্রতা তাতে যায়নি। আর তার সাথে আছে এক ধরনের সতর্ক ভাব, একটা পর্যটকসুলভ মুহূর্তযাপনের প্রবৃত্তি।

    কানাইয়ের সঙ্গে ছিল টানা-হাতল আর চাকা লাগানো একটা এয়ারলাইন ব্যাগ। ক্যানিং লাইনের ফিরিওয়ালাদের কাছে ওই ব্যাগ কানাইয়ের মাঝবয়সি চাকচিক্য আর শহুরে স্বাচ্ছল্যের একটা অংশ–ওর সানগ্লাস, কüরয় ট্রাউজার্স আর সোয়েডের জুতোরই মতো। ফলে হকার, ভিখিরি আর চাঁদা-তোলা ছেলেছোকরার দল ওকে ছেকে ধরল। অবশেষে সবুজ-হলুদ রঙের ইলেকট্রিক ট্রেনটা ঘস ঘস করে স্টেশনে ঢোকার পর ওদের হাত থেকে রেহাই পেল কানাই।

    গাড়িতে ওঠার সময় কানাই লক্ষ করল বিদেশি মেয়েটা চলাফেরায় যথেষ্ট অভ্যস্ত। ট্রেন স্টেশনে ঢুকতেই ও চট করে ওর বিশাল পিঠব্যাগদুটো নিজেই তুলে নিয়ে গোটাছয়েক কুলিকে পাশ কাটিয়ে দিব্যি এগিয়ে গেল। ওই ছোটখাটো দেখতে হলে কী হবে, হাতে-পায়ে শক্তিও আছে মেয়েটার। আর যে ভাবে ব্যাগদুটোকে ট্রেনের কামরায় তুলে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে ঠেলেঠুলে এগিয়ে গেল অনায়াসে, তাতে বোঝাই গেল এরকম একা চলাফেরার অভ্যাস ওর আছে। কানাই একবার ভাবল ওকে বলবে কিনা যে মেয়েদের জন্যও একটা আলাদা কামরা আছে এই ট্রেনে, কিন্তু কিছু বলার আগেই গাড়ির ভিড় মেয়েটাকে গিলে ফেলল। ওকে আর দেখতেই পেল না কানাই।

    ঠিক তক্ষুনি হুইসল বেজে উঠল আর কানাই নিজেও ধাক্কাধাক্কি করে উঠে পড়ল কামরাটায়। একটু ডাইনে-বাঁয়ে তাকিয়েই একটা খালি সিট দেখতে পেয়ে বসে পড়ল টুপ করে। ও ঠিক করেছিল এই ট্রেন জার্নির সময় কয়েকপাতা পড়ে নেবে, কিন্তু সুটকেস থেকে কাগজপত্রগুলো বের করতে গিয়েই টের পেল সিটটা মোটেই সুবিধের নয়। খুব একটা আলোও আসছে না, আর ঠিক ডানদিকেই এক মহিলার কোলে একটা বাচ্চা হাত-পা ছুঁড়ে সমানে চাঁচাচ্ছে। সারাপথ যদি ওই বাচ্চার খুদে হাত-পায়ের ঘুষি-লাথি সামলাতে সামলাতে যেতে হয়, তবে তো পড়ার দফা রফা। বাঁদিকের সিটটায় বসতে পারলে চমৎকার হত। দিব্যি আরামে পড়তে পড়তে যাওয়া যেত জানালার ধারে বসে। কিন্তু সেখানে একটা লোক বসে নিবিষ্ট মনে একটা বাংলা খবরের কাগজ পড়ে যাচ্ছে। লোকটাকে একটু মেপে নিল কানাই। নিরীহগোছের বয়স্ক মানুষ–একটু চাপাচাপি করলেই সরে যাবে মনে হয়।

    “দাদা, একটু শুনবেন?” হাসি হাসি মুখে কানাই জিজ্ঞেস করল লোকটাকে। ভদ্রলোক কাগজ থেকে মুখ তুলে তাকাতেই ভারী ভালমানুষের মতো বলল, “আপনার অসুবিধা না থাকলে আমার সঙ্গে সিটটা চেঞ্জ করবেন? আমাকে আসলে একগাদা কাজ করতে হবে, জানালার কাছে বসলে আলোটাও একটু বেশি পাব–কাগজপত্রগুলো পড়তে সুবিধা হবে।” লোকটা একটু আশ্চর্য হয়ে ওর দিকে তাকাল। মুহূর্তের জন্য মনে হল বোধহয় মুখের ওপর ‘না’ বলে দেবে। কিন্তু কানাইয়ের পোশাক-আশাক চেহারাছবি দেখে শেষপর্যন্ত মনে হল মত পালটাল লোকটা। হয়তো ভাবল, কে জানে বাবা এর হাত কত লম্বা, হয়তো পুলিশ-দারোগা নেতা-টেতা চেনাশোনা আছে– কিছুই বলা যায় না। ঝামেলায় গিয়ে কাজ নেই, তার থেকে সিটটা পালটে নেওয়াই ভাল। মানে মানে সরে গিয়ে কানাইয়ের জন্য জায়গা করে দিল লোকটা।

    যাক বাবা, বিশেষ ঝামেলা ছাড়াই সিটটা পাওয়া গেল। মাথা নেড়ে লোকটাকে ধন্যবাদ জানাল কানাই। মনে মনে ঠিক করল চা-ওয়ালা এলে ওকে একটা চা অফার করবে। গুছিয়ে বসে সুটকেসের সামনের ফ্ল্যাপ থেকে এক গোছা কাগজ টেনে বের করল ও। খুদে খুদে অক্ষরে বাংলা লেখা। হাঁটুর ওপর পেতে হাত দিয়ে পাতাগুলো সমান করে নিয়ে পড়তে শুরু করল কানাই।

    “কথিত আছে, মহাদেব যদি তার জটার মধ্যে গঙ্গার প্রবল স্রোতকে সংযত না করতেন, তা হলে মর্তে অবতরণের সময় নদীর তীব্র গতি পৃথিবীকে চূর্ণ চূর্ণ করে দিত। এই কাহিনি থেকে গঙ্গার একটি বিশেষ রূপ কল্পনা করা যায় : যেন স্বর্গ থেকে নেমে আসা বিশাল এক জলের বেণী এলিয়ে পড়েছে এক শুষ্ক, তৃষ্ণার্ত সমভূমির ওপর। কিন্তু এই নদীকাহিনিতে যে কোথাও একটা মোচড় থাকতে পারে, গঙ্গার গতিপথের একেবারে শেষ পর্যায়ে আসার আগে সেটা বোঝাই যায় না। তবে গল্পের সেই চমকপ্রদ শেষাংশ কেউ কোথাও লিখে যাননি। হয়তো কল্পনাই করেননি কেউ। আমার মনে হয়, এইভাবে তা লেখা যেতে পারে : এই এলিয়ে পড়া জলরাশির বেণী এক সময় সম্পূর্ণ খুলে যায় এবং মহাদেবের জটপাকানো কেশগুচ্ছ ছড়িয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ এক অঞ্চল জুড়ে। একটা সময় নদী সব বাঁধন ছিঁড়ে ছড়িয়ে পড়ে শত শত–হয়তো বা সহস্রাধিক–পরস্পরগ্রন্থিত জলধারায়।

    “এখানে সমুদ্র এবং বাংলার সমতলভূমির মধ্যে সংযোগসাধন করেছে এক বিশাল দ্বীপপুঞ্জ। তার বিশাল বিস্তার চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। প্রায় তিনশো কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে আছে এই দ্বীপগুলি–পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদী থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মেঘনার তীর পর্যন্ত।

    “এই দ্বীপগুলি যেন ভারতমাতার বস্ত্রের প্রান্তভাগ, যেন তার লুটিয়ে পড়া শাড়ির আঁচল–সমুদ্রের লোনা জলে আধো ভেজা। হাজার হাজার এইরকম দ্বীপ ছড়িয়ে আছে এই অঞ্চলে। তাদের মধ্যে কয়েকটির আয়তন বিশাল, আবার কয়েকটি ছোট্ট বালির চর মাত্র। কিছু দ্বীপ আছে লিখিত ইতিহাসের সমান বয়সি, কিছু আবার গজিয়ে উঠেছে মাত্র দু’-এক বছর আগে। এই দ্বীপগুলি যেন মাটির পৃথিবীর কাছে জলের ক্ষতিপূরণ–সারা যাত্রাপথে ধরিত্রীমায়ের কাছ থেকে সে যা গ্রহণ করেছে, এখানে সাগরে পড়ার আগে সে যেন সেই ঋণ শোধ করে দিয়ে যেতে চায়। তবে এই দানের ওপর জল কিন্তু তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। তার স্রোতধারা ছড়িয়ে থাকে সমস্ত স্থলভাগের ওপর সূক্ষ্ম এক জালের মতো। এখানে জল-স্থলের সীমা সর্বদাই পরিবর্তনশীল–সতত অনিশ্চিত।

    “নদীপ্রণালীগুলির মধ্যে কয়েকটি আয়তনে বিশাল–এক তীর থেকে অন্য তীর দেখা যায় না। আবার অনেকগুলি মাত্র কয়েকশো মিটার চওড়া, লম্বায় খুব বেশি হলে দু-তিন কিলোমিটার। তবুও এদের প্রত্যেকেই একেকটি নদী, প্রতিটির একটি করে আশ্চর্য দ্যোতনাময় নামও রয়েছে। এই নদীগুলি যেখানে পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়–একটা দুটো নয়, চার পাঁচটা, এমনকী কখনও কখনও ছ’টা পর্যন্ত–সে সঙ্গমস্থলের বিস্তার প্রায় দিগ্বলয়কে স্পর্শ করে। দূরে আবছায়া দেখা যায় জঙ্গল, দিগন্তের কাছে স্থলভূমির প্রতিধ্বনির মতো। কথ্য ভাষায় এই সঙ্গমের নাম মোহনা–এক আশ্চর্য মনোমুগ্ধকর শব্দ, প্রায় মাদকতাময়।

    “এইখানে মিঠেজল আর লোনাজল, নদী আর সমুদ্রের মধ্যে কোনও সীমারেখা নেই। জোয়ারের স্রোত উজানে তিনশো কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছয়, আর প্রতিদিন বানের সময় হাজার হাজার একর জঙ্গল চলে যায় জলের তলায়। ভাটা এলে জল নেমে যায়, আবার মাথা তুলে ওঠে অরণ্য। জলের স্রোত এমনই তীব্র যে দ্বীপগুলির আকৃতি প্রায় প্রতিদিনই বদলে যায়। কোনওদিন হয়তো গোটা একটা উপদ্বীপ বা ছোটখাটো অন্তরীপ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় স্রোতের টানে, আবার কখনও বা জলের মধ্যে। হঠাৎ জেগে ওঠে একটা নতুন চর।

    “এইভাবে জোয়ার-ভাটার টানে যখনই একটা নতুন চর মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, প্রায় রাতারাতি সেখানে গজিয়ে উঠতে থাকে ম্যানগ্রোভ জাতীয় গাছ। পরিবেশ যদি অনুকূল হয়, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই ঘন জঙ্গলে ছেয়ে যায় পুরো দ্বীপ। এই ম্যানগ্রোভ অরণ্য যেন সম্পূর্ণ আলাদা এক জগৎ–অন্য কোনও বনজঙ্গলের সঙ্গে কোনও মিলই নেই এর। অন্য জঙ্গলের মতো কোনও আকাশছোঁয়া গুল্মশোভিত গাছ এখানে নেই, ফার্ন বা জংলা ফুল নেই, কাকাতুয়ার মতো পাখিও এখানে চোখে পড়ে না। ম্যানগ্রোভ জাতীয় গাছের পাতা হয় পুরু এবং শক্ত। গ্রন্থিল শাখা এবং ঘন পল্লবরাজির জন্য এ ধরনের জঙ্গল হয় একেবারে দুর্ভেদ্য। বনের গভীরে আলো প্রায় ঢোকে না বললেই চলে। ফলে দিনের বেলাতেও সামান্য দূরের জিনিস কষ্ট করে ঠাহর করতে হয়। বাতাসও এখানে নিশ্চল আর পূতিগন্ধময়। এ বনে ঢোকা মাত্রই যে কারও মনে হবে এ এক ভয়ংকর শত্ৰুপুরী। জীবন্ত এক ধূর্ত প্রাণীর মতো যেন তেন প্রকারেণ এই জঙ্গল আগন্তুককে হয় প্রাণে মারতে চায়, নয়তো দূর করে দেয় তার ত্রিসীমানা থেকে। প্রতি বছরই এই দুর্ভেদ্য অরণ্যে প্রাণ দেয় বহু মানুষ হয়–বাঘের হাতে, নয়তো কুমির বা সাপের কামড়ে।

    “এ অরণ্যে এমন কিছুই নেই কোনও বহিরাগতের কাছে সুন্দর বলে মনে হতে পারে। তবুও সারা পৃথিবী এই দ্বীপপুঞ্জকে ‘সুন্দরবন’ নামেই জানে। অনেকে মনে করে ম্যানগ্রোভজাতীয় সুন্দরী গাছ–হেরিটেরিয়া মাইনর–এখানে বেশি আছে বলে এ বনের নাম সুন্দরবন। তবে এ জঙ্গলের নাম বা ইতিহাস খুঁজে বের করা এক কঠিন কাজ, কেননা মুঘল আমলের নথিপত্রে এই জায়গার প্রসঙ্গে কোনও বিশেষ গাছের নাম করা হয়নি, বরং উল্লেখ করা হয়েছে নদীর স্রোতবিশেষের–ভাটির। এখানকার দ্বীপবাসীরাও এ দেশকে ভাটির দেশ বলেই জানে। জোয়ার নয়, সমুদ্রমুখী জলের টান, অর্থাৎ ভাটা থেকেই এ জায়গা তার নাম পেয়েছে। কেননা জোয়ার যখন আসে, এ অঞ্চলের অধিকাংশই তখন চলে যায় জলের তলায়। কেবল মাত্র ভাটার সময়ই জল থেকে জন্ম নেয় জঙ্গল। অরণ্যের এই জন্মপ্রক্রিয়া (যেখানে ধাইয়ের কাজটা করে চাঁদ) লক্ষ করলেই বোঝা যাবে যে ‘ভাটির দেশ’ নামটি শুধু যথার্থই নয়, এটাই আসল নাম হওয়া উচিত এই অঞ্চলের। কারণ রিলকের কবিতার হ্যাঁজেল গাছ থেকে ঝুলন্ত তন্তুজাল বা কালো মাটির ওপর বসন্তের বৃষ্টির মতো, ভাটার স্রোতের দিকেও যখন আমরা তাকাই,

    এই আমরা, যারা আনন্দকে

    জেনেছি উদীয়মান, ঊর্ধ্বগামী, আমাদেরও হয় অনুভূত

    সেই সূক্ষ্ম আবেগ, যা প্রায় বিহ্বল করে যখন আনন্দময় কোনো-কিছু

    পড়ে যায়।”

  • আমন্ত্রণ

    আমন্ত্রণ

    শহুরে এলাকা ছাড়িয়ে মিনিট বিশেক চলার পর ট্রেনটা একটা স্টেশনে এসে থামতেই কপালজোরে জানালার পাশের সিটটা পেয়ে গেল পিয়া। এতক্ষণ ও ঘুপচিমতো একটা কোনার দিকে ভিড়ে ঠাসা বেঞ্চির ওপর কোনওরকমে আলগাভাবে বসেছিল। সামনে পড়েছিল গন্ধমাদনের মতো বিশাল পিঠব্যাগগুলো। জানালার পাশে এসে এবার একটু হাঁফ ছাড়ার সুযোগ পেল। বাইরে তাকিয়ে দেখল স্টেশনটার নাম চম্পাহাটি। প্ল্যাটফর্মটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে কতগুলো নোংরা ঝুপড়ির কাছে, তারপর ডুব দিয়েছে একটা এঁদো ডোবার মধ্যে। ডোবার ঘোলাটে জলে থকথকে ময়লা ফেনা ভাসছে। কামরার ভেতরে এখনও তিলধারণের জায়গা নেই। তার মানে ক্যানিং পর্যন্ত এইরকমই চলবে। রেললাইন বরাবর ঝুপড়ি-বস্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে ও ভাবছিল, কে বলবে যে সুন্দরবনের প্রায় দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে ট্রেনটা?

    প্ল্যাটফর্মে একটা লোক চা বিক্রি করছে। জানালা দিয়ে হাত বার করে ইশারায় ওকে ডাকল পিয়া। দাম মিটিয়ে জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে গরম ভাড়টা যেই ও হাতে নিয়েছে, সামনের সিটে বসা লোকটা কীসের যেন একটা পাতা ওলটাল, আর তার হাতের ধাক্কায় ভাড় থেকে চলকে পড়ল খানিকটা চা। চট করে হাত ঘুরিয়ে নিয়ে পিয়া চেষ্টা করল যাতে বেশিরভাগটাই জানালার বাইরে পড়ে, কিন্তু তা সত্ত্বেও কয়েকটা ফোঁটা গিয়ে পড়ল লোকটার হাতের কাগজে। “ওহ, আই অ্যাম সো সরি”–একেবারে মরমে মরে গেল পিয়া। কামরার সবগুলো লোকের মধ্যে বেছে বেছে এই লোকটার সঙ্গেই এরকম হল! ঢাকুরিয়া স্টেশনেই ওকে লক্ষ করেছিল পিয়া। লোকটার ঘাড় হেলিয়ে দাঁড়ানোর মধ্যে এমন একটা আত্মতুষ্ট ভাব ছিল যে সেটা নজর না করে পারেনি ও। স্টেশনের অন্যদের থেকে একেবারে আলাদা করে চোখে পড়ছিল লোকটাকে; অসংকোচে চারপাশের প্রত্যেকের দিকে তাকিয়ে দেখছিল–প্রতিটা লোককে খুঁটিয়ে নজর করে, যেন মনে মনে মেপেজুপে আলাদা আলাদা করে রেখে দিচ্ছিল যার যার নিজের জায়গায়। অন্যকে নিজের গুরুত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার একটা অনায়াস দক্ষতাও আছে লোকটার, লক্ষ করেছিল পিয়া, যখন পাশের ভদ্রলোককে জানালার কাছের সিটটা থেকে সরিয়ে দিল ও। ওকে দেখে নিজের কয়েকজন কলকাতার আত্মীয়র কথা মনে পড়ছিল পিয়ার। মনে হচ্ছিল তাদেরই মতো অনেকটা এই লোকটা, এরা মনে করে যেন পৃথিবীর যাবতীয় সুখসুবিধা এদেরই প্রাপ্য (শ্রেণিগত কারণ, না শিক্ষা?), আশা করে যেন ছোটখাটো সমস্যা-টমস্যাগুলো ওদের সুবিধার জন্য আপনা থেকেই সরে যাবে।

    “এই নিন,” লোকটার দিকে একমুঠো টিস্যু পেপার এগিয়ে দিল ও। “আমি হেল্প করছি আপনাকে কাগজগুলো মুছতে।”

    “দরকার নেই। একেবারে বারোটা বেজে গেছে।” বিরক্ত মুখ করে দুমড়ে মুচড়ে কাগজগুলো জানালার বাইরে ছুঁড়ে দিল লোকটা।

    একটু থতমত খেয়ে গেল পিয়া। মিনমিন করে বলল, “খুব একটা ইম্পর্ট্যান্ট কিছু ছিল না তো?”

    “সেরকম অপূরণীয় ক্ষতি কিছু হয়নি। একটা লেখার জেরক্স কপি ছিল ওগুলো।”

    এক মুহূর্তের জন্য পিয়ার মনে হল লোকটাকে বলে যে ওরই হাতের ধাক্কায় পড়েছিল চা-টা, কিন্তু ওর মুখ দিয়ে শুধু বেরোল, “আমি খুবই দুঃখিত। কিছু মনে করলেন না আশা করি।”

    “মনে করেও কি লাভ আছে কিছু?” ব্যঙ্গের চেয়ে চ্যালেঞ্জের ভাবই যেন বেশি প্রশ্নটার মধ্যে। “আজকের দুনিয়ায় আমেরিকানদের সঙ্গে টক্কর দিয়ে কেউ কি সুবিধা করতে পারে?”

    ঝগড়া করার ইচ্ছে ছিল না, তাই প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেল পিয়া। বদলে একটা তারিফের ভাব দেখিয়ে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল, “কী করে বুঝলেন?”

    “কী বুঝলাম?”

    “যে আমি আমেরিকান? আপনার চোখ আছে বলতে হবে।”

    একটু যেন শান্ত হয়ে লোকটা আরাম করে সিটে হেলান দিল। “বোঝার কিছু নেই, আমি জানতাম।”

    “কী করে জানতেন? আমার উচ্চারণ শুনে?”

    “হ্যাঁ,” মাথা নাড়ল লোকটা। “উচ্চারণ শুনে লোক চিনতে ভুল আমার কমই হয়। আসলে আমি ট্রান্সলেটর। দোভাষীর কাজও করি। এটাই আমার পেশা। উচ্চারণের সামান্য তফাতও সেই জন্যে আমি চট করে ধরে ফেলতে পারি।”

    “সত্যি?” পিয়া হাসল। ওর ডিমাকৃতি শ্যামলা মুখে সাদা দাঁতগুলো ঝিকিয়ে উঠল। “কটা ভাষা জানেন আপনি?”

    “ছ’টা। ডায়লেক্টগুলো বাদ দিয়ে।”

    “ওয়াও!” সত্যি সত্যি তারিফের সুর এবার পিয়ার গলায়। “আমি তো শুধু ইংরেজিটাই জানি, আর সেটাও যে খুব একটা ভাল জানি তা নয়।”

    একটু আশ্চর্য হল লোকটা। “আপনি বলছিলেন আপনি ক্যানিং যাচ্ছেন, তাই না?”

    “হ্যাঁ।”

    “কিন্তু পথঘাট চেনেন না, বাংলা-হিন্দি না জানলে ওখানে গিয়ে তো মুশকিলে পড়বেন।”

    “মনে হয় না। এসব অভ্যেস আছে আমার,” হেসে ফেলল পিয়া। “কিছু না কিছু একটা ব্যবস্থা হয়েই যায়। তা ছাড়া আমার যা কাজ তাতে কথাবার্তার বিশেষ কোনও দরকারও পড়ে না।”

    “কী কাজ করেন আপনি, জানতে পারি?”

    “আমি সিটোলজিস্ট। মানে–” ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে বোঝাতে যাচ্ছিল পিয়া, কিন্তু মাঝপথে ওকে থামিয়ে দিল লোকটা।

    “সিটোলজিস্ট মানে আমি জানি। আপনাকে বুঝিয়ে দিতে হবে না। আপনি জলচর স্তন্যপায়ী প্রাণীদের নিয়ে কাজ করেন, তাই তো?”

    “হ্যাঁ,” মাথা নাড়ল পিয়া। “আপনি তো অনেক কিছু জানেন দেখছি। জলচর স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ওপরই গবেষণা করি আমি–ডলফিন, তিমি, ডুগং এইসব। কাজের জন্য অনেকটা সময়ই আমাকে জলের ওপর কাটাতে হয়। কথা বলার মতো ধারে কাছে কেউ থাকেই না। অন্তত ইংরেজি বলার মতো কেউ তো নয়ই।”

    “তা হলে কাজের সূত্রেই আপনি ক্যানিং যাচ্ছেন?”

    “হ্যাঁ। সুন্দরবনের এইসব জলচর প্রাণীদের স্টাডি করার ইচ্ছে আছে আমার। আশা করি কোনওরকমে পারমিট একটা জোগাড় হয়ে যাবে।”

    এবার একটু থমকাল লোকটা। একটুই অবশ্য। “সুন্দরবনে এরকম প্রাণী আছে নাকি? আমি তো জানতামই না।”

    “আছে। মানে একসময় ছিল তো বটেই। প্রচুরই ছিল।”

    “তাই? সুন্দরবন মানেই তো আমাদের ধারণা শুধু বাঘ আর কুমির।”

    “জানি। সুন্দরবনের অন্য সব জলচর প্রাণীর কথা লোকে প্রায় ভুলেই গেছে। কারণটা বলা মুশকিল। হতে পারে যে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে জীবগুলো। অথবা, এদের নিয়ে কখনও কোনও গবেষণা হয়নি, সে কারণে সাধারণ মানুষ এদের কথা জানে না, তাও হতে পারে। এমনকী ঠিকমতো সার্ভেও কখনও করা হয়নি।”

    “কেন?”

    “হয়তো পারমিশন পাওয়া যায় না বলে। গত বছর একটা টিম এসেছিল এখানে সার্ভের জন্য। বেশ কয়েকমাস ধরে ওরা প্রস্তুতি করেছিল, দরকারি কাগজপত্র ঠিকঠাক পাঠিয়েছিল, কিন্তু শেষে যেতেই পারল না নদী পর্যন্ত। একেবারে লাস্ট মোমেন্টে পারমিট বাতিল করা হল।”

    “আপনার ক্ষেত্রেও তো একই ব্যাপার ঘটতে পারে?”

    “একা থাকলে কঁকফোকর গলে বেরিয়ে যাওয়াটা অনেক সোজা।”

    একটু থেমে মুচকি হাসল পিয়া–”তা ছাড়া কলকাতায় আমার এক কাকা আছেন বেশ উঁচু সরকারি পদে। উনি ক্যানিং-এ ফরেস্ট অফিসে একজনের সঙ্গে কথা বলে রেখেছেন। এখন দেখা যাক কী হয়।”

    “আই সি!” পিয়ার এই অকপট অথচ চালাক-চতুর ভাবটা লোকটার ভাল লেগেছে মনে হল। “তা হলে ক্যালকাটায় আত্মীয়স্বজন আছে আপনার?”

    “হ্যাঁ। আমার নিজের জন্মও ওখানেই। আমার বাবা-মা দেশ ছেড়েছেন যখন আমার এক বছর বয়স।” কথাটা বলেই লোকটার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল ও ভুরু তুলে বলল, “আপনিও দেখছি ক্যালকাটা বলেন। আমার বাবাও এখনও বলেন ক্যালকাটা।”

    মাথা নেড়ে ভুলটা স্বীকার করল কানাই। “ঠিকই বলেছেন, একটু খেয়াল রাখতে হবে নামটা বলার সময়।” হেসে হাতটা বাড়িয়ে দিল ও–”পরিচয়টা সারা যাক। আমার নাম কানাই দত্ত।”

    “আমি পিয়ালি রয়। সবাই পিয়া বলেই ডাকে।”

    ওর এমন পরিষ্কার বাংলা নাম শুনে কানাই একটু আশ্চর্য হয়েছে বুঝতে পারল পিয়া। আরও বিশেষ করে এইজন্য যে পিয়া নিজে ভাষাটা জানে না। কানাই হয়তো ভেবেছিল পিয়ার বাবা-মা ইন্ডিয়ার অন্য কোনও অঞ্চলের লোক হবে।

    “আপনার নামটা তো দেখছি বাঙালি, কিন্তু আপনি বাংলা জানেন না?”

    “দোষটা ঠিক আমার নয়,” তাড়াতাড়ি বলল পিয়া। “আমি আমেরিকায় বড় হয়েছি। আর আমরা যখন দেশ ছেড়ে গেছি তখন আমি এত ছোট যে ভাষাটা শেখার সুযোগই পাইনি।”

    “সেরকম হিসেব করলে তো আমারও ইংরেজি বলার কথা নয়। কারণ আমি বড় হয়েছি কলকাতায়।”

    “আসলে ভাষার ব্যাপারে আমার মাথা বিশেষ কাজ করে না…” কথাটা শেষ করল না ও, যেন বাতাসে ভাসিয়ে দিল। তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পালটে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, আপনি কেন ক্যানিং যাচ্ছেন, মিস্টার দত্ত?”

    “কানাই–আমাকে কানাই বলে ডাকতে পারেন।”

    “কান-আয়,” একটু হোঁচট খেয়ে উচ্চারণ করল পিয়া। ওকে শুধরে দেওয়ার জন্য কানাই বলল, “হাওয়াই-এর সঙ্গে মিলিয়ে বলতে পারেন।”

    “কানাই?”

    “দ্যাটস রাইট। এবার আপনার প্রশ্নের জবাব দিই–আমি আমার এক মাসির সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।”

    “উনি ক্যানিং-এ থাকেন?”

    “না। উনি থাকেন লুসিবাড়ি বলে একটা ছোট্ট দ্বীপে। ক্যানিং থেকে বহুদূর।”

    “ঠিক কোন জায়গায়?” পিঠব্যাগের চেন খুলে একটা ম্যাপ বের করল পিয়া। “জায়গাটা কোথায় এই ম্যাপে একটু দেখিয়ে দিন আমাকে।”

    ম্যাপটা খুলে ধরে আঙুল দিয়ে একটা লম্বা আঁকাবাকা কাল্পনিক রেখা টানল কানাই। “ট্রেনে করে এলে ক্যানিং হল সুন্দরবনে ঢোকার দরজা। আর লুসিবাড়ি হল এই যে, এইখানে–একেবারে শেষপ্রান্তে। এর পরে আর কোনও দ্বীপে মানুষ থাকে না। অ্যানপুর, জেমসপুর, এমিলিবাড়ি ছাড়িয়ে আরও বেশ কিছুটা নদীপথে গেলে আপনি লুসিবাড়ি পৌঁছবেন।”

    ম্যাপ দেখতে দেখতে ভুরু কোঁচকাল পিয়া, “অদ্ভুত সব নাম।”

    “সুন্দরবনের কত জায়গার নাম যে ইংরেজি থেকে এসেছে জানলে আশ্চর্য হয়ে যাবেন। লুসিবাড়ি মানে হল লুসির বাড়ি।”

    “লুসির বাড়ি?” অবাক হয়ে তাকাল পিয়া। “মানে লুসি নামের কোনও মেয়ের বাড়ি?”

    “একজ্যাক্টলি,” কানাইয়ের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “আপনি একবার এসে দেখে যেতে পারেন জায়গাটা। লুসিবাড়ি নামটা কী করে হল আপনাকে শোনাব।”

    “নিমন্ত্রণ করছেন?” মুচকি হেসে পিয়া জিজ্ঞেস করল।

    “অবশ্যই। চলে আসুন। আপনি এলে আমারও বনবাসের ভার একটু কমে।”

    পিয়া হাসল। শুরুতে মনে হচ্ছিল কানাই একেবারেই আত্মকেন্দ্রিক একটা লোক, কিন্তু এখন মনে হল আরেকটু উদারভাবে দেখা যেতে পারে মানুষটাকে। কোথাও যেন একটা বৈপরীত্য রয়েছে ওর চরিত্রের মধ্যে। আর তার জন্যেই ওর আত্মকেন্দ্রিক ভাবটাও খানিকটা ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠেছে। অন্তত পিয়া প্রথমে যা ভেবেছিল তার তুলনায় তো বটেই।

    “কিন্তু আপনাকে পাব কোথায়? কোথায় গিয়ে খুঁজব?”

    “আপনি সোজা লুসিবাড়ি হসপিটাল চলে যাবেন। সেখানে গিয়ে মাসিমার খোঁজ করলেই লোকে আপনাকে আমার মাসির কাছে নিয়ে যাবে। আর মাসির সঙ্গে দেখা করলেই আমার খোঁজ পেয়ে যাবেন।”

    “মাসিমা?” পিয়া জিজ্ঞেস করল। “মাসিমা তো আমারও একজন আছেন। মাসিমা মানে মায়ের বোন তো, তাই না? শুধু মাসিমা বললেই হবে? আরও অনেকেরই নিশ্চয়ই মাসিমা থাকতে পারেন ওখানে?”

    “আপনি যদি হসপিটালে গিয়ে মাসিমার কথা বলেন, যে কেউ বুঝবে আপনি কার সঙ্গে দেখা করতে চান। ওই হসপিটালটা আমার মাসিই শুরু করেছিলেন, আর যে সংস্থা ওটা চালায়–বাদাবন ট্রাস্ট–উনি তার সর্বেসর্বা। ওঁর নাম নীলিমা বোস, কিন্তু সবাই ‘মাসিমা বলেই ডাকে ওখানে। আমার মেসো আর মাসি ছিলেন একেবারে যাকে বলে রাজযোটক–ওখানকার সকলের সার’ আর ‘মাসিমা।”

    “সার? তার মানে?”

    কানাই হেসে ফেলল। “ওটা হল sir বলার বাংলা ধরন। আসলে উনি ছিলেন ওখানকার স্কুলের হেডমাস্টার। তাই সব ছাত্ররা ওনাকে sir-ই বলত। লোকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল ওনার একটা আসল নাম আছে–নির্মল বোস।”

    “আপনি ওনার বিষয়ে পাস্ট টেন্স-এ কথা বলছেন যে?”

    “হ্যাঁ। উনি বহুদিন হল মারা গেছেন।” মুখটা একটু বিকৃত করল কানাই; যেন মনে মনে স্বীকার করতে চায় না ব্যাপারটাকে।

    “তবে এই মুহূর্তে কী মনে হচ্ছে আমার জানেন তো? মনে হচ্ছে মেসো যেন বেঁচেই আছেন এখনও।”

    “কী রকম?”

    “কারণ উনি প্রায় কবর খুঁড়ে উঠে এসে ডেকে পাঠিয়েছেন আমাকে,” হাসল কানাই।

    “আসলে মারা যাওয়ার সময় মেসো কিছু কাগজপত্র আমার জন্য রেখে গিয়েছিলেন। এত বছর সেগুলোর কোনও হদিশ ছিল না, কিন্তু রিসেন্টলি পাওয়া গেছে। সেইজন্যই আমি লুসিবাড়ি যাচ্ছি। মাসির খুব ইচ্ছে আমি একবার গিয়ে কাগজগুলো দেখি।”

    ওর কথার মধ্যে ক্ষীণ একটা বিরক্তির আভাস পেল পিয়া। “মনে হচ্ছে আপনার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না আসার?”

    “ধরেছেন ঠিক। আদৌ ইচ্ছে ছিল না,” বলল কানাই। “হাতে এমনিতেই প্রচুর কাজ, আর এই সময়টাতে কাজের চাপ খুবই বেশি থাকে। এখন এক সপ্তাহ ছুটি নেওয়া–”

    “ও। এই প্রথম আপনি যাচ্ছেন ওখানে?”

    “না, প্রথম নয়। অনেক বছর আগে আরেকবার আমাকে ওখানে পাঠানো হয়েছিল।”

    “পাঠানো হয়েছিল? কেন?”

    “সে গল্প বলতে গেলে একটা ইংরেজি শব্দের কথা টানতে হয়, বুঝলেন?” হাসল কানাই। “রাস্টিকেট’ শব্দটা জানেন তো?”

    “না। কখনও শুনেছি বলে মনে পড়ছে না।”

    “এটা আসলে ছিল একটা শাস্তির ব্যবস্থা, দুষ্ট্র স্কুলছাত্রদের জন্য, কানাই বলল। “আগেকার দিনে এরকম দুরন্ত ছেলেদের সব গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হত গেঁয়ো, মানে রাস্টিক, লোকেদের কাছে। যখন ছোট ছিলাম, আমার ধারণা ছিল অনেক কিছুই আমি আমার মাস্টারমশাইদের থেকে বেশি জানি। একবার আমি একজন টিচারকে সবার সামনে অপদস্থ করেছিলাম। সে ভদ্রলোক কিছুতেই ‘লায়ন’ শব্দটা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারতেন না। বলতে গিয়ে জিভ জড়িয়ে ফেলতেন, ফলে অদ্ভুত শোনাত শব্দটা, খানিকটা ‘গ্রয়েন’-এর সঙ্গে ছন্দে মিলত। আমার বয়স তখন দশ। তো, তারপর অনেক ঝামেলা-টামেলা হল, স্কুল থেকে আমার বাবা-মাকে জানানো হল যে আমাকে রাস্টিকেট করা হবে। সেই সময়ে আমাকে মাসি-মেসোর কাছে লুসিবাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল,” ঘটনাটা মনে করে হাসি পেল কানাইয়ের। “সে কতকাল আগের কথা, ১৯৭০।”

    ট্রেনের গতি কমতে শুরু করেছিল; কানাইয়ের কথার মাঝখানেই হুইসল বাজল। জানালা দিয়ে তাকিয়ে স্টেশনের হলুদ সাইনবোর্ডটা দেখতে পেল ও–”ক্যানিং।”

    “এসে গেছি,” ট্রেনের আলাপ এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাওয়ায় হঠাৎ যেন মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল কানাইয়ের। এক টুকরো কাগজ ছিঁড়ে নিয়ে খসখস করে কয়েকটা শব্দ লিখে ও পিয়ার হাতে দিল–”এটা রাখুন, আমাকে খুঁজে বার করতে কাজে লাগবে।”

    ট্রেন থামতেই কামরার সব লোক হুড়মুড় করে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। পিয়াও দাঁড়িয়ে উঠে পিঠব্যাগগুলো কাঁধে ঝোলাল। “আবার হয়তো দেখা হয়ে যাবে।”

    “আশা করি।” হাত নাড়ল কানাই। “মানুষখেকো বাঘ আছে কিন্তু, সাবধানে থাকবেন।”

    “আপনিও ভাল থাকবেন। চলি।”

  • ক্যানিং

    ক্যানিং

    প্ল্যাটফর্মের ভিড়ের মধ্যে মিশে যাওয়া পিয়ার পিঠের দিকে সাগ্রহে তাকিয়ে রইল কানাই। বিয়ে-টিয়ে এখনও করেনি যদিও, কিন্তু নিজেকে ও বলে “রেয়ারলি সিঙ্গল”–কদাচিৎ সঙ্গিনীহীন। গত কয়েক বছরে বেশ কিছু মহিলা ওর জীবনে এসেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্পর্কগুলো একটা মধুর আন্তরিকতায় শেষ হয়েছে–অথবা টিকে রয়েছে। শেষবারের বিচ্ছেদের ঘটনাটা অবশ্য খুব একটা মধুর হয়নি। মেয়েটি ছিল বিখ্যাত এক কমবয়সি ওড়িশি নৃত্যশিল্পী। সপ্তাহ দুয়েক আগে প্রচণ্ড রেগেমেগে কানাইয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সে ওকে ফোনে আর যোগাযোগ করতে বারণ করেছিল। ব্যাপারটা তখন খুব সিরিয়াসলি নেয়নি কানাই। কিন্তু তারপরে যখন মেয়েটির মোবাইলে ফোন করল, দেখল সেটা ও ওর ড্রাইভারকে দিয়ে দিয়েছে। ঘটনাটায় বেশ জোরালো একটা ধাক্কা খেয়েছিল কানাইয়ের অহমিকা। তারপর থেকেই সেই ভাঙা অহংকারকে জোড়া দিতে ও যে-কোনও একটা সংক্ষিপ্ত সম্পর্কে জড়ানোর চেষ্টা করছে–এমন একটা সম্পর্ক, যার শুরু আর শেষের চাবিকাঠি ওরই হাতে থাকবে। কিন্তু এ যাবৎ সে চেষ্টায় বিশেষ কোনও ফল হয়নি। লুসিবাড়ি ভ্রমণের সময়টায় কানাই ভেবেছিল এই বান্ধবী খোঁজার চেষ্টায় একটা সাময়িক বিরতি দেবে। তবে এটাও ও জানে যে জীবনে অনেক সম্ভাবনারই জন্ম হয় খুব অপ্রত্যাশিত ভাবে। যেমন, পিয়ার সঙ্গে আজ ট্রেনের আলাপটা। এরকম প্রায় ঘঁচে-ফেলা আদর্শ একটা সিচুয়েশন খুব সহজে মেলে না : নদিন পরে ওকে ফিরতেই হবে, কাজেই কেটে পড়ার রাস্তাও পরিষ্কার। আর পিয়া যদি ওর নিমন্ত্রণ রাখতে লুসিবাড়ি শেষপর্যন্ত যায়, তা হলে হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলারও কোনও মানে হয় না।

    ট্রেনের ভিড় পাতলা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল কানাই। তারপর প্ল্যাটফর্মে নেমে এসে সুটকেসটা দুপায়ের মাঝে রেখে ধীরেসুস্থে চারিদিকে তাকাল।

    নভেম্বর শেষ হয়ে আসছে। মিঠে রোদ্দুর আর ঠান্ডা বাতাসে বেশ একটা খড়খড়ে ভাব। হাওয়া বইছে, তবে খুব জোরে নয়। কিন্তু কীরকম যেন একটা ক্লান্ত মরকুটে ভাব স্টেশনটার, যেন ক্ষয়টে মাটি-বেরোনো ঘাসহীন একটা শহুরে পার্ক। চকচকে রেললাইন বরাবর স্তরে স্তরে জমে আছে পেচ্ছাপ পায়খানা আর যত রাজ্যের আবর্জনা; আর প্ল্যাটফর্মটাকে দেখে মনে হচ্ছে কেমন যেন মাটিতে গেঁথে বসে গেছে মানুষের পায়ের চাপে।

    এই স্টেশনে প্রথম ও এসেছিল তিরিশ বছরেরও বেশি আগে, কিন্তু এখনও কানাই পরিষ্কার মনে করতে পারে কেমন আশ্চর্য হয়ে ও মাসি-মেসোকে জিজ্ঞেস করেছিল, “এখানে এত লোক থাকে?”

    মজা পেয়ে হেসেছিল নির্মল। “তুমি কী ভেবেছিলে? শুধু জঙ্গল থাকবে?”

    “হ্যাঁ।”

    “লোকজন ছাড়া ওরকম জঙ্গল শুধু সিনেমাতেই হয়। এখানে একেকটা জায়গা আছে যেখানে একেবারে কলকাতার বাজারের মতো ভিড়। আর কোনও কোনও নদীতে যত নৌকো দেখতে পাবে, গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডেও তত ট্রাক থাকে না।”

    নিজের সমস্ত গুণের মধ্যে কানাইয়ের সবচেয়ে গর্ব ওর স্মৃতিশক্তি নিয়ে। লোকে যখন এতগুলো ভাষা জানার জন্য ওর প্রশংসা করে, কানাইয়ের ধরাবাঁধা জবাব হল পরিষ্কার কান আর ভাল স্মৃতিশক্তি থাকলেই যে-কোনও ভাষা শেখা যায়; আর ওর সৌভাগ্য যে এ দুটোই ওর আছে। তাই এতগুলো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও নির্মলের গলার স্বর আর কথা বলার ধরন স্পষ্ট মনে আছে দেখে বেশ একটু আত্মতৃপ্তি অনুভব করল কানাই।

    শেষ যেবার নির্মলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল সেবারের কথা মনে পড়তে বেশ একটু হাসিই পেল ওর। সেটা সত্তরের দশকের শেষ দিক, কানাই তখন কলকাতায় কলেজে পড়ে। ক্লাসে যেতে দেরি হয়ে গেছে বলে ও তাড়াহুড়ো করে হাঁটছিল। ইউনিভার্সিটির ফুটপাথে পুরনো বইয়ের দোকানগুলোর সামনে দিয়ে প্রায় দৌড়ে যাওয়ার সময় একটা লোকের গায়ে গোঁত্তা খেল কানাই। ভদ্রলোক দোকানে দাঁড়িয়ে একটা বই উলটে পালটে দেখছিলেন। কানাইয়ের আচমকা ধাক্কায় বইটা হাত থেকে উড়ে গিয়ে পড়ল পথের পাশে জমা জলে। “রাস্তা থেকে সরে দাঁড়াতে পারো না বোকাচোদা”–বলে লোকটাকে খিস্তি করতে গিয়েই মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে মেসোর হকচকিয়ে যাওয়া চোখদুটো ওর নজরে এল।

    “আরে কানাই নাকি?”

    “আরে তুমি!” নিচু হয়ে মেসোকে প্রণাম করার সময় জলে-পড়া বইটাও তুলে নিল ও। বিধ্বস্ত মলাটটায় চোখ পড়ল কানাইয়ের–ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের Travels in Mughal Empire.

    দোকানদার ততক্ষণে চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছে–”এত দামি বইটার বারোটা বাজিয়ে দিলেন মশাই, এটার দাম দিয়ে যেতে হবে আপনাকে।” মেশোর কাঁচুমাচু মুখের দিকে একঝলক তাকিয়েই কানাই বুঝতে পারল এত পয়সা মেশোর সঙ্গে নেই। ঘটনাচক্রে ও নিজে সেদিনই কিছু টাকা পেয়েছিল–একটা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে কাগজে, তার পারিশ্রমিক। পকেট থেকে ওয়ালেট বার করে দাম মিটিয়ে বইটা নির্মলের হাতে গুঁজে দিল কানাই। পুরো ব্যাপারটাই ঘটে গেল লহমার মধ্যে। অপ্রস্তুত মেসোকে কোনও কৃতজ্ঞতার কথা বলার সুযোগ না দেওয়ার জন্য ও তড়বড় করে বলল, “আমাকে এখন দৌড়োতে হবে, ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে।” একলাফে জল-জমা একটা গর্ত পেরিয়ে সেখান থেকে হাওয়া হয়ে গেল কানাই।

    এরপর কতবার ওর মনে হয়েছে আবার কখনও ঠিক এভাবেই দেখা হয়ে যাবে মেশোর সঙ্গে–দোকানে দাঁড়িয়ে কোনও দামি বই নেড়েচেড়ে দেখবে নির্মল, সে বই হয়তো তার কেনার সামর্থ্য নেই, আর কানাই তখন এসে বইটা মেসোকে কিনে দেবে। কিন্তু সেরকম কিছু আর ঘটেনি। কলেজ স্ট্রিটের সেই দুপুরের প্রায় দু’বছর পরে দীর্ঘদিন রোগে ভুগে লুসিবাড়িতে মারা গেল নির্মল। মৃত্যুশয্যায় মেসোর ওর কথা মনে পড়েছিল, নীলিমার কাছ থেকে পরে শুনেছে কানাই। নিজের কোনও একটা লেখা কানাইকে পাঠিয়ে দিতে বলেছিল। কিন্তু মারা যাওয়ার বেশ কয়েকমাস আগে থেকেই মেসোর কথাবার্তা অসংলগ্ন হয়ে গিয়েছিল, তাই নীলিমা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি কী করবে। নির্মল যাওয়ার পর সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেছিল–যদি কোথাও কিছু থেকে থাকে। কিছুই পাওয়া যায়নি। নীলিমারও তাই মনে হয়েছিল ওসব লেখা-টেখার কথা হয়তো প্রলাপের ঘোরেই বলা। শেষের দিকে এমনিতেই তো অকারণে বিড়বিড় করত মানুষটা।

    কিন্তু মাসদুই আগে একদিন সকালে দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের ফ্ল্যাটে হঠাৎ মাসির একটা ফোন পেল কানাই। নীলিমা ফোন করেছিল গোসাবার একটা বুথ থেকে–লুসিবাড়ির কাছেই আধা শহর-আধা গঞ্জ একটা জায়গা। ফোনটা যখন বাজল, কানাই তখন ব্রেকফাস্টের অপেক্ষায় খাওয়ার টেবিলে বসে।

    “কানাই বলছিস?”

    দু’-একটা এটা সেটা কথা, কুশল প্রশ্নের পরেই ওর মনে হল মাসির গলায় কেমন একটা বাধোবাধো সুর। যেন কী একটা বলতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। “কিছু হয়েছে নাকি মাসি?

    তুমি কি কিছু বলবে আমাকে?” কানাই জিজ্ঞেস করল।

    “হ্যাঁ রে, একটা কথা বলার ছিল,” নীলিমার স্বর একটু অপ্রতিভ।

    “কী ব্যাপার? বলো না।”

    “আমি ভাবছিলাম, মানে, তুই যদি একবার কয়েকদিনের জন্য লুসিবাড়িতে আসতে পারিস খুব ভাল হয় রে কানাই। তুই কি পারবি?”

    একটু অবাকই হল কানাই। ঠিকই, নীলিমার ছেলেপুলে নেই, নিকট আত্মীয় বলতে একমাত্র ও-ই, কিন্তু এরকম দাবি মাসি আর কখনও করেছে বলে মনে পড়ল না ওর। নীলিমা বরাবরই একটু চাপা প্রকৃতির, কারও কাছে কোনও অনুগ্রহ চাওয়া তার স্বভাবে নেই। “কেন বলো তো?” আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল কানাই।

    ফোনের ওপারে কয়েকমুহূর্ত কোনও শব্দ নেই। তারপর নীলিমা বলল, “তোর মনে আছে কানাই, অনেক বছর আগে আমি বলেছিলাম নির্মল তোর জন্য একটা লেখা রেখে গেছে?”

    “হ্যাঁ, মনে তো আছেই। কিন্তু সে লেখাটা তো পাওয়া যায়নি?”

    “সেটাই তো,” বলল নীলিমা। “মনে হয় শেষপর্যন্ত পেয়েছি। তোর নাম লেখা একটা মোটা প্যাকেট খুঁজে পাওয়া গেছে।”

    “কোথায় পেলে?”

    “নির্মলের পড়ার ঘরে। আমি যেখানে থাকি, ট্রাস্টের গেস্টহাউসে, তার ছাদের ওপর। ও মারা যাওয়ার পর এত বছর ধরে ঘরটা তালাবন্ধ পড়েছিল। কিন্তু এবার ওটা ভেঙে ফেলতে হবে, বাড়িটা আর একতলা বাড়াব। দু’একদিন আগে সেজন্য ঘরটা পরিষ্কার করতে গিয়ে পেলাম প্যাকেটটা।”

    “ভেতরে কী ছিল?”

    “নিশ্চয়ই ওইসব প্রবন্ধ, কবিতা-টবিতা যা লিখেছিল এত বছর ধরে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, আমি জানি না। আমার মনে হয় ও থাকলে তোকেই প্রথম ওগুলো পড়াতে চাইত। আমার লিটারারি জাজমেন্টের ওপর ওর কখনওই কোনও ভরসা ছিল না, আর আমিও সত্যি সত্যিই কিছু বুঝি না ওসব। তাই ভাবছিলাম তুই যদি একবার আসিস। হয়তো তুই লেখাগুলো ছাপানো-টাপানোরও ব্যবস্থা করতে পারবি। তোর তো অনেক পাবলিশারের সঙ্গে জানাশোনা আছে।”

    “তা আছে,” কানাই বলল। মাথার মধ্যে কেমন সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল ওর।

    “কিন্তু এখন লুসিবাড়িতে যাওয়া—এতদূরে–দিল্লি থেকে যেতেই তো দু’দিন লাগবে। মানে, গেলে ভালই লাগবে, কিন্তু–”

    “তুই এলে আমি খুব খুশি হব, কানাই।”

    নীলিমার কথা বলার এই শান্ত অথচ দৃঢ় ভঙ্গিটা কানাই খুব চেনে। কিছু একটা করবে বলে মনস্থির করলেই ওর কথা বলার ধরনটাই যেন পালটে যায়। কানাই বুঝতে পারছিল মাসি সহজে ছাড়বে না। ওদের পরিবারে তো নীলিমা তার জেদের জন্যই বিখ্যাত। আর ওই ছিনে-জেঁকের মতো লেগে থাকার ক্ষমতা আছে বলেই ও আজকের এই বাদাবন ট্রাস্ট গড়ে তুলতে পেরেছে। গ্রামের মানুষদের নিয়ে যেসব এনজিও কাজ করে, তাদের মধ্যে এই ট্রাস্টকে এখন আদর্শ বলে জানে সবাই।

    “প্যাকেটটা ডাকে পাঠিয়ে দেওয়া যায় না, মাসি?” শেষ চেষ্টা কানাইয়ের।

    “এরকম একটা জিনিস আমি ডাকে পাঠাব? কোথায় হারিয়ে যাবে তারপর!”

    “মানে, ব্যাপারটা কী জানো তো, এখন আমাদের খুব কাজের চাপ। এক্কেবারে দম ফেলার সময় পাচ্ছি না।”

    “তুই তো সব সময়ই ব্যস্ত।”

    “সেটা ঠিকই।” কানাইদের ফার্মটা ছোট হলেও চড়চড় করে উন্নতি করছে। এই কোম্পানি ওর নিজের হাতে গড়া, আর ও-ই এটার হর্তাকর্তা-বিধাতা। দিল্লির বিভিন্ন দূতাবাস, বহুজাতিক সংস্থা আর দাঁতব্য প্রতিষ্ঠানের কাজে যে সমস্ত বিদেশি লোকজনেরা আসে, ওর কোম্পানির লোকেরা তাদের জন্য অনুবাদ আর দোভাষীর কাজ করে। এই ধরনের আর কোনও সংস্থা দিল্লিতে নেই বলেই এ লাইনে ওদের প্রায় একচেটিয়া দখল, আর চাহিদাও প্রচণ্ড। ফলে অফিসের লোকেদের সবাইকেই মুখে রক্ত তুলে খাটতে হয়; কানাইকে পরিশ্রম করতে হয় সবচেয়ে বেশি।

    “তুই তা হলে আসছিস তো?” নীলিমা আবার জিজ্ঞেস করল। “প্রতি বছরই বলিস আসবি, কিন্তু শেষপর্যন্ত আর আসিস না। আমারও তো বয়স হচ্ছে, নাকি?”

    একটু আগেও কানাই ভাবছিল কোনওরকমে কাটিয়ে দেবে নীলিমাকে, কিন্তু মাসির গলায় অনুনয়ের সুরটা শুনে মত পালটাল ও। বরাবরই কানাই নীলিমার একটু ন্যাওটা। মা মারা যাওয়ার পর টানটা আরও বেড়েছে। চেহারায়, স্বভাবে ওর মায়ের সঙ্গে এই মাসির খুবই মিল। মাসির জন্য কানাইয়ের শ্রদ্ধায়ও কোনও খাদ নেই। নিজের ব্যবসাটা গড়ে তুলতে গিয়ে ও হাড়ে হাড়ে বুঝেছে বাদাবন ট্রাস্টের মতো একটা প্রতিষ্ঠানের জন্য কী ঝড়টা সামলাতে হয়েছে নীলিমাকে। আর ওর ব্যবসার তুলনায় নীলিমার কাজ ছিল আরও অনেক কঠিন, কারণ বাদাবন ট্রাস্ট লাভের জন্য কাজ করে না। প্রথমবার লুসিবাড়িতে গিয়ে তো ও নিজের চোখেই দেখেছে কী নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটায় ভাটির দেশের মানুষরা। আর ওরা যাতে একটু অন্তত ভাল থাকতে পারে তার জন্যই নিজের জীবনটা বিলিয়ে দিয়েছে মাসি। নীলিমার এই গুণটার কোনও তুলনা খুঁজে পায় না কানাই। কেন এই জীবন মাসি বেছে নিল তারও কোনও ব্যাখ্যা ও খুঁজে পায় না। নিজের কাজের জন্য নীলিমা কোনও স্বীকৃতি পায়নি তা নয়–এই গত বছরই তো রাষ্ট্রপতির সম্মানপদক আর বড়সড় একটা উপাধি পেল। কিন্তু তাও কানাই ভাবে, যে পরিবেশ থেকে তার মাসি এই বাদাবনে এসেছিল, তাতে তার পক্ষে লুসিবাড়িতে এতগুলো বছর কাটিয়ে দেওয়াটা একটা আশ্চর্য ঘটনা। মা-র কাছ থেকে কানাই শুনেছে, তার মামাবাড়িতে আরাম-বিলাসের কোনও কমতি ছিল না। আর সে তুলনায় লুসিবাড়িতে তো সাধারণ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যেরও কোনও ব্যবস্থা নেই।

    বন্ধুদের কাছে কানাই কতবার গল্প করেছে, তার মাসি কত স্বার্থত্যাগ করেছে সাধারণ মানুষের জন্য–যেন নীলিমা কোনও স্বর্ণযুগের এক চরিত্র, যে যুগে বড়লোকদের মধ্যে এত সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা ছিল না। এই সমস্তকিছুই মনের মধ্যে কাজ করছিল বলে মাসির অনুরোধটা শেষপর্যন্ত ফেরাতে পারল না কানাই।

    “ঠিক আছে, তুমি যখন যেতে বলছ, তা হলে তো করার আর কিছু নেই, যেতেই হবে।” একটু অনিচ্ছার সঙ্গেই ও বলল। “দিনদশেকের জন্য যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমাকে কি আজকালের মধ্যেই রওয়ানা হতে বলছ?”

    “না না,” নীলিমা তাড়াতাড়ি বলল। “এক্ষুনি আসার কোনও দরকার নেই।”

    “তা হলে অবশ্য অনেক সহজ হয়ে যায় ব্যাপারটা আমার পক্ষে,” স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল কানাই। সেই ওড়িশি শিল্পীর সঙ্গে ওর টক-ঝাল সম্পর্কটা তখন একটা ইন্টারেস্টিং মোড় নিচ্ছিল। সেই মুহূর্তে তার ছন্দপতন ঘটানোর মতো একটা ত্যাগ স্বীকার করতে মন চাইছিল না। শেষপর্যন্ত সেটা করতে হল না ভেবে খুশি হল কানাই। “ঠিক আছে। মাস দুয়েকের মধ্যেই পৌঁছে যাব আমি। এদিকটা একটু গুছিয়ে নিয়েই তোমাকে জানাব।”

    “ওকে। আমি অপেক্ষা করে থাকব।”

    আর এখন, এই ক্যানিং স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কানাই দেখল শেডের নীচে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে তার মাসি–প্রায় জনাবিশেক লোক তাকে ঘিরে রয়েছে। তাদের কেউ কেউ নীলিমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে, আর কেউ রয়েছে বৃত্তের বাইরের দিকে, ভিড় ঠেলে ভেতরে পৌঁছতে পারছে না। চুপচাপ হেঁটে গিয়ে কানাই ভিড়টার পাশে দাঁড়াল। লোকগুলোর কথাবার্তা শুনে মনে হল এরা কেউ এসেছে কিছু কাজের খোঁজে, আর উঠতি নেতাগোছের কিছু লোক এসেছে নীলিমার সাহায্যের আশায়। কিন্তু জটলাটার বেশিরভাগ লোকই স্রেফ শুভাকাঙ্ক্ষী। তারা শুধু নীলিমাকে একবার চোখের দেখা দেখতে চায়, তার সান্নিধ্যের ছোঁয়া নিতে চায়। আর কিছু না।

    এই ছিয়াত্তর বছর বয়সে নীলিমা বোস আকারে প্রায় গোল, তার টোল-পড়া গোল ঘঁদের মুখে পূর্ণিমার চাঁদের আদল। গলার স্বর নরম, কিন্তু চেরা বাঁশের গায়ে টোকা দিলে যেমন আওয়াজ বের হয় সেরকম, একটু ভাঙা। ছোট্টখাট্টো মানুষটি, মাথার চুল এখনও যথেষ্ট কালো–পেছনদিকে পুঁটলি করে বাঁধা। পরনে সর্বদাই বাদাবন ট্রাস্টে বোনা সুতির কাপড়, পাড়ে বাটিকের কাজ করা। এরকমই একটা আটপৌরে সরু কালো পাড় শাড়ি পরে নীলিমা চলে এসেছে, কানাইকে রিসিভ করতে।

    এমনিতে নীলিমার ব্যবহারে সব সময়ই একটা আলগা প্রশ্রয়ের ভাব থাকে, কিন্তু দরকার পড়লেই বেরিয়ে আসে ভেতরের কঠিন মানুষটা–সে সময় তাকে অমান্য করার সাহস কারও নেই। কারণ সবাই ভাল করেই জানে, সব মা-মাসিদের মতোই নীলিমা একদিকে যেমন স্নেহময়ী, তেমনি দোষীদের কখনও ছেড়ে কথা বলা তার ধাতে নেই।

    . ভিড়ের বাইরে কানাইয়ের চেহারাটা নজরে আসতেই হাতের ইশারায় লোকগুলোকে থামিয়ে দিল নীলিমা। আর জটলাটা যেন মন্ত্রবলে দু’ভাগ হয়ে গিয়ে কানাইয়ের জন্য পথ করে দিল।

    “কানাই! কোথায় ছিলি এতক্ষণ? আমি তো ভাবছি ট্রেন মিস করলি বোধ হয়”–প্রণাম করার জন্য নিচু হতেই হাত দিয়ে ওর চুলগুলো এলোমেলো করে দিল নীলিমা।

    “ঠিক সময়েই পৌঁছে গেছি তো৷” একহাতে মাসিকে জড়িয়ে ধরে দাঁড় করাতে করাতে কানাই ভাবছিল কী রকম বুড়িয়ে গেছে নীলিমা এই ক’বছরে। মাসির কনুইটা ধরে ধীরে ধীরে স্টেশনের গেটের দিকে এগোল ও। জটলার লোকগুলো মালপত্র নিয়ে আসতে লাগল পেছন পেছন।

    “তুমি আবার খামকা ক্যানিং পর্যন্ত ঠেঙিয়ে আসতে গেলে কেন বলো তো? আমি ঠিকই পৌঁছে যেতে পারতাম।” এ কথাটা অবশ্য নিছক ভদ্রতার খাতিরেই বলা, কারণ একা খুঁজে খুঁজে লুসিবাড়ি যেতে হলে বেশ একটু মুশকিলেই পড়তে হত ওকে। আর ক্যানিং-এ এসে যদি দেখত ওকে নিতে কেউ আসেনি, মেজাজটা একেবারে খাট্টা হয়ে যেত কানাইয়ের।

    নীলিমা অবশ্য অতশত বোঝেনি। “ভাবলাম চলে আসি। লুসিবাড়ি থেকে মাঝে মধ্যে বেরোতে পারলে ভালই লাগে। কিন্তু সে যাকগে, ট্রেনে কোনও অসুবিধা হয়নি তো? বোর হসনি তো একা একা?”

    “না না। আসলে একটা ইন্টারেস্টিং মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল, কথা বলতে বলতে চলে এলাম। আমেরিকান মেয়ে একটা।”

    “তাই? এখানে কী করতে এসেছে?” জিজ্ঞেস করল নীলিমা।

    “ওই ডলফিন-টলফিন জাতীয় প্রাণীদের ওপর রিসার্চ করছে। আমি ওকে বলেছি পারলে একবার লুসিবাড়ি ঘুরে যেতে।”

    “বেশ করেছিস। আসবে আশা করি।”

    “হ্যাঁ, আশা করি,” বলল কানাই।

    চলতে চলতে আচমকা থমকে গিয়ে কানাইয়ের কনুইটা খামচে ধরল নীলিমা। উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, আমি তোকে নির্মলের একটা লেখা পাঠিয়েছিলাম, তুই কি পেয়েছিলি?”

    “হ্যাঁ,” মাথা নাড়ল কানাই। “সেটাই তো ট্রেনে পড়তে পড়তে এলাম। মেসো আমার জন্য যে প্যাকেট রেখে গেছে ওটা কি তার মধ্যে পেলে?”

    “না না, এই লেখাটা তো বহুকাল আগের। একটা সময়–বেশ কিছুদিন–তোর মেসো সারাদিন কেমন মনমরা হয়ে থাকত। তখন আমি ভাবলাম যদি কিছু একটা কাজে ওকে জড়িয়ে রাখা যায় তা হলে হয়তো মনটা একটু ভাল লাগবে। তাই বললাম সুন্দরবন নিয়ে টুকটাক কিছু লিখতে তো পারো। ভেবেছিলাম পরে ওগুলোকে আমাদের ব্রোশিওর-টোশিওরে লাগিয়ে দেব। কিন্তু শেষপর্যন্ত ও যেগুলো লিখল, সেগুলো একটু অন্য ধাঁচের। তোর ভাল লাগতে পারে ভেবে তোকে পাঠিয়েছিলাম।”

    “ও। আমার কেন জানি মনে হয়েছিল ওই প্যাকেটের থেকে বের করে ওগুলো তুমি। পাঠিয়েছ।”

    “না না। প্যাকেটটা আমি খুলিইনি,” বলল নীলিমা। “যেমন আঠা লাগিয়ে বন্ধ করা ছিল সেরকমই আছে। আমি জানি নির্মল চেয়েছিল তুই-ই ওই লেখাগুলো প্রথম পড়িস। আমাকেও ও তাই বলেছিল, মারা যাওয়ার ঠিক আগে।”

    কানাই একটু ভুরু কোঁচকাল। “তোমার কখনও কৌতূহল হয়নি?”

    মাথা নাড়ল নীলিমা। “কানাই, তুই যখন আমার বয়সে পৌঁছবি, দেখবি যেসব ভালবাসার মানুষরা চলে গেছে তাদের স্মৃতিমাখানো জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করতে কীরকম মন খারাপ লাগে। সেজন্যই আমি তোকে আসতে বলেছিলাম।”

    স্টেশন চত্বর ছেড়ে ধুলোভরা একটা রাস্তায় নেমে এল ওরা। রাস্তার দু’ধারে গায়ে গায়ে লাগানো পানবিড়ি তেলেভাজার দোকান, আরও কত ছোটখাটো দোকান।

    “কানাই, তুই যে শেষপর্যন্ত এসেছিস তাতে আমি কী খুশি যে হয়েছি–” নীলিমা বলল। “কিন্তু একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না।”

    “কী কথা?”

    “তুই ক্যানিং দিয়ে কেন আসতে চাইলি? বাসন্তী হয়ে এলে কত সুবিধা হত। আজকাল তো এই রুটে কেউ আসেই না প্রায়।”

    “তাই নাকি? কেন আসে না?”

    “নদীর জন্য। নদীটা একেবারে পালটে গেছে তো।”

    “পালটে গেছে? কীরকম?”

    কানাইয়ের মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে নীলিমা বলল, “একটু অপেক্ষা কর, দেখতে পাবি এক্ষুনি।”

    “যে-কোনও বড় নদীর কাছে গেলেই পুরনো দিনের কোনও না কোনও স্মৃতিচিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবে।”

    মেসো এর পর ওকে যে লম্বা লিস্টি শুনিয়েছিল তা পরিষ্কার মনে আছে কানাইয়ের :

    মানাওসের অপেরা হাউস, কার্নাকের মন্দির, প্যাগানদের দশ হাজার প্যাগোডা… ক্যানিংকেও ওই তালিকায় তুলে দিয়েছিল মেসো, ভেবে হাসি পেল কানাইয়ের। “আমাদের এই মাতলার পাশের ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন হল পোর্ট ক্যানিং।”

    ক্যানিং বাজার অঞ্চলের চেহারাটা একই রকম রয়ে গেছে দেখল কানাই–সরু সরু গলি, ঘেঁষাঘেষি দোকানপাট, নোনাধরা ঘরবাড়ি। ছোট ছোট দোকানে নানারকম পেটেন্ট ওষুধ বিক্রি হচ্ছে, ব্যথাবেদনা আর পেটের রোগের। বিচিত্র সব নাম ওষুধগুলোর হজমোজাইন, দৰ্দোসাইটিন। বাড়িঘরের মধ্যে চোখে পড়ার মতো আছে একমাত্র কিছু সিনেমা হল। বিশাল বিশাল হল সব, বালির বস্তার মতো কুৎসিত চেহারা নিয়ে চেপে বসে আছে জায়গাটার ওপর। যেন মাতলা যাতে শহরটাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে না পারে সেইজন্যই ওগুলিকে বসিয়ে রাখা হয়েছে এখানে।

    একটা ইটবাঁধানো রাস্তায় গিয়ে শেষ হয়েছে বাজারটা। রাস্তাটা চলে গেছে শহর থেকে নদীর দিকে; কিন্তু খানিকটা গিয়েই শেষ হয়ে গেছে–নদীতে পৌঁছনোর বেশ কিছুটা আগেই। রাস্তার একদম শেষপ্রান্তে এসে কানাই বুঝতে পারল নীলিমা কেন বলছিল নদী পালটে গেছে। ওর স্মৃতিতে যে মাতলা আছে সে এক বিশাল নদী, সেরকম আর কখনও ও জীবনে দেখেনি। কিন্তু এখন সামনে বেশ কিছুটা দূরে যেটা দেখা যাচ্ছে সেটাকে বড়জোর একটা সরু খাল বলা যেতে পারে। ভাটা অনেকক্ষণ শুরু হয়ে গেছে, আর প্রায় কিলোমিটারখানেক চওড়া খাতের ঠিক মাঝখান দিয়ে তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে মাতলা। জলের ধার বরাবর সদ্য জমা পলি রোদে চকচক করছে, মনে হচ্ছে যেন পরতে পরতে জমে থাকা গলন্ত চকলেট। মাঝে মাঝেই এখানে ওখানে নদীর গভীর থেকে দু’-একটা বুদবুদ ভেসে উঠেই ফেটে যাচ্ছে, বৃত্তাকার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে বার্নিশ করা জলের ওপর। বুদবুদের শব্দগুলো যেন অস্ফুটে বলা কোনও কথার মতো মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীর গভীর থেকে ভেসে আসা কোনও কণ্ঠস্বর আপন মনে বকবক করে চলেছে।

    “ওই দেখ,” নীলিমা বলল দুরের দিকে একটা আঙুল দেখিয়ে। ভাটার মাতলার ওপর দিয়ে জল ছিটিয়ে এগিয়ে আসছে একটা নৌকো। মিটার নয়েকের বেশি লম্বা নয়, কিন্তু শখানেকের বেশি মানুষ গাদাগাদি করে উঠেছে ওটার ওপর। কানায় কানায় ভর্তি নৌকোটা, কিনারাগুলো জলের ওপর কোনওরকমে মাত্র ইঞ্চি ছয়েক জেগে রয়েছে। নদীর ধারে এসে নৌকোর গতি কমতেই মাঝিদের একজন একটা লম্বা তক্তা বের করে পাড়ের কাদায় খুঁজে দিল। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল কানাই। কী হবে এখন? এতগুলো লোক এই তলতলে কাদার সমুদ্র পেরিয়ে পাড়ে এসে পৌঁছবে কী করে?

    নৌকোয় ততক্ষণে অবশ্য তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। মহিলারা শাড়ি গুটিয়ে, আর পুরুষরা যার যার লুঙ্গি, প্যান্ট হাঁটুর ওপর তুলে কাদায় নামার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তক্তা বেয়ে লোকগুলো এবার এক এক করে নামতে লাগল। হাঁ করে দেখছিল কানাই, মাটিতে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকে কীভাবে আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে থকথকে কাদায়। ঘন ডালের বাটিতে চামচ রাখলে সেটা যেমন ধীরে ধীরে ডুবতে থাকে, কাদায় ডুবন্ত যাত্রীদের ঠিক সেরকম মনে হচ্ছিল। বেশ কয়েকটা দীর্ঘ মুহূর্ত–কাদা একেকজনের প্রায় পাছা পর্যন্ত পৌঁছনোর পর শুরু হল ওদের সামনের দিকে এগোনোর পালা। প্রত্যেকের পা-ই কাদার নীচে, মানুষগুলোর শুধু ধড়টুকু দেখা যাচ্ছে–শরীরে মোচড় দিতে দিতে ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগিয়ে আসছে শুকনো ডাঙার দিকে।

    ভুরু কুঁচকে ওদের দিকে তাকিয়ে ছিল নীলিমা। “এদের দেখেই তো আমার হাঁটুতে ব্যথা করছে। আগে আমিও পারতাম রে এরকম কাদা ঠেলে আসতে, কিন্তু এখন আর পায়ে সে জোর নেই। আর মুশকিল কী জানিস তো? নদীতে জলও ভীষণ কমে গেছে আজকাল। ভাটার সময় তো থাকে না বললেই চলে। তোকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আজকে আমরা ট্রাস্টের লঞ্চ নিয়ে এসেছি, কিন্তু আরও অন্তত ঘণ্টা দুয়েকের আগে লঞ্চ এই অবধি আসতেই পারবে না।” একটু অভিযোগের দৃষ্টিতে বোনপোর দিকে তাকাল নীলিমা। “তুই যদি বাসন্তী দিয়ে আসতিস কত সহজ হত জার্নিটা বল তো?”

    “আমি তো জানতাম না,” খেদের সুর কানাইয়ের গলায়। “তুমি যদি একবার বলতে… আমি তো এই রুটে এসেছি কারণ ১৯৭০-এ যখন লুসিবাড়ি গেলাম তখনও আমরা ক্যানিং হয়েই গিয়েছিলাম।”

    চারিদিকে তাকিয়ে দৃশ্যগুলো যেন মনের মধ্যে গেঁথে নিচ্ছিল কানাই। ওর স্পষ্ট মনে পড়ল আকাশের গায়ে বিরাট একটা সারসের মতো দেখতে নির্মলের সিলুয়েট। পাখির উপমাটা মনে এসেছিল মেসোর পোশাক আর ছাতাটার জন্য। নদীর হাওয়ায় নির্মলের ধুতি-পাঞ্জাবি পতপত করে উড়ছিল পালকের ডানার মতো। আর সরু ছাতাটাকে মনে হচ্ছিল ঠিক যেন লম্বা ছুঁচলো পাখির ঠোঁট।

    “ঠিক এই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে ছিল, আমরা যখন নৌকোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”

    “কে, নির্মল?”

    “হ্যাঁ। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা, হাতে ছাতা।”

    হঠাৎ ওর কনুইটা শক্ত করে চেপে ধরল নীলিমা, “চুপ কর, চুপ কর কানাই, আর বলিস না।”

    থমকে থেমে গেল কানাই। “এখনও তোমার এত মন খারাপ হয়ে যায় মেসোর কথা শুনলে? এত বছর পরেও?”

    নীলিমা যেন শিউরে উঠল। “এই জায়গাটায়–ঠিক এই জায়গাটাতেই ওকে পাওয়া গিয়েছিল, জানিস? এই ক্যানিং-এর বাঁধের ওপর। তারপর আর কয়েকমাস মাত্র বেঁচে ছিল। নিশ্চয়ই বৃষ্টিবাদলের মধ্যে বাইরে বাইরে ঘুরেছিল–নিউমোনিয়া হয়ে গিয়েছিল তো।”

    “আমি তো এতসব জানতাম না! কিন্তু মেসো ক্যানিং এসেছিলই বা কেন?”

    “এখনও ঠিক জানি না কেন এসেছিল। শেষের দিকে ওর চালচলন কীরকম খাপছাড়া হয়ে গিয়েছিল–সব সময় যেন একটা চাপের মধ্যে থাকত। রিটায়ার করল হেডমাস্টার হয়ে, আর মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই চোখের সামনে কেমন বদলে গেল চেনা মানুষটা। যখন তখন কিছু না বলে কয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যেত। আর সে সময়টাতেই মরিচঝাঁপির গণ্ডগোলও শুরু হয়েছে, আমি তো ভয়ে কাঠ হয়ে থাকতাম।”

    “তাই নাকি?” কানাই একটু অবাক। “মরিচঝাঁপির ব্যাপারটা কী যেন? আমার ঠিক মনে নেই।”

    “মরিচঝাঁপি ছিল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একটা দ্বীপ। রিফিউজিরা এসে দখল করে নিয়েছিল। সরকার যেই বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, অমনি শুরু হয়ে গেল মারদাঙ্গা। গভর্নমেন্ট ওদের জোর করে মধ্যভারতের একটা উদ্বাস্তু শিবিরে ফেরত পাঠাতে চাইছিল। প্রচুর বাস-ট্রাক বোঝাই করে মানুষগুলোকে নিয়ে যাচ্ছিল সেখানে। এদিকে সারা তল্লাটে তো নানা গুজব ছড়াতে লাগল। আমি ভয়ে কাঁটা হয়ে আছি–নির্মলকেও যদি নিজের মনে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াতে দেখে ওরা, কী যে হবে! শেষে মনে হয় ওকেও জোর করে ওরকম একটা বাসেই তুলে দিয়েছিল।”

    “তাই নাকি?”

    “আমার তাই ধারণা,” নীলিমা বলল। “পরে হয়তো কেউ ওকে চিনতে পেরে কোথাও একটা নামিয়ে দিয়েছে। তারপর ও কোনওরকমে ক্যানিং-এ চলে এসেছে। এখানেই তো ওকে দেখা গিয়েছিল–ঠিক এই বাঁধের ওপর।”

    “তুমি জিজ্ঞেস করনি কোথায় গিয়েছিল?”

    “জিজ্ঞেস করেছি রে কানাই। কিন্তু সে সময় ওর ঠিকমতো কোনও কথার জবাব দেওয়ার অবস্থাই চলে গিয়েছিল। মাথামুণ্ডু কী যে বকত… তারপর থেকে একবারই মাত্র সজ্ঞানে কথা বলেছিল–যখন তোকে ওই প্যাকেটটা দিতে বলল। আমি তো ভেবেছিলাম তখনও ভুল বকছে। কিন্তু পরে দেখলাম তা নয়।”

    মাসিকে একহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল কানাই৷ “খুব কষ্টে কেটেছে তোমার সেই সময়টা, না?”

    চোখ মুছে নীলিমা বলল, “এখনও আমার পরিষ্কার মনে আছে ওকে যখন নিতে এসেছিলাম ক্যানিং-এ, সেই দিনটার কথা। ঠিক এখানটাতে দাঁড়িয়ে ও চিৎকার করছিল, ‘মাতলা জেগে উঠবে! মাতলা জেগে উঠবে!’ জামাকাপড় সব ধুন্ধুড়ে ময়লা, হাতে মুখে কাদা–সে চেহারাটা আমি কিছুতেই ভুলতে পারি না।”

    বহুদিনের চাপা-পড়া একটা স্মৃতি কানাইয়ের মাথার মধ্যে চাড়া দিয়ে উঠল। “মাতলা জেগে উঠবে বলছিল? মেসো নিশ্চয়ই সেই গল্পটার কথা ভাবছিল।”

    “কোন গল্প রে?” একটু চমকে উঠে জিজ্ঞেস করল নীলিমা।

    “তোমার মনে নেই? সেই যে লাটসাহেব এখানে বন্দর বানিয়েছিল, আর পিডিংটন বলে এক সাহেব–ওই যে, সাইক্লোন’ শব্দটা যার তৈরি–সে কীরকম ভবিষ্যৎবাণী করল যে মাতলা জেগে উঠবে আর পোর্ট ক্যানিং ভাসিয়ে নিয়ে যাবে?”

    “চুপ কর!” প্রায় চেঁচিয়ে উঠে হাত দিয়ে দু’কান চেপে ধরল নীলিমা। “আর বলিস না রে কানাই। এই স্মৃতিগুলো মনে এলেই আমার বুকের ভেতরটা যেন কুরে কুরে খেতে থাকে। সেজন্যই ওই প্যাকেটটা আমি নিজে খুলিনি, তোর হাতে দিয়ে দিতে চেয়েছি। ওসব কথা ভাবার মতো মনের জোরই নেই আমার।”

    “সত্যি, খুবই কঠিন তোমার পক্ষে এ ঘটনাগুলো মনে করা,”কানাইয়ের গলায় অনুতাপ। “ঠিক আছে, এই প্রসঙ্গটা আমি আর তুলব না।”

    দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কানাইয়ের মনে পড়ল আগেরবারেও এই বাঁধের ওপর অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছিল ওদের। ভাটার জন্য নয়, স্রেফ লুসিবাড়ির দিকে যাওয়ার কোনও নৌকো পাওয়া যাচ্ছিল না বলে। ও নীলিমার সঙ্গে একটা চায়ের দোকানে বসেছিল, আর নির্মলকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল বাঁধের ওপর, নৌকোর খোঁজ করতে। সে কাজে অবশ্য নির্মলের মন ছিল না খুব একটা। কলকাতার একটা বইয়ের দোকান থেকে সদ্য কেনা রাইনার মারিয়া রিলকের দুইনো এলিজির একটা অনুবাদ তার হাতে ছিল। কবিতাগুলো অনুবাদ করেছিলেন কবি বুদ্ধদেব বসু–নির্মলের এক সময়কার পরিচিত। নৌকোর জন্য নদীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল বটে, কিন্তু নির্মলের মন পড়ে ছিল ওই বইটার ওপর। নীলিমার ভয়ে খুলে পড়তে পারছিল না, তবে বুকের মধ্যে তেরচাভাবে চেপে ধরা বইটার দিকে সুযোগ পেলেই একবার তাকিয়ে নিচ্ছিল চুপি চুপি।

    শেষপর্যন্ত অবশ্য নৌকোর জন্য নির্মলের ওপর ভরসা করতে হয়নি। এক মাঝি নিজের থেকেই এসে ওদের উদ্ধার করল। “আরে মাসিমা, আপনি এখানে?” গলাটা শুনে ওরা ফিরে তাকানোর আগেই বছর কুড়ি-বাইশের একটা ছেলে বাঁধের ঢাল বেয়ে দৌড়ে উঠে এসে নীলিমাকে প্রণাম করল।

    “হরেন না? হরেন নস্কর তো তুই?” ছেলেটার মুখের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল নীলিমা।

    “হ্যাঁ মাসিমা।” বেঁটে গাঁট্টাগোট্টা চেহারা ছেলেটার, চওড়া চ্যাপটামতো মুখ, রোদে কুঁচকে আছে চোখদুটো। পরনে খুব সাধারণ একটা লুঙ্গি আর গায়ে কাদার ছোপ লাগা গেঞ্জি।

    “তুই ক্যানিং-এ কী করতে এসেছিস?” নীলিমা জিজ্ঞেস করল।

    “কাল জঙ্গল করতে বেরিয়েছিলাম মাসিমা। বনবিবির দয়ায় অনেকটা মধু পেয়ে গেছি–তা প্রায় দু’বোতল হবে। তো সেইগুলোকে বেচতে এনেছি ক্যানিং-এ।”

    হরেনের কথা শুনে নীলিমার কানে কানে ফিসফিস করে কানাই জিজ্ঞেস করেছিল, “মাসি, বনবিবি কে?”

    “বনবিবি হলেন জঙ্গলের দেবী। এখানকার লোকেরা বিশ্বাস করে যে উনিই সমস্ত জঙ্গল আর জন্তু জানোয়ারকে শাসন করেন,” ফিসফিস করেই জবাব দিয়েছিল নীলিমা।

    “ও!” এতবড় জোয়ান লোকটা এইরকম একটা গাঁজাখুরি গল্প বিশ্বাস করে দেখে অবাক। হয়ে গিয়েছিল কানাই। গুরগুর করে একটা হাসির দমক উঠে এসেছিল গলা বেয়ে।

    “কানাই!” এক বকা দিয়েছিল নীলিমা। “এই সবজান্তা ভাবটা ছাড়ো। এটা তোমার কলকাতা শহর নয়, মনে রেখো।”

    হাসির শব্দটা হরেনের কানে গিয়েছিল। নিচু হয়ে কানাইকে ভাল করে দেখে ও জিজ্ঞেস করেছিল, “এটা কে, মাসিমা?”

    “আমার বোনপো। স্কুলে বাঁদরামি করেছিল বলে ওর বাবা-মা এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে, একটু শিক্ষা দিতে।”

    “তা হলে ওকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন মাসিমা,” একগাল হেসে বলেছিল হরেন।

    “আমার বাড়িতেও তো তিনটে বাচ্চা আছে; বড় ছেলেটার বয়স এর কাছাকাছিই হবে। এরকম ছেলেদের শিক্ষা দিতে খুব ভাল পারি আমি।”

    “শুনলি তো কানাই?” ভয় দেখিয়েছিল মাসিমা। “এবার কোনও ঝামেলা করলে কিন্তু আমি তাই করব–একেবারে হরেনের বাড়ি দিয়ে আসব তোকে।”

    সঙ্গে সঙ্গে মুখের হাসি-টাসি উবে গিয়ে কানাই একেবারে যাকে বলে সুবোধ বালক। হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল ও যখন প্রসঙ্গটা এখানেই শেষ হল আর নীলিমার মালপত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল হরেন।

    “আপনারা নৌকোর জন্য অপেক্ষা করছেন তো মাসিমা?”

    “হ্যাঁ রে হরেন, অনেকক্ষণ ধরেই তো বসে আছি এখানে, কিছুই পাচ্ছি না।”

    “তালে চলুন আমার সঙ্গে,”নীলিমাকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই একটা ভারী ব্যাগ কাঁধে তুলে নিয়েছিল হরেন। “আমার নৌকো আছে, আমিই আপনাদের লুসিবাড়ি পৌঁছে দেব।”

    কানাইয়ের মনে পড়ল, হরেনকে বাধা দেওয়ার একটা ক্ষীণ চেষ্টা করেছিল তার মাসি। “তোর তো অনেক ঘোরা হবে হরেন? কেন খামখা যাবি এত ঘুরপথে?”

    “খুব একটা বেশি ঘোরা হবে না মাসিমা। আপনি আমাদের কুসুমের জন্য এত করেছেন, আর আমি আপনার জন্য এইটুকু করতে পারব না? আপনারা দাঁড়ান এখানে, আমি নৌকোটা নিয়ে আসি।”

    চটপট পা চালিয়ে বাঁধের ওপর দিয়ে চলে গেল হরেন। ও একটু দূরে যেতেই কানাই জিজ্ঞেস করল নীলিমাকে, “লোকটা কে গো মাসি? ও কী বলছিল? কুসুম কে?”

    হরেন আসলে একজন জেলে, নীলিমা ওকে বুঝিয়েছিল। লুসিবাড়ির কাছেই সাতজেলিয়া বলে একটা দ্বীপে থাকে। ওকে দেখে যেরকম মনে হয় তার থেকেও ওর বয়স অনেক কম, কুড়িও হয়নি হয়তো। কিন্তু এই ভাটির দেশের লোকেরা খুব কম বয়সেই ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়। হরেনেরও বছর চোদ্দোতে বিয়ে হয়েছিল। এই বয়সেই তাই ও তিন বাচ্চার বাপ হয়ে গেছে।

    কুসুম ওদেরই গাঁয়ের একটা মেয়ে। বছর পনেরো বয়েস। লুসিবাড়ির মহিলা সমিতির কাছে ওকে দিয়ে গেছে হরেন, দেখাশোনা করার জন্য। কুসুমের বাবা জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে মারা যাওয়ার পর পেটের দায়ে ওর মা শহরে গিয়ে কাজ নিল। “মেয়েটা একা একা থাকত, কখন কী বিপদ আপদ ঘটে, তাই ওকে লুসিবাড়িতে দিয়ে গেছে হরেন,” নীলিমা বলেছিল। “কত রকমের লোকজন ওর ওপর নজর দিচ্ছিল। একজন তো ওকে বিক্রিই করে দেওয়ার তালে ছিল। হরেন না বাঁচালে কী যে হত ওর…”।

    কানাইয়ের জ্ঞানতৃষ্ণা প্রবল হয়ে উঠেছিল। “কী হত মাসি?”

    বিষণ্ণ হয়ে উঠেছিল নীলিমার চোখ। মানুষের যে দুঃখকষ্টের সমাধান তার হাতের বাইরে, সেগুলির কথা মনে এলেই এরকম একটা করুণ কোমল ছায়া নেমে আসে মাসির চোখে, সেটা কানাই আগেও দেখেছে। “কী হত? কুসুমকে ওর মান-ইজ্জত খোয়াতে হতে পারত। কত গরিবঘরের মেয়ের যে ওরকম সর্বনাশ হয়েছে…”

    “ও,” কানাই গম্ভীরভাবে বলেছিল। একটু অকালপক্ক ও ছিল ঠিকই, তবে নীলিমার কথার ইশারা ইঙ্গিতগুলো সব বুঝতে পারেনি তখন। কিন্তু কথার ভাবটুকু যতটা ওর মাথায় ঢুকেছিল, তাতেই শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বেড়ে গিয়েছিল।

    “এখন কী করে মেয়েটা?” সাগ্রহে জিজ্ঞেস করেছিল কানাই।

    “লুসিবাড়িতেই থাকে। মহিলা সমিতি ওর দেখাশোনা করে। দেখতেই পাবি গেলে।”

    মাসির কথা শেষ হতে না হতেই বাঁধের গা বেয়ে দৌড় লাগিয়েছিল কানাই–একেবারে নির্মল যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে পৌঁছে ব্যগ্র চোখে নদীর দিকে তাকিয়ে খুঁজতে শুরু করেছিল কোথায় হরেনের নৌকো। এতক্ষণ পর্যন্ত লুসিবাড়ি যাওয়ার ব্যাপারে ওর মনে একটা বিরক্তি মেশানো আপত্তির ভাব ছিল, কিন্তু কুসুমের কথা শুনে সে ভাবটা একেবারে কেটে গেল।

  • লঞ্চে

    লঞ্চে

    [book]

    লঞ্চে

    ক্যানিং বাজারের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বাড়িটার সামনে এসে থমকে গেল পিয়া। কাজের সূত্রে ওকে বনেজঙ্গলে নদীনালায় ঘুরতেই হয়, তাই বহু বছরের অভিজ্ঞতায় ফরেস্ট বা ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টগুলোর সম্পর্কে একটা তিতিবিরক্ত ভাব জন্মে গেছে পিয়ার মনে। এখানে আসার সময়ও ও ভাবছিল হয়তো দেখবে কতগুলো ঘুপচি নোংরা অফিসঘরে কিছু লোক বসে কলম পিষছে। কিন্তু তার বদলে ঝকঝকে রং-করা বাংলোটা দেখে একটু হকচকিয়েই গেল পিয়া। তবুও, গেট ঠেলে ঢুকতে ঢুকতে মনটাকে শক্ত করে নিল ও : হাজার হোক সরকারি অফিস, কত আর তফাত হবে?

    কিন্তু যেরকম ভেবেছিল শেষপর্যন্ত ততটা খারাপ দাঁড়াল না ব্যাপারটা। হ্যাঁ, দারোয়ানকে পেরিয়ে অফিসঘরের ভেতর ঢোকার জন্য ঝাড়া একঘণ্টা অপেক্ষা করতে হল, কিন্তু একবার ঢোকার পরে একেবারে ঝটপট হয়ে গেল সব কাজ। দেখা গেল কাকার যোগাযোগে কাজ হয়েছে–ঢুকতে না ঢুকতেই একজন ওকে সোজা নিয়ে গেল সিনিয়র রেঞ্জারের কাছে। ক্লান্ত চেহারার নম্র ভদ্রলোক এটা সেটা দু-একটা ভদ্রতার কথা বলার পর জুনিয়র অফিসারকে বললেন ওর ব্যাপারটা দেখে দিতে। সে ভদ্রলোকের পেছন পেছন ঘুরতে হল বেশ খানিকক্ষণ–এ করিডোর, ও করিডোর, বড় ঘর থেকে ছোট ঘর, আরও ছোট ঘর, এ টেবিল, সে টেবিল। মধ্যে মধ্যে দীর্ঘ চা-পানের বিরতি আর পানের ছোপ-লাগা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করার পালা চলল বেশ কিছুক্ষণ, কিন্তু সব মিলিয়ে ঘণ্টাচারেকের মধ্যেই দরকারি সমস্ত কাগজপত্র হাতে পেয়ে গেল ও।

    জয়ের আনন্দে আত্মহারা হয়ে অফিস থেকে বেরোতে গিয়েই একটা ধাক্কা খেল পিয়া। সরকারি নিয়মকানুনের পালা এখনও শেষ হয়নি। সার্ভের কাজের জন্য জলেজঙ্গলে যেতে হলে ওকে একজন ফরেস্ট গার্ড নিতেই হবে। মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল পিয়ার। আগের অভিজ্ঞতায় ও দেখেছে এইসব সরকারি লোকজন সঙ্গে থাকলে অনেক সময় বেশ অসুবিধাই হয়, কখনও কখনও সার্ভের থেকে ওদের দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে হয়। একা যেতে পারলেই সবচেয়ে ভাল হত–শুধু নৌকো চালানো আর রাস্তা দেখানোর জন্য একটা লোক থাকলেই চলত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সে সম্ভাবনা দূর অস্ত। এমনকী ইতিমধ্যে ওর জন্য একজন গার্ড ঠিকও হয়ে গেছে, সে-ই ওকে পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবে, নৌকো ভাড়া করে দেবে, অন্যান্য যা যা দরকার সেসব ব্যবস্থাও করবে। যাক, এ নিয়ে আর ঝামেলা করে লাভ নেই, অন্তত পারমিট-টারমিটগুলো তো তাড়াতাড়ি পাওয়া গেছে।

    সদ্য ভাঁজ-ভাঙা খাকি পোশাক-পরা ছুঁচোমুখো গার্ড লোকটা বিনয়ী হাসি হেসে সামনে এসে দাঁড়াল। মানুষটাকে দেখে অবশ্য খুব একটা খারাপ মনে হল না। কিন্তু যেই ও রাইফেল আর কার্তুজের পেটিটা বের করল, কেমন একটু অস্বস্তি লাগল পিয়ার। বন্দুক-টন্দুকের আবার কী দরকার? অফিসারের সঙ্গে কথা বলার জন্য সোজা অফিসঘরে ফিরে গেল ও। অফিসার বুঝিয়ে বললেন যেহেতু ওকে টাইগার রিজার্ভের মধ্যে দিয়েই যেতে হবে, তাই বন্দুক ছাড়া একেবারেই চলবে না। কারণ যে-কোনও সময়েই অ্যাটাক হতে পারে। কী আর করা যাবে। পিঠব্যাগ কাঁধে তুলে গার্ডের পেছন পেছন ফরেস্ট অফিস থেকে বেরিয়ে এল পিয়া।

    খানিকদূর যেতে না যেতেই লোকটার হাবভাব অন্যরকম হয়ে গেল। একটু আগের বিগলিত হাসি-টাসি কোথায় মিলিয়ে গেল, চুপচাপ গম্ভীরভাবে ও পিয়াকে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে চলল। কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে সেসব জানানোর ধার দিয়েই গেল না। একটু বাদে বাঁধের ওপর একটা চায়ের দোকানে এসে থামল ওরা। একটা ডাকাত-ডাকাত চেহারার লোক সেখানে বসেছিল। ওদের কথাবার্তা পিয়া কিছু বুঝছিল না, কিন্তু যদূর মনে হল লোকটার নাম মেজদা। গাঁট্টাগোট্টা চেহারা, বিশাল থলথলে মুখ, গলায় আবার অনেকগুলো চকচকে চেন আর মাদুলি ঝুলছে। মেজদা বা গার্ড কেউই ইংরেজি বলতে পারে না, কিন্তু আশেপাশের দু’-একজনের ভাঙা ভাঙা অনুবাদে পিয়া যা বুঝল তা হচ্ছে–মেজদা একটা লঞ্চের মালিক। আর নাকি খুব ভাল গাইড, সুন্দরবনের নদীনালা সব ওর নখদর্পণে।

    মেজদার লঞ্চটা একবার দেখতে চাইল পিয়া, কিন্তু জানা গেল সেটা এখন সম্ভব নয়। লঞ্চটা নাকি বেশ কিছুটা দূরে নোঙর করা আছে। সেখানে নৌকো করে যেতে হবে। ভাড়া যা বলল সেটাও যথেষ্ট বেশি। পিয়া পরিষ্কার বুঝতে পারছিল এই লোকগুলির মধ্যে যোগসাজস আছে। একটা শেষ চেষ্টা চালাল ও এদের খপ্পর থেকে বেরিয়ে অন্য লঞ্চওয়ালার খোঁজ করার, কিন্তু খুব একটা লাভ কিছু হল না। মেজদা আর গার্ডকে দেখে ধারেকাছে ঘেঁষলই না কেউ।

    পিয়া ভেবেচিন্তে দেখল ওর সামনে দুটো রাস্তা খোলা আছে এখন। এক হল ফরেস্ট অফিসে ফিরে গিয়ে এদের নামে কমপ্লেন করা, আর নয়তো এরা যা বলছে তাতেই রাজি হয়ে গিয়ে সার্ভের কাজ শুরু করে দেওয়া। কিন্তু সারাটা দিন যে অফিসটায় কাটিয়েছে সেখানে ফিরে যেতে আর মন চাইল না। শেষপর্যন্ত মেজদার লঞ্চ ভাড়া করাই ঠিক করল ও।

    লঞ্চের দিকে যেতে যেতে একটু একটু খারাপ লাগছিল পিয়ার। মনে হচ্ছিল এ লোকগুলো হয়তো ততটা মন্দ নয়, হয়তো ও ওদের ভুল বুঝেছে। হতেই পারে ওরা সুন্দরবন সম্পর্কে অনেক কিছু জানে। দেখাই যাক না কতটা কাজ হয় ওদের দিয়ে।

    এবারের সার্ভের জন্য পিয়া একটা ডিসপ্লে কার্ড নিয়ে এসেছে, দু’রকম ডলফিনের ছবি আঁকা–গ্যাঞ্জেটিক আর ইরাবড়ি। এই দু’রকম ডলফিনই এই অঞ্চলের নদীতে পাওয়া যায়।

    ডিসপ্লে কার্ডের ছবিগুলি অবশ্য খুব একটা ভাল নয়, আঁকা ছবি, ১৮৭৮ সালের একটা প্রবন্ধ থেকে কপি করা। পিয়া নিজেই এর থেকে অনেক ভাল ভাল ছবি দেখেছে–হাতে-আঁকা ছবি, ফটোগ্রাফ, দু’রকমই। কিন্তু কেন কে জানে, এই ছবিগুলো লোককে দেখিয়েই সবচেয়ে ভাল ফল পেয়েছে ও। লোকে অনেক সহজে এগুলো দেখে চিনতে পারে। অনেক সময় এমনকী ফটোগ্রাফেও এত ভাল কাজ হয় না।

    এর আগে অন্যান্য নদীতে কাজ কররার সময় এই ধরনের ডিসপ্লে কার্ডগুলো খুব কাজে দিয়েছে। যেসব জায়গায় ভাষার সমস্যা ছিল না, সেখানে কার্ডের ছবি দেখিয়ে ও জেলেদের জিজ্ঞেস করেছে এরকম প্রাণী তারা কোথায় দেখেছে, কোন কোন জায়গায় থাকে এরা, প্রাণীগুলোর স্বভাব কীরকম, বছরের কোন সময় বেশি দেখা যায়–এই সব। আর যেখানে দোভাষীর সাহায্য পাওয়া যায়নি, সেই সব জায়গায় ও জেলেদের ওই কার্ডের ছবিগুলো দেখিয়ে জবাবের অপেক্ষা করেছে। বেশিরভাগ সময়ই কায়দাটা কাজে এসেছে। প্রাণীগুলোকে চিনতে পেরেছে জেলেরা, তারপর ওকে ইশারায় দেখিয়ে দিয়েছে কোনদিকে গেলে তাদের দেখা যাবে। কিন্তু ছবি দেখে প্রাণীটাকে চিনতে পেরেছে শুধু সবচেয়ে ঝানু পোড়খাওয়া জেলেরাই। একটা গোটা ডলফিনের চেহারা আর ক’টা জেলেই বা চোখে দেখেছে? বেশিরভাগই তো দেখেছে শুধু জলের ওপর ভেসে ওঠা পিঠের পাখনা বা নাকের ফুটো। তাই ছবিগুলো দেখানোর পর অনেকসময়ই অনেক জেলে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথা বলেছে। কিন্তু মেজদা যা বলল সেরকম প্রতিক্রিয়া পিয়া তার এতদিনের অভিজ্ঞতায় কখনও দেখেনি। কার্ডটাকে হাতে নিয়ে তো প্রথমে সেটা উলটো করে ধরল। তারপর নানাদিক থেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার পর গ্যাঞ্জেটিক ডলফিনের ছবিটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল ওটা কোনও পাখি কি না। পিয়া কথাটা বুঝতে পারল কারণ ইংরেজিতে একটা শব্দ বারবার বলছিল মেজদা–”বার্ড? বার্ড?”

    পিয়া এত আশ্চর্য হয়ে গেল যে ও নিজে ছবিটা আবার নতুন করে দেখল। ওটার সঙ্গে পাখির সাদৃশ্যটা কোথায় সেটাই বোঝার চেষ্টা করল খানিকক্ষণ ধরে। শেষে যখন ডলফিনটার লম্বা নাক আর সরু ছুঁচোলো দাঁতগুলোর দিকে মেজদা আঙুল দিয়ে দেখাল, তখন পিয়ার মাথায় ঢুকল ব্যাপারটা। ইশনিস্ট ড্রয়িং-এর মতো ওর চোখের সামনেও যেন ডলফিনের ছবিটা পালটে যেতে থাকল। পিয়ার মনে হল ও যেন মেজদার চোখ দিয়ে ছবিটা দেখছে। কেন লোকটা ভুল বুঝেছিল সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারল ও এতক্ষণে–জন্তুটার গোলগাল শরীরটা অনেকটা ঘুঘুপাখির মতো, আর লম্বা চামচের মতো ঠোঁটটার সঙ্গে বকজাতীয় পাখির কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে। তা ছাড়া গ্যাঞ্জেটিক ডলফিনের সেরকম কোনও পিঠের পাখনাও নেই। বেচারা মেজদার আর কী দোষ! কিন্তু ডলফিনকে পাখি বলে ভুল করা–ব্যাপারটা এত হাস্যকর যে তাড়াতাড়ি কার্ডটা ফেরত নিয়ে হাসি লুকোনোর জন্য অন্যদিকে মুখ ঘোরাল পিয়া।

    নৌকোয় যেতে যেতে বারবারই ঘটনাটা মনে পড়ছিল, আর নিজের মনে হেসে ফেলছিল পিয়া। কিন্তু মেজদার লঞ্চের চেহারাটা চোখে পড়তেই ওর মুখের হাসি মুখেই মিলিয়ে গেল। লঞ্চ বলে যেটাকে চালাতে চেষ্টা করছে লোকগুলো, সেটা আসলে একটা জরাজীর্ণ ডিজেল স্টিমার। টুরিস্টদের জন্য সারেং-এর ঘরের পেছনে কয়েকটা চেয়ার পাতা, মাথার ওপরে ঝুলকালো একটা তেরপল। এর থেকে তো একটা আউটবোর্ড মোটর লাগানো ফাইবারগ্লাসের ডিঙি নিলেই ভাল হত। ওরকম ছোট নৌকোতেই সার্ভের কাজ করতে বেশি সুবিধা। মেজদা আর গার্ডের কথায় রাজি হয়ে যাওয়ার জন্য এতক্ষণে একটু অনুশোচনা হল পিয়ার। কিন্তু আর ফেরার উপায় নেই এখন।

    তক্তা বেয়ে লঞ্চে উঠতে উঠতে ডিজেলের গন্ধটা সপাট একটা থাপ্পড়ের মতো মুখে এসে লাগল পিয়ার। ওপরে জনা কয়েক ছোকরা হেলপার লঞ্চের ইঞ্জিনটা খুলে মেরামত করার চেষ্টা করছিল। অবশেষে সেটা যখন চালু হল, যা আওয়াজ বেরোল তাতে ডেকের ওপরেই কান প্রায় কালা হবার জোগাড়।

    ছেলেগুলোকে ডেকে লঞ্চ থেকে নেমে যেতে বলল মেজদা। ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গেল পিয়া। তার মানে শুধু মেজদা আর গার্ড–এই দুটো মাত্র লোক লঞ্চটা চালিয়ে নিয়ে যাবে? বেশ একটু গোলমেলে ঠেকল ব্যাপারটা। ছেলেগুলো যখন এক এক করে লঞ্চ থেকে নেমে গেল কেমন একটু ভয় ভয় করতে লাগল পিয়ার। দুশ্চিন্তাটা আরও বাড়ল মেজদার মূকাভিনয় দেখে। ব্যাপারটা হল, ঘটনাচক্রে পিয়া আর মেজদা একই রংয়ের পোশাক পরেছিল–নীল ট্রাউজার্স আর সাদা শার্ট। ও নিজে প্রথমে খেয়াল করেনি ব্যাপারটা, কিন্তু মেজদা ঠিক লক্ষ করেছিল। নানারকম ইশারায়, অঙ্গভঙ্গিতে নিজের দিকে আর পিয়ার দিকে দেখিয়ে ওদের মধ্যে মিল-অমিলগুলো ও বোঝানোর চেষ্টা করছিল–দু’জনের একইরকম পোশাক, একইরকম গায়ের রং, কালো চোখ আর ছোট করে কাটা কোঁকড়া চুল। তবে সবশেষে যে ভঙ্গিটা মেজদা করল সেটা বেশ একটু গোলমেলে আর অশ্লীল মনে হল। একবার নিজের জিভের দিকে আর একবার ঊরুসন্ধির দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে হো হো করে হাসতে লাগল মেজদা। এই অদ্ভুত ইশারার মানেটা ঠিক ধরতে না-পেরে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মুখটা তাড়াতাড়ি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল পিয়া। বেশ খানিকটা পরে ওর মাথায় এল যে ওটা আসলে ওদের দুজনের ভাষা আর লিঙ্গের পার্থক্যের রহস্যের বিষয়ে মেজদার নিজস্ব ভাষ্য।

    কিন্তু তারপরে যে হাসির হররাটা উঠল তাতেই আরও অস্বস্তি লাগল পিয়ার। এমনিতে সরকারি নজরদারির মধ্যে ও আগে কখনও কাজ করেনি এমন নয়; মাত্র বছরখানেক আগেই ইরাবড়ি নদীতে যখন সার্ভে করছিল তখন সরকারি আদেশে (কাগজে-কলমে যদিও ‘পরামর্শ’) তিনটে বাড়তি লোককে নিতে হয়েছিল ওর নৌকোয়। লোক তিনটের হুবহু একরকম পোশাক–গল্ফ শার্ট, চেক-কাটা সারং আর স্টিল ফ্রেমের অ্যাভিয়েটর সানগ্লাস। পরে ও শুনেছিল ওরা ছিল মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের লোক–সরকারের স্পাই। কিন্তু ওদের সঙ্গে থেকে কাজ করতে ওর কখনও অস্বস্তি লাগেনি, কোনও বিপদের আশঙ্কাও হয়নি। আসলে ও যা কাজ করে, ওই ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রচণ্ড রোদের মধ্যে টলমলে নৌকোয় খাড়া দাঁড়িয়ে দুরবিন চোখে জলের দিকে তাকিয়ে থাকা আর আধঘণ্টা পর পর ডেটাশিট ভর্তি করা–সে কাজের ধরনটাই যেন একটা নিরাপত্তাবেষ্টনীর মতো ওকে সবসময় ঘিরে রাখে বলে মনে হয় পিয়ার। ইরাবড্ডি, মেকং বা মহাকাম নদীতে কাজ করার সময় অবশ্য আরও একটা জিনিস ওর পক্ষে বর্মের মতো কাজ করেছিল; সেটা হল ওর বিদেশি চেহারা। পিয়া নিজে অবশ্য তখন ব্যাপারটা লক্ষ করেনি, তবে ওর মুখের আদল, ছোট করে কাটা কালো চুল আর রোদেপোড়া গায়ের রঙে স্পষ্ট বোঝা যেত যে ও ওই অঞ্চলের লোক নয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এই সুন্দরবনে–যেখানে ওর নিজেকে সবচেয়ে বেশি পরদেশি বলে মনে হচ্ছে, ওর সেই বিদেশি চেহারার বর্ম আর কাজ করছে না। ওর জায়গায় যদি আজ একজন সাদা চামড়ার ইয়োরোপিয়ান বা জাপানি মেয়ে থাকত তা হলে কি এই লোকগুলো এরকম ব্যবহার করার সাহস পেত? মনে হয় না। এমনকী ওর কলকাতার আত্মীয়দের সঙ্গেও এরা কোনও দুর্ব্যবহার করতে পারত না। কারণ ওদের চেহারার মধ্যে একটা উচ্চমধ্যবিত্ত কালচারের ছাপ-মারা রয়েছে। সেটাই প্রায় লেসার-গাইডেড মিসাইলের মতো এইসব জায়গায় ওদের রক্ষা করে। আর সে অস্ত্র এইসব লোকেদের ওপর কীভাবে প্রয়োগ করতে হয় সেটা ওরাও ভাল করেই জানে। ওদের সামাজিক হিসাবে কার কোথায় জায়গা সেটা পরিষ্কার বুঝিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এই বিশাল এবং সূক্ষ্ম সমাজ সংস্থানের মধ্যে ওর নিজের জায়গাটাই পিয়া ঠিক করে জানে না, অন্যে পরে কা কথা।

    আর ওর সেই অজ্ঞতারই সুযোগ নিচ্ছে এই লোকগুলো–সেটা এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছিল পিয়া।

  • লুসিবাড়ি

    লুসিবাড়ি

    লুসিবাড়ি

    কানাই আর নীলিমাকে নিয়ে ট্রাস্টের লঞ্চ যখন লুসিবাড়ির ঘাটে গিয়ে ভিড়ল, নদীতে তখন ভাটার টান। জল এত নীচে যে দ্বীপের ধার বরাবর টানা বাঁধটাকে পাহাড়ের মতো উঁচু মনে হচ্ছিল। বাঁধের ওপারের কিছুই দেখা যাচ্ছিল না লঞ্চ থেকে। ডাঙায় নেমে পাড় বেয়ে ওঠার পর নীচে তাকিয়ে তবে অবশেষে দেখা গেল গ্রামটাকে। সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিতে আঁকা একটা ম্যাপ যেন খুলে গেল মাথার ভিতর, আর কানাই দেখতে পেল গোটা লুসিবাড়িটা ওর চোখের সামনে ছড়িয়ে রয়েছে।

    লম্বায় প্রায় দু’ কিলোমিটার দ্বীপটা দেখতে অনেকটা শখের মতো। দক্ষিণ থেকে শুরু হয়েছে ঘন ম্যানগ্রোভ জঙ্গল। চওড়ায় পঞ্চাশ কিলোমিটার সেই গভীর বন শেষ হয়েছে একেবারে বঙ্গোপসাগরের প্রান্ত পর্যন্ত গিয়ে। আর এই পঞ্চাশ কিলোমিটারের মধ্যে আর একটি দ্বীপেও কোনও জনবসতি নেই। আশেপাশে দ্বীপ আরও বেশ কয়েকটা আছে বটে, কিন্তু চারটে নদী চারদিক থেকে ঘিরে লুসিবাড়িকে তাদের থেকে আলাদা করে রেখেছে। নদীগুলোর মধ্যে দুটো মাঝারি মাপের, আর একটা এতই ছোট যে ভাটার সময় জল প্রায় থাকেই না। কিন্তু দ্বীপের ছুঁচলো দিকটা–মানে শাঁখের একেবারে মুখের কাছটা–যে নদীতে গিয়ে শেষ হয়েছে, তার থেকে বড় নদী এই ভাটির দেশে কমই আছে। সে নদীর নাম রায়মঙ্গল।

    জোয়ারের সময় লুসিবাড়ি থেকে দেখলে রায়মঙ্গলকে নদী বলে মনেই হয় না, মনে হয় যেন ওটা সাগরেরই অংশ, একটা উপসাগর, নিদেন একটা বিশাল নদীমুখ। আসলে পাঁচটা নদী এসে মিশেছে এখানে, ফলে একটা বিশাল মোহনার সৃষ্টি হয়েছে যার এপার ওপার প্রায় দেখাই যায় না। এখন ভাটার সময় অবশ্য দূরে দূরে অন্য নদীর মুখগুলো পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে–সেগুলোকে মনে হচ্ছে যেন বিরাট বড় গোল একটা সবুজ গ্যালারির মধ্যে মধ্যে লোক যাতায়াতের জন্য দৈত্যাকার প্রবেশপথ। তবে কানাই জানে যে জোয়ারের সময় এই পুরো অঞ্চলটারই চেহারা বদলে যাবে একেবারে। জঙ্গল, নদী আর নদীমুখ সবই চলে যাবে ঘোলাটে জলের নীচে। ওপরে জেগে থাকবে মাত্র কয়েকটা কেওড়া গাছের মাথা। ওগুলো না থাকলে মনে হত যেন চোখের সামনের আদিগন্ত এই জলরাশির কোনও শুরু শেষ নেই। জোয়ারের তারতম্য অনুসারে এই দৃশ্য কখনও অপূর্ব, কখনও ভয়ংকর। ভাটার সময় যখন বাঁধের অনেক নীচে নেমে যায় জল, তখন লুসিবাড়িকে মনে হয় বিশাল এক মাটির জাহাজের মতো, স্থির হয়ে ভাসছে। কিন্তু জোয়ার এলেই পরিষ্কার দেখা যায় নদীর জল দ্বীপের মাটির অনেক ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই যে দ্বীপকে মনে হচ্ছিল বিশাল জাহাজ, সেটাকে তখন মনে হয় যেন একটা ছোট্ট থালা, টলমল করে ভাসছে জলের ওপর। যে-কোনও সময় সেটা উলটে গিয়ে ঘুরতে ঘুরতে চলে যাবে নদীর তলায়।

    দ্বীপের সরু দিকটা থেকে একটা মাটির চড়া বের হয়ে জলের মধ্যে বেশ কিছুটা চলে গেছে। বাতাসের গতিপথ বোঝার জন্য অনেকসময় বড় নৌকো বা জাহাজের মাস্তুলে যে হালকা উইন্ডসক ঝোলানো থাকে, এই চড়াটাও যেন অনেকটা সেরকম–স্রোতের দিক বদলের সাথে সাথে সরে সরে যায়। তবে স্থান পালটালেও গোড়াটা কিন্তু সবসময়ই লেগে থাকে দ্বীপের সঙ্গে। নৌকোর মাঝি বা লঞ্চওয়ালাদের অবশ্য খুব সুবিধা হয়েছে ওটা থাকায়, আলাদা করে আর জেটির দরকার হয় না; মালপত্র কি প্যাসেঞ্জার নামানোর জন্য চড়াটাই ওরা ব্যবহার করে। এমনিতে লুসিবাড়িতে কোনও ডক বা জেটি তৈরি করাও যায়নি নদীর তীব্র স্রোতের জন্য।

    দ্বীপের সবচেয়ে বড় গ্রামটার নামও লুসিবাড়ি। গ্রাম শুরু হয়েছে চড়াটার একেবারে গোড়ার দিকটায়, বাঁধের আড়ালে। বাঁধের ওপর থেকে প্রথম দর্শনে লুসিবাড়িকে বাংলাদেশের আর পাঁচটা গ্রামের মতোই লাগে–সেই পরপর ছাঁচের বেড়ার ঘর, খুপরি খুপরি দোকান, খড় বা হোগলাপাতায় ছাওয়া। কিন্তু একটু ভাল করে নজর করলেই সাধারণ গ্রামের সাথে তফাতটা চোখে পড়ে।

    গ্রামের ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটা বড় মাঠ। রুলে-টানা নিখুঁত চতুর্ভুজ না হলেও মোটামুটি চৌকোনাই বলা চলে। মাঠের একধারে অনেকটা জায়গা জুড়ে হাট–গায়ে গায়ে লাগা পরপর সব দোকানঘর। শনিবার জমজমাট হাট বসে, সপ্তাহের অন্যদিন খালি পড়ে থাকে চালাগুলো। হাটের ঠিক উলটোদিকে স্কুল। মাঠের ধার ঘেঁষে যেন প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে স্কুলের বাড়িটা। নতুন লোকেদের কাছে এই স্কুলটাই এ গাঁয়ের সবচেয়ে বড় চমক। এমনিতে খুব কিছু বিশাল না হলেও, চারপাশের ঝুপড়ি বস্তি আর কুঁড়েঘরের মধ্যে স্কুলবাড়িটাকে হঠাৎ দেখলে আকাশছোঁয়া প্রকাণ্ড একটা গির্জার মতো মনে হয়। বাড়িটাকে ঘিরে ইটের পাঁচিল, মেনগেটে স্কুলের নাম আর প্রতিষ্ঠার বছর লেখা–স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটন হাই স্কুল, ১৯৩৮। সামনের দিকে একটা লম্বা ঢাকা বারান্দা, মাঝে মাঝে পলকাটা থাম, দরজা-জানালার ওপরের দিকগুলো তিনকোনা নিওক্লাসিকাল ঢঙের। খানিকটা আরবি ধরনের খিলান আর সে আমলের স্কুলবাড়ির স্থাপত্যের আরও দু-একটা টুকিটাকি চিহ্ন এদিক ওদিকে। ঘরগুলো বড় বড়, প্রচুর আলো-হাওয়া, লম্বা লম্বা জানালাগুলিতে খড়খড়ি বসানো।

    স্কুলের কাছেই একসারি গাছের আড়ালে রয়েছে আরেকটা ঘেরা চত্বর। জায়গাটার ঠিক মাঝখানে একটা বাড়ি, স্কুলবাড়ির থেকে অনেকটা ছোট। এমনিতে চোখের আড়ালে থাকলেও, এটার চেহারা অনেক বেশি নজরকাড়া। পুরো কাঠের তৈরি বাড়িটা মিটার দুয়েক উঁচু কয়েকটা খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ধাঁচটা অনেকটা পাহাড়ি বাংলোর মতো, ভাটির দেশে একটু যেন বেমানান। চালাটা খাড়াই পিরামিডের মতো–সারি সারি খুঁটি, পিলার, জানালা আর পিল্পের ওপর বসানো। দেওয়াল জোড়া বিশাল বিশাল জানালা, মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত খড়খড়ি দেওয়া। পুরো বাড়িটার চারদিক ঘিরে ঢাকা বারান্দা। সামনে একটা শালুক ফুলে ভরা পুকুর, পাড় ঘেঁষে ইট বাঁধানো পথ–শ্যাওলা-ধরা।

    কানাইয়ের মনে পড়ল, ১৯৭০ সালে এ বাড়িটা ছিল একেবারে নির্জন, শুনশান। গাঁয়ের প্রায় মাঝামাঝি জায়গায় হলেও, আশেপাশে ঘরবাড়ি বিশেষ ছিল না তখন। খানিকটা যেন সম্ভ্রমের বশেই দ্বীপের অন্য বাসিন্দারা এই কুঠিবাড়িটার থেকে একটু দূরে দূরে থাকত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবই পালটে গেছে। একনজরেই বোঝা যায় এই উঠোন দিয়ে এখন যথেষ্ট লোক চলাচল হয়। আঙিনার চারপাশ ঘিরে গজিয়ে উঠেছে নতুন ঘরবাড়ি, পান-বিড়ির গুমটি আর মিষ্টির দোকান। পাশের আঁকাবাঁকা রাস্তাটা গমগম করছে ফিল্মি গানের সুরে, বাতাসে সদ্য-ভাজা জিলিপির গন্ধ।

    আড়চোখে তাকিয়ে কানাই দেখল নীলিমা মহিলা সমিতির দুই কত্রীর সঙ্গে ট্রাস্টের কাজকর্ম নিয়ে কথা বলছে। পাশ থেকে চুপি চুপি সরে এল ও। বাইরের গেটটা ঠেলে ঢুকে পড়ল চত্বরটায়, তারপর শ্যাওলা-ঢাকা পথ দিয়ে মূল বাড়িটার দিকে এগোল। আঙিনাটায় ঢোকামাত্র একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল কানাইয়ের। বাইরে এত আওয়াজ, কিন্তু ভেতরে তার কিছুই প্রায় শোনা যাচ্ছে না। হঠাৎ মনে হল সময়টা যেন থমকে থেমে গেছে। বাড়িটাকে এই মনে হচ্ছে খুব পুরনো আবার পরক্ষণেই মনে হচ্ছে আনকোরা নতুন। কাঠগুলো বহু বছরের রোদে জলে অনেক পুরনো কোনও গাছের বাকলের মতো একটা রুপোলি রং নিয়েছে। সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ায় প্রায় স্বচ্ছ মনে হচ্ছে সেগুলোকে খানিকটা গিলটি-করা ধাতুর ওপরের পাতলা ছালের মতো। পড়ন্ত বিকেলের আকাশের ছায়ায় গোটা কুঠিটা একটা নীলচে আভা ছড়াচ্ছে।

    খুঁটিগুলোর সামনে এসে বাড়ির নীচের দিকটা একবার উঁকি দিয়ে দেখল কানাই। একরকম রয়ে গেছে আলোছায়ার জ্যামিতিক নকশাগুলো। কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে কুঠির দরজার সামনে যেতেই যেন মেসোর গলা শুনতে পেল ও।

    “ওদিক দিয়ে ঢোকা যাবে না, মনে নেই?” নির্মল বলছিল। “সামনের দরজার চাবি তো কবেই হারিয়ে গেছে। বাড়ির পেছনের দিক দিয়ে ঘুরে গিয়ে ঢুকতে হবে আমাদের।”

    আগেরবার কোথা দিয়ে গিয়েছিল মনে করে করে বারান্দা ধরে এগোতে লাগল কানাই। ব্যালকনির কোনাটা ঘুরে কুঠির পেছন দিকটায় গিয়ে একটা ছোট দরজা। আলতো করে ঠেলতেই খুলে গেল পাল্লাদুটো। ঘরে ঢুকেই প্রথম যে জিনিসটা কানাইয়ের চোখে পড়ল সেটা হল কাঠের সিট-ওয়ালা পুরনো ঢঙের একটা কমোড়। পোর্সেলিনের। তার পাশেই বিশাল একটা লোহার বাথটাব, ধারটা গোল করে বাঁকানো, পায়াগুলো নখওয়ালা থাবার প্যাটার্নে ঢালাই করা। মাথার কাছে একটু ঝুঁকে আছে ঝাঁঝরি, নরম বোঁটার ওপর ঝিমিয়ে পড়া ফুলের মতো।

    যা দেখে গিয়েছিল তার থেকে একটুও বদলায়নি জিনিসগুলো, শুধু আর একটু বেশি মরচে ধরেছে। ছোটবেলায় প্রথমবার এসে ঘরের জিনিসপত্রগুলো যেন চোখ দিয়ে গিলছিল ও, মনে পড়ল কানাইয়ের। সেবার লুসিবাড়িতে এসে থেকেই নির্মল আর নীলিমার মতো ওকেও পুকুরেই স্নান করতে হচ্ছিল, ঝাঁঝরিটা দেখে তাই প্রচণ্ড লোভ হয়েছিল ওটার নীচে গিয়ে দাঁড়ানোর।

    “এটা হল সাহেবি চৌবাচ্চা, বুঝলে? সাহেবরা এটাতে বসে স্নান করে”, টাবটা দেখিয়ে ওকে বলেছিল নির্মল। বাথটবের এই বর্ণনাটা কানাইয়ের মন্দ লাগেনি। কিন্তু মেসো এমন করে কথাটা বলেছিল যেন ও এক্কেবারে গেঁয়ো, এসব কখনও দেখেনি। মনে মনে তখন একটু রাগই হয়েছিল কানাইয়ের। “আমি জানি, এটা বাথটাব,” নির্মলকে বলেছিল ও।

    বাথরুমের অন্যদিকের আরেকটা দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতর দিকটায় যাওয়া যায়। পাল্লাটা ঠেলা দিয়ে খুলে গুহার মতো বিশাল একটা ঘরে এসে পড়ল কানাই। ঘরের দেওয়ালগুলো কাঠ দিয়ে বাঁধানো। খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে সামান্য আলো এসে পড়েছে। ভেতরে। আলোর সেই রেখাগুলির মধ্যে ঘন ধুলো যেন জমাট বেঁধে আছে। মাঝখানে পড়ে আছে লোহার তৈরি বিরাট একটা পালঙ্কের কাঠামো। দেওয়ালে দেওয়ালে মোটা ফ্রেমে বাঁধানো বিশাল বিশাল সব পোর্ট্রেট ঝুলছে–লম্বা পোশাক-পরা মেমসাহেব, হাঁটু অবধি ব্রিচেসওয়ালা সাহেব। বহুদিনের অযত্নে রং জ্বলে ঝাপসা হয়ে এসেছে ছবিগুলো। ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে একটা পোর্ট্রেটের সামনে এসে থেমে গেল কানাই। ছবিটা একটা কমবয়েসি মেয়ের, লেস-লাগানো পোশাক পরা। ছোট ছোট হলুদ ফুলে ভরা একটা ঘাসজমির ওপর পা মুড়ে বসে আছে মেয়েটা, খাড়াই উঠে গেছে পেছনের জমি, তার খাঁজে খাঁজে বেগনি রংয়ের ঝোঁপড়া গাছ। দূরে পাহাড়ের মাথায় বরফ জমে আছে। ছবির নীচে ময়লাটে একটা পেতলের পাতের ওপর লেখা, ‘লুসি ম্যাককে হ্যামিলটন, আইল অব অ্যারান।

    “লুসি হ্যামিলটন কে ছিল?” কানাই যেন নিজের ছেলেবেলার গলার আওয়াজ শুনতে পেল।

    “ওর নামেই নাম দেওয়া হয়েছে এই দ্বীপটার।”

    “ও এখানে থাকত? এই বাড়িটায়?”

    “না। ইউরোপ থেকে এখানে আসার পথেই জাহাজডুবি হয়ে মারা গিয়েছিল। এ বাড়িটা ও চোখেই দেখেনি। কিন্তু ওর জন্যই যেহেতু এটা বানানো হয়েছিল, লোকে তাই এটাকে বলত লুসির বাড়ি। পরে মুখে মুখে সেটা হয়ে গেল লুসিবাড়ি। আস্তে আস্তে গোটা দ্বীপটার নামই লুসিবাড়ি হয়ে গেল। এই বাড়িটাকে কিন্তু আর কেউ ওই নামে ডাকে না। লোকের কাছে এটা এখন হ্যামিলটনের কুঠি।”

    “কেন?”

    “কারণ এটা বানিয়েছিল যে সাহেব তার নাম ছিল স্যার ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিলটন, লুসির কাকা। হ্যামিলটন সাহেবের নাম দেখনি তুমি স্কুলের দরজায়?”

    “উনি কে ছিলেন?”

    “ওনার কথা জানতে চাও তুমি?”

    “শোনো তা হলে,” গাঁট-পাকানো তর্জনী তুলে বলেছিল মেসো। “শুনতে চেয়েছ যখন, তা হলে বলি। মন দিয়ে শুনবে। একবর্ণও কিন্তু বানানো গল্প নয়।”