Author: তাহের আলমাহদী

  • বিষকন্যা

    বিষকন্যা

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    বিষকন্যা

    যে কালের উপর চিরবিস্মরণের পর্দা পড়িয়া গিয়াছে, সেকাল মিলনোৎকণ্ঠিতা নবযৌবনা নাগরী যখন সন্ধ্যাসমাগমে ভবনশীর্ষে উঠিয়া কেশপ্রসাধনে প্রবৃত্ত হইতেন, তখন তাঁহার স্বর্ণমুকুরে যে উৎফুল্ল-উৎসুক স্মিত-সলজ্জ মুখের প্রতিবিম্ব পড়িত, তাহা এ কালেও আমরা সহজে অনুমান করিতে পারি। চিরন্তনী নারীর ঐ মূর্তিটিই শুধু শাশ্বত— যুগে যুগান্তরে অচপল হইয়া আছে। কেবলমাত্র ঐ নিদর্শন দ্বারাই তাঁহাকে সেই নারী বলিয়া চিনিয়া লইতে পারি।

    কিন্তু অন্য বিষয়ে—?

    সে যাক। প্রসাধনরতা সুন্দরীর দ্রুত অধীর হস্তে গজদন্ত-কঙ্কতিকা কেশ কর্ষণ করিয়া চলিতে থাকে। ক্রমে দুটি একটি উন্মূলিত কেশ কঙ্কতিকায় জড়াইয়া যায়; প্রসাধনশেষে সুন্দরী কঙ্কতিকা হইতে বিচ্ছিন্ন কেশগুচ্ছ মুক্ত করিয়া অন্যমনে দুই চম্পক-অঙ্গুলীর দ্বারা গ্রন্থি পাকাইয়া দূরে নিক্ষেপ করেন। ক্ষুদ্র কেশগ্রন্থি অবহেলার লক্ষ্যহীন বায়ুভরে উড়িয়া কোন্‌ বিস্মৃতির উপকূলে বিলীন হইয়া যায়, কে তাহার সন্ধান রাখে?

    তেমনই, বহু বহু শতাব্দী পূর্বে একদা কয়েকটি মানুষের জীবন-সূত্র যেভাবে গ্রন্থি পাকাইয়া গিয়াছিল, ইতিহাস তাহার সন্ধান রাখে না। মহাকালভুজগের যে বক্ষচিহ্ন একদিন ধরিত্রীর উপর অঙ্কিত হইয়াছিল, তাহা নিশ্চিহ্ন হইয়া মুছিয়া গিয়াছে। মৃন্ময়ী চিরনবীনা, বৃদ্ধ অতীতের ভোগ-লাঞ্ছন সে চিরদিন বক্ষে ধারণ করিয়া রাখিতে ভালবাসে না। নিত্য নব নব নাগরের গৃহে তাহার অভিসার। হায় বহুভর্তৃকা, তোমার প্রেম এত চপল বলিয়াই কি তুমি চিরযৌবনময়ী?

    দুই সহস্র বৎসরেরও অধিক কাল হইল, যে কয়টি স্বল্পায়ু নর-নারীর জীবনীসূত্র সুন্দরীর কুটিল কেশকুণ্ডলীর মতো জড়াইয়া গিয়াছিল, তাহাদের কাহিনী লিখিতে বসিয়াছি। লিখিতে বসিয়া একটা বড় বিস্ময় জাগিতেছে। জন্মজন্মান্তরের জীবন তো আমার নখদর্পণে, সহস্র জন্মের ব্যথা-বেদনা আনন্দের ইতিহাস তো এই জাতিস্মরের মস্তিষ্কের মধ্যে পুঞ্জীভূত হইয়া আছে, তবু যতই পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আমার বিগত জীবনের আলোচনা করি না কেন, দেখিতে পাই, কোনও না কোনও নারীকে কেন্দ্র করিয়া আমার জীবন আবর্তিত হইয়াছে; জীবনে যখনই কোনও বৃহৎ ঘটনা ঘটিয়াছে, তখনই তাহা এক নারীর জীবনের সঙ্গে জড়াইয়া গিয়াছে। নারীদ্বেষক হইয়া জন্মিয়াছি, কিন্তু তবু নারীকে এড়াইতে পারি নাই। বিস্ময়ের সহিত মনে প্রশ্ন জাগিতেছে— পৃথিবীর শত কোটি মানুষের জীবন কি আমারই মতো? ইহাই কি জীবনের অমোঘ অলঙ্ঘনীয় রীতি? কিংবা— আমি একটা সৃষ্টিছাড়া ব্যতিক্রম?

    ন্যূনাধিক চব্বিশ শতাব্দী পূর্বের কথা। বুদ্ধ তথাগত প্রায় শতাধিক বর্ষ হইল নির্বাণ লাভ করিয়াছেন। উত্তর ভারতে চারিটি রাজ্য— কাশী কোশল লিচ্ছবি ও মগধ। চারিটি রাজ্যের মধ্যে বংশানুক্রমে অহি-নকুলের সম্বন্ধ স্থায়িভাব ধারণ করিয়াছে। পাটলিপুত্রের সিংহাসনে শিশুনাগবংশীয় এক অশ্রুতকীর্তি রাজা অধিরূঢ়।

    শিশুনাগবংশের ইতিবৃত্ত পুরাণে আদ্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে লিপিবদ্ধ হইতে পায় নাই, অজাতশত্রুর পর হইতে কেমন যেন এলোমেলো হইয়া গিয়াছে। তাহার কারণ, অমিতবিক্রম অজাতশত্রুর পর হইতে মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের অভ্যুদয় পর্যন্ত মগধে এক প্রকার রাষ্ট্রীয় বিপ্লব চলিয়াছিল। পিতাকে হত্যা করিয়া রাজ্য অধিকার শিশুনাগরাজবংশের একটা বৈশিষ্ট্য হইয়া দাঁড়াইয়াছিল, বিপুল রাজপরিবারের মধ্যে সিংহাসনের জন্য হানাহানি অন্তর্বিবাদ সহজ ও প্রকৃতিসিদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিল। বংশের একজন শক্তিশালী ব্যক্তি রাজাকে বিতাড়িত করিয়া নিজে সিংহাসনে অধিরোহণ করিলেন, ইহার কিছুকাল পরে পূর্ববর্তী রাজা শক্তি সংগ্রহ করিয়া আবার সিংহাসন পুনরুদ্ধার করিলেন— এইভাবে ধারাবাহিক শাসন-পারম্পর্য নষ্ট হইয়া গিয়াছিল। বলা বাহুল্য, প্রজারাও সুখে ছিল না। তাহারা মাঝে মাঝে মাৎস্যন্যায় করিয়া রাজাকে মারিয়া আর একজনকে তাহার স্থানে বসাইয়া দিত। সেকালে প্রকৃতিপুঞ্জের সহিষ্ণুতা আধুনিক কালের মতো এমন সর্বংসহা হইয়া উঠিতে পারে নাই, প্রয়োজন হইলে ধৈর্যের শৃঙ্খল ছিঁড়িয়া যাইত। তখন শ্রীমন্মহারাজের শোণিতে পথের ধূলি নিবারিত হইত, তাঁহার জঠর-নিষ্কাশিত অন্ত্র দ্বারা রাজপুরী পরিবেষ্টিত করিয়া জিঘাংসু বিদ্রোহীর দল প্রতিহিংসা চরিতার্থ করিত।

    সে যাক। পুরাণে শিশুনাগবংশীয় মহারাজ চণ্ডের নাম পাওয়া যায় না। চণ্ডের প্রকৃত নাম কি ছিল তাহাও লোকে ভুলিয়া গিয়াছিল। মহিষের মতো আকৃতির মধ্যে রাক্ষসের মতো প্রকৃতি লইয়া ইনি কয়েক বৎসর মগধে রাজত্ব করিয়াছিলেন। তার পর— কিন্তু সে পরের কথা।

    রাজ-অবরোধে এক দাসী একটি কন্যা প্রসব করিয়াছিল। অবশ্য মহারাজ চণ্ডই কন্যার পিতা; সুতরাং সভাপণ্ডিত নবজাত কন্যার কোষ্ঠী তৈয়ার করিলেন।

    কোষ্ঠী পরীক্ষা করিয়া পণ্ডিত বলিলেন— ‘শ্রীমন্‌, এই কন্যা অতিশয় কুলক্ষণা, প্রিয়জনের অনিষ্টকারিণী— সাক্ষাৎ বিষকন্যা। ইহাকে বর্জন করুন।’

    সিংহাসনে আসীন মহারাজের বন্ধুর ললাটে ভীষণ ভ্রূকুটি দেখা দিল; পণ্ডিত অন্তরে কম্পিত হইলেন। স্পষ্ট কথা মহারাজ ভালবাসেন না; স্পষ্ট কথা বলিয়া অদ্যই সচিব শিবমিশ্রের যে দশা হইয়াছে, তাহা সকলেই জানে। পণ্ডিত স্খলিত বচনে বলিলেন— ‘মহারাজ, আপনার কল্যাণের জন্যই বলিতেছি, এ কন্যা বর্জনীয়া।’

    কিন্তু মহারাজের ভ্রূকুটি শিথিল হইল না। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘কোন্‌ প্রিয়জনের অধিক অনিষ্ট হওয়া সম্ভব?’

    পণ্ডিত পুনরায় কোষ্ঠী দেখিলেন, তারপরে ভয়ে ভয়ে বলিলেন— ‘উপস্থিত পিতা-মাতা সকলেরই অনিষ্ট-সম্ভাবনা রহিয়াছে। মঙ্গল সপ্তমে ও শনি অষ্টমে থাকিয়া পিতৃস্থানে পূর্ণদৃষ্টি করিতেছে।’

    কে কোথায় দৃষ্টি করিতেছে তাহা জানিবার কৌতূহল মহারাজের ছিল না। তাঁহার মুখে স্ফুরিত-বিদ্যুৎ বৈশাখী মেঘ ঘনাইয়া আসিল। মহারাজের সাম্যদৃষ্টির সম্মুখে অপরাধী ও নিরপরাধের প্রভেদ নাই— অশুভ বা অপ্রীতিকর কথা যে উচ্চারণ করে সেই দণ্ডার্হ। এ ক্ষেত্রে শনি-মঙ্গলের পাপদৃষ্টির ফল যে জ্যোতিষাচার্যের শিরে বর্ষিত হইবে না, তাহা কে বলিতে পারে? পণ্ডিত প্রমাদ গণিলেন।

    সভা-বিদূষক বটুকভট্ট সিংহাসনের পাশে বসিয়াছিল। সে খর্বকায় বামন, মস্তকটি বৃহদাকার, কণ্ঠস্বর এরূপ তীক্ষ্ণ যে, মনে হয় কর্ণের পটহ ভেদ করিয়া যাইবে। পণ্ডিতের দুরবস্থা দেখিয়া সে সূচ্যগ্রসূক্ষ্ম কণ্ঠে হাসিয়া উঠিল, বলিল— ‘বিষকন্যা! তবে তো ভালই হইয়াছে, মহারাজ! এই দাসীপুত্রীকে সযত্নে পালন করুন। কালে যৌবনবতী হইলে ইহাকে নগর-নটির পদে অভিষিক্ত করিবেন। আপনার দুষ্ট প্রজারা অচিরাৎ যম-মন্দিরে প্রস্থান করিবে।’

    বটুকভট্টকে রাজ-পার্ষদ সকলেই ভালবাসিত, শুধু তাহার বিদূষণ-চাতুর্যের জন্য নয়, বহুবার বহু বিপন্ন সভাসদ্‌কে সে রাজরোষ হইতে উদ্ধার করিয়াছিল।

    তাহার কথায় মহারাজের ভ্রূগ্রন্থি ঈষৎ উন্মোচিত হইল, তিনি বামহস্তে বটুকের কেশমুষ্টি ধরিয়া তাহাকে শূন্যে তুলিয়া ধরিলেন। সূত্রাগ্রে ব্যাদিত-মুখ মৎস্যের ন্যায় বটুক ঝুলিতে লাগিল।

    রাজা বলিলেন— ‘বটু, তোর জিহ্বা উৎপাটিত করিব।’

    বটুক তৎক্ষণাৎ দীর্ঘ জিহ্বা বাহির করিয়া দিল। রাজা হাস্য করিয়া তাহাকে মাটিতে নামাইলেন। পণ্ডিতের ফাঁড়া কাটিয়া গেল।

    ভৃঙ্গারে মাধ্বী ছিল। রাজার কটাক্ষমাত্রে কিঙ্করী চষক ভরিয়া তাঁহার হস্তে দিল। চষক নিঃশেষ করিয়া রাজা বলিলেন— ‘এখন এই বিষকন্যাটাকে লইয়া কি করা যায়?’

    গণদেব নামক একজন চাটুকার পার্ষদ বলিল— ‘মহারাজ, উহাকেও শিবমিশ্রের পথে প্রেরণ করুন— রাজ্যের সমস্ত অনিষ্ট দূর হউক।’

    মহারাজ চণ্ডের রক্ত-নেত্রে একটা ক্রূর কৌতুক নৃত্য করিয়া উঠিল, তিনি স্বভাবস্ফীত অধর প্রসারিত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘মহাসচিব শিবমিশ্র মহাশয় এখন কি করিতেছেন, কেহ বলিতে পার?’

    গণদেব মুণ্ড আন্দোলিত করিয়া মুখভঙ্গি সহকারে বলিল— ‘এইমাত্র দেখিয়া আসিতেছি, তিনি শ্মশানভূমিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হইয়া শ্মশান-শোভা নিরীক্ষণ করিতেছেন। ব্রাহ্মণভোজন করাইব বলিয়া কিছু মোদক লইয়া গিয়াছিলাম, কিন্তু দেখিলাম ব্রাহ্মণের মিষ্টান্নে রুচি নাই।’ বলিয়া নিজ রসিকতায় অতিশয় উৎফুল্ল হইয়া চারিদিকে তাকাইল।

    মহারাজা অট্টহাস্য করিয়া উঠিলেন, বলিলেন— ‘ভাল। অদ্য নিশাকালে শিবাদল আসিয়া শিবমিশ্রের মুণ্ড ভক্ষণ করিবে।’ তারপর ভীষণ দৃষ্টিতে চতুর্দিকে চাহিয়া বলিলেন— ‘শিবমিশ্র আমার আজ্ঞার প্রতিবাদ করিয়াছিল, তাই আজ তাহাকে শৃগালে ছিঁড়িয়া খাইবে। — তোমরা এ কথা স্মরণ রাখিও।’

    সভা স্তব্ধ হইয়া রহিল, কেহ বাক্য উচ্চারণ করিতে সাহসী হইল না।

    রাজা তখন সভা-জ্যোতিষীকে বলিলেন— ‘পণ্ডিতরাজ, আপনার অভিমত রাজ্যের কল্যাণে এ কন্যা বর্জিত হউক। ভাল, তাহাই হইবে। কন্যা ও কন্যার মাতা উভয়েই আদ্য রাত্রিতে শ্মশানে প্রেরিত হইবে। সেখানে কন্যার মাতা স্বহস্তে কন্যাকে শ্মশানে প্রোথিত করিবে। তাহা হইলে দৈব আপদ দূর হইবে তো?’

    পণ্ডিত শিহরিয়া উঠিয়া বলিলেন— ‘মহারাজ, এরূপ কঠোরতা নিস্প্রয়োজন। কন্যাকে ভাগীরথীর  জলে বিসর্জন করুন, কিন্তু কন্যার মাতা নিরপরাধিনী— তাহাকে—’

    রাজা গর্জিয়া উঠিলেন— ‘নিরপরাধিনী! সে এরূপ কন্যা প্রসব করে কেন?— যাক, আপনার বাগ্‌বিস্তারেতে প্রয়োজন নাই, যাহা করিবার আমি স্বহস্তে করিব।’ বলিয়া মহারাজ সিংহাসন হইতে উঠিয়া দাঁড়াইলেন।

    যাহার দুর্দম দানবপ্রকৃতি মর্ত্যলোকে কোনও বস্তুকে ভয় করিত না, দৈব আপদের আশঙ্কা তাহাকে এমনই অমানুষিক নিষ্ঠুরতায় জ্ঞানশূন্য করিয়া তুলিয়াছিল যে, নিজ ঔরসজাত কন্যার প্রতি তাহার চিত্তে তিলমাত্র মমতার অবকাশ ছিল না।

    পাটলিপুত্র নগরের চৌষট্টি দ্বার, তন্মধ্যে দশটি প্রধান ও প্রকাশ্য। বাকিগুলি অধিকাংশই গুপ্তপথ।

    এই গুপ্তপথের একটি রাজপ্রাসাদসংলগ্ন; রাজা বা রাজপরিবারস্থ যে কেহ ইচ্ছা করিলে এই দ্বারপথে নগর-প্রাকারের বাহিরে যাইতে পারিতেন। তাল-কাণ্ডের একটি শীর্ণ সেতু ছিল, তাহার সাহায্যে পরিখা পার হইতে হইত। এই স্থানে গঙ্গাপ্রবাহের সহিত খনিত পরিখা মিলিত হইয়াছিল।

    পরিখার পরপারে কিছু দূর যাইবার পর গঙ্গাতটে পাটলিপুত্রের মহাশ্মশান আরম্ভ হইয়াছে;— যত দূর দৃষ্টি যায়, তরুগুল্মহীন ধু ধু বালুকা। বালুকার উপর অগণিত লৌহশূল প্রোথিত রহিয়াছে; শূলগাত্রে কোথাও অর্ধপথে বীভৎস উলঙ্গ মনুষ্যদেহ বিদ্ধ হইয়া আছে, কোথাও শুষ্ক নরকঙ্কাল শূলমূলে পুঞ্জীভূত হইয়াছে। চারিদিকে শত শত নরকপাল বিক্ষিপ্ত। দিবাভাগেই এই মহাশ্মশানের দৃশ্য অতি ভয়ঙ্কর; অপিচ, রাত্রিকালে নগরীর দ্বার রুদ্ধ হইয়া গেলে এই মনুষ্যহীন মৃত্যুবাসরে যে পিশাচ-পিশাচীর নৃত্য আরম্ভ হয়, তাহা কল্পনা করিয়াই পাটলিপুত্রের নাগরিকরা শিহরিয়া উঠিত। দণ্ডিত অপরাধী ভিন্ন রাত্রিকালে মহাশ্মশানে অন্যের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল— চণ্ডালরাও মহাশ্মশানের অনির্বাণ চুল্লীতে কাষ্ঠ নিক্ষেপ করিয়া সন্ধ্যাকালে গৃহে প্রতিগমন করিত।

    সে-রাত্রে আকাশে সপ্তমীর খণ্ড চন্দ্র উদিত হইয়াছিল। অপরিস্ফুট আলোক শ্মশানের বিস্তীর্ণ বালুকারাশির উপর যেন একটা শ্বেতাভ কুজ্ঝটিকা প্রসারিত করিয়া দিয়াছিল। তটলেহী গঙ্গার ধূসর প্রবাহ চন্দ্রালোকে কৃষ্ণবর্ণ প্রতিভাত হইতেছিল। শ্মশান ও নদীর সন্ধিরেখার উপর দূরে অনির্বাণ চুল্লীর আরক্ত অঙ্গার জ্বলিতেছিল।

    প্রথম প্রহর রাত্রি— প্রাকাররুদ্ধ পাটলিপুত্রে এখনও নগরগুঞ্জন শান্ত হয় নাই; কিন্তু শ্মশানে ইহারই মধ্যে যেন প্রেতলোকের অশরীরী উৎসব আরম্ভ হইয়া গিয়াছে। চক্ষে কিছু দেখা যায় না, তবু মনে হয়, সূক্ষ্মদেহ পিশাচী-ডাকিনীরা চক্ষু-খদ্যোত জ্বালিয়া লুব্ধ লালায়িত রসনায় গলিত শবমাংস অন্বেষণ করিয়া ফিরিতেছে। আকাশে নিশাচর পক্ষীর পক্ষশব্দ যেন তাহাদেরই আগমনর্বাতা ঘোষণা করিতেছে।

    এই সময়, যে দিকে রাজপ্রাসাদের গুপ্তদ্বার, সেই দিক হইতে এক নারী ধীরে ধীরে শ্মশানের দিকে যাইতেছিল। রমণীর এক হস্তে একটি লৌহখনিত্র, অন্য হস্তে বক্ষের কাছে একটি ক্ষুদ্র বস্তুপিণ্ড ধরিয়া আছে। ক্ষীণ চন্দ্রের অস্পষ্ট  আলোকে রমণীর আকৃতি ভাল দেখা যায় না; সে যে যুবতী ও এক সময় সুন্দরী ছিল, তাহা তাহার রক্তহীন মুখ ও শীর্ণ কঙ্কালসার দেহ দেখিয়া অনুমান করাও দুরূহ। অতি কষ্টে দুর্ভর দেহ ও লৌহখনিত্র বহন করিয়া জরাজীর্ণ বৃদ্ধার মতো সে চলিয়াছে। রুক্ষ কেশজাল মুখে বক্ষে ও পৃষ্ঠে বিপর্যস্তভাবে পড়িয়া আছে। রমণী মাঝে মাঝে দাঁড়াইতেছে, ত্রাস-বিমূঢ় চক্ষে পিছু ফিরিয়া চাহিতেছে, আবার চলিতেছে।

    শ্মশানের সীমান্তে পৌঁছিয়া সে জানু ভাঙিয়া পড়িয়া গেল। তাহার কণ্ঠ হইতে একটি কাতর আর্তস্বর বাহির হইল; সেই সঙ্গে বক্ষের বস্ত্রপিণ্ডের ভিতর হইতেও ক্ষীণ ক্রন্দনধ্বনি শ্রুত হইল।

    কিছুক্ষণ পড়িয়া থাকিবার পর রমণী আবার উঠিয়া চলিতে লাগিল। ক্রমে সে শ্মশানের বীভৎস দৃশ্যাবলীর মাঝখানে আসিয়া উপস্থিত হইল।

    একবার সে চক্ষু তুলিয়া দেখিল, সম্মুখে দীর্ঘ শূল প্রোথিত রহিয়াছে; শূলশীর্ষে বিকট ভঙ্গিমায় এক নরমূর্তি বিদ্ধ হইয়া আছে, শূলনিন্মে দুইটা শৃগাল ঊর্ধ্বমুখ হইয়া সেই দুষ্প্রাপ্য ভক্ষ্যের দিকে তাকাইয়া আছে। চন্দ্রালোকে তাহাদের চক্ষু জ্বলিতেছে।

    রমণী চিৎকার করিয়া পলাইবার চেষ্টা করিল, কিন্তু অধিক দূর যাইতে পারিল না, কয়েক পদ গিয়া আবার বালুর উপর পড়িয়া গেল।

    এবার দীর্ঘকাল পরে রমণী উঠিয়া বসিল। বোধ হয় সংজ্ঞা হারাইয়াছিল, উঠিয়া বসিয়া ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চারিদিকে চাহিল। বক্ষের বস্ত্রপিণ্ড ভূমিতে পড়িয়া গিয়াছিল, সেদিকে দৃষ্টি পড়িতেই সে উন্মত্তের মতো উঠিয়া খনিত্র দিয়া বালু খনন করিতে আরম্ভ করিল।

    অল্পকালমধ্যে একটি নাতিগভীর গর্ত হইল। তখন রমণী সেই বস্তুপিণ্ড তুলিয়া লইয়া গর্তে নিক্ষেপ করিল— অমনই ক্ষীণ নির্জীব ক্রন্দনধ্বনি উত্থিত হইল। রমণী দুই হাতে কান চাপিয়া কিয়ৎকাল বসিয়া রহিল, তারপর বালু দিয়া গর্ত পূরণ করিবার চেষ্টা করিল। কিন্তু পারিল না। সহসা দুই বাহু বাড়াইয়া বস্ত্রকুণ্ডলী গর্ত হইতে তুলিয়া লইয়া সজোরে নিজ বক্ষে চাপিয়া ধরিল। একটা ধাবমান শৃগাল তাহার অতি নিকট দিয়া তাহার দিকে গ্রীবা বাঁকাইয়া চাহিতে চাহিতে ছুটির গেল; বাহ্য-চেতনাহীন রমণী তাহা লক্ষ্য করিল না।

    অতঃপর মৃগতৃষ্ণিকাভ্রান্ত মৃগীর মতো নারী আবার এক দিকে ছুটিতে লাগিল। তখন তাহার আর ইষ্টানিষ্ট-জ্ঞান নাই— কোন্‌ দিকে ছুটিয়াছে তাহাও জানে না; শুধু পূর্ববৎ এক হস্তে খনিত্র ধরিয়া আছে, আর অপর হস্তে সেই বস্ত্রাবৃত জীবনকণিকাটুকু বক্ষে আঁকড়িয়া আছে।

    কিছু দূর গিয়া সে থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল; সম্মুখে দূরে গঙ্গার শ্যামরেখা বোধ করি তাহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল। কয়েক মুহূর্ত বিহ্বল-বিস্ফারিত নেত্রে সেই দিকে তাকাইয়া থাকিয়া, যেন সহসা উদ্ধারের পথ খুঁজিয়া পাইয়াছে, এমনই ভাবে সে হাসিয়া উঠিল। তারপর অসীমবলে অবসন্ন দেহ সেই দিকে টানিয়া লইয়া চলিল।

    মানব-মানবীর জীবনে এরূপ অবস্থা কখনও কখনও আসে— যখন তাহারা মৃত্যুকে বরণ করিবার জন্য হাহাকার করিয়া ছুটিয়া যায়।

    জাহ্নবীর শীতল বক্ষে পৌঁছিতে আর বিলম্ব নাই, মধ্যে মাত্র ছয়-সাত দণ্ড বালুভূমির ব্যবধান, এই সময় রমণীর মুহ্যমান চেতনা পার্শ্বের দিকে এক প্রকার শব্দ শুনিয়া আকৃষ্ট হইল। শব্দটা যেন মনুষ্যের কণ্ঠস্বর— অর্ধব্যক্ত তর্জনের মতো শুনাইল। রমণীর গতি এই শব্দে আপনিই রুদ্ধ হইয়া গেল। সে মুখ ফিরাইয়া দেখিল, চন্দ্রালোকে শুভ্র বালুকার উপর একপাল শৃগাল কোনও অদৃশ্য কেন্দ্রের চারিধারে ব্যূহ রচনা করিয়া রহিয়াছে। তাহাদের লাঙ্গুল বহির্দিকে প্রসারিত। ঐ শৃগালচক্রের মধ্য হইতে মনুষ্যকণ্ঠের তর্জন মাঝে মাঝে ফুঁসিয়া উঠিতেছে, অমনি শৃগালের দল পিছু হটিয়া যাইতেছে। আবার ধীরে ধীরে অলক্ষিতে তাহাদের চক্র সঙ্কুচিত হইতেছে।

    রমণী যন্ত্রচালিতের মতো কয়েক পদ সেই দিকে অগ্রসর হইল। শৃগালের একজন জীবন্ত মনুষ্যকে আসিতে দেখিয়া দংষ্ট্রাবিকাশ করিয়া দূরে সরিয়া গেল। তখন মধ্যস্থিত বস্তুটি দৃষ্টিগোচর হইল।

    মাটির উপর কেবল একটি দেহহীন মুণ্ড রহিয়াছে। মুণ্ডের দুই বিক্ষত গণ্ড হইতে রক্ত ঝরিতেছে, চক্ষে উন্মত্ত দৃষ্টি। মুণ্ড রমণীর দিকেই তাকাইয়া আছে।

    রমণী এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখিয়া অস্ফুট চিৎকার করিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল।

    মুণ্ড তখন বিকৃত স্বরে বলিল— ‘তুমি প্রেত পিশাচ নিশাচর যে হও, আমাকে উদ্ধার কর।’

    মানুষের কণ্ঠস্বরে রমণীর সাহস ফিরিয়া আসিল। সে আরও কয়েক পদ নিকটে আসিল; রুদ্ধ শুষ্ক কণ্ঠ হইতে অতি কষ্টে শব্দ বাহির করিল— ‘কে তুমি?’

    মুণ্ড বলিল— ‘আমি মানুষ, ভয় নাই। আমার দেহ মাটিতে প্রোথিত আছে— উদ্ধার কর।’

    রমণী তখন কাছে আসিয়া ভাল করিয়া তাহার মুখ দেখিল, দেখিয়া সংহত অস্ফুট স্বরে বলিল— ‘মন্ত্রী শিবমিশ্র!’ — তারপর খনিত্র দিয়া প্রাণপণে মাটি খুঁড়িতে আরম্ভ করিল।

    মৃত্তিকাগর্ভ হইতে বাহিরে আসিয়া শিবমিত্র কিয়াৎকাল মৃত্যুবৎ মাটিতে শুইয়া রহিলেন। তারপর ধীরে ধীরে দুই হস্তে ভর দিয়া উঠিয়া বসিলেন। রমণীর ক্ষীণ অবসন্ন দেহ তখন ভূমিশয্যায় লুটাইয়া পড়িয়াছে।

    শিবমিশ্রের শৃগালদ্রষ্ট গণ্ড হইতে রক্ত ঝরিতেছিল, তিনি সন্তর্পণে তাহা মুছিলেন। রমণীর রক্তলেশহীন পাংশু মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন— ‘দুর্ভাগিনি, তুমি কোন্‌ অপরাধে রাত্রিকালে মহাশ্মশানে আসিয়াছ?’

    রমণী নীরবে পাশ্বর্স্থ বস্ত্রপিণ্ড দেখাইয়া দিল, শিবমিশ্র দেখিলেন— একটি শিশু। পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘তোমার পরিচয় কি? তুমি আমার প্রাণদাত্রী, তোমার নাম স্মরণ করিয়া রাখিতে চাহি।’

    রমণী নির্জীব কণ্ঠে বলিল— ‘আমার নাম মোরিকা— আমি রাজপুরীর দাসী।’

    শিবমিশ্র সচকিত হইলেন, বলিলেন— ‘বুঝিয়াছি। তুমি কবে এই সন্তান প্রসব করিলে?’

    ‘আজ প্রভাতে!’

    শিবমিশ্র কিছুক্ষণ স্তব্ধ রহিলেন।

    ‘হতভাগিনি! কিন্তু তুমি শ্মশানে প্রেরিত হইলে কেন? পরমভট্টারকের সন্তান গর্ভে ধারণ করা কি এতই অপরাধ?’

    মোরিকা বলিল— ‘সভাপণ্ডিত গণনা করিয়া বলিয়াছেন, আমার কন্যা রাজ্যের অনিষ্টকারিণী বিষকন্যা— তাই—’

    ‘বিষকন্যা!’ শিবমিশ্রের চক্ষু সহসা জ্বলিয়া উঠিল— ‘বিষকন্যা! দেখি!’

    শিবমিশ্র ব্যগ্রহস্তে শিশুকে তুলিয়া লইলেন। তখন চন্দ্র অস্ত যাইতেছে, ভাল দেখিতে পাইলেন না। তিনি শিশুকে ক্রোড়ে লইয়া দূরে চুল্লীর দিকে দ্রুতপদে চলিলেন।

    চুল্লীর অঙ্গারের উপর ভস্মের প্রচ্ছদ পড়িয়াছে। শিবমিশ্র একখণ্ড অর্ধদগ্ধ কাষ্ঠ তাহাতে নিক্ষেপ করিলেন— অগ্নিশিখা জ্বলিয়া উঠিল।

    তখন সেই শ্মশান-চুল্লীর  আলোকে শিবমিশ্র নবজাত কন্যার দেহলক্ষণ পরীক্ষা করিলেন। পরীক্ষা করিতে করিতে তাঁহার রক্তলিপ্ত মুখে এক পৈশাচিক হাস্য দেখা দিল।

    তিনি মোরিকার নিকট ফিরিয়া গিয়া বলিলেন— ‘হাঁ, বিষকন্যা বটে।’

    মোরিকা পূর্ববৎ ভূশয্যায় পড়িয়া ছিল, প্রত্যুত্তরে একবার গভীর নিশ্বাস ত্যাগ করিল।

    শিবমিশ্র আগ্রহকম্পিত স্বরে বলিলেন— ‘বৎসে, তুমি তোমার কন্যা আমাকে দান কর, আমি উহাকে পালন করি। কেহ জানিবে না।’

    মোরিকা পুনরায় অতি গভীর নিশ্বাস ত্যাগ করিল।

    শিবমিশ্র বলিলেন— ‘তুমি ফিরিয়া গিয়া বলিও কন্যাকে বিনষ্ট করিয়াছ। আমি অদ্যই উহাকে লইয়া গঙ্গার পরপারে লিচ্ছবিদেশে পলায়ন করিব। তারপর—’

    মোরিকা উত্তর দিল না। তখন শিবমিশ্র নতজানু হইয়া তাহার মুখ দেখিলেন। তারপর করাগ্রে শীর্ণ মণিবন্ধ ধরিয়া নাড়ি পরীক্ষা করিলেন।

    ক্ষণেক পরে তিনি উঠিয়া দাঁড়াইলেন। দুই হস্তে শিশুকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া উদ্দীপ্ত চোখে দূরে অর্ধদৃষ্ট রাজপ্রাসাদশীর্ষের দিকে চাহিলেন। কহিলেন— ‘এই ভাল।’

    এই সময় আকাশের নিকষে অগ্নির রেখা টানিয়া রক্তবর্ণ উল্কা রাজপুরীর ঊর্দ্ধে পিণ্ডাকারে জ্বলিয়া উঠিল, — তারপর ধীরে ধীরে মিলাইয়া গেল।

    সেই আলোকে শিশুর মুখের দিকে চাহিয়া শিবমিশ্র বলিলেন— “এ নিয়তির ইঙ্গিত। তোমার নাম রাখিলাম— উল্কা।”

    তারপর মগ্নচন্দ্রা রাত্রির অন্ধকারে জাহ্নবীর তীররেখা ধরিয়া শিবমিশ্র পাটলিপুত্রের বিপরীত মুখে চলিতে আরম্ভ করিলেন।

    মোরিকার প্রাণহীন শব মহাশ্মশানে পড়িয়া রহিল। যে শিবাকুল তাহার আগমনে সরিয়া গিয়াছিল, তাহারা আবার চারিদিক হইতে ফিরিয়া আসিল।

  • চন্দন-মূর্তি

    চন্দন-মূর্তি

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    চন্দন-মূর্তি

    বৌদ্ধ ভিক্ষু বলিতে যে-চিত্রটি আমাদের মনে উদয় হয়, একালের সাধারণ বাঙালীর চেহারার সঙ্গে সে-চিত্রের মোটেই মিল নাই। অথচ, যাঁহার কথা আজ লিখিতে বসিয়াছি সেই ভিক্ষু অভিরাম যে কেবল জাতিতে বাঙালী ছিলেন তাহাই নয়, তাঁহার চেহারাও ছিল নিতান্তই বাঙালীর মতো।

    আরম্ভেই বলিয়া রাখা ভাল যে ভিক্ষু অভিরামের আগাগোড়া জীবন-বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করা আমার অভিপ্রায় নয়, থাকিলেও তাহা সম্ভব হইত না। তাঁহার বংশ বা জাতি-পরিচয় কখনও শুনি নাই, তিনি বাঙালী হইয়া বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের গণ্ডীতে কি করিয়া গিয়া পড়িলেন সে ইতিহাসও আমার কাছে অজ্ঞাত রহিয়া গিয়াছে। কেবল এক বৎসরের আলাপে তাঁহার চরিত্রের যে-পরিচয়টি আমি পাইয়াছিলাম এবং একদিন অচিন্তনীয় অবস্থার মধ্যে পড়িয়া কিরূপে সেই পরিচয়ের বন্ধন চিরদিনের জন্য ছিন্ন হইয়া গেল, তাহাই সংক্ষেপে বাহুল্য বর্জন করিয়া পাঠকের সম্মুখে স্থাপন করিব। আমাদের দেশ ধর্মোম্মত্ততার মল্লভূমি, ধর্মের নামে মাথা ফাটাফাটি অনেক দেখিয়াছি। কিন্তু ভিক্ষু অভিরামের হৃদয়ে এই ধর্মানুরাগ যে বিচিত্র রূপ গ্রহণ করিয়াছিল তাহা পূর্বে কখনও দেখি নাই এবং পরে যে আর দেখিব সে সম্ভাবনাও অল্প।

    ভিক্ষু অভিরামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় ইম্পীরিয়াল লাইব্রেরিতে। বছর-চারেক আগেকার কথা, তখন আমি সবেমাত্র বৌদ্ধ যুগের ইতিহাস লইয়া নাড়াচাড়া আরম্ভ করিয়াছি। একখানা দুষ্প্রাপ্য বৌদ্ধ পুস্তক খুঁজিতে গিয়া দেখিলাম তিনি পূর্ব হইতে সেখানা দখল করিয়া বসিয়া আছেন।

    ক্রমে তাঁহার সহিত আলাপ হইল। শীর্ণকায় মুণ্ডিতশির লোকটি, দেহের বস্ত্রাদি ঈষৎ পীতবর্ণ, বয়স বোধ করি চল্লিশের নীচেই। কথাবার্তা খুব মিষ্ট, হাসিটি শীর্ণ মুখে লাগিয়াই আছে; আমাদের দেশের সাধারণ উদাসী সম্প্রদায়ের মতো একটি নির্লিপ্ত অনাসক্ত ভাব। তবু তাঁহাকে সাধারণ বলিয়া অবহেলা করা যায় না। চোখের মধ্যে ভাল করিয়া দৃষ্টিপাত করিলেই বুঝিতে পারা যায়, একটা প্রবল দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা সদাসর্বদা সেখানে জ্বলিতেছে। জটা কৌপীন কিছুই নাই; তথাপি তাঁহাকে দেখিয়া রবীন্দ্রনাথের ‘পরশপাথরে’র সেই ক্ষ্যাপাকে মনে পড়িয়া যায়—

    ওষ্ঠে অধরেতে চাপি                অন্তরের দ্বার ঝাঁপি

    রাত্রিদিন তীব্র জ্বালা জ্বেলে রাখে চোখে।

    দুটো নেত্র সদা যেন                নিশার খদ্যোত-হেন

    উড়ে উড়ে খোঁজে কারে নিজের আলোকে।

    বাঙালী বৌদ্ধ ভিক্ষু বর্তমান কালে থাকিতে পারে এ কল্পনা পূর্বে মনে স্থান পায় নাই, তাই প্রথম দর্শনেই তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িয়াছিলাম। ক্রমশ আলাপ ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হইল। তিনি সময়ে অসময়ে আমার বাড়িতে আসিতে আরম্ভ করিলেন। বৌদ্ধ শাস্ত্রে তাঁহার জ্ঞান যেরূপ গভীর ছিল, বৌদ্ধ ইতিহাসে ততটা ছিল না। তাই বুদ্ধের জীবন সম্বন্ধে কোনও নূতন কথা জানিতে পারিলে তৎক্ষণাৎ আমাকে আসিয়া জানাইতেন। আমার ঐতিহাসিক গবেষণা সম্বন্ধেও তাঁহার ঔৎসুক্যের অন্ত ছিল না; ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থির হইয়া বসিয়া আমার বক্তৃতা শুনিয়া যাইতেন, আর তাঁহার চোখে সেই খদ্যোত-আলোক জ্বলিতে থাকিত।

    খাদ্যাদি বিষয়ে তাঁহার কোনও বিচার ছিল না। আমার বাড়িতে আসিলে গৃহিণী প্রায় ভক্তিভরে তাঁহাকে খাওয়াইতেন; তিনি নির্বিবাদে মাছ মাংস সবই গ্রহণ করিতেন। আমি একদিন প্রশ্ন করায় তিনি ক্ষীণ হাসিয়া বলিয়াছিলেন, ‘আমি ভিক্ষু, ভিক্ষাপাত্রে যে যা দেবে তাই আমাকে খেতে হবে, বাছ-বিচার করবার তো আমার অধিকার নেই। তথাগতের পাতে একদিন তাঁর এক শিষ্য শূকর-মাংস দিয়েছিল, তিনি তাও খেয়েছিলেন।’ ভিক্ষুর দুই চক্ষু সহসা জলে ভরিয়া গিয়াছিল।

    প্রায় ছয়-সাত মাস কাটিয়া যাইবার পর একদিন তাঁহার প্রাণের অন্তরতম কথাটি জানিতে পরিলাম। আমার বাড়িতে বসিয়া বৌদ্ধ শিল্প আলোচনা হইতেছিল। ভিক্ষু অভিরাম বলিতেছিলেন, ‘ভারতে এবং ভারতের বাইরে কোটি কোটি বুদ্ধমূর্তি আছে। কিন্তু সবগুলিই তাঁর ভাব-মূর্তি। ভক্ত-শিল্পী যে-ভাবে ভগবান তথাগতকে কল্পনা করেছে, পাথর কেটে তাঁর সেই মূর্তিই গড়েছে। বুদ্ধের সত্যিকার আকৃতির সঙ্গে তাদের পরিচয় ছিল না।’

    আমি বলিলাম, ‘আমার তো মনে হয়, ছিল। আপনি লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয় যে, সব বুদ্ধমূর্তিরই ছাঁচ প্রায় এক রকম। অবশ্য অল্পবিস্তর তফাৎ আছে, কিন্তু মোটের উপর একটা সাদৃশ্য পাওয়া যায়— কান বড়, মাথায় কোঁকড়া চুল, ভারী গড়ন— এগুলো সব মূর্তিতেই আছে। এর কারণ কি? নিশ্চয় তাঁর প্রকৃত চেহারা সম্বন্ধে শিল্পীদের জ্ঞান ছিল, নইলে কেবল কাল্পনিক মূর্তি হলে এতটা সাদৃশ্য আসতে পারত না। একটা বাস্তব মডেল তাদের ছিলই।’

    গভীর মনঃসংযোগে আমার কথা শুনিয়া ভিক্ষু অভিরাম কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন, তারপর ধীরে ধীরে বলিলেন, ‘কি জানি। বুদ্ধদেবের জীবিতকালে তাঁর মূর্তি গঠিত হয়নি, তখন ভাস্কর্যের প্রচলন ছিল না। বুদ্ধমূর্তির বহুল প্রচলন হয়েছে গুপ্ত-যুগ থেকে, খ্রীস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে, অর্থাৎ বুদ্ধ-নির্বাণের প্রায় সাত-শ’ বছর পরে। এই সাত-শ’ বছর ধরে তাঁর আকৃতির স্মৃতি মানুষ কি করে সঞ্জীবিত রেখেছিল? বৌদ্ধ শাস্ত্রেও তাঁর চেহারার এমন কোনও বর্ণনা নেই যা থেকে তাঁর একটা স্পষ্ট চিত্র আঁকা যেতে পারে। আপনি যে সাদৃশ্যের কথা বলছেন, সেটা সম্ভবত শিল্পের একটা কনভেনশ্যন— প্রথমে একজন প্রতিভাবান্‌ শিল্পী তাঁর ভাব-মূর্তি গড়েছিলেন, তারপর যুগপরম্পরায় সেই মূর্তিরই অনুকরণ হয়ে আসছে।’ ভিক্ষু একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিলেন, ‘না— তাঁর সত্যিকার চেহারা মানুষ ভুলে গেছে। — টুটেনখামেন আমেন-হোটেপের শিলা-মূর্তি আছে, কিন্তু বোধিসত্ত্বের দিব্য দেহের প্রতিমূর্তি নেই।’

    আমি বলিলাম, ‘হ্যাঁ, মানুষের স্মৃতির উপর যাদের কোনও দাবি নেই তারাই পাথরে নিজেদের প্রতিমূর্তি খোদাই করিয়ে রেখে গেছে, আর যাঁরা মহাপুরুষ তাঁরা কেবল মানুষের হৃদয়ের মধ্যে অমর হয়ে আছেন। এই দেখুন না, যীশুখ্রীস্টের প্রকৃত চেহারা যে কি রকম ছিল তা কেউ জানে না।’

    তিনি বলিলেন, ‘ঠিক। অথচ কত হাজার হাজার লোক তাঁর গায়ের একটা জামা দেখবার জন্য প্রতি বৎসর তীর্থযাত্রা করছে। তারা যদি তাঁর প্রকৃত প্রতিমূর্তির সন্ধান পেত, কি করত বলুন দেখি। বোধ হয় আনন্দে পাগল হয়ে যেত।’

    এই সময় তাঁহার চোখের দিকে আমার নজর পড়িল। ইংরাজীতে যাহাকে ফ্যানাটিক বলে, এ সেই তাহারই দৃষ্টি। যে উগ্র একাগ্রতা মানুষকে শহীদ করিয়া তোলে, তাঁহার চোখে সেই সর্বগ্রাসী তন্ময়তার আগুন জ্বলিতেছে। চক্ষু দুটি আমার পানে চাহিয়া আছে বটে, কিন্তু তাঁহার মন যেন আড়াই হাজার বৎসরের ঘন কুজ্ঝটিকা ভেদ করিয়া এক দিব্য পুরুষের জ্যোতির্ময় মূর্তি সন্ধান করিয়া ফিরিতেছে।

    তিনি হঠাৎ বলিতে লাগিলেন, ‘ভগবান বুদ্ধের দন্ত কেশ নখ দেখেছি; কিছু দিনের জন্য এক অপরূপ আনন্দের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলুম। কিন্তু তবু তাতে মন ভরল না। কেমন ছিল তাঁর পূর্ণাবয়ব দেহ? কেমন ছিল তাঁর চোখের দৃষ্টি? তাঁর কণ্ঠের বাণী— যা শুনে একদিন রাজা সিংহাসন ছেড়ে পথে এসে দাঁড়িয়েছিল, গৃহস্থ-বধূ স্বামী-পুত্র ছেড়ে ভিক্ষুণী হয়েছিল— সেই কণ্ঠের অমৃতময় বাণী যদি একবার শুনতে পেতুম—’

    দুর্দম আবেগে তাঁহার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হইয়া গেল। দেখিলাম, তাঁহার দেহ রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিয়াছে, অজ্ঞাতে দুই শীর্ণ গণ্ড বাহিয়া অশ্রুর ধারা গড়াইয়া পড়িতেছে। বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া গেলাম; এত অল্প কারণে এতখানি ভাবাবেশ কখনও সম্ভব মনে করি নাই। শুনিয়াছিলাম বটে, কৃষ্ণনাম শুনিবামাত্র কোনও কোনও বৈষ্ণবের দশা উপস্থিত হয়, বিশ্বাস করিতাম না; কিন্তু ভিক্ষুর এই অপূর্ব ভাবোন্মাদনা দেখিয়া আর তাহা অসম্ভব বোধ হইল না। ধর্মের এ-দিকটা কোনও দিন প্রত্যক্ষ করি নাই; আজ যেন হঠাৎ চোখ খুলিয়া গেল।

    ভিক্ষু বাহ্যজ্ঞানশূন্যভাবে বলিতে লাগিলেন, ‘গৌতম! তথাগত! আমি অর্হত্ত্ব চাই না, নির্বাণ চাই না, — একবার তোমার স্বরূপ আমাকে দেখাও। যে-দেহে তুমি এই পৃথিবীতে বিচরণ করতে সেই দেব-দেহ আমাকে দেখাও। বুদ্ধ, তথাগত—’

    বুঝিলাম বৌদ্ধ ধর্ম নয়, স্বয়ং সেই কালজয়ী মহাপুরুষ ভিক্ষু অভিরামকে উন্মাদ করিয়াছেন।

    পা টিপিয়া টিপিয়া ঘর হইতে বাহির আসিলাম। এই আত্মহারা ব্যাকুলত বসিয়া দেখিতে পারিলাম না, মনে হইতে লাগিল যেন অপরাধ করিতেছি।

  • হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর

    হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর

    মহানায়ক উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা ‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর’। গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন অভীক চট্টোপাধ্যায়। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১৩; প্রকাশক স্বাতী রায়চৌধুরী; সপ্তর্ষি প্রকাশন; প্রচ্ছদ এঁকেছেন সৌরীশ মিত্র। একই বছর ফেব্রুয়ারিতে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

    উৎসর্গ

    প্রকাশকের তরফ থেকে

    উত্তমকুমার অনুরাগীদের

    ভূমিকা

    ছোটোবেলায় যখন থেকে বড়োদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাওয়ার সুযোগ ঘটল, তখন সেই বয়সেই মনের মধ্যে একটা ইচ্ছে খচখচ করত। অবশ্যই, কারোর কাছে তা প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। আসলে, চলচ্চিচত্রের পর্দায় দেখতে ইচ্ছে হত, উত্তমকুমারকে। যেসব ছবি আমাকে দেখতে নিয়ে যাওয়া হত, তার কোনোটাতেই উত্তমকুমার থাকতেন না। অথচ, বাড়ির পিসি—কাকা—দাদাদের মুখে, বাড়ির বিভিন্ন ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সিনেমার পত্রিকার পাতায় পাতায়, দেওয়ালে দেওয়ালে সাঁটা পোস্টারে— সর্বত্রই দেখতাম একজনের প্রাধান্য— উত্তমকুমার! এই মানুষটিকে নড়াচড়া অবস্থায় পর্দায় দেখার ইচ্ছেটা প্রবল হওয়াই স্বাভাবিক। অবশেষে, ইচ্ছেপূরণ হল। মায়ের সঙ্গে দেখলাম ‘জয়জয়ন্তী’। ছবিটিতে ছোটোদের ভূমিকার একটা প্রাধান্য থাকার কারণেই বোধহয়, আমাকে তা দেখতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু, আজ একথা অকপটে জানাতে দ্বিধা নেই, ওই বয়সেই ছবিতে থাকা বাচ্চচাদের পরিবর্তে উত্তমকুমার, অপর্ণা সেন এবং সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানগুলি আমার মন কেড়েছিল। এ আমি আজও স্পষ্ট মনে করতে পারি। উত্তমকুমারকে প্রথম অভিনয়রত অবস্থায় দেখে, ঐ ছোটো বয়সেই ওঁর মতো হাঁটতে, চলতে, কথা বলতে ইচ্ছে জেগেছিল। পরবর্তীকালে, দেখলাম এই অসম্ভব আকর্ষণের নামই ‘উত্তমকুমার’। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানারকম শিক্ষাদীক্ষা, পড়াশুনা, রাজনৈতিক—সামাজিক পরিবেশজাত প্রভাব থেকে সরল স্বাভাবিক ভাবনাগুলোর ওপরে যখন একধরনের সচেতন ধ্যান ধারণার আস্তরণ পড়তে লাগল, তার ফলে, সেই যুবকাবস্থায় নানারকম বিভাজনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হল। এরই ফলস্বরূপ, ‘মূলধারা’র সিনেমার রোম্যান্টিক ‘হিরো’ উত্তমকুমারের সম্বন্ধে বেশি ভাবনা—চিন্তা করার মতো কিছু নেই—এইরকম একপ্রকার মতের সমর্থক হয়ে উঠেছিলাম সেইসময়। ক্রমে, এইসব আরোপিত ঘোর যখন কাটতে শুরু করল এবং যথাযথভাবে আপন সত্তার দিকে তাকানোর অবকাশ মিলল, তখন চেতনার অনেকটাই মুক্তি ঘটার ফলে, অনেক বিষয়ের সঙ্গেই নতুন করে হৃদয়ের যোগ স্থাপিত হল, যেগুলি, এতদিন সচেতনভাবে দূরে সরিয়ে রাখা ছিল। এহেন অবস্থায় নতুন করে বুঝলাম, শক্তিশালী অভিনয় ও ‘স্টার’ অভিনেতার এক সম্পৃক্ত মিশ্রণের আদর্শ রূপ হলেন ‘উত্তমকুমার’। অনেক অর্থেই তিনি ব্যতিক্রমী। কেন? আসব সে কথায়, তবে তার আগে এই বইটার হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনি এবং গঠনপ্রণালী নিয়ে কয়েকটি কথা বলা দরকার।

    উপরে এত ব্যক্তিগত কথা দিয়ে শুরু করার একটাই অর্থ, আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার মতো চল্লিশোর্ধ্ব বাঙালির জীবনে উত্তমকুমারের আগমনের ধরন, একটু হেরফের করে আমার ধাঁচেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটেছে। এবার আসি বইটার প্রসঙ্গে। আমার এক বন্ধু দেবাশিস গুপ্ত, যিনি আমার এলাকা চন্দননগরের বাসিন্দা, তিনিই নিজ উদ্যোগে তাঁর সংগ্রহে থাকা ১৩৬৭ সালের বৈশাখের প্রথম সংখ্যা নবকল্লোল পত্রিকা থেকে, একবছর ধরে পরপর সংখ্যায় বেরোনো উত্তমকুমারের ধারাবাহিকভাবে লেখা ‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর’ শীর্ষক আত্মজীবনীমূলক রচনাটি সম্পূর্ণ ফোটোকপি করে আমার হাতে তুলে দেন। এই রচনাটি সম্বন্ধে কোনো ধারণাই আমার ছিল না। দীর্ঘদিন এটি দৃষ্টির অগোচরে ছিল। পুরোনো বই ও পত্রপত্রিকার সংগ্রাহক বন্ধু দেবাশিস গুপ্ত—র প্রতি এজন্য আমার কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা নেই। তিনি এইভাবে নিজে এগিয়ে এসে, এই রচনাটি সম্বন্ধে আমায় অবহিত না করলে, বইটিই প্রকাশিত হতে পারত না। এই ফোটোকপি হাতে আসার পর, এটিকে বইয়ের আকার দেওয়ার ইচ্ছেটা প্রবল হয়। ‘সপ্তর্ষি প্রকাশন’ —এর সৌরভকে একবার বলাতেই, সে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেল। এজন্য, তারও কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য। কিন্তু, যতটুকু রচনা পাওয়া গিয়েছিল, তার পরে আরও ছিল। পুরোটা না পেলে তো, বই হবে না। লাইব্রেরির সাহায্য নেওয়া দরকার। বিশিষ্ট সাংবাদিক—প্রাবন্ধিক ও অনেক উচ্চচমানের গ্রন্থের সম্পাদক ভবেশ দাসের স্ত্রী রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজের লাইব্রেরিয়ান শ্রীমতী এলা দাস, যাঁরা দুজনেই আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন, সেই বৌদি যোগাযোগ করিয়ে দিলেন ‘জাতীয় গ্রন্থাগার’—এ উচ্চচপদে কর্মরত জয়গোপাল সাহার (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) সঙ্গে। তিনি অসম্ভব আন্তরিকতার সঙ্গে আমাকে সাহায্য করলেন। পেয়ে গেলাম রচনাটির বাকি অংশের (নবকল্লোল ১৩৬৮ ও ১৩৬৯’ বৈশাখ) ফোটোকপি। ব্যস, সম্পূর্ণ রচনা হাতে। এরপর, এল অনুমতির প্রশ্ন। উত্তমকুমারের পৈতৃক বাড়ি যে রাস্তার ওপরে, সেই গিরিশ মুখার্জি রোডেই ‘গিরিশ ভবন’—এ আমার এক ভাইঝির বিয়ে হয়েছে। ওদের সঙ্গে দীর্ঘদিন যাবৎ উত্তমকুমারের পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা। ভাইঝির শ্বশুরমশাই শ্রীতপন মুখোপাধ্যায়ের মারফত যোগাযোগ হল, উত্তমকুমারের পুত্রবধূ শ্রীমতী মহুয়া চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ভীষণ আন্তরিক ব্যবহারসহযোগে, তিনি এককথায় লিখিত অনুমতি দিয়ে দিলেন। উপরিল্লিখিত, প্রত্যেককে আমার অন্তরের সবটুকু কৃতজ্ঞতা নিবেদন করলাম। এছাড়া, তথ্য, ছবি ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, শ্রদ্ধেয় শঙ্খ ঘোষ, সমাজতাত্ত্বিক গবেষক সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, রেকর্ড—সংগ্রাহক জয়দীপ চক্রবর্তী, উত্তমকুমারকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাতা স্বপন দাস, শ্রদ্ধেয় সংগীতব্যক্তিত্ব ডঃ দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা বেতারের শ্রদ্ধেয় মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়, কলেজ জীবনের অন্তরঙ্গ বন্ধু চলচ্চিচত্রপ্রেমী মানসকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, চলচ্চিচত্র—গবেষক দেবীপ্রসাদ ঘোষেদের মতো ব্যক্তিরা। এঁদের প্রত্যেককে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানালাম। প্রখ্যাত রেকর্ড—সংগ্রাহক সুশান্তকুমার চট্টোপাধ্যায় একটি পত্রিকায় বেরোনো তাঁর লেখা উত্তমকুমারের রেকর্ড ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাওয়া গান সংক্রান্ত অভিনব দুষ্প্রাপ্য তথ্যবহুল রচনাটি এই বইতে পুনর্মুদ্রণের অনুমতি দিয়ে কৃতার্থ করেছেন। এজন্য, তাঁর প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। অবশ্যই কৃতজ্ঞতা জানাই, আশিস পাঠককে যিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় সেপ্টেম্বর মাসে বইটি সম্পর্কে এক সুন্দর প্রতিবেদন লিখে, আগাম সবাইকে বইটি সম্পর্কে অবহিত করেছেন। এদের প্রত্যেকের অবদান বইটিকে বাস্তব রূপ দিতে সহায়তা করেছে।

    এবার, শেষে, উত্তমকুমার তাঁর এই বইতে কীভাবে উঠে এসেছেন, সে বিষয়ে কয়েকটি কথা বলে ভূমিকায় ইতি টানব। বাংলা সিনেমা সবাক হবার পর থেকে, বলা যায় আজ অবধি ঠিকঠাকভাবে যে তিনজন ‘স্টার’—এর দেখা মিলেছে, তাঁরা হলেন দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথেশ বড়ুয়া ও উত্তমকুমার। প্রথম দুজনের চেয়ে উত্তমকুমার জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘপ্রভাবের দিক থেকে যে অনেক এগিয়ে, তা অনেকেই সম্ভবত মানবেন। তাছাড়া, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় যে সময় বিরাজ করতেন, তা ছিল মূলত থিয়েটারের যুগ এবং তিনিও নিজে পছন্দ করতেন মঞ্চাভিনয়।

    তখন সেই তিন—এর দশকে নির্বাক যুগ থেকে সবাক যুগে ধীরে ধীরে উত্তরণ ঘটছে চলচ্চিচত্রের—নিতান্তই এক শৈশবাবস্থা বলা যায়। ফলে, অভিনয় জগৎ শাসিত হত মঞ্চাভিনয়ের দ্বারা। আর, প্রমথেশ বড়ুয়া অবশ্যই একশো ভাগ চলচ্চিচত্রের মানুষ হলেও খতিয়ে দেখলে, একটা বিষয় সম্ভবত পরিষ্কার হয় যে, বড়ুয়াসাহেব প্রথমে একজন চিত্র—পরিচালক তারপরে অভিনেতা। প্রযোজনা ও পরিচালনার গুণে চলচ্চিচত্রকে সাবালক তৈরির ক্ষেত্রে, উজ্জ্বল ভূমিকা নিয়েছিলেন। এর সঙ্গে অবশ্যই ছিল প্রমথেশচন্দ্রের নায়ক ভূমিকায় অভিনয়। কিন্তু, উত্তমকুমার ছিলেন একজন আদ্যোপান্ত চলচ্চিচত্রাভিনেতা। অল্প কিছু ক্ষেত্রে, মঞ্চাভিনয় বা চলচ্চিচত্র—পরিচালনা করলেও, উত্তমকুমার সকলের মনে বিরাজ করছেন একজন স্বপ্নের নায়ক ও ‘স্টার’ অভিনেতা হিসেবে, একথা আশাকরি সকলেই মানবেন। এর বীজ নিয়েই যে তিনি জন্মেছিলেন, তার পরিষ্কার আভাস তাঁর লেখা এই বইতে আছে। এই রচনা যেখানে শেষ হচ্ছে তখন ১৯৬২ সালের এপ্রিল—মে মাস। সকলেই জানেন, এ সময়ে তিনি মধ্যগগনে। ফলে, তাঁর নিজেকে গড়ে তোলার জায়গাটি অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে উঠে এসেছে এই বইতে। মনে রাখতে হবে, দুর্গাদাস ও প্রমথেশচন্দ্র দুজনেই ছিলেন কিন্তু অভিজাত বংশোদ্ভুত। অন্যদিকে, উত্তমকুমার এক ছাপোষা মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের কলমপেষা কেরানি ছিলেন। সেখান থেকে স্বপ্ন দেখতেন নায়ক হওয়ার। এ যেন, আমাদের মতো সাধারণের ভাবনায় ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে আমির হওয়ার স্বপ্ন দেখার মতো ব্যাপার। কিন্তু, যিনি আমিরত্বের সত্তা নিয়েই জন্মেছেন, ছেঁড়া—কাঁথা—টাথা তাঁর কাছে কিছু নয়। তিনি আমির হবেনই এবং হলেনও তা।

    ১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে শুরু করে, পরপর ৭ খানি ছবি ফ্লপ হওয়ার পরে, ১৯৫২ সালে ব্যতিক্রমী পরিচালক নির্মল দে— র ‘বসু পরিবার’ ছবিতে প্রথম সাফল্যের মুখ দেখলেন। এ থেকে স্পষ্ট হয়, কী পরিমাণ টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এই অন্ধকার সময়টি তিনি অতিক্রম করেছেন। কখনও লড়াই ছেড়ে তো যানই নি, উপরন্তু, প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে গেছেন তাঁর লক্ষ্যে। এইসময় একদিন একা গঙ্গার ধারে বসে থাকার সময়, হঠাৎ, এক সন্ন্যাসী কোথা থেকে উদয় হয়ে, উত্তমকুমারকে তাঁর পারিবারিক ও ছবির জীবনের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে এক অমোঘ ভবিষ্যৎবাণী করে চলে যান, যা পরে অক্ষরে অক্ষরে ফলে যায়। একদিকে গৌরী দেবীকে জীবনে পাওয়ার ব্যাপারে চিন্তা, অন্যদিকে ছবির জগতে সাফল্য পাওয়া নিয়ে চরম উদ্বেগ। সব মিলিয়ে এক অন্য উত্তমকুমার উঠে আসেন, তাঁর নিজ রচনায়। নিজের ছবির জগতে সাফল্য পাওয়ার বিষয়ে কতখানি গভীর চিন্তা—ভাবনা তিনি করেছিলেন, একটু ভাবলেই আমাদের কাছে তা পরিষ্কার হয়। ‘বসু পরিবার’—এ সাফল্য আসার পর কয়েকটি ছবি পেরিয়ে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ (১৯৫৪) ছবিতে সম্পূর্ণ এক অন্য উত্তমকুমার জেগে ওঠেন যেন। ইনিই হন আমাদের চেনা ‘স্টার’। একইসঙ্গে, এই ছবি থেকে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর রোম্যান্টিক রসায়নটিও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এই বইতেই এক জায়গায় উত্তম তাঁর প্রিয় অভিনেতা হিসেবে প্রখ্যাত হলিউড ‘স্টার’ রোনাল্ড কোলম্যান—এর নাম করেছেন। ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিতেই প্রথম দেখা যায়, উত্তমকুমারের হাঁটাচলা, পোষাক নির্বাচন, চুলের বিন্যাস, তাকানো, ক্যামেরাকে ব্যবহার—সমস্ত পালটে যায়। একধরনের হলিউডি ‘স্টার’ ঘরানার সঙ্গে যার প্রভূত মিল চোখে পড়ে। এই জায়গা থেকেই তিনি সবাইকার থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলেন। শুধু তাই নয়, ক্যামেরাকে নতুন ভাবে ব্যবহার করাও দেখা গেল তাঁর মধ্যে থেকে। যেমন, উত্তমকুমারের ক্যামেরার দিকে পিছন করে, পাশে তাকিয়ে একধরনের বিশেষ স্টাইলকে অবলম্বন করে অভিনয়, আমাদের কাছে ভীষণ প্রিয়। এর আগে, এরকম বিদেশিয়ানার ছোঁয়া—লাগা ভঙ্গিমায়, অন্য কোনো নায়ককে দেখতে অভ্যস্ত ছিল না দর্শককুল। নিজে খুবই ভালো গান গাইতে পারতেন এবং কতখানি সংগীতবোধ তাঁর ছিল, তা তো ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবিতে উত্তমকুমারের সুরারোপিত গানগুলি শুনলেই বোঝা যায়। এর ফলে, গানের সঙ্গে ঠোঁট নাড়ার ক্ষেত্রে, তিনি উচ্চচতম মানে পৌঁছেছিলেন। কী অসম্ভব নিষ্ঠা অভিনয় সংক্রান্ত বিষয়ে সারাজীবন দেখাতে পারলে, তবেই এই উচ্চচতায় পৌঁছোনো সম্ভব, তা সহজেই অনুমেয়। একটি দূরদর্শন সাক্ষাৎকারে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মান্না দে বলেছিলেন যে, একবার তাঁর সঙ্গে মুম্বইয়ের রাস্তায় উত্তমকুমারের দেখা হয়েছিল। উত্তমবাবু হাতে একটা টেপ রেকর্ডার নিয়ে ঘুরছিলেন। মান্না দে জিজ্ঞাসা করাতে, উত্তমকুমার বলেছিলেন, তখন ‘অ্যান্টনী ফিরিঙ্গি’ ছবির জন্য সদ্য রেকর্ড করা মান্না দে—র গাওয়া গানগুলি যখনই সময় পাচ্ছেন, বারবার শুনে ‘লিপিং’ প্র্যাকটিশ করছেন, যাতে স্যুটিং—এর সময়ে অভিনয়ে তা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। ভাবা যায়! অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার চরমতম নিদর্শন ছাড়া, একে আর কীইবা বলা যায়। এককথায়, ব্যক্তিগতভাবে যা মনে হয়, বাংলা ছবিতে হলিউডের ‘স্টার’ ঘরানাকে এক আদর্শ বাঙালির মোড়কে সফলতার সঙ্গে প্রথম এনেছিলেন উত্তমকুমার তাঁর অভিনয়শৈলীর মধ্য দিয়ে।

    বিশ্ববন্দিত সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘নায়ক’ ছবির মধ্য দিয়ে যেন এই হলিউড স্টার উত্তমকুমারকেই অসাধারণভাবে তুলে ধরেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের মতো চিত্র পরিচালকেরা সাধারণত চিত্রনাট্য রচনা করে তার চরিত্রোপযোগী অভিনেতা—অভিনেত্রীদেরই নির্বাচন করে থাকেন। ‘নায়ক’ ছবির ক্ষেত্রে, কিন্তু উত্তমকুমারের সব কিছু বজায় রেখে সত্যজিৎ চরিত্রটি নির্মাণ করেন। একথা, তিনি নিজেই বলেছেন। এর ফলে, দুই অসামান্য সৃষ্টিশীল প্রতিভাধরের প্রতিভার এক অপূর্ব বিনিময় ঘটে যেন ছবিতে। একইরকম বিনিময় আমরা দেখি সত্যজিৎ রায়—ছবি বিশ্বাস (‘জলসাঘর’) বা সত্যজিৎ রায়—তুলসী চক্রবর্তী (‘পরশপাথর’)—র ক্ষেত্রে। বিশেষ করে, একজন অভিনেতার কাছে, এ যে কতখানি সম্মানের তা বলে বোঝানো যায় না। এখান থেকেই বোধহয় উত্তমকুমারদের মতো অভিনেতারা বহুর মধ্যে এক হয়ে ওঠেন। মৃত্যুর ৩৩ বছর পরও, এই কারণেই বোধহয় উত্তমকুমার আমাদের মধ্যে এতখানি জীবন্ত হয়ে থাকতে পারেন। এ হেন ঈশ্বরপ্রতিম অভিনেতার আত্মজীবনীর সম্পাদনার কাজে নিজেকে যুক্ত রাখতে পেরে, সত্যিই নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে।

    সবশেষে বলি, এই বইয়ের শেষে কিছু প্রাসঙ্গিক টীকাকরণ ও উত্তমকুমারের জীবনীপঞ্জি ও কর্মপঞ্জির একটি সাধ্যমতো বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সম্পাদক হিসেবে কখনওই দাবি করছি না, যা দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ।

    একটা কথা মনে রাখতে হবে, এটি কিন্তু উত্তমকুমারের আংশিক আত্মজীবনী (১৯৬২ সাল অবধি)। সম্পাদনার ক্ষেত্রে, যেসব ত্রুটি রয়ে গেল, তার জন্য পাঠকবর্গের কাছে আগাম মার্জনা চেয়ে রাখলাম। উত্তমকুমারের পরিবারবর্গ, প্রকাশক সহ বইটি নির্মাণে সমস্ত সাহায্যকারী ও উৎসাহদাতাদের উদ্দেশ্যে পুনরায় আমার কৃতজ্ঞতা জানালাম। সবশেষে, প্রণাম জানালাম চিরভাস্বর চিরনায়ক উত্তমকুমারকে।

    ১৮.১.২০১৩
    অভীক চট্টোপাধ্যায়
  • এক

    এক

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    এক

    দ্বিজেন্দ্রলালের1 দিলদার এক জায়গায় বলেছেন— “আমি পারিষদ, দার্শনিকের পদে এখনও উন্নীত হইনি। তবে ঘাস খেতে খেতে মুখ তুলে চাওয়ার নাম যদি দর্শন হয় তাহলে আমি দার্শনিক।”

    ঠিক তেমনি, আমিও অভিনেতা। অভিনয়ই আমার জীবন। সাহিত্যিক আমি নই।

    তবুও আমাকে অনুরোধ করেছেন লেখবার জন্য।

    প্রথমটা ভেবেছিলাম লিখব না। শেষকালে কলম ধরতে বাধ্য হলাম এই ভেবে যে আমারও আপনাদের কাছে কিছু বলবার আছে। সেই না-বলা বাণীকেই আজ আমি ভাষায় রূপ দিতে চলেছি।

    কারণ ইলেকট্রিকের আলোর সাহায্যে রুপালি পর্দার ওপর আমার ছবি দেখে অনেকেই আমার সম্বন্ধে বিভ্রান্তিকর ধারণা করতে শুরু করেছেন। আর সেই ভ্রান্তি আমাকে নিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে তুলে আর এক কল্পলোকে—যেখানকার অধিবাসী আমি নই, হবার যোগ্যতাও রাখি না।

    যেমন, আমার বাড়ি নাকি বিরাট একটা বাগানের মাঝখানে। রাত্তিরবেলা সেইখানে নাকি আলো জ্বলে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় রংও তার বদলায়। সুইজারল্যান্ড থেকে নাকি আমার জন্যে এসেছে স্পেশাল একধরনের দম দেওয়া পাখি, যাতে দম দিয়ে দিলে সুন্দর গান ভেসে আসে। আর সেই গান শুনতে শুনতে আমি নাকি রাত্তিরে ঘুমোই। Studio থেকে ফেরার সময় একটা ঝোলানো electric hanging bridge-এর সাহায্যে আমার গাড়ি নাকি উঠে যায় বাড়ির তেতলার ছাদে। আমি যেন কোনো রূপকথার রাজপুত্র।

    তবে এখন প্রশ্ন হতে পারে এ সব কাহিনি রটল কী করে? আমার যতদূর বিশ্বাস এসব কাহিনি রটেছে—কারণ দীর্ঘদিন দর্শকরা আমাকে পর্দার ওপরে দেখেছেন নায়কের ভূমিকায়। সিনেমার নায়ক অধিকাংশ সময় বড়োঘরের ছেলে কিংবা গরীবের ছেলে হলেও একটা বড়োলোক আত্মীয় বা বড়োলোক নায়িকা তার থাকেই। কিন্তু এ ধরনের গল্প আমার সম্বন্ধে যাঁরা রটান তাঁরা ভুলে যান, পর্দার গায়ে আমাকে যার বেশে দেখছেন তার সঙ্গে বাস্তব ক্ষেত্রে আমার সম্বন্ধ একেবারেই নেই। আমি নায়ক। যেমন বড়োলোক সাজি, তেমনি গরীব চাকরও মাঝে মাঝে সাজতে হয়। সবচেয়ে মজার কথা এই যে, অনেকে ভাবেন গরীবের চরিত্রে অভিনয় করাটাই আমার সত্যিকারের অভিনয়, আর শেষেরটা আমার জীবন।

    কিন্তু আপনারা বিশ্বাস করুন রূপকথার রাজপুত্তুর আমি নই। আপনাদেরই মতো সাধারণ রক্তমাংসে গড়া মানুষ। শোকে দুঃখে আমারও জীবন আপনাদেরই মতন গড়ে উঠেছে—আর সেই কথা বলবার জন্যে আপনাদের দরবারে হাজির হয়েছি।

    হাজির হয়েছি এই জন্যে যে, আমি ভালোবেসেছি আপনাদের। আপনাদের আনন্দ দিয়ে সেবা করতে চেয়েছিলাম আমার মনপ্রাণ ঢেলে। জানিনা সে কাজে আমি কতদূর সফলতা লাভ করেছি। তবে আমার এই কাজের বিনিময়ে আমি পেয়েছি আপনাদের শুভেচ্ছা আর আশীর্বাদ—যা আমার জীবনের যাত্রাপথে ধ্রুবতারা হয়ে অন্ধকার রাত্রে পথনির্দেশ করবে।

    ছেলেবয়সে একদিন স্বামী বিবেকানন্দের কথা পড়তে পড়তে একটা ঘটনা আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে যায়। তখন তার মানে ভালো করে বুঝতে পারিনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অর্থ কিছু উপলব্ধি করতে পারি।

    ঘটনাটা এইরকম।

    স্বামী বিবেকানন্দ একদিন গিয়েছিলেন এ যুগের অবতার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে দক্ষিণেশ্বরে দেখতে।

    ফিরে আসছেন তিনি সেখান থেকে। সঙ্গে হরি মহারাজ বা তুরীয়ানন্দ।

    স্বামীজি প্রশ্ন করলেন—‘কেমন দেখলে ঠাকুরকে?’

    উত্তরে তুরীয়ানন্দ অনেক কথাই বললেন। অবশেষে প্রশ্ন করলেন—‘তুমি কেমন দেখলে তাঁকে?’

    পথ চলতে চলতে গম্ভীর কণ্ঠে স্বামীজী উত্তরে বললেন–‘L–o–v–e, personified.’

    পরে বুঝেছি ঘনীভূত ভালোবাসাই ভগবানের প্রকৃত রূপ এবং তাঁকে পেতে গেলে বা তাঁর কাজ করতে গেলে মানুষের অন্তরেও চাই ভালোবাসা। সুতরাং সেইদিন থেকে এই সহজ পথই বেছে নিলাম নিজের আদর্শরূপে। ভালোবাসলাম নিজের বাবা, মা, আত্মীয়স্বজনকে। ভালোবাসলাম পাড়ার ছেলেদের। ভালোবাসলাম আপনাদের।

    কাজের ফাঁকে ফাঁকে অনেক চিন্তা করেছি, আমি কি প্রকৃতই আমার উদ্দেশ্যপথে এগিয়ে যেতে পারছি, না লক্ষ্যহারা হয়ে আমি জীবনের আদর্শ থেকে বহুদূরে সরে যাচ্ছি? তেমন যুক্তিপূর্ণ উত্তর পেতাম না। উত্তর পেলাম সেইদিন যেদিন আমি ভিক্ষাপাত্র হাতে বেরিয়েছিলাম আপনাদের দরজায় দরজায়। সেইদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম কতখানি ভালোবাসা আমি আপনাদের কাছ থেকে পেয়েছি।

    কিন্তু আমার এমনি দুর্ভাগ্য যে সেদিন আপনাদের প্রত্যেকের সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আলাপ করার সুযোগ আমার ছিল না।

    আপনারা সকলেই জানেন কলকাতার লোকের জীবন ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে থাকে বাঁধা। যদি কোনো কারণে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যায় তাহলে সেই কয়েকটা মিনিট পূর্ণ করবার জন্য কী প্রাণান্তকর পরিশ্রমই না মানুষকে করতে হয়!

    তেমনি আমার জীবনও বাঁধা রয়েছে ওই ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে।

    চিত্রনির্মাতারা আমার অধিকাংশ সময়ই কিনে নিয়েছেন। আমাকেও তাই পাল্লা দিয়ে দ্রুত ছুটতে হয় ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে। ইচ্ছে থাকলেও আপনাদের সঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনা করবার সময় আমি পাই না।

    বিশ্বাস করুন, কত রাত বিছানায় শুয়ে আমি ভেবেছি, এ আমার অন্যায়। কিন্তু পরমুহূর্তে এই ভেবে আশ্বস্ত হয়েছি, মুখোমুখি আপনাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে না পারলেও আপনাদের আনন্দ আর সেবার জন্যে আমার অধিকাংশ সময় ব্যয়িত হয়। এইটুকুই আমার একমাত্র তৃপ্তি।

    অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেছেন, আমার ছেলে বয়সের অরুণকুমার নাম আমি কেন পরিবর্তন করলাম। কী-সে এমন ঘটনা ঘটেছিল, যার জন্যে এই নাম পরিবর্তন!

    আপনারা অনেকেই জানেন আমার নাম ছিল অরুণকুমার— অর্থাৎ সূর্যের পুত্র।

    সূর্যদেব হচ্ছেন সেই সে দেবতা যাঁর দয়ায়, জগৎ আর তাঁর সৃষ্টি রক্ষা পায়। কিন্তু আমি তো তা নই।

    এ যুগের কবিগুরুর নামও তাই।

    মধ্যাহ্ন ভাস্করের মতন তিনি সাহিত্যজগতে বিরাজিত। তাঁর মৃত্যুতে আমার যতদূর স্মরণ আছে— Sir Morris Gayer2 বলেছিলেন— ‘গত দু’হাজার বৎসরের মধ্যে এমনি প্রতিভাবান ব্যক্তির জন্ম হয়নি। আর আগামী দু’হাজার বৎসরের মধ্যে এমন কবির জন্ম হবে কিনা সন্দেহ।’

    তাই আমি ভেবে দেখলাম তাঁরই সাজে ‘রবীন্দ্র’ নাম নেওয়া। কিন্তু আমি? আমি তো সামান্য মানুষ! ও নাম বা তাঁর পুত্র হবার যোগ্যতা আমার কোথায়? তাই আমার নিজের নাম বদল করে রাখলাম উত্তমকুমার। অর্থাৎ আমি হচ্ছি উত্তম-মানুষের পুত্র।

    অবশ্য এ বিষয়ে আপনারাও আমার সঙ্গে একমত হবেন। নিজের পিতাকে সব পুত্রই শ্রেষ্ঠ পুরুষ মনে করে। তা সে নিজে যাই হোক। কারণ বাবা-মা যে কোনও ছেলেমেয়ের সাক্ষাৎ উপাস্য দেবতা। তাই আমি নাম বদল করে হলাম উত্তমকুমার।

  • দুই

    দুই

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    দুই

    আত্মজীবনী লিখতে যাওয়া ভারী বিপদ। অনেক কথা ভিড় করে আসে মাথায়। সেগুলোকে বেছে বেছে, একের পর এক, পাঠকের সামনে উপস্থিত করতে হবে। তার মধ্যে কাহিনিকারকে আগে ভেবে নিতে হয়, কোনটা আগে কোনটা পরে। যেন না কখনও মিথ্যের আশ্রয় নিতে হয়। এই বাছাবাছির মধ্যে সবচেয়ে কঠিন নিজের শৈশবের কথা লেখা।

    ছেলেবয়েস থেকে কোনও ডায়ারিও লিখে রাখিনি যা থেকে আজ এই কাহিনি লিখতে সাহায্য পাব।

    নিজের স্মৃতি ঘেঁটে তাই আমার শৈশবের এক একটা ঘটনা আজ খুঁজে বার করতে হচ্ছে—আপনাদের কাছে নিবেদন করব বলে।

    যাক, যা বলছিলাম।

    আমি শুনেছি, আমি নাকি আহিরীটোলায় আমার মামার বাড়িতে ৩ সেপ্টেম্বর জন্মেছিলাম। আমার বাবার3 বাড়ি কিন্তু ভবানীপুর অঞ্চলে গিরিশ মুখার্জি রোডে। বাবার বাড়ি বলছি বলে একথা কেউ মনে করবেন না, সেই বাড়িতে কেবল আমার বাবাই থাকতেন। সেটা ছিল, ও অঞ্চলের চট্টোপাধ্যায় পরিবারের যৌথ সংসার।

    মা’র মুখ থেকে গল্প শুনেছি, আমার মা4 যখন বধূবেশে এ বাড়িতে আসেন, তখন তাঁর অত্যন্ত অল্প বয়স। চট্টোপাধ্যায় পরিবারের তখন উঠতি সময় নয়। ভাঙন শুরু হয়েছে। বন্যার টানে ভেসে যাচ্ছেন অনেকেই। অর্থের অভাব সংসারে দেখা দিয়েছে।

    আমার মা’কেও তাই গৃহের কাজে খাটতে হত উদয়াস্ত। লোকজন রাখবার সামর্থ্য আমার বাবার তখন ছিল না। নিশ্বাস ফেলবার সময়ও তাঁর ছিল না। রান্নাবান্না; এককথায় গৃহস্থালীর যাবতীয় কাজ, তিনি নিজে হাতেই করতেন। আর আমার বাবা? সকাল থেকে ঘুরতেন, অর্থের চিন্তায়। কী যে তিনি করতেন তা অবশ্য খবর রাখার বয়স তখন আমার হয়নি। অদ্ভুত ছিলেন এই মানুষটি। সংসারে কারোর ওপর কোনও দাবি রাখতেন না। সকলকে দিতেই তিনি যেন এসেছিলেন। দিয়েই তিনি চলে গেলেন।

    আমি তাঁর বড়ো ছেলে হয়েও তাঁর দুঃখের লাঘব এতটুকু করতে পারলাম না।

    মেট্রো কোম্পানি কলকাতায় বায়োস্কোপ5 খোলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেখানে যোগদান করেছিলেন ‘চীফ অপারেটর’ হিসাবে। তাই বেশিরভাগ দিনই তিনি বাড়ি আসতেন আমরা যখন ঘুমিয়ে পড়তাম। আমাদের সঙ্গে সম্বন্ধ ছিল তাঁর কম।

    কিন্তু একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করেছি। আমরা কী করছি, তা তাঁর থাকত নখদর্পণে।

    সাধারণ বাপ মা’র মতন আমাদের গায়ে তিনি কখনও হাত তোলেননি।

    চেঁচামেচি করে বাড়িতে যে বকাবকি করেছেন, এমন কথাও মনে পড়ে না। কিন্তু ওই মানুষটিকে আমরা চিরদিন ভয় পেয়েছি। শুধু ভয় নয়, সত্যিকারের ভালোবেসেছিলাম। সে ভালোবাসা যে কতখানি, তা আজ মর্মে মর্মে অনুভব করছি—তাঁকে হারিয়ে।

    তিনমাস আগে আমাদের ছেড়ে যখন তিনি চলে গেলেন, তখন মনে হয়েছিল আমি এ সংসারে যা হারালাম তা বুঝি কোনোদিন পূর্ণ হবে না।

    শ্মশানঘাটে চিতার ধোঁয়ার দিকে চেয়ে খালি ভেবেছি—উপযুক্ত পুত্র হয়েও আমি করতে পারলাম না কিছুই আপনার। কেবল দু’হাত পুরে আমি নিয়েই গেলাম। বিনিময়ে দিলাম কী?

    আমার উন্নতি, প্রতিষ্ঠা; আজ সংসারে যা কিছু পেয়েছি তা আপনারই দয়ায়।

    এই সমস্ত কথা ভাবতে ভাবতে, তাঁর শেষ কাজ করে ফিরে এলাম আমাদের পুরোনো বাড়িতে।

    মা’র দিকে চেয়ে দেখি, তাঁর অঙ্গে উঠেছে তখন বিধবার সাজ। কোথায় গেল তাঁর লালপাড় শাড়ি, কোথায় গেল বা তাঁর সিঁথির সিঁদুর!

    ঘর থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। মা ডাকলেন, ‘খোকা শোন।’

    এতক্ষণ ধৈর্য ধরে ছিলাম, কিন্তু এ স্নেহস্পর্শে আমার সব ধৈর্যের বাঁধন যেন টুটে গেল। স্বার্থপরের মতো একবারও সেদিন চিন্তা করতে পারিনি যে এই দুঃখ মায়ের বুকেও কম ব্যথা দেয়নি। তবুও তিনি, আমাদের মুখ চেয়ে নিজেকে প্রাণপণে শক্ত করে রেখেছেন।

    মা’র কাছে গিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম। বললাম—‘মা, কী হবে? আমি তো কিছুই ভাবতে পারছি না।’

    অভয়দায়িনীর মতো আমাকে অভয় দিয়ে তিনি বললেন—‘ভয় কী! আমি তো আছি। আর রয়েছে তাঁর আশীর্বাদ।’

    আমি বললাম—‘বাবার তো কিছুই আমি করতে পারলাম না। জীবনের শেষদিন অবধি তিনি কাজই করে গেলেন। বিশ্রাম যে কী জিনিস তা তো তিনি জানলেন না। এমন কি এই বাড়ি থেকে আমার নতুন বাড়িতে উঠে যেতে তোমাদের বললাম, তাও তোমরা যেতে রাজি হলে না। তোমাদের সেবা করবার সুযোগ আমাকে দিলে না, কেবল অপরাধীই করে রাখলে।’

    আমাকে দু’হাত দিয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে মা বললেন — ‘দুঃখ পাসনে বাবা, জীবনে কখনও তিনি কারুর কাছ থেকে আশা করতেন না। তাই অসুস্থতা সত্ত্বেও শেষ দিন অবধি তিনি কাজ করে গেলেন। তাই বলে মনে ভাবিস না—তিনি তোদের ভালোবাসতেন না। কতখানি যে তোদের ভালোবাসতেন তিনি, তা কেবল জানি আমি। তোদের ভার সমস্ত আমার ওপর দিয়ে তিনি আজ চলে গেলেন।’

    কথাগুলো বলতে বলতে তাঁরও দু’চোখ বেয়ে অশ্রুধারা নেমে এলো আমার মাথার ওপর।

    শ্রাদ্ধশান্তি চুকে যাবার পর মাকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম আমার নতুন বাড়িতে। কিন্তু মা বললেন—তাঁর শ্বশুর আর স্বামীর ভিটে ছেড়ে কোথাও তিনি থাকতে পারবেন না। কারণ তাহলে ভিটেতে প্রদীপ দেবে কে?

    তাই আমি ভাবছি আমার নতুন বাড়ি ছেড়ে দিয়ে চলে যাব আমার মায়েরই কাছে। জীবনের বাকি ক’টা দিন তাঁরই সেবায় জীবন উৎসর্গ করব। কারণ বিবেক আমাকে নিয়ত দংশন করছে যে আমার বাবার আমি কিছুই করতে পারিনি।

  • তিন

    তিন

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    তিন

    অনেকে আমাকে আর সম্পাদকমশাইকে চিঠি দিয়েছেন। তাঁরা আমার পূর্বোক্ত কাহিনির মধ্যে রোম্যান্টিক ঘটনা পাননি বলে অভিযোগ জানিয়েছেন।

    পর্দার ওপরে আমাকে তাঁরা দেখেছেন নানারকম রোম্যান্টিক চরিত্রে অভিনয় করতে। কিন্তু তেমন রোম্যান্সের সন্ধান আমি পাই কোথায়? তাও আবার এই বিশেষ ধরনের রোম্যান্সগুলো ঘটে একটা নির্দিষ্ট বয়সে। সেই বয়সে কাহিনিকে না টেনে নিয়ে যাওয়া অবধি, আপনাদের কাছে আমার বিনীত নিবেদন, আপনারা একটু ধৈর্য ধরে আমার কথা শুনুন।

    যাক যা বলছিলাম।

    আমার জেঠামশাই-এর ছিল ‘সুহৃদ সমাজ’ নামে একটি যাত্রা ক্লাব।

    ছেলেবয়সে পড়াশুনা আরম্ভ হবার আগে আদরের ভাইপো বলে, রিহার্সালে যাবার অধিকারটুকু আমার বোধহয় মিলত। সেইসমস্ত যাত্রার বিভিন্ন ভঙ্গী, পার্ট, আবৃত্তি আর গান আমাকে মুগ্ধ করত। তখন থেকে ভাবতাম কবে বড়ো হব, কবে আমিও যাত্রা করবার সুযোগ পাব!

    যাত্রার রিহার্সাল দেখতে দেখতে কতদিন যে ক্লাবঘরে ঘুমিয়ে পড়েছি তার আর ইয়ত্তা নেই। দিনের বেলায় রিহার্সাল বসত না। বড়ো ফাঁকা ফাঁকা লাগত। কেবলই মনে হত কখন সন্ধে হয়!

    আগেই বলেছি আমরা ছিলাম যৌথ পরিবার। তাই আমার বয়সি আমার সঙ্গীসাথিরও বিশেষ অভাব ছিল না। কিন্তু সকলকার চেয়ে আমার বিক্রম বেশি ছিল আমার নিজের দিদির ওপর।

    এইখানে বলে রাখি, আমরা ছিলাম চার ভাইবোন। ছিলাম বলছি, তার কারণ, আজ আমাদের একজন আর ইহলোকে নেই। শৈশবেই তাকে চলে যেতে হয়েছে অপর এক পৃথিবীর ডাকে।

    খুব সম্ভব ‘বুড়ো’ (তরুণকুমার)5 তখনও হয়নি।

    একদিন সকালবেলায় খেলতে খেলতে দিদি আমাকে বলে—‘হ্যাঁরে তুই রোজ সন্ধের পর ক্লাবঘরে যাস কেন?’

    আমি বলি—‘যাই কেন জানিস? যাত্রা শিখব বলে।’

    দিদি বলে—‘ইস, তুই যাত্রা করতে পারবি? যা রোগাপটকা চেহারা তোর!’

    আমি রেগে উঠলাম। ক্ষেপে উঠে দাঁড়িয়ে যাত্রার ভঙ্গীতে আবৃত্তি করতে লাগলাম।

    দিদি হেসেই খুন? দিদি যত হাসে, আমার যাত্রা করবার উৎসাহ ততই বাড়ে। ভেতর ভেতর রাগও যে হচ্ছিলনা তা নয়।

    হঠাৎ পার্ট বলা বন্ধ করে বলি—‘হাসছিস কেন রে?’

    দিদি বলে—‘হাসব না? তুই কি যাত্রা করছিস, তুই তো কেবল আমার দিকে চেয়ে পার্ট বলে যাচ্ছিস। যাত্রা বুঝি ওইভাবে করে? যাত্রা করতে গেলে তো ঘুরে ঘুরে অ্যাক্টিং করতে হয়।’

    সত্যি তো, ক্লাবঘরে যাদের অ্যাক্টিং করতে দেখেছি তারা তো ঘুরে ঘুরেই বলে। উত্তেজনার মাথায় সেটা তো ভুলেই গিয়েছিলাম।

    কিন্তু দিদির কাছে তর্কে হারতে ইচ্ছে হ’ল না। তাই বলি—‘ইস—আমি কি সত্যিকারের যাত্রা করছি নাকি! আমার কি গদা আছে না তলোয়ার আছে! গদা আর তলোয়ার জোগাড় করে দে, তা হলে দেখ আমি যাত্রা করতে পারি কি না। এখন তো আমি থিয়েটার করে তোকে দেখাচ্ছিলাম।’

    অকাট্য যুক্তি। এর কিছুদিন আগে মা’র সঙ্গে আমার মামারবাড়ি গিয়েছিলাম। সেখান থেকে মায়ের সঙ্গে একদিন থিয়েটারও দেখতে গিয়েছিলাম। কী থিয়েটার দেখেছিলাম, তা আজ আর মনে নেই। মনে রাখবার বয়সও তখন আমার হয়নি। তবে পর্দা ওঠবার পর পাদপ্রদীপের সামনে কয়েকজন লোক এসে চিৎকার করে কী সব বলছিল। তাদের হাত ঘোরানো, চলে যাওয়া, দেখতে দেখতে কখন যে মায়ের বুকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তা নিজেই বুঝতে পারিনি।

    দিদি ছিল আমার চেয়ে মাত্র দু বছরের বড়ো। তারও পরিণাম ওই একই হয়েছিল।

    আমরা দুই ভাইবোন যখন ঘুম থেকে উঠলাম, তখন দেখি কোথায় থিয়েটার, কোথায় বা গদি-আঁটা চেয়ার। তার বদলে আমরা শুয়ে আছি মায়ের দুধারে।

    তাই আমার ওই যুক্তিতে দিদি চুপ করে গেল। খানিকটা চুপ করে থেকে বলল—‘কই তুই তো গান গাইলিনি!’

    বলা বাহুল্য যাত্রা ক্লাবঘরে গানের রিহার্সাল রোজই সন্ধেবেলায় বসত। কয়েকটা গান, প্রত্যহ শুনে শুনে, একরকম মুখস্থর মতনই হয়ে গিয়েছিল, তাই চেঁচিয়ে গান ধরলাম। তাতে না ছিল সুর, না ছিল কিছু। তারস্বরে চিৎকার করে কয়েকটা লাইন মুখস্থ বলা ছাড়া আর কিছু নয়।

    দিদি হয়তো এতটা আশা করেনি আমার কাছ থেকে—তাই সে বড়ো বড়ো চোখ করে কেবল আমার দিকে চেয়ে রইল।

    ঠিক এমনি সময় পেছন থেকে চটিজুতোর ফটফট আওয়াজ শুনে দিদি আর আমি সচকিত হয়ে পেছনদিকে চাইলাম। দেখি বাবা আসছেন। আমি থেমে গেলাম।

    বাবা কাছে এসে সস্নেহে বললেন—‘কীরে খোকা, গান গাইছিলি?’

    আমি অপ্রস্তুত হয়ে গিয়ে বলি—‘না, মানে ইয়ে—‘

    সস্নেহে আমার পিঠটা চাপড়ে দিয়ে বাবা বললেন—‘সামনেই সরস্বতী পুজো, সেইদিন তোমার হাতেখড়ি হবে। তারপর তোমায় ভর্তি করে দেব স্কুলে।’

    দিদি অবশ্য কাছেরই একটা মেয়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। আমি স্কুলে যেতাম না বলে, নিজেকে কেমন দিদির চেয়ে ছোটো ছোটো মনে হত। সেই আমি, আমার হাতেখড়ি হবে, আমি স্কুলে যাব। আনন্দের আর সীমা রইল না।

    বাবা কিন্তু কথা বলে আর দাঁড়াননি, চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু হাতেখড়ি জিনিসটা যে কী তা তো বুঝে নেওয়া হয়নি। তাই ছুটে গেলাম মায়ের কাছে। জিজ্ঞেস করলাম—‘হাতেখড়ি কী জিনিস মা?’

    মা বললেন—‘সরস্বতী পুজোর দিনই দেখতে পাবে।’

    সরস্বতী পুজোর আগে বাবা নিয়ে এলেন আমার জন্যে একখানা ধুতি আর চাদর। অবশ্য দিদির জন্যেও একখানা ছোট্ট শাড়ি এনেছিলেন বাসন্তী রঙের।

    মা আমার ধুতি আর চাদরটাকে রঙে চুপিয়ে পরতে দিলেন।

    সরস্বতী পুজোর দিন নতুন ধুতি আর চাদর পরে প্রতিমার সামনে উপস্থিত হলাম। সকাল থেকেই মা খেতে বারণ করেছিলেন। বলেছিলেন—খেলে নাকি বিদ্যে হয় না। দারুণ খিদেও তখন পেয়েছিল। বড়ো বড়ো নারকোলে কুল, মাখন, মিছরি, মিষ্টি, সব কিছু সাজানো রয়েছে থালার ওপর। মা, জেঠাইমা আজ সকাল থেকেই পুজোর কাজেই লেগে রয়েছেন।

    পুরোহিতমশাই আমার হাত ধরে, মাটিতে খড়ি পেতে লিখতে শেখালেন। কী যে ঘটে গেল ব্যাপারটা তা আমি নিজেও ঠিকমতো বুঝতে পারলাম না। তারপর পুজোর শেষে অঞ্জলি দেওয়া। অঞ্জলিশেষে মা বললেন—‘এবারে প্রসাদ খা খোকা।’

    আমাকে, দিদিকে, আলাদা করে তিনি প্রসাদ দিলেন। কিন্তু, কতক্ষণ— আমার সেটাকে শেষ করে ফেলতে।

    খাওয়া শেষ করে দেখি দিদির তখনও আদ্দেকও খাওয়া হয়নি।

    প্রথমে অনুনয়-বিনয় করলাম দিদিকে, বললাম—‘সকাল থেকে কিছু খাইনি, বড্ড খিদে পেয়েছে, দে ভাই, দে, একটু ভেঙে দে।’

    উত্তরে দিদি মুখঝামটা দিয়ে বলল—‘আর আমি বুঝি সকালবেলা একপেট খেয়েছি! অঞ্জলি দেব বলে আমিও যে কিছু খাইনি তা জানিস না!’

    সত্যিই দিদিও সকাল থেকে কিছু খায়নি, সেটা আমার অজানা নয়। কিন্তু একটা কিছু বলতে হয়, তাই দিদিকে বলি—‘তোর কি হাতেখড়ি হয়েছে যে তোর খিদে পেয়েছে?’

    দিদি বলে—‘নাইবা হ’ল!’

    বুঝলাম অনুনয়-বিনয়ে কিছু হবে না। তাই দিদির চুলের মুঠি ধরে পিঠে বসিয়ে দিলাম গুম গুম করে গোটা-কতক কিল। আর তার পাত থেকে সন্দেশটা তুলে নিয়ে পালিয়ে গেলাম সেখান থেকে।

    আমার হাতে মার খেয়ে দিদি ভ্যাঁ করে কান্না জুড়ে দিল।

    জানতাম ওই রকমই একটা কিছু হবে। তার জন্যে তাই তৈরিই ছিলাম। মা’র কাছে ঘণ্টা দু-তিনের ভেতর না গেলেই হল। তারপর ঘটনাটা মাও ভুলে যাবে, দিদিও ভুলে যাবে। কতক্ষণ সে আর আমার সঙ্গে না কথা বলে থাকতে পারবে?

    ক্লাবের ঘরে পুজো হয়েছিল। তাই এদিক সেদিক বেশ খানিকটা ঘুরে ফিরলাম বাড়ি।

    আমাকে দেখতে পেয়ে দিদি বলল—‘হ্যাঁরে খোকা, এতক্ষণ ছিলি কোথায়? মা কখন থেকে খুঁজছে তোকে।’

    আমি বলি—‘কেন রে দিদি?’

    —‘বাঃ, খুঁজবে না? কত বেলা হয়েছে বল তো, খাবি না?’

    আমি জিজ্ঞেস করি—‘তুই খেয়েছিস দিদি?’

    দিদি একটু যেন আশ্চর্য হয়ে গিয়ে বললো—‘তুই খাসনি, আমি কী করে খাব?’

    এই আমার সেই দিদি, যাকে খানিকক্ষণ আগে আমি মেরেছি! যার পাত থেকে আমি তারই মুখের সন্দেশ কেড়ে নিয়েছি? আর বিনিময়ে সেই দিদি আমার, আমারই জন্যে না খেয়ে অপেক্ষা করছে? বড়ো মায়া হল। দিদিকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে বলি—‘চল ভাই, খেতে যাই।’

    মনে থাকবার নয় তবু মনে আছে, কারণ এরই পরে আমার জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল যা আমি ভুলতে পারিনি আজও। বোধহয় ভুলতে পারবও না কোনোদিন। আর আমি তা ভুলতেও চাই না। ভুলতে চাই না এই জন্যে, কারণ সেদিনের কথা ভুললে, বিস্মৃতির অতলতলে মিলিয়ে যাবে আমার জীবনের অনেকখানি। কারণ এরই কিছু পরে, মাত্র সাত বছর বয়সে, আমার দিদি ছেড়ে গেছে ইহলোক। মাত্র কয়েক দিনের জ্বরে সে ভুগেছিল।

    সব কথা আজ পরিষ্কার মনেও নেই। তবে এইটুকু পরিষ্কার মনে আছে, দিদিকে নিয়ে মা সারাদিন বসে রইলেন।

    বাবা সেদিন কাজে বেরোননি। কেবল ঘর আর বার করছিলেন।

    মা’র কোলের ওপর শুয়ে দিদি মাঝে মাঝে যন্ত্রণায় কেবল বলছিল—‘উঃ, আঃ!’

    ঘরের মধ্যে ঢুকে বড়ো বড়ো চোখ করে আমি তারই দিকে চেয়েছিলাম।

    মা’র মুখখানা কেমন যেন থমথম করছে। সাহস করে একবার ডাকলাম—‘দিদি!’

    সেই যন্ত্রণার মাঝখানেও দিদি চোখ মেলে একবার আমার দিকে চাইল। বোধহয় কী যেন বলতেও চাইল, কিন্তু বলতে পারল না। ঠোঁট দুটো তার কেঁপে কেঁপে উঠল।

    ঘরের মধ্যে বাবা বসেছিলেন। আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। বললেন—‘দিদির অসুখ করেছে, ওকে ডেকে বিরক্ত কোরো না।’

    আমার কেন যেন ভয় ভয় করছিল।

    কেঁদে ফেলে বলি—‘বাবা, দিদি কথা বলছে না কেন? কালও তো দিদি আমার সঙ্গে কথা বলেছে।’

    বাবা খানিক গম্ভীর হয়ে বললেন—‘অসুখটা আজ দিদির বেড়েছে কি না! তাই—’

    ‘তাই’ যে কী তা বুঝিনি তখন। বুঝলাম খানিক বাদে, যখন দেখলাম, মা দিদির ওপর লুটিয়ে পড়ে আর্তনাদ করে উঠলেন।

    আমি বিস্মিত হয়ে গিয়ে বলি—‘মা, ওকী করছ, দিদির লাগবে না!’

    বাবাকে বলতে গেলাম। কিন্তু বাবারও চোখে দেখি জল। বাবাকেও বলা হল না কথাটা।

    বাড়ির সকলে কাঁদল। সকলের কান্না দেখে আমিও কাঁদলাম। এরপর দিদিকে ওরা নিয়ে গেল।

    আমার মনে প্রশ্ন উঠল, দিদিকে ওরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? ডাক্তারবাবুর বাড়ি?

    কাঁদতে কাঁদতে সে রাত্রে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালবেলা উঠে প্রতিটি মুহূর্তে ভেবেছি বুঝি দিদি ফিরে আসবে। কিন্তু দিদি তো ফিরল না!

    এমন অবস্থা, মুখ ফুটে কাউকে কিছু জিজ্ঞাসাও করতে পারিনা।

    মাকে যে জিজ্ঞাসা করব, তারও উপায় নেই কারণ আমি ঘরে ঢুকলেই মা কেবলই ‘খুকি রে’ বলে কাঁদছেন।

    অনেকক্ষণ পরে প্রশ্ন করলাম, আমার চেয়ে বয়সে বড়ো আমার এক জেঠতুতো ভাইকে। জিজ্ঞেস করলাম—‘দিদি কোথায়, কবে আসবে?’

    গম্ভীর হয়ে গিয়ে আমার সে দাদা বললেন—‘পুতুল আর ফিরে আসবে না।’

    —‘ফিরে আসবে না? কেন?’

    দাদা বললেন—‘সে মারা গেছে।’

    মারা গেলে যে লোকে ফিরে আসে না তা বিশ্বাস হল না। কতবার জিজ্ঞেস করলাম—‘লোকে মরে কোথায় যায়?’

    দাদা বললেন—‘ঐ আকাশে!’

    তারপর কতদিন নিজের মনেই ওই আকাশের দিকে চেয়ে দিদিকে দেখবার চেষ্টা করেছিলাম।

    কতবার ভেবেছি ওই তারার মধ্যে দিদির মুখ বুঝি উঁকি মারছে। অস্পষ্টভাবে দেখতেও যে পাইনি তাও নয়।

    মাঝে মাঝে তাকে দেখতেও পেয়েছি। কিন্তু চোখ কচলে ভালোভাবে যেই তাকে অনুভব করতে গেছি সঙ্গে সঙ্গে সে হারিয়ে গেছে ওই আকাশের নীলের মাঝে।

    আজও একা থাকলে, রাত্তিরবেলায় আকাশেরদিকে চেয়ে ভাবি—কোথায় সে আমার হারিয়ে যাওয়া বোন! মাঝে মাঝে যেন শুনতে পাই কে যেন আমায় কচি গলায় বলছে—‘তুই এখনও খাসনি, আমি খাব কী করে?’

    সংসারে সবই পেলাম, কিন্তু অমন বোনের স্নেহ তো কোথাও পেলাম না!

    এই কথাটাই প্রথম প্রথম ভাবতাম। কিন্তু আজ? আজ আমার দিদিকে আমি পেয়েছি বাংলাদেশের প্রতিটি মেয়ের মধ্যে।

    আমার অভিনয় দেখে যখনই কোনো ভদ্রমহিলা আমাকে চিঠি লিখেছেন আমার অভিনয়ের সুখ্যাতি করে, তখনই আমি ভেবেছি, আমার দিদি যদি আজ বেঁচে থাকত, তাহলে সে আমার গৌরবে এমনিভাবেই আনন্দ প্রকাশ করত, এমনিভাবেই আমাকে জানাত অভিনন্দন।

    তাই আমার মনে হয়, আমার দিদি নেই ওই আকাশে, সে আবার জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে। দেশের প্রতিটি মেয়ের মুখে ফুটে উঠেছে তার প্রতিচ্ছবি।

    তাই আজ আর আমার দুঃখেরও কোনও কারণ নেই। ভ্রাতৃদ্বিতীয়ায় যখন মঙ্গলশঙ্খের সঙ্গে প্রতিবেশিনীরা ভায়ের কপালে ফোঁটা দেন তখন আমার মনে হয়, একটি নয় দুটি নয়, অগণিত চন্দনের ফোঁটা এসে পড়ছে আমার কপালে।

    অগণিত ভগ্নীর দল আমার মঙ্গল কামনা করছেন ভগবানের চরণে।

    যাক সে সব কথা। আমি দার্শনিক নই, উচ্চশিক্ষিতও নই। তবে লেখক হিসেবে আত্মকাহিনি লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে আমার মনের ভাবটুকু আমি বর্ণনা করেছি এইমাত্র।

    আবার ফিরে যাই আমি পুরোনো কাহিনিতে।

    এ সংসার কারোর জন্যেই আটকে থাকে না। নিজের গতিতে সে এগিয়ে চলে। অদ্ভুত তার যাত্রা। এর শেষ নেই, বিরাম নেই, ক্লান্তি নেই। সে চলেছে। কেবলই এগিয়ে চলেছে। ভাগ্যবিধাতার নির্দেশে কবে যে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা কেবল তিনিই জানেন। মানুষ তার অর্থ কী বুঝবে? তাই সে গতির সঙ্গে তাল রেখে যে না চলতে পারে, সে পড়ে স্মৃতির পর্যায়ে।

    আমাদের এই জীবনটাই দেখুন না কেন। স্মৃতি ছাড়া তো আর কিছু নেই! তাই আজকের দিন যা চলে যাচ্ছে, কালকে শত চেষ্টায়ও তাকে ফেরাতে পারা যাবে না। আজকের দিন পড়বে স্মৃতিতে।

    তারই মধ্যে কোনোটা থাকবে উজ্জ্বল, কোনোটা থাকবে ম্লান হয়ে। তাই এ জীবনকে যদি আমরা স্মৃতির সমষ্টি বলি তাহলে কি ভুল হয়?

    তেমনি আমার দিদির স্মৃতি আমার মনে উজ্জ্বল হয়ে রইল!

    মা আবার উঠলেন, আমাদেরই মুখ চেয়ে। সংসার আবার চলতে শুরু হল আগেকারই মতন। বিশেষ কোনো পরিবর্তন দেখা দিল না।

    চক্রবেড়িয়া স্কুলে বাবা আমায় ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু লেখাপড়া করবে কে? অভিনয়ের নেশা আমার মন থেকে গেল না। অভিনয় যে আমায় করতেই হবে।

    মাঝে মাঝে ভাবি—জেঠামশাইকে বলব নাকি? কিন্তু বলবার দরকার আর হল না।

    আমার জীবনে অভিনয়ের সুযোগ এসে গেল। স্কুলে প্লে হবে ‘গয়াসুর’। বড়ো ছেলেরাই প্লে করবে। কিন্তু ছোটো গয়াসুর সাজবার ছেলে নেই।

    দু চারজন ছেলেকে ওই পার্টের জন্য ট্রায়াল দেওয়া হল, কিন্তু কেউ পারল না। শেষকালে স্যার বিরক্ত হয়ে একদিন ক্লাসে এসে বললেন—‘তোমাদের মধ্যে এমন কি কেউ নেই, যে প্লে করতে পারে?’

    কেমন যেন অপমান বোধ হল। সঙ্গে সঙ্গে বেঞ্চি ছেড়ে দাঁড়িয়ে বললাম—‘আমি করব স্যার!’

    স্যার আমার দিকে চোখ রেখে বললেন—‘ইউ বয়! তোমার নামটা কী, অরুণ না? পারবে, ভয় পাবে না?’

    — ‘না স্যার।’

    — ‘বেশ এসো।’

    স্যার আমায় নিয়ে গেলেন রিহার্সাল রুমে। ছোটো গয়াসুরের পার্ট দিলেন আমাকে। আমারও মনটা আনন্দে ভরে গেল একটা অভিনয়ের চান্স পেয়েছি বলে।

    পার্ট মুখস্থ করতে দেরি হল না। নিয়মিত রিহার্সালে যাই।

    আমাদের বাংলা শিক্ষক আমাদের অভিনয় শেখাতেন, দেখতে দেখতে অভিনয়ের দিন এগিয়ে এল।

    স্কুলের প্রাঙ্গণে তক্তা ফেলে স্টেজ বাঁধা হলো। গ্রিনরুমে আমরা সবাই সাজগোজ করতে আরম্ভ করলাম। দুচারজন দর্শকও এসে জমায়েত হলেন।

    গ্রিনরুম থেকে পোশাক পরে, মেক-আপ নিয়ে চলে এলাম স্টেজের ওপর।

    উইংসের ফাঁক দিয়ে লক্ষ্য করলাম স্কুলের উঠোনটা। সেখানে ভরে গেছে কালো মাথায়। কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল। হঠাৎ অনুভব করলাম, আমার মুখ যেন শুকিয়ে গেছে, ভীষণভাবে জলতেষ্টা পেয়েছে।

    গ্রিনরুমে ফিরে গিয়ে মেক-আপ-ম্যানের সামনেই ঢক ঢক করে জল খেতে লাগলাম। মেক-আপম্যানও ‘হাঁ-হাঁ’ করে চেঁচিয়ে উঠে বলল— ‘আরে, মুখের রং উঠে যাবে যে!’

    অগত্যা আদ্দেকটা গেলাসের জল শেষ করে আবার গেলাম মেক-আপম্যানের কাছে, মুখের রং ঠিক করতে।

    ঠিক এমনি সময় আমাদের হেডমাস্টারমশাই এসে ঢুকলেন আমাদের সাজঘরে। তিনি বললেন— ‘রেডি বয়েজ, আর মাত্র দশ মিনিট সময় আছে। ইউ, অরুণ, তুমি এখনও মেক-আপ নিচ্ছ কেন? হয়নি তোমার?’

    আমি কাছে সরে গিয়ে বললাম— ‘কেমন যেন ভয় করছে স্যার!’

    আমার পিঠে একটা চাপড় দিয়ে বললেন— ‘ডোন্ট গেট নার্ভাস মাই বয়! ভয় পেও না, ভালো অভিনয় করবে তুমি; আমি দেখেছি তোমার রিহার্সাল। এই ন’বছর বয়সেই সুন্দর অভিনয় করছ তুমি।’

    যথারীতি ঘণ্টা পড়ে সীন উঠল। আমিও আবির্ভূত হলাম পাদপ্রদীপের সামনে।

    হেডমাস্টার মশায়ের সেই উপদেশ বাণী— ‘সামনের দিকে চেও না।’

    চাইলাম না সামনের দিকে। নিজের মনেই অভিনয় করে যেতে লাগলাম।

    প্রথমটা একটু আড়ষ্ট লেগেছিল। কিন্তু তারপরেই আমি ভুলে গেলাম যে আমি চক্রবেড়িয়া স্কুলের ছাত্র, ভুলে গেলাম আমি অভিনয় করছি।

    আমার তখন মনে হতে লাগল, আমি বুঝি কৃষ্ণভক্ত সেই ‘গয়াসুর’।

    অভিনয়শেষে সীন পড়ল। হেডমাস্টারমশাই এসে পিঠ চাপড়ে বললেন— ‘ওয়ান্ডারফুল! চমংকার অভিনয় করেছ তুমি।’

    তখনও আমার অভিনয়ের ঘোর কাটেনি। নিজেকে তখনও ভাবছি ‘গয়াসুর’।

    হেডমাস্টারমশায়ের কথায় আমার চমক ভাঙল। তা হলে আমি ‘গয়াসুর’ নই।

    যা হোক, সে রাত্রে দুটো মেডেল পেলাম। মাস্টারমশাই করলেন আমাকে প্রশংসা। মুখে রং মেখেই, পেন্ট না ধুয়ে ছুটতে ছুটতে চলে এলাম গিরিশ মুখার্জি রোডে আমাদের বাড়িতে। পোশাক পরে আসবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু আমার পার্ট শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই ড্রেসাররা সেগুলো খুলে নিয়েছে। তাই হাফপ্যান্ট আর শার্ট পরেই ছুটে এলাম মা’র কাছে।

    মাকে বললাম সব কথা। অবশ্য একটু আধটু বাড়িয়েই বলেছিলাম। কারণ আনন্দ তখন আমি আর চেপে রাখতে পারছি না।

    তারপরে মুখের রং তুলে, খাওয়াদাওয়া সেরে শুয়ে পড়লাম।

    এরপর, স্কুলে অভিনয় হলেই সুযোগ পাই অভিনয় করবার। কিন্তু জেঠামশায়ের ক্লাবে যাত্রা করার সুযোগ তখনও হয়নি।

    কিন্তু যাত্রা তো করতেই হবে আমাকে। জুড়িদের বাজনা শুনে শুনে তো একরকম মুখস্থই করে ফেলেছি। কিন্তু তেমন সুযোগ তো পাচ্ছি না।

    সেবারে যাত্রা ক্লাবে ধরা হল ‘ব্রজদুলাল’। ছোটো কৃষ্ণ সাজবার লোক নেই।

    বেশ কিছুদিন খোঁজাখুঁজি চলল, কিন্তু মনের মতন ছেলে পাওয়া গেল না। আবার সেবারে অভিনয় করছেন তখনকার বিখ্যাত অভিনেতা ফণী রায়6

    তার কিছুদিন আগে ‘অন্নপূর্ণার মন্দিরে’7 তিনি এক হাঁপানি রুগীর অভিনয় দেখিয়ে, ছবিতে দর্শকদের মন কেড়ে নিয়েছেন।

    তাই আমাদের যাত্রা ক্লাবে, যদি অভিনয় খারাপ হয়, তাহলে আমাদের লজ্জার আর শেষ থাকবে না।

    বোধহয় এইজন্যেই জেঠামশাই শেষপর্যন্ত রাজি হলেন আমাকে কৃষ্ণের ভূমিকায় অভিনয় করতে দিতে।

    প্রায় মাস দুই রিহার্সালের পর শেষপর্যন্ত আমাদের অভিনয়ের দিন স্থির হল।

    কোথায় যে সে রাত্রে অভিনয় হয়েছিল আজ আর তা মনে নেই। তবে এক বিরাট উঠোনে আমাদের সে রাত্রে অভিনয়ের আসর বসেছিল, সেটুকু মনে আছে।

    আমি বাঁশি হাতে ‘কৃষ্ণ’ সেজে আসরে এলাম। দেখি চতুর্দিকে লোক। দোতলার বারান্দার ওপরে মেয়েরাও বসে দেখছেন।

    শুরুতেই ছিল আমার একটা গান। ওদিকে ঢোল, কনসার্ট বেজে উঠলো, আমিও গান ধরলাম।

    হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন বলল— ‘ও খোকা, আমার দিকে ফেরো। আমি কি খালি তোমার—’

    আবার সেদিকে ফিরলাম। অভিনয় বেশ জমে উঠেছে। যে রাস্তাটা দিয়ে অভিনেতারা আসরে আসছেন, হঠাৎ সেদিকে চোখ পড়তে দেখি জেঠামশাই স্বয়ং দাঁড়িয়ে আমার দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে চেয়ে আছেন।

    পার্ট শেষ করে যখন আমি সাজঘরে ফিরে গেলাম তখন তিনি আমার পিঠ চাপড়ে বললেন— ‘চমৎকার অভিনয় করেছিস তো!’

    জেঠামশাইকে ফণীবাবু সে রাত্রে বলেছিলেন— ‘তোমার ভাইপো বড়ো অভিনেতা হবে হে!’

    থাক সেসব কথা।

    অভিনয় যখন পুরোদমে চলছে তখন হঠাৎ বাড়ি থেকে চাকর এসে জেঠামশাইকে বললো— ‘যে ছেলেটি “কৃষ্ণ” অভিনয় করছে, তাকে গিন্নিমা ডাকছেন।’

    গিন্নিমা!

    জেঠামশাই আমাকে বললেন— ‘ওর সঙ্গে তুমি যাও।’

    আমি জিজ্ঞেস করি— ‘এইভাবেই জেঠামশাই?’

    জেঠামশাই বললেন— ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই ভাবেই।’

    অগত্যা গেলাম বাড়ির ভেতর। একজন স্থুলাঙ্গী, সুন্দর চেহারার ভদ্রমহিলা কাছে ডেকে আমার জিজ্ঞেস করলেন— ‘তোমার নাম কী খোকা?’

    আমি বলি— ‘অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়।’

    তিনি বললেন— ‘উত্তম অভিনয় করেছ তুমি। এতো রাত হয়েছে, কিছু খেয়েছ কি?’

    অভিনয়ের আনন্দেই ভুলে ছিলাম। খিদেতেষ্টার কথা মনেও ছিল না।

    তিনি কিছুতেই ছাড়লেন না। জোর করে কাছে বসিয়ে আমাকে নানারকম খাবার খাওয়ালেন।

    আমি যত বলি—ওদিকে অভিনয়ের দেরি হয়ে যাচ্ছে, তিনি তত বলেন— ‘হোক দেরি। পাঁচ সাত মিনিটে এমন কিছু হবে না, তুমি কিছু খেয়ে নাও, অনেক রাত্তির হয়ে গেছে।’

    সে রাত্রের অভিনয়ে বেশ নাম হল আমার। এদিকে অভিনয়ও করি, লেখাপড়াও বেশ সমানভাবেই চলছে। চক্রবেড়িয়া স্কুল ছেড়ে এসে ভর্তি হলাম সাউথ সুবার্বন স্কুলে। সেখান থেকে ‘৪১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাসও করলাম। এরপর থেকেই আমার জীবনে শুরু হল আর এক নতুন অধ্যায়।

    সারা বাংলাদেশের বুকে নেমে এসেছে তখন পঞ্চাশের ভয়াবহ মন্বন্তর।

    সকাল থেকে কলকাতার রাস্তায় কান পাতা যায় না— “একটু ফেন দেবে মা, একটু ফেন দেবে!”

    বুকের ভেতরটা আমার যেন সে ডাক শুনলে মোচড় দিয়ে উঠত। করতে পারতাম না কিছুই। এরই কিছু আগে, জাপানি বোমার ভয়ে, কলকাতা থেকে পালিয়ে গিয়েছে বহু লোক। ফিরেও এসেছেন তাঁরা সকলে। তবে বেশিরভাগই এসেছেন রোগ সঙ্গে নিয়ে। কেউবা এসেছেন সর্বস্বান্ত হয়ে।

    গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজে ভর্তি হলাম। কিন্তু ওই, নামেই ভর্তি হওয়া। দুর্গাদাস8, অহীনবাবু9, ধীরাজ ভট্টাচার্য10মহাশয়ের অভিনয় তখন রীতিমতো বায়োস্কোপে দেখছি। ছবিদা11(ছবি বিশ্বাস) তখন যথেষ্ট নাম করেছেন সিনেমায়। তাঁর অভিনয় আমায় তখন মুগ্ধ করত।

    নাট্যাচার্যের12 অভিনয়ও শ্রীরঙ্গমে13 নিয়মিতভাবে দেখছি।

    ছবিতে অভিনয় করার আকাঙ্ক্ষা তখন আমার মনে জেগে উঠেছে দুর্দমনীয়ভাবে। কিন্তু সুযোগ পাই না।

    দু একজনকে যে বলিনি তা নয়। সকলেই ফচকে ছোঁড়ার কথা শুনে হেসেই উড়িয়ে দেয়। আবার কেউ কেউ বা বলেন, থাক যথেষ্ট হয়েছে, আর ছবিতে অভিনয় করতে হবে না।

    ঠিক এমনি সময় আমার জীবনে ঘটল এমন একটা ঘটনা, যার জের আজও টেনে চলেছি।

    একদিন আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ একটি মেয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলে— ‘অন্নপূর্ণা আছে বাড়িতে?’

    অন্নপূর্ণা আমার জেঠতুতো বোনের নাম। একটু বিরক্ত হয়ে গিয়েই বলি— ‘দেখুন না ভেতরে।’

    মেয়েটি ধীরে ধীরে প্রবেশ করল আমাদের বাড়িতে। ক্ষণিক দেখাতেই সে আমার মাথা ঘুরিয়ে দিয়ে গেল। কী একটা আকর্ষণে গেলাম তার পিছু পিছু। মেয়েটি কাদের বাড়ির তা আমাকে জানতেই হবে।

    বাড়ির মধ্যে ঢুকে আমার মাকেই সে প্রথম জিজ্ঞেস করল— ‘অন্নপূর্ণা কোথায়?’

    মা হাতের কাজ ফেলে চাইলেন তার মুখের দিকে। খানিকটা কী যেন দেখে নিলেন তার মুখের ওপর। তারপরে জিজ্ঞেস করলেন— ‘তোমার নাম কী মা?’ শান্ত অথচ ধীর কণ্ঠে মেয়েটি বলল তার নাম।

    মা বলেন— ‘বাঃ, চমৎকার নাম তো তোমার!’

    চেঁচিয়ে আমার জেঠতুতো বোনকে ডেকে দিলেন মা।

    মেয়েটিকে সেখান থেকে আমার বোন নিয়ে যেতেই আমি এলাম মা’র কাছে।

    মা অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন ভাবছিলেন। আমি বলি— ‘মা, ও মা, কী ভাবছ? কার সঙ্গে কথা বলছিলে এতক্ষণ?’

    মা একরকম যেন চমকে উঠে বললেম— ‘কে, খোকা? কী বলছিলি? মেয়েটি? আমার পুতুল বেঁচে থাকলে—আচ্ছা, ওর মুখখানা ঠিক আমার পুতুলের মতন নয়? সে বেঁচে থাকলে, এত বড়োই হত।’

  • চার

    চার

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    চার

    একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেবার পর হঠাৎ মনে হল সামনে দীর্ঘ তিনমাস ছুটি, কী করা যায় এখন?

    তাছাড়া কলকাতা তখন বেশ ফাঁকা। আড্ডা মারবার লোকও খুঁজে পাওয়া শক্ত।

    আগেই বলেছি সেটা ছিল ১৯৪২ সাল। ইউরোপের যুদ্ধ তখন ঘোরতরভাবে শুরু হয়ে গেছে। যে ক’জন লোক পাড়াতে আছেন, সকালবেলা সংবাদপত্র নিয়ে তাঁদের মধ্যে বেশ খানিকটা বচসা লেগে যেত। বচসার বিষয় চিরপুরাতন—ইংরেজ জিতবে না জার্মানি জিতবে।

    আমিও মাঝে মাঝে সেই তর্কে যোগ দিতুম। তারপরে জাপান যুদ্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতার লোক হল ভয়ে সারা।

    বর্মায় বোমা পড়ল, আর ভয়ে পালালো কলকাতার লোক। কিন্তু সব যাবে কোথায়? ট্রেনে জায়গা নেই, গ্রামও ভর্তি। শুনেছি যাঁদের গ্রাম বা দেশ ছিল না, তাঁরা সাঁওতাল পরগনায় বা ওই ধরনের কোনো স্বাস্থ্যকর জায়গায় পরিবারের সকলকে পাঠিয়ে দিলেন। আর নিজে কলকাতায় একা থেকে চাকরি বাঁচাতে লাগলেন।

    লোকজনও পাওয়া যেত না। সন্ধে হতে না হতেই ঠুঙ্গিপরা আলোগুলো কর্পোরেশনের লোকেরা জ্বেলে দিয়ে যেত। তাতে না হতো আলো, না হত কিছু। রাত্রে পাছে যদি কলকাতা আক্রান্ত হয়, তাই এ. আর পি.11 আর সিভিক গার্ডদের14 সুবিধের জন্য আলোর সঙ্গে একটা করে দড়ি বাঁধা ছিল। যাতে সময় এলেই সেটাকে টেনে নিচে থেকে নিভিয়ে দেওয়া যায়। ফলে হল কী, কর্পোরেশনের লোক আলো জ্বেলে দিয়ে গেলেই, পাড়ার ছেলেরা যারা বাইরে যেতে পারেনি, তারা দড়ি ধরে টেনে আলোগুলো দিত নিভিয়ে। রাস্তা হয়ে যেত অন্ধকার।

    তাছাড়া ব্রিটিশ সরকারের ছিল কড়া শাসন—বাড়ির আলো রাস্তায় এসে পড়বে না। যদি কারো বাড়ির আলো রাস্তায় এতটুকু এসে পড়েছে, অমনি এ আর. পি. আর সিভিক গার্ড এসে প্রথমে গৃহস্থকে সাবধান করতেন আলো দেখা যাচ্ছে বলে। গৃহস্থ যদি তাতে সাবধান হতেন তো ভালো, নইলে হত ফাইন।

    যতদিন পরীক্ষা হয়নি, ততদিন কোনোরকম করে সময় কেটেছে। এখন সময় কাটাই কী করে? তাই ঠিক করলাম, এবারে একটু গান শিখব।

    ছেলেবয়েস থেকে পড়ায় ফাঁকি দিয়ে যাত্রাদলের কোরাস গানগুলো একদম মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। কিন্তু তবুও, কী জানি কেন, কারোর সামনে গাইতে লজ্জা করত। ভাবতাম, আমার গলার আওয়াজ শুনে যদি কেউ হাসে? কোরাসে চলছে, চলুক না!

    অনেকসময় মুখ নেড়ে গেছি, গান গাইনি। গলা দিয়ে একটা টুঁ শব্দও বার করিনি। অথচ আসরের কোনো শ্রোতা হয়তো যাত্রাশেষে বাড়ি আসবার সময় আমার পিঠ চাপড়ে বললেন— ‘বাঃ, বেড়ে গান গেয়েছ তো ছোকরা!’

    তাই সময় পেতেই ভাবলাম ও বিদ্যেটা একটু আয়ত্ত করে নিতে ক্ষতি কি?

    তাছাড়া গান শেখার আর একটা উদ্দেশ্য ছিল। ফিল্মে অভিনয় করব এ ছিল আমার মনের তখন একটা স্বপ্ন। রুপালি পর্দার ওপর তখনকার দিনে নায়ক কে. এল. সাইগল15, পাহাড়ী সান্যাল16, এমন অনেককেই গান গাইতে দেখলাম।

    এমন কি জহরদাও17 বাদ যাননি। তাই ভাবতাম, ভালো গান না জানলে বুঝি ছবিতে অভিনয় করা সম্ভব হবে না।

    কবে গান শিখব, বা কার কাছে গান শিখব, এই প্রশ্নটাই তখন আমার মনে দিবারাত্র ঘুরে বেড়াতে লাগল।

    অনেক কষ্টে সংগীতশিল্পী নিদানবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়18 মহাশয়ের কাছে গেলাম।

    ভেবেছিলাম, গান যদি শিখতেই হয় তো উচ্চাঙ্গসংগীত শেখা ভালো। তাতে গলাটাও তৈরি হবে, আর যখন কেউ আমার গলা পরীক্ষা করবে তখন গিটকিরি আর তান মেরে সকলকে চমকে দেব।

    হায় তখন কি জানতাম ফিল্মে গান গাইবার জন্য প্রযোজকরা কোনোদিনই আমাকে সুযোগ দেবেন না! ক্যামেরার সামনে অপরের গাওয়া গানের সঙ্গে আমার ঠোঁট নাড়াই সার হবে! আর ওই জায়গাটায় শ্রোতারা শুনবেন অন্য কোনো সুগায়কের কণ্ঠস্বর!

    যাক, তখন তো আর এত কথা বুঝিনি। তাই সংগীতজ্ঞ নিদানবন্ধুর কাছে গিয়ে বললাম— ‘দয়া করে আমাকে একটু গান শেখাবেন?’

    আমার আপাদমস্তক ভালো করে লক্ষ্য করে নিয়ে তিনি বললেন— ‘গান আগে কখনও শিখেছ কি?’

    মাথা চুলকে বললাম— ‘আজ্ঞে, তেমন কিছু নয়, তবে একটু একটু মানে, ইয়ে হয়েছে—মানে—’

    ভাবলুম যাত্রাদলে কোরাস গানের কথা বলব নাকি? পরক্ষণে মনে হল কোরাস গানের মধ্যে বাহাদুরি তো কিচ্ছু নেই! তাই কথাটা চেপে গিয়ে বললাম— ‘আজ্ঞে, একটু আধটু উঁঃ আঁঃ করতে পারি।’

    আমার দিকে চোখ রেখে তিনি বললেন— ‘করো দিকিনি!’

    মাথা চুলকে বললাম— ‘আজ্ঞে, আমি তো হারমোনিয়াম বাজাতে জানি না।’

    তিনিও ছাড়বার পাত্র নন। সামনে-রাখা একটা হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে বলেন— ‘গাও, আমি বাজাচ্ছি।’

    গান শেখা যতটা সহজ ভেবেছিলাম, তার চেয়ে ঢের শক্ত বুঝি একা কারোর সামনে গান গাওয়া। কোথায় গেল আমার সেই ষাঁড়ের মতো আওয়াজ! তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ! গলার আওয়াজ যেন বারই হতে চায় না। জিভ, তালু যেন একেবারে শুকিয়ে কাঠ! তবুও সাহস করে ধরে ফেললাম যাত্রাদলের একটা গান— ‘এসো হে নন্দকিশোর’। অনেক কষ্টে গান থামলে, আমি দেখছি আমার জামা তখন ঘামে ভিজে গেছে। নিদানবাবুর মুখের দিকে চাইতে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, চেষ্টা করলে হতে পারে। এসো তুমি আগামী শুক্রবার। দেখি কী করা যায় তোমায় নিয়ে।’

    ভয়ে ভয়ে গেলাম পরের শুক্রবার। মা সরস্বতীকে প্রণাম করে তিনি বললেন— ‘গান তো শিখতে এসেছ, গলা সাধতে পারবে? তোমার গলাটা সামান্য বেসুরো আছে। রীতিমতো অভ্যাস করলে ঠিক হয়ে যেতে পারে। এখন এসো, কীভাবে গলা সাধতে হয় তোমায় শিখিয়ে দিই।’

    বেশ খানিকক্ষণ সময় তাঁর কাছে বসে, সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি, র্সা সাধা গেল এবং গলা সাধবার কয়েকটা নিয়মও তিনি শিখিয়ে দিলেন। তারপরে বললেন— ‘এসো তুমি আবার পরে, গলা ঠিক হলে গান দেব। এখন নিয়মিত কেবল গলা সেধে যাও।’

    শুধু গলা সাধাই নয়, তখন নিয়ম করে শরীরচর্চাও শুরু করে দিয়েছি। কারণ আমি তখনই বুঝেছিলাম, সিনেমায় ঢুকতে গেলে এ ধরনের ‘ল্যাকপ্যাকে’ চেহারা চলবে না। রীতিমতো ডন বৈঠক, এমন কি বক্সিংও শুরু করলাম। তখনকার সময় আমাকে বক্সিং শিখিয়েছিলেন শ্রীভবানী দাস। আজ অবশ্য তাঁর নাম, ‘ববি ডায়াস’। বক্সার হিসাবে নয়, ইংরেজি নাচ জানেন বলে তিনি আজ বিখ্যাত।

    আমার আগামী ছবির জন্য তাঁরই কাছ থেকে ‘বলড্যান্স’ শিক্ষা করছি।

    কলকাতার মানুষ আবার ফিরে এল, আবার শুরু হল মানুষের সরল জীবনযাত্রা। কলেজে পড়া ইস্তফা দিতে হল, কারণ তখন দেখা দিয়েছে সংসারে অভাব অনটন। একটা যেকোনো চাকরি আমাকে জুটিয়ে নিতেই হবে।

    কিছুদিন ঘোরাঘুরি আর ধরাধরি করবার পর চাকরি আমার একটা জুটল—পোর্ট কমিশনার অফিসে ক্যাশ ডিপার্টমেন্টে।

    অফিসে যাতায়াত নিত্য করছি। কিন্তু কিছুতেই আমি যা চাইছি তা পাচ্ছি না। কীসের যেন বরাবর একটা অভাব থেকে যাচ্ছে।

    তখন স্বর্গীয় শিশির ভাদুড়ি মশাই শ্রীরঙ্গম আবার নতুন করে খুলেছেন। মাঝে মাঝে দেখতেও যাচ্ছি। কিন্তু কিছুতেই আমার মন আরও ভরে না।

    এমনিভাবে কেটে গেল আমার জীবনের আরও তিনটি বছর। পাড়ার ক্লাবে মাঝে মাঝে থিয়েটার করি, রীতিমতো ছবিও দেখি। দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সবেমাত্র মারা গেছেন, বাংলা ছবিতে তাঁর স্থান নিয়েছেন শ্রদ্ধেয় প্রমথেশ বড়ুয়া19 ও শ্রদ্ধেয় ছবিদা (শ্রীছবি বিশ্বাস)।

    তাঁদের অভিনয় মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। আর মনে মনে ভাবতাম—আমি কবে এমন অভিনয় করতে পারব।

    দর্শকদের করতালি শুনে মনে হত, আমি কি এমন করতালিধ্বনির অধিকারী কোনোদিন হতে পারব?

    যাক এমনি যখন আমার মনের অবস্থা তখন একদিন দেখা হয়ে গেল পুর্বোক্ত সেই মেয়েটির সঙ্গে। তখন তার বয়স কতই বা! চোদ্দো পনেরো হবে! গায়ের ফর্সা রং, ওই মুখ ইত্যাদি যেন আমায় আকর্ষণ করতে লাগল।

    আমার জেঠতুতো বোন অন্নপূর্ণার কাছ থেকে সেদিন যেই মেয়েটি চলে গেল, ভাবলাম, লজ্জার মাথা খেয়ে তাকে একবার জিজ্ঞাসা করি ওই মেয়েটির বিষয়। কিন্তু রাজ্যের লজ্জা যেন আমায় পেয়ে বসল।

    ‘কী রে অন্নপূর্ণা, কী করছিস’—ওই পর্যন্ত বলেই আমার সব কথা যেন ফুরিয়ে গেল।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    পাঁচ

    নাঃ, দিন আমার কাটবে না। মেয়েটাই আমাকে পাগল করবে। কেবলই তার চিন্তা। অফিসে যাই, কাজ করতে করতে কেবল মনে পড়ে সেই মুখখানা। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দরজার কাছে বসে থাকি, যদি সে অন্নপূর্ণার সঙ্গে দেখা করতে আসে তাহলে আর কিছু না হোক একবার দেখতে তো পাব!

    আঃ, কী অধীর প্রতীক্ষা! কিন্তু যার জন্যে এত, তার মনের ভাবটা কী, তা তো জানতে পারা গেল না! কী বা ভাবে সে আমার সম্বন্ধে! কোনো করুণা, কোনো স্নেহ, কোনো আকাঙ্ক্ষা তার আছে কি আমার জন্যে?

    সাজপোশাক দেখে মনে হয় বড়োলোকের মেয়ে। আমাকে তার ভালো লাগবে কেন? আমাদের অবস্থা তো এই! তার ওপর করি তো সামান্য মাইনের চাকরি! এসব জেনেশুনেও— নাঃ,—আর ভাবতে পারলাম না।

    তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়াটা সেরে নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম, যদি সে আসে।

    ঝোঁকের মাথায় ভুলেই গিয়েছিলাম, আজ তার আসবার কোনো সম্ভাবনা নেই।

    কারণ, অন্নপূর্ণা গেছে গানের স্কুলে গান শিখতে।

    বসে থাকাই হল সার— ‘সে ফিরে এল না’। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খাঁ খাঁ করে উঠল। কিন্তু আমি নিরুপায়। হঠাৎ মনে হল, আমারই মতো অন্য কোনো বড়োলোকের ছেলে, নতুন একটা ‘অস্টিন’ বা ‘মরিস’ বা ওই ধরনের কোনো গাড়িতে তাকে বসিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে না তো?

    আবার সেই হতাশা। কখনওবা সেই কল্পিত ছেলেটির উদ্দেশ্যে নিজের অজান্তে, আমার বক্সিং-করা হাতদুটো মুখের কাছে তুলে ধরেছি ঘুসি বাগিয়ে, তা নিজেই বুঝতে পারিনি।

    তখন আমার মনের অবস্থা একেবারে অবর্ণনীয়। আমার অজ্ঞাতে আমার সীতাকে কি রাবণ হরণ করে নিল? তা কিছুতেই হবে না! হতে আমি দেব না।

    মনে মনে কতরকম প্যাঁচ কষছি তাকে জব্দ করব বলে। হঠাৎ ও, কী ও? নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করা গেল না। সে-ই নয়? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে-ই তো! অন্নপূর্ণার সঙ্গে আমাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। তাহলে মেয়েটা গানের স্কুলে গান শেখে? হুররে! কোনো রাবণ তাকে হরে নিয়ে যায়নি! আমার চান্স তাহলে এখনও আছে!

    কিন্তু না! গম্ভীর হতে হবে। কোনোরকম ছ্যাবলামি করে ফেললে যদি পাগলা বলে পালিয়ে যায়! সব দিক দেখেশুনে, তবে এগোতে হয়।

    কিন্তু এগোবো কোথায়! ও যে বড়োলোকের মেয়ে! সঙ্গে রয়েছে বিরাট দারোয়ান!

    নিজের অজ্ঞাতসারেই সেদিকে এতক্ষণ চেয়েছিলাম। কিন্তু যেই তার সঙ্গে চোখাচোখি হল, অমনি চোখ ফিরিয়ে নিলাম।

    কী জানি আমার কল্পনা কতদূর সত্য হবে তা কে বলতে পারে?

    ওরা ততক্ষণে এসে -পড়েছে বাড়ির কাছে। অন্নপূর্ণা ঢুকে পড়ল বাড়ির মধ্যে। সেই মেয়েটাও ফিরে গেল বাড়ির দরজা থেকে। যাবার সময় কয়েকবার পেছন ফিরে চাইল। হঠাৎ আমার মনে হল, আমার চোখে চোখ পড়ায় সে কেমন যেন ফিক করে হেসে ফেলল। আমারও বুকের ভেতরের রক্তটা কেমন যেন ছলাৎ করে উঠল।

    তবে?

    আজ লজ্জার মাথা খেয়ে অন্নপূর্ণাকে জিজ্ঞেস করলুম— ‘মেয়েটা কে রে তোকে পৌঁছে দিতে এসেছিল?’

    অন্নপূর্ণা বলে— ‘কে বলো তো?’

    আমি আরও বিস্মিত হয়ে গিয়ে বলি— ‘ওই যে এক্ষুনি এসেছিল!’

    অন্নপূর্ণা বলল— ‘ও তো গৌরী!’

    — ‘গৌরীটা ক্যা?’

    — ‘ওর নাম গৌরীরানী গাঙ্গুলি20। ল্যান্সডাউন রোডের21 বিখ্যাত বড়োলোক চণ্ডীচরণ গাঙ্গুলির মেয়ে।’

    — ‘তোর সঙ্গে ভাব হল কী করে?’

    — ‘গানের স্কুলে।’

    একে বড়োলোকের মেয়ে। তার ওপর—

    মনের ভাবটা গোপন করে অন্নপূর্ণাকে জিজ্ঞেস করি— ‘ও-ও গান শেখে?’

    — ‘হ্যাঁ। শুধু শেখে নয়, বেশ ভালোই গায়। কিন্তু গৌরীর সম্বন্ধে এত প্রশ্ন করছ কেন?’

    কেন করছি—মনে মনেই বলি—মুখে বলি— ‘এমনি,—বসেছিলুম,— দেখলুম —তাই— ‘

    অন্নপূর্ণা গৌরীর চেয়ে বয়সে কিছু বড়ো। আমার অভিসন্ধিটা বোধহয় সে বুঝতে পারলে। তাই তার মুখে কেমন চাপা হাসি ফুটে উঠল।

    আমি বুঝলাম, গতিক ভালো নয়। দূতীকে ক্ষ্যাপালে ফল হয়তো ভবিষ্যতে খারাপ হবে। তার চেয়ে যেমন চলছে চলুক। পরে সময় বুঝে যা হয় একটা কিছু করা যাবে।

    করা তো যাবে! কিন্তু করবটা কী! বহুদিন ধরে ভেবেচিন্তে তেমন কোনো একটা প্ল্যান মাথায় আনতে পারলাম না। মেয়েটার মনোভাব না বোঝা অবধি এগোনোও তো কিছুতে যায় না! যদি অপমান করে!

    বোধহয় মানুষমাত্রই বিরহযন্ত্রণা উপস্থিত হলে কবিতা লেখে। কবিতা পড়তেও ভালো লাগে। তাই প্রথমেই আমি বার করে ফেললাম বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির একখানা গান। আপনাদের কাছে তা অত্যন্ত পরিচিত। সেই—

    ‘সখি হামারও দুঃখকো

    নাহি ওর রে

    ই ভরা বাদর, মাহ ভাদর

    শূন্য মন্দির মোর’

    কবিতা যখন লিখতেই পারি না তখন এই পথ বেছে নিলাম। দেখা যাক আমার শব্দভেদী বাণ কোথায় কেমন করে গিয়ে ঠেকে!

    এতো কথা বলছি—ইদানীং সে যেন ঘন ঘন আমাদের বাড়িতে আসতে শুরু করেছে।

    বেশ আছি, কিন্তু তাকে দেখলেই বুকের মধ্যে কেমন যেন হু-হু করে উঠতো। তাই আমার শব্দভেদী বাণ ছোড়ার এত প্রয়োজন হল।

    বাড়িতে পাহাড়ীদার গাওয়া ওই গানটার পুরোনো রেকর্ড ছিল। বাজিয়ে বাজিয়ে সুরটা তুললাম।

    তারপরে একদিন সন্ধের সময় গৌরী আমাদের বাড়িতে আসতেই হারমোনিয়াম নিয়ে বসলাম গানটা গাইতে।

    এর আগে কতবার সিনেমায় দেখেছি, নায়িকা হয়তো কোনও একটা বিরাট প্রাসাদের ভেতর বসে নায়কের জন্যে বিরহযন্ত্রণা অনুভব করছে। অপরদিকে বহু দূরে বসে, ঠিক সেই সময়ে নায়ক রেডিওতে গান ধরল। নায়িকা অমনি রেডিও সেটটা চালিয়ে দিল, আর নায়কের কণ্ঠস্বর শুনে একটা হদিশ ঠিক করে নিয়ে আনন্দে চোখ মুছতে মুছতে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

    বোধহয় এই রোম্যান্টিক ঘটনাটা আমার মাথায় ভর করে বসেছিল। ভুলে গিয়েছিলাম আমি তখনও ছবির নায়ক হইনি, নায়ক হবার একটা দুর্বার আকাঙ্ক্ষা আমায় পেয়ে বসেছে।

    আমার নায়িকা আমাকে মনে মনে ভাবে কিনা তাও জানা নেই। রেডিও সেটের কথা আর নাইবা তুললাম।

    ইংরেজিতে একটা কথা আছে, যার অর্থ ‘ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়’। তাই আমারও একটা উপায় হল। আমার নায়িকা এল আমাদের বাড়িতে, পাশের ঘরে বসে গল্প-গুজবও শুরু করল। আর ঠিক সেইসময় আমি পাশের ঘরে বসে গান ধরলাম।—গানের পর উদগ্রীব হয়ে লক্ষ্য করলাম কোনো পরিবর্তন দেখতে পাই কিনা, কিন্ত হা হতোস্মি! মন্দভাগ্যম! কোনো পরিবর্তনই দেখতে পেলাম না। সিনেমার নায়িকার মতো ছুটে যাওয়া তো দূরে থাক, খানিক পরে হাসতে হাসতে সে বেরিয়ে গেল। আমাকেও কেমন জানি একটা বিশ্রী হতাশা পেয়ে বসল।

    ভাবলাম কূলে এসে কি তরী ডুবল। আদৌ বোধহয় মেয়েটা আমায় ভালোবাসে না, তার বদলে সে বোধহয়—না আমি কি বোকারে বাবা! নিজের ওপর নিজেরই রাগ হতে লাগল। কেন মরতে—

    বুঝিতো সব, কিন্তু মন বাধা মানে কই।

    হঠাৎ সেই সময় অন্নপূর্ণা এসে আমাকে বললো— ‘হঠাৎ তুমি যে বড়ো গান গাইছিলে?’

    আমি একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বলি— ‘এমনি! রেওয়াজ করতে হবে না!’

    অন্নপূর্ণা একটু যেন চাপা হাসিতে ফেটে পড়ে বলে— ‘তা তো হবেই। তবে রোজ তুমি সকালের দিকে গান গাও, আজকে বিকেলের দিকে— ‘

    মনে মনে ভাবি, আরে বাবাঃ, ধরে ফেললে নাকি? আমার আসল উদ্দেশ্যটা যদি বুঝতে পেরে থাকে তা হলে?

    তাই বেশ একটু গম্ভীর হবার চেষ্টা করে বলি— ‘শিল্পীর ব্যাপারই আলাদা! তাদের কখন কী খেয়াল ওঠে কে বলতে পারে বল? এইতো তুই, এতো দিন ধরে গান শেখবার চেষ্টা করছিস, শিল্পী নয় বলেই কেবল সন্ধের সময় সা-রে-গা-মা সাধাই সার হচ্ছে। কিন্তু যদি প্রকৃত শিল্পী হতিস, তাহলে, গানের ভাব যখন উঠত তখন কি আর চাপতে পারতিস? হারমোনিয়াম নিয়ে তোকে বসতেই হত।’

    কথাগুলো অবশ্য বেশ গম্ভীরভাবেই বলেছিলাম। কিন্তু ফলটা ফলল উলটো।

    অন্নপূর্ণা হাসিতে ফেটে পড়ে বলল— ‘আমার বন্ধু গৌরী বলছিল— ‘ বলে, সে চুপ করল।

    আমি সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করি— ‘কী বলছিল রে?’

    — ‘সে বলছিল— “তোর দাদাটা একটু পাগলাটে হলেও গান গায় মন্দ নয়। বেশ গলাটা। কেমন গাইছে দেখ।” তুমি তো ওকে শোনাবার জন্যে গান গাইছিলে, তা আমি বুঝতে পেরেছি।—’

    হুররে! তাহলে আমার বাণ লক্ষ্যভেদ করেছে? মুখে গাম্ভীর্য এনে বলি— ‘বড়ো জেঠা হয়ে গেছিস তো!’

  • ছয়

    ছয়

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    ছয়

    সময় সময় মানুষের জীবনে এমন সব ঘটনা ঘটে, যা উত্তরকালে ভাবলেও বিস্ময়ের উদয় হয়। অথচ, তাকে ভোলাও যায় না। কারণ, ভুলতে গেলে ভুলতে হয় জীবনের কয়েকটি চরম মুহূর্ত। এই চরম মুহূর্ত বলতে আমি এই মানে করতে চাইছি যে, মনের সঙ্গে সঙ্গে বাইরেরও পরিবর্তন হয়।

    কথাটা পরিষ্কার করেই বলি—

    আপনারা অনেক সময় লক্ষ্য করেছেন কিনা জানি না, কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি, যে কাজ আপনার করতে ইচ্ছে নেই, করতে ভালোও লাগে না, সেই কাজই আপনাকে করতে হচ্ছে, ইচ্ছের বিরুদ্ধে। সর্বমন-প্রাণ দিয়ে আপনি যা চাইছেন তা পাচ্ছেন না, আর যা পাচ্ছেন তা চাইছেন না। অথচ তা থেকে বেরিয়ে আসবার যেন কোনো উপায় নেই। ঠিক যেন ছোট্ট একটা পালতোলা নৌকো বন্দী হয়েছে একটা পুকুরের মধ্যে। পালে বাতাস লাগছে না, তর তর করে ছুটে চলবার শক্তিও সে হারিয়ে ফেলেছে। তাকে চালাতে হচ্ছে গুণ টেনে।

    হঠাৎ পুকুরের একধারের সঙ্গে যুক্ত হল নদীর খরস্রোত। পালেও লাগল হাওয়া, নৌকোও ছুটে চলল অজানার সন্ধানে। সে জানলও না অন্তরীক্ষ থেকে কে তার যাত্রা পরিচালনা করছে, তাকে যেতে হবে কোথায়! এইটুকু সে জানে তাকে চলতে হবে। ঠিক তেমনি ঘটনা ঘটেছিল আমার জীবনে।

    একদিকে ফিল্মে নামবার দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা আর অপর দিকে গৌরীকে পাবার তেমনি আকাঙ্ক্ষা।

    এই দুই আকাঙ্ক্ষার শত্রুই সেদিন আমাকে পাগল করে তুলেছিল। আমার অবস্থাও হয়েছিল ওই পালতোলা নৌকোর মতো। কানে শুনতে পাচ্ছি নদীর কুলুকুলু শব্দ। সেই শব্দ আমার কানের মধ্যে দিয়ে রক্তে মিশে আমাকে তুলছে মাতাল করে। আমি শুনতে পাচ্ছি কার যেন আহ্বান! কিন্তু যাব কেমন করে? সব পথই যে রুদ্ধ।

    গৌরীকে পাবার আকাঙ্ক্ষা আমার পক্ষে দুরাশা। কারণ, সে বড়োলোকের মেয়ে। অপর দিকে রুপালি আলোর খেলা। সেখানেও প্রবেশ আমার নিষিদ্ধ।

    স্টুডিওর দরজায় দরজায় ঘুরেছি। পরিচালক প্রযোজকদের সঙ্গে দেখা হওয়া তো দূরের কথা, স্টুডিওর গেটই পার হতে পারিনি।

    ছবিতে নামবার আশা আমার কেবল স্বপ্নই থেকে যায়, বাস্তবে রূপ নেয় না। অথচ অফিসও করতে ভালো লাগে না।

    অফিস কামাই করে যে ছবিতে নামবার চেষ্টা করব, তারও উপায় নেই। তাতে আয় বন্ধ হবার ভয় আছে। অথচ!

    তাই ছুটির পর একে-তাকে বলি; মাঝে মাঝে যে টালিগঞ্জে না যাই, তাও নয়; কিন্তু ওই যাওয়া-আসাই সার হয়।

    একটা নিদারুণ হতাশা ও ব্যর্থতা ক্রমশ আমাকে পেয়ে বসতে লাগল! কিছুই ভালো লাগে না, তাই অনেক সময় অফিসের পর একা গিয়ে বসে থাকতাম গড়ের মাঠে অথবা গঙ্গার ধারে। চেয়ে থাকতাম ওই জাহাজগুলোর দিকে। আর মনে মনে ভাবতাম, কী হল আমার?

    কর্মমুখর কলকাতার লোক ফিরে যেত তাদের নিজের বাড়িতে। আমি ভাবতাম সকলেই কেমন আনন্দে রয়েছে, আমি কেবল সহ্য করছি এই নিদারুণ, দুঃসহ মনোযন্ত্রণা। রাস্তার বাতিগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে যেত কর্পোরেশনের কর্মীরা। তীব্র হেডলাইট ফেলে গাড়িগুলো ছুটে যেত। আমার কথা, আমার খবর কেউ রাখত না। যাকনা চলে, কোনো ক্ষতি নেই। জীবনে প্রতিষ্ঠাই যদি না পেলাম, তাহলে বেঁচে থেকে কী লাভ? একা বসে বসে এইসব কথাই চিন্তা করতাম।

    তখন বোধহয় শীতকাল। গঙ্গাসাগর বা ওই ধরনের কোনো একটা মেলা উপলক্ষ্যে লোক আসছে দলে দলে!

    হঠাৎ আমার কাছে কে যেন বলল— ‘বাবুজি, কুছ হুয়া?’

    চমকে উঠলাম। মুখ ফিরিয়ে দেখলাম, এক গেরুয়া-বসনধারী সন্ন্যাসী! অত ঠান্ডায়ও গায়ে কিছু নেই। ছাই মাখা। মাথা কামানো। মুখে দাড়ি-গোঁফের চিহ্ন নেই। দীর্ঘ চেহারা। কিন্তু চোখের চাহনি অদ্ভুত। আমার চোখের ওপর চোখ পড়ায় যেন মনে হল, আমার সমস্ত মনটাকে সে দেখতে পাচ্ছে। মুখ ঈষৎ রক্তাভ। তার চোখে পড়ায় কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করলাম! বিরক্তও যে হলাম না তাও নয়। কারণ, তখন একটা বিশ্বাসই ছিল, এই গেরুয়ার অন্তরালে যারা থাকে, তারা সকলেই ঠগ আর চোর ছাড়া কিছু নয়। সংসারে কিছু করবার চেষ্টা বা ইচ্ছা তাদের নেই; কেবল পরের ঘাড়ে বসে খাওয়াই তাদের লক্ষ্য।

    আমিও বললাম— ‘কিছু হবে না বাবা, সরে পড়ো।’

    — ‘হবে না? হবে না মানে কী?’

    আবার চমকে উঠলাম, সন্ন্যাসীর এ পরিষ্কার বাংলা শুনে। তবে কি লোকটা বাঙালি? তখন কম বয়স। চপলতা হিসেবে উপদেশ দেওয়ার ইচ্ছাটাও প্রবল। কারণ এ উপদেশ দিতে গেলে খরচ হয় না। যদি তা হত, তাহলে আপনারা আমার মতনই লক্ষ্য করতেন, সংসারে অনেক উপদেশই বন্ধ হয়ে গেছে।

    আর একটা আশ্চর্য জিনিস এই যে, যে ব্যাপার আমার জানা নেই, কোনো অভিজ্ঞতাই নেই যার সম্বন্ধে, সেই বিষয়ে আমরা আগে উপদেশ দিই। আর যে উপদেশের পাত্র, আমরা সব সময়ে লক্ষ্য রাখি সে আমার চেয়ে দুর্বল কিনা। তাই দেখি, বড়ো ছোটোকে উপদেশ দেয়, সবল দেয় দুর্বলকে। প্রতিপক্ষ যদি সবল হয়, তাহলে উপদেশ দেবার ইচ্ছা আমাদের চলে যায়, আর চোখের ওপর তাকে ভুল করতে দেখলেও বলি— ‘বাঃ, ঠিক বলেছেন আপনি!’

    এক্ষেত্রে সন্ন্যাসী আমার কাছে প্রার্থী। আর আমি ইচ্ছে করলে দুটো বা চারটে পয়সা দিয়ে দাতার আসনে বসতে পারি।

    সুতরাং আমার অবস্থা ওর চেয়ে সবল। তাই একটু গলা ঝেড়ে বললাম— ‘বেশ চেহারাটা তো দেখছি তোমার, খেটে খেতে পারো না?’

    আমার কথা শুনে সন্ন্যাসী হেসে উঠলেন। তারপরে বললেন— ‘খেটে খাব না বলেই মা বাপের কাছ থেকে পালিয়েছি। তবে খাটব কেন?’

    না, এর কথা সাধারণ সন্ন্যাসীর মতন তো নয়! কেমন যেন লাগল! তাই বললাম— ‘কী বলছেন আপনি, কিছু তো বুঝতে পারলাম না!’

    সন্ন্যাসী বললেন— ‘আরে এটুকু সোজা কথা বুঝলে না? কয়েকদিন ঘুরেই তুমি হতাশ হয়ে পড়লে? মা বাবা, বাড়ি, ঘরদোর ছেড়ে এই ঠান্ডাতেই বা বসে আছ কেন? তুমি বলবে—আমি ভাবছি, কী করে আমার উদ্দেশ্য সফল হয় সেই কথা। আর আমরা কী করছি জানো? সব কিছু ছেড়েছি, কেবল তাঁকে পাবার জন্যে। কারণ তিনি যে অসীম। তাঁকে লাভ করতে পারলে চরম আনন্দের অধিকারী হওয়া যায়।’

    বিস্ময় তখন আমার চরমে পৌঁছে গেছে। আমি ভাবছি এ লোকটা যে দেখছি আমার মনের কথা বলে দিচ্ছে, তবে কি এ লোকটা thought reader? তাই পরীক্ষার জন্য তাকে বলি, ‘আচ্ছা, আমি কী ভাবছি বলুন তো?’

    সন্ন্যাসী আমার কাছে বসে পড়ে বললেন— ‘আরে দূর পাগলা, সন্ন্যাসীকে কি পরীক্ষা করতে হয় ওভাবে? এসব কথা বলা কি তাঁর পক্ষে শক্ত কাজ? এসব তো খুব সামান্য জিনিস। সে তো এখুনি বলে দেওয়া যায়। তুমি ভাবছ সেই মেয়েটির কথা। আর ভাবছ, কী করে ফিল্মে অভিনয় করা যায়।’

    আমি তখন বেশ অভিভূত হয়ে পড়েছি। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে তাঁকে বলি— ‘আমি কী করে—’

    আর বলতে হয় না। হেসে ফেলে তিনি বলেন— ‘একদিন যে বড়ো অভিনেতা হবে, সেই ভাবছে কী করে ফিল্মে চান্স পাওয়া যায়!’

    আমি বড়ো অভিনেতা হব! নাঃ, এ লোকটা নিশ্চয়ই thought reader।

    আমার মনের কথা বুঝতে পেরে, আমাকে খুশি করে বেশ কিছু টাকা ও বার করে নিতে চায়। তাই এইসমস্ত কথা বলছে।

    আমি বলি— ‘সব বাজে কথা! অভিনয় আমি মোটেই করতে চাই না। আর আমি— ‘

    — ‘আর তুমি—কী বলো?’

    — ‘কাউকে ভালোওবাসি না। কী তুমি যা-তা বলছ!’

    আবার প্রশান্ত হাসিতে ফেটে পড়লেন সেই সন্ন্যাসী।

    এইবারে সোজা দাঁড়িয়ে বললেন— ‘অভিনয় করতে চাও আর না চাও, ফিল্মে তোমাকে নামতেই হবে। আর যে মেয়েটিকে এতক্ষণ বসে চিন্তা করছিলে, সেই তোমার স্ত্রী হবে। বাড়ি, গাড়ি, যা চাও সব পাবে। আজকে তুমি ভাবতেও পারবে না আগামীদিনের কথা। বললেও তুমি বুঝতে পারবে না।’

    তিনি চলে যাচ্ছিলেন—

    খপ করে তাঁকে ধরে ফেলে বলি— ‘একটা কথা শুনে যান। এসব কথা আপনি বললেন কী করে?’

    তিনি বললেন— ‘আরে, এতো সন্ন্যাসীর কাছে কিছুই নয়। সব মনই বাঁধা রয়েছে সেই বিরাট একটি মনে। আমি সেই বিরাটেরই ধ্যান করি দিনরাত। তাঁকে লাভ করাই আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। তাই আমার পক্ষে এটুকু বলা কিছু শক্ত নয়। তোমার মুখখানা দেখে বড়ো ভালো লেগেছিল। তাই ভাবলাম, তোমার এত কীসের দুঃখ, একা বসে আছ! তাই তোমাকে আশার কথা শুনিয়ে গেলাম। তবে একটা কথা বলি, তুমি উপবীতধারী ব্রাহ্মণের সন্তান। যাই করো না কেন, দুবেলা গায়ত্রী জপতে ভুলো না। জেনো, এই জগতের সবকিছুর ওপরে একজন আছেন, যার ইচ্ছায় এই পৃথিবী চলছে। বিজ্ঞানের সামান্য ভড়কিতে বা পার্থিব নাম, যশ আর টাকায় তাকে কখনও ভুলো না। সংসারে যদি আঘাত আসে, জানবে পেছনেই আছে তোমার সফলতা। দিন আর রাত্রি যেমন পর পর আসা-যাওয়া করে, ঠিক তেমনি আশা আর নিরাশা মানুষের জীবনেও আসে ঘুরে ঘুরে। নিরাশায় ভেঙে না পড়ে এগিয়ে চলো।’

    পকেটে হাত দিয়ে দেখি একটা পাঁচ টাকার নোট রয়েছে। তাড়াতাড়ি সেটাকে বার করে তাঁর পায়ের কাছে রাখতেই—কিন্তু কোথায় তিনি? আমার ধারেকাছেও কেউ নেই। তাড়াতাড়ি উঠে তাঁকে খুঁজতে আরম্ভ করলাম। তাঁকে কোথাও দেখতে পেলাম না। সোজা রাস্তা ধরে দুদিকে সন্তর্পণে চাইতে চাইতে, একেবারে ইডেন গার্ডেন অবধি এগিয়ে এলাম। কিন্তু সেই সন্ন্যাসীকে কোথাও দেখতে পেলাম না।

    খুঁজতে খুঁজতে এক সন্ন্যাসীর দলের মধ্যে গিয়ে পড়লাম। গিয়ে দেখলাম, তারা শীতের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে কাঠ জড়ো করে আগুন লাগিয়েছে। বুঝলাম, এই ধরনের রকম দেখেই মানুষ ভুল বোঝে আসল সন্ন্যাসীকে।

    কিন্তু আমি যে ঠকলাম! হাতের কাছে তাঁকে পেয়েও হারালাম। একী নিদারুণ দুঃখ!

    ইচ্ছা করলে হয়তো আরও অনেক কথা জানতে পারতাম। ছিঃ ছিঃ, এ কী দুর্মতি আমার ঘাড়ে চাপল! কিন্তু, তখন তো যা হবার তা হয়ে গেছে।

    বিশাল কলকাতার মাঝখানে তাঁকে খুঁজে বার করা আমার সাধ্য নয়। বাড়িতে এসে কেবলই ভাবতে লাগলাম সেই সন্ন্যাসীরই কথা।

    পরের দিন সকালবেলায় বসলাম গায়ত্রী জপ করতে। হঠাৎ মা কী একটা কাজে ঘরের মধ্যে ঢুকেছিলেন, আমাকে গায়ত্রী জপ করতে দেখে বললেন— ‘এতদিনে সুমতি হল!’

    একবার ভাবলাম, মাকে বলি কালকের রাত্রের সব কথা। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হল এতবড়ো মহাপুরুষকে হাতের কাছে পেয়েও আমার নির্বুদ্ধিতার জন্যে উপদেশ দিতে গিয়েছিলাম, জানতে পারলে মা হয়তো দুঃখই পাবেন। তাই মাকে খুশি করবার জন্যে বলি— ‘কেন মা, তুমিই তো বলেছ গায়ত্রী জপ করতে রোজ!’

    মা খুশি হয়ে বলেন— ‘সে কথা যে তুই মনে রেখেছিস তাই ভালো’—বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

    এরই কয়েকদিন পর হঠাৎ গণেশদা ওরফে গণেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হল।

    আমাকে দেখেই তিনি বললেন— ‘অরুণ, ফিল্মে নামবার কথা অনেকদিন বলেছিলি। একটা চান্স এসেছে, নামবি ফিল্মে?’

    ফিল্ম! নিজের কানকে নিজেরই বিশ্বাস হলো না। গণেশদা এ কী বলছেন! আমি নামব ফিল্মে! জিজ্ঞেস করি, ‘কী ছবি, কী পার্ট?

    — ‘আরে তোকে এখন হিরোর চান্স কে দেবে বল? আমাদের একটা হিন্দি ছবি ‘মায়াডোর’-এ বর সাজতে হবে। তেমন বিশেষ কিছু পার্ট নয়। রাজি তো?’

  • সাত

    সাত

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    সাত

    গণেশদার মুখ থেকেই জানতে পারলাম, ‘মায়াডোর’ ছবিতে আমার কাজ স্রেফ বর সেজে বসে থাকা।

    ওদিকে পান্না সাজবেন কনে। আমার স্যুটিং একদিনেই শেষ।

    তখনই মাথার মধ্যে খেলে গেল সন্ন্যাসীর কথা। আমি না বড়ো অভিনেতা হব?

    কিন্তু এতে তো অভিনয়ের নামগন্ধও নেই। স্রেফ রং মেখে সঙ সাজা।

    আচ্ছা কুছ পরোয়া নেহি। সুযোগ যখন একটা পেয়েছি, স্টুডিওর গেট পার হওয়ার, তা আর ছাড়ছি না। কে জানে, এর থেকেই পরে একটা বড়ো চান্স পাব কি না।

    গণেশদাকে জিজ্ঞেস করলুম— ‘আমায় কবে যেতে হবে, কী করতে হবে?’

    হেসে তিনি বলেন— ‘আরে, সে একটা দিন আমি তোকে বলে দেব। তারপরে সেই বুঝে তুই অফিসের ছুটি নিয়ে নিবি। তারপর স্যুটিং করে পরের দিন অফিসে গেলেই চলবে।’

    আমি ছবিতে নামব! একদিন হোক, দু’দিন হোক, আমি স্যুটিং করব! যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।

    তাই গণেশদার দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করি— ‘কথাটা সত্যি বলছ তো?’

    — ‘সত্যি না তো কী, তোর সঙ্গে আমি ইয়ার্কি করছি?’

    যাক তবুও ভালো। কথা শেষ করে অফিসে চলে গেলাম।

    কিন্তু এতবড়ো খবরটা আমি চেপে রাখব কী করে? সারা বাস বাদুড়ঝোলা হয়ে গিয়েও খুঁজতে লাগলাম যদি কোনো চেনা লোক চোখে পড়ে, অন্তত তাকে বলেও খানিকটা নিশ্চিন্ত হওয়া যেতে পারে।

    একটু দেরি হওয়ার জন্য, আমার সঙ্গে বেশিরভাগই যাঁরা অফিসে যান, তাঁরা প্রায় সকলেই অফিস চলে গেছেন। তাই বিশেষ চেনা মুখের সঙ্গে দেখা হল না। সুখবরটা তাই কাউকে দেওয়াও হল না।

    অফিসে পৌছেই, আজও স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন যার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমার ফিল্মে নামার খবরটা জানিয়ে দিয়েছিলুম।

    এখানে বলে রাখা ভালো, আমাদের পাড়ার লুনার ক্লাবে যখনই কোনো থিয়েটার হত আমি তাতে বিশেষ অংশগ্রহণ করতাম। এখানে অভিনয় করার সময় আমার কাকার কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েছিলাম প্রচুর। এইভাবেই আমি তাঁদের সঙ্গে অভিনয় করেছিলাম—কর্ণার্জুনে—শ্রীকৃষ্ণ, সাজাহানে—দিলদার, দুই পুরুষে—সুশোভন।

    তারাশংকরবাবুর ‘দুই পুরুষ’ নাটকটি নাট্যভারতীতে (বর্তমান গ্রেস সিনেমায়) অভিনীত হয়েছিল। তাতে ‘নুটুবিহারী’র ভূমিকায় প্রথমে ছবিদা অপূর্ব অভিনয় করেছিলেন। পরে ওই ভূমিকায় স্বর্গীয় বিশ্বনাথ ভাদুড়ি22অভিনয় করেন। তাঁর সুন্দর অপূর্ব বাচনভঙ্গির দ্বারা তিনি দর্শকের মন জয় করতে পেরেছিলেন। অবশ্য নাট্যভারতী ভেঙে যাবার পর ছবিদা কিছুদিন মিনার্ভায় ‘নুটুবিহারী’র ভূমিকায় অভিনয় করেন। কিন্তু ‘সুশোভন’-এর ভূমিকায় বরাবরই দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করতেন সুলালদা বা জহর গাঙ্গুলি। শেষের দিকে তিনি যখন স্টেজে এসে বলতেন— ‘আমাকে দশটা টাকা দিতে পারো নুটুদা—আজও আমার মুখ দিয়ে রক্ত উঠেছে’—তখন দর্শকের চোখ আর শুকনো থাকত না।

    সেই ভূমিকায় আমি যখন অভিনয় করতে নামি তখন আমার মনে মনে বেশ ভয় করেছিল। হোক না একদিনের জন্য, পারব কি আমি দর্শকের মনে ছাপ রাখতে?

    কিন্তু আমার ভাগ্য প্রসন্ন ছিল, তাই অভিনয় দেখে সেদিন অনেকেই আমার সুখ্যাতি করেছিলেন।

    ঠিক তেমনি ছিল ‘দিলদার’-এর চরিত্র। বাংলার প্রায় সব শ্রেষ্ঠ শিল্পী একবার করে দিলদারের চরিত্রে অভিনয় করে তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। তা থেকে সুলালদা, ছবিদাও বাদ যাননি।

    পাড়াতে যখন এই ভূমিকায় অভিনয় করবার জন্য আমাকে মনোনীত করা হয়েছিল, তখন মুখে সাহস দেখালেও, ভেতরে সাহস পাইনি সেদিন। সত্যি কথা বলতে কী বেশ ভয় করেছিল।

    তার কিছু আগে কালিকায় (বর্তমান কালিকা সিনেমায়) নরেশদা23 ও একবার এই দিলদারের ভূমিকায় অভিনয় করলেন। তাঁর— ‘একটা সমুদ্র শুকিয়ে গেছে’, ‘পর্বত ভেঙে পড়েছে’ কিংবা ‘জাগো অন্ধ জাগো’ এইসমস্ত উক্তি আমার মনে তখনও স্পষ্ট ভেসে আছে।

    ছবিদা সুন্দর চেহারায় যখন বিরক্ত ভঙ্গিতে বলতেন— ‘বিদ্যার এখনও সে তেজ আছে, যা তোমার রৌপ্যের মাথায় লাথি মারতে পারে’ —তখন দর্শকের মনে অপূর্ব এক ভাবের সঞ্চার হত।

    সব শেষে বলি সুলালদার কথা। তাঁর অপূর্ব কণ্ঠস্বরে তিনি দর্শকদের মাতিয়ে তুলতেন। বিশেষ করে ‘দারা’র মৃত্যুদৃশ্যে, কোনও দর্শকের চোখ তাঁর অভিনয় দেখে শুকনো থাকত না।

    সেই ভূমিকায় নামলাম আমি। তখন আমার বয়স কতই বা! অভিনয়েরই বা কতখানি জানি! ভেবেছিলাম দর্শকরা হাততালি দিয়ে আমাকে উপহাস করবেন। কিন্তু না, তা হল না। অভিনয় বেশ জমল। দর্শকেরা ভালোও বললেন আমাকে।

    এসব তো গেল পাড়ার অভিনয়ের কথা। অফিসে আমি অভিনয় করেছিলাম অবশ্য একবারই, তা হল শরদিন্দুবাবুর হাসির নাটক ‘ডিটেকটিভ’-এ একেবারে অনন্তর ভূমিকায়।

    অফিসে ‘চান্স’ পাওয়া কি মুখের কথা? আমার মতো ‘হিরো’ সাজবার জন্যে দলে দলে লোক প্রস্তুত হয়ে আছে। তার ওপর যিনি ইনস্টিটিউটের সেক্রেটারি, মনতোষবাবু, তিনি ছিলেন আমার বিপক্ষে। তাঁর আদৌ ইচ্ছা ছিল না আমি ওই ভূমিকায় অভিনয় করি। মুখে সাহস দেখালেও ভেতরে বেশ ভয় করছিল। শেষ দৃশ্যে ‘ফেয়ার’ জুতো খোলার সময় ‘আঃ, আমি কী ডিটেকটিভ রে বাবা’—এই কথা শুনে দর্শকদের ভালোও লাগল। যবনিকা পড়বার পর সেই মনতোষবাবুই আমাকে উপহার দিলেন একটি স্বর্ণপদক। এর থেকে আমরা পরিচয় পাই তাঁর মহৎ হৃদয়ের। অবশ্য এই অভিনয় করার ব্যাপারে আরও দুজন আমায় অলক্ষ্য থেকে সাহায্য করেছিলেন। তাঁদের একজনের নাম সুধামাধব চট্টোপাধ্যায়, অপরের নাম প্রকাশ ঘোষ।

    বড়কর্তারা অভিনয়ের পর কে অরুণকুমার তা দেখবার জন্যে আমায় ডেকেছিলেন। বুঝতেই পারছেন, এই সব কারণের জন্যেই বোধহয় আমার মনে একটা বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল, ভালোরকম চান্স পেলে আমিও আমার এলেমটা একবার দেখিয়ে দিতে পারি। কিন্তু বুঝতেই তো পারছেন, তেমন চান্স এখনও পর্যন্ত আমি পাইনি।

    হতাশায় মন বেশ ভেঙে গেছে। এমন সময় ফিল্মে নামবার সুযোগ আমার এল। তাই একথা আর কি চেপে রাখতে পারি! তাই অফিসে পৌঁছনোর ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে সারা অফিসের লোক জেনে গেলেন, আমি এবার ফিল্মে নামছি।

    কেউ আমাকে বললেন— ‘ব্রেভো’, কেউবা বললেন— ‘সাবাস’, আবার কেউ বা নাক কুঁচকে বললেন— ‘জানতুম ছেলেটা ভালো অভিনয় করে।’ আর বৃদ্ধগোছের কেউ কেউ বললেন— ‘ছেলেটা এতদিনে একেবারে গোল্লায় গেল। যা থিয়েটার যাত্রার দিকে ঝোঁক, যাবে না তো কি?’

    সর্বনাশ! এরকম মন্তব্যের জন্য তো প্রস্তুত ছিলুম না। আনন্দের চোটে এদিকটা তো ভাবিনি। বাবা-মার মত নেওয়া দরকার। তার ওপর, কেমন মনে মনে লজ্জা করল,—ওই গৌরীকে একবার জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়।

    নাঃ, আর ভাবতে পারছি না। কথা তো বলিনি কোনোদিন। এই ফাঁকে কোনোরকমে যদি কথা বলাটা আরম্ভ করা যায়, তাহলে কেমন হয়!

    কিন্তু অন্নপূর্ণাটা আছে যে? বাড়ির সকলকে বলে দেবে না তো? যাক, যাই হোক, একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। ওই তিনজনের মত আমাকে নিতেই হবে।

    আনন্দটা কেমন যেন আদ্ধেক হয়ে গেল। বিকেলে অফিস থেকে বাড়ি এলুম।

    মা খাবার দিতে এলেন আমার ঘরে। এইখানে বলে রাখা ভালো, আমার মা, চিরদিন আমাদের তিন ভাইকে, নিজে হাতে করে সবসময় খেতে দিয়েছেন। আজও আমাদের কারোর বাড়ি ফিরতে যদি দেরি হয় নিজে অভুক্ত থেকে মা তার জন্য অপেক্ষা করেন।

    এর ব্যতিক্রম দেখিনি কখনও। স্টুডিওর কাজে যখন সকালে আমাকে বেরিয়ে যেতে হয়, যেদিন আর বাড়ি ফিরবার সময় পাই না, শুনেছি মারও ভালো করে সেদিন খাওয়া হয়না।

    যাক, যা বলছিলাম। মা ঘরে ঢুকতেই, মাকে দুহাত দিয়ে ছোটেআ ছেলের মতো জড়িয়ে ধরলাম। তারপরে কথা বললাম— ‘মা, একটা কথা বলবো?’

    মা জানতেন এরপরেই আমি হয়তো কিছু চেয়ে বসবো।

    সস্নেহে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন— ‘কিছু চাই বুঝি? ওঁকে বলতে হবে?’

    আমি বললাম— ‘না মা, তেমন কিছু চাই না। চাই তোমার অনুমতি।’

    মা একটু বিস্মিত হয়ে গিয়ে বলেন— ‘অনুমতি? কিসের?’

    — ‘আমি—ফিল্মে নামবো।’

    মার সাদা মুখটা কেমন যেন কালো হয়ে গেল।

    তারপরে আমায় বললেন— ‘তুমি বড়ো হয়েছ খোকা। ভালমন্দ বোঝবার বয়সও তোমার হয়েছে। ফিল্মে নামতে চাও নামো। কিন্তু আমাকে কথা দাও জীবনে এমন কিছু করবে না, যাতে আমার লজ্জায় মুখ পুড়ে যাবে।’

    মার পা ছুঁয়ে তখনই বললাম— ‘না মা, তোমাকে আমি কথা দিচ্ছি, তোমার খোকা জীবনে এমন কাজ করবে না, যাতে তুমি তার পরিচয় দিতে লজ্জা পাবে।’

    আমাকে দুহাত দিয়ে বুকে জড়িয়ে নিয়ে মা বললেন— ‘জানি বাবা, সে বিশ্বাস তোমার ওপর আমার আছে। ছেলেবয়েস থেকে তুমি যাত্রা করেছ, থিয়েটার করেছ, লোকে তোমার কত সুখ্যাতি করেছে, তোমার সুখ্যাতি শুনতে আমার যে কত ভালো লাগে তা কি তুমি জানো না। ফিল্মে নামছো নামো। আমি জানি, ওতেও তুমি নাম করবে, কিন্তু ওর মতও তো একবার নেওয়া দরকার।’

    আমি বলি— ‘বাবাকে, তুমি একবার বলো না মা।’

    মা বললেন— ‘না, এ কথা তোমাকে নিজে গিয়েই বলতে হবে।’

    পরের দিন ভয়ে ভয়ে গেলাম বাবার ঘরে। তারপর আস্তে আস্তে বললাম আমার বক্তব্য।

    বাবা সব শুনে, একটু গম্ভীর হয়ে বললেন— ‘তোমাদের কারোকে কোনো ব্যাপারে আমি বাধা দিতে চাইনা। যা ভালো বুঝবে তাই করবে। সবসময় মনে রেখো আর্ট জিনিসটা কিছু খারাপ নয়। তবে তা করতে গেলে চাই সাধনা। তা কি তুমি করতে পারবে?’

    আমি আস্তে আস্তে বলি— ‘আপনি যদি আশীর্বাদ করেন তাহলে নিশ্চয়ই পারবো।’

    —Very good. চেষ্টা করে দেখ তোমার ভাগ্যে কী আছে।

    বাবার কাছ থেকে অনুমতি তো পাওয়া গেল। কিন্তু যার সঙ্গে কোনোদিন কথা বলিনি তার কাছ থেকে অনুমতি নিই কেমন করে! দূর হোকগে ছাই। অনুমতি নেবারই বা কি দরকার। সে আমার কে? পরমুহূর্তে মনে হলো সন্ন্যাসীর কথা— ‘যার কথা তুমি ভাবছো সে-ই তোমার স্ত্রী হবে।’

    করবো তো একটা ‘বরে’র পার্ট। তার জন্য এত কিসের?

    পরমুহূর্তেই মনে হলো এই সুযোগে কথা বলা আরম্ভ করা যেতে পারে। কিন্তু আজতো অন্নপূর্ণার গানের স্কুল নেই। গৌরী তো আসবে না আমাদের বাড়ি। আবার কাল যদি গণেশদা একটা দিন বলে দেয় তাহলে?

    সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে তো অফিস চলে গেলাম। সেদিন অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সাড়ে তিনটের মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম। জানতাম গৌরী রমেশ মিত্তির গার্লস স্কুলে পড়ে। সেইসময় রাস্তায় কোনোরকমভাবে যদি—

    এলাম স্কুলের সামনে। সবে ছুটি হয়েছে তখন। হরেকরকমের শাড়ি দুলিয়ে মেয়েরা বাড়ি ফিরছে। কিন্তু গৌরী কোথায়? হঠাৎ দেখি গৌরী স্কুল থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক কী দেখে নিয়ে চলতে শুরু করলো।

    সঙ্গে যথানিয়মে দারোয়ানও আছে। আমার সবটুকু আশা, আনন্দ, উৎসাহ যেন কোথায় উবে গেল।

    হন হন করে দুচারবার গৌরীর সামনে যাতায়াত করলাম, কিন্তু একটাও কথা বলতে সাহস হল না। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ঢিপ ঢিপ করতে লাগলো। এখন কী বলে কথা আরম্ভ করা যায়?

    হঠাৎ গৌরীর চোখে চোখ পড়ায় দেখি সে কেমন ফিক করে হেসে ফেললো। তারপর, মেয়েদের কাছ থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে, পেছন থেকে আমাকে হাত নেড়ে ডাকলো।

    আমি কাছে যেতেই আমাকে বললো— ‘আজ অফিস যাওয়া হয়নি? কী হচ্ছে এখানে?’

    সারাটা দিন কত কথা ভেবে রেখেছিলুম বলবো বলে। এখন যেন সব গুলিয়ে গেল। কেবল আমতা আমতা করে বলি— ‘না, তাড়াতাড়ি অফিস থেকে এলুম, তাই ভাবলুম— ‘

    একটু হেসে গৌরী বললো— ‘আমাকে দেখে যাই, না?’

    আমি বলি— ‘না গৌরী। তোমাকে একটা মানে—আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবার ছিল।’

    গৌরী হেসে ফেলে বললো— ‘থাক বীরপুরুষ, রাস্তায় আর কথা বলতে হবে না। বাড়ি ফিরে যাও, খানিকটা পরে আমি আসছি তোমাদের বাড়িতে।’

    গৌরী আমাকে ‘তুমি’ বললো? অথচ আমি ক্যাবলার মত তাকে ‘আপনি’ ‘আপনি’ করছিলুম?—প্রথম কথা গৌরী চলে যেতেই আমার মনে হলো। এ ‘তুমি’র অর্থ? মানে—মানে—ও কি আমাকে ভালোবাসে?

    রাস্তায় চলতে চলতেও সেই বিকেলবেলায়ও মনে হলো যেন আমি আর চলতে পারছি না, সমস্ত শরীর যেন মাটি ছেড়ে উড়ে যেতে চাইছে। ভালো যেন দেখতে পাচ্ছি না।

    আঃ, সে কী অপূর্ব অনুভূতি! গৌরী আমায় ভা—লো—বা—সে।

  • আট

    আট

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    আট

    গৌরী তো বলে গেল সে আসছে। কিন্তু সে ‘আসার’ অর্থ কী? কী করে কথা বলবে? কেমন করে আরম্ভ করবো কথা? কেমন করে আমার ফিল্মে নামার কথাটা পাড়বো? আবার ফিল্মে নামার কথা শুনে যদি ‘না’ বলে? তাহলে কেমন করে তাকে বোঝাবো যে ঐ রুপালি আলোর খেলা আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে তারই মতো!

    একটু প্রকৃতিস্থ হতেই প্রশ্নগুলো যেন হুড়মুড় করে আমার মাথার মধ্যে উঠে পড়লো। শুধু কি উঠে পড়া? আমার সমস্ত স্নায়ুতে রক্তে, তারা ছুটোছুটি শুরু করলো। আর তাদের সেই ছুটোছুটিতে আমিও যেন কেমন হয়ে পড়লাম। সমস্ত ধাক্কা কাটিয়ে যখন প্রকৃতিস্থ হলাম, তখন দেখি রমেশ মিত্র রোড থেকে সোজা কেমন করে চলে এসেছি আমাদের গিরিশ মুখার্জী রোডের বাড়ির সামনে। অকারণে বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করা যায়না, তাই ঢুকে পড়লাম বাড়িতে।

    মা’র কাছ থেকে খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম। ঘড়ির কাঁটার দিকে অধীর প্রতীক্ষায় কেবলই চাইছিলাম। কারণ গৌরী আসবে বলেছে।

    আজ বলতে বাধা নেই, সেদিন কেবলই মনে হয়েছিল ঘড়িগুলো যেন আমার সঙ্গে শত্রুতা করে একসঙ্গে স্লো হতে আরম্ভ করেছে।

    খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে আবার সেই অধীর প্রতীক্ষা। তবে আজ আর হারমোনিয়াম নিয়ে নয়। গান শুনিয়ে শব্দভেদী বাণও ছুঁড়তে হবেনা। আজ পরিষ্কার যা হয় একটা হয়ে যাবে। আজ ঠিক বুঝতে পারবো ও আমায় ভালোবাসে, না মাছিমারা কেরানী বলে ঘৃণা করে!

    একবার মনে হলো, গৌরী বোধহয় সত্যি আমায় ভালোবাসে না। পরক্ষণে মনে হলো তাহলে ‘তুমি’ বলার অর্থ? আর আমাকে কেনই বা ও বললে—এখুনি আসবে বাড়িতে? খেলা করছে নাতো আমায় নিয়ে? দূর বাপু! আর চিন্তা করতে পারি না, কেমন যেন হতাশা এসে গেল।

    তাছাড়া সন্ন্যাসীঠাকুর তো আমাকে বলেইছেন, গৌরীর সঙ্গে আমার—মানে—ইয়ে, বিয়ে হবে। তবে আর কি ভাবনা? তাঁর সব কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে। তবে, গৌরীকে না পাওয়া অবধি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি কি করে?

    যাক, আর ভাববো না। আশু মিলনের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করা ভালো।

    সূর্য তখন অস্ত গেছে। বাড়িতে বাড়িতে সন্ধ্যার শাঁখও বেজে উঠেছে। প্রতি বাড়িতে ছেলেমেয়েরা তখন বই নিয়ে বসবার উপক্রম করছে।

    গৌরী এসেছে আমাদের বাড়িতে প্রায় আধঘণ্টার ওপর। কিন্তু এতক্ষণ তার সঙ্গে কথা বলবার সুযোগ পাইনি। অন্নপূর্ণা আছে। আমি ঘুরঘুর করছি। এমনি সময় অন্নপূর্ণা এসে আমাকে বললো— ‘দাদা, তোমার কোনো কাজ আছে?’

    আমি বললাম— ‘কেন রে?’

    — ‘গৌরীর দারোয়ানটা এখনও আসেনি, তাই সে যেতে পারছে না, ওকে যদি একটু এগিয়ে দাও।’ গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলি— ‘এত ঝঞ্ঝাটও তোরা পাকাতে পারিস! আমি এখন কাজ ছেড়ে যাই কি করে বল তো?’ আমার এ চালটা অন্নপূর্ণা বুঝেছিল কিনা জানি না, তাই সে কেবল উত্তরে বললো— ‘বেশ, তোমার সময় যদি না হয়, তাহলে আমি অন্য কাউকে বলি।’ সর্বনাশ, অন্নপূর্ণাটা বলে কী! মানে, এইটুকুর জন্যে আমি যে এতক্ষণ অধীর প্রতীক্ষা করছি। গৌরীকে একা পাবো। ভালো হোক, মন্দ হোক, দু চারটে কথা তার সঙ্গে বলবো, ইডিয়েটটা বলে কিনা ‘অন্য কাউকে বলবো’। মান সম্মান আর রাখলে না দেখছি! তাই তাড়াতাড়ি গলার আওয়াজ মিষ্টি করে বলি— ‘না, এমন কী কাজ, বলছিস যখন—চল।’

    ঠিক এমনি সময় ঘরের মধ্যে ঢোকে গৌরী। আমার দিকে চেয়ে বলে— ‘দেখুন, বড়ো মুশকিলে পড়েছি। এদিকে রাত্তির হয়ে যাচ্ছে। দারোয়ানটা কী জানি কেন, এলোনা এখনও। আপনি যদি একটু পৌছে দেন। নইলে দাদু, ঠাকুমা, বাবা, মা সকলে ভাববেন যে।’

    — ‘আমি, মানে ইয়ে, আপনাকে পৌছে দেব?’

    বুঝতে পারলাম গৌরী এতক্ষণ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমাদের কথাবার্তা শুনছিল। ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতেই হবে। ঠিক সেই সময় অন্নপূর্ণাকে কে যেন ডাকলো।

    — ‘যাই’ বলে সাড়া দিয়ে, ‘আমি এখুনি আসছি’ বলে সে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ঘরের মধ্যে তখন রইলাম, আমি আর গৌরী। তাড়াতাড়ি চাপা স্বরে গৌরী আমায় প্রশ্ন করে— ‘আমাকে কী যেন বলতে গিয়েছিলে স্কুলে?’

    বুকের রক্তটা আমার ছলাৎ করে উঠলো তার সেই ‘তুমি’ ডাক শুনে।

    নিজেকে সংযত করে নিয়ে বলি— ‘আমি, মানে, একটা বড়ো বিপদে পড়েছি।’

    বিস্মিত হয়ে গিয়ে গৌরী বললো— ‘বিপদ, কী বিপদ?’

    নাঃ, আর চেপে রাখা যায় না। বলেই ফেললাম— ‘গৌরী, আমি সিনেমায় নামছি। এ ব্যাপারে তোমার মতটা কী তাই জিজ্ঞাসা করছি।’

    — ‘আমার মত? তাতে কী দরকার?’

    চোখ তুলে দেখি গৌরী আমার দিকে চেয়ে আছে তীব্রভাবে।

    নাঃ, এই সুবর্ণ সুযোগ, যা হবার হোক। বলেই ফেললাম তাকে— ‘কারণ, আমি তো—তোমায় ভালোবাসি।’

    গৌরী আমাকে প্রশ্ন করে— ‘তাহলে একটা কথা বলো! সিনেমায় নেমে আমায় ভুলে যাবে না কোনোদিন?’

    — ‘তোমায়? তোমায় ভুলবো আমি?’

    আবেগে উচ্ছৃসিত হয়ে কী যেন বলতে গিয়েছিলাম সেদিন।

    মুখে আঙুল দিয়ে সে আমায় কথা বলতে বারণ করে। ঘরের দরজা দেখিয়ে দিয়ে ইশারা করে বলে— ‘কে যেন আসছে।’

    পরমুহূর্তেই অন্নপূর্ণা ঘরের মধ্যে ঢোকে। কী বলতে হবে, না বুঝতে পেরে ভ্যাবাগঙ্গারামের মত চেয়ে থাকি তার দিকে, অপলকদৃষ্টিতে।

    তাড়াতাড়ি কথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে গৌরী বলে— ‘আর দেরি করিসনে অন্নপূর্ণা, তোর দাদাকে বলনা ভাই, আমাকে তাড়াতাড়ি পৌঁছে দিতে।’

    বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমরা এলাম রাস্তায়। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে আমি জিজ্ঞাসা করি— ‘কী ব্যাপার বলো তো? আজ তোমাদের দারোয়ান এলোনা যে?’

    গৌরী বলে— ‘এটুকুও বুঝতে পারলে না? বাড়িতে যদি তোমার সঙ্গে কথা বলবার সুযোগ না পাই, তাই আমি দারোয়ানকে আসতে বারণ করে দিয়েছি। তাইতো দারোয়ান আজ আসেনি।’

    আমি বলি— ‘গৌরী, তুমি কী করে বুঝলে আমি তোমায় ভালোবাসি?’

    হাসতে হাসতে গৌরী জবাব দিলো— ‘মেয়েমানুষের কি পুরুষের ভালোবাসা বুঝতে দেরি হয়? আর তারই মধ্যে সে বুঝে নেয় কোনটা আসল আর কোনটা মেকি।’

    ‘কিন্তু আমার যে এখনও একটা কথা জানা হয়নি!’ শান্ত অথচ গম্ভীর কণ্ঠে গৌরী প্রশ্ন করে— ‘কী বলো?’

    — ‘তুমি কি আমায়’—

    হাসিতে ফেটে পড়ে সে জবাব দেয়— ‘তা যদি না বুঝতে পেরে থাকো, তা হলে বুঝেও আর দরকার নেই।’

    কথাটা শুনে নিজের কানকে নিজেরই বিশ্বাস হল না।

    তবুও সন্দেহ দূর করবার জন্যে তার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করি— ‘কেরানী বলে তুমি আমায় ঘেন্না করো না?’

    আমার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে টেনে নিয়ে সে জবাবে বলে— ‘মেয়েমানুষ কি তার প্রিয়তমের আর্থিক অবস্থার কথা কোনোদিন চিন্তা করে? সে সবসময় ভাবে তার স্বামীর ঘরই আপনার।’

    স্বামী! কথাটা যেন কানের ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগলো।

    কিছুদিন আগে কীর্তনে একটা চণ্ডীদাসে24 ২৬র লেখা গান শুনেছিলাম— ‘কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো আকুল করিল মোর প্রাণ’।

    তখন ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি, আজ হাতেনাতে তা অনুভব করলাম। উঃ কী মিষ্টি ডাক! কল্পনায় যে সম্বন্ধ কতবার মনে মনে স্থাপন করেছি, রাত্রে ঘুমোতে ঘুমোতে যাকে নিজের বুকের ওপর কতবার স্বপ্নে পেয়েছি, সেই গৌরী আমাকে, আমার সেই চির-আকাঙ্ক্ষিত সম্বন্ধ ধরে সম্বোধন করলো?

    বাংলা ভাষায় ‘ধরাকে সরা জ্ঞান’ বলে একটা কথা আছে। সেই ধরাকে সরা চোখে দেখা যে কী জিনিস এতদিন জানতাম না।

    আজ বলতে বাধা নেই আমিও যেন চোখে সরা দেখতে আরম্ভ করলাম সেই সন্ধের সময়। বাড়ি, ঘর, দোর, রাস্তা, গাড়ি, ঘোড়া সবকিছু মুছে গেল আমার চোখের সামনে থেকে। আমার কল্পনালোকে কেবল রইলাম আমি আর গৌরী, গৌরী আর আমি।

    চমক ভাঙলো গৌরীর ডাক শুনে। প্রকৃতিস্থ হয়ে বলি— ‘কী বলছো আমাকে?’

    সে বলে— ‘এতো ঢিমে তেতালায় চললে বাড়ি পৌঁছতে যে একমাস লেগে যাবে, একটু জোরে চলো।’

    আমিও বলি— ‘চলো।’

    তারপরে জিজ্ঞেস করি— ‘গৌরী, তুমি আমায় কবে থেকে ভালোবাসো?’

    ফিক করে হেসে ফেলে গৌরী বলে— ‘যবে আমি তোমাদের বাড়িতে প্রথম গিয়েছিলাম। তুমি বাইরে দাঁড়িয়েছিলে, আমি তোমায় জিজ্ঞেস করলাম, অন্নপূর্ণা আছে কি না? তুমি আমাকে উত্তরে বললে—দেখুন না, বাড়ির মধ্যে সে আছে কিনা?’

    — ‘সেই দিন থেকে, কী আশ্চর্য!’

    কথায় কথায় গৌরীর বাড়ির কাছে এসে পড়েছিলাম।

    গৌরী বললে— ‘আজ এই পর্যন্ত।’

    আমি জিজ্ঞেস করি— ‘আবার কবে দেখা হবে?’

    সে বললো— ‘খুব শিগগিরি। তোমাদের বাড়িতে আমি আবার যাবো।’

    গৌরীকে পৌছে দিয়ে সেদিন ফিরে আসতে আসতে কেবলই মনে হয়েছিল, মিথ্যা নয়, কল্পনা নয়, সত্যি গৌরী আমায় ভালোবাসে। তার প্রমাণ আজ আমি হাতে হাতে পেয়েছি। রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে কেবলই মনে হয়েছে, খানিকটা আগে যা ঘটে গেল, তা কল্পনা না বাস্তব। বোধহয় এমন চিন্তা অনেকেরই মনে হয়। কারণ ঘটনার সমাপ্তির পর সুখ, দুঃখ, বেদনার যে অনুভূতিই মানুষের মনে হোকনা কেন, তার ঝঙ্কার থেকে যায় মানুষের মনের মধ্যে। আর সেই ঝঙ্কারের রেশ ধরে মানুষ কখনও কাঁদে, কখনও হাসে।

    হাসি-কান্নাটা কিছুই নয়, সেটা হলো তার বহিঃপ্রকাশ। অন্তরের ঝঙ্কারই হল আসল। তাই রাস্তায় চলতে চলতে গুনগুন করে ধরলাম রবিবাবুর সেই গান— “শেষ গানেরই রেশ নিয়ে যাও চলে, শেষ কথা যাও বলে।”

    গণেশদার সঙ্গে স্টুডিওর দরজা পার হলাম। মুখে রঙও মাখলাম। বর সেজে ক্যামেরার সামনে বসলাম।

    ফটাস করে ‘ক্ল্যাপস্টিক’ টানা হল। ক্যামেরার হাতল ঘুরতে লাগলো ঘরঘর করে। আমারও বুকের ভেতর করতে লাগলো গুড়গুড়।

    স্যুটিংএর পর সেদিন মনে হয়েছিল, বায়োস্কোপে ছবি তোলা কী শক্ত রে বাবা! থিয়েটার করেছি, যাত্রা করেছি—এতো শক্ত বলে মনে হয়নি। কিন্তু আজকে এই একটা ছোট্ট সেটের মধ্যে গোটাকতক আলোর সামনে অভিনয় করতে একেবারে ঘেমেনেয়ে গেলুম।

    আমার দ্বারা বোধহয় ‘ফিল্মে’ অভিনয় করা আর হবে না।

    কিন্তু মন এ কথা মেনে নিতে পারলো না। সন্ন্যাসীঠাকুর যে বলেছেন—আমি বড়ো অভিনেতা হব! তার চিহ্ন তো দেখতে পাচ্ছি না! আমার কেমন যেন তখন ধারণা জন্মে গেছে, তাঁর কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হবেই। কারণ গৌরী আমাকে বলেছে—ও আমাকে ভালোবাসে। একটা কথা যদি তার সত্যি হয়, আর একটা হবে না কেন? আর যা ঘটবার তা যখন ঘটবেই, তা নিয়ে আমি আর অত মাথা ঘামাই কেন? অপেক্ষা করেই দেখি, সুযোগ আর সুবিধে কীভাবে আসে আমার জীবনে!

    একদিন অফিসের পর সাউদার্ন পার্কে যাই ফুটবল খেলতে। খেলাধুলো করা আমার নিত্যকার অভ্যেস তখন। ভালো খেলতেও পারতাম। আজও স্টুডিও ফেরত গাড়ি করে যেতে যেতে, ময়দানে বা পার্কে যখন দেখি ছেলেরা ফুটবল খেলছে, তখন আমারও ইচ্ছে হয় গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে ‘সট’ মারি ঐ বলে। কিন্তু তা আর হয়না। মনের ইচ্ছে আমাকে মনেই চেপে রাখতে হয়—কারণ আজ আর আমি উনিশ কুড়ি বছরের ছেলে নই।

    হাতেনাতে প্রমাণও হয়ে গেল সেদিন। আগামী ছবি ‘সপ্তপদী’25 ২৭র একটা ফুটবল খেলার দৃশ্য তুলতে পরিচালক আমায় নিয়ে গিয়েছিলেন ফুটবল গ্রাউণ্ডে।

    বাঁধা গরু ছাড়া পেলে যেমন সে ছুটোছুটি করে, আমিও তেমনি বলের সঙ্গে ছুটোছুটি করছিলুম।

    পরিচালক অবশ্য অনেকবারই আমায় বারণ করেছিলেন অমনটি করতে, কিন্তু কে শোনে কার কথা। ভুলে গেলাম আমি আমার বয়স, ভুলে গেলাম স্থান, কাল, পাত্র। ভুলে গেলাম আমি উত্তমকুমার, তারাশঙ্করবাবুর লেখা ‘সপ্তপদী’র নায়ক কৃষ্ণেন্দুর চরিত্রে আমি অভিনয় করছি। আমার মনে হল আমি ফিরে গেছি আমার সেই অতীত জীবনে, যখন অফিস, খেলা আর গৌরীর চিন্তাই ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য। সম্বিৎ ফিরলো যখন, অনভ্যাসের ফলে পা মচকালো। মুহূর্তেই পা ফুলে উঠলো। ফিরতে হল বাড়িতে। দুদিন আবার বাড়িতে হলাম বন্ধ। ছেলেবেলাকার দিনগুলোর মতনই মা নিয়ে এলেন চুন আর হলুদ গরম করে। একরকম ধমকে, লাগিয়ে দিলেন প্রলেপ। আমার মনে হল, এখনও মা’র চোখে বোধহয় আমি সেই তেমনি ছোটো ছেলেটিই আছি। এত ভালো লেগেছিল সেই দুটো দিন।

    যাক যখনকার কথা বলছিলাম, ফিরে যাই আমার সেই কাহিনিতে।

    ছুটোছুটি করে রীতিমতো তখন খেলাধুলো করছি এমনি সময় সেখানে উপস্থিত হলেন ধীরেনবাবু26। আমাদের যাত্রা থিয়েটারের ‘ড্রেস’ সাপ্লায়ার ছিলেন তিনি।

    আজকাল ফিল্মেও ড্রেস সাপ্লাই দিচ্ছেন। কাছে এসে বললেন— ‘অরুণ, শোনো! বায়োস্কোপের ছবিতে নামবে?’

    জিজ্ঞেস করলাম— ‘কী বই? কী পার্ট?’

    উত্তরে ধীরেনবাবু বললেন— ‘এস. বি. প্রোডাকসনের—রবীন্দ্রনাথের ”দৃষ্টিদান”। পার্ট বিশেষ কিছু নয়! করবে তুমি অভিনয়?’

    মত তো আগের থেকে সকলকার নেওয়াই আছে। তাই মাথা নেড়ে জানালাম— ‘হ্যাঁ।’

    মাথা তুলে দেখলাম গৌরী দারোয়ানের সঙ্গে পথ দিয়ে কোথায় যাচ্ছে। চোখে চোখ পড়ায় সে ফিক করে হাসল।

    তারপর?

  • নয়

    নয়

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    নয়

    রাজি তো হয়ে গেলাম ধীরেনবাবুর কথায়। তখন কি জানতাম এই ‘দৃষ্টিদান’ ছবিকে উপলক্ষ্য করেই আমার জীবনেও আরম্ভ হয়ে যাবে আর একটা অধ্যায়!

    আজ সেই কথাই বলবো আমার পাঠকদের কাছে। অবশ্য এই ছবি থেকেই আমি বিখ্যাত হইনি, প্রচুর টাকাও পাইনি। সম্মান? সে আর আমি কি পাবো বলুন? কারণ, আমি তো তখনও নায়কের পার্ট করিনি! করেছিলাম হবু নায়কের পার্ট। হবু নায়ক বলতে আমি এই কথাই মনে করছি, ছবি আরম্ভর পর দুটি ছোটো কিশোর কিশোরী বা ছোটো দুটি শিশুকে আপনারা পর্দার ওপর দেখতে পেলেন। কিছুক্ষণ তারা আপনাদের সামনে এলো, কথা বললো, খানিকটা আপনাদের আনন্দও দিলো। তারপরেই ক্যামেরাম্যানের কায়দায় হঠাৎ পর্দার ওপরে লেখা হয়ে গেল ‘বিশ বছর পরে’। তারপরে বেশীক্ষণ ধরে যাঁরা পর্দার ওপর রইলেন তাঁরাই কেড়ে নিলেন দর্শকের মন। সিনেমা হল থেকে যখন দর্শকরা বেরিয়ে আসেন তখন ছোট শিশুদুটি বা কিশোর-কিশোরীরা দর্শকের মন থেকে একেবারে মুছে গেছে।

    অসিতদা27 (অসিতবরণ) আর সুনন্দা দেবী28 ছিলেন এই ছবির নায়ক-নায়িকা। আমাকে অভিনয় করতে নেওয়া হয়েছিল ঐ অসিতদারই ছোটোবয়সের চরিত্রে। তাই নিজেকে নায়ক না বলে বললাম—হবু নায়ক। আমারই সঙ্গে হবু নায়িকার পার্ট করেছিলেন কেতকী29

    ইতিপূর্বে শ্রীরঙ্গমে শিশিরকুমারের পরিচালনায় ‘বিন্দুর ছেলে’ তে অসিতদা বিন্দুর ছেলে অর্থাৎ অমূল্যর পার্ট করতেন। যাহোক, তাঁর জীবনে তবুও দর্শকের হাততালি পাবার একটা চান্স তিনি পেয়েছেন, আমি পাইনি।

    পাড়াতে অভিনয় করা এক জিনিস আর দর্শকশূন্য স্টুডিওর সেটে ক্যামেরার সামনে অভিনয় করা আর এক জিনিস। শুধু তাই নয়, আমার পরবর্তী জীবনে, দীর্ঘদিন ধরে, স্টার থিয়েটারের পাদপ্রদীপের সামনে পুর্ণ প্রেক্ষাগৃহে ‘শ্যামলী’30 অভিনয় করতে গিয়ে দেখেছি, সে অভিনয় সম্পূর্ণ আলাদা।

    এখন বলি, কেন এ কথা আমি বলছি। পাড়ায় বন্ধুবান্ধব মিলে স্টেজ তৈরি করে অভিনয় আমরা করেছি, একথা সত্যি। সে অভিনয় কেমন? তাতে থাকে না দায়িত্ববোধ। দর্শকরা অভিনেতাদের বেশিরভাগ স্থানেই হন বন্ধুস্থানীয়। ভুল-ক্রটি আপনি যাই করুন না কেন, সকলেই তা নেবেন ক্ষমার চোখে আর হাসির মাধ্যমে।

    যেমন ধরুন, আপনি হয়তো কোনো বৃদ্ধের পার্ট করছেন।

    গোঁফ দাড়ি খুব ভালো করে লাগিয়েছেন; মেক-আপে আপনাকে চেনবার জো নেই। নির্দিষ্ট সময়ের এক ঘণ্টা বা দেড় ঘণ্টা পরে অভিনয় যখন হল তখন আপনি দেখলেন ভীষণ মুশকিল হয়ে গেছে। সাজসজ্জার সময় মুখ বন্ধ করে সেজেছেন। পেন্টার তাড়াতাড়িতে গোঁফের চুলগুলো বড়োই রেখেছেন, কেটে দিতে ভুলে গেছেন। এখন আপনি যেই কথা বলতে যাচ্ছেন, ঠোঁটটা ওপর দিকে উঠে যাচ্ছে, ওপর দিকে উঠতেই, নিঃশ্বাসের সঙ্গে চুলগুলো গিয়ে ঢুকছে আপনার নাকের ভেতর। আর আপনি তখন কথা বলবেন কী, তার আগেই আপনার হয়ে যাচ্ছে প্রচণ্ড হাঁচি।

    দু’চারবার এইরকম হবার পর আপনার দর্শকরা আপনাকে দেখে হাসতে আরম্ভ করলেন, কিংবা আপনার অনুকরণে হাঁচতে আরম্ভ করলেন।

    পরের দৃশ্যে আপনি যখন গোঁফের চুল কেটে আবার স্থিত হয়ে এলেন, তখন আপনার পূর্ব দৃশ্যের অপরাধ অনেকেই ভুলে গেছেন। পাড়ার কয়েকটা বখাটে ছেলে অবশ্য আপনাকে দেখে হাঁচল। তাদের অবশ্য তখুনি থামিয়ে দেন বয়োজ্যেষ্ঠ লোকেরা। সুতরাং আপনার অভিনয় জমেও গেল।

    পরের দিন সকালবেলা যখন রকে রকে বা জানলায় জানলায় আপনার অভিনয়ের সমালোচনা শুরু হল, তখন আপনার অস্বাভাবিক হাঁচির কথা তাঁরা ভুলে গেছেন।

    এ তো গেল শখের দলের অভিনয়ের কথা। এখন বলি পেশাদার রঙ্গমঞ্চে অভিনয়ের কথা।

    অভিনয় করতে যাবার আগেই আপনার মনে হবে, যাঁরা আপনার অভিনয় দেখতে এসেছেন তাঁদের কাউকেই আপনি চেনেন না। আপনার দোষ-ত্রুটি ধরবার জন্যে তাঁরা ওঁত পেতে বসে আছেন। অথচ তাঁদেরই সামনে অভিনয় করে আপনাকে তাঁদের খুশি করতে হবে। যদি খুশি করতে পারেন তাহলে আপনার সুনামের অবধি থাকবে না। আর আপনার সুনাম হলেই নাট্যপরিচালক, রঙ্গমঞ্চের মালিক, সকলেই খুশি হবেন আপনার ওপর। কারণ তাদের নাটক শুধু চলবেই না, বক্স-অফিসও হিট করবে।

    ক্যামেরার সামনে অভিনয় করাটা স্বতন্ত্র। এ প্রম্পটারের কথা শুনে অভিনয় করা নয়। ঠিক যতগুলি কথা আপনাকে বলতে হবে ততগুলি সংলাপ আপনাকে মুখস্থ করতে হবে। পরিচালক যেমনটি দেখিয়ে দিয়েছেন ঠিক তেমনটি আপনাকে করতে হবে। একটু ভুল বা ত্রুটি হলেই অন্যদিক থেকে আওয়াজ আসবে— ‘কাট’। তাতে প্রযোজকের মুখ হবে গম্ভীর, কারণ আপনার সামান্য ভুলের জন্য অতখানি নেগেটিভ তাঁর নষ্ট হল।

    শুধু এই নয়। ঘণ্টা আড়াই কি তিন, গোছগাছ আর রিহার্সাল দেওয়ার পর আপনি হয়তো ক্যামেরার সামনে অভিনয় করলেন দু’মিনিট। ঠিক যেন টেস্ট পরীক্ষায় allow হয়ে তিনমাস পরে পরীক্ষা দিলেন তিন ঘণ্টায়। কেমন হয়েছে তা জানবার উপায় নেই, যতক্ষণ না ইউনিভার্সিটি ফল বার করছে। এখানেও ঠিক তাই। অভিনয় করে আপনি বসে রইলেন। ছ’মাস কি সাত মাসের পর যখন ছবি মুক্তি পেল, তখন যদি দর্শকরা নিলেন সে ছবি তাহলে বুঝলেন আপনার অভিনয় ভালো হয়েছে। আর যদি ছবি flop করে তাহলে বুঝলেন অভিনয় ভালো হয়নি।

    যা হোক, যে কথা বলছিলাম। স্টুডিওতে গেলাম। স্যুটিং হল দু’দিন। দক্ষিণা নিতে গেলাম। শুনলাম আমার ভাগ্যে এবারের দক্ষিণা হচ্ছে সাতাশ টাকা। কমিশন বাদ দিয়ে আমি পকেটে পেলাম মাত্র সাড়ে তের টাকা। আজকে ‘মাত্র’ বলছি কিন্তু সেদিন মনে হয়েছিল যেন অনেকখানি। আরও আনন্দ হয়েছিল, খুব শিগগির এর যা হয় একটা কিছু ফলাফল জানতে পারব।

    আবার ফিরে গেলাম আমার সেই পুরোনো জীবনে। অফিস আর বাড়ি, বাড়ি আর অফিস। গৌরী আসে। আজকাল অবশ্য বেশ সয়ে গেছে। আমার ঘরে বসে কথাও বলে। অবশ্য অন্য লোকের অসাক্ষাতে।

    ‘সয়ে গেছে’ বলছি এই অর্থে,—মা আর অন্নপূর্ণা বা আমার বাড়ির অন্য লোকেরা এ ব্যাপার নিয়ে আর মাথা ঘামান না। কিন্তু আমার কি সত্যি সয়ে গিয়েছিল? আজ স্বীকার করতে বাধা নেই নিভৃতে গৌরীর সঙ্গে যখনই কথা বলবার সুযোগ পেতাম তখন আমার বুকের স্পন্দন যেন বন্ধ হয়ে যেত। তারপরে গৌরী চলে গেলে কিছুক্ষণ আনন্দে সেই চিন্তায় বিভোর হয়ে থাকতাম। পরক্ষণেই মনের মধ্যে আসত কেমন একটা হতাশা। কিছুক্ষণ আগেকার ঘটনা মন যেন বিশ্বাস করতেই চাইত না। মনের মধ্যে কেবলই উঠত একটিমাত্র প্রশ্ন—এ সত্যি ভালোবাসা না অভিনয়?

    মাঝে মাঝে হতাশা কাটাবার জন্যে ভাবতাম অভিনয় যদি হবে তাহলে গৌরী কেন আমাদের বাড়ি আসবে। আবার মনে হত, গৌরী বোধহয় আমায় নিয়ে কেবল খেলা করছে। ও জানে সময় হলে ওর বিয়ে হবে কোনো বড়োলোকের ছেলের সঙ্গে। তখন আমার মতো অবস্থার ছেলেকে ভুলতে ওর এতটুকু সময় লাগবে না।

    যাক, এইরকম করতে করতে কেটে গেল আরও কয়েকটা মাস। ‘দৃষ্টিদান’ মুক্তি পেল। ছবিটা দেখেও এলাম। মনটাও খুশি হল। কিন্তু হঠাৎ দেখলাম আমাদের বাড়িতে গৌরীর আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এ বন্ধ হওয়ার অর্থ কিছু বুঝতে পারলাম না। ওদের বাড়িতে যেতেও সাহস হয় না। কী জানি যদি কেউ কিছু ভাবে! মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে গেল।

    অন্নপূর্ণাকে বলি— ‘তোর বন্ধু গৌরীর কী হয়েছে রে? একবার খোঁজ নিস তো!’

    অন্নপূর্ণা বোধহয় ব্যাপারটা আঁচ করেছিল। বিকেলবেলায় আমি অফিস থেকে আসতেই সে আমাকে বলল— ‘শুনেছ কী হয়েছে?’

    আমি সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করি, ‘কী রে?’

    — ‘গৌরী তার ঠাকুমার সঙ্গে গিয়েছিল ”দৃষ্টিদান” দেখতে। ঠাকুমা বায়োস্কোপ দেখতে দেখতে হঠাৎ নাকি গৌরীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন— “হ্যারে গৌরী, তুই কাকে বিয়ে করবি বল তো? এই সমস্ত ছেলেদের মধ্যে কাউকে পছন্দ হয়?” ঠাকুমা হয়তো ভেবেছিলেন—লজ্জায় ভেঙে পড়ে গৌরী বলবে—বাবা কী বলছ ঠাকুমা! ঠাকুমাও নাতনিকে ঠাট্টা করবার একটা সুযোগ পাবেন। কিন্তু গৌরী সে দিক দিয়েও গেল না। হঠাৎ ঠাকুমাকে নাকি তোমার ছবিটা দেখিয়ে দিয়ে গৌরী বলেছে— “ঐ, ঐ, ওকে।” নাতনির উত্তর শুনে ঠাকুমার চোখ তো ছানাবড়া। বাড়িতে ফিরে এসেই সে খবর দিয়েছেন তাঁর ছেলেকে। ফলে গৌরীর স্কুলে যাওয়া, এমনকি বাড়ি থেকে বের হওয়াও বন্ধ।’

    স্তম্ভিত হয়ে গেলাম অন্নপূর্ণার কথা শুনে। গৌরী তাহলে সত্যিই আমায় ভালোবাসে! আমার জন্যে সে এতখানি দুঃখবরণ করেছে! তার দুঃখের কথা শুনে আমার কোথায় দুঃখ হওয়া উচিত, তা না হয়ে, আমার মনে প্রাণে খেলে গেল একটা আনন্দের হিল্লোল—গৌরীর ভালোবাসার মধ্যে কোন মেকি নেই জেনে।

    অন্নপূর্ণা আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে বলল— ‘কী ভাবছ দাদা?’

    একটু ঢোঁক গিলে নিয়ে বলি— ‘না, এমন কিছু নয়!’

    একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বুক ঠেলে বের হয়ে আসতে চায়। সেটাকে চাপবার প্রাণপণ চেষ্টা করি।

    হঠাৎ সচকিত হয়ে অন্নপূর্ণা বলে— ‘হ্যাঁ, আসবার সময় তাড়াতাড়িতে গৌরী যেন কী তোমায় লিখে দিয়েছে। পড়ে দেখো।’—বলে সে একটা ভাঁজকরা কাগজ আমার হাতে দিলো।

    সেটা নিয়ে গিয়ে নিজের ঘরে বসে দরজা বন্ধ করে বারবার পড়তে থাকি। তাতে লেখা রয়েছে : ‘অন্নপূর্ণার মুখে আমার সব কথা হয়তো শুনেছ। এই আমাদের জীবনের পরীক্ষা শুরু। ভয় পেয়ে পিছিয়ে যেও না বীরপুরুষ। আমি জানি, এ খবর শুনে তোমার কষ্ট হবে। তার সঙ্গে এ-ও জানি, আমার ভালোবাসাই তোমায় টেনে আনবে আমার কাছে একদিন!

    ইতি—তোমারই গৌরী’

    অদ্ভুত, ছোট্ট অথচ মিষ্টি চিঠি। বারবার পড়েও যেন তৃপ্তি হয় না।

  • দশ

    দশ

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    দশ

    যে কখনও চিনি খায়নি তাকে যেমন মিষ্টির স্বাদ বোঝানো যায় না, তেমনি যে কখনও প্রেম করেনি তাকে, প্রেমে পড়লে মানুষের মনে যে কী অনুভৃতি হয়, তাও বোঝানো যায়না।

    রোম্যান্টিক ‘হিরো’ বলে আমার একটা নাম আছে। অনেকে খুশিও হয়েছেন আমার সে অভিনয় দেখে। কারণ আমি তাঁদের কাছে প্রশংসাপত্র পেয়েছি এবং ‘বাহবা’ ধ্বনি শুনেছি।

    নানাধরনের রোম্যান্টিক চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে দেখেছি বাংলা ছবির নায়ককে যেন সবসময় বোকা বোকা হয়ে থাকতে হয়। তার সাজগোজটা হবে careful অথচ careless, অর্থাৎ সব ব্যাপারটাই সে বোঝে অথচ উদাসীন। তারপরে এই ধরনের চরিত্রগুলোতে বেশিরভাগ সময় দেখতে পাওয়া যায় নায়কের বাবার থাকে প্রচুর টাকা। সে একটা ক্রাইসলার গাড়ি বা ওই জাতীয় কিছুতে চড়ে বেড়াচ্ছে।

    নায়িকা তার জন্যে জানলায় অপেক্ষা করছে। কিংবা ডিনারে, পার্টিতে তাদের প্রথম সাক্ষাতেই প্রেম হল। অথবা প্রেম হবার পর নায়িকা রয়েছেন ঘরের মধ্যে বন্দী। নায়কের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ অনেকদিন নেই। মন অত্যন্ত খারাপ নায়কের জন্যে। সেকেন্ড ‘হিরো’ বা ‘ভিলেন’ নায়িকার সঙ্গে বিয়ে একরকম পাকাপাকি করে ফেলেছে—এমনি সময় বসন্তের কোকিলের ডাকের মতন রেডিওতে ভেসে এল নায়কের কণ্ঠস্বর। নায়িকা বুঝল নায়ক বেঁচে আছে। উত্তেজিত কণ্ঠস্বরে ‘ভিলেন’কে তখন প্রত্যাখ্যান করল। বলল— ‘এ বিয়ে আমি করব না’, কিংবা মোটর নিয়ে ছুটল নায়ককে ধরবার উদ্দেশ্যে।

    কিন্তু আমার জীবনের ঘটনা, ঠিক এপথে চলেনি। ‘ক্রাইসলার’ গাড়ি তো দূরে থাক, সামান্য বাস-ট্রামেই ঘুরে বেড়াতাম। সামান্য কেরানি আমি অথচ প্রাণে শখ অনেক। প্রেম করলাম তো করলাম—ওই অবস্থাপন্ন মেয়ের সঙ্গে! এখন আমার উপায়?

    বাড়িতে গৌরী বন্দী। সে-ই আবার আমাকে চিঠি লিখল তার সমস্ত কথা জানিয়ে। বর্তমানে ‘অ্যাটম বম্ব’ কিংবা ‘হাইড্রোজেন বম্ব’ কী তা দেখিনি, কিন্তু আমার মনে হল এই চিঠি তার চেয়েও ভীষণ সাংঘাতিক।

    এর কিছুদিন আগে গত মহাযুদ্ধের শেষে ‘হিরোসিমা’ আর ‘নাগাসাকি’র ওপর ‘অ্যাটম বম্ব’ পড়েছিল। কাগজে পড়েছিলাম শহর দুটোই নাকি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল তাছাড়া আরও অনেক কথা।

    চিঠিটা পেয়ে আমারও তেমনি অবস্থা হল, কিছুই ভালো লাগে না।

    কিন্তু ভালো লাগে না বললে সংসার ছাড়বে কেন? ন’টার পর মুখ ভার করে অফিস যেতে হত বৈকি। খেলাধুলা, যাত্রা, থিয়েটার সবই একরকম বন্ধ করে দিলাম। বন্ধুরা ডাকতে এলে বলতাম—ভালো লাগে না ভাই।

    ভালো তো লাগে না, করিটা কী? কেবল নিজের ঘরে বসে বসে গৌরীকে চিন্তা করছি। শুনেছি শিবকে পাবার জন্যে গৌরী নাকি তপস্যা করেছিলেন বরফের মতো ঠান্ডা জলে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে।

    এ যুগে আমার গৌরী কী করেছিল জানি না, আমি প্রায় ‘তপস্যা’র মতো করে ফেলেছিলাম আর কি! দিনরাত কেবল একই চিন্তা—কী হবে, কী হবে!

    মা’কে রাজি করানো শক্ত নয়। মা মত দিলে বাবাও মত দেবেন এ বিয়েতে। কিন্তু গৌরীর বাড়িতে? শুধু তখন আমার শ্বশুরমশাই একা নন, তাঁরও পিতা অর্থাৎ আমার দাদাশ্বশুর নগেন গাঙ্গুলি মহাশয় তখনও জীবিত। তিনি যখন শুনবেন আমি ফিল্ম করি, তার ওপর অফিসেও একটা সামান্য চাকরি করি, তখন তিনি কি এ বিয়েতে রাজী হবেন? তাঁর আদরের ছোটো নাতনিকে কিছুতেই আমার মতো পাত্রের হাতে সঁপে দেবেন না।

    মনে মনে চিন্তা করতাম, সাহসে ভর করে আমি একদিন চলে গেছি গৌরীদের বাড়িতে, সকলের সামনে বুক চিতিয়ে বলছি, গৌরীকে আমার চাই, নইলে আমার জীবন একেবারে ব্যর্থ হয়ে যাবে।

    ঠিক সেইসময়ে মনে হত, ওদের বাড়ির দারোয়ানদের কথা। সঙ্গে সঙ্গে একা বসে আমার ঘণ্টা দু’তিন ধরে ভাবনার গতিটা যেন হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে অন্য দিকে চলে যেত। ভাবতাম—যদি ওরা অপমান করে? যদি ওরা আমার কথা না শোনে? তাহলে?

    অপমানটা আমার তো কেবল একার হবে না! হবে আমার বাবা, মা, সকলকার। তাহলে? না না, এ কাজ আমি কখনও করতে পারব না। নিজের জন্য কোনোদিন ভাবি না, ভাবতে চাই-ও না। কিন্তু আমি এমন কাজ করতে পারি না যাতে আমার মা-বাবার অপমান হয়। এজন্যে যদি গৌরীকে আমি না-ও পাই সেও ভালো। মৃত্যু অবধি যদি তার জন্য আমাকে অপেক্ষা করতে হয়, তাও করব। প্রাণ থাকতে আমি এ কাজ করতে পারব না।

    আবার সেই একটানা হতাশা। একঘেয়ে জিজ্ঞাসা—কী হবে, আর কী হবে!

    বন্ধুবান্ধব কাউকে একথা বলতে পারি না, কারণ কে কোন চোখে দেখবে কে জানে! বুদ্ধি দেওয়া দূরে থাক, হয়তো ঠাট্টা করে আমাকে পাগল করবে। আমি খারাপ হতে পারি, কিন্তু আমার প্রেম আমার ভালোবাসা—এত খারাপ নয়! আমার মনের এই পবিত্র জিনিসকে নিয়ে কেউ যে ঠাট্টা করবে তা আমার সহ্য হবে না। তাহলে এমন কী উপায় করা যায়? অথচ সন্ন্যাসী তো বলেছেন, ‘ওকে’ আমি পাবই।

    প্রথম দিনকতক তো গেল এইভাবে। ভগবানকে যে কোনোদিন খুব একটা বিশ্বাস করতাম তা নয়। কিন্তু ব্রাহ্মণের ছেলে, একটা সংস্কার তো ছিল। আর কিছু না হোক গলায় উপবীত তো আছে। তাই সকাল সন্ধ্যায় যখনই কোনো দেব বা দেবীর মন্দিরের সামনে দিয়ে যাই, অমনি তাঁকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম জানাই। বলি— ‘ভগবান, একটা ব্যবস্থা করো’। সে তীব্র অনুভূতি লিখে বোঝানো যায় না। হয়তো মুখে বললেও লোকে আমাকে পাগল আখ্যা দেবে। তবুও বিশ্বাস করুন, সেই তুষের জ্বালা আমি অহোরাত্র সহ্য করেছি! তখন রেকর্ডে গাওয়া কানন দেবীর একটা গান কেবলই মনে পড়তো। গানটি হল—

    ‘সখি! কে বলে পিরিতি ভালো। হাসিতে হাসিতে পিরিতি করিয়া কাঁদিতে জনম গেল।’

    কারোর সামনে কাঁদিনি বটে, কিন্তু কাঁদতে বাকি ছিল কতটুকু? যত দিন যায় তত মনের জ্বালা যেন তীব্র হয়ে ওঠে। তীব্রভাবে সে যেন আমাকে পোড়াতে চায়। ভেতরটা তখন সত্যিই আমার তুষের আগুনের মতো জ্বলে যাচ্ছিল। খেতে ভালো লাগে না, রাত্রে চোখে ঘুম আসে না। দিনের বেলায় ক্লান্তিতে বিছানায় শুয়ে যখন সামান্য তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়তাম তখন দেখতাম কত মজার স্বপ্ন। কখনও দেখতাম গৌরী আমার কাছে এসেছে, কখনওবা দেখতাম ও যেন কোথায় চলে যাচ্ছে, আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেও ওর নাগাল পাচ্ছিনা।

    বেশিরভাগ, রাত্রেই এ সমস্ত স্বপ্ন দেখার পর ঘুম ভেঙে যেত। তারপর সারারাত জেগে কাটাতে হত। সে কল্পনাও যেন অপূর্ব সুখের তীব্র অনুভূতি দিয়ে যেত। কিন্তু তারপর?

    রাত্রির পরে ভোর হলেই আবার সেই একটানা হতাশা।

    আমার এইরকম অবস্থা মা’র চোখ এড়ায়নি। তিনি একদিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন— ‘হ্যাঁরে খোকা, তোর কী হয়েছে রে? ভালো করে খাস না, রাত্রেও লক্ষ করেছি, খুব ভালো করে ঘুমোতে পারিস না, ছটফট করে কেবল দরজা খুলে বের হোস। কী হয়েছে বল তো?’

    বুঝলাম মা’র কাছে ধরা পড়ে গেছি। তবুও প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বলি— ‘নাঃ কিছু তো হয়নি!’

    মা বলেন— ‘না হলেই ভালো।’

    দিন পনেরো এইভাবে কাটাবার পর হঠাৎ একদিন অফিস থেকে বাড়ি এসে শুনলাম গৌরী এসেছে আমাদের বাড়ি। বুকের রক্ত ছলাৎ করে উঠল। কান মাথা যেন গরম হয়ে উঠল। সমস্ত পৃথিবীর শব্দ যেন কেবল একসুরে বলে উঠল— ‘ওরে পাগল চেয়ে দেখ, গৌরী এসেছে।’

  • এগার

    এগার

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    এগার

    আমার জীবনে তখন নেমে এসেছে হতাশা। একদিকে গৌরী, অপর দিকে ফিল্ম। গৌরীর কাহিনি আগেই বলেছি। অবস্থার বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই সেজন্যে হতাশাও কমেনি।

    অপরদিকে ‘দৃষ্টিদান’-এর হবু নায়কের চরিত্রে অভিনয় করার পর আর কোনো নতুন সুযোগ আমার জীবনে তখনও আসেনি।

    অথচ ফিল্মে অভিনয় করবার আশা আমার দুরন্ত।

    এইরকম সময় যখন মনের দোলায় আমি দুলছি, তখন হঠাৎ একদিন বড়োমামা এসে আমাকে বললেন— ‘কী রে, কোথায় যাচ্ছিস?’

    আমি বলি— ‘ন’টা বেজে গেছে, অফিসে।’

    আমার মুখের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বড়োমামা বললেন— ‘পরের গোলামি আর কতদিন করবি?’

    এইখানে বলে রাখা ভালো আমার বড়োমামা জ্যোতিষ নিয়ে চর্চা করেন। তাই ভাগ্নের কুষ্ঠীও তিনি মা’র কাছ থেকে আগেই চেয়ে নিয়ে বিচার করেছেন।

    আমি সন্ন্যাসীর কথার খানিকটা প্রতিধ্বনি তাঁর মুখ থেকে শুনে জিজ্ঞেস করলাম— ‘কী করব বড়োমামা যদি চাকরি ছেড়ে দিই?’

    বড়োমামা বলেন— ‘তুই শিল্পী!’

    মনটা আশায়, আনন্দে দুলে উঠল। শিল্পী! তবুও ঠাট্টা করে বলি— ‘আমি তো ছবি আঁকি না।’

    বড়োমামা আমার উপহাসটা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন। তাই একটু গুরুগম্ভীর চালে বললেন— ‘যতসব জ্যাঠা ছেলে!’

    খোঁচালে ফল আর ভালো হবে না। ওদিকে আমার অফিস যেতেও দেরি হয়ে যাচ্ছে—তাই জামাটা গায়ে ফেলে দিয়েঅফিসে যাবার জন্যে তৈরি হয়ে নিলাম। তাড়াতাড়ি নাকেমুখে গুঁজে আবার সেই বাস ধরা, অফিস, সন্ধে নাগাদ বাড়ি ফেরা। সেই একঘেয়ে জীবন, এতে নেই কোনো পরিবর্তন, নেই কোনো আকর্ষণ।

    কিন্তু পরের দিন সকালবেলায় সত্যিই আমাকে বিস্মিত হতে হল, যখন বুড়ো (বর্তমানে তরুণকুমার) এসে আমায় খবর দিল, বাবার বসবার ঘরে আমার ডাক পড়েছে।

    চোরের মন সদাসর্বদা যেমন বোঁচকার দিকে থাকে, তেমনি আমারও হঠাৎ বাবা ডাকছেন শুনে মনে হল, আমার লুকিয়ে প্রেম করার কথা বাবা কি জেনে ফেলেছেন নাকি?

    সর্বনাশ! যদি তাঁর কানে ওঠে তবে কী জবাব দেব? মিথ্যে কথা বলব? কখনও তো বাবার কাছে মিথ্যে কথা বলিনি। তার ওপর এক্ষেত্রে যদি এখন মিথ্যে কথা বলি, পরে সত্যি কথা বলবার সুযোগও পাবোনা। তখন উপায়?

    বুড়ো তাড়া মেরে বলে— ‘দাদা, কী ভাবছ এতো, বাবা ডাকছে না!’

    একটু খোশামোদ করেই তাকে জিজ্ঞেস করি— ‘কেন বাবা ডাকছে রে?’

    বুড়ো উত্তরে বলে— ‘তা তো জানি না, একজন কে লোক এসেছে তাই তোমায় ডাকছে।’

    সর্বনাশ! গৌরীদের বাড়ির কেউ আসেনি তো! যদি এসে থাকে তাহলে উপায়?

    আমার শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করে বুড়োকে বলি— ‘লোকটা কে রে?’

    বুড়ো বলে— ‘গিয়েই দেখোনা, আমি কী জানি!’

    সে তো বলেই খালাস। কথা শেষ করে বুড়ো ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

    কিন্তু আমি তো অত সহজে খালাস হতে পারলাম না। ভাবলাম একবার—বাড়ি থেকে পালিয়ে যাব! কিন্তু সেখানে ভয় আছে, বুড়ো আমায় দেখে গেছে ঘরে, বাবাকে এক্ষুনি গিয়ে বলে দেবে। তাতে ফল ভালো হবে না। তাই ভগবানের নাম স্মরণ করে কাঁপতে কাঁপতে গেলাম বাবার বসবার ঘরের দিকে।

    গিয়ে দেখলাম, এতক্ষণ যা ভেবে এসেছি তা মোটেই নয়। গৌরীদের বাড়ি থেকে বাবার কাছে আমার নামে নালিশ করতে কেউ আসেননি। তার বদলে সেখানে বসে রয়েছেন বাবারই বাল্যবন্ধু পুলিনবাবু।

    বাবা আমাকে দেখেই বললেন— ‘এই যে খোকা, পুলিন তোমায় অনেকক্ষণ ধরে ডাকছে।’

    আমি তাঁকে অভিবাদন জানিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি।

    পুলিনবাবু বললেন— ‘আমি একটা ছবি করছি। নামবে আমার ছবিতে?’

    ছবি! ভেতরের হিম রক্তটা হঠাৎ যেন উষ্ণ হয়ে উঠল।

    আমি বলি— ‘কী ছবি করছেন?’

    পুলিনবাবু বলেন— ‘ওরে যাত্রী’ বলে একটা ছবি তুলব ভাবছি।

    — ‘আমাকে কী করতে হবে?’

    — ‘তোমাকে?’—আমার আপাদমস্তক ভালো করে লক্ষ্য করে নিয়ে তিনি বলেন— ‘সেকেণ্ড হিরোর পার্ট।’

    যাক, এবারে আর হবু নায়কের পার্ট নয়, একেবারে উপনায়কের পার্ট। দর্শকদের কিছু দেখাবার মতন একটা সুযোগ হয়তো এবার পাব। ‘উপ’ শব্দটার মধ্যে বোধহয় একটা মাধুর্য আছে। কারণ এই ‘উপ’দের নিয়েই শুনেছি রচিত হয়েছে বহু কাব্য। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ একজায়গায় বলেছেন—ভগবানকে ভালোবাসতে হবে ওই উপস্ত্রীর মতো বা উপপতির মতো। তাই সেকেণ্ড হিরো বা উপনায়কের পার্টের কথা শুনে আশায় আর আনন্দে আমার মন দুলে উঠল। আমি জিজ্ঞেস করি— ‘কবে থেকে আমাকে যেতে হবে?’

    পুলিনবাবু বলেন— ‘তাহলে তুমি রাজি?’

    রাজি! মনে মনেই ভাবি। শোনামাত্রই আমি যে প্রস্তুত। সেই যে কথায় আছে না— ‘ভাত খাবি আয়, না হাত ধোবো কোথা’। আমারও মনের অবস্থা তখন ঠিক তাই।

    মনে মনে বেশ একটু রাগ হল। দূর ছাই! আমার চেহারাটা যদি আর একটু মোটা হত, তাহলে পুলিনবাবুকে ধরে করে হিরোর চান্সটা আমিই হয়তো পেতাম। কিন্তু উপস্থিত তা তো হবার উপায় নেই।

    যাক, যা পাওয়া যাচ্ছে, ঠিকমতো বলতে গেলে ভাগ্যে যা জুটছে তাকে অবহেলা করা উচিত নয়।

    অনেকক্ষণ চুপ করে আছি। আমি কথা বলছি না বলে তিনিও বিশেষ কথা বলছেন না, তাই নীরবতা ভঙ্গ করে প্রশ্ন করলাম— ‘ছবিটা পরিচালনা করবেন কে?’

    পুলিনবাবু বলেন— ‘রাজেন চৌধুরী’।

    একটু আমতা আমতা করে বলি— ‘নায়কের পার্ট করবেন কে?’

    — ‘দীপক মুখার্জি1। তুমি বোধহয় তার অভিনয় দেখেছ।’

    — ‘দীপকবাবুর অভিনয়’,—আমি বলি— ‘হ্যাঁ দেখেছি’।

    আমার কৌতূহল দেখে বোধহয় পুলিনবাবু আমার মনের কথাটা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই বললেন— ‘হিরোর পার্ট করতে পারলে বড়ো খুশি হতে, না?’

    আমি সুযোগ পেয়ে বলি— ‘আজ্ঞে! আমি কী পারব?’

    আমাকে একরকম আশ্বাস দিয়েই তিনি বলেন— ‘দেখো, বই যদি ভালো চলে, তাহলে আমার next ছবিটায় তোমাকে হিরো করতে আর আপত্তি থাকবে না। অবশ্য যদি তোমাকে দর্শক নেয়।’

    সেদিন প্রবীন প্রযোজকের মুখে যে-কথা শুনেছিলাম সে কথার অর্থ বুঝতে পারিনি তখন। ভেবেছিলাম পুলিনবাবু ইচ্ছা করলেই তো আমাকে একটা চান্স দিতে পারেন। দর্শকের নেওয়া বা না নেওয়া—সে তো প্রযোজক আর পরিচালকের হাতে। সে কথার অর্থ বুঝলাম আরও কিছুদিন পর।

    যাক, সময়মতো সেকথা বলব।

    আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে পুলিনবাবু বলেন— ‘তুমি একদিন এসো আমার ধর্মতলার অফিসে, চুক্তিপত্রটা সেইখানেই সই করে দিও। আর দেখো, আমি তোমায় এমনিতে খাটাব না, পারিশ্রমিক কিছু দেব।

    বাবা বলেন— ‘ছেলেটার বড়ো শখ ফিল্মে নামবার। দেখো শিখিয়ে পড়িয়ে যদি নিতে পারো। তারপরে ওর ভাগ্য।’

    আমি বলি— ‘কবে যাব, কালই যাব?’

    পুলিনবাবু কী একটা ভেবে নিয়ে বলেন— ‘বেশ, কালই এসো আমার ধর্মতলার অফিসে, সেইখানেই কথাবার্তা হবে। আচ্ছা, তুমি এখন যেতে পারো।’

    যেতে আমার মোটেই ইচ্ছা ছিল না সে জায়গা ছেড়ে, তবু আমাকে যেতে হল ভদ্রতার খাতিরে। মনের মধ্যে তখন আর হতাশা নেই, সব মনটা জুড়েই তখন উঠেছে আর একটা রঙিন স্বপ্ন।

    পরের দিন চুক্তিপত্র সই হয়ে গেল যথানিয়মে।

    পুলিনবাবু আমাকে বললেন— ‘এই ছবিটার জন্যে তোমাকে আমি ৭০০ টাকা দিতে পারি। কেমন, রাজি?’

    রাজি! এর আগের ছবি দৃষ্টিদানে পেয়েছি মাত্র ১৩০ টাকা। তার ওপর উপনায়কের পার্ট। এ কি আমি ছাড়তে পারি! যাইহোক, কিছু না দিলেও আমি করতে প্রস্তুত। টাকা যেটা আমায় নিতে হয় সেটা আমার নিজের জন্য নয়, মা আর বাবার কিছুটা সুখ-সুবিধা করে দিতে পারব বলে।

    মাকে দেখেছি, সংসারের জন্য কী অমানুষিক পরিশ্রম করেন। আমি তাঁর ছেলে হয়েও তাঁর সে কষ্ট এখনও ঘোচাতে পারিনি। তাই এই টাকা নেওয়ার প্রশ্ন।

    চাকরি যা করি তাতে কি আর হয়। সেকথা আমিও বুঝি। সংসারের জন্যে চাই আমার টাকা। আমার ছোটো দুটি ভাই তখনও নাবালক।

    যাক সেসব কথা।

    চুক্তিপত্রে সই করার পরেই মনে প্রশ্ন উঠল, এখন স্যুটিং-এর দিনে কী করে স্টুডিওতে উপস্থিত হওয়া যায়? এ তো একদিন বা দু’ দিনের কাজ নয়। এ একেবারে পনেরো কুড়ি দিন যেতে হবে, তাও রোজ নয়—যেদিন ‘সেটে’ আমার পার্ট থাকবে সেদিন। ক্যাজুয়াল লীভগুলো নষ্ট করব? না, ‘earned leave’ নিয়ে একমাসের ছুটি নেব?

    কিন্তু earned leave-এ ছুটি নিলে নির্দিষ্ট তারিখে আবার অফিসে যোগ দিতে হবে। কিন্তু তখন যদি আমার স্যুটিং শেষ না হয়, তাহলে?

    সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে গিয়ে বসলাম অফিসে আমার নির্দিষ্ট জায়গায়।

    আরও দিন দুই কেটে গেল। কিন্তু সমস্যার সমাধান আর কিছু হল না।

    এদিকে নিয়মমতো পার্ট মুখস্থ করে যাচ্ছি অথচ মনে জুৎ পাচ্ছি না।

    এমনি সময় হঠাৎ একদিন অফিসে আমায় ধরে বসলেন আমাদেরই অফিসের বড়োবাবু গোরাচাঁদবাবু।

    জিজ্ঞেস করলেন— ‘অরুণ, তোমার মুখটা ক’দিন ধরে কেন ভার ভার দেখছি ভাই? কী হয়েছে বলো তো।’

    আমি তাঁকে অকপটে সব কথা বলি।

    গোরাচাঁদবাবু শুনে বললেন— ‘আরে, এই ব্যাপার? তা এতদিন কেন বলোনি? মিথ্যে মুখ ভার করে বসে আছ কেন? আরে আমি কি তোমার পর? একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবেই। আর ওপরওয়ালাকে ম্যানেজ করার ভার তো আমার ওপর! তোমার জন্যে আর এটুকুও করতে পারব না!’

    কৃতজ্ঞতায় আমি গলে গিয়ে বলি— ‘দেখুন, ফিল্মে নামার আমার বড্ড শখ। কিন্তু চাকরি ছেড়ে দিয়ে এদিকে যেতেও সাহস হচ্ছে না। কারণ জানেন তো আমার অবস্থা।’

    হেসে বড়োবাবু বললেন,— ‘কুছ পরোয়া নেই ব্রাদার, তুমি এগিয়ে যাও, তোমাকে দেখার ভার আমার ওপর ছেড়ে দাও। আর ছবিটা উঠলে আমাকে দেখাতে ভুলো না।’

    এই প্রসঙ্গে আরও দু’জনার নাম উল্লেখ না করে পারি না, যাদের অকৃত্রিম স্নেহ আর বন্ধুত্বের জোরেই আমি আরও তিন বছর চাকরি করতে পেরেছিলাম। তাঁরা হলেন লালচাঁদবাবু আর শ্যামবাবু।

    অভিনেতা উত্তমকুমারকে হয়তো আপনারা কোনোদিনই দেখতে পেতেন না যদি না সেদিন অফিস থেকে এঁরা আমাকে সাহায্য করতেন।

    তাঁদের স্নেহ, ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের কথা আমি আমরণ স্মরণ রাখব।

    অফিসের ব্যবস্থা একরকম হয়ে গেল। এইবারে স্যুটিং এর দিনের জন্যে আমি প্রস্তুত হতে লাগলাম।

    দিনও একদিন পড়ল। গেলাম ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে। কারণ ওখানেই আমাদের তখন ‘ওরে যাত্রী’ তোলা হচ্ছে।

    কিন্তু তখন স্টুডিওর পরিবেশ আজকের মতন ছিল না। একদল লোক সদাসর্বদা সেটের মধ্যেই বসে থাকতেন। তাঁরা না শিল্পী না টেকনিশিয়ান।

    অথচ তাঁদের সঙ্গে পরিচয় থাকত সব পরিচালক আর প্রযোজকদের।

    শুধু তাই নয়, বড়ো বড়ো শিল্পীদের সঙ্গেও তাঁদের ঘনিষ্ঠভাবেই পরিচয় থাকতো।

    নতুন কোনো ছেলে বা মেয়েকে স্টুডিওর মধ্যে আসতে দেখলেই তাঁরা তাঁদের সমস্ত শক্তি নিয়ে পরিচালক আর প্রযোজককে বোঝাবার চেষ্টা করতেন, নতুন ছেলে বা মেয়েটার কিছু হবে না। পত্রপাঠ যেন তাকে বিদায় দেওয়া হয়।

    এক্ষেত্রে একটা কথা না বলে পারি না। বর্তমানের বিখ্যাত অভিনেত্রী চিত্রতারকা রমা বা সুচিত্রা সেন31 কেও এঁরা বাদ দেননি।

    একজন মন্তব্য করেছিলেন, এ মেয়ের দ্বারা কিছু হবে না। তাঁর কথাকে মিথ্যা প্রমাণ করে আজ সুচিত্রা গৌরবের আসনে বসেছেন। এইসমস্ত লোকেরা জানেনও না তাঁদের ওই ধরনের কথাবার্তা তরুণ-তরুণীদের মনে কতখানি হতাশা এনে দেয়।

    আমার জীবনেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। পরিচালকের নির্দেশে মেকআপ-ম্যানের কাছ থেকে মেকআপ নিয়ে গেলাম ফ্লোরে।

    করছি এক ডাক্তারের পার্ট। স্টেথিসকোপ গলায় জড়ানো। অপরদিকে আমার রোগিণী সেজেছেন মঞ্চ ও পর্দার বিখ্যাত অভিনেত্রী প্রভা দেবী।32

    প্রথম সীনেই আমি তাঁর নাড়ি পরীক্ষা করব। মুখে আলো ফেলা হল। ওদিকে ‘মনিটার’ শুরু হবে, অর্থাৎ ক্যামেরা চালাবার পূর্বে ক্যামেরাম্যান, পরিচালক এবং সাউণ্ডম্যান দেখে নেবেন দৃশ্যটা কেমন উঠছে।

    যতক্ষণ না ওঁদের মনঃপূত হবে ততক্ষণ এই ধরনের মনিটার চলতেই থাকবে, আর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের তাঁদের নির্দেশ মেনে বার বার একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি করে যেতে হবে।

    আগেই বলেছি, আমার চেহারা ছিল রোগা। তার ওপর এই ধরনের একটা অভিনয়ের উত্তেজনাও কম নয়। ভেতর ভেতর বেশ নার্ভাস হয়েছিলাম। মুখে আলো পড়তেই, সেই অবাঞ্ছিত দলের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠলেন— ‘রাজেনদা, এ কলির ভীমকে কোথা থেকে পেলেন? পায়ে পাথর বেঁধে না রাখলে ঝড় দিলে উড়ে যাবে যে!’ কথাটা শাণিত ছুরির মতো গিয়ে বিঁধল আমার মনের ওপর।

    আর একজন মন্তব্য করলেন— ‘একেবারে নতুন আমদানি হয়েছে যে গাঁ থেকে!’

    একেই নার্ভাসনেস আর উত্তেজনায় আমার আগেই হাত পা ঠাণ্ডা হতে আরম্ভ করেছিল, এ ধরনের মন্তব্য শুনে শুরু হল কাঁপুনি।

    ঠিক এমনি সময় পরিচালক নির্দেশ দিলেন— ‘অর্ডার! Now you boy, এগিয়ে গিয়ে তোমার patientকে examine করো।’

    অগত্যা গেলাম এগিয়ে। জলতেষ্টায় তখন আমার গলা শুকিয়ে গেছে।

    নাড়ি দেখবার জন্যে প্রভা দেবীর হাত ধরলাম। আমার ঠাণ্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে প্রভা দেবী চোখ তুলে আমার মুখের দিকে চাইলেন। তারপর বললেন— ‘এ ছেলে অভিনয় করবে কী! এর তো এখনই হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে জমে এসেছে। এ তো কাঁপছে ভয়ে।’

    বলতে বাধা নেই, তখন আমার হাত এত বেশি কাঁপছিল যে প্রভা দেবীও তা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলেন।

    ভিড়ের মধ্যে থেকে মন্তব্য হল— ‘চেহারা দেখেই আমাদের মালুম হয়েছে। আগেই বলেছিলুম এর দ্বারা কিসসু হবে না।’

    আমার দ্বারা হবে না! কথাটা শুনে আমার সারা মন প্রাণ হতাশায় ভরে গেল। কিন্তু কেন হবে না, তা তো কেউ কিছু বললেন না।

  • বার

    বার

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    বার

    সেই ‘কেন’র জবাব আমায় কেউ দিল না বটে, অথচ ফ্লোর ছেড়ে যাওয়াও আমার চলল না। যাব বলে তো আসিনি। এত দীর্ঘদিন ধরে যা কল্পনা করেছি, যে স্টুডিও ছিল আমার ধ্যান, জ্ঞান, স্বপ্ন, সেই স্টুডিওর ফ্লোর আমায় ছেড়ে যেতে হবে!

    কিছুতেই না। সুযোগ যখন পেয়েছি তখন তাকে ছাড়া, কিছুতেই চলবে না। যাক, সেদিনে ঘেমে গিয়েও পরিচালকের নির্দেশমতো ছবির কাজ করে গেলাম। কাজের শেষে সেই ভিড়-করা লোকেরা আমাকে প্রশ্ন করলেন— ‘আর কোনো ছবিতে কাজ করেছ? না, এই প্রথম?’

    আমি বলি— ‘না, আরও দুটো ছবিতে কাজ করেছি।’

    তার মধ্যে থেকে আর একজন বললেন— ‘কিন্তু মানিক, দেখে যে মনে হচ্ছে একেবারে নতুন। মা’র কাছে মামার বাড়ির গল্প! আমরা যে বাবা রোজ সেই বারোটা থেকে এখানে বসে থাকি, প্যাক আপ (স্টুডিওর কাজ শেষ হয়ে গেলে জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়াকে ‘প্যাক আপ’ বলে) না হওয়া অবধি।’

    আমি বলি— ‘ইচ্ছে না হয় বিশ্বাস করবেন না। তবে দেখুন, পরিচালক রাজেনদা কিন্তু বিশ্বাস করেন, তাঁকেই একবার জিজ্ঞেস করে দেখবেন।’

    এবারে বোধহয় কাজ হল।

    তাঁদের মধ্যে একজন বললেন— ‘আরে, অত করে জিজ্ঞেস করার কী আছে! ছোঁড়াটা বলছে যখন, তখন কি ভুল কথা বলছে! নিশ্চয় দু’একবার নেমেছে।’

    সেদিনকার মতো ব্যাপারটা সেখানে চুকে গেলেও, চুকল না পরের দিন।

    আবার স্টুডিওতে গিয়ে দেখি, সেই তাঁরাই সকলে বসে রয়েছেন ‘সেটে’।

    মনে মনে বেশ বিরক্ত হলাম। ভাবলাম, পরিচালক বা প্রযোজক এদের কেন ‘সেটে’ আসতে দেন! তাড়িয়ে দিতে পারেন না!

    কিন্তু আমি মনে করলেই তো, তা হবে না।

    আমাকে দেখেই একজন বলে উঠলেন— ‘হিয়ার কামস নিউ দুর্গাদাস!’

    দুর্গাদাসবাবুর অপূর্ব অভিনয়ের কথা শুনেছি। ‘পরশমণি’, ‘প্রিয়বান্ধবী’ প্রভৃতি দু একটা ছবিও দেখেছি। দেখে বুঝেছিলাম কী অপূর্ব নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি অভিনয় করতেন। দর্শকদের মন কেড়ে নেবার কতখানি তাঁর ক্ষমতা ছিল!

    একজন সেটাকে ঠিক করে বললেন— ‘দুর্গাদাস, না না, তার চেয়ে বরং বল, ছবি বিশ্বাস। ভবিষ্যতে ও-তো ওনারই পদ নেবে।’

    মনে হল থাক আমার অভিনয়। থাক আমার সবকিছু পড়ে। আমি ফিরে যাই আমার সেই পোর্ট কমিশনার্স অফিসে।

    কিন্তু, কেন বার বার এই উপহাস! পাড়াতে অভিনয় করে বা একবার দুবার এক্সট্রার মধ্যে থেকে স্টুডিওর সম্বন্ধে আমার যে ধারণা হয়েছিল, তা তো একেবারে পাল্টে গেল। অভিনয় করা যতটা সোজা মনে করেছিলুম ততটা সোজা তো নয়!

    অভিনয় সোজা হলেও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিকে আমাকে এখন জয় করতে হবে। তাই মনে মনে বিরক্ত হয়েও মুখে ভাব দেখাই অন্যরকম।

    পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বার করে বলি— ‘আসুন, নিন!’

    অমনি চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে আমার সিগারেটের প্যাকেট গেল শূন্য হয়ে। তা যাক, তাতে দুঃখ নেই।

    সিগারেট ধরিয়ে যে ক’জন সেখানে বসেছিলেন তাঁরা ধোঁয়া ছেড়ে বলেন— ‘না হে ছোকরা, নার্ভাস হয়ো না। তোমার এলেম আছে। হলেও হতে পারে।’

    আমি তাঁদের আরও আপ্যায়িত করে বলি— ‘আপনাদের বুঝি সকলের সঙ্গে আলাপ আছে?

    ওঁদের মধ্যে একজন জবাব দিলেন কথার।

    — ‘আলাপ মানে? অহীন্দ্রবাবু, ছবিবাবু থেকে সকলের সঙ্গেই আমাদের বন্ধুত্ব। খাতিরও আছে। সব পরিচালকদের সঙ্গে আমাদের আলাপ আছে। যদি ছবির চান্স চাও তাহলে আমাদের সঙ্গে খাতির রাখো—আমরা যা বলি তাই করো। তারপরে তুমি স্রেফ লক্ষ করো তোমার কী হয়ে গেছে।

    বুঝলাম আমার প্রথম ওষুধ কাজে লেগেছে। মুখে বলি— ‘তা তো নিশ্চয়! আচ্ছা, কতদিন ধরে আপনারা এরকম স্টুডিওতে যাতায়াত করছেন?’

    এক ভদ্রলোক বলেন— ‘অনেকদিন ধরে। এই যাতায়াত আছে বলেই আমাদের সকলকার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হয়েছে কিনা।’

    একটু আগেই সেদিন স্টুডিওতে গিয়েছিলাম। ‘মেকআপ-ম্যান’ তখনও এসে পৌছোয়নি। তাই হাতে খানিকটা সময়ও ছিল। সেই ভদ্রলোককে লক্ষ্য করে বলি— ‘চলুন না, একটু চা খাওয়া যাক।’

    তাঁদের মধ্যে আর একজন বলেন— ‘চা খাওয়াবে, তা বেশ চলো।’

    আমি বলি— ‘আমার মতো লোক আপনাদের আর কী করতে পারে বলুন! তবে হ্যাঁ, ওই চা খাওয়ার ফাঁকে আলাপটা একটু জমিয়ে নেব। কারণ বুঝতেই তো পারছি এ লাইনে উন্নতি করতে গেলে আপনাদের সাহায্য ছাড়া হবে না।’

    একজন আমার কথায় সায় দিয়ে বললেন— ‘বিলক্ষণ, ছোকরাকে যতটা বোকা বলে মনে হয়েছিল, ততটা বোকা নয় হে হরিশ!’

    এই হরিশ বা হরিশদা ছিলেন এই দলের পাণ্ডা-গোছের লোক।

    আমার আপাদমস্তক ভালো করে লক্ষ করে তিনি বললেন— ‘হ্যাঁ, হতে পারে।’

    আমি বলি— ‘যাক ওসব কথা, চলুন না চা খাওয়া যাক।’

    চা, টোস্ট, ডিমের ওমলেট, পাশেরই একটা ক্যানটিন থেকে তাঁদের খাওয়ালাম। আরও দু প্যাকেট সিগারেট কিনে তাদের পরিতুষ্ট করলাম।

    এইসমস্ত করতে গিয়ে আমার পকেটে যা ছিল তা একেবারেই নিঃশেষ হয়ে গেল। স্টুডিও থেকে ফেরবার বাসভাড়াটুকুও পর্যন্ত রইল না।

    না থাক ক্ষতি নেই, হেঁটেই ফিরব। বড়ো জোর এক ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা সময় যাবে। তাতে কী হয়েছে। এই ধরনের লোকগুলোর হাত থেকে তো অব্যাহতি পাওয়া যেতে পারে। আর তাছাড়া আমার সম্বন্ধে অনবরত বিরুদ্ধ মন্তব্য শুনলে পরিচালক প্রযোজকরাই বা কী ভাববেন! যদি রাগ করে আমাকে তাঁরা বাদ দিয়ে দেন!

    তাই আমাকে করতেই হবে এঁদের মনতুষ্টি!

    সেদিন কিন্তু স্যুটিং-এর সময় দেখলাম একটা অদ্ভুত ব্যাপার। যাঁরা আগের দিন বলেছিলেন—আমার দ্বারা এতটুকু অভিনয় করা সম্ভবপর হবে না, আমি নাকি একেবারে গেঁইয়া,—তাঁরাই মনিটারের সময় ‘বাঃ চমৎকার’, ‘বেস্ট অ্যাকটিং’ বলে আমাকে উৎসাহিত করলেন।

    উৎসাহের আতিশয্যে কেউ কেউ বা পরিচালককে লক্ষ্য করে বললেন— ‘এ ছেলে আপনার বইতে বেস্ট অ্যাকটিং করবে দেখবেন। বই যদি চলে ওরই জন্যে চলবে।’

    আমি মনে মনে বুঝলাম—এ আর কিছুই নয়, সকালবেলার চা, টোস্ট আর সিগারেটের ফল।

    যাইহোক, সেদিনটাও ভালোয় ভালোয় স্যুটিং হয়ে গেল।

    আমি কিন্তু চা আর সিগারেট উপহার দিতে ভুলি না। অবশ্য একদিন ‘ওরে যাত্রী’র স্যুটিং শেষ হয়ে গেল। বই তখন দেখানোর জন্য প্রস্তুত হতে লাগল।

    ভেবেছিলাম, প্রথম ছবির থেকেই আমি দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারব। কিন্তু আমার এমনি দুর্ভাগ্য, ‘ওরে যাত্রী’ দর্শকরা নিলেন না, দু তিন সপ্তাহ চলবার পর ছবি হল বন্ধ।

    আমারও হয়ে গেল মন খারাপ। আবার যাই অফিসে। মন বসাবার চেষ্টা করি কাজে। কিন্তু মন আর বসে কই!

    দুপুরবেলায় কাজ করতে করতে অলস মুহূর্তে নিজের কানে যেন শুনতে পাই স্টুডিওর ‘ক্ল্যাপাস্টিক’ টানার আওয়াজ, ডিরেক্টারের ‘রেডি’ বলার শব্দ। চমকে উঠে সামনের দিকে চেয়ে দেখি কোথায় বা স্টুডিওর ফ্লোর, কোথায় বা কী! আমি বসে রয়েছি আমাদেরই অফিসের চেয়ারে।

    ওপরওয়ালার কাছ থেকে একটা স্লিপ নিয়ে বেয়ারা এসে ডাকছে — ‘অরুণবাবু, এ অরুণবাবু!’

    মুহূর্তের মধ্যেই স্টুডিওর উত্তমকুমার হয়ে যায় পোর্ট কমিশনার্সের ‘অরুণবাবু’।

    শ্লিপটা হাতে নিয়ে বলি— ‘তুই যা, আমি দেখছি।’

    এরপরে আমার জীবনে সুযোগ আসে ‘কামনা’33 ছবিতে একেবারে নায়কের পার্টে। সুযোগ অবশ্য করে দেন ছবির পরিচালক শ্রীনবেন্দুসুন্দর ব্যানার্জি।

    আমার অপর দিকে নায়িকার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন ছবি রায়।34

    আগেকার মতনই এবারেও অফিসে ব্যবস্থা করেছিলাম। ছবি তোলবার সময় অফিস থেকেও সাহায্য পেয়েছিলাম প্রচুর। তাই নির্বিঘ্নে ছবিটাও তুলে ফেললাম।

    ছবিতে এবারে পারিশ্রমিক পেলাম ১৫০০ টাকা। ভেবেছিলাম, ছবিটা হয়তো দর্শকরা নেবেন, কিন্তু এবারেও ভাগ্য খারাপ, ছবি চলল না। নায়ক সেজে আমার অভিনয় করার স্বপ্ন, স্বপ্ন হয়েই মিলিয়ে গেল। মনে হল কি আর হবে ছবি করে! নাম তো করতে পারলাম না! দর্শকের মনে রেখাপাতই যদি না করতে পারি, তাহলে আমার অভিনয় করে লাভ!

    কিন্তু একটা কথা আছে, স্বভাব মলেও যায় না! তাই বার বার বাইরে থেকে আঘাত এলেও, আমার মনের ইচ্ছে বোধহয় ম্লান হল না। কেবলই মনে হয়, একটা ভালো ছবিতে যদি কাজ করতে পেতাম! কিন্তু তেমন ভালো ছবি পাই কোথায়? তাছাড়া, যাঁরা ছবি তুলবেন তাঁদেরও আমায় পছন্দ হওয়া চাই!

    আবার সেই একটানা হতাশা আমাকে পেয়ে বসতে লাগলো। এমনি সময় খবর পেলাম, সরোজবাবু অর্থাৎ সরোজ মুখার্জি35 নায়ক খুঁজছেন। ওঁরা প্রথমে প্রদীপবাবু36 কে এই বই-এর নায়ক মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু অন্য একটা ছবির কাজে প্রদীপবাবু আটকে যাওয়ায়, তাঁকে তখন পাওয়া গেল না। তাই তাঁদের এখন একজন নায়ক প্রয়োজন।

    আমি গিয়ে দেখা করলাম। বললাম আমার সব কথা। ওরা শুনলেন। শুনে কী ভেবে রাজিও হয়ে গেলেন আমায় নিতে। কেবল একটা শর্ত হল আমি এই ছবিতে উত্তমকুমার নামে অভিনয় করতে পারব না।

    এ ছবিতে আমার নামকরণ হলো অরূপকুমার। ছবির কাজ পুরোদমে চলছে। ঠিক সেইসময় ‘এম. পি.’র37 ম্যানেজার বিমল ঘোষ মহাশয় ‘এম. পি.’র জন্য নতুন নায়ক খুঁজছেন।

    ওঁরা অসিতদাকে নিয়ে একটা ছবি করবার মনস্থ করেছিলেন কিন্তু কী জানি কেন সেটা আর সফল হয়নি।

    বিমলবাবু একদিন এলেন স্টুডিওতে। আমাকে দেখে ওঁদের পছন্দও হয়েছিল। কিন্তু উনি যে আমাকে দেখেছিলেন, সেকথা আমি তখন জানতে পারিনি। জেনেছিলাম পরে। ছবিতে পাহাড়ীদাও কাজ করছিলেন, তাঁকেই আড়ালে নিয়ে গিয়ে বিমলবাবু প্রশ্ন করেন— ‘ছেলেটি কেমন অভিনয় করে? চলতে পারে কি?’

    উত্তরে নাকি সেদিন পাহাড়ীদা বলেছিলেন— ‘আমার তো মনে হয় ঘষলে মাজলে ভালোই হতে পারে।’

    বিমলবাবু যেমন নীরবে এসেছিলেন সেইরকম নীরবেই আমাকে দেখে চলে গেলেন। আমি জানতেও পারিনি তাঁর উপস্থিতি।

    সরোজবাবুর ‘মর্যাদা’ ছবির কাজও শেষ হয়ে গেল। ভাগ্যে অবশ্য এবারেও আমার সেই একই ফল। ছবি ‘ফ্লপ’ করল, দর্শকে নিল না।

    ভাবলাম ফিল্ম লাইন ছেড়েই দেব। অবশ্য সংসারে তখন টানাটানি বেড়েছে। রোজগার করবার মধ্যে বাবা আর আমি। জিনিসপত্রের দাম তো হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। বরুণ, তরুণ দুজনেই তখন স্কুলে পড়ে। আমার আয় বাড়ানোর দরকার। তাহলে মা একটু শান্তি পান। মুখ বুজে কী অমানুষিক পরিশ্রমই না করেন!

    কিন্তু আয় বাড়াবার উপায় কিছু খুঁজে পাই না। আমার মতন বিদ্যেতে যা করা সম্ভব তা আমি করছি।

    টেনেটুনে বি. এ. টা যদি পাস করতে পারি, তাহলে কাজের আর একটু উন্নতি হতে পারে। কিন্তু বি. এ. পাস! সেও তো সোজা নয়!

    এমনি যখন আমার মনের অবস্থা তখন হঠাৎ এল মুরলীবাবুর ‘এম. পি.’ থেকে একখানা চিঠি। তাঁদের ধর্মতলা অফিসে আমায় গিয়ে দেখা করতে বলা হয়েছে। ভাবলাম, কী হবে গিয়ে। সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এতগুলি ছবি করলাম। কী হল। এমনি সময় তরুণ আর বন্ধু তারাপদ একরকম জোর করেই আমাকে পাঠিয়ে দিলেন ‘এম. পি.’র অফিসে।

    সেদিন তরুণ আমাকে বলেছিল— ‘দাদা, এম. পি.তে যখন চান্স পাচ্ছ ছেড়ো না। ভালো কোম্পানি, দেখোই না একবার গিয়ে, কী হয়!

    সেদিন একরকম ওরই উৎসাহে দুপুরবেলা অফিস থেকে ছুটি নিয়ে গিয়েছিলাম ‘এম. পি.’র অফিসে। গিয়ে দেখি, একটা ঘরের মধ্যে একদঙ্গল ছেলে আর মেয়ে বসে রয়েছে। তার মাঝখানে একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে উচ্চৈঃস্বরে কী যেন বলছেন।

    পরিবেশ দেখেই আমার স্টুডিওর কথা মনে পড়ে গেল। আবার সেই ‘ফড়ের’ দল! চা আর সিগারেট দিয়ে যাদের সন্তুষ্ট করতে হবে! কিন্তু ইনি কে? চিঠিখানা দিলাম তাঁর হাতে।

    চিঠিখানা পড়ে ভদ্রলোক আমার আপাদমস্তক ভালো করে আবার দেখলেন। তারপর একরকম তিক্তকণ্ঠেই প্রশ্ন করলেন— ‘আপনার নামই উত্তমকুমার?’

    আমি জবাবে বলি— ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

    — ‘অভিনয় করা নেশা, না পেশা?’

    বিরক্তিতে ভরে গেল মন। তবুও সংযত হয়ে জবাব দিলাম— ‘আপাতত নেশা, পরে সুবিধে হলে পেশা করতে আপত্তি নেই।’

    — ‘আচ্ছা দেখা যাক, আপনাকে নিয়ে কী করা যায়, আসুন এ ঘরে।’

    আমিও ধীরে ধীরে ভদ্রলোকের সঙ্গে গেলাম।

  • তের

    তের

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    তের

    অনেকে মনে করেন অভিনেতার জীবন বড়ো সুখের, বড়ো আরামের, যেন নরম ফুল দিয়ে বিছানো। এর প্রধান কারণ শখের দলে এক—আধ দিনের জন্যে অভিনয় করতে সকলেরই ভালো লাগে। তাতে উত্তেজনাও প্রচুর আছে, সেকথা স্বীকার করতে হবে। কিন্তু সেই অভিনয় যখন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলতে থাকে, তখন আর তার মধ্যে আনন্দ থাকে না। একথা আমি আগে বলেছি ‘শ্যামলী’র অভিনয় থেকে যখন বিদায় নিয়েছিলাম তার কারণ হিসেবে।

    আপনারা হয়তো বলবেন, বাপু হে, তুমি তো অভিনয় করছ ক্যামেরার সামনে। সে ক্যামেরা চলতে শুরু করে, যখন তুমি তাকে চলতে বলো। আর এতে তোমায় একটানা অভিনয় করতেও হয় না। সামান্য কয়েকটা মিনিট—তাতে আবার কষ্ট কী? আমি বলব—এ সামান্য কয়েকটা মিনিটের পেছনে থাকে বিরাট প্রস্তুতি। হয়তো দশটায় স্যুটিং আরম্ভ হবার কথা, সাড়ে নটার মধ্যে আপনি স্টুডিওতে পৌঁছেছেন, মেকাপ করেছেন। সেটে পৌঁছেছেন। হয়তো সেদিন আপনাকে একটা হাসির দৃশ্যে অভিনয় করতে হবে, কিন্তু মুশকিল বেধেছে আপনার নিজেকে নিয়ে। হাসি আর সেদিন আপনার ফুটছে না, পরিচালকেরও মনোমতো হচ্ছে না। ফলে সে দু’মিনিটের দৃশ্য তুলতে লেগে গেল দু’ঘণ্টার ওপর।

    কেন এমন হয়?

    এই দেহের পিছনে মন বলে আমাদের একটা পদার্থ আছে। সেই মনটা ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায় আমাদের শরীরটাকে। সেই মনটাই মাঝে মাঝে মহা অনর্থ সৃষ্টি করে বসে। একদিন হয়তো ঘুম থেকে উঠেই দেখলেন, আপনার মনটা অকারণে দুঃখে ভরে রয়েছে। বাড়িতে এটা—সেটা করতে যান। এদিকে স্টুডিওতে যাবারও সময় হল। স্টুডিওতে এসেও, যে চরিত্রে আপনি অভিনয় করবেন, তা ভাববার সময় আপনি পাবেন না। মেকাপ—রুমে যান, বন্ধুবান্ধব এসে কথা বলছেন, কারোকে আপনি না বলতে পারছেন না। না বলাটা অভদ্রতা —তাঁরাই বা কী মনে করবেন। ফ্লোরে গেলেন, সেখানেও ঐ একই অবস্থা। স্যুটিং হচ্ছে, এদিকে গালগল্পও চলছে। আপনার ডাক এলো, চরিত্র নিয়ে আপনি চিন্তাও করেননি ইতিপূর্বে। তাই পরিচালক চরিত্রচিত্রণে মুখের ওপর যেমন অভিব্যক্তি চান, তেমনটি আপনার মুখে আর ফুটছে না। কারণ ইতিপূর্বে আপনার মনঃসংযোগ হয়নি। তাই খাটুনিও বেড়ে চলল। সে খাটুনির কোনো মাপকাঠি নেই।

    আমার মনে হয়, অভিনেতা যখন মেক—আপ নিতে শুরু করেন, তখন থেকে পরিচালক বা সহকারী পরিচালক যদি শিল্পীদের কাছে এসে তাঁদের চরিত্র সম্বন্ধে ভালো করে বুঝিয়ে দেন বা সেই ঘটনার মধ্য দিয়ে তাঁরা দর্শককে কী বোঝাতে চাইছেন, সেটুকু আলোচনা করেন, তাহলে অভিনয়ের মান আরো উন্নত হতে পারে এবং কম খাটুনিতেও ছবি তোলা সম্ভব হতে পারে। একথা বলছি তার কারণ হচ্ছে, যিনি যখন যে চরিত্রে অভিনয় করবেন, সাময়িক হলেও তাঁর নিজেকে ভুলে যেতে হবে। ভাবতে হবে সেই চরিত্রই আমি। এই চিন্তা তাঁর মধ্যে যত স্পষ্ট হয়ে উঠবে তাঁর চরিত্র—রূপায়ণ তত ভালো হবে।

    এই ক্ষেত্রে একটা কথা বলি। ‘সপ্তপদী’র কৃষ্ণেন্দুর চরিত্র বা ‘দুই ভাই’38 এর উৎপল—এর চরিত্র—দুটো চরিত্রই আমার ভালো লেগেছিল। অভিনয় করে আমি নিজেও আনন্দ পেয়েছি। ইদানীং রোম্যাণ্টিক চরিত্রে অভিনয় করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তারাশঙ্করবাবুর কৃষ্ণেন্দুর চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে দেখি সেখানে রয়েছে নতুন কথা— মানুষকে ভালোবাসো, মানুষের ঊর্ধ্বেও আর একজন আছেন যিনি আমাদের চালিয়ে নিয়ে চলেছেন, তিনি আমাদের ভালোই করেন, কখনও মন্দ করেন না। মানুষের মধ্যে কৃষ্ণেন্দুকে তাঁর প্রকাশ দেখে।

    নৃপেন্দ্রকৃষ্ণের39‘দুই ভাই’এর উৎপলের চরিত্রের মধ্যেও তেমনি নতুনত্ব দেখেছি। সে বড়োভাই, প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে তার ছোটোভাই কমলকে। তার কল্পনা অনুপাতে সে ছোটোভাইকে মানুষ করতে চায়। কিন্তু ছোটোভাই তার কল্পনা নিচ্ছে না। সে কালের চাকায় গড়িয়ে চলেছে, লাগল ভালোবাসার সঙ্গে সংঘাত। সবটুকুর মধ্যেই রয়েছে ভালোবাসা। দুঃখ, বেদনা, হাসি,—সবগুলোই গাঁথা রয়েছে এক সূত্রে। হয়তো মনের কোনো গোপন অজানা আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে হয়েছে তার মিল। তাই আনন্দ পেলাম এই চরিত্রদুটোতে অভিনয় করতে।

    এখন কথা হল এ দুটো চরিত্র আমার নয় মনোমতো হয়েছে। এমন তো বহু চরিত্রে আমাকে অভিনয় করতে হয়, যা আমার মনোমতো হয় না। তখনই প্রয়োজন হয়েছে মনঃসংযমের এবং সেইজন্যই বলছিলাম পরিচালক বা সহকারীদের উচিত বারবার অভিনয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে অভিনেতা—অভিনেত্রীর সঙ্গে আলোচনা করা, যাতে চরিত্র বুঝতে এতটুকু দেরি না হয়।

    শ্রদ্ধেয় নাট্যাচার্য এ বিষয়ে বলতেন—’যখন তুমি যে চরিত্রে অভিনয় করবে, তখন পর্দা উঠলে তুমি মনে করবে তুমি সেই। তোমার সত্তাকে তুমি একেবারে দেবে ডুবিয়ে।’ অদ্ভুত অভিনেতা ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি অভিনয় করতেন সাজাহান40আর ঔরঙ্গজেব41, আলমগীর42 আর রাজসিংহের43 চরিত্রে। সাজাহান স্নেহবৎসল ঔরঙ্গজেব কঠোর, কুটিল; সাজাহান পুত্রস্নেহে পাগল, ঔরঙ্গজেব স্বার্থসিদ্ধির খাতিরে ধর্মের ভান করে। তেমনি আলমগীর কুটিল হলেও সত্যাশ্রয়ী আর রাজসিংহ যুদ্ধপ্রিয় হলেও সরল, উদার। এই ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় তাঁর পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল।

    মনঃসংযম দিয়ে তিনি বদলে ফেলতেন নিজেকে। এ যেন একই মানুষের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা ডক্টর জেকিল44 আর মিস্টার হাইড45। তাই আজও তিনি যুগান্তকারী অভিনেতা— তিনি সত্যিকারের একজন সাধক।

    তাই বলি অভিনয় ছেলেখেলা নয়। দুটো ছবিতে নিজেকে সুন্দর করে সাজিয়ে, দু-চারটি নায়িকার সঙ্গে রোম্যাণ্টিক দৃশ্যে অবতীর্ণ হয়ে, দম্ভভরে ভালো জামা গায়ে দিয়ে গাড়ি চড়ে রাস্তায় বা লোকের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে চলে গেলাম—কিছু স্কুল-কলেজের পড়ুয়া ছেলে একটু টীকাটিপ্পনী কাটল বা কিছু রঙিন মুখে তাকিয়ে হাসল বা একটু উচ্ছ্বাস দেখাল, এটা অভিনয়ের মূল কথা নয়। অভিনয়, সাধনার বস্তু। এ রসে যারা একবার মজেছে তারাই মরেছে।

    এ প্রসঙ্গে প্রবীণ অভিনেতা তুলসীদা মানে তুলসী চক্রবর্তীর46 মুখে আমি একটি গল্প শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সে যুগের স্টেজ সম্বন্ধে তুলসীদা যা বলেন সেগুলো গল্প নয়—সেগুলো সত্য ঘটনা। তিনি বলেছিলেন যে তখনকার দিনে কোনো একজন অভিনেতা, নামটা আমার ঠিক মনে নেই, জয়দেব চরিত্রে অভিনয় করতেন। দিনের পর দিন যায়। তিনি ভক্তিরসে নিজেকে আপ্লুত করার চেষ্টা করেন। সেই ভক্তিরসে ডুবতে গিয়ে তিনি শেষে মজে গেলেন। একদিন দেখা গেল তিনি আর স্টেজে এলেন না, কৃত্রিম পথে ভগবানকে না পেয়ে অকৃত্রিম পথে তিনি ছুটলেন ভগবানের পিছনে। কিছুদিন খোঁজ তল্লাসির পর তাঁকে পাওয়া যায় পুরীর রাস্তায়,— মুখে ঠিক সেই অভিব্যক্তি— সেই বাণী—হা প্রভু! হা জগন্নাথ! তারপর শোনা যায় যে, যে—মুহূর্তে তিনি জগন্নাথ—মন্দিরে পদার্পণ করেন সেই মুহূর্তে তাঁর প্রাণবায়ু নির্গত হয়। আপনারা বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, কিন্তু এটা সত্যি ঘটনা। তুলসীবাবু শ্রদ্ধেয়, মাননীয় এবং আমি তাঁর কথা সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করি— বিশেষ করে তিনি যখন পুরোনো দিনের স্টেজের কথা বলেন।

    তাছাড়া এসব কথা নিয়ে কেউ মশকরা করে না বলেই আমার ধারণা। এই থেকে বুঝতে পারা যায়, সৎ চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে যদি সে সত্যি চরিত্র ফুটিয়ে তোলার জন্য চেষ্টা করে, তবে আখেরে সে সৎই হয়ে যায়।

    এই প্রসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের বলা একটা কথা মনে পড়ল। তিনি বলতেন, ‘মন ধোপা ঘরের কাপড়। একে যে রঙে রাঙাবে সেই রঙ হবে।’

    এতেই বোঝা যাবে তুলসীদা যে ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে বুজরুকি থাকা সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, সৎ অভিনয় মানুষকে দেবতার স্তরে তুলে নিয়ে যেতে পারে।

    যাক সে কথা।

    অভিনয়ের কথা বলতে বসে অভিনয় থেকে অভিনেতার চরিত্রের পরিবর্তনের সম্ভাবনা অবধি আলোচিত হয়ে গেল। এখন অভিনেতাদের মধ্যে বিশেষ করে বিদেশি অভিনেতাদের মধ্যে কাকে আমার ভালো লাগে বলছি।

    বলছি আমি এই কারণে, কেন অভিনয়টাকে আমি শিল্প বলে গ্রহণ করতে পেরেছি। যাঁর কথা বলব, যাঁকে আজও আমি আমার সর্বান্তঃকরণ দিয়ে শ্রদ্ধা করি, তিনি আজ জীবিত নেই। তবুও তাঁর সুক্ষ্ম অবস্থিতি আমি প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করি।

    সেই চিরস্মরণীয় অভিনেতার নাম রোনাল্ড কোলম্যান।47 ‘Double Life’এ তাঁর অভিনয় দেখতে দেখতে আমি অভিনেতাকে হারিয়ে ফেলে নায়কের সুখদুঃখের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে ফেলেছিলুম। এখনও মনে হয় এ কি করে সম্ভব হয়, আর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে— বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি—

  • চোদ্দ

    চোদ্দ

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    চোদ্দ

    হ্যাঁ, যা বলছিলাম। অভিনয়ের কথা। অভিনয় করতে করতে মনের পরিবর্তনের কথা। তুলসীদার মুখ থেকে যেমন ওই কথা শুনেছি তেমনি ছেলেবয়সে যাত্রা দেখতে দেখতে এর কিছুটা প্রমাণও পেয়েছি।

    একবার ছেলেবয়সে যাত্রা দেখতে গিয়েছিলাম, শ্রীগৌরাঙ্গ সম্বন্ধীয় কোনো যাত্রা অভিনয় হচ্ছিল। অভিনয় জমে উঠেছে।

    যে ভদ্রলোক ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’র পার্ট করছিলেন তিনি নিমাই—এর গৃহত্যাগের দৃশ্যে অঝোরধারায় কাঁদতে লাগলেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি এতটা আত্মহারা হয়ে গেলেন যে, সেই সভাতেই হঠাৎ তিনি অচেতন হয়ে পড়ে গেলেন।

    সকলে তো ত্রস্ত,—কী হল কী হল! দলের লোক জানতেন। তাঁরা তাড়াতাড়ি তাঁকে সভা থেকে তুলে নিয়ে গেলেন। শুশ্রূষার পর তাঁর আবার জ্ঞান ফিরে এল। শুনেছিলাম সেইবার প্রথম নয়, এমনটি নাকি তাঁর প্রায়ই হয়। বড়ো আশ্চর্য লেগেছিল তখন। কিন্তু আজ আর কোনো বিস্ময় জাগে না। মনে হয় সবই সম্ভব।

    অপরদিকে দেখেছি দীর্ঘদিন স্বামী—স্ত্রীর অভিনয় করতে করতে অভিনেতার মনেও এসেছে লোভ, এসেছে আকাঙ্খা।

    যেমন ধরুন, এক নায়িকার সঙ্গে দীর্ঘদিন আপনি ভালোবাসার অভিনয় করছেন। তিনি করছেন আপনার সঙ্গে অভিনয়। পরিচালক আপনাদের অভিনয় দেখে খুশি হয়েছেন।

    বললেন— ‘অদ্ভুত জীবন্ত হচ্ছে!’ উৎসাহ আপনার বেড়ে গেল। আপনি লক্ষ করলেন অপর দিকের উৎসাহও কম নয়। সারাদিন অভিনয়ের পর আপনি হয়তো ফিরছেন বাড়িতে। বাড়ি ফেরার পথে এই চিন্তাটা আপনাকে পেয়ে বসল— যার সঙ্গে সারাদিন ধরে ভালোবাসার অভিনয় করলেন সেটা কি শুধু অভিনয়? না তার মধ্যে কিছু সত্যতা আছে?

    মনের মধ্যে আবার কল্পনার রং ভেসে উঠল। তার মনের অবস্থা কেমন? জানতে পারলে বড়ো ভালো হয়।

    এই প্রসঙ্গে এক বিখ্যাত মনস্তাত্ত্বিকের কথা না বলে পারছি না। তিনি বলেছিলেন— ‘মানুষের দেহই বুড়ো হয়, মন কখনও বুড়ো হয় না। তবে সব মানুষ যে নিজেকে সংযত করে রাখে তার কারণ সামাজিক বন্ধন।’

    যখন পড়েছিলাম তখন ওই কথায় গুরুত্ব দিইনি বুঝতেই পারিনি এর অন্তর্নিহিত অর্থ। পরে বুঝেছিলাম এটা কতদূর সত্য।

    যাক যে কথা বলছিলাম। আপনার ভেতরের ‘হিরো’,—হিরোই বলুন আর তাকে ‘সেক্স’ই আখ্যা দিন, আমি সে বলতে চাইনা,—সেই সত্তাটা হঠাৎ জেগে উঠবে—’ওকে না পেলে জীবন আমার দুর্বিষহ হয়ে যাবে।’ মনের এই অহরহ তাগাদা আপনাকে অস্থির করে তুলবে। বাস্তবে তার প্রতিফলন চাইবে। আপনি ঠিক করলেন, পরের দিন স্টুডিওতে গিয়েই তাকে এই কথা জিজ্ঞাসা করব— তার মধ্যেও কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কিনা। সে—ও এ জিনিসকে অনুমোদন করে কি না!

    আপনি ঠিক করেই ফেললেন। পরের দিন আপনি স্টুডিওতে আগে এলেন। সবাই দেখে উৎসাহিত হয়ে বলল, ‘আজ এত সকাল সকাল?’

    এসে থেকে আপনার হতে লাগল অস্বস্তি। কী হবে, কী উত্তর পাবেন!

    যদি অসংযত কথা বলার জন্য অসম্মানিত হন? তখন আপনি কী করবেন? এইরকম একটা উৎকণ্ঠা নিয়ে আপনি নিয়ে এলেন স্টুডিওতে।

    সারাদিন ভাবলেন, জিজ্ঞেস করা যায় কী করে? অনেক ভেবেচিন্তে একটা প্ল্যানও বার করেছেন। কিন্তু আসল সময়ে দেখলেন, আপনার মন চাইছে না সে প্রশ্ন করতে। কারণ সামাজিক বন্ধন।

    শুধু সামাজিক বন্ধনই নয়, ঘরে আপনার স্ত্রী আছেন, আত্মীয়স্বজন সকলেই আছেন। তাঁদের চোখের জল আর দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কথা ভেবে আপনি আর এগিয়ে যেতে পারলেন না। আসল ব্যাপারটা আমার মনে হয়, যাঁরা সত্যিকারের ভালোবাসা পান, সেবা পান, যত্ন পান, তাঁরা বোধহয় আগের ভালোবাসা কাটিয়ে আর এগিয়ে যেতে পারেন না। তাঁরা অভিনয়টাকে পেশা হিসাবেই দেখে থাকেন। স্ফূর্তি বা আমোদের সুযোগ হিসেবে দেখেন না। শুনেছি, আগেকার দিনে এসব জায়গাকে কেন্দ্র করে নাকি নানারকম ব্যাপার ঘটত। তবে শোনা কথার উপর কোনো কিছু না বিশ্বাস করাই ভালো। কারণ এই শোনা কথাটাই মানুষের জীবনে অনেকরকম ঘটনা ঘটায়। মানুষকে মরীচিকার পিছনে ছোটায়। আকাশেও তোলে, আবার সময় সময় পাতালেও নামায়। তাই বলছিলাম শোনা কথার গুরুত্ব না দেওয়াই ভালো।

    ধরুন একজন অভিনেতা নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য নিযুক্ত হলেন।

    প্রথম ছবিতে তিনি বেশ সুন্দর অভিনয় করলেন। দর্শকও নিলেন। ব্যস, দু’চারটে প্রশংসার কথা শুনে তাঁর ধারণা হল তিনি মস্ত অভিনেতা। অভিনয়ের অনুশীলন আর তাঁর প্রয়োজন নেই। দম্ভভরে চলতে আরম্ভ করলেন। অভিনয়ের অনুশীলন ছেড়ে দিলেন। তিনি ভাবলেন, আমি যা অভিনয় করব তাই দর্শকরা নেবেন। কিন্তু তারপর দেখা গেল দু’ তিনখানা ছবি দর্শক নিলেন না।

    এমনটি ঘটলে ধর্মতলার অফিস1 গুলো তাঁকে আর ডাকবে না। তিনি যখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে সচেতন হলেন, তখন আর সময় নেই। সব সুযোগই চলে গেছে।

    একথা বলতে পারছি, কারণ প্রথম দিকে দর্শক আমাকে নেননি। তাই অভিনয়ে নিষ্ঠার দাম আমি বুঝেছিলাম।

    আজ যত প্রশংসাই শুনি না কেন, অভিনয়ের ব্যাপারে আমি খুব জেনে গেছি, এ ধারণা আমার কখনও হয় না।

    কিংবা কোনো নাটক শুধু আমার জন্যই চলছে, এ বিশ্বাসও আমার হয় না। কারণ আমি জানি ফুটবলের একজন খেলোয়াড়ের একলার সাধ্য নেই একটা দলকে জিতিয়ে দেওয়ার, তিনি যত ভালোই খেলুন না কেন। একথা যেমন আমি জানি, তেমনি জানেন আপনারাও। একইভাবে ছবির কাহিনি যদি দুর্বল হয় বা চিত্রনাট্য যদি মানুষের মন স্পর্শ না করতে পারে, তাহলে শত ভালো অভিনেতা হলেও ছবি চলে না। একটা ভালো ছবির সম্পদ, ও দুটোই। ও দুটো একসঙ্গে হলে তবেই ছবি দর্শকরা নেন। তাছাড়া পরিচালক, সাউণ্ড, ক্যামেরাম্যানের কাজও ভালো হওয়া চাই। নইলে কিন্তু ছবি চলা শক্ত।

    ওঁদের দেশের ছবির মধ্যে দেখেছি, যতদূর সাধ্য ওঁরা নিখুঁত করার চেষ্টা করেন। ক্যামেরা, সাউণ্ডের কাজ আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত ধরনের হয়।

    সেইজন্য আমার মনে হয় এ দেশেও যদি ভালো টেকনিশিয়ান তৈরি হয়, তাহলে আরও উন্নত ধরনের ছবি সৃষ্টি করা যেতে পারে।

    প্রসঙ্গত আমি কেবল স্টুডিওতেই অভিনয় করি না। এইতো সেদিন পাড়ার ছেলেরা এসে ধরলো আমাকে—যাত্রা করতে হবে।

    আমি বলি— কী বই অভিনয় করবে তোমরা?

    ওরা বলে —’গয়াসুর’ । আপনাকে নারায়ণের পার্টটা করতে হবে।

    —গয়াসুর, নারায়ণ!

    মনের ভিতর যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। মনে পড়ে গেল, আমি ছোটো ছেলে, স্কুলে পড়ি। আমার জীবনের প্রথম অভিনয় ‘গয়াসুর’এর ছোটো কৃষ্ণ। সেই প্রথম মুখে রং মেখে এসে মাকে দেখানো।

    পাড়ার ছেলেদের কথায় চটকা ভাঙে— ‘উত্তমদা জগদ্ধাত্রী পূজোর কী হবে। তুমি করছ তো?’

  • পনের

    পনের

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    পনের

    >শীতটা প্রচণ্ড পড়েছে। ‘শিউলি বাড়ি’41 ৫২র স্যুটিং—এর দরুন যেতে হয়েছিল এই ঠাণ্ডাতেও, রাঁচির কাছে একটা শহরে। সারাদিন স্যুটিং—এর পর রাত্রিতে ফিরে এসেছি যে যার আস্তানায়। পাহাড়ি ঠাণ্ডা। সোয়েটার, গরম কোট পরে অবসর সময় কাটাবার জন্যে রেডিওটা খুলে দিলাম। রেডিও—ঘোষক ঠিক সেইসময় ঘোষণা করছেন— ‘বিখ্যাত অভিনেতা তুলসী চক্রবর্তী পরলোকগমন করেছেন।’ নিজের কানকে যেন বিশ্বাস হল না। কিন্তু সেই নির্মম সত্য, আমায় বিশ্বাস করতে হল। পরের দিন খবরের কাগজ পৌঁছতেই দেখলাম সেই একই ব্যাপার—তুলসীদা আর নেই। মনে পড়ল অতীত দিনের কথা।

    ‘কামনা’ ছবির নায়কের পার্ট করবার জন্য আমি মনোনীত হয়েছিলাম। ইতিপূর্বে ছবিতে অনেককে দেখেছি, কিন্তু আলাপ হয়নি কারোর সঙ্গে। হঠাৎ দেখি তুলসীদা তাঁর সুপরিচিত টাকটিকে নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন।

    প্রশ্ন করলেন—’তোমারই নাম উত্তমকুমার, এই ছবির নায়ক?’

    সলজ্জভাবে নমস্কার করে বললাম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

    আমার মুখের দিকে চেয়ে তিনি বললেন—‘দেখে তো মনে হচ্ছে বয়স বেশি হয়নি। লেখাপড়া, অফিস, এসব ছেড়ে এ লাইনে কেন? বলি, ফুর্তি করবার ইচ্ছা আছে নাকি?’

    প্রবীণ অভিনেতার মুখে এ কী কথা! সলজ্জভাবে বলি —‘আজ্ঞে না, অভিনয়কে ভালোবাসি আমি।’

    —‘অভিনয়কে ভালোবাসো? তা হলে স্টেজে যাওনি কেন?’

    কী জবাব দেব?

    বলি—‘আমাকে নেবেই বা কেন?’

    সরাসরি বলতে পারলাম না আমাকে এই ফিল্ম লাইনে ঢুকতে যা বেগ পেতে হচ্ছে তা তো দেখছি। তাতে এ লাইনে আসার শখ বুঝি মিটে যায়!

    মুখে কিন্তু বলতে পারলাম না সেকথা। মনের কথা আঁচ করে নিয়ে তুলসীদা বললেন—‘অভিনয় যদি ভালো লাগে তাহলে অভিনয়কে সাধনা করে নিয়ো হে উত্তম। তবেই জীবনে প্রতিষ্ঠা পাবে।’

    শুরু করলেন তাঁর জীবনের কাহিনি বলতে। তিনি বললেন— ‘মাত্র ন’বছর বয়সে তিনি অভিনয় করতে পারবেন বলে কেমন করে ভিড়ে গিয়েছিলেন একটা সার্কাসের দলে। আউট্রাম ঘাটে তিনি আর তাঁর বন্ধু একদিন দেখলেন একটা দল বর্মা মুলুকে যাবে জাহাজে করে। সঙ্গে তাদের প্রচুর জিনিসপত্র। বর্মা কোথায়, কলকাতা থেকে কতদূর, কিছুই জানা নেই। তবু জানেন দলে ভিড়তে পারলে দর্শকদের অভিবাদন করবার সুযোগ তিনি পাবেন।

    এই আশাতেই তিনি একদিন দেখা করলেন ম্যানেজারের সঙ্গে। মনোনীত হলেন সার্কাসে খেলা দেখাবার জন্যে। জাহাজে উঠে পড়লেন। ঘাট থেকে জাহাজ ছেড়ে দিল।

    ঝোঁকের মাথায় কাজটি করবার সময় তার গুরুত্ব বোঝেননি। বুঝলেন, যখন কলকাতার মাটি ধীরে ধীরে চোখের সামনে থেকে সরে যেতে লাগল। তাও মিলিয়ে গেল দিকচক্রবালে। ক্রমশ জাহাজ এসে পড়ল সমুদ্রের মাঝখানে।

    এ যেন রবীন্দ্রনাথের ‘দেবতার গ্রাস’43 এর রাখালের অবস্থা।—

    ‘জল, জল, জল,

    দেখে দেখে চিত্ত তার হয়েছে বিকল।’

    কিন্তু ফিরে যাবার উপায় নেই, সার্কাসের ম্যানেজারের ভয় রয়েছে।

    এলেন বর্মা মুলুকে। তাঁবুতে খেলাও দেখালেন। খেলা দেখাতে গিয়ে বুঝলেন তিনি যা মনে মনে চেয়েছিলেন এ, তা নয়। কী করেন অনেক কষ্টে এলেন কলকাতায়। স্টার থিয়েটারে যোগ দিয়ে পূর্ণ হল তাঁর মনের বাসনা।

    তারপর বললেন—’জানলে, কত কষ্ট করেছি থিয়েটার করবার জন্যে। তবুও তো একটা বড়ো পার্ট পেলাম না আজ পর্যন্ত। বলি, তোমরা তো একেবারেই হিরো হয়ে এসেছো হে! যেদিন প্রথম একটু বড়ো পার্ট পেলুম,—তাও নতুন বইতে নয়, একজন আসেনি তার জায়গায়, এক রাত্তিরের জন্যে—সেদিন আমার ড্রেসারের কাছে গেলুম মোজা চাইতে। ড্রেসার বলল— ভাগ, একদিনের জন্য পার্ট করবে, তার জন্যে আবার মোজা পায়ে দেবে। সবেদা দিয়ে এঁকে নে।’

    আমি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলাম— ‘তাই করলেন?’

    তুলসীদা বললেন— ‘উপায় কি, চান্স মিস করব ভাই? আর যদি না চান্স পাই! সবেদা আর আলতা দিয়ে বর্ডার এঁকে নেমে গেলাম স্টেজে। তারপর সাতদিন লাগলো পায়ের আলতার দাগ তুলতে।

    যখনই আলতা ধুয়েছি, তখনই মনে মনে আনন্দ হয়েছে যে একটা বড়ো পার্ট করবার সুযোগ পেয়েছি।’

    ওনার কথা শুনে বুঝলাম, কতখানি ভালোবোসেন উনি অভিনয়কে।

    তারপর বললেন—’শুনবে আর একটা গল্প? সেবারে পার্ট পেয়েছিলাম হাকিমের। কথা ছিল নায়িকার নাড়ি টিপে বলব— আর চিন্তার কারণ নেই, রক্ষা পেয়ে যাবেন।’

    মনে মনে কত আশা। ভাবছি ভালোভাবে পার্টটা করতে পারলে চাই কি একদিন হিরোর চান্সও হয়ে যাবে।

    কিন্তু কপাল আমার মন্দ। স্টেজে গিয়ে দারুণ ভয় পেয়ে গেলুম। কারণ নায়ক বা নায়িকা যাদের সঙ্গে পর্দায় অভিনয় করতে হবে, তাঁরা দুজনাই সে যুগের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বা অভিনেত্রী। হাত পা কাঁপতে লাগলো, মাথাটা কেমন যেন ঘুরে উঠলো। তবুও মনটাকে জোর করে রেখেছি— এই অভিনয়ের উপর আমার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

    আমার কথা বলার সময় এলো। কথাগুলো উলটে বলে ফেললাম— “রক্ষার কারণ নেই, চিন্তা পেয়ে যাবেন।” কথাটা বলে ফেলে নিজেও ভালো বুঝতে পারিনি যে ভুল বলেছি।

    প্রশংসা পাবার আশায় নায়িকার মুখের দিকে চেয়ে আছি, সেখানে অসুস্থতার লক্ষণ নেই, চোখে ফুটে উঠেছে আগুন। নায়কের মুখও বিরক্তিপূর্ণ।

    বুঝলাম কোথায় একটা গোলমাল করে ফেলেছি।

    তাড়াতাড়ি স্টেজ থেকে ভেতরে আসতেই প্রম্পটার আমাকে এই মারে তো ঐ মারে।

    সীন পড়তে নায়কও খোঁজ করলেন আমাকে। ভয়ে পালিয়ে গেলাম সেদিনকার মতো গ্রীনরুম থেকে। তারপর সাতদিন একেবারে থিয়েটারমুখোই হইনি।’

    প্রথম আলাপেই তিনি জয় করে নিলেন আমার হৃদয়। আমাদের বন্ধুত্ব শুরু হল এইভাবে। যদিও মুখে ওকে ‘দাদা’ বলতাম, স্নেহ পেতাম পুত্রের। আমাদের সম্বন্ধ হতে লাগল নিবিড়তর।

    আজ তুলসীদার কথা লিখতে বসে কত কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে আমার প্রথম গাড়ি কেনার কথা। গাড়িটা ছিল হিন্দুস্থান—১৪।

    ‘চাঁপাডাঙ্গার বৌ’ স্যুটিং হচ্ছে। গাড়িটা চড়ে গেলাম স্টুডিওতে।

    আমার গাড়ি দেখে তুলসীদার সে কী আনন্দ! বারবার মুছছেন গাড়িটাকে। সকলকে ডেকে বলছেন— ‘উত্তম আজ গাড়ি কিনেছে।’

    তখনও গাড়ি চালাতে শিখিনি।

    আমাকে বললেন— ‘একবার আমাকে ঘুরিয়ে আনবি?’

    ড্রাইভারকে বললাম তুলসীদাকে ঘুরিয়ে আনতে। একপাক টালিগঞ্জ অঞ্চল ঘোরা হল ।

    গাড়ি আবার স্টুডিওতে ফিরে এলো। তুলসীদার মন তখনও তৃপ্ত হয়নি।

    আমাকে বললেন— ‘চ আরেকবার ঘুরে আসি লেকের ধার থেকে।’

    সেদিন তুলসীদার মুখে যে কী আনন্দর চিহ্ন আমি দেখেছিলাম অতি আত্মীয় ছাড়া তেমনটি আর দেখা যায় না। সে মুখ আমার স্মৃতিপটে চিরদিন আঁকা থাকবে।

    আর একবার বুড়ো (তরুণকুমার) নিয়ে গিয়েছিল গৌতমকে45, স্টুডিওতে।

    গৌতমের পরিচয় তুলসীদা যেই পেলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাকে কোলে নিয়ে তাঁর কী আনন্দ!

    মেক—আপ করছিলেন তুলসীদা। বন্ধ হল তাঁর মুখের রং মাখা। ছোটো ছেলের মতো তিনি গৌতমকে নিয়ে নাচতে লাগলেন।

    আমি বলি— ‘তুলসীদা, পরিচালক যে এখুনি ডাকবেন, মেকআপটা শেষ করে নিন।’

    উনি বললেন— ‘তুই থাম। অনেক অভিনয় করেছি জীবনে, বাঁচলে অনেক অভিনয় করবও ভবিষ্যতে। কিন্তু গৌতম এমন ছোট্টটি থাকবে না, সে বড়ো হয়ে যাবে। তখন হয়তো আমাকে এমন অবাক চোখে আর দেখবে না।’

    মুহূর্তের মাঝে দেখি বয়সের ব্যবধান ছুটে গেছে। তুলসীদাকে দেখে, কে বলবে তিনি তখন পঞ্চাশের ওপরে বৃদ্ধ। তখন মনে হচ্ছে তিনি যেন গৌতমেরই সমবয়সি।

    আর একবার তুলসীদা আর আমি গাড়িতে যাচ্ছি আশুতোষ মুখার্জি রোডের ওপর দিয়ে।

    বেলা তখন কতইবা! চারটে বাজে। ঠিক এমনি সময় একটা মেয়ে—স্কুলের ‘বাস’ আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল। নায়ক হিসেবে তখন আমার কিছু নাম হয়েছে। তাই ছাত্রীরা আমার দিকে বিস্ফারিত চোখে চেয়েছিল।

    ব্যাপারটাকে আমি তত গুরুত্ব দিইনি। কারণ তখন আমি গাড়ি চালাতেই ব্যস্ত।

    তুলসীদা হঠাৎ আমাকে বললেন—’দেখো, উত্তম, ওরা বিস্ফরিত দৃষ্টিতে তোমার দিকে চাইল। তোমার উচিত ছিল হাত নেড়ে ওদের অভিনন্দন জানানো।’

    আমি বলি —’কেন তুলসীদা?’

    তুলসীদা বললেন— ‘যদি তোমাকে কেউ নায়ক করে থাকে, জানবে সে হচ্ছে ওই ছোটো ছোটো আমাদের বোনেরা। পরিচালক নন, প্রযোজকও নন। ওরা খোঁজে বলেই তোমার এত দাম। নইলে আমাদের আর দাম কী!’

    ভেবে দেখলাম কথাটা নিদারুণ সত্য। যতদিন দর্শকের কাছ থেকে সংবর্ধনা পাইনি ততদিন তো আমাকে কেউ খোঁজেনি! আমাকে নায়ক করেছেন, প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন আমার দর্শকরা। আমার যা—কিছু সব তাঁদেরই। সুতরাং সতর্ক হয়ে তাঁদের অভিবাদন জানানো উচিত আমার।

    তুলসীদার কথা লিখতে বসলে লেখার শেষ হয়না কোনোদিন। তাই জোর করেই নিজেকে সংবরণ করছি। তুলসীদার একটা কথা ছিল — ‘সূর্যতোরণ’46—এ উত্তম আমাকে চাকর রেখেছে। ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’47—এ আমি উত্তমকে চাকর রেখেছি।

    ইদানীং আমার সঙ্গে দেখা হলেই তিনি ‘সূর্যতোরণ’—এর সংলাপ বলতেন। আগামী ছবি ‘বিপাশা’য় আবার দেখবেন তাঁর ‘পানওয়ালা’র অদ্ভুত পার্ট।

    তুলসীদা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। খবরটা পেয়ে আমি বুড়োকে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম তাঁকে দেখতে। বলেছিলাম, ‘বলবি, সুবিধে পেলেই আমি তাঁকে দেখতে যাবো।’

    আমি যাব শুনে তাঁর সে কী আনন্দ! বলে পাঠালেন, ‘উত্তমকে বোলো, তাকে আসতে হবে না। আমি ডাক্তারের অনুমতি পেলেই নিজে যাব তার কাছে।’

    যাব যাব করে আমারও যাওয়া হল না। গেলাম ‘শিউলিবাড়ি’র স্যুটিং করতে। সেখানেই শুনলাম এই নিদারুন ঘটনা।

    স্মৃতির ঝুলি খুলে ভাবছিলাম আমার হারিয়ে যাওয়া দিনের কথা। তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ মনে হল তুলসীদা সামনে এসে মুখে সেই সুপরিচিত হাসি ফুটিয়ে আমাকে বলে যাচ্ছেন বহুবার শোনা ‘সূর্যতোরণ’—এর সংলাপ।

    ঘুম ভেঙে গেল। চেয়ে দেখলাম ঘরে কোথাও কেউ নেই। মনে হল তিনি তো আজ সব ধরাছোঁয়ার বাইরে।

    প্রণাম জানালাম মনে মনে। বললাম, তুলসীদা আশীর্বাদ করুন, যেন আপনার মতো প্রকৃত অভিনেতা হতে পারি।

  • ষোল

    ষোল

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    ষোল

    তুলসীদার মৃত্যুর পর থেকেই বুঝতে পেরেছি মৃত্যু কত সত্য। বাবার মৃত্যুতে শোকে অভিভূত হয়েছিলাম। তাই জীবনকে বোঝবার বা দেখবার সুযোগ তখন পাইনি। দিদির মৃত্যুতে শিশুসুলভ চপলতায় মনে করেছিলাম, দিদি আবার ফিরে আসবে। কিন্তু, আজ বুঝতে পারছি, ও পথে যে যায়, সে আর ফেরে না। জীবনের যবনিকা পড়লে আর ওঠে না। সেখানে শুরু হয় নতুন নাটক।

    আমাদের বাড়িতে একদিন উপনিষদ পড়তে পড়তে একজন বলেছিলেন, ‘নান্যঃ পন্থা মৃতুরেতি,’ মৃত্যু ছাড়া অন্য পথ নেই। ভেবেছিলাম, তবে এই যে বাড়ি, এই গাড়ি, জীবনের যে রঙিন স্বপ্ন, এর সবটাই মিথ্যে? যদি মিথ্যেই হয় তবে কোটি কোটি মানুষ কেন ছুটছে এর পেছনে! হাসি পেয়েছিল কথাটা ভেবে। কবিগুরুর লেখা ‘পথের শেষ কোথায়,’ যেদিন পড়েছিলাম সেদিন তার আসল মানে বুঝতে পারিনি। আজ ভাবছি সত্যিই তো, ‘কী আছে শেষে।’ এত প্রীতি, এত ভালোবাসা, মুহূর্তের মধ্যে জীবনের সবকিছু শেষ হয়ে যায়! তাই বোধহয় গীতায় ভগবান বলেছেন, ‘সর্বধর্মান পরিত্যাজ্য মামেক্য শরণং ব্রজ’— সবকিছু ত্যাগ করে, তুমি শুধু আমাকেই ভজনা করো।

    আজ বুঝছি, ব্যাপ্ত মনকে যদি তুলে কোনোকিছু অসীমের ওপর দেওয়া যায়, তাহলে বোধহয় জীবনের দুঃখ এত তীব্র হয়ে ওঠে না। উন্মাদ করেও দেয় না। মনে পড়ে যায় শ্রীশ্রীসারদা মায়ের কথা, ‘তাঁতে মন দিলে খাঁড়ার ঘা—ও প্রবল হয়ে আঘাত করে না। প্রবল আঘাতও নরুনের আঘাতের মতন তুচ্ছ হয়ে যায়।’ কিন্তু, কে তা পারার ক্ষমতা রাখে…।

    একটা প্রবাদবাক্য আছে ভগবান যখন দেন তখন ছাদ ফুটো করেই দেন।

    মানুষ নিজের চেষ্টায় কী করতে পারে? এ প্রত্যক্ষ সত্য আমি নিজের জীবন দিয়েও সেদিন অনুভব করেছিলাম। আমাদের মনের ইচ্ছেগুলোকে যদি তীব্রভাবে আমাদের মনে আমরা জাগিয়ে রাখতে পারি, এবং তাকে ধরে বাকি জীবনটা চেষ্টা করতে থাকি, তাহলে হয়তো একদিন-না-একদিন তা সফল হবেই।

    রবার্ট ব্রুসের দৃষ্টান্ত টানতে চাই না। Try, Try, Try again বলে আপনাদের মনও ভারী করতে চাই না। তবে আমার জীবনে সেদিন যে, এ জিনিসের ব্যতিক্রম হয়নি, তাই আপনাদের বলছি।

    তীব্র ইচ্ছা ছিল ফিল্মের ‘হিরো’ হবার। সেকথা আগেই বলেছি।

    সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও আপনাদের জানিয়েছি, টাকার অভাবও ছিল আমার প্রচুর, সংসারের চাহিদা সামান্য চাকরি করে মিটতও না। তাই, এদিকে আর একটা রোজগারের পথ পাব বলেই আশা করেছিলাম।

    শখের যাত্রাদলে আর থিয়েটারে অভিনয় করে, নাম-যশের আশাও কম ছিল না। কিন্তু আগেকার সব ক’টা ছবি আমার জন্যে নিয়ে এসেছিল হতাশা। তাই নিজের আত্মবিশ্বাস তখনও গড়ে ওঠেনি।

    নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল না বলেই বোধহয় সেদিন ‘এম. পি.’র আমন্ত্রণে যেতে মোটেই ইচ্ছা ছিল না।

    যাই হোক, এসে যখন পড়েছি, তখন এঁরা যা বলেন তা আমার শোনা উচিত।

    বিমলবাবুর1 পেছনে পেছনে গিয়ে ঢুকলাম একটা ঘরে। ঘরে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা ছিল,— ‘বিভূতি লাহা’48

    বুঝলাম এ ঘরটা তখনকার বিখ্যাত পরিচালকগোষ্ঠীর অন্যতম বিভূতি লাহার ঘর।

    ঘরের মধ্যে তখন ‘সহযাত্রী’ ছবির রিহার্সাল হচ্ছে। রিহার্সাল দেওয়াচ্ছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা সন্তোষ সিংহ মহাশয়।

    বিমলবাবু আমাকে ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে সন্তোষবাবুকে উদ্দেশ্য করে বললেন— ‘দেখুন তো, এ ছেলেকে দিয়ে কিছু হয় কি না? ওপরের চেহারাটা তো মন্দ নয়। এখন মাকাল ফল না হলেই বাঁচি!’

    সন্তোষবাবু আমাকে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। এদিকে আমারও বুকের ভেতর কে যেন হাতুড়ি পিটতে গুরু করল।

    সন্তোষবাবু আমাকে বললেন— ‘আপনার নাম কী?’

    আমি বলি— ‘আজ্ঞে, উত্তমকুমার।’

    বয়সে কম বলেই বোধহয় তিনি বললেন— ‘হুঁ, চেহারাটা তো উত্তমের মতনই মনে হচ্ছে, এখন গলার আওয়াজ আর অভিনয়টা উত্তম হলেই তো বাঁচি!’

    এতক্ষণ বুকের ভেতর বোধহয় স্যাকরার হাতুড়ি পড়ছিল, সন্তোষবাবুর কথা শুনে সেটা হঠাৎ কামারের হয়ে গেল। ভয়ে আমার গায়ে ঘাম দিল। সব রাগ পড়লো গিয়ে বুড়োটার ওপর। কেন আমাকে জোর করে এখানে পাঠাল? আমি তো অভিনয় ছেড়েই দেব ভেবেছিলাম। পাড়াতে শখের দলে যা যাত্রা থিয়েটার করছি তাই করতাম। ফিল্ম করে কী হবে? খানিকটা পরেই তো এঁরা তাড়িয়ে দেবেন। সে অপমানিত আর হতে হত না।

    যাক, এসে যখন পড়েছি, তখন তো আর ফেরা যায় না। একটা ভদ্রতা, একটা চক্ষুলজ্জা তো আছে। দেখাই যাক না, শেষ পর্যন্ত কী হয়!

    সন্তোষবাবু আমাকে বললেন— ‘কী ভাবছ হে ছোকরা? একটু অভিনয় করে দেখাও!’

    আমি বলি— ‘কী অভিনয় করব?’

    সামনে রাখা খাতায় লেখা ‘সহযাত্রী’র পাণ্ডুলিপিটা আমার হাতে তিনি তুলে দিলেন। একটা ‘সীন’ বার করে দিয়ে বললেন— ‘এইটা পড়ো।’

    ‘সীন’টা ছিল কান্নার।

    মনকে শক্ত করে নিয়ে আমি পড়ে ফেললাম। বলা বাহুল্য, ভাব দিয়েই পড়বার চেষ্টা করেছিলাম। পড়া শেষ করে চাইলাম সন্তোষদার মুখের দিকে।

    বড়ো অভিনেতা তিনি। মুখ দেখে তাঁর মনের ভাব বোঝা ভারী শক্ত।

    তাই আমিও ঠিক বুঝতে পারলাম না আমার অভিনয়টা কেমন হয়েছে।

    তাড়াতাড়ি তিনি পাতা উলটে পাণ্ডুলিপির আর একটা জায়গা আমাকে পড়তে বললেন।

    একই দৃশ্যের ধারা মনে করে পড়তে গিয়ে দেখি কোথায় কান্না, এ যে সম্পূর্ণ বিপরীত— হাসির দৃশ্য!

    খানিকটা দাঁড়িয়ে দম নিয়ে নিলুম। তারপর, গলাটা নামিয়ে বেশ ইয়ার্কির ছলেই হাসির দৃশ্যটা পড়তে লাগলাম।

    পড়া হয়ে গেলে সন্তোষদা এবারে বললেন— ‘বাঃ মন্দ পড়োনি তো হে! আচ্ছা তুমি এইখানটা এইবার একটু পড়ো!

    আগেকার অভিজ্ঞতাতেই বুঝতে পেরেছি সন্তোষদা আমাকে বিভিন্ন ভাবের দৃশ্য পড়তে দিচ্ছেন।

    উদ্দেশ্য—কোন ভাবটা আমার ভেতর ভালো ফোটে, তাই দেখা। তাই চেঁচিয়ে পড়বার আগে মনে মনে একবার সেটাকে পড়ে নিয়ে দেখে নিলাম, সেটা কী দৃশ্য। আরে! এটা যে একেবারে নায়িকার সঙ্গে নায়কের প্রেম। যাকে বলে—love scene!

    প্রবীণ অভিনেতার সামনে কেমন যেন লজ্জা লজ্জা করল। যা হোক, কুছ পরোয়া নেহি,—নাচতে নেমে ঘোমটা টানলে তো চলে না!

    আবেগের সঙ্গে পড়ে ফেললাম দৃশ্যটা। বিমলবাবু সন্তোষদাকে জিজ্ঞেস করলেন— ‘উত্তমকে দিয়ে চলবে তো?’

    সন্তোষদা বললেন—হ্যাঁ ঘষলে মাজলে চলে যাবে।

    সেইদিনই বিমলবাবু আমার হাতে দিলেন কোম্পানির একটা চুক্তিপত্র। যার অর্থ এম. পি.র নিজস্ব অভিনেতা হিসাবে আমি তিন বছরের জন্য নিযুক্ত হলাম।

    এর প্রথম বছরে আমাকে দেওয়া হবে মাসে ৪০০ টাকা করে, দ্বিতীয় বছর দেওয়া হবে ৬০০ টাকা করে, আর তৃতীয় বছরে আমি পাব মাসিক ৭০০ টাকা করে।

    এত টাকা! নিজের চোখকেও যেন ভালো করে বিশ্বাস করতে পারলাম না।

    চুক্তিপত্রে সেইদিনই সই করে দিলাম আমি। এইখানে বলে রাখা ভালো ‘নিউ থিয়েটার্স’49 একসময় বহু অভিনেতা, অভিনেত্রীকে এইভাবে মাইনে করে রেখে দিতেন।

    তারপর শ্রদ্ধেয় মুরলীধর চট্টোপাধ্যায়50 মহাশয় তাঁর এম. পি. প্রতিষ্ঠানে এই রীতির প্রবর্তন করেন।

    ‘সহযাত্রী’ ছবি উঠবে, নায়ক মনোনীত হয়েছেন অসিতদা। কিন্তু আর একটা ছবির কাজের জন্যে, তিনি এ কাজ করতে পারলেন না।

    সুতরাং শিকে ছিঁড়ল আমার। আমিই মনোনীত হলাম নায়কের পার্ট করবার জন্যে। আমার বিপরীতে অভিনয় করবেন তখনকার দিনের প্রখ্যাতা অভিনেত্রী ভারতী দেবী।51

    ভারতী দেবী প্রথম চিত্রজগতে অভিনয় করেন নিউ থিয়েটার্সের ‘ডাক্তার’52 ছবিতে। তাঁর সে ছবি যখন মুক্তি পায় তখন আমি স্কুলের ছেলে। তবে সে অভিনয় আমার মনে রেখাপাত করেছিল। তার কথা আজও আমি ভুলতে পারিনি।

    ওই নিউ থিয়েটার্সেরই ‘প্রতিশ্রুতি’53ছবিতে অসিতদা প্রথম অভিনয় করেন, এবং তাঁর বিপরীতে তখন ছিলেন ভারতী দেবী।

    রোম্যাণ্টিক নায়ক আর নায়িকা হিসেবে তাঁরা তখন নামও করেছিলেন প্রচুর।

    সেই ভারতী দেবী অভিনয় করছেন আমারই বিপরীতে।

    যাইহোক, রিহার্সাল হল। স্টুডিওর সেটে গেলাম স্যুটিং করতে। স্যুটিং-এর ফাঁকে ভারতী দেবীকে বললাম, ‘দেখুন, অভিনয়ে ভুল-ক্রটি হলে একটু সংশোধন করে নেবেন। তবেআমি আপ্রাণ সুঅভিনয় করবার চেষ্টা করব।’

    অভিনয় হল। ছবিও তৈরি হয়ে নানা প্রেক্ষাগৃহে দেখানো হল। কিন্তু এবারেও সেই আমার ভাগ্য এক। ছবি চলল না।

    অভিনেতার জীবনে ছবি না-চলা যে কতখানি দুঃখের তা লিখে বোঝানো যায় না।

    ভাবলাম কাজ নেই আর অভিনয় করে। ফিরে যাই আমি আমার সেই পোর্ট কমিশনার্স অফিসে।

    অগ্রদূতে54র বিভূতিবাবুকে একদিন জিজ্ঞাসা করলাম— ‘কী করা যায় বলুন তো? চাকরিতে ফের ফিরে যাব?’

    বিভূতিবাবু একটু বিস্মিত হয়ে গিয়ে বললেন— ‘চাকরি এখনও রেখেছ?’

    আমি আমতা আমতা করে বলি— ‘আজ্ঞে, কী হবে তা তো ঠিক বুঝতে পারছি না, তাই বন্ধুবান্ধবের সাহায্যে কোনোরকমে চাকরিটা টিঁকিয়ে রেখেছি।’

    বিভূতিবাবু শুনে বললেন— ‘মনে হচ্ছে, চেহারার জোরে তুমি টিঁকে যেতে পারো। তবে আর একটু চেষ্টা করা দরকার। কারণ চাকরি ছাড়লে, এ বাজারে আর একটা চাকরি জোগাড় করা বড়ো শক্ত। তার ওপর তোমার পোর্ট কমিশনারের চাকরি! চাকরিটাও কিছু খারাপ নয়।’

    আমি বলি— ‘কিন্তু চাকরি রাখতে গেলে’—

    বিভূতিবাবু বলেন— ‘সেটা অবশ্য তুমি বোঝো, কী করে রাখবে?’

    মনটা তখন আমার সত্যিই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কারণ চেহারার ওপর যেটুকুও আস্থা ছিল, সেটুকুও আমার তখন চলে গেছে, তখনকার দিনের একখানা বিখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকায় একটা কার্টুন ছবি দেখে। ছবিটার নামকরণ করা হয়েছিল ‘বাংলার নায়ক’।

    আমাকে সাজানো হয়েছে একটা ছ’মাসের ছেলে। অপরদিকে একটি মেয়ের কোলের ওপর একটি শিশুকে শোয়ানো হয়েছে। শিশুটি মেয়েটির গলা লক্ষ্য করে দুটি হাত তুলেছে ওপর দিকে। নিচে লেখা আছে— ‘আমি তোমায় ভালোবাসি’।

    হায়, এইকি আমার ভাগ্য! আমার চেয়েও বয়সে বড়ো যদি কোনো নায়িকার সঙ্গে আমাকে অভিনয় করতে হয়, সে দোষ কি আমার? সে দোষ যাঁরা পার্ট ঠিক করেছেন তাঁদের। কিন্তু মাঝখান থেকে বেশ খানিকটা বিদ্রূপ আর গালাগালি এসে পড়ল আমার ওপর।

    আজকে অবশ্য সেকথা মনে পড়লে হাসিই পায়। সেদিন অবশ্য হাসির বদলে চোখে দেখা দিয়েছিল জল, পরাজয়ের চিহ্ন হিসেবে।

  • সতের

    সতের

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    সতের

    গত মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে আমাকে চলে যেতে হয়েছিল কলকাতার বাইরে। যদিও এটা নিছক দেশভ্রমণ নয়, কাজের তাগিদেই যেতে হয়েছিল সুদূর রাজপুতানার উদয়পুরের পাহাড়ে পাহাড়ে। ঘোড়ায় চড়ে তরোয়াল হাতে ছবি তোলবার সময় কেবলি মনে হচ্ছিলো, এই সেই দেশ, যেখানে জন্মেছিলেন বাপ্পা, প্রতাপ, রাজসিংহ। যে দেশের লোকেরা তরোয়াল আর ঘোড়া সম্বল করে বেরিয়ে পড়ত দেশদেশান্তরে। সেই দেশেই আমি এসেছি, তরোয়াল খেলার আর ঘোড়ায় চড়ার অভিনয় করতে। কতদূর সার্থক হয়েছি, তার বিচার করবেন আপনারা। ইচ্ছে ছিল মাউণ্ট আবু অবধি যাব, কিন্তু তার আগেই ফিরে আসতে হল কলকাতায়।

    আজ এক বছরের ওপর ধরে আমার ক্ষুদ্র জীবনের কাহিনি আপনাদের বলতে শুরু করেছি। একসঙ্গে লিখে দিতে পারলেই ভালো হতো কিন্তু তার সময় কোথায়? তাছাড়া, আমি এতবড়ো লেখক নই যাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে আপনাদের ধরে রাখতে পারি। তবুও লিখছি এ কাহিনি, যাতে ছবিতে রাজপুত্রের ভূমিকায় আমায় দেখে কেউ না আমায় মনে করেন, আমি সত্যিকারের রাজপুত্র। ঘোড়া আর তরোয়াল নিয়ে আমি নেমে পড়েছি আমার জীবনযুদ্ধে। তাঁদের কাছে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ তাঁরা যেন মনে রাখেন এটা ঘোড়া আর তরোয়ালের যুগ নয়, এ যুগটা এরোপ্লেন আর হাইড্রোজেন বোমার যুগ।

    যাক সেসব কথা। কথায় কথায় যুদ্ধের কথা যখন উঠে পড়ল তখন আমার জীবনের একটা যুদ্ধের কাহিনি বলবার লোভ আর সংবরণ করতে পারছি না।

    সালটা বোধহয় ১৯৪৭ হবে। গৌরীর সঙ্গে বেশ প্রেম জমে উঠেছে, আবার বিচ্ছেদও হয়েছে। বিচ্ছেদ মানে, ঘটনাটা জানাজানি হওয়ার পর বাড়িতে সে আটকা পড়েছে।

    আমার জীবনের কাহিনি লিখতে গিয়ে সেকথা আপনাদের আগেই নিবেদন করেছি।

    আমার মনমেজাজও বিশেষ ভালো নয়। একটুতেই তিরিক্ষে হয়ে উঠি। এমনি সময় আমাদের পাড়ার কাছে ঘটল একটা ঘটনা।

    গোটাকতক ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাদের ওই গলির মোড়টায় রাতে সাড়ে আটটা ন’টা থেকে তখন ভিড় জমাত। তখনও বেবী ট্যাক্সি50র প্রচলন হয়নি। কলকাতার অধিকাংশ ট্যাক্সি ড্রাইভার ছিল অবাঙালি।

    যুদ্ধ কিছুদিন আগে থেমেছে। রেশ তখনও কমেনি।

    তারপর কলকাতার বুকে কিছুদিন আগেই ঘটে গেছে সেই সর্বনাশা ৪৬ সালের ১৬ অগস্টের53 ঘটনা। এখানে সেখানে লোক জমায়েত হলেই, লোকে ভাবে, বুঝি তারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ব্যাপার কী কেউ অনুসন্ধান করে না। সকলেই মারামারি থেকে দূরে থাকতে চায়। খানিকটা এরই সুযোগ নিয়ে ওদের আড্ডাটা জমলও ভালো। রাতের অন্ধকারে যা হয় তা হতেও দেরি হল না। চড়চাপড় মেরে এর কাছ থেকে পয়সা কেড়ে নেওয়া, ওকে অপমান করা, এ তো প্রায়ই ঘটত। শুধু এই নয়, মেয়েরা ভয়ে ও রাস্তা দিয়ে চলাই বন্ধ করল। কারণ দু’একজন রাত্রে ফেরবার সময় বেশ অপমানিত হয়েছিলেন।

    খবরটা আমাদের কানে এল। গোলমাল আর পুলিস হাঙ্গামার ভয়ে, কেউ গায়ে মাখল না। থানাতে জানিয়েও কোনো লাভ নেই। কারণ তাঁরা তখন অন্য ব্যাপারে ব্যস্ত। এদিকে ওই দলকে সাহস করে চটাতেও কেউ চাইছে না। কারণ কলকাতায় যদি আরও গণ্ডগোল বাধে তখন ভরসা তো ওদেরই বাহুবল!

    কিন্তু আমার যেন ব্যাপারটা অসহ্য মনে হল। একদিন আমি রাত্তির বেলায় আরও দু তিন জন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে একরকম ইচ্ছে করেই রাত্তির করে বাড়ি ফিরলাম। মাকে আমার উদ্দেশ্যের কথা আগে বলিনি। কী জানি, জানতে পারলে হয়তো বাড়ি থেকে বেরোতেই দেবেন না কিংবা বকুনি দিয়ে হয়তো নিজের কাছে বসিয়ে রাখবেন। রাত্তিরবেলায় যখন ফিরছিলাম, ওই দলের একজন একটু মত্ত অবস্থাতেই আমার কাছে এসে বলল— ‘অ্যাই, কিধার যাতা?’

    গলার স্বরটাকে নকল করে আমি বললাম— ‘যিধার খুশ।’

    লোকটা অপমানিত বোধ করল। সুরটা একটু চড়িয়ে আমাকে বলল— ‘পাঁচঠো রূপেয়া দে যাও!’

    আমি এই সুযোগেরই অপেক্ষা করছিলাম। সজোরে এক ঘা বসিয়ে দিয়ে বললাম— ‘লিজিয়ে!’

    লোকটা এরজন্য প্রস্তুত ছিল না। আচমকা আঘাতে, পড়ে গেল রাস্তার ওপর। তার দলের দশ-বারো জন সঙ্গীকে পড়ে যেতে দেখে, আমাদের চার পাঁচ জনের ওপর বাঘের মতো লাফিয়ে পড়ল। কিন্তু ওই পর্যন্তই।

    বিশেষ দ্রব্যের প্রভাবে আমাদের সামনে তারা বেশিক্ষণ আর দাঁড়াতে পারল না। হোক না কেন তারা আমাদের চেয়েও লম্বাচওড়া আর বিশেষ শক্তিশালী।

    মিনিট দশেকের মধ্যেই ওদের রণে ভঙ্গ দিয়ে পালাতে হল। ততক্ষণে কিন্তু আমাদের সকলকারই গায়ে, মুখে, মাথায় ওরা খানিকটা করে চিহ্ন এঁকে দিয়ে গেছে। পায়ে পা লাগিয়ে আমিই প্রথম ঝগড়া বাধাতে গিয়েছিলাম বলে, আমি পড়েছিলাম ওদের মাঝখানে। আমার বন্ধুর দল না থাকলে ওরা আমাকে হয়তো মেরেই ফেলত সেদিন। কিন্তু বন্ধুরা থাকার দরুন আমার মাথাটাই সেদিন ফেটেছিল। জামাকাপড়ের অবস্থাও সেইরকম। বেশ ছিঁড়ে গেছে। দরদর করে রক্ত কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। পুলিসের ভয়ে তাড়াতাড়ি ঢুকতে হল বাড়িতে।

    ভেবেছিলাম কলে মুখ-হাত ধুয়ে জামাকাপড়টা বদলে নেব। তারপরে মাথায় একটা ব্যাণ্ডেজ করলেই হবে। আমার জামাকাপড়ের ওই অবস্থা আর রক্ত দেখেই, বুড়ো খবরটা মাকে গিয়ে দিল। ব্যস, আর যায় কোথায়! কলঘরের মধ্যেই ছুটে এলেন তিনি। জোর করে রক্ত ধুয়ে দিয়ে নিজের শাড়ির আঁচলা ছিঁড়ে ফেলে কপালে ব্যাণ্ডেজ করে দিলেন। তারপর, সে রাত্রে কাছে বসিয়ে খাইয়ে, নিজের কাছে নিয়ে শুলেন তিনি। আমার কোনো ওজর-আপত্তি তাঁর কাছে সেদিন টিঁকল না। সারারাত কেবল মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন।

    আমি যত তাঁকে বোঝাবার চেষ্টা করি— ‘মা, আমার কিছুই হয়নি, তুমি ঘুমোও।’—উত্তর শুনি কেবল একটা কথা— ‘তুই আগে ঘুমো, তারপরে আমি ঘুমোবো।’

    আমি বলি— ‘কেন তুমি এত ভাবছ, আমি ভালো আছি, আমার কিছু হয়নি।’

    উত্তরে কেবল তিনি বললেন— ‘তোর কী হয়েছে না হয়েছে তা কী আমায় বলে দিতে হবে?’

    অত বয়সেও তিনি আমার সঙ্গে ব্যবহার করতে লাগলেন যেন আমি একটা দু’বছরের ছেলে। নিজের আঘাতের গুরুত্বটুকুও বোঝবার ক্ষমতা যেন আমার নেই।

    মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম দেখব, মা ঘুমিয়ে পড়েছেন। তার বদলে দেখলাম, তন্দ্রার কোলে ঢলে পড়েও তিনি জোর করে জেগে থেকে আমার শুশ্রূষা করবার চেষ্টা করছেন।

    আমি মাকে বলি— ‘মা, তুমি শুয়ে পড়ো, আমি ভালোই আছি।’

    আমাকে উত্তরে তিনি কেবল বললেন— ‘হুঁ, তুমি যে কেমন আছো তা আমার আর জানতে বাকি নেই! এখন জ্বর না এলে বাঁচি!’—কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর দু চোখ ভরে এল জল।

    আমি বলি— ‘লাগল আমার, ব্যথা পেলে তুমি? আমার কী হয়েছে, আমি কি কচিখোকা যে কিচ্ছু বুঝতে পারি না?’

    মা একটু রাগতভাবে বললেন— ‘না তুমি খুব বুড়ো হয়েছ! এখন ঘুমিয়ে আমাকে উদ্ধার করো।’

    সেইদিনই প্রথম বুঝতে পারলাম, আমি এতটুকু ব্যথা পেলে তা কতখানি হয়ে মা’র বুকে গিয়ে লাগে। কতখানি স্নেহ আর মমতা দিয়ে তিনি আমাদের ঘিরে রেখেছেন! আর বিনিময়ে আমি মাকে কী দিতে পারলাম!

    সেরে উঠলাম দিন তিনেকের মধ্যে। ওই ঘটনাতে আর একটা ব্যাপার দেখতে পেয়েছিলাম। জানি না কেমন করে কথাটা পৌঁছেছিল গৌরীর কানে। সেও কেঁদে কেঁদে হয়েছিল সারা। ও-তো ভেবেইছিল গুণ্ডারা বুঝি আমায় মেরেই ফেলেছে।

    ১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে গৌরী শুরু করল অনশন। কারণ ওর বাড়ি থেকে তখন ওর জন্য পাত্র স্থির করা হয়েছে। বিয়েরও আর বেশি দেরি নেই, একরকম উপায়হীন হয়েই প্রতিবাদস্বরূপ সে খাওয়া বন্ধ করল।

    অগত্যা ওর বাবা মাকে রাজি হতে হল ওরই কথায়। ছাড়া পেল গৌরী, এল আমাদের বাড়ি। আমার হাত ধরে বলল— ‘চলো আমার বাবার কাছে, গিয়ে বলো সব কথা তাঁকে। উনি নিশ্চয়ই রাজি হবেন। আমাদের বিয়ে দেবেন।’

    দুরুদুরু বুকে গৌরীর সঙ্গে এগিয়ে গেলাম ওদের বাড়িতে। বাড়ির সামনে গিয়ে কেমন যেন ভয়ে গলা শুকিয়ে আসতে লাগলো। পরে শুনেছি প্রেমের ধর্মই নাকি সন্দেহ করা।

    আমার হঠাৎ মনে হল, যদি গৌরী আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, যদি ওর বাবাকে দিয়ে দরোয়ান ডেকে মারের ব্যবস্থা করে থাকে, তাহলে?

    সব সাহস কোথায় আমার চলে গেল। যেই গৌরী গেল তার বাবাকে ডাকতে, অমনি আমিও সেখান থেকে পত্রপাঠ গেলাম পালিয়ে।

    আমায় খুঁজে না পেয়ে গৌরী আবার এল আমার কাছে। বললো— ‘পালিয়ে এলে যে? বলতে হবে না?’

    আমি বলি— ‘না মানে, একা গিয়ে বলব ওঁর সামনে, তাই এসেছিলাম বুড়োকে ডাকতে। ওকেও সঙ্গে নিয়ে যাই না।’

    আমার একার সাহসে যে কুলোচ্ছেনা তা বোধহয় বুঝেছিল গৌরী। তাই বোধহয় রাজি হল আমার কথায়।

    আমি বুড়োকে সঙ্গে নিয়ে আবার গেলাম ওদের বাড়িতে। বিশেষ কিছু বলতে হল না। গৌরীর বাবা নিজের থেকে বললেন— ‘ও আমার আদরের মেয়ে, ওকে অযত্ন কোনোদিন করবে না তো?’

    আমি বলি— ‘দেখুন, আমার সাধ্যমতো’—

    কথাটা একরকম মুখ থেকে কেড়ে নিয়েই বললেন তিনি— ‘করো তো পোর্ট কমিশনারে চাকরি, ফিলিমে নামবারও চেষ্টা করছ শুনেছি। যাহোক, তোমরা সুখী হও। তবে এইটুকু কথা দাও, জীবনের কোনো অবস্থাতেই আমার গৌরীর অনাদর করবে না। এইটুকুই তোমার কাছে আমার অনুরোধ। আমি যাব তোমার বাবার কাছে, তিনি মত দেবেন তো এ বিয়েতে?

    আমি বলি— ‘মাকে আমি বলে রাখব। আশাকরি উনিও মত দেবেন।’

    কথাটা বোধহয় ইতিপূর্বে মা কানাঘুষোয় শুনেছিলেন। তাছাড়া গৌরীকে মা’র বরাবরই পছন্দ হয়েছিল।

    মাকে কথাটা বিশেষ করে বলতে হল না। অনুমতি চাইবার ভূমিকা করতে না করতেই তিনি আমায় বললেন— ‘খোকা, বিয়ের ব্যাপার, ভালো করে ভেবে বল, তুই সুখী হবি তো?’

    আমি বলি— ‘হ্যাঁ মা, যদি তুমি আশীর্বাদ করো।’

    মা বললেন— ‘আশীর্বাদ! তোর সুখই আমার সব সময় লক্ষ্য! তোর বাবাকে আমি রাজি করাবোই।’

    এদিকে গৌরীর বাবাও এলেন আমাদের বাড়িতে। কথাবার্তাও হল পাকাপাকি। ১ জুন সকালবেলায় আমাদের বাড়িতে বেজে উঠল শুভ সানাই। অবসান হতে চলল দীর্ঘ প্রতীক্ষার।