Author: তাহের আলমাহদী

  • শিক্ষাবিস্তার ও ধর্মপ্রচার

    শিক্ষাবিস্তার ও ধর্মপ্রচার

    শিক্ষাবিস্তার ও ধর্মপ্রচার

    জনশিক্ষা প্রসারে ওমর বিশেষ জোর দেন; এ বিষয়ে উদ্যম ছিল অপরিসীম। সারা আরবে ও বিজিত দেশসমূহে প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা হয়। ছাত্রদিগকে লিখন-পঠন, প্রাথমিক গণিত, কোরআন পাঠ, নীতি শিক্ষামূলক কবিতা ও আরবী সুবচন শিক্ষা দেওয়া হতো। যে-সব সাহাবা হাদীসে ও কোরআন পাঠে দক্ষ, তাঁরাই জনশিক্ষা নিয়োজিত হতেন। শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন দেওয়া হতো। ওমরের এ বিষয়ে একটি সুন্দর ব্যবস্থা এই যে, তিনি শিক্ষকদের জন্যে একটি পৃথক বৃত্তি-তালিকা প্রস্তুত করান ও নিয়মিত বৃত্তিদানের নির্দেশ দেন। মদীনায় শিক্ষকরা মাস প্রতি পনের দিরহাম বেতন লাভ করতেন। সমকালীন অর্থনৈতিক অবস্থানুসারে এ হার স্বল্প ছিল না।

    ইসলামে শিক্ষা ও ধর্ম অভিন্ন। শিক্ষা প্রসারের সঙ্গে ধর্মশিক্ষাদান ও ধর্মপ্রচার সমানভাবে চলতো। খলিফা হিসেবে ওমরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হচ্ছে, ইসলামের প্রসার ও জনগণকে ধর্মীয় শিক্ষাদান। ইসলামের বিস্তৃতি, কোরআন-হাদীস শিক্ষার ব্যবস্থা এবং শরিয়ত শিক্ষা বাধ্যকরণের উদ্দেশ্যে ওমর একটি পৃথক বিভাগ খোলেন। এ কথা এখানে অবশ্যই বিশদ হওয়া দরকার যে, ইসলাম প্রচার অর্থে মুসলিমেতর লেখকদের প্রচারিত তথাকথিত এক হাতে কোরআন ও আর এক হাতে তরবারি নিয়ে নয়। এরূপ বিকৃত পন্থা অবলম্বন খলিফাদের স্বপ্নেরও অগোচর ছিল, কারণ কোরআনের এই মহাশিক্ষা কোন প্রকৃত মুসলিমই বিস্মৃত হতে পারেন না: লা ইব্রাহা ফিদ্দীন-ধর্মে বলপ্রয়োগ নেই (২ : ২৫৬)। পূর্বেই উক্ত হয়েছে যে, খলিফা ওমর আপন ব্যক্তিগত খাদিম খ্রিস্টান আতিককে বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ইসলাম গ্রহণে রাযী করতে অক্ষম হয়ে কোরআনের এই বাণীর মধ্যেই শান্তি খুঁজেছেন, কিন্তু বলপ্রয়োগ করেন নি। তাঁর প্রধান কার্যকরী অস্ত্র ছিল, কাজে ও কর্মে ইসলাম আদর্শিক জীবন অনুশীলন করে মানুষকে ইসলামের শিক্ষা ও সৌন্দর্যে আকৃষ্ট করা। ওমরের খেলাফতকালে দেশে দেশে ইসলামের বিকিরণ হয়েছিল আলোকধারার মতো কিন্তু তা সম্ভব হয়েছিল খলিফার শিক্ষায় ও নিয়মানুবর্তিতায়। মুসলিমদের জীবন আপন ধর্মের উজ্জ্বল ও বাস্তব আদর্শে রূপায়িত হয়ে উঠেছিল। তা না হলে মরুচর যাযাবর ক্ষুদ্র জাতি পৃথিবী-জয়ে সাহসী হতো না। যখনই বিদেশীরা মুসলিমদের সংস্পর্শে এসেছে, তখনই তারা মুসলিমদের দেখেছে, সত্য ন্যায়, অকপটতা, সাধুতা ও শুচি-শুভ্র সরল জীবনের মূর্ত প্রতীকরূপে এবং বিস্ময়ে, ভক্তিতে আপ্লুত হয়ে প্রাণের আবেগে ইসলাম গ্রহণ করে জীবন ধন্য মনে করেছে। পাঠকের স্মরণ হতে পারে, সিরিয়া অভিযানকালে রোমক-দূত জর্জ আবু ওবায়দার সেনাবাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হয়েই কিভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, নিজের জাতি, সমাজ ও পরিবার স্বেচ্ছায় বিসর্জন করে।

    যখনই ওমর কোনও নতুন দেশ অভিযানে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছেন, তখনই সিপাহসালারকে নির্দেশ দিয়েছেন, প্রথমে শান্তির পথে ইসলামের মহিমা প্রচার করে ইসলাম গ্রহণে আহ্বান জানাতে। পারস্য বিজয়ী সা’দ-বিন্-ওক্কাসকে ওমর যে পত্র লেখেন তাতে এই কথাগুলি পরিষ্কার ছিল: আমি তোমায় আদেশ দিচ্ছি যখন বিপক্ষদের সাক্ষাৎ পাবে, তখন যুদ্ধের পূর্বে তাদের ইসলামে আহ্বান জানাবে। কাজী আবু ইউসুফ বলেন, যখনই ওমর সেনা সংগ্রহ করতেন, তখনই এমন সালার নিযুক্ত করতেন, যিনি কোরআনে এবং শরিয়তী আইনে পারঙ্গম।

    ইসলাম বিস্তৃতির দ্বিতীয় কারণ ছিল, মুসলিম সেনাদের সর্বত্র নিরঙ্কুশ বিজয়লাভ সমকালীন পৃথিবীখ্যাত মহাপ্রতাপশালী সুবিশাল রোমক সাম্রাজ্য ও পারস্য সাম্রাজ্য মাত্র কয়েক হাজার মরুচারী আরবের পদভারে বাদামের খোসার মত গুঁড়িয়ে গেছে। ভোজবাজীর মতো এ অসাধ্য সাধন দেখে বিমুগ্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন স্থানীয় অধিবাসীরা বিস্ময় মেনেছে, আর ভেবেছে, নিশ্চয়ই ঈশ্বর মুসলিমদের সহায়। পারস্যের খসরু যখন চীনা সম্রাটের সাহায্য ভিক্ষা করেন, তখন চীনা সম্রাট মুসলিমদের সম্বন্ধে সম্যক সন্ধান নিয়ে জওয়াব দিয়েছিলেন, এমন মানুষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা পাগলামি মাত্র। আবু রিজা ফারসীর পিতামহ বলেছিলেন: আমি কাদিসিয়ার যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেম এবং তখন অগ্নিপূজকও বিপক্ষে ছিলেন। আরবরা যখন তীর নিক্ষেপ আরম্ভ করে, তখন সেগুলি ছুঁচ ভেবে হেসেছিলাম। কিন্তু সে ছুঁচগুলিই আমাদের সাম্রাজ্য ছিন্নভিন্ন করেছিল। মিসর অভিযানকালে আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ কদের উপদেশ দেন: রোমক সাম্রাজ্য খতম হয়ে গেছে; যাও মুসলিমদের সঙ্গে যোগ দাও।

    আরো একটি কারণে ইসলামের বিস্তৃতি সুগম ও ত্বরান্বিত হয়েছিল। সিরিয়া ও ইরাকে বহু আরব গোত্র বসতি স্থাপন করেছিল ও স্থানীয় খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ করেছিল। যখন তাদেরই স্বজাতি একজন আরব নবীরূপে উদিত হলেন, তখন তারা স্বাজাত্যপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েও ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী হয়েছিল। আবার অনেক ক্ষেত্রে কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ধর্মনেতা ইসলাম গ্রহণ করলে তার অনুগামীরাও একযোগে মুসলিম হয়ে যেতো। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, দামেশক বিজয়ের পর তত্রস্থ বিশপ আরফুন খালিদের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তার অনুগামীরাও মুসলিম হয়ে যায়।

    এ-সব ব্যবস্থায় ওমরের খেলাফতকালে ইসলাম দ্রুত প্রসার লাভ করে। আফসোস এই যে, ঐতিহাসিকদের দৃষ্টি ত এদিকে ততদূর আকৃষ্ট হয় নি, তার দরুন ওমরের সময়ে নও-মুসলিমদের তায়দাদ্ কোনখানে উঠেছিল, সঠিকভাবে তা নির্ণয় করা কঠিন .কিন্তু নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে যে, ওমরের আমলে উপরে বর্ণিত নও-মুসলিম ব্যতীত আরও বহুস্থানের বাসিন্দা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল। ১৬ই হিজরীতে জালুলা অধিকৃত হলে তথাকার জমিদার ও সামন্তগণ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁদের অনুগামীরাও তাঁদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে। কাদিসিয়ার যুদ্ধজয়ের পর খসরু পারভেজের দাইলামাইত নামক চার হাজার সুশিক্ষিত দেহরক্ষী ইসলাম গ্রহণ করে। তুস্তারের বাসিন্দারা ইসলাম গ্রহণ করলে সিয়াবজাহ্, জা ও আন্দঘার নামীয় সিন্ধুদেশাগত গোত্রগুলিও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। মিসরের বড় বড় শহরের বাসিন্দারা পাইকারী হারে ইসলাম গ্রহণ করে। ফুস্তাতের বিভিন্ন পল্লীতে বানু-নবাহ্, বানু-আরজাক ও রুবিল নামক গ্রীক গোত্রীয়রা এবং অন্য একটি মহল্লায় সমস্ত অগ্নিপূজকরা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এ-ভাবে বিভিন্ন দেশের নও-মুসলিমদের সংখ্যা কম হিসাবে ধরলেও দশ লক্ষের উর্ধ্বে ছিল।

    ইসলামের সীমান্ত বর্ধিত করেই ওমর ক্ষান্ত হন নি। ইসলামের শ্রেষ্ঠ স্তম্ভ দুটি-কোরআন ও হাদীস-ওমরের হাতে সংরক্ষিত হয় এবং এ দুটির শিক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা অনুসৃত হয়। শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ সত্যই বলেছেন: ইসলাম জগতের যে কেউ আজ কোরআন শরীফ পাঠ করে সেই ফারুক-ই আযমের নিকট কৃতজ্ঞতা-পাশে আবদ্ধ হয়।

    এ কথায় আজ সন্দেহের অবকাশ নাই যে, ওমরের উদ্যমেই কোরআনের নির্ভুল সংগৃহীত হয় এবং সারা ইসলাম জগতে তার বহুল প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। রসূলুল্লাহর জীবদ্দশায় কোরআন শরীফ সামগ্রিকভাবে লিখিত হয়েছিল বিভিন্ন ও সুরায় প্রত্যেক সূরা গ্রথিত হয়েছিল যথাযথ সন্নিবেশিত আয়াত সমূহে। কিন্তু একখানি গ্রন্থে লিখিত তার রূপ ছিল না। হাড়ে, খেজুর পাতায় ও পাথরের বিভিন্ন অংশে লিখিত হয়ে বিভিন্ন সাহাবার হেফাযতে ছিল। আবার প্রত্যেক সাহাবা কিছু কিছু নির্ভুল মুখস্থ করলেও অনেকের সমগ্র অংশ কণ্ঠস্থ ছিল না। আবুবকরের খেলাফত আমলে জাল পয়গম্বর মুসায়লামার সঙ্গে যুদ্ধে বেশ কিছু সংখ্যক সাহাবা শাহাদত লাভ করেন। অথচ তাঁদের অনেকেরই সমগ্র কোরআন অথবা অংশ বিশেষ নির্ভুল কণ্ঠস্থ ছিল। তার দরুন ওমর কোরআনের নিরাপত্তার জন্যে উদ্বিগ্ন হন। তিনি আবুবকরকে বলেন, যাঁদের বুকে কোরআন হেফাযতে ছিল, তাঁরা যদি এ ভাবে শহীদ হন, তা হলে কোরআন লোপ পাবে; অতএব কোরআন সংগ্রহ ও সংরক্ষণের আশু ব্যবস্থা করা উচিত। আবুবকর প্রথমে অনিচ্ছুক হন, এই সঙ্কোচ করে যে, রসূলুল্লাহ্ যা করেন নি, কিভাবে তাঁর দ্বারা তা সম্ভব। কিন্তু ওমরের বারবার তাগিদে আবুবকর সম্মত হন। কোরআন লেখার প্রধান দায়িত্ব পড়ে যায়েদ-বিন্ সাবিতের উপর। বিভিন্ন স্থানে সাহাবাদের থেকে কোরানের সূরা ও আয়াত সংগ্রহের ভার তাঁর উপর ন্যস্ত হয়। প্রকাশ্যে ঘোষণাও করা হয় যে, যার হেফাযতে বিশ্বনবীর সময় থেকে কোরআনের কিছু অংশ রক্ষিত আছে, তা উপস্থিত করতে। কোন অংশ উপস্থিত করার সময় এটাই প্রমাণ দিতে হতো, অন্তত দুজন সাক্ষীর দ্বারা যে, অংশটি রসূলে করীমের সময় তারা লিখিত প্রত্যক্ষ করেছে। এ-ভাবে সব সূরা সংগৃহীত হলে, একটি কমিটি গঠিত হয়, একখণ্ডে কোরআন নির্ভুলভাবে লিখিত রাখার কাজ তদারক করতে। সা’দ-বিন্-আসের আবৃত্তি অনুযায়ী যায়েদ লিপিবদ্ধ করতেন। কমিটির উপর আরও নির্দেশ ছিল, উচ্চারণ সম্বন্ধে মতদ্বৈত হলে মুদার গোত্রীয়দের উচ্চারণ-বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করা হবে, কারণ, কোরআন তাদের ভাষাতেই নাযেল হয়েছিল। এ-ভাবে অতীব সাবধানতা-সহকারে কোরআন সংগৃহীত হয়ে নির্ভুলভাবে লিখিত হলে ওমর নির্দেশ দেন, নির্ভুল সংস্করণ বহুলভাবে প্রচার ও শত শত লোককে সমগ্র কোরআনে হাফেজ করে তুলতে। যাতে কোরআন পাঠে ভুল না হয়, তার জন্যে নির্দেশ দেন, যে স্বরচিহ্নগুলি (যথা জবর, জের, পেশ ইত্যাদি) এবং শব্দের অবিকৃত গঠন যেন রক্ষা করা হয়। সকল শিক্ষায়তনে কোরআনে শিক্ষা অবশ্য-পাঠ্য বিষয় ধার্য হয়। বেদুঈনদের কোরআন পাঠ শিক্ষা অবশ্য কর্তব্য হিসেবে গণ্য হয় এবং কিছু অংশও কণ্ঠস্থ না করা দণ্ডনীয় হয়। প্রত্যেককেই অন্তত পাঁচটি সূরা-বাকারা, নিসা, মায়দা ও হজ ও নুর অবশ্যই মুখস্থ করতে হতো। আবু সুফিয়ান বেদুঈনদের, আবুদরদা দামেশকে, ইবাদা হিমস্ নগরে এবং মুয়ায প্যালেস্টাইনে ওমর কর্তৃক কোরআন-শিক্ষক নিযুক্ত হন। কোরআনে সঠিক জ্ঞান লাভ ও ধর্ম অনুধাবনের উদ্দেশ্যে আরবী ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষা ও বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। আরও নিয়ম করা হয়েছিল যে, যাঁর শব্দ-বিজ্ঞানে ব্যুৎপত্তি নেই, তাঁর কোরআন শিক্ষা দান করা উচিত নয়।

    কোরআনের পরেই আসে হাদীস প্রসঙ্গ। হাদীস প্রচারে ওমর বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করেন এবং সুদক্ষ সাহাবা ব্যতীত অন্যের পক্ষে হাদীস বর্ণনা অনুচিত হিসেবে অভিমত প্রকাশ করেন। শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ বলেন: ফারুক ই-আযম আবদুল্লাহ বিন্-মাসুদকে কুফায়, মকাল-বিন্-ইয়াসার ও অন্য দুজনকে বসরায় এবং ইবাদা ও আবু দরদাকে সিরিয়ায় প্রেরণ করেন এবং আমীর মুআবীয়কে নির্দেশ দেন যে, উপরোক্ত সাহাবাগণ ব্যতীত অন্য কেউ যেন হাদীস বর্ণনা না করে। হাদীস কথনে ওমর এতোখানি সতর্ক ছিলেন যে, তাঁর বরাতী হাদীসের সংখ্যা মাত্র সত্তরটি। এ বিষয়ে শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্‌র অভিমত উল্লেখযোগ্য: ওমর প্রকাশ্য ভাষণে হাদীস উল্লেখ করতেন বর্ণনাকারীর নাম না নিয়ে, যাতে বর্ণনাটি সন্দেহাতীত হয়। অনেকে মনে করেন, আবুবকর ছয়টি ও ওমর সত্তরটি সুনির্ভর হাদীস বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তাঁরা লক্ষ্য করেন যে, ওমর সমগ্র হাদীসশাস্ত্রকে সুদৃঢ় করেছিলেন।

    ওমর সেই শ্রেণীর হাদীসসমূহের প্রসার ও প্রচারণার দিকে বেশি জোর দিয়েছিলেন, যেগুলি নামায, নীতি ও সামাজিক ক্রিয়া-কর্মের বিষয়ীভূত এবং যেগুলির এ-সব বিষয়ের সম্বন্ধে কোন ইঙ্গিত নেই, সেগুলির সম্বন্ধে তিনি ততো মনোযোগী ছিলেন না। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, যে-সব হাদীস আঁ-হযরতের রেসালত সম্পর্কিত ও ইসলাম প্রচারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সেগুলির সঙ্গে তাঁর নিজস্ব মানবীয় জীবন-সম্পর্কিত হাদীসসমূহ যেন মিশ্রিত হয়ে না যায়। শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ বলেন: গভীর পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, ফারুক-ই-আযম তীক্ষ্ণ দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছিলেন মানুষের নৈতিক ক্রমোন্নতি ও শরীয়ত বা আইন সম্পর্কিত হাদীস সমূহ ও অন্যগুলির পার্থক্য নির্ণয় করায়। অতএব যে-সব হাদীস রসূলুল্লাহ্‌র নিছক ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক ও অভ্যাস সম্পর্কিত সেগুলির তিনি খুবই কম উল্লেখ করেছেন। এর কারণ ছিল দুটি-প্রথমত সেগুলির আইন ও বাধ্যতামূলকতার ততো মূল্য নেই। আর দ্বিতীয়ত সেগুলির প্রসার ও প্রচারণার দিকে সমান জোর দিলে সেগুলি ও ধর্মীয় বিধি-বিধান সম্পর্কিত হাদীসসমূহ একাকার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিত। ওমর আরও সালাত সম্পর্কিত হাদীসসমূহ কোনও বাঁধা-ধরা বিধান হিসেবে প্রচারণার ইচ্ছা প্রকাশ করেন নি। তাঁর যুক্তি ছিল ওয়ালীউল্লাহ্ মতে: “ওমর সম্যক জ্ঞাত ছিলেন যে, নামায আদায়কারীর আন্তরিকতা ও নম্রতার উপরেই তাঁর সাধনা-আরাধনা গৃহীত হওয়া না হওয়া নির্ভর করে, শুধু সালাতের কথার উপর নয়।”

    ওমরের আর একটি মহৎ কাজ হাদীস মূল্যায়ন-শাস্ত্রের উদ্ভাবন। তিনি জানতেন যে, কোনও যুগেই মানুষ স্বাভাবিক দুর্বলতা পরিহার করতে পারে না এবং তার দরুন ভক্তির আতিশয্যে রসুলুল্লাহ্ নামাঙ্কিত যে কোন হাদীস মানুষ সহজে বিশ্বাস করে নেয়, তার সত্যাসত্যের যাচাই না করে। এজন্যে হাদীসের মূল্যাবধারণে তিনি সর্বদাই ভ্রমে পতিত না হওয়ার দিকে তীক্ষ্ণ লক্ষ্য রাখতেন এবং তার ফলেই পরবর্তীকালে হাদীস যাচাইয়ের নীতিটি এমন একটি সুশৃঙ্খল টেক্‌টিকে রূপায়িত হয়েছে যা বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারে এক অভিনব সংযোজন। হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষার্থে ওমরের উৎকণ্ঠা সম্বন্ধে আলোচনাকালে বিখ্যাত জ্ঞানী ও সমালোচক মুহাদ্দিস যাহাবী ‘তাযকিরাতুল হুফ্‌ফাযে’ লিখেছেন:

    পাছে লোকে রসূলুল্লাহ থেকে সরাসরি হাদীস কথনে ভুল করে বসে এবং পাছে হাদীস নিয়ে এমন মত্ত হয়ে পড়ে যাতে কোরআন পাঠে গালতি আসে, এজন্যে ওমর সাহাবাদেরকে নিষেধ করেন রসূলুল্লাহ্ থেকে সরাসরি হাদীস উল্লেখ না করতে। কারযা-বিন্-ক্কাব বলেছেন: আমরা যখন ইরাকে রওয়ানা হই, তখন ওমর আমাদের সঙ্গে কিছু দূর সহগামী হন এবং আমায় জিজ্ঞাসা করেন, কেন আমি আসছি বলতে পার? আমি উত্তর দিলেম, আমাদের সম্মান দেখাতে। ওমর বললেন, তা সত্যি তবে আরও কারণ আছে। তোমরা যেখানে যাচ্ছো সেখানে লোকে মৌমাছির মতো কোরআন পাঠে ভিড় জমিয়েছে। তাদের যেন হাদীসের মায়ায় জড়িও না; হাদীস ও কোরআন একাকার করে ফেলো না এবং তা হলে আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। কারযা ইরাকে হাজির হলে লোকে তাঁকে হাদীস বলতে অনুরোধ করলো। তিনি বললেন, ওমর হাদীস বলতে নিষেধ করেছেন। আবুসালমা বলেন, পরবর্তীকালে আমরা আবু হোরায়রাকে জিজ্ঞাসা করি, এখন যত হাদীস বর্ণনা করেন, ওমরের আমলে কি সেরূপ করতেন? আবু হোরায়রা উত্তর দেন, তা হলে তো ওমর বেত্রাঘাত করতেন। আবদুল্লাহ্-বিন্-মাসুদ, আবু দুর্দা ও আবু মাসুদ-আনসারীকে ওমর জেলে পাঠিয়েছিলেন রসূলুল্লাহ্ বরাত দিয়ে খুব বেশি হাদীস বর্ণনার জন্যে।

    বিখ্যাত মুহাদ্দিসে ঐতিহাসিক বালাজুরি বলেছেন: শরীয়তের কোনও বিধান সম্বন্ধে লোকে ওমরকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছিলেন: আমার যদি কখনো মিথ্যা বলার ভয় না থাকতো তা হলে এ সম্বন্ধে একটি হাদীস বর্ণনা করতেম। বহু হাদীসবেত্তা বারবার বলেছেন, ওমর খুব কমই হাদীস উল্লেখ করতেন এবং সময়ে সময়ে এভাবেও বলতেন না-”রসূলুল্লাহ্ বলেছিলেন….।” বস্তুত হাদীস কথনে এতোখানি সাবধানতা এবং সত্যাসত্য নির্ণয়ে এরকম উচ্চমান নির্ধারণের ফলে ওমরের আমলে খুব কমই হাদীস উল্লেখিত হতো এবং সেগুলিতে সন্দেহের লেশমাত্রও থাকতো না। পরবর্তীকালে হাদীস বর্ণণের মাত্রা খুবই বৃদ্ধি পায় এবং তার ফলে সঠিকতা ও বিশ্বস্ততার মান অনেক নিম্নস্তরে নেমে যায়। এ সম্বন্ধে শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ উক্তি প্রণিধানযোগ্য: যদিও সাহাবারা সকলে সত্যাশ্রয়ী তাঁদের উক্তি গ্রহণযোগ্য এবং বাধ্যতামূলক তবুও ফারুকের আমলে হাদীস ও ফিকাহ্ যে পর্যায়ে ছিল এবং পরবর্তীকালে যা হয়েছিল, তার মধ্যে পার্থক্যটা আসমান জমীনের মতোই।

    ফিকাহশাস্ত্রের সৃষ্টি ওমরেরই অবদান। এ বিষয়ে ওমরের সূক্ষ্মদর্শিতা ও শ্রেষ্ঠতা সম্বন্ধে সাহাবামণ্ডলী একমত। দারিমী তাঁর মসনদে লিখেছেন: হোদায়ফা-বিন্-আল-য়্যম বলেছেন, যিনি ইমাম ও কোরআনে যাঁর সম্যক অধিকার আছে তাঁরই বিধান দেওয়া সাজে। তাঁর মতে এরূপ ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি নির্দ্বিধায় ওমর-বিন্ – খাত্তাবের নামোচ্চারণ করেছিলেন। আবদুল্লাহ্ বিন্-মাসুদের মতে সারা আরববাসীর জ্ঞান পাল্লার একদিকে ও ওমরের জ্ঞান অন্যদিকে স্থাপিত হলে ওমরের দিকই ভারী হবে। আবদুল্লাহ্ আরো বলেছেন ওমরের সাহচর্যে এক ঘণ্টা যাপন করা এক বছরের এবাদতের চেয়েও উত্তম। নিযামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তী আবু ইসহাক শিরাজী ফকীহ্ বা আইন-বেত্তাদের সম্বন্ধে পুস্তকে সাহাবী ও তাঁদের উত্তরাধিকারীদের বয়ানমতে ওমরের মীমাংসার উল্লেখ করে লিখেছেন: অতি-বর্ণনার ভয় না থাকলে আমি ওমরের এতো মীমাংসা ও সে-সব থেকে উৎপাদ্য আইনকানুনের নযীর দিতে পারতাম; যার বহর দেখে বিদ্যুৎকুল বিস্ময় মানতেন। ইমাম মুহম্মদ তাঁর ‘কিতাবুল আসিরে’ বলেছেন: রসূলুল্লাহ্ (আল্লাহ্‌র শান্তি ও আশিসরাশি তাঁর উপর বর্ষিত হোক) ফিকাহ্ আলোচনা করতেন আলী, ওবাই ও আবু মুসা আশারীর সঙ্গে একত্রে: আবার ওমর, যায়েদ-বিন্-সাবিত ও আবদুল্লাহ-বিন্-মাসুদের সঙ্গে একত্রে। বস্তুত এই ছয়জন ছিলেন ফিকাহ্ শাস্ত্রের ছয়টি স্তম্ভ।

    শরীয়তের প্রশ্নে হাদীস থেকে সাধারণত স্পষ্ট নির্ভুল বিধান মেলে। তবুও যুগধর্মে এমন অনেক প্রশ্নের উদ্ভব হয়, যার কোন পরিষ্কার বিধান হাদীসে পাওয়া যায় না, কিন্তু সে সবের ব্যাখ্যা থেকে একটা মীমাংসায় উপস্থিত হতে হয়, কিংবা পরস্পরবিরোধী হাদীস থাকলে সে সব জ্ঞান ও যুক্তির আলোকে ব্যাখ্যা ও অনুধাবন করে একটা মীমাংসা করতে হয়। ওমরের কৃতিত্ব ও পারঙ্গমতা ছিল এখানে এবং ইসলামের আদি স্তর থেকেই ওমর ফিকাহ্ শাস্ত্রের বিশেষ অধ্যয়ন ও অনুধ্যান করেছিলেন। তার দরুন আবদুল্লাহ-বিন্-মাসুদ, আবুমুসা আশারী ও যায়েদ-বিন্-সাবিত নির্দ্বিধায় ওমরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করতেন। আইনের কূটতর্ক উপস্থিত হলে ওমর নিজের মতামত লিপিবদ্ধ করতেন, তারপর গভীর ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করে সে মত দূরীভূত বা পরিবর্তন করতেন। কিতিল্লানী বুখারী শরীফের তফসীর প্রণয়নকালে প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন যে, পিতামহের ওয়ারিসী স্বত্ব সম্বন্ধে ওমর অন্যূন দুইশত মত প্রকাশ করেছিলেন। ফিকাহশাস্ত্রে ও সমসাময়িক আরবী ইতিহাসে ওমরের যে-সব মীমাংসার উল্লেখ আছে, সে-সবের প্রশ্নাবলীর উদ্ভব হয়েছিল বিভিন্ন দেশ থেকে। তাঁর আইন ঘটিত মীমাংসার সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। তার মধ্যে কেবল ফিকাহ্‌র প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে ছিল প্রায় এক হাজার এবং চার মযহাবের স্রষ্টাগণ অকুণ্ঠভাবে সে-সব অনুসরণ করেছেন। শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ বলেন: এই চার মযহাবের আইন-বেত্তাগণ ফারুক-ই-আযমের ফিকাহ্ সংক্রান্ত প্রশ্নগুলির মীমাংসা নির্দ্বিধায় অনুসরণ করেছেন এবং সেগুলির সমষ্টি হবে এক হাজার। এখানে আরও উল্লেখযোগ্য যে, ওমর যে-সব বিষয়ের প্রশ্ন রসূলুল্লাহ্ রেসালত সংশ্লিষ্ট নয় বলে বিবেচনা করেছেন সে-সব ক্ষেত্রে নির্দ্বিধায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন খোদ রসূলুল্লাহ্ সাক্ষাতে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, বদরযুদ্ধে ধৃত বন্দীদের প্রতি ব্যবহার বিষয়ে এবং হোদায়বিয়ার সন্ধিকালে অসম শর্তগুলির বিরুদ্ধে ওমর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। হাদীসের এই বিভিন্ন রূপের পার্থক্য অনুধাবন করে ওমর ইসলাম-সম্পর্কিত নয় এমন সব বিষয়ের মীমাংসা করেছেন নিজের জ্ঞান বিবেকের উপর নির্ভর করে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, আবুবকরের সময় পর্যন্ত দাসীরা সন্তান জন্মদানের পরও মুক্তি লাভ করতো না এবং যথেচ্ছভাবে বিকিকিনি হতো। ওমর এ প্রথা একেবারে রহিত করেন। তাবুক অভিযানকালে রসূলুল্লাহ্ জিয়া ধার্য করেছিলেন মাথাপিছু এক দীনার হারে, কিন্তু ওমর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন হার ধার্য করেন। রসূলুল্লাহ্ সময় পর্যন্ত পানদোষের কোন নির্দিষ্ট শাস্তি ছিল না, কিন্তু ওমর আশিটি বেত্রাঘাতের আদেশ জারী করেন। এখানেই স্পষ্ট হওয়া দরকার যে, এ-সব ব্যাপারে রসূলুল্লাহ্ কথায় বা কাজে যদি এতোটুকু বিধির ইঙ্গিত থাকতো, তা হলে তাঁর অতি প্রিয় ও পরমভক্ত সহচর ওমর কখনও পরিবর্তনের কল্পনাও করতে পারতেন না; আর যদিও করতেন তা হলে ধর্মভীরু সাহাবাগোষ্ঠী তাঁকে খলিফা হিসেবে একদিনও সহ্য করতেন না।

    আইনশাস্ত্রের উন্নতি ও সর্ববিষয়ে মীমাংসাকরণের সদিচ্ছা থেকেই ‘কিয়াসের জন্ম। বলা বাহুল্য, কিয়াস মুসলিম আইনশাস্ত্রের চতুর্থতম স্তম্ভ। কিয়াসের লক্ষ্য হচ্ছে, দৃষ্টান্ত থেকে তুলনামূলক বিচার করে যুক্তি নির্ভর আইন-সূত্র উদ্ভাবন করা। চার মযহাবের স্রষ্টা মহামনীষী ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফী ও ইমাম আমদ এবনে হাম্বলের দৃষ্টান্ত থেকে অনুমেয় সিদ্ধান্তে উপস্থিত হওয়ার উপযোগিতা স্বীকার করতেন এবং তার দরুন তাঁদের বহু আইন-নীতি কিয়াস থেকে উদ্ভুত। কিন্তু মুসলিম আইন শাস্ত্রের এই অন্যতম স্তম্ভের জন্মদাতা ছিলেন মহৎ ওমর।

    একটা সাধারণ ধারণা আছে, কিয়াসের উদ্ভাবক ছিলেন মুয়ায-বিন্-জবাল। তাঁরা বলেন, রসূলুল্লাহ্ যখন মুয়াযকে ইয়ামন পাঠান, তখন জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি অভিযোগসমূহের কিভাবে ফয়সালা করবেন। মুয়ায উত্তর দেন, কোরআনের বিধি-বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করবেন; সেখানে নির্দেশ না পাওয়া না গেলে হাদীস থেকে এবং কোরআন ও হাদীসের কোন নির্দেশ না পেলে তিনি নিজের বিচার-শক্তি প্ৰয়োগ করবেন। এটি ইতিহাদ অর্থাৎ নিজের বিচার-শক্তি খাটানো, কিয়াস নয়। মুসলিম আইন-তত্ত্বের ক্রমবিকাশ পর্যালোচনা করলে লক্ষ্য করা যায়, আবুবকরের সময় পর্যন্ত কোরআন ও হাদীস এবং এ দুটি থেকে আলোক না মিললে ইজ্জ্‌মার উপর নির্ভর করে বিষয়াদির মীমাংসা করা হতো। তখনও কিয়াস চিন্তার বিষয়ীভূত হয় নি। ওমর আবু মুসা আশারীকে বিচার-সংক্রান্ত যে ইতিহাস-বিশ্রুত ফরমান পাঠিয়েছিলেন তার এই কথাগুলি এক্ষেত্রে পুনরায় স্মরনীয়: “যখন কোন বিষয়ের মীমাংসার নির্দেশ কোরআন ও হাদীসে পাওয়া না যায় এবং তোমার মনে সন্দেহ জাগে তখন বিষয়টি বারবার চিন্তা করবে। আর অনুরূপ বিষয়ে পূর্বের কোন নজীর থাকলে তাই প্রয়োগ করবে।” এর মধ্যেই কিয়াসের জন্ম-সূত্র নিহিত, কারণ কিয়াসের লক্ষ্য হলো: কোরআন সুন্নাহ বা ইজ্‌জ্মায় রয়েছে, এমন কোন পূর্ব-ঘটনা বা বিষয়ের সঙ্গে নতুন ঘটনার সামঞ্জস্য আছে কিনা বিচার করে দেখা এবং থাকলে সেই বিধান প্রবর্তন করা। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, সুন্নায় আছে, কোন ব্যক্তি অপরের জিনিস জোরপূর্বক ব্যবহার করলে জিনিস কিংবা তার মূল্য ফেরত দিতে বাধ্য। এখন একজন অন্যের লোহা নিয়ে অস্ত্র তৈরী করে ফেললো। জিনিসটি নষ্ট হয়নি, কিন্তু রূপ পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিয়াসের বিধান হলো, এক্ষেত্রেও মূল্য ফেরত দিতে হবে। আসলে কিয়াসের বীজ নিহিত আছে কোরআনের বাণীতে। বহু জাতির উত্থান-পতনের এবং নিষেধ অমান্য করায় শাস্তির উল্লেখ আছে কোরআনে এবং বিধর্মী ও অন্যায়কারীদের তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। এখানে কিয়াসের নির্দেশ হলো, তোমরা যদি এমনই করো, তা হলে তোমাদেরও অনুরূপ শাস্তি হবে। বস্তুত শরীয়তের উৎসসমূহের মধ্যে কিয়াসের স্থান চতুর্থ হলেও ইতিহাদের প্রধান পন্থা হিসেবে তার প্রভাব-পরিসর অতি প্রশস্ত। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে যুগে যুগে কিয়াসের প্রয়োজন অনুভূত হয় এবং তার দ্বারা ইসলামী আইনশাস্ত্রে নতুন নতুন ধারা-উপধারা সংযোজিত হচ্ছে। সংক্ষেপে বলা যায়, কিয়াস ইসলামের সঞ্জীবনী শক্তি আর এই শক্তির স্রষ্টা হিসেবে ফারুক-ই আযমের নাম প্রথমে গ্রহণীয়। খুম্‌স্‌ বা মালে-গণিমাতের পঞ্চমাংশে রসূলুল্লাহ্‌র ওয়ারিসানের একক অধিকার নেই, এটি ওমরের কিয়াসমতের নির্দেশ। ফিকের বাগিচায় রসূলুল্লাহ্ ওয়ারিসানের খাসস্বত্ব নেই, এটিও ওমরের কিয়াসমতে হুকুম। এ সিদ্ধান্তের সমর্থন মেলে কোরআনের এ মহাবাণী থেকে যা কিছু আল্লাহ্ রসূলকে দান করেছেন নগরবাসীদের অধিকার থেকে, তাতে স্বত্ব আছে আল্লাহ্‌র রসূলের, আত্মীয়-স্বজনের, অভাবগ্রস্ত ও মুসলিমদের (৫৯ : ৭)। আর এ রকম সিদ্ধান্তের মৌল ভিত্তি হলো এই সর্বজন মতগ্রাহ্য চিরন্তন নীতি যদি কোনও ব্যক্তি পয়গম্বর, ইমাম, আমীর বা সুলতানের পদাধিকার বলে কোন সম্পত্তি অর্জন করেন, তবে সে সম্পত্তি তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয় না এবং তাঁর ওয়ারিসান দাবী করতে পারে। এ-দৃষ্টান্ত থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয়, যে-সব প্রশ্ন বহু বিতর্ক সাপেক্ষ এবং সাহাবাগণও যার মীমাংসায় দ্বিধাগ্রস্ত সে সব কি সুন্দর ও ন্যায়ানুগতভাবে মীমাংসিত হয়েছে ওমরের হাতে। তাঁর মীমাংসাসমূহ এক দিকে কোরআন ও হাদীসের অনুবর্তী, অন্যদিকে রাষ্ট্রনীতি ও সভ্যতার প্রগতির পথে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ

  • রাষ্ট্রনায়ক : ব্যক্তিত্ব

    রাষ্ট্রনায়ক : ব্যক্তিত্ব

    রাষ্ট্রনায়ক : ব্যক্তিত্ব

    ওমরের কর্তৃত্ব বিস্তৃত ছিল সুবিশাল ভূখণ্ডে পূর্বে ও পশ্চিমে বহু দেশের নানা ধর্মাবলম্বী নানা জাতির উপর। কিন্তু তাঁর প্রতাপ ছিল দোর্দণ্ড, শাসন ছিল নিরঙ্কুশ ও অব্যাহত এবং শান্তি ও শৃঙ্খলা পূর্ণভাবে বিরাজিত ছিল রাষ্ট্রের সর্বত্র এবং দূরতম অগম্য প্রান্তদেশেও। তাঁর পূর্বে ও পরে বহু প্রতাপশালী রাষ্ট্রপতি রাজ্য শাসন করেছেন, শান্তি ও শৃঙ্খলা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। কিন্তু এ-দুয়ের মধ্যে নীতিগত পার্থক্যটা বিশেষ লক্ষণীয়। তাঁদের রাষ্ট্রে শাসনের মৌলনীতি ছিল, রাজদ্রোহের সামান্যতম আভাসে ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করা এবং একের অপরাধে সমস্ত পরিবারটিকে নির্মূল করে ফেলে এমন ভয়-বিভিষিকা সৃষ্টি করা, যার ফলে অন্য আর কারও মাথায় বিদ্রোহ করার কল্পনাও না জাগে। কিন্তু খলিফা ওমর ন্যায় নীতি থেকে এতোটুকু ভ্রষ্ট না হয়ে প্রকাশ্য রাষ্ট্রদোহীদেরকে দেখেছেন ক্ষমাসুন্দর চোখে এবং নিরাপত্তার খাতিরে তাদেরকে আত্মীয়-পরিজনসহ আপন পছন্দ স্থানে সরকারী খরচে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আর বুসের বাসিন্দারা বারে বারে বিদ্রোহের ধ্বজা তুলেছে, কিন্তু তাদের উপর ওমর কোন রকম দমননীতি প্রয়োগ বা হিংসাত্মক ব্যবস্থা অবলম্বন করেন নি নাজরানের খ্রিস্টানরা চল্লিশ হাজার সৈন্য সংগ্রহ করে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল, কিন্তু তাদেরকেও নির্মূল না করে তিনি স্বেচ্ছায় অন্যত্র বসবাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন সরকারী ব্যয় এবং দুবছরের জন্যে জিয়াও মাফ করে দিয়েছিলেন।

    ওমর খেলাফতের ভার গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে দুটি ভীষণ প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হন। একদিকে বিদেশী বিধর্মী ও বিজাতি খ্রিস্টান ও পারসিককেরা বহু শতাব্দী সাম্রাজ্যবাদের সব রকমের ভোগ-বিলাসে অভ্যস্ত হয়ে মুসলিমদের হাতে সহসা ভাগ্য পরিবর্তনকে সহজে গ্রহণ করতে পারে নি, নতি স্বীকার করে নি; বরং সময় ও সুযোগ বুঝে বারে বারে বিদ্রোহের ধ্বজা তুলেছে। অন্যদিকে আরবের মধ্যেই এমন কয়েকটি গোত্র ও বংশ ছিল, যারা ওমরের খেলাফত সহজে মেনে নিতে চায় নি; বরং হিংসার বশবর্তী হয়ে নিজেদের উচ্চাভিলাষ পূরণ ও খেলাফতের আসন অধিকার করবার প্রয়াস পেয়েছে। ওমর শান্তভাবে ও ধীর মস্তিষ্কে এ দুটি দলকে সংযত রেখেছেন, কোন রকম দমননীতির আশ্রয় না নিয়ে। বনি হাশিম ও বনি-উমাইয়া মনে করতো, খেলাফত তাদেরই ন্যায্য ও বিধিদত্ত অধিকার ওমর অন্যায়ভাবে তাদের বঞ্চিত করেছেন। আমর-বিন্-আসের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিও যখন সরকারী রাজস্বের জন্যে হিসাবদিহি করতে বাধ্য হন তখন ক্ষোভে বলেছিলেন: কী ভাগ্যের পরিহাস। আইয়্যামে জাহেলিয়াতে আমার পিতা কিংখাবের জামা পরতেন, আর খাত্তাব মাথার বয়ে জ্বালানী কাঠ বেচে খাবার যোগাড় করতো। আজ সেই খাত্তাব-নন্দন আমার উপর মনিবানা চালাচ্ছে। হাশেমীরা কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারে নি যে, একজন তাইয়েমী (আবুবকর) এবং একজন আবি (ওমর) তাদের উপস্থিতিতে খলিফা হবে। তারা প্রকাশ্যে খলিফার পদবি লোপের প্রচারণা করতো। শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ বলেন: জুবায়ের এবং একদল হাশেমী বিবি ফাতেমার গৃহে জটলা করতেন এবং খেলাফত উচ্ছেদের আলোচনা করতেন।

    স্থিতধী ওমর এসবে এতোটুকু বিচলিত হন নি, বরং শিষ্টাচার ও সহানুভূতির মাধ্যমে সকল শ্রেণীর হৃদয় জয় করতে সমর্থ হয়েছেন। আরবরা স্বভাবতই যথেচ্ছাচারী, আত্মসর্বস্ব ও স্বাধীনতাপ্রিয় আর তার দরুন তারা কারও শাসন শৃঙ্খল স্বীকার করতো না। আরব-চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্যগুলি নষ্ট করে দিয়ে পরবর্তীকালের আমীর মুআবীয়ার মতো নিজের আসন নিরঙ্কুশ ও নিঃসংশয় করবার মনোবৃত্তি ওমরের ছিল না; তিনি সকল প্রতিকূল মনোভাবাপন্ন দলের হৃদয় জয় করে তাদের মনোরাজ্যে নিজের আসন সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এটাই ছিল ওমরের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে গৌরবজনক ভূমিকা।

    কিন্তু ‘ওমর’ নাম এমনই মহিমান্বিত, এমনই শ্রদ্ধা, ভয় ও ভীতিব্যঞ্জক যে, তার শাসিত সুবিশাল ভূখণ্ডে কারও সাধ্য ছিল না, তাঁর বিরুদ্ধে টুশব্দ করে, তাঁর ফরমান অমান্য করে, তাঁর সম্বন্ধে ‘কি-ও-কেন’ প্রশ্ন তোলে। আলেকজান্দার, তায়মুর, নেপোলিয়ান প্রভৃতি বিশ্ববিজয়ী সম্রাটের নামেও মানুষের বুক দুরু দুরু কেঁপে উঠতো কিন্তু তাঁদের রাজসিক শান-শওকত, শতসহস্র দেহরক্ষী, চৌকিদার চোবদার ছিল তাঁদের মহিমা বা ভীতির প্রতীক। মুহূর্তে মুহূর্তে তাঁদের উপস্থিতিতে প্রত্যক্ষ হয়েছে কতো ভীতি প্রদর্শন, কতো শাসন-বচন। আর শত তালি-শোভিত জীর্ণ জামা পরিহিত নিরস্ত্র একাকী খলিফাতুল মুসলেমীন ওমর ফিরেছেন পথে-প্রান্তরে। অথচ আরব, মিসর, সিরিয়া, ইরাক, ইরান শিহরিত হয়েছে তাঁর নামোচ্চারণে, কম্পিত হয়েছে তাঁর তর্জনী হেলনে। পৃথিবী চমকিত, হতচকিত হয়েছে, যেদিকে তিনি দৃষ্টি ফিরিয়েছেন। সিরিয়ায় চলেছেন ইসলাম জগতের প্রহরীবিহীন চীরধারী সম্রাট খলিফা ওমর একা পথে উটের রশি ধরে। তবুও চারদিক নীরবে কেঁপে উঠেছে-পৃথিবীর শক্তিকেন্দ্র গতিলাভ করেছে।

    ওমর প্রশাসনিক প্রয়োজনে খালিদকে পদচ্যুত করেছেন ভীষণতম যুদ্ধের মহাসন্ধিক্ষণে একটি ফরমান জারী করে। অথচ তখন খালিদের লোকপ্রীতিতে দিগ্‌দিগন্ত মুখরিত। আর বিশ্ববিজয়ী বীর খালিদ সে ফরমান মান্য করেছেন বিনা প্রতিবাদে মহাভক্তি ভরে। ইরান-বিজয়ী সা’দ-ওক্কাসের কৈফিত তলব করেছেন ওমর সা’দ দুরু দুরু বুকে মদীনায় এসে পদচ্যুতির হুকুম গ্রহণ করেছেন সামান্য সিপাহীর বেশে, কোনও প্রতিবাদ না জানিয়ে। আমর-বিন্-আসের মতো মহাপ্রতাপশালী ব্যক্তির পুত্রকে ওমর শাস্তি দিয়েছেন পিতৃসমক্ষে বেত্রাঘাতে জর্জরিত করে, আমর নীরবে তা দেখেছেন। আমীর মুয়াবিয়া ও আমরের শক্তি-গর্ব ও শান-শওকত সর্বজনবিদিত, তবুও তাঁরা ওমরের নামে সন্ত্রস্ত, শঙ্কিত। জনগণ ওমরের এ-সব কাজ অকুণ্ঠায় সমর্থন করেছে। এমনই ছিল ওমরের রাষ্ট্র কৌশল এবং প্রশাসনিক প্রতিভা ও প্রভাব।

    এখানে আরও একটি দিক লক্ষ্যণীয়। আলেকজান্দার প্রতি পদক্ষেপে এরিস্টটলের জ্ঞান-বুদ্ধিতে চালিত হয়েছেন, বাদশাহ্ আকবরের শক্তি সামর্থের পিছনে ছিলেন মানসিংহ, আবুল ফজল, টোডরমল প্রভৃতি নও-রতন-সভার বীর মনীষীবৃন্দ। আলফ-লায়লা বিশ্ববিশ্রুত আব্বাসী খলিফাদের শক্তি গরিমার পশ্চাতে ছিল বারমেকী বংশের মনীষা। কিন্তু ওমর ছিলেন নিতান্তই একাকী, অন্যপক্ষে স্বয়ংপ্রভু রাষ্ট্রনায়ক। তিনি ইচ্ছামতো সিপাহসালার, প্রাদেশিক শাসন নিযুক্ত করেছেন, কিন্তু প্রয়োজনের ক্ষেত্রে বিনা দ্বিধায় খালিদ, আমর, আম্মার, আয়ায-বিন্-ঘনমকে পদচ্যুত করেছেন। তবু তার দরুন শাসন-যন্ত্রে এতোটুকু দুর্বলতা দেখা দেয় নি, বিজয় অভিযানের গতিরোধ হয় নি। সকলেই ছিলেন ওমরের শাসনযন্ত্রের হাতিয়ারের মতো, অবাঞ্ছিত ও অপ্রয়োজনীয় হলে ওমর নির্দ্বিধায় ছাঁটাই করে নতুন উপযুক্ত লোক বেছে নিয়েছেন। কেউই ওমরের চোখে অপরিহার্য হয়ে ওঠেন নি।

    ওমর ছিলেন সুদক্ষ রাষ্ট্রনায়ক। সমকালীন মশহুর সাহাবাদের কেউই এ বিষয়ে তাঁর যোগ্যতার ধারে-কাছে ছিলেন না। আরব, ইরাক, সিরিয়া, ইরান, মিসর প্রত্যেক দেশেই শাসননীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি ছিল ভিন্ন ভিন্ন। তীক্ষ্ণধী ওমর এ-সব নীতি বৈশিষ্ট্যপূর্ণভাবে অনুধাবন করে প্রত্যেক দেশেরই শাসন-যন্ত্র সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করে তোলেন। ইরাকের মরান ও ইরানের দেহকান্ উপাধিধারী জমিদার-জোতদারদেরকে উপযুক্ত রাজকীয় বৃত্তিদান করে শান্ত, সংযত ও অনুগত করে রাখেন। সিরিয়া ও মিসরের রোমক শোষণ জর্জরিত কৃষকও নাগরিকদের ভূমিস্বত্ব স্বীকার করে নিয়ে তাদেরকে উৎপীড়ন ও শোষণ থেকে রক্ষা করেন এবং সহৃদয় ব্যবহারে এমনভাবে . তাদের হৃদয় জয় করে ফেলেন যে, পরবর্তীকালে রোমকদের বিরুদ্ধে তারা রুখে দাঁড়াতে ও মুসলিমদের সাহায্য করতে ইতস্ততঃ করে নি। মিসরের রোমক-রাজপ্রতিনিধি সাইরাস প্রথম থেকেই মুসলিমদের শুভানুধ্যায়ী হয়ে উঠেছিলেন। তবুও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্যে ওমর প্রত্যেকটি ঘাঁটিতে যেমন বস্ত্রা, কুফা, ফুস্তাত সেনানিবাস স্থাপন করে সেগুলি খাস আরবদের উপনিবেশ হিসেবে গড়ে তোলেন। তা ছাড়া উপযুক্ত প্রাদেশিক শাসনকর্তা নির্বাচন করা, সময়ে সময়ে তাদেরকে বদলি করা, তাঁর আর একটি কৌশল ছিল। হাশেমীদের কাউকে রাজনৈতিক কারণে প্রশাসনিক কাজের ভার দেওয়া হতো না। আরও একটি আদর্শ লক্ষণীয়। ওমরের স্বজনপ্রীতির বালাই ছিল না, এজন্যে তাঁর গোত্রীয় কেউ প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অধিকার পাননি। কাজের চাহিদা ও গুরুত্ব অনুযায়ী সঠিক এবং যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচন ও নিয়োগ করা ওমরের আর একটি প্রশংসনীয় কৃতিত্ব; লোক-চরিত্র অনুধাবনে ছিল তাঁর আশ্চর্য ক্ষমতা এবং সারা আরবের মনীষীদীপ্ত ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নাম ছিল তাঁর নখাগ্রে এবং যোগ্যতম ব্যক্তিকে তাঁর যোগ্য পদে নিয়োগ করা হতো। আমীর মু’আবীয়া, আমর, মুগিরা, যিয়াদ প্রশাসনিক পদে, খালিদ, সা’দ, নোমান, আয়ায সেনানায়কের পদে, মায়েদ-বিন্-সাবিত ও আবদুল্লাহ্-বিন্-আরকামের মতো শিক্ষিত ব্যক্তিরা সেক্রেটারীর পদে, কাজী শুরায়হ্ ক্কাব, সালমান আবদুল্লাহ্-বিন্-মাসুদ বিচারপতি পদে অসীম যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সংক্ষেপে যিনি যে কাজের উপযুক্ত, তাঁকে সেই কাজেই নিয়োগ করা হতো। জনৈক পাশ্চাত্য লেখক বলেন: ওমরের ক্যাপটেন ও গভর্নর নিয়োগনীতি স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে ছিল এবং আশ্চর্যভাবে কল্যাণকর হয়েছিল।

    ওমরের আর একটি রাষ্ট্রনীতি ছিল অন্যদেশের আইন ও শাসননীতি সম্বন্ধে ওয়াকিফহাল হওয়া এবং যেগুলি উত্তম ও আদর্শিক সেগুলি বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করা। ভূমিকর-নীতি, শুল্ক-নীতি, দরওয়ারী প্রশাসনিক নীতি, হিসাব পরীক্ষা নিরীক্ষা-নীতি, সেনানিবাস স্থাপন ও রসদ যোগান বিভাগ প্রবর্তন প্রভৃতি পারসিক ও রোম রাষ্ট্র চালনা-নীতিসমূহ তিনি রদবদল ও ইসলাম-অভিসারী করে অসঙ্কোচে গ্রহণ করেছিলেন। বাহ্যত জিয়ার ধর্মীয় সম্পর্ক থাকলেও তার হার নিরূপণ ও আদায় প্রথা নওশেরওয়ার নীতির অনুসারী ছিল। জিয়া সম্বন্ধে আলোচনাকালে তাবারী বলেছেন: এ-সব আইন পারস্য জয় করার পরে প্রবর্তন করেন। ইসলাম জগতের দার্শনিক-চিকিৎসক-বিজ্ঞানী মহামনীষী ইবনে সিনার সমসাময়িক দার্শনিক ইবনে-মাস্কাবীহ ওমরের শাসন-নীতি আলোচনাকালে আরও বিশদ করে বলেছেন: ওমর কয়েকজন পারসিককে নিজের সাহচর্যে রাখতেন। তাঁরা রাজাদের বিশেষত পারসিক রাজাদের শাসন-নীতি ওমরকে পাঠ করে শোনাতেন। তাঁদের মধ্যে নওশেরওয়ার কালেরই বেশি, কারণ ওমর নওশেরওয়ার শাসন-প্রণালী পছন্দ করতেন এবং প্রায়ই সেগুলি প্রয়োগ করতেন। আমরা দেখেছি, ফারেসের রাজা হরমুজান ইসলাম কবুল করে মদীনাবাসী হন ও ওমরের প্রশাসনিক ব্যাপারে অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠেন। এখানে এ কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ওমর পূর্বযুগের ও বিদেশী রাজন্যদের সুনীতিগুলি গ্রহণ দুর্নীতিগুলি একেবারে নির্মূল করেন। কূলগৌরব, আত্মমন্যভাব, অহেতুক ব্যঙ্গবিদ্রূপ, কামোত্তেজক কবিতা রচনা, যৌন বিকৃতি ও নারী জাতির অবমাননা এবং পানদোষ নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

    ওমর গোয়েন্দা ও গুপ্তচর বিভাগের সৃষ্টি করেন, একথা উল্লেখিত হয়েছে। বর্তমান রাষ্ট্রনীতিরও এ বিভাগটি এক অপরিহার্য অঙ্গ। তাবারী বলেন: ওমরের কিছুই অগোচর থাকতো না। সংবাদবাহকেরা তাঁকে জানাতো ইরাকে কারা বিদ্রোহ করেছে, আবার কারা সিরিয়ায় পুরস্কৃত হয়েছে। সামান্যতম ঘটনাও তাঁর গোচরে আসতো। মায়সনের শাসক নোমান বিলাসস্রোতে গা ভাসিয়ে স্ত্রীকে কবিতার ব্যঙ্গচ্ছলে লিখে পাঠান: সাবধান! খলিফা যদি জানতে পারেন আমরা বাস করছি আর পানোৎসবে মত্ত আছি, এটা তিনি মোটেই পছন্দ করবেন না। ওমর কিন্তু যথা সময়ে এ খবর পান এবং সঙ্গে সঙ্গে নোমানকে বরখাস্ত করেন। ওমর কিন্তু এই চির-সজাগ সৃষ্টি ও বিচক্ষণতা সম্বন্ধে সম্যক অবহিত থাকায় প্রাদেশিক শাসকরা সর্বদাই হুঁশিয়ার থাকতেন এবং তাঁর বিনা পরামর্শে কোনও গুরুত্বপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করতেন না।

    ওমরের শাসননীতির কয়েকটি প্রধান গুণ ছিল। তার একটি, সকলের প্রতি সমান আচরণ। ধনী-দরিদ্র, উচ্চ-নীচ নির্বিশেষে সকলেই তাঁর নিকট সমান ব্যবহার লাভ করতো। আত্মীয়-পর সকলেই রাষ্ট্রের নীতিতে সমান চোখে দৃষ্ট হতো ঘাসসানী গোত্র প্রধান জাবালা ইসলাম গ্রহণ করেন। একদা কা’বা প্রদক্ষিণকালে জনৈক সাধারণ লোক তাঁর পাগড়ী মাড়িয়ে দেওয়ায় তিনি তাকে চপেটাঘাত করেন এবং সেও তাঁকে সমান চপেটাঘাত করে। জাবালা ওমরের নিকট প্রতিবাদ জানালে ওমর রায় দেন, উচিত শাস্তিই হয়েছে। জাবালা বংশমর্যাদার দাবী তুলে বলেন, এমন ব্যবহারে লোকটির মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। কিন্তু ওমর বলেন: আইয়ামে জাহেলিয়াতে এ নিয়ম ছিল বটে, কিন্তু ইসলাম উচ্চ-নীচ সকলকে একই সমতলে এনে দিয়েছে। রাগে, ক্ষোভে জাবালা ইসলাম ত্যাগ করে কনস্টান্টিনোপলে পলায়ন করেন। একবার কোরায়েশ প্রধানরা ওমরের সাক্ষাৎপ্রার্থী হন। সোহায়েব, বিলাল, আমার এবং আরও কয়েকজন মুক্তদাসও সেখানে আছেন। ওমর প্রথমে বিলাল প্রভৃতিকে ডাক দিলেন, কোরায়েশ-প্রধানরা অপেক্ষা করতে লাগলেন। আবুসুফিয়ান অপমানিত বোধ করে বলেই ফেলেন : অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস! আযাদ গোলামরা পায় প্রথমে সাক্ষাৎ, আর আমরা বাইরে বসে থাকি প্ৰতীক্ষায়।

    কাদিসিয়ার যুদ্ধের পর আরব-গোত্রসমূহকে যখন বৃত্তি দেওয়া হয়, তখনও নানা প্রতিবাদ শোনা যায়। ওমর বংশমর্যাদার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে, ইসলামের সেবায় মানদণ্ডের বৃত্তি নির্ধারণ করেন। যারা প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করেছে, কিংবা প্ৰথম জেহাদসমূহে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছে, তালিকায় তাদের নাম ওঠে সবার ঊর্ধ্বে, তার পর নবীবংশের লোকদের, তার পর অন্য সকলের। প্রভু-গোলামে কোন পার্থক্য রইতো না; অথচ আরবে গোলামদের অবস্থা ছিলো সবচেয়ে ঘৃণ্য ও শোচনীয়। এমন কি খলিফার পত্রে আবদুল্লাহ্‌র হার ধার্য হয় ওসামা-বিন্-যায়েদের চেয়ে কম। আবদুল্লাহ্ প্রতিবাদ করলে ওমর ধমক দেন, “রসূলুল্লাহ্ তোমার চেয়ে ওসমানকে বেশি স্নেহ করতেন।

    ওমরের এই সমদর্শী নীতি রাজ্যশাসনে সমাজে, বিচারালয়ে সর্বত্র সমান অনুসৃত হতো, কোন বৈষম্যের লেশমাত্র ছিল না। আমর বিন্-আস্ মিসরের জামে মসজিদে নিজের জন্যে একটা উচ্চ মিনার স্থাপন করেছিলেন। ওমর তাঁকে ভর্ৎসনা করে লেখেন : তুমি কি ভেবেছো যে, অন্য সব মুসলিম তোমার নিচে বসবে, আর তুমি উচ্চাসনে বসবে রাজসিক গর্ব নিয়ে?

    একবার খোদ্ ওমর প্রতিবাদী হিসেবে যায়েদ-বিন্-সাবিতের এজলাসে হাযির হলে যায়েদ তাঁকে সম্মানের আসন দিতে অগ্রসর হন। কিন্তু ওমর বাদী ওবাই-বিন্-ক্বাবের পাশে বসে যায়েদকে বলেন: তুমি প্রথমেই মামলাটিতে অবিচার করলে।

    বস্তুত ঘরে-বাইরে, মসজিদে-দরবারে ওমরের আচারে-ব্যবহারে এতোটুকু প্রকাশ পেতো না, তিনি খলিফাতুল মুসলেমীন। তাঁর অঙ্গে এমন কোন চিহ্ন থাকতো না। ওমরের রুক্ষ মেযাজের কথা শোনা যায়, কিন্তু তাঁর সুক্ষ্ণ ন্যায় বিচারে সকলেই মুগ্ধ হতো। শাস্তি দানে আপন-পর শত্রু, মিত্র কোন পার্থক্য ছিল না। পুত্র শা’মা পানদোষের জন্যে আশিটি বেত্রদণ্ড লাভ করেন শ্যালক খোদ্ ওমরের হাতে এবং শেষে লজ্জায় ও আঘাতে প্রাণত্যাগ করেন। খলিফার মশহুর সাহাবা কাদামা-বিন্-মায়ূন একই অপরাধে প্রকাশ্য বেত্রদণ্ড লাভ করেন।

    ওমরের কর্মধারার একটি বৈশিষ্ট্য এই যে কোনও কাজই তাঁর নিকট তুচ্ছ মনে হতো না। ছোট হোক, বড় হোক, গুরুত্বপূর্ণ হোক বা সামান্যই হোক, সব বিষয়েই তিনি গভীর আগ্রহ নিয়ে মনোযোগ দিতেন এবং হাসিমুখে ছোট ছোট কাজও নিজের হাতে তুলে নিতেন। শত শত মাইল দূরে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংকট-মুহূর্তে কাদিসিয়া, ইয়ারমুক কিংবা নিহাওন্দের ভীষণতম যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হচ্ছে, ওমর মদীনায় বসে প্রত্যেকটি যুদ্ধের পরিকল্পনা করছেন, হামলার নির্দেশ দিচ্ছেন। বিপক্ষদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধি হচ্ছে, ওমর প্রত্যেকটি শর্ত নির্ধারণ করেছেন। বিভিন্ন দফতরে বিভাগীয় প্রশাসনিক সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান করছেন, আইনের কূটতর্ক ভেদ করে সহজ সরল মীমাংসা করছেন, গুরুত্বপূর্ণ শরীয়তী বিধানের নির্দেশ দিচ্ছেন। আবার বায়তুল-মাল থেকে বৃত্তি নিজের হাতেই বিলি করছেন, বৃত্তিধারীদের রেজিস্টার নিজের হাতে পূরণ করেছেন। যাকাতলব্ধ পশুগুলিকে নিজেই চারণ করেছেন, রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন। অনাথা বিধবার উট দোহন করে দিয়েছেন, এতিম মেয়েটির মেষের সন্ধান করেছেন। গাজীরা যুদ্ধে গেছে, তিনি তাদের সংসারে খবরদারী করেছেন, আবশ্যকীয় তৈজসপত্র সংগ্রহ করে, বাজার থেকে ক্রয় করে এনে দিয়েছেন। যুদ্ধের ময়দান থেকে চিঠির বোঝা এসেছে, খলিফা নিজেই হাতে হাতে বিলি করেছেন, কারও চিঠি পড়ে দিয়েছেন, কারও কাগজ-কলম সংগ্রহ করে দিয়েছেন, আবার কারও জওয়াব নিজের হাতে লিখে দিয়েছেন। কর্মক্লান্ত দিনের অবসানে মসজিদে নামায শেষে অপেক্ষা করেছেন, যদি কোনও মোহ্তাজ আসে, যদিই বা কারও কোন অভিযোগ থাকে। মানুষের নবীর উত্তরাধিকারী মানুষের খলিফা হয়ে তার নিকটবর্তী আত্মীয়, বন্ধু, ভাই হয়ে সুখ-দুঃখের সমভোগী হয়েছেন, সমদর্শী, ন্যায়দর্শী, সত্যদর্শী মানবপ্রেমিক ওমর ফারুক।

    অন্ধ, আতুর ও দুঃখী ব্যক্তিদের জাতিধর্ম নির্বিশেষে বায়তুল-মাল থেকে জীবন ধারণের বৃত্তি দেওয়া হতো। সাহিব-ই-বায়তুল মাল অর্থাৎ খাজাঞ্চীকে নির্দেশ দেওয়া হয়, যে কোরআনের বিধান অনুসারে সাদকা অর্থাৎ দানের হকদার গরীব ও অভাবগ্রস্তের দল। এ ক্ষেত্রে মুসলিম গরীব ও অমুসলিম অভাবগ্রস্ত ইহুদী ও খ্রিস্টানরাও দানের হকদার এবং সরকার তাদেরকেও প্রতিপালন করতে বাধ্য। আধুনিক সভ্যজগৎ দুস্থ-বেকার বৃদ্ধদের পেনশন দানের বিষয় চিন্তা করছে, কিন্তু তেরশো বছরেরও বহু আগে খলিফা ওমর এ বিষয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থা করে গেছেন। এতিম বা পিতৃমাতৃহীন শিশুদের ভরণপোষণ এবং সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণেরও ব্যবস্থা ওমর করেছিলেন। একবার ওমর হাকাম-বিন্-আল-আস্‌কে লিখেন : আমার আশ্রিত এতিমদের সম্পত্তি থেকে যাকাত দেওয়ায় তাদের সম্পত্তি ক্ষয় পাচ্ছে। অতএব তাদের সম্পত্তি ব্যবসায়ে খাটিয়ে মুনাফা যোগ করা উচিত। এ উদ্দেশ্যে তিনি হাকামকে দশ হাজার দিনার দান করেন এবং কালক্রমে তা একলাখে বর্ধিত হয়। অসহায়া মাতা কর্তৃক পথিপার্শ্বে পরিত্যক্ত শিশুদের ভরণ-পোষণ ও দুগ্ধদানের ব্যবস্থাও বায়তুল-মাল থেকে করা হতো। এ শ্রেণীর শিশু-প্রতি প্রথমে বার্ষিক একশ দিরহাম বৃত্তি ধার্য হয় এবং শিশুর বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে বৃত্তিও বর্ধিত হতো।

    চৌদ্দ হিজরীতে আরবে দুর্ভিক্ষ উপস্থিত হলে ওমর কঠোর পরিশ্রম করে, নিবারণের ব্যবস্থা করেন। এ উদ্দেশ্যে মদীনার কেন্দ্রীয় বায়তুল-মাল থেকে সাহায্য দান করা হতো, পরে প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়, খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে মদীনায় প্রেরণ করতে। আবুওবায়দাহ্ সিরিয়া থেকে চার হাজার উট বোঝাই এবং আমর-বিন-আস্ মিসর থেকে লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে জাহাজপ্রতি ছয় হাজার মণ শস্য-ভর্তি কুড়িটা জাহাজ আরবে প্রেরণ করেন। দুটি প্রকাণ্ড শস্য-ভাণ্ডার নির্মিত হয় এবং যায়েদ-বিন্-সাবিত দুর্ভিক্ষ পীড়িত ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুত করেন। ওমরের মোহরাঙ্কিত কুপর লোকদের বিলি করা হতো শস্য বিতরণের জন্যে ওমর একদিকে বৃত্তিদানের ও সাদৃকা দানের ব্যবস্থা করেন, অন্যদিকে ভিক্ষাবৃত্তিরোধেরও ব্যবস্থা করেন। যদি কোনও সক্ষম ব্যক্তি ভিক্ষা গ্রহণ করতো, তাকে তিনি অবজ্ঞা করতেন। তিনি বলতেন: যতই হীন হোক, খেটে খাওয়া ভিক্ষা চাওয়ার চেয়ে মর্যাদার কাজ। তিনি ধর্ম বেত্তাদের পরিষ্কার বলতেন: তোমরা মুসলিমদের ভার হয়ো না।

    এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, সমদর্শী, ন্যায়দর্শী মহাপ্রাণ ওমর কেন আমীরুল মুমেনীনের মতো গৌরব-মণ্ডিত উপাধি গ্রহণ করেছিলেন? এ সম্বন্ধে দার্শনিক-ঐতিহাসিক ইনে-খলদুনের একটি উক্তি স্মরণীয়: সমকালীন প্রথায় উপাধিটি গর্বসূচক ছিল না। তার দ্বারা পদের দায়িত্ব বোঝানো হতো। সৈন্যাধ্যক্ষদের আমীর সম্বোধন করা হতো নেতা বোঝাতে। আর মুসলিমরা রসূলুল্লাহকে বলতো মক্কার আমীর। পরবর্তীকালে ইরাকবাসীরা সা’দ্-বিন্-ওক্কাসকে আমীরুল মুমেনীন নামে সম্বোধন করতো। ওমরের উপাধি ধারণের কোন ধারণাও ছিল না, সহসা উপাধিটি চালু হয়ে যায়। একদা লাবিদ-বিন্-রাবিয়া ও আদি-বিন্-হাতিম ওমরের সাক্ষাৎপ্রার্থী হন এবং কুফার প্রথানুযায়ী প্রকাশ করেন ‘আমীরুল মুমেনীনের সাক্ষাৎ চাই।’ আমর-বিন্-আস্ হুবহু এইভাবে ওমরকে সম্বোধন করে সাক্ষাৎপ্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন। ওমর এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে সাক্ষাৎপ্রার্থীদ্বয় তাঁদের সাধারণ প্রথার কথা বলেন। খলিফা এটি অনুমোদন করেন এবং তার পর থেকেই খলিফাকে ‘আমীরুল মুমেনীন’ উপাধিতে সাধারণত সম্বোধন করার রেওয়াজ হয়ে যায়। এ থেকে ওমরের ব্যক্তিগত গর্ব নাম জাহির করার অভিসন্ধি সন্দেহ করলে তাঁর অবিচারই করা হবে। আমরা পূর্বে দেখেছি, কি অবস্থায় তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুশয্যায় খলিফা আবুবকর তাঁকে খলিফা পদে মনোনয়ন করে ওসিয়ত করেছিলেন। তখন খলিফার পদলাভে তাঁর অনীহা ও নির্লোভই প্রকাশ পেয়েছিল। যখন সমসাময়িক নেতাদের মধ্যে তাঁর চেয়ে যোগ্যতর আর কেউ ছিল না, সেই যুগ-সন্ধিক্ষণে মনোনীত হওয়ার পর তিনি এ মহান দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন নব-প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রকে মজবুত ও শক্তিশালী করতে। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই তিনি জনসমাবেশে প্রকাশ্য বলেছিলেন: আমার যদি এ প্রত্যয় না থাকতো যে, আমি তোমাদের দায়িত্ব বহনে যোগ্যতম হতে পারবো, তা হলে আমি কিছুতেই এ পদ গ্রহণে সাহসী হতাম না। ‘মুয়াত্তায়’ ইমাম মুহম্মদ এ কথাটি আরো বিশদ করে বলেছেন: আমি যদি জানতেম যে, অন্য কেউ আমার চেয়েও যোগ্যতরভাবে এ দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবে, তাহলে তাই আমার পক্ষে গ্রহণ করা হতো সবচেয়ে আনন্দদায়ক, এ গুরুভার নিজে বহন করার চেয়েও।

    রাষ্ট্রশাসনে, ধর্ম, শিক্ষা ও সমাজ-জীবনে ওমর যে-সব নয়া নীতি প্রবর্তন করেছিলেন, এখানে সে সবের একটি তালিকা দেওয়া গেল:

    1. হিজরী সনের প্রবর্তন।
    2. আমীরুল-মু’মেনীন উপাধি ধারণ।
    3. বিজিত দেশসমূহকে প্রদেশে বিভক্তীকরণ
    4. বায়তুল-মাল বা সরকারী খাজাঞ্চীখানা স্থাপন
    5. সমর-দরের সৃষ্টি।
    6. রাজস্ব-দরের সৃষ্টি।
    7. পুলিশ বিভাগের সৃষ্টি।
    8. ভূমি জরীপ ও ভূমিকর ধার্য।
    9. সমুদ্রজাত দ্রব্যাদির মাসুল ধার্য ও আদায়ের ব্যবস্থা।
    10. আমদানি ও রফতানি ধার্য ও আদায়ের ব্যবস্থা।
    11. বিদেশী সওদাগরদের ব্যবসার সুযোগ দান।
    12. ব্যবসার ঘোড়ার উপর যাকাত ধাৰ্য।
    13. জিয়ার পরিবর্তে বানু তগলীব গোত্রীয় খ্রিস্টানদের উপর যাকাত ধার্য।
    14. আদমশুমারী।
    15. কারাগার স্থাপন ও বড়ো শহর স্থাপন।
    16. সৈন্য-বিভাগে রিজার্ভ বাহিনী ও তাদের বেতন দানের সুব্যবস্থা।
    17. প্রত্যেক ঘাঁটিতে সেনা-নিবাস স্থাপন
    18. প্রত্যেক শহরে মুসাফিরখানা স্থাপন।
    19. খাল খনন।
    20. আদালত স্থাপন ও কাজী নিয়োগ; এবং শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ।
    21. মদীনা থেকে মক্কার পথে সরাইখানা নির্মাণ।
    22. মাদ্রাসা স্থাপন ও বেতনভোগী শিক্ষক নিয়োগ।
    23. ওয়াক্‌ফ প্রবর্তন।
    24. মসজিদে আলোর ব্যবস্থা।
    25. ইমাম ও মুয়ানিদের বেতন দান।
    26. মসজিদে ধর্ম বক্তৃতার রেওয়ায় প্রবর্তন।
    27. জানাযায় চার তাকবীর দানের ইজ্‌জ্মা।
    28. ফযরের আযানে “আস্-সালাতো খায়রুম মিনান-নওম” অর্থাৎ নিদ্রার চেয়ে সালাত উত্তম শব্দগুলির সংযোজন।
    29. জামাতে তারাবীহ্ নামায আদায়ের নিয়ম।
    30. একসঙ্গে তিন তালাক উচ্চারনে তালাক-বায়েন বা চূড়ান্ত তালাকের বিধান।
    31. উত্তরাধিকার আইনে সঠিক অংশ নির্ধারণের ব্যবস্থা।
    32. কিয়াসের উদ্ভাবন।
    33. আবুবকরকে কোরআন-সংগ্রহে সম্মত করান এবং নিজের তত্ত্বাবধানে উক্ত কার্য সম্পাদন।
    34. মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে আরববাসীকে ক্রীতদাস করার প্রথা বিলোপ। ৩৫। ইহুদী ও খ্রিস্টান অক্ষম ব্যক্তিদের বৃত্তির ব্যবস্থা।
    35. পরিত্যক্ত শিশুদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা।
    36. বেত্রদণ্ডের ব্যবস্থা।
    37. পানদোষের অপরাধে আশিটি বেত্রাঘাতের ব্যবস্থা।
    38. রাত্রিতে টহল দিয়ে নাগরিকদের অবস্থার অনুসন্ধান।
    39. গোয়েন্দা ও গুপ্তচর নিয়োগ।
    40. নিন্দা, বিদ্রুপ বা মানহানিকর কবিতা বা প্রবন্ধ রচনা নিষিদ্ধকরণ।
    41. স্ত্রীলোকের নামাঙ্কিত বা কামোদ্দীপক যৌনমূলক কবিতা রচনা নিষিদ্ধকরণ।
  • মানুষ ওমর

    মানুষ ওমর

    মানুষ ওমর

    কান্তিসুন্দর না হলেও ওমর ছিলেন পিঙ্গল বর্ণের। তাঁর বীরত্ব ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ বিরাট চেহারা সহজেই সকলের দৃষ্টি ও শ্রদ্ধা আকর্ষণ করতো। তিনি এতোখানি দীর্ঘকায় ছিলেন যে, তাঁর আশপাশের সকলকেই খর্বকায় মনে হতো। তাঁর শরীর সুগঠিত, স্বাস্থ্যদীপ্ত ও মস্তকের সম্মুখভাগ কেশহীন ছিল। ঘন-চাপদাড়ি ও বিশাল গুম্ফ-শোভিত, তাঁর মুখমণ্ডল প্রতিভাদীপ্ত ও আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু তাঁর গাম্ভীর্য সকলেরই সম্ভ্রম জাগাতো এবং তারা সর্বদাই সন্ত্রস্ত থাকতো। যৌবনে তিনি কতদূর দুঃসাহসী, নির্ভীক, অভিযানপ্রয়াসী ও মল্লবীর ছিলেন, এই গ্রন্থের প্রথমেই সে-কথা উল্লেখিত হয়েছে।

    ওমরের জীবন ছিল আড়ম্বরবিহীন, অত্যন্ত সাদাসিধে, ভোগ-বিলাসের লেশমাত্র তাঁকে স্পর্শ করতে পারে নি। কোরা মোটা জামাকাপড়েই তাঁর সন্তুষ্টি। তাও শততালিযুক্ত এবং একখানিতে দিন চলে যেতো। অনেক সময় দেখা গেছে, ওমর একখানি মাত্র কাপড় কেচে দিয়ে রৌদ্রে মেলে ধরে শুষ্ক করেছেন, আর ওদিকে মহামান্য দূত খলিফার দর্শনলাভে অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করেছেন। শুকনো খেজুর ও খোর্মা চিবানো ছিল তাঁর অভ্যাস, জলপাইযোগে মোটা লাল আটার রুটি ছিল তাঁর আহার, মধু হলেই বিরাট ভোজ হতো। গোশ্ত, সব্‌জি বা দুধ সময়ে সময়ে পাতে জুটতো, আবার কখনও কখনও তাও জুটে নি। মেহমানরাও খলিফার গৃহে এর বেশি ভোজ্যদ্রব্যে আপ্যায়িত হন নি। আরবে দুর্ভিক্ষের সময় তিনি শুধু যবের আটাতেই সন্তুষ্ট থাকতেন। খেজুর পাতার চাটাই ছিল তাঁর প্রিয় শয্যা; অনেক সময় মহামান্য সম্রাট দূতেরা তাঁর সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে মসজিদে ধূলি-শয্যাতেই তার দর্শন পেতেন। ফকিরীর ফকরে মহিমান্বিত এই ত্যাগী মহাযোগী সম্রাটের রূপকল্পনায় মুগ্ধ কবি উদাত্ত কণ্ঠে প্রশস্তি গেয়েছেন :

    অর্ধ পৃথিবী শাসন করেছো ধূলার ততে বসি,

    খেজুর পাতার প্রাসাদ তোমার বারে বারে গেছে খসি

    সাইমুম ঝড়ে। পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’ নুয়ে,

    ঊর্ধ্বের যারা-পড়েছে তাহারা, তুমি ছিলে খাড়া ভূঁয়ে!

    শত প্রলোভন বিলাস-বাসনা ঐশ্বর্যের মদ

    করেছে সালাম দূর হতে সব, ছুঁইতে পারেনি পদ।

    সবারে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়া তুমি ছিলে সব নিচে,

    বুকে করে সবে বেড়া করি’ পার, আপনি রহিলে পিছে!

    ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ও পরে ওমর কয়েকটি স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। ওসমান বিন্-মায়ুনের ভগিনী যয়নব তাঁর প্রথমা স্ত্রী। এই ওসমান ছিলেন রসূলুল্লাহ্‌র অন্তরঙ্গ সাহাবাদের অন্যতম। প্রথমে যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন ওসমান তাদের সংখ্যায় চতুর্দশতম ছিলেন এবং হযরতের এতোখানি প্রিয়পাত্র ছিলেন যে, তাঁর মৃত্যুতে হযরত অধীর হয়ে ক্রন্দন করতে থাকেন। যায়নব ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মক্কাতেই তাঁর ওফাত হয়। আবদুল্লাহ ও ওম্মুল মুমেনীন্ হাফসা যয়নাবের দুই সন্তান। ওমরের দ্বিতীয়া স্ত্রীর নাম কারিবা; তিনি ও উমায়তুল্ মাখযুমীর কন্যা, আবার ওম্মুল মুমেনীন ওন্মে-সালমার ভগিনী। কারিবা ইসলাম গ্রহণ করেননি; এজন্যে হুদায়বিয়ার সন্ধির পর অমুসলিমদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধন অসিদ্ধ ঘোষিত হলে ছয় হিজরীতে ওমর তাঁকে পরিত্যাগ করেন। তৃতীয়া স্ত্রী মালায়কার অন্যতম নাম ছিল ওম্মে-কুলসুম এবং তিনিও ইসলাম গ্রহণ না করায় একই বৎসরে পরিত্যক্তা হন।

    মদীনায় হিজরত করে ওমর আনসারদের সঙ্গে আত্মীয়তা বন্ধনের উদ্দেশ্যে আসিম – বিন্-সাবিতের কন্যা জমিলাকে বিবাহ করেন। জমিলার প্রথম নাম ছিল আসিয়া, কিন্তু রসূলুল্লাহ তাঁকে ইসলামে দীক্ষিত করে জমিলা নামাঙ্কিত করেন। কোন অজ্ঞাত কারণে ওমর তাকেও তালাক দেন।

    জীবনের শেষের দিকে ওমরের বাসনা হয়, রসূলুল্লাহর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে আবদ্ধ হয়ে জীবন ধন্য করতে। এজন্যে তিনি বিবি ফাতেমা ও আলীর প্রিয়তমা কন্যা ওন্মে-কুলসুমের পাণিপ্রার্থী হন। আলী প্রথমে অসম্মত হন কন্যার কম বয়সের কথা চিন্তা করে, কিন্তু ওমরের সনির্বন্ধ অনুরোধে শেষে রাযী হন। ১৭ হিজরীতে এই পুণ্যময় পরিণয় সম্পন্ন হয়। ওমর চল্লিশ হাজার দিরহাম দেন-মোহর দিতে অঙ্গীকার করেন।

    ওমরের আরও কয়েকটি স্ত্রী ছিল: হারিস্-বিন্-হিশামের কন্যা ওম্মে হাকিম, ফকিহা য়্যামেনীয়া ও যায়েদ-বিন-আমরের কন্যা আতিকা। আতিকা ছিলেন ওমরের পিতৃব্য কন্যা ও অসামান্য সুন্দরী। তাঁর প্রথম বিবাহ হয় আবুবকরের পুত্র আবদুল্লাহর সঙ্গে। কিন্তু তায়েফের যুদ্ধে আবদুল্লাহ শাহাদত বরণ করলে ওমর আতিকাকে বিবাহ করেন বারো হিজরীতে আলীর অনুরোধক্রমে।

    ওমরের অনেকগুলি পুত্রকন্যা ছিল। কন্যা হাসার প্রথম বিবাহ হয় খানিস্ বিন্‌ হুদায়ফার সঙ্গে। কিন্তু খানিস ওহোদের যুদ্ধে শহীদ হলে রসূলুল্লাহ তৃতীয় হিজরীতে হাসাকে শাদী করে ধন্য করেন। ওম্মুল মুমেনীন ও হাসা অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং অনেক প্রবীণ সাহাবা সেগুলি শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। ওমরের ছয় পুত্রের নাম আবদুল্লাহ, ওবায়দুল্লাহ, আসিম, আবুশা’মা আবদুর রহমান, যায়েদ ও মুজিব। তন্মধ্যে প্রথম তিনজন প্রথিতযশা। আবদুল্লাহ্ হাদীস ও ফিকাহ্‌র স্তম্ভ হিসেবে সর্বজনবিদিত। তিনি পিতার সঙ্গেই ইসলাম গ্রহণ করেন। রসূলুল্লাহ্‌র সঙ্গে বহু যুদ্ধে শরীক হয়ে একদিকে আবদুল্লাহ যেমন বীরত্ব দেখিয়েছেন অন্যদিকে পাণ্ডিত্য ও ধর্মনিষ্ঠায় সকলের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছেন। তাঁর সত্যনিষ্ঠা ও স্পষ্টবাদিতা প্রশংসনীয়। মহাত্রাস হাজ্জাজ-বিন্-ইউসুফ যখন কা’বাগৃহে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, তখন নিৰ্ভীক আবদুল্লাহ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন: এ ব্যক্তি আল্লাহর দুশমন, সে আল্লাহ্-ভক্তদের নির্বিচারে নিহত করেছে। কিন্তু এ-উক্তিই তাঁর কাল হয়েছিল; হাজ্জাজ্ নিযুক্ত আততায়ীর হস্তে বিষাক্ত আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। আলী ও মুআবীয়া যখন খেলাফত নিয়ে যুদ্ধে ব্যস্ত তখন মুসলিমরা তাঁকে খলিফা হতে অনুরোধ করলে তিনি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, মুসলিমদের রক্ত-স্রোতে স্নাত খেলাফত তাঁর কাম্য নয়। ওবায়দুল্লাহ ছিলেন বীর পুরুষ, প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর শৌর্যবীর্যে চারদিকে মুখরিত হয়েছে। আসিম পাণ্ডিত্য ও কবি-প্রতিভায় প্রখ্যাত। উল্লেখযোগ্য যে, আসিমের কন্যার পুত্র মহাপ্রাণ ওমর-বিন্-আবদুল আজিজ ওমাইয়া বংশের সবচেয়ে ধর্মভীরু ও ন্যায়নিষ্ঠ খলিফা।

    কিন্তু ঐতিহাসিকরা এ বিষয়ে একমত যে ওমরের জীবন নারী শাসিত ছিল না। তার কারণ এই নয় যে, নারী জাতির প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা ছিল। নারীর হৃদয়ানুভূতি, নারীর মর্মব্যথা তাঁর অন্তর স্পর্শ করতো। একবার এক প্রোষিতভর্তৃকা যুবতীর করুণ বিরহগীতি শ্রবণ করে ওমর নির্দেশ দেন, কোন সৈন্যকে চার মাসের বেশি গৃহসুখে বঞ্চিত রাখা চলবে না। ওমর কখনও নারীকে তাঁর কর্মক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে দেন নি, সব সময়ে বাহির বিশ্বের কর্তব্যের ঊর্ধ্বে রেখেছিলেন। তাঁর স্নেহভাণ্ডারও তিনি আপন সন্তানদের জন্যেই উন্মুক্ত না করে সমগ্র মুসলিমদের সেবার ব্যয়িত করেছিলেন। এমন কি উপযুক্ত শিক্ষিত পুত্রদেরকে রাষ্ট্রশাসনে প্রাধান্য দেওয়া দূরে থাক, কাউকে কোন সরকারী কাজেও নিয়োগ করেন নি। কনিষ্ঠ যায়েদ ছিল তাঁর পরম প্রিয়পাত্র। ইয়ামামাহর যুদ্ধে যায়েদ শহীদ হলে ওমর বালকের ন্যায় ক্রন্দন করেছিলেন। যায়েদের নামোল্লেখ করা হলে তিনি আবেগভরে বলতেন: ইয়ামামাত্র বাতাস প্রবাহিত হলে আমি যায়েদের দেহ সৌরভ গ্রহণ করতে পাই।

    বাল্যকাল থেকেই ওমর রুক্ষ, কোপনস্বভাব এবং কড়া মেযাজের দরুন সকলের ত্রাসসঞ্চারকারী ছিলেন। আইয়ামে জাহেলিয়াতে ছিলেন মূর্তিমান রুদ্র-খোলা তরবারি নিয়ে রসূলুল্লাহকে হত্যা করতে গিয়েছিলেন; কনিষ্ঠা ভগিনীকে ইসলাম গ্রহণের জন্যে প্রহারে জর্জরিত করেছিলেন। রসূলুল্লাহর সম্মুখেও তাঁর মেযাজের উগ্রতা প্রকাশ পেতো, সামান্য উত্তেজনায় তরবারি ধরতেন আবুবকর তাঁকে মনোনীত করেছেন শ্রবণ করে অনেকের ত্রাস সঞ্চার হয়; তালহা আবুবকরের নিকট ভীতি প্রকাশও করেছিলেন। কিন্তু ইসলামের শিক্ষার মহিমায় ওমরের কঠোরতা কোমলতায় রূপায়িত হয়েছিল ক্রমে ক্রমে এবং খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর ক্রোধ পুড়ে ছাই হয়ে স্নেহ-নির্ঝরে পরিণত হয়েছিল। আর তখন তাঁর স্নেহকরুণার ধারা উৎসারিত হতো মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের উপর।

    কৈশোরে ওমর দানানের মরু-প্রান্তরে উট চারণ করেছেন, যৌবনে সিরিয়া ও পারস্যের দূর অঞ্চলে ব্যবসায় উপলক্ষে সফর করেছেন। ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় ও মদীনাতেও তিনি তেজারতি করে অন্নসংস্থান করেছেন। মদীনায় এসে প্রথম দিকে ক্ষেত-জমি সংগ্রহ করে আধিয়ারী প্রথায় চাষাবাদও করেছেন। কখনও তিনি নিজে বীজ দিয়েছেন, কখনও তাঁর চাষী বীজ সংগ্রহ করেছে। ফসল উভয়ে আধাআধি গ্রহণ করেছেন। খলিফা নিযুক্ত হওয়ার পর সাহাবারা তাঁর একটা মাসিক ভাতা ধার্য করতে অগ্রসর হলেন, তাঁকে খোরপোষ সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত করতো। আলীর প্রস্তাব অনুযায়ী ওমর ও তাঁর পরিবারের জন্যে একটা সাধারণ পরিবারের উপযুক্ত খোরপোষ নির্দিষ্ট হয়। ইবনে সা’দ বলেন, ওমরের সংসারের দৈনিক খরচ ছিল মাত্র দুই দিরহাম, অর্থাৎ প্রায় দশ আনার মতো। খায়বরের যুদ্ধের পর রসূলুল্লাহ সাহাবাদের মধ্যে জমি বণ্টন করে দেন। ওমরের ভাগে পড়ে ‘সুমগ’ নামাঙ্কিত উর্বর জমি। বনি হারিস নামক ইহুদী গোত্রের নিকট থেকেও ওমর ‘সুমগ’ নামধেয় আর এক খণ্ড জমি পান। পরবর্তীকালে তিনি উভয়খণ্ড জমিই গণহিতার্থে দান করেন। সহীহ্ বুখারীতে এ বিষয় উল্লেখিত হয়েছে। এই ‘ফিসা-বিলিল্লাহ’ দানের শর্ত ছিল: এ জমি দান-বিক্রয় করা চলবে না, উত্তরাধিকার হিসেবে বন্টন করা হবে না। তার উৎপন্ন ফসল দীন-দুঃখী, নিকট-আত্মীয়, ক্রীতদাস, মুসাফির ও মেহমানদের সেবায় ব্যয় করা হবে। বলা বাহুল্য মুসলিম ওয়াক্ফ আইনের সূত্রপাত এ থেকেই।

    ওমর ছিলেন ইসলাম-আদর্শিক জীবনের জীবন্ত প্রতীক। তাঁর সত্যনিষ্ঠা। তাঁকে ‘ফারুক’ অর্থাৎ মিথ্যা থেকে সত্য পৃথক করার ধ্রুপদী নিষ্ঠার অনুসারী করেছিল। একটি কাহিনীমতে রসূলুল্লাহ বলেছিলেন: আল্লাহ্ ওমরের রসনা ও অন্তর সত্যে সন্দীপিত করেছিলেন; এজন্যে তিনি ‘ফারুক’ কারণ তাঁর উপস্থিতিতে সত্য মিথ্যা থেকে পৃথক হয়ে যায়। বস্তুত তাঁর নাড়ীতে ছিল সত্য, দেহের তন্তুতে ছিল ন্যায়ের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ। এজন্যে তাঁর রসনায় সত্য ঝলকিত, অন্তরে ন্যায় নিকষিত। তাঁর তৌহিদ-মন্ত্রে একনিষ্ঠা ও আল্লাহ্ করুণায় একান্ত নির্ভরতা; তাঁর সাধুতা, সরলতা, আত্মত্যাগ ও অহঙ্কারহীনতা ভোগ-বিলাসবিমুখতা, ন্যায়নীতি-প্রীতি, গর্ব ও মর্যাদার প্রতি অনীহা এবং কলরব-মুখরিত খ্যাতির প্রাঙ্গণে শ্রেষ্ঠ আসনের অবিসংবাদী অধিকারী হয়ে ও ধ্যানীযোগীসুলভ নিস্পৃহতা অনন্য ও অতুলনীয় ছিল। চুম্বক যেমন লোহাকে টানে, সেই রকম ধ্রুবসত্য তাঁর অন্তরমনকে সর্বদাই আকর্ষণ করতো, উদ্ভাসিত করতো। আর আগুনের পরশমণির ছোঁয়ায় যেমন অন্ধকার দূরীভূত হয় যেরকম তাঁর সংস্পর্শ সকলকেই তাঁরই প্যাটার্নে রূপায়িত করতো। সুন্দরের সহবাসে যেমন সব কিছু সুন্দর হয় সেই রকম তাঁর সাহচর্যে সকলেই আল্লাহ–প্রীতিতে, সত্যনিষ্ঠায় উজ্জীবিত হয়ে উঠতো। মাসুর-বিন্-মাজামা গর্বভরে বলেছেন: তাঁর সাহচর্য লাভে আমরা উৎসুক হতেম সদ্গুণরাশি শিক্ষা করতে ও আল্লাহ্-প্রীতিতে আপ্লুত হতে। মাসুদী বলেছেন: তাঁর সদগুণরাশি তাঁর অনুগামী অনুচর ও কর্মচারী সেনানায়কদের উদ্দীপিত করেছিল। সাল্‌মান ফারসী, আবুওবায়দাহ্ সা’দ-বিন্-আমীর তার জীবনের উৎকৃষ্ট প্রতিচ্ছায়া।

    খেলাফতের গুরু কর্মভারে তাঁর সারাদিন ব্যস্ততায় কেটে যেতো এবং রাত্রি কেটে যেতো এবাদতে-আরাধনায়। রসূলুল্লাহর একটি মহৎ শিক্ষা হচ্ছে, কর্মনিষ্ঠা এবাদতেরই শামিল। কাজ পালিয়ে যোগাভ্যাসে ইসলামের শিক্ষা নয়। কর্মবীর ওমর কর্তব্য সাধনে ও ধর্মাচরণে সমান নিষ্ঠা দেখিয়েছেন। রাত কেটে যেতো তাঁর নফল ও তাহাজ্জুদের নামাযে সকালে সারা পরিবারকে জাগিয়ে তুলতেন নামায আদায় করতে কোরআনের বাণী উচ্চারণ করে: তোমার পরিবারকেও নামাযে বাধ্য করো। ফজরের নামাযে তিনি লম্বা সূরায় কেরাত পড়তেন-প্রায় একশবিশ আয়াত। সূরা ইউসুফ, সুরা হজ্জ, সুরা ইউনুস, সুরা কাহফ্ ও সুরা হুদ্ ছিল তাঁর প্রিয়। তিনি বলতেন যে, জামাতে নামায আদায় সারারাত এবাদতের চেয়েও পুণ্যময়। কিন্তু নামাযের আগে কাজ উপস্থিত হলে কাজটি সেরে নিয়ে নামাযে বসতেন। নামাযের সময়েই তিনি জেহাদের পরিকল্পনা করে ফেলতেন। তিনি নিজেই বলেছেন: নামায আদায় কালেই আমি সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করে নিই। ফজরের নামাযের সময় তিনি বাহ্রায়েনের ভূমিকরের পরিমাণ নির্ধারণ করেছিলেন। মৃত্যুর দু’বছর পূর্ব থেকে তিনি দৈনিক রোযা অভ্যাস করেন। প্রতি বছরেই তিনি হজ্বে যেতেন এবং নিজেই ইমামতী করতেন। তেইশ হিজরীতে হজ্ব থেকে প্রত্যাবর্তনকালে তিনি আতার কঙ্করাকীর্ণ প্রান্তরে মাথা রেখে শুয়ে পড়েন ও দুহাত তুলে প্রার্থনা করেন: “হে সর্বশক্তিমান আল্লাহ্, আমি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি, আমার সব অঙ্গই দুর্বল হয়ে গেছে, আমার যাবার সময় এসে গেছে।’ তার দেড় মাসের মধ্যেই ওমর শাহাদত লাভ করেন।

    রোজ কিয়ামত সম্বন্ধে ওমরের দারুণ ভীতি ছিল। সহীহ্ বুখারীর একটি উক্তি-মতে ওমর একদা আবু মুসা আশারীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: আমরা যাঁরা প্রথমেই ইসলাম গ্রহণ করেছি ও রসূলুল্লাহর সঙ্গে হিযরত করেছি, সে সব কারণেই কি নাযাত বা মুক্তি পাবো না? শাস্তি বা পুরস্কার কিছুই চাই নে। যে আল্লাহ্ ওমরের জীবন স্বামী তাঁর নামে শপথ নিয়ে আমি শুধু এই চাই, যেন বিনা শাস্তিতে আমি পরিত্রাণ পাই। মৃত্যু শয্যায় যে কবিতাটি আবৃত্তি করেন, তার ভাবার্থ এই:

    আমি আত্মার প্রতি অবিচার করেছি, আমি

    মুসলিম, শুধু নামায রোযা করতে পারি।

    অতুলনীয় এই ইসলামের নিষ্ঠা ও রসূলে আকরমের প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে ওমর ‘আশারা-ই-মুবাশশারাহ্’ অর্থাৎ সুসংবাদপ্রাপ্ত ভাগ্যবান দশজনের একজন হিসেবে প্রখ্যাত। তিরমিযী-বর্ণিত একটি হাদীসে এই দশজন মহাভাগ্যের নাম উল্লেখিত হয়েছে, জীবদ্দশাতেই বেহেশ্বাসী হওয়ার সুসংবাদ লাভের অধিকাররূপে: আবুবকর, ওমর, ওসমান, আলী, তালহা, জুবায়ের, সাদ্-বিন্-আবি ওক্কাস, আবদুর রহমান বিন-আউফ, ওবায়দাহ্-বিন-জর্রাহ ও সাঈদ-বিন্-যায়েদ।

    এখানে উল্লেখযোগ্য, ইসলামের এক উজ্জ্বল রত্ন হয়েও ধর্মনিষ্ঠ ওমর শুষ্কভাবে কঠোর ও সংকীর্ণ মন নিয়ে ইস্লাম চর্চা করেন নি বিধর্মীর প্রতি এতোটুকু ঘৃণা বা তাচ্ছিল্য কখনও তাঁর আচরণে প্রকাশ পায় নি। ইমাম বুখারী ও ইমাম শাফী বলেন : এক খ্রিস্টান রমণীর কুজার পানি নিয়ে ওমর ওজু করেছেন। বাগাবী বলেন, ওমর খ্রিস্টানদের তৈরি পানীয় খেতে বলতেন। ওমরের আপন ভৃত্য ছিল খ্রিস্টান আতিক, মদীনায় ভূমি-করের মহাফেয ছিল খ্রিস্টান। ইরাক, সিরিয়া ও মিসরে ভূমি-রাজস্বের নথিপত্র লিখিত হতো সিরীক, কপ্টিক ও ফারসী ভাষায় এবং তার জন্যে এ কাজে ওমর খ্রিস্টান ও অগ্নিপূজকদের বহু সংখ্যায় নিযুক্ত করেছিলেন। মৃত্যুশয্যায় শায়িত হয়েও তিনি খ্রিস্টান ও ইহুদী জিম্মীদের কল্যাণার্থে বিশেষ ওসিয়ত করে যান। শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ এটিকে ওমর-চরিত্রের এক মহৎ ও বিশেষ গুণ বলেছেন। ধর্ম নিয়ে, জাতি নিয়ে আজকার পৃথিবী যেভাবে হিংসায় উন্মত্ত ও ক্রুর হয়ে উঠেছে, তখন ওমরের এ মহৎ গুণ অনুশীলনের প্রয়োজন এসেছে।

    ওমর ধর্মমতে যেমন উদার, তেমনি কুসংস্কারমুক্ত ছিলেন। কা’বার হজুরে আসোয়াদ্ বা পবিত্র পাথরটিকে মুসলিমরা যেমন অন্ধভাবে ভক্তি দেখাতো, তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বলেছিলেন, রসূলুল্লাহ চুম্বন না দিলে এটিকে ভেঙ্গে ফেলা হতো। হজ্বের সময় ‘রমল’ বা কা’বা গৃহটির চতুর্দিকে সহজভাবে তিনবার দৌড়ানোর রেওয়ায আছে। একদা রসূলুল্লাহ যখন মদীনা থেকে মক্কায় হজ্বে এসেছিলেন, তখন অমুসলমানেরা বিদ্রুপচ্ছলে বলেছিল, মুসলিমরা দারিদ্র্যে ও অনাহারে রোগা হয়ে গেছে, কাবা তওয়াফ, বা প্রদক্ষিণ করার সামর্থ নেই। হযরত তখন মুসলিমদের নির্দেশ দেন, দৌড়ে তওয়াফ করতে। তখন থেকেই এটি রেওয়ায হয়ে গেছে। কিন্তু ওমর বলেন: ‘রমল’ আর বাধ্যকর নয়, যে বেদীনদের দেখানোর জন্যে এ হুকুম দেওয়া হয়েছিল, তারাও আর নেই। শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ বলেন, রসূলুল্লাহ্ স্মৃতি বিজরিত থাকায় ওমর রেওয়াযটি বন্ধ করেন নি। ওমরের প্রিয়তম শিষ্য আবদুল্লাহ্-বিন্-আব্বাস বলতেন : লোকে ‘রমল’ সুন্না মনে করে, কিন্তু এ ধারণা ভুল।

    জ্ঞানী ও সুধীর সমাবেশ ওমরের অত্যন্ত প্রিয় ছিল। তাঁর অধিকাংশ সময় সাহাবা ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের সাহচর্যে কাটতো। এ বিষয়ে যুবক, বৃদ্ধ কোন বয়সের তারতম্য ছিল না। বুখারী বলেন যে, ওমরের নিত্যসঙ্গী ছিলেন মশহুর প্রবীণ ও জ্ঞানবৃদ্ধ সাহাবাগণ, তরুণ শিক্ষিত ও জ্ঞানীগণ এবং সকলের সঙ্গেই অসঙ্কোচে রাষ্ট্রের এবং ধর্মের জটিল সমস্যা সম্বন্ধে আলোচনা করতেন ও তাঁদের মতামত গ্রহণ করতেন। ফিকাহ্ শাস্ত্র এ-সব মজলিসেই সুমার্জিত ও সংশোধিত হয়ে রূপায়িত হয়। আলী, ওসমান প্রমুখ জ্ঞানবৃদ্ধ প্রবীণ সাহাবাদের সঙ্গে ওবায়বিন্-ক্কাব, যায়েদ-বিন্-সাবিত, আবদুল্লাহ্-বিন্-মাসুদ, আবদুল্লাহ্-বিন্-আব্বাস, আবদুর রহমান, হুরর-বিন্-কিয়াস্ প্রভৃতি প্রতিভাদীপ্ত শিক্ষিতেরাও এ-সব মজলিসে উপস্থিত থাকতেন। অনেক সময় দেখা গেছে, নবীনেরা প্রবীণদের সম্মুখে স্বাধীনভাবে মতামত ব্যক্ত করতে ইতস্তত করলে ওমর তাদের উৎসাহ দিয়ে বলতেন, জ্ঞান বয়স অনুপাতে পরিমাপ করা যায় না। বহুবার অল্প বয়স্ক আবদুল্লাহ্ বিন্-মাসুদের কঠিন প্রশ্নের সহজ সুন্দর মীমাংসা করার ক্ষমতা দেখে ওমর আনন্দে বলে উঠতেন: আবদুল্লাহ্ সত্যই বিদ্যার জাহাজ। ওমরের আর একটি মহৎ গুণ ছিল প্রকৃত জ্ঞানীর সম্মান রক্ষা করা। এ কথায় সন্দেহের অবকাশ নেই যে, ওমরের সমকালে এক আলী ভিন্ন অন্য কেউই জ্ঞানে তাঁর সঙ্গে তুলনীয় হওয়ার যোগ্য ছিলেন না। তবুও ওমর প্রকৃত জ্ঞানীদের এমন সম্মান দেখাতেন, এমন নম্র হয়ে ও সম্ভ্রম-সহকারে কথা বলতেন, যেন তাঁরা তাঁর গুরুজন। ওবাই বি-ক্কাবকে ওমর এতোখানি ভক্তি করতেন যে, তাঁর মৃত্যুতে ওমর এই বলে শোক প্রকাশ করেছিলেন: মুসলিম শ্রেষ্ঠ মানুষ আজ বিদায় নিয়ে গেলেন। আবু-গিফারী বদরের যুদ্ধে যোগদান করেন নি, তবুও ওমর তাঁকে বদর বিজয়ী বীরদের সমান বৃত্তিদানকালে বলেছিলেন, ধীশক্তিতে ও জ্ঞান-গরিমায় তিনি কারও দ্বিতীয় ছিলেন না। এইরূপ আবুওবায়দাহ্, সালমান ফারসী, ওমর-বিন্-সা’দ, আবু মুসা আশারী, সলিম, আবুদর্দা ওমর কর্তৃক উচ্চ সম্মানে ভূষিত হতেন।

    কোন ব্যক্তিবিশেষ বা শ্রেণীবিশেষের উপর ওমরের করুণা বর্ষিত হতো না। যে কেউ কোন প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে সে-ই ওমরের স্নেহদৃষ্টি লাভে ধন্য হয়েছে। কবি, সাহিত্যিক, বক্তা, কুলজী-বিশারদ, মল্লবীর, যোদ্ধা সকলেই ওমরের স্নেহ-সিঞ্চিত হয়েছেন অজস্র ধারায়। সমকালীন কবিশ্রেষ্ঠ মুতামমিম্-বিন্-নুয়ায়রার ভ্রাতা মালিক খালিদের হাতে নিহত হলে, কবি যে আকুল মর্মস্পর্শী ভাষায় শোকগীতি গাইতেন, তার দ্বারা অভিভূত নরনারীবৃন্দ তাঁর শোকে আকুল হয়ে ক্রন্দন করতো। একদা ওমর মুতামিমকে ডেকে তাঁর শোকগাথা শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কবি মর্মস্পর্শী ভাষায় ব্যক্ত করেন:

    আমরা দুজন জসিমার দরবারে এতোখানি ঘনিষ্ঠ ছিলেম,

    লোকে বলতো, আমাদের আর বিচ্ছেদ হবে না কিন্তু

    আমরা তো বিচ্ছিন্ন হয়েই গেলেম এমনভাবে, যেন আমরা

    একরাতও একত্রে কাটাই নি।

    ওমর এই মর্সিয়া শ্রবণ করে আকুল হয়ে বলেছিলেন: আমার মর্সিয়া রচনার শক্তি থাকলে আমি এমনি ভাষায় যায়েদের জন্যে শোকগীতি রচনা করতেম।

    এই প্রসঙ্গে এখানে উল্লেখযোগ্য যে, কবিতার সমঝদার হিসেবে ওমরের স্থান অনেক উচ্চে। তাঁর কবিতা-কর্মের তেমন প্রমাণ না থাকলেও সমকালীন সাহিত্য সমালোচকরা একবাক্যে উল্লেখ করেন যে, তাঁর কবিতা-রস গ্রহণে শক্তি ছিল খুবই উচ্চস্তরের ও মার্জিতরুচির। ইনে-রাশিক ও জাহিজ একবাক্যে বলেন, ওমর ছিলেন সমকালীন শ্রেষ্ঠ কবিতা-সমালোচক। সমকালীন ও পূর্ববর্তী সকল প্রতিষ্ঠাবান কবির কর্মের সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর পরিচয়। তবুও তাঁর সবচেয়ে প্রিয় কবি ছিলেন ইমরুল কায়েস, জাহির ও নাবিগা। আবার তাদের মধ্যে জাহিরের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল সবচেয়ে বেশি, কারণ তাঁর মতে জাহির ছিলেন ‘কবিদের কবি’; তিনি কবিতায় কঠিন কথা ব্যবহার করে দুর্বোধ্য করে তোলেন নি; তার ভাষা স্বচ্ছন্দ, লীলা-কৌতুকী তার ব্যঞ্জনা। জাহির ও নাবিগার বহু কবিতা ওমরের কণ্ঠস্থ ছিল। ইমরুল কায়েসের অপূর্ব কল্পনাশক্তি ও ভাষার ব্যঞ্জনা ওমরকে মুগ্ধ করতো। ওমর বলতেন: ইমরুল কায়েস কবিকূল-শিরোমণি। তিনি কবিতা কূপ থেকে সুরের ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করেছেন, অন্ধ-ভাবকে চক্ষুদান করেছেন। বস্তুত ওমরের কাব্য-প্রীতি তীব্র ছিল এবং হাজার হাজার কবিতা তাঁর কণ্ঠস্থ থাকতো। কোনও সুন্দর বয়েত তাঁর নযরে পড়লেই তিনি বারবার সেটি আবৃত্তি করে কণ্ঠস্থ করে ফেলতেন। ঐতিহাসিকেরা বলেন, ওমরের এত কবিতা কণ্ঠস্থ ছিল যে, কোন কঠিন বিষয়ের মীমাংসা দানকালে একটি কবিতাংশ আবৃত্তি করে তিনি বিষয়টির উপরে মধু ঢেলে দিতেন। যে-সব কবিতায় আত্ম-সম্মান, স্বাধীনতা, মহত্ত্ব, আত্মসচেতনতা এবং মানবিক ও কুল-গৌরব প্রকাশ পায়, সেইসব কবিতা ওমরের প্রিয় ছিল এবং সিপাহ্ সালার থেকে প্রশাসনিক কর্মচারীদের এই সব শ্রেণীর উৎকৃষ্ঠ কবিতা কণ্ঠস্থ রাখতে উৎসাহিত করতেন। তিনি বিশেষভাবে বলতেন, প্রত্যেক শিশুকেই সন্তরণ, অশ্বারোহন, প্রবচন ও উত্তম কবিতা মুখস্থ করা শিক্ষা দেওয়া উচিত। এখানে এ কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ব্যঙ্গাত্মক বা অপমানকর কিংবা যৌন ভাবোদ্দীপক, অশ্লীল কবিতাচর্চা ওমর একেবারে বন্ধ করে দেন। হাইফা নামক একজন কবিকে এরূপ কবিতা রচনার জন্যে ওমর কারাদণ্ড দিয়েছিলেন।

    ওমরের বাক্‌শক্তি ছিল অসাধারণ তাঁর ভাষণ হতো যেমন জোরালো তেমনই আকর্ষণীয়। তাঁর বক্তৃতায় যেমন তীক্ষ্ণবুদ্ধির ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির, তেমনই রসজ্ঞানের পরিচয় মিলতো। আমর মাযি-করবকে প্রথম দেখেই ওমর তাঁর প্রকাণ্ড চেহারায় অবাক হয়ে বলে ওঠেন: মাশাল্লাহ। ওর স্রষ্টা ও আমার স্রষ্টা কি এক? আমওয়াদের মহামারীর সময় ওমর যখন নিরাপদ স্থানে যাওয়া স্থির করেন, তখন অদৃষ্টবাদী আবুওবায়দা হ্ প্রতিবাদ করে বলেন: কি ওমর! আল্লাহ্‌র ইচ্ছা থেকে কোথায় পালাচ্ছো? ওমর শান্ত কণ্ঠে বলেছিলেন: হাঁ! আমি আল্লাহ্‌র ইচ্ছা থেকে তাঁর ইচ্ছার দিকে যাচ্ছি। তাঁর বক্তব্য হতো পরিচ্ছন্ন ও হৃদয়গ্রাহী। খেলাফতের রশ্মি হাতে নিয়ে ওমর প্রথম ভাষণে বলেছিলেন: মহিমাময় আল্লাহ্, আমি কঠোর, আমায় কোমল করো, আমি দুর্বল আমায় সবল করো। এখন আরবীরা বেয়াড়া উটের মতো, কিন্তু তার নাসিকা রজ্জু আমার হাতের মুঠিতে। দেখো, আমি তাকে ঠিকপথে চালাবো। দু-তিন দিন পরেই ইরাক অভিযানের সৈন্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি যে উদ্দীপনা-সঞ্চারী ভাষণ দেন, তার ফলে সমগ্র আরবজাতি যুদ্ধে মেতে ওঠে। দামে সফরকালে জাবিয়ায় যখন তিনি বক্তৃতা করেন, সে মজলিসে বহু জাকির ও বহু ধর্মাবলম্বী শ্রোতা ছিল, খোদ খ্রিস্টান বিশপ উপস্থিত ছিলেন। বহু সামরিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল আলোচনার বিষয় মুসলিমদের মনোবল উজ্জীবিত করার প্রয়োজন ছিল; অমুসলিমদের ইসলামের শিক্ষা ও সৌন্দর্য বর্ণনা করে শান্তি জেহাদের তাৎপর্য বর্ণনা করে শান্তি ও জেহাদের তাৎপর্য বুঝানোর দরকার ছিল; আবার, খালিদের পদচ্যুতির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের কারণ বিশদ করারও প্রয়োজন ছিল। ওমর এ সময়ে যে তেজোময়ী জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দেন তা ইতিহাসের অন্তর্গত হয়েছে। লোকের মুখে মুখে তাঁর উক্তিগুলি বহুদিন গুঞ্জরিত হতো, সাহিত্যিক তা থেকে রচনার চিন্তা-ভাবনা সংগ্রহ করতেন, নীতিবিদ তা থেকে নৈতিক শিক্ষার আদর্শ পেতেন, আর আইবিদ্, খুঁজতেন আইনের সূত্র। তেইশ হিজরীতে হজ্ব সমাপন করে মদীনায় ফিরে এসে ওমর জুমার খুত্বা দানকালে খলিফা নির্বাচন বিষয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সাকিফায়ে বানি-সাদায় গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মন্ত্রণা, আনসারগণের বিভেদ-প্রয়াস, আবুবকরের যুক্তিগর্ভ উত্তর, ওমরের সব আলোচনা তর্কের অবসান করে দিয়ে আবুবকরের আনুগত্য গ্রহণ প্রভৃতি বিতর্কমূলক প্রশ্নের উপর এমন সর্ব-তর্ক-সন্দেহ-নিরসনকারী আলোকপাত করেন, যার দরুন পরিষ্কারভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল যে, এ মহাসন্ধিক্ষণে যা মীমাংসা করা হয়েছিল, তাই ছিল সর্বোত্তম এবং দ্বিতীয় কোন পন্থা ছিল না।

    ওমর সাধারণত উপস্থিত-মত বক্তৃতা দিতেন, গুরুত্বপুর্ণ বিষয়ে পূর্ব থেকে প্রস্তুতি নিতেন। কিন্তু কখনও লিখিত ভাষণ দেন নি। যে কোন বিষয়, যে কোন সময়ে মজলিসের মেযাজ বুঝে তিনি এমন তোজোদীপ্ত যুক্তিগর্ভ বক্তৃতা দিতে পারতেন যে, শ্রোতাগণ নির্দ্বিধায় তার মতানুকূলে ঢলে পড়তো। ওমরই রাজনৈতিক বক্তা, যিনি সব সময় নিজের মতানুযায়ী শ্রোতাদের চালিত করতে পারতেন। তিনি যখন দাঁড়িয়ে বক্তৃতা

    দিতেন তখন সমাগত মজলিসে তাঁর মাথা সকলের উর্ধ্বে ছাপিয়ে উঠতো এবং তাঁর উদাত্ত, গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বরে সব গুঞ্জন স্তব্ধ হয়ে যেতো। এখানে, কয়েকটি ঐতিহাসিক বক্তৃতার অংশবিশেষ দৃষ্টান্ত হিসেবে উদ্ধৃত করা যেতে পারে। প্রশাসনিক কর্মচারীদের একদা তিনি বলেছিলেন:

    আমার মতে তিন রকমে অর্থের ব্যাপারে পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে: প্রথমত সর্বদাই ন্যায়পথে অর্থ সংগ্রহ করবে, দ্বিতীয়ত ন্যায়ভাবে অর্থ ব্যয় করবে আর তৃতীয়ত অন্যায়ভাবে অর্থ ব্যয় করা একেবারে বন্ধ করতে হবে। আমি স্বেচ্ছাচারীকে ভূপাতিত করবো, তার একগাল মাচিতে রেখে আর একগাল পা দিয়ে চেপে ধরবো, যতক্ষণ না সে স্বীকারোক্তি করে। হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ তাঁর নিজস্ব বিষয়ে খুবই কঠোর, তিনি ফেরেশতাদেরকে ঈশ্বর বলার অধিকার দেন নি। তোমরা নিশ্চিত জেনে রাখো! আমি তোমাদের স্বেচ্ছাচারী করি নি তোমাদের আমি মোমেনদের পদপ্রদর্শক নিযুক্ত করেছি। তোমাদের সাধুজীবনই জনগণের অনুসরণের যোগ্য হবে।

    অন্য একবার তিনি বলেছিলেন :

    তোমরা দুনিয়ার খলিফাতুল্লাহ্! স্থানীয় বাসিন্দাদের উপর তোমাদের অবাধ অধিকার। আল্লাহ্ তোমাদের ধর্ম চিরস্থায়ী করেছেন। এখন তোমাদের ধর্মের শত্রু আর কেউ নেই। কিন্তু দুটি শত্রু এখনও আছে; প্রথম যারা ইসলামের বশ্যতা মেনে নিয়েছে অথচ তারা পরিশ্রম করছে, ব্যবসা করছে আর তোমরা যারা তাদের মুনাফা লুটে নিচ্ছো। দ্বিতীয়ত যারা কেবল বিপ্লবের প্রতীক্ষায় আছে। কিন্তু আল্লাহ্‌তায়ালা ভয়ার্ত করে তুলেছেন, আল্লাহ্‌র সেনারা তাদের বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। সেনারা এখন তাদের বাসগৃহ অফুরন্ত ভাণ্ডারে ভরিয়ে ফেলেছে এবং সীমান্তসমূহে দুর্ভেদ্য ঘাঁটি ও অজেয় বাহিনী রয়েছে।

    ওমর প্রায় ক্ষেত্রেই বক্তৃতা শেষ করতেন এই বলে :

    হে আল্লাহ! আমায় ভুল পথে চালিত করো না, আমায় যেন সহসা জওয়াবদিহি করতে না হয়, আর আমায় তুমি যেন কখনো অবহেলা করো না, বঞ্চিত করো না।

    ওমরের লেখনী চলতো বাক্‌শক্তির সঙ্গে সমান তালে। তাঁর ফরমানগুলি, পত্রাবলী সরকারী হুকুমনামাসমূহ প্রভৃতির আজও অস্তিত্ব রয়ে গেছে এবং সেগুলি তার লিপিকৌশল ও বর্ণনাভঙ্গির ঋজুতার অপূর্ব ক্ষমতার পরিচয় বহন করে। যে বিষয়েই তিনি কলম ধরেছেন, তাই ভাষার স্বাচ্ছন্দ্যে ও গাম্ভীর্যে অনন্য হয়ে উঠেছে উদাহরণস্বরূপ তাঁর বিচার সম্পর্কীয় পূর্বোল্লিখিত ফরমানটির কথা স্মরণীয়। এখানে তাঁর দুটি লিপির কিয়দংশ উদ্ধৃত করা যায়। আবু মুসা আশারীকে লেখা একখানি পত্ৰ :

    লোকে সাধারণত শাসককে ঘৃণার চোখে দেখে। পাছে লোকে আমায় সেই চোখে দেখে, তার জন্যে আমি আল্লাহ্ শরণ ভিক্ষা করি। বৃথা সন্দেহ পোষণ করবে না, দ্বেষ, হিংসা থেকে দূরে থাকবে এবং লোককে বৃথা উচ্চাশায় উৎসাহ দিও না। আর আল্লাহ্ হক সম্বন্ধ সর্বদাই সচেতন থাকবে। অসৎ লোকেরা যাতে ঐক্যবদ্ধ না হয় সে বিষয়ে হুঁশিয়ার থাকবে। যদি কোন জাতিকে মুসলিম রাষ্ট্র সম্বন্ধে হিংসাপরায়ণ দেখো, তা হলে এমন শয়তানী বুদ্ধির জন্যে অস্ত্রমুখেই সে জাতিকে নির্মূল করবে, যদি তারা আল্লাহ্ বিধান না মানে ও সৎপথে না আসে।

    আবু মুসাকে অন্য এক পত্রে লিখেছিলেন :

    দীর্ঘসূত্রতায় গা ভাসিয়ে না দিলে মানুষের কাজ শেষ করবার প্রবৃত্তি নিজে থেকেই জন্মে। কারণ, একবার ঢিলেমি শুরু করলে কর্ম হয়ে ওঠে প্রবল আকার, তখন কোনটা করবে, কোনটা করবে না, কিছুই স্থির করতে পারবে না, ফলে সব কাজই, মাটি হয়ে যাবে।

    আমর-বিন্-আল-আস্ মিসরের শাসক নিযুক্ত হয়ে খাজনা ওয়াসীল করতে দেরী করতে থাকেন। ওমর তাগাদা দিলেও আমর দেরী করতে থাকেন। তখন ওমর কড়া সুরে লেখেন:

    আমি বেশ বুঝতে পারছি, তোমার অধীনস্থ কর্মচারীরা সৎ নয় বলেই তোমার জওয়াব দিতে দেরী হচ্ছে। তারা তোমায় আড়াল ভেবেছে, কিন্তু আমি এর যোগ্য ওষুধ জানি। আমি আশ্চর্য হচ্ছি যে, তোমায় বারবার বিশেষ করে লিখছি, অথচ তুমি খাজনা পাঠাচ্ছো না, সোজা জওয়াবও দিচ্ছ না। ভালকথা, আবু আব্দুল্লাহ্! কিছু ভেবো না। তোমার নিকট থেকে প্রাপ্য যথাযোগ্য আদায় হবে এবং তুমিও দেবে: দরিয়া যেমন মুক্তা বের করে দেয় সেই রকম তোমাকেও প্রাপ্য গণ্ডা বুঝিয়ে দিতে হবে।

    ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ওমর আরবী ভাষা উত্তমরূপে আয়ত্ত করেছিলেন। মদীনায় হিজরত করার পর তিনি হিব্রু ভাষাও শিখে ফেলেন। দারিমি মসনদে উল্লেখ করেছেন, ওমর হিব্রু ভাষায় তওরাত পাঠ করে হযরতকে শোনাতেন। তওরাত পাঠ করেই ওমর ইহুদীদের মধ্যে প্রচারিত অলিক কাহিনীগুলির অসারতা সম্যক জ্ঞাত হন এবং এ সম্বন্ধে মুসলিমদের অবহিত করেন। তার বিচার-শক্তিও প্রখর হয়, দূরদর্শিতা প্রসারিত হয় এবং বুদ্ধি-বৃত্তি তীক্ষ্ণ হয়। সমসাময়িক বহু গ্রন্থে ওমরের বহু সুভাষিতের উল্লেখ আছে। এখানে কয়েকটি উদ্ধৃত করা গেল:

    • যে নিজের বুদ্ধিতে চলে, সে নিজের বিষয়কর্ম আয়ত্তে রাখে।
    • যাকে ঘৃণা করো, তাকে ভয়ও করবে।
    • সে-ই সবচেয়ে বুদ্ধিমান, যে নিজের কাজের জবাবদিহি করতে পারে।
    • আজকের কাজ কালকের জন্যে ফেলে রেখো না।
    • অর্থে কারও মাথা উঁচু হয় না।
    • যা পিছু হটে, তা আগে বাড়ে না।
    • যে মন্দ জানে না, সে মন্দ করবেই।
    • আমায় কেউ প্রশ্ন করলেই তার বিদ্যার বহর বুঝতে পারি।
    • অন্যকে উপদেশ দেওয়ার পূর্বে নিজের দিকে তাকিও।
    • যতোই সংসারে অনাসক্ত হবে, ততই স্বাধীন হবে।
    • তওবার তিক্ততা সহ্য করার চেয়ে পাপ না করা অনেক ভাল।
    • প্রত্যেক অসাধু লোকের পিছনে আমার দুটি প্রহরী আছে পানি ও কাদা।
    • ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা যদি দুটি উটনী হতো, তা হলে আমি নির্বিচারে একটায় চড়ে বসতেম।
    • যে আমার একটি ভুল আমায় উপহার দেয়, আল্লাহ্ করুণা তার উপর
    • কারও নাম-যশ শুনেই বিভ্রান্ত হয়ো না।
    • কারও নামায-রোযা দেখেই তার বিচার করো না, তার জ্ঞান ও সাধুতার দিকে লক্ষ্য রেখো।
  • ওমর-কাহিনীগুচ্ছ

    ওমর-কাহিনীগুচ্ছ

    ওমর-কাহিনীগুচ্ছ

    ইংরেজীতে একটি প্রবচন আছে: দৃষ্টান্ত উপদেশের চেয়ে অনেক শ্রেয়। অর্থাৎ কথায় বড় না হয়ে কাজে বড় হওয়াই ঢের ভাল।

    বস্তুত ইসলামের এটি একটি মহৎ শিক্ষা। ইসলামের উদ্‌গাতা রসূলুল্লাহ্ একটি কাহিনী থেকেই এ শিক্ষার বাস্তব পরিচয় বিশদ হয়েছে। একদিন একজন সাহাবা রসূলুল্লাহ্‌র নিকট একটি বালককে হাযির করে আরয করলেন: এর মধু খাওয়ার ভীষণ লোভ, একে হিদায়েত করুন। হযরত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ছেলেটিকে তিন দিন বাদে নিয়ে এসো। তিনদিন বাদে ছেলেটিকে হাযির করা হলে রসূলুল্লাহ্ ছেলেটিকে স্নেহভরে মিষ্ট কথায় বোঝালেন, মধু খাওয়ার লোভ ত্যাগ করা উচিত। ছেলেটি উপদেশ পালন করলো। জনৈক সাহাবা এই সময় নিয়ে উপদেশ দেওয়ার কারণ কি জানতে উৎসুক হলে হযরত স্মিত হাস্যে বলেছিলেন: আমারও মধু খাওয়ায় লোভ ছিল। সময় নিয়ে নিজে মধু খাওয়ার প্রবৃত্তি জয় করে ছেলেটিকে উপদেশ দিতে পেরেছি। এ-সব তুচ্ছ ঘটনার মধ্য দিয়ে মহৎ শিক্ষার কি সব উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রসূলুল্লাহ্ রেখে গেছেন আমাদের জন্যে! ‘আপনি আচরি ধর্ম পরে শিখাইব-এ নীতি তিনি পালন করে গেছেন সারা জীবন ধরে অক্ষরে অক্ষরে, মর্মে মর্মে।

    রসূলুল্লাহ্‌র জীবন্ত প্রতিচ্ছায়া ছিলেন তাঁর সাহাবা বা সাক্ষাৎ শিষ্যগণ। আবার তাঁদের মধ্যে উজ্জ্বলতম রত্ন ছিলেন চারজন-আবুবকর, ওমর, ওসমান, আলী। এঁদেরকে হযরতের প্রতিবিম্ব বলা চলে। সৌরজগতের চন্দ্রগ্রহণে উপগ্রহগুলি যেমন সূর্যের চারপাশে অবস্থান করে এবং সৌরকিরণে প্রতিফলিত হয়ে উজ্জ্বল রূপ ধারণ করে, সে রকম এই চারজন সাহাবা-শ্রেষ্ঠ হযরতের জীবনাদর্শের পূর্ণালোকে লালিত হয়ে তাঁর শিক্ষা, বাণী ও আদর্শকে বাস্তবায়িত করেছিলেন। এজন্যে এদের জীবনধারা আলোচনা করলে হযরতের জীবনচিত্রের চিত্রণ দেখি, এঁদের কর্মধারার মধ্যে হযরতের শিক্ষা ও বাণীর পরিচয় লাভ করি, তাঁদের মধ্যেই রসূলুল্লাহ্ উপস্থিতি অনুভব করি।

    ওমর রসূলের যোগ্য প্রতিনিধি ছিলেন এই অর্থে যে, তিনি রসূলের কদম মুবারকের অনুসরণ করতে চেষ্টা করেছেন জীবনের প্রতি পদক্ষেপে। তার দৃষ্টান্ত পাই ওমরের প্রতিটি কর্মে। তাঁর কর্মজীবন আলোচনাকালে বহু কাহিনীর দৃষ্টান্ত দিয়ে তার প্রকৃত পরিচয় দিতে চেষ্টা করা হয়েছে, তাঁর বাস্তব জীবনের নানাদিকে আলোকপাত করা হয়েছে। এখানে আরও কাহিনী বিবৃত করা যেতে পারে, তাঁর কর্মজীবনের নানা দিকে আলোকপাত করার জন্যে। এগুলি সন্ধানী আলোর মতো তাঁর জীবন ও কর্মধারাকে দ্যুতিময় করে তুলেছে তাঁর অন্তর-বাহির আমাদের নিকট আরও পরিচ্ছন্ন ও স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। নিঃসন্দেহে আসল মানুষটির পরিচয় মেলে এই কাহিনীগুলির মাধ্যমে:

    ❀ ১ ❀

    একবার এক বেদুঈন ওমরের নিকট নালিশ করে একজন কর্মচারীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে। ওমর তাকে সাক্ষী হাযির করতে বললে সে অক্ষমতা জানায়। তখন, ওমর সহসা রাগান্বিত হয়ে তাকে বেত্রাঘাত করে দূর করে দেন। পরে গোপনে সংবাদ নিয়ে ওমর নিঃসন্দেহ হন, বেদুঈনের অভিযোগ সত্য। তখনই তিনি অভিযোগের প্রতিকার করেন। কিন্তু বেদুঈনকে অনুরোধ করেন, তাকে অহেতুক বেত্রাঘাত করার দরুন তাঁকেও বেত্রাঘাত করে প্রতিশোধ নিতে। বেদুঈন সসম্ভ্রমে প্রত্যাখ্যান করেন। তখন অনুতপ্ত ওমর আল্লাহ্‌র নিকট প্রার্থনা জানান :

    হে খাত্তাব-নন্দন! তুমি অধম ছিলে, আল্লাহ্ তোমায় উর্ধ্বে

    তুলেছেন। তুমি বিভ্রান্ত ছিলে, আল্লাহ্ তোমায় সঠিক পথে

    চালনা করেছেন। তুমি দুর্বল ছিলে, আল্লাহ তোমায় সবল

    করেছেন। তার পর তোমায় নিজ কওমের উপর শাসনভার

    দিয়েছেন! কিন্তু তাদেরই একজন যখন তোমার সাহায্য

    ভিক্ষা করলো, তাকে তুমি আঘাতই দিয়েছ! এখন আল্লাহর

    সামনে উপস্থিত হয়ে তুমি কি কৈফিয়ৎ দিবে?

    ❀ ২ ❀

    একবার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু মালে-গণিমাত মদীনায় উপস্থিত হয়। এ খবর পেয়ে ওমর-তনয়া ও ওম্মুল-মুমেনীন বিবি হাস্সা পিতৃসমক্ষে উপস্থিত হয়ে প্রার্থনা করলেন: আমীরুল মুমেনীন! আমি আপনার কন্যা, আমায় মালে গনিমাতের অংশ দিন। ওমর উত্তর দিলেন: বৎসে! আমার সম্পত্তিতেই শুধু তোমার হক আছে। কিন্তু মালে গনিমাত সর্বসাধারণের সম্পত্তি। আমি তো তোমার কথায় কর্তব্য ভুলতে পারি নে। হাসা লজ্জা পেয়ে সরে পড়েন।

    ❀ ৩ ❀

    সিরিয়া বিজয়ের পর প্রাচ্য দেশীয় রাজা বাদশাদের সঙ্গে মুসলিমদের পত্রাদি বিনিময় হতে থাকে। একবার ওমর-পত্নী ওম্মে-কুলসুম কয়েক শিশি ভর্তি সুগন্ধি উপহার পাঠান এক সম্রাট-মহিষীকে এবং প্রতিদানে সব শিশিভর্তি মুক্তা আসে। ওমর এ খবর পেয়ে স্ত্রীকে বলেন, এ উপহার রাষ্ট্রীয় কারণে সরকারী কর্মচারী মারফত এসেছে, অতএব এসব মুক্তা বায়তুল মালে যাবে। তবে সুগন্ধির মূল্য হিসেবে কিছু খেসারত দেওয়া যেতে পারে।

    ❀ ৪ ❀

    একবার খলিফাতুল মুসলেমীন ওমর অসুখে পড়েন। সকলেই উপদেশ দিল, মধু খেতে। কিন্তু বায়তুল-মালে প্রচুর মধু থাকলেও ওমরের গৃহে এক ফোঁটা মধু নেই। অথচ সাধারণের অনুমতি ব্যতীত খলিফা মধু নিতে পারেন না। জুমার দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা হলো এবং জনসাধারণ মসজিদে উপস্থিত হলে প্রার্থনা করা হলো, অসুস্থ খলিফার জন্যে কিছু মধু বরাদ্দ করতে। জনগণের সম্পত্তিতে খলিফার কোন অধিকার নেই, তিনি শুধু প্রহরীমাত্র, এর চেয়ে উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত আর কি হতে পারে?

    ❀ ৫ ❀

    যিয়াদ-বিন্ হাদি ছিলেন ইরাকের প্রধান শুল্ক-কর্মচারী। তিনি এক খ্রিস্টানের একটি ঘোড়ার কুড়ি হাজার দিরহাম মূল্য ধরে এক হাজার দিরহাম শুল্ক চেয়ে বসলেন। ঘোড়ার মালিক একহাজার দিরহাম বাদ দিয়ে উনিশ হাজার নিয়ে চলে যায়। কিছু দিন পরে খ্রিস্টান মালিক সে পথ দিয়ে যাবার সময়ে আবার তার নিকট শুল্ক দাবী করা হলো। তখন মালিক অনন্যোপায় হয়ে ওমরের নিকট নালিশ করে। খলিফা বললেন, ভয় নেই। খ্রিস্টান যিয়াদের নিকট যেয়ে মা’সুল দিয়ে ঘোড়াটি ফেরৎ চাইলে, তাকে জানানো হয়, বিনা মাসুলেই খলিফা ঘোড়া ফেরৎ দিতে ফরমান জারী করেছেন, কারণ একই পণ্যদ্রব্যের বছরে দুবার মা’সুল লাগে না। কিছুদিন পর ওমর যখন কা’বাগৃহে খুৎবা দিচ্ছিলেন, তখন এক খ্রিস্টান তাঁর নিকট শুল্ক বিষয়ে একই নালিশ জানায়। ওমর তৎক্ষণাৎ বলেন, একই পণ্যের দুবার মাসুল লাগে না। তখন খ্রিস্টানটি জানায় সে-ই পূর্বে এ বিষয়ে নালিশ করেছিল। ওমর তখন বলেন: আমিও সেই মুসলিম, যে তোমার ক্ষতির প্রতিকার করেছিল।

    ❀ ৬ ❀

    সিরিয়া ভ্রমণ শেষ করে ওমর মদীনায় ফিরছেন। পথে মরু-প্রান্তরে একটি তাঁবু সম্মুখে পড়ে। তখনই উট থেকে নেমে ওমর তাঁবুর নিকট গিয়ে দেখলেন, একটি অসহায়া বৃদ্ধা মূর্তিমান হতাশার মতো বসে আছে। খলিফার মনে দয়ার উদ্রেক হলো। তিনি বললেন, ওমরকে তোমার অবস্থা জানাও না কেন? বৃদ্ধা উত্তর দিলে: শুনেছি, ওমর সিরিয়া থেকে ফিরছে। কিন্তু আল্লাহ্ অভিশাপ তার উপর, সে আমায় এক দিরহামও সাহায্য পাঠায় নি। ওমর বললেন: এতো দূর বিয়াবান্ থেকে তোমার খবর ওমরের নিকট কি করে পৌঁছাবে? বৃদ্ধা পুনরায় অভিশাপ দিয়ে বলে: তবে সে খলিফা হয়েছে কেন? প্রত্যেক বাসিন্দার খবরাখবর যদি রাখতে না পারে, তার খলিফা সাজা কেন? ওমর অশ্রুবিগলিত কণ্ঠে বললেন: মা, ঠিকই বলেছ, ওমর মহা অপরাধী।

    ❀ ৭ ❀

    একবার একদল যাত্রী মদীনার উপকণ্ঠ আস্তানা ফেলে। ওমর নিজেই রাত্রি জেগে তাদের খবরদারী করতে থাকেন। একটি তাঁবুতে দেখলেন, একটি মেয়ের কোলে এক কচি শিশু অনবরত রোদন করছে, কিন্তু মেয়েটি কিছুতেই স্তন্য দিচ্ছে না। ওমর ধমক দিয়ে শিশুকে শান্ত করতে বললেন। কিছুক্ষণ পর আবার সেদিক যেতে যেতে ওমর দেখলেন, শিশুটি সমানে রোদন করছে। ওমর কড়া ধমক দিয়ে বললেন, এমন নিষ্ঠুর মা আর দেখিনি। মেয়েটি তখন রাগান্বিত হয়ে বললে: যা জান না, তা নিয়ে ঝাল দেখি ও না। ওমর ফরমান জারী করেছে, দুধ না ছাড়া পর্যন্ত শিশুরা বায়তুল-মাল থেকে ভাতা পাবে না। তাই আমি জোর করে একে দুধ ছাড়াচ্ছি, আর তাই এতো চেঁচাচ্ছে। ওমরের তো চক্ষুস্থির। তাঁর তীব্র অনুশোচনা হলো, এভাবে না জানি কতো শিশু অকালে প্রাণ হারিয়েছে। তিনি সেদিনই ফরমান জারী করেন, জন্মাবার দিন থেকেই প্রত্যেক শিশু বায়তুল-মাল থেকে ভাতা পাবে এবং বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে ভাতাও বৃদ্ধি পাবে।

    ❀ ৮ ❀

    ওমরের ভৃত্য আসলাম এই কাহিনী বলেছেন। এক রাত্রে ওমরের সঙ্গে আসলাম শহর-পরিক্রমায় বের হয়েছেন। যখন তাঁরা মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে সরার নামক স্থানে উপস্থিত তখন লক্ষ্য করেন একটি রমণী চুলায় একটি ডেকচি জ্বাল দিচ্ছে, আর চার পাশে কয়েকটি অপোগণ্ড শিশু রোদন করছে। ওমর নিকটে যেয়ে কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। রমণীটি আর্তস্বরে বললে, ঘরে এক কণা খাবার নেই, অথচ ক্ষুধার জ্বালায় শিশুরা রোদন করছে। এজন্যে তাদের ভুলাবার উদ্দেশ্যে ডেকচিতে শুধু পানি জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। শিশুরা রোদন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। এ কথা শুনেই ওমরের বুকে মোচর দিয়ে উঠলো। তিনি পাগলের মতো শহরের দিকে দৌড় দিলেন এবং বায়তুল-মাল থেকে আটা, ঘি, খেজুর প্রভৃতি খাদ্য বস্তুতে ছালা বোঝাই করে আসলামকে অনুরোধ করলেন, তাঁর পিঠে বোঝা তুলে দিতে। আসলাম সবিনয়ে আর করলেন, তিনিই বোঝা বহন করবেন। কিন্তু ওমর বললেন: ভালো কথা কিন্তু রোয-কিয়ামতে আমার বোঝা বইতে তো তুমি থাকবে না; তখন আমার কি হবে? ছোট হোক বড় হোক জুলুমের বোঝা বওয়ার চেয়ে লোহার পর্বতের ভারী বোঝা বহন করা ঢের সহজ। অতঃপর ওমর নিজেই ছালা পিঠে বয়ে তাঁবুতে উপস্থিত হলেন। রমণী রুটি তৈরি করতে লাগলো, ওমর নিজে সেঁকতে লাগলেন। খাবার প্রস্তুত হলে শিশুরা মহানন্দে উদর পূর্তি করলো, ওমর গভীর তৃপ্তিভরে দেখতে লাগলেন। রমণীটি তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে বললে: আল্লাহ্ তোমায় কৃপা করুন! সত্যি কথা বলতে তুমিই ওমরের চেয়ে খলিফা হওয়ার উপযুক্ত। ওমর খুশী হয়ে আসলামকে বললেন : বাচ্চাদেরকে ভুখা দেখে আমার মনে হয়েছিল, যেন পাহাড় ভেঙে আমার পিঠে পড়েছে। এখন মনে হচ্ছে, সে পাহাড় আমার উপর থেকে সরে গেছে।

    ❀ ৯ ❀

    এক রাত্রে ওমর একাকী টহল দিতে দিতে শহর থেকে অনেক দূর চলে গেলেন। সহসা তাঁর সামনে একটি তাঁবু পড়লো তিনি লক্ষ্য করলেন, একজন বেদুঈন বড় বিষণ্ণ হয়ে একাকী বাইরে বসে আছে। তিনি বেদুঈনটির নিকট যেয়ে আলাপ আরম্ভ করলেন। সহসা তাঁবুর ভিতর থেকে নারীর আর্তকণ্ঠ শ্রুত হলো। ওমর ব্যস্ত হয়ে কারণ জিজ্ঞাসা করলে বেদুঈন ক্ষুণ্ণ কণ্ঠে বললে, তার স্ত্রীর প্রসব বেদনা উপস্থিত হয়েছে। অথচ সাহায্য করতে কোন ও দ্বিতীয় স্ত্রীলোক নেই। ওমর আর কথা না বলে তৎক্ষণাৎ গৃহে উপস্থিত হলেন এবং বিবি ওম্মে কুলসুমকে বললেন, প্রসূতির সমস্ত সরঞ্জাম নিয়ে তখনই তার সঙ্গে যেতে। তাঁবুতে উপস্থিত হয়ে ওমর বেদুঈনের অনুমতি নিয়ে ওম্মে কুলসুমকে ভিতরে প্রেরণ করলেন ও নিজে কিছু খাবার নিয়ে বেদুঈনকে সঙ্গে করে আহারে প্রবৃত্ত হলেন। কিছুক্ষণ পরে ওম্মে কুলসুম বের হয়ে বললেন: আমীরুল মুমেনীন! আপনার বন্ধুকে সুসংবাদ দিন, একটি পুত্র হয়েছে। ‘আমীরুল মু’মেনীন’ সম্বোধন শুনেই তো বেদুঈনের চক্ষু ছানাবড়া! সে সঙ্গে সঙ্গে সালাম জানিয়ে সসম্ভ্রমে এক পাশে দাঁড়ালো। কিন্তু ওমর বললেন: কিছু মনে করো না ভাই! আমি স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ী যাচ্ছি, কাল তুমি দরবারে দেখা করো, শিশুর একটা ভাতার ব্যবস্থা করে দেব।

    ❀ ১০ ❀

    আবদুর-রহমান-বিন্-আউফ বলেছেন: এক রাত্রে ওমর সহসা আমার নিকট উপস্থিত হলেন। আমি আরজ করলেম, তাঁর এতো কষ্ট করার দরকার ছিল না, আমায় ডাকলেই হাযির হতেম। কিন্তু ওমর বললেন: ওসব কথা থাক। একদল যাত্রী শহরের উপকণ্ঠে তাঁবু ফেলেছে। তারা নিশ্চয়ই ক্লান্ত। চলো আমরা দুজনে তাদের কাজ করে দিই ও সারারাত পাহারা দিই। তাঁর সনিবন্ধ অনুরোধে আমরা সারারাত পাহারা দিয়েছি।

    ❀ ১১ ❀

    আহনাফ্-বিন-কায়েস একবার ওমরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছে কয়েকজন গণ্যমান্য মাতবর। মসজিদে খলিফাকে না পেয়ে তাঁরা ওমরের খোঁজে বের হলেন এবং শহর-প্রান্তে দেখলেন, খোদ্ খলিফা কোমরে কাপড় গুঁজে ছুটাছুটি করছেন তাঁদেরকে দেখতে পেয়েই ওমর জোরে হাঁক দিলেন: আহনাফ্! দৌড়ে এসো, বায়তুল-মালের একটা উট ছুটে পালিয়েছে, ওটাকে ধরতে হবে। জানো তো কত এতিমের অংশ রয়েছে এই উটটিতে। একজন মাতবর বললেন: তার জন্যে খোদ্ আমীরুল মু’মেনীন দৌড়াদৌড়ি করছেন কেন? একজন গোলাম পাঠালেই চলতো। স্মিতহাস্যে ওমর উত্তর দিলেন; আমার চেয়ে বড় গোলাম আর কে আছে?

    ❀ ১২ ❀

    একদা ওমর লক্ষ্য করেন একজন বৃদ্ধ খ্রিস্টান দুর্বল শরীর নিয়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করছে। ওমর তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, এমন দুর্বল শরীরে সে ভিক্ষা করছে কেন? বৃদ্ধ উত্তর দিলে, তার উপর জিয়া কর ধার্য করা হয়েছে, অথচ তার সামর্থ্য নেই; এজন্যে ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়েছে। ওমর তাকে সঙ্গে করে নিজ গৃহে আনলেন ও কিছু অর্থ দিয়ে বিদায় করলেন। সঙ্গে সঙ্গে বায়তুল মালের খাজাঞ্চীকে নির্দেশ দিলেন এ রকম অক্ষম লোকদের বায়তুল মাল থেকে ভরণ-পোষণ করা কর্তব্য। এই সঙ্গে কোরআনের বাণী ‘সাদকা দুঃখী ও অভাবগ্রস্তদের প্রাপ্য’ উদ্ধৃত করে এই ফরমান দেন: আল্লাহ্‌র নামে বলছি, এটা কখনই উচিত নয় যে, আমরা জনগণের যৌবনকালের উপকার লাভ করবো, কিন্তু বৃদ্ধাবস্থায় তাদের পথে ফেলে দেবো।

    ❀ ১৩ ❀

    একবার এক বেদুঈন ওমরের নিকট এসে উক্তি করে: হে ওমর! বেহেশতের আনন্দই পরমানন্দ। আমার মেয়েদের ও তাদের মাকে বস্ত্র দান কর। আল্লাহ্‌র দোহাই! বস্ত্র দান করো! ওমর বললেন, যদি না দিই, তা হলে কি হবে? বেদুঈন বললে: তাহলে রোয-কিয়ামতে আমার জন্যে তোমার জওয়াবদিহি করতে হবে। তখন তুমি লা-জওয়াব হয়ে যাবে, আর তার পর তোমার গতি হবে বেহেশতে না হয়ে দোজখে। এ কথাই শুনেই ওমর এরূপ ক্রন্দন করতে থাকেন যে তাঁর দাঁড়ি বেয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে। তখন তাঁর নিকট কিছুই না থাকায় গায়ের বস্ত্রখানিই খুলে নিয়ে বেদুঈনকে দান করলেন।

    ❀ ১৪ ❀

    এক গভীর রাত্রিতে টহল দিয়ে ফিরছেন। সহসা নারীকণ্ঠে এই করুণগীতি শ্রুত হলো :

    ঘোর রজনী দীর্ঘ রজনী ঘিরিছে মোরে;

    প্রিয় নাই পাশে, একাকী নয়ন ঝুয়ে!

    ওমর সংবাদ নিয়ে জানলেন, যুবতীর স্বামী যুদ্ধে গেছে, বহুদিন ঘরে ফেরে নি। রমণীর বিরহ-ব্যথা ওমরের মর্মে আঘাত করলো। তিনি চিন্তা করলেন, এভাবে কতো বিরহিণীকে তিনি যাতনা দিয়ে অভিশাপ কুড়িয়েছেন। কন্যা হাসাকে জিজ্ঞাসা করলেন, নারী কতোদিন স্বামীর বিরহ সহ্য করতে পারে? ওম্মুল-মুমেনীন উত্তর দিলেন, বড় জোর চার মাস। পরদিন প্রাতেই ওমর ফরমান জারী করলেন, কোনও যোদ্ধাকে চার মাসের বেশি গৃহ-সুখে বঞ্চিত করা যাবে না।

    ❀ ১৫ ❀

    সাইদ্-বিন্-য়ারবু ছিলেন অন্যতম সাহাবা। বৃদ্ধ হয়ে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। একদিন ওমর তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, জুমার নামাযে তিনি শরীক হন না কেন? সাঈদ বললেন, তিনি অন্ধ হয়ে পড়েছেন, একা পথে হাঁটতে পারেন না, তাঁর কোন সঙ্গী-সহায়ও নেই। তখন তখনই ওমর এক জন ভৃত্য নিযুক্ত করলেন, সাঈদকে সাহায্য করতে।

    ❀ ১৬ ❀

    একদিন ওমর কয়েকজ ব্যক্তিকে ভোজ দিয়েছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, এক ব্যক্তি বাম হাত দিয়ে মুখে খাবার তুলছে। ওমর তাকে উপদেশ দিলেন, ডান হাত দিয়ে আহার করতে। লোকটি বললে, ইয়ারমুকের যুদ্ধে তার ডান হাত কাটা গেছে। তখনই ওমরের অন্তর সমবেদনায় ভরে গেল, তিনি তার নিকট বসে নিজের হাতে তাকে খাবার তুলে দিতে লাগলেন। তার গোসল করতে, কাপড় পরতে কতো অসুবিধা হয় তা বিবেচনা করলেন এবং সেই দিনই তার সেবা করার জন্যে একজন ভৃত্য নিযুক্ত করলেন।

    ❀ ১৭ ❀

    একদিন ওমর এক বিরাট জনসভায় বক্তৃতা দিচ্ছেন। চারদিকে বিশালজনতা নীরবে তাঁর বক্তৃতা শুনছে। এক সময়ে উচ্চকণ্ঠে তিনি জনতাকে প্রশ্ন করলেন : বন্ধুগণ, আমি যদি বিপথে চলি, যদি দুনিয়াবী লোভে পড়ে যাই, তা হলে তোমরা কি করবে? তখনই এক ব্যক্তি মাথা তুলে দাঁড়ালো এবং তরবারি উঁচিয়ে তুলে উচ্চস্বরে বললে, তা হলে ওমর! তোমার মাথা কেটে ফেলবো। লোকটির সাহস পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে ওমর ধমক দিয়ে বললেন: তুমি এ কথা খলিফাকে বলছো? লোকটি নির্ভীক কণ্ঠে বললে, হাঁ ওমর, আমি তোমাকেই বলছি। দুহাত উর্ধ্বে তুলে ওমর আল্লাহ্ শুকরগুজারী করে বললেন: আল্লাহ! আমি কী ভাগ্যবান! আমি যদি বিপথে চলি, তা হলে আমায় সঠিক পথে চালাবার লোকের অভাব হবে না।

    ❀ ১৮ ❀

    এক জুমার দিনে ওমর খুত্বা দিতে উঠে দাঁড়িয়েছেন। তখনই উপস্থিত মুসল্লীদের মধ্যে একজন দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানালো : হে ওমর! প্রথমে আমার প্রশ্নের জওয়াব দিন, তার পর আপনার কথা শুনবো। তখনই ওমর মিম্বার থেকে নেমে বললেন: বল, কি তোমার প্রশ্ন? সে বললে: আমরা মালে-গনিমাত থেকে যে এক এক টুকরো কাপড় পেয়েছি, তা তো কুর্তা হয় না, অথচ আপনার গায়ের বড় কুর্তা বানিয়েছেন। আপনি কোথা থেকে এই কাপড় পেলেন? খলিফা পুত্র আবদুল্লাহকে ডেকে বললেন: তুমি এর কৈফিয়ত দাও। তিনি বললেন: আমি আমার অংশ পিতাকে দান করেছি, তাই দুটুকরো কাপড়ে কুর্তা তৈরি হয়েছে। তখন লোকটি বলল, আমীরুল মু’মেনীন! এবার আপনার খুত্বা শুনবো। খলিফা স্মিতকণ্ঠে বললেন: আল্লাহ! আমি কি ভাগ্যবান! আমারও কৈফিয়ত তলব করতে কারও সঙ্কোচ-ভয় হয় না।

    ❀ ১৯ ❀

    একদা ওমর মদীনার পথে যাচ্ছিলেন। এমন সময় একজন সাধারণ লোক তাঁর পথ রোধ করে বললে: ওহে ওমর! তোমার কি আল্লাহ্ ভয় নেই? তুমি বুঝি ভেবেছ যে, তোমার আমলাদের জন্যে কতকগুলি হুকুমনামা পাঠিয়ে দিয়েই তুমি আল্লাহ্‌র গযব থেকে ত্রাণ পেয়ে যাবে?

    ওমর ভীত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন: কেন, কি হয়েছে?

    লোকটি বললে: তুমি কি খবর রাখো, তোমার নিযুক্ত মিসরের শাসক আইয়ায-বিন্-ঘনম মিহি কাপড়ের শৌখিন পোশাক পরে এবং ফটকে একজন দ্বারী রাখে?

    ওমর সেদিনই মিসরে দূত হিসেবে পাঠালেন মুহম্মদ-বিন্-মস্লামাকে এই নির্দেশ দিয়ে, তিনি আইয়াযকে যে-অবস্থায় পাবেন, সে অবস্থাতেই খলিফার সম্মুখে উপস্থিত করবেন। দূত মিসরে উপস্থিত হয়ে দেখলেন, আইয়াযের বিরুদ্ধে অভিযোগ যথার্থ। তাঁর দেহে মিহি কাপড়ের পোশাক আছে, একজন দ্বারীও ফটকে নিযুক্ত আছে। আইয়াযকে সেই অবস্থায় মদীনায় উপস্থিত করা হলো। ওমর এক নযর তাঁকে দেখেই হুকুম দিলেন, তাঁর পোশাক খুলে নিয়ে কোরা পশমের পোশাক পরিয়ে দিতে এবং এক পাল মেষ দিয়ে আদেশ দিলেন: যাও এবার বনজঙ্গলে মেষ চরাও গে।

    আইয়ায বিনা প্রতিবাদে হুকুম তামিল করতে প্রস্তুত হলেন। কিন্তু নিজের অদৃষ্টকে ধিক্কার দিয়ে বারবার আক্ষেপ করতে লাগলেন; এর চেয়ে মরণও ভালো ছিল।

    ওমর তো শুনে বললেন: এ কাজ করতে তোমার লজ্জা পাওয়ার কথা নয়। তোমার পিতা আজীবন মেষের রাখালি করে গেছে, আর এজন্যেই তার নাম হয়েছিল ঘনম্।

    আইয়ায অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইলেন। তার পর এই চরম শাস্তি শিরোধার্য করে তিনি নীরবে আজীবন মেষের রাখালি করে গেছেন।

    ❀ ২০ ❀

    পরমজ্ঞানী সালমান ফারসীকে ওমর একবার জিজ্ঞাসা করলেন: আমি সম্রাট না খলিফা?

    সাল্‌মান উত্তর দিলেন: আপনি যদি মুসলিমদের জমির উপর এক দেরহাম কিংবা তার বেশি বা তার চেয়েও কম কর ধার্য করে থাকেন এবং তা শারীয়ার বিধানের বিপরীতে ব্যয় করে থাকেন, তাহলে আপনি সম্রাট, খলিফা নন।

    ওমর এ কথা শুনে অঝোরে অশ্রুপাত করতে করতে প্রার্থনা জানালেন: হে আল্লাহ! আমায় সঠিক পথে চালনা করো!

  • শেষ প্ৰসঙ্গ

    শেষ প্ৰসঙ্গ

    শেষ প্ৰসঙ্গ

    বিশাল ওমর-চরিত কাহিনী সাঙ্গ হলো। সৃষ্টির আদি কাল থেকে কতো মহৎ ব্যক্তি, বীরপুরুষ, ন্যায়দর্শী, সত্যদর্শী মহাপ্রাণ মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁদের পুণ্যময় জীবন-কাহিনী যুগে যুগে মানুষকে আদর্শ দান করছে, প্রেরণা যোগাচ্ছে। আমরা সে সব কীর্তিধর স্মরণীয় ও বরণীয় মহামানবের পথ লক্ষ্য করে চলবার অনুপ্রেরণা লাভ করছি। এসব বিশ্বনন্দিত মহৎ ব্যক্তির চরিতমালায় ওমর-চরিত সংযোজিত হলো। নিরপেক্ষ জ্ঞানী পাঠকবৃন্দ নিজেরাই বিচার করবেন, বিশ্বেতিহাসে ওমর-চরিতের তুলনা কোথায়!

    আমরা যে তরুণ ওমরের প্রথম সাক্ষাৎ পাই, সে ছিল বীর্যবান, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা আইয়ামে-জাহেলিয়াতের এক কুলিশ-কঠোর মূর্তি। দাজানের মরু-প্রান্তরে উট-পালক হিসেবে তার পরিচয়। পরিণত বয়সে তাঁর সাক্ষাৎ পাই, আমীরুল মুমেনীন হিসেবে মহাশক্তিধর, অর্ধ-পৃথিবীর মহাশাসক হিসেবে, পরমজ্ঞানী, ন্যায়দর্শী, সত্যদর্শী, রাজর্ষিরূপে। আলেকজান্দার, নেপোলিয়ানের মতো বিশ্ববিজয়ী, আরিস্টটল, প্লেটোর মতো মহাজ্ঞানী, আবদুল কাদের জিলানী, জালাল উদ্দীন রুমীর মতো মহাতাপস, নওশেরওয়ার মতো ন্যায়দর্শী এবং অতুলনীয় ওমরের মতোই মিথ্যা থেকে সত্য বিচ্ছিন্নকারী সত্যদর্শী, একাধারে এতোগুলি মহত্ত্বের অপূর্ব সমাবেশ আর কোথায়? এর তুলনাই বা কোথায়? মহৎ শব্দের এমন মণিকাঞ্চনযোগ ওমর ভিন্ন অন্য কোন চরিত্রে সম্ভব? আরবীতে একটি সুবচন আছে-আল্লাহ্ পক্ষে এটা অসম্ভব নয় যে, তিনি একটা মানব-চরিত্রেই বিশ্বরূপ দেখাতে পারেন। কিন্তু ওমর চরিত ভিন্ন অন্য কোন্ মানুষে এমন বিশ্বরূপের সার্থকতা রূপায়িত হয়েছে? তিনি নবী নন, রসূল নন, কিন্তু রসূলুল্লাহর শিক্ষা ও আদর্শের এমন সার্থক রূপায়ণ আর কোন্ চরিতে সম্ভব হয়েছে? তাইতো মুগ্ধ কবি বিস্ময় বিমুগ্ধ কণ্ঠে গেয়েছেন:

    আজ বুঝি, কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর,

    মোর পরে যদি নবী হতো কেউ-হতো সে এক ওমর।

    যে আরবভূমিতে ওমরের জন্ম, সেখানে শাসনতন্ত্র, নিয়মতন্ত্রের বালাই ছিল না। দাজ্নানের উট-পালকের স্বপ্নেও জাগে নি, একদিন অর্ধ-পৃথিবীর কোটি কোটি জনগণের শাসন-রশ্মি হাতে তুলে নিতে হবে, মহান রাষ্ট্রনায়কের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু কর্তব্যের ডাক যখন এলো তখন দেখা গেল, শ্রেষ্ঠ নরপালক হিসেবে তাঁর তুলনা নেই, রাষ্ট্র রূপায়ণে তাঁর মতো কুশলী শিল্পীর দ্বিতীয় সাক্ষাৎ আজও পৃথিবী পায় নি। একটা অজ্ঞাত, অখ্যাত, অনুন্নত জাতিকে মাত্র দশ বছরের কর্মব্যস্ততায় বিশ্বের মহাশক্তিতে উন্নীত করা এবং আদর্শ জাতিতে রূপায়িত করা ওমরের মতো প্রতিভার পক্ষেই সম্ভব ছিল। অথচ এ রাজর্ষি বাস করেছেন পর্ণকুটিরে, শয্যা পেতেছেন ধুলি ধূসরিত মাটির কোলে, গায়ে তুলেছেন অসংখ্য তালিশোভিত জীর্ণ বস্ত্রখণ্ড। এখনই তিনি মহামান্য রাজদূতের দর্শন দিয়ে ধন্য করেছেন কিংবা ক্রান্তিকালীন যুদ্ধবিগ্রহের নির্দেশ দিচ্ছেন, অথবা মহাশক্তিধর প্রদেশ পালদের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রসংক্রান্ত উপদেশ দিয়েছেন। আবার পরমুহূর্তেই তাঁকে দেখা যাচ্ছে, অসহায় বিধবার পানি তুলে দিচ্ছেন, তার উট দোহন করছেন; কিংবা এতিমের উট চারণ করছেন, অসহায় ক্লান্ত পথিকের সেবায় ব্যস্ত আছেন। আবার হয়তো তার পরেই জ্ঞানী ও বিচক্ষণ সাহাবাদের সঙ্গে বসে শারিয়ার কঠিন মালায় সুষ্ঠু মীমাংসা করে দিচ্ছেন। ইসলামের একনিষ্ঠ সেবকরূপে, ধর্মভীরু, আল্লাহ্ভীরু ন্যায়নিষ্ঠ তাপস হিসেবে, আবার মানুষের পরম সহায় ও বন্ধু হিসেবে ওমরের তুলনা কোথায়? তাঁর সত্যনিষ্ঠা, ন্যায়নিষ্ঠা, সাধুতা, সরলতা, আড়ম্বরলেশহীনতা, নম্রতা, তিতিক্ষা, আত্মত্যাগ বাস্তবিকই বিস্ময়কর। আরও বিস্ময়কর, এই বাহ্যত রুক্ষ কঠোর মূর্তির হৃদয়ে এতো স্নেহ-মমতা ছিল, এতো মানবপ্রীতি ছিল, এমন করুণার ফল্গুধারা ছিল।

    রসূলুল্লাহর আবির্ভাব বিশ্বলোকের অপূর্ব নিয়ামত ও চিরন্তন আশিসরাশি স্বরূপ। ধর্মপ্রচারণা তাঁর প্রধান ভূমিকা হলেও মানবতার কল্যাণসাধন তাঁর একটি অনন্য কর্মসূচী ছিল। আর এ কর্মসাধনে তাঁর একটি লক্ষ্য ছিল এমন একদল আত্মভোলা ত্যাগীর সৃষ্টি করতে হবে, যারা পৃথিবীর হাতছানিকে অগ্রাহ্য করে বহু জনহিতায় বহুজন সুখায়’ মরণ বরণ করে নিয়ে মানবতার সেবায় হাসিমুখে অগ্রসর হবে, আত্মোৎসর্গ করবে। যারা আত্মত্যাগের মহামন্ত্র মুখে প্রচার না করে কাজে দেখাবে। মাত্র তেইশ বছরের কর্মমুখর জীবন একটা অত্যুচ্চ ধর্ম সংস্থাপনে, একটা আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ও একটা ঐক্য শৃঙ্খল সুসংবদ্ধ নয়া জাতিগঠনের শুধু নজীরবিহীন নজীর রেখেই যান নি, যে কেউ তাঁর সংস্পর্শে এসেছে, সাহচর্যলাভে ধন্য হয়েছে, সে-ই তাঁর ভাবধারায়ও চিন্তা-ভাবনায় উদ্দীপিত হয়েছে এবং নয়া জীবন-রসে সজীবিত হয়ে উঠেছে। জগৎ ও জীবনে তিনি যে আদর্শিক বিপ্লবের সহস্রধারা প্রবাহিত করে গেছেন, আজও তা মানবেতিহাসে অনুপম ও অপ্রমেয় হয়ে আছে; মিথ্যা ও ভ্রান্তির বিনাশ সাধনে যে সিরাজুমমুনীরা বা সত্যের আলোকবর্তিকা তুলে ধরেছিলেন, আজও তা অনির্বাণ আছে এবং মানুষের হৃদয়ে যে বহ্নি প্রজ্বলিত করেছিলেন, শত শতাব্দীর পরেও তা প্রতিটি নরনারীকে সন্দীপিত করে তুলেছে। তাঁর আলোকধারায় সন্দীপিত, তাঁরই আদেশে অনুপ্রাণিত হয়ে মহাপ্রাণ ওমর মাত্র দশ বছরে যে বিস্ময়কর কীর্তি রেখে গেছেন, তার মহিমা কীর্তনে স্বধর্মী ও বিধর্মী প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য লেখকবর্গের প্রতিযোগিতায় আজও শ্রান্তি আসে নি। আদর্শ মহৎ কিন্তু তার রূপায়ণের ও বাস্তবায়নের কৃতিত্ব মহত্তর। এজন্যেই ওমর হয়তো মহীয়ান, ওমর-চরিত বিশ্বের বিস্ময়।

    এই বিস্ময়কর প্রতিভার প্রশস্তি-রচনায় আঠারো শতকের পাশ্চাত্য ক্লাসিক ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গীবন বলেছেন:

    ওমরের সংযম ও সৌজন্যে আবুবকরের চেয়ে ন্যূন ছিল না। তাঁর খাদ্য ছিল যবের রুটি, কিংবা খেজুর; পানীয় ছিল সাদা পানি। তিনি ধর্মবক্তৃতা দিতেন একখানি জীর্ণ জামা পরে, তার তালি ছিল বারো জায়গায়। আর পারসিক প্রাদেশিক শাসক যখন তাঁর বশ্যতা স্বীকার করতে এলেন, তখন তিনি ঘুমিয়ে রয়েছেন, দীন-দুঃখীর সঙ্গে মদীনার মসজিদের সোপানের উপর। মিত্যব্যয়িতা উদারতা আনে এবং রাজস্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তিনি মুসলিমদের গতকালের ও সমকালীন কর্মের পুরস্কার হিসেবে উপযুক্ত স্থায়ী বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। নিজের মাসোহারা সম্বন্ধে তিনি ছিলেন নিস্পৃহ অথচ পয়গম্বরের পিতৃব্য আব্বাসের জন্যে বৃত্তির ব্যবস্থা করেন সর্বাধিক হারে, মাসিক পঁচিশ হাজার দিরহাম। বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বৃদ্ধ যোদ্ধাদের প্রত্যেকে পান পাঁচ হাজার মুদ্রা, এমন কি মুহম্মদের সর্বনিম্ন সাহাবারও বার্ষিক বৃত্তি নির্ধারিত হয় হাজার মুদ্রা। তাঁর পূর্বকালীন শাসনকালে দেখা গেছে, প্রাচ্যের বিজেতা ছিলেন আল্লাহ্ ও জনগণের বিশ্বাসী ভৃত্য। বায়তুল মালের অধিকাংশই ব্যয়িত হতো শান্তি ও যুদ্ধের জন্যে। ন্যায়নিষ্ঠা ও বদান্যতার পরিণামদর্শী সংমিশ্রণের ফলে সারাদিনের মধ্যে এসেছিল আশ্চর্য নিয়মানুবর্তিতা। আর একনায়কত্বের আশু কর্মবিধান ও সফল প্রচেষ্টার সঙ্গে আশ্চর্য দক্ষভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসুলভ নীতি সমূহের মিশ্রণ ঘটেছিল।

    উনিশ শতকের মুসলিম-বিদ্বেষী বিখ্যাত ইংরেজ ঐতিহাসিক স্যার উইলিয়াম মুইরও ওমর চরিত্র মূল্যায়নে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন:

    মাত্র কয়েক ছত্রে ওমর-জীবন আঁকা যেতে পারে। সরলতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা ছিল তাঁর ধ্রুব লক্ষ্য। নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা ছিল তাঁর শাসননীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। দায়িত্বজ্ঞান তাঁর এতো প্রখর ছিল যে, প্রায়ই তাঁকে আক্ষেপ করতে শোনা যেতো: হায়! আমায় যদি মা জন্ম না দিতেন! আমি যদি তৃণখণ্ড হয়ে থাকতে পারতেম! প্রথম বয়সে অগ্নিমূর্তি ও অসহিষ্ণু হিসেবে পরিচিত, এমন কি পয়গম্বরের সময়ে শেষের দিকেও তিনি প্রতিশোধের প্রধান সমর্থক ছিলেন। সর্বদাই তরবারি উঁচিয়ে-ধরা স্বভাবের মানুষটি বদর যুদ্ধের সময় উপদেশও দিয়েছিলেন যে, সমস্ত বন্দীকে হত্যা করা হোক। কিন্তু বয়োগুণে ও কর্ণদায়িত্বে রুক্ষতা কোমল হয়ে এসেছিলো। তাঁর ন্যায়নিষ্ঠা ছিল সুদৃঢ়। কোন কোন বর্ণনামতে মাত্র খালিদের ক্ষেত্রে তিনি নির্দয় প্রতিহিংসায় চালিত হলেও একটি অত্যাচার কিংবা অবিচারে তাঁর জীবন কলঙ্কিত হয় নি; এমন কি খালিদের ক্ষেত্রেও এক বিজিত শত্রুর প্রতি বিবেকজ্ঞান-বর্জিত ব্যবহারেই ওমরের ক্রোধ জন্মেছিল। ওমরের সৈন্যাধ্যক্ষ ও প্রাদেশিক শাসক নির্বাচন ছিল পক্ষপাতশূন্য এবং আল্-মুগিরা ও আম্মার ব্যতীত ফলও হয়েছিল আশ্চর্যরূপে শুভ। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন গোত্র ও সংস্থাগুলির বহুবিধ স্বার্থ দ্বারা চালিত হয়েও তাঁর ন্যায়পরায়ণতায় ছিল অকুণ্ঠ বিশ্বাসী এবং তাঁর সবল বাহুতে সাম্রাজ্যের শৃঙ্খলা ও আইন ছিল সুপ্রতিষ্ঠিত। বেত্রদণ্ডটি হাতে নিয়ে ওমর মদীনার পথে-ঘাটে ভ্রমণ করেছেন এবং অকুস্থলেই অপরাধীর শাস্তিবিধান করেছেন। এজন্যেই প্রবাদ বাক্য শোনা যেতো ওমরের বেত্রখানি অন্যের তরবারীর চেয়েও ভয়াবহ। কিন্তু এসব সত্ত্বেও তিনি ছিলেন কোমল প্রকৃতির এবং তাঁর বহু করুণা-সিক্ত কাহিনী ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে— যেমন বিধবাদের এবং এতিমদের দুঃখ ও অভাব মোচন।

    উনিশ শতকের মাঝামাঝি আর একজন বিখ্যাত ঐতিহাসিক ওয়াশিংটন আরভিং ওমর সম্বন্ধে বলেছেন:

    ওমরের সমগ্র ইতিহাসে এই সাক্ষ্য মেলে যে, তাঁর মনের জোর ছিল অসাধারণ, সততা ছিল অনমনীয় এবং ন্যায়নিষ্ঠা ছিল সুদৃঢ়। অন্য কারও চেয়ে তিনিই ছিলেন মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা-পয়গম্বরের প্রত্যাদেশগুলিকে সফল ও রূপায়িত করেছেন, আবুবকরের ক্ষণস্থায়ী খেলাফতকালে সুপরামর্শদানে সাহায্য করেছেন এবং জয়ের-পর-জয়ে দ্রুত বর্ধমান মুসলিম সাম্রাজ্যের সর্বত্র কঠোর আইনের শাসন প্রবর্তন উদ্দেশ্যে সুবিবেচিত বিধি-বিধান স্থাপন করেছেন। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় সৈন্যাধ্যক্ষদের উপরে সৈন্যচালনাকালে কিংবা পূর্ণবিজয়গৌরব মুহূর্তেও তাঁর যেমন সুদৃঢ় কৰ্তৃত্ব ছিল, তা থেকে শাসনকার্যে তাঁর অভূতপূর্ব দক্ষতাই নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়। তাঁর সরল প্রকৃতি এবং বিলাস ও আড়ম্বরের প্রতি অনীহা থেকে প্রমাণিত হয় যে, তিনি পয়গম্বর ও আবুবকরের দৃষ্টান্ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। এবং সিপাহ্ সালাদেরকে পত্রালাপের সময় এই নীতি ও দৃষ্টান্তের উপকারিতা সম্বন্ধে বিশেষভাবে অবহিত করেছেন। তিনি বলতেন: পারসিক খাদ্যবস্তু ও বসন-ভূষণের বিলাসিতা থেকে সাবধান। স্বদেশের সাদা-সিদা অভ্যাস আঁকড়ে থাকো, আল্লাহ্ তোমাদের চির-বিজেতা করবেন; কিন্তু এ সব ত্যাগ করলেই তোমাদের ভাগ্য বিপর্যয় অনিবার্য। এ নীতির উপকারিতায় তাঁর এমনই ধ্রুববিশ্বাস ছিল যে, তাঁর কর্মচারীদের বাহ্যিক আড়ম্বর ও বিলাসপ্রিয়তা এন করতে তিনি কঠোর শাস্তি দান করতেন।

    তাঁর বহু আদেশ-নির্দেশ তাঁর মগজের এবং হৃদয়ের উৎকৃষ্ট পরিচয় বহন করে। তিনি বিশেষভাবে নিষিদ্ধ করেন কোন বন্দিনী সন্তানের মাতা হলে তাকে ক্রীতদাসী হিসেবে বিক্রয় করা চলবে না। বায়তুলমালের সাপ্তাহিক বিতরণকালে তিনি অভাবের মানানুযায়ী পরিমাণ নির্ধারিত করতেন, প্রাপকের যোগ্যতানুযায়ী নয়। তিনি বলতেন: আল্লাহ্ আমাদের অফুরন্ত নিয়ামত দান করেছেন, আমাদের পার্থিব অভাব মোচন করতে; আমাদের সদ্গুণের পুরস্কার হিসেবে নয়, কারণ এ সবের পুরস্কার মিলবে অন্য জগতে।

    দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য-ধন্য সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বকোষ ‘এসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিয়া’– বলা হয়েছে:

    ওমরের খেলাফতকালে দশ বছর প্রধানত মহা-মহা বিজয় লাভ ঘটে গেছে। তিনি নিজে কখনও যুদ্ধক্ষেত্রে যান নি, মদীনাতেই থেকেছেন কিন্তু তবুও কর্তৃত্ব-রশ্মি কখনও তাঁর হস্তচ্যুত হয় নি, এমনই ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের দুর্দান্ত প্রভাব এবং মুসলিম জাতির তাঁর উপর আস্থা। তাঁর রাষ্ট্রনীতি সম্বন্ধে অন্তর্দৃষ্টিতে পরিচয় মেলে, মুসলিম বিজয়ের সীমা নির্ধারণে তাঁর উৎকণ্ঠা থেকে, ইসলামী গণতন্ত্রে আরবের জাতীয় চরিত্র অক্ষুণ্ণ ও বলিষ্ঠ রাখায় এবং আভ্যন্তরীণ শাসনকার্যে আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁর অক্লান্ত সাধনায়। যে মহাবাণী উচ্চারণ করে তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তা কখনও পুরাতন হওয়ার মতো নয়: আল্লাহ্‌র নামে শপথ! তোমাদের মধ্যে যে দুর্বলতম, সে আমার চক্ষে সবলতম থাকবে, যতক্ষণ না তার অধিকার সংরক্ষিত হয়। আবার তোমাদের মধ্যে যে সবলতম, সে আমার চক্ষে দুর্বলতম থাকবে, যতক্ষণ না সে আইনানুসারী হয়। রাষ্ট্রবিধির এর চেয়ে উচ্চতর সংজ্ঞা আর দেওয়া যায় না।

    সর্বশেষে উদ্ধৃত করা যেতে পারে পাক-ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ও মুতাকাল্লামুন বা মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিক দার্শনিকদের শেষ প্রতিনিধি শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্‌র ওমর সম্বন্ধে উক্তি। ওমর-চরিত্র চিত্রণের শেষ প্রসঙ্গে তার চেয়ে মহৎ উক্তি আর হতে পারে না। শাহ্ সাহেব বলেছেন:

    ওমর-হৃদয়কে এক বহু-দ্বারবিশিষ্ট গৃহের সঙ্গে কল্পনা করা যেতে পারে। তার প্রত্যেক দ্বারে এক একটি মহৎ প্রতিভার অধিষ্ঠান। একটি দ্বারে উপস্থিত মহান আলেকজান্দার তাঁর বিশ্বজয়ী, রণকৌশলী শত্রু নিপাত-ক্ষম প্রতিভা নিয়ে, অন্য দ্বারে উপস্থিত নওশেরওয়া, তাঁ মধুরতা ও মহানুভবতা নিয়ে, প্রজাকুলের জন্যে প্রেম ও ন্যায়দণ্ড হাতে নিয়ে (অবশ্য ওমর-চরিত্র চিত্রণে নওশেরওয়ার সঙ্গে তুলনায় ওমরকে) ছোট করা হয়। অপর একটি দ্বারে বসে আছে সৈয়দ আবদুল কাদির জিলানি কিংবা খাজা বাহাউদ্দীনের মতো ধর্মীয় নেতা। অন্য দ্বারে আছেন আবু হোরায়রাহ্ ও ইনে-ওমরের মতো নিষ্ঠাবান হাদীস-বিশারদগণ এবং আরও একটি দ্বারে আছেন মওলানা জালালউদ্দিন রুমী ও শেখ ফরীদউদ্দীন আত্তারের পর্যায়ের চিন্তানায়কবৃন্দ। আর বিশাল জনতা ভীড় জমিয়ে আছে গৃহটির চারপাশে এবং প্রত্যেকেই আপন আপন রুচি-মাফিক ইমামের নিকট নিজের অভাব জানাচ্ছে এবং পূর্ণ পরিতোষ লাভ করে হৃষ্টমনে ফিরে যাচ্ছে……।

    ***

  • ঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র

    ঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র

    ঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র

    [writer]

    তাঁর পূর্বসূরী বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনীতে ইতিহাস বর্ণময় হয়ে উঠেছিল, আর শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে ইতিহাস গল্পময়। ঐতিহাসিক গল্প-উপন্যাসের লেখক হিসেবে শরদিন্দুর নাম বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্রের পরেই উচ্চারিত। ‘বহু দূরকালের সামান্য কয়খানা ঘটনার কঙ্কালের মধ্যে তিনি প্রতিভার মন্ত্রবলে প্রাণসঞ্চার’ করে যে-কালজয়ী আখ্যানমালা রচনা করেছিলেন তা যেন সর্বকালের ‘ঐতিহাসিক’ সম্পদ।

    ইতিহাস সম্পর্কে শরদিন্দুর আজন্ম আগ্রহ ছিল। তিনি ছিলেন ভারতের অতীত ইতিহাসের একনিষ্ঠ পাঠক। ফলে, প্রায় লেখকজীবনের গোড়া থেকেই তিনি ইতিহাসের ভেতরে গল্পের অনুসন্ধান করেছেন, ইতিহাসকে গল্পের ভেতরে বন্দি করেছেন অভিনব কৌশলে। সুকুমার সেন দেখিয়েছেন : ‘প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত শরদিন্দুবাবুর ঐতিহাসিক গল্পের কালপ্রসার। এর মধ্যে কোথাও গল্পের পরিবেশ গল্পরসের তীক্ষ্ণতার হানি করেনি। দূরের দৃশ্যপটকে নিকটে এনে দূরের মানুষকে কাছের মানুষ করতে পেরেছেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়।’

    এই বিষয়ে তিনি ছিলেন সার্থক ও সতর্ক স্রষ্টা। এক সাক্ষাৎকারে শরদিন্দু বলেছিলেন : ‘ইতিহাস থেকে চরিত্রগুলো কেবল নিয়েছি; কিন্তু গল্প আমার নিজের। সর্বদা লক্ষ্য রেখেছি কি করে সেই যুগকে ফুটিয়ে তোলা যায়। যে সময়ের গল্প তখনকার রীতি নীতি, আচার ব্যবহার, অস্ত্র, আহার, বাড়িঘর ইত্যাদি খুঁটিনাটি সব জানা না থাকলে যুগকে ফুটিয়ে তোলা যায় না। এরপর আছে ভাষা। ঐতিহাসিক গল্পের ভাষাও হবে যুগোপযোগী।’

    রহস্য সন্ধানী ব্যোমকেশ বক্সীর অমর স্রষ্টা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইতিহাস-আশ্রিত গল্প-উপন্যাসে কাহিনী ও ইতিহাস যুগপৎ ‘জীবন্ত’ হয়ে উঠেছে। বৌদ্ধযুগ, গৌড়বঙ্গ, চৈতন্যযুগ, প্রাক-মুঘল কিংবা মুঘল যুগ অথবা অদূর অতীতের পোর্তুগীজ-ইংরেজ অধিকৃত বাংলার সমকাল দুর্নিবার হয়ে উঠেছে কল্পনা ও বর্ণনার অশেষ গুণে, রচনা ও গল্পরসের অনিবার্য সৃষ্টিতে। তিনি বলতেন : ‘ইতিহাসের গল্প লিখেই বেশি তৃপ্তি পেয়েছি।’ পরিশ্রমী সম্পাদনায় দুই মলাটের মধ্যে সাজিয়ে দেওয়া শরদিন্দুর সমস্ত ইতিহাস-নির্ভর উপন্যাস (পাঁচটি) এবং গল্প (সতেরোটি) পাঠকদেরও তৃপ্তি দেবে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি।

    প্রথম সংস্করণ: জানুয়ারি ১৯৯৮

    প্রচ্ছদ: সুব্রত চৌধুরী

    অলংকরণ: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য

    প্রকাশকের নিবেদন

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমুদয় ঐতিহাসিক গল্প ও উপন্যাস ইতিপূর্বে প্রতুলচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় শরদিন্দু অম্‌নিবাস ষষ্ঠ ও তৃতীয় খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। এই কাহিনীগুলি একত্রে বর্তমানে ‘ঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র’ নামে প্রকাশিত হল।

    শরদিন্দু অম্‌নিবাস ষষ্ঠ খণ্ডে সুকুমার সেন মহাশয়ের লেখা ভূমিকার ঐতিহাসিক গল্প সম্পর্কে মন্তব্য-অংশটি বর্তমান সঙ্কলনের পরিশিষ্ট অংশে পুনর্মুদ্রিত হল।

  • অমিতাভ

    অমিতাভ

    অমিতাভ

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    যত অসম্ভব কথাই বলি না কেন, যদি একজন বড় পণ্ডিতের নাম সেই সঙ্গে জুড়িয়া দিতে পারি, তবে আর কথাটা কেহ অবিশ্বাস করে না। আমি যদি বলি, আজ রাত্রিতে অন্ধকার পথে একেলা আসিতে আসিতে একটা ভূত দেখিয়াছি, সকলে তৎক্ষণাৎ তাহা হাসিয়া উড়াইয়া দিবে; বলিবে— “বেটা গাঁজাখোর, ভেবেছে আমরাও গাঁজা খাই!” কিন্তু স্যর অলিভার লজ যখন কাগজে-কলমে লিখিলেন, একটা নয়, লক্ষ-লক্ষ কোটি-কোটি ভূত দিবারাত্রি পৃথিবীময় কিলবিল করিয়া বেড়াইতেছে, তখন সকলেই সেটা খুব আগ্রহ সহকারে পড়িল এবং গাঁজার কথাটা একবারও উচ্চারণ করিল না।

    এটা অবিশ্বাসের যুগ— অথচ মানুষকে একটা কথা বিশ্বাস করানো কত সহজ! শুধু একটি পণ্ডিতের নাম— একটি বড়সড় আধুনিক পাশ্চাত্য পণ্ডিত,— সেকেলে হইলে চলিবে না এবং দেশী হইলে তো সবই মাটি!

    তাই ভাবিতেছি, আমি যে জাতিস্মর এ কথা কেমন করিয়া বিশ্বাস করাইব? কোন্ বিদেশী বৈজ্ঞানিকের নাম করিয়া সন্দেহ-দ্বিধা ভঞ্জন করিব? আমি রেলের কেরানী, বিদ্যা এন্ট্রাস্ পর্যন্ত। তের বৎসর একাদিক্রমে চাকরি করিবার পর আজ ছিয়াত্তর টাকা মাসিক বেতন পাইতেছি— আমি জাতিস্মর! হাসির কথা নয় কি?

    রেলের পাস পাইয়া যে বৎসর আমি রাজগীরের ভগ্নাবশেষ দেখিতে যাই— ঘন জঙ্গলের মধ্যে প্রাচীন ইষ্টকস্তূপের উপর দাঁড়াইয়া সেদিন প্রথম আমার চক্ষুর সম্মুখ হইতে কালের যবনিকা সরিয়া গিয়াছিল। যে দৃশ্য দেখিয়াছিলাম, তাহা কতদিনের কথা! দু’ হাজার বৎসর, না তিন হাজার বৎসর? ঠিক জানি না। কিন্তু মনে হয়, পৃথিবী তখন আরও তরুণ ছিল, আকাশ আরও নীল ছিল, শষ্প আরও শ্যাম ছিল।

    আমি জাতিস্মর! ছিয়াত্তর টাকা মাহিনার রেলের কেরানী— জাতিস্মর! উপহাসের কথা— অবিশ্বাসের কথা! কিন্তু তবু আমি বারবার— বোধ হয় বহু শতবার এই ভারতে জন্মগ্রহণ করিয়াছি। কখনও দাস হইয়া জন্মিয়াছি, কখনও সম্রাট্ হইয়া সসাগরা পৃথ্বী শাসন করিয়াছি; শত মহিষী, সহস্র বন্দিনী আমার সেবা করিয়াছে। বিদ্যুৎশিখার মতো, জ্বলন্ত বহ্নির মতো রূপ লইয়া আজ সেই নারীকুল কোথায় গেল? সে রূপ পৃথিবীতে আর নাই— সে নারীজাতিও আর নাই, ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। এখন যাহারা আছে, তাহারা তেলাপোকার মতো অন্ধকারে বাঁচিয়া আছে। তখন নারী ছিল অহির মতো তীব্র দুর্জেয়। আরণ্য অশ্বিনীর মতো তাহাদিগকে বশ করিতে হইত।

    আর পুরুষ? আরশিতে নিজের মুখ দেখি আর হাসি পায়। সেই আমি— শূরসেনরাজের দুই কন্যাকে দুই বাহুতে লইয়া দুর্গপ্রাচীর হইতে পরিখার  জলে লাফাইয়া পড়িয়া সন্তরণে যমুনা পার হইয়াছিলাম। তারপর— কিন্তু যাক্ সে কথা। কেহ বিশ্বাস করিবে না, কেবল হাসিবে। আমিও হাসি— অফিসে কলম পিষিতে পিষিতে হঠাৎ অট্টহাসি হাসিয়া উঠি।

    কিন্তু কথাটা সত্য। এমন বহুবার ঘটিয়াছে। রাজগীরের ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়াইয়া মনে হইয়াছিল, এ-স্থান আমার চিরপরিচিত; একবার নহে— শত সহস্রবার আমি এইখানে দাঁড়াইয়াছি। কিন্তু তখন এ-স্থান জঙ্গল ও ইষ্টকস্তূপে সমাহিত ছিল না। ঠিক যেখানে আমি দাঁড়াইয়া আছি, তাহার বাঁ দিক্ দিয়া এক সংকীর্ণ দীর্ঘ পথ গিয়াছিল। পথের দুই পাশে ব্যবহারীদের গৃহ ছিল; দূরে ঐ স্থানে মহাধনিক সুবর্ণদত্তের দারু-নির্মিত প্রাসাদ ছিল। যেদিন রাজগৃহে আগুন লাগে, সেদিন সুবর্ণদত্ত আসবপানে বিবশ হইয়া কক্ষদ্বার রুদ্ধ করিয়া ঘুমাইতেছিল। তাহার সঙ্গে ছিল চারিজন রূপাজীবা নগরকামিনী। নগর ভস্মীভূত হইবার পর পৌরজন তাহাদের মৃতদেহ কক্ষ হইতে বাহির করিল। দেখা গেল, শ্রেষ্ঠী মরিয়াছে বটে, কিন্তু তাহার দেহ দগ্ধ হয় নাই— সুসিদ্ধ হইয়াছে মাত্র। কিছুকাল পূর্বে সে বলিদ্বীপ হইতে এক অষ্টোত্তর-সহস্রনাল ইন্দ্রচ্ছন্দা মালা আনিয়াছিল। সেরূপ মুক্তাহার মগধে আর ছিল না। সকলে দেখিল, বণিকের কণ্ঠ বেষ্টন করিয়া আছে সেই ইন্দ্রচ্ছন্দার মুক্তাভস্ম।

    কিন্তু ক্রমেই আমি অসংযত হইয়া পড়িতেছি। শূরসেনের সহিত মগধ, অগ্নিদাহের সহিত রাজকন্যা-হরণ মিশাইয়া ফেলিতেছি। এমন করিলে তো চলিবে না।

    আসল কথাটা আর একবার বলিয়া লই— আমি জাতিস্মর! মিউজিয়ামে রক্ষিত এক শিলাশিল্প দেখিয়া আমার বুকের ভিতরটা আলোড়িত হইয়া উঠে, কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হইয়া যায়। এ শিল্প তো আমার রচনা! আসমুদ্রকরগ্রাহী সম্রাট্ কণিষ্কের সময় যখন সদ্ধর্মের পুনরুত্থান হইয়াছিল, তখন বিহারের গাত্রশোভার জন্য এ নবপত্রিকা আমি গড়িয়াছিলাম। তখন আমার নাম ছিল পুণ্ডরীক। আমি ছিলাম প্রধান শিল্পী— রাজভাস্কর। সেই পুণ্ডরীক-জীবনের প্রত্যেক ঘটনা যে আমার স্মরণে মুদ্রিত আছে। এই যে নবপত্রিকার মধ্যবর্তী বিনগ্না যক্ষিণী-মূর্তি দেখিতেছেন, তাহার আদর্শ কে ছিল জানেন? সিতাংশুকা— তক্ষশিলার সর্বপ্রধানা রূপোপজীবিনী, বারমুখ্যা। সকলেই জানিত, সিতাংশুকা রাজ-ঔরসজাতা। সেই সিতাংশুকাকে নিরংশুকা করিয়া, সম্মুখে দাঁড় করাইয়া, বজ্রসূ্চী দিয়া পাষাণ কাটিয়া কাটিয়া এই যক্ষিণী-মূর্তি গড়িয়াছিলাম। পুণ্ডরীক ভিন্ন এ মূর্তি আর কে গড়িতে পারিত? কিন্তু তবু মনে হয়, সে অপার্থিব লাবণ্য কঠিন প্রস্তরে ফুটে নাই। আজও, এই কেরানী জীবনেও সেই অলৌকিক রূপৈশ্বর্য আমার মস্তিষ্কের মধ্যে অঙ্কিত আছে।

    আবার কেমন করিয়া বিষ-ধূম দিয়া সিতাংশুকা আমার প্রাণসংহার করিল, সে কথাও ভুলি নাই। সুরম্য কক্ষ, চতুষ্কোণে স্ফটিক-গোলকের মধ্যে পুন্নাগচম্পক-তৈলের সুগন্ধি দীপ জ্বলিতেছে, কেন্দ্রস্থলে বিচিত্র চীনাংশুকে আবৃত পালঙ্কশয্যা, শিয়রে ধূপ জ্বলিতেছে। — সেই ধূপশলাকার গন্ধে ধীরে ধীরে দেহ অবশ হইয়া আসিতেছে। বহুদূর হইতে বাদ্যের করুণ নিক্কণ ইন্দ্রিয়সকলকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করিয়া আনিতেছে; তারপর মোহনিদ্রা— সে নিদ্রা সে জন্মে আর ভাঙিল না।

    এমনই কত জীবনের কত বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কত অসমাপ্ত কাহিনী স্মৃতির মধ্যে পুঞ্জীভূত হইয়া আছে। সেই সুদূর অতীতে এমন অনেক জিনিস ছিল— যাহা সেকালের সম্পূর্ণ নিজস্ব, একালের সহিত তাহার সম্বন্ধমাত্র নাই। অতিকায় হস্তীর মতো তাহারা সব লোপ পাইয়াছে। মনে হয় যেন, তখন মানুষ বেশি নিষ্ঠুর ছিল, জীবনের বড় একটা মূল্য ছিল না। অতি তুচ্ছ কারণে একজন আর একজনকে হত্যা করিত এবং সেই জন্যই বোধ করি, মানুষের প্রাণের ভয়ও কম ছিল। আবার মানুষের মধ্যে ক্রূরতা, চাতুরী, কুটিলতা ছিল বটে, কিন্তু ক্ষুদ্রতা ছিল না। একালের মানুষ যেন সব দিক্ দিয়াই ছোট হইয়া গিয়াছে। দেহের, মনের, হৃদয়ধর্মের সে প্রসার আর নাই। যেন মানুষ তখন তরুণ ছিল, এখন বৃদ্ধ হইয়া গিয়াছে।

    আর একটা কথা, একালের মতো স্বাধীনতা কথাটাকে তখন কেহ এত বড় করিয়া দেখিত না। মাছ যেমন জলে বাস করে, মানুষ তেমনই স্বাধীনতার আবহাওয়ায় বাস করিত। স্বাধীনতায় ব্যাঘাত পড়িলে লড়াই করিত, মরিত; বাঘের মতো পিঞ্জরাবদ্ধ হইয়াও পোষ মানিত না। যুগান্তরব্যাপী অধীনতার শৃঙ্খল তখনও মানুষের পায়ে কাটিয়া বসে নাই, মনের দাসবৃত্তি ছিল না। রাজা ও প্রজার মধ্যে প্রভেদও এত বেশি ছিল না। নির্ভয়ে দীন প্রজা চক্রবর্তী সম্রাটের নিকট আপনার নালিশ জানাইত, অধিকার দাবি করিত, ভয় করিত না।

    ঘরের কোণে বসিয়া লিখিতেছি, আর ধূম্র-কুণ্ডলীর মতো বর্তমান জগৎ আমার সম্মুখ হইতে মিলাইয়া যাইতেছে। আর একটি মায়াময় জগৎ ধীরে ধীরে জাগিয়া উঠিতেছে। আড়াই হাজার বৎসর পূর্বের এক স্বপ্ন দেখিতেছি। এক পুরুষ— ভারত আজ তাঁহাকে ভুলিয়া গিয়াছে— তাঁহার কোটিচন্দ্রস্নিগ্ধ মুখপ্রভা এই দুই নশ্বর নয়নে দেখিতেছি, আর অন্তরের অন্তস্তল হইতে আপনি উৎসারিত হইতেছে—

    “অসতো মা সদ্‌গময়

    তমসো মা জ্যোতির্গময়—”

    সেই জ্যোতির্ময় পুরুষকে একদিন দুই চক্ষু ভরিয়া দেখিয়াছিলাম— তাঁহার কণ্ঠস্বর শুনিয়াছিলাম— আজ সেই কথা জন্মান্তরের স্মৃতি হইতে উদ্ধৃত করিব।

    উত্তরে মাতুলবংশ লিচ্ছবি ও পশ্চিমে মাতুলবংশ কোশল মগধেশ্বর পরমবৈষ্ণব শ্রীমন্মহারাজ অজাতশত্রুকে বড়ই বিব্রত করিয়া তুলিয়াছে। পূর্বতন মহারাজ বিম্বিসার শান্তিপ্রিয় লোক ছিলেন, তাই লিচ্ছবি ও কোশলের সহিত বিবাদ না করিয়া তাহাদের কন্যা বিবাহ করিয়াছিলেন। অজাতশত্রু কিন্তু সে ধাতুর লোক নহেন— বিবাহ করা অপেক্ষা যুদ্ধ করাকে তিনি বেশি পছন্দ করেন। তা ছাড়া, ইচ্ছা থাকিলেও মাতুলবংশে বিবাহ করা সম্ভব নহে। তাই অজাতশত্রু পিতার অপঘাত মৃত্যুর পর প্রফুল্ল মনে যুদ্ধ আরম্ভ করিয়া দিলেন।

    কিন্তু অসুবিধা এই যে, শত্রু দুই দিকে— উত্তরে এবং পশ্চিমে। উত্তরের শত্রু তাড়াইতে গেলে পশ্চিমের শত্রু রাজ্যের মধ্যে ঢুকিয়া পড়ে; কোশলকে কাশীর পরপারে খেদাইয়া দিয়া ফিরিবার পথে দেখেন, লিচ্ছবিরা রাজগৃহে ঢুকিবার বন্দোবস্ত করিতেছে। মগধরাজ্যের অন্তপাল সামন্ত রাজারা সীমানা রক্ষা করিতে না পারিয়া কেহ রাজধানীতে পলাইয়া আসিতেছে, কেহ বা শত্রুর সহিত মিলিয়া যাইতেছে। রাজ্যে অশান্তির শেষ নাই। প্রজারা কেহই অজাতশত্রুর উপর সন্তুষ্ট নহে; তাহাদের মতে রাজা বীর বটে, কিন্তু বুদ্ধিশুদ্ধি অধিক নাই, শীঘ্র ইহাকে সিংহাসন হইতে না সরাইলে রাজ্য ছারেখারে যাইবে।

    প্রজারা কিন্তু ভুল বুঝিয়াছিল। অজাতশত্রু নির্বোধ মোটেই ছিলেন না। তাঁহার অসির এবং বুদ্ধির ধার প্রায় সমান তীক্ষ্ণ ছিল।

    একদিন, বর্ষাকালের আরম্ভে যুদ্ধ স্থগিত আছে— অজাতশত্রু রাজ্যের মহামাত্য বর্ষকারকে ডাকাইয়া পাঠাইলেন। নগরের নির্জন স্থানে বেণুবন নামে এক উদ্যান আছে; বিম্বিসার ইহা বুদ্ধদেবকে দান করিয়াছিলেন, কিন্তু অজাতশত্রু আবার উহা কাড়িয়া লন। সেই উদ্যানে প্রাচীন মন্ত্রী ও নবীন মহারাজের মধ্যে অতি গোপনে কি কথাবার্তা হইল। সে সময় গুপ্তচরের ভয় বড় বেশি; সন্ন্যাসী, ভিক্ষুক, জ্যোতিষী, বারবনিতা, নট, কুশীলব, ইহাদের মধ্যে কে গুপ্তচর কে নহে, অনুমান করা অতিশয় কঠিন। সম্প্রতি নগরে বৈশালী হইতে জঘনচপলা নাম্নী এক বারাঙ্গনা আসিয়াছে। তাহাকে দেখিয়া সমস্ত নাগরিক তো ভুলিয়াছেই, এমন কি স্বয়ং রাজা পর্যন্ত চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছেন। কিন্তু জঘনচপলা কোশল কিংবা বৃজির গুপ্তচর কি না, নিশ্চিতরূপে না-জানা পর্যন্ত অজাতশত্রু নিজেকে কঠিন শাসনে রাখিয়াছেন। এইরূপ চর সর্বত্রই ঘুরিতেছে; তাই গূঢ়তম মন্ত্রণা খুব সাবধান হইয়াই করিতে হয়। এমন কি, সকল সময় অন্যান্য অমাত্যদের পর্যন্ত সকল কথা জানানো হয় না।

    নিভৃতে বহুক্ষণ আলাপের পর মহামন্ত্রী গৃহে ফিরিয়া গেলেন। উদ্যানের প্রতিহারী দেখিল, বৃদ্ধের শুষ্ক নীরস মুখে হাসি এবং নির্বাপিত চক্ষুতে জ্যোতি ফুটিয়াছে।

    প্রহর রাত্রি অতীত হইবার পর আহারান্তে শয়ন করিয়াছিলাম, ঈষৎ নিদ্রাকর্ষণও হইয়াছিল। এমন সময় দাসী আসিয়া সংবাদ দিল, “পরিব্রাজিকা সাক্ষাৎ চান।”

    তন্দ্রা ছুটিয়া গেল। চকিতে শয্যায় উঠিয়া বসিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “পরিব্রাজিকা? এত রাত্রে?”

    এই রাজ-সম্মানিতা মহাশক্তিশালিনী নারী কি প্রয়োজনে এরূপ সময়ে আমার সাক্ষাৎপ্রার্থিনী, জানিবার জন্য ত্বরিতপদে দ্বারে উপস্থিত হইলাম। সসম্ভ্রমে তাঁহাকে গৃহের ভিতর আনিয়া আসনে বসাইয়া দণ্ডবৎ হইয়া প্রণাম করিয়া বলিলাম, “দেবী, কি জন্য দাসের প্রতি কৃপা হইয়াছে?”

    পরিব্রাজিকার যৌবন উত্তীর্ণ হইয়াছে, কিন্তু মুখশ্রী এখনও সুন্দর ও সম্ভ্রম-উৎপাদক। তাঁহার পরিধানে পট্টবস্ত্র, ললাটে কুঙ্কুমতিলক, হস্তে একটি সনাল পদ্মকোরক। সহাস্যে বলিলেন, “বৎস্য, অদ্য সন্ধ্যার পর কমলকোরক দিয়া কুমারীর পূজা করিতেছিলাম, সহসা এই কোরকটি কুমারীর চরণ হইতে আমার ক্রোড়ে পতিত হইল।”

    কথার উদ্দেশ্য কিছুই বুঝিতে না পারিয়া আমি শুধু বলিলাম, “তার পর?”

    পরিব্রাজিকা বলিলেন, “কুমারীর আদেশ বুঝিতে না পারিয়া ধ্যানস্থ হইলাম। তখন দেবী আমার কর্ণে বলিলেন, ‘এই নির্মাল্য শ্রেণিনায়ক কুমারদত্তকে দিবে। ইহার বলে সে সর্বত্র গতিলাভ করিবে।”

    আমি হতবুদ্ধির মতো পরিব্রাজিকার মুখের পানে তাকাইয়া রহিলাম।

    তিনি কক্ষের চতুর্দিকে ক্ষিপ্র দৃষ্টিপাত করিয়া মৃদুকণ্ঠে কহিলেন, “এই কোরক লও, ইহাতেই উপদেশ আছে। কার্যসিদ্ধি হইলে ইহার বিনাশ করিও। মনে রাখিও, ইহার বলে রাজমন্দিরেও তোমার গতি অব্যাহত হইবে।”

    এই বলিয়া পদ্মকলিটি আমার হস্তে দিয়া পরিব্রাজিকা বিদায় লইলেন। আমি নির্বোধের মতো বসিয়া রহিলাম, তাঁহাকে প্রণাম করিতেও ভুলিয়া গেলাম।

    আমি সামান্য ব্যক্তি— কুলি-মজুর খাটাইয়া খাই, রাজগৃহের স্থপতি-সূত্রধার-সম্প্রদায়ের শ্রেণিনায়ক। আমার উপর রাজ-রাজড়ার দৃষ্টি পড়িল কেন? যদি বা পড়িল, তবে এমন রহস্যময়ভাবে পড়িল কেন? রাজ-অবরোধের পরিব্রাজিকা আমার মতো দীনের কুটিরে পদধূলি দিলেন কি জন্য? কুমারী কুমারদত্তের উপর সদয় হইয়া তাহার সর্বত্র গতিবিধির ব্যবস্থাই বা করিয়া দিলেন কেন? এখন এই পদ্মকলি লইয়া কি করিব? কার্যসিদ্ধি হইলে ইহাকে বিনষ্ট করিতেই বা হইবে কেন? আমি পূর্বে কখনও রাজকীয় ব্যাপারে লিপ্ত হই নাই, তাই নানা চিন্তায় মন একেবারে দিশাহারা হইয়া গেল।

    দ্বিপ্রহর রাত্রি প্রায় উত্তীর্ণ হইতে চলিল। দাসী দ্বারের কাছে অপেক্ষা করিয়া আছে। তাহার বোধ করি, আজ কোথাও অভিসার আছে, কারণ বেশভূষায় একটু শিল্প-চাতুর্য রহিয়াছে। কবরীতে জাতিপুষ্পের শোভা, কঞ্চুলী দৃঢ়বদ্ধ! দাসী দেখিতে মন্দ নহে, চোখ দুটি বড় বড়, মুখে মিষ্ট হাসি, তার উপর ভরা যৌবন। আমি তাহাকে বলিলাম, “বনলতিকে, তুমি গৃহে যাও, রাত্রি অধিক হইয়াছে।” সে হাসিমুখে প্রণাম করিয়া বিদায় হইল।

    পদ্মকোরক হস্তে শয়ন-মন্দিরে গেলাম; বর্তিকার সম্মুখে ধরিয়া বহুক্ষণ নিরীক্ষণ করিলাম। কোরকটি মুদিত হইয়া আছে, ধীরে ধীরে পলাশগুলি উন্মোচন করিয়া দেখিতে লাগিলাম। দেখিতে দেখিতে নাভির সমীপবর্তী কোমল পল্লবে অস্পষ্ট চিহ্নসকল চোখে পড়িল। সযত্নে পল্লবটি ছিঁড়িয়া দেখিলাম, কজ্জলমসী দিয়া লিখিত লিপি— ‘অদ্য মধ্যরাত্রে একাকী মহামন্ত্রীর দ্বারে উপস্থিত হইবে। সংকেত-মন্ত্র— কুট‌্‌মল।’ লিপির নিম্নে মগধেশ্বরের মুদ্রা।

    এতক্ষণে ব্যাপারটা পরিষ্কার হইল। পরিব্রাজিকার নিগূঢ় কথাবার্তা, কুমারীর পূজা সমস্তই স্পষ্ট বুঝিতে পারিলাম। গোপনে মহামাত্যের নিকট আমার তলব হইয়াছে। কিন্তু প্রকাশ্যভাবে ডাকিয়া পাঠাইলেই তো হইত! আকাশ-পাতাল ভাবিয়া কিছুই স্থির করিতে পারিলাম না। আমি একজন অতি সামান্য নাগরিক, আমাকে লইয়া রাজ্যের মহামাত্য কি করিবেন? বুড়া অত্যন্ত খিট‌্‌খিটে, কি জানি যদি না-জানিয়া কোনও অপরাধ করিয়া থাকি তবে হয়তো শূলে চড়াইয়া দিবে। কিংবা কে বলিতে পারে, হয়তো গোপনে কোথাও রত্নাগার নির্মাণ করিতে হইবে, তাই এই সতর্ক আহ্বান।

    উদ্বেগ, আশঙ্কা এবং উত্তেজনায় আরও কিছুক্ষণ কাটিয়া গেল। কিন্তু রাজাদেশ উপেক্ষা করিবার উপায় নাই,— স্বেচ্ছায় না যাইলে হয়তো বাঁধিয়া লইয়া যাইবে। তাই অবশেষে উত্তরীয় লইয়া পথে বাহির হইলাম।

    আমার গৃহ নগরের উত্তরে, মহামন্ত্রীর প্রাসাদ নগরের কেন্দ্রস্থলে। পথ জনহীন, পথের উভয় পার্শ্বস্থ গৃহগুলিও নির্বাপিতদীপ, নিদ্রিত। দূরে দূরে সংকীর্ণ পথিপার্শ্বে পাষাণ-বনদেবীর হস্তে স্ফটিকের দীপ জ্বলিতেছে। তাহাতে মধ্যরাত্রের গাঢ় অন্ধকার ঈষৎ আলোকিত।

    মহামাত্যের বৃহৎ প্রাসাদ-সম্মুখে উপস্থিত হইলাম। বাহিরে অন্ধকার, প্রহরীও নাই; কিন্তু বহির্দ্বার উন্মুক্ত। একটু ইতস্তত করিয়া, সাহসে ভর করিয়া প্রবেশ করিতে গেলাম— অমনি তীক্ষ্ণ ভল্লের অগ্রভাগ কণ্ঠে ফুটিল; অন্ধকারে অদৃশ্য থাকিয়া ভল্লের অন্যপ্রান্ত হইতে কে নিম্নস্বরে প্রশ্ন করিল, “তুমি কে?”

    অকস্মাৎ এরূপভাবে আক্রান্ত হইয়া বাক‌্‌রোধ হইয়া গেল। বর্শার ফলা কণ্ঠ স্পর্শ করিয়া আছে, একটু চাপ দিলেই সর্বনাশ! আমি মূর্তির মতো ক্ষণকাল দাঁড়াইয়া থাকিয়া শেষে এই সনাল পদ্মকলি তুলিয়া ধরিয়া দেখাইলাম।

    আততায়ী জিজ্ঞাসা করিল, “উহা কি, নাম বল।”

    বলিলাম, “সনাল উৎপল।”

    সন্দিগ্ধকণ্ঠে পুনরায় প্রশ্ন হইল, “কি নাম বলিলে?”

    বুঝিলাম, এ প্রহরী। লিপিতে যে সংকেত-মন্ত্র ছিল তাহা স্মরণ হইল, বলিলাম, “কুট‌্‌মল।”

    বর্শা কণ্ঠ হইতে অপসৃত হইল। অন্ধকারে প্রহরী আমার হাত ধরিয়া প্রাসাদের মধ্যে লইয়া চলিল।

    সূচীভেদ্য অন্ধকারে কিছুদূর পর্যন্ত সে আমাকে লইয়া গেল। তারপর আর একজন আসিয়া হাত ধরিল। সে আরও কিছুদূর লইয়া গিয়া অন্য এক হস্তে সমর্পণ করিল। এইরূপে পাঁচ-ছয় জন দ্বারী, প্রহরী, প্রতিহারীর হস্ত হইতে হস্তান্তরিত হইয়া অবশেষে এক আলোকিত ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে উপস্থিত হইলাম।

    সেই কক্ষের মধ্যস্থলে অজিনাসনে বসিয়া একস্তূপ ভূর্জপত্র-তালপত্র সম্মুখে লইয়া বৃদ্ধ মহামন্ত্রী নিবিষ্ট-মনে পাঠ করিতেছেন। কক্ষে দ্বিতীয় ব্যক্তি নাই।

    সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিলাম। মহামাত্য সম্মুখে আসন নির্দেশ করিয়া বলিলেন, “উপবিষ্ট হও।”

    আমি উপবেশন করিলাম।

    মহামাত্য জিজ্ঞাসা করিলেন, “পরিব্রাজিকার হস্তে যে লিপি পাইয়াছিলে, উহা কোথায়?”

    পদ্মদল বাহির করিয়া মহামাত্যকে দিলাম। তিনি সেটার উপর একবার চক্ষু বুলাইয়া আমাকে ফিরাইয়া দিয়া বলিলেন, ‘ভক্ষণ কর।”

    কিছুই বুঝিতে না পারিয়া তাঁহার মুখের প্রতি মূঢ়বৎ তাকাইয়া রহিলাম। ভক্ষণ করিব আবার কি?

    মহামন্ত্রী আবার বলিলেন, “এই লিপি ভক্ষণ কর।”

    মন বিদ্রোহী হইয়া উঠিল। রাত্রি দ্বিপ্রহরে ডাকাইয়া পাঠাইয়া তারপর অকারণে লিপি ভক্ষণ করিতে বলা, এ কিরূপ ব্যবহার? হউন না তিনি রাজমন্ত্রী— তাই বলিয়া—

    মন্ত্রীর ওষ্ঠপ্রান্তে ঈষৎ কুঞ্চন দেখা গেল। আবার অনুচ্চকণ্ঠে কহিলেন, “চারিদিকে গুপ্তচর ঘুরিতেছে— তাই এ সতর্কতা। লিপি সুস্বাদু বলিয়া তোমাকে উহা খাইতে বলি নাই।”

    তখন ব্যাপার বুঝিয়া সেই কোমল পদ্মপল্লবটি খাইয়া ফেলিলাম।

    তারপর কিছুক্ষণ সমস্ত নীরব। মহামাত্যের শীর্ণ মুখ ভাবলেশহীন। প্রদীপের শিখা নিষ্কম্পভাবে জ্বলিতেছে। আমি উদ্‌গ্রীব প্রতীক্ষায় বসিয়া আছি, এবার কি হইবে?

    হঠাৎ প্রশ্ন হইল, “তুমি জঘনচপলার গৃহে যাতায়াত কর?”

    অতর্কিত প্রশ্নে ক্ষণকালের জন্য বিমূঢ় হইয়া গেলাম। জঘনচপলা বেশ্যা, তাহার গৃহে যাই কি না সে সংবাদে রাজমন্ত্রীর কি প্রয়োজন? কিন্তু অস্বীকার করিবার উপায় নাই, বুড়া খোঁজ না লইয়া জিজ্ঞাসা করিবার পাত্র নহে। কুণ্ঠিতস্বরে কহিলাম, “একবার মাত্র গিয়াছিলাম। কিন্তু সে স্থান আমার মতো ক্ষুদ্র ব্যক্তির নয়। তাই আর যাই নাই।”

    মন্ত্রী বলিলেন, “ভালো করিয়াছ। সে লিচ্ছবির গুপ্তচর।”

    আবার কিছুক্ষণ সমস্ত নিস্তব্ধ। মহামাত্য ধ্যানমগ্নের মতো বসিয়া আছেন; আমি আর একটি প্রশ্নের বজ্রাঘাত প্রতীক্ষা করিতেছি।

    “তোমার অধীনে কত কর্মিক আছে?”

    “সর্বসুদ্ধ প্রায় দশ সহস্র।”

    “স্থপতি কত?”

    “ছয় হাজার।”

    “সূত্রধার?”

    “তিন হাজারের কিছু উপর।”

    “তক্ষক ও ভাস্কর?”

    “তক্ষক-ভাস্করের সংখ্যা কম— পাঁচশতের অধিক নহে।”

    দেখিতে দেখিতে মহামন্ত্রীর নির্জীব শুষ্ক দেহ যেন মন্ত্রবলে সঞ্জীবিত হইয়া উঠিল। নিষ্প্রভ চক্ষুতে যৌবনের জ্যোতি সঞ্চারিত হইল। তিনি আমার দিকে তর্জনী তুলিয়া বলিতে আরম্ভ করিলেন, “শুন। এখন বর্ষাকাল। শরৎকাল আসিলে পথঘাট শুকাইলে আবার যুদ্ধ আরম্ভ হইবে। দুই দিক্ হইতে শত্রুর আক্রমণে দেশ বিধ্বস্ত হইয়া উঠিয়াছে। অতএব এবার যুদ্ধ আরম্ভের পূর্বে ভাগীরথী ও হিরণ্যবাহুর সংগমে এক ঔদক দুর্গ নির্মাণ করিতে হইবে। এমন দুর্গ নির্মাণ করিতে হইবে— যাহাতে পঞ্চাশ হাজার যোদ্ধা নিত্য বাস করিতে পারে। মধ্যে মাত্র তিন মাস সময়। এই তিন মাসের মধ্যে দুর্গ সম্পূর্ণ হওয়া চাই। এবার শরৎকালে কোশল ও বৃজি যখন নদী পার হইতে আসিবে, তখন সম্মুখে যেন মগধের গগনলেহী দুর্গচূড়া দেখিতে পায়। “

     জলের মৎস্য ধীবরের জাল হইতে  জলে ফিরিয়া আসিলে যেরূপ আনন্দিত হয়, আমারও সেইরূপ আনন্দ হইল। এই সকল কথা আমি বুঝি। বলিলাম, “দশ হাজার লোক দিয়া তিন মাসের মধ্যে এরূপ দুর্গ তৈয়ার করিয়া দিতে পারি। কিন্তু এই বর্ষাকালে পথ অতিশয় দুর্গম; মালমসলা সংগ্রহ হইবে না।”

    মন্ত্রী বলিলেন, “সে ভার তোমার নয়। তুমি শুধু দুর্গ তৈয়ার করিয়া দিবে। উপাদান সংগ্রহ আমি করিব। রাজ্যের সমস্ত রণহস্তী পাষাণাদি বহন করিয়া দিবে। সেজন্য তোমার চিন্তা নাই।”

    আমি বলিলাম, “তবে তিন মাসের মধ্যে দুর্গ তৈয়ার করিয়া দিব।”

    মন্ত্রী বলিলেন, “যদি না পার?”

    “আমার মুণ্ড শর্ত রহিল। কবে কার্য আরম্ভ করিব?”

    মন্ত্রী ঈষৎ চিন্তা করিয়া বলিলেন, “এখনও রবি স্থিররাশিতে আছেন; আজ হইতে চতুর্থ দিবসে গুরুবাসরে চন্দ্রও স্বাতীনক্ষত্রে গমন করিবেন। অতএব সেই দিনই কার্যের পত্তন হওয়া চাই।”

    “যথা আজ্ঞা, তাহাই হইবে।”

    কিছুক্ষণ স্থির থাকিয়া মহামাত্য বলিতে লাগিলেন, “এখন যাহা বলিতেছি, মনোযোগ দিয়া শুন। তোমার উপর অত্যন্ত গূঢ় কার্যের ভার অর্পিত হইতেছে। সর্বদা স্মরণ রাখিও যে শত্রুরাজ্যে দুর্গনির্মাণের সংবাদ পৌঁছিলে তাহারা কিছুতেই দুর্গ নির্মাণ করিতে দিবে না, পদে পদে বাধা দিবে। চারিদিকে গুপ্তচর ঘুরিতেছে, তাহারা যদি একবার মগধের উদ্দেশ্য জানিতে পারে, সপ্তাহকালমধ্যে কোশলের মহারাজ ও লিচ্ছবির কুলপতিগণ এ সংবাদ বিদিত হইবে। সুতরাং নিরতিশয় সতর্কতার প্রয়োজন। তুমি তোমার দশ সহস্র কর্মিক লইয়া কাল গঙ্গা-শোণ-সংগমে যাত্রা করিবে। এমনভাবে যাত্রা করিবে— যাহাতে কাহারও সন্দেহ উদ্রিক্ত না হয়। একবার যথাস্থানে পৌঁছিতে পারিলে আর কোনও ভয় নাই। কারণ, সে স্থান জঙ্গলপূর্ণ, প্রায় জনহীন। কিন্তু তৎপূর্বে পথে যদি কোনও ব্যক্তিকে গুপ্তচর বলিয়া সন্দেহ হয়, তবে তৎক্ষণাৎ তাহাকে হত্যা করিতে দ্বিধা করিবে না। কার্যস্থলে উপস্থিত হইয়া মগধের মুদ্রাঙ্কিত পত্রের প্রতীক্ষা করিবে। সেই পত্রে দুর্গনির্মাণের নির্দেশ ও চিত্র লিপিবদ্ধ থাকিবে। যথাসময়ে চিত্রানুরূপ দুর্গের শুভারম্ভ করিবে। স্মরণ রাখিও, তুমি এ কার্যের নিয়ামক, কোনও বিঘ্ন ঘটিলে দায়িত্ব সম্পূর্ণ তোমার।”

    আমি বলিলাম, “যথা আজ্ঞা। কিন্তু এই দশ সহস্র লোকের রসদ কোথায় পাইব?”

    মন্ত্রী বলিলেন, “গঙ্গা-শোণ-সংগমের নিকট পাটলি নামে এক ক্ষুদ্র গ্রাম আছে। এক সন্ধ্যার জন্য সেই গ্রামে আতিথ্য স্বীকার করিবে। দ্বিতীয় দিনে আমি তোমাদের উপযুক্ত আহার্য পাঠাইব।”

    তারপর ঊষাকাল সমাগত দেখিয়া মহামাত্য আমাকে বিদায় দিলেন। বিদায়কালে বলিলেন, “শুনিয়া থাকিবে, সম্প্রতি বৌদ্ধ নামে এক নাস্তিক ধর্ম-সম্প্রদায় গঠিত হইয়াছে। এই বৌদ্ধগণ অতি চতুর ও ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের বিরোধী। শাক্যবংশের এক রাজ্যভ্রষ্ট যুবরাজ ইহাদের নায়ক। এই যুবরাজ অতিশয় ধূর্ত, কপটী ও পরস্বলুব্ধ। মায়াজাল বিস্তার করিয়া গতাসু মগধেশ্বর বিম্বিসারকে বশীভূত করিয়া মগধে স্বীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করিয়াছিল; অধুনা অজাতশত্রু কর্তৃক মগধ হইতে বিতাড়িত হইয়াছে। এই বৌদ্ধাদিগকে কদাচ বিশ্বাস করিবে না, ইহারা মগধের ঘোর শত্রু। দুর্গসন্নিধানে যদি ইহাদের দেখিতে পাও, নির্দয়ভাবে হত্যা করিও।”

    তাই ভাবি, কালের কি কুটিল গতি! আড়াই হাজার বৎসর পরে আজ পাটলিপুত্র-রচয়িতা মগধের পরাক্রান্ত মহামন্ত্রী বর্ষকারের নাম কেহ শুনিয়াছে কি? কিন্তু শাক্যবংশের সেই রাজ্যভ্রষ্ট যুবরাজ? আজ অর্ধেক এশিয়া তাঁহার নাম জপ করিতেছে। সসাগরা পৃথ্বীকে যাহারা বারবনিতার ন্যায় উপভোগ করিয়াছিল, তাহাদের নাম সেই ভুঞ্জিতা ধরিত্রীর ধূলিকণার সহিত মিশাইয়া গিয়াছে; আর যে নিঃসম্বল রাজ-ভিখারীর একমাত্র সম্পদ ছিল নির্বাণ, সেই শাক্যসিংহের নাম অনির্বাণ শিখার ন্যায় তমসান্ধ মানবকে জ্যোতির পথ নির্দেশ করিতেছে।

    বর্ষাকালে স্থপতি-সূত্রধার-সম্প্রদায় প্রায়শঃ বসিয়া থাকে। তাই আমার শ্রেণীভুক্ত শ্রমিকদিগকে সংগ্রহ করিতে বড় বিলম্ব হইল না। যথাসময় আমার দশ হাজার শিল্পী নগরের ভিন্ন ভিন্ন তোরণ দিয়া বাহির হইয়া গেল। কোনও পথে দুই শত, কোনও পথে চারি শত বাহির হইল— যাহাতে নাগরিক সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে। বেলা প্রায় তিন প্রহরকালে নগরের উত্তরে তিন ক্রোশ দূরে সকলে সমবেত হইল।

    এখান হইতে গঙ্গা-শোণ-সংগম প্রায় পঞ্চদশ ক্রোশ, ন্যূনাধিক এক দিনের পথ। পরামর্শের পর স্থির হইল যে, সন্ধ্যা পর্যন্ত যতদূর সম্ভব যাইব, তারপর পথিপার্শ্বে রাত্রি কাটাইয়া পরাহে অতিপ্রত্যূষে আবার গন্তব্যস্থানের উদ্দেশে যাত্রা করিব। তাহা হইলে মধ্যাহ্নের পূর্বে পাটলিগ্রামে পৌঁছিতে পারা যাইবে।

    তখন সকলে যুদ্ধগামী পদাতিক সৈন্যের মতো শ্রেণীবদ্ধভাবে চলিতে আরম্ভ করিল। আকাশে প্রবল মেঘাড়ম্বর, শীতল বায়ু খরভাবে বহিতেছে; রাত্রিতে নিশ্চয় বৃষ্টি হইবে। কিন্তু সেজন্য কাহারও উদ্বেগ নাই। আসন্ন কর্মের উল্লাসে সকলে মহানন্দে গান গাহিতে গাহিতে চলিল।

    মগধরাজ্যের স্থানীয় বলিয়া তখন রাজগৃহ হইতে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম চতুর্দিকে বিভিন্ন রাজ্যে যাইবার পথ ছিল। তদ‌্‌ভিন্ন নগর হইতে নগরান্তরে যাইবার পথও ছিল। রাজকোষ হইতে পথের জন্য প্রভূত অর্থ ব্যয় করা হইত। আবশ্যক হিসাবে পথের উপর প্রস্তরখণ্ড বিছাইয়া পথ পাকা করা হইত, পথিকের সুবিধার জন্য পথের ধারে কূপ খনন করানো হইত, ছায়া করিবার জন্য দুই ধারে বট, অশ্বত্থ, শাল্মলী বৃক্ষ রোপিত হইত। মধ্যে নদী পড়িলে সেতু বা খেয়ার বন্দোবস্ত থাকিত।

    এই সকল পথে দলবদ্ধ বৈদেশিক বণিক্গণ অশ্ব, গর্দভ ও উষ্ট্রপৃষ্ঠে মহার্ঘ পণ্যভার বহন করিয়া নগরে নগরে ক্রয়-বিক্রয় করিয়া বেড়াইত; নট-কুশীলব সম্প্রদায় আপন আপন কলা-নৈপুণ্য দেখাইয়া ফিরিত। রাজদূত দ্রুতগামী অশ্বে চড়িয়া বায়ুবেগে গোপনবার্তা বহন করিয়া রাজসমীপে উপস্থিত হইত। কদাচ রাত্রিকালে এই সকল পথে দস্যু-তস্করের ভয়ও শুনা যাইত। বন্য আটবিক জাতিরা এইরূপ উৎপাত করিত। কিন্তু তাহা ক্বচিৎ, কালেভদ্রে। পথের পাশে সৈনিকের গুল্ম থাকায় তস্করগণ অধিক অত্যাচার করিতে সাহসী হইত না। রাজপথ যথাসম্ভব নিরাপদ ছিল।

    উত্তরে ভাগীরথীতীর পর্যন্ত মগধের সীমা— সেই পর্যন্ত পথ গিয়াছে। আমরা সেই পথ ধরিয়া চলিলাম। ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনীভূত হইয়া আসিল, বায়ু স্তব্ধ এবং আকাশে মেঘপুঞ্জ বর্ষণোন্মুখ হইয়া রহিল। আমরা রাত্রির মতো পথসন্নিকটে এক বিস্তীর্ণ প্রান্তরে আশ্রয় লইলাম।

    প্রত্যেকের সহিত এক সন্ধ্যার আহার্য ছিল। কিন্তু বর্ষাকালে উন্মুক্ত প্রান্তরে রন্ধনের সুবিধা নাই। কষ্টে যদি বা অগ্নি জ্বালা যায়, বৃষ্টি পড়িলেই নিবিয়া যাইবার সম্ভাবনা। তথাপি অনেকে একটা মৃত বৃক্ষ হইতে কাষ্ঠ সংগ্রহ করিয়া যব-গোধূমচূর্ণ ও শক্তু শানিয়া পিষ্টক-পুরোডাশ তৈয়ার করিতে লাগিল। আবার যাহারা অতটা পরিশ্রম স্বীকার করিতে অনিচ্ছুক, তাহারা চিপিটক  জলে সিক্ত করিয়া দধি-শর্করা সহযোগে ভোজনের আয়োজন করিতে লাগিল।

    চারিদিক হইতে দশ হাজার লোকের কলরব, গুঞ্জন, গান, চিৎকার, গালিগালাজ আসিতেছে। দূরে দূরে ধুনির ন্যায় অগ্নি জ্বলিতেছে। অন্ধকারে তাহারই আশেপাশে মানুষের ছায়ামূর্তি ঘুরিতেছে। ক্বচিৎ অগ্নিতে তৈল বা ঘৃত প্রদানের ফলে অগ্নি অত্যুজ্জ্বল শিখা তুলিয়া জ্বলিয়া উঠিতেছে। সেই আলোকে চতুষ্পার্শ্বে উপবিষ্ট মানুষের মুখ ক্ষণকালের জন্য স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে। এ যেন সহসা বিজন প্রান্তর-মধ্যে এক ভৌতিক উৎসব আরম্ভ হইয়া গিয়াছে।

    আমার সহিত কদলী, কপিত্থ, রসাল ইত্যাদি ফল, কিঞ্চিৎ মৃগমাংস এবং এক দ্রোণ লোধ্ররেণু চিত্রকাদির দ্বারা সুরভিত হিঙ্গুল-বর্ণ অতি উৎকৃষ্ট আসব ছিল। আমি তদ্দ্বারা আমার নৈশ আহার সুসম্পন্ন করিলাম।

    ক্রমে রাত্রি গভীর হইতে চলিল। এক বৃহৎ বৃক্ষতলে মৃত্তিকার উপর আস্তরণ পাতিয়া আমি শয়নের উপক্রম করিতেছি, এমন সময় অন্ধকারে দুই জন লোক আমার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। জিজ্ঞাসা করিলাম, “কে?”

    একজন উত্তর দিল, “নায়ক, আমি এই ছাউনির রক্ষী। অপরিচিত এক ব্যক্তি কূপের নিকট বসিয়াছিল, তাই আদেশমত ধরিয়া আনিয়াছি।”

    আমি বলিলাম, “মশাল জ্বাল।”

    মশাল জ্বলিলে দেখিলাম, প্রহরীর সঙ্গে এক দীর্ঘাকৃতি নগ্নপ্রায় অতিশয় শ্মশ্রুগুম্ফজটাবহুল পুরুষ। শুকচঞ্চুর ন্যায় বক্র নাসা, চক্ষু অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “তুমি কূপ-সন্নিকটে কি করিতেছিলে?”

    সে ব্যক্তি স্থিরনেত্রে আমার মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া বলিল, “তুমি রাষ্ট্রপতি হইবে; তোমার ললাটে রাজদণ্ড দেখিতেছি।”

    কৈতববাদে ভুলিবার বয়স আমার নাই। উপরন্তু মহামাত্য যে সন্দেহ আমার মনের মধ্যে সঞ্চারিত করিয়া দিয়াছিলেন, এই অপরিচিত জটিল সন্ন্যাসীকে দেখিবামাত্র তাহা জাগরূক হইয়া উঠিল। বলিলাম, “আপনি দেখিতেছি জ্যোতির্বিদ। আসন পরিগ্রহ করুন।”

    আসন গ্রহণ করিয়া জটাধারী কহিলেন, “আমি শৈব সন্ন্যাসী। রুদ্রের কৃপায় আমার তৃতীয় নয়ন উন্মীলিত হইয়াছে। ত্রিকাল আমার নখ-দর্পণে প্রকট হয়। আমি দেখিতেছি, তুমি অদূর-ভবিষ্যতে মহালোকপালরূপে রাজদণ্ড ধারণ করবে। তোমার যশোদীপ্তিতে ভূতপূর্ব রাজন্যগণের কীর্তিপ্রভা ম্লান হইয়া যাইবে।”

    সন্ন্যাসীকে বুঝিয়া লইলাম। অত্যন্ত শ্রদ্ধাপ্লুতকণ্ঠে কহিলাম, “আপনি মহাজ্ঞানী। আমি অতি দুষ্কর কার্যে যাইতেছি; কার্যে সফল হইব কি না, আজ্ঞা করুন।”

    ত্রিকালদর্শী ভ্রূকুটি করিয়া কিছুক্ষণ নিমীলিতনেত্রে রহিলেন, তারপর জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোথায় যাইতেছ?”

    আমি হাসিয়া বলিলাম, “আপনিই বলুন।”

    সন্ন্যাসী তখন মৃত্তিকার উপর এক খণ্ড প্রস্তর দিয়া রাশিচক্র আঁকিলেন। আমি মৃদু হাস্যে প্রশ্ন করিলাম, “এ কি, আপনার নখ-দর্পণ কোথায় গেল?”

    সন্ন্যাসী আমার প্রতি সন্দেহপ্রখর এক দৃষ্টি হানিয়া কহিলেন, “সূক্ষ্ম গণনা নখ-দর্পণে হয় না। তুমি জ্যোতিষশাস্ত্রে অনভিজ্ঞ, এ সকল বুঝিবে না।”

    আমি বিনীতভাবে নীরব রহিলাম। সন্ন্যাসী গভীর মনঃসংযোগে রাশিচক্রে আঁক কষিতে লাগিলেন। অনেকক্ষণ অঙ্কপাত করিবার পর মুখ তুলিয়া কহিলেন, “তুমি কোনও গুপ্ত রাজকার্যে পররাজ্যে যাইতেছ। শনি ও মঙ্গল দৃষ্টি-বিনিময় করিতেছে, এজন্য মনে হয় তুমি যুদ্ধ-সংক্রান্ত কোনও গূঢ় কার্যে ব্যাপৃত আছ।” এই বলিয়া সপ্রশ্ননেত্রে আমার প্রতি চাহিয়া রহিলেন।

    আমি চমৎকৃত হইয়া বলিলাম, “আপনি সত্যই ভবিষ্যদ্দর্শী, আপনার অগোচর কিছুই নাই। আমি রাজানুজ্ঞায় লিচ্ছবি দেশে যাইতেছি, কি উদ্দেশ্যে যাইতেছি তাহা অবশ্যই আপনার ন্যায় জ্ঞানীর অবিদিত নাই। এখন কৃপা করিয়া আমার এক সুহৃদের ভাগ্যগণনা করিয়া দিতে হইবে। প্রহরী, কুলিক মিহিরমিত্র জম্বু-বৃক্ষতলে আশ্রয় লইয়াছেন, তাঁহাকে ডাক।”

    কুলিক মিহিরমিত্র আমার অধীনে প্রধান শিল্পী এবং আমার প্রাণোপম বন্ধু। ভাস্কর্যে তাহার যেরূপ অধিকার, জ্যোতিষশাস্ত্রেও সেইরূপ পারদর্শিতা। ভৃগু, পরাশর, জৈমিনি তাহার কণ্ঠাগ্রে।

    মিহিরমিত্র আসিয়া উপবিষ্ট হইলে, আমি সন্ন্যাসীকে নির্দেশ করিয়া কহিলাম, “ইনি জ্যোতিষশাস্ত্রে মহাপণ্ডিত, তোমার ভাগ্য গণনা করিবেন।”

    মিহিরমিত্র সন্ন্যাসীর দিকে ফিরিয়া বসিল। তাঁহার আপাদমস্তক একবার নিরীক্ষণ করিয়া নিজ করতল প্রসারিত করিয়া বলিল, “কোন্ লগ্নে আমার জন্ম?”

    সন্ন্যাসীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ঈষৎ চাঞ্চল্য ও উৎকণ্ঠার লক্ষণ দেখা দিল। সে করতলের প্রতি দৃক‌্‌পাত না করিয়াই বলিল, “তোমার অকালমৃত্যু ঘটিবে।”

    মিহিরমিত্র বলিল, “ঘটুক, কোন্ লগ্নে আমার জন্ম?”

    সন্ন্যাসী ইতস্তত করিয়া বলিল, “বৃষ লগ্নে।”

    “বৃষ লগ্নে!” মিহিরমিত্র হাসিল, “উত্তম। চন্দ্র কোথায়?”

    “তুলা রাশিতে।”

    “তুলা রাশিতে? ভালো। কোন্ নক্ষত্রে?”

    সন্ন্যাসী নীরব। ব্যাকুলনেত্রে একবার চারিদিকে নিরীক্ষণ করিল, কিন্তু পলায়নের পথ নাই। জ্যোতিষীর নাম শুনিয়া উৎসুক কর্মিকগণ একে একে আসিয়া চারিদিকে ঘিরিয়া দাঁড়াইয়াছে।

    মিহিরমিত্র কঠোরকণ্ঠে আবার প্রশ্ন করিল, “চন্দ্র কোন্ নক্ষত্রে?”

    জিহ্বা দ্বারা শুষ্ক ওষ্ঠাধর লেহন করিয়া স্খলিতকণ্ঠে সন্ন্যাসী কহিল, “চন্দ্র মৃগশিরা নক্ষত্রে।”

    মিহিরমিত্র আমার দিকে ফিরিয়া অল্প হাস্য করিয়া বলিল, “এ ব্যক্তি শঠ। জ্যোতিষশাস্ত্রের কিছুই জানে না।”

    তখন সন্ন্যাসী দ্রুত উঠিয়া সেই শ্রমিক-ব্যূহ ভেদ করিয়া পলায়নের চেষ্টা করিল। সন্ন্যাসী অসাধারণ বলিষ্ঠ— কিন্তু বিশ জনের বিরুদ্ধে একা কি করিবে? অল্পকালের মধ্যেই সকলে ধরিয়া তাহাকে ভূমিতে নিপাতিত করিল। রজ্জু দ্বারা তাহার হস্তপদ বাঁধিয়া ফেলিবার পর সন্ন্যাসী বলিল, “মহাশয়, আমাকে বৃথা বন্ধন করিতেছেন। আমি দীন ভিক্ষুক মাত্র, জ্যোতিষীর ভান করিয়া কিছু বেশি উপার্জনের চেষ্টা করিয়াছিলাম; কিন্তু আপনারা জ্ঞানী— আমার কপটতা ধরিয়া ফেলিয়াছেন। এখন দয়া করিয়া আমাকে ছাড়িয়া দিন, আমার যথেষ্ট দণ্ডভোগ হইয়াছে।”

    আমি বলিলাম, “ভণ্ড সন্ন্যাসী, তুমি কোশল অথবা বৃজির গুপ্তচর। আমাকে ভুলাইয়া কথা বাহির করিবার চেষ্টা করিতেছিলে।”

    সন্ন্যাসী ভয়ে চিৎকার করিতে লাগিল, “কুমারীর শপথ, জয়ন্তের শপথ, আমি গুপ্তচর নহি। আমি ভিক্ষুক। আমাকে ছাড়িয়া দিন, আমি আর কখনও এমন কাজ করিব না…উঃ, আমি বড় তৃষ্ণার্ত— একটু  জল…” এই পর্যন্ত বলিয়া হঠাৎ থামিয়া গেল।

    আমি একজন প্রহরীকে আদেশ করিলাম, “কূপ হইতে এক পত্র জল আনিয়া ইহাকে দাও।”

    জল আনীত হইলে সন্ন্যাসীর মুখের কাছে জলপাত্র ধরা হইল। কিন্তু সন্ন্যাসী নিশ্চেষ্ট, জল পানের কোনও আগ্রহ নাই।

    প্রহরী বলিল, “জল আনিয়াছি— পান কর।”

    সন্ন্যাসী নীরব নিস্পন্দভাবে পড়িয়া রহিল, কথা কহিল না। আমি তখন তাহার নিকটে গিয়া বলিলাম, “তৃষ্ণার্ত বলিতেছিলে, জল পান করিতেছ না কেন?”

    সন্ন্যাসী তখন ক্ষীণস্বরে কহিল, “আমি জল পান করিব না।”

    সহসা যে প্রহরী জল আনিয়াছিল, সে জলপাত্র ফেলিয়া দিয়া কাতরোক্তি করিয়া মাটিতে পড়িয়া গেল। ‘কি হইল, কি হইল’— বলিয়া সকলে তাহাকে ধরিয়া তুলিল। দেখা গেল, এই অল্পকালের মধ্যে তাহার মুখের অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটিয়াছে। মুখ তাম্রবর্ণ ধারণ করিয়াছে, চক্ষু অস্বাভাবিক উজ্জ্বল, সর্বাঙ্গ থরথর করিয়া কাঁপিতেছে। ক্রমে সৃক্কণী বহিয়া ফেন নির্গত হইতে লাগিল। বাক্য একেবারে রোধ হইয়া গিয়াছে। ‘কি হইয়াছে?’ ‘কেন এরূপ করিতেছ?’— এই প্রকার বহু প্রশ্নের উত্তরে সে কেবল ভূপতিত জলপাত্রটি অঙ্গুলিসংকেতে দেখাইতে লাগিল।

    তারপর অর্ধদণ্ডের মধ্যে দারুণ যন্ত্রণায় হস্তপদ উৎক্ষিপ্ত করিতে করিতে উৎকট মুখভঙ্গি করিয়া প্রহরী ইহলোক ত্যাগ করিল। তাহার বিষ-বিধ্বস্ত দেহ মৃত্যুর করস্পর্শে শান্ত হইলে পর, সমবেত সকলের দৃষ্টি সেই ভণ্ড সন্ন্যাসীর উপর গিয়া পড়িল। ক্রোধান্ধ জনতার সেই জিঘাংসানিষ্ঠুর দৃষ্টির অগ্নিতে সন্ন্যাসী যেন পুড়িয়া কুঁক‌্‌ড়াইয়া গেল।

    আর এক মুহূর্ত বিলম্ব হইলে বোধ করি সেই ক্ষিপ্ত কর্মিকদল সন্ন্যাসীর দেহ শত খণ্ডে ছিঁড়িয়া ফেলিত, কিন্তু সেই মুহূর্তে শ্রমিক-ব্যূহ ঠেলিয়া কর্মিক-জ্যেষ্ঠ বিশালকায় দিঙ‌্‌নাগ সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। ভূশায়িত সন্ন্যাসীর জটা ধরিয়া সকলের দিকে ফিরিয়া পরুষ-কণ্ঠে কহিল, “ভাই সব, এই ভণ্ড তপস্বী শত্রুর চর। আমাদের প্রাণনাশের জন্য কূপের জল বিষ-মিশ্রিত করিয়াছে। ইহার একমাত্র উচিত শাস্তি— মৃত্যু; অতএব সে শাস্তি আমরা ইহাকে দিব। কিন্তু এখন নয়। তোমরা সকলেই জান, যে কার্যে আমরা যাইতেছি, তাহাতে নরবলির প্রয়োজন। ভৈরবের তুষ্টিসাধন না করিলে আমাদের কার্য সুসম্পন্ন হইবে না। সুতরাং এখন কেহ ইহার অঙ্গে হস্তক্ষেপ করিও না। যথাসময় গঙ্গার উপকূলে আমরা ইহাকে জীবন্ত সমাধি দিব। এই পাপাত্মার প্রেতমূর্তি অনন্তকাল ধরিয়া আমাদের দুর্গ পাহারা দিবে।”

    দিঙ‌্‌নাগের কথায় সকলে ক্ষান্ত হইল।

    তারপর মৃত প্রহরীর দেহ সকলে মিলিয়া কূপ-সন্নিকটে এক বৃক্ষতলে সমাধিস্থ করিল এবং সন্ন্যাসীকে সেই বৃক্ষশাখায় হস্তপদ বাঁধিয়া ভাণ্ডবৎ ঝুলাইয়া রাখিল।

    পরদিন প্রত্যূষে যাত্রা করিয়া আমরা বেলা প্রায় তৃতীয় প্রহরে পাটলিগ্রামে উপস্থিত হইলাম। গঙ্গার উপকূলে জঙ্গল পরিবৃত অতি ক্ষুদ্র একটি জনপদ— সর্বসাকুল্যে বোধ করি পঞ্চাশটি দরিদ্র পরিবারের বাস। গ্রামবাসীরা অধিকাংশই নিষাদ কিংবা জালিক— বনে পশু শিকার করিয়া এবং নদীতে মৎস্য ধরিয়া জীবনযাত্রা নির্বাহ করে। মাঝে মাঝে বৃহৎ অরণ্যের মধ্যে বৃক্ষাদি কাটিয়া, ক্ষেত্র সমতল করিয়া, যব গোধূম চণক ইত্যাদিও উৎপন্ন করে। আমরা সদলবলে উপস্থিত হইলে গ্রামিকেরা আমাদের আততায়ী মনে করিয়া গ্রাম ছাড়িয়া অরণ্যের মধ্যে প্রবেশ করিল। আমরা অনেক আশ্বাস দিলাম, কিন্তু কেহ শুনিল না, কিরাতভীত মৃগযূথের মতো গভীর বনমধ্যে অন্তর্হিত হইয়া গেল।

    তখন আমরা অনাহূত যেখানে যাহা পাইলাম, তাহাই গ্রহণ করিয়া ক্ষুন্নিবৃত্তি করিলাম। গ্রামের সম্বৎসরের সঞ্চিত খাদ্য এক সন্ধ্যার আহারে প্রায় নিঃশেষ হইয়া গেল।

    সেদিন আর কোনও কাজ হইল না। শ্রান্ত কর্মিকদল যে যেখানে পারিল ঘুমাইয়া রাত্রি কাটাইয়া দিল।

    পরদিন প্রভাতে কাজের হুড়াহুড়ি পড়িয়া গেল। রণহস্তীর পৃষ্ঠে স্তূপীকৃত খাদ্য বস্ত্রাবাস প্রভৃতি যাবতীয় আবশ্যক বস্তু আসিয়া পৌঁছিতে লাগিল। ছাউনি ফেলিতে, প্রস্তরাদি যথাস্থানে সন্নিবেশিত করিতে সমস্ত দিন কাহারও নিশ্বাস ফেলিবার অবকাশ রহিল না।

    দূতহস্তে মহামন্ত্রী দুর্গের নক্সা পাঠাইয়াছেন, তাহা লইয়া মিহিরমিত্র ও দিঙ‌্‌নাগকে সঙ্গে করিয়া আমি দুর্গের স্থান-নির্ণয়ের জন্য নদীসংগমে গেলাম। বর্ষায় কূলপ্লাবী দুই মহানদী স্ফীত তরঙ্গায়িত হইয়া ঘোররবে ছুটিয়াছে। গঙ্গা ধূসর, শোণ স্বর্ণাভ। দুই স্রোত যেখানে মিলিত হইয়াছে, সেখানে আবর্তিত জলরাশি ফেন-পুষ্পিত হইয়া উঠিয়াছে।

    এই সংগমের দক্ষিণ উপকূলে দাঁড়াইয়া আমরা দেখিলাম যে, শোণ এবং সংযুক্ত প্রবাহের সন্ধিস্থলে এক বিশাল দ্বিভুজের সৃষ্টি হইয়াছে— মনে হয় যে, দুই নদী বাহু বিস্তার করিয়া দক্ষিণের তটভূমিকে আলিঙ্গন করিবার প্রয়াস করিতেছে। বহু পর্যবেক্ষণ ও বিচারের পর স্থির করিলাম যে, এই দ্বিভুজের মধ্যেই দুর্গ নির্মাণ করিতে হইবে। কারণ, তাহা হইলে দুর্গের দুই দিক্ নদীর দ্বারা বেষ্টিত থাকিবে, পরিখা-খননের প্রয়োজন হইবে না।

    তারপর সেই স্থানের জঙ্গল পরিষ্কৃত করিবার জন্য লোক লাগিয়া গেল। বড় বড় পুরাতন বৃক্ষ কাটিয়া ভূমি সমতল করা হইতে লাগিল। হস্তীসকল ভূপতিত বৃক্ষকাণ্ড টানিয়া বাহিরে লইয়া ফেলিতে লাগিল। বৃক্ষপতনের মড়মড় শব্দে, মানুষের কোলাহলে, হস্তী ও অশ্বের নিনাদে দিক‌্‌প্রান্ত প্রকম্পিত হইয়া উঠিল। যেন বহু-যুগব্যাপী নিদ্রার পর অরণ্যানী কোন দৈত্যের বিজয়নাদে চমকিয়া উঠিল।

    সমস্ত দিন এইরূপ পরিশ্রমের পর রাত্রিতে আহারাদি শেষ করিয়া বিশ্রামের উদ্যোগ করিতেছি, এমন সময় দিঙ‌্‌নাগ আসিয়া উপস্থিত হইল। বলিল, “নায়ক, রাত্রি দ্বিপ্রহর সমাগত; আজ দুর্গারম্ভের পূর্বে দৈবকার্য করিতে হইবে।”

    আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “কিরূপ দৈবকার্য?”

    দিঙ‌্‌নাগ বলিল, “ইহারই মধ্যে ভুলিয়া গেলেন? সেই ভণ্ড তপস্বী— আজ তাহাকে জীবন্ত পুঁতিয়া ফেলিতে হইবে।”

    তখন সকল কথা স্মরণ হইল। বলিলাম, “ঠিক কথা, তাহাকে ভুলিয়া গিয়াছিলাম। তা বেশ, তাহাকে যখন বধ করিতেই হইবে, তখন এক কার্যে দুই ফল হউক। শত্রু নিপাত ও দেবতুষ্টি একসঙ্গেই হইবে। কিন্তু এই সকল দৈবকার্যের কি কি অনুষ্ঠান তাহা কি তোমাদের জানা আছে?”

    দিঙ‌্‌নাগ বলিল, “অনুষ্ঠান কিছুই নহে। বলিকে সুরাপান করাইয়া যখন সে অচৈতন্য হইয়া পড়িবে, তখন তাহার কানে কানে বলিতে হইবে, ‘তুমি চিরদিন প্রেতদেহে এই দুর্গ রক্ষা করিতে থাক।’ — এই বলিয়া তাহাকে জীবন্ত অবস্থায় পুঁতিয়া ফেলিতে হইবে।”

    আমি ঈষৎ বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “তুমি এত বিধি-ব্যবস্থা জানিলে কোথা হইতে?”

    দিঙ্‌নাগ হাসিয়া বলিল, “এ কার্য আমি পূর্বে করিয়াছি। ধনশ্রী শ্রেষ্ঠী যখন গুপ্ত রত্নাগার মাটির নীচে তৈয়ার করে, তখন আমিই কুলিক ছিলাম। সেই সময় অরণ্য হইতে এক শবর ধরিয়া আনিয়া শ্রেষ্ঠী এই নরযাগ সম্পন্ন করে। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম।”

    আমি বলিলাম, “তবে এ কার্যও তুমিই কর।”

    দিঙ‌্‌নাগ বলিল, “করিব। কিন্তু নায়ক, কার্যকালে আপনাকেও উপস্থিত থাকিতে হইবে। ইহাই বিধি।”

    “বেশ থাকিব।”

    দিঙ‌্‌নাগ চলিয়া যাইবার পর নানা চিন্তায় মগ্ন হইয়া আছি, এমন সময় সে ছুটিতে ছুটিতে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, “নায়ক, সর্বনাশ! সন্ন্যাসী আমাদের ফাঁকি দিয়াছে!”

    “ফাঁকি দিয়াছে?”

    “বিষপান করিয়াছে। তাহার কবচের মধ্যে বিষ লুকানো ছিল, জীবন্ত সমাধির ভয়ে তাহাই খাইয়া মরিয়াছে। এখন উপায়?”

    “কিসের উপায়?”

    “মানস করিয়াছি, বলি না দিলে যে সর্বনাশ হইবে! রুদ্র কুপিত হইবেন।” দিঙ‌্‌নাগ মাটিতে বসিয়া পড়িল।

    চিন্তার কথা বটে। নির্বোধ সন্ন্যাসীটা আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিতে পারিল না! পাছে আমাদের একটু উপকার হয়, তাই তাড়াতাড়ি বিষপান করিয়া বসিল। এদিকে আমন্ত্রিত দেবতা প্রতীক্ষা করিয়া আছেন। অন্য বলি কোথায় পাওয়া যায়?

    বিশেষ ভাবিত হইয়া পড়িয়াছি, এরূপ সময় শিবিরের প্রহরী আসিয়া সংবাদ দিল, “কতকগুলা মুণ্ডিত-মস্তক ভিখারী ছাউনিতে আশ্রয় খুঁজিতেছিল, ধরিয়া বাঁধিয়া রাখিয়াছি। আজ্ঞা হয় তো লইয়া আসি।”

    দিঙ‌্‌নাগ লাফাইয়া উঠিয়া মহানন্দে চিৎকার করিয়া উঠিল, “জয় রুদ্রেশ্বর, জয় ভৈরব!..নায়ক, দেবতা স্বয়ং বলি পাঠাইয়াছেন!”

    এত সহজে যে বলি-সমস্যার মীমাংসা হইয়া যাইবে তাহা ভাবি নাই। ভিখারী অপেক্ষা উত্তম বলি আর কোথায় পাওয়া যাইবে? দিঙ‌্‌নাগ ঠিকই বলিয়াছে, দেবতা স্বয়ং বলি পাঠাইয়াছেন।

    সর্বসুদ্ধ চারি-পাঁচটি ভিখারী,— পরিধানে কৌপীন, সংঘাটি ও উত্তরীয়, হস্তে ভিক্ষাপাত্র,— আমার সম্মুখে আনীত হইল। ভিক্ষুকগণ সকলেই বয়স্থ;— কেবল একটি বৃদ্ধ,— বয়স বোধ করি সত্তর অতিক্রম করিয়াছে।

    বৃদ্ধ স্মিত হাস্যে বলিলেন, “মঙ্গল হউক!”

    এই বৃদ্ধের মুখের দিকে চাহিয়া সহসা আমার সমস্ত অন্তরাত্মা যেন তড়িৎস্পৃষ্ট হইয়া জাগিয়া উঠিল। আমি কে, কোথায় আছি, এক মুহূর্তে সমস্ত ভুলিয়া গেলাম। কেবল বুকের মধ্যে এক অদম্য বাষ্পোচ্ছ্বাস আলোড়িত হইয়া উঠিল। কে ইনি? এত সুন্দর, এত মধুর, এত করুণাসিক্ত মুখকান্তি তো মানুষের কখনও দেখি নাই। দেবতার মুখে যে জ্যোতির্মণ্ডল কল্পনা করিয়াছি, আজ এই বৃদ্ধের মুখে তাহা প্রথম প্রত্যক্ষ করিলাম। এই জ্যোতির স্ফুরণ বাহিরে অতি অল্প, কিন্তু চক্ষুর মধ্যে দৃষ্টিপাত করিলেই মনে হয়, ভিতরে অমিতদ্যুতি স্থির সৌদামিনী জ্বলিতেছে। কিন্তু সে সৌদামিনীতে জ্বালা নাই, তাহা অতি স্নিগ্ধ, অতি শীতল, যেন হিম-নির্ঝরিণীর শীকর-নিষিক্ত।

    সে মূর্তির দিকে তাকাইয়া তাকাইয়া আমার প্রাণের মধ্যে একটি শব্দ কেবল রণিত হইতে লাগিল— ‘অমিতাভ! অমিতাভ!’

    আমি বাক‌্‌রহিত হইয়া বসিয়া আছি দেখিয়া তিনি আবার হাসিলেন। অপূর্ব প্রভায় সে মুখ আবার সমুদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। বলিলেন, “বৎস, আমরা যাযাবর ভিক্ষু, কুশীনগর যাইবার অভিপ্রায় করিয়াছি। অদ্য রাত্রির জন্য তোমার আশ্রয় ভিক্ষা করি।”

    অবরুদ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনি কে?”

    তাঁহার একজন সহচর উত্তর করিলেন, “শাক্যসিংহ গৌতমের নাম কখনও শুন নাই?”

    শাক্যসিংহ? ইনিই তবে সেই শাক্যবংশের রাজ্যভ্রষ্ট যুবরাজ! মহামন্ত্রী বর্ষকারের কথা মনে পড়িল। ইঁহারই উদ্দেশে তিনি বলিয়াছিলেন,-ধূর্ত, কপটী, পরস্বলুব্ধ! মরি মরি, কে ধূর্ত কপটী? মনে হইল, মানুষ তো অনেক দেখিয়াছি, কিন্তু আজ এই প্রথম মানুষ দেখিলাম। হায়, মহামন্ত্রী বর্ষকার, তুমি এই পুরুষসিংহকে দেখ নাই, কিংবা দেখিয়াও আত্মাভিমানে অন্ধ ছিলে। নহিলে এমন কথা মুখে উচ্চারণ করিতে পারিতে না।

    বুকের মধ্যে প্রবল রোদনের উচ্ছ্বাস সমস্ত দেহকে কম্পিত করিতে লাগিল। আমার অতিবাহিত জীবনের অপরিমেয় শূন্যতা, অশেষ দৈন্য, যেন এককালে মূর্তি ধরিয়া আমার সম্মুখে দেখা দিল, কি পাইয়া এত দিন ভুলিয়া ছিলাম!

    আমি উঠিয়া তাঁহার পদপ্রান্তে পতিত হইয়া বলিলাম, “অমিতাভ, আমি অন্ধ, আমাকে চক্ষু দাও, আমাকে আলোকের পথ দেখাইয়া দাও।”

    অমিতাভ আমাকে ধরিয়া তুলিলেন। মস্তকে করার্পণ করিয়া বলিলেন, “পুত্র, আশীর্বাদ করিতেছি, তোমার অন্তরের দিব্যচক্ষু উন্মীলিত হইবে, আপনিই আলোকের পথ দেখিতে পাইবে।”

    আমি আবার তাঁহার চরণ ধারণ করিয়া বলিলাম, “না, শ্রীমন্, আমার হৃদয় অন্ধকার। আজ প্রথম তোমার মুখে দিব্যজ্যোতি দেখিয়াছি। ঐ জ্যোতির কণামাত্র আমাকে দান কর।”

    একজন ভিক্ষু বলিলেন, “শাস্তা, আপনি ইহাকে ত্রিশরণ দান করুন।”

    শাক্যসিংহ কহিলেন, “আনন্দ, তাহাই হউক। আমার মস্তকে হস্ত রাখিয়া বলিলেন, “পুত্র, তুমি ত্রিশরণ গ্রহণ করিয়া গৃহস্থের অষ্টশীল পালন কর। আশীর্বাদ করি, যেন বাসনামুক্ত হইতে পার।”

    তখন বুদ্ধের চরণতলে বসিয়া তদ্‌গতকণ্ঠে তিনবার ত্রিশরণ মন্ত্র উচ্চারণ করিলাম।

    অদূরে দাঁড়াইয়া দিঙ‌্‌নাগ— দুর্ধর্ষ, নিষ্করুণ, অসুরপ্রকৃতি দিঙ‌্‌নাগ— গলদশ্রু হইয়া কাঁদিতে লাগিল। তাহার বিকৃত কণ্ঠ হইতে কি কথা বাহির হইতে লাগিল বুঝা গেল না।

    এ যেন কয়েক পলের মধ্যে এক মহা ভূমিকম্পে আমাদের অতীত জীবন ধূলিসাৎ হইয়া গেল। কীট ছিলাম, এক মুহূর্তে মানুষ হইয়া গেলাম।

    পরদিন ঊষাকালে তথাগত কুশীনগর অভিমুখে যাত্রা করিলেন। হিরণ্যবাহুর সুবর্ণ-সৈকতে দাঁড়াইয়া আমার হস্তধারণ করিয়া তিনি কহিলেন, “পুত্র, আমি চলিলাম। হিংসায় হিংসার ক্ষয় হয় না, বৃদ্ধি হয়— এ কথা স্মরণ রাখিও।”

    বাষ্পাকুল-স্বরে কহিলাম, “শাস্তা, আবার কত দিনে সাক্ষাৎ পাইব?”

    সেই হিমবিদ্যুতের ন্যায় হাসি তাঁহার ওষ্ঠাধরে খেলিয়া গেল, বলিলেন, “আমি কুশীনগর যাইতেছি, আর ফিরিব না।”

    তারপর বহুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে গঙ্গা-শোণ-সংগমে দুর্গভূমির প্রতি তাকাইয়া রহিলেন। শেষে স্বপ্নাবিষ্ট কণ্ঠে কহিলেন, “আমি দেখিতেছি, তোমার এই কীর্তি বহু-সহস্রবর্ষ স্থায়ী হইবে। এই ক্ষুদ্র পাটলিগ্রাম ও তোমার নির্মিত এই দুর্গ এক মহীয়সী নগরীতে পরিণত হইবে। বাণিজ্যে, ঐশ্বর্যে, শিল্পে, কারুকলায়, জ্ঞানে,  বিজ্ঞানে পৃথিবীতে অদ্বিতীয় স্থান অধিকার করিবে। সদ্ধর্ম এইস্থানে দৃঢ়প্রতিষ্ঠা লাভ করিবে। তোমার কীর্তি অবিনশ্বর হউক।”

    এই বলিয়া, পুনর্বার আমাকে আশীর্বাদ করিয়া, দিব্যদর্শী পরিনির্বাণের পথে যাত্রা করিলেন।

    ১৯৩০

  • রক্ত-সন্ধ্যা

    রক্ত-সন্ধ্যা

    রক্ত-সন্ধ্যা

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    মানুষের সহজ সাধারণ বৈচিত্র্যহীন জীবনযাত্রার মাঝখানে ভূমিকম্পের মতো এমন এক-একটা ঘটনা ঘটিয়া যায় যে, পারিপার্শ্বিক অবস্থার সহিত তুলনা করিয়া সেটাকে একটা অসম্ভব অঘটন বলিয়া মনে হয়। যে গল্পটা আজ বলিতে বসিয়াছি, সেটাও একদিন এমনই অকস্মাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে আমার জীবনে আসিয়া হাজির হইয়াছিল। যদিও শুধু দর্শক হিসাবে ছাড়া এ গল্পের সঙ্গে আমার কোনও সংস্রব নাই, তবু ইহা আমার মনের উপর এমন একটা গভীর দাগ কাটিয়া দিয়াছে— যাহা বোধ করি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মুছিবে না।

    যে লোকটার কাহিনী আজ লিপিবদ্ধ করিতে বসিয়াছি, আজ সাত দিন হইল সে হাইকোর্টের রায় মাথায় করিয়া পরলোক যাত্রা করিয়াছে। সুতরাং সাক্ষীসাবুদ উপস্থিত করিবার আমার আর উপায় নাই। তবে সংবাদপত্রের নথি হইতে এবং আসামীর বিচারের সময় সাক্ষীদের মুখের যে যে কথা এই গল্পে কাজে আসিতে পারে, তাহা প্রয়োজনমত ব্যবহার করিব। বিশ্বাস আমি কাহাকেও করিতে বলি না এবং নিছক গাঁজা বলিয়া যাঁহারা উড়াইয়া দিতে চাহেন, তাঁহাদের বিরুদ্ধেও আমার কোনও নালিশ নাই। আমি শুধু এইটুকুই ভাবি যে, সে লোকটা মরিবার পূর্বে নিজের দোষ-ক্ষালনের বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করিয়াও এতগুলি অনাবশ্যক মিথ্যা কথা বলিয়া গেল। কেন?

    এই সময় দৈনিক সংবাদপত্র ‘কালকেতু’তে এই ঘটনার যে বিবরণ বাহির হইয়াছিল, তাহাই সর্বাগ্রে উদ্ধৃত করিয়া দিতেছি—

    “গতকল্য বেলা প্রায় সাড়ে নয়টার সময় কলিকাতার দুর্গাচরণ ব্যানার্জির লেনে এক কসাইয়ের দোকানে ভীষণ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হইয়া গিয়াছে। দোকানের মালিক গোলাম কাদের অন্য দিনের ন্যায় যথারীতি মাংস বিক্রয় করিতেছিল। দোকানে কয়েকজন ফিরিঙ্গী ও মুসলমান খরিদ্দার উপস্থিত ছিল। এমন সময় একজন অপরিচিত ফিরিঙ্গী দোকানে প্রবেশ করিয়া কিছু গোমাংস খরিদ করিতে চাহে। তাহাকে দেখিয়াই দোকানদার গোলাম কাদের ভীষণ চিৎকার করিয়া মাংস-কাটা ছুরি হস্তে  তাহার উপর লাফাইয়া পড়ে এবং নৃশংসভাবে তাহার বুকে, পেটে, মুখে ছুরিকাঘাত করিতে থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তি মাটিতে পড়িয়া যায়, তখন গোলাম কাদের তাহার বুকের উপর বসিয়া এক একবার ছুরিকাঘাতের সঙ্গে সঙ্গে বলিতে থাকে, “ভাস্কো-ডা-গামা, এই আমার স্ত্রীর জন্যে— এই আমার কন্যার জন্যে— এই আমার বৃদ্ধ পিতার জন্যে।” দোকানে যাহারা ছিল সকলেই এই লোমহর্ষণ কাণ্ড দেখিয়া দ্রুত পলায়ন করিয়া পুলিসে খবর দেয়। পুলিস আসিয়া যখন গোলাম কাদেরকে গ্রেপ্তার করিল, তখনও সে মৃতদেহের উপর ছুরি চালাইতেছে ও পূর্ববৎ বকিতেছে।

    “সন্দেহ হয় যে, গোলাম কাদের হঠাৎ পাগল হইয়া গিয়াছে। কারণ, হত ব্যক্তির সহিত পূর্ব হইতে তাহার পরিচয় ছিল বলিয়া জানা যাইতেছে না এবং তাহার স্ত্রী, কন্যা বা বৃদ্ধ পিতা কেহই বর্তমান নাই। অনুসন্ধানে জানা গিয়াছে যে, গোলাম কাদের প্রায় পনেরো বৎসর পূর্বে বিপত্নীক হইয়াছিল। তাহার স্ত্রী এক মৃত কন্যা প্রসব করিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তাহার পর সে আর বিবাহ করে নাই।

    “পুলিস-তদন্তে বাহির হইয়াছে যে, হত ব্যক্তি গোয়া হইতে নবাগত একজন পোর্তুগীজ ফিরিঙ্গী, ব্যবসায় উপলক্ষে কয়েকদিন পূর্বে কলিকাতায় আসিয়া এক ক্ষুদ্র হোটেলে বাস করিতেছিল। তাহার নাম গেব্রিয়েল ডিরোজা।

    “গোলাম কাদের এখন হাজতে আছে। ডিরোজার লাস পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে প্রেরিত হইয়াছে।”

    ঘটনাস্থলের খুব কাছেই আমার বাড়ি এবং অনেকদিন হইতে এই গোলাম কাদের লোকটার সহিত আমার মুখ- চেনাচিনি ছিল বলিয়াই ব্যাপারটা বেশি করিয়া আমাকে আকৃষ্ট করিয়াছিল। তাহা ছাড়া আর একটি জিনিস আমার কৌতূহল উদ্রিক্ত করিয়াছিল, সেটি ভাস্কো-ডা-গামার নাম। ছেলেবেলা হইতেই আমি ইতিহাসের ভক্ত, তাই হঠাৎ কসাইখানার হত্যাকাণ্ডের মধ্যে এই ইতিহাস-প্রসিদ্ধ নামটা উঠিয়া পড়ায় আমার মন সচকিত ও উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছিল। ‘ভাস্কো-ডা-গামা’ সাধারণ প্রচলিত নাম নহে; একজন অশিক্ষিত মুসলমান কসাইয়ের মুখে এ নাম এমন অবস্থায় উচ্চারিত হইতে দেখিয়া কোন্ এক গুপ্ত রোমান্সের গন্ধে আমার মনটা ভরিয়া উঠিয়াছিল। কি অদ্ভুত রহস্য এই বিশ্রী হত্যাকাণ্ডের অন্তরালে প্রচ্ছন্ন হইয়া আছে? কে এই গেব্রিয়েল ডিরোজা— যাহাকে হত্যাকারী ভাস্কো-ডা-গামা বলিয়া সম্বোধন করিল? সত্যই কি ইহা কেবলমাত্র এক বাতুলের দায়িত্বহীন প্রলাপ?

    তা সে যাহাই হউক, কৌতূহল আমার এতই বাড়িয়া গিয়াছিল যে, যেদিন এই মোকদ্দমা করোনারের কোর্টে উঠিল, সেদিন আমি একটু সকাল সকাল আদালতে গিয়া হাজির হইলাম। করোনার তখনও উপস্থিত হন নাই, কিন্তু আসামীকে আনা হইয়াছে। চারিদিকে পুলিস গিসগিস করিতেছে। আসামীর হাতে হাতকড়া— একটি টুলের উপর চুপ করিয়া বসিয়া আছে। আমাকে দেখিয়া সে চিনিতে পারিল এবং হাত তুলিয়া সেলাম করিল। পাগলের লক্ষণ কিছুই দেখিলাম না, নিতান্ত সহজ মানুষের মতো চেহারা। মুখে ভয় বা উৎকণ্ঠার কোনও চিহ্নই নাই। দেখিয়া কে বলিবে, এই লোকটাই দুই দিন আগে এমন নির্দয়ভাবে আর একটা লোককে হত্যা করিয়াছে।

    করোনার আসিয়া পড়িলেন। তখন কাজ আরম্ভ হইল। প্রথমেই ডাক্তার আসিয়া এজাহার দিলেন। তিনি বলিলেন, লাসের গায়ে সর্বসুদ্ধ সাতান্নটি ছুরিকাঘাত পাওয়া গিয়াছে। এই সাতান্নটির মধ্যে কোন্টি মৃত্যুর কারণ, বলা শক্ত। কারণ, সবগুলিই সমান সাংঘাতিক।

    ডাক্তারের জবানবন্দি শেষ হইলে জর্জ ম্যাথুস নামক একজন দেশী খ্রীস্টানকে সাক্ষী ডাকা হইল। অন্যান্য সওয়াল জবাবের পর সাক্ষী কহিল, ‘আমি গত দশ বৎসর প্রায় প্রত্যহ গোলাম কাদেরের দোকানে মাংস কিনিয়াছি; কিন্তু কোনও দিন তাহার এরূপ ভাব দেখি নাই। সে স্বভাবত বেশ শান্তশিষ্ট লোক।’

    প্রশ্ন— আপনার কি মনে হয়, সে যে-সময় হত ব্যক্তিকে আক্রমণ করে, সে সময় সে স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না?

    উত্তর— হত ব্যক্তি দোকানে প্রবেশ করিবার আগে পর্যন্ত সে স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল— আমাদের সঙ্গে সহজভাবে কথাবার্তা কহিতেছিল; কিন্তু ডিরোজাকে দেখিয়াই একেবারে যেন পাগল হইয়া গেল।

    প্রশ্ন— আপনার কি বোধ হয়, আসামী হত ব্যক্তিকে পূর্ব হইতে চিনিত?

    উত্তর-হাঁ। কিন্তু  তাহার আসল নাম না বলিয়া ভাস্কো-ডা-গামা বলিয়া ডাকিয়াছিল।

    প্রশ্ন— ডিরোজা আক্রান্ত হইয়া কোনও কথা বলিয়াছিল?

    উত্তর— না।

    প্রশ্ন— আসামী মদ বা অন্য কোনও নেশা করে, আপনি জানেন?

    উত্তর— আমি কখনও তাহাকে নেশা করিতে বা মাতাল হইতে দেখি নাই।

    প্রশ্ন— আসামীর ভাবে ইঙ্গিতে কি আপনার বোধ হইয়াছিল যে, সে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করিবার জন্য ডিরোজাকে খুন করিতেছে?

    উত্তর— হাঁ। তাহার কথায় ও মুখের ভাবে আমার মনে হইয়াছিল যে, ডিরোজা পূর্বে তাহার স্ত্রী, কন্যা ও বৃদ্ধ পিতার উপর কোনও অত্যাচার করিয়া থাকিবে।

    জর্জ ম্যাথুসের পরে আরও কয়েকজন সাক্ষী প্রায় ওই মর্মে এজাহার দিবার পর পুলিসের ডেপুটি কমিশনার এজাহার দিতে উঠিলেন। তিনি বলিলেন যে, গোয়া হইতে খবর পাইয়াছেন যে, ডিরোজা সেখানকার একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, জাতিতে ফিরিঙ্গী পোর্তুগীজ— বয়স বিয়াল্লিশ বৎসর। সে পূর্বে কখনও গোয়া ছাড়িয়া অন্যত্র যায় নাই— জীবনে এই প্রথম কলিকাতায় পদার্পণ করিয়াছিল। আসামী সম্বন্ধে ডেপুটি কমিশনার বলিলেন, ‘আসামীর আত্মীয়-স্বজন স্ত্রী পুত্র পরিবার কেহ নাই। অনুসন্ধানে জানা গিয়াছে যে, গত ত্রিশ বৎসরের মধ্যে সে কলিকাতা ছাড়িয়া কোথাও যায় নাই। তাহার বয়স অনুমান সাতচল্লিশ বৎসর। সুতরাং ডিরোজার সহিত তাহার যে পূর্বে কখনও দেখা-সাক্ষাৎ হইয়াছিল, তাহা সম্ভব বলিয়া বোধ হইতেছে না।’

    আসামী এতক্ষণ চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। এবার সে কথা কহিল, বলিল, ‘ডা-গামাকে আমি অনেকবার দেখিয়াছি।’

    মুহূর্তমধ্যে ঘর একেবারে নিস্তব্ধ হইয়া গেল। করোনার ডেপুটি কমিশনারকে চুপ করিতে ইঙ্গিত করিয়া আসামীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তুমি ডিরোজাকে পূর্ব হইতে জানো?’

    আসামী বলিল, ‘ডিরোজাকে আমি কখনও দেখি নাই— আমি ভাস্কো-ডা-গামাকে চিনি। ভাস্কো-ডা-গামা ছদ্মবেশে আমার দোকানে মাংস কিনিতে আসিয়াছিল।’

    করোনার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আসামীর দিকে চাহিয়া বলিলেন, ‘আচ্ছা, ভাস্কো-ডা-গামাকে তুমি কোথায় দেখিয়াছ?’

    আসামী কহিল, ‘প্রথম দেখি কালিকটের বন্দরে— শেষ দেখি সমুদ্রের বুকের উপর—’ এই পর্যন্ত বলিয়া আসামী হঠাৎ থামিয়া গেল। দেখিলাম, তাহার মুখ-চোখ লাল হইয়া উঠিয়াছে, মুখ দিয়া কথা বাহির হইতেছে না। সে অবরুদ্ধকণ্ঠে একবার ‘ইয়া খোদা!’— বলিয়া দুই হাতে মুখ গুঁজিয়া বসিয়া পড়িল— আর কোনও কথা বলিল না।

    তারপর করোনার যথাসময়ে রায় দিলেন যে, ক্ষণিক উন্মত্ততার বশে গোলাম কাদের ডিরোজাকে খুন করিয়াছে।

    কোর্ট হইতে যখন বাহিরে রাস্তায় আসিয়া দাঁড়াইলাম, তখন আমার মাথার ভিতর ঝাঁ-ঝাঁ করিতেছে। ‘কালিকট’, ‘সমুদ্রের বুকের উপর’— আসামী এ সব কি বলিল? আরও কত কথা, না জানি কোন্ অপূর্ব কাহিনী এই মূর্খ নিরক্ষর কসাই গোলাম কাদেরের বুকের মধ্যে লুকানো আছে। কারণ, সে যে পাগলামির ভান করিতেছে না, তাহা নিঃসন্দেহ। কোনও কথা বা কাজই তাহার পাগলের মতো নহে। অথচ দুই-একটা অসংলগ্ন কথার ভিতর দিয়া অতীতের পর্দার একটা কোণ তুলিয়া ধরিয়া এ কি এক আশ্চর্য রূপকথার ইঙ্গিত দিয়া গেল!

    ইহার পর গোলাম কাদেরের ভাগ্যে যাহা যাহা ঘটিয়াছিল, তাহা বিস্তারিতভাবে বলিবার কোনও প্রয়োজন দেখিতেছি না। দায়রা-সোপর্দ হইয়া মামলা হাইকোর্টে উঠিলে হাইকোর্টের জজবাহাদুর গোলাম কাদেরকে এক মাস ডাক্তারের নজরবন্দিতে থাকিবার হুকুম দিলেন। এক মাস পরে ডাক্তারের রিপোর্ট আসিল— গোলাম কাদের সুস্থ সহজ মানুষ, পাগলামির চিহ্নমাত্র তাহার মধ্যে নাই। তারপর বিচার। বিচারে গোলাম কাদের নিজের উকিলের পরামর্শ অগ্রাহা করিয়া স্পষ্ট ভাষায় বলিল, ‘আমি খুন করিয়াছি, সে জন্য বিন্দুমাত্র দুঃখিত বা অনুতপ্ত নই। আবার যদি তাহার সহিত দেখা হয়, আবার তাহাকে এমনই ভাবে হত্যা করিব।’

    হাইকোর্ট নিরুপায় হইয়া তাহার ফাঁসির হুকুম দিলেন।

    আমি শেষ পর্যন্ত আদালতে উপস্থিত ছিলাম। গোলাম কাদেরের জীবননাট্যে বিচারের অঙ্কটা শেষ হইয়া গেলে একটা নিশ্বাস ফেলিয়া বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইলাম। বিচারে তাহার মুক্তির প্রত্যাশা কোন দিনই করি নাই, কিন্তু তবু অকারণে মনটা অত্যন্ত খারাপ হইয়া গেল। বুকের নিভৃত স্থানে যেন একটা সংশয় লাগিয়াই রহিল যে, এ সুবিচার হইল না, কোথায় যেন কি একটা অত্যন্ত জরুরী প্রমাণ বাদ পড়িয়া গেল।

    এইসব নানা কথা ভাবিতেছি, এমন সময় কয়েকজন পুলিসের লোক আসামীকে বাহিরে লইয়া আসিল। আমি গোলাম কাদেরের মুখের দিকে চাহিতেই সে ইসারা করিয়া আমাকে কাছে ডাকিল। তারপর গলা নামাইয়া বলিল, ‘বাবুজী, আপনি আমার মোকদ্দমার শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত আছেন, তাহা আমি দেখিয়াছি। আমি তো চলিলাম, আমার একটি শেষ আর্জি আছে— একবার জেলে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিবেন, আমার কিছু বলিবার আছে।’

    আমি বলিলাম, ‘নিশ্চয় করিব।’

    গোলাম কাদের হাতকড়া-বাঁধা দুই হাত তুলিয়া আমাকে সেলাম করিয়া জেলের গাড়িতে চড়িয়া চলিয়া গেল।

    তারপর কি করিয়া কর্তৃপক্ষের অনুমতি লইয়া জেলে  তাহার সহিত দেখা করিলাম, সে বিবৃতি এখানে অনাবশ্যক। শুধু কন‌‌্‌ডেম‌্‌ড আসামীর কক্ষে বসিয়া মৃত্যুর দুই দিন পূর্বে সে আমাকে যে গল্প বলিয়াছিল, তাহাই বাংলাভাষায় অনূদিত করিয়া আনুপূর্বিক উদ্ধৃত করিতেছি। —

    গোলাম কাদের বলিল, ‘বাবুজী, আমার এই কাহিনী আপনি বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, আমি যে পাগল নই— আমার এই কথাটি আপনি অবিশ্বাস করিবেন না। সত্য কথা বলিতে কি, আমার কাছেও ইহা এক অদ্ভুত ব্যাপার। আমি কিতাব পড়ি নাই, আজীবন মাংস বিক্রয় করিয়াছি। গল্প বানাইয়া বলিবার শক্তি আমার নাই। যাহা আজ বলিব, তাহা আমি নিজে প্রত্যক্ষ করিয়াছি বলিয়াই বলিব। অথচ এ সকল ঘটনা আমার— এই গোলাম কাদেরের জীবনে যে ঘটে নাই, তাহাও নিশ্চিত। আপনাকে কেমন করিয়া বুঝাইব জানি না, আমি মূর্খ লোক। শুধু এইটুকু বলিতে পারি যে, ইহা আজিকার ঘটনা নয়, বহু বহু যুগের পুরাতন।

    ‘তবে শুরু হইতেই কথাটা বলি। পনের-ষোল বৎসর পূর্বে আমার স্ত্রী এক কন্যা প্রসব করিতে গিয়া মারা যায়, মেয়েটিও মারা গেল। কি করিয়া জানি না, আমার মনের মধ্যে বদ্ধমূল হইয়া গেল যে, কোনও দুশমন আমার স্ত্রী-কন্যাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করিয়াছে। শোকের অপেক্ষা ক্রোধ ও প্রতিহিংসায় আমার অন্তঃকরণ অধিক পূর্ণ হইয়া উঠিল; সর্বদাই মনে হইত, যদি সেই অজ্ঞাত দুশমনটাকে পাই, তাহা হইলে তাহার প্রতি অঙ্গ ছিড়িয়া ছিঁড়িয়া ইহার প্রতিশোধ লই।

    ‘এইভাবে কিছুদিন কাটিবার পর ক্রমে বুঝিতে পারিলাম যে, ইহা আমার ভ্রান্তি— সত্যের উপর ইহার কোনও প্রতিষ্ঠা নাই। তারপর যত দিন কাটিতে লাগিল, আস্তে আস্তে শোক এবং ক্রোধ দুই ভুলিতে লাগিলাম; কিন্তু আর বিবাহ করিতে পারিলাম না। শেষ পর্যন্ত হয়তো জীবনটা আমার এমনই সহজভাবে কাটিয়া যাইত, যদি না সে-দিন অশুভক্ষণে সেই লোকটা আমার দোকানে পদার্পণ করিত।

    ‘শুনিয়াছি, মানুষ  জলে ডুবিলে তাহার বিগত জীবনের সমস্ত ঘটনা ছবির মতো চোখের পর্দার উপর দেখিতে পায়। এই লোকটাকে দেখিবামাত্র আমারও ঠিক তাহাই হইল। এক মুহূর্তের মধ্যে চিনিয়া লইলাম— এই সেই নৃশংস রাক্ষস, যে আমার স্ত্রী-কন্যা এবং পিতাকে হত্যা করিয়াছিল। ছবির মতো সে সকল দৃশ্য আমার চোখের উপর জাগিয়া উঠিল। মজ্জমান জাহাজের উপর সেই মরণোন্মুখ অসহায় যাত্রীদের হাহাকার কানে বাজিতে লাগিল। ভাস্কো-ডা-গামার সেই ক্রূর হাসি আবার দেখিতে পাইলাম।

    ‘আমার জজসাহেবরা হত্যার কারণ খুঁজিতেছিলেন, কৈফিয়ৎ চাহিতেছিলেন। বাবুজী, আমি কি কৈফিয়ৎ দিব, আর দিলেই বা তাহা বুঝিত কে?

    ‘আপনি হয়তো বুঝিবেন। আপনার চোখে মুখে আমি তাহার পরিচয় পাইয়াছিলাম, তাই আপনাকে এই কষ্ট দিয়াছি। ইহাতে ফল কিছু হইবে না জানি, কিন্তু আমার হৃদয়ভার লাঘব হইবে; এ ছাড়া আমার অন্য স্বার্থ নাই।

    ‘আমার এই কসাই-জীবনের ইতিহাসটা এখানেই শেষ করিতেছি। এবার যাহার কথা আরম্ভ করিব, তাহার নাম মির্জা দাউদ বিন্ গোলাম সিদ‌্‌কী। আমিই যে এই মির্জা দাউদ, তাহা এখন ভুলিয়া যান। মনে করুন, ইহা আর কাহারও জীবনের কাহিনী।’—

    কালিকটের নাম আপনি শুনিয়া থাকিবেন। মালাবার উপকূলে অতি সুন্দর মহার্ঘ মণিখণ্ডের মতো একটি ক্ষুদ্র নগর। মোরগের ডাক যতদূর শুনা যায়, ততদূর তাহার নগর-সীমানা। নগরের পশ্চাতে ছোট ছোট পাহাড়, উপত্যকা, কঙ্করপূর্ণ সমতল ক্ষেত্র, এবং তাহার পশ্চাতে অভ্রভেদী পশ্চিমঘাট সমস্ত পৃথিবী হইতে যেন এই স্থানটুকুকে পৃথক করিয়া ঘিরিয়া রাখিয়াছে। সম্মুখে অপার সমুদ্র ভিন্ন কালিকটে প্রবেশ বা নিষ্ক্রমণের অন্য সুগম পথ নাই। এই সমুদ্রপথে অসংখ্য বাণিজ্যতরণী কলিকটের বন্দরে প্রবেশ করে, আবার পাল তুলিয়া সমুদ্রে বিলীন হইয়া যায়। কালিকট যেন পৃথিবীর সমগ্র বণিক-সমাজের মোসাফিরখানা।

    পীতবর্ণ চৈনিক, তাম্রবর্ণ বাঙালী, লোহিতবর্ণ পারসিক, কৃষ্ণবর্ণ মূর— সকলেই কলিকটের পথে সমান দর্পে পা ফেলিয়া চলে, কেহ কাহারও অপেক্ষা হীন নহে। চীন হইতে লাক্ষা, দারুশিল্প; ব্রহ্ম হইতে গজদন্ত; মলয়দ্বীপ হইতে চন্দন; বঙ্গ হইতে ক্ষৌম পট্টবস্ত্র, মলমল, ব্যাঘ্রচর্ম; চম্পা ও মগধ হইতে চামর, কস্তুরী, চারু-কেশরার পুষ্পবীজ; দাক্ষিণাত্য হইতে অগুরু, কর্পূর, দারুচিনি; লঙ্কা হইতে মুক্ত আসিয়া কালিকটে স্তূপীকৃত হয়। পশ্চিম হইতে তুরস্ক, পারসিক, আরব ও মূর সওদাগর তাহাই স্বর্ণের বিনিময়ে ক্রয় করিয়া জাহাজে তুলিয়া, কেহ বা পারস্যোপসাগরের ভিতর দিয়া ইউফ্রাটেস নদের মোহনায় উপস্থিত হয়, কেহ বা লোহিত সাগরের উত্তর প্রান্তে নীলনদের সন্নিকটে গিয়া তরণী ভিড়ায়। তথা হইতে প্রাচী-র পণ্য সমগ্র পাশ্চাত্য খণ্ডে ছড়াইয়া পড়ে। কালিকটের রাজা সামরী বাণিজ্যতরণীর শুল্ক আদায় করিয়া রাজ্যের ব্যয়ভার নির্বাহ করেন। রাজকোষ সর্বদা সুবর্ণ-মণিমাণিক্যে পূর্ণ। রাজ্যে কোথাও দৈন্য নাই, অশান্তি নাই, অসন্তোষ নাই; ইতর-ভদ্র সকলেই সুখী।

    মির্জা দাউদ এই কালিকটের একজন সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী। তাঁহার একুশখানি বাণিজ্যতরী আছে,— হোয়াংহো হইতে নীলনদের প্রান্ত পর্যন্ত তাহাদের গতিবিধি। যখন এই তরণী সকল শুভ্র পাল তুলিয়া শ্রেণীবদ্ধভাবে সমুদ্রযাত্রায় বাহিত হয়, তখন মনে হয়, রাজহংসশ্রেণী পক্ষ বিস্তার করিয়া নীল আকাশে ভাসিয়া চলিয়াছে।

    মির্জা দাউদ জাতিতে মূর। কলিকটে তাঁহার শ্বেত-প্রস্তরের প্রাসাদ মূর-প্রথায় নির্মিত। সুদূর মরক্কো দেশে এখনও তাঁহার বৃদ্ধ পিতা বর্তমান; কিন্তু তিনি কালিকটকেই মাতৃভূমিত্বে বরণ করিয়াছেন। অনেক বৈদেশিক সওদাগরই এরূপ করিয়া থাকেন। মির্জা দাউদ ধর্মে মুসলমান হইলেও একপত্নীক। সম্প্রতি চৌত্রিশ বৎসর বয়সে প্রথমে একটি কন্যা জন্মিয়াছে। কন্যার জন্মদিনে মির্জা দাউদ এক সহস্র তোলা সুবর্ণ বিতরণ করিয়াছেন— তারপর তাঁহার গৃহে সপ্তাহব্যাপী উৎসব চলিয়াছিল। নগরে ধন্য ধন্য পডিয়া গিয়াছিল।

    বস্তুত মির্জা দাউদের মতো সর্বজনপ্রিয় বহু-সম্মানিত ব্যক্তি নগরে আর দ্বিতীয় নাই। উচ্চ-নীচ, ধনী-নির্ধন সকলেই তাঁহাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করে। স্বয়ং রাজা সামরী তাঁহাকে বন্ধুর মধ্যে গণ্য করেন। এদিকে ব্যবসায়ে দিন দিন অধিক অর্থাগম হইতেছে। মানুষ পৃথিবীতে যাহা কিছু পাইলে সুখী হয়, কিছুরই তাঁহার অভাব নাই।

    একদিন গ্রীষ্মের সায়াহ্নে পশ্চিম দিগ্বলয় রঞ্জিত করিয়া সূর্যাস্ত হইতেছে। সমুদ্রের  জল যতদূর দৃষ্টি যায়, রাঙা হইয়া টলমল করিতেছে। দূর লাক্ষাদ্বীপ হইতে সুগন্ধ বহন করিয়া স্নিগ্ধ বায়ু বহিতে আরম্ভ করিয়াছে। আকাশ মেঘ-নির্মুক্ত।

    সমস্ত দিন গরম ভোগ করিয়া নগরের নরনারী শীতল বায়ু সেবন করিবার জন্য এই সময় বন্দরের ঘাটে আসিয়া জমিয়াছে। বহুদূর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অর্ধচন্দ্রাকৃতি ঘাট— বড় বড় চতুষ্কোণ পাথর দিয়া বাঁধানো। পাথরের উপর সারি সারি জাহাজ বাঁধিবার লোহার কড়া। জোয়ারের সময় সমুদ্রের জল ওই ঘাটের কানায় কানায় ভরিয়া উঠে, আবার ভাঁটার সময় সিক্ত বালুকারাশি মধ্যে রাখিয়া দূরে সরিয়া যায়। এই ঘাটই নগরের কর্মকেন্দ্র। ক্রয়-বিক্রয়, দর-দস্তুর, আমোদ-প্রমোদ সমস্তই এই স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। তাই সকল সময় এখানে মানুষের ভিড়।

    সে সময় ঘাটে একটিও নবাগত কিংবা বহির্গামী বাণিজ্যতরী ছিল না। কাজকর্ম কিছু শিথিল। নাগরিকগণ নানা বিচিত্র বেশ পরিধান করিয়া কেহ সস্ত্রীক সপুত্রকন্যা পাদচারণা করিতেছে, কেহ উচ্চৈঃস্বরে গান ধরিয়াছে। চঞ্চলমতি কিশোরগণ ছুটাছুটি করিয়া খেলা করিতেছে, আবার কেহ বা ঘাট হইতে সমুদ্রের  জলে লাফাইয়া পড়িয়া সন্তরণ করিতেছে।

    চীনদেশীয় এক বাজিকর নানা প্রকার অদ্ভুত খেলা দেখাইতেছে। জনতার মধ্য হইতে মাঝে মাঝে উচ্চ হাসির রোল উঠিতেছে।

    বাজিকর একজন স্থূলকায় প্রৌঢ় সিংহলীকে ধরিয়া তাহার কানের মধ্যে দৃষ্টিপাত করিয়া বলিল, ‘তোমার মাথার মধ্যে ২৫৬টি পাথরের নুড়ি রহিয়াছে, বল তো বাহির করিয়া দিই।’ অমনিই জনতা সোল্লাসে চিৎকার করিয়া উঠিল, ‘বাহির কর, বাহির কর।’ তখন বাজিকর ক্ষিপ্রহস্তে ক্ষুদ্র চিমটা দিয়া তাহার কর্ণ হইতে সুপারীর মতো বড় বড় অসংখ্য পাথর বাহির করিয়া মাটিতে স্তূপীকৃত করিল। প্রৌঢ় সিংহলী বিস্ময়ে বিহ্বল হইয়া চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া তাহা দেখিতে লাগিল। ভারি হাসির একটা ধুম পড়িয়া গেল। একজন পরিহাস করিয়া বলিল, ‘শেঠ, তোমার মাথা যে এত নিরেট, তাহা জানিতাম না।’

    ক্রমে সূর্য অস্তমিত হইল। সমুদ্রের গায়ে সীসার রং লাগিল। দিগন্তরেখার যে স্থানটায় সূর্য অস্ত গিয়াছিল, তাহাকে কেন্দ্র করিয়া সন্ধ্যার রক্তিমাভা ধীরে ধীরে সংকুচিত হইয়া আসিতে লাগিল।

    এমন সময় দূর সমুদ্রবক্ষে সেই রক্তিমাভার সম্মুখে তিনটি কৃষ্ণবর্ণের ছায়া আবির্ভূত হইল। সকলে দেখিল, তিনখানি জাহাজ বন্দরের মধ্যে প্রবেশ করিতেছে।

    তখন, জাহাজ কোথা হইতে আসিয়াছে, কাহার জাহাজ— ইহা লইয়া ঘাটের দর্শকদিগের মধ্যে তর্ক চলিতে লাগিল। কেহ বলিল, আরবী জাহাজ, কেহ বলিল, চীনা; কিন্তু অন্ধকার ঘনাইয়া আসিতেছিল— কোন্ দেশীয় জাহাজ, নিশ্চয়রূপে কিছু বুঝা গেল না।

    মির্জা দাউদ ঘাটে ছিলেন। তিনি বহুক্ষণ একদৃষ্টে সেই জাহাজ তিনটির প্রতি চাহিয়া রহিলেন। ক্রমে তাঁহার মুখে উদ্বেগের চিহ্ন দেখা দিল। তিনি অস্ফুটস্বরে কহিলেন, ‘পোর্তুগীজ জাহাজ!— কিন্তু ফিরিঙ্গী কোন্ পথে আসিল?’

    তারপর গগনপ্রান্তে দিবা-দীপ্তি নিবিয়া যাইবার সঙ্গে সঙ্গে তিনটি জীর্ণ সিন্ধুবিধ্বস্ত ক্ষুদ্র পোত ছিন্ন পাল নামাইয়া কালিকটের বন্দরে আসিয়া ভিড়িল।

    পরদিন প্রভাতে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মির্জা দাউদ বন্দরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন, কয়েকজন বিদেশীকে ঘিরিয়া ভারি ভিড় জমিয়া গিয়াছে। ফিরিঙ্গীগণ অপরিচিত ভাষায় কি বলিতেছে, কেহই বুঝিতেছে না এবং প্রত্যুত্তরে নানা দেশীয় ভাষায় তাহাদের প্রশ্ন করিতেছে। মির্জা দাউদ ভিড় ঠেলিয়া তাহাদের সম্মুখীন হইলেন। তাঁহাকে আসিতে দেখিয়া সকলে সসম্মানে পথ ছাড়িয়া দিল।

    আগন্তুকদিগের মধ্যে একজন বলিল, ‘এখানে পোর্তুগীজ ভাষা বুঝে, এমন কেহ কি নাই? আমি জামোরিনের সহিত সাক্ষাৎ করিতে চাই— দোভাষী খুঁজিতেছি।’

    মির্জা দাউদ দেখিলেন, বক্তা শালপ্রাংশু বিশালদেহ এক পুরুষ। তপ্ত কাঞ্চনের ন্যায় বর্ণ, দীর্ঘ স্বর্ণাভ কেশ এবং হ্রস্ব সূচ্যগ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডল। ঊর্ধ্বাঙ্গে সোনার জরির কাজ-করা অতি মূল্যবান মখমলের অঙ্গরক্ষা, কটি হইতে জানু পর্যন্ত ঐ মখমলের জাঙিয়া এবং জানু হইতে নিম্নে পদদ্বয় চর্মনির্মিত খাপে আবৃত। মস্তকে টুপির উপর কঙ্কপত্র বক্রভাবে অবস্থিত; এই পুরুষের সহিত অন্য পাঁচ-ছয় জন যাহারা রহিয়াছে, তাহারাও প্রায় অনুরূপ বেশধারী। সকলের কটিবন্ধে তরবারি।

    মির্জা দাউদ এই প্রধান পুরুষের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিয়া গভীরস্বরে কহিলেন, “আমি পোর্তুগীজ ভাষা বুঝি।”

    নবাগত কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে মির্জা দাউদের মুখের প্রতি চাহিয়া রহিল।  তাহার মুখ অন্ধকার হইল। সে ধীরে ধীরে কহিল, ‘তুমি দেখিতেছি মূর!’

    এই তিনটি শব্দের অন্তর্নিহিত যে সুতীক্ষ্ণ ঘৃণা, তাহা মীর্জা দাউদকে বিদ্ধ করিল। তিনিও মনোগত বিদ্বেষ গোপন করিবার চেষ্টা না করিয়া কহিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি মূর। তোমরা দেখিতেছি পোর্তুগীজ— জলদস্যু; তোমাদের সহিত পরিচয় আমার প্রথম নহে, কিন্তু ফিরিঙ্গীর সঙ্গে আমাদের সদ্ভাব নাই।’

    এতক্ষণে দ্বিতীয় একজন পোর্তুগীজ কথা কহিল। তাহার বয়স অল্প, উদ্ধতকণ্ঠে বলিল, ‘মূর-কুক্কুরের সহিত আমরা সদ্ভাব রাখি না— মূরের উচ্ছেদ করাই আমাদের ধর্ম।’

    নিমেষমধ্যে মির্জা দাউদের কটি হইতে ছুরিকা বাহির হইয়া আসিল, দুই চক্ষু জ্বলিয়া উঠিল; কিন্তু পরক্ষণেই আগন্তুকদিগের প্রধান ব্যক্তি হাত তুলিয়া তাহাকে নিরস্ত করিল। বিনীতস্বরে কহিল, ‘মহাশয়, আমার এই স্পর্ধিত সঙ্গীকে ক্ষমা করুন। আপনি মূর এবং আমরা পোর্তুগীজ বটে; কিন্তু আমরা উভয়েই ব্যবসায়ী, জলদস্যু নহি। অন্যত্র যাহাই হোক্, এখানে আমার সহিত আপনাদের বিবাদ নাই। বরঞ্চ আপনার হৃদ্যতা লাভ করিলেই আমরা কৃতার্থ হইব।’ তারপর নিজ সঙ্গীর দিকে ফিরিয়া বলিল, ‘পেড্রো, আর কখনও যদি তোমার মুখে এরূপ কথা শুনিতে পাই, তোমার প্রত্যেক অস্থি চাকায় ভাঙিয়া তারপর ডালকুত্তা দিয়া খাওয়াইব।’

    ভয়ে পেড্রোর মুখ পীতবর্ণ হইয়া গেল। কিন্তু তথাপি সে কম্পিত বিদ্রোহের কণ্ঠে কহিল, ‘আমি সত্য কথা বলিতে ভয় করি না। মূরমাত্রেই আমাদের ঘৃণার পাত্র। আপনি নিজেও তো মূরকে—’

    তাহার কথা শেষ হইবার পূর্বেই প্রথম ব্যক্তি বিদ্যুতের মতো দুই হাত বাড়াইয়া তাহার কণ্ঠ চাপিয়া ধরিল। বজ্রমুষ্টিতে নিঃশব্দে কিছুক্ষণ তাহার কণ্ঠনালী চাপিয়া থাকিবার পর ছাড়িয়া দিতেই পেড্রো হতজ্ঞান হইয়া মাটিতে পড়িয়া গেল। তাহার প্রতি আর দৃক‌্‌পাত না করিয়া প্রথম ব্যক্তি মির্জা দাউদের দিকে ফিরিয়া ঈষৎ হাস্যে কহিল, ‘মিথ্যাবাদীর দণ্ডদান ধার্মিকের কর্তব্য। এখন দয়া করিয়া আমার সহিত জামোরিনের নিকট গিয়া আমার নিবেদন তাঁহাকে বুঝাইয়া দিলে আপনার নিকট চিরকৃতজ্ঞ রহিব।’— বলিয়া মাথার টুপি খুলিয়া আভূমি লুণ্ঠিত করিয়া অভিবাদন করিল। দর্শকবৃন্দ— যাহারা পোর্তুগীজ ভাষা বুঝিল না, তাহারা অবাক্ হইয়া এই দুর্বোধ্য অভিনয় দেখিতে লাগিল।

    মির্জা দাউদ আগন্তুকের মিষ্ট বাক্যে ভুলিলেন না, অটল হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। শেষে ধীরে ধীরে কহিলেন, ‘ফিরিঙ্গী, তুমি অতি ধূর্ত। কি জন্য সামরীর রাজ্যে আসিয়াছ, সত্য বল।’

    ‘বাণিজ্য করিতে।’

    ‘খ্রীস্টান, আমি তোমাদের চিনি। কলহ তোমাদের ব্যবসায়, লোভ তোমাদের ধর্ম, পরশ্রীকাতরতা তোমাদের স্বভাব। এ রাজ্যে কলহ-বিদ্বেষ নাই— হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান, হিব্রু নির্বিবাদে শান্তিতে ব্যবসায়-বাণিজ্য করিতেছে। সত্য বল, তোমরা কি উদ্দেশ্যে এই হিন্দে পদার্পণ করিয়াছ?’

    ফিরিঙ্গীর মুখ রক্তহীন হইয়া গেল। শুধু তাহার চক্ষুযুগল জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো নিষ্ফল ক্রোধ ও হিংসা বিকীর্ণ করিতে লাগিল; কিন্তু পরক্ষণেই আপনাকে সংবরণ করিয়া সে কণ্ঠবিলম্বিত সুবর্ণ-ক্রুশ হস্তে তুলিয়া বলিল, ‘এই ক্রুশ স্পর্শ করিয়া সত্য করিতেছি— সকলের সহিত সদ্ভাব রাখিয়া বাণিজ্য করা ব্যতীত আমাদের আর অন্য উদ্দেশ্য নাই।’

    ক্ষণকাল নিঃশব্দে তাহার মুখের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিয়া মির্জা দাউদ কহিলেন, ‘তোমার কথা বিশ্বাস করিলাম। চল, সামরীর প্রাসাদে তোমাদের লইয়া যাই।’

    তখন বিদেশীরা মির্জা দাউদের অনুসরণ করিয়া রাজপ্রাসাদ অভিমুখে চলিল। পেড্রোর সংজ্ঞাহীন দেহ ঘাটের পাথরের উপর মৃতবৎ পড়িয়া রহিল।

    প্রাসাদে উপস্থিত হইয়া সামরীর সম্মুখে নতজানু হইয়া তাঁহার বস্ত্রপ্রান্ত চুম্বন করিয়া পোর্তুগীজ বণিকদিগের অধিনায়ক বলিল, ‘আমার নাম ভাস্কো-ডা-গামা— আমি পোর্তুগালের রাজদূত। আপনার নিকট কালিকটে বাণিজ্য করিবার অনুমতি প্রার্থনা করিতেছি।’ এই বলিয়া পোর্তুগাল-রাজ-প্রেরিত মহার্ঘ উপঢৌকন সকল সামরীর সম্মুখে স্থাপন করিতে সঙ্গীগণকে ইঙ্গিত করিল।

    মুখে যাহাই বলুন, সন্দেহ এবং অবিশ্বাস মির্জা দাউদের অন্তর হইতে দূর হইল না। তিনি ফিরিঙ্গীকে পূর্ব হইতেই চিনিতেন— মূরমাত্রেই চিনিত। স্বদেশে বহু সংঘর্ষের ভিতর দিয়া এই পরিচয় ঘনিষ্ঠ হইয়াছিল। তাহারা জনিত যে, ফিরিঙ্গী অতিশয় অর্থলিপ্সু ও ভোগলুব্ধ। ইহাদের জন্মভূমি অর্থপ্রসূ নহে; তাই অন্নের জন্য ইহাদিগকে দৈহিক ও মানসিক কঠোরতার মধ্যে জীবনযাপন করিতে হয় বটে, কিন্তু এই জন্যই ইহারা অপেক্ষাকৃত ধনী মুসলমানদিগকে অত্যন্ত ঈর্ষা করে। পরের উন্নতি ইহাদের চক্ষুশূল। কোথাও একবার ধনরত্ন-ঐশ্বর্যের সন্ধান পাইলে ইহাদের লালসা ও ক্ষুধা এত উগ্র, নির্মম হইয়া উঠে যে, কোনও মতে সেখানে প্রবেশ লাভ করিয়া নিজেকে একবার ভালরূপে প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিলে শত্রুমিত্রনির্বিচারে সকলের উপর দুর্বিনীত বাহুবল, স্পর্ধা ও জুলুম প্রকাশ করিতে থাকে। ইহারা নিরতিশয় কলহপ্রিয় ও যুদ্ধনিপুণ। স্বার্থরক্ষার জন্য এমন কাজ নাই যাহা ইহারা পারে না এবং স্বজাতির স্বার্থবর্ধনের জন্য প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করিতে ইহারা তিলমাত্র কুণ্ঠিত নহে।

    পোর্তুগাল হইতে সমুদ্রপথে আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করিয়া আজ পর্যন্ত কেহ ভারতবর্ষে আসে নাই, এ পথ এতদিন অজ্ঞাত ছিল। ভাস্কো-ডা-গামা সেই পথ ইউরোপীয়দের জন্য উন্মুক্ত করিয়া দিয়া বহু নূতন সম্ভাবনা ও দুর্ভাবনার সৃষ্টি করিল। সম্প্রতি ভাস্কো-ডা-গামার উদ্দেশ্যও নিশ্চয়ভাবে বুঝা যায় না। অথচ উদ্ধত ও কটুভাষী পেড্রোর কণ্ঠরোধ করিয়া সে যে একটা গূঢ় অভিপ্রায় গোপন করিয়া গেল, তাহাও বুঝিতে মির্জা দাউদের বিলম্ব হইল না। শঙ্কা ও সংশয়ের মেঘে তাঁহার মন আচ্ছন্ন হইয়া রহিল।

    পোর্তুগীজগণ কালিকটে বাস করিতে লাগিল এবং দিন দিন নূতন পণ্যে তরণী পূর্ণ করিতে লাগিল। অতি অপদার্থ পণ্য দ্বিগুণ চতুর্গুণ মূল্য দিয়া কিনিতে লাগিল। ইহাতে নির্বোধ ব্যবসায়ীরা যতই উৎফুল্ল হউন না কেন, মির্জা দাউদের ন্যায় বহুদর্শী শ্রেষ্ঠীদের মনে সন্দেহ ততই ঘনীভূত হইয়া উঠিল। উচিত মূল্যের অধিক মূল্য দিয়া পণ্য ক্রয় করা ব্যবসায়ীর স্বভাব নহে, অথচ নবাগতরা অব্যবসায়ী বা নির্বোধ নহে। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য ছিলমাত্র, অন্য কোনও দুরভিসন্ধি তাহাদের অন্তরে প্রচ্ছন্ন আছে, ইহা অনুমান করিয়া বিচক্ষণ ব্যবসায়ীদের চিন্তা ও উৎকণ্ঠার অবধি রহিল না।

    এইরূপে কিছুকাল বিগত হইল। কালিকটের জীবনপ্রবাহ পূর্ববৎ প্রশান্তভাবে চলিতে লাগিল।

    একদিন শরৎকালে মেঘমার্জিত আকাশে শুভ্র পাল উড়াইয়া দুইটি জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করিল। সঙ্গে সঙ্গে নগরে রাষ্ট্র হইয়া গেল যে, বঙ্গদেশ হইতে প্রভাকর শ্রেষ্ঠীর নৌকা আসিতেছে। প্রভাকর শেঠ অতি প্রসিদ্ধ বণিক— প্রতি বৎসর এই সময় লক্ষাধিক মুদ্রার বস্ত্রাদি পণ্য বহন করিয়া  তাহার তরণী কালিকটে উপস্থিত হয়। কাশ্মীরের শাল, বারাণসীর চেলি, কৌশেয় পট্ট, বাংলার মলমল কিনিবার জন্য কালিকটে সওদাগর সমাজে হুড়াহুড়ি পড়িয়া যায়। এত সুন্দর এবং এত মূল্যবান বস্ত্র কেহই আনিতে পারে না, সেজন্য প্রভাকরের এত খ্যাতি।

    প্রভাকরের নৌকা ঘাটে লাগিবার পূর্বেই নগরের বড় বড় ব্যবসায়ীরা ঘাটে সমবেত হইয়াছিলেন। প্রভাকর নৌকার উপর দাঁড়াইয়া পরিচিত সকলকে নমস্কার-সম্ভাষণাদি করিতে লাগিল। সে অতিশয় বাক‌্‌পটু ও রহস্যপ্রিয়, এজন্য সকলেই তাহাকে ভালবাসিত।

    হিব্রু মুশা ইব্রাহিম তাহাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘প্রভাকর, এবার তোমার দেরি দেখিয়া আমরা ভাবিয়ছিলাম, বুঝি আর আসিলে না— পথে তোমাদের সুন্দরবনের কুমীর তোমাকে পেটে পুরিয়াছে।’

    প্রভাকর হাসিয়া বলিল, ‘মুশা সাহেব, পেটে পুরিলেও কুমীর আমাকে হজম করিতে পারিত না!— এই যে মির্জা সাহেব! আদাব আদাব— শরীর-গতিক সব ভালো তো? এবার আপনার ফরমাশী জিনিস সমস্ত আনিয়াছি, কত লইতে পারেন দেখিব। আপনার কোমরে তলোয়ারখানি নূতন দেখিতেছি, ডামাস্কাসের বুঝি? আমার কিন্তু এক জোড়া চাই— গৌড়েশ্বরের কাছে বাক্যদত্ত হইয়া আছি। ভালো কথা, পথে আসিতে শ্রীখণ্ডের নিকট আপনার যবদ্বীপ-যাত্রী জাহাজের সঙ্গে দেখা হইয়াছিল— খবর সব ভালো। — হায়দর মুস্তফা যে, ইতিমধ্যে কয়টি সাদি করিলেন? এবার কিন্তু ইস্পাহানী আঙ্গুরের রস না খাওয়াইলে বড়ই অন্যায় হইবে। — জাম্বো, শাঁখালুর মতো দাঁত বাহির করিয়া হাসিস না— দড়িটা ধর্।’

    নৌকা বাঁধা হইলে প্রভাকর ঘাটে নামিয়া সকলের সহিত আলিঙ্গনাদি করিল। তখন মির্জা দাউদ জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘প্রভাকর, কি কি সওদা আনিলে?’

    প্রভাকর বলিল, ‘এবার যে মলমল আনিয়াছি, মির্জা সাহেব, তেমন মলমল আজ পর্যন্ত কখনও চোখে দেখেন নাই। মাকড়শার জালের চেয়েও নরম, কাশফুলের চেয়েও হালকা— মুঠির মধ্যে দেড়শ গজ কাপড় ধরা যায়। কিন্তু এক থান কাপড়ের দাম পাঁচ তোলা সোনা, তার কমে দিতে পারিব না। কোচিনে চার তোলা পর্যন্ত দিতে চাহিয়াছিল— আমি লই নাই। শেষে কি লোকসান দিয়া ঘরে ফিরিব। শেঠনী তাহা হইলে আমার মুখ দেখিবে না।’

    মির্জা দাউদ হাসিয়া বলিলেন, ‘তা না দেখুক। তোমার মুখ না দেখিলেও শেঠনীর কোনও লোকসান হইবে না। — এখন তোমার সওদা দেখাও।’

    প্রভাকর বলিল, ‘বলেন কি মির্জা সাহেব, লোকসান হইবে না? শেঠনীর এখন যৌবনকাল, কাঁচা বয়স; এখন স্বামীর মুখদর্শন না করিলে জীবন-যৌবন সমস্তই লোকসান হইয়া যাইবে যে!— ভালো কথা, গতবারে শুনিয়াছিলাম, আপনার বিবি-সাহেবা নাকি অসুস্থ। তা কোনও শুভ সংবাদ আছে নাকি?’

    মির্জা দাউদ বলিলেন, ‘খোদার দয়ায় একটি মেয়ে হইয়াছে—’

    প্রভাকর বলিল, ‘এত বড় আনন্দের সংবাদ এতক্ষণ চাপিয়া রাখিয়াছিলেন! আমাদের দেশে বলে, মেয়ে হইলে পিতার পরমায়ু বৃদ্ধি হয়। তাহা হইলে আজ রাত্রে আপনার দৌলতখানায় আমার নিমন্ত্রণ রহিল। দেশে কুক্কুটাদি ভোজনের সুবিধা হয় না— দুষ্প্রাপ্যও বটে, আর ব্রাহ্মণগুলো বড়ই গণ্ডগোল করে। — ও বাবা! এটি আবার কে, মির্জা সাহেব? এ রকম পোশাক-পরিচ্ছদ তো কখনও দেখি নাই। ইহারা কোথা হইতে আসিল?’

    মির্জা দাউদ ফিরিয়া দেখিলেন, ভাস্কো-ডা-গামা দুই জন সহচর সঙ্গে সেই দিকে আসিতেছে। ইতিমধ্যে কালিকটের পথে-ঘাটে দুই জনের দেখা-সাক্ষাৎ ঘটিয়াছিল বটে, কিন্তু কোন পক্ষেই সৌহার্দ্য বর্ধনের আগ্রহ দেখা যায় নাই। বরঞ্চ উভয়ে উভয়কে যথাসম্ভব এড়াইয়া চলিয়াছেন।

    প্রভাকরের প্রশ্নের উত্তরে মির্জা দাউদ কহিলেন, ‘ইহারা পোর্তুগীজ। ক্রমে পরিচয় পাইবে।’

    ইত্যবসরে প্রভাকরের নৌকা হইতে পণ্যসামগ্রী সকল পরিদর্শনের জন্য ঘাটে নামানো হইতেছিল। সওদাগরেরা ভিড় করিয়া তাহাই দেখিতেছিলেন। মির্জা দাউদও সেই সঙ্গে যোগ দিলেন। অন্য দিক হইতে ভাস্কো-ডা-গামাও আসিয়া মিলিত হইল।

    মলমলের নমুনা দেখিয়া মির্জা দাউদ কহিলেন, ‘অতি উৎকৃষ্ট মলমল। প্রভাকর, এ জিনিস কত আনিয়াছ?’

    প্রভাকর সগর্বে বলিল, ‘পুরা এক জাহাজ।’

    দাউদ কহিলেন, ‘ভালো, আমি এক জাহাজই লইলাম। দর-দামের কথা আজ রাত্রে স্থির হইবে।’

    ভাস্কো-ডা-গামা এরূপ অপূর্ব সূক্ষ্ম মলমল পূর্বে কখনও দেখে নাই। বস্তুত, এত মহার্ঘ মলমল পারস্য দেশ ভিন্ন অন্য কোথাও যাইত না। পোর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্স প্রভৃতি পাশ্চাত্যদেশে যাহা যাইত, তাহা অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট শ্রেণীর মলমল। ডা-গামার অন্তর লুব্ধ হইয়া উঠিল। পোপ এবং রাজা ইম্যানুয়েলকে নজর দিতে হইলে ইহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট বস্তু আর কি আছে? সে বলিল, ‘এ মলমল আমি কিনিব।’

    মির্জা দাউদ হাসিয়া বলিলেন, ‘আর উপায় নাই। এই মলমল আমি কিনিয়াছি।’

    ডা-গামা প্রভাকরের দিকে ফিরিয়া বলিল, ‘আমি অধিক মূল্য দিব।’

    মির্জা দাউদ কহিলেন, ‘অধিক মূল্য দিলেও পাইবে না— এ মলমল এখন আমার।’

    ডা-গামা সেদিকে কর্ণপাত না করিয়া প্রভাকরকে লক্ষ্য করিয়া কহিল, ‘আমি দ্বিগুণ মূল্য দিব।’

    মির্জা দাউদ বিরক্ত হইয়া বলিলেন, ‘শতগুণ দিলেও আর পাইবে না।’

    ডা-গামা বিদ্যুদ‌্‌বেগে মির্জা দাউদের দিকে ফিরিল। কর্কশকণ্ঠে কহিল, ‘মূর, চুপ কর্— আমি মালের মালিকের সহিত কথা কহিতেছি।’

    প্রভাকর বুদ্ধিমান, মির্জা দাউদ  তাহার পুরাতন খরিদ্দার, অথচ এই ব্যক্তিকে সে চেনেও না। সে বলিল, ‘উনিই এখন মালের মালিক, আমি কেহ নই। উনি যদি আপনাকে বিক্রয় করিতে ইচ্ছা করেন, করিতে পারেন।’

    ডা-গামার অশিষ্ট কথায় কিন্তু মির্জা দাউদের মুখ ক্রোধে কৃষ্ণবর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল। তিনি তিক্তকণ্ঠে কহিলেন, ‘ডা-গামা, পূর্বেও বুঝিয়াছিলাম, কিন্তু আজ তোর প্রকৃত স্বরূপ ধরা পড়িল। ব্যবসায় তোর ভান মাত্র, তুই তস্কর। নচেৎ অনুচিত মূল্য দিয়া বাণিজ্য নষ্ট করিবি কেন?’

    আহত ব্যাঘ্রের মতো গর্জন করিয়া ভাস্কো-ডা-গামা নিজ কটি হইতে তরবারি বাহির করিল। দন্তে দন্ত ঘর্ষণ করিয়া ক্রোধকষায়িত নেত্রে কহিল, ‘স্পর্ধিত মূর, আজ তোর রক্তে তরবারির কলঙ্ক ধৌত করিব।’

    মির্জা দাউদও তরবারি নিষ্কোষিত করিয়া কহিলেন, ‘বর্বর ফিরিঙ্গী, আজ তোকে জাহান্নামে পাঠাইব।’

    মুহূর্তমধ্যে ব্যগ্র জনতা চতুর্দিকে সরিয়া গিয়া মধ্যে বৃত্তাকৃতি স্থান যুযুৎসুদের জন্য ছাড়িয়া দিল। শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হইলেও এরূপ ব্যাপার কালিকটে একান্ত বিরল নহে। কলহ যখন তরবারি পর্যন্ত পৌঁছায়, তখন তাহা ভঞ্জন করিবার প্রয়াস যে শুধু নিষ্ফল নহে, অত্যন্ত বিপজ্জনক, তাহা কাহারও অবিদিত ছিল না। তাই সকলে সরিয়া দাঁড়াইয়া অস্ত্রদ্বারা উভয়পক্ষকে বিবাদের মীমাংসা করিবার সুবিধা করিয়া দিল।

    ভাস্কো-ডা-গামা ও মির্জা দাউদ প্রথম দৃষ্টি-বিনিময়েই পরস্পরকে যে বিষদৃষ্টিতে দেখিয়াছিলেন, সেই বিষ উভয়ের অন্তরে সঞ্চিত হইয়া আজ সামান্য সূত্র ধরিয়া দুর্নিবার বিরোধরূপে আত্মপ্রকাশ করিল। এ কলহ যে একজন না মরিলে নিবৃত্ত হইবে না, তাহা উভয়েই মনে মনে বুঝিলেন।

    নিস্তব্ধ জনতার কেন্দ্রস্থলে অসিধারী দুই জন দাঁড়াইলেন। ভাস্কো-ডা-গামা বিশালকায়, প্রস্তরের মতো কঠিন, হস্তীর মতো বলশালী। মির্জা দাউদ অপেক্ষাকৃত কৃশ ও খর্ব; কিন্তু বিষধর কালসর্পের মতো ক্ষিপ্র, তেজস্বী ও প্রাণসার। ভাস্কো-ডা-গামার তরবারি বেত্রবৎ ঋজু, তীক্ষ্ণাগ্র; মির্জা দাউদের তরবারি ঈষৎ বক্র ও ক্ষুরধার। নগ্ন কৃপাণহস্তে ক্ষণকালের জন্য দুই জন পরস্পরকে নিরীক্ষণ করিয়া লইলেন। তারপর ঝড়ের মতো তরবারিকে অগ্রবর্তী করিয়া ভাস্কো-ডা-গামা আক্রমণ করিল।

    কিন্তু ডা-গামার তরবারি মির্জা দাউদের অঙ্গ স্পর্শ করিবার পূর্বেই তিনি ক্ষিপ্রহস্তে নিজ তরবারি দ্বারা তাহা অপসারিত করিয়া সরিয়া দাঁড়াইলেন এবং পরক্ষণেই তাঁহার বক্র অসি বিদ্যুতের মতো একবার ডা-গামার জানু দংশন করিয়া ফিরিয়া আসিল। ডা-গামা পিছু হটিয়া আত্মরক্ষা করিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল না। তাহার জানুর চর্মাবরণ ধীরে ধীরে রক্তে ভিজিয়া উঠিল।

    ডা-গামা সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করিল না; কিন্তু সাবধান হইল। সংযত ও সতর্কভাবে অসিচালনা করিতে লাগিল। সে বুঝিল যে, বিপক্ষকে অবজ্ঞা করিলে চলিবে না। মির্জা দাউদের অসি-কৌশল অসাধারণ, তাঁহার সম্মুখে দ্বিতীয়বার ভুল করিলে আর তাহা সংশোধনের অবকাশ থাকিবে না।

    এদিকে মির্জা দাউদও বুঝিলেন যে, ডা-গামা অসি-কৌশলে তাঁহার সমতুল্য, কিন্তু তাঁহার অপেক্ষা দ্বিগুণ বলশালী। আবার সে তাঁহার মতো ক্ষিপ্রগামী ও লঘুদেহ নয় বটে, কিন্তু তরবারি ঋজু এবং দীর্ঘ— মির্জা দাউদের তরবারি বক্র এবং খর্ব। তাঁহাদের যুদ্ধরীতিও সম্পূর্ণ পৃথক। এ ক্ষেত্রে, মির্জা দাউদ দেখিলেন, ডা-গামার জয়ের সম্ভাবনাই অধিক। মির্জা দাউদ অত্যন্ত সাবধানে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন।

    সর্প ও নকুলের যুদ্ধে যেমন উভয়ে উভয়ের চক্ষুতে চক্ষু নিবদ্ধ রাখিয়া পরস্পরকে প্রদক্ষিণ করিতে থাকে এবং সুযোগ পাইবামাত্র তীরবেগে আক্রমণ করিয়া আবার স্বস্থানে ফিরিয়া আসে, ডা-গামা ও মির্জা দাউদও সেইরূপে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। অস্ত্রে অস্ত্রে প্রতিরুদ্ধ হইয়া মুহুর্মুহুঃ ঝনৎকার উঠিতে লাগিল, চঞ্চল অসিফলকে সূর্যকিরণ পড়িয়া তড়িৎরেখার মতো জ্বলিয়া উঠিতে লাগিল। নিস্পন্দ জনব্যূহ সহস্রচক্ষু হইয়া এই অদ্ভুত যুদ্ধ দেখিতে লাগিল।

    যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে মির্জা দাউদ বাক্যশূলে ডা-গামাকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন, ‘ফিরিঙ্গী দস্যু, চাহিয়া দেখ, তোর রক্ত মানুষের রক্তের মতো লাল নয়, শয়তানের মতো নীল! খ্রীস্টান কুত্তা, এখনও ক্ষমা প্রার্থনা কর্— তোর প্রাণ ভিক্ষা দিব।’

    ডা-গামা কোনও উত্তর না দিয়া নিঃশব্দে যুদ্ধ করিতে লাগিল। শ্লেষ করিয়া মির্জা দাউদ যে  তাহার ধৈর্যচ্যুতি ঘটাইবার চেষ্টা করিতেছেন, চতুর ডা-গামা তাহা বুঝিয়াছিল।

    যুদ্ধ ক্রমে আরও প্রখর ও তীব্র হইয়া উঠিল। দুই যোদ্ধারই ঘন ঘন শ্বাস বহিল। সর্বাঙ্গে ঘাম ঝরিতে লাগিল; কিন্তু উভয়েই যেন এক অদৃশ্য বর্মে আচ্ছাদিত। ডা-গামার তরবারি বার বার মির্জা দাউদের কণ্ঠের নিকট হইতে, বক্ষের নিকট হইতে ব্যর্থ হইয়া ফিরিয়া গেল, মির্জা দাউদের অসি ডা-গামাকে ঘিরিয়া এক ঝাঁক ক্রুদ্ধ মৌমাছির মতো গুঞ্জন করিয়া ফিরিতে লাগিল, কিন্তু কোথাও হুল ফুটাইতে পারিল না।

    সহসা এক সময় ডা-গামা সভয়ে দেখিল যে, সে ঘুরিতে ঘুরিতে একেবারে ঘাটের কিনারায় আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, আর এক পা পিছাইলেই সমুদ্রের  জলে পড়িয়া যাইবে। মির্জা দাউদ তাহার মুখের ভাব দেখিয়া উচ্চহাস্য করিয়া উঠিলেন। বিদ্রূপ-বিষাক্ত কণ্ঠে কহিলেন, ‘ফিরিঙ্গী, আজ তোকে ঐ সমুদ্রের জলে চুবাইব। তারপর মরা ইঁদুরের মতো তোর রাজা ইম্যানুয়েলের কাছে তোকে বকশিশ পাঠাইয়া দিব।’

    এতক্ষণে মির্জা দাউদ যাহা চাহিতেছিলেন তাহাই হইল— ভাস্কো-ডা-গামা ধৈর্য হারাইল। উন্মত্ত বন্যমহিষের মতো গর্জন করিয়া অসি ঊর্ধ্বে উত্তোলন করিয়া সে মির্জা দাউদকে আক্রমণ করিল। ইচ্ছা করিলে মির্জা দাউদ অনায়াসে ডা-গামাকে বধ করইতে পারিতেন; কিন্তু তাহা না করিয়া তিনি উল্টা পিঠ দিয়া ডা-গামার দক্ষিণ মুস্তিতে দারুণ আঘাত সঙ্গে সঙ্গে তাহার তরবারি হস্তমুক্ত হইয়া ঊর্ধ্বে উৎক্ষিপ্ত হইয়া দূরে গিয়া পড়িল। অকস্মাৎ অস্ত্রহীন হইয়া ডা-গামা থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল।

    ডা-গামার দুই জন সহচর এতক্ষণ সকলের সঙ্গে দাঁড়াইয়া যুদ্ধ দেখিতেছিল। প্রভুর অপ্রত্যাশিত বিপৎপাতে তাহারা সাহায্য করিতে অগ্রসর হইল। কিন্তু দুই পদ অগ্রসর হইবার পূর্বেই, অতি বিশাল-কলেবর নিকষকৃষ্ণ হাবসী জাম্বো মাস্তুলের ন্যায় দুই হস্ত বাহির করিয়া তাহাদের কেশ ধরিয়া ফিরাইয়া আনিল এবং নিরতিশয় শুভ্র দুইপাটি দন্ত বিনিষ্ক্রান্ত করিয়া যাহা বলিল, তাহার একটি বর্ণও তাহারা বুঝিতে না পারিলেও জাম্বোর মনোগত অভিপ্রায় অনুধাবন করিতে তাহাদের বিন্দুমাত্র ক্লেশ হইল না।

    মির্জা দাউদ তরবারির ধার ডা-গামার কণ্ঠে স্থাপন করিয়া কহিলেন, ‘ডা-গামা, নতজানু হ, নহিলে তোকে বধ করিব।’

    ডা-গামা নতজানু হইল না— বাহুদ্বয়ে বক্ষ নিবদ্ধ করিয়া বিকৃতমুখে হাস্য করিয়া কহিল, ‘মূর, নিরস্ত্রকে হত্যা করা তোদের স্বভাব বটে।’

    মির্জা দাউদ কিয়ৎকাল চিন্তা করিয়া কহিলেন, ‘ভালো, তোকে ছাড়িয়া দিব— কিন্তু প্রতিজ্ঞা কর্—’

    ডা-গামা কহিল, ‘আমি কোনও প্রতিজ্ঞা করিব না, তোর যাহা ইচ্ছা কর্।’

    মির্জা দাউদ বলিলেন, ‘শপথ কর্ যে, আজ হইতে সপ্তাহমধ্যে সদলবলে এ দেশ ছাড়িয়া যাইবি, আর কখনও ফিরিবি না।’

    ডা-গামা উচ্চহাস্য করিয়া উঠিল, কহিল, ‘মূর, তুই অতি নির্বোধ! আমি শপথ করিব না, আমাকে বধ কর্। আমার রক্তে কালিকটের মাটি ভিজিলে হিন্দে ইম্যানুয়েলের জয়ধ্বজা সহজে রোপিত হইবে।’

    মির্জা দাউদ হাস্য করিয়া কহিলেন, ‘এতদিনে নিজ মুখে নিজের অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলি! কিন্তু তাহা হইতে দিব না। ইম্যানুয়েলের জয়ধ্বজা কালিকটে রোপিত হইবে না। কালিকট চিরদিন পৃথিবীর সমস্ত জাতির মিলনক্ষেত্র হইয়া থাকিবে। প্রতিজ্ঞা কর্, নচেৎ—’

    ডা-গামা ভ্রূকুটি করিয়া কহিল, ‘নচেৎ?’

    ‘নচেৎ পোর্তুগালে ফিরিয়া যাইতে একটি প্রাণীও জীবিত রাখিব না। তোদের জাহাজ পুড়াইয়া এই একশত ত্রিশ জন লোককে কাটিয়া সমুদ্রের জলে ভাসাইয়া দিব।’

    ডা-গামা স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। কোনও উত্তর দিল না।

    মির্জা দাউদ পুনশ্চ কহিলেন, ‘ডা-গামা, এখনও শপথ কর্— তোর ধর্মের উপর বিশ্বাস করিয়া ছাড়িয়া দিব। — ভাবিয়া দেখ, তোরা মরিলে কে তোর দেশবাসী ভিক্ষুকদের পথ দেখাইয়া লইয়া আসিবে?’

    ডা-গামা অবরুদ্ধ কণ্ঠে কহিল, ‘শপথ করিতেছি—’

    মির্জা দাউদ কহিলেন, ‘তোদের যেশুর জননী মেরীর নামে শপথ কর্।’

    ডা-গামা তখন কম্পিত ক্রোধ-জর্জরিত কণ্ঠে শপথ করিল যে, সপ্তাহমধ্যে এদেশ ছাড়িয়া চলিয়া যাইবে এবং আর কখনও ভারতভূমির উপর পদার্পণ করিবে না।

    ডা-গামাকে ছাড়িয়া দিয়া মির্জা দাউদ ও আরও প্রধান প্রধান নাগরিকগণ সামরীর সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। সমস্ত বিবরণ আদ্যোপান্ত শুনিয়া সামরী কহিলেন, ‘যত দিন উহারা আমার রাজ্যের কোনও প্রকাশ্য অনিষ্ট না করিতেছে, ততদিন শুধু সন্দেহের উপর নির্ভর করিয়া আমি উহাদিগকে রাজ্য হইতে বিতাড়িত করিতে পারি না। তবে কেহ যদি তোমাদের ব্যক্তিগত অনিষ্ট করিয়া থাকে, তোমরা প্রতিশোধ লইতে পার, আমি বাধা দিব না।’

    সকলে সামরীকে বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন যে, ইহারা অত্যন্ত কূটবুদ্ধি ও যুদ্ধনিপুণ, তাহাদের কামান, বন্দুক, গোলাগুলি আছে; সুযোগ পাইলেই তাহারা বাহুবলে এই সোনার রাজ্য অপূর্ব অমরাবতী গ্রাস করিবে।

    সামরী হাসিয়া উত্তর করিলেন, ‘আমার সৈন্যবল নাই সত্য, কিন্তু সামরীবংশ পঞ্চদশ শতাব্দী ধরিয়া এই মসলন্দে রাজত্ব করিতেছে— কেহ তাহাকে রাজ্যভ্রষ্ট করে নাই। আমার সিংহাসন সুশাসন ও জনপ্রিয়তার উপর প্রতিষ্ঠিত। উহারা আমার কি করিতে পারে?’

    সকলে নিরাশ হইয়া ফিরিয়া গেলেন।

    সপ্তাহ পরে স্বর্ণপত্রে লিখিত সামরীর সন্ধিলিপি মস্তকে ধারণ করিয়া ভাস্কো-ডা-গামা অনুচরসহ জাহাজে উঠিল।

    মির্জা দাউদ বন্দর হইতে ডাকিয়া বলিলেন, ‘ডা-গামা, শপথ স্মরণ রাখিও।’

    একটা ক্রূর হাস্য ডা-গামার মুখের উপর খেলিয়া গেল, মির্জা দাউদের প্রতি স্থিরদৃষ্টি রাখিয়া সে বলিল, ‘মির্জা দাউদ, আবার আমাদের সাক্ষাৎ হইবে।’

    মির্জা দাউদ হাসিয়া উত্তর দিলেন, ‘সম্ভব নয়। আমি মুসলমান— বেহেস্তে যাইব।’

    ডা-গামা দুই চক্ষুতে অগ্নিবর্ষণ করিয়া কহিল, ‘ইহজন্মেই আবার আমাদের সাক্ষাৎ হইবে।’

    তারপর ধীরে ধীরে  তাহার তিনটি জাহাজ বন্দরের বাহির হইয়া গেল।

    চারি বৎসর অতীত হইয়াছে। এই চারি বৎসরে যাহা যাহা ঘটিয়াছে, তাহা এই কাহিনীর অন্তর্গত না হইলেও সংক্ষেপে বর্ণিত হইল। ভাস্কো-ডা-গামা কালিকট ত্যাগ করিবার দুই বৎসর পরে আবার পোর্তুগীজ জাহাজ ভারতবর্ষে আসিল। এবার পোর্তুগীজদের অধিনায়ক আল‌্‌ভারেজ কেব‌্‌লার নামক একজন পাদ্রী এবং তাঁহার অধীনে নয়খানি জাহাজ। পাদ্রী আল‌্‌ভারেজ কালিকট বন্দরে প্রবেশ করিয়াই জাহাজ হইতে নগরের উপর গোলাবর্ষণ আরম্ভ করিলেন। ফলে বহু নাগরিকের প্রাণনাশ হইল, অনেকে আহত হইল এবং কয়েকটি অট্টালিকা চূর্ণ হইয়া গেল। এইরূপে রাজা-প্রজার মনে ভীতি ও কর্তব্যজ্ঞান সঞ্চারিত করিয়া পোর্তুগীজরা আবার ভারতভূমিতে পদার্পণ করিল। রাজা সামরী আগন্তুকদিগকে সম্মান দেখাইলেন ও তাহাদের বাসের জন্য নগরের বাহিরে ভূমিদান করিয়া কুঠি-নির্মাণের অনুমতি দিলেন। কিন্তু পোর্তুগীজদিগের এই অহেতুক জিঘাংসা ও নিষ্ঠুরতায় কালিকটের জনসাধারণের মন তাহাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষে পূর্ণ হইয়া উঠিল।

    তারপর কলহ বাধিতে বিলম্ব হইল না। দাম্ভিক বিদেশীদের প্রতি যাহাদের ব্যক্তিগত বিদ্বেষ জন্মিয়াছিল, তাহারা ঝগড়া বাধাইয়া রক্তপাত করিতে লাগিল। পোর্তুগীজরাও জবাব দিল। ক্রমে ভিতরে বাহিরে আগুন জ্বলিয়া উঠিল। একদিন নাগরিকগণ পোর্তুগীজদের কুঠিতে অগ্নিসংযোগ করিয়া সত্তর জন্য ফিরিঙ্গীকে হত্যা করিল। অবশিষ্ট পলাইয়া জাহাজে উঠিল এবং জাহাজ হইতে গোলা মারিয়া নগরের এক অংশে আগুন লাগাইয়া দিল। তারপর সেই যে তাহারা কালিকট ছাড়িয়া গেল, দুই বৎসরের মধ্যে আর ফিরিয়া আসিল না।

    কালিকটের রাজা-প্রজা নিশ্বাস ফেলিয়া ভাবিল— আপদ দূর হইয়াছে, আর ফিরিবে না।

    শেষোক্ত ঘটনার বৎসরেক পরে মির্জা দাউদ স্ত্রী-কন্যা লইয়া তাঁহার জন্মভূমি মরক্কো দেশে গেলেন। সেখানে কিছু দিন অবস্থানের পর বৃদ্ধ পিতাকে সঙ্গে লইয়া মক্কাশরীফ দর্শন করিলেন। তারপর তীর্থ-দর্শন শেষ করিয়া সকলে মিলিয়া কালিকটে প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন।

    কথা ছিল, মক্কাশরীফ হইতে মির্জা দাউদ কালিকটে আসিবেন, তাঁহার পিতা মরক্কো দেশে ফিরিয়া যাইবেন। কিন্তু পিতা স্থবির ও জরাগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছেন— অধিক দিন পরমায়ু নাই। পুনরায় মরক্কো যাইবার সুযোগ হয়তো শীঘ্র হইবে না, ততদিন পিতা বাঁচবেন কি না, এই সকল বিবেচনা করিয়া মির্জা দাউদ তাঁহাকে ছাড়িলেন না, নিজের সঙ্গে কালিকটে লইয়া চলিলেন। বৃদ্ধও ঈদের চাঁদের মতো সুন্দর ক্ষুদ্র নাতিনীটিকে দেখিয়া ভুলিয়াছিলেন— তিনিও বিশেষ আপত্তি করিলেন না।

    মক্কাশরীফ দর্শনের সময় কালিকটের কয়েকজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সহিত মির্জা দাউদের সাক্ষাৎ হইয়াছিল। তিনি তাঁহাদের বলিলেন, ‘আপনারাও কালিকটে ফিরিতেছেন— আমার জাহাজেই চলুন।’ তাঁহারা আনন্দিত হইয়া সপরিবারে মির্জা দাউদের জাহাজে আশ্রয় লইলেন।

    মক্কা হইতে কালিকট তিন মাসের পথ। জাহাজ যথাসময়ে আরব উপকূল ছাড়িয়া লোহিত সাগর পার হইল। ক্রমে পারস্য উপসাগর উত্তীর্ণ হইয়া ভারত সমুদ্রে আসিয়া পড়িল।

    মহাসাগরের বুকের উপর বায়ু-বর্তুলিত পালের ভরে মির্জা দাউদের তরণী দক্ষিণাভিমুখে চলিয়াছে। চারিদিকে অতল  জল দুলিতেছে, ফুলিতেছে— লক্ষকোটিখণ্ডে বিচূর্ণিত দর্পণের মতো রবিকরে প্রতিফলিত হইতেছে। পূর্ণ দিগন্তরেখা অখণ্ডভাবে তরুণীকে চারিদিকে বেষ্টন করিয়া আছে। কেবল বহুদূরে পূর্বচক্রবালে মেঘের মতো কচ্ছভূমির তটবনানী ঈষন্মাত্র দেখা যাইতেছে।

    জাহাজে যে অভিজ্ঞ আড়কাঠি আছে, সে বলিয়াছে যে বায়ুর দিক এবং গতি পরিবর্তিত না হইলে অষ্টাহমধ্যে কালিকটে পৌঁছানো যাইবে। আশু যাত্রাশেষ কল্পনা করিয়া আরোহীরা সকলেই হৃষ্ট হইয়া উঠিয়াছেন।

    সেদিন শুক্রবার, সূর্য ক্রমে মধ্যগগন অতিক্রম করিয়া পশ্চিমে ঢলিয়া পড়িল। জাহাজের বিস্তৃত ছাদের উপর মির্জা দাউদ, তাঁহার পিতা ও আর আর পুরুষগণ দ্বিপ্রাহরিক নমাজ প্রায় শেষ করিয়াছেন। জাহাজের নিয়ামক সম্মুখে স্থিরদৃষ্টি করিয়া হালের নিকট নিশ্চলভাবে দাঁড়াইয়া আছে। চারিদিক নিস্তব্ধ, শুধু তরণীর বেগবিদীর্ণ জলরাশি ফেন-হাস্যে কল‌্‌কল্ করিতেছে।

    এমন সময় আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করিয়া মেঘগর্জনের ন্যায় ভীষণ শব্দে সকলে চমকিত হইয়া দেখিলেন, পশ্চাৎ হইতে পাঁচখানা ফিরিঙ্গী জাহাজ সমস্ত পাল তুলিয়া দিয়া এবং সঙ্গে সঙ্গে অগণ্য দাঁড় বাহিয়া যেন বহুপদবিশিষ্ট অতিকায় জলজন্তুর মতো ছুটিয়া আসিতেছে। অতর্কিতে এত নিকটে আসিয়া পড়িয়াছে যে, জাহাজের মানুষগুলাকে পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাইতেছে। এই আকস্মিক দৃশ্য দেখিয়া সকলেই বুদ্ধিভ্রষ্টের মতো সেই দিকে নিষ্পলকভাবে তাকাইয়া রহিলেন।

    বিস্মিত হইবার মতো দৃশ্য বটে! দুই দণ্ড পূর্বেও চতুর্দিকে কোথাও একটা ভেলা পর্যন্ত ছিল না। সহসা সমুদ্রের কোন্ অতল গুহা হইতে এই পাঁচটা ভীষণ দৈত্য বাহির হইয়া আসিল? মির্জা দাউদের মন বলিল, আজ আর রক্ষা নাই। কামান দাগিয়া ইহারা নিজ আগমনবার্তা ঘোষণা করিয়াছে— আজ তাহারা দয়ামায়া দেখাইবে না। মূরের রক্তে হিংসা চরিতার্থ করিবার আজ তাহাদের সুযোগ মিলিয়াছে।

    এরূপ ঘটনা প্রতীচ্যখণ্ডের সমুদ্রবক্ষে পূর্বে কখনও ঘটে নাই। স্মরণাতীত কাল হইতে এইপথে শত শত তরণী অবাধে যাতায়াত করিয়াছে। চীন হইতে কাস্পীয় হ্রদ পর্যন্ত কেহ কখনও হিংস্রিকা বা বোম্বেটের নাম পর্যন্ত শুনে নাই। স্থলপথ অপেক্ষা জলপথ অধিক নিরাপদ ছিল বলিয়াই জলবাণিজ্য এত প্রসার লাভ করিয়াছিল। কিন্তু আজ যুগযুগান্তরের বাহিতপণ্য অব্যাহত পথে স্বার্থান্ধ ফিরিঙ্গী  তাহার অগ্নি-অস্ত্র লইয়া পথরুদ্ধ করিয়া দাঁড়াইল।

    কিন্তু যুদ্ধদান করা মির্জা দাউদের পক্ষে অসম্ভব। তাঁহার জাহাজ তীর্থযাত্রীর জাহাজ, তাহাতে বারুদ-গোলা কিছুই নাই। আছে কেবল কতকগুলি অসহায় যুদ্ধানভিজ্ঞ ধর্মপরায়ণ তীর্থযাত্রী এবং তদপেক্ষাও অসহায় কতকগুলি নারী ও শিশু। এরূপ অবস্থায় পাঁচখানা রণপোতের সঙ্গে যুদ্ধ করা বাতুলতা ভিন্ন আর কিছুই নহে। এক উপায় পলায়ন; কিন্তু মির্জা দাউদের জাহাজ কেবল পালের ভরে চলে— বিপক্ষের পাল দাঁড় দুই আছে; এ ক্ষেত্রে পলায়নও সাধ্যাতীত।

    মির্জা দাউদ ক্ষণকাল স্তব্ধভাবে চিন্তা করিলেন। একবার আকাশের দিকে দৃষ্টি করিলেন। আকাশ নির্মেঘ— বেলা প্রায় তৃতীয় প্রহর। রাত্রি হইতে বিলম্ব আছে। তিনি নাবিককে ডাকিয়া সমস্ত পাল তুলিয়া প্রাণপণে জাহাজ ছুটাইতে আজ্ঞা দিলেন।

    কিন্তু এ আজ্ঞা পালিত হইতে না হইতে জলদস্যুদিগের পাঁচখানা জাহাজ হইতে একসঙ্গে কামান ডাকিল। একটা গোলা বড় পালের ভিতর ছিদ্র করিয়া জাহাজের পরপারে গিয়া সমুদ্রগর্ভে প্রবেশ করিল, অন্যগুলা জাহাজের চারিদিকে জলের উপর পড়িল। কোনটাই কিন্তু জাহাজকে গুরুতর জখম করিতে পারিল না।

    জাহাজের পুরুষযাত্রীদের মুখ শুকাইল। নিম্ন হইতে ভীত শিশু ও নারীগণের আর্তস্বর ও ক্রন্দন উঠিল। দন্তে দন্ত চাপিয়া মির্জা দাউদ নাবিকদের হুকুম দিলেন, ‘যতক্ষণ পার, জাহাজ চালাও, ফিরিঙ্গী দস্যু্র হাতে ধরা দিব না।’

    এমন সময় মির্জা দাউদের চারি বৎসরের কন্যা হাঁপাইতে হাঁপাইতে উপরে উঠিয়া আসিয়া পিতার জানু জড়াইয়া ধরিল। বলিল, ‘বাবা, মা তোমাকে ডাকছেন।’— বলিয়া পিতার মুখের দিকে চোখ তুলিয়াই উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিয়া উঠিল, ‘বাবা, আমার বড় ভয় করছে।’

    মির্জা দাউদ কন্যাকে দুই হাতে তুলিয়া বুকে চাপিয়া ধরিলেন। তাহার কানে কানে বলিলেন, ‘হারুণা, কাঁদিস না। তুই মূরের কন্যা— তোর কিসের ভয়? আজ আমরা সকলে একসঙ্গে বেহেস্তে যাইব।’

    কন্যাকে পিতার ক্রোড়ে দিয়া মির্জা দাউদ নীচে নামিয়া গেলেন। সম্মুখেই আকুলনয়না স্ত্রীর সহিত সাক্ষাৎ হইল।

    নিজ কটি হইতে ক্ষুদ্র মাণিক্যখচিত ছুরিকা পত্নীর হস্তে দিয়া সংযত কণ্ঠে কহিলেন, ‘শালেহা, বোধ হয় আজ অন্তিমকাল উপস্থিত হইয়াছে। বোম্বেটে জাহাজ পিছু লইয়াছে। যদি উহারা এ জাহাজে পদার্পণ করে, এ ছুরি নিজের উপর ব্যবহার করিও। তার পূর্বে কিছু করিও না। আর অন্যান্য স্ত্রীলোকদের আশ্বাস দিও, অকারণে ভয় না পায়। চলিলাম।’— এই বলিয়া মুহূর্তকালের জন্য পত্নীর মস্তক বক্ষে চাপিয়া ধরিয়া মির্জা দাউদ উপরে ফিরিয়া গেলেন।

    উপরে উঠিয়া দেখিলেন, এই অল্পকাল মধ্যে দস্যুজাহাজগুলি অর্ধচন্দ্রাকারে তাঁহাদিগকে ঘিরিয়া ফেলিয়াছে। এত নিকটে আসিয়া পডিয়াছে যে, তাহাদের কণ্ঠস্বর পর্যন্ত স্পষ্ট শুনা যাইতেছে। মির্জা দাউদ দেখিলেন, প্রত্যেক জাহাজ হইতে কামানের মুখ তাঁহাদের প্রতি লক্ষ্য করিয়া আছে। এত নিকট হইতে এবার আর লক্ষ্যভ্রষ্ট হইবে না।

    মির্জা দাউদের পিতা আসিয়া বলিলেন, ‘দাউদ, আর উপায় নাই। ধরা না দিলে জাহাজডুবি হইয়া মরিতে হইবে।’

    মির্জা দাউদ কহিলেন, ‘ধরা দিলেও নিশ্চয় মরিতে হইবে, তাহার অপেক্ষা ডুবিয়া মরাই শ্রেয়ঃ।’

    পিতা বলিলেন, ‘সে কথা ঠিক। কিন্তু সঙ্গে শিশু ও স্ত্রীলোক রহিয়াছে। তাহাদের রক্ষা করিবার চেষ্টা করা উচিত নহে কি?’

    মির্জা দাউদ কিয়ৎকাল চিন্তা করিয়া কহিলেন, ‘কিন্তু দস্যুরা শিশু ও নারীদের দয়া করিবে কি? বরঞ্চ—’

    পিতা কহিলেন, ‘ফিরিঙ্গী অর্থলোভী, অর্থের বিনিময়ে তাহাদের ছাড়িয়া দিতে পারে।’

    অন্যান্য পুরুষগণও বৃদ্ধের বাক্য সমর্থন করিলেন। মির্জা দাউদ তখন কহিলেন, ‘ভালো, চেষ্টা করিয়া দেখা যাক্।’

    ঠিক এই সময় একখানা জাহাজ হইতে আবার কামান দাগিল। এবার গোলার আঘাতে প্রকাণ্ড মাস্তুল পালসুদ্ধ মড়মড় শব্দে ভাঙিয়া পড়িল এবং সঙ্গে সঙ্গে স্তূপীকৃত পালের কাপড়ে আগুন লাগিয়া গেল।

    রমণীরা এতক্ষণ পর্যন্ত আব‌্‌রু রক্ষা করিয়া জাহাজের খোলের মধ্যেই ছিল, কিন্তু এবার আর লজ্জার বাধা মানিল না। সন্তানবতীরা সন্তান কোলে লইয়া, যাহাদের সন্তান নাই— তাহারা যে যেমনভাবে ছিল, উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিতে কাঁদিতে উপরে উঠিয়া আসিল। সকলেই ভয়বিহ্বলা। কেহ ঊর্ধ্বমুখী নতজানু হইয়া ঈশ্বরের নিকট প্রাণের আকুল আবেদন জানাইতে লাগিল, কেহ শিশু-সন্তানকে দুই হাতে উচ্চে তুলিয়া ধরিয়া জলদস্যুদিগকে দেখাইয়া তাহাদের কৃপা আকর্ষণের চেষ্টা করিতে লাগিল।

    এদিকে পালের আগুন ক্রমে বাড়িয়া উঠিয়া জাহাজময় ব্যাপ্ত হইবার উপক্রম করিল। পুরুষগণ তখন সমুদ্র হইতে  জল তুলিয়া অগ্নিনির্বাপণের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। বহু কষ্টে অনেক জল ঢালিবার পর অগ্নি নির্বাপিত হইল। তখনকার মতো জাহাজ রক্ষা পাইল।

    একখানা ফিরিঙ্গী জাহাজ মির্জা দাউদের জাহাজের একেবারে পাশে আসিয়া পড়িয়াছিল। মধ্যে মাত্র একশত গজের ব্যবধান। কামান ঘুরাইয়া তাহারা আবার গোলা ছুঁড়িবার উদ্যোগ করিতেছিল। তখন মির্জা দাউদ উচ্চকণ্ঠে তাহাদিগকে ডাকিয়া কহিলেন, ‘গোলা ছুঁড়িও না— আমরা আত্মসমর্পণ করিতেছি।’

    কামান ছাড়িয়া তাহারা উল্লাসধ্বনি করিয়া উঠিল। তাহাদের মধ্যে একজন— বোধ হয়, সেই প্রধান নাবিক— কহিল, ‘তোমাদের জাহাজে যত অস্ত্র আছে,  জলে ফেলিয়া দাও— নহিলে কামান ছুঁড়িব।’

    মির্জা দাউদ কহিলেন, ‘আমাদের সঙ্গে কোনও অস্ত্র নাই। ইহা তীর্থযাত্রীর জাহাজ। যাহা কিছু ধনরত্ন সঙ্গে আছে, দিতেছি— আমাদের ছাড়িয়া দাও।’

    এইরূপ কথাবার্তা হইতেছে, এমন সময় আক্রমণকারী জাহাজের ভিতর হইতে একজন পুরুষ উপরে উঠিয়া আসিল। অতি মহার্ঘ বেশভূষায় সজ্জিত বিশালদেহ এক পুরুষ। তাহাকে দেখিয়া মির্জা দাউদের বুকের রক্ত সহসা যেন স্তব্ধ হইয়া গেল। চিনিলেন— ভাস্কো-ডা-গামা। তাহার মুখের উপর কৃষ্ণ কাল-সর্পের মতো হিংসা যেন কুণ্ডলিত হইয়া আছে। মির্জা দাউদকে দেখিয়া ভাস্কো-ডা-গামা হাসিল। মাথার কঙ্কপত্রযুক্ত টুপি খুলিয়া তাহা আভূমি সঞ্চারিত করিয়া বলিল, ‘মির্জা দাউদ, আজ সুপ্রভাত! স্মরণ আছে, বলিয়াছিলাম আবার দেখা হইবে?’

    মির্জা দাউদের মুখ দিয়া সহসা কথা বাহির হইল না। ভাস্কো-ডা-গামা তখন পূর্বোক্ত প্রধান নাবিকের দিকে ফিরিয়া কঠোর কণ্ঠে কহিল, ‘কাপ্তেন, কামান নীরব কেন? আমার হুকুম কি ভুলিয়া গিয়াছ?’

    ভীত কাপ্তেন বলিল, ‘প্রভু, উহারা ধনরত্ন দিয়া পরিত্রাণের আর্জি করিতেছে।’

    দুই জাহাজ ক্রমে আরও নিকটবর্তী হইতেছিল। ডা-গামা আবার মির্জা দাউদের দিকে ফিরিয়া শ্লেষতীক্ষ্ণ কণ্ঠে কহিল, ‘মূর, ধনরত্ন দিয়া প্রাণভিক্ষা চাও?’

    মির্জা দাউদ কহিলেন, ‘নিজের প্রাণভিক্ষা চাহি না। আমাদের সর্বস্ব লইয়া বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের ছাড়িয়া দাও।’

    ডা-গামা শত্রুর লাঞ্ছনার রস অল্প অল্প করিয়া পান করিতে লাগিল, কহিল, ‘বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের ছাড়িয়া দিব? কিন্তু তাহাতে আমাদের লাভ? বরঞ্চ তোমরা যুবতী নারীদের আমাদের নিকট পাঠাইয়া দিয়া পুরুষগণ প্রাণ বাঁচাইতে পার। আমাদের জাহাজে স্ত্রীলোকের কিছু প্রয়োজন হইয়াছে। আমার নিজের জন্য নয়— খালাসীদের জন্য। আমার নারীতে রুচি নাই।’

    ক্রোধে অপমানে মির্জা দাউদের মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল। বুঝিলেন, ডা-গামা তাঁহাকে লইয়া খেলা করিতেছে। অতি কষ্টে আত্মদমন করিয়া কহিলেন, ‘ডা-গামা, তোমার প্রস্তাবের উত্তর দিতে ঘৃণা হইতেছে। যদি অভিরুচি হয়, আমাদের সহিত যাহা মূল্যবান সামগ্রী ও স্বর্ণ রৌপ্য আছে, তাহা লইয়া আমাদের নিস্কৃতি দাও। নতুবা কিছুই পাইবে না।’

    ডা-গামা ভ্রূকুটি করিয়া কহিল, ‘কিছুই পাইব না, তার অর্থ?’

    মির্জা দাউদ কহিলেন, ‘তার অর্থ— জোর করিলে আমাদের মারিয়া ফেলিতে পরিবে, কিন্তু কিছু লাভ করিতে পরিবে না। যদি আমার জাহাজে চড়াও করিবার চেষ্টা কর, তক্তা খুলিয়া জাহাজ ডুবাইয়া দিব।’

    মির্জা দাউদের কথা শুনিয়া ডা-গামার ভ্রূকুটি গভীরতর হইল, সে নতমুখে চিন্তা করিতে লাগিল।

    এদিকে জাহাজের মাস্তুল ভাঙিয়া যাওয়ায় মির্জা দাউদ পঙ্কে নিবদ্ধ হস্তীর মতো চলচ্ছক্তিহীন। ফিরিঙ্গীর পাঁচখানা জাহাজ ধীরে ধীরে তিন দিক হইতে ঘিরিয়া আরও নিকটবর্তী হইতে লাগিল।

    মির্জা দাউদ অধীর হইয়া কহিলেন, ‘ডা-গামা, যাহা করিবে, শীঘ্র কর। আমাদের সহিত বারশত তোলা সোনা আছে— আরও অন্যান্য মহার্য বস্তু আছে; যদি পাইতে ইচ্ছা কর, শীঘ্র বল। অধিক বিলম্ব করিলে সব হারাইবে।’

    ডা-গামা বলিল, ‘রমণীদের দিবে না?’

    মির্জা দাউদ গর্জিয়া উঠিলেন, ‘না, দিব না। আমরা স্ত্রী-কন্যার ব্যবসা করি না।’

    ডা-গামা কহিল, ‘মূর, এখনও তোর স্পর্ধা কমিল না!— ভালো, অর্থই লইব। তোমার জাহাজে যাহা কিছু আছে, ভেলায় করিয়া আমাড় জাহাজে পাঠাও।’

    ‘যাহা কিছু আছে, পাইলে ছাড়িয়া দিবে?’

    ‘দিব।’

    ‘তোমাকে বিশ্বাস কি?’

    ‘আমি মিথ্যা কথা বলি না।’

    ‘মিথ্যাচারি, শপথ করিয়াছিলে কখনও হিন্দে পদার্পণ করিবে না,  তাহার কি হইল?’

    ডা-গামা হাসিয়া বলিল, ‘এখনও হিন্দে পদার্পণ করি নাই।’

    মির্জা দাউদ তখন অন্যান্য সকলের সহিত পরামর্শ করিলেন। সকলেই কহিলেন, উহাদের কবলে যখন পড়িয়াছি, তখন উহাদের কথায় বিশ্বাস করা ভিন্ন উপায় নাই। অগত্যা মির্জা দাউদ সম্মত হইলেন।

    তখন এক ভেলা প্রস্তুত করিয়া তাহারই উপর যাহা কিছু ছিল, এমন কি, নারীগণের অলংকার পর্যন্ত তুলিয়া ডা-গামার জাহাজে পৌঁছাইয়া দেওয়া হইল।

    ডা-গামা জিজ্ঞাসা করিল, ‘তোমাদের আর কিছু নাই?’

    ‘না।’

    ‘আবার জিজ্ঞাসা করিতেছি— নারীদের দিবে না?’

    অসহ্য ক্রোধে মির্জা দাউদের বাক্‌রুদ্ধ হইয়া গেল। শুধু তাঁহার চক্ষুর্দ্বয় অগ্নিশিখার মতো জ্বলিতে লাগিল।

    ভাস্কো-ডা-গামা কালকূটের মতো হাসিল। বলিল, ‘ভালো, তোমাদের যেরূপ অভিরুচি।’ তারপর কাপ্তেনের দিকে ফিরিয়া বলিল, ‘কাপ্তেন, গোলা মারিয়া উহাদের জাহাজে আগুন লাগাইয়া দাও। আজ মুসলমান কুকুরগুলোকে পুড়াইয়া মারিব।’

    মির্জা দাউদ চিৎকার করিয়া উঠিলেন, ‘শঠ! বিশ্বাসঘাতক! মিথ্যাবাদী শয়তান!’

    ডা-গামা কহিল, ‘মির্জা দাউদ, তোর প্রাণরক্ষা করিতে পারে, এত অর্থ পৃথিবীতে নাই। তবে তুই তোর স্ত্রীর বিনিময়ে এখনও প্রানরক্ষা করিতে পারিস। তোর স্ত্রীকে আমি বাঁদি করিয়া রাখিব।’

    মির্জা দাউদ উন্মত্তের মতো গর্জন করিতে লাগিলেন, ‘শয়তান! শয়তান!’

    জাহাজে ভীষণ কোলাহল উঠিল। নর-নারী সকলে পাগলে মতো চারিদিকে ছুটাছুটি করিতে লাগিল। সকলেই যেন এই অভিশপ্ত জাহাজ হইতে পলাইবার চেষ্টা করিতেছে। চতুর্দিক হইতে আর্তরব উঠিল, ‘রক্ষা কর! দয়া কর! প্রাণ বাঁচাও!’

    এই আকুল প্রার্থনার জবাব আসিল। সহসা শিলাবৃষ্টির মতো জাহাজের উপর বন্দুকের গুলি পড়িতে লাগিল। কেহ হত, কেহ আহত হইয়া পড়িতে লাগিল। মৃত্যুর বিভীষিকা যেন ভীষণতার রুপ ধরিয়া দেখা দিল।

    মির্জা দাউদের পিতা ক্ষুদ্র হারুণাকে বক্ষে লইয়া কাঁপিতে কাঁপিতে পুত্রের পাশে আসিয়া দাঁড়াইলেন। স্খলিত কণ্ঠে একবার শুধু ডাকিলেন, ‘দাউদ!’

    দুর্দম আবেগে মির্জা দাউদ একসঙ্গে পিতা ও কন্যাকে জড়াইয়া ধরিলেন, এমন সময় লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়া শালেহা আসিয়া স্বামীর হস্ত ধরিয়া দাঁড়াইলেন।

    মির্জা দাউদ বাষ্পাচ্ছন্ন চোখ একবার তিন জনের মুখের দিকে চাহিলেন। তারপর অবরুদ্ধ স্বরে কহিলেন, ‘পিতা, ঈশ্বর কি নাই?’

    সহসা হারুণা ক্ষুদ্র একটি কাতরোক্তি করিয়া এলাইয়া পড়িল। দ্রুত কন্যাকে নিজের ক্রোড়ে লইয়া মির্জা দাউদ দেখিলেন, তাহার দেহে প্রাণ নাই। নিষ্ঠুর গুলি তাহার বক্ষে প্রবেশ কারিয়াছে।

    তারপর দ্রুত অনুক্রমে স্ত্রী ও পিতা গুলির আঘাতে মাটিতে পড়িয়া গিয়া মরণ-যন্ত্রণায় ছট্‌ফট্‌ করিতে লাগিলেন। ভাস্কো-ডা-গামা তখন স্বয়ং ধূমায়িত বন্দুক হাতে করিয়া পিশাচের মতো উচ্চ হাসি হাসিতেছে।

    সূর্য তখন পশ্চিম দিগন্তরেখা স্পর্শ করিয়াছে। আকাশ এবং সমুদ্র তপ্ত রক্তের মতো রাঙা হইয়া উঠিয়াছে। সাগরবক্ষে সূর্যাস্ত হইতেছে।

    এইবার পাঁচখানা জাহাজ হইতে এককালে কামান ডাকিল। গোলার সংঘাতে শীতার্ত বৃদ্ধের মতো মির্জা দাউদের জাহাজখানা কাঁপিয়া উঠিল। পালের কামড়ে দপ করিয়া আবার আগুন জ্বলিয়া উঠিল। ধীরে ধীরে টলিতে টলিতে জাহাজ নিমজ্জিত হইতে লাগিল। আবার কামান গর্জিল। এবার জাহাজের সম্মুখ দিকটা ছিন্নভিন্ন হইয়া গেল। কল্‌কল্‌ শব্দে  জল ঢুকিতে লাগিল।

    তারপর নিমেষের মধ্যে সমস্ত শেষ হইয়া গেল। আরোহীদের মিলিত কণ্ঠ হইতে এক মহা হাহাকার-ধ্বনি উঠিল। জ্বলন্ত জাহাজ অকস্মাৎ জীবিতবৎ সোজা দাঁড়াইয়া উঠিল; তারপর সবেগে সমুদ্রগর্ভে প্রবেশ করিল। যাত্রীদের ঊর্ধ্বোর্ত্থিত কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হইয়া গেল। মুহূর্তপূর্বে যেখানে জাহাজ ছিল, সেখানে আবর্তিত তরঙ্গশীর্ষ জলরাশি ক্রীড়া করিতে লাগিল।

    ফিরিঙ্গী জাহাজগুলি চিত্রার্পিতবৎ স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। প্রায়ান্ধকারে তাহাদিগকে যেন অন্য জগতের কোনও ভৌতিক তরণীর মতো দেখাইতে লাগিল।

    ক্ষণকাল পরে সান্ধ্য নীরবতা বিদীর্ণ করিয়া ভাস্কো-ডা-গামার জাহাজ হইতে দামামা ও তূর্য বাজিয়া উঠিল।

    সূর্য তখন সমুদ্রপারে অস্তমিত হইয়া অন্য কোন্ নূতন গগনে উদিত হইয়াছে।

    ১৯৩০

  • ফুটন্ত গোলাপ

    ফুটন্ত গোলাপ

    ফুটন্ত গোলাপ

    কাসেম বিন আবুবাকার

    ফুটন্ত গোলাপ বাংলাদেশের কাসেম বিন আবুবাকারের লিখিত একটি রোমান্টিক উপন্যাস। লেখকের প্রথম উপন্যাস ফুটন্ত গোলাপ বইটি ১৯৮৬ প্রকাশিত হবার পরে, বইটি বাংলাদেশের প্রান্তিক গ্রামাঞ্চলের মানুষের নিকট বইটি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠে, এবং বইটি তৎকালীন সময়ে বেস্ট সেলার বই হয়ে উঠে। এরপর ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি লেখক ও এই বইটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করার পরে লেখক ও বইটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কেন্দ্রে পরিণত হয়। এমনকি বইটি কাসেম বিন আবুবাকারের লেখা কিনা, সেটা নিয়েও সন্দেহ ও বিতর্ক তৈরি হয়। তবে কিছু পাঠক বইটি নিয়ে ব্যক্তিগত ব্লগিং ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা করেছেন। ২০১১ সালে বইটি ৩০ তম সংস্করণ বাজারে বের হয়েছে, এবং বইটি সর্বমোট ১.৫ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে।

    কাহিনী সংক্ষেপ

    এই উপন্যাসটি প্রেমের সাথে ইসলামি ভাবধারার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। উপন্যাসের শুরুতেই মূল দুই ব্যক্তিত্ব নায়ক সেলিম ও নায়িকা লাইলির দেখা হয়ে যায়। গল্পে লাইলিকে একজন ধর্মপ্রান যুবতী হিসাবে দেখানো হয়েছে, লাইলির বাবা একজন কেরানি। লাইলি নিজে ভালো ইসলামি গান জানে। লাইলিদের পরিবার গরিব, অসহায় ও দুস্থভাবে জীবনযাপন করে। অপরদিকে সেলিমের পিতা একজন ধনী পরিবারের একজন সন্তান, সেলিম নিজেও ধর্মকর্ম তেমন বেশি মানেনা। সেলিম খুব ভালো ফুটবল খেলোয়ার এবং জুডো ও কারাতে পারদর্শী। সে নিজের গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করতে পারে। তবে লাইলি ও সেলিমের মধ্যে একটি বিষয়ে মিল রয়েছে, সেটি হলো তারা দুইজনই মেধাবী শিক্ষার্থী, তারা উভয়ই নিজ নিজ ক্লাসে প্রথম স্থানের অধিকারী হয়।

    উপন্যাসে লেখক গল্পের মধ্যে নানা নীতিকথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত, সেটিও লেখক তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়েছেন। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের বিষয়ে কুরআন ও হাদিসে কি ধরনের নির্দেশনা দেওয়া আছে, সেটিও বইতে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে।

    বাস্তব উপজিব্য

    লেখক মল্লিক ব্রাদার্সে চাকরি করার সময় এই উপন্যাসটি লিখেন। সেই সময়ে মল্লিক ব্রাদার্সে একটি শিক্ষিতা মেয়ে কাজের জন্য আসতো। মেয়েটি বাইরে কমদামী বোরকা পরলেও, ভিতরে দামি পোশাক পরিধান করে ছিলো। লেখক বিষয়টি বুঝতে পারলে, মেয়েটি জবাবে তাকে বলে, ইসলাম ধর্ম নারীদের নিরাপত্তা ও পর্দার বিধানের জন্য বাইরে বের হওয়ার সময় অনাকর্ষক পোশাক পরিধান করতে বলেছে। লেখক এই মেয়ের এই ধারণা শুনে অভিভূত হন, এবং এই উপন্যাসটি রচনা করেন। উপন্যাসটি লেখার পরে লেখক দৃঢ় বিশ্বাস নিয়েই বলেছিলেন, আমার এই উপন্যাস এক দিন না এক দিন সবাই গ্রহণ করবে।

    জনপ্রিয়তা

    লেখক এই বইটি ১৯৭৮ সালে লেখা শুরু করেন, এটিই লেখকের প্রথম বই হওয়ায় নানা প্রতিবন্ধকতায় বইটি ১৯৮৬ সালে ১ ডিসেম্বর তারিখে প্রকাশ করা হয়। বইটি প্রকাশের পর ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর বইটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করে। এরপর বই ও লেখককে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ইয়াহু নিউজ, যুক্তরাজ্যের মিডিয়া ডেইলি মেইল, মধ্যপ্রাচ্যের আরব নিউজ, মালয়েশিয়ার দ্য স্টার ও মালয়মেইল পত্রিকা, ফ্রান্সের দ্য ডন পত্রিকা, ফ্রান্সের ফ্রান্স টুয়েন্টি ফোর ও রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল পত্রিকাসহ আরো নানা আন্তর্জাতিক পত্রিকা বইটি ও লেখককে নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশের মধ্যেও বইটি সম্পর্কে বহু প্রতিবেদন এবং বিশাল জনপ্রিয়তা প্রকাশ পায়। বইটি গুডরিডস বুক রিভিউ ওয়েবসাইটে ২১০ রেটার ২.৬৭ রেটিংস দিয়েছে।

    সমালোচনা

    বইটির তুমুল জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অনেক সমালোচনাও রয়েছে। সমালোচকগণ বইটিকে একটি নিম্নমানের সাহিত্য বলে উল্লেখ করেছে, তারা বলেছে এই বইয়ের বাচনভঙ্গি, তুলনামূলক উদাহরণ ও বাক্য রচনায় উচ্চ সাহিত্যের ছাপ পাওয়া যায়নি। তারা উল্লেখ করেছে বইটি নিম্নমানের অর্ধ-শিক্ষিত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে রচনা করেছে। এছাড়াও কিছু ইসলামি ব্যক্তিত্বও বইটিতে ইসলামি রচনার মোড়কে অশ্লীলতা ও নগ্নতা ছড়ানোর অভিযোগ করেছে।

    গ্রন্থকথা

    ফুটন্ত গোলাপ ইসলামিক প্রেমের উপন্যাস; লেখকের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। প্রকাশক নূর-কাসেম পাবলিশার্স। প্রকাশকাল : প্রথম প্রকাশ – ডিসেম্বর-১৯৮৬ খৃঃ। প্রথম নূর কাসেম পাবলিশার্স সংস্করণ জানুয়ারি-১৯৯৭ খৃঃ। ত্রিশতম প্রকাশ : মার্চ-২০১১ খৃঃ। প্রচ্ছদ সমর মজুমদার। যুক্তরাজ্য পরিবেশক সঙ্গী লিমিটেড, ২২ ব্রিকলেন, লন্ডন, যুক্তরাজ্য। গ্রন্থস্বত্ব লেখক। নূর-কাসেম পাবলিশার্স, ৩৮/৪, বাংলাবাজার (২য় তলা), ঢাকা-১১০০, থেকে মোঃ সায়ফুল্লাহ্ খান কর্তৃক প্রকাশিত এবং সালমানী মুদ্রণ সংস্থা, ৩০/৫, নয়াবাজার, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।

    বর্ণ বিন্যাস বাধন কম্পিউটার্স ৪৭/১, বাংলাবাজার (২য় তলা), ঢাকা ১১০০।

    উৎসর্গ

    যাদের মারফত আল্লাহপাক আমাকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, সেই পুণ্যবান ও পুণ্যবতী আব্বা-আম্মার মোবারক কদমে।

    • “হে ঈমানদারগণ তোমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ কর। এবং শয়তানের অনুসারী হয়ো না। বাস্তবিকই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” –আল-কোরআন, সূরা-বাকারা, আয়াত-২০৮, পারা-২।
    • “পাঁচ ব্যক্তির সংসর্গ হইতে সর্বদা দূরে থাকিও (ক) মিথুক (খ) আহাম্মক (গ) কৃপণ (ঘ) কাপুরুষ (ঙ) ফাসেক।” –ইমাম জাফর সাদেক (রঃ)

    ভূমিকা

    বর্তমান সমাজের চরম অবনতি উপলব্ধি করে এই কাহিনী লেখার প্রেরণা পেয়েছি। আমার মনে হয়েছে এভাবে যদি দিন দিন আমরা প্রগতি ও নারী স্বাধীনতার নাম দিয়ে চলতে থাকি, তা হলে ইসলাম থেকে সমাজের মানুষ বহুদূরে চলে যাবে। শুধু মুখে, কেতাবে ও মুষ্টিমেয় লোকের কাছে ছাড়া অন্য কোথাও ইসলামের নাম গন্ধ থাকবে না।

    বিদেশী শিক্ষাকে আমি খারাপ বলছি না। পৃথিবীর যে কোনো ভাষায় আমরা জ্ঞান অর্জন করতে পারি। কিন্তু বিদেশী শিক্ষার সংগে সংগে তাদের ভালো দিকটা বাদ দিয়ে খারাপ দিকটাই অনুকরণ করে আমরা যেন “কাকের ময়ুর হওয়ার মত মেতে উঠেছি।

    অথচ আল্লাহ তায়ালা কোরআন পাকে বলিয়াছেন-”তোমরা (মুসলমানরা) উত্তম সম্প্রদায়, যে সম্প্রদায়কে প্রকাশ করা হইয়াছে মানবমণ্ডলীর জন্য। তোমরা নেক কাজের আদেশ কর এবং মন্দ কাজ হইতে নিবৃত্ত রাখ এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ।” (সূরা-আল ইমরান, ১১০ নং আয়াত, পারা-৪)।

    আর এখন আল্লাহপাকের কথিত সেই মুসলমানেরা কোরআন ও হাদিসের আদর্শ ত্যাগ করে দুনিয়ার মধ্যে সব থেকে নিকৃষ্ট জাতিতে পরিণত হয়েছে। তাই তারা পৃথিবীর সকল দেশেই উৎপীড়িত ও লাঞ্ছিত।

    আমরা যদি আল্লাহর ও রাসূলের (দঃ) বাণীকে অনুকরণ ও অনুস্বরণ করে চলি, তা হলে নিশ্চয়ই আল্লাহপাকের রহমতে আবার আমরা আমাদের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস তৈরি করতে পারব।

    যদি এই বাস্তবধর্মী উপন্যাসটি পড়ে বর্তমান যুব সমাজ সামান্যতমও জ্ঞান লাভ করে সেইমতো চলার প্রেরণা পায়, তবে নিজেকে ধন্য মনে করব।

    আমার এই প্রাণ প্রিয় উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৮৬ইং সালে এবং প্রথম সংস্করণেই বাংলাদেশ ও ভারতের পাঠক সমাজে আশাতীতভাবে সমাদৃত হয়। এ জন্য আমি আল্লাহপাকের দরবারে শতকোটি শুকরিয়া আদায় করছি এবং সেই সংগে আমার প্রিয় পাঠকবর্গের কাছে অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

    ওয়াস সালাম
    কাসেম বিন আবুবাকার
    ২০ই পৌঁষ- ১৪০৩ বাংলা
    ২৩শে শাবান- ১৪১৭ হিজরী
    ৩রা জানুয়ারী ১৯৯৭ ইং

  • সে কোন বনের হরিণ

    সে কোন বনের হরিণ

    সে কোন বনের হরিণ

    কাসেম বিন আবুবাকার

    সে কোন বনের হরিণ, ঔপন্যাসিক কাসেম বিন আবুবাকার; প্রকাশক বিশ্বসাহিত্য ভবন, ৩৮/৪ বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০।

    1. “সৎ দ্বারা অসৎ দূর কর”, এই আয়াত সম্বন্ধে (হযরত মুহাম্মদ (দঃ)) বলিয়াছেন, “ক্রোধে ধৈর্য এবং অসদ্ব্যবহারের সময় ক্ষমা কর। যখন তাহারা ইহা অবলম্বন করে, আল্লাহ তাহাদিগকে রক্ষা করিবেন এবং তাহাদের শত্রুগণকে হেয় করিবেন, যেন তাহারা পরম সুহৃদ হয়।” –বর্ণনায় : হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বুখারী
    2. “হে নফস, কথা বলাটা রূপার মতো হলেও চুপ থাকাটা স্বর্ণের ন্যায়।”–হযরত আলি (রাঃ)
    3. নীরবতা মঙ্গল না করতে পারে, কিন্তু ক্ষতি করে না।——জর্জ রিচার্ড

    এক

    আপু তোর ফোন।

    রূপা রাত দশটায় খেয়ে এসে পড়ছিল। ছোট বোন সায়মার কথা শুনে ঘড়ির দিকে তাকাল, কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে দশটা।

    তাই দেখে সায়মা বলল, ছেলেটা রোজ রোজ তোকে ডিস্টার্ব করে, তুই কিছু বলিস নি কেন?

    রূপা তার কথার জওয়াব না দিয়ে বলল, বলে দে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি।

    সায়মা অবাককণ্ঠে বলল, আমাকে মিথ্যে বলতে বলছ? তুমিই তো বলেছ কোনো কারণেই মিথ্যে বলা হারাম।

    একটা পড়া তৈরি করছিলাম, তাই বেখেয়ালে বলে ফেলেছি। তারপর ড্রইংরুমে এসে রিসিভার তুলে বিরক্তকণ্ঠে বলল, কেন প্রতিদিন ঠিক এই সময়ে। ফোন করেন? কতদিন আপনাকে বলেছি, এ সময়ে পড়াশোনা করি।

    অন্য সময়ে আপনাকে নিরিবিলি পাওয়া যায় না। তাই এই সময়ে করি। রূপা রাগের সঙ্গে বলল, কিন্তু এখন তো সবাই জেগে। তা ছাড়া ফোনটা তো আমার ঘরে নেই। ছোট বোন প্রতিদিন ফোন ধরে আমাকে ডেকে দেয়। আচ্ছা, কে আপনি?

    আমি একজন মানুষ।

    আমার তো মনে হয় অমানুষ।

    তা হতে পারি। তবে অমানুষ হলেও খুব খারাপ অমানুষ নই।

    আমার ধারণা, আপনি খুব খারাপ অমানুষই। নচেৎ প্রত্যেকদিন একজন ছাত্রীর পড়ার ডিস্টার্ব করতেন না।

    আপনার কথা কতটা সত্য জানি না। তবে কী জানেন, আমাকে অনেক রাত পর্যন্ত পড়তে হয়। খেয়ে এসে এই সময়ে কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারি না। আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপ করার পর পড়ায় মন বসে। তাই একটু ডিস্টার্ব করি।

    কিন্তু আপনার ফোন আসার পর আমি যে পড়ায় মন বসাতেপারি না। প্লীজ, আর কোনো দিন এ সময়ে ফোন করবেন না।

    তা হলে বলুন, কখন ফোন করলে আপনার ডিস্টার্ব হবে না?

    কোনো সময়েই ফোন না করলে খুশী হব।

    কিন্তু আপনার সঙ্গে কথা না বললে যে আমার পড়াশোনা একটুও হবে না। সারারাত একটু ঘুমও হবে না। পরীক্ষায় নির্ঘাৎ ডাব্বা মারব।

    আপনি আমাকে চেনেন না, জানেন না। আমিও আপনাকে চিনি না, জানি না, তবু এরকম কথা বলছেন কেন?

    আপনি আমাকে না চিনলেও, না জানলেও আমি আপনার সব কিছু জানি। কী জানেন বলুন তো?

    আপনার ভালো নাম যাবিন তাসনিম। ডাক নাম রূপা। বাবা রোকন উদ্দিন সাহেব একজন মুক্তিযোদ্ধা ও ব্যবসায়ী। বর্তমানে মন্ত্রী। দেশের বাড়ি নীলফামারী জেলার পলাশবাড়ি। ঢাকায় দু’টা বাড়ি, দু’টা গাড়ি। একটা আপনার বাবার। অন্যটা আপনাদের দু’বোনের। গাড়ি নিয়ে দু’বোন মাঝে মধ্যে ঝগড়া করেন। আপনি ইডেনে বাংলায় অনার্স করছেন। ছোট বোন সায়মা ঐ কলেজেই ইন্টারে পড়ছেন। আপনারা দু’বোনই সুন্দরী। তবে আপনি একটু বেশি।

    সবকিছু মিলে যাচ্ছে দেখে রূপা খুব অবাক হয়ে ভাবল, ছেলেটা আমাদের সবকিছু জানে। কে হতে পারে চিন্তা করে না পেয়ে অধৈর্য গলায় বলল, হয়েছে হয়েছে, আর বলতে হবে না। এবার আপনার পরিচয়টা বলুন।

    বলা যাবে না।

    কেন?

    সময় হলে বলব।

    আপনি শুধু অমানুষ নন, কাপুরুষও। এই কথা বলে রূপা রিসিভার ক্র্যাডেলে রেখে ফিরে এসে পড়তে বসল। কিন্তু কিছুতেই মন বসাতে পারল না। বই বন্ধ করে চিন্তা করতে লাগল, ছেলেটা কে হতে পারে? আমার পেছনেই বা লেগেছে কেন? ব্যাপারটা আব্বাকে জানালে কেমন হয়? আবার চিন্তা করল, ছেলেটার গলার আওয়াজ বেশ মিষ্টি। দেখতে কেমন কে জানে? অনেকের গলার আওয়াজ মিষ্টি হলেও দেখতে রোগা পেঁচকা, বেঁটে, চোখ ছোট ছোট, গায়ের রং মিশমিশে কালো। আবার কোনো গরিবের দেখতে শুনতে ভালো ছেলে নিজেকে বড়লোকের ছেলের পরিচয় দিয়ে ধন-সম্পত্তির লোভে বড়লোকের মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে করতে চায়। এই ছেলেটা সেরকম নয়তো? তা না হলে পরিচয় দিতে চায় না কেন? এদিকে তলে তলে আমাদের সব খবর জেনে নিয়েছে। আজ তিন মাস ধরে ছেলেটা পিছনে লেগেছে। যদি সত্যিই তার কোনো বদ মতলব থাকে, তা হলে আব্বাকে। বলে বাছাধনকে জেলের ভাত না খাইয়েছি তো আমার নাম রূপা নয়।

    রূপা ও সায়মা রিডিংরুমে দুটো আলাদা টেবিলে পড়ে। দু’বোন একই বেডরুমে আলাদা খাটে ঘুমায়। সেখানেও পড়ার জন্য দু’টো চেয়ার টেবিল আছে। রাত দশটায় খাওয়ার পর দু’জনে বেডরুমে পড়ে। পড়তে পড়তে ঘুম পেলে সায়মা প্রায় প্রতিদিন চোখে মুখে পানি দিয়ে বারান্দায় কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে। তাই ড্রইংরুমে ফোন বাজলে সে-ই ধরে।

    সায়মা এতক্ষণ একটা নোট করছিল। নোটটা শেষ করে রূপার দিকে তাকিয়ে বলল, আপু, এই বন্ধ করে চুপচাপ কী ভাবছিস?

    রূপা জানে কথা বললেই সায়মা ঐ ছেলেটাকে নিয়ে নানান কমেন্ট করবে। উপদেশ দিতেও ছাড়বে না। তাই তার কথার উত্তর না দিয়ে হাই তুলে বলল, আজ আর পড়তে ভালো লাগছে না, ঘুমাব বলে খাটে শুয়ে পড়ল।

    সায়মা কিছু বলল না, শুধু তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। বাথরুমের কাজ সেরে এসে শোয়ার সময় বলল, আপু তুই কী ঘুমিয়ে পড়েছিস?

    ঘুমাই নি, তবে ঘুম পাচ্ছে। তুই আর কোনো কথা বলবি না, চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়।

    আচ্ছা আপু, ছেলেটা তোকে প্রতিদিন ফোন করে কেন বলবি?

    রূপা রেগে উঠে বলল, তোকে কথা বলতে নিষেধ করলাম, তবু কথা বলছিস? বললাম না, আমার ঘুম পাচ্ছে?

    প্লীজ আপু, আমার প্রশ্নের উত্তরটা দিয়ে দে, আর একটাও কথা বলব না।

    সায়মা, তুই কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি করছিস। আর যদি একটা কথা বলিস, রিডিংরুমে গিয়ে ঘুমাব।

    সায়মা খুব ভীতু। একা ঘুমাতে ভয় পায়। রূপা যেদিন কোনো কারণে খুব রেগে যায়, সেদিন রিডিংরুমে ঘুমাতে চলে যায়। সায়মা তখন অন্যায় স্বীকার করে অনেক কাকুতি মিনতি করে তাকে এই রুমে নিয়ে আসে। তাই এখন তার কথা শুনে আর কিছু না বলে ঘুমিয়ে পড়ল।

    রূপা কিন্তু অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমাতে পারল না। চিন্তা করতে লাগল, কিভাবে ছেলেটার পরিচয় পাওয়া যেতে পারে? হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি আসার পর ঘুমিয়ে পড়ল।

    পরের দিন সকালে রূপা আব্বুকে বলল, আমাদের বেডরুমে একটা প্যারালাল ফোনের ব্যবস্থা করে দাও। পড়ার সময় ফোন এলে ড্রইংরুমে গিয়ে ফোন ধরতে খুব বিরক্ত লাগে। অনেক সময় ওখানে বাইরের লোকজন থাকে। অসুবিধে হয়।

    রোকন উদ্দিন সাহেবের কোনো পুত্র সন্তান নেই। শুধু দু’টো মেয়ে। বড় মেয়ে রূপা মায়ের সবকিছু পেয়েছে। পুত্র সন্তান না থাকায় রোকন উদ্দিন সাহেব দুই মেয়েকেই ভীষণ ভালবাসেন। তবে রূপাকে একটু বেশি। তার কথা শুনে বললেন, প্যারালাল নয়, কয়েকদিনের মধ্যে আর একটা ফোন তোদের জন্য নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেব।

    রূপা বলল, কয়েকদিন পরে যা করার করো, আজ প্যারালাল ফোনের ব্যবস্থা করে দাও।

    রোকন উদ্দিন সাহেব মৃদু হেসে বললেন, ঠিক আছে, অফিসে গিয়ে একজন লোক পাঠিয়ে দেব। সে ব্যবস্থা করে দেবে।

    আজ সন্ধ্যের পর থেকে খুব ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। রাত নটার পর বৃষ্টি একটু কমলেও দমকা দমকা ঝড় বইছে। দশটার সময় খেয়ে এসে রূপা সায়মাকে বলল, ঝড়-বৃষ্টির কারণে আজ হয়তো ছেলেটা ফোন করবে না। তবু যদি করে, তুই ফোন ধরবি। তারপর কি বলবে বুঝিয়ে বলল।

    সায়মা বলল, আজ আবার মিথ্যে বলতে বলছ?

    হ্যাঁ বলছি। বাজে ঝামেলা থেকে বাঁচার জন্য মিথ্যে বললে দোষ হয় না।

    কিন্তু উনি তো আমার গলা চেনেন।

    চিনুক, তবু যা বলতে বললাম বলবি।

    ঠিক সাড়ে দশটায় ফোন বেজে উঠতে রূপা সায়মাকে রিসিভ করতে বলল।

    সায়মা রিসিভার তুলে সালাম দিয়ে বলল, রূপা বলছি।

    অপর প্রান্ত থেকে অজানা ছেলেটা সালামের উত্তর দিয়ে বলল, আপনি রূপা নন, সায়মা।

    কী করে বুঝলেন? আমি তো রূপাই বলছি।

    শুধু শুধু মিথ্যে বলে নিজেকে ছোট করছেন কেন?

    আপনি যখন বিশ্বাসই করছেন না তখন ফোন রেখে দিচ্ছি।

    প্লীজ রাখবেন না, দয়া করে আপনার আপুকে দিন।

    আপনি তো বিশ্বাসই করছেন না, আমি রূপা। রেখে দেব না তো কী করব?

    তা হলে বলুন, “আল্লাহর কসম আমি রূপা বলছি।”

    সায়মা জানে আল্লাহর নামে মিথ্যে কসম খাওয়া কবীরা গুণাহ। তাই কিছু বলতে না পেরে চুপ করে রইল।

    কী হল? আল্লাহর কসম খেয়ে বললেন না যে?

    সায়মা মাউথপীসে হাত চাপা দিয়ে রূপার দিকে তাকিয়ে কসম খাওয়ার কথা বলে বলল, এখন কী করব?

    রূপা তার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে বলল, আমার একটা অনুরোধ রাখবেন?

    ছেলেটা আহতস্বরে বলল, ছোট বোনকে দিয়ে এভাবে ফোন রিসিভ করতে বলা আপনার উচিত হয় নি। এটা আমার আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার কাছে সায়মা কত ছোট হয়ে গেল বলুন তো?

    উচিত অনুচিতের কথা পরে, আমার একটা অনুরোধ রাখবেন কী না বলুন?

    একটা কেন, হাজারটা অনুরোধ রাখব। তবে ফোন করার ব্যাপারটা ছাড়া। তারপর বলল, বেডরুমে ফোন নিয়ে খুব ভালো করেছেন। পড়ার সময় আর ডিস্টার্ব করব না। কাল থেকে সাড়ে বারটার সময় যখন ঘুমাতে যাবেন তখন করব।

    রূপা খুব অবাক হয়ে বলল, এ রুমে ফোন নিয়েছি আপনি জানলেন কিভাবে?

    আল্লাহর ইচ্ছায় আমি অনেক কিছু জানতে পারি। শু

    ধু আমাদের অনেক কিছু জানতে পারেন, না অন্যদেরও জানতে পারেন?

    অন্যদের কোনো কিছু জানার ইচ্ছা কখন হয় নি। তাই সেকথা বলতে পারলাম না। তারপর বলল, কী যেন অনুরোধ করবেন বললেন?

    তা আর করব না। তবে একটা প্রশ্ন করব, সঠিক উত্তর দেবেন তো?

    উত্তর জানা থাকলে সঠিকই দেব। কারণ কোনো মুমীন মুসলমান মিথ্যে বলতে পারে না।

    আপনি আমার পেছনে লেগেছেন কেন?

    উত্তরটা আপনি জানেন, তবু জিজ্ঞেস করছেন কেন?

    সিওর হওয়ার জন্য।

    যা জেনেছেন সেটাই সত্যি।

    আমি কি জেনেছি, তা আপনি বুঝলেন কী করে? কারো মনের কথা তো আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানতে পারে না। এটা কুরআন পাকের কথা।

    আপনি ঠিক কথা বলেছেন। তবে আল্লাহ যাদেরকে পছন্দ করেন তাদেরকে মানুষের মনের খবর জানার জ্ঞান দান করেন।

    তারা তো আল্লাহর খাস বান্দা। আপনিও কী নিজেকে তাই ভাবেন?

    কখনই না। তাদের পায়ের ধূলোর সমান যোগ্যতাও আমার নেই।

    তা হলে ঐ কথা বললেন কেন?

    আল্লাহর মেহেরবাণীতে আমি হিকমতের দ্বারা শুধু আপনাদের সবকিছু জেনে নিই।

    বুঝলাম না।

    পরে এক সময় বুঝিয়ে দেব। অবশ্য আপনিও চেষ্টা করলে হিকমতের দ্বারা আমার সবকিছু জানতে পারেন।

    হিকমত টিকমত বুঝিও না, আর জানিও না। আমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন। কিনা বলুন?

    বললাম তো, উত্তর জানা থাকলে নিশ্চয় দেব।

    আপনার নাম বলুন।

    আব্দুস সাত্তার।

    বাবার নাম?

    বলা যাবে না।

    ঠিকানা?

    তাও বলা যাবে না।

    কেন?

    বললাম বলা যাবে না, তবু জিজ্ঞেস করছেন কেন?

    আপনি কী করেন?

    দু’তিন মাস পরে ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স দেব।

    আপনার বাবা কী করেন?

    একটা বেসরকারী কলেজে অধ্যাপনা করেন।

    আপনি যখন ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স করছেন তখন ধর্ম সম্পর্কে নিশ্চয় অনেক জ্ঞান রাখেন?

    তাতো কিছু রাখি।

    তা হলে প্রতি রাতে একজন গায়ের মহররম মেয়েকে ফোন করা যে ইসলামের পরিপন্থী, তা তো জানার কথা। তবু করেন কেন?

    আপনাকে প্রায় দু’বছর আগে থেকে ভালবাসি এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিয়ে। করব। জীবন সাথী পছন্দ করা ইসলামের পরিপন্থী নয়।

    এই আইন শুধু ছেলেদের বেলায়, না মেয়েদের বেলায়ও।

    উভয়েরই।

    আমি তো আপনাকে দেখি নি, চিনি নি, আপনাকে যদি আমার পছন্দ না হয়?

    ছেলেরা যেসব কারণে মেয়েদের পছন্দ করে, সে সব আপনার মধ্যে আছে। তাই আমি যেমন আপনাকে পছন্দ করেছি, তেমনি মেয়েরা যেসব কারণে ছেলেদের পছন্দ করে, সেসব আমার মধ্যে আছে। তাই আমি হান্ড্রেডপার্সেন্ট সিওর, আমাকে দেখলে আপনি অপছন্দ করবেন না।

    আপনার কথা সত্য হলেও সবক্ষেত্রে নয়। যেমন অনেক সুন্দরী মেয়ে অসুন্দর ছেলেকে পছন্দ করে। আবার অনেক সুন্দর ছেলে অসুন্দর মেয়েকে পছন্দ করে।

    আপনার কথা অস্বীকার করব না। আমি বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিতে বলেছি। আর আপনি যা বললেন, তা ব্যতিক্রম।

    আপনি আমাকে দেখে শুনে ও আমাদের সবকিছু জেনে পছন্দ করেছেন এবং বিয়ে করার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন বললেন। আমারও কী উচিত নয়, আপনাকে দেখে।

    ও আপনাদের সবকিছু জেনে পছন্দ করা?

    অফকোর্স।

    তা হলে বলুন, কবে-কখন ও কোথায় আপনার সঙ্গে আলাপ করব।

    কাল বলব, আজ অনেক রাত হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়ন, নচেৎ ফজরের নামায কাযা হয়ে যাবে। তারপর রূপা কিছু বলার আগেই সালাম দিয়ে লাইন কেটে দিল।

    রূপা সালামের উত্তর দিয়ে রিসিভার রেখে দিল।

    সায়মা এতক্ষণ নিজের খাটে বসেছিল। ছেলেটার কথা শুনতে না পেলেও আপুর কথায় বুঝতে পারল, সে আপুকে ভালবাসে ও বিয়ে করতে চায়। তাই রিসিভার রেখে দেওয়ার পর জিজ্ঞেস করল, ছেলেটা পরিচয় বলেছে?

    শুধু নাম বলেছে আব্দুস সাত্তার। বাবার নাম ও বাসার ঠিকানা বলে নি।

    তুই দেখা করার কথা বলতে কী বলল?

    কাল বলবে বলেছে?

    আর কী করেন জিজ্ঞেস করতে?

    ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স দেবে।

    নাম ছাড়া অন্য কিছুই যখন বলে নি, মনে হয় ছেলেটা ফ্রড। একা একা তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া তোর ঠিক হবে না।

    তোকে অত পাকামী করতে হবে না। নে এবার শুয়ে পড় বলে রূপা বাথরুম থেকে এসে শুয়ে পড়ল।

  • অবতারের মহিমা

    অবতারের মহিমা

    অবতারের মহিমা

    উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

    সে দিন পূর্ণিমা। সন্ধ্যাবেলাই চায়ের পেয়ালা কোলে করে’ পণ্ডিত হৃশীকেশের সঙ্গে মুখোমুখি হ’য়ে বসে’ রকম-বেরকমের খোসগল্প করা যাচ্চে, এমন সময় ঘর্ম্মাক্ত কলেবরে হাঁপাতে হাঁপাতে গোপাল দা’ এসে উপস্থিত।

    গোপাল দা’কে তোমার মনে আছে ত? দাদার যা’ বয়স তাকে ঠিক যৌবন বলা চলে না, কিন্তু এখনও তেমনি নধর গোল গাল চুকচুকে চেহারা; আর দুপয়সা রোজগারের সঙ্গে সঙ্গে ধৰ্ম্ম-কর্ম্মেও মতিগতি হয়েছে। বার, ব্রত, উপবাস, হাঁচি, টিক্‌টিকি প্রভৃতি অষ্টসাত্ত্বিক লক্ষণের অনেকগুলিই দেখা দিয়েছে, টাকের পিছনে একটি ছোটখাট টিকিও গজিয়েছে। দাদা ফিরছেন এই পূজোর পর সস্ত্রীক গয়া দর্শন করে।

    ঘরে ঢুকেই একখানা ঠ্যাং-ভাঙ্গা চেয়ারের উপর বস্‌তে গিয়ে দাদা প্রায় ডিগবাজী খাব-খাব হয়েছেন এমন সময় পণ্ডিত হৃশীকেশ চায়ের পেয়ালায় গোঁফজোড়া জুব্‌ড়ে চোখদুটি উঁচু করে’ খুব সহানুভূতিসূচক স্বরে বলিলেন— “দেখো, দাদা, ভাঙ্গা চেয়ারখানায় যেন বোসো না”। দাদার চোখের কোণে সাত্বিক প্রকৃতির ঈষৎ বিকৃতির লক্ষণ দেখা দিল; কিন্তু দাদা সেটুকু সাম্‌লে নিয়ে আমার দিকে চেয়ে বল্‌লেন— “এবার গয়ায় গিয়ে দেখে এলাম বুদ্ধদেবের দাঁত। সহজে কি মোহাস্ত দেখাতে চায়! অনেক কাকুতি-মিনতি করে’ তবে দর্শন পেয়েছি। অবতার পুরুষের অঙ্গ কি না—এই এত বড়! আর কি মহিমা, ভায়া! এমন হাজার হাজার লোক সেখানে পূজো মানস করে আধিব্যাধি থেকে যুক্ত হচ্চে।”

    পণ্ডিত হৃদীকেশ ততক্ষণ নিজের পেয়ালাটি নিঃশেষ করে’ দাদার জন্য এক পেয়ালা ঢেলে ভুল করে’ নিজের মুখের দিকে তুল্‌তে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বুদ্ধদেবের দাঁতের মহিমা শুনে সেটি আবার নামিয়ে রেখে বললেন— “তা, আর হবে না! আমাদের বিট্‌লেরাম বাবাজী ত ভক্তিতত্ত্ব-কৃজ্ঝটিকায় লিখেই গেছেন—“হরির চেয়ে হরি নামের বেশী মাহাত্ম্য—তা’ বুদ্ধদেবের চেয়ে তাঁর দাতের মহিমা যে বেশী হবে’ এতো জানা কথা।”

    বুদ্ধদেবের সম্বন্ধে এ রকম বক্রোক্তি শুনে গোপাল দা’ একটু ক্রুদ্ধ হবার চেষ্টা কর্‌ছিলেন। কিন্তু তাঁর অন্তরাত্মায় যে ক্রোধের উদ্রেক হয়েছিল তা তাঁর অস্থি, মজ্জা, মেদ, বসা, চৰ্ম্ম, ফুঁড়ে বহিরঙ্গে প্রকাশ হবার পূর্ব্বেই পণ্ডিতজী ফের বক্তৃতা সুরু করে’ দিলেন—“শাস্ত্রে যে বলে অবতার পুরুষেরা আত্মভোলা, গোপালদা’র কথা শুনে সে-সম্বন্ধে আজ আমার সব সন্দেহ দূর হ’য়ে গেল। আহা! দেখ একবার তামাসা! বুদ্ধদেব নিজেই সংসারের আধিব্যাধির দাওয়াই খুঁজ্‌তে খুঁজ্‌তে হয়রাণ হয়েছিলেন। তাঁর নিজের দাঁতের যে এত গুণ তা’ যদি জানতেন ত একটা কেন, বত্রিশটাই উপড়ে ফেলে গোপালদা’কে বখ্‌সিস দিয়ে যেতেন। বৌদিদিকে আর তা’হলে ঢোলকের মত মাদুলি ব’য়ে বেড়াতে হোতো না।”

    বক্তৃতার ঝাপ্‌টা লেগে চা’টা মাঝ থেকে ঠাণ্ডা হয়ে যায় দেখে আমিই সেটার সদ্ব্যবহার করে’ নিজেকে একটু গরম করে’ নিলুম। কেননা দেখলুম যে, এই শনিবারের বারবেলায় পণ্ডিতজীর জিহ্বাখানি বেশ একটু বিষিয়েছে, কাউকে-না-কাউকে না ছুব্‌লে তিনি ছাড়বেন না।”

    রাগে গোপালদা’র শ্যামবর্ণ মুখখানি একেবারে অন্ধকার বর্ণ হয়ে দাঁড়াল। তক্তাপোষে একটা বিরাট চাপড় মেরে তিনি বল্‌লেন—“কি সৰ্ব্বনেশে কথা! আমি দেখে এলাম বুদ্ধদেবের দাঁত, আর তুমি না বল্লেই হবে! অবতার পুরুষদের তুমি ঠাওরেছে কি? তাদের মহিমা যুগযুগান্তর ধরে’ থাকে!”

    পণ্ডিত হৃশীকেশ বক্তৃতার পর গলাটা একটু ভিজিয়ে নেবার জন্যে এতক্ষণ আর এক পেয়ালা চা ঢাল্‌ছিলেন। এক চুমুক খেয়ে জিহ্বাটা বেশ একটু শানিয়ে নিয়ে বললেন—“সে কথা আর বল্‌তে! মহিমার জ্বালায় হাড় ভাজা-ভাজা হয়ে উঠেছে। এলেন ত্রেতাযুগে অবতার রামচন্দ্র, আর ছেড়ে দিয়ে গেলেন দেশের মধ্যে এক পাল হনুমান! গেরস্তর বাগানে কলাটা, মুলোটা বার্ত্তাকুটা কিছুই আর থাকবার জো নেই! তারপর দ্বাপরে এলেন শ্রীমান কৃষ্ণচন্দ্র, ঢলাঢলি রক্তারক্তি যা করে’ গেলেন, তার ছাপ এখনও দেশ থেকে মোছেনি। কলিতে নাকি এসেছিলেন শ্রীগৌরাঙ্গ—আর ছেড়ে দিয়ে গেছেন দেশে ঝাঁকে ঝাঁকে নেড়ানেড়ী। বলা নেই, কওয়া নেই, একেবারে বাড়ীর ভিতরে এসে—‘জয় রাধে কৃষ্ট, দাও মা দুটি ভিক্ষে’, দিতেই হবে’;– আর এদিকে চালের দর ১২৲ টাকা। আজকাল আবার গাঁয়ে গাঁয়ে অবতার গণ্ডায় গণ্ডায় জন্মে দেশময় ত্যাগধর্ম্মের মহিমা ঘোষণা কর্‌তে লেগে গেছেন। পুরাণো অবতারদের তবু দুটো ফুল বিল্বপত্র দিয়েই তুষ্ট করা যায়; কিন্তু এই হালফ্যাসনের অবতারদের বচনের ঠেলা সাম্‌লাতে পোড়া দেশের যে কত দিন লাগবে তা’ ভগবানই জানেন।”

    পণ্ডিত হৃশীকেশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাকি চা টুকু শেষ করে’ দিলেন। গোপাল দা’ কি-একটা বলতে যাচ্ছিলেন; কিন্তু তাঁর ভাবটা স্ফুট ভাষায় ব্যক্ত হবার পূর্ব্বেই মা সরস্বতী পণ্ডিতজীর জিহ্বায় ভর করে’ বোসলেন। তিনি উর্দ্ধবাহু হয়ে শূন্যে একটা টুকি মেরে বল্লেন—“চুলোয় যাক্‌ ত্যাগের কথা ঘরে সম্পত্তির মধ্যে ত একটা বুড়ী ব্রাহ্মণী আর-একটা সিংভাঙ্গা গোরু; তাও আবার দু’ বছর থেকে দুধ দেয় না। সেগুলো না হয় কামিনী-কাঞ্চনের দোহাই দিয়ে ত্যাগই কল্লুম। আর এই দুর্ভিক্ষের দিনে অবতার পুরুষদের হুকুম মত কোনো দিন বা উপবাস; কোনো দিন বা পান্তাভাত ভক্ষণ, তা’ও না-হয় চল্‌তে পারে। কিন্তু অবতারেরা যদি পাজি-পুঁথি দেখে একটা ভাল দিন স্থির করে’ হুকুম করেন যে আজ পাঁচ্‌টা দশ মিনিট থেকে সাতটা বাইশ মিনিট পৰ্য্যন্ত সবাই দিলে কাঁদ; কাল ন’টা সতের মিনিট থেকে সাড়ে দশটা পৰ্য্যন্ত সবাই মিলে গড়ের মাঠে গিয়ে ডিগবাজী খাও, তা’হলে যে পৈতৃক প্রাণটা নিতান্তই অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে ৷ এ সব দাঁত-পূজো, খড়ম-পুজো, কাঁথা-পূজোরই উল্টো পিঠ।”

    কথাগুলোর মধ্যে রাজনীতির একটু বোট্‌কা গন্ধের আভাষ পেয়ে তাড়াতাড়ি সেরে নেবার জন্যে আমি বল্‌লাম— “ও-সব সে কালে চল্‌তো, পণ্ডিতজী; আজকালকার ছেলেরা অত সহজে ঘাড় নোয়ায় না।”

    পণ্ডিতজী একটু হেঁসে বল্লেন— “ঐ ত তোমাদের রোগ, ভায়া; পুরাণো বন্ধু একটু বেশ বদ্‌লে এলে আর তোমরা চিন্‌তে পার না। মানুষের ধাত কি আর অত সহজে বদ্‌লায়? ছাপান্ন পুরুষ ধরে’ যারা খড়ম-পূজো কোরে এসেছে, তাদের ঘাড়গুলি কারো না কারো পায়ের তলায় লুটিলে পড়বার জন্যে ব্যস্ত হয়ে রয়েছে। যেমন-তেমন একটা হলেই হলো—হয় গুরুঠাকুর, নয় প্রভুপাদ, নয় মহাত্মা, নয় লিডার। ওসব এক জিনিসেরই কালভেদে ভিন্নরূপ। এঁরাই প্রমোশন পেয়ে ক্রমশঃ অবতার হ’য়ে দাঁড়ান। তখন তাদের হাতে ভেল্কি হয়, দাঁতে রোগ সারে, চটিজুতোর শুকতলা ভিজিয়ে খেলে একবারে পরমপদ প্রাপ্তি হয়।”

    চটিজুতার কথা শুনে গোপাল দা’ও হেসে ফেল্লেন, কিন্তু পণ্ডিতজীর তখন বক্তৃতাটা মাথায় চড়ে গেছে। তিনি বল্লেন— “না, না, দাদা এটা হেসে ওড়াবার কথা নয়। রাজনীতি, সমাজনীতি, ধৰ্ম্মনীতি, এমনকি গার্হস্থ্যনীতিতে পর্যন্ত আমরা ঐ খড়ম পূজোকেই সার সত্য বলে স্থির করে’ ফেলেছি। আমরা ফুল বিল্বপত্র হাতে করে’ বসে আছি, যেই একটি ছোটখাট মহাপুরুষের আবির্ভাব, অমনি শ্রীচরণে অঞ্জলি দিয়ে, ঢাক ঢোল কাঁশি বাজিয়ে, চামর ঢুলিয়ে, হেঁসে কেঁদে, নেচে গেয়ে এমনি একটা বীভৎস ব্যাপার করে তুলি যে মহাপুরুষটি যদি সাক্ষাৎ ভগবানও হন, ত তাঁর ভূত হ’য়ে যেতে বড় বেশী বিলম্ব হয় না। তারপর তাঁর দাঁত, নখ, চুল নিয়ে দলাদলি আর মারামারি। তিনি ফুস কর্‌লেন কি ফাস্ কর্‌লেন, টুক করলেন কি টাক্‌ করলেন—এই নিয়ে গভীর আধ্যাত্মিক গবেষণা! এ সব কি ধর্ম্ম রে বাপ!—এ শুধু জড়ভরতের জটলা; বক্-ধার্ম্মিক শেয়াল-কোম্পানির আধ্যাত্মিক হুক্কা হুয়া।”

    গোপাল দা এগুক্ষণ চুপ করে’ ভ্যাদা গঙ্গারামের মত বসে ছিলেন। এইবার পণ্ডিতজীকে থাম্‌তে দেখে একটু সাহস পেয়ে বল্লেন—“তা’ বলে ত আর বাপ পিতাম’র ক্রিয়াকাণ্ড ছাড়তে পারিনে।”

    পণ্ডিতজী লাফিয়ে উঠে বল্লেন— “সে দোষ ত তোমার নয়, দাদা, দোষ তোমার ভগবানের। মনটা যার এখনও চার পায়ে হাঁটে, তাকে মানুষের আকার দিয়ে তার শরীরটাকে দু’পায়ে হাঁটান—একটা অত্যাচার বই ত নয়! মনটা আমাদের ক্রমাগত খুঁজ্‌ছে কোথায় কার পায়ের তলায় পড়ে’ নাক রগড়াবে; তাই আমরা সব কাজেই একজন-না-একজন মুরুব্বীর দোহাই দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাই। পরকালের ব্যবস্থা করতে হবে—ত টেনে আন দু’চারটি মহত্মাকে না হয় অবতারকে; দেশের স্বাধীনতা চাই ত আওড়াও মিল-বেনথামের বুলি; সমাজ গড়তে হবে ত নিয়ে এস ধার করে’ বল্‌সেভিজম্ ঘরকন্না গড়তে হবে, ত ডাক রাঙ্গা ঠানদিদিকে, না হয় ত পদী পিসিকে। মোট কথা কারো-না-কারো আওতায় পড়লে তবে আমরা থাকি ভাল। আমাদের মনগুলি যে এক-একটি বোরখাঢাকা পর্দ্দানসিন বিবি। ভগবানের খোলা হাওয়া গায়ে লাগলেই তাদের ধর্ম্ম-কর্ম সব পণ্ড হ’য়ে যাবে। আমাদের মনে মনে বেশ একটা ভয় আছে যে পাঁচজন মুরুব্বী মিলে ভগবানের এই সৃষ্টিটাকে ঠেকনা দিয়ে না রাখলে সৃষ্টিটা একদিন হুড়মুড় করে’ পড়ে যাবে। তাই আমাদের কথায়-কথায় পরের দোহাই, বাপ-পিতাম’র নাম করে নিজেদের পঙ্গুত্ব লুকিয়ে রাখা। নমশূদ্রের জল চল্ কর্‌তে হবে, ত দেখ পরাশর, যাজ্ঞবল্ক্য কি বলে গেছেন; আর পরাশর, যাজ্ঞবল্ক্য যে এদিকে কবে মরে ভূত হ’য়ে গেছেন তার ঠিক-ঠিকানা নেই! যারা জাত মানেন, তাঁরা দোহাই দেন পুঁথির, আর যারা মানেন না তাঁরা দোহাই দেন ফ্রেঞ্চ রিভলিউসনের। দোহাই একটা দেওয়া চাই!! নিজের বলে ত আমাদের কিছু নেই। সমাজ আর ধর্ম্ম—বাপ ঠাকুরদাদার; দেশটা বিদেশীর; আর মনটা— যিনি দয়া করে দুটি পায়ের ধুলা দেন তাঁর। আমাদের ধর্ম্মের মধ্যে খড়ম-পূজো আর কর্ম্মের মধ্যে পাদোদক পান! সস্কৃত-পড়া পণ্ডিত, আর ইংরিজী পড়া গ্রাজুয়েট— সবাইকার ঐ এক গতি; তফাতের মধ্যে এই যে একজন গড়াগড়ি দেন পূর্ব্বমূখ হ’য়ে, আর একজন পশ্চিম মুখ হ’য়ে; একজন মন্ত্র আওড়ান সস্কৃতে আর একজন আওড়ান ইংরিজিতে। ধর্ম্মের বেলায় সত্যপীর আর রাজনীতির বেলায় মন্টেগু।”

    বক্তৃতাটা বেশ জমে আসছে, এমন সময় বাড়ীর ভেতর থেকে পোঁ করে শাঁক বেজে উঠতেই পণ্ডিতজী থেমে গিয়ে আমার মুখের দিকে চাইলেন। ও! আজ যে পূর্ণিমা! আমরা বাহিরে বসে বক্তৃতা করছি আর ব্রাহ্মণী যে ঘরের মধ্যে সত্যপীরকে সিন্নি খাওয়াচ্ছেন! তার পরেই দরজার শিকলি নেড়ে ডাক পড়্‌ল—ঠুন্‌ ঠুন্ ঠুন্, ঠুন্ ঠুন্ ঠান। আমি একটু উসখুস করছি দেখে পণ্ডিতজী বল্লেন, “যাও, ভায়া, সত্যপীরের কথা শোন গে। আজ তা’হলে এই খানেই বেদব্যাসের বিশ্রাম।

    পণ্ডিতজী বেরিয়ে পড়লেন; আর আমি গোপাল দাদাকে সঙ্গে নিয়ে সত্যপীরের কথা শুনতে চললুম। পুরুৎঠাকুর তখন গলা ছেড়ে পড়্‌ছেন—

    “একথা শ্রবণ কালে                                যেবা অন্য কথা বলে

    আর যেবা করে উপহাস,

    লাঞ্ছিত সে সৰ্ব্ব ঠাঁই                               তাহার নিষ্কৃতি নাই

    আকস্মাৎ হয় সর্ব্বনাশ!”

    পণ্ডিত হৃষীকেশের যে হঠাৎ কি সৰ্ব্বনাশটাই ঘট্‌বে তাই ভেবে আমি শিউরে উঠতে লাগলাম।

  • মৃৎপ্রদীপ

    মৃৎপ্রদীপ

    মৃৎপ্রদীপ

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    প্রাণিতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতেরা মাটি খুঁড়িয়া অধুনালুপ্ত প্রাগৈতিহাসিক জীবের যে সকল অস্থি-কঙ্কাল বাহির করেন, তাহাতে রক্তমাংস সংযোগ করিয়া তাহার জীবিতকালের বাস্তব মূর্তিটি তৈয়ারি করিতে গিয়া অনেক সময় তাঁহাদিগকে নিছক কল্পনার আশ্রয় লইতে হয়। ফলে যে মূর্তি সৃষ্টি হয়, সত্যের সহিত তাহার সাদৃশ্য আছে কি না এবং থাকিলেও তাহা কতদূর, সে সম্বন্ধে মতভেদ ও বিবাদ-বিসংবাদ কিছুতেই শেষ হয় না।

    আমাদের দেশের ইতিহাসও কতকটা ঐ ভূ-প্রোথিত অতিকায় জন্তুর মতো। যদি বা বহু ক্লেশে সমগ্র কঙ্কালটুকু পাওয়া যায়, তাহাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হওয়া দূরের কথা, তাহার সজীব চেহারাখানা যে কেমন ছিল তাহা আংশিকভাবে প্রতিপন্ন হইবার পূর্বেই বড় বড় পণ্ডিতেরা অত্যন্ত তেরিয়া হইয়া এমন মারামারি কাটাকাটি শুরু করিয়া দেন যে, রথি-মহারথী ভিন্ন অন্য লোকের সে কুরুক্ষেত্রের দিকে চক্ষু ফিরাইবার আর সাহস থাকে না। এবং যুদ্ধের অবসানে শেষ পর্যন্ত সেই কঙ্কালের বিভিন্ন হাড় কয়খানাই রণাঙ্গনে ইতস্তত পড়িয়া থাকিতে দেখা যায়।

    তাই, যখনই আমাদের জন্মভূমির এই কঙ্কালসার ইতিহাসখানা আমার চোখে পড়ে তখনই মনে হয়, ইহা হইতে আসল বস্তুটির ধারণা করিয়া লওয়া সাধারণ লোকের পক্ষে কত না দুরূহ ব্যাপার। যে মৃৎপ্রদীপের কাহিনী লিখিতে বসিয়াছি, তাহারই কথা ধরি না কেন। প্রাচীন পাটলিপুত্রের যে সামান্য ধ্বংসাবশেষ খনন করিয়া বাহির করা হইয়াছে, তাহারই চারিপাশে স্বপ্নাবিষ্টের মতো ঘুরিতে ঘুরিতে জঞ্জাল-স্তূপের মধ্যে এই মৃৎপ্রদীপটি কুড়াইয়া পাইয়াছিলাম। নিতান্ত একেলে সাধারণ মাটির প্রদীপের মতোই তাহার চেহারা, ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়া প্রায় কাগজের মতো পাতলা হইয়া গিয়াছে। কিন্তু এতকাল পরেও তাহার মুখের কাছটিতে একটুখানি পোড়া দাগ লাগিয়া আছে। এই নোনাধরা জীর্ণ বিশেষত্ববর্জিত প্রদীপটি দেখিয়া কে ভাবিতে পারে যে, উহার মুখের ঐ কালির দাগটুকু একদিন ইতিহাসের একটি পৃষ্ঠাকে একেবারে কালো করিয়া দিয়াছিল এবং উহারই ঊর্ধ্বোত্থিত ক্ষুদ্র শিখার বহ্নিতে একটা রাজ্য পুড়িয়া ছারখার হইয়া গিয়াছিল।

    অনুসন্ধিৎসু ঐতিহাসিকেরা বোধ করি অবহেলা করিয়া এই তুচ্ছ প্রদীপটা ফেলিয়া দিয়াছিলেন, মিউজিয়ামে স্থান দেন নাই। আমি সযত্নে কুড়াইয়া আনিয়া সন্ধ্যার পর আমার নির্জন ঘরে মধুমিশ্রিত গব্য ঘৃত দিয়া উহা জ্বালিলাম। কতদিন পরে এ প্রদীপ আবার জ্বলিল? পুরাবৃত্তের কোন্‌ মসীলিপ্ত অধ্যায়কে আলোকিত করিল? বিজ্ঞ পুরাতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতেরা তাহা কোথা হইতে জানিবেন? উহার অঙ্গে তো তাম্রশাসন-শিলালিপি লটকানো নাই! সে কেবল আমার, — এই জাতিস্মরের মস্তিষ্কের মধ্যে দুরপনেয় কলঙ্কের কালিমা দিয়া মুদ্রিত হইয়া আছে।

    প্রদীপ জ্বলিলে যখন ঘরের দ্বার বন্ধ করিয়া বসিলাম, তখন নিমেষমধ্যে এক অদ্ভূত ইন্দ্রজাল ঘটিয়া গেল। স্তম্ভিত কাল যেন অতীতের সঙ্গী এই প্রদীপটাকে আবার জ্বলিয়া উঠিতে দেখিয়া বিস্মিত দৃষ্টিতে পিছু ফিরিয়া তাকাইয়া রহিল। এই পাটলিপুত্র নগর মন্ত্রবলে পরিবর্তিত হইয়া কবেকার এক অখ্যাত মগধেশ্বরের মহাস্থানীয় রাজধানীতে পরিণত হইল। আর আমার মাথার মধ্যে যে স্মৃতিপুত্তলিগুলি এতক্ষণ স্বপ্নের মতো ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল, তাহারা সজীব হইয়া আমার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। প্রত্যেকটি ক্ষুদ্র ঘটনা— কত নগণ্য অনাবশ্যক কথা— এই বর্তিকার আলোকে দীপ্তিমান জীবন্ত স্পষ্ট হইয়া উঠিল। আমার সম্মুখ হইতে বর্তমান মুছিয়া একাকার হইয়া গেল, কেবল অতীতের বহুদূর জন্মান্তরের স্মৃতি ভাস্বর হইয়া জ্বলিতে লাগিল।

    সেই প্রদীপ সম্মুখে ধরিয়া তাহারই আলোতে আজ এই কাহিনী লিখিতেছি।

    আজি হইতে ষোল শতাব্দী আগেকার কথা।

    ক্ষুদ্র ভূস্বামী ঘটোৎকচগুপ্তের পুত্র চন্দ্রগুপ্ত লিচ্ছবি রাজবংশে বিবাহ করিয়া শ্যালককুলের বাহুবলে পাটলিপুত্র দখল করিয়া রাজা হইলেন। রাজা হইলেন বটে, কিন্তু নামে মাত্র। পট্টমহাদেবী লিচ্ছবিদুহিতা কুমারদেবীর দুর্ধর্ষ প্রতাপে চন্দ্রগুপ্ত মাথা তুলিতে পারিলেন না। রাজমুদ্রায় রাজার মূর্তির সহিত মহাদেবীর মূর্তি ও লিচ্ছবিকুলের নাম উৎকীর্ণ হইতে লাগিল। রাজার নামে রানী স্বেচ্ছামত রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। রাজা একবার নিজ আজ্ঞা প্রচার করিতে গিয়া দেখিলেন, তাঁহার আজ্ঞা কেহ মানে না। চন্দ্রগুপ্ত বীরপুরুষ ছিলেন, তাঁহার আত্মাভিমানে আঘাত লাগিল; কিন্তু কিছুই করিতে পারিলেন না। নিষ্ফল ক্রোধে শক্তিশালী শ্যালককুলের প্রতি বক্রদৃষ্টিপাত করিয়া তিনি মৃগয়া, সুরা ও দ্যুতক্রীড়ায় মনোনিবেশ করিলেন।

    প্রজাদের তাহাতে বিশেষ আপত্তি ছিল না। রাজা বা রানী যিনিই রাজত্ব করুন, তাহাদের কিছু আসে যায় না। মহামারী, দুর্ভিক্ষ অথবা যুদ্ধের হাঙ্গামা না থাকিলেই তাহারা সন্তুষ্ট। কান্ববংশ লুপ্ত হইবার পর বহুবর্ষব্যাপী যুদ্ধ-বিগ্রহ অন্তর্বিবাদে দেশ অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছিল। প্রকাণ্ড মগধ সাম্রাজ্য বিষ্ণুচক্রে ছিন্ন সতীদেহের ন্যায় খণ্ড খণ্ড হইয়া বহু ক্ষুদ্র রাজ্যের সমষ্টিতে দাঁড়াইয়াছিল। ক্ষুদ্র রাজারা ক্ষুদ্র কারণে পরস্পর কলহ করিয়া প্রজার দুর্গতি বাড়াইয়া তুলিয়াছিলেন। এই সময় চন্দ্রগুপ্ত পাটলিপুত্র ও তাহার পারিপার্শ্বিক ভূখণ্ড অধিকার করিয়া কিছু শান্তি আনয়ন করিয়াছিলেন। শান্তিতে জীবনযাত্রা নির্বাহ করিতে পাইয়া প্রজারা তৃপ্ত ছিল, রাজা বা রানী— কে প্রকৃতপক্ষে রাজ্যশাসন করিতেছেন, তাহা দেখিবার তাহাদের প্রয়োজন ছিল না।

    যাহা হউক, তরুণী পট্টমহিষী একমাত্র শিশুপুত্র সমুদ্রগুপ্তকে ক্রোড়ে লইয়া রাজ-অবরোধ হইতে প্রজাশাসন করিতেছেন, দেশে নিরুপদ্রব শান্তিশৃঙ্খলা বিরাজ করিতেছে, এমন সময় একদিন শরৎকালের নির্মল প্রভাতে মহারাজ চন্দ্রগুপ্ত নগরোপকণ্ঠের বনমধ্যে মৃগয়া করিতে গেলেন। মহারাজ মৃগয়ায় যাইবেন, সুতরাং পূর্ব হইতে বনমধ্যে বস্ত্রাবাস ছাউনি পড়িল। কারুকার্যখচিত রক্তবর্ণের পট্টবাস সকল অকালপ্রফুল্ল কিংশুকগুচ্ছের ন্যায় বনস্থলী আলোকিত করিল। কিঙ্করী, নর্তকী, তাম্বূলিক, সংবাহক, সূপকার, নহাপিত প্রভৃতি বহুবিধ দাসদাসী কর্ম-কোলাহলে ও আনন্দ কলরবে কাননলক্ষ্মীর বিশ্রব্ধ শান্তি ভঙ্গ করিয়া দিল। তারপর যথাসময়ে পরিষদ-পরিবেষ্টিত হইয়া সুরারুণনেত্র মগধেশ্বর মৃগয়াস্থলে উপস্থিত হইলেন।

    প্রভাতে দ্যূতক্রীড়া ও তিত্তিরি-যুদ্ধ দর্শন করিয়া চন্দ্রগুপ্ত আনন্দে কালহরণ করিলেন। দ্বিপ্রহরে পানভোজনের পর অন্য সকলকে শিবিরে রাখিয়া মাত্র চারিজন বয়স্য সঙ্গে মহারাজ অশ্বারোহণে অরণ্যমধ্যে প্রবেশ করিলেন। বয়স্যরা সকলেই মহারাজের সমবয়স্ক যুবা, সকলেই সমান লম্পট ও উচ্ছৃঙ্খল। চাটুমিশ্রিত ব্যঙ্গ-পরিহাস করিতে করিতে তাহারা মহারাজের সঙ্গে চলিল।

    মৃগ-অন্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে প্রায় দিবা তৃতীয় প্রহরে এক ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনীর কূলে সহসা তাঁহাদের গতিরোধ হইল। সর্বাগ্রে মহারাজ দেখিলেন, তটিনীর উচ্চ তটের উপর ছিন্নমৃণাল কুমুদিনীর মতো এক নারীমূর্তি পড়িয়া আছে। দেহে বস্ত্র কিংবা আভরণ কিছুই নাই— সম্পূর্ণ নগ্ন। কণ্ঠে, প্রকোষ্ঠে, কর্ণে অল্প রক্ত চিহ্ন। দেখিলে বুঝা যায়, দস্যুতে ইহার সর্বস্ব লুণ্ঠন করিয়া পলাইয়াছে।

    রাজা ত্বরিতপদে অশ্ব হইতে নামিয়া রমণীমূর্তির নিকটে গেলেন। নির্নিমেষ নেত্রে তাহার নগ্ন দেহ-লাবণ্যের দিকে চাহিয়া রহিলেন। নারীর বয়স ষোড়শ কি সপ্তদশের অধিক হইবে না। নবোদ্ভিন্ন যৌবনের পরিপূর্ণ বিকশিত রূপ; রাজা দুই চক্ষু ভরিয়া পান করিতে লাগিলেন। তাহার পর নতজানু হইয়া সন্তর্পণে বক্ষে হস্তার্পণ করিয়া দেখিলেন— প্রাণ আছে, দ্রুত হৃৎস্পন্দন অনুভূত হইতেছে।

    বয়স্য চারিজন ইতিমধ্যে রাজার পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল ও লুব্ধদৃষ্টিতে সংজ্ঞাহীনার অনাবৃত সৌন্দর্য নিরীক্ষণ করিতেছিল। সহসা রাজা তাহাদের দিকে ফিরিয়া কহিলেন, “এ নারী কাহার?”

    রাজার আরক্ত মুখমণ্ডল ও চক্ষুর ভাব দেখিয়া বয়স্যগণ পরিহাস করিতে সাহসী হইল না। একজন কুণ্ঠাজড়িত কণ্ঠে বলিল, “রাজ্যের সকল নর-নারীই মহারাজের।”

    মহারাজ বোধ করি অন্য কিছু ভাবিয়া এই প্রশ্ন করিয়াছিলেন, কিন্তু এইরূপ উত্তর পাইয়া তিনি প্রদীপ্ত দৃষ্টিতে দ্বিতীয় বয়স্যের দিকে ফিরিলেন। পুনরায় প্রশ্ন করিলেন, “এ নারী কাহার?”

    মন বুঝিয়া বয়স্য বলিল, “মহারাজের।”

    তৃতীয় বয়স্যের দিকে ফিরিয়া চন্দ্রগুপ্ত জিজ্ঞাসু নেত্রে চাহিলেন।

    কিন্তু তৃতীয় বয়স্য— সে অন্তরের দুর্দম লালসা গোপন করিতে পারিল না— ঈষৎ হাসিবার চেষ্টা করিয়া বলিল, “দস্যু-উপদ্রুতা নারী শ্রীমৎ মগধেশ্বরের ভোগ্যা নয়। এই নারীদেহটা মহারাজা অধমকে দান করুন।”

    বারুণী-কষায়িত নেত্র কিছুক্ষণ তাহার মুখের উপর স্থাপন করিয়া মহারাজ উচ্চহাস্য করিয়া উঠিলেন। বলিলেন, “বিট, স্বর্গের পারিজাত লইয়া তুই কি করিবি? এ নারী আমার”— এই বলিয়া উষ্ণীষ খুলিয়া সূক্ষ্ম বস্ত্রজালে রমণীর সবার্ঙ্গ ঢাকিয়া দিলেন।

    লুব্ধ বয়স্য তখনও আশা ছাড়ে নাই— রূপসীর প্রতি সতৃষ্ণ একটা কটাক্ষ হানিয়া বলিল, “কিন্তু মহারাজ, এ অনুচিত। পট্টমহাদেবী শুনিলে…”

    বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ন্যায় রাজা ফিরিয়া দাঁড়াইলেন। কর্কশ কণ্ঠে কহিলেন, “পট্টমহাদেবী? রে পীঠমর্দ, পট্টমহাদেবী আমার ভর্ত্রী নয়, আমি তার ভর্তা— বুঝিলি? এ রাজ্য আমার, এ নারী আমার— পট্টমহাদেবীর নয়।”

    এই আকস্মিক উগ্র ক্রোধে বয়স্যগণ ভয়ে নিশ্চল বাক্‌শূন্য হইয়া গেল। চন্দ্রগুপ্ত নিজেকে কিঞ্চিৎ সংযত করিয়া কহিলেন, “এই নারীকে আমি মহিষীরূপে গ্রহণ করিলাম। বয়স্যগণ, মহাদেবীকে প্রণাম কর।”

    যন্ত্রচালিতবৎ বয়স্যগণ প্রণাম করিল।

    তখন সেই সংজ্ঞাহীন দেহ সন্তর্পণে বক্ষে তুলিয়া মহারাজ অশ্বারোহণে শিবিরে ফিরিয়া চলিলেন। মূর্ছিতার অবেণীবদ্ধ মুক্ত কুন্তল কৃষ্ণ ধূমকেতুর মতো পশ্চাতে উড়িতে উড়িতে চলিল।

    শিবিরে ফিরিয়া সংজ্ঞালাভ করিবার পর রমণী যে পরিচয় দিল তাহা এইরূপ—

    তাহার নাম সোমদত্তা। সে শ্রাবস্তীর এক শ্রেষ্ঠীর কন্যা, পিতার সহিত চম্পাদেশে যাইতেছিল, পথে আটবিক দস্যু কর্তৃক অপহৃতা হয়। তাহার পিতাকে দস্যুরা মারিয়া ফেলে। অতঃপর দস্যুপতি তাহার রূপযৌবন দেখিয়া তাহাকে আত্মসাৎ করিতে মনস্থ করে। অন্য দস্যুগণ তাহাতে ঘোরতর আপত্তি করিল। ফলে তাহারা পরস্পরের সহিত বিবাদ-বিসংবাদ আরম্ভ করিল এবং একে অন্যের পশ্চাদ্ধাবন করিতে গিয়া, যাহাকে লইয়া কলহ তাহাকেই অরক্ষিত ফেলিয়া গেল। যাইবার সময় একজন চতুর দস্যু, পাছে সোমদত্তা কোথাও পলায়ন করে, এই ভয়ে তাহার বস্ত্র কাড়িয়া লইয়া তাহাকে অজ্ঞান করিয়া রাখিয়া যায়।

    যথাকলে চন্দ্রগুপ্ত সোমদত্তাকে দোলায় তুলিয়া নগরে লইয়া গেলেন। শাস্ত্রমত বিবাহ হইল কি না জানা গেল না, যদি বা হইয়া থাকে তাহা গান্ধর্ব কিংবা পৈশাচ-জাতীয়। যাহা হউক, দাসীসহচরীপরিবৃতা সোমদত্তা রাজপুরীর পুরন্ধ্রী হইয়া বাস করিতে লাগিল। তাহার অবস্থানের জন্য মহারাজ একটি স্বতন্ত্র মহল নির্দেশ করিয়া দিলেন।

    কুমারদেবী রাজার এই দুষ্মন্ত-উপাখ্যান শুনিলেন, কিন্তু ঘৃণাভরে কোনও কথা বলিলেন না। বিশেষত, সেকালের রাজাদের পক্ষে ইহা এমন কিছু গর্হিত কার্য ছিল না। একাধিক পত্নী ও উপপত্নী সকল রাজ-অন্তঃপুরেই স্থান পাইত। এমন কি, প্রকাশ্য বেশ্যাকে বিবাহ করাও রাজন্যসমাজে অপ্রচলিত ছিল না। কুমারদেবী অবিচলিত নিষ্ঠার সহিত পুত্রকে সম্মুখে রাখিয়া রাজকার্য পরিচালনা করিতে লাগিলেন। মহারাজ চন্দ্রগুপ্ত মধুভাণ্ডের নিকট ষট্‌পদের মতো সোমদত্তার পদপ্রান্তে পড়িয়া রহিলেন।

    এইরূপে ছয় মাস কাটিল।

    তারপর একদিন চূত-মধুক-সুগন্ধি বসন্তকালের প্রারম্ভে জলস্থল অন্ধকার করিয়া পঙ্গপালের মতো এক বিরাট বাহিনী দেশ ছাইয়া ফেলিল। ইতিহাসে এই ঘটনার উল্লেখমাত্র আছে। পুষ্করণা নামক মরুরাজ্যের অধিপতি চন্দ্রবর্মা দিগ্বিজয় যাত্রার পথে মগধ আক্রমণ করিলেন। হীনবীর্য মগধ বিনা যুদ্ধে অধিকৃত হইল। কিন্তু চন্দ্রবর্মা যাহা সংকল্প করিয়াছিলেন তাহা এত সহজে সিদ্ধ হইল না, — তিনি পাটলিপুত্রে জয়স্কন্ধাবার স্থাপন করিতে পারিলেন না। তাঁহার বিশাল সেনা-সমুদ্রের মধ্যস্থলে পাটলিপুত্র দুর্গ দশ লৌহদ্বারে ইন্দ্রকীলক আঁটিয়া দিয়া ক্ষুদ্র পাষাণদ্বীপের মতো জাগিয়া রহিল।

    মগধেশ্বর তখন সোমদত্তার গজদন্ত পালঙ্কে শুইয়া ঘুমাইতেছিলেন; প্রহরিণীর মুখে এই বার্তা শুনিয়া শয্যায় উঠিয়া বসিলেন। তাঁহার বহুকাললুপ্ত ক্ষত্রতেজ নিমেষের জন্য জাগ্রত হইয়া উঠিল, কক্ষের চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন, “আমার বর্ম?”— বলিয়াই তাঁহার কুমারদেবীর কথা স্মরণ হইল, মুখের দীপ্তি নিবিয়া গেল। ক্ষীণ শ্লেষের হাসি হাসিয়া বলিলেন, “আক্রমণ করিয়াছে তা আমি কি করিব। পট্টমহাদেবীর কাছে যাও।”— বলিয়া পুনশ্চ শয্যায় শয়ন করিলেন।

    সোমদত্তা প্রাসাদচূঁড়া হইতে দ্রুত চঞ্চলপদে নামিয়া আসিয়া দেখিল, রাজা পূর্ববৎ নিশ্চিন্তে ঘুমাইতেছেন। তাহার শিখরতুল্য দশনে বিদ্যুতের ন্যায় হাসি হাসিয়া গেল। রাজার মস্তকে মৃদু করস্পর্শ করিয়া অস্ফুটস্বরে কহিল, “ঘুমাও বীরশ্রেষ্ঠ! ঘুমাও!”

    এদিকে প্রহরিণী পট্টমহাদেবীকে গিয়া সংবাদ দিল। কুমারদেবী তখন ষষ্ঠবর্ষীয় কুমার সমুদ্রগুপ্তকে শিক্ষা দিতেছিলেন : “পুত্র, তুমি লিচ্ছবিকুলের দৌহিত্র, এ কথা কখনও ভুলিও না। পাটলিপুত্র তোমার পাদপীঠ মাত্র। ভরতের মতো, মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের মতো, চণ্ডাশোকের মতো এই সমুদ্রবেষ্টিত বসুন্ধরা তোমার সাম্রাজ্য, — এ কথা স্মরণ রাখিও। তুমি বাহুবলে গুর্জর হইতে সমতট, হিমাদ্রি হইতে অনার্য পাণ্ড্য-দেশ পর্যন্ত পদানত করিবে। তোমার যজ্ঞীয় অশ্ব উত্তরাপথে ও দাক্ষিণাপথে, আর্যাবর্তে ও দাক্ষিণাত্যে সমান অপ্রতিহত হইবে।”

    বালক রত্নখচিত ক্রীড়াকন্দুক হস্তে লইয়া গভীরমুখে মাতার কথা শুনিতেছিল।

    এমন সময় প্রতিহারিণীর মুখে ভয়ংকর সংবাদ শুনিয়া মহাদেবীর মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল; ক্ষণকাল নিশ্চল হইয়া বসিয়া রহিলেন। একবার ইচ্ছা হইল জিজ্ঞাসা করেন, আর্যপুত্র কোথায়। কিন্তু সে ইচ্ছা নিরোধ করিয়া বলিলেন, “শীঘ্র কঞ্চুকীকে মহামাত্যের কাছে পাঠাও— এখনি তাঁহাকে আমার সম্মুখে উপস্থিত করুক। দুর্গের দ্বার সকল রুদ্ধ হউক। বিনা যুদ্ধে মহাস্থানীয় শত্রুর হস্তে সমর্পণ করিব না।”

    মহাদেবীর আদেশের প্রয়োজন ছিল না, মহাসচিব ও সান্ধিবিগ্রহিক পূর্বেই দুর্গদ্বার রোধ করিয়াছিলেন। প্রাকারে প্রাকারে ভল্লহস্তে সতর্ক প্রহরী ঘুরিতেছিল, সিংহদ্বারগুলির উপরে বৃহৎ কটাহে তৈল উত্তপ্ত হইতেছিল। লৌহজালিকে সর্বাঙ্গ আচ্ছাদিত করিয়া স্নায়ুজ্যাযুক্ত ধনুহস্তে ধানুকিগণ ইন্দ্রকোষে লুক্কায়িত থাকিয়া পরিখা-পারস্থিত শত্রুর উপর বিষ-বিদূষিত শর নিক্ষেপ করিতেছিল। প্রাকারের হস্তিনখমধ্যে প্রচ্ছন্ন থাকিয়া সেনানীগণ শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করিতেছিল। বুভুক্ষিত কুম্ভীরদল পরিখার কমলবনের মধ্যে খাদ্যান্বেষণে ইতস্তত সঞ্চরণ করিয়া ফিরিতেছিল। বাহিরে শত্রুসৈন্য মাঝে মাঝে একযোগে দুর্গদ্বার আক্রমণ করিতেছিল। তখন মকরমুখ হইতে প্রচণ্ডবেগে তপ্ত— তৈল বর্ষিত হইতেছিল। আক্রমণকারীরা হতাহত সহচরদিগকে দুর্গদ্বারে ফেলিয়া ভগ্নোদ্যমে ফিরিয়া যাইতেছিল।

    পূর্ণ একদিন এইভাবে যুদ্ধ হইল। চন্দ্রবর্মা রণহস্তীর দ্বারা দুর্গদ্বার ভাঙিয়া ফেলিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু সে চেষ্টাও বিফল হইল। সর্বাঙ্গে বাণবিদ্ধ হস্তী মাহুতকে ফেলিয়া দিয়া আর্তনাদ করিতে করিতে পলায়ন করিল। চন্দ্রবর্মা দেখিলেন, যুদ্ধ করিয়া দুর্গজয় সহজ নহে।

    তখন তাঁহার সৈন্য যুদ্ধে ক্ষান্ত দিয়া দুর্গ বেষ্টন করিয়া বসিল। ক্রোশের পর ক্রোশ, যোজনের পর যোজন ব্যাপ্ত করিয়া তাহাদের শিবির পড়িল। নদীতে কাতারে কাতারে তরণী আসিয়া দুর্গ-প্রাকারের বাহিরে গণ্ডি রচনা করিল। পাটলিপুত্রে পিপীলিকারও আগম-নিগমের পথ রহিল না।

    ভিতরে মহামাত্য কুমারদেবীকে গিয়া সংবাদ দিলেন, “আশু ভয়ের কারণ নাই। কিন্তু বর্বর চন্দ্রবর্মা আমাদের অনাহারে শুকাইয়া মারিবার চেষ্টা করিতেছে। দেখা যাক্‌, কতদূর কি হয়।”

    দিগ্বিজয়ী রণপণ্ডিত চন্দ্রবর্মার উদ্দেশ্য কিন্তু দুই প্রকার ছিল। ক্ষুদ্র দুর্বল পাটলিপুত্র অচিরাৎ দখল করিতে তিনি বড় ব্যগ্র ছিলেন না। হইলে ভালো, না হইলেও বিশেষ ক্ষতি নাই; আপাতত মগধের অন্যত্র জয়স্কন্ধাবার স্থাপন করিলেই চলিবে। কিন্তু তাঁহার স্থল-সৈন্য বহুদূর পথ যুদ্ধ করিতে করিতে আসিয়া পরিশ্রান্ত— তাহাদের কিছুদিন বিশ্রামের প্রয়োজন। তাই তিনি তাঁহার নৌবহর নোঙ্গর ফেলিল। দুর্গাবরোধ ও শ্রান্তি অপনোদন একসঙ্গে চলিল।

    দুর্গ অবরোধের পঞ্চম দিবসে মহামাত্য আসিয়া রাণীকে জানাইলেন যে, দুর্গের খাদ্যভার কমিতে আরম্ভ করিয়াছে— শীঘ্র ইহার কিছু বিধি-ব্যবস্থা করা আবশ্যক।

    মন্ত্রীর সহিত কুমারদেবী বহুক্ষণ পরামর্শ করিলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, “গোপনে খাদ্য আনিবার কোনও পথ কি নাই?”

    সচিব বলিলেন, “হয়তো আছে, কিন্তু আমরা জানি না। নদীপথে খাদ্য আনা যাইতে পারিত, কিন্তু সে পথও বন্ধ। দুবৃত্ত চন্দ্রবর্মা নৌকা দিয়া ব্যূহ সাজাইয়া রাখিয়াছে।”

    “তবে এখন উপায়?”

    “একমাত্র উপায় আছে।”

    তারপর আরও অনেকক্ষণ পরামর্শ চলিল।

    শেষে মহামাত্য বিদায় লইলে পর কুমারদেবী অলক্ষিতে প্রাসাদশীর্ষে উঠিলেন। অঞ্চলের ভিতর হইতে রক্তচক্ষু ধূম্রবর্ণ দূত-পারাবত বাহির করিয়া আকাশে উড়াইয়া দিলেন। পারাবত দুইবার প্রাসাদ পরিক্রমণ করিয়া উত্তরাভিমুখে ধাবিত হইল। যতক্ষণ দেখা যায়, কুমারদেবী আকাশের সেই কৃষ্ণবিন্দুর দিকে তাকাইয়া রহিলেন, তারপর নিশ্বাস ফেলিয়া ধীরে ধীরে নামিয়া আসিলেন।

    অতঃপর আরও আট দিন কাটিল। চন্দ্রবর্মা কোনও প্রকার যুদ্ধোদ্যম না করিয়া কেবলমাত্র পথরোধ করিয়া বসিয়া রহিলেন। ক্রমে দুর্গে খাদ্যদ্রব্য দুর্মূল্য হইতে আরম্ভ করিল। নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিল।

    এইরূপে আশায় আশঙ্কায় আরও একপক্ষ অতীত হইল। ফাল্গুন নিঃশেষ হইয়া আসিল।

    একটা কথা বলিতে ভুলিয়াছি। সেই বিট— সেই পীঠমর্দ, যে সোমদত্তার অনাবৃত যৌবনশ্রী দেখিয়া উন্মত্ত হইয়াছিল, সে আমি। তখন আমার নাম ছিল, চক্রায়ুধ ঈশানবর্মা। ঘটোৎকচগুপ্তের ন্যায় আমার পিতাও একজন পরাক্রান্ত ভূস্বামী ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর আমি স্বাধীন হইয়া রাজধানীতে রাজার সাহচর্যে নাগরিক-বৃত্তি অবলম্বন করিয়া ঐশ্বর্যে বিলাসে কালযাপন করিতেছিলাম।

    তীব্র আসবপান করিলে যে বিচারহীন বিবেকহীন মত্ততা জন্মে, সোমদত্তাকে দেখিয়া আমার সেই মত্ততা জন্মিয়াছিল। অবশ্য, বিবেকবুদ্ধি তৎপূর্বেই যে আমার অত্যন্ত অধিক ছিল তাহা নহে। চিরদিন আমার চিত্ত বল্গাশূন্য অশ্বের মতো শাসনে অনভ্যস্ত। কোনও বস্তু আত্মসাৎ করিতে— তা সে নারীই হউক বা ধনরত্নই হউক— নিজের ঐহিক সুবিধা ও সামর্থ্য ভিন্ন কোনও নিষেধ কখনও স্বীকার করি নাই। গুরুলঘুজ্ঞান কদাপি আমার বাসনার সামগ্রীকে দুষ্প্রাপ্য করিয়া তুলে নাই। যখন যাহা অভিলাষ করিয়াছি, ছলে-বলে যেমন করিয়া পারি তাহা গ্রহণ করিয়াছি।

    চন্দ্রগুপ্ত যখন সোমদত্তাকে শ্যেনপক্ষীর মতো আমার চক্ষুর সম্মুখ হইতে ছোঁ মারিয়া লইয়া গেল, তখন বাধাপ্রাপ্ত প্রতিহত বাসনা দুর্বার আক্রোশে আমার বক্ষের মধ্যে গর্জন করিতে লাগিল। চন্দ্রগুপ্ত রাজা, আমি তাহার নর্মসহচর— বয়স্য; কিন্তু তথাপি কোনও দিন তাহাকে আমা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বা যোগ্যতর ভাবিতে পারি নাই। শ্যালকপ্রসাদে সে রাজা হইয়াছে; সুযোগ ঘটিলে আমিও কি হইতে পারিতাম না? বাহুবলে, রণশিক্ষায়, নীতিকৌশলে, বংশগরিমায় আমি তাহার অপেক্ষা কোনও অংশে ন্যূন নহি। তবে কোন্‌ অধিকারে সে আমার ঈপ্সিত বস্তু কাড়িয়া লইল?

    অন্য তিন জন রাজপ্রসাদলোভী চাটুকার, যাহারা সেদিন আমার নিগ্রহ দেখিয়াছিল, তাহারা আমার ক্রোধ ও অন্তর্দাহে ইন্ধন নিক্ষেপ করিতে লাগিল, তামাশা-বিদ্রূপ-ইঙ্গিতের গোপন দংশনে আমাকে জর্জরিত করিয়া তুলিল। একদিন, চন্দ্রগুপ্ত তখনও সভায় আগমন করেন নাই, সভাস্থ পারিষদবর্গের মধ্যে নিম্নকণ্ঠে বাক্যালাপ হাস্য-পরিহাস চলিতেছিল, এমন সময় সিদ্ধাপাল আমাকে লক্ষ্য করিয়া অপেক্ষাকৃত উচ্চকণ্ঠে বলিল, “চক্রায়ুধ, দেখ তো এই রত্নটি কেমন, কোশলের কোনও শ্রেষ্টী মহারাজকে উপহার দিয়াছে। মহারাজ বলিয়াছেন, রত্নটি যদি অনাবিদ্ধ হয় তাহা হইলে স্বয়ং রাখিবেন, নচেৎ তোমাকে উহা দান করিবেন। দেখ তো, রত্নটি বজ্রসমুৎকীর্ণ কি না।”— বলিয়া একটি ক্ষুদ্র অতি নিকৃষ্টজাতীয় মণি আমার সম্মুখে তুলিয়া ধরিল।

    সভারূঢ় ব্যক্তিগণ এই কদর্য ইঙ্গিতে কেহ দাঁত বাহির করিয়া, কেহ বা নিঃশব্দে হাসিল। সিংহাসনের পার্শ্বে চামরবাহিনী কিঙ্করীগণ মুখে অঞ্চল দিয়া পরস্পরের প্রতি সকৌতুকে কটাক্ষ হানিল। আমি লজ্জায় মরিয়া গেলাম।

    ক্রমে আমার কথা পাটলিপুত্র নগরের কাহারও অবিদিত রহিল না। আমি কোনও গোষ্ঠীসমবায় বা সমাপানকে পদার্পণ করিবামাত্র চোখে চোখে কটাক্ষে কটাক্ষে গুপ্ত ইঙ্গিতের স্রোত বহিয়া যাইত। রাজসভায় রাজা আমাকে দেখিয়া ভ্রূকুটি করিতে লাগিলেন। অতঃপর আমাকে রাজসভা ছাড়িতে হইল, লোক-সমাজও দুঃসহ হইয়া উঠিল। নিজ হর্ম্যতলে একাকী বসিয়া অন্তরের অগ্নিতে অহরহ দগ্ধ হইতে লাগিলাম।

    এই সময় সমুদ্রোচ্ছ্বাসতুল্য অভিযান পাটলিপুত্রের দুর্গতটে আসিয়া প্রহত হইল। আমি ক্ষত্রিয়, যুদ্ধের সময় আমার ডাক পড়িল। মহাবলাধিকৃত বিরোধবর্মা আমাকে শতরক্ষীর অধিনায়ক করিয়া গৌতম-দ্বার নামক দুর্গের পশ্চিম তোরণ রক্ষার ভার দিলেন।

    কৃষ্ণপক্ষের চন্দ্রহীন রাত্রি। আমি অভ্যাসমত প্রাকারের উপর একাকী পদচারণ করিতেছিলাম। অবসন্ন বসন্তের শেষ চম্পা চারিদিকে তীব্র বাস বিকীর্ণ করিতেছিল।

    বাহিরে শত্রুশিবিরে দীপসকল প্রায় নিবিয়া গিয়াছে— দূরে দূরে দুই একটা জ্বলিতেছে। নিম্নে পরিখার জল স্থির কৃষ্ণদর্পণের মতো পড়িয়া আছে, তাহাতে আকাশস্থ নক্ষত্রপুঞ্জের প্রতিবিম্ব পড়িয়াছে। নগরের মধ্যে শব্দ নাই, আলোক নাই, গৃহে গৃহে দ্বার রুদ্ধ, দীপ নির্বাপিত। রাজপথও আলোকহীন। তামসী রাত্রির গহন অন্ধকার যেন বিরাট পক্ষ দিয়া চরাচর আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে।

    পাটলিপুত্র সুপ্ত, অরাতি-সৈন্যও সুপ্ত। কিন্তু নগরদ্বারের প্রহরীরা জাগ্রত। তোরণের উপর নিঃশব্দে রক্ষীগণ প্রহরা দিতেছে। প্রাকারের উপর স্থানে স্থানে সতর্ক রক্ষী নিশ্চলভাবে দণ্ডায়মান। শত্রু পাছে অন্ধকারে গা ঢাকিয়া অতর্কিতে প্রাকার-লঙ্ঘনের চেষ্টা করে, এইজন্য রাত্রিতে পাহারা দ্বিগুণ সাবধান থাকে।

    রাজপুরী হইতে বেহাগ-রাগিণীতে মধ্যরাত্রি বিজ্ঞাপিত হইল। সঙ্গে সঙ্গে পাটলিপুত্রের দশ দ্বারের প্রহরী দুন্দুভি বাজাইয়া উচ্চ-কণ্ঠে প্রহর হাঁকিল। নৈশ নীরবতা ক্ষণকালের জন্য বিক্ষুব্ধ করিয়া এই উচ্চরোল ক্রমে ক্রমে মিলাইয়া গেল; নগরী যেন শত্রুকে জানাইয়া দিলে— “সাবধান! আমি জাগিয়া আছি!”

    একাকী পদচারণা করিতে করিতে নানা চিন্তা মনে উদয় হইতেছিল। কিসের জন্য এই রাত্রি দ্বিপ্রহরে নিদ্রা ত্যাগ করিয়া নিশাচরের মতো ঘুরিয়া বেড়াইতেছি? পাটলিপুত্র দুর্গ রক্ষা করিয়া আমার লাভ কি? যাহার রাজ্য, সে তো কামিনীর কণ্ঠলগ্ন হইয়া সুখে নিদ্রা যাইতেছে। পাটলিপুত্র যদি চন্দ্রবর্মা অধিকার করে, তবে কাহার কি ক্ষতি? দুর্গের মধ্যে অন্নাভাবের সঙ্গে সঙ্গে রোগ দেখা দিয়াছে, মানুষ না খাইয়া মরিতে আরম্ভ করিয়াছে। বাহির হইতে খাদ্য আনয়নের উপায় নাই। শুধু রাত্রির অন্ধকারে লুকাইয়া জালিকেরা নদী হইতে প্রত্যহ কিছু কিছু মৎস্য সংগ্রহ করিতেছে। কিন্তু তাহাই বা কতটুকু?— নগরীর ক্ষুধা তাহাতে মিটে না। এভাবে আর কত দিন চলিবে? অবশেষে একদিন বশ্যতা স্বীকার করিতেই হইবে; তবে অনর্থক এ ক্লেশভোগ কেন? সমগ্র দেশ যখন চন্দ্রবর্মার চরণে আত্ম-সমর্পণ করিয়াছে, তখন পাটলিপুত্র নগর একা কয়দিন টিকিয়া থাকিবে?

    চন্দ্রগুপ্ত যদি রাজ্যাধিকারের যোগ্য হইত, তবে সে নিজে আসিয়া নিজের রাজ্য রক্ষা করিত। আমি কেন এই অপদার্থ রাজার রাজ্যরক্ষায় সাহায্য করিতেছি? সে আমার কি করিয়াছে? আমার মুখের গ্রাস কাড়িয়া লইয়াছে, আমাকে জগতের সম্মুখে হাস্যাস্পদ করিয়াছে। সোমদত্তা! সেই দেবভোগ্যা অপ্সরা! বুঝি পুরুষের লালসা-পরিতৃপ্তির জন্যই তাহার অনুপম দেহ সৃষ্ট হইয়াছিল! তাহাকে না পাইলে আমার এই অনির্বাণ তৃষ্ণা মিটিবে কি?— সে এখন চন্দ্রগুপ্তের অঙ্কশায়িনী। চন্দ্রগুপ্ত কি তাহাকে বিবাহ করিয়াছে? করুক না করুক, সোমদত্তাকে আমার চাই; যেমন করিয়া পারি, যে উপায়ে পারি, সোমদত্তাকে আমি কাড়িয়া লইব। পারিব না? নারীর মন কত দিন এক পুরুষে আসক্ত থাকিবে? তখন চন্দ্রগুপ্ত! তোমাকে জগতের কাছে হাস্যাস্পদ করিব। সেই আমার লাঞ্ছনার যোগ্য প্রতিশোধ হইবে।

    এই সর্বগ্রাসী চিন্তা মনকে এমনই আচ্ছন্ন করিয়াছিল যে, অজ্ঞাতসারে গোতম-দ্বার হইতে অনেকটা দূরে আসিয়া পড়িয়াছিলাম। প্রাকারের এই অংশ রাত্রিকালে স্বভাবতই অতিশয় নির্জন। এই স্থানের দুর্গ-প্রাচীর এতই দুরধিগম্য যে, প্রহরী-স্থাপনেরও প্রয়োজন হয় নাই।

    ইতস্তত দৃষ্টিপাত করিতে করিতে ফিরিব ভাবিতেছি, এমন সময় সহসা চোখে পড়িল, সম্মুখে কিছুদূরে প্রাকারের প্রান্তস্থিত এক কণ্টকগুল্মের অন্তরালে দীপ জ্বলিতেছে। পাছে বাহির হইতে শত্রু দুর্গ-প্রাচীরে আরোহণ করে, এজন্য প্রাচীরগাত্রে সর্বত্র কাঁটাগাছ রোপিত থাকিত। কখনও কখনও এই সকল কাঁটাগাছ প্রাকারশীর্ষ ছাড়াইয়া মাথা তুলিত। সেইরূপ দুইটি ঘন-পল্লবিত কণ্টকতরুর মধ্যস্থিত ঝোপের ভিতর প্রদীপ জ্বলিতেছে দেখিলাম। প্রদীপ কখনও উঠিতেছে, কখনও মণ্ডলাকারে আবর্তিত হইতেছে। কেহ যেন একান্তে দাঁড়াইয়া কোনও অদৃশ্য দেবতার আরতি করিতেছে।

    পাদুকা খুলিয়া ফেলিয়া নিঃশব্দে কটি হইতে তরবারি বাহির করিয়া হস্তে লইলাম। তারপর অতি সন্তর্পণে সেই সঞ্চরমাণ দীপশিখার দিকে অগ্রসর হইলাম।

    কণ্টকগুল্মের মধ্যে প্রবেশ করিয়া দেখিলাম, তন্মধ্যে এক নারী দাঁড়াইয়া পরিখার অপর পারে অনন্য স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়া আছে। এবং প্রদীপ ইতস্তত আন্দোলিত করিতেছে। পশ্চাৎ হইতে তাহার মুখ সম্পূর্ণ দেখিতে পাইলাম না, শুধু চোখে পড়িল, তাহার নবমল্লিকাবেষ্টিত কুণ্ডলিত কবরীভার, তন্মধ্যে দুইটি পদ্মরাগমণি সর্পচক্ষুর মতো জ্বলিতেছে। বুঝিতে বিলম্ব হইল না, এ রমণী গুপ্তচর; আলোকের ইঙ্গিতে শত্রুর নিকট সংবাদ প্রেরণ করিতেছে।

    লঘুহস্তে তাহার স্কন্ধ স্পর্শ করিলাম। সশব্দ নিশ্বাস টানিয়া বিদ্যুদ্বেগে রমণী ফিরিয়া দাঁড়াইল। তখন তাহারই হস্তধৃত মৃৎপ্রদীপের আলোকে তাহাকে চিনিলাম।

    সোমদত্তা!

    কম্পিত দীপশিখার আলোক তাহার ত্রাসবিবৃত মুখের উপর পড়িল। চক্ষুর সুবৃহৎ কৃষ্ণতারকা আরও বৃহৎ দেখাইল। মুহূর্তের জন্য আমার মনে সন্দেহ জন্মিল, এ কি সত্যই সোমদত্তা, না আমার দৃষ্টিবিভ্রম? যে চিন্তা অহরহ আমার অন্তরকে গ্রাস করিয়া আছে, সেই চিন্তার বস্তু কি মূর্তি ধরিয়া সম্মুখে দাঁড়াইল? কিন্তু এ ভ্রম অল্পকালের জন্য, আকস্মিক আঘাতে বিপন্ন বুদ্ধি পরক্ষণেই ফিরিয়া আসিল। দেখিলাম, সোমদত্তার হস্তে প্রদীপ থরথর করিয়া কাঁপিতেছে, এখনই পড়িয়া নিবিয়া যাইবে। আমি তরবারি কোষবদ্ধ করিয়া তাহার হাত হইতে প্রদীপ লইলাম,— তাহার মুখের সম্মুখে তুলিয়া ধরিয়া মৃদুহাস্যে বলিলাম, “এ কি! পরমভট্টারিকা মহাদেবী সোমদত্তা!”

    সোমদত্তা ভয়সূচক অস্ফুটধ্বনি করিয়া নিজ বক্ষে হস্তার্পণ করিল। পরক্ষণেই ছুরির একটা ঝলক এবং সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষ্ণাগ্র অস্ত্র আমার বস্ত্রাবৃত লৌহজালিকের ব্যবধানপথে বক্ষের চর্ম স্পর্শ করিল। ভিতরে লৌহজালিকা না থকিলে সোমদত্তার হস্তে সেদিন আমার প্রাণ যাইত। আমি ক্ষিপ্রহস্তে ছুরিকা কাড়িয়া লইয়া নিজ কটিতে রাখিলাম, তারপর সবলে দুই বাহু দিয়া তাহাকে বক্ষে চাপিয়া ধরিলাম। তাহার কর্ণে কহিলাম, “সোমদত্তা, কুহকিনী, আজ তোমাকে পাইয়াছি!”

    তৈলপ্রদীপ মাটিতে পড়িয়া নিবিয়া গেল।

    জালবদ্ধা ব্যাঘ্রীর মতো সোমদত্তা আমার বাহুমধ্যে যুদ্ধ করিতে লাগিল, নখ দিয়া আমার মুখ ছিঁড়িয়া দিল। আমি আরও জোরে তাহাকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া বলিলাম, “ভালো, ভালো। তোমার নখর-ক্ষত কাল চন্দ্রগুপ্তকে দেখাইব।”

    সহসা সোমদত্তার দেহ শিথিল হইয়া এলাইয়া পড়িল; অন্ধকারে ভাবিলাম, বুঝি মূর্ছা গিয়াছে। তারপর তাহার দ্রুত কম্পনে ও কণ্ঠোত্থিত নিরুদ্ধ শব্দে বুঝিলাম, মূর্ছা নহে— সোমদত্তা কাঁদিতেছে। কাঁদুক— কামিনীর ক্রন্দন আমার জীবনে এই প্রথম নহে। প্রথম প্রথম এমনই কাঁদে বটে। আমি তাহাকে কাঁদিতে দিলাম।

    কিছুক্ষণ ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিবার পর সোমদত্তা সোজা হইয়া দাঁড়াইল; অশ্রুবিকৃত কণ্ঠে কহিল, “তুমি কে? কেন আমাকে ধরিয়াছ? শীঘ্র ছাড়িয়া দাও!”

    আমি আলিঙ্গন শিথিল করিলাম না, বলিলাম, “আমি কে শুনিবে? আমি চক্রায়ুধ ঈশানবর্মা—তোমার চন্দ্রগুপ্তের বয়স্য, উপস্থিত দুর্গ-তোরণের রক্ষক। আরও অধিক পরিচয় চাও তো বলি, আমি সোমদত্তার রূপের মধুকর। যেদিন তটিনীতটে অচেতন হইয়া পড়িয়াছিলে, ছলনাময়ী, সেইদিন হইতে তোমার রূপযৌবনের আরাধনা করিতেছে!”

    অনুভব করিলাম, সোমদত্তা শিহরিয়া উঠিল। আমি বলিলাম, “চিনিয়াছ দেখিতেছি! হাঁ, আমি সেই বিট, যে স্বর্গের পারিজাত দেখিয়া লুব্ধ হইয়াছিল।”

    সোমদত্তা কহিল, “পাপিষ্ট, আমাকে ছাড়িয়া দাও, নচেৎ রাজ-আদেশে তোমার মুণ্ড যাইবে।”

    আমি হাসিয়া বলিলাম, “পাপিষ্টা, তোমাকে ছাড়িব না। ছাড়িয়া দিলে তোমার পট্টমহাদেবীর আদেশে আমার মুণ্ড যাইতে পারে। তুমি নিশীথ সময়ে রাজপুরী ছাড়িয়া কি জন্য বাহিরে আসিয়াছ? প্রাকারের নিভৃত স্থানে প্রদীপ লইয়া কি করিতেছিল?”

    কিছুক্ষন স্তব্ধ থাকিয়া সোমদত্ত উত্তর করিল, “আমি রাজার অনুমতি লইয়া পুরীর বাহিরে আসিয়াছি।”

    ব্যঙ্গ করিয়া বলিলাম, “চন্দ্রগুপ্ত বোধ করি তোমাকে শত্রুর নিকটে সংকেত প্রেরণ করিবার জন্য পাঠাইয়াছে?”

    সোমদত্তা আবার শিহরিল। বলিল, “আমি বৌদ্ধ সেবাশ্রমে আর্তের চিকিৎসা করিতে প্রত্যহ আসি— রাজার অনুমতি আছে। আজিও আসিয়াছি।”

    “প্রাকারের উপর এতক্ষণ কোন্‌ আর্তের চিকিৎসা করিতেছিলে?”

    “প্রাকারের উপর আহত কেহ আছে কি না দেখিতে আসিয়াছিলাম।”

    “ভালো, আজ রাত্রিতে আমার নিকট বন্দিনী থাক, কাল চন্দ্রগুপ্তকে এই কথা বলিও। প্রহরী ডাকি?”

    সোমদত্তা নীরব, মুখে কথা নাই।

    আমি পুনরায় কহিলাম, “কি বল? প্রহরী ডাকি?”

    অবরুদ্ধ কণ্ঠে সোমদত্তা কহিল, “তুমি যাহা চাও দিব— আমাকে ছাড়িয়া দাও।”

    আমি বলিলাম, “যাহা চাই, তাহা এখন জোর করিয়া লইব। তোমার দানের অপেক্ষা রাখি না।”

    ভীত অস্পষ্ট কণ্ঠে সে জিজ্ঞাসা করিল, “কি চাও?”

    “তোমাকে।”

    সোমদত্তা পুনরায় আমার আলিঙ্গন-মুক্ত হইবার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিল। শেষে বিফল হইয়া আমার বক্ষের উপর সবলে করাঘাত করিতে করিতে বলিতে লাগিল, “আমাকে ছাড়িয়া দাও! ছাড়িয়া দাও! ছাড়িয়া দাও! আমি রাজমহিষী, আমার উপর অত্যাচার করিলে তুমি শূলে যাইবে।”

    আমি বলিলাম, “তুমি চন্দ্রবর্মার চর, — রাজাকে রূপের কুহকে ভুলাইয়া রাজঅন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়াছ। শূল তো দূরের কথা, তোমার উপর অত্যাচার করিলে কুমারদেবী আমাকে পুরস্কৃত করিবেন। মনে রাখিও, তুমি তাঁর সপত্নী।”

    সোমদত্তা কাঁদিয়া উঠিল, “দয়া কর, আমি রাজার স্ত্রী।”

    “তুমি গুপ্তচর।”

    তখন সোমদত্তা আমার বক্ষের উপর নিঃসহায়ে মাথা রাখিয়া কাঁদিতে লাগিল। এত কাঁদিল যে, বোধ করি পাষাণও দ্রব হইয়া যাইত। কিন্তু আমি লোভে নিষ্ঠুর— তাহার অশ্রু আমাকে দ্রব করিতে পারিল না।

    কাঁদিতে কাঁদিতে সোমদত্তা জিজ্ঞাসা করিল, “দয়া করিবে না?”

    আমি বলিলাম, “এইটুক দয়া করিতে পারি, আমি যাহা চাই তাহা স্বেচ্ছায় যদি দাও, তবে চন্দ্রগুপ্ত কিছু জানিবে না।”

    ব্যাকুল হইয়া সোমদত্তা কহিল, “আমি সেরূপ স্ত্রীলোক নহি। চন্দ্রগুপ্ত আমার স্বামী, আমি তাঁহাকে ভালবাসি। শুন, আমি চন্দ্রবর্মার গুপ্তচর এ কথা সত্য, তাঁহারই কার্যসিদ্ধির জন্য মগধে আসিয়াছিলাম। কিন্তু তখন জানিতাম না— ভালবাসার স্বাদ পাই নাই। আজ আমি স্বামীর রাজ্য পরের হস্তে তুলিয়া দিবার যত্ন করিতেছি, কেন করিতেছি তাহা তুমি বুঝিবে না। কিন্তু স্বরূপ বলিতেছি, আমি তাঁহাকে ভালবাসি, আমার চোখে তিনি ভিন্ন অন্য পুরুষ নাই। তুমি আমাকে দয়া কর, মুক্তি দাও। আমি শপথ করিতেছি, চন্দ্রবর্মা পাটলিপুত্র অধিকার করিলে আমি তোমাকে কাশী, কোশল, চম্পা, গৌড়— যে রাজ্য চাও তাহার সিংহাসনে বসাইব। চন্দ্রবর্মা আমাকে স্নেহ করেন, আমার যাচ্ঞা কখনো নিষ্ফল হইবে না।”

    “কিন্তু চন্দ্রবর্মা যদি পাটলিপুত্র অধিকার করিতে না পারেন?”

    “এমন কখনো হইতে পারে না।”

    “বুঝিলাম। কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, তুমি যদি চন্দ্রগুপ্তকে সত্যই ভালবাস, তবে তাহার সর্বনাশ করিতেছ কেন?”

    কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া সোমদত্তা বলিল, “চন্দ্রবর্মা আমার পিতা।”

    ঘোর বিস্ময়ে কহিলাম, “তুমি চন্দ্রবর্মার কন্যা?”

    অধোমুখে সোমদত্তা কহিল, “হাঁ, কিন্তু বারাঙ্গনার গর্ভজাতা।”

    “বুঝিয়াছি।”

    “তুমি নরাধম, কিছু বুঝ নাই। আমি শৈশব হইতে রাজ-অন্তঃপুরে পালিত।”

    “ভালো, তাহাও বুঝিলাম। বুঝিলাম যে, পিতার জন্য তুমি স্বামীর সর্বনাশ করিতে প্রস্তুত। কিন্তু আমার কথাও তুমি বুঝিয়া লও। আমি গৌড় চাহি না, চম্পা চাহি না, কাশী-কোশল কিছুই চাহি না— আমি তোমাকে চাই। অস্বীকার করিলে কোনও ফল হইবে না— উপরন্তু চন্দ্রগুপ্ত তোমার এই অভিসার-কথা জানিতে পরিবে।”

    সোমদত্তা কম্পিতস্বরে কহিল, “ইচ্ছা হয়, আমাকে হত্যা করিয়া ঐ পরিখার জলে ফেলিয়া দাও, আমি কোনও কথা কহিব না। কিন্তু মহারাজকে এ কথা বলিও না। পুরুষের মন সর্বদা সন্দিগ্ধ, তিনি আমার প্রকৃত অভিপ্রায় বুঝিবেন না, আমাকে অবিশ্বাস করিবেন। স্বীকার কর, বলিবে না?”

    নারী-চরিত্র কে বুঝিবে? কহিলাম, “উত্তম, বলিব না। কিন্তু আমার পুরস্কার?”

    সোমদত্তা নীরব।

    আবার জিজ্ঞাসা করিলাম, “আমার পুরস্কার?”

    তথাপি সোমদত্তা মৌন।

    আমি তখন ক্ষিপ্ত। নির্মম পীড়নে তাহার দেহলতা বিমথিত করিয়া অধরে চুম্বন করিলাম।

    বলিলাম, “সোমদত্তা, তোমার রূপের আগুনে আজ আপনাকে আহুতি দিলাম।”

    সোমদত্তা যেন মর্মতন্তু ছিঁড়িয়া কথা কহিল, “শুধু তুমি নহ, তুমি, আমি, চন্দ্রগুপ্ত, মগধ— সব এই আগুনে পুড়িয়া ছাই হইবে!”

    নগরের কেন্দ্রস্থলে প্রায় পাদক্রোশ ভূমির উপর মগধের প্রাচীন রাজপুরী। এই পাদক্রোশ ভূমি উচ্চ পাষাণ-প্রাচীর বেষ্টিত। পূর্বদিকে প্রশস্ত রাজপথের উপর কারুকার্যশোভিত উচ্চ পাষাণ-তোরণ। এই তোরণ উত্তীর্ণ হইয়া প্রথমেই বহুস্তম্ভযুক্ত বিচিত্র দ্বিতল মন্ত্রগৃহ। তাহার পশ্চাতে মহলের পর মহল, প্রাসাদের পর প্রাসাদ,—কোনটি কোষাগার, কোনটি অলংকারগৃহ, কোনটি দেবগৃহ, কোনটি চিত্রভবন। মধ্যে কুঞ্জবেষ্টিত কমল-সরোবর— তাহাতে সারস মরাল প্রভৃতি পক্ষী ও বহুবর্ণের মৎস্য ক্রীড়া করিতেছে।

    সকলের পশ্চাতে শীর্ণ অথচ জলপূর্ণ পরিখার গণ্ডিনিবদ্ধ মগধেশ্বরের অন্তঃপুর। সেতু পার হইয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিতে হয়। সেতুমুখে কঞ্চুকীসেনা অহোরাত্র পাহারা দিতেছে। ভিতরে সুন্দর কারুশিল্পমণ্ডিত উচ্চশীর্ষ সৌধ সকল পরস্পর সংলগ্ন হইয়া যেন ইন্দ্রভুবন রচনা করিয়াছে। এখানে সকল গৃহই ত্রিতল, প্রথম তল শ্বেত-প্রস্তরে রচিত, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তল দারুনির্মিত।

    এই পুরী চন্দ্রগুপ্তের নির্মিত নহে, মৌর্যকালীন প্রাচীন রাজভবন। রাজ্যজয়ের সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রগুপ্ত ইহা অধিকার করিয়াছিলেন। অধিকার করিয়াই রাজপুরীর যাহা সারবস্তু সেই মোহনগৃহ সন্ধান করিয়াছিলেন, কিন্তু বহু চেষ্টাতেও তাহা আবিষ্কার করিতে পারেন নাই। মোহনগৃহ রাজভবনের একটি গোপন কক্ষ, দেখিতে অন্যান্য সাধারণ কক্ষের মতোই, কিন্তু ইহার প্রাচীর ও হর্ম্যতলে নানা গুপ্তদ্বার থাকিত। সেই গুপ্তদ্বার দিয়া ভূ-নিম্নস্থ সুড়ঙ্গপথে পুরীর বাহিরে যাওয়া যাইত; এমন কি ঘোর বিপদ-আপদের সময় দুর্গের বাহিরে পলায়ন করাও চলিত। এই মোহনগৃহ প্রত্যেক রাজপুরীর একটি অপরিহার্য অঙ্গ ছিল; স্বয়ং রাজা এবং পট্টমহিষী ভিন্ন ইহার সন্ধান আর কাহারও জানা থাকিত না। মৃত্যুকালে রাজা পুত্রকে বলিয়া যাইতেন।

    এই রাজপ্রাসাদে পূর্ববর্ণিত ঘটনার পরদিন প্রভাতে আমি কিছু গোপন অভিসন্ধি লইয়া উপস্থিত হইলাম। সম্মুখেই মন্ত্রগৃহ,— বহুজনাকীর্ণ। সচিব, সভাসদ্‌, সেনানী, শ্রেষ্ঠী, বয়স্য, বিদূষক— সকলেই উপস্থিত; সকলের মুখেই দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠার চিহ্ন। চারিদিক্ হইতে তাহাদের মৃদুজল্পিত গুঞ্জনধ্বনি উঠিতেছে। সভার কেন্দ্রস্থলে রত্নসিংহাসনে বসিয়া কেবল মহারাজ চন্দ্রগুপ্ত নির্লিপ্ত নির্বিকার। আমি সভায় প্রবেশ করিতে চন্দ্রগুপ্ত একবার চক্ষু তুলিয়া আমার দিকে চাহিল— মোহাচ্ছন্ন স্বপ্নাবিষ্ট ভাব— যেন কিছুতেই আসে যায় না। আমি সম্ভ্রম দেখাইয়া অবনত মস্তকে প্রণাম করিলাম, চন্দ্রগুপ্ত ঈষৎ বিরক্তিসূচক ভ্রূকুটি করিয়া মুখ ফিরাইয়া লইল। আমার হাসি আসিল, মনে মনে বলিলাম, “চন্দ্রগুপ্ত! যদি জানিতে!…”

    রাজ-সম্মুখ হইতে অপসৃত হইয়া ইতস্তত ঘুরিতে ঘুরিতে এক স্তম্ভের আড়ালে সন্নিধাতার সহিত দেখা হইল। সর্বদা রাজ-সন্নিধানে থাকিয়া তাঁহার পরিচর্যা করা সন্নিধাতার কার্য। নানা কারণে এই সন্নিধাতার সহিত আমার কিছু প্রণয় ছিল; অনেকবার রাজপ্রাসাদের অনেক গূঢ় সংবাদ তাহার নিকট হইতে পাইয়াছি। তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “বল্লভ, খবর কি?”

    বল্লভ বলিল, “নূতন খবর কিছুই নাই। মহারাজ আজ পত্রচ্ছেদ্যকালে বলিতেছিলেন যে, মোহনগৃহের সন্ধান জানা থাকিলে এ পাপ রাজ্য ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেন।”

    আমি বলিলাম, “সংসারে এত বৈরাগ্য কেন?”

    বল্লভ চোখ টিপিয়া মৃদুস্বরে কহিল, “সংসারের সকল বস্তুতে নয়!— সে যাক্‌, তোমায় বহুদিন দেখি নাই, সভায় আস না কেন?”

    আমি বলিলাম, “দিনরাত গোতম-দ্বারে পাহারা— সময় পাই না। — বিরোধবর্মা কোথায় বলিতে পার? সভায় তো তাঁহাকে দেখিতেছি না।”

    বল্লভ বলিল, “মহাবলাধিকৃত উপরে আছেন, সান্ধিবিগ্রহিকের সঙ্গে কি পরামর্শ হইতেছে।”

    “আমারও কিছু পরামর্শ আছে”— বলিয়া সোপান অতিবাহিত করিয়া আমি উপরে গেলাম।

    বিরোধবর্মা তখন গুপ্তসদস্যগৃহে বসিয়া সান্ধিবিগ্রহিকের সহিত চুপিচুপি কথা কহিতেছিলেন। আমাকে দেখিয়া উভয়ে জিজ্ঞাসু নেত্রে আমার দিকে চাহিলেন। আমি কোনও প্রকার ভণিতা না করিয়া বলিলাম, “এরূপভাবে কতদিন চলিবে? দুর্গে খাদ্য নাই, পানীয় নাই; এক দীনারের কমে আঢ়ক পরিমাণ মাধ্বী পাওয়া যায় না। ঘরে ঘরে লোক না খাইয়া মরিতে আরম্ভ করিয়াছে। যুদ্ধে মরিত কোনও কথা ছিল না; কিন্তু শত্রুকে বিতাড়িত করিবার কোনও চেষ্টাই নাই। কেবলমাত্র দুর্গদ্বার রুদ্ধ করিয়া বসিয়া থাকিলে কি ফল দর্শিবে? নাগরিকগণ নানা কথা বলিতেছে— দুর্গরক্ষীরাও সন্তুষ্ট নয়।”

    সান্ধিবিগ্রহিক জিজ্ঞাসা করিলেন, “তাহারা কি বলে?”

    আমি বলিলাম, “কাল সন্ধ্যায় চণ্ডপালের মদিরাগৃহে গিয়াছিলাম। সেখানে শুনিলাম, অনেকেই বলাবলি করিতেছে— চন্দ্রবর্মার দিগ্বিজয়ী সেনার বিরুদ্ধে শূন্য উদর লইয়া দুর্গরক্ষার চেষ্টা পণ্ডশ্রম মাত্র। দুর্গ একদিন তাহারা অধিকার করিবেই, সুতরাং বাধা না দিয়া নির্বিবাদে আসিতে দেওয়াই সুবুদ্ধি— তাহাতে তাহাদের নিকট সদ্‌ব্যবহার প্রত্যাশা করা যাইতে পারে।”

    সান্ধিবিগ্রহিক ও মহাবলাধিকৃত দৃষ্টি-বিনিময় করিলেন। বিরোধবর্মা কহিলেন, “চন্দ্রবর্মা পাটলিপুত্র অধিকার করিতে পরিবে না, তাহার দিগ্বিজয়যাত্রা এইখানেই শেষ হইবে।”

    আমি বলিলাম, “কিন্তু—”

    বাধা দিয়া বিরোধবর্মা বলিলেন, “ইহার মধ্যে কিন্তু নাই। জানিয়া রাখ, আজ হইতে দশ দিনের মধ্যে দিগ্বিজয়ী চন্দ্রবর্মা লাঙ্গুল উচ্চে তুলিয়া মগধ হইতে পলায়ন করিবে। ইচ্ছা হয়, তুমি তার পশ্চাদ্ধাবন করিও।

    ভিতরে কিছু কথা আছে বুঝিলাম। কি কথা জানিবার জন্য পুনশ্চ বলিলাম, “কেমন করিয়া এই অঘটন সম্ভব হইবে জানি না। দশ দিনের মধ্যে নগর শ্মশানে পরিণত হইবে। তখন চন্দ্রবর্মা রহিল কি পলাইল, কে দেখিতে যাইবে?”

    বিরোধবর্মা কহিলেন, “খাদ্যের আয়োজন হইয়াছে, কল্য হইতে সকলে প্রচুর খাদ্য পাইবে।”

    আমি বিস্মিতভাবে তাঁহার মুখের প্রতি চাহিয়া রহিলাম। ইচ্ছা হইল জিজ্ঞাসা করি, কিভাবে কোথা হইতে খাদ্য আসিবে! কিন্তু প্রশ্ন করা সুবিবেচনা হইবে না বুঝিয়া বলিলাম, “কিন্তু খাদ্য পাইলেই কি চন্দ্রবর্মাকে বিতাড়িত করা যাইবে?”

    বিরোধবর্মা বলিলেন, “বলিয়াছি, দশ দিনের মধ্যে চন্দ্রবর্মাকে তাড়াইব।”

    “কিন্তু এই দশ দিন প্রজাদের কি বলিয়া বুঝাইয়া রাখিবেন? প্রজা ও রক্ষিসৈন্য মিলিয়া যদি মাৎস্যন্যায় করে?”

    “মাৎস্যন্যায়!”— বিরোধবর্মা গর্জিয়া উঠিলেন, “চক্রায়ুধ, যে যোদ্ধা শত্রুকে দুর্গ-সমর্পণের কথা চিন্তা করিবে তাহাকে শূলে দিব, যে প্রজা মাৎস্যন্যায়ের কথা উচ্চারণ করিবে তাহাকে হাত-পা বাঁধিয়া পরিখার কুম্ভীরের মুখে ফেলিয়া দিব। মাৎস্যন্যায়!— এখনো আমি বাঁচিয়া আছি।” ঈষৎ শান্ত হইয়া বলিলেন, “তুমি যাও, যে জিজ্ঞাসা করিবে, তাহাকে বলিও অন্তরীক্ষপথে বার্তা আসিয়াছে, চন্দ্রবর্মার উচ্ছেদ হইতে আর অধিক বিলম্ব নাই।”

    অন্তরীক্ষ-পথে! আমি উঠিলাম। উভয়কে প্রণাম করিয়া বাহির হইতেছি, সান্ধিবিগ্রহিক আমাকে ফিরিয়া ডাকিলেন। ধীরে ধীরে কহিলেন, “চক্রায়ুধ! যাহা শুনিলে, তাহা হইতে যদি কিছু অনুমান করিয়া থাক, তাহা নিজ অন্তরে রাখিও। মন্ত্রভেদে রাজ্যের সর্বনাশ হয়।”

    “যথা আজ্ঞা”— বলিয়া মনে মনে হাসিয়া আমি বিদায় লইলাম।

    সেই রাত্রিতে মধ্যযাম ঘোষিত হইবার পর সোমদত্তা আবার আসিল। গতরাত্রির সংকেতস্থানে আমি পূর্ব হইতেই উপস্থিত ছিলাম, প্রদীপ হস্তে ধরিয়া ভুবনমোহিনীর ন্যায় আমার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। আমি দুই বাহু প্রসারিত করিয়া তাহাকে বুকে টানিয়া লইলাম। সোমদত্তা ভুবনমোহন হাসি হাসিয়া আমার আলিঙ্গনে আত্ম-সমর্পণ করিল।

    এক রাত্রির মধ্যে কি পরিবর্তন! নারীর মন এমনই বটে— কাল যে ধর্মের জন্য যুদ্ধ করিতেছিল, আজ সে নাগরের প্রেমে পাগল! আমি এমন অনেক দেখিয়াছি, তাই বিস্মিত হইলাম না। স্ত্রীজাতি যখন দেখে কুল গিয়াছে, তখন প্রাণপণে নাগরকে ধরিয়া থাকে; দু’কূল হারাইয়া ইতোনষ্ট স্ততোভ্রষ্ট হইতে চাহে না।

    আমি বলিলাম, “সোমদত্তা, চন্দ্রগুপ্ত ভিন্ন অন্য পুরুষ পৃথিবীতে আছে কি?”

    সোমদত্তা দুই মৃণালভুজে আমার কুণ্ঠবেষ্টন করিয়া মুখের অত্যন্ত নিকটে মুখ আনিয়া মৃদু সলজ্জ স্বরে কহিল, “আগে জানিতাম না, এখন বুঝিয়াছি, তুমি ভিন্ন জগতে অন্য পুরুষ নাই।”

    সোমদত্তার কথা, তাহার স্পর্শ, তাহার দেহসৌরভ আমার সর্বাঙ্গ ঘিরিয়া হর্ষের প্লাবন আনিয়া দিল। অনির্বচনীয় সুখের মাদকতা মস্তিষ্ককে যেন অবশ করিয়া ফেলিল। সৃষ্টির আরম্ভ হইতে এমনই বুঝি নারী পুরুষকে বশ করিয়া রাখিয়াছে!

    আমি বলিলাম, “সোমদত্তা, প্রিয়তমে, তোমাকে আমি সমগ্রভাবে, অনন্যভাবেই চাই। রাত্রিতে চোরের মতো লুকাইয়া এই ক্ষণিকের মিলন— ইহাতে আমার হৃদয় পূর্ণ হইতেছে না।”

    সোমদত্তা আমার স্কন্ধে মস্তক রাখিয়া দীর্ঘশ্বাস মোচন করিয়া বলিল, “তাহা কি করিয়া হইবে, প্রাণাধিক? আমি যে রাজপুরীর পুরন্ধ্রী— চন্দ্রগুপ্তের বনিতা।”

    বহুক্ষণ দুইজনে নীরব রহিলাম। সোমদত্তার মতো নারীকে যে পায় নাই, সে জানে না, তাহার জন্য পুরুষের মনে কি তীব্র— কি দুর্বার আকাঙ্ক্ষা জাগিতে পারে। আমিও যতদিন তাহাকে দূর হইতে কামনা করিয়াছিলাম, ততদিন তাহার এই দুর্নিবার শক্তি অনুভব করি নাই। সোমদত্তাকে লাভ করিবার বাসনা অপেক্ষা তাহাকে একান্তে নিজস্ব করিয়া ভোগ করিবার আকাঙ্ক্ষা শতগুণ প্রবল! তাহার মধ্যে এমন একটা আকর্ষণ আছে, যাহা তাহার অলৌকিক যৌবনশ্রীরও অতীত, যাহা ভোগে অবসাদ আসে না, ঘৃতাহুতির ন্যায় কামনার অগ্নিকে আরও বাড়াইয়া তুলে। সোমদত্তার ন্যায় নারীর জন্য পুরুষ ইহকাল পরকাল অকাতরে বিসর্জন করিতে পারে, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়, সৃষ্টি রসাতলে পাঠাইতে তিলমাত্র দ্বিধা করে না।

    “শত্রুর নিকট কাল কি সংকেত পাঠাইতেছিলে?”

    সোমদত্তা আমার স্কন্ধ হইতে মস্তক তুলিল। আমার মুখের উপর দুই চক্ষু পাতিয়া যেন অন্তরের অন্তস্তল পর্যন্ত অন্বেষণ করিয়া লইল। সেখানে কি দেখিল জানি না, বলিল, “দুর্গের দুই একটা কথা জানাইতেছিলাম।”

    “তাহা না বলিলেও বুঝিয়াছি। কি কথা?”

    “নগরে খাদ্য নাই, এই সংবাদ দিতেছিলাম।”

    আমি বলিলাম, “ভুল সংবাদ দিয়াছ— কাল প্রভাত হইতে নগরে আর অন্নাভাব থাকিবে না।”

    সোমদত্তা চমকিত হইয়া বলিল, “সে কি! কোথা হইতে খাদ্য আসিবে?”

    আমি বলিলাম, “তাহা জানি না! বোধ হয় কোনও সুড়ঙ্গ আবিষ্কৃত হইয়াছে। সেই পথে বাহির হইতে খাদ্যাদি আসিবে।”

    “সুড়ঙ্গ? কোথায় সুড়ঙ্গ?”

    “তাহা কি করিয়া জানিব? এ আমার অনুমান মাত্র। কিন্তু নিশ্চিত বলিতেছি, নগরে আর দুর্ভিক্ষ থাকিবে না, সে আয়োজন হইয়াছে। শুধু তাই নয়, শীঘ্রই চন্দ্রবর্মা বাহির হইতে আক্রান্ত হইবেন— বোধ হয় বৈশালী হইতে সৈন্য আসিতেছে।”

    “সত্য বলিতেছ? আমাকে প্রতারণা করিতেছ না?”

    “সত্য বলিতেছি, আজ বিরোধবর্মার মুখে এ কথা শুনিয়াছি।”

    সোমদত্তা ললাটে করাঘাত করিল; বলিল, “হায়! কাল এ কথা শুনি নাই কেন? শুনিলে প্রাণ দিতাম, তবু…”

    সোমদত্তা বিদ্যুদগ্নিপূর্ণ দুই চক্ষু আমার দিকে ফিরাইল। দীর্ঘকাল মৌন থাকিয়া শেষে বলিল, “যাহা হইবার হইয়াছে, ললাট-লিখন কে খণ্ডাইবে? বেশ্যা-কন্যার বুঝি ইহাই প্রাক্তন!”

    আমি বাহু দ্বারা তাহার কটিবেষ্টন করিয়া সোহাগে গদ্‌গদ স্বরে বলিলাম, “সোমদত্তা, প্রেয়সী, কেন বৃথা খেদ করিতেছ? তুমি আমার। চক্রায়ুধ ঈশানবর্মা তোমার জন্য অগ্নিতে প্রবেশ করিবে, জলে ঝাঁপ দিবে। চন্দ্রগুপ্তের কাল পূর্ণ হইয়াছে, তোমার জন্য আমি তার সর্বনাশ করিব।”

    “তুমিও চন্দ্রগুপ্তের সর্বনাশ করিবে?”

    “করিব। তুমি পার, আর আমি পারি না? চন্দ্রগুপ্ত আমার কে?”

    “সখা!”

    “সখা নয়। আমি তার প্রমোদের সহচর, স্তাবক সভাসদ্‌, বিট-বিদূষক মাত্র। চন্দ্রগুপ্ত একদিন আমার মুখের গ্রাস কড়িয়া লইয়াছিল, আমিও লইয়াছি। যার অঙ্কলক্ষ্মীকে কাড়িয়া লইয়াছি, তার সঙ্গে আবার সখ্য কিসের? এখন আমরা দু’জনে মিলিয়া তার উচ্ছেদ করিব।”

    কিছুক্ষণ নির্বাক্‌ থাকিয়া সোমদত্তা প্রশ্ন করিল, “কি করিতে চাও?”

    “শুন বলিতেছি। প্রভাতে বিরোধবর্মার মুখে যাহা শুনিয়াছি তাহা হইতে অনুমান হয় যে, আজ হইতে দশ দিনের মধ্যে লিচ্ছবিদেশ হইতে পাটলিপুত্রের সাহায্যার্থে সৈন্য আসিবে— পারাবত-মুখে এই সংবাদ আসিয়াছে। চন্দ্রবর্মা যদি পাটলিপুত্র অধিকার করিতে চান, তবে তৎপূর্বেই করিতে হইবে, লিচ্ছবিরা আসিয়া পড়িলে আর তাহা সুসাধ্য হইবে না। তখন নিজের প্রাণ লইয়া টানাটানি পড়িয়া যাইবে। এদিকে নগরের খাদ্যাভাবও ঘুচিয়াছে, সুতরাং বাহুবলে এই দশ দিনের মধ্যে দুর্গ জয় করা অসম্ভব। এরূপ ক্ষেত্রে উপায় কি?”

    “কি উপায়?”

    “বিশ্বাসঘাতকতা।”

    “কে বিশ্বাসঘাতকতা করিবে?”

    “আমি করিব। কিন্তু পরিবর্তে চন্দ্রবর্মা আমাকে কি দিবেন?”

    “যাহা পাইয়াছ তাহাতে তৃপ্তি নাই?”

    “না। কাল বলিয়াছিলাম বটে, রাজ্য সিংহাসন চাহি না, কিন্তু তাহা ভুল। রাজ্য না পাইলে তোমাকে পাইয়াও আমার অতৃপ্তি থাকিয়া যাইবে। তুমি রাজ-ঐশ্বর্যের স্বাদ পাইয়াছ,— অল্পে কি তোমার মন উঠিবে?”

    “তা বটে, অল্পে আমার ক্ষুধা মিটিবে না!…কৃতঘ্নতার মূল্য কি চাও?”

    “আমি সব স্থির করিয়াছি। তুমি দীপসংকেতে চন্দ্রবর্মাকে সমস্ত সংবাদ দাও, — জানাও যে বিশ্বাসঘাতকতা ভিন্ন দুর্গ অধিকার হইবে না। তাঁহাকে এ কথাও বল যে, একজন দ্বারপাল সেনানী দুর্গদ্বার খুলিয়া দিতে প্রস্তুত আছে, কিন্তু পুরস্কারস্বরূপ তাহাকে মগধের সিংহাসন দিতে হইবে।”

    সোমদত্তা প্রস্তরমূর্তির মতো দাঁড়াইয়া রহিল; তারপর হাসিয়া উঠিল! দীপের কম্পমান আলোকে সে হাসি অদ্ভুত দেখাইল। বলিল, “বেশ, বেশ! আমিও তো ইহাই চাহিয়াছিলাম। মনে করিয়াছিলাম পিতাকে তুষ্ট করিয়া এক জনের জন্য মগধের সিংহাসন ভিক্ষা মাগিয়া লইব, এক স্পর্ধিতা দুর্বিনীতা নারীর দর্পচূর্ণ করিব। কিন্তু এই ভালো। তোমার ও আমার ষড়যন্ত্রে পিতা দুর্গ অধিকার করিবেন, তারপর তুমি সিংহাসনে বসিবে, আর আমি— আমি তোমার পট্টমহিষী হইব। এই ভালো!”— বলিয়া সোমদত্তা আবার হাসিল।

    আমি বলিলাম, “চন্দ্রগুপ্তকে হত্যা করিতে হইবে। তাহাকে বাঁচিতে দিয়া কোনও লাভ নাই। পরে গণ্ডগোল বাধিতে পারে। একটা সুবিধা আছে, চন্দ্রগুপ্ত পলাইতে পরিবে না, সে মোহনগৃহের সন্ধান জানে না।”

    চন্দ্রগুপ্তের প্রতি সোমদত্তার মনে কোনও মমতা আছে কি না দেখিবার জন্য এই কথা বলিয়াছিলাম। দেখিলাম, তাহার মুখে করুণার ভাব ফুটিয়া উঠিল না, বরঞ্চ মুখ ও অধরোষ্ঠ আরও কঠিনভাব ধারণ করিল। সে স্থির নিষ্করুণ দৃষ্টিতে আমার দিকে চাহিয়া রহিল। জিজ্ঞাসা করিল, “মোহনগৃহ কি?”

    মোহনগৃহ কি, বুঝাইয়া দিলে সোমদত্তার মুখে কিছু উৎফুল্লতা দেখা দিল। সে আমার কণ্ঠবেষ্টন করিয়া বলিল, “প্রিয়তম, চন্দ্রগুপ্ত ও কুমারদেবী পুত্র লইয়া পলাইবে, এই কথা ভাবিয়া আমার মনে সুখ ছিল না; এখন নিশ্চিন্ত হইলাম। ভাবিও না, তোমাতে আমাতে নিরাপদে রাজ্যসুখ ভোগ করিব।”

    “আর চন্দ্রগুপ্ত?”

    “সে ভার আমার। আমি তার ব্যবস্থা করিব।”

    ঊষার সূচনা করিয়া শীতল বায়ু আমাদের অঙ্গ স্পর্শ করিয়া গেল। পূর্বগগনে কৃষ্ণপক্ষের ক্ষয়প্রাপ্ত শশিকলা রোগপাণ্ডুর মুখ তুলিয়া চাহিল। আমি বলিলাম, “আর বিলম্বে প্রয়োজন নাই, রাত্রি শেষ হইয়া আসিতেছে, এই বেলা সংকেত পাঠাও।”

    সোমদত্তা প্রদীপ লইয়া প্রাকারের প্রান্তে গিয়া দাঁড়াইল। প্রসারিত-হস্তে কিছুক্ষণ প্রদীপ ধরিয়া থাকিয়া মুখে নিশাচর পক্ষীর মতো একপ্রকার শব্দ করিল। উৎকর্ণ হইয়া শুনিলাম, পরিখার পরপার হইতে অস্পষ্ট উত্তর আসিল। তখন সোমদত্তা প্রদীপ ধীরে ধীরে সঞ্চালিত করিতে লাগিল। তাপসীর মতো আত্মসমাহিত মুখ, নিশ্চল তন্ময় চক্ষু, সোমদত্তা দীপরশ্মির সাহায্যে সমস্ত সংবাদ বাহিরে প্রেরণ করিল।

    সংবাদ শেষ হইলে বাহিরের অন্ধকার হইতে আবার শব্দ আসিল— এবার পাপিয়ার উচ্চতান— শব্দ স্তরে স্তরে উঠিয়া ঊর্ধ্বে বায়ুমণ্ডলে বিলীন হইয়া গেল।

    সোমদত্তা প্রদীপ নামাইয়া বলিল, “কল্য উত্তর পাইবে।”

    নিশাবসানে পৌরজন নিদ্রাত্যাগ করিয়া দেখিল, নগরের হট্টে রাশি রাশি খাদ্য স্তূপীকৃত হইয়াছে। ঘৃত, তৈল, শালি-তণ্ডুল, গোধূম, চণক, শাক-সব্জী— কোনও বস্তুরই অভাব নাই। কোথা হইতে খাদ্য আসিল, কেহ জানিল না। শুধু দেখা গেল, বুদ্ধ তথ্যাগতের পাষাণময় বিহারের অভ্যন্তর হইতে এই খাদ্য-স্রোত নিঃসৃত হইতেছে। নাগরিকগণ ঊর্ধ্ব কণ্ঠে সৌগতের জয়ঘোষণা করিতে করিতে হট্টের অভিমুখে ছুটিল।

    মহারাজ চন্দ্রগুপ্ত তখন মল্লগৃহের সুচিক্কণ শীতল মণি-কুট্টিমের উপর শয়ান ছিলেন, দুই জন নহাপিত সুগন্ধি তৈল দ্বারা তাঁহার হস্তপদাদি মর্দন করিয়া দিতেছিল। নাগরিকদের এই আনন্দনিনাদ তাঁহার কর্ণে প্রবেশ করিল; তিনি মুদিত চক্ষু ঈষন্মাত্র উন্মীলিত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “বল্লভ, কিসের চিৎকার? চন্দ্রবর্মা কি দুর্গপ্রবেশ করিল?”

    সন্নিধাতা বল্লভ সুবর্ণস্থলীর উপর স্ফটিকপাত্রপূর্ণ ফলাম্লরস লইয়া অদূরে দাঁড়াইয়া ছিল— মহারাজ স্নানান্তে পান করিয়া শরীর স্নিগ্ধ করিবেন। সে বলিল, “না অজ্জ, বহুদিন পরে পৌরজন খাদ্য পাইয়াছে, তাই মহারাজের জয়-ধ্বনি করিতেছে।”

    চন্দ্রগুপ্ত জিজ্ঞাসা করিলেন, “খাদ্য কোথা হইতে আসিল?”

    বল্লভ সবিশেষ জানিত না, তথাপি মহারাজের কথার উত্তর দিতে হইবে; বলিল, “বিহারমধ্যে খাদ্য সঞ্চিত ছিল, ভিক্ষুগণ তাই হাই বিতরণ করিতেছেন।”

    মহারাজ আর প্রশ্ন করিলেন না, পুনশ্চ চক্ষু মুদিত করিয়া কহিলেন, “ভাল, মহাদেবীকে সমাচার দাও। তিনি প্রকৃতিপুঞ্জের জন্য বড়ই ব্যাকুল হইয়াছিলেন।”

    মহারাজের গূঢ় শ্লেষ বল্লভ অনুধাবন করিল না, মহাদেবী বলিতে প্রেয়সী সোমদত্তাকেই বুঝিল। “যথা আজ্ঞা!”— বলিয়া বাহিরে গেল। বাহিরে গিয়া দেখিল, অসংবৃতকুন্তলা এক তরুণী দাসী দ্রুতপদে বহির্মুখে যাইতেছে। বল্লভ ইঙ্গিত করিয়া তাহাকে কাছে ডাকিল, বলিল, “জয়ন্তী, তোমার কেশবেশ যেরূপ বিস্রস্ত, বাহিরে গেলে লোকে নিন্দা করিবে!”

    জয়ন্তী মথিত-কজ্জল চক্ষু মার্জনা করিয়া কহিল, “কি প্রয়োজন তাই বল না, রসিকতার সময় নাই। আমি কাজে যাইতেছি।”

    বল্লভ বলিল, “কাজ পরে করিও, এখন অন্দরে ফিরিয়া যাও।”— বলিয়া তাহার মুখে সংবাদ পাঠাইয়া দিল।

    জয়ন্তী সংবাদ লইতেই আসিতেছিল, ফিরিয়া গিয়া সোমদত্তাকে সকল কথা জানাইল।

    সোমদত্তা তখন শীতল হর্ম্যতলে পড়িয়া দুই বাহুর উপর মুখ রাখিয়া চিন্তা করিতেছিল। কি গহন, কি কুটিল তাহার চিন্তা, তাহা কে বলিবে? দাসীর কথা শুনিয়া সে উঠিয়া বসিল। দুই চক্ষু কালিমাবেষ্টিত হইয়া যেন আরও উজ্জ্বল আরও প্রভাময় হইয়াছে, শিশির-কালের প্রস্ফুট হিমচম্পকের ন্যায় কপোল দুইটি পাণ্ডুর। রূপের বুঝি অন্ত নাই। দাসী এই ক্লান্ত-সন্তপ্ত সৌন্দর্যের সম্মুখ হইতে বোধ করি লজ্জা পাইয়া ধীরে ধীরে সরিয়া যাইতেছিল; সোমদত্তা ডাকিল, “জয়ন্তী!”

    দাসী ফিরিয়া আসিয়া সসম্ভ্রমে বলিল, “অজ্জা!”

    অধোমুখে কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া সোমদত্তা বলিল, “তুই একবার বাহিরে যা। বৌদ্ধ-বিহারে গিয়া শ্রমণাচার্য ভিক্ষু অকিঞ্চনকে আমার কাছে ডাকিয়া আন্‌। বলিবি যে ভিক্ষুণী দীপান্বিতা তাঁহাকে স্মরণ করিয়াছে। আর কঞ্চুকী যদি তাঁর পুরপ্রবেশে বাধা দেয়, এই মুদ্রা দেখাস্‌।”— বলিয়া আপন কণ্ঠের রত্নহার হইতে সুবর্ণমুদ্রা খুলিয়া দাসীর হস্তে দিল।

    জয়ন্তীর মুখ পাংশু হইয়া গেল, সে ভীতকণ্ঠে বলিল, “কিন্তু অজ্জা, কুমারদেবী জানিতে পারিলে—”

    সোমদত্তা কহিল, “ত্যক্ত করিস্‌ না, যা বলিলাম কর্‌।”

    জয়ন্তী প্রস্থান করিল, মনে মনে বলিতে বলিতে গেল, “তোমার আর কি! অন্দরে বৌদ্ধ ভিক্ষু ডাকিয়াছি শুনিলে পট্টদেবী আমার মাথাটি খাইবেন।”

    ভিক্ষু অকিঞ্চনকে লইয়া যখন জয়ন্তী ফিরিল, তখন সোমদত্তা স্নান করিয়া শুদ্ধশুচি হইয়া বসিয়াছে। ললাটে কুঙ্কুম-তিলক পরিয়াছে, বক্ষে কাঁচুলি বাঁধিয়া উচ্ছল দেহলাবণ্য সংযত করিয়াছে। ভিক্ষু কক্ষে প্রবেশ করিয়া সোমদত্তাকে আশীর্বাদ করিলেন এবং আসন পরিগ্রহ করিয়া জিজ্ঞাসু নেত্রে তাহার মুখের প্রতি চাহিয়া রহিলেন। সংঘস্থবিরের বয়স হইয়াছে, মস্তক ও মুখ মুণ্ডিত, পরিধানে পীতবস্ত্র, শান্ত সৌম্য মূর্তি। কৃচ্ছ্রসাধনের ফলে কিছু কৃশ, কিন্তু মুখমণ্ডলে ব্রহ্মচর্যের নির্মল দীপ্তি জাজ্বল্যমান।

    সোমদত্তা জয়ন্তীকে চলিয়া যাইতে ইঙ্গিত করিল। জয়ন্তী প্রস্থান করিলে সে ভিক্ষুকে প্রণিপাত করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে কহিল, “অর্হৎ, আত্ম-পরিচয় গোপন করিয়া সংঘারামে গিয়াছিলাম— ক্ষমা করুন!”

    অকিঞ্চন কহিলেন, “আত্মগোপন করিয়া যে আর্তের সেবা করে, সিদ্ধার্থ তাহাকে অধিক কৃপা করেন।”

    সোমদত্তা কহিল, “আজ রাত্রে বোধ হয় সংঘারামে যাইবার অবকাশ হইবে না। তাই অজ্জা কুমারদেবীর বৌদ্ধ-বিদ্বেষ জানিয়াও আপনাকে এখানে আহ্বান করিয়াছি। আমার কিছু জিজ্ঞাস্য আছে।”

    অকিঞ্চন কহিলেন, “সময় উপস্থিত হইলে ভগবান শাক্যসিংহ কুমারদেবীকে সুমতি দিবেন। … তোমার জিজ্ঞাস্য কি?”

    সোমদত্তা কহিল, “শুনিলাম, নগরে খাদ্য আসিয়াছে; এ কথা সত্য?”

    “সত্য।”

    “কি করিয়া আসিল?”

    ভিক্ষু কিছুক্ষণ স্থির থাকিয়া বলিলেন, “তথাগতের কৃপায়।”

    সোমদত্তা ঈষৎ অধীর হইয়া বলিলেন, “তাহা জানি। কিন্তু কোথা হইতে কোন্‌ পথে আসিল?”

    অকিঞ্চন মৃদুহাস্যে বলিলেন, “সংঘের পথে।”

    শিরঃসঞ্চালন করিয়া সোমদত্তা কহিল, “তাহাও জানি; খাদ্য সংঘারামে সঞ্চিত ছিল?”

    “না।”

    “তবে?”

    “এ অতি গূঢ় বৃত্তান্ত। দীপান্বিতে, তুমি কৌতূহল প্রকাশ করিও না, — আমি বলিব না।”

    “তবে আমিই বলিতেছি! সংঘমধ্যে কোনও সুড়ঙ্গ আবিষ্কৃত হইয়াছে, সেই পথে দুর্গের বাহির হইতে খাদ্য আসিতেছে— সত্য কি না?”

    ইতস্তত করিয়া ভিক্ষু কহিলেন, “সত্য। জান যদি, প্রশ্ন করিতেছ কেন?”

    “জানি না, অনুমান করিয়াছি মাত্র। অর্হৎ, কন্যার প্রতি একটি অনুগ্রহ করুন। কি করিয়া কবে এই সুড়ঙ্গ আবিষ্কৃত হইল, আমাকে বলুন।”

    কিয়ৎকাল চিন্তা করিয়া সংঘাচার্য বলিলেন, “ভাল, শুন। এই সুড়ঙ্গের সন্ধান একপক্ষ পূর্ব পর্যন্ত আমি অথবা অন্য কেহ জানিত না। আমার পূর্ববর্তী সংঘস্থবির নির্বাণের পূর্বে মোহপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন, তাই ইহার কথা আমাকে বলিয়া যাইতে পারেন নাই।”

    নির্নিমেষ চক্ষুর্দ্বয় ভিক্ষুর মুখের উপর স্থাপন করিয়া সোমদত্তা শুনিতে লাগিল।

    অকিঞ্চন বলিতে লাগিলেন, “সংঘের মধ্যে ভূগর্ভস্থ যে প্রকোষ্ঠে বুদ্ধের অস্থি রক্ষিত আছে, তাহার উপরে আর একটি কক্ষ আছে, তুমি দেখিয়া থাকিবে। কক্ষটি সচরাচর ব্যবহৃত হয় না, কদাচ আমি মননাদির জন্য উহা ব্যবহার করিয়া থাকি। গত পূর্ণিমা-তিথিতে আমি সেই কক্ষে প্রবেশ করিয়া দেখি, ঘরটি অত্যন্ত অপরিষ্কার হইয়াছে এবং ছাদের মধ্যস্থলে যে প্রস্তরের ধর্মচক্র ক্ষোদিত আছে, তাহার উপর মধুমক্ষিকা চক্রনির্মাণ করিয়াছে। ঘরটিকে মলনির্মুক্ত করিবার মানসে আমি প্রথমে একটি বংশদণ্ডাগ্রে মশাল যোজিত করিয়া ধূম প্রয়োগ দ্বারা মধুমক্ষিকাগুলিকে বিদূরিত করলাম, তারপর মধুচক্রটি স্থানচ্যুত করিবার অভিপ্রায়ে বংশদণ্ডদ্বারা উহা তাড়িত করিবামাত্র এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটিল। ধর্মচক্রের মধ্যস্থলে যে ক্ষুদ্র ছিদ্র আছে, তাহার মধ্যে বংশের অগ্রভাগ প্রবেশ করিবার সঙ্গে সঙ্গে কক্ষপ্রাচীরের এক স্থানে প্রস্তর সরিয়া গিয়া একটা চতুষ্কোণ গহ্বর দেখা দিল। আমি অতিশয় বিস্মিত হইয়া সেই রন্ধ্রটি পরীক্ষা করিলাম, দেখিলাম, অন্ধকার মধ্যে সোপান নামিয়া গিয়াছে।

    “পাছে অন্য কেহ আসিয়া পড়ে, এ জন্য তখন আর কিছু করিলাম না— কক্ষের কবাট বন্ধ করিয়া ফিরিয়া আসিলাম। রাত্রিতে সকলে ঘুমাইলে, প্রদীপ লইয়া কক্ষের ভিতর হইতে অর্গলবদ্ধ করিয়া দিয়া সুড়ঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করিলাম। প্রস্তর ও ইষ্টকনির্মিত সুড়ঙ্গ, অতিশয় সংকীর্ণ ও অনুচ্চ, মস্তক অবনত করিয়া চলিতে হয়। অর্ধ ক্রোশান্তরে বায়ুপ্রবাহের জন্য কূপ আছে— সেই কূপ সকল লঙ্ঘন করিয়া অগ্রসর হইতে হয়। আমি এইভাবে বহুদূর পর্যন্ত গমন করিয়াও সুড়ঙ্গের শেষ পাইলাম না। প্রদীপের তৈল নিঃশেষ হইয়া আসিতেছিল, সে রাত্রিতে ভগ্নোদ্যমে ফিরিয়া আসিলাম। তারপর উপর্যুপরি পঞ্চরাত্র চেষ্টার পর ষষ্ঠরাত্রিতে সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে পৌঁছিলাম। কুক্কুটপাদ বিহারের অঙ্গনে গিয়া সুড়ঙ্গ শেষ হইয়াছে…”

    সংহত নিশ্বাসে সোমদত্তা বলিল, “তারপর?”

    নিশ্বাস ফেলিয়া অকিঞ্চন কহিলেন, “কুক্কুটপাদ বিহারের পূর্বশ্রী আর নাই, এখন উহা জনহীন ভগ্নপ্রায়, শ্বাপদের বাসভূমি। কিন্তু গোতমের করুণার উৎস এখনো শতমুখে উৎসারিত হইতেছে। তাই ভগবান পথ দেখাইয়া দিলেন। আমি ফিরিয়া আসিয়া সান্ধিবিগ্রহিককে সংবাদ দিলাম, বলিলাম, সংঘের পথেই বুভুক্ষিতের ক্ষুধা নিবারণ হউক।”

    ভিক্ষু নীরব হইলেন। সোমদত্তা নতমুখে চিন্তা করিতে লাগিল। কিছুক্ষণ এইভাবে কাটিবার পর ভিক্ষু আসন ত্যাগ করিয়া উঠিবার উপক্রম করিলেন। তখন সোমদত্তা যুক্তপাণি হইয়া বলিল, “শ্রীমন্‌, আর একটি প্রশ্ন আছে। এই রাজপুরী যিনি নির্মাণ করিয়াছিলেন, তিনি কি বৌদ্ধ ছিলেন?”

    অকিঞ্চন কহিলেন, “হাঁ, শুনিয়াছি, অশোক প্রিয়দর্শী এই পুরী নির্মাণ করাইয়াছিলেন, সংঘারামও তাঁহারই প্রতিষ্ঠিত।”

    সোমদত্তা প্রণাম করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল, “ভগবন্‌, আশীর্বাদ করুন, যেন পূর্ণমনোরথ হইতে পারি।”

    হাস্যমুখে অকিঞ্চন কহিলেন, “সুমঙ্গলে, গোতমের ইচ্ছায় তোমার মনস্কাম সিদ্ধ হইবে— গৌতম অন্তর্যামী।”

    সংঘস্থবির বিদায় হইলে সোমদত্তা কক্ষমধ্যে পদচারণ করিতে করিতে ভাবিতে লাগিল। দীর্ঘকাল গভীর চিন্তা করিল। ধর্মচক্র! ধর্মচক্র! কিন্তু পুরীমধ্যে কোথাও তো ধর্মচক্র নাই। বুদ্ধের মূর্তি, ধর্মচক্র প্রভৃতি যাহা ছিল, তাহা অপসারিত করিয়া তৎপরিবর্তে দেবমূর্তি স্থাপিত হইয়াছে।

    ভাবিতে ভাবিতে অজ্ঞাতসারে তাহার চক্ষু ঊর্ধ্বে নিপতিত হইল। তখন বিস্ফারিত নেত্রে স্তম্ভিত বক্ষে সোমদত্তা দেখিল, উচ্চ ছাদের মধ্যস্থলে রক্তপ্রস্তরে উৎকীর্ণ ধর্মচক্র— এবং তাহার কেন্দ্রমধ্যে ক্ষুদ্র সুগোল একটি ছিদ্র!

    বহুক্ষণ তদাবস্থ থাকিবার পর সোমদত্ত ছুটিয়া গিয়া জয়ন্তীকে ডাকিল। উত্তেজিত কণ্ঠে কহিল, “জয়ন্তী, শীঘ্র যা— অস্ত্রাগার হইতে ধনুর্বাণ লইয়া আয়! জিজ্ঞাসা করিলে বলিস্‌, মহাদেবী সোমদত্তা লক্ষ্যবেধ শিক্ষা করিবেন।”

    শব্দতরঙ্গে অন্ধকার পরিপূর্ণ করিয়া বাঁশি বাজিতেছিল। সোমদত্তা প্রদীপের সম্মুখে বসিয়া করতলে চিবুক রাখিয়া এই দূরাগত বংশীধ্বনি শুনিতেছিল। আমি প্রাকার-কুড্য আশ্রয় করিয়া দাঁড়াইয়া ছিলাম।

    বাঁশি প্রথমে বসন্ত-রাগ ধরিল; তারপর কিছুক্ষণ গুর্জরী-রাগ লইয়া ক্রীড়া করিয়া আবার বসন্ত-রাগে ফিরিয়া আসিল। শেষে এই দুই রাগ ছাড়িয়া বাঁশি মালকোষ ধরিল। কত নিপুণ সুরের কৌশল, কত মীড়-গমক-ঝংকার, কত তান-লয়ের পরিবর্তন দেখাইল। তারপর সহসা বাঁশি স্তব্ধ হইল।

    “বাঁশি কি বলিল?”

    সোমদত্তা যেন তন্দ্রার ঘোর হইতে জাগিয়া উঠিল। অতি দীর্ঘ এক নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিল, “তুমি যাহা চাও পাইবে। চন্দ্রবর্মা তোমাকে মগধের ক্ষত্রপ নিযুক্ত করিবেন। আগামী অমাবস্যার রাত্রিতে দ্বিতীয় প্রহর ঘোষিত হইবার পর আমি এই প্রদীপ দ্বারা রাজপুরীতে অগ্নিসংযোগ করিব। অগ্নি যখন ব্যাপ্ত হইয়া আকাশ লেহন করিবে, সেই সময় তুমি গোতম-দ্বারের অর্গল খুলিয়া দিবে। রাজপ্রাসাদে অগ্নিসংযোগই সংকেত; এই সংকেত পাইয়া চন্দ্রবর্মার সেনা দুর্গপ্রবেশের জন্য প্রস্তুত থাকিবে, তুমি দ্বার খুলিয়া দিলেই তাহারা প্রবেশ করিবে। পৌরজন রাজপুরী রক্ষার্থ ব্যস্ত থাকিবে, সেই অবসরে চন্দ্রবর্মা বিনা বাধায় পাটলিপুত্র অধিকার করিবেন।”

    আমি উত্তেজিত হইয়া বলিলাম, “অমাবস্যার রাত্রি? তার তো বিলম্ব নাই— আগামী পরশ্ব!”

    “হাঁ। অধিক বিলম্বে ভয় আছে, লিচ্ছবিগণ আসিয়া পড়িতে পারে।”

    ইহার পর সোমদত্তা আবার মৌন অবলম্বন করিল, করলগ্নকপোলে নিষ্পলক দৃষ্টিতে দীপশিখার দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল। আমিও সহসা কি কথা বলিব ভাবিয়া পাইলাম না, মানসিক উত্তেজনা রসনাকে যেন জড় করিয়া দিল। তথাপি চেষ্টা করিয়া কহিলাম, “বাঁশি তো রাগ-রাগিণীর আলাপ করিল, তুমি এত কথা বুঝিলে কি করিয়া?”

    সোমদত্তা অন্যমনে কহিল, “ঐ রাগ-রাগিণীতে সংযুক্ত কথাগুলা আমার জানিত। যিনি বাঁশি বাজাইতেছিলেন, তিনি আমার গীতাচার্য ছিলেন।”

    অতঃপর আবার দীর্ঘ নীরবতা বিরাজ করিতে লাগিল। কাহারও মুখে কথা নাই। এই সুকঠিন মৌন আর সহ্য করিতে না পারিয়া আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “কি ভাবিতেছ?”

    সোমদত্তা মুখ তুলিয়া বলিল, “ভাবিতেছি, কি অপরিমেয় শক্তি এই ক্ষুদ্র মৃৎপ্রদীপের! এত তুচ্ছ, ভঙ্গুর— মাটিতে পড়িলে ভাঙিয়া শতখণ্ড হইবে; অথচ একটা রাজ্য ধ্বংস করিবার শক্তি ইহার আছে। এমনি কতশত ছার মৃৎপ্রদীপ কেবল রূপশিখার অনলে সংসার ভস্মীভূত করিতেছে!”

    আমি তাহার বাক্যের মর্ম বুঝিয়া হস্তধারণপূর্বক বলিলাম, “মৃৎপ্রদীপ নয়, সোমদত্তা, তুমি রত্নপ্রদীপ! তোমার দীপ্তিতে মগধ আলোকিত হইবে।”

    সোমদত্তা উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল, “আমি শ্মশানের আলো!… এখন চলিলাম, সেই অমাবস্যার রাত্রিতে আবার সাক্ষাৎ হইবে। চন্দ্রবর্মাকে সঙ্গে লইয়া প্রাসাদে যাইও, আমি মন্ত্রগৃহে প্রতীক্ষায় থাকিব।”

    আমি তাহাকে সাদরে নিকটে টানিয়া লইয়া বলিলাম, “সেই দিন আমাদের মনোরথ পূর্ণ হইবে!”

    ঈষৎ হাসিয়া সোমদত্তা বলিল, “হাঁ, সেই দিন আমার মনোরথ পূর্ণ হইবে।”

    মহারাজ চন্দ্রগুপ্ত সোমদত্তার কক্ষে রাত্রিকালে নিদ্রা যাইতেছিলেন। অকস্মাৎ তীব্র শ্বাসরোধকর ধূমের গন্ধে তাঁহার নিদ্রাভঙ্গ হইল। চক্ষু না খুলিয়াই ডাকিলেন, “সোমদত্তা!” উত্তর পাইলেন না। তখন নিদ্রাকষায়নেত্র উন্মীলন করিয়া দেখিলেন, শয্যায় সোমদত্তা নাই। কক্ষের চারিদিকে চাহিলেন, সোমদত্তাকে দেখিতে পাইলেন না।

    বাহিরে তখন সমস্ত পুরী জাগিয়া উঠিয়াছে। সদ্যোত্থিত নারীদের ভীত চিৎকার, গৃহপালিত ময়ূর শারিকা প্রভৃতি পক্ষীদের সচকিত আর্তস্বর এবং সর্বোপরি বিস্তারশীল অগ্নির গর্জন নৈশ বায়ুকে বিলোড়িত করিতেছে। দারুপ্রাসাদে আগুন লাগিলে রক্ষা করিবার কোনও উপায় নাই, পলায়ন করিয়া আত্মরক্ষা করাই একমাত্র পথ। পুরীস্থ সকলে মহাকোলাহল করিয়া নিজ নিজ মূল্যবান দ্রব্য যাহা পাইতেছে, লইয়া পলাইতেছে। কে পড়িয়া রহিল, রাজা-রানী কে মরিল কে বাঁচিল, কাহারও দেখিবার অবসর নাই। নিজের প্রাণ বাঁচাইবার জন্য সকলেরই উগ্র বাহ্যজ্ঞানশূন্য ত্বরা।

    অগ্নি ক্রমশ আরও ব্যাপ্ত হইতে লাগিল, এক প্রাসাদ ছাড়িয়া সংলগ্ন প্রাসাদসকল আক্রমণ করিল। বায়ুর বেগ বাড়িয়া গেল। অমাবস্যা রাত্রির মসীতুল্য অন্ধকার এই ভীষণ অগ্নিকাণ্ডে যেন বিদীর্ণ শতখণ্ড হইয়া গেল। বহুদূর পর্যন্ত নগর রক্তাভ আলোকে উদ্ভাসিত হইল।

    নাগরিকগণ জাগিয়া উঠিয়া কোলাহল করিতে করিতে রাজপুরীর দিকে ছুটিল। উত্তেজিত বিহ্বল নর-নারী স্খলিতবসনে মুক্ত-কেশে বাহ্যজ্ঞানশূন্যভাবে জ্বলন্ত রাজ-প্রাসাদের চতুর্দিকে সমবেত হইতে লাগিল।

    সহসা বহুদূরে সম্মিলিত সহস্রকণ্ঠে মহাজয়ধ্বনি শ্রুত হইল। রাজপুরীর চারিপাশে সমবেত নাগরিকগণ ঊর্ধ্বমুখে অনলোল্লাস দেখিতেছিল, তাহার মধ্য হইতে কে একজন চিৎকার করিয়া বলিল, “পালাও! পালাও! নগরে শত্রু প্রবেশ করিয়াছে!”— অমনই বিক্ষুব্ধ জনতা উন্মত্তের ন্যায় চারিদিকে দৌড়িতে আরম্ভ করিল। কেহ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিতে ছুটিতে পড়িয়া গিয়া জানু ভাঙিল, কেহ জনমর্দের চরণতলে পড়িয়া পিষ্ট হইয়া গেল। ক্রন্দন, হাহাকার এতক্ষণ রাজপুরীর মধ্যে নিবদ্ধ ছিল, এবার নগরময় ছড়াইয়া পড়িল।

    সোমদত্তা তখন কোথায়?

    সোমদত্তা তখন আলুলায়িত কুন্তলে, লুণ্ঠিত বসনে পট্টমহাদেবীর প্রাসাদে প্রবেশ করিতেছে। কুমারদেবীর ভবনে তখনও ভালো করিয়া আগুন লাগে নাই, কিন্তু দাসী, কিঙ্করী, প্রহারিণী— যে যেখানে ছিল সকলে পলাইয়াছে। কুমারদেবীর অরক্ষিত শয়নকক্ষে প্রবেশ করিয়া সোমদত্তা দেখিল, বিস্তৃত শয্যার উপর পুত্রকে বুকের কাছে লইয়া তিনি তখনও নিদ্রিতা।

    সোমদত্তা সবলে তাঁহার অঙ্গে নাড়া দিয়া বলিল, “দেবী, উঠুন, উঠুন— প্রাসাদে আগুন লাগিয়াছে!”

    কুমারদেবী চুক্ষ মুছিয়া শয্যায় উঠিয়া বলিলেন, “কে?”

    “আমি, সোমদত্তা। আর বিলম্ব করিবেন না, শীঘ্র শয্যাত্যাগ করুন”— বলিয়া ঘুমন্ত সমুদ্রগুপ্তকে ক্রোড়ে তুলিয়া লইতে গেল।

    কুমারদেবীর দৃষ্টি তীক্ষ্ণ ও কঠিন হইয়া উঠিল। তিনি বলিলেন, “আমার পুত্রকে স্পর্শ করিও না। দাসীরা কোথায়?”

    “কেহ নাই, সকলে প্রাণভয়ে পলাইয়াছে।”

    “মহলে কি করিয়া আগুন লাগিল?”

    আর গোপন করিবার প্রয়োজন ছিল না। সোমদত্তা স্থিরদৃষ্টিতে কুমারদেবীর মুখের পানে চাহিয়া বলিল, “আমি মহলে আগুন দিয়াছি।”

    কুমারদেবী চিৎকার করিয়া কহিলেন, “স্বৈরিণী! তাহা জানি। যখন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে ঘরে আনিয়াছিস্‌ তখনি তোর অভিসন্ধি বুঝিয়াছি।”

    সোমদত্তা কহিল, “অজ্জা, ক্রোধে অন্ধ হইয়া নির্দোষের প্রতি দোষারোপ করিবেন না। সেই বৌদ্ধ ভিক্ষুর প্রসাদেই আজ আপনাদের প্রাণরক্ষা করিতে পারিব। এখন আসুন, পুরী এতক্ষণে ভস্মসাৎ হইল। আর বিলম্ব করিলে বুঝি আপনাদের বাঁচাইতে পারিব না।”

    “তুই বাঁচাইবি? কেন, আমি কি আত্মরক্ষা করিতে জানি না?”

    “না অজ্জা, আজ আমি ভিন্ন আর কেহ আপনাদের বাঁচাইতে পরিবে না।”

    “তার অর্থ?”

    “তার অর্থ চন্দ্রবর্মার সেনা দুর্গে প্রবেশ করিয়াছে, এতক্ষণে বোধ করি রাজপুরী ঘিরিল।”

    কুমারদেবীর চক্ষু দিয়া অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বাহির হইতে লাগিল, “ডাকিনী! এ তোর কার্য; তুই মগধরাজ্য ছারখারে দিলি!”

    সোমদত্তা স্থিরভাবে বলিল, “স্বীকার করিলাম। কিন্তু আর বিলম্ব করিলে কুমারকে বাঁচাইতে পারিব না। ঐ দেখুন, অগ্নি প্রাসাদ বেষ্টন করিয়াছে।”

    এই সময় অর্ধচন্দ্রাকৃতি বাতায়নপথে অগ্নির আরক্ত লোলরসনা ও কুণ্ডলিত ধূমোদাগার কক্ষে প্রবেশ করিল।

    সোমদত্তা সমুদ্রগুপ্তকে ক্রোড়ে তুলিয়া লইয়া বলিল, “আজ আমার স্বামীর বংশধরকে বাঁচাইব বলিয়া আসিয়াছি, নহিলে আসিতাম না। আপনি থাকিতে হয় থাকুন, আমি চলিলাম”— বলিয়া দ্বারের দিকে অগ্রসর হইল।

    কুমারদেবী ছুটিয়া আসিয়া তাহার বাহু ধরিলেন, বলিলেন, “রাক্ষসী, ছাড়িয়া দে, আমার পুত্রকে ছাড়িয়া দে!”

    সোমদত্তা প্রজ্বলিত নয়নে ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, “দুর্ভাগিনী, নিজের ইষ্ট বুঝিতে পার না? আমার স্বামীর পুত্র কি আমার পুত্র নয়? এ রাজ্যে আগুন আমি জ্বালি নাই, জ্বালিয়াছে তোমার দুরন্ত অন্ধ অভিমান। সেই আগুনে তুমি পুড়িয়া মর!”

    কুমারদেবীর হাত ছাড়াইয়া পুত্র বুকে লইয়া সোমদত্তা ধূম্রান্ধকার অলিন্দের ভিতর দিয়া ছুটিয়া চলিল। কাঁদিতে কাঁদিতে উন্মাদিনীর ন্যায় কুমারদেবী তাহার পশ্চাত চলিলেন।

    নিজ শয়নকক্ষে ফিরিয়া আসিয়া সোমদত্তা দেখিল, রাজা অভিভূতের ন্যায় শয্যাপার্শ্বে বসিয়া আছেন— চতুর্দিকে কি ঘটিতেছে, তাঁহার যেন কোনও ধারণা নাই। ঘর ধূমাচ্ছন্ন— ঘরের চারিকোণে চারিটি সুবর্ণ-প্রদীপ তখনও ক্ষীণ আলোক বিস্তার করিয়া জ্বলিতেছে।

    হাঁপাইতে হাঁপাইতে পুত্রকে স্বামীর ক্রোড়ে ফেলিয়া দিয়া সোমদত্তা ছুটিয়া গিয়া ধনুর্বাণ লইয়া আসিল। ভালো দেখা যায় না, দুই চক্ষু বহিয়া অশ্রুধারা ঝরিতেছে, সোমদত্তা ধর্মচক্রের মধ্যস্থল লক্ষ্য করিয়া শরসন্ধান করিল। লক্ষ্যভ্রষ্ট শর পাথরে লাগিয়া ফিরিয়া আসিল। আবার শরনিক্ষেপ করিল, ব্যর্থ শর আবার প্রতিহত হইয়া ভূমিতে পড়িল। অদম্য ক্রন্দনের আবেগে সোমদত্তার বক্ষ ফাটিয়া যাইবার উপক্রম হইল। তবে কি গুপ্তদ্বার খুলিবে না?

    এদিকে ঘরের মধ্যে অগ্নির অসহ্য উত্তাপ উত্তরোত্তর বাড়িতেছে। রাজা এবং কুমারদেবী নির্বাক্‌ নিষ্পলক হইয়া সোমদত্তার এই উন্মত্তবৎ কার্য দেখিতে লাগিলেন। সোমদত্তা অসীম বলে আপনাকে সংযত করিয়া পুনশ্চ ধনুর্বাণ তুলিয়া লইল। লক্ষ্যবস্তু নিকটেই কিন্তু ভালো করিয়া দেখা যায় না, হাত কাঁপে, চক্ষু কূলে কূলে ভরিয়া উঠে। বহুক্ষণ ধরিয়া, অনেকবার চক্ষু মুছিয়া, অতি সাবধানে লক্ষ্য স্থির করিয়া সোমদত্তা তীর ছুঁড়িল। এবার আর তীর ফিরিয়া আসিল না— ধর্মচক্রের মধ্যস্থলে বিঁধিয়া রহিল। সোমদত্তা ধনু ফেলিয়া দিয়া একবার ক্ষণকালের জন্য মাটিতে লুটাইয়া পড়িল।

    কিন্তু পরক্ষণেই চক্ষু মুছিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। কুমারদেবীর নিকটে গিয়া বলিল, “অজ্জা, এইবার স্বামিপুত্র লইয়া এই সুড়ঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করুন। সুড়ঙ্গ নগর বাহিরে কুক্কুটপাদ বিহারে গিয়া শেষ হইয়াছে। সেখানে শত্রু নাই, সেখান হইতে সহজেই নিরাপদ স্থানে যাইতে পারিবেন।”

    চন্দ্রগুপ্ত সুড়ঙ্গমুখের দিকে চাহিয়া বসিয়া ছিলেন, এতক্ষণে প্রথম কথা কহিলেন, “নগরের বাহিরে যাইবার প্রয়োজন কি?”

    সোমদত্তা কহিলে, “প্রয়োজন আছে। শত্রু নগর অধিকার করিয়াছে।”

    তখন পুত্র লইয়া দুইজনে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করিলেন। সোমদত্তা চন্দ্রগুপ্তের চরণে মস্তক রাখিয়া প্রণাম করিয়া কহিল, “প্রিয়তম! এইবার বিদায় দাও।”

    সহসা চন্দ্রগুপ্ত যেন তাঁহার সমস্ত চেতনা ফিরিয়া পাইলেন; ভীষণ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন, “সোমদত্তা, তুমি আসিবে না?”

    সোমদত্তা দুই হাতে মুখ ঢাকিল; বলিল, “না প্রিয়তম, আমি আর তোমার সঙ্গে যাইবার যোগ্য নহি। কেন নহি, তাহা দেবীর মুখে শুনিও। চন্দ্রবর্মা আমার পিতা— এই কথা মনে করিয়া যদি পারো, আমাকে ক্ষমা করিও। তোমরা যাও— আমি ভিন্ন পথে যাইব।”

    হৃদয়-বিদারক স্বরে চন্দ্রগুপ্ত ডাকিলেন, “সোমদত্তা!” দুই হস্তে কর্ণ আবরণ করিয়া সোমদত্তা কাঁদিয়া উঠিল, “না, না, ডাকিও না— আমি যাইতে পারিব না। আমায় মরিতে হইবে। প্রাণাধিক, আবার জন্মান্তরে দেখা হইবে, তখন তোমার সোমদত্তাকে সঙ্গে লইও।”

    এই বলিয়া সবলে টানিয়া সুড়ঙ্গের পাষাণ-দ্বার বন্ধ করিয়া দিল। চন্দ্রগুপ্তের মুখনিঃসৃত অর্ধোচ্চারিত বাণী পাষাণ-প্রাচীরে লাগিয়া স্তব্ধ হইয়া গেল!

    তখন সেই উত্তপ্ত হর্ম্যতলে পড়িয়া, বসুধা আলিঙ্গন করিয়া, কেশ বিকীর্ণ করিয়া, ভূতলে ললাট প্রহত করিয়া সোমদত্তা কাঁদিল।

    কিন্তু তবু অগ্নি নিবিল না।

    এক হস্তে মুক্ত তরবারি, অন্য হস্তে প্রজ্বলিত উল্কা লইয়া দুর্গাবরোধকারী সেনা গোতম-দ্বার দিয়া প্রবেশ করিল। তাহাদের পুরোভাগে লৌহবর্মাবৃত ধাতুনির্মিত শিরস্ত্রাণধারী ভীষণাকৃতি স্বয়ং চন্দ্রবর্মা। দ্বারের প্রহরীদিগকে পূর্বেই সরাইয়া দিয়াছিলাম, সুতরাং একবিন্দুও রক্তপাত হইল না।

    চন্দ্রবর্মা আমাকে দেখিয়া পরুষকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমিই বিশ্বাসঘাতক দ্বারপাল?”

    কথার ভাবটা ভালো লাগিল না। যাহার জন্য বিশ্বাসঘাতকতা করিলাম, সে-ই বিশ্বাসঘাতক বলে! যাহা হউক, বিনীত কণ্ঠে বলিলাম, “হাঁ আমিই। সম্রাটের জয় হউক।”

    চন্দ্রবর্মা নিষ্করুণ আরক্ত দুই চক্ষু আমার মুখের উপর স্থাপন করিয়া মনে মনে কি যেন গবেষণা করিলেন, তারপর বলিলেন, “ভালো, সর্বাগ্রে পথ দেখাইয়া রাজপ্রাসাদে লইয়া চল।”

    পথ দেখাইয়া লইয়া যাইবার কোনও প্রয়োজন ছিল না। বিরাট অনলস্তম্ভের মতো প্রাসাদ তখন জ্বলিতেছে— সমস্ত নগর আলোকিত করিয়াছে। আপনার প্রভায় রাজপুরী স্বয়ংপ্রকাশ।

    সেনাদলের অগ্রে অগ্রে আমি চলিলাম। পথে কেহ গতিরোধ করিবার চেষ্টা করিল না, যে সম্মুখে পড়িল চৈত্রের বায়ুতাড়িত শুষ্কপত্রের মতো নিমেষমধ্যে বিপরীত মুখে অন্তর্হিত হইল।

    প্রাসাদের শূন্য তোরণ পার হইয়া সদলবলে সম্মুখস্থ মন্ত্রগৃহে প্রবেশ করিলাম। অগ্নি তখনও মন্ত্রগৃহ পর্যন্ত সংক্রামিত হয় নাই, তবে দীর্ঘ জিহ্বা বিস্তার করিয়া অগ্রসর হইতেছে— অচিরাৎ গ্রাস করিবে।

    বিশাল বহুস্তম্ভযুক্ত মন্ত্রগৃহ প্রায়ান্ধকার, জনশূন্য। কেবল তাহার মধ্যস্থলে সিংহাসনের বেদীর সম্মুখে সোমদত্তা দাঁড়াইয়া আছে। অশনিপূর্ণ বৈশাখী মেঘের ন্যায় তাহার মূর্তি; বক্ষে পৃষ্ঠে মুক্ত কৃষ্ণ কেশজাল, ললাটে রক্তরেখা, নয়নের কৃষ্ণতারকায় জ্বালাময় বিদ্যুৎ।

    বহু মশালের দীপ্তিতে মন্ত্রগৃহ আলোকিত হইল। তখন সোমদত্তা চন্দ্রবর্মাকে দেখিতে পাইয়া দ্রুতপদে আসিয়া তাঁহাকে প্রণাম করিল।

    “বৎসে! কল্যাণী!”— বলিয়া চন্দ্রবর্মা সোমদত্তাকে পদপ্রান্ত হইতে তুলিলেন। ক্ষণকালের জন্য এই ভীষণ দুর্ধর্ষ যোদ্ধার কণ্ঠস্বরা যেন প্রসাদগুণ প্রাপ্ত হইল।

    সোমদত্তা অবরুদ্ধ কণ্ঠে কহিল, “পিতা, আপনার কার্য সিদ্ধ হইয়াছে।”

    চন্দ্রবর্মা বলিলেন, “পুত্রী, সে তোমারই জন্য! তোমার যোগ্য পুরস্কার আমি সযত্নে সঞ্চিত করিয়া রাখিয়ছি। এখন এই রত্নহার গ্রহণ কর।”— বলিয়া নিজ বক্ষ হইতে অমূল্য রশ্মিকলাপ মণিহার খুলিয়া সোমদত্তার হস্তে দিলেন।

    সোমদত্তা হার দুই হন্তে ছিঁড়িয়া দূরে ফেলিয়া দিল; বলিল, “আর আমার পুরস্কারের প্রয়োজন নাই। আমার জীবনের সমস্ত প্রয়োজন শেষ হইয়াছে।”

    চন্দ্রবর্মা বলিলেন, “সে কি! চন্দ্রগুপ্ত কোথায়?”

    সোমদত্তা কহিল, “তা নয়, আমি বিধবা হই নাই। কিন্তু আমার স্বামীকে আর আপনি খুঁজিয়া পাইবেন না। তিনি পুরী ত্যাগ করিয়াছেন।”

    “পুরী ত্যাগ করিয়াছেন! কোথায় গেল?”

    “তাঁহাকে গুপ্তপথে দুর্গের বাহিরে পাঠাইয়াছি।”

    “কন্যা, এ কার্য কেন করিলে?”

    “দেব, এ ভিন্ন আমার আর অন্য পথ ছিল না। তিনি থাকিলে সকল কথা জানিতে পারিতেন, তাহা হইলে মরিয়াও আমার এ নরক-যন্ত্রণা শেষ হইত না। পিতা, আমার কিছুই নাই— সব গিয়াছে। নারীর যাহা কিছু মূল্যবান, যাহা কিছু প্রেয়, এক নরকের পশু তাহা হরণ করিয়াছে।”

    অঙ্গারের মতো দুই চক্ষু সোমদত্তা আমার দিকে ফিরাইল। তর্জনী প্রসারিত করিয়া বিকৃতমুখে চিৎকার করিয়া কহিল, “এই নরকের পশু আমার সর্বস্ব হরণ করিয়াছে!”

    অল্পকালের জন্য সমস্ত পৃথিবী যেন নীরব হইয়া গেল। আমি আমার হৃৎপিণ্ডের মধ্যে রক্তপ্রবাহের শব্দ শুনিতে পাইলাম। তারপর ব্যাঘ্রের মতো গর্জন করিয়া চন্দ্রবর্মা আসিয়া আমার কেশমুষ্টি ধারণ করিলেন। অন্য হস্তের অঙ্গুলিগুলা আমার চক্ষু উৎপাটিত করিবার জন্য অগ্রসর হইতেছিল, ক্রূর হাসি হাসিয়া সোমদত্তা কহিল, “পিতা, ক্ষণকাল অপেক্ষা করুন, আমি পুরস্কার লইব। এই পিশাচকে এখনি মারিবেন না, ইহাকে তিলে তিলে দগ্ধ করিয়া মারিবেন। দীর্ঘকাল ধরিয়া বিষকন্টকপূর্ণ অন্ধকূপে যেন এই নরাধম পচিয়া পচিয়া মরে, গলিত ক্রিমিপূর্ণ শূকরমাংস ভিন্ন যেন অন্য খাদ্য না পায়; মরিবার পূর্বে যেন ইহার প্রত্যেক অঙ্গ গলিয়া খসিয়া পড়ে। আমার আত্মা পরলোক হইতে দেখিয়া সুখী হইবে।”

    চন্দ্রবর্মা আমার কেশ ছাড়িয়া দিয়া বলিলেন, “তাহাই করিব!…ইহাকে বাঁধিয়া রাখ।”

    দশ জন মিলিয়া আমাকে বাঁধিয়া মাটিতে ফেলিল। তখন সোমদত্তা আমার নিকটে আসিয়া দাঁড়াইল। আমার প্রতি অগ্নিপূর্ণ দুই চক্ষু মেলিয়া চাহিয়া থাকিয়া সে আমার মুখে একবার পদাঘাত করিল। তারপর চন্দ্রবর্মার নিকট ফিরিয়া গিয়া স্থির শান্ত স্বরে কহিল, “পিতা, এইবার পিতার কার্য করুন।”

    চন্দ্রবর্মার বজ্রের মতো কণ্ঠস্বর কাঁপিয়া উঠিল, “কি কার্য বৎসে?”

    সোমদত্তা বলিল, “এ দেহ আপনিই দিয়াছিলেন, আপনিই ইহার নাশ করুন।”

    পাষাণ-স্তম্ভের মতো চন্দ্রবর্মা দাঁড়াইয়া রহিলেন।

    সোমদত্তা পুনরায় কহিল, “আমার মন নিষ্কলুষ, এই দূষিত দেহ হইতে তাহাকে মুক্ত করিয়া পিতার কর্তব্য করুন।”

    বহুক্ষণ পরে অস্ফুট কণ্ঠে চন্দ্রবর্মা বলিলেন, “সেই ভালো, সেই ভালো।”

    সোমদত্তা তখন দুই হস্তে বক্ষের কঞ্চুলী ছিঁড়িয়া ফেলিয়া পিতার সম্মুখে নতজানু হইয়া বসিল।

    চন্দ্রবর্মা দক্ষিণহস্তে সুতীক্ষ্ণ ভল্ল তুলিয়া লইয়া চতুর্দিকে চাহিয়া কর্কশভয়ানক কণ্ঠে কহিলেন, “সকলে শুন, আমার কন্যার দেহ অশুচি হইয়াছিল, আমি তাহা ধ্বংস করিলাম।”— বলিয়া দুই পদ পিছু হটিয়া গিয়া ভল্ল ঊর্ধ্বে তুলিলেন। সোমদত্তা উন্মুক্ত বক্ষে নির্ভীক নিষ্পলক দৃষ্টিতে পিতার মুখের প্রতি চাহিয়া রহিল।

    আমি সভয়ে চক্ষু মুদিলাম।

    পুনরায় যখন চক্ষু উন্মীলিত করিলাম, তখন দেখিলাম, রক্তচন্দন-চর্চিত শৈবালবেষ্টিত শ্বেত কমলিনীর মতো সোমদত্তার বিগতপ্রাণ দেহ মাটিতে পড়িয়া আছে।

    ১ বৈশাখ, ১৩৩৮

  • কলের ওস্তাদী

    কলের ওস্তাদী

    কলের ওস্তাদী

    উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

    আমাদের পাড়ায় যদু পোদ্দারের ভাইপো মার্কিন মুল্লুক থেকে কলকারখানা গড়বার ওস্তাদ হ’য়ে ফিরে এসেছে—এই কথা শোনা অবধি আমাদের শিরোমণি মশায়ের নাতিটির মুখে আর হাসি ধরে না! ছেলেটা আমার ভারি ন্যাওটো; সুবিধা পেলেই তালটা, বেলটা, কলাটা, নৈবিদ্যির মাথার সন্দেশটা বাড়ীতে না বলে আমায় এনে দেয়। ফলার ঘুসতে, ছাদা বাঁধতে, দক্ষিণে আদায় করতে তাকে এক রকম অদ্বিতীয় পুরুষ বললেই হয়। পূজোর সময় মাগ্যিগণ্ডার বাজারে এবার ফলারের ধুমটা ভারি কমে গিছলো বলে সে এতদিন মুখ শুকিয়ে শুকিয়ে বেড়াচ্ছিলো। যদু পোদ্দারের ভাইপো একটা দুধের না কিসের মস্ত বড় কারখানা বানাবে শুনে’ সে হাসতে হাসতে গড়াতে গড়াতে স্ফূর্ত্তির চোটে আকাশ পানে ঠ্যাং ছুড়তে আরম্ভ করে’ দিল। আমি ত ছেলেটার রকম সকম দেখে বললাম—“কি রে ক্যাবলা, ক্ষেপলি নাকি?” ক্যাবলা আরও খানিকটা ঠ্যাং ছুড়ে’ শেষে হাঁফাতে হাঁফাতে বললে—“না গো দাদা মশাই, ভারি মজা হয়েছে; সন্দেশ এবার সস্তা হবেই হবে। গয়লা বেটারা এবার যা জব্দ হবে! যদু পোদ্দারে ভাইপো এমনি একটা কল বানিয়েছে যে তা বসাবার জন্যে তিন কোশ জমি চাই। কলের এক মুখে থাকবে পঞ্চাশ হাত লম্বা চওড়া বাঘমুখে একটা প্রকাণ্ড দরজা, আর-একদিকে থাবে গোটা ২০/২৫ মোটা নল; আর ভিতরে রকম-বেরকমের এঞ্জিন। একদিক দিয়ে তাড়া করে’ তুমি একপাল গরু সেই কলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে’ দাও; খানিক পরে দেখবে ও-মুখের নলগুলো দিয়ে বেরুচ্চে-দুধ, দই, ছানা, ঘি, মাখন, কাঁচাগোল্লা, চটিজুতো আর শিঙের শক্ত চিরুণী। কল কি সাঙ্ঘাতিক চিজ, দাদামশাই। ওতে হয় না এমন জিনিস নেই।”

    পণ্ডিত হৃষীকেশ এতক্ষণ ঘরের এক কোণে বসে’ খেলো হুঁকোটায় ভুড়ুক ভুড়ুক টান দিচ্ছিলেন। এইবার খুব একটা দমকা টান টেনে নাক দিয়ে খানিকটা ধোঁয়া বা’র করে’ দিয়ে বললেন— “এ আর তুই বেশী কি বললি, ক্যাবলা? আমাদের চোখের সামনেই ত এর চেয়ে আরও চমৎকার সব কল বসান রয়েছে। তোর৷ চোখ থাকতে দেখবিনে, তার আমি কি করব বল্?”

    ক্যাবলা ত পণ্ডিতজীর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।

    পণ্ডিতজী বললেন— “অত বড় হাঁ করিসনে, বাপ। কথাটায় দম্ আটকানর মত বিশেষ-কিছু নেই। আমিত চারিদিকে ঐ রকম কল ছাড়া আর-কিছু দেখতে পাচ্ছিনে। আচ্ছা, এই ধর-রঘুনন্দন কোম্পানীর পেটেন্ট ব্রহ্মচারিণী তৈরির কল। একটা বিধবা বা সধবা মেয়েকে ধরে’ তার নাক চুল কেটে, গয়নাগুলো কেড়ে নিয়ে ঐ কলের মধ্যে ফেলে দাও— দিন কতকপরে ঐ কল থেকে হয় একটা ত্রিশূলধারিণী ভৈরবী, নয় একটা যক্ষাকেশো ব্রহ্মচারিণী বেরিয়ে আসবেই আসবে। তার পর ধর কল নং দুই—পতিব্রতা তৈরির কল। খুব ছেলেবেলায় একটা কচি কাপড়ে-হেগো মেয়েকে ঘোমটা দিয়ে সাতপুরু মুড়ে ঐ কলের মধ্যে ফেলে দাও, মাঝে মাঝে কেবল এক একখানা গয়না ছুঁড়ে ঐ কলের মধ্যে ফেলে দিও—দেখবে বছর কতক পরে একটি খাসা নথ-নাকে, মিশি-দাঁতে, ঝাঁটা-হাতে সীতা বা সাবিত্রী তোমার ঘর উজ্জ্বল করে’ দাড়িয়ে আছে।

    “এ সব না হয় সেকেলে মিস্ত্রীর গড়ন—তা বলে আজকালের মিস্ত্রীরাও ফেলা যায় না। ঐ আমাদের গোঁফেশ্বর মিস্ত্রী এমনি কল বানিয়েছে যে তার মধ্যে খানকত সরকারী ছাপমারা বই ভরে’ দিয়ে একটা গাধা হোক, ঘোড়া হোক, ভেড়া হোক, যা-হোক্ একটা তার মধ্যে পুরে’ দাও, বছর কতক না যেতে যেতেই কলের ও-মুখ থেকে একটা M. Sc. B. Sc. বেরিয়ে আসবেই আসবে। এ কি কম ওস্তাদি, বাবা!

    “তারপর আমাদের টেক্‌ষ্টবুক কমিটি রায় বাহাদুর তৈরি করবার কি কলই না বানিয়েছে! একটা ছোট ছেলেকে ধরে দীনেশ বাবুর রাজারাণীর ছবিওয়ালা বইগুলোর খানকয়েক পাতা দিয়ে তাকে মুড়ে ঐ কলের মধ্যে ফেলে দাও—একেবারে মাথায় সামলা আঁটা একটা রায় বাহাদুর, না-হয় রায় সাহেব সেখান থেকে সেলাম ঠুকতে ঠুকুতে বেরিয়ে আসবে!

    সাবাস জোয়ান! এমন না হলে কারিগর!!

    ❀                            ❀                            ❀

    পণ্ডিতজী আবার থেলো হুঁকোটা তুলে নিলেন। ক্যাবলা কিন্তু হাঁ করে’ তাঁর মুখের পানে চেয়েই রইল।

    ১১ই অগ্রহায়ণ ১৩২৭

  • ভবপারের নৌকা

    ভবপারের নৌকা

    ভবপারের নৌকা

    উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

    গোপাল দাদার গুরুঠাকুর এসেছেন শুনে পণ্ডিত হৃষীকেশের হঠাৎ কি রকম ভক্তির উদ্রেক হোলো; তিনি তাড়াতাড়ি কোঁচার খুঁট গায়ে দিয়েই এই শীতকালের সন্ধ্যেবেলা গুরুজীকে দর্শন করতে বেরিয়ে পড়লেন। আমি ভাবলুম— হবেও বা, পণ্ডিতজীর বয়স ত প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি হ’য়ে এলো; সূৰ্য্য ত বিলক্ষণই পশ্চিমে হেলে পড়েছে; এইবার বুঝি পণ্ডিতজীর একটু পরকালের চিন্তা এসেছে। বিশেষতঃ গোপাল দাদার গুরু এক প্রকাণ্ড সিদ্ধপুরুষ বলে’ প্রসিদ্ধ, তাঁর চেলাও দশ-বিশ হাজারের কম হবে না।

    প্রায় এক ঘণ্টা চুপ করে’ বসে’ আছি, দেখি না পণ্ডিতজী— আস্তে আস্তে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে’ দিয়ে তক্তাপোষের উপর বসে’ পড়লেন। মুখখানা খুব গভীর বটে, কিন্তু চোখের কোণে একটু চাপা চাপা দুষ্ট হাসি।

    “কি পণ্ডিতজী, এরি মধ্যে সাধু-দর্শন শেষ হয়ে গেল যে!” বলে আমি হুঁকোটা পণ্ডিতজীর হাতের কাছে এগিয়ে দিলুম।

    পণ্ডিতজী হুঁকোটা রেখে দিয়ে বললেন— “না, ভায়া, এ আর চলবে না। একে ত সাধুজী ভাব জগতের যে আধ্যাত্মিক ধোঁয়া ছেড়ে দিয়েছেন তা’তেই আমার দম্ আটকাবার যোগাড় হয়েছে; তার ওপর এই মায়িক, নশ্বর, পার্থিব ধোঁয়াটা এলে জুটলে আমার প্রাণে-বাঁচা দায় হবে।”

    আমার একটু রাগ হোলো। সবাই বলে গোপাল দাদার গুরু মস্ত বড় সাধু; আর পণ্ডিতজী তাঁর ওপর টিপ্পনী কাটতে ছাড়লেন না! আমি বল্লুম— “দেখ, পণ্ডিতজী, তুমি একটি বিশ্বনিন্দুক। অত বড় একজন সাধু যাঁর চরণ পেয়ে কত লোক তরে যাচ্ছে, তাঁকে দেখে তোমার মন উঠল না।”

    পণ্ডিতজী একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বললেন— “কি করব, ভায়া,— আমার কেমন পাষণ্ড-নক্ষত্রে জন্ম, খুঁৎটাই আগে চোখে পড়ে। আমি দেখতে গেলুম একটা পুরো মানুষ আর দেখে এলুম পাঁচ-সাত হাত লম্বা জটাওয়ালা এক ভুড়েল সাধু বাঘ-ছালের ওপর বসে’ বসে’ সকলকার ভব-রোগ সারাবার পেটেন্ট দাওয়াই বাৎলাচ্ছেন। অনেক বোঝবার চেষ্টা করলুম, কিন্তু এই ‘ভব’টা যে একটা রোগ এটা কিছুতেই বুঝতে পারলুম না।

    “আর একটা বড় মজার কথা মনে পড়ে গেল। সেকালে দময়ন্তী যখন স্বয়ম্বরা হন, তখন রাজ সভায় দেবতারা লোভে লোভে উপস্থিত হয়েছিলেন। কারও চোদ্দটা মাথা আঠারটা ঠ্যাং, কারও বা পনেরটা নাক, ত্রিশটা পাছা—সবাই এক-একটা কেউ বিষ্ট ধনুর্দ্ধর। কিন্তু দময়ন্তী সটান গিয়ে নলরাজার গলাতেই মালা দিয়ে বলেছিলেন— ‘আমি নারী, সুতরাং আমি নরই চাই। দেবতা নিয়ে আমার কি হবে?”

    “আমার সেই কথাই মনে হ’তে লাগল— ভবপারে গিয়ে আমি করব কি? আমার এপারের যা-কিছু নিয়েই যে কারবার। এপারের তোমরা কেউ একটা ব্যবস্থা করতে পার?

    সেই সেকালের বুদ্ধ শঙ্করের আমল থেকে আজকালকার ছোটখাট গুরুর গুরু পরম গুরু পর্য্যন্ত সবাই, নৌকো নিয়ে কূলে দাঁড়িয়ে হাঁকচেন—চলে আয় ভবপারের যাত্রী, সস্তা দরে পার দেব। কেউ বলছেন— ‘আমার নৌকোর গেরুয়া নিশান একেবারে পরম ধামের মুক্তি ঘাটায় গিয়ে লাগবে; নৌকায় বোস, হালুয়া পুরির অভাব হবে না।’ কেউ বা বলছেন— ‘আমার নৌকায় গাব মাখান হয়েছে। জল ঢোকবার কোন ভয় নেই, ঝড় লেগে তুফান লেগে যদি নৌকা এক পেশে হয় তবে আমাদের নাচন কোদনের ভরেই নৌকা সামলে উঠবে। ঐ বৈকুণ্ঠের উপরে গোলোক, তার উপরে শব্দ ব্রহ্মের ঢোলোক যেখানে বাজছে আমরা ‘বদর’ ‘বদর’ বলতে বলতে একেবারে তোমাদের সেইখানে পৌঁছে দেব।—বাপ জগৎটা যে দুঃখময় তা পারে যাবার যাত্রীদের এই জগৎ থেকে সরে পড়বার জন্য ঠেলিঠেলি দেখলেই বেশ বুঝতে পারা যায়।’

    পণ্ডিতজীর মুখখানা যখন খুলে যায়, তখন লঘুগুরু জ্ঞান থাকে না। এক নিঃশ্বাসে সব মহাপুরুষদের মূর্ত্তিগত করতে দেখে আমি বল্লুম—“তোমার দুঃসাহস ত কম নয়। তুমিই শুধু ঠিক বুঝেছ আর সবারই ভুল?”

    পণ্ডিতজী বললেন—“চটে যেয়ো না দাদা; বড় বড় নামের বোঝা আমার ঘাড়ে ফেলে দিয়ে আমায় চেপে মেরে কোন লাভ নেই। নিউটন মাথা ঘামিয়ে বিজ্ঞানের অনেক তত্ত্বই বার করে গিয়েছিলেন; কিন্তু আজ কালের কলেজের ছেলেরাও তাঁর চেয়ে বেশী জিনিস জানে। তা দিয়ে কি প্রমান হয় যে, ঐ সব ছেলেরা নিউটনের চেয়ে বুদ্ধিমান? শুধু এই টুকুই বোঝা যায় যে, মানুষের জ্ঞানের মাত্রা বেড়ে চলেছে। ধৰ্ম্ম সম্বন্ধেও তাই। আগেকার মহাপুরুষেরা যে অতীন্দ্রিয় সত্যের সন্ধান পেয়েছিলেন সেইটেই চরম সত্য, বা একমাত্র সত্য, এ কথা না মানলে আর তাদের পন্থা ভিন্ন অন্য পন্থা খুঁজলে যদি তাদের অপমান করা হয়, ত আমি নাচার। তাঁরা ভবপারে যাবার রাস্তা বাৎলে গেছেন বেশ কথা। গোলকের উপর ঢোলকই থাক আর আর নোলকই থাক, সে সংবাদে আমার দুঃখ ঘুচবে না। সেই যে সেদিন গুপে বাগদির ছেলেটাকে জমীদারের কাছরিতে টেনে নিয়ে গিয়ে বেদম মারলে, তার চীৎকারেই আমার কান ভরে আছে সেখানে শব্দব্রহ্মের ঢোলকের আওয়াজ একবারেই ঢুকছে না। আমি এ-পারের মাটি কামড়েই পড়ে’ থাকবো, এইখানেই গু ঘাঁটব। আমার দুঃখে যদি কোন দেবতার প্রাণ কাঁদে ত তাঁকে গোলোক ছেড়ে আমার কাছে আসতে হবে। ওপারে গিয়ে কি রকম দুগ্ধ মজা লুটবো তার লম্বা চওড়া বিজ্ঞাপন দিয়ে আমাকে ভোলালে চলবে না! স্বর্গের দেবতা যদি স্বর্গেই থেকে যান, মর্তে যদি তার পা না পড়ে ত সে দেবতার কাছে মাথা খুঁড়ে আমার কোন লাভ নেই। সবাই যদি এখানে থেকে মরে, ত আমি একলা পালিয়ে গিয়ে বেঁচে কি করব?”

    মহাপুরুষদের নিয়ে এইরকম খোঁচাখুঁচি দেখে আমার প্রাণটা আঁৎকে উঠছিল। আমি বললাম— “পণ্ডিতজী, অবতার কল্প মহাপুরুষ বা ভগবানের বিষয় নিয়ে এ রকম ঠাট্টা বিদ্রূপ কি ভাল?”

    পণ্ডিতঙ্গী হোঃ হোঃ করে হেসে বলেন— “ও তাই বটে! ঐটে হজম করতে বেগ পেতে হচ্চে। তা, দেখ ভগবানের একটি নাম রঙ্গনাথ। তিনি যে sunday schoolএর হেডমাষ্টারের মত খুব একজন গম্ভীর পুরুষ, একথা আমার আদৌ মনে হয় না। তারা ভগবানকে নিয়ে পুঁটলি বেঁধে ভবপারের পেটেন্ট পিল তৈরি করেন তাদের ব্যবসার হানি হতে পারে বটে—কিন্তু ভগবান যদি নিতান্ত বেরসিক না হন, তা হলে ঐ জন্যে আমার উপর চটে যাবেন বলে ত মনে হয় না। আর মহাপুরুষদের কথা যদি তুললে ত বলি—সত্যের ভাঁড়ার যদি তাঁরা ওজার করে গিয়ে থাকেন, আর আমাদের পক্ষে তাঁদের এটো কাঁটা দু-এক-দানা খুটে খাওয়া ভিন্ন যদি উপায়ান্তর না থাকে তাহলে এই দুনিয়ার কলে চাবি বন্ধ করে দিয়ে ভগবানের এই সৃষ্টির ব্যবসা তুলে দেওয়াই উচিত।”

    আমি বললুম—“একবার ভবনদীর ওপারে গিয়ে সেইজন্যে একখানা দরখাস্ত না হয় ভগবানের দরবারে পেশ করে আসি।”

    পতিতজী ঘাড় নেড়ে বললেন—“ওরে গাধা, ওরে আদার ব্যাপারী— দরখাস্ত পেশ করবার জন্যে এবার আর তোকে ডিঙ্গিচড়ে ও-পারে যেতে হবে না। এবার ভরা ভাদরের বান ডেকে এপার ওপার সব একাকার করে দিয়ে যাবে। গুরুগিরির ব্যবসাটা এবার আর টিকিবে না।”

    ১৮ই অগ্রহায়ণ ১৩২৭

  • ছিরিচরণের ছুঁচো

    ছিরিচরণের ছুঁচো

    ছিরিচরণের ছুঁচো

    উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

    সেদিন সকালবেলা চা খাবার পর পণ্ডিতজীর একটু খোসমেজাজ দেখে গোপাল দা একবার এগিয়ে দুবার পিছিয়ে, শেষে একটু গলা খেঁকারি দিয়ে দুঃসাহসে ভর করে জিজ্ঞেস করলেন— “আচ্ছা পণ্ডিতজী, যদি রাগ না করেন, ত একটা কথা জিজ্ঞাসা করি—আপনি গুরু ঠাকুরদের পিছনে অত লেগেছেন কেন?”

    আমি আরও এক কাপ চা ঢালছি দেখে পণ্ডিতজীর তাল-তোবড়া মুখখানিতে একটু হাসির আভাষ ফুটে উঠল। তিনি বললেন—“রাগ কেন করব ভাই; রাগ আমার শরীরে নেই বললেই হয়। যা দেখতে পাও ওটা রাগের আকার, ওতে মানসিক বিকারের গন্ধমাত্র নেই। দুর্ব্বাসা ঋষি মরার সময় আমার প্র-পরা-অপ-সম-নি-পিতামহকে যে আশীর্ব্বাদ করে গিছলেন, তারই যা-কিছু ছিটে-ফোটা পড়ে আছে । ওতে ভয় পাবার কিছু নেই।”

    চায়ের কাপটা কোলের কাছে টেনে নিয়ে খুব আদরে-ভরা একটা চুমুক দিয়ে পণ্ডিতজী বলতে লাগলেন—“দেখ, ঐ গুরুগিরির কথা যদি জিজ্ঞেস করলে ত ব্যাপারটা গোড়া থেকেই বলি। জান ত, ডাক্তারেরা একটা জন্তু জানোয়ারের এক আধখানা হাড়ের টুকরো পেলেই তা দেখে বলে দিতে পারেন যে জন্তুটা ক’ হাত লম্বা, ক’ হাত চওড়া, তার কটা ঠ্যাং, সে কি খায়— ইত্যাদি। আমিও তেমনি অনেককেলে ওস্তাদ কিনা তাই কোন একটা সমাজের আধ-টুকরা অনুষ্ঠান দেখলেই তাদের চাষা-ভুষো থেকে আরম্ভ করে রাজারাজরার পর্য্যন্ত হাড়ির খপর বলে দিতে পারি। ঐ যে সেদিন দেখলুম গঙ্গার ধারে নেড়া বটগাছের তলায় জটাজুটওয়ালা বাবাজীটি ছাই মেখে বসে’ বসে’ গাঁজায় দম মারছেন আর গুপে বাগদীর ছেলে থেকে আরম্ভ করে পেশেনপ্রাপ্ত সব ডেপুটী পৰ্য্যন্ত মাদুলী ভরে’ ভরে’ তাঁর পায়ের ধুলো মাথায় ঠেকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে—এই থেকে যদি বল, ত আমি এদেশের সমাজতত্ত্ব, ভগবৎতত্ত্ব, রাজতত্ত্ব সব নিখুঁত করে’ তোমার সামনে কষে দিতে পারি।”

    পণ্ডিতজীর কথা শুনতে শুনতে গোপালদাদার হাঁ-টা ক্রমে আকর্ণ বিস্তৃত হবার যোগাড় হচ্ছে দেখে পণ্ডিতজী চায়ের কাপটা তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়ে বল্লেন—“গলাটা একটু ভিজিয়ে নাও ভায়া; কাণে শুনে কথাগুলো বোঝবার সুবিধে না হয় মুখে দিয়ে শোনা ছাড়া আর উপায় কি? তা, মুখ দিয়েই শোন; আর একটু চিবিয়ে বুঝো, তা’হলে নিতান্ত গুরুপাক না’ও হতে পারে।”

    গোপাল দা নিৰ্ব্বিবাদে চা-টুকু গিলে ফেলে পণ্ডিতজীর মুখের দিকে চেয়ে বললেন—“তার পর?”

    —“তারপর আর কি! গুপে বাগদীর ছেলেটাকে হাসতে হাসতে ফিরে যেতে দেখে আমার মনে হোলো—নিজের বিদ্যেটা ঠিক কি না একবার পরীক্ষা করে’ দেখি। ছেলেটাকে ডেকে জিজ্ঞেসা করলুম—‘হাঁরে খ্যাঁদা, আজ এখনি যদি সাক্ষাৎ কৃষ্ণ-ভগবান একেবারে ভেঁপু বাজাতে বাজাতে ধরা চূড়ো পরে ঐ আকাশ ফুঁড়ে তোর সামনে ঝুপ করে’ নেমে এসে তোকে বলে—খ্যাঁদা, বর নে–তা হোলে তুই কি চাস?”

    খ্যাঁদা রাঙ্গা রাঙ্গা দাঁত বার করে’ এক গাল হেঁসে ফেলে বললে— “এঁজ্ঞে বাবাঠাকুর, আমরা শূদ্দর ক্ষুদ্দুর মানুষ, আমাদের কি সে ভাগ্যি হবার জো আছে?”

    —— “ধর যদি বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েই যায়?”—

    খ্যাঁদা আমতা আমতা করতে করতে মাথা চুলকুতে চুলকুতে বললে—“এজ্ঞে, আমি তা’হলে বলি, দেবতা, আমি যেন মরে বৈকুণ্ঠে গিয়ে আপনার ছিরিচরণের আশে পাশে ছুঁচো হ’য়ে কিচমিচ করে’ বেড়াই।”

    “সেদিন জমীদারের নূতন নায়েবটা যখন গুপে বাগদীর ছেলেকে ধরে বাকি খাজনা আদায়ের জন্য মারতে মারতে একেবারে লম্বা করে’ ছেড়ে দিলে, আর ছোঁড়াটা শুধু নায়েবের হাতে পায়ে ধরে কাকুতি মিনতি করতে লাগলো, তখন আমার চোখে ব্যাপারটা বড় বিসদৃশ, এক-তরফা-রকমের বলে মনে হয়েছিল।

    “আর তার পরদিন তার গায়ের ব্যাথা ঘুরতে-না-মরতে যখন দেখলুম যে সে ঐ বট-তলার গঞ্জিকানন্দ বাবাজীর পায়ের তলায় চৌদ্দপোয়া হয়ে পড়ে’ মাদুলী ভরে’ পদধূলি সংগ্রহ করছে, তখন বেশ দিব্য চক্ষে দেখতে পেলুম যে তার মনটা অনেক দিন থেকে লম্বা হয়ে পড়ে’ আছে বলেই সেদিন নায়েবের পায়ের কাছে তার শরীরটা অত শিগগির লম্বা হ’য়ে পড়েছিলো। তোমরা ভাবছ তিন বৎসর অন্তর লাটসভার সভ্য গড়বার জন্যে ভোট দিতে পেলেই তারা স্বাধীন হ’য়ে উঠবে। হায় রে পোড়া কপাল! মাথায় যার সাপে কামড়েছে তার পায়ের আঙ্গুলে বিষ পাথর লাগালে কি হবে।”

    পণ্ডিতজীর বক্তৃতা শুনে আমারও একটু ভাবনা হ’য়ে গেল। গোপাল দা’ও একটু উসখুস করতে করতে জিজ্ঞেসা করলেন— “তাইত! তা’হলে উপায়?”

    পণ্ডিত বল্লেন—“উপায় আর কি। ভগবানের খোলা হাওয়া লোকগুলোর মনে একটু লাগতে দাও; তাতে আধ্যাত্মিক সর্দ্দি, কাশি হবার কোনোই ভয় নেই। আর তোমার পেশাদার গুরু- ঠাকুরদের বলো একটু আওতা ছেড়ে দাঁড়াতে।”

    ২৫এ অগ্রহায়ণ, ১৩২৭

  • স্বদেশী সেপাই

    স্বদেশী সেপাই

    স্বদেশী সেপাই

    উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

    সেদিন রাজনীতির বক্তৃতা শুনতে শুনতে গোটা দুই বেফাঁস কথা পণ্ডিত হৃষীকেশের মুখ থেকে বেরিয়ে পড়েছিল বলে আমাদের রায় বাহাদুর পার্ব্বতী দাদার বড় ছেলেটা আজ তাঁকে এসে পাকড়াও করেছে। আন্দোলনের জোরে ভারত স্বাধীন হবে শুনে কেন তিনি হেসেছিলেন, এ কৈফিয়ৎ আজ তাঁকে দিতেই হবে!

    এবার কংগ্রেসের পর কলকাতা থেকে কলেজ বয়কট করে’ ফিরে আসা অবধি ছেলেটি ভীষণ রকমের স্বদেশী হয়ে উঠেছে। তার বুটের ফিতে থেকে আরম্ভ করে গলার নেক্‌-টাই, আর মাথার হ্যাটটি পর্য্যন্ত একেবারে ষোল আনা স্বদেশী কোম্পানীর তৈরি! গ্রামে এসে সে একটা “জাতীয় ইস্কুল” খুলবে বলে চাঁদার খাতাও খুলেছিল; তবে চিফ সেক্রেটারির কাছ থেকে তার বাপের নামে একখানা লম্বা চওড়া চিঠি আসার পর সেটা ধামা-চাপা পড়ে গেছে।

    একে ত রায় বাহাদুর একজন দোর্দ্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার; তাঁর জমীদারীর শুধু বাজে আদায়ই হবে ৫/৭ হাজার, আর সেই সেদিন পুন্যার নজর দিতে দেরী হয়েছিল বলে তাঁর কাছারীতে গুপে বাগ্দীর ছেলেটা মার খেয়ে এখনও নেংচে বেড়াচ্চে; আর তারপর—গোদের উপর বিষফোড়া—তাঁর দৌহিত্রীর সঙ্গে আমাদের পুলিশ সুপারিন্‌টেনডেন্টের ছেলের বিয়ের সম্বন্ধ হচ্ছে—আর এ দিকে তাঁর ছেলেটা পুরোদস্তুর স্বদেশী সেপাই; পাড়ার ছেলেগুলো ইস্কুলে গেলেই তাদের ঠ্যাং খোঁড়া করে’ দেবে বলে সে শাসিয়ে বেড়াচ্চে। বাপ বেটার এই দুই জাঁতা কলের মধ্যে পড়ে’ চাষাভূষোরা একেবারে পিষে যাবার যোগাড় হয়েছে।

    পণ্ডিতজী ছেলেটার মুখখানির দিকে একটু চেয়ে থেকে বললেন—“দেখ, বাবা, অনেক দিন আগে— সেকালের স্বদেশী যুগেরও আগে—একবার পাড়াগাঁ অঞ্চলে ভারত-উদ্ধার প্রচার করতে গিয়েছিলুম। একটু চালাক চট্‌পটে রকমের এক চাষাকে ধরে প্রায় দেড় ঘণ্টা আন্দাজ বক্তৃতা ঝেড়ে যখন মনে হ’ল, তাকে কাৎ করে এনেছি, তখন সে অতি বিনীত ভাবে যোড়হাত করে’ আমায় বলে— ‘আমার একটি নিবেদন আছে।’

    “আমি এই গরুড়ের মত ভক্তটি পেয়ে বিষম উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞাসা কল্লুম— ‘কি, কি?’

    “সে বল্লে— ‘দেখুন, আপনাদের হাতে দেশ স্বাধীন হবার ২/৪ ঘণ্টা আগে আমায় একটু খবর দেবেন; আমি সপরিবারে বিষ খেয়ে মরে থাকব।’

    “তখন লোকটার কথা শুনে আমার পিত্তি পর্য্যন্ত জ্বলে গিয়েছিল। কিন্তু এখন তোমাদের দেখে-শুনে মনে হয় যে, লোকটার কথা একেবারে বাজে নাও হতে পারে।”

    আমাদের স্বদেশী সেপাইটি বললেন— “আমি থাকলে তাকে চাবকে সোজা করে’ দিতুম।”

    পণ্ডিতজী বললেন—“বাবা, চাবকানি অনেক দেখেছি; কিন্তু চাবুকের চোটে লোককে বেঁকে পড়তেই দেখেচি; একটাকেও সোজা হতে দেখিনি। তোমার দাদা-মশায় চাবুকের চোটে জমিদারীর আয় বিলক্ষণ বাড়িয়ে গেলেন, তোমার বাবাও শাস্ত্র-চর্চ্চার অবসরে যথেষ্ট চাবুক-চর্চ্চা করেন—আর ভবিষ্যতে সুবিধা পেলে তুমিও তা করবে—কিন্তু সোজা কটাকে করেছ?”

    ঐ বেতালা কথা কওয়া পণ্ডিতজীর কেমন রোগ! পাছে কথাটা রায় বাহাদুরের কাণে ওঠে সেই ভয়ে আমি তাড়াতাড়ি বললুম—“তা, ছেলেরা যা করছে, সে ত ভালর জন্যেই করছে। দেশটা স্বাধীন হ’লে গৌরবের ভাগীদার ত চাষাভূষোরাও হবে।”

    পণ্ডিতজী আমার দিকে একটা এমনি বিতিকিচ্ছি রকমের চাউনি চাইলেন, যা তাঁর চোখেও বড়-একটা দেখিনি। তিনি একেবারে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন—“দেখ, তোমাদের ঐ ন্যাকামি শুনতে শুনতে আমার হাড় ভাজা ভাজা হয়ে গেছে। তোমরা কথায় কথায় বল— ‘আহা দেশটা যদি আমাদের কথায় সাড়া দিত ত এতদিন আমরা কেষ্ট বিষ্ট হয়ে যেতুম। ছাপ্পান্ন পুরুষ ধরে যাদের গলায় এক পা আর পেটে এক পা দিয়ে চেপে রেখেছ— আজ টিকি ধরে হেঁচকা টান মারছ বলে কি তোমাদের ফরমাইস মত তারা নেচে উঠবে? ধৰ্ম্মে, কৰ্ম্মে, আচারে ব্যবহারে যাদের পরাধীন করে রেখেছ, যাদের ছুলে তোমাদের নাইতে হয়, যাদের বেগার খাটিয়ে তোমরা নবাবী কর, আজ তাদের স্বাধীনতার কথা বোঝাতে গিয়ে নিতান্তই বেহায়া না হলে তোমরা লজ্জায় মরে যেতে! মানুষের মনের আধখানা পরাধীন রেখে বাকি আধখানাকে স্বাধীন করে দেবে?—বলিহারী তোমাদের বুদ্ধি হে? তোমার রাজনীতির চর্চ্চা করবে কে?—যারা করবে তাদের যে মেরে রেখেছ! এ জাত যদি কখনো বেঁচে উঠে লড়ে, ত আগে লড়বে তোমাদের সঙ্গে।”

    আমি দেখলাম, কেঁচো খুঁড়তে খুঁড়তে ক্রমে সাপ রেরিয়ে পড়বার জোগাড় হচ্চে। তাড়াতাড়ি পণ্ডিতজীর মুখ বন্ধ করবার জন্যে এক কাপ চা তৈরি করে বললাম—“থাক; এদিকে চা-টা যে জুড়িয়ে গেলো।”

    পণ্ডিতজীর কাছে থেকে তাড়া খেয়ে আমাদের রায় বাহাদুরের ছেলে ওরফে স্বদেশী সেপাই মুখখানা বেজায় গম্ভীর করে’ বললে—“আপনি বলেন কি, আমরা দেশটাকে এত করে বলছি আমাদের সঙ্গে উঠতে—আর দেশটা উঠবে না?”

    পণ্ডিতজী হোঃ হোঃ করে হেসে উঠে বল্লেন—“উঠবে বৈ কি! দেশের যদি একটু লজ্জা সরম থাকে, ত তোমরা পাঁচজন ইয়ার-বন্ধু মিলে, দুবার “Arise awake” বলে তুড়ী মেরে ডাকলেই তোমাদের জননী ভারতবর্ষ একেবারে হুড়মুড় করে লাফিয়ে উঠবে। আর তাও বলি বেটীরই কেমন আক্কেল! সেই যে হাজার বছর ধরে’ ঘাড়মুড় ভেঙ্গে পড়ে আছে, আর উঠবার নামটি নেই। রাণাসঙ্গ ডেকে খুন হয়ে গেল—বেটির মুখ দিয়ে একটি কথাও ফুটল না। শিবাজী, গুরু গোবিন্দ মায়ের অনেক আদরের ছেলে— তাদের ডাকে বুড়ী একবার চোখ চাইতে না চাইতেই আবার পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। তাঁরা কেউ বা ডেকেছিলেন—হিন্দীতে, কেউ বা ডেকেছিলেন মারাঠিতে সে ডাক হয়ত মায়ের মনে ধরেনি। এইবার তোমরা সব স্বদেশী কাপ্তেন মিলে গোল দীঘির পাড় থেকে ইংরেজী ডাক ডাকলে হয়ত বেটী ভয়ে ডরে উঠতে পারে! তা বেয়ে চেয়ে দেখ একবার।”

    স্বদেশী সেপাই একটু যেন বিরক্ত হয়ে বললে—“দেখি দু-এক বছর নেড়ে চেড়ে। দেশটা উঠল ত উঠল, আর তা না হয় ত বাবার জমিদারীটা ত আর কোথাও যায়নি।”

    পণ্ডিতজী বললেন—“এতক্ষণে একটা বুদ্ধিমানের কথা বলেছ! দেশে এরকম বুদ্ধিমানের দল যে রকম প্রবল বেগে বেড়ে উঠছে, তাতে দেশের ভবিষ্যত সম্বন্ধে এক রকম নিশ্চিন্ত হওয়া যেতে পারে। নেপালে বেড়াতে গিয়েও সাধুদের মহলেও একবার এ রকম একটি বুদ্ধিমান দেখেছিলুম। সেবার ভারি শীত পড়েছে । একে নেপালী শীত, মাটির উপর হাতখানেক বরফ জমে গেছে, তার উপর ভূরি ভোজনের ব্যবস্থাটাও বড় সুবিধে রকমের হচ্ছিল না। তাই আমরা ধরমশালার এক কোণে আগুন জ্বালিয়ে একেবারে টুপভুজঙ্গ অবস্থায় বসে আছি, এমন সময় বেঁটে খেটে জোয়ান গোছের এক সাধু পুরুষ দরজার কাছে উঁকি মেরে বল্লেন—ওঁ।

    “আমরা তাড়াতাড়ি ‘নমো নারায়ণ’ বলে অভিবাদন করে তাঁর পাঞ্চভৌতিক দেহের কুশল প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি চক্ষু বুজে বললেন—ওঁ।

    সব কথার উত্তরেই সাধু এক ওঙ্কার ধ্বনি করেন দেখে আমরা ত ভ্যাবাচাকা লেগে যাবার যোগার হয়ে পড়েছি, এমন সময় আমার এক বন্ধু বললেন— “আরে হাঁ করে দেখেছিস কি? এটা আর বুঝতে পারছিস নে যে, বৈরাগ্য আর শীতের চোটে সাধুজীর মনটা একেবারে ত্রিকুটে লয় হয়ে যাবার জোগাড় হয়েছে! বেশ এক বাটা গরম চা কর দেখি; আর খানকতক মোটা মোটা রুটি বানিয়ে তার সঙ্গে ঐ কুমড়োটা কেটে খানিকটা ছক্কা করে দে। একবার দেখি চেষ্টা করে সাধুজীর মনটা যদি নেমে আসে। শাস্ত্রে বলে কুমড়োর মত এমন বৈরাগ্যনাশন দাওয়াই মেলাই মুস্কিল।” তাড়াতাড়ি একবাটি গরম চা করে সাধুজীর মুখের কাছে ধরতেই সাধুজী সেটুকু জঠর নিহত ব্রহ্মাগ্নিতে আহুতি দিয়ে আনন্দে দত্ত বিকশিত করে বল্লেন— ওঁ।

    কুমড়োর ছক্কা দিয়ে দিস্তে খানেক রুটি খাবার পর সাধুজী ওঙ্কারলোক থেকে পার্থিব লোকে নেমে এসে আমার বন্ধুটির সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেললেন। তখন সাধুজীর এই পাঞ্চভৌতিক খোলসটি কোন কুল উজ্জ্বল করেছে, খোলসের মায়িক সম্বন্ধের কোনখানে কে আছে এই সম্বন্ধে সদালাপ আরম্ভ হল। ঘণ্টা খানেক পায়তারা কসবার পর, সাধুজীর মনটা যখন দু-তিনবাটি চায়ে গলে একেবারে থসথসে হয়ে গেছে তখন তিনি বললেন—“দেখ, গত বৎসর ধানটান কাটার পর প্রায় শ’খানেক টাকা হাতে পেয়েছিলুম; তা একটা বিয়ে করতেই সব খরচ হয়ে গেল। আর মেয়েটিও ছোট; বয়স বছর ১২/১৩; আমি ভাবলুম দূর ছাই আর কাজ নেই; ঘরে থাকলেই খরচ, তাই এক সাধুর কাছে ভেক নিয়ে বেরিয়ে পড়লুম। তা দেখি, দু-চার বছর, ব্রহ্ম মিল্‌ল ত ভাল; না হয় ঘর ত আছেই।”

    পণ্ডিতজী হেসে বল্লেন—“দেখলে, ব্রহ্মচিন্তা করলে কি হয়, হিসেব বোধটি ঠিক আছে! তোমাদের দেশচিন্তাও ঐ রকম।”

    ২৯শে পৌষ ১৩২৭

  • বাঘের বাচ্চা

    বাঘের বাচ্চা

    বাঘের বাচ্চা

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    পুণা গ্রাম হইতে প্রায় সাত-আট ক্রোশ দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে উপত্যকা হইতে বহু ঊর্ধ্বে গিরিসংকটের ভিতর দিয়া দুইজন সওয়ার নিম্নাভিমুখে অবতরণ করিতেছিল। চারিদিকেই উচ্চনীচ ছোটবড় পাহাড়ের শ্রেণী— যেন কতকগুলা অতিকায় কুম্ভীর পরস্পর ঘেঁষাঘেঁষি হইয়া তাল পাকাইয়া এই হেমন্ত অপরাহ্ণের সোনালী রৌদ্রে শুইয়া আছে। তাহারি মধ্যে পিপীলিকার মতো দুইটি প্রাণী সূর্যের দিকে পশ্চাৎ করিয়া ক্রমশ দীর্ঘায়মান ছায়া সম্মুখে ফেলিয়া ধীরে ধীরে নামিয়া আসিতেছিল।

    এখান হইতে উপত্যকা দৃষ্টিগোচর নয়, পথেরও কোনও চিহ্ন কোথাও নাই। চতুর্দিকে কেবল উলঙ্গ কর্কশ পাহাড়, মাঝে মাঝে দুই একটা খর্বাখৃতি কণ্টকগুল্ম। এই সকল চিহ্ন ছাড়া পথিককে বহুদূরস্থ জনপদে পরিচালিত করিবার কোনও নিদর্শন নাই— অনভিজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষে এরূপ স্থানে দিক্‌ভ্রান্ত হইবার সম্ভাবনা অত্যন্ত অধিক।

    অশ্বারোহী দুইজন যে পথ দিয়া নামিতেছিল তাহাকে পথ বলা চলে না, বর্ষার জল চূড়া হইতে নামিবার সময় পর্বতগাত্রে যে উপলপিচ্ছিল প্রণালী রচনা করে, এ সেইরূপ একটি প্রণালী, পাহাড়ের শীর্ষ হইতে প্রায় ঋজুরেখায় পাদমূল পর্যন্ত নামিয়া গিয়াছে।

    সওয়ার দুইজন ঘোড়ার বল্গা ছাড়িয়া দিয়া পরস্পর বাক্যালাপ করিতে করিতে চলিয়াছিল, খর্বদেহ রোমশ পাহাড়ী ঘোড়া স্বেছামত সেই ঢালু বিপজ্জনক পথে সাবধানে অবতরণ করিতেছিল। এই স্থানে পথ এত বেশি ঢালু যে একবার অশ্বের পদস্খলন হইলে আরোহীর মৃত্যু অনিবার্য; কিন্তু সেদিকে আরোহীদের দৃষ্টি নাই।

    আরোহীদের মধ্যে একজন প্রাচীন বয়স্ক; মাথার চুল ও গোঁফ পাকা, বর্ণ এত বয়সেও তপ্তকাঞ্চনের ন্যায়। কপালের একপ্রান্ত হইতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত শ্বেতচন্দনের দুইটি রেখা বোধ করি জরাজনিত ললাটরেখাকে ঢাকিয়া দিয়াছে। মস্তকে শুভ্র কার্পাসবস্ত্রের উষ্ণীষ; দেহে তুলট্‌ আংরাখার ফাঁকে বাম স্কন্ধের উপর উপবীতের একাংশ দেখা যাইতেছে। চোখে-মুখে একটি দৃঢ় অচঞ্চল বুদ্ধির প্রভা। দেখিলেই বুঝা যায় ইনি একজন শাস্ত্রাধ্যায়ী অভিজাতবংশীয় ব্রাহ্মণ। ইহার হস্তে কোনও অস্ত্র নাই, কিন্তু যেরূপ স্বচ্ছন্দ নিশ্চিন্ততার সহিত অবতরণশীল অশ্বপৃষ্ঠে অটল হইয়া বসিয়া আছেন, তাহাতে মনে হয় কেবল ব্রহ্মবিদ্যার অনুশীলন করিয়াই ইনি জীবন অতিবাহিত করেন নাই।

    দ্বিতীয় আরোহীটি ইহার সম্পূর্ণ বিপরীত। বয়স বোধ করি ষোল বৎসরও অতিক্রম করে নাই; দেহের বর্ণ শ্যাম, কিন্তু মুখের গঠন অতিশয় ধারালো। মৃদঙ্গসদৃশ মুখের মধ্যস্থলে শ্যেনচঞ্চুর মতো নাসিকা এই অল্প বয়সেই তাহার মুখে শিকারীর মতো একটা শাণিত তীব্রতা আনিয়া দিয়াছে। চক্ষু দু’টি বড় বড়, চক্ষুতারকা নিবিড় কৃষ্ণবর্ণ; বালকসুলভ চঞ্চলতা সত্ত্বেও দৃষ্টি অতিশয় তীক্ষ্ণ ও মর্মভেদী। ওষ্ঠের উপর ও চিবুকের নিম্নে ঈষন্মাত্র রোমরেখা দেখা দিয়াছে, তাহাও বর্ণের মলিনতার জন্য স্পষ্ট প্রতীয়মান নয়। ভ্রূ-যুগল সূক্ষ্ম ও দূরপ্রসারিত। সহসা এই বালকের মুখ দেখিলে একটা অপূর্ব বিভ্রম জন্মে, মনে হয় যেন একখানা তীক্ষ্ণধার বাঁকা কৃপাণ সূর্যালোকে ঝক্‌ঝক্ করিতেছে।

    মুখ হইতে দৃষ্টি নামাইয়া দেহের প্রতি চাহিলে কিন্তু আরো চমক লাগে। মুখের মতো দেহের সৌষ্ঠব নাই, প্রস্থের তুলনায় দৈর্ঘ্যে দেহ অত্যন্ত খর্ব। প্রথমেই মনে হয়, অতিশয় বলশালী। কটি হইতে পায়ে শুঁড়তোলা নাগরা জুতা পর্যন্ত প্রাণসার অথচ ক্ষীণ, মৃগচরণের মতো যেন অতি দ্রুত দৌড়িবার জন্যই সৃষ্ট হইয়াছে; কিন্তু কটি হইতে ঊর্ধ্বে দেহ ক্রমশ প্রশস্ত হইয়া বক্ষঃস্থল এরূপ বিশাল আয়তন ধারণ করিয়াছে যে বিস্মিত হইতে হয়। আরো অদ্ভুত তাহার দুই বাহু; আজানুলম্বিত বলিলেও যথেষ্ট হয় না, সন্দেহ হয় ঘোড়ার পিঠে বসিয়া হাত বাড়াইলে মাটি হইতে উপলখণ্ড তুলিয়া লইতে পারে। তাহার উপর যেমন সুপুষ্ট তেমনি পেশীবহুল; দুই বাহু দিয়া কাহাকেও সবলে জড়াইয়া ধরিলে তাহার পঞ্জর ভাঙিয়া যাওয়া অসম্ভব নয়।

    এই বালক হাসিতে হাসিতে চতুর্দিকে চঞ্চল চক্ষে দৃষ্টিপাত করিতে করিতে নামিতেছিল। ঘোড়ার রেকাব নাই, লাল রেশমের জরিমোড়া লাগামও ছাড়িয়া দিয়াছে, অথচ কম্বলের জিনের উপর এমনভাবে বসিয়া আছে যেন সে আর ঘোড়া পৃথক নয়— কোন ক্রমেই তাহাদের বিচ্ছিন্ন করা যাইবে না। বাম হস্তে আগাগোড়া লোহার ভারী বল্লমটা এমনি অবহেলাভরে ধরিয়া আছে যেন পাগড়ির উপর খেলাচ্ছলে রোপিত শুকপুচ্ছটার চেয়েও সেটা হালকা।

    ঘোড়া দুইটি পাহাড়ের পাদমূলে আসিয়া দাঁড়াইল। সম্মুখে প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে আর একটা পাহাড় আরম্ভ হইয়াছে, এবার সেইটাতে চড়িতে হইবে। সূর্য পিছনের উচ্চ পাহাড়ের চূড়া স্পর্শ করিল, শীঘ্রই তাহার আড়ালে ঢাকা পড়িবে।

    বালক চতুর্দিকে চাহিয়া যেন প্রাণশক্তির আতিশয্যবশতঃই উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া উঠিল, তারপর বলিল, “দাদো, প্রতিধ্বনি শুনবে? হোয়া হো হো হো হো! চুপ! এইবার শোনো।”

    কয়েক মুহূর্ত পরেই তিন দিক হইতে ভৌতিক শব্দ ফিরিয়া আসিল— হোয়া! হো হো হো!

    বালক অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া উত্তর দিকের একটা উচ্চ পর্বতশৃঙ্গ দেখাইয়া বলিল, “ঐটে সবচেয়ে দূরে। আওয়াজ ফিরে আসতে কত দেরি হল দেখলে? চোখে দেখে কিন্তু বোঝা যায় না কোন্‌টা কাছে, কোন্‌টা দূরে। অন্ধকার রাত্রে পথ হারিয়ে গেলে প্রতিধ্বনি ভারী কাজে লাগে। — না দাদো?”

    বৃদ্ধ মৃদুহাস্যে উত্তর করিলেন, “তা লাগে; কিন্তু অন্ধকার রাত্রে এ-রকম জায়গায় পথ হারিয়ে যাবার তোমার কোনও সম্ভাবনা আছে কি?”

    বালক বলিল, “তা নেই। তুমি আমার চোখ বেঁধে দাও, দেখ আমি ঠিক পুণায় ফিরে যেতে পারব।”

    বৃদ্ধ বলিলেন, “সে আমি জানি। লেখাপড়ার দিকে তোমার একেবারে মন নেই, কেবল দিবারাত্রি পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে পেলেই ভালো থাকো। তোমার বাবা যখন আমার কাছে কৈফিয়ৎ চাইবেন, তখন যে আমি কি কৈফিয়ৎ দেব তা জানি না।”

    বালকের মুখে একটা দুষ্টামির হাসি খেলিয়া গেল, সে বৃদ্ধের দিকে আড়চোখে কটাক্ষপাত করিয়া বলিল, “আচ্ছা দাদো, ‘আলিফ ভালো, না ‘অ’ ভালো? বাঁ দিক থেকে ডান দিকে লেখা সুবিধে, না ডান দিক থেকে বাঁ দিকে?”

    বৃদ্ধ বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “সে তুমি বুঝতে পারবে না। ষোল বছর বয়স হল, এখনো নিজের নাম সই করতে শিখলে না। তোমার লেখাপড়ার চেষ্টা করাই বৃথা!— কিন্তু শিকারের দিকেও তো তোমার মন নেই দেখতে পাই। আজ সারাদিন ঘুরে একটা খরগোসও মারতে পারলে না।”

    বালক আক্ষেপে হস্ত উৎক্ষিপ্ত করিয়া বলিল, “খরগোস আমি মারতে পারি না, আমার ভারী মায়া হয়। ঐটুকু জানোয়ার, তার ওপর হিংসার লেশ তার শরীরে নেই— খালি প্রাণপণে পালাতে জানে।”

    বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করিলেন, “তবে কোন্‌ জানোয়ার মারতে চাও শুনি— বাঘ!”

    উৎসাহ-প্রদীপ্ত চক্ষে কিশোর বলিল, “হ্যাঁ, বাঘ। এ পাহাড়ে বাঘ পাওয়া যায় না, দাদো?”

    বৃদ্ধ মাথা নাড়িয়া বলিলেন, “না, শুনেছি আরো দক্ষিণে পাহাড়ের গুহায় বাঘ আছে; কিন্তু তুমি বাঘ মারবে কি করে?”

    কিশোর বলিল, “কেন, এই বল্লম দিয়ে মারব। মাটিতে সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে মারব।”

    “ভয় করবে না?”

    “ভয়!” বালকের উচ্চহাস্য আবার চারিদিকে প্রতিধ্বনি তুলিল। “আচ্ছা দাদো, ভয় জিনিসটা কি আমাকে বুঝিয়ে বলতে পারো? সকলের মুখেই ওই কথাটা শুনতে পাই, কিন্তু ওটা যে কি পদার্থ তা বুঝতে পারি না। ভয় কি ক্ষুধার মতো একটা প্রবৃত্তি?”

    দাদো বলিলেন, “ভয় কি তা বুঝতে পারবে, যেদিন প্রথম যুদ্ধে নামবে, যেদিন হাতিয়ারবন্দ্‌ শত্রুকে সামনে দেখতে পাবে।”

    বালক কি একটা বলিতে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সংবরণ করিয়া লইয়া চুপ করিয়া ভাবিতে লাগিল।

    দাদো বলিলেন, “আমি বড় বড় বীরের মুখে শুনেছি যে তাঁরাও প্রথমে শত্রুর সম্মুখীন হয়ে ভয় পেয়েছেন। এতে লজ্জার বিষয় কিছু নেই; সেই ভয়কে জয় করাই প্রকৃত বীরত্ব।”

    সূর্য গিরিশৃঙ্গের অন্তরালে অদৃশ্য হইল, সঙ্গে সঙ্গে নিম্নভূমির উপর ছায়ার একটা সূক্ষ্ম যবনিকা পড়িয়া গেল। শুধু ঊর্ধ্বে নগ্ন গিরিকূট এবং আরো ঊর্ধ্বে নীল আকাশে একখণ্ড মেঘ সিন্দূরবর্ণ ধারণ করিয়া জ্বলিতে লাগিল।

    দাদো নিজের অশ্ব সম্মুখে চালিত করিয়া কহিলেন, “আর দেরি নয়। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, এখনো দুটো পাহাড় পার হতে বাকি। পুণা পৌঁছতে রাত হয়ে যাবে।”

    বালক তাঁহার অনুগামী হইয়া বলিল, “তা হলেই বা? আমি তোমাকে পথ দেখিয়ে ঠিক নিয়ে যাব।”

    দাদো বলিলেন, “রাত্রে এসব পাহাড়-পর্বত নিরাপদ নয়। শোনোনি, এদিকের গাঁয়ে-বস্তিতে আজকাল প্রায় লুঠ-তরাজ হচ্ছে?”

    বালক ভারী বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিল, “তাই নাকি? কৈ, আমি তো শুনিনি। কারা লুঠ-তরাজ করছে?”

    দাদো বলিলেন, “তা কেউ জানে না। বোধ হয় এই দিকের বুনো পাহাড়ী মাওলীরা ডাকাতি করছে। বিজাপুর এলাকার তিনটে বড় বড় গ্রাম গত চার মাসের মধ্যে লুণ্ঠ হয়ে গেছে। শুনতে পাই তাদের সর্দার একজন ছোকরা, লোহার সাঁজোয়া আর মুখোস পরে ঘোড়ায় চড়ে লুঠেরাগুলোকে ডাকাতি করতে নিয়ে যায়। ছোঁড়াটা নাকি ভয়ংকর কালো, বেঁটে আর জোয়ান।”

    বালক তাহার হাতের বল্লমটা খেলাচ্ছলে ঘুরাইতে ঘুরাইতে তাচ্ছিল্যভরে জিজ্ঞাসা করিল, “তাই নাকি? তুমি এত কথা কোথা থেকে জানলে, দাদো?”

    দাদো পাহাড়ে ঘোড়া চড়াইতে চড়াইতে বলিলেন, “ও অঞ্চলের দেশমুখরা দরবারে নালিশ করতে এসেছিল। তাদের বিশ্বাস ডাকাতের সর্দার পুণার লোক।”

    দাদোর পশ্চাতে বালকও পাহাড়ে উঠিতে উঠিতে জিজ্ঞাসা করিল, “তোমরা দরবার থেকে কি ব্যবস্থা করলে?”

    দাদো বলিলেন, “কিছু করা হয়নি। দেশমুখদের তোমার বাবার কাছে বিজাপুরে পাঠিয়ে দিয়েছি।”

    বালক পশ্চাতে থাকিয়া মিটিমিটি হাসিতেছিল, দাদো তাহা দেখিতে পাইলেন না। কিছুক্ষণ কোনও কথা হইল না।

    পাহাড়ের পিঠের উপর উঠিয়া দুইজনে ক্ষণকাল পাশাপাশি দাঁড়াইলেন। এখানে আবার সূর্যকিরণ আসিয়া বালকের বল্লমের ফলায় যেন আগুন ধরাইয়া দিল।

    সম্মুখের পাহাড়তলিতে তখন ঘোর-ঘোর হইয়া আসিয়াছে, নীচের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া বালক বলিল, “আচ্ছা দাদো, এখন যদি আমাদের ডাকাতে আক্রমণ করে, তুমি কি করো?”

    দাদো ক্ষিপ্রদৃষ্টিতে একবার চতুর্দিকে চাহিয়া বলিলেন, “কি আর করি! তাদের সঙ্গে লড়াই করি।”

    “তারা যদি পঞ্চাশজন হয়?”

    “তা হলেও লড়ি।”

    বালক বলিল, “কিন্তু সে যে ভারী বোকামি হবে, দাদো। পঞ্চাশজনের সঙ্গে লড়াই করে তুমি পারবে কেন?”

    দাদো বলিলেন, “তাতে কি! না হয় লড়াই করতে করতে মরব।”

    বালক বিস্মিত হইয়া বলিল, “কিন্তু এরকম মরে লাভ কি, দাদো?” তারপর মাথা নাড়িয়া বলিল, “আমি কিন্তু লড়ি না, তীরের মতো এই ধার বেয়ে পালাই। এত জোরে পালাই যে ডাকাতের বর্শা আমাকে ছুঁতেও পারবে না।”

    ক্ষুব্ধ বিস্ময়ে দাদো বলিলেন, “ক্ষত্রিয়ের ছেলে তুমি, দুশমনের সামনে থেকে পালাবে? এই না বলছিলে, ভয় কাকে বলে জানো না?”

    বালক বলিল, “ভয়! পালানোর সঙ্গে ভয়ের সম্পর্ক কি? পালাব, কারণ পালালেই আমার সুবিধে হবে, পরে ডাকাতদের জব্দ করতে পারব। আর লড়ে যদি মরেই যাই, তাহলে তো ডাকাতদের জিত হল।”

    দাদো মাথা নাড়িয়া বলিলেন, “না না, এসব শিক্ষা তুমি কোথা থেকে পাচ্ছ? না লড়ে পালিয়ে যাওয়া ভয়ংকর কাপুরুষতা। যে বীর, সে কখনো পালায় না। রাজপুত বীরদের গল্প শোনোনি?”

    বালক বলিল, “রাজপুতদের গল্প শুনলে আমার গা জ্বালা করে। তারা শুধু লড়াই করতে পারে, বুদ্ধি এতটুকু নেই। যিনি যতবড় বীর, তিনি ততবড় বোকা।”

    দাদো খোঁচা দিয়া বলিলেন, “তুমিও তো রাজপুত! মায়ের দিকে থেকে তোমার গায়েও তো যদুবংশের রক্ত আছে।”

    বালক সবেগে শিরঃসঞ্চালন করিয়া বলিল, “না, আমি রাজপুত হতে চাই না, আমি মারাঠী।” বালকের ললাট মেঘাচ্ছন্ন হইয়া উঠিল, কিন্তু পরক্ষণেই সে হাসিয়া উঠিয়া বলিল, “আচ্ছা দাদো, তোমার কাছে তো বড় বড় যুদ্ধের গল্প শুনেছি, কিন্তু একটা কথা কিছুতেই বুঝতে পারি না। সম্মুখ-যুদ্ধ করার মানে কি?”

    দাদো সহসা এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিলেন না। শেষে বলিলেন, “সম্মুখ-যুদ্ধ মানে সামনা-সামনি শক্তি পরীক্ষা। যার শক্তি বেশি সেই জিতবে।”

    “আর যার শক্তি কম, সে যদি চালাকি করে জিতে যায়?”

    “সে তো আর ধর্মযুদ্ধ হল না।”

    “নাই বা হল! যুদ্ধে হার-জিতই তো আসল— ধর্মযুদ্ধ হল কি না তা দেখে লাভ কি?”

    দাদো অনেকক্ষণ বালকের জিজ্ঞাসু মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন, শেষে দুঃখিতভাবে ঘাড় নাড়িয়া বিড়বিড় করিয়া বলিলেন, “বাপের স্বভাব ষোল আনা পেয়েছে, তেমনি ধূর্ত আর হুঁশিয়ার— সর্বদাই লাভ-লোকসানের দিকে নজর। আর শুধু বাপ কেন, বংশটাই ধূর্ত! মালোজী ভোঁস্‌লে যদি চালাকি করে যদুবংশের মেয়ে ঘরে না আনতে পারত, তাহলে ভোঁস্‌লে বংশকে চিনত কে? আর শাহুই বা এতবড় জায়গীরদার হত কোথা থেকে?”

    পলকের মধ্যে বালকের সংশয়প্রশ্নপূর্ণ মুখভাবের পরিবর্তন হইল। বালকোচিত কৌতূহলে দাদোর নিকটে সরিয়া গিয়া সানুনয়কণ্ঠে বলিল, “দাদো, তুমি যে আমার মা’র বিয়ের গল্প বলবে বলেছিলে, কৈ বললে না? বলো না দাদো, কি করে ঠাকুর্দা যদুবংশী মেয়ে ঘরে আনলেন।”

    এই সময় নিম্নের ছায়াচ্ছন্ন প্রদোষান্ধকার হইতে গাভীর হাম্বারব ভাসিয়া আসিল। বালক সচকিত হইয়া বলিয়া উঠিল, “ঐ শোনো, দেওরামের গরু ঘরে ফিরে এলো। চলো, চলো দাদো, আর দেরি নয়; সমস্ত দিন ঘুরে ঘুরে ভারী ক্ষিদে পেয়ে গেছে— এতক্ষণ তা লক্ষ্যই করিনি। দেওরামের মেয়ে নুন্নার সঙ্গে সেই যে সকলবেলা তেঁতুলবনের ধারে দেখা হয়েছিল, সে বলেছিল ফেরবার সময় তাজা দুধ খাওয়াবে। জয় ভবানী!”

    বালক দুই পা দিয়া ঘোড়ার পেট চাপিয়া ধরিতেই ঘোড়া লাফাইয়া সম্মুখ দিকে অগ্রসর হইল। আঁকিয়া বাঁকিয়া পার্বত্য হরিণের মতো পাথর হইতে পাথরের উপর ধাপে ধাপে লাফাইয়া পড়িয়া বিদ্যুদ্বেগে নীচের দিকে অদৃশ্য হইল।

    দাদো বালকের উচ্চ কণ্ঠস্বর দূর হইতে শুনিতে পাইলেন, “চলে এসো দাদো, দেওরামের ঘর ঝর্ণাতলার টালের উত্তর দিকে কুলগাছের জঙ্গলের মধ্যে; যদি খুঁজে না পাও, হাঁক দিও— নুন্না এসে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।”

    বৃদ্ধ পর্বত হইতে অবতরণ করিয়া বদরীবনের মধ্যে যখন দেওরামের কুটির অঙ্গনে পৌঁছিলেন, তখন দেখিলেন একটি বারো-তেরো বছরের মাওলী চাষার মেয়ে একটা ক্ষুদ্রকায় গাভীকে দোহনের চেষ্টা করিতেছে এবং বালক ঘোড়া ছাড়িয়া দিয়া অদূরে দাঁড়াইয়া সকৌতুকে সেই দৃশ্য দেখিতেছে। গাভীটা বোধ হয় অপরিচিত ব্যক্তি ও ঘোড়া দেখিয়া ভয় পাইয়াছে, তাই কিছুতেই স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া দুগ্ধ দোহন করিতে দিতেছে না, চেষ্টা করিবামাত্র সরিয়া সরিয়া যাইতেছে।

    মেয়েটি বিব্রত হইয়া বলিল, “তুমি ওর শিং দুটো একবার ধরো না, নইলে বজ্জাত গরু কিছুতেই দুইতে দেবে না।”

    বালক গরুর শিং ধরিবার কোনও চেষ্টা না করিয়া তামাসা করিয়া বলিল, “তুই কেমন মাওলার মেয়ে— গাই দুইতে জানিস না? দাঁড়া, বিশুয়াকে বলে দেব, সে আর তোকে বিয়ে করবে না।”

    ক্ষুব্ধ লজ্জায় নুন্না এতটুকু হইয়া গিয়া বলিল, “তোমার ঘোড়া দেখেই তো আজ ও অমন করছে, নইলে আমিই তো রোজ দুই।”

    বালক মুরুব্বিয়ানা দেখাইয়া বলিল, “হ্যাঁ, দুই! আর বড়াই করতে হবে না। দে আমায় ঘটি, আমি দুয়ে দিচ্ছি।”

    নুন্না বলিল, “তুমি পারবে না। আমি আর বাবা ছাড়া কেউ ওকে দুইতে পারে না। তোমাকে ও এখনি ফেলে দেবে।”

    বালকের আত্মাভিমানে ভীষণ আঘাত লাগিল, সে তর্জন কারিয়া বলিল, “কি! ফেলে দেবে! দেখি তো কেমন তোর গরু? দে ঘটি।”

    নুন্নার হাত হইতে জোর করিয়া ঘটি কড়িয়া লইয়া বালক দুগ্ধ দোহন করিতে বসিল। গরুটা ঘাড় বাঁকাইয়া একবার দোহনকারীকে দেখিয়া লইয়া চক্রাকারে ঘুরিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু বালকও ছাড়িবার পাত্র নয়, ঘটি লইয়া মুখে নানাপ্রকার প্রীতিসূচক শব্দ করিতে করিতে তাহার পশ্চাতে ঘুরিতে লাগিল। অবশেষে কি মনে করিয়া গাভীটা দাঁড়াইয়া পড়িল। তখন বালক সন্তর্পণে তাহার দেহে হাত বুলাইয়া দিয়া গাভীর পশ্চাদ্দিকে বসিয়া দুই জানুর মধ্যে ভাণ্ডটি ধরিয়া যেমন গাভীর ঊধসের দিকে হাত বাড়াইয়াছে, অমনি গাভী এক চরণ তুলিয়া তাহাকে এরূপ সবেগে পদাঘাত করিল যে বালক ভাণ্ডসমেত চিৎ হইয়া মাটিতে পড়িয়া গেল।

    নুন্না কলকণ্ঠে উচ্চহাস্য করিয়া উঠিল। গাভীটা যেন কর্তব্যকর্ম সুচারুরূপে সম্পন্ন করিয়া স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া রোমন্থন করিতে লাগিল।

    বৃদ্ধ দাদো অশ্ব হইতে অবতরণ করিয়া বালকের কাছে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “লেগেছে নাকি?”

    বালক অঙ্গের ধূলা ঝাড়িতে ঝাড়িতে উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, “গরু নয়— ঘোড়া। গরু কখনো অমন চাট ছোঁড়ে? নে নুন্না, তোর ঘটি, আমি ঘোড়ার দুধ খেতে চাই না। বাড়ি চললুম।”

    বালক অশ্বপূষ্ঠে উঠিতে যায় দেখিয়া নুন্না মিনতি করিয়া বলিল, “আর একটু দাঁড়াও না, বাবা এলো বলে। বড্ড ক্ষিদে পেয়েছে বলছিলে— ঘরে বাজরার রুটি আছে, এনে দেব?”

    বালক বলিল, “না, তোর রুটি-দুধ— কিছু খেতে চাই না। আমি চললুম।”

    এমন সময় কুটিরের পশ্চাতের ঘন ঝোপের ভিতর হইতে দুইটি লোক বাহির হইয়া আসিল। একজন খর্বকায় বৃষস্কন্ধ মধ্যবয়স্ক লোক, অপরটি পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়সের দৃঢ়শরীর যুবা। হাতের বল্লম কুটিরের গায়ে হেলাইয়া রাখিয়া মধ্যবয়সী লোকটি দ্রুতপদে আসিয়া বালকের ঘোড়ার রাশ ধরিল। বালক তখন ঘোড়ার উপর চড়িয়া বসিয়াছে, লোকটি সানুনয় নিম্নকণ্ঠে বলিল, “রাজা, ঘোড়া থেকে নামো, দুধ না খেয়ে যেতে পাবে না।”

    যুবকটিও এতক্ষণে সসম্ভ্রম হাস্যোদ্ভাসিত মুখে নিকটে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল। বালক একলম্ফে ঘোড়া হইতে নামিয়া দৌড়িয়া গিয়া নুন্নার চুলের মুঠি ধরিল, তাহাকে চুল ধরিয়া টানিতে টানিতে যুবকের সম্মুখে লইয়া গিয়া প্রায় তাহার বুকের উপর ফেলিয়া দিয়া বলিল, “এই নে বিশুয়া, এটাকে তুই ঘরে নিয়ে যা, তোর সঙ্গে ওর বিয়ে দিলুম। যদি বজ্জাতি করে, খুব পিটবি। আর ওই হতভাগা গরুটাকেও তুই নিয়ে যা, ওটা হল তোর বিয়ের যৌতুক।”

    নুন্না বালকের হাত ছাড়াইয়া কুটিরের ভিতর পলাইয়া গেল। বিশুয়া হাসিতে হাসিতে হেঁট হইয়া বালকের পদস্পর্শ করিয়া বলিল, “তুমি যখন দিলে রাজা, তখন আর আমার ভাবনা কি! এবার ঘোড়ার পিঠে তুলে ওকে ঘরে নিয়ে যাব। কি বলো, দেওরাম?”

    দেওরাম গম্ভীরভাবে একটু হাসিয়া বলিল, “তা যাস্‌। রাজা যখন তোর হাতে নুন্নাকে দিয়েই দিয়েছে, তখন আর আমি কি বলব? আর, আমি নুন্নার মন জানি, সেও তোকেই বিয়ে করতে চায়।”

    এই সময় নুন্নার হাসিমুখ কুটিরের ভিতর হইতে পালকের জন্য দেখা গেল। সে সশব্দে কুটির-দ্বার বন্ধ করিয়া দিল।

    দেওরাম ভূপতিত ঘটিটা তুলিয়া লইয়া দুগ্ধ-দোহনে প্রবৃত্ত হইল। গাভীটা এবার আর কোনও আপত্তি করিল না।

    বৃদ্ধ দাদো এতক্ষণ অদূরে দাঁড়াইয়া ইহাদের কথাবার্তা শুনিতেছিলেন। তাহার মুখে সংশয় ও সন্দেহের ছায়া ঘনীভূত হইতেছিল। এই নির্জন বনের মধ্যে একটিমাত্র কুটির, তাহার অধিবাসী এই ভীমকায় দেওরাম। ইহারা কে এবং বালকের সহিত ইহাদের পরিচয় হইল কিরূপে?

    তিনি অগ্রসর হইয়া বিশুয়াকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমরা এঁকে চিনলে কি করে?”

    নিমেষের জন্য বিশুয়া ও বালকের চোখে চোখে একটা ইঙ্গিত খেলিয়া গেল। বিশুয়ার মুখ ভাবলেশহীন হইয়া গেল, সে কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া বলিল, “দরবারে ওঁকে দেখেছি, উনি জাগীরদারের ছেলে।”

    বৃদ্ধ সন্দিগ্ধভাবে পুনশ্চ প্রশ্ন করিলেন, “তোমরা ওঁকে রাজা বলে ডাকছ কেন?”

    বিশুয়া কোনও উত্তর খুঁজিয়া পাইল না, দুগ্ধদোহন করিতে করিতে দেওরাম জবাব দিল, “জাগীরদারের ছেলে, উনিই একদিন মালিক হবেন, তাই রাজা বলে ডাকি।”

    দাদো উত্তরে সন্তুষ্ট হইলেন না, বলিলেন, “ইনি জায়গীরদারের মেজো ছেলে তাও জানো না? সে যাক—” বালকের দিকে ফিরিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কিন্তু তুমি এদের চিনলে কি করে জিজ্ঞাসা করি?”

    বালক অত্যন্ত সরলভাবে উত্তর করিল, “শিকার করতে এসে এদের সঙ্গে ভাব হয়েছে, দাদো। তুমি তো আর প্রত্যেকবার আমার সঙ্গে আসো না, তাই জানো না। কতবার শিকার করে ফেরবার মুখে দেওরামের জোয়ারী রুটি খেয়েছি— দেওরাম আমাকে ভারী যত্ন করে।”

    দাদো বালকের ছলনাহীন মুখের দিকে কিয়ৎকাল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাইয়া থাকিয়া শুধু কহিলেন, “হুঁ।” মনে মনে ভাবিলেন, — তোমার গতিবিধির উপর এখন হইতে একটু বিশেষ লক্ষ্য রাখিতে হইবে। ব্যাপার ঠিক বুঝা যাইতেছে না।

    ধারোষ্ণ দুগ্ধের পাত্র আনিয়া দেওরাম বালকের হাতে দিল। বালক জিজ্ঞাসা করিল, “দাদো, তুমি খাবে না?”

    দাদো কহিলেন, “না, তুমি খাও। আমার এখনো আহ্নিক বাকি।”

    দুগ্ধপাত্র দুই হস্তে ধরিয়া বালক অদূরে একটি শিলাখণ্ডের উপর গিয়া বসিল। দেওরামও তাহার অনুবর্তী হইয়া পাশে গিয়া দাঁড়াইল। এক চুমুক দুগ্ধ পান করিয়া বালক অন্যমনস্কভাবে আকাশের দিকে তাকাইয়া নিম্নস্বরে বলিল, “পরশু অমাবস্যা।”

    দেওরামও অলসভাবে ঊর্ধ্বে দৃষ্টি করিয়া অস্ফুটস্বরে বলিল, “হ্যাঁ। লোক সব তৈরি আছে। কোথায় থাকতে হবে?”

    “রাক্ষসমুখো গুহার মধ্যে। আমি দেড় পহর রাত্রে আসব। পঁচিশ জনের বেশি লোক যেন না হয়।”

    “বেশ। এবার কোন্‌ দিকে যাওয়া হবে?”

    “উত্তর দিকে। দক্ষিণে আর নয়, সেদিকে বড় হৈ চৈ হয়েছে। দরবার পর্যন্ত খবর গেছে।”

    দাদো তাহাদের দিকে লক্ষ্য করিতেছেন দেখিয়া দেওরাম প্রকাণ্ড একটা হাই তুলিয়া অপেক্ষাকৃত উচ্চকণ্ঠে বলিল, “আচ্ছা। হরিণ কিন্তু এদিকে পাওয়া যায় না।”

    বালক বাকি দুগ্ধটুকু নিঃশেষে পান করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া সহজভাবে বলিল, “আজ তাহলে চললুম, দেওরাম। নুন্নার বিয়ের দিন আমাকে খবর দিও— আমি দাদোকে নিয়ে আসব। দাদো একজন ভারী শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত জানো তো? উনিই নুন্নার বিয়ে দেবেন।”

    ঘোড়ার পিঠে একলাফে উঠিয়া বালক বলিল, “আর যদি হরিণছানা পাও, পুণায় নিয়ে যেও। আর দেরি করব না, রাত হয়ে এলো। দাদোর আবার ভারী ডাকাতের ভয়!”

    বিশুয়া ও দেওরাম দাঁড়াইয়া রহিল, অশ্বারোহী দুইজনে বদরীকানন পার হইয়া ঝরনার সঞ্চিত অগভীর ক্ষুদ্র জলাশয়ের পাশ দিয়া আবার পাহাড়ে উঠতে আরম্ভ করিল। এইটি শেষ পাহাড়— ইহার পরই উপত্যকা। কিছুক্ষণ কোনও কথা হইল না, দুইজনেই স্ব স্ব চিন্তায় মগ্ন। এদিকে অন্ধকার গাঢ় হইয়া আসিতেছে। ঘোড়া দুটি সতর্কভাবে পর্বতগাত্র আরোহণ করিতেছে।

    হঠাৎ চমক ভাঙিয়া বালক দাদোর দিকে দৃষ্টিপাত করিল, দেখিল দাদো তাহারই মুখের প্রতি সন্দেহাকুল চক্ষে চাহিয়া আছেন। বালক অপ্রতিভ হইয়া পড়িল, তারপর জোর করিয়া হাসিয়া বলিল, “কি দেখছো, দাদো? এবার আমার মা’র বিয়ের গল্প বলো।”

    বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস মোচন করিয়া কিয়ৎকাল নিস্তব্ধ হইয়া রহিলেন, আপনার মনে বলিলেন, “বংশের ধারা বদলানো যায় না; বাঘের বাচ্চা বাঘই হয়, শৃগাল হয় না— ঈশ্বরের এই বিধান। কে জানে, হয়তো এর মধ্যে মঙ্গলেরই বীজ নিহিত আছে।”

    বালক তাঁহাকে দীর্ঘকাল চিন্তা করিবার অবকাশ না দিয়া পুনশ্চ কহিল, “বলো না, দাদো?”

    দাদো আবার একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিতে আরম্ভ করিলেন, “গল্প অতি সামন্যই। কিন্তু তোমার ঠাকুর্দা মালোজী ভোঁস্‌লে যে কি রকম চতুর ছিলেন, এই গল্প থেকে তার পরিচয় পাওয়া যায়।

    “তোমার মাতুলবংশের মতো এতবড় বিখ্যাত যশস্বী বংশ দাক্ষিণাত্যে খুব অল্পই আছে। আজ থেকে নয়, চারশো বছর আগে আলাউদ্দিন খিল্‌জির আমল থেকে দেবগিরির যদুবংশের নাম দক্ষিণাত্যের পাথরে পাথরে তলোয়ার দিয়ে খোদাই হয়ে আসছে।

    “অতীতের কোন্ যুগে এই যদুবংশ রাজপুতানা থেকে এসে দেবগিরিতে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সে কাহিনী লুপ্ত হয়ে গেছে। দেবগিরির রাজ্যও আর নেই; কিন্তু বীরত্বে, ধর্মনিষ্ঠায়, মহানুভবতায় এই বংশ আজ পর্যন্ত হিন্দুমাত্রেরই আদর্শ হয়ে আছে।

    “এ-হেন বংশে তোমার দাদামশায় লিখুজী যদুরাও একজন পরাক্রমশালী মহাতেজস্বী পুরুষ ছিলেন। দশ হাজার সিপাহী নিত্য তাঁর রুটি খেত। বিজাপুর-গোলকুণ্ডা তাঁকে যমের মতো ভয় করত, আমেদনগর রাজ্যের তিনি ছিলেন প্রধান স্তম্ভ। মালিক অম্বর যদি তাঁর সঙ্গে কপটাচারিতা না করত— কিন্তু সে অন্য কথা। এখন আসল গল্পটা বলি।

    “সে আজ বহুদিনের ঘটনা, তখন আমার বয়স দশ-এগারো বছরের বেশি নয়; কিন্তু সেদিনকার প্রত্যেক ঘটনাটি স্পষ্ট মনে আছে। সেদিন ছিল ফাল্গুনী পৌর্ণমাসী, রাজপুতদের একটা মস্ত উৎসবের দিন। দাক্ষিণাত্যে দোলপূর্ণিমার দিন আবীর খেলার প্রথা এই যদুবংশই প্রচার করেছিলেন। সেদিন দেশের সমস্ত গণ্যমান্য লোক, এমন কি বিজাপুর, গোলকুণ্ডা, আমেদনগর দরবারের বড় বড় হিন্দু আমীর-ওমরা এসে লখুজীর কেল্লার মতো বিশাল ইমারতে জমা হতেন। সমস্ত রাত্রিদিনব্যাপী উৎসব চলত, ফাগ, রং এবং সুরার স্রোত বয়ে যেত।

    “সেবার লিখুজীর প্রকাণ্ড প্রাসাদের দরবার-ঘরে মজলিস বসেছে। মেঝের ওপর পার্সী গালিচা পাতা, তার ওপর অনেকে বসেছেন; দরবার লোকে লোকারণ্য। সিপাহী থেকে সর্দার পর্যন্ত সকলের অবাধ যাতায়াত। সামান্য সৈনিক পাঁচহাজারী সর্দারের মুখে আবীর মাখিয়ে দিচ্ছে, মন্‌সবদার সিপাহীকে মাটিতে ফেলে তার মুখে মদ ঢেলে দিচ্ছে। হাসির হর্‌রা ছুটছে। ছোট বড়, উচ্চ নীচ কোনও প্রভেদ নেই, এই একদিনের জন্যে সকলে সমান। সবাই আমোদে মত্ত।

    “সভার মাঝখানে মস্তবড় একটা চাঁদির থালায় আবীর স্তূপীকৃত রয়েছে, সেই থালা ঘিরে প্রধান প্রধান অতিথিরা বসেছেন। পানদান, গুলাবপাশ, আতরদান চারিদিকে ছড়ানো রয়েছে। স্বয়ং লখুজী এখানে আসীন; তোমার ঠাকুর্দা মালোজীও আছেন। মালোজী তখন লখুজী অনুগৃহীত একজন সামান্য সর্দার মাত্র; কিন্তু তাঁর কূটবুদ্ধি ও রণনৈপুণ্যের জন্যে লখুজী তাঁকে ভারী স্নেহ করতেন। তাই মালোজীও সাহস করে এই সভায় এসে বসেছেন। সকলের মুখেই আবীরের প্রলেপ, দেহের বস্ত্র এবং মিরজাই রঙে রক্তবর্ণ, চক্ষু ঢুলুঢুলু। এখানে গানের মজলিস বসেছে; আরো অনেক লোক চারিদিক ঘিরে দাঁড়িয়ে গান শুনছে এবং মজা দেখছে।

    “গান গাইছেন আমেদনগরের একজন বুড়ো ওমরা— তাঁর নাম ভুলে গেছি। মস্ত ওস্তাদ বলে তাঁর খ্যাতি ছিল। গড়গড়া টানতে টানতে হঠাৎ তিনি বসন্তরাগের এক তান মারলেন— সুরের ধমকে পাকা গোঁফ থেকে একরাশ আবীর উড়ে গেল। তোমার ঠাকুর্দা মালোজী সারঙ্গী কোলে করে ওস্তাদের পিছনে বসে ছিলেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গে সংগত আরম্ভ করলেন। লখুজী নিজে মৃদঙ্গ বাজাতে লাগলেন।

    “গান থামলে প্রশংসাধ্বনির একটা ঝড় বয়ে গেল, লখুজী পাখোয়াজ ফেলে প্রায় এক তোলা অম্বুরী আতর পলিতকেশ গায়কের গোঁফে মাখিয়ে দিয়ে দাড়ি ধরে নেড়ে দিয়ে বললেন, ‘কৎল্‌ কিয়া বিবি! আর একঠো ফর্মাও!’

    “বৃদ্ধ দন্তহীন হাসি হেসে চোখ ঠেরে আবার গান ধরলেন, ‘চোলিমে ছিপাউঁ কৈসে যোবনা মোরি’।

    “বিরাট হাসির একটা হল্লা পড়ে গেল। লখুজী ওস্তাদকে কোলে তুলে নিয়ে নৃত্য শুরু করে দিলেন। — কি আনন্দের দিনই গিয়েছে; এখন সব স্বপ্ন বলে মনে হয়।”

    দাদো একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন।

    ঘোড়া দুইটি ইতিমধ্যে পর্বত পার হইয়া উপত্যকায় নামিয়া আসিয়াছে, কিন্তু পথ এখনো শিলা-সংকুল। আশেপাশে মাটি ফাটিয়া বড় বড় খাদ রচনা করিয়াছে। শুষ্ক পয়ঃপ্রণালীর মতো এই খাদগুলি অন্ধকারে বড়ই বিপজ্জনক, ঘোড়া একবার পা ফস্কাইয়া উহার মধ্যে পড়িলে কোথায় অন্তর্হিত হইবে তাহার স্থিরতা নাই। এদিকে দিবার দীপ্তিও সম্পূর্ণ নিবিয়া গিয়াছে, কেবল সম্মুখে বহুদূরে পুণার দীপগুলি মিট্‌মিট্‌ করিয়া জ্বলিতেছে।

    বালক একাগ্রমনে গল্প শুনিতেছিল, দাদো থামিতেই সাগ্রহে গলা বাড়াইয়া বলিল, “তারপর?”

    দাদো বলিলেন, “হুঁশিয়ার হয়ে পথ চলো, রাস্তা বড় খারাপ।” তারপর গল্প আরম্ভ করিলেন, “দু’টি ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে এই দরবার ঘরের চারিদিকে খেলা করে বেড়াচ্ছিল, দু’জনেরই লাল বেনারসী চেলির জোড় পরা, কানে কুণ্ডল, হাতে বালা, গলায় হার। ছেলেটির বয়স পাঁচ বছর, আর মেয়েটির তিন।

    “এদের দিকে কারো দৃষ্টি ছিল না, এরা নিজের মনে ঘরময় খেলে বেড়াচ্ছিল। কখন এক সময় মেয়েটি দূর থেকে ছেলেটিকে দেখতে পেয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল, গম্ভীর মুখে ছেলেটির আপাদমস্তক দেখে নিয়ে আধ-আধ ভাষায় প্রশ্ন করলে, ‘তুমি কে?’

    “ছেলেটিও মেয়েটির দিকে গম্ভীরভাবে তাকিয়ে বললে, ‘আমি শাহু। আমি তীর ছুঁড়তে পারি। তুমি কে?’

    “মেয়েটির দুই চক্ষু সম্ভ্রমে ভরে উঠল, সে ফুলের মতো ঠোঁট দুটি খুলে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে আস্তে আস্তে বললে, ‘আমি দিদা।’ তারপর একটু ভেবে আবার বললে, ‘আমার বাবাও তীর ছুঁড়তে পারে।’

    “অতঃপর এই বীর এবং বীরকন্যার মধ্যে ভাব হতে বেশি দেরি হল না। শাহু গিয়ে মেয়েটির গলা জড়িয়ে নিলে, মেয়েটিও শাহুর কোমর জড়িয়ে ধরলে। এইভাবে তারা অনেকক্ষণ দরবার-ঘরের চারিদিকে ঘুরে বেড়াতে লাগল। তাদের মধ্যে চুপিচুপি কি কথা হল তারাই জানে। খুব সম্ভব শাহু তার অসামান্য শৌর্য-বীর্যের কথা খুব ফলাও করে ব্যাখ্যা করে মেয়েটির ছোট্ট প্রাণটুকু জয় করে নিচ্ছিল। আর মেয়েটিও বোধ হয় নিঃসংশয় সহানুভূতি এবং প্রশংসা দ্বারা শাহুর বীর-হৃদয় সম্পূর্ণ বশীভূত করে ফেলছিল।

    “এদিকে গানের মজলিস তখন টিলে হয়ে এসেছে; বৃদ্ধ গায়ক তিন পাত্র গুলাবি সরবত খেয়ে কিংখাপের তাকিয়া হেলান দিয়ে বসে হাঁপাচ্ছেন, — এমন সময় এই দু’টি ছেলে-মেয়ে গলা-জড়াজড়ি করে তাদের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। এতগুলো লোক চারপাশে বসে আছে, কিন্তু সেদিকে তাদের ভ্রূক্ষেপ নেই, নিজেদের কথাতেই তারা মশগুল। বৈঠকে যাঁরা বসেছিলেন তাঁদের সকলের মুগ্ধ দৃষ্টি একসঙ্গে তাদের ওপর গিয়ে পড়ল। এ কি অপূর্ব আবির্ভাব! আজ দোলের দিনে সত্যিই কি বৃন্দাবন-লীলা তাঁদের চোখের সামনে অভিনীত হচ্ছে? সকলে চোখ মুছে দেখলেন, — তাই তো! ছেলেটির বর্ণ নবজলধরশ্যাম, আর মেয়েটি বিদ্যুল্লতার মতো গৌরী!

    “মেয়েটির হঠাৎ কি খেয়াল হল, সে আতরদানে তার ছোট্ট চাঁপার কলির মতো আঙুল ডুবিয়ে শাহুর নাকের নীচে আঙুলটি বুলিয়ে দিলে। শাহুও আদর-আপ্যায়নে কম যাবার পাত্র নয়, সে চাঁদির থালা থেকে এক মুঠি আবীর তুলে নিয়ে সযত্নে মেয়েটির মুখে কপালে মাখিয়ে দিলে।

    “সকলে আনন্দে জয়ধ্বনি করে উঠলেন, ‘রাধা-গোবিন্দজী কি জয়!’

    “লখুজী আর মালোজী ছাড়া আর কেউ জানতেন না এ ছেলে-মেয়ে দু’টি কে। লখুজী উচ্চহাস্য করে উঠলেন, তারপর দু’টিকে কাছে টেনে নিয়ে নিজের কোলে বসিয়ে বললেন, ‘রাধা-গোবিন্দজী নয়, এরা আমার মেয়ে আর মালোজীর ছেলে। বন্ধুগণ, এ দু’টির বিয়ে হলে কেমন মানায় বলুন তো?’

    “লখুজী পরিহাসচ্ছলেই কথাটা বলেছিলেন, তা ছাড়া গুলাবি সরবতের নেশাও অল্পবিস্তর ছিল। তাঁর কথা শুনে সকলে হেসে উঠলেন, কিন্তু মালোজী ভোঁস্‌লে তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে উঠে করজোড়ে সকলকে বললেন, ‘মহাশয়গণ, আপনারা সাক্ষী থাকুন, লিখুজী তাঁর কন্যাকে আমার পুত্রের সঙ্গে বাগদত্তা করলেন।’

    “সকলে অবাক হয়ে রইলেন, লিখুজীর নেশা ছুটে গেল। তাঁর মুখ আবীর-প্রলেপের ভিতর থেকে ক্রোধে কালো হয়ে উঠল। তাঁর মেয়েকে— দেবগিরির রাজবংশের মেয়েকে যে মালোজীর মতো একজন সামান্য প্রাণী নিজের পুত্রবধূ করবার স্পর্ধা করতে পারে, এ তাঁর কল্পনারও অতীত; কিন্তু তবু কথাটা যে তাঁর মুখ থেকেই বেরিয়ে গেছে এ কথাও অস্বীকার করা চলে না। মালোজীর দিকে কট্‌মট্‌ করে চেয়ে লিখুজী বললেন, ‘মালোজী, তুমি পাগলের মতো কথা বলছ। আমার মেয়ে রাজার ঘরে পড়বে।’

    “মালোজী পূর্ববৎ জোড়করে বললেন, ‘আমার ছেলে আপনার মেয়ের মুখে আবীর দিয়েছে, আপনার মেয়ে আমার ছেলের মুখে আতর দিয়েছে, তারপর আপনি তাদের কোলে নিয়ে যা বলেছেন তা উপস্থিত সকলেই শুনেছেন। ধর্মতঃ, আপনার মেয়ে আমার ছেলের বাগ্‌দত্তা। এখন যদি আপনি সে কথা প্রত্যাহার করতে চান, করুন, আমার আপত্তি নেই।’

    “ক্রোধে লিখুজী আসন ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন, কিন্তু মুখ দিয়ে তাঁর কথা বেরুল না। একবার সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, কিন্তু তাঁদের মনোভাব বুঝতেও বিলম্ব হল না; সকলেই নীরবে মালোজীর কথার সমর্থন করছেন। লখুজী নিজের মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে ঝড়ের মতো অন্তঃপুরে চলে গেলেন।

    “মালোজীও ছেলে নিয়ে ঘরে ফিরে এলেন। চারিদিকে রাষ্ট্র হয়ে গেল যে লখুজীর মেয়ে প্রকাশ্য দরবারে মালোজীর ছেলের বাগ্‌দত্তা হয়েছে। কথাটা অবশ্য বেশি দিন চাপা থাকত না, প্রকাশ হয়ে পড়তই; কিন্তু এমনি তোমার ঠাকুর্দার উদ্যম আর তৎপরতা যে সপ্তাহ মধ্যে মহারাষ্ট্রের সর্বত্র এই সুসংবাদ প্রচার হয়ে পড়ল, জনপ্রাণীরও জানতে বাকি রইল না।

    “লখুজী নিষ্ফল ক্রোধে ফুলতে লাগলেন। মালোজীর সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হয়ে গেল, এমন কি মুখ-দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, মালোজীর মতো ধড়িবাজ অকৃতজ্ঞ লোককে আর তিনি কোনও সাহায্য করবেন না, বরং তার যাতে অনিষ্ট হয় সেই চেষ্টাই করবেন।

    “তাঁর প্রতিজ্ঞা কিন্তু রইল না। যতই বছরের পর বছর কেটে যেতে লাগল, ততই তিনি বুঝতে পারলেন চতুর মালোজী তাঁকে কি বিষম ফাঁদে ফেলেছে। তিনি বুঝলেন অন্যত্র মেয়ের বিয়ে দিলে মেয়ে সুখী হবে না, যত তার বয়স বাড়ছে শাহু ছাড়া আর কেউ যে তার স্বামী হতে পারে না, এ ধারণা তার মনে ততই দৃঢ় হচ্ছে। তাছাড়া অন্যের বাগ্‌দত্তা মেয়ে কেউ জেনেশুনে বিয়ে করতে চায় না, দু’-চারটে ঘরানা ঘরে সম্বন্ধ করতে গিয়ে লজ্জা পেয়ে লখুজীকে ফিরে আসতে হল। শেষ পর্যন্ত তিনি দেখলেন শাহু ছাড়া জিজার গতি নেই।

    “এইভাবে ন’-দশ বছর কেটে গেছে। মালোজী কপালের জোরে এবং বুদ্ধিবলে খুব উন্নতি করেছেন, বিষয়-সম্পত্তিও হয়েছে। লখুজীর বিদ্বেষ ও অনিচ্ছা ক্রমেই কমে আসতে লাগল। তারপর একদিন মালোজীকে নিজের বাড়িতে ডেকে পাঠিয়ে তাকে আলিঙ্গন করে বললেন, ‘ভাই, আমারই ভুল; জিজাকে তুমি তোমার ছেলের জন্যে নিয়ে যাও।’

    “ব্যাস্‌, আর কি! এইখানেই গল্প শেষ। মালোজীর মতলব সিদ্ধ হল, মহা ধুমধাম করে তোমার বাপের সঙ্গে তোমার মায়ের বিয়ে হয়ে গেল। তখন তোমার মা’র বয়স তেরো বৎসর, আর শাহুর পনেরো। বিয়ের রাত্রে তোমার মা’র গর্বোজ্জ্বল হাসিভরা মুখ আমার আজও মনে আছে।

    “তবে একথা ঠিক যে জন্মান্তরের সম্বন্ধ না হলে এত বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে, এতবড় সামাজিক পার্থক্য লঙ্ঘন করে এ বিয়ে কখনই হতে পারত না। তোমার মা-বাবা পূর্বজন্মেও স্বামী-স্ত্রী ছিলেন।”

    বৃদ্ধ দাদো মৌন হইলেন। কিছুক্ষণ কোনও কথা হইল না, দুইজনে নীরবে চলিলেন। অন্ধকার তখন বেশ গাঢ় হইয়াছে, পাশের লোকও স্পষ্ট দেখা যায় না। দাদো লক্ষ্য করিয়া দেখিলেন, বালক দুই কর যুক্ত করিয়া ললাটে ঠেকাইয়া বারংবার কাহার উদ্দেশে নমস্কার করিতেছে। দাদো কথা কহিলেন না, অপূর্ব আবেগভরে তাঁহার শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল।

    কিয়ৎকাল পরে একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া অর্ধস্ফুটস্বরে বালক বলিল, “কি সুন্দর গল্প! আমার মা’র মতো এমন মা পৃথিবীর আর কারো নেই— না দাদো?”

    দাদো সংযতকণ্ঠে বলিলেন, “না। তোমার মায়ের মতো এমন অসামান্য নারী আর কোথাও নেই। সেই তিন বছর বয়স থেকে আজ পর্যন্ত দেখে আসছি, এমনটি আর দেখিনি।”

    পূর্ণ হৃদয় লইয়া দুইজনে নীরব রহিলেন। ক্রমে পুণার আলোক নিকটবর্তী হইতে লাগিল, পথ সমতল ও অনুদ্ঘাত হইল। অশ্বদ্বয় আশু গৃহে পৌঁছিবার আশায় দ্রুতবেগে চলিতে আরম্ভ করিলে।

    পুণা পৌঁছিতে যখন পাদক্রোশ মাত্র বাকি আছে, তখন কে একজন সম্মুখের অন্ধকার হইতে উচ্চকণ্ঠে হাঁকিল, “হো শিব্বা হো! হো দাদোজী!”

    বালক শিব্বা চমকিয়া উঠিয়া সানন্দে চিৎকার করিয়া উঠিল, “তানা! তানা!” তারপর তীরবেগে সম্মুখে ঘোড়া ছুটাইয়া দিল।

    অন্ধকারে তানাজী মালেশ্বর ঘোড়ার উপর বসিয়া ছিল, শিব্বা প্রায় তাহার ঘাড়ের উপর গিয়া পড়িল।

    তানাজী তিরস্কারের সুরে বলিল, “আজ কি আর বাড়ি ফিরতে হবে না? কোথায় ছিলে এতক্ষণ? মা কত ভাবছেন, শেষে আর থাকতে না পেরে আমাকে পাঠালেন?”

    শিব্বা ঘোড়ার উপর হইতেই তানাজীর গলা জড়াইয়া ধরিয়া বলিল, “মা কোথায় রে, তানা?”

    তানাজী বলিল, “কোথায় আবার— বাড়িতে! দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে পথের পানে চেয়ে আছেন। তোমার এত দেরি হল কেন?” গলা খাটো করিয়া বলিল, “দেওরামের সঙ্গে দেখা হল নাকি? ওদিকের কি খবর? কবে?”

    শিব্বা অন্যমনস্কভাবে বলিল, “খবর ভালো। অমাবস্যার রাত্রে সব ঠিক হয়েছে — চল্‌ তানা, শীগ্গির বাড়ি যাই। মাকে সমস্ত দিন দেখিনি— ভারী মন-কেমন করছে।”

    দুই কিশোর বন্ধু তখন নীড়-প্রতিগামী পাখির মতো দ্রুতবেগে গৃহের দিকে অগ্রসর হইল।

    বৃদ্ধ দাদোজী কোণ্ডু বহুদূর পশ্চাতে পড়িয়া রহিলেন।

    ১৩৩৮

  • রুমাহরণ

    রুমাহরণ

    রুমাহরণ

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    চক্রায়ুধ ঈশানবর্মা নামক জনৈক নাগরিকের ঘৃণিত জীবন-কাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়াছি। দিগ্বিজয়ী চন্দ্রবর্মা পাটলিপুত্রের প্রাসাদভূমির এক প্রান্তে এক অর্ধশুষ্ক কূপমধ্যে তাহাকে নিক্ষেপ করিয়াছিলেন। কূপের মুখ ঘনসন্নিবিষ্ট লৌহজাল দ্বারা আঁটিয়া বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। এই কূপের দুর্গন্ধ পঙ্কে আ-কটি নিমজ্জিত হইয়া, ভেক-সরীসৃপ-পরিবৃত হইয়া আমার অন্তিম তিন মাস কাটিয়াছিল।

    জয়ন্তী নাম্নী পুরীর এক দাসী চণ্ডালহস্তে শূকর মাংস আনিয়া প্রত্যহ সন্ধ্যায় আমার জন্য কূপে ফেলিয়া দিয়া যাইত। এই জয়ন্তীর নিকট আমি রাজা-অবরোধের অনেক কথা শুনিতে পাইতাম। জয়ন্তী সোমদত্তার সহচরী কিঙ্করী ছিল; সে সোমদত্তার মনের অনেক কথা জানিত, অনেক কথা অনুমান করিয়াছিল। সে কূপমুখে বসিয়া সোমদত্তার কাহিনী বলিত, আমি নিম্নে অন্ধকারে কীটদংশনবিক্ষত অর্ধগলিত দেহে দাঁড়াইয়া উৎকর্ণ হইয়া তাহা শুনিতাম।

    একদিন জয়ন্তীকে বলিয়াছিলাম, “জয়ন্তী, আমাকে উদ্ধার করিবে? আমার বহু গুপ্তধন মাটিতে প্রোথিত আছে, যদি মুক্তি পাই, তোমাকে দশ হাজার স্বর্ণদীনার দিব। তোমাকে আর চেটীবৃত্তি করিতে হইবে না।”

    ভীতা জয়ন্তী আমাকে গালি দিয়া পলায়ন করিয়াছিল, আর আসে নাই। অনন্তর চণ্ডাল একাকী আসিয়া মাংস দিয়া যাইত।

    আমি একাকী এই জীবন্ত নরকে বসিয়া থাকিতাম আর ভাবিতাম। কি ভাবিতাম, তাহা বলিবার এ স্থান নহে। তবে সোমদত্তা আমার চিন্তার অধিকাংশ স্থান জুড়িয়া থাকিত। ভাবিতাম, সোমদত্তার মনে যদি ইহাই ছিল, তবে সে আমার নিকট আত্মসমর্পণ করিল কেন? যদি চন্দ্রগুপ্তকে এত ভালোবাসিত, তবে সে বিশ্বাসঘাতিনী না হইয়া আত্মঘাতিনী হইল না কেন? রমণীর হৃদয়ের রহস্য কে বলিবে? তখন এ প্রশ্নের কোন উত্তর পাই নাই।

    কিন্তু আজ বহু জীবনের পরপারে বসিয়া মনে হয়, যেন সোমদত্তার চরিত্র কিছু কিছু বুঝিয়াছি। সোমদত্তা গুপ্তচর রূপে রাজ-অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া ক্রমে চন্দ্রগুপ্তকে সমস্ত মনপ্রাণ ঢালিয়া ভালোবাসিয়াছিল। কুমারদেবী চন্দ্রগুপ্তকে অবজ্ঞার চক্ষে দেখিতেন, ইহা সে সহ্য করিতে পারিত না। তাই সে সংকল্প করিয়াছিল, চন্দ্রবর্মাকে দুর্গ অধিকারে সাহায্য করিয়া পরে স্বামীর জন্য পাটলিপুত্র ভিক্ষা মাগিয়া লইবে; কুমারদেবীর প্রভাব অস্তমিত হইবে, চন্দ্রগুপ্ত সত্যই রাজা হইবেন এবং সেই সঙ্গে সোমদত্তাও স্বামীসোহাগিনী হইয়া পট্টমহিষীর আসন গ্রহণ করিবে।

    আমার দুরন্ত লালসা যখন তাহার গোপন সংকল্পের উপর খড়্গের মতো পড়িয়া উহা খণ্ডবিখণ্ড করিয়া দিল, তখন তাহার মনের কি অবস্থা হইল সহজেই অনুমেয়। নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারিণী হীন গুপ্তচর বলিয়া কোন্‌ রমণী ধরা পড়িতে চাহে? সোমদত্তা দেখিল, ধরা পড়িলে স্বামীর অতুল ভালোবাসা সে হারাইবে; সে যে চন্দ্রগুপ্তকেই রাজ্য ফিরিয়া দিবার মানসে চক্রান্ত করিয়াছে, এ কথা চন্দ্রগুপ্ত বুঝিবে না, নীচ বিশ্বাসঘাতিনী বলিয়া ঘৃণাভরে তাহাকে পরিত্যাগ করিবে। এদিকে চক্রায়ুধের হস্তেও নিস্তার নাই, ইচ্ছায় হউক অনিচ্ছায় হউক, ধর্মনাশ নিশ্চিত। এরূপ অবস্থায় অসহায় জালবদ্ধা কুরঙ্গিণী কি করিবে?

    অপরিমেয় ভালোবাসার যূপে সোমদত্তা সতীধর্ম বিসর্জন দিল। ভাবিল, আমার তো চরম সর্বনাশ হইয়াছে, কিন্তু এই মর্মভেদী লজ্জার কাহিনী স্বামীকে জানিতে দিব না। এখন আমার যাহা হয় হউক, তারপর যে জীবন ধ্বংস করিয়াছে, তাহাকে যমালয়ে পাঠাইয়া নিজেও নরকে যাইব। কিন্তু স্বামীকে কিছু জানিতে দিব না।

    ইহাই সোমদত্তার আত্মবিসর্জনের অন্তরতম ইতিহাস।

    কিন্তু আর না, সোমদত্তার কথা এইখানেই শেষ করিব। এই নারীর কথা স্মরণে ষোল শত বৎসর পরে আজও আমার মন মাতাল হইয়া উঠে। জানি, সোমদত্তার মতো নারীকে বিধাতা আমার জন্য সৃষ্টি করেন না— সে দেবভোগ্যা। জন্মজন্মান্তরের ইতিহাস খুঁজিয়া এমন একটিও নারী দেখিতে পাই নাই, যাহার সহিত সোমদত্তার তুলনা করিব। আর কখনও এমন দেখিব কি না জানি না।

    আমি বিশ্বাস করি, জন্মান্তরের পরিচিত লোকের সহিত ইহজন্মে সাক্ষাৎ হয়। সোমদত্তার সহিত যদি আবার আমার সাক্ষাৎ হয়, জানি, তাহাকে দেখিবামাত্র চিনিতে পারিব। নূতন দেহের ছদ্মবেশ তাহাকে আমার চক্ষু হইতে লুকাইয়া রাখিতে পরিবে না।

    কিন্তু সে-ও কি আমাকে চিনিতে পরিবে? ললাটে কি স্মৃতির ভ্রূকুটি দেখা দিবে? অধরে সেই অন্তিমকালের অপরিসীম ঘৃণা স্ফুরিত হইয়া উঠিবে? জানি না! জানি না!

    পূর্বে বলিয়াছি যে, আমি বিশ্বাস করি, জন্মান্তরের পরিচিত লোকের সঙ্গে ইহজন্মে সাক্ষাৎ হয়। আপনি তাহার মুখের পানে অবাক্ হইয়া কিছুক্ষণ তাকাইয়া থাকেন, চিনি-চিনি করিয়াও চিনিতে পারেন না। মনে করেন, পূর্বে কোথাও দেখিয়া থাকিবেন। এই পূর্বে যে কোথায় এবং কত দিন আগে, আপনি তাহা জানেন না; আমি জানি। ভগবান আমাকে এই অদ্ভুত শক্তি দিয়াছেন। তাহাকে দেখিবামাত্র আমার মনের অন্ধকার চিত্রশালায় চিত্রের ছায়াবাজি আরম্ভ হইয়া যায়। যে কাহিনীর কোনও সাক্ষী নাই, সেই কাহিনীর পুনরাভিনয় চলিতে থাকে। আমি তখন আর এই ক্ষুদ্র আমি থাকি না, মহাকালের অনিরুদ্ধ স্রোতঃপথে চিরন্তন যাত্রীর মতো ভাসিয়া চলি। সে যাত্রা কবে আরম্ভ হইয়াছিল জানি না, কত দিন ধরিয়া চলিবে তাহাও ভবিষ্যের কুজ্ঝটিকায় প্রচ্ছন্ন। তবে ইহা জানি যে, এই যাত্রা শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন অব্যাহত। মাঝে মাঝে মহাকালের নৃত্যের ছন্দে যতি পড়িয়াছে মাত্র— সমাপ্তির ‘সম’ কখনও পড়িবে কি না এবং পড়িলেও কবে পড়িবে, তাহা বোধ করি বিধাতারও অজ্ঞেয়।

    মহেঞ্জোদাড়োর নগর ও মিশরের পিরামিড যখন মানুষের কল্পনায় আসে নাই, তখনও আমি জীবিত ছিলাম। এই আধুনিক সভ্যতা কয় দিনের? মানুষ লোহা ব্যবহার করিতে শিখিল কবে? কে শিখাইল? প্রত্নতাত্ত্বিকেরা পরশুমুণ্ড পরীক্ষা করিয়া এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজিতেছেন, কিন্তু উত্তর পাইতেছেন না। আমি বলিতে পারি, কবে লোহার অস্ত্র ভারতে প্রথম প্রচারিত হইয়াছিল। কিন্তু সন-তারিখ দিয়া বলিতে পারিব না। সন-তারিখ তখনও তৈয়ার হয় নাই। তখন আমরা কাঁচা মাংস খাইতাম।

    চারিদিকে পাহাড়ের গণ্ডি দিয়া ঘেরা একটি দেশ, মাঝখানে গোলাকৃতি সুবৃহৎ উপত্যকা। ‘যজ্ঞিবাড়ি’তে কাঠের পরাতের উপর ময়দা স্তূপীকৃত করিয়া ঘি ঢালিবার সময় তাহার মাঝখানে যেমন নামাল করিয়া দেয়, আমাদের পর্বতবলয়িত উপত্যকাটি ছিল তাহারই একটি সুবিরাট সংস্করণ। আবার বিধাতা মাঝে মাঝে আকাশ হইতে প্রচুর ঘৃতও ঢালিয়া দিতেন; তখন ঘোলাটে রাঙা  জলে উপত্যকা কানায় কানায় ভরিয়া উঠিত। পাহাড়ের অঙ্গ বহিয়া শত নির্ঝরিণী সগর্জনে নামিয়া আসিয়া সেই হ্রদ পুষ্ট করিত। আবার বর্ষাপগমে  জল শুকাইত, কতক গিরিরন্ধ পথে বাহির হইয়া যাইত; তখন অগভীর জলের কিনারায় একপ্রকার দীর্ঘ ঘাস জন্মিত। ঘাসের শীর্ষে ছোট ছোট দানা ফলিয়া ক্রমে সুবর্ণবর্ণ ধারণ করিত। এই গুচ্ছ গুচ্ছ দানা কতক ঝরিয়া জলে পড়িত, কতক উত্তর হইতে ঝাঁকে ঝাঁকে হংস আসিয়া খাইত। সে সময় জলের উপরিভাগ অসংখ্য পক্ষীতে শ্বেতবর্ণ ধারণ করিত এবং তাহাদের কলধ্বনিতে দিবা-রাত্রি সমভাবে নিনাদিত হইতে থাকিত। শীতের সময় উচ্চ পাহাড়গুলার শিখরে শিখরে তুলার মতো তুষারপাত হইত। আমরা তখন মৃগ, বানর, ভল্লুকের চর্ম গাত্রাবরণ রূপে পরিধান করিতাম। গিরিকন্দরে তুষার-শীতল বাতাস প্রবেশ করিয়া অস্থি পর্যন্ত কাঁপাইয়া দিত। পাহাড়ে শুষ্ক তরুর ঘর্ষণে অগ্নি জ্বলিতে দেখিয়াছিলাম বটে, কিন্তু অগ্নি তৈয়ার করিতে তখনও শিখি নাই। অগ্নিকে বড় ভয় করিতাম।

    আমাদের এই উপত্যকা কোথায়, ভারতের পূর্বে কি পশ্চিমে, উত্তরে কি দক্ষিণে, তাহা আমার ধারণা নাই। ভারতবর্ষের সীমানার মধ্যে কি না, তাহাও বলিতে পারি না। উপত্যকার কিনারায় পাহাড়ের গুহাগুলির মধ্যে আমরা একটা জাতি বাস করিতাম; পর্বতচক্রের বাহিরে কখনও যাই নাই, সেখানে কি আছে তাহাও জানিতাম না। আমাদের জগৎ এই গিরিচক্রের মধ্যেই নিবদ্ধ ছিল। পাহাড়ে বানর, ভল্লুক, ছাগ, মৃগ প্রভৃতি নানাবিধ পশু বাস করিত, আমরা তাহাই মারিয়া খাইতাম; ময়ূরজাতীয় এক প্রকার পক্ষী পাওয়া যাইত, তাহার মাংস অতি কোমল ও সুস্বাদু ছিল। তাহার পুচ্ছ দিয়া আমাদের নারীরা শিরোভূষণ করিত। গাছের ফলমূলও কিছু কিছু পাইতাম, কিন্তু তাহা যৎসামান্য; পশুমাংসই ছিল আমাদের প্রধান আহার্য।

    চেহারাও আহারের অনুরূপ ছিল। মাথায় ও মুখে বড় বড় জটাকৃতি চুল, রোমশ কপিশ-বর্ণ দেহ, বাহু জানু পর্যন্ত লম্বিত। দেহ নিতান্ত খর্ব না হইলেও প্রস্থের দিকেই তাহার প্রসার বেশি। এরূপ আকৃতির মানুষ আজকালও মাঝে মাঝে দু’-একটা চোখে পড়ে, কিন্তু জামা-কাপড়ের আড়ালে স্বরূপ সহসা ধরা পড়ে না। তখন আমাদের জামা-কাপড়ের বালাই ছিল না, প্রসাধনের প্রধান উপকরণ ছিল পশুচর্ম। তাহাও গ্রীষ্মকালে বর্জন করিতাম, সামান্য একটু কটিবাস থাকিত।

    আমাদের নারীরা ছিল আমাদের যোগ্য সহচরী—তাম্রবর্ণা, কৃশাঙ্গী, ক্ষীণকটি, কঠিনস্তনী। নখ ও দন্তের সাহায্যে তাহারা অন্য পুরুষের নিকট হইতে আত্মরক্ষা করিত। স্তন্যপায়ী শিশুকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া অন্যহস্তে প্রস্তরফলকাগ্র বর্ষা পঞ্চাশহস্ত দূরস্থ মৃগের প্রতি নিক্ষেপ করিতে পারিত। সন্ধ্যার প্রাক্কালে ইহারা যখন গুহাদ্বরে বসিয়া পক্ব লোহিত ফলের কর্ণাভরণ দুলাইয়া মৃদুগুঞ্জনে গান করিত, তখন তাহাদের তীব্রোজ্জ্বল কালো চোখে বিষাদের ছায়া নামিয়া আসিত। আমরা প্রস্তরপিণ্ডের অন্তরালে লুকাইয়া নিস্পন্দবক্ষে শুনিতাম— বুকের মধ্যে নামহীন আকাঙ্ক্ষা জাগিয়া উঠিত!

    এই সব নারীর জন্য আমরা যুদ্ধ করিতাম, হিংস্র শ্বাপদের মতো পরস্পর লড়িতাম। ইহারা দূরে দাঁড়াইয়া দেখিত। যুদ্ধের অবসানে বিজয়ী আসিয়া তাহাদের হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া যাইত। আমাদের জাতির মধ্যে নারীর সংখ্যা কমিয়া গিয়াছিল…

    কিন্তু গোড়া হইতে আরম্ভ করাই ভালো! কি করিয়া এই অর্ধপশু জীবনের স্মৃতি জাগরূক হইল, পূর্বে তাহাই বলিব।

    পূজার ছুটিতে হিমাচল অঞ্চলে বেড়াইতে গিয়াছিলাম। রেলের চাকরিতে আর কোনও সুখ না থাক, ঐটুকু আছে— বিনা খরচে সারা ভারতবর্ষটা ঘুরিয়া আসা যায়। আমি হিমালয়ের কোন্‌ দিকে গিয়াছিলাম, তাহা বলিবার প্রয়োজন নাই,—তবে সেটা দার্জিলিং কিংবা সিমলা পাহাড় নহে। যেখানে গিয়াছিলাম সে স্থান আরও নির্জন ও দুরধিগম্য; রেলের শেষ সীমা ছাড়াইয়া আরও দশ-বারো মাইল রিক্‌শ কিংবা ঘোড়ায় যাইতে হয়।

    হিমালয়ের নৈসর্গিক বর্ণনা করিয়া উত্ত্যক্ত পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাইব না; সচরাচর আশ্বিনমাসে পাহাড়ের অবস্থা যেমন হইয়া থাকে, তাহার অধিক কিছু নহে। গিরিক্রোড়ের এই ক্ষুদ্র জনবিরল শহরটি এমনভাবে তৈয়ারি যে, মানুষের হাতের কাজ খুব কমই চোখে পড়ে। যে পথটি সর্পিল গতিতে কখনও উঁচু কখনও নিচু হইয়া শহরটিকে নাগপাশে বাঁধিয়া রাখিয়ছে, পাইন্‌ গাছের শ্রেণীর দ্বারা তাহা এমনই আচ্ছন্ন যে, তাহার শীর্ণ দেহটি সহসা চোখেই পড়ে না। ছোট ছোট পাথরের বাড়িগুলি পাহাড়ের অঙ্গে মিশিয়া আছে। মাঝে মাঝে পাইনের জঙ্গল, তাহার মধ্যে পাথরের টুকরা বসাইয়া মানুষের বিশ্রামের স্থান করা আছে। রাত্রিকালে ক্বচিৎ ফেউয়ের ডাক শুনা যায়। শীত চমৎকার উপভোগ্য।

    সেদিন পাইন্‌ গাছের মাথায় চাঁদ উঠিয়াছিল। আধখানা চাঁদ, কিন্তু তাহারই আলোয় বনস্থলী উদ্ভাসিত হইয়াছিল। আমি একাকী পাইন্‌ বনের মধ্যে ঘুরিয়া বেড়াইতেছিলাম। গায়ে ওভারকোট ছিল, মাথায় একটা অদ্ভুত আকৃতির পশমের টুপি পরিয়াছিলাম। এ দেশের পাহাড়ীরা এইরকম টুপি তৈয়ারি করিয়া বিক্রয় করে। চাঁদের আলোয় আমার দেহের যে ছায়াটা মাটিতে পড়িয়াছিল, তাহা দেখিয়া আমারই হাসি পাইতেছিল। ঠিক একটি জংলী শিকারীর চেহারা,—হাতে একটা ধনুক কিংবা বর্শা থাকিলে আর কোনও তফাত থাকিত না।

    এখানে আসিয়া অবধি কোনও বাঙালীর মুখ দেখি নাই, অন্য জাতীয় লোকের সঙ্গেও বিশেষ পরিচয় হয় নাই, তাই একাকী ঘুরিতেছিলাম। বাহিরের শীতশিহরিত তন্দ্রাচ্ছন্ন প্রকৃতি আমাকে গভীর রাত্রিতে ঘর হইতে টানিয়া বাহির করিয়াছিল। এই প্রকৃতির পানে চাহিয়া চাহিয়া আমার মনে হইতেছিল, এ-দৃশ্য যেন ইহজগতের নহে, কিংবা যেন কোন্‌ অতীত যুগ হইতে ছিঁড়িয়া আনিয়া অর্ধ-ঘুমন্ত দৃশ্যটাকে কেহ এখানে ফেলিয়া দিয়া গিয়াছে। বর্তমান পৃথিবীর সঙ্গে ইহার কোনও যোগ নাই, চন্দ্রাস্ত হইলেই অস্পষ্ট স্বপ্নের মতো ইহা শূন্যে মিলাইয়া যাইবে।

    এ বন রাত্রিকালে খুব নিরাপদ নহে জানিতাম, ফেউয়ের ডাকও স্বকর্ণে শুনিয়াছি; কিন্তু তবু এক অদৃশ্য মায়া আমাকে ধরিয়া রাখিয়াছিল। কিছুক্ষণ এদিক্‌-ওদিক্‌ ঘুরিয়া বেড়াইবার পর একটি গাছের ছায়ায় পাথরের বেদীর উপর বসিয়া পড়িলাম। নিস্তব্ধ রাত্রি। মাঝে মাঝে মৃদু বাতাসে গাছের পাতা অল্প নড়িতেছে; দু’-একটা ফল বৃন্তচ্যুত হইয়া টুপটাপ করিয়া মাটিতে পড়িতেছে। ইহা ছাড়া জগতে আর শব্দ নাই।

    আমি ভিন্ন এ-বনে আরও কেহ আছে। বনভূমির উপর  আলো ও ছায়ার যে ছক পাতা রহিয়াছে, তাহার উপর একটি নিঃশব্দে সঞ্চরমাণ শুভ্রমূর্তি মাঝে মাঝে চোখে পড়িতেছে। মূর্তি কখনও তরুচ্ছায়ার অন্ধকারে মিলাইয়া যাইতেছিল, কখনও অবাস্তব কল্পনার মতো চন্দ্রালোক-কুহেলি ভিতর দিয়া চলিয়া যাইতেছিল। ক্রমে একটি ক্ষীণ তন্দ্রামধুর কণ্ঠস্বর কানে আসিতে লাগিল,— ঐ ছায়ামূর্তি গান করিতেছে। গানের কথাগুলি ধরা গেল না, কিন্তু সুরটি পরিচিত, যেন পূর্বে কোথায় শুনিয়াছি। ঘুম-পাড়ানী ছড়ার মতো সুর, কিন্তু প্রাণের সমস্ত তন্ত্রী চির-পরিচয়ের আনন্দে ঝংকৃত করিয়া তুলে।

    গান ক্রমশ নিকটবর্তী হইতে লাগিল। এই গান যতই কাছে আসিতে লাগিল, আমার শরীরের স্নায়ুমণ্ডলেও এক অপূর্ব ব্যাপার ঘটিতে আরম্ভ করিল। সে অবস্থা বর্ণনা করি এমন সাধ্য আমার নাই। সে কি তীব্র অনুভূতি! আনন্দের কোন্‌ উদ্দামতম অবস্থায় মানুষের শরীরে এমন ব্যাপার ঘটিতে পারে জানি না, কিন্তু মনে হইল, দেহের স্নায়ুগুলা এবার অসহ্য হর্ষবেগে ছিঁড়িয়া-খুঁড়িয়া একাকার হইয়া যাইবে। — যে গান গাহিতেছিল, সে নারী এবং যে ভাষায় গান গাহিতেছিল তাহা বাংলা; কিন্তু সে জন্য নহে। আমার সমস্ত অন্তরাত্মা যে সংক্ষুব্ধ সমুদ্রের মতো আলোড়িত হইয়া উঠিয়াছিল, তাহার অন্য কারণ ছিল। এই গান এই কণ্ঠে গীত হইতে আমি পূর্বে শুনিয়াছি— বহুবার শুনিয়াছি। ইহার প্রত্যেকটি শব্দ আমার কাছে পুরাতন। কিন্তু তফাত এই যে, যে-ভাষায় এ গান পূর্বে শুনিয়াছিলাম, তাহা বাংলাভাষা নহে। সে ভাষা ভুলিয়া গিয়াছি, কিন্তু গান ভুলি নাই! কোথায় অন্তরের কোন্‌ নির্জন কন্দরে এতকাল লুকাইয়া ছিল, শুনিবামাত্র প্রতিধ্বনির মতো জাগিয়া উঠিল। গানের কথাগুলি বাংলায় রূপান্তরিত হইয়া অসংযুক্ত ছড়ার মতো প্রতীয়মান হয়, কিন্তু একদিন উহারই ছন্দে আমার বুকের রক্ত নৃত্য করিয়া উঠিত। গানের কথাগুলি এইরূপ :

    বনের চিতা মেরেছে মোর স্বামী

    ধারালো তীর হেনে!

    চামড়া তাহার আমায় দেবে এনে

    পারবো গায়ে আমি।

    আমার চুলে বিনিয়ে দেব, ওরে,

    তার ধনুকের ছিলা,

    স্বামী আমার, — নিটোল দেহ তার

    কঠিন যেন শিলা!

    গায়িকা আরও কাছে আসিতে লাগিল। আমি দাঁড়াইয়া উঠিয়া রোমাঞ্চিত-দেহে প্রতীক্ষা করিতে লাগিলাম। ওঃ, কত কল্পান্ত পরে সে ফিরিয়া আসিল! আমার প্রিয়া— আমার সঙ্গিনী— আমার রুমা! এত দিন কি তাহারই প্রতীক্ষায় নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করিতেছিলাম?

    যে তরুচ্ছায়ার নিম্নে আমি দাঁড়াইয়াছিলাম, সে গাহিতে গাহিতে ঠিক সেই ছায়ার কিনারায় আসিয়া দাঁড়াইল। আমাকে সে দেখিতে পায় নাই, চাঁদের দিকে চোখ তুলিয়া গাহিল,—

    স্বামী আমার,— নিটোল দেহ তার

    কঠিন যেন শিলা!

    তাহার উন্নমিত মুখের পানে চাহিয়া আর আমার হৃদয় ধৈর্য মানিল না। আমি বাঘের মতো লাফাইয়া গিয়া তাহার হাত ধরিলাম। কথা বলিতে গেলাম, কিন্তু সহসা কিছুই বলিতে পারিলাম না। যে ভাষায় কথা বলিতে চাই, সে ভাষার একটা শব্দও স্মরণ নাই। অবশেষে অতি কষ্টে যেন অর্ধজ্ঞাত বিদেশী ভাষায় কথা কহিতেছি, এমনই ভাবে বাংলায় বলিলাম, “তুমি রুমা— আমার রুমা!”

    তাহার গান থামিয়া গিয়াছিল, সে ভয়-বিস্ফারিত নয়নে চাহিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল, “কে? কে?”

    তাহার মুখের অত্যন্ত কাছে মুখ লইয়া গিয়া বলিলাম, “আমি, আমি! রুমা, চিনতে পারছ না?”

    সভয় ব্যাকুল-কণ্ঠে সে বলিল, “না। কে তুমি? তোমাকে আমি চিনি না। হাত ছেড়ে দাও!”

    জলবিম্ব যেমন তরঙ্গ-আঘাতে ভাঙিয়া যায়, তেমনই এক মুহূর্তে আমার মোহ-বুদ্বুদ ভাঙিয়া গেল। প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খাইয়া বর্তমান জগতে ফিরিয়া আসিলাম। তাহার হাত ছাড়িয়া দিয়া লজ্জিত অপ্রতিভভাবে বলিলাম, “মাপ করুন। আমার ভুল হয়েছিল।”

    রুমা চিত্রার্পিতার মতো স্থির অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে চাহিয়া রহিল। আমিও তাহার পানে চাহিলাম। এই আমার সেই রুমা! পরিধানে সাদা শালের শাড়ি, আর একটি ত্রিকোণ শুভ্র শাল স্কন্ধ বেষ্টন করিয়া বুকের উপর ব্রুচ দিয়া আটা, পায়ে সাদা চামড়ার জুতা। মস্তক অনাবৃত, কালো কেশের রাশি কুণ্ডলিত আকারে গ্রীবামূলে লুটাইতেছে। মুখখানি কুমুদের মতো ধবধবে সাদা, বয়স বোধ করি আঠারো-উনিশের বেশি নহে— একটি তরুণী রূপসী শিক্ষিতা বাঙালী মেয়ে!

    কিন্তু না, এ আমার সেই রুমা! যাহাকে আমি তাহার স্বজাতির ভিতর হইতে কাড়িয়া আনিয়াছিলাম, যে আমার সন্তান গর্ভে ধারণ করিয়াছিল, এ সেই রুমা! আজি ছদ্মবেশ ধারণ করিয়া সে আমার কাছে আসিল? আমাকে সে চিনিতে পারিল না?

    আমার গলার পেশীগুলি সংকুচিত হইয়া শ্বাসরোধের উপক্রম করিল। আমি রুদ্ধস্বরে আবার বলিয়া উঠিলাম, “রুমা, চিনতে পারছ না?”

    রুমা স্বপ্নাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল, মোহাবিষ্ট স্বরে কহিল, “আমার নাম রমা।”

    “না— না— না, তুমি রুমা! আমার রুমা! মনে নেই, গুহার মধ্যে আমরা থাকতুম, ওপরে পাহাড়, নীচে উপত্যকা? তুমি গান গাইতে— যে গান এখনই গাইছিলে, সেই গান গাইতে, মনে নেই?”

    রুমার দুই চক্ষু আরও তন্দ্রাতুর হইয়া আসিল। ঠোঁট দুটি একটু নড়িল, বলিল, “মনে পড়ে না—কবে— কোথায়…”

    মাথার টুপিটি অধীরভাবে খুলিয়া ফেলিয়া আমি ব্যগ্রস্বরে কহিতে লাগিলাম, “মনে পড়ে না? সেই উপত্যকায় তোমরা একদল যাযাবর এসেছিলে, তোমাদের সঙ্গে ঘোড়া উট ছিল, তোমরা আগুন জ্বেলে মাংস সিদ্ধ করে খেতে। হ্রদের  জলে যে লম্বা ঘাস জন্মাতো, তার শস্য থেকে চাল তৈরি করতে তুমিই যে আমায় শিখিয়েছিলে। ভেড়ার লোম থেকে কাপড় বোনবার কৌশল যে আমি তোমার কাছ থেকেই শিখেছিলুম! মনে পড়ে না? একদিন অন্ধকার রাত্রিতে আমরা তোমাদের আক্রমণ করলুম! তোমার দলের সব পুরুষ মরে গেল! তোমাকে নিয়ে আমি যখন পালাচ্ছিলুম, তুমি লোহার ছুরি দিয়ে আমার কপালে ঠিক এইখানে মারলে!”

    কপালের দিকেই রুমা একদৃষ্টে তাকাইয়া ছিল। আমার মনে ছিল না যে, কপালের ঠিক ঐ স্থানটিতেই আমার একটা রক্তবর্ণ জড়ুল আছে। কপালে হাত পড়িতেই স্মরণ হইল, নিজেই চমকিয়া উঠিলাম। বহু পূর্বজন্মে যেখানে রুমার ছুরিকাঘাতে ক্ষত হইয়াছিল, প্রকৃতির দুর্জ্ঞেয় বিধানে ইহজন্মে তাহা রক্তবর্ণ জড়ুলরূপ ধরিয়া দেখা দিয়াছে! রুমা সেই চিহ্নটার দিকে নির্নিমেষনেত্রে চাহিয়া হঠাৎ চিৎকার করিয়া আমার বুকের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল, “গাক্কা! গাক্কা!”

    গাক্কা! হাঁ, ঐ বিকট শব্দটাই তখন আমার নাম ছিল। বজ্রকঠিন বন্ধনে তাহাকে বুকের ভিতর চাপিয়া লইলাম, বলিলাম, “হ্যাঁ, গাক্কা— তোমার গাক্কা। চিনতে পেরেছ, রুমা! ওঃ, আমার জন্মজন্মান্তরের রুমা!”

    কতক্ষণ এইভাবে কাটিল, বলিতে পারি না। এক সময় সযত্নে তাহার মুখখানি বুকের উপর হইতে তুলিয়া ধরিয়া দেখিলাম,— রুমা মূর্ছা গিয়াছে।

    তিত্তিকে লইয়া হুড়ার সহিত আমার যুদ্ধ অনিবার্য হইয়া উঠিয়াছিল। তিত্তিকে আমি ভালোবাসিতাম না, তাহাকে দেখিলে আমার বুকের রক্ত গরম হইয়া উঠিত না। কিন্তু সে ছিল আমাদের জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠা যুবতী, — সুন্দরী-কুলের রানী। আর আমি ছিলাম যুবকদের মধ্যে প্রধান, আমার সমকক্ষ কেহ ছিল না। সুতরাং তিত্তিকে যে আমি গ্রহণ করিব এ বিষয়ে কাহারও মনে কোনও সন্দেহ ছিল না— আমারও ছিল না।

    আমাদের গোষ্ঠীর মধ্যে নারীর সংখ্যা কমিয়া গিয়াছিল। আমরা জোয়ান ছিলাম প্রায় দুই শত, কিন্তু গ্রহণযোগ্য যুবতী ছিল মাত্র পঞ্চাশটি। তাই নারী লইয়া যুবকদের মধ্যে বিবাদ-বিসংবাদ আরম্ভ হইয়া গিয়াছিল। আমাদের ডাইনী বুড়ি রিক্‌খা তাহার গুহার সম্মুখের উঁচু পাথরের উপর পা ছাড়াইয়া বসিয়া দুলিয়া দুলিয়া সমস্ত দিন গান করিত—

    “আমাদের দেশে মেয়ে নেই! আমাদের ছেলেদের সঙ্গিনী নেই! এ জাত মরবে— এ জাত মরবে! হে পাহাড়ের দেবতা, বর্ষার স্রোতে যেমন পোকা ভেসে আসে, তেমনই অসংখ্য মেয়ে পাঠাও। এ জাত মরবে! মেয়ে নেই— মেয়ে নেই!…”

    রিক্‌খার দন্তহীন মুখের স্খলিত কথাগুলি গুহার মধ্যে প্রতিধ্বনিত হইয়া অশরীরী দৈববাণীর মতো বাতাসে ঘুরিয়া বেড়াইত।

    সঙ্গিনীর জন্য সকলে পরস্পর লড়াই করিত বটে, কিন্তু তিত্তির দেহে কেহ হস্তক্ষেপ করিতে সাহস করে নাই। দূর হইতে লোলুপ ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে চাহিয়া সকলে সরিয়া যাইত। তিত্তির রূপ দেখিবার মতো বস্তু ছিল। উজ্জ্বল নব-পল্লবের মতো বর্ণ, কালো হরিণের মতো চোখ, কঠিন নিটোল যৌবনোদ্ভিন্ন দেহ— ন্যগ্রোধপরিমণ্ডলা! তাহার প্রকৃতিও ছিল অতিশয় চপল। সে নির্জন পাহাড়ের মধ্যে গিয়া তরুবেষ্টিত কুঞ্জের মাঝখানে আপন মনে নৃত্য করিত। নৃত্য করিতে করিতে তাহার অজিন শিথিল হইয়া খসিয়া পড়িত, কিন্তু তাহার নৃত্য থামিত না। বৃক্ষগুল্মের অন্তরাল হইতে অদৃশ্য চক্ষু তাহার নিরাবরণ দেহ বিদ্ধ করিত। কিন্তু তিত্তি দেখিয়াও দেখিত না— শুধু নিজ মনে অল্প অল্প হাসিত। সে ছিল কুহকময়ী চিরন্তনী নারী।

    আমার মন ছিল শিকারের দিকে, তাই আমি তিত্তির চপলতা ও স্বৈরাচার গ্রাহ্য করিতাম না। কিন্তু ক্রমে আমারও অসহ্য হইয়া উঠিল। তাহার কারণ হুড়া। হুড়া ছিল আমারই মতো একজন যুবক, কিন্তু সে অন্যান্য যুবকদের মতো আমাকে ভয় করিত না। সে অত্যন্ত হিংস্র ও ক্রূরপ্রকৃতির ছিল, তাই শক্তিতে আমার সমকক্ষ না হইলেও আমি তাহাকে মনে মনে সম্ভ্রম করিয়া চালিতাম। সেও আমাকে ঘাঁটাইত না, যথাসম্ভব এড়াইয়া চলিত। কিন্তু তিত্তিকে লইয়া সে এমন ব্যবহার আরম্ভ করিল যে, আমার অহংকারে ভীষণ আঘাত লাগিল। সে নিঃসংকোচ তিত্তির পাশে গিয়া বসিত, তাহার হাত ধরিয়া টানাটানি করিত, চুল ধরিয়া টানিত, তাহার কান হইতে পাকা বদরী ফলের অবতংস দাঁত দিয়া খুলিয়া খাইয়া ফেলিত। তিত্তিও হাসিত, মারিত, ঠেলিয়া ফেলিয়া দিত, কিন্তু সত্যিকার ক্রোধ প্রকাশ করিয়া হুড়াকে নিরুৎসাহ করিত না।

    এইরূপে হুড়ার সহিত আমার লড়াই অনিবার্য হইয়া পড়িয়াছিল।

    সেদিন প্রকাণ্ড একটা বরাহের পিছনে পিছনে বহু ঊর্ধ্বে পাহাড়ের প্রায় চূড়ার কাছে আসিয়া পড়িয়াছিলাম। হাতে তীরধনুক ছিল। কিন্তু বরাহটাকে মারিতে পারিলাম না। সোজা যাইতে যাইতে সহসা সে একটা বিবরের মধ্যে অন্তর্হিত হইল। হতাশ হইয়া ফিরিতেছি, এমন সময় চোখে পড়িল, নীচে কিছুদূরে একটি সমতল পাথরের উপর দু’টি মানুষ পরস্পরের অত্যন্ত কাছাকাছি বসিয়া আছে। স্থানটি এমনই সুরক্ষিত যে, উপর হইতে ছাড়া অন্য কোন দিক্‌ হইতে দেখা যায় না। মানুষ দু’টির একটি স্ত্রী, অন্যটি পুরুষ। ইহারা কে, চিনিতে বিলম্ব হইল না— তিত্তি এবং হুড়া! তিত্তির মাথা হুড়ার স্কন্ধের উপর ন্যস্ত, হুড়ার একটা হাত তিত্তির কোমর জড়াইয়া আছে। দুইজনে মৃদুকণ্ঠে হাসিতেছে ও গল্প করিতেছে।

    আমি সাবধানে পিঠ হইতে হরিণের শিঙের তীরটি বাছিয়া লইলাম। এটি আমার সবচেয়ে ভালো তীর, আগাগোড়া হরিণের শিং দিয়া তৈয়ারি, যেমন ধারালো তেমনই ঋজু। এ তীরের লক্ষ্য কখনও ব্যর্থ হয় না। আজ তিত্তি ও হুড়াকে এক তীরে গাঁথিয়া ফেলিব।

    ধনুকে তীর সংযোগ করিয়াছি, এমন সময় তিত্তি মুখ ফিরাইয়া উপর দিকে চাহিল। পরক্ষণেই অস্ফুট চিৎকার করিয়া সে বিদ্যুদ্বেগে উঠিয়া একটা প্রস্তরখণ্ডের পিছনে লুকাইল। হুড়াও সঙ্গে সঙ্গে উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিল, আমাকে দেখিয়া সে হিংস্র জন্তুর মতো দাঁত বাহির করিল; গর্জন করিয়া কহিল, “গাক্কা, তুই চলে যা, আমার কাছে আসিস্‌ না। আমি তোকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবো!”

    আমি ধনুঃশর ফেলিয়া নীচে নামিয়া গেলাম, হুড়ার সম্মুখে দাঁড়াইয়া গর্বিতভাবে বলিলাম, “হুড়া, তুই পালিয়ে যা! আর যদি কখনও তিত্তির গায়ে হাত দিবি, তোর হাত-পা মুচড়ে ভেঙে পাহাড়ের ডগা থেকে ফেলে দেব। পাহাড়ের ফাঁকে মরে পড়ে থাকবি, শকুনি তোর পচা মাংস ছিঁড়ে খাবে।”

    হুড়ার চোখ দু’টা রক্তবর্ণ হইয়া ঘুরিতে লাগিল, সে দন্ত কড়মড় করিয়া বলিল, “গাক্কা, তিত্তি আমার! সে তোকে চায় না, আমাকে চায়। তুই যদি তার দিকে তাকাস্‌, তোর চোখ উপড়ে নেব। কেন এখানে এসেছিস্‌, চলে যা! তিত্তি আমার, তিত্তি আমার!” — বলিয়া ক্রোধান্ধ হুড়া নিজের বক্ষে সজোরে চপেটাঘাত করিতে লাগিল।

    আমি বলিলাম, “তুই তিত্তিকে আমার কাছ থেকে চুরি করে নিয়েছিস্‌। যদি পারিস্‌ কেড়ে নে; — আয়, লড়াই কর্‌!”

    হুড়া দ্বিতীয় আহ্বানের অপেক্ষা করিল না, বন্য শূকরের মতো আমাকে আক্রমণ করিল।

    তখন সেই চত্বরের ন্যায় সমতল ভূমির উপর ঘোর যুদ্ধ বাধিল। দুইটি ভল্লুক সহসা ক্ষিপ্ত হইয়া গেলে যেভাবে যুদ্ধ করে, আমরাও সেইভাবে যুদ্ধ করিলাম। সেই আদিম যুদ্ধ, যখন নখ-দন্ত ভিন্ন অন্য অস্ত্র প্রয়োজন হইত না। হুড়া কামড়াইয়া আমার দেহ ক্ষতবিক্ষত করিয়া দিল, সর্বাঙ্গ দিয়া রক্ত ঝরিতে লাগিল। কিন্তু পূর্বেই বলিয়াছি, শক্তিতে সে আমার সমকক্ষ ছিল না। আমি ধীরে ধীরে তাহাকে নিস্তেজ করিয়া আনিলাম। তারপর তাহাকে মাটিতে ফেলিয়া তাহার পিঠের উপর চড়িয়া বসিলাম।

    নিকটেই একখণ্ড পাথর পড়িয়াছিল। দুই হাতে সেটা তুলিয়া লইয়া হুড়ার মাথা গুঁড়া করিয়া দিবার জন্য ঊর্ধ্বে তুলিয়াছি, হঠাৎ বিকট চিৎকার করিয়া রাক্ষসীর মতো তিত্তি আমার ঘাড়ের উপর লাফাইয়া পড়িল। দুই হাতের আঙুল আমার চোখের মধ্যে পুরিয়া দিয়া প্রখর দন্তে আমার একটা কান কামড়াইয়া ধরিল।

    বিস্ময়ে, যন্ত্রণায় আমি হুড়াকে ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইলাম, তিত্তি কিন্তু গিরটিটির মতো আমার পিঠ আঁকড়াইয়া রহিল। চোখ ছাড়িয়া দিয়া গলা জড়াইয়া ধরিল, কিন্তু কান ছাড়িল না। ওদিকে হুড়াও ছাড়া পাইয়া সম্মুখ হইতে আক্রমণ করিল। দুইজনের মধ্যে পড়িয়া আমার অবস্থা শোচনীয় হইয়া উঠিল।

    তিত্তিকে পিঠ হইতে ঝাড়িয়া ফেলিবার চেষ্টা করিলাম, কিন্তু বৃথা চেষ্টা। হাত-পা দিয়া সে এমনভাবে জড়াইয়া ধরিয়াছে যে, সে নাগপাশ হইতে মুক্ত হওয়া একেবারে অসম্ভব। তাহার উপর কান কামড়াইয়া আছে, ছাড়ে না। এদিকে হুড়া আমার পরিত্যক্ত প্রস্তরখণ্ডটা তুলিয়া লইয়া আমারই মস্তক চূর্ণ করিবার উদ্যোগ করিতেছে। আমার আর সহ্য হইল না, রণে ভঙ্গ দিলাম। রাক্ষসীটাকে পিঠে করিয়াই পলাইতে আরম্ভ করিলাম।

    অসমতল পাহাড়ের উপর একটা উলঙ্গ উন্মত্ত ডাকিনীকে পিঠে লইয়া দৌড়ানো সহজ কথা নহে। কিন্তু কিছুদূর গিয়া সে আপনা হইতেই আমাকে ছাড়িয়া দিল। আমার কর্ণ ত্যাগ করিয়া পিঠ হইতে পিছলাইয়া নামিয়া পড়িল। আমি আর ফিরিয়া তাকাইলাম না। পিছনে তিত্তি চিৎকার করিয়া হাসিয়া করতালি দিয়া নাচিতে লাগিল। —

    “গাক্কা ভীতু, গাক্কা কাপুরুষ। গাক্কা মরদ নয়! সে কোন্‌ সাহসে তিত্তিকে পেতে চায়? তিত্তি হুড়ার বৌ! হুড়া তিত্তিকে গাক্কার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে, তিত্তির ভয়ে গাক্কা পালিয়েছে। গাক্কা ভীতু! গাক্কাকে দেখে সবাই হাসবে। গাক্কা আর মানুষের কাছে মুখ দেখাবে না। গাক্কা কাপুরুষ! গাক্কা মরদ নয়!”— তিত্তির এই তীব্র শ্লেষ রক্তাক্ত কর্ণে শুনিতে শুনিতে আমি ঊর্ধ্বশ্বাসে পলাইলাম।

    সেই দিন, সূর্য যখন উপত্যকার ওপারে পাহাড়ের আড়ালে ঢাকা পড়িল, তখন আমি চুপি চুপি নিজের গুহা হইতে পাথরের ফলকযুক্ত বর্শাটি লইয়া গোষ্ঠী পরিত্যাগ করিলাম। তিত্তিকে হারাইয়া আমার দুঃখ হয় নাই, কিন্তু গ্রামের সকলে, যাহারা এত কাল আমাকে ভয় করিয়া চলিত, তাহারা আমার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া উপহাস করিবে, তিত্তি করতালি দিয়া হাসিবে, ইহা সহ্য করা অপেক্ষা গোষ্ঠী ত্যাগ করাই শ্রেয়ঃ। উপত্যকার পরপারে ঐ যেখানে সূর্য ঢাকা পড়িল, ওখানে একটি ছোট গুহা আছে, একদিন শিকার করিতে গিয়া উহা আবিষ্কার করিয়াছিলাম। গুহার পাশ দিয়া একটি সরু ঝরনা নামিয়াছে, তাহার  জল চাকভাঙা মধুর মতো মিষ্ট। ওদিকে শিকারও বেশি পাওয়া যায়। এদিক হইতে তাড়া খাইয়া প্রায় সকল জন্তুই ওদিকে গিয়া জমা হয়, সুতরাং ঐখানে গিয়া বাস করিব।

    গ্রাম ছাড়িয়া যখন চলিয়া আসিতেছি, তখন শুনিতে পাইলাম, বুড়ি ডাইনী রিক্‌খা তাহার চাতালে বসিয়া গাহিতেছে—

    “মেয়ে নেই! মেয়ে নেই! আমাদের ছেলেরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করে মরছে। এ জাত বাঁচবে না। হে পাহাড়ের দেবতা, মেয়ে পাঠাও…”

    উপত্যকা পার হইয়া ওদিকের পাহাড়ে পৌঁছিতে মধ্যরাত্রি অতীত হইয়া গেল। আকাশে চাঁদ ছিল। চাঁদটা ক্রমে ভরাট হইয়া আসিতেছে, দুই-তিন দিনের মধ্যেই নিটোল আকার ধারণ করিবে। এখন শরৎকাল, আকাশে মেঘ সাদা ও হাল্‌কা হইয়াছে, আর বৃষ্টি পড়ে না। উপত্যকার মাঝখানে হ্রদ,—ঠিক মাঝখানে নহে, একটু পশ্চিম দিক্‌ ঘেঁষিয়া, — তাহার কিনারায় লম্বা লম্বা ঘাস জন্মিয়াছে। ঘাসের আগায় শীষ গজাইয়া হেলিয়া পড়িয়াছে। আর কিছু দিন পরে ঐ শীষ পীতবর্ণ হইলে উত্তর হইতে পাখিরা আসিতে আরম্ভ করিবে।

    হ্রদের ধার দিয়া যাইতে যাইতে দেখিলাম, হরিণের দল জল পান করিয়া চলিয়া গেল। তাহাদের মসৃণ গায়ে চাঁদের  আলো চকচক করিয়া উঠিল। ক্রমে যেখানে আমার ক্ষীণা ঝরনাটি হ্রদের সঙ্গে মিশিয়াছে, সেইখানে আসিয়া পড়িলাম। এদিকে হ্রদের জল প্রায় পাহাড়ের কোল পর্যন্ত আসিয়া পড়িয়াছে, মধ্যে ব্যবধান পঞ্চাশ হাতের বেশি নহে। সম্মুখেই পাহাড়ের জঙ্ঘার একটা খাঁজের মধ্যে আমার গুহা। আমি ঝরনার পাশ দিয়া উঠিয়া যখন আমার নূতন গৃহের সম্মুখে পৌঁছিলাম, তখন চাঁদের অপরিপুষ্ট চক্রটি গুহার পিছনে উচ্চ পাহাড়ের অন্তরালে লুকাইল।

    নূতন গৃহে নূতন আবেষ্টনীর মধ্যে আমি একাকী মনের আনন্দে বাস করিতে লাগিলাম। কাহারও সহিত দেখা হয় না— হরিণের অন্বেষণেও এদিকে কেহ আসে না। তাহার প্রধান কারণ, পাহাড়-দেবতার করাল মুখের এত কাছে কেহ আসিতে সাহস করে না। আমাদের জাতির মধ্যে এই চক্রাকৃতি পর্বতশ্রেণী একটি অতিকায় অজগর বলিয়া পরিচিত ছিল, এই অজগরই আমাদের পর্বত-দেবতা। পর্বত-দেবতার মুখ ছিল দংষ্ট্রাবহুল অন্ধকার একটা গহ্বর। বস্তুত, দূর হইতে দেখিলে মনে হইত, যেন শল্কাবৃত বিশাল একটা সরীসৃপ কুণ্ডলিত হইয়া তাহার ব্যাদিত মুখটা মাটির উপর রাখিয়া শুইয়া আছে। প্রাণান্তেও কেহ এই গহ্বরমুখের কাছে আসিত না।

    গ্রীষ্মের অবসানে যখন আকাশে মেঘ আসিয়া গর্জন করিত, তখন আমাদের পাহাড়-দেবতাও গর্জন করিতেন। উপত্যকা জলে ভরিয়া উঠিলে তৃষ্ণার্ত দেবতা ঐ মুখ দিয়া জল শুষিয়া লাইতেন। আমাদের গোষ্ঠী হইতে বর্ষা-ঋতুর প্রাক্কালে দেবতার প্রীত্যর্থে জীবন্ত জীবজন্তু উৎসর্গ করা হইত। দেবতার মুখের নিকটে কেহ যাইতে সাহসী হইত না— দূর হইতে দেবতাকে উদ্দেশ করিয়া জন্তুগুলা ছাড়িয়া দিত। জন্তুগুলাও দেবতার ক্ষুধিত নিশ্বাসের আকর্ষণে ছুটিয়া গিয়া তাঁহার মুখে প্রবেশ করিত। দেবতা প্রীত হইয়া তাহাদিগকে ভোজন করিতেন।

    দেবতার এই ভোজনরহস্য কেবল আমি ধরিয়া ফেলিয়াছিলাম; কিন্তু কাহাকেও বলি নাই। আমি দেখিয়ছিলাম, জন্তুগুলা কিছুকাল পরে দেবতার মুখ হইতে অক্ষতদেহে বাহির হইয়া আসে এবং স্বচ্ছন্দে বিচরণ করিতে করিতে পাহাড়ে ফিরিয়া যায়। পর্বত-দেবতার মুখ যে প্রকৃতপক্ষে একটা বড় গহ্বর ভিন্ন আর কিছুই নহে, তাহা আমি বেশ বুঝিয়াছিলাম, তাই তাহার নিকট যাইতে আমার ভয় করিত না। একবার কৌতূহলী হইয়া উহার ভিতরেও প্রবেশ করিয়াছিলাম, কিন্তু গহ্বরের মুখ প্রশস্ত হইলেও উহার ভিতরটা অত্যন্ত অন্ধকার, এজন্য বেশিদূর অগ্রসর হইতে পারি নাই। কিন্তু রন্ধ্র যে বহুদূর বিস্তৃত, তাহা বুঝিতে পারিয়াছিলাম।

    এই পাহাড়-দেবতার মুখ আমার গুহা হইতে প্রায় তিন শত হাত দূরে উত্তরে পর্বতের সানুদেশে অবস্থিত। এ-প্রান্তে দেবতার ভয়ে কেহ আসে না, অথচ এদিকে শিকারের যত সুবিধা, অন্য দিকে তত নহে। রাত্রিতে ঝরনা ও হ্রদের মোহনায় লুকাইয়া থাকিলে যত ইচ্ছা শিকার পাওয়া যায়— শিকারের জন্য পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরিয়া বেড়াইতে হয় না। আমার গুহাটি এমনই চমৎকার যে, অত্যন্ত কাছে আসিলেও ইহাকে গুহা বলিয়া চেনা যায় না। গুহার মুখটি ছোট— লতাপাতা দিয়া ঢাকা; কিন্তু ভিতরটি বেশ সুপ্রসর। ছাদ উঁচু— দাঁড়াইলে মাথা ঠেকে না; মেঝেটি একটি আস্ত সমতল পাথর দিয়া তৈয়ারি। তাহার উপর লম্বাভাবে শুইয়া রন্ধ্রপথে মুখ বাড়াইলে সমস্ত উপত্যকাটি চোখের নীচে বিছাইয়া পড়ে। শীতের সময় একটা পাথর দিয়া স্বচ্ছন্দে গুহামুখ বন্ধ করিয়া দেওয়া যায়, ঠাণ্ডা বাতাস প্রবেশ করিতে পারে না। তাহা ছাড়া রাত্রিকালে হিংস্র জন্তুর অতর্কিত আক্রমণও এই উপায়ে প্রতিরোধ করা যায়।

    এইখানে নিঃসঙ্গ শান্তিতে আমার কয়েকদিন কাটিয়া গেল। আকাশের চাঁদ নিটোল পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়া আবার ক্ষীণ হইতে হইতে একদিন মিলাইয়া গেল। হ্রদের কিনারায় লম্বা ঘাসের শস্য পাকিয়া রং ধরিতে আরম্ভ করিল। পাখির ঝাঁক একে একে আসিয়া হ্রদের  জলে পড়িতে লাগিল; তাহাদের মিলিত কণ্ঠের কলধ্বনি আমার নিশীথ নিদ্রাকে মধুর করিয়া তুলিল।

    একদিন অপরাহ্ণে, আমার গুহার পাশে ঝরনা যেখানে পাহাড়ের এক ধাপ হইতে আর এক ধাপে লাফাইয়া পড়িয়াছে, সেই পৈঠার উপর বসিয়া আমি একটা নূতন ধনুক নির্মাণ করিতেছিলাম। দুই দিন আগে একটা হরিণ মারিয়াছিলাম, তাহারই অন্ত্রে ধনুকের ছিলা করিব বলিয়া জলে ধুইয়া পরিষ্কার করিয়া রাখিয়াছিলাম। পাহাড়ে একপ্রকার মোটা বেত জন্মায়, তাহাতে খুব ভালো ধনুক হয়, সেই বেত একটা ভাঙিয়া আনিয়া শুকাইয়া রাখিয়াছিলাম। উপস্থিত আমার বর্শার ধারালো পাথরের ফলা দিয়া তাহারই দুই দিকে গুণ লাগাইবার খাঁজ কাটিতেছিলাম। অস্তমান সূর্যের  আলো আমার ঝরনার জলে রক্ত মাখাইয়া দিয়াছিল; নীচে হ্রদের জলে পাখিগুলি ডাকাডাকি করিতেছিল। ঝরনার চূর্ণ জলকণা নীচের ধাপ হইতে বাষ্পাকারে উঠিয়া অত্যন্ত মিঠাভাবে আমার অনাবৃত অঙ্গে লাগিতেছিল। মুখ নত করিয়া আমি আপন মনে ধনুকে গুণ-সংযোগে নিযুক্ত ছিলাম।

    হঠাৎ একটা অশ্রুতপূর্ব চিঁহি-চিঁহি শব্দে চোখ তুলিয়া উপত্যকার দিকে চাহিতেই বিস্ময়ে একেবারে নিম্পন্দ হইয়া গেলাম। এ কি! দেখিলাম, পাহাড়-দেবতার মুখবিবর হইতে পিপীলিকা-শ্রেণীর মতো একজাতীয় অদ্ভুত মানুষ ও ততোধিক অদ্ভুত জন্তু বাহির হইতেছে। এরূপ মানুষ ও এরূপ জন্তু জীবনে কখনও দেখি নাই।

    আগন্তুকগণ বহু নিম্নে উপত্যকায় ছিল, অতদূর হইতে আমাকে দেখিতে পাইবার কোনও সম্ভাবনা ছিল না। তথাপি আমি সন্তর্পণে বুকে হাঁটিয়া ঝরনার তীর হইতে আমার গুহায় ফিরিয়া আসিয়া লুকাইলাম। গুহার মধ্যে লুকাইয়া দ্বারপথে মুখ বাড়াইয়া নবাগতদিগকে দেখিতে লাগিলাম।

    মানুষ হইলেও ইহারা যে আমার সগোত্র নহে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না। বাহিরের কোনও অজ্ঞাত জগৎ হইতে রন্ধ্রপথে আমাদের রাজ্যে প্রবেশ করিয়াছে, তাহাও অস্পষ্টভাবে অনুভব করিলাম। কিন্তু যেখান হইতেই আসুক, এমন আশ্চর্য চেহারা ও বেশভূষা যে হইতে পারে তাহা কখনও কল্পনা করি নাই। জন্তুদের কথা পরে বলিব, প্রথমে মানুষগুলার কথা বলি। এই মানুষগুলার গায়ের রং আমাদের মতো মধুপিঙ্গল বর্ণ নহে— ধবধবে সাদা। ইহাদের চুল সূর্যাস্তের বর্ণচ্ছটার ন্যায় উজ্জ্বল, দেহ অতিশয় দীর্ঘ ও সুগঠিত। পশুচর্মের পরিবর্তে ইহাদের দেহ একপ্রকার শ্বেতবস্ত্রে আচ্ছাদিত। ইহারা সংখ্যায় সর্বসুদ্ধ প্রায় একশত জন ছিল, তাহার মধ্যে অর্ধেক নারী। নারীগণও পুরুষদের মতো উজ্জ্বল কেশযুক্ত ও দীর্ঘাকৃতি। তাহারা বস্ত্র দ্বারা বক্ষোদেশ আচ্ছাদিত করিয়া রাখিয়াছে। পুরুষদের হাতে ধনুর্বাণ ও ভল্ল আছে, ভল্লের ফলা সূর্যের আলোয় ঝকমক করিতেছে। বর্শার ফলা এমন ঝকমক করিতে পূর্বে কখনও দেখি নাই।

    ইহাদের সঙ্গে তিন প্রকার জন্তু রহিয়াছে। প্রথমত, একপ্রকার বিশাল অথচ শীর্ণকায় জন্তু— তাহাদের পিঙ্গলবর্ণ দেহ আশ্চর্যভাবে ঢেউখেলানো; দেহের সন্ধিগুলা যেন অত্যন্ত অযত্ন সহকারে সংযুক্ত হইয়াছে, মুখ কদাকার। পিঠের উপর প্রকাণ্ড কুঁজ। ইহাদের পৃষ্ঠে নানাপ্রকার দ্রব্য চাপানো রহিয়াছে। উদ্‌গ্রীবভাবে গলা বাড়াইয়া ইহারা মন্থরগতিতে চলিয়াছে। দ্বিতীয় জাতীয় জন্তু ইহাদের অপেক্ষা অনেক ছোট, তাহাদের দেহ রোমশ ও রক্তবর্ণ, আঁটসাঁট মজবুত গঠন। ইহারা দেখিতে ক্ষুদ্র বটে, কিন্তু পৃষ্ঠে বড় বড় বোঝা বহন করিয়া চলিয়াছে। উপরন্তু বহু মনুষ্য-শিশুও ইহাদের পিঠের উপর পা ঝুলাইয়া বসিয়া আছে। এই জন্তুগুলাই গুহামুখ হইতে হ্রদ দেখিয়া অদ্ভুত শব্দ করিয়াছিল।

    তৃতীয় শ্রেণীর জন্তু সর্বাপেক্ষা ক্ষুদ্র, দেখিতে কতকটা পাহাড়ী ছাগের মতো, কিন্তু ইহাদের দেহ ঘন রোমে আবৃত। এমন কি, ইহাদের রোম পেটের নীচে পর্যন্ত ঝুলিয়া পড়িয়াছে। ইহারা একসঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষিভাবে চলিয়াছে ও মাঝে মাঝে ‘ব্যা-ব্যা’ শব্দ করিতেছে।

    এই সকল জন্তুর আচরণে সর্বাপেক্ষা বিস্ময়ের বস্তু এই যে, ইহারা মানুষ দেখিয়া তিলমাত্র ভয় পাইতেছে না, বরং মানুষের সঙ্গে পরম ঘনিষ্ঠভাবে মিলিয়া মিশিয়া চলিয়াছে। মানুষ ও বন্যপশুর মধ্যে এরূপ প্রীতির সম্পর্ক স্থাপিত হইতে এই প্রথম দেখিলাম।

    ইহারা স্ত্রী-পুরুষ একত্র হইয়া কিছুক্ষণ কি জল্পনা করিল, তারপর সদলবলে আমার ঝরনার মোহানার দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল। বুঝিলাম, তাহারা এই স্থানেই ডেরাডাণ্ডা গাড়িবে বলিয়া মনস্থ করিয়াছে।

    ক্রমে সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছিল। দিবাশেষের নির্বাপিতপ্রায় আলোকে ইহারা ঠিক আমার গুহার নিম্নে— ঝরনার জল যেখানে পাহাড় হইতে নামিয়া স্বচ্ছ অগভীর স্রোতে উপত্যকার উপর দিয়া বহিয়া গিয়া হ্রদের জলে মিশিয়াছে, সেই স্থানে আসিয়া পশুগুলির পৃষ্ঠ হইতে ভার নামাইল। ভারমুক্ত পশুগুলি ঝরনার প্রবাহের পাশে কাতার দিয়া দাঁড়াইয়া তৃষ্ণার্তভাবে জল পান করিতে লাগিল।

    ইহারা আমার এত কাছে আসিয়া পড়িয়াছিল যে, এই প্রদোষালোকেও আমি প্রত্যেকের মুখ স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছিলাম। আমার গুহা হইতে লোষ্ট্র নিক্ষেপ করিলে বোধ করি তাহাদের মাথায় ফেলিতে পারিতাম। তাহাদের কথাবার্তাও স্পষ্ট শুনিতে পাইতেছিলাম, কিন্তু একবর্ণও বোধগম্য হইতেছিল না।

    রাত্রি হইল। তখন ইহারা এক আশ্চর্য ব্যাপার করিল। একখণ্ড পাথরের সহিত আর একখণ্ড অজ্ঞাত পদার্থ ঠোকাঠুকি করিয়া স্তূপীকৃত শুষ্ক কাষ্ঠে অগ্নি সংযোগ করিল। অগ্নি জ্বলিয়া অঙ্গারে পরিণত হইলে সেই অঙ্গারে মাংস পুড়াইয়া সকলে আহার করিতে লাগিল। দগ্ধ মাংসের একপ্রকার অপূর্ব গন্ধ আমার নাসারান্ধে প্রবেশ করিয়া জিহ্বাকে লালায়িত করিয়া তুলিল।

    রাত্রি গভীর হইলে ইহারা পশুগুলির দ্বারা অগ্নির চারিপাশে একটি বৃহৎ চক্রব্যূহ, রচনা করিল, তারপর সেই চক্রের ভিতর অগ্নির পাশে শয়ন করিয়া ঘুমাইয়া পড়িল। কেবল একজন লোক ধনুর্বাণ হাতে লইয়া ব্যূহের বাহিরে পরিক্রমণ করিতে লাগিল।

    ইহারা ঘুমাইল বটে, কিন্তু বিস্ময়ে উত্তেজনায় আমি সমস্ত রাত্রি জাগিয়া রহিলাম। এই বিচিত্র জাতির অতি বিস্ময়কর আচার-ব্যবহার মনে মনে আলোচনা করিতে করিতে তাহাদের ক্রমশ নির্বাণোন্মুখ অগ্নির দিকে চাহিয়া রাত্রি কাটাইয়া দিলাম।

    প্রাতঃকালে উঠিয়াই আগন্তুকরা কাজে লাগিয়া গেল। ইহারা অসাধারণ উদ্যমী; একদল পুরুষ উপত্যকার উপর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত বড় বড় পাথরের টুকরা গড়াইয়া আনিয়া প্রাচীর-নির্মাণে প্রবৃত্ত হইল, আর একদল ধনুর্বাণ-হস্তে শিকারের অন্বেষণে পাহাড়ে উঠিয়া গেল। অবশিষ্ট অল্পবয়স্ক বালকগণ পশুগুলাকে লইয়া উপত্যকার শষ্পাচ্ছাদিত অংশে চরাইতে লইয়া গেল। স্ত্রীলোকেরাও অলসভাবে বসিয়া রহিল না, তাহারা হ্রদের জলে নামিয়া লম্বা ঘাসের পাকা শীষগুলি কাটিয়া আনিয়া রৌদ্রে শুকাইতে লাগিল। এইরূপে মৌমাছি-পরিপূর্ণ মধুচক্রের মতো এই ক্ষুদ্র সম্প্রদায় কর্ম-প্রেরণায় চঞ্চল হইয়া উঠিল।

    দেখিতে দেখিতে আমার দৃষ্টির সম্মুখে চক্রাকৃতি প্রস্তর-প্রাচীর গড়িয়া উঠিল। সন্ধ্যার পূর্বেই প্রাচীর কোমর পর্যন্ত উঁচু হইল। কেবল হ্রদের দিকে দুই হস্ত-পরিমিত স্থান নির্গমনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হইল। সন্ধ্যার সময় শিকারীরা একটা বড় হরিণ ও দুটা শূকর মারিয়া বর্শাদণ্ডে ঝুলাইয়া লইয়া আসিল। তখন সকলে আনন্দ-কোলাহল সহকারে অগ্নি জ্বলিয়া সেই মাংস দগ্ধ করিয়া আহারের আয়োজন করিতে লাগিল।

    আর একটা অভিনব ব্যাপার লক্ষ্য করিলাম। নারীগণ একপ্রকার বর্তুলাকৃতি পাত্র কক্ষে লইয়া ঝরনার তীরে আসিতেছে এবং সেই পাত্রে জল ভরিয়া পুনশ্চ কক্ষে করিয়া লইয়া যাইতেছে। ইহারা কেহই ঝরনায় মুখ ডুবাইয়া কিংবা অঞ্জলি করিয়া জল পান করে না, প্রয়োজন হইলে সেই পাত্র হইতে জল ঢালিয়া তৃষ্ণা নিবারণ করে।

    আর একটা রাত্রি কাটিয়া গেল, নবাগতগণ উপনিবেশ স্থাপন করিয়া বাস করিতে লাগিল। ভাব দেখিয়া বোধ হইল, এই উপত্যকাটি তাহাদের বড়ই পছন্দ হইয়াছে, সুতরাং এ স্থান ত্যাগ করিয়া যাইবার আশু অভিপ্রায় তাহাদের নাই। আর একটা মনুষ্য জাতি যে সন্নিকটেই বাস করিতেছে, তাহা তাহারা জানিতে পারে নাই; এবং সেই জাতির এক পলাতক যুবা যে অলক্ষ্যে থাকিয়া অহরহ তাহাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করিতেছে, তাহা সন্দেহ করিবারও কোনও উপলক্ষ হয় নাই। দিনের বেলা আলো থাকিতে আমি কদাচ গুহা হইতে বাহির হইতাম না।

    এইরূপে আরও দুই দিন কাটিয়া গেল। বরাহদন্তের মতো বাঁকা চাঁদ আবার পশ্চিম আকাশে দেখা দিল।

    ইহাদের মধ্যে যে-সব রমণী ছিল, তাহারা সকলেই সমর্থা; বৃদ্ধা বা অকর্মণ্যা কেহ ছিল না। নারীগণ অধিকাংশই সন্তানবতী এবং কোনও-না-কোনও পুরুষের বশবর্তিনী; কিন্তু কয়েকটি আসন্নযৌবনা কিশোরী কুমারীও ছিল। ইহাদের ভিতর হইতে একটি কিশোরী প্রথম হইতেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল।

    এই কিশোরীর নাম আমি জানিতে পারিয়াছিলাম,— রুমা। রুমা বলিয়া ডাকিলেই সে সাড়া দিত। রুমার রূপ কেমন ছিল, তাহা আমি বলিতে পারিব না। যে-চোখে দেখিলে নিরপেক্ষ রূপবিচার সম্ভব হয়, আমি তাহাকে সে-চোখে দেখি নাই। আমি তাহাকে দেখিয়াছিলাম যৌবনের চক্ষু দিয়া— লোভের চক্ষু দিয়া। আমার কাছে সে ছিল আকাশের ঐ আভুগ্ন চন্দ্রকলাটির মতো সুন্দর। তিত্তি তাহার পায়ের নখের কাছে লাগিত না।

    এই রুমার চরিত্র অন্যান্য বালিকা হইতে কিছু স্বতন্ত্র ছিল। কৈশোরের গণ্ডি অতিক্রম করিয়া সে প্রায় যৌবনের প্রান্তে পদার্পণ করিয়াছিল, তাই তাহার চরিত্রে উভয় অবস্থার বিচিত্র সম্মিলন হইয়াছিল। সে অন্যান্য নারীদের সঙ্গে যথারীতি কাজ করিত বটে, কিন্তু একটু ফাঁক পাইলেই লুকাইয়া খেলা করিয়া লইত। তাহার সঙ্গিনী বা সখী কেহ ছিল না, সে একাকী খেলা করিতে ভালোবাসিত। কখনও হ্রদের জলে ঝাঁপাইয়া পড়িয়া সাঁতার কাটিত, সাঁতার কাটিতে কাটিতে বহুদূর পর্যন্ত চলিয়া যাইত। তাহাকে আসিতে দেখিয়া জলে ভাসমান পাখিগুলি উড়িয়া আর একস্থানে গিয়া বসিত। সে জলে ডুব দিয়া একেবারে তাহাদের মধ্যে গিয়া মাথা তুলিত, তখন পাখিরা ভয়সূচক শব্দ করিয়া ছত্রভঙ্গ হইয়া যাইত।

    কিন্তু এ খেলাও তাহার মনঃপূত হইত না। কারণ, তাহার দেখাদেখি অন্যান্য বালক-বালিকারা জলে পডিয়া সাঁতার দিতে আরম্ভ করিত। সে তখন  জল হইতে উঠিয়া সিক্ত কেশজাল হইতে জলবিন্দু মোচন করিতে করিতে অন্যত্র প্রস্থান করিত।

    কখনও একটু অবসর পাইলে সে চুপি চুপি কোনও পুরুষের পরিত্যক্ত ধনুর্বাণ লইয়া পাহাড়ে উঠিয়া যাইত। আমি কিছুক্ষণ তাহাকে দেখিতে পাইতাম না, তারপর আবার সে চুপি চুপি ফিরিয়া আসিত। দেখিতাম, চুলে বনফুলের গুচ্ছ পরিয়াছে, কর্ণে পক্ব ফলের দুল দুলাইয়াছে, কটিতে পুষ্পিত লতা জড়াইয়া দেহের অপূর্ব প্রসাধন করিয়াছে। ভীরু হরিণীর মতো এদিক্‌-ওদিক্‌ চাহিয়া জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখিত, তারপর ঈষৎ হাসিয়া ত্রস্ত চকিত পদে প্রস্থান করিত। আমি লক্ষ্য করিয়াছিলাম, সকলের অজ্ঞাতে একাকিনী কোনও কাজ করিতে পারিলেই সে খুশি হয়। ইহা যে তাহার বয়ঃসন্ধির একটা স্বভাবধর্ম, তাহা তখনও বুঝি নাই। কিন্তু আমার ব্যগ্র লোলুপ চক্ষু সর্বদাই তাহার পিছনে পিছনে ঘুরিতে থাকিত। এমন কি, রাত্রিকালে প্রস্তরব্যূহের মধ্যে ঠিক কোন্‌ স্থানটিতে সে শয়ন করিয়া ঘুমায়, তাহা পর্যন্ত আমার দৃষ্টি এড়াইতে পারে নাই!

    পাখিরা যেমন খড়কুটা দিয়া গাছের ডালে বাসা তৈয়ার করে, ইহারাও তেমন গাছের ডালপালা দিয়া ব্যূহের মধ্যে একপ্রকার কোটর নির্মাণ করিতে আরম্ভ করিয়াছিল, বোধ হয় অধিক শীতের সময় উহার মধ্যে রাত্রিবাস করিবার সংকল্প ছিল। কিন্তু সেগুলির নির্মাণ তখনও শেষ হয় নাই, তাই উপস্থিত মুক্ত আকাশের তলেই শয়ন করিতেছিল।

    ইহাদের আগমনের পঞ্চম দিনই বিশেষ স্মরণীয় দিন। আমার মনের মধ্যে যে অভিসন্ধি কয়েকদিন ধরিয়া ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হইয়া উঠিতেছিল, সেইদিন মধ্যরাত্রি উত্তীর্ণ হইবার পূর্বে যে তাহা এমন অচিন্তনীয়ভাবে ফলবান হইয়া উঠিবে, তাহা কে কল্পনা করিয়াছিল? আগন্তকদের নির্ভয় অসন্দিগ্ধচিত্তে কোনও অমঙ্গলের ছায়াপাত পর্যন্ত হয় নাই। এ রাজ্যে যে অন্য মানুষ আছে, এ সন্দেহই তাহাদের মনে উদয় হয় নাই।

    সেদিন দ্বিপ্রহরে পুরুষেরা সকলে নানা কার্য উপলক্ষে বাহিরে গিয়াছিল। এক দল শিকারে বাহির হইয়াছিল, আর এক দল কাষ্ঠ আহরণের জন্য পর্বতপৃষ্ঠস্থ জঙ্গলে প্রবেশ করিয়াছিল। বালকেরা পশুগুলিকে চরাইতে গিয়াছিল। নারীগণ শিশু কোলে লইয়া অর্ধ-নির্মিত দারু কোটরের ছায়ায় বিশ্রাম করিতেছিল। হ্রদের  জলে সূর্যকিরণ পড়িয়া চতুর্দিকে প্রতিফলিত হইতেছিল ও জল হইতে একপ্রকার সূক্ষ্ম বাষ্প উত্থিত হইতেছিল।

    আমি অভ্যাসমত গুহামুখে শয়ান হইয়া ভাবিতেছিলাম, রুমাকে যদি হাতের কাছে পাই, তাহা হইলে চুরি করি। রাত্রিতে যে-সময় উহারা ঘুমায়, সে-সময় যদি চুরি করিয়া আনিতে পারিতাম, তাহা হইলে ভালো হইত। কিন্তু একটা লোক সমস্ত রাত্রি জাগিয়া পাহারা দেয়, তাহার উপর আবার আগুন জ্বলে। লোকটাকে তীর মারিয়া নিঃশব্দে মারিয়া ফেলিতে পারি— কেহ জানিবে না; কিন্তু আগুনের আলোয় চুরি করিতে গেলেই ধরা পড়িয়া যাইব। তার চেয়ে রুমাকে কোনও সময়ে যদি একেলা পাই, — সন্ধ্যার সময় নির্জনে যদি আমার গুহার কাছে আসিয়া পড়ে, তবে তাহাকে হরণ করিয়া লইয়া পলায়ন করি। এ গুহা ছাড়িয়া তাহাকে লইয়া এমন স্থানে গিয়া লুকাইয়া থাকি যে, তাহার জাতি-গোষ্ঠীর কেহ আমাদের খুঁজিয়া পাইবে না।

    সূর্যতাপে গুহার বায়ু উত্তপ্ত হইয়াছিল, আমি তৃষ্ণাবোধ করিতে লাগিলাম। পাশেই নির্ঝরিণী, গুহা হইতে বাহির হইয়া দুই পদ অগ্রসর হইলেই শীতল জল পাওয়া যায়; কিন্তু গুহার বাহিরে যাইলে পাছে নিম্নস্থ কাহারও দৃষ্টিপথে পড়িয়া যাই, এই ভয়ে ইতস্তত করিতে লাগিলাম। কিন্তু তৃষ্ণা ক্রমে প্রবলতর হইতে লাগিল, তখন সরীসৃপের মতো বুকে হাঁটিয়া বাহির হইলাম। উঠিয়া দাঁড়ানো অসম্ভব, দাঁড়াইলেই এদিকে দৃষ্টি আকৃষ্ট হইবে। আমি সন্তর্পণে চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া ঝরনার দিকে অগ্রসর হইবার উদ্যোগ করিতেছি, এমন সময় এক অপ্রত্যাশিত বাধা পাইয়া দ্রুত নিজের কোটরে ফিরিয়া আসিয়া লুকাইলাম।

    ঝরনার ধার দিয়া দিয়া রুমা উপরে উঠিয়া আসিতেছে। গুহামুখের লতাপাতার আড়ালে থাকিয়া আমি স্পন্দিতবক্ষে দেখিতে লাগিলাম। সে ধাপে ধাপে লাফাইয়া যেখানে ঝরনার জল প্রপাতের মতো নীচে পড়িয়াছে, সেইখানে আসিয়া দাঁড়াইল।

    পূর্বে বলিয়াছি, আমার গুহার পাশেই ঝরনার  জল প্রপাতের মতো নীচে পড়িয়াছে। যেখানে এই প্রপাত সবেগে উচ্ছলিত হইয়া পতিত হইয়াছে, সেইখানে পাথরের মাঝখানে একটি গোলাকার কুণ্ড সৃষ্টি করিয়াছিল। এই নাতিগভীর গর্তটি পরিপূর্ণ করিয়া স্বচ্ছ জল আবার নীচের দিকে গড়াইয়া পড়িতেছিল। রুমা এই স্থানে আসিয়া দাঁড়াইল। একবার সতর্কভাবে চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া কক্ষ হইতে বর্তুলাকৃতি জলপাত্রটি নামাইয়া রাখিল, তারপর ধীরে ধীরে দেহের বস্ত্র উন্মোচন করিতে লাগিল।

    অসন্দিগ্ধচিত্তা হরিণীর পানে অদূরবর্তী চিতাবাঘ যেরূপ লোলুপ ক্ষুধিতভাবে চাহিয়া থাকে, আমিও সেইভাবে তাহাকে দেখিতে লাগিলাম। মধ্যাহ্নের দীপ্ত সূর্যকিরণে তাহার শুভ্র যৌবনকঠিন দেহ হইতে যেন লাবণ্যের ছটা বিকীর্ণ হইতেছিল। বস্ত্র খুলিয়া ফেলিয়া সে অলসভাবে দুই বাহু তুলিয়া তাহার সোমলতার মতো উজ্জ্বল কেশজাল জড়াইতে লাগিল। তারপর শূকরদন্তের মতো বাঁকা তীক্ষ্ণাগ্র একটা ঝকঝকে অস্ত্র পরিত্যক্ত বস্ত্রের ভিতর হইতে তুলিয়া লইয়া চুলের মধ্যে গুজিয়া দিল।

    এইরূপে কুণ্ডলিত কুন্তলভার সংবরণ করিয়া রুমা শিলাপট্টের উপর হইতে ঝুঁকিয়া বোধ করি জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখিবার চেষ্টা করিল। তারপর হর্ষসূচক একটি শব্দ করিয়া জলের মধ্যে লাফাইয়া পড়িল।

    দুর্নিবার কৌতূহল ও লোভের বশবর্তী হইয়া আমি নিজের অজ্ঞাতসারেই গুহা হইতে বাহির হইয়া আসিলাম। ইহারা যেদিন প্রথম আসে সেদিন আমি যে শিলাপৈঠার উপর বসিয়া ধনুকে গুণ সংযোগ করিতেছিলাম, গিরগিটির মতো গুঁড়ি মারিয়া সেই পৈঠার উপর উপস্থিত হইলাম। ইহার দশ হাত নীচেই জলের কুণ্ড। গলা বাড়াইয়া দেখিলাম রুমা আবক্ষ জলে ডুবাইয়া বসিয়া আছে এবং নিজের ভাষায় গুনগুন করিয়া গান করিতেছে। স্বচ্ছ নির্মল জলের ভিতর হইতে তাহার দেহখানি পরিষ্কার দেখা যাইতেছে। শীকরকণাস্পৃষ্ট চূর্ণকুন্তল বেষ্টিত মুখটি প্রস্ফুট জলপুষ্পের মতো দেখাইতেছে।

    নির্নিমেষ-নয়নে এই নিভৃত স্নানরতার পানে কতক্ষণ চাহিয়া রহিলাম, বলিতে পারি না। অগ্নিগর্ভ মেঘ আমার বুকের ভিতর গুরুগুরু করিতে লাগিল।

    ক্রীড়াচ্ছলে দুই হাতে জল ছিটাইতে ছিটাইতে হঠাৎ এক সময় রুমা চোখ তুলিয়া চাহিল। তাহার গান ও হস্তসঞ্চালন একসঙ্গে বন্ধ হইয়া গেল। আমার বুভূক্ষু ভীষণ চক্ষুর সহিত তাহার বিস্ফারিত ভীত চক্ষু কিছুক্ষণ আবদ্ধ হইয়া রহিল। তারপর অস্ফুট চিৎকার করিয়া সে জল হইতে উঠিয়া পলাইবার চেষ্টা করিল।

    এই সুযোগ! আমি আর দ্বিধা না করিয়া উপর হইতে  জলে লাফাইয়া পড়িলাম। রুমা তখনও জল হইতে উঠিতে পারে নাই, জল-কন্যার মতো তাহার সিক্ত শীতল দেহ আমি দুই হাতে জড়াইয়া ধরিলাম।

    কিন্তু সিক্ত পিচ্ছিলতার জন্যই তাহাকে ধরিয়া রাখিতে পারিলাম না, সে তাহার দেহটিকে সংসর্পিত বিভঙ্গিত করিয়া আমার হাত ছাড়াইয়া লইল, তারপর বিদ্যুদ্বেগে তীরে উঠিয়া এক হস্তে ভূপতিত বস্ত্র তুলিয়া লইয়া পশ্চাদ্দিকে একটা ভয়চকিত দৃষ্টি হানিয়া নিমেষমধ্যে অন্তর্হিত হইয়া গেল।

    ব্যর্থ-মনোরথে নিজের গুহায় ফিরিয়া আসিয়া দেখিলাম, নিম্নে ভীষণ গোলযোগ বাধিয়া গিয়াছে। অসংবৃতবস্ত্রা রুমা নারীগণের মধ্যে দাঁড়াইয়া উত্তেজিতভাবে কথা কহিতেছে এবং অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া উপরদিকে দেখাইতেছে। নারীগণ সমস্বরে কলরব করিতেছে। ইতিমধ্যে একদল পুরুষ ফিরিয়া আসিল। তাহারা রুমার বিবৃতি শুনিয়া তীর-ধনুক ও বল্লম হস্তে দলবদ্ধভাবে আমার গুহার দিকে উঠিতে আরম্ভ করিল।

    এই স্থানে থাকা আর নিরাপদ নহে দেখিয়া আমি গুহা ছাড়িয়া পলায়ন করিলাম। গাছপালার আড়ালে লুকাইয়া, পাহাড়ের বন্ধুর পথ ধরিয়া বহুদূর দক্ষিণে উপস্থিত হইলাম। অতঃপর এতদূর পর্যন্ত কেহ আমার অনুসরণ করিবে না বুঝিয়া এক ঝোপের মধ্যে বসিয়া চিন্তা করিতে লাগিলাম।

    এইখানে বসিয়া চিন্তা করিতে করিতে হঠাৎ একটা কথা আমার মনে উদয় হইল। তীর-বিদ্ধের মতো আমি লাফাইয়া উঠিয়া দাঁড়াইলাম। — একথা এতদিন মনে হয় নাই কেন? শিরায় রক্ত নাচিয়া উঠিল, আমি দ্রুতপদে আবার চলিতে আরম্ভ করিলাম।

    আমাদের গ্রামের কিনারায় আসিয়া যখন পৌঁছিলাম, তখন গোধূলি আগতপ্রায়। দূর হইতে শুনিতে পাইলাম, ডাইনী বুড়ি রিক্‌খা গাহিতেছে—

    “রাত্রে পাহাড়-দেবতার মুখে আগুন জ্বলে। কেউ দেখে না, শুধু আমি দেখি। দেবতা কি চায়? মানুষ চায়— মানুষের তাজা রক্ত চায়! এ জাত বাঁচবে না, এ জাত মরবে! দেবতা রক্ত চায়— জোয়ানের তাজা রক্ত! কে রক্ত দেবে— কে দেবতাকে খুশি করবে! এ জাত মরবে— মেয়ে নেই! এ জাত মরবে— দেবতা রক্ত চায়! হে দেবতা, খুশি হও, তোমার মুখের আগুন নিবিয়ে দাও! মেয়ে পাঠাও, মেয়ে পাঠাও!…”

    রিক্‌খার গুহা গ্রামের এক প্রান্তে। চুপি চুপি পিছন হইতে গিয়া তাহার কানের কাছে বলিলাম, “রিক্‌খা, দেবতা তোর কথা শুনেছে— মেয়ে পাঠিয়েছে!”

    রিক্‌খা চমকিয়া ফিরিয়া বলিল, “গাক্কা! তুই ফিরে এলি? ভেবেছিলাম, দেবতা তোকে নিয়েছে— কি বললি— আমার কথা দেবতা শুনেছে?”

    “হ্যাঁ, শুনেছে। দেবতা অনেক মেয়ে পাঠিয়েছে। …শোন্ রিক্‌খা, গাঁয়ের ছেলেদের গিয়ে বল্‌ যে, পাহাড়-দেবতার মুখ থেকে একপাল মানুষ বেরিয়েছে— তাদের মধ্যে অর্ধেক মেয়ে। রাত্রে উপত্যকার ওধারে যেখানে আগুন জ্বলে, সেইখানে ওরা থাকে। মেয়েদের চেহারা ঠিক ঐ চাঁদের মতো, — নীল তাদের চোখ, চুলে  আলো ঠিক্‌রে পড়ে। আমি দেখেছি। তুই ছেলেদের বল্, যদি বৌ চায় আমার সঙ্গে আসুক। আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবো। আমাদের গাঁয়ে যত জোয়ান আছে, সবাইকে ডাক। আজ রাত্তিরেই আমরা পুরুষগুলোকে মেরে ফেলে মেয়েদের কেড়ে নেব।”

    আকাশে খণ্ডচন্দ্র তখন অস্ত গিয়াছে। আমরা প্রায় দুই শত জোয়ান অন্ধকারে গা ঢাকিয়া নিঃশব্দে আগন্তুকদের গৃহপ্রাচীরের নিকটে উপস্থিত হইলাম। প্রাচীরের মধ্যে সকলে সুপ্ত— কোথাও শব্দ নাই। ধুনির আগুন জ্বলিয়া সূক্ষ্ম ভস্ম-আবরণে ঢাকা পড়িয়াছে। তাহারই অস্ফুট আলোকে দেখিলাম, ছায়ামূর্তির মতো চারিজন প্রহরী সশস্ত্রভাবে প্রাচীরের বাহিরে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। বুঝিলাম, আজ দ্বিপ্রহরে আমাকে দেখিবার পর ইহারা সতর্কতা অবলম্বন করিয়াছে।

    পূর্ব হইতেই স্থির ছিল। আমরা চারিজন তীরন্দাজ এক একটি প্রহরীকে বাছিয়া লইলাম। একসঙ্গে চারিটি ধনুকে টংকারধ্বনি হইল— অন্ধকারে চারিটি তীর ছুটিয়া গেল। আমার তীর প্রহরীর কণ্ঠে প্রবেশ করিয়া অপর দিকে ফুঁড়িয়া বাহির হইল। নিঃশব্দে প্রহরী ভূপতিত হইল। তারপর বিকট কোলাহল করিয়া সকলে প্রাচীর আক্রমণ করিল। নৈশ নিস্তব্ধতা সহসা শতধা ভিন্ন হইয়া গেল।

    আমি জানিতাম ব্যূহের কোন্ দিকে রুমা শয়ন করে। আমি সেই দিকে গিয়া প্রাচীর উল্লঙ্ঘন করিয়া দেখিলাম, ভিতরে সকলে জাগিয়া উঠিয়াছে, পুরুষগণ অস্ত্র লইয়া ব্যূহ-প্রাচীরের দিকে ছুটিতেছে। একজন পুরুষ দীর্ঘ বল্লম-আঘাতে অগ্নির ভস্মাচ্ছাদন দূর করিয়া দিল, অমনই লেলিহান আরক্তচ্ছটায় দিক্‌ উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল।

    প্রাচীর উল্লঙ্ঘন করিবার পর রুমাকে যখন দেখিতে পাইলাম, তখন সে সদ্য নিদ্রা হইতে উঠিয়া হতবুদ্ধির মতো ইতস্তত দৃষ্টিপাত করিতেছে, তাহার চারিপাশে সদ্যোত্থিত নারীগণ আর্ত-ক্রন্দন করিতেছে। আমি লাফাইয়া গিয়া রুমার উপর পড়িলাম, তাহাকে দুই হাতে তুলিয়া লইয়া কোনও দিকে ভ্রূক্ষেপ না করিয়া দৌড়িতে আরম্ভ করিলাম। কয়েক পদ যাইতে না-যাইতে দেখিলাম, একজন পুরুষ শাণিত দীর্ঘ অস্ত্র উত্তোলিত করিয়া আমার দিকে ছুটিয়া আসিতেছে। রুমাকে মাটিতে ফেলিয়া দিয়া আমি ক্ষিপ্রহস্তে মাটি হইতে একখণ্ড পাথর তুলিয়া লইয়া তাহাকে ছুঁড়িয়া মারিলাম। মস্তকে আঘাত লাগিয়া সে মৃতবৎ পড়িয়া গেল। রুমা চিৎকার করিয়া উঠিল। আমি আবার তাহাকে কাঁধে ফেলিয়া ছুটিলাম।

    আমাদের দলের অন্য সকলে তখন প্রাচীর ডিঙাইয়া ভিতরে ঢুকিতেছে— ব্যূহের কেন্দ্রস্থলে ভীষণ যুদ্ধ চলিতেছে। দুই পক্ষেরই মানুষ পড়িতেছে, মরিতেছে— কেহ আহত হইয়া বিকট কাতরোক্তি করিতেছে। আমি দ্বারের নিকট উপস্থিত হইয়া দেখিলাম সেখানে জীবিত কেহ নাই, কয়েকটি রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়িয়া আছে। দ্বার অতিক্রম করিতে যাইতেছি, এমন সময় রুমা সহসা যেন মোহনিদ্রা হইতে জাগিয়া উঠিল। নিজের কেশের মধ্যে হাত দিয়া সেই উজ্জ্বল বাঁকা অস্ত্রটা বাহির করিল, তারপর ক্ষিপ্তের মতো চিৎকার করিয়া আমার কপালের পাশে সজোরে বসাইয়া দিল।

    কপাল হইতে ফিন্‌কি দিয়া রক্ত বাহির হইতে লাগিল। আমি আবার তাহাকে মাটিতে ফেলিয়া দিলাম। তাহার হাত হইতে অস্ত্রটা কাড়িয়া লইয়া তাহাকে নির্দয়ভাবে মাটিতে চাপিয়া ধরিয়া বলিলাম, “তুই আমার বৌ! তুই আমার রুমা! এই রক্ত দিয়ে আমি তোকে আমার করে নিলাম!”— বলিয়া আমার ললাটস্রুত রক্ত হাতে করিয়া তাহার কপালে চুলে মাখাইয়া দিলাম।

    ওদিকে তখন যুদ্ধ শেষ হইয়া গিয়াছে— বিপক্ষ দলের একটি পুরুষও জীবিত নাই। আমাদের দলের যাহারা বাঁচিয়া আছে, তাহারা রক্তলিপ্ত দেহে উন্মত্ত গর্জন করিয়া নারীদের অভিমুখে ছুটিয়াছে।

    ৫ শ্রাবণ ১৩৩৯

  • অষ্টম সর্গ

    অষ্টম সর্গ

    অষ্টম সর্গ

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    সেদিন সন্ধ্যার আকাশে দ্রুত সঞ্চরমাণ মেঘের দল শিপ্রার বর্ষাস্ফীত বক্ষে ধূমল ছায়া ফেলিয়া চলিয়াছিল। বৃষ্টি পড়িতেছে না বটে, কিন্তু পশ্চিম হইতে খর আর্দ্র বায়ু বহিতেছে— শীঘ্রই বৃষ্টি নামিবে। ছিন্ন ধাবমান মেঘের আড়ালে পঞ্চমীর চন্দ্রকলা মাঝে মাঝে দেখা যাইতেছে— যেন মহাকালের করচ্যুত বিষাণ খসিয়া পড়িতেছে, এখনই দিগন্তরালে অদৃশ্য হইবে।

    শিপ্রার পূর্বতটে উজ্জয়িনীর পাষাণ-নির্মিত বিস্তৃত ঘাট। ঘাটের অসংখ্য সোপান বহু ঊর্ধ্ব হইতে ধাপে ধাপে নামিয়া শিপ্রার গর্ভে প্রবেশ করিয়াছে, ক্ষিপ্র জল-ধারা এই পাষাণ প্রতিবন্ধকে আছাড়িয়া পড়িয়া আবর্ত সৃষ্টি করিয়া বহিয়া যাইতেছে। কিন্তু শূন্য ঘাটে আজ শিপ্রার আক্ষেপোক্তি শুনিবার কেহ নাই।

    ঘাট নির্জন। অন্যদিন এই সময় বহু স্নানার্থিনীর ভিড় লাগিয়া থাকে; তাহাদের কলহাস্য ও কঙ্কণকিঙ্কিণী মুখরভাবে শিপ্রাকে উপহাস করিতে থাকে; তাহাদের ঘটোচ্ছিলিত জল মসৃণ সোপানকে পিচ্ছিল করিয়া তোলে। আজ কিন্তু ভিড় নাই। মাঝে মাঝে দুই একটি তরুণী বধূ আকাশের দিকে সশঙ্ক দৃষ্টি হানিয়া ঘট ভরিয়া দ্রুতপদে প্রস্থান করিতেছে। ক্বচিৎ এক ঝাঁক কিশোরী বয়স্যা মঞ্জীর বাজাইয়া গাগরী ভরিতে আসিতেছে; তাহারাও অল্পকাল জলক্রীড়া করিয়া পূর্ণঘট-কক্ষে চঞ্চল-চরণে সোপান আরোহণ করিয়া প্রস্থান করিতেছে। নির্জন ঘাটে সন্ধ্যার ছায়া আরও ঘনীভূত হইতেছে।

    ঘাট নির্জন বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ জনশূন্য নহে। একটি পুরুষ নিম্নতর সোপানের এক প্রান্তে চিন্তামগ্নভাবে নীরবে বসিয়া আছেন। পুরুষের বয়স বোধ হয় পঁয়ত্রিশ কিংবা ছত্রিশ বৎসর হইবে। — যৌবনের মধ্যাহ্ন। দেহের বর্ণ তপ্তকাঞ্চনের ন্যায়, মস্তক মুণ্ডিত, স্কন্ধে উপবীত, ললাটে শ্বেত চন্দনের ত্রিপুণ্ড্রক। মেঘাচ্ছন্ন প্রাবৃট-সন্ধ্যার স্বল্পালোকেও তাঁহার খড়্গের ন্যায় তীক্ষ্ণ নাসা ও আয়ত উজ্জ্বল চক্ষু স্পষ্ট দেখা যাইতেছে। তিনি কখনও আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করিতেছেন, কখনও উদ্বেল-যৌবনা নদীর তরঙ্গ-ভঙ্গ নিরীক্ষণ করিতেছেন, কখনও ক্রীড়া-চপলা তরুণীদের রহস্যালাপ শ্রবণ করিয়া মৃদু মৃদু হাসিতেছেন।

    কিন্তু তাঁহার মুখ চিন্তাক্রান্ত। গত দুইদিন হইতে একটি দুরূহ সমস্যা কিছুতেই তিনি ভঞ্জন করিতে পারিতেছেন না। অলঙ্কারশাস্ত্র ঘাঁটিয়া শেষ করিয়া ফেলিয়াছেন, কিন্তু তাঁহার প্রশ্নের উত্তর কোথাও পাওয়া যায় নাই। এদিকে মহারাজ অবন্তীপতি ও সভাস্থ রসিক-মণ্ডলী সাগ্রহে প্রতীক্ষা করিয়া আছেন। ঘরে গৃহিণী তাঁহার ঔদাস্য ও অন্যমনস্কতায় সন্দিগ্ধ হইয়া উঠিতেছেন। নানা দুশ্চিন্তায় দুর্ভাবনায় এই মধুর আষাঢ় মাসেও রাত্রিতে নিদ্রা নাই!

    কয়েকটি যুবতী এই সময় মঞ্জীর-ঝঙ্কারে অমৃতবৃষ্টি করিয়া সোপানশীর্ষ হইতে  জলের ধারে নামিয়া আসিল। পুরুষকে কেহ লক্ষ্য করিল না— উত্তরীয় কলস নামাইয়া রাখিয়া জলে অবতরণ করিল; কৌতুক-সরস আলাপ করিতে করিতে পরস্পরের দেহে জল ছিটাইতে লাগিল। পুরুষ একবার সচকিতে তাহাদের প্রতি কটাক্ষপাত করিয়া নতমুখে তাহাদের আলাপের ছিন্নাংশ শুনিতে লাগিলেন।

    ‘কাল তোর বর দেশে ফিরিয়াছে— না? তাই—’

    সমুচ্চ কলহাস্যে বাকি কথাগুলি চাপা পড়িয়া গেল।

    ‘কি ভাই? কি হইয়াছে ভাই?’

    ‘তুই আইবুড় মেয়ে— আমাদের সঙ্গে মিশবি কেন লা? তোকে কিছু বলিব না।’

    ‘আহা বল্ বল্— ওর তো এই মাসেই বর আসিবে— ও এখন আমাদের দলে। …’

    ‘মধু, মোম, কুঙ্কুম আর ইঙ্গুদী-তৈল মিশাইয়া ঠোঁটে লাগাস্— আর কোনও ভয় থাকিবে না। সেই সঙ্গে একটু কেয়ার রেণুও দিতে পারিস্‌, কিন্তু খুব সামান্য …’

    ‘ওলো দ্যাখ্ দ্যাখ্, কপোতিকার কি দশা হইয়াছে…’

    পুরুষ আড়নয়নে দেখিলেন, কপোতিকা তাড়াতাড়ি আবক্ষ জলে ডুবাইয়া বসিল।

    ‘…লোলার কি দুঃখ ভাই! তাহার স্বামী আজিও ফিরিল না— কে জানে হয়তো— যবদ্বীপ কতদূর ভাই?’

    ‘সিংহল পার হইয়া যাইতে হয়— ছয় মাসের পথ— লোলার জন্য বড় দুঃখ হয়— আমাদের সঙ্গে আসে না—’

    ‘— দ্যাখ, মেঘগুলা আজ পূর্বমুখে ছুটিয়াছে—’

    ‘— হ্যাঁ। এ মেঘ অলকায় যাইবে না।’

    পুরুষ কর্ণ উদ্যত করিয়া শুনিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু আর অধিক শুনিতে পাইলেন না। যুবতীরা গাত্র মার্জনা সমাপন করিয়া তীরে উঠিল।

    এই যুবতীযূথের মধ্যে একটিকে পুরুষ চিনিতেন। তাহারা বস্ত্র-পরিবর্তন সমাপ্ত করিলে তিনি ডাকিলেন— ‘ময়ূরিকে, তোমরা একবার এদিকে শুনিয়া যাও।’

    চমকিত হইয়া সকলে মুখ ফিরাইল। বোধ করি একটু লজ্জাও হইল। তাই উত্তরীয় দ্বারা তাড়াতাড়ি অঙ্গ আবৃত করিয়া ফেলিল।

    ময়ূরিকা নিম্নকণ্ঠে পুরুষের নাম উচ্চারণ করিল, নিমেষের মধ্যে চোখে চোখে একটা উত্তেজিত ইঙ্গিত খেলিয়া গেল। তারপর সকলে সংযতভাবে পুরুষের সমীপবর্তী হইয়া দাঁড়াইল।

    ময়ূরিকা যুক্তকরে প্রণাম করিয়া বলিল— ‘ভট্ট, আমাদের প্রণাম গ্রহণ করুন।’

    ভট্ট স্মিতমুখে আশীর্বাদ করিলেন— ‘আয়ুষ্মতী হও। তোমরা এতক্ষণ কি কথা কহিতেছিলে?’

    সকলে পরস্পরের মুখাবলোকন করিতে লাগিল। যে সকল কথা হইতেছিল, তাহা পুরুষকে, বিশেষত ভট্টকে কি করিয়া বলা যাইতে পারে?

    মঞ্জরিকা ইহাদের মধ্যে ঈষৎ প্রগল্‌ভা, সে-ই উত্তর দিল। কৌতুক-চঞ্চল-দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল— ‘ভট্ট, আজ আকাশের মেঘদল পূর্বদিকে চলিয়াছে। উত্তরে অলকাপুরীতে পৌঁছিতে পারিবে না, তাই আমরা আক্ষেপ করিতেছিলাম।’

    ভট্ট জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘সে জন্য আক্ষেপ কেন?’

    মঞ্জরিকা বলিল— ‘যক্ষপত্নী বিরহ-বেদনায় কালযাপন করিতেছেন, যক্ষের সংবাদ পাইবেন না,— এই জন্য আক্ষেপ।’

    এতক্ষণে যেন বুঝিতে পারিয়াছেন এমনিভাবে ভট্ট বলিলেন— ‘বুঝিয়াছি। তোমরা মেঘদূত কাব্যের কথা বলিতেছ। ভাল, তোমরা দেখিতেছি কাব্যশাস্ত্রে সুচতুরা। আমার একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পার?’

    সকলে যুক্তকরে বলিল— ‘আজ্ঞা করুন।’

    ভট্ট চিন্তা করিলেন; পরে শিরঃসঞ্চালন করিয়া কহিলেন— ‘না, সে বড় কঠিন প্রশ্ন, তোমরা পরিবে না।’

    মঞ্জরিকা অনুনয় করিয়া বলিল— ‘তবু আজ্ঞা করুন আর্য।’

    ভট্ট সকলের চক্ষে অধীর কৌতূহল লক্ষ্য করিয়া বলিলেন— ‘উত্তম, বলিতেছি শুন। — তোমরা বলিতে পার, কাব্যে নায়ক-নায়িকার বিবাহ সম্পাদিত হইবার পর কবির আর কিছু বক্তব্য থাকে কি না?’

    সকলে বিস্মিতভাবে নীরব রহিল; ভট্ট যে তাহাদের মতো অপরিণত-বুদ্ধি যুবতীদের নিকট কাব্যশাস্ত্র সম্বন্ধীয় এরূপ প্রশ্ন করিবেন, তাহা যেন সহসা ধারণা করিতেই পারিল না।

    শেষে ময়ূরিকা বলিল— ‘আর্য, নায়ক-নায়িকার মিলন ঘটিলেই তো কাব্য শেষ হইল! তাহার পর কবির আর কি বক্তব্য থাকিতে পারে?’

    ভট্ট বলিলেন— ‘ময়ূরিকে, আমি মিলনের কথা বলি নাই, বিবাহের কথা বলিয়াছি।’

    বিস্মিতা মঞ্জরিকা বলিল— ‘উভয়ই এক নহে কি?’

    ভট্ট গূঢ় হাসিয়া বলিলেন— ‘উহাই তো প্রশ্ন।’

    ভট্টের কথার মর্ম কেহ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিল না, সকলে নির্বাক্ হইয়া রহিল। ভট্ট ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া চিন্তিতভাবে রহিলেন।

    অবশেষে অরুণিকা কথা কহিল। সে ইহাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা চতুরা, এতক্ষণ কথা বলে নাই, এবার মুখ টিপিয়া জিজ্ঞাসা করিল— ‘ভট্ট, এ প্রশ্নটি কখনও ভট্টিনীর নিকট করিয়াছিলেন কি?’

    ভট্ট চমকিয়া মুখ তুলিলেন। দেখিলেন অরুণিকার অরুণ ওষ্ঠপ্রান্তে একটু চাপা হাসি খেলা করিতেছে। তিনি ঈষৎ বিব্রতভাবে বলিলেন— ‘না, তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করি নাই, স্মরণ ছিল না। আজ গৃহে ফিরিয়াই জিজ্ঞাসা করিব। — কিন্তু তোমরা আর বিলম্ব করিও না, এবার গৃহে যাও। রাত্রি আগতপ্রায়।’

    বক্রোক্তিটা সকলের কানে পৌঁছিল না; শুধু অরুণিকা বুঝিল, ভট্ট মৃদু রকমের প্রতিশোধ লইলেন। সকলে যুক্তহস্তা হইয়া বলিল— ‘আর্য, আমাদের আশীর্বাদ করুন।’

    ভট্ট হাসিলেন— ‘তোমাদের আমি আর কি আশীর্বাদ করিব? আমি শঙ্করের দাস— অথচ স্বয়ং শঙ্করারি তোমাদের সহায়। ভাল, আশীর্বাদ করিতেছি—’ মুহূর্ত-কাল নীরব থাকিয়া জলদগম্ভীর-কণ্ঠে কহিলেন, ‘মাভূদেবং ক্ষণমপি চ তে স্বামিনা বিপ্রয়োগঃ।’

    সকলে কপোতহস্তে আশীর্বাদ গ্রহণ করিয়া শিরোধার্য করিল। তারপর প্রফুল্ল মনে প্রীতিবিম্বিতমুখে শ্রোণি-কলস-ভার-মন্থর পদে প্রস্থান করিল।

    ভট্ট বসিয়া রহিলেন। যুবতীদের নূপুরনিক্কণ ক্রমে শ্রুতি-বহির্ভূত হইয়া গেল। তখন আবার তাঁহার মুখ চিন্তাচ্ছন্ন হইল। কি করা যায়? এ প্রশ্নের কি সমাধান নাই? তীরে আসিয়া শেষে তরী ডুবিবে? অবশ্য এ কথা সত্য যে, নায়ক-নায়িকার বিবাহ দিবার পর কবির কর্তব্য শেষ হয়। কিন্তু তবু তাঁহার মন সন্তোষ মানিতেছে না কেন? কাব্য তো শেষ হইয়াছে;— আর এক পদ অগ্রসর হইলে প্রতিজ্ঞা-লঙ্ঘন হইবে, যাহা প্রতিপন্ন করিবার জন্য লেখনী ধারণ করিয়াছিলেন তাহার অতিরিক্ত কথা বলা হইবে। তাহা করিবার প্রয়োজন কি? নায়িকার মুখে সলজ্জ হাসি ফুটাইয়া বিদায় লওয়াই তো কবির উচিত; আর সেখানে থাকিলে যে রসভঙ্গ হইবে। সবই ভট্ট বুঝিতেছেন, তবু তাঁহার মন উঠিতেছে না। কেবলি মনে হইতেছে— এ হইল না, কাব্য শেষ হইল না, চরম কথাটি বলা হইল না।

    এদিকে রাত্রি মেঘের ধূসর পক্ষে আশ্রয় করিয়া দ্রুত অগ্রসর হইয়া আসিতেছে। সন্ধ্যা-আহ্নিকও হয় নাই— মন বিক্ষিপ্ত! ভট্ট উঠিবার চেষ্টা করিয়া চারিদিকে চাহিলেন। দেখিলেন, কলস-কক্ষে একটি তরুণী নিঃশব্দে নামিয়া আসিতেছে। তাহার গতিভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল— যাহা দেখিয়া ভট্ট উঠিতে পারিলেন না, আবার বসিয়া পড়িলেন।

    তরুণী ধীরে ধীরে কলস নামাইয়া সোপানের শেষ পৈঠায় আসিয়া বসিল। কোনও দিকে লক্ষ্য করিল না, বিষণ্ণ ব্যথিত চক্ষু দুটি তুলিয়া যেখানে শিপ্রার স্রোত দূরে বাঁকের মুখে অদৃশ্য হইয়াছে, সেই দিকে চাহিয়া রহিল।

    ভট্ট দেখিলেন— রমণীর দেহে সৌভাগ্যের চিহ্ন ব্যতীত অন্য কোনও অলঙ্কার নাই। রুক্ষকেশের রাশি একটা-মাত্র বেণীতে আবদ্ধ হইয়া অংসের উপর পড়িয়া আছে, শুষ্ক অশ্রুহীন চোখে কজ্জল নাই।

    এই নীরব শোকপরায়ণা একবেণীধরা যুবতীকে ভট্ট বালিকা-বয়সে চিনিতেন। সম্প্রতি বহুদিন দেখেন নাই। তাঁহার চক্ষে  জল আসিল, কিন্তু বক্ষে আনন্দের ক্ষণপ্রভাও খেলিয়া গেল। তিনি ডাকিলেন— ‘লোলা!’

    তন্দ্রাহতের ন্যায় যুবতী ফিরিয়া চাহিল। ভট্টকে দেখিয়া সলজ্জে উত্তরীয় দ্বারা অঙ্গ আবৃত করিয়া সঙ্কোচ-জড়িত-পদে তাঁহার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। ভট্টের চক্ষু বড় তীক্ষ্ণ, বস্ত্র ভেদ করিয়া দেহ ও দেহ ভেদ করিয়া মনের অন্তরতম কথাটি দেখিয়া লয়। লোলা কুণ্ঠিত নতমুখে দাঁড়াইয়া রহিল।

    ভট্ট জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘তুমি রৈবতক নাবিকের বধূ?’

    লোলা হেঁটমুখে রহিল, উত্তর করিল না। তাহার অধর কাঁপিতে লাগিল।

    ভট্ট পুনরায় বলিলেন— ‘তোমার স্বামী শ্রেষ্ঠী বরুণমিত্রকে লইয়া গত বৎসর যবদ্বীপে গিয়াছে— আজিও ফিরে নাই?’

    লোলার চক্ষু দিয়া জল গড়াইয়া পড়িল। সে কেবল মাথা নাড়িল।

    ভট্ট সুস্মিত মুখে বলিলেন— ‘তুমি ভয় করিও না, রৈবতক কুশলে আছে।’

    ব্যাকুল নয়নে লোলা ভট্টের মুখের দিকে চাহিল। তাহার দৃষ্টির কাতর-বিহ্বল প্রশ্ন ভট্টের বক্ষে সূচীবেধবৎ বিঁধিল। তিনি লজ্জিত হইলেন— ছি, ছি, এতক্ষণ এই বালিকার আকুল আশঙ্কা লইয়া তিনি খেলা করিতেছিলেন!

    অনুতপ্তস্বরে বলিলেন— ‘আজ রাজসভায় সংবাদ আসিয়াছে— রৈবতক সমস্ত নৌকা লইয়া সমুদ্র-সঙ্গমে ফিরিয়াছে! দুই-এক দিনের মধ্যেই গৃহে ফিরিবে। তুমি নিশ্চিন্ত হও।’

    থরথর কাঁপিয়া লোলা সেইখানেই বসিয়া পড়িল। তারপর গলদশ্রুনেত্রে গলবস্ত্র হইয়া ভট্টকে প্রণাম করিল, বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে কহিল— ‘দেব, আপনি আজ অভাগিনীর প্রাণ দিলেন। মহাকাল আপনাকে জয়যুক্ত করুন।’ উদ্গত অশ্রু সম্বরণ করিয়া জিজ্ঞাসা করিল— ‘আজ সংবাদ আসিয়াছে?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘সকলে নিরাপদে আছেন?’

    ‘হ্যাঁ, সকলেই নিরাপদে আছেন। — লোলা, তুমি অনুপমা। রৈবতক আসিলে তাহাকে আমার কাছে পাঠাইয়া দিও, তাহাকে তোমার কথা বলিব।’

    অশ্রু মার্জনা করিয়া লোলা সিক্ত হাসি হাসিল, অস্ফুটস্বরে বলিল— ‘যে আজ্ঞা।’

    এতক্ষণে শীকরকণার ন্যায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়িতে আরম্ভ করিয়াছিল, বায়ুতাড়িত জলকণা তির্যকভাবে ভট্টের মুখে পড়িতে লাগিল। তিনি উঠিলেন, সস্নেহস্বরে লোলাকে বলিলেন— ‘লোলা, দুঃখের অন্তেই মিলন মধুর হয়। আমার উমাকে আমি যে দুঃখ দিয়াছি তাহা স্মরণ করিলেও বক্ষ বিদীর্ণ হয়; কিন্তু চরমে সে ঈপ্সিত বর লাভ করিয়াছে। মদন পুনরুজ্জীবিত হইয়াছে। — তুমিও আমার গৌরীর ন্যায় সুভগা। তোমার জীবনেও মদন পুনরুজ্জীবিত হইবেন। কল্য তাঁহার মন্দিরে পূজা পাঠাইও।’

    লোলা কৃতাঞ্জলি হইয়া বসিয়া রহিল, ভট্টের সকল কথা বুঝিতে পারিল না, কিন্তু অপরিমিত সুখাবেশে তাহার হৃদয় পরিপূর্ণ হইয়া গেল। ভট্ট সহাস্যে তাহার মস্তকে একবার হস্তার্পণ করিয়া ত্বরিত পদে সোপান অতিবাহিত করিয়া প্রস্থান করিলেন।

    ঘাট হইতে পথে অবতীর্ণ হইয়া তিনি দেখিলেন, পথ পিচ্ছিল, কর্দমপূর্ণ। সম্মুখেই মহাকালের কৃষ্ণপ্রস্তুর-নির্মিত গগনভেদী মন্দির মেঘলোকে চূড়া তুলিয়া আছে। ভট্ট সেইদিকে অগ্রসর হইতেই মন্দির-অভ্যন্তর হইতে ঘোর রবে ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল। সন্ধ্যারতির কাল উপস্থিত। মন্দিরের অঙ্গনে বহু লোক আরতি দেখিবার জন্য উপস্থিত হইয়াছে। ভট্ট ভিতরে প্রবেশ করিলেন না, বাহির হইতে বদ্ধাঞ্জলি হইয়া ইষ্টদেবতাকে ভক্তিভরে প্রণাম করিলেন। শঙ্খ-ঘণ্টার রোল চলিতে লাগিল; কালাগুরু ধূপ ও গুগ্গুলের গন্ধ চারিদিকের বায়ুকে সৌরভে ভারাক্রান্ত করিয়া তুলিল।

    আরতি শেষ হইলে ভট্ট আবার চলিতে আরম্ভ করিলেন। অন্ধকার আকাশ হইতে সূক্ষ্ম বারিপতন হইতেছে— রাজপথে লোক নাই। এখন রাত্রি হইয়াছে, অথচ পাষাণ-বনদেবীর হস্তে পথদীপ জ্বলে নাই; মধ্যরাত্রির পূর্বে বনদেবীগণ প্রদীপহস্ত হইবেন না। পথিপার্শ্বের সুবৃহৎ অট্টালিকা-সমূহে বর্তিকা জ্বলিতেছে বটে, কিন্তু তাহা অভ্যন্তর মাত্র আলোকিত করিয়াছে; ক্বচিৎ নাগরিকদিগের বিলাস-কক্ষের মুক্ত গবাক্ষপথে আলোক-রশ্মি ও জাতী কদম্ব কেতকী যূথীর মিশ্র গন্ধ নির্গত হইয়া পথচারীকে গৃহের জন্য উন্মনা করিয়া তুলিতেছে। ভট্ট এই ঈষদালোকিত কর্দম-পিচ্ছিল পুষ্প-সুবাসিত পথ দিয়া সাবধানে চলিতে লাগিলেন।

    উজ্জয়িনীর পথ অতিশয় সঙ্কীর্ণ, কোনওমতে দুইটি রথ বা প্রবহন পাশাপাশি চলিতে পারে। পথ ঋজু নহে, সংসর্পিত হইয়া আঁকিয়া-বাঁকিয়া বহু শাখা প্রশাখা বিস্তার করিয়া চলিয়াছে। ভট্ট হেঁটমুণ্ডে গৃহাভিমুখে চলিতে চলিতে অন্যমনস্ক হইয়া পড়িয়াছেন— কোনও দিকে লক্ষ্য ছিল না; সহসা একটা মোড় ঘুরিয়া সম্মুখে দীপোদ্ভাসিত প্রাসাদ-তোরণ দেখিয়া তাঁহার চমক ভাঙ্গিল।

    তোরণের পশ্চাতে প্রাসাদ, সেখানেও দীপোৎসব। তোরণ-সম্মুখে বহু সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির রথ, দোলা, যানবাহন যাতায়াত করিতেছে। প্রাসাদের অভ্যন্তর হইতে সঙ্গীতের সুমিষ্ট ধ্বনি কানে আসিতেছে। ভট্টের স্মরণ হইল, আজ প্রিয়দর্শিকার গৃহে সমাপানক। স্বয়ং মহামাণ্ডলিক অবন্তীপতি এই সমাপানকে যোগদান করিবেন বলিয়াছেন। ভট্টেরও নিমন্ত্রণ আছে।

    ভট্টের মুখ হর্ষোৎফুল্ল হইয়া উঠিল। কি আশ্চর্য! এ কথাটা তাঁহার এতক্ষণ মনে হয় নাই কেন? তাঁহার নিদারুণ সমস্যার যদি কেহ সমাধান করিতে পারে তো সে ঐ মহাবিদুষী চতুঃযষ্টিকলার পারংগতা অলোকসামান্যা বারবধূ প্রিয়দর্শিকা। তাহার মতো সর্বশাস্ত্রে সুপণ্ডিতা অবন্তীরাজ্যে অন্য কে আছে? সত্য কথা বলিতে কি, তাঁহার কাব্যের নিগূঢ় রস ব্যঙ্গোক্তি প্রিয়দর্শিকা যতটা বুঝিবে, এত আর কেহ বুঝিবে না। সে সামান্যা রূপোপজীবিনী নহে— রাজ্যের বারমুখ্যা। স্বয়ং আর্যাবর্তের অধীশ্বর বিক্রমাদিত্য উজ্জয়িনীতে পদার্পণ করিয়াই প্রিয়দর্শিকাকে স্মরণ করেন; শুধু তাহার অলৌকিক রূপযৌবনের জন্য নহে, তাহার অশেষ গুণাবলীর জন্য তাহাকে সম্মান প্রদর্শন করেন। সেই প্রিয়দর্শিকার গৃহে নিমন্ত্রিত হইয়াও তিনি এতক্ষণ ভুলিয়া ছিলেন? ভট্ট সহর্ষে তোরণ অভিমুখে অগ্রসর হইলেন।

    কিন্তু তোরণের সমীপবর্তী হইয়া ভট্টের মুখে ঈষৎ উদ্বেগের ছায়া পড়িল। গৃহে ভট্টিনী প্রতীক্ষা করিয়া আছেন; তিনি এসব পছন্দ করেন না। বিশেষত প্রিয়দর্শিকাকে তিনি ঘোর সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেন। দেশে নিন্দুকের অভাব নাই, ভট্টের সহিত প্রিয়দর্শিকার গুপ্ত প্রণয়ের একটা জনশ্রুতি ভট্টিনীর কানে উঠিয়াছে। তদবধি প্রিয়দর্শিকার নাম শুনিলেই তিনি জ্বলিয়া যান। সুতরাং গণ্ডের উপর পিণ্ডের ন্যায় আজ যদি ভট্ট প্রিয়দর্শিকার গৃহে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত যাপন করেন, তাহা হইলে আর রক্ষা থাকিবে না।

    তোরণের সম্মুখে দাঁড়াইয়া ভট্ট ইতস্তত করিতেছেন দেখিয়া তোরণপালিকা কিঙ্করীগণ কলকণ্ঠে তাঁহাকে সম্ভাষণ করিল— ‘আসুন কবীন্দ্র। স্বাগত! আসুন পণ্ডিতবর, আর্যা প্রিয়দর্শিকা আপনার জন্য অধীরভাবে প্রতীক্ষা করিতেছেন। আসুন মহাভাগ, আপনার অভাবে নবরত্নমালিকা আজি মধ্যমণিহীন। স্বাগত! শুভাগত!’

    দাসীগণ সকলেই যৌবনবতী, রসিকা ও সুন্দরী। তাহাদের কাহারও হস্তে পুষ্পমালা, কাহারও হস্তে জলপূর্ণ ভৃঙ্গার, কেহ বা সুগন্ধি দ্রব্যপূর্ণ স্থালী লইয়া দাঁড়াইয়া আছে। তাহারা সকল অতিথিকেই মহা সম্মানপূর্বক স্বাগত-সম্ভাষণ করিতেছে; কিন্তু কবিকে দেখিয়া তাহারা যেরূপ সমস্বরে সাহ্লাদে আহ্বান করিল, তাহাতে কবি আর দ্বিধা করিতে পারিলেন না। গৃহের চিন্তা মন হইতে অপসারিত করিয়া হাস্যমুখে তোরণ-পথে প্রবেশ করিলেন।

    মর্মর-পট্টের উপর পদার্পণ করিবামাত্র একটি দাসী ছুটিয়া আসিয়া তাঁহার চরণে  জল ঢালিয়া দিতে লাগিল, অন্য একজন নতজানু হইয়া বসিয়া পদ প্রক্ষালন করিয়া দিল। তৃতীয় দাসী শুভ্র কার্পাস বস্ত্র দিয়া পা মুছাইয়া দিল। কবিকে উজ্জয়িনীর নাগরিক-নাগরিকা যেরূপ ভালবাসিত, এরূপ আর কাহাকেও বাসিত না। তাই তাঁহার সেবা করিবার সৌভাগ্যের জন্য দাসীদের মধ্যে হুড়াহুড়ি পড়িয়া গেল।

    গন্ধদ্রব্যের স্থালী হস্তে কবির সম্মুখে দাঁড়াইতেই তিনি অঙ্গুলির প্রান্ত চন্দনে ডুবাইয়া সকৌতুকে তাহার ভ্রূমধ্যে তিলক পরাইয়া দিলেন। সকলে আহ্লাদে হাস্য করিয়া উঠিল। যাহার হাতে পুষ্পমাল্য ছিল, সে আসিয়া তাড়াতাড়ি কবির গলায় যূথীর একটি স্থূল মালা পরাইয়া দিল। কবি তাহাকে ধরিয়া বলিলেন— ‘সুলোচনে, এ কি করিলে? তুমি আমার গলায় মালা দিলে?’

    সুলোচনাও বাক্যবিন্যাসে কম নহে, সে কুটিল হাসিয়া উত্তর করিল— ‘কবিবর, এখানে আমরা সকলেই আর্যা প্রিয়দর্শিকার প্রতিনিধি।’

    মুখের মতো উত্তর পাইয়া কবি হাসিতে হাসিতে প্রাসাদ অভিমুখে চলিলেন। উদ্যানের মধ্য দিয়া শ্বেত প্রস্তরের পথ, তাহার দুইধারে ধ্যানাসীন মহাদেবের মূর্তি। মূর্তির শীর্ষস্থ জটাজাল হইতে সুগন্ধি বারি উৎসের ন্যায় নিক্ষিপ্ত হইতেছে।

    প্রথম মহল নৃত্যশালা। সেখানে প্রবেশ করিয়া কবি দেখিলেন তরুণ নাগরিকদের সভা বসিয়া গিয়াছে। মধ্যস্থলে নর্তকী বাহুবল্লরী বিলোলিত করিয়া অপাঙ্গে বিদ্যুৎস্ফুলিঙ্গ বর্ষণ করিয়া কেয়ূর-কিঙ্কিণী মঞ্জীর-শিঞ্জনে অপূর্ব সম্মোহন সৃষ্টি করিয়া রাগ-দীপক নৃত্যে অপ্সরালোকের ভ্রান্তি বহিয়া আনিতেছে। সঙ্গে সঙ্গে নিপুণ চরণনিক্ষেপের তালে তালে মৃদঙ্গ ও সপ্তস্বরা বাজিতেছে। মৃদঙ্গীর চক্ষু নর্তকীর চরণে নিবদ্ধ; বীণা-বাদকের ললাটে ভ্রূকুটি, চক্ষু মুদিত। অন্য সকলে নর্তকীর অপরূপ লীলা-বিভ্রম দেখিতেছে। সকলেই গুণী রসজ্ঞ— কলা-সঙ্গত বিশুদ্ধ নৃত্য দেখিতে দেখিতে তাহাদের চক্ষু ভাবাতুর। কেহ নড়িতেছে না, মূর্তির মতো বসিয়া দেখিতেছে।

    কবি কিছুক্ষণ বসিয়া দেখিলেন, তারপর নিঃশব্দে কক্ষ হইতে নির্গত হইলেন। দ্বিতীয় প্রাসাদ নৃত্যশালার সংলগ্ন, মধ্যে একটি অলিন্দের ব্যবধান। সেখানে গিয়া কবি দেখিলেন, কথা-কাহিনীর আসর বসিয়াছে। বক্তা স্বয়ং বেতালভট্ট। তিনি মণিকুট্টিমের মধ্যস্থলে শঙ্খরচিত কমলাসনে বসিয়াছেন, তাঁহাকে ঘিরিয়া বহু নাগরিক-নাগরিকা করতলে চিবুক রাখিয়া অবহিত হইয়া শুনিতেছে। চষকহস্তা কিঙ্করীগণ পূর্ণ পানপাত্র সম্মুখে ধরিতেছে, কিন্তু কাহারও ভ্রূক্ষেপ নাই। কিঙ্করীরাও পাত্র হস্তে চিত্রার্পিতার ন্যায় গল্প শুনিতেছে।

    বেতালভট্ট গম্ভীর কণ্ঠে কহিতেছেন— ‘পিশাচ অট্ট অট্ট হাস্য করিল; কহিল, মহারাজ, এই শ্মশানভূমির উপর আপনার কোনও অধিকার নাই, ইহা আমার রাজ্য। ঐ যে নরমেদঃ-শোণিতলিপ্ত মহাশূল মশানের মধ্যস্থলে প্রোথিত দেখিতেছেন, উহাই আমার রাজদণ্ড।’

    কবি আর সেখানে দাঁড়াইলেন না, হাস্য গোপন করিয়া চুপিচুপি নিষ্ক্রান্ত হইলেন। যাইবার পূর্বে সকলের মুখ একবার ভাল করিয়া নিরীক্ষণ করিয়া লইলেন, কিন্তু প্রিয়দর্শিকাকে শ্রোতৃমণ্ডলীর মধ্যে দেখিতে পাইলেন না।

    তৃতীয় প্রাসাদটি সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ও সুরম্য। সভার ন্যায় সুবিশাল কক্ষ, তাহার চারিদিকে বহুবিধ আসন ও শয্যা বিস্তৃত রহিয়াছে, কেন্দ্রস্থলের মর্মর-কুট্টিম অনাবৃত; তাহার উপর মণিময় অক্ষবাট অঙ্কিত রহিয়াছে। ছাদ হইতে সুবর্ণ শৃঙ্খলে অগণিত দীপ দুলিতেছে, কক্ষ-প্রাচীরে সারি সারি দীপ, উপরন্তু হর্ম্যতলে স্থানে স্থানে স্বর্ণদণ্ডের শীর্ষে সুগন্ধি বর্তিকা জ্বলিতেছে। কক্ষের কোথাও লেশমাত্র অন্ধকার নাই। এই কক্ষের দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া কবির মনে হইল, কক্ষে বুঝি কেহ নাই— এত বিশাল এই কক্ষ যে সেখানে প্রায় ত্রিশজন লোক থাকা সত্ত্বেও উহা শূন্য মনে হইতেছে। সখী ও পরিচারিকাগণ ছায়ার মতো গমনাগমন করিতেছে; তাহাদের নূপুরগুঞ্জনও যেন মৃদু ও অস্পষ্ট হইয়া গিয়াছে।

    ঘরের মধ্যস্থলে উপস্থিত হইয়া কবি দেখিলেন, মহারাজা অবন্তীশ্বর বররুচির সহিত অক্ষ-ক্রীড়ায় বসিয়াছেন। তাঁহাদের একপার্শ্বে রত্নখচিত সুরাভৃঙ্গার ও চষক, অন্যপার্শ্বে তাম্বূল-করঙ্ক। দুইজনেই খেলায় নিমগ্ন। কবি গিয়া দাঁড়াইতেই মহারাজ অন্যমনস্কভাবে চক্ষু তুলিয়া পার্ষ্টি ঘষিতে ঘষিতে বলিলেন— ‘কালিদাস? এস বন্ধু, আমার সহায় হও। বররুচি আমার অঙ্গদ জিতিয়া লইয়াছে— এবার কঙ্কণ পণ—’ বলিয়া পার্ষ্টি ফেলিলেন। গজদন্তের পার্ষ্টিতে মরকতের অক্ষি আলোকসম্পাতে ঝলসিয়া উঠিল।

    রাজার আহ্বানে কালিদাস বসিলেন। অন্যদিন হইলে নিমেষমধ্যে তিনিও খেলায় মাতিয়া উঠিতেন; কিন্তু আজ তাঁহার মন লাগিল না। বিশেষ ইহারা দুইজনেই খেলায় এত একাগ্র যে, মাঝে মাঝে সূরাপাত্র নিঃশেষ করা ব্যতীত আর কোনও দিকে মন দিতে পারিতেছেন না। কিছুক্ষণ বসিয়া থাকিয়া কালিদাস উঠিলেন; ঘরের চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিতে করিতে দেখিলেন, দূরে নীল পক্ষ্মল চীনাংশুকের আস্তরণের উপর প্রিয়দর্শিকা বসিয়া আছে— যেন সরোবরের মাঝখানে একটি মাত্র কমল ফুটিয়াছে। তাহার সম্মুখে বসিয়া একজন পুরুষ হাত নাড়িয়া কি কথা বলিতেছে, পশ্চাৎ হইতে কালিদাস তাহার মুখ দেখিতে পাইলেন না। প্রিয়দর্শিকা কপোলে হস্ত রাখিয়া তাহার কথা শুনিতেছিল। কালিদাস সেইদিকে ফিরিতেই দুইজনের চোখাচোখি হইল। প্রিয়দর্শিকা স্মিত হাসিয়া চোখের ইঙ্গিতে কবিকে ডাকিল।

    কবি বুঝিলেন, প্রিয়দর্শিকা বিপদে পড়িয়াছে। তিনি মন্দমন্থর পদে সেই দিকে অগ্রসর হইলেন। নিকটে গিয়া দেখিলেন, যে ব্যক্তি প্রিয়দর্শিকার সহিত কথা কহিতেছে, সে অত্যন্ত পরিচিত— তাহার মুখ শূকরের ন্যায় কদাকার, দেহ রোমশ, মস্তকের কেশ কণ্টকবৎ ঋজু ও উদ্ধত। কবি মৃদুকণ্ঠে হাসিয়া উঠিলেন, কহিলেন— ‘কে ও? বরাহ— না না—মিহিরভট্ট যে! প্রিয়দর্শিকে, জ্যোতির্বিশারদ কি তোমার ভাগ্য-গণনা করিতেছেন?’

    বাধাপ্রাপ্ত বরাহমিহির ক্রুদ্ধমুখে কবির দিকে ফিরিলেন। প্রিয়দর্শিকা যেন ইতিপূর্বে কবিকে দেখে নাই, এমনিভাবে তাড়াতাড়ি উঠিয়া দাঁড়াইয়া করজোড়ে তাঁহাকে প্রণাম করিল। তাহার কর্ণে নীলকান্তমণির অবতংস দুলিয়া উঠিল। কণ্ঠস্বরে মধু ঢালিয়া দিয়া বলিল— ‘কবিবর, স্বাগতোহসি। আপনার পদার্পণে আজ আমার গৃহে পরমোৎসব। আসন গ্রহণ করুন আর্য। — হলা বকুলে, শীঘ্র কবিবরের জন্য পানীয় লইয়া আয়।’

    কালিদাস বসিলেন, বলিলেন— ‘আচার্য মিহির, কিসের আলোচনা হইতেছিল? ফলিত জ্যোতিষ? উত্তম কথা, আমার ভাগ্যটা একবার গণনা করিয়া দেখুন তো। সম্প্রতি বড় বিপদে পড়িয়াছি।’

    বরাহমিহির মুখে হাসির একটা অনুকৃতি করিয়া বলিলেন— ‘কবি, তুমি এখন বিনাইয়া বিনাইয়া একটা বর্ষা-সংহার কাব্য লেখ গিয়া। এসব কথা তুমি বুঝিবে না।’

    পরিচারিকা স্ফটিকপাত্রে আসব লইয়া আসিল, প্রিয়দর্শিকা তাহা স্বহস্তে লইয়া কবিকে দিল। কবি পান করিয়া পাত্র দাসীকে ফিরাইয়া দিলেন, তারপর প্রিয়দর্শিকার হস্ত হইতে তাম্বূল লইয়া বলিলেন— ‘কেন বুঝিব না? জ্যোতিষশাস্ত্রে শক্ত কি আছে? দ্বাদশ রাশি সপ্তবিংশতি নক্ষত্র আর নবগ্রহ— এই লইয়া তো ব্যাপার। ইহাও যদি বুঝিতে না পারি—’

    বরাহমিহির কবিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়া প্রিয়দর্শিকার দিকে ফিরিয়া অসমাপ্ত বক্তৃতা আবার আরম্ভ করিলেন। বলিলেন— ‘একবার ভাবিয়া দেখ, আমাদের অপৌরুষেয় শাস্ত্রের উপর এই অর্বাচীন যাবনিক বিদ্যা বলাৎকারপূর্বক বসাইয়া দেওয়া হইয়াছে। ফল কিরূপ বিষময় হইয়াছে তাহা জান কি? অশ্বিন্যাদি বিন্দু পুরা তিন অংশ সরিয়া গিয়াছে।’

    বরাহমিহির ক্ষুদ্র রক্তবর্ণ নেত্রে প্রিয়দর্শিকাকে দগ্ধ করিবার উপক্রম করিলেন, যেন এই অপরাধের পরিপূর্ণ দায়িত্ব তাহারই— ‘তিন অংশ! কল্পনা কর— তিন অংশ! ইহার ফলে সমগ্র ভ-চক্র তিন অংশ সরিয়া গিয়াছে। সর্বনাশ হইতে আর বাকি কি? যে সকল গর্ভদাস এই কুকার্য করিয়াছে, তাহারা জানে না যে, আকাশচক্র রথচক্র নয়— উহা চিরস্থির চির-নিরয়ন। এই গ্রহতারামণ্ডিত ব্যোম নিরন্তর ঘূর্ণমান হইয়াও অচল গতিহীন—’

    কালিদাস হাসিয়া উঠিলেন; দেখিলেন, বরাহ আজ যেরূপ ক্ষেপিয়াছে, সহজে উহার কবল হইতে প্রিয়দর্শিকাকে উদ্ধার করা যাইবে না। তিনি উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিলেন— ‘মিহিরভট্ট, ওটা আপনার ভুল। আকাশচক্র সত্যই রথচক্র— মহাকালের নিঃশব্দ ঘর্ঘরহীন রথচক্র। উহা নিরন্তর ঘুরিতেছে এবং সেই সঙ্গে আমরাও ঘুরিতেছি।’

    বরাহ কবির দিকে কেবল একটা কষায়িত নেত্রপাত করিয়া আবার কহিতে লাগিলেন— “শুধু কি তাই! এই দ্বাদশ রাশির অভিযানের ফলে ফলিত জ্যোতিষ একেবারে লণ্ডভণ্ড হইয়া গিয়াছে! অভিজিৎ আজ কোথায়? অভিজিৎকে ছাগমুণ্ড করিয়া তাহার গলা কাটিয়া তাহাকে নক্ষত্রলোক হইতে নির্বাসিত করা হইয়াছে! দ্বাদশ রাশিকে সুতন্ত্রিত করিবার জন্য অষ্টবিংশতি নক্ষত্র এখন সপ্তবিংশতি হইয়াছে। দু’দিন পরে অভিজিতের নাম পর্যন্ত লোকে ভুলিয়া যাইবে— জ্যোতিঃশাস্ত্র মূর্খের দ্বারা লাঞ্ছিত অবজ্ঞাত হইবে—’

    শুনিতে শুনিতে কবি অন্যত্র প্রস্থান করিলেন। প্রিয়দর্শিকা তাঁহার প্রতি একবার করুণ-কটাক্ষ নিক্ষেপ করিল; কিন্তু উপায় নাই। দৈত্য কর্তৃক আক্রান্ত উর্বশীকে পুরুরবা উদ্ধার করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু এ দৈত্য অবধ্য। বিমর্ষভাবে চিন্তা করিতে করিতে কবি কক্ষে ইতস্তত ঘূরিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। রাত্রিও ক্রমে গভীর হইতেছে; কবি ভাবিলেন, আজ আর কিছু হইল না, গৃহে ফিরি। এই সময় তাঁহার দৃষ্টি পড়িল কক্ষের দূর কোণ হইতে একব্যক্তি হস্ত-সঙ্কেতে তাঁহাকে ডাকিতেছে। লোকটি বোধ হয় কিছু অধিক মাত্রায় মাদক-সেবা করিয়াছে, কারণ সে আসন হইতে উঠিবার চেষ্টা করিতেছে, কিন্তু পারিতেছে না এবং যতই উঠিতে অসমর্থ হইতেছে, ততই আর এক চষক পান করিয়া শক্তি সংগ্রহে যত্নবান হইতেছে। তিনজন গূঢ়হাস্যমুখী দাসী তাহার আসব যোগাইতেছে।

    লোকটি বৃদ্ধ, কিন্তু বেশভূষা নবীন নাগরিকের ন্যায়। দেহটি স্থূল, মুখ বর্তুলাকার ও লোলমাংস; কিন্তু অতি যত্ন সহকারে অঙ্গ-সংস্কার করা হইয়াছে। চক্ষে কজ্জল, কর্ণে সুবর্ণ কুণ্ডল, কণ্ঠে মুক্তাহার, রোমশ দেহে পত্রচ্ছেদ্য— নব যুবক সাজিবার কোনও কৌশলই পরিত্যক্ত হয় নাই। কালিদাস তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইলে তিনি চক্ষু তুলিয়াই সহসা কাঁদিয়া ফেলিলেন। দাসীরা মুখ ফিরাইয়া হাসিল।

    কালিদাস বৃদ্ধের পাশে বসিয়া উদ্বিগ্নভাবে প্রশ্ন করিলেন— ‘বটু, কি হইয়াছে? এত কাতর কেন?’

    চক্ষু মার্জনা করিয়া বৃদ্ধ স্খলিত বচনে কহিলেন— ‘বরাহমিহির একটা ষণ্ড!’

    সমবেদনাপূর্ণ হৃদয়ে কালিদাস বলিলেন— ‘সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই। কিন্তু কি হইয়াছে?”

    বৃদ্ধ পুনশ্চ বলিলেন— ‘বরাহমিহির একটা বৃষ!’

    কবি বলিলেন— ‘বটু, এ বিষয়ে আমি তোমার সহিত একমত। কিন্তু ব্যাপার কি— বৃষটা করিয়াছে কি?’

    ভগ্নহৃদয় বৃদ্ধ আবার আরম্ভ করিলেন— ‘বরাহমিহির একটা—’

    ‘বলীবর্দ!’ কবি বৃদ্ধের পৃষ্ঠে হাত রাখিয়া বলিলেন— ‘উক্ষা ভদ্রো বলীবর্দঃ ঋষভো বৃষভো বৃষঃ’ আমার কণ্ঠস্থ আছে— সুতরাং আবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। এখন বলীবর্দটার দুস্কৃতি সম্বন্ধে সবিশেষ জানিতে পারিলে নিশ্চিন্ত হইতে পারি।’

    বৃদ্ধ আর এক চষক মদ্য পান করিলেন, তারপর কহিলেন— ‘কালিদাস, তুমি আমার প্রাণাধিক বয়স্য, তোমার সঙ্গে শৈশবে একসঙ্গে খেলা করিয়াছি, তোমার কাছে আমার গোপনীয় কিছুই নাই। আমি প্রিয়দর্শিকার প্রেমে মজিয়াছি।’— এইখানে বৃদ্ধ আর এক চষক পান করিলেন— ‘তাহাকে যে কতবার কত মদনালঙ্কার উপহার দিয়াছি, কত সঙ্কেত জানাইয়াছি, তাহার ইয়াত্ত নাই। কিন্তু দুষ্টা আমাকে দেখিলেই ‘তাত’ বলিয়া সম্বোধন করে— এমন ছলনা দেখায় যেন আমার মনের ভাব বুঝিতেই পারে নাই!— আজি আমি সঙ্কল্প করিয়া আসিয়াছিলাম যে, প্রিয়দর্শিকার চরণে আত্মনিবেদন করিব— কোনও ছল-চাতুরী শুনিব না। কিন্তু আসিয়াই দেখিলাম, ঐ বরাহটা উহাকে কর-কবলিত করিয়াছে। সেই অবধি কেবলই সুযোগ খুঁজিতেছি, কিন্তু শূকরটা কিছুতেই উহার সঙ্গ ছাড়িতেছে না।’ বলিয়া সুরাবিহ্বল নেত্রে যতদূর সম্ভব বিদ্বেষ-সঞ্চার করিয়া যেখানে বরাহমিহির বসিয়া ছিলেন, সেইদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন।

    প্রবল হাস্যোচ্ছ্বাস দমন করিয়া কালিদাস কহিলেন— ‘বটু, তোমার বুদ্ধিভ্রংশ হইয়াছে— প্রিয়দর্শিকার প্রতি প্রেমসঞ্চার তোমার পক্ষে অতীব গর্হিত। তুমি বালকমাত্র— প্রিয়দর্শিকা বর্ষীয়সী,— তাহার সহিত তোমার প্রণয় কদাপি যুক্তিযুক্ত নয়। তুমি বরঞ্চ তোমার বয়সোপযোগিনী কোনও কুমারী কন্যার প্রতি আসক্ত হও।’

    বৃদ্ধ বিবেচনা করিয়া বলিলেন — ‘সে কথা যথার্থ। কিন্তু আমি প্রিয়দর্শিকাকে মনপ্রাণ সমর্পণ করিয়া ফেলিয়াছি, এখন আর ফিরাইয়া লইতে পারি না।’ তারপর কালিদাসের হস্ত ধারণ করিয়া কাতরভাবে বলিলেন— ‘কালিদাস, তুমি আমার সখা, আজ সখার কার্য কর, ঐ শূকরটাকে প্রিয়দর্শিকার নিকট হইতে খেদাইয়া দাও। নতুবা বন্ধুহত্যার পাপ তোমাকে স্পর্শ করিবে।’

    অকস্মাৎ একটা কূটবুদ্ধি কালিদাসের মাথায় খেলিয়া গেল। ঠিক হইয়াছে— কণ্টকেনৈব কণ্টকম্! তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘শুধু প্রিয়দর্শিকার নিকট হইতে খেদাইয়া দিলেই হইবে? আর কিছু চাহ না?’

    ‘আর কিছু চাহি না।’

    ‘ভাল, চেষ্টা করিয়া দেখি।’ কালিদাস উঠিলেন। কিছু দূর গিয়া আবার ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন— ‘একটা কথা। বটু, পৃথিবীর আহ্নিক গতি আছে, এ কথা তুমি বিশ্বাস কর?’

    বৃদ্ধ বলিলেন — ‘পৃথিবীর আহ্নিক গতি থাক্ বা না থাক্ —’

    কালিদাস বলিলেন— ‘না না, ওটা একান্ত আবশ্যক! বরাহমিহির আহ্নিক গতিতে বিশ্বাস করেন না।’

    নিজের ঊরুর উপর প্রচণ্ড চপেটাঘাত করিয়া বটুক বলিলেন— ‘তবে আমি বিশ্বাস করি। মুক্তকণ্ঠে কহিতেছি —’

    কবি হাসিয়া বলিলেন— ‘থাক, উহাতেই হইবে। একেবারে মিথ্যা বলিতে চাহি না।’

    বরাহমিহির তখন নিজের বাগ্নিতায় মাতিয়া উঠিয়াছেন; কালিদাস তাঁহার সম্মুখে দাঁড়াইয়া দুঃখিতভাবে মস্তক আন্দোলন করিয়া কহিলেন— ‘আর্য মিহিরভট্ট, বড়ই দুঃসংবাদ শুনিতেছি।’

    বরাহমিহির বাক্যস্রোত সম্বরণ করিয়া কহিলেন— ‘কি হইয়াছে?’

    কালিদাস উপবেশন করিয়া বলিলেন— ‘এতক্ষণ তাত অমরসিংহের সহিত কথা হইতেছিল। তিনি বলিলেন, আর্যভট্টের মীমাংসাই সত্য; পৃথিবীর আহ্নিক গতি আছে।’

    মিহিরভট্ট শূকর-দন্ত নিষ্ক্রান্ত করিয়া সক্রোধে বলিলেন— ‘অমরসিংহ একটা নখদন্তহীন বৃদ্ধ ভল্লুক, তাহার বুদ্ধি লোপ পাইয়াছে।’

    কালিদাস কহিলেন— ‘তিনি বলিতেছেন যে, ‘আহ্নিক’ নামে একটি নূতন শব্দ শীঘ্রই  অমরকোষে সংযোজিত করিবেন। তাহাতে আর্যভট্টের মীমাংসাই—’

    মিহিরভট্ট আর স্থির থাকিতে পারিলেন না, অর্ধরুদ্ধ একটি গর্জন ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন। তারপর— ‘জড়বুদ্ধি জরদ্গব।’ ‘শৌণ্ড’ ‘উন্মাদ’ ইত্যাদি কটূক্তি করিতে করিতে অমরসিংহের অভিমুখে ধাবিত হইলেন।

    প্রিয়দর্শিকা ও কালিদাস পরস্পরের মুখের দিকে চাহিয়া হাসিলেন। এই বারাঙ্গনা ও কবির মধ্যে এমন একটি অন্তর্গূঢ় পরিচয় ছিল যে, একে অন্যের মুখের দিকে চাহিয়াই তাহার মনের অন্তরতম কথাটি জানিতে পারিতেন। আজ কবির চিত্ত কোনও কারণে উৎক্ষিপ্ত হইয়াছে, তাহা প্রিয়দর্শিকা বুঝিয়াছিল। কিন্তু সে সে-কথা না বলিয়া শ্রদ্ধাবিগলিত অস্ফুট কাকলিতে কহিল— ‘কবি, অবলার দুঃখমোচনে যদি পুণ্য থাকে, তবে সে পুণ্য আপনার।—কিন্তু ওদিকে যে গজকূর্মের যুদ্ধ বাধিল বলিয়া।’

    কবি প্রাণে এক অপরূপ শান্তি অনুভব করিতে লাগিলেন। কেবলমাত্র এই নারীর সাহচর্যই যেন তাঁহাকে প্রসন্ন করিয়া তুলিল। তিনি শয্যার উপর অর্ধশায়িত হইয়া প্রিয়দর্শিকার দিকে চাহিয়া রহিলেন। প্রিয়দর্শিকা তাঁহার বাহুর নিম্নে সযত্নে একটি উপাধান ন্যস্ত করিয়া দিল।

    কিছুক্ষণ দুইজনে মুখোমুখি বসিয়া রহিলেন। কবির চোখে প্রশান্ত নিস্তরঙ্গ শান্তি, — প্রিয়দর্শিকা কিছু বিচলিত।

    তারপর প্রিয়দর্শিকা চক্ষু নত করিল; তাম্বূল-করঙ্ক কবির সম্মুখে ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিল— ‘ভট্টিনীর সংবাদ কি?’

    কবি ঈষৎ চমকিত হইয়া তাম্বূল লইলেন, ভ্রূ একটু কুঞ্চিত হইল, বলিলেন— ‘ভট্টিনী? সংবাদ কিছু নাই, তিনি গৃহে আছেন।’

    একটা দুঃসহ ক্ষোভের ছায়া প্রিয়দর্শিকার মুখের উপর দিয়া বহিয়া গেল। কিন্তু তাহা নিমেষকালের জন্য। সে হাস্যমুখেই বলিল— ‘হায় কবি, এই সপ্তসাগরা পৃথিবী তোমার গুণে পাগল, কিন্তু তোমার গৃহিণী তোমাকে চিনিলেন না।’

    বিস্ময়ে ভ্রূ তুলিয়া কালিদাস বলিলেন— ‘চিনিলেন না। কিন্তু তিনি তো আমাকে —’

    প্রিয়দর্শিকা পূর্ণদৃষ্টিতে তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া ব্যথা-বিদ্ধ কণ্ঠে কহিল— ‘আমি সব জানি কবি, আমার কাছে কোনও কথা গোপন করিবার চেষ্টা করিও না।’ তারপর মুহূর্তমধ্যে কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করিয়া চটুল স্বরে বলিল— ‘কিন্তু থাক্‌ ও কথা। আজ কবির ললাটে চিন্তারেখা দেখিতেছি কেন? যে কাব্য শেষ হইতে আর দেরি নাই বলিয়া সকলকে আশ্বাস দিয়া রাখিয়াছেন, তাহা কি এখনও শেষ হয় নাই?’

    কালিদাস উঠিয়া বলিলেন— ‘প্রিয়দর্শিকে, বড়ই বিপদে পড়িয়াছি,— গত তিন রাত্রি হইতে আমার নিদ্রা নাই। তোমার পরামর্শ চাহি।’

    বিস্মিতা প্রিয়দর্শিকা বলিল— ‘কি ঘটিয়াছে?’

    কালিদাস বলিলেন— ‘আমি যে কাব্য লিখিতেছি, তাহারই সংক্রান্ত ব্যাপার— অনেক ভাবিয়াও কিছু স্থির করিতে পারিতেছি না। তোমাকে উপদেশ দিতে হইবে।’

    আনন্দে প্রিয়দর্শিকার মুখ উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল, বাষ্পাচ্ছন্ন নেত্রে সে বলিল — ‘কবি, আপনি রসের অমরাবতীতে বিজয়ী বাসব, কল্পনার ধ্যানলোকে আপনি শূলপাণি, আমি আপনাকে উপদেশ দিব? আমাকে লজ্জা দিবেন না।’

    প্রিয়দর্শিকার জানুতে করাঙ্গুলি স্পর্শ করিয়া কবি কহিলেন — ‘প্রিয়দর্শিকে, অবন্তীরাজ্যে যদি প্রকৃত রসের বোদ্ধা কেহ থাকে তো সে তুমি — এ কথা অকপটে কহিলাম। আর সকলে পল্লবগ্রাহী, মধুর শব্দে মুগ্ধ, বাহ্য সৌন্দর্যে আকৃষ্ট; রসের অতলে কেবল তুমিই ডুবিতে পারিয়াছ। তুমি ভাগ্যবতী।’

    সজলনেত্রে যুক্তপাণি হইয়া প্রিয়দর্শিকা বলিল— ‘কবিবর, আমি সত্যই ভাগ্যবতী। কিন্তু কি আপনার সমস্যা, শুনি। কাব্য কি শেষ হয় নাই?’

    কবি বলিলেন— ‘কাব্য শেষ হইয়াছে কি না, তাহা বুঝিতে পারিতেছি না।’

    বিস্ময়-কৌতূহল-মিশ্রিত স্বরে প্রিয়দর্শিকা বলিল— ‘কাব্য শেষ হইয়াছে কি না বুঝিতে পারিতেছেন না? এ তো বড় অদ্ভুত কথা!’

    কালিদাস আরও নিকটে সরিয়া আসিয়া আগ্রহে বলিতে লাগিলেন— ‘এ পর্যন্ত অন্য কাহাকেও বলি নাই, তোমাকে প্রথম বলিতেছি, শুন। আমার কাব্যের নাম কুমারসম্ভব। স্বয়ং মহেশ্বর এই কাব্যের নায়ক— পার্বতী নায়িকা। কাব্যের বিষয় এইরূপ— তারকাসুরের উৎপীড়নে অতিষ্ঠ হইয়া দেবগণ ব্রহ্মার নিকট উপস্থিত হইলেন। ব্রহ্মা কহিলেন, মহাদেবের ঔরসে স্কন্দ জন্মগ্রহণ করিয়া তারকাসুরকে সংহার করিবেন। সতীর দেহত্যাগের পর শঙ্কর তখন ধ্যানমগ্ন; ও-দিকে সতী হিমালয় গৃহে উমা হইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। উমা যৌবনপ্রাপ্ত হইয়া হরের পরিচর্যার জন্য তাঁহার তপোভূমিতে উপস্থিত হইলেন। হরের তপস্যা কিন্তু ভাঙ্গে না। তখন দেবগণ মদনকে তপস্যা ভঙ্গের জন্য পাঠাইলেন। মদন তপোভঙ্গ করিলেন বটে, কিন্তু স্বয়ং হরনেত্রজন্মা বহ্নিতে ভস্মীভূত হইলেন। মহাদেব তপোভূমি ত্যাগ করিয়া গেলেন। ভগ্নহৃদয়া উমা তখন পতিলাভার্থে কঠোর তপশ্চর্যা আরম্ভ করিলেন। ক্রমে মহেশ্বর প্রীত হইয়া উমার নিকট ফিরিয়া আসিলেন; তারপর উভয়ের বিবাহ হইল।’

    এই পর্যন্ত বলিয়া কবি থামিলেন। প্রিয়দর্শিকা তন্ময় হইয়া শুনিতেছিল, মুখ তুলিয়া চাহিল।

    কবি বলিলেন— ‘সপ্তম সর্গে আমি হরপার্বতীর বিবাহ দিয়াছি। বধূর সলজ্জ মুখে হাসি ফুটিয়াছে— কন্দর্প পুনরুজ্জীবিত হইয়াছে।  কুমারসম্ভব কাব্যের যাহা প্রতিপাদ্য, তাহা প্রতিপন্ন হইয়াছে। সুতরাং কাব্যকলা-সঙ্গত ন্যায়ে কাব্য শেষ হইয়াছে— যথার্থ কি না?’

    প্রিয়দর্শিকা উত্তর করিল না, তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে কবির প্রতি চাহিয়া রহিল। ক্ষণকাল নীরব থাকিয়া কবি বলিলেন— ‘আমিও বুঝিতেছি যে শাস্ত্রমতে কাব্য এইখানেই সমাপ্ত হওয়া উচিত! তথাপি মনের মধ্যে একটা সন্দেহ জাগিয়াছে।’

    ‘কিসের সন্দেহ?’

    ‘মনে হইতেছে যেন কাব্য সম্পূর্ণ হইল না। উমা-মহেশ্বরের পূর্বরাগ ও বিবাহ বর্ণনা করিলাম বটে, কিন্তু তবু কাব্যের মূল কথাটি অকথিত রহিয়া গেল। প্রিয়দর্শিকে, তোমার কি মনে হয়? দেবদম্পতির বিবাহোত্তর জীবন চিত্রিত করা কি কাব্যকলা-সঙ্গত হইবে?’

    প্রিয়দর্শিকা বলিল— ‘অলঙ্কার-শাস্ত্রমতে হইবে না। প্রথমত বিষয়াতিরিক্ত বর্ণনা বাগ্‌বাহুল্য বলিয়া বিবেচিত হইবে। দ্বিতীয়ত জগৎপিতা ও জগন্মাতার দাম্পত্যজীবন-বর্ণনা অতিশয় গর্হিত বলিয়া নিন্দিত হইবে।’

    কবি জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘তবে তোমার মতে বিবাহ দিয়াই কাব্য শেষ করা কর্তব্য?’

    প্রিয়দর্শিকা দীর্ঘকাল করতলে কপোল রাখিয়া বসিয়া রহিল। অবশেষে বলিল— ‘কবি, কাব্যশাস্ত্রের চেয়ে সত্য বড়। সত্যের অনুজ্ঞায় সকলেই শাস্ত্র লঙ্ঘন করিতে পারে, তাহাতে বাধা নাই।’

    কবি বলিলেন— ‘কিন্তু এ ক্ষেত্রে সত্য কাহাকে বলিতেছ?’

    প্রিয়দর্শিকা বলিল— ‘হরপার্বতীর মিলনই সত্য।’

    কবি বলিলেন— ‘তাহাই যদি হয় তবে সে সত্য তো পালিত হইয়াছে।’

    ‘হইয়াছে কি?’

    ‘হয় নাই?’

    ‘তাহা আমি বলিতে পারিব না; উহা কবির অন্তরের কথা।’

    কবি কিয়ৎকাল নীরব থাকিয়া বলিলেন— ‘আমার অন্তরের কথা আমি বুঝিতে পারিতেছি না— তাই এই সংশয়। তোমার অভিমত কি বল।’

    প্রিয়দর্শিকা মৃদু হাস্য করিয়া বলিল— ‘আমার অভিমত শুনিবেনই?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘না শুনিয়া নিরস্ত হইবেন না?’

    ‘না।’

    ‘ভাল। আজ আপনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করুন— রাত্রি গভীর হইয়াছে। কাল প্রাতে যদি আপনার মনে কোনও সংশয় থাকে, আমার অভিমত জানাইব।’ — বলিয়া প্রিয়দর্শিকা উঠিয়া দাঁড়াইল।

    কবি ঈষৎ নিরাশ হইলেন, কিন্তু মুখে কিছু বলিলেন না। প্রিয়দর্শিকা তোরণদ্বার পর্যন্ত তাঁহার সঙ্গে আসিল। বিদায়কালে কবি বলিলেন— ‘চলিলাম। মিহিরভট্ট ও অমরসিংহ হইতে দূরে দূরে থাকিও। আর কথাটা চিন্তা করিয়া দেখিও।’ দুইজনের চোখে চোখে স্মিতহাস্য বিনিময় হইল।

    প্রিয়দর্শিকা বলিল— ‘দেখিব।’

    কবি যখন নিজ গৃহদ্বারে পৌঁছিলেন, তখন রাত্রি তৃতীয় প্রহর। দ্বার ভিতর হইতে অর্গলবদ্ধ— অন্ধকার। কবি উৎকর্ণ হইয়া শুনিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু কোনও শব্দ পাইলেন না। বোধ হয় সকলে নিদ্রিত।

    তিনি কবাটে করাঘাত করিলেন।

    ভিতর হইতে কণ্ঠস্বর শুনা গেল— ‘কে?’

    কবি কুণ্ঠিতস্বরে উত্তর করিলেন— ‘আমি— কালিদাস।’

    গৃহের কবাট খুলিল— কবি সভয়ে দেখিলেন প্রদীপ হস্তে স্বয়ং গৃহিণী!

    গৃহিণী কহিলেন— ‘আসিয়াছ? এত রাত্রি পর্যন্ত কোথায় ছিলে?’

    গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া কবি ক্ষুব্ধস্বরে কহিলেন— ‘প্রিয়ে, তুমি এতক্ষণ জাগিয়া আছ কেন? দাসীকে বলিলেই তো—’

    কবিপত্নী কঠিন স্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘এত রাত্রি পর্যন্ত কোথায় ছিলে?’

    সঙ্কুচিত হইয়া কবি কহিলেন— ‘সমাপানকে গিয়াছিলাম—’

    কবিপত্নীর অবরুদ্ধ ক্রোধ এতক্ষণে ফাটিয়া পড়িল, তিনি প্রজ্বলিত নেত্রে কহিলেন— ‘প্রিয়দর্শিকার গৃহে গিয়াছিলে! বল বল, লজ্জা কি? কেহ নিন্দা করিবে না। তুমি মহাপণ্ডিত, তুমি সভাকবি, তুমি ধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ— বেশ্যালয়ে রাত্রিযাপন করিয়াছ, তাহাতে আর লজ্জা কি?’

    ‘প্রিয়ে—’

    ‘ধিক্‌! আমাকে প্রিয়সম্বোধন করিতে তোমার কুণ্ঠা হয় না? কে তোমার প্রিয়া? আমি— না ঐ সহস্রভোগ্যা পথকুক্কুরী প্রিয়দর্শিকা?’

    কবি নিরুত্তর দাঁড়াইয়া রহিলেন। তাঁহার নীরবতা কবিপত্নীর ক্রোধে ঘৃতাহুতি দিল— ‘ধিক্‌ মিথ্যাচারী! ধিক্‌ লম্পট! কি জন্য রাত্রিশেষে গৃহে আসিয়াছ? বেশ্যার উচ্ছিষ্টভোগীকে স্পর্শ করিলে কুলাঙ্গনাকে স্নান করিয়া শুচি হইতে হয়! যাও— গৃহে তোমার কি প্রয়োজন? যেখানে এতক্ষণ ছিলে, সেইখানেই ফিরিয়া যাও!’ — এই বলিয়া কবিপত্নী শয়নকক্ষে প্রবেশ করিয়া সশব্দে দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিলেন।

    অন্ধকারে কবি নিশ্চল হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। এই তাঁহার গৃহ! এই তাঁহার ভার্যা! গৃহিণী সচিব সখী প্রিয়শিষ্যা! গভীর নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কবি ফিরিলেন। যে ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে বসিয়া কাব্য-রচনা করিতেন সেই প্রকোষ্ঠে গিয়া দীপ জ্বালিলেন।

    মৃগচর্ম বিছাইয়া উপবেশন করিতেই অদূরে কাষ্ঠাসনে রক্ষিত কুমারসম্ভবের বৃহৎ পুঁথির উপর দৃষ্টি পড়িল। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎচমকের ন্যায় আকস্মিক প্রভা তাঁহার মস্তিষ্কের মধ্যে খেলিয়া গেল। প্রিয়দর্শিকা ঠিক বুঝিয়াছিল। সে বলিয়াছিল— ‘কাল প্রাতে যদি কোনও সংশয় থাকে—।’ না, তাঁহার মনে আর লেশমাত্র সংশয় নাই। পত্নীর সহিত সাক্ষাতের সঙ্গে সঙ্গে সংশয়ের অন্ধকার কাটিয়া গিয়াছে।

    কালিদাস উঠিলেন। প্রদীপদণ্ড আনিয়া আসনপার্শ্বে রাখিলেন, কাষ্ঠাসন-সমেত পুঁথি সম্মুখে স্থাপন করিলেন। মসীপাত্র, লেখনী ও তালপত্র পাড়িয়া আবার আসিয়া বসিলেন।

    ক্রমে তাঁহার মুখের ভাব স্বপ্নাচ্ছন্ন হইল। লেখনী মুষ্টিতে লইয়া তালপত্রের উপর পরীক্ষা করিলেন, তারপর ধীরে ধীরে লিখিলেন— ‘অষ্টমঃ সর্গঃ।’

    এই পর্যন্ত লিখিয়া অতি দীর্ঘকাল দৃষ্টিহীন নয়নে গবাক্ষের দিকে চাহিয়া রহিলেন। বাহিরে তামসী রাত্রি, টিপ টিপ করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছে। কিন্তু কবির মানসপটে যে চিত্রগুলি একে একে ভাসিয়া উঠিতে লাগিল, তাহা বসন্তের গন্ধে বর্ণে কাকলিতে সমাকুল— বর্ষা রজনীর শ্যামসজল ছায়া তাহার অম্লান দীপ্তিকে স্পর্শ করিতে পারিল না।

    সহসা অবনত হইয়া কবি লিখিতে আরম্ভ করিলেন, শরের লেখনী তালপত্রের উপর শব্দ করিয়া চলিতে লাগিল— ‘পাণিপীড়নবিধেরনন্তরম্‌—’

    ৩০ আষাঢ় ১৩৪০

  • চুয়াচন্দন

    চুয়াচন্দন

    চুয়াচন্দন

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    একদিন গ্রীষ্মের শেষভাগে, সূর্য মধ্যাকাশে আরোহণ করিতে তখনও দণ্ড তিন-চার বাকি আছে, এমন সময় নবদ্বীপের স্নানঘাটে এক কৌতুকপ্রদ অভিনয় চলিতেছিল।

    ভাগীরথীর পূর্বতটে নবদ্বীপ। স্নানের ঘাটও অতি বিস্তৃত— এক গঙ্গাঘাটে লক্ষ লোক স্নান করে। ঘাটের সারি সারি পৈঠাগুলি যেমন উত্তর-দক্ষিণে বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত, তেমনি প্রত্যেকটি পৈঠা প্রায় সেকালের সাধারণ রাজপথের মতো চওড়া। গ্রীষ্মের প্রখরতায় জল শুকাইয়া প্রায় সব পৈঠাই বাহির হইয়া পড়িয়াছে— দু’-এক ধাপ নামিলেই নদীর কাদা পায়ে ঠেকে। স্নানের ঘাট যেখানে শেষ হইয়াছে, সেখান হইতে বাঁধানো খেয়াঘাট আরম্ভ। তথায় খেয়ার নৌকা, জেলে-ডিঙ্গি, দুই-একটা হাজারমনী মহাজনী ভড় বাঁধা আছে। নৌকাগুলির ভিতরে দৈনিক রন্ধনকার্য চলিতেছে,— ছই ভেদ করিয়া মৃদু মৃদু ধূম উত্থিত হইতেছে।

    বহুজনাকীর্ণ স্নান-ঘাটে ব্যস্ততার অন্ত নাই। আজ কৃষ্ণা চতুর্দশী। ঘাটের জনতাকে সমগ্রভাবে দর্শন করিলে মনে হয়, মুণ্ডিতশীর্ষ উপবীতধারী ব্রাহ্মণ ও প্রৌঢ়া-বৃদ্ধ নারীর সংখ্যাই বেশি। ছেলে-ছোকরার দলও নেহাৎ কম নয়; তাহারা সাঁতার কাটিতেছে, জল তোলপাড় করিতেছে। নারীদের স্নানের জন্য কোনও পৃথক ব্যবস্থা নাই, যে যেখানে পাইতেছে সেখানেই স্নান করিতেছে। তরুণী বধূরা ঘোমটায় মুখ ঢাকিয়া টুপ্‌ টুপ্‌ ডুব দিতেছে। পর্দাপ্রথা বলিয়া কিছু নাই বটে, তবু অবগুণ্ঠন দ্বারা শালীনতারক্ষার একটা চেষ্টা আছে; যদিও সে চেষ্টা তনু-সংলগ্ন সিক্তবস্ত্রে বিশেষ মর্যাদা পাইতেছে না। সেকালে বাঙালী মেয়েদের দেহলাবণ্য গোপন করিবার সংস্কার বড় বেশি প্রবল ছিল না; গৃহস্থ-কন্যাদের কাঁচুলি পরিবার রীতিও প্রচলিত হয় নাই।

    যে যুগের কথা বলিতেছি, তাহা আজ হইতে চারি শতাব্দীরও অধিককাল হইল অতীত হইয়াছে। সম্ভবত আমাদের ঊর্ধ্বতন পঞ্চদশ পুরুষ সে সময় জীবিত ছিলেন। তখন বাংলার ঘোর দুর্দিন যাইতেছিল। রাজশক্তি পাঠানের হাতে; ধর্ম ও সমাজের বন্ধন বহু যুগের অবহেলায় গলিত রজ্জু-বন্ধনের ন্যায় খসিয়া পড়িতেছে। দেশও যেমন অরাজক, সমাজও তেমনি বহুরাজক। কেহ কাহারও শাসন মানে না। মৃত বৌদ্ধধর্মের শবনির্গলিত তন্ত্রবাদের সহিত শাক্ত ও শৈব মতবাদ মিশ্রিত হইয়া যে বীভৎস বামাচার উত্থিত হইয়াছে— তাহাই আকণ্ঠ পান করিয়া বাঙালী অন্ধ-মত্ততায় অধঃপথের পানে স্খলিতপদে অগ্রসর হইয়া চলিয়াছে। সহজিয়া সাধনার নামে যে উচ্ছৃঙ্খল অজাচার চলিয়াছে, তাহার কোনও নিষেধ নাই। কে কাহাকে নিষেধ করিবে? যাহারা শক্তিমান, তাহারাই উচ্ছৃঙ্খলতায় অগ্রবর্তী। মাতৃকাসাধন, পঞ্চ-মকার উদ্দাম নৃত্যে আসর দখল করিয়া আছে। প্রকৃত মনুষ্যত্বের চর্চা দেশ হইতে যেন উঠিয়া গিয়াছে।

    তখনও স্মার্ত রঘুনন্দন আচারকে ধর্মের নিগূঢ় বন্ধনে বাঁধিয়া সমাজের শোধন-সংস্কার আরম্ভ করেন নাই। কাণভট্ট রঘুনাথ মিথিলা জয় করিয়া ফিরিয়াছেন বটে, কিন্তু নবদ্বীপে সরস্বতীর পীঠ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। নদের নিমাই তখনও ব্যাকরণের টোলে ছাত্র পড়াইতেছেন ও নানাপ্রকার ছেলেমানুষি করিতেছেন। তখনও সেই হরিচরণস্রুত প্রেমের বন্যা আসে নাই— বাঙালীর ক্লেদকলুষিত চিত্তের বহু শতাব্দী সঞ্চিত মলামাটি সেই পূত প্রবাহে ধৌত হইয়া যায় নাই।

    ১৪২৬ শকাব্দের প্রারম্ভে এক কৃষ্ণা চতুর্দশীর পূর্বাহ্ণে বাংলার কেন্দ্র নবদ্বীপের ঘাটে কি হইতেছিল, তাহাই লইয়া এই আখ্যায়িকার আরম্ভ।

    ঘাটে যে সকলেই স্নান করিতেছে, তাহা নয়। এক পাশে সারি সারি নাপিত বসিয়া গিয়াছে; বহু ভট্টাচার্য গোঁসাই গলা বাড়াইয়া ক্ষৌরী হইতেছেন। বুরুজের গোলাকৃতি চাতালে একদল উলঙ্গপ্রায় পণ্ডিত দেহে সবেগে তৈলমর্দন করিতে করিতে ততোধিক বেগে তর্ক করিতেছেন। বাসুদেব সার্বভৌম মিথিলা হইতে সর্ববিদ্যায় পারংগম হইয়া ফিরিয়া আসিবার পর হইতে নবদ্বীপে বিদ্যাচর্চার সূত্রপাত হইয়াছিল। কিন্তু বিদ্যা তখনও হৃদয়ে আসন স্থাপন করেন নাই; তাই বাঙালী পণ্ডিতের মুখের দাপট কিছু বেশি ছিল। শাস্ত্রীয় তর্ক অনেক সময় আঁচড়া-কামড়িতে পরিসমাপ্তি লাভ করিত।

    তৈল-মসৃণ পণ্ডিতদের তর্কও ন্যায়শাস্ত্রের সীমানা ছাড়াইয়া অরাজকতার দেশে প্রবেশ করিবার উপক্রম করিতেছিল। একজন অতি গৌরকান্তি যুবা— বয়স বিশ বছরের বেশি নয়— তর্ক বাধাইয়া দিয়া, পাশে দাঁড়াইয়া তাহাদের বিতণ্ডা শুনিতেছিল ও মৃদু মৃদু হাস্য করিতেছিল। তাহার ঈষদরুণ আয়ত চক্ষু হইতে যেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, পণ্ডিত্যের অভিমান ও কৌতুক একসঙ্গে ক্ষরিয়া পড়িতেছিল।

    জলের কিনারায় বসিয়া কেহ কেহ পায়ে ঝামা ঘষিতেছিল। নারীরা বস্ত্রাবরণের মধ্যে ক্ষার-খৈল দিয়া গাত্র মার্জনা করিতেছিল। কয়েকজন বর্ষীয়ান্ ব্রাহ্মণ আবক্ষ জলে নামিয়া পূর্বমুখ হইয়া আহ্নিক করিতেছিলেন।

    এই সময় দক্ষিণ দিকে গঙ্গার বাঁকের উপর দুইখানি বড় সামুদ্রিক নৌকা পালের ভরে উজান ঠেলিয়া ধীরে ধীরে নবদ্বীপের ঘাটের দিকে অগ্রসর হইতেছিল— অধিকাংশ স্নানার্থীর দৃষ্টি সেই দিকেই নিবদ্ধ ছিল। সমুদ্রযাত্রী বানিজ্যতরীদের দেশে ফিরিবার সময় হইয়াছে; প্রতি সপ্তাহেই দুটি একটি করিয়া ফিরিতেছিল।

    ক্রমে নৌকা দুইটি খেয়ার ঘাটে গিয়া ভিড়িল। মধুকর ডিঙ্গার ছাদের উপর একজন যুবা দাঁড়াইয়া পরম আগ্রহের সহিত ঘাটের দৃশ্য দেখিতেছিল; পাল নামাইবার সঙ্গে সঙ্গে সেও তীরে অবতরণ করিবার জন্য ছাদ হইতে নামিয়া গেল।

    বড় নৌকা ঘাটের নিকট দিয়া যাইবার ফলে জলে ঢেউ উঠিয়া ঘাটে আঘাত করিতে আরম্ভ করিয়াছিল; অনেক ছেলে-ছোকরা কোমরে গামছা বাঁধিয়া ঢেউ খাইবার জন্য জলে নামিয়াছিল। ঢেউয়ের মধ্যে বহু সন্তরণকারী বালকের হস্তপদসঞ্চালনে ঘাট আলোড়িত হইয়া উঠিয়াছিল।

    হঠাৎ তীর হইতে একটা ‘গেল গেল’ রব উঠিল। যে গৌরকান্তি যুবাটি এতক্ষণ দাঁড়াইয়া তর্করত পণ্ডিতদের রঙ্গ দেখিতেছিল, সে দুই লাফে জলের কিনারায় আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কি হয়েছে?”

    কয়েকজন সমস্বরে উত্তর দিলে, “কানা-গোঁসাই এতক্ষণ জলে দাঁড়িয়ে আহ্নিক করছিলেন, হঠাৎ তাঁকে আর দেখা যাচ্ছে না। ভাবে-ভোলা মানুষ, হয়তো নৌকোর ঢেউ লেগে তলিয়ে গেছেন।”

    যুবা কোমরে গামছা বাঁধিতে বাঁধিতে শুনিতেছিল, আদেশের স্বরে কহিল, “তোমরা কেউ জলে নেমো না, তাহলে গণ্ডগোল হবে। আমি দেখছি।” — বলিয়া সে জলে ঝাঁপাইয়া পড়িল।

    গ্রীষ্মকালে ঘাটে স্নান করা ভাবে-ভোলা মানুষদের পক্ষে সর্বদা নিরাপদ নয়। কারণ, জলের মধ্যে দুই ধাপ সিঁড়ি নামিয়াই শেষ হইয়াছে— তারপর কাদা। এখানে বুক পর্যন্ত জলে বেশ যাওয়া যায়, কিন্তু আর এক পা অগ্রসর হইলেই একেবারে ডুবজলে। যুবক জলে ঝাঁপ দিয়া কয়েক হাত সাঁতার কাটিয়া গেল, তারপর অথৈ জলে গিয়া ডুব দিল।

    কিছুক্ষণ তাহার আর কোনও চিহ্ন নাই। ঘাটের ধারে কাতার দিয়া লোক দাঁড়াইয়া দেখিতেছে। সকলের মুখেই উদ্বেগ ও আশঙ্কার ছায়া। কয়েকজন প্রৌঢ়া স্ত্রীলোক ক্রন্দন-করুণ সুরে হা-হুতাশ করিতে আরম্ভ করিয়া দিল।

    পঞ্চাশ গুণিতে যতক্ষণ সময় লাগে, ততক্ষণ পরে যুবকের মাথা জলের উপর জাগিয়া উঠিল। সকলে হর্ষধ্বনি করিয়া উঠিল— কিন্তু পরক্ষণেই আবার নীরব হইল। যুবক নিমজ্জিত ব্যক্তিকে খুঁজিয়া পায় নাই, সে বার-কয়েক সুদীর্ঘ নিশ্বাস টানিয়া আবার ডুব দিল।

    এবারও সমধিক কাল ডুবিয়া থাকিয়া সে আবার উঠিল; একবার সজোরে মস্তক সঞ্চালন করিয়া এক হাতে সাঁতার কাটিয়া তীরের দিকে অগ্রসর হইল।

    সকলে সচিৎকারে প্রশ্ন করিল,” পেয়েছ? পেয়েছ?”

    যুবক হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল, “বলতে পারি না। তবে এক মুঠো টিকি পেয়েছি।”

    যুবক যখন তীরে আসিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, তখন সকলে বিস্মিত হইয়া দেখিল, তাহার বামমুষ্টি এক গুচ্ছ পরিপুষ্ট শিখা দৃঢ়ভাবে ধরিয়া আছে এবং নিমজ্জিত পণ্ডিতের দেহসমেত মুণ্ড উক্ত শিখার সহিত সংলগ্ন হইয়া আছে।

    কিয়ৎকাল শুশ্রূষার পর পণ্ডিতের চৈতন্য হইল। তিনি কিছু জল পান করিয়াছিলেন, তাহা উৎক্ষিপ্ত হইবার পর চক্ষু মেলিয়া চাহিলেন। যুবক সহাস্যকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “শিরোমণি মশায়, বলুন দেখি বেঁচে আছেন, না মরে গেছেন? আপনার নব্য ন্যায়শাস্ত্র কি বলে?”

    শিরোমণি এক চক্ষু দ্বারা কিছুক্ষণ ফ্যাল্‌ফ্যাল্ করিয়া চাহিয়া থাকিয়া ক্ষীণকণ্ঠে কহিলেন, “কে— নিপাতনে সিদ্ধ? ডুবে গিয়েছিলুম— না? তুমি বাঁচালে?” যুবককে শিরোমণি মহাশয় ‘নিপাতনে সিদ্ধ’ বলিয়া ডাকিতেন। একটু ব্যাকরণের খোঁচাও ছিল; কূটতর্কে অপরাজেয় শক্তির জন্য সমাদরমিশ্রিত স্নেহও ছিল।

    নিপাতনে সিদ্ধ হাসিয়া বলিল, “বাঁচাতে পেরেছি কি না, সেই কথাই তো জিজ্ঞাসা করছি। যদি বেঁচে থাকেন, ন্যায়ের প্রমাণ দিন।”

    কাণভট্ট ধীরে ধীরে উঠিয়া বসিলেন। এইমাত্র মৃত্যুর মুখ হইতে ফিরিয়া আসিয়াছেন— শরীরে বল নাই; কিন্তু তাঁহার এক চক্ষুতে প্রাণময় হাসি ফুটিয়া উঠিল; তিনি বলিলেন, “প্রমাণ নিম্প্রয়োজন। আমি বেঁচে আছি— এ কথা স্বয়ংসিদ্ধ। আমি বেঁচে নেই, এ কথা যে বলে, সে তৎক্ষণাৎ প্রমাণ করে দেয় যে, সে বেঁচে আছে। বাজিকর যত কৌশলী হোক, নিজের স্কন্ধে আরোহণ করতে অক্ষম; মানুষ তেমনি নিজেকে অস্বীকার করতে পারে না।”

    নৈয়ায়িকের কথায় সকলে হাসিয়া উঠিল। নিপাতনে সিদ্ধ বলিল, “যাক, তাহলে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। — এখন উঠতে পারবেন কি?”

    শিরোমণি তাহার হাত ধরিয়া দাঁড়াইলেন, বলিলেন, “হঠাৎ হাতে পায়ে কেমন খিল ধরে গিয়েছিল। নিপাতন তুমিই জল থেকে টেনে তুলেছ, না?”

    নিপাতন বলিল, “উঁহু। আপনাকে টেনে তুলেছে আপনার প্রচণ্ড পাণ্ডিত্যের বিজয়নিশান।”

    “সে কি?”

    “আপনার নধর শিখাটিই আপনার প্রাণদাতা! ওটি না থাকলে কিছুতেই টেনে তুলতে পারতাম না।”

    “জ্যাঠা ছেলে।”

    “আপনার পৈতে ছুঁয়ে বলছি— সত্যি কথা। — কিন্তু সে যা হোক, একলা বাড়ি ফিরতে পারবেন তো?”

    “পারব, এখন বেশ সুস্থ বোধ করছি।” তারপর তাহার হাত ধরিয়া বলিলেন, “বিশ্বম্ভর, এত দিন জানতাম তুমি নিপাতনেই সিদ্ধ, কিন্তু এখন দেখছি প্রাণদানেও তুমি কম পটু নও। আশীর্বাদ করি, এমনি ভাবে মজ্জমানকে উদ্ধার করেই যেন তোমার জীবন সার্থক হয়।”

    নিপাতন হাসিয়া বলিল, “কি সর্বনাশ! শিরোমণি মশায়, ও আশীর্বাদ করবেন না। তাহলে আমার ব্যাকরণ-টোলের কি দশা হবে?”

    ও-দিকে নৌকার মালিক যুবকটি এ-সব ব্যাপার কিছুই জানিতে পারে নাই। সে নগর-ভ্রমণের উপযুক্ত সাজসজ্জা করিয়া ঘাটে নামিল। স্নান-ঘাটের দিকে দৃষ্টি পড়িতেই সে থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। দেখিল, এক অতি গৌরকান্তি সুপুরুষ যুবা একজন একজন মধ্যবয়স্ক একচক্ষু ব্যক্তির সহিত দাঁড়াইয়া কথা কহিতেছে। এই গৌরাঙ্গ যুবকের অপূর্ব দেহসৌষ্ঠব দেখিয়া সে মুগ্ধ হইয়া গেল। সে পৃথিবীর অনেক দেশ দেখিয়াছে; সিংহল, কোচিন, সুমাত্রা, যবদ্বীপ— কোথাও যাইতে তাহার বাকি নাই। কিন্তু এমন অপরূপ তেজোদীপ্ত পুরুষমূর্তি আর কখনও দেখে নাই।

    একজন জেলে-মাঝি নিজের ক্ষুদ্র ডিঙ্গিতে বসিয়া জাল বুনিতেছিল, যুবক তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “বাপু, ঐ লোকটি কে জানো?”

    জেলে একবার চোখ তুলিয়া বলিল, “ঐ উনি? উনি নিমাই পণ্ডিত।”

    যুবক ভাবিল— পণ্ডিত! এত অল্প বয়সে পণ্ডিত! যুবকের নিজের পাণ্ডিত্যের সহিত কোনও সুবাদ ছিল না। সে বেনের ছেলে, বুদ্ধির বলেই সাত সাগর চষিয়া সোনাদানা আহরণ করিয়া আনিয়াছে। সে আর একবার নিমাই পণ্ডিতের অনিন্দ্য দেহকান্তির প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া হৃষ্টচিত্তে নগর পরিদর্শনে বাহির হইল।

    বেনের ছেলের নাম চন্দনদাস। বেশ সুশ্রী চোখে-লাগা চেহারা; বয়স একুশ-বাইশ। বুদ্ধিমান, বাক্‌পটু, বিনয়ী— বেনের ছেলের যত প্রকার গুণ থাকা দরকার, সবই আছে; বরং দেশ-বিদেশে ঘুরিয়া নানাজাতীয় লোকের সহিত মিশিয়া আরও পরিমার্জিত হইয়াছে। বেশভূষাও ঘরবাসী বাঙালী হইতে পৃথক। পায়ে সিংহলী চটি, পরিধানে চাঁপা রঙের রেশমি ধুতি মালসাট করিয়া পরা; স্কন্ধে উত্তরীয়। দুই কানে হীরার লবঙ্গ; মাথার কোঁকড়া চুল কাঁধ পর্যন্ত পড়িয়াছে— মাঝখানে সিঁথি। গলায় সোনার হার বণিক্‌পুত্রের জাতি-পরিচয় দিতেছে।

    চন্দনদাস অগ্রদ্বীপের প্রসিদ্ধ সওদাগর রূপচাঁদ সাধুর পুত্র। রূপচাঁদ সাধুর বয়স হইয়াছে, তাই এবার নিজে না গিয়া উপযুক্ত পুত্রকে বাণিজ্যে পাঠাইয়াছিলেন। এক বৎসর নয় মাস পরে ছেলে বিলক্ষণ দু-পয়সা লাভ করিয়া দেশে ফিরিতেছে। বহুদিন একাদিক্রমে নৌকা চালাইয়া মাঝি-মাল্লারা ক্লান্ত; তাই একদিনের জন্য চন্দনদাস নবদ্বীপে নৌকা বাঁধিয়াছে। কাল প্রভাতেই আবার গৃহাভিমুখে যাত্রা করিবে।

    চন্দনদাস হরষিত-মনে গঙ্গাঘাটের পথ ধরিয়া নগর দর্শনে চলিল। সে-সময় নবদ্বীপের সমৃদ্ধির বিশেষ খ্যাতি ছিল। পথে পথে নাট্যশালা, পাঠশালা, চূর্ণ-বিলেপিত দেউল, প্রতি গৃহচূড়ায় বিচিত্র ধাতু-কলস, প্রতি দ্বারে কারু-খচিত কপাট; বাজারের এক বিপণিতে লক্ষ তঙ্কার সওদা কেনা যায়। পথগুলি সংকীর্ণ বটে, কিন্তু তাহাতে নগরশ্রী আরও ঘনীভূত হইয়াছে। রাজপথে বহু লোকের ব্যস্ত যাতায়াত নগরকে সজীব ও প্রাণবন্ত করিয়া তুলিয়াছে।

    অনায়াস-মন্থরপদে চন্দনদাস চারিদিকে চাহিতে চাহিতে চলিয়াছিল; কিছুদূর যাইবার পর একটি জিনিস দেখিয়া হঠাৎ তাহার বাইশ বছরের মুণ্ড ঘুরিয়া গেল; সে পথের মাঝখানেই মন্ত্রমুগ্ধবৎ দাঁড়াইয়া পড়িল। বেচারা চন্দনদাস সাত সাগর পাড়ি দিয়াছে; কিন্তু সে বিদ্যাপতির কাব্য পড়ে নাই— “মেঘমাল সঞে তড়িতলতা জনু হৃদয়ে শেল দেই গেল”— এরূপ ব্যাপার যে সম্ভবপর, তাহা সে জানিত না। বিদ্যাপতি জানা থাকিলে হয়তো ভাবিতে পারিত—

    অপরূপ পেখলুঁ রামা

    কনকলতা অব-                       লম্বনে উয়ল

    হরিণহীন হিমধামা।

    কিন্তু চন্দনদাস কাব্যরসবঞ্চিত বেনের ছেলে, আত্মবিস্মৃতভাবে হাঁ করিয়া তাকাইয়া রহিল। প্রভাতে সে কাহার মুখ দেখিয়া উঠিয়াছিল কে জানে, কিন্তু আজ তাহার সুন্দর মুখ দেখিবার পালা।

    যাহাকে দেখিয়া চন্দনদাসের মুণ্ড ঘুরিয়া গিয়াছিল, সে মেয়েটি একজন বয়স্ক সহচরীর সঙ্গে ঘাটে স্নান করিতে যাইতেছিল। পূর্ণযৌবনা ষোড়শী— তাহার রূপের বর্ণনা করিতে গিয়া হতাশ হইতে হয়। বৈষ্ণব-রসসাহিত্য নিঙড়াইয়া এই রূপের একটা কাঠামো খাড়া করা যাইতে পারে; হয়তো এমনই কোনও গোরোচনা গোরী নবীনার নববিকশিত রূপ দেখিয়া প্রেমিক বৈষ্ণব কবি তাঁহার রাই-কমলিনীকে গড়িয়াছিলেন, কে বলিতে পারে? মেয়েটির প্রতি পদক্ষেপে দর্শকের হৃৎকমল দুলিয়া দুলিয়া উঠে, যেন হৃৎকমলের উপর পা ফেলিয়া সে চলিয়াছে। তাহার মদির নয়নের অপাঙ্গদৃষ্টিতে মনের মধ্যে মধুর মাদকতা উন্মথিত হইয়া উঠে।

    কিন্তু এত রূপ সত্ত্বেও মেয়েটির মুখখানি ম্লান, যেন তাহার উপর কালো মেঘের ছায়া পড়িয়াছে। চোখ দুটি অবনত করিয়া ধীরপদে সে চলিয়াছে; তৈলসিক্ত চুলগুলি পিঠের উপর ছড়ানো; পরণে আটপৌরে রাঙাপাড় শাড়ি। দেহে একখানিও গহনা নাই, এমন কি, নাকে বেসর, কানে দুল পর্যন্ত নাই। কেবল দুই হাতে দু’গাছি শঙ্খ।

    মেয়েটির সঙ্গে যে সহচরী রহিয়াছে, তাহাকে সহচরী না বলিয়া প্রতিহারী বলিলেই ভালো হয়। সে যেন চারিদিক হইতে তাহাকে আগলাইয়া চলিয়াছে। তাহাকে দেখিলেই বুঝা যায়, বিগতযৌবনা ভ্রষ্টা স্ত্রীলোক। আঁটসাঁট দোহারা গঠন, গোলাকৃতি মুখ, কলহপ্রিয় বড় বড় দুইটা চোখ যেন সর্বদাই ঘুরিতেছে।

    চন্দনদাস হাঁ করিয়া পথের মধ্যস্থলে দাঁড়াইয়া রহিল, মেয়েটি তাহার পাশ দিয়া চলিয়া গেল। পাশ দিয়া যাইবার সময় একবার চকিতের ন্যায় চোখ তুলিল, আবার তৎক্ষণাৎ মাথা হেঁট করিল। সঙ্গিনী স্ত্রীলোকটা কটমট করিয়া চন্দনদাসের পানে তাকাইল, তাহার আত্মবিস্মৃত বিহ্বলতার জন্য যেন কিছু বলিবে মনে করিল। কিন্তু চন্দনদাসের বিদেশীর মতো সাজ-সজ্জা দেখিয়া কিছু না বলিয়া সমস্ত দেহের একটা স্বৈরিণীসুলভ ভঙ্গি করিয়া চলিয়া গেল।

    চন্দনদাসও অমনি ফিরিল। তাহার নগর-ভ্রমণের কথা আর মনে ছিল না, সে একদৃষ্টি মেয়েটির দিকে তাকাইয়া রহিল! মেয়েটিও কয়েক পা গিয়া একবার ঘাড় বাঁকাইয়া পিছু ফিরিয়া চাহিল। ‘গেলি কামিনী, গজহু গামিনী, বিহসি পালটি নেহারি’— চন্দনদাসের যেটুকু সর্বনাশ হইতে বাকি ছিল, তাহাও এবার হইয়া গেল।

    সেও গঙ্গাঘাটের দিকে ফিরিল, অগ্রবর্তিনী স্নানার্থিনীদের দৃষ্টি-বহির্ভূত হইতে না দিয়া তাহাদের পিছু পিছু চলিল।

    ক্রমে তাহারা ঘাটের সম্মুখে পৌঁছিল। এখানে চন্দনদাস আবার নিমাই পণ্ডিতকে দেখিতে পাইল। তিনি স্নান শেষ করিয়া বোধ হয় গৃহে ফিরিতেছিলেন; ভিজা গামছা গায়ে জড়ানো। চন্দনদাস লক্ষ্য করিল, মেয়েটির প্রতি দৃষ্টি পড়িতেই নিমাই পণ্ডিতের মুখে একটা ক্ষুব্ধ কারুণ্যের ভাব দেখা দিয়াই মিলাইয়া গেল। তিনি অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া দ্রুতপদে প্রস্থান করিলেন।

    অতঃপর স্ত্রীলোক দুইটি ঘাটে গিয়া স্নান করিল। চন্দনদাস একটু আড়ালে থাকিয়া চোরা চাহনিতে দেখিল। চন্দনদাস দুষ্মন্ত নয়, — “অসংশয়ং ক্ষত্রপরিগ্রহক্ষমা” তাহার মনে আসিল না; কিন্তু নানা ক্ষুদ্র কারণে তাহার ধারণা জন্মিল যে, মেয়েটি বেনের মেয়ে, তাহার স্বজাতি। কিন্তু একটা কথা সে কিছুতেই বুঝিতে পারিল না, এত বয়স পর্যন্ত মেয়েটি অনূঢ়া কেন? বিধবা নয়, হাতের শঙ্খ ও রাঙাপাড় শাড়ি তাহার প্রমাণ। তবে ষোল-সতের বছরের মেয়ে বাংলাদেশে অবিবাহিতা থাকে কি করিয়া?

    কিন্তু সে যাহা হউক, স্নান সারিয়া তাহারা যখন ফিরিয়া চলিল, তখন সেও তাহাদের পিছু লইল।

    চন্দনদাসের ব্যবহারটা বর্তমানকালে কিছু বর্বরোচিত বোধ হইতে পারে; কিন্তু একালের রুচি দিয়া সেকালের শিষ্টাচার বিচার করা সর্বদা নিরাপদ নয়। তা ছাড়া, উপস্থিত ক্ষেত্রে শিষ্টাচারের সূক্ষ্ম অনুশাসন মানিয়া চলিবার মতো হৃদ্‌যন্ত্রের অবস্থা চন্দনদাসের ছিল না। তাঁহার কাঁচা হৃদ্‌যন্ত্রটা একেবারেই অবশ হইয়া পড়িয়াছিল। বিশেষ দোষ দেওয়াও যায় না। অনুরূপ অবস্থায় পড়িয়া সেকালের ঠাকুর-দেবতারাও কিরূপ বিহ্বল বে-এক্তিয়ার হইয়া পড়িতেন, তাহা তো ভক্ত কবিগণ লিপিবদ্ধ করিয়াই গিয়াছেন। — “এ ধনি কে কহ বটে!”

    মোট কথা, চন্দনদাস তাহার মন-চোরা মেয়েটির পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিল। এ-পথ হইতে ও-পথে কয়েকটা মোড় ফিরিয়া প্রায় একপোয়া পথ অতিক্রম করিবার পর মেয়েটি এক গলির মধ্যে প্রবেশ করিল। চন্দনদাস দেখিল, পাড়াটা অপেক্ষাকৃত গরিব বেনেপাড়া। অধিকাংশ বাড়ির খড়ের বা খোলার চাল।

    গলির মধ্যে কিছুদূর গিয়া মেয়েটি এক ক্ষুদ্র পাকা বাড়ির দালানে উঠিয়া অদৃশ্য হইয়া গেল। বাড়িটা পাকা বটে, কিন্তু অতিশয় জীর্ণ ও শ্রীহীন। বাড়ির সম্মুখীন হইয়া চন্দনদাস দেখিল, দালানের উপর একটি ক্ষুদ্র বেনের দোকান। আদা, মরিচ, হলুদ, চই ছোট ছোট ধামাতে সাজানো আছে; একজন বৃদ্ধা স্ত্রীলোক বেসাতি করিতেছে। দালানের পশ্চাদ্ভাগে একটি দ্বার, উহাই অন্দরে প্রবেশ করিবার পথ। চন্দনদাস বুঝিল, ঐ পথেই মেয়েটি ও তাহার সঙ্গিনী অন্দরে প্রবেশ করিয়াছে।

    চন্দনদাস বড় সমস্যায় পড়িল। সে কোনও মতলব স্থির করিয়া ইহাদের অনুসরণ করে নাই, গুণের নৌকার ন্যায় অদৃশ্য রজ্জুবন্ধন তাহাকে টানিয়া আনিয়াছে। কিন্তু এখন সে কি করিবে? কেবলমাত্র মেয়েটির বাড়ি দেখিয়া ফিরিয়া যাইবে? চন্দনদাস বাড়ির সম্মুখ দিয়া কয়েকবার অলসভাবে যাতায়াত করিয়া কর্তব্য স্থির করিয়া লইল। তাহার হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল, তাহার মা তাহাকে নবদ্বীপ হইতে ভালো চুয়া কিনিয়া আনিতে বলিয়াছিলেন। সে-কথা সে ভুলে নাই, আজ নগর-ভ্রমণের সময় কিনিয়া লইবে স্থির করিয়াছিল; কিন্তু চুয়া কিনিবার অছিলা এমনভাবে সদ্ব্যবহার করিবার কথা এতক্ষণ তাহার মনেই আসে নাই।

    সে দৃঢ়পদে দোকানের সম্মুখীন হইল; মিঠা হাসিয়া বুড়িকে জিজ্ঞাসা করিল, “হ্যাঁগো ভালোমানুষের মেয়ে, তোমার দোকানে ভালো চুয়া আছে?”

    যে বৃদ্ধা বেসাতি করিতেছিল, তাহার দেহ-যষ্টিতে বিন্দুমাত্র রস না থাকিলেও, প্রাণটা তাজা ও সরস ছিল। চন্দনদাসকে বাড়ির সম্মুখে অকারণ ঘুর্‌ঘুর্‌ করিতে দেখিয়া বুড়ি এই অনিশ্চিত ঘোরাঘুরির গূঢ় কারণটি ধরিয়া ফেলিয়াছিল এবং মনে মনে একটু আমোদ অনুভব করিতেছিল। পাড়ার কোনও চ্যাংড়া ছোঁড়া হইলে বুড়ি মুখ ছাড়িত; কিন্তু এই কান্তিমান সুদর্শন ছেলেটির বিদেশীর মতো সাজ-পোশাক দেখিয়া সে একটু আকৃষ্ট হইয়াছিল।

    চন্দনদাসের প্রশ্নের উত্তরে সে বলিল, “আছে বইকি বাছা। এসো, বসো।”

    চন্দনদাসও তাই চায়, সে দালানে উঠিয়া জলচৌকির উপর চাপিয়া বসিল। জিজ্ঞাসা করিল, “হ্যাঁগা, তোমাদের বাড়িতে কি পুরুষমানুষ নেই? তুমি নিজে বেসাতি করছ যে?”

    বৃদ্ধা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “সে কথা আর বলো না বাছা; একটা ব্যাটাছেলে ঘরে থাকলে কি আজ আমাদের এমন খোয়ার হয়?” তারপর কথা পাল্টাইয়া বলিল, “তা হ্যাঁ বাছা, তোমাকে তো আগে কখনও দেখিনি, ন’দের লোক নও বুঝি?”

    চন্দনদাস বলিল, “না, আমার বাড়ি অগ্রদ্বীপ।”

    বুড়ি বলিল, “ও— তাই। কথায়-বার্তায় যেন বেনের ছেলে বলে মনে হচ্ছে।”

    চন্দনদাস তখন জাতি-পরিচয় দিল, নিজের ও পিতার নাম উল্লেখ করিল। বুড়ি দু’দণ্ড বসিয়া গল্প করিবার লোক পায় না, সে আহ্লাদে গদ্‌গদ হইয়া বলিল, “ও মা, তুমি তো আমাদের ঘরের ছেলে গো— স্বজাত! আহা, যেমন সোনার কার্তিকের মতো চেহারা, তেমনি মা’র কোল জুড়ে বেঁচে থাকো। — কোথায় বিয়ে-থা করেছ?”

    চন্দনদাস কহিল, “তের বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল আয়ি, এক বছর পরেই বৌ মরে যায়। তারপর আর বিয়ে করিনি।”

    বুড়ি একটু বিমনা হইল; তারপর উৎসুকভাবে নানা কথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল।

    চন্দনদাস কথাপ্রসঙ্গে বলিল, “সমুদ্রে গিয়েছিলাম আয়ি, দু’বছর পরে দেশে ফিরছি। তা ভাবলাম, ন’দেয় একদিন থেকে যাই; মা’র বরাত আছে চুয়া কেনবার, চুয়া কেনাও হবে, একটু জিরেন দেওয়াও হবে।”

    বুড়ি বলিল, “তা বেশ করেছ বাছা, ভাগ্যিস এসেছিলে তাই তো আমন চাঁদমুখখানি দেখতে পেলাম।” বুড়ি একটা নিশ্বাস ফেলিল। তাহার প্রাণের ভিতরটা হায় হায় করিয়া উঠিল। আহা, যদি সম্ভব হইত!

    চন্দনদাস এতক্ষণ ফাঁক খুঁজিতেছিল, জিজ্ঞাসা করিল, “আয়ি, তোমার আপনার জন কি আর কেউ নেই?”

    “একটি নাতনী আছে, আর সব মরে হেজে গেছে। পোড়াকপালী ছুঁড়ির কপাল।”— বলিয়া বুড়ি আঁচলে চোখ মুছিল।

    “নাতনী!”— চন্দনদাস সচকিত হইয়া উঠিল; তবে বুড়ির নাতনীকেই সে দেখিয়াছে। — “তবে তুমি বুড়োমানুষ দোকান দেখ কেন? সে দেখতে পারে না?”

    বুড়ি উদাস আশাহীন সুরে বলিল, “সে অনেক কথা, বাছা। আমাদের দুঃখের কাহিনী কাউকে বলবার নয়। সমাজ আমাদের বিনা দোষে জাতে ঠেলেছে, মুখ তুলে চাইবার কেউ নেই। আর কাকেই বা দোষ দেব, সব দোষ ঐ হতভাগীর কপালের। এমন রূপ নিয়ে জন্মেছিল, ঐ রূপই ওর শত্তুর।”

    চন্দনদাসের কৌতূহল ও উত্তেজনা বাড়িয়াই চলিয়াছিল। সে সাগ্রহে প্রশ্ন করিল, “কি ব্যাপার আয়ি? সব কথা খুলেই বলো না।”

    বুড়ি কিন্তু রাজী হইল না, বলিল, “কি হবে বাবা, আমাদের লজ্জার কথা শুনে? কিছু তো করতে পারবে না, কেবল মনে দুঃখ পাবে।”

    “কে বললে, কিছু পারব না?”

    “না বাবা, সে কেউ পারবে না। — আহা! সোনার প্রতিমা আমার কালই জলে ভাসিয়ে দিতে হবে রে!”— বলিয়া বুড়ি হঠাৎ মুখে কাপড় চাপা দিয়া কাঁদিয়া উঠিল।

    চন্দনদাস বুড়ির হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিল, “আয়ি, আমি বেনের ছেলে, তোর গা ছুঁয়ে বলছি, মানুষের যা সাধ্য আমি তা করব। তোর নাতনীর কি বিপদ বল্।”

    বুড়ি উত্তর দিবার পূর্বেই, বোধ করি তাহার ক্রন্দনের শব্দে আকৃষ্ট হইয়া সেই বিগতযৌবনা প্রহরিণী বাহির হইয়া আসিল, কর্কশকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “কাঁদছিস কেন রে, বুড়ি? কি হয়েছে?”

    বুড়ি বিলক্ষণ বুদ্ধিমতী, তাড়াতাড়ি চোখ মুছিয়া আমতা আমতা করিয়া বলিল, “কিছু নয় রে চাঁপা— অমনি। এই ছেলেটি দূর-সম্পর্কে আমার নাতি হয়, অনেক দিন পরে দেখলুম— তাই—”

    চাঁপা চন্দনদাসের দিকে ফিরিল, বৃহৎ সুবর্তুল চক্ষু তাহার মুখের উপর স্থাপন করিয়া বুড়ির উদ্দেশে বলিল, “হুঁ— নাতি!— তোর নাতি আছে, আগে কখনও বলিসনি তো?” বুড়ি কম্পিতস্বরে বলিল, “বললুম না, দূর-সম্পর্কে। আমার পিসতুত বোনের—”

    চাঁপা বলিল, “বুঝেছি।” — তারপর চন্দনদাসকে প্রশ্ন করিল, “তোমাকে আজ পথে দেখেছি না?”

    চন্দনদাস সটান মিথ্যা কথা বলিল, “কই, না! আমার তো মনে পড়ছে না।”

    চাঁপা তীক্ষ্ণ-চক্ষে আরও কিছুক্ষণ চন্দনদাসকে নিরীক্ষণ করিল, শেষে মুখে একটু হাসি আনিয়া বলিল, “তবে আমারই ভুল। বুড়ি, তুই তাহলে তোর নাতির সঙ্গে কথা ক’— আমি একটু পাড়া বেড়িয়ে আসি। তোর নাতি আজ এখানে থাকবে তো? দেখিস, ছেড়ে দিসনি যেন, এমন রসের নাতি কালেভদ্রে পাওয়া যায়।”— বলিয়া চোখ ঘুরাইয়া বাহিরের দিকে প্রস্থান করিল।

    চাঁপা দৃষ্টি-বহির্ভূত হইয়া গেলে চন্দনদাস জিজ্ঞাসা করিল, “এটি কে?”

    বুড়ির তখনও হৃদ্‌কম্প দূর হয় নাই, সে বলিল, “ও মাগী যমের দূত। বাবা, এমন ভয় হয়েছিল— এখনি টুঁটি টিপে ধরত। তুই যা দাদা, আর এখানে থাকিসনি। ওরে, তুই আমাদের কি ভালো করবি? ভগবান আমাদের ভুলে গেছেন। তুই এখান থেকে পালা, শেষে কি মায়ের নিধি বেঘোরে প্রাণ দিবি?”

    চন্দনদাস বলিল, “সে কি ঠান্‌দি, নাতিকে কি এমনি করেই তাড়াতে হয়? একটা পান পর্যন্ত দিতে নেই? তা ছাড়া চুয়া কিনতে এসেছি, চুয়া না দিয়েই তাড়িয়ে দিচ্ছিস? তুই কেমন বেনের মেয়ে?”

    বুড়ি এবার হাসিয়া ফেলিল। এই ছেলেটির মুখের কথা যতই সে শুনিতেছিল, ততই তাহার মন ভিজিতেছিল। তাহার প্রাণের একান্তে বিদলিত মুহ্যমান আশা একটু মাথা তুলিল। তবে কি এই শেষ সময়ে ভগবান মুখ তুলিয়া চাহিলেন?

    বুড়ি মনে ভাবিল,— যা হয় তা হয়, একবার শেষ চেষ্টা করিয়া দেখিব। কে বলিতে পারে, হয়তো অভাগিনীর ভাগ্যে চরম দুর্গতি বিধাতা লেখেন নাই; নচেৎ নিরাশার গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে এই অপরিচিত বন্ধু কোথা হইতে আসিয়া জুটিল?

    তখন বুড়ি সংকল্প স্থির করিয়া বলিল, “ও মা, সত্যি তো! চুয়ার কথা মনে ছিল না। তা দেব, দাদা— কিন্তু বড় দামী জিনিস, দাম দিতে পারবে তো?”

    “দাম কত?”

    “জীবন-যৌবন-মন-প্রাণ সব দিলেও সে জিনিসের দাম হয় না।”

    চন্দনদাস একটু অবাক হইল, কিন্তু হারিবার পাত্র সে নয়, বলিল, “আচ্ছা, আগে জিনিস দেখি।”

    “এই যে, দেখাই। ওলো ও চুয়া, একবার এদিকে আয় তো, দিদি।”

    চন্দনদাস তড়িৎস্পৃষ্টের মতো চমকিয়া উঠিল। তবে মেয়েটির নাম চুয়া! আর সে চুয়া কিনিতে এখানে আসিয়াছে! এ কি দৈব যোগাযোগ!

    “কি বলছি ঠান্‌দি?”— বলিতে বলিতে চুয়া অন্দরের দরজার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। চন্দনদাসকে দেখিয়া সে চমকিয়া বুকের উপর হাত রাখিল। চন্দনদাস সেই দিকেই তাকাইয়া ছিল, দেখিল, চুয়ার কুমুদের মতো গাল দুটিতে কে যেন কাঁচা সিঁদুর ছড়াইয়া দিল। তারপর ম্রিয়মাণ লজ্জায় তাহার চোখ দুটি ধীরে ধীরে নত হইয়া পড়িল। চন্দনদাস বুঝিল, চুয়া তাহাকে চিনিতে পারিয়াছে; পথের ক্ষণিক-দেখা মুগ্ধ পান্থকে ভুলে নাই।

    বুড়ি বলিল, “চুয়া, অতিথি এসেছে; একটু মিষ্টিমুখ করা, পান দে।”

    চুয়া মুখ তুলিল না, আস্তে আস্তে চন্দনদাসের সতৃষ্ণ চক্ষুর সম্মুখ হইতে সরিয়া গেল।

    কিছুক্ষণ কোনও কথা হইল না। চন্দনদাস দ্বারের দিকেই তাকাইয়া রহিল। শেষে বুড়ি বলিল, “আমার চুয়াকে দেখলে?”

    “দেখলাম।”— আগেও যে দেখিয়াছে, তাহা আর চন্দনদাস ভাঙিল না। বুড়িও সে দিক দিয়া গেল না, বলিল, “কেমন মনে হল?”

    “মনে হল—” সহসা চন্দনদাস বুড়ির দিকে ঝুঁকিয়া ব্যগ্রকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, “ঠান্‌দি, চুয়ার কি বিপদ আমায় বলো। কেন তোমাদের সবাই জাতে ঠেলেছে? ওরা এখনও বিয়ে হয়নি কেন?”

    দ্বারের নিকট হইতে জবাব আসিল, “কি হবে তোমার শুনে?”

    এক হাতে ফুল-কাঁসার ছোট রেকাবির উপর চারিখানি বাতাসা ও দুটি পান, অন্য হাতে জলের ঘটি লইয়া চুয়া ফিরিয়া আসিয়াছে। চন্দনদাসের শেষ কথাগুলি সে শুনিতে পাইয়াছিল; শুনিয়া লজ্জায় ধিক্কারে তাহার মন ভরিয়া উঠিয়াছিল। কেন এই অপরিচিত যুবকের এত কৌতূহল? তাহাকে বলিয়াই বা লাভ কি? চুয়া রেকাবি ও ঘটি চন্দনদাসের সম্মুখে নামাইয়া আরক্ত-মুখে তীব্র অধীর স্বরে বলিল, “কে তুমি? কোথা থেকে এসেছ? কি হবে তোমার আমাদের কথা শুনে?”

    ক্ষণকালের জন্য চন্দনদাস বিস্ময়ে হতবাক্ হইয়া রহিল; তারপর উঠিয়া দাঁড়াইয়া চুয়ার মুখের উপর চোখ রাখিয়া শান্ত সংযত স্বরে বলিল, “চুয়া, আমি তোমার স্বজাতি; আমার বাড়ি অগ্রদ্বীপ। নবদ্বীপের ঘাটে আমার ডিঙ্গা বাঁধা আছে। তোমার কি বিপদ আমি জানি না; কিন্তু আমি যদি তোমায় সাহায্য করতে চাই, আমার সাহায্য কি নেবে না?”

    চুয়ার মুখ হইতে সমস্ত রক্ত নামিয়া গিয়া মুখখানা সাদা হইয়া গেল। তাহার চোখে পরিত্রাণের ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষণ-বিস্ফারিত আশার আলো ফুটিয়া উঠিল। কয়েক মুহূর্তের জন্য তাহার মুখ দিয়া কথা বাহির হইল না। তারপর সে রুদ্ধস্বরে বলিয়া উঠিল, “কেন আমাকে মিছে আশা দিচ্ছ?”— বলিয়া দাঁতে ঠোঁট চাপিয়া দ্রুতপদে প্রস্থান করিল।

    চন্দনদাস বসিয়া পড়িল। কিয়ৎকাল বসিয়া থাকিয়া অন্যমনস্কভাবে একখানা বাতাসা তুলিয়া লইয়া মুখে দিল; তারপর আলগোছে ঘটির জল গলায় ঢালিয়া জলপান করিল। শেষে পান দুটি মুখে পুরিয়া বুড়ির দিকে তাকাইয়া মৃদুহাস্যে বলিল, “ঠান্‌দি, এবার তোমার গল্প বলো।”

    “বলব, কিন্তু তুমি আগে একটা কথা দাও।”

    “কি?”

    “তুমি ওকে উদ্ধার করবে?”

    “করব। অন্তত প্রাণপণে চেষ্টা করব।”

    “বেশ, উদ্ধার করা মানে ওকে এ দেশ থেকে নিয়ে পালাতে হবে। পারবে?”

    “পারব— খুব পারব।”

    “ভালো, কিন্তু তারপর?”

    “তারপর কি?”

    বুড়ি একটু দ্বিধা করিল; শেষে বলিল, “কিছু মনে করো না, সব কথা স্পষ্ট করে বলাই ভালো। তুমি জোয়ান ছেলে, চুয়াও যুবতী মেয়ে, তুমি ওকে চুরি করে নিয়ে যাবে। তারপর?”

    চন্দনদাস জিজ্ঞাসুনেত্রে চাহিয়া রহিল।

    বুড়ি তখন স্পষ্ট করিয়া বলিল, “ওকে বিয়ে করতে পারবে?”

    চন্দনদাসের চোখের সম্মুখে যেন একটা নূতন আলো জ্বলিয়া উঠিল; সে উদ্ভাসিত মুখে বলিল, “পারব।”

    “তোমার বাপ-মা—”

    “তাঁরা আমার কথায় অমত করবেন না।”

    বৃদ্ধা কম্পিত স্বরে বলিল, “বেঁচে থাকো দাদা, তুমি বড় ভালো ছেলে। কিন্তু ছুঁড়ির যা কপাল—”

    বুড়ি তখন চুয়ার কাহিনী বলিতে আরম্ভ করিল। চন্দনদাস করতলে কপোল রাখিয়া শুনিতে লাগিল। শুনিতে শুনিতে সে টের পাইল, চুয়া কখন চুপি চুপি আসিয়া দ্বারের পাশে দাঁড়াইয়াছে।

    চুয়ার বাপের নাম কাঞ্চনদাস। বেনেদের মধ্যে সে বেশ সংগতিপন্ন গৃহস্থ ছিল; চুয়ার বয়স যখন সাত বৎসর, তখন কাঞ্চনদাস বাণিজ্যের জন্য নৌকা সাজাইয়া সমুদ্রযাত্রা করিল। কাঞ্চনদাসের নৌকা গঙ্গার বাঁকে অদৃশ্য হইয়া গেল— আর ফিরিল না। সংবাদ আসিল, নৌকাডুবি হইয়া কাঞ্চনদাস মারা গিয়াছে।

    এই ঘটনার এক বৎসর পরে চুয়ার মাও মরিল। তখন বুড়ি ছাড়া চুয়াকে দেখিবার আর কেহ রহিল না। বুড়ি কাঞ্চনদাসের মাসী— আট বছর বয়স হইতে সে হাতে করিয়া চুয়াকে মানুষ করিয়াছে।

    নৌকাডুবিতে কাঞ্চনদাসের সমস্ত সম্পত্তিই ভরাডুবি হইয়াছিল, কেবল এই ভদ্রাসনটি বাঁচিয়াছিল। বুড়ি দোকান করিয়া কষ্টে সংসার চালাইতে লাগিল।

    এইভাবে বৎসরাধিক কাল কাটিল। চুয়ার বয়স যখন দশ বছর, তখন এক গৃহস্থের ছেলের সঙ্গে তাহার বিবাহের সম্বন্ধ হইল।

    এই সময় একদিন জমিদারের ভ্রাতুষ্পুত্র ঘোড়ায় চড়িয়া এই পথ দিয়া যাইতেছিল। চুয়াকে বাড়ির সম্মুখে খেলা করিতে দেখিয়া সে ঘোড়া হইতে নামিল। দুর্দান্ত জমিদারের মহাপাষণ্ড ভাইপো মাধবের নাম শুনিয়া দেশের লোক তো দূরের কথা, কাজি সাহেব পর্যন্ত থরথর করিয়া কাঁপে। রাজার শাসন— সমাজের শাসন কিছুই সে মানে না। জাতিতে ব্রাহ্মণ হইলে কি হয়, স্বভাব তার চণ্ডালের মতো। সে দশ বছরের চুয়াকে চিবুক তুলিয়া ধরিয়া দেখিল, তারপর বাড়িতে আসিয়া তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিল। বুড়ি ভয়ে ভয়ে পরিচয় দিল। শুনিয়া মাধব বলিল, এ মেয়ের বিবাহ দেওয়া হইবে না, ইহাকে দৈবকার্যের জন্য মানত করিতে হইবে। ষোল বছর বয়স পর্যন্ত কুমারী থাকিবে, তারপর মাধব আসিয়া তাহাকে লইয়া যাইবে। তান্ত্রিক সাধনায় উত্তরসাধিকার স্থান অধিকার করিয়া কন্যার ষোল বছরের কৌমার্য সার্থক হইবে। সাধক— স্বয়ং মাধব।

    এই হুকুম জারি করিয়া মাধব প্রস্থান করিল। বাড়িতে কান্নাকাটি পড়িয়া গেল; তান্ত্রিক সাধনার গূঢ় মর্মার্থ বুঝিতে কাহারও বাকি রহিল না। বণিক-সমাজ মাধবের বিরুদ্ধে কিছু করিতে সাহস করিল না, তাহারা চুয়াকে জাতিচ্যুত করিল। বিবাহও ভাঙিয়া গেল।

    ক্রমে চুয়ার বয়স বাড়িতে লাগিল— বারো বছর বয়স হইল। বুড়ি দেশে কাহারও নিকট সাহায্য না পাইয়া শেষে চুয়াকে লইয়া দেশ ছাড়িয়া পলাইবার মতলব করিল। কিন্তু বুড়ির হাতে পয়সা কম, আত্মীয়বন্ধুরও একান্ত অভাব। তাহার মতলব সিদ্ধ হইল না; মাধবের কানে সংবাদ গেল।

    মাধব আসিয়া বুড়িকে পদাঘাত মুষ্ট্যাঘাত দ্বারা শাসন করিল; তারপর চুয়াকে পাহারা দিবার জন্য চাঁপাকে পাঠাইয়া দিল। নাপিত-কন্যা চাঁপা চুয়ার অভিভাবিকাপদে অধিষ্ঠিত হইল। চাঁপা বয়সকালে তান্ত্রিক সাধন-ভজন করিয়াছিল, এখন যৌবনান্তে ধর্মকর্ম ত্যাগ করিয়াছে। সে চুয়া ও বুড়ির উপর কড়া নজর রাখিতে লাগিল।

    এইভাবে চারি বৎসর কাটিয়াছে। কয়েক দিন আগে মাধব আসিয়াছিল। সে চুয়াকে দেখিয়া গিয়াছে এবং বলিয়া গিয়াছে যে, আগামী অমাবস্যার রাত্রিতেই চুয়াকে দৈবকার্যে উৎসর্গ করিতে হইবে— সেজন্য যেন সে প্রস্তুত থাকে। অনুষ্ঠানের যাহাতে কোনও ত্রুটি না হয়, এজন্য মাধব নিজেই সমস্ত বিধান দিয়া গিয়াছে। অমাবস্যার সন্ধ্যার সময় চুয়া গঙ্গার ঘাটে গিয়া স্নান করিবে; স্নানান্তে রক্তবস্ত্র, জবামাল্য ও রক্তচন্দনের ফোঁটা পরিয়া ঘাট হইতে একেবারে সাধনস্থলে অর্থাৎ উদ্যানবাটিকায় উপস্থিত হইবে। সঙ্গে ঢাক-ঢোল ইত্যাদি বাজিতে বাজিতে যাইবে। মাধব এইরূপ শাস্ত্রীয় ব্যবস্থা দিয়া চলিয়া যাইবার পর পাঁচ দিন কাটিয়া গিয়াছে। আজ কৃষ্ণা চতুর্দশী— কাল অমাবস্যা।

    গল্প শেষ করিয়া বুড়ি কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, “দাদা, সব কথা তোমায় বললুম। এখন দেখ, যদি মেয়েটাকে উদ্ধার করতে পারো। তুমি ছাড়া ওর আর গতি নেই।”

    গল্প শুনিতে শুনিতে চন্দনদাসের বুকের ভিতরটা জ্বালা করিতেছিল, ঐ দানবপ্রকৃতি লোকটার বিরুদ্ধে ক্রোধ ও আক্রোশ অগ্নিশিখার মতো তাহার দেহকে দাহ করিতেছিল। সে দাঁতে দাঁত চাপিয়া বলিয়া উঠিল, “আমি যদি চুয়াকে বিয়ে করে কাল আমার নৌকোয় তুলে নিয়ে দেশে নিয়ে যাই— কে কি করতে পারে?”

    দ্বারের আড়ালে চুয়ার বুক দুরুদুরু করিয়া উঠিল। কিন্তু বুড়ি মাথা নাড়িয়া ক্ষুব্ধস্বরে বলিল, “তা হয় না দাদা। চাঁপা রাক্ষসী আছে— সে কখনই হতে দেবে না।”

    চন্দনদাস বলিল, “চাঁপাকে সোনায় মুড়ে দেব। তাতে রাজী না হয়, মুখে কাপড় বেঁধে ঘরে বন্ধ করে রাখাব।”

    বুড়ি কাঁপিতে লাগিল, এতখানি দুঃসাহস তাহার পক্ষে কল্পনা করাও দুষ্কর; কিন্তু বুড়ির প্রাণে আশা জাগিয়াছিল, আশা একবার জাগিলে সহজে মরিতে চায় না। তবু বুড়ি কাঁপিতে কাঁপিতে বলিল, “সে যেন হল, কিন্তু বিয়ে হবে কি করে? বিয়ে দেবে কে?”

    “কেন— ন’দেয় কি পুরুত নেই?”

    বৃদ্ধা মাথা নাড়িয়া বলিল, “তুমি মাধবকে জানো না। তার ভয়ে কোনও বামুন রাজী হবে না।”

    চন্দনদাস আশ্চর্য হইয়া বলিল, “এখানকার বামুনরা এত ভীরু?”

    “কার ঘাড়ে দশটা মাথা আছে দাদা, যে জমিদারের ভাইপোর শত্রুতা করবে? তা— শুনেছি, জগন্নাথ ঠাকুরের ছেলে নিমাই পণ্ডিত বড় ডাকাবুকো ছেলে, কাউকে ভয় করেন না। বয়স কম কিনা। — কিন্তু তিনি কি রাজী হবেন?”

    চন্দনদাস মহা উৎসাহে দাঁড়াইয়া উঠিয়া বলিল, “ভালো মনে করিয়ে দিয়েছ, ঠান্‌দি। — নিমাই পণ্ডিতই উপযুক্ত লোক। তাঁকে আমি আজ গঙ্গাঘাটে দেখেছি; ঠিক দেবতার মতো চেহারা— তিনি নিশ্চয় রাজী হবেন। — ঠান্‌দি, আমি এখন তাঁর খোঁজে চললাম, ওবেলা সব ঠিক করে আবার আসব। তখন—”

    “কিন্তু তিনি যদি রাজী না হন?”

    চন্দনদাস চিন্তা করিল, “যদি রাজী না হন— তিনি রাজী হোন বা না হোন, রাত্রিতে কোনও সময় আমি আসবই। — নাই বা হল বিয়ে? আজ রাত্রিতে চুয়াকে চুরি করে নিয়ে যাব। তারপর দেশে গিয়ে বিয়ে করব। — কি বলো?”

    বুড়ির মুখে আশঙ্কার ছায়া পড়িল। চন্দনদাসের যে কোনও দুরভিসন্ধি নাই, তাহা সে অন্তরে বুঝিতেছিল; কিন্তু তবু— চন্দনদাস একেবারে অপরিচিত। সেও যে একজন ধূর্ত প্রবঞ্চক নয়, তাহা বুড়ি কি করিয়া জানিবে? বারবার দাগা পাইয়া বুড়ির মন বড় সন্দিগ্ধ হইয়া উঠিয়াছিল। সে ইতস্তত করিতে লাগিল।

    এই সময় চুয়া দরজার আড়াল হইতে বাহির হইয়া আসিল। সংশয়-সংকোচ করিবার তাহার আর সময় ছিল না। এক দিকে অবশ্যম্ভাবী সর্বনাশ, অন্য দিকে সম্ভাবনা। চুয়া সজল চক্ষু চন্দনদাসের মুখের উপর রাখিয়া কম্পিত্যকণ্ঠে কহিল, “তুমি আজ রাত্তিরে এসো। নিমাই পণ্ডিত যদি রাজী না হন, তবু, তোমার ধর্মের ওপর বিশ্বাস করে আমি তোমার সঙ্গে যাব।”

    চন্দনদাসের বুক নাচিয়া উঠিল। সে আনন্দের উচ্ছ্বাসে কি বলিতে যাইতেছিল— এমন সময় বাধা পড়িল।

    গলির মধ্যে দ্রুত অশ্বক্ষুর-ধ্বনি শুনা গেল। চুয়া একটা আর্ত চিৎকার গলার মধ্যে রোধ করিয়া ছুটিয়া পলাইয়া গিয়া ঘরে দরজা বন্ধ করিয়া দিল। বুড়ি থরথর করিয়া কাঁপিয়া দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজিয়া বসিয়া পড়িল।

    পরক্ষণেই একজন অশ্বারূঢ় ব্যক্তি বাড়ির সম্মুখে আসিয়া ঘোড়া থামাইল। লোকটার গায়ে লাল রঙের কোর্তা, কোমরে তরবারি, মাথায় পাগ নাই, ঝাঁকড়া রুক্ষ চুল কাঁধ পর্যন্ত পড়িয়াছে; কপালে প্রকাণ্ড একটা সিন্দূরের ফোঁটা। ফোঁটার নিচে বিশাল ভাঁটার মতো চোখ দুটাও প্রায় অনুরূপ রক্তবর্ণ। মুখে ঘনকৃষ্ণ গোঁফ এবং গালে গালপাট্টা। বয়স বোধ করি পঁয়তাল্লিশ।

    এই ভীষণাকৃতি লোকটার মুখের প্রতি অবয়বে যেন জীবনব্যাপী দুষ্কৃতি ও পাপ পঙ্কিল রেখায় অঙ্কিত হইয়া আছে। এমন দুষ্কার্য নাই— যাহা সে করে নাই; এমন মহাপাতক নাই— যাহা সে করিতে পারে না। একটা ঘৃণার শিহরণ চন্দনদাসের দেহের উপর দিয়া বহিয়া গেল; সে চিনিল, ইনিই জমিদারের দুর্দান্ত ভ্রাতুষ্পুত্র মাধব।

    মাধব একলাফে ঘোড়া হইতে নামিয়া ঘোড়া ছাড়িয়া দিয়া দালানের উপর উঠিল। সম্মুখেই চন্দনদাস; রক্তচক্ষু দ্বারা আপাদমস্তক তাহাকে নিরীক্ষণ করিয়া স্বভাবকর্কশ ভয়ংকর সুরে মাধব প্রশ্ন করিল, “তুই কে?”

    চন্দনদাসের ইচ্ছা হইল, মাধবের দম্ভস্ফীত মুখে একটা লাথি পারে; কিন্তু সে তাহা করিল না। তাহার মাথার মধ্যে বিদ্যুতের মতো চিন্তাকার্য চলিতেছিল। মাধবের অভাবনীয় আবির্ভাবে তাহার সমস্ত মতলব পণ্ড হইয়া গিয়াছিল; সে ভাবিতেছিল, এ অবস্থায় কি করিলে সব দিক রক্ষা হয়? মাধবের সঙ্গে একটা গণ্ডগোল বাধাইলে লাভ হইবে না, বরং অনিষ্টের সম্ভাবনা। উপস্থিত ক্ষেত্রে কোনও হাঙ্গামা না করিয়া অপসৃত হওয়াই সুবিবেচনার কাজ। অথচ এই পাষণ্ডটার মুখ দেখিলে ও কথা শুনিলে মেজাজ ঠিক রাখা দুষ্কর। চুয়ার সর্বনাশ করিবার জন্যই এই নরপশু তাহাকে ছয় বৎসর জিয়াইয়া রাখিয়াছে, ভাবিতে চন্দনদাসের চোখের দৃষ্টি পর্যন্ত রক্তাভ হইয়া উঠিল।

    তবু সে যথাসাধ্য আত্মদমন করিয়া মাধবের কথার উত্তর দিল, বলিল, “সে খোঁজে তোমার দরকার কি?”

    মাধব একটা অকথ্য গালি দিয়া বলিল, “তুই এখানে কি চাস?”

    চন্দনদাস আর ধৈর্য রক্ষা করিতে পারিল না, তাহার মাথায় খুন চাপিয়া গেল। সে প্রত্যুত্তরে মাধবের নাসিকায় বজ্রসম কিল বসাইয়া দিয়া বলিল, “এই চাই।”

    এই নিরীহ-দর্শন যুবকের নিকট হইতে মাধব এত বড় দুঃসাহসিক কার্য একেবারে প্রত্যাশা করে নাই, সে চক্ষে সরিষার ফুল দেখিয়া মাটিতে বসিয়া পড়িল।

    চন্দনদাস দেখিল, আর বিলম্ব করা সমীচীন নয়; সে নিরস্ত্র, মাধবের কোমরে তরবারি রহিয়াছে। ঘোড়াটা সম্মুখেই দাঁড়াইয়াছিল, সে দালান হইতে লাফ দিয়া তাহার পিঠে চড়িয়া বসিল। এই সময় মাধব ষণ্ডের মতো গর্জন করিয়া কোমর হইতে তরবারি বাহির করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। কিন্তু তাহার নাগালে পৌঁছিবার পূর্বেই চন্দনদাস তেজী ঘোড়ার পেট দুই পায়ে চাপিয়া ধরিয়া সবেগে ঘোড়া ছুটাইয়া দিল।

    কেহ কেহ লুকাইয়া পাপাচরণ করে। কিন্তু ধর্ম ও সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়া পাশবিক বলে প্রকাশ্যভাবে পাপানুষ্ঠান করিতে যাহারা অভ্যস্ত, তাহাদের অপরাধ-ক্লান্ত জীবনে এমন অবস্থা আসে, যখন কেবলমাত্র রমণীর সর্বনাশ করিয়া আর তাহারা তৃপ্তি পায় না। তখন তাহারা পাপাচারের সহিত ধর্মের ভণ্ডামি মিশাইয়া তাহাদের দুষ্কার্যের মধ্যে এক প্রকার নূতন রস ও বিলাসিতা সঞ্চারের চেষ্টা করে। মাধব এই শ্রেণীর পাপী।

    চন্দনদাস তাহারই ঘোড়ায় চড়িয়া তাহাকে ফাঁকি দিয়া পলায়ন করিবার পর মাধব নিষ্ফল আক্রোশে আর কাহাকেও সম্মুখে না পাইয়া বুড়িকে ধরিল; বুড়ির চুলের মুঠি ধরিয়া তলোয়ার দিয়া তাহাকে কাটিতে উদ্যত হইল। কিন্তু কাটিতে গিয়া তাহার মনে হইল, বুড়িকে মারিলে হয়তো সেই ধৃষ্ট যুবকের পরিচয় অজ্ঞাত রহিয়া যাইবে। কিল খাইয়া কিল চুরি করিবার লোক মাধব নয়; তখনও তাহার নাকের রক্তে গোঁফ ভাসিয়া যাইতেছিল। সে বুড়ির চুল ধরিয়া টানিতে টানিতে ভিতরে লইয়া চলিল।

    আঙ্গিনার মাঝখানে বুড়িকে আছড়াইয়া ফেলিয়া তাহার শীর্ণ হাতে একটা মোচড় দিয়া মাধব বলিল, “হারামজাদী বুড়ি, ও ছোঁড়া তোর কে বল্।”

    পূর্বেই বলিয়াছি, বুড়ি বুদ্ধিমতী; তাই ভয়ে প্রাণ শুকাইয়া গেলেও তাহার চিন্তা করিবার শক্তি ছিল। সে বুঝিয়াছিল, কোনও কথা না বলিলেও প্রাণ যাইবে এবং ষড়যন্ত্র প্রকাশ করিয়া ফেলিলেও প্রাণ যাইবে; সুতরাং মধ্যপথ অবলম্বন করাই যুক্তিসঙ্গত। সর্বনাশ উপস্থিত হইলে পণ্ডিতগণ অর্ধেক ত্যাগ করেন, বুড়িও তেমনই ষড়যন্ত্রের অংশটা বাদ দিয়া আর সব সত্য কথা বলিবে স্থির করিল। তাহাতে আর কিছু না হউক, মাধবের হাতে প্রাণটা বাঁচিয়া যাইতে পারে।

    বুড়ি তখন অকপটে চন্দনদাসের যতটা পরিচয় জানিতে পারিয়াছিল, তাহা মাধবের গোচর করিল। চাঁপা পাছে অনর্থক হাঙ্গামা করে, এই ভয়ে মিছামিছি চন্দনদাসকে নাতি বলিয়া পরিচিত করিয়াছিল, তাহাও স্বীকার করিল। কাঁদিতে কাঁদিতে, অনেক মাথার দিব্য, চোখের দিব্য দিয়া বলিল যে, চন্দনদাসকে সে পূর্বে কখনও দেখে নাই, আজ প্রথম সে তাহার দোকানে আসিয়া মিষ্ট কথায় তাহার সহিত আলাপ করিতে আরম্ভ করে। তাহার কোনও দূরভিসন্ধি ছিল কি না, তাহাও বুড়ির অজ্ঞাত।

    চাঁপা মাধবের বাড়িতে খবর দিতে গিয়াছিল, এতক্ষণে এক ঝাঁক পাইক সঙ্গে লইয়া পদব্রজে ফিরিল। পাইকদের হাতে সড়কি, ঢাল; জাতিতে তেঁতুলে বাগ্‌দী। ইহাদেরই বাহুবলে মাধব দেশটাকে সন্ত্রস্ত করিয়া রাখিয়াছিল। প্রভু ও ভৃত্যে অবস্থাভেদ ছাড়া প্রকৃতিগত পার্থক্য বিশেষ ছিল না।

    বুড়িকে নানা প্রশ্ন করিয়া শেষে বোধ হয় মাধব তাহার গল্প বিশ্বাস করিল। চাঁপা যাহা বলিল, তাহাতে বুড়ির কথা সমর্থিত হইল। তা ছাড়া মাধবের রক্তচক্ষুর সম্মুখে বুড়ি মিথ্যা কথা বলিবে, ইহাও দাম্ভিক মাধব বিশ্বাস করিতে পারে না। সে এদিক-ওদিক তাকাইয়া বলিল, “তোর নাতনী কোথায়?”

    বুড়ি বলিল, “ঘরেই আছে, বাবা।”

    মাধব চাঁপাকে হুকুম করিল, “দেখে আয়।”

    চাঁপা দেখিয়া আসিয়া বলিল, চুয়া ঘরেই আছে বটে।

    মাধবের তখন বিশ্বাস জন্মিল, চুয়া সম্বন্ধে ভয়ের কোনও কারণ নাই। তবু সে দুইজন পাইককে বুড়ির বাড়ি পাহারা দিবার জন্য নিযুক্ত করিল, বলিল, “কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বাড়িতে কাউকে ঢুকতে দিবিনে। যদি কেউ ঢুকতে চায়, তার গলায় সড়কি দিবি।”

    এইরূপে বাড়ির সুব্যবস্থা করিয়া মাধব বাহিরে আসিল। এই সময় একবার তাহার মনে হইল, আর বৃথা দেরি না করিয়া আজই চুয়াকে নিজের প্রমোদ-উদ্যানে টানিয়া লইয়া যায়। কিন্তু তাহা হইলে এত বৎসর ধরিয়া যে চরম বিলাসিতার আয়োজন করিয়াছে, তাহা ব্যর্থ হইয়া যাইবে। মাধব নিরস্ত হইল। তৎপরিবর্তে যে স্পর্ধিত বেনের ছেলেটা তাহার গায়ে হাত তুলিতে সাহস করিয়াছে, তাহার নৌকা লুঠ করিয়া তাহাকে নিজের চক্ষুর সম্মুখে কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুঁতিয়া কুকুর দিয়া খাওয়াইবার আয়োজনে দিনটা সদ্ব্যয় করিতে মনস্থ করিল। এটাও একটা মন্দ বিলাসিতা নয়।

    বাহিরে আসিয়া মাধব তাহার সর্দার-পাইককে বলিল, “বদন, তুই দশ জন পাইক নিয়ে গঙ্গাঘাটে যা। সেখানে চন্দনদাস বেনের নৌকো আটক কর্। আমি যাচ্ছি।”— বলিয়া আর একজন পাইককে ঘোড়া আনিতে পাঠাইল।

    বদন সর্দার প্রভুর আজ্ঞা শিরোধার্য করিয়া যখন ঘাটে পৌঁছিল, তখন চন্দনদাসের নৌকা দু’খানি ভাগীরথীর বক্ষে শুভ্র পাল উড়াইয়া উজান বাহিয়া চলিয়াছে; বহুপদবিশিষ্ট বিরাট জল-পতঙ্গের মতো তাহাদের দাঁড়গুলি যেন গঙ্গার উপর তালে তালে পা ফেলিতেছে।

    ওদিকে চন্দনদাস তীরবেগে ঘোড়া ছুটাইয়া দিয়াছিল। দ্বিপ্রহর অতীত হইয়া গিয়াছে, পথে লোকজন কম। চন্দনদাস ধাবমান ঘোড়ার পিঠে বসিয়া চিন্তা করিতেছিল— এখন কর্তব্য কি? প্রথমত, চুয়াকে রক্ষা করিতে হইবে। মাধবের নাকে কিল মারার ফলে তাহার ক্রোধ কোন্ পথ লইবে, অনুমান করা কঠিন; মাধব চুয়ার কথা ভুলিয়া তাহার প্রতি ধাবমান হইতে পারে; তাহাতে চুয়া কিছুক্ষণের জন্য রক্ষা পাইবে। দ্বিতীয়ত, তাহার নৌকা বাঁচাইতে হইবে। ক্রোধান্ধ মাধব প্রথমে তাহাকেই ধরিতে আসিবে; তখন তাহার অমূল্য পণ্য ও সোনাদানায় বোঝাই নৌকা লুণ্ঠিত হইবে। মাধব রেয়াৎ করিবে না।

    ঘাটে পৌঁছিবার পূর্বেই চন্দনদাস কর্তব্য স্থির করিয়া ফেলিল। অশ্বত্থ-শাখায় ঘোড়া বাঁধিয়া সে দ্রুতপদে নৌকায় গিয়া উঠিল; দেখিল, মাঝি-মাল্লারা আহার করিতে বসিয়াছে। চন্দনদাস সর্দার-মাঝিকে ডাকিয়া পাঠাইয়া বলিল, “এখনি নৌকো খুলতে হবে।”

    হতবুদ্ধি মাঝি বলিল, “এখনি? কিন্তু—”

    “শোনো, তর্ক করবার সময় নেই। এই দণ্ডে নৌকো খোলো— পাল আর দাঁড় দুই লাগাও। আজ সন্ধ্যে পর্যন্ত যতদূর সম্ভব উজান বেয়ে যাবে, তারপর গাঙের মাঝখানে নোঙর ফেলবে। আমি যতদিন না ফিরি সেইখানে অপেক্ষা করবে। বুঝলে?”

    “আপনি সঙ্গে যাবেন না?”

    “না। এখন যাও, আর দেরি করো না। যতদিন আমি না ফিরি সাবধানে নৌকো পাহারা দিও।”

    “যে আজ্ঞা।”— বলিয়া প্রাচীন মাঝি চলিয়া গেল। মুহূর্ত পরে দুই নৌকার মাঝি-মাল্লার হাঁকডাক ও পাল তোলার হুড়াহুড়ি আরম্ভ হইল। এই অবকাশে চন্দনদাস নৌকার পশ্চাতে মাণিকভাণ্ডারে গিয়া কিছু জিনিস সংগ্রহ করিয়া লইল। প্রথমে সিন্দুক হইতে মোহর-ভরা একটা সর্পাকৃতি লম্বা থলি বাহির করিয়া কোমরে জড়াইয়া লইল। যে-কার্যে যাইতেছে, তাহাতে কত অর্থের প্রয়োজন কিছুই স্থিরতা নাই; অথচ বোঝা বাড়াইলে চলিবে না। চন্দনদাস ভাবিয়া চিন্তিয়া একছড়া মহামূল্য সিংহলী মুক্তার হার গলায় পরিয়া লইল। যদি মোহরে না কুলায়, হার বিক্রয় করিলে যথেষ্ট অর্থ পাওয়া যাইবে।

    এ ছাড়া আরও দুইটি জিনিস চন্দনদাস সঙ্গে লইল। একটি ইস্পাতের উপর সোনার কাজ করা ছোট ছোরা; এটি সে কোচিনে এক আরব বণিকের নিকট কিনিয়াছিল। দ্বিতীয়, এক কাফ্রির উপহার একটি লোহার কাঁটা। কৃষ্ণবর্ণ দ্বিভুজ লোহার কাঁটা, সেকালে শৌখীন স্ত্রী-পুরুষ এইরূপ কাঁটা চুলে পরিত। এই কাঁটার বিশেষত্ব এই যে, ইহার তীক্ষ্ণ অগ্রভাগ শরীরের কোনও অংশে ফুটিলে তিনবার নিশ্বাস ফেলিতে যতক্ষণ সময় লাগে, ততক্ষণের মধ্যে মৃত্যু হইবে। চন্দনদাস কাঁটার সূক্ষ্মাগ্র সোনার খাপে ঢাকিয়া সাবধানে নিজের চুলের মধ্যে গুজিয়া লইল।

    নৌকা হইতে নামিয়া চন্দনদাস নগরের ভিতর দিয়া আবার হাঁটিয়া চলিল। ঝাঁ-ঝাঁ দ্বিপ্রহর, আশেপাশে দোকানের মধ্যে দোকানী নিদ্রালু; মধ্যাকাশ হইতে সূর্যদেব প্রখর রৌদ্র ঢালিয়া দিতেছেন। গাছ-পালা পর্যন্ত নিঝুম হইয়া পড়িয়াছে; মানুষ গৃহতলের ছায়ায় আশ্রয় লইয়াছে।

    কিছুদূর যাইবার পর একটা মোড়ের মাথায় পৌঁছিয়া চন্দনদাস এবার কোন্‌ পথে যাইবে ভাবিতেছে, এমন সময় তাহার চোখে পড়িল, একটা নয়-দশ বছরের কটিবাসপরিহিত শীর্ণকায় বালক প্রচণ্ড মার্তণ্ড-ময়ুখ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়া পথের মধ্যে একাকী ডাণ্ডাগুলি খেলিতেছে। চন্দনদাস হাতছানি দিয়া তাহাকে ডাকিল। বালক ক্রীড়ায় বিরাম না দিয়া, যষ্টির আঘাতে ক্ষুদ্র কাষ্ঠখণ্ডটিকে চন্দনদাসের দিকে তাড়িত করিতে করিতে তাহার সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল। তারপর প্রবীণের মতো তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চন্দনদাসের বেশভূষা নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, “সওদাগর! সমুদ্দুর থেকে আসছ— ন্যাঃ?”

    বালকের ভাষা ও বাক্‌প্রণালী অতি অদ্ভুত— আমরা তাহা সরল ও সহজবোধ্য করিয়া দিলাম।

    চন্দনদাস বলিল, “হ্যাঁ। নিমাই পণ্ডিতের বাড়ি কোথায় জানিস?”

    বালক বলিল, “হিঃ— জানি।”

    “আমাকে সেখানে নিয়ে চল্‌।”

    বালকের ধূর্ত মুখে একটু হাসি দেখা দিল, সে এক চক্ষু মুদিত করিয়া বলিল, “ডাংগুলি খেলছি যে।”

    “পয়সা দেব।”

    আকর্ণ দন্তবিকাশ করিয়া বালক হাত পাতিল, “আগে দাও।”

    চন্দনদাস তাহাকে একটা কপর্দক দিল, তখন সে আবার ডাংগুলি খেলিতে খেলিতে পথ দেখাইয়া লইয়া চলিল।

    বেশি দূর যাইতে হইল না; নিম্ববৃক্ষচিহ্নিত একটা বাড়ি যষ্টি-নির্দেশে দেখাইয়া দিয়া বালক প্রস্থান করিতেছিল, চন্দনদাস তাহাকে ফিরিয়া ডাকিল, বলিল, “তুই যদি আর একটা কাজ করতে পারিস, তোকে চারটে পয়সা দেব।”

    “কি?”

    “কাঞ্চন বেনের বাড়ি জানিস?”

    বালকের চক্ষু উজ্জ্বল হইল, “চুয়া? মাধায়ের কইমাছ? জানি। — হি হি!”

    চন্দনদাসের ইচ্ছা হইল, অকালপক্ব ছোঁড়ার গালে একটা চপেটাঘাত করে; কিন্তু সে কষ্টে ক্রোধ সংবরণ করিয়া বলিল, “হ্যাঁ, চুয়া। শোন্‌, তার বাড়ির সামনে দিয়ে যাবি, কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করবি না, কেবল দেখে আসবি, সেখানে কি হচ্ছে। পারবি?”

    বালক বলিল, “হিঃ— পয়সা দাও।”

    চন্দনদাস মাথা নাড়িয়া বলিল, “না, আগে খবর নিয়ে আসবি, তবে পয়সা পাবি। আমি এইখানেই থাকব।”

    বালক ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া মনে মনে গবেষণা করিল, চন্দনদাসকে বিশ্বাস করা যাইতে পারে কি না? শেষে ঘাড় নাড়িয়া সম্মতি জানাইয়া পূর্ববৎ ডাংগুলি খেলিতে খেলিতে প্রস্থান করিল।

    চন্দনদাস তখন নিমাই পণ্ডিতের গৃহে প্রবেশ করিল। সম্মুখেই টোলের আটচালা; ছাত্ররা কেহ নাই, নিমাই পণ্ডিত একাকী বসিয়া আছেন। তাঁহার কোলে তুলটের একখানি নূতন পুঁথি; পাশে লেখনী ও মসীপাত্র। চন্দনদাসের পদশব্দে নিমাই পণ্ডিত মুখ তুলিলেন; প্রশান্ত বিশাল চক্ষু হইতে শাস্ত্র-চিন্তাজনিত স্বপ্নাচ্ছন্নতা দূর করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কাকে চান?”

    চন্দনদাস বলিল, “নিমাই পণ্ডিতকে।”

    “আমিই নিমাই পণ্ডিত।”

    পাদুকা খুলিয়া চন্দনদাস গিয়া নিমাই পণ্ডিতকে প্রণাম করিল। নিমাই পণ্ডিত বয়সে তাহার অপেক্ষা ছোট হইলেও ব্রাহ্মণ। তুলসীপাতার ছোট বড় নাই।

    নিমাই পণ্ডিত প্রণাম গ্রহণ করিয়া বলিলেন, “দেখেছি বলে মনে হচ্ছে— আপনিই কি আজ দুখানি নৌকা নিয়ে সমুদ্রযাত্রা থেকে ফিরেছেন?”

    চন্দনদাস বিনীতভাবে বলিল, “আজ্ঞা হাঁ, আমিই।”

    নিমাই পণ্ডিত হাসিয়া বলিলেন, “আজ আপনার নৌকার ঢেউয়ে নবদ্বীপের একটি অমূল্য রত্ন ভেসে যাচ্ছিল, অনেক কষ্টে রক্ষা করা গিয়েছে। যা হোক, আপনি—?”

    চন্দনদাস নিজের পরিচয় দিয়া শেষে করজোড়ে বলিল, “আপনি ব্রাহ্মণ এবং মহাপণ্ডিত, আমাকে ‘আপনি’ সম্বোধন করলে আমার অপরাধ হয়।”

    নিমাই পণ্ডিত বলিলেন, “বেশ, কি ব্যাপার বলো তো?”

    চন্দনদাস বলিল, “একটা কাজে আপনার সাহায্য চাইতে এসেছি। নবদ্বীপে কাউকে আমি চিনি না, কেবল আপনার নাম শুনেছি। শুনেছি, আপনি শুধু অপরাজেয় পণ্ডিত নন, সৎকার্য করবার সাহসও আপনার অদ্বিতীয়। আমাকে সাহায্য করবেন কি?”

    নিমাই পণ্ডিত বুঝিলেন, বণিকতনয় আজ গুরুতর কোনও কাজ আদায় করিতে আসিয়াছে, মৃদুহাস্যে বলিলেন, “তোমার নম্রতা আর বিনয় দেখে ভয় হচ্ছে। যা হোক্‌, প্রস্তাবটা কি শুনি?”

    চন্দনদাসও হাসিল; বুঝিল, নিমাই পণ্ডিতকে মিষ্ট চাটুকথায় বিগলিত করা চলিবে না, তাঁহার সহিত অকপট ব্যবহার করাই শ্রেয়ঃ। সে ক্ষণেক চিন্তা করিয়া বলিল, “আপনি কাঞ্চন বেনের মেয়ে চুয়াকে জানেন?”

    নিমাই পণ্ডিত তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চন্দনদাসের মুখের পানে চাহিলেন। তাঁহার মুখ ঈষৎ গভীর হইল, বলিলেন, “জানি। চুয়ার কথা নবদ্বীপে সকলেই জানে।”

    চন্দনদাস বলিয়া উঠিল, “তবু তাকে উদ্ধারের চেষ্টা কেউ করে না?”

    নিমাই পণ্ডিত স্থির হইয়া রহিলেন, কোনও উত্তর দিলেন না।

    চন্দনদাস তখন বলিল, “আমি চুয়াকে বিয়ে করতে চাই। আপনি সহায় হবেন কি?”

    নিমাই পণ্ডিত বিস্মিত হইলেন। কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া কোল হইতে পুঁথি নামাইয়া ধীরে ধীরে বলিলেন, “কিন্তু চুয়া সম্বন্ধে সব কথা তুমি জানো কি?”

    “যা জানি, আপনাকে বলছি।”— এই বলিয়া আজ নৌকা হইতে নামিবার পর এ পর্যন্ত যাহা যাহা ঘটিয়াছিল সমস্ত সবিস্তারে বর্ণনা করিল; শেষে কহিল, “এই নির্বান্ধব পুরীতে চুয়া যেমন একা, আমিও তেমনি একা। এখন আপনি যদি সাহায্য করেন, তবেই কিছু করিতে পারি। নচেৎ একটি বালিকার সর্বনাশ হয়।”

    নিমাই পণ্ডিত ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া চিন্তামগ্ন হইলেন।

    এই সময় সেই বালক ডাংগুলি হস্তে ফিরিয়া আসিল। চন্দনদাস সাগ্রহে তাহাকে কাছে ডাকিতেই সে বলিল, “চুয়ার বাড়ির সামনে দুটো পাক্‌ বসে আছে; যে যাচ্ছে তারে হুমকি দিচ্ছে।”

    “আর কি দেখলি?”

    “চুয়া আর তার ঠান্‌দি ঘরে আছে। চাঁপা নাপতিনী বুড়ির সঙ্গে কোঁদল করছে।”

    “আর কিছু?”

    “আর মাধাই চন্নন বেনের ডিঙ্গি লুঠ করতে গেছে। পয়সা দাও।”

    খুশি হইয়া চন্দনদাস বালককে চার পয়সার স্থলে দু’গণ্ডা দিল। হৃষ্ট বালক তীক্ষ্ণস্বরে একবার “উ—” বলিয়া উল্লাস জ্ঞাপনপূর্বক ডাংগুলি খেলিতে খেলিতে প্রস্থান করিল।

    বালককে বিদায় করিয়া চন্দনদাস নিমাই পণ্ডিতের দিকে ফিরিতেই তিনি উদ্দীপ্তকণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন, “আমি তোমাকে সাহায্য করব। তোমার উদ্যম প্রশংসনীয়; আমরা গাঁয়ের লোক যা করিনি, তুমি বিদেশী তাই করতে চাও। তোমার স্বার্থ আছে জানি, কিন্তু তাতে তোমার মহত্ত্বের কিছু মাত্র হানি হয় না; আমি কি করতে পারি বলো।”

    চন্দনদাস বলিল, “তা আমিও জানি না। আপাতত পরামর্শ দিতে পারেন।”

    “বেশ, এসো, পরামর্শ করা যাক। মাধব যে রকম দুর্ধর্ষ পাষণ্ড, তার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে কোনও ফল হবে না। আমার মনে হয়—”

    চন্দনদাস বলিল, “একটি নিবেদন আছে। আমার বড় তৃষ্ণা পেয়েছে; ব্রাহ্মণবাড়ি একটু পাদোদক পেতে পারি?”

    নিমাই সচকিত হইয়া বলিলেন, “তুমি এখনও আহার করোনি?”

    চন্দনদাস হাসিয়া বলিলেন, “না, কেবল চুয়ার দেওয়া একখানি বাতাসা খেয়েছি।”

    “কি আশ্চর্য! এতক্ষণ বলোনি কেন? দাঁড়াও, আমি দেখি।”— বলিয়া খড়ম পরিয়া ত্বরিতে অন্দরে প্রবেশ করিলেন।

    বেলা তখন তৃতীয় প্রহর। বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী ভৃত্য-পরিজন সকলকে খাওয়াইয়া নিজে আহারে বসিতে যাইতেছিলেন, নিমাই গিয়া বলিলেন, “একজন অতিথি এসেছে। খেতে দিতে পারবে?”

    বিষ্ণুপ্রিয়া ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, “পারব।” তারপর ক্ষিপ্রহস্তে দালানে জল-ছড়া দিয়া পিঁড়ি পাতিয়া নিজের অন্নব্যঞ্জন অতিথির জন্য ধরিয়া দিয়া স্বামীর মুখের গানে চাহিলেন।

    নিমাই দাঁড়াইয়া দেখিতেছিলেন, স্মিতমুখে চন্দনদাসকে ডাকিতে গেলেন। এই নীরব কর্মপরায়ণা অনাদৃতা বধূটি ক্ষণকালের জন্য নিমাই পণ্ডিতের মন হইতে লক্ষ্মীদেবীর স্মৃতি মুছিয়া দিল।

    অতঃপর চন্দনদাস পরিতোষপূর্বক ব্রাহ্মণগৃহে প্রসাদ পাইল।

    পরামর্শ স্থির করিতে অপরাহ্ণ গড়াইয়া গেল। যে সকল ছাত্র টোলে পড়িতে আসিল, নিমাই পণ্ডিত তাহাদের ফিরাইয়া দিলেন।

    সংকল্প স্থির করিয়া নিমাই বলিলেন, “এ ছাড়া আর তো কোনও উপায় দেখি না। তৃতীয় ব্যক্তিকে দলে টানতে ভয় করে; কথাটা জানাজানি হয়ে যদি মাধবের কানে ওঠে, তাহলে আর কোনও ভরসা থাকবে না।”

    চন্দনদাস জিজ্ঞাসা করিল, “এ দেশের মাঝি-মাল্লাদের বিশ্বাস করা যেতে পারে?”

    “অন্য ব্যাপারে বিশ্বাস করা যায়, কিন্তু যে ব্যাপারে মাধব আছে, তাতে কাউকে বিশ্বাস করা চলে না। ঘূণাক্ষরে আমাদের মতলব টের পেলে তারা আমাদেরই মাধবের হাতে ধরিয়ে দেবে।”

    “তাহলে—”

    নিমাই হাসিয়া বলিলেন, “হ্যাঁ, মাঝি-মাল্লার কাজ আমাকেই করতে হবে। কাণভট্টের আশীর্বাদ দেখছি, এরি মধ্যে ফলতে আরম্ভ করেছে।”

    চন্দনদাস বলিল, “চূয়াকে আমি খবর দেব। শেষ রাত্রির দিকে পাইকরা ঘুমিয়ে পড়বে— সেই উপযুক্ত সময়। কি বলেন?”

    “হ্যাঁ। তুমি তোমার নৌকা পাঠিয়ে দিয়ে বড় বুদ্ধিমানের কাজ করেছ। মাধব নিশ্চিন্ত থাকবে, হয়তো রাত্রিতে চুয়ার বাড়িতে পাহারা না থাকতে পারে।”

    “অতটা ভরসা করি না। যা হোক, দেখা যাক।”

    সন্ধ্যার প্রাক্কালে দুই জন বাহির হইলেন। ব্রাহ্মণপল্লী হইতে অনেকটা উত্তরে গঙ্গাতীরে নৌ-কর সূত্রধরদের বাস। সেখানে উপস্থিত হইয়া দুই জনে দেখিলেন, রাশি রাশি স্তূপীকৃত শাল, পিয়াল, সেগুন, জারুল কাষ্ঠের প্রাকারের মধ্যে ছোট বড় নানাবিধ নৌকা তৈয়ার হইতেছে। কোনটির কংকালমাত্র গঠিত হইয়াছে, কোনটি পাটাতনে শোভিত হইয়া পূর্ণাঙ্গ হইয়া উঠিতেছে। বড় বড় বজরা— পঞ্চাশ দাঁড়ের নৌকা— কাহারও হাঙ্গর-মুখ, কেহ বা ময়ূরপঙ্ক্ষী, কেহ বা হংসমুখী। আবার ক্ষুদ্রকায় ডিঙ্গি, সংকীর্ণ-দেহ ছিপও আছে। কোনটি সম্পূর্ণ হইয়াছে, কোনটি এখনও অসম্পূর্ণ।

    দুই জনে অনেক নৌক দেখিয়া শেষে একটি ছোট ডিঙ্গি পছন্দ করিলেন। ডিঙ্গির সুন্দর গঠন, আড়াই হাত চওড়া, আট হাত লম্বা— শোলার মতো হালকা। মাত্র চারি জন লোক তাহাতে বসিতে পারে।

    নিমাই পণ্ডিত ছুতারকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “দাম কত?”

    ছুতার কিন্তু ডিঙ্গি বেচিতে রাজী হইল না, বলিল, ‘ফরমাশী ডিঙ্গি।”

    চন্দনদাস জিজ্ঞাসা করিল, “এ ডিঙ্গির জন্যে কত দাম পাবে?”

    ছুতার একটু বাড়াইয়া বলিল, “তিন তঙ্কা।”

    চন্দনদাস নিঃশব্দে তাহার হাতে এক মোহর দিল। ছুতার স্বপ্নেও এত মূল্য কল্পনা করে নাই, সে কিছুক্ষণ হতবাক্‌ থাকিয়া মহানন্দে ডিঙ্গির মালিকত্ব চন্দনদাসকে সমর্পণ করিল।

    ডিঙ্গি তৎক্ষণাৎ গঙ্গার জলে ভাসানো হইল। নিমাই পণ্ডিত ও চন্দনদাস তাহাতে আরোহণ করিয়া দুই জোড়া দাঁড় হাতে লইলেন। দাঁড়ের আঘাতে ডিঙ্গি জ্যা-মুক্ত তীরের মতো জলের উপর ছুটিয়া গেল।

    কিছুক্ষণ গঙ্গাবক্ষে দাঁড় টানিয়া উভয়ে দেখিলেন, ডিঙ্গি নির্দোষ ও অতি সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। দুই জনে সন্তুষ্ট হইয়া তীরে ফিরিলেন। তারপর নৌকা ছুতারের তত্ত্বাবধানে রাখিয়া নিমাই পণ্ডিত বলিলেন, “কাল বৈকালে আমি এসে ডিঙ্গি নিয়ে যাব।”

    ছুতার সাহ্লাদে এক দিনের জন্য নৌকা রাখিতে সম্মত হইল।

    অতঃপর নিমাই পণ্ডিত গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। চন্দনদাসের তখনও কাজ শেষ হয় নাই, সে গঙ্গার ধারা দিয়া ঘাটের দিকে চলিল।

    যে ঘাটে দ্বিপ্রহরে নৌকা বাঁধিয়াছিল, সেই ঘাটে যখন উপস্থিত হইল, তখন সন্ধ্যার ছায়া ঘনীভূত হইয়া আসিতেছে। ঘাটে কয়েকটি ক্ষুদ্র ডিঙ্গি বাঁধা ছিল; চন্দনদাস কয়েকজন মাঝিকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “বাপু, তোমরা জেলে তো?”

    “আজ্ঞে কর্তা।”

    “তোমাদের মোড়ল কে?”

    একজন বৃদ্ধ-গোছের জেলে বলিল, “আজ্ঞে কর্তা, আমি মোড়ল। আমার নাম শিবদাস।”

    “বেশ। তোমার সঙ্গে আমি কিছু কারবার করতে চাই। এখানে যত জেলে আছে, সবাই তোমার অধীন তো?”

    “আজ্ঞে।”

    “কত জেলে-ডিঙ্গি তোমাদের আছে?”

    “তা— ত্রিশ-চল্লিশখানা হবে।”

    “বেশ। শোনো; তোমাদের যত জেলে-ডিঙ্গি আছে, সব আমি ভাড়া করলাম। তোমরা জেলে-মাঝির দল কাল বেলা তিন পহরের সময় বেরুবে; বেরিয়ে সটান স্রোতের মুখে দক্ষিণে গিয়ে শান্তিপুরের ঘাটে নৌকো বাঁধবে। তারপর সেখানে আমার জন্যে অপেক্ষা করবে। সন্ধ্যে পর্যন্ত আমি যদি না যাই, তাহলে আবার ফিরে আসবে। — বুঝলে?”

    “বুঝলাম কর্তা। কিন্তু কাজটা কি, তা তো এখনও জানতে পারিনি।”

    “কাজের কথা শান্তিপুরের ঘাটে জানতে পারবে। কেমন, রাজী আছ?”

    “আজ্ঞে, গররাজী নই। কিন্তু ধরুন, শান্তিপুরের ঘাটে যদি আপনার দেখা না পাই?”

    “বলেছি তো, তাহলে ফিরে আসবে।”

    “কিন্তু আমাদের যাওয়া-আসা যে তাহলে না-হক হয়রানি হয়, কর্তা। আপনাকে তখন পাব কোথায়? আপনাকে তো চিনি না।”

    চন্দনদাস হাসিয়া বলিল, “তা হলেও তোমাদের লোকসান হবে না। তোমাদের অর্ধেক ভাড়া আমি আগাম দিয়ে যাব। সব নৌকো শান্তিপুরে যাওয়া-আসার জন্যে কত ভাড়া লাগবে?”

    শিবদাস মোড়ল বিবেচনা করিয়া বলিল, “আজ্ঞে, দশটি তঙ্কার কমে হবে না।”

    চন্দনদাস একটু ব্যবসাদারি করিল। কারণ, এক কথায় রাজী হইয়া গেলে জেলেরা কিছু সন্দেহ করিতে পারে। কিছুক্ষণ কষা-মাজার পর নয় তঙ্কা ভাড়া ধার্য হইল। চন্দনদাস পাঁচ তঙ্কা শিবদাস মোড়লের হাতে দিয়া বলিল, “এই নাও। কিন্তু কথার নড়াচড় যেন না হয়।”

    “আজ্ঞে”— শিবদাস মুদ্রা গনিয়া লইল, “আপনি নিশ্চিন্দি থাকুন কর্তা, ঠিক সময়ে আমরা শান্তিপুরের ঘাটে হাজির থাকব—”

    “সব ডিঙ্গি নিয়ে যাবে, একখানাও বাদ না পড়ে।”

    “আজ্ঞে, একখানাও বাদ পড়বে না।”

    এইরূপে নবদ্বীপ হইতে সমস্ত ডিঙ্গি তফাৎ করিবার বন্দোবস্ত করিয়া চন্দনদাস কতকটা নিশ্চিন্তমনে নিমাই পণ্ডিতের গৃহে ফিরিল। সেইখানেই তাহার রাত্রিতে থাকিবার ব্যবস্থা হইয়াছিল।

    রাত্রি তিন প্রহরে, চুয়ার বাড়ির দালানে পাইক দুই জন বসিয়া বসিয়াই ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। একজন দেয়ালে ঠেস দিয়া পদযুগল প্রসারিত করিয়া দিয়াছিল। দ্বিতীয় ব্যক্তি ঘুমের ঘোরে কখন কাৎ হইয়া শুইয়া পড়িয়াছিল; তাহার নাসারন্ধ্র হইতে কামারের হাপরের মতো একপ্রকার শব্দ নির্গত হইতেছিল।

    চারিদিকে গাঢ় অন্ধকার; কিন্তু অন্ধকারে চক্ষু অভ্যস্ত হইলে কিছু কিছু দেখা যায়। চন্দনদাস নিঃশব্দে ছায়ার মতো দালানে আসিয়া দাঁড়াইল। তাহার বাঁ হাতে সেই ক্ষুদ্র ছোরা। কিয়ৎকাল মূর্তির মতো দাঁড়াইয়া সে পাইকের নাসিকাধ্বনি শুনিল তারপর দালানের গাঢ়তর অন্ধকারের ভিতর তাহার চক্ষু বস্তু নির্বাচন করিতে আরম্ভ করিল।

    যে পাইকটা বসিয়া বসিয়া ঘুমাইতেছে, তাহার পদদ্বয় ঠিক দরজার সম্মুখে প্রসারিত; ভিতরে প্রবেশ করিতে হইলে তাহাকে লঙ্ঘন করিয়া যাইতে হইবে। তা ছাড়া দরজার কবাট ভেজানো রহিয়াছে, ভিতর হইতে অর্গলবদ্ধ কি না, বুঝা যাইতেছে না। চন্দনদাস ধীরে ধীরে অতি সন্তর্পণে হাত বাড়াইয়া কবাট একটু ঠেলিল। মরিচাধরা হাঁসকলে ছুঁচার ডাকের মতো শব্দ হইল। দরজা ঈষৎ খুলিল।

    হাঁসকলের শব্দে পাইকের হাপর হঠাৎ বন্ধ হইল। চন্দনদাস স্পন্দিত-বক্ষে ছোরা দৃঢ়মুষ্টিতে ধরিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। কিন্তু পাইক জাগিল না, আবার তাহার নাক ডাকিয়া উঠিল।

    চন্দনদাস তখন আবার কবাট একটু ঠেলিল, কবাট খুলিয়া গেল। এবারও একটু শব্দ হইল বটে, কিন্তু কেহ জাগিল না। তখন চন্দনদাস ইষ্টদেবতার নাম স্মরণ করিয়া নিঃশব্দে পাইকের পদযুগল লঙ্ঘন করিয়া ভিতরে প্রবেশ করিল।

    আঙ্গিনায় উপস্থিত হইয়া চন্দনদাস চারিদিকে চাহিল। সম্মুখে কয়েকটা ঘর অস্ফুটভাবে দেখা যাইতেছে। কিন্তু কোন্‌ ঘরে চুয়া ঘুমাইতেছে? চাঁপাও বাড়িতে আছে; চুয়াকে খুঁজিতে গিয়া যদি চাঁপা জাগিয়া উঠে, তবেই সর্বনাশ। চন্দনদাস কি করিবে ভাবিতেছে, এমন সময় তাহার হাতে মৃদু স্পর্শ হইল।

    চন্দনদাস চমকিয়া উঠিয়া অজ্ঞাতসারেই ছোরা তুলিল। এই সময় তাহার কানের কাছে মৃদু শব্দ হইল, “এসেছ?”

    “চুয়া!” কোমরে ছোরা রাখিয়া চন্দনদাস দুই হাতে চুয়ার হাত ধরিল, বলিল, “চুয়া! এসেছি।”

    চুয়ার নিশ্বাসের মতো মৃদু চাপা স্বর থরথর করিয়া কাঁপিতে লাগিল; সে বলিল, “তুমি আসবে বলেছিলে, তাই আমি তোমার জন্যে সারা রাত জেগে আছি।”

    অন্য সময় কথাগুলি অভিসারিকার প্রণয়বাণীর মতো শুনাইত; কিন্তু বিপদের মাঝখানে দাঁড়াইয়াও চন্দনদাসের মনে হইল, এত মধুর শব্দসমষ্টি সে আর কখনও শুনে নাই। চুয়ার মুখখানি দেখিবার জন্য তাহার প্রাণে দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা জাগিতে লাগিল। অথচ অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। চন্দনদাস চুয়ার কানে কানে বলিল, “চুয়া, একটা আলো জ্বালতে পারো না? তোমাকে বড় দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে।”

    দু’জনে অন্ধকারে হাত ধরাধরি করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল, চুয়া ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া বলিল, “আচ্ছা, এসো।”— বলিয়া হাত ধরিয়া লইয়া চলিল। চন্দনদাস তেমনই মৃদুকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “চাঁপা কোথায়?”

    “ঘুমুচ্ছে।”

    “ঠান্‌দি?”

    “ঠান্‌দিও ঘূমিয়ে পড়েছে।”

    গোহালের মতো একটা পরিত্যক্ত ঘরে লইয়া গিয়া চুয়া চকমকি ঠুকিয়া আলো জ্বালিল। তখন প্রদীপের ক্ষীণ আলোকে চুয়ার মুখ দেখিয়া চন্দনদাস চমকিয়া উঠিল— চোখ দুটি জবাফুলের মতো লাল, চোখের কোলে কালি পড়িয়াছে; আশা, আশঙ্কা ও তীব্রোৎকণ্ঠার দ্বন্দ্বে চুয়ার অনুপম রূপ যেন ছিঁড়িয়া ভাঙ্গিয়া একাকার হইয়া গিয়াছে।

    চন্দনদাসের বুকে বেদনার শূল বিঁধিল, সে বাষ্পাকুল কণ্ঠে বলিয়া উঠিল, “চুয়া!”

    চুয়া মাটিতে বসিয়া কাঁদিতে লাগিল; রোদনরুদ্ধ স্বরে বলিল, “তোমার নৌকা চলে গেছে শুনে এত ভয় হয়েছিল!”

    চন্দনদাস চুয়ার পাশে বসিয়া আর্দ্রকণ্ঠে বলিল, “চুয়া, আর ভয় নেই। তোমার উদ্ধারের সমস্ত ব্যবস্থা করেছি।”

    চুয়া চোখ মুছিয়া মুখ তুলিল, “কি?”

    চন্দনদাস বলিল, “বলছি। আগে বলো দেখি, তুমি সাঁতার কাটতে জানো?”

    অবসাদ-ভরা সুরে চুয়া বলিল, “জানি। তাই তো ডুবে মরতে পারিনি। কতবার সে চেষ্টা করেছি।”

    চন্দনদাসের ইচ্ছা হইল, চুয়াকে বুকে জড়াইয়া লইয়া সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু সে লোভ সংবরণ করিল, বলিল, “ও কথা ভুলে যাও, চুয়া, বুকে সাহস আনো। আমি এসেছি দেখেও তোমার সাহস হয় না?”

    চুয়া কেবল তাহার কালিমালিপ্ত চোখ দুটি তুলিয়া চন্দনদাসের মুখের পানে চাহিয়া রহিল; হয়তো নিজের একান্ত নির্ভরশীলতার কথা প্রকাশ করিয়া বলিতে চাহিল, কিন্তু বলিতে পারিল না। চন্দনদাস তখন সংক্ষেপে প্রাঞ্জলভাবে উদ্ধারের উপায় বিবৃত করিয়া বলিল; চুয়া ব্যগ্র বিস্ফারিতনয়নে শুনিল। শুনিতে শুনিতে তাহার চোখ দিয়া জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল।

    চন্দনদাসের বিবৃতি শেষ হইলে চুয়া কিছুক্ষণ হেঁটমুখে নীরব হইয়া রহিল। লজ্জা করিবার সে অবকাশ পায় নাই,— হৃদয়ের তুমুল আন্দোলনের মধ্যে এই তরুণ উদ্ধারকর্তাটিকে সে যে কি দৃষ্টিতে দেখিয়াছে, তাহা নিজেই জানিতে পারে নাই। তাই উদ্ধারের আশা যখন তাহার সংশয়ময় চিত্তে আগুনের মতো জ্বলিয়া উঠিল, তখন সে আর আত্মসংবরণ করিতে পারিল না, চন্দনদাসের পায়ের উপর আছড়াইয়া পড়িল। দুই হাতে পা জড়াইয়া কাঁদিয়া কহিল, “একটা কথা বলো।”

    চন্দনদাস চুয়ার মুখ তুলিয়া ধরিবার চেষ্টা করিতে করিতে বলিল, “চুয়া, চুয়া, কি কথা?”

    “বলো, আমায় বিয়ে করবে? তুমি আমায় প্রবঞ্চনা করছ না?”

    চন্দনদাস জোর করিয়া চুয়ার মুখ তুলিয়া তাহার চোখের উপর চোখ রাখিয়া বলিল, “চুয়া, আমার মায়ের নামে শপথ করছি, তোমাকে যদি বিয়ে না করি, যদি আমার মনে অন্য কোনও অভিসন্ধি থাকে, তবে আমি কুলাঙ্গার।”

    চুয়ার মাথা আবার মাটিতে লুটাইয়া পড়িল। তারপর সে চোখ মুছিয়া উঠিয়া বসিল, বলিল, “তবে আমাকে এখনই নিয়ে যাচ্ছ না কেন?”

    চন্দনদাসের ইচ্ছা হইতেছিল, এখনই এই কারাগার হইতে চুয়াকে মুক্ত করিয়া লইয়া পলায়ন করে; কিন্তু সুবুদ্ধি নিষেধ করিল। রাত্রি শেষ হইয়া আসিতেছে, ধরা পড়বার সম্ভাবনা বড় বেশি। সে মাথা নাড়িয়া বলিল, “না— এখন ভরসা হয় না। বাড়ির দোরে পাহারা— যদি ওরা জেগে ওঠে। —কিন্তু আমার এখানে আর থাকা বোধ হয় নিরাপদ নয়— চাঁপার ঘুম ভাঙতে পারে।”— বলিয়া চন্দনদাস অনিচ্ছাভরে উঠিয়া দাঁড়াইল।

    চুয়ার মনে আবার ভয় প্রবেশ করিল। সম্মুখে সমস্ত দিন পড়িয়া আছে; কি জানি কি হয়! সে ভয়-কাতর চক্ষু দুইটি তুলিয়া বলিল, “যাচ্ছ?— কিন্তু—”

    “কোনও ভয় নেই, চুয়া।”

    “কিন্তু— যদি বিঘ্ন হয়— যদি— একটা জিনিস দিতে পারবে?”

    “কি?”

    “একটু বিষ। যদি কিছু বিঘ্ন হয়—”

    চন্দনদাস কিছুক্ষণ শক্ত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল, তারপর ধীরে ধীরে নিজের চুল হইতে সেই কাঁটা বাহির করিয়া দিল। গাঢ়স্বরে বলিল, “চুয়া, যদি দেখ কোনও আশা নেই তবেই ব্যবহার করো, তার আগে নয়।”— বলিয়া কাঁটার ভয়ংকর কার্যকারিতা বুঝাইয়া দিল।

    এতক্ষণে চুয়ার মুখে হাসি দেখা দিল। সে উঠিয়া দাঁড়াইয়া প্রোজ্জ্বল চক্ষে বলিল, “আর আমি ভয় করি না।”

    চন্দনদাসের মুখে কিন্তু হাসির প্রতিবিম্ব পড়িল না। সে চুয়ার দুই হাত লইয়া নিজের বুকের উপর রাখিয়া বলিল, “চুয়া—”

    বাক্‌পটু চন্দনদাস ইহার অধিক আর কথা খুঁজিয়া পাইল না।

    চুয়া অশ্রু-আর্দ্র হাসিমুখ একবার চন্দনদাসের বুকের উপর রাখিল, অস্ফুটস্বরে কহিল, “চুয়া নয়— চুয়া-বউ। এই আমাদের বিয়ে।”

    ঘরের বাহিরে আসিবার পর একটা কথা চন্দনদাসের মনে পড়িল, সে বলিল, “ঠান্‌দির কথা ভুলে গিয়েছিলাম। তাকে ব’লো— কাল সন্ধের পর বাড়ি থেকে পালিয়ে যেন নিমাই পণ্ডিতের বাড়িতে যায়। সেখানে দু’-এক দিন লুকিয়ে থাকবে, তারপর আমি তাকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করব।”

    গ্রীষ্মের হ্রস্ব রাত্রি তখন শেষ হইয়া আসিতেছে। কাক-কোকিল ডাকে নাই, কিন্তু বাতাসে আসন্ন প্রভাতের স্পর্শ লাগিয়াছে। পূর্বকাশে শুকতারা দপ্‌ দপ্‌ করিয়া জ্বলিতেছে।

    আঙ্গিনায় দাঁড়াইয়া চন্দনদাস আর একবার চুয়ার দুই হাত নিজের বুকে চাপিয়া লইল। তারপর যে ভাবে আসিয়াছিল, সেই ভাবে ছায়ামূর্তির মতো বাহির হইয়া গেল।

    পাইক দুই জন শেষ রাত্রির গভীর ঘুম ঘুমাইতে লাগিল।

    অমাবস্যার সংশয়পূর্ণ দিবস ধীরে ধীরে ক্ষয় হইয়া আসিল। অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটিল না। কেবল দ্বিপ্রহরে মাধব চুয়ার গৃহে আসিয়া তদারক করিয়া গেল ও জানাইয়া গেল যে, তাহার প্রদত্ত শাস্ত্রীয়-বিধান যেন যথাযথ পালিত হয়।

    এখানে চাঁপার কাজ শেষ হইয়াছিল; মাধবের অনুমতি পাইয়া সে প্রমোদ-উদ্যানে পূজার আয়োজন করিতে গেল।

    সায়াহ্নে নবদ্বীপের ঘাটে স্নানার্থীর বিশেষ ভিড় ছিল না। দুই-চারি জন নারী গা ধুইয়া যাইতেছিল, কেহ কেহ কলসে ভরিয়া গঙ্গাজল লইয়া যাইতেছিল। পুরুষের সংখ্যা অল্প। কেবল একজন পুরুষ অধীরভাবে সোপানের উপর পদচারণ করিতেছিল ও মাঝে মাঝে স্থির হইয়া উৎকর্ণভাবে কি শুনিতেছিল। তাহার গলায় মুক্তাহার বিলম্বিত— অন্যথা সাধারণ বাঙালীর বেশ। বলা বাহুল্য, সে চন্দনদাস।

    ক্রমে সূর্য নদীর পরপারে অস্তমিত হইল। নিদাঘকালের দ্রুত সন্ধ্যা যেন পক্ষ বিস্তার করিয়া আসিয়া ভাগীরথীর জলে ধূসর ছায়া বিছাইয়া দিল। পাশে নৌকাঘাট নির্জন ও নিস্তব্ধ। জেলে-ডিঙ্গি একটিও নাই। দুই-একখানি স্থূলকলেবর মহাজনী কিস্তি নিঃসঙ্গ অসহায়ভাবে বিস্তীর্ণ ঘাটে লাগিয়া আছে।

    গঙ্গাবক্ষেও নৌকা নাই। কেবল দূরে উত্তরে একটি ক্ষুদ্র ডিঙ্গি স্রোতের মুখে ভাসিয়া আসিতেছে। অস্পষ্ট আলোকে মনে হয়, একটি লোক দাঁড় ধরিয়া তাহাতে বসিয়া আছে।

    ক্রমে ডিঙ্গি মাঝগঙ্গা দিয়া ঘাটের সম্মুখীন হইল; কিন্তু ঘাটের নিকটে আসিল না, গঙ্গাবক্ষে স্থির হইয়া রহিল। নৌকারূঢ় ব্যক্তি মাঝে মাঝে দাঁড় টানিয়া নৌকা ভাসিয়া যাইতে দিল না।

    চন্দনদাস চিন্তিতমুখে অধীরপদে ঘুরিতে ঘুরিতে হঠাৎ থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল— ঐ আসিতেছে। পথে দূরাগত বাদ্যোদ্যম শুনা গেল। চন্দনদাস একবার গঙ্গাবক্ষস্থ ডিঙ্গির দিকে তাকাইল, তারপর স্পন্দিতবক্ষে একটা গোলাকার বুরুজের উপর গিয়া বসিল।

    বাদ্যধ্বনি ক্রমশ কাছে আসিতে লাগিল। মহারোলে কাঁসর-ঘণ্টা শিঙা-ঢোল বাজিতেছে। তামাসা দেখিবার জন্য বহু স্ত্রী-পুরুষ-বালক জুটিয়াছিল, তাহাদের কলরব সেই সঙ্গে মিশিয়া কোলাহল তুমুল হইয়া উঠিয়াছে।

    ঘাটের শীর্ষে আসিয়া কোলাহল থামিল; বাজনা বন্ধ হইল। চন্দনদাস দেখিল, কৌতূহলী জনতাকে দ্বিধাবিভক্ত করিয়া দুই সারি ঢাল-সড়কিধারী পাইক নামিয়া আসিতেছে। তাহাদের দুই সারির মধ্যস্থলে মুক্তকেশী জবামাল্য-পরিহিতা চুয়া। চন্দনদাসও কৌতূহলী দর্শকের মতো দাঁড়াইয়া এই বিচিত্র শোভাযাত্রা দেখিতে লাগিল।

    পাইকগণ সদম্ভে অস্ত্র আস্ফালন করিয়া দর্শকদের ঠেলিয়া সরাইয়া দিয়া ঘাটের দিকে নামিতে আরম্ভ করিল। তাহাদের মধ্যবর্তিনী চুয়া মন্থরপদে এদিক-ওদিক চাহিতে চাহিতে সোপান অবরোহণ করিতে লাগিল।

    তারপর চন্দনদাসের সঙ্গে তাহার চোখাচোখি হইল। নিমেষের দৃষ্টি-বিনিময়ে যে ইঙ্গিত খেলিয়া গেল, আর কেহ তাহা দেখিল না।

    বুরুজের পাশ দিয়া যাইবার সময় চন্দনদাস অগ্রগামী পাইককে উচ্চৈঃস্বরে জিজ্ঞাসা করিল, “হ্যাঁ সর্দার, এ তোমাদের কিসের মিছিল?”

    বদন সর্দার প্রশ্নকারীর দিকে ভ্রূকুটি করিয়া তাকাইল, তাহার গলায় দোদুল্যমান মুক্তার হার দেখিল, তারপর রূঢ়স্বরে কহিল, “তোর অত খবরে দরকার কি?”

    চন্দনদাস মুখে বিনীতভাব প্রকাশ করিয়া বলিল, “না না, তাই জিজ্ঞাসা করছি।” মনে মনে বলিল, “মালিক আর চাকরের রা দেখি একই রকম। দাঁড়াও, তোমার মুণ্ডপাতের ব্যবস্থা করছি!”

    পরবর্তী পাইকগণ সকলেই চোখ পাকাইয়া চন্দনদাসের দিকে তাকাইল; তাহার গলায় লোভনীয় মুক্তাহার কাহারও দৃষ্টি এড়াইল না। দুর্দান্ত প্রভুর উচ্ছৃঙ্খল ভৃত্য— হারছড়া কাড়িয়া লাইবার জন্য সকলেরই হাত নিশপিশ করিতে লাগিল।

    জলের কিনারায় গিয়া পাইকের দল থামিল। চুয়া সোপান হইতে ঝুঁকিয়া গঙ্গাজল মাথায় দিল; তাহার ঠোঁট দুটি অব্যক্ত প্রার্থনায় একটু নড়িল। তারপর সে ধীরে ধীরে জলে অবতরণ করিল। প্রথমে এক হাঁটু, ক্রমে এক কোমর, শেষে বুক পর্যন্ত জলে গিয়া দাঁড়াইল। গলার মালা জলে ভাসাইয়া দিয়া ডুব দিল।

    পাইকেরা কিনারায় কেহ বসিয়া, কেহ দাঁড়াইয়া গল্প করিতে করিতে গোঁফে মোচড় দিতে লাগিল।

    এই সময় একটি ক্ষুদ্র ব্যাপার ঘটিল। চন্দনদাস ইতিমধ্যে বুরুজ হইতে নামিয়া পাইকদের পিছনে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল, হঠাৎ ব্যাকুলস্বরে বলিয়া উঠিল, “ঐ যাঃ!”

    একজন পাইক ফিরিয়া দেখিল, চন্দনদাসের গলার মুক্তাহার ছিঁড়িয়া গিয়াছে এবং মুক্তাগুলি সুতা হইতে ঝর্‌ঝর্‌ করিয়া ঘাটের শানের উপর ঝরিয়া পড়িতেছে। সে লাফাইয়া আসিয়া মুক্তা কুড়াইতে লাগিল। তাহাকে মুক্ত কুড়াইতে দেখিয়া বাকি কয়জন পাইক হুড়মুড় করিয়া আসিয়া পড়িল। মুক্তার হরির লুট— এমন সুযোগ বড় ঘটে না। সকলে কড়াকড়ি করিয়া মুক্তা চুনিতে লাগিল, ঠেলা খাইয়া চন্দনদাস বাহিরে ছিটকাইয়া পড়িল।

    পাইকেরা মুক্তা কুড়াইতেছে, দর্শকেরা তাহাদের ঘিরিয়া লুব্ধচক্ষে দেখিতেছে। কেহ লক্ষ্য করিল না যে, এই অবকাশে চন্দনদাস গঙ্গায় নামিল। চুয়া তখন সাঁতার দিতে আরম্ভ করিয়াছে।

    চুয়া ও চন্দনদাস পাশাপাশি সাঁতার কাটিয়া চলিল। অন্ধকার হইয়া আসিয়াছে; তাহাদের কালো মাথা দুটি কেবল জলের উপর দেখা যাইতেছে। চুয়া চন্দনদাসের পানে তাকাইল, তাহার সিক্ত মুখের উচ্ছলিত হাসি চন্দনদাসকে পুরস্কৃত করিল।

    তাহারা যখন ঘাট হইতে প্রায় চল্লিশ হাত গিয়াছে, তখন ঘাটে একটা হৈ-হৈ শব্দ উঠিল। তারপর “ধর্ ধর্, পালাল, পালাল—” বলিয়া কয়েক জন পাইক জলে লাফাইয়া পড়িল, কয়েক জন নৌকার সন্ধানে ছুটিল। কিন্তু নৌকা কোথায়? বদন সর্দার ষাঁড়ের মতো চেঁচাইতে লাগিল।

    গঙ্গার বুকে যে ছোট্ট ডিঙ্গি ভাসিতেছিল, তাহা ক্রমে নিকটবতী হইতে লাগিল। চন্দনদাস বলিল, “চুয়া যদি হাঁপিয়ে পড়ে থাকো, আমার কাঁধ ধরো।”

    চুয়া বলিল, “না আমি পারব।”

    চন্দনদাস পিছু ফিরিয়া দেখিল, যে পাইকগুলা জলে ঝাঁপ দিয়াছিল, তাহারা সজোরে সাঁতারিয়া আসিতেছে। কিন্তু তাহারা এখনও অনেক দূরে, নৌকা সম্মুখেই। কয়েক মুহূর্ত পরে দুই জনে একসঙ্গে গিয়া নৌকার কানা ধরিল।

    নিমাই পণ্ডিত দাঁড় ছাড়িয়া চুয়াকে ধরিয়া নৌকায় তুলিলেন। চন্দনদাস তাহার পরে উঠিল।

    যে পাইকটা সর্বাগ্রে আসিতেছিল, সে প্রায় বিশ হাতের মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছিল। সে হাত তুলিয়া ভাঙা গলায় চিৎকার করিয়া কি একটা বলিল। প্রত্যুত্তরে চন্দনদাস উচ্চ হাসিয়া দু’খানা দাঁড় হাতে তুলিয়া লইল। নিমাই পণ্ডিতও দাঁড় হাতে লইলেন।

    দুই জনে একসঙ্গে দাঁড় জলে ডুবাইয়া টানিলেন। প্রদোষের ছায়ালোকে ক্ষুদ্র ডিঙ্গি পাখির মতো উড়িয়া চলিল।

    নবদ্বীপ হইতে পাঁচ ক্রোশ উত্তরে গঙ্গাবক্ষে চন্দনদাসের দুই সমুদ্রতরী নোঙর করা ছিল। অন্ধকারে তাহাদের একচাপ গাঢ়তর অন্ধকারের মতো দেখাইতেছিল।

    রাত্রি এক প্রহরকালে ক্ষুদ্র নৌকা গিয়া চন্দনদাসের মধুকর ডিঙ্গার গায়ে ভিড়িল। মাঝিরা সজাগ ও সতর্ক ছিল; মুহূর্তমধ্যে সকলে বড় নৌকায় উঠিলেন।

    নিমাই পণ্ডিত বলিলেন, “আমার কাজ তো শেষ হল, আমি এবার ফিরি।”

    চন্দনদাস হাত জোড় করিয়া বলিল, “ঠাকুর, এত দয়া করলেন, একটু বিশ্রাম করে যান।”

    নৌকায় দুইটি কুঠুরি— একটি মাণিকভাণ্ডার, অপরটি চন্দনদাসের শয়নকক্ষ। শয়নকক্ষের মেঝেয় রঙীন পক্ষ্মল সুতির আস্তরণ। ঘরে দীপ জ্বলিতেছিল; সকলে তাহাতে প্রবেশ করিলেন। চুয়া এক কোণে জড়সড় হইয়া অর্ধশুষ্ক বসন গায়ে জড়াইয়া দাঁড়াইল। চন্দনদাস তাড়াতাড়ি পেটারি হইতে নিজের একখানা ক্ষৌমবস্ত্র বাহির করিয়া চুয়ার গায়ে ফেলিয়া দিল। চুয়া কাপড় লইয়া পাশের ঘরে গেল।

    নিমাই পণ্ডিত আস্তরণের উপর আসন গ্রহণ করিয়াছিলেন; চুয়া প্রস্থান করিলে চন্দনদাস চুপি চুপি বলিল, “ঠাকুর, বিয়েটা আজ রাতেই দিয়ে দিলে ভাল হয়।”

    নিমাই হাসিয়া বলিলেন, “এত তাড়া কিসের? বাড়ি গিয়ে বিয়ে করো।”

    চন্দনদাস ভারি ভালমানুষের মতো বলিল, “না ঠাকুর, চুয়া যদি কিছু মনে করে?— তা ছাড়া, নৌকোয় একটি বই শোবার ঘর নেই।”

    নিমাই বলিলেন, “কিন্তু বিয়ে দিই কি করে? উপকরণ কই?”

    “ঠাকুর, আপনি পণ্ডিতমানুষ, সামান্য পুরুত তো নন। আপনি ইচ্ছে করলে শুধু হাতেই বিয়ে দিতে পারেন।”

    নিমাই স্মিতমুখে চিন্তা করিয়া বলিলেন, “মন্দ কথা নয়। তুমি কন্যাকে হরণ করে এনেছ সুতরাং তোমাদের রাক্ষস-বিবাহ হতে পারে। রাক্ষস-বিবাহে কোনও অনুষ্ঠানের দরকার নেই।”

    চন্দনদাস মহা উল্লাসে উঠিয়া গিয়া চুয়ার হাত ধরিয়া লইয়া আসিল; বলিল, “চুয়া, ঠাকুর এখনই আমাদের বিয়ে দেবেন।”

    পট্টাম্বরপরিহিতা চুয়া নত-নয়নে রহিল। নিমাই হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “চন্দনদাস নাছোড়বান্দা, আজই বিয়ে করে তবে ছাড়বে।” চুয়ার মুখে অরুণরাগ দেখিয়া বুঝিলেন তাহার অমত নাই। বলিলেন, “বেশ। ফুলের মালা তো হবে না, দু’ছড়া হার যোগাড় করো।”

    পুলকিত চন্দনদাস মাণিকভাণ্ডার হইতে দু’গাছা মুক্তার মালা বাহির করিয়া দিল। তখন বিবাহ-ক্রিয়া আরম্ভ হইল।

    নিমাই একটি হার চুয়ার হাতে দিয়া বলিলেন, “দু’জনে দু’জনের গলায় দাও।”

    উভয়ে মালা-বদল করিল।

    নিমাই বলিলেন, “ঈশ্বর সাক্ষী করে গঙ্গার বুকের উপর ব্রাহ্মণ-সাক্ষাতে আজ তোমরা স্বামী-স্ত্রী হলে। আশীর্বাদ করি, তোমাদের মঙ্গল হোক।”

    উভয়ে নতজানু হইয়া ভক্তিপূত-চিত্তে এই দেবকল্প তরুণ ব্রাহ্মণের পদধূলি লইল।

    তারপর উঠিয়া চন্দনদাস বলিল, “ঠাকুর, এ বিয়ে লোকে মানবে তো?”

    নিমাই পণ্ডিতের নাসা স্ফুরিত হইল, তিনি গর্বিতস্বরে বলিলেন, “নিমাই পণ্ডিত যে-বিয়ের পুরুত, সে-বিয়ে অমান্য করে কে?”

    চন্দনদাস তখন নিমাই পণ্ডিতের পদতলে এক মুঠি মোহর রাখিয়া বলিল, “দেবতা, আপনার দক্ষিণা।”

    নিমাই এইবার হাসিয়া উঠিলেন, “ঐটি পারব না। — যাক্‌, আজ উঠলাম। বুড়িকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা শীগ্‌গির করো। আর, বাড়ি গিয়ে যথারীতি লৌকিক বিবাহ করো। অধিকন্তু ন দোষায়।”

    “তা করব। কিন্তু ঠাকুর, আপনি ক্লান্ত, পাঁচ-ছ’ ক্রোশ দাঁড় টেনে এসেছেন, আজ রাত্রিটা নৌকোয় কাটিয়ে গেলে হত না?”

    “না— আজই আমায় ফিরতে হবে। রাত্রিতে না ফিরলে মা চিন্তিত হবেন। তা ছাড়া, তোমার নৌকায় তো একটি বই ঘর নেই।”— বলিয়া মৃদু হাসিলেন।

    চন্দনদাস একটু লজ্জিত হইল।

    তারপর সেই মসীকৃষ্ণ অমাবস্যার মধ্যযামে নিমাই পণ্ডিত ডিঙ্গিতে উঠিয়া একাকী নবদ্বীপের পানে ফিরিয়া চলিলেন। যতক্ষণ তাঁহার দাঁড়ের শব্দ শুনা গেল, চুয়া ও চন্দন জোড়হস্তে তদগতচিত্তে নৌকার পাশে দাঁড়াইয়া বাহিরের দিকে তাকাইয়া রহিল।

    ১৮ অগ্রহায়ণ ১৩৪১