Category: উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

  • ঊনপঞ্চাশী

    ঊনপঞ্চাশী

    ঊনপঞ্চাশী

    ‘শ্রীউপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়’ রচিত রম্যগল্পগ্রন্থ ‘ঊনপঞ্চাশী’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৯ বঙ্গাব্দ মুতাবিক ১৯২২ খৃষ্টাব্দে। প্রকাশক শ্রীনৃপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ১২ নং রমরতন বোস লেন, শ্যামবাজার, কলিকাতা। গ্রন্থটির মূল্য ছিল ১৷৽ পাঁচ সিকা। ‘ঊনপঞ্চাশী’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে। প্রকাশক শ্রীবরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, আত্মশক্তি লাইব্রেরী, ১৫নং কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা।

    ‘উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়’ (৬ জুন ১৮৭৯—৪ এপ্রিল ১৯৫০) একজন বাঙালি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী, সম্পাদক ও লেখক। তাঁর রচিত বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ হল ‘নির্বাসিতের আত্মকথা’। অন্তঃপুরে সাধক, প্রথম গুণের লেখক এবং জন্মগত দেশপ্রেমিক ছিলেন উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯০৮ সালের ২ মে মানিকতলা গার্ডেন হাউস থেকে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও অন্যান্যদের সঙ্গে মুজাফফরপুর বোমা মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

    হুগলি জেলার চন্দননগরের গোন্দলপাড়ায় ১৮৭৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন উপেন্দ্রনাথ। অল্প বয়সে সন্ন্যাস নিয়ে ভারবর্ষের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান, পরে আবার সংসারে ফিরে আসেন। উপেন্দ্রনাথ ছিলেন প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত রমানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র। চন্দননগরের ডুপ্লে কলেজ থেকে এফ. এ. পাশ করে কলকাতা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে যোগ দিলেও ভগ্নস্বাস্থ্যের জন্য পড়া শেষ করতে পারেন নি। কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি। কলকাতার ডাফ কলেজে বি. এ. পাঠরত অবস্থায় ‘যুগান্তর’ দলের সংস্পর্শে আসেন। ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ আন্দোলনের সময় তিনি ‘যুগান্তর’ ও ‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯০৭ সালে বিখ্যাত আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় মানিকতলার বাগানবাড়ী থেকে অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কানাইলাল দত্ত, দেবব্রত বসু, হৃষিকেশ কাঞ্জিলাল ও আরও অনেক বিপ্লবীর সঙ্গে উপেন্দ্রনাথও ধরা পড়েন। তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। সেলুলার জেলে তাঁর দীর্ঘ বারো বছর কারাবাসের কাহিনী নিয়ে লেখেন নির্বাসিতের আত্মকথা বইটি। মুক্তি লাভের পরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নারায়ণ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন, বারীন্দ্রকুমার ঘোষের সঙ্গে বিজলী পত্রিকা প্রকাশ করেন। এর পর তিনি নিজ সম্পাদনায় প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক আত্মশক্তি। দেশ বিরোধী লেখার জন্য ব্রিটিশ সরকার আবার উপেন্দ্রনাথকে ৩ বছরের জন্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল। ১৯২৬-এ মুক্ত পেয়ে ফরোয়ার্ড, লিবার্টি, অমৃতবাজার পত্রিকায় সাংবাদিকতার কাজ করতেন। ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাস থেকে আমৃত্যু তিনি দৈনিক বসুমতী পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। শেষ জীবনে হিন্দু মহাসভার সাথে যুক্ত হন ও বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

    উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন, এর মধ্যে ‘নির্বাসিতের আত্মকথা’ সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হল — উনপঞ্চাশী, পথের সন্ধান, ধর্ম ও কর্ম, স্বাধীন মানুষ, জাতির বিড়ম্বনা, ভবঘুরের চিঠি, অনন্তানন্দের পত্র, বর্তমান জগত ইত্যাদি।

  • অবতারের মহিমা

    অবতারের মহিমা

    অবতারের মহিমা

    উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

    সে দিন পূর্ণিমা। সন্ধ্যাবেলাই চায়ের পেয়ালা কোলে করে’ পণ্ডিত হৃশীকেশের সঙ্গে মুখোমুখি হ’য়ে বসে’ রকম-বেরকমের খোসগল্প করা যাচ্চে, এমন সময় ঘর্ম্মাক্ত কলেবরে হাঁপাতে হাঁপাতে গোপাল দা’ এসে উপস্থিত।

    গোপাল দা’কে তোমার মনে আছে ত? দাদার যা’ বয়স তাকে ঠিক যৌবন বলা চলে না, কিন্তু এখনও তেমনি নধর গোল গাল চুকচুকে চেহারা; আর দুপয়সা রোজগারের সঙ্গে সঙ্গে ধৰ্ম্ম-কর্ম্মেও মতিগতি হয়েছে। বার, ব্রত, উপবাস, হাঁচি, টিক্‌টিকি প্রভৃতি অষ্টসাত্ত্বিক লক্ষণের অনেকগুলিই দেখা দিয়েছে, টাকের পিছনে একটি ছোটখাট টিকিও গজিয়েছে। দাদা ফিরছেন এই পূজোর পর সস্ত্রীক গয়া দর্শন করে।

    ঘরে ঢুকেই একখানা ঠ্যাং-ভাঙ্গা চেয়ারের উপর বস্‌তে গিয়ে দাদা প্রায় ডিগবাজী খাব-খাব হয়েছেন এমন সময় পণ্ডিত হৃশীকেশ চায়ের পেয়ালায় গোঁফজোড়া জুব্‌ড়ে চোখদুটি উঁচু করে’ খুব সহানুভূতিসূচক স্বরে বলিলেন— “দেখো, দাদা, ভাঙ্গা চেয়ারখানায় যেন বোসো না”। দাদার চোখের কোণে সাত্বিক প্রকৃতির ঈষৎ বিকৃতির লক্ষণ দেখা দিল; কিন্তু দাদা সেটুকু সাম্‌লে নিয়ে আমার দিকে চেয়ে বল্‌লেন— “এবার গয়ায় গিয়ে দেখে এলাম বুদ্ধদেবের দাঁত। সহজে কি মোহাস্ত দেখাতে চায়! অনেক কাকুতি-মিনতি করে’ তবে দর্শন পেয়েছি। অবতার পুরুষের অঙ্গ কি না—এই এত বড়! আর কি মহিমা, ভায়া! এমন হাজার হাজার লোক সেখানে পূজো মানস করে আধিব্যাধি থেকে যুক্ত হচ্চে।”

    পণ্ডিত হৃদীকেশ ততক্ষণ নিজের পেয়ালাটি নিঃশেষ করে’ দাদার জন্য এক পেয়ালা ঢেলে ভুল করে’ নিজের মুখের দিকে তুল্‌তে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বুদ্ধদেবের দাঁতের মহিমা শুনে সেটি আবার নামিয়ে রেখে বললেন— “তা, আর হবে না! আমাদের বিট্‌লেরাম বাবাজী ত ভক্তিতত্ত্ব-কৃজ্ঝটিকায় লিখেই গেছেন—“হরির চেয়ে হরি নামের বেশী মাহাত্ম্য—তা’ বুদ্ধদেবের চেয়ে তাঁর দাতের মহিমা যে বেশী হবে’ এতো জানা কথা।”

    বুদ্ধদেবের সম্বন্ধে এ রকম বক্রোক্তি শুনে গোপাল দা’ একটু ক্রুদ্ধ হবার চেষ্টা কর্‌ছিলেন। কিন্তু তাঁর অন্তরাত্মায় যে ক্রোধের উদ্রেক হয়েছিল তা তাঁর অস্থি, মজ্জা, মেদ, বসা, চৰ্ম্ম, ফুঁড়ে বহিরঙ্গে প্রকাশ হবার পূর্ব্বেই পণ্ডিতজী ফের বক্তৃতা সুরু করে’ দিলেন—“শাস্ত্রে যে বলে অবতার পুরুষেরা আত্মভোলা, গোপালদা’র কথা শুনে সে-সম্বন্ধে আজ আমার সব সন্দেহ দূর হ’য়ে গেল। আহা! দেখ একবার তামাসা! বুদ্ধদেব নিজেই সংসারের আধিব্যাধির দাওয়াই খুঁজ্‌তে খুঁজ্‌তে হয়রাণ হয়েছিলেন। তাঁর নিজের দাঁতের যে এত গুণ তা’ যদি জানতেন ত একটা কেন, বত্রিশটাই উপড়ে ফেলে গোপালদা’কে বখ্‌সিস দিয়ে যেতেন। বৌদিদিকে আর তা’হলে ঢোলকের মত মাদুলি ব’য়ে বেড়াতে হোতো না।”

    বক্তৃতার ঝাপ্‌টা লেগে চা’টা মাঝ থেকে ঠাণ্ডা হয়ে যায় দেখে আমিই সেটার সদ্ব্যবহার করে’ নিজেকে একটু গরম করে’ নিলুম। কেননা দেখলুম যে, এই শনিবারের বারবেলায় পণ্ডিতজীর জিহ্বাখানি বেশ একটু বিষিয়েছে, কাউকে-না-কাউকে না ছুব্‌লে তিনি ছাড়বেন না।”

    রাগে গোপালদা’র শ্যামবর্ণ মুখখানি একেবারে অন্ধকার বর্ণ হয়ে দাঁড়াল। তক্তাপোষে একটা বিরাট চাপড় মেরে তিনি বল্‌লেন—“কি সৰ্ব্বনেশে কথা! আমি দেখে এলাম বুদ্ধদেবের দাঁত, আর তুমি না বল্লেই হবে! অবতার পুরুষদের তুমি ঠাওরেছে কি? তাদের মহিমা যুগযুগান্তর ধরে’ থাকে!”

    পণ্ডিত হৃশীকেশ বক্তৃতার পর গলাটা একটু ভিজিয়ে নেবার জন্যে এতক্ষণ আর এক পেয়ালা চা ঢাল্‌ছিলেন। এক চুমুক খেয়ে জিহ্বাটা বেশ একটু শানিয়ে নিয়ে বললেন—“সে কথা আর বল্‌তে! মহিমার জ্বালায় হাড় ভাজা-ভাজা হয়ে উঠেছে। এলেন ত্রেতাযুগে অবতার রামচন্দ্র, আর ছেড়ে দিয়ে গেলেন দেশের মধ্যে এক পাল হনুমান! গেরস্তর বাগানে কলাটা, মুলোটা বার্ত্তাকুটা কিছুই আর থাকবার জো নেই! তারপর দ্বাপরে এলেন শ্রীমান কৃষ্ণচন্দ্র, ঢলাঢলি রক্তারক্তি যা করে’ গেলেন, তার ছাপ এখনও দেশ থেকে মোছেনি। কলিতে নাকি এসেছিলেন শ্রীগৌরাঙ্গ—আর ছেড়ে দিয়ে গেছেন দেশে ঝাঁকে ঝাঁকে নেড়ানেড়ী। বলা নেই, কওয়া নেই, একেবারে বাড়ীর ভিতরে এসে—‘জয় রাধে কৃষ্ট, দাও মা দুটি ভিক্ষে’, দিতেই হবে’;– আর এদিকে চালের দর ১২৲ টাকা। আজকাল আবার গাঁয়ে গাঁয়ে অবতার গণ্ডায় গণ্ডায় জন্মে দেশময় ত্যাগধর্ম্মের মহিমা ঘোষণা কর্‌তে লেগে গেছেন। পুরাণো অবতারদের তবু দুটো ফুল বিল্বপত্র দিয়েই তুষ্ট করা যায়; কিন্তু এই হালফ্যাসনের অবতারদের বচনের ঠেলা সাম্‌লাতে পোড়া দেশের যে কত দিন লাগবে তা’ ভগবানই জানেন।”

    পণ্ডিত হৃশীকেশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাকি চা টুকু শেষ করে’ দিলেন। গোপাল দা’ কি-একটা বলতে যাচ্ছিলেন; কিন্তু তাঁর ভাবটা স্ফুট ভাষায় ব্যক্ত হবার পূর্ব্বেই মা সরস্বতী পণ্ডিতজীর জিহ্বায় ভর করে’ বোসলেন। তিনি উর্দ্ধবাহু হয়ে শূন্যে একটা টুকি মেরে বল্লেন—“চুলোয় যাক্‌ ত্যাগের কথা ঘরে সম্পত্তির মধ্যে ত একটা বুড়ী ব্রাহ্মণী আর-একটা সিংভাঙ্গা গোরু; তাও আবার দু’ বছর থেকে দুধ দেয় না। সেগুলো না হয় কামিনী-কাঞ্চনের দোহাই দিয়ে ত্যাগই কল্লুম। আর এই দুর্ভিক্ষের দিনে অবতার পুরুষদের হুকুম মত কোনো দিন বা উপবাস; কোনো দিন বা পান্তাভাত ভক্ষণ, তা’ও না-হয় চল্‌তে পারে। কিন্তু অবতারেরা যদি পাজি-পুঁথি দেখে একটা ভাল দিন স্থির করে’ হুকুম করেন যে আজ পাঁচ্‌টা দশ মিনিট থেকে সাতটা বাইশ মিনিট পৰ্য্যন্ত সবাই দিলে কাঁদ; কাল ন’টা সতের মিনিট থেকে সাড়ে দশটা পৰ্য্যন্ত সবাই মিলে গড়ের মাঠে গিয়ে ডিগবাজী খাও, তা’হলে যে পৈতৃক প্রাণটা নিতান্তই অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে ৷ এ সব দাঁত-পূজো, খড়ম-পুজো, কাঁথা-পূজোরই উল্টো পিঠ।”

    কথাগুলোর মধ্যে রাজনীতির একটু বোট্‌কা গন্ধের আভাষ পেয়ে তাড়াতাড়ি সেরে নেবার জন্যে আমি বল্‌লাম— “ও-সব সে কালে চল্‌তো, পণ্ডিতজী; আজকালকার ছেলেরা অত সহজে ঘাড় নোয়ায় না।”

    পণ্ডিতজী একটু হেঁসে বল্লেন— “ঐ ত তোমাদের রোগ, ভায়া; পুরাণো বন্ধু একটু বেশ বদ্‌লে এলে আর তোমরা চিন্‌তে পার না। মানুষের ধাত কি আর অত সহজে বদ্‌লায়? ছাপান্ন পুরুষ ধরে’ যারা খড়ম-পূজো কোরে এসেছে, তাদের ঘাড়গুলি কারো না কারো পায়ের তলায় লুটিলে পড়বার জন্যে ব্যস্ত হয়ে রয়েছে। যেমন-তেমন একটা হলেই হলো—হয় গুরুঠাকুর, নয় প্রভুপাদ, নয় মহাত্মা, নয় লিডার। ওসব এক জিনিসেরই কালভেদে ভিন্নরূপ। এঁরাই প্রমোশন পেয়ে ক্রমশঃ অবতার হ’য়ে দাঁড়ান। তখন তাদের হাতে ভেল্কি হয়, দাঁতে রোগ সারে, চটিজুতোর শুকতলা ভিজিয়ে খেলে একবারে পরমপদ প্রাপ্তি হয়।”

    চটিজুতার কথা শুনে গোপাল দা’ও হেসে ফেল্লেন, কিন্তু পণ্ডিতজীর তখন বক্তৃতাটা মাথায় চড়ে গেছে। তিনি বল্লেন— “না, না, দাদা এটা হেসে ওড়াবার কথা নয়। রাজনীতি, সমাজনীতি, ধৰ্ম্মনীতি, এমনকি গার্হস্থ্যনীতিতে পর্যন্ত আমরা ঐ খড়ম পূজোকেই সার সত্য বলে স্থির করে’ ফেলেছি। আমরা ফুল বিল্বপত্র হাতে করে’ বসে আছি, যেই একটি ছোটখাট মহাপুরুষের আবির্ভাব, অমনি শ্রীচরণে অঞ্জলি দিয়ে, ঢাক ঢোল কাঁশি বাজিয়ে, চামর ঢুলিয়ে, হেঁসে কেঁদে, নেচে গেয়ে এমনি একটা বীভৎস ব্যাপার করে তুলি যে মহাপুরুষটি যদি সাক্ষাৎ ভগবানও হন, ত তাঁর ভূত হ’য়ে যেতে বড় বেশী বিলম্ব হয় না। তারপর তাঁর দাঁত, নখ, চুল নিয়ে দলাদলি আর মারামারি। তিনি ফুস কর্‌লেন কি ফাস্ কর্‌লেন, টুক করলেন কি টাক্‌ করলেন—এই নিয়ে গভীর আধ্যাত্মিক গবেষণা! এ সব কি ধর্ম্ম রে বাপ!—এ শুধু জড়ভরতের জটলা; বক্-ধার্ম্মিক শেয়াল-কোম্পানির আধ্যাত্মিক হুক্কা হুয়া।”

    গোপাল দা এগুক্ষণ চুপ করে’ ভ্যাদা গঙ্গারামের মত বসে ছিলেন। এইবার পণ্ডিতজীকে থাম্‌তে দেখে একটু সাহস পেয়ে বল্লেন—“তা’ বলে ত আর বাপ পিতাম’র ক্রিয়াকাণ্ড ছাড়তে পারিনে।”

    পণ্ডিতজী লাফিয়ে উঠে বল্লেন— “সে দোষ ত তোমার নয়, দাদা, দোষ তোমার ভগবানের। মনটা যার এখনও চার পায়ে হাঁটে, তাকে মানুষের আকার দিয়ে তার শরীরটাকে দু’পায়ে হাঁটান—একটা অত্যাচার বই ত নয়! মনটা আমাদের ক্রমাগত খুঁজ্‌ছে কোথায় কার পায়ের তলায় পড়ে’ নাক রগড়াবে; তাই আমরা সব কাজেই একজন-না-একজন মুরুব্বীর দোহাই দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাই। পরকালের ব্যবস্থা করতে হবে—ত টেনে আন দু’চারটি মহত্মাকে না হয় অবতারকে; দেশের স্বাধীনতা চাই ত আওড়াও মিল-বেনথামের বুলি; সমাজ গড়তে হবে ত নিয়ে এস ধার করে’ বল্‌সেভিজম্ ঘরকন্না গড়তে হবে, ত ডাক রাঙ্গা ঠানদিদিকে, না হয় ত পদী পিসিকে। মোট কথা কারো-না-কারো আওতায় পড়লে তবে আমরা থাকি ভাল। আমাদের মনগুলি যে এক-একটি বোরখাঢাকা পর্দ্দানসিন বিবি। ভগবানের খোলা হাওয়া গায়ে লাগলেই তাদের ধর্ম্ম-কর্ম সব পণ্ড হ’য়ে যাবে। আমাদের মনে মনে বেশ একটা ভয় আছে যে পাঁচজন মুরুব্বী মিলে ভগবানের এই সৃষ্টিটাকে ঠেকনা দিয়ে না রাখলে সৃষ্টিটা একদিন হুড়মুড় করে’ পড়ে যাবে। তাই আমাদের কথায়-কথায় পরের দোহাই, বাপ-পিতাম’র নাম করে নিজেদের পঙ্গুত্ব লুকিয়ে রাখা। নমশূদ্রের জল চল্ কর্‌তে হবে, ত দেখ পরাশর, যাজ্ঞবল্ক্য কি বলে গেছেন; আর পরাশর, যাজ্ঞবল্ক্য যে এদিকে কবে মরে ভূত হ’য়ে গেছেন তার ঠিক-ঠিকানা নেই! যারা জাত মানেন, তাঁরা দোহাই দেন পুঁথির, আর যারা মানেন না তাঁরা দোহাই দেন ফ্রেঞ্চ রিভলিউসনের। দোহাই একটা দেওয়া চাই!! নিজের বলে ত আমাদের কিছু নেই। সমাজ আর ধর্ম্ম—বাপ ঠাকুরদাদার; দেশটা বিদেশীর; আর মনটা— যিনি দয়া করে দুটি পায়ের ধুলা দেন তাঁর। আমাদের ধর্ম্মের মধ্যে খড়ম-পূজো আর কর্ম্মের মধ্যে পাদোদক পান! সস্কৃত-পড়া পণ্ডিত, আর ইংরিজী পড়া গ্রাজুয়েট— সবাইকার ঐ এক গতি; তফাতের মধ্যে এই যে একজন গড়াগড়ি দেন পূর্ব্বমূখ হ’য়ে, আর একজন পশ্চিম মুখ হ’য়ে; একজন মন্ত্র আওড়ান সস্কৃতে আর একজন আওড়ান ইংরিজিতে। ধর্ম্মের বেলায় সত্যপীর আর রাজনীতির বেলায় মন্টেগু।”

    বক্তৃতাটা বেশ জমে আসছে, এমন সময় বাড়ীর ভেতর থেকে পোঁ করে শাঁক বেজে উঠতেই পণ্ডিতজী থেমে গিয়ে আমার মুখের দিকে চাইলেন। ও! আজ যে পূর্ণিমা! আমরা বাহিরে বসে বক্তৃতা করছি আর ব্রাহ্মণী যে ঘরের মধ্যে সত্যপীরকে সিন্নি খাওয়াচ্ছেন! তার পরেই দরজার শিকলি নেড়ে ডাক পড়্‌ল—ঠুন্‌ ঠুন্ ঠুন্, ঠুন্ ঠুন্ ঠান। আমি একটু উসখুস করছি দেখে পণ্ডিতজী বল্লেন, “যাও, ভায়া, সত্যপীরের কথা শোন গে। আজ তা’হলে এই খানেই বেদব্যাসের বিশ্রাম।

    পণ্ডিতজী বেরিয়ে পড়লেন; আর আমি গোপাল দাদাকে সঙ্গে নিয়ে সত্যপীরের কথা শুনতে চললুম। পুরুৎঠাকুর তখন গলা ছেড়ে পড়্‌ছেন—

    “একথা শ্রবণ কালে                                যেবা অন্য কথা বলে

    আর যেবা করে উপহাস,

    লাঞ্ছিত সে সৰ্ব্ব ঠাঁই                               তাহার নিষ্কৃতি নাই

    আকস্মাৎ হয় সর্ব্বনাশ!”

    পণ্ডিত হৃষীকেশের যে হঠাৎ কি সৰ্ব্বনাশটাই ঘট্‌বে তাই ভেবে আমি শিউরে উঠতে লাগলাম।

  • কলের ওস্তাদী

    কলের ওস্তাদী

    কলের ওস্তাদী

    উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

    আমাদের পাড়ায় যদু পোদ্দারের ভাইপো মার্কিন মুল্লুক থেকে কলকারখানা গড়বার ওস্তাদ হ’য়ে ফিরে এসেছে—এই কথা শোনা অবধি আমাদের শিরোমণি মশায়ের নাতিটির মুখে আর হাসি ধরে না! ছেলেটা আমার ভারি ন্যাওটো; সুবিধা পেলেই তালটা, বেলটা, কলাটা, নৈবিদ্যির মাথার সন্দেশটা বাড়ীতে না বলে আমায় এনে দেয়। ফলার ঘুসতে, ছাদা বাঁধতে, দক্ষিণে আদায় করতে তাকে এক রকম অদ্বিতীয় পুরুষ বললেই হয়। পূজোর সময় মাগ্যিগণ্ডার বাজারে এবার ফলারের ধুমটা ভারি কমে গিছলো বলে সে এতদিন মুখ শুকিয়ে শুকিয়ে বেড়াচ্ছিলো। যদু পোদ্দারের ভাইপো একটা দুধের না কিসের মস্ত বড় কারখানা বানাবে শুনে’ সে হাসতে হাসতে গড়াতে গড়াতে স্ফূর্ত্তির চোটে আকাশ পানে ঠ্যাং ছুড়তে আরম্ভ করে’ দিল। আমি ত ছেলেটার রকম সকম দেখে বললাম—“কি রে ক্যাবলা, ক্ষেপলি নাকি?” ক্যাবলা আরও খানিকটা ঠ্যাং ছুড়ে’ শেষে হাঁফাতে হাঁফাতে বললে—“না গো দাদা মশাই, ভারি মজা হয়েছে; সন্দেশ এবার সস্তা হবেই হবে। গয়লা বেটারা এবার যা জব্দ হবে! যদু পোদ্দারে ভাইপো এমনি একটা কল বানিয়েছে যে তা বসাবার জন্যে তিন কোশ জমি চাই। কলের এক মুখে থাকবে পঞ্চাশ হাত লম্বা চওড়া বাঘমুখে একটা প্রকাণ্ড দরজা, আর-একদিকে থাবে গোটা ২০/২৫ মোটা নল; আর ভিতরে রকম-বেরকমের এঞ্জিন। একদিক দিয়ে তাড়া করে’ তুমি একপাল গরু সেই কলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে’ দাও; খানিক পরে দেখবে ও-মুখের নলগুলো দিয়ে বেরুচ্চে-দুধ, দই, ছানা, ঘি, মাখন, কাঁচাগোল্লা, চটিজুতো আর শিঙের শক্ত চিরুণী। কল কি সাঙ্ঘাতিক চিজ, দাদামশাই। ওতে হয় না এমন জিনিস নেই।”

    পণ্ডিত হৃষীকেশ এতক্ষণ ঘরের এক কোণে বসে’ খেলো হুঁকোটায় ভুড়ুক ভুড়ুক টান দিচ্ছিলেন। এইবার খুব একটা দমকা টান টেনে নাক দিয়ে খানিকটা ধোঁয়া বা’র করে’ দিয়ে বললেন— “এ আর তুই বেশী কি বললি, ক্যাবলা? আমাদের চোখের সামনেই ত এর চেয়ে আরও চমৎকার সব কল বসান রয়েছে। তোর৷ চোখ থাকতে দেখবিনে, তার আমি কি করব বল্?”

    ক্যাবলা ত পণ্ডিতজীর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।

    পণ্ডিতজী বললেন— “অত বড় হাঁ করিসনে, বাপ। কথাটায় দম্ আটকানর মত বিশেষ-কিছু নেই। আমিত চারিদিকে ঐ রকম কল ছাড়া আর-কিছু দেখতে পাচ্ছিনে। আচ্ছা, এই ধর-রঘুনন্দন কোম্পানীর পেটেন্ট ব্রহ্মচারিণী তৈরির কল। একটা বিধবা বা সধবা মেয়েকে ধরে’ তার নাক চুল কেটে, গয়নাগুলো কেড়ে নিয়ে ঐ কলের মধ্যে ফেলে দাও— দিন কতকপরে ঐ কল থেকে হয় একটা ত্রিশূলধারিণী ভৈরবী, নয় একটা যক্ষাকেশো ব্রহ্মচারিণী বেরিয়ে আসবেই আসবে। তার পর ধর কল নং দুই—পতিব্রতা তৈরির কল। খুব ছেলেবেলায় একটা কচি কাপড়ে-হেগো মেয়েকে ঘোমটা দিয়ে সাতপুরু মুড়ে ঐ কলের মধ্যে ফেলে দাও, মাঝে মাঝে কেবল এক একখানা গয়না ছুঁড়ে ঐ কলের মধ্যে ফেলে দিও—দেখবে বছর কতক পরে একটি খাসা নথ-নাকে, মিশি-দাঁতে, ঝাঁটা-হাতে সীতা বা সাবিত্রী তোমার ঘর উজ্জ্বল করে’ দাড়িয়ে আছে।

    “এ সব না হয় সেকেলে মিস্ত্রীর গড়ন—তা বলে আজকালের মিস্ত্রীরাও ফেলা যায় না। ঐ আমাদের গোঁফেশ্বর মিস্ত্রী এমনি কল বানিয়েছে যে তার মধ্যে খানকত সরকারী ছাপমারা বই ভরে’ দিয়ে একটা গাধা হোক, ঘোড়া হোক, ভেড়া হোক, যা-হোক্ একটা তার মধ্যে পুরে’ দাও, বছর কতক না যেতে যেতেই কলের ও-মুখ থেকে একটা M. Sc. B. Sc. বেরিয়ে আসবেই আসবে। এ কি কম ওস্তাদি, বাবা!

    “তারপর আমাদের টেক্‌ষ্টবুক কমিটি রায় বাহাদুর তৈরি করবার কি কলই না বানিয়েছে! একটা ছোট ছেলেকে ধরে দীনেশ বাবুর রাজারাণীর ছবিওয়ালা বইগুলোর খানকয়েক পাতা দিয়ে তাকে মুড়ে ঐ কলের মধ্যে ফেলে দাও—একেবারে মাথায় সামলা আঁটা একটা রায় বাহাদুর, না-হয় রায় সাহেব সেখান থেকে সেলাম ঠুকতে ঠুকুতে বেরিয়ে আসবে!

    সাবাস জোয়ান! এমন না হলে কারিগর!!

    ❀                            ❀                            ❀

    পণ্ডিতজী আবার থেলো হুঁকোটা তুলে নিলেন। ক্যাবলা কিন্তু হাঁ করে’ তাঁর মুখের পানে চেয়েই রইল।

    ১১ই অগ্রহায়ণ ১৩২৭

  • ভবপারের নৌকা

    ভবপারের নৌকা

    ভবপারের নৌকা

    উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

    গোপাল দাদার গুরুঠাকুর এসেছেন শুনে পণ্ডিত হৃষীকেশের হঠাৎ কি রকম ভক্তির উদ্রেক হোলো; তিনি তাড়াতাড়ি কোঁচার খুঁট গায়ে দিয়েই এই শীতকালের সন্ধ্যেবেলা গুরুজীকে দর্শন করতে বেরিয়ে পড়লেন। আমি ভাবলুম— হবেও বা, পণ্ডিতজীর বয়স ত প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি হ’য়ে এলো; সূৰ্য্য ত বিলক্ষণই পশ্চিমে হেলে পড়েছে; এইবার বুঝি পণ্ডিতজীর একটু পরকালের চিন্তা এসেছে। বিশেষতঃ গোপাল দাদার গুরু এক প্রকাণ্ড সিদ্ধপুরুষ বলে’ প্রসিদ্ধ, তাঁর চেলাও দশ-বিশ হাজারের কম হবে না।

    প্রায় এক ঘণ্টা চুপ করে’ বসে’ আছি, দেখি না পণ্ডিতজী— আস্তে আস্তে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে’ দিয়ে তক্তাপোষের উপর বসে’ পড়লেন। মুখখানা খুব গভীর বটে, কিন্তু চোখের কোণে একটু চাপা চাপা দুষ্ট হাসি।

    “কি পণ্ডিতজী, এরি মধ্যে সাধু-দর্শন শেষ হয়ে গেল যে!” বলে আমি হুঁকোটা পণ্ডিতজীর হাতের কাছে এগিয়ে দিলুম।

    পণ্ডিতজী হুঁকোটা রেখে দিয়ে বললেন— “না, ভায়া, এ আর চলবে না। একে ত সাধুজী ভাব জগতের যে আধ্যাত্মিক ধোঁয়া ছেড়ে দিয়েছেন তা’তেই আমার দম্ আটকাবার যোগাড় হয়েছে; তার ওপর এই মায়িক, নশ্বর, পার্থিব ধোঁয়াটা এলে জুটলে আমার প্রাণে-বাঁচা দায় হবে।”

    আমার একটু রাগ হোলো। সবাই বলে গোপাল দাদার গুরু মস্ত বড় সাধু; আর পণ্ডিতজী তাঁর ওপর টিপ্পনী কাটতে ছাড়লেন না! আমি বল্লুম— “দেখ, পণ্ডিতজী, তুমি একটি বিশ্বনিন্দুক। অত বড় একজন সাধু যাঁর চরণ পেয়ে কত লোক তরে যাচ্ছে, তাঁকে দেখে তোমার মন উঠল না।”

    পণ্ডিতজী একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বললেন— “কি করব, ভায়া,— আমার কেমন পাষণ্ড-নক্ষত্রে জন্ম, খুঁৎটাই আগে চোখে পড়ে। আমি দেখতে গেলুম একটা পুরো মানুষ আর দেখে এলুম পাঁচ-সাত হাত লম্বা জটাওয়ালা এক ভুড়েল সাধু বাঘ-ছালের ওপর বসে’ বসে’ সকলকার ভব-রোগ সারাবার পেটেন্ট দাওয়াই বাৎলাচ্ছেন। অনেক বোঝবার চেষ্টা করলুম, কিন্তু এই ‘ভব’টা যে একটা রোগ এটা কিছুতেই বুঝতে পারলুম না।

    “আর একটা বড় মজার কথা মনে পড়ে গেল। সেকালে দময়ন্তী যখন স্বয়ম্বরা হন, তখন রাজ সভায় দেবতারা লোভে লোভে উপস্থিত হয়েছিলেন। কারও চোদ্দটা মাথা আঠারটা ঠ্যাং, কারও বা পনেরটা নাক, ত্রিশটা পাছা—সবাই এক-একটা কেউ বিষ্ট ধনুর্দ্ধর। কিন্তু দময়ন্তী সটান গিয়ে নলরাজার গলাতেই মালা দিয়ে বলেছিলেন— ‘আমি নারী, সুতরাং আমি নরই চাই। দেবতা নিয়ে আমার কি হবে?”

    “আমার সেই কথাই মনে হ’তে লাগল— ভবপারে গিয়ে আমি করব কি? আমার এপারের যা-কিছু নিয়েই যে কারবার। এপারের তোমরা কেউ একটা ব্যবস্থা করতে পার?

    সেই সেকালের বুদ্ধ শঙ্করের আমল থেকে আজকালকার ছোটখাট গুরুর গুরু পরম গুরু পর্য্যন্ত সবাই, নৌকো নিয়ে কূলে দাঁড়িয়ে হাঁকচেন—চলে আয় ভবপারের যাত্রী, সস্তা দরে পার দেব। কেউ বলছেন— ‘আমার নৌকোর গেরুয়া নিশান একেবারে পরম ধামের মুক্তি ঘাটায় গিয়ে লাগবে; নৌকায় বোস, হালুয়া পুরির অভাব হবে না।’ কেউ বা বলছেন— ‘আমার নৌকায় গাব মাখান হয়েছে। জল ঢোকবার কোন ভয় নেই, ঝড় লেগে তুফান লেগে যদি নৌকা এক পেশে হয় তবে আমাদের নাচন কোদনের ভরেই নৌকা সামলে উঠবে। ঐ বৈকুণ্ঠের উপরে গোলোক, তার উপরে শব্দ ব্রহ্মের ঢোলোক যেখানে বাজছে আমরা ‘বদর’ ‘বদর’ বলতে বলতে একেবারে তোমাদের সেইখানে পৌঁছে দেব।—বাপ জগৎটা যে দুঃখময় তা পারে যাবার যাত্রীদের এই জগৎ থেকে সরে পড়বার জন্য ঠেলিঠেলি দেখলেই বেশ বুঝতে পারা যায়।’

    পণ্ডিতজীর মুখখানা যখন খুলে যায়, তখন লঘুগুরু জ্ঞান থাকে না। এক নিঃশ্বাসে সব মহাপুরুষদের মূর্ত্তিগত করতে দেখে আমি বল্লুম—“তোমার দুঃসাহস ত কম নয়। তুমিই শুধু ঠিক বুঝেছ আর সবারই ভুল?”

    পণ্ডিতজী বললেন—“চটে যেয়ো না দাদা; বড় বড় নামের বোঝা আমার ঘাড়ে ফেলে দিয়ে আমায় চেপে মেরে কোন লাভ নেই। নিউটন মাথা ঘামিয়ে বিজ্ঞানের অনেক তত্ত্বই বার করে গিয়েছিলেন; কিন্তু আজ কালের কলেজের ছেলেরাও তাঁর চেয়ে বেশী জিনিস জানে। তা দিয়ে কি প্রমান হয় যে, ঐ সব ছেলেরা নিউটনের চেয়ে বুদ্ধিমান? শুধু এই টুকুই বোঝা যায় যে, মানুষের জ্ঞানের মাত্রা বেড়ে চলেছে। ধৰ্ম্ম সম্বন্ধেও তাই। আগেকার মহাপুরুষেরা যে অতীন্দ্রিয় সত্যের সন্ধান পেয়েছিলেন সেইটেই চরম সত্য, বা একমাত্র সত্য, এ কথা না মানলে আর তাদের পন্থা ভিন্ন অন্য পন্থা খুঁজলে যদি তাদের অপমান করা হয়, ত আমি নাচার। তাঁরা ভবপারে যাবার রাস্তা বাৎলে গেছেন বেশ কথা। গোলকের উপর ঢোলকই থাক আর আর নোলকই থাক, সে সংবাদে আমার দুঃখ ঘুচবে না। সেই যে সেদিন গুপে বাগদির ছেলেটাকে জমীদারের কাছরিতে টেনে নিয়ে গিয়ে বেদম মারলে, তার চীৎকারেই আমার কান ভরে আছে সেখানে শব্দব্রহ্মের ঢোলকের আওয়াজ একবারেই ঢুকছে না। আমি এ-পারের মাটি কামড়েই পড়ে’ থাকবো, এইখানেই গু ঘাঁটব। আমার দুঃখে যদি কোন দেবতার প্রাণ কাঁদে ত তাঁকে গোলোক ছেড়ে আমার কাছে আসতে হবে। ওপারে গিয়ে কি রকম দুগ্ধ মজা লুটবো তার লম্বা চওড়া বিজ্ঞাপন দিয়ে আমাকে ভোলালে চলবে না! স্বর্গের দেবতা যদি স্বর্গেই থেকে যান, মর্তে যদি তার পা না পড়ে ত সে দেবতার কাছে মাথা খুঁড়ে আমার কোন লাভ নেই। সবাই যদি এখানে থেকে মরে, ত আমি একলা পালিয়ে গিয়ে বেঁচে কি করব?”

    মহাপুরুষদের নিয়ে এইরকম খোঁচাখুঁচি দেখে আমার প্রাণটা আঁৎকে উঠছিল। আমি বললাম— “পণ্ডিতজী, অবতার কল্প মহাপুরুষ বা ভগবানের বিষয় নিয়ে এ রকম ঠাট্টা বিদ্রূপ কি ভাল?”

    পণ্ডিতঙ্গী হোঃ হোঃ করে হেসে বলেন— “ও তাই বটে! ঐটে হজম করতে বেগ পেতে হচ্চে। তা, দেখ ভগবানের একটি নাম রঙ্গনাথ। তিনি যে sunday schoolএর হেডমাষ্টারের মত খুব একজন গম্ভীর পুরুষ, একথা আমার আদৌ মনে হয় না। তারা ভগবানকে নিয়ে পুঁটলি বেঁধে ভবপারের পেটেন্ট পিল তৈরি করেন তাদের ব্যবসার হানি হতে পারে বটে—কিন্তু ভগবান যদি নিতান্ত বেরসিক না হন, তা হলে ঐ জন্যে আমার উপর চটে যাবেন বলে ত মনে হয় না। আর মহাপুরুষদের কথা যদি তুললে ত বলি—সত্যের ভাঁড়ার যদি তাঁরা ওজার করে গিয়ে থাকেন, আর আমাদের পক্ষে তাঁদের এটো কাঁটা দু-এক-দানা খুটে খাওয়া ভিন্ন যদি উপায়ান্তর না থাকে তাহলে এই দুনিয়ার কলে চাবি বন্ধ করে দিয়ে ভগবানের এই সৃষ্টির ব্যবসা তুলে দেওয়াই উচিত।”

    আমি বললুম—“একবার ভবনদীর ওপারে গিয়ে সেইজন্যে একখানা দরখাস্ত না হয় ভগবানের দরবারে পেশ করে আসি।”

    পতিতজী ঘাড় নেড়ে বললেন—“ওরে গাধা, ওরে আদার ব্যাপারী— দরখাস্ত পেশ করবার জন্যে এবার আর তোকে ডিঙ্গিচড়ে ও-পারে যেতে হবে না। এবার ভরা ভাদরের বান ডেকে এপার ওপার সব একাকার করে দিয়ে যাবে। গুরুগিরির ব্যবসাটা এবার আর টিকিবে না।”

    ১৮ই অগ্রহায়ণ ১৩২৭

  • ছিরিচরণের ছুঁচো

    ছিরিচরণের ছুঁচো

    ছিরিচরণের ছুঁচো

    উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

    সেদিন সকালবেলা চা খাবার পর পণ্ডিতজীর একটু খোসমেজাজ দেখে গোপাল দা একবার এগিয়ে দুবার পিছিয়ে, শেষে একটু গলা খেঁকারি দিয়ে দুঃসাহসে ভর করে জিজ্ঞেস করলেন— “আচ্ছা পণ্ডিতজী, যদি রাগ না করেন, ত একটা কথা জিজ্ঞাসা করি—আপনি গুরু ঠাকুরদের পিছনে অত লেগেছেন কেন?”

    আমি আরও এক কাপ চা ঢালছি দেখে পণ্ডিতজীর তাল-তোবড়া মুখখানিতে একটু হাসির আভাষ ফুটে উঠল। তিনি বললেন—“রাগ কেন করব ভাই; রাগ আমার শরীরে নেই বললেই হয়। যা দেখতে পাও ওটা রাগের আকার, ওতে মানসিক বিকারের গন্ধমাত্র নেই। দুর্ব্বাসা ঋষি মরার সময় আমার প্র-পরা-অপ-সম-নি-পিতামহকে যে আশীর্ব্বাদ করে গিছলেন, তারই যা-কিছু ছিটে-ফোটা পড়ে আছে । ওতে ভয় পাবার কিছু নেই।”

    চায়ের কাপটা কোলের কাছে টেনে নিয়ে খুব আদরে-ভরা একটা চুমুক দিয়ে পণ্ডিতজী বলতে লাগলেন—“দেখ, ঐ গুরুগিরির কথা যদি জিজ্ঞেস করলে ত ব্যাপারটা গোড়া থেকেই বলি। জান ত, ডাক্তারেরা একটা জন্তু জানোয়ারের এক আধখানা হাড়ের টুকরো পেলেই তা দেখে বলে দিতে পারেন যে জন্তুটা ক’ হাত লম্বা, ক’ হাত চওড়া, তার কটা ঠ্যাং, সে কি খায়— ইত্যাদি। আমিও তেমনি অনেককেলে ওস্তাদ কিনা তাই কোন একটা সমাজের আধ-টুকরা অনুষ্ঠান দেখলেই তাদের চাষা-ভুষো থেকে আরম্ভ করে রাজারাজরার পর্য্যন্ত হাড়ির খপর বলে দিতে পারি। ঐ যে সেদিন দেখলুম গঙ্গার ধারে নেড়া বটগাছের তলায় জটাজুটওয়ালা বাবাজীটি ছাই মেখে বসে’ বসে’ গাঁজায় দম মারছেন আর গুপে বাগদীর ছেলে থেকে আরম্ভ করে পেশেনপ্রাপ্ত সব ডেপুটী পৰ্য্যন্ত মাদুলী ভরে’ ভরে’ তাঁর পায়ের ধুলো মাথায় ঠেকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে—এই থেকে যদি বল, ত আমি এদেশের সমাজতত্ত্ব, ভগবৎতত্ত্ব, রাজতত্ত্ব সব নিখুঁত করে’ তোমার সামনে কষে দিতে পারি।”

    পণ্ডিতজীর কথা শুনতে শুনতে গোপালদাদার হাঁ-টা ক্রমে আকর্ণ বিস্তৃত হবার যোগাড় হচ্ছে দেখে পণ্ডিতজী চায়ের কাপটা তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়ে বল্লেন—“গলাটা একটু ভিজিয়ে নাও ভায়া; কাণে শুনে কথাগুলো বোঝবার সুবিধে না হয় মুখে দিয়ে শোনা ছাড়া আর উপায় কি? তা, মুখ দিয়েই শোন; আর একটু চিবিয়ে বুঝো, তা’হলে নিতান্ত গুরুপাক না’ও হতে পারে।”

    গোপাল দা নিৰ্ব্বিবাদে চা-টুকু গিলে ফেলে পণ্ডিতজীর মুখের দিকে চেয়ে বললেন—“তার পর?”

    —“তারপর আর কি! গুপে বাগদীর ছেলেটাকে হাসতে হাসতে ফিরে যেতে দেখে আমার মনে হোলো—নিজের বিদ্যেটা ঠিক কি না একবার পরীক্ষা করে’ দেখি। ছেলেটাকে ডেকে জিজ্ঞেসা করলুম—‘হাঁরে খ্যাঁদা, আজ এখনি যদি সাক্ষাৎ কৃষ্ণ-ভগবান একেবারে ভেঁপু বাজাতে বাজাতে ধরা চূড়ো পরে ঐ আকাশ ফুঁড়ে তোর সামনে ঝুপ করে’ নেমে এসে তোকে বলে—খ্যাঁদা, বর নে–তা হোলে তুই কি চাস?”

    খ্যাঁদা রাঙ্গা রাঙ্গা দাঁত বার করে’ এক গাল হেঁসে ফেলে বললে— “এঁজ্ঞে বাবাঠাকুর, আমরা শূদ্দর ক্ষুদ্দুর মানুষ, আমাদের কি সে ভাগ্যি হবার জো আছে?”

    —— “ধর যদি বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েই যায়?”—

    খ্যাঁদা আমতা আমতা করতে করতে মাথা চুলকুতে চুলকুতে বললে—“এজ্ঞে, আমি তা’হলে বলি, দেবতা, আমি যেন মরে বৈকুণ্ঠে গিয়ে আপনার ছিরিচরণের আশে পাশে ছুঁচো হ’য়ে কিচমিচ করে’ বেড়াই।”

    “সেদিন জমীদারের নূতন নায়েবটা যখন গুপে বাগদীর ছেলেকে ধরে বাকি খাজনা আদায়ের জন্য মারতে মারতে একেবারে লম্বা করে’ ছেড়ে দিলে, আর ছোঁড়াটা শুধু নায়েবের হাতে পায়ে ধরে কাকুতি মিনতি করতে লাগলো, তখন আমার চোখে ব্যাপারটা বড় বিসদৃশ, এক-তরফা-রকমের বলে মনে হয়েছিল।

    “আর তার পরদিন তার গায়ের ব্যাথা ঘুরতে-না-মরতে যখন দেখলুম যে সে ঐ বট-তলার গঞ্জিকানন্দ বাবাজীর পায়ের তলায় চৌদ্দপোয়া হয়ে পড়ে’ মাদুলী ভরে’ পদধূলি সংগ্রহ করছে, তখন বেশ দিব্য চক্ষে দেখতে পেলুম যে তার মনটা অনেক দিন থেকে লম্বা হয়ে পড়ে’ আছে বলেই সেদিন নায়েবের পায়ের কাছে তার শরীরটা অত শিগগির লম্বা হ’য়ে পড়েছিলো। তোমরা ভাবছ তিন বৎসর অন্তর লাটসভার সভ্য গড়বার জন্যে ভোট দিতে পেলেই তারা স্বাধীন হ’য়ে উঠবে। হায় রে পোড়া কপাল! মাথায় যার সাপে কামড়েছে তার পায়ের আঙ্গুলে বিষ পাথর লাগালে কি হবে।”

    পণ্ডিতজীর বক্তৃতা শুনে আমারও একটু ভাবনা হ’য়ে গেল। গোপাল দা’ও একটু উসখুস করতে করতে জিজ্ঞেসা করলেন— “তাইত! তা’হলে উপায়?”

    পণ্ডিত বল্লেন—“উপায় আর কি। ভগবানের খোলা হাওয়া লোকগুলোর মনে একটু লাগতে দাও; তাতে আধ্যাত্মিক সর্দ্দি, কাশি হবার কোনোই ভয় নেই। আর তোমার পেশাদার গুরু- ঠাকুরদের বলো একটু আওতা ছেড়ে দাঁড়াতে।”

    ২৫এ অগ্রহায়ণ, ১৩২৭

  • স্বদেশী সেপাই

    স্বদেশী সেপাই

    স্বদেশী সেপাই

    উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

    সেদিন রাজনীতির বক্তৃতা শুনতে শুনতে গোটা দুই বেফাঁস কথা পণ্ডিত হৃষীকেশের মুখ থেকে বেরিয়ে পড়েছিল বলে আমাদের রায় বাহাদুর পার্ব্বতী দাদার বড় ছেলেটা আজ তাঁকে এসে পাকড়াও করেছে। আন্দোলনের জোরে ভারত স্বাধীন হবে শুনে কেন তিনি হেসেছিলেন, এ কৈফিয়ৎ আজ তাঁকে দিতেই হবে!

    এবার কংগ্রেসের পর কলকাতা থেকে কলেজ বয়কট করে’ ফিরে আসা অবধি ছেলেটি ভীষণ রকমের স্বদেশী হয়ে উঠেছে। তার বুটের ফিতে থেকে আরম্ভ করে গলার নেক্‌-টাই, আর মাথার হ্যাটটি পর্য্যন্ত একেবারে ষোল আনা স্বদেশী কোম্পানীর তৈরি! গ্রামে এসে সে একটা “জাতীয় ইস্কুল” খুলবে বলে চাঁদার খাতাও খুলেছিল; তবে চিফ সেক্রেটারির কাছ থেকে তার বাপের নামে একখানা লম্বা চওড়া চিঠি আসার পর সেটা ধামা-চাপা পড়ে গেছে।

    একে ত রায় বাহাদুর একজন দোর্দ্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার; তাঁর জমীদারীর শুধু বাজে আদায়ই হবে ৫/৭ হাজার, আর সেই সেদিন পুন্যার নজর দিতে দেরী হয়েছিল বলে তাঁর কাছারীতে গুপে বাগ্দীর ছেলেটা মার খেয়ে এখনও নেংচে বেড়াচ্চে; আর তারপর—গোদের উপর বিষফোড়া—তাঁর দৌহিত্রীর সঙ্গে আমাদের পুলিশ সুপারিন্‌টেনডেন্টের ছেলের বিয়ের সম্বন্ধ হচ্ছে—আর এ দিকে তাঁর ছেলেটা পুরোদস্তুর স্বদেশী সেপাই; পাড়ার ছেলেগুলো ইস্কুলে গেলেই তাদের ঠ্যাং খোঁড়া করে’ দেবে বলে সে শাসিয়ে বেড়াচ্চে। বাপ বেটার এই দুই জাঁতা কলের মধ্যে পড়ে’ চাষাভূষোরা একেবারে পিষে যাবার যোগাড় হয়েছে।

    পণ্ডিতজী ছেলেটার মুখখানির দিকে একটু চেয়ে থেকে বললেন—“দেখ, বাবা, অনেক দিন আগে— সেকালের স্বদেশী যুগেরও আগে—একবার পাড়াগাঁ অঞ্চলে ভারত-উদ্ধার প্রচার করতে গিয়েছিলুম। একটু চালাক চট্‌পটে রকমের এক চাষাকে ধরে প্রায় দেড় ঘণ্টা আন্দাজ বক্তৃতা ঝেড়ে যখন মনে হ’ল, তাকে কাৎ করে এনেছি, তখন সে অতি বিনীত ভাবে যোড়হাত করে’ আমায় বলে— ‘আমার একটি নিবেদন আছে।’

    “আমি এই গরুড়ের মত ভক্তটি পেয়ে বিষম উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞাসা কল্লুম— ‘কি, কি?’

    “সে বল্লে— ‘দেখুন, আপনাদের হাতে দেশ স্বাধীন হবার ২/৪ ঘণ্টা আগে আমায় একটু খবর দেবেন; আমি সপরিবারে বিষ খেয়ে মরে থাকব।’

    “তখন লোকটার কথা শুনে আমার পিত্তি পর্য্যন্ত জ্বলে গিয়েছিল। কিন্তু এখন তোমাদের দেখে-শুনে মনে হয় যে, লোকটার কথা একেবারে বাজে নাও হতে পারে।”

    আমাদের স্বদেশী সেপাইটি বললেন— “আমি থাকলে তাকে চাবকে সোজা করে’ দিতুম।”

    পণ্ডিতজী বললেন—“বাবা, চাবকানি অনেক দেখেছি; কিন্তু চাবুকের চোটে লোককে বেঁকে পড়তেই দেখেচি; একটাকেও সোজা হতে দেখিনি। তোমার দাদা-মশায় চাবুকের চোটে জমিদারীর আয় বিলক্ষণ বাড়িয়ে গেলেন, তোমার বাবাও শাস্ত্র-চর্চ্চার অবসরে যথেষ্ট চাবুক-চর্চ্চা করেন—আর ভবিষ্যতে সুবিধা পেলে তুমিও তা করবে—কিন্তু সোজা কটাকে করেছ?”

    ঐ বেতালা কথা কওয়া পণ্ডিতজীর কেমন রোগ! পাছে কথাটা রায় বাহাদুরের কাণে ওঠে সেই ভয়ে আমি তাড়াতাড়ি বললুম—“তা, ছেলেরা যা করছে, সে ত ভালর জন্যেই করছে। দেশটা স্বাধীন হ’লে গৌরবের ভাগীদার ত চাষাভূষোরাও হবে।”

    পণ্ডিতজী আমার দিকে একটা এমনি বিতিকিচ্ছি রকমের চাউনি চাইলেন, যা তাঁর চোখেও বড়-একটা দেখিনি। তিনি একেবারে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন—“দেখ, তোমাদের ঐ ন্যাকামি শুনতে শুনতে আমার হাড় ভাজা ভাজা হয়ে গেছে। তোমরা কথায় কথায় বল— ‘আহা দেশটা যদি আমাদের কথায় সাড়া দিত ত এতদিন আমরা কেষ্ট বিষ্ট হয়ে যেতুম। ছাপ্পান্ন পুরুষ ধরে যাদের গলায় এক পা আর পেটে এক পা দিয়ে চেপে রেখেছ— আজ টিকি ধরে হেঁচকা টান মারছ বলে কি তোমাদের ফরমাইস মত তারা নেচে উঠবে? ধৰ্ম্মে, কৰ্ম্মে, আচারে ব্যবহারে যাদের পরাধীন করে রেখেছ, যাদের ছুলে তোমাদের নাইতে হয়, যাদের বেগার খাটিয়ে তোমরা নবাবী কর, আজ তাদের স্বাধীনতার কথা বোঝাতে গিয়ে নিতান্তই বেহায়া না হলে তোমরা লজ্জায় মরে যেতে! মানুষের মনের আধখানা পরাধীন রেখে বাকি আধখানাকে স্বাধীন করে দেবে?—বলিহারী তোমাদের বুদ্ধি হে? তোমার রাজনীতির চর্চ্চা করবে কে?—যারা করবে তাদের যে মেরে রেখেছ! এ জাত যদি কখনো বেঁচে উঠে লড়ে, ত আগে লড়বে তোমাদের সঙ্গে।”

    আমি দেখলাম, কেঁচো খুঁড়তে খুঁড়তে ক্রমে সাপ রেরিয়ে পড়বার জোগাড় হচ্চে। তাড়াতাড়ি পণ্ডিতজীর মুখ বন্ধ করবার জন্যে এক কাপ চা তৈরি করে বললাম—“থাক; এদিকে চা-টা যে জুড়িয়ে গেলো।”

    পণ্ডিতজীর কাছে থেকে তাড়া খেয়ে আমাদের রায় বাহাদুরের ছেলে ওরফে স্বদেশী সেপাই মুখখানা বেজায় গম্ভীর করে’ বললে—“আপনি বলেন কি, আমরা দেশটাকে এত করে বলছি আমাদের সঙ্গে উঠতে—আর দেশটা উঠবে না?”

    পণ্ডিতজী হোঃ হোঃ করে হেসে উঠে বল্লেন—“উঠবে বৈ কি! দেশের যদি একটু লজ্জা সরম থাকে, ত তোমরা পাঁচজন ইয়ার-বন্ধু মিলে, দুবার “Arise awake” বলে তুড়ী মেরে ডাকলেই তোমাদের জননী ভারতবর্ষ একেবারে হুড়মুড় করে লাফিয়ে উঠবে। আর তাও বলি বেটীরই কেমন আক্কেল! সেই যে হাজার বছর ধরে’ ঘাড়মুড় ভেঙ্গে পড়ে আছে, আর উঠবার নামটি নেই। রাণাসঙ্গ ডেকে খুন হয়ে গেল—বেটির মুখ দিয়ে একটি কথাও ফুটল না। শিবাজী, গুরু গোবিন্দ মায়ের অনেক আদরের ছেলে— তাদের ডাকে বুড়ী একবার চোখ চাইতে না চাইতেই আবার পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। তাঁরা কেউ বা ডেকেছিলেন—হিন্দীতে, কেউ বা ডেকেছিলেন মারাঠিতে সে ডাক হয়ত মায়ের মনে ধরেনি। এইবার তোমরা সব স্বদেশী কাপ্তেন মিলে গোল দীঘির পাড় থেকে ইংরেজী ডাক ডাকলে হয়ত বেটী ভয়ে ডরে উঠতে পারে! তা বেয়ে চেয়ে দেখ একবার।”

    স্বদেশী সেপাই একটু যেন বিরক্ত হয়ে বললে—“দেখি দু-এক বছর নেড়ে চেড়ে। দেশটা উঠল ত উঠল, আর তা না হয় ত বাবার জমিদারীটা ত আর কোথাও যায়নি।”

    পণ্ডিতজী বললেন—“এতক্ষণে একটা বুদ্ধিমানের কথা বলেছ! দেশে এরকম বুদ্ধিমানের দল যে রকম প্রবল বেগে বেড়ে উঠছে, তাতে দেশের ভবিষ্যত সম্বন্ধে এক রকম নিশ্চিন্ত হওয়া যেতে পারে। নেপালে বেড়াতে গিয়েও সাধুদের মহলেও একবার এ রকম একটি বুদ্ধিমান দেখেছিলুম। সেবার ভারি শীত পড়েছে । একে নেপালী শীত, মাটির উপর হাতখানেক বরফ জমে গেছে, তার উপর ভূরি ভোজনের ব্যবস্থাটাও বড় সুবিধে রকমের হচ্ছিল না। তাই আমরা ধরমশালার এক কোণে আগুন জ্বালিয়ে একেবারে টুপভুজঙ্গ অবস্থায় বসে আছি, এমন সময় বেঁটে খেটে জোয়ান গোছের এক সাধু পুরুষ দরজার কাছে উঁকি মেরে বল্লেন—ওঁ।

    “আমরা তাড়াতাড়ি ‘নমো নারায়ণ’ বলে অভিবাদন করে তাঁর পাঞ্চভৌতিক দেহের কুশল প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি চক্ষু বুজে বললেন—ওঁ।

    সব কথার উত্তরেই সাধু এক ওঙ্কার ধ্বনি করেন দেখে আমরা ত ভ্যাবাচাকা লেগে যাবার যোগার হয়ে পড়েছি, এমন সময় আমার এক বন্ধু বললেন— “আরে হাঁ করে দেখেছিস কি? এটা আর বুঝতে পারছিস নে যে, বৈরাগ্য আর শীতের চোটে সাধুজীর মনটা একেবারে ত্রিকুটে লয় হয়ে যাবার জোগাড় হয়েছে! বেশ এক বাটা গরম চা কর দেখি; আর খানকতক মোটা মোটা রুটি বানিয়ে তার সঙ্গে ঐ কুমড়োটা কেটে খানিকটা ছক্কা করে দে। একবার দেখি চেষ্টা করে সাধুজীর মনটা যদি নেমে আসে। শাস্ত্রে বলে কুমড়োর মত এমন বৈরাগ্যনাশন দাওয়াই মেলাই মুস্কিল।” তাড়াতাড়ি একবাটি গরম চা করে সাধুজীর মুখের কাছে ধরতেই সাধুজী সেটুকু জঠর নিহত ব্রহ্মাগ্নিতে আহুতি দিয়ে আনন্দে দত্ত বিকশিত করে বল্লেন— ওঁ।

    কুমড়োর ছক্কা দিয়ে দিস্তে খানেক রুটি খাবার পর সাধুজী ওঙ্কারলোক থেকে পার্থিব লোকে নেমে এসে আমার বন্ধুটির সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেললেন। তখন সাধুজীর এই পাঞ্চভৌতিক খোলসটি কোন কুল উজ্জ্বল করেছে, খোলসের মায়িক সম্বন্ধের কোনখানে কে আছে এই সম্বন্ধে সদালাপ আরম্ভ হল। ঘণ্টা খানেক পায়তারা কসবার পর, সাধুজীর মনটা যখন দু-তিনবাটি চায়ে গলে একেবারে থসথসে হয়ে গেছে তখন তিনি বললেন—“দেখ, গত বৎসর ধানটান কাটার পর প্রায় শ’খানেক টাকা হাতে পেয়েছিলুম; তা একটা বিয়ে করতেই সব খরচ হয়ে গেল। আর মেয়েটিও ছোট; বয়স বছর ১২/১৩; আমি ভাবলুম দূর ছাই আর কাজ নেই; ঘরে থাকলেই খরচ, তাই এক সাধুর কাছে ভেক নিয়ে বেরিয়ে পড়লুম। তা দেখি, দু-চার বছর, ব্রহ্ম মিল্‌ল ত ভাল; না হয় ঘর ত আছেই।”

    পণ্ডিতজী হেসে বল্লেন—“দেখলে, ব্রহ্মচিন্তা করলে কি হয়, হিসেব বোধটি ঠিক আছে! তোমাদের দেশচিন্তাও ঐ রকম।”

    ২৯শে পৌষ ১৩২৭