Author: তাহের আলমাহদী

  • ত্রয়োবিংশ অধ্যায় : বাবুরের ইন্তেকাল

    ত্রয়োবিংশ অধ্যায় : বাবুরের ইন্তেকাল

    ত্রয়োবিংশ অধ্যায় : বাবুরের ইন্তেকাল

    ১৫৩০ ঈসায়ী সনের ২৪ ডিসেম্বর আগ্রা কেল্লায় বাবুর ইন্তেকাল করলেন।

    এই বীরসেনানী, যোদ্ধা, বিদ্বান ও মোগল সামাজ্যেরে প্রতিষ্ঠাতার ইন্তেকালের বিষয়ে ঐতিহাসিকেরা এক আকর্ষণীয় বিবরণও দিয়েছেন। তবে এই বিবরণ থেকে পৃথকভাবে এ কথাও বলা হয় যে, ১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দের গ্রীষ্মকালে হুমায়ূন বাদাখশান থেকে আগ্রায় এসেছিলেন। বাবুর তাঁর উপর বাদাখশানের শাসনভার অর্পণ করেছিলেন।

    হুমায়ূনের বাদাখশান থেকে আগ্রা আসার মূল কারণ ছিল লাগাতার যুদ্ধে রত থাকার কারণে বাবুরের স্বাস্থ্য প্রায় এক বছর ধরে খারাপ চলছিল। তিনি কোনো যুদ্ধে না নেমে স্বাস্থ্যোদ্ধার করছিলেন। এমতাবস্থায় বাবুরের অন্তিম সময় ঘনিয়ে আসতে দেখে, বাবুরের কিছু দরবারি গুপ্ত পরামর্শ করে বাবুরের পর তাঁর পুত্র হুমায়ূনের স্থলে বাবুরের ভগ্নিপতি মুহম্মদ মেহেদি খাজাকে রাজ-সিংহাসনে আসীন করার জন্য চিন্তাভাবনা শুরু করে দিয়েছিলেন।

    হুমায়ূন যেইমাত্র এই খবর পেলেন, অমনি তিনি বাদাখশান থেকে আগ্রা চলে এলেন। ষড়যন্ত্রকারীদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। বাদাখশান থেকে ফেরার পর অন্তিম সময় পর্যন্ত হুমায়ূন পিতার কাছেই থাকেন। বাবুর তাঁর উপস্থিতিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার পূর্বে বাবুর হুমায়ূনকে সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন। বাবুর হুমায়ূনকে এ নসিহতও দেন যে, তিনি অন্য তিন ভাই কামরান, আসকারি ও হিন্দালের সঙ্গে যেন সর্বদাই ন্যায়াচার করেন।

    আকর্ষণীয় বিবরণটি হলো এরকম—

    ১৫৩০ ঈসায়ী সনের গ্রীষ্মকালে হুমায়ূন অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর অসুস্থতা বেড়ে চলল। বাবুর বেহদ চিন্তিত হলেন। কেননা, পুত্রের উপর কোনো ওষুধই কাজ করছিল না। তখন এক বুজুর্গ বলেন, হুমায়ূন তখনই সুস্থ হতে পারেন, যখন বাবুর তাঁর সর্বাধিক প্রিয় বস্তুটি আল্লাহর রাহে কুরবান করতে পারবেন।

    বাবুর জানেন যে, পুত্রের জীবন রক্ষার জন্য তাঁর কাছে সবচেয়ে বহুমূল্য আর প্রিয় বস্তুটি হলো তাঁর জীবন। এ কথা ভেবেই বাবুর পুত্রের জীবন রক্ষার জন্য নিজের জীবন খোদার রাহে কুরবান করার জন্য সংকল্প করলেন। এই সংকল্পের কথা পুনরাবৃত্তি করে তিনি অসুস্থ হুমায়ূনের পালঙ্কের চারপাশে তিনবার প্রদক্ষিণ করলেন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন, তাঁর জীবনের বিনিময়ে হুমায়ূনের জীবন দান করা হোক।

    বাবুরের এই প্রার্থনায় সাথে সাথেই হুমায়ূন সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলেন। আর বাবুর রোগশয্যা নিলেন। তারপর, ওই রোগে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।

    উপসংহার

    সম্ভবত, বাবুরের মৃত্যু সম্বন্ধে দুটি কথাই সঠিক। তবে এ কথা তো মানতেই হবে যে, হুমায়ূনের আগে থেকেই বাবুরের অসুস্থতা চলছিল। তিনি এক বছর আগে থেকে তাঁর আত্মকথা ‘তুজুক-ই-বাবরী’ (বাবরনামা) লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধের জন্য আর যুদ্ধক্ষেত্রে নামছিলেন না, যেখানে ভারতের বিশাল অংশ তার হাতে অবিজিত হয়ে পড়ে ছিল।

    বাবুরের ন্যায় যোদ্ধার অসুস্থতা ব্যতীত, যুদ্ধক্ষেত্রে না নামা, বিস্ময়কর বলেই অভিহিত করা যেতে পারে।

    তাঁর, হুমায়ূনের বদলে নিজের জীবন আল্লাহর রাহে দান করার বিষয়টি সঠিকভাবে জুড়ে যায়। যে কোনো পিতাই তাঁর পুত্রকে অনিরাময়যোগ্য রোগে আক্রান্ত, পালঙ্কে পড়ে থাকতে দেখে স্থির থাকতে পারেন না, তখন তিনি এই দোয়াই করতে পারেন যে, হে আল্লাহ আমার জীবনের বিনিময়ে আমার পুত্রের জীবন ফিরিয়ে দাও…।

    এই প্রসঙ্গটি আল্লাহর কাছে বাবুরের প্রার্থনা রূপেই দেখা উচিত। অলৌকিক কোনো ঘটনা রূপে দেখাটা বোধ হয় ঠিক হবে না।

    অবশেষে ১৫৩০ ঈসায়ী সনের ২৪ ডিসেম্বর তারিখে এই নশ্বর সংসারকে আল-বিদা জানিয়ে বাবুর জান্নাতবাসী হলেন। তার পূর্বেই তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হুমায়ূনকে ভারত-সাম্রাজ্য অর্পণ করেন। বাবুর কর্তৃক ভারতে স্থাপিত সাম্রাজ্য মোগল সাম্রাজ্য নামে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। বাবুরের পর হুমায়ূন, তাঁর পর আকবর, তাঁর পর জাহাঙ্গীর, তাঁর পর শাহজাহাঁ এবং শাহজাহার পর ঔরঙ্গজেব অবধি মোগল সাম্রাজ্যের বিস্তারের ধারা অব্যাহত থাকে।

    বাবুরের পর তাঁর পঞ্চম প্রজন্ম অবধি মোগল সাম্রাজ্যের গৌরবদীপ্ত ধারা অব্যাহত থাকে।

    ঔরঙ্গজেবের পর সাম্রাজ্যের বিকেন্দ্রীকরণ শুরু হয়ে যায় এবং অবশেষে সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ‘জাফর’ পর্যন্ত এসে তা নিঃশেষ হয়ে যায়। শেষ মোগল, বাহাদুর শাহ ‘জাফর’ নামমাত্র বাদশাহ ছিলেন। মোগল সাম্রাজ্যের সেই জৌলুস ও মর্যাদা আর ছিল না। তিনি বাস্তবিক ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের কৃপাপাত্র রূপে অবসরকালীন বেতনভুক রূপে দিল্লির বাদশাহ মাত্র রয়ে গিয়েছিলেন।

    যদি, ১০ মে, ১৮৫৭ ঈসায়ী সনে সিপাহী বিদ্রোহের পতাকা উত্তর ভারতে উত্তোলিত না হতো এবং মিরাট ছাউনি থেকে বেরিয়ে আসা বিপ্লবীরা ১১ মে, ১৮৫৭ ঈসায়ীতে দিল্লি পৌঁছে বাহাদুর শাহকে নিজেদের নেতৃত্বে বরণ করে না নিতেন, তাহলে সম্ভবত মোগল বংশের এই শেষ প্রদীপটির নাম ইতিহাসের পৃষ্ঠায় বড়ই কঠিনতার সঙ্গে সন্ধান করলেই তবে পাওয়া যেত।

    ***

  • হযরত ওমর

    হযরত ওমর

    হযরত ওমর

    বিচারপতি আবদুল মওদূদ রচিত ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর জীবনী ‘হযরত ওমর’। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল পৌষ ১৩৭৪ বঙ্গাব্দ (জানুয়ারি ১৯৬৭)। গ্রন্থটির দ্বাদশ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ২০২৩ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে। প্রকাশক মেছবাহউদ্দীন আহমদ, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ৬৬ প্যারীদাস রোড, ঢাকা ১১০০। প্রচ্ছদ এঁকেছেন গোপাল মণ্ডল।

    উৎসর্গ

    বহু-ভাষাবিদ্ জ্ঞান সাগর

    ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

    শ্রদ্ধাভাজনেষু—

    ওকবাহ-বিন-আমিরের উক্তি-মতে নবী করীম (স.) বলেছিলেন–আমার পরে যদি কেউ নবী হতো, তা হলে ওমর-বিন্-খাত্তাব হতো।

    —তিরমিযি

    ভূমিকা

    ‘হযরত ওমর’ রচনা আজ শেষ হলো। এজন্যে প্রথমেই জানাই করুণাময় আল্লাহতালার উদ্দেশ্যে অশেষ শুকরিয়া।

    ওমর চরিত্রের বিশালতা উপলব্ধি করে স্বভাবতঃই আমি কুণ্ঠিত হই এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে, যদিও অনুরোধ আসে ‘কেন্দ্রীয় বাঙলা-উন্নয়ন-বোর্ডের পরিচালকের নিকট থেকে, যা আমার পক্ষে গৌরবের বিষয়। আমি আরও কুণ্ঠিত হই প্রধানত দুটি কারণে : যে পরিমাণ জ্ঞান ও অধ্যয়ন থাকা দরকার এরূপ মহৎ চরিত্র-চিত্রণে, তার কোনটাই আমার নেই; দ্বিতীয়তঃ সরকারী গুরু কর্তব্যভার যথাযোগ্য সম্পন্ন করে এরূপ বিরাট কাজে হস্তক্ষেপ করার মতো উপযুক্ত অবসর এবং মন ও মেজাজ পাওয়াও আমার পক্ষে সুদুর্লভ। তবুও এ কাজের ভার গ্রহণ করতে সাহসী হই, শ্রদ্ধেয় বন্ধুবর ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক সাহেবের আগ্রহাতিশয্যে। আমার সীমিত সামর্থের মধ্যে এ কাজে কতোটুকু সফল হতে পেরেছি, তার বিচারভার রইলো সহৃদয় পাঠক-শ্রেণীর উপর।

    আমি আগেই বলেছি, ওমর চরিত্র বিশাল ও মহৎ। এরূপ মহান চরিত্র চিত্রণকালে যে সব বিষয়ে, বিশেষতঃ খালিদ-বিন-ওলিদের পদচ্যুতি সম্পর্কিত তর্কিত বিষয়ে, যেরূপ আলোকপাত করা উচিত, আমার অক্ষম লেখনী-মুখে তা সম্ভব হয়নি, বিশাদ বা পরিচ্ছন্ন হয়নি। এ অক্ষমতাটুকুর জন্যে ওজরখাহী করে আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, কোথাও সত্য গোপন করিনি, ঐতিহাসিক তথ্যের বিপরীত কিছু আলোচনা করিনি, কিংবা আমার আজন্ম শ্রদ্ধান্বিত হিরোর’ চরিত্র-চিত্রণে অতিরঞ্জনের চেষ্টাও পাইনি। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে তথ্য-সম্বলিত সঠিক আলেখ্য তুলে ধরতে প্রয়াস পেয়েছি।

    আরও একটি বিষয়ে পাঠকশ্রেণীর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আবুবকর, ওমর, ওসমান, আলী প্রভৃতি ইসলামের পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির নামোল্লেখে আমি ইংরেজিতে ও সাধারণতঃ উর্দুতে অনুসৃত নীতি অবলম্বন করে কেবলমাত্র তাঁদের নামোল্লেখ করেছি, নামের পূর্বে ‘হযরত’ ও পরে ‘রাদিআল্লাহ্” লিখিনি। এ পন্থা অবলম্বন করেছি লেখার সুবিধার্থে ও সাহিত্যের রীতি অনুসারে। আমি ‘হযরত’ শব্দটির শুধুমাত্র নবী-করীমের উদ্দেশ্যই ব্যবহার করেছি এবং এভাবে তাঁর ও তাঁর সাহাবাদের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখিতে প্রয়াস পেয়েছি।

    রাওয়ালপিণ্ডি
    ১৫ নভেম্বর, ১৯৬৫।
    আবদুল মওদুদ

    ❀ ❀ ❀

    ওমর! ফারুক! আখেরী নবীর ওগো দক্ষিণ বাহু!

    আহ্বান নয়-রূপ ধরে এসো! -গ্রাসে অন্ধতা রাহু

    ইসলাম-রবি, জ্যোতি তার আজ দিনে দিনে বিমলিন!

    সত্যের আলো নিভিয়া-জ্বলিছে জোনাকীর আলো ক্ষীণ!

    * * *

    ইসলাম-সেত পরশ-মাণিক, তারে কে পেয়েছে খুঁজি?

    পরশে তাহারা সোনা হলো যারা, তাদেরই মোরা বুঝি।

    আজ বুঝি—কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর

    “মোর পরে যদি নবী হতো কেউ-হত সে এক উমর।”

    * * *

    হে খলিফাতুল মুসলেমীন! হে চীরধারী সম্রাট!

    অপমান তব করিবনা আজ করিয়া নান্দী পাঠ

    মানুষেরে তুমি বলেছ বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই

    তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই।

    — কাজী নজরুল ইসলাম

  • গুমরাহীর অন্ধকারায়

    গুমরাহীর অন্ধকারায়

    গুমরাহীর অন্ধকারায়

    বিশ্বনবীর নবুয়ত প্রাপ্তির পাঁচ-সাত বছর আগের কথা।

    ওকাযের বৃহৎ প্রান্তর জুড়ে মেলা বসেছে। বাৎসরিক মেলা। প্রতি বছরেই হজের পূর্বে এ মেলা বসে, আর আরব দেশের সব অংশ থেকেই লোকেরা জমায়েত হয়। মক্কার বাসিন্দারাই ভীড় জমায় বেশি। সারি সারি তাঁবু বসে যায়। সারা মেলা জুড়ে বিক্রয়-সম্ভার থরে থরে সাজানো। এসব পণ্য হেজাযেরই নয়, শাম ও য়েমন দেশেরও পণ্য এসেছে অজস্র ভারে। মেয়ে-পুরুষ দল বেঁধে পণ্য দেখছে, কিনছে। মেয়েদের ভীড়ই এসব জায়গায় বেশি।

    মেলার এক বিশেষ প্রান্তে জমেছে কুস্তিগীরদের আখড়া। সেখানে আরবী সব কবিলার সেরা কুস্তিগীরের বিচিত্র সমাবেশ। আর রয়েছে প্রত্যেক কবিলার নামজাদা কবি, যিনি নিজ কবিলার মহিমা ও কুস্তিগীরের বাহাদুরীর বয়ান শুনিয়ে যাচ্ছেন সোচ্চার কণ্ঠে।

    একদিন এই আখড়ায় এক কবিলার কবিবর উচ্চ কণ্ঠে গেয়ে চলেছেন নিজ কবিলার মহিমা, প্রিয় কুস্তিগীরের শক্তির বড়াই। শ্রোতারা ঘন ঘন বাহবা দিয়ে পরিবেশটি মুখরিত করে তুলছে। কিন্তু কেউ জওয়াব দিতে সাহস পাচ্ছে না।

    এক কোণে বসেছিল এক তরুণ যুবা। বয়স্যদের নিয়ে কবির কীর্তন উপভোগ করছিল রহস্যভরে। আর মাঝে মাঝে উচ্চহাসি তুলে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। সহসা উঠে দাঁড়ালো যুবক। তার দীর্ঘ শরীর, শালপ্রাংশু বাহু ও কঠোর মুখভঙ্গি সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যুবক সামনে অগ্রসর হয়ে কবির কীর্তিত কুস্তিগীরকে আহ্বান করলো শক্তির পরীক্ষায়। নির্ভয়ে, দাম্ভিক কণ্ঠে।

    এক নিমেষে চিনলো সবাই যুবাকে। এ যে খাত্তাব-নন্দন ওমর। সকলেরই অতিচেনা।

    বিদ্যুৎগতিতে খবর ছড়িয়ে গেল সারা মেলায়। যে যেখানে ছিল, ছুটে এসে ভীড় জমালো আখড়ার চারিদিকে। ছেলে, মেয়ে, যুবা, বুড়া সকলেই রুদ্ধ নিশ্বাসে লক্ষ্য করতে লাগলো, মল্লযুদ্ধের ফলাফল।

    ওমর সুযোগ দিলেন প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রথমে আক্রমণ করতে। সে বুক ফুলিয়ে আস্ফালন করে ঝাঁপিয়ে পড়লো ওমরের উপর। বেদুইন নওজওয়ানের আক্রমণ নীরবে প্রতিহত করে ওমর কৌশলে তার কাঁধের উপর সওয়ার হলেন এবং এক নিমেষে ভূপাতিত করে তার বুকের উপর বসে গেলেন কঠিন অনড় পাহাড়ের মতো। বেদুইন নওজওয়ান নিশ্বাস নিতে অক্ষম হয়ে ওমরের নিকট প্রাণ ভিক্ষা করলো। তিনি হাসিমুখে তাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। জয়ধ্বনির উচ্চস্বরে চারিদিক ভরে গেল।

    তার তিন দিন পরের ঘটনা।

    ওকাযের মেলা শেষ হয়ে আসছে। কিন্তু শেষ পর্বের আর একটি প্রধান ঘটনা ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতা। প্রত্যেক কবিলার সেরা ঘোড়সওয়াররা আপন আপন দ্রুতগামী তাজীর পিঠে প্রতিযোগিতার মাঠে প্রস্তুত। খাত্তাবনন্দন ওমরও প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। তাঁর কালোবরণ সুন্দর তাজীই সবচেয়ে প্রধান আকর্ষণ। সঙ্কেত মাত্রেই প্রতিযোগীরা বায়ুবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। অসংখ্য ঘোড়ার মধ্যেও ওমরের তাজী ছুটে চলেছে সকলের শিরোভাগে। ওমরকে অশ্বপৃষ্ঠে বিন্দুবৎ দেখা যাচ্ছে। সকলে জয়ধ্বনি তুলে উঠলো ওমরের নামে। তিনি সব প্রতিযোগীকে বহু বহু দূরে ফেলে জয়ী হয়েছেন। আবার খাত্তাব-নন্দন জয়ের শিরোপা লাভ করে ধন্য হলেন।

    এই ছিল খাত্তাব-নন্দন ওমরের প্রাক্-ইসলাম যুগের পরিচয়।

    ওমরের জন্ম-সন নিয়ে বহু মতভেদ আছে। তবে একটি প্রামাণ্য হাদিস মোতাবেক ওমরের জন্ম হয় ক্রান্তিকালীন ঘটনা রসূলে-আকরমের হিজরতের চল্লিশ বছর পূর্বে। হিজরত অনুষ্ঠিত হয় ৬২২ খ্রিস্টাব্দে এবং এ হিসেবে ওমরের জন্ম-সন হয় ৫৮১-৫৮২ খ্রিস্টাব্দে। আর এ হিসেবে ওমর রসূলে আকরমের চেয়ে বারো বছরের ছোট। আমর-বিন-আসের একটি উক্তি-মতে একদিন তিনি কয়েকজন বন্ধুসহ খাত্তাবের গৃহে আনন্দ-উৎসবে মত্ত ছিলেন, এমন সময় আনন্দধ্বনি উঠে। খবর হয় যে, খাত্তাবের একটি পুত্র-সন্তান জন্ম লাভ করেছে। এ থেকে অনুমিত হয়, ওমরের জন্মকালে মহোৎসব হয়েছিল।

    ওমরের পিতামহের নাম নুফায়েল-ইবনে-আবদুল-উজ্জা। আদি হলো তাঁর আদিপুরুষ এবং আদির অন্য ভাই মরাহ্ ছিলেন রসূলে আকরমের পূর্বপুরুষ। এ-হিসেবে অষ্টম পুরুষে রসূলে-আকরম ও ওমরের পূর্বপুরুষ এক হয়ে যান।

    নুফায়েল ছিলেন কুলপঞ্জী-বিশারদ। তাঁর কুলজী-প্রজ্ঞা ও তীক্ষ্ণ বিচারশক্তি ছিল সর্বজনবিদিত। এজন্যে কোরায়েশ-কুলের শ্রেষ্ঠ বিচারকের মর্যাদায় নুফায়েল ছিলেন অভিষিক্ত। একবার রসূলে আকরমের পিতামহ আবদুল মোত্তালিব ও হারাব-ইবনে-ওমাইয়ার মধ্যে গোত্রের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ উপস্থিত হলে নুফায়েল আবদুল মোত্তালিবের পক্ষে রায় দিয়ে হারাবকে উপদেশ দিয়েছিলেন: কেন তুমি এমন লোকের সঙ্গে কলহ করছো, যে তোমার চেয়ে দীর্ঘদেহী, ব্যক্তিত্বশালী, তোমার চেয়েও মার্জিতরুচি ও জ্ঞানী এবং যার বংশধর তোমার চেয়েও সংখ্যায় অধিক ও যার মহানুভবতা তোমার সর্বজনবিদিত? এসব বলে আমি অবশ্য তোমার উচ্চ গুণাবলীর অবজ্ঞা করছি না, কারণ আমিও তোমার গুণগ্রাহী। তুমি মেষের ন্যায় নিরীহ, সারা আরবে তুমি উচ্চ কণ্ঠের জন্য সুবিদিত এবং নিজ গোত্রের একটি শক্তিস্তম্ভ।

    ওমরের মাতার নাম খাতামাহ্ ও মাতামহের নাম হিশাম। হিশামের পিতা মুগিরাহ্ ছিলেন বিরাট ব্যক্তিত্বশালী পুরুষ এবং যখনই কোরায়েশকুল অন্য গোত্রের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হতো, তখনই সেনানায়কের পদ (সাহিব-উল-আইননাহ্) ছিল মুগিরা জন্যে অবিসংবাদিত অবধারিত।

    কিশোরকালে ওমর উটের রাখালী করেছেন। চারণবৃত্তি আরবে হেয় ছিল না, জাতীয় বৃত্তি হিসেবে মর্যাদাসিক্ত ছিল। স্বয়ং রসূলে-আকরমও কিশোর বয়সে মেষচারণ করেছিলেন। জীবনের কঠোর ও মহান শিক্ষা লাভ হতো চারণভূমিতে। উষর মরুপ্রান্তরে অবাধ্য উটশ্রেণীর দীর্ঘদিন রাখালী করে ওমরের স্বভাবও হয়ে গিয়েছিল অনেকখানি রুক্ষ ও কঠোর। তার উপর খাত্তাব ছিলেন বেশ উগ্র ও নির্দয় প্রকৃতির। দাজনানের বিশাল প্রান্তরে খররৌদ্রে দীর্ঘদিন উট চারণকালে কিশোর ওমর ক্লান্ত হয়ে যদি একটু বিশ্রাম সুখ ভোগ করতেন, তখন খাত্তাব তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে প্রহার করতেন। দাজনান প্রান্তরে তিক্ত স্মৃতি ওমরের মনে বরাবর জাগরুক ছিল। পরবর্তী জীবনে খলিফা পদাভিষিক্ত হয়ে ওমর একবার দাজনান অতিক্রম করছিলেন। তখন পূর্বস্মৃতিতে সহসা উদ্বেলিত হয়ে তিনি বলেছিলেন: ‘আল্লাহর অশেষ করুণা। এমন একদিন ছিল, যখন একটা সামান্য পশমী জামা গায়ে আমি এই মাঠে উটের রাখালী করতাম, আর যখনই শ্রান্ত হয়ে বিশ্রাম নিতাম, তখনই পিতা নির্দয়ভাবে প্রহার করতেন। এখন এমন দিন এসেছে, যখন আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কেউ আমার উপরওয়ালা নেই।’

    বাল্যে ওমর নিজের চেষ্টায় ও ঐকান্তিক আগ্রহে কিছু লেখাপড়াও শিখেছিলেন। বলা বাহুল্য, সে আমলে আরবে বিদ্যাশিক্ষার চর্চা ছিল খুবই সীমাবদ্ধ এবং উচ্চ বংশজদের মধ্যেও বিদ্যাশিক্ষার চেয়ে শরীরচর্চা ও কুস্তিগিরী ছিল বেশি সম্মানার্হ। বালাজুরীর উক্তি-মতে নবী-করীমের সমকালীন মাত্র সতেরোজন সাক্ষর ছিলেন এবং ওমর তাঁদের অন্যতম। ওমরের অত্যন্ত ঝোঁক ছিল কবিতার দিকে এবং প্রায় সকল প্রতিষ্ঠাবান কবির বাছাই বাছাই কবিতা তাঁর কন্ঠস্থ ছিল। কবিতা মুখস্থ করায় তাঁর এমনই কৃতিত্ব ছিল যে, কোনও কবিতা একবার মাত্র পাঠেই বা শ্রবণেই সেটি কণ্ঠস্থ হয়ে যেত নির্ভুলভাবে। ওমরের হস্তলিপি ছিল সুন্দর এবং তার ভাষাজ্ঞানও ছিল উচ্চস্তরের। তাঁর বাক্‌শক্তি ছিলো প্রশংসনীয় ও চিত্তহারী এবং তার দরুন বহুবার তাঁকে মধ্য-যৌবনেই কোরায়েশকুলের পক্ষে দৌত্যকার্য করতে হয়েছে।

    ওমর প্রথম যৌবনকালেই জীবিকার্থে ব্যবসায় শুরু করেন। সেকালে ব্যবসায় ছিল একটি লাভজনক ও সম্মানার্হ জীবিকা। স্বয়ং রসূলে আকরম কিছুকাল তেজারতীতে লিপ্ত ছিলেন। তেজারতীর কারণে ওমর সিরিয়া ও ইরাক-আযমে সফর করেছেন। সে সময় ওমর বহু গুণীজ্ঞানীর সাহচর্য লাভ করেছেন এবং বহু আরবী ও ইরানী শাসকের দরবারেও হাজির হয়েছেন। তার ফলে মানব-চরিত্রে ওমরের বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে প্রচুরভাবে। পরবর্তী কর্মমুখর জীবনে এসব অভিজ্ঞতা ও ভূয়োদর্শিতার ফলশ্রুতি ছিল প্রচুরভাবেই। যথাস্থানে তার পরিচয় উন্মোচিত হবে।

    একথা অনস্বীকার্য যে, ওমরের প্রাক্-ইসলাম যুগের জীবন ততো বিস্তৃত, ততো দীপ্তিময় ছিল না। এজন্যে তাঁর জীবনের প্রথমার্ধের বহুলাংশই অজ্ঞাত রয়ে গেছে। সমসাময়িক অন্যান্য কৃতী ও মহিমাসিক্ত ব্যক্তির উক্তির বা স্মৃতিচারণের বিন্দু বিন্দু আলোকপাতেই এই অনালোকিত অধ্যায়ের কিছু কিছু অংশ ভাস্বর হয়ে উঠেছে।

  • ঐতিহাসিক সমগ্র

    ঐতিহাসিক সমগ্র

    ঐতিহাসিক সমগ্র

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    সংকলন – শোভন রায়

    প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ২০১৪

    প্রচ্ছদ – মানস চক্রবর্তী

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    বাংলাভাষায় ছোটদের সাহিত্যে যে কয়েকজন হাতে-গোনা লেখক সবস্বাদের লেখায় সববয়েসি ছোটদের মন জয় করেছেন হেমেন্দ্রকুমার তাঁদের শীর্ষে বললেও অত্যুক্তি হয় না।

    সে গোয়েন্দা-অ্যাডভেঞ্চার গল্প-কাহিনি…বিমল-কুমার-সুন্দরবাবুকে নিয়ে হোক, কি অনুবাদ সাহিত্য হোক, কী ইতিহাসের পাতা থেকে মণিমুক্তো তুলে আনাই হোক, হেমেন্দ্রকুমার রায় সব কলমেই সব্যসাচী।

    হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন পত্রপত্রিকার পৃষ্ঠা থেকে, দীর্ঘদিন অমুদ্রিত বই থেকে খুঁটে-খুঁটে নিরলসভাবে এই গবেষণামূলক কাজটি সম্পন্ন করেছেন আদ্যন্ত হেমেন্দ্রকুমার-ভক্ত শোভন রায়।

    এই বৃহৎ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৮টি উপন্যাস, ১৪টি বড় ও ছোট গল্প, ১৮টি অসামান্য রচনা।

    শোভন রায়কে আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

    ১৫ নভেম্বর ২০১৩
    ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়
  • ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতে

    ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতে

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    আঁধার আঁধার! অসীম আঁধার!

    আঁখি হয়ে যায় অন্ধ!

    জাগো শিশু-রবি, আনো আলো-সোনা

    আনো প্রভাতের ছন্দ!

    হ্যাঁ, ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতের কথা বলব। প্রাগৈতিহাসিক কালে আর্যাবর্তে বিচরণ করতেন রঘু, কুরু, পাণ্ডব, যদু ও ইক্ষ্বাকু প্রভৃতি বংশের মহা মহা বীররা। তাঁদের কেউ কেউ অবতার রূপে আজও পূজিত হন। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকদের জগতে ভারতে প্রথম প্রভাত এনেছিলেন উত্তর-পশ্চিম ভারতবিজয়ী আলেকজান্ডার এবং গ্রিকবিজয়ী সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত।

    রাম-রাবণ ও কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধকাহিনির মধ্যে অল্পবিস্তর ঐতিহাসিক সত্য থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু সে সম্বন্ধে তর্ক না তুলে আপাতত এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, পুরাণ-বিখ্যাত সেই সব যুদ্ধের পরেও ভারতে এসেছিল দীর্ঘকালব্যাপী এক তমিস্রযুগ। তারই মধ্যে কেবল সত্যের সন্ধান দেয় নিষ্কম্প দীপশিখার মতো বুদ্ধদেবের বিস্ময়কর অপূর্ব মূর্তি। আজ ইতিহাস বলতে আমরা যা বুঝি, তখনও তার অস্তিত্ব ছিল না বটে, কিন্তু কি এদেশি, কি বিদেশি কোনও ঐতিহাসিকেরই এমন সাহস হয়নি যে বুদ্ধদেবকে অস্বীকার করে উড়িয়ে দেন। সেই খ্রিস্টপূর্ব যুগে মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের আবির্ভাব না হওয়া পর্যন্ত ভারতের ইতিহাস বলতে বুঝি, বুদ্ধদেবের জীবনচরিত।

    বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ এবং শিলালিপি প্রভৃতির দৌলতে বুদ্ধদেবের আবির্ভাবের পরবর্তী যুগের ভারতের কতকগুলি প্রামাণিক ছবি আমরা পেয়েছি। যদিও সে যুগের বৌদ্ধ চিত্রশালা সম্পূর্ণ নয়, তবু আলো-আঁধারের ভিতর থেকে ভারতের যে মূর্তিখানি আমরা দেখতে পাই, বিচিত্র তা—মোহনীয়!

    তারপরই সেই ছায়ামায়াময় প্রাচীন আর্যাবর্তে সমুজ্জ্বল মশাল হাতে নিয়ে প্রবেশ করলেন দিগবিজয়ী আলেকজান্ডার। যে শ্রেণির কাহিনিকে আজ আমরা ইতিহাস বলে গ্রাহ্য করি, তার জন্ম হয়েছিল সর্বপ্রথমে সেকালকার গ্রিক দেশেই। কাজেই আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান স্থানলাভ করল গ্রিক ইতিহাসেও এবং আলেকজান্ডারের পরেও প্রাচীন ভারতের সঙ্গে গ্রিসের আদান-প্রদানের সম্পর্ক বিলুপ্ত হয়নি। তাই সে যুগের ভারতবর্ষের অনেক কথাই আমরা জানতে পেরেছি গ্রিক লেখকদের প্রসাদে। সেলিউকস প্রেরিত গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস লিপিবদ্ধ করে না রাখলে আমরা মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের যুগে মগধ সাম্রাজ্য তথা ভারতবর্ষের রাজপ্রাসাদ, রাজসভা, রাজধানী, সমাজনীতি, শাসননীতি, আচার-ব্যবহার প্রভৃতির অনেক কথাই জানতে পারতুম না। এজন্যে গ্রিসের কাছে ভারতবর্ষ হয়ে থাকবে চিরকৃতজ্ঞ।

    প্রাকৃতিক জগতে যেমন কখনও মেঘ কখনও রোদের খেলা, কখনও আলো কখনও ছায়ার মেলা, প্রত্যেক দেশের সভ্যতার ইতিহাসেও তেমনই পরিবর্তনের লীলা দেখা যায়। মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত মগধের বা ভারতের সিংহাসনে আরোহণ করেন খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ কি আরও দুই-এক বছর আগে। তার কিছু কম দেড় শতাব্দী পরে মৌর্য সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়। তারপর ভারতবর্ষের ইতিহাসে দেখি সুঙ্গ, কান্ব ও অন্ধ্র প্রভৃতি বংশের কমবেশি প্রভুত্ব। ইতিমধ্যে গ্রিকরাও বারকয়েক ভারতের মাটিতে আসন পাতবার চেষ্টা করেছিল বটে, কিন্তু বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারেনি।

    কেবল গ্রিকরা নয়, মধ্য এশিয়ার ভবঘুরে মোগলজাতি তখন থেকেই ভারতবর্ষে হানা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। মোগল বলতে তখন মুসলমান বোঝাত না (নিজ মঙ্গোলিয়ায় আজও বৌদ্ধধর্মাবলম্বী মোগলরা আছে) এবং মোগল বলতে আসলে কী বোঝায় সে সম্বন্ধেও সকলের খুব পরিষ্কার ধারণা নেই। যুগে যুগে নানা জাতি মোগলদের নানা নামে ডেকেছে। এদের বাহন ছিল ঘোড়া, খাদ্য ছিল মাংস, পানীয় ছিল দুগ্ধ। গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোদোতাস এদের ডেকেছেন ‘সিথিয়ান’ বলে, পরবর্তী যুগের রোমানরা এদের ‘হুন’ নামে ডাকতেন, প্রাচীন ভারতে এদের নাম ছিল ‘শক’, এবং চিনারা এদের নাম দিয়েছিল Hiungnu। আসলে মোগল, শক, হুন, তাতার ও তুর্কিরা একরকম এক জাতেরই লোক, কারণ তাদের সকলেরই উৎপত্তি মধ্য এশিয়ায় বা মঙ্গোলিয়ায়। এই আশ্চর্য জাতি ধরতে গেলে এক সময়ে প্রাচীন পৃথিবীর অধিকাংশ সভ্য দেশকেই দখল করেছিল এবং ভারতবর্ষ তাদের অধিকারে এসেছিল দুইবার। প্রথমবারে তাদের বংশ কুষাণ বংশ বলে পরিচিত হয়। বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বিখ্যাত সম্রাট কনিষ্ক এই বংশেরই ছেলে। দ্বিতীয়বারে তারা মোগল রাজত্বের প্রতিষ্ঠা করে।

    মোগল বা শকরা ভারতে এসে ভারতীয় সভ্যতার প্রভাবে নিজেদের সমস্ত বিশেষত্ব—এমনকী ধর্ম পর্যন্ত হারিয়ে একেবারে এদেশের মানুষ হয়ে পড়েছিল। কনিষ্ক ছিলেন বৌদ্ধ, তবু তাঁর নামে বিদেশি গন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু কুষাণ বংশের শেষ সম্রাট বাসুদেবের নামই কেবল ভারতীয় নয়, ধর্মেও তিনি ছিলেন শৈব মতাবলম্বী হিন্দু। কারণ তাঁর নামাঙ্কিত প্রায় প্রত্যেক মুদ্রায় দেখা যায় শিব এবং শিবের ষাঁড়ের প্রতিমূর্তি।

    আনুমানিক ২২০ খ্রিস্টাব্দে বাসুদেবের মৃত্যু হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে হয় কুষাণ সাম্রাজ্যের পতন। যদিও তারপরেও কিছুকাল পর্যন্ত ভারতের এখানে-ওখানে কুষাণদের খণ্ড খণ্ড রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু কুষাণদের কেউ আর সম্রাট নামে পরিচিত হতে পারেননি।

    মোগল বা শকদের রাজত্বের সময়েই ভারতবর্ষের ইতিহাসের উপরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে গোধূলির ম্লান আলো। প্রাচীনতর হলেও মৌর্য যুগের ভারতবর্ষ যেন স্পষ্ট রূপে ও রেখায় আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। শক ভারতবর্ষে তেমনভাবে নজর চলে না—সেটা ছিল যেন আলো-মাখানো ছায়ার যুগ, তার খানিকটা স্পষ্ট আর খানিকটা অস্পষ্ট।

    কিন্তু কুষাণ সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতে এল সত্যিকার তমিস্রযুগ। যেন এক অমাবস্যার মহানিশা এসে সমগ্র আর্যাবর্তকে তার বিপুল আঁধার আঁচলে ঢেকে দিলে। অবশ্য, এ সময়কার হিন্দুস্থানে কোনও সাম্রাজ্য ও সম্রাট না থাকলেও ছোট ছোট রাজ্যের খুদে খুদে রাজার যে অভাব ছিল না, এ বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। নানা পুরাণে এ সময়কার যেসব বর্ণনা পাওয়া যায়, তাও ভাসা ভাসা, রহস্যময়। ওই খুদে রাজাদের কারুর ভিতরে এমন শক্তি ও প্রতিভা ছিল না যে সমগ্র ভারতের উপরে বিপুল একচ্ছত্র তুলে ধরেন। এক-এক দেশের সিংহাসন পেয়ে এবং বড়জোর প্রতিবেশি ছোট ছোট রাজাদের সঙ্গে যুদ্ধ বা ঝগড়া করেই তাঁরা তুষ্ট ছিলেন। এই গভীর অন্ধকার জগতে মাঝে মাঝে যেন, বিদ্যুৎ-চমকের মধ্যে দেখা যায় আভিরাস, যবন, শক, বল্হীক ও গর্দব্বিলাস প্রভৃতি অদ্ভুত বা বিদেশি বংশকে!

    বৃহৎ ভারতের আত্মা যখন ঘুমিয়ে পড়েছিল। অনুমানে বোঝা যায়, তখন ক্রমেই বৌদ্ধধর্মের অধঃপতন হচ্ছিল এবং হিন্দুধর্মের হচ্ছিল ক্রমোন্নতি। কিন্তু তখনকার দেশাচার, কলা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির কথা, রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক ইতিহাস জানবার কোনও উপায়ই এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। চন্দ্রগুপ্তের রাজধানী পাটলিপুত্র মৌর্য বংশ লোপ পাওয়ার পরেও এবং সেই অন্ধকার যুগেও যে একটি প্রসিদ্ধ নগর বলে গণ্য হত, এ কথা জানা যায়। কিন্তু পাটলিপুত্রের রাজার নাম পাওয়া যায় না। পাঞ্জাবে ও কাবুলে ছিলেন শকবংশীয় কোনও কোনও রাজা। এ কথাও জানা গিয়েছে যে, কাবুলের ভারতীয় শক রাজারা ছিলেন বিলক্ষণ ক্ষমতাবান (৩৬০ খ্রিস্টাব্দেও কাবুলের শক রাজার দ্বারা প্রেরিত ভারতীয় যুদ্ধহস্তী ও সৈন্যের সাহায্যে পারস্যের অধিপতি দ্বিতীয় সাপর প্রাচ্য রোম-সৈন্যদের পরাজিত করেন)।

    প্রায় এক শতাব্দী এই অন্ধকার রহস্যের মধ্য দিয়ে অতীত হয়ে যায়। এই হারানো ভারতকে আর অতীতের গর্ভ থেকে উদ্ধার করা যাবে না, বহুযুগের ওপার থেকে ভেসে আসে কেবল অন্ধকারের আর্তনাদ!

    ইউরোপের অবস্থাও তখন ভালো নয়। গ্রিস তখন গৌরবহীন এবং পশ্চিম রোম সাম্রাজ্য হয়েছে বর্বর, অন্ধকার যুগের মধ্যে প্রবেশ করতে উদ্যত। চতুর্থ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কনস্তানতাইন দি গ্রেটের মৃত্যুর পর ইউরোপীয় রোম-সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল নামে মাত্র।

    কিন্তু ইউরোপীয় সভ্যতা যখন মৃত্যুন্মুখ,  মহাভারতে জাগল তখন নবজীবনের কলধ্বনি।

    প্রায় শতাব্দীকাল পরে ঐতিহাসিক ভারতে এল আবার দ্বিতীয় প্রভাত! আমরা আজ সেই নবপ্রভাতের জয়গান গাইবার জন্যেই আয়োজন করছি।

    দীর্ঘরাত্রি শেষে প্রাতঃসন্ধ্যা এসে অন্ধকারের যবনিকা যখন সরিয়ে দিলে, তখন দেখলুম পাটলিপুত্রের সিংহাসনে বিরাজ করছেন যে রাজা, ইতিহাসে তিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত নামে বিখ্যাত (আনুমানিক ৩১৮ খ্রিস্টাব্দে) তাঁর বাপের নাম ঘটোৎকচ এবং ঠাকুরদাদা ছিলেন শুধু গুপ্ত নামেই পরিচিত।

    গুপ্তবংশের উৎপত্তি নিয়ে গোলমাল আছে। কেউ বলেন, তাঁরা ছিলেন নীচ জাতের লোক। কেউ বলেন, তাঁরা ছিলেন অহিন্দু।

    লিচ্ছবি জাতি বুদ্ধদেবের সময়েই বিখ্যাত হয়েছিল। বৌদ্ধগ্রন্থে প্রসিদ্ধ বৈশালী নগরে ছিল লিচ্ছবিদের রাজ্য। লিচ্ছবিরা আর্য না হলেও সম্ভ্রান্ত ছিল অত্যন্ত এবং তাদের শক্তিও ছিল যথেষ্ট।

    এই বংশের রাজকন্যা কুমারদেবীকে বিয়ে করে প্রথম চন্দ্রগুপ্তের মানমর্যাদা এত বেড়ে গেল যে, তুচ্ছ ‘রাজা’ উপাধি আর তাঁর ভালো লাগল না। তিনি গ্রহণ করলেন ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি এবং স্বাধীন নরপতির মতো নিজের ও রানি কুমারদেবীর নামাঙ্কিত মুদ্রারও প্রচলন করলেন।

    সঙ্গে সঙ্গে চলল রাজ্য বাড়াবার চেষ্টা। এ চেষ্টাও বিফল হল না। দেখতে দেখতে মাত্র কয়েক বৎসরের মধ্যেই তিরহুত ও অযোধ্যা প্রভৃতি দেশ হস্তগত করে প্রথম চন্দ্রগুপ্ত প্রমাণ করলেন যে সত্যসত্যই তিনি মহারাজাধিরাজ উপাধি লাভের যোগ্য। ওদিকে তাঁর রাজ্যসীমা গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমস্থল (আজ যেখানে এলাহাবাদের অবস্থান) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রাজ্যাভিষেকের পরে নিজের নামে তিনি এক নতুন অব্দও চালালেন—তা গুপ্তাব্দ বলে পরিচিত।

    প্রথম চন্দ্রগুপ্ত বেশিদিন রাজ্যসুখ ভোগ করতে পারেননি। কিন্তু ছোট্ট একটি খণ্ড রাজ্যের মালিক হয়েও তিনি যখন মাত্র দশ-পনেরো বছরের ভিতরেই নিজের রাজ্যকে প্রায় সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন, তখন তাঁর যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, অসাধারণ বীরত্ব ও যথেষ্ট যুদ্ধকৌশলের অভাব ছিল না, এ সত্য বোঝা যায় সহজেই। ম্যাসিদনের অধিপতি ফিলিপ তাঁর সমধিক বিখ্যাত পুত্র আলেকজান্ডারের জন্যে এমন দৃঢ় ভিত্তির উপরে সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছিলেন যে বিশেষজ্ঞদের মতে ফিলিপের মতো রাজনীতিজ্ঞ ও যুদ্ধকৌশলী পিতা না পেলে আলেকজান্ডার বিশ্বজয়ী হতে পারতেন কিনা সন্দেহ! গুপ্তবংশীয় চন্দ্রগুপ্তও আর এক অতি বিখ্যাত পুত্রের পিতা। অতি অল্পদিনে খণ্ড-বিখণ্ড ভারতবর্ষে তিনি এমন এক অখণ্ড ও বিপুল রাজ্য স্থাপন করে গেলেন যে অদূর ভবিষ্যতেই আকারে ও বলবিক্রমে তা প্রায় সুপ্রসিদ্ধ মৌর্য সাম্রাজ্যের সমান হয়ে উঠেছিল এবং তার স্থায়িত্ব হয়েছিল কিছু কম দুইশত বৎসর! ব্যাপকভাবে ধরলে বলতে হয়, ভারতবর্ষের উপরে গুপ্তযুগের অস্তিত্ব ছিল তিনশত পঞ্চাশ বৎসর!

    বলেছি, গুপ্তবংশীয় প্রথম চন্দ্রগুপ্তের আবির্ভাব নিশান্তকালে প্রাতঃসন্ধ্যায়। কিন্তু ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতের গৌরবময় অপূর্ব সূর্যোদয় তখনও হয়নি। প্রথম চন্দ্রগুপ্ত তরুণ সূর্যের জন্যে অরুণ আসর সাজিয়ে রাখলেন। তারপরই হল গৌরবময় সূর্যোদয়। আর্যাবর্ত তারপরে আর কখনও দেখেনি তেমন আশ্চর্য সূর্যকে। তারই বিচিত্র কিরণে সৃষ্ট হয়েছিল ভারতের যেসব নিজস্বতা বা বিশেষত্ব, আজও বিশ্বসভায় তাই নিয়ে আমরা গর্ব করে থাকি। ভারতের অমর কালিদাস গুপ্তযুগেরই মানুষ। কেবল কি কালিদাসের কাব্য? ‘মৃচ্ছকটিক’, ‘মুদ্রারাক্ষস’ প্রভৃতি অতুলনীয় সাহিত্যরত্নের সৃষ্টি গুপ্তযুগেই। প্রাচীনতম পুরাণ ‘বায়ুপুরাণ’ এবং ‘মনুসংহিতা’ও তাই। গণিতজ্ঞ ও জ্যোতিষজ্ঞ হিসাবে গুপ্তযুগের বরাহমিহির ও আর্যভট্টের নাম বিশ্ববিখ্যাত। স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় গুপ্তযুগের প্রতিভাকে প্রমাণিত করবার জন্য আজও বিদ্যমান আছে অজন্তা, ইলোরা, সাঁচী, সারনাথ, ভরহুত, অমরাবতী ও শিগিরি প্রভৃতি। দিল্লির বিস্ময়কর লৌহস্তম্ভের জন্ম গুপ্তযুগেই। সংগীতকলাও হয়ে উঠেছিল সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ। কত আর নাম করব?

    এতক্ষণ গেল ইতিহাসের কথা। পরের পরিচ্ছেদেই আমাদের গল্প শুরু হবে এবং দেখা দেবেন আমাদের কাহিনির নায়ক।

  • ওঙ্কার

    ওঙ্কার

    ওঙ্কার

    আহমদ ছফা

    কয়েকটি অভিমত

    এ গ্রন্থটি পাঠ করলে যে কোনো সহৃদয় পাঠকই মোহিত হবেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রচণ্ড আবেগ এবং অনুভূতি নিয়ে এর চাইতে উৎকৃষ্ট কিছু কোথাও লিখিত হয়েছে এমন আমার জানা নেই।

    — আবুল ফজল

    শেষে জানাই তাঁর (আহমদ ছফার) লেখা পড়ে আমি আনন্দ পেয়েছি এবং সকল পাঠক আমারই মত তাঁর গ্রন্থ পাঠে সে আনন্দের শরীক হতে পারবেন বলে আমার ধারণা।

    — দৈনিক পূর্বদেশ

    হিন্দু পুরাণ মতে ‘ওঙ্কার’ হচ্ছে আদি ধ্বনি, সকল ধ্বনির মূল। লেখক বলতে চেয়েছেন, বাহ্য কান দিয়ে আমরা ধরতে পারি না পারি, সকল চেতনে, সকল হৃদয়ে সেই আদ্য ধ্বনি বিরাজিত। এই ধ্বনি, এই হৃদয় এই চেতনা যে বোবা মেয়েতে ছিল, সে তার প্রাণ দিয়ে তা প্রমাণ করেছে। একটি সমুচ্চ বক্তব্যকে তীক্ষ্ণ ও তীব্রভাবে প্রকাশের চেষ্টা করেছেন লেখক। তার এই প্রচেষ্টা কিছুটা অভিনব। আহমদ ছফার ছোট গল্প পড়তে গিয়ে দেখেছি তিনি দুঃসাহসী পুরুষ।

    — দৈনিক ইত্তেফাক

    আহমদ ছফার বর্ণনা কৌশল চরিত্র চিত্রণ রীতি এবং অনুভুতি স্নিগ্ধ ও হৃদয়গ্রাহ্য ভাষাই মনকে গ্রাস করে। এই রচনার অন্তর্গত সংবেদনশীলতাই বক্তব্যের গভীরে টেনে নেয়। … মনে হয়, একটি মহাকাব্যের বিষয়কে যেন সনেটে বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এই গ্রন্থে।

    — দৈনিক বাংলা

    সত্যি বলতে কি আজকাল গল্পের বাজার বড় মন্দা। প্রথম পাঠে আন্দোলিত বা বিহ্বল হবার মত গ্রুপ অধুনা তেমন চোখে পড়ে না। আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’ সেদিক থেকে এক বিরল ব্যতিক্রম।

    — সাপ্তাহিক বিচিত্রা

    একজন প্রাবন্ধিক হিসেবেই আহমদ ছফাঁকে জানতাম। কিন্তু সম্প্রতি ‘বিচিত্রায় প্রকাশিত তাঁর গল্প ‘ওঙ্কার’ পড়ে তার মধ্যে একজন নিপুণ গল্পকারকে দেখতে পেয়েছি। সত্যিই ভাষায় সাবলীল সৌন্দর্যে বিদগ্ধ বর্ণনায়, তাঁর গল্পটি হয়ে উঠেছে সজীব প্রাণময়। গল্পের বিষয়বস্তুটিও নতুনতর।

    — বিচিত্রায় জনৈক পাঠকের পত্রাংশ

    সমগ্র উপন্যাসটি বড় গল্প না গদ্য কবিতা? আমাকে একটি বিদেশী উপন্যাসের কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, যদিও তার সঙ্গে বিষয়বস্তুর দিক থেকে কোনই মিল নেই। শ্রী বিষ্ণুদে অনূদিত ভের করস (ফরাসী) সমুদ্রের মৌন’ উপন্যাসটি আপনি পড়েছেন? ফ্রান্সে নাজি অবরোধের সময় লেখা।…

    ক্ষয়িষ্ণু সমাজের প্রতিনিধি বোবা বাংলা মার মুখে ভাষা ফোঁটাতে পারবে না, যে কাজ একমাত্র শক্তিমান সচেতন মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই সম্ভব। এই কথা কটি যে কতখানি সত্য তা আমরা এখানে (পশ্চিম বাংলায়) সবচেয়ে ভাল এখন বুঝতে পারছি।

    — সিদ্ধার্থ ঘোষ

    সাহিত্য ধারা। ৪/২, মহেন্দ্র রোড, কোলকাতা, ২৫ (জনৈক কোলকাতার পাঠকের পত্রাংশ)।

  • ইসলামের আলোকধারায়

    ইসলামের আলোকধারায়

    ইসলামের আলোকধারায়

    ওমরের জীবনের প্রায় সাতাশ-আটাশ বছর কেটে গেছে। মধ্যযৌবন-কাল।

    ঠিক এই সময়ে প্রায় ৬১০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বজগৎ এক নতুন জীবনের আস্বাদ লাভ করে। এক নয়া জ্যোতির বিকিরণ হয় আরবের হিরার গুহায়। কালক্রমে জগজ্জ্যোতিরূপে সে আলো ছড়িয়ে পড়ে সবখানে, সবদেশে। ইসলাম তার পরিচয়।

    কিন্তু এ আলোকশিখা, এ সিরাজুম্-মুনীরার বিকিরণ দাবানল গতিতে হয় নি। একটু একটু করে ধীর-মন্থর গতিতে তার দীপ্তি বিকশিত হয়েছিল।

    আর এই আলোকবর্তিকা নির্ভয়ে এবং নীরব হয়ে নম্র হয়ে প্রাণ পর্যন্ত পণ করে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন, সেই নরকুলধন্য কামেল মানুষটি। তাঁর পবিত্র দেহের উপর দিয়ে নির্বিচারে ও নির্মমভাবে স্রোত বয়ে গেছে নির্যাতনের, নিপীড়নের। তার আপন গোত্রীয় এমনকি নিকট-আত্মীয়দের নিকট থেকে এসেছে কতো ভ্রূকুটি প্রদর্শন, কতো শাসন-বচন, কতো শাস্তিবচন। কিন্তু নিজের মাঝেই শক্তি ধরে নিঃশঙ্কচিত্তে উদার কণ্ঠে তিনি বিলিয়ে চলেছেন শান্তির ললিত বাণী, ইসলামের বাণী। নিখিল মানবের অভয়দাতা, ত্রাণকর্তা হযরত মুহম্মদের কণ্ঠে বার বার ধ্বনিত হচ্ছে তওহীদ-মন্ত্র ‘লা-শরীক আল্লাহ্—’।

    একটির পর একটি প্রদীপ জ্বলতে থাকে এ বাণীর তড়িৎস্পর্শে। এক এক করে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় খোঁজে।

    নবুয়ত-প্রাপ্তির পর প্রায় ছয় বছর কেটে যাচ্ছে। এ দীর্ঘকালে প্রায় পঁয়তাল্লিশ জন পুরুষ একুশ জন নারী ইসলাম কবুল করেছেন। কারও কারও মতে এ সংখ্যার সামান্য কম-বেশি হতে পারে।

    কিন্তু এই স্বল্পসংখ্যক ইসলাম কবুলকারীদের উপরেও বিপক্ষ দলের নির্যাতন নিপীড়নের অন্ত ছিল না। জুলুম ও অত্যাচারের ঝড় বয়ে গেছে তাদের উপর। তাদের কেউ কেউ আবিসিনিয়ায় (হাবশ) আশ্রয় খুঁজেছে প্রাণের দায়ে রসুলে আকরমের অনুমতি নিয়ে।

    ওমরের কানেও এসেছে এই তওহীদ-বাণী। কিন্তু গুমরাহীর অন্ধকারায় তাঁর সহৃদয় মন সঠিকভাবে আবদ্ধ। পাষাণে সারা জাগছে না। বারে বারে ধাক্কা দিয়ে প্রতিহত হচ্ছে। পাষাণ প্রাণকে আরও বিরুদ্ধমনা, কুলিশ-কঠোর করে তুলছে।

    আপন ঘরে বাঁদী লবিনাহ মুসলিম হয়ে গেছে এ খবরে ওমর ক্ষিপ্তপ্রায় হয়ে গেছেন। বেদেরেগভাবে তাকে বেধড়ক প্রহার করে চলেছেন। শেষে নিজেই ক্লান্ত হয়ে শাসাচ্ছেন, ‘থাম্ থাম্! আমি একটু নিশ্বাস ফেলি তার পর আবার প্রহার শুরু করবো।’

    কিন্তু তবুও যে তওহীদ-মন্ত্রে দীক্ষিত একজনকেও ফিরানো যায় না। এ অগ্নিশিখায় সন্দীপিত একটি হৃদয়ও বশ মানে না। টলে না, দমে না। শুধু ঘরে-ঘরে জ্বলে উঠছে দ্বীন-ইসলাম লাল মশাল। এ কোন শরাব, কোন আবেহায়াত পান করাচ্ছেন আবদুল্লাহ-নন্দন?

    খাত্তাব-নন্দন শুধু ভাবেন, আর ভাবেন! কী উপায়ে এ বিপ্লব-তরঙ্গের গতিরোধ করা যায়।

    সহসা তাঁর মাথায় মতলব এলো, সব অনর্থের মূল ইসলাম-প্রবর্তককে নিঃশেষ করলেই এ বিপদ দূর হয়। অগ্নিশিখার উৎসমূল নির্বাপিত করলেই সব চিন্তাভাবনার অবসান হয়।

    যেই চিন্তা, সেই কাজ। ওমর খোলা তরবারি হাতে নিয়ে সোজা চললেন আঁ-হযরতের সন্ধানে।

    পথেই দেখা হলো নূয়াইম-ইবনে-আবদুল্লাহর সঙ্গে। নূয়াইম ওমরেরই বংশজ এবং গোপনে তিনি ইসলাম কবুল করেছিলেন। আরও করেছিলেন ওমরের চাচাতো ভাই সাইদ, যিনি খাত্তাবের এক কন্যাকে শাদী করেছিলেন এবং স্ত্রীকেও ইসলামের সহধর্মিণী করেছিলেন। ওমর অবশ্য এসব কিছুই জানতেন না।

    নুয়াইম ওমরের হাতে নাঙ্গা তলোয়ার, চোখে-মুখে তীব্র উত্তেজনা ও ঘন ঘন তপ্ত নিশ্বাস দেখে কিছুটা বিস্মিত হলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি ব্যাপার?’ ওমর সোজাসুজি বললেন, ‘মুহাম্মদকে খুন করতে চলেছি।’

    নুয়াইম বললেন, ‘বনি-হাশিম ও বনি আবদে-মুনাফদের ভয় কর না? তারা তোমায় জ্যান্ত রাখবে কি?’

    ওমর ক্রোধে চিৎকার করে উঠলেন, ‘মুহাম্মদের উপর এতো দরদ কেন? বুঝি ইসলাম কবুল করেছ? তবে এসো, তোমাকে দিয়েই শুরু করা যাক।’ নুয়াইম শ্লেষের হাসি হেসে বললেন, ‘নিজের ঘরের খবর রাখো কি? তোমার বোন ও ভগিনীপতিটি যে আগেই ইসলাম কবুল করেছে।’

    একথা শুনে ওমর ক্রোধে দিশাহারা হয়ে ভগিনী ফাতেমার বাড়ীতে ছুটলেন। ফাতেমা ও সাঈদ তখন রুদ্ধদ্বার ঘরে খোবাবের নিকট কোরআনুল করিম তেলাওয়াত করছিলেন। ওমরের কর্কশ হাঁক শুনেই খোবাব লুকিয়ে গেলেন।

    ওমর তীক্ষ্ণকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী পড়া হচ্ছিল?’

    ফাতেমা বললেন, ‘ও কিছু না।’

    ওমর বললেন, ‘আমার নিকট কিছুই লুকাতে চেষ্টা করো না, আমি সব জেনে ফেলেছি। তোমরা দু’জনেই নাকি ধর্মত্যাগ করেছ?’ একথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সাঈদকে ধরে প্রহারের পর প্রহার করতে লাগলেন। স্বামীকে রক্ষা করতে ফাতেমা ছুটে এলেন, কিন্তু তিনি প্রহারে প্রহারে জর্জরিত হয়ে গেলেন। তাঁর কোমলাঙ্গ ফেটে রক্তধারা ছুটলো।

    কুপিতা সিংহিনীর মতো ফাতেমা তখন গর্জে উঠলেন, ‘ওমর, তোমার যা খুশী করতে পার। সত্যই আমরা ইসলাম কবুল করেছি এবং কিছুতেই আমরা আমাদের ‘দ্বীন’ ত্যাগ করতে পারবো না।’

    সেই মুহূর্তে ওমরের মনে জন্ম নিল বিচিত্র এক সমবেদনা। তা কেবল কোমলাঙ্গী নারীদেহে রক্তধারা দর্শনসঞ্জাত নয়, একই নাড়ীর টানেও আপ্লুত নয়; চিরায়ত মানবতার বেদনার্ত চিত্তের এ স্বাভাবিক উপলব্ধি। ওমর শান্ত স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

    কিছুক্ষণ পর লজ্জাজড়িত কণ্ঠে ওমর ভগিনীকে অনুরোধ করলেন, ‘আচ্ছা, শোনাও তো—কী পড়ছিলে তোমরা!’

    ফাতেমা লুক্কায়িত কোরআনের আয়াতসমূহ ওমরের সামনে তুলে ধরলেন। ওমর পাঠ করলেন :

    ‘আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সমস্ত আল্লাহর মহিমা গান করে, তিনি সর্বশক্তিমান, তিনি সর্বজ্ঞ।’

    পাষাণ হিমগিরি গলে যাচ্ছে। ঘন তমসাবৃত অন্ধ হৃদয়ে আলোর খেলা শুরু হয়েছে। ওমর আবার পড়লেন, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের উপর ঈমান আনো।

    বাণীর এ কী অনাস্বাদিত সুর-মূর্ছনা! এ যে কানের ভিতর দিয়ে সোজা কর্ণমূলে বেজে উঠে সারা প্রাণ আকুল করে তোলে। কান্না ও হর্ষের দোল-দোলায় মানুষ অভিভূত হয়ে উঠে। সংশয়-দ্বিধা-ভয় সব কেটে যাচ্ছে। ধ্রুব-জ্যোতিতে মনের সব অন্ধকার কেটে যেয়ে আলোয় আলোময় হচ্ছে। বিশ্বাসীর ঋজু ভঙ্গিতে অন্তর মন উজ্জীবিত হয়ে আসছে।

    বিচিত্র অনুভূতিতে আচ্ছন্ন ওমর হৃদয়-কন্দরে যেন চিরবাঞ্ছিতের ডাক শুনতে পেলেন। তিনি সহসা ঘোষণা করলেন : লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ্। আমায় তাঁর নিকট নিয়ে চলো।

    তখন রসূলে-আকরম ছিলেন সাহাবা আরকামের বাড়ীতে। সাফা পর্বতের সানুদেশে। ওমর নিজেই সেখানে উপস্থিত হলেন ও দরওয়াজায় সজোরে ধাক্কা দিলেন। তাঁর হাতে নাঙ্গা তলোয়ার দেখে সাহাবাদের অনেকের মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠলো। আমীর হামযা বললেন : আসতে দাও ওমরকে। যদি বন্ধুভাবে এসে থাকে, অতি উত্তম কথা। অন্য মতলব থাকে তো আমি নিজেই তার শির লুটিয়ে দেব।

    শান্ত সমাহিতচিত্ত ওমর ধীর পদক্ষেপে ভিতরে প্রবেশ করলে রসূলে-আকরম নিজেই তাঁর দিকে অগ্রসর হলেন। একটা মানুষকে বিশ্বাসে উজ্জীবিত করতে হলে যেমন বিশ্বাসীর ঋজুভঙ্গি আনতে হয় শরীরে, তাই এনে আঁ-হযরত ওমরের বস্ত্রাঞ্চলে ঝটকা মেরে বললেন : ওমর! কী ইচ্ছা নিয়ে এখানে এসেছো? এই দৃঢ়গম্ভীর বাণী শুনেই ওমরের চিত্ত কেঁপে উঠলো। তিনি নম্রসুরে ধীরে ধীরে বললেন, আমি ইসলাম কবুল করতে এসেছি। এ জওয়াব শুনেই আঁ-হযরতের কণ্ঠে উদাত্তসুরে ধ্বনিত হলো : আল্লাহু আকবর! সঙ্গে সঙ্গে সাহাবাদের কণ্ঠেও ধ্বনিত হলো: আল্লাহু আকবর! যে ভাব গম্ভীর ধ্বনি দূর-দিগন্তে  মক্কার পর্বত-শ্রেণীতেও কেঁপে কেঁপে বয়ে গেল।

    ওমরের ইসলাম গ্রহণ সম্বন্ধে এটিই অতি প্রসিদ্ধ ও বিশ্বস্ত কাহিনীরূপে স্বীকৃত হয়। কিন্তু ওমরের নিজস্ব বয়ান মতে আর একটি কাহিনীও আছে। এখানে সেটিও উল্লেখযোগ্য।

    ওমর নিজেই বলেন : আমি ইসলাম থেকে বহু দূরে ছিলাম। জাহেলিয়াতের অন্ধকারায় এমনভাবে আবদ্ধ ছিলাম যে, আমি তখন শরাব পান করতাম এবং খুবই উল্লাসের সঙ্গে পান করতাম। আমার মহফিলে তখন কোরায়েশকুলের সব নওজওয়ানই ভীড় জমাতো। এক রাতে আমি নিজস্ব মহফিলে উপস্থিত হয়ে দেখলেম, অন্য কেউ তখন হয় নি। তখন চিন্তা করলেম, মক্কায় অমুক পানশালায় গেলে মদ মিলতে পারে। কিন্তু সেখানে যেয়েও বঞ্চিত হলেম। তখন চিন্তা করলেম, আচ্ছা! এ সময় কাবায় সাত কিংবা সত্তর বার প্রদক্ষিণ (তওয়াফ) করলে বেশ হয়। এ উদ্দেশ্যে আমি কাবায় উপস্থিত হয়ে দেখি, রসূলুল্লাহ্ তখন নামায পড়ছেন। লক্ষ্য তাঁর শাম অঞ্চলের দিকে এবং তাঁর ও শামের মধ্যস্থলে কাবা অবস্থিত। তাঁকে দেখেই চিন্তা করলেম, তাঁর বাণী শোনবার এটাই সবচেয়ে উত্তম সুযোগ। অতএব শোনাই যাক। কিন্তু এ আশঙ্কা হলো, খুব কাছাকাছি গেলে যদি তিনি ভয় পান। এরূপ ভেবে আমি ‘হজরে আসওয়াদের নিকট দিয়ে গিলাফে-কাবায় ঢুকে পড়লেম ও নিঃশব্দে তাঁর নিকটবর্তী হলেম। তিনি নামাযে কোরআন পাক তেলাওয়াত করছিলেন। আমিও চলতে চলতে একেবারে তাঁর সামনে পড়ে গেলাম। তখন তাঁর ও আমার মধ্যখানে গিলাফে-কাবা ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। কোরআনের মধুর বাণী আমার মর্ম স্পর্শ করতে লাগলো, ইসলাম আমার হৃদয়-দুয়ার খুলে দিয়ে নিঃশব্দে নীরবে প্রবেশ করতে লাগলো। আমি শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইলেম। রসূলুল্লাহ্ নামায শেষ করে গৃহাভিমুখে চলতে লাগলেন। আমিও তাঁর পিছনে পিছনে চলতে লাগলেম। তিনি স্বগৃহের নিকটবর্তী হয়ে আমার পদশব্দে চকিত হয়ে আমার দিকে ফিরলেন ও আমায় চিনলেন। হয়তো তাঁর সন্দেহ হলো, আমি কোনও কুমতলবে তাঁর অনুসরণ করছি। তখন সাহস সঞ্চয় করে বেশ উচ্চস্বরেই তিনি বললেন, খাত্তাব-নন্দন এ সময় কেন তুমি এসেছো? আমি বিনীতভাবে বললেম, আল্লাহ্‌র রসূলে ও তাঁর ওহীর উপর ঈমান আনবার জন্য। তিনি আল্লাহ্‌র প্রশংসায় মুখর হয়ে আমায় বললেন : আল্লাহ তোমায় সত্যপথের অনুসারী করেছেন। একথা বলে তিনি আমার বুকে হাত রাখলেন এবং আমার মুক্তি ও সত্যপন্থী হওয়ার জন্যে প্রার্থনা জানালেন। এভাবে আমি তাঁর দ্বীনের ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়ে গেলেম।

    কাহিনী দুটির সত্যাসত্য তর্কিত হলেও এ-বিষয় তর্কাতীতভাবে প্রমাণিত যে, ওমরের ইসলামে দীক্ষা ইতিহাসের এক ক্রান্তিকালীন ঘটনা। পূর্বে ইসলামের প্রচার হচ্ছিল ধীরমন্থর গতিতে। যাঁরা মুসলিম হয়েছেন, তাঁরা নিজেদের দীক্ষা রেখেছেন গোপন করে এবং গোপনে ইসলামের সেবা করেছেন। প্রকাশ্যে ইসলাম অনুষ্ঠান পালন সহজ ছিল না, দিবালোকে জনসমক্ষে কাবাগৃহে নামায আদায় করা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু ওমরের দীক্ষার পর সব কিছুই পরিবর্তিত হয়ে গেল। তিনি প্রকাশ্যে সকলের মুখের উপর ইসলামের দীক্ষা গ্রহণ প্রচার করতেন এবং অকুতোভয়ে বিপক্ষদলের সব রকম বিরোধ ও হিংসামূলক কাজের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অগ্রাহ্য করে প্রকাশ্য মুসলিমদেরকে নিয়ে বিপক্ষদলের তীব্র বিরোধিতা অগ্রাহ্য করে প্রকাশ্যে কাবাগৃহে নামায আদায় করেন। ইবনে হিশাম আবদুল্লাহ ইবনে-মাসুদের একটি উক্তির বরাত দিয়ে বলেছেন।

    ওমর ইসলাম গ্রহণ করার পর কোরায়েশদের সঙ্গে বহু সংঘাতের সম্মুখীন হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিই জয়ী হন এবং শেষ পর্যন্ত  কাবায় প্রবেশ করে নামায আদায় করেন। আমরাও তাঁর শরীক হয়েছিলাম।

  • খেলাফতের প্রতিষ্ঠায়

    খেলাফতের প্রতিষ্ঠায়

    খেলাফতের প্রতিষ্ঠায়

    রসূলে-আকরমের ওফাতের পর ওমরের মনে যে প্রশ্নটি প্রবল হয়ে উঠেছিল তা হচ্ছে : মুসলিমদের ভাগ্যে কি হবে?

    বস্তুত আঁ-হযরতের উত্তরাধিকার নিয়ে যে প্রশ্ন প্রবল হয়ে ওঠে, তার সমাধান সহজ ছিল না। তাঁর কোনও পুত্র-সন্তান জীবিত ছিল না। সন্ততিদের মধ্যে একমাত্র জীবিত ছিলেন ফাতেমা-জোহরা, আলীর সহধর্মিণী। উত্তরাধিকারের কোনও বাঁধা পদ্ধতি ছিল না; এবং আঁ-হযরতও এ-সম্বন্ধে কোনও সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে যান নি। আরবের রীতি ছিল গোত্রীয় রীতি-সাধারণ গোত্রীয় সরদার বা শেখ নির্বাচিত হতেন বয়োজ্যেষ্ঠ হওয়ার কিংবা উপযুক্ততার গুণে। মদিনার আনসারগণ আরবের অন্য গোত্রসমূহ থেকে ভিন্ন প্রকৃতির ছিলেন না, এজন্যে তাঁরা এ-প্রথার চিন্তা করতে পারেন নি। তাঁরাই সর্বপ্রথমে উপলব্ধি করেন, এই উত্তরাধিকারী বা নতুন নেতার নির্বাচন কতোখানি গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থপূর্ণ হবে। এ-জন্যে আঁ-হযরতের ওফাত সম্বন্ধে নিশ্চিত সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ-বিষয়ে অসম্ভব তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। বলা বাহুল্য, আনসারগণই তৎপর হন নি, আরও দাবীদার উপস্থিত হন। কিন্তু এই অধ্যায়ের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও লজ্জাকর দিক এই যে, রসূলে আকরমের নশ্বর দেহ সমাহিত করার সব ব্যবস্থা রইলো উপেক্ষিত, আর যাঁরা তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর প্রতি ভক্তিতে, প্রীতিতে ও আনুগত্যে ছিলেন উচ্চকণ্ঠে, তাঁরাই অতি-ব্যগ্র হয়ে উঠলেন, যাতে রাষ্ট্রপ্রধানের আসন তাঁদের হস্তচ্যুত না হয়ে যায়।

    খেলাফতের প্রশ্নে মদিনাবাসী মুসলিমরা এই তিনটি সুস্পষ্ট দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে : প্রথম, আনসারগণ। তাঁরা মদিনার আদি অধিবাসী, রসূলে আকরমের সাহায্যকারী এবং ইসলামের নতুন আশ্রয়দাতা। তাঁরা প্রকাশ্যেই দাবী করেন, তাঁদের সাহায্য ব্যতীত ইসলাম ভীষণভাবে বাধাপ্রাপ্ত হতো, অতএব তাঁদের মধ্য থেকেও মুসলিমদের খলিফা নির্বাচিত হওয়া উচিত। ওবায়দাহ্ ছিলেন তাঁদের নেতা।

    দ্বিতীয়, মুহাজেরীন। তাঁদের দাবীর যৌক্তিকতা এই যে, তাঁরা আঁ-হযরতের গোত্রীয়, ইসলামে প্রথম-দীক্ষিত ও হযরতের সুখে দুঃখে সমভাগী হিসেবে জন্মভূমি ত্যাগ করে মদিনায় আগত। তাঁরাই ছিলেন আঁ-হযরতের নিকটতম সাহাবা। ওমর আবুবকর প্রমুখ ছিলেন তাঁদের নেতৃস্থানীয়।

    তৃতীয়, বানু-হাশিম গোত্র, যাঁদের মুখপাত্র ছিলেন বিবি ফাতেমার স্বামী আলী। তাঁদেরকে বলা যায়, জন্ম-স্বত্বদাবীর, কারণ তাঁদের বিশ্বাসই ছিল যে, আঁ-হযরতের চাচাতো ভাই এবং একমাত্র জীবিত জামাতা হিসেবে তিনিই খেলাফতের যোগ্যতম দাবীদার। তাঁরা আরও বিশ্বাস করতেন যে, আলীর খেলাফতের দাবী ইলাহী স্বত্বাধিকার, কারণ রসূলের উত্তরাধিকারের মতো মহৎ অধিকার মানুষের ইচ্ছাধীন হতে পারে না।

    সমসাময়িক বিবরণী থেকে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত যে, রসূলে আকরমের ওফাতের অব্যবহিত পরেই আনসারগণ সাকিফাহ্-বানু-সাঈদায় সমবেত হন ও নিজেদের মধ্য থেকে খলিফা নির্বাচনের বিষয় আলোচনা করতে থাকেন। লোক-মুখে এ সংবাদ পেয়েই ওমর আবুবকরকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। আলী ও ফাতেমার গৃহে বানু-হাশিম গোত্রের সভায় উপস্থিত হন। এ-সম্বন্ধে সহীহ্ বোখারী থেকে ওমরের উক্তি বিশেষ স্মরণীয়।

    আমাদের ভাগ্যে এরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। আঁ-হযরতের ওফাতের পর আনসাররা একটি পৃথক জোটে বিভক্ত হয়ে যান এবং সাকিফাহ্-বানু-সাঈদায় একত্র হয়ে আমাদের বিপক্ষতা করতে থাকেন। অন্যদিকে আলী, জুবায়ের ও তাঁদের অনুগামীরাও আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান। তখন অবস্থা এই যে, মুহাজেরীন আবুবকরের অধীনে একত্র হন।

    ওমরের এ ভাষণ দেওয়া হয়েছিল পরবর্তীকালে এক বিশাল জনতার সম্মুখে, যেখানে বহুশত বিশিষ্ট সাহাবা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু এ উক্তির কোনও প্রতিবাদ ওঠে নি। অতএব এরূপ অনুমান সমীচীন হবে না যে, এ উক্তি বাস্তব ঘটনার বিপরীত ছিল।

    এখন বিবেচ্য এই যে, এরূপ বিভিন্ন জোটে বিভক্ত মুসলিমদের শেষ পরিণতি কী হতে পারতো?

    হযরতের ওফাতের সময় মদিনায় বহু দুষ্কৃতমনা মুনাফেক ছিল, যারা শুধু ইসলামের প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর অপেক্ষায় ছিল, তার উপর মৃত্যুবাণ হানতে। এরূপ কঠিন সময়ে শোকাচ্ছন্ন হওয়ার চেয়ে বেশি দরকার হয়ে উঠেছিল, ঝটিতি খলিফা মনোনীত করে ফেলে এবং অবস্থা আয়ত্তে আনয়ন করে শৃঙ্খলা স্থাপন করা। আনসারগণ সঙ্গোপনে নিজেদের মধ্যে খেলাফতের প্রশ্ন আলোচনা করে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছিলেন। অথচ এ কথা সর্বজনবিদিত যে, কোরায়েশরা তাঁদের চক্ষে হেয় আনসারদের কর্তৃত্ব কখনই মাথা পেতে নিতেন না। তাছাড়া সারা আরবের কোনও গোত্রও আনসারদের প্রাধান্য স্বীকার করতো না। সাকিফায় আবুবকরের একটি উক্তি থেকেই এ-মতের পোষকতা মিলে : আরবদের অধিবাসীরা কখনও এরূপ মনোনয়নে স্বীকৃত হবে না, অন্তত যতদিন কোরায়েশরা জীবিত থাকবে।

    এই সঙ্কটমুহূর্তে ওমরের কৃতিত্ব হচ্ছে কালের ঝুঁটি ধরে ঘটনাস্রোতের গতিরোধ করা এবং বিন্দুমাত্র সময় অপব্যয় না করে আবুবকরের হাতে হাত রেখে বায়আত বা বশ্যতা স্বীকার করা। তাঁর এ সিদ্ধান্তের পিছনে বলিষ্ঠ যুক্তিও ছিল: দাবীদারদের মধ্যে আবুবকর ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ, সবচেয়ে ব্যক্তিত্বশালী এবং সর্বাপেক্ষা শ্রদ্ধেয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি।

    ওমর বায়আত কালে বলেছিলেন: আবুবকর! হযরত কি নির্দেশ দেন নি যে, আপনি মুসলিমদের নামাযে ইমামতি করবেন? আপনি খলিফায়ে রসূল এবং আমি আপনার হাতে বায়আত করছি এই কারণে যে, আপনি আমাদের সকলের চেয়ে রসূলের প্রিয়বন্ধু ছিলেন।

    এমন অকাট্য ও অন্তরস্পর্শী যুক্তির পর আর মতভেদ থাকতে পারে? স্বয়ং আবু ওবায়দাহ্ সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে আবুবকরের হাতে বায়আত করলেন। আনসারদের ঐক্য ভেঙ্গে গেল এবং ওবায়দাহ্ ব্যতীত সকলেই আবুবকরের বশ্যতা স্বীকার করলো। তখন সকলে মসজিদে নববীতে উপস্থিত হলেন। সেখানে ওসমান আবদুর রহমান ইনে আউফ আবুবকরের বশ্যতা স্বীকার করলেন। তারপর বিশ্বনবীর পবিত্র দেহাবশেষ সমাহিত করার সুব্যবস্থা করা হয়।

    পরদিন আবুবকর মসজিদে-নববীতে উপস্থিত হলে উপস্থিত জনগণকে ওমর এক মর্মস্পর্শী বক্তৃতা দান করেন ও বলেন : ‘আল্লাহ্ তোমাদের কর্মসূত্র এমন এক ব্যক্তির হাতে তুলে দিয়েছেন, যিনি আমাদের সবার উত্তম। তিনি রসূলুল্লাহ্ প্রিয়বন্ধু, আর যখন দুজনে গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন, তখনও ছিলেন প্রিয়সঙ্গী। অতএব, তোমরা সকলেই তাঁর হাতে বায়আত করো।’ তখন সকলেই দণ্ডায়মান হয় এবং সকিফাহ্-বানু-সাঈদার পর দ্বিতীয়বার সর্বসাধারণের বশ্যতা গ্রহণ পর্ব সমাধা হয়।

    একমাত্র ভিন্নমত পোষণকারী জোট রয়ে গেলেন বানু-হাশিম ও তাঁদের নেতা আলী। বানু হাশিম আলী ব্যতীত অন্য কোন ও ব্যক্তির নিকট নতি স্বীকার করতে স্বীকৃত হন নি। যতদিন বিবি ফাতেমা জীবিত ছিলেন ততদিন আলী বায়আত করেন নি। সহীহ্-বুখারীর খয়বর যুদ্ধের অধ্যায়ে একটি উক্তি আছে যে, আবুবকরের নির্বাচনের ছয়মাস পরে বিবি ফাতেমা জোহরার ওফাত হলে পর আলী আবুবকরের নিকট বায়আত গ্রহণ করবার উদ্দেশ্যে সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেন। কিন্তু আলী একথাও বলে পাঠান যে আবুবকর একাকী আসবেন, কারণ ওমরের উপস্থিতি তাঁর পছন্দ নয়।

    আলী ইবনে-আবিতালিব এবং বানু-হাশিম যে উপযুক্ত আবুবকরের বায়আত করেন নি, তার কারণ নির্দেশে ওমরের রূঢ় ব্যবহার ও অতি ব্যগ্রতা হেতু আলীর বিরক্তি সৃষ্টি হওয়ার দিকে অনেকে ইঙ্গিত করেছেন। এর সত্যতা একেবারে অস্বীকৃত না হলেও আসল কারণটি কি ছিল, তা নির্ণয় করা শক্ত। তবে ইতিহাসের সাক্ষ্যে এ-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় না যে, আলী ও বানু-হাশিম অন্য মুসলিমদের মতো নির্দ্বিধায়, একসঙ্গে আবুবকরের বায়আত কবুল করেছিলেন। প্রকৃত কারণ এই যে, রসুল-নন্দিনী ফাতেমা জোহরা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আবুবকরের প্রতি বিমুখ ছিলেন। আবুবকর তাঁকে পিতৃসম্পদ থেকে বঞ্চিত করেছিলেন, এ জন্যেই তাঁর বিরাগ সৃষ্টি হয়েছিল? কিংবা তিনি স্বামী আলীকে খেলাফতের প্রশ্নে আবুবকরের চেয়ে যোগ্যতর মনে করতেন? এসব প্রশ্নের জওয়াবে যথেষ্ট মতভেদ আছে, কিন্তু একথা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত যে, ওমর আবুবকরের সঙ্গে এ সিদ্ধান্তে একমত ছিলেন যে, নবীর উত্তরাধিকার সদকাহ্, যার কেউ ব্যক্তিগত উত্তরাধিকারী হতে পারে না। আর ওমরের এ সিদ্ধান্তই ফাতেমা জোহরার সমূহ বিরাগের কারণ হয়। এখানে প্রশ্ন ওঠে যে, ফাতেমা জোহরার এই বিরাগই কি আলীর বায়আতে অস্বীকৃতি এবং ওমরের তাঁদের প্রতি অসন্তোষের সৃষ্টি করেছিল, যার দরুন ওমর নিজের হাতেই খলিফা নির্বাচনের বিষয়টি একান্তভাবে গ্রহণ করেছিলেন? আসল কারণ যাই হোক, এর পরিণতিতে ইসলামের ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যার দুরপনের প্রভাব আজও দূরীভূত হয় নি। এবং যার কম বেশি প্রকাশ আজও শীয়া ও আলী পন্থীদের ব্যবহারে সুস্পষ্ট। তাঁরা ওমরকে শুধু অশ্রদ্ধাই করেন না, বরং বিরাগযুক্ত বিরূপ দৃষ্টিতেই দেখে থাকেন।

    একথা অনস্বীকার্য যে, ওমরের প্রকৃতিই ছিল উগ্র ও কোপন স্বভাবের। এবং এই সংকট মুহূর্তে ফাতেমা জোহরার গৃহ বানু-হাশিমের যড়যন্ত্রের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হওয়া তিনি বরদাশত করতে পারেন নি। এ-জন্যে এ বিষয়ে তাঁর ব্যবহারে রূঢ়তা ও অতি-ব্যগ্রতা নবী-নন্দিনীর চক্ষে অসহ্য হয়ে উঠেছিল। তবু এ-কথা অস্বীকার করা চলে না যে, ওমরের আচরণে কোমলতা না থাকলেও পরিস্থিতি উপলব্ধিতে ও ঘটনাস্রোত বিশ্লেষণে তাঁর এতটুকু ভুল হয় নি, দৃষ্টি বিভ্রান্তি হয় নি এবং দৃঢ়তার অভাব হয় নি। এ-জন্যেই যড়যন্ত্রের অঙ্কুরেই বিনাশ সাধন সম্ভব হয়েছিল। যদি বানু-হাশিমের ষড়যন্ত্র ও কুমন্ত্রণা উপেক্ষা করা হতো, তাহলে পরিস্থিতি এরূপ ভীষণ ঘোরালো হয়ে উঠতো, যার দরুন ইসলামী ভ্রাতৃত্বের, ঐক্যের ও শৃঙ্খলার মূলেই কুঠারাঘাত করা হতো এবং তার ফলে তখনই এমন অন্তর্বিপ্লব আরম্ভ হয়ে যেতো, যা আলী ও মাবিয়ার মধ্যে পঁচিশ বছর পরেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

    এ সব কার্যকলাপ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করিলে সহজেই প্রতীয়মান হয়, খেলাফতের প্রতিষ্ঠায় ওমরের ভূমিকা ও কৃতিত্ব কী পরিমাণের ছিল।

    আবুবকরের খেলাফত দুবছর তিন মাস স্থায়ী ছিল। তাঁর ওফাত হয় তের হিজরীর জয়াদিউস্-সানি মাসের তেইশ তারিখে (২২শে আগস্ট, ৬৩৪ খ্রি.)। বলা বাহুল্য যে, তাঁর আমলে অনুষ্ঠিত প্রত্যেকটি কর্মে ওমরের ভূমিকা ছিল সক্রিয় এবং ওমরের উপদেশের গুরুত্বও ছিল তাঁর চক্ষে অনেকখানি। এ সবের বিস্তৃত পরিচয় মিলবে আবুবকর সিদ্দীকের জীবনীতে এবং এখানে সে-সবের উল্লেখ পুনরুক্তি হবে বিবেচনায় বর্জন করা গেল। কেবল একটি মাত্র ঘটনার উল্লেখ করে তার ইঙ্গিত মাত্র দেওয়া যেতে পারে।

    খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পরদিন আবুবকর বাজারে তাঁর দোকানে যাচ্ছিলেন। পথে ওমরের সঙ্গে দেখা। ওমর জিজ্ঞাসা করলেন: আপনি কোথায় চলেছেন? আবুবকর জওয়াব দিলেন: কেন, বাজারে, নিজের দোকানে। ওমর বললেন: আপনি যদি দোকানে বসে থাকেন, তবে দেশের শাসন চালাবেন কী করে? আবুবকর বললেন: কিন্তু আমার ঘর-সংসার চলবে কী করে?

    ওমর চিন্তা করলেন সত্যিই তো খলিফার অন্য-সংস্থান না হলে দেশের শাসন চলবে কি করে! তখনই তিনি প্রধান সাহাবাদের মজলিশ ডেকে স্থির করে ফেললেন, একজন মানুষের দৈনিক যা খরচ লাগে, সেই পরিমাণ হিসেবে আবুবকরের সংসারে বায়তুল-মাল থেকে রোজ বরাদ্দ দেওয়া হবে। কিন্তু তিনি সংসারের অন্য কোনও কাজ-কারবার করতে পারবেন না। এভাবে খলিফার বরাদ্দ স্থির হয় ওমরের মধ্যস্থতায়। এখানে আর একটি কাহিনীর উল্লেখ করে আবুবকরের ন্যায়নিষ্ঠার পরিচয় দেওয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না। উপরোক্ত বরাদ্দমতে আবুবকরের সংসার চলতে লাগলো। একদিন তাঁকে হালুয়া খেতে দেওয়া হলো। তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন: হালুয়া কে সওগাত পাঠিয়েছে? স্ত্রী বললেন: কেউ পাঠায় নি। আমি দৈনিক বরাদ্দ থেকে কিছু বাঁচিয়ে হালুয়া তৈরি করেছি। আবুবকর শঙ্কিত হয়ে জানতে চাইলেন, উদ্বৃত্তের পরিমাণ কতো স্ত্রী পরিমাণ জানালে ধর্মভীরু আবুবকর তখনই বায়তুল-মালের রক্ষককে নির্দেশ দিলেন, সে পরিমাণ বরাদ্দ কম দিতে।

    বহুদিনের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে আবুবকরের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে, তাঁর পরে খেলাফতের গুরুভার দায়িত্বগ্রহণের যোগ্যতা রয়েছে একমাত্র ওমরেরই। তবু জীবন-সন্ধ্যা যখন ঘনিয়ে এল তখন আবুবকর একবার লোকমত যাচাই করতে চাইলেন। তিনি স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন যে নিজেই উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যাবেন। আঁ-হযরতের ওফাতের পর খেলাফতের প্রশ্ন নিয়ে আনসারদের জোট পাকানো এবং সকিফাহ্-বনি সাঈদার কার্যক্রম তাঁর চোখে ভেসে উঠলো। পুনরায় যদি তাঁর মৃত্যুর পর এই প্রশ্ন নিয়ে মতভেদের সৃষ্টি হয় তাহলে তার সমাধান নিশ্চয়ই সহজ হবে না। এবার এ প্রশ্নের সমাধান আনসার-মুহাজেরদের মধ্যেই সীমিত থাকবে না। ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধরত মুজাহিদের মধ্যেও মতভেদ ছড়িয়ে পড়িবে; এবং তারা ইতিমধ্যেই ইরান ও রোম-সম্রাটের শক্তির স্বাদ পেয়েছে। এবার যদি একই প্রশ্ন পুনরায় প্রবল হয়ে ওঠে, তা হলে সারা আরবে তা বিস্তৃত হয়ে পড়বে এবং তার ফলে আরদ্ধ সকল কর্মই পণ্ড হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি কাউকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে গেলে এবং মুসলিমগণ তাঁকে স্বীকার করে নিলে বিষয়টার সহজ সমাধান হয়ে যাবে। তিনি আরও চিন্তা করছিলেন: রসুলুল্লাহ নিজের খলিফা মনোনীত করে যান নি। তার কারণ এই ছিল, পাছে জনগণ ভেবে বসে যে, এরূপ মনোনয়ন ওহী রব্বানীর সমর্থিত ছিল এবং সে খলিফা হতেন খলিফাতুল্লাহ নামাঙ্কিত। কিন্তু আবুবকর যদি কাউকে নিজের খলিফা মনোনীত করেন, তাহলে এরূপ সংশয় সৃষ্টির অবকাশ থাকে না, অথচ মুসলিমরাও মতবিরোধের শিকার হয় না। অন্যদিকে ইসলামী এলাকা বিস্তৃতির কাজও পূর্ণবিক্রমে চলতে থাকে। কিন্তু ওমরেরই খলিফা হওয়া এবং সমগ্র জনগণের তাতে সম্মতি থাকাও একান্ত দরকার। যদি জনগণকে ওমরের খেলাফতীতে একমত করানো যায়, তাহলে আল্লাহ্ দৃষ্টিতেও ইসলামের উন্নতি ও সাফল্যের হেতু হবে।

    এ সব ভেবে-চিন্তে আবুবকর প্রথমে আবদুর রহমান ইবনে আউফকে এবং ওমরের মনোনয়ন সম্বন্ধে তাঁর মতামত চাইলেন। আবদুর রহমান বললেন, আপনার ওমর সম্বন্ধে যা ধারণা, ওমর তারও অনেক উচ্চে কিন্তু মেজাজ বড়ো উগ্র। আবুবকর বললেন, আমার কোমল প্রকৃতির পরিপূর্ণতার্থেই তার এই উগ্রতা। কিন্তু দায়িত্ব ঘাড়ে পড়লেই উগ্রতা প্রশমিত হয়ে যাবে। আমি বিশেষ ঘনিষ্ঠভাবেই তাকে পরীক্ষা করে দেখেছি, আমি যখন রাগান্বিত হয়েছি, সে তখন নরম হতে চেষ্টা করেছে, আর আমি নরম হলে সে উগ্র হয়েছে।

    তারপর ওসমানকে ডাকানো হয় এবং তাঁর অভিমত চাওয়া হয়। ওসমান বললেন, আল্লাহ্ উত্তম জানেন। আমার যতদূর ধারণা, তাঁর বাইরের চেয়ে ভিতরটা অতি উত্তম এবং আমরা কেউ তাঁর সমকক্ষ নই। ওসমান চলে গেলে সঈদ-ইবনে জায়েদ, আসাদ ইবনে-হুজায়ের এবং আরও আনসারী ও মুহাজেরীনকে ডেকে মত চাওয়া হয়। অন্য সাহাবাগণ যখন আবুকরের এ অভিপ্রায় অবগত হয় তখন তারা আশঙ্কা করেন যে, ওমর খলিফা হলে তাঁর রুঢ় ও কোপন স্বভাব মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করবে। অতএব তাঁকে ইচ্ছা থেকে বিরত করতে হবে। এরূপ চিন্তা করে তাঁরা আবুবকরের সমীপে উপস্থিত হন। তাঁদের মধ্যে তালহা নিজের ভীতি প্রকাশ করে বললেন: আপনি যথেষ্ট জানেন, আপনার জীবদ্দশাতেই ওমর কী রকম রূঢ়ভাবে আমাদের সঙ্গে ব্যবহার করেন। আল্লাহ্ জানেন, খেলাফতের দায়িত্ব হাতে পেলে তিনি আমাদের প্রতি কিরূপ ব্যবহার করবেন। আপনি তো আমাদেরকে চিরকালের জন্যে ছেড়ে যাচ্ছেন, অথচ আমাদের ভাগ্য এমন একজন লোকের হাতে ছেড়ে দিচ্ছেন, যে কঠোর হাতেই আমাদের উপর শাসন চালাবে। আপনি আল্লাহ্র নিকট আমাদের সম্বন্ধে কী জবাবদিহি করবেন?

    আবুবকর কিঞ্চিৎ উষ্ণভাবেই জওয়াব দিলেন: আমায় আল্লাহ্র ভয় দেখাচ্ছো? জেনে রাখো, আমি আল্লাহকে বলবো, আমি আপনার বান্দাদেরকে এমন একজনের হেফাজতে রেখে এসেছি যে, সবার শ্রেষ্ঠ।

    এ কথা বলেই ওমর ওসমানকে তলব করলেন এবং ওসিওনামা লিখতে নির্দেশ দিলেন। ভূমিকাটুকু বলে দেওয়ার পরই আবুবকর মূর্ছিত হলেন। ওসমান কিন্তু লিখেই চললেন: আমি এতদ্বারা ওমরকে খলিফা নিযুক্ত করলেম। মূর্ছাভঙ্গের পর আবুবকর ওসমানকে নির্দেশ দিলেন, লিখিত অংশ পড়ে শোনাতে। সবটুকু শোনা শেষ হলেই আবুবকর বলে উঠলেন: আল্লাহু আকবর! আল্লাহ্ তোমায় পুরস্কৃত করবেন।

    অতঃপর ওসিওনামাখানি একজন অনুচরের হাতে দিয়ে আবুবকর নির্দেশ দিলেন, সমবেত জনগণকে উচ্চস্বরে পড়ে শোনাতে। তারপর তিনি অলিন্দে উঠে জনগণকে সম্বোধন করলেন: আমি আমার কোনও আত্মীয় স্বজনকে খলিফা নিযুক্ত করি নি, আমি ওমরকে নিযুক্ত করেছি। তোমরা এ বন্দোবস্ত পছন্দ কর? জনগণ একবাক্যে প্রত্যুত্তর করলো: আমরা আপনার বাণী শুনেছি আপনার নির্দেশ শিরোধার্য করছি।

    আবুবকর মহাপ্রশান্তি অনুভব করলেন। তারপর ওমরকে উপদেশ দান করলেন, ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধ পূর্ণ উদ্যমে চালিয়ে যেতে। আরও স্মরণ করিয়ে দিলেন, খলিফাতুল-মুসলেমীন হিসাবে কোন্ কোন্ কর্তব্যের মধ্য দিয়ে আল্লাহ্ সন্ধান মিলে। আল্লাহ্ সর্বদাই আসেন করুণাধারায়। তিনি রুদ্র আলোকেও আসেন, যাতে মানুষ তাঁর কথা ভুলে না যায় এবং তার পক্ষে যা বৈধ নয়, তার জন্যে লালায়িত না হয়। এ-ভাবেই সে অদৃশ্য সবকিছুর মধ্যে মৃত্যুকে সবচেয়ে শ্রষ্ঠ বন্ধু মনে করে।

    ওমর খেলাফতের গুরুদায়িত্ব অনুভব করে অভিভূত হয়ে পড়লেন।

  • বিজয়ীর বেশে ফিরে দেশে দেশে

    বিজয়ীর বেশে ফিরে দেশে দেশে

    ওমরের খেলাফৎ আমলে সাড়ে বাইশ লক্ষ বর্গমাইলেরও বেশি ভূ-ভাগ ইসলামের এলাকাভুক্ত হয়েছিল। এই বিশাল ভূভাগের অন্তর্গত ছিল পশ্চিম মিসর থেকে শুরু করে সিরিয়া, খোজিস্তান, ইরাক-আরব, ইরাক-আযম, আযরবাইজান, ফারস, কিরমান, খোরাসান, মাকরান, মায় বর্তমান বেলুচিস্তান বৃহদংশ পর্যন্ত। আবার এ ভূভাগের মধ্যে ছিল সমকালীন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দুইটি প্রবল প্রতাপান্বিত ও বহু শতাব্দীর বহু ঐতিহ্যমণ্ডিত সাম্রাজ্য-পশ্চিমে রোম সাম্রাজ্য ও পূর্বে (বর্তমান ইরানে) পারসিক সাম্রাজ্য। মাত্র এক দশকের শাসনকালে (৬৩৪-৬৪৪ খ্রি.) এবং মাত্র এক ব্যক্তির শাসন আমলে এমন পৃথিবী-বিশ্রুত শক্তিধর দুটি সম্রাটের মুকাবিলা করে এতো বিশাল ভূভাগ অধিকারের তুলনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

    এমন অনন্যসাধারণ বিজয়সমূহ আলোচনার পূর্বে সমকালীন রাজনৈতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা শিক্ষাপ্রদ।

    রসূলে-করিমের ওফাতের পর যে সব আরব গোত্র ও মোশরেকদল উদ্যত হয়েছিল ইসলামের উপর মারাত্মক আঘাত হানতে, আবুবকর কঠোর হস্তে তাদের নির্মূল করে দেন। অতঃপর আরবের আভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা আর উৎপীড়িত হয়নি, নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হয়নি কোনও বিদ্রোহ-বিপ্লবে। আবুবকরের আমলেই আরবের বহির্বিশ্বের ইসলামের এলাকা বিস্তার ও তদুদ্দেশ্যে সৈন্য চালনার পরিকল্পনা গৃহীত হয়। বারো হিজরীতে ইরাকে একদল সৈন্য প্রেরিত হয় এবং হিরার অঞ্চলসমূহ অধিকৃত হয়। তের হিজরীতে সিরিয়ার বিরুদ্ধে আর একটি সেনাবাহিনী প্রেরিত হয়। এ-সব অভিযান তখন প্রাথমিক পর্যায়ে, এমন সময় আবুবকর ইন্তেকাল করেন এবং ওমরের উপর খেলাফতের গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত হয়। ওমরের কৃতিত্ব হচ্ছে, এ-সব অভিযান প্রয়াসকে গৌরবের সঙ্গে পরিচালনা করা এবং সর্বক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করা।

    আরব উপদ্বীপের সঙ্গে ইরাকের সম্পর্ক এবং সংগ্রাম-সংঘাত অতি প্রাচীন কাল থেকেই বিজড়িত। পুরাকাহিনী থেকে জানা যায়, আরবের অতি প্রাচীন প্রজাতি আরব বায়েদার দুটি গোত্র এককালে ইরাকের উপর প্রভুত্ব করতো। ইয়ামনের আর আরিবা গোত্র এরূপ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে, তারা বহুবার আরব-পারসিক-সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধতা করে স্বাধীনতা ঘোষণা করতো। ক্রমে ক্রমে আরও বহু আরব-গোত্র পারসিক রাজ্যে বসতি স্থাপন করে। তারা একতাবদ্ধ জয়ে শক্তি সঞ্চয় করতো এবং সুযোগ ও সুবিধা বুঝে স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজেদের রাজ্য স্থাপনও করতো। এরূপ একটি রাজ্যের শাসক আমর-বিন-আদি হিরায় রাজধানী স্থাপন করেন এবং নিজেকে ইরাকের রাজা হিসাবে ঘোষণা করেন। তাঁর বংশ বহুদিন ইরাকে শাসন করতো।

    সাসানীয় বংশের দ্বিতীয় সম্রাট শাপুর বিন-আদর্শির সর্বপ্রথম হিজায ও ইয়ামেন জয় করে পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু আরবীরা ছিল চির-চঞ্চল, দুর্বিনীত ও দুর্ধর্ষ। কারো অধীনতাপাশে আবদ্ধ থাকা তাদের স্বভাববিরুদ্ধ। বারে বারে তারা বিদ্রোহ করেছে, আপোষহীন সংগ্রাম চালিয়েছে পারসিক সম্রাটের বিরুদ্ধে। শাপুর একবার তাদের দমন করতে মদিনা পর্যন্ত অভিযান চালিয়েছিলেন এবং আরব সরদারদের বন্দী করে তাদের স্কন্ধের হাড় ভেঙ্গে দিয়ে ‘ফুল-আক্তাফ’ উপাধিও অর্জন করেছিলেন। সম্রাট পারভেজের রাজত্বকালে বকর গোত্রসমূহ একত্র হয়ে পারস্য-সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক ভীষণ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে জয়লাভ করে। এ-যুদ্ধে রসূলে-আকরমও উপস্থিত ছিলেন এবং শত্রুপক্ষের পরাজয়ে উল্লসিত হয়ে ঘোষণা করেছিলেন: এই প্রথম আরব পারস্যের উপর প্রতিশোধ তুলতে সক্ষম হলো।

    ষষ্ঠ হিজরীতে আঁ-হযরত প্রতিবেশী শাসকসমূহের নিকট পত্রসহ দূত প্রেরণ করেন, ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়ে। এসব পত্রে ছিল শান্তির চিরন্তন বাণী, শক্তি বা বল প্রয়োগের বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত ছিল না। তবু পারভেজ পত্র পাঠ করে ক্রোধে চিৎকার করে উঠেছিলেন: আমার দাস হয়ে আমায় এভাবে পত্র দিতে সাহস করে? তিনি তখনই ইয়ামনের শাসনকর্তা বাজাকে নির্দেশ পাঠান, আঁ-হযরতকে বন্দী করে সরাসরি তাঁর দরবারে হাজির করতে। কিন্তু পারভেজের ভাগ্যলিপি এমনই ছিল যে, ইতিমধ্যে তারই পুত্র বিদ্রোহী হয়ে তাঁকে হত্যা করে ফেলে এবং তার ধমকও স্তব্ধ হয়ে যায়।

    প্রাক-ইসলাম যুগে কয়েকটি আরব-গোত্র সিরিয়ার প্রত্যন্ত দেশেও বসতি স্থাপন করে; এবং কালক্রমে শক্তি সঞ্চয় করে সিরিয়ার অভ্যন্তরে অভিযান চালিয়ে অনেক অঞ্চল দখল করে নেয়। তাদের সরদারগণ সিরিয়ার রাজা হিসেবে কীর্তিত হলেও, আসলে তাঁরা ছিলেন রোমের প্রতিনিধি মাত্র। এসব আরব-গোত্রজরা ঈসায়ী ধৰ্ম গ্ৰহণ করে এবং সমধর্মী হিসেবে তাদের ও রোমকদের মধ্যে প্রীতির বন্ধন গড়ে ওঠে। ইসলাম প্রচারণা শুরু হলে আরবের অন্যান্য প্রতিমাপূজকের মতো তারাও ঘোরতর ইসলাম-বিদ্বেষী ছিল।

    পূর্বে উল্লিখিত মতো ষষ্ঠ হিজরীতে রসূলে করীম রোমান সম্রাটকেও পত্র প্রেরণ করেন, ইসলাম গ্রহণ করতে আহ্বান জানিয়ে। পত্রবহ প্রত্যাবর্তনকালে এসব সিরীয়-আরবীর হস্তে লাঞ্ছিত ও লুণ্ঠিত হন। অনুরূপভাবে আঁ-হযরত হারিস ইবনে ওমায়েরকে প্রেরণ করেন বসরা শাসকের নিকট ইসলামের আমন্ত্রণ-লিপি দিয়ে। কিন্তু হারিস পথিমধ্যে নিহত হন। এর প্রতিশোধ তুলতে আঁ-হযরত অষ্টম হিজরীতে একদল বাহিনীসহ অভিযান করেন; এবং মুতায় বিপক্ষের সঙ্গে ঘোরতর যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে কয়েকজন মশহুর সাহাবা শহীদ হন এবং শেষ পর্যন্ত খালিদের রণকৌশলে মুসলিম বাহিনী রক্ষা পেলেও প্রকৃতপক্ষে মুসলিমদেরই পরাজয় ঘটে। নবম হিজরীতে রোমকরা আরবের অভ্যন্তরে হানা দিয়ে মদিনা আক্রমণের চেষ্টা করে। আঁ-হযরত পূর্বেই সংবাদ পেয়ে একদল সৈন্য নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করতে তাঁবুতে উপস্থিত হন। তখন রোমকরা অবস্থার গুরুত্ব হৃদয়ঙ্গম করে আর অধিক অগ্রসর হতে সাহস পায় না। কিন্তু অবস্থার উত্তেজনা প্রশমিত হয় না এবং মুসলিমরা সর্বদাই আশঙ্কায় থাকতো, কোন্ সময়ে শত্রুপক্ষ সুযোগ বুঝে মদিনা আক্রমণ করে বসে। সহীহ বুখারীতে একটি উক্তি আছে, যখন গুজব রটে যে, আঁ-হযরত পত্নীদেরকে তালাক দিয়েছেন, তখন এক ব্যক্তি ওমরকে জিজ্ঞাসা করে, তিনি কিছু খবর রাখেন কি? ওমর সহসা জিজ্ঞাসা করেন: কি খবর? ঘাসানীরা আক্রমণ করতে আসছে না কি? এ থেকেই অনুমেয়, শত্রুদের হঠাৎ আক্রমণ কতোখানি আশঙ্কিত ছিল। যাহোক, এ আশঙ্কা নিঃশেষ করার উদ্দেশ্যে এগারো হিজরীতে আঁ-হযরত সিরিয়ার বিরুদ্ধে এক বিশাল বাহিনী প্রেরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন ওসামাহ্ ইবনে যায়েদের নেতৃত্বে। কিন্তু ওসামাহ্ সমরযাত্রা করার পূর্বেই আঁ-হযরতের ওফাত হয়। আবুবকর এ অভিযানের প্রস্তুতি সমাধা করে সিরিয়ায় বাহিনী প্রেরণ করেন। ওসামাহ্ চল্লিশদিন পরে সিরিয়ার প্রান্তদেশ শাসন করে ফিরে আসেন। কিন্তু সিরিয়ায় সংগ্রাম তখনও চলতে থাকে।

    এভাবে দুই ফ্রন্ট যুদ্ধ চলা অবস্থায় ওমরের খেলাফত আরম্ভ হয়। আরব তথা ইসলাম তখন বহির্বিশ্বের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এবং পশ্চিমে রোম-সম্রাট ও পূর্বে পারস্য সম্রাট তার সঙ্গে শক্তি-পরীক্ষায় প্রস্তুত হচ্ছেন।

    ওমরের বিজয়সমূহ বর্ণিত হবে প্রথমে পূর্বদিকের ইরাক বিজয় সম্বন্ধে। তৎকালে ইরাক বলতে আরবের প্রান্তস্থিত ইরাক অঞ্চলকে বোঝাত ইরাক আরব এবং পারস্য বা বর্তমান ইরাককে বলা হতো ইরাক-আযম। উত্তরে তাবারিস্তান, দক্ষিণে সিরাজ, পূর্বে খুজিস্তান ও পশ্চিমে মরাগাহ্ শহর পর্যন্ত ছিল তৎকালীন ইরাক-আযমের বিস্তৃতি। ইস্পাহান, হামদান ও রায় ছিল সে আমলের মশহুর শহর। অধুনা প্রায় ধ্বংসাবস্থায় এবং তার সন্নিকটে ইরানের বর্তমান রাজধানী তেহরান গড়ে উঠেছে। সিরিয়ার বিজয়-কাহিনী তারপরে এবং সর্বশেষে মিসরের বিজয়-কাহিনী আলোচিত হবে।

  • ইরাক-আরব বিজয়

    ইরাক-আরব বিজয়


    ইরাক-আরব বিজয়
    (প্রথম পর্যায়)

    পারস্য-সাম্রাজ্যের চতুর্থ যুগে সাসানীর বংশ রাজত্ব করতো। এ বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাটের ন্যায়পরায়ণ নওশেরওয়া। এ যুগটাই ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের সোনালী যুগ। নওসেরওয়ার পৌত্র পারভেজ ছিলেন রসূলে আকরমের সময় পারস্যের সিংহাসনে সমাসীন; পূর্বেই উক্ত হয়েছে যে, রসূলে-আকরম পারভেজকে ইসলামে আহ্বান করে লিপি প্রেরণ করেন, কিন্তু পারভেজ উদ্ধতভাবে তাঁকে বন্দী করতে হুকুমজারী করেন। কিন্তু সে হুকুম কার্যকরী হওয়ার পূর্বেই পারভেজকে পরলোকযাত্রা করতে হয়। তারপর খসরু বা পারস্য সম্রাটের সিংহাসন নিয়ে তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে রক্তলীলা চলতে থাকে। এ রক্তলীলার শেষ অঙ্কে দেখা গেল, সাত বছরের শিশু ইয়েদর্গিদ ব্যতীত রাজবংশে কোনও পুরুষ জীবিত নেই। অগত্যা বুরান্দুখত নামে এক রমণীকে রাজসিংহাসনে বসানো হয় এই শর্তে যে, ইয়েদর্গিদ বয়ঃপ্রাপ্ত হলেই তাঁকে সিংহাসন ফিরিয়ে দিতে হবে। সিংহাসন নিয়ে এই কাড়াকাড়ি অবশ্যাম্ভাবী ফলস্বরূপ সারা রাজ্যে বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হয়। অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে ইরাকের ‘ওয়াইল’ নামীয় আরব-গোত্রের দুই সরদার মুসান্না সায়বাণী ও সুয়াইদ আজলী বিদ্রোহ করেন ও আশপাশে লুটতরাজ চালাতে থাকেন।

    ঠিক এই সময় খলিফা আবুবকরের নির্দেশে খালিদ ইবনে-ওলিদ ইমামাহ্ ও অন্যান্য আরব-গোত্রের বিরুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন। মুসান্না সুযোগ বুঝে আবুবকরের নিকট উপস্থিত হয়ে প্রার্থনা করলেন, ইরাক আক্রমণ করতে। প্রার্থনা মঞ্জুর হলো। মুসান্না পূর্বেই ইসলাম কবুল করেছিলেন। এখন নিজের সমস্ত গোত্রকে ইসলাম কবুল করিয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে ইরাক অভিযান করেন। আবুবকর তাঁর সাহায্যে খালিদকে প্রেরণ করেন। তাঁদের সম্মিলিত শক্তির সম্মুখে ইরাকের সীমান্তবর্তী নগরসমূহ একের পর এক লুণ্ঠিত হতে লাগলো এবং হিরাহ্ পর্যন্ত অধিকৃত হলো। হিরাহ্ বিজয়কে বলা যায় পারসিক গাছের প্রথম আপেল আহরণ। খালিদের অনন্যসাধারণ রণকুশলতায় হয়তো ইরাক বিজয়-পর্ব শেষ হয়ে যেতো। কিন্তু এই সময় সিরীয় যুদ্ধাঙ্গনে মুসলিমরা বড়ো বেকায়দায় পড়ে যায়। বাধ্য হয়ে আবুবকরকে তখনই আদেশ পাঠাতে হয়, খালিদ অবিলম্বে মুসান্নার হাতে ইরাকের সব ভার অর্পণ করে সিরিয়ায় গমন করবেন (রবিউস্‌সানি ১৩ হিজরী, ৬৩৪ খ্রি.)। তার প্রায় দুই মাস পরেই আবুবকর ইন্তিকাল করেন।

    খেলাফতের ভার স্বহস্তে গ্রহণ করেই ওমরের প্রথম লক্ষ্য হলো ইরাক অভিযান জোরদার করা। তিনি জনগণ সমক্ষে ওজস্বিনী ভাষায় প্রচার করতে লাগলেন। প্রথমে তেমন সাড়া জাগে নি। কিন্তু দিনের পর দিন ধরে বক্তৃতা করে শেষের দিকে ওমর জনগণের উৎসাহ জাগিয়ে তোলেন। এই সময় মুসান্নার এ যুক্তিও বাস্তবভাবে কার্যকরী হলো: আমি এই অগ্নিপূজকদের সাহসিকতা প্রত্যক্ষভাবে যাচাই করে দেখেছি, তারা যুদ্ধক্ষেত্রে বিশেষ পটু নয়। আমরা ইতিমধ্যেই ইরাকের বহু শহর দখল করে ফেলেছি, পারসিকরা আমাদের শক্তিমত্তায় নিকট হার মেনেছে। তাঁর এই কথায় সাকিফ গোত্রের নেতা আবুওবায়দাহ্ আবেগপূর্ণ কণ্ঠে চেঁচিয়ে ওঠেন, আমি কার্যভার গ্রহণ করলেম। জনগণও কলরব করে উঠলো, আমরাও প্রস্তুত আছি। ওমর দশ হাজার সৈন্যের বাহিনী সংগ্রহ করে আবু ওবায়দাকে সিপাহসালার নিযুক্ত করলেন। আবুওবায়দাহ্ আঁ-হযরতের সাহাবা ছিলেন না। এজন্যে তাঁর নিয়োগে কিছুটা প্রতিবাদ ওঠে এবং একজন বলেই ফেলেন: হে ওমর! সাহাবাদের মধ্য থেকেই এ নিয়োগ করা উচিত। সেনাদলে অসংখ্য সাহাবা আছেন, অতএব সিপাহসালার একজন সাহাবাই হওয়া উচিত। কিন্তু ওমর রূঢ় কণ্ঠে বললেন: আপনারা এ মর্যাদা সাহস ও ধৈর্যের গুণে অর্জন করেছিলেন, কিন্তু নিজ দোষে সে মর্যাদা হারিয়েছেন। যুদ্ধে যাদের উৎসাহ জাগে না, যুদ্ধনেতৃত্ব তাদের সাজে না। ওমর অবশ্য আবু ওবায়দাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সাহাবাদের যথাযোগ্য সম্মান দেখাতে এবং প্রতি কর্মে তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করতে।

    এদিকে পারস্য-সম্রাজ্ঞী বুরান্দুখত ও নিশ্চেষ্ট ছিলেন না। খোরাসানের শাসক রুস্তম ছিলেন একজন জবরদস্ত বীর ও ঝানু কূটনৈতিক। তাঁকে তলব করে বুরান্দুখত সার্বভৌম ক্ষমতা দিয়ে সিপাহসালার নিযুক্ত করলেন, তার মস্তকে পারসিক রাজমুকুট বসালেন এবং সর্বশ্রেণীর কর্মচারীদের আদেশ দিলেন রুস্তমের নির্দেশ বিনা প্রতিবাদে পালন করতে। রুস্তম ইরাকের প্রত্যেক অংশে প্রচারক প্রেরণ করে জনগণকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে লাগলেন ধর্মের দোহাই দিয়ে। সারাদেশে যেন আগুন জ্বলে উঠলো এবং মুসলিম-অধিকৃত অঞ্চলসমূহেও জনগণ মুসলিমদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল। বুরান্দুত নয়া একদল সেনাবাহিনী গঠন করলেন এবং নরসী ও জাপান নামক দুজন শ্রেষ্ঠ বীর প্রেরণ করলেন রুস্তমের সাহায্যার্থে।

    আবু ওবায়দাহ্ সৈন্যসহ অগ্রসর হয়ে নমারক নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেন। এখানে উভয়পক্ষে অস্ত্র-পরীক্ষা হয়। পারসিকদের বিখ্যাত বীর মরদান শাহ্ নিহত হন এবং জাপান মুসলিমদের হাতে বন্দী হন। কিন্তু যে সৈন্যটি তাঁকে বন্দী করে সে তাঁর পরিচয় না জানায় মুক্তি-মূল্য নিয়ে তাঁকে মুক্তি দেয়। পরে এ কথা প্রকাশ হলে অনেকে এরূপ দুর্ধর্ষ শত্রুর মুক্তিতে আপত্তি তোলে, কিন্তু আবুওবায়দাহ্ তাদের নিরস্ত্র করে বলেন যে ইসলামের প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করা বে-আইনী।

    অতঃপর আবু ওবায়দাহ্ সম্মুখে অগ্রসর হয়ে সাকাতিয়াহ্ নামক স্থানে নরসীর সঙ্গে মোকাবিলা করেন। এখানে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে নরসী সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হন। আবু ওবায়দাহ্ চারদিকে সৈন্য প্রেরণ করে পারসিকদের ব্যতিব্যস্ত করে তুললেন।

    মুসলিমদের সঙ্গে শক্তি-পরীক্ষায় এমন ভাগ্য-বিপর্যয়ের সংবাদ শ্রবণ করে রুস্তম চার হাজার সৈন্যের এক সুসজ্জিত বাহিনী প্রেরণ করেন প্রবীণ ও মহাবীর বামন শাহের নেতৃত্বে। বামন শাহ ফোরাত নদীর পূর্বতীরে মারওয়াহ্ নামক স্থানে সৈন্যবিন্যাস করেন। মুসলিম বাহিনীর শিবির ছিল নদীর অপর তীরে। বামন শাহ মুসলিমদের আহ্বান করলেন, নদী অতিক্রম করে আক্রমণ করতে, অন্যথায় তিনিই নদী অতিক্রম করবেন। অসমসাহসিক আবুওবায়দাহ্ অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই বীরত্বের প্রতিযোগিতা করতে যেয়ে নদী পার হয়ে যুদ্ধ করতে আদেশ দিলেন। মুসান্না, সুলাইত ও অন্যান্য রণকুশলী সেনানী এরূপ হঠকারিতা না করতে ও নদী পার না হওয়ার পক্ষে অনেক যুক্তি দেখালেন। কিন্তু তাঁদের কোনও যুক্তি টিকলো না, সিপাহসালার আবুওবায়দার হুকুমই কার্যকরী হলো। নদী পার হয়ে মুসলিমরা দেখলো, জায়গাটা অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ ও অসমতল এবং যুদ্ধার্থে সৈন্যবিন্যাসের পক্ষে খুবই অনুপযোগী।

    পারস্য-সেনা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল এবং নিজেদের মনোনীত ক্ষেত্রে যুদ্ধের সুযোগ পেয়ে মুসলিমদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। তাদের হস্তীগুলি কালো পর্বতের মতো বিচরণ করতে লাগলো এবং অশ্বারোহী লৌহবর্মে সজ্জিত সেনাবাহিনী কালান্তকসদৃশ বীরবিক্রমে যুদ্ধ করতে লাগলো। আবুওবায়দাহ্ হস্তীযূথ দ্বারা ব্যতিব্যস্ত হয়ে আদেশ দিলেন, ব্যূহ রচনা করে হস্তীযূথকে বন্দী করতে এবং হাওদাসমেত আরোহীদেরকে ভূতলশায়ী করতে। কিন্তু এ উপায়েও কোন ফল হলো না, কারণ মদমত্ত হস্তীথ যেদিকেই যায়, সেদিকেই অসংখ্য মুসলিম সেনা পদ-পিষ্ট হতে থাকে। তখন আবুওবায়দাহ্ আদেশ দিলেন হস্তীদের শুন্ড কর্তন করে নিধন করতে। তিনি নিজেই একটি শ্বেতহস্তীর শুন্ড কর্তন করতে ধাবিত হলেন, কিন্তু দুর্দান্ত পশুটিকে আয়ত্তে আনার পূর্বে সেটি তাঁকে শুন্ড দ্বারা ধরে ফেলে ও পদতলে পিষ্ট করে নিহত করে।

    সিপাহসালার আবুওবায়দার মৃত্যুর পর তাঁর ভ্রাতা হাকাম এবং পরপর সাতজন আত্মীয় হস্তীযুথের পদতলে শহীদ হন। শেষে মুসান্না পতাকা নিয়ে অগ্রসর হলেন। কিন্তু তখন যুদ্ধের গতি মুসলিমদের বিপক্ষে গেছে এবং তারা পলায়নপর হয়েছে। বিপদের মাত্রা আরও ঘনীভূত করতে একজন সেতুটিও ধ্বংস করে দিল এবং পলায়নের পথও বন্ধ হয়ে গেল। অনেকে পানিতে ঝাঁপ দিল। মুসান্না অতি কষ্টে সেতুটি পুনরায় স্থাপন করলেন এবং একদল অশ্বারোহীর বেষ্টনী করে সেতু পারাপারে সুযোগ সৃষ্টি করলেন। তবু যুদ্ধ শেষে গণনায় দেখা গেল, নয় হাজার সৈন্যের মধ্যে মাত্র তিন হাজার জীবিত, বাকি সমস্তই শহীদ।

    ইসলামের ইতিহাসে এরূপ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়নের কাহিনী অত্যন্ত বিরল। যখন এই ভাগ্য-বিপর্যয়ের কাহিনী মদিনায় পৌঁছে, তখন ঘরে ঘরে ক্রন্দনের রোল ওঠে। ওমর প্রতি ঘরে-ঘরে শোকার্তকে সান্ত্বনা ও পলায়িত সৈন্যকে সমবেদনা জানান।

    সেতুর যুদ্ধে মুসলিমদের পরাজয়ে ওমর মর্মাঘাত পেলেন, কিন্তু হতোদম্য হন নি। তিনি সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সর্বাত্মকভাবে সমরায়োজন করতে লাগলেন, দুশমনকে পুনরায় আক্রমণ করতে। আরবের প্রতি অঞ্চলে প্রচারক পাঠানো হলো, অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা দিয়ে জনগণ-মন উদ্দীপিত ও উৎসাহিত করে তুলতে। সারা আরবে সাড়া পড়ে গেল, ধর্মের ডাকে দেশের ডাকে প্রাণপণ করতে। দলে দলে গোত্রের পর গোত্র জমায়েত হতে লাগলো আরবের প্রতিটি অংশ থেকে। আজ্‌দ গোত্রপতি মক্‌নাফ ইবনে-সালিম এলেন, বানু তাসিমদের নায়ক হাসিন-বিন-মবিন এলেন, হাতেম তাই এর পুত্র আদি এলেন বিশাল বাহিনী নিয়ে আরও এলো রবাব, বানু কিনানাহ্ কাসাম, বানু হাজালাহ্ ও বানু দব্বাহ্ গোত্রগুলি নিজ নিজ প্রধানদের অধীনে যুদ্ধ সজ্জায় সজ্জিত হয়ে। এমনকি নমর ও তগলিব নামক খ্রিস্টান গোত্র দুটিও নিজেদের দলপতির অধীনে যুদ্ধার্থে সজ্জিত হয়ে ওমরের নিকট দাবী জানালো, পারস্যের সঙ্গে আরবের এই জাতীয় মোকাবিলায় শরীক হতে। জরীর বজলী নামক বিখ্যাত আরব-বীরও উপস্থিত হলেন তাঁর গোত্রীয়দের একত্র করে। ওদিকে মুসান্নাও ইরাকের সীমান্তবর্তী জিলাসমূহে প্রচারক প্রেরণ করে বাসিন্দাদেরকে পারস্য-বিদ্বেষী করে তুলেছিলেন।

    মুসলিমদের সমর প্রস্তুতির সংবাদ গুপ্তচরগণ যথাযথভাবে পারস্য-দরবারে প্রেরণ করতো। বুরাদুত রাজকীয় অশ্বারোহী বাহিনী থেকে বারো হাজার সৈন্য বাছাই করে মেহরানের অধিনায়কত্বে অর্পণ করলেন। মেহরান বাল্যে আরবে লালিত হয়েছিলেন; তার দরুন আরব রীতি-নীতি ও বলবীর্যের সম্যক অনুধাবনশক্তি থাকায় তাঁর অধিনায়কতায় জয়ের সম্ভাবনা নিশ্চিত এ চিন্তাই বুরান্দুতের মাথায় উদয় হয়েছিল।

    মুসলিম বাহিনী কুফার অনতিদূরে ফোরাত কূলবর্তী বুয়ায়েব নামক প্রান্তরে যুদ্ধার্থে প্রস্তুত হলো। মুসান্না সুশৃঙ্খলভাবে সৈন্য সন্নিবেশিত করলেন। কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে মুসলিম বাহিনী সুদক্ষ সেনানায়কদের অধীনে সজ্জিত হলো। পারসিক বাহিনী মেহরানের অধীনে রাজধানী থেকে যাত্রা করে বুয়ায়েবে উপস্থিত হলো ফোরাতের অপর তীরে এবং পরদিন প্রত্যুষে নদী পার হয়ে সমরসজ্জায় সজ্জিত হয়ে গেল।

    ‘আল্লাহু আকবর’-রবে মুসলিম বাহিনী যুদ্ধ আরম্ভ করলো। পারসিক বাহিনী বজ্রের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো মুসলিমদের উপর। অস্ত্রে অস্ত্রে সংঘাত, তীরের শনশন আওয়াজে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠলো। তীব্র তেজে মুসান্না শত্রু পক্ষের ব্যুহের কেন্দ্ৰ মধ্যে উপস্থিত হলেন। পারসিকরা আক্রমণের তীব্রতায় টলমল করে উঠলো, কিন্তু শীঘ্রই সাহস সঞ্চয় করে দ্বিগুণ তেজে যুদ্ধ করতে লাগলো। এক সময় মুসলিম পক্ষে দৃঢ়তার অভাব দেখা গেল। কিন্তু মুসান্না বীরের মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন: হে মুসলিমগণ! কোথায় যাও তোমরা? আমি এখানে। এ উৎসাহবাণীতে মুসলিমরা একত্র হয়ে নতুন বিক্রমে যুদ্ধ করতে লাগলো। মুসান্নার ভাই মাসুদ সহসা মারাত্মক আঘাতে ভূপাতিত হলেন। কিন্তু মুসান্না চিৎকার করে উঠলেন: হে মুসলিমগণ! আমার ভাইয়ের মৃত্যুতে কিছু পরোয়া করো না। বীরের মৃত্যু এভাবেই হয়। নিশান ঊর্ধ্বে তোলো। মুমূর্ষু মাসুদও চিৎকার করলেন: আমার মৃত্যুতে তোমরা হতোদ্যম হয়ো না। মুসলিম পক্ষের অন্যতম খ্রিস্টান সেনানায়ক আসান-বিন-হিলালও অঘাতে ধরাশায়ী হলেন। মুসান্না অশ্ব থেকে নেমে তাঁকে কোলে তুলে নিয়ে মাসুদের পাশে শুইয়ে দিলেন। জাতীয় স্বার্থের মহাসঙ্কটকালে ধর্মীয় ভেদ জ্ঞান কোথায় বিলীন হয়ে গেল। আরও অনেক মুসলিম সেনানায়ক মৃত্যু আলিঙ্গন করলেন। কিন্তু মুসান্নার দৃঢ়তা ও রণকৌশল যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিল মুসলিমদের পক্ষে। পারসিক বাহিনীর কেন্দ্রব্যুহ বিধ্বস্ত হয়ে গেল। তাদের বিখ্যাত বীর শাহবাজ ধরাশায়ী হলেন। মেহরান পূর্ণ বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে একজন তাগলিব যোদ্ধার হাতে নিহত হলেন। তাঁর মৃত্যুতে যুদ্ধের গতি সহসা থেমে গেল। পারসিকরা পাগলের মতো বিশৃঙ্খলভাবে পলায়নপর হলো। মুসান্না ক্ষিপ্রগতিতে সেতুমুখ বন্ধ করে দিলেন। তখন পারসিকগণ অস্ত্রমুখে প্রাণ দিতে লাগলো। ঐতিহাসিকগণ বলেন, পরবর্তীকালে বুয়ায়ের প্রান্তরে শুধু মানবাস্থির শ্বেতস্তূপ লক্ষিত হতো। এ যুদ্ধের সবচেয়ে স্থায়ী লক্ষণ এই যে আরবীদের নৈতিক বল সহস্র গুণে বেড়ে গেল। পারস্য সাম্রাজ্যের বিভীষিকা তাদের মন থেকে অন্তর্হিত হলো এবং খসরু সাম্রাজ্যের শেষদিনও তাদের গণনার বিষয় হয়ে উঠলো। যুদ্ধশেষে মুসলিমরা সারা ইরাকে ছড়িয়ে পড়ে।

    সে সময়ে বর্তমান বাগদাদ নগরীর সন্নিহিত অঞ্চলে এক বিরাট মেলা বসেছিল। মুসান্না সৈন্যসহ মেলায় উপস্থিত হলে পণ্য বিক্রেতার ভয়ে পলায়ন করে এবং বহু মালামাল মুসলিমদের হস্তগত হয়। এই চরম পরাজয় বার্তা পারস্য দরবারে উপস্থিত হলে সকলেই হতাশ স্বরে একবাক্যে বলে উঠে; রমণীর শাসন আমলে এবং বিভেদ ও বিশৃঙ্খলার পরিণতি আর কি হতে পারে? বুরান্দুখ্ত অচিরেই সিংহাসনচ্যুত হলেন এবং ষোড়শ বর্ষীয় ইয়েজদি সিংহাসনে আরোহণ করলেন। তাঁর অভিষেকে সাড়া সাম্রাজ্যে নব জীবনের সাড়া পড়ে গেল। নয়া উদ্যমে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে লাগলো, মরুচারী যাযাবর আরবীদেরকে সমুচিত শিক্ষা দিতে। সব কিল্লা ও সমর ঘাঁটি সুরক্ষিত ও শক্তিশালী করা হলো, ঘরে ঘরে অস্ত্র নির্মাণের কারখানা বসে গেল। সাম্রাজ্যের দুই স্তম্ভ রুস্তম ও ফিরোজ ব্যক্তিগত বিরোধ ভুলে এ মহাসমর প্রস্তুতিতে মিলিত শক্তি নিয়োগ করলেন।

    ওমরের নিকট পারসিকদের এসব প্রস্তুতির সংবাদ যথাযথ পৌঁছে গেল। তিনি প্রথমে মুসান্নাকে নির্দেশ দিলেন, সমস্ত মুসলিম বাহিনীকে একত্র করে আরবের সীমান্ত প্রদেশ কুক্ষিগত করে রাখতে ও সৈন্যসহ অভিযানের জন্যে প্রস্তুত থাকতে। এদিকে সারা আরবদেশ আলোড়িত করে ওমর সমরপ্রস্তুতি চালাতে লাগলেন। দিকে দিকে প্রচারকেরা ধাবিত হলো প্রতি অঞ্চল মথিত করে যত যোদ্ধা, সরদার কুটনীতিবিদ, কবি, বক্তা ও রাজনীতি-বিশারদ আছেন, সকলকে খলিফার দরবারে উপস্থিত করতে দলে দলে আরব গোত্রসমূহ জমায়েত হতে লাগলো। সা’দ-বিন ওক্কাস উপস্থিত হলেন নিজ গোত্রের তিন হাজার সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে। হাদ্রামৌত, সদফ, ঘহজ্, কয়েস ও ইলান গোত্রের নেতাগণ উপস্থিত হলেন প্রত্যেকে বিশাল বাহিনী নিয়ে। তাছাড়াও ইয়ামনের গোত্রগুলি এক হাজার, বানু তামিম গোত্র চার হাজার ও বানু-আসাদ গো তিন হাজার সৈন্যসহ উপস্থিত হলো।

    ওমর মক্কা থেকে হজ পালন করে মদিনায় ফিরে দেখলেন, শহরের আশপাশ শুধু সংখ্যাহীন সৈন্যে ছেয়ে গেছে। ওমর এই বিশাল বাহিনী একত্র করে নিজেই পরিচালনার ভার গ্রহণ করলেন। আলীকে নিজের স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে ওমর ইরাকের দিকে অগ্রসর হলেন। বিশাল বাহিনী তিনটি প্রধান দলে বিভক্ত হলো-সম্মুখ ভাগের অধিনায়ক হলেন তালহা, জোবায়ের পেলেন দক্ষিণ বাহুর ও আবদুর রহমান-বিন-আউফ-পেলেন বাম বাহুর ভার। মদিনা থেকে তিন মাইল দূরে সরার নামক ঝর্নার পাশে শিবির স্থাপিত হলো। এখানে ওমর একটা সমর-পরিষদ গঠন করলেন, আমীরুল মুমেনীন হিসাবে তাঁর স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হওয়া সমীচীন কি না, এ প্রশ্নের মীমাংসা করতে। সাধারণ বাহিনী দাবী করলো, যুদ্ধে জয়ী হতে হলে আমীরুল মুমেনীনকে নেতৃত্ব দিতে হবে। প্রবীণ সাহাবাগণ অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা করে পরামর্শ দিলেন, খলিফার যুদ্ধ ক্ষেত্রে না যাওয়াই যুক্তিযুক্ত। তখন আলীকে নেতৃত্ব করতে অনুরোধ করা হয়, কিন্তু তিনি অস্বীকৃত হন। শেষে সা’দ-বিন-ওক্কাসই সিপাহসালার নির্বাচিত হলেন। তিনি ছিলেন রসূলে-করিমের মাতুল ও বিশিষ্ট সাহাবা। ওমর সা’দের মনোনয়ন গ্রহণ করলেন। কিন্তু সা’দের রণপটুতা ও রণকুশলতা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ না হয়ে তিনি অভিযান-নিয়ন্ত্রণের সর্ববিধ ক্ষমতা নিজের হাতেই রাখেন। বাহিনীর অগ্রগতি, যুদ্ধকালে সেনাসন্নিবেশ, আক্রমণের কৌশল নির্দেশ প্রভৃতি যুদ্ধের প্রারম্ভ থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত সর্বস্তরের পরিচালনভার তাঁরই দায়িত্বে রইল। তাঁর নির্দেশ ব্যতীত যুদ্ধসংক্রান্ত কোনও প্রশ্নের মীমাংসা করা হতো না, এমনকি মদিনা থেকে ইরাক পর্যন্ত সমস্ত পথে গতিবিধি বা ছাউনি ফেলার স্থানও তিনি বাছাই করে দিতেন 1

    সা’দ-বিন-ওক্কাস মদিনা থেকে যাত্রা করে প্রথম ছাউনি ফেলেন সালাবা নামক স্থানে। এখানে মেলার পর্যাপ্ত জিনিসপত্র ও প্রচুর পানি সরবরাহ বিশাল বাহিনীর কষ্ট লাঘব করে। সা’দ এখানে প্রায় তিনমাসকাল অবস্থান করেন। এই সময় মুসান্না প্ৰায় আট হাজার সৈন্য নিয়ে ধিকার নামক স্থানে সা’দের মিলিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু বুয়ায়েবের যুদ্ধে তিনি যে গুরুতর আঘাত পান, তাই প্রাণঘাতী হয়ে অকালে তাঁর জীবননাশ করে।

    সালাবা থেকে যাত্রা করে সা’দ শরফ নামক স্থানে ছাউনি ফেলেন। এখানে অবস্থানকালে তিনি ওমরের নিকট থেকে যুদ্ধকালে সৈন্য-বিন্যাসের ও যুদ্ধকৌশল সম্বন্ধে বিস্তৃত নির্দেশ প্রাপ্ত হন। মোট ত্রিশ হাজার সৈন্য ছিল তাঁর বাহিনীতে। তাদেরকে তিনি সাতটি দলে বিভক্ত করে এক একজন সুদক্ষ সেনানায়কের দায়িত্বে ন্যস্ত করেন। উল্লেখযোগ্য যে মশহুর ইরানী সাহাবা সমান ফারসী রসদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত হন। বদর যুদ্ধে যোগদানকারী সত্তরজন সাহাবা এবং মক্কা বিজয়ে অংশীদার বহুলোক ও সেনাবাহিনীতে উপস্থিত ছিলেন।

    শরফে অবস্থানকালেই সা’দ নির্দেশ পান, কাদিসিয়ার প্রান্তের পারসিকদের মুকাবিলা করতে। এই ছোট্ট শহরটি কুফা থেকে ত্রিশ মাইল দূরে ছিল। উহা বেশ উর্বরা ও সম্পদময়ী এবং খাল-সেতু দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে নিরাপদ স্থান ছিল। প্রাক-ইসলাম যুগে ওমর বহুবার এদিকে সফর করেছিলেন। এজন্যে স্থানটির অবস্থান, বিস্তার ও যুদ্ধকৌশলের সুবিধাদি সম্বন্ধে তিনি সম্যক অবগত ছিলেন। সা’দের উপর নির্দেশ ছিল কাদিসিয়ার বর্তমান অবস্থার সামগ্রিক বিবরণ ও ভৌগোলিক বৃত্তান্তসহ একটি নকশা প্রস্তুত করে ওমরের নিকট প্রেরণ করতে। তিনি নির্দেশমতো সমস্ত জ্ঞাতব্য বিষয় প্রেরণ করেন।

    শরফ থেকে ছাউনি তুলে সা’দ খাদিব স্থানে উপস্থিত হন। এখানে অবস্থিত পারসিকদের অস্ত্রাগার ও যুদ্ধের মালখানা বিনা আয়াসে মুসলিমরা দখল করে। সা’দ প্রত্যেক দিকে গুপ্তচর পাঠিয়ে শত্রুদের সংবাদ গ্রহণ করেন ও অবগত হন, পারসিকদের সিপাহসালার রুস্তম স্বয়ং রাজধানী মাদায়েন থেকে অগ্রসর হয়ে সাবাতে অবস্থান করছেন। এ সংবাদ ওমরকে পাঠানো হলে নির্দেশ এলো, যুদ্ধারম্ভের পূর্বে দূত পাঠিয়ে পারস্যরাজকে ইসলামে আহ্বান করা উচিত। সা’দ আরব-গোত্রসমূহের দলপতিদের থেকে গুণে ও মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ চৌদ্দজনকে নির্বাচন করে নুমান বিন-মাকরানের নেতৃত্বে পারস্য-সম্রাটের নিকট প্রেরণ করলেন।

    নওসেরওয়ার আমল ডেকে মাদায়েন ছিল পারস্যের রাজধানী। সমকালীন শ্রেষ্ঠ নগরী শোভা-সম্পদময়ী মাদায়েন ছিল কাদিসিয়া থেকে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে। আরব দূতগণ সুদর্শন অশ্বপৃষ্ঠে নির্ভয়ে পারস্য-রাজপ্রাসাদে উপস্থিত হলেন। ইয়েৰ্গিদ্‌ সুসজ্জিত জাঁকজমক ভরা বিশ্ববিশ্রুত রাজদরবারে দূতগণকে গ্রহণ করলেন। প্রাথমিক আলাপের পর ইয়েদি আরব দূতগণকে জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁর রাজ্যে আগমনের হেতু কি? দূতপ্রধান নুমান ইসলামের মহিমা কীর্তন করে জানালেন, ইসলামের প্রচারই তাঁদের উদ্দেশ্য; পারসিকরা ইসলাম গ্রহণ করে এবং এক ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে, কিংবা জিয়া কর দিয়ে মুসলিমদের আশ্রয়ে আসতে পারে, অন্যথায় অস্ত্রই এ বিরোধের মীমাংসা করবে।

    ইয়েৰ্গিদ্ উষ্মামিশ্রিত কণ্ঠে বললেন : তোমরা কি করে ভুলে গেলে, তোমরাই ছিলে দুনিয়ার দীনতম ও ঘৃণ্যতম জাতি? যখনই তোমরা ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছ, তখনই আমাদের নির্দেশে তোমাদের বিদ্রোহ চূর্ণ করে দিয়ে তোমাদের মাথা ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।

    সম্রাটের এ রূঢ় মন্তব্যে মুগিরাহ্ বিন যুরারহ্ অপমানে গর্জে উঠে বললেন: আমার সঙ্গীরা আরব-কৌলীন্যের সুষমাস্বরূপ, নম্রতাগুণে তাঁরা অতিভাষী নন। আমি এ সুযোগে কয়েকটি উপযুক্ত কথা বলতে চাই। এ কথা সত্য, আমরা ঘৃণ্য ছিলেম, অজ্ঞ ছিলেম। আমরা পরস্পর কাটাকাটি করেছি, আমাদের শিশুকন্যাদেরকে জীবন্ত কবর দিয়েছি। কিন্তু আল্লাহ্ আমাদের মধ্যে একজন নবী পাঠালেন, যিনি কুল-মানে আমাদের শীর্ষস্থানীয় ছিলেন। আমরা প্রথমে তাঁর বিরুদ্ধতা করেছি। তিনি সত্য বলেছেন, আমরা তাঁকে মিথ্যুক বলেছি। তিনি অগ্রপথে চলেছেন, আমরা পিছনে পড়ে থেকেছি। ক্রমে ক্রমে তিনি আমাদের মর্মস্পর্শ করলেন। তিনি যা বলেছেন আল্লাহ্‌র আদেশেই বলেছেন, তিনি যা করেছেন, আল্লাহ্‌র হুকুমেই করেছেন। তিনি আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, এ ধর্ম পৃথিবীর ঘরে ঘরে পৌছে দিতে। যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারাই হয়েছে আমাদের মতো সমান অধিকারে অভিষিক্ত। যারা ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে, কিন্তু জিয়া দিতে সম্মত হয়েছে, তারা ইসলামের আশ্রয় লাভ করেছে। আর যারা কোনটাই স্বীকার করে নি, তাদের সঙ্গে হয়েছে অস্ত্রে-অস্ত্রে পরিচয়।

    ইয়েৰ্গিদ্ ক্রোধে প্রদীপ্ত হয়ে বললেন, দূত অবধ্য, অন্যথায় তোমাদের কাউকে জীবিত ফিরে যেতে হতো না। তার পর তিনি এক ঝুড়ি মাটি আনিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ কে? আসিম বিন-ওমর অগ্রসর হয়ে নির্ভয়ে বললেন, সে আমি। সম্রাট তাঁরই মাথায় মাটির ঝুড়িটি বসিয়ে দিতে আদেশ দিলেন। আসিম দ্রুত গতিতে স্বশিবিরে ফিরে এসে মাটির ঝুড়িটি সা’দের সম্মুখে রেখে বললেন: মুবারক হোক! শত্রুপক্ষ স্বেচ্ছায় নিজের দেশ সমর্পণ করেছে।

    অতঃপর মুসলিম বাহিনী যুদ্ধার্থে প্রস্তুত হতে লাগলো। কিন্তু রুস্তম তবু ও গড়িমসি করে সাক্ষাৎ-যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে লাগলেন। মুসলিমরা নিকটবর্তী অঞ্চলে হামলা চালিয়ে রসদ সংগ্রহ করতে লাগলেন। ইতিমধ্যে পারসিক বাহিনীতে ভাঙ্গন ধরতে লাগলো এবং জওশনমাসহ তাদের কয়েকজন সেনানায়ক মুসলিম পক্ষে যোগ দিল। কয়েক মাস ধরে এ রকম অবস্থা চলতে থাকলে স্থানীয় বাসিন্দারা ব্যতিব্যস্ত হয়ে ইয়েদর্গিদের নিকট অভিযোগ জানালো, তাদের আর রক্ষা না করলে তারা মুসলিম পক্ষে যোগ দিতে বাধ্য হবে। তখন রুস্তম অগ্রসর হতে বাধ্য হলেন এবং ষাট হাজার সৈন্যের বিপুল বাহিনী নিয়ে কাদিসিয়ায় উপস্থিত হলেন। কিন্তু পথে তাঁর বাহিনী অত্যাচার ও ব্যভিচারের যে নারকীয় অবস্থার সৃষ্টি করলো, তাতে লোকের মনে আশঙ্কা জন্মাতে লাগলো, পারস্যে শেষের দিন সমাগত।

    সা’দ সমাগত শত্রুবাহিনীর সব খবর আনয়নের জন্যে যথেষ্ট গুপ্তচর নিয়োগ করেন। এই রকম ছদ্মবেশে ভ্রমণকালে এক গভীর রাত্রে তোলায়হা রুস্তমের বাহিনীর মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং একটি উৎকৃষ্ট সুন্দর অশ্ব নিয়ে আসেন।

    তখনও রুস্তম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এড়ানোর উদ্দেশ্যে সন্ধির প্রস্তাব পাঠান সা’দের নিকট। এবার রাবী বিন-আমীর অদ্ভুত পোশাকে সজ্জিত হয়ে রুস্তমের শিবিরে উপস্থিত হন। রুস্তম জাঁকজমকপূর্ণ দরবারে রাবীকে গ্রহণ করে জিজ্ঞাসা করেন, এদেশ হামলা করার উদ্দেশ্য কী? রাবী উত্তর দিলেন, সৃষ্টির বদলে স্রষ্টার ভজন সংস্থাপনই আমাদের লক্ষ্য। রুস্তম সন্ধির প্রশ্ন এড়িয়ে জওয়াব দিলেন, সাম্রাজ্যের প্রধানদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরে মীমাংসা হবে।

    শেষ দূত হিসেবে মুগিরাহ রুস্তমের দরবারে উপস্থিত হন। তিনি রুস্তমের আসনের পাশে বসেই আলাপ করতে উদ্যত হলেন। কিন্তু তাঁর সভাসদরা মুগিরাহ্ ব্যবহারে অপমান বোধ করে তাঁকে জোর করে আসন থেকে উঠাতে উদ্যত হলেন। তখন মুগিরাহ্ বললেন, আমি অতিথি হিসেবে এখানে এসেছি, অতএব অতিথির যোগ্য ব্যবহার পেতে চাই। আমাদের মধ্যে এ রীতি নেই যে, একজন দেবতার মতো উচ্চাসনে থাকবে, আর অন্যরা দাসের মতো প্রণতি জানাবে। তাঁর এই তেজোদীপ্ত জওয়াবে গুঞ্জন উঠলো, এ জাতিকে তুচ্ছ ভাবা আমাদের ভুল হয়েছে। তারপর রুস্তম পারস্যের সম্পদ বৈভব, শক্তি-সামর্থ্যের দীর্ঘ ফিরিস্তি গিয়ে মুরব্বির চালে বললেন, মুসলিমরা যদি এখনও ফিরে যায়, তাহলে তাদের অপরাধ মাফ করা হবে। বরং তাদের প্রত্যেককে কিছু পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। মুগিরাহ্ তখন কোমরে ঝুলায়মান তরবারির খাপে হাত রেখে বললেন, তোমরা যদি ইসলাম বা জিয়া কবুল না কর, তাহলে এর দ্বারাই মীমাংসা হবে। রুস্তম ক্রোধে অগ্নিমূর্তি হয়ে বললেন, সূর্যের শপথ! কালই আমি সমগ্র আরব ধ্বংস করবো।

    অতঃপর সাক্ষাৎ-যুদ্ধ ছাড়া আর গত্যন্তর রইলো না।

  • ইরাক-আযম বিজয়

    ইরাক-আযম বিজয়


    ইরাক-আযম বিজয়
    (প্রথম পর্যায়)

    মাদায়েনের পতনের পর পারসিক জাতি নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সম্যক অনুধাবনে তৎপর হয়। এতোদিন তারা আরব জাতিকে অসভ্য ভেবে অবজ্ঞার চোখে দেখতো। এখন বাস্তব অবস্থা তাদের মোহমুক্তি ঘটলো। এখন আরব নামেই তাদের অন্তরাত্মা কেপে ওঠে। প্রতিটি পারসিক শাসক নিজের নিরাপত্তা সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠেন এবং নিজ অনুচরদের একত্রিত করে নিজ নিজ অধিকার সংরক্ষণে প্রস্তুত হতে থাকেন। এভাবে পারস্যের প্রতি অংশে আরব অভিযানের বিরুদ্ধে সমর-ঘাঁটি গড়ে ওঠে এবং দুর্দম আরবশক্তি প্রতিহত করতে যত্নবান হয়।

    সর্ব প্রথমে জাজিরার শাসক আরবদের সঙ্গে শক্তি পরীক্ষায় অগ্রসর হন। জাজিরাহ ইরাক-আরবের সীমান্তেই অবস্থিত ছিল। সা’দ এসব সংকাদ ওমরের গোচরীভূত করলে আবদুল্লাহ বিন-আলুমুতামকে একটি বাহিনীসহ প্রেরণ করেন। ওমর অবস্থায় গুরুত্ব বিবেচনা করে সম্মুখরক্ষীদলের নায়ক রাবি বিন আল-আফকল, দক্ষিণ বাহুর নায়ক হারিস বিন হাসান, বাম বাহুর নায়ক ফারাতে বিন্-হাযান ও পঞ্চাতদলের নায়ক হানি বিন্-কয়েসকে নিয়োগ করেন। আবদুল্লাহ পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়ে প্রথমে তারকিক দুর্গ অবরোধ করেন। প্রায় একমাস ধরে এ অবরোধ চলে এবং কুড়িবার চেষ্টা করা হয় সুরক্ষিত দুর্গটি বাহুবলে অধিকার করার। শেষে যেসব আরব-গোত্র পারসিকদের সহযোগী ছিল, তাদেরকে বশীভূত করে পারসিকদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করা হয়। তাদের সহযোগিতায় পারসিকদেরকে বিধ্বস্ত করা হয় ও দুর্গটি অধিকৃত হয়।

    সতেরো হিজরীতে (৬৩৮ খ্রি.) সা’দ পাঁচ হাজার সৈন্যসহ আয়ায বিন ঘানামকে পাঠান জাজিরাহ অধিকার করতে। আয়ায শীঘ্রই অভিযান শুরু করেন এবং রিহা নামক শৈলদুর্গে ছাউনি ফেলেন। এখানকার শাসক প্রথমে বাধা দান করেন। কিন্তু সহজেই পরাজিত হয়ে বশ্যতা স্বীকার করেন এবং জিয়া কর প্রদান করতে স্বীকৃত হন। অতঃপর সমগ্র জাজিরাহ আয়াযের হস্তগত হয়। আয়ায আরও কিছুদিন অভিযান চালিয়ে রিকাহ, হারান প্রভৃতি স্থানীয় অঞ্চল সম্পূর্ণরূপে অধিকার করেন।

    পনেরো হিজরীতে মুগিরাহ বিন-শুবাহ বসরার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তিনি লক্ষ্য করলেন, বস্ত্রার অতি সন্নিকটে খুজিস্তান অবস্থিত। অতএব বস্ত্রার শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার্থে এ পারসিক রাজ্যটি আশু অধিকার করা বাঞ্ছনীয়। সতেরো হিযরীতে তিনি হরমুষ শহর নামে প্রখ্যাত আওয়ায আক্রমণ করেন। তথাকার শাসক শালিয়ানা সামান্য পরিমাণ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে শান্তি প্রার্থনা করেন। মুগিরাহ এ শর্তেই সন্তুষ্ট হন। পর বছরে মুগিরার স্থলে আবু মুসা আশারী শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। শাসক পরিবর্তনের সুযোগে আওয়ায শাসক শালিয়ানা কেবল কর দেওয়া বন্ধ করেন নি, প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করতেও প্রস্তুত হলেন। আবু মুসা ক্রুদ্ধ হয়ে আওয়ায অবরোধ করেন। পারসিকরা অসম সাহসে যুদ্ধ করে পরাজিত হয় এবং প্রায় দশ হাজার বন্দী হয়। ওমরের আদেশে পরে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। অতঃপর আবু মুসা মনাযির নামে বিখ্যাত সুরক্ষিত শহর অবরোধ করেন। কিন্তু শহরবাসীরা অতুল বিক্রমে প্রতিরোধ করে এবং মুহাজির বিন্-জিয়াদ নামক একজন মশহূর সেনানায়ককে বন্দী করে নির্মমভাবে হত্যা করে।

    আবু মুসা-মুহাজিরের ছোট ভাই রাবিকে মনাযির দখলের ভার দিয়ে শুস্ অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হন। রাবি কয়েক দিনেই মনাযির ভূমিসাৎ করে ভ্রাতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেন! আবু মুসা শুস্ অবরোধ করে বাইরের সব যোগাযোগ বন্ধ করেন। তখন স্থানীয় শাসক বাধ্য হয়ে সন্ধি করেন এই শর্তে যে, তার পরিবারের একশত মানুষকে মুক্তি দিতে হবে। শাসক নাম উচ্চারণ করতে করতে শতপূর্তি হয়ে গেল, তবু তার নাম উচ্চারিত শেষ হলো না। আবু মুসা শাসককে হত্যা করেন। অতঃপর রামহর্ষ অবরুদ্ধ হলে বার্ষিক আট লক্ষ দিরহাম কর দেওয়ার শর্তে নিষ্কৃতি পায়।

    এই সময় কিা ইয়েজ্‌দগির্দ কুম শহরে অবস্থান করছিলেন। বিখ্যাত পারসিক বীর হরমুযান কিার সমীপে উপস্থিত হয়ে প্রার্থনা করেন, আওয়ায ও ফারস্ প্রদেশের শাসনভার তাঁর হস্তে দেওয়া হোক। তিনি আরবদের অগ্রগতি রোধ করবেন। ইয়েজর্দি তাঁকে এই দুটি বিশাল প্রদেশের শাসক নিযুক্ত করেন এবং এক বিরাট বাহিনীও অর্পণ করেন। খুজিস্তানের রাজধানী শুস্তারে বহু শাহী বালাখানা ও সেনানিবাস ছিল। হরমুযান কিল্লাটির সংস্কার করে শক্তিশালী করেন এবং চারদিকে পরিখা নির্মাণ করেন। অতঃপর চারদিকে প্রচারকদল পাঠিয়ে তিনি বাসিন্দাদের ক্ষেপিয়ে তোলেন মুসলিমদের বিরুদ্ধে। যে জাতীয়তা জ্ঞান ও আরবদের প্রতি সাধারণ ঘৃণা পারসিকদের মজ্জাগত ছিল, পুনরায় তা সন্দীপিত হয় এবং দলে দলে সৈন্য সমবেত হয়। আবু মুসা খলিফার নিকট আশু সাহায্য প্রার্থনা করেন। প্রথমে কুফা থেকে নুমান বিন-মাকরান আসেন এক হাজার সৈন্য নিয়ে। কিন্তু শত্রুপক্ষের সুবিশাল বাহিনীর শাসক আমর উপস্থিত হন আরও ঊর্ধ্ব সংখ্যক সৈন্য নিয়ে। জুলুলা থেকে জরীর বেলী উপস্থিত হন একদল সৈন্য নিয়ে। এভাবে শক্তিবৃদ্ধি হওয়ায় আবু মুসা শুস্তারের শহরতলীতে উপস্থিত হয়ে শিবির স্থাপন করেন।

    হরমুযান বিশাল সংখ্যক বাহিনীর গর্বে প্রথমেই আক্রমণ করা স্থির করেন এবং অতর্কিতে মুসলিমদের আক্রমণ করেন। আবু মুসা অপূর্ব কৌশলে সৈন্য বিন্যাস করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। উভয়পক্ষ বীরবিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকে, কিন্তু মীমাংসা হয় না। শেষে বারা বিন মালিক অসমসাহসে একদল সৈন্য নিয়ে দুর্গ প্রাকারের দ্বারদেশে ছুটে যান। এখানে হরমুযান অমিতবিক্রমে যুদ্ধরত ছিলেন। দুই বীরের মিলন হলো। বারু শহীদ হলেন। তখন মুজজাত বিন সাত্তার ঝাঁপ দিয়ে হরমুযানের উপর পড়েন ও এক মারাত্মক আঘাত হানেন। হরমুযান ও এ আঘাত ও প্রতিরোধ করেন এবং আততায়ীকে হত্যা করেন। শেষে মুসলিমদেরই জয় হয় এবং এক হাজার শত্রুসেনা নিহত ও ছয়শত বন্দী হয়। হরমুযান দুর্গমধ্যেই আশ্রয় নিয়ে যুদ্ধ চালাতে থাকে।

    যুদ্ধের আর শেষ হয় না। শেষে একজন শহরবাসী আবু মুসার নিকট প্রস্তাব করে, তাকে প্রাণভিক্ষা দিলে সে নগর-প্রবেশের গুপ্তপথ দেখিয়ে দিতে পারে। আবু মুসা এ প্রস্তাবে সহজেই স্বীকৃত হন। লোকটি তখন আশরাশ নামক এক আরবীকে ভৃত্যের ছদ্মবেশে নগর প্রদেশের ভূগর্ভস্থ গুপ্তপথ দেখায়। আরও দেখায় হরমুযানের শাহী বালাখানা এবং সমগ্র শহরের প্রধান প্রধান স্থান। হরমুযান সে রাত্রে নিশ্চিন্তে সভাসদদের নিয়ে পানাহারে মত্ত ছিলেন। সবকিছু অন্ধি-সন্ধি বিশেষভাবে জ্ঞাত হয়ে আশরাশ্ আবু মুসার নিকট ফিরে আসেন এবং দাবী জানান তাঁকে দুশো প্ৰকৃত সাহসী ও বিশ্বাসী সৈন্য দিলে তিনি শহর অধিকার করতে পারেন। তখনই দুশো নির্ভীক সাহসী সৈন্য প্রস্তুত হয়ে গেল আল্লাহ্‌র রাহে প্রাণ দিতে। আশরাশ্ তাদেরকে নিয়ে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার রাত্রিতে পূর্বে দেখানো গুপ্তপথ দিয়ে দুর্গপ্রাকারের সদর দরওয়াজায় উপস্থিত হন এবং অতর্কিতে শাস্ত্রীদেরকে নিহত করে দুর্গদ্বার খুলে দেন। আবু মুসা বাহিনী নিয়ে বাহিরে সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। দুর্গদ্বার খোলা পেয়ে মুসলিম বাহিনী পঙ্গপালের মতো শহরে ঢুকে পড়ে এবং হতভম্ব শহরবাসীদেরকে সহজেই দমন করে ফেলে।

    হরমুযান হতাশ হয়ে দুর্গশীর্ষে আশ্রয় গ্রহণ করেন। আক্রমক মুসলিমরা তাঁর নিকটবর্তী হতে চেষ্টা করলে তিনি হুমকি দিয়ে বলেন : আমার তৃণীরে এখনও একশোটি শর আছে এবং একশো জন ধরাশায়ী না হওয়া পর্যন্ত আমায় কেউ বন্দী করতে পারবে না। তবে আমি এ শর্তে আত্মসমর্পণ করতে রাযী আছি, আমায় অক্ষত দেহে মদিনায় পাঠিয়ে দিতে হবে এবং আমার ভাগ্য নির্ধারণ-তা সে যা-ই হোক-ওমরের হাতেই হবে। আবু মুসা এ প্রস্তাবে সম্মত হন এবং আনাস বিন্-মালেকের সঙ্গে হরমুযানকে মদিনায় প্রেরণ করেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর পরিবারবর্গ ও অধীনস্থ কয়েকজন সরদারও যান। মদিনার নিকটবর্তী হয়ে তিনি শাহের মূল্যবান পরিচ্ছদ ধারণ করলেন, মাথায় দিলেন ‘আযিন’ নামধেয় মূল্যবান মণিমুক্তাখচিত তাজ এবং কটিতটে ঝুলতে লাগলো মহামূল্য প্রস্তরাদি খচিত তরবারির খাপ। এভাবে খুব জাঁকজমকের সঙ্গে সজ্জিত হয়ে হরমুযান মদিনায় প্রবেশ করেন ও জিজ্ঞাসা করেন, খলিফার বালাখানা কোথায়? তিনি ভেবেছিলেন, যাঁর সেনাবাহিনী কিসারার গর্ব ধূলিস্যাৎ করতে পারে এবং যাঁর নাম-যশ পৃথিবীময় কীর্তিত, তিনি নিশ্চয়ই বিশাল শাহী বালাখানায় বিশেষ সমারোহে বাস করেন। কিন্তু যখন তাঁকে মসজিদে চত্বরে ধূলিশয্যায় শায়িত ওমরকে দেখিয়ে দেওয়া হয়, তখন তাঁর বিস্ময়ের অবধি থাকে না।

    ওমর রাজসমারোহের মূর্ত প্রতীক হরমুযানকে দেখে শুধু বললেন, এসব মিথ্যাময়ী পৃথিবী মায়াময় ছলনা মাত্র। তারপর আলাপ শুরু হলো। হরমুযানের পরিচয় পেয়েই ওমর অন্তরে রোষে ফুলে উঠেছিলেন। কাদিসিয়ার যুদ্ধের পর এই লোকটি বারেবারে সা’দের সঙ্গে সন্ধির প্রতারণা করেছে। শুস্তারের যুদ্ধে এর হাতেই দু’জন মুসলিম বীর নিহত হয়েছেন। এসব চিন্তা করতে করতে ওমরের দু চোখে বহ্নিশিখা জ্বলে উঠেছিল। তিনি এমন ব্যক্তিকে প্রাণদণ্ডেরই আদেশ দিবেন, স্থিরসিদ্ধান্ত করছিলেন। কিন্তু আত্মসমর্পনের সুযোগ দিলে হরমুযান নিজের কার্যাবলীর কী সাফাই দেন, তাই তিনি নীরবে শ্রবণ করছিলেন। হরমুযান ওমরের চোখ-মুখের ভাব দেখে নিজের জীবন সম্বন্ধে সন্দিহান হয়ে বললেন : হে ওমর! যতদিন খোদা আমাদের সহায় ছিলেন, আপনারা আমাদের ক্রীতদাস ছিলেন, এখন আল্লাহ্ আপনাদের সহায় ছিলেন, তাই আমরা গোলাম হয়েছি। অতঃপর তিনি পানি চাইলেন। তাঁকে পানি দেওয়া হলো। কিন্তু পাত্রখানি হাতে নিয়ে আরয করলেন, যতক্ষণ না তাঁর পান শেষ হয়, ততক্ষণ যেন তাঁকে হত্যা করা না হয়। ওমর প্রার্থনা মঞ্জুর করেন।

    সহসা পানপাত্রটি নামিয়ে হরমুযান বললেন, আমি এ পানি পানই করবো না, এবং আপনি ওয়াদা মতো আমায় হত্যা করতে পারেন না। ওমর এ যুক্তির ফাঁকিতে আশ্চর্য হয়ে ভাবছেন, সহসা হরমুযান উচ্চকণ্ঠে কলেমা শাহাদত পাঠ করে ইসলামে তাঁর নিষ্ঠা প্রকাশ করে বললেন আমি পূর্বেই হৃদয় দিয়ে ইসলাম কবুল করেছি, কিন্তু প্রথমে তা প্রকাশ না করে এই ফন্দির আশ্রয় নিয়েছি, যাতে লোকে না ভাবে, হরমুযান তলোয়ারের ভয়ে ইসলাম কবুল করেছে। অতঃপর ওমরের সব রাগ পানি হয়ে গেল। তিনি হরমুযানকে ক্ষমা করলেন এবং মদিনায় বাস করার অনুমতি দিলেন। হরমুযানের বার্ষিক বৃত্তিও নির্দিষ্ট হলো দুই হাজার মোহর। অতঃপর হরমুযান ইসলামের হিতৈষী হয়ে ওঠেন। তিনি প্রায়ই ওমরের সাহচর্যে থাকতেন। ফারস্ ও পারস্য সাম্রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলে অভিযান চালাবার সময় ওমর বহুবার তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। পরে যখন ওমর শহীদ হন, তখন তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ ওঠে হরমুযানের বিরুদ্ধে। ওবায়দুল্লাহ্ বিনওমরের এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ থাকে না এবং তিনি হরমুযানকে নিহত করেন।

    অতঃপর শুস্তারের অনতিদূরে অবস্থিত জন্দিসাবুর অবরোধ করা হয়। কয়েকদিন ধরে এ অবরোধ চলে, কিন্তু শহরটি শায়েস্তা হয় না। হঠাৎ একদিন দেখা গেল, শহরবাসীরা সদর দরওয়াজা খুলে রেখেছে এবং নিশ্চিন্তে আপন আপন কর্ম করে যাচ্ছে। এর কারণ অনুসন্ধানে জানা গেল, মুসলিমরা জিয়া কর গ্রহণ করার শর্তে তাদের নিরাপত্তা ও শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আরও অনুসন্ধানে সঠিক জানা গেল, একজন মুসলিম গোলাম তাদের সঙ্গে এ সন্ধি করেছে। আবু মুসা এরূপ অবস্থার স্বীকৃতি দিতে রাযী না হয়ে বিষয়টি ওমরের গোচরে আনেন। ওমর নির্দেশ দেন, মুসলিমের গোলাম ও মুসলিম, অতএব তার সন্ধি করায় মুসলিমদেরই অঙ্গীকার করা হয়েছে এবং তা অবশ্য পালনীয়। জন্দিসাবুরের অধিকারে সমগ্র খুজিস্থান প্রদেশে ইসলাম বিস্তৃত হয়ে পড়ে।

    আমরা পূর্বেই লক্ষ্য করেছি, শাহানশাহ্ ইয়েজর্দি মাদায়েন থেকে ফেরার হয়ে হুলওয়ানে আত্মগোপন করেন। কিন্তু সেখানেও তাড়া খেয়ে রায় পলায়ন করেন। সেখানের শাসক আবাজাদুয়াহ্ তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে তিনি ইস্পাহান ও কিরমানের পথ ধরে খোরাসানে উপস্থিত হন এবং মার্ভ শহরে বাস করতে থাকেন। তাঁর সঙ্গে আছে পবিত্র ও অনির্বাণ পারসী অগ্নি, শাহী তাজ মহামূল্য হীরামণি-মাণিক্যাদি এবং আপন শাহী আত্মীয়স্বজন। এখানে তিনি পবিত্র অগ্নির জন্যে একটি মন্দির নির্মাণ করেন এবং আপাতত কোন দিক থেকে বিপদের আশঙ্কা নেই দেখে কতকটা নিশ্চিন্ত হয়ে পূর্বতন শানশওতসহ শাহী দরবার স্থাপন করেন। ইতিমধ্যে দুঃসংবাদ আসে যে, খুজিস্তান আরবদের অধিকারে চলে গেছে এবং সাম্রাজ্যের প্রধান স্তম্ভ হরমুযানও বন্দী হয়ে মদিনায় প্রেরিত হয়েছেন। এসব সংবাদে ইয়েজ্‌গিদ পিঞ্জরাবদ্ধ কেশরীর ন্যায় রাগে ফুলতে লাগলেন। সত্য বটে তিনি রাজধানী থেকে বিতাড়িত ও পূর্বেকার সুখস্বর্গ থেকে বিচ্যুত কিার সে ত্রাসসঞ্চারী শক্তিমত্তা ও মানমর্যাদা ধুল্যবলুণ্ঠিত; কিন্তু তবুও তিনি তিন হাজার বছরের ঐতিহ্যশালী শাহী বংশের উত্তরাধিকারী। এ সুনাম এতো সহজে মুছে যেতে পারে না। আর এতোদিন পারসিকদের ও প্রদেশসমূহের শাসককুলের ধারণা ছিল যে, আরব-অভিযান একটা সাময়িক ঘূর্ণিবায়ু মাত্র, যার আবর্তে পারস্য-সীমান্ত পর্যন্ত আবর্তিত হয়ে সব শান্ত হয়ে যাবে, অভ্যন্তরে তার স্পর্শ লাগবে না। কিন্তু খুজিস্তান পর্যন্ত আরব অধিকার বিস্তৃত হওয়ায় তাদের মোহমুক্তি হয়ে গেল। তারা সভয়ে দেখলো, মুসলিমরা তাদের গৃহে প্রবেশ করতে আরম্ভ করেছে, তাদেরকে আশ্রয়চ্যুত করে তাদের ঘরবাড়ী, ধনসম্পদ দখল করেছে। তখন শাসককুল পরস্পর যোগাযোগ করে এই বহিঃশত্রুকে আর অগ্রসর হতে না দেওয়ার উদ্দেশ্যে এক যোগে প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত হতে লাগলেন। তাবারিস্তান, জুর্জান, দমাত্তন্দ, রায়, ইস্পাহান, হামদান এমনকি সুদূর খোরাসান ও সিন্ধুর সীমান্ত পর্যন্ত সমগ্র পারসিক সাম্রাজ্যের প্রত্যেক প্রদেশের শাসকরা একযোগে সমর-প্রস্তুতিতে সমগ্র জনগণকে মাতিয়ে তুললেন।

    সময় ও সুযোগ বুঝে ইয়েজর্দি এসব শাসকের নিকট বিশেষ দূত পাঠিয়ে নির্দেশ দিতে লাগলেন আর একবার সকলের শক্তির সমবায়ে সাধারণ শত্রুকে প্রতিরোধ করতে ও নিশ্চিহ্ন করতে হবে। এসব উদ্যম আয়োজনের ফলে দেড় লক্ষ সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী সমবেত হলো কুম্ শহরের বিশাল প্রান্তরে। এখানে বিভিন্ন কারখানায় সমরাস্ত্র প্রস্তুত হতে লাগলো। হরমুযের পুত্র মরদান শাহকে ইয়েজর্দি এই বিশাল বাহিনীর সিপাহসালার নিযুক্ত করেন এবং নির্দেশ দেন, অবিলম্বে নিহাওন্দে যাত্রা করে আরবদের মুকাবিলা করতে। পুরাকালের মন্ত্রপূত ‘কাভাহ্’ ঝাণ্ডা উড়তে লাগলো মরদান শাহের মাঙ্গলিক ধ্বজা হয়ে।

    কুফার শাসনকর্তা আম্‌মার বিন-ইয়াসির পারসিক পক্ষের সব সমরায়োজনের বিস্তৃত বিবরণী পাঠালেন ওমরের নিকট। ওমর মসজিদে-নববীতে সমবেত জনগণের সম্মুখে সে বিবরণী পাঠ করে বললেন: হে আরবের জনগণ! এবার পারসিকরা একযোগে কোমর বেঁধে দাঁড়িয়েছে, দুনিয়া থেকে মুসলিমদের চিহ্ন মুছে দিতে। এখন কী করণীয় আমাদের? তালহা বিন্ ওবায়দুল্লাহ্ বললেন: হে আমিরুল মুমেনীন! দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তোমায় বিচক্ষণ করে তুলেছে। আর আমরা তোমার হুকুম তামিল করা বই কিছু জানি নে। ওসমান পরামর্শ দিলেন: আমার মতে এখনই সিরিয়া, ইয়ামেন ও বসরার শাসকদের নির্দেশ দেওয়া হোক, অবিলম্বে নিজ নিজ বাহিনীসহ ইরাক রওয়ানা হতে, আর আপনি স্বয়ং মদিনাবাসীদের নিয়ে রওয়ানা হোন। কুফার সমস্ত সৈন্য আপনার ঝাণ্ডার নিচে সমবত হোক, আর সেখান থেকে আমরা একত্রে নিহাওয়ন্দের দিকে রওয়ানা হবো। সকলেই সমন্বয়ে এ প্রস্তাব সমর্থন করলো, শুধু আলী প্রথম নীরব রইলেন। ওমর তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করলে তিনি পরামর্শ দিলেন: সিরিয়া ও বসরা থেকে সমস্ত সৈন্য চলে গেলে সীমান্তস্থিত শত্রুরা আমাদের অধিকৃত অঞ্চল দখল করে ফেলবে, আর আপনি মদিনা থেকে চলে গেলে সারা আরবে এমন সাংঘাতিক আন্দোলন উঠবে, যা দমন করা কঠিন হবে। অতএব, আমার মতে আপনি মদিনাতেই থাকুন, আর সিরিয়া, ইয়ামেন ও বসরা থেকে এক তৃতীয়াংশ করে সৈন্যসংখ্যা ইরাকে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হোক। ওমর এ পরামর্শ সমীচীন মনে করেন। কিন্তু তবু প্রশ্ন থেকে যায়, কার হাতে এ অভিযানের ভার দেওয়া যায়?

    ওমরের একটি প্রকৃষ্ট গুণ এই ছিল যে, তিনি মানুষের গুণ ও সামর্থ্যের প্রকৃত সমঝদ্বার ছিলেন। সকলেই তাঁর এ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জ্ঞাত ছিল। এ জন্যে সকলেই একবাক্যে জানালো, ওমরই সমর-নেতা নির্বাচন করুন। ওমর নুমান বিন্ মাকরানকে সিপাহসালার নিযুক্ত করেন। নুমান ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে নিহাওন্দের দিকে যাত্রা করেন। বহু প্রবীণ সাহাবা এ যুদ্ধে শরীক হন। চরমুখের সংবাদ অবলম্বন করে নুমান বিনা বাধায় নিহাওন্দ থেকে নয় মাইল দূরবর্তী স্থান ইস্পাহানে উপস্থিত হয়ে ছাউনি ফেলেন। ওমরের নির্দেশে ফাসে অবস্থিত মুসলিমরা সেদিকের পারসিকদের নিহাওন্দ যাত্রাপথে বাধাদান করে।

    উভয়পক্ষে প্রস্তুতি হতে লাগলো সম্মুখ যুদ্ধের। পারসিকরা প্রথমে সন্ধির প্রস্তাব দিয়ে দূত চেয়ে পাঠালো। এ কাজে পারদর্শী মুগিরাহ বিন-শুবাহুকে প্রেরণ করা হয়। তিনি পূর্বে ইয়েজগির্দের নিকট ও রুস্তমের নিকট দৌত্যগিরি করেছিলেন। মরদান শাহ্ শান-শওকতের সঙ্গে দরবার সাজিয়ে স্বর্ণসিংহাসনে বসলেন হীরা-মাণিক্য-খচিত মুকুট পরে। তাঁর দুপাশে বসলেন শাজাদারা ও সাম্রাজ্যের আমীররা স্বর্ণমুকুট মাথায় দিয়ে সোনার জরি-মিশ্রিত রেশমী পরিচ্ছদে এবং দুহাতে স্বর্ণ বলয়ে শোভিত হয়ে। পিছনের দুসারিতে খাড়া হলো উন্মুক্ত ও ঝলসিত তরবারি হস্তে রক্ষী সেনাদল। সন্ধি সম্বন্ধে আলোচনা শুরু হলে মরদান শাহ্ প্রভুত্বব্যঞ্জকস্বরে বললেন: হে আরববাসীরা! যদি কোনও জাতি ঘৃণ্য হিসেবে অন্য সব জাতিকে অতিক্রম করে থাকে, তা সে তোমরাই। আমার সিংহাসনের চতুর্দিকে দণ্ডায়মান তীরন্দাজরা এক নিমেষে তোমার ভাগ্য শেষ করে দিতে পারে। কিন্তু তোমাদের দূষিত রক্তে তাদের তীর কলঙ্কিত করতে চাই নে। তোমরা এখনই আমাদের রাজ্যসীমা ত্যাগ করলে তোমাদের ক্ষমা করে দেবো। মুগিরাহ্ শ্লেষমিশ্রিত কণ্ঠে জওয়াব দিলেন: আপনি সত্যই বলেছেন, আমরা ঘৃণ্য ও অস্পৃশ্য। কিন্তু এদেশের সম্পদরাশি আমাদের দেহ যতক্ষণ ভূমিসাৎ না হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা এসব বিলাস ত্যাগ করে এক পাও নড়বো না। মুগিরাহ্ আর বাক্যব্যয় না করে স্থান ত্যাগ করলেন এবং সন্ধির সব আশা নির্মূল হয়ে গেল।

    অতঃপর উভয়পক্ষে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো। পারসিকরা নিজেদের সম্মুখে বিস্তীর্ণ স্থান জুড়ে গোখরু কাঁটা ছড়িয়ে দিল। তাঁর ফলে মুসলিমদের সম্মুখে অগ্রসর হওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে, কিন্তু পারসিকরা সুযোগ মতো আক্রমণ করতে থাকে। তখন তোলায়হার উপদেশ মতে মুসলিম বাহিনী ছয় সাত মাইল দূরে যুদ্ধার্থে প্রস্তুত হয়ে রইলো এবং কাকা’ একদল বাহিনী নিয়ে নগর আক্রমণ করতে অগ্রসর হলেন। পারসিকরা শহর ছেড়ে তাদের আক্রমণ করলে তারা পিছু হটতে লাগলো এবং এভাবে পারসিকরা গোখরু কাঁটার এলাকা ছাড়িয়ে মুসলিমদের ধাওয়া করলো। তাদের আক্রমণে মুসলিমরা হতাহত হতে লাগলো, তবুও নুমান প্রতি আক্রমণের নির্দেশ দেন না। মুগিরাহ ও অন্যান্য সেনানায়করা বারবার আক্রমণ করতে চাইলেন। কিন্তু নুমান আঁ-হযরতের নিয়মানুযায়ী দ্বিপ্রহর অতীতের অপেক্ষা করতে লাগলেন। সূর্য দ্বিপ্রহরের রেখা অতিক্রম করলেই মুসলিমরা বীরবিক্রমে যুদ্ধ আরম্ভ করে। হতাহতের সংখ্যায় যুদ্ধক্ষেত্রে পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং রক্তেরও স্রোত বইতে থাকে। সহসা নুমানের অশ্ব হোঁচট খেয়ে তাঁকে নিয়ে পড়ে যায় ও তিনি মারাত্মক আঘাত পান। সঙ্গে-সঙ্গে তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা নুয়ায়েম তাঁর টুপি মাথায় পড়ে ও ঝাণ্ডা হাতে করে তাঁর অশ্বে সওয়ার হয়ে যুদ্ধের নির্দেশ দিতে লাগলেন। সাধারণ সৈন্যরা নুমানের অবস্থা জানতে পারলো না। নুমান কড়া আদেশ দিলেন, তাঁর দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে। সন্ধ্যার পূর্বেই মুসলিম পক্ষের জয় সূচিত হলো এবং পারসিকরা বিধ্বস্ত হয়ে গেল।

    নুমান তখনও জীবিত ছিলেন। একজন সেনা তাঁকে বিজয়-সংবাদ দিলে তিনি আল্লাহ্ শুকরগুজারী করে নির্দেশ দেন, এখনই খলিফার নিকট সংবাদ পাঠাও। তারপর তিনি জান্নাতবাসী হন।

    অতঃপর হুদায়ফাহ্ বিন্-ইয়ামান মুসলিমদের সিপাহসালার নিযুক্ত হন। তিনি বিজয়-গৌরবে নিহাওন্দে প্রবেশ করেন। সেখানে একটি অতি প্রাচীন অগ্নি-মন্দির ছিল। মন্দিরের পুরোহিত তাঁর সম্মুখে কিরা পারভেজের সঞ্চিত এক পেটিকা বহুমূল্য মণি মুক্তা উপস্থিত করে। হুদয়াফাহ্ মালে-গনিমাত বিজয়ী সেনাদের মধ্যে বিভাগ করে দিয়ে তার এক পঞ্চমাংশ ও উক্ত পেটিকাটি মদিনায় প্রবেশ করেন। ওমর কয়েক সপ্তাহ যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদ না পেয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন। এখন বিজয় বার্তা পেয়ে আনন্দে অধীর হলেন। কিন্তু নুমানের শাহাদতের সংবাদ শোনা মাত্র তিনি ক্রন্দন করতে লাগলেন। কাসেদ তাঁকে মৃতদের নাম বলতে থাকে। শেষে বলে, আরও যারা শহীদ হয়েছে তাদের নাম সে জানে না। ওমর কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তাদের চিনে নেবেন। মণি-মুক্তার পেটিকা তাঁর সম্মুখে উপস্থিত করা হলে তিনি বললেন, এসব আমার সম্মুখ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাও। হুদায়ফাকে বলো, এ সমস্ত বিক্রয় করে সংগৃহীত অর্থ সৈন্যদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে। সেগুলি বিক্রয় করে পাঁচ কোটি দিরহাম পাওয়া যায়। মুসলিমরা যুদ্ধের পর পারসিকদের হামাদান পর্যন্ত তাড়া করে। প্রায় ত্রিশ হাজার পারসিক নিহাওন্দের যুদ্ধে নিহত হয়। মুসলিমরা এ যুদ্ধকে ‘বিজয়ের বিজয়’ নামে অভিহিত করেন।

    এখানে একটি কথা উল্লেখযোগ্য, এই যুদ্ধেই ফিরোয় নামে একজন পারসিক বন্দী হয়। এই ফিরোযই পরবর্তীকালে ওমরকে হত্যা করেছিল।

  • সিরিয়া বিজয়

    সিরিয়া বিজয়


    সিরিয়া বিজয়
    (প্রথম পর্যায়)

    ওমরের খেলাফত আমলে সিরিয়া বিজয়-কাহিনী শুরু করার আগে কিছুটা পূর্বকাহিনীর উল্লেখ করা দরকার।

    সিরিয়া ছিল পূর্ব-রোমক বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। এ অঞ্চলটি ছিল ছয়টি প্রদেশে বিভক্ত, তাদের মধ্যে দামেশক, হিম্‌স, জর্দান ও প্যালেস্টাইন ছিল বিখ্যাত ও শক্তিশালী। সিরিয়ার অধিবাসীরা ছিল প্রধানত গ্রীক্ বা ইস্টার্ন চার্চের অনুসারী খ্রিস্টান। ইসলামের আবির্ভাবকালে হিরাক্লিয়াস ছিলেন রোম সম্রাট। তিনি খ্রিস্টধর্মের পবিত্রতা ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সংহতি ও শৃঙ্খলার স্থাপয়িতা হিসেবে কীর্তিত।

    ৬২৯ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে হিরাক্লিয়াস যখন পারসিকদের নিকট থেকে উদ্ধারকৃত আদি ও পবিত্র ক্রুশ জেরুজালেমে পুনঃ স্থাপনের উৎসবে ব্যস্ত ছিলেন, তখন সংবাদ আসে যে, জর্দান সীমান্তে এক আরব অভিযান অনায়াসে প্রতিরোধ করা হয়েছে। এ অভিযান ছিল মুতায়, আঁ-হযরতের পোষ্যপুত্র জায়েদের নেতৃত্বে। তিনি তিন হাজার সৈন্য নিয়ে মুতায় অভিযান করেন বস্ত্রায় গাস্সানী রাজার নিকট আঁ-হযরতের প্রেরিত দূতের হত্যার প্রতিশোধ তুলতে কিন্তু তিনিও শহীদ হন। খালিদ-বিন্-ওলিদ বহুকষ্টে অবশিষ্ট সৈন্যদের মদিনায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। পরবর্তী সালে (৬৩০ খ্রি.) রসূলে করীম স্বয়ং তাবুতে অভিযান করেন এবং রক্তহীন সংঘাতে কয়েকটি মরূদ্যান আরবদের হস্তগত জয়। আবুবকর ‘রিদ্দা’ বা অবিশ্বাসীদের বিদ্রোহ দমনের পর সিরিয়ার প্রতি দৃষ্টিপাত করতে সক্ষম হন। তের হিজরীর প্রথম ভাগে (৬৩৪ খ্রি.) তিনি সিরিয়ার বিভিন্ন অংশে একযোগে অভিযান চালাবার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। আবুওবায়দাহ্ হিমস্ দখল করতে, ইয়াজিদ বিন্ আবু সুফিয়ান দামেশ্বক দখল করতে, শুরাহ্বিল জর্দান আক্রমণ করতে এবং আমর বিন্-আল-আস্ প্যালেস্টাইন অধিকার করতে আদিষ্ট হন।

    এ চারটি অভিযানকারী বাহিনীর সংখ্যা ছিল চল্লিশ হাজার। আরবসীমান্ত অতিক্রম করে তাঁরা প্রত্যেকেই বিরাট সংখ্যক রোমক সৈন্যের সম্মুখীন হন। রোম-সম্রাট পূর্বেই চরমুখে এসব আরব-অভিযানের পরিকল্পনা অবগত হয়ে বিপুল বাহিনী সংগ্রহ করেন, প্রত্যেককেই পৃথকভাবে যুদ্ধদান করতো। মুসলিম সেনানায়করা তখন একত্রিত হয়ে যুদ্ধার্থে প্রস্তুত হন ও আরও সৈন্য ভিক্ষা করে মদিনায় সংবাদ পাঠান। আবুবকর তখনই আদেশ দিলেন, ইরাক-অভিযানে ব্যস্ত খালিদকে অবিলম্বে সিরিয়ায় গমন করতে। খালিদ পথিমধ্যে শত্রুপক্ষের সকল বাধা অতিক্রম করে দামেশকের নিকট উপস্থিত হয়ে শিবির স্থাপন করেন। রোম সম্রাট একদল সেনা পাঠান আনাদায়েনে আরবদের গতিরোধ করতে। কিন্তু খালিদ ও আবুওবায়দাহ্ রোমক বাহিনীর পূর্বেই আনাদায়েনে উপস্থিত হন। শুরাহবিল, ইয়াজিদ, আমর একে একে পরে উপস্থিত হলেন। এখানে উভয়পক্ষের ভীষণ যুদ্ধ হয় এবং মুসলিমদের তিন হাজার সৈন্য নিহত হলেও তাদেরই জয়লাভ হয়। অতঃপর খালিদ পুনরায় দামেশকে উপস্থিত হন এবং চতুর্দিক থেকে শহরটি অবরোধ করেন। ঠিক এই সময়ে আবুবকরের ওফাত হয় ও ওমর খলিফার পদে অভিষিক্ত হন।

    দামে ছিল সিরিয়ার বৃহত্তম ও ধনসম্পদময়ী শ্রেষ্ঠ নগরী। প্রাক্ ইসলামী যুগ থেকে আরব সওদাগররা এখানে যাতায়াত করতো এবং শহরের শান-শওকত ও শোভা-সম্পদের কাহিনী সারা আরবে মুখে মুখে কীর্তিত হতো। এ সুরক্ষিত শহরটি অবরোধকালে খালিদ বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করেন। নগর-প্রাকারের তিনটি দ্বারে অন্য তিন মশহুর সেনানায়ক মোতায়েন করে খালিদ স্বয়ং পূর্ব দিকের প্রধান দ্বারে পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়ে অবস্থান করেন। ছয় মাস ধরে এ ভীষণ অবরোধ চলে। সিরিয়ার তীব্র শীতে আরবরা কাবু হয়ে স্থানত্যাগ করতে বাধ্য হবে, এ ভরসা মিথ্যা হয়। খালিদ পূর্ব থেকেই ধুঘিলায় সৈন্য মোতায়েন করে বাহির থেকে সাহায্য প্রেরণের পথও বন্ধ করে দেন। তার দরুন হিম্‌স অঞ্চল থেকে হিরাক্লিয়াস কর্তৃক প্রেরিত সাহায্য বাহিনীও পথিমধ্যে রুদ্ধ হয়ে যায়। শহরবাসীরা হতাশায় নিমজ্জিত হতে থাকে। এই সময়ে নগরপালের এক পুত্র জন্মে এবং শহরবাসীরা তার জন্মোৎসবে পানাহারে মত্ত হয়ে ওঠে। খালিদ অবস্থার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেন। চারদিকের পরিখা পানিতে পরিপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও অসম-সাহসিক খালিদ রাত্রির অন্ধকারে কয়েকজন সঙ্গীসহ মশক বুকে ধরে পরিখা পার হন এবং দড়ির মই বেয়ে কৌশলে সুউচ্চ প্রাচীর পার হয়ে ভিতরে প্রবেশ করেন তার পর ক্ষিপ্রগতিতে দ্বাররক্ষীদের হত্যা করে তালা ভেঙ্গে দেন। বাইরে প্রতীক্ষমাণ আরব সৈন্য বন্যার মতো শহরে প্রবেশ করে। খ্রিষ্টানরা আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে অপর দ্বারগুলিও খুলে দেয় এবং আবুওবায়াদার শরণাপন্ন হয় খালিদের রুদ্ররোষ থেকে তাদের রক্ষা করতে। বিনা যুদ্ধে শহরটি অধিকৃত হয় এবং শহরবাসীদের সঙ্গে সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হয়। এই সন্ধিশর্তগুলি পরবর্তীকালে সিরীয়-প্যালেস্টাইনের অধিকৃত সব শহরের সঙ্গে সন্ধিকালে আদর্শ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় সেগুলি উল্লেখযোগ্য:

    পরম করুণাময় ও কৃপানিধান আল্লাহ্‌র নামে খালিদ-বিন্-অলিদ দামেশক প্রবেশকালে শহরবাসীকে এসব দান করেছেন: তিনি তাদের জীবন, সম্পদ ও মন্দিরসমূহের নিরাপত্তা প্রতিজ্ঞা করেছেন। নগর প্রাচীন ভূমিসাৎ করা হবে না, কোনও মুসলিমকে তাদের গৃহে স্থান দেওয়া হবে না। এতদ্বারা আমরা তাদেরকে আল্লাহর চুক্তি এবং তাঁর নবীর, খলিফাদের ও মুমেনদের আশ্রয় দান করছি। যতদিন তারা জিয়া আদায় করবে তাদের ভাগ্যে মঙ্গলই বর্ষিত হবে।

    দামেকের পতন রোমকদের হতাশ করে। কিন্তু হতোদ্যম না হয়ে তারা সৈন্য সংগ্রহ করতে লাগলো পুনরায় শক্তি-পরীক্ষা করতে। মুসলিম বাহিনী অতঃপর জর্দান প্রদেশে অভিযান করে। সীজার হিরাক্লিয়াস দামেশক রক্ষার্থে যে বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন, সে বাহিনীসহ রোমকরা প্রায় চল্লিশ হাজার সৈন্য একত্রিত করে এবং সিফলার নামক রোমক-সেনানায়কে অধীনে প্রদেশের প্রধান শহর বাইসনে মুসলিমদের গতিরোধ করে। মুসলিম বাহিনী ফাহ নামক স্থানে যুদ্ধার্থে প্রস্তুত হয়। রোমকরা মধ্যবর্তী স্থানের জলনালীগুলি পানিতে পূর্ণ করে দিয়ে মুসলিমদের অগ্রগতিতে বাধা দেয়। কিন্তু খ্রিস্টানরা জয় সম্বন্ধে আশান্বিত না হয়ে সন্ধির প্রস্তাব করে। আবু ওবায়দাহ দূত হিসেবে মুয়ায-বিন-জবলকে প্রেরণ করেন। রোমকরা সোনার জরি দিয়ে তৈরী রেশমী বস্ত্র বিছিয়ে আলোচনার জন্যে শান-শওকতপূর্ণ দরবার করে। মুয়ায মাটিতেই বসেন এই বলে যে, দরিদ্রকে শোষণ করে যে গালিচা তৈরী, তার উপর বসতে তিনি ঘৃণাবোধ করেন। দাসরা যদি মাটিতেই বসে, তা হলে তাঁর চেয়ে আল্লাহ্‌র হীনতম দাস আর কেউ নেই। রোমকরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করে, তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি মুসলিমদের মধ্যে আর অছে কি-না। তিনি জওয়াব দেন, আল্লাহ্ দোহাই, আমি এ কথা চিন্তা করতে পারি নে। আমি তো সবার অধম। আলোচনা আরম্ভ হলে রোমক মুখপাত্র বলেন : আমরা জানতে চাই, কি উদ্দেশ্যে তোমরা এদেশে এসেছো। হাবশীদের দেশ তোমাদের নিকটবর্তী। পারস্যে এখন একজন রমণী মাত্র সিংহাসনাসীনা এবং তথায় বিশৃঙ্খলা চলছে। এসব দিকে নযর না দিয়ে তোমরা কোন্ সাহসে আমাদের রাজ্যে প্রবেশ করেছো, যেখানে সীজার সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নৃপতি আর আমরা সংখ্যায় আকাশের তারকারাশির চেয়ে কিংবা পৃথিবীর অণু-পরমাণুর চেয়েও সংখ্যাবহুল? মুয়ায জওয়াব দিলেন: আমাদের প্রথম অনুরোধ, ইসলাম কবুল করো এবং মদ্যপান ও শূকর আহার ত্যাগ করো। যদি এটি স্বীকার করো, তা হলে তোমরা আমাদের ভাই। যদি ইসলাম কবুল না করো, তা হলে জিয়া দাও। তাও স্বীকার না করলে অস্ত্রেই বিরোধের মীমাংসা হবে। তোমরা সংখ্যার ভয় দেখাচ্ছো, তার পরোয়া আমরা করি নে, সংখ্যার গুরুত্বে আমাদের কিছু আসে যায় না। রোমকরা তখন প্রস্তাব দেয়, বল্‌কা শহর আরবের নিকটবর্তী জর্দানের সীমান্ত অংশ-সমূহ তারা সমর্পণ করতে রাযী আছে এই শর্তে যে, মুসলিমরা তাদের দেশ ত্যাগ করবে। মুয়ায এ শর্তও অগ্রাহ্য করে প্রস্থান করেন।

    তখন রোমকরা সেনাপতি আবু ওবায়দার সঙ্গে সরাসরি সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে দূত প্রেরণ করে। দূতবর মুসলিম শিবিরে উপস্থিত হয়ে দেখেন, সেনাপতি আবুওবায়দা হ্ সাধারণ সৈন্যের মতো পোশাক পরে সকলের মাঝে মাটিতে বসে আছেন। আলোচনা আরম্ভ হলে দূতবর প্রস্তাব দেন, প্রত্যেক মুসলিমকে দুটি ‘সোনার মোহর’ দেওয়া হবে এবং তাই গ্রহণ করে আবুওবায়দাহ্ দেশ ত্যাগ করবেন। আবুওবায়দাহ্ ঘৃণাভরে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তখন উভয়পক্ষ যুদ্ধাৰ্থে প্ৰস্তুত হয়।

    রোমকরা প্রায় পঞ্চাশ হাজার সৈন্য দুই দিন ধরে সুকৌশলে সন্নিবেশিত করে। তার পর তিনদলে বিভক্ত হয়ে একের পর এক বীরবিক্রমে মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। খালিদ প্রথমে প্রতিরক্ষায় ব্যস্ত থাকেন, শেষে শত্রুপক্ষকে ক্লান্ত দেখে একযোগে আক্রমণ শুরু করেন। রোমকরা আক্রমণের বেগ সহ্য করতে না পেরে পিছু হটতে থাকে। সুযোগ বুঝে খালিদ ঝাঁকে ঝাঁকে সৈন্য প্রেরণ করে রোমকদের বিধ্বস্ত করতে থাকেন। হাশিম-বিন্ ওত্বা অশ্ব ছেড়ে খোলা তলোয়ার হাতে শত্রুপক্ষের মধ্যস্থলে উপস্থিত হন। মাত্র এক ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর রোমকরা পরাজিত হয়ে বিক্ষিপ্তভাবে পলায়ন করতে থাকে। আবুওবায়দাহ্ খলিফার নিকট বিজয়-বার্তা প্রেরণ করেন এবং বিজিত খ্রিস্টানদের সঙ্গে কিরূপ ব্যবহার করা যেতে পারে, তার নির্দেশ প্রার্থনা করেন। ওমর নির্দেশ দেন যে, বিজিত লোকদের জিয়া করদাতার সমান অধিকার দেওয়া হবে এবং কৃষিযোগ্য কোনও জমি থেকে মালিককে বঞ্চিত করা হবে না।

    এ যুদ্ধের পর জর্দান প্রদেশের অন্যান্য কিল্লা ও শহর সহজেই পদানত হয়, এবং শান্তি স্থাপিত হয়। বিজিত জাতির জীবন; সম্পদ, জমি, বাসগৃহ, মন্দির, গির্জা সমস্তই নিরাপদ ঘোষণা করা হয়। কেবলমাত্র কয়েকটি স্থান দখল করে মসজিদ নির্মিত হয়।

    অতঃপর হিস অভিযানের প্রস্তুতি শুরু হয়। সিরিয়ার মধ্যে হিম্‌স ছিল অতি প্রাচীন শহর, তার ইংরেজী নাম ইমেসা। অতি প্রাচীন কাল থেকে এখানে একটি সূর্য মন্দির ছিল। দামেশকের পর জেরুজালেম, ইমেসা ও অস্তিয়ক ছিল সিরিয়ার বিখ্যাত শহর এবং ইমেসা ছিল অন্য শহর দুটি পথিমধ্যে। তখন আন্তিয়কে সীজারের শাসনকেন্দ্র ছিল। অতএব অভিযান পথে প্রথমেই ইমেসা অধিকার করা স্থির হয়। পথিমধ্যে বল্‌বক্ শহর সামান্য যুদ্ধেই বিজিত হয়। কিন্তু রোমকরা ইমেসার নিকট গতিরোধ করতে একত্রিত হয়। পথিমধ্যে ছোটখাট বাধা সহজেই অতিক্রম করে খালিদ ও আবুওবায়দাহ্ একযোগে ইমেসা অবরোধ করেন। তীব্র শীত শুরু হওয়ায় রোমকরা চিন্তা করে, মুসলিমরা সহজেই স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হবে। সীজারও একদল সৈন্য প্রেরণ করেন ইমেসার সাহায্যার্থে, কিন্তু সা’দ বিন্ আবি ওক্কাস্ ইরাক থেকে সংবাদ অবগত হয়েই এ সৈন্যদলটিকে ইমেসার পথে আটক করেন। শীতেও মুসলিমরা কাবু না হয়ে অবরোধ আরও প্রচণ্ড করে তোলে। তখন ইমেসাবাসীরা হতাশ হয়ে সন্ধি ভিক্ষা করে।

    আবু ওবায়দাহ্ ইমেসার শাসনভার ওবায়দাহ্ বিন্-সামতের হাতে অর্পণ করে হিমাত শহরের দিকে অগ্রসর হন। হিমাতবাসীরা বিনাবাধায় আত্মসমর্পণ করে ও জিয়া আদায় করতে রাযী হয়। অতঃপর আবুওবায়দাহ্ শিয়ার, মিরাতুল-নুমান প্রভৃতি স্থান অধিকারকালে লাধকিয়া বা আমাপ্‌না নামক প্রাচীন শহরের দিকে অগ্রসর হন। আবুওবায়দাহ্ কৌশল করে শহরটি অধিকার করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল অন্তিয়ক পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে স্বয়ং সীজার হিরাক্লিয়াসকে বিতাড়িত করা কিন্তু সহসা খলিফার ফরমান আসে, অগ্রগতি বন্ধ করার। অতঃপর খালিদ দামেশকে আমর জর্দানে ও আবুওবায়দাহ্ ইমেসায় শক্তিকেন্দ্র স্থাপন করে বিজিত প্রদেশসমূহে মুসলিম শাসন সুদৃঢ় করতে চেষ্টিত হন।

    দামেস্ক ইমেসা প্রভৃতি স্থানে উপর্যুপরি ভাগ্যবিপর্যয়ের পরে রোমকরা অন্তিয়কে পলায়ন করে ও সীজার হিরাক্লিয়াসের নিকট আক্ষেপ জানায়, আরবজাতি সারা সিরিয়াকে ধ্বংস করে দিল। তিনি রাজ্যের সমস্ত আশ্রয় ভিখারী জ্ঞানী ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকের ডেকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন আরবদের মতো সংখ্যাল্প এবং শক্তিতে ও যুদ্ধাস্ত্রে অপেক্ষাকৃত হীন জাতির নিকট রোমকরা বারবার মার খাচ্ছে? একজন জ্ঞান-প্রবীণ রোমক জওয়াব দেন: আরবদের নীতিজ্ঞান আমাদের চেয়ে অনেক উর্ধ্বে। তারা রাতে এবাদত করে, দিনে রোযা রাখে। তার কাউকে অন্যায় আঘাত করে না এবং সকলেই সমান সমান। অন্যদিকে আমরা মদ্যপান করি, বিলাস-বাসনে সময় কাটাই। আমরা প্রতিজ্ঞা রক্ষা করি নে এবং দুর্বলকে পীড়ন করি। চরিত্রের এই বৈপরীত্যের দরুন তাদের সব কাজে দৃঢ়তা ও উৎসাহের চিহ্ন সুপরিস্ফুট; আর আমাদের সব কাজে কেবল অস্থিরমতিত্ব ও দুর্বলতা। সীজার অবস্থা অনুধাবন করে সিরিয়া ত্যাগ করে কনস্টান্টিনোপলে ফিরে যাবেন স্থির করেছিলেন, কিন্তু খ্রিস্টানরা ক্রমাগত শহরে উপস্থিত হয়ে ‘রক্ষা করুন, রক্ষা করুন’ ফরিয়াদ করছিল। এতে সীজারের গর্ব ও অহমিকায় আঘাত লাগে। এবং তিনি প্রতিজ্ঞা করেন সাম্রাজ্যের সব শক্তি, সব সামার্থ্য একত্রিত করে আর একবার আরবজাতির উপর শেষ আঘাত হানবেন। তিনি রোম, কনস্টান্টিনোপল, জাজিরাহ্, আর্মেনিয়া প্রভৃতি সাম্রাজ্যের সব শক্তিকেন্দ্রে নির্দেশ পাঠান, নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে সৈন্যশক্তি উজাড় করে রাজধানী আন্তিয়কে প্রেরণ করতে। প্রত্যেক শহরেও নির্দেশ গেল, সমগ্র জনবল সংগ্রহ করে পাঠিয়ে দিতে। অল্পদিনের মধ্যেই আন্তিয়কের বিশাল প্রান্তর ছেয়ে গেল সৈন্য-সমুদ্রে।

    আবুওবায়দাহ্ স্থানীয় বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মারফত সীজারের সমর-প্রস্তুতি সম্যক অবগত ছিলেন। তিনি পদস্থ সেনানায়কদের আহ্বান করে এক আবেগময়ী বক্তৃতায় সম্মুখ-সঙ্কটের রূপ বিশ্লেষণ করে পরামর্শ চাইলেন, কী করা উচিত। ইয়াজিদ ও সুরাহবিল নিজ নিজ বক্তব্য পেশ করলেন। সকলের মত হলো, সাহায্যবাহিনী না আসা পর্যন্ত ইমেসায় অপেক্ষা করা। কিন্তু আবুওবায়দাহ্ যুক্তি দেখালেন, আর অপেক্ষার সময় নেই। শেষে স্থির হয়, ইমেসা ত্যাগ করে দামেশকে চলে যাওয়া; সেখানে খালেদের উপস্থিতি ও আরব-সীমান্তের নৈকট্য অনেকটা নির্ভরযোগ্য। তখন আবুওবায়দাহ্ খাজাঞ্চিখানার অধ্যক্ষ হাবিব বিন্-মসলেহমাকে নির্দেশ দিলেন, খ্রিস্টানদের নিকট থেকে আদায়কৃত সমস্ত জিয়া কর প্রত্যর্পণ করতে, কারণ শত্রুর হামলা থেকে রক্ষার শর্তসাপেক্ষে যে কর আদায় করা হয়েছিল, এখন নিজেদেরই নিরাপত্তা আশঙ্কিত হওয়ায় সে কর গ্রহণের আইনত অধিকার নেই। এভাবে বহু লক্ষ দিরহাম শহরবাসীদের যথাযোগ্য ফেরত দেওয়া হয়। খ্রিস্টানরা মুসলিমদের এই সাধুতায় অভিভূত হয়ে সজল নয়নে বলেছিল, ঈশ্বর আপনাদের পুনরায় ফিরিয়ে আনবেন। আর ইহুদীরা তো আরও অভিভূত হয়ে প্রতিজ্ঞা করে: জিহোবার বিধি ও নবীদের দোহাই! যতক্ষণ আমাদের দেহে প্রাণ থাকবে, সীজার কিছুতে ইমেসা দখল করতে পারবেন না। বলা বাহুল্য এভাবে সকল শহর থেকে আদায়কৃত জিয়া প্রতার্পিত হয়।

    অতঃপর আবুওবায়দাহ্ দামেশকে যাত্রা করেন এবং পরিস্থিতির পূর্ণ বিবরণ দিয়ে ওমরকে পত্র পাঠান। ওমর পত্র পেয়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও দুঃখিত হন এবং বলেন, এ হয়তো আল্লাহর কোনও ইচ্ছার ফলাফল। তিনি শীঘ্রই সাহায্য প্রেরণ করতে চেষ্টিত হলেন।

    এদিকে দামেস্কে উপস্থিত হয়ে আবুওবায়দাহ্ সমর পরিষদের বৈঠক ডাকালেন, কর্তব্য স্থির করতে। এই সময় জর্দান থেকে আমরের দূত এসে জানান যে জর্দানে সাধারণ বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেছে। বিশাল রোম বাহিনীর অভিযান আরম্ভ হওয়ায় চতুর্দিকে আতঙ্ক উপস্থিত হয়েছে এবং ইমেসা থেকে মুসলিমদের অপসারণে তাদের ইজ্জত অনেকটুকুই নষ্ট হয়েছে। আবুওবায়দাহ্ ওমরকে জানান, পরিস্থিতি এমন সঙ্কটময় হয়ে উঠেছে যে, এখন সকলের একত্রে থাকাই নিরাপদ।

    পরদিন আবুওবায়দাহ্ দামেস্ক থেকে যাত্রা করে জর্দানের সীমান্তস্থিত ইয়ারমুকে উপস্থিত হন। আমরও তাঁর সঙ্গে যোগদান করেন। নিরাপত্তার দিক দিয়ে সুবিধাজনক ক্ষেত্রে শত্রুপক্ষকে মুকাবিলা করতে ইয়ারমুকের বিশাল প্রান্তর প্রশস্ত বিবেচিত হয়। তখনও মদিনা থেকে সাহায্য বাহিনী উপস্থিত হয় নি, অথচ রোমকরা অতুল বিক্রমে অগ্রসর হচ্ছে রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়ে। আবুওবায়দাহ্ পুনরায় খলিফার নিকট পত্র প্রেরণ করেন বিশেষভাবে সংবাদ দিয়ে যে, রোমকরা জলে-স্থলে হাজারে হাজারে অনবরত উপস্থিত হচ্ছে, খ্রিস্টানদের উৎসাহ ও রণোন্মদনা চরমে উঠেছে। এমনকি সন্তু-সন্ন্যাসীরাও মঠ ত্যাগ করে সৈন্যদলে যোগ দিয়েছে। ওমর পত্র পেয়েই সমস্ত মদিনাবাসীর সম্মেলন ডাকলেন ও পত্রের মর্ম অবগত করালেন। প্রবীণ সাহাবাদের চক্ষু ফেটে অশ্রু দেখা দিল মুসলিমদের শোচনীয় অবস্থা শ্রবণ করে এবং সকলেই সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে যাত্রা করতে প্রস্তুত হলেন। আবদুর রহমান বিন-আউফ চিৎকার করে উঠলেন: হে আমীরুল মু’মেনীন! আপনিই সিপাহসালার হয়ে আমাদের নেতৃত্ব করুন। যা’হোক সকলের মত হলো, অবিলম্বে যথাসাধ্য সাহায্যবাহিনী পাঠানো হোক। তখনই সৈন্য নিয়োগ ও প্রেরণের দ্রুত ব্যবস্থা অবলম্বিত হলো এবং আবুওবায়দাকে উৎসাহব্যঞ্জক পত্র দেওয়া হলো: সাবধান! ওমর সালাম পাঠাচ্ছে ও নির্দেশ দিচ্ছে, হে ইসলামের সেবকগণ! তোমরা দুশমনের মুকাবিলা করবে সিংহের মতো, আর নিজেদের মধ্যে আচরণ করবে পিপিলিকার মতো নম্র হয়ে। আমরা বিশ্বাস রাখি, তোমরা জয়ী হবেই।

    এ-পত্র যেদিন আবুওবায়দাহ্ পান, সেদিনই যামীর উপস্থিত হলেন এক হাজার সৈন্য নিয়ে। তার ফলে মুসলিমদের মধ্যে নয়া উদ্দীপনা ও আত্মনির্ভরতা জেগে ওঠে সৈন্যবিন্যাসের ও চালনার ভার গ্রহণ করলেন স্বয়ং খালিদ। রোমকবাহিনী ইয়ারমুকের বিপরীত দিকে অবস্থিত দায়ের-উল-জবলে ছাউনি ফেলে। স্থানটির তিনদিক উঁচু পাহাড় দিয়ে ঘেরা, এবং বাহির হওয়ার একটি মাত্র দিকে মুসলিমবাহিনী ছাউনি ফেলে বন্ধ করে দেয়। এভাবে রোমক বাহিনী নিজেরাই এমন এক জায়গায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে, যেখান থেকে সহজে বের হওয়ার পথ খোলা রইলো না। তাদের সৈন্যসংখ্যা ছিল ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন মতে এক লক্ষ থেকে দু’লক্ষ চল্লিশ হাজার। চব্বিশটি পর পর শ্রেণীতে তারা সজ্জিত হলো, আর সম্মুখে সন্ন্যাসী পাদ্রীরা ক্রুশ উত্তোলন করে তাদেরকে ধর্মীয় উন্মাদনায় মাতিয়ে রাখলো। উভয়পক্ষ সামনাসামনি হলে প্রথমে একজন রোমক বীর একজন মুসলমানকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করে। খালিদের ইঙ্গিতে কায়েস বিন-হাবিরাহ্ দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হন, এবং অল্পায়াসে রোমক-বীরকে নিহত করেন। মুসলিমরা এ বিজয়কে শুভ সূচনা হিসেবে গ্রহণ করে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে।

    রোমকপক্ষে সিপাহসালার ছিলেন থিওডোরাস স্বয়ং সীজারের কনিষ্ঠ ভ্রাতা। কিন্তু তার সহকারী হিসেবে রইলেন বীরপুরুষ বাহান। বাহান সেনানায়কদের এক সভা ডেকে বললেন, সিরিয়ার সম্পদ ও আরাম-আয়েশ মুসলিমদের প্রলুব্ধ করেছে, অতএব তাদেরকে মোটা রকম বকশিশ্ দিয়ে ফেরৎ পাঠালেই হয় না? সকলেই এ যুক্তি সমর্থন করলো। পরদিন রোমক শিবির থেকে জর্জ নামক দূত এলো আবুওবায়দা নিকট শান্তির প্রস্তাব নিয়ে। খালিদ দৌত্যকর্মের মনোনীত হন। জর্জ প্রত্যেকটি মুসলিম সেনার ইসলাম প্রীতি ও প্রতিটি অনুষ্ঠানে তীব্র অনুরাগ দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি আবুওবায়দা নিকট আরও অবগত হলেন, কোরআনে হযরত ঈসা নবী হিসেবে কীর্তিত, এবং মুসলিমদের নিকট পরম শ্রদ্ধেয়। তখন তিনি আবেগভরে কলেমা পাঠ করে ইসলাম কবুল করেন। তাঁর আর রোমক শিবিরে প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু আবুওবায়দাহ্ সম্মত না হয়ে বললেন, তাঁকে স্বশিবিরে ফিরে যেতেই হবে, তবে মুসলিম শিবির তাঁর জন্য সর্বদাই খোলা থাকবে।

    পরদিন খালিদ রোমক শিবিরে উপস্থিত হলে বাহান তাঁকে জাঁকজমক পূর্ণ দরবারে খুবই সম্ভ্রমের সঙ্গে গ্রহণ করেন। সাধারণ সৌজন্য প্রকাশের পর আলোচনা শুরু হলে বাহান সীজারের অপরিসীম ক্ষমতা ও সম্পদ রাশির উল্লেখ করে শেষে বললেন : আপনারা এখন শ্রান্তভাবে এ দেশ ত্যাগ করলে আপনাদের সিপাহসালারকে দশ হাজার দিনার, প্রত্যেক সেনানায়ককে এক হাজার এবং প্রত্যেক সৈন্যকে একশোড দিনার ইনাম দেব। বাহানের বক্তব্য শেষ হলে খালিদ প্রথমে আল্লাহর গুণগান, আঁ-হযরতের শিক্ষার মহিমা উল্লেখ করে বললেন: যে ইসলাম কবুল করে, সে আমাদের ভাই হয়ে যায়। যে কবুল করে না, কিন্তু জিয়া আদায় করে, আমরা তার নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করি। আর যে একটিও গ্রহণ করে না, তার সঙ্গে হয় অস্ত্রে অস্ত্রে পরিচয়।

    জিযয়ার উল্লেখে বাহান দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করে নিজের অগণিত সেনা বাহিনীর দিকে লক্ষ্য করে বললেন, তারা মৃত্যু বরণ করবে, তবু জিয়া স্বীকার করবে না। আমরা জিয়া দেই না, গ্রহণ করি। অতঃপর সন্ধির প্রস্তাবে ভেঙে যায়।

    পরদিন রোমকরা রীতিমতো যুদ্ধার্থে প্রস্তুত হলো। খালিদও নিজের বাহিনী নিয়ে যথারীতি প্রস্তুত। আবুসুফিয়ান, আমর নিজের বাহিনীকে উৎসাহ দিয়ে প্রাণপণ করে যুদ্ধে উদ্বুব্ধ করলেন। মুসলিমপক্ষে ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ছিল। আর এ যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, বহু মুসলিম বীরাঙ্গনা পুরুষদের পাশে পাশে সিংহীর মতো যুদ্ধ করেছেন। আমীর মু’আবিয়ার মতো হিন্দাহ্ ভগ্নি জুয়েরিয়াহ্ শক্তি ও বীরত্ব প্রকাশে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

    প্রায় ত্রিশ হাজার রোমক-বীর পায়ে পায়ে শৃঙ্খলিত হয়ে যুদ্ধে প্রস্তুত হলো, যাতে পশ্চাদসরণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। হাজার হাজার সৈন্যের এ-বিপুল সমাবেশ দেখে জনৈক মুসলিম সেনা সহসা বলে উঠে, ওহ্ আল্লাহ্! কী বিপুল সংখ্যক সৈন্যের সমাবেশ! খালিদ তাকে ধমক দিয়ে বললেন: আঃ থামো! আমার ঘোড়ার খুরগুলো যদি আরও একটু মজবুত হতো, তা হলে খ্রিস্টানদের বলতেম তারা দেদার খুশী সৈন্য জড়ো করতে পারে।

    প্রায় দু’মাস ধরে বিক্ষিপ্তভাবেই যুদ্ধ চললো, জয়-পরাজয়ে কোন লক্ষণ দেখা যায় না। শুধু রণহুঙ্কারে ও আর্তের চিৎকার যুদ্ধস্থল কেঁপে উঠতে থাকে। চারিদিকে শুধু শব কিংবা কর্তিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত, রক্তের স্রোতে ঘন ঘন যোদ্ধাদের পদস্খলন। এসব বিভীষিকাময় দৃশ্য সারা ইয়ারমুকের বিশাল প্রান্তরে। আবু জহল-নন্দন ইকরামা হাসতে হাসতে প্রাণ দান করলেন এবং তাঁর মৃত্যুতে খালিদের খেদোক্তি: হে আল্লাহ! ওমরের এ কথা ভুল যে, আমরা তোমরা রাহে শহীদ হতে জানি নে! পুত্ৰ ইয়াজিদকে আবু সুফিয়ান উৎসাহ দিচ্ছেন: বৎস! তোমার সেনারা কী বীরত্বে যুদ্ধ করছে! তুমি তাদের নায়ক, দেখো, তারা যেন তোমার বীরত্বে ও সাহসে অতিক্রম করে না যায়! রণরঙ্গিণী আরব মহিলারা তাঁবুর খুঁটি তুলে নিয়ে সৈন্যদের পিছনে থেকে তাদের সাবধান করছেন: আমদের মুখপানে তাকাতেই পারে না, যদি তোমরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন কর। এ সবের চেয়েও করুণ, কিন্তু বীরকে মহিমোজ্জ্বল হাবাশ-বিন-কায়েসের তীব্র যুদ্ধে একখানি পা হারিয়ে ও রণোন্মদনায় তা ভুলে যাওয়া, এবং কিছুক্ষণ পর প্রাকৃতিক অনূভূমিহেতু নিজের অবস্থা স্মরণ করে চারদিকে কর্তিত পাখানি খোঁজ করা ও অন্য সবকে জিজ্ঞাসা করা: আমার পাখানি খুঁজে দাও ভাই!

    যুদ্ধ সঙিন অবস্থা ধারণ করে ২০শে আগস্ট, ৬৩৬ খ্রি.। গ্রীষ্মের সারাদিন অগ্নিঢালা রৌদ্রের প্রচণ্ড উত্তাপে যখন চারদিক ধূলি ঝড়ে ছেয়ে ফেলে, সে সময় সুযোগ বুঝে খালিদ নিজের সৈন্যদের তীব্রবেগে চালনা করলেন, এ রকম অভ্যস্ত আবহাওয়ায় শত্রুপক্ষকে মরণাঘাত হানতে। মরুসন্তানদের এমন ভীষণ আক্রমণে সীজারের বাহিনী একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গেল। কত পাদ্রীর প্রার্থনা ও উৎসাহবাণী বিফল হলো, তাদের ক্রুশচিহ্নের ঘনঘন আস্ফালনও বৃথা গেল। যারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিয়ে নদীর দিকে পলায়ন করলো, নদীবক্ষে কিংবা রুক্‌দাদ উপত্যকায় তাদের দেহ প্রসারিত হলো। স্বয়ং থিওডোরাস যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন। কিন্তু বাহান পলায়ন করে আত্মরক্ষা করেন। তাবারীর মতে এক লক্ষ, এবং বালাজুরির মতে সত্তর হাজার সীজার সৈন্য যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রাণত্যাগ করে। মুসলিমপক্ষে প্রায় তিন হাজার শহীদ হয়।

    আবুওবায়দাহ্ সঙ্গে সঙ্গে বিজয়বার্তা মদিনায় প্রেরণ করেন। ওমর কয়েকদিন বিনিদ্র অবস্থায় যুদ্ধের সংবাদের প্রতীক্ষা করতেন। সংবাদ পাওয়ামাত্র তিনি আল্লাহ্‌র দরগায় শুকরগুজারীর নফল নামায আদায় করেন।1

    ইয়ারমুকের যুদ্ধ বিশ্ব-ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি যুগ নির্ণায়ক ঘটনা। মুসলিমরা এ যুদ্ধে এক মহাসঙ্কটের সম্মুখীন হয়। তাদের বিপক্ষে ছিল, মহাপরাক্রমশালী রোমসম্রাটের অগণিত লোকবল, প্রচুর অস্ত্রবল, অথচ মুসমিদের সৈন্যসংখ্যা ছিল ছয় ভাগের একভাগ। কিন্তু তাদের মনোবল ও নৈতিক বল ছিল বহুগুণ। এ জন্যই ইয়ারমুকের যুদ্ধে আর একবার প্রমাণিত হলো, মনোবল ও নৈতিকবলের নিকট লোকবল কত তুচ্ছ, কতো সহজে বন্যামুখে তৃণখণ্ডের মতো ভেসে যায়। এ যুদ্ধের পরেই মুসলিমরা বিশ্ব ইতিহাসে সগর্বে প্রবেশ করে এবং পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে আর একটি নতুন জাতির গৌরবময় উত্থানপথের দিকে চেয়ে থাকে। সাম্রাজ্যবাদের কবলিত যুগযুগ-নিপীড়ন, শোষিত অগণিত মানুষ সাম্য মৈত্রী মন্ত্রের উদ্‌গাতা ইসলাম পন্থীদের আশ্রয়ে মুক্তির আস্বাদ লাভে উন্মুখ হয়ে ওঠে।

    ইয়ারমুকের যুদ্ধের পর আবুওবায়দাহ্ হিসের দিকে অগ্রসর হলেন। খালিদ গমন করলেন কিনিসিরিনের দিকে, এবং শহরবাসীরা প্রথমে বাধা দিলেও খালিদের সম্মুখে সে-বাধা তৃণখণ্ডের মতো উড়ে গেল, তারা জিয়া দিতে অঙ্গীকার করে বশ্যতা স্বীকার করলো। তানুখ নামক বেদুইন জাতি, খ্রিস্টমতাবলম্বী বানুসালিহ্ গোত্র ও তার গোত্রের অধিকাংশই ইসলাম কবুল করে। অতঃপর আবুওবায়দাহ্ আলেপ্পোর দিকে অগ্রসর হন। শহরের চতুর্দিকে অবস্থিত আরব বেদুইনরা সহজেই ইসলাম কবুল করে। কিন্তু আলেপ্পোবাসীরা দুর্গদ্বার বন্ধ করে দেয়। আয়ায-বিন-ঘানাম্ শহরটি অবরোধ করেন এবং কয়েকদিন পর আত্মসমর্পণ করতে ও জিয়া আদায় করতে বাধ্য করেন।

    অতঃপর সিরিয়ার রাজধানী আন্তিয়কের পথ পরিষ্কার হয়ে যায়। সে আমলে আন্তিয়ক ছিল ধন-সম্পদে ও কৃষ্টি-সম্পদে কনস্টান্টিনোপলের প্রতিদ্বন্দ্বী। তার লোকসংখ্যা ছিল এক লক্ষেরও বেশি এবং খ্রিস্টান ধর্মের কেন্দ্রস্থল হিসেবে সীজারের অত্যন্ত প্রিয়। চতুর্দিকের যুদ্ধবিগ্রহে রোমকরা ও অন্যান্য খ্রিস্টানরা বিতাড়িত হয়ে এখানে দলে দলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। আবুওবায়দাহ্ চারদিক থেকে শহরটি অবরোধ করেন এবং কয়েকদিন প্রতিরক্ষার বৃথা চেষ্টা করে শহরবাসীরা আত্মসমর্পণ করে। ওমর আন্তিয়কের প্রতিপত্তি ও সমৃদ্ধির সম্যক অবগত ছিলেন, এবং তাঁর চক্ষে জেরুজালেম বিজয়ের চেয়ে আন্তিয়ক বিজয় ছিল অনেকখানি গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যে তিনি আবুওবায়দা সাংবাদদূতের অপেক্ষা করতেন ততখানি আগ্রহ নিয়ে, যতখানি তিনি সা’দ-বিন-ওক্কাসে দূতের অপেক্ষা করতেন কাদিসিয়ার যুদ্ধের সংবাদ শ্রবণের জন্যে। তিনি আন্তিয়ক-বিজয় আরবজাতির এক শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে ঘোষণা করেন।

    সীজার হিরাক্লিয়াস্ কি করছিলেন? আলেপ্পো বিজিত হওয়ায় তাঁর সব আশা-ভরসা চুরমার হয়ে যায়, প্রাচ্যের রোমক রাজ্যের অস্তিত্বের স্বপ্নও তাঁর বিলীন হয়ে যায়। তিনি ভগ্নমনোরথ হয়ে চুপেচুপে আন্তিয়ক ত্যাগ করে পাহাড়ের পথ ধরেন এবং শস্যশ্যামল হরিৎ ক্ষেত্র-শোভিত সিরিয়ার দিকে তৃষিত নেত্রে চেয়ে চেয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে শেষ আফসোস্ করেন: বিদায় সিরিয়া! বিদায়! কি সুন্দর দেশই আজ দুশমনদের দিয়ে গেলাম!

    আন্তিয়ক বিজয়ের পর আবুওবায়দাহ্ তাঁর বাহিনীকে চারিদিকে ছড়িয়ে দিলেন, সমগ্র অঞ্চলটিকে অধিকার করতে। বুকা, জুমাহ, সুরমিন, তুজি, কুরাস, তিলখর্জ, দালুক, রুবান প্রভৃতি শহর ও কিল্লা বিনা রক্তপাতে অধিকৃত হয়। বালিস্ ও কারিন নামক কিল্লা দুটিও প্রথম হামলাতেই বশ্যতা স্বীকার করে। জর্জ মাইট্ গোত্রীয়রা জিয়া আদায় করতে অস্বীকার করেও বলে যে, মুসলিমদের পাশে পাশে তারাও শত্রুপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। জিয়া আদায়ের হেতু সামরিক সাহায্যের প্রতিদান বিধায় তাদের শর্ত গৃহীত হয়।

    আন্তিয়কের নিকটবর্তী এবং এশিয়া-মাইনর সীমান্তের শেষে বুখরাস নামে একটি বিখ্যাত কিল্লা ছিল। ঘাসান, তানুখ, আয়াজ প্রভৃতি খ্রিস্টমতাবলম্বী বহু আরবগোত্র এখানে একত্রিত হয় হিরাক্লিয়াসের সঙ্গে মিলিত হতে। হাবিব বিন-মস্লামাহ্ তাদের আটক করেন, এবং জীষণ যুদ্ধে কয়েক হাজার হতাহতের পর তারা বশ্যতা স্বীকার করে। ওদিকে খালিদ মারাস শহরটি অবরোধ করলে তারা সন্ধি করে এই শর্তে যে তাদেরকে শহর পরিত্যাগ করে যথেচ্ছ গমনের সুযোগ দিতে হবে।

    এখানে একটি কাহিনীর উল্লেখ করা যেতে পারে। আন্তিয়ক বিজয়ের পর সিরিয়াবাসী আরব গোত্রগুলি যখন দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে, তখন মাস্সা গোত্র-প্রধান জাবালা আত্মীয় পরিজনসহ ইসলাম কবুল করেন। এ সংবাদ ওমরের নিকট প্রেরিত হলে তিনি অত্যন্ত সন্তোষবোধ করেন ও জাবালাকে মদিনায় আহ্বান করেন। অনুমতি লাভ করে জাবালা বিশেষ শান-শওকতের সঙ্গে প্রায় পাঁচশত অনুচরসহ মদিনায় উপস্থিত হন এবং মদিনাবাসী কর্তৃক সাদরে গৃহীত হন। কিছুদিন মদিনায় অবস্থানের পর জাবালা ওমরের সঙ্গে মক্কায় গমন করেন হজ করতে। সেখানে কাবাগৃহ তওয়াফকালে সহসা তাঁর পাগড়ির প্রান্ত বানু ফরাযা গোত্রীয় এক ব্যক্তির পদতলে পিষ্ট হয়। তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে লোকটিকে আঘাত করেন ও তার নাক ভেঙ্গে দেন। সে ওমরের নিকট নালিশ করে। ওমর জিজ্ঞাসা করলে জাবালা ঘটনা স্বীকার করেন। তখন ওমর নির্দেশ দেন, তুমি যখন স্বীকার করছো, তখন ফরিয়াদীকে সন্তুষ্ট করো, অন্যথায় তোমার বিচারে শাস্তি গ্রহণ করতে হবে। জাবালা বলেন, তা কি করে হতে পারে? ও তো সাধারণ লোক আর আমি বাদশাহ্। ওমর বলেন, ইসলাম বাদশাহ্ ও ফকীরে ভেদাভেদ নেই, তোমরা একই সমতলে। জাবালা তখন বলেন, এমন ইসলামে আমি থাকতে চাই নে, আমি পুনরায় খ্রিস্টান হবো। ওমর বলেন, তা হলে তোমায় মুশরেকীর অপরাধে শিরশ্ছেদ শাস্তি পেতে হবে। জাবালা ওমরকে বিচারে অনমনীয় দেখে এক রাত্রির সময় প্রার্থনা করেন। তারপর রাত্রির অন্ধকারে চুপচাপে সব অনুচরসহ মক্কা ত্যাগ করে সোজা কনস্টান্টিনোপলের পথ ধরেন ও হিরাক্লিয়াসের সঙ্গে মিলিত হন।

    একথা বলা দরকার যে, মাত্র কিতাবুল-আগানীতে কাহিনীটির উল্লেখ দেখা যায়। অন্যসব বিশিষ্ট ঐতিহাসিক জাবালার কাহিনী সত্য হিসেবে স্বীকার করেন না। মাত্র একটা আদর্শ নীতিকাহিনী হিসেবে তার প্রচলন রয়ে গেছে, মনে করেন।

  • মিসর বিজয়

    মিসর বিজয়

    মিসর বিজয়

    মিসর, সিরিয়া ও হিজাযের মারাত্মক কাছাকাছি থাকায় তার সামরিক কৌশলসুলভ অবস্থিতি, শস্য-উৎপাদিকা মাটির গুণে কনস্ট্যান্টিনোপলের শস্যভাণ্ডার হিসাবে পরিচিত, তার রাজধানী  আলেকজান্দ্রিয়ার বাইজান্টাইন নৌশক্তির কেন্দ্রস্থলরূপে খ্যাত এবং উত্তর আফ্রিকার প্রদেশাদ্বাররূপে যুগ যুগ ধরে ব্যবহার-এ সব কারণেই এই নীলনদবাহী উপত্যকাভূমি আরব জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাদের রাজ্যবিস্তৃতির প্রথম যুগেই।

    মিসর বিজয়ের কৃতিত্ব একমাত্র আমর-বিন-আসের প্রাপ্য। যৌবনকালে তিনি বাণিজ্যব্যপদেশে মিসর সফর করেছিলেন, এজন্যে মিশরের ধনসম্পদ, শহর, জনপদ, মায় অলিগলি সমস্তই তাঁর সম্যক চেনাজানা ছিল। তার বিখ্যাত প্রতিদ্বন্দ্বী খালিদের মতোই একটা বৃহৎ জয়ের আশা তাঁকে প্রলুব্ধ করে মিসর অভিযান করতে। আমর একজন কোরায়েশ, এবং যুদ্ধপ্রিয় তীক্ষ্ণ কূটনীতিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি আমীর মু’আবীয়াকে খেলাফত অধিকার করতে সাহায্য করেন এবং মু’আবীয়া কর্তৃক ‘ইসলামে চার জন আরব রাজনীতি বিশারদের একজন হিসেবে কীর্তিত হন। এ-কথা অনস্বীকার্য যে ঝানু রাজনীতিজ্ঞের মতোই তিনি সুবিধামাফিক ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য জ্ঞান পরিহার করে চলতেন।

    ওমর যখন জেরুজালেমে সফর করেছিলেন, তখন এই আমর-বিন্-আস্ তাঁর অনুমতি প্রার্থনা করেন, মশহুর ফেরাউনদের দেশে অভিযান করতে। ওমর প্রথমে এ-ঝুঁকি নিতে গর-রাযী হন, কিন্তু আমরের পুনঃ পুনঃ প্রার্থনায় রাষী হন এই শর্তে: যাও, এবং আশা করি জয়ী হও। কিন্তু মিসরের মাটিতে পা ফেলার পূর্বে যদি আমার চিঠি পাও, তা হলে বিনা ওজরে প্রত্যাবর্তন করবে। আদেশ শিরোধার্য করে চার হাজার সৈন্যর এক বাহিনী নিয়ে আমর মিসর অভিযানের অগ্রসর হন। তিনি আরিশ নামক স্থানে উপস্থিত হলেই ওমরের পত্র পান। কিন্তু তখন তিনি মিসরের মাটিতে পদার্পণ করেছেন, এ জন্যে ওমরের নিষেধে ভ্রূক্ষেপ না করে অগ্রসর হন। উল্লেখযোগ্য যে, আমর বাহিনী নিয়ে সমুদ্রোপকূলবর্তী সেই মহাপথ বেয়ে অভিযান করেন, যে পথে পূর্বকালে গিয়েছেন হযরত ইব্রাহীম, ক্যাবিসেস, আলেকজান্দার, অস্তিওকাস এবং পরবর্তীকালে নেপোলিয়ান ও জামাল পাশা।

    আরববাহিনী যে-দুর্গটি আক্রমণ করে, তার নাম ফারমা (জানুয়ারী ৬৪০ খ্রি.) এটি ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী জনবহুল নগরী, এবং প্রসিদ্ধ গ্রীক চিকিৎসাবিশারদ গ্যালেন বা জালিনুসের (খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক) সমাধিক্ষেত্র ধারণ করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। একমাস আত্মরক্ষার পর শহরটি আত্মসমর্পণ করে। অতঃপর আমর ফুস্তাতের দিকে অগ্রসর হন এবং পথপাশের বাবিস্ ও অন্যান্য শহর দখল করেন। সেকালে ফুতাত ছিল নীলনদ ও মাক্তম্ পর্বতের মধ্যবর্তী হরিৎ শস্যক্ষেত্র-শোভিত উপত্যকা। এখানে ব্যাবিলন নামে একটি সুরক্ষিত কিল্লা ছিল, এবং রোম সাম্রাজ্যের মিসরীয় রাজপ্রতিনিধির রাজধানী ছিল। আমর এই গুরুত্বপূর্ণ শহরটি অবরোধ করেন। মাকাকিস্ বা সাইরাস ছিলেন তৎকালীন মিসরীয় রাজপ্রতিনিধি। তিনি একদল সুশিক্ষিত রোমবাহিনী নিয়ে আমরকে বাধা দেন। আমর আইন্-শামস নামক প্রান্তরে শিবির স্থাপন করেন ও সাহায্য প্রার্থনা করে  মদীনায় দূত পাঠান। শীঘ্রই জুবায়ের-বি-আওয়াম নামক প্রবীণ সাহাবার নেতৃত্বে সাহায্যবাহিনী উপস্থিত হয়। তখন মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা দাঁড়ায় দশ হাজার এবং বিপক্ষদলের সৈন্যসংখ্যা ছিল বিশ হাজার; তা ছাড়াও দুর্গস্থিত সৈন্যসংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার। প্রথম যুদ্ধেই রোমকবাহিনী বিধ্বস্ত হয়ে যায় এবং তাদের সিপাহসালার থিওডোরাস আলেকজান্দ্রিয়ায় পলায়ন করেন। শাসক সাইরাস ব্যাবিলন দুর্গে আত্মরক্ষা করেন। সাত মাস ধরে অবরোধ চলে কিন্তু দুর্গের পতন হয় না। শেষে সাইরাস মনোবল হারিয়ে সন্ধির প্রস্তাব দেন। আমর তিনটি শর্ত দান করেন: আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তা হলে আপনি ও আপনার সকল প্ৰজা আমাদের ভ্রাতৃস্থানীয় হবেন। যদি তা স্বীকার করেন, তা হলে জবরদস্তি নেই, তবে আপনাদেরকে জিয়া দান করতে হবে। তখন আমরা আপনাদের কোনও ক্ষতি করবো না, বরং আপনাদেরকে ক্ষমা করতে বাধ্য হবো। আর তাও যদি স্বীকার না করেন, তা হলে যুদ্ধই এ-বিরোধের মীমাংসা করবে।

    বলা বাহুল্য, পক্ষপাতমূলক মানস নিয়ে অমুসলিম লেখকশ্রেণী এই শর্তগুলিকে এরূপ বিকৃত ফর্মুলা বা সূত্রে রূপায়িত করেছেন, ইসলাম: জিয়া: তরবারি। কিন্তু মুসলিমদের ধর্মজ্ঞান কতোখানি প্রবল ছিল, তাদের ন্যায়নিষ্ঠা, তিতিক্ষা ও সাম্যনীতিজ্ঞান কতো সুদৃঢ় ও উচ্চস্তরের ছিল, তার প্রমাণ মেলে সাইরাস কর্তৃক প্রেরিত দূতগণ যখন মুসলিম সিপাহসালারকে অর্থলোভে বশীভূত করার চেষ্টায় বিফল হয়ে প্রত্যাবর্তন করে তাঁকে বলেছিল: আমরা এমন একটি জাতি দেখে এলেম, যাঁদের প্রত্যেকের নিকট জীবনের চেয়ে মরণই বেশি প্রিয়, উচ্চাকাঙ্ক্ষায় তীব্র অনীহা, এবং পার্থিক কোনো কিছুর প্রতি এতোটুকু আকর্ষণ নেই। ধূলি-আসনই তাঁদের শ্রেষ্ঠ আসন এবং জানুর উপরই খাবার রেখে তাঁরা খান। তাঁদের সিপাহসালার তাঁদেরই মতো সমান মর্যাদায় অভিষিক্ত; কে ছোট, কে বড় মোটেই সনাক্ত করা যায় না, প্রভু-দাস কোন সম্পর্ক নেই। এমন জাতির সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় না।

    যা হোক, দীর্ঘকালেও ব্যাবিলন অধিকার না হওয়ায় জুবায়ের একদিন মরণপণ করে কয়েকজন দুঃসাহসী সৈনিক নিয়ে দুর্গপ্রাকারে আরোহণ করে দুর্গে প্রবেশ করেন ও দ্বার খুলে দেন। দ্বার খোলা পেয়ে বাইরের প্রতীক্ষারত মুসলিম সেনাগণ বন্যার মত দুর্গে প্রবেশ করে। খ্রিস্টানরা দিশেহারা হয়ে পলায়ন করতে থাকে। সাইরাস অন্যন্যোপায় হয়ে সন্ধি করতে বাধ্য হন। সন্ধির শর্তসমূহ নির্ধারণ করতে মুসলিম দলের নেতা হিসেবে ওবায়দাবিন্-সাবিত নামক হাবশীকে দেখে তিনি বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে যান। জিয়া দেওয়ার শর্তে সন্ধি স্থাপিত হয়। সাইরাস হিরাক্লিয়াসের নিকট এ-বার্তা প্রেরণ করলে সীজার তাঁকে বিশ্বাসঘাতক বলে দোষারোপ করেন ও বলেন: কপটরা যদি যুদ্ধ করতে না পারে, তা হলে আমার মিসরস্থ অগণিত রোমক-সৈন্য আক্রমণকদের যুদ্ধসাধ মিটিয়ে দেবে। তিনি এক বিশাল বাহিনী পাঠিয়ে দেন  আলেকজান্দ্রিয়ায় মুসলিমদের মোকাবেলা করতে। সাইরাসকে নির্বাসনে পাঠানো হয়।

    আর ফুস্তাতে কিছুদিন অবস্থান করার পর আলেকজান্দ্রিয়ার দিকে অগ্রসর হন। আমর ফুস্তাতে নিজের তাঁবু উঠাবার সময় লক্ষ্য করেন একটি কবুতর ইতিমধ্যেই বাসা বেঁধেছে। তিনি তাঁবুটি যথাস্থানে রাখার নির্দেশ দিয়ে বললেন, দেখো যেন নতুন অতিথি গৃহহারা না হয়। পরবর্তীকালে আমর এ স্থলেই ফুস্তাত শহরের পত্তন করেন। যা হোক, ফুস্তাত থেকে নিকিউ শহর অধিকার করে তিনি মিসরের রাজধানী অবরোধ করেন। ইতিমধ্যে আরও একদল সাহায্যবাহিনী উপস্থিত হওয়ায় মুসলিম সৈন্যের সংখ্যা দাঁড়ায় বিশ হাজার।

    এই বিশাল বাহিনী নিয়ে আমর এক প্রত্যুষে মিসরের রাজধানীতে উপস্থিত হন। অসংখ্য সুউচ্চ প্রাসাদ ও দুর্ভেদ্য প্রাকারবেষ্টিত আলেকজান্দ্রিয়া ছিল একরূপ অভেদ্য দুর্গ। তার একদিকে ছিল আমুদ্-অলসওয়ারী নামক সুউচ্চ প্রাসাদ, তার মধ্যে ছিল সেরাপিসের মন্দির ও গ্রন্থাগার; অন্যদিকে ছিল সেন্ট মার্কের গির্জা। কথিত আছে, গির্জাটির পত্তন করেন মিসর সৌন্দর্যের রানী ক্লিওপেট্রা স্বামী জুলিয়াস সীজারের স্মৃতিরক্ষার্থে। আরও পশ্চিমে ছিল দুটি রক্তবর্ণ আওয়ান-গ্রানাইট নির্মিত সুচ, তাও ক্লিওপেট্রার নির্মিত হিসেবে কীর্তিত: আর পশ্চাদ্‌ভূমিতে ছিল বিখ্যাত ‘ফারস্’ যা দিনে সূর্য-রশ্মিতে ও রাতে নিজের আগুনেই চারদিক প্রতিফলিত করে রাখতো এবং পৃথিবীর সপ্তমাশ্চর্য হিসেবে কীর্তিত হতো। এ-অগণ্য প্রাসাদ-শোভিত জনসম্পদময়ী রাজধানীর প্রতি মরুচর আরববাসীরা ততখানি বিস্ময়-বিমুগ্ধ নেত্রে তাকিয়েছিল যেমন আধুনিক গননচুম্বী প্রাসাদরাজি শোভিত নিউইয়র্কের প্রতি আগন্তুকরা তাকিয়ে থাকে।  আলেকজান্দ্রিয়ার সৈন্যসংখ্যা ছিল পঞ্চাশ হাজার, তার পিছনে ছিল প্রবল বাইজান্টাইনের দুর্ভেদ্য নৌশক্তি।

    আরব আক্রমকরা সংখ্যা ছিল কম, এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্রও ছিল কম। তাদের একটি জাহাজও ছিল না, এবং অবরোধকারী উপযুক্ত যন্ত্রপাতিও ছিল না। এজন্যে সুউচ্চ নগরপ্রাকার ভগ্ন করা তাদের সাধ্যাতীত ছিল। মাসের পর মাস ধরে অবরোধ করেও মুসলিমরা শহরটিকে কাবু করতে পারে না। সাইরাস বন্দীবাস থেকে এসে শহররক্ষার ভার গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষায় পর ওমর পত্র দেন আমরকে ভর্ৎসনা করে: বহুদিন মিসরের বিলাস-জীবনে অভ্যস্ত হয়ে তোমরাও খ্রিস্টানদের মতো অকর্মণ্য হয়ে পড়েছ, তা না হলে আজও যুদ্ধজয় হয় না কেন? আমর পত্র পাওয়া মাত্র সমগ্র বাহিনীকে উগ্র বক্তৃতা দিয়ে জেহাদে উদ্বুদ্ধ করবে। তার পর সকলে একযোগে আক্রমণ করবে, সৈন্যাধ্যক্ষদেরকে সম্মুখে রেখে। দেখো, এ-আক্রমণ যেন ব্যর্থ না হয়। আমর তখন সৈন্যদেরকে রণোন্মদনায় জাগিয়ে তুলে ওবায়দাহ্ বিন্ সামিত, জুবায়ের 13 মসলামাহকে বিভিন্ন দলের ভারাপর্ণ করে একযোগে আক্রমণ করেন। সে প্রচণ্ড আক্রমণের বেগ সহ্য করতে অক্ষম হয়ে শহরটি আত্মসমর্পণ করে। সাইরাস সন্ধি ভিক্ষা করেন এবং জিয়া দেওয়ার শর্তে সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হয় (৮ই নভেম্বর, ৬৪১ খ্রি.) বয়স্ক লোক প্রতি দুই দিনার ও জমির জন্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ গম আদায় দেওয়ার শর্ত হয়। রোম সাম্রাজ্যের সর্বাপেক্ষা ধনসম্পদ ও সৌন্দর্যময়ী প্রদেশ আবরদের করতলগত হয়।

    আমর এই বিজয়বার্তা মদীনায় প্রদেশ নিকট নিম্নলিখিতভাবে প্রেরণ করেন: আমি এমন একটি শহর হস্তগত করেছি, যার বিশদ বর্ণনার ভাষা জানি নে। এটুকু মাত্র বলাই যথেষ্ট যে, তার চার হাজার হামামসহ চার হাজার বাগানবাড়ী আছে, চল্লিশ হাজার জিয়া করদাতা ইহুদী আছে, এবং চারশত রাজকীয় বিলাসাগার আছে। বিশ্বত্রাস খলিফা ওমরের নিকট এই মহাবিজয় বার্তা উপস্থিত হলে তিনি আল্লাহ্‌র দরগাহে শুকরানা নামাজ আদায় করেন, এবং বার্তাবহ মু’আবীয়া-বিন্ খুদায়েজকে আপ্যায়ন করেন যথাসম্বল কয়েকটি শুকনো খোর্মা, এক টুকরা রুটি ও সামান্য জলপাই তেল দিয়ে!

    ফুতাত ও আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ের পর সারা মিসর আমরের পদানত হয়ে পড়ে। কয়েকটি জনবহুল শহরে রোমকদের প্রাধান্য থাকায় আমর কয়েকটি সেনাদল চতুর্দিকে প্রেরণ করেন, সারা প্রদেশভূমে অভিযান চালিয়ে সব বিরুদ্ধ শক্তি নিস্তব্ধ করে দিতে। খারিজাহ্-বিন-হুদায়ফাহ্ দখল করেন ফায়ুম, আমুনীন, আীম বাদাত, মুয়াদ প্রভৃতি অঞ্চল এবং এসব এলাকার অধিবাসীদের জিয়া দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। ওমর-বিন্-ওহাব দখল করেন তানিস, দিনিয়াত, তুনা, দামিরাস, শাতা ও কালা, বনাহ ও বহির এবং ওবাহ-বিন্-আমীর সমগ্র নিম্ন মিসরভূমিতে দখল কায়েম করেন।

    আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক মিথ্যাময়ী কাহিনীর প্রচলন দেখা যায়। কাহিনী হচ্ছে, ওমরের আদেশক্রমে আমর শহরের সমস্ত চুল্লিতে ছ’মাস ধরে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরীর হাজার হাজার পুস্তক অগ্নিদগ্ধ করেন। এরূপ গ্রন্থদগ্ধরূপ মহাযজ্ঞের কারণ হিসেবে বলা হয়, ওমর এ কর্মের নির্দেশ দেন এই যুক্তিতে-যদি গ্রন্থসমূহে কোরআনের বিপরীত শিক্ষা থাকে, তা হলে সেসব অপাঠ্যও ধ্বংসযোগ্য এবং যদি কোরআনের সমর্থক শিক্ষা থাকে, তা হলে সেসব ফজুল ও অপ্রয়োজনীয়, অতএব ধ্বংসযোগ্য। বলাবাহুল্য, কল্পকাহিনী হিসেবে তার কিছু আদর থাকলেও ইতিকাহিনী হিসেবে কিছুমাত্র মূল্য নেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, জুলিয়াস সীজার কর্তৃক সুবৃহৎ টলেমী গ্রন্থাগারটি খ্রিস্টপূর্ব ৪৮ অব্দে ভস্মীভূত হয়। পরবর্তীকালে এখানেই দ্বিতীয় বৃহৎ কন্যকা-গ্রন্থাগার ৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে অগ্নিদগ্ধ করা হয় সীজার থিওডোসীয়াসের এক ফরমান বলে। অতএব আরব অধিকারের সময় আলেকজান্দ্রিয়ায় কোনও গ্রন্থাগারই ছিল না। আর এ-জন্যে কোনও সমসাময়িক ইতিহাসকার আমর কিংবা ওমরের বিরুদ্ধে এমন কোন অভিযোগ করেন নি। ৬২৯ হিজরীতে (১২৩১ খ্রি.) আবদুল লতিফ বাগদাদী সর্বপ্রথম এই অদ্ভট কাহিনী সৃষ্টি করেন, এবং কেন করেন, তাও বোধগম্য নয়। তার পর কাহিনীটি শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত হয়ে চালু হয়ে আসছে অমুসলিম লেখকদের কল্যাণে।

    মিসরের যুদ্ধসমূহে বহু কপট ও রোমক বন্দী হয়েছিল। তাদের প্রতি কিরূপ ব্যবহার করা যেতে পারে, এ বিষয়ে আমর ওমরের নির্দেশ চেয়ে পাঠান। ওমর নির্দেশ দেন: বন্দীদেরকে জানানো হোক, ইসলাম গ্রহণ করার অথবা আপন খ্রিস্টানধর্মে দৃঢ় থাকার অধিকার তাদের রয়েছে। যারা মুসলিম হবে, তারা অন্য মুসলিমদের সমান অধিকার লাভ করবে, আর যারা হবে না, তারা অন্য অমুসলিমদের মতো সমান হারে জিয়া আদায় করবে। এ নির্দেশ পেয়ে আমর সহস্র সহস্র বন্দীকে একত্রিত করেন এবং খ্রিস্টান প্রধানদেরকে আহ্বান করেন। অতঃপর মুসলিমরা ও খ্রিস্টানরা মুখোমুখি আসন গ্রহণ করে এবং বন্দীদেরকে একের পর এক ডেকে জিজ্ঞাসা করা হয়। সে ইসলাম কবুল করবে, না স্বধর্মে নিষ্ঠাবান থাকবে। যখন কোন বন্দী ইসলাম কবুল করার ইচ্ছা জানায়, তখন মুসলিমরা গগনভেদী ‘আল্লাহু আকবার’ আওয়াজ তোলে। আর যখন বন্দী স্বধর্মে থাকার ইচ্ছা জানায়, তখন খ্রিস্টানরা আনন্দে জয়ধ্বনি করে ওঠে। এভাবে সেদিন বন্দীদের ধর্ম বিষয়ে নিষ্ঠার প্রশ্ন নিয়ে মুসলিম ও খ্রিস্টানরা আপন আপন দলভারে উল্লসিত হয়ে ওঠেছিল। বিজিত ও বিজিতার মনোভাব মুছে গিয়েছিল।

  • ওমরের শাহাদাত

    ওমরের শাহাদাত

    ওমরের শাহাদাত

    দেশে দেশে দিকে দিকে যখন জ্বলে উঠেছিল ‘দী-ই-ইসলামী লাল মশাল’ যখন ‘রণধারা বাহি’ ‘জয় গান গাহি’ ‘উন্মাদ কলরবে ভেদি’ ‘মরুপথ গিরিপর্বত’, মুসলিম বাহিনী পূর্বে সিন্ধুদেশ সীমান্ত থেকে মিসরের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বিজয়-গৌরবে বিচরণ করে ফিরছিল, ঠিক সেই চরম গৌরব মুহূর্তে ইসলাম-জগতের উপর সহসা অশনিসম্পাত হয়ে গেল। উন্মাদ নিয়তির তর্জনীহেলনে ইসলামের অগ্রগতি নিমেষে রুদ্ধ ও স্তব্ধ হয়ে গেল।

    তেইশ হিজরীর ছাব্বিশে জিলহজ্জ বুধবার দিন। (তেসরা নভেম্বর, ৬৪৪ খ্রি.)। ওমর মারাত্মকভাবে আহত হন। তারপর মাত্র তিনদিন জীবিত ছিলেন।

    ওমরের আততায়ীর নাম ছিল ফিরোজ ওরফে আবু লুলু। জাতিতে সে পারসিক, ধর্মে অগ্নিপূজক। মাত্র দুবছর পূর্বে নিহাওন্দের যুদ্ধে বন্দী হয়ে সে  মদিনায় আনীত হয় এবং মুগিরাহ্ বিন্-শব্‌হার গোলাম হিসাবে তাঁর আজ্ঞাধীন হয়।

    সে-বছর হজ সমাপনান্তে ওমর  মদীনায় প্রত্যাগত হন। কয়েক দিন পর তিনি বাজারের পথে যাচ্ছিলেন, এমন সময় আবু লুলু তাঁর পথরোধ করে ও নালিশ জানায়: আমীরুল মুমেনীন! আমায় মুগিরার হাত থেকে বাঁচান। তিনি অন্যায়ভাবে আমার উপর বেশি কর নির্ধারণ করেছেন। ওমর জিজ্ঞাসা করলেন, করের পরিমাণ কত? সে উত্তর দিল, দৈনিক দুই দিরহাম। ওমর পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, কী কাজ কর তুমি? সে বললে, ছুতারের কাজ করি, ছবি আঁকি, আবার কামারের কাজও করি। তখন ওমর বলেন, পেশার তুলনায় তোমার কর তো বেশি নয়! আমি তো শুনেছি, তুমি হাওয়ায় চলা কলও তৈরি করতে পার। সত্যি নাকি? আবু লুলু বললে, সত্যি বটে। তখন ওমর বললেন, তা হলে আমার জন্যে একটা কল তৈরি করে দাও। আবু লুলু চোখ মুখ লাল করে বললে, যদি বেঁচে থাকি, আপনার জন্যে এমন কল তৈরি করবো, তার আলোচনায় পশ্চিম থেকে পূর্বদেশ মুখর হয়ে উঠবে। তার পর সে হনহন করে চলে গেল। ওমর উপস্থিত লোকদের বললেন, লোকটা আমায় শাসিয়ে গেল।

    অভ্যাসমতো ওমর সেদিন অতি প্রত্যুষে গৃহত্যাগ করে মসজিদে উপস্থিত হন ফজরের নামাজের জন্যে। নিয়মিতভাবে শ্রেণী ঠিক করা হলো এবং সকলে নামাজের জন্যে প্রস্তুত হলে ওমর ইমামতির জন্যে সবার অগ্রে দণ্ডায়মান হলেন। তখনও রঙিন ঊষার ভালে সূর্যের দীপ্তি জাগে নি। কিন্তু নামায শুরু করা মাত্রই আবু লুলু পিছন থেকে ক্ষিপ্রগতিতে ছয়বার ওমরের দেহে ছুরিকাঘাত করে, একটি আঘাত সাংঘাতিকভাবে নাভীর নিম্নদেশে লাগে। ওমর তৎক্ষণাৎ পড়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ধরো, ধরো, এই কুকুরটা আমায় খুন করে ফেললে।

    আবু লুলু রাত্রির অন্ধকারে মসজিদের এককোণে লুকিয়েছিল। তার চাদর-ঢাকা হাতের মধ্যে দুদিকে তীক্ষ্ণ ফলাযুক্ত একটি ছুরি ছিল। ওমরকে প্রাণান্তক আঘাত করেই আবু লুলু প্রাণভয়ে দৌড় দেয়। উপস্থিত নামাযীরা প্রথমে হকচকিয়ে উঠে, তার পর আবু লুলুকে তাড়া করে। সে ছুরি উচিয়ে ডানে-বামে উন্মত্তের মতো চালাতে থাকে, ফলে বারজন আহত হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ছয়জন প্রাণত্যাগ করে। শেষে একজন পিছন থেকে একখানা চাদর ছুঁড়ে দেয় আবু লুলুর মুখের উপর। আবু লুলু পড়ে যায়, কিন্তু কায়দামতো ধৃত হওয়ার পূর্বেই ছুরি দিয়ে আত্মহত্যা করে ফেলে।

    ওমর মাটিতে পড়ে যেয়েই আবদুর রহমান-বিন্-আউফকে ইঙ্গিত করলেন, নামাযে ইমামতি করতে এবং তার পরই মূর্ছিত হয়ে পড়লেন। আমীরুল মুমেনীনের রক্তাক্ত দেহ মাটিতে পড়ে রইলো, আল্লাহ্‌র বান্দারা নামাযে খাড়া হলেন, আবদুর রহমান নামায শেষ করলেন দুটি সংক্ষিপ্ত সুরা আসর ও সুরা কওসর আবৃত্তি করে। তারপর সকলে ধরাধরি করে ওমরকে স্বগৃহে আনয়ন করে। সেখানে তাঁর চৈতন্যেদয় হলে সর্বপ্রথম জিজ্ঞাসা করেন তাঁর আততায়ী কে? উত্তর হলো, ফিরোয। ওমর হাত তুলে বললেন, আল্লাহ্ শুকর। কোন মুসলিম আমায় খুন করে নি। আমার কোন আরব খুন করে নি।

    একজন আরব চিকিৎসক ডাকা হলো। তিনি ওমরকে কিছুটা খুর্মার রস খাওয়ান, কিন্তু সমস্তটাই নাভীর নিচের জখম দিয়ে বেরিয়ে গেল রক্তরঙীন হয়ে। পুত্র আবদুল্লাহ্ একজন আনসারী চিকিৎসক ডাকালেন, বানু মাবিয়া বংশেরও একজন চিকিৎসক উপস্থিত হলেন। তাঁদের নির্দেশ অনুযায়ী খলিফাকে কিছু দুগ্ধ পান করান হয়। কিন্তু তার সমস্তটুকুই উক্ত জখম দিয়ে বেরিয়ে গেল, একটুও বর্ণের পরিবর্তন হলো না। তখন চিকিৎসক খলিফাকে বললেন, আমীরুল মুমেনীন। আল্লাহ্‌র নাম স্মরণ করুন। তার পরিষ্কার অর্থ, খলিফার মৃত্যু অনিবার্য, ওমর হাসিমুখে বললেন, তবীব ভাই। তুমি সত্য কথাই বলেছ, আল্লাহ্ আমায় ডাক দিয়েছেন। উপস্থিত সকলেই এ দুরাশা পোষণ করেছিলেন, খলিফার জখম মারাত্মক নয়, আল্লাহর রহমতে নিরাময় হয়ে উঠবেন 1 এখন তাঁরা খলিফার মৃত্যু নিশ্চিত জেনে মাতম করে উঠলেন। তাঁদের মাথায় যেন বিষাদের ও শোকের পাহাড় ভেঙ্গে পড়লো। তা শুনে ওমর বললেন, আমার জন্যে অশ্রুপাত করো না। যে কাঁদবে, সে এখান থেকে সরে যাও। তোমরা কি রসূলুল্লাহ্ বাণী ভুলে গেছ, আত্মীয়ের অশ্রুবর্ষণে মৃতের উপর গযব আসে?

    এদিকে মসজিদে ও চতুর্দিকে সারা মদীনাবাসী ভেঙ্গে পড়েছে। সকলের মুখে এককথা, কেন এই হামলা খলিফার উপর? কেন আবু লুলু এমন শয়তানী কাজ করলো? এর পিছনে আর কে আছে?

    আবু লুলুর হামলার পিছনে কোন ষড়যন্ত্র ছিল কি-না এবং এ ষড়যন্ত্রের অংশীদার কে কে ছিল, সে রহস্য উৎঘাটিত হয় নি। আবু লুলু আত্মহত্যা করায় তার জবানীতে এ রহস্য উদ্ঘাটিত করার পথও চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেছে। তবু উপস্থিত মদীনাবাসী এ সম্বন্ধে যা আলোচনা করেছিল, যে যে কাহিনী ব্যক্ত করেছিল, তার কোন কোনটি ঐতিহাসিকরা ইচ্ছামত গ্রহণ করে বর্ণনা করে গেছেন। তার দরুন তাঁদেরও বর্ণনায় সামঞ্জস্য না থাকায় রহস্য উদ্ঘাটনে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে তাঁদের সকলের বর্ণনা থেকে যে কথাটি নিঃসন্দেহে স্পষ্ট হয়েছে, তার উল্লেখ করা যেতে পারে।

    যখন থেকে মুসলিমরা পারসিকদের, ইহুদী ও খ্রিস্টানদের উপর প্রভুত্ব স্থাপন করে, তাদের দেশের উপর একচ্ছত্র অধিকার বিস্তার করে এবং শাহানশাহ্ কিস্স্সা ইয়েদির্গকে লগুড়াহত কুকুরের মতো স্বদেশ থেকে বিতাড়িত করে, তখন থেকেই পারসিক ইহুদী ও খ্রিস্টানদের অন্তর-মন হিংসায় ও বিদ্বেষে ভরে যায় সারা আরবের প্রতি এবং বিশেষ করে খলিফা ওমরের প্রতি তারা আক্রোশে ফুলতে থাকে এবং আপসে তাঁর বিরুদ্ধে চুপে চুপে নিজেদের বিদ্বেষ-বিষ ছড়াতে থাকে। এ কথা স্মরণীয় যে, ওমরকে যখন বলা হয় যে, তাঁর আততায়ীর নাম আবু লুলু, তখন তিনি বলেছিলেন, তোমাদেরকে মানা করেছিলুম, কোনো বেদ্বীনকে আমার সামনে আসতে দিও না, তোমরা আমার বারণ শুনলে না। এ থেকেই পরিষ্কার যে, এ-সব অমুসলিমকে বিদ্বেষ ও হিংসার কথা তাঁরও আগোচর ছিল না। এ কথা নিঃসন্দেহ যে, সংখ্যাল্প হলেও  মদীনায় এ-সব আযমী অমুসলিমদের একটি জামাত ছিল এবং তাদের এই বিদ্বেষ ও হিংসার কথাও অবিদিত ছিল না। হরমুযান এবং জুফিনাহকে তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে মিশতে দেখা যেতো। হরমুজানের পরিচয় পূর্বেই দেওয়া হয়েছে। জুফিনাহ্ ছিল হিরাবাসী একজন খ্রিস্টান এবং সা’দ-বিন-আবু ওক্কাসের একজন দুগ্ধভাই। এই্ আত্মীয়তাহেতু সা’দ তাঁকে মদীনায় আনয়ন করেন। জুফিনাহ্ মদীনায় মুসলিম বালকদেরকে লেখাপড়া শিখাতো।

    আবদুর রহমান-বিন্-আউফ যখন ওমরকে জখম-করা ছুরিখানা দেখেন, তখন বলেছিলেন আমি এই ছুরি গতকাল হরমুযান ও জুফিনার নিকট দেখেছি। আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করি, এ ছুরি দিয়ে কি হবে? তারা উত্তর দেয়, গোশত কাটবে। আবদুর রহমান-বিন্-আবুবকরও বলেছিলেন : আমি গত রাতে ওমরের আততায়ী আবু লুলুর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেম। তখন লক্ষ্য করলেম, সে হরমুযান ও জুফিনাহ সঙ্গে চুপি চুপি আলাপ করছে। আমি নিকটবর্তী হতেই আবু লুলু পালাবার চেষ্টা করে এবং তখন একটা ছুরি তার নিকট থেকে পড়ে যায়। তার মাঝখানে বাঁট এবং দুদিকে ফলা। বলা বাহুল্য, এমন দুজন সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাবান ব্যক্তির সাক্ষ্যের পর এই ষড়যন্ত্রের অস্তিত্ব সম্বন্ধে এবং হরমুযান ও জুফিনাহর তাতে অংশগ্রহণ করা সম্বন্ধে কারও এতটুকু সন্দেহ থাকে না, এবং এরূপে নিঃসন্দেহ হয়েই আবুল্লাহ্-বিন-ওমর হরমুযান ও জুফিনাহকে হত্যা করেন।

    মৃত্যু সম্বন্ধে নিঃসন্দেহের হয়ে ওমর প্রথমেই পুত্র আবদুল্লাহকে আদেশ দেন, আয়েশা সিদ্দীকার নিকট যেয়ে তাঁর অনুমতি প্রার্থনা করতে যে তিনি যেন আঁ-হযরতের একপাশে ওমরকে সমাহিত করার সম্মতি দেন। বলা বাহুল্য, ইতিপূর্বে আবুবকর সিদ্দীককে রসূলে-করীমের একপাশে সমাহিত করা হয়েছিল। আবদুল্লাহ আয়েশার নিকট উপস্থিত হয়ে প্রার্থনা জানালে আয়েশা ক্রন্দন করতে করতে বললেন: আমার ইচ্ছে ছিল এই স্থানটি আমার জন্যে নির্দিষ্ট থাকবে। কিন্তু আজ নিশ্চয়ই ওমরকে আমার উপরে স্থান দেব। তাঁর ইচ্ছা পূরণ হবেই। আবদুল্লাহ গৃহে ফিরলে ওমর অধীর আগ্রহে জিজ্ঞাসা করলেন, কী খবর বৎস? পুত্র উত্তর দিলেন, আপনার যাতে সন্তুষ্টি। ওমর স্মিত কণ্ঠে বললেন, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কামনা ছিল এইটিই। কিন্তু আমার নির্দেশ রইল, আমার লাশ নিয়ে আয়েশার গৃহে যেয়ে পুনরায় তাঁর অনুমতি নিও। তখন আমি খলিফা থাকব না এবং তখন তিনি সম্মতি দিলে আমায় সমাহিত করো।

    ওমরের পরে কে-এটাই ছিল সে-সময়ের সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন। ইসলামের সবচেয়ে কঠিন সমস্যা ছিল, কে ওমরের পরে খলিফা হবেন। সকল সাহাবাই ওমরকে বারবার আরজ করলেন শেষ-নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে তিনি যেন উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। এমন সঙ্কটময় মুহূর্তে তিনি যেন এ-সমস্যার সমাধান করে যান।

    ওমর এ-প্রশ্নটি পূর্বে বহুবার চিন্তা করেছেন। বহুবার তাঁকে দেখা গেছে একাকী গভীর চিন্তায় মগ্ন আছেন শুধুমাত্র এই সমস্যাটি নিয়ে। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলতেন, খেলাফতের সমস্যাই তাঁকে বেশি চিন্তিত করেছে। কিন্তু বারবার চিন্তা করেও তিনি উত্তরাধিকারী নির্বাচনে স্থির-নিশ্চয় হতে পারেন নি। এজন্যে মাঝে মাঝে গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করে বলতেন, কী আফসোস! আমি কাউকে এই গুরুভার বোঝা বইবার উপযুক্ত দেখছিনে। সাহাবাদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন, যাঁরা তাঁর উত্তরাধিকারী হওয়ার যোগ্যতা রাখতেন। তাঁদের নাম সা’দ বিন্-ওক্কাস্, আবদুর রহমান বিন্ আউফ্, আলী বিন আবু তালিব, ওসমান-বিন আফ্ফান, জুবায়ের বিন্-আওয়াম ও তোলায়হা বিন্ আবদুল্লাহ্। কিন্তু ওমরের চোখে তাঁদের একটা না একটা স্বভাবগত দোষ ছিল এবং এ কথা তিনি বহুবার প্রকাশ্য ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের মধ্যে আলীকেই তিনি সবচেয়ে উপযুক্ত বিবেচনা করতেন, কিন্তু কয়েকটি কারণে তাঁকেও তিনি মনোনীত করতে পারেন নি।

    এখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত হয়ে জনগণের প্রবল অনুরোধে ওমর এই ওসিয়ত করে যান: এই ছয়জনের চেয়ে আর কাউকে খলিফা হওয়ার উপযুক্ত মনে করি নে। তাঁদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশি ভোটের অধিকারী হবেন, তিনিই আমার পর খলিফা হবেন। যদি সা’দ নির্বাচিত হন, তা হলে তিনিই খলিফা হবেন, তাঁর দ্বারা কোনও ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তেমনি অন্য কেউ নির্বাচিত হলে মুসলিমরা বিনা দ্বিধায় তাঁকে গ্রহণ করবেন।

    নিষ্ঠুর আততায়ীর হাতে ছয়টি প্রাণঘাতী আঘাতের যন্ত্রণা সহ্য করে মৃত্যুর সঙ্গে সংগ্রামকালেও ওমর ইসলাম, মুসলিম জাতি ও আরবের অগ্রগতি, সংগতি এবং নিরাপত্তার বিষয় চিন্তা করেছেন, এ থেকেই তাঁর এ তিনটির প্রতি নিষ্ঠা ও প্রেমের প্রকৃষ্ট পরিচয় মেলে। তিনি সমাগত জনগণকে উদ্দেশ্য করে শেষ উপদেশ দিয়েছিলেন: আমার পর যিনিই খলিফা নির্বাচিত হোন, তাঁকে এই পাঁচ শ্রেণীর ব্যক্তির অধিকার ও দাবী-দাওয়া রক্ষার্থে বিশেষ সাবধান করছি: মুহাজেরীন, আনসারী, বেদুঈন, পরদেশে প্রবাসী আরবগণ ও জিম্মী অর্থাৎ ইসলামের আশ্রয়প্রার্থী খ্রিস্টান ইহুদী ও অগ্নি পূজকগণ। প্রত্যেক শ্রেণীর সুবিধা, অসুবিধা ও জন্মগত অধিকার সম্বন্ধে অবহিত করে জিম্মীদের সম্বন্ধে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন, সমকালীন খলিফার প্রতি আমার শেষ নির্দেশ রইলো, তিনি যেন আল্লাহ ও রসূলের প্রতি তাঁর কর্তব্য যথাসাধ্য পালন করেন। তিনি যেন জিম্মীদের সঙ্গে প্রতিশ্রুত শর্তসমূহ মর্যাদার সঙ্গে রক্ষা করেন, তাদের শত্রুদের কবল থেকে রক্ষা করেন, এবং তাদেরকে সহ্যাতীত কোন হুকুমে বাধ্য না করেন।

    সাধারণের প্রতি কর্তব্য পালন করে ওমর ব্যক্তিগত শেষ কর্তব্যের দিকে লক্ষ্য দেন। তিনি পুত্র আবদুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করলেন বায়তুল মাল থেকে আমার ঋণের পরিমাণ কত? আবদুল্লাহ জওয়াব দিলেন: ছিয়াশি হাজার দিরহাম, উল্লেখযোগ্য যে, ওমর এই অর্থ বিভিন্ন সময়ে গ্রহণ করে সৎকার্যে দান করেছিলেন, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত খরচের জন্যে নয়। ওমর তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দেন: এই দেনা আমার নিজস্ব সম্পত্তি বিক্রয় করে শোধ করে দিও। তাতে সঙ্কুলান না হলে আদি গোত্রের লোকদের বলো, বাকী দেনা শোধ করে দিতে এবং তারাও অসমর্থ হলে কোরায়েশীদেরকে বলো, ঋণভার গ্রহণ করতে। অন্যের উপর এ বোঝা ফেলে দিও না। পরবর্তীকালে এই সমস্ত দেনা আমীর মু’আবীয়ার নিকট থেকে ক্রীত ওমরের বাসগৃহ বিক্রয় করে শোধ করা হয়। উল্লেখযোগ্য যে: বাবু-স্সালাম বা শান্তি দ্বার ও বাবু-র্ রহমাত বা করুণার দ্বার নামক দুটি পবিত্র দরওয়াজার মধ্যবর্তী স্থানে এই বাসগৃহ অবস্থিত ছিল এবং তার বিক্রয়মূল্যে দেনা শোধ করায় তার নামকরণ হয় দারুল-কাজা।

    ওমর আহত হন বুধবার প্রত্যুষে। শনিবার তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দশ বছর ছয় মাস চারদিন ওমর ইসলাম জগতের খলিফা ছিলেন। তিনি যখন খলিফা মনোনীত হন আবুবকরের দ্বারা তখন লোকেরা তাঁর মেজাজের রুক্ষতা ও কঠোরতা স্মরণ করে শিউরে উঠেছিল। আজ সাড়ে দশ বছরে তিনি জনগণের সবচেয়ে বড় বন্ধু, সবচেয়ে হিতকারী ও ন্যায়নিষ্ঠ শাসক হিসেবে তাদের মনে মণিকোঠায় শ্রদ্ধার ও প্রীতির স্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সেজন্যে আপামর সাধারণ তাঁর মৃত্যুতে নিজেদেরকে এতিম ও ভাগ্যাহত বিবেচনা করে শোকে অধীর হয়ে গেল। আলী তাঁর মৃত্যুতে অধীর হয়ে বলেছিলেন: আবু হাস! আল্লাহ আপনাকে নিজের করুণাধারায় সিক্ত করে দিলেন। কিন্তু আমার নিকটে রসূলুল্লাহ (স.) ব্যতীত আপনার ন্যায় কেউ প্রিয়জন ছিলেন না। আপনার আমলনামার সঙ্গে আমি আল্লাহর নিকট হাজির হবো।

    জানাযার জন্যে ওমরের লাশ মসজিদে নীত হলে রসূলুল্লাহ্র মরদেহ মুবারক ও মিম্বারের মাঝেখানে রাখা হয়। ওসমান ও আলী জানাযা পড়াবার জন্যে ইচ্ছুক হলে আবদুর রহমান-বিন্-আউফ বললেন, তিনি হুকুম দিয়ে গেছেন শোহায়েবকে নামায পড়াতে। শোহায়েব নামায পড়ালেন এবং আবদুল্লাহ্-বিন্-ওমর, ওসমান, আলী, আবদুর রহমান-বিন্-আউফ্, সা’দ ও জুবায়ের তাঁর নশ্বর দেহ কবরের শেষ শয্যায় রক্ষা করলেন।

    ধূলির দেহ ধূলিশয্যায় ধন্য হলো। পবিত্র নিষ্কলুষ আত্মা ফিরে গেল সেই অনন্ত অসীম প্রেমময়ের উদ্দেশ্যে, যেখান থেকে ধূলির ধরণীতে তার আবির্ভাব হয়েছিল। আটাশ বছর পূর্বে একদিন যার সম্মুখে হাতের শমশের ফেলে দিয়ে সব গর্ব, সব অহঙ্কার চোখের পানিতে ডুবিয়ে, যে রসূলে করীমের আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন, ষোল বছর ধরে ছায়ার মতো যাঁর চরণচিহ্ন দশ বছর সগৌরবে বহন করেছিলেন, আজ মৃত্যুর পর তাঁর পার্শ্বদেশে অনন্তশয্যা লাভ করে ওমরের দেহাবশেষও ধন্য হয়ে গেল। ইসলামের এক গৌরব-জ্যোতি অন্তর্হিত হয়ে গেল। অর্ধ পৃথিবীর অধীশ্বর হয়েও দুস্থ ধূলির সম্রাট আজ মৃত্যুর কবাট খুলে কোন্ সার্বজন্য আবেহায়াতের সন্ধানে চলে গেলেন; রেখে গেলেন সাম্য-মৈত্রী-তিতিক্ষার মহামন্ত্র। কোটি কোটি নরনারী শোক বিহ্বল হয়ে এতিমের মতো অসহায় কণ্ঠে আহাজারী করতে লাগলো:

    ওমর! ফারুক! আখেরী নবীর ওগো দক্ষিণ বাহু!

    আহ্বান নয়, রূপ ধরে এস, গ্রাসে অন্ধতা-রাহু।

  • রাজ্যজয় ও রাষ্ট্রগঠন

    রাজ্যজয় ও রাষ্ট্রগঠন

    রাজ্যজয় ও রাষ্ট্রগঠন

    ওমরের সাড়ে দশ বছর খেলাফৎ আমলে মোট বাইশ লক্ষ একান্ন হাজার ত্রিশ বর্গমাইল ভূ-খণ্ড ইসলামিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তার বিস্তৃতি ছিল মক্কাকে কেন্দ্র করে এক হাজার ছত্রিশ মাইল উত্তরে, এক হাজার সাতাশি মাইল পূর্বে এবং চারশো তিরাশি মাইল দক্ষিণে, পশ্চিমে লোহিত সাগরের উপকূল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে। এই ভূখণ্ড সমগ্র ইন্দো-পাকিস্তান উপমহাদেশ ও ইরানের সমষ্টি এলাকার প্রায় সমতুল্য। পশ্চিমে মিসর থেকে শুরু করে সিরিয়া, খোজিস্তান, ইরাক-আরব, ইরাক-আযম, আর্মেনিয়া, আজরবাইজান, ফারস্, কিরমান, খোরাসান, মাকরান ও পূর্ব সীমান্তে বেলুচিস্তানের কিয়দংশ ছিল এই বিশাল ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। আরও উল্লেখযোগ্য যে, এই ভূখণ্ডে তখন পারস্যের কিার ও পূর্ব রোমক রাজ্যের সীজারের দুটি সাম্রাজ্য অবস্থিত ছিল। আর এই সাম্রাজ্য দুটিই ছিল সমকালীন বিদিত পৃথিবীর মধ্যে ধন-সম্পদে, সামরিক শক্তিমত্তায়, কৃষ্টিসভ্যতায় ও শিল্পকলায় শীর্ষস্থানীয়।

    এই বিশাল ভূখণ্ডের এমন বিদ্যুৎগতিতে অধিকার সম্বন্ধে আলোচনাকালে পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকগণ বলে থাকেন, পূর্বরোমক সাম্রাজ্যের ও কিরা সাম্রাজ্যের হীনবল ও অন্তিমদশাই হলো আরব-বিজয়ের প্রথম কারণ। আর দ্বিতীয় কারণ হলো, ধর্মীয় বিরোধ-বিক্ষোভহেতু স্থানীয় বাসিন্দাদের বিজেতাগণকে সাদর আহ্বান। পারস্যের মাজদক ও নেস্টরীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায় এবং পূর্বরোমক সাম্রাজ্যের বিশেষত মিসরের খ্রিস্টানরা নয়া ‘মনোলিথিক’চার্চের বিরোধী থাকায় এ সব ক্ষুব্ধ ধর্মসম্প্রদায় নিজ নিজ রাজশক্তির বিরুদ্ধভাবাপন্ন ছিল এবং তাঁরাই সক্রিয়ভাবে সাহায্য দান করে নবাগত বিজেতাদেরকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়েছিল। তার ফলেই আরব বিজয় অভিযান দ্রুত সাফল্যমণ্ডিত হয়েছিল।

    কারণ দুটিতে কিছুটা সত্য থাকলেও, তাই সবটুকু নয়। আলোচ্য সাম্রাজ্য দুটি উন্নতির শীর্ষবিন্দুতে অধিষ্ঠিত না থাকলেও মোটেই এমন হীনবল ছিল না যে, মরুচর আরবজাতির ন্যায় অর্ধসভ্য ও অনুন্নত শক্তির হাতে ভেঙ্গে চুরমার হওয়ার মতো অন্তঃসারশূন্য ছিল। পারসিকরা ও বাইজান্টাইনরা নিঃসন্দেহে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিল। তাদের সমরাস্ত্র সমূহও উন্নত ধরনের ছিল। তাছাড়া তাদের ছিল অসংখ্য লোকবল, অতুলনীয় অর্থবল, প্রচুর রসদ-সম্ভার এবং অসংখ্য সুরক্ষিত কিল্লা ও সমরঘাটি। তাঁদেরকে আক্রমণাত্মক পন্থা অবলম্বন করতে হয় নি, নিজের সুপরিচিত ও সুরক্ষিত পরিবেশে প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা সুদৃঢ় করে আত্মরক্ষা করতে হয়েছিল। একথা স্মরণীয় যে, মুসলিমদের পারস্যাভিযানে যসর, বুরায়েব, কাদিসিয়া, জালুলা, মাদায়েন, জাজিরাহ্, খোরাসান, জান্দিসাবুর, নিহাওন্দ, কামুস, আজারবাইজান, ফারস, কিরমান, সিস্তান, মাকরান ও খোরাসানে; সিরিয়া অভিযানকালে আজনা-দায়েন, দামেশক, হাল, হিস্‌, ইয়ারমুক, এমেসা ও সিজারিয়ায় এবং মিসর বিজয়াভিযানে ফারমা, ব্যাবিলন আলেকজান্দ্রিয়া ও অন্যান্য স্থানে প্রতিপক্ষের প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বিশেষত কাদিসিয়া, নিহাওন্দ, ইয়ারমুক ও আলেকজান্দ্রিয়ায় সংগ্রামকালে মুসলিমরা ভাগ্যবিপর্যয়েরও সম্মুখীন হয়ে পর্বতপ্রমাণ বাধাবিপত্তি সহ্য করে বিজয়মাল্য লাভ করেছিল। প্রতিটি শহর ও দুর্গ তাদেরকে প্রবল বাধা দিয়েছে, প্রতিটি দেশে ইঞ্চি ইঞ্চি করে অগ্রসর হতে হয়েছে। রোমক বীর জুলিয়াস সীজারের মতো ‘ভেনি ভিদি ভিসি’ অর্থাৎ ‘এলাম, দেখলাম ও জয় করলাম’ সৌভাগ্য তাদের কোনও ক্ষেত্রেই হয় নি। দুটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যশালী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে, একই সঙ্গে আক্রমণাত্মক সংগ্রাম পরিচালনাকালে মুসলিম সেনাবাহিনীর সংখ্যা কোনও সময় একলক্ষেরও উর্ধ্বে ওঠে নি। অথচ ইয়ারমুকের যুদ্ধে বিপক্ষ দলের সৈন্যসংখ্যা ছিল দুই লক্ষের উপর।

    পারস্যের প্রবল প্রতাপ কিসরা পারভেজ আঁ-হযরতের সময় জীবিত ছিলেন এবং কাদিসিয়ার যুদ্ধ হয় চৌদ্দ হিজরীতে অর্থাৎ পারভেজের মৃত্যুর তিন বছরের মধ্যেই। এতো অল্প সময়ে এতো শক্তিশালী সাম্রাজ্য হীনবল হওয়ার কথা নয়, তার অর্থ বল, সৈন্যবল পূর্বের মতোই অক্ষুন্ন ছিল। আর স্থানীয় মাজদক বা খ্রিস্টান সম্প্রদায় কোন সময়ে আরবদের সাহায্য করেছে, এমন তথ্যও ইতিহাসে মেলে না। বরং স্বদেশ রক্ষার্থে তারা রাজশক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে, এরূপ সাক্ষ্যই পাওয়া যায়।

    অপরদিকে সীজার হিরাক্লিয়াসও ছিলেন প্রবল প্রতাপান্বিত সম্রাট। ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি খ্রিস্টান-জগতের নয়া ত্রাতা ও পূর্বরোমক সাম্রাজ্যের ক্রুশটি উদ্ধার করেন ও বিরাট শান-শওকতের সঙ্গে জেরুজালেমে তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তখন তার অখণ্ড প্রতাপ। মুতার যুদ্ধে (৮ হিজরী=৬৩০ খ্রি.) তাঁর অজেয় বাহিনী মুসলিমদের পরাজিত করেছে এবং আরবদের অন্তর্ভেদ করে মদীনা আক্রমণের জন্য হুমকি দেওয়ায় আরবজাতি দুরুদুরু বক্ষে প্রতীক্ষা করেছে। অথচ মাত্র ছয় বছর পরে ইয়ারমুকের যুদ্ধে (১৫ হি.=৬৩৬ খ্রি.) সীজারের বিশ্বত্রাসী বিরাট বাহিনী বিধ্বস্ত হয়ে গেছে সেই আরবজাতির হস্তে এবং হিরাক্লিয়াস্ শশকের মতো বাইজান্টাইনের পথে পলায়ন করেছেন সিরিয়াকে চিরবিদায় জ্ঞাপন করে। এ কি শুধু ভাগ্যের লীলাবৈচিত্র্য, না আরও কোনও বাস্তব কারণঘটিত?

    আমাদের দৃষ্টিতে মুসলিম-বিজয়ের প্রকৃত কারণ ছিল ইসলামের শিক্ষার মহিমা, যার দরুন গোটা আরবজাতি উৎসাহে, সঙ্কল্পে, একগ্রতায়, বীর্যে ও নির্ভীকতায় নয়াভাবে সন্দীপিত হয়েছিল এবং ওমরের ব্যক্তিত্বের বলে এ গুণাবলী সুতীক্ষ্ণ ও সুদৃঢ় হয়েছিল। তার সঙ্গে হয়েছিল একটা নয়া জাতির আত্মচেতনা, প্রাণবন্ত লৌহ-কঠিন মনোবল অত্যুচ্চ সাধুতা ও অপক্ষপাত ন্যায়পরায়ণতা। যখনই একটা নতুন অঞ্চল বিজিত হয়েছে, তার অধিবাসীরা বিজেতা মুসলিমদের অত্যুচ্চ চরিত্রবলে এবং ন্যায়দৃষ্টি ও সহানুভূতিতে মুগ্ধ হয়ে গেছে, আর তাদের অন্তর মন থেকে বিজেতাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব নিঃশেষে মুছে গেছে। স্মরণীয় যে ইয়ারমুকের যুদ্ধের প্রাক্কালে মুসলিমরা যখন কয়েকটি অধিকৃত শহর পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়, তখন তারা সমস্ত আদায়কৃত জিয়া ফেরত দিয়েছে এবং খ্রিস্টান অধিবাসীরা মুসলিমদের পুনরাগমনের জন্যে প্রার্থনা জানিয়েছে ও ইহুদীরা তওরাত হাতে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করেছে, সীজারকে তারা প্রাণ থাকতে আর গ্রহণ করবে না।

    দ্বিতীয় কারণ ছিল, সিরিয়া ও ইরাক প্রবাসী আরব গোত্রসমূহের মধ্যে জাতীয় ও গোত্রীয় চেতনায় ফল; এজন্যে তারা খ্রিস্টান হয়েও স্বজাতি আরব-বিজেতাদেরকে অন্তর দিয়ে গ্রহণ করেছে এবং প্রায় ক্ষেত্রে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিমদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। দামেশকের ঘাস্সানী গোত্রীয় আরবরা সিরিয়া বিজয়কালে এবং ইরাকের লামিদ্ গোত্রীয় আরবরা প্রথম সুযোগেই স্বজাতির সঙ্গে মিশে গেছে এবং সীজার ও কিার বিরুদ্ধে সাহায্য করেছে। সিরিয়া অভিযানকালে আরও লক্ষ্য করা গেছে যে, রোমসম্রাটের বিরুদ্ধে প্রজামণ্ডলী বিরূপ ছিল প্রধানত তিনটি কারণে : অসহনীয় করভার, ভূমিদাসত্বের প্রবর্তন এবং ইহুদীদের রোম-চার্চের বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি ধর্মীয় জুলুম। মিসরকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের শস্যভাণ্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং কৃষিজাত শস্যের অধিকাংশই শোষণ করে কনস্টান্টিনোপলে চালান করে দেওয়া হতো। এজন্যে প্রজাকুল সীজারের শোষণ নীতির ফলে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল এবং অন্তর-মনে তাঁর শাসনের ইতি কামনা করতো।

    ওমরের বিজয়সমূহের সঙ্গে আলেকজান্দার, চেঙ্গিস খান, নেবুকাত-নাজার, অমীর তাইমুর, নাদির শাহ্ প্রভৃতি বিশ্ববিজয়ী বীরের বিজয়-কাহিনীর সঙ্গে অনেকে তুলনামূলক আলোচনা করে থাকেন। অবশ্য এ রকম তুলনা কোনক্ষেত্রেই শোভনীয় ও সঙ্গত নয়। তবে তুলনার কথা প্রসঙ্গে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, তাঁদের সকলের বিজিত সাম্রাজ্য কোন্ দিন ধূল্যবলুণ্ঠিত হয়ে গেছে, কিন্তু তের শো বছরের পরেও ওমরের অধিকৃত এলাকাসমূহ এখনও মুসলিম শাসনাধীন আছে। আর ওমরের বিজয়সমূহের কোনও ক্ষেত্রে রক্তাক্ত হিংসার পথ অবলম্বিত হয় নি, কোথাও সামগ্রিকভাবে ধ্বংসাত্মক কার্য বা হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয় নি। যুদ্ধের পর প্রজাগণের জান-মাল নিরাপদ হয়েছে, এমন কি যুদ্ধের সময় নারী বা শিশু হত্যা, নিরীহ নগরবাসীর হত্যা বা উৎপীড়ন, এমন কি বৃক্ষ ফসলের ক্ষেত ধ্বংস করা হয় নি। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সন্ধির শর্তসমূহ সততার সঙ্গে প্রতিপালিত হয়েছে। এজন্যে ওমরের নামোচ্চারণও এ-সব বিশ্বত্রাস বীরগণের সঙ্গে শোভনীয় নয়। আরও লক্ষণীয় যে, আলেকজান্দার, চেঙ্গিস, তাইমুর প্রভৃতি স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন, নরহত্যাযজ্ঞে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন; কিন্তু ওমর কখনও মদীনার বাইরে পদার্পণ করেন নি। অন্যান্য বীর অসংখ্য সশস্ত্র দেহরক্ষীবেষ্টিত হয়ে জনগণ মনে ত্রাস সঞ্চার করে ফিরেছেন। কিন্তু ওমর একজনও দেহরক্ষী বা দ্বাররক্ষী নিযুক্ত করেন নি। এমন কি দু’বার সিরিয়া যাত্রাকালে একটি মাত্র বাহন অনুচর ব্যতীত অন্য কোন সঙ্গী গ্রহণ করার প্রয়োজন অনুভব করেন নি। সাধারণের মধ্যে সমানভাবে মেলামেশা করেই নয়, একাত্ম হয়ে তাদের সঙ্গে মিশে যেয়ে এরূপ বিশাল ভূ-খণ্ডের শাসনদণ্ড পরিচালনার দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত বিশ্ব-ইতিহাসে বিরল।

    অথচ ওমর ছিলেন কার্যত বিজয়সমূহের স্বয়ং সিপাহসালার। সামরিক বিভাগের সংগঠন, পরিকল্পনা, শৃঙ্খলাবিধান, নিয়ন্ত্রণ, সমস্তই তাঁর তর্জনী শাসিত ছিল। এমন কি, সৈন্য সংগ্রহ, ছাউনী নির্মাণ, সৈন্যদের কুচকাওয়াজ, সমরঘাঁটি নির্মাণ, অস্ত্রপরীক্ষা ও অনুমোদন, অবরোধ বা আক্রমণের গতি নিয়ন্ত্রণ, সব কিছুই ওমর মদীনার মসজিদের ধূলিশয্যায় বসে কৃতিত্বের সঙ্গে পালন করেন গেছেন। কাদিসিয়ার যুদ্ধকালে তিনি মদীনায় বসে যুদ্ধক্ষেত্রের ম্যাপ ঠিক করেছেন, সৈন্যবিন্যাসের ব্যবস্থা করেছেন, কে কোন দিকের বা কোন বাহুর সৈন্যাধ্যক্ষ হবেন, ও কে কিভাবে সৈন্য চালনা করবেন, তারও নির্দেশ প্রদান করেছেন নিখুঁতভাবে। নিহাওন্দ ও হিমসের যুদ্ধকালে মুসলিমবাহিনী কঠিন সঙ্কট-মুহূর্তের সম্মুখীন হলে ওমরই রণচাতুর্যের নির্দেশ দিয়ে শত্রুপক্ষকে বিধ্বস্ত করার উপায় বিধান করেছেন। সম্মুখসমরে উপস্থিত না হয়েও এ-রকম রণনীতি পারঙ্গমতার উদাহরণ ইতিহাসে সুলভ নয়।

    ওমর একহাতে রাজ্যজয় করেছেন, প্রশাসনিক ব্যবস্থা অবলম্বন করেছেন দক্ষতার সঙ্গে এবং শান্তি শৃঙ্খলা স্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনাও করেছেন সুচারুরূপে। এজন্যে যতগুলি দফতরের প্রয়োজন, সে সবেরও প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সে সবের সুষ্ঠু কার্যনির্বাহের প্রণালীও উদ্ভাবন করেছেন প্রবীণ শাসকের যোগ্যতা নিয়ে। বলা বাহুল্য, মুসলিম রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন রসূলে করীমের দ্বারা হলেও প্রশাসনিক দফতরসমূহের সৃষ্টি ওমরের আমলেই হয়েছিল।

    ওমরের রাষ্ট্র-সংগঠনিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় শাসন-নীতিসমূহের আলোচনার প্রারম্ভে এ কথা সুস্পষ্ট হওয়া দরকার যে, ইসলামী রাষ্ট্র ছিল পূর্ণ গণতান্ত্রিক, স্বেচ্ছাতান্ত্রিক বা একতান্ত্রিক নয়। আরব-চরিত্রের বৈশিষ্ট্য গণাভিসারী হওয়া, একনায়কত্ব তারা বরদাস্ত করতে পারতো না। এজন্যে ওমরের সম্মুখে রোমক ও পারসিক রাজতান্ত্রিক শাসনের দৃষ্টান্ত থাকলেও তিনি সহজেই গণতান্ত্রিক শাসনের অনুসারী হন। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যে কয়টি মৌল প্রতিষ্ঠান-গণানুমোদিত নিয়মতান্ত্রিক সরকার, গণপরিষদ ও স্বাধীন বিচার বিভাগ-সে-সবের বাস্তব রূপায়ণও হয়েছিল ওমরের হাতে।

    প্রথমেই উল্লেখ করা যায় ‘মজলিস-ই-শুরা’ বা মন্ত্রণাসভার। যখনই শাসনসংক্রান্ত কোনও প্রশ্ন দেখা দিত, তখনই ‘মজলিস-ই-শুরা’র অধিবেশনে ডাকা হতো, এবং খলিফা প্রশ্নটি উপস্থিত করে সকলের স্বাধীন মতামত আহ্বান করতেন। রীতিমতো তর্কবিতর্কের পর সংখ্যাধিক্যের মতানুযায়ী প্রশ্নটির মীমাংসা গৃহীত হতো। এই মজলিসে মুহাজেরীন ও আনসারী প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকতেন। মজলিসের সদস্যসংখ্যা এবং তাঁদের সকলের নাম না পাওয়া গেলে, লক্ষ্য করা গেছে, ওসমান, আলী, আবদুর রহমান-বিন্-আউফ, মুয়ায-বিন্-জবল, উবায়-বিন্-কাব এবং যায়েদ-বিন্-সাবিত সভ্য হিসেবে বরাবর উপস্থিত থেকেছেন এবং আলোচনায় অংশগ্রহণ করে স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করেছেন। মজলিসের অধিবেশনে এভাবে ডাকা হতো: একজন নির্দিষ্ট খতিব থাকতেন, তিনি মদীনাবাসীদেরকে নামাযে আহ্বান করতেন। সকলে উপস্থিত হলে ওমর প্রথমে মসজিদে নববীতে দুরাকাত নামায পড়তেন। তার পর মিম্বারে দাঁড়িয়ে বিষয়টি সকলের সম্মুখে উপস্থিত করতেন। সাধারণ দৈনন্দিন সমস্যাগুলির সমাধান এভাবে করা হতো। কিন্তু কোনও গুরুতর সমস্যা উপস্থিত হলে মুহাজেরীন ও আনসারীদের সাধারণ অধিবেশন ডাকা হতো। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, ইরাক ও সিরিয়া বিজয়ের পর কয়েকজন সাহাবা দাবী করেন যে, অধিকৃত অঞ্চলের জমি সৈন্যদেরকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে বন্টন করে দেওয়া হোক। এ প্রশ্নের মীমাংসা হেতু আনসারী, মুহাজেরীন এবং আউস ও খাজরাজ গোত্রের পাঁচ জন করে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির মজলিস বসে। কয়েকদিন ধরে আলোচনা চলে। তখন ওমর যে বক্তৃতা দেন, তা থেকে খলিফার ক্ষমতা ও অধিকার সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ পরিচয় মেলে: আমি আপনাদেরকে আহ্বান করেছি, রাষ্ট্র সম্বন্ধে আমার গুরুভার দায়িত্বের অংশগ্রহণ করতে। কারণ, আমি আপনাদেরই একজন মাত্র এবং আমি চাই নে, আপনারা আমার ইচ্ছার, অনুবর্তী হবেন। একুশ হিজরীতে নিহাওন্দ যুদ্ধের প্রাক্কালে সঙ্কট সম্বন্ধে বিবেচনার জন্যে বৃহৎ মজলিস ডাকা হয়। ওসমান, আলী, তালহা, জুবায়ের, আবদুর রহমান ও অনেকে বক্তৃতা করেন এবং সকলে মত প্রকাশ করেন, খলিফার স্বয়ং যুদ্ধস্থলে যাওয়া উচিত। কিন্তু সংখ্যাধিক্যের মতানুযায়ী স্থির হয়, খলিফার যুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়। এই রকম সৈন্যদের বেতন ও ভাতা, দপ্তরের সৃষ্টি বিদেশীদের সঙ্গে অবাধ বাণিজ্য আমদানির মাসুল নির্ণয় প্রভৃতি রাষ্ট্রীয় প্রশ্নের মীমাংসা হতো মজলিস-ই-শুরায়। ওমর একবার পরিষ্কার বলেছিলেন, লা খিলাফাতুন ইল্লা আন মাশুরাতুন্-মন্ত্রণা ব্যতীত খেলাফত নেই।

    মজলিসে-ই-শুরা বা মন্ত্রণাসভা ডাকা হতো রাষ্ট্রীয় কঠিন সমস্যা সমাধানের বিশেষ ক্ষেত্রে। দৈনন্দিন শাসনকার্য নির্বাহ ও অন্যান্য ছোট ছোট বিষয়ের মীমাংসার জন্যে দ্বিতীয় একটি মন্ত্রণাসভা ছিল। এই সভার অধিবেশনে বরাবর মসজিদে-নববীতে বসতো এবং মুহাজেরীন অংশগ্রহণ করতেন। প্রদেশ ও জিলাসমূহ থেকে যে দৈনন্দিন প্রশাসনিক রিপোর্ট আসতো, এ সভায় তা পেশ করা হতো, আলোচিত হতো ও যথানির্দেশ জ্ঞাপন করা হতো। অগ্নিপূজকদের উপর জিয়া প্রবর্তনের মীমাংসা এই সভায় স্থির হয়। ওমর সমাগত সভ্যদের সঙ্গে মসজিদে নামাযের পাটিতে বসেই সেসবের মীমাংসা করে ফেলতেন।

    উপরে মজলিস-ই-শুরা সম্বন্ধে যা বলা হয়েছে, আসলে তা ছিল পরামর্শসভা; আধুনিক পরিষদ (লেজিসলেচার) বলতে যা বোঝায়, তেমন কোনও পরিষদ খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলে ছিল না। কিন্তু যখনই কোনও রাষ্ট্রীয়নীতি সংক্রান্ত কোনও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার উদ্ভব হতো, তখনই খলিফা সমাজের নেতৃবৃন্দকে আহ্বান করে তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। এ কথাও বিশদ হওয়া দরকার যে, যাঁদের সঙ্গে এভাবে পরামর্শ করা হতো, তাঁরা সাধারণ কর্তৃক কিংবা গোত্রীয় হিসেবে এতদুদ্দেশ্যে যথাবিধি নির্বাচিত হতেন না। খলিফার একমাত্র করণীয় ছিল, শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণও বিভিন্ন গোষ্ঠী-সরদারগণকে আহ্বান করা এবং এই ছিল তাঁর মজলিস-ই-শুরা। কিন্তু তৎকালীন সমাজ-ব্যবস্থা যতটুকু প্রতিনিধিত্বশীল হওয়া সম্ভব ছিল, মজলিসে ই-শুরা ছিল ততটুকু প্রতিনিধিত্বশীল। উপস্থাপিত বিষয়টির আলোচনার পর ওমর সকলের মতামত চাইতেন, সে পরামর্শের মূল্য বিবেচনা করতেন এবং যা তিনি ঠিক মনে করতেন, সে অনুসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন— কখনও সংখ্যাগুরুর মত মেনে নিয়ে, কখনও সংখ্যালঘুর মত গ্রহণ করে এবং কখনও উভয়ের মত অগ্রাহ্য করে। রাষ্ট্রের দৈনন্দিন সমস্যাগুলোর সমাধান এভাবেই হতো; কিন্তু ওমরের চক্ষে মজলিসের গুরুত্ব কতোখানি ছিল, তার পরিচয় মেলে ওমরেরই উপরে উল্লেখিত উক্তি থেকে। এখানে আরও উল্লেখযোগ্য যে, সমসাময়িক ইতিহাসে মজলিসের বহু অধিবেশনের যে-সব বিস্তৃত বিবরণী লিপিবদ্ধ দেখা যায়, সে সব থেকে স্বতঃই প্রমাণিত হয় যে, মজলিস-ই-শুরার অধিবেশন খলিফার খেয়াল খুশীর উপর নির্ভরশীল ছিল না।

    মন্ত্রণাসভা ছাড়াও নাগরিকদের অধিকার ছিল প্রশাসনিক বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করার। প্রাদেশিক শাসক ও জিলা-শাসকরাও নাগরিকদের অভিমত অনুযায়ী নিযুক্ত হতেন। কোন কোন ক্ষেত্রে এ-সব নিয়োগ নাগরিকদের নির্বাচন মতে হতো। কুফা, বসরা এবং সিরিয়ার রাজস্বসচিব নিয়োগকালে ওমর স্থানীয় নাগরিকদের নির্দেশ দেন, তারা যেন নিজেরাই আপন আপন কর্মচারী নির্বাচন করে তাঁর নিকটে অনুমোদনের জন্যে পাঠিয়ে দেয়। সা’দ বিন্ আবু ওক্কাসের মতো বিশিষ্ট সাহাবা ও পারস্য বিজয়ী বীর কুফার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন, কিন্তু প্রজারা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। ওমর নাগরিকদের বক্তৃতার সময় তাদের স্বত্বাধিকার সম্বন্ধে সচেতন করতেন এবং সরকারী কর্মচারীদেরকে নিয়োগের সময় উপদেশলিপি দিয়ে প্রজাদের স্বত্ব ও অধিকার সম্বন্ধে সতর্ক করে দিতেন। সময়ে সময়ে, বিশেষত প্রত্যেক হজের সময় প্রাদেশিক শাসকদের সম্মেলন আহ্বান করে নাগরিকদের অধিকার সম্বন্ধে সতর্ক করতেন এবং সেগুলি যথাযথ পালন করার নির্দেশ দিতেন।

    এরূপ বিশাল ভূ-খণ্ডের রাষ্ট্রনায়ক ওমর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংগঠনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, ব্যক্তিগত জীবনে নিজেকে জনগণের সঙ্গে একই সমতলে স্থাপন করে। খলিফা হিসেবে তাঁর কোনও বিশেষ ভাতা বা ব্যয়-বরাদ্দ ছিল না, বিশেষ অধিকার বা ক্ষমতা ছিল না। আইনের চোখে তাঁর ও একজন সাধারণের মধ্যে কোন ভেদাভেদ ছিল না। তাঁর ক্ষমতা ও কার্যকলাপ সাধারণ নাগরিকদের সমালোচনার উর্ধ্বে ছিল না। বহুবার তিনি নিজে খলিফা হিসেবে তাঁর মর্যাদা ও ক্ষমতার সীমা বিশেষভাবে ব্যক্ত করেছেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে একটি উক্তি উল্লেখযোগ্য: তোমাদের বায়তুলমালে আমার অধিকার এতিমের সম্পত্তির একজন অছির চেয়ে অধিক নয়। আমি স্বচ্ছল হলে এক কপর্দকও গ্রহণ করতে পারি নে। আমি দরিদ্র হলে সকলের সমান হারে ভাতা নিতে পারি। আমার উপর তোমাদের সকলের হক্ আছে, তোমাদের তা দাবী করা উচিত। তার একটি হলো, আমি অন্যায় ভাবে কর আদায় করতে কিংবা মালে-গনিমাতের অংশগ্রহণ করতে পারি নে। দ্বিতীয়টি হলো, কর বা মালে গনিমাত আমি স্বেচ্ছামতো ব্যয় করতে পারি নে। তৃতীয়টি হলো, আমার কর্তব্য, তোমাদের নিরাপত্তার বিধান করা।

    একবার জনসমক্ষে বক্তৃতাকালে একজন চিৎকার করে ওঠে: ওমর! আল্লাহকে ভয় করো। তাকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হলে ওমর বলেন : ওকে বলতে দাও। ওরা আমায় সাবধান না করলে ওদের মূল্য কোথায়? ওদের কথা না শুনলে আমি ভুল পথে চলবো। এভাবেই শাসক ও শাসিতের ব্যবধান দূর হয়েছিল। জনগণচিত্ত হয়েছিল ভয়শূন্য, শির উচ্চ ও স্বাধীন বাপ্ৰিয়।

  • প্রশাসনিক ও রাজস্ব-ব্যবস্থা

    প্রশাসনিক ও রাজস্ব-ব্যবস্থা

    প্রশাসনিক ও রাজস্ব-ব্যবস্থা

    আধুনিক সভ্য জগতে বলিষ্ঠ ও নিখুঁত প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রথম চিহ্ন হচ্ছে, শাসন-সংক্রান্ত কর্মসমূহের সুষ্ঠু পরিচালনার্থে প্রয়োজনীয় দফতর সমূহে বিভক্ত করা এবং সেগুলির মাধ্যমে শাসনযন্ত্র সক্রিয় রাখা। মুসলিম রাষ্ট্রের শৈশব অবস্থায় ওমরের খেলাফত আমলেই এরূপ প্রয়োজনীয় দফতরসমুহের সৃষ্টি হয় এবং তাঁর কৃতিত্ব হচ্ছে উপযুক্ত নির্বাচন দ্বারা প্রত্যেক দফতরের ভারার্পণ করা।

    শাসন ব্যবস্থার প্রথম পদক্ষেপে ওমর সমগ্র মুসলিম রাজ্যকে আধুনিক মতে প্রদেশে, জিলায় ও মহকুমায় বিভক্ত করেন। তাঁর আমলেই প্রায় সাড়ে বাইশ লক্ষ বর্গমাইল বিস্তৃত বিরাট ভূভাগ অধিকৃত হয়। ঐতিহাসিকদের মতে ওমর মুসলিম রাষ্ট্রকে আটটি প্রদেশে বিভক্ত করেন: মক্কা, মদীনা, সিরিয়া, জাজিরা, বস্ত্রা কুফা, প্যালেস্টাইন। ফারস্, খোজিস্তান, কিরমান প্রভৃতি ইরাক-আযমের প্রদেশগুলি অবশ্য এ-হিসাবের মধ্যে নয়। শাসনকার্যের সুবিধার্থে ওমর অধিকৃত দেশসমূহের প্রাদেশিক ও জিলাওয়ারী বিভাগ পূর্বাপর অধিকৃত রেখেছিলেন। মুসলিম অধিকারের পূর্বে মিসরের প্রশাসনিক ব্যবস্থা কিরূপ ছিল সঠিক জানা যায় না। ওমর সুশাসনের উদ্দেশ্যে মিশরকে আটাশটি জিলা-সম্বলিত উচ্চ-মিসর প্রদেশে ও পনেরটি জিলা-সম্বলিত নিম্ন-মিসর প্রদেশে বিভক্ত করেন। উচ্চ-মিসর প্রদেশে আবদুল্লাহ-বিন্-সা’দ শাসনকর্তা ও নিম্ন মিসরে অপর একজন শাসনকর্তা নিযুক্ত হলেও আমর-বিন্-আস ছিলেন সমগ্র মিসরের গভর্নর-জেনারেল।

    প্রত্যেক প্রদেশে একটি সরকারী বালাখানা বা দারুল ওমারা ও স্থায়ী দফতরখানা বা দিওয়ান্ থাকতো। প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে ওয়ালী, তাঁর খামুনশী বা চি সেক্রেটারীকে কাতিব, সেনাবিভাগের প্রধান সচিবকে কাতিব-উদ্-দিওয়ান, রাজস্ব-সচিবকে সাহিব-উল্‌-খারিয, প্রধান খাজাঞ্চীকে সাহিব-উল্ বায়তুল-মাল ও প্রধান বিচারককে কাযী বলা হতো। প্রত্যেক প্রদেশে পৃথক সৈন্যাধ্যক্ষ নিযুক্ত হলেও ওয়ালীই প্রাদেশিক সিপাহসালার থাকতেন। পুলিশ-প্রধানকে সাহিব-উল্‌-আহ্দাস্ বলা হলেও এ-বিভাগের কর্ম অন্য আমিল দ্বারাই নির্বাহ করা হতো। প্রত্যেক জিলায় একজন জিলা প্রধান বা আমিল ও একজন কাযী থাকতেন। পরগনায় তহসীলদারের অনুরূপ কর্মচারী থাকতেন। খলিফার নির্দেশে ওয়ালী ও তাঁর কর্মচারীবৃন্দ সরাসরি নিযুক্ত হতেন। কুফায় আম্‌মার শাসনকর্তা নিযুক্ত হলে তাঁর সঙ্গে দশজন কর্মচারীও নিযুক্ত হন। খাস্-মুশী নিযুক্ত হতেন বাগ্মীতা ও রচনাশক্তির পারদর্শিতাগুণে। বসরার শাসনকর্তা আবু মুসা আশারীর খাস্ মুনশী যিয়াদ-বিন্-সামিয়া বাকশক্তিতে স্বয়ং ওমর পর্যন্ত অভিভূত ও তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করতেন। আবদুল্লাহ্ বিন্-আরকাম ছিলেন খোদ বিশ্বনবীর লিপিকার এবং লিপিকৌশলে মুগ্ধ ওমর খলিফা হয়ে তাঁকে নিজের খাস্-মুনশী নিযুক্ত করেন।

    প্রাদেশিক শাসনকর্তা ও রাষ্ট্রের অন্যান্য বিশিষ্ট কর্মচারী সাধারণত মজলিস-ই-সূরা কর্তৃক প্রকাশ্য নির্বাচন দ্বারা নিয়োজিত হতেন। ব্যক্তিত্বের মূল্যায়নে ছিল ওমরের বিশেষ দক্ষতা এবং তার দরুন কে কোন কর্মে বিশেষ পারদর্শী তার নির্ণয়নে ও সঠিক ব্যক্তি নির্বাচনে তাঁর কৃতিত্ব ছিল অসাধারণ। এজন্যে যুদ্ধের সৈন্যাধ্যক্ষ নির্বাচনের জন্যই হোক কিংবা বেসামরিক প্রাদেশিক শাসনকর্তা নিয়োগের জন্যেই হোক, জনমত নির্ধারণের হেতু মজলিস-ই-শুরার অধিবেশন ডাকা হলো প্রায় ক্ষেত্রেই মজলিস ওমরের মতানুযায়ী নির্বাচন করতো। তৎকালে সারা আরবের মধ্যে শাসকার্যে ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বাপেক্ষা দক্ষ ব্যক্তি ছিলেন চারজন-আমির মু’আবিয়া, আমর-বিন্-আস, মুগিরাহ-বিন্-শুরাহ্ ও যিয়াদ বিন-সামিয়াহ্। তাঁদের প্রথম তিনজন উচ্চ শাসনকার্যে নিয়োজিত হন এবং তরুণ যিয়াদ আবু মুসা আশারীর খামুনশী নিযুক্ত হন। মজলিস ব্যতীত প্রত্যেক নাগরিকের রাষ্ট্রীয় শাসনকার্যে মতামত দেওয়ার অধিকার স্বীকৃত হতো এবং অনেকক্ষেত্রে প্রাদেশিক ওয়ালী কিংবা জিলার আমিল নাগরিকদের দ্বারাও নির্বাচিত হতেন। কুফা, বসরা ও সিরিয়ার সাহিব-ই-খিরাজ নিয়োগের সময় ওমর এই তিনটি প্রদেশের নাগরিকদেরকে নির্দেশ দেন, তাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে সাধু ও দক্ষ নির্বাচিত হবেন, তাঁকেই নিজ নিজ প্রদেশের প্রধান রাজস্ব-সচিব নির্বাচিত করে মদীনায় তাঁদেরকে প্রেরণ করতেন। এভাবে ওসমান-বিন্-ফরকাদ্ কূফায়, হুজ্জাজ আল্লাত বসরায়, ওসমান-বিন ইয়াযিদ সিরিয়ায় নির্বাচিত হন এবং ওমর তাঁদের নির্বাচন অনুমোদন করে তাঁদেরকেই নিয়োগপত্র দান করেন।

    সরকারী কাজে নিয়োগের সময় প্রত্যেককে একখানি উপদেশলিপি দেওয়া হতো। তাতে তাঁর পদাধিকার, দয়িত্ব ও ক্ষমতার সীমা লিখিত থাকতো। মজলিসে উপস্থিত সাহাবাগণ উপদেশলিপি তস্দীক করতে। কর্মস্থলে উপস্থিত হয়ে কর্মচারীকে সর্বসমক্ষে এখানি পাঠ করতে হতো, যাতে জনগণ তাঁর পদাধিকার ও দায়িত্ব সম্বন্ধে অবহিত হয় এবং সীমা লঙ্ঘন করলে তাঁর কৈফিয়ত তলবও করতে পারে। প্রত্যেক কর্মচারীকে নিয়োগকালে এ প্রতিশ্রুতি দিতে হতো যে তিনি তুর্কী ঘোড়ায় চড়বেন না, মিহি বস্ত্ৰ পরবেন না, মিহি আটা খাবেন না এবং দরওয়াজায় প্রহরী রাখবেন না। তিনি সকলের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবেন এবং সর্বদা সকলের অভিযোগ শুনতে প্রস্তুত থাকবেন। নিয়োগের সময় প্রত্যেককেই নিজ নিজ সম্পত্তির হিসাব দাখিল করতেন। সম্পত্তির অসঙ্গত বৃদ্ধি দেখা গেলে তাকে কৈফিয়ত দিতে হতো এবং সন্তোষজনক না হলে বাজেয়াক্ত করা হতো। আবু হোরায়রাহ্ একটি কবিতায় হুজ্জাজ, নাফিস, আসিম প্রভৃতি বহু উচ্চপদস্থ কর্মচারীর অসংযত সম্পত্তি বৃদ্ধির ইঙ্গিত করেন। ওমর এ সম্বন্ধে তদন্ত করেন ও প্রত্যেকের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াক্ত করে বায়তুল মালে প্রেরণ করেন। প্রত্যেক বছর হজের সময় প্রত্যেক কর্মচারীকে মক্কায় উপস্থিত থাকতে হতো। তখন তাঁদের প্রত্যেকের কর্মের খতিয়ান হতো, অভিযোগ শ্রবণ ও সরাসরি প্রতিকার করা হতো। একবার একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে এক ব্যক্তি অভিযোগ করে যে, বিনা দোষে তাকে একশত বেত্রাঘাত করা হয়েছে। বিচারে অভিযোগ সাব্যস্ত হয় ও ওমর নির্দেশ দেন, দোষী কর্মচারীকে প্রকাশ্যে একশত বেত্রাঘাত দেওয়া হোক। আমর-বিন্-আস্ আপত্তি তুলে বলেন, এর ফলে কর্মচারীদের মনোবল ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে। কিন্তু ওমর বলেন, অপরাধীকে শাস্তি নিতেই হবে। তখন আমর ফরিয়াদিকে অনুনয় করেন প্রত্যেক বেত্রাঘাতের দরুন দুটি সোনার মোহর ক্ষতিপূরণ হিসেবে গ্রহণ করতে।

    কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সময়ে সময়ে খলিফার নিকট যে-সব অভিযোগ উপস্থিত হতো সে সবের তদন্তের জন্য মুহম্মদ বিন্-মস্‌লেমাহ্ নামক একজন প্রাচীন ও সর্বজনমান্য সাহাবা নিযুক্ত হন। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উপস্থিত হলে তিনি প্রকাশ্য তদন্ত করতেন। ২১ হিজরীতে কুফাবাসীরা কাদিসিয়ার সমরবিজয়ী সা’দ-বিন্-ওক্কাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। তখন সঙ্কটজনক মুহূর্ত হলেও ওমর মুহম্মদ-বিন্-মস্‌লেমাকে তদন্তে কুফায় প্রেরণ করেন। কখনও কখনও তদন্ত-সভা গঠিত হতো কয়েকজন সমবায়ে এবং তদন্ত শেষে রিপোর্ট পেশ করা হলে খলিফা অভিযুক্ত কর্মচারীকে মদীনায় উপস্থিত হতে নির্দেশ দিতেন ও নিজে তাঁর কৈফিয়ত শ্রবণ করতেন। বসরার শাসক আবু মুসা আশারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উপস্থিত হলে ওমর নিজেই সাক্ষ্য প্রমাণ লিপিবদ্ধ করেন এবং প্রমাণিত অভিযোগের প্রতিকার করেন। মিসরের ওয়ালী আইয়াহ্ বিন্ ঘানামের বিরুদ্ধে অভিযোগ হয়, তিনি মিহি বস্ত্র পরিধান করেন ও দৌবারিক রাখেন। মুহম্মদ বিন্-মসলেমাহ্ তদন্ত পূর্বক আইয়াযকে মিহি বস্ত্র পারহিত অবস্থার মদীনায় উপস্থিত করেন। ওমর নির্দেশ দেন : আইয়াযকে কোরা পশমের বস্ত্র পরে জঙ্গলে মেষচারণ করতে হবে। আইয়াহ্ এরূপ শাস্তিকে মৃত্যুর চেয়েও কঠিন বলে আক্ষেপ করলে ওমর বলেছিলেন : যার পিতা ছিল মেষের রাখাল এবং তার দরুন তার উপাধি ছিল ঘানাম, তার পুত্রের এ আক্ষেপ সাজে না। সাদ-বিন্-ওক্কাস কুফায় একটি বিশাল বালাখানা নির্মাণ করে দারওয়ানেরও ঘর রাখেন। ওমরের নির্দেশে সেটি ভস্মীভূত করা হয়।

    এ সব ব্যবস্থা থেকে লক্ষণীয় যে, ওমর সরকারী কর্মচারী ও জনগণের মধ্যে কোন শ্রেণীগত বৈষম্য রাখতে চান নি, যার দরুন জনগণের মনে হীনমন্যতার ভাবোদ্রেক হয়। কারণ এ রকম উচ্চ-নীচ ভেদ জ্ঞান থেকেই শাসক শ্রেণীর মধ্যে যথেচ্ছাচার ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ উপস্থিত হয় এবং শাসক শ্রেণী জনগণের রক্ষক ও সেবক না হয়ে ভক্ষক ও প্রভু হয়ে উঠে। ওমর বারবার কর্মচারী শ্রেণীকে সাবধান করে বলছেন: স্মরণ রেখো! আমি তোমাদের জনগণের প্রভু ও শোষক নিযুক্ত করি নি। তোমরা তাদের নেতৃত্ব দেবে, যাতে তারা তোমাদের আদর্শ হিসেবে তাদের অযথা প্রশংসাবাদ করো না, তার ফলে তারা আত্মম্ভরী হয়ে উঠবে। মুসলিমদের অধিকার সর্বদাই রক্ষা করবে, এবং পীড়ন করে ঘৃণ্যাবস্থায় ফেলে দিও না। তোমাদের দ্বার কখনও বন্ধ করো না, তার দরুন সবল কখনও দুর্বলের উপর অন্যায় অত্যাচার করতে পারবে না। আর কখনও তাদের উপর প্রভুত্ব খাটাতে যেয়ো না, কারণ সেটা স্বেচ্ছাচারেরই নামান্তর।

    কর্মচারীদের সৎ, নির্লোভ ও দুর্নীতিহীন হওয়ার একটি প্রধান কারণ ছিল তাঁদের উপযুক্ত বেতন দেওয়া। ওমর এ সত্য অনুধাবন করেছিলেন যে, রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদেরকে উপযুক্ত বেতন দেওয়া হলে তাঁরা স্বভাবতই সৎ ও নির্লোভ হবেন এবং ঘুষ রেশওয়াৎ প্রভৃতি দুর্নীতি থেকে দূরে থাকবেন। প্রশাসনিক এই অত্যাবশ্যকীয় নিয়মটির কার্যকারিতা আধুনিক রাষ্ট্রসমূহ বহু শতাব্দী পরেও যথার্থ অনুধাবন করতে পারছে না। এবং তার দরুন উৎকোচ গ্রহণ ও দুর্নীতিপ্রবণতা কর্মচারী মহলে অন্যায়রুপেই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে। সেকালে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য ছিল অবিশ্বাস্যরূপে সস্তা, খাওয়া পরার খরচ অত্যন্ত কম এবং টাকাকড়িও ছিল কম। তবু তুলনামূলকভাবে ওমরের আমলে কর্মচারীদের বেতন দেয়া হতো উচ্চহারে। প্রত্যেক প্রাদেশিক শাসনকর্তার বেতন ছিল এক হাজার দিনার; এ ছাড়াও তিনি মালে গনিমাতের একটা মোটা অংশ প্রাপ্ত হতেন। উল্লেখযোগ্য যে, এক হাজার দিনার পাঁচ হাজার টাকা অনুরূপ। আমির মুআবিয়া এরূপ বেতনে সিরিয়ার ওয়ালী হিসাবে যেরূপ শান-শওকতের সঙ্গে থাকতেন, তাতে খোদ ওমর আক্ষেপ করতেন, মুআবীয়া খসরু অর্থাৎ ইরান-সম্রাটের সমারোহে বাস করে।

    আরবসমাজে ভূমি-রাজস্ব কথাটা প্রায় অজানিত ছিল। প্রাক-ইসলাম যুগের ইতিহাসে এ সম্বন্ধে কোন তথ্যই মেলে না। ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুগে জানা যায়, খায়বর যুদ্ধের পর ইহুদীরা প্রার্থনা করে যে, তারা কৃষিকর্মে সুপটু, অতএব জমি তাদের দখলেই রাখা হোক! বিশ্বনবী এ প্রার্থনা মন্যুর করেন এবং উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক কর হিসেবে নির্ধারিত করেন। তার পর যে সব অঞ্চলের সমস্ত অধিবাসী ইসলাম গ্রহণ করতো, তাদেরকে যাকাতের অনুরূপ একটা ভূমি কর দিতে হতো। আবুবকরের সময় ইরাকের যে অংশ অধিকৃত হয়েছিল, তার জন্যে একটা থোক হিসেবে কর স্থিরীকৃত হয়েছিল।

    ওমরের আমলে বিশাল ভূভাগ ইসলামের অধিকারে আসে এবং তখনই ভূমি-কর নির্ধারণের একটা সুস্পষ্ট নির্দিষ্ট নীতি গ্রহণের প্রয়োজন দেখা যায়। ইরাক সিরিয়া ও মিসর দেশ একের পর এক অধিকৃত হলে ওমর ভূমি-কর বিষয়ে প্রথম মনোনিবেশ করেন। এ বিষয়ে যে সমস্যা উদ্ভুত হয়, তা হলো, এই : আঁ-হযরতের নীতি অনুযায়ী এ-সব নতুন অধিকৃত দেশ সেনাদের মধ্যে খণ্ডিতভাবে বন্টন করে দেওয়া হবে, না সামাজিক-অর্থনৈতিক ন্যায়নীতির ভিত্তিতে অন্য নীতি গৃহীত হবে? সব সৈন্যাধ্যক্ষ দাবী করেন, অধিকৃত অঞ্চলসমূহ সেনাবাহিনীর মধ্যে পৃথক জোতে এবং চাষীদেরকে ভূমিদাস হিসেবে বণ্টন করে দেওয়া হোক। তাঁদের এ দাবী সমর্থন করেন আবদুর রহমান বিন্-আউফ প্রমুখ কয়েকজন মশহুর সাহাবা এবং তাঁদের যুক্তি হলো: সুন্না অনুযায়ী যুদ্ধে-অধিকৃত ভূমিতে মুজাহিদদেরই দাবী, এ পর্যন্ত এ নীতিই প্রচলিত আছে। বিলাল ওমরকে এ বিষয়ে এরূপ চাপ দিতে থাকেন যে, ওমর বিরক্ত হয়ে খেদোক্তি করেন, ‘আল্লাহ্! আমাকে বিলালের হাত থেকে বাঁচাও।’ ওমরের যুক্তি ছিল আরবসেনারা ভূম্যধিকারী হয়ে গেলে তাদের ক্ষাত্রশক্তি লুপ্ত হয়ে হীনবল হয়ে পড়বে। তা ছাড়া দেশের পর দেশ যখন আরবসেনাদের করতলগত হচ্ছে, তখন অগণিত জনগণকে ভূমিদানে পরিণত করে দিলে এমন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসবে এসব ভূমিখণ্ডে, যা ইসলামী ন্যায়নীতির ঘোরতর পরিপন্থী। তাঁর আরও যুক্তি ছিল, যদি সমস্ত অধিকৃত ভূ-খণ্ড সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়, তা হলে সেনাবাহিনীর ভরণপোষণের এবং রাষ্ট্রীয় শাসন ও শৃঙ্খলা রক্ষার বিপুল ব্যয়ভার কীভাবে পূরণ হবে? তিনি সা’দ বিন্-ওক্কাসকে নির্দেশ দেন, অধিকৃত দেশসমূহের ভূমির পরিমাণ নির্ধারণ করতে এবং আদম-শুমারী গ্রহণ করতে। আদম-শুমারীতে দেখা গেল, প্রত্যেক সেনার ভাগে তিনজন চাষী পড়ে। ওমর মনস্থির করেন, ভূমি বাসিন্দাদের দখলেই থাকবে, তারা কারও অধীন হবে না।

    কিন্তু এ-বিষয়ে জনমত গ্রহণের জন্যে ওমর মজলিই-ই-শুরার অধিবেশন আহ্বান করেন। কয়েকদিন ধরে দীর্ঘ আলোচনা চলে, কিন্তু কোনও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় না তখন ওমরের সহসা সূরা আল-হাশরের এই আয়াতসমূহ স্মরণ হয়:

    ইহা দুঃখীদের, যারা পলায়ন করেছে, যারা বাসগৃহ ও সম্বল থেকে বিতাড়িত হয়েছে…. এবং যারা ভবিষ্যতে আসছে……(৫৯:৮-১০)।

    এই বাণী থেকে ওমর যুক্তি গ্রহণ করেন: বিজয়াধিকারে ভবিষ্যৎ বংশধরদের হক্ স্বীকৃত হয়েছে, কিন্তু ভূমি যদি সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়, তা হলে ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্যে কি থাকে? আর এ মহাবাণীর মধ্যেই নিহিত আছে বিশ্বের জাতি সমূহের ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়নীতি যা-নিঃসন্দেহে ইসলামের একটি আদর্শিক মৌল শিক্ষা। উল্লেখযোগ্য যে, ওমরের এই যুক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মেলে-কাল ও যুগধর্মের প্রভাবে উত্থিত সমস্যার সমাধানে কোরআন ও সুন্নার বিধানসমূহের ব্যাখ্যা কোন্ আলোকে ও কী পন্থায় করা উচিত। ওমর বিশেষভাবে উপলব্ধি করেন, আঁ-হযরতের সীমিত গোত্রের ও পরিবেশের ক্ষেত্রে যে নীতি গ্রহণ করা সমীচীন মনে করেছিলেন, বিশাল ভূ-খণ্ডের বহু জাতির ভাগ্য নির্ধারণে সে নীতি অনুসরণ করলে ন্যায়নীতির মর্যাদা রক্ষিত হয় না-অথচ আঁ-হযরত এরই প্রতিষ্ঠার আজীবন আপোষহীন সংগ্রাম করে গেছেন। এ বিষয়ে তাঁর আরও সুদৃঢ় যুক্তি ছিল যদিও তিনি একটি সুন্নার আপাত-বিপরীত নীতি গ্রহণ করছেন, তা আঁ-হযরতের মৌল শিক্ষার অনুসরণহেতুই করছেন এবং আর একটি সর্বযুগমান্য সুন্নার পাবন্দ হয়েই করছেন। বাস্তবিক, আঁ-হযরতের মহৎ শিক্ষার এরূপ সৃষ্টিধর্মী শাশ্বত বাস্তবায়ন ওমরের ন্যায় অতি অল্পলোকের দ্বারা সম্ভব হয়েছে। জীবন্ত প্রগতিশীল সমাজের কল্যাণার্থে এ রকম বলিষ্ঠ যুক্তি ও মত গ্রহণের প্রয়োজন যুগে যুগে দেখা দেয়। ওমরের যুক্তির সারবত্তা সেদিন মজলিস-ই-শুরা বিনা প্রতিবাদে গ্রহণ করে এবং এই নীতি গৃহীত হয়: বিজিত অঞ্চলসমূহ রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে গৃহীত হবে, সেনাবাহিনীর তাতে অধিকার থাকবে না এবং ভূমির উপস্থিত মালি-দের উৎখাত করা হবে না।

    ওমর এই নীতি প্রথমে ইরাক-আরবে প্রবর্তন করতে অগ্রসর হলেন। স্মরণাতীত কাল থেকে নওশেরওয়ার শাসনকাল পর্যন্ত উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক রাজকর হিসেবে নির্দিষ্ট ছিল এবং তিন কিস্তিতে আদায় করা হতো। খসরু পারভেজ এ হারের বৃদ্ধি করেন এবং ইয়েগির্দের আমলে আরও উচ্চহার নির্ধারিত হয়। ওমর প্রথমে জমি-জরিপের নির্দেশ দেন, এবং নিজেই মাপকাঠি প্রস্তুত করে দেন। ওসমান-বিন্-হানিফ ও হুদায়ফা বিন্-আল-ঈমান্ নামক দুই মশহুর সাহাবা কয়েক মাস পরিমাপ কাজ চালান। কিতাবুল-খারাজ নামক পুস্তকে কাযী আবু ইউসুফ বলেছেন, এ-পরিমাণ বস্ত্রখণ্ড মাপার মতো নির্ভুল হয়েছিল। সারা ইরাকের আয়তন ছিল প্রায় ত্রিশ হাজার বর্গ মাইল। তা থেকে পার্বত্যভূমি, মরুভূমি, নদীনালা প্রভৃতি বাদ দিয়ে তিন কোটি আট লক্ষ ‘জরীব’ কৃষিযোগ্য জমি পাওয়া গেল। রাজবংশের নিজস্ব সম্পত্তি, অগ্নি মন্দিরের সম্পত্তি, উত্তরাধিকারহীন, পলাতক ব্যক্তি ও রাষ্ট্রদোহীদের সম্পত্তি এবং নদী ও বনভূমি থেকে আহৃত সম্পত্তিসমূহ রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়, এবং সে সবের আয় থেকে ডাক, সরকারী ইমারতাদি ও পথঘাট রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় নির্বাহ করা হয়। কেউ ইসলামের সেবায় মহৎকাজ করলে এ-সব সম্পত্তি থেকে ইনাম দেওয়া হতো, কিন্তু কোন জমিই নিষ্কর দান করা হতো না। বাকী সব জমি পূর্বতন মালিকদের অধিকারে দেওয়া হয় ও এরূপ হারে প্রতি ‘জরীব’ জমিতে কর নির্ধারিত হয়: গমের দরুন দুই দিরহাম, যবের দরুন এক দিরহাম, ইক্ষুর দরুন ছয়, তুলার পাঁচ, আঙ্গুরের দশ, তিলের আট, সজীর তিন ও খেজুর-বাগানের দরুন দশ দিরহাম। উচ্চ শ্রেণীর জমির জন্যে এ হার দ্বিগুণ পর্যন্ত ধার্য হতো। পড়ো-জমির প্রতি জরীবের কর ছিল এক দিরহাম। এভাবে সমগ্র ইরাকের রাজস্বের পরিমাণ ছিল আট কোটি আট লক্ষ দিরহাম। ক্রমে ক্রমে পড়ো জমি আবাদ করা হলে এই রাজস্বের পরিমাণ তাঁর আমলেই বৃদ্ধি পেয়েছিল দশ কোটি আটাশ লক্ষ দিরহামে।

    মিসরে টলেমিরা ফেরাউনদের অনুসৃত রাজস্ব-ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। ফেরাউনী আমলে ভূমির জরীপ করা হয় এবং চার বছরের চুক্তিতে কয়েক বছরের ফসলের গড় ধরে কর নির্ধারণ হয়। সে কর আদায় হতো অর্থে কিংবা ফসলে। রোমকরাও এ-নিয়ম বজায় রেখেছিল। তবে তারা ভূমি কর ছাড়াও রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের ও সেনাবাহিনীর জন্যে প্রতি বছর অতিরিক্ত খাদ্যশস্য আদায় করতো। ওমর ভূমি-কর প্রথা বজায় রাখেন, কিন্তু অতিরিক্ত খাদ্যশস্য আদায় বন্ধ করে দেন। তিনি করধার্যের ও আদায়ের সুবিধাজনক নীতি প্রবর্তন করেন। গীর্জা, স্নানাগার ও সরাইখানা সমূহের কোন কর ছিল না। তবে গ্রামীণ কারিগরদিগকেও কুটির শিল্পের জন্যে কর দিতে হতো। ভূমি-করের হার ছিল সাধারণত জরীব প্রতি এক দিনার। এভাবে মিসর থেকেও ওমরের আমলে এক কোটি কুড়ি লক্ষ দিনার (যার বর্তমান মূল্য পাঁচ কোটি ছয় লক্ষ টাকা) ভূমি-কর আদায় হতো। সিরিয়ার গ্রীকদের প্রবর্তিত ভূমি-কর ব্যবস্থা ওমর অপরিবর্তিতরূপে গ্রহণ করেন। তাঁর আমলে সিরিয়ার ভূমি-রাজস্বের পরিমাণ ছিল এক কোটি চল্লিশ লক্ষ দিনার। ফারস্, কিরমান, আর্মেনিয়া প্রভৃতি অন্যান্য বিজিত দেশের ভূমি-রাজস্ব সম্বন্ধে বিশেষ তথ্য পাওয়া যায় না। অনুমান হয়, মিসর ও সিরিয়ার মতো চলিত ব্যবস্থাই ওমর গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কেবল প্রচলিত কর-ব্যবস্থাই গ্রহণ করেন নি, রাজস্ব বিষয়ক সরকারী দলিলপত্র ও প্রচলিত ব্যবস্থায় ও স্থানীয় ভাষায় রক্ষিত হতো। প্রাক-ইসলাম যুগে ইরাক ও পারস্যে ফারসী ভাষায়, সিরিয়ায় ল্যাটিন ভাষায় ও মিসরে কপ্ট ভাষায় সরকারী কাগজপত্র লিখিত হতো। ওমরের আমলে এ-সব ভাষাতেই যথাযথ দলিল-দস্তাবেজ রক্ষিত হতো এবং পারসিক, গ্রীক ও কপ্ট কর্মচারীর রাজস্ববিভাগে যথাপূর্ব বহাল থাকতো।

    কিন্তু ভূমি-রাজস্ব-ব্যবস্থায় ওমরের সবচেয়ে বড় সংস্কার হচ্ছে, প্রাচীন ও সমকালীন রাষ্ট্রসমূহের ন্যায় আবাদী জমি বাজেয়াত পূর্বক সেনাবাহিনী ও রাজকর্মচারীদের মধ্যে বন্টন না করে দিয়ে কৃষককুলের মালিকানা স্বত্ব বহাল রাখা। রোমকরা মিসর ও সিরিয়া জয় করে সমস্ত আবাদী জমি বাজেয়াক্ত করেছিল; এক অংশ সেনাবাহিনী ও রাজকর্মচারীদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছিল, এক অংশ সম্রাটের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং এক অংশ চার্চের জন্যে নির্দিষ্ট করেছিল। তার ফলে প্রকৃত চাষীরা উৎখাত হয়ে যায় এবং নয়া মালিকেরা ভূমিদাসে পরিণত হয়। ওমর এ-প্রথা রহিত করে দেন, এবং কঠোর নির্দেশ দেন যে, মুসলিমরা আবাদী জমির মালিকানা গ্রহণ করতে পারবে না, এমন কি ক্রয় মূল্যেও না। তিনি প্রাদেশিক শাসকদের বিশেষভাবে নির্দেশ দেন, কোন আরব যেন বিজিত দেশের কোনও প্রান্তে কৃষিকাজে লিপ্ত না হয়। শুরাইক ঘাতকী নামক জনৈক আরব মিসরে কৃষিকাজ আরম্ভ করলে ওমর তাকে মদীনায় তলব করেন এবং এরূপ কঠিন ভাষায় ভর্ৎসনা করে শাসন করেন যে, তার পর আর কেউ এ নিয়ম লঙ্ঘন করতে সাহসী হয় নি। পূর্বতন চাষীরা উৎখাত না হওয়ায় দেশের উৎপাদন-নীতিতে রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন হেতু কোন বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় নি। তার উপর ওমর প্রকাশ্যে ঘোষণা করে দেন, যে কেউ পড়ো-জমি আবাদ করবে, সে সে-জমির মালিক হবে। কিন্তু কেউ জমি তিন বছরের বেশি অনাবাদী রাখলে মালিকানা স্বত্ব হারাবে। এই নীতির ফলে বহু অনাবাদী জমি অত্যল্পকাল মধ্যে ফসল উৎপাদন করতে থাকে। যারা যুদ্ধবিগ্রহের সময় দেশ ত্যাগ করেছিল, তারা প্রত্যাবর্তন করে নিজ নিজ জমিতে অধিকার লাভ করে ও নির্বিবাদে ফসল উৎপন্ন করতে থাকে। জমিতে সেচন প্রথার জন্যে খাল খনন, বাঁধ নির্মাণ ও পানি সরবরাহের জন্যে একটি পৃথক দফতরের সৃষ্টি হয়। এক মিসরেই এই দফতরে প্রায় এক লক্ষ তিন হাজার লোক সরকারী ব্যয়ে বহাল ছিল। খোজিস্তান ও আয়ায্ অঞ্চলে জুমা-বিন-মাবীয়া ওমরের নির্দেশে কয়েকটি খাল খনন করে সেচনের ব্যবস্থা করেন, তার ফলে লক্ষ লক্ষ একর জমি আবাদী হয়ে ওঠে। ওমরের কঠোর আদেশ ছিল, সৈন্য চলাচলকালে বা অন্য কোন কারণে যেন জমির ফসল নষ্ট করা না হয়। সিরিয়ায় অভিযানকালে জনৈক কৃষক ওমরের নিকট নালিশ করে, আরব সৈন্য তার জমির মধ্য দিয়া যাতায়াতকালে সমস্ত ফসল নষ্ট করে ফেলেছে। ওমর তখনই তাকে দশ হাজার দিরহাম ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন।

    ভূমিকর নির্ধারণ ও আদায় ব্যবস্থায় ওমর এই ন্যায়নীতি অনুসরণ করেন: তিনি স্থানীয় পারসিক ও খ্রিস্টান জিম্মীদের মধ্য থেকে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামত গ্রহণ করতেন এবং তাঁদের অভিমত ও প্রস্তাবসমূহ সহৃদয়ভাবে বিবেচনা করতেন। ইরাকের ভূমি-কর ব্যবস্থা নিরূপণকালে প্রত্যেক প্রদেশের দুজন অভিজ্ঞ ইরাকীকে, আহ্বান করে তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছিল। মিসরের ক্ষেত্রে প্রাক্তন শাসক মুকাকুস্ ও একজন কন্ট্ রাজনীতি বিশারদের পরামর্শ গৃহীত হয়েছিল।

    খেরাজ প্রবর্তনে উপরোক্ত নীতি গৃহীত হলেও উদ্রী বা মুসলিম দখলীকৃত ভূমির কর নির্ধারণে পৃথক নীতি গৃহীত হয়। এ-উদ্দেশ্যে উরি জমি তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়: মদীনা ও অন্যান্য খাস আরবদেশে আরব মুসলিমদের জমি; ফৌৎ জিম্মীদের যে-সব জমি মুসলিমদের দখলে আসে এবং মুসলিমরা যে-সব অনাবাদী জমি আবাদ করেছিল। এ-সব উরি জমির উপর খেরাজের পরিবর্তে যাকাত হিসেবে উৎপন্ন ফসলের এক দশমাংশ কর বসানো হয়। কিন্তু জমিতে সেচনের সুবিধা থাকলে খেরাজের হারে কর দিতে হতো। তাছাড়া মুসলিমদেরকে গৃহপালিত পশু, ঘোড়া ও নগদ সঞ্চিত অর্থের উপর যাকাত দিতে হতো, অথচ জিম্মীদের দিতে হতো না। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বিশ্বনবী ঘোড়ার উপরে কোন যাকাত ধরেন নি, কারণ তাঁর আমলে অশ্ব শুধু আরোহণের জন্যেই ব্যবহৃত হতো। কিন্তু ওমরের আমলে অশ্ব ব্যবসায় খুবই লাভজনক হয়ে উঠে; এজন্য আরোহণের ব্যবহৃত অশ্ব ব্যতীত অন্য সব অশ্বের উপর ওমর যাকাত ধার্য করেন।

    ওমর উত্তর নামে আর একটি মাসুল ধার্য করেন। যে-সব মুসলিম বিদেশে ব্যবসা করতো, তাদেরকে আমদানি-কর হিসেবে মালের এক-দশমাংশ মূল্য সে-সব দেশের ইনানুযায়ী রাজসরকারে আদায় দিতে হতো। ওমরও তুল্যরূপে মুসলিম দেশসমূহে আমদানিকৃত পণ্যদ্রব্যের উপর মূল্যের এক দশমাংশ মাসুল হিসেবে ধার্য করেন। এই মাসুল আদায়ের জন্যে ওমর পৃথক পৃথক বহিঃশুল্ক বিভাগও স্থাপন করেন। এই মাসুল আমদানিকৃত পণ্যদ্রব্যের উপর এক বার মাত্র আদায় করতে হতো। ব্যক্তিগত মালপত্রের উপর কিংবা দুইশত দিরহামের ন্যূন মূল্যের পণ্যের উপর মাসুল ধার্য হতোনা।

    রাজস্ব-নীতির আমূল সংস্কারের ফলে প্রভূত পরিমাণে টাকা-কড়ি আমদানি হতে থাকে। এবং তার দরুন আনুষঙ্গিক সরকারী খাজাঞ্চীখানা স্থাপনের প্রয়োজনও দেখা দেয়। বলা বাহুল্য ওমরের পূর্বে মুসলিম রাষ্ট্রের এটির প্রয়োজন অনুভূত হয় নি। আঁ-হযরতের জীবদ্দশায় শেষবার বাহ্‌রায়েন থেকে আট লক্ষ দিরহাম পাওয়া যায় ভূমি-কর হিসেবে, কিন্তু এক বৈঠকেই সমুদয় অর্থ বিলিয়ে দেন। মালে-গনিমাত বা অন্যবিধ যা কিছু অর্থ সামগ্রী আমদানি হতো আবুবকর সে-সমস্তই বিলিয়ে দিতেন, কিছুই উদ্বৃত্ত থাকতো না।

    ১৫ হিজরীতে আবু হোরায়রাহ্ ওমর কর্তৃক বাায়েনের শাসক নিযুক্ত হন, এবং সালতামামীতে পাঁচ লক্ষ দিরহাম মদীনায় প্রেরণ করেন। এই বিপুল অর্থ নিয়ে কি করা যায়, মজলিস-ই-শুরায় তার আলোচনা হয়। আলী বলেন, সারা বছরে যা কিছু অর্থ পাওয়া যায়, সবই বিলিয়ে দেওয়া উচিত, জমা রাখার দরকার নেই। ওসমান এ মতের বিরোধিতা করেন, এবং ওলিদ-বিন্ হিশাম বলেন যে, তিনি সিরিয়ায় খাজাঞ্চীখানা ও হিসাব-দফতর দেখেছেন। এ প্রস্তাব ওমরের পছন্দ হয়, এবং তিনি মদীনায় একটি কেন্দ্রীয় কোষাগার স্থাপন করেন। আবদুল্লাহ-বিন্-আরকাম নামক মশহুর সাহাবা ইসলামের প্রথম খাজাঞ্চী নিযুক্ত হন। ক্রমে ক্রমে কুফা, ইস্পাহান প্রভৃতি প্ৰত্যেক প্রাদেশিক রাজধানীতে ও অন্যান্য কেন্দ্রস্থলে খাজাঞ্চীখানা স্থাপিত হয়। এ উদ্দেশ্যে মজবুত ইমারত প্রস্তুত হয় ও নিরাপত্তার জন্যে সর্বক্ষণ লোক-সমাগম সম্ভব মসজিদের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। পরবর্তীকালে কোষাগার হারার জন্যে একদল সৈন্য মোতায়েন রাখা হতো। প্রাদেশিক বা জিলার কোষাগার থেকে স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যয়-নির্বাহ হ’তো এবং বছর শেষে সমগ্র উদ্বৃত্ত অর্থ মদীনায় কেন্দ্রীয় কোষাগারে প্রেরিত হতো। মদীনাবাসীদের মাসোহারা প্রভৃতিতে সালানা তিন কোটি মুদ্রা কোষাগার থেকে ব্যয়িত হতো।

    যাকাত ও জিয়া ধার্যের জন্যে আদম শুমারী অনুষ্ঠিত হয়। আরবে আদমশুমারী গৃহীত হয় সুষ্ঠুভাবে মাসোহারা বন্টনের জন্যে। উম্মুল মুমেনীন বিবি আয়েশার বার্ষিক বৃত্তি ছিল বারো হাজার দিরহাম। আল-বায়েত বা নবী বংশীয়রা এবং মুহজেরীন ও আনসারগণ ইসলাম গ্রহণের দিন হিসেবে অগ্রাধিকার লাভ করতেন এবং প্রত্যেক সালানা পাঁচ বা চার হাজার দিরহাম প্রাপ্ত হতেন। তাঁদের পর আরবের সাধারণ বাসিন্দাদের নামোল্লেখ থাকতো সেনাবিভাগের কর্মদক্ষতার গুণে কিংবা কোরআন হাফিজ হওয়ার দক্ষতার জন্য। একজন যোদ্ধার বার্ষিক বরাদ্দ ছিল পাঁচ থেকে ছয় শত দিরহাম। নারী, শিশু ও মাওলী বা সেবকদের জন্যেও বার্ষিক নির্দিষ্ট বরাদ্দ ছিল। এ সব আদম-শুমারী ও বৃত্তিধারীদের তালিকা প্রস্তুত হতো একটি পৃথক দিওয়ানে। ওমর নিঃসন্দেহে ইসলামে এরূপ দিওয়ান সৃষ্টির জন্য কৃতিত্বের হদার।

    সরকারী আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ ওমরের আমল থেকে আরম্ভ হয়। সেনাবাহিনীর অধিনায়কদেরকেও যুদ্ধের ব্যয় ও মালে-গনিমাতের সঠিক হিসাব রাখতে হতো ও খলিফার নিকট পেশ করতে হতো। উল্লেখযোগ্য যে, খালিদের পদচ্যূতি হয়েছিল হিসাব দাখিল করতে অস্বীকার করার দরুন।

    এরূপ নানাবিধ হিসাব সংরক্ষণ এবং সরকারী কাজকর্মের ও নথিপত্রের ক্রম-রক্ষার প্রয়োজনেই পঞ্জিকার উদ্ভব। প্রাক-ইসলাম যুগে আরবে কোনও অব্দ বা সাল গণনার রীতি ছিল না। ১৬ই হিজরীর কোন এক দিনে ওমরের নিকট একটি খসড়া পেশ করা হয়, তাতে কেবল ‘শাবান’ শব্দের উল্লেখ ছিল। ওমর জিজ্ঞাসা করেন, উক্ত শাবান গত বছরের, না চলতি বছরের, কিন্তু কোন সদুত্তর মেলে না। তখন তিনি মজলিসে-ই-শুরার নিকট সন ধার্যের মীমাংসা চাইলেন। অনেকেই মত প্রকাশ করেন, পারসিকদের পদ্ধতি গ্রহণ করা উচিত। মহাজ্ঞানী আলী প্রস্তাব করেন, হিজরত অর্থাৎ আঁ-হযরতের মক্কা থেকে মদীনায় অমর বিদায়ের ঘটনা থেকে গণনা করা উচিত। সকলেই এ প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করেন। মহানবী হিজরত করেছিলেন রবিউল আউয়াল মাসের আট তারিখে। কিন্তু আরবী বছরের প্রথম মাসের নাম মহররম এবং এ হিসেবে হিজরত হয় বছর আরম্ভের দুই মাস আট দিন পরে। সকলেই একমত হন, বছরের প্রথম দিন থেকে হিজরী সন গণনা করা হবে, এবং এ হিসেবে সনটি দুইমাস আট দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়।

    ওমরের আর একটি কৃতিত্ব আরবী মুদ্রার প্রচলন। অনেক ঐতিহাসিক এ কৃতিত্ব খলিফা আবদুল মালেক-বিন্ মারওয়ানকে (৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে) দিয়ে থাকেন, কিন্তু মাকরিজি বলেন, ওমরই প্রথম আরবী মুদ্রা জারী করেন। ১৮ হিজরীতে ওমর নির্দেশ দেন, জনপ্রতি এক জরীব মাপের খাদ্যশস্য ও দুই দিরহাম কমপক্ষে মাসিক বরাদ্দ পাবে। এই সময়েই তিনি খুসরু নওশেরওয়ার অনুরূপ দিরহাম প্রবর্তন করেন। ওমরের শাসনের শেষের দিকে দশ দিরহাম মুদ্রার ওজন ছিল ছয় মিকাল। মারওয়ান্দী বলেন, সেকালে পারস্যে তিন শ্রেণীর দিরহামের প্রচলন ছিল, আট দাঙের বাঘালি দিরহাম, চার দাঙের তাবারী দিরহাম ও তিন দাঙের দাঙের মাগরিবী দিরহাম। বাঘালি ও তাবারী দিরহাম অধিক জনপ্রিয় থাকায় ওমর নির্দেশ দেন, এ দুয়ের মোট মূল্যের অর্ধেক ধরে ইসলামী দিরহামের মূল্যমান স্থিরীকৃত হবে। তার দরুন ছয় দাঙ মূল্যের দিরহাম নির্দিষ্ট হয়।

  • সেনাবিভাগ

    সেনাবিভাগ

    সেনাবিভাগ

    ইসলাম-পূর্ব যুগে রোমক সাম্রাজ্যে ও পারস্য সাম্রাজ্যে সেনাবিভাগ সুগঠিত ও সুব্যবস্থিত ছিল। সেনানায়কত্ব সাধারণত কুলপ্রথা ও উচ্চ বংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো এবং জায়গীর প্রথার মতই প্রদত্ত হতো। রণ-প্রভুরা সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বিশাল ভূ-সম্পত্তির মালিকানা স্বত্ব ভোগ করতেন এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য পালন করতেন। যুদ্ধকালে স্ব-স্ব বাহিনীসহ রণক্ষেত্রে সম্রাটের পক্ষে লড়তেন, আবার সুযোগ উপস্থিত হলে বিরুদ্ধেও লড়তেন। এ রকম জায়গীয় প্রথানিষ্ঠ সেনাবাহিনী ব্যারন ও ডিউকদের অধীনে ইউরোপখণ্ডেও বিরাজ করতো। ফরাসী দেশের সেনাবাহিনীর কোন বেতন ছিল না। যুদ্ধকালে লুণ্ঠনই ছিল তাদের একমাত্র আকর্ষণ।

    আরবের ইয়ামেন ও অন্যান্য রাজার কোনও সুগঠিত সেনাবাহিনী ছিল না। ইসলামের প্রথম যুগে সেনা সংগঠনের প্রয়োজন অনুভূত হয় নি, প্রত্যেক মুসলিমই ছিল মুজাহিদ, আল্লাহর রাহে সত্যের সৈনিক। আরব উম্‌মাহ অর্থাৎ সমগ্র জাতি ছিল সক্রিয় সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত। আবুবকরের খেলাফতকালে মালে গনিমাত প্রত্যেককে বন্টন করে দেওয়া হতো। প্রথম বছরে প্রত্যেক মুজাহিদ পায় দশ দিরহাম ও দ্বিতীয় বছরে পায় বিশ দিরহাম। তখনও কোন সৈন্য তালিকা রক্ষিত হতো না, কোনও সমর দফতর সৃষ্টি হয় নি। ওমরের খেলাফতের প্রথম দু বছর একই ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। কিন্তু ১৫ হিজরীতে সমর বিভাগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়।

    আবু হোরায়রাহ্ বাহরায়েনের শাসনকর্তা নিযুক্ত হওয়ার পর ১৫ হিজরীতে পাঁচ লক্ষ দিরহাম ভূমি কর হিসেবে সংগ্রহ করে মদীনায় আনয়ন করেন। পূর্বে কোনও আরববাসী এরূপ অগাধ অর্থের সংখ্যা শোনেনি। ওমর মজলিস-ই-শুরার’র পরামর্শ চাহিলেন, এই অগাধ অর্থ নিয়ে কী করা যায়। আলী, ওসমান ও অন্যান্য সাহাবা বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করেন। ওলিদ বিন হিশাম সিরিয়ার শাসকদের সমর দফতর ও সেনাতালিকার বিষয় ও অর্থ সঞ্চয়ের জন্যে কোষাগারের বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি ইরাকের দিওয়ান অর্থাৎ দফতরের কথাও উল্লেখ করেন। তখন এই বিপুল অর্থ নিয়ে খাজাঞ্চিখানা স্থাপিত হয় এবং সৈন্যদের মধ্যে বন্টনের সুবিধার্থে একটি সৈন্য রেজিস্টারী প্রণয়ন ও একটি দিওয়ান বা সমর দফতর প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে সাহিব-ই-দিওয়ান নামে সমর-দফতরের প্রধান কর্মচারীর পদ সৃষ্টি হয়। সৈন্য-রেজিষ্টারী আরম্ভ হয় প্রথমে কোরায়েশ ও আনসারদের নিয়ে। পরে প্রত্যেক কবীলা বা গোত্রের জন্যে রেজিস্টারী প্রস্তুত হয়।

    রেজিস্টারীভুক্ত প্রত্যেক পুরুষ যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য ছিল। তারা দুভাবে বিভক্ত ছিল, যাঁরা সর্বক্ষণ যুদ্ধার্থে প্রস্তুত থাকতো এবং দ্বিতীয় ছিল ‘মাতুআই’ বা রিজার্ভ বাহিনী। রিজার্ভ-বাহিনী বাড়ীতে বাস করতো ও নিজ নিজ পেশায় নিযুক্ত থাকতো, কিন্তু ডাক পড়লেই যুদ্ধে গমন করতে হতো। ২১ হিজরীর মধ্যে সেনাবিভাগ ওমর কর্তৃক সর্বাংশে সুগঠিত ও সুসংবদ্ধ হয়ে ওঠে।

    সেনাবিভাগের সুষ্ঠু প্রশাসনের জন্যে ওমর কয়েকটি সামাজিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত করেন ‘জুন্দ্’ নাম দিয়ে। নামটি আজও সেনাবিভাগে তাঁর স্মৃতি বহন করছে। প্রথমে মদীনা, কুফা, বসরা, মসুল, ফুস্তাত, দামেস্ক উবদান ও প্যালেস্টাইনে আটটি জুন্দ্ স্থাপিত হয়। ওমরের সময় মুসলিম অধিকার বিস্তৃত ছিল বেলুচিস্তান পর্যন্ত; কিন্তু জাজিরাহ্, সিরিয়া, ইরাক ও মিসরকেই সাধারণত ‘স্বদেশ’ বলা হতো, আর তার দরুন এ দেশগুলির নিরাপত্তা নিরঙ্কুশ করতে ওমর আটটি জুন্দ স্থাপন করেছিলেন। প্রত্যেক জুন্দে এ-সব ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়। সেনাদের বাসের জন্যে সেনাবারিক নির্মিত হয়। উল্লেখযোগ্য যে, কুফা, বসরা ও ফুস্তাতে (বর্তমান কায়রো) প্রথমে সেনাবারিক ছিল, পরে সেগুলি প্রসিদ্ধ শহর হিসেবে গড়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত প্রত্যেক জুন্দ্ েচার হাজার যুদ্ধাশ্বের আস্তাবল নির্মিত হয়। এভাবে বত্রিশ হাজার নিয়মিত যুদ্ধাশ্ব সর্বদা প্রস্তুত থাকতো, অতি স্বল্প সময়ে সমরাঙ্গণে প্রেরণ করার জন্যে। ১৭ হিজরীতে জাজিরায় সহসা বিদ্রোহ উপস্থিত হলে, মুহূর্ত মধ্যে অশ্বারোহী সেনাদল উপস্থিত হয়ে অঙ্কুরেই সে বিদ্রোহ নির্মূল করে। এ-সব যুদ্ধাশ্বের রক্ষণাবেক্ষণ ও শিক্ষার জন্যে বিশেষ যত্ন নেওয়া হতো। মদীনার আস্তাবলগুলি খোদ ওমরের তত্ত্বাবধানে থাকতো। তাঁর খাস্ সেবক হানী চারণভূমির তদারককারী ছিল। উল্লেখযোগ্য যে, মদীনার নিকটবর্তী চারণভূমি সমূহে শুধু যুদ্ধের ঘোড়াই থাকতো না, চল্লিশ হাজার উট ও প্রতিপালিত হতো যুদ্ধের জন্যে। যুদ্ধের ঘোড়াগুলির উরুদেশে ছাপ মেরে দেওয়া হতো ‘জাইশ্-ফি-সাবিলিল্লাহ্‌র; অর্থাৎ আল্লাহ অশ্ববাহিনী। তৃতীয়ত প্রত্যেক জুন্দে যুদ্ধের নথিপত্র হেফাজতের জন্যে সমর-দিওয়ান থাকতো; এবং চতুর্থত সেনাবাহিনীর রসদ বিভাগের পৃথক গুদাম ছিল এবং সেখান থেকে সমস্ত রসদ সমরক্ষেত্রে সরাসরি চালান হতো।

    এ-সব জুন্দ্ ব্যতীত ওমর প্রত্যেক শহরে ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সেনানিবাস স্থাপন করেন, এবং এভাবে সমগ্র মুসলিম অধিকারে আরবজাতিকে ছড়িয়ে বাস করতে বাধ্য করেন। কোন নতুন শহর বা অঞ্চল অধিকার করা হলেই সেখানে একটা সেনানিবাস স্থাপিত হতো। সিরিয়া বিজিত হলে ওমর প্রত্যেক শহরে একদল সৈন্য মোতায়েন করে বিজেতা আবুওবায়দা শক্তি বৃদ্ধি করেন। সিরিয়ার সমুদ্রোপকূলবর্তী স্থানসমূহে-আরবী ভাষায় বিলাদ ই-সাহিলিয়াহ্-সেনাবাহিনীর সহজগতি ছিল এবং তার দরুন রোমক আক্রমণ থেকে নিরাপদ করার উদ্দেশ্যে সমুদ্রোপকূলবর্তী প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সমরঘাঁটি স্থাপিত হয় ও উপযুক্ত সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন রাখা হয়। এ-সব স্থানে আগুন জ্বালিয়ে শত্রুর গতিবিধি সম্বন্ধে সাবধান করার ব্যবস্থাও অবলম্বন করা হয়। মিসরে আমর-বিন্-আসের অধীনে যে বাহিনী ছিল তার এক-চতুর্থাংশ আলেকজান্দ্রিয়ার প্রতিরক্ষায় নিযুক্ত থাকতো, এক চতুর্থাংশ থাকতো সমুদ্রোপকূলে টহলদারী করতে এবং বাকী সৈন্য সারা মিসরে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার হেতু ফুস্তাতে মোতায়েন থাকতো। বসরা ও কুফা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ অঞ্চলে অবস্থিত হলেও চল্লিশ হাজার সৈন্য বসরায় অবস্থান করতো এবং তার মধ্যে দশ হাজার সর্বদা প্রস্তুত থাকতো, বহিরাক্রমণে যাত্রা করতে। ইরাকের প্রতিটি পুরাতন পারসি কসেনানিবাস পুননির্মিত হয়, খারিযা ও জাবুকাস্থিত সাতটি সেনানিবাস নতুনভাবে নির্মিত হয়। রায় ও আজরবাইজানের সেনানিবাসে দশ হাজার সৈন্য থাকতো। সারা মুসলিম অধিকৃত অঞ্চলে এ-সব সমরঘাঁটি ও সেনানিবাস স্থাপনের কারণ ছিল দুটি: ইরাকে বহু মারজাবান্ বা সামন্ত ছিলেন, যাঁরা সুযোগ দেখলেই বিদ্রোহ করে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করতেন, এজন্যে তাঁদেরকে শায়েস্তা করতে হতো আর মুসলিমদের মোটেই নৌশক্তি ছিল না। এজন্যে সিরিয়ার উপকূলভাগ রোমক নৌশক্তির আক্রমণ থেকে রক্ষার হেতু এ সব সমরঘাঁটি শক্তিশালী রাখার প্রয়োজন ছিল।

    সেনানিয়োগ ও সেনাবাহিনী সংগঠনেও ওমর নয়া নীতি প্রবর্তন করেন ও সামরিকশক্তি বৃদ্ধি করেন। প্রথমভাগে আনসার ও মুহাজেরদের মধ্যে সৈন্যবিভাগে নিযুক্তি সীমিত থাকলেও পরে সমগ্র আরববাসীর জন্যে সেনাবিভাগে নিয়োগ উন্মুক্ত করা হয়। মদীনা ও আস্ফানের মধ্যবর্তী আরবরা এবং সুদূর বাহ্রায়েনবাসী আরবরাও সৈন্যবিভাগে নিযুক্ত হয় এবং তালিকাভুক্ত হয়। এমন কি, কুকা, বা, ফুস্তাত্, জাজিরাহ্ প্রভৃতি ভিন্ন দেশবাসী আরবরাও সেনাবিভাগের প্রবেশাধিকার লাভ করে। এভাবে প্রায় আট দশ লাখ আরব-সৈন্য তালিকাভুক্ত হয়। ইবনে সা’দের বয়ান মতে প্রতি বছর ত্রিশ হাজার রংরুট বাহিনী যুদ্ধস্থলে প্রেরিত হতো। তাবারীর বর্ণনা মতে প্রায় একলক্ষ যুদ্ধক্ষম বাসিন্দা কুফায় ছিল এবং তাদের মধ্যে চল্লিশ হাজার স্থায়ী সৈন্য পর্যায়ক্রমে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরিত হতো। কালক্রমে ওমর সেনাবিভাগ পারসিকদের এবং অন্যান্য বিদেশীদের জন্যেও উন্মুক্ত করে দেন। সায়াহ্, খরো, শাহ্রীয়ার ও আফরুদ্দীন নামক পারসিক সেনানায়কগণ প্রত্যেকে আড়াই হাজার ও আরও একশত পারসিক নায়ক প্রত্যেকে দুই হাজার মুদ্রা বেতনভোগী ছিলেন। তুস্তারের যুদ্ধ সায়ার রণ-কৌশলে জয় করা হয়েছিল। ইয়ামনের পারসিক শাসক বাধানোর সমগ্র পারসিক বাহিনী ইসলাম গ্রহণ করে ও সৈন্য-তালিকাভুক্ত হয়। আনন্দের সঙ্গে এটাও উল্লেখযোগ্য যে, ওমরের সেনাবিভাগে পাক-ভারতীয়রাও প্রবেশেধিকার লাভ করেছিল। পারসিক খসরু ইয়েগির্দের সেনাবিভাগে সিন্ধুর জাঠরা নিয়োজিত ছিল এবং ২০ হিজরীতে সুস্ অধিকৃত হলে জাঠ সৈন্যরাও ইসলাম গ্রহণ করে সৈন্যতালিতাভুক্ত হয়। আরবরা তাদেরকে ‘যাত’ নামাঙ্কিত করেছিল। মুসলিম সেনাবাহীতে রোমক ও গ্রীকরাও ছিল এবং তাদের পাঁচশত সেনা মিসর জয়কালে ইসলামের পতাকাতলে যুদ্ধ করেছিল। রিজার্ভ বাহিনীতে প্রায় দশ হাজার অগ্নিপূজক ছিল এবং তারা মুসলিমদের সমান বৃত্তিলাভ করতো। স্থায়ী বাহিনীতেও তাদের সংখ্যা ন্যূন ছিল না। সংক্ষেপে বলা যায়, উদার ও ন্যায়দর্শী ওমর সেনাবিভাগ সকল দেশের সকল গোত্রের জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন, জাতি ও ধর্মের কোন ভেদাভেদ রাখেন নি।

    কোনও রকম ব্যবসা বা কৃষিকাজে লিপ্ত হওয়া আরবসৈন্যদের পক্ষে একেবারে নিষিদ্ধ ছিল। এজন্যে তাদের বেতন বৃদ্ধি করা হয় ও সব রকম প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও হাতিয়ার সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। ওমর সৈন্যদের সর্বনিম্নবেতন বার্ষিক দু থেকে তিনশত মুদ্রায় বৃদ্ধি করেন। কর্মচারীদের বেতন ছিল সাত থেকে দশ হাজার। পূর্বে সেনাদের সন্তানরা মাতৃস্তন্য ত্যাগ করার পর নির্ধারিত বৃত্তি পেত। ওমর তাদের জন্মদিন থেকে বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। তা ছাড়া সেনাদের পৃথক ভাতা ছিল। বেতন দেওয়া হতো বছরের প্রথম মাস মহরমের প্রথম ভাগে, ভাতা দেওয়া হতো বসন্তকালে। প্রতি গোত্রের দশজন সৈন্যের অধিনায়ককে আরিফ বলা হতো: এবং আরিফরাই নিজ নিজ অধীনস্থ সৈন্যমধ্যে বেতন বিলি করতো। বেতন ব্যতীত সেনারা একটা নির্দিষ্ট হারে ‘মাউনাহ্’ বা ভাতা লাভ করতো। চাকরীর মেয়াদ অনুসারে পদোন্নতি হতো ও বেতন বৃদ্ধি হতো। বেতন ও ভাতা ব্যতীত মালে-গনিমাতের অংশও সৈন্যদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হতো এবং এভাবে প্রাপ্যের পরিমাণে কোনও সীমারেখা ছিল না। দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখযোগ্য যে, জালুলার যুদ্ধজয়ের পর প্রতিটি অশ্বারোহী সৈন্য দশ হাজার এবং নিহাওন্দের যুদ্ধজয়ের পর ছয় হাজার মুদ্রা প্রাপ্ত হয়। ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, আরব সেনারা পারসিক বা রোমক সেনাদের চেয়ে বেশি বেতন লাভ করতো, তার উপর মালে গনিমাতে ছিল নিশ্চিত লাভ। যুদ্ধ-ব্যবসা শুধু লাভজনক ছিল না, সবচেয়ে মহৎ ও আল্লাহর নিকট প্রিয় ছিল। আরব সৈন্যর শক্তি শুধু সংখ্যাধিক্য উন্নত অস্ত্র-শস্ত্রে বা সংগঠন-নীতিতে ছিল না; উচ্চ নীতি জ্ঞান, অনমনীয় মনোবল এবং ধর্মীয় প্রীতির মধ্যেই তা নিহিত ছিল।

    সৈন্যদের পোশাক কি ছিল তা জানা যায় না। তবে তাদেরকে পারসিকদের পোশাক পড়তে দেওয়া হতো না। ২১ হিজরীতে যখন মিসরে জিম্মীদের উপর জিয়া প্রবর্তিত হয়, তখন সৈন্যবিভাগের জন্যে পোশাকও অন্তর্ভুক্ত হয়, এবং তা ছিল একটি পশমী কোট, একটি লম্বা টুপী বা আমামা, পাজামা ও চামড়ার থলিয়া। প্রত্যেক গোত্রের নিজস্ব নিশান ছিল, এক টুকরা বিশেষ ধরনের কাপড় বর্ণায় গেঁথে গোত্রের বীরশ্রেষ্ঠ তা বহন করতো। পদাতিক বাহিনীর অস্ত্র ছিলো, তীর ধনুক ফিঙ্গা, ঢাল ও তয়োয়ার; খাপে-ঢাকা তলোয়ারখানি ডান কাঁধে ঝুলে থাকতো, পরবর্তীকালে আবিসিনিয়া থেকে ‘হারবাহ’ বা বর্শা আমদানি করা হলে পদাতিকরাও ব্যবহার করতো। অশ্বারোহী বাহিনীর অস্ত্র ছিল ‘রুম্হ বা দীর্ঘ বর্শা; তার ‘খত্তি’ বা দণ্ডটি বাহ্রায়েনের আল্-খাত্ নামক সমুদ্রোপকূলবর্তী স্থানের বাঁশ থেকে নির্মিত হতো। তীর-ধনুকও অশ্বারোহীদের অস্ত্র ছিল। তরবারি স্থানীয় কারখানায় প্রস্তুত হতো, তবে ‘হিন্দী’ নামক উচ্চ শ্রেণীর তরবারী পাক-ভারত উপমহাদেশ থেকে আমদানি করা হতো। আত্মরক্ষার্থে সৈন্যরা ঢাল ও বর্ম ব্যবহার করতো। সৈন্যরা নিজেরাই অশ্ব সংগ্রহ করতো। যাদের বেতন অল্প এবং অবস্থা ভাল হয়, তাদের জন্য সরকার থেকে অশ্ব সরবরাহ করা হতো।

    প্রথম দিকে সৈন্যদের রসদ যোগানোর ব্যবস্থা (কমিসরিয়ট) কিছুই ছিল না। কাদিসিয়ার যুদ্ধে নিযুক্ত সেনাবাহিনী আশপাশের গ্রামগুলি থেকে নিজেরাই খাদ্য-শস্য সংগ্রহ করতো, খলিফা মদিনা থেকে গোশত পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলেন। পরবর্তীকালে জিম্মীরা জিয়ার সঙ্গে মাথাপিছু পঁচিশ সের খাদ্যশস্য আদায় দিত এবং এভাবে সংগৃহীত সব খাদ্যশস্য সেনাবিভাগে চালান যেতো। মিসর থেকে জলপাই তৈল, মধু ও সির্কাও সংগৃহীত হতো এবং সৈন্যরা তা দিয়ে রুটি মেখে খেত। জাজিরাহ্ থেকেও এ-সব সংগ্রহ হতো। পরবর্তীকালে ‘আহরা’ নামক রসদ যোগান দফতর সৃষ্টি হয়। সব রকম খাদ্যদ্রব্য এক স্থানে সঞ্চিত হতো এবং মাসের প্রথম মাথাপিছু এ রকম হারে বন্টন করা হতো-খাদ্যশস্য এক মণ দশ সের, জলপাই তৈল বার সের ও সিকা বার সের। ইয়াকুবী বলেন, পরবর্তীকালে ওমর যখন সিরিয়ায় সফরে যান, তখন সৈন্যদেরকে খোরাকী দেওয়ার পরিবর্তে পাক করা খাবার দেওয়া হতো।

    সৈন্যদের সুস্থ ও কর্মঠ রাখার জন্যে কয়েকটি বিধি-নিয়ম পালন করা হতো। তাদেরকে দৈনিক ঘোড়দৌড়, তীরছোঁড়া, কুস্তিবাজী, সন্তরণ ও খোলা পায়ে হাঁটা প্রভৃতি ব্যায়াম করতে হতো। দৈনিক আধুনিক পন্থার ড্রিল করানোর কোনও নিয়ম ছিল কি-না জানা যায় না। অভিযান পরিকল্পিত হতো। ঋতু পরিবর্তনের দিকে লক্ষ্য রেখে। শীত-প্রধান দেশে গ্রীষ্মকালে এবং গ্রীষ্মপ্রধান দেশে শীতকালে সাধারণ অভিযান করার চেষ্টা করা হতো। ঋতু অনুযায়ী এভাবে চালানোর আরবী নাম ছিল ‘শাতিয়াহ্’ ও ‘সাফিয়াহ্’। ১৭ হিজরীতে মাদায়েন অধিকৃত হওয়ার পর লক্ষ্য করা গেল, সৈন্যদের স্বাস্থ্য ঋতুর কঠোরতার দরুন ভেঙ্গে পড়েছে, তখন ওৎবাহ্ বিন্-খাওয়ানের উপর নির্দেশ হয়, বাহিনী প্রতি বছর বসন্তকালে স্বাস্থ্যপ্রদ স্থানে অপসারণ করতে। উত্তম আবহাওয়ার সঙ্গে উপযুক্ত চারণভূমির দিকেও দৃষ্টি রাখা হতো। মিসরের শাসক আমর-বিন্-আস্ বসন্ত সমাগমে সেনাবাহিনীকে গ্রামাঞ্চলে স্থানান্তরিত করতেন; তখন তারা শিকারে ও আমোদ-প্রমোদ স্বাস্থ্যোন্নতি করতো এবং চারণভূমিতে উট ও ঘোড়াগুলি মোটা হয়ে উঠতো।

    সেনানিবাসে ও সেনাবারিক নির্মাণের সময় আবহাওয়া ও স্বাস্থ্যবিধির দিকে লক্ষ্য রাখা হতো। এজন্যে খোলা উঁচু জায়গা নির্বাচিত হতো ও প্রতিটি গৃহের সম্মুখে প্রশস্ত উঠান রাখা হতো। কুফা, বসরা, ফুস্তাত প্রভৃতি বৃহৎ শহরের সেনানিবাসগুলির প্রশস্ত পথ ছিল। ওমর নিজেই এসবের পরিকল্পনা প্রস্তুত করতেন এবং রাস্তার প্রস্থ ও অবস্থান নির্দেশিত করতেন।

    সৈন্যরা অভিযানে মার্চ করার সময় শুক্রবারে বিশ্রাম করতো। তারা একদিন ও একরাত বিশ্রাম করে শ্রান্তি দূর করতো এবং পোশাক ও অস্ত্র পরিষ্কার করে নিতো। খাদ্যদ্রব্যের ও পানির সহজপ্রাপ্যতা দেখে ছাউনি ফেলা হতো। সা’দ-বিন-ওক্কাসের নিকট প্রেরিত ফরমান থেকে এ-সব নির্দেশের উল্লেখ পাওয়া যায়।

    সৈন্যদের নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে ছুটি দেওয়া হতো। দূরবর্তী স্থানে অবস্থিত সেনারা বছরে একবার ছুটি ভোগ করতো। একবার ওমর এক যুবতীকে বিরহের গান গাইতে শুনে জানতে পারেন, তার মুজাহিদ স্বামী বহু দিন ঘরে ফেরে নি। ওমর তখনই সিপাহসালারদের নির্দেশ দেন, কোনও সৈনিকের চারমাসের বেশি গৃহসুখ থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

    ওমর সৈন্যবিভাগে আরও কয়েকটি নতুন নিয়ম প্রবর্তন করেন। প্রত্যেক বাহিনীর সঙ্গে একজন হিসাবরক্ষক, একজন কাজী, কয়েকজন দোভাষী ও চিকিৎসক থাকতেন। কাদিসিয়ার যুদ্ধকালে আবদুর রহমান-বিন্-রাবিয়া কাজী হিসেবে, যিয়াদ-বিন্-আবিসুফিয়ান হিসাব পরীক্ষারূপে এবং হিলালহিজরী দোভাষী হিসেবে অনুগমন করেছিলেন।

    যুদ্ধকালে সৈন্যবিন্যাস করা হতো শ্রেণীবদ্ধরূপে। সৈন্যদের বিভক্ত করা হতো দক্ষিণ, বাপ, সম্মুখ ও পশ্চাৎসারি হিসেবে। প্রত্যেক সারি পৃথকভাবে যুদ্ধ করতো, সমগ্র বাহিনীর কোন নির্দিষ্ট সিপাহসালার থাকতো না প্রথম দিকে। ইয়ারমুকের যুদ্ধের সময় সর্বপ্রথম খালিদ-বিন্-ওলিদ একক সিপাহসালার হিসেবে সেনাবাহিনী সুসংবদ্ধরূপে পরিচালনা করেন। চল্লিশ হাজার সৈন্য ছত্রিশটি অংশে বিভক্ত হলেও খালিদের নেতৃত্বে সুগঠিত হয়ে এক যোগে যুদ্ধদান করেছিল। ওমরের নির্দেশমতে সৈন্যদল এরূপভাবে সারিবদ্ধ হতো : কর্ বা মধ্যভাগ, এটির সঙ্গে সিপাহসালার যুক্ত থাকতেন; মকাদ; দামাহ্ বা সম্মুখদল; মায়ামানাহ্ বা দক্ষিণবাহু; মায়সারাহ্ বা বামবাহু; সাকাহ্ বা পশ্চাদ্দল, তালাইয়াহ্ বা টহলদারীদল, যাদের কাজ ছিল শত্রুপক্ষের গতিবিধির উপর লক্ষ্য রাখা; রিদ্ অর্থাৎ সর্বপশ্চাদ্ দল, যাদের কাজ ছিল সম্মুখের দলগুলিকে শক্তিশালী করা; রাইদ্ অর্থাৎ রসদ যোগানদার; রুকবান্ অর্থাৎ উষ্ট্রবাহিনী; ফরসান্ অর্থাৎ অশ্বারোহী বাহিনী; রাজিল্ অর্থাৎ পদাতিক বাহিনী; রমাত্ অর্থাৎ তীর ধনুকধারী বাহিনী। কিল্লা দখল করতে ও দুর্গপ্রাচীর ভূমিসাৎ করতে প্রস্তরক্ষেপক যন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার করা হতো। ১৬ হিজরীতে বসির দুর্গ আক্রমণকালে ন্যূনপক্ষে কুড়িটি এরূপ যন্ত্রের ব্যবহার করা হয়। দবাবহ্ নামক আর একটি যন্ত্র অবরোধকালে ব্যবহৃত হতো। এটি কাঠের কয়েকটি তালাযুক্ত উঁচু যন্ত্রবিশেষ। চাকায় চালিত যন্ত্রটিতে প্রস্তর নিক্ষেপকারী, প্রাচীর রন্ধ্রকারী ও তীরন্দাজগণ আত্মগোপন করে শত্রুর দুর্গপ্রকারের কোলে উপস্থিত হতে পারতো এবং সহজে দুর্গপ্রাকার বিধ্বস্ত করে দিত। অভিযানকালে সড়ক, সেতু ও অস্থায়ী গৃহ নির্মাণ করবার পৃথক বাহিনী থাকতো। মারিযী বলেন, আলেকজান্দ্রিয়া অভিযানকালে মিসরবাসীরা স্বেচ্ছায় এ-সব কাজের ভার গ্রহণ করে ছিল এবং সারাপথে বাজার বসিয়ে মুসলিমবাহিনীর রসদ যোগাড়ের ব্যবস্থা করেছিল।

    ওমরের খেলাফতকালে গুপ্তচর নিয়োগ ও গোয়েন্দাগিরি উচ্চ পর্যায়ের ছিল। গুপ্তচর হিসেবে ইরাক ও সিরিয়া নও-মুসলিম আরবদিগকে নিযুক্ত করা হতো। তারা বহু বছর এ সব দেশে বাস করে দেশের অবস্থা ও বাশিন্দাদের স্বভাব-প্রকৃতি সম্যক অবগত ছিল এবং সহজেই অগ্নিপূজক অথবা খ্রিস্টানদের বেশ ধরে শত্রুদলে মিশে যেতো এবং শত্রুপক্ষের সৈন্যশক্তি, গতিবিধি প্রভৃতি মূল্যবান সংবাদ সংগ্রহ করতো। ইয়ারমুক, কাদিসিয়া ও তিরকিতের যুদ্ধে এ-সব গুপ্তচর খুবই সাহায্যকারী হয়েছিল। সিরিয়ার বড়ো বড়ো শহরবাসীরা নিজেরাই গুপ্তচর নিয়োগ করতো এবং রোমক সৈন্যবাহিনীর গতিবিধি সম্বন্ধে মুসলিমদেরকে সন্ধান দিতো। প্যালেস্টাইন ও জর্ডানের উত্তরাঞ্চলের সুমারিতান গোত্রীয় ইহুদীরা গুপ্তচর হিসেবে অত্যন্ত পারদর্শী ছিল এবং কাজের পুরস্কার হিসেবে তাদের নিষ্কর ভূমি দান করা হতো।

    ওমরের সেনাবিভাগ-প্রশাসনের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে সেনাবাহিনীর উপর সর্বদাই সামগ্রিক কর্তৃত্ব স্থাপন; এবং তা এতোখানি চূড়ান্ত ছিল যে, যদিও বিশাল বাহিনী মুসলিম অধিকারের দেশে দেশে অতিদূর অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, বহু জাতি ও গোত্রের সংমিশ্রণে গঠিত ছিল, তবুও তাঁর উপস্থিত প্রতিটি সৈন্যঘাঁটিতে অনুভূত হতো এবং তার দরুন সিপাহসালার থেকে সামান্য সৈন্য পর্যন্ত সর্বদাই সন্ত্রস্ত ও শঙ্কিত থাকতো। আর তার কারণ ছিল দুটি: ওমরের সমুদ্রবৎ অসীম মহিমাপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও নিরঙ্কুশ প্রভাব। দ্বিতীয়ত প্রতিটি সেনাদলে ওমরের এমন বিধ্বস্ত সংবাদদাতা ছিল, যার মারফত তিনি প্রতিটি সংবাদ সংগ্রহ করতে সক্ষম হতেন। তাবারী বলেন: প্রত্যেক সেনাদলে ওমরের সংবাদদাতা ও গোয়েন্দা নিযুক্ত থাকতো এবং তারা প্রতিটি সংবাদ খলিফার গোচরে আনতো। তার ভয়ে কেউ কোনও অপরাধ করলে অনতিবিলম্বে খলিফা অবহিত হতেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিবিধান করতেন। পারসিকদের সঙ্গে যুদ্ধকালে আমর মাযি-করর্ সেনাপতির সঙ্গে অভদ্র আচরণ করেন। সঙ্গে সঙ্গে তা খলিফার গোচরে আসে এবং মাযি-করর্ এমন কঠিন ভর্ৎসনা লাভ করেন যে, পরবর্তীকালে আর কেউ অবাধ্যতা করার কল্পনাও করতে পারতো না।

  • শহর পত্তন ও পূর্তবিভাগ

    শহর পত্তন ও পূর্তবিভাগ

    শহর পত্তন ও পূর্তবিভাগ

    ওমরের খেলাফত আমলে নয়া নয়া শহরের পত্তন একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এ-সব শহর নির্মাণকল্পে খলিফা কেবল ইচ্ছা প্রকাশ করে কিংবা নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, নিজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন এবং অনেক সময় পরিকল্পনাও স্বয়ং প্রস্তুত করে দিতেন। এভাবে বসরা, কুফা, ফুস্তাত, মুসাল জাজিরাহ্ প্রভৃতি ইতিহাস প্রসিদ্ধ নগরের সৃষ্টি হয়।

    পূর্বে পারস্য-উপসাগর বেয়ে পারসিক ও ভারতীয় জাহাজগুলি আবালাহ্ বন্দরে নোঙ্গর ফেলতো এবং তার দরুণ খাসআরব অঞ্চল সহজে পারস্য ও ভারত থেকে হঠাৎ আক্রমণীয় ছিল। এজন্যে ওমর নিরাপত্তা রক্ষার্থে বন্দর থেকে অনতিদূরে একটি শহর পত্তন করার জন্যে ১৪ হিজরীতে ওবা-বিন্ খাওয়ানকে নিয়োগ করেন। ওমর স্থান নির্মাণ ও পরিকল্পনাও প্রস্তুত করে দেন। খারিবার আশপাশ নিয়ে বসরা শহরের পত্তন হয়। তখন এটা মুক্ত প্রান্তর ও কঙ্করাকীর্ণ ছিল, কিন্তু পানি ও চারণভূমিও ছিল, আর এজন্যেই আরবী মেযাজের অনুকূল স্থান ছিল। ওৎবা শহর নির্মাণকালে স্থানটি ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের জন্যে নির্দিষ্ট মহল্লায় বিভক্ত করেন এবং বাসের জন্যে মাটি কুটা দিয়ে অসংখ্য কুটির নির্মাণ করেন। সেগুলি বিভিন্ন গোত্রের নয়া বাসিন্দাদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হয়। জামে-মসজিদ ও দফতরখানাসহ রাষ্ট্রভবনটি সবচেয়ে বৃহৎ দর্শনীয় ছিল। ১৭ হিজরীতে এক অগ্নিকাণ্ডে অধিকাংশ বাসগৃহ ভস্মসাৎ হয়ে যায়। তখন কুফার শাসক সা’দ-বিন-ওক্কাসের আবেদনক্রমে ওমর ইটের ঘর প্রস্তুতের অনুমতি দেন, কিন্তু নির্দেশ দেন, কেউ তিনটির চেয়ে বেশি কামরাবিশিষ্ট ঘর তুলতে পারবে না। দজলা (ট্রাইগ্রিস) নদী কুফা থেকে দশ মাইল দূরে প্রবাহিত ছিল। ওমরের আদেশে নদীটি থেকে একটি খাল খনন করে শহরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বসরা নামকরণ সম্বন্ধে আরব অভিধানিকরা বলেন, আরবী ‘বাহ’ শব্দের অর্থ কঙ্কর, এজন্যেই কঙ্করময় স্থানটি বসরা নামাঙ্কিত হয়। পারসিক পণ্ডিতদের মতে ‘বিস্‌রাহ্’ অর্থাৎ বহু সড়কের সংযোগস্থল বিধায় বস্রা নামের উৎপত্তি হয়েছে। যা হোক, আবহাওয়া প্রীতিপ্রদ হওয়ায় শীঘ্রই শহরটি জনবহুল হয়ে ওঠে এবং প্রায় আশি হাজার শহরবাসীর নাম সৈন্য তালিকাভুক্ত হয়। কালক্রমে বা ওলামাপ্রধান আরবী শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এখানেই খলিল বস্ত্রী কর্তৃক প্রথম আরবী অভিধান ‘কিতাবুল-আইন্’ সঙ্কলিত হয়, আরবী ছন্দ-প্রকরণ ও সংগীত চর্চার সৃষ্টি হয়। আবার এখানেই ইমাম আবু হানিফা জন্মগ্রহণ করে হানাফী মযহাবের সৃষ্টি করেন এবং কাজী আবু ইউসুফ, ইমাম মুহম্মদ প্রমুখের সহযোগিতায় ফিকাহ্‌র উন্নতি সাধন করেন। হাদিস ও ফিকাহ্‌র বহু মহামনীষীর জন্ম ও কর্মক্ষেত্র হিসেবেও বস্ত্রা মুসলিম ধর্মেতিহাসে অমর হয়ে আছে।

    মাদায়েন অধিকৃত হওয়ার পর সা’দ বিন্-ওক্কাস্ খলিফার নিকট সংবাদ প্রেরণ করেন যে, স্থানীয় আবহাওয়ায় সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ছে। ওমর তখনই নির্দেশ দেন, সাগর ও বৈশিষ্ট্যযুক্ত একটা নতুন শহর পত্তন করে সেখানে সেনানিবাস স্থাপন করতে। তখন হুদায়ফা ও সালমন কুফায় নতুন শহরের স্থান নির্বাচন করেন। ফোরাত (ইউফ্রেতিস) নদীকূল থেকে দুমাইল দূরে অবস্থিত স্থানটি বালু ও কঙ্করময় ছিল এবং আবহাওয়া আরামদায়ক ছিল। ১৭ই হিজরীতে কুফার পত্তন হয়। আরবরা কুফাকে ‘খাদ্ উল্ আযরা’ বা প্রেমিকের গণ্ডদেশ নামে উল্লেখ করতো, আর তার কারণ এই যে, এখানে নানাবিধ আরবী ফুল অজস্রভাবে ফুটতো। প্রথমে চল্লিশ হাজার বাসগৃহ নির্মিত হয় কুটা-মাটি দিয়ে এবং সেগুলিকে বিভিন্ন মহল্লায় বিভক্ত করে ভিন্ন ভিন্ন আরব গোত্রের মধ্যে বন্টন করা হয়। ওমর নিজে শহরের নির্মাণ পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন। প্রধান সড়কগুলি চল্লিশ হাত, দ্বিতীয় শ্রেণীর সড়ক ত্রিশ হাত, তৃতীয় শ্রেণীর সড়ক কুড়ি হাত ও গলিরাস্তাগুলি সাত হাত প্রশস্ত ছিল। জামে-মসজিদটি বৃহৎ আকারে একটা উঁচু টিলার উপর নির্মিত হয়, সেখানে চল্লিশ হাজার মুসল্লী একযোগে নামায আদায় করতে পারতেন। মসজিদের সম্মুখে একটি বিরাট মণ্ডপ নির্মিত হয়, সেটি একশো গজ লম্বা ছিল এবং খামগুলি ইরানের খসরুদের বালাখানা থেকে সংগৃহীত মর্মর নির্মিত ছিল। কুফাতেও অগ্নিকাণ্ডে মাটির ঘরগুলি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ওমর ইষ্টক নির্মিত গৃহনির্মাণের অনুমতি দান করেন। মসজিদ থেকে মাত্র একশো গজ দূরে রাষ্ট্র ভবন নির্মিত হয়। সেখানে খাজাঞ্চীখানাও অবস্থিত ছিল। তার সংলগ্ন একটি সাধারণ অতিথিশালা নির্মিত হয়। এখানে পথিকেরা বিনামূল্যে আহার ও বাসস্থান লাভ করতো। সাত শতক পরে ইবনে বতুতা কুফা সফর করতে এসে সা’দ কর্তৃক নির্মিত রাষ্ট্রভবনের অস্তিত্ব প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

    জামে মসজিদ ব্যতীত আরও বহু মসজিদ প্রত্যেক মহল্লায় নির্মিত হয়েছিল। কুফায় বার হাজার ইয়ামেনবাসী ও আট হাজার নযরগোত্রীয় লোক বসতি করে; তা ছাড়া প্রায় আরও কুড়িটি গোত্রের অধিবাসীর নামোল্লেখ দেখা যায়। কুফায় প্রধানত আরবরাই বাসস্থান নির্মাণ করে এবং আরব-শক্তি ও সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে। ওমরের জীবদ্দশাতেই কুফা এরূপ জনবহুল ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে যে, তিনি কুফাকে ইসলামের শিরোমণি হিসেবে অভিহিত করেন।

    মিসরে ফুতাত শহরের পত্তন হয় একটি তাঁবুকে কেন্দ্র করে, এবং তাঁবুর আরবী শব্দ ‘ফুসতার্ত’ বিধায় শহরটি এভাবে নামাঙ্কিত হয়ে যায়। কথিত আছে, আমর-বিন্-আস্ যখন আলেকজান্দ্রিয়ায় অভিযান উদ্দেশ্যে কসরউল্-সামা ত্যাগ করেন, তখন লক্ষ্য করেন যে, তাঁর নবনির্মিত তাঁবুতে একটি কবুতর বাসা তৈরী করেছে। তিনি হৃষ্টকণ্ঠে বলেন, এটি অক্ষত রেখে দাও, যাতে আমাদের অতিথির অসুবিধা না হয়। এখন ওমরের নির্দেশে তিনি তাঁবুটিকেই কেন্দ্র করে ফুস্তাত শহরের পত্তন করেন। এখানেও কয়েক হাজার কাঁচাঘর তোলা হয় ও বিভিন্ন গোত্রীয় লোকদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হয়। জামে-মসজিদটি নির্মাণে বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়। জুবায়ের প্রমুখ আটজন বিশিষ্ট সাহাবা মসজিদের কিলাহ্ নির্ণয় করেন। মসজিদটি পঞ্চাশ গজ প্রস্থে হয় ও তিনটি দরওয়াজা থাকে। তার একটি দরওয়াজার সম্মুখে মাত্র সাত গজ দূরে বিশাল রাষ্ট্রভবন নির্মিত হয়। শহরটির পত্তন হয় ২১ হিজরীর শেষভাগে।

    ফুস্তাত শীঘ্রই জনাকীর্ণ সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে, এবং আলেকজান্দ্রিয়ার নাম-যশ অবলুপ্ত করে দিয়ে মিসরের প্রাণ-কেন্দ্রে পরিণত হয়। শহরের আরব বাসিন্দাদের সংখ্যা চল্লিশ হাজারের উর্ধ্বে ছিল। কুদাই-এর বিবরণ মতে ফুস্তাতে ছত্রিশ হাজার মসজিদ, আট হাজার সড়ক ও প্রায় বারো শত সাধারণ স্নানাগার ছিল। মারিযী কয়েক পৃষ্ঠাব্যাপী বিবরণীতে শহরটির ঐশ্বর্য ও জাঁকজমকের উল্লেখ করেছেন। বহু শতাব্দী ধরে ফুস্তাত মিশরের রাজধানী এবং শিল্প, শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল ছিল। চারশো বছর পরে বশারী পৃথিবী পরিক্রমণকালে ফুস্তাতের সমৃদ্ধিতে অভিভূত হয়ে নিজের ভূ-বিবরণীতে লিপিবদ্ধ করেন: এই শহরটি বাগদাদের নাম রাহুগ্রস্ত করেছে, এটি পাশ্চাত্যের ধনাগার ও ইসলামের গৌরব। মুসলিম জগতের মধ্যে এখানকার মসজিদের ন্যায় এতো আলেমের সমাবেশ অন্য কোনখানে নেই, এবং এখানকার বন্দরের ন্যায় কোথাও এতো বেশি জাহাজের সমাগম হয় না।

    মুসাল্ শহরের পত্তন হয়েছিল ইসলামের বহু পূর্বে; কিন্তু ওমরের আমলে তার ভগ্নদশা উপস্থিত, একটি দূর্গ এবং কয়েকটি গীর্জা ও মঠ নিয়ে ছিল তার অস্তিত্ব। ওমর শহরটি নয়ারূপে পত্তন করেন। হারসামা বিন্-আরফজা নির্মাণকাজে নিযুক্ত হন এবং কয়েক হাজার বাসগৃহ নির্মাণ করে বহু আরব গোত্রের পুনর্বাসন করেন। একটি জামে-মসজিদ ও কয়েকটি সরকারী বালাখানা নির্মিত হয়। শহরটির রাজনৈতিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য, কারণ এটি ছিল, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলনক্ষেত্র এবং এজন্যেই তাঁর মুসাল্ নাম সার্থক। বিখ্যাত ভৌগোলিক ইয়াকুত হাম্বী বলেন: লোকে বলে, পৃথিবীতে তিনটি বৃহৎ নগরী আছে-প্রাচ্যের প্রবেশদ্বার নিশাপুর, পাশ্চাত্যের প্রবেশদ্বার দামেক এবং প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মিলন পথ মুসাল। যে কেউ পৃথিবী পদচারণে বহির্গত হলে তাকে মুসালের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।

    সর্বশেষে ওমরের নির্মিত অন্যতম শহর জামিরার বর্ণনা করা যেতে পারে। এটি নির্মিত হয় নীলনদের পশ্চিম তীরে ফুস্তাতের ঠিক বিপরীত দিকে। আমর প্রথমে আলেকজান্দ্রিয়াতেই রাজধানী স্থাপনের কল্পনা করেছিলেন, কিন্তু ওমরের নির্দেশে তা সফল হয় নি। তবু নীলনদের অপর পারে একটি ঘাঁটি প্রস্তুত করার প্রয়োজন তিনি অনুভব করেন, যার উপস্থিতিতে রোমকরা নীল নদের অপর তীরে সময়-অসময় হানা দিতে না পারে। আমর এ প্রস্তাব খলিফার নিকট পেশ করলে ওমর একটি কিল্লা নির্মাণের অনুমতি দেন। ২১ হিজরীর মধ্যে কিল্লাটি ও তাঁর চতুর্দিকে শহর গড়ে ওঠে কালক্রমে জাজিরা ইসলামী ধর্মশিক্ষার একটা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বহু বহু মশহুর আলেম ও মুহাদ্দিসের জন্মভূমি এই জাজিরা। ‘মুজ্‌জমা-উল্‌-বুল্ দানে’ জাজিরার সমৃদ্ধি ও মনীষীবৃন্দের চিত্তাকর্ষক কাহিনী লিপিবদ্ধ আছে।

    শহর পত্তনের সঙ্গে পূর্তবিভাগীয় কার্যসমূহের আলোচনা বাঞ্ছনীয়। বলা বাহুল্য, পূর্তবিভাগ বলতে আজকাল যা বোঝায়, তেমন কোনও প্রতিশব্দ আরবী ভাষায় লক্ষ্য করা সুদুর্লভ। মিসর ও সিরিয়ায় তার নাম ছিল নযারাত্‌-ই-নাফিয়া। এই বিভাগের উপর ন্যস্ত কার্যভার ছিল সরকারী ভবন হাসপাতাল, খাল, পথ ও পুলের নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ। এ কথা অনস্বীকার্য যে, ওমরের খেলাফতকালে এ সব কাজের জন্যে কোনও স্বতন্ত্র বিভাগ গড়ে ওঠে নি, কিন্তু এক হাসপাতাল ব্যতীত এ বিভাগের অন্য সব কাজের উপযুক্ত বন্দোবস্ত হয়েছিল ওমরের আমলে।

    প্রথমে ধরা যাক সরকারী ভবন নির্মাণের উদ্যোগ। ওমর মোটামুটি তিন শ্রেণীর গৃহ নির্মাণ করেছিলেন সরকারী ব্যয়ে; মসজিদ; সমরবিভাগীয় ভবন, যথা, সেনাবারিক, সেনানিবাস ও দুর্গ; এবং প্রশাসনিক গৃহাদি। বিভাগীয় নির্মাণকার্যের বর্ণনা অন্যত্র বিশদ হয়েছে। প্রশাসনিক গৃহাদি ছিল: দারুল-আমারত বা প্রাদেশিক ও জেলা-মহকুমার সরকারী কর্মচারীদের বাসভবন; দিওয়ান বা সরকারী দফতরখানা; বায়তুল-মাল বা সরকারী খাজাঞ্চিখানা; জেলখানা, যা প্রথমে মদীনায় ও বসরায় নির্মিত হয় এবং মুসাফিরখানা। বালাজুরী বলেন, ওমর নির্দেশ দেন যে, মুসাফিরদের আরাম ও আহারের ব্যবস্থার জন্যে প্রত্যেক শহরে মুসাফিরখানা নির্মিত হবে। মদীনায় মুসাফিরখানা স্থাপিত হয় ১৭ হিজরীতে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, এ সব সরকারী ভবন ওমরের আমলে যথাসম্ভব কম খরচে ইট ও মাটি দিয়ে নির্মিত হতো। বায়তুল-মাল থেকে অনর্থক ব্যয় এরূপ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল যে, প্রয়োজনাতিরিক্ত একটি মুদ্রাও ব্যয়িত হলে তার কৈফিয়ৎ দিতে হতো জনগণের সম্মুখে মজলিস-ই-শুরায়। খলিফা যতোই ব্যক্তিত্বশালী হোন, বায়তুল-মাল নিয়ে যথেষ্ট ব্যয় তাঁর ক্ষমতাতীত ছিল।

    ওমরের আমলে কৃষিকাজের উন্নতিকল্পে যে সব খাল খনন করা হয়েছিল, পূর্বে তার উল্লেখ করা হয়েছে। এ সব ছাড়াও বহু খাল খনিত হয়েছিল পানীয় জলের অভাব পূরণের জন্যে এবং ব্যবসার প্রসারকল্পে। আবু মুছা খাল খনন করা হয়েছিল বস্ত্রার লোকের পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে। এ খালটির দৈর্ঘ্য ছিল নয় মাইল, এবং দজলা নদী থেকে সুমিষ্ট পানি বসার ঘরে ঘরে প্রচুর পরিমাণে সরবরাহ করা হতো।

    আরবীতে একটা প্রবচন আছে, “আল্লাহ্‌র খাল প্রবাহিত হলে মাকালার খাল অকেজো হয়ে পড়ে”। বলা বাহুল্য এ খালটি ও মা-বিন্-ইয়াসার কর্তৃক খনন করা হয়েছিল দজলা নদী থেকে খাবার পানি স্থানীয় লোকদের সরবরাহ করতে। আনবারের বাসিন্দাদের আবেদনক্রমে কুফার শাসক সা’দ পানীয় জলের অভাব মোচনার্থে একটি খাল খনন আরম্ভ করেন, কিন্তু মধ্যপথে পাহাড়ের বাধা দেখা যায় ও সেখানেই পরিত্যক্ত হয়। পরবর্তীকালে হাজ্জাজ পাহাড়ের মধ্য দিয়ে সুড়ঙ্গ কেটে খালটি প্রবাহিত করেন, কিন্তু খালটি সাদেরই নামাঙ্কিত থেকে যায়।

    সবচেয়ে দীর্ঘ ও প্রয়োজনীয় খাল ওমরের আমলে করা হয়েছিল নীলনদ থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত। এটির নাম ছিল আমীরুল মুমেনীনের খাল। ১৮ হিজরীতে আরবে এক ভীষণ দুর্ভিক্ষ উপস্থিত হয়। ওমর প্রত্যেক প্রাদেশিক ও জেলা-শাসককে নির্দেশ দেন প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্য ক্রয় করে মক্কায় প্রেরণ করতে। সিরিয়া ও মিসরে প্রচুর খাদ্যশস্য সংগৃহীত হলো, কিন্তু সমস্যা দেখা দিল, আরবে কিভাবে সে-সব শস্য চালান করা যায়। আমর-বিন্-আস কয়েকজন বিশিষ্ট মিসরবাসীকে নিয়ে মদিনায় আলোচনা করতে আসেন, কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়। সব কিছু বিবেচনা করে ওমর নির্দেশ দেন, নীলনদের সঙ্গে খাল কেটে লোহিত সাগর যদি সংযুক্ত করা যায়, তা হলে জলপথে মাল-চলাচল সহজ ও দ্রুত হবে, এবং আরবে কখনও দুর্ভিক্ষ হবে না। আমর ফুতাত থেকে ঊনসত্তর মাইল খাল কেটে লোহিত সাগরে যোগ করে দেন। মাত্ৰ ছয় মাসে কাল সম্পূর্ণ খনিত হয় এবং প্রথমেই কুড়িটি জাহাজভর্তি ষাট হাজার আরুব ওজনের খাদ্য-শস্য মদীনায় উপস্থিত হয়। এভাবে খালটি বহুকাল আরব ও মিসরের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ রক্ষা করে। উমাইয়া খলিফা ওমর-বিন-আবদুল আযিযের (৭১৯-৭২০ খ্রি.) সময় খালটি স্থানে স্থানে মজে যেয়ে ধান্ বুল তামসাহ-নামক স্থানে একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।

    এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, আমর লোহিতসাগরের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরের সংযোগ ঘটাবার উদ্দেশ্যে একটি বৃহৎ খাল খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং সত্তর মাইল দীর্ঘখালের একটি নক্শাও প্রস্তুত করেন। ওমরের নিকট প্রস্তাব পাঠানো হলে তিনি এই যুক্তিতে অননুমোদন করেন যে, এ খাল প্রস্তুত হলে গ্রীক নৌবহর সহজেই লোহিত সাগরে হানা দিয়ে আরবে হামলা করবে ও লুটতরাজ চালাবে। আমরের পরিকল্পনা বাস্তবে রূপায়িত হলে প্রায় সাড়ে বারো শো বছর পূর্বে সুয়েজ ক্যানেলের অনুরূপ পৃথিবী-বিশ্রুত খাল খননের কৃতিত্ব আরবদেরই হতো।

    ওমরের আমলে বহু সড়ক ও পুল প্রস্তুত হয় এবং আরব থেকে সিরিয়া ও পারস্যের প্রত্যন্ত অঞ্চল যাতায়াত সুগম হয়। তাঁর খেলাফতকালে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যে-সব সন্ধি হতো, তার মধ্যে একটা শর্ত জুড়ে দেওয়া হতো যে, স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের শ্রম ও অর্থে পথগুলি ও পুলসমূহ প্রস্তুত এবং রক্ষণাবেক্ষণ করবে। আবুওবায়দাহ্ সিরিয়া জয় করলে সন্ধিপত্রে এই বিশেষ শর্তটি সন্নিবেশিত হয়।

    মক্কা শরীফ যদিও বহু শতাব্দী ধরে সারা আরবের তীর্থ কেন্দ্র ছিল, মক্কা যাওয়ার রাস্তাগুলি সুগম ছিল না। ১৭ হিজরীতে ওমর যখন মক্কা শরীফ গমন করেন, তখন এদিকে তাঁর দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় এবং তাঁর নির্দেশে অবিলম্বে মদীনা থেকে মক্কা পর্যন্ত দীর্ঘ ২২০ মাইল (মতান্তরে ২৭০ মাইল) রাস্তা নতুনরূপে প্রস্তুত হয় এবং প্রত্যেক মনযিলে সরাইখানা নির্মিত ও কূপ খনন করা হয়। এ সম্বন্ধে পাক-ভারতের শ্রেষ্ঠ মনীষী শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর ‘ইয়ালাতুলখিফ’য় বলেছেন: অন্যান্য কাজের মধ্যে ওমর যখন মক্কায় ওমরাহ করতে যান, তখন প্রত্যাবর্তনকালে নির্দেশ দেন, যেন দুটি পবিত্র শহরের মধ্যবর্তী পথের প্রত্যেক মনযিলে মুসাফিরখানা নির্মাণ করা হয়, মজে যাওয়া কূপগুলির সংস্কার করা হয় এবং দরকারক্ষেত্রে নতুন কূপও খনন করা হয়। এভাবে হাজীদের যাত্রাপথে সুগম ও আরামপ্রদ করা হয়েছিল।

    ওমরের খেলাফতকে বলা যেতে পারে মসজিদ-নির্মাণের স্বর্ণযুগ। মুহাদ্দিস্ জামালুদ্দিন তাঁর ‘রওযাতুল-আহবার’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ওমর চার হাজার মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। পূর্বেই উক্ত হয়েছে যে, প্রত্যেক নব-প্রতিষ্ঠিত শহরে জামে-মসজিদ নির্মিত হয়, প্রত্যেক সেনানিবাসে একটি করে মসজিদ স্থাপিত হয়। সিরিয়ার প্রত্যেক কর্মচারীর উপর নির্দেশ ছিল, প্রতিটি শহরে ও মুসলিম অধ্যুষিত পল্লীতে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত করতে। সে-সব মসজিদের কোন কোনটি আজও কালের করাল কবল অপেক্ষা করে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।

    ওমর পবিত্র কা’বাগৃহের সংস্কার করেন, কিছুটা আয়তন বৃদ্ধি করেন এবং অলঙ্কৃত করেন। ইসলামের দ্রুত প্রচারের সঙ্গে প্রতি বছরে হাজী-সমাগম বৃদ্ধি পেতে থাকে; তার দরুন কা’বাগৃহের আয়তন বৃদ্ধির প্রয়োজন অনুভূত হয়। এজন্যে সতের হিজরীতে ওমর কা’বার চতুষ্পার্শের বাসগৃহগুলি ক্রয় করেন এবং সেগুলি ভূমিসাৎ করে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করেন। পূর্বে কা’বার চতুর্দিকে প্রাচীর ছিল না। ওমর মসজিদের প্রাঙ্গণ ঘিরে চারদিকে প্রাচীর তুলে দেন ও রাত্রিতে জ্বালার বন্দোবস্ত করেন। পুরাকাল থেকেই সমগ্র কা’বাগৃহটি আচ্ছাদিত করার রেওয়ায ছিল। পূর্বে গিলাফ-ই-কা’বা প্রস্তুত হতো নুতা নামীয় বস্ত্রে, ওমরের সময় থেকে মিসরে-প্রস্তুত ‘কাবাতি’ নামক মূল্যবান বস্ত্র দিয়ে গিলাফ-ই-কা’বা প্রস্তুত আরম্ভ হয়। বলা বাহুল্য, আজও মিসর গিলাফ সরবরাহের গৌরব রক্ষা করে আসছে। এই কা’বাগৃহের চতুঃসীমা একদিকে তিন মাইল ও অন্যদিকে সাত মাইল বিস্তৃত। চতুঃসীমা আসাব্ নামাঙ্কিত প্রস্তর-স্তম্ভ দিয়ে চিহ্নিত। সতের হিজরীতে ওমর এই চতুঃসীমা মাহ্যামা প্রমুখ প্রবীণ ও মশহুর সাহাবা কর্তৃক নির্ধারিত করিয়ে আসাব্ প্রোথিত করিয়েছিলেন।

    মদীনায় অবস্থিত মসজিদ-ই-নববীও ওমরের আমলে বর্ধিত ও সুসংস্কৃত হয়। রসূলুল্লাহর সময় মসজিদটি তদানিন্তন মদীনাবাসীদের পক্ষে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু কালক্রমে মদীনার লোকসংখ্য অসম্ভবরূপে বর্ধিত হয় এবং নামাযীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদের আয়তন বৃদ্ধির প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৭ হিজরীতে ওমর এতদুদ্দেশ্যে মসজিদে-নববীর চতুষ্পার্শ্বের গৃহগুলি খরিদ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রথমে আব্বাস তাঁর বাড়ী বিক্রয় করতে অস্বীকার করেন ও ওবাইয়া-বিন্-কাবের এজলাসে ওমরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। আদালত রায় দেন যে, বলপূর্বক বাড়ী ক্রয়ের অধিকার ওমরের নেই। তখন আব্বাস ইচ্ছা প্রকাশ করেন, বাড়ীখানি তিনি মুসলমানদেরকে দান করবেন। ওমর উম্মুল মুমেনীনদের বাসগৃহগুলি অক্ষত রেখে চারদিকের মসজিদটির আয়তন বৃদ্ধি করেন। পূর্বে মসজিদটি ছিল একশত গজ লম্বা, এখন তার দৈর্ঘ্য হলো একশত চল্লিশ গজ, তাছাড়া তার প্রস্থও কুড়ি গজ বৃদ্ধি পায়। মসজিদের সংস্কার কার্যে পুরাতন সাদাসিধা ভাব বজায় রাখা হয়, এমন কি, হযরতের আমলের কাঠের খাম্বা গুলিও যথাস্থানে অক্ষত রাখা হয়। মসজিদ প্রাঙ্গণে একটি উচ্চ মঞ্চ প্রস্তুত হয়। এখান থেকে কবিতা আবৃত্তি বা বক্তৃতা করা হতো।

    পূর্বে মসজিদে কোনও আলোর ব্যবস্থা ছিল না। ওমরের নির্দেশে তমিমদারী আলো জ্বালার ব্যবস্থা করেন। ওমর মসজিদে লোবান জ্বালানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। একবার মালে-গনিমাত কিছু অগুরু পাওয়া যায়। প্রথমে খলিফা ইচ্ছা করেন, দ্রব্যটি সকলকে বিতরণ করে দেওয়া, কিন্তু পরিমাণে স্বল্প হওয়ায় তিনি নির্দেশ দেন, মসজিদে জ্বালানো হোক, তা হলে সকলেই সুগন্ধ উপভোগ করবে। তখন মুয়াযিন একটি আধারে অগুরু জ্বালিয়ে মসজিদে সমাগত মুসল্লীদের সারে সারে সেটি প্রদক্ষিণ করান, সকলে সৌরভে আমোদিত হয়ে ওঠেন। মসজিদের মাঝে গালিচা না বিছিয়ে সাধারণ মাদুর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।2

  • বিচার-বিভাগ

    বিচার-বিভাগ

    বিচার-বিভাগ

    আধুনিক গণকল্যাণ রাষ্ট্রের একটি মহৎ লক্ষণ হচেছ প্রশাসন নিরপেক্ষ স্বাধীন বিচার-বিভাগ সংস্থাপন। বলা বাহুল্য, বর্তমান সভ্যতাভিমানী রাষ্ট্রসমূহে এ লক্ষণটি বিকশিত হয়েছে বহু বিলম্বে বহু আবর্তনের মাধ্যমে। কিন্তু খলিফা ওমরের প্রতিভার ফলশ্রুতিরূপে বিচার-বিভাগ প্রশাসনিক আওতা থেকে তার খেলাফতের প্রথমভাগেই মুক্ত হয়েছিল।

    আবুবকরের সময় পর্যন্ত স্বয়ং খলিফা ও তার প্রশাসন কর্মচারীরাই কাজীর বা বিচারকের কর্তব্য পালন করেছেন। ওমর প্রথমেও এরূপ কর্তব্য পালন করেছেন যতদিন না তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতা অবিসংবাদী রূপে প্রতিষ্ঠিত ও জনগণের শ্রদ্ধাই হয়েছে। এ প্রত্যয় তাঁর সুদৃঢ় ছিল যে, যতক্ষণ না গণমনে কারও মর্যাদা শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত না হয় ততক্ষণ তার বিচারকর্ম আস্থাভাজন হয় না। এ প্রত্যয়ে নিষ্ঠা থাকায় ওমর আবু মুসা আশারীকে একদা লিখেছেন: এমন কোনও ব্যক্তিকে কাজী নিযুক্ত করা উচিত হবে না যিনি জনগণের শ্রদ্ধা আকর্ষণে অক্ষম। শুধু এই কারণেই ওমর আবদুল্লাহ বিন্ মাসুদকে বিচার-কার্য করতে নিষেধ করেছিলেন।

    খেলাফতের প্রভাব সুপ্রতিষ্ঠিত হলেই ওমর বিচার বিভাগকে পৃথক করেন। তিনি কাজী নিযুক্ত করেন। কেবলমাত্র বিচারকর্ম করতে এবং এ বিষয়ে তিনি কুফার শাসনকর্তা আবু মুসা আশারীর নিকট যে ঐতিহাসিক ফরমান প্রেরণ করেন, সেটিতে বিচারকের অবশ্য পালনীয় মৌলিক নীতিসমূহ বিশদরূপে বিবৃত হয়েছে।

    ফরমানটির আক্ষরিক অনুবাদ এই :

    ‘আল্লাহ্‌র প্রশংসা কীর্তিত হোক। এখন, ন্যায়-বিচার একটি অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। তোমার উপস্থিতিতে, তোমার এজলাসে এবং তোমার রায়ে সকল মানুষকে সমান ব্যবহার দেখাবে, যাতে দুর্বল ন্যায়-বিচারে আস্থা না হারায় এবং সবল অনুগ্রহের আশা না রাখে। প্রমাণের ভার বাদীর উপর এবং অস্বীকৃতি যেন শপথ নিয়ে করা হয়। আপোষ করা যেতে পারে, কিন্তু তার দরুণ ন্যায়কে অন্যায় ও অন্যায়কে ন্যায় করা চলবে না। পুনর্বিবেচনায় তোমার সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করতে কোন বাধা যেন না জন্মে (যদি পূর্বসিদ্ধান্ত ভ্রান্ত হয়)। কোনও প্রশ্নে সংশয় দেখা দিলে এবং কোরান কিংবা মহানবীর সুন্নায় তার বিষয়ে কিছু না পাওয়া গেলে প্রশ্নটি পুনরায় চিন্তা করো। নজীর সমূহ ও অনুরূপ পূর্ব-মামলাগুলিও বিবেচনা করবে এবং তার পর উপমা-নির্ভর সিদ্ধান্তে উপস্থিত হবে। যে সাক্ষী উপস্থিত করতে চায়, তাকে শর্তাধীন হতে হবে। যদি সে দাবী প্রমাণ করে তবে তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত কর। অন্যথায় তার মামলা ডিসমিস হবে। সব মুসলিমই বিশ্বাসযোগ্য, কিন্তু তারা নয়, যারা বেত্রদণ্ড লাভ করেছে, কিংবা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে, কিংবা যাদের ওয়ারিসী সম্বন্ধে সংশয়কুল।’

    বিচারবিভাগের ন্যায়পরায়ণতা এবং বিচারে ন্যায় রক্ষা হয় তিনটি মৌলনীতিতে: আইনের নির্ভুলতা ও সর্বময়তা, যার দ্বারা বিচারকার্য করতে হয়; সাধু, নির্লোভ ও দক্ষ বিচারক নিয়োগে এবং কতকগুলি নিয়ম ও নীতির উপস্থিতি, যার দরুন বিচারকরা পক্ষপাতিত্ব দেখাতে না পারেন এবং উৎকোচ ও অন্যায় প্রভাবের শিকার না হন। তার সঙ্গে আরও একটি নিয়ম যোগ করা উচিত। বিচারকের সংখ্যা মামলা দায়েরের সংখ্যানুপাতিক হওয়া চাই, যাতে বিচারে অযথা বিলম্ব না হয়। ওমর এ-সব নিয়মের সুষ্ঠু ব্যবস্থা করেছিলেন। নতুন আইন প্রবর্তনের প্রয়োজন ছিল না, কারণ ইসলামী আইনের মৌল উৎসই হচ্ছে কোরআন। কোরআনে পরিচ্ছন্ন নির্দেশ কিংবা বিশদ তথ্য পাওয়া না গেলে সুন্না, ইজমা ও ক্বিয়াস হবে তার সহায়ক ও পরিপূরক। বিচারকদিগকে ওমর বারে বারে আইনের মৌল উৎসসমূহের দিকে লক্ষ্য রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন : মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে কোরআনের বিধিবিধান অনুযায়ী; যেখানে কোরআনের বিধান মিলবে না, কিংবা তা পরিচ্ছন্ন হয় না, সেক্ষেত্রে সুন্নার সাহায্য নেওয়া উচিত সুন্নাতেও যার বিধান মেলে না, তার নিষ্পত্তি করতে হবে মুসলিমের সর্ববাদিসম্মত মতভিত্তিতে। তাতেও অক্ষম হলে বিচারক নিজের জ্ঞান প্রয়োগ করবেন। ওমর কেবল ফরমান জারী করেই ক্ষান্ত হন নি, তিনি মাঝে মাঝে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সমাধান হিসেবে ফতোয়া বা মীমাংসা লিখে কাজীদের নিকট পাঠিয়ে দিতেন আদর্শ হিসেবে। তাঁর ফতোয়াসমূহ সংরক্ষিত হলে একটি আদর্শ ন্যায়সংহিতা পাওয়া যেতো; কিন্তু কালের করালগ্রাসে তাদের অনেকগুলিই হারিয়ে গেছে, কয়েকটি মাত্র পাওয়া যায় ‘আখবারুল-কুয়াত’ ‘কানযুল-উমমাল’ ও শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলবীর ‘ইযালাতুলখিফা’ নামক গ্ৰন্থসমূহে।

    কাজী নির্বাচনে ওমর কতোখানি সাবধানতা ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন, তার প্রমাণ এই যে, তাঁর নিয়োজিত কাজীরা সারা আরবের শ্রদ্ধেয় ও মর্যাদাসিক্ত ব্যক্তি ছিলেন। রাজধানী মদিনায় নিযুক্ত কাজী যিয়াদ-বিন্-সাবিত ছিলেন ওহী-প্রাপ্ত কোরআনের বাণীসমূহের বিশ্বনবী-নিযুক্ত লিপিকার, সিরীয় ও হিব্রুভাষায় সুপণ্ডিত এবং দায়বিষয়ক আইনে সারা আরবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বসরার কাজী কাব-বিন্-সুর-আল-আবদী ছিলেন মহাজ্ঞানী ও গভীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, তাঁর বহু রায় লিপিবদ্ধ করেছেন ইমাম-বিন-শিরিন। প্যালেস্টাইনের কাজী ইবাদা-বিন-সামাত বিশ্বনবীর জীবিতাবস্থায় প্রসিদ্ধ হাফিয-ই-কোরআন-পঞ্চকের অন্যতম ছিলেন এবং খোদ নবী-করিম (স.) তাঁকে আসহাবে সাফ্ফার শিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন। ওমর ইবাদাকে এতোখানি সম্মানের চোখে দেখতেন যে, আমির মুয়াবিয়ার সঙ্গে তাঁর মনান্তর হলে ওমর তাঁকে মু’আবিয়ার কর্তৃত্ব থেকে নিষ্কৃতি দেন। কুফার কাজী আবদুল্লাহ-বিন্-মসউদের পাণ্ডিত্য ও বিচার জ্ঞান ছিল সন্দেহাতীত। হানাফী আইনের জনক হিসেবে তিনি কীর্তিত। তাঁর স্থলাভিষিক্ত কাযী শুরায়হ্ সাহাবা না হয়েও সারা আরবে প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার জন্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন এবং মহাজ্ঞানী আলী তাঁকে আদ্-উল-আরব অর্থাৎ সারা আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায়াবীশ আখ্যা দিয়েছেন। এ-সব ছাড়া আরও বহু কীর্তিমান কাজীর নামোল্লেখ পাওয়া যায় সমকালীন সাহিত্যে, যাঁরা ওমরের খেলাফত আমলে কাজীর আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন।

    ওমর কাজী নিয়োগ করতেন স্বয়ং পরীক্ষা করে এবং ব্যক্তিগতভাবে তাঁর চরিত্র ও কাজের সঙ্গে পরিচিত হয়ে। কাজীরা প্রাদেশিক শাসকদের কর্তৃত্বাধীনে থাকতেন এবং শাসকদের কাজী নিয়োগের এখতিয়ারও ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে বিশেষ সাবধানতার হেতু ওমর কাজী নিয়োগের কাজটি নিজের হাতেই রাখতেন। এ বিষয়ে কারও সুপারিশ চলতো না। কাজী শুরায় নিয়োগ হয়েছিল এভাবে: ওমর একটি অশ্ব ক্রয় করেন এবং তার উপযোগিতা পরীক্ষা করতে জনৈক ব্যক্তিকে আদেশ দেন। সে লোকটি দৌড় দেওয়ার সময় ঘোড়াটিকে খোঁড়া করে ফেলে। তখন ওমর মালিককে ঘোড়াটি ফেরত দিতে চান, কিন্তু মালিক নিতে অস্বীকার করে। ওমর এ বিষয়ে মীমাংসার জন্যে শুরায়কে অনুরোধ করেন। শুরায়হ্ বলেন, যদি মালিকের অনুমতিক্রমে দৌড় দেওয়া হয়ে থাকে তা হলে সে ফেরত নিতে বাধ্য, অন্যথায় বাধ্য নয়। ওমর এ মীমাংসায় প্রীত হন এবং শুরায়হ্ কুফার কাজী নিযুক্ত হন। কাজীরা যাতে উৎকোচ কিংবা অন্যায় পুরস্কার নিতে প্রলুব্ধ না হন, তাঁর জন্যে তাঁদের অভাব মোচনার্থে উচ্চ বেতন দেওয়া হতো। সাধারণত কাজীদের বেতন ছিল মাসিক পাঁচশত দিরহাম। আরও নিয়ম ছিল যে স্বচ্ছল সদ্বংশজাত সাধু ব্যক্তি ব্যতীত কেউ কাজীর আসন অলঙ্কৃত করতে পারবেন না। কাজীরা ব্যক্তিগত ব্যবসা কিংবা স্থানীয় নাগরিকদের সঙ্গে ক্রয়-বিক্রয় বা বিনিময় করতে পারতেন না।

    আইনের চোখে ধনী-নির্ধন, উচ্চ-নীচ, রাজা-প্রজা ভেদাভেদ নেই-এ নীতিটি ওমর আক্ষরিকভাবে পালন করতেন। তিনি বহুবার আদালতে বাদী প্রতিবাদীরূপে উপস্থিত হয়ে এ নীতিটি উপস্থিত করেছেন। একবার উবাই নামক জনৈক ব্যক্তি ওমরের নামে যিয়াদ-বিন্-সাবিতের আদালতে একটি নালিশ রুযু করে। সাধারণ বিচারপ্রার্থীর মতো ওমর আদালতে উপস্থিত হলে যিয়াদ তাঁকে সম্মান দেখাতে চান। ওমর বিরক্ত হয়ে যিয়াদকে ভর্ৎসনা করেন, “এটি তোমার প্রথম বে-ইনসাফ” এবং বাদী উবাইয়ের পাশে আসন গ্রহণ করেন। ওমর দাবী অস্বীকার করেন। উবাইয়ের সাক্ষী না থাকায় প্রচলিত আইনানুযায়ী সে দাবী করে, “ওমর শপথ নিয়ে দাবীটি অস্বীকার করুন।” খোদ আমীরুল মুমেনীনকে শপথ নিতে সঙ্কোচ বোধ করে যিয়াদ উবাইকে দাবীটি তুলে নিতে অনুরোধ করেন। ওমর রাগান্বিত হয়ে বলেন, “যদি ওমর ও অন্য সাধারণ ব্যক্তি তোমার চোখে তুল্যমূল্য না হয়, তা হলে কাজীর আসনে বসা তোমার শোভা পায় না।”

    প্রত্যেক জেলায় অন্তত একজন কাজী নিযুক্ত থাকতেন। মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে অতিরিক্ত কাজী নিযুক্ত হতেন। অমুসলিমরা নিজেদের মধ্যেই বিবাদ মীমাংসা করে ফেলতে পারতো এবং কাজীর নিকট প্রায় ক্ষেত্রে হাজির হতো না। কিন্তু ওমরের এদিকে লক্ষ্য ছিল যে, বিচার ত্বরান্বিত হয়, ব্যয়সাধ্য না হয় ও প্রত্যেকের নিকট সহজলভ্য হয়। বাদীকে কোন ফি দিতে হতো না, মৌখিক নালিশ রুযু করা চলতো। নিজেই সাক্ষী হাজির করে পক্ষগণ নিজ নিজ দাবী প্রমাণ করতো। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ সাক্ষী কাজী নিজেই তলব করতেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একদা ওমরের নিকট জাবরকান নালিশ করেন, হাতীয়া একটি শ্লেষাত্মক কবিতা লিখে তাঁর সম্মানহানি করেছেন। কবিতাটির টেকনিক অভিনব থাকায় ওমর হাসান-বিন্-সাবিত নামক তৎকালীন মশহুর কবিকে আহ্বান করেন কবিতার প্রকৃত মর্ম ব্যক্ত করতে এবং তাঁর প্রদত্ত সাক্ষ্যানুসারে ওমর মামলাটির বিচার করেন। উত্তরাধিকার প্রশ্নে শারীরবিজ্ঞানীর বিশেষ সাক্ষ্য গ্রহণ করা হতো।

    ওমরের আর একটি কৃতিত্ব হচ্ছে ‘ইতা’ অর্থাৎ আইন উপদেষ্টার পদ প্রবর্তন। বিচারকর্মের অন্যতম মৌলনীতি হচ্ছে, প্রত্যেকেই আইন জানে, এ অনুমান গ্রহণীয় কেউ অপরাধমূলক কাজ করে এ রকম সাফাই নিতে পারে না, সে আইন জানে না। পৃথিবীর সকল সভ্য দেশে এ নিয়ম নিঃসন্দেহে সুপ্রতিষ্ঠিত যে, আইন জ্ঞাত নয়, এ সাফাই অচল। কিন্তু নীতি প্রতিষ্ঠিত হলেও এ পর্যন্ত কোনও সভ্যদেশে এমন কোনও অবস্থা অবলম্বিত হয় নি, যার দ্বারা জনসাধারণকে প্রচলিত আইনসমূহ সম্যক জ্ঞাত করা যায়। সাধারণ ব্যক্তি ব্যয়সাধ্য উকিলের পরামর্শ গ্রহণে বাধ্য হয়। ওমর আইন উপদেষ্টার পদ সৃষ্টি করে বিনা ব্যয়ে জনগণকে আইনের সাহায্য লাভের পথসুগম করে দেন। প্রত্যেক শহরে জনবহুল কেন্দ্রস্থলে একজন ফকীহ্ নিযুক্ত থাকতেন, তাঁর কর্তব্য ছিল বিনা পারিশ্রমিকে জনসাধারণকে আইনের সঠিক পরামর্শ দান করা। ফতোয়া দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। আলী, ওসমান, মুয়ায বিন্-জবল, আবদুর রহমান-বিন্‌-আউফ, উবাই-বিন্-ক্কব, যায়েদ-বিন্ সাবিত, আবু হোরায়রাহ্, আবু দর্দা প্রমুখের উপর এ-ভার ন্যস্ত ছিল। শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ ‘ইযালাতুলখিফা’য় বলেছেন : প্রথম যুগে ফতোয়া দেওয়ার অধিকার খলিফার অনুমতি সাপেক্ষ ছিল এবং তাঁর হুকুম ব্যতীত কেউ আইনের ব্যাখ্যা করতে বা ফতোয়া দেবার অধিকারী ছিল না। পরবর্তীকালে অবশ্য অনেকে খলিফার অনুমতি ব্যতীত ফতোয়া দিতেন। মুফতীদের কর্তব্য ছিল, ফতোয়া প্রকাশ্যে প্রচার করবেন। সেকালে সংবাদপত্র বা আধুনিক রেডিও-টেলিভিশনের ন্যায় প্রচারযন্ত্র ছিল না। এজন্যে মুফ্‌তীকে ফতোয়া প্রচার করতে হতো জনসমাবেশে। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখযোগ্য যে, সিরিয়ার সফরকালে ওমর জাবিয়ার জনসমাবেশে যখন বক্তৃতা করেন, তখন বলেছিলেন: কোরআন শরীফ লিখতে হলে উবাই-বিন্-ক্কাবের নিকট যাও, কর্তব্য কর্ম জানতে হলে যিয়াদের নিকট যাও, আর আইন জানতে হলে মুয়াযের নিকট যাও।

    যতদূর তথ্য মেলে, তা থেকে জানা যায় না যে, ওমর স্বতন্ত্র ফৌজদারী আদালত স্থাপন করেছিলেন। চুরি ও ব্যভিচারের অপরাধে কাজীই বিচার করতেন, বাকী সাধারণ অপরাধের বিচার পুলিশ-বিভাগের হাতেই ছিল। পুলিশ-বিভাগকে আহ’দাস’ বলা হতো এবং পুলিশ প্রধানের উপাধি ছিল সাহিবুল-আদাস। আবুহোরায়রাহ্ বাহ্রায়েনের সাবিহ-ই-আহ্দাস ছিলেন। ওজনের বাটখারা পরীক্ষা করা, পথিপার্শ্বের অন্যায়াধিকার করে বাস উত্তোলন বন্ধ করা, ভারবাহী জন্তুকে কষ্ট দেওয়া বন্ধ করা, প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ পানীয় বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করা প্রভৃতি কাজও আদিস্-বিভাগের আওতায় ছিল। ওমর যখন আবদুল্লাহ্-বিন-ওবাকে বাজার পরিদর্শকের কাজে নিয়োগ করেন, তখন জেলরক্ষার ভারও তাঁর উপর ন্যস্ত হয়। ওমরের পূর্বে আরবে কোনও জেলখানা ছিল না। ওমর সাফওয়ান বিন্-ওমাইয়ার বাসগৃহটি চার হাজার দিরহামে ক্রয় করে প্রথম জেল স্থাপন করেন। ক্রমে ক্রমে প্রত্যেক জেলায় জেলখানা স্থাপিত হয়। প্রথম দিকে ফৌজদারী আসামীদেরকে জেলে পাঠানো হতো, পর ডিক্রি খাতকদেরকেও কাজী সুরায় জেলে পাঠাতেন। জেলখানা স্থাপিত হয়ে দণ্ডাজ্ঞায় কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়। শাস্তির কঠোরতা হ্রাস পায়। যেমন মদ্যপানের শাস্তি ছিল বেত্রদণ্ড; কিন্তু মশহুর কবি ও কাদিসিয়ার যুদ্ধখ্যাত বীর আবু মাজান সাফি বারবার পানদোষের জন্য দণ্ডিত হতে থাকায় শেষে তাঁকে জেলে পাঠানো হয়। দ্বীপান্তর দণ্ডও ওমরের সময়ে প্রবর্তিত হয়। আবু মাইজানকে একবার একটি ক্ষুদ্র দ্বীপে চালান করা হয়েছিল।

  • জিম্মীদের অধিকার সংরক্ষণ ও দাসপ্রথা নিয়ন্ত্ৰণ

    জিম্মীদের অধিকার সংরক্ষণ ও দাসপ্রথা নিয়ন্ত্ৰণ

    জিম্মীদের অধিকার সংরক্ষণ ও দাসপ্রথা নিয়ন্ত্ৰণ

    বিজাতি, বিধর্মী ও বিদেশীর প্রতি বিরূপ মনোভাব মানুষের মজ্জাগত স্বভাব। ইসলাম-পূর্ব যুগে এ মনোভাব এতোখানি বিরুদ্ধ ছিল যে তাদের কোন স্বত্ত্বাধিকারই স্বীকৃত হতো না। ইসলাম যখন প্রচারিত হয়, প্রতিবেশী দুটি পরাক্রান্ত সাম্রাজ্য পূর্ব-রোমকে এবং পারস্যে বিজাতি ও বিধর্মীরা শুধু মানুষ নামই ধারণ করতো, তাদের কোন অধিকারই ছিল না এবং সাধারণ তৈজসপত্রের শামিল ধরা হতো। সিরিয়াবাসী খ্রিস্টানরা রোমক প্রভুদের সমধর্মী হয়েও জমিতে স্বত্বাধিকার লাভ করতো না, বরং ভূমিদাসে পরিণত হয়ে সম্পত্তি হস্তান্তরকালে শুধু প্রভু-বদলের ভাগ্য লাভ করতো। ইহুদীদের ভাগ্যও কিছুমাত্র ঈর্ষাজনক ছিল না। পারস্যেও খ্রিস্টান ও ইহুদীরা সমান পর্যায়ভুক্ত ছিল।

    ওমরের খেলাফতকালে এ-সব দেশবাসীর ভাগ্য পরিবর্তন ঘটে এবং মানুষের মর্যাদা-সিক্ত হয়ে তারা সাধারণ নাগরিকের সর্বাধিকার লাভ করে। বিজিত ও বিজেতা, স্বধর্মী ও বিধর্মী এবং স্বদেশী ও বিদেশীর ভেদ-রেখা লুপ্ত হয়। বিজিত দেশগুলির সঙ্গে ওমর যে সব সন্ধি করেছিলেন, সেগুলি থেকে আমাদের এ দাবী সমর্থন মিলে। বলা বাহুল্য, এ সব সন্ধিপত্রের শর্তাবলী এমনই একরূপ হতো যে পরবর্তীকালে প্রথম স্বাক্ষরিত সন্ধিপত্রের বরাত দিয়েই সে সব শর্ত অবিকৃতভাবে গৃহীত হতো। এরূপ আদর্শ-সন্ধি স্বাক্ষরিত হয় জেরুজালেমবাসীদের সঙ্গে এবং স্বয়ং ওমরের বয়ান মতে। সন্ধিপত্রটির আক্ষরিক অনুবাদ এইরূপ:

    এ আশ্রয়দান করছেন আল্লাহ্‌র বান্দা ওমর, আমীরুল মুমেনীন, আইলিয়ার সমস্ত অধিবাসীকে। এ আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে তাদের জানমালের, তাদের গীর্জা ও ক্রশসমূহের, তাদের আতুর ও স্বাস্থ্যবানদের এবং তাদের সমস্ত সমধর্মীর জন্য। তাদের গীর্জাসমূহ বাসগৃহরূপে ব্যবহৃত হবে না, সেগুলি ভূমিসাৎ করা হবে না, কিংবা তাদের কোন অংশের, আঙিনার বা ক্রশসমূহের কোনও ক্ষতি করা হবে না, কিংবা তাদের সম্পত্তিরও হানি করা হবে না। ধর্ম বিষয়ে তাদের উপর কোন জবরদস্তি করা হবে না, কিংবা ধর্মের কারণে কারও কোন ক্ষতি করা হবে না। ইহুদীদিগকে তাদের সঙ্গে আইলিয়াতে বাস করতে বাধ্য করা হবে না। আইলিয়ার অধিবাসীরা অন্যান্য শহরবাসীর মতো জিয়া আদায় দিতে ও রোমকদেরকে বহিষ্কার করতে অঙ্গীকার করছে। যেসব রোমক শহর ত্যাগ করবে তারা নিরাপদ স্থানে উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের ধনপ্রাণ নিরাপদ, কিন্তু কোন রোমক আইলিয়ার বাসিন্দা হতে ইচ্ছা করলে তার নিরাপত্তা রক্ষা করা হবে এবং সে জিয়া আদায় দিতে বাধ্য হবে। যদি আইলিয়ার কোনও অধিবাসী রোমকদের সহগামী হতে চায় ও সম্পত্তি সঙ্গে নিতে চায়, তাহলে সে তার গির্জা ও ক্রশ নিরাপদ স্থানে স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ। এতদ্বারা যা কিছু লিখিত হলো, সে-সব আল্লাহ্‌র দেওয়া অঙ্গীকারে ও তাঁর রসূলের খলিফাদের এবং মুসলিমদের দায়িত্ব দেওয়া গেল, যতক্ষণ তারা ধার্য জিয়া আদায় দেবে। এ দলীলে সাক্ষী রইলেন খালিদ-বিন্‌-অলিদ, আমর-বিন্-আস্, আব্দুর রহমান-বিন্-আউফ ও মুয়াবীয়া-বিন-আবু সুফিয়ান।

    লিখিত হয় ১৫ হিজরীতে।

    উপরোক্ত ফরমান থেকে ধ্রুব প্রত্যয় হবে, বিধর্মীদের ধন-প্রাণ কতোদূর নিরাপদ ছিল, ধর্মমত কতোখানি স্বাধীন ছিল, ধর্মস্থান ও ধর্মচিহ্ন পর্যন্ত কিভাবে মর্যাদার সঙ্গে রক্ষিত হতো। বস্তুত ধর্মবিশ্বাসে জিম্মীদের পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল। তাদের নিজস্ব ধর্মানুষ্ঠান প্রকাশ্যে পালন করার, ঘণ্টা বাজাবার, শোভাযাত্রা করে ক্রশ বহন করার ও ধর্মীয় মেলা বসাবার নিরঙ্কুশ অধিকার ছিল। আলেকজান্দ্রিয়ার যাজক বেন্‌জামিন্ তের বছর ধরে রোমক ভীতিতে দেশে দেশে আত্মগোপন করে ফিরেছেন। ২০ হিজরীতে আমর-বিন্ আস মিসর জয় করলে বেজমিন নির্ভয়ে প্রত্যাবর্তন করেন ও নিজের যাজকতায় অধিষ্ঠিত হন। প্রতিটি সন্ধিপত্রে ধর্মমতে স্বাধীনতা বিশেষভাবে স্বীকৃত হতো। হুদায়ফা কর্তৃক মাহদিনারবাসীদের সঙ্গে সন্ধিতে, জুরজান্ বিজয়ের পর অধিবাসীদের সঙ্গে সন্ধিতে, আজরবাইজন ও মুকানের সন্ধিপত্রে বিশেষ শর্ত ছিল : বানিন্দাদের ধন-প্রাণ এবং ধর্ম ও আইন নিরাপদ এবং কোন পরিবর্তন করা চলবে না। ওমরের ইসলামপ্রীতি ও ইসলাম প্রচারে উৎসাহ তুলনাহীন। কিন্তু তিনিও আপন গোলাম আস্তিকে বারবার খ্রিস্টান ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম হতে উপদেশ দিয়ে হার মেনেছেন ও কোরআনের বাণী উচ্চারণ করে শান্তি খুঁজেছেন : লা ইব্রাহা ফিদ্-দীন-ধর্মে বলপ্রয়োগ নেই। বিজেতা কর্তৃক বিজিতের প্রতি এতোখানি ন্যায়পরায়ণতা ও উদারতার দৃষ্টান্ত জগতেতিহাসে আর দ্বিতীয় নেই।

    জিম্মীদের ধন-প্রাণই শুধু নিরাপদ হয় নি, জিম্মীরা মুসলিমদের সমপর্যায়ের নাগরিক অধিকার লাভ করতো এবং অপরাধক্ষেত্রে কোন ভেদাভেদ করা হতো না। কোনও মুসলিম জিম্মীকে খুন করলে তাকে জীবন দিয়ে শাস্তি নিতে হতো। ইমাম শাফী বলেন, একবার বকর বিন্-ওয়াইল গোত্রের জনৈক ব্যক্তি একজন জিম্মী খ্রিস্টানকে হত্যা করে। ওমর বিচার করেন, খুনীকে মৃত ব্যক্তি ওয়ারীসানের হাতে অর্পণ করা হলে তাকেও হত্যা করা হয়। জিম্মীদের কাউকে জমি থেকে উৎখাত করা হয়নি। তাদের দেয় ভূমিকরের পরিমাণও ছিল সহনীয়। শাসন-বিষয়ে জিম্মীদেরও মতামত গ্রহণ করা হতো এবং তাদের কল্যাণার্থে ব্যবস্থা অবলম্বিত হতো। ইরাকের ভূমিকর ধার্যকরণের সময় স্থানীয় জোতদারদের মদীনায় ডেকে এনে পরামর্শ লওয়া হয়। মিসর-জয়ের পরও এ নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল। ধন-প্রাণ নিরাপত্তা বিধানের নির্দেশ কেবল কাগজেই লিপিবদ্ধ থাকে নি। সিরিয়ার জনৈক চাষীর ক্ষেত সেনাবাহিনী নষ্ট করে দিলে ওমর তাকে দশ হাজার দিরহাম ক্ষতিপূরণ দিয়েছিলেন। কাজী ইউসুফ বলেন, ওমর সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনকালে একস্থানে লক্ষ্য করেন, কয়েজনকে নির্যাতন করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেল, তারা জিয়া আদায় না দেওয়ায় শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। ওমর তখনই তাদেরকে নিষ্কৃতি দিতে আদেশ দিয়ে বলেন : আল্লাহ্‌র রসূল বলে গেছেন : ‘মানুষকে আঘাত করো না, যারা মানুষকে যাতনা দেয় রোজহাশরে তাদের যাতনা দেবেন স্বয়ং আল্লাহ্।

    মৃত্যুশয্যায় শায়িত খলিফা ওমর উত্তরাধিকারীকে উপদেশ দানকালেও বলে গেছেন : আমার উত্তরাধিকারীকেও এই ওসিয়ত রইলো, আল্লাহ্ ও তার রসূলের আশ্রয়ে যারা রয়েছে (অর্থাৎ জিম্মী) তাদের সঙ্গে অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালিত হবে। তাদেরকে আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে এবং তাদের উপর সাধ্যাতীত ভার কখনো চাপানো হবে না।

    তবু অভিযোগ থেকে যায় : ওমর জিম্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, মুসলিমদের পোশাক গ্রহণ না করতে, কোমরবন্ধ ও লম্বা টুপী পরতে, নতুন গীর্জা না তুলতে, মদ ও শূকরের মাংস বিক্রয় না করতে, ঘণ্টা না বাজাতে এবং শোভাযাত্রা করে ক্রশ বহন না করতে। তিনি আরও নির্দেশ দিয়েছিলেন বনী-তগলিব গোত্রকে তাদের সন্তানগণকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত না করতে। তিনি আরব থেকে ইহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে বিতাড়িত করে শুধু মুসলিমদের জন্যেই বাসভূমি নির্দিষ্ট করেছিলেন।

    সমকালীন ইতিহাস থেকে তথ্য মেলে, ওমর এ-সব নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু যে-সব কারণে ও ক্ষেত্রে এসব হুকুম দেওয়া হয়েছিল, সেগুলি বিরুদ্ধবাদীরা হয় ইচ্ছাপূর্বক বিকৃত করেছেন, না হয় গোপন করেছেন। তিনি খ্রিস্টান, ইহুদী ও পারসিকদেরকে নিজ নিজ জাতীয় পোশাক ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেমন দিয়েছিলেন মুসলিমদেরকে দিজের কওমী লেবাসে দেহাবৃত করতে। পারসিকদেরকে কোমরবন্ধ (যুন্নার বা মুর্তিকা বা কাতি) ব্যবহার করতে বলেন তাদের বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে। মুসলিম-প্রধান মহল্লাতে নতুন গীর্জা তোলা, মদ ও শূকর-মাংস প্রকাশ্যে বিক্রয় না করা, ঘণ্টা না বাজানো, শোভাযাত্রা ও বাদ্যাদিসহ ক্রশ বহন নিষিদ্ধ ছিল, ইহুদী বা খ্রিস্টান-প্রধান মহল্লায় এসব অবারিত ও প্রচলিত ছিল। বনি তগলিব গোত্রের যে-সব এতিম ও পরিত্যক্ত সন্তান ছিল, মুসলিম পিতামাতার, তাদেরকেই খ্রিস্টানধর্মে দীক্ষিত করা নিষিদ্ধ ছিল, খ্রিস্টান পিতামাতার সন্তানদের জন্য নয়। খায়বারের ইহুদীদের ও নাজরানের খ্রিস্টানদের মুসলিমবিদ্বেষ, স্বদেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে রোমকদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করার কাহিনী ইতিহাস-বিশ্রুত। বিশ্ব-নবীর সময় থেকে বারেবারে তারা মুসলিদেরকে হয়রান করেছে, আরবের নিরাপত্তা বিপন্ন করেছে। এ জন্যেই তাদের ইরাক ও সিরিয়ায় স্বধর্মীদের মধ্যেই বসবাস করবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এ-সব সুবিধা দান করার ফরমান দিয়ে : সিরিয়া ও ইরাকের যেখানে ইচ্ছা তারা বসবাস করতে পারবে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাদের বাসের জায়গা ও চাষের জমি দিতে বাধ্য থাকবে। স্থানীয় মুসলিমরা সব রকম সাহায্য দিয়ে তাদের পুনর্বাসন করবে। দুবছরের জন্যে তাদের জিয়া কর মাফ থাকবে।

    এবার বাকী থাকে জিয়া-করের কথা।

    ইসলামের গোড়া থেকেই পরিষ্কার ভাষায় বলা হয়, জিয়া প্রতিরক্ষার জন্যে নির্ধারিত কর, সামরিক কর্তব্য পালনের পরিবর্তে দেয়। ওমরের খেলাফতকালে এই কর ধার্যের তাৎপর্য আরও বিশদ করা হয়। প্রথমত পারস্য সম্রাট নওশেরওয়ার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে জিয়া বিভিন্ন হারে ধার্য হতো এবং পরিষ্কাররূপে জানানো হতো, নওশেরওয়ার প্রবর্তিত করভার নয়। তিনি আরও পরিষ্কার ঘোষণা করেন, যতক্ষণ প্রতিরক্ষা দায়িত্ব নিরাপদে প্রতিপালিত হবে, যতক্ষণ জিয়া আদায়যোগ্য। দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণীয় যে, ইয়ারমুকের যুদ্ধ-সঙ্কটকালে যখন সিরিয়ার প্রতিটি শহর থেকে মুসলিম বাহিনী উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং দামেষ্ক, হিস্‌ প্রভৃতি শহরের অধিবাসীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন তাদের নিকট থেকে আদায়কৃত সমস্ত জিয়া কর প্রত্যার্পিত হয়। আবার যখন অধিবাসীদের নিকট থেকে সামরিক সাহায্য গ্রহণ করা হতো, জিয়া মাফ হয়ে যেতো এবং একবার সাহায্য গৃহীত হলেই সারা বছরের কর থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া হতো। ১৭ হিজরীতে ওমর ইরাকের সিপাহসালারদের নির্দেশ দেন : অশ্বারোহী জিম্মী সেনাদের সাহায্য গ্রহণ করবে ও জিয়া মাফ করে দেবে। ২২ হিজরীতে আজরবাইজানের বিজিত নাগরিকদের সঙ্গে সন্ধিতে এই বিশেষ শর্ত আরোপিত হয় : যারা সেনাবাহিনীতে একবার কাজ করবে, তারা সারা বছরের জিয়া কর থেকে রেহাই পাবে। আরমেনিয়া ও শাহ্‌রবাজের নাগরিকদের সঙ্গে এই শর্ত ছিল : তারা প্রত্যেক সামরিক অভিযানে যোগ দিতে বাধ্য থাকবে ও শাসকের নির্দেশমতো চলবে এবং তাদেরকে জিয়া কর আদায় দিতে হবে না। জুরজান অধিকৃত হলে তাদের ফরমানে বলা হয় : আমরা তোমাদের নিরাপত্তা করতে বাধ্য এই শর্তে যে, তোমরা সাধ্যমত জিয়া আদায় দেবে, কিন্তু তোমাদের নিকট থেকে সামরিক সাহায্য গ্রহণ করা হলে জিয়া মওকুফ হবে।

    এ-সব ঘোষণা সন্ধিশর্ত ও বাস্তব অনুশীলন দ্বারা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত যে জিয়া প্রতিরক্ষা দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে আদায়যোগ্য ছিল এবং জিয়া আদায় করা হতো প্রত্যেক সমর্থ ব্যক্তির নিকট থেকে; অন্ধ খঞ্জ প্রভৃতি আতুর ব্যক্তি এ দায় থেকে রেহাই লাভ করতো জিয়া খাতে আদায়কৃত সমস্ত কর সৈন্যদের পোশাক, খোরাক প্রভৃতি সামরিক প্রয়োজনেই ব্যয়িত হতো। জিয়া নগদ অর্থে ও ফসলাদিতে আদায় দিতে হতো। মিসরে জনপ্রতি চার দীনার জিয়া ধার্য ছিল, অর্ধেক নগদ ও অর্ধেক গম, জলপাই তেল, মধু ও সির্কায় আদায় করা হতো। কিন্তু পরবর্তীকালে রসদ বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে সবটা করই নগদে আদায় করা হতো।

    ওমর দাস-প্রথা রহিত করেন নি এবং যুগের প্রভাব এমনই ছিল যে তাঁর পক্ষে এরূপ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে বিবিধ উপায়ে তিনি এ প্রথায় এমন বাধা সৃষ্টি করেছিলেন যার ফলে প্রথাটি নামমাত্রে পর্যবসিত হয়েছিল এবং দাসরা প্রভুর সমমর্যাদায় উন্নীত হয়েছিল। খেলাফতের ভার গ্রহণ করেই ওমর নির্দেশ দেন, যারা আবুবকরের আমলে অনুষ্ঠিত ধর্মত্যাগীদের সঙ্গে যুদ্ধে দাস হয়েছিল তারা স্বাধীন হবে। তিনি এই নিয়ম করেন, কোনও আরব দাস হতে পারে না। যদিও ইমাম আহমদ তাঁর সঙ্গে অমত হয়ে বলেছিলেন আমি ওমরের সঙ্গে একমত নই যে আরব দাস হতে পারে না-তবুও ওমরের এ অনুশাসন বাস্তাবে রূপায়িত হয়েছিল। আরবের অধিবাসীদের সম্বন্ধে ওমর এ নিয়ম প্রয়োগ না করেও বিজিত দেশসমূহে দাস-প্রথা অনেকখানি গর্ব করেছিলেন। ইরাক ও মিসর বৃহৎ দেশ এবং সেনাবাহিনীর জিদ সত্ত্বেও এ দুটি দেশের কোনও অধিবাসীকে দাস করা হয় নি। মিসরের কিছু অধিবাসীকে যুদ্ধে বিরুদ্ধতা করার দরুন দাস হিসাবে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে চালান করা হয়েছিল, কিন্তু ওমর তাদের প্রত্যেককে সংগ্রহ করে মিসরে ফেরত পাঠান ও শাসককে সাবধান করেন : তোমার উচিত কাজ হয় নি।

    বসরা, দামেশ্‌ক হিম্‌স্, হামাদ, আন্তিয়ক প্রভৃতি সিরিয়ার বহু শহরের খ্রিস্টান অধিবাসীরা প্রবল বিরুদ্ধতা করেছিল, কিন্তু তাদের কাউকে দাস করা হয় নি। ফারস্, খোজিস্তান, কিরমান, জাজিরা ও অন্যান্য স্থানের বাসিন্দাদের সঙ্গে বিশেষ শর্ত ছিল যে, তাদের কোনরূপ বিঘ্নিত হবে না। জুন্দিসাবুর, শিরাজ প্রভৃতি স্থানের বাসিন্দাদেরকে পরিষ্কার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে, তাদের কোন ব্যক্তিকে দাস করা যাবে না।

    ওমর আর একটি উত্তম নিয়ম করেন যে, কোনও দাসীর সন্তান হলে সে মুক্তিপ্রাপ্ত হবে। ওমর আরও নির্দেশ দেন ‘মকাতবা’ পদ্ধতিতে দাসগণ মুক্তিলাভের অধিকারী হবে। এটা একটা চুক্তি-যদি কোনও দাস নির্দিষ্ট সময় মধ্যে চুক্তিকৃত মুক্তিপণ আদায় দেয় না তা হলে সে মুক্তি পাবে। কোরআনে একটি বাণী আছে : যদি তারা ভালো হয়, তাদের সঙ্গে চুক্তি কর। ওমর এ থেকেই এরূপ চুক্তি বিধিবদ্ধ করেন। সহীহ্ বুখারীতে উক্তি আছে : সিরিন নামক আনাসের দাস এরূপ চুক্তির প্রস্তাব করলে আনাস অস্বীকার করেন। তখন সিরিন খলিফার নিকট অভিযোগ করে। ওমর আনাসকে বেত্রঘাত করে কোরআনের বিধান পালন করতে নির্দেশ দেন যে, দাসগণকে অতি নিকট আত্মীয় থেকে পৃথক করা চলবে না। অর্থাৎ, স্বামী-স্ত্রীকে, দুই ভাইকে, মাতা-সন্তানকে পৃথক করা বা দাসত্বে রাখা যাবে না।

    ওমর দাসগণের প্রতি যে সহৃদয় ব্যবহার করতেন, তার তুলনা হয় না। বদরের ও অন্যান্য যুদ্ধকালে যারা অংশগ্রহণ করেছিল, তাদেরকে বৃত্তিদানকালে তিনি দাস ও প্রভুকে সমান হারে বৃত্তি দিয়েছিলেন। তিনি প্রাদেশিক শাসকদের নিকট থেকে রিপোর্ট চাইতেন, দাসদের প্রতি সুনজর রাখা হয় কি-না। ওমর নিজে দাসদের সঙ্গে একাসনে বসেছেন, যারা দাসের সঙ্গে আহারে বসতে লজ্জাবোধ করে, তাদের উপর আল্লাহ্ অভিশাপ হোক। একবার একজন দাস নগরবাসীদের নিরাপত্তা দান করেছিল, ওমর এ-প্রতিশ্রুতি মুসলিমের উপর বাধ্যকররূপে গ্রহণ করেছিলেন।

    দাসগণের প্রতি এমন মহৎ ব্যবহারের ফলে তাদের মধ্যে বহু প্রতিভার উন্মেষ হয়েছে, বহু মনীষীর সাক্ষাৎ মেলে। হাদীসের অন্যতম ইমাম ও ফকীহ্ ইকরামা ইমাম মালেকের ওস্তাদ ও হাদিস সাহিত্যের সোনালী শৃঙ্খলরূপে সম্মানিত নাফী দাস ছিলেন এবং ওমরের যুগে প্রখ্যাত হয়েছিলেন। ইবনে খাল্লিকান বলেন, মদীনাবাসীরা দাসী ও তাঁর সন্তানকে অবজ্ঞার চোখে দেখতো, কিন্তু আবুবকরের পৌত্র কাসিম, ওমরের পৌত্র সলিম ও ইমাম জয়নুল আবেদীন দাসীপুত্র হয়েও শিক্ষায় ও চরিত্রবলে শীর্ষস্থানে উঠেছিলেন তখন থেকেই মদীনাবাসীরা দাসদের সঙ্গে সহৃদয় ব্যবহার ও সম্মান করতে শেখে।