Author: তাহের আলমাহদী

  • পতন

    পতন

    পতন

    সন্ধে প্রায় ঘনিয়ে এসেছে, এমন সময় দূরে একটা নৌকো নজরে এল পিয়ার। শুরুতে একেবারে বিন্দুর মতো দেখা যাচ্ছিল নৌকোটাকে–দিগন্তের কাছে অনেকগুলি নদীর মোহনায় যেন স্থির একটা কালো দাগ। খানিক বাদে দাগটা একটু বড় হতে বোঝা গেল সেটা একটা ছইওয়ালা ছোট্ট মাছধরা ডিঙি। দুরবিন চোখে লাগিয়ে একজনই মাত্র জেলেকে দেখতে পাচ্ছিল পিয়া। নৌকোর ওপর সোজা দাঁড়িয়ে লোকটা একটা জাল ছুঁড়ে দিচ্ছে, একটু পরে আবার নিচু হয়ে টেনে টেনে তুলছে।

    তিন ঘণ্টা হয়ে গেল লঞ্চের সামনের দিকটায় ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে পিয়া। দূরবিনটা একবারও নামায়নি চোখ থেকে, জলের দিকে চেয়ে অপেক্ষা করেছে যদি একটা শুশুক কোথাও দেখা যায়। তবে লাভ কিছু হয়নি এখনও পর্যন্ত। একবার মুহূর্তের জন্য একটু আশা জেগেছিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত দেখা গেল জল থেকে যেটা লাফিয়ে উঠেছে সেটা আসলে একটা শংকর মাছ। শূন্যের মধ্যে লেজওয়ালা প্রাণীটাকে মনে হচ্ছিল যেন একটা উড়ন্ত ঘুড়ি। তার মিনিট দুয়েক পরেই হঠাৎ ভীষণ উত্তেজিত হয়ে ওপরে দৌড়ে এল মেজদা। ওর প্রপেলারের মতো হাত-পা নাড়া দেখে পিয়ার মনে হল নিশ্চয়ই শুশুক-টুশুক কিছু একটা দেখতে পেয়েছে। কিন্তু এবারেও ব্যর্থ আশা। পাড়ে শুয়ে রোদ পোয়ানো কয়েকটা কুমির দেখানোর জন্যে দৌড়ে এসেছে মেজদা। তবে ওর উৎসাহের কারণটা বোঝা গেল এর পর। ডান হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুলে ইশারা করে ও জানাল এই গুরুদায়িত্ব সম্পাদনের জন্যে কিছু বকশিস লাগবে। খুব রাগ হল পিয়ার। বিরক্ত একটা ভঙ্গি করে ও বুঝিয়ে দিল বকশিস-টকশিস কিছু হবে না।

    মেজদা দেখানোর অনেক আগেই কুমিরগুলো নজরে এসেছিল পিয়ার। দূরবিন দিয়ে বেশ কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেই ওদের দেখতে পেয়েছিল ও। দানবের মতো বিশাল চারখানা সরীসৃপ, সবচেয়ে বড়টা লম্বায় প্রায় এই লঞ্চটার সমান। এগুলির একটার মুখোমুখি পড়লে কী যে হবে ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল পিয়ার।

    কুমির আর শংকরমাছ ছাড়া এই তিন ঘণ্টায় আর কিছুই চোখে পড়ল না। কিছু যে দেখা যাবেই ঠিক সেরকম যে আশা করেছিল পিয়া তা নয়, তবে সারা দুপুরটা এইরকম নিষ্ফলা যাবে তাও ভাবেনি। এই অঞ্চলের নদীতে একসময় যে প্রচুর শুশুক ছিল সে বিষয়ে তো কোনও সন্দেহ নেই। ঊনবিংশ শতকের অনেক প্রাণিবিজ্ঞানীই এদের বিষয়ে লিখে গেছেন। গ্যাঞ্জেটিক ডলফিনের আবিষ্কর্তা’ উইলিয়াম রক্সবার্গের লেখায় রয়েছে, মিষ্টিজলের শুশুকরা “কলকাতার দক্ষিণ এবং দক্ষিণপূর্বের নদী-খাড়িগুলিতে থাকতে পছন্দ করে”। অথচ এই অঞ্চলটাতেই এতক্ষণ ঘোরাঘুরি করেও কিছুই চোখে পড়ল না। পিয়া ভেবেছিল পথে কোনও পোড়-খাওয়া জেলের সঙ্গে দেখা হলেও কিছু খোঁজখবর হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু সেরকম জেলে নৌকোও খুব বেশি নজরে পড়েনি আজ সারাদিনে। ভিড়ে ঠাসা খেয়া

    নৌকো আর স্টিমার দেখা গেছে বেশ কয়েকটা, তবে জেলে নৌকো এতই কম চোখে পড়েছে যে একেক সময় মনে হয়েছে হয়তো এই অঞ্চলে মাছ ধরা নিষেধ। এই জেলে ডিঙিটা তো, দেখা গেল বেশ অনেকক্ষণ পর। ওরা মনে হয় নৌকোটার কয়েকশো মিটার মাত্র দূর দিয়ে যাবে। লঞ্চটা একটু ঘুরিয়ে ওটার কাছাকাছি নিয়ে যেতে বলবে কিনা ভাবছিল পিয়া।

    বেল্ট থেকে রেঞ্জফাইন্ডারটা খুলে হাতে নিল ও। খানিকটা দূরবিনের মতো দেখতে যন্ত্রটার একদিকে দুটো আইপিস, আর অন্যদিকে একটা সাইক্লোপিয়ান লেন্স। ডিঙিটার দিকে ফোকাস করে একটা বোতাম টিপল, কয়েক মুহূর্ত পরেই বিপ করে একটা আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে নৌকো আর লঞ্চের মধ্যের দূরত্বটা ভেসে উঠল যন্ত্রের পর্দায়–১.১ কিলোমিটার।

    ডিঙির ওপর মাছ ধরতে ব্যস্ত লোকটাকে এতদূর থেকে খুব একটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু ও যে পাকা জেলে সেটা দিব্যি বোঝা যাচ্ছিল। থুতনি আর গালে সাদা ছোপ ছোপ দুরবিন দিয়ে দেখে মনে হল খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি। মাথায় পাগড়ি মতো কিছু একটা জড়ানো, কিন্তু সারা গা খালি; শুধু কোমরে একটুকরো কাপড় মালকেঁচার মতো করে বাঁধা। শরীরটা কঙ্কালসার ক্ষয়টে মতো, নোনা হাওয়া আর রোদ্দুরে যেন দেহের সব চর্বি-মাংস খেয়ে গেছে–সারাজীবন জলে জলে কাটালে যেমন হয়। অন্য অনেক নদীতে এরকম জেলেদের দেখেছে পিয়া, এদের কাছ থেকেই বেশিরভাগ সময় ভাল খোঁজখবর পাওয়া যায়। ও ঠিক করল একটু ঘুরে গিয়ে লোকটাকে একবার ওর ফ্ল্যাশকার্ডগুলো দেখিয়ে নেবে। যদি কিছু লাভ হয়।

    এর আগেও দু’বার পিয়া মেজদাকে এদিকে-সেদিকে লঞ্চ ঘোরাতে বলেছিল, কিন্তু ওই কুমিরের ব্যাপারটার পর থেকে কীরকম একটু তিরিক্ষি হয়ে আছে লোকটা। আর বিশেষ পাত্তা-টাত্তা দিচ্ছে না ওকে। কিন্তু এবারে পিয়া ঠিক করেছে যে-কোনও ভাবেই হোক লঞ্চটাকে নিয়ে যাবে ওই নৌকোর কাছে।

    কাঁচ-লাগানো সারেংএর ঘরটার মধ্যে পাশাপাশি বসেছিল মেজদা আর গার্ড–মেজদার হাতে স্টিয়ারিং। লঞ্চের সামনের দিকটা থেকে সরে এসে ওদের দিকে এগোল পিয়া। ওকে দেখেই চট করে চোখটা নামিয়ে নিল মেজদা। ওর চোর চোর ভাবটা দেখে পরিষ্কার বোঝা গেল ওকে নিয়েই ওরা আলোচনা করছিল এতক্ষণ।

    একটা ফ্ল্যাশকার্ড বার করে সারেং-এর ঘরের সামনে এসে মেজদার ঠিক মুখোমুখি দাঁড়াল পিয়া। কাঁচের ওপর একটা হাত রেখে বলল, “স্টপ!” ওর আঙুল বরাবর তাকাতেই দূরের ডিঙি নৌকোটার দিকে নজর পড়ল মেজদার; ডিঙিটাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এখন। “ওই দিকে চলুন–ওই নৌকোটার দিকে। এই ছবিটা ও চিনতে পারে কিনা দেখব,” হাতের কার্ডটা তুলে দেখাল পিয়া।

    সঙ্গে সঙ্গে দড়াম করে খুলে গেল সারেং-এর ঘরের দরজাটা, আর খাকি প্যান্টটা টেনে তুলতে তুলতে বাইরে বেরিয়ে এল ফরেস্ট গার্ড। ডেকের সামনের দিকে লঞ্চের একেবারে কিনারায় গিয়ে দাঁড়াল লোকটা, এক হাতে রোদ্দুর আড়াল করে ঝুঁকে পড়ে ডিঙিটার দিকে তাকিয়ে রইল। দেখতে দেখতে ভুরু কুঁচকে উঠল গার্ডের, বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল সারেংকে। দু’জনে কী বলাবলি করল খানিকক্ষণ, তারপরে মাথা নেড়ে তাড়াতাড়ি স্টিয়ারিং ঘোরাল মেজদা। আস্তে আস্তে লঞ্চের মুখ ঘুরতে লাগল ডিঙিটার দিকে।

    “গুড,” খুশি হল পিয়া। কিন্তু গার্ডটা কোনও পাত্তাই দিল না ওকে। তার সমস্ত মনোযোগ এখন ওই নৌকোটার দিকে। লোকটার হাবভাবের একাগ্রতা দেখে একটু আশ্চর্য হল পিয়া। কেমন একটা হিংস্র ভাব ওর চোখেমুখে। দেখে একটুও মনে হল না যে স্রেফ পিয়ার কথা রাখার জন্যই নৌকোটার দিকে যাচ্ছে ওরা।

    ডিঙির জেলেটা তখন আরেকবার জাল ফেলার জন্য তৈরি হচ্ছে। নৌকো একই জায়গায় স্থির, একটু একটু করে আকারে বড় হয়ে উঠছে। এখনও এক কিলোমিটারের বেশি দূরে রয়েছে ডিঙিটা।

    লঞ্চের মুখ ঘোরার পর একবারও ওটার দিক থেকে দূরবিন সরায়নি পিয়া। জেলেটা এতক্ষণ খেয়াল করেনি ওদের, কিন্তু লঞ্চের দিক বদলানোর সঙ্গে সঙ্গেই মনে হল টের পেল ও, সতর্ক হয়ে বন্ধ করল জাল ফেলা। ঘুরে তাকাল ওদের দিকে, চোখেমুখে ভয়ের ছাপ। দূরবিন দিয়ে ওর চোখদুটো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল পিয়া। পাশের দিকে মুখ ফেরাল লোকটা, ঠোঁটদুটো নড়ে উঠল, মনে হল কাউকে কিছু বলছে। পাশে ফোকাস করে পিয়া দেখল ও একা নয়, আরও একজন আছে ডিঙিটাতে। একটা বাচ্চা ছেলে, হয়তো নাতি বা ভাইপো-ভাগনে কেউ হবে। ডিঙির আগায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে বাচ্চাটা। পিয়ার মনে হল ও-ই লঞ্চটা দেখতে পেয়ে লোকটাকে বলেছে। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে এখনও লঞ্চটারই দিকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে ছেলেটা।

    দুজনেই ওরা খুব ভয় পেয়েছে মনে হল। লোকটা তাড়াতাড়ি ভেতর থেকে একজোড়া বৈঠা বের করে ঊর্ধ্বশ্বাসে নৌকো বাইতে শুরু করল, আর ছেলেটা দৌড়ে ডিঙির পেছন দিকে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল ছইয়ের আড়ালে। মিটার পঞ্চাশেক দূরের সরু একটা খাঁড়ির মুখের দিকে এখন সোজা এগোচ্ছে নৌকোটা। ভরা জোয়ারের সময় খাঁড়ির দু’ ধারের ঘন জঙ্গল অর্ধেক ডুবে আছে জলে, আর একবার যদি সে বনের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে পারে, কোনও লঞ্চের সাধ্য হবে না ওই খুদে ডিঙিকে খুঁজে বের করে। জল এখন বেশ গভীর, নৌকোটা খুব সহজেই জঙ্গলের আড়ালে আড়ালে পালাতে পারবে।

    ব্যাপারটা বেশ একটু অদ্ভুত লাগল পিয়ার। ইরাবড়ি বা মেকং-এ ও অনেক সময় দেখেছে যে জেলেদের সাথে কথা বলতে গেলে তারা অচেনা লোক বা সরকারি লোকেদের দেখে ভয় পেয়েছে, কিন্তু কোনও জেলেই কখনও ডিঙি নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেনি।

    ডানদিকে মুখ ফিরিয়ে পিয়া দেখল লঞ্চের সামনের দিকে দাঁড়িয়ে আছে ফরেস্ট গার্ড–কাঁধে রাইফেল। পিয়া যখন একদৃষ্টে নৌকোটার দিকে দেখছিল সেই সময়ে ভেতরে গিয়ে বন্দুকটা নিয়ে এসেছে ও। এতক্ষণে বোঝা গেল কেন পালাচ্ছে ডিঙিটা। পিয়া গার্ডের দিকে ফিরল। আঙুল দিয়ে বন্দুকটাতে খোঁচা মেরে বলল, “এটা কেন এনেছেন? কী করবেন রাইফেল দিয়ে? যান, রেখে আসুন ওটা।” ঝটকা মেরে পিয়ার হাতটা সরিয়ে দিয়ে লোকটা মেজদাকে চেঁচিয়ে কী একটা বলল। সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনের ধকধকানি বেড়ে গেল, আর তিরবেগে লঞ্চটা এগিয়ে চলল নৌকোর দিকে।

    পিয়া বুঝতে পারল ওর নিজেরই শুরু করা ঘটনাক্রম এখন আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে। কী যে হচ্ছে, সেটাই ভাল করে মাথায় ঢুকছিল না। এক হতে পারে এটা নিষিদ্ধ এলাকা আর ওই জেলে বেআইনিভাবে মাছ ধরছিল, তাই ফরেস্ট গার্ড ওকে তাড়া করেছে। তাই যদি হয় তা হলে যে-কোনও ভাবেই হোক এই ইঁদুর-বেড়াল খেলাটা এক্ষুনি বন্ধ করতে হবে। কারণ একবার যদি খবর রটে যায় যে ও স্থানীয় লোকেদের পেছনে লেগেছে, সার্ভের কাজের একেবারে বারোটা বেজে যাবে।

    সারেং-এর ঘরের দিকে ফিরে ও মেজদাকে বলল, “লঞ্চ থামান, আর যেতে হবে না। থামুন বলছি।” কথাটা শেষ করে কেবিনটার দিকে এগোতে গিয়েই শুনল ফরেস্ট গার্ড চিৎকার করে নৌকোর জেলেটাকে ধমকাচ্ছে। ওদিকে চেয়ে দেখল রাইফেলটা কাঁধের কাছে তুলে ধরে ডিঙির দিকে তাক করছে লোকটা, মনে হল যে-কোনও সময়ে গুলি চালিয়ে দেবে।

    মাথায় রক্ত উঠে গেল পিয়ার। “ভেবেছেনটা কী আপনারা? যা ইচ্ছে তাই করবেন নাকি?” দৌড়ে গিয়ে একহাত দিয়ে গার্ডের কনুই ধরে আরেক হাতে বন্দুকের নলটা অন্যদিকে ঠেলে দিতে চেষ্টা করল ও। কিন্তু লোকটা অনেক বেশি ক্ষিপ্র। কিছু বোঝার আগেই ওকে কনুই দিয়ে প্রচণ্ড একটা গুতো মারল কাঁধের হাড়টার কাছে। ছিটকে পড়ল পিয়া ডেকের ওপর, হাত থেকে ডিসপ্লে কার্ডটা উড়ে গিয়ে পড়ল খানিকটা দূরে।

    ডিঙির লোকটা ওদিকে দাঁড় টানা থামিয়ে দিয়েছে। মেজদাও লঞ্চের ইঞ্জিন বন্ধ করল। হঠাৎ করে যেন চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে নৌকোর পাশে গিয়ে স্থির হল লঞ্চটা। চেঁচিয়ে কিছু একটা বলে গার্ড ডিঙিটার ওপর একটা দড়ি ছুঁড়ে দিল। দড়িটা ধরে নিয়ে নৌকোর সঙ্গে বেঁধে দিল জেলেটা। পিয়া দেখতে পেল ছইয়ের আড়ালের আবছা অন্ধকার থেকে জুলজুল করে তাকিয়ে রয়েছে বাচ্চাটা।

    গার্ডের ধমক খেয়ে বিড়বিড় করে কী যেন একটা বলল নৌকোর লোকটা। জবাবটা মনোমতো হয়েছে মনে হল, কারণ মেজদার দিকে ফিরে একটা আত্মতৃপ্তির হাসি হাসল গার্ড। তারপর খানিক গুজগুজ করে কী সব বলাবলি করল দু’জনে, শেষে পিয়ার সামনে এসে ফরেস্ট গার্ড খানিকটা অভিযোগের সুরে বলল, “পোচার”।

    “কী?” একেবারে হাঁ হয়ে গেল পিয়া। বলে কী লোকটা? এ তো রাতকে দিন করে দিতে পারে! মাথা নেড়ে ও বলল, “হতেই পারে না। ও স্রেফ মাছ ধরছিল।”

    “পোচার”, গার্ড তার বক্তব্যে অনড়। রাইফেল দিয়ে জেলেটার দিকে দেখিয়ে আবার বলল, “পোচার”।

    কী ঘটেছে এতক্ষণে বুঝতে পারছিল পিয়া। এই লোকটা নিশ্চয়ই নিষিদ্ধ এলাকায় মাছ ধরছিল; এমন একটা জায়গাও তাই বেছে নিয়েছিল দরকার হলে যেখান থেকে খুব সহজেই পালানো যেতে পারে। পিয়াদের লঞ্চটাকে ও মনে হয় ভেবেছিল সাধারণ টুরিস্ট লঞ্চ, তার মধ্যে যে একজন সশস্ত্র ফরেস্ট গার্ড থাকতে পারে সেটা বুঝতে পারেনি। এখন বাঁচতে হলে ওকে হয় ফাইন দিতে হবে, নয়তো ঘুষ দিতে হবে।

    ক্লান্ত চেহারার লোকটা দাঁড়ে ভর দিয়ে খাড়া দাঁড়িয়েছিল নৌকোর ওপর। কাছ থেকে ওকে দেখে চমকে গেল পিয়া। দুরবিন দিয়ে দেখে যেরকম মনে হয়েছিল লোকটা আদৌ সেরকম সাদা দাড়িওয়ালা বুড়ো নয়। বয়সে ওর কাছাকাছিই হবে, খুব বেশি হলে সাতাশ-আটাশ। শরীরের কাঠামোটাও মোটেই ক্ষয়টে ধরনের নয়, শুধু একটু বেশি রোগা। লম্বা লম্বা হাত-পাগুলোতে এতটুকু চর্বি বা বাড়তি মাংসের চিহ্ন নেই, হাড়ের ওপর দড়ির মতো পাকিয়ে পাকিয়ে আছে পেশিগুলো। দূর থেকে যেগুলোকে দেখে পিয়া পাকা দাড়ি ভেবেছিল, সেই সাদা সাদা কুচিগুলো আসলে শুকনো নুনের গুঁড়ো–সারাদিন নোনা জলের ওপর কাটানোর ফল। লোকটার মুখটা সরু তিনকোনা মতো, আর এত ভীষণ রোগা যে তার ওপর চোখগুলোকে বিশাল বড় বড় মনে হচ্ছে। হতদরিদ্র চেহারাটা আরও ফুটে বেরোচ্ছে কোমরে জড়ানো আধময়লা ত্যানাটার জন্য। তবু ওর এই আপাত প্রতিরোধহীন হাড়-বেরোনো চেহারার মধ্যেও কোথাও একটা বিদ্রোহের ভাব রয়েছে মনে হল পিয়ার। একটু সতর্ক চোখে গার্ডের দিকে তাকিয়ে দেখছে লোকটা, যেন কত টাকা খোয়াতে হবে সেটা আঁচ করার চেষ্টা করছে। অন্তত এক সপ্তাহের রোজগার তো হবেই, মনে মনে ভাবল পিয়া; এক মাসেরও হতে পারে।

    লঞ্চের ডেকের ওপর থেকে ডিসপ্লে কার্ডটা তুলে নিল ফরেস্ট গার্ড–মনে হল যেন পিয়ার এখানে কী কর্তব্য সেটা খেয়াল করিয়ে দিতে চায় ওকে। শিকার জালে পড়ে গেছে, তাই ওর ভাবভঙ্গিতে আর ব্যস্ততার চিহ্নমাত্র নেই। ধীরেসুস্থে কার্ডটা পিয়ার হাতে দিয়ে নৌকোর দিকে ইশারা করল জেলেটাকে একবার দেখিয়ে নেওয়ার জন্য।

    লোকটা ওকে ওর কাজ চালিয়ে যেতে বলছে, যেন কিছুই ঘটেনি! ব্যাপারটা বিশ্বাসই করতে পারছিল না পিয়া। মাথা নেড়ে হাত সরিয়ে নিল ও। কিন্তু নিরস্ত না হয়ে আবার কার্ডটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিল গার্ড। ওর হাতের সঙ্গে সঙ্গে এবার বন্দুকটাও মনে হল এগিয়ে এল, যেন গুঁতিয়ে ওকে পাঠাবে জেলেটার দিকে। “ঠিক আছে তা হলে,” কাঁধ আঁকাল পিয়া। কোমর থেকে যন্ত্রপাতির বেল্টটা খুলে নিল ও, তারপর দূরবিন-টুরবিন সুদ্ধ ওটাকে ঠেসে ঢোকাল পিঠব্যাগটার মধ্যে। ডিসপ্লে কার্ডটা তুলে নিয়ে লঞ্চের মুখের দিকে এগিয়ে গেল। পিয়ার ঠিক নীচে এখন নৌকোটা, লঞ্চের একেবারে গায়ের কাছে দড়ি দিয়ে বাঁধা। জেলেটার মুখটা ঠিক ওর হাঁটুর সামনে।

    হঠাৎ মুখের সামনে পিয়াকে দেখে যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠল লোকটা। এতক্ষণ আসলে ওর সমস্ত মনোযোগটাই ছিল গার্ডের দিকে, লঞ্চে যে কোনও মহিলা থাকতে পারে সেটা ভাবতেই পারেনি। এখন পিয়াকে দেখতে পেয়ে হঠাৎই ও আত্মসচেতন হয়ে উঠল। মাথায় যে কাপড়ের টুকরোটা জড়ানো ছিল এক টান মেরে নামিয়ে আনল সেটাকে। গোটানো কাপড়টা খুলে গিয়ে পর্দার মতো গায়ের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। কোমরের কাছে একটা গিট মেরে বেঁধে দেওয়ার পর পিয়া বুঝতে পারল এতক্ষণ যে পাকানো কাপড়টাকে ও পাগড়ি বলে ভাবছিল সেটা আসলে লুঙ্গি। লোকটার বিবেচনা আছে দেখা যাচ্ছে। আর ওর উপস্থিতিকে স্বীকৃতি দেওয়ার ভাবটাতেও মনে মনে খানিকটা স্বস্তি পেল পিয়া। মনে হল লঞ্চে ওঠার পর থেকে এতক্ষণে এই প্রথম ও একজন স্বাভাবিক মানুষের কাছাকাছি এল। তবে এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতেও কিন্তু ওর মাথার মধ্যে একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে–কখন জেলেটাকে দেখাবে ফ্ল্যাশকার্ডটা।

    এক হাঁটু ভাঁজ করে পায়ের ওপর ভর দিয়ে নিচু হয়ে জেলেটার মুখোমুখি বসল পিয়া। দু’জনের মাথা এক উচ্চতায় আসার পর কার্ডটা ওর সামনে ধরল। একটু হাসারও চেষ্টা করল ওকে আশ্বস্ত করার জন্য, কিন্তু কিছুতেই ওর চোখের দিকে তাকাল না লোকটা। তবে ছবিগুলোর দিকে নজর পড়তেই হাত তুলে ও নদীর উজানের দিকে একটা জায়গা দেখিয়ে দিল। এত দ্রুত আর দ্বিধাহীন প্রতিক্রিয়া দেখে পিয়ার একবার মনে হল লোকটা বোধহয় বুঝতে পারেনি ও কী জানতে চাইছে। ব্যাপারটা বোঝার জন্য সরাসরি চোখে চোখে তাকাতেই মাথা নাড়ল ও, যেন বলতে চায়, হ্যাঁ, ঠিক ওই জায়গাতেই এরকম শুশুক দেখেছি আমি। কিন্তু কোন ধরনের শুশুক ও দেখেছে সেটা ঠিক বোঝা গেল না। আবার কার্ডটা এগিয়ে দিল পিয়া, মনে মনে ভাবল নিশ্চয়ই গ্যাঞ্জেটিক ডলফিনের ছবিটার দিকে দেখাবে ও। কারণ এই প্রজাতির শুশুকই বেশি দেখা যায়। কিন্তু আশ্চর্য, লোকটা ইশারা করল অন্য ছবিটার দিকে। মানে ও ইরাবড্ডি ডলফিন দেখেছে এই নদীতে? ওর্কায়েলা ব্রেভিরোসি? এবার মুখ খুলল লোকটা। বাংলায় কী একটা বলে দু’হাতের ছ’টা আঙুল তুলে দেখাল।

    “ছ’টা?” পিয়া উত্তেজনা চেপে রাখতে পারছিল না। “তুমি ঠিক দেখেছ?”

    হঠাৎ একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজে ওর কথা থেমে গেল। তাকিয়ে দেখল ওদের কথাবার্তার সুযোগ নিয়ে কখন নৌকোটায় নেমে গেছে ফরেস্ট গার্ড। ছইয়ের ভেতর রাখা পোঁটলা-পুঁটলিগুলো হাতের রাইফেলটা নিয়ে নেড়ে-চেড়ে দেখছে। বাচ্চাটা এক কোনায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে, হাত দুটো বুকের কাছে মুঠো করে ধরা। আচমকা যেন ছোঁ মেরে ওকে টেনে তুলল গার্ড। জোর করে আলগা করল মুঠি। দেখা গেল সামান্য কয়েকটা টাকা ওর হাতে, সেগুলোকেই লুকোনোর চেষ্টা করছিল এতক্ষণ। গার্ড ওর কাছ থেকে টাকাগুলো ছিনিয়ে নিয়ে নিজের পকেটে পুরল, তারপর ধীরেসুস্থে লঞ্চে গিয়ে উঠল।

    ওপর থেকে দেখতে দেখতে হঠাৎ নিজের কোমরের বেল্টে বাঁধা টাকার ব্যাগটার কথা মনে পড়ল পিয়ার। চুপি চুপি সেটার চেন খুলে একগোছা টাকা বের করে আনল ও। টাকাগুলোকে পাকিয়ে শক্ত করে মুঠোর মধ্যে ধরে অপেক্ষা করতে লাগল লঞ্চটা চালু হওয়ার জন্য। গার্ড পেছন ফিরতেই ঝুঁকে পড়ে হাতটা বাড়িয়ে দিল ও জেলেটার দিকে। প্রায় ফিসফিস করে বলল, “এই যে, এদিকে তাকাও একবার”। কিন্তু ইঞ্জিনের ভটভট শব্দে ওর গলা চাপা পড়ে গেল। চলতে শুরু করেছে লঞ্চ, নৌকো আর লঞ্চের মাঝে জল দেখা যাচ্ছে নীচে, কিন্তু পিয়ার মনে হল আর খানিকটা উঁচুতে দাঁড়াতে পারলেই টাকাটা ছুঁড়ে দিতে পারবে ও। একটা প্লাস্টিকের চেয়ার ছিল কাছে, সেটাকে লঞ্চের ধারে টেনে নিয়ে এল। ওটার ওপর কোনওরকমে ব্যালান্স করে দাঁড়িয়ে ছুঁড়ে দিল টাকাটা নৌকোর দিকে। “এদিকে তাকাও, এদিকে,” বলেই একটা জোরালো হিসহিসে আওয়াজ করল মুখ দিয়ে। এবার শুনতে পেল জেলেটা, চমকে প্রায় লাফিয়ে উঠল। কিন্তু শব্দটা কানে যেতে গার্ডও তিরবেগে দৌড়ে এল ডেকের অন্য প্রান্ত থেকে। লোকটার একটা পা এসে লাগল চেয়ারটায়, আর ভারসাম্য রাখতে না পেরে শূন্যে ছিটকে গেল পিয়া। টের পেল ও পড়ে যাচ্ছে, ঘোলাটে বাদামি জল দ্রুত এগিয়ে আসছে ওর মুখের দিকে।

  • স্যার ড্যানিয়েল

    স্যার ড্যানিয়েল

    স্যার ড্যানিয়েল

    “ভাটির দেশের সঙ্গে মরুভূমির অনেক মিল আছে”, বলেছিল নির্মল। “যেমন ধরো, মরুভূমির মতো এখানেও মরীচিকা দেখা যায় যা নেই তাও দেখতে পায় মানুষ। স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটনও দেখেছিলেন। ভাটির দেশের কাঁকড়ায় ভরা নদীতীর দেখে স্কটল্যান্ড থেকে আসা সাহেবের মনে হয়েছিল কাদামাটি নয়, সোনার চেয়েও ঝকমকে কিছু দিয়ে তৈরি এ জায়গাটা। কত দাম হতে পারে এখানকার এই কাদার, বলেছিলেন উনি। ‘বাংলাদেশের এক একর জমি পনেরো মণ ধান ফলাতে পারে। কিন্তু এক বর্গমাইল সোনায় কী ফসল হবে? কিছুই না।’ “

    আঙুল তুলে দেওয়ালে ঝোলানো একটা পোর্ট্রেট দেখিয়েছিল নির্মল। “দেখো, এই হল ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের নাইটহুড পাওয়ার দিনের ছবি। এইদিন থেকেই স্যার উপাধি বসল ওঁর নামের আগে–উনি হলেন স্যার ড্যানিয়েল।”

    ছবির সাহেবের পায়ে মোজা, বকলস-বাঁধা জুতো, হাঁটু অবধি ব্রিচেস আর পরনে জ্যাকেট, পেতলের বোতাম আঁটা। নাকের নীচে ঝুপো সাদা গোঁফ, কোমরে বেল্টের সঙ্গে মনে হয় একটা তলোয়ার বাঁধা; সেটার বাঁটটা শুধু দেখা যাচ্ছে। চোখদুটো দেখলে মনে হয় সরাসরি তাকিয়ে আছে দর্শকের দিকে, মায়ামাখা দৃষ্টিতে খানিকটা কঠোরতার ছায়া। তার সঙ্গে মিশে আছে একটু রূঢ়তা আর কিছুটা খ্যাপামি। সব মিলিয়ে চোখদুটোতে এমন একটা কিছু ছিল, যে অস্বস্তি হচ্ছিল কানাইয়ের। ছবির হ্যামিলটনের নজর এড়ানোর জন্যে মেসোর আড়ালে সরে গিয়েছিল ও।

    “স্যার ড্যানিয়েলের শিক্ষা শুরু হয়েছিল স্কটল্যান্ডে,” বলে চলেছিল নির্মল। “সে দেশের প্রকৃতি ছিল রুক্ষ আর পাথুরে, প্রচণ্ড ঠান্ডা আর নির্মম। ইস্কুলে মাস্টারমশাইদের কাছে উনি শিখেছিলেন কঠোর পরিশ্রমের কোনও বিকল্প নেই। একমাত্র পরিশ্রম দিয়েই সবকিছুকে জয় করা যায়–পাহাড় পাথর সবকিছু। কাদামাটিও। তো, সে সময়কার বেশিরভাগ স্কটল্যান্ডবাসীর মতো ড্যানিয়েল হ্যামিলটনও একদিন বের হলেন ভাগ্যের সন্ধানে। যাওয়ার জায়গা ছিল একটাই–স্বপ্নের দেশ, সোনার দেশ ভারতবর্ষ। এসে পৌঁছলেন কলকাতায়। পারিবারিক যোগাযোগের সূত্রে কাজও জুটে গেল একটা, ম্যাকিনন ম্যাকেঞ্জিতে। ম্যাকিন ম্যাকেঞ্জি তখন পি অ্যান্ড ও জাহাজ কোম্পানির জন্য টিকিট বেচত। জাহাজের ব্যবসায় সেকালের দুনিয়ায় পি অ্যান্ড ও-র ধারেকাছে কেউ ছিল না। হ্যামিলটনের জোয়ান বয়স, খাটতেও পারতেন খুব, দিনরাত পরিশ্রম করে প্রচুর টিকিট বিক্রি করে দিলেন–ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস, থার্ড ক্লাস, স্টিয়ারেজ–সবরকমের টিকিট। কলকাতা বন্দর থেকে একেকটা জাহাজ ছাড়ত আর শত শত টিকিট বিক্রি হত। টিকিট এজেন্ট মাত্র একজন। কাজেই হ্যামিলটনের তো পোয়াবারো। উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠতে উঠতে কিছুদিনের মধ্যেই একেবারে কোম্পানির কর্তা হয়ে বসলেন। বিশাল ধনসম্পত্তির মালিক হ্যামিলটন হয়ে উঠলেন ভারতের সবচেয়ে ধনী লোকেদের একজন। উনি ছিলেন, যাকে বলে মনোপলি ক্যাপিটালিস্ট। এত ধনসম্পদ উপার্জন করার পর অন্য যে-কোনও লোক হয় এখানকার পাততাড়ি গুটিয়ে দেশে ফিরে যেত, নয়তো আরাম-বিলাসে পয়সা ওড়াত–এটাই ছিল সে সময়ের দস্তুর। কিন্তু স্যার ড্যানিয়েল ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া।”

    “কেন?”

    “ধীরে বৎস, ধীরে। সে কথায় আসব আমরা। তার আগে একবার দেওয়ালের ওই ছবির দিকে তাকাও, তারপর চোখ বন্ধ করে কল্পনা করো, এই সায়েব, স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটন, খাড়া দাঁড়িয়ে আছেন পি অ্যান্ড ও কোম্পানির জাহাজের ডেকে, ভেঁপু বাজিয়ে জাহাজ কলকাতা ছেড়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে বঙ্গোপসাগরের দিকে। সহযাত্রী অন্য সাহেব-মেম যাঁরা আছেন তারা যে যার মতো হাসছেন গাইছেন পানভোজন ফুর্তিতে মেতে আছেন। স্যার ড্যানিয়েল কিন্তু সেসবের মধ্যে নেই। ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি তখন দু’ চোখ ভরে পান করছেন চারপাশের দৃশ্য–এই বিশাল নদী, এই কাদামাটির চর, এই ম্যানগ্রোভে ঢাকা দ্বীপ। দেখতে দেখতে সাহেবের মনে হল, ‘এই জায়গাগুলো খালি পড়ে আছে কেন? কেন কেউ এই দ্বীপগুলিতে থাকে না? এতসব জমি শুধু পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে?’ জংলা দ্বীপগুলোর দিকে সাহেবকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে জাহাজের এক খালাসি এগিয়ে এল। আঙুল তুলে দূরে ইশারা করে বলল, “ওই দেখুন স্যার, জঙ্গলের মধ্যে একটা মন্দির দেখা যাচ্ছে। আর ওইদিকে দেখুন, একটা মসজিদ। এসব জায়গায় একসময় মানুষের বাস ছিল, কিন্তু ঝড়-ঝঞ্ঝা আর বাঘ-কুমিরের উপদ্রবে লোকে টিকতে পারেনি। তাই নাকি? স্যার ড্যানিয়েল বললেন, ‘একসময়ে যদি এখানে মানুষের বাস থেকে থাকে, তা হলে তো নতুন করে আবার বসতি গড়ে তোলাই যায়। আর এমন কিছু দূরধিগম্যও নয় জায়গাটা, ভারতের প্রবেশপথই বলা যেতে পারে বিশাল একটা উপমহাদেশে ঢোকার দরজায় একেবারে। পুবদিক থেকে এসে যারাই গাঙ্গেয় সমভূমিতে ঢোকার চেষ্টা করেছে তাদের প্রত্যেককে এখান দিয়ে যেতে হয়েছে, সে তোমার আরাকানিদেরই বললো, কি খমেরদেরই বলো অথবা যবদ্বীপের লোকেদের, কি ওলন্দাজ, মালয়ি, চিনে, পর্তুগিজ, ব্রিটিশ সক্কলকে। অনেকেই জানে এই ভাটির দেশের সবকটা দ্বীপে মানুষ থাকত কোনওনা-কোনও সময়। কিন্তু দেখে বলবে কার সাধ্যি? আসলে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের বৈশিষ্ট্যই হল এই। শুধু দ্বীপের পর দ্বীপ গিলে ফেলেই ক্ষান্ত হয় না, সময়কে একেবারে মুছে ফেলে দেয় এ জঙ্গল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নতুন নতুন প্রেতের জন্ম দিয়ে চলে।

    “কলকাতায় ফিরে এসেই হ্যামিলটন খোঁজ শুরু করলেন, কার কাছে এইসব জায়গার সম্পর্কে আরও খবর পাওয়া যায়। বিভিন্ন লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে জানতে পারলেন ওখানকার সব সমস্যার চেয়ে বড় সমস্যা হল খোদ ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট। পুরো সুন্দরবনটাকে ওরা ওদের জমিদারি মনে করে। কিন্তু ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টকে গোড়াই কেয়ার করেন হ্যামিলটন। ১৯০৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ভাটির দেশের দশ হাজার। একর জমি কিনে নিলেন উনি।”

    “দশ হাজার একর! সেটা কতটা জায়গা?”

    “সে বহু দ্বীপ কানাই, বহু বহু দ্বীপ। সরকার অবশ্য খুশি হয়েই বেচে দিয়েছিল সেগুলি। ফলে গোসাবা, রাঙ্গাবেলিয়া, সাতজেলিয়া–এইসব জায়গা চলে এল হ্যামিলটনের দখলে। এই নামগুলির সঙ্গে পরে যোগ হল আমাদের এই দ্বীপের নাম, এই লুসিবাড়ির। সায়েব অবশ্য চেয়েছিলেন তার নতুন জমিদারির নাম হবে অ্যান্ড্রপুর, স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রর নামে। এই সেন্ট অ্যান্ড্র শুরুতে ছিলেন খুব গরিব, সোনাদানা তার কিছুই ছিল না। পরবর্তী জীবনে তিনি প্রচুর টাকার মালিক হন। কিন্তু অ্যান্ড্রপুর নামটা চলল না। লোকের মুখে মুখে জমিদারির নাম হল হ্যামিলটনাবাদ। দিনে দিনে তোক যত বাড়তে লাগল, নতুন নতুন সব গ্রাম গজিয়ে উঠল, আর স্যার ড্যানিয়েল সেগুলোর নতুন নতুন নাম দিতে লাগলেন। যেমন একটা গ্রামের নাম দিয়েছিলেন সব নমস্কার’, আরেকটার নাম ‘রজত জুবিলি’, এইরকম। এই দ্বিতীয় নামটা বোধহয় কোনও রাজা মহারাজার রজত জয়ন্তী উপলক্ষে দেওয়া হয়েছিল। এর পরে সাহেব তার আত্মীয়স্বজনদের নামে বিভিন্ন গ্রামের নাম দিতে শুরু করলেন–জেমসপুর, অ্যানপুর, এমিলিবাড়ি। এই লুসিবাড়ির নামটাও সেভাবেই হয়েছে।”

    “কারা থাকত এইসব জায়গায়।”

    “শুরুতে কেউই থাকত না। একটা কথা খেয়াল রাখতে হবে–সে সময় এই জায়গাগুলি ছিল গভীর বন। কোনও লোকজন ছিল না, বাঁধ ছিল না, খেতজমি কিছু ছিল । শুধু কাদার বাদা আর ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। জোয়ারের সময় বেশিরভাগ অঞ্চল জলে ডুবে যেত। আর চারদিকে হিংস্র বন্য জন্তু–বাঘ, কুমির, কামট, লেপার্ড।”

    “তা হলে লোকে কেন এল এখানে?”

    “জমির জন্য এল। একটা সময় ছিল যখন লোকে এক-দু’ বিঘা জমির জন্য নিজেদের বিক্রি করে দিত। আর এই জায়গাটা তো দেশেরই মধ্যে, কলকাতা থেকে বেশি দূরেও নয়। জাহাজে করে বার্মা কি মালয় কি ফিজি কি ত্রিনিদাদ তো যেতে হল না। আর সবচেয়ে বড় কথা এখানে জমি পাওয়া যাচ্ছিল বিনে পয়সায়, একেবারে মুফতে।”

    “সেইজন্য লোকে চলে এল?”

    “শুধু চলে এল নয়, হাজারে হাজারে এল, আসতেই থাকল। হ্যামিলটন সাহেব বলেছিলেন যে কেউ গতরে খাটতে রাজি থাকবে সেই জমি পাবে। তবে হ্যাঁ, একটা শর্তে। ওইসব বিভেদ-বিবাদ জাতপাত এখানে চলবে না। তুমি বামুন কি শুদ্র, বাঙালি কি উড়িয়া সেসব ভুলে যেতে হবে। সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে, একসঙ্গে খেটে যেতে হবে। যেই না এ খবর ছড়িয়ে পড়ল, অমনি স্রোতের মতো মানুষ আসতে লাগল উত্তর উড়িষ্যা থেকে, পুব বাংলা থেকে, সাঁওতাল পরগণা থেকে। নৌকো করে এল, ডিঙি করে এল, হাতের সামনে যা পেল তাতে করেই চলে এল। হাজারে হাজারে। ভাটার সময় তারা দা-কাটারি দিয়ে জঙ্গল সাফ করত, আর জোয়ার এলে মাচার ওপর বসে অপেক্ষা করত কখন জল নামবে। রাত্তিরে তারা উঁচু গাছের ওপর দোলনার মতো বানিয়ে তার ওপর ঘুমোত, জোয়ারের জলে যাতে ভেসে না যায়।

    অবস্থাটা একবার কল্পনা করার চেষ্টা করো: প্রতিটা দ্বীপে অসংখ্য নদী-খাঁড়ি আর জঙ্গলে বাঘ, কুমির, সাপ কিলবিল করছে। তাদের তো একেবারে ভোজ লেগে গেল। শত শত লোককে বাঘে খেল, কুমিরে নিল, সাপে কাটল। এত লোক মরতে লাগল যে স্যার ড্যানিয়েলকে পুরস্কার ঘোষণা করতে হল। যে-ই একটা বাঘ বা কুমির মারতে পারবে সে-ই পুরস্কার পাবে।”

    “কিন্তু কী দিয়ে মারবে?”

    “খালি হাতে মারবে, ছুরি দিয়ে মারবে, বাঁশের তৈরি বর্শা দিয়ে মারবে। যা পাবে তাই দিয়ে মারবে। হরেনকে মনে আছে তোমার? যে আমাদের ক্যানিং থেকে নৌকো করে নিয়ে এল?”

    “মনে আছে,” মাথা নাড়ল কানাই।

    “ওর কাকা বলাই একবার মাছ ধরতে যাওয়ার সময় একটা বাঘ মেরেছিল। স্যার ড্যানিয়েল ওকে দু’ বিঘে জমি দিলেন, এই লুসিবাড়িতে। তারপর তো বহু বছর বলাই এ দ্বীপে বীরের সম্মান পেত।”

    “কিন্তু স্যার ড্যানিয়েল কেন করেছিলেন এসব? টাকার জন্যে?”

    “না। টাকার আর দরকার ছিল না সাহেবের। উনি চেয়েছিলেন একটা নতুন ধরনের সমাজ গড়তে, একটা নতুন দেশ গড়তে। ওঁর ইচ্ছে ছিল সে দেশটা চলবে সমবায় পদ্ধতিতে। সেখানে প্রত্যেকের জন্য জমি থাকবে, কেউ কাউকে শোষণ করবে না। এ নিয়ে মহাত্মা গাঁধী রবীন্দ্রনাথের মতো সব বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন স্যার ড্যানিয়েল। বুর্জোয়ারা তার সঙ্গে একমত হলেন। ঠিক হল একেবারে অন্যরকম একটা দেশ তৈরি হবে এখানে একটা আদর্শ দেশ।”

    “কিন্তু এটা দেশ কী করে হবে? তখন তো কিছুই নেই এখানে রাস্তাঘাট নেই, ইলেকট্রিসিটি নেই…”

    নির্মল একটু হেসেছিল। “সে সবই হয়েছিল।” দেওয়ালের দিকে দেখিয়ে বলেছিল, “ওইদিকে একবার তাকাও।” কানাই তাকিয়ে দেখল দেওয়ালের ধার ঘেঁষে একটা রং জ্বলে যাওয়া ইলেকট্রিকের তার চলে গেছে ঘরের একদিক থেকে অন্যদিকে। “দেখেছ তো? বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছিলেন স্যার ড্যানিয়েল। শুরুর দিকে একটা বিশাল জেনারেটর ছিল এখানে, ঠিক স্কুলটার পাশে। পরে ওটা খারাপ হয়ে যায়। তদ্দিনে সাহেবও মারা গেছেন, আর অন্য কেউ উদ্যোগ নিয়ে ওটা সারাবার ব্যবস্থা করেনি।”

    একটা টেবিলের পাশে নিচু হয়ে বসে আরেক গোছা তার দেখিয়েছিল নির্মল। “এই দেখো। টেলিফোনও ছিল এখানে। এমনকী কলকাতাতেও ফোন চালু হওয়ার আগে গোসাবায় টেলিফোন এনেছিলেন স্যার ড্যানিয়েল। সমস্ত কিছুর ব্যবস্থা করেছিলেন সাহেব এই দ্বীপগুলিতে, কিচ্ছু বাকি রাখেননি। গোসাবায় একটা সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক ছিল, এমনকী আলাদা টাকাও ছিল–গোসাবা মুদ্রা।”

    দেওয়ালের গায়ে সারি সারি বইয়ের তাকগুলোর কাছে গিয়ে একটা ধূলিধূসরিত ঘেঁড়া কাগজের টুকরো নামিয়ে এনেছিল নির্মল। “এই দেখ, একটা ব্যাঙ্কনোট। কী লেখা আছে দেখেছ? ‘এ শুধু নিষ্প্রাণ মুদ্রা নয়, এই নোটের পেছনে আছে জীবিত মানুষ। এমনিতে এর দাম কানাকড়িও নয়, কিন্তু এর প্রকৃত মূল্য প্রচুর–যতটা জঙ্গল সাফাই হবে, যতগুলি পুকুর কাটা হবে, যতগুলি ঘরবাড়ি তৈরি হবে, তার একশো শতাংশ। এক সুস্থ, পরিপূর্ণ জীবনের সমান এ ব্যাঙ্কনোটের মূল্য।”

    কাগজটা কানাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল নির্মল। “ভাল করে দেখে নাও। পড়ে মনে হয় যেন খোদ কার্ল মার্ক্স লিখেছেন। এ তো পরিষ্কার লেবার থিয়োরি অব ভ্যালু। কিন্তু নীচে সইটা দেখো। কী লেখা আছে? স্যার ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিলটন।”

    কাগজের টুকরোটা হাতে নিয়ে উলটে পালটে দেখছিল কানাই। “কিন্তু উনি কীসের জন্য করেছিলেন এইসব? পয়সা রোজগারের দরকার না থাকলে এত কষ্ট কেন করতে গেলেন হ্যামিলটন? আমার তো মাথায় ঢুকছে না।”

    “তোমার কী মনে হয় কানাই?” জিজ্ঞেস করেছিল নির্মল। “আসলে সাহেবের একটা স্বপ্ন ছিল। যারা স্বপ্নের পেছনে ছোটে তারা যা চায়, স্যার ড্যানিয়েলও তাই চেয়েছিলেন। উনি চেয়েছিলেন একটা দেশ গড়তে যেখানে কোনও শোষণ-বঞ্চনা থাকবে না, সমাজে উঁচু-নিচু ভেদ থাকবে না, তুচ্ছ সব বিষয় নিয়ে বিবাদ-বিসংবাদ থাকবে না। উনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন একটা জায়গার যেখানে সব্বাই পুরুষ মহিলা নির্বিশেষে সক্কলে–সকালবেলায় হবে চাষি, দুপুরে কবি, আর সন্ধ্যাবেলায় ছুতোরমিস্ত্রি।”

    হো হো করে হেসে উঠেছিল কানাই। “কী হাল হয়েছে সেই স্বপ্নের। রয়ে গেছে শুধু কতগুলো পোকায়-খাওয়া ইঁদুরে-কাটা দ্বীপ।”

    এইটুকু একটা বাচ্চা ছেলের থেকে এতটা বিদ্রূপ ঠিক আশা করেনি নির্মল। একটু হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। খানিকটা খাবি খাওয়ার মতো ভাব করে শেষে বলেছিল, “হেসো না কানাই। আসলে এসব কিছুর জন্য তখনও প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারেনি এই ভাটির দেশ। কে বলতে পারে, হয়তো কোনওদিন সত্যি হয়ে উঠতে পারে হ্যামিলটন সাহেবের সেই স্বপ্ন।”

  • স্নেল’স উইন্ডো

    স্নেল’স উইন্ডো

    স্নেল’স উইন্ডো

    খোলা সমুদ্রের পরিষ্কার জলে যখন সূর্যের আলো পড়ে তা সমুদ্রতল থেকে একটু তেরচা ভাবে নীচে গিয়ে ঢোকে। জলের ভেতর থেকে ওপরে তাকালে সে আলো একটা উলটানো শঙ্কুর মতো চোখে এসে পড়ে। স্বচ্ছ বৃত্তের মতো সেই শঙ্কুর ভূমি ঝুলতে থাকে দর্শকের মাথার ওপরে, মনে হয় ঠিক যেন এক ভাসমান জ্যোতির্বলয়। সমুদ্রের নীচের আলোর তৈরি এই জ্যামিতিক আকারের নাম স্মেলস উইন্ডো। এই আলোর জানালা দিয়েই ডলফিনরা সমুদ্রগর্ভ থেকে বাইরের পৃথিবীকে দেখে। জলের তলায় যেদিকেই তারা যায়, ঝকঝকে রুপোলি রং-এর অনন্ত এক ঝাপসা বিস্তারের মধ্যে সেই ভাসমান আলোকবৃত্ত তাদের সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে।

    গঙ্গা বা ব্রহ্মপুত্রের মতো নদীতে কিন্তু এই আলোর জানালা ঢাকা থাকে ভারী পলির পর্দায়। পলির পরিমাণ এই নদীগুলিতে এতটাই বেশি যে জলের মধ্যে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার যাওয়ার পরেই সূর্যের আলো পথ হারিয়ে ফেলে। সেই ভাসমান পলির স্রোতের মধ্যে একহাত দূরেও দৃষ্টি চলে না। পথ দেখাবার মতো কোনও আলোকবৃত্তও থাকে না বলে খুব সহজেই দিক ভুল হয়ে যেতে পারে। ওপরে না নীচে, আগে না পেছনে কোন দিকে যেতে হবে সেটা বুঝে ওঠা যায় না। এই সমস্যার জন্যই মনে হয় গ্যাঞ্জেটিক ডলফিনরা সাঁতরায় কাত হয়ে–নদীর তলের সমান্তরালে। একদিকের পাখনা ঝুলে থাকে নীচের দিকে, নোঙরের মতো; সেটা দিয়ে নদীর তলার সেই অন্ধকারের রাজ্যে ওরা দিশা ঠিক রাখে।

    পিয়া যদি নৌকো থেকে সমুদ্রের জলে পড়ত, তা হলে সামলে উঠতে ওকে বেশি বেগ পেতে হত না। এমনিতে ও যথেষ্ট ভাল সাঁতার জানে, স্রোতের টানের মুখেও নিজেকে ভাসিয়ে রাখার ক্ষমতা আছে। কিন্তু সুন্দরবনের নদীর ঘোলা জলের নীচে ঝাপসা আলোয় দিশাহারা হয়ে ভয় পেয়ে গেল পিয়া। দম দ্রুত ফুরিয়ে আসছে আর মনে হচ্ছে অদ্ভুত উজ্জ্বল একটা পলির স্তর আস্তে আস্তে ওকে ঢেকে নিচ্ছে, কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না কোন দিকে গেলে ভেসে ওঠা যাবে। মাথার ভেতরে কেমন একটা ঘ্রাণের বোধ, অথবা ঘ্রাণ ঠিক নয়, যেন একটা ধাতব স্বাদ। রক্তের স্বাদ নয়, সেটা এই অবস্থাতেও বোঝা যাচ্ছিল–কাদামাটি ঢুকে গেছে মুখে। নাকে চোখে গলার মধ্যে–সর্বত্র মাটি, একটা পলিমাটির পর্দা যেন নেমে আসছে চারদিক থেকে, ঘোলাটে সেই চাদর ধীরে ধীরে জড়িয়ে নিচ্ছে ওকে। এই শেষ তা হলে? একটা মরিয়া চেষ্টা করল পিয়া পলির চাদরটা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার–আঁচড়ে, ঘুষি মেরে, লাথি মেরে–কিন্তু পিচ্ছিল দেওয়ালের মতো সেটা বার বার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। হঠাৎ পিঠের ওপর যেন কর্কশ কিছুর একটা ঘষা লাগল। মুহূর্তের জন্য মনে হল সেটা কোনও সরীসৃপের ছুঁচোলো নাক। আঁকুপাঁকু করে উঠল পিয়া, ঘাড় ফেরাল পেছনে, কিন্তু জলের দুর্ভেদ্য ঘোলাটে রং ছাড়া আর কিছুই নজরে এল না। বাতাসের অভাবে শক্ত হয়ে আসছে শরীর, তাও শেষ শক্তিটুকু দিয়ে প্রবল চেষ্টায় হাত ছুড়ল। এবার মনে হল তীব্র বেগে কিছু একটা এগিয়ে আসছে মুখের ওপর; পিয়া বুঝতে পারল কেউ ওকে জলের মধ্যে টেনে নিয়ে চলে যাচ্ছে সামনের দিকে, কিন্তু বাধা দেওয়ার শক্তি ওর ফুরিয়ে গেছে। এরপর হঠাৎই যেন হালকা হয়ে গেল মাথাটা, সারা শরীরে একটা ফুরফুরে ভাব–বাতাসের ছোঁয়া। কিন্তু জলে আর কাদায় বন্ধ হয়ে আছে মুখ নাক, নিশ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা আর নেই।

    জলের ওপর হাতের চাপড় মেরে উঠে আসার চেষ্টা করল পিয়া, সঙ্গে সঙ্গে আবার একটা প্রচণ্ড ঝাঁপটা লাগল মুখে। কোথা থেকে একজোড়া হাত এসে ওর বুকের চারপাশে জড়িয়ে ধরল। একটা ঝাঁকি দিয়ে কেউ ওর মাথাটা হেলিয়ে দিল পেছনের দিকে। পিয়া বুঝতে পারল নিজের দু’পাটি দাঁতের মধ্যে অন্য কারও দাঁত চেপে বসে যাচ্ছে। মুখের মধ্যে থেকে মনে হল কেউ কিছু শুষে নিচ্ছে আর সঙ্গে সঙ্গে কী যেন উঠে আসছে গলা বেয়ে। শ্বাসনালিতে যেই বাতাসের স্পর্শ টের পাওয়া গেল, আরও দম নেওয়ার জন্য খাবি খেতে লাগল পিয়া। একটা হাত এখনও শক্ত করে তুলে ধরে রেখেছে ওকে জলের ওপর, বাঁদিকের কাঁধের ওপর কাটাকাটা কিছুর খোঁচা লাগছে। শ্বাস নেওয়ার জন্য হাঁসফাস করতে করতেও আবছায়া চৈতন্যে পিয়ার মনে হল ওই ডিঙি নৌকোর জেলেটাই ধরে আছে ওকে, আর ওরই দাড়ির ঘষা লাগছে কাঁধের কাছে। ওই খোঁচা খোঁচা ভাবটাতেই ওর মাথাটা যেন অনেকটা সাফ হয়ে গেল। জোর করে ভয়ে শক্ত হয়ে যাওয়া পেশিগুলোকে আলগা করে দিল পিয়া, শরীরটাকে শান্ত করে রাখল, যাতে ওকে বয়ে নিয়ে সাঁতার কাটতে লোকটার অসুবিধা না হয়।

    স্রোতের টানে বেশ খানিকটা দূরে ভেসে চলে এসেছিল ওরা। স্থির হয়ে না থাকলে নৌকো পর্যন্ত ওকে টেনে নিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। জলের ওপর গড়িয়ে গিয়ে তাই চিত হল পিয়া, পিঠটা একটু বাঁকিয়ে দিল আর-একটা হাত জেলেটার হাতের মধ্যে গলিয়ে দিয়ে শরীরটাকে প্রায় ভারশূন্য করে ভেসে রইল। কিন্তু নদীর স্রোত এখানে প্রায় মাধ্যাকর্ষণের মতো তীব্র। পিয়াকে টেনে নিয়ে ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগোতেও প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল লোকটার, মনে হচ্ছিল যেন একটা ভারী মাল ঘাড়ে ধীরে ধীরে চড়াই ভেঙে উঠতে হচ্ছে ওকে।

    অবশেষে নৌকোর সামনের দিকটা পিয়ার হাতের নাগালে এল। জলের মধ্যে জেলেটা কর্কশ্রুর মতো ঘুরে গেল একপাক, নীচ থেকে চাপ দিয়ে পিয়ার শরীরটাকে ঠেলে তুলল ডিঙির ওপর। উপুড় হয়ে পড়ল পিয়া, আর সঙ্গে সঙ্গে পেট থেকে ফোয়ারার মতো জল উঠে এসে দম বন্ধ করে দিল। হঠাৎ মনে হল আবার যেন ডুবে যাচ্ছে ও, নাকমুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে জল। দু’হাত দিয়ে গলার কাছটা চেপে ধরল পিয়া, হাঁসফাস করে খামচাতে লাগল, যেন একটা ফাস আটকে আছে সেখানে, আর সেটাকে ও আলগা করার চেষ্টা করছে। আবার জেলেটা দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরল ওর কাঁধ দুটো, ওর শরীরটাকে উলটে দিয়ে একটা পা আড়াআড়ি রাখল কোমরের কাছে। আস্তে আস্তে চাপ দিতে থাকল, মুখে মুখ লাগিয়ে পিয়ার গলার ভেতর থেকে শুষে নিতে থাকল জল আর সঙ্গে সঙ্গে হাওয়া পাম্প করতে থাকল ফুসফুসে।

    পিয়ার শ্বাসনালিতে বায়ু চলাচল আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে আসতে মুখ সরিয়ে নিল লোকটা। শুয়ে শুয়ে শুনতে পাচ্ছিল পিয়া, থুতু ফেলছে ও মুখের থেকে পিয়ার বমির স্বাদ ধুয়ে পরিষ্কার করছে।

    ধীরে ধীরে শ্বাসপ্রশ্বাসের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরতে লাগল, কানে এল কথাবার্তার আওয়াজ। আস্তে আস্তে চোখ খুলল পিয়া। দেখল লঞ্চের রেলিং-এ ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফরেস্ট গার্ড আর মেজদা। আড়চোখে ওর দিকে দেখছে আর ফিসফিস করে কথা বলছে নিজেদের মধ্যে। ওকে চোখ মেলতে দেখে নিজের ঘড়ির দিকে আর আকাশের দিকে ইশারা করল গার্ড। সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিমে, সারা আকাশ লালে লাল। লোকটা কী বলতে চাইছে প্রথমে ঠিক ধরতে পারেনি পিয়া। শেষে যখন হাত নেড়ে ডাকতে লাগল, তখন ওর মাথায় ঢুকল ব্যাপারটা : সন্ধে নেমে আসছে, তাই ও চাইছে পিয়া তাড়াতাড়ি লঞ্চে উঠে আসুক, তারপর যেখানে যাওয়ার যাওয়া যাবে।

    এই অবস্থার মধ্যেও গার্ডের এই তাড়া দেওয়া দেখে গা জ্বলে গেল পিয়ার। লোকটা ধরেই নিয়েছে যে এখন ওর আর গত্যন্তর নেই, ওদের কথা শুনেই ওকে চলতে হবে এবার, যা বলবে তাই মেনে নিতে হবে। প্রথম থেকেই এই লোকদুটোকে নিয়ে পিয়ার মনে একটা অস্বস্তির ভাব ছিল। এখন লঞ্চে ফিরে গেলে তো ওদের কাছে নিজের অসহায় ভাবটাই প্রকাশ করা হবে। আর এই পরিস্থিতিতে এই গার্ড আর মেজদার খপ্পরে পড়া মানে ওরা বুঝে যাবে যে পিয়া এখন ওদের হাতের মুঠোর নিরীহ শিকার। নাঃ, কোনওমতেই আর ফেরা চলবে না লঞ্চে। কিন্তু কী করবে ও তা হলে? আর কী রাস্তা খোলা আছে?

    হঠাৎ বিদ্যুৎঝলকের মতো একটা শব্দ মনে এল পিয়ার। এত অপ্রত্যাশিত ভাবে মাথায় এল কথাটা যে একটু আশ্চর্যই হয়ে গেল ও। তাড়াতাড়ি উঠে বসে জপ করার মতো বিড়বিড় করে বার বার বলতে লাগল শব্দটা, যাতে হারিয়ে না যায়। মুখ ফিরিয়ে দেখল জেলেটা এখন ডিঙির সামনের দিকটায় উবু হয়ে বসে আছে। খালি গা, শুধু কোমরে একটুকরো কাপড় জড়ানো। জলে ঝাঁপ দেওয়ার সময় লুঙ্গিটা ছিঁড়ে খুলে ফেলেছিল, সেটা দিয়ে বাচ্চা ছেলেটা এখন ওর মাথা মুছিয়ে দিচ্ছে। পিয়া উঠে বসতে বাচ্চাটা ফিসফিস করে কিছু বলল। ঘুরে তাকাল লোকটা। চোখাচোখি হতেই মাথার মধ্যে শব্দটা হারিয়ে যাওয়ার আগে সময় নষ্ট না করে বলে ফেলল পিয়া, লুসিবাড়ি?’ ভুরু কোঁচকাল লোকটা, যেন বলতে চায় ঠিক শুনতে পায়নি কথাটা। তাই আবার পিয়া বলল, ‘লুসিবাড়ি?’ আর একটা শব্দও জুড়ে দিল, ‘মাসিমা?’ এবার মাথা নাড়ল লোকটা। নামগুলো ওর চেনা।

    বিস্ময়ে গোল গোল হয়ে গেল পিয়ার চোখ। এই লোকটা চেনে ওই মহিলাকে? সন্দেহ নিরসনের জন্য আবার বলল ও, ‘মাসিমা?’ আবার লোকটা মাথা নাড়ল, একটু হাসির আভাসও দেখা গেল ঠোঁটের কোনায়। যেন বলতে চায় ও ঠিকই বুঝতে পেরেছে কার কথা বলতে চাইছে পিয়া। কিন্তু এখনও ধাঁধা রয়ে গেছে পিয়ার মনে, ওর পুরো বক্তব্যটা কি লোকটা বুঝেছে? এবার একটা অন্য রাস্তা নিল ও। লোকটা নৌকোয় করে ওকে লুসিবাড়িতে পৌঁছে দিতে পারবে কি না সেটা বোঝাতে একবার নিজের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাল, আর একবার দেখাল দূরে, দিগন্তের দিকে। আবার মাথা নাড়ল ও, ব্যাপারটা যে বুঝেছে সেটা জানানোর জন্যই যেন মুখেও বলল, ‘লুসিবাড়ি’।

    ‘হ্যাঁ।’ এতক্ষণে একটা নিশ্চিন্ত স্বস্তির শ্বাস ফেলল পিয়া। চোখ বন্ধ করল, অবসাদে শিথিল হয়ে এল পেশিগুলো।

    ওদিকে লঞ্চের ওপর থেকে হাত বাড়িয়ে তুড়ি দিচ্ছিল ফরেস্ট গার্ড, যেন ঘুম থেকে জাগানোর চেষ্টা করছে ওকে। কোনওরকমে নৌকোর ছইটা ধরে উঠে দাঁড়াল পিয়া, ইশারায় লোকটাকে ওর পিঠব্যাগগুলো নামিয়ে দিতে বলল। প্রথম ব্যাগটা চুপচাপ নামিয়ে দিল লোকটা, কিন্তু দ্বিতীয়টার জন্য হাত বাড়াতেই ও বুঝল যে পিয়া আর লঞ্চে ফিরবে না। মুহূর্তে গার্ডের হাসি হাসি ভাবটা মিলিয়ে গেল, চোখ রাঙিয়ে ও জেলেটাকে চিৎকার করে ধমকাতে শুরু করল। জেলেটা কিন্তু নির্বিকার, শুধু বিড়বিড় করে কী একটা বলল। তাতে আরও খেপে গেল গার্ড, ঘুষি পাকিয়ে ভয় দেখাতে লাগল, পারলে তেড়ে আসে এরকম একটা ভাব।

    ভীষণ রাগ হল পিয়ার। চেঁচিয়ে বলল, “ওকে ধমকাচ্ছেন কেন? ওর কী দোষ?” এবার অপ্রত্যাশিত একটা সমর্থন পেল পিয়া। লঞ্চের ওপর থেকে মেজদাও মনে হল আপত্তি করল, পশ্চিমের সূর্যের দিকে আঙুল দেখিয়ে গার্ডকে কিছু একটা বলল। তাতে যেন সম্বিত ফিরে পেল লোকটা, ফের মনোযোগ দিল পিয়ার দিকে। দ্বিতীয় পিঠব্যাগটা একহাতে তুলে ধরে অন্য হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের ইশারায় বোঝাল কিছু টাকা না খসালে ওটা ও হাতছাড়া করবে না।

    এতক্ষণে টাকাপয়সার কথা খেয়াল হল পিয়ার। ভাগ্যিস ওর ওয়াটারপ্রুফ টাকার ব্যাগটা বেল্টের সঙ্গে বাঁধা ছিল। ব্যাগের চেনটায় হাত দিয়ে হাঁফ ছাড়ল পিয়া। যাক বাবা, এত কাণ্ডের পরও সব ঠিকঠাকই আছে। নৌকোর ভাড়া আর গার্ডের একদিনের পারিশ্রমিক হিসেব করে কিছু টাকা গুনে বের করল ব্যাগটা থেকে। টাকাটা গার্ডের হাতে দিতে গিয়েও কী মনে করে আরও কয়েকটা নোট জুড়ে দিল সঙ্গে। যথেষ্ট হয়েছে একদিনের পক্ষে, যত তাড়াতাড়ি এই ঝঞ্জাট থেকে রেহাই পাওয়া যায় ততই মঙ্গল। লোকটা চুপচাপ হাত বাড়িয়ে টাকাগুলো নিল, তারপর ব্যাগটা ছুঁড়ে দিল নৌকোর ওপর।

    এত সহজে ঝামেলা মিটে যাবে আশাই করেনি পিয়া। ও ভেবেছিল আরও খানিকটা চিৎকার চেঁচামেচি করবে লোকগুলো, হয়তো আরও টাকা চাইবে। কিন্তু যতটা সহজে পার পেয়ে গেছে ভেবেছিল পিয়া দেখা গেল তার থেকে একটু বেশিই খসাতে হয়েছে ওকে। লঞ্চের ওপর থেকে একটা দামি ওয়াকম্যান হাতে তুলে দেখাল গার্ড, এর মধ্যে এক ফাঁকে পিয়ার ব্যাগ থেকে ওটা ও হাতিয়ে নিয়েছে। চুরির আনন্দে কোমর বেঁকিয়ে আর দু’হাতে অশ্লীল ভঙ্গি করে নাচতে লাগল ডেকের ওপর।

    কিন্তু এসব কিছুই আর গায়ে লাগছে না পিয়ার এখনওদের দুজনের হাত থেকে যে অবশেষে মুক্তি পাওয়া গেছে তাতেই ও খুশি। ভটভট শব্দটা আস্তে আস্তে দুরে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত ও চোখ বন্ধ করে রইল।

  • ট্রাস্ট

    ট্রাস্ট

    ট্রাস্ট

    লুসিবাড়ি দ্বীপটা এমনিতে ছোট হলেও বেশ কয়েক হাজার লোক বাস করে এখানে। অধিবাসীদের মধ্যে অনেকেই সেই ১৯২০ সালে আসা আদি বাসিন্দাদের পৌত্র-প্রপৌত্র। কিন্তু তা ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ঢেউয়ের মতো এসেছে মানুষ। একদল এসেছে ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর, আবার অনেকে এসেছে ১৯৭১-এ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়। এমনকী তার পরেও এ দ্বীপে লোক এসে বসত করেছে। তারা এসেছে আশেপাশের দ্বীপ থেকে বাস্তুহারা হয়ে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য সরকার অনেক সময় জোর করে এ অঞ্চলের কিছু দ্বীপ খালি করে দিয়েছে; এই শেষ শ্রেণীর বাসিন্দারা সেই সরকারি ব্যবস্থার শিকার। এই সবকিছু মিলিয়ে লুসিবাড়ির জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। ফলে এক টুকরো জমিও এখন আর খালি পড়ে নেই এখানে। ঘন সবুজ ফসলখেতের কথা মুড়ি দিয়ে পড়ে রয়েছে গোটা দ্বীপটা, তার মাঝে মাঝে ছোট ছোট কিছু মাটির ঘর, আর খেতের এদিক থেকে ওদিক কাটাকুটি খেলার দাগের মতো চলে গেছে কয়েকটা পায়ে হাঁটা পথ। কয়েকটা চওড়া রাস্তা আবার ইট-বাঁধানো, দু’ধারে সারি দিয়ে লাগানো ঝাউগাছের ছায়ায় ঢাকা। তবে এ হল ওপর ওপর দেখা। এ দেখায় বাংলাদেশের আর পাঁচটা গায়ের সাথে লুসিবাড়ির কোনও তফাত মিলবে না। এমনিতে বোঝাই যাবে না এই শান্ত চেহারার গ্রামটার জীবনপ্রণালী নির্ভর করছে একটি মাত্র ভৌগোলিক উপাদানের ওপর। সে হল এখানকার বাঁধ। পুরো গ্রামটাকে বেড় দিয়ে থাকা প্রাকারের মতো সে বাঁধ রোজ দু’বেলা লুসিবাড়িকে বাঁচায় বানভাসি থেকে।

    বাদাবন ট্রাস্টের কম্পাউন্ডটা মূল লুসিবাড়ি গ্রাম থেকে কিলোমিটার খানেক দূরে, শাঁখের মতো দ্বীপটার গোল দিকে। এখানেই একটা ছোট বাড়িতে নীলিমা থাকে। অতিথি অভ্যাগত কেউ এলে তাদেরও সেই বাড়িতেই থাকতে দেওয়া হয়।

    কানাই আর নীলিমা যখন এসে পৌঁছল তখন সন্ধে গড়িয়ে গেছে। ওরা বোট থেকে নেমেছিল দ্বীপের অন্য দিকটায়, চড়ার ওপরে। সেটা সুসিবাড়ি গ্রামের কাছে। সেখান থেকে যখন রওয়ানা হয়েছে তখনই সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। ঘাটের কাছ থেকে তারপর একটা রিকশাভ্যান ভাড়া করতে হয়েছে ট্রাস্টে আসার জন্য। এই রিকশাভ্যান জিনিসটা আগের বার এখানে দেখেনি কানাই। এখন এখানে এটার খুব চল হয়েছে। মালপত্র, গোরু-ছাগল, মানুষ সবকিছুই নিয়ে যাওয়া যায় ভ্যানে করে। পেছনের পাটাতনটায় ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে প্যাসেঞ্জাররা, আর মাঝে মাঝে খানাখন্দে পড়ে ভ্যান লাফিয়ে উঠলে এ ওকে ধরে টাল সামলায়।

    “এটাতে আমাদের সবাইকে ধরবে তো?” ভ্যানটার দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল কানাই।

    “কেন ধরবে না? উঠে পড়, আমরা ধরে থাকব তোকে, ভয়ের কিছু নেই,” নীলিমা অভয় দিল।

    যাত্রা শুরু হল। কানাইয়ের সুটকেসটা চাপানো হয়েছে একটা সবজির ঝুড়ির ওপর, তার একপাশে আবার কয়েকটা হাঁস মুরগি, তারস্বরে চেঁচাচ্ছে সেগুলো। খানিক চলার পর একটা ইট-ফেলা রাস্তার ওপর এসে পড়ল ভ্যানটা। ভাল করে বসানো হয়নি ইটগুলো, মাঝে মাঝেই দু’-একটা উঠে গেছে, গর্ত গর্ত হয়ে আছে সে জায়গাগুলো। ভ্যানের চাকা একেকবার সে গর্তের মধ্যে পড়ছে, আর ছিটে-গুলির মতো শূন্যে ছিটকে যাচ্ছে লোকগুলো। কানাই তো একবার পড়েই যাচ্ছিল, কোনও রকমে ওর জামা-টামা ধরে সামলাল অন্য যাত্রীরা।

    “আমাদের গেস্ট হাউসটায় তুই থাকতে পারবি তো রে কানাই?” নীলিমার গলায় চিন্তার সুর। “খুব সাধারণ ব্যবস্থা কিন্তু। কোনও স্পেশাল কিছু আশা করিস না। তোর জন্যে একটা ঘর সাফসুতরো করে রাখা হয়েছে। রাতের খাবারও রাখা থাকবে টিফিন ক্যারিয়ারে। আমাদের একজন ট্রেনি নার্সকে বলা আছে, ও-ই তোর খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করবে। তোর কিছু দরকার হলে ওকেই বলতে পারিস। মেয়েটার নাম ময়না। ও নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে ওখানে আমাদের জন্যে।”

    নামটা কানে যেতেই ভ্যানের চালক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। জিজ্ঞেস করল, “মাসিমা কি ময়না মণ্ডলের কথা বলছেন?”

    “হ্যাঁ।”

    “ওকে তো আপনি এখন গেস্ট হাউসে পাবেন না মাসিমা। আপনি শোনেননি কী হয়েছে?”

    “কী হয়েছে?”

    “ওর বর ফকির তো আবার কোথায় চলে গেছে। এবার আবার ছেলেটাকেও সঙ্গে নিয়ে গেছে। ময়না বেচারি এখন চারদিকে খুঁজে খুঁজে মরছে।”

    “সত্যি? তুই ঠিক জানিস?”

    “হ্যাঁ মাসিমা,” অন্য কয়েকজন যাত্রীও মাথা নেড়ে সমর্থন করল ভ্যানওয়ালাকে।

    জিভ দিয়ে চুক চুক শব্দ করল নীলিমা। “বেচারি ময়না। লোকটা একেবারে ওকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খেল।”

    মন দিয়ে সব শুনছিল কানাই। নীলিমার মুখে চিন্তার ছায়া দেখে জিজ্ঞেস করল, “তোমার তো খুব মুশকিল হয়ে যাবে তা হলে, না?”

    “না রে। আমরা কিছু একটা ব্যবস্থা ঠিক করে নেব। আমি ভাবছি ময়নার কথা। এই বরটার জ্বালায় তো পাগল হয়ে যাবে মেয়েটা।”

    “লোকটা, মানে, ওর বরটা কে?”

    “ওকে তুই চিনবি না–” বলতে বলতে মাঝপথে থমকে গেল নীলিমা। কানাইয়ের হাতটা খামচে ধরল। “দাঁড়া, দাঁড়া, আমারই খেয়াল ছিল না। তুই তো ওকে চিনবিই। মানে

    ওকে ঠিক না, ওর মাকে তুই চিনিস।”

    “ওর মাকে?”

    “হ্যাঁ। কুসুম বলে একটা মেয়ের কথা তোর মনে আছে?”

    “কেন মনে থাকবে না?” কানাই বলল। “খুব মনে আছে। আগের বার যখন এসেছিলাম। তখন ও-ই তো এখানে আমার একমাত্র বন্ধু ছিল।”

    “হ্যাঁ।” ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল নীলিমা। “আমারও মনে পড়ছে, তোরা একসঙ্গে খেলাধুলা করতিস। তো এই ছেলেটা, ফকির, ও হল সেই কুসুমের ছেলে। ওর সঙ্গে আমাদের ময়নার বিয়ে হয়েছে।”

    “এই ফকিরকেই কি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না?”

    “হ্যাঁ, ওকেই পাওয়া যাচ্ছে না।”

    “আর কুসুমের কী খবর? ও কোথায় আছে এখন?”

    লম্বা একটা শ্বাস ছাড়ল নীলিমা। “কুসুমও কোথায় একটা পালিয়ে গিয়েছিল; বোধহয় তুই ফিরে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই। তার পর বহু বছর কোনও খোঁজখবর নেই, শেষে একদিন ফিরে এল আবার। ওর কথা ভাবলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়।”

    “কেন? কী হয়েছিল ওর?”

    চোখ বন্ধ করল নীলিমা। যেন মনের থেকে আড়াল করে রাখতে চাইছে কুসুমের স্মৃতিটাকে। “ওকে মেরে ফেলেছিল।”

    “মেরে ফেলেছিল? কারা? কেন?”

    “সেসব তোকে পরে বলব,” নিচু গলায় বলল নীলিমা। “এখন নয়।”

    “আর ওর ছেলে?” কানাই নাছোড়বান্দা। “কত বড় ও তখন? কুসুম মারা যাওয়ার সময়?”

    “ও তো তখন একেবারে বাচ্চা। বছর পাঁচেক বয়স। ওদের এক আত্মীয়, হরেন, ওকে নিয়ে গিয়ে মানুষ করল।”

    হঠাৎ চোখের সামনে একটা বিশাল বাড়ি কানাইয়ের মনোযোগ কেড়ে নিল। “ওখানে ওটা কী মাসি?”

    “ওটা হাসপাতাল,” বলল নীলিমা। “আগের বার দেখিসনি তুই?”

    “না। এটা তৈরি হওয়ার পর তো আর আসিনি আমি।”

    হাসপাতালের গেটের কাছে অনেকগুলো লাইট লাগানো, প্রত্যেকটার চারদিকে মনে হচ্ছে একেকটা আলোর পুঞ্জ জমে আছে। জীবন্ত মনে হচ্ছে সেগুলোকে ঘুরছে, নড়াচড়া করছে। ভ্যানটা গেট পেরিয়ে ঢোকার সময় কানাই দেখল সেই জ্যোতিপুঞ্জগুলি আসলে খুদে খুদে কতগুলি পোকার ঝক। মেঘের মতো জমে আছে আলোর কাছে।

    প্রত্যেকটা বালবের নীচে কিছু স্কুলের ছেলেমেয়েও বসে আছে। কোলের ওপর বইখাতা নিয়ে ওই আলোয় পড়াশোনা করছে তারা।

    “এগুলো ইলেকট্রিক আলো?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল কানাই। ৫৪

    “হ্যাঁ রে।”

    “কিন্তু আমি যে শুনেছিলাম লুসিবাড়িতে ইলেকট্রিসিটি আসেনি এখনও?”

    “বিজলি বাতির ব্যবস্থা শুধু আমাদের এই কম্পাউন্ডটুকুর মধ্যে। মাত্র কয়েক ঘণ্টা থাকে আলো, সূর্য ডোবার পর থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত,” নীলিমা বলল।

    এই বিদ্যুৎ আসলে আসে একটা জেনারেটর থেকে। একজন পৃষ্ঠপোষক যন্ত্রটা ট্রাস্টকে দান করেছিলেন। প্রতিদিন সন্ধেবেলা কয়েক ঘণ্টার জন্য চালানো হয় জেনারেটরটা। হাসপাতালের কর্মীদের সেটা সবচেয়ে ব্যস্ততার সময়। তাড়াতাড়ি কাজকর্ম সেরে তারা রাতের নিস্তব্ধতার জন্য প্রস্তুত হয়। আশেপাশের স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েরাও ওই আলোর টানে সন্ধের সময় হাসপাতালের সামনে চলে আসে। বাড়িতে পড়ার চেয়ে এখানে এই ইলেকট্রিকের আলোয় পড়ার অনেক সুবিধা। তা ছাড়া কেরোসিন মোমবাতির খরচটাও বাঁচে।

    “আমাদের এখন ওইখানে যেতে হবে,” সামনের একটা বাড়ির দিকে দেখিয়ে বলল নীলিমা। দোতলা গেস্ট হাউসটা হাসপাতালের কাছেই, মাঝে শুধু একটা পুকুর আর একসারি নারকেল গাছ। চুনকাম করা ছোট্ট স্কুলের মতো দেখতে ঝকঝকে বাড়িটায় বেশ একটা মন ভাল করে দেওয়া ভাব রয়েছে। অতিথিদের থাকার জায়গা দোতলায়। একতলায় নীলিমার সংসার। নির্মলের সঙ্গে এখানেই থেকেছে ও, সত্তরের দশকের শেষ দিক পর্যন্ত। এ বাড়িরই ছাদের ওপর ছিল নির্মলের পড়ার ঘর। ওর সমস্ত কাগজপত্র এখনও ওখানেই রাখা আছে।

    ভ্যান থেকে নেমে কানাইয়ের হাতে একটা চাবি দিল নীলিমা। “এই নে, এটা তোর মেসোর ছাদের ঘরের চাবি। ঘরে ঢুকেই ডেস্কের ওপর দেখতে পাবি ওই খামটা রাখা রয়েছে। আমিই তোকে নিয়ে যাব ভেবেছিলাম, কিন্তু ভীষণ ক্লান্ত লাগছে রে।”

    “কিছু ভেবো না মাসি, আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব। সকালে দেখা হবে তা হলে তোমার সঙ্গে।”

    সুটকেসটা নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছিল কানাই, এমন সময় নীলিমা আবার ডাকল পেছন থেকে। “জেনারেটর কিন্তু ন’টায় বন্ধ হয়ে যায়, খেয়াল রাখিস। অন্ধকারের মধ্যে মুশকিলে পড়বি না হলে।”

  • ফকির

    ফকির

    ফকির

    লঞ্চের শব্দটা দূরে মিলিয়ে যেতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল পিয়া। বিপদ কেটে যাওয়ার পর এতক্ষণে ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এল পেশিগুলো, মারাত্মক ধকলটা যেন শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে টের পাওয়া গেল। হঠাৎ হাত-পাগুলি কঁপতে শুরু করল, থুতনিটা বার বার ঠকঠক করে এসে ধাক্কা খেতে লাগল হাঁটুর ওপরে। মুহূর্তের মধ্যে এমন একটা কাঁপুনি এল সারা শরীরে যে গোটা ডিঙিটা দুলতে লাগল, ছোট ছোট ঢেউ ছড়িয়ে গেল নদীর জলে।

    কার যেন একটা ছোঁয়া লাগল কাঁধের কাছে। পাশ ফিরে তাকিয়ে পিয়া দেখল বাচ্চা ছেলেটা, ওর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। পেছন থেকে পিয়ার গলা জড়িয়ে ধরল বাচ্চাটা, নিজের গায়ের ওম দিয়ে ওর শরীরে তাপ দিতে লাগল। স্বস্তিতে, আরামে চোখ বন্ধ হয়ে এল পিয়ার। দাঁতের খটখট বাজনা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আর চোখ খুলল না ও।

    চোখ মেলেই দেখল ওর সামনে উবু হয়ে বসে আছে জেলেটা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে ওর মুখ, চোখে চিন্তার ছাপ। পিয়ার শরীরের কাঁপুনি থেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে লোকটার চেহারাতেও আস্তে আস্তে স্বস্তি ফিরে এল। একটা হাসির আভাসও দেখা গেল ঠোঁটের কোনায়। বুকের ওপর একটা আঙুল রেখে ও বলল, “ফকির”। ওর নাম। পিয়াও নিজের দিকে দেখিয়ে বলল, “পিয়া”। মাথা নাড়ল ফকির। বুঝতে পেরেছে। এবার বাচ্চাটার দিকে ইশারা করে বলল, “টুটুল”। তারপর আঙুল দিয়ে একবার বাচ্চাটার দিকে আর একবার নিজের দিকে দেখাতে লাগল। পিয়া বুঝতে পারল ওরা বাপ আর ছেলে।

    “টুটুল।”

    বাচ্চাটার দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখল পিয়া। যা মনে হচ্ছিল ওর বয়স আসলে তার থেকেও কম। খুব বেশি হলে বছর পাঁচেক হবে। এই নভেম্বরের ঠান্ডায় শুধু টিঙটিঙে পাতলা একটা সোয়েটার পরে রয়েছে ছেলেটা। আর একটা বেটপ রং-জ্বলা হাফপ্যান্ট। নিশ্চয়ই কারও পুরনো স্কুলের পোশাক হবে। বাচ্চাটার হাতে ওটা কী? তুলে দেখাল–পিয়ার ডিসপ্লে কার্ডটা। কোথা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে কে জানে। ওটা যে আবার ফিরে পাওয়া যাবে ভাবেইনি পিয়া। একটা ট্রের মতো করে ধরে ওটা পিয়ার সামনে নিয়ে এল ছেলেটা। তারপরে ওর আঙুলগুলো ধরে আলতো একটা চাপ দিল, যেন বলতে চাইছে “ভয় পেয়োনা, আমি তো আছি।”

    কিন্তু বাচ্চাটার আশ্বাসে উলটো প্রতিক্রিয়া হল পিয়ার ওপর। আচমকা ওর নিজেকে খুব অসহায় মনে হল। একেবারেই নতুন এই অনুভূতি পিয়ার। এর আগে বহুবার ও একা একা জলে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছে, অনেক সময়ই একেবারে অচেনা লোকেদের সাথেও ঘুরেছে, কিন্তু আজকে ওই ফরেস্ট গার্ড আর মেজদার ব্যবহারে আত্মবিশ্বাস একটু চিড় খেয়ে গেছে পিয়ার। এখনও ওর মনে হচ্ছে ও যেন আস্তে আস্তে একটা দুঃস্বপ্নের মধ্যে থেকে জেগে উঠছে, যেন এই মাত্র কয়েকটা হিংস্র পশুর হাত থেকে কোনও রকমে প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছে। সত্যিই, এই ডিঙিতে বাচ্চাটা আছে বলে অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করল পিয়া।

    তা না হলে আগেকার মতো সম্পূর্ণ অচেনা একটা লোকের ওপর কিছুতেই হয়তো আর ভরসা রাখতে পারত না। এক হিসাবে দেখতে গেলে তো বাচ্চাটা সত্যিই ওর রক্ষাকর্তা এখন। হঠাৎ কী রকম একটা মমতা-মাখা কৃতজ্ঞতায় বুকটা ভরে গেল পিয়ার। ওর স্বভাবের সঙ্গে ঠিক খাপ খায় না ব্যাপারটা, কিন্তু এখন এই টলমলে নৌকোর ওপর পিয়ার আবেগ আর বাঁধ মানল না–দু’হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে ও বুকে টেনে নিল।

    আদর শেষে হাত আলগা করতে গিয়ে পিয়া লক্ষ করল ছেলেটা একদৃষ্টে ওর হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। নজর পড়তে দেখল মানিব্যাগটা এখনও দু আঙুলের ফাঁকে ধরা। হঠাৎ নিজেকে একটু অপরাধী মনে হল পিয়ার, মনে পড়ল জেলেটার সঙ্গে এখনও টাকাপয়সার ব্যাপারে কোনও কথাই বলা হয়নি। মানিব্যাগ থেকে একতাড়া টাকা নিয়ে পাতলা একটা গুছি আলাদা করে বের করল ও। টাকাটা গুনতে গুনতেই মনে হল ওরা বাপ-ব্যাটা দু’জনে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মুখ তুলে দেখল ওদের নজর যেন আঠার মতো আটকে গেছে ওর হাতের সঙ্গে, স্তব্ধ বিস্ময়ে ওরা লক্ষ করছে ওর আঙুলের প্রতিটি নড়াচড়া যেন কোনও মায়াবিনীর হাতের জাদু। লোভ কিন্তু নয়, এমন একটা মুগ্ধতা ছিল ওদের দৃষ্টিতে যে পিয়া বুঝতে পারল জীবনে এই প্রথম ওরা এত টাকা একসঙ্গে দেখছে। এতগুলো কড়কড়ে নোট এত কাছ থেকে দেখার ভাগ্য ওদের আগে কখনও হয়নি। কিন্তু ওর জন্যেই যে ওগুলো গুনছে পিয়া সেটা মনে হল ফকিরের কল্পনায়ও আসেনি। গোনা শেষ করে টাকাটা এগিয়ে দিতেই অপরাধীর মতো কুঁকড়ে গেল ফকির, যেন পিয়া কোনও নিষিদ্ধ জিনিস ওর হাতে তুলে দিতে চাইছে।

    মাত্র তো কয়েকটা টাকা, দু’কাপ কফি আর স্যান্ডউইচের জন্যেও পিয়া অনেক সময় এর থেকে বেশি খরচ করেছে। আর রিসার্চ গ্রান্ট হিসেবে যে পয়সা পাওয়া যায় তাতে বেহিসেবি হওয়ার সুযোগও বিশেষ মেলে না। এই সামান্য ক’টা টাকা ওদের প্রাপ্য বলেই ওর মনে হয়েছিল। লোকটার পরনে যদি কোনও জামা থাকত পিয়া ওর পকেটেই খুঁজে দিতে পারত টাকাগুলো, কিন্তু কোমরে জড়ানো ওই ভেজা টুকরো কাপড়টা ছাড়া আর কিছুই নেই ওর গায়ে। অবশ্য একটা মাদুলি বাঁধা আছে এক হাতে। উপায়ান্তর না দেখে ওই মাদুলির সুতোটার মধ্যেই পিয়া টাকা ক’টা মুড়িয়ে খুঁজে দিল। লোকটার সারা গায়ে ঘামাচির মতো কাটা দিয়ে উঠল। সে ওর হাতের ছোঁয়ায়, নাকি এই নভেম্বরের সন্ধ্যার হাওয়ায়, সেটা বুঝতে পারল না পিয়া।

    মাদুলির বাঁধন থেকে টাকাটা বার করে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল ফকির। এতগুলো টাকা নিজের হাতে ধরে আছে সেটা যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না ওর। মুখের সামনে থেকে একটু দূরে রেখে নোটগুলো নিরীক্ষণ করতে লাগল ও। অবশেষে লঞ্চটা যেদিকে গেছে সেদিকে ইশারা করে একটা মাত্র নোট আলাদা করে নিল। পিয়া বুঝতে পারল ও আসলে বলতে চাইছে যে লঞ্চের লোকগুলো তো এই ক’টা টাকাই নিয়ে গেছে, তাই এর থেকে বেশি ও নেবে না। আলাদা করে রাখা নোটটা ছেলের হাতে দিতেই সে দৌড়ে চলে গেল ছইয়ের মধ্যে ওটাকে লুকিয়ে রাখতে।

    বাকি টাকাগুলো পিয়াকে ফেরত দিয়ে দিল ফকির। প্রতিবাদের চেষ্টা করতেই দিগন্তের দিকে হাত তুলে হড়বড় করে একটানা অনেক কথা বলে গেল। তার মধ্যে শুধু লুসিবাড়ি’ শব্দটা পিয়ার কানে চেনা ঠেকল। মোটের ওপর বোঝা গেল লুসিবাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত এই দেনাপাওনার ব্যাপারটা স্থগিত রাখতে চায় ও। আপাতত সেই ব্যবস্থাতেই সম্মত হল পিয়া।

  • পাঁচকড়ি দে রচনাবলী

    পাঁচকড়ি দে রচনাবলী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    সম্পাদনা : বারিদবরণ ঘোষ

    করুণা প্রকাশনী, কলকাতা

    প্রথম প্রকাশ : ১লা বৈশাখ, ১৪১৭

    প্রচ্ছদ : ইন্দ্রনীল ঘোষ

    ॥ রোমাঞ্চন ॥

    বাংলা রহস্যকাহিনির একটা পর্বের ইতিবৃত্ত লিখতে গিয়ে বড়ো ধন্দে পড়া গেছে। কাকে রহস্য কাহিনি বলা যাবে? সংস্কৃত মতে, এমনকি বাংলা মতেও ‘রহস্য’ অনেকটা ঠাট্টা বিদ্রুপের দলে পড়ে, যেমন গোপাল ভাঁড়ের রহস্য। ইংরেজি মতে আবার রহস্যের নানা ব্যাখ্যান–এডভেঞ্চার, থ্রিলার, শিকার, ক্রাইম, ডিটেকটিভ, মিস্ট্রি, স্পাই—নানান শব্দের ফাঁকে-ফোঁকরে রহস্য ছড়িয়ে আছে। আমরা এই শেষের দিকের সবধরনের রচনাকে একত্র করে ভেবে নিচ্ছি। এছাড়া উপায় নেই। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে শূদ্রকের মৃচ্ছকটিকে শর্বিলক-এর চুরি করতে যাওয়ার মধ্যে রোমাঞ্চের গন্ধ আছে—কিন্তু তাকে কোনোক্রমেই গোয়েন্দা-কাহিনি বলা যাবে না। বাংলা গোয়েন্দা কাহিনি ইংরেজি গোয়েন্দা রচনার অনুবাদের হাত ধরে এসেছে। অতএব ইংরেজি মতগুলোকে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

    ইংরেজি মতের কথা মনে হলেই এডগার অ্যালেন পো-এর কথা আগে মনে পড়ে যাবে। তাঁর The Murders in the Rue Morgue- পৃথিবীর প্রথম ডিটেকটিভ গল্প (১৮৪১ খ্রি.)। এর পরে নাম করতে হয় উইলকি কলিন্স-এর। তাঁর মুন স্টোন অথবা দি উওম্যান ইন্‌ হোয়াইট-এর ইন্সপেক্টর বাকেট ছিলেন ডিটেকটিভদের প্রথম সেরা মানুষ। তারপরে এসেছেন শার্লক হোমস্ আর ওয়াটসন নিয়ে আর্থার কোনান ডয়েল। আগাথা ক্রিস্টির এরকুল পোয়রোর কথা রসিকমাত্রেই জানেন। জেমস্ বন্ড, হ্যাডলি চেজ তো হাল আমলের ব্যাপার। নইলে Mystries of the Court of London (বাংলায় ‘লণ্ডন রহস্য’ নামে কয়েকখণ্ডে অনূদিত) পুরনো আমলে কম সাড়া জাগায়নি। এসব নামের উল্লেখ এজন্যে যে বাংলা রহস্য কাহিনি এগুলির কাছে সবচেয়ে ঋণী। পাঁচকড়ি দে মশাই কি গোবিন্দরাম বা দেবেন্দ্রবিজয় নির্মাণ করতে পারতেন, যদি না পুলিস ইন্সপেক্টর বাকেট তাঁর চোখের সামনে ঘোরাফেরা না করতেন?

    ॥২॥

    কাজেই বাংলা সাহিত্যে ডিটেকটিভ রচনার আবির্ভাব হতে দেরি হয়েছিলো। ভালো ডিটেকটিভ গল্প লেখা খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। হত্যা, খুন, রাহাজানি, জোচ্চুরি এসব কাজের মধ্যে একটা অপরাধজনক মৌজ আছে। এর গল্পকে হতে হয় ঘামছোটানো ঘুম-তাড়ানো চরিত্র। আমাদের মধ্যে গোপন অপরাধ-বোধকে জাগ্রত করে তাতে সুড়সড়ি দিতে হবে—গল্পটা হবে পো-এর ভাষায় ‘Somewhat Peculiar Narrative.’ লেখককে হতে হবে একইসঙ্গে নাট্যকার, সাংবাদিক, ঐতিহাসিক, মনস্তাত্ত্বিক, বিজ্ঞানী এবং শিল্পীও। চাই কৌতূহল শেষ অবধি জিইয়ে রাখার দুঃসাধ্য সংযম এবং আর্ট। রহস্যময়তাকে বজায় রাখতে হবে আদ্যোপান্ত। ভারতের আপাত নিস্তরঙ্গ জীবনে এতোগুলো বিপ্লব একসঙ্গে ঘটেনি। ঘটলো ইংরেজ আগমনের পর অপরাধ প্রবণতার বিচিত্র পরিবেশ সৃষ্টির ফলে। ইংরেজি সাহিত্য এবং ব্রিটিশ সরকার দুই হাত ধরে অতএব রহস্যকাহিনি বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় এসে পড়ল। এর মধ্যে ছোট গল্পের যথার্থ একটা কাঠামোর সঙ্গে বাঙালি রসিক পরিচিত হবার সুযোগ পেয়েছেন। কারণ তখনি আবির্ভূত হচ্ছেন বাংলা ছোটগল্পের জন্মদাতা, পালয়িতা এবং অভিভাবক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অভিযোগ, তাঁর রহস্যময় গল্পের পিছনে ছিলো অ্যালেন পো-র রহস্যময়তার ছায়া। রবীন্দ্রনাথকে অভিযুক্ত করবো কি, স্বয়ং কোনান ডয়েল শার্লক হোমসের চরিত্র কি আঁকতে পারতেন যদি না সামনে পোর ডিটেকটিভ Dupin প্রত্যক্ষ না থাকতেন! তাঁর প্রভাবেই ডয়েল Professor Challenger-কে নিয়ে Science fiction লেখেননি?

    অতএব সত্যেন্দ্রনাথের লাইব্রেরি থেকে পো নিয়ে রবীন্দ্রনাথ মগ্ন হলেন এবং Golden Bag এবং গুপ্তধন, The Cask of Amontillado আর The Tell – Tale-Heart ও সম্পত্তি সমৰ্পণ, Premature Burial এবং জীবিত ও মৃত ইত্যাদি মিতালি পাতিয়ে বসলো। কঙ্কাল, নিশীথে, ক্ষুধিত পাষাণ, ডিটেকটিভ গল্পগুলি অচিরে স্বকীয়তায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

    ॥৩॥

    একটু আগে যে ব্রিটিশ রাজত্বের কথা বলছিলাম। তার একটা কারণ চোর-ডাকাতের প্রাধান্য যেমন বেড়েছিল, তেমনি ধনীদের অত্যাচারও বেড়েছিলো। বেন্টিকের আমলে শ্লিম্যানের চেষ্টায় ঠগিদমন হলেও অপরাধীর সংখ্যা কমেনি। “থানাদার” স্থলে ‘দারোগা’রা এলেন। এমনি এক দারোগা ছিলেন গিরিশচন্দ্র বসু (এ পদে যোগ দেন ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে)। ডাকাতি দমনে তাঁর পটুত্ব ছিল। তাঁর চোখে দেখা অপরাধীদের অপরাধ ও তার দমনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁর ঝুলিতে ছিল। তাই দিয়ে তিনি লিখে বসলেন ‘সেকালের দারোগার কাহিনী’–বিশ্বস্ত এবং রোমাঞ্চকর আত্মজীবনীর ভঙ্গিতে। প্রকাশিত হলো ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে। সত্যি কথা বলতে বাংলার মাটিতে অপরাধ ও তার দমনের একটা বিশ্বাসযোগ্য চিত্র প্রথম পেলাম এই বইটিতে। একে গোয়েন্দাকাহিনি কেউ বলবো না—কিন্তু তার সূত্রপাত তো বলতেই পারি।

    সঠিক গোয়েন্দা কাহিনি পাবার জন্যে আমাদের আরও সাত-আট বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।১৮৯৬। তার আগেই অবশ্য আমরা ক্রাইম-এর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম বঙ্কিমচন্দ্রের বিভিন্ন রচনায়—ইংরেজি রাজমোহনস্ ওয়াইফ, কৃষ্ণকান্তের উইল প্রভৃতিতে। কিন্তু রীতিমতো রহস্য-রোমাঞ্চ নিয়ে প্রথম আবির্ভূত হলেন প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় এবং বাঁকাউল্লার দপ্তরের লেখক বরকতুল্লা (?)। দুজনকেই ব্রাকেটে প্রথম বলা যেতে পারে বই প্রকাশের দিক থেকে।

    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৫৫-১৯১৭) আদরিণী (১৮৮৭), ডিটেকটিভ পুলিস-১ম কাণ্ড (১৮৮৭) পাহাড়ে মেয়ে (১৮৮৯), বনমালীদাসের হত্যা (১৮৯১) প্রভৃতি গ্রন্থের রচয়িতা হলেও তিনি খ্যাতি পেয়েছিলেন ‘দারোগার দপ্তর’ লিখে। এটি ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে (১ম সংখ্যা) ধারাবাহিকভাবে পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হতে আরম্ভ করে। ৪০-৪৮ পৃষ্ঠার এই পুস্তিকাগুলি বিভিন্ন নামে অবশ্য প্রকাশিতহত। যেমন ১৭৯ সংখ্যার নাম ছিল ‘প্রতিশোধ’। ১৫৯ সংখ্যার নাম ছিল ‘দীর্ঘকেশী’। ১৫৭ সংখ্যার নাম (১৪ বর্ষ ১৩১৩ব.) “ভীষণ হত্যা অর্থাৎ একটি স্ত্রীলোক হত্যার ভীষণ রহস্য”। ‘দারোগার দপ্তর’ এর প্রচার সংখ্যা ছিল প্রচুর। খুব লক্ষ্য করার ব্যাপার ইংল্যান্ডে ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে শার্লক হোমস্-এর আবির্ভাবের মাত্র এক বছর পরে প্রিয়নাথের ‘ডিটেকটিভ পুলিস’ বাজার মাত করে দেয়। Indian Mirror পত্রিকা (২৫ জানুয়ারি ১৮৮৮) এর প্রশংসা করে লিখেছিল :

    We have also read with attention another book composed by the same author, and styled. ‘Detective Police’. The book has also been written by following the story of a man who was actually tried by the High Court of Calcutta on the most serious charges and is up to date undergoing the term of punishment in the criminal jail of Alipore.

    ১৪নং হুজুরি মলস্ লেন বৈঠকখানা ‘দারোগার দপ্তর’ কার্যালয় থেকে (সুকুমার সেন জানিয়েছেন ১৬২ নং বহুবাজার স্ট্রিট এর কার্যালয় ছিল। তবে কি ঠিকানার পরিবর্তন হয়েছিল?) উপেন্দ্রভূষণ চৌধুরি কর্তৃক প্রকাশিত হয়ে ‘দারোগার দপ্তর’ খণ্ডে খণ্ডে আত্মপ্রকাশ করত।

    এই সময়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল ‘বাঁকাউল্লার দপ্তর’। এর দারোগা মশায়ের নাম ছিল বরকাতুল্লা—‘শ্রীযুক্ত কোতোয়া, বরকতুল্লা নাম’। একদা সুকুমার সেন অনুমান করেছিলেন বইটির ‘সম্ভাব্য লেখক’ প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়। এই অনুমান অবশ্য তথ্যসমর্থিত নয়। তবে বরকতুল্লা নামটি লোকমুখে বকাউল্লা থেকে বাঁকাউল্লায় পরিণত হয়েছিল সম্ভবত। এর কাহিনির মূল ছিলো ইংরেজি পরে বাংলায় রূপান্তরিত হয়ে ‘বাঁকাউল্লার দপ্তর’, নাম পায়। বারোটি অধ্যায়ে বিভক্ত এর প্রতিটি অধ্যায়ের নামকরণ ছিল লোমহর্ষক। এইভাবে গিরিশচন্দ্র-বঙ্কিমচন্দ্র-প্রিয়নাথদের দিয়ে বাংলা সাহিত্যের পাঠক ফাঁড়ি-দারোগা-থানা-পুলিশের একটা রোমাঞ্চিত স্বাদ পেতে শুরু করেছিল। বাঁকাউল্লার দপ্তরের মধ্যেই নারীরা ডিটেকটিভ কাহিনীর অনিবার্য চরিত্রে পরিণত হতে শুরু করেছিল।

    এই নারী-হত্যা-নারীহরণ-ডাকিনীবিদ্যা প্রত্যক্ষভাবে এসে গিয়েছিল ‘বিলাইতি’ রহস্যরস আর দেশি কাহিনির জারজসন্তান হিসেবে ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের (১৮৪২-১৯১৯) কলম মারফৎ। রেনল্ডসের Joseph Wilmot-এর ছায়া অবলম্বনে এই এক নূতন! আমার গুপ্তকথা (১৮৭০-৭৩) নামে ৮৭০ পৃষ্ঠার এই বিশাল খিচুড়িরসের বইটির অনুক্রম হিসেবে ১৮৭৩-৭৯ সালে ছয় বছর ধরে ‘আমার গুপ্তকথা।—আশ্চর্য!!!’ নামে ধারাবাহিক প্রকাশের পর তিনখণ্ডে মোট ৪৯৬ পৃষ্ঠার ‘তুমি কি আমার’ গ্রন্থনামে পরবর্তী বইটি প্রকাশিত হল। আর ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ৬৪৪ পৃষ্ঠার আর একটি ঢাউস ‘নবন্যাস’ প্রকাশিত হল ‘আর এক নতুন! হরিদাসের গুপ্তকথা’। আসলে এই ‘গুপ্তকথা’ প্রকাশ্য করেই ভুবনচন্দ্র খ্যাতিমান হয়ে পড়লেন। অবশ্য রেনল্ডস-এর বইটির বঙ্গানুবাদ দুখণ্ডে মোট (৭৪৫+৭৮৪) ১৫২৯ পৃষ্ঠায় প্রকাশকালে নাম ছিল ‘বিলাতি গুপ্তকথা’। কিন্তু প্রত্যক্ষ ডিটেকটিভ বইগুলির মধ্যে ছিল চার খণ্ড ‘মার্কিন পুলিস কমিশনার’ (১ম খণ্ড হারাধনের অনুসন্ধান : ১৮৯৬, পৃ. ৬৪, ২য় খণ্ড মেয়ে চুরি : ১৮৯৬, পৃ. ৬০;৩-৫ খণ্ড—অপূর্ব নারী ডিটেকটিভ : ১৮৯৬, পৃ. ২৬৮ এবং ৬ষ্ঠ খণ্ড জলবিবি : ১৮৯৬, পৃ. ৬০) গুপ্তচর (১৮৯৮), ইউজিন সু রচিত ওয়াণ্ডারিং জু অবলম্বনে রচিত চারখণ্ডে ঠাকুরবাড়ীর দপ্তর। অভিশপ্ত য়িহুদী (১৯০০), নন্দনকানন সিরিজের তৃতীয় বল্লরী চন্দ্রমুখী (১৯০২), ঐ সিরিজের মারী কোরেলির Sorrows of Satan এর বঙ্গানুবাদ ‘সন্তপ্ত সয়তান’ (১৯০৩-৪), সয়তানী (১৯০৬), ডিউক তারাচাঁদ (১৯২০), গোয়েন্দার গল্প (মাইকেল মোহনচাঁদ) প্রভৃতি। তাঁর খ্যাতির অন্য আর একটি কারণ ছিলো রেনল্ডস-এর বিখ্যাত Mysteries of Court of London-এর খণ্ডশ অনুবাদ ‘লণ্ডন রহস্য’ (১৯১২-১৪)।

    এই ফাঁকে একজন কৃতী লেখকের কথা বলে নিই। ভদ্রলোক যে কেন আর রহস্য কাহিনি লিখলেন না জানিনা, লিখলে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হতো। কারণ তাঁর আগে ‘ভদ্রস্থ’ কোনো লেখক এপথে পা বাড়াননি। তিনি নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ‘তপস্বিনী’ উপন্যাস লিখে যিনি খ্যাতি-অখ্যাতি দুই-ই কুড়িয়েছিলেন। ‘ভারতী ও বালক’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পটি ছিল ‘চুরি না বাহাদুরি’। রহস্যজনক গোয়েন্দা গল্পের যথার্থ স্রষ্টা তাকে বলা চলতো যদি তিনি এপথে থাকতেন। রোমাঞ্চকর পরিবেশ সৃষ্টি, ভৌতিক আবেশ রচনা ও শেষাবধি কৌতূক নির্মাণে সিদ্ধহস্ত লেখক ট্রেনের মধ্যে দুই ভদ্রলোকের চুরি ও গোয়েন্দাদের ব্যর্থতার একটা ঠাসবুনুনিতে পাঠকদের অভিভূত করে রাখেন। শেষ অবধি চোর টাকা পয়সা দিয়ে যায় এক অদ্ভুত কৌশলে। গল্পে হয়তো চমৎকারিত্ব নেই, কিন্তু আছে পরিবেশ রচনার কৃতিত্ব। প্রিয়নাথের ‘Detective Story গুলি বঙ্গভাষায় মৌলিক Sensational novel-রূপে পরিগণিত হইবার উপযোগী’ বলে সাহিত্য সমালোচক মন্তব্য করলেও এগুলিকে সাহিত্য পর্যায়ভুক্ত করা যাবে কিনা বলা মুস্কিল। সেদিক থেকে নগেন্দ্রনাথের রচনাটি সাহিত্যরসে টইটম্বুর।

    সাহিত্যরস থাকুক না থাকুক গোয়েন্দারহস্য একালের পাঠকদের রুচি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছিল। আসলে নতুন স্বাদের এই রচনা পাঠককে অভিভূত করতে সমর্থ হচ্ছিল। শরচ্চন্দ্ৰ দেব (সরকার)-এর ক্রাইম কাহিনিগুলির বিক্রির হিসেব থেকে এটা সহজে বোঝা যায়। শরচ্চন্দ্র সরকার ‘সংকলিত গোয়েন্দা কাহিনি নামে ডিটেকটিভ গল্প মাঝে মাঝে প্রকাশিত হত। প্রত্যেক খণ্ড সপ্তাহে দুদিন করে সাময়িকপত্রের মতো ফর্মা ধরে বিক্রি হত। এ-সম্পর্কিত একটি বিজ্ঞাপনের বয়ান থেকে জানতে পারি, “গোয়েন্দা কাহিনী” এপর্যন্ত প্রায় পাঁচ লক্ষ ফর্মা বিক্রীত হইয়াছে।’ শরচ্চন্দ্র তীর্থে বিভ্ৰাট অথবা গুমখুন নামে বইপত্রও লিখেছিলেন। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, ‘ভাল ভাল লোকে ও যে গোয়েন্দা কাহিনি পড়তে শুরু করেছিলেন তার প্রমাণ লেখকেরা অনেক সময় এই সব ভালো ভালো লোককে বই উৎসর্গ করতেন। সুকুমার সেন এঁদের কয়েকজনের নাম জানিয়েছেন—মহেন্দ্ৰনাথ বিদ্যানিধি, নগেন্দ্রনাথ ঘোষ, কালীপ্রসাদ ঘোষ, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রাজনারায়ণ বসু, দামোদর মুখোপাধ্যায়, চন্দ্রনাথ বসু, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বিনয় কৃষ্ণ দেব, সারদাচরণ মিত্র প্রভৃতি। গল্পগুলির সঙ্গে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে এ সময়ে আসতে শুরু করেছিল ভালো ভালো ছবির আকর্ষণও। গোয়েন্দা কাহিনি চরিত্র হয়ে প্রকাশিত হতে আরম্ভ করেছিল প্রথমযুগের ঠিক অব্যাবহিত পরেই। ‘রঘু ডাকাত’ ছিল এদের মধ্যে অগ্রগণ্য।

    এসময়ে অনেক অকিঞ্চিৎকর লেখকের আবির্ভাব ঘটেছিল, তাদের কথা আমরা তেমন করে বলতে চাইছি না।

    ॥ 8 ॥

    বাংলা ডিটেকটিভ উপন্যাসের দ্বিতীয় ভূবন নির্মাণে এগিয়ে এসেছিলেন তিন বিখ্যাত রহস্যরসিক পাঁচকড়ি দে, দীনেন্দ্রকুমার রায় এবং সুরেন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য। আর একজনেরও নাম করতে পারি হরিসাধন মুখোপাধ্যায়।

    পাঁচকড়ি দে (১৮৭৩-১৯৪৫) এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন। বঙ্গ-বিহার- উড়িষ্যা-আসাম পর্যন্ত তিনি খ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। ছোটোগল্প লেখার তেমন চেষ্টা তিনি করেন নি—কিন্তু ছোটো আকারের রহস্য কাহিনী লিখেছিলেন। পাঁচকড়ির খ্যাতি শুধু গল্পের প্লটের জন্য নয়, তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথম দুটি গোয়েন্দাকে আমদানি করলেন ইংরেজি অনুকরণে। এঁরা হলেন দেবেন্দ্রবিজয় ও তাঁর সহায়ক-কাম-গুরু অরিন্দম। আগেই বলেছি পুলিশ ইন্সপেক্টর বাকেট সাহেব ছিলেন তাঁর আদর্শ।

    শরচ্চন্দ্র দেবের জনপ্রিয়তার কথা আগেই বলে এসেছি। কিন্তু যার বই নিয়ে প্রথম কাড়াকাড়ি প’ড়ে গেল লাইব্রেরিতে লাইন পড়লো, সংস্করণের পর সংস্করণ ছাপা হতে শুরু করলো—তিনি পাঁচকড়ি দে। তাঁর হাতের কাছে আছে শার্লক হোমস আর আছে ‘যমুনা পত্রিকা’। যমুনা পত্রিকা মানে ফণীন্দ্রনাথ পাল আর তাঁর দাদা যতীন্দ্র পাল। দুই পাল-ভাই আর পাঁচকড়ি মিলে যেন বই লেখার প্রতিযোগিতায় নামলেন। যতীনবাবু লিখলেন কুলবধূ, গৃহিণী, ঘরের লক্ষ্মী, ধর্মপত্নী নাম দিয়ে অজস্র বই। তাঁর ভাই লিখলেন ইন্দুমতী, ছোট বৌ, বন্ধুর বৌ, মধুমিলন প্রভৃতি। আর বন্ধু পাঁচকড়ি বাজার সরগরম করে ফেললেন মায়াবী, মায়াবিনী, হত্যাকারী কে? নীলবসনা সুন্দরী দিয়ে। ‘যমুনা’ আর ‘জাহ্নবী’তে জোয়ার বইতে লাগল তাই নিয়ে। পাঁচকড়ি কলকাতার তিন জায়গায় তিনটে প্রাসাদ নির্মাণ করলেন। হবেই না বা কেন? ১০০,০০০ লক্ষাধিক বিক্রি হয় তাঁর বই—মায়াবী, মনোরমা, মায়াবিনী, পরিমল, জীবনস্মৃত রহস্য, হত্যাকারী কে? লক্ষ টাকা, হত্যারহস্য, ভীষণ প্রতিশোধ, ভীষণ প্রতিহিংসা, কালসর্পী, নীলবসনা সুন্দরী, গোবিন্দ রাম, রহস্য বিপ্লব, মৃত্যু বিভীষিকা, পরিতজ্ঞা পালন, বিষম বৈসূবন, জয় পরাজয়, নরবলি, মৃত্যুরঙ্গিনী, শক দুহিতা, হরতনের নওলা, সুহাসিনী, মরিয়ম প্রভৃতি। ‘বিশেষ সুবিধা—একত্রে ৫ কিংবা তদূর্ধ্ব মূল্যের এই উপন্যাস লইলে মাশুল লাগে না।’ উপরন্তু ‘সতী শোভনা’ সঙ্গে ফ্রি। সমস্ত বই অনুবাদিত হয়ে চলেছে হিন্দি, উর্দু, তামিল, তেলেগু, ‘কেনেদী’, মারাঠি, গুজরাটি, সিংহলি, ইংরেজি—দেশি-বিদেশি ভাষায়। ছাপা ভালো, ছবিও সব মনোরম। বই পড়ে কখনও হিতবাদী লেখে “রচনাচাতুর্য চরিত্র অঙ্কনে তিনি বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করিয়াছেন, কখনও Statesman লেখে- This is a sensational Hypnotic Novel in Bengali’ তাঁর জনপ্রিয়তা রবীন্দ্রনাথকে পর্যন্ত ধাওয়া করেছে। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজের বছরে (১৯১৩) পাঁচকড়ি তাঁকে উৎসর্গ করেছেন ‘জীবমৃত-রহস্য’–’শ্রদ্ধাস্পদ কবিবর/শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/মহাশয় করকমলেষু’। সুকুমার সেন অনুমান করেছেন রবীন্দ্রনাথের ‘নিশীথে’ পড়ে তিনি ‘শ্রীমতী শোভনা’ লিখেছিলেন।

    খুব মজার একটা কাকতলীয় ব্যাপার ঘটে গেলো পাঁচকড়ির শেষ জীবনে। হঠাৎ বন্ধু যতীন্দ্রনাথ পাল মারা গেলেন। যতীন্দ্রনাথ পাল সাহিত্যিক ধীরেন্দ্রনাথ পালের পুত্র। মাত্র ৩৬/৩৭ বছর বয়সের মধ্যেই ছোটোবড়ো মিলিয়ে প্রায় ২০০ খানা বইয়ের লেখক। তাঁর মৃত্যুতে পাঁচকড়ি ‘জীবনৃত’ হয়ে গেলেন। তাঁর রহস্যকাহিনির ‘উৎস’টি গেল শুকিয়ে। বন্ধুর মৃত্যুর পর আড়াই দশকের বেশি বেঁচে রইলেন তিনি—কিন্তু আর কোনো বই লিখতে পারলেন না। কু-লোকে নানা কথা বলে। বলেন—তাঁর রচনায় নাকি শরৎচন্দ্র সরকার, ধীরেন্দ্রনাথ পাল এবং রাজানারায়ণ বসুর পুত্র মনীন্দ্রনাথ বসুর হাতের গন্ধ পান তাঁরা।

    ॥ ৫ ॥

    পাঁচকড়ি দে-র জন্ম ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে। বাবার নাম কেদারনাথ দে। বাল্য শিক্ষার সূচনা ভবানীপুরের একটি স্কুলে। খুব বেশি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনো করেছিলেন বলে বলা যায় না। দেখতে বেশ সুরুপুষ। শুধু রহস্য উপন্যাস লিখেই যা উপার্জন করে গেছেন তা তিন পুরুষে ভোগ করার উপযুক্ত। জোড়া সাঁকোর ৭নং শিবকৃষ্ণ দাঁ লেনে তাঁর একটি বইয়ের দোকান ছিল—”পাল ব্রাদার্স”। তিনি দে দোকান কেন পাল ব্রাদার্স হল ভাবতে গেলে মনে হয়- তিনি সম্ভবত ধীরেন্দ্রনাথ পাল যতীন্দ্রনাথ পালেদের বকলমা নিয়েছিলেন। একটি, ছাপাখানারও তিনি মালিক হন বাণী প্রেস।

    পাঁচকড়ির জনপ্রিয়তার একটা দৃষ্টান্ত দিই। হিতবাদী পত্রিকা সে সময়ে মন্তব্য করেছিলেন—”রচনা চাতুর্যে চরিত্র অঙ্কনে তিনি বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। আমরা দেওয়ান গোবিন্দরাম পাঠে প্রকৃতই পরম প্রীতি লাভ করিয়াছি। এই জনপ্রিয়তার মূলে ছিল তাঁর বিদেশি রোমাঞ্চ সাহিত্যের আত্মকরণ। তার প্রমাণ তিনি অনেক বইতে রেখে গেছেন। একটি বইয়ের পাদটীকায় তিনি লিখে গেছেন—”সঞ্জীবচন্দ্রই এরূপ একটা ক্ষমতাপ্রাপ্ত দেখিয়া কেহ কেহ বিস্মিত হইবেন সন্দেহ নাই। এই বিদ্যা অতিশয় ধৈর্য্য এবং বিপুল অধ্যবসায় সাপেক্ষ। ইহা আমাদিগের দেশীয় বিদ্যা নহে, ইউরোপীয়। এখন আমাদের দেশে অল্পসংখ্যক ব্যক্তি এই বিদ্যা শিক্ষা করিয়াছেন। ইহার নাম (Ventroquilism) ভেন্ট্রোকুইলিজম। কেবল অপরের স্বর অনুকরণে সক্ষম হইলে ভেন্ট্রোকুইলিস্ট হইতে পারা যায় না—শব্দকে ইচ্ছামত স্থানে উত্তেজিত করা প্রয়োজন। আমরা বৃহৎ অট্টালিকা মধ্যে, প্রান্তরে, নদীতটে, অথবা কোন নির্জন স্থানে দাঁড়াইয়া কোন শব্দ করিবামাত্র চারিদিক হইতে প্রতিধ্বনি শুনতে পাই;যিনি নিজের স্বর অব্যক্ত রাখিয়া কেবলমাত্র সেই প্রতিধ্বনিতে ইচ্ছামত দূরে সুস্পষ্টরূপে উত্তেজিত করিতে পারেন, তিনি প্রকৃত ভেস্ট্রোকুইলিস্ট।’

    তাঁর সময়ে উপন্যাস রাজত্বে সম্রাটের স্থানে আসীন বঙ্কিমচন্দ্র। সেকারণে ভাষার ভঙ্গিমায় তিনি বঙ্কিমচন্দ্রকে অনুসরণ করেছেন—’প্রভাত হইলে কাহার? বিষাদ, আনন্দ কাহার উত্তমর্ণের, তাহার একদিনের সুদ বাড়িল। আর কাহার, কয়েদী তস্করের; তাহার একদিনের মেয়াদ কমিল।’

    আমরা এই খণ্ডে পাঁচকড়ি দে-রচিত পাঁচটি রহস্য উপন্যাসের সংকলন ঘটিয়েছি। পরবর্তী খণ্ডগুলিও একে একে প্রকাশিত হবে। সেখানে পাঁচকড়ির রচনা-বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমরা আরও কথা বলবো—যেমন তাঁর রচিত গোয়েন্দা চরিত্র, সহকারী গোয়েন্দা-চরিত্র, পুলিশের ভূমিকা ইত্যাদি প্রকাশ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হবে। এখন সংকলিত উপন্যাস-পঞ্চকের মধ্যে তিনটি উপন্যাস সম্পর্কে সমসাময়িক কালের বক্তব্য তুলে দিয়ে তৎকালীন প্রতিক্রিয়ার কথা একালের পাঠকের সমীপে নিবেদন করি—

    মায়াবিনী উপন্যাসের আগে তিনি ‘মনোরমা’ উপন্যাস লেখেন। এই মায়াবী যখন ‘গোয়েন্দার গ্রেপ্তার’ সাময়িকপত্রে ধারাবাহিকভাবে বের হচ্ছিল—তখন এর নাম ছিল ‘জুমেলিয়া’। তিনফর্মা ছাপা হয়েছিল, পরে বাকি অংশটি লিখে তিনি একেবারে বই আকারে যখন প্রকাশ করলেন—তখনই নাম বদলে হয় ‘মায়াবিনী’। তিনি চেষ্টা করতেন প্রতি পুনর্মুদ্রণে বইকে পরিমার্জিত করার। যেমন দ্বিতীয়বার ছাপার সময় মায়াবিনী উপন্যাসের ভূমিকায় লেখেন—’এখানে ইহার অনেকাংশ পরিবর্ধিত হইয়াছে, অনেকাংশ পরিত্যাগ করা গিয়াছে, এবং কোন কোন স্থান পুনর্বার লিখিত হইয়াছে। মুদ্রাঙ্কণকার্যও পূর্বাপেক্ষা সুসম্পাদিত করা গেল এবং তিনখানি ছবি দেওয়া হইল।’

    মায়াবিনীর আগে যে ‘মায়াবী’ রহস্যন্যাস লেখা হয়েছিল—সেটি সম্পর্কে ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকা ২ জ্যৈষ্ঠ ১৩১২ তারিখে মন্তব্য করেছিলেন—

    “আমরা অন্যান্য অনেক লেখকের ও অনেক ডিটেকটিভ উপন্যাস পড়িয়াছি কিন্তু তন্মধ্যে কোনখানি শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বাবু লিখিত উপন্যাসের ন্যায় হৃদয়গ্রাহী নয় নাই। হয়ত সেগুলিতে নানা রকমের বীভৎস ঘটনার দ্বারা কেবল একটা গল্প তৈয়ারী করা হইয়াছে মাত্র, কিন্তু বাঁধন নাই, গল্প সাজাইবার যে একটা কৌশল থাকা দরকার তাহাও নাই। নতুবা হয়ত কোন একখানি ইংরাজি বা ফরাসী উপন্যাসের ধারাবাহিক অক্ষম অনুবাদ। ‘মায়াবী’র ঘটনা সর্ব্বাঙ্গসুন্দর। ভাষাও গ্রন্থকারের নিজস্ব; যেমন প্রাঞ্জল তেমনি মধুর। গ্রন্থকারের গল্প সাজাইবার বেশ হাত আছে—রহস্য বিন্যাসের ক্ষমতাও অতুলনীয়। একবার পড়িতে আরম্ভ করিলে শেষ পৃষ্ঠার শেষ পংক্তি পর্যন্ত পাঠককে বিপুল আগ্রহে অগ্রসর হইতে হয়।”

    এবার ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘নীলবসনা সুন্দরী’ বইটি সম্পর্কে কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন ‘জাহ্নবী’ পত্রিকায় প্রথম বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যায় যে সমালোচনাটি করেছিলেন—তা উদ্ধার করে দিই—

    “নীল বসনা সুন্দরী, হত্যাকারী কে? শ্রী পাঁচকড়ি দে প্রণীত। এই দুইখানি ডিটেকটিভ উপন্যাস আমরা স্বীকার করতে বাধ্য, আমরা সচরাচর ইংরাজি ও ফরাসীস্ লেখকদিগের রচিত যেসব ডিটেকটিভ উপন্যাস পাঠ করি, তদপেক্ষা সমালোচ্য উপন্যাস দুখানি কোন অংশে হীন নহে। ভাষা বেশ সরল, সুন্দর যেন জলধারার মত বহিয়া যাইতেছে। লেখক সুনিপুণ কৌশলে, মুন্সিয়ানার সহিত, ওস্তাদির সহিত পাঠককে গ্রন্থের প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করিতে বাধ্য করেন। কৌতূহল চরিতার্থ করিবার জন্য এক দুর্দমনীয় ব্যাকুলতা জন্মে। লেখকের পক্ষে ইহা কম বাহাদুরীর বিষয় নহে।”

    ‘বঙ্গভূমি’ পত্রিকা (১৯ মাঘ ১৩১১) পাঁচকড়ির সবচেয়ে সাড়াজাগানো রচনা ‘নীলবসনা সুন্দরী’ সম্পকে লিখেছিলেন :

    “নীলবসনা সুন্দরী বঙ্গ সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ডিটেকটিভ ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি দে প্রণীত। ইনি সাহিত্য সমাজে সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। আমরা এই পুস্তক অত্যন্ত আগ্রহের সহিত পাঠ করিয়াছি। পূর্বে বাংলায় ভালো ডিটেকটিভ উপন্যাস ছিল না, শ্রীযুক্ত পাঁচকড়িবাবু বঙ্গীয় পাঠকগণের সে অভাব পূরণ করিয়াছেন। আমরা তাঁহার ডিটেকটিভ উপন্যাসের সমাদর করি। তাঁহার ন্যায় প্রতি পরিচ্ছেদে এমন নব নব কৌতূহল সৃষ্টি করিবার ক্ষমতা কাহারও দেখি না। যদি এমন উপন্যাস পড়িতে চাহেন, যাহা একবার পড়িয়া তৃপ্তি হয় না, দশবার পড়িয়া দশ জনকে শুনাইতে ইচ্ছা করে তবে এই ‘নীলবসনা সুন্দরী’ পাঠ করুন। পড়িতে পড়িতে যেন এই উপন্যাস চুম্বকের আকর্ষণে পাঠককে টানিয়া লইয়া যায়। ঘটনা কৌতূহলজনক, ভাষাও তেমন সরল ও তরল, যেন নির্ঝরিণীর ন্যায় তরতর বেগে বহিয়া যাইতেছে। শব্দচ্ছটাও অতি সুন্দর। বঙ্গ সাহিত্যে গ্রন্থকারের ডিটেকটিভ উপন্যাস যথেষ্ট সমাদর লাভ করিবে।”

    “হত্যাকারী কে?” (দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯০৭) সম্পর্কে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় (৩ বর্ষ ১ সংখ্যা) বিখ্যাত সমালোচক চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায় মন্তব্য করেছিলেন :

    “হত্যাকারী কে? পাঁচকড়ি দে প্রণীত একখানি ডিটেকটিভ গল্প এবং সে হিসাবে ইহাতে বিবৃত ঘটনার সমাবেশ এবং অনুসন্ধানের প্রণালীতে কারিকুরীর পরিচয় পাওয়া যায়। অক্ষয়বাবু যে একজন সুদক্ষ ডিটেকটিভ ইহা গ্রন্থকার দেখাইতে সমর্থ হইয়াছেন। ভাষাও প্ৰশংসার্হ।”

    আর ১৯ ভাদ্র ১৯১০ তারিখের ‘বসুমতী’ মন্তব্য করেছিলেন—

    “গল্পটি বেশ হইয়াছে, গল্পটি আদ্যোপান্ত পাঠ করিবার পর সত্য সত্যই জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা করে হত্যাকারী কে? ইহাতে লেখকের বাহাদুরী প্রকাশ পাইয়াছে। যে পাঠকগণ ডিটেকটিভ গল্প পাঠ করিতে বিশেষ উৎসুক, এই পুস্তকখানি তাঁহাদের নিশ্চয়ই ভালো লাগিবে।”

    পাঁচকড়ির বই ইংরেজির মতও বহু ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়ে তাঁর জনপ্রিয়তার পরিসরকে বহুধাবিস্তৃত করেছিল। সেই প্রবাহকে একালেও বহমান রাখার জন্যে আমাদের খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশের এই আয়োজন।

    দোলযাত্রা ১৪১৬
    বারিদবরণ ঘোষ

    সূচি

    • নীলবসনা সুন্দরী
      ‘নীল বসনা সুন্দরী’ পাঁচকড়ি দে’র একটি সাড়া জাগানো উপন্যাস। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে। ১৩১১ বঙ্গাব্দের ১৯শে মাঘ ’বঙ্গভূমি’ পত্রিকায় উপন্যাসটি সম্বন্ধে লেখা হয়েছে— “‘নীলবসনা সুন্দরী’ বঙ্গ সাহিত্যের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ডিটেক্টিভ ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি দে প্রণীত। ইনি সাহিত্য সমাজে সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। আমরা এই পুস্তক অত্যন্ত আগ্রহের সহিত পাঠ করিয়াছি। পূর্ব্বে বাংলায় ভালো ডিটেক্টিভ উপন্যাস ছিল …
    • পাঁচকড়ি দে রচনাবলী
      সম্পাদনা : বারিদবরণ ঘোষ করুণা প্রকাশনী, কলকাতা প্রথম প্রকাশ : ১লা বৈশাখ, ১৪১৭ প্রচ্ছদ : ইন্দ্রনীল ঘোষ ॥ রোমাঞ্চন ॥ বাংলা রহস্যকাহিনির একটা পর্বের ইতিবৃত্ত লিখতে গিয়ে বড়ো ধন্দে পড়া গেছে। কাকে রহস্য কাহিনি বলা যাবে? সংস্কৃত মতে, এমনকি বাংলা মতেও ‘রহস্য’ অনেকটা ঠাট্টা বিদ্রুপের দলে পড়ে, যেমন গোপাল ভাঁড়ের রহস্য। ইংরেজি মতে আবার রহস্যের নানা ব্যাখ্যান–এডভেঞ্চার, থ্রিলার, শিকার, ক্রাইম, …
    • মায়াবিনী
      বিজ্ঞাপন প্রথম বার। গতবর্ষে “গোয়েন্দার গ্রেপ্তার” নমাক সাময়িক পত্রিকায় “জুমেলিয়া” নামে এই পুস্তকের ৩ ফর্ম্মা বাহির হইয়াছে। এক্ষণে অবশিষ্ট ফৰ্ম্মাগুলি মুদ্রাঙ্কিত করিয়া পুস্তক সম্পূর্ণ করা গেল। “জুমেলিয়া” নামের পরিবর্ত্তে “মায়াবিনী” নামে সম্পূর্ণ পুস্তক স্বতন্ত্র আকারে বাহির হইল। দ্বিতীয় বার। এক্ষণে ইহার অনেকাংশ পরিবর্তিত হইয়াছে, অনেকাংশ পরিত্যাগ করা গিয়াছে, এবং কোন কোন স্থানে পুনর্ব্বার লিখিত হইয়াছে। মুদ্রাঙ্কণকার্য্যেও পূৰ্ব্বাপেক্ষা সুসম্পাদিত করা …

    নীলবসনা সুন্দরী
    মায়াবিনী
    মায়াবী
    হত্যা রহস্য
    হত্যাকারী কে

  • চিঠি

    চিঠি

    চিঠি

    গেস্ট হাউসটা দোতলায়। পুরো দোতলাটা জুড়েই। সরু একটা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। সব মিলিয়ে চারটে ঘর, হুবহু এক ভাবে সাজানো–দুটো সিঙ্গল খাট, একটা ডেস্ক আর-একটা চেয়ার। ঘরগুলোর সামনে দিয়ে টানা একটা জায়গা। তার খানিকটা বারান্দা, খানিকটা ডাইনিং রুম, আর একদিকে রান্না-বান্নার ব্যবস্থা। বারান্দার শেষপ্রান্তে একটা বাথরুম, শাওয়ার লাগানো। গোটা বাড়িটায় এটুকুই যা বিলাসিতার ছোঁয়া। বাথরুমটা দেখে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল কানাই। পুকুরে গিয়ে স্নান করতে হবে ভেবে ও একটু ভয়ে ভয়েই ছিল এতক্ষণ।

    ডাইনিং টেবিলের ওপর ঝকঝকে স্টেনলেস স্টিলের একটা টিফিন ক্যারিয়ার। ওর রাতের খাবার, কানাই আন্দাজ করল। নিজের সংসারের সব দুশ্চিন্তা সত্ত্বেও ময়না খাবারটা রেখে যেতে ভোলেনি। ঘুরে ফিরে দেখে একটা ঘরে ওর সুটকেসটা রাখল কানাই। ওরই জন্যে মনে হয় গুছিয়ে গাছিয়ে রাখা হয়েছে ঘরটা। তারপর ধীরে সুস্থে সিঁড়ির দিকে এগোল।

    ছাদের ওপর উঠে এসে চোখ জুড়িয়ে গেল কানাইয়ের। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সারা আকাশ লালে লাল। ভাটা পড়ে গেছে অনেকক্ষণ, দ্বীপগুলো জলের অনেক ওপরে মাথা তুলে জেগে রয়েছে। নীচে নদীর জলেও যেন লাল আবির ছড়িয়ে রয়েছে। ছাদটায় এক চক্কর মেরে কানাই দেখল এদিকে ওদিকে সব মিলিয়ে অন্তত গোটা ছয়েক দ্বীপ দেখা যাচ্ছে কাছাকাছি। আর আটটা নদী’। লুসিবাড়ির দক্ষিণে আর কোনও দ্বীপেই জনবসতি নেই। খেত-জমি বাড়ি-ঘরেরও তাই কোনও চিহ্ন নেই। গভীর ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে ঢাকা দ্বীপগুলো।

    ছাদের একধারে একটা লম্বাটে টিনের চালাঘর। দরজায় তালা আঁটা। এটাই তা হলে মেশোর পড়াশোনার ঘর ছিল। নীলিমার দেওয়া চাবিটা দিয়ে তালাটা খুলল কানাই। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল। মুখোমুখি উলটোদিকের দেওয়াল ভর্তি তাক, কাগজ আর বইপত্রে ঠাসা। একটাই মাত্র জানালা ঘরটার পশ্চিম দিকে। সেটা খুলে দিল কানাই। এখান থেকে রায়মঙ্গলের মোহনাটা দেখা যায়। জানালার ঠিক নীচে ডেস্ক। তার ওপর একটা দোয়াত, কয়েকটা কালির কলম, একটা পুরনো ধাঁচের অর্ধগোলাকার ব্লটার সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা। মনে হচ্ছে যেন কাছেই কোথাও গেছে নির্মল, একটু পরেই ফিরে এসে কাজে বসবে। ব্লটারটার নীচে বেশ বড়সড় একটা বন্ধ খাম, কানাইয়ের নাম লেখা। খামটা কয়েকপ্রস্থ প্লাস্টিকে মোড়া। সেগুলোকে আবার গঁদের আঠা দিয়ে জোড়া হয়েছে। তার ওপর বোধহয় কোনও নোটবই থেকে ছেঁড়া টুকরো একটা কাগজে কুড়ি বছর আগের নির্মলের হাতে লেখা কানাইয়ের নাম ঠিকানা। দু’আঙুলে চাপ দিয়ে বুঝতে পারল না কানাই ভেতরে কী আছে। কী করে প্যাকেটটা খোলা যাবে সেটাও কিছু বোঝা গেল না। প্লাস্টিকের পরতগুলো একেবারে গায়ে গায়ে সেঁটে গেছে মনে হচ্ছে। চারদিকে তাকিয়ে জানালার তাকের ওপর আধখানা দাড়ি কামানোর ব্লেড দেখতে পেল কানাই। সেটা নিয়ে এসে সাবধানে খামটার একদিকে কাটতে শুরু করল। বেশ কয়েক পরত কেটে ফেলার পর প্যাকেটটার ভেতরের বস্তুটা নজরে এল। একটা বাঁধানো খাতা। পাখির বাসার মধ্যে ডিমের মতো সযত্নে রাখা। একটু আশ্চর্য হল কানাই। ও ভেবেছিল হয়তো এক গোছা খোলা পাতা থাকবে, কবিতা বা প্রবন্ধ লেখা। একটা গোটা বাঁধানো খাতা ঠিক আশা করেনি। কয়েকটা পাতা উলটে পালটে দেখল। ঘন করে বাংলায় লেখা। জায়গা বাঁচানোর জন্য এত ছোট ছোট করে লেখা হয়েছে যে প্রায় গায়ে গায়ে লেগে গেছে লাইনগুলো। হাতের লেখাও ট্যারাবাকা, দেখেই মনে হয় খুব তাড়াহুড়ো করে লেখা হয়েছে। কাটাকুটিতে ভর্তি সমস্ত খাতাটা, একেকটা লাইন মার্জিনের বাইরে বেরিয়ে পড়েছে। এতগুলি প্লাস্টিকের মোড়কের মধ্যে রাখা সত্ত্বেও ছোপ ছোপ ড্যাম্প ধরে গেছে মাঝে মাঝে। কয়েক জায়গায় তো লেখা এমন ঝাপসা হয়ে গেছে যে প্রায় পড়াই যায় না।

    লেখাটার প্রথম কয়েকটা শব্দ খুবই অস্পষ্ট। খাতাটা প্রায় নাকের কাছে নিয়ে এসে সেগুলো পাঠোদ্ধার করতে হল। প্রথম পাতার একেবারে ওপরে বাঁদিকে তারিখ আর সময় ইংরাজিতে লেখা : May 15, 1979, 5.30 a.m. তার ঠিক নীচে কানাইয়ের নাম। বিশেষ কোনও সম্ভাষণ দিয়ে শুরু না হলেও, পড়তে শুরু করলেই বোঝা যায় এটা আসলে কানাইয়ের জন্যই লেখা লম্বা একটা চিঠি।

    প্রথম কয়েকটা লাইন পড়তেই সে ব্যাপারে নিঃসন্দিগ্ধ হয়ে গেল কানাই : “এ লেখাটা আমি এমন একটা জায়গায় বসে লিখছি যে জায়গার নাম তুমি হয়তো শোনেইনি। ভাটির দেশের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তের এই দ্বীপের নাম মরিচঝাঁপি..”

    খাতা থেকে মুখ তুলে নামটা নিয়ে মনের মধ্যে কয়েকবার নাড়াচাড়া করল কানাই। অভ্যাসের বশেই প্রায় শব্দটার একটা মানেও চলে এল মনে : ‘লঙ্কার দ্বীপ।

    আবার খাতার দিকে মন দিল ও :

    “ঘড়ির কাটা যেন আর ঘুরতেই চাইছে না। অজানা এক ভয়ংকরের আশঙ্কায় কাটছে প্রতিটা মুহূর্ত। মনে হচ্ছে যেন খানিক বাদেই এসে আছড়ে পড়বে প্রচণ্ড সাইক্লোন, আমরা সবাই যেন তার অপেক্ষায় গুটিসুটি মেরে ঘরের ভেতরে বসে আছি। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। একেকটা সেকেন্ড মনে হচ্ছে একেকটা যুগ। বাতাসও যেন গম্ভীর, স্থির হয়ে আছে। সময় যেন নিথর হয়ে গেছে ভয়ের ধাক্কায়।

    অন্য কোনও পরিস্থিতিতে হলে হয়তো এরকম ক্ষেত্রে আমি কিছু একটা পড়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু এখন এই খাতা, ডটপেন আর রিলকের দুইনো এলিজির ইংরাজি আর বাংলা অনুবাদগুলো ছাড়া আর কিছুই নেই আমার সঙ্গে। এমনিতেও অবশ্য খানিকক্ষণ আগে পর্যন্ত কিছুই পড়া সম্ভব ছিল না। কারণ এইমাত্র ভোরের আলো ফুটছে, আর আমি বসে আছি একটা ঘঁচের বেড়ার ঘরে, যেখানে একটা মোমবাতি পর্যন্ত নেই। ছাঁচের বেড়ার ফাঁক দিয়ে সামনে গারল নদী দেখা যাচ্ছে। সবে মাত্র সূর্য উঠতে শুরু করেছে, আর তার সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নদীর জল। জোয়ার আসছে। আশেপাশের দ্বীপগুলো তলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। খানিক পরেই মেরু সমুদ্রের আইসবার্গের মতো ওগুলোর বেশিরভাগটাই চলে যাবে জলের নীচে। শুধু সবচেয়ে উঁচু গাছের চুড়াগুলো জেগে থাকবে নদীর ওপর। এখনই দ্বীপের ধারের চর আর জালের মতো ঠেসমূলগুলোর ওপর দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে–শেকড়-বাকরগুলি জলের নীচে কেমন একটা ঝাপসা ভূতুড়ে চেহারা নিয়েছে মনে হচ্ছে যেন ওগুলো কোনও সামুদ্রিক আগাছা, থিরথির করে কাঁপছে স্রোতের টানে। একটু দূরে একঝাক বক উড়ে যাচ্ছে জলের ঠিক ওপর দিয়ে। জোয়ার আসছে, তাই ডুবন্ত দ্বীপগুলোর থেকে দূরে কোনও নিশ্চিন্ত আস্তানার খোঁজে যাচ্ছে ওরা। ভোর হচ্ছে, ভাটির দেশের মিষ্টি সুন্দর ভোর।

    যে ঘরটায় আমি এখন বসে আছি সেটা আসলে আমার ঘর নয়। আমি এখানে অতিথি। এ ঘরের মালকিনকে তুমি চেন–কুসুম। প্রায় বছরখানেক হল ও ছেলেকে নিয়ে এখানে আছে। আচ্ছা, এই এক বছর রোজই তো ঘুম ভেঙে উঠে ওরা এই রকম ভোর দেখেছে–কুসুম আর ফকির। কেমন লেগেছে ওদের? ওদের প্রতিদিনের জীবন-যাপনের যন্ত্রণায় কতটুকু শান্তির প্রলেপ দিতে পেরেছে এই ভোর? কে বলতে পারে? এখন, এই অন্তহীন অপেক্ষার সময়, আমার শুধু কবির কথাগুলোই মনে পড়ছে:

    ‘সৌন্দর্য আর-কিছু নয়,

    শুধু সেই আতঙ্কের আরম্ভ, যা অতি কষ্টে আমাদের পক্ষে নয়

    এখনো অসহনীয়। আরাধ্য সে আমাদের, যেহেতু সে শান্ত উপেক্ষায়

    তার সাধ্য সংহার হানে না।’

    কাল সারারাত ধরে আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি, কাকে ভয় পাচ্ছি আমি? কীসের ভয়? আজ, এই সূর্যোদয়ের সময় আমি সে প্রশ্নের উত্তর পেলাম। আমি ভয় পাচ্ছি কারণ আমি জানি এই ঝড় কেটে গেলে তার আগের কথা কেউ আর মনে রাখবে না। এই ভাটির দেশের পলি কত তাড়াতাড়ি অতীতকে ঢেকে দেয় তা আমার চেয়ে ভাল তো আর কেউ জানে না।

    যে অনাগত ভয়ংকরের অপেক্ষায় আমরা এখানে প্রহর গুনছি, তাকে বাধা দেওয়ার মতো শক্তি আমার নেই। কিন্তু এক সময় তো আমি সাহিত্যচর্চা করেছি। যা এখানে ঘটছে, ঘটতে চলেছে, তার কিছুটা তো আমি লিখে রেখে যেতে পারি। একটু তো অন্তত দাগ রেখে যেতে পারি মহাকালের স্মৃতির পাতায়। এই ভাবনা আর এই ভয়ই আমাকে দিয়ে আজ এক অসাধ্য সাধন করিয়ে নিল–তিরিশ বছর পর কলম ধরিয়ে ছাড়ল আমাকে।

    জানি না কতটা সময় আমার হাতে আছে। হয়তো শুধু আজকের দিনটাই। তার মধ্যেই আমি চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব লিখে রেখে যেতে যদি কোনওদিন তোমার হাতে গিয়ে পৌঁছয় এ লেখা। তুমি হয়তো ভাববে, এত লোক থাকতে তোমার জন্যই কেন লিখছি। কারণ হিসাবে এটুকুই আমি বলতে পারি যে এ গল্প আসলে আমার গল্প নয়। যাকে নিয়ে এই লেখা, লুসিবাড়িতে থাকার দিনগুলিতে সেই ছিল তোমার একমাত্র সঙ্গী। সে হল কুসুম। আমার জন্য না হলেও, কুসুমের কথা মনে করে অন্তত লেখাটা পড়ো।”

  • ডিঙিতে

    ডিঙিতে

    ডিঙিতে

    ফকিরের নৌকোটা লম্বায় প্রায় মিটার পাঁচেক হলেও খুব একটা চওড়া নয়। এমনকী ঠিক মাঝখানটাতেও দু’জনের বেশি লোকের পাশাপাশি বসার জায়গা নেই। ডিঙিটাকে পিয়ার মনে হল ঠিক যেন একটা বস্তিবাড়ির ভাসমান সংস্করণ–ছেঁচা বাঁশ, টুকরো-টাকরা কাঠ আর ভেঁড়াখোঁড়া পলিথিন দিয়ে কোনও রকমে জোড়াতাড়া দেওয়া। নৌকোর বাইরের দিকের তক্তাগুলোতেও কোনওকালে পালিশ পড়েছে বলে মনে হয় না, ফঁক-ফোকরগুলো আলকাতরা দিয়ে বোজানো; যাতে জল চুঁইয়ে না ঢুকতে পারে। ডিঙির ওপরে কতগুলো পুরনো চায়ের পেটির প্লাইউড পাতা, কয়েকটাতে চা কোম্পানির নামটা এখনও পড়া যায়। পেরেক-টেরেকেরও কোনও বালাই নেই, তক্তাগুলি স্রেফ একটা তাকের মতো কাঠের ওপর পর পর রাখা। ইচ্ছে করলেই এদিক সেদিক নাড়াচাড়া করা যায়। নীচের গোল মতো অংশটায় জিনিসপত্র রাখার জায়গা। ডিঙির সামনের দিকে কোনাচে জায়গাটায় কিছু বুনো ঘাস আর জংলা গাছের ডালপালা জড়ো করা, কয়েকটা কাঁকড়া সেগুলোর মধ্যে নড়াচড়া করছে। এখানেই রাখা থাকে ফকিরের সারাদিনের শিকার। ডালপালা আর ঘাসগুলো দিয়ে জায়গাটাকে স্যাঁতস্যাঁতে রাখা হয়েছে। ওগুলো না থাকলে কাঁকড়াগুলো বোধহয় নিজেদের মধ্যে ছেঁড়াছিঁড়ি শুরু করে দিত।

    নৌকোর ছইটাও তৈরি করা হয়েছে হেঁচা বাঁশ, কঞ্চি আর বাখারি দিয়ে। ছোট্ট ছইটা, কোনওরকমে দুটো লোক তার মধ্যে রোদ-বৃষ্টি থেকে মাথা আড়াল করতে পারে। জল আটকানোর জন্য ভেতরে আবার একটা ধূসর ছিট ছিট প্লাস্টিক দেওয়া। সেটার ওপরের লেখাগুলো চেনা লাগল পিয়ার–ওটা আসলে একটা ছেঁড়া মেলব্যাগ। ও নিজেই কতবার এরকম ব্যাগ ব্যবহার করেছে আমেরিকা থেকে চিঠিপত্র পাঠানোর জন্য। ডিঙির একেবারে পেছনের দিকে, বাঁকানো ল্যাজের মতো অংশটা আর ছইয়ের মাঝে ছোট একটা প্ল্যাটফর্ম মতো করা। পোড়া দাগ ধরা একটা তক্তা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে সেটা। ছইয়ের ভেতরে তক্তার নীচে আরও একটা খোপ। সেটাই এই নৌকোর ভাড়ার। জায়গাটা কাঠের দেওয়াল দিয়ে আলাদা করা। নীল একটা পলিথিন যেমন তেমন ভাবে পাতা আছে জল আটকানোর জন্য। ভেতরটায় সুন্দর করে গোছানো আছে কিছু শুকনো জামাকাপড়, রান্নার বাসনপত্র, সামান্য কিছু খাবার-দাবার আর খাওয়ার জল। খুপরিটার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটা ভজ করা কাপড় বের করে আনল ফকির। ভাঁজ খুলতে দেখা গেল সেটা একটা শস্তার ছাপা শাড়ি।

    এর পর যা ঘটতে লাগল তাতে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল পিয়া। প্রথমে টুটুলকে নৌকোর সামনের দিকে পাঠিয়ে দিল ফকির। তারপর পিয়ার ব্যাগগুলো ঠেসেটুসে ঢোকাল ছইয়ের মধ্যে। এবার নিজে বেরিয়ে এসে পিয়াকে ভেতরে যেতে ইশারা করল। পিয়া কোনওরকমে গুঁড়িসুড়ি মেরে ঢুকে যাওয়ার পর ছইয়ের সামনের দিকে পর্দার মতো শাড়িটাকে টাঙিয়ে দিল ফকির।

    ব্যাপারটা মাথায় ঢুকতে বেশ খানিকক্ষণ লাগল পিয়ার। আসলে ওর জন্য একটা ঘেরা জায়গা বানিয়ে দিয়েছে ফকির, একটা আড়াল করে দিয়েছে, যাতে ও নিশ্চিন্তে ভেজা জামাকাপড় পালটে নিতে পারে। এতক্ষণে একটু অস্বস্তি হল পিয়ার। ওর নিজের সংকোচ হওয়ার আগেই ফকিরই চিন্তা করেছে কী করে ও আড়াল রেখে জামাকাপড় পালটাবে। একটু হাসিও এল ঠোঁটের কোনায়, কারণ ছাত্র অবস্থায় তো ওকে অনেক বছরই ছেলেদের সঙ্গে এক ডর্মিটরিতে থাকতে হয়েছে, এমনকী এক বাথরুম শেয়ার করতে হয়েছে। কাজের প্রয়োজনেও পুরুষদের সঙ্গে এক বাড়িতে কাটাতে হয়েছে অনেক সময়। তা সত্ত্বেও ফকিরের এই আচরণ পিয়ার মনকে কোথাও একটা ছুঁয়ে গেল। ফকির যে ওকে শুধু জামাকাপড় পালটানোর জন্যে একটা জায়গা করে দিয়েছে তা তো নয়, সাথে সাথে একটা সহজ সামাজিকতায় ওকে গ্রহণ করেছে, কথা না বলতে পারলেও বুঝিয়ে দিয়েছে পিয়া কেবল নামহীন ভাষাহীন কোনও বিদেশি নয়, সুন্দরবনের এই জেলের কাছে ও আপন লোক। কিন্তু ফকিরের মতো একজন মানুষ, যে হয়তো এর আগে কোনও বিদেশির এত কাছাকাছি আসেইনি, তার পক্ষে এটা সম্ভব হল কী করে?

    জামাকাপড় বদলানো হয়ে যাওয়ার পর শাড়িটাকে হাত দিয়ে একবার ছুঁয়ে দেখল পিয়া। বহুদিন ধোপ খেয়ে খেয়ে পাতলা আর নরম হয়ে এসেছে কাপড়টা। ঠিক এইরকম শাড়ি পরত পিয়ার মা, ওদের আমেরিকার বাড়িতে। এই রকম নরম, কোঁচকানো, ব্যবহারে ব্যবহারে পাতলা হয়ে আসা সেই শাড়ির ছোঁয়া এখনও ওর স্মৃতিতে লেগে আছে। মাঝে মাঝে খুব রাগও হত মায়ের ওপর। মনে হত সব সময় এই রকম রং-জ্বলা পুরনো একটা কাপড় পরে থাকলে ওর বন্ধুরা কী ভাববে? ওরা হয়তো মনে করবে পিয়ার মা জামাকাপড় পরে না, একটা বিছানার চাদর গায়ে জড়িয়ে থাকে।

    কিন্তু এই শাড়িটা কার? ওর বউয়ের? বাচ্চাটার মা-র? দু’জনে কি একই লোক? প্রশ্নগুলো মনে আসছিল বটে, কিন্তু উত্তর জানার কোনও উপায় নেই বলে যে খুব একটা আফশোস হচ্ছিল পিয়ার, তাও ঠিক নয়। একদিক থেকে বাঁচোয়া; একটা মানুষের জীবনের খুঁটিনাটি জানার সাথে সাথে কিছু দায়িত্বও তো চলে আসে। তার থেকে অন্তত অব্যাহতি পাওয়া গেল।

    ছইয়ের ভেতর থেকে গুঁড়ি মেরে বেরিয়ে এল পিয়া। নৌকোর নোঙর তোলা হয়ে গেছে, দাঁড় হাতে তুলে নিয়েছে ফকির। ওরও স্নান সারা হয়ে গেছে। চুল-টুল আঁচড়ে একেবারে ফিট বাবুটি হয়ে গেছে এর মধ্যে। মাঝখানে সিঁথি কাটা, চুলগুলি পেতে আছে মাথার ওপর। মুখে গলায় নুনের গুঁড়োগুলো না থাকায় খুব ছেলেমানুষ মনে হচ্ছিল ফকিরকে, এক্কেবারে একটা কলেজ-পালানো দুষ্টু ছেলের মতো লাগছিল। স্নান করে জামাকাপড়ও পালটে নিয়েছে ও। একটা ঘিয়ে রঙের টি শার্ট গায়ে দিয়েছে, পরনে একটা কাঁচা লুঙ্গি। দূরবিন দিয়ে পিয়া ওকে যে লুঙ্গিটা পরে থাকতে দেখেছিল সেটা আপাতত মেলা আছে ছইয়ের ওপর।

    সূর্য এর মধ্যে পাটে বসেছে। দিগন্ত থেকে যেন একটা রঙের ধূমকেতু ছিটকে উঠে ডুব দিয়েছে ঠিক মোহনার মাঝখানে। একটু পরেই রাত নামবে, রাত কাটানোর মতো একটা কোনও জায়গায় গিয়ে পৌঁছতে হবে তার মধ্যে। দিনের আলোতেই এই নদী-খাঁড়ির ভুলভুলাইয়ায় পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন, রাতের অন্ধকারে এইটুকু ডিঙি নিয়ে তো দিশাহারা হয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে। তবে ফকির নিশ্চয়ই কোনও একটা নিরাপদ জায়গার কথা মনে মনে ভেবে রেখেছে। এখন যত তাড়াতাড়ি সেখানে গিয়ে পৌঁছনো যায় ততই মঙ্গল।

    নৌকো চলতে শুরু করার পর উঠে দাঁড়াল পিয়া, দূরবিন চোখে তুলে নিয়ে কাজ শুরু করল ফের। জরুরি সব যন্ত্রপাতি সঙ্গেই আছে, কোমরের বেল্টের সাথে লাগানো। দূরবিনে চোখ রাখতেই মনে হল যেন স্নিগ্ধ বৃষ্টি এসে ধুয়ে দিল চারপাশের দৃশ্যপট, চেনা কাজের ছন্দে মনের অস্থিরতা কমে এল ধীরে ধীরে। দূরবিন চোখে ঘড়ির কাটার মতো নদীর দিকে নজর রাখছিল পিয়া, আস্তে আস্তে ঘাড় ঘোরাচ্ছিল–ডানদিক থেকে বাঁদিক, বাঁদিক থেকে ডানদিক, যেন কোনও বাতিঘরের সিগনাল, আলো দেখিয়ে যাচ্ছে যন্ত্রের মতো। নৌকোর দুলুনিতে কোনও অসুবিধাই হচ্ছিল না ওর। এত বছরের চর্চায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে ওর শরীর, অভ্যাসগত প্রতিবর্তে জলের দোলার সাথে সাথে এখন সংকুচিত প্রসারিত হয় হাঁটুর পেশি। ভারসাম্য রাখার জন্য আর আলাদা করে চেষ্টা করতে হয় না।

    ওর কাজের এই ব্যাপারটাই পিয়ার সবচেয়ে পছন্দের : সারাক্ষণ ভেসে ভেসে বেড়ানো, মুখে জোলো বাতাসের ঝাঁপটা, সতর্ক চোখ নদীর দিকে, আর হাতের কাছে সব জরুরি জিনিসপত্র যা যা দরকার। পিয়ার কোমরে সবসময় বাঁধা থাকে পর্বতারোহীদের বেল্ট, ক্লিপবোর্ড থেকে শুরু করে ছোটখাটো যন্ত্রপাতি সব হুকের সঙ্গে ঝোলানো। সবচেয়ে দরকারি যে যন্ত্রটা ও কখনও কাছছাড়া করে না সেটা হল ছোট্ট একটা হাতে-ধরা মনিটর। গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমে যে-কোনও জায়গায় নিজের নির্ভুল অবস্থান জানা যায় এটা দিয়ে। পিয়া যখন চোখে দূরবিন এঁটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুশুক খুঁজতে থাকে, তখন নিখুঁতভাবে এই যন্ত্র রেকর্ড করে যায় ওর পথ, প্রতিটি সেকেন্ডের, প্রতিটি মিটারের হিসেব রেখে চলে। এমনকী খোলা সমুদ্রেও এটার সাহায্যে অভ্রান্ত ভাবে দিক নির্ণয় করা যায়। হয়তো কোনও একদিন কোনও এক সময় এক জায়গায় একটা শুশুকের পাখনার একটু আভাস দেখা গিয়েছিল, প্রয়োজন হলে ঠিক সেই বিন্দুতে আবার ফিরে আসা যায় যদি এই যন্ত্র হাতে থাকে।

    এই জিপিএস মনিটর ছাড়াও পিয়ার সঙ্গে আছে একটা রেঞ্জফাইন্ডার আর একটা ডেস্থ সাউন্ডার। প্রথম যন্ত্রটা দিয়ে কোনও বস্তুর দূরত্ব মাপা যায়, আর দ্বিতীয়টা কাজে লাগে জলের গভীরতা মাপতে। এই সব ক’টা যন্ত্রই পিয়ার কাজের জন্য খুব জরুরি, কিন্তু সবচেয়ে দরকারি হল ওর গলায় ঝোলানো ওই দূরবিন। ওটা কিনতে গিয়ে প্রায় ফতুর হয়ে গিয়েছিল পিয়া, কিন্তু তাতে ওর কোনও দুঃখ নেই। কারণ দূরবিন ছাড়া এ ধরনের রিসার্চ একেবারেই কানা। বহু বছরের ব্যবহারে যন্ত্রটার বাইরের ঔজ্জ্বল্য কমেছে, লেন্সের ঢাকনাগুলো রোদে আর নুনের গুঁড়োর আঁচড়ে আঁচড়ে ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে এসেছে, কিন্তু জলনিরোধক আবরণ যেটা আছে সেটা খুবই কাজের। এই ছয় বছর ধরে একটানা ব্যবহার করার পরেও তাই একেবারে ঠিকঠাক কাজ করে যাচ্ছে পিয়ার এই বিশ্বস্ত দূরবিন। শক্তিশালী লেন্সগুলো এখনও বহুদূরের জিনিসকে যেন নাকের কাছে নিয়ে চলে আসে। ডানদিকের আইপিসটার সঙ্গে আবার একটা কম্পাস লাগানো আছে। ফলে দূরবিনটা চোখ থেকে না নামিয়েই দৃষ্টিপথ ঠিক রাখতে পারে পিয়া, জলের দিকে নজর রাখতে পারে অর্ধবৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে নিখুঁত অর্ধবৃত্ত। ১৮০ ডিগ্রি। বেশিও নয়, কমও নয়। এটা যখন কিনেছিল তখন ও সদ্য ক্যালিফোর্নিয়ার স্ক্রিপস ইন্সটিটিউশন অব ওশ্যেনোগ্রাফিতে ভর্তি হয়েছে গ্র্যাজুয়েশন করতে। খুব জোর হলে বছর খানেক হয়েছে। সে ভাবে বলতে গেলে সে সময় এরকম একটা দূরবিনের দরকারই ছিল না ওর। তবে পিয়ার মনে কোনও দ্বিধা ছিল না। পড়াশোনা শেষ হলে কী করবে সেটা তখন থেকেই মনে মনে ও স্থির করে নিয়েছিল। দুরবিন কেনার কথা মনে হতে তাই বাজারের সেরাটাই কেনার ইচ্ছে হয়েছিল ওর। বেশ কিছুদিন ধরে বহু ক্যাটালগ ঘেঁটেঘুঁটে অবশেষে মানি অর্ডার করেছিল কোম্পানিতে।

    প্যাকেটটা যখন এসে পৌঁছল সেটার ওজন দেখে বেশ একটু ঘাবড়েই গিয়েছিল পিয়া। সে সময়ে ও যেই ঘরটায় থাকত সেটা ছিল ইউনিভার্সিটির রাস্তার একেবারে পাশে। বইখাতা হাতে ছাত্রছাত্রীরা সব সময় সেখান দিয়ে যাতায়াত করছে। দূরবিনটা নীচের দিকে তাক করে ও ছেলেমেয়েগুলোর মুখ, ওদের হাতের বইপত্র দেখার চেষ্টা করছিল। অত উঁচু থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল প্রতিটা লোককে। এমনকী বইয়ের মলাটের লেখা, খবরের কাগজের হেডলাইনগুলো পর্যন্ত পরিষ্কার পড়া যাচ্ছিল। কিন্তু দূরবিনটা ঘুরিয়ে অন্যদিকে দেখতে গিয়ে বোঝা গেল যতটা সহজ মনে হয়েছিল আসলে ততটা সহজ নয় ব্যাপারটা। এ যন্ত্র হাতে একশো আশি ডিগ্রি পর্যন্ত ঘুরে দেখতে গেলে শুধু ঘাড় ঘোরালে চলবে না, একেবারে গোড়ালি থেকে শুরু করে কোমর কাধ মাথা সুদ্ধ পুরো শরীরটাই ঘোরাতে হবে। কয়েক মিনিটেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল পিয়া। হাতে ব্যথা ধরে গিয়েছিল। এই ভারী দূরবিন নিয়ে দিনে দশ বারো ঘণ্টা কী করে কাজ করে লোকে? তা হলে কি ওকে দিয়ে এ ধরনের কাজ হবে না? একটু হতাশ হয়ে পড়েছিল পিয়া।

    এমনিতে বরাবরই বন্ধুবান্ধবদের তুলনায় ও দেখতে একটু ছোটখাটো। একেবারে ছেলেবেলায়, এমনকী কিশোর বয়সেও, ওর সমবয়সিদের সামনে ওকে লিলিপুটের মতো লাগত। তবে সেটা এক রকম অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল পিয়ার। কিন্তু যেদিন প্রথম ও লা জোলাতে ওর সিটোলজির ক্লাসে গেল সেদিন সহপাঠীদের সামনে ওর নিজেকে একেবারে একরত্তি একটা পুঁচকে মেয়ে মনে হচ্ছিল। “এ তো দেখা যাচ্ছে তিমির দলে পুঁটিমাছের প্রবেশ,” একজন অধ্যাপক ঠাট্টা করে বলেছিলেন। হবে না-ই বা কেন? অন্য যারা ওর ক্লাসে ছিল তারা প্রায় সকলেই পোড়-খাওয়া খেলোয়াড় গোছের ছেলেমেয়ে-ইয়া মোটা মোটা হাড়, পেশিগুলো যেন পাথর কুঁদে বের করা। বিশেষ করে মেয়েগুলো বোধহয় জন্ম থেকেই ক্যালিফোর্নিয়া কি হাওয়াই কি নিউজিল্যান্ডের সমুদ্রের ধারে ভলিবল খেলে, ডাইভিং করে, ডুবসাঁতার কেটে, নৌকো চালিয়ে বড় হয়েছে। তাদের শরীরের গড়নই তো অন্য রকম। রোদে পুড়ে পুড়ে গায়ের চামড়া প্রায় তামাটে সোনালি, তার ওপর হাতের কুচি কুচি লোমগুলো যেন চিকচিকে বালির দানা। পিয়া নিজে কোনওদিন খেলাধুলোর ধার দিয়েই যায়নি। তাতে করে অন্যদের থেকে আরও নিজেকে আলাদা মনে হত ওর। শুধু এই ছোটখাটো চেহারার জন্যই সারা কলেজে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল ও, সবাই চিনে গিয়েছিল এই “পুঁচকে ইস্ট ইন্ডিয়ান” মেয়েটাকে।

    তবে কোস্টারিকা উপকূলের কাছে জীবনে প্রথমবার সার্ভের কাজ করতে গিয়েই নিজের ক্ষমতা সম্বন্ধে সন্দেহ মিটে গিয়েছিল পিয়ার। শুরুর ক’টা দিন কিছুই দেখা গেল না সেবার, শুধু এ দিগন্ত থেকে ও দিগন্ত নিষ্ফলা নজর রেখেই সময় কেটে গেল। দূরবিনের ভারে পিয়াকে হাসফাস করতে দেখে মনে হয় মায়া হচ্ছিল সহপাঠীদের, রুটিন ভেঙে ডেকে বসানো বড় বাইনোকুলারটা বেশিক্ষণ ধরে,ওরা ওকে দেখতে দিচ্ছিল। যাই হোক, এ ভাবে পর পর তিন দিন কেটে যাওয়ার পর চতুর্থ দিনে দেখা মিলল এক দঙ্গল ডলফিনের। শুরুতে মনে হয়েছিল ছোট একটা দল, খুব বেশি হলে সব মিলিয়ে গোটা কুড়ি হয়তো হবে। কিন্তু ক্রমেই বাড়তে থাকল সংখ্যাটা–কুড়ি থেকে একশো, দুশো করে বাড়তে বাড়তে প্রায় হাজার সাতেকে গিয়ে দাঁড়াল। শেষপর্যন্ত এত অজস্র ডলফিন দেখা যেতে লাগল চতুর্দিকে যে গুণতে গুণতে খেই হারিয়ে ফেলল ওরা। মনে হচ্ছিল গোটা সমুদ্রটা যেন ভরে গেছে ডলফিনে, যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই একেবারে দিগন্ত পর্যন্ত থিকথিক করছে অগুন্তি ডলফিন, ঢেউয়ের চেয়েও সংখ্যায় বেশি, জলের ওপর চার দিকে শুধু অজস্র ছুঁচোলো ঠোঁট আর চকচকে তেকোনা পাখনা। ঠিক সেই সময়ে পিয়া দেখল কীভাবে হঠাৎ হালকা হয়ে গেল ওর দূরবিনটা। মানে, রাতারাতি যে ও মহা শক্তিশালী গামা পালোয়ান হয়ে গেল তা নয় (যদিও ততদিনে দড়ির মতো পাকানো পাকানো পেশি গজিয়ে গেছে ওর হাতে), কিন্তু শুধু ওই একজোড়া কাঁচ সমুদ্রটাকে আর ডিগবাজি-খাওয়া ডলফিনগুলোকে এত কাছে এনে দিয়েছিল, যে ভারী ওজনের সমস্যাটা একেবারে বেরিয়েই গেল মাথা থেকে।

  • নির্মল আর নীলিমার কথা

    নির্মল আর নীলিমার কথা

    নির্মল আর নীলিমার কথা

    নির্মল আর নীলিমা বোস প্রথমবার লুসিবাড়িতে আসে একটা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। সেটা ১৯৫০ সাল, তখন একবছরও হয়নি ওদের বিয়ে হয়েছে।

    নির্মলের আদি বাড়ি ঢাকায়। কলকাতায় ও এসেছিল পড়াশোনা করতে। তারপর স্বাধীনতা, দাঙ্গা, দেশভাগ–পরিবারের সঙ্গে সব যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেল। নির্মল নিজেও কলকাতাতেই থেকে যেতে চেয়েছিল। তখন ও উঠতি লেখক, একটু নাম-টামও হয়েছে বামপন্থী বুদ্ধিজীবী হিসেবে। সেই সময়েই একটা চাকরি জুটে গেল আশুতোষ কলেজে। ইংরেজি পড়ানোর চাকরি। নীলিমা ছিল সেই কলেজের ছাত্রী।

    পরিবারগত ভাবে দেখতে গেলে নির্মল আর নীলিমার মধ্যে কোনও মিলই ছিল না। নীলিমা ছিল বনেদি পরিবারের মেয়ে, ওর বাপ-কাকাদের লোকে এক ডাকে চিনত। ওর ঠাকুর্দা ছিলেন কংগ্রেসের প্রথম সদস্যদের একজন। আর বাবা, অর্থাৎ কানাইয়ের দাদু, ছিলেন হাইকোর্টের ডাকসাইটে ব্যারিস্টার। নীলিমার যখন তেরো-চোদ্দো বছর বয়স, তখন একবার ওর প্রচণ্ড হাঁপানি হয়। তার প্রকোপ চলেছিল বেশ কিছুদিন। ফলে কয়েক বছর পর স্কুলের গণ্ডি পেরোতেই ওকে ভর্তি করে দেওয়া হল ওদের বালিগঞ্জ প্লেসের বাড়ির কাছে আশুতোষ কলেজে। বাড়ির একটা প্যাকার্ড গাড়ি রোজ সকালে ওকে কলেজ পৌঁছে দিত, আবার বিকেলে ফেরত নিয়ে আসত।

    একদিন ছুটির পর একটা ছুতো করে বাড়ির ড্রাইভারকে ফেরত পাঠিয়ে দিল নীলিমা, আর বইখাতা বগলে নিয়ে কলেজের ইংরেজির অধ্যাপকের পেছন পেছন একটা বাসে গিয়ে উঠে পড়ল। অধ্যাপকের চোখের আদর্শবাদের দীপ্তি তখন আগুনের দিকে পতঙ্গের মতো টেনেছিল নীলিমাকে। ওর ক্লাসের অনেক মেয়েই তখন নির্মলের আগুনঝরা বক্তৃতা আর আবেগময় আবৃত্তিতে মুগ্ধ, এমনকী তাদের কেউ কেউ নির্মলের প্রেমে পাগলও ছিল, কিন্তু নীলিমার মানসিক শক্তি বা উদ্ভাবনী ক্ষমতা তাদের ছিল না। বাসে উঠে সেদিন ও ঠিক নির্মলের পাশের সিটটায় গিয়ে বসল; আর এক মাসের মধ্যেই বাড়িতে জানিয়ে দিল যে বিয়ের পাত্র ওর ঠিক করা হয়ে গেছে। বাড়ির লোকেদের স্বাভাবিক ভাবেই প্রচণ্ড আপত্তি ছিল এই বিয়েতে, কিন্তু তাতে নীলিমার জেদ বাড়ল বই কমল না। ১৯৪৯ সালে একদিন সাদামাটা এক অনুষ্ঠান করে বিয়ে হয়ে গেল ওদের। হোম-যজ্ঞ-মন্ত্রপাঠের বদলে পড়া হয়েছিল ব্লেক, মায়কোভস্কি আর জীবনানন্দের কবিতা। সে বিয়েতে পৌরোহিত্য করেছিল নির্মলের এক পাটি কমরেড।

    বিয়ের পর মাস খানেকও হয়নি, হঠাৎ একদিন সকালে ওদের মুদিয়ালির ছোট্ট ফ্ল্যাটে পুলিশ হানা দিল। আগের বছর কলকাতায় সোশ্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনালের এক কনফারেন্সে অংশ নিয়েছিল নির্মল–সেই সূত্রে। (গল্পের ঠিক এই জায়গায় এসে নির্মল একটু থেমে যেত, তারপর একটু ঝোঁক দিয়ে শুরু করত পরের বাক্যটা। ওর মতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে কলকাতার এই কনফারেন্স ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এমনকী দশ-বিশ বছর পরেও এশিয়ার সমস্ত গণ অভ্যুত্থানের সঙ্গে পশ্চিমি গোয়েন্দা দফতরগুলি এই কনফারেন্সের যোগসূত্র খুঁজে বের করত–সে ভিয়েতনামই হোক, কি মালয়েশিয়ার আন্দোলন, অথবা বার্মার রেড ফ্ল্যাগ অভ্যুত্থান। ওদের মতে এই সবকিছুর মূলেই ছিল ১৯৪৮-এর কলকাতা কনফারেন্সের ‘সশস্ত্র সংগ্রাম নীতি’। নির্মল বলত এমনিতে যে এসব কথা সবাইকে জানতেই হবে তার কোনও মানে নেই, কিন্তু এই ভাটির দেশে এ ধরনের খবরের বিশেষ মূল্য আছে। বাইরের পৃথিবীর বড় বড় ঘটনার খোঁজ এখানে সহজে এসে পৌঁছয় না, সেই জন্যেই আরও বেশি করে সেগুলি এখানকার মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসের প্লাবনের ঢেউ এক সময় না এক সময় পৃথিবীর দুর্গমতম অঞ্চলেও গিয়ে ধাক্কা দেয়।)

    আটচল্লিশের কনফারেন্সে অবশ্য নির্মলের ভূমিকা ছিল খুবই সামান্য, সে ক’দিন ওকে বার্মিজ ডেলিগেশনের গাইড হিসেবে কাজ করতে হয়েছিল। কিন্তু বার্মায় কমিউনিস্ট আন্দোলন শুরু হওয়ার পর সেই সূত্র ধরেই পুলিশ এল ওর বাড়িতে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওরা নিয়ে গেল ওকে। এখনও ওই ডেলিগেশনের কারও সাথে ওর যোগাযোগ আছে কিনা, অথবা ওদের সম্পর্কে নতুন কিছু খবর যদি ও দিতে পারে, এই সব তথ্য ওর কাছে জানতে চেয়েছিল পুলিশ।

    সবসুদ্ধ মাত্র দু-এক দিনই লক-আপে থাকতে হয়েছিল নির্মলকে। কিন্তু ওর পক্ষে সে অভিজ্ঞতার ফল হল মারাত্মক। সে সময় নীলিমার পরিবারের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই, নিজের বাড়ির থেকেও একেবারে বিচ্ছিন্ন, ফলে নিজের মধ্যে কেমন গুটিয়ে গেল নির্মল। কলেজে যেত না, দিনের পর দিন বিছানা থেকে উঠতে চাইত না। ব্যাপারটা বাড়াবাড়ির দিকে যাচ্ছে দেখে লজ্জার মাথা খেয়ে অবশেষে বাপের বাড়ির শরণাপন্ন হল নীলিমা। নির্মলের সঙ্গে বিয়েটা পরিবারের লোকেরা কখনওই ক্ষমার চোখে দেখেনি, কিন্তু এই বিপদের দিনে ওরাই ওর পাশে এসে দাঁড়াল। নীলিমার বাবার কথায় কয়েক জন ডাক্তার এসে নির্মলকে দেখে হাওয়া বদলের পরামর্শ দিলেন। নির্মলের পার্টির লোকেদেরও মনে ধরল কথাটা। আসলে ওরাও বুঝে গিয়েছিল এই রকম দুর্বল মানসিকতার লোক পার্টির বিশেষ কাজে আসবে না। নীলিমাও খুশি হল–শহর থেকে দূরে গেলে নির্মলও সেরে উঠবে, ওর নিজের হাঁপানিরও হয়তো কিছুটা উপশম হবে। কিন্তু কোথায় যাওয়া হবে সেটা ঠিক করাই হল সমস্যা। এবারেও মুশকিল আসান করলেন নীলিমার বাবা। সে সময় হ্যামিলটন এস্টেটের কিছু কাজকর্ম উনি দেখাশোনা করতেন। সেই সূত্রেই জানতে পারলেন এস্টেটের ম্যানেজার একজন শিক্ষকের খোঁজ করছেন লুসিবাড়ির স্কুলটা চালানোর জন্য।

    ১৯৩৯-এ স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটন মারা যাওয়ার পর এস্টেটের মালিকানা বর্তায় তার ভাইপো জেমস হ্যামিলটনের ওপর। কিন্তু জেমস থাকতেন স্কটল্যান্ডের অ্যারান দ্বীপে। কাকার সম্পত্তি পাওয়ার আগে কখনও ভারতে আসার কথা তার চিন্তাতেও আসেনি। স্যার ড্যানিয়েলের মৃত্যুর পর কয়েকদিনের জন্য উনি গোসাবায় এসেছিলেন বটে, কিন্তু এস্টেটের কাজেকর্মে কখনও মাথা গলাননি। সেসব দেখাশোনা করত ম্যানেজার আর কর্মচারীরা। ফলে নীলিমার বাবা একবার বলে দিলেই যে নির্মলের চাকরিটা হয়ে যাবে সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ ছিল না।

    কিন্তু বেঁকে বসল নির্মল নিজে। এতদিন বামপন্থী রাজনীতি করার পর শেষে একজন পুঁজিপতির এস্টেটে গিয়ে কাজ করতে হবে? সে কী করে সম্ভব? অনেক সাধ্যসাধনার পর নীলিমা একবার গিয়ে জায়গাটা দেখে আসতে রাজি করাল ওকে। অবশেষে একদিন ওরা দু’জন গোসাবায় গিয়ে পৌঁছল। ঘটনাচক্রে সেদিন ছিল হ্যামিলটনের জন্মদিন। অবাক হয়ে ওরা দেখল ঠিক একটা পুজোর মতো করে জয়ন্তী উদ্যাপন করা হচ্ছে। এস্টেটের বিভিন্ন জায়গায় স্যার ড্যানিয়েলের মূর্তিগুলোকে মালা চন্দন দিয়ে সাজানো হয়েছে, ধূপ-ধুনো জ্বলছে সামনে, মূর্তির সামনে গিয়ে লোকে গড় হয়ে প্রণাম করছে। বোঝাই যাচ্ছিল স্থানীয় মানুষের কাছে এই স্কট সাহেব একজন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি, প্রায় ভগবানের মতো ভক্তি করে হ্যামিলটনকে এখানকার লোকেরা। বাসিন্দাদের কাছে এস্টেটের আদর্শবাদী প্রতিষ্ঠাতার গল্প শুনে অবশেষে মত পরিবর্তন করতে বাধ্য হল নির্মল আর নীলিমা। মনে মনে একটু লজ্জাও হল ওদের।

    কোথাকার কোন বিদেশি পুঁজিপতি এই জল-জঙ্গলের দেশে এসে গরিব মানুষের দুঃখ দূর করার জন্য কত কিছু করেছেন, আর সেখানে কলকাতা শহরের বাইরে মানুষ কীভাবে থাকে সে ব্যাপারে ওদের কোনও ধারণাই নেই। এতদিন ধরে যা বড় বড় প্রগতিশীল কথা বলে এসেছে সেগুলি হঠাৎ কেমন শূন্যগর্ভ মনে হল নির্মলের।

    দু-একদিনের মধ্যেই মন স্থির করে ফেলল ওরা। আর লুসিবাড়িতে পা দেওয়ার পর ঠিক করে ফেলল এই দ্বীপেই এসে কাটাবে কয়েক বছর। সেবার কলকাতায় ফিরে গিয়ে নিজেদের সামান্য জিনিসপত্র যা ছিল গুছিয়ে নিল নির্মল আর নীলিমা, তারপর বর্ষা কেটে যাওয়ার পর একদিন চাটিবাটি গুটিয়ে এসে উঠল লুসিবাড়িতে।

    প্রথম কয়েক মাস ওরা যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। সব কিছুই এখানে একেবারে নতুন, সব জায়গার থেকে আলাদা। এমনিতে গ্রামগঞ্জের ব্যাপারে যেটুকু ধারণা ওদের ছিল সেসব সাধারণ সমতলের গ্রাম। সেসব জায়গার সঙ্গে এতটুকুও মিল নেই এই ভাটির দেশের। অদ্ভুত এখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনপ্রণালী ওদের মতো শহুরে লোকেদের বোধবুদ্ধির বাইরে। কতটুকুই বা দূর এখান থেকে কলকাতা শহর? মেরেকেটে সাতানব্বই কিলোমিটার। কিন্তু এদের সম্পর্কে বলতে গেলে কিছুই জানে না কলকাতার মানুষ। কত কথাই তো বলা হয় গ্রামভারতের স্মরণাতীত কালের ঐতিহ্য নিয়ে, কিন্তু চেনা জগতের থেকে একেবারে অন্যরকম এই পৃথিবীর কথা ক’টা লোক জানে? ক’জন চোখে দেখেছে এরকম একটা জায়গা যেখানে জাতপাত নেই, উঁচুনিচুর ভেদ নেই? আবার অন্যদিকে, কোথায় গেল সেই সমবায় ঋণ ভিত্তিক গণতান্ত্রিক দেশ? এখানকার সেই আলাদা মুদ্রা আর ব্যাঙ্কেরই বা কী হল? ভাটির দেশের কাদায় সোনা ফলানোর যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল সে সোনা কোথায়?

    দারিদ্র্য এত চরম এই ভাটির দেশে যে পঞ্চাশের মন্বন্তরের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল নির্মল আর নীলিমার। তফাত শুধু একটা খিদে, মৃত্যু আর বিপর্যয় লুসিবাড়ির মানুষের রোজকার জীবনযাপনের অঙ্গ। দশকের পর দশক ধরে মানুষ বাস করছে এই দ্বীপে, কিন্তু বহু চেষ্টায়ও এখানকার জমির লোনাভাব পুরোপুরি দূর করা যায়নি। চাষবাস তাই বিশেষ হয় না, যেটুকু ফসল ওঠে তাও খুবই নিকৃষ্ট মানের। দ্বীপের বেশিরভাগ মানুষই একবেলা খেয়ে থাকে। এত বছর ধরে এত পরিশ্রমে যে বাঁধ বাঁধা হয়েছে, তার ওপরেই বা কতটুকু ভরসা করা যায়? ঝড়ে বন্যায় প্রায়ই ফাটল ধরে এখানে সেখানে। আর বাঁধ ভেঙে একবার যদি লোনা জল ঢুকে পড়ে গ্রামের মধ্যে, বেশ কয়েক বছরের মতো চাষবাসের দফারফা। শুরুতে যারা এসে বসত শুরু করেছিল লুসিবাড়িতে তাদের বেশিরভাগই ছিল চাষিবাসি মানুষ। বিনেপয়সার চাষের জমি দিয়ে এখানে এনে বসানো হয়েছিল তাদের। এদিকে অনাবাদি জমিতে ফসল ভাল হয় না। অথচ পেটের জ্বালাও বড় বালাই। তাদের কেউ তাই শুরু করল মাছ ধরতে, আবার কেউ বা গেল জঙ্গলের দিকে, যদি কিছু শিকার পাওয়া যায় সেই আশায়। ফল হল মারাত্মক। বহু লোক জলে ডুবে মরল, অনেককে কুমিরে কামটে টেনে নিয়ে গেল। এই বাদাবন থেকে যা পাওয়া যায় তাতে রোজকার পেটের খিদে মেটে না। তবুও হাজার হাজার মানুষ জঙ্গলে যেতে শুরু করল, সামান্য একটু মধু, মোম, জ্বালানি কাঠ বা কেওড়া গাছের টোকো ফলের আশায়। ফলে প্রতিদিনই একটা না একটা লোক মরত হয়–বাঘের বা কুমিরের মুখে, কিংবা সাপের ছোবলে।

    আর স্কুলটারও যা ছিরি দেখল ওরা সে আর বলবার নয়। থাকার মধ্যে আছে চারটে দেওয়াল আর মাথার ওপরে একটা ছাদ। এস্টেটের তো ভাঁড়ে মা ভবানী। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উন্নয়ন, সবকিছুর জন্য পয়সার বরাদ্দ আছে ঠিকই, কিন্তু সে পয়সা যে কোথায় যায় তা কেউ জানে না। লোকে বলে ফান্ডের সব টাকাই যায় আসলে ম্যানেজারবাবুর পকেটে, আর সে নিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করলেই পোষা গুণ্ডা লেলিয়ে তার মুখ বন্ধ করার ব্যবস্থা আছে। পুরো জায়গাটাই যেন দ্বীপান্তর পাওয়া লোকেদের কলোনি। পরিবেশটাও দমবন্ধ, প্রায় জেলখানার মতো।

    নির্মল আর নীলিমা হ্যামিলটনের স্বপ্নরাজ্যের খোঁজে লুসিবাড়িতে আসেনি বটে, কিন্তু এখানে এসে দারিদ্র্যের এরকম নির্মম চেহারা দেখতে হবে সেটাও ওদের কল্পনাতে ছিল না। সব দেখেশুনে একটাই প্রশ্ন মনে এল ওদের : “কী করা যায় এই মানুষগুলোর জন্য?”

    কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে নির্মল লেনিনের “কী করতে হবে” বইটা বারবার পড়তে লাগল, কিন্তু সন্তোষজনক কোনও পথ খুঁজে পেল না। তুলনায় নীলিমার বাস্তবুদ্ধি অনেক বেশি। পুকুরে বা কুয়োতে স্নান করতে কি কাপড় কাঁচতে গিয়ে গ্রামের মহিলাদের সঙ্গে দেখা হলে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে শুরু করল ও। তাদের সুখদুঃখের খবরও জেনে নিতে লাগল।

    লুসিবাড়িতে আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করল নীলিমা। দ্বীপের মহিলাদের বেশিরভাগেরই বেশভূষা বিধবাদের মতো–সাদা শাড়ি, সাদা সিঁথি, হাতে একগাছা রুলিও নেই। মাঝে মাঝে তো এমন হয় যে একজনও সধবা মহিলা খুঁজে পাওয়া যায় না পুকুরঘাটে কি কুয়োতলায়। খোঁজখবর করে নীলিমা জানতে পারল ভাটির দেশের এ এক অদ্ভুত নিয়ম। এখানকার মেয়েরা ছোটবেলা থেকেই জেনে আসে শাখা সিঁদুরের জোর ওদের নেই। বিয়ে যদি হয়ও, কয়েক বছরের মধ্যেই স্বামীহারা হতেই হবে। কেউ ঠেকাতে পারবে না। পঁচিশ, কি খুব বেশি হলে তিরিশ বছর, তার বেশি বয়স পর্যন্ত স্বামী-সোহাগ লেখা নেই ওদের কপালে। এ ধারণা ওদের একেবারে মর্মে মর্মে গেঁথে গেছে। সেই জন্যই ঘরের লোক মাছ ধরতে কি জঙ্গল করতে গেলে এখানকার মেয়েরা রঙিন শাড়ি ছেড়ে সাদা কাপড় পরে, সিঁদুর ধুয়ে ফেলে মাথা থেকে। যেন আগে থেকে দুঃখভোগ করে নিতে চায় স্বেচ্ছায়–যদি তাতে একটু দেরিতে আসে সে দুঃখের দিন। নাকি অনিবার্য ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে নিতেই এই নিয়ম বানিয়ে নিয়েছে এরা?

    পুরো ব্যবস্থাটার প্রচণ্ড তীব্রতা নীলিমাকে যেন একটা ঝাঁকি দিয়ে গেল। ওর চেনা। জগতের মহিলারা–ওর মা কি দিদি তো মরে গেলেও এভাবে তাদের সধবার বেশ ত্যাগ করতে পারবে না। নিজেই কি পারবে নীলিমা? এত প্রগতিশীলতার শিক্ষা সত্ত্বেও তো ওর কাছে এখনও সজ্ঞানে শাঁখা সিঁদুর ফেলে দেওয়া আর স্বামীর বুকে শেল বিধিয়ে দেওয়া একই ব্যাপার। কিন্তু এই মেয়েদের জন্য বৈধব্যের পরীক্ষা বৃথা যায় কমই। ভাটির দেশের নদী-খাড়ির বাঁকে বাঁকে মরণ ওত পেতে থাকে। পেটের ভাতের জন্য জলে-জঙ্গলে যাওয়া ছাড়া যাদের গতি নেই বেশি দিন শাঁখা-সিঁদুরের বিলাসিতা ভোগ করা তাদের ঘরের বউ মেয়েদের কপালে নেই।

    হিন্দু সমাজের প্রান্তবাসী ভাটির দেশের এই গ্রামে অবশ্য সামাজিক অনুশাসনের চোখরাঙানি নেই। বিধবারা যদি চায় আরেকবার বিয়ে করতেই পারে। কিন্তু সমর্থ পুরুষ মানুষেরই যেখানে আকাল সেখানে সে বাধা থাকাই বা কী, না থাকাই বা কী। বরঞ্চ নীলিমা দেখল সমতলের গ্রাম-শহরের তুলনায় এখানেই বিধবাদের আরও বেশি পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়, বছরের পর বছর সহ্য করে যেতে হয় পীড়ন আর লাঞ্ছনা।

    কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এই মেয়েদের যন্ত্রণার জীবনকে? কোন শব্দ দিয়ে বর্ণনা করবে এদের নীলিমা? এরা তো একটা অন্য শ্রেণী। কিন্তু নির্মলকে কে বোঝাবে। তার মতে শুধুমাত্র এই মেয়েদের কী করে একটা শ্রেণীতে ফেলা যায়? শ্রমিকরা হল একটা শ্ৰেণী, কিন্তু শ্রমিকের বিধবাদের একটা শ্ৰেণী বলে উল্লেখ করার কোনও মানেই হয় না, এরকম কোনও শ্রেণী কখনও হতে পারে না।

    কিন্তু এরা যদি একটা আলাদা শ্রেণী না হয়, তা হলে এরা কী?

    শব্দ আর তত্ত্বের ভাড়ার যখন খালি হয়ে এল তখন অবশেষে বোধোদয় হল নীলিমার। কী আসে যায় নামে? শ্রেণী হোক বা না হোক, এই মেয়েদের কষ্টের জীবন পালটাতেই হবে। সে যে করেই হোক। স্কুলের কাছেই থাকত বছর পঁচিশ বয়সের এক বিধবা মহিলা, তাকে গিয়ে নীলিমা একদিন জিজ্ঞেস করল সে গোসাবা থেকে কিছু সাবান, দেশলাই ও আরও দু-একটা টুকিটাকি জিনিস কিনে আনতে পারবে কি না। লুসিবাড়িতে ওই সব জিনিসের যা দাম, তাতে সেগুলো বিক্রির পর ওর যাতায়াত ভাড়া বাদ দিয়েও হাতে বেশ কিছুটা পয়সা থেকে যাবে। তার অর্ধেক ও নিজের জন্য রাখতে পারে। নীলিমার এই ভাবনার বীজ থেকেই ধীরে ধীরে পাতা মেলল লুসিবাড়ির মহিলা সংগঠন। আর সেদিনের সেই চারাগাছ অবশেষে মহীরুহের আকার নিল বাদাবন ট্রাস্টের জন্মের পর।

    নির্মল আর নীলিমার লুসিবাড়িতে আসার কয়েক বছরের মধ্যেই জমিদারি উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিল সরকার। আইন হল কোনও একজন ব্যক্তি বা সংগঠনের মালিকানায় খুব বেশি জমি থাকতে পারবে না। টুকরো টুকরো হয়ে গেল হ্যামিলটন এস্টেটের সম্পত্তি। যেটুকু যা বাকি ছিল মামলা-মোকদ্দমায় তারও শোচনীয় অবস্থা দাঁড়াল। অন্যদিকে নীলিমার মহিলা সংগঠন তখন দিনে দিনে বাড়ছে। রোজ নতুন নতুন মেয়েরা আসছে নাম লেখাতে, কাজও বেড়ে চলেছে পাল্লা দিয়ে চিকিৎসা, চাষ-আবাদ, ছোটখাটো আইনি সমস্যা–সব ব্যাপারে মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে সংগঠন। আস্তে আস্তে এত বিশাল আকার নিল নীলিমাদের এই আন্দোলন যে সেটা রেজিষ্ট্রি করানোর প্রশ্ন এল তখন। সাথে সাথে খাতায়-কলমে যাত্রা শুরু হল বাদাবন ট্রাস্টের।

    নীলিমার এই কাজ কিন্তু কখনওই নির্মলের পুরোপুরি সহযোগিতা পায়নি। সমাজসেবার গন্ধলাগা এই সব কাজে কোনওদিনই ও বিশেষ উৎসাহ পায়নি। ট্রাস্টের নামটা অবশ্য ওরই দেওয়া। কিন্তু ওই পর্যন্তই।

    আসলে ‘বাদাবন’ শব্দটা ছিল নির্মলের খুব পছন্দের। ও বলত ইংরেজি ‘বেদুইন’-এর মতো বাদাবনও এসেছে আরবি ‘বাদিয়া’ শব্দ থেকে, যার অর্থ মরুভূমি। “কিন্তু ইংরেজরা তো আরবি শব্দটাকেই শুধু একটু পালটে নিয়েছে। আর বাঙালিরা আরবি বাদা’র সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে সংস্কৃত ‘বন’,” নীলিমাকে প্রায়ই বলত নির্মল। “বাদাবন শব্দটা নিজেই যেন দুটো বিরাট ভাষার মোহনায় গড়ে ওঠা একটা দ্বীপের মতো যেন গঙ্গা আর ব্রহ্মপুত্রের মাঝে জেগে ওঠা আরেকটা ভাটির দেশ। তোমার ট্রাস্টের জন্য এর থেকে ভাল নাম আর কিছু হতে পারে না।”

    ট্রাস্ট তৈরি হওয়ার পর প্রথমেই দ্বীপের মাঝামাঝি একটা জায়গায় বেশ খানিকটা জমি কিনল নীলিমারা। পরে, সত্তরের দশকের শেষদিকে, সেই জমির ওপরেই আস্তে আস্তে গড়ে উঠল ওদের নিজস্ব হাসপাতাল, ওয়ার্কশপ, অফিসঘর আর গেস্ট হাউস। কিন্তু সেসব তো বছর দশেক পরের কথা। কানাই প্রথম যখন লুসিবাড়িতে আসে–সেই ১৯৭০ সালে–এসবের কোনও চিহ্নই ছিল না তখন। মহিলা সমিতির মিটিং-ও তখন নির্মলদের ‘বাংলো’র উঠোনেই হত। আর সেখানেই কুসুমের সঙ্গে প্রথম দেখা হল কানাইয়ের।

  • নোঙর

    নোঙর

    নোঙর

    সন্ধ্যার পড়ন্ত আলোয় বড় একটা খাঁড়ির মুখে এসে পৌঁছল ফকিরের ডিঙি। আবছা আঁধারে কয়েক কিলোমিটার দূরের ডাঙা প্রায় দেখাই যায় না। খাঁড়ির মাঝ বরাবর তাকিয়ে পিয়ার নজরে এল কিছু একটা নোঙর করা রয়েছে। মনে হল যেন বেড়া দিয়ে ঘেরা একটা কিছু জলের ওপর ভাসছে। দূরবিন চোখে লাগিয়ে পিয়া দেখল জিনিসটা আর কিছুই না, গোটা ছয়েক মাছ-ধরা নৌকো জড়ো হয়ে রয়েছে এক জায়গায়। নৌকোগুলো আকারে আয়তনে অবিকল ওদের ডিঙিটার মতো একটার সঙ্গে আরেকটা পাশাপাশি দড়ি দিয়ে বাঁধা। এদিকে ওদিকে আরও কতগুলো দড়িদড়া নেমে গেছে জলের ভেতর, বোধ হয় স্রোতের মুখে নৌকোগুলোকে এক জায়গায় ভাসিয়ে রাখার জন্য। প্রায় এক কিলোমিটার দূর থেকেও দুরবিন দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেল পিয়া নৌকোর ওপর চলে ফিরে বেড়াচ্ছে লোকজন। কয়েকজন একা একা বসে বিড়ি ফুকছে, অন্যরা কেউ চা খাচ্ছে, অনেকে আবার গোল হয়ে বসে তাস পেটাচ্ছে। দু-এক জনকে দেখা গেল কাপড় কাঁচছে, বাসন মাজছে, বা স্টিলের বালতি করে জল তুলছে নদী থেকে। ঠিক মাঝখানের একটা নৌকো থেকে ধোঁয়া উঠছে পাকিয়ে পাকিয়ে। ওটাতেই নিশ্চয়ই রান্না-বান্নার ব্যবস্থা। দৃশ্যটা খুব পরিচিত পিয়ার, কিন্তু পুরো ব্যাপারটা কেমন যেন অদ্ভুত। মেকং কি ইরাবড়িতেও ও দেখেছে ঠিক এইভাবেই সন্ধে নামে নদীর ধারের গ্রামগুলোতে। অন্ধকার নেমে আসার সাথে সাথে সেখানেও এইরকম মন্থর ধোঁয়ার কুন্ডলী পাক খেতে খেতে হারিয়ে যায় আবছা আলোয়, গাঁয়ের লোকজন পা চালিয়ে এগোতে থাকে নদীর দিকে, সারাদিনের ধুলোময়লা ধুয়ে রাতের বিশ্রামের জন্য তৈরি হয়। সময় একদিকে যেমন দ্রুত কাটতে থাকে, অন্যদিকে আবার মনে হয় কালের গতি যেন থমকে থেমে গেছে হঠাৎ। কিন্তু ঠিক সেইরকম গ্রামই এখানে ডাঙা ছেড়ে নেমে এসেছে মাঝনদীতে। কেন?

    ডিঙিগুলো চোখে পড়তেই ফুর্তিতে চেঁচিয়ে উঠল টুটুল। তারপর কী সব বকবক করতে লাগল বাপের সঙ্গে। নিশ্চয়ই ওরা চিনতে পেরেছে নৌকোগুলোকে। হয়তো ওদেরই বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনরা আছে ওখানে। এত বছর ধরে নদীতে নদীতে জেলেদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে একটা জিনিস বুঝেছে পিয়া–নিজেদের এলাকার মধ্যে এই সব জেলে বা মাঝিরা প্রত্যেকে প্রত্যেককে চেনে, জানে। মোটামুটি নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় ফকিররা ওই নৌকোর দঙ্গলের লোকজনদের ভালই চেনে, আর একবার ওখানে গিয়ে পৌঁছতে পারলে আদরযত্নেরও অভাব হবে না। আজকে রাতের বিশ্রামটা ওখানেই হবে বোঝা যাচ্ছে। স্নান টান সেরে বন্ধুবান্ধবদের কাছে সারাদিনের অভিজ্ঞতা গল্প করবে ফকির, হয়তো বলবে “দেখো কাকে নিয়ে এসেছি আমাদের সঙ্গে।” হয়তো শুরু থেকেই এখানে এসে রাত কাটানোর পরিকল্পনা ছিল ফকিরের। সেইজন্যই হয়তো নৌকোটা ও এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। কে জানে!

    বাঁকের মুখে ডিঙিটা ঘুরতেই আরও নিশ্চিত হয়ে গেল পিয়া। এর পরের কয়েকটা ঘণ্টা কীভাবে কাটবে ভাবতে লাগল। এইরকম অভিজ্ঞতা তো আর ওর কাছে নতুন কিছু নয়। সার্ভের কাজে বছরের পর বছর নদীতে নদীতে কাটিয়েছে ও, এই রকম জেলেদের সঙ্গে। কতবার এরকম অদ্ভুত অদ্ভুত জায়গায় গিয়ে রাতের জন্য নোঙর ফেলেছে ওদের নৌকো। এখন পর পর কী ঘটবে চোখ বুজে বলে দিতে পারে পিয়া। ওকে দেখে প্রথমে কীরকম বিস্মিত হয়ে যাবে মানুষগুলো, তারপর শুরু হবে প্রশ্নের বন্যা–সবকটার জবাব দিতে হবে ফকিরকে, তারপর অভ্যর্থনার পালা। সে অভ্যর্থনার ভাষা না বুঝলেও জোর করে মুখে হাসি টেনে এনে প্রত্যুত্তর দিতে হবে পিয়াকে। পুরো ব্যাপারটা ভেবেই গায়ে জ্বর এল পিয়ার। এমন নয় যে ওদের কাছ থেকে ওর কোনও বিপদের আশঙ্কা আছে–বরং এই জেলেদের মধ্যেই ও সবচেয়ে নিরাপদ, সেটা ও জানে কিন্তু ওই ভিড়ের মধ্যে এখন কিছুতেই যেতে ইচ্ছে করছে না ওর। তার চেয়ে ফকিরের এই ডিঙিতেই ওর নিজস্ব নিস্তব্ধতার দ্বীপটুকুর মধ্যে গা এলিয়ে চুপচাপ ভাসতে ভাসতে রাতটা কাটিয়ে দেওয়া অনেক আরামের হবে। ওর খুব ইচ্ছে করছিল ফকিরকে বলে এখানে না থেমে এগিয়ে যেতে, পাড়ের কাছে কোনও নিরাপদ জায়গা দেখে রাতের জন্য নৌকো বাঁধতে।

    কিন্তু সে কথা তো আর ফকিরকে বলা যায় না, ভাষার ব্যবধান না থাকলেও পিয়া ওরকম বলতে পারত না। তাই ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গেল পিয়া যখন ও দেখল যে ফকিরের নৌকো ওর যেদিকে ইচ্ছে সেদিকেই যাচ্ছে। একটু পরেই আরও পরিষ্কার বোঝা গেল ডিঙি ঘুরিয়ে নিয়েছে ফকির ওই নৌকোর ঝুঁকের দিক থেকে, পাড়ির ছায়ায় ছায়ায় বেয়ে নিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। বাইরে নিজের মনের ভাব একটুও বুঝতে দিল না পিয়া, দূরবিন হাতে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে নজর রেখে চলল জলের দিকে, কিন্তু ওর বুকের ভেতরটা যেন লাফিয়ে উঠল বাচ্চা ছেলে অযাচিত ল্যাবেঞ্চস হাতে পেলে যেরকম খুশি হয়ে ওঠে, ঠিক সেইরকম আনন্দ হল পিয়ার।

    দিনের আলো মিলিয়ে যেতে একটা খালে নৌকো ঢুকিয়ে নোঙর ফেলল ফকির। স্রোতের টানে টানে মাটি সরে গিয়ে খালটা এখানে সুরক্ষিত একটা খাঁড়ির চেহারা নিয়েছে। বোঝাই যাচ্ছিল আজ রাতে এর থেকে বেশি দূরে আর যাওয়া সম্ভব ছিল না ওদের পক্ষে, কিন্তু ফকিরের হাবভাব দেখে মনে হল ঠিক এই জায়গায় নৌকো বাঁধতে ও চায়নি। ও যেন মনে মনে অন্য কোনও জায়গার কথা ভেবে রেখেছিল। আর সেখানে পৌঁছতে পারেনি বলে যেন নিজের ওপরেই খানিকটা রেগে গেছে।

    এবার বিশ্রামের সময়। সারাদিনে বিচিত্র অভিজ্ঞতার পর যেন একটা শ্লথ শ্রান্তির ছায়া নেমে এসেছে ডিঙির ওপর। কোমরের কষি থেকে দেশলাই বের করে কালচিটে একটা লক্ষ জ্বালাল ফকির। সেই আগুনে বিড়ি ধরিয়ে পাটায় বসে টানতে লাগল ফুকফুক করে। টানতে টানতে যখন ছোট্ট হয়ে এল বিড়িটা তখন সেটা নিভিয়ে উঠে পড়ল ও। ইশারায় পিয়াকে দেখিয়ে দিল নৌকোর পেছনের দিকে ছোট্ট চৌকোনো ঘেরা জায়গাটা–কী করে সামনে একটা পর্দা টেনে সেটাকে বাথরুমের মতো ব্যবহার করা যায়। পুরো ব্যাপারটা পিয়াকে পরিষ্কার করে বোঝানোর জন্যই যেন নদী থেকে এক বালতি লোনা জল তুলে সেই জলে টুটুলকে স্নান করাতে লাগল সাবান ঘষে ঘষে। একটা ক্যানেস্তারায় খানিকটা মিষ্টি জলও রাখা আছে দেখা গেল, মাঝে মাঝে তার থেকে একটু একটু করে নিয়ে সাবানের ফেনা ধুয়ে দিতে লাগল টুটুলের গা থেকে।

    সূর্য ডোবার পর নদীর জোলো হাওয়ায় বেশ টের পাওয়া যাচ্ছিল শীতের কামড়। স্নানের পর ভিজে চুপ্পড় বাচ্চাটা ঠকঠক করে কাঁপছিল ঠান্ডায়। কোথা থেকে একটা চেক কাটা কাপড় বের করে ভাল করে ওর গা মুছিয়ে জামাকাপড় পরিয়ে দিল ফকির। লাল রঙের এই গা মোছার কাপড় আরও কয়েকটা রাখা ছিল নৌকোয়। পিয়ার আবছা মনে হল এরকম কাপড়ের টুকরো আগেও যেন ও দেখেছে, কিন্তু কোথায় দেখেছে সেটা কিছুতেই মনে পড়ল না।

    এবার টুটুলের পালা তার বাবাকে স্নান করাবার। গায়ের সমস্ত জামাকাপড় খুলে শুধু একটা ল্যাঙোট পরে পাটাতনের ওপর বসল ফকির, আর নদী থেকে ঠান্ডা জল তুলে টুটুল ঢালতে লাগল ওর মাথায়। বাপকে স্নান করানোর ফুর্তিতে ওর খিলখিল হাসি আর চিৎকারে বেশ মজা লাগছিল পিয়ার। এত রোগা ফকির যে ওর খালি গায়ে পাঁজরের সবক’টা হাড় গোনা যায়। টিনের কৌটোর ওপর থেকে লেবেলটা ছিঁড়ে নিলে তার ঢেউখেলানো গা-টা যেমন দেখায় ফকিরের হাড় বের-করা শরীরটা দেখে ঠিক সেইরকম মনে হচ্ছিল। ওর সারা গা বেয়ে সরু আঁকাবাঁকা রেখার মতো গড়িয়ে পড়ছে জল, পাঁজরের হাড়ে ধাক্কা খেতে খেতে নেমে আসছে ছোটো ছোটো ঝরনার মতো।

    বাপ-বেটার স্নান শেষ হল। এবার পিয়ার পালা। নদী থেকে এক বালতি জল তুলে রাখল ফকির, একটা শাড়ি টেনে দিল সামনে পর্দার মতো। কিন্তু এইটুকু ডিঙির ওপর নড়াচড়া করাই এক সমস্যা। দু’জনকে পাশ কাটিয়ে হেঁটে যাওয়া তো অসম্ভব। ছইয়ের নীচে প্রায় বুকে হেঁটে কনুইয়ে ভর দিয়ে ওদের একদিক থেকে আরেক দিকে যেতে হচ্ছিল। ফকিরকে এক হাত দিয়ে লুঙ্গিটা চেপে ধরে থাকতে হচ্ছিল, যাতে খুলে না পড়ে। পাশ দিয়ে যাবার সময় পিয়া আর ও মুখোমুখি হয়ে গেল। চোখে চোখ পড়তে দু’জনেই হেসে ফেলল।

    ডিঙির পেছন দিকে এসে পিয়া দেখল আবছা অন্ধকারে পারার মতো চিকচিক করছে জল। আকাশ ভরা ফুটফুটে জোছনায় সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাগুলো শুধু চোখে পড়ছে। নৌকোর লম্ফটা ছাড়া জলে ডাঙায় কোথাও কোনও বাতি দেখা যাচ্ছে না। কোথাও কোনও শব্দও নেই নদীর ছলাৎ ছলাৎ ছাড়া। পাড় এখান থেকে এত দূরে যে এমনকী জঙ্গলের ঝিঁঝির ডাকও কানে আসছে না। চারদিকে জনমানবের চিহ্ন নেই। এর আগে একমাত্র মাঝসমুদ্রে ছাড়া আর কোথাও এরকম পরিস্থিতিতে থেকেছে বলে মনে পড়ল না পিয়ার। তবুও লম্ফর হলদে আলোয় ওর ছোট্ট বাথরুমের ভেতর তাকিয়ে ও দেখল পরিষ্কার স্নান টানের জন্য সব ব্যবস্থাই মজুত রেখেছে ফকির। সত্যি বলতে কী, এই মাঝনদীতে এইরকম ব্যবস্থা আশাই করেনি পিয়া। সদ্যতোলা নদীর লোনা জলের বালতির পাশেই একটা ক্যানেস্তারায় খানিকটা টলটলে মিঠে জল রাখা আছে, একটা তাকের ওপর এক টুকরো সাবান, আর তার পাশে একেবারে অপ্রত্যাশিত একটা জিনিস ছোট্ট একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে খানিকটা শ্যাম্পু। ক্যানিং-এ কয়েকটা চায়ের দোকানে এরকম শ্যাম্পুর প্যাকেটের লম্বা ফিতে ঝুলতে দেখেছে পিয়া। তবুও, জিনিসটা হাতে নিয়ে ওর মনে হল এইরকম একটা জায়গায় এটা একেবারে বেখাপ্পা। ও হয়তো টান মেরে ছুঁড়ে ফেলেই দিত ওটা, কিন্তু মনে হল ফকিরদের কাছে প্যাকেটটা নিশ্চয়ই বহু মূল্যবান (কে জানে ক’টা কঁকড়ার বিনিময়ে কিনতে হয়েছে ওটা), আর শুধু ওর সম্মানেই মনে হয় এটা আজকে বের করা হয়েছে। এটা ফেলে দিলে ওদের ভালবাসার আন্তরিকতাকে অসম্মান করা হবে। এই শ্যাম্পু মাথায় দেওয়ার বিন্দুমাত্র বাসনা না থাকা সত্ত্বেও পিয়া তাই একটুখানি হাতে নিয়ে চুলে মাখল। জল ঢেলে ফেনা ধুয়ে নিল তারপর যদি জলে ভেসে যাওয়া বুদ্বুদগুলো চোখে পড়ে ফকিরের।

    দু’এক মগ জল গায়ে ঢালতেই কাঁপুনি ধরল পিয়ার। এতক্ষণে মনে হল গা মোছার জন্য কোনও তোয়ালে-টোয়ালে তো সঙ্গে নেই! শীত কাটানোর জন্য পাটাতনের ওপর উবু হয়ে বসে নিজের হাঁটুদুটোকে জড়িয়ে ধরল ও। এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখতে পেল গা মোছার ব্যবস্থাও করে রেখেছে ফকির। ওই লাল চেক-কাটা কাপড়ের একটা টুকরো বাখারিতে ঝোলানো রয়েছে ওর জন্য। টুকরোটা খটখটে শুকনো। তার মানে বেশ কিছুক্ষণ ধরেই নিশ্চয়ই ওটা রাখা আছে ওখানে। জিনিসটা হাতে নিয়েই ওর কীরকম যেন মনে হল এটা পরেই জলে ঝাঁপ দিয়েছিল ফকির ওকে তোলার জন্য। এই কাপড়গুলো অনেক কাজে লাগে, পিয়া জানে। নাকের কাছে এনে ওর মনে হল রোদে-শুকোনো খরখরে কাপড়টায় নদীর কাদামাটির ধাতব ঘ্রাণ ভেদ করে আবছা একটু ঘামের গন্ধও যেন পাওয়া যাচ্ছে।

    হঠাৎ পিয়ার মনে পড়ে গেল এরকম কাপড় ও আগে কোথায় দেখেছে। যখন ও ছোটো ছিল, আমেরিকায় ওদের এগারোতলার ফ্ল্যাটে এই জিনিস দেখেছে ও। ওর বাবার ওয়ার্ডরোবের হাতলে জড়ানো। পরে আস্তে আস্তে ও বড় হয়েছে, কাপড়টা কিন্তু রয়েই গেছে ওখানে–ধূলিমলিন, শতছিন্ন। মাঝে মাঝেই ওটা খুলে ফেলে দেওয়ার ইচ্ছে হত পিয়ার, কিন্তু বাবা কিছুতেই ফেলতে দিত না। এমনিতে সেন্টিমেন্ট-ফেন্টিমেন্টের বিশেষ বালাই ছিল না বাবার, দেশের ব্যাপারে তো নয়ই। অন্যদের মতো দেশের স্মৃতি আঁকড়ে থাকা পছন্দ করত না বাবা। বলত, “আমি বর্তমানের মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে ভালবাসি”, সাদা বাংলায় ওই বর্তমানের মাটির অর্থ চাকরির উন্নতির সিঁড়ি। সেটা পিয়া পরে বুঝেছে। কিন্তু ওই কাপড়ের টুকরোটা ফেলে দেওয়ার কথা তুললেই বাবা প্রায় আর্তনাদ করে উঠত। বলত এত বছর ধরে ওটা আছে ওখানে যে নখ বা চুলের মতো ওটা প্রায় শরীরের অংশ হয়ে গেছে বাবার। “ওটার সঙ্গে আমার ভাগ্য জড়ানো রয়েছে”, ওটা ফেলে দেওয়ার কথা ভাবাই যায় না। কী যেন নাম কাপড়ের টুকরোটার? কী যেন বলত বাবা? শব্দটা জানত একসময় পিয়া। কিন্তু বহুদিনের অব্যবহারে সেটা স্মৃতি থেকে মুছে গেছে।

  • কুসুম

    কুসুম

    কুসুম

    গেস্ট হাউসটার ছাদে দাঁড়ালে একটানা অনেকটা অবধি চোখে পড়ে। বেশ খানিকটা দূরে হ্যামিলটন হাই স্কুল, তারও পরে নির্মলদের আগেকার বাড়ির জায়গাটা পর্যন্ত এখান থেকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল কানাই। সে বাড়িটার জায়গায় এখন একটা হস্টেল উঠেছে স্কুলের ছাত্রদের জন্য, কিন্তু কানাইয়ের মনে নির্মলের সেই বাংলোর ছবি এখনও স্পষ্ট। নামে ‘বাংলো’ হলেও আকারে প্রকারে বাড়িটা আসলে ছিল স্রেফ একটা গুমটি। পুরোটা কাঠের তৈরি, ইট কি সিমেন্টের বালাই নেই। মাটি থেকে একটু ওপরে হাত-খানেক উঁচু কয়েকটা খুঁটির ওপর যেন কোনওরকমে দাঁড় করানো ছিল সেই বাড়ি। মেঝেটাও ছিল এবড়ো খেবড়ো মতো। শীতে বর্ষায় আবার তার ঢাল বদল হত। কানাইয়ের মনে আছে বর্ষাকালে কেমন স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যেত মেঝেটা, একটু দেবে যেত নীচের দিকে। শীতকালে হাওয়া শুকনো হয়ে এলে আবার টানটান যেমনকে তেমন।

    সাকুল্যে দুখানা মাত্র ঘর ছিল সেই ‘বাংলোয়। একটা শোয়ার ঘর, আরেকটাকে বলা যেতে পারে স্টাডি মতন, নির্মল আর নীলিমা দুজনেই সেখানে তাদের লেখাপড়ার কাজকর্ম করত। ওই ঘরেই একটা খাট পাতা হয়েছিল কানাইয়ের জন্য। সব সময় মোটা সুতির মশারি ফেলা থাকত তার ওপর। নির্মলদের বড় খাটটাতেও থাকত। যত না মশার জন্য, তার চেয়েও অন্যান্য প্রাণীর জন্য মশারিটা বেশি জরুরি ছিল সে সময়। রাতে তো বটেই, এমনকী দিনের বেলাতেও মশারি খাটানো না থাকলে সাপ-খোপ কি কাঁকড়াবিছে বালিশের তলায় বা বিছানার চাদরের নীচে ঢুকে বসে থাকত। পুকুরের পাড়ে একটা কুঁড়েতে নাকি একদিন তক্তপোশের ওপর একটা মরা মাছ পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছিল। সে বাড়ির বউ এসে গল্পটা বলেছিল। একটা আস্ত কইমাছ কে জানে কখন কানে হেঁটে এসে উঠেছে, তারপর বিছানার ওপরেই মরে পড়ে রয়েছে।

    রাত্তিরে মশারি গোঁজার আগে সব কোনা-খামচাগুলো একবার ভাল করে দেখে নিতে হত। এইসব রোজকার সাধারণ কাজের মধ্যেও মাঝেমধ্যেই ছোটবড় নানা উত্তেজনার খোরাক থাকত ভাটির দেশে। লুসিবাড়িতে আসার কিছুদিন পর একবার তো মশারি খাটাতে গিয়ে আরেকটু হলেই বিপদে পড়েছিল নীলিমা। রাত্রিবেলা, ঘরে একটা মাত্র মোমবাতি। সেটা আবার রাখা আছে ঘরের অন্য প্রান্তে, জানালার তাকের ওপর। নীলিমা একেই বেঁটেখাটো, তার ওপর চোখেও বেশ পাওয়ার, কম আলোতে ভাল দেখে না। খাটের চারকোনায় চারটে বাঁশের খুঁটি আটকানো, সেগুলির থেকেই মশারিটা ঝোলানো হত। খুঁটি অবধি ভাল করে হাত যায় না, পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে কোনওরকমে, আন্দাজে আন্দাজে মশারির দড়িগুলি বাঁধছিল নীলিমা। আচমকা একটা দড়ি যেন জ্যান্ত হয়ে ছিটকে এল। সঙ্গে ফোঁস করে একটা আওয়াজ। নীলিমা তো পড়ি কি মরি করে কোনওরকমে মারল এক লাফ। হাতটা টেনে নেওয়ার আগেই চটাস করে লেজের একটা ঝাঁপটা লাগল তালুর মধ্যে। তারপর একেবেঁকে দরজার তলা দিয়ে সাপটা যখন বেরিয়ে যাচ্ছে ও দেখল সেটা একটা বেশ বড়সড় চিতিবোড়া। যথেষ্ট বিষাক্ত সাপ। সাধারণত মাঝারি গাছের ডালপালার মধ্যে এদের বাস। মশারি খাটানোর বাঁশটাকেও তাই নিজের জায়গা মনে করে বেশ গুছিয়ে বসেছিলেন বাবাজি।

    রাত্তিরে খাটে শুলেই কানাইয়ের মনে হত গোটা ছাদটা যেন জ্যান্ত হয়ে উঠেছে। চালার মধ্যে থেকে থেকেই অদ্ভুত সব আওয়াজ পাওয়া যেত–কখনও হয়তো কিছু একটা খচমচ করে দৌড়ে গেল, অথবা ফোঁস করে উঠল কোথাও, সঙ্গে সঙ্গে হয়তো একটা প্রবল কিচমিচ। মাঝে মধ্যেই ঠপ করে চালা থেকে নীচে পড়ত প্রাণীগুলো। পড়েই অবশ্য লাফিয়ে উঠে বেরিয়ে যেত দরজার তলা দিয়ে, কিন্তু মাঝে মধ্যে সকালে ঘুম থেকে উঠে কানাই দেখত একটা মরা সাপ কি কয়েকটা পাখির ডিম পড়ে আছে মেঝের ওপর, আর পিঁপড়েরা ভোজ লাগিয়ে দিয়েছে। কখনও কখনও একেকটা আবার সোজা মশারির ওপর এসে পড়ত। পড়েই এমন নড়াচড়া শুরু করত যে মশারি টাঙানোর খুঁটিগুলো পর্যন্ত দুলতে থাকত। এইরকম ক্ষেত্রে একটাই উপায় ছিল। বালিশটা নিয়ে চোখ বুজে এক ঝাঁপটা মারতে হত মশারির চালে। সাপ, ইঁদুর, বিছে যাই হোক না কেন, ওই এক ঝাঁপটাতেই পগার পার হয়ে যেত তারা। কয়েকটা অবশ্য শূন্যে ছিটকে উঠে আবার মশারির ওপর এসে পড়ত। সেরকম হলে ফের বালিশ হাতে রণাঙ্গনে নামতে হত কানাইকে।

    বাংলোর পেছন দিকে একটা খোলা উঠোন মতো জায়গা ছিল, সেখানেই লুসিবাড়ি মহিলা সমিতির মিটিং-টিটিং হত। ১৯৭০ সালে কানাইকে যখন নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল এখানে, তখনও মহিলা সমিতি এত বিরাট হয়নি, টিমটিম করে চলছিল কোনওরকমে। সপ্তাহে কয়েকবার করে সমিতির সদস্যারা জড়ো হত নীলিমার বাড়ির উঠোনে। সেলাই-ফোঁড়াই, কাপড় বোনা, সুতো রং করা–এইসব নানান রোজগারমূলক কাজকর্ম নিয়ে আলাপ আলোচনা হত। সাধারণ গল্পগুজবও হত নানা রকম। আর ঘরের কথা উঠলেই অনেক সব জমানো ক্ষোভ-দুঃখের কথাও চলে আসত অনিবার্য ভাবেই।

    শুরুর দিকে গাঁয়ের মেয়েদের এইসব ঘরোয়া পাঁচালি শুনতে অসহ্য লাগত কানাইয়ের। সমিতির মিটিং শুরু হলেই ও তাই বেরিয়ে পড়ত বাড়ি থেকে। ঘুরে বেড়াত এদিক ওদিক। কিন্তু তার একটা সমস্যাও ছিল। লুসিবাড়িতে কানাইয়ের সমবয়সি কোনও বন্ধু ছিল না। আর সেরকম কোনও যাওয়ার জায়গাও ছিল না। ওর বয়সের ছেলেপুলে যারা ছিল তারা হয় একেবারে সরল-সোজা, চুপচাপ অথবা অকারণে মারকুটে ধরনের। আর কানাইও মনে মনে জানত যে কয়েক সপ্তাহ পরেই ও এই নির্বাসন থেকে মুক্তি পাবে, ওদের সঙ্গে মেশার জন্য তাই বিশেষ কোনও ইচ্ছেও হয়নি। বারদুয়েক আড়াল-আবডাল থেকে ছোঁড়া ঢিল খাওয়ার পর অবশেষে ওর মনে হল বাড়ির বাইরে থেকে ভেতরেই বেশি নিরাপদ। ফলে দুপুরগুলো ওর কাটতে লাগল মাসির বাংলোর স্টাডিতে শুয়ে-বসে। উঠোনে মিটিং-এর কথাবার্তা হট্টগোলও গা সওয়া হয়ে এল আস্তে আস্তে।

    এইরকম একটা মিটিঙেই প্রথম কুসুমকে দেখল কানাই। সামনের একটা দাঁত একটু ভাঙা, ছোটো করে কাটা চুল–একটু যেন আলাদা দ্বীপের অন্যসব মেয়েদের থেকে। আগের বছর টাইফয়েড হওয়ার পর ওকে নেড়া করে দেওয়া হয়েছিল। কোনওরকমে বেঁচে উঠেছিল মেয়েটা। তখনও বেশ দুবলা, সবাই আগলে আগলে রাখত ওকে। সমিতির মিটিংগুলোর সময় ও সেখানে থাকলে কেউ তাই কিছু বলত না। একই কারণে বোধ হয় সেই পনেরো-ষোলো বছর বয়সেও ফ্রক পরে ঘোরাঘুরিতেও ওর বারণ ছিল না। ওর বয়সি গাঁয়ের অন্যান্য মেয়েদের তো শাড়িই পরতে হত। ওই বয়সেও ফ্রক পরার পেছনে অবশ্য অন্য একটা কারণও থাকতে পারে। জামাগুলি তো তখনও যথেষ্ট ব্যবহারযোগ্য। শাড়ি ধরার আগে আরও যতটুকু পরে নেওয়া যায় নিঙড়ে নেওয়া যায় সবটুকু উপযোগিতা। গোটা গোটা ফ্রকগুলি কি প্রাণে ধরে ফেলে দেওয়া যায়?

    একদিন সমিতির মিটিং-এ গাঁয়ের এক বউ সবিস্তারে তার দুঃখের কথা শোনাচ্ছিল। কিছুদিন আগের এক রাতের ঘটনা, বলছিল বউটি। তার সোয়ামি গিয়েছিল মাছ ধরতে, ঘরে শুধু সে আর বাচ্চারা। সবাই গভীর ঘুমে। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, একখানা লম্ফ শুধু টিমটিম করে জ্বলছে। এমন সময় গলা পর্যন্ত মাল টেনে টলতে টলতে ঘরে এসে ঢুকল তার শ্বশুর। হাতে এক বিশাল রামদা। বাচ্চাগুলির সামনেই দাটা গলার কাছে চেপে ধরে ছেলের বউয়ের কাপড়ে টান দিল সে। বউ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতেই লোকটা দায়ের এক কোপ মারল তার হাতে। বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলটা প্রায় দু’-আধখান হয়ে গেল। শেষমেশ জ্বলন্ত লক্ষটা বুড়োর গায়ে ছুঁড়ে মেরে সে যাত্রা রক্ষা পেল মেয়েটি। এদিকে বুড়োর লুঙ্গিতে তো গেল আগুন ধরে। বেশ খানিকটা পুড়েও গেল। তাতেই শ্বশুরবাড়ির লোকেরা খেপে গেল। ঘাড় ধরে বউকে বাড়ির বাইরে বের করে দিল। বেচারির স্বামীর ঘর করা শেষ হল স্রেফ নিজের আর ছেলেমেয়েদের ইজ্জত বাঁচাতে চেয়েছিল বলে।

    গল্পের এই জায়গায় এসে গলা চড়তে লাগল বউটির। যেন ঘটনাটা প্রমাণ করার জন্যই প্রায় চিৎকার করে সে বলতে লাগল, “এই যে, এইখানে কোপ মেরেছিল আমাকে, এইখানে, এইখানে।”

    কানাই আর থাকতে না পেরে দরজা দিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখতে গেল। যে বউটি গল্প বলছিল তাকে দেখা যাচ্ছিল না। বাকি সকলে তার দিকেই তাকিয়ে ছিল বলে কানাইকে কেউ নজর করল না। শুধু একজন ছাড়া কুসুম। বাকিদের থেকে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে ছিল সে। চোখে চোখ পড়ল দু’জনের। মুহূর্তের জন্য মনে হল ওরা যেন সৃষ্টির আদিমতম সময়ে কোনও প্রান্তরের দুদিক থেকে পরস্পরের দিকে চেয়ে রয়েছে, একে অন্যকে মেপে নিতে চাইছে, বুঝে নিতে চাইছে কতটা ভয়ংকরের সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে অন্য প্রান্তে। মনে হচ্ছিল দু’জনের মধ্যেকার এই দূরত্বটুকুর মধ্যেই হয়তো গোপন রয়েছে আজকের এই আবেগের সূত্র–এই বীভৎস হিংসার বীজ। এই পারস্পরিক সমীক্ষার ফলাফল কিন্তু সাধারণ ভয় বা বিতৃষ্ণা ছিল না, দু’জনের দৃষ্টিতেই ছিল একে অপরের সম্পর্কে এক সজাগ কৌতূহল।

    কানাইয়ের যদূর মনে পড়ে, কুসুমই ওর সঙ্গে প্রথম এসে কথা বলেছিল। সেই দিন নয়, অন্য আরেক দিন। সকাল বেলায়। বাংলোর মেঝেতে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে একটা বই পড়ছিল কানাই। পরনে স্রেফ একটা খাকি হাফপ্যান্ট। বইটা রাখা ছিল ওর কোলের ওপর। হঠাৎ মনে হল দরজার বাইরে থেকে কে যেন ওকে উঁকি মেরে দেখছে। বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে ও দেখল হাঁটা চুল আর ছেঁড়া ফ্রক-পরা ধীর গম্ভীর একটা চেহারা দাঁড়িয়ে রয়েছে দরজার সামনে। খানিকটা ঝগড়াটে গলায় চোখমুখ কুঁচকে ওকে জিগ্যেস করল, “কী করছিস তুই এখানে বসে?”

    “বই পড়ছি।”

    “আমি দেখেছি–সেদিন তুই সব শুনছিলি।”

    “কী হয়েছে তাতে?” কাঁধ ঝাঁকাল কানাই।

    “আমি বলে দেব।”

    “বলগে যা।” কিন্তু বাইরে সাহস দেখালেও ভেতরে ভেতরে ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল কানাইয়ের। যদি সত্যি সত্যি বলে দেয়। প্রসঙ্গটা অন্য দিকে ঘোরাতে তাড়াতাড়ি একপাশে সরে কুসুমের বসার জন্য জায়গা করে দিল ও। কানাইয়ের পাশেই এসে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসল মেয়েটা। একেবারে গা ঘেঁষে। হাঁটুর ওপর চিবুক। খুব কাছ থেকে ওর দিকে তাকিয়ে দেখার সাহস হল না কানাইয়ের, কিন্তু টের পাচ্ছিল মেয়েটার শরীরে ঠেকে আছে ওর শরীর ওর কনুইয়ের সঙ্গে, পায়ের সঙ্গে, হাঁটুর সঙ্গে ঘষা খাচ্ছে কুসুমের কনুই, পা, হাঁটু। ওর বাঁদিকের বুকের ওপর একটা ছোট্ট তিল নজরে এল কানাইয়ের। খুবই ছোট্ট একটা তিল, কিন্তু কিছুতেই ও আর সেটার থেকে চোখ সরাতে পারছিল না।

    “দেখি, তোর.বইটা দেখা তো আমাকে”, বলল কুসুম।

    বইটা ছিল একটা ইংরিজি রহস্য গল্প। কানাই তাই পাত্তাই দিল না ওর অনুরোধকে। “এটা দেখে তুই কী করবি? কিছুই বুঝবি না।”

    “কেন বুঝব না?”

    “তুই ইংরেজি পড়তে পারিস?” জিগ্যেস করল কানাই। “না।”

    “তালে দেখতে চাইছিস কেন?”

    জবাব না দিয়ে কয়েকমুহূর্ত প্যাটপ্যাট করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকল মেয়েটা। তারপর ডানহাতটা ওর নাকের সামনে এনে আস্তে আস্তে মুঠোটা খুলে জিগ্যেস করল, “এটা কী জানিস?”

    একটা ঘাসফড়িং। তাচ্ছিল্যের ভাব করে কানাই বলল, “না জানার কী আছে। এ তো সব জায়গায় পাওয়া যায়।”

    “তা’লে দেখ”, বলেই খপ করে ফড়িংটা নিজের মুখের ভেতরে পুরে দিল কুসুম।

    ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হাতের বইটা নামিয়ে হাঁ করে মেয়েটার দিকে চেয়ে রইল কানাই। “তুই খেয়ে ফেললি ওটাকে?”

    হঠাৎ হাঁ করল কুসুম। সঙ্গে সঙ্গে ঘাসফড়িংটা একলাফে বেরিয়ে সোজা কানাইয়ের মুখের ওপর এসে পড়ল। চমকে চেঁচিয়ে উঠে পেছন দিকে উলটে পড়ে গেল কানাই, আর খিলখিল করে হাসতে লাগল মেয়েটা।

    “কী বোকা রে! ওটা তো এমনি একটা পোকা। ভিতু কোথাকার।”

  • কথা

    কথা

    কথা

    স্নানের পর জামাকাপড় পালটে ছইয়ের তলা দিয়ে গুঁড়ি মেরে নৌকোর সামনের দিকটায় গেল পিয়া। সেই চেক-চেক কাপড়ের টুকরোটা তখনও ঝুলছে হাতে। কিছুতেই মনে আসছে না কাপড়টার নাম। ফকিরকে একবার জিগ্যেস করল, কিন্তু ওর ইশারার প্রশ্ন ফকির বুঝতেই পারল না। একটু অবাক হয়ে হাঁ করে চেয়ে রইল ওর মুখের দিকে। অবশ্য বুঝবে যে, সে আশাও পিয়া বিশেষ করেনি; কারণ এতক্ষণের মধ্যে একবারও ফকির ওকে বাংলা শেখাবার কোনও চেষ্টাই করেনি। একটু আশ্চর্যই হয়েছে তাতে পিয়া। এইরকম ক্ষেত্রে সাধারণত ও দেখেছে লোকে আশেপাশের এটা-সেটার দিকে দেখিয়ে তাদের ভাষায় সেগুলির নাম বলে বলে দিতে থাকে, চেষ্টা করে যাতে ভিনদেশি মানুষটা কিছুটা অন্তত বুঝতে পারে তারা কী বলতে চাইছে। কিন্তু ফকির দেখা গেল ব্যতিক্রম। পিয়া যে ওই চেক কাটা কাপড়টার বাংলা নামটা জানতে চাইতে পারে সেটা তাই ওর মাথাতেই এল না।

    কিন্তু পিয়াও হাল ছাড়ার পাত্রী নয়। নানারকম ইশারা অঙ্গভঙ্গি করেই যেতে লাগল যতক্ষণ না ফকির বুঝতে পারে ও কী বলতে চাইছে। বেশ খানিকক্ষণের চেষ্টার পর অবশেষে সফল হল পিয়া। “গামছা”, ফকির সংক্ষেপে বলল। আরে, তাই তো! গামছা, গামছা–শব্দটা তো পিয়া জানে! কিছুতেই মনে পড়ছিল না এতক্ষণ।

    আচ্ছা, কেমন করে একেকটা শব্দ এভাবে হারিয়ে যায়? স্মৃতির মধ্যে লুকিয়ে থাকে–ভাঙা আলমারির এক কোনায় পড়ে থাকা পুরনো খেলনার মতো? তারপর কোনওদিন কেউ জঞ্জাল সাফ করতে গিয়ে হঠাৎ সেটা ফিরে পায়, বের করে আনে মাকড়শার জাল আর ধুলোর মধ্যে থেকে।

    ছোটবেলার কথা মনে পড়ে পিয়ার। বাংলা ভাষা সে সময় যেন ক্রোধের বন্যার মতো আছড়ে আছড়ে পড়ত ওর দরজায়। ঝড়ের মতো, ঢেউয়ের মতো প্রবল সেই তোড়ের থেকে বাঁচার জন্য গুঁড়ি মেরে ও গিয়ে ঢুকত কাপড়ের আলমারির পেছনে, দু’কান চেপে ধরে দূরে ঠেলে রাখতে চাইত শব্দগুলোকে। কিন্তু আলমারির পলকা দরজা বাবা-মার গলার আওয়াজ আটকাতে পারত না। বাংলা ছিল পিয়ার মা আর বাবার ঝগড়া করার ভাষা। সে ঝগড়ার শব্দ দরজার তলা দিয়ে ফাঁকফোকর গলে পৌঁছে যেত পিয়ার কাছে, মুহূর্তে মুহূর্তে বাড়তে থাকত বন্যার জলের মতো, একেক সময় মনে হত শব্দের সেই জলোচ্ছ্বাস যেন ডুবিয়ে মারতে চাইছে ওকে। যেখানেই লুকোক, কী করে যেন সেই ঝগড়ার আওয়াজ ঠিক খুঁজে খুঁজে বের করত পিয়াকে। সে সময় বাবা আর মা তাদের সমস্ত জমা রাগ উগরে দিত বাংলা ভাষায়। সেই থেকেই ভাষাটার সঙ্গে কোথায় যেন একটা বিষণ্ণতার সুর লেগে রয়েছে। আলমারির কোনায় গুঁড়ি মেরে শুয়ে থাকতে থাকতে সে সময় পিয়া ওই শব্দগুলোকে মাথা থেকে ধুয়ে মুছে সাফ করে ফেলতে চাইত; এমন সব শব্দের কথা ভাবত যেগুলি হবে ইস্পাতের মতো ভারী, ডাক্তারের দস্তানার মতো পরিষ্কার, ঝকঝকে, জীবাণুমুক্ত। সেই সব শব্দের স্বপ্ন দেখত অভিধানে যাদের ঠিকানা মেলে, যাদের সঙ্গে কোনও অসুখের অনুষঙ্গ জড়িয়ে নেই।

    পিয়ার সেই ছোটবেলার শোয়ার ঘরের একটা জানালা দিয়ে এক চিলতে সমুদ্র নজরে আসত। ওদের অ্যাপার্টমেন্টটা ছিল ছোট্ট দুটো বেডরুম, একটা লিভিংরুম আর একটা রান্নাঘর। সেই অ্যাপার্টমেন্টের একটা বেডরুমের জানালা দিয়ে এরকম সুন্দর দৃশ্য দেখতে পাওয়া রীতিমতো ভাগ্যের ব্যাপার ছিল।

    সেই সবচেয়ে ভাল ঘরটাই ছিল পিয়ার নিজের ঘর। দু’বছরের পিয়াকে ঘিরেই তখন ওর মা-বাবার সাজানো সংসার। ওর কাছে তখন সেই বাড়িটা ছিল একটা মন্দিরের মতো, আর ওর নিজের ঘরটা তার গর্ভগৃহ। মা আর বাবা থাকত অন্য ঘরটাতে। সেটা এত ছোট যে খাটের পায়ের দিকটা বেয়ে ওদের বিছানায় উঠতে হত। সেই ছোট্ট বদ্ধ ঘরটাই ছিল ওদের দু’জনের সমস্ত রাগ-অভিমান প্রকাশের একমাত্র জায়গা। তার মধ্যেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাত ওরা, এটা-সেটা নিয়ে খিটিমিটি করত, আর মাঝে মধ্যে চিৎকার করে ঝগড়া করত।

    বড় ঘরটাকে প্রায় বছর পাঁচেক নিজের দখলে রেখেছিল পিয়া। তারপর হঠাৎ একদিন মা এসে ওকে সেখান থেকে উৎখাত করল। বাবার সঙ্গে এক ঘরে আর থাকতে পারছিল না মা। দরজা বন্ধ করে তাই বাকি পরিবারের থেকে নিজেকে আলাদা রেখে শান্তিতে থাকতে চাইছিল। কিছুদিন পরেই ধরা পড়ল মায়ের ক্যান্সার হয়েছে। সার্ভাইকাল ক্যান্সার। কিন্তু মাঝের বেশ খানিকটা সময় মা ওকে বিছানায় বসতে দিত মনে আছে। একমাত্র পিয়াই তখন যেতে পারত মা-র কাছে, দেখা করতে পারত, ছুঁতে পারত মাকে। আর কাউকেই সে সময় সহ্য করতে পারত না মা। বাবাকে তো নয়ই। পিয়ার মনে আছে ও স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলেই মা ওকে আদর করে ডেকে নিত : “আয় পিয়া, আয়, এখানে এসে বোস।” অদ্ভুত ব্যাপার, সেই শব্দগুলো কেমন শুনতে ছিল সেটা পিয়ার আর কিছুতেই মনে পড়ে না (ইংরেজিতে বলত কি মা, নাকি বাংলাতে?) কিন্তু শব্দগুলির মানে, মায়ের গলার আওয়াজ, কথা বলার সুরটা স্পষ্ট মনে আছে এখনও। ও আস্তে আস্তে ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখত মা গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে বিছানার ওপর, পুরনো একটা শাড়ি পরে। সারা সকালটা তখন বাথরুমে কাটাত মা, ধুয়ে ধুয়ে কাল্পনিক ময়লা সব সাফ করতে চেষ্টা করত। অতক্ষণ ভিজে থাকার জন্য তাই কেমন যেন ভাজ ভাজ হয়ে থাকত হাতের চামড়া।

    সেই সময়েই একদিন জানালা দিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে পিয়া জানতে পারল মায়ের ছেলেবেলার অনেকটা সময় কেটেছে এইভাবে জলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে। মায়ের বাবা ছিলেন আসামের এক চা বাগানের ম্যানেজার। সেই বাগানের ধার ঘেঁষে বয়ে যেত এক বিশাল নদ। তার নাম ব্ৰহ্মপুত্র। আমেরিকার খুপরি ফ্ল্যাটবাড়ির ঘরে শুয়ে সমুদ্র দেখতে দেখতে মা পিয়াকে তার ছোটবেলার সুখের সময়ের গল্প বলত। রোদটলা সেই চা বাগানে ওরা কেমন দৌড়োদৌড়ি করে খেলে বেড়াত, মাঝে মাঝে লম্বা নৌকোসফরে যেত ব্রহ্মপুত্রে, সেই সব কথা বলত।

    পরে, পিয়া যখন গ্রাজুয়েট স্কুলে ভর্তি হল, সে সময়ে ওকে অনেকেই জিজ্ঞেস করত মিষ্টি জলের শুশুকের বিষয়ে ওর আগ্রহের পেছনে কোনও পারিবারিক কারণ আছে কি না। প্রসঙ্গটা উঠলেই গা জ্বলে যেত পিয়ার। ও কী পড়াশোনা করবে, কী গবেষণা করবে সেটা মা বাবা ঠিক করে দিয়েছে–সে ইঙ্গিতটার জন্যে রাগ হত ওর। তা ছাড়া ব্যাপারটা আদৌ সে রকম কিছু ছিল না। ছোটবেলা থেকে ইতিহাসের কথা, পরিবারের কথা, ভাষার কথা, নানা রকম দায়িত্বের কথা পিয়া অনেক শুনেছে, কিন্তু ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কথা মা-বাবা কখনও ভাবেইনি।

    যেমন, কলকাতার কথা বহু শুনেছে পিয়া মা-বাবার কাছে, কিন্তু কেউ ওকে কখনও বলেনি যে আমেরিকার এই পিউগেট সাউন্ড সমুদ্রের খুনে তিমির সমগোত্রীয় ওর্কায়েলা ব্রেভিরোষ্ট্রিস সেখানেই প্রথম দেখা গিয়েছিল।

    খানিক বাদেই রাতের খাওয়া-দাওয়ার তোড়জোড় শুরু করল ফকির। তক্তার নীচ থেকে দুটো বেশ বড়সড় জ্যান্ত কাঁকড়া বের করে নিয়ে এল। সেগুলোকে কালচিটে একটা পাত্র দিয়ে ঢেকে রেখে রান্নার অন্যসব সরঞ্জাম আনতে গেল। ছইয়ের ভেতর থেকে নিয়ে এল বড় একটা ছুরি, সঙ্গে আরও কিছু বাসনপত্র, আর একটা চোঙামতন মাটির জিনিস। সেটাকেও প্রথমে একটা বাসনই ভেবেছিল পিয়া। তার পরে দেখল জিনিসটার গায়ে একদিকে গোলমতো একটা গর্ত করা আছে। শেষে যখন তার মধ্যে টুকরো টুকরো জ্বালুনি কাঠ গুঁজে দিল ফকির, তখন পিয়া বুঝল ওটা আসলে একটা স্টোভ, মাটির তৈরি। স্টোভটাকে নৌকোর পেছনের দিকে তুলে নিয়ে গেল ফকির। ছইয়ের থেকে বেশ খানিকটা দূরে রেখে তাতে আগুন দিল, তারপর হাওয়া দিয়ে দিয়ে গনগনে আঁচ তুলল। এবার খানিকটা চাল ভাল করে ধুয়ে জলটা একটা তোবড়ানো টিনের পাত্রের মধ্যে ঢালল। তারপর চালটাতে আবার খানিকটা জল দিয়ে আগুনে বসাল সেটাকে। খানিক পরে হাঁড়িতে যখন টগবগ শব্দ উঠল, তখন কঁকড়াগুলোকে নিয়ে বসল ফকির। টুকরো টুকরো করে কেটে, দাঁড়াগুলো ছুরি দিয়ে ভেঙে ভেঙে নিল। ভাত হয়ে যাওয়ার পর হাঁড়ি নামিয়ে আরেকটা কালচে রঙের অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র বসাল সেখানে। তারপর একটা তোবড়ানো টিনের কৌটো থেকে পাঁচ-সাতটা ছোট ছোট কাগজের পুঁটলি বের করল। পুঁটলিগুলো খুলে খুলে পর পর গোল করে সাজিয়ে রাখল স্টোভটার সামনে। দাউ দাউ আগুনের আভায় পিয়া দেখল বিভিন্ন রঙের সব মশলা রাখা আছে মোড়কগুলির মধ্যে কোনওটা লাল, কোনওটা হলুদ, কোনওটা তামাটে। আগুনে বসানো পাত্রটার মধ্যে খানিকটা তেল ঢালল ফকির, তারপর মশলার মোড়কগুলির ওপরে ওর হাত যেন উড়ে বেড়াতে লাগল পাখির মতো। একের পর এক মশলা ছিটিয়ে দিতে থাকল ফুটন্ত তেলে হলুদ, লঙ্কা, ধনে, জিরে।

    রান্নার গন্ধটা ঝাঁঝালো লাগছিল পিয়ার নাকে। অনেকদিন এরকম খাবার খায়নি ও। ফিল্ডে থাকলে তো এমনিতে প্যাকেট, ক্যান বা বোতলের জিনিস ছাড়া কিছু মুখেই দেয় না। বছর তিনেক আগে ফিলিপাইন্সের মালাম্পায়া সাউন্ডে কাজ করার সময় একবার অসাবধান হয়েছিল ও। ফল হয়েছিল মারাত্মক। প্রায় বেহুশ অবস্থায় হেলিকপ্টারে করে ওকে তুলে নিয়ে যেতে হয়েছিল ম্যানিলায়, চিকিৎসার জন্য। তারপর থেকে সার্ভেতে গেলেই সব সময় নিজের সঙ্গে খাদ্য-পানীয়ের একটা জোগান রাখে পিয়া। যথেষ্ট পরিমাণে মিনারেল ওয়াটার, আর হালকা কিছু খাবার। প্রধানত হাই-প্রোটিন নিউট্রিশন বার। কখনও কখনও গুঁড়ো দুধ বা ওভালটিন জাতীয় পাউডারও রাখে। দুধ খাওয়ার একান্ত দরকার পড়লে সেটা গুলে নেয়। তা না হলে দিনে গোটা দুয়েক প্রোটিন বারেই ওর চলে যায়। তার একটা বাড়তি সুবিধাও আছে। এতে করে অজানা-অচেনা জায়গায় জঘন্য সব বাথরুম ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় কম।

    আগুনের সামনে বসে ফকিরের রান্না করা দেখতে দেখতে বেশ বুঝতে পারছিল পিয়া যে রান্না শেষ হলেই ওকে খেতে বলবে ফকির। কিন্তু এই খাবার তো পিয়া খাবে না। তবু, রান্নার ঝাঝালো গন্ধে গা গুলিয়ে উঠলেও, মশলার মোড়কের ওপর দিয়ে উড়ে বেড়ানো ফকিরের আঙুলগুলির দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিল না পিয়া। মনে হচ্ছিল ও যেন আবার সেই ছোট্ট পিয়া হয়ে গেছে, পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে ডিঙি মেরে দেখছে স্টোভের পাশে রান্নার তাকের ওপর পর পর সাজানো সব স্টেনলৈস স্টিলের বাসন, যেন ও দেখছে ওর মায়ের আঙুল, মশলার রং আর আগুনের আভার মধ্যে ছুটে বেড়াচ্ছে এদিক থেকে ওদিক। ছেলেবেলার এই ছবিটা হারিয়েই গিয়েছিল পিয়ার মন থেকে। আর সে ছবি যে সুন্দরবনের নদীতে এই নৌকোর ওপর এভাবে ফিরে আসবে সে কথা ও কখনও স্বপ্নেও ভাবেনি।

    এই ঝাঝালো গন্ধগুলোই এক সময় কত চেনা ছিল পিয়ার। এগুলিই ছিল ওর বাড়ির গন্ধ। সব সময় এই গন্ধই ও পেত মায়ের গায়ে; স্কুল থেকে ফেরার পথে, ফ্ল্যাটের লিফটে উঠতে উঠতে–সারাক্ষণ এ গন্ধগুলো নাকে লেগে থাকত পিয়ার। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেই দৌড়ে আসত গন্ধগুলো পোষা প্রাণীর মতো। ফ্ল্যাটের বদ্ধ গরম হাওয়ায় যেন পুষ্টি পেত ওরা। পিয়া কল্পনা করত রান্নাঘরটা যেন ওদের খাঁচা, ওখানেই ওরা খায়-দায়, ঘুমোয়। তাই খেলার মাঠে লোকের আলগোছ মন্তব্য বা বন্ধুদের খোঁচা-মারা রসিকতায় পিয়া যখন বুঝতে পারত যে অদৃশ্য পোষা প্রাণীর মতো গন্ধগুলি সব সময় ওর পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ায়, তখন রীতিমতো চমকে যেত ও। এক সময় পিয়ার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। লড়াই শুরু করল ও–এই গন্ধগুলির বিরুদ্ধে, ওর মায়ের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ, শান্ত, নাছোড়বান্দা লড়াই। রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে সেখানেই ও ওদের আটকে রাখতে চেষ্টা করত।

    কিন্তু এখানে এই নৌকোর ওপরে চারপাশের পরিবেশ যেন শান্ত করে রেখেছে ওই পোষা গন্ধের ভূতগুলোকে। ফকিরের আঙুলগুলোর চলনে প্রায় সম্মোহিত হয়ে গেছে। পিয়া। কেবল একেকটা হাওয়ার দমকে যখন লঙ্কার তীব্র ঝাঁঝ সরাসরি ওর নাকে এসে ঝাঁপটা মারছে, তখনই শুধু মুহূর্তের জন্য কেটে যাচ্ছে সে সম্মোহনের ঘোর। হঠাৎ করে তখন যেন জেগে উঠছে ভূতগুলো, তীক্ষ্ণ নখে চিরে দিচ্ছে ওর গলা আর চোখ–যেন ও কোনও শত্রুপক্ষের লোক, হঠাৎ সীমান্ত পেরিয়ে চলে এসেছে এখানে। আস্তে আস্তে নৌকোর সামনের দিকটায় সরে গেল পিয়া। একটু পরে ফকির যখন এগিয়ে এসে ভাতের থালা বাড়িয়ে দিল, তখন জলের বোতল আর প্রোটিন বারগুলোর দিকে দেখিয়ে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে হেসে মাথা নাড়ল ও। হাবেভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, ফকির কিছু যেন মনে না করে।

    কিন্তু ফকির যেন জানতই যে ওই খাবার ও খাবে না। একটু অবাক হল পিয়া। ও ভেবেছিল প্রতিবাদ করবে ফকির, আশ্চর্য হবে, কতটা আহত হয়েছে সেটা বোঝানোর চেষ্টা করবে, কিন্তু সেসব কিছুই করল না ও। একবার মাথা নাড়ল শুধু, আর খানিকক্ষণ চেয়ে রইল পিয়ার দিকে, যেন যাচাই করার দৃষ্টিতে। মনে হল নিজের মনে একটা লিস্টিতে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে ও, বোঝার চেষ্টা করছে কী কী কারণে ওর আনা খাবার ফিরিয়ে দিতে পারে পিয়া। পিয়ার আশঙ্কা হল ফকির হয়তো ভাবছে জাত-পাত বা ওই রকম কোনও রহস্যময় কারণে ও খাচ্ছে না ওই খাবার। তাই নিজের পেটে হাত রেখে খানিকটা শরীর খারাপের অভিনয় করে দেখাল ও কাজ হল তাতে। হেসে ফেলল ফকির। তারপর থালাটা দিয়ে দিল ছেলের হাতে। সেটা হাতে নিয়ে লোভীর মতো সাপটে সুপটে ভাত ক’টা খেয়ে নিল টুটুল।

    খাওয়া-দাওয়া হলে বাসনপত্র আর স্টোভটা নিয়ে ফের তক্তার নীচে রেখে দিল ফকির। কয়েকটা মাদুর আর চাদর বের করে আনল সেখান থেকে। এর মধ্যেই ঝিমোতে শুরু করেছিল টুটুল। ছইয়ের নীচে একটা মাদুর পেতে নিয়ে মাথা অবধি চাদর মুড়ি দিয়ে খানিকক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল ও। তার পাশেই আরেকটা মাদুর পেতে দিয়ে সেটার দিকে ইশারা করল ফকির। রাতের জন্য ওখানেই ও পিয়ার শোয়ার ব্যবস্থা করছে। কিন্তু পিয়ার নিজেরই একটা মাদুর রয়েছে সঙ্গে। নীল রঙের পাতলা ফোম একটা, পিঠব্যাগের ফ্রেমের সঙ্গে বাঁধা। ইলাস্টিকের দড়িটা খুলে নৌকোর ওপর সেটা পেতে নিল পিয়া। মাথার দিকটা রাখল নৌকোর মুখের সরু জায়গাটার কাছাকাছি।

    পিয়াকে ওইখানে রাতের জন্য শোয়ার বন্দোবস্ত করতে দেখে অস্থির হয়ে উঠল ফকির। বারবার মাথা নেড়ে দূরের জঙ্গলের দিকে ইশারা করতে লাগল হাত দিয়ে। ফকিরের ইঙ্গিতটা মনে হল ইচ্ছাকৃতভাবে খানিকটা অস্পষ্ট। পিয়া অনুমান করল কোনও জংলি জানোয়ারের ভয় পাচ্ছে ও। কোনও হিংস্র জন্তুর ভয়। এতক্ষণে একটু একটু বুঝতে পারছিল ও কেন এরকম একটা অদ্ভুত জায়গায় এনে নৌকোটাকে রেখেছে ফকির। মাঝরাতে যাতে বাঘ এসে হানা দিতে না পারে সেই জন্য মনে হয়। স্থলচর মাংসাশী প্রাণীদের নিয়ে পিয়া কখনও বিশেষ চর্চা করেনি বটে, কিন্তু যত খিদেই পাক শিকারের জন্য পাড় থেকে এতটা দূরে কোনও জন্তু সাঁতরে আসতে পারে বলে মনে হল না ওর। আর চলেই যদি আসে, তা হলে ছইয়ের নীচেই শোও কি বাইরেই শোও, খুব একটা তফাত কি হবে? এ নৌকোর যা ছিরি, একটা বাঘ উঠে এলে তার ভারে সবসুদ্ধই উলটে যাবে মনে হয়।

    সব কিছু মিলিয়ে ব্যাপারটা এমন অদ্ভুত অবাস্তব ঠেকল, যে হেসে ফেলল পিয়া। ফকিরকেও মজার ভাগ দেওয়ার জন্য ও হাতের আঙুলগুলো বাঁকিয়ে বাঘের মতো হিংস্র মুখভঙ্গি করে এগিয়ে গেল ওর দিকে। কিন্তু ফকির দু হাত দিয়ে ওর কবজি চেপে ধরল; আর প্রচণ্ড মাথা নাড়াতে লাগল। মনে হল কোনওভাবে ওই প্রসঙ্গটা তুলতেই ও বারণ করছে। তখনকার মতো ব্যাপারটাকে আর না ঘাঁটানোই স্থির করল পিয়া। হাত দিয়ে নিজের মাদুরটাকে টানটান করে নিয়ে শুয়ে পড়ল তার ওপর। মনে হল এটাই ফকিরকে বোঝানোর সবচেয়ে সহজ উপায় যে, কোনও জলচর শ্বাপদের ভয়ে ওই ছইয়ের নীচে গাদাগাদি করে রাত কাটানো ওর পক্ষে সম্ভব নয়। ও আর প্রতিবাদ করল না দেখে স্বস্তি পেল পিয়া। ছইয়ের ভেতর থেকে একটা শাড়ি নিয়ে সেটাকে ভাজ করে বালিশ বানিয়ে এনে দিল ফকির। সঙ্গে একটা তেলচিটে ময়লা চাদর।

    তারপর নৌকোর মাঝের দিকে গিয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে একটা বিড়ি ধরাল ফকির। একটু পরেই আধো তন্দ্রায় পিয়ার কানে একটা গানের সুর ভেসে এল। ফকির গুনগুন করছে। কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে পড়ল পিয়া। বলল, “সিং”। একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ওর দিকে খানিক চেয়ে রইল ফকির। এবার পিয়া দু হাত ওপরের দিকে তুলে ইশারা করে বলল, “লাউডার। সিং লাউডার”।

    বুঝল ফকির। মাথাটা পেছনে হেলিয়ে গাইল দু’ কলি। সুরটা শুনে অবাক হয়ে গেল পিয়া। এক্কেবারে অন্যরকম। এর আগে যেসব ভারতীয় গান ও শুনেছে–ওর বাবার প্রিয় হিন্দি ফিল্মের গান, আর মায়ের গলায় দুয়েকটা বাংলা গান–সেগুলোর সঙ্গে এই সুরটার কোনও মিলই নেই। ফকিরের গলা যে খুব ভাল তা বলা চলে না, একটু কর্কশই; খাদে বা চড়ায় সুর ধরে রাখতে পারছিল না ঠিক, কিন্তু সুরটার মধ্যে কেমন যেন একটা বিষণ্ণতার ছোঁয়া লেগে রয়েছে। পিয়াকে ভেতরে ভেতরে নাড়া দিয়ে গেল সেটা।

    এতক্ষণ পিয়ার মনে হচ্ছিল ফকিরের ওই পেশল চেহারার মধ্যে একটা সরল নিষ্পাপ ভাব রয়েছে, যেটা মনকে টানে। কিন্তু এখন এই গান শোনার পর পিয়ার মনে হল ও নিজেই কি একটু বেশি সরল তা হলে? ওর জানতে ইচ্ছে করছিল গানটা কী নিয়ে, গানের কথাগুলোর কী মানে; কিন্তু এই সুরের বেদনা আজ এখানে মনের কোন তার কীভাবে ছুঁয়ে গেল, এক নদী শব্দ খরচ করেও যে তা ঠিকমতো বোঝানো যাবে না সেটাও বেশ বুঝতে পারছিল পিয়া।

  • বনবিবির মহিমা

    বনবিবির মহিমা

    বনবিবির মহিমা

    কুসুমের বাড়ি ছিল কাছেই একটা দ্বীপে। সাতজেলিয়ায়। ওর বাবা মারা গিয়েছিল জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে। ঘটনাটা ঘটেছিল বনবিভাগের নিষিদ্ধ এলাকায়, আর ওর বাবার কোনও পারমিটও ছিল না। তাই কোনও ক্ষতিপূরণ পায়নি কুসুমের মা। সংসার প্রায় চলে না, রোজগারেরও কোনও সংস্থান নেই, এইরকম সময় একদিন গ্রামের জোতদার দিলীপ চৌধুরি এসে বলল তার সঙ্গে শহরে গেলে একটা কাজ জোগাড় হতে পারে। হাতে যেন চাঁদ পেল কুসুমের মা।

    গাঁয়ের আরও অনেক মেয়েকেই কাজ জুটিয়ে দিয়েছে দিলীপ, তাই এ প্রস্তাবে আপত্তির আর কী থাকতে পারে? কুসুমকে আত্মীয়দের কাছে রেখে একদিন সকালে দিলীপের সঙ্গে চলে গেল সে, কলকাতার ট্রেন ধরতে। দিলীপ ফিরে এল একা। কুসুমকে বলল তার মা খুব ভাল একটা বাড়িতে কাজ পেয়েছে, কদিন পরে ওকেও নিয়ে যাবে। খুব বেশিদিন লাগল না; মাসখানেক পরেই দিলীপ এসে বলল মা বলে পাঠিয়েছে ওকে কলকাতায় তার কাছে নিয়ে যেতে।

    এই সময় হরেন নস্কর জানতে পারল ব্যাপারটা। হরেন কুসুমের বাবার সঙ্গে কাজ করত। ওর মা-র সঙ্গেও শ্বশুরবাড়ির সূত্রে তার দূর সম্পর্কের একটা আত্মীয়তা ছিল। সে এসে বলল ভুলেও যেন কুসুম দিলীপের ফাঁদে পা না দেয়। ও লোক ভাল নয়। মেয়ে পাচার করাই হল ওর ব্যবসা। কুসুমের মাকে কী কাজ জুটিয়ে দিয়েছে সে খবর কি ও রাখে? নিশ্চয়ই সোনাগাছির কোনও বেশ্যাবাড়িতে পচছে বেচারি। আর কুসুমের দিকে তো আরও বেশি করে নজর যাবেই দিলীপের। কমবয়সি মেয়েদের বেচতে পারলে অনেক বেশি পয়সা আসে। দিলীপের হাতে পড়লে ও হয় কলকাতার কোনও বেশ্যাপট্টিতে, নয়তো বোম্বের কোনও খারাপ জায়গায় গিয়ে ঠেকবে। হরেনই তারপর কুসুমকে লুসিবাড়িতে নিয়ে এসে মহিলা সমিতির হাতে তুলে দিল। ঠিক হল স্থায়ী একটা কিছু ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত সমিতির সদস্যারাই ওর দেখাশোনা করবে।

    মাসকয়েক যেতে না যেতেই লুসিবাড়ি দ্বীপটাকে নিজের হাতের তেলের মতো চিনে গেল কুসুম। আর কানাই আসার পর ও-ই হল তার মুরুব্বি। কুসুমই কানাইকে গাঁয়ের সব খবরাখবর দিত–কে কীরকম লোক, কে কার ছেলে বা মেয়ে, গায়ে কোথায় মোরগ লড়াই হচ্ছে, কোথায় কী পুজো হচ্ছে, কার বাচ্চা হল, কে মারা গেল–সব। আর কানাই ওকে বলত শহরের গল্প, ওর স্কুলের কথা, বন্ধুদের কথা। কুসুমের গল্পগুলোর তুলনায় নিজের গল্পগুলো সাদামাটা, ম্যাড়ম্যাড়ে মনে হত কানাইয়ের। কুসুম কিন্তু খুব মন দিয়ে শুনত। মাঝে মাঝে এটা ওটা প্রশ্ন করত।

    “আচ্ছা, আমি যদি তোর সঙ্গে শহরে চলে যাই কেমন হয়?” একদিন জিজ্ঞেস করল : কুসুম। “তুই কোথায় থাকিস দেখব বেশ।”

    কানাই চুপ করে গেল। এরকম একটা প্রশ্ন যে কুসুম করতে পারে সেটা ভাবতেই পারেনি ও। মেয়েটা কিচ্ছু বোঝে না নাকি? ওকে কলকাতার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তুললে কী হবে কল্পনা করতেই সিঁটিয়ে গেল কানাই। মনে মনে পরিষ্কার শুনতে পেল মায়ের গলার ঝাঝালো সুর। আর পাড়ার লোকেরাই বা কী বলবে? “নতুন ঝি নিয়ে এলেন নাকি দিদি? বাসন মাজা কাপড় কাঁচার লোক তো ছিলই একটা আপনাদের। আরও একটা?”

    “কলকাতায় তোর ভাল লাগবে না,” খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল কানাই। “ওখানে গিয়ে মানাতে পারবি না তুই।”

    কুসুমের কাছ থেকেই শুনেছিল কানাই একটা যাত্রার দল আসছে লুসিবাড়িতে, বনবিবির পালা করবে। বনবিবির গল্পের কথা দুয়েকবার শুনেছে কানাই এখানে এসে, কিন্তু পুরো গল্পটা ঠিকমতো ওর জানা ছিল না। কুসুমকে জিজ্ঞেস করতে ও প্রায় আঁতকে উঠল, “সে কী রে? তুই বনবিবির গল্প জানিস না?”

    “না।”

    “ভয় পেলে তালে কাকে ডাকিস তুই?”

    প্রশ্নের মানেটা ঠিক ধরতে না পেরে অন্য কথা পেড়েছিল কানাই। কিন্তু কথাটা ঘুরতেই থাকল ও মাথার মধ্যে। একটু বাদে নির্মলকে গিয়ে ও ধরল বনবিবির গল্প বলার জন্য।

    নির্মল পাত্তাই দিল না। “ছাড়ো তো। এসব এখানকার লোকেদের বানানো উদ্ভট গল্প। এগুলি নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। যত্তসব গাঁজাখুরি কল্পনা।”

    “গল্পটা বলোই না আমাকে।”

    “হরেনকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো,” বলেছিল নির্মল। “দেখবে ও বলবে, বনবিবি এই পুরো জঙ্গলটার দেবী। বাঘ, কুমির, আরও সব জন্তু জানোয়ার সবাই এখানে বনবিবির কথা শুনে চলে, এই সব। এখানকার অনেক বাড়ির সামনে ছোট ছোট মন্দিরের মতো দেখনি? ওগুলির মধ্যে বনবিবির মূর্তি আছে। তোমার মনে হতে পারে যে এরকম একটা জায়গায় বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে মাথা ঘামানোটাই গ্রামের লোকের পক্ষে বেশি স্বাভাবিক, কিন্তু এরা সব এই দেবী, পির আর যত সব আজগুবি অলৌকিক জিনিসেই বিশ্বাস করে।”

    “কিন্তু গল্পটা আমাকে বলো না,” কানাই নাছোড়বান্দা। “কী নিয়ে গল্পটা? কী ঘটনার কথা আছে ওটাতে?”

    “যেমন থাকে সব এরকম গল্পে,” অধৈর্য হয়ে হাত ওলটাল নির্মল। “দেবদেবী, পির ফকির, জন্তু জানোয়ার, দত্যি দানো–এই সব। অনেক লম্বা গল্প। তার চেয়ে এক কাজ করো। যাত্রাটা দেখে নাও, তাহলেই জেনে যাবে গল্পটা।”

    যাত্রার মঞ্চ বানানো হয়েছিল লুসিবাড়ির বড়ো ময়দানে, হ্যামিলটনের কুঠি আর স্কুলের মাঝামাঝি জায়গায়। সাদামাটা একটা মঞ্চ, একদিনও লাগেনি তৈরি করতে। চারিদিকে বাঁশের ভারা মতে বেঁধে খানিকটা ওপরে কয়েকটা তক্তা পেতে দেওয়া হল। ওইটাই মঞ্চের মেঝে। পালা চলার সময় পেছনদিকের একটা বাঁশ থেকে একটা রংচং করা কাপড় ঝুলিয়ে দেওয়া হল। দর্শকদের জন্য সেইটাই হল দৃশ্যপট, আর অভিনেতাদের জন্য পর্দা। তার আড়ালে তারা বিড়ি টানে, খাওয়া-দাওয়া করে, পোশাক বদল করে। আলোকসম্পাতের জন্য ঝুলিয়ে দেওয়া হল কয়েকটা হ্যাঁজাক বাতি, আর সংগীতের জন্য একটা ব্যাটারিতে চালানো ক্যাসেট রেকর্ডার আর লাউডস্পিকার।

    লুসিবাড়িতে রাত নামে তাড়াতাড়ি। মোমবাতি কি লম্ফর দাম তো কম নয়; খরচ বাঁচানোর জন্য তাই হিসেব করে আলো জ্বালানো হয়। সূর্যের আলো থাকতে থাকতেই রাতের খাওয়া সেরে নেয় সবাই, আর রাতের অন্ধকার নেমে এলে নিঝুম হয়ে যায় সারা গাঁ। সে নিস্তব্ধতা ভাঙে কদাচিৎ দূর থেকে জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা জানোয়ারের ডাকে। ফলে, রাতে কোনও অনুষ্ঠানের আয়োজন হলে লুসিবাড়িতে সেটা একটা বিশেষ ঘটনা। কয়েকদিন আগে থেকেই ছেলেবুড়ো সকলে মেতে ওঠে। আসল অনুষ্ঠানের চেয়ে প্রস্তুতিপর্বের উৎসাহটাও কম নয়। যাত্রা যখন শুরু হল, রাতের পর রাত জেগে বনবিবির পালা দেখল গাঁয়ের সমস্ত লোক। কুসুম আর কানাইও।

    যাত্রার শুরুতেই একটা চমক অপেক্ষা করে ছিল কানাইয়ের জন্য। এরকম দেবদেবীর কাহিনি আগে যা শুনেছে ও, সেগুলো শুরু হয় স্বর্গে কিংবা গঙ্গার তীরে। কিন্তু এই বাঘের দেবীর গল্পের আরম্ভটা এক্কেবারে অন্যরকম। প্রথম দৃশ্য শুরু হল আরবদেশের এক শহরে। পেছনের সিনে মসজিদ আর মিনারের ছবি আঁকা।

    দৃশ্যটা মদিনার। মুসলমানদের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। সেই শহরে বাস করত এক ধর্মপ্রাণ মুসলমান, ইব্রাহিম। সন্তানহীন ইব্রাহিম সুফি ফকিরদের মতো পবিত্র জীবন যাপন করত। শেষে দেবদূত গ্যাব্রিয়েলের কৃপায় দুটি যমজ সন্তান হল তার, বনবিবি আর শা জঙ্গলি। এই দুই ছেলেমেয়ে যখন বড় হল, তখন একদিন দেবদূত এসে বলল তাদের ভাইবোনকে আল্লা একটা কাজের ভার দিয়েছেন। এই আরবদেশ থেকে তাদের যেতে হবে আঠারো ভাটির দেশে। গিয়ে সেই জায়গাটাকে মনুষ্যবাসের উপযুক্ত করে তুলতে হবে। এই দায়িত্ব পেয়ে তো বনবিবি আর শা জঙ্গলি রওনা হল বাংলাদেশের বাদাবন অঞ্চলের উদ্দেশ্যে। পরনে তাদের সাধারণ সুফি ভিক্ষুকের পোশাক।

    আঠারো ভাটির দেশে তখন দানবরাজ দক্ষিণরায়ের রাজত্ব। ভয়ংকর তার ক্ষমতা। সেখানকার সমস্ত প্রাণী, ভূত, পিশাচ–সকলে তার কথায় ওঠে বসে। আর মানুষ হল দক্ষিণরায়ের দু’ চক্ষের বিষ। কিন্তু মানুষের মাংসের প্রতি তার অসীম লোভ।

    একদিন দক্ষিণরায় শুনল জঙ্গলের মধ্যে কে যেন আজান দিচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারল বনবিবি আর শা জঙ্গলি এসেছে তার রাজত্বে। ভয়ানক রেগে গিয়ে তো দক্ষিণরায় তার সমস্ত সৈন্য সামন্ত জড়ো করল। এই দু’জনকে তাড়াতেই হবে এলাকা থেকে। ভীষণ এক যুদ্ধ হল তারপর। যুদ্ধে গোহারা হেরে গেল দক্ষিণরায়। কিন্তু বনবিবির দয়ার শরীর। যুদ্ধে জিতেও দানবরাজকে মারলেন না তিনি। বরং বললেন, এই ভাটির দেশের অর্ধেকটার ওপর রাজত্ব করতে পারে দক্ষিণরায়। সেখানে জঙ্গলের মধ্যে সে তার ভূত পিশাচদের নিয়ে থাকতে পারে। বাকি অর্ধেকটা নিয়ে নিলেন বনবিবি। সেখানে বন কেটে বসত হল। শান্তি এল আঠারো ভাটির দেশে। দেশটাকে জঙ্গল আর বসত, এই দু’ভাগে ভাগ করে বনবিবি সেখানে শৃঙ্খলা নিয়ে এলেন। সুখেই কাটছিল সময়, কিন্তু মানুষের লোভই একদিন শান্তি ভাঙল আবার।

    ধনা নামে একটা লোক ভাটির দেশের একপ্রান্তে বাস করত। সে একদিন ঠিক করল জঙ্গলে যাবে, ভাগ্যান্বেষণে। কিন্তু সপ্তডিঙা সাজিয়ে ধনা যখন রওনা হতে যাবে তখন দেখা গেল একজন মাল্লা কম পড়ছে। হাতের কাছেই ছিল দুখে বলে একটা ছেলে। নামেও যেমন দুখে, সারাটা জীবন সেরকম দুঃখেই কেটেছে তার। ছোট্টবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছিল দুখে। এখন সে থাকে তার অসুস্থ বুড়ি মা-র সঙ্গে। কোনওরকমে কায়ক্লেশে তাদের সংসার চলে। দুখেকে যেতে দেওয়ার একটুও ইচ্ছে ছিল না তার মায়ের। কিন্তু অবশেষে বিদায় নেওয়ার সময় এল। মা তখন তাকে একটা পরামর্শ দিল। বলল যখনই বিপদে পড়বে, দুখে যেন বনবিবিকে স্মরণ করে। বনবিবি আর্তের সহায়, গরিবের মুশকিল আসান। তিনি নিশ্চয়ই তাকে রক্ষা করবেন।

    ধনার নৌবহর তো যাত্রা শুরু করল। ভাটির দেশের এ নদী সে নদী এ খাল সে খাল দিয়ে অবশেষে গিয়ে পৌঁছল কেঁদোখালির চরে। এখন, কেঁদোখালির চর ছিল দক্ষিণরায়ের রাজত্বের মধ্যে। কিন্তু মাল্লারা সেটা জানত না। তারা তো গিয়ে নৌকো ভেড়াল সেখানে। দক্ষিণরায় কিন্তু আগে থেকেই খোঁজ পেয়ে গিয়েছিল। ধনা আর তার দলবলের জন্য কিছু চমকেরও ব্যবস্থা করে রেখেছিল সে। চরে নেমেই তারা দেখল গাছে গাছে বড় বড় সব লোভনীয় মধু-টসটসে মৌচাক। কিন্তু যেই সেগুলির দিকে এগিয়ে যায়, মৌচাক আর দেখা যায় না। সেটা তখন একটু দূরের কোনও গাছে ঝুলছে। সারাদিনে একটা মৌচাকও জোগাড় করতে পারল না ধনা। নাকানিচোবানি খেয়ে গেল একেবারে। তারপর সেই রাতে স্বপ্নের মধ্যে ধনাকে দেখা দিয়ে দক্ষিণরায় দু’পক্ষের স্বার্থরক্ষার জন্য একটা প্রস্তাব দিল। ধনা তার নৌকোয় যে ছেলেটাকে এনেছে সেই ছেলেটাকে চাইল দক্ষিণরায়। বহুদিন হল মানুষের মাংস জোটেনি। দুখেকে খাওয়ার জন্য তাই নোলা সক সক করছে তার। তার বদলে সে ধনাকে নৌকো বোঝাই করে ধনসম্পদ দেবে।

    লোভে পড়ে এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল ধনা। যেই না রাজি হওয়া, সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলের সব ভূত দানো পিশাচ, এমনকী মৌমাছিরা পর্যন্ত মধু আর মোম’ নিয়ে এসে ধনার নৌকো ভরে দিল। সবগুলো নৌকো টইটম্বুর হয়ে গেল মোমে আর মধুতে। এবার ধনার কথা রাখার পালা। দুখেকে ডেকে সে বলল জঙ্গল থেকে কিছু কাঠ নিয়ে আসতে। কী আর করে দুখে, নৌকো থেকে নেমে জঙ্গলে ঢুকল। খানিক পরে কাঠ নিয়ে যখন ফিরে এল তখন দেখল যা ভয় পেয়েছিল তাই হয়েছে। একটা নৌকোরও কোনও চিহ্ন নেই। সে একা দাঁড়িয়ে আছে চরে–সামনে তার বিশাল নদী আর পেছনে জঙ্গল। এই সময়ে হঠাৎ দূরে একটা হলুদ কালো ঝলক চোখে পড়ল দুখের। দেখে এক বিরাট বাঘ। নদীর অন্য পারে ঝোঁপের আড়ালে আড়ালে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। বাঘটা আর কেউ নয়, দক্ষিণরায় স্বয়ং। পৃথিবী ঝাঁপিয়ে প্রচণ্ড এক গর্জন ছেড়ে সেটা লাফ দিল দুখের দিকে। বাঘের ওই বিশাল ভয়ানক

    চেহারা দেখে তো তার প্রাণপাখি উড়ে যাওয়ার দশা। ভয়ে জ্ঞান হারাতে হারাতে মায়ের উপদেশের কথা মনে পড়ল দুখের। মনপ্রাণ দিয়ে সে ডাকতে লাগল, “ও বনবিবি, ও দয়াবতী, আমাকে রক্ষা করো, আমার সহায় হও।”

    তখন বহুদূরে ছিলেন বনবিবি। কিন্তু ভক্তের ডাক শুনে এক লহমায় নদী পেরিয়ে পৌঁছে গেলেন তার কাছে। দুখেকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে তার শুশ্রূষা করতে লাগলেন তিনি। আর তার ভাই শা জঙ্গলি প্রচণ্ড প্রহার করে তাড়িয়ে দিলেন দক্ষিণরায়কে। দুখেকে তার বাড়ি নিয়ে গিয়ে নিজের হাতে সেবা শুশ্রূষা করে তাকে সুস্থ করে তুললেন বনবিবি। তারপর দুখের যখন ঘরে ফেরার সময় হল, প্রচুর মধু আর মোম তার সাথে দিয়ে তাকে মায়ের কাছে পৌঁছে দিলেন তিনি। দুনিয়াকে বনবিবি বুঝিয়ে দিলেন, এই হল জঙ্গলের আইন। লোভী বড়লোকেরা শাস্তি পাবে, আর সৎ গরিব মানুষেরা পাবে তার আশীর্বাদ।

    কানাই ভেবেছিল বুঝি ওর একঘেয়ে লাগবে এই গেঁয়ো যাত্রা। কলকাতায় তো ওরা নাটক দেখতে যায় অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে আর সিনেমা দেখতে যায় গ্লোবে। কিন্তু যাত্রা দেখতে দেখতে কাহিনিটার মধ্যে ও ডুবে গেল। দানোটা যখন দুখের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছে, সত্যিই প্রচণ্ড ভয়ে তখন কাটা হয়ে গিয়েছিল কানাই। যদিও বাঘের চেহারাটা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য হয়নি, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল সেটা ডোরাকাটা কাপড় জড়ানো আর মুখোশ পরা একটা লোক। আবার বনবিবি যখন দুখের পাশে এসে দাঁড়ালেন, তখনও কানাই কেঁদে ফেলেছিল আনন্দ আর কৃতজ্ঞতায়। সত্যিকারের কান্না। আসরের সক্কলেরই তখন চোখে জল। অবশ্য মঞ্চে বনবিবির আবির্ভাবটা যে খুব অসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে হয়েছিল তা নয়। এমনকী দুখে যখন অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে আর বাঘ তাকে খেয়ে নিতে যাচ্ছে, তখনও বনবিবি মঞ্চের একপাশে ঝুঁকে পড়ে মুখ থেকে পানের ছিবড়ে ফেলতে ব্যস্ত। শেষে দর্শকরাই তাড়া দিয়ে দিয়ে পাঠাল তাকে দুখের কাছে। কিন্তু এসব কিছুই কাহিনির সাবলীল গতিকে রোধ করতে পারেনি। অভিনয় শেষ হওয়ার আগেই কানাই বুঝতে পেরেছিল এ পালা তাকে আবার দেখতে হবে।

    যাত্রা যেদিন শেষ হল লুসিবাড়িতে, সেদিন সে এক দেখার মতো দৃশ্য। আশেপাশের সব দ্বীপ থেকে লোক একেবারে ভেঙে পড়েছিল। প্রচণ্ড ঠেলাঠেলি। ময়দানে তিল ধারণের জায়গা নেই। গুঁতোগুঁতির মধ্যে কানাই আর ভেতরের দিকটায় ঢুকতে পারেনি। একধারে কোনার দিকে বসে দেখছিল। এতবার দেখার পর প্রথম দিকটায় একটু একঘেয়েমি এসে গিয়েছিল কানাইয়ের; বসে বসেই ও ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভেঙে দেখল ও কুসুমের পাশে বসে আছে। “কী হচ্ছে রে?” ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল কানাই। “কোন জায়গাটা হচ্ছে এখন?” কোনও সাড়া নেই। যাত্রায় একেবারে ডুবে গেছে কুসুম, কানাই যে পাশে বসে আছে সে তার খেয়ালই নেই। কী এত মুগ্ধ হয়ে দেখছে কুসুম বোঝার জন্য মঞ্চের দিকে তাকিয়ে কানাই দেখে যা ভেবেছিল তার চেয়ে একটু বেশিই ঘুমিয়েছে ও। কাহিনি অনেকদূর গড়িয়ে গেছে। ধনা আর তার দলবল কেঁদোখালির চরে পৌঁছে গেছে। এর পরেই দক্ষিণরায়ের সঙ্গে সেই চুক্তিটা হবে।

    “কুসুম?” ফিসফিস করে আবার ডাকল কানাই। মুহূর্তের জন্য মুখ ফেরাল কুসুম।

    হ্যাজাকের অস্পষ্ট আলোয় কানাই দেখল নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে আছে ও, আর দু’গাল বেয়ে গড়াচ্ছে চোখের জল। এই যাত্রা দেখতে দেখতে কান্না আসতেই পারে, তাই খুব একটা আশ্চর্য হল না কানাই। কিন্তু তারপর কুসুম যখন হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করল, তখন ওর মনে হল শুধু যাত্রা দেখে তো এরকম ভাবে কাঁদবে না। নিশ্চয়ই অন্য কোনও কারণ আছে। মুহূর্তের আবেগে, কুসুমকে সান্ত্বনা দিতে একটা হাত বাড়িয়ে দিল কানাই, ওর হাত ধরার জন্য। কিন্তু যেখানে থাকবে ভেবেছিল কুসুমের হাত সেখানে ছিল না। বদলে ওর ফ্রকের ভঁজে জড়িয়ে গেল কানাইয়ের আঙুল। ফ্রকের জট থেকে হাত ছাড়ানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল কানাই, কিন্তু বাইরে বেরিয়ে আসার বদলে কুসুমের শরীরের একটা নরম আর অপ্রত্যাশিত রকম গরম জায়গায় ঠেকে গেল ওর আঙুল। সে স্পর্শের অভিঘাতে চমকে উঠল ওরা দুজনেই, ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো।

    চাপা একটা চিৎকার করে উঠে দাঁড়াল কুসুম। তারপর কোনওরকমে হোঁচট খেতে খেতে বেরিয়ে গেল অন্ধকারের মধ্যে। কানাইয়ের ইচ্ছে করছিল ছুটে যায় ওর পেছন পেছন, কিন্তু স্বাভাবিক প্রবৃত্তির বশেই মনে হল ঠিক হবে না সেটা করা। লোকে দেখলে খারাপ ভাবতে পারে। মিনিট দুয়েক তাই অপেক্ষা করল কানাই। তারপর ধীরে ধীরে উঠে অন্য আরেক দিক দিয়ে বেরিয়ে এল ভিড় ছেড়ে। অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে অনেকটা ঘুরে এসে কানাই ধরল কুসুমকে। ও তখন হ্যামিলটনের কুঠির দিকে যাচ্ছে। “কুসুম–একটু দাঁড়া। দাঁড়া একটু।”

    দূরের হ্যাঁজাক থেকে যেটুকু আলো চুঁইয়ে আসছিল তাতে দেখা যাচ্ছিল কোনও রকমে হাতড়াতে হাতড়াতে হাঁটছে কুসুম, মাঝে মাঝে ঘাড় ফিরিয়ে নাক দিয়ে গড়িয়ে পড়া জল মুছে নিচ্ছে জামার কাঁধে। “কুসুম,” চাপা গলায় আবার ডাকল কানাই। “দাঁড়া একটু বলছি।” কাছে এসে ওর কনুই ধরে ফেলল কানাই। “ভুল করে হয়ে গেছে, আমি ইচ্ছে করে করিনি।”

    থেমে গেল কুসুম। কানাইও দাঁড়িয়ে গেল শক্ত হয়ে। ভাবল এক্ষুনি কুসুম খিঁচিয়ে উঠবে, গালাগাল আর বকুনির তোড়ে ধুইয়ে দেবে ওকে। কিন্তু কিছুই বলল না কুসুম। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কানাইয়ের মনে হল কুসুমের মন খারাপের পেছনে ওর ভূমিকা নিতান্তই সামান্য। মনে হল শুধু একটা ছেলের ভুল করে ছুঁয়ে দেওয়া নয়, ওই কান্নার উৎস রয়েছে আরও গভীরে কোথাও।

    কুঠির গেটের প্রায় সামনে চলে এসেছে ওরা এখন। এক লাফে গেটটা ডিঙিয়ে গেল কানাই। কুসুমকে ডাকল তারপর, “আয় না, চলে আয়।” এক মুহূর্ত দোনামনা করে কুসুমও ঢুকল ভেতরে। ওর হাত ধরে পুকুরপাড়ের শ্যাওলা ধরা ইটের ওপর দিয়ে দৌড়ে কুঠিতে ওঠার সিঁড়ির সামনে এসে পৌঁছল কানাই। কুসুমকে নিয়ে তুলল ঢাকা বারান্দাটায়। তারপর পুরনো কাঠের দেওয়ালটায় পিঠ দিয়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল ওরা। ময়দানটা পরিষ্কার চোখে পড়ছে এখান থেকে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে স্টেজের ওপর দুখে শুয়ে আছে, আকুল হয়ে ডাকছে বনবিবিকে।

    কুসুমই কথা বলল প্রথম। “আমিও ডেকেছিলাম। কিন্তু আসেনি।”

    “কে?”

    “বনবিবি। যেদিন বাবা মরে গেল। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, আমার চোখের সামনে একেবারে। আমি কত বার ডাকলাম বনবিবিকে…”

    আর পাঁচটা দিনের মতোই ছিল সেই দিনটা। আর ঘটনাটা ঘটেছিল ভর দুপুরে–সূর্য তখন মাঝ আকাশে। বাড়িতে টাকা ছিল, খাবারও ছিল। কারণ ঠিক তার আগের দিন মাছ ধরা সেরে ফিরেছে কুসুমের বাবা। বেশ ক’দিনের জন্যে বেরিয়েছিল মাছ ধরতে। অনেক মাছ পেয়েওছিল। ক্ষতি বলতে একটাই হয়েছিল সেবার, গামছাটা বাবা হারিয়ে এসেছিল। ভাল করে খেতে চেয়েছিল বাবা। মা বসে রাঁধছিল, ভাত ডাল তরকারি। কিন্তু মাছ রাঁধতে গিয়ে দেখে জ্বালানি কাঠ শেষ হয়ে গেছে। শুনেই তো বাবা খেপে আগুন। কতদিন খাওয়া জোটেনি ঠিক মতো, সেদিন তো ভাল করে খাবেই। কিছুতেই ছাড়বে না। দুমদাম করে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। বলল এক্ষুনি ফিরবে কাঠ নিয়ে।

    ওদের কুঁড়েটা ছিল বাঁধের গায়ে, সরু একটা খাঁড়ির পাড়ে। নৌকো বেয়ে অন্য পারের জঙ্গলটায় যেতে খুব বেশি হলে দশ থেকে পনেরো মিনিট লাগত। রিজার্ভ ফরেস্ট ছিল ওটা, কিন্তু জ্বালানি কাঠের দরকার হলে ওখান থেকেই নিয়ে আসত ওদের গাঁয়ের লোক। কুসুমও বেরোল বাবার পেছন পেছন; বাবা নৌকো নিয়ে ওপারে গেল, আর ও বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। উলটোদিক থেকে প্রচণ্ড হাওয়া দিচ্ছিল সেদিন, তাই এমনিতে যা লাগে তার চেয়ে বেশি সময় লাগছিল বাবার ওপারে পৌঁছতে। তারপর বাবা যখন নৌকোটাকে ঠেলে পাড়ে তুলছে, তখনই কুসুম দেখতে পেল জানোয়ারটাকে–গোটাটা দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু ঝোঁপের ফাঁকে হলুদ কালো ডোরা যেটুকু নজরে আসছিল সেটুকুই বোঝার পক্ষে যথেষ্ট।

    “মানে, তুই দেখতে পেলি–” কিন্তু কানাই বাঘশব্দটা উচ্চারণ করার আগেই কুসুম ওর মুখটা চেপে ধরল হাত দিয়ে। “বলিস না, বলিস না একদম। নাম বললেই এসে হাজির হবে।”

    পাড়ের ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছিল জন্তুটা। ওর এগোনো দেখেই বুঝতে পেরে গিয়েছিল কুসুম যে নদী পেরোনোর সময় ও নৌকোটাকে দেখতে পেয়েছে। কুসুমের প্রথম চিৎকারটাতেই ওর মা আর আশেপাশের পড়শিরা ছুটে বেরিয়ে এসেছিল বাঁধের ওপর। কিন্তু যাকে ডাকছিল চেঁচিয়ে সে-ই শুনতে পেল না। তখন উলটোদিকে বইছিল হাওয়া, তাই কুসুমের গলার আওয়াজ পৌঁছল না বাবার কানে।

    কয়েক মুহূর্তের মধ্যে জনা বিশেক লোক জড়ো হয়ে গেল বাঁধের ওপরে। কুসুমের সঙ্গে ওরাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল জানোয়ারটা এগোচ্ছে বাবার দিকে। গাঁয়ে পুরুষ যারা ছিল সবাই দৌড়ল নৌকো আনতে। মেয়েরা হাতের কাছে থালা ঘটি বাটি যা পেল সব নিয়ে বাজাতে লাগল আর চিৎকার করতে লাগল যত জোরে পারে। কিন্তু কোনও লাভ হল না। হাওয়া তখন ওদের দিকে বইছিল, ওপারে তাই কিছুই শুনতে পেল না বাবা। জানোয়ারটাও ছিল তার শিকারের তুলনায় হাওয়ার উলটোদিকে এপার থেকে দেখা যাচ্ছিল চকচক করছে ওর গাটা। ও জানে হাওয়ায় ওর গায়ের দুর্গন্ধ পাওয়া যায়, তাই সেরকম ভাবেই চলাফেরা করে ও। এই উলটো হাওয়ার মুখে ওপারের অতগুলো লোক কিছুই করতে পারবে না সেটা যেন ও জানত। এত ওর সাহস, শেষটায় তো বেরিয়েই পড়ল ঝোঁপের আড়াল ছেড়ে। শিকার ধরার জন্য দৌড়তে শুরু করল পাড় ধরে; আড়াল-টাড়ালের আর পরোয়াই করল না। সবাই পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল এপার থেকে। আশ্চর্য সেই ভয়ংকর দৃশ্য। এরকম আগে বোধহয় কেউ দেখেওনি কখনও। কারণ ভাটির দেশের এই বড় বেড়ালের চলাফেরা এক্কেবারে ভুতের মতো। তার পায়ের ছাপ দেখা যায়, গর্জন শোনা যায়, গায়ের গন্ধ পাওয়া যায়, কিন্তু তাকে দেখা যায় না সহজে। এতই কম চোখে পড়ে জন্তুটা, যে বলা হয় যারা তাকে দেখে তারা কেউ আর ঘরে ফেরে না। সেদিনের ওই দৃশ্য দেখতে দেখতে তো কয়েক জন মেয়ে অজ্ঞানই হয়ে গেল বাঁধের ওপর।

    কিন্তু কুসুম অজ্ঞান হয়নি। ও হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিল। ফিসফিস করে বলছিল, “ও বনবিবি, দয়াবতী গো, আমার বাবাকে বাঁচিয়ে দাও।” চোখ বুজে ছিল কুসুম, তাই দেখতে পায়নি শেষটা। কিন্তু কান তো খোলা ছিল। হাওয়া ওদের দিকে ছিল বলে প্রতিটা আওয়াজ স্পষ্ট ভেসে আসছিল জলের ওপর দিয়ে। প্রথম কানে এল গর্জনটা, যাতে ভয়ে কাঠ হয়ে গেল বাবা। “বাঁচাও” বলে একবার চেঁচিয়ে উঠল। তারপর জানোয়ারটার থাবার ঝাঁপটে ঘাড়টা মটকে গেল বাবার। হাড় ভাঙার শব্দটা স্পষ্ট শোনা গেল। শেষে ঝোঁপঝাড়ের সড়সড় আওয়াজ এল কানে। শিকার নিয়ে বনের মধ্যে ঢুকে গেল শয়তানটা।

    এই সারাটা সময় বনবিবির নাম জপ করে গিয়েছিল কুসুম। একবারও থামেনি।

    হরেন এসে তুলেছিল ওকে ধুলো থেকে। “বনবিবি শুনতে পেয়েছেন তোর কথা। অনেক সময় তার কাছের মানুষদের এভাবেই ডেকে নেন উনি। তোর বাবার মতো বাউলেরাই তাই সবসময় আগে যায়,” বলেছিল হরেন।

    ঘটনাটা বলতে বলতে শরীর ছেড়ে দিয়েছিল কুসুমের। কোনও রকমে কানাইয়ের কাঁধে ভর দিয়ে বসেছিল ও। কানাই টের পাচ্ছিল ওর গায়ে এসে লাগছে কুসুমের চুল। গল্পটা শুনতে শুনতে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে উঠছিল ওর গলার কাছে। ইচ্ছে করছিল দু’হাতে জড়িয়ে ধরে কুসুমকে, ইচ্ছে করছিল ওর শোক ভুলিয়ে দেয়, মুছিয়ে দেয় ওর চোখের জল। নিজের শরীর দিয়ে দেওয়ালের মতো আড়াল করে রাখে ওকে গোটা পৃথিবীর কাছ থেকে। এরকম তীব্র শারীরিক অনুভূতি এর আগে কখনও হয়নি কানাইয়ের। কাউকে আগলে রাখা, আড়াল করার এই প্রচণ্ড ইচ্ছা, সহানুভূতির এরকম সুতীব্র শারীরিক প্রকাশ কানাই এর আগে কোনওদিন এভাবে অনুভব করেনি। নিজের ঠোঁট দিয়ে কুসুমের চোখ মুছিয়ে দিল ও। এত কোমল উষ্ণ সেই অনুভূতি, যে থামতে পারল না কানাই। এক হাতে জড়িয়ে ধরে কুসুমকে বুকে টেনে নিল ও, নিজের মাথা চেপে ধরল ওর মাথায়।

    হঠাৎ একটা আওয়াজ শোনা গেল। কেউ যেন দৌড়ে আসছে। মচমচ করে উঠল হ্যামিলটন বাংলোর সেগুনকাঠের সিঁড়ি। “কুসুম, কুসুম”–হরেনের গলা। চাপা হিসহিস স্বরে ও ডাকছে কুসুমকে।

    “আমি এখানে,” বলে দাঁড়িয়ে উঠল কুসুম।

    ওদের সামনে এসে হাঁপাতে লাগল হরেন। “কুসুম, এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে হবে আমাদের। আমি দিলীপকে দেখলাম, কয়েকটা লোককে নিয়ে এসেছে। তোকে খুঁজছে। এখানে থাকা আর নিরাপদ নয়। লুসিবাড়ি থেকে পালাতে হবে তোকে।”

    কানাইয়ের পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসল হরেন। ওর ঠোঁটের ওপর একটা আঙুল রেখে বলল, “একটা কথা শুনে রাখো ছোটবাবু। যদি কেউ জানতে পারে কুসুম কোথায় গেছে আর কার সঙ্গে গেছে, তা হলে তুমিও কিন্তু খুব বিপদে পড়বে বলে রাখলাম। বুঝেছ?”

    জবাবের অপেক্ষা না করে কুসুমের হাত ধরে বেরিয়ে গেল হরেন। দৌড়ে।

    সেই শেষ দেখা কুসুমের সঙ্গে। পরদিন নির্মল বলল কানাইয়ের বনবাস শেষ, ওকে ফেরত দিয়ে আসা হবে কলকাতায়।

  • স্পন্দন

    স্পন্দন

    স্পন্দন

    পূর্ণিমা আসতে এখনও ক’দিন বাকি। চাঁদের তিন ভাগ মাত্র দেখা যাচ্ছে। তাও এত উজ্জ্বল জ্যোৎস্না এসে পড়েছে জলের ওপর, মনে হচ্ছে নদীর ভেতর থেকে যেন আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। একটু ঠান্ডা ঠান্ডা পড়েছে রাতের দিকটায়, কিন্তু হাওয়া চলছে না। পাড় থেকেও কোনও শব্দ ভেসে আসছে না। নিঝুম নিস্তরঙ্গ চারদিক। অস্বচ্ছন্দ তন্দ্রায় একবার পাশ ফিরল পিয়া। ঠিক করে নিল ভাজ-করা শাড়ির বালিশটা। দেখে নৌকোর গলুই-এর কাঠটার ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছে ও। হঠাৎ একটা নড়াচড়ার আওয়াজে ঘুম ছুটে গেল পিয়ার। কীসে যেন খচমচ করছে, নখ দিয়ে আঁচড়াচ্ছে নৌকোর গা, ডিঙি বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। যেন নৌকোর পেটের ভেতর থেকে কাঠ ভেদ করে কানে আসছে আওয়াজটা। কয়েকমিনিট লাগল পিয়ার বুঝতে, ব্যাপারটা কী। কিছুই না, ফকিরের ডিঙির জীবন্ত পণ্যভাণ্ডার। তক্তার নীচে কঁকড়াগুলি নড়াচড়া করছে, তারই শব্দে ঘুম ভেঙেছে পিয়ার। কঁকড়ার খোলার খটর খটর, দাঁড়াগুলোর কট কট আওয়াজ, ডালপালার খসখস স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল পিয়া। মনে হচ্ছিল ও যেন একটা দৈত্য, মাটিতে কান পেতে শুনছে কোনও পাতালপুরীর প্রাণস্পন্দন।

    নৌকোটা দুলে উঠল হঠাৎ, মনে হল কারও নড়াচড়ায়। পায়ের দিকে তাকিয়ে পিয়া দেখল ডিঙির মাঝের জায়গাটায় ফকির বসে আছে। একটা চাদর দিয়ে তাঁবুর মতো করে ঘাড় পর্যন্ত মোড়া। পিয়া ভেবেছিল ও বোধহয় ঘুমোচ্ছে ছইয়ের নীচে। কিন্তু ফকিরের বসার ভঙ্গিটায় এমন একটা পাথুরে নিশ্চলতা রয়েছে, বোঝাই যাচ্ছিল বেশ খানিকক্ষণ ওই ভাবে বসে আছে ও। পিয়া যে ওর দিকে তাকিয়ে আছে সেটা যেন টের পেল ফকির। ঘুরে তাকাল ওর দিকে। পিয়া জেগে গেছে দেখে হাসল। হাসিটার মধ্যে একই সঙ্গে একটা কৈফিয়ত আর আত্মবিদ্রুপের ভাব। ওখানে বসে বসে ওকে আর টুটুলকে পাহারা দিচ্ছে ফকির, ভেবে ভাল লাগল পিয়ার। মনে পড়ল জলের তলায় প্রথম যখন ফকিরের হাতের ছোঁয়া পেয়েছিল, কী প্রচণ্ড চেষ্টা করেছিল পিয়া সেটাকে সরিয়ে দিতে–যতক্ষণ না ও বুঝেছিল যেটা ওকে ধরার চেষ্টা করছে সেটা কোনও হিংস্র প্রাণী নয়, একটা মানুষ, যার ওপর ও ভরসা করতে পারে, যে ওর কোনও ক্ষতি করবে না। বিশ্বাসই হচ্ছিল না পিয়ার যে কয়েক ঘণ্টা হয়েছে মাত্র ও উলটে পড়েছিল জলে ওই লঞ্চটা থেকে। ঘটনাটা মনে পড়তেই সারা শরীর কেঁপে উঠল পিয়ার। চোখ বুজতেই মনে হল আবার যেন জল চেপে ধরেছে ওকে চারদিক থেকে, ও যেন সেই অদ্ভুত উজ্জ্বল অতলে তলিয়ে যাচ্ছে ফের, যেখানে সূর্যের আলোর কোনও দিকদিশা নেই, যেখানে বোঝা যায় না কোনদিকে গেলে ওপরে ওঠা যাবে আর কোনদিকে গেলে ডুবে যাবে নিতল গভীরে।

    পিয়ার মনে হল নৌকোটা যেন নড়ছে ওর শরীরের নীচে। বুঝতে পারছিল কাঁপুনি হচ্ছে ওর। একের পর এক লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, এমন সময় কাঁধের কাছে একটা ঠান্ডা, দৃঢ় হাতের স্পর্শ পেল পিয়া। অদ্ভুত ভাবে, এই ছোঁয়াটাও ওকে সেই পড়ে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিল। ফকির এসেছে–বুঝতে পারল ও। চোখ মেলে দেখল উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে ফকির চেয়ে আছে ওর মুখের দিকে। একটু হাসার চেষ্টা করল পিয়া, কিন্তু খিচুনির মতো কাঁপছে সারা শরীর, তাই মুখবিকৃতির মতো দেখাল হাসিটা। ও বুঝতে পারল ফকিরের উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে যাচ্ছে, তাই ওর হাতের ওপর একটা হাত রাখল। হাতটা ধরে নিয়ে ওর পাশে শুয়ে পড়ল ফকির, লম্বা হয়ে। ওর শরীরের লোনা, রোদে-পোড়া গন্ধ এখন পিয়ার নাকে; দু’জনের মধ্যে ব্যবধান বলতে একটা চাদর, সেটা ভেদ করে ফকিরের পাঁজরগুলি অনুভব করতে পারছিল পিয়া। ফকিরের গায়ের ওমে ধীরে ধীরে গরম হয়ে উঠল চাদরটা, শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থিরথিরে কাঁপুনির ভাবটা থিতিয়ে এল আস্তে আস্তে। কাঁপুনি থামতে একটু অপ্রতিভ হয়ে ধড়মড় করে উঠে বসল পিয়া। ফকিরও ছিটকে উঠে পড়ল। পিয়া বুঝতে পারছিল একই রকম অপ্রস্তুত বোধ করছে ও-ও। কী করে বোঝানো যায় ফকিরকে যে সব ঠিক আছে, কিছু মনে করেনি পিয়া, ভুল বোঝেনি ওকে? ভেবে পেল না পিয়া। সশব্দে গলা পরিষ্কার করল একবার, তারপর শুধু বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ”। ঠিক সেই সময়েই, যেন এই অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে ওদের উদ্ধার করার জন্য ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠল টুটুল। সঙ্গে সঙ্গে উঠে ছইয়ের ভেতর ঢুকে গেল ফকির, ছেলেকে শান্ত করতে।

    পুঁটুলি পাকানো শাড়িটার ওপর আবার মাথা নামাল পিয়া। মনে হল কাপড়টার ভাজে ভজে ওটার মালিকের গন্ধ পাচ্ছে ও। যেন হঠাৎ সে সশরীরে উপস্থিত হয়েছে এই নৌকোর ওপর। ভেবে ভাল লাগল পিয়ার, ফকিরকে যা বলতে চেয়েছিল একই কথা বলতে পারবে তাকেও –অনৈতিক কিছু করেনি ওরা, কিছু ঘটেইনি আদতে।

    কীই বা ঘটতে পারত? ফকিরের বিষয়ে খুব একটা কিছু জানে না পিয়া, কিন্তু এটুকু তো বোঝা গেছে যে ও বিবাহিত এবং ওর একটা বাচ্চা আছে। আর নিজের সম্পর্কেও এটা অন্তত বলতে পারে পিয়া যে এরকম ব্যক্তিগত কোনও জটিলতায় জড়ানোর কথা ও স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। ও একটা কাজের দায়িত্ব নিয়ে এসেছে, এ জায়গাটা প্রকৃতপক্ষে ওর কর্মক্ষেত্র। আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের থেকে দূরে থাকলেই একটা জায়গা কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। দুয়ের মধ্যে যে ভেদরেখা সেটার পবিত্রতায় বিশ্বাস করে পিয়া; নিজের কাজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করে সে রেখা ও কিছুতেই পেরোতে পারবে না।

    সকালে যখন ঘুম ভাঙল পিয়ার নৌকো ততক্ষণে চলতে শুরু করেছে। চোখ খুলে দেখে রাতের ঠান্ডা বাতাস আর নদীর গরম জলের ধাক্কায় ধাক্কায় জমে ওঠা কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে আছে চারদিক। নিজের পাটুকু পর্যন্ত কোনওরকমে দেখতে পাচ্ছিল পিয়া; গায়ের চাদরটা চুপচুপে ভিজে গেছে হিমে। পুব আকাশে একটা আবছা আভা দেখে শুধু বোঝা যাচ্ছিল যে সূর্য উঠেছে। এই আলোতেও কী করে নৌকো চালাচ্ছে ফকির ভেবে একটু আশ্চর্য হল পিয়া। বোঝাই যাচ্ছে এই জলের রাস্তা ওর মুখস্থ প্রায়, তাই এই ঝুম কুয়াশাতেও নদী-খাঁড়ির কিনারা বুঝে বুঝে ডিঙি চালিয়ে নিয়ে যেতে কোনও অসুবিধাই হচ্ছে না।

    উঠে পড়ার কোনও তাড়া ছিল না, তাই আবার আরামে চোখ বুজল পিয়া। একটু পরে হঠাৎ থেমে গেল নৌকোটা। পিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। চেয়ে দেখল কুয়াশা এখনও বেশ ঘন, চারপাশের জল জঙ্গল কিছুই নজরে আসছে না। ডিঙির পেছনের দিক থেকে নোঙর নামানোর শব্দ কানে এল এবার। পিয়া একটু অবাক হল। এরকম একটা জায়গায় এনে কেন নোঙর ফেলছে ফকির? কুয়াশার জন্যই হবে নিশ্চয়ই। হয়তো বড় নদীতে কি মোহনায় এসে পড়েছে, ভাল করে না দেখে আর দিক ঠিক করা যাচ্ছে না।

    আবার ঘুমিয়ে পড়তে যাচ্ছিল পিয়া, হঠাৎ একটা আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠে বসল সোজা হয়ে। ভাল করে শোনার জন্য হাত রাখল কানের পেছনে। আবার সেই আওয়াজ! ছলাৎ করে জলের শব্দ একটু, তারপর একটা চাপা নাক ঝাড়া দেওয়া শব্দ। যেন খুব মোটা রুমালের মধ্যে কেউ নাক পরিষ্কার করছে।

    “আশ্চর্য!” ছিটকে উঠে হাঁটু গেড়ে বসল পিয়া, কুয়াশায় কান পেতে শুনতে লাগল মনোযোগ দিয়ে। মিনিট কয়েক ভাল করে শুনে বোঝা গেল বেশ কয়েকটা ডলফিন ঘোরাঘুরি করছে নৌকোর চারপাশে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে নানা দিক থেকে আসছিল শব্দগুলো, জায়গা বদলাচ্ছিল মুহূর্তে মুহূর্তে। কয়েকটা আওয়াজ খুব ক্ষীণ, মনে হয় যেন কিছুটা দূর থেকে আসছে; কয়েকটা আবার বেশ স্পষ্ট, ধারে কাছেই। দিনের পর দিন কাটিয়েছে পিয়া এই চাপা ঘোঁতঘোঁত আওয়াজ শুনে, ও জানে একমাত্র ইরাবড়ি ডলফিন, মানে ওর্কায়েলা ব্রেভিরোষ্ট্রিস ই পারে এরকম আওয়াজ করতে। অর্থাৎ একটা ওর্কায়েলার ঝক এই পথ দিয়ে যেতে যেতে নৌকোটাকে দেখে একটু থেমেছে এখানে। আর এমনই পিয়ার কপাল যে ঘটনাটা এমন একটা সময় ঘটছে যখন ও নিজের হাতের তেলো পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। আগের আগের অভিজ্ঞতা থেকে পিয়া জানে যে মিনিট কয়েক পরেই অস্থির হয়ে উঠবে ডলফিনগুলো। হয়তো ওর যন্ত্রপাতি বের করতে করতেই ওরা চলে যাবে দূরে।

    “ফকির!” ও-ও শুনেছে কিনা আওয়াজগুলো সেটা বোঝার জন্য চাপা গলায় ডাকল পিয়া। একটু দুলে উঠল নৌকোটা। বুঝল ফকির এগিয়ে আসছে। তাও চমকে গেল পিয়া ওকে দেখে : কাঁধের কাছে ঘেঁড়া ছেঁড়া কুয়াশায় মনে হল ওর মাথাটা যেন ভাসছে শূন্যে, একটা মেঘের ওপর।

    “লিসন,” শব্দগুলোর দিকে ইশারা করে কানের পেছনে একটা হাত রেখে বলল পিয়া। মাথা নাড়ল ফকির, কিন্তু অবাক হল না; যেন এই ডলফিনের ঝকের সঙ্গে দেখা হওয়াটা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়, ও যেন আগে থেকেই জানত যে ওগুলি থাকবে এখানে। তা হলে ও কি রাত থেকে এদিকেই আসছিল, পিয়াকে ডলফিন দেখাবে বলে?

    আরও গুলিয়ে গেল পিয়ার মাথাটা। ফকির করে জানবে যে ঠিক এই সময়ে এই এক ঝাক ওর্কায়েলা আসবে এখানে? হতে পারে নদীর এ জায়গাটায় ডলফিনের ঝাক মাঝে মাঝে আসে, কিন্তু তাও, আজকে এই সময়টাতেই যে ওরা এখানে থাকবে সেটা ও জানবে কী করে? আর যাই হোক, এরকম ভ্রাম্যমাণ শুশুকের ঝুঁকের চলাফেরার ঠিক ঠিকানা আগে থেকে অনুমান করা তো অসম্ভব ব্যাপার, সেটা তো অস্বীকার করা যায় না। যাক গে, এখন এসব প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। আপাতত এই কুয়াশার মধ্যেই যতটা পারা যায় তথ্য সংগ্রহ করে নিতে হবে।

    হাতে সময় বেশি নেই যদিও, কিন্তু ব্যাগ থেকে কাজের যন্ত্রপাতি বের করার সময় পিয়া খুব ধীর এবং গোছানো। একগোছা ডেটাশিট বের করে ক্লিপবোর্ডে আটকাতে যাবে, ঠিক সেই সময় মাত্র মিটার খানেক দূরে ভেসে উঠল একটা ডলফিন। এত কাছে যে ওটার নিশ্বাসের সঙ্গে ফোয়ারার মতো বিন্দু বিন্দু জল এসে লাগল পিয়ার গায়ে। পিঠের পাখনা আর ভোঁতা নাকটা একবারের জন্য দেখা গেল। সন্দেহের আর কোনও জায়গা নেই, এগুলো ওর্কায়েলা-ই।

    কোনওই ভুল নেই। যদিও শুরু থেকেই মোটামুটি নিশ্চিত ছিল পিয়া সে ব্যাপারে, তাও এবার চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন হয়ে গেল। নৌকোর এত কাছে ভেসে উঠেছিল শুশুকটা, যে জিপিএস মনিটরটা হাত বাড়িয়ে ধরে রেখেই রিডিং নিয়ে নিল পিয়া। ডেটাশিটে সংখ্যাগুলো লেখার সময় যেন একটা যুদ্ধজয়ের আনন্দ হচ্ছিল ওর–এক্ষুনি, এই মুহূর্তেও যদি চলে যায় ডলফিনগুলো, এই ছোট্ট কাগজের টুকরোটায় তো ধরা থেকে গেল এই তথ্যপ্রমাণ।

    এর মধ্যে পাতলা হয়ে এসেছে কুয়াশা। ভাটাও শেষ হতে চলল প্রায়; কয়েকশো মিটার দূরেই ডাঙা দেখা যাচ্ছে। পিয়া লক্ষ করল ফকির নৌকোটা যেখানে এনে দাঁড় করিয়েছে, সেটা একটা বাঁকের মুখ। পাড়টা এখানে এসে একটা ভাঁজ করা হাতের মতো বেঁকে গেছে। ফলে কনুইয়ের বাঁকটায় একটা নিস্তরঙ্গ এলাকা তৈরি হয়েছে নদীর মধ্যে। আর ঠিক এই স্থির গভীর জায়গাটার মধ্যেই এসে নোঙর ফেলেছে ফকির। খানিকটা বুমেরাং-এর মতো দেখতে এই দহটা লম্বায় প্রায় এক কিলোমিটার। এই জায়গাটুকুতেই, যেন অদৃশ্য একটা পুকুরের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে ওই ডলফিনগুলো।

    কিছুক্ষণের মধ্যেই ভোরের কুয়াশা আর রাতের ঠান্ডা সুদূর স্মৃতির মতো কোথায় মিলিয়ে গেল। উঁচু বাঁধ আর ঘন জঙ্গলের বাধা পেরিয়ে কোনও হাওয়াও আসতে পারছে না নদী পর্যন্ত। স্থির জলের বুকে নদীর মধ্যে যেন আর একখানা সূর্য জ্বলছে। ওপরের মেঘহীন আকাশ থেকে আগুনের হলকা নামছে, জলের বুক থেকেও ঠিকরে উঠে আসছে তাপ। পারা চড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাঁসফাস করতে করতে মাটির নীচের জীবনপ্রবাহ উঠে আসছে পাড়ের কাদায়। পালে পালে কঁকড়া চলে বেড়াচ্ছে সেখানে, ঝাঁপিয়ে পড়ছে নদীর রেখে যাওয়া পাতা আর অন্যান্য রসালো আবর্জনার ওপর।

    দুপুর পর্যন্ত ডেটা যা জোগাড় হল তাতে ঝকটায় কটা ডলফিন আছে মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই আন্দাজ করা চলে। পিয়া হিসাব করে দেখল সব মিলিয়ে সাতটা। তার মধ্যে একটা জোড়া মনে হচ্ছে একসাথে সাঁতরাচ্ছে আর মোটামুটি একই সঙ্গে ভেসে উঠছে। জোড়াটার একটা ডলফিন দলের অন্যগুলোর চেয়ে মাপে একটু ছোট। ওটা নিশ্চয়ই একটা ছানা; একেবারে কচি বাচ্চাও হতে পারে। হয়তো এখনও মাকে ছেড়ে নিজে নিজে আলাদা সাঁতরানোর বয়স হয়নি। পিয়া দেখল ছানাটা বার বার পাক খেতে খেতে উঠে আসছে জলের তলা থেকে, ছোট্ট মাথাটা ভেসে উঠছে জলের ওপর–মানে এখনও ঠিকমতো শ্বাস নিতেও শেখেনি ওটা। যতবার ওই কচি মাথাটা ভেসে উঠছিল, আনন্দে নেচে উঠছিল পিয়ার মনটা : তার মানে ওর্কায়েলারা এখনও বংশবৃদ্ধি করছে এখানে।

    সাঁতার কেটেই যাচ্ছে শুশুকগুলো, বাঁকের মুখটা ছেড়ে অন্যদিকে যাচ্ছেই না প্রায়। নদীর ওই ছোট্ট গভীর অংশটার মধ্যে পাক খেয়ে যেতেই যেন ভাল লাগছে ওদের। নৌকোটার জন্য যে ওরা এখানে ঘুরঘুর করছে তাও নয়; যেটুকু আগ্রহ নৌকোটার প্রতি ওদের ছিল সে কখন ফুরিয়ে গেছে।

    তা হলে কীসের জন্য ঘুরছে ডলফিনগুলো এখানে? এ জায়গাটায় ওরা এসেছেই বা কেন, আর কীসের জন্যই বা অপেক্ষা করছে? খুবই গোলমেলে সমস্যা। পিয়ার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে খুব কৌতুলহজনক কিছু একটা ঘটছে এখানে; এমন কিছু, যা থেকে ইরাবড়ি ডলফিন এবং তাদের স্বভাব সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য জানা যেতে পারে। ওকে শুধু মাথা খাঁটিয়ে বের করতে হবে রহস্যটা কী।

  • নীলবসনা সুন্দরী

    নীলবসনা সুন্দরী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    ‘নীল বসনা সুন্দরী’ পাঁচকড়ি দে’র একটি সাড়া জাগানো উপন্যাস। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে। ১৩১১ বঙ্গাব্দের ১৯শে মাঘ ’বঙ্গভূমি’ পত্রিকায় উপন্যাসটি সম্বন্ধে লেখা হয়েছে— “‘নীলবসনা সুন্দরী’ বঙ্গ সাহিত্যের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ডিটেক্টিভ ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি দে প্রণীত। ইনি সাহিত্য সমাজে সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। আমরা এই পুস্তক অত্যন্ত আগ্রহের সহিত পাঠ করিয়াছি। পূর্ব্বে বাংলায় ভালো ডিটেক্টিভ উপন্যাস ছিল না, শ্রীযুক্ত পাঁচকড়িবাবু বঙ্গীয় পাঠকগণের সে অভাব পূরণ করিয়াছেন। আমরা তাঁহার ডিটেকটিভ উপন্যাসের সমাদর করি। তাঁহার ন্যায় প্রতি পরিচ্ছেদে এমন নব নব কৌতূহল সৃষ্টি করিবার ক্ষমতা কাহারও দেখি না। যদি এমন উপন্যাস পড়িতে চাহেন যাহা একবার পড়িয়া তৃপ্তি হয় না, দশবার পড়িয়া দশজনকে শুনাইতে ইচ্ছা করে তবে এই ‘নীল বসনা সুন্দরী’ পাঠ করুন। পড়িতে পড়িতে যেন এই উপন্যাস চুম্বকের আকর্ষণে পাঠককে টানিয়া লইয়া যায়। ঘটনা কৌতূহলজনক, ভাষাও তেমন সরল ও তরল, যেন নির্ঝরিণীর ন্যায় তরতর বেগে বহিয়া যাইতেছে। শব্দচ্ছটাও অতি সুন্দর। বঙ্গ সাহিত্যে গ্রন্থকারের ডিটেকটিভ উপন্যাস যথেষ্ট সমাদর লাভ করিবে।”

    নলিনী রঞ্জন পণ্ডিত সম্পাদিত ‘জাহ্ণবী’ মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে। পত্রিকাটির প্রথম বর্ষের ষষ্ঠ সংখ্যায় কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন পাঁচকড়ি দে’র দুটি উপন্যাস সম্বন্ধে লিখেছেন— “’নীল বসনা সুন্দরী’, ‘হত্যাকারী কে?’ শ্রী পাঁচকড়ি দে প্রণীত। এই দুইখানি ডিটেকটিভ উপন্যাস আমরা স্বীকার করিতে বাধ্য, আমরা সচরাচর ইংরাজী ও ফরাসীয় লেখকদের রচিত যে সব ডিটেকটিভ উপন্যাস পাঠ করি, তদপেক্ষা সমালোচ্য উপন্যাস দুখানি কোন অংশে হীন নহে। ভাষা বেশ সরল, সুন্দর যেন জলধারার মত বহিয়া যাইতেছে। লেখক সুনিপুণ কৌশলে, মুন্সিয়ানার সহিত, ওস্তাদির সহিত পাঠককে গ্রন্থের প্রথম হইতে শেষ পর্য্যন্ত পাঠ করিতে বাধ্য করেন। কৌতূহল চরিতার্থ করিবার জন্য এক দুর্দ্দমনীয় ব্যাকুলতা জন্মে। লেখকের পক্ষে ইহা কম বাহাদুরীর বিষয় নহে।”

    সাহিত্যিক ধীরেন্দ্রনাথ পালের পুত্র যতীন্দ্রনাথ পালের আকস্মিক মৃত্যুতে দীনেন্দ্রনাথ অত্যন্ত শোকগ্রস্ত হন। যতীন্দ্রনাথ ছিলেন পাঁচকড়ির বিশেষ বন্ধু। তার নামানুসারেই জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ লেনে পাঁচকড়ির বইয়ের দোকানের নাম ছিল ‘পাল ব্রাদার্স’। বন্ধুর মৃত্যুর পর তিনি আর কোন লেখা লেখেন নি। ১৯৪৫ খৃষ্টাব্দের ২০শে নভেম্বর তার মৃত্যু হয়।

    সৰ্ব্বসদ্‌গুণালঙ্ক তহৃদয়

    সুহৃদ্বর

    শ্রীযুক্ত অভয়চরণ পাল বি.এ., বি. এল.,

    বৈবাহিক মহাশয়ের নামে এই গ্ৰন্থ

    সাদরে

    উৎসর্গীকৃত হইল।

  • প্রথম খণ্ড : নিয়তি—লীলাক্ষেত্র

    প্রথম খণ্ড : নিয়তি—লীলাক্ষেত্র

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    প্রথম খণ্ড : নিয়তি—লীলাক্ষেত্র

    Cas. Vengeance, lie still, thy cravings shall be stated

    Death roams at large, the furies are unchain’d,

    and murder plays her mighty master-piece.

    Nathaniel Lee-Alexander-The Great, Act. V. Scene II.

  • দ্বিতীয় খণ্ড : নিয়তি—লীলাময়ী

    দ্বিতীয় খণ্ড : নিয়তি—লীলাময়ী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    দ্বিতীয় খণ্ড : নিয়তি—লীলাময়ী

    Coun                                      This suspense,

    This horrid fear-I can no longer bear it

    For heaven’s sake, tell me, what has taken place.”

    Coleridge :— The death of Walleustein, Act I Seene IX.

  • তৃতীয় খণ্ড : নিয়তি—রহস্যময়ী

    তৃতীয় খণ্ড : নিয়তি—রহস্যময়ী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    তৃতীয় খণ্ড : নিয়তি—রহস্যময়ী

    Mme-de Mon [aside], A clue—another clue-that I will follow,

    Until it lead to the throne!

    Lord Lytton— The Duchess de la Vulliere. Act III, Scene III.

  • চতুর্থ খণ্ড : নিয়তি—ছদ্মবেশা

    চতুর্থ খণ্ড : নিয়তি—ছদ্মবেশা

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    চতুর্থ খণ্ড : নিয়তি—ছদ্মবেশা

    “Nature naver made

    A heart all marble, but all in its fissures sows

    The wild flower Love; from whose rich seeds spring forth

    A word of mercies and sweet charities.”

    Barry Cornwall.

  • পঞ্চম খণ্ড : নিয়তি—রাক্ষসী

    পঞ্চম খণ্ড : নিয়তি—রাক্ষসী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    পঞ্চম খণ্ড : নিয়তি—রাক্ষসী

    “This is the man should do the bloody deed;

    The image of a wicked heinous fault

    Lives in his eye; that close aspect of his

    Does show the mood of a much-troubled breast.”

    Dodd’s “Beauties of Shakespeare.”