Author: তাহের আলমাহদী

  • আলাপ

    আলাপ

    আলাপ

    স্নান সেরে জানালার পাশে চেয়ারটায় গা ডুবিয়ে বসল পিয়া। খানিক পরে দেখল ওর আর ওঠার ক্ষমতা নেই। এই কদিন স্রেফ উবু হয়ে আর আসন করে বসে থাকার পর একটা হেলান দেওয়ার জায়গা পেয়ে কেমন যেন এক অদ্ভুত আরামের অনুভূতি হচ্ছে। ইচ্ছেমতো পা-ও দোলানো যাচ্ছে–পড়ে যাওয়ার কোনও ভয় নেই। এখনও মনে হচ্ছে নৌকোর দুলুনি টের পাচ্ছে সারা শরীরে, কানে বাজছে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের ঝিরঝির শব্দ।

    নৌকোয় চলার বোধটা ফেরত আসতেই হঠাৎ সকালের সেই ভয়ংকর ঘটনার কথা মনে পড়ে গা শিউরে উঠল পিয়ার। মাত্রই কয়েকঘন্টা আগের ঘটনা অনুভূতিগুলি যেন এখনও স্মৃতি হয়ে যায়নি; টাটকা, স্পষ্ট রয়ে গেছে মনের মধ্যে। পরিষ্কার দেখতে পেল পিয়া কুমিরটার মাথা মোচড় খেয়ে ঘুরে যাচ্ছে শূন্যে, দেখতে পেল এক মুহূর্ত আগেও ওর কবজিটা যেখানে ছিল ঠিক সেইখানটায় এসে খপাত করে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সরীসৃপটার হাঁ মুখ : হাতটা ধরে ফেলবে বলে এত নিশ্চিত ছিল কুমিরটা, যে ওকে ডিঙি থেকে টেনে জলের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য শরীরের চলন যেরকম হওয়া দরকার ঠিক সেইভাবেই লাফ দিয়েছিল ওটা। পিয়া কল্পনা করল একটানে ওকে জন্তুটা নিয়ে চলে যাচ্ছে জলের নীচে, একবার মুহূর্তের জন্য আলগা হচ্ছে কামড়, তারপর ওর শরীরের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় এসে ফের বন্ধ হচ্ছে হাঁ-মুখ। দ্রুত ওকে নিয়ে চলে যাচ্ছে সেই অদ্ভুত উজ্জ্বল গভীরে, যেখানে সূর্যের আলোর কোনও দিক-দিশা নেই, যেখানে বোঝা যায় না কোনদিকে গেলে ওপরে ওঠা যাবে, আর কোনদিকে গেলে তলিয়ে যাবে আরও নীচে। লঞ্চ থেকে পড়ে যাওয়ার সময়কার আতঙ্কের কথা মনে পড়ে গেল ওর, মনে পড়ল সেই শরীর অবশ করা ভয়ের কথা, যখন চেতনার মধ্যে একটাই কথা বাজতে থাকে–এই অতল কারা থেকে মুক্তির কোনও উপায় নেই। পর পর এই সব দৃশ্যগুলো চোখের সামনে এসে এমন এক স্পষ্ট জীবন্ত মন্তাজ তৈরি হল যে পিয়ার হাত আবার থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। আর ফকিরের অনুপস্থিতিতে ঘটনাগুলিকে তখনকার থেকে অনেক বেশি ভয়াবহ মনে হল এখন।

    জোর করে উঠে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল পিয়া। এখনও চাঁদ ওঠেনি, অন্ধকারে ঝুপসি কয়েকটা নারকেলগাছ আবছা নজরে আসছে, তার পরেই ফসল কাটা ন্যাড়া জমির বিস্তীর্ণ শূন্যতা। বাড়ির সামনের দিক থেকে একটা কথাবার্তার আওয়াজ ভেসে আসছে : কোনও মহিলার গলা আর তার সঙ্গে কানাইয়ের ভারী গম্ভীর কণ্ঠস্বর।

    চেয়ার থেকে শরীরটাকে টেনে তুলে একতলায় নেমে এল পিয়া। দরজাটার সামনে হাতে একটা লণ্ঠন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কানাই লাল শাড়ি পরা এক মহিলার সঙ্গে কথা বলছে। খানিকটা অন্যদিকে ফিরে দাঁড়িয়েছিল মহিলা, পিয়াকে আসতে দেখে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে কানাইয়ের লণ্ঠনের আলোয় হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার মুখের একটা পাশ। পিয়া দেখল ওরই কাছাকাছি বয়স হবে মেয়েটির, ভরা শরীর, চওড়া হাঁ মুখ আর বড় বড় ঝকঝকে দুটো চোখ। দুই ভুরুর মাঝে বড় একটা লাল টিপ আর মাথায় চকচকে কালো চুলের মাঝখান দিয়ে একটা ক্ষতচিহ্নের মতো মোটা করে টকটকে লাল সিঁদুরের দাগ।

    “আরে এই যে পিয়া”, কানাই বলল ইংরেজিতে। ওর গলায় বাড়তি উচ্ছ্বাসের সুরটা থেকে পিয়া আন্দাজ করল ওকে নিয়েই কথা হচ্ছিল এতক্ষণ। দেখল মেয়েটি স্পষ্ট স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে, যেন বুঝতে পেরেছে ও কে, আর মনে মনে যাচাই করে নিচ্ছে ওকে। তারপর ওই খোলা নজরে জরিপ করার মতোই অস্বস্তিকর ভঙ্গিতে হঠাৎ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল মুখটা। কানাইয়ের হাতে কয়েকটা স্টেনলেস স্টিলের কৌটো ধরিয়ে দিয়ে নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে; তারপর অন্ধকারে ঢাকা ট্রাস্ট চৌহদ্দির মধ্যে মিলিয়ে গেল কোথায়।

    “কে ওই মহিলা?” পিয়া জিজ্ঞেস করল কানাইকে।

    “বলিনি আপনাকে? ও তো ময়না, ফকিরের বউ।”

    “তাই বুঝি?”

    ফকিরের বউয়ের চেহারা যেমন কল্পনা করেছিল পিয়া তার থেকে ময়না এতটাই আলাদা যে ব্যাপারটা হজম করতে একটু সময় লাগল ওর। তারপর বলল, “বোঝা উচিত ছিল আমার।”

    “কী বোঝা উচিত ছিল?”

    “যে ও ফকিরের বউ। ছেলেটার চোখদুটো ঠিক ওর মতো।”

    “তাই নাকি?”

    “হ্যাঁ,” বলল পিয়া। “কী বলতে এসেছিল ও?”।

    “এই যে, এই টিফিন ক্যারিয়ারটা দিয়ে গেল,” স্টিলের কৌটোগুলো তুলে দেখাল কানাই। “আমাদের রাতের খাবার আছে এর মধ্যে। হাসপাতালের রান্নাঘর থেকে ময়না নিয়ে এসেছে আমাদের জন্য।”

    মুহূর্তের জন্য কানাইয়ের ওপর থেকে মনোযোগ সরে গেল পিয়ার। ওই মেয়েটির কথা ভাবছিল ও, ফকিরের বউয়ের কথা। ফকির আর টুটুলের কাছে ফিরে গেল বউটি, আর ওকে ফিরে যেতে হবে গেস্ট হাউসের দোতলার শূন্যতায় ভেবে অল্প একটু ঈর্ষা হল মনে। এই চিন্তায় নিজেরই লজ্জা লাগল পিয়ার, আর সেটা ঢাকার জন্য ও কানাইয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে তাড়াতাড়ি বলল, “আমি যেরকম ভেবেছিলাম তার সঙ্গে কোনওই মিল নেই ওর।”

    “মিল নেই?”

    “না।” আবার পিয়া দেখল ঠিক উপযুক্ত শব্দটা কিছুতেই মনে আসছে না। বলল, “মানে, বেশ ভালই দেখতে, না?”

    “আপনার তাই মনে হল?”

    বুঝতে পারছিল পিয়া এ প্রসঙ্গটা এখানেই শেষ করে দেওয়া ভাল, কিন্তু তাও থামল না, ক্ষতস্থানের ওপর থেকে মামড়ি খুঁটে তোলার মতো বলেই যেতে লাগল : “তাই তো। বেশ সুন্দরীই বলা চলে।”

    “ঠিকই বলেছেন, নিজেকে সামলে নিয়ে একটু মোলায়েম সুরে বলল কানাই। “খুবই অ্যাট্রাক্টিভ। কিন্তু আরও গুণ আছে ওর সেসব দেখতে গেলে খুব একটা সাধারণ মেয়ে নয় ময়না।”

    “তাই নাকি? কী রকম?”

    “অদ্ভুত ওর জীবনের কাহিনি,” বলল কানাই। “অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও নিজের চেষ্টায় লেখাপড়া শিখেছে, শিগগিরই হয়তো পুরোদস্তুর নার্স হয়ে যাবে এই হাসপাতালে, নিজের এবং পরিবারের জন্য ও ঠিক কী চায় সেটা ও জানে, এবং সেটা অর্জন করার জন্য যে-কোনও বাধাকে তুচ্ছ করে এগিয়ে যাওয়ার জোর ওর আছে। ওর মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, এক ধরনের বলিষ্ঠতা আছে। অনেকদূর যাবে ওই মেয়ে।”

    কানাইয়ের কথার মধ্যে কোথায় যেন একটা তুলনামূলক বিচারের আভাস রয়েছে মনে হল। সেই বিচারে ও নিজে কোন জায়গায় দাঁড়াবে মনে মনে না ভেবে পারল না পিয়া–ওর কখনওই বিশেষ কোনও উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না, আর পড়াশোনা শেখার জন্যও কখনও নিজের চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করতে হয়নি। ও জানে, কানাইয়ের চোখে ও একটা নরম-সরম, বাপ-মার আদরে মানুষ হওয়া সাদামাটা ধরনের মেয়ে। তবে এই ভাবে ওকে বিচার করার জন্য কানাইকে দোষ দেয় না পিয়া; কানাইয়ের সম্পর্কেও তো ওর যেমন মনে হয় যে বিশেষ একটা ধাঁচের ভারতীয় ছেলেরা যে রকম হয় সেই রকম ধরনের মানুষ ও–দাম্ভিক, আত্মকেন্দ্রিক, জোর করে নিজের মতামত অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে আগ্রহী–তবু, এ সব কিছু সত্ত্বেও অপছন্দ করার মতো নয়।

    এবার একটা নিরাপদ দিকে কথা ঘোরাল পিয়া, “ওরা কি এই লুসিবাড়িরই লোক? ফকির আর ময়না?”

    “না,” কানাই বলল। “ওদের দুজনেরই বাড়ি ছিল অন্য একটা দ্বীপে, সাতজেলিয়ায়। এখান থেকে অনেকটা দূরে।”

    “তা হলে ওরা এখানে কেন থাকে?”

    “একটা কারণ হল ময়না এখানে নার্সিং-এর ট্রেনিং নিচ্ছে, আর একটা কারণ হচ্ছে ও ছেলেকে লেখাপড়া শেখাতে চায়। ফকির টুটুলকে নিয়ে মাছ ধরতে চলে গিয়েছিল বলেই তাই রেগে গেছে ময়না।”

    “দু’দিন ধরে আমিও যে ছিলাম ওই নৌকোতে সেটা ও জানে?”

    “জানে,” বলল কানাই। “সবই জানে–ফরেস্ট গার্ড টাকা নিয়ে নিয়েছিল, আপনি জলে পড়ে গিয়েছিলেন, আপনাকে বাঁচাতে ফকির ঝাঁপ দিয়েছিল–সব। কুমিরের ঘটনাটাও জানে দেখলাম–বাচ্চাটা সব বলেছে ওকে।”

    কানাই যে শুধু বাচ্চার কথাটাই উল্লেখ করছে সেটা লক্ষ করল পিয়া : তার মানে কি ফকির ময়নাকে বিশেষ কিছু বলেনি এই দু’দিনের ঘটনা সম্পর্কে, না কি ও অন্য রকম কিছু বিবরণ দিয়েছে? এই দুটো প্রশ্নের কোনওটারই উত্তর কানাইয়ের জানা আছে কিনা বুঝতে পারল না পিয়া, কিন্তু জিজ্ঞেসও করে উঠতে পারল না নিজে থেকে। তার বদলে বলল, “ময়না নিশ্চয়ই ভাবছে আমি কী করতে এসেছি এখানে?”

    “সে তো বটেই,” বলল কানাই। “আমাকে জিজ্ঞেসও করল। আমি বললাম যে আপনি একজন বৈজ্ঞানিক। খুব ইমপ্রেসড হল ও।”

    “কেন?”

    “বুঝতেই পারছেন, লেখাপড়া সংক্রান্ত যে-কোনও বিষয়েই ওর খুব আগ্রহ।”

    “ওকে বললেন নাকি যে আমরা কাল যাব ওদের বাড়িতে?”

    “বললাম,” কানাই জবাব দিল। “ওরা থাকবে বাড়িতে, অপেক্ষা করবে আমাদের জন্য।” কথা বলতে বলতে দোতলায় গেস্ট হাউসে উঠে এসেছে কানাই আর পিয়া। হাতের টিফিন ক্যারিয়ারটা টেবিলের ওপর রাখল কানাই। “নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে আপনার?” বাটিগুলো আলাদা করতে করতে জিজ্ঞেস করল ও। “সব সময় এত খাবার নিয়ে আসে ময়না–আমাদের দুজনের কুলিয়ে বেশি হয়ে যাবে। দেখি কী এনেছে–ভাত আছে, ডাল আছে, মাঝের ঝোল আছে, চচ্চড়ি আর বেগুন ভাজা। নিন, কী দিয়ে শুরু করবেন?”

    পাত্রগুলোর দিকে একটু সংশয়ের দৃষ্টিতে তাকাল পিয়া। বলল, “কিছু মনে করবেন না আশা করি, কিন্তু এগুলোর একটাও কিছু খাওয়ার সাহস নেই আমার। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আমাকে খুব সাবধানে থাকতে হয়।”

    “এমনি ভাত খান হলে একটু,” কানাই বলল। “সেটা তো খেতেই পারেন?” মাথা নাড়ল পিয়া। “হ্যাঁ, সেটা হয়তো খেতে পারি একটু–শুধু প্লেন, সাদা ভাত।”

    “এই নিন।” কয়েক হাতা ভাত পিয়ার প্লেটে তুলে দিল কানাই। একটা চামচও দিল। তারপর জামার হাতাটা গুটিয়ে, নিজের থালাতে খানিকটা ভাত নিয়ে খেতে শুরু করল হাত দিয়ে।

    খেতে খেতে লুসিবাড়ির বিষয়ে অনেক কথা বলল কানাই। ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের কথা বলল, কী করে এই দ্বীপে বসতি শুরু হল সে কথা বলল, নির্মল আর নীলিমা কীভাবে এখানে এসেছিল সেই গল্প করল। জায়গাটার বিষয়ে ও এত্ব কিছু জানে দেখে শেষে পিয়া জিজ্ঞেস করল, “আপনার কথা শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে যেন আপনি বহু দিন কাটিয়েছেন এখানে। কিন্তু সেটা তো ঠিক নয়, তাই না?”

    পিয়ার বক্তব্য সমর্থন করল কানাই, “একেবারেই না। আমি এর আগে একবার মাত্র এসেছিলাম এখানে। ছোটবেলায়। সত্যি কথা বলতে কী, এখনও এত স্পষ্ট সব কিছু মনে আছে দেখে আমি নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি। আরও বিশেষ করে, কারণ আমাকে তো আসলে শাস্তি দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল এখানে।”

    “কেন আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছেন?”

    কাধ ঝাঁকাল কানাই। “আমি আসলে যে ধরনের মানুষ তাতে আমার পক্ষে এটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। আমি অতীত আঁকড়ে পড়ে থাকি না। সব সময় সামনের দিকে তাকিয়ে চলতে পছন্দ করি।”

    “কিন্তু এখানে, এই লুসিবাড়িতে এখন তো আমরা অতীতে নেই, আমরা তো বর্তমানে আছি, তাই না?” হেসে বলল পিয়া।

    “মোটেও না,” জোর দিয়ে বলল কানাই। “আমার কাছে লুসিবাড়ি সবসময় অতীতেরই অংশ হয়ে থাকবে।”

    ভাত শেষ হয়ে গিয়েছিল পিয়ার, টেবিল থেকে উঠে থালা বাসনগুলো গুছোতে শুরু করল ও। তাই দেখে ব্যস্ত হয়ে উঠল কানাই।

    “আরে, বসে পড়ুন। আপনি আবার এগুলোতে কেন হাত দিচ্ছেন? ওসব ময়না করে নেবে এখন।”

    “আমি ময়নার থেকে কিছু খারাপ করব না,” পিয়া জবাব দিল।

    কানাই কাঁধ ঝাঁকাল। “বেশ।”

    নিজের প্লেটটা ধুতে ধুতে পিয়া বলল, “এই যে আপনি এখানে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করলেন, এত কিছু করলেন, কিন্তু আমার এদিকে মনে হচ্ছে আমি তো আপনার সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানি না বলতে গেলে। শুধু নামটা ছাড়া।”

    “তাই?” একটু অবাক হয়ে হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল কানাই। “কেমন করে ঘটল। এই আশ্চর্য ঘটনাটা বলুন তো? আমার খুব একটা বাক্ সংযম আছে বলে তো বাজারে কোনও দুর্নাম নেই।”

    “তা হলেও, কথাটা সত্যি। এমনকী আপনি কোথায় থাকেন সেটা পর্যন্ত আমি জানি না।”

    “এক্ষুনি সব সমস্যার সমাধান করে দিচ্ছি,” কানাই বলল। “আমি থাকি নতুন দিল্লিতে, আমার বয়স বিয়াল্লিশ এবং বেশিরভাগ সময়েই আমি সঙ্গিনীহীন।”

    “তাই বুঝি?” একটু কম ব্যক্তিগত দিকে কথা ঘোরাল পিয়া, “আর আপনি তো ট্রান্সলেটর, তাই না? এই একটা কথা বলেছিলেন মনে আছে আমার।”

    “একদম ঠিক। মৌখিক এবং লিখিত অনুবাদের কাজ করি আমি। যদিও এখন সেসব কিছুর চেয়ে ব্যবসাটাই বেশি করে করছি। বছর কয়েক আগে আমি খেয়াল করি যে দিল্লিতে পেশাদার ভাষাবিদের সংখ্যা খুব কম। তখন নিজেই একটা অফিস খুলে বসলাম। এখন আমার কোম্পানি সমস্ত রকম সংস্থার জন্য সব রকমের অনুবাদের কাজ করে–ব্যবসায়ীদের জন্য, বিভিন্ন দূতাবাসের জন্য, সংবাদমাধ্যমের জন্য, নানারকম সব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের জন্য–এক কথায়, যারাই পয়সা দেয় তাদেরই জন্য কাজ করি আমরা।”

    “এ কাজের চাহিদা কী রকম বাজারে?”

    “চাহিদা আছে, চাহিদা আছে,” মাথা নেড়ে বলল কানাই। “দিল্লি এখন হল পৃথিবীর ব্যস্ততম কনফারেন্স সিটিগুলির মধ্যে একটা। মিডিয়ারও প্রচুর কাজ। কিছু না কিছু একটা সব সময় লেগেই আছে। আমি তো কাজ করে কুলিয়ে উঠতে পারি না অনেক সময়। ব্যবসা সমানে বেড়েই যাচ্ছে। এই তো কয়েকদিন আগেই আমরা চালু করলাম একটা স্পিচ ট্রেনিং অপারেশন। কল সেন্টারে যারা কাজ করে তাদের ইংরেজি উচ্চারণ শেখানোর জন্য। সেই বিভাগের কাজ তো এখন দিনে দিনে বাড়ছে।”

    শুধু মাত্র ভাষার আদান প্রদানের ওপর নির্ভর করে যে একটা ব্যবসা দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায় এই ধারণাটাই খুব আশ্চর্য মনে হল পিয়ার। “তা হলে আপনি নিজেও নিশ্চয়ই

    অনেকগুলো ভাষা জানেন, তাই না?”

    “ছ’টা,” মুচকি হেসে সঙ্গে সঙ্গে বলল কানাই। “হিন্দি, উর্দু আর বাংলাটাই প্রধানত কাজে লাগে এখন। আর ইংরেজি তো আছেই। তা ছাড়াও আরও দুটো জানি, ফরাসি আর আরবি–সেগুলোও সময়ে অসময়ে কাজে লেগে যায়।”

    অদ্ভুত লাগল পিয়ার এই দুটো ভাষার কথা শুনে। “ফরাসি আর আরবি! এই ভাষাগুলো আবার কী করে শিখলেন?”

    “স্কলারশিপ,” একটু হেসে বলল কানাই। “বিভিন্ন সব ভাষার ব্যাপারে আমার সব সময়ই খুব আগ্রহ। ছাত্র অবস্থায় প্রায়ই ঢু মারতাম কলকাতার অলিয়স ফ্রঁসেতে। তারপর এটা ওটা নানা যোগাযোগে স্কলারশিপ পেয়ে গেলাম একটা। তারপর প্যারিসে যখন ছিলাম সেই সময় একটা সুযোগ এল টিউনিশিয়াতে গিয়ে আরবি শেখার। এরকম সুযোগ আর কে ছাড়ে? তারপর থেকে আর কখনও পেছনে তাকাতে হয়নি।”

    একটা হাত তুলে ডান কানের রুপোর দুলটা খুঁটতে লাগল পিয়া। ভঙ্গিটার আত্মবিস্মৃত ভাবটা ছেলেমানুষি, কিন্তু তারই মধ্যে যুবতীসুলভ একটা সুষমাও রয়েছে। “আপনি তা হলে ঠিকই করে নিয়েছিলেন যে এই অনুবাদের কাজটাকেই এক সময় পেশা করবেন?”

    “না না,” বলল কানাই। “একেবারেই না। আমি যখন আপনার বয়সি ছিলাম, কলকাতার আর পাঁচটা কলেজের ছাত্রর মতো তখন আমারও মাথার মধ্যে গজগজ করত কবিতার ভূত। পেশাদারি জীবনের শুরুতে আমার ইচ্ছে ছিল আমি জীবনানন্দ অনুবাদ করব আরবিতে আর অ্যাডোনিস অনুবাদ করব বাংলায়।”

    “তারপর কী হল?” নাটকীয় ভাবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল কানাই। “সংক্ষেপে বলতে গেলে, কিছুদিনের মধ্যেই আমি আবিষ্কার করলাম যে ভাষা হিসেবে যদিও বাংলা এবং আরবি দুটোরই সম্পদ অপরিমেয়, কিন্তু এই দুটোর কোনও ভাষাতেই শুধু সাহিত্যিক অনুবাদের কাজ করে পেট চালানো সম্ভব নয়। বড়লোক আরবদের বাংলা সাহিত্যের বিষয়ে কোনও আগ্রহই নেই, আর বড়লোক বাঙালিদের কীসে আগ্রহ আছে তাতে কিছুই যায় আসে না, কারণ সংখ্যায় তারা এত কম যে তাদের পক্ষে কিছু করে ওঠা সম্ভব নয়। একটা সময় এসে তাই আমি নিজেকে ভাগ্যের হাতে সঁপে দিলাম, আর এইসব ব্যবসায়িক কাজ শুরু করলাম। তবে এটা বলতেই হবে খুবই ভাল সময়ে শুরু করেছি আমি : অনেক কিছু হচ্ছে এখন এই দেশে, আর তার অংশ হতে পারাটা বেশ একটা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আমার মনে হয়।”

    পিয়ার মনে পড়ল বাবার কাছে শোনা ইন্ডিয়ার গল্প, যে দেশ ছেড়ে বাবা চলে গিয়েছিল আমেরিকায় : সে ছিল এমন এক দেশ যেখানে গাড়ি ছিল মাত্র দু’রকমের, আর যেখানে মধ্যবিত্ত জীবনকাঠামোর প্রধান ধর্ম ছিল বিদেশি যে-কোনও কিছুর প্রতি এক তীব্র আকর্ষণ। কিন্তু কানাই যে জগতে বাস করে এই লুসিবাড়ি বা ভাটির দেশের থেকে সে পৃথিবী যতটা দূরে, পিয়ার বাবার স্মৃতির ভারতের সঙ্গে তার দূরত্ব কোনও অংশে কম নয়।

    “আপনার কখনও আবার সাহিত্যিক অনুবাদের কাজে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে হয় না?” ও জিজ্ঞেস করল কানাইকে।

    “হয় কখনও কখনও। খুব বেশি হয় না। সব মিলিয়ে এটা স্বীকার করতেই হবে যে একটা গোটা অফিস চালাতে আমার বেশ ভালই লাগে। ভাবতে ভাল লাগে আমি লোকজনদের চাকরি দিচ্ছি, মাইনে দিচ্ছি, অর্থহীন ডিগ্রিওয়ালা ছাত্রছাত্রীদের কাজের সুযোগ করে দিচ্ছি। আর, পয়সা এবং স্বাচ্ছন্দ্যটাও যথেষ্ট উপভোগ করি আমি। সেটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। পয়সাওয়ালা একা লোকের পক্ষে দিল্লি বেশ ভাল জায়গা। অনেক ইন্টারেস্টিং মহিলার সঙ্গে যোগাযোগ হয়।”

    এই শেষ কথাটায় একেবারে আশ্চর্য হয়ে গেল পিয়া। এক মুহূর্ত ঠিক বুঝে উঠতে পারল

    কী বলবে। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে সদ্য বোয়া প্লেটগুলোকে গুছিয়ে রাখছিল ও। শেষ প্লেটটা রেখে একটা হাই তুলল, এক হাত তুলে আড়াল করল মুখটা।

    “সরি।”

    সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে কানাই বলল, “এত সব ঘটনার পরে নিশ্চয়ই খুব টায়ার্ড আপনি?”

    “ভীষণ। মনে হচ্ছে ঘুমোতে যেতে হবে এবার।”

    “এক্ষুনি?” জোর করে একটু হাসল কানাই, যদিও বোঝাই যাচ্ছিল বেশ একটু হতাশ হয়েছে ও। “অবশ্য ঠিকই তো, যা ধকলটা গেছে। আপনাকে বলেছি কি যে আর ঘণ্টাখানেক বাদে কিন্তু ইলেকট্রিক আলো বন্ধ হয়ে যাবে। হাতের কাছে মোমবাতি রাখবেন একটা।”

    “তার অনেক আগেই আমি ঘুমিয়ে পড়ব।”

    “গুড। আশা করি ভাল করে বিশ্রাম নিতে পারবেন রাত্তিরটা। আর যদি কিছু দরকার হয়, ওপরে গিয়ে দরজা ধাক্কাবেন। আমি মেসোর পড়ার ঘরে থাকব।”

  • ঝড়

    ঝড়

    ঝড়

    পরের সপ্তাহেই আবার মরিচঝাঁপি যাব ঠিক করেছিলাম, কিন্তু হেডমাস্টারের রিটায়ার করার সময় অনেক টুকিটাকি কাজ আর নিয়মমাফিক অনুষ্ঠান থাকে–সেই সবের মধ্যে আটকে গেলাম আমি। অবশেষে সব ঝামেলা মিটল, সরকারিভাবে শেষ হয়ে গেল আমার কর্মজীবন।

    কয়েকদিন পর আমার পড়ার ঘরে এসে কড়া নাড়ল হরেন। “সার!”

    “কুমিরমারির বাজারে গিয়েছিলাম,” ও বলল। “সেখানে কুসুমের সঙ্গে দেখা। ও কিছুতেই ছাড়বে না, বলল ওকে এখানে নিয়ে আসতে হবে।”

    “এখানে!” প্রায় চমকে উঠলাম আমি। “এই লুসিবাড়িতে? কেন?”

    “ও মাসিমার সঙ্গে দেখা করবে। মরিচঝাঁপির লোকেরা মাসিমার সাহায্য চায়।”

    সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম আমি। এটাও স্থানীয় সমর্থন জোগাড়ের জন্য উদ্বাস্তুদের চেষ্টার অঙ্গ। তবে এই ক্ষেত্রে ওদের চেষ্টায় কোনও ফল হবে বলে মনে হল না আমার।

    “হরেন, তুমি কুসুমকে বারণ করতে পারতে,” বললাম আমি। “নীলিমার সঙ্গে দেখা করে ওদের কোনও লাভ হবে না।”

    “বলেছিলাম সার। কিন্তু ও কিছুতেই ছাড়বে না।”

    “ও কোথায় এখন?”

    “নীচে সার। মাসিমার জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু আপনার কাছে কাকে নিয়ে এসেছি দেখুন।” একপাশে সরে দাঁড়াল হরেন, আর আমি দেখলাম এতক্ষণ ধরে ওর আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়িয়েছিল ফকির।

    “আমাকে একবার বাজারে যেতে হবে। ওকে তাই আপনার কাছে রেখে গেলাম।” পাঁচ বছরের ছেলেটাকে আমার কাছে বসিয়ে রেখে একদৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে গেল ও।

    এতদিন মাস্টারি করতে করতে একাধিক বাচ্চার সঙ্গে কীরকম ব্যবহার করতে হয় সেটাই জেনেছি, কিন্তু নিজের কোনও সন্তান না থাকায়, শুধুমাত্র একজন শিশুর সাথে কথা বলার অভ্যাস আমার ছিল না। এখন একজোড়া পাঁচ বছর বয়সি খোলা চোখের নজরের সামনে বসে আমি যা যা বলব ভেবে রেখেছিলাম সবই ভুলে গেলাম।

    প্রায় আতঙ্কে ছেলেটাকে নিয়ে ছাদের ধারে গেলাম আমি। সামনে রায়মঙ্গলের মোহনার দিকে দেখিয়ে বললাম, “দেখো কমরেড, সামনে চোখ মেলে তাকাও, বলো আমাকে কী দেখতে পাচ্ছ।”

    মনে হল আমি কী জানতে চাইছি সেটা নিজেকেই ও মনে মনে জিজ্ঞেস করছিল। খানিক এদিক ওদিক তাকিয়ে অবশেষে বলল, “বাঁধ দেখতে পাচ্ছি সার।”

    “বাঁধ দেখতে পাচ্ছ? তা তো বটেই, বাঁধই তো দেখা যাচ্ছে।”

    এই উত্তর আমি আদৌ আশা করিনি, কিন্তু খুবই স্বস্তি পেলাম মনে মনে জবাবটা পেয়ে। কারণ এই ভাটির দেশে বাঁধ শুধু যে মানুষের প্রাণরক্ষা করে তা তো নয়, বাঁধই তো আমাদের ইতিহাসের ভাড়ারঘর, অঙ্কের আকর, গল্পের খনি। এই বাঁধ যতক্ষণ আমার চোখের সামনে আছে, আমি জানি আমার কথা বলার বিষয়ের কোনও অভাব হবে না।

    “ঠিক আছে কমরেড, চালিয়ে যাও। আবার দেখো, খুব ভাল করে দেখো। দেখি তো খুঁজে বের করতে পারো কিনা কোন কোন জায়গায় বাঁধটা সারাই করা হয়েছে। প্রত্যেকটা জায়গার জন্য আমি একটা করে গল্প বলব তোমাকে।”

    হাত তুলে একটা জায়গার দিকে ইশারা করল ফকির। “ওইখানটায় কী হয়েছিল সার?”

    “আচ্ছা, ওইখানটায়। কুড়ি বছর আগে ওই জায়গায় বাঁধটা ভেঙেছিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, ঝড়েও ভাঙেনি, কন্যাতেও ভাঙেনি। একটা লোক গিয়ে ওখানে বাঁধটা কেটে দিয়েছিল। কেন জানো? এক পড়শির সঙ্গে ওর ঝগড়া হয়েছিল, সেইজন্য। রাতের অন্ধকারে চুপিচুপি গিয়ে বাঁধের ওই জায়গাটায় ও একটা গর্ত করে রেখে এল। ভাবল ওখান দিয়ে নোনা জল ঢুকে পড়শির খেতটা ডুবিয়ে দেবে। কিন্তু এটা ওর মাথায় আসেনি যে বাঁধ কেটে ও নিজেরও একই ক্ষতি করছে। তাই ওদের দু’জনের কেউই আর এখন এখানে থাকে না কারণ নোনা জল ঢোকার পর দশ বছর পর্যন্ত আর কিছু চাষ করা যায়নি ওই জায়গার জমিতে।”

    “আর ওখানটায় সার? ওখানে কী হয়েছিল?”

    “ওই জায়গার গল্পটা শুরু হয়েছিল একবার জোয়ারের সময়। কোটাল গোনে জল খুব বেড়ে গিয়েছিল সেবার, তারপরে ওখান দিয়ে উপছে এসে ঢুকেছিল গাঁয়ে। তখন বাঁধ সারাইয়ের ঠিকাদারি যাকে দেওয়া হল সে ছিল তখনকার গ্রামপ্রধানের শালা। সে তো বলল এমন করে সারিয়ে দেবে যে জীবনে আর জল ঢুকবে না ওখান দিয়ে। কিন্তু পরে দেখা গেল ও জায়গায় যত মাটি ফেলার পয়সা তাকে দেওয়া হয়েছিল তার মাত্র অর্ধেক পয়সার মাটি ফেলেছে। বাকি পয়সাটা অন্যসব শালাদের সঙ্গে ভাগ করে খেয়ে ফেলেছে।”

    “আর ওই জায়গাটায় সার?”

    ভাল গল্প বলিয়েদেরও মাঝে মাঝে থামতে জানতে হয়। জানতে হয় কখনও কখনও বিচক্ষণতার দাম সাহসের চেয়ে অনেক বেশি। “ওই জায়গাটার বিষয়ে কমরেড খুব বেশি কিছু আমি তোমাকে বলতে পারব না। ওখানে যারা থাকে তাদের দেখতে পাচ্ছ, ওই যে বাঁধের ধার ঘেঁষে পরপর ঘরগুলোতে? এখন ব্যাপার হল গিয়ে একবার ওই লোকগুলো একটা ভুল দলকে ভোট দিয়ে ফেলেছিল। ফলে অন্য আরেক পার্টি যখন ক্ষমতায় এল, তারা ঠিক করল শোধ নিতে হবে। সেই শোধ নেওয়ার জন্য ওরা কী করল? না, ওই জায়গায় বাঁধের গায়ে একটা গর্ত করে রেখে দিল। রাজনীতি যারা করে তারা এইরকমই হয়, তবে এই নিয়ে আর বেশি কথা না বলাই ভাল–এই বিষয়টা আমাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে খুব একটা ভাল নাও হতে পারে। তার চেয়ে বরং ওই জায়গাটা দেখো, ওই যে, আমি আঙুল দিয়ে য়ে জায়গাটা দেখাচ্ছি, ওইখানটা।”

    যে জায়গাটার দিকে আমি ইশারা করলাম তিরিশের দশকের এক ঝড়ে সেখানে প্রায় কিলোমিটারখানেক বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে গিয়েছিল।

    “একবার কল্পনা করো ফকির, কী কঠিন জীবন ছিল তোমার পূর্বপুরুষদের,” বললাম আমি। “ওরা তখন মাত্রই এসেছে এই ভাটির দেশে, নতুন এসে বসত করেছে এই দ্বীপে। বছরের পর বছর ধরে নদীর সাথে লড়াই করে আস্তে আস্তে এই বাঁধের ভিতটা সবে বানিয়েছে। বহু পরিশ্রমে কয়েক মুঠো ধান আর আলুপটলও ফলাতে পেরেছে। বছরের পর বছর খুঁটির ওপর বাসা বানিয়ে থাকার পর অবশেষে নেমে আসতে পেরেছে মাটিতে। সমান জমিতে কয়েকটা বস্তি ঝুপড়ি বানাতে পেরেছে। এই সবকিছুই কিন্তু ওই বাঁধের কল্যাণে। এবার কল্পনা করো সেই ভয়াবহ রাতের কথা। ঝড় যখন এল তখন সবে কোটাল লেগেছে; ভাবো একবার, সেই চাল-উড়ে যাওয়া ঘরে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে বসে ওরা দেখছে জল বাড়ছে, বাড়ছে… এত বছরের পরিশ্রমে নদীকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য যে বালি আর মাটি জড়ো করেছিল ওরা, চোখের সামনে তার ওপর এসে আছড়ে আছড়ে পড়ছে ঢেউ। ভাবো একবার, কীরকম লাগছিল ওরা যখন দেখল মাটি গলিয়ে হু হু করে ঢুকে আসছে জোয়ারের জল, তাড়া করে আসছে পেছন পেছন, পালিয়ে বাঁচার কোনও উপায়ই নেই। আমি তোমাকে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি দোস্ত, সেদিন এই নদীর সামনে দাঁড়িয়ে ওই দৃশ্য দেখার চেয়ে বাঘের মুখে গিয়ে দাঁড়াতে বললেও রাজি হয়ে যেত ওদের যে কেউ।”

    “আরও ঝড় হয়েছিল সার?”

    “আরও অনেকবার ঝড় এসেছে ফকির, অনেকবার। দেখো ওই জায়গাটার দিকে তাকিয়ে দেখো,” নদীর পাড়ে দ্বীপের একটা জায়গার দিকে দেখালাম আমি। দেখে মনে হয় যেন বিশাল কোনও দানব কোনওদিন লুসিবাড়ির নদীতীরের ওই জায়গা থেকে একটা টুকরো কামড়ে ছিঁড়ে নিয়েছে। “দেখো। ১৯৭০ সালের ঝড়ে এই কাণ্ড হয়েছিল। বিশাল ভাঙন ধরেছিল–দ্বীপের চার একর জমি ওখান থেকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল নদী। মুহূর্তের মধ্যে মাঠ ঘাট গাছপালা বাড়িঘর সবসুদ্ধ চলে গেল জলের তলায়।”

    “সবচেয়ে বড় ঝড় ছিল ওটা?”

    “না কমরেড, না। সবচেয়ে বড় ঝড় যেটাকে বলা হয়, সে হয়েছিল আমারও জন্মের আগে। এখানে লোকজন এসে বসত শুরু করারও অনেক আগে।”

    “কবে সার?”

    “সে ঝড় হয়েছিল ১৭৩৭ সালে। তার তিরিশ বছর আগে ঔরঙ্গজেব বাদশা মারা গেছেন, সারা দেশ জুড়ে নানা গোলমাল। কলকাতা শহরের সবে জন্ম হয়েছে। গোলমালের সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা এসে আস্তে আস্তে উঁকিয়ে বসছে। এই গোটা পুবদেশে তখন কলকাতা তাদের প্রধান বন্দর।”

    “তারপর কী হল সার?”

    “সে ঝড় হয়েছিল অক্টোবর মাসে। ওই সময়টাতেই বেশি ঝড় হয়–অক্টোবর আর নভেম্বর। সে ঝড়ের ঘা এসে লাগার আগেই বিশাল এক ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল এই ভাটির দেশে। বারো মিটার উঁচু সেই জলের দেওয়াল এসে ভেঙে পড়ল এখানে। কত বড় ঢেউ বুঝতে পারছ? ওইরকম একটা ঢেউ যদি এখন আসে, তা হলে তোমার দ্বীপ তো বটেই, আমাদের এই দ্বীপেও সবকিছু জলের তলায় চলে যাবে। এই ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও ডুবে যাব আমরা।”

    “না।”

    “হ্যাঁ, কমরেড, হ্যাঁ। কলকাতার কিছু ইংরেজ তখন এইসব মাপজোক করে সমস্ত লিখে রেখে দিয়েছিল। এতদূর পর্যন্ত জল উঠেছিল যে হাজার হাজার জন্তু জানোয়ার মারা পড়েছিল তাতে। সেই মরা জানোয়ারগুলো জলের টানে নদীর উজান বরাবর বহু দূর পর্যন্ত ভেসে গিয়েছিল। অনেক জায়গায় ডাঙার ভেতরে পর্যন্ত চলে গিয়েছিল সেইসব জীবজন্তুর লাশ। এমনকী নদী থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ধানজমিতে, গ্রামের পুকুরের মধ্যে মরা বাঘ আর গণ্ডারের দেহ পাওয়া গিয়েছিল সেই ঝড়ের পরে। মাঠের পর মাঠ ছেয়ে গিয়েছিল মরা পাখির পালকে। আর সেই ঢেউ যখন এই ভাটির দেশের ওপর দিয়ে কলকাতার দিকে ধেয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় আরও একটা ঘটনা ঘটল–এক অকল্পনীয় ঘটনা।”

    “কী ঘটল সার? কী ঘটল?”

    “বিরাট এক ভুমিকম্প হল কলকাতায়।”

    “সত্যি সত্যি?”

    “সত্যি, দোস্ত। একেবারে খাঁটি সত্যি। সেই জন্যেই আরও এই ঝড়ের কথা মনে আছে লোকের। কোনও কোনও বৈজ্ঞানিকের ধারণা যে ঝড় আর ভূমিকম্পের মধ্যে কোনও একটা রহস্যজনক সম্পর্ক আছে। কিন্তু এই প্রথম দুটোই একসঙ্গে ঘটতে দেখা গেল।”

    “তারপরে কী হল সার?”

    “মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার বাড়ি ধসে পড়ল কলকাতায়। ইংরেজদের প্রাসাদ থেকে শুরু করে এমনি সাধারণ বাড়ি, কুঁড়েঘর, কিছুই রেহাই পেল না। ইংরেজদের যে গির্জা ছিল, তার চুড়োটা টুকরো টুকরো হয়ে এসে পড়ল মাটিতে। লোকে বলে শহরের একটা বাড়িরও নাকি চারটে গোটা দেওয়াল অক্ষত ছিল না। সেতু-টেতু সব উড়ে চলে গেল, জাহাজঘাটাগুলো জলের তোড়ে কোথায় ভেসে গেল, গুদামের ধানচাল কিচ্ছু বাকি রইল না, বারুদখানার বারুদও হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। দেশ-বিদেশের ছোটবড় জাহাজ সব নোঙর করা ছিল তখন নদীতে। তার মধ্যে ইংরেজদেরও দুটো জাহাজ ছিল–পাঁচশো টনের জাহাজ একেকটা। সেই জাহাজগুলোকে জল থেকে তুলে উড়িয়ে নিয়ে গেল ঝড়ে, গাছপালা ঘরবাড়ির ওপর দিয়ে উড়ে নদী থেকে আধ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পড়ল সেগুলো। বিশাল বিশাল সব বজরা কাগজের ঘুড়ির মতো লাট খেতে খেতে উড়ে গেল। শোনা যায় সবসুদ্ধ কুড়ি হাজার জাহাজ, নৌকো, বজরা আর ডিঙি নষ্ট হয়েছিল ওই একদিনে। যেগুলো টিকে ছিল, সেগুলি নিয়েও অদ্ভুত সব ঘটনার কথা শোনা যেতে লাগল।”

    “কীরকম ঘটনা সার?”

    “একটা ফরাসি জাহাজ ঝড়ের তোড়ে পাড়ের ওপর অনেকটা দূর পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। কিন্তু জাহাজের মালপত্র সব নষ্ট হয়নি। ঝড়ের পরদিন, জাহাজের নাবিকদের মধ্যে যে ক’জন বেঁচেছিল তারা মাঠের মধ্যে দেখতে গেল–ওই ধ্বংসাবশেষ থেকে যদি কিছু উদ্ধার করা যায়। একজন মাল্লাকে পাঠানো হল জাহাজের খোলের ভেতর কী কী অক্ষত আছে গিয়ে দেখে আসতে। তারপর বেশ খানিকক্ষণ কেটে গেল, কিন্তু লোকটা আর বেরোয় না। বাইরে যারা ছিল, তারা চেঁচিয়ে ডাকাডাকি করতে লাগল, কিন্তু কোনও সাড়া নেই। তখন আরেকজন লোককে পাঠানো হল। খোলের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পর তার কাছ থেকেও কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। তারপর আরও একটা লোক গেল, কিন্তু সেই একই ব্যাপার। বাইরে যারা ছিল তারা তখন খুব ভয় পেয়ে গেল। কেউ আর খোলের মধ্যে ঢুকতে রাজি হয় না। শেষে একটা আগুন জ্বালানো হল–অন্ধকার খোলের ভিতরে কী ব্যাপারটা হচ্ছে সেটা দেখার জন্য। আগুন যখন দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করল, সেই আলোয় দেখা গেল খোলের ভেতরটা জলে টইটম্বুর, আর তার মধ্যে সাঁতরে বেড়াচ্ছে এক প্রকাণ্ড কুমির। ওই তিনটে লোককে সেটাই মেরে ফেলেছে।

    “এটা কিন্তু বানানো গল্প নয় কমরেড, এক্কেবারে খাঁটি সত্যি ঘটনা। এই সমস্ত বিবরণ লেখা নথিপত্র যত্ন করে রাখা আছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে, যেখানে বসে দাস ক্যাপিটাল লিখেছিলেন মার্ক্স সাহেব।”

    “ওরকম ঝড় তো আর হবে না, তাই না সার?”

    বুঝতে পারলাম আমাদের এইসব নদীর খিদে কতটা হতে পারে সেটা আঁচ করার চেষ্টা করছে ফকির। ওর ছোট্ট মনটাকে শান্তি দিতে পারলে খুশি হতাম, কিন্তু সেরকম ছলনা করতে মন চাইল না। “সে কথা বলা যায় না বন্ধু। সত্যি কথা বলতে কী, ওরকম আবার ঘটবে। ঘটবেই। প্রচণ্ড ঝড় আসবে, ফুঁসে উঠবে নদী, ভাসিয়ে নিয়ে যাবে বাঁধ। এ শুধু সময়ের অপেক্ষা।”

    “কী করে জানলেন সার?” মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল ফকির।

    “দেখো দোস্ত, সামনের দিকে চেয়ে দেখো। দেখো কত দুর্বল, পলকা আমাদের এই বাঁধ। এবার তার ওপারে জলের দিকে দেখো–দেখো কী বিপুল তার বিস্তার, কেমন ধীর শান্তভাবে বয়ে চলেছে। শুধু তাকিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবে, আজ হোক কি কাল হোক, এই লড়াইয়ে নদীরই জয় হবে একদিন। কিন্তু শুধু চোখে দেখে যদি বিশ্বাস না হয়, তা হলে তোমাকে ভরসা করতে হবে তোমার কানের ওপর।”

    “আমার কান?”

    “হ্যাঁ। এসো আমার সঙ্গে।”

    সিঁড়ি দিয়ে নেমে মাঠের ওপারে চললাম আমরা। লোকজন নিশ্চয়ই টেরিয়ে টেরিয়ে দেখছিল আমাদের দিকে এক লতপতে ধুতি পরে আমি চলেছি, রোদ আটকানোর জন্য ছাতা খুলে ধরেছি মাথায়, আর ছোট্ট ফকির ছেঁড়া হাফপ্যান্ট পরে আমার পায়ে পায়ে দৌড়ে চলেছে। সোজা বাঁধের কাছে গিয়ে আমার বাঁ কানটা মাটিতে চেপে ধরলাম আমি। “বাঁধের ওপর কান পাতো, তারপর মন দিয়ে শোনো। দেখি বুঝতে পারো কি না কী হচ্ছে।”

    খানিক পরে ফকির বলল, “একটা আঁচড় কাটার শব্দ শুনতে পাচ্ছি সার। খুব আস্তে আস্তে হচ্ছে শব্দটা।”

    “কিন্তু কীসের ওই শব্দটা?”

    আরও খানিকক্ষণ কান পেতে শুনল ফকির। তারপর একটা হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ওর মুখ। “কাঁকড়া, তাই না সার?”

    “ঠিক ধরেছ ফকির। সবাই শুনতে পায় না ওই আওয়াজ, কিন্তু তুমি পেলে। অগুন্তি কাঁকড়া দিনরাত কুরে কুরে গর্ত করে চলেছে আমাদের এই বাঁধের ভেতর। এখন ভাবো এইসব কাঁকড়া আর জোয়ার, বাতাস আর ঝড়ের রাক্ষুসে খিদের সঙ্গে কতদিন পাল্লা দিতে পারবে আমাদের এই ঠুনকো মাটির বাঁধ? আর যখন এই বাঁধ ভেঙে যাবে তখন কার কাছে গিয়ে দাঁড়াব আমরা, কমরেড?”

    “কার কাছে, সার?”

    “কার কাছে? দেবদূতরাও না, মানুষও না, কেউই আমাদের ডাক শুনতে পাবে না সেদিন। আর জন্তু জানোয়ারদের কথা যদি বলো, তারাও শুনবে না আমাদের কথা।”

    “কেন শুনবে না সার?”

    “কারণটা কবি লিখে গেছেন, ফকির। কারণ ওই পশুরাও

    ‘জেনে গেছে, এই

    ব্যাখ্যাত জগতে নেই আমাদের স্বাচ্ছন্দ্য বা

    স্থিতিবোধ।”

  • আলোচনা

    আলোচনা

    আলোচনা

    লুসিবাড়ি হাসপাতালের ট্রেনি নার্সদের জন্যও স্টাফ কোয়ার্টার্সের ব্যবস্থা আছে। ময়না সেখানেই থাকে। বাঁধের পাশেই একটা টানা লম্বা ব্যারাকের মতো বাড়িতে পরপর সব কোয়ার্টার্স। ট্রাস্টের সীমানার একপ্রান্তে মিনিট পাঁচেক লাগে গেস্ট হাউস থেকে হেঁটে যেতে।

    বাড়িটার একেবারে শেষে ময়নার কোয়ার্টার্স। একটা বড় ঘর আর এক টুকরো উঠোন। দরজায় দাঁড়িয়ে কানাই আর পিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল ময়না। সামনে যেতে হেসে নমস্কার করল হাতজোড় করে। তারপর উঠোনটার মধ্যে নিয়ে গেল ওদের। কয়েকটা ফোল্ডিং চেয়ার রাখা সেখানে ওদের জন্য।

    একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসতে বসতে চারিদিকে একবার তাকাল পিয়া। “টুটুল কোথায়?”

    “স্কুলে,” ময়নার কাছ থেকে জেনে নিয়ে বলল কানাই।

    “আর ফকির?”

    “ওই যে, ওখানে।”

    মাথা ঘুরিয়ে পিয়া দেখল ঘরের দরজার সামনেটায় উবু হয়ে বসে আছে ফকির। একটা তেলচিটে নীল পর্দায় আড়াল পড়ে গেছে খানিকটা। একবার মুখ তুলে তাকালও না ও। এমনকী চিনতে যে পেরেছে সেরকমও মনে হল না ওর হাবভাব দেখে। মাটির দিকে তাকিয়ে বসে বসে একটা কাঠি দিয়ে নকশা আঁকতেই লাগল। পরনে সেই একটা টি-শার্ট আর লুঙ্গি; কিন্তু ডিঙিতে দেখে যেটা মনে হয়নি, এখানে ওরই নিজের বাড়ির এই পরিবেশের মধ্যে সেগুলিকে কেমন রং-জ্বলা হতদরিদ্র চেহারার মনে হল পিয়ার। এমন একটা এড়িয়ে-যাওয়া গোমড়ানো ভাব নিয়ে বসেছিল ফকির যে মনে হল প্রচণ্ড চাপে পড়ে (ময়নার না প্রতিবেশীদের?) আজকে এখানে উপস্থিত থাকতে রাজি হয়েছে ও।

    ফকিরের এই পরাজিত ভীত চেহারাটা বুকে শেলের মতো বিধল পিয়ার। যে লোকটা ওর প্রাণ বাঁচানোর জন্য এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল তার আবার কীসের ভয়? পিয়ার ইচ্ছে করছিল ফকিরের সামনে গিয়ে সোজা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে সহজ স্বাভাবিকভাবে কথা বলে ওর সঙ্গে। কিন্তু ওর ভঙ্গি দেখে মনে হল এখানে, ময়না আর কানাইয়ের উপস্থিতিতে, সেটা করলে ওর অস্বস্তি বাড়বে বই কমবে না।

    কানাইও দেখছিল ফকিরকে। একান্তে ফিসফিস করে পিয়াকে বলল, “আমি ভেবেছিলাম শুধু টিয়াপাখিই ওইভাবে বসতে পারে।”

    তখন পিয়া নজর করল, ও যেরকম ভেবেছিল সেরকম মেঝের ওপর বসে নেই ফকির, দরজার চৌকাঠটার ওপর উবু হয়ে বসে আছে ও, আর পাখি যেমন দাড়ের ওপর বসে, সেইভাবে পায়ের আঙুল দিয়ে আঁকড়ে রেখেছে কাঠটাকে।

    ওদের কথাবার্তায় ফকিরের বিন্দুমাত্রও আগ্রহ নেই দেখে অবশেষে পিয়া ঠিক করল ওর বউয়ের সঙ্গেই কথা বলবে ও। কানাইকে জিজ্ঞেস করল, “আমার জন্য একটু দোভাষীর কাজ করে দেবেন প্লিজ?”

    কানাইয়ের মাধ্যমেই পিয়া ময়নাকে তার কৃতজ্ঞতা জানাল, তারপর বলল ফকির ওর জন্য যা করেছে তার জন্য ফকিরের পরিবারকে ও সামান্য কিছু উপহার দিতে চায়।

    আগে থেকেই একতোড়া নোট গুছিয়ে নিয়ে এসেছিল পিয়া। বেল্টে বাঁধা ব্যাগ থেকে সেটা বের করতে করতে দেখল কানাই একটু পেছনে হেলে জায়গা করে দিচ্ছে, যাতে পাশের চেয়ার পর্যন্ত হাত বাড়িয়ে টাকাটা দিতে পারে পিয়া। ময়নাও একটা প্রত্যাশার হাসি মুখে নিয়ে একটু এগিয়ে বসেছে। বোঝাই যাচ্ছে ওরা দুজনেই আশা করে আছে পিয়া টাকাটা ময়নাকেই দেবে, ফকিরকে নয়। এক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত পিয়াও সেরকমই ঠিক করেছিল, কিন্তু এখন টাকাটা হাতে নিয়ে ওর বিচারবুদ্ধি বিদ্রোহ করে উঠল–ওকে তো নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে জল থেকে টেনে তুলেছিল ফকির, কাজেই এই টাকা ফকিরের হাতে দেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত হবে। ফকির ওর জন্য যা কিছু করেছে তার পরে পিয়া ওর সঙ্গে এমন ব্যবহার করতে পারে না যাতে মনে হয় ফকিরের কোনও অস্তিত্বই নেই। টাকাটা নিয়ে ও বউকে দেবে কি বাড়ির জন্য খরচ করবে সেটা একান্তই ওর ব্যাপার–ওর হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনও অধিকার তো পিয়ার নেই।

    চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল পিয়া, কিন্তু ময়নাও চট করে উঠে এসে ওর সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল হাত পেতে। এইভাবে বাধা পাওয়ার পর তো পিয়ার আর কিছু করার থাকে না সেই অবস্থায় ওর পক্ষে যতটা সম্ভব শোভনভাবে ময়নার হাতেই টাকাটা তুলে দিল পিয়া।

    “ময়না বলছে ওর স্বামীর তরফ থেকে এই উপহার নিয়ে ও খুব খুশি হয়েছে।”

    পিয়া লক্ষ করল এই পুরো সময়টাই ফকির কিন্তু সেই একভাবে বসে রইল, একটুও নড়ল না–যেন এইভাবে অদৃশ্য মানুষের মতো থাকতেই ও অভ্যস্ত।

    চেয়ারে ফিরে যেতে যেতে পিয়া শুনল ফকির কিছু একটা বলল, আর সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল ময়না।

    “কী বলল ফকির?” ফিসফিস করে পিয়া জিজ্ঞেস করল কানাইকে।

    “ও বলল এইরকম কিছুর জন্য টাকা নেওয়াটা ভাল দেখায় না।”

    “আর ময়না কী জবাব দিল?”

    “ময়না বলল, তা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই–ঘরে খাবার কিছু নেই, একটা পয়সাও নেই। শুধু কয়েকটা কাঁকড়া ছাড়া আর কিছু নেই।”

    পিয়া কানাইয়ের মুখোমুখি ঘুরে বসে বলল, “দেখুন, ওদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারে আমি নাক গলাতে চাই না, কিন্তু ব্যাপারটা শুধু আমার আর ময়নার মধ্যে থাকুক সেটাও চাই না আমি। ফকির কিছু বলে কিনা একটু দেখুন না। ওর সঙ্গেই কথা বলার দরকার আমার।”

    “দেখি কী করতে পারি,” বলল কানাই। চেয়ার ছেড়ে উঠে ও ফকিরের সামনে গেল। তারপর খানিকটা বন্ধুত্বের সুরে সহৃদয় গলায় একটু জোরে বলল, “হ্যাঁ গো ফকির, আমাকে চেনো তুমি? আমি মাসিমার ভাগনে, কানাই দত্ত।”

    কোনও জবাব দিল না ফকির। কানাই আবার বলল, “আমি তোমার মাকে চিনতাম, তুমি জানো?”

    এই কথায় ঘাড় তুলে তাকাল ফকির। আর এই প্রথম সামনাসামনি ফকিরের মুখটা দেখে অবাক হয়ে গেল কানাই। কী আশ্চর্য মিল কুসুমের চেহারার সঙ্গে চোয়ালের গড়ন, একটু ভেতরে ঢোকা ঘোলাটে চোখ, এমনকী চুলের ধরনটা আর ভাবভঙ্গিও পুরো ওর মা-র মতো। কিন্তু কথাবার্তা বলার কোনও উৎসাহ ওর মধ্যে দেখা গেল না। এক মুহূর্ত কানাইয়ের চোখাচোখি তাকিয়ে আবার মুখ ঘুরিয়ে নিল ও, কোনও জবাব দিল না প্রশ্নের। কানাই কটমট করে ওর দিকে একটু চেয়ে থেকে আস্তে আস্তে আবার নিজের জায়গায় ফিরে এল।

    “কী হল?” জিজ্ঞেস করল পিয়া।

    “চেষ্টা করছিলাম, যদি কথা বলানো যায়। বললাম আমি ওর মাকে চিনতাম।”

    “ওর মাকে? আপনি চিনতেন?”

    “চিনতাম,” বলল কানাই। “মারা গেছে ও। যখন ছেলেবেলায় এখানে এসেছিলাম তখন ওর মা-র সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার।”

    “সেটা বললেন ওকে?”

    “চেষ্টা করলাম,” একটু হাসল কানাই। “কিন্তু আমাকে কোনও পাত্তাই দিল না ও।”

    মাথা নাড়ল পিয়া। ওদের দুজনের মধ্যে কথা কী হয়েছে সেটা ও বুঝতে পারেনি, কিন্তু ফকিরের সঙ্গে কথা বলার সময় কানাইয়ের গলার দাক্ষিণ্যের সুরটুকু পিয়ার কান এড়ায়নি। এমন সুরে কথা বলছিল ও, যেন কোনও হাবাগবা চাকর বাকরের সঙ্গে কথা বলছে–খানিকটা মশকরার সঙ্গে একটু কর্তৃত্ব মেশানো একটা অদ্ভুত সুর। ফকির যে চুপ করেছিল তাতে একটুও অবাক হয়নি পিয়া–ওটাই ওর স্বাভাবিক আত্মরক্ষার কৌশল।

    “যাক, ওকে আর ঘটানোর দরকার নেই, আমরা বরং এবার উঠি,” পিয়া বলল।

    “আমি তো রেডি।”

    “একটা কথা ওকে একটু বলে দিন তা হলে।”

    পিয়া বলতে শুরু করল, আর ফকিরকে সেটা বাংলায় বলে দিতে লাগল কানাই। ভাল করে বুঝিয়ে পিয়া বলল ওই গর্জনতলার দহে যেরকম শুশুক আসে সেইরকম শুশুক নিয়ে ও গবেষণা করছে। গত দু’দিনে ও বুঝতে পেরেছে–আর ফকির সেটা আগে থেকেই জানে–যে দিনের বেলা জল যখন বাড়তে থাকে তখন শুশুকগুলো খাবারের খোঁজে দহটা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু কোন পথ দিয়ে কীভাবে ওরা চলাফেরা করে সেটা দেখতে আর বুঝতে চায় পিয়া। আর তার জন্য, ওর মনে হয়েছে, সবচেয়ে ভাল উপায় হল ফকিরকে নিয়ে আরেকবার ওই গর্জনতলায় ফিরে যাওয়া। এবার একটা বড় নৌকো নিয়ে যাবে ওরা, সম্ভব হলে একটা মোটরবোট; তারপর ওই দহটার কাছে গিয়ে নোঙর ফেলে শুশুকদের এই দৈনিক চলাচল লক্ষ করবে পিয়া। আর সে কাজে ফকির ওকে সাহায্য করবে। এই পুরো কাজটায় দিন কয়েক লাগবে–সব মিলিয়ে চার কি পাঁচদিন, কী দেখা যায় না যায় তার ওপরে নির্ভর করবে কদিন থাকতে হয়। খরচখরচা সব পিয়াই দেবে–নৌকোর ভাড়া, খাবার-দাবারের খরচ-টরচ সব–তা ছাড়াও এর জন্য একটা থোক টাকা পাবে ফকির, আর দিন প্রতি আরও কিছু টাকা দেবে পিয়া। আর সব যদি ভালয় ভালয় মেটে তা হলে একটা বোনাসও দেবে। সব মিলিয়ে মোটমাট তিনশো আমেরিকান ডলারের মতো রোজগার করতে পারবে ফকির।

    পিয়া যেমন যেমন বলছিল সঙ্গে সঙ্গে অনুবাদ করে যাচ্ছিল কানাই। শেষ কথাটা শুনে  একটা হেঁচকি তোলার মতো আওয়াজ করে দু’হাতে মুখ ঢাকা দিল ময়না।

    “টাকাটা কম বললাম?” একটু ব্যস্ত হয়ে পিয়া জিজ্ঞেস করল কানাইকে।

    “কম বললেন? দেখলেন না ময়না কীরকম খুশি হয়েছে? ওদের পক্ষে একটা লটারি পাওয়ার মতো ব্যাপার এটা। আর টাকাটা সত্যি সত্যিই প্রয়োজন ওদের।”

    “আর ফকির কী বলছে? ও কি একটা লঞ্চ-টঞ্চের ব্যবস্থা করতে পারবে?”

    একটু চুপ করে শুনল কানাই। “ও বলছে, হ্যাঁ, এ কাজটা ও করবে। এক্ষুনি ও বেরিয়ে যাবে সব ব্যবস্থা করতে। তবে কোনও মোটরবোট এখানে নেই, ভটভটি দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে হবে আপনাকে।”

    “সেটা কী জিনিস?”

    “ডিজেলে চালানো নৌকোকে এখানে ভটভটি বলে,” কানাই বলল। “ইঞ্জিনের ভটভট আওয়াজের জন্য ওগুলোর এরকম নাম দেওয়া হয়েছে।”

    “কীরকম নৌকো তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু একটা নৌকো জোগাড় করতে পারবে তো ও?” জিজ্ঞেস করল পিয়া।

    “হ্যাঁ। কাল সকালেই একটা ভটভটি ও নিয়ে আসবে, আপনি দেখেশুনে নিতে পারবেন,” জবাব দিল কানাই।

    “নৌকোর মালিককে ও চেনে তো?”

    “হ্যাঁ। যার ভটভটি সে ওর বাবার মতো।”

    ক্যানিং থেকে লঞ্চ ভাড়া করে ফরেস্ট গার্ড আর তার আত্মীয়ের সঙ্গে কী ঝামেলা হয়েছিল মনে পড়ল পিয়ার। জিজ্ঞেস করল, “আপনার কী মনে হয়, বিশ্বস্ত লোক তো?”

    “হ্যাঁ, হ্যাঁ,” বলল কানাই, “আসলে আমিও চিনি লোকটাকে। ওর নাম হল হরেন নস্কর। আমার মেসোরও অনেক কাজ করে দিত ও। নিশ্চিন্তে নিতে পারেন ওর নৌকো, আমি গ্যারান্টি দিতে পারি।”

    “ঠিক আছে তা হলে।”

    ফকিরের দিকে একপলক তাকিয়ে পিয়া দেখল হাসি ফুটেছে ওর মুখে। এক মুহূর্তের জন্য পিয়ার মনে হল ডাঙার গোমড়ামুখো বিরক্ত চেহারাটা সরে গিয়ে নৌকোর ওপরের স্বাভাবিক মানুষটা যেন আবার ফিরে এসেছে। আবার জলের ওপর ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনায়, না বাড়িতে যে পাষাণভার চেপে থাকে বুকের ওপর তার থেকে দূরে যাওয়ার চিন্তায় ফকিরের মেজাজ খুশ হয়ে গেল সেটা অবশ্য বুঝতে পারল না পিয়া। তবে ফকিরের কাছে যার দাম আছে সেরকম কিছু করতে পেরেছে তাতেই ও খুশি।

     “এই যে, শুনুন,”কানাই কনুই দিয়ে একটু ঠেলা দিয়ে বলল পিয়াকে, “ময়না কী জিজ্ঞেস করছে আপনাকে।”

    “কী জিজ্ঞেস করছে?”

    “বলছে আপনার মতো এত উচ্চশিক্ষিত একজন বৈজ্ঞানিকের ওর স্বামীর মতো লোকের সাহায্য নেওয়ার কেন দরকার হয়–ও তো এক বিন্দুও লেখাপড়া জানে না।”

    ভুরু কোঁচকাল পিয়া। বুঝতে পারল না; সত্যিই কি ময়না এতটাই তাচ্ছিল্য করে ওর স্বামীকে, নাকি ও আসলে বোঝাতে চাইছে ফকিরের বদলে অন্য কাউকে নিয়ে যাক পিয়া? কিন্তু অন্য কোনও লোককে তো নিয়ে যেতে চায় না পিয়া–বিশেষত সে যদি আবার ওই ফরেস্ট গার্ডের মতো লোক হয়।

    পিয়া কানাইকে বলল, “আপনি প্লিজ ময়নাকে বলবেন, ওর স্বামী এখানকার নদীকে খুব ভাল চেনে। ফকিরের জ্ঞান তাই আমার মতো একজন বৈজ্ঞানিকের অনেক কাজে আসতে পারে।”

    কথাটা ময়নাকে বুঝিয়ে দেওয়ার পর জবাবে ও এমন কিছু একটা তীক্ষ্ণ মন্তব্য করল যে হেসে ফেলল কানাই।

    “হাসছেন কেন?” জিজ্ঞেস করল পিয়া।

    “এত চালাক না মেয়েটা!” হাসতে হাসতেই বলল কানাই।

    “কেন? কী বলল ও?”

    “‘জ্ঞান’ আর ‘গান’ এই দুটো বাংলা শব্দ নিয়ে একটু মজা করল ও। বলল ওর স্বামীর জ্ঞানটা সত্যিই একটু বেশি থেকে গানটা আরেকটু কম থাকলে অনেক সুবিধা হত।”

  • অভ্যাস

    অভ্যাস

    অভ্যাস

    কুসুম লুসিবাড়িতে আসায় আদৌ খুশি হয়নি নীলিমা। সেইদিন সন্ধেবেলা আমাকে বলল, “জানো, কুসুম আজকে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। ওই মরিচঝাঁপির ঝামেলায় ট্রাস্টকে জড়াতে চাইছিল। ওরা চায় ওখানে কিছু চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে ট্রাস্ট ওদের সাহায্য করুক।”

    “তুমি কী বললে?”

    “আমি বলে দিয়েছি আমাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়,” খুব ঠান্ডা দৃঢ় গলায় বলল নীলিমা।

    “কেন সাহায্য করতে পারবে না ওদের?” প্রতিবাদ করলাম আমি। “ওরাও তো। মানুষ–অন্য সব জায়গার লোকেদের মতো ওদেরও অসুখ-বিসুখ করে, ওষুধপত্রের দরকার হয়।”

    “এটা সম্ভব নয় নির্মল,” বলল নীলিমা। “এই লোকগুলো দখলদার; ওই দ্বীপের জমি তো ওদের নয়, ওটা সরকারের সম্পত্তি। অমনি উড়ে এসে জুড়ে বসে পড়লেই হয়ে গেল? ওদের যদি ওখানে থাকতে দেওয়া হয়, লোকে তো ভাববে এই ভাটির দেশের যে-কোনও দ্বীপই এরকমভাবে ইচ্ছেমতো দখল করে নেওয়া যায়। জঙ্গলটার তা হলে কী হবে? পরিবেশের কথাটা কেউ একবার ভাববে না?”

    জবাবে আমি বললাম, এই লুসিবাড়িও একসময় জঙ্গল ছিল–এই জমিও সরকারের সম্পত্তি ছিল এককালে। তা সত্ত্বেও স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটনকে তাঁর পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য এখানে বসতি গড়ার অধিকার দেওয়া হয়েছিল। এবং এত বছর ধরে নীলিমা বলে এসেছে উনি যা করেছেন সেটা খুবই প্রশংসাহ। তফাতটা তা হলে কী? এই উদ্বাস্তুদের স্বপ্নের মূল্য কি স্যার ড্যানিয়েলের স্বপ্নের মূল্যের চেয়ে কম? উনি ধনী সাহেব আর এরা ঘরছাড়া গরিব মানুষ বলে?

    “কিন্তু নির্মল, স্যার ড্যানিয়েল যা করেছিলেন সে অনেককাল আগের কথা,” বলল নীলিমা। একবার ভাবো এখন যদি সবাই সেরকম করতে শুরু করে কী হাল হবে এই গোটা জায়গাটার। জঙ্গলের কোনও চিহ্নই থাকবে না আর।”

    “দেখো নীলিমা, ওই উদ্বাস্তুরা আসার আগেও কিন্তু মরিচঝাঁপিতে জঙ্গল সেভাবে ছিল না। দ্বীপের খানিকটা অংশ তো সরকারই ব্যবহার করছিল চাষবাসের জন্য। এখন পরিবেশের নামে যা বলা হচ্ছে সব বাজে কথা। যে মানুষগুলোর আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, তাদের ওই দ্বীপটা থেকে তাড়ানোর জন্যই শুধু বলা হচ্ছে এসব।”

    “তা হতে পারে, কিন্তু ট্রাস্টকে আমি এই ব্যাপারে কিছুতেই জড়াতে দিতে পারি না,” নীলিমা বলল। “আমাদের পক্ষে একটু বেশি ঝুঁকি হয়ে যাবে সেটা। হাসপাতালের রোজকার কাজ কীভাবে চলে তুমি তো জানো না, জানলে বুঝতে পারতে সরকারের সুনজরে থাকার জন্য কী করতে হয় আমাদের। নেতারা যদি একবার আমাদের পেছনে লাগে তা হলে তো হয়ে গেল। সেই ঝুঁকি আমি নিতে পারি না।”

    এবার পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হল আমার কাছে। “তা হলে তুমি বলতে চাইছ যে বিষয়টার ন্যায়-অন্যায় নিয়ে তোমার কোনও বক্তব্য নেই। এই লোকগুলোকে তুমি সাহায্য করবে না, তার কারণ তুমি সরকারের সুনজরে থাকতে চাও।”

    হাতদুটো মুঠো পাকিয়ে কোমরের কাছে রেখে দাঁড়াল নীলিমা। বলল, “তোমার কোনও বাস্তব ধারণা নেই নির্মল। তুমি এখনও তোমার ওই দুর্বোধ্য কবিতা আর বিপ্লবের ঝাপসা স্বপ্নের জগতেই বাস করছ। কিছু একটা সত্যি সত্যি গড়ে তোলা আর সেটার স্বপ্ন দেখা এক জিনিস নয়। কোনও জিনিস গড়ে তুলতে গেলে সবসময়েই বুঝেশুনে কিছু আপোশের রাস্তা বেছে নিতে হয়।”

    নীলিমা যখন এই সুরে কথা বলে তখন সাধারণত আমি তর্কের মধ্যে আর যাই না। কিন্তু এবার ঠিক করলাম আমিও ছেড়ে কথা বলব না–”যে আপোশের রাস্তা তুমি নিয়েছ সেটা খুব বুঝেশুনে বেছে নেওয়া বলে মনে হয় না আমার।”

    আরও রেগে গেল নীলিমা। বলল, “নির্মল, একটা কথা আমি তোমাকে মনে করিয়ে দিতে চাই। তোমার জন্যেই কিন্তু আমরা প্রথম লুসিবাড়িতে এসেছিলাম, কারণ রাজনীতি করতে গিয়ে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলে তুমি, আর তারপর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলে। আমার তো এখানে কিছুই ছিল না বাড়ির লোকজন না, বন্ধুবান্ধব না, চাকরিও না। কিন্তু আস্তে আস্তে আমি কিছু তো একটা গড়ে তুলেছি সত্যিকারের কিছু একটা, যেটা লোকের কাজে লাগছে, সামান্য হলেও যেটা মানুষের কিছু উপকারে আসছে। আর এতগুলো বছর ধরে তুমি শুধু বসে বসে আমার কাজের বিচার করে গেছ। কিন্তু এখন তো আমার কাজের ফল চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছ–এই হাসপাতালটা। আর এটাকে বাঁচানোর জন্য আমি কী করব যদি জিজ্ঞেস করো, তা হলে বলে রাখছি শোনো, মা তার বাচ্চাদের বাঁচানোর জন্য যেমন লড়াই করে, সেইভাবে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাব আমি। এই হাসপাতালটার ভালমন্দ, এর ভবিষ্যৎ–এটাই তো আমার সব। তার কোনও ক্ষতি আমি হতে দেব না। এতদিন ধরে তোমার কাছে আমি খুব একটা কিছু চাইনি, কিন্তু এবার চাইছি–আমার একটাই অনুরোধ, মরিচঝাঁপির ব্যাপারটার মধ্যে তুমি জড়িয়ো না। আমি জানি সরকার ওদের থাকতে দেবে না ওখানে, আর এটাও জানি যারা যারা এর মধ্যে থাকবে তাদের কাউকে ওরা রেয়াত করবে না। তুমি যদি ওই উদ্বাস্তুদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ো, তা হলে আমার সারা জীবনের কাজ দিয়ে আমাকে তার মূল্য দিতে হতে পারে। এইটা মাথায় রেখো। এইটুকুই শুধু তোমার কাছে চাইছি আমি।”

    আর কিছু বলার রইল না আমার। আমার চেয়ে বেশি তো আর কেউ জানে না কী ত্যাগ স্বীকার করেছে আমার জন্য ও। বুঝতে পারলাম, মরিচঝাঁপিতে গিয়ে সেখানকার বাচ্চাদের পড়ানোর স্বপ্ন শুধু আমার এ বুড়ো বয়সের ভীমরতি, অনিবার্য অবসরকে ঠেকিয়ে রাখার একটা ব্যর্থ চেষ্টা। বিষয়টা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে চেষ্টা করলাম আমি।

    নতুন বছর এসে পড়ল–১৯৭৯–আর কিছুদিন পরেই হাসপাতালের জন্য চাঁদা তোলার কাজে আবার বেরিয়ে পড়ল নীলিমা। কলকাতার এক ধনী মাড়োয়ারি পরিবার একটা জেনারেটর দিতে রাজি হয়েছে; ওর এক মাসতুতো ভাই রাজ্য সরকারের মন্ত্রী হয়েছে, তার সঙ্গেও একবার দেখা করতে চায় নীলিমা। এমনকী মোরারজি দেশাই সরকারের এক বড় অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে একবার দিল্লিও যেতে হতে পারে। এত কিছু কাজ ওকে সামলাতে হবে।

    নীলিমা যেদিন গেল, জেটি পর্যন্ত ওকে এগিয়ে দিতে গেলাম আমি। ঠিক নৌকোয় ওঠার মুখে ও বলল,”নির্মল, মরিচঝাঁপি নিয়ে যা বলেছি মনে রেখো। ভুলে যেয়ো না কিন্তু।”

    নৌকো ছেড়ে দিল, আর আমিও ফিরে এলাম আমার পড়ার ঘরে। মাস্টারির কাজ মিটে গেছে, সময় কাটানোই এখন সমস্যা। বহু বছর পর আবার আমার খাতাটা খুললাম, ভাবলাম দেখি যদি কিছু লিখতে পারি। অনেকদিন ধরেই ভেবেছি একটা বই লিখব এই ভাটির দেশ নিয়ে–এত বছরে যা দেখেছি এখানে, যা কিছু জেনেছি জায়গাটার সম্পর্কে, সব থাকবে তাতে।

    কয়েকদিন নিয়ম করে টেবিলটায় এসে বসলাম। বসে বসে দূরে রায়মঙ্গলের মোহনার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে কত কথাই যে মনে এল। মনে পড়ল, যখন প্রথম এই লুসিবাড়িতে এলাম আমি, সূর্যাস্তের সময় পাখির ঝাঁকে অন্ধকার হয়ে যেত আকাশ। বহু বছর আর তত পাখি একসঙ্গে দেখি না। প্রথম যখন লক্ষ করলাম পাখির সংখ্যা কমে এসেছে, ভাবলাম হয়তো সাময়িক ব্যাপার, আবার পরে ফিরে আসবে ঝাঁকে ঝাকে। কিন্তু এল না। মনে পড়ল, একটা সময় ছিল যখন ভাটার সময় নদীর পাড়গুলো লাল হয়ে থাকত–চারদিকে থিকথিক করত লক্ষ লক্ষ কঁকড়া। সেই রং আস্তে আস্তে ফিকে হতে শুরু করল, এখন তো দেখাই যায় না আর। মনে মনে ভাবি গেল কোথায় সেই লক্ষ লক্ষ কঁকড়া? সেই পাখির ঝক?

    বয়স মানুষকে মৃত্যুর চিহ্নগুলি চিনে নিতে শেখায়। হঠাৎ একদিনে সেগুলো দেখা যায় না; অনেক বছর ধরে ধীরে ধীরে বোঝা যেতে থাকে তাদের উপস্থিতি। এখন আমার মনে হল সর্বত্র সেই চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি আমি–আমার মধ্যে শুধু নয়, এই গোটা জায়গাটায়, যেখানে তিরিশটা বছর আমি কাটিয়ে দিয়েছি। পাখিরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে, মাছের সংখ্যা কমে আসছে, দিনে দিনে সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে জমি। কতটুকু লাগবে এই গোটা ভাটির দেশটা জলের তলায় চলে যেতে? বেশি নয়–সমুদ্রের জলের স্তরের সামান্য একটুখানি হেরফেরই যথেষ্ট।

    এই সম্ভাবনাটা নিয়ে যত ভাবতে লাগলাম, আমার মনে হতে লাগল খুব একটা সাংঘাতিক ক্ষতি কিছু হবে না সেরকম ঘটনা ঘটলে। এত যন্ত্রণার সাক্ষী এই দ্বীপগুলো–এত কষ্ট, এত দারিদ্র্য, এত বিপর্যয়, এত স্বপ্নভঙ্গ–এগুলো যদি আজকে হারিয়েও যায়, হয়তো মানবজাতির পক্ষে অকল্যাণকর হবে না সেটা।

    তারপর মরিচঝাঁপির কথা মনে পড়ল আমার–যে জায়গাকে আমার মনে হচ্ছে কেবল চোখের জলে ভেজা, সেই একই দেশ তো কারও কারও কাছে সোনার সমান। কুসুমের গল্প মনে পড়ে গেল আমার–মনে পড়ল সেই দূর বিহারে ওর নির্বাসনের দিনগুলি, কেমন তখন ওরা এই ভাটির দেশে ফেরার স্বপ্ন দেখত, এই কাদামাটি এই জোয়ার-ভাটা কেমন ওদের মনকে টানত সেই কাহিনি মনে পড়ল। আরও বাকি যারা এসেছে মরিচঝাঁপিতে, কত কষ্ট সহ্য করেছে ওরা এখানে আসার জন্য, সেই কথাও মনে এল আমার। কীভাবে এই জায়গার প্রতি সুবিচার করতে পারি আমি? এমন কী লিখতে পারি এই দেশ সম্পর্কে আমি যা ওদের মনের টান আর ওদের স্বপ্নের সমান শক্তি ধরবে? কীরকম চেহারা হবে সে লাইনগুলোর? ঠিক করে উঠতে পারলাম না। আমি–নদীর মতো বহমান হবে কি সে লেখার গতি, না ছন্দোময় হবে জোয়ার-ভাটার মতো?

    বইখাতা সব সরিয়ে রাখলাম আমি, ছাদে গিয়ে জলের দিকে তাকালাম। সেই মুহূর্তে আমার চোখে প্রায় অসহ্য লাগল ওই দৃশ্য। মনে হল দুই দিক থেকে দুই প্রচণ্ড টানে বুকটা ভেঙে যাচ্ছে আমার একদিকে আমার স্ত্রী, আরেকদিকে আমার বাগদেবী সেই নারী, যেরকম কেউ আগে আমার জীবনে কখনও আসেনি; একদিকে ধীর শান্ত দৈনন্দিন পরিবর্তনের জগৎ, আরেকদিকে বিপ্লবের মাতাল করা উত্তেজনা–একদিকে গদ্য, আরেকদিকে পদ্য।

    ফিরে ফিরে মনে হতে লাগল, এই দ্বিধার কথা কল্পনা করে কি মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছি। আমি? এইসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অধিকার কি আমি কখনও অর্জন করেছি?

    সেই মুহূর্তে সেই জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম আমি, যেখানে কবির কথায় আমরা নিজেদের বলি–

    ‘হয়তো বা বাকি থাকে কোনো

    ঢালুতে দাঁড়ানো বৃক্ষ, দ্রষ্টব্য দিনের পরে দিন,

    কিংবা কাল যেখানে হেঁটেছিলাম, সেই পথ,

    আর কোনো জট বাঁধা অভ্যাসের অদম্য সাধুতা–

    বিদায়ে যা পরাত্মখ, আমাদের ভক্ত সহবাসী।’

  • একটি সূর্যাস্ত

    একটি সূর্যাস্ত

    একটি সূর্যাস্ত

    বিকেল ফুরিয়ে এসেছে। সূর্য ঢলে পড়েছে বিদ্যার মোহনায়। পিয়া ঠিক করল কানাইয়ের আমন্ত্রণের সুযোগটা নেবে একবার গেস্ট হাউসের ছাদে উঠে পড়ার ঘরের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ল ও।

    “কে?” চোখ পিটপিট করতে করতে এসে দরজাটা খুলল কানাই। মনে হল একটা ঘোর থেকে যেন জেগে উঠেছে।

    “ডিস্টার্ব করলাম?”

    “না না, সেরকম কিছু না।”

    “ভাবলাম একটু সূর্যাস্ত দেখি ছাদ থেকে।”

    “গুড আইডিয়া–ভালই করেছেন চলে এসে।” হাতের বাঁধানো খাতাটা রেখে দিয়ে, পিয়ার সঙ্গে ছাদের পাঁচিলের ধারে এসে দাঁড়াল কানাই। শেষ বেলার সূর্যের আলোয় দূরে আকাশ আর মোহনায় তখন আগুন লেগেছে।

    “অসাধারণ, তাই না?” জিজ্ঞেস করল কানাই।

    “সত্যিই অসাধারণ।”

    লুসিবাড়ির দ্রষ্টব্যগুলি এক এক করে পিয়াকে দেখাতে লাগল কানাই–ময়দান, হ্যামিলটনের কুঠি, হাসপাতাল, আরও এটা ওটা। দেখানো যখন শেষ হল ততক্ষণে ঘুরে ছাদের উলটোদিকটায় চলে এসেছে ওরা–সকালে যে রাস্তা ধরে গিয়েছিল, সেটার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালের স্টাফ কোয়ার্টার্সগুলি সামনে চোখে পড়ছে। পিয়া বুঝতে পারল দু’জনেই ওরা ফকিরের বাড়ির ঘটনার কথা ভাবছে।

    “কাজগুলো যে সব ঠিকঠাক হয়েছে আজকে, ভেবেই বেশ ভাল লাগছে আমার,” পিয়া বলল।

    “সব ঠিকঠাক হয়েছে মনে হয় আপনার?”

    “হ্যাঁ, মনে হয়,” বলল পিয়া। “অন্তত ফকির তো আবার যেতে রাজি হয়েছে। শুরুতে আমার বেশ সন্দেহই ছিল ও যাবে কিনা।”

    “সত্যি কথা বলতে কী, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কী ভাবা উচিত,” কানাই বলল। “এমন অদ্ভুত গোমড়া টাইপের ছেলে, কখন কী করবে বোঝা কঠিন।”

    “কিন্তু বিশ্বাস করুন, যখন নৌকোয় থাকে তখন ও একেবারে অন্য মানুষ।”

    “আপনি ঠিক জানেন, আপনার কোনও অসুবিধা হবে না ওর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে?”

    জিজ্ঞেস করল কানাই। “বেশ কয়েকটা দিনের মামলা কিন্তু।”

    “হ্যাঁ, জানি।” পিয়া বুঝতে পারছিল ফকিরের বিষয়ে কানাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে গেলেই অদ্ভুত একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষত সকালের সেই নীরব ভর্ৎসনার ব্যাপারটা এখনও ভুলতে পারেনি কানাই। পিয়া আস্তে আস্তে বলল, “আমাকে ফকিরের মায়ের কথা বলুন না। কেমন মানুষ ছিলেন উনি?”

    একটু ভাবল কানাই। “ফকির একদম ওর মায়ের চেহারাটা পেয়েছে,” বলল অবশেষে। “কিন্তু আর কোনও মিল খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কুসুম ছিল টগবগে স্বভাবের মেয়ে, সবসময় হাসত, মজা করত। ফকিরের মতো একটুও নয়।”

    “কী হয়েছিল ওনার?”

    “সে অনেক লম্বা গল্প,” জবাব দিল কানাই। “সবটা আমি জানিও না। এটুকু শুধু বলতে পারি, পুলিশের সঙ্গে একটা গণ্ডগোলে মারা গিয়েছিল ও।”

    ভয়ানক আশ্চর্য হয়ে গেল পিয়া। “কী করে?”

    “একদল রিফিউজি এখানকার একটা দ্বীপ দখল করে বসেছিল–ও-ও তাদের সঙ্গে ছিল। কিন্তু সে জমির মালিকানা ছিল সরকারের। ফলে গোলমাল বাধল, আর বহু লোক মারা গেল। ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৭৯ সালে ফকিরের বয়স তখন খুব বেশি হলে পাঁচ কি ছয়। ওর মা মারা যাওয়ার পরে হরেন নস্কর ওকে এনে মানুষ করে। হরেনই ওর বাবার মতো।”

    “মানে ফকিরের জন্ম এখানে নয়?”

    “না। ওর জন্ম হয়েছিল বিহারে,” বলল কানাই। “ওর বাবা-মা ওখানে থাকত তখন। তারপর ওর বাবা মারা যাওয়ার পর ওর মা ওকে নিয়ে এখানে চলে আসে।”

    পিয়ার মনে পড়ল কল্পনায় ফকিরের পরিবারের কীরকম ছবি দেখেছিল ও–কীরকম দেখেছিল ওর বাবা-মা-র চেহারা, অনেক ভাইবোন। নিজের অন্তদৃষ্টির অভাবে নিজেরই খুব লজ্জা লাগল ওর। “এই একটা ব্যাপারে তা হলে ফকির আর আমার একটু মিল আছে,” বলল পিয়া।

    “কী ব্যাপারে।”

    “মাকে ছাড়া বড় হয়ে ওঠা।”

    “আপনারও কি ছোটবেলায় মা মারা গিয়েছিলেন?” জিজ্ঞেস করল কানাই।

    “ওর মতো অতটা ছোট ছিলাম না। আমার বারো বছর বয়সে মারা যান, আমার মা। ক্যানসার হয়েছিল। আমার অবশ্য মনে হয় তার অনেক আগে থেকেই মাকে হারিয়েছিলাম আমি,” পিয়া বলল।

    “কেন?”

    “কারণ আমাদের থেকে–মানে আমার বাবা আর আমার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল মা। ডিপ্রেশনে ভুগত। আর যত দিন গেছে অসুখটা বাড়তেই থেকেছে।”

    “আপনার নিশ্চয়ই খুব কষ্টে কেটেছে সেই সময়টা?”

    “মায়ের থেকে বেশি নয়,” পিয়া বলল। “মা কেমন ছিল জানেন, খানিকটা যেন অর্কিডের মতো, দুর্বল অথচ সুন্দর, অনেক অনেক লোকের যত্ন আর ভালবাসার ওপর নির্ভরশীল। মা যে ধরনের মানুষ ছিল, তাতে বাড়ি থেকে এতটা দূরে না গেলেই পারত। আমেরিকায় তো মা-র কিছুই ছিল না–বন্ধুবান্ধব না, কাজের লোকজন না, চাকরি না, নিজস্ব কোনও জীবনই ছিল না। ওদিকে বাবা ছিল যাকে বলে এক্কেবারে খাঁটি প্রবাসী–উদ্যমী, পরিশ্রমী, সফল মানুষ। নিজের কেরিয়ার নিয়েই ব্যস্ত সবসময়। আর আমি ব্যস্ত আমার স্বাভাবিক ছেলেমানুষি খেলাধুলো পড়াশোনা নিয়ে। আমার মনে হয় একটা হতাশার মধ্যে আস্তে আস্তে তলিয়ে যেতে শুরু করেছিল মা। তারপর একটা সময় এসে নিজেই হাল ছেড়ে দিয়েছিল।”

    ওর হাতের ওপর হাত রেখে একটু চাপ দিল কানাই। “খুব খারাপ লাগছে আমার।”

    কানাইয়ের কথার সুরের মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল যেটা খুব অবাক করল পিয়াকে। ওকে সবসময় মনে হয়েছে ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক, অন্যদের ব্যাপার নিয়ে কখনওই মাথা ঘামায় না। কিন্তু এখন ওর গলায় যে সহানুভূতির সুর সেটা তো আন্তরিক বলেই মনে হল।

    একটু হেসে পিয়া বলল, “ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। আপনি বলছেন আমার জন্য আপনার খারাপ লাগছে, কিন্তু ফকিরের জন্য তো আপনার বিশেষ সহানুভূতি আছে বলে মনে হচ্ছে না। অথচ আপনি ওর মাকে চিনতেন। কেন বলুন তো?”

    কথাটা শুনে শক্ত হয়ে গেল কানাইয়ের চোয়াল, তারপর একটু বাঁকা সুরে হেসে উঠল ও। বলল, “ফকিরের কথা যদি বলেন, তা হলে আমি বলব আমার সহানুভূতি ওর বউয়ের জন্যই বেশি।”

    “তার মানে?”

    “আজ সকালে ময়নার জন্য একটুও খারাপ লাগেনি আপনার?” জিজ্ঞেস করল কানাই। “একবার ভাবুন তো, ওরকম একটা লোকের সঙ্গে জীবন কাটানো কীরকম কঠিন ব্যাপার। তার ওপরে রুটিরুজি বলুন, মাথার ওপরে একটা ছাদ বলুন, সেসব কথাও তো ওকেই ভাবতে হয়। কী অবস্থা থেকে ও উঠে এসেছে কল্পনা করুন একবার ওর জাতপাতের সমস্যা, ওর বাড়ির পরিবেশ তার মধ্যে থেকেও যে আজকের দুনিয়ায় বেঁচে থাকার জন্য কী করা দরকার সেটা মাথা খাঁটিয়ে বের করেছে ও, সেই ব্যাপারটা প্রশংসাজনক নয়? আর শুধু যেনতেনভাবে বেঁচে থাকা নয়, ভালভাবে বাঁচতে চায় ও, নিজেকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।”

    মাথা নাড়ল পিয়া। “বুঝেছি।” এতক্ষণে ও উপলব্ধি করল, কানাইয়ের পক্ষে এই লুসিবাড়ির মতো জায়গায় এসে ময়নার মতো একজন মেয়ের দেখা পাওয়াটা খুবই ভরসার কথা–নিজের জীবনে যে পথ কানাই বেছে নিয়েছে, ময়নার গোটা অস্তিত্বটা ওর কাছে যেন সেই পথেরই যৌক্তিকতা প্রমাণ করছে। কানাইয়ের পক্ষে বিশ্বাস করা খুবই জরুরি যে ওর নিজস্ব মূল্যবোধগুলো আসলে সমদর্শী, সংস্কারমুক্ত, গুণবাদী। ও মনে মনে ভাবতে পারলে ভরসা পাবে যে, “আমি নিজের জন্য যা চাই অন্য সকলের আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে তার আসলে কোনও তফাত নেই। বড়লোক গরিবলোক নির্বিশেষে যে কারওই সামান্য একটু উদ্যম আছে, একটু ক্ষমতা আছে, সে-ই চায় এই পৃথিবীতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে–ময়নাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।” পিয়া বুঝতে পারল, যে আয়নায় কানাই নিজেকে দেখছে, ফকিরের মতো মানুষ সেখানে গাড়ির রিয়ারভিউ মিররের ওপর একটা ছায়া ছাড়া কিছু নয়, দ্রুত মিলিয়ে যাওয়া একটা উপস্থিতি মাত্র, চির-অতীত লুসিবাড়ি থেকে উঠে আসা ভূতের মতো। কিন্তু এটাও আন্দাজ করতে পারে পিয়া যে কানাই যে দেশে বাস করছে, সমস্ত নতুনত্ব এবং কর্মচাঞ্চল্য সত্ত্বেও এরকম অসংখ্য অদেখা ছায়াশরীরের উপস্থিতি সেখানে কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না, যত জোরেই চিৎকার করা যাক না কেন, তাদের ফিসফিসে কণ্ঠস্বর পুরোপুরি চাপা দেওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।

    “আপনি সত্যিই ময়নাকে পছন্দ করেন, তাই না?” পিয়া জিজ্ঞেস করল।

    “ঠিক কথাটা যদি জানতে চান, তা হলে বলব ওকে শ্রদ্ধা করি আমি,” জবাব দিল কানাই।

    “সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু ফকিরের জায়গা থেকে যদি দেখেন, তা হলে ওর চেহারাটা হয়তো একটু অন্যরকম দেখাবে।”

    “কী বলতে চাইছেন আপনি?”

    “নিজেকে জিজ্ঞেস করেই দেখুন না,” বলল পিয়া। “ও যদি আপনার স্ত্রী হত তা হলে কেমন লাগত আপনার?”

    হো হো করে হেসে উঠল কানাই। তারপর আবার যখন কথা বলতে শুরু করল তখন ওর গলার সুরের চটুলতায় দাঁতে দাঁত ঘষল পিয়া। “ময়না যে ধরনের মেয়ে তাতে ওর সঙ্গে ছোটখাটো একটা এক্সাইটিং সম্পর্কের কথা ভাবা চলতে পারে,” বলল কানাই। “মানে যাকে আমরা বলতাম ফ্লিং। কিন্তু তার থেকে বেশি কিছু নয়। সেরকম ক্ষেত্রে আপনার মতো কোনও মহিলাই আমার বেশি পছন্দের।”

    হাতটা তুলে কানের দুলে আস্তে আস্তে আঙুল বোলাল পিয়া, খানিকটা যেন ভরসা পাওয়ার জন্য। তারপর একটু সতর্ক হাসি হেসে বলল, “আপনি কি ফ্লার্ট করছেন আমার

    সঙ্গে, কানাই?”

    “কী মনে হয়?” একগাল হেসে কানাই পালটা প্রশ্ন করল।

    “আমার অভ্যেস চলে গেছে,” বলল পিয়া।

    “তা হলে তো সে ব্যাপারে কিছু করা উচিত আমাদের, তাই না?”

    নীচের থেকে ভেসে আসা একটা চিৎকারে কথা থেমে গেল ওর। “কানাইবাবু!”

    পাঁচিলের ওপর থেকে ঝুঁকে ওরা দেখল নীচের রাস্তার ওপর ফকির দাঁড়িয়ে রয়েছে। পিয়াকে দেখতে পেয়ে চোখ নামাল ও, মাটিতে পা ঘষতে লাগল আস্তে আস্তে। তারপর কানাইয়ের উদ্দেশ্যে দু’-একটা কী কথা বলেই হঠাৎ ঘুরে বাঁধের দিকে হেঁটে চলে গেল।

    “কী বলল ও?” জিজ্ঞেস করল পিয়া।

    “আপনাকে জানিয়ে দিতে বলল যে হরেন নস্কর কালকে ওর ভটভটি নিয়ে এখানে আসবে। আপনি গিয়ে দেখে নিতে পারেন। আর যদি মনে হয় ওটায় কাজ হবে, তা হলে পরশু সকালে রওয়ানা হয়ে যেতে পারেন, কানাই বলল।

    “চমৎকার,” বলে উঠল পিয়া। “আমি বরং গিয়ে আমার জিনিসপত্রগুলি গুছিয়ে গাছিয়ে নিই।”

    পিয়া লক্ষ করল মাঝপথে বাধা পড়ায় ও নিজে যতটা খুশি হয়েছে, ঠিক ততটাই বিরক্ত হয়েছে কানাই। ভুরুটা একটু কুঁচকে ও বলল, “আমারও মনে হয় এবার গিয়ে মেসোর খাতাটা নিয়ে বসা উচিত।”

  • রূপান্তর

    রূপান্তর

    রূপান্তর

    হরেন যদি না থাকত, আবার হয়তো আমি আমার পুরনো অভ্যাসের চক্রেই ফিরে যেতাম; প্রবল ভালবাসায় যে অভ্যাসগুলো আঁকড়ে ধরে থাকে আমাকে, ছেড়ে যেতে চায় না কিছুতেই, তাদের মধ্যে থেকেই হয়তো সুখে কাটিয়ে দিতাম বাকি দিনগুলি। কিন্তু একদিন ঠিক খুঁজতে খুঁজতে এসে উপস্থিত হল হরেন। বলল, “সার, পৌষমাস তো শেষ হয়ে এল। বনবিবির পুজো তো এসেই গেল প্রায়। কুসুম আর ফকির একদিন গর্জনতলা যাবে বলছিল, তো আমি বলেছি ওদের নিয়ে যাব। কুসুম বলল আপনাকে একবার জিজ্ঞেস করতে, যদি যান।”

    “গর্জনতলা? সেটা আবার কোথায়?”

    “জঙ্গলের অনেক ভেতরে। ছোট একটা দ্বীপ। কুসুমের বাবা সেখানে বনবিবির একটা মন্দির বানিয়েছিল, তাই ও একবার যেতে চায় ওখানে।”

    এ আরেক নতুন সমস্যা। এর আগে সব সময়ই যে-কোনও ধর্মীয় ব্যাপার থেকে আমি সাবধানে দূরে সরে থেকেছি। তা যে শুধু ধর্ম বিশ্বাসকে ভ্রান্ত চেতনা বলে মনে করি সে জন্যই নয়, সেই বিশ্বাস কত ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে দেশ বিভাগের সময় সেটা নিজের চোখে দেখেছি বলেও বটে। আর হেডমাস্টার হিসেবেও আমার মনে হয়েছে, হিন্দুই বল বা মুসলমানই বল, কোনও ধর্মের সঙ্গেই না জড়ানোটা আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। একটু আশ্চর্যের মনে হলেও, সেই কারণেই কখনও বনবিবির পুজো দেখিনি আমি, আর এই দেবীটি সম্পর্কে কোনও আগ্রহও কখনও হয়নি আমার। কিন্তু এখন তো আমি আর হেডমাস্টার নেই, কাজেই সেই নিয়মটাও আর খাটে না।

    কিন্তু নীলিমা যে বারণ করে গেল, তার কী হবে? ও যে বার বার করে আমাকে মরিচঝাঁপি থেকে দূরে সরে থাকতে অনুরোধ করে গেল? নিজেকে বোঝালাম, এর সঙ্গে তো সেভাবে দেখতে গেলে মরিচঝাঁপির কোনও সম্পর্ক নেই, কারণ আমরা তো যাচ্ছি অন্য একটা দ্বীপে। “ঠিক আছে হরেন, আমি যাব গর্জনতলা। কিন্তু মনে রেখো, মাসিমার কানে যেন একটা কথাও না যায়।”

    “সে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন সার।”

    পরদিন ভোরবেলা হরেন এল, আর আমরা বেরিয়ে পড়লাম।

    শেষ যেবার মরিচঝাঁপি এসেছিলাম তারপর কয়েকমাস কেটে গেছে। সেখানে পৌঁছতেই চোখে পড়ল অনেক পরিবর্তন হয়েছে এর মধ্যে : আগের সেই উদ্দীপনা কেটে গেছে, একটা ভীতি আর সন্দেহর পরিবেশ যেন চেপে ধরেছে দ্বীপটাকে। একটা কাঠের ওয়াচ টাওয়ার বানানো হয়েছে, উদ্বাস্তুরা ছোট ছোট দলে নদীর পাড় ধরে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিচ্ছে। নৌকো পাড়ে ভিড়তেই বেশ কয়েকজন লোক এসে ঘিরে ধরল আমাদের। তারপর নানা জেরা। আপনাদের পরিচয় কী? কী দরকারে এসেছেন এখানে?

    একটু অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যেই গিয়ে পৌঁছলাম কুসুমের কুঁড়েতে। দেখলাম ও-ও একটু মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছে। বলল কয়েক সপ্তাহ ধরেই নানাভাবে আরও চাপ দিতে শুরু করেছে সরকার। কয়েক জন অফিসার, পুলিশের লোকজন ঘুরে গেছে এর মধ্যে। দ্বীপ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য উদ্বাস্তুদের প্রথমে নানা রকম লোভ দেখিয়েছে। তাতে কাজ না হওয়ায় তারপর সরাসরি হুমকি দিয়েছে। যদিও হটেনি উদ্বাস্তুরা, কিন্তু একটা ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে : কেউ জানে না কী হবে এবার।

    বেলা হয়ে গিয়েছিল, তাই পা চালিয়ে চললাম আমরা। কুসুম আর ফকির বনবিবি এবং তার ভাই শা জঙ্গলির ছোট ছোট মূর্তি গড়ে এনেছিল মাটি দিয়ে, সেগুলিকে হরেনের নৌকোয় তোলা হল। তারপর দ্বীপ ছেড়ে রওয়ানা হলাম আমরা।

    নদীতে বেরিয়ে পড়বার পর স্রোতের টানে সবার মেজাজ ভাল হয়ে গেল। চারপাশে আরও অনেক নৌকো দেখতে পেলাম, সবাই কোথাও না কোথাও যাচ্ছে। পুজো দিতে। কয়েকটা নৌকোয় দেখলাম কুড়ি-ত্রিশজন পর্যন্ত লোক আছে। সুন্দর রং করা বনবিবি আর শা জঙ্গলির বিশাল বিশাল মূর্তি নিয়ে যাচ্ছে তারা, সঙ্গে গানের লোকজন আর ঢাকঢোলও আছে দেখলাম।

    আমাদের নৌকোয় শুধু আমরা চারজন–হরেন, ফকির, কুসুম আর আমি।

    “তোমার ছেলেমেয়েদের নিয়ে এলে না কেন হরেন? তারা সব কোথায়?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।

    “ওরা সব আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেদের সঙ্গে গেছে,” কেমন একটু মিনমিন করে জবাব দিল হরেন। “ওদের নৌকোটা বড়।”

    একটা মোহনায় এসে পৌঁছলাম আমরা। মোহনা পেরোতে পেরোতে লক্ষ করলাম কোনও মন্দির অথবা ঠাকুর দেবতার মূর্তি-টুর্তির সামনে এলে মানুষ যেমন করে, হরেন আর কুসুম সেই রকম ভক্তিভরে বারবার নমস্কার করছে। ফকির দেখলাম খুব মন দিয়ে লক্ষ করছে, আর ওদের দেখাদেখি ও-ও হাতদুটো একবার কপালে ঠেকাচ্ছে, আরেকবার বুকের কাছে নিয়ে আসছে।

    “কী ব্যাপার বল তো?” একটু আশ্চর্য হয়েই জিজ্ঞেস করলাম আমি। “কী দেখতে পেলে তোমরা? এখানে তো কোনও মন্দির-টন্দির নেই? আমি তো চারিদিকে জল ছাড়া আর কিছু দেখছি না।”

    হেসে উঠল কুসুম। প্রথমে তো কিছুতেই বলবে না, তারপর একটু সাধাসাধি করতে শেষে বলল, ভাটির দেশকে ভাগ করার জন্য বনবিবি যে গণ্ডী টেনে দিয়েছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে, ওই মাঝ-মোহনায় আমরা সেই গণ্ডী পেরোলাম। অর্থাৎ মানুষদের জগৎ আর দক্ষিণরায় এবং তার চেলা চামুণ্ডা সব দৈত্য দানবদের জগতের মাঝের সীমানাটা পেরিয়ে এলাম আমরা। ভেবে একটু শিউরে উঠলাম যে আমার কাছে একটা সত্যিকারের কাটাতারের বেড়া যেরকম, কুসুম আর হরেনের কাছে এই কাল্পনিক রেখা ঠিক সেরকমই বাস্তব।

    আমার চোখেও এখন যেন চারিদিকের দৃশ্য সব নতুন ঠেকতে লাগল–সবকিছুই মনে হতে লাগল অপ্রত্যাশিত, বিস্ময়কর। সময় কাটানোর জন্য একটা বই নিয়েছিলাম সঙ্গে, কিন্তু এখন মনে হল একদিক থেকে দেখতে গেলে তো এই ভূদৃশ্যের সঙ্গে বইয়ের খুব একটা তফাত নেই–এও তো ঠিক সেই পর পর সাজানো পাতার মতো, কিন্তু একটা পাতা আরেকটার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই বই মানুষ খোলে নিজের নিজের রুচি এবং শিক্ষা, স্মৃতি এবং সাধ অনুযায়ী : একজন ভূতাত্ত্বিকের চোখের সামনে তার এক রকম পাতা খুলে যায়, নৌকোর মাঝি দেখতে পায় অন্য এক পাতা, জাহাজের পথপ্রদর্শক বা শিল্পীর জন্যেও সে রকম আলাদা আলাদা পাতা রয়েছে এ বইয়ে। কখনও কখনও সে পাতার লাইনগুলির নীচে দাগ টানা থাকে, যে দাগ কিছু মানুষ দেখতেই পায় না, আবার কিছু মানুষের কাছে সে দাগ প্রত্যক্ষ বাস্তব, বৈদ্যুতিক তারের মতোই মারাত্মক।

    আমার মতো একজন শহুরে লোকের কাছে এই ভাটির দেশের জঙ্গল ছিল শুধুমাত্র এক শূন্যতা, যেখানে সময় স্থির হয়ে আছে। এখন আমি বুঝতে পারলাম, সে ছিল আমার চোখের ভুল। আসল ঘটনা ঠিক তার উলটো। সময়ের চাকা এখানে এত দ্রুত ঘুরছে যে তা চোখে দেখাই যায় না। অন্য জায়গায় একটা নদীর গতিপথ বদলাতে কয়েক দশক লাগে, কখনও কখনও কয়েকশো বছর পর্যন্ত লেগে যায়; এক যুগ লেগে যায় একটা দ্বীপ গড়ে উঠতে। কিন্তু পরিবর্তনই হল ভাটির দেশের ধর্ম। এক এক সপ্তাহে এখানে নদীর খাত বদলায়, দিনে দিনে গড়ে ওঠে বা মিলিয়ে যায় গোটা দ্বীপ। অন্য জায়গায় নতুন করে একটা জঙ্গল তৈরি হতে কয়েক শতক, এমনকী কয়েক হাজার বছর পর্যন্ত লেগে যায়, কিন্তু এখানে মাত্র দশ কি পনেরো বছরে নেড়া একটা দ্বীপ ঢেকে যায় ঘন বাদাবনে। এরকম কি হতে পারে, যে পৃথিবীর ছন্দটাই অনেক দ্রুত হয়ে গেছে এখানে এসে? আর সেইজন্যই এত তাড়াতাড়ি এখানে ঘটছে সমস্ত কিছু?

    রয়্যাল জেমস অ্যান্ড মেরি নামের সেই বিলিতি জাহাজের কথা মনে পড়ে গেল আমার। ১৬৯৪ সালে সেই জাহাজ এই ভাটির দেশের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। রাতের অন্ধকারে এক চড়ায় ধাক্কা খেয়ে বহু মাস্তুলবিশিষ্ট সেই বিশাল সমুদ্রপোত তলিয়ে গেল জলে। ক্যারিবিয়ান সাগর কি ভূমধ্যসাগরের শান্ত জলে যদি এই দুর্ঘটনা ঘটত, তা হলে কী হত? সাগরতলের প্রাণী এবং উদ্ভিদে নিশ্চয়ই ছেয়ে যেত সে ধ্বংসাবশেষ এবং সেই অবস্থাতেই রয়ে যেত শত শত বছর। ডুবুরি আর অভিযাত্রীরা নিশ্চয়ই সেখানে নেমে খুঁজে বেড়াত হারিয়ে যাওয়া ধনরত্ন। কিন্তু এখানে? মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সেই বিশাল জাহাজটাকে স্রেফ হজম করে ফেলল এই ভাটির দেশ। এতটুকু চিহ্নও আর রইল না কোথাও।

    এটাই এরকম একমাত্র ঘটনা নয়। স্মৃতির পথে পিছু হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ল এমন অসংখ্য প্রাচীন জাহাজের সলিল সমাধি ঘটেছে এই ভাটির দেশের নদী-খাঁড়িতে। সেই ১৭৩৭-এর ভয়ংকর ঝড়ে তো দু’ডজনেরও বেশি জাহাজডুবি হয়েছিল এখানে। আর ১৮৮৫-তে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া স্টিম নেভিগেশন কোম্পানির গর্ব সেই দুই স্টিমার, আর্কট আর মাহরাট্টা তো এখানেই তলিয়ে গিয়েছিল জলে। আর ১৮৯৭-এ সিটি অব ক্যান্টারবেরির ডুবে যাওয়ার ঘটনাই বা ভুলি কী করে? কিন্তু সেসব দুর্ঘটনার জায়গায় গেলে কিছুই আর খুঁজে পাওয়া যাবে না এখন। এই হিংস্র স্রোতের করাল গ্রাস থেকে কোনও কিছুরই কোনও ছাড় নেই; সব কিছুই গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে শেষ পর্যন্ত মিহি পলির চেহারা নেয়, রূপান্তর ঘটে পরিণত হয় নতুন কোনও পদার্থে।

    মনে হল যেন গোটা ভাটির দেশটাই কবির কণ্ঠে বলছে : “জীবন যাপিত হয় রূপান্তরে।”

    মরিচঝাঁপিতে এখন বিকেল। দ্বীপের এই ওয়ার্ডের উদ্বাস্তুদের মিটিং থেকে এক্ষুনি ফিরল কুসুম আর হরেন। গুজব যা শোনা গিয়েছিল সেটা সত্যি। নদীর অন্য পারে যে গুণ্ডাবাহিনী জড়ো হয়েছে ওদেরই এখানে নিয়ে আসা হবে উদ্বাস্তুদের তাড়ানোর জন্য। কিন্তু সে আক্রমণ শোনা গেল খুব সম্ভবত কাল শুরু হবে। আরও কয়েক ঘণ্টা সময় হাতে আছে আমার।

  • তীর্থদর্শন

    তীর্থদর্শন

    তীর্থদর্শন

    রাতের খাবার দেখে পিয়ার মনে হল ওর খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাস সম্পর্কে ময়নাকে কেউ কিছু বলেছে। সাধারণ ভাত আর মাছের ঝোল ছাড়াও এ বেলা ময়না নিয়ে এসেছে খানিকটা আলুসেদ্ধ আর দুটো কলা। ভাল লাগল পিয়ার। হাত জোড় করে ময়নাকে ধন্যবাদ জানাল ও।

    ময়না চলে যাওয়ার পর পিয়া কানাইকে জিজ্ঞেস করল ও কি এ ব্যাপারে ময়নাকে কিছু বলেছে? মাথা নাড়ল কানাই : “না তো।”

    “তা হলে নিশ্চয়ই ফকির।” সাগ্রহে আরও এক হাতা আলুসেদ্ধ তুলে নিল পিয়া। “এখন শুধু একটু ওভালটিন থাকলেই সোনায় সোহাগা হত।”

    “ওভালটিন?” আশ্চর্য হয়ে প্লেট থেকে চোখ তুলে তাকাল কানাই। “আপনি ওভালটিন ভালবাসেন?” মাথা নেড়ে পিয়া হ্যাঁ বলাতে হাসতে শুরু করল ও। “মার্কিন দেশেও আজকাল লোকে ওভালটিন খাচ্ছে নাকি?”

    “এই অভ্যাসটা আসলে দেশ থেকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল আমার বাবা মা,” জবাব দিল পিয়া। “স্টক ফুরোলে ওখানকার ইন্ডিয়ান দোকান থেকে কিনে নিত। আর আমি পছন্দ করি কারণ জিনিসটা সঙ্গে রাখাও সহজ, আর জলে জলে ঘোরার সময় বানিয়ে খেয়ে নিতেও কোনও ঝামেলা নেই।”

    “তার মানে আপনার ওই ডলফিনদের পিছু পিছু ঘুরে বেড়াবার সময় আপনি ওভালটিন খেয়েই কাটান?”

    “কখনও কখনও।”

    প্লেট ভরে ভাত ডাল আর হেঁচকি তুলে নিতে নিতে দুঃখের সঙ্গে মাথা নাড়াল কানাই। “এই প্রাণীগুলোর জন্যে অনেক কষ্ট করেন আপনি, না?”

    “আমি ঠিক সেভাবে দেখি না ব্যাপারটাকে।”

    “আপনার এই জন্তুগুলো কি খুব ইন্টারেস্টিং?” জিজ্ঞেস করল কানাই। “মানে, ওদের নিয়ে চর্চা করার জন্যে আগ্রহ হতে পারে লোকের?”

    “আমি তো যথেষ্টই ইন্টারেস্ট পাই,” পিয়া বলল। “আর অন্তত একটা কারণ আমি বলতে পারি যাতে আপনার মনেও একটু আগ্রহ জাগতে পারে।”

    “বলুন, শুনছি,” জবাব দিল কানাই। “সাগ্রহে অপেক্ষা করিতেছি প্ররোচিত হইবার জন্য। বলুন, কী সেই কারণ?”

    “একেবারে প্রথম দিকে যে জায়গাগুলোতে এই জাতীয় শুশুকের নমুনা পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলির মধ্যে একটা হল কলকাতা,” পিয়া বলল। “একটু ইন্টারেস্ট পাচ্ছেন কি এবার?”

    “কলকাতা?” কানাইয়ের চোখে অবিশ্বাস। “মানে আপনি বলতে চান কলকাতায় এক সময় ডলফিন দেখা যেত?”

    “যেত। শুধু ডলফিন কেন, তিমি মাছও দেখা যেত এক সময়,” পিয়া বলল। “তিমি মাছ?” হেসে ফেলল কানাই। “রসিকতা করছেন?”

    “রসিকতা নয়, সত্যি সত্যিই একটা সময় এইসব জলচর প্রাণীদের প্রচুর সংখ্যায় দেখতে পাওয়া যেত কলকাতায়।”

    “বিশ্বাস হচ্ছে না,” স্পষ্ট জবাব কানাইয়ের। “মানে, এরকম কিছু হলে সেটা আমি নিশ্চয়ই জানতে পারতাম।”

    “কিন্তু ঘটনাটা সত্যি,” বলল পিয়া। “আপনাকে বলেই ফেলি, এই যে গত সপ্তাহে আমি কলকাতা হয়ে এলাম, সেটা ছিল বলতে পারেন আমার প্রাণীবৈজ্ঞানিক তীর্থযাত্রা।”

    হাসিতে ফেটে পড়ল কানাই। “প্রাণীবৈজ্ঞানিক তীর্থযাত্রা?”

    “আজ্ঞে হ্যাঁ,” পিয়া বলল। “কলকাতায় আমার মাসতুতো বোনেরাও হেসেছিল কথাটা শুনে, কিন্তু সত্যি জানেন, এক বর্ণও বাড়িয়ে বলছি না, এবার কলকাতায় তীর্থেই এসেছিলাম আমি।”

    “আপনার মাসতুতো বোনেরা?” জিজ্ঞেস করল কানাই।

    “হ্যাঁ। আমার মাসিমার দুই মেয়ে। দু’জনেই আমার চেয়ে বয়সে ছোট। একজন স্কুলে পড়ে, আরেক জন কলেজে। বেশ ব্রাইট, স্মার্ট দুটো মেয়ে। ওরা বলল কলকাতায় যেখানে যেখানে আমি যেতে চাই, বাড়ির গাড়িতে করে নিয়ে যাবে আমায়। ড্রাইভার আছে, কোনও অসুবিধা হবে না। ওরা মনে হয় ভেবেছিল আমি টুকটাক কেনাকাটা করতে চাইব। তাই যখন বললাম আমি কোথায় যেতে চাই ওরা অবাক হয়ে গেল : বটানিকাল গার্ডেনস! ওখানে কী করতে যাবে?”

    “ঠিক প্রশ্ন। বটানিকাল গার্ডেনের সঙ্গে ডলফিনের কী সম্পর্ক?” কানাই প্রশ্ন করল।

    “সম্পর্ক আছে,” বলল পিয়া। “নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরিতে এই বটানিকাল গার্ডেনের ভার ছিল খুব দক্ষ কয়েকজন প্রকৃতিবিদের ওপর। তাদেরই একজন ছিলেন এই গ্যাঞ্জেটিক ডলফিনের আবিষ্কর্তা উইলিয়াম রক্সবার্গ।

    “কলকাতার এই বটানিকাল গার্ডেনে বসেই ১৮০১ সালে রক্সবার্গ সেই বিখ্যাত প্রবন্ধ লেখেন, যাতে তার নদীজলের ডলফিন আবিষ্কারের কথা জানতে পারে সারা পৃথিবী। এই ডলফিনের নাম তিনি দিয়েছিলেন ডেলফিনাস গ্যাঞ্জেটিকাস (কলকাতার বাঙালিরা এই প্রাণীকে বলে শুশুক’)। পরে অবশ্য জানা গেল খ্রিস্টীয় প্রথম শতকেই রোমান পণ্ডিত প্লিনি দ্যা এল্ডার এই ভারতীয় ডলফিনদের বিষয়ে লিখে গেছেন। তাঁর বইয়ে তিনি এই প্রাণীদের প্লাটানিস্টা বলে উল্লেখ করেছেন। এই তথ্য জানার পর পরিবর্তন করা হল রক্সবার্গের দেওয়া নাম। জুওলজিক ইনভেন্টরির তালিকায় এই শুশুকরা এখন প্লাটানিস্টা গ্যাঞ্জেটিকা রক্সবার্গ ১৮০১। বহু বছর পরে, জন অ্যান্ডারসন নামে বটানিকাল গার্ডেনে রক্সবার্গের এক উত্তরসূরি বাথটাবের মধ্যে একটা ডলফিনের বাচ্চা পুষেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ বেঁচে ছিল বাচ্চাটা।

    “কিন্তু মজার ব্যাপার কী জানেন,” বলল পিয়া, “বাথটাবে ডলফিন পুষলেও অ্যান্ডারসন কিন্তু জানতেন না যে এই প্লাটানিস্টারা চোখে দেখতে পায় না। ওরা যে কাত হয়ে সাঁতার কাটে সেটাও উনি লক্ষ করেননি।”

    “তাই বুঝি?”

    “হ্যাঁ।”

    “সেই বাথটাবটা খুঁজে পেলেন নাকি?” আরও একটু ভাত নেওয়ার জন্য হাত বাড়াল কানাই।

    হেসে ফেলল পিয়া। “না। তবে তাতে বিশেষ দুঃখ হয়নি আমার। ওখানে যে যেতে পেরেছি তাতেই আমি খুশি।”

    “তো, এর পরে কোথায় গেলেন তীর্থ করতে?” জিজ্ঞেস করল কানাই।

    “সেটা শুনলে আরও আশ্চর্য হবেন আপনি,” পিয়া বলল। “সল্ট লেক।”

    চোখ কপালে উঠে গেল কানাইয়ের। “মানে, আমাদের সল্ট লেক উপনগরী?”

    “উপনগরী তো আর চিরকাল ছিল না,” দ্বিতীয় কলাটার খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে জবাব দিল পিয়া।

    “১৮৫২ সালে জায়গাটা ছিল স্রেফ একটা জলা জমি৷ তারই মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকটা পুকুর আর দিঘি। সে বছর জুলাই মাসে একবার বিশাল এক বান এল,” বলে চলল পিয়া। “ফুলে ফেঁপে উঠল গোটা বদ্বীপের সব নদী। জলের তোড় ঢুকে এল অনেক ভেতর পর্যন্ত। কলকাতার আশেপাশে সমস্ত জলা আর বাদা ভেসে গেল। তারপর জল যখন নামতে শুরু করল, সারা কলকাতায় গুজব ছড়িয়ে গেল শহরের পুবদিকের এক নোনা জলের ঝিলের মধ্যে নাকি এক দল বিশাল সামুদ্রিক জীব আটকা পড়ে রয়েছে। সে সময় কলকাতার বটানিকাল গার্ডেনের সুপারিন্টেডেন্ট ছিলেন ইংরেজ প্রকৃতিবিদ এডওয়ার্ড ব্লিথ। খবরটা শুনে তো তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। কারণ ঠিক তার আগের বছরেই মালাবার উপকূলে এভাবে আটকা পড়েছিল একটা তিমি মাছ। সাতাশ মিটার লম্বা সে মাছটাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলেছিল সেখানকার গ্রামের লোকেরা। ছুরি, কুড়ুল, বর্শা যে যা পেয়েছিল হাতের কাছে তাই নিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল প্রাণীটার ওপর। ওখানকার এক ইংরেজ পাদরিকে সেই তিমি মাছের টাটকা আর শুকনো মাংস নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছিল লোকে, বলেছিল সে নাকি খুব সুস্বাদু মাংস। এই জীবগুলোকেও যদি ঠিকমতো পরীক্ষা করার আগেই কেটেকুটে খেয়ে নেয় সবাই? এই ভেবে তাড়াতাড়ি সল্ট লেকের দিকে রওনা হলেন ব্লিথ সাহেব।

    “প্রাণীগুলোর মরা-বাঁচা নিয়ে সাহেবের যে বিশেষ দুশ্চিন্তা ছিল তা নয়, তবে ওদের মারার কাজটা উনিই নিজের হাতে করতে চেয়েছিলেন, এই যা,” বলল পিয়া।

    “আকাশে তখন চড়চড়ে রোদ, গোটা জলাটার থেকে যেন ভাপ উঠছে। বাড়তি বানের জলটাও নেমে গেছে। সল্ট লেকে পৌঁছে সাহেব দেখলেন ছোট একটা এঁদো পুকুরে প্রায় গোটা বিশেক প্রাণী কিলবিল করছে। গোল ধরনের মাথা, সারা শরীর কালো, শুধু পেটের দিকের রংটা সাদা। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ প্রাণীগুলো একেকটা চার মিটারেরও বেশি লম্বা। ডোবাটায় জল তখন এতই কম যে প্রাণীগুলোর সারা শরীর ডুবছে না, পিঠের ছোট পাখনাগুলোর ওপর দুপুরের রোদ পড়ে পিছলে যাচ্ছে। খুবই বিপদে পড়েছে প্রাণীগুলো। এমনকী একটা কাতর আর্তনাদের মতো শব্দও পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। প্রথমটায় ব্লিথের মনে হল ওগুলি বোধহয় খাটো পাখনাওয়ালা পাইলট তিমি, গ্লোবিসেফ্যালাস ডিডাকটর। আটলান্টিক মহাসাগরে এদের বেশি দেখা যায়। বছর ছয়েক আগে ব্রিটিশ শারীরতত্ত্ববিদ জে ই গ্রে এই তিমি আবিষ্কার করেছিলেন। নামকরণটাও গ্রে সাহেবেরই।

    “ইনি কি গ্রেজ অ্যানাটমির সেই গ্রে?” কানাই জিজ্ঞেস করল।

    “হ্যাঁ। ইনিই তিনি।”

    “ডোবাটার চারপাশে ততক্ষণে বহু লোক জড়ো হয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে ব্লিথ দেখলেন তারা কেউ প্রাণীগুলোকে মারে-টারেনি। অনেকে বরং সারা রাত ধরে খাটা-খাটনি করেছে ওদের বাঁচানোর জন্য। সরু একটা খালের মধ্যে দিয়ে টেনে নিয়ে গিয়ে জন্তুগুলোকে নদীতে ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। মনে হল তিমি মাছের মাংসের প্রতি এখানকার গ্রামের লোকেদের বিশেষ আসক্তি নেই। প্রাণীগুলিকে মেরে যে তেল বের করা যেতে পারে সেটাও বোধহয় এদের জানা নেই। ব্লিথ শুনলেন অনেকগুলো প্রাণীকেই এর মধ্যে নদীতে ছেড়ে দিতে পেরেছে গ্রামবাসীরা। বেশ কয়েক ডজনের বড় একটা ঝাক নাকি ছিল এই ডোবায়। তার থেকে এই কয়েকটা এখনও রয়ে গেছে। যে গতিতে উদ্ধারকাজ চলছে, সাহেবের মনে হল খুব বেশি সময় আর হাতে নেই। অবশিষ্ট প্রাণীগুলোর মধ্যে থেকে সব চেয়ে ভাল দেখে দুটোকে বেছে নিলেন ব্লিথ। সঙ্গীদের বললেন পাড়ে খুঁটি পুঁতে । তার সঙ্গে শক্ত দড়ি দড়া দিয়ে সেগুলোকে বেঁধে রাখতে। ভাবলেন পরদিন উপযুক্ত যন্ত্রপাতি নিয়ে এসে ঠিকমতো ব্যবচ্ছেদের বন্দোবস্ত করা যাবে।

    “কিন্তু পরদিন সকালে ফিরে এসে সাহেব দেখলেন সব ভো ভা। দুটো তিমির একটাও সেখানে নেই,” পিয়া বলল। “গ্রামের লোকেরা দড়ি কেটে জলে ছেড়ে দিয়েছে তাদের। কিন্তু ব্লিথও দমবার পাত্র নন। শেষ যে ক’টা প্রাণী সেখানে ছিল, তাদের মধ্যে থেকে দুটোকে ডাঙায় তুলে এনে চটপট কেটেকুটে ফেললেন। তারপর দীর্ঘক্ষণ ধরে হাড়গুলোকে পরীক্ষা করে সাহেব সিদ্ধান্তে এলেন এগুলো একেবারে নতুন প্রজাতির প্রাণী। এদের নাম উনি দিলেন ইন্ডিয়ান পাইলট হোয়েল, গ্লোবিসেফ্যালাস ইন্ডিকাস৷

    “এইখানে আমার একটা থিয়োরি আছে,” মুচকি হেসে পিয়া বলল। “ব্লিথ যদি সেদিন সল্ট লেকে না যেতেন তা হলে উনিই একদিন ইরাবড়ি ডলফিন আবিষ্কার করতে পারতেন।”

    ডান হাতের তর্জনী থেকে একটা ভাতের দানা চেটে নিল কানাই। “কেন?”

    “কারণ ছ’বছর পর প্রথম ওর্কায়েলার নমুনাটা যখন উনি দেখলেন, তখন খুব বড় একটা ভুল করে ফেললেন ব্লিথ সাহেব।”

    “সেটা আবার কোথায় দেখলেন উনি?”

    “কলকাতায়। একটা মাছের বাজারে,” হেসে বলল পিয়া। “কেউ এসে ওনাকে বলেছিল, এরকম একটা অদ্ভুত প্রাণী বাজারে এসেছে। খবরটা শুনে তো দৌড়ে গেলেন সাহেব সেখানে। প্রাণীটাকে এক নজর দেখেই সিদ্ধান্ত করলেন ওটা আসলে একটা বাচ্চা পাইলট তিমি। ছ’বছর আগে সল্ট লেকে যে প্রাণীগুলোকে দেখেছিলেন, সেই জাতের। ওই সল্ট লেকের প্রাণীগুলোকে কিছুতেই মাথা থেকে বের করতে পারেননি ব্লিথ।”

    “তা হলে আপনার এই সাধের ডলফিনদের আবিষ্কারকর্তা ব্লিথ সাহেব নন?” জিজ্ঞেস করল কানাই।

    “নাঃ,” বলল পিয়া। “একটুর জন্যে সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে গেল ব্লিথবাবুর। তার প্রায় বছর পঁচিশেক পরে কলকাতা থেকে সাড়ে ছ’শো কিলোমিটার দূরে বিশাখাপত্তনমে আরেকটা এই রকম ছোট মাপের গোল-মাথা জলজন্তুর দেহ পাওয়া গেল। এবারে তার কঙ্কালটা সোজা নিয়ে যাওয়া হল ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। সেখানে তো হইচই পড়ে গেল। লন্ডনের শারীরতত্ত্ববিদরা কঙ্কালটা পরীক্ষা করলেন। ব্লিথ সাহেব যা দেখতে পাননি, এই পণ্ডিতদের কিন্তু তা চোখ এড়াতে পারল না। দেখা গেল প্রাণীটা মোটেই পাইলট তিমির বাচ্চা নয়। এটা একটা নতুন প্রজাতির জীব–খুনে তিমি ওসিঁস ওর্সার দূর সম্পর্কের আত্মীয়! কিন্তু ওর্সার সঙ্গে অনেক অমিলও আছে। একেকটা খুনে তিমি লম্বায় দশ মিটার পর্যন্ত হতে পারে, কিন্তু এই নতুন প্রাণীটার দৈর্ঘ্য মেরেকেটে আড়াই মিটার। আবার, খুনে তিমিরা মেরু সাগরের হিম ঠান্ডা জলে থাকতে ভালবাসে, কিন্তু তাদের এই আত্মীয়ের পছন্দ নিরক্ষীয় অঞ্চলের উষ্ণ জল–তা সে নোনা জলও হতে পারে, আবার মিঠেও হতে পারে। বিশালকায় ওর্সার তুলনায় এতই নরম-সরম এই প্রাণীটা, যে এর নামকরণের সময় : পণ্ডিতদের একটা ক্ষুদ্রত্ববাচক শব্দ ভেবে বের করতে হল। নাম ঠিক করা হল ওর্কায়েলা–ওর্কায়েলা ব্রেভিরোষ্ট্রিস।

    “আপনি বলতে চান এই খুনেলা তিমি একটা ধরা পড়েছিল কলকাতায়, আর-একটা বিশাখাপত্তনমে?” একটু খটকার সুর কানাইয়ের গলায়।

    “হ্যাঁ।”

    “তা হলে এদের ‘ইরাবড়ি ডলফিন’ বলা হচ্ছে কেন?”

    “সে আরেক কাহিনি। এই ইরাবড়ি ডলফিন নামটা দিয়েছিলেন জন অ্যান্ডারসন–সেই যে সাহেব নিজের বাথটাবে শুশুক পোষার চেষ্টা করেছিলেন,” পিয়া বলল। “১৮৭০-এর দশকে অ্যান্ডারসন বার দুয়েক প্রাণিতাত্ত্বিক অভিযানে বার্মা হয়ে দক্ষিণ চিন পর্যন্ত গিয়েছিলেন। ইরাবড়ি নদীর ভাটি বেয়ে তারা যখন যাচ্ছিলেন, সেই সময়ে কোনও ওর্কায়েলা তাঁদের চোখে পড়েনি। উজানের দিকে কিন্তু প্রচুর সংখ্যায় দেখা গেল ডলফিনগুলোকে। নোনা জলের ডলফিন আর মিষ্টি জলের ডলফিনদের মধ্যে শারীরবৃত্তীয় কিছু তফাতও রয়েছে মনে হল। অ্যান্ডারসন সিদ্ধান্তে এলেন, এই নদীর ডলফিনদের নিশ্চয়ই দুটো আলাদা প্রজাতি রয়েছে: ওর্কায়েলা ব্রেভিরোষ্ট্রিস-এর এক তুতো ভাই আমদানি করলেন সাহেব–ওর্কায়েলা ফ্লিউমিনালিস৷ তার হিসেব মতো এই হল ইরাবড্ডি ডলফিন, এশিয়ার সব নদীর আসল বাসিন্দা।

    “অ্যান্ডারসনের দেওয়া নামটা রয়ে গেল, কিন্তু তার সিদ্ধান্তটা টিকল না,” বলল পিয়া। “বেশ কয়েকটা কঙ্কাল পরীক্ষা করে গ্রে সাহেব রায় দিলেন দুটো নয়, ওর্কায়েলার একটার বেশি জাত হয় না। এদের মধ্যে এক দল সমুদ্র উপকূলের নোনা জলে থাকতে ভালবাসে, আর এক দল পছন্দ করে নদীর মিষ্টি জল, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই; আর এটাও ঠিক যে এই দুই দলের মধ্যে কোনও মেলামেশা নেই, কিন্তু শারীরবৃত্তীয় কোনও অমিল এদের মধ্যে নেই। লিনিয়ান সারণিতে এই ডলফিনদের নাম শেষ পর্যন্ত হল ওর্কায়েলা ব্রেভিরোষ্ট্রিস গ্রে ১৮৮৬।

    “আয়রনিটা হল ব্লিথ বেচারির কপালে কোনও কৃতিত্বই শেষ পর্যন্ত জুটল না,” পিয়া বলে চলল। “শুধু যে ওর্কায়েলা আবিষ্কারের সুযোগটা ভদ্রলোকের হাত ফসকে গেল তাই নয়, দেখা গেল সল্ট লেকের জলায় আটকে পড়া প্রাণীগুলোকেও চিনতে ভুল করেছিলেন সাহেব। ওগুলো আসলে ছিল খাটো-পাখনা পাইলট তিমিই। গ্রে দেখিয়ে দিলেন গ্লোবিসেফ্যালাস ইন্ডিকাস বলে কোনও প্রাণী জগতে নেই।”

    মাথা নাড়ল কানাই। “এরকমই ছিল সে যুগে। ওর্সার তুলনায় ওর্কায়েলা যেমন, লন্ডনের তুলনায় সেরকমই ছিল কলকাতা।”

    নিজের প্লেটটা বাসন ধোয়ার সিঙ্কে নিয়ে যেতে যেতে হেসে ফেলল পিয়া। “সন্দেহ মিটেছে? কলকাতা যে জলচর প্রাণীবিদ্যার একটা প্রধান কেন্দ্র ছিল সে কথা বিশ্বাস হচ্ছে এখন?”

    একটা হাত তুলে কানের লতিতে আঙুল বোলাল পিয়া। আগেও এ অভ্যাসটা লক্ষ করেছে কানাই। নর্তকীর মতো মাধুর্যময় আবার একই সাথে শিশুর মতো কোমল এ ভঙ্গিটা যতবার দেখে ততবার বুকটা ধক করে ওঠে কানাইয়ের। পরের দিনই চলে যাবে পিয়া, ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল ওর।

    প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে হাত ধুতে বাথরুমে গেল কানাই। মিনিটখানেক বাদেই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে সিঙ্কের সামনে এসে পিয়ার কনুইয়ের কাছটায় গিয়ে দাঁড়াল।

    “আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে, বুঝলেন?”

    “কী?” কানাইয়ের চোখের চকচকে ভাব দেখে একটু সতর্ক গলায় বলল পিয়া। “আপনার কালকের এই অভিযানে কীসের অভাব আছে বলুন তো?”

    “কীসের?” কানাইয়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ঠোঁট চেপে জিজ্ঞেস করল পিয়া। “একজন ট্রান্সলেটরের,” কানাই বলল। “হরেন আর ফকির ওদের দুজনের কেউই ইংরেজি বলতে পারে না, কাজেই একজন অনুবাদক সঙ্গে না থাকলে আপনি ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলবেন কী করে?”

    “কেন? গত কয়েক দিন তো আমি দিব্যি চালিয়ে দিয়েছি।”

    “কিন্তু তখন তো আপনার সঙ্গে এত মাঝিমাল্লা ছিল না।”

    মাথা নেড়ে সায় দিল পিয়া। মনে হল, ঠিকই, কানাই সঙ্গে থাকলে অনেকটাই সুবিধা হবে কাজের। কিন্তু ওর ষষ্ঠেন্দ্রিয় একটা সতর্কবার্তাওপাঠাচ্ছিল। মনের গভীরে কোথায় যেন বোধ হচ্ছিল কানাইয়ের উপস্থিতি ঝামেলাও ডেকে আনতে পারে। একটু সময় নিয়ে বিষয়টা বোঝার জন্য ও জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু আপনার তো এখানে কাজ রয়েছে?”

    “কাজ বলতে সেরকম কিছু নয়,” বলল কানাই। মেসোর নোটবইটা প্রায় শেষ হয়েই এসেছে। আর ওটা এখানে বসেই যে পড়তে হবে তারও কোনও মানে নেই। লেখাটা আমি সঙ্গেও নিয়ে যেতে পারি। সত্যি বলতে কী, এই গেস্ট হাউসে একটু হাঁপিয়ে উঠেছি আমি। দু-এক দিন বাইরে ঘুরে এলে মন্দ হয় না।”

    স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল কানাইয়ের ব্যগ্রতাটা। তা ছাড়াও একটু বিবেক দংশনও যে হচ্ছিল না তাও নয়–কানাইয়ের আতিথেয়তা যে ত্রুটিহীন সেটা তো অস্বীকার করা যাবে না। সে উদারতার কিছুটা প্রতিদান দিতে পারলে এই গেস্ট হাউসে থাকাটা অনেক সহজ হবে ওর পক্ষে, মনে হল পিয়ার।

    “ঠিক আছে তা হলে, চলে আসুন,” সামান্য একটু দ্বিধার পর বলল পিয়া। “ভালই হবে আপনি সঙ্গে এলে।”

    এক হাত দিয়ে অন্য হাতের তালুতে এক ঘুষি মারল কানাই। “থ্যাঙ্ক ইউ!” কিন্তু উচ্ছ্বাসের এই প্রকাশে নিজেই মনে হল ও একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। অপ্রতিভ ভাবটা ঢাকতে তাড়াতাড়ি বলল, “আমার কতদিনের শখ একটা এক্সপিডিশনে যাওয়ার। যেদিন থেকে জানতে পেরেছি যে ইয়ংহাজব্যান্ডের তিব্বত অভিযানের সময় আমার ঠাকুর্দার কাকা তাঁর সঙ্গে ট্রান্সলেটর হিসেবে গিয়েছিলেন, সেইদিন থেকেই মনে মনে ঠিক করে রেখেছি আমাকেও একদিন একটা অভিযানে যেতেই হবে।”

  • নিয়তি

    নিয়তি

    নিয়তি

    বইটা সরিয়ে রেখে কুসুমকে জিজ্ঞেস করলাম, “ঠিক কোন জায়গাটায় যাচ্ছি আমরা বল তো? দ্বীপটার নাম গর্জনতলা কেন?”

    “গর্জনগাছের জন্য ওই রকম নাম হয়েছে সার। ওখানে অনেক গর্জনগাছ আছে তো।”

    “তাই বুঝি?” এই ব্যাপারটা এতক্ষণ আমার মনে আসনি। গর্জন শব্দের অন্য মানেটাই মাথার মধ্যে ঘুরছিল। “তা হলে বাঘের ডাকের জন্য নামটা হয়নি?”

    হাসল ওরা। “তাও হতে পারে।”

    “কিন্তু গর্জনতলাতে কেন যাচ্ছি আমরা? মানে ওই জায়গাটাতেই কেন যাচ্ছি, অন্য কোথাও কেন নয়?”

    “সে আমার বাবার জন্য সার,” বলল কুসুম।

    “তোর বাবার জন্য?”

    “হ্যাঁ। অনেক বছর আগে ওই দ্বীপটায় এসে বাবা একবার প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল।”

    “তাই নাকি? কী হয়েছিল?”

    “জিজ্ঞেস করলেন বলে বলছি স্যার। কিন্তু আমি জানি আপনি বিশ্বাস করবেন না, হয়তো হাসবেন।

    “সে অনেক কাল হল, আমার জন্মের বহু বহু দিন আগে; বাবা একদিন জেলে ডিঙি নিয়ে একা পড়েছিল ঝড়ে–ভীষণ তুফানে। সেই তুফানের তোড় ফুঁসে ফুঁসে আসে, তার ঝাঁপটের ঘায়ে, নৌকো ভেঙে ভেসে গেল কুটোর মতন। হাবুডুবু খেতে খেতে গাছের এক গুঁড়ি ধরে কোনওমতে বাবা বেঁচে গেল প্রাণে। ঢেউয়ের ধাক্কায় আর জলের টানেতে, গিয়ে পৌঁছল সেই গর্জনতলা। গাছে চড়ে উঠে বসে গামছার পাকে বাঁধল ডালের সাথে নিজের শরীর। হু হু শব্দে ধেয়ে আসে ঝড়ের ঝাঁপট, দু’হাতে আঁকড়ে ধরে বাবা সেই ডাল। আচমকাই থেমে গেল সব তাণ্ডব, নিশ্চুপ হয়ে গেল গোটা জঙ্গল। তুফানের ধাক্কায় নুয়ে পড়া গাছ সব ফের খাড়া হল, শান্ত হল নদী। চাঁদ নেই আকাশেতে, কালিমাখা রাত, নিঝুম আঁধারে চোখ অন্ধ মনে হয়।

    “হঠাৎ প্রচণ্ড এক বাজ পড়ে যেন। থরথর কেঁপে ওঠে সব গাছপালা ভীষণ এক গর্জনে। আর তার সাথে নাকে আসে বদগন্ধ, বাবা শিউরে ওঠে। নাম নেওয়া মানা যার সেই জানোয়ার ওত পেতে আছে কোথা শিকারের খোঁজে। আতঙ্কে অজ্ঞান বাবা গাছের ওপরে কোনওমতে ঝুলে থাকে গামছার বাঁধনে। সেই অচেতন স্বপ্নে আসে বনবিবি, বলে, ‘ওরে মুখ, তোর কেন এত ভয়? আমাকে বিশ্বাস কর, এ দ্বীপ আমার। যে মানুষ মনে সাচ্চা, এই জঙ্গলে তার কোনও ভয় নেই, আমি আছি পাশে।

    “ভোরের আলো ফুটলেই দেখিস তখন ভাটার সময় হবে। দ্বীপ পার হয়ে উত্তর দিক পানে হেঁটে চলে যাস। নজর রাখিস জলে, অধৈর্য হস নে দেখবি এ জঙ্গলে তুই একা নোস। আমি আছি কাছাকাছি। দূতেরা আমার তোর পাশে পাশে আছে। তারাই আমার চোখ আর কান সেটা মনে রেখে দিস। যতক্ষণ ভাটা চলে সঙ্গ দেবে তারা। তারপর আসবে তোর মুক্তির সময়। জেলে ডিঙি ভেসে যাবে ওই পথ দিয়ে। তোকে নিয়ে গিয়ে তারা পৌঁছে দেবে ঘরে।”

    এত সুন্দরভাবে বলা এরকম একটা গল্প শুনে মুগ্ধ না হয়ে উপায় কী? হেসে জিজ্ঞেস করলাম, “এরপর তুই নিশ্চয়ই বলবি যে পরদিন সকালে হুবহু ওই রকমই সব ঘটেছিল?”

    “ঘটেছিল তো সার। যেমন যেমন স্বপ্নে দেখেছিল বাবা, ঠিক সেই রকম। পরে একবার ওই দ্বীপে ফিরে গিয়ে বনবিবির একটা থান তৈরি করে এসেছিল বাবা। যতদিন বাবা বেঁচেছিল, প্রতি বছর বনবিবির পুজোর সময়ে সবাই মিলে আমরা গর্জনতলায় আসতাম।”

    আমার হাসি পেয়ে গেল। বললাম, “আর ওই দেবীর দূতদেরও নিশ্চয়ই দেখতে পেয়েছিল তোর বাবা?”

    “দেখেছিল তো। একটু পরেই আপনি নিজেও দেখতে পাবেন সার,” বলল কুসুম।

    এবার হো হো করে হেসে ফেললাম আমি। “আমিও দেখতে পাব? আমার মতো অবিশ্বাসী নাস্তিক? আমার ওপরে কি এত দয়া হবে দেবীর?”

    “হ্যাঁ সার,” আমার ব্যঙ্গ উপেক্ষা করে কুসুম বলল। “কোথায় খুঁজতে হবে জানা থাকলে যে কেউই দেখতে পায় বনবিবির দূতদের।”

    ছাতার আড়ালে বসে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি। তন্দ্রা ভাঙল কুসুমের ডাকে। পৌঁছে গেছি আমরা গর্জনতলায়।

    ধড়মড় করে উঠে বসলাম। এতক্ষণ ধরে এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করছি আমি–কখন কুসুমের বিশ্বাসী মনের ভুল ভেঙে দেওয়ার সুযোগ পাব। ভাটা পড়ে গেছে। বাঁকের মুখে খানিকটা জায়গায় স্থির হয়ে আছে জল–ঠিক সেইখানটাতেই এসে থেমেছে আমাদের নৌকো। ডাঙা এখনও খানিকটা দূরে। দূত-টুত বা অন্য কোনও দৈব দৃশ্য কিছুই দেখা যাচ্ছে না কোথাও। নিজের ওপর একটু খুশি না হয়ে পারলাম না। জয়ের আনন্দ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে করতে কুসুমকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী রে, কোথায় গেল তোর দেবীর দূতেরা?”

    “দেখতে পাবেন সার, একটু সবুর করুন।”

    হঠাৎ একটা অদ্ভুত আওয়াজ কানে এল–আমার মনে হল যেন সশব্দে নাক ঝাড়ছে কেউ। সবিস্ময়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম কিছু একটা অদৃশ্য হয়ে গেল জলের তলায়। শেষ মুহূর্তে কালো চামড়ার একটু আভাস শুধু চোখে পড়ল।

    “কী ওটা?” আশ্চর্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। “কোথা থেকে এল? কোথায় চলে গেল?”

    “ওই যে,” অন্য আরেক দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল ছোট্ট ফকির। “ওইখানে।”

    ঘুরে দাঁড়িয়ে আরেকটা ওরকম জীব দেখতে পেলাম আমি। জলের মধ্যে ডিগবাজি খাচ্ছে। একটা তিনকোনা পাখনাও দেখতে পেলাম এক ঝলক। আগে কখনও দেখিনি, কিন্তু বুঝতে পারলাম ওগুলো কোনও এক জাতের ডলফিন হবে। তবে এখানকার নদীতে যে শুশুক দেখেছি আমি, তার সঙ্গে এদের তফাত আছে। শুশুকের পিঠে এরকম কোনও পাখনা হয় না।

    “ওগুলো কী? জিজ্ঞেস করলাম আমি। “কোনও এক ধরনের শুশুক নিশ্চয়ই।”

    এবার কুসুমের হাসার পালা। “আমি আমার নিজের মতো নাম দিয়েছি ওদের। আমি ওদের বনবিবির দূত বলি।” ওরই জিত। অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই।

    যতক্ষণ নৌকোটা ওখানে দাঁড়িয়ে রইল, জন্তুগুলো খেলা করে বেড়াতে লাগল আমাদের চারপাশে। কেন এখানে এসেছে ওরা? এতক্ষণ ধরে একই জায়গায় রয়েছেই বা কেন? জবাব খুঁজে পেলাম না। তারপর হঠাৎ এক সময় দেখলাম একটা ডলফিন জল থেকে মাথা তুলে সোজা আমার দিকে তাকাল। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম কী করে কুসুম এত সহজে জন্তুগুলোকে অন্য কিছু বলে বিশ্বাস করতে পেরেছে। ওর চোখে যা বনবিবির চিহ্ন বলে মনে হয়েছে, আমার কাছে তাই মনে হল কবির চোখের দৃষ্টি। মনে হল সে চোখ যেন আমাকে বলছে :

    “বোবা পশু শান্ত ঘাড় উঁচু করে

    আমাদের চুলচেরা দেখে নিতে চায়।

    এবং তারই আরেক নাম বুঝি নিয়তি…”

  • মেঘা

    মেঘা

    মেঘা

    সকালে একটা সাইকেল ভ্যান ভাড়া করে ফকিরের জোগাড় করা ভটভটিটা দেখতে গেল পিয়া আর কানাই। ইট-বসানো রাস্তা দিয়ে ঝাঁকুনি খেতে খেতে গ্রামের দিকে চলেছে। ভ্যান। পিয়া বলল, “ওই নৌকোর মালিককে আপনি চেনেন বলছিলেন না? কীরকম লোক ও?”

    “আমি যখন ছোটবেলায় এখানে এসেছিলাম তখন ওর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আমার,

    কানাই বলল। “ওর নাম হরেন। হরেন নস্কর। খুব যে চিনি সেটা বলা ঠিক হবে না, তবে এটুকু বলতে পারি যে আমার মেসোর সঙ্গে ওর ভালই যোগাযোগ ছিল।”

    “আর ফকিরের কে হয় ও?”

    “ধর্মবাপ বলতে পারেন,” জবাব দিল কানাই। “ফকিরের মা মারা যাওয়ার পর হরেনের কাছেই থাকত ও।”

    বাঁধের গোড়ার কাছে ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল হরেন। ফকির দাঁড়িয়ে ছিল পাশে। এক নজর দেখেই হরেনকে চিনতে পারল কানাই–সেই গাঁট্টাগোট্টা চেহারা, চওড়া কঁধ। শরীরে খানিকটা চর্বি জমেছে এই ক’বছরে। ভুড়ি হয়েছে একটু। ফলে বুকের ছাতিটা আগের চেয়েও চওড়া মনে হচ্ছে। বয়েসের সঙ্গে গম্ভীর হয়েছে মুখের ভাঁজগুলি–চোখ দুটো দেখাই যায় না প্রায়। তবে সাথে সাথে একটা ভারিক্কি ভাবও এসেছে চেহারায়। হাবভাবে যূথপতির গাম্ভীর্য। দেখলেই বোঝা যায় এ মানুষটা আশেপাশের সব লোকেদের শ্রদ্ধার পাত্র। পোশাক-আশাকেও স্বাচ্ছল্যের আভাস ডোরাকাটা লুঙ্গিটা সযত্নে মাড় দিয়ে ইস্ত্রি করা, গায়ের জামা ধবধবে সাদা। হাতে ভারী মেটাল স্ট্র্যাপের ঘড়ি, জামার পকেট থেকে একটা সানগ্লাস উঁকি দিচ্ছে।

    “আমাকে চিনতে পারছেন হরেনদা?” হাত জোড় করে নমস্কারের ভঙ্গি করল কানাই। “আমি সারের ভাগ্নে।”

    “চিনব না কেন?” হরেন নিরুত্তাপ। “বাড়ি থেকে আপনাকে শাস্তি দিয়ে এখানে পাঠানো হয়েছিল সত্তর সালে। সেই আগুনমুখা ঝড়ের বছর। তবে আপনি তো বোধহয় ঝড়ের আগেই ফিরে গিয়েছিলেন।”

    “ঠিক বলেছেন। তা আপনার ছেলেমেয়েরা কেমন আছে? তখন তো বোধহয় তিনটি ছিল, তাই না?”

    “ওরা নিজেরাই এখন ছেলেপুলের বাপ-মা হয়ে গেছে,” হরেন বলল। “এই যে, এ হল আমার এক নাতি,” স্মার্ট নীল টি-শার্ট আর জিনস পরা একটা ছেলের দিকে ইশারা করল ও। “ওর নাম নগেন। এই সবে ইস্কুল শেষ করেছে। ও-ও যাবে আমাদের সঙ্গে নৌকোয়।”

    “বেশ বেশ,” কানাই বলল। “এবার এনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। ইনি হলেন শ্রীমতী পিয়ালি রায়, বৈজ্ঞানিক। ইনিই আপনার ভটভটিটা ভাড়া করছেন।”

    পিয়ার দিকে তাকিয়ে মাথা ঝোকাল হরেন। বলল, “চলুন তা হলে, ভটভটিটা দেখে নিন একবার।”

    হরেনের পেছন পেছন বাঁধের ওপর উঠে এল পিয়া আর কানাই। সামনে নদীর বুকের ওপর ঢোকা লম্বাটে একটা বালির চড়া দেখা যাচ্ছে। এটাই লুসিবাড়ির জেটি। তার পাশে নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে হরেনের ভটভটি। তার গলুইয়ের সামনে বড় বড় সাদা অক্ষরে লেখা ‘এম ভি মেঘা।

    এমনিতে নজরে ওঠার মতো কিছু নয় নৌকোটা। কেমন একটু অদ্ভুত ভাবে ভেসে আছে জলের ওপর। জায়গায় জায়গায় রং চটে গেছে, এখানে ওখানে বেড়ানো–পুরনো টিনের খেলনার মতো দেখতে খানিকটা। হরেনের কিন্তু ওর ভটভটি নিয়ে গর্বের শেষ নেই। বিশদভাবে তার গুণকাহিনি বর্ণনা করল ও। এ পর্যন্ত নাকি বহু সওয়ারি বয়েছে এই মেঘা। কখনও কেউ মন্দ বলতে পারেনি। কত পিকনিক পার্টিকে নিয়ে গেছে পাখিরালায়, কত বর আর বরযাত্রীকে নিয়ে দূর দূর দ্বীপে পৌঁছে দিয়েছে সেসব গল্প কানাইকে শোনাল হরেন। খুব একটা অবিশ্বাস্য মনে হল না গল্পগুলো। কারণ বাইরে থেকে দেখে জরাজীর্ণ মনে হলেও, জায়গা অনেক আছে নৌকোটায়। একটু গাদাগাদি হলেও, প্রয়োজন হলে যে এ ভটভটিতে অনেক লোক উঠতে পারে সে ব্যাপারে সন্দেহের বিশেষ কোনও কারণ দেখা গেল না। নৌকোর ভেতর দিকটা খানিকটা বড়সড় একটা গুহার মতো। সারি সারি বেঞ্চি পাতা। টানা লম্বা জানালায় হলুদ তেরপলের পর্দা ঝুলছে। গুহার এক প্রান্তে ইঞ্জিন ঘর, আরেক প্রান্তে রান্নার জায়গা। ওপরে একটা ছোট ডেক, সারেঙের ঘর, আর ছোট্ট ছোট্ট দুটো কেবিন। শেষ প্রান্তে টিন দিয়ে ঘেরা একটা বাথরুম। সেখানে মেঝেতে একটা গর্ত ছাড়া আর কিছুই নেই, তবে মোটের ওপর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।

    “দেখতে আহামরি কিছু নয়,” স্বীকার করল কানাই। “তবে কাজ চলে যাবে মনে হয়। ওপরের কেবিনদুটোর একটায় আপনি থাকতে পারবেন, আর একটায় আমি। তা হলে ইঞ্জিনের আওয়াজটাও কানে লাগবে না, আর ধোঁয়াও খেতে হবে না।”

    “আর ফকির কোথায় থাকবে?” পিয়া জিজ্ঞেস করল।

    “ফকির নীচে থাকবে। হরেন আর ওর হেল্পার, মানে ওর নাতির সঙ্গে।”

    “ব্যাস, মাত্র দু’জন? আর কোনও লোকজন লাগবে না?” প্রশ্ন করল পিয়া।

    “নাঃ। বেশ ফাঁকায় ফাঁকায় যাওয়া যাবে,” বলল কানাই।

    আরেকবার সন্দেহের দৃষ্টিতে মেঘার দিকে তাকাল পিয়া। “রিসার্চের পক্ষে আদর্শ নৌকো বলা যাবে না এটাকে, তবে মনে হয় মোটামুটি চালিয়ে নিতে পারব আমি। একটাই শুধু সমস্যা আছে।”

    “কী সমস্যা?”

    “এই গামলাটায় চড়ে ডলফিনগুলোকে ফলো করব কী করে সেটাই ভাবছি। সরু খাঁড়ি-টাড়িতে তো এটা ঢুকতে পারবে না।”

    পিয়ার প্রশ্নটা হরেনকে অনুবাদ করে শোনাল কানাই। হরেনের জবাবটা আবার ইংরেজিতে বলে দিল পিয়াকে : ফকিরের ডিঙিটাও যাবে ওদের সঙ্গে। দড়ি দিয়ে মেঘার সঙ্গে বাঁধা থাকবে ওটা। তারপর পিয়ার কাজের জায়গায় পৌঁছলে ভটভটিটা এক জায়গায় অপেক্ষা করবে, আর পিয়া ফকিরের সঙ্গে ডিঙিতে করে ডলফিনদের পেছন পেছন যেতে পারবে।

    “সত্যি?” এই জবাবটাই শুনতে চাইছিল পিয়া। “এই একটা জায়গায় অন্তত ফকির আমার থেকে এগিয়ে।”

    “কী মনে হয়? চলবে?” জিজ্ঞেস করল কানাই।

    “চলবে না মানে? চমৎকার আইডিয়া,” পিয়া বলল। “ছোট ডিঙিতেই ডলফিনদের ফলো করা বেশি সুবিধার।”

    কানাইয়ের মধ্যস্থতায় ভটভটির ভাড়া-টাড়াগুলো ঠিক করা হয়ে গেল চটপট। ভাড়ার খানিকটা অংশ দিতে চাইল কানাই, কিন্তু কিছুতেই রাজি হল না পিয়া। শেষে রফা হল রসদ যা লাগবে তার খরচটা দু’জনে ভাগ করে নেবে। হরেনকে কিছু টাকা তক্ষুনি দিয়ে দেওয়া হল, চাল, ডাল, তেল, চা, মিনারেল ওয়াটার, গোটাদুয়েক মুরগি আর বিশেষ করে পিয়ার জন্য প্রচুর পাউডার দুধ কেনার জন্য।

    “ওঃ, এত এক্সাইটেড লাগছে আমার,” গেস্ট হাউসের পথে ফিরতে ফিরতে বলল পিয়া। “মনে হচ্ছে এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ি। গেস্ট হাউসে ফিরে আজ সকালেই জামাকাপড়গুলো কেচে ফেলব।”

    “আমিও মাসিকে গিয়ে খবরটা দিই। দিনকয়েক যে থাকব না সেটা জানাই। মাসি আবার কী বলবে কে জানে,” কানাই বলল।

    দরজা খোলাই ছিল। ঘরে ঢুকে কানাই দেখল টেবিলের সামনে বসে আছে নীলিমা, হাতে চায়ের কাপ। হাসিমুখে তাকাল কানাইয়ের দিকে। কিন্তু তারপরেই হাসি মিলিয়ে গিয়ে ভাজ পড়ল কপালে। “কী ব্যাপার রে কানাই? কিছু গণ্ডগোল হয়েছে?”

    “না, গণ্ডগোল কিছু হয়নি,” একটু অস্বস্তির সুর কানাইয়ের গলায়। “তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছিলাম মাসি। আমি কয়েক দিন থাকব না।”

    “ফিরে যাচ্ছিস নাকি?” আশ্চর্য হয়ে বলল নীলিমা। “এইতো মাত্র এলি, এখনি চলে যাবি?”

    “ফিরে যাচ্ছি না গো,” কানাই বলল। “তুমি রাগ কোরো না মাসি, আসলে পিয়া একটা ভটভটি ভাড়া করেছে ওর সার্ভের জন্য। তো, ওর একজন দোভাষীর দরকার।”

    “ও, আই সি,” নীলিমা বলল ইংরেজিতে। “তার মানে তুই ওর সঙ্গে যাচ্ছিস?”

    নির্মলের স্মৃতি নীলিমার কাছে যে কতখানি, সেটা ভাল করেই জানে কানাই। নরম গলায় তাই বলল, “ভাবছিলাম নোটবইটাও নিয়ে যাব সঙ্গে। অবশ্য যদি তোমার আপত্তি না থাকে।”

    “সাবধানে রাখবি তো?”

    “নিশ্চয়ই।”

    “কতটা পড়লি এ কয়দিনে?”

    “অনেকটাই পড়া হয়ে গেছে,” জবাব দিল কানাই। “ফিরে আসার আগেই শেষ হয়ে যাবে মনে হয়।”

    “বেশ। এই নিয়ে আর এখন কিছু জিজ্ঞেস করব না তোকে,”নীলিমা বলল। “কিন্তু একটা কথা বল কানাই, ঠিক কোথায় যাচ্ছিস তোরা?”

    কানাই মাথা চুলকোতে লাগল। কোথায় যে যাওয়া হচ্ছে সেটা তো ও জানেই না। জিজ্ঞেস করার কথাটাও মাথায় আসেনি। কিন্তু কোনও ব্যাপারেই নিজের অজ্ঞানতা প্রকাশ করাটা স্বভাবে নেই ওর। তাই যে নদীর নাম মুখে এল বলে দিল মাসিকে। “মনে হয় তারোবাঁকি নদী পর্যন্ত যাব আমরা। একেবারে ফরেস্টের ভেতরে।”

    “জঙ্গলে যাচ্ছিস?” একটু চিন্তিত চোখে কানাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল নীলিমা।

    “তাই তো জানি,” কানাইয়ের গলায় অনিশ্চয়তা।

    চেয়ার ছেড়ে উঠে ওর সামনে এসে দাঁড়াল নীলিমা। “কানাই, ভাল করে ভেবেচিন্তে যাচ্ছিস তো?”

    “হ্যাঁ, ভাবব না কেন? ভেবেছি তো,” নিজেকে হঠাৎ একটা স্কুলে-পড়া ছেলের মতো মনে হল কানাইয়ের।

    “আমার মনে হয় না তুই ভেবেচিন্তে যাচ্ছিস,” নীলিমা কোমরে হাত রাখল। “অবশ্য তোকে দোষ দেওয়াও যায় না। আমি জানি, বাইরের লোকেরা ধারণাই করতে পারে না কী ধরনের বিপদ হতে পারে এখানকার জঙ্গলে।”

    “মানে তুমি বাঘের কথা বলছ?” কানাইয়ের ঠোঁটে মুচকি হাসির আভাস। “পিয়ার মতো একটা তাজা সুস্বাদু খাবার মুখের সামনে থাকলে বাঘে আমার দিকে ফিরেও তাকাবে না।”

    “কানাই!” এক ধমক দিল নীলিমা। “এটা ঠাট্টার বিষয় নয়। আমি জানি, এই টুয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরিতে দাঁড়িয়ে নিজেকে বাঘের শিকার বলে কল্পনা করাটা তোর পক্ষে সহজ নয়, কিন্তু বাঘের অ্যাটাক এই সুন্দরবনে কোনও অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। প্রতি সপ্তাহে অন্তত এ রকম দু-তিনটে ঘটনা এখানে ঘটে।”

    “সে কী! এত আকছার?” কানাই জিজ্ঞেস করল।

    “হ্যাঁ। তার চেয়ে বেশি বই কম নয়। দাঁড়া, একটা জিনিস তোকে দেখাই,” কানাইয়ের কনুই ধরে ঘরের অন্যপ্রান্তে দেওয়ালের গায়ের সারি সারি বইয়ের তাকগুলোর কাছে নিয়ে গেল নীলিমা। “দেখ,” নীলিমা একটা ফাইলের বান্ডিলের দিকে ইশারা করল। “বছরের পর বছর ধরে লোকের মুখে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে আমি এই আনঅফিশিয়াল রেকর্ড রেখে যাচ্ছি। আমার হিসেব মতো প্রতি বছর একশোরও বেশি মানুষ এখানে বাঘের পেটে যায়। এটা কিন্তু শুধু সুন্দরবনের ইন্ডিয়ান অংশটার কথা বলছি আমি। বাংলাদেশের ভাগটাও যদি ধরিস তা হলে বোধহয় সংখ্যাটা দ্বিগুণেরও বেশি গিয়ে দাঁড়াবে। সব মিলিয়ে হিসেব করলে দেখা যাবে প্রতি একদিন অন্তর একটা করে মানুষ বাঘে নেয় এই সুন্দরবনে। অন্তত।”

    চোখ কপালে উঠে গেল কানাইয়ের। “বাঘের হাতে যে মানুষ মরে এখানে সেটা জানতাম, কিন্তু সংখ্যাটা এত বেশি সেটা ধারণা ছিল না।”

    “সেটাই সমস্যা,” নীলিমা বলল। “কেউই জানে না ঠিক কত লোক বাঘের কবলে পড়ে সুন্দরবনে। কোনও হিসেবই ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়। কিন্তু একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত–সরকারি খাতাপত্রে যা হিসেব দেখানো হয়, সংখ্যাটা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি।”

    কানাই মাথা চুলকাল। “এই বাড়াবাড়িটা নিশ্চয়ই রিসেন্ট ব্যাপার। লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার জন্যও তো হতে পারে? হয়তো বাঘের থাকার জায়গায় মানুষের হাত পড়ছে, বা ওরকম কিছু কারণে?”

    “কী যে বলিস,” নীলিমা একটু বিরক্ত হল। “শত শত বছর ধরে এইভাবে মানুষ মরছে এখানে। লোকসংখ্যা যখন এখনকার তুলনায় খুবই সামান্য ছিল তখনও একই ঘটনা ঘটেছে। এইটা দেখ,” বুড়ো আঙুলের ওপর ভর দিয়ে ওপরের তাক থেকে একটা ফাইল টেনে নামাল নীলিমা। তারপর নিয়ে গেল নিজের টেবিলে। “দেখ। এখানে দেখ। দেখতে পাচ্ছিস সংখ্যাটা?”

    খোলা পাতাটার দিকে তাকিয়ে কানাই দেখল নীলিমা যেখানে আঙুল রেখেছে ঠিক তার ওপরে লেখা রয়েছে একটা সংখ্যা : ৪,২১৮।

    “সংখ্যাটা লক্ষ কর কানাই,” বলল নীলিমা। “এটা হল মাত্র ছ’বছরের হিসেব। ১৮৬০ থেকে ১৮৬৬-র মধ্যে এই এতগুলো তোক বাঘের পেটে গিয়েছিল এই নিম্নবঙ্গে। এটা জে. ফেরারের দেওয়া হিসেব। এই ফেরার ছিলেন একজন ইংরেজ প্রকৃতিবিদ। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার’ নামটা ওনারই দেওয়া। একবার কল্পনা কর কানাই–চার হাজারেরও বেশি মানুষ মরেছে মাত্র ছ’বছরে। গড়ে প্রতিদিন দু’জন করে। একশো বছরে সংখ্যাটা তা হলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে একবার ভেবে দেখ।”

    “ষাট-সত্তর হাজার।”ভুরু কুঁচকে ফাইলের খোলা পাতাটার দিকে তাকিয়ে রইল কানাই।

    “বিশ্বাস করা কঠিন।”

    “কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এটা নির্জলা সত্যি,” নীলিমা বলল। “তোমার কী মনে হয় মাসি? কেন এরকম হয়?” জিজ্ঞেস করল কানাই। “কী হতে পারে কারণটা?”

    চেয়ারে বসে পড়ল নীলিমা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “জানি না রে কানাই। এত রকম সব থিয়োরি আছে এই নিয়ে, কোনটা যে বিশ্বাস করব বুঝে উঠতে পারি না।”

    “তবে একটা বিষয়ে সব তাত্ত্বিকরাই এক মত, এই ভাটির দেশের বাঘের স্বভাবচরিত্র অন্য সব জায়গার বাঘেদের থেকে একেবারে আলাদা,” বলল নীলিমা। অন্যান্য জায়গার বাঘেরা মানুষকে আক্রমণ করে একমাত্র খুব বিপাকে পড়লে–পঙ্গু হয়ে গেলে বা কোনও কারণে অন্য কোনও শিকার ধরতে অক্ষম হয়ে গেলে। কিন্তু ভাটির দেশের বাঘের জন্য সে তত্ত্ব আদৌ খাটে না। স্বাস্থ্যবান বা কমবয়সি বাঘেদেরও এখানে মানুষখেকো হতে দেখা যায়। কারও কারও মতে এর কারণ হল এখানকার অদ্ভুত পরিবেশতন্ত্র–একমাত্র এই জঙ্গলেই বাঘেদের চারণভূমির অর্ধেকের বেশি অংশ প্রতিদিন ডুবে যায় জোয়ারের জলে। জল তাদের ঘ্রাণচিহ্ন ধুয়ে দেয়, ফলে যে প্রবৃত্তিগত ক্ষমতায় বাঘেরা নিজেদের এলাকা চিনে নিতে পারে তা ঘুলিয়ে যায়। সেইজন্যেই এত হিংস্র হয়ে ওঠে এখানকার বাঘেরা। সুন্দরবনের বাঘের হিংস্রতার কারণ সম্পর্কে যে কয়েকটা তত্ত্বের কথা শোনা যায় তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় নীলিমার। কিন্তু এই তত্ত্ব মেনে নিলেও সে ব্যাপারে করার তো কিছু নেই।

    বছর কয়েক পর পরই কেউ না কেউ একটা না একটা নতুন তত্ত্ব এনে হাজির করে। আর মাঝে মাঝে তার সাথে থাকে অদ্ভুত সব সমাধানের উপায়। ১৯৮০-র দশকে একবার এক জার্মান প্রকৃতিবিদ বললেন নরমাংসের প্রতি এখানকার বাঘেদের এই আসক্তির সঙ্গে সুন্দরবনে মিষ্টি জলের অভাবের সম্পর্ক আছে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের খুব মনে ধরেছিল সেই থিয়োরি। বাঘেদের জন্য চটপট কয়েকটা মিষ্টি জলের পুকুর খোঁড়া হয়ে গেল জঙ্গলের ভেতরে।

    “ভাব একবার কাণ্ডটা!” নীলিমা বলল। “বাঘের জল খাওয়ার জন্য পুকুর! আর সেটা করা হচ্ছে এমন এক জায়গায় যেখানে মানুষের তেষ্টার কথাটা কেউ ভাবেও না!”

    সে যাই হোক, এই পুকুর-টুকুর খোঁড়া সবই শেষ পর্যন্ত বৃথা গেল। বিন্দুমাত্র কোনও লাভ হল না। বাঘের আক্রমণ যেমন চলছিল চলতেই থাকল।

    “তার কিছুদিন পর এল আরেকটা নতুন থিয়োরি। ইলেকট্রিক শক,” নীলিমার চোখের কোণে চিকচিক করছে হাসি।

    “এক বিশেষজ্ঞের মনে হল পাভলভ তার কুকুরদের যেভাবে একটা নিয়মে অভ্যস্ত করেছিলেন, সেই একই পদ্ধতিতে সুন্দরবনের বাঘেরও অভ্যাস পালটে দেওয়া যেতে পারে। মাটি দিয়ে অনেকগুলো প্রমাণ সাইজের মানুষের মূর্তি বানানো হল। তারপর সেগুলোর গায়ে তার জড়িয়ে সেই তার জুড়ে দেওয়া হল গাড়ির ব্যাটারির সঙ্গে। এই বৈদ্যুতিক মানুষ-পুতুলগুলোকে এবার বসানো হল জঙ্গলের মধ্যে বিভিন্ন দ্বীপে। প্রথম প্রথম কিছুদিন মনে হল ওষুধ ধরেছে। লোকের মনে ফুর্তি আর ধরে না। কিন্তু কয়েকদিন পরেই আবার শুরু হল হানা। মূর্তিগুলো যেমন কে তেমন পড়ে রইল, আর আগের মতোই ফের মরতে লাগল মানুষ।

    “আরেকবার, এক ফরেস্ট অফিসারের মাথায় এরকমই আরেকটা অদ্ভুত আইডিয়া এল। জঙ্গলে যারা যাবে, তারা যদি মাথার পেছনদিকে একটা মুখোশ পরে নেয় তা হলে কেমন হয়? যুক্তিটা হল–বাঘে তো মানুষকে সাধারণত পেছনদিক থেকে আক্রমণ করে, তাই ওই একজোড়া রং করা চোখকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলে নিশ্চয়ই সেখান থেকে পালিয়ে যাবে। এই থিয়োরিটাও সকলের খুব পছন্দ হল। প্রচুর মুখোশ তৈরি করে বিলি করা হল সর্বত্র। সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হল অসাধারণ এক এক্সপেরিমেন্ট শুরু হয়েছে সুন্দরবনে। আইডিয়াটার চিত্রগুণ লোকের বেশ মনে ধরল। একের পর এক টেলিভিশন ক্যামেরা এল, এমনকী কয়েকজন পরিচালক ফিল্মও বানিয়ে ফেললেন গোটাকতক।

    “কিন্তু বাঘেদের দিক থেকে আদৌ কোনও সহযোগিতা পাওয়া গেল না। বোঝাই গেল, মুখ আর মুখোশের তফাত ধরতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হচ্ছে না তাদের।”

    “মানে তুমি বলতে চাইছ যে এই সবকিছু বুঝে শুনে হিসেব করে শিকার ধরার ক্ষমতা আছে এখানকার বাঘের?” জিজ্ঞেস করল কানাই।

    “জানি না রে কানাই। আমি তো পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে আছি, কিন্তু একবারও বাঘ দেখিনি। দেখতে চাইও না। এখানকার লোকে যেটা বলে সেটা আমি খুব মানিঃ জঙ্গলে বাঘ দেখে সে গল্প বলার জন্য জ্যান্ত ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। সেইজন্যেই তোকে বলছি কানাই, খেয়াল হল আর জঙ্গলে চলে গেলাম, সেরকম করা মোটেই উচিত নয়। যাওয়ার আগে ভাল করে একবার ভেবে দেখিস, সত্যিই তোর যাওয়ার কোনও প্রয়োজন আছে কি না।”

    “কিন্তু আমার তো জঙ্গলে যাওয়ার কোনও প্ল্যান নেই,” কানাই বলল। “আমি তো থাকব ভটভটিতে। সেখানে আর বিপদ কেন হবে?”

    “ভটভটিতে থাকলে কোনও বিপদ হতে পারে না ভেবেছিস?”

    “হ্যাঁ। আমরা তো জলের ওপরে থাকব। পাড় থেকে অনেক দূরে। সেখানে আর কী হবে?

    “তা হলে একটা ঘটনার কথা বলি তোকে। ন’বছর আগে এই লুসিবাড়ি থেকেই একবার একটা বাচ্চা মেয়েকে বাঘে নিয়েছিল। পরে দেখা গেল সে বাঘটা পুরো বিদ্যা নদীর মোহনা সাঁতরে এসেছিল এখানে। তারপর শিকার ধরে আবার ফিরে গিয়েছিল মোহনা পেরিয়ে। দূরত্বটা কত জানিস?”

    “না।”

    “ছয় ছয় বারো কিলোমিটার, যাতায়াত মিলিয়ে। আর সুন্দরবনের বাঘের পক্ষে সেটা কোনও দূরত্বই নয়। একটানা তেরো কিলোমিটার পর্যন্ত সাঁতরে গিয়ে শিকার ধরেছে বাঘ সেরকম ঘটনাও ঘটেছে এখানে। তাই কখনওই ভাবিস না যে জলের ওপর আছিস বলে বিপদের কোনও সম্ভাবনা নেই। নৌকো আর ভটভটিতে বাঘের হানার কথা আকছারই শোনা যায় এখানে। এমনকী মাঝনদীতেও। প্রত্যেক বছর বেশ কয়েকটা ঘটনা ঘটে এরকম।”

    “সত্যি?”

    “হ্যাঁ,” মাথা নাড়ল নীলিমা। “আমার কথা যদি বিশ্বাস না হয় তা হলে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের যে-কোনও লঞ্চ দেখলেই বুঝতে পারবি কতখানি ঝুঁকি নিয়ে চলাফেরা করতে হয় এখানে। একেকটা লঞ্চ একেবারে ভাসমান দুর্গের মতো। আমার কবজির মতো ইয়া মোটা মোটা লোহার গরাদ দেওয়া জানালায়। ফরেস্ট গার্ডদের সঙ্গে বন্দুক থাকা সত্ত্বেও এই রকম দুর্ভেদ্য করে বানানো হয় লঞ্চগুলিকে। তোর ওই ভটভটির জানালায় কি কোনও গরাদ-টরাদের বালাই আছে?”

    মাথা চুলকাল কানাই। “মনে পড়ছে না ঠিক।”

    “কিছু বলার নেই,” বলল নীলিমা। ব্যাপারটা লক্ষ করারই কোনও প্রয়োজন মনে করিসনি তুই। কোন বিপদের মধ্যে পা বাড়াচ্ছিস সেটা তুই বুঝতে পারছিস বলে মনে হচ্ছে না। জন্তু জানোয়ারের কথা যদি ছেড়েও দিই–এইসব ভটভটি আর নৌকোগুলোই তো সবচেয়ে বিপজ্জনক। প্রতি মাসে কোথাও না কোথাও একটা-দুটো নৌকোডুবি লেগেই আছে।”

    “তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পার মাসি। কোনওরকম কোনও ঝুঁকি নেব না আমি,” কানাই বলল।

    “কিন্তু একটা কথা তুই বুঝতে পারছিস না কানাই। আমার মনে হচ্ছে তুই নিজেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। অন্য সবাই কোনও না কোনও প্রয়োজনে যাচ্ছে, কিন্তু তুই তো যাচ্ছিস স্রেফ একটা খেয়ালের বশে। জঙ্গলে যাওয়ার কোনও দরকার তো তোর নেই।”

    “তা নয়, একটা কারণ আছে–” কিছু না ভেবেই কথাটা বলতে শুরু করেছিল কানাই। সচেতন হতে হঠাৎ থেমে গেল মাঝপথে।

    “কানাই? তুই কিছু লুকোচ্ছিস আমার কাছ থেকে?”

    “না না, সেরকম কিছু নয়,” কী বলবে ঠিক ভেবে উঠতে না পেরে মাথা নিচু করল কানাই।

    তীক্ষ্ণ চোখে বোনপোর দিকে তাকাল নীলিমা। “ওই মেয়েটা, তাই না? পিয়া?” কোনও জবাব দিল না কানাই। মুখ ঘুরিয়ে তাকাল অন্য দিকে। হঠাৎ গলার সুরে প্রচণ্ড শ্লেষ ঝরিয়ে নীলিমা বলল, “তোরা সব এক রকম, তোরা পুরুষরা। তোদের মতো হিংস্র প্রাণীরা যদি মানুষ বলে পার পেয়ে যায় তা হলে বাঘেদের আর কী দোষ?” এত তেতো সুর মাসির গলায় আগে কখনও শোনেনি কানাই।

    কানাইয়ের কনুইটা ধরে আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগোল নীলিমা। “সাবধান, কানাই খুব সাবধান, বলে রাখলাম।”

  • স্মৃতি

    স্মৃতি

    স্মৃতি

    ডলফিনগুলোর সঙ্গে আধঘণ্টাখানেক কাটানোর পর গর্জনতলার দিকে ফের নৌকো বাইতে শুরু করল হরেন। দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছে আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসতে লাগল ও।

    “এসে গেলাম প্রায়। ভয়টা এবার টের পাচ্ছেন সার?”

    “ভয়?” জিজ্ঞেস করলাম আমি। “ভয় কেন পাব হরেন? তুমি তো সঙ্গে আছ।”

    “ভয়টাই তো রক্ষা করে সার। ভয়ই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে এখানে। ভয় না থাকলে বিপদ দুগুণ বাড়ে।”

    “তার মানে তোমার ভয় করছে, তাই না?”

    “হ্যাঁ সার। বুঝতে পারছেন না আমার মুখ দেখে?”

    ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম সত্যিই ওর মুখে অচেনা একটা ছায়া দেখতে পাচ্ছি আমি–একটা সতর্ক সন্ত্রস্ত ভাব, চোখের দৃষ্টিতে একটা বাড়তি তীক্ষ্ণতা। কেমন যেন ছোঁয়াচে সেই গা ছমছমে ভাব। কয়েক মুহূর্ত পরেই আমারও বেশ ভয় ভয় করতে লাগল। হরেনকে বললাম আমিও ভয় পাচ্ছি ওর মতো।

    ‘হ্যাঁ গো হরেন, টের পাচ্ছি।”

    “ভাল সার, খুব ভাল।”

    পাড় যখন আর মিটার বিশেক দূরে, হঠাৎ নৌকো বাওয়া বন্ধ করে দাঁড় তুলে নিল হরেন। চোখ বন্ধ করে কী যেন বিড়বিড় করতে শুরু করল, আর নানা রকম অদ্ভুত ইশারা ইঙ্গিত করতে লাগল হাত দিয়ে।

    “কী করছে বল তো ও?” কুসুমকে জিজ্ঞেস করলাম আমি।

    “আপনি জানেন না সার? ও বাউলে তো, তাই বড় শেয়ালের মুখ বন্ধ করার মন্তর পড়ছে। সে জানোয়ার আমাদের যাতে কোনও ক্ষতি না করে তার ব্যবস্থা করছে ও।”

    অন্য সময় হলে হয়তো হেসে ফেলতাম। কিন্তু এখন তো আমি ভয় পেয়েছি : ভয়ের অভিনয় আর করতে হচ্ছে না আমাকে। আমি জানি যে মন্ত্র পড়ে বাঘের মুখ বন্ধ করার ক্ষমতা আসলে হরেনের নেই। যদি থাকত, তা হলে তো মন্ত্র পড়ে ঝড়ও ডেকে আনতে পারত। কিন্তু তা সম্ভব নয়। তবুও ওর অর্থহীন বিড়বিড়ানি শুনে মনে মনে স্বস্তি পেলাম আমি। ও তো কোনও বাহাদুরি দেখানোর চেষ্টা করছে না, জাদুকরের মতো সম্মোহনের ভঙ্গি করছে না, বরং একজন মিস্ত্রির মতো মন দিয়ে নিজের কাজটুকু করছে–শেষবারের মতো আরেকটু প্যাঁচ দিয়ে নিচ্ছে নাট বল্টগুলিতে, কিছু যাতে আলগা না রয়ে যায়। হরেনের এই ভাবটাই অনেকটা আশ্বস্ত করল আমাকে।

    “এবার মন দিয়ে আমার কথাটা শুনুন সার,” বলল হরেন। “আপনি তো আগে জঙ্গলে আসেননি, তাই একটা নিয়ম আপনাকে আমি বলে দিচ্ছি। এটা ভুলবেন না।”

    “কী নিয়ম হরেন?”

    “নিয়মটা হল, পাড়ে যখন উঠবেন, নিজের কোনও অংশ আপনি সেখানে রেখে আসতে পারবেন না। থুতু ফেলতে পারবেন না, পেচ্ছাপ করতে পারবেন না, পায়খানা করতে পারবেন না–যা খেয়ে এসেছেন তা এখানে দিয়ে যেতে পারবেন না। এই নিয়ম যদি না মানেন তা হলে কিন্তু আমাদের সক্কলের বিপদ।”

    কেউ হাসেনি, ঠাট্টাও কেউ করেনি আমাকে নিয়ে, কিন্তু কেমন যেন মনে হল হরেনের কথার সুরে একটা হালকা বিদ্রুপের ছোঁয়া রয়েছে।

    “না গো হরেন, কাজকম্ম সব সেরেই এসেছি। কোনও চিন্তা নেই। ভয়ে একেবারে অবশ না হয়ে পড়লে কিচ্ছু ছেড়ে যাব না এখানে,” বললাম আমি।

    “ঠিক আছে সার। শুধু বলে রাখলাম আপনাকে।”

    আবার দাঁড় বাইতে শুরু করল হরেন। ডাঙা আরেকটু কাছে আসার পর এক ধার দিয়ে লাফিয়ে জলে নেমে পাড়ের দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে লাগল নৌকোটাকে। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম ফকিরও নেমে গেল নদীতে হরেনের পেছন পেছন। জল ওর চিবুক ছুঁই-ছুঁই, কিন্তু তার মধ্যেই নৌকোর গায়ে কাধ ঠেকিয়ে ঠেলা দিতে লাগল গায়ের জোরে।

    ওরা কিন্তু কেউ অবাক হল না। ওর মা আমার দিকে ফিরে তাকাল। মনে হল ছেলের গর্বে যেন ফেটে পড়ছে। বলল, “দেখেছেন সার? নদী ওর রক্তে আছে।”

    মনে হল আমিও যদি বলতে পারতাম এভাবে! মনে হল যে-কোনও মূল্য দিতে রাজি আছি আমি, যদি এইভাবে একবার বলতে পারি আমার রক্তেও তো আছে নদী, সমস্ত পাপের ভার নিয়ে বয়ে চলেছে আমার শিরায় শিরায়। কিন্তু প্রতি মুহূর্তে নিজেকে আরও বেশি করে বহিরাগত মনে হতে লাগল আমার। তবুও, শেষ পর্যন্ত কাদায় যখন নামলাম, অনুভব করলাম এত দিন ভাটির দেশে থাকা আমার সার্থক হয়েছে। এই গভীর তলতলে পাঁকের মধ্যে পায়ের পাতাদুটোকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয় সেটুকু অন্তত শিখিয়েছে আমাকে এই দেশ। হরেন কুসুমদের পেছন পেছন নিরাপদেই পাড় পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছতে পারলাম আমি।

    এবার বাদাবনের ভেতরে ঢোকার পালা। হরেন চলেছে সবার আগে, দা দিয়ে ঝোঁপ জঙ্গল সাফ করতে করতে। তার পেছনে কুসুম–মাটির মূর্তিদুটো কাঁধের ওপর ধরা। আর আমি সবার শেষে। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে বেড়াজালের মতো ঘন এই বাদাবনের মধ্যে যদি একটা বাঘ এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার ওপরে, আমার তো কোনওদিকে পালাবারও ক্ষমতা থাকবে না। একেবারে খাঁচায়-পোরা তৈরি খাবার পেয়ে যাবে মুখের সামনে।

    কিন্তু কোনও অঘটন ঘটল না। একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পৌঁছলাম আমরা। কুসুম এগিয়ে গেল ঠাকুরের থানের দিকে। থান বলতে মাটি থেকে খানিকটা উঁচু একটা বেদি, চারপাশে বাঁশ দিয়ে ঘেরা, আর মাথায় একটা গোলপাতার ছাউনি। সেখানেই বনবিবি আর তার ভাই শা জঙ্গলির মূর্তিগুলি নামিয়ে রাখলাম আমরা। কুসুম খান কয়েক ধূপকাঠি জ্বালাল, আর জঙ্গল থেকে কিছু ফুলপাতা এনে মূর্তি দুটোর পায়ের কাছে রাখল হরেন।

    এই পর্যন্ত বেশ স্বাভাবিক ভাবেই চলছিল ঘটনাক্রম, সাধারণ ঘরোয়া পুজোআর্চায় যেমন হয়। ছেলেবেলায় আমাদের বাড়িতেও মাকে এভাবে ঠাকুরপুজো করতে দেখেছি আমি। তফাত শুধু পারিপার্শ্বিকের। কিন্তু তারপরে হঠাৎ সুর করে একটা মন্ত্র বলতে শুরু করল হরেন। ভীষণ আশ্চর্য হয়ে শুনলাম ও বলে চলেছে :

    বিসমিল্লা বলিয়া মুখে ধরিনু কলম/ পয়দা করিল যিনি তামাম

    আলম * বড় মেহেরবান তিনি বান্দার উপরে/ তার ছানি কেবা

    আছে দুনিয়ার পরে *

    একেবারে তাজ্জব বনে গেলাম। আমি তো ভেবে এসেছিলাম একটা হিন্দু পুজোতে যাচ্ছি। তারপর এই প্রার্থনার মধ্যে এত আরবি শব্দ শুনে আমার মনের অবস্থাটা কী রকম হল সহজেই কল্পনা করতে পার। কিন্তু ছন্দটা তো নিঃসন্দেহে পাঁচালির। বাড়িতে কি মন্দিরে কত পুজোতে ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি এই একই সরল পয়ার ছন্দের পাঁচালি-পাঠ।

    তন্ময় হয়ে শুনছিলাম হরেনের মন্ত্রোচ্চারণ। মূল ভাষাটা বাংলা, কিন্তু এত আরবি-ফারসি শব্দ তাতে মেশানো, যে সবটা ভাল বোঝা যাচ্ছিল না। গল্পটা অবশ্য আমার চেনা : সেই দুখের দুর্দশার কাহিনী। কেমন করে তাকে একটা নির্জন দ্বীপে ব্যাঘ্ৰদানব দক্ষিণ রায়ের মুখে ফেলে চলে আসা হয়েছিল, আর সেখান থেকে কীভাবে বনবিবি আর শা জঙ্গলি তাকে রক্ষা করলেন সেই গল্প।

    এক এক করে সকলের পুজো দেওয়া শেষ হল। জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে ফাঁকা জায়গাটুকু পেরিয়ে আমরা আবার গিয়ে ডিঙিতে উঠলাম। নৌকো করে মরিচঝাঁপির দিকে যেতে যেতে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এত লম্বা এই মন্ত্র তুমি কোথায় শিখলে হরেন?”

    খানিকটা যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ও তাকাল আমার দিকে। “এ তো আমি ছেলেবেলা থেকেই জানি সার। বাবাকে তো শুনতাম এই মন্তর পড়তে, সেই শুনে শুনে শিখেছি।”

    “মানে মুখে মুখেই এটা চলে আসছে? শুধু শুনে শুনে মনে রেখে দিতে হয়?”

    “তা কেন স্যার?” হরেন বলল। “ছাপা বইও পাওয়া যায়। একখানা আমার কাছেও আছে।” নিচু হয়ে নৌকোর খোলের ভেতরে অন্যান্য জিনিসপত্রের মধ্যে থেকে হলদে হয়ে যাওয়া ছেঁড়া একটা চটি বই বের করে আনল ও। “এই যে সার, দেখুন।”

    প্রথম পাতায় দেখলাম বইয়ের নাম লেখা আছে বনবিবির কেরামতি অর্থাৎ বনবিবি জহুরানামা। বইটা খুলতে গিয়েই কিন্তু একটা ধাক্কা খেলাম : এ তো আরবি কেতাবের মতো ডাইনে থেকে বাঁয়ে পাতা উলটে পড়তে হয়, বাংলা বইয়ের মতো বদিক থেকে ডাইনে নয়। ছন্দপ্রকরণ যদিও বাংলা লোককথার ধরনের : দ্বিপদী পয়ারে লেখা। দুটো করে লাইনের একেকটা শ্লোক–এক এক লাইনে মাত্রা সংখ্যা মোটামুটি বারো, আর প্রতি লাইনের মাঝামাঝি জায়গায় একবার করে যতি।

    বইটা দেখলাম একজন মুসলমান ভদ্রলোকের লেখা। লেখকের নাম দেওয়া আছে আব্দুর রহিম। সাধারণ মাপকাঠিতে বিচার করলে খুব একটা সাহিত্যগুণসমৃদ্ধ বলা চলে না লেখাটাকে। প্রতি জোড়া লাইনে মোটা দাগের একটা ছন্দমিল যদিও আছে, কিন্তু পুরো লেখাটা দেখতে আদৌ কবিতার মতো নয়। গদ্যের মতো একটানা। মাঝে মাঝে শুধু তারা চিহ্ন আর দুই দাড়ি দেওয়া। অন্য ভাবে বলতে গেলে লেখাটা দেখতে গদ্যের মতো কিন্তু পড়তে পদ্যের মতো–অদ্ভুত একটা মিশ্রণ, প্রথমটায় মনে হল আমার। তার পরে আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম বিষয়টার অসাধারণত্ব। গদ্য এখানে ছন্দ আর তালের সিঁড়িতে ভর করে পদ্যের জগতে উত্তীর্ণ হচ্ছে–এক কথায় চমৎকার।

    “কবে লেখা হয়েছে এ বইটা?” আমি জিজ্ঞেস করলাম হরেনকে। “তুমি জানো?”

    “এ তো পুরনো বই স্যার। অনেক, অনেক পুরনো।”

    অনেক, অনেক পুরনো? কিন্তু প্রথম পাতাতেই তো দেখতে পাচ্ছি এক জায়গায় লেখা আছে, “কেহ দিবা নিশি চলে আতলস পরিয়া/ ছায়ের করিয়া ফেরে চৌদ্দলে চড়িয়া।”

    হঠাৎ মনে হল এই কাহিনির জন্ম নিশ্চয়ই উনিশ শতকের শেষে অথবা বিশ শতকের প্রথম দিকে, যখন নতুন বাসিন্দারা সবে আসতে শুরু করেছে এই ভাটির দেশে। সে কারণেই হয়তো লোককথা আর ধর্মশাস্ত্র, নিকট আর দূর, বাংলা আর আরবির মিশ্রণে এরকম আশ্চর্য চেহারা নিয়েছে এই জহুরানামা। কে বলতে পারে?

    অবশ্য কী-ই বা হতে পারে তা ছাড়া? নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে তোত আমি দেখেছি–শুধু পলি বয়ে আনা নদীর ঢেউ ছাড়াও, কাছের দূরের নানা ভাষার স্রোত বার বার এসে আছড়ে পড়েছে এই ভাটির দেশে, এখানকার মাটিতে মিশে আছে। তাদের চিহ্ন। বাংলা, ইংরেজি, আরবি, হিন্দি, আরাকানি–আরও কত ভাষা কে জানে। এক ভাষার স্রোত গিয়ে মিশেছে অন্য ভাষায়, জন্ম দিয়েছে সেই প্রবাহে ভাসমান অগুন্তি ছোট ছোট ভাষা জগতের। চৈতন্যোদয় হল আমার : এ ভাটির দেশে মানুষের বিশ্বাসও এখানকার বিশাল সব মোহনার মতো। সে মোহনা শুধু অনেক নদীর মিলনের জায়গাই নয়, সে হল বহু পথের সংযোগস্থল। সে সব পথ নানা দিকে টেনে নিয়ে যায় মানুষকে–এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এমনকী এক বিশ্বাস থেকে আরেক বিশ্বাসে, এক ধর্ম থেকে অন্য ধর্মে।

    বিষয়টা মাথায় এমন চেপে বসল যে তক্ষুনি কাঁধের ঝোলা থেকে নোটবই বের করে কয়েকটা লাইন টুকতে শুরু করে দিলাম আমি। ঘটনাচক্রে এই নোটবইটাই ছিল সেদিন আমার সঙ্গে। খুদে খুদে ছাপার অক্ষর, চোখ কুঁচকে বেশ কষ্ট করে পড়তে হচ্ছিল আমাকে। এক সময় অন্যমনস্ক ভাবে ফকিরের হাতে তুলে দিলাম চটি বইটা–অনেক সময় ক্লাসে ছাত্রদের যেমন দিতাম–বললাম, “জোরে জোরে পড়ো, লিখে নিই।”

    ও জোরে জোরে উচ্চারণ করতে থাকল শব্দগুলো, আর আমি লিখতে শুরু করলাম। লিখতে লিখতে হঠাৎ একটা কথা খেয়াল হল আমার। কুসুমকে বললাম, “আচ্ছা, তুই না বলেছিলি ফকির লিখতে পড়তে পারে না?”

    “হ্যাঁ সার। ও তো লেখাপড়া শেখেনি,” জবাব দিল কুসুম। “তা হলে?”

    একটু হেসে ফকিরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল কুসুম। “এটা তো ওর মুখস্থ। এত বার আমার কাছ থেকে শুনেছে যে কথাগুলো ওর মাথায় গেঁথে গেছে একেবারে।”

    সন্ধে হয়ে গেছে। আমার লেখার যাতে অসুবিধা না হয় সে জন্য সামনে একটা মোমবাতি রেখে গেছে কুসুম। ওদিকে হরেন অধৈর্য হয়ে উঠছে। ফকিরকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পড়েছে ওর ওপর। শুধু কুসুম আর আমি এখন থাকব এখানে। জলের ওপর থেকে ভেসে আসছে টহলদার নৌকোর শব্দ। গোটা দ্বীপটাকে ঘিরে ফেলেছে নৌকোগুলো। অন্ধকার আর একটু গাঢ় না হলে ফকিরকে নিয়ে পালাতে পারবে না হরেন।

    কিন্তু আর সবুর সইছে না হরেনের। এখনই বেরোতে চায় ও। আমি বললাম, “আর কয়েকটা ঘণ্টা অপেক্ষা করো। সারাটা রাত তো পড়েই রয়েছে।” আমার সঙ্গে গলা মেলাল কুসুমও। হরেনকে ডেকে নিয়ে গেল বাইরে : “চলো, তোমার নৌকোয় যাই। সারকে একটু একা থাকতে দাও।”

  • মধ্যস্থ

    মধ্যস্থ

    মধ্যস্থ

    নোটপত্র গোছানো, জামাকাপড় কাঁচা আর যন্ত্রপাতি পরিষ্কারের কাজ শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমে গেল। পিয়া ঠিক করল এখনই শুয়ে পড়বে। রাতের খাওয়ার জন্য আর অপেক্ষা করবে না। এরপরে কবে আবার কপালে একটা বিছানা জুটবে তার তো কোনও ঠিক নেই। তাই আজকে রাতে এই বিছানাটার সদ্ব্যবহার করাই ভাল। যতটা পারা যায় ঘুমিয়ে নেবে ও। কানাই ছাদের স্টাডিতে পড়াশোনা করছে, ওকে আর খামখা ডিস্টার্ব করার দরকার নেই। এক গ্লাস ওভালটিন গুলে নিয়ে নীচে ফাঁকায় নেমে এল পিয়া।

    চাঁদ উঠে গেছে অনেকক্ষণ। রুপোলি আলোয় পিয়া দেখতে পেল নীলিমা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মনে হল কী যেন একটা গভীর চিন্তায় ডুবে আছে। পিয়ার পায়ের শব্দ পেয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল।

    এক হাতে ওভালটিনের গ্লাস, অন্য হাতটা দিয়ে বাতাসে ঢেউয়ের মতো একটা আঁক কাটল পিয়া : “হ্যালো।”

    জবাবে একটু হাসল নীলিমা। কী যেন বলল বাংলায়। খানিকটা আপশোসের সুরে পিয়া বলল, “সরি। বুঝতে পারলাম না।”

    “আরে, তাই তো,”নীলিমা বলল। “আমারই তো সরি বলা উচিত। বার বার খালি ভুলে যাই আমি। আসলে তোমার চেহারাটার জন্যই একটুও খেয়াল থাকে না আমার। খালি নিজেকে মনে করাতে থাকি যাতে বাংলা না বলি তোমার সঙ্গে, তাও ঠিক বেরিয়ে যায় মুখ ফসকে।”

    হাসল পিয়া। “আমার মা বলত বাংলা ভাষাটা না-জানার জন্য একদিন দুঃখ করব আমি। মনে হয় ঠিকই বলত মা।”

    “কিন্তু একটা কথা বলো তো বাছা,” নীলিমা বলল, “জানতে ইচ্ছে করছে বলেই জিজ্ঞেস করছি–তোমার বাবা-মা কেন তোমাকে কখনও বাংলা শেখাতে চেষ্টা করেননি?”

    “মা একটু চেষ্টা করেছিল,” বলল পিয়া। “আমারই বিশেষ আগ্রহ ছিল না। আর বাবার কথা যদি বলেন, তা হলে মনে হয় বিষয়টা নিয়ে বাবার নিজের মনেই একটু সন্দেহ ছিল।

    “সন্দেহ? তোমাকে বাংলা শেখানোর ব্যাপারে?”

    “হ্যাঁ,” পিয়া বলল। “পুরো গল্পটা একটু কমপ্লিকেটেড। আসলে আমার ঠাকুরদা-ঠাকুরমাও ছিলেন প্রবাসী বাঙালি–বার্মায় থাকতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেখানকার ঘরবাড়ি ছেড়ে ওদের দেশে ফিরে আসতে হয়েছিল। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে বড় হবার ফলে প্রবাসী বা উদ্বাস্তুদের বিষয়ে নিজের মতো করে কয়েকটা থিয়োরি তৈরি করে নিয়েছিল বাবা। বাবার ধারণা হল ভারতীয়রা বিশেষ করে বাঙালিরা কখনওই ভাল পর্যটক হতে পারে না। কারণ তাদের চোখ সব সময় ফেরানো থাকে পেছন দিকে ঘরের দিকে। তাই যখন আমরা আমেরিকায় গেলাম, বাবা ঠিক করল যে এই ভুল করবে না। সে দেশের মতো করেই খাপ খাইয়ে নেবে নিজেকে।”

    “তাই উনি তোমার সঙ্গে সব সময় ইংরেজিতে কথা বলতেন?”

    “হ্যাঁ,” পিয়া বলল। “আর এর জন্যে অনেকটাই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল বাবাকে, সেটা ভুললে চলবে না। কারণ ইংরেজি ভাষাটা খুব ভাল বলতে পারত না বাবা। এখনও, এই এতদিন বিদেশে থাকার পরেও পারে না। বাবা পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, ফলে কথা যখন বলে ইংরেজিটা খানিকটা যেন কন্সট্রাকশন ম্যানুয়েলের মতো শোনায়।”

    “তোমার মায়ের সঙ্গে কী ভাষায় কথা বলতেন উনি?”

    “নিজেদের মধ্যে বাবা-মা বাংলাই বলত,” হেসে বলল পিয়া। অবশ্য যখন ওরা কথা বলত। আর দু’জনের মধ্যে কথা যখন বন্ধ থাকত তখন আমিই ছিলাম ওদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। তবে এই বার্তাবাহকের কাজ করার সময় বাবা-মাকে ইংরেজিতে কথা বলতে বাধ্য করতাম আমি–তা না হলে কিছুতেই খবর পৌঁছে দিতাম না।”

    কোনও জবাব দিল না নীলিমা। একটু অস্বস্তি হল পিয়ার। ভুল করে কোনও বেফঁস কথা বলা হয়ে গেল নাকি? কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই নিজের আঁচলের কোনাটা ধরে মুখের কাছে নিয়ে গেল নীলিমা। দু’চোখে টলটল করছে জল।

    “আই অ্যাম সরি,” তাড়াতাড়ি বলল পিয়া। “আমি কি অন্যায় কিছু বলে ফেলেছি?”

    “না বাছা। অন্যায় কিছু বলনি। আমি খালি তোমার ছোটবেলার কথা ভাবছিলাম–কেমন করে বাবা-মার কথাগুলো পৌঁছে দিতে পরস্পরের কাছে। স্বামী-স্ত্রী যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলতে পারে না সেটা যে কত দুঃখের কথা সে তোমাকে কী বলব বাছা। তাও তো তুমি ছিলে তোমার বাবা-মার মাঝখানে। যদি কেউ না থাকত তা হলে–”

    কথাটা শেষ করল না নীলিমা। থেমে গেল আবার। পিয়া বুঝতে পারছিল ব্যক্তিগত কোনও ব্যথার জায়গায় ছুঁয়ে ফেলেছে না বুঝে। নীলিমার ধাতস্থ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল চুপ করে।

    “আমাদের বাড়িতে তো ছেলেপুলে বলতে ওই কানাই-ই একবার এসে ছিল কিছুদিনের জন্য,” অবশেষে বলল নীলিমা। “আমার স্বামীর কাছে সেইটুকুই যে কতখানি ছিল সেটা আগে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। শুধু নিজের কথাগুলো কাউকে বলে যাওয়ার জন্যেই যে কী আকুলতা ছিল মানুষটার, কী বলব। তারপরেও কত বছর ধরে যে আমাকে বলেছে, কানাইটা যদি আবার এসে কিছুদিন থাকত। আমি মনে করিয়ে দিতাম, কানাই তো আর ছোটটি নেই, বড় হয়ে গেছে। তারও নিজের কাজকর্ম আছে। কিন্তু তাতে কিছু এসে যেত না আমার স্বামীর। কতবার যে চিঠি লিখেছে কানাইকে, এখানে আসার জন্য।”

    “কানাই আসেনি?”

    “নাঃ,” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নীলিমা। “ও তখন খুবই ব্যস্ত। ব্যবসায় উন্নতি করছে। তার দামটাও তো দিতে হবে। নিজের জন্যে ছাড়া আর কারও জন্যেই সময় ছিল না ওর। নিজের মা-বাবার জন্যেও না। আমাদের কথা তো ছেড়েই দাও।”

    “ও কি সব সময়ই এই রকম?” পিয়া জিজ্ঞেস করল। “এই রকম উদ্যমী?”

    “কেউ কেউ বলে স্বার্থপর,” জবাব দিল নীলিমা। “আসলে কানাইয়ের মুশকিলটা কী জানো তো? ও সব সময়ই একটু বেশি চালাক। সব কিছু খুব সহজেই হাতে এসে গেছে তো, তাই বেশির ভাগ মানুষের কাছে দুনিয়াটা যে কী রকম সে বোধটাই ওর কখনও হয়নি।”

    পিয়া বুঝতে পারল তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমতী নীলিমা ঠিকই চিনেছে তার ভাগ্নেকে। কিন্তু সে ধারণাটা প্রকাশ না করাই ভাল মনে হল। ভদ্রতা রাখতে বলল, “আমি তো ওকে সামান্যই দেখেছি, আমি আর কী বলব?”

    “ঠিকই,” বলল নীলিমা। “তবে তোমাকে একটু সাবধান করে দিই বাছা। আমার ভাগ্নেকে আমি ভালবাসি ঠিকই, কিন্তু একটা কথা আমার বলে দেওয়া উচিত যে কানাই হল সেই ধরনের মানুষ যারা মনে করে যে মেয়েরা তাদের কাছাকাছি এলেই প্রেমে একেবারে হাবুডুবু খাবে। দুঃখের বিষয় হল পৃথিবীতে বোকা মেয়ের তো অভাব নেই। অনেকেই আছে যারা এই রকম লোকেদের ধারণাকে সত্যি বলে প্রমাণ করে। কানাই মনে হয় সব সময় সেই রকম মেয়েদেরই খুঁজে বেড়ায়। তোমরা কী বল জানি না, আমাদের সময় তো এ ধরনের লোকেদের আমরা বলতাম লম্পট’।” নীলিমা কথা শেষ করল। ভুরু উপরে তুলে জিজ্ঞেস করল, “আমার কথাটা বুঝতে পেরেছ তো?”

    “বুঝেছি।”

    মাথা নেড়ে শাড়ির আঁচলে নাক মুছল নীলিমা। “যাকগে, আর ভ্যাজর ভ্যাজর করব না। কাল তো তোমার অনেক কাজ, তাই না?”

    “হ্যাঁ,” বলল পিয়া। “আমরা সকাল সকালই বেরিয়ে পড়ব। সত্যি, ভাবতেই ভাল লাগছে।”

    পিয়ার কাঁধের ওপর একটা হাত দিয়ে ওকে বুকের কাছে টেনে নিল নীলিমা। “শোনো বাছা, খুব সাবধানে থাকবে। জঙ্গল ভয়ংকর জায়গা, মনে রাখবে। আর সব সময় জন্তু জানোয়াররাই যে শুধু ভয়ের কারণ তা কিন্তু নয়।”

  • ঘেরাটোপে

    ঘেরাটোপে

    ঘেরাটোপে

    আমি গর্জনতলা থেকে ঘুরে আসার কয়েকদিন পর নীলিমা ফিরল তার কাজ শেষ করে। সঙ্গে নিয়ে এল বাইরের পৃথিবীর অজস্র খবর। নানা গল্প করতে করতে এ কথা সে কথার মাঝখানে হঠাৎই বলল, “আর মরিচঝাঁপিতেও মনে হয় এবার কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।”

    আমার কান খাড়া হয়ে উঠল। “কী ঘটতে যাচ্ছে?”

    “মনে হয় সরকার এবার ব্যাপারটার একটা হেস্তনেস্ত করতে চায়। সেরকম দরকার হলে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে ঠিক হয়েছে শুনলাম।”

    কিছু বললাম না, শুধু মনে মনে ভাবতে লাগলাম কী করে খবরটা পৌঁছে দেওয়া যায় কুসুমের কাছে, কী করে সাবধান করে দেওয়া যায় ওদের। কিন্তু খুব দ্রুত ঘটনা গুরুতর মোড় নিল। সাবধান করে দেওয়ার কোনও পথই রইল না। পরদিন শোনা গেল বন সংরক্ষণ আইনে মরিচঝাঁপিতে যাতায়াত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। পুরো এলাকায় জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা। তার মানে চারজনের বেশি লোক এক জায়গায় জড়ো হওয়াও নিষিদ্ধ।

    বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদী বেয়ে স্রোতের মতো ছড়িয়ে যেতে শুরু করল নানা গুজব। শোনা গেল কয়েক ডজন পুলিশের নৌকো ঘিরে রেখেছে গোটা দ্বীপটাকে, কাদানে গ্যাস আর রাবার বুলেট চালানো হয়েছে, দ্বীপে কোনও খাবার-দাবার বা জল নিয়ে যেতে দেওয়া হচ্ছে না মরিচঝাঁপির লোকেদের, বেশ কয়েকটা নৌকো ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে, কয়েক জন নাকি মারাও গেছে। সময় যত যেতে লাগল গুজবগুলিও তত ফুলেফেঁপে উঠতে থাকল; মনে হল যেন যুদ্ধ লেগেছে শান্ত নিরিবিলি এই ভাটির দেশে।

    নীলিমার কথা ভেবেই প্রাণপণে স্থির থাকার চেষ্টা করছিলাম আমি। মনের মধ্যে যে উথাল পাথাল চলছিল তাকে বাইরে প্রকাশ হতে দিচ্ছিলাম না। কিন্তু সেদিন সারারাত কিছুতেই দু’চোখের পাতা এক করতে পারলাম না। সকাল হতেই মনে মনে বুঝলাম মরিচঝাঁপিতে যেতে আমাকে হবেই। যে-কোনও উপায়েই থোক। তার জন্যে এমনকী নীলিমার সঙ্গে বিবাদে যেতেও আমি প্রস্তুত। আমার সৌভাগ্য, পরিস্থিতি সেদিকে যায়নি–অন্তত এখনও পর্যন্ত নয়। ভোরবেলায় স্কুলের কয়েকজন মাস্টারমশাই এলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে। তাঁদেরও কানে এসেছে গুজবগুলো, আর আমারই মতো তারাও চিন্তায় আছেন ওই দ্বীপবাসীদের জন্য। এতটাই উদ্বিগ্ন তাঁরা, যে একটা ভটভটি পর্যন্ত ভাড়া করে ফেলেছেন মরিচঝাঁপি যাওয়ার জন্য : যদি কোনওভাবে মিটমাটের একটা রাস্তা বের করা যায়। মাস্টারমশাইরা জিজ্ঞেস করলেন আমিও তাঁদের সঙ্গে যেতে রাজি আছি কি না। আমি তো এক পা তুলে খাড়া।

    সকাল দশটা নাগাদ ছাড়ল আমাদের ভটভটি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দূর থেকে দেখা গেল আমাদের গন্তব্য। এখানে একটা কথা বলে রাখি–মরিচঝাঁপি বিশাল দ্বীপ, ভাটির দেশের সবচেয়ে বড় দ্বীপগুলির একটা। এখানকার তটরেখার দৈর্ঘ্য প্রায় কুড়ি কিলোমিটার। প্রথম যখন চোখে পড়ল দ্বীপটা, তখনও আমরা প্রায় দু-তিন কিলোমিটার দূরে। দেখলাম ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে দ্বীপের ওপর।

    খানিক পরেই দেখা গেল সরকারি মোটরবোটগুলিকে। টহল দিচ্ছে দ্বীপের চারপাশে। আমাদের ভটভটিওয়ালা দেখলাম বেশ ভয় পেয়ে গেছে। অনেক কাকুতি-মিনতি করে তাকে আরেকটু কাছাকাছি যেতে রাজি করানো গেল। রাজি সে হল বটে, কিন্তু একটা শর্তে : আমাদের নৌকো যাবে নদীর অন্য পাড় ধরে–দ্বীপ থেকে যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে। অতএব সে ভাবেই এপাশের কিনারা ঘেঁষে এগোতে লাগলাম আমরা, আর আমাদের দৃষ্টি ফেরানো রইল অন্যদিকে, মরিচঝাঁপির দিকে।

    এভাবে চলতে চলতে একটা গ্রামের কাছাকাছি এসে পৌঁছলাম আমরা। দেখতে পেলাম পাড়ের ওপর বহু লোক জড়ো হয়েছে, ব্যস্তসমস্ত ভাবে তারা একটা নৌকোয় প্রচুর মালপত্র বোঝাই করছে। ভটভটি বা পালের নৌকো নয় কিন্তু, এমনি সাধারণ ডিঙি নৌকো, হরেনের যেরকম একটা ছিল। খানিকটা দূর থেকেও দিব্যি বোঝা গেল নৌকোটাতে রসদ বোঝাই করছে ওরা–বস্তা বস্তা চাল-ডাল আর জেরিক্যান ভর্তি খাবার জল। তারপর এক এক করে অনেকে গিয়ে উঠে পড়ল নৌকোটাতে। বেশিরভাগই পুরুষ, তবে কিছু মহিলা এবং বাচ্চাও ছিল। কয়েকজন তো বোঝাই যাচ্ছিল দিনমজুর–কাজের জন্য গিয়েছিল অন্য কোনও দ্বীপে, তারপরে আর ফিরতে পারেনি। বাকিরা মনে হল কোনও কারণে আত্মীয়স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, আর এখন যে-কোনও রকমে ফেরার চেষ্টা করছে মরিচঝাঁপিতে। তবে কারণ যাই হোক না কেন, ওদের গরজটা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। গাদাগাদি করে এই রকম একটা পলকা ডিঙিতে ওঠার ঝুঁকি নিতেও তাই দ্বিধা ছিল না ওদের। অবশেষে নৌকো যখন ছাড়ল তখন তাতে অন্তত ডজন দুয়েক লোক। কোনও রকমে টলমল করতে করতে স্রোতের মুখে গিয়ে পড়ল ডিঙিটা। টইটম্বুর ভর্তি ওইটুকু একটা মোচার খোলা–কীভাবে যে ভেসে ছিল না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। খানিকটা দূর থেকে রুদ্ধশ্বাসে আমরা দেখতে লাগলাম। সকলেরই বুক দুরুদুরু–কী হয় কী হয়। বোঝাই যাচ্ছিল ওদের আশা পুলিশকে এড়িয়ে কোনও রকমে পৌঁছতে পারবে মরিচঝাঁপিতে, আটকা-পড়া দ্বীপবাসীদের কাছেও পৌঁছে দেবে কিছু রসদ। এখন পুলিশ কী করবে? আমাদের নৌকোয় প্রত্যেকেরই দেখলাম এ ব্যাপারে নিজস্ব কিছু বক্তব্য রয়েছে।

    হঠাৎ, ঠিক যেন আমাদের সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটানোর জন্যই, বাগনা নদী বেয়ে গর্জন করতে করতে ধেয়ে এল একটা পুলিশের স্পিডবোট। তিরবেগে ডিঙিটার কাছে পৌঁছে তার চারদিকে পাক খেতে লাগল সেটা। পুলিশের বোটে দেখা গেল একটা লাউডস্পিকার আছে। যদিও আমরা বেশ খানিকটা দূরেই ছিলাম, মাইকে পুলিশ কী বলছে তার দু-একটা টুকরো ঠিকই কানে এসে পৌঁছচ্ছিল। ডিঙির মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে যেখান থেকে এসেছে আবার সেখানেই ফেরত যেতে বলছিল ওরা। জবাবে নৌকোর লোকেরা কী বলল সেটা শুনতে পেলাম না, কিন্তু ভাবভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছিল পুলিশগুলোকে মিনতি করছে ওরা, বলছে ওদের যেতে দিতে মরিচঝাঁপিতে।

    ফল হল উলটো। পুলিশের লোকগুলো ভয়ানক খেপে চিৎকার করতে লাগল। মাইকে। আচমকা, বাজ পড়ার মতো, একটা বন্দুকের আওয়াজ শোনা গেল। শূন্যে গুলি ছুঁড়েছে পুলিশ।

    এবার নিশ্চয়ই ফিরে আসবে নৌকোর লোকগুলো? মনে মনে আমরা সবাই চাইছিলাম ওরা ফিরে আসুক। কিন্তু তার বদলে যা হল সে একেবারে অপ্রত্যাশিত। হঠাৎ নৌকোর সব লোক এক সাথে গলা মিলিয়ে চিৎকার করতে শুরু করল : “আমরা কারা? বাস্তুহারা।”

    জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা করুণ সেই চিৎকার শুনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল আমার। সেই মুহূর্তে মনে হল প্রতিবাদ নয়, এ যেন বিশ্বজগতের কাছে ওই মানুষগুলির ব্যাকুল জিজ্ঞাসা। যেন হতবুদ্ধি এই মানবজাতির হয়ে প্রশ্ন করছে ওরা। আমরা কারা? কোথায় আমাদের স্থান? সেই উচ্চারণ শুনতে শুনতে মনে হল ওরা তো আমারই হৃদয়ের গভীরতম অনিশ্চয়তার কথা বলছে–নদীর কাছে, স্রোতের কাছে। আমি কে? কোথায় আমার স্থান? কলকাতায় না এই ভাটির দেশে? ভারতে সীমান্তের ওপারে? গদ্যে না পদ্যে?

    তারপর আমরা শুনতে পেলাম সে প্রশ্নের জবাব। নৌকো থেকে ভেসে এল কয়েকটা পুনরাবৃত্ত শব্দের একটা নতুন শ্লোগান : “মরিচঝাঁপি ছাড়ছি না, ছাড়ছি না, ছাড়ব না।”

    ভটভটির ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগলাম। অপূর্ব! যে জায়গা ছাড়তে প্রাণ চায় না সেই তো আমার দেশ।

    ওদের চিৎকারে আমার ক্ষীণ কণ্ঠ মিলিয়ে আমিও বলে উঠলাম, “মরিচঝাঁপি ছাড়ব না!”

    মোটরবোটের পুলিশগুলো উদ্বাস্তুদের ওই শ্লোগানের কী অর্থ করতে পারে সেটা ভাবার কথা আমার খেয়াল হয়নি। মিনিট কয়েক ধরে একই জায়গায় থেমে ছিল বোটটা; হঠাৎ দেখলাম ইঞ্জিন চালু করল। মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে নৌকোটার থেকে দূরে সরে যেতে লাগল। খানিকক্ষণ পর্যন্ত মনে হল মন গলেছে পুলিশদের, উদ্বাস্তুদের ডিঙিটাকে ওরা চলে যেতে দেবে।

    কিন্তু শিগগিরই ভুল ভাঙল। খানিকদূর যাওয়ার পর একটা চক্কর খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল বোটটা। তারপর হঠাৎ প্রচণ্ড গতিতে সোজা ছুটতে লাগল মানুষ আর মালপত্রে ভরা টলমলে নৌকোটার দিকে। ধাক্কাটা লাগল নৌকোর ঠিক মাঝখানটায়। চোখের সামনে কাঠের তক্তাগুলো টুকরো টুকরো হয়ে ছিটকে গেল চতুর্দিকে। জলের মধ্যে আঁকুপাকু করতে লাগল ডজন দুয়েক ছেলেবুড়ো মেয়েম।

    হঠাৎ খেয়াল হল কুসুম আর ফকিরও তো থাকতে পারে ওদের মধ্যে। ধক করে উঠল আমার বুকের ভেতর।

    আমরা চেঁচিয়ে আমাদের ভটভটিওয়ালাকে বললাম জায়গাটার আরেকটু কাছাকাছি যেতে–যদি একটু সাহায্য করতে পারি মানুষগুলোকে। ও একটু ইতস্তত করছিল, ভয় পাচ্ছিল যদি পুলিশ কিছু বলে। অনেক করে বোঝানো হল ভয়ের কোনও কারণ নেই, একদল স্কুলের মাস্টারমশাইকে পুলিশ কিচ্ছু বলবে না। অবশেষে রাজি হল ও।

    আমরা এগোতে শুরু করলাম। খুব আস্তে আস্তে যেতে হচ্ছিল, পাছে জলের মধ্যে কারও সঙ্গে ধাক্কা লেগে যায়। ভটভটির ওপর থেকে হাত বাড়িয়ে দিলাম ভাসন্ত লোকগুলির দিকে। একজন দু’জন করে ডজনখানেক লোককে টেনে তোলা হল। ভাগ্যক্রমে জল খুব একটা গভীর ছিল না, অনেকেই তার মধ্যে পাড়ে গিয়ে উঠে পড়েছে।

    ভটভটিতে টেনে তোলা একটা লোককে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কুসুম মণ্ডলকে চেনো? ও কি ওই নৌকোয় ছিল?” দেখা গেল লোকটা চেনে কুসুমকে। মাথা নাড়ল ও। কুসুম মরিচঝাঁপিতেই আছে। প্রচণ্ড একটা স্বস্তিতে অবসন্ন হয়ে গেল শরীর। কিন্তু দ্বীপের ওপর ঘটনা যে কোন দিকে মোড় নিচ্ছে সে তখন আমি কিছুই জানি না।

    এদিকে পুলিশের লোকগুলো তো তেড়ে এল আমাদের দিকে। ধমকে জিজ্ঞেস করল, “কে আপনারা? কী করছেন এখানে?”

    আমাদের কোনও কথাতেই কান দিল না ওরা। বলল পুরো এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি আছে, বেআইনি জমায়েতের জন্য গ্রেফতার হয়ে যেতে পারি আমরা।

    গুটিয়ে গেলাম আমরা। সবাই সাধারণ ইস্কুলমাস্টার, অনেকেরই বউ-বাচ্চা আছে; চুপচাপ পাড়ে গিয়ে জল থেকে টেনে তোলা মানুষগুলোকে নামিয়ে দিয়ে রওয়ানা হলাম ঘরের দিকে।

    কলমের কালি ফুরিয়ে গেছে, পেন্সিলের টুকরোটার যেটুকু বাকি আছে এবার সেটা দিয়ে লিখছি। বাইরে পায়ের শব্দ শুনলেই মনে পড়ে যাচ্ছে যে-কোনও সময় কুসুম আর হরেন ফিরে আসবে, আর এসেই তক্ষুণি রওনা হয়ে পড়তে চাইবে হরেন। কিন্তু থামার উপায় নেই আমার। এখনও কত কী বলা বাকি রয়ে গেছে।

  • কথা

    কথা

    কথা

    ছাদের ঘরের নিশ্চিন্ত আরামে বসে রাতের খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিল কানাই। কম্পাউন্ডের জেনারেটর থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের আলোটা যখন নিভে গেল তখনও ও একমনে লেখাটা পড়ছে। আলো নিভতে মনে পড়ল ঘরের কোথাও একটা কেরোসিনের লক্ষ রয়েছে। অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে হাতড়ে সেটা খুঁজছে কানাই, এমন সময় কার যেন পায়ের শব্দ পাওয়া গেল দরজার কাছে।

    “কানাইবাবু?”

    হাতে একটা মোমবাতি নিয়ে ময়না দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। “দেশলাই লাগবে?” জিজ্ঞেস করল কানাইকে। “আমি তো টিফিন ক্যারিয়ারটা নিয়ে যেতে এসেছিলাম। দেখলাম আপনি এখনও খাননি।”

    “নীচেই যাচ্ছিলাম আমি,” বলল কানাই। “এ ঘরে কোথায় একটা হারিকেন ছিল না? খুঁজে পাচ্ছি না।”

    “ওই তো ওখানে।”

    মোমবাতি হাতে হারিকেনের কাছে গিয়ে কাঁচটা খুলে ফেলল ময়না। পলতেটা জ্বালাতে যেতেই হাত পিছলে গেল। মোমবাতি হারিকেন দুটোই ছিটকে পড়ল মাটিতে। চুরমার হয়ে গেল কাঁচটা আর কেরোসিনের কটু গন্ধে ভরে গেল সারা ঘর। মোমবাতিটা গড়াতে গড়াতে চলে গেল ঘরের এক কোণে। শিখা নিভে গেলেও সলতের ডগায় একটু লাল আভা তখনও দেখা যাচ্ছে। “জলদি!” মেঝের উপর উবু হয়ে বসে পড়ে মোমটার দিকে হাত বাড়াল কানাই। “পলতেটা টিপে নিভিয়ে দাও। নইলে কেরোসিনে আগুন ধরে সারা বাড়ি জ্বলে যাবে এক্ষুনি।”ময়নার হাত থেকে মোমবাতিটা নিয়ে বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মধ্যে টিপে নিজেই পলতেটা নিভিয়ে ফেলল কানাই। “যাক, নিভে গেছে। এবার কাঁচের টুকরোগুলো পরিষ্কার করতে হবে।”

    “সে আমি করছি কানাইবাবু।”

    “দু’জনে মিলে করলে তাড়াতাড়ি হবে।” ময়নার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে হাত দিয়ে সাবধানে মেঝেটা মুছতে লাগল কানাই।

    “খাবারটা তো ঠান্ডা হয়ে গেল কানাইবাবু,” বলল ময়না। “খেয়ে নেননি কেন?”

    “কালকের জন্যে তৈরি হচ্ছিলাম,” কানাই বলল। “ভোরবেলাতেই বেরিয়ে পড়তে হবে তো। আমিও যাচ্ছি, জানো কি?”

    “জানি। মাসিমা বলেছেন। আপনি যাবেন শুনে আমি একটু খুশি হয়েছি।”

    “কেন? আমার জন্যে খাবার আনতে আর ভাল লাগছে না?”

    “না না,” বলল ময়না। “সে জন্যে নয়।”

    “তা হলে?”

    “আপনিও ওদের সঙ্গে যাবেন সেটা জেনেই অনেকটা শান্তি পেয়েছি। ওরা একা থাকবে না।”

    “কারা?”

    “ওরা দু’জন,” হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল ময়নার গলা।

    “মানে ফকির আর পিয়া?”

    “আর কে? যখন শুনলাম আপনি ওদের সঙ্গে যাবেন, এত নিশ্চিন্ত লাগল যে কী বলব। সত্যি কথা বলতে কী, আমি ভাবছিলাম যদি আপনি ওর সঙ্গে একটু কথা বলেন…”

    “ফকিরের সঙ্গে? কী ব্যাপারে কথা বলব?”

    “ওই যে, ওই মেমসাহেব মেয়েটার ব্যাপারে। আপনি যদি ওকে একটু বুঝিয়ে বলেন, মেয়েটা এখানে শুধু ক’দিনের জন্যে এসেছে, আবার ফিরে চলে যাবে…”

    “কিন্তু সে কথা তো ফকির জানে। জানে না?”

    অন্ধকারের মধ্যে শাড়ির খসখস শব্দ শোনা গেল। কাপড়টা ভাল করে গায়ে জড়িয়ে নিল ময়না। “তাও, আপনার কাছ থেকে একবার শুনলে ভাল হবে, কানাইবাবু। কে জানে মনে মনে কী সব ভেবে বসে আছে ও। এত এত টাকা দিচ্ছে তো। ওই মেয়েটার সঙ্গেও যদি একটু কথা বলতে পারেন ভাল হয়। যদি একটু বুঝিয়ে বলেন, এরকমভাবে মাথা ঘুরিয়ে দিলে ফকিরের তাতে ভাল হবে না।”

    “কিন্তু আমাকে কেন বলছ ময়না?” আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল কানাই। “আমি কী বলব বল?”

    “কানাইবাবু, এখানে তো আপনিই শুধু ওদের দুজনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন ফকিরের সঙ্গেও পারেন, আর ওই মেয়েটার সঙ্গেও পারেন। আপনিই তো ওদের দু’জনের মাঝখানে আছেন। আপনিই তো ওদের একজনের কথা শুনে আরেকজনকে বলবেন। আপনাকে ছাড়া ওদের কেউ তো জানতেই পারবে না অন্যজনের মনে কী আছে। এখন সবই আপনার হাতে কানাইবাবু। আপনি যা ইচ্ছে করবেন তাই বলাতে পারবেন ওদের মুখ দিয়ে।”

    “আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না ময়না,” ভুরু কুঁচকে বলল কানাই। “কী বলতে চাইছ তুমি বলো তো? কীসের ভয় পাচ্ছ তুমি?”

    “ও একটা মেয়ে, কানাইবাবু,” প্রায় ফিসফিস করে বলল ময়না। “আর ফকির একটা পুরুষ মানুষ৷”

    অন্ধকারের মধ্যে ময়নার দিকে কটমট করে তাকিয়ে রইল কানাই। “আমিও তো একটা পুরুষ মানুষ, ময়না। তোমার কি মনে হয়, আমার কিংবা ফকিরের মধ্যে একজনকে যদি বেছে নিতে হয়, ও কাকে পছন্দ করবে?”

    হ্যাঁ না কিছুই জবাব দিল না ময়না। ধীরে ধীরে বলল, “আমি কী করে বলব কানাইবাবু, কী আছে ওর মনে?”

    ময়নার কথায় দ্বিধার সুরে একটু উত্তেজিত হয়ে উঠল কানাই। “আর তুমি? যদি সম্ভব হত তুমি কাকে বেছে নিতে আমাদের দু’জনের মধ্যে, ময়না?”

    “কী বলছেন আপনি কানাইবাবু? ফকির আমার স্বামী,” শান্ত গলায় জবাব দিল ময়না। কিন্তু কানাই হাল ছাড়ার পাত্র নয়। “তুমি তো এত বুদ্ধিমতী মেয়ে ময়না, কত কী করতে পারো, ফকিরের কথা তুমি ভুলে যাও। তুমি বুঝতে পারছ না, ওর সঙ্গে থাকলে তুমি জীবনে কিছুই করে উঠতে পারবে না?”

    “ও আমার ছেলের বাবা কানাইবাবু,” বলল ময়না। “আমি ওকে ছেড়ে যেতে পারি না। আমি যদি চলে যাই তা হলে ওর কী হবে?”

    হাসল কানাই। “ঠিক আছে, ও তোমার স্বামী কিন্তু তা হলে তুমি নিজে কেন ওর সঙ্গে কথা বলতে পারছ না? এই কাজটা কেন তোমার হয়ে আমাকে করে দিতে হবে?”

    “ও আমার স্বামী, সেইজন্যেই এই নিয়ে ওর সঙ্গে আমি কথা বলতে পারি না কানাইবাবু,” শান্তভাবে জবাব দিল ময়না। “একজন বাইরের লোকের সঙ্গেই শুধু এসব নিয়ে কথা বলা যায়।”

    “তুমি নিজে যেটা করতে পারছ না সেটা একজন বাইরের লোক কী করে পারবে?”

    “পারবে কানাইবাবু,” ময়না বলল। “কারণ মুখের কথা হল গিয়ে বাতাসের মতন। যখন হাওয়া দেয় তখন দেখবেন জলের ওপরে কেমন ঢেউ ওঠে৷ আসল নদীটা থাকে তার নীচে–তাকে দেখাও যায় না শোনাও যায় না। নদীর ভেতর থেকে কিন্তু হাওয়া দিয়ে ঢেউ তোলা যায় না। সেটা করা যায় বাইরে থেকে। সেটা করার জন্যেই আপনার মতো কাউকে আমার দরকার।”

    আবার হেসে উঠল কানাই। “মুখের কথা বাতাসের মতো হতে পারে ময়না, কিন্তু সে কথার মারপ্যাঁচ তো দেখছি তোমার দিব্যি জানা আছে।”

    উঠে পড়ে টেবিলটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল কানাই। “আচ্ছা, সত্যি করে বলো তো ময়না, তোমার কি কখনও মনে হয় না অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে যদি তুমি থাকতে তা হলে কেমন হত? কখনও কৌতূহল হয় না তোমার?”

    একটা হালকা ঠাট্টার সুর ছিল কানাইয়ের কথাটার মধ্যে। ঠিক সেটাই দরকার ছিল ময়নাকে উশকে দেওয়ার জন্য। চটে উঠল ময়না। “আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছেন, তাই না কানাইবাবু? আপনি চান আমি একবার হা বলি, আর তাই নিয়ে আপনি মজা করবেন। সব লোককে বলে বেড়াবেন আমি এরকম বলেছি, তাই না? আমি গাঁয়ের মেয়ে হতে পারি, কিন্তু এত বোকা নই যে আপনার এই কথার জবাব দেব। যে মেয়ের সঙ্গেই আপনার দেখা হয় তার সঙ্গেই আপনি এই খেলা খেলেন–ঠিক বুঝতে পেরেছি আমি।”

    ঠিক জায়গায় ঘা লাগল ময়নার এই শেষ কথাটায়। একটু যেন কুঁকড়ে গেল কানাই। তড়িঘড়ি বলল, “ময়না, শোনো, রাগ কোরো না–আমি খারাপ কিছু বলতে চাইনি।”

    শাড়ির খসখস শব্দ শোনা গেল আবার। উঠে পড়ে এক টানে দরজাটা খুলে ফেলল ময়না। তারপর অন্ধকারের মধ্যেই কানাই শুনতে পেল ও বলছে, “ওই মেমসাহেবের সঙ্গে মনে হয় আপনার ভালই জমবে কানাইবাবু। সেটা হলেই আমাদের সকলের মঙ্গল।”

  • অপরাধ

    অপরাধ

    অপরাধ

    বেশ কয়েকদিন ধরে চলল পুলিশি অবরোধ। পুরো ব্যাপারটাই আমাদের হাতের বাইরে, কিছুই করতে পারছি না, শুধু শুনতে পাচ্ছি নানারকম গুজব–কানে আসছে খুব সাবধানে খরচ করা সত্ত্বেও খাবার-দাবার সব শেষ হয়ে গেছে, খিদের জ্বালায় অনেকে নাকি ঘাস পর্যন্ত খাচ্ছে। সব টিউবওয়েলগুলো ভেঙে দিয়েছে পুলিশ, দ্বীপে কোনও খাওয়ার জল পাওয়া যাচ্ছে না। তেষ্টায় লোকে পুকুর-ডোবার জল খাচ্ছে, ফলে নাকি মারাত্মক কলেরা ছড়িয়ে পড়েছে মরিচঝাঁপিতে।

    একদিন অবশেষে উদ্বাস্তুদের একজন পুলিশের চোখ এড়িয়ে পালিয়ে এল। সাঁতরে পার হয়ে গেল গারল নদী–নিঃসন্দেহে খুবই বীরত্বব্যঞ্জক কাজ। কিন্তু তাতেই সে থেমে থাকল না। বহু কষ্ট করে শেষে গিয়ে পৌঁছল কলকাতায়। সেখানকার সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা করে তাদের সমস্ত বৃত্তান্ত জানাল। পুরো ব্যাপারটা ফলাও করে ছাপা হল খবরের কাগজে। হুলুস্থুল পড়ে গেল চারদিকে। নাগরিক মঞ্চগুলি নানা জায়গায় আপিল করল, তুমুল হইচই হল বিধানসভায়, শেষে হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়াল ব্যাপারটা। আদালত রায় দিল এভাবে দ্বীপবাসীদের ঘেরাও করে রাখা বেআইনি, অবিলম্বে অবরোধ ওঠাতে হবে সরকারকে।

    মনে হল একটা বড় জিত হল উদ্বাস্তুদের। খবরটা যেদিন আমাদের কাছে পৌঁছল, তার পরদিন দেখি বাঁধের কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে হরেন। মুখ ফুটে কিছু বলতে হল না–ঝোলা গুছিয়ে নিয়ে গুটিগুটি গিয়ে চেপে বসলাম ওর নৌকোয়। তারপর রওয়ানা দিলাম।

    মনের মধ্যে তখন বেশ একটা ফুরফুরে ভাব। ভাবছি মরিচঝাঁপি গিয়ে নিশ্চয়ই দেখব মোচ্ছব চলছে, সকলে জয়ের আনন্দে মাতোয়ারা। কিন্তু পৌঁছে দেখি চিত্রটা একেবারেই অন্যরকম। এ কয়দিনের ঝড়ের আঘাতটা মারাত্মকভাবে লেগেছে মরিচঝাঁপিতে। তা ছাড়া অবরোধ উঠলেও পুলিশরা কিন্তু চলে যায়নি। এখনও তারা দ্বীপে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে, সকলকে বলছে দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে।

    কুসুমকে দেখে তো বুক ফেটে গেল আমার। শুকিয়ে কাঠির মতো হয়ে গেছে শরীর, চামড়া কুঁড়ে বেরিয়ে আসা হাড়গুলো যেন গোনা যায়। এত দুর্বল যে মাদুর ছেড়ে ওঠার ক্ষমতাটুকুও নেই। বরং ফকিরের ওপর দেখা গেল ততটা লাগেনি অবরোধের ধাক্কা–বাচ্চা বলেই হয়তো। ওই দেখাশোনা করছে মায়ের।

    দেখেশুনে আমার মনে হল ফকির যাতে খেতে পায় সেইজন্য এই কয়দিন নিজে কিছু খায়নি কুসুম। কিন্তু দেখা গেল ব্যাপারটা অতটা সরল নয়। বেশিরভাগ সময়টাতেই কুসুম ফকিরকে ঘরে আটকে রাখার চেষ্টা করেছে, চারিদিকে থিকথিকে পুলিশের মধ্যে বাইরে যেতে দিতে চায়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও কঁক-ফোকর খুঁজে ফকির মাঝে মাঝেই বেরিয়ে গেছে, কখনও কয়েকটা কাঁকড়া, কখনও বা কিছু মাছ ধরে নিয়ে এসেছে। তার অধিকাংশটা কুসুম ওকেই খাইয়ে দিয়েছে। আর নিজে খেয়েছে একরকমের বুনো শাক–এখানকার লোকেরা তাকে বলে জাদু পালং। প্রথম প্রথম খেতে মন্দ লাগেনি। কিন্তু তারপর বোঝা গেল কী মারাত্মক ছিল সেই শাক। ভয়ানক পেটের গণ্ডগোল হল কুসুমের ওটা খেয়ে। একেই তো কয়েকদিন কোনও পুষ্টিকর খাবার পেটে পড়েনি, তার ওপর এই পেট খারাপ। সেইজন্যই এইরকম দশা দাঁড়িয়েছে কুসুমের।

    ভাগ্যিস বুদ্ধি করে কিছু রসদ সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম আমরা খানিকটা চাল ডাল আর তেল। কুসুমের ঝুপড়ির মধ্যে এখন সেগুলি ঠিকমতো গুছিয়ে রাখতে লাগলাম। কিন্তু কুসুম সেসব কিছুই খাবে না। কোনওরকমে মাদুর থেকে উঠে একটা ব্যাগ টেনে তুলল নিজের কাঁধে, হরেন আর ফকিরকে বলল বাকিগুলো তুলে নিতে।

    “আরে দাঁড়া দাঁড়া, কী করছিস তুই?” ভীষণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি। “কোথায় যাচ্ছিস এগুলো নিয়ে? এ তো আমরা তোর জন্যে নিয়ে এসেছি।”

    “আমি তো এগুলো রাখতে পারব না সার। এখন সব খাবার-দাবার খুব হিসেব করে খরচ করছি আমরা এখানে। এগুলো নিয়ে গিয়ে আমাদের পাড়ার নেতার কাছে জমা করতে হবে এক্ষুনি।”

    যুক্তিটা আমি বুঝতে পারলাম। কিন্তু তাও অনেক করে বোঝালাম কুসুমকে–সবকিছু ভাগ করে খাওয়া হচ্ছে বলে যে সমস্তটাই উজাড় করে দিয়ে দিতে হবে তার কোনও মানে নেই। এর থেকে দু’-এক মুঠো চাল ডাল আলাদা করে রেখে দেওয়াটা কিছু অনৈতিক হবে না। বিশেষ করে ও যখন একটা বাচ্চার মা। তার দেখাশোনাও তো ওকে করতে হবে।

    আমরা কাপে করে মেপে খানিকটা চাল ডাল তুলে রাখছি দেখে কাঁদতে শুরু করে দিল কুসুম। ওর সেই চোখের জল দেখে যেন একটা ঝাঁকুনি লাগল আমার আর হরেনের। এত ঝড়ঝঞ্জার মধ্যেও যে কুসুম সাহস আর মনোবল হারায়নি, তাকে এমন করে ভেঙে পড়তে দেখাটা বুকে শেল বেঁধার মতো যন্ত্রণাদায়ক। মায়ের পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দু’হাত দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরল ফকির, আর পাশে বসে কুসুমের কাঁধে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল হরেন। আমি বসে রইলাম স্থাণু হয়ে। আমার তো কিছু দেওয়ার নেই এখানে, শুধু মুখের কথা ছাড়া।

    “কী হল কুসুম?” জিজ্ঞেস করলাম আমি। “কী ভাবছিস রে?”

    “কী জানেন সার,” আঁচলে চোখ মুছে বলল কুসুম, “খিদে-তেষ্টাটা তবু সহ্য হয়, কিন্তু তার চেয়েও বেশি কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে এই ক’দিনে। এই ঝুপড়ির মধ্যে অসহায়ভাবে বসে বসে শোনা–বাইরে পুলিশের দল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, বারবার মাইকে বলছে আমাদের প্রাণের দাম এক কানাকড়িও নয়–সে যে কী ভয়ংকর সে আপনাকে কী বলব। বসে বসে খালি শুনেছি, এই দ্বীপকে রক্ষা করতে হবে গাছেদের জন্য, বন্য পশুদের জন্য। এই দ্বীপ ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সম্পত্তি, ব্যাঘ্র প্রকল্পের অংশ। সারা পৃথিবীর মানুষের পয়সায় এই প্রকল্প চলছে। প্রতিদিন খালি পেটে এখানে বসে বসে কতবার যে এই কথাগুলো শুনতে হয়েছে তার কোনও হিসেব নেই। মনে মনে ভেবেছি কারা এইসব লোক, যারা এত ভালবাসে বনের পশুদের যে তাদের জন্যে আমাদের মেরে ফেলতেও কোনও আপত্তি নেই? তারা কি জানে তাদের নাম করে কী করা হচ্ছে এখানে? কোথায় থাকে এই মানুষেরা? তাদের ঘরে কি ছেলেমেয়ে আছে? মা আছে? বাবা আছে? যত ভেবেছি তত মনে হয়েছে এই গোটা পৃথিবীটাই জন্তু জানোয়ারদের জায়গা হয়ে গেছে; আর আমাদের দোষ, আমাদের অপরাধ যে আমরা মানুষ হয়ে জন্মেছি, যেভাবে সবসময় মানুষ বাঁচার চেষ্টা করেছে, সেভাবে এই জল মাটির ওপর নির্ভর করে বাঁচতে চেয়েছি। সেই বাঁচার চেষ্টাকে যদি কেউ অপরাধ বলে মনে করে তা হলে সে ভুলে গেছে এভাবেই মানুষ বেঁচে এসেছে এতটা কাল মাছ ধরে, জঙ্গল সাফ করে আর সেই জমিতে চাষ করে।”

    কথাগুলো শুনে আর ওর ভাঙাচোরা মুখটা দেখে এত খারাপ লাগল আমার–এই অকর্মণ্য সাধারণ ইস্কুল মাস্টারের–যে মাথাটা ঘুরতে শুরু করল হঠাৎ। মাদুরের ওপর চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়তে হল আমাকে।

  • বিদায় লুসিবাড়ি

    বিদায় লুসিবাড়ি

    বিদায় লুসিবাড়ি

    গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে হাসপাতালের রাস্তা ধরে কানাই যখন হাঁটতে শুরু করল লুসিবাড়ি তখন ভোরের কুয়াশায় ঢাকা। এই সাতসকালেও দেখা গেল একটা সাইকেল ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে গেটের সামনে। সেটাকে নিয়ে আবার গেস্ট হাউসে ফিরল কানাই। পিয়া আর ভ্যানওয়ালার সঙ্গে হাত লাগিয়ে মালপত্রগুলো তুলে ফেলল ভ্যানের পিছনে। মালপত্র বলতে খুব একটা বেশি কিছু না–কানাইয়ের সুটকেস, পিয়ার পিঠব্যাগ দুটো, আর গেস্ট হাউস থেকে ধার করা বালিশ কম্বলের একটা বান্ডিল।

    বেশ জোরেই চলছিল ভ্যানটা। খানিকক্ষণের মধ্যেই গ্রামের সীমানায় এসে পড়ল ওরা। বাঁধের কাছাকাছি পৌঁছে হঠাৎ সামনের দিকে ইশারা করল ভ্যানওয়ালা। “ওই দেখুন, কী যেন একটা হচ্ছে ওখানে, ওই বাঁধের ওপরে।”

    ভ্যানের তক্তার ওপর পা ঝুলিয়ে পেছন ফিরে বসেছিল কানাই আর পিয়া। ভ্যানওয়ালার কথা শুনে গলা বাড়িয়ে কানাই দেখল বাঁধের একেবারে ওপরে বেশ কিছু লোক জড়ো হয়েছে। মনে হল ওপারে কিছু একটা হচ্ছে কোনও প্রতিযোগিতা বা ওইরকম একটা কিছু। ভিড়ের সবাই মন দিয়ে দেখছে, কেউ কেউ মাঝে মাঝে চিৎকার করে উঠছে, মনে হল যেন উৎসাহ দিচ্ছে কাউকে। মালপত্র ভ্যানে রেখে কানাই আর পিয়াও উঠল বাঁধের ওপর, কী হচ্ছে দেখে আসতে।

    ভাটা পড়ে গেছে। চড়াটার একেবারে শেষে নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে মেঘা। পাশে ফকিরের ডিঙি। সেটাই দেখা গেল সম্মিলিত জনতার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। নৌকোর ওপর দাঁড়িয়ে ফকির আর টুটুল। তাদের পাশে হরেন আর তার সেই তেরো-চোদ্দো বছরের নাতি। একটা মাছধরা সুতোকে প্রাণপণে টেনে ধরে আছে ওরা। টানটান সুতোটা চিকচিক করছে আলো লেগে, তীব্র গতিতে জল কেটে এঁকেবেঁকে ছুটছে ডাইনে বাঁয়ে।

    লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল একটা শঙ্করমাছ গেঁথেছে ফকিরের বঁড়শিতে। কানাই আর পিয়ার চোখের সামনেই হঠাৎ ছাই রঙের চ্যাপটা জীবটা এরোপ্লেনের মতো ছিটকে উঠে এল জল থেকে। ফকিররা সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে গিয়ে ধরল সেটাকে। মনে হল যেন বিশাল একটা ঘুড়িকে টেনে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে। হাতে গামছা জড়িয়ে সর্বশক্তিতে মাছটাকে ধরে রেখেছে ওরা। আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে আসছে প্রাণীটার আছাড়ি পিছাড়ি। শেষ পর্যন্ত ডিঙির কিনার দিয়ে ঝুঁকে পড়ে দায়ের এক কোপে মাছটার ভবলীলা সাঙ্গ করল ফকির।

    শিকার ডাঙায় এনে ফেলার পর ভিড় করে সেটাকে ঘিরে দাঁড়াল সবাই। পিয়া আর কানাইও গেল দেখতে। পাখনাগুলো মেলে ধরার পর দেখা গেল প্রায় মিটার দেড়েকের মতো চওড়া মাছটা। লেজের দৈর্ঘ্য মোটামুটি তার অর্ধেক। ওরা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই একজন মাছওয়ালা দর দিল ওটাকে কেনার জন্য। রাজি হয়ে গেল ফকির। কিন্তু মাছটা নিয়ে যাওয়ার আগে দায়ের এক কোপে লেজটা কেটে নিয়ে ফকির টুটুলকে দিল সেটা। দেওয়ার ভঙ্গিটার মধ্যে এমন একটা আড়ম্বরের ভাব ছিল যে মনে হল যেন কোনও যুদ্ধ জয় করে আনা রত্নভাণ্ডার ছেলের হাতে তুলে দিচ্ছে ফকির।

    “টুটুল ওটা দিয়ে কী করবে?” জিজ্ঞেস করল পিয়া।

    “খেলবে-টেলবে আর কী,” জবাব দিল কানাই। “আগেকার দিনে রাজা জমিদাররা এই শঙ্করমাছের লেজের চাবুক দিয়ে অবাধ্য প্রজাদের শাসন করত। ভয়ানক যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার। কিন্তু খেলনা হিসেবে জিনিসটা মন্দ নয়। আমারও একটা ছিল ছোটবেলায়।”

    টুটুল তখনও মুগ্ধ হয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে লেজটাকে, এমন সময় ভিড় ঠেলে হঠাৎ ময়না এসে দাঁড়াল ওর সামনে। ঘাবড়ে গিয়ে একছুটে মায়ের নাগালের বাইরে পালাল টুটুল, গিয়ে লুকোল ফকিরের পেছনে। ছেলের গায়ে লেগে যাবে ভয়ে দু’হাতে রক্তমাখা দা-টা মাথার ওপরে তুলে ধরল ফকির। আর মায়ের হাত এড়িয়ে বাপের চারদিকে ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগল টুটুল। ভিড়ের সমস্ত লোক হো হো করে হেসে উঠল দৃশ্যটা দেখে।

    ডিউটিতে যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়ে বেরিয়েছে ময়না। পরনে নার্সের পোশাক–নীল পাড় সাদা শাড়ি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টুটুলকে যখন ও ধরতে পারল, শাড়ি ততক্ষণে জলে কাদায় মাখামাখি। এত লোকের সামনে অপদস্থ হয়ে ঠোঁটদুটো অল্প অল্প কঁপছে ময়নার। ফকিরের দিকে ঘুরে তাকাল ও। চোখ নামিয়ে ফেলল ফকির। দা থেকে মুখের ওপর গড়িয়ে পড়া একটা রক্তের ফোঁটা মুছে নিল হাতের পেছনে।

    “তোমাকে বলেছিলাম না ওকে সোজা স্কুলে নিয়ে যেতে?” ঝাঝালো গলায় বলল ময়না। “তুমি ওকে এখানে নিয়ে চলে এসেছ?”

    ছেলের হাত থেকে শঙ্করমাছের লেজটা ছিনিয়ে নিল ও। বিষম খাওয়ার মতো একটা সম্মিলিত আওয়াজ উঠল ভিড় থেকে। একটানে লেজটাকে নদীর মধ্যে ছুঁড়ে দিল ময়না। মুহূর্তে স্রোতের টানে মিলিয়ে গেল ফকিরের বিজয়স্মারক। তারপর হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে চলল টুটুলকে। কান্নায় মুচড়ে গেল ছেলেটার মুখ। চোখদুটো চেপে বন্ধ করে চলতে লাগল মায়ের পেছন পেছন, যেন জোর করে দৃষ্টির আড়াল করে দিতে চাইছে চারপাশের সবকিছুকে।

    কানাইয়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সামান্য কমে এল ময়নার চলার গতি। মুহূর্তের জন্য একবার চোখাচোখি হল দু’জনের। তারপর ছেলের হাত ধরে একদৌড়ে বাঁধের গা বেয়ে নেমে গেল ও। ময়না চোখের আড়ালে চলে যাওয়ার পর ফিরে তাকাল কানাই। দেখল ফকির একদৃষ্টে চেয়ে আছে ওর দিকে, মেপে নিচ্ছে ওকে। মনে হল কানাইয়ের সঙ্গে ময়নার নির্বাক ভাব বিনিময় নজরে পড়েছে ফকিরের–মনে মনে বোঝার চেষ্টা করছে তার মানেটা।

    হঠাৎ খুব অস্বস্তি হতে লাগল কানাইয়ের। তাড়াতাড়ি পিয়ার দিকে ফিরে ও বলল, “চলুন, মালপত্রগুলো নামিয়ে ফেলি গিয়ে।”

    ধকধক দমদম আওয়াজ তুলল ইঞ্জিন। ধীরে ধীরে লুসিবাড়ির চর ছেড়ে সরে যেতে লাগল মেঘা, আর ভটভটিটার পেছন পেছন দমকে দমকে এগোতে লাগল ফকিরের ডিঙি। মেঘার ইঞ্জিনের গতি বদলের সঙ্গে সঙ্গে এক-একবার টান পড়ছে ডিঙিতে বাঁধা দড়িতে, পরক্ষণেই আবার ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। এই এলোমেলো গতিতে হঠাৎ ধাক্কা-টাক্কা যাতে না-লেগে যায়। সেজন্য ভটভটিতে না উঠে ডিঙিতেই রয়ে গেল ফকির। হাতে একটা লগি নিয়ে বসে রইল নৌকোর গলুইয়ে–ভটভটির খুব কাছে চলে এলে লগি দিয়ে ঠেলে সরিয়ে নিয়ে আসবে ডিঙিটাকে।

    মেঘার ওপরের ডেকে সারেং-এর ঘরের পাশে দুটো উঁচু কাঠের চেয়ার রাখা, তারই একটায় গিয়ে বসেছিল কানাই। মাথার ওপর রোদ আড়াল করার জন্য একটা তেরপল টাঙানো। নির্মলের নোটবইটা কোলের ওপর খুলে রেখেছে কানাই, কিন্তু পড়ছে না। সার্ভের কাজের জন্য জিনিসপত্র গুছিয়ে তৈরি হচ্ছে পিয়া, তাকিয়ে তাকিয়ে তা-ই দেখছে ও।

    গলুইয়ের সামনের দিকটা যেখানটায় একটু ছুঁচোলো হয়ে সামনে এগিয়ে গেছে, একেবারে তার কাছটায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল পিয়া। রোদ-হাওয়ার মুখোমুখি। ঠিকমতো দাঁড়িয়ে প্রথমে দূরবিনটা ঝুলিয়ে নিল গলায়, তারপর অন্য যন্ত্রপাতির বেল্টটা বাঁধতে লাগল। বেল্টের একদিকে লাগানো রয়েছে ক্লিপবোর্ড, আর অন্যদিকে ঝুলছে দু’খানা যন্ত্র–জিপিএস ট্র্যাকার আর ডেথ সাউন্ডার। বেল্ট-টেল্ট বাঁধা হয়ে গেলে তারপর দূরবিনটা তুলে নিয়ে চোখে লাগাল পিয়া। পা দুটো অনেকখানি ফাঁক করে দাঁড়িয়েছে, অল্প অল্প দুলছে ভটভটির দুলুনির সাথে সাথে। একমনে জলের দিকেই তাকিয়ে যদিও, কিন্তু কানাই বুঝতে পারছিল চারপাশে যা যা হচ্ছে–নৌকোর ওপরে কি নদীর পাড়ে–সবকিছুর প্রতিই বেশ সতর্ক রয়েছে পিয়া।

    সূর্য যত ওপরে উঠতে লাগল ততই বাড়তে থাকল জলের ওপর থেকে ঠিকরে আসা আলোর তীব্রতা। বেলার দিকে একটা সময়ে সেই জোরালো বিচ্ছুরণে মুছে গেল জল আর আকাশের সীমারেখা। সানগ্লাস পরেও নদীর দিকে বেশিক্ষণ চোখ রাখা যায় না। পিয়া কিন্তু নির্বিকার। কী আলো, কী হাওয়া, কিছুতেই যেন কিছু আসে যায় না ওর। ভটভটির ঝাঁকুনি সামলানোর জন্য হাঁটুদুটো একটু ভাজ করে দাঁড়িয়ে কাজ করে যাচ্ছে একটানা, শরীরটা অল্প দুলছে পাশাপাশি, মনে হচ্ছে যেন খেয়ালই করছে না ঢেউয়ের দুলুনি। এতক্ষণে একটাই শুধু আপোশ করেছে–রোদ আড়াল-করা একটা টুপি বের করে পরে নিয়েছে মাথায়। তেরপলের আড়ালে বসে আলোর বিপরীতে ছায়ার মতো পিয়ার শরীরটা দেখতে পাচ্ছিল কানাই, চওড়া কানাওয়ালা টুপি আর যন্ত্রপাতি-ঝোলানো বেল্ট সমেত অনেকটা আমেরিকান কাউবয়দের মতো মনে হচ্ছিল ওর চেহারাটাকে।

    বেলার দিকে হঠাৎ একবার একটু উত্তেজনার সঞ্চার হল বোটে। শোনা গেল ডিঙি থেকে চিৎকার করছে ফকির। ইশারায় হরেনকে ইঞ্জিন বন্ধ করতে বলে ডেকের পেছন দিকটায় দৌড় লাগাল পিয়া। কানাইও ছুটল পেছন পেছন, কিন্তু যতক্ষণে ও গিয়ে পৌঁছেছে তখন আর দেখার মতো কিছুই নেই।

    “কী হল বলুন তো?”

    একটা ডেটাশিটের ওপর ব্যস্ত হয়ে কীসব লিখে চলছিল পিয়া, মুখ তুলে তাকাল না। “ফকির একটা গ্যাঞ্জেটিক ডলফিন দেখতে পেয়েছে,” লিখতে লিখতেই জবাব দিল ও। “ভটভটির ডানদিকে, শ’ দুয়েক মিটার পেছনে। এখন আর চেষ্টা করে লাভ নেই, দেখতে পাবেন না। এতক্ষণে সাবধান হয়ে গেছে ওটা।”

    পিয়ার গলায় সামান্য একটু হতাশা লেগে রয়েছে মনে হল কানাইয়ের। “এটাই কি প্রথম আজকে?”

    “হ্যাঁ,” উৎসাহের সুরে জবাব দিল পিয়া। “এটাই প্রথম। তাতে অবশ্য আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। যা আওয়াজ।”

    “ওরা কি ভটভটির শব্দে ভয় পেয়ে গেছে মনে হয়?”

    “হতেই পারে,” পিয়া বলল। “আবার এরকমও হতে পারে যে আওয়াজটা মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত জলের নীচে ডুব দিয়ে থাকছে। যেমন ধরুন এই ডলফিনটা–আমরা ওটাকে পেরিয়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে আসার পর জল থেকে মাথা তুলল ও।”

    “আচ্ছা, আগে কি এখানে আরও বেশি ডলফিন দেখা যেত?”

    “সে তো যেতই,” বলল পিয়া। “এইসব অঞ্চলের নদী-নালায় বিভিন্ন প্রজাতির জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণী একসময় গিজগিজ করত। পুরনো তথ্য ঘাঁটলেই সে বিষয়ে নানা খোঁজখবর পাওয়া যায়।”

    “তারা সব গেল কোথায়?”

    “ব্যাপারটা কী জানেন, পরিবেশের পরিবর্তনের জন্যেই মনে হয় ডলফিনের সংখ্যা ক্রমশ কমে এসেছে এখানে। হয়তো আচমকা বড় রকমের কিছু একটা ঘটেছিল কোনও সময়।”

    “তাই?” বলল কানাই। “আমার মেসোরও এইরকমই একটা ধারণা ছিল।”

    “ধারণাটা ভুল ছিল না,” পিয়া একটু গম্ভীর। “একটা স্থায়ী বসবাসের জায়গা ছেড়ে যদি চলে যেতে শুরু করে এইরকম প্রাণীরা, বুঝতে হবে কোথাও খুব, খুব সাংঘাতিক কিছু একটা গোলমাল হয়েছে।”

    “সে গোলমালটা কী হতে পারে বলে মনে হয় আপনার?”

    “কোথা থেকে শুরু করি বলুন তো?” একটু শুকনো হেসে জিজ্ঞেস করল পিয়া। “বাদ দিন সেসব কথা। এই ইতিহাস ঘাঁটতে শুরু করলে চোখের জল সামলানো মুশকিল।”

    খানিক পরে একটু জল খেয়ে নেওয়ার জন্যে পিয়া চোখ থেকে দূরবিনটা নামাতে কানাই বলল, “তো, আপনার কি তা হলে এটাই কাজ? এরকমভাবে সারাদিন জলের দিকে তাকিয়ে থাকা?”

    কানাইয়ের পাশে এসে বসে পড়ল পিয়া। বোতল কাত করে খানিকটা জল গলায় ঢেলে বলল, “হ্যাঁ। সেটারও অবশ্য একটা পদ্ধতি আছে, কিন্তু বেসিক্যালি কাজটা তাই-ই। জলের দিকে তাকিয়ে থাকা। কিছু দেখতে পেলে ভাল, না পেলেও আফশোস খুব একটা নেই। সেটাও একটা তথ্য। সবটাই কাজে লাগে।”

    না বোঝার ভাব করে মুখ বাঁকাল কানাই। বলল, “যার কাজ তাকে সাজে। আমি হলে তো পুরো একটা দিনও এই কাজ করে উঠতে পারতাম না। ভীষণ একঘেয়ে মনে হত।”

    বোতলের জলটা শেষ করে ফেলল পিয়া। হাসল আবার। “সেটা আমি বুঝতে পারি। কিন্তু এই কাজের ধরনটাই তাই, জানেন? হয়তো অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করে বসে আছেন কিন্তু কিছুই ঘটছে না, আবার কখনও হয়তো সাংঘাতিক ব্যস্ততা। আর সে ব্যস্ততাটাও মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। এই কাজের ছন্দটার সঙ্গে মানিয়ে নিতে খুব কম লোকই পারে। আমার তো মনে হয় দশ লাখে একটা পাওয়া যায় সেরকম লোক। সে কারণেই এখানে ফকিরের মতো একটা লোককে পেয়ে খুব আশ্চর্য হয়েছি আমি।”

    “আশ্চর্য হয়েছেন? কেন?”

    “ডলফিনটাকে কেমন স্পট করল ও দেখলেন তো?” বলল পিয়া। “যেন সব সময়ই জলের দিকে নজর রেখে চলেছে ও। নিজের অজান্তেই। এর আগেও অনেক অভিজ্ঞ জেলের সঙ্গে কাজ করেছি আমি, কিন্তু এরকম অদ্ভুত ইন্সটিংক্ট আমি কারওর মধ্যে দেখিনি। নদীর বুকের ভেতরটা পর্যন্ত যেন দেখে নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে ওর।”

    পিয়ার কথাটা হজম করতে এক মুহূর্ত সময় লাগল কানাইয়ের। “তা হলে ওর সঙ্গেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে আপনার?”

    “ওর সঙ্গে আবার কাজ করার ইচ্ছে তো আমার আছে বটেই,” বলল পিয়া। “আমার মনে হয় ফকিরের সঙ্গে মিলে কাজ করতে পারলে অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারা যাবে।”

    “মনে হচ্ছে আপনার কিছু একটা লং-টার্ম প্ল্যান রয়েছে?” মাথা নাড়ল পিয়া। “সত্যি বলতে কী, সেরকম ইচ্ছে একটা আছে। একটা প্রজেক্টের কথা আমার মাথায় ঘুরছে, সেটা যদি হয় তা হলে বেশ কয়েক বছরই হয়তো এখানে থেকে যেতে হবে আমাকে।”

    “এখানে? মানে এই সুন্দরবনে?”

    “হ্যাঁ।”

    “সত্যি?” কানাইয়ের ধারণা ছিল সামান্য কয়েকদিনের জন্যেই ইন্ডিয়ায় এসেছে পিয়া। কিন্তু ও যে এদেশে বেশ কিছুদিন থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে তাও কোনও শহর-টহরে নয়, সমস্ত অসুবিধা সত্ত্বেও এই ভাটির দেশের জলকাদার মধ্যে সেটা জানতে পেরে বেশ একটু অবাকই হয়ে গেল কানাই।

    “আপনি ভাল করে ভেবে নিয়েছেন তো? এইরকম একটা জায়গায় থাকতে পারবেন আপনি বছরের পর বছর?” ও জিজ্ঞেস করল।

    “কেন পারব না?”কানাইয়ের প্রশ্নটা শুনে একটু অবাকই হল পিয়া। “না পারার তো কিছু নেই।”

    “আর এখানে থাকলে এই ফকিরের সঙ্গেই কাজ করবেন?”

    মাথা নাড়ল পিয়া। “খুবই খুশি হব যদি তা সম্ভব হয়। কিন্তু সেটা আমার মনে হয় ফকিরের ওপরই নির্ভর করছে।”

    “অন্য আর কেউ কি আছে যার সঙ্গে আপনি কাজটা করতে পারেন?”

    “সেটা এক ব্যাপার হবে না কানাই,” পিয়া বলল। “ফকিরের পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা অসাধারণ। সকলের এরকম থাকে না। গত ক’দিন ওর সঙ্গে কাজ করতে যে কী ভাল লেগেছে সেটা আমি আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। এত সুন্দর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আমার খুব কমই হয়েছে।”

    কানাইয়ের মনের ভেতরে কোথায় হঠাৎ একটা ঈর্ষার তীক্ষ্ণ খোঁচা লাগল। নিজেকে সামলাতে না-পেরে একটু ব্যঙ্গের সুরে বলল, “আর এই পুরো সময়টায় ও যা যা বলেছে তার একটা বর্ণও আপনি বুঝতে পারেননি। ঠিক বলছি?”

    “পারিনি,” সম্মতিতে মাথা নাড়ল পিয়া। “কিন্তু মজার ব্যাপারটা কী জানেন? আমাদের দু’জনের মধ্যে এত বিষয়ে মিল যে ভাষার ব্যবধানটার জন্য অসুবিধাই হয়নি কোনও।”

    “শুনুন পিয়া,” স্পষ্ট গলায় খানিকটা কর্কশভাবে বলল কানাই। “নিজের সঙ্গে ছলনা করার চেষ্টা করবেন না। ফকির আর আপনার মধ্যে কোনও মিল কোনওকালে ছিল না, এখনও নেই। ফকির একটা জেলে, আর আপনি একজন সায়েন্টিস্ট। যে জীবজগৎ আপনার কাছে গবেষণার বিষয়, ওর চোখে সেটা খাবার জিনিস। জীবনে কখনও চেয়ারে বসেনি ও, আমি দিব্যি গেলে বলতে পারি। কল্পনা করতে পারেন প্লেনে চড়লে ওর কী অবস্থা হবে?” জেটপ্লেনের সারি সারি চেয়ারের মধ্যে দিয়ে লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে ফকির হেঁটে যাচ্ছে দৃশ্যটা কল্পনা করেই হেসে ফেলল কানাই। “আপনাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র কোনও মিল নেই পিয়া। থাকতে পারে না। আপনারা দুজনে দুটো আলাদা দুনিয়ার মানুষ, আলাদা জগতের। আপনার ওপর বজ্রাঘাত হতে যাচ্ছে বুঝতে পারলেও আপনাকে সেটা জানানোর কোনও উপায় নেই ফকিরের হাতে।”

    ঠিক তক্ষুনি, কানাইয়ের কথার সূত্র ধরেই যেন, হঠাৎ ফকিরের চিৎকার শোনা গেল– ভটভটির ইঞ্জিনের শব্দের ওপর গলা চড়িয়ে চেঁচিয়ে বলছে, “কুমির! কুমির!”

    “কী বলল ওটা?” ডেকের পেছনদিকে দৌড়ে গেল পিয়া। কানাইও দৌড়াল ওর সঙ্গে সঙ্গে।

    ডিঙির ওপর ছইয়ের গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে নদীর ভাটির দিকে ইশারা করছে ফকির। “কুমির!”

    “কী দেখতে পেয়েছে ও?” দূরবিন তুলে চোখে লাগাল পিয়া।

    “আ ক্রোকোডাইল।”

    এরকম একটা তাৎক্ষণিক উদাহরণ হাতের সামনে পেয়ে সেটা ব্যবহার করার সুযোগটা আর ছাড়তে পারল না কানাই। “আপনি নিজেই দেখুন পিয়া, যদি আমি এখন এখানে না থাকতাম আপনি বুঝতেই পারতেন না কী দেখে চেঁচিয়ে উঠল ফকির।”

    দূরবিনটা চোখ থেকে নামিয়ে বোটের সামনে ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল পিয়া। ঠান্ডা গলায় বলল, “আপনার বক্তব্য আমি পরিষ্কার বুঝতে পেরেছি কানাই। থ্যাঙ্ক ইউ।”

    “শুনুন,” পিছু ডাকল কানাই। “পিয়া–” কিন্তু দেরি হয়ে গেছে ততক্ষণে। পিয়া ফিরে গেছে নিজের জায়গায়। মাফ চাওয়ার জন্য ঠোঁটের ডগায় আসা শব্দগুলি গিলে নিতে হল কানাইকে।

    মিনিট কয়েক পর কানাই দেখল বোটের সামনের দিকটায় ফের গিয়ে দাঁড়িয়েছে পিয়া, চোখের সঙ্গে সাঁটা দূরবিন, এমন মগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছে জলের দিকে যে কানাইয়ের মনে হল ও যেন পুঁথিপড়া পণ্ডিত–কোনও পাণ্ডুলিপির পাঠোদ্ধার করার চেষ্টা করে যাচ্ছে গভীর মনোযোগে। পৃথিবী যেন নিজের হাতে লিখে রেখেছে দুপাঠ্য সেই পুঁথি। দেখতে দেখতে কানাইয়ের মনে পড়ল ও নিজে প্রায় ভুলেই গেছে কেমন লাগে কোনও কিছুর দিকে এভাবে নিবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে থাকতে। কোনও ভোগ্যদ্রব্য নয়, সুখসুবিধার উপকরণ নয়, লালসা নিবৃত্তির বস্তু নয়–এরকম আপাত-অর্থহীন কিছুর দিকে এমন নিমগ্ন হয়ে চেয়ে থাকা আর হয় না এখন। অথচ একটা সময় ছিল যখন ও-ও পারত এইভাবে মনটাকে একটা বিন্দুতে নিয়ে আসতে; ঠিক এইরকম একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকত অজানার দিকে–যেন একটা চশমার ভেতর দিয়ে। কিন্তু ওর সেই দৃশ্যবস্তু লুকোনো থাকত বিভিন্ন বিজাতীয় ভাষার গভীরে। ভাষার সেই দিগন্তছোঁয়া প্রান্তরে পৌঁছে অদ্ভুত একটা তৃষ্ণার বোধ জাগত মনে, ঠিক কোন পথ দিয়ে এসে অন্য বাস্তবেরা এক জায়গায় মিলে যায় খুঁজে বের করার ইচ্ছে হত সেটা। সে যাত্রার পথের বাধাগুলির কথাও এখন স্পষ্ট মনে পড়ল কানাইয়ের–সেই হতাশার কথা, যখন এক এক সময় মনে হত কিছুতেই ওই শব্দগুলিকে ঠিকমতো তুলে আনা যাবে না ঠোঁটে, ঠিক ঠিক ওই আওয়াজগুলো মুখ দিয়ে বের করতে পারা যাবে না কোনওদিন, যেমন দরকার ঠিক সেভাবে বাক্য জুড়ে জুড়ে কথা বলা আর হয়ে উঠবে না, চেনা ছক ভেঙে গুঁড়িয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে সবকিছু। শুধুমাত্র একটা উদগ্র ইচ্ছায় তখন দ্রুতগতি হয়ে উঠত মন, আর সে উত্তেজনা মনে মনে এখনও অনুভব করছে কানাই। কাম্য বস্তুর চেহারাটা কেবল পালটে গেছে, সেই তীব্র বাসনা এখন জলজ্যান্ত একটা মেয়ের চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে, এই বোটের ওপর রক্তমাংসে গড়া সেই ভাষার শরীর।

  • ব্যাঘাত

    ব্যাঘাত

    ব্যাঘাত

    লুসিবাড়ি ছাড়ার পর থেকেই নির্মলের নোটবইটা নিয়ে হরেনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ খুঁজছিল কানাই। বেশ খানিকক্ষণ পর মেঘা যখন অবশেষে একটা খোলা জায়গায় এসে পড়ল, তখন ও আস্তে আস্তে উঠে সারেঙের ঘরটায় গিয়ে ঢুকল। নোটবইটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এটা চিনতে পারেন হরেনদা?”

    সামনে জলের দিকে চেয়েছিল হরেন। মুহূর্তের জন্য একবার নজর ফিরিয়ে দেখল নোটবইটা। নিরুত্তাপ গলায় বলল, “হ্যাঁ। সার ওটা আমাকে রাখতে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন আপনাকে দিয়ে দিতে।”

    হরেনের সংক্ষিপ্ত জবাবে একটু চুপসে গেল কানাই। নির্মলের লেখায় বিভিন্ন প্রসঙ্গে এতবার হরেনের উল্লেখ আছে যে কানাই ভেবেছিল নোটবইটা দেখে ঠিক আবেগের বন্যায় ভেসে না গেলেও দু-একটা পুরনো স্মৃতি নিশ্চয়ই উশকে উঠবে ওর মনে।

    “মেসো আপনার কথা অনেক লিখেছে এর মধ্যে,” ওকে একটু উৎসাহিত করার জন্য বলল কানাই। হরেন কিন্তু চোখই সরাল না জল থেকে। মাথাটা অল্প একটু নাড়াল শুধু।

    ওর পেট থেকে কিছু বের করা খুব একটা সহজ কাজ হবে না বুঝতে পারল কানাই। এতটাই কি কম কথা বলে ও? নাকি বাইরের লোকের সামনে মুখ খুলতে চাইছে না? বলা মুশকিল।

    “কোথায় ছিল খাতাটা?” কানাই নাছোড়বান্দা। “কোত্থেকে বেরোল এতদিন পরে?”

    গলাটা একটু সাফ করে নিল হরেন। বলল, “হারিয়ে গিয়েছিল।”

    “কী করে?”

    “আপনি জানতে চাইলেন তাই বলছি,” বলল হরেন। “সার খাতাটা আমাকে দেবার পর আমি ওটাকে বাড়ি নিয়ে গেলাম। তারপর জল-টল যাতে না লাগে সেজন্য ভাল করে । প্লাস্টিকে মুড়ে আঠা লাগিয়ে আঠাটা শুকোনোর জন্যে রোদে দিলাম। তো বাড়ির কোনও বাচ্চা (ফকির কি?) ওটাকে খেলার জিনিস ভেবে উঠিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল। তারপর বাচ্চাদের যেমন স্বভাব–বেড়ার খাঁজের মধ্যে ওটাকে লুকিয়ে রেখে ভুলেই গেল সে কথা। আমি চারদিকে কত খুঁজলাম, কিছুতেই পেলাম না। তারপর আস্তে আস্তে আমিও একসময় ভুলে গেলাম খাতাটার কথা।”

    “শেষপর্যন্ত কী করে পাওয়া গেল তারপর?”

    “বলছি সে কথা,” শান্ত, মাপা গলায় বলতে লাগল হরেন। “প্রায় বছর খানেক হবে–আমি ঠিক করলাম আমাদের পুরনো চালাঘরটা ভেঙে একটা পাকা বাড়ি বানাব। সেই ঘর ভাঙার সময়ই খুঁজে পাওয়া গেল ওটা। আমাকে যখন এনে দিল খাতাটা আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না কী করব ওটাকে নিয়ে। ডাকে পাঠাতে চাইনি, যদি ঠিকানা ভুল হয়ে যায়। আর মাসিমাকে নিয়ে গিয়ে যে দেব, সে সাহসও আমার ছিল না। কত বছর হল ওনার সঙ্গে কোনও কথাই হয়নি। তারপর খেয়াল হল ময়না তো যায় মাঝে মাঝে গেস্ট হাউসে। শেষে ওর হাত দিয়েই পাঠিয়ে দিলাম খাতাটা। ওকে বললাম, “এটা নিয়ে চুপচাপ সারের পুরনো পড়ার ঘরটাতে গিয়ে রেখে দিয়ে আয়। সময় হলে ওরা ঠিক খুঁজে পাবে। তো এই হল ঘটনা।”

    এই বলে মুখ বন্ধ করল হরেন। এমনভাবে কথাটা শেষ করল যে বোঝা গেল এই বিষয়ে আর কোনও বাক্যব্যয় করতে রাজি নয় ও।

    ঘণ্টা তিনেক একটানা চলার পর হঠাৎ একবার ইঞ্জিনের শব্দটা মুহূর্তের জন্য বেতালা শোনাল পিয়ার কানে। মেঘার ডেকের ওপর একইভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ও, কিন্তু শুরুতে সেই যে একটা গ্যাঞ্জেটিক ডলফিনকে একঝলক দেখা গিয়েছিল, তারপর থেকে এ পর্যন্ত কিছুই আর চোখে পড়েনি। তার ফলে ওর সেই দহটাতে তাড়াতাড়ি গিয়ে পৌঁছনোর ইচ্ছেটা আরও বেড়েছে বই কমেনি৷ এইসময় যদি ইঞ্জিন গড়বড় করে তা হলে খুবই আফশোসের ব্যাপার হবে। জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই কান খাড়া করে ইঞ্জিনের আওয়াজটা শুনতে লাগল পিয়া। খানিকক্ষণের মধ্যেই ধকধক শব্দের ছন্দটা আবার ফিরে আসতে হাঁফ ছাড়ল ও।

    কিন্তু বেশিক্ষণের জন্য নয়। মিনিট পনেরো পরেই ফের তাল কাটল ইঞ্জিনের। একটা ফঁপা ফটফট আওয়াজ হল কয়েকবার, তারপর ক্লান্ত কাশির মতো কয়েকটা শব্দ, তারপর আচমকা সব চুপচাপ। মোহনার মাঝ বরাবর এসে একেবারে থেমে গেল মেঘার ইঞ্জিন।

    পিয়া বুঝতে পারছিল এ গোলমাল সহজে সারবার নয়। এত বিরক্ত লাগছিল যে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতেও ইচ্ছে করছিল না। কেউ না কেউ এক্ষুনি সেটা জানাতে আসবে নিশ্চয়ই, তাই ইঞ্জিনঘরের দিকে এগিয়ে দেখার চেষ্টা না করে নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রইল ও। বাতাসে ঢেউ তোলা নদীর দিকে চেয়ে দেখতে লাগল এক মনে।

    যা ভাবা গিয়েছিল, খানিক বাদেই গুটিগুটি পায়ে কানাই এসে দাঁড়াল পাশে। “একটা খারাপ খবর আছে পিয়া।”

    “আজকে আর হবে না, তাই তো?”

    “মনে হয় না।”

    হাত তুলে দূরে পাড়ের দিকে ইশারা করল কানাই। ওখানে একটা ছোট গ্রাম আছে। স্রোতের টানে টানে ওই পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়াটা নাকি খুব একটা সমস্যা হবে না, হরেন বলেছে। সেখানে হরেনের কিছু আত্মীয়স্বজন আছে। তাদের একজন নাকি এইসব ইঞ্জিন-টিঞ্জিনের কাজ জানে। সব যদি ঠিকঠাক চলে তা হলে কাল সকাল নাগাদ গর্জনতলার দিকে রওয়ানা হওয়া যেতেও পারে।

    পিয়া মুখ বাঁকাল। “কী আর বলব? কী আর করা যাবে এ ছাড়া।”

    “নাঃ। সত্যিই আর কোনও উপায় নেই।”

    ইতোমধ্যে ভটভটিটাকে ঘুরিয়ে নিয়েছে হরেন। বোটের মুখ এখন দূরের ওই গাঁয়ের দিকে। খানিকক্ষণের মধ্যেই বোঝা গেল স্রোতের টানে ধীরে ধীরে মোহনা পেরিয়ে যাচ্ছে ওরা। যদিও ভাটা পড়ে গেছে, ফলে নদীর টান এখন ওদের অনুকূলে, কিন্তু তা সত্ত্বেও ভয়ানক আস্তে আস্তে এগোচ্ছে মেঘা। অবশেষে যখন গন্তব্য স্পষ্টভাবে নজরে এল, দিন তখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

    দেখা গেল মোহনার ঠিক ধারে নয় গ্রামটা। একটু ভেতরে, কয়েক কিলোমিটার চওড়া একটা নদীর পাড়ে। ভাটা চলছে বলে এখন পাড়টাকে মনে হচ্ছে আকাশছোঁয়া, বোট থেকে। গ্রামটা চোখেই পড়ছে না। বাঁধের মাথায় শুধু দেখা যাচ্ছে বেশ কয়েকটা জটলা–কিছু লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেন অপেক্ষা করছে মেঘার জন্য। ভটভটিটা কাছাকাছি পৌঁছতে দেখা গেল কয়েকজন নেমে আসছে কাদা ভেঙে, হাত নাড়ছে ওদের উদ্দেশে। জবাবে বোটের রেলিংয়ের ওপর ঝুঁকে পড়ে হাত দুটো মুখের সামনে জড়ো করে এক হাঁক পাড়ল হরেন। খানিক বাদেই দেখা গেল একটা নৌকো সড়সড় করে পাড় বেয়ে নেমে জলে পড়ল, তারপর আস্তে আস্তে এসে থামল মেঘার পাশে। দুটো লোক ছিল নৌকোটায়। একজনকে আলাপ করিয়ে দিল হরেনের আত্মীয় বলে, সামনের গ্রামটাতেই সে থাকে, পেশায় জেলে। আর অন্যজন তার বন্ধু, পার্ট-টাইম মোটর মিস্ত্রি। বেশ খানিকক্ষণ ধরে চলল আলাপ পরিচয়ের পালা, তারপর ওদের দুজনকে নিয়ে হরেন নেমে গেল ভটভটির খোলের ভেতর। কিছুক্ষণের মধ্যেই মিস্ত্রির যন্ত্রপাতির আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ল গোটা বোটে। হাতুড়ি-বাটালির প্রবল খটখট শব্দের মধ্যে অস্ত গেল সূর্য।

    খানিক পরে সন্ধের আবছায়া চিরে হঠাৎ বিকট একটা জান্তব আওয়াজ শোনা গেল; মনে হল প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে কাতর আর্তনাদ করছে কেউ। হাতে টর্চ নিয়ে পিয়া আর কানাই দৌড়ে বেরিয়ে এল নিজের নিজের কেবিন থেকে। দু’জনেরই মাথায় একই চিন্তা। কাউকে নিশ্চয়ই বাঘে ধরেছে, তাই না?” জিজ্ঞেস করল পিয়া।

    “জানি না।”

    রেলিংয়ের ওপর ঝুঁকে পড়ে চেঁচিয়ে হরেনকে কী একটা জিজ্ঞেস করল কানাই। এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল হাতুড়ির আওয়াজ। তারপরেই খোলের ভেতর থেকে ভেসে এল। হরেনদের অট্টহাসির শব্দ।

    “ব্যাপারটা কী?” পিয়া কানাইয়ের দিকে তাকাল।

    কানাইয়ের মুখেও হাসি। বলল, “আমি জিজ্ঞেস করলাম কাউকে বাঘে ধরেছে কিনা, তাতে ওরা বলল গাঁয়ে একটা মোষ বাছুর বিয়োচ্ছে, ওটা তারই আওয়াজ।”

    “কী করে জানল ওরা?”

    “কারণ মোষটার মালিক হরেনের আত্মীয়। বাঁধের একেবারে পাশেই ওদের বাড়ি–ওই দিকটায়।”

    পিয়াও হেসে ফেলল এবার। “আমরা মনে হয় খামখাই ঘাবড়ে যাচ্ছি।” দু’ হাতের আঙুলগুলো জড়ো করে লম্বা একটা আড়মোড়া ভাঙল ও। হাই তুলল একবার। “সকাল সকাল শুয়ে পড়তে হবে মনে হচ্ছে।”

    “আজকেও?” একটু বিরক্তির আভাস কানাইয়ের গলায়। তারপর, যেন বিরক্ত ভাবটাকে চাপা দেওয়ার জন্যই যোগ করল, “খাওয়া-দাওয়া করবেন না?”

    “একটা নিউট্রিশন বার খেয়ে নেব। তাতেই কাল সকাল পর্যন্ত চলে যাবে আমার। কিন্তু আপনার কী প্ল্যান? অনেক রাত পর্যন্ত জাগবেন নাকি?”

    “হ্যাঁ, কানাই বলল। “মনুষ্যজগতের অধিকাংশের মতো এই অধমেরও নিশাকালে কিঞ্চিৎ আহার্য গ্রহণের বদভ্যাস আছে। আর, আজকে তারপরেও খানিকক্ষণ জেগে থাকার পরিকল্পনা আছে আমার–মেসোর নোটবইটা আজকেই পড়ে শেষ করব ঠিক করেছি।”

    “পড়া কি প্রায় হয়ে এসেছে?”

    “হ্যাঁ, শেষের দিকে,” বলল কানাই।

  • বাঁচা

    বাঁচা

    বাঁচা

    লুসিবাড়িতে যখন পৌঁছলাম তখনও আমার শরীর বেশ খারাপ। নীলিমা হরেনকে বকাবকি করতে লাগল। বলল, “তোমার জন্যেই এরকম হল। কেন বারবার ওকে টেনে নিয়ে যাও মরিচঝাঁপিতে? দেখো তো এখন, কীরকম অসুস্থ হয়ে পড়ল মানুষটা।”

    সুস্থ যে আমি ছিলাম না সে কথা ঠিক–নানারকম স্বপ্ন, কল্পনা আর ভয়ের চিন্তায় সবসময় ভরে থাকত মাথাটা। এমনও অনেকদিন হয়েছে যে বিছানার থেকে ওঠারই ক্ষমতা হয়নি–চুপচাপ শুধু শুয়ে থেকেছি আর রিলকের কবিতা পড়েছি, ইংরেজিতে আর বাংলায়।

    আমার সঙ্গে অনেক নরম সুরে কথা বলত নীলিমা তখন। “কতবার বলিনি তোমাকে ওখানে না যেতে? বলো? বলিনি এইরকম অবস্থা দাঁড়াবে একদিন? তুমি যদি সত্যি সত্যি কিছু করতে চাও তা হলে তো ট্রাস্টের কাজেই সাহায্য করতে পারো। হাসপাতালটার জন্যে কিছু কিছু কাজ করতে পারো। তার জন্য মরিচঝাঁপিতে কেন যেতে হবে?”

    “সে তুমি বুঝবে না নীলিমা।”

    “কেন নির্মল? বলো আমাকে। কিছু কিছু গুজব আমার কানে এসেছে। সবাই নানারকম কানাঘুষো করছে। কুসুমের সঙ্গে কি এসবের কোনও সম্পর্ক আছে?”

    “এটা তুমি কী বললে নীলিমা? এতগুলি বছর তো আমার সঙ্গে কাটালে–কখনও কি এ ধরনের কোনও চিন্তার কোনও কারণ ঘটেছে?”

    নীলিমা কাঁদতে শুরু করল। “লোকে তো সেসব কথা বুঝবে না নির্মল। চারদিকে কুৎসিত গুজব রটছে, কান পাতা যায় না।”

    “নীলিমা, এ সমস্ত গুজবে কান দেওয়া কি তোমাকে মানায়, বলো?”

    “তা হলে কুসুমকে এখানে নিয়ে এসো। ও এখানে থেকে ট্রাস্টের কাজ করুক। তুমিও করো।”

    কী করে ওকে বোঝাব আমি, যে ট্রাস্টের কাজ করার জন্য আমার থেকে ভাল লোক অনেক আছে। আমি তো এখানে শুধু কলম পেষার কাজ করতে পারব, যন্ত্রের মতো, দম দেওয়া খেলনার মতো। কিন্তু মরিচঝাঁপির ব্যাপারটা আলাদা। রিলকে আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কী করতে পারি আমি ওখানে। আমারই জন্য একটা কবিতায় গোপন সংকেত রেখে গেছেন কবি–শুধু আমার জন্য। সে সংকেতের লুকোনো অর্থ খুঁজে বের করেছি আমি। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। শুধু সেই ব্রাহ্মমুহূর্তের জন্য বসে আছি আমি, অপেক্ষা করে আছি একটা ইশারার জন্য। সে ইশারা পেলে কী করব সেটা আর বলে দিতে হবে না।

    কারণ, কবি নিজেই আমাকে বলে গেছেন–

    ‘এখানেই উচ্চার্যের মাতৃভূমি। এই তার কাল।

    বল, তা ঘোষণা কর…’

    দিনের পর দিন চলে গেল, সপ্তাহের পর সপ্তাহ–অবশেষে শরীরে বল ফিরে পেতে লাগলাম আমি, মনে হল আস্তে আস্তে আবার গিয়ে বসা যেতে পারে পড়ার ঘরটাতে। প্রতিদিন সকাল আর দুপুরগুলো কাটাতে লাগলাম ওখানে বিস্তীর্ণ শূন্য সেই সময়প্রান্তর পার করতাম মোহনার দিকে তাকিয়ে, বসে বসে চেয়ে দেখতাম কেমন করে আস্তে আস্তে জল নামছে, খালি হচ্ছে মোহনা, ফের ভরে যাচ্ছে, ফের খালি হচ্ছে, ফের ভরে যাচ্ছে, দিনের পর দিন, পৃথিবীর মতো ক্লান্তিহীন।

    একদিন দুপুরে, দ্বিপ্রহরিক বিশ্রামের পর অন্যান্য দিনের তুলনায় খানিকটা আগেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছি নীচে, এমন সময় নীলিমার গলা কানে এল। গেস্ট হাউসে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে, গলার স্বরে বুঝতে পারলাম কে, আগের দিন রাতে ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা হয়েছিল আমার। লোকটি কলকাতার ডাক্তার, সাইকিয়াট্রিস্ট। নীলিমা বলছিল খুব ভয় পাচ্ছে ও, খুবই চিন্তায় আছে আমাকে নিয়ে। ও এমন একটা খবর জানতে পেরেছে যেটা শুনলে আমি নাকি অস্থির হয়ে পড়ব, কী করে সেটা আমার থেকে গোপন রাখা যায় সে বিষয়ে ডাক্তারবাবুর পরামর্শ চাইছিল।

    “খবরটা কী?” জিজ্ঞেস করলেন ডাক্তার।

    “আপনার হয়তো ব্যাপারটা সেরকম সাংঘাতিক কিছু মনে হবে না,” বলল নীলিমা। “এখান থেকে কিছু দূরে একটা দ্বীপ আছে–মরিচঝাঁপি বলে–সেইটার দখল নিয়ে গণ্ডগোল। একদল বাংলাদেশি উদ্বাস্তু ওই দ্বীপটায় এসে উঠেছে, আর কিছুতেই যেতে চাইছে না। আমার কাছে খবর আছে সরকার খুব কড়া হাতে ওদের মোকাবিলা করার জন্য তৈরি হচ্ছে এখন।”

    “ওঃ, সেই উদ্বাস্তু সমস্যা!” বললেন ডাক্তার। “যতসব ঝামেলা। তো, আপনার স্বামীর তাতে কী? ওই দ্বীপে ওনার চেনাশুননা কেউ আছে নাকি? ওনার সঙ্গে ওদের সম্পর্কটা কী?”

    এক মুহূর্ত চুপ করে রইল নীলিমা। তারপর গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে একটু দ্বিধার সঙ্গে বলল, “আপনাকে ব্যাপারটা আমি ঠিক বোঝাতে পারছি না ডাক্তারবাবু। আমার স্বামী যখন রিটায়ার করলেন, তারপর থেকেই ওঁর হাতে আর বিশেষ কোনও কাজ তো নেই–তাই উনি ওই মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তুদের ভালমন্দের সঙ্গে আস্তে আস্তে জড়িয়ে ফেলেছেন নিজেকে। এখন আমাদের যে সরকার আছে তারা ওদের বিরুদ্ধে কিছু করবে সেটা উনি ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারেন না। উনি সেই আগেকার আমলের বামপন্থী মানুষ। আজকালকার অনেকের মতো নন, এখনও উনি মনেপ্রাণে ওই আদর্শে বিশ্বাস করেন। এদিকে, এখন যারা ক্ষমতায় আছে তারা অনেকেই ওঁর এক সময়কার বন্ধু বা রাজনৈতিক সহকর্মী। আসলে–কী বলব–আমার স্বামী ঠিক প্র্যাকটিকাল মানুষ নন, বাস্তব জগৎটার সম্পর্কে ওঁর ধারণা খুব সীমিত। উনি বুঝতে পারেন না, একটা পার্টি যখন ক্ষমতায় আসে তাকে রাজ্যশাসনের কাজ করতে হয়। তার কতগুলি সীমাবদ্ধতা থাকে। আমি ভয় পাচ্ছি মরিচঝাঁপিতে যা ঘটতে যাচ্ছে সেটা যদি উনি জানতে পারেন, সে মোহভঙ্গের আঘাত উনি সহ্য করতে পারবেন না–ওঁর পক্ষে মারাত্মক হয়ে দাঁড়াতে পারে সেটা।”

    “তা হলে সেসব ওনাকে না জানানোই ভাল,” ডাক্তারের গলা শোনা গেল। “কী করতে কী করে বসবেন, বলা তো যায় না।”

    “একটা কথা বলুন ডাক্তারবাবু,” নীলিমা বলল, “কয়েকদিন কি ওঁকে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায় না?”

    “তা যায়। সেটাই মনে হয় ভাল হবে।”

    আর কিছু শোনার ছিল না আমার। পড়ার ঘরে ফিরে গিয়ে চটপট কয়েকটা জিনিস ঝোলায় পুরে নিলাম। তারপর চুপি চুপি নেমে এসে তাড়াতাড়ি হাঁটা দিলাম গ্রামের দিকে। ভাগ্যক্রমে ঘাটে একটা নৌকো ছিল তখন, তাতে করে সোজা চলে গেলাম সাতজেলিয়া–হরেনের খোঁজে।

    “এক্ষুনি আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে হরেন,” দেখা হতেই ওকে বললাম। “সরকার মরিচঝাঁপি আক্রমণ করবে ঠিক করেছে, খবর পেয়েছি আমি।”

    খবর ওর কাছেও কিছু কম ছিল না। নানারকম গুজব ওরও কানে এসেছে–বাসভর্তি লোক বাইরে থেকে এসে নাকি জড়ো হয়েছে মরিচঝাঁপির আশেপাশের গ্রামগুলিতে, গুণ্ডা-মস্তান ধরনের লোক সব। ভাটির দেশের মানুষ এরকম লোক আগে কখনও দেখেনি। পুলিশের নৌকো সবসময় টহল দিচ্ছে দ্বীপের চারদিকে; ঢোকা কি বেরোনো প্রায় অসম্ভব।

    “হরেন, কুসুম আর ফকিরকে ওখান থেকে বের করে আনতেই হবে আমাদের। এই অঞ্চলের নদীনালা তোমার থেকে ভাল কেউ চেনে না। ওখানে গিয়ে পৌঁছনোর কোনও একটা পথ বের করা যাবে না?” ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি।

    মিনিটখানেক কী চিন্তা করল হরেন। তারপর বলল, “আজ চাঁদ থাকবে না আকাশে। যাওয়া গেলেও যেতে পারে। চেষ্টা করে দেখি একবার।”

    সন্ধের মুখে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। বেশ খানিকটা খাবার আর জল নিয়ে নিলাম সঙ্গে। খানিক পরেই অন্ধকার ঘনিয়ে এল। আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু হরেন তারই মধ্যে কী করে যেন ঠিক চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নৌকোটাকে। খুব ধীরে ধীরে চলছিলাম আমরা, একেবারে পাড় ঘেঁষে। কথাবার্তা বলছিলাম ফিসফিস করে।

    “আমরা এখন কোথায় হরেন?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।

    ও দেখলাম একেবারে নিখুঁতভাবে বলে দিল আমাদের অবস্থান। “এই গারল পেরিয়েছি। ঝিল্লায় ঢুকেছি এবার। বেশি দূর নেই আর, একটু পরেই পুলিশের নৌকো দেখতে পাবেন।” মিনিট কয়েক পরেই দেখতে পেলাম বোটগুলোকে–সগর্জনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সার্চলাইটের আলোয় ধুয়ে দিচ্ছে নদীটাকে। প্রথমে একটা, তারপর আরেকখানা, তারপর আরও একটা। খানিকক্ষণ পাড় ঘেঁষে চুপটি করে লুকিয়ে রইলাম আমরা। কতক্ষণ পরপর বোটগুলো আসছে সে সময়টা মনে মনে মেপে নিল হরেন। তারপর আবার রওয়ানা হলাম। খানিক চলে, খানিক থেমে একটা সময় পুলিশ-নৌকোর নজরদারির এলাকা পেরিয়ে গেলাম আমরা।

    একটু বাদেই গোত্তা খেয়ে পাড়ের নরম মাটিতে গিয়ে ঠেকল আমাদের নৌকো। “এসে গেছি সার,” জানান দিল হরেন। “পৌঁছে গেছি মরিচঝাঁপিতে।”দু’জনে মিলে টেনেটুনে ডিঙিটাকে বাদাবনের আড়ালে নিয়ে গিয়ে তুললাম–যাতে জল থেকে চোখে না পড়ে। হরেন বলল দ্বীপের লোকেদের সব নৌকো পুলিশ নাকি ডুবিয়ে দিয়েছে। আমাদের নৌকোটা তাই ভাল করে ঢেকেঢুকে আড়াল করে রাখলাম, তারপর জল আর খাবার-দাবার যা যা সঙ্গে এনেছিলাম সেগুলি নিয়ে নদীর পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম কুসুমের কুঁড়েতে। সেখানে পৌঁছে আমরা তো অবাক। কুসুমের কোনও হেলদোলই নেই। দিব্বি আছে এখনও। সারা রাত ধরে আমরা ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম–এক্ষুনি ওর চলে যাওয়া উচিত দ্বীপ ছেড়ে, কিন্তু কোনও কথাই ও কানে তুলল না।

    “মরিচঝাঁপি ছেড়ে কোথায় যাব? আর কোথাও তো আমি যেতে চাই না,” ওর সাফ জবাব। কী কী গুজব আমাদের কানে এসেছে ওকে বললাম, বললাম চারপাশের সব কটা গাঁয়ে বাইরে থেকে তোক এসে জড়ো হয়েছে, যে-কোনও সময়ে হামলা শুরু হয়ে যাবে। হরেন নিজের চোখে দেখেছে, বাস ভর্তি করে এসেছে সব। “কী করবে ওরা?” কুসুম বলল। “এখনও দশ হাজারের বেশি লোক আমরা এখানে আছি। ভরসা করে থাকতে হবে। হাল ছাড়লে চলবে কেন?”

    “কিন্তু ফকিরের কী হবে?” জিজ্ঞেস করলাম আমি। “ভালমন্দ একটা কিছু যদি ঘটে যায়, ও তা হলে কী করবে?”

    “ঠিক বলেছেন সার,” আমার সঙ্গে সুর মেলাল হরেনও। “তুই যদি না যেতে চাস, তা হলে ফকিরকে অন্তত দিয়ে দে আমার সঙ্গে। কয়েকটা দিন অন্য কোথাও নিয়ে গিয়ে রাখি, তারপর এখানকার ঝামেলা-টামেলা মিটে গেলে আবার এসে দিয়ে যাব।”

    বোঝা গেল এই নিয়ে আগে থাকতেই ভেবে রেখেছিল কুসুম। বলল, “ঠিক আছে তা হলে, তাই করা যাক। ফকিরকে নিয়ে যাও তোমরা, সাতজেলেতে নিয়ে কয়েকদিন রাখো, তারপর এখানকার ঝড়ঝাঁপটা থামলে নিয়ে এসো আবার।”

    কথা বলতে বলতে ফর্সা হয়ে গিয়েছিল আকাশ। আর ফেরা যাবে না এখন। হরেন বলল, “রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। অন্ধকার না হলে পুলিশ বোটের নজর এড়িয়ে বেরোতে পারব না।”

    এবার আমার পালা ওদের অবাক করে দেওয়ার। বললাম, “হরেন, আমি কিন্তু থেকেই যাচ্ছি।”

    ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গেল ওরা। বিশ্বাসই করতে পারছিল না। বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগল কেন আমি থেকে যেতে চাই, কিন্তু আমি সেসব কথা এড়িয়ে গেলাম। কত কিছুই তো ওদের বলতে পারতাম আমি লুসিবাড়িতে আমার জন্য যে ওষুধের ব্যবস্থা করা আছে সে কথা বলতে পারতাম, নীলিমার সঙ্গে ডাক্তারের কথোপকথনের কথা বলতে পারতাম অথবা দিনের পর দিন কী শূন্যতাবোধ নিয়ে সময় কাটিয়েছি আমার পড়ার ঘরটায় সেই কথাও বলতে পারতাম। কিন্তু এসব কিছুর বিন্দুমাত্র গুরুত্ব আছে বলে মনে হল না আমার। ঘটনা হল মরিচঝাঁপিতে আমার থেকে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে এতটুকু কোনও সংশয় ছিল না আমার মনে। এই নোটবইটা দেখিয়ে বললাম, “আমাকে থাকতেই হবে রে, একটা জরুরি লেখা লিখে ফেলতে হবে এখানে বসে।”

    আর সময় নেই। মোমবাতিটা দপদপ করছে। পেনসিলটা ছোট্ট হয়ে গেছে ক্ষয়ে ক্ষয়ে। আমি শুনতে পাচ্ছি ওরা এগিয়ে আসছে। আশ্চর্য মনে হচ্ছে হো হো করে হাসতে হাসতে আসছে ওরা। হরেন এক্ষুনি বেরিয়ে যেতে চাইবে জানি, কারণ রাত আর বেশি বাকি নেই। ভাবতেই পারিনি এই গোটা নোটবইটা লিখে শেষ করে ফেলতে পারব আমি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখছি পুরোটা ভরেই গেল। এটাকে এখানে রেখে আর লাভ নেই। ঠিক করেছি দিয়ে দেব হরেনের সঙ্গে, যাতে কোনও না কোনও সময় তোমার হাতে গিয়ে পৌঁছয় এটা, কানাই। আমি নিশ্চিত জানি সারাজীবনে জগতের যেটুকু মনোযোগ আমি আকর্ষণ করতে পেরেছি, তার থেকে অনেক বেশি তুমি পারবে। এই খাতা নিয়ে কী করবে সেটা তুমিই ঠিক কোরো। আমি সবসময় তরুণদের ওপর ভরসা রেখে এসেছি। আমার প্রজন্মের মানুষদের তুলনায় তোমরা আদর্শের দিক দিয়ে ঋদ্ধতর হবে, কম শুভনাস্তিক হবে, কম স্বার্থপর হবে–এ আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।

    ওরা ভেতরে ঢুকে এসেছে। মোমের আলোয় ওদের মুখগুলো দেখতে পাচ্ছি আমি। ওদের হাসিতে আমি কবির সেই পংক্তিগুলি প্রত্যক্ষ করছিঃ

    ‘দেখো, আমি বেঁচে আছি। কোন পথ্যে? শৈশব অথবা ভাবীকাল,

    কোনওটাই হ্রাসপ্রাপ্ত হয় না… অস্তিত্বের অনন্ত পর্যায়

    আমার হৃদয় থেকে উৎসারিত।’

    খাতাটা রাখতে গিয়ে কানাই দেখল হাত কাঁপছে ওর। লফের ধোঁয়ায় ভরে গেছে কেবিন, কেরোসিনের গন্ধ চারিদিকে; মনে হল দম বন্ধ হয়ে আসছে। শোয়ার জায়গা থেকে একটা কম্বল তুলে গায়ে পেঁচিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এল কেবিন থেকে। বাইরে বেরোতেই ধক করে কড়া বিড়ির গন্ধ এসে লাগল নাকে। বাঁদিকে ফিরে বোটের সামনের দিকটায় তাকাল কানাই।

    সেখানে পাশাপাশি পাতা দুটো আরাম চেয়ার। তার একটায় বসে আছে হরেন। পা দুটো বোটের গলুইয়ের কাছে রেখে বিড়ি টানছে। কানাই কেবিনের দরজা বন্ধ করতে ফিরে তাকাল ও।

    “এখনও জেগে?”

    “হ্যাঁ, কানাই বলল। “এইমাত্র মেসোর খাতাটা পড়ে শেষ করলাম।”

    জবাবে আবেগহীন একটা আওয়াজ করল হরেন গলা দিয়ে।

    হরেনের পাশের চেয়ারটায় গিয়ে বসল কানাই। “আপনার নৌকোয় ফকিরকে নিয়ে ফিরে আসার কথা দিয়েই শেষ হয়েছে মেসোর লেখা।”

    চোখটা একটু নামাল হরেন, জলের দিকে। যেন ফিরে তাকাল অতীতের ভেতর। খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “আরেকটু আগেই বেরিয়ে পড়া উচিত ছিল আমাদের। জলের টানের সুযোগটা পাওয়া যেত তা হলে।”

    “আর মরিচঝাঁপিতে তারপর কী হল? আপনি জানেন?” বিড়িতে আরেকটা টান দিল হরেন। “আর সবাই যা জানে তার থেকে বেশি কিছু আমি জানি না। সবই গুজব বলতে পারেন।”

    “কী গুজব?”

    অল্প একটু ধোঁয়া পাক খেয়ে বেরিয়ে এল হরেনের নাক দিয়ে। “শুনেছিলাম হামলাটা শুরু হয়েছিল তার পরের দিন। আশেপাশের গাঁ-গুলোতে যেসব গুণ্ডারা জড়ো হয়েছিল তাদের সকলকে লঞ্চে, ডিঙিতে, ভটভটিতে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মরিচঝাঁপিতে। ওরা গিয়ে সব ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিল, দ্বীপের লোকেদের নৌকো-টৌকো যা ছিল ডুবিয়ে দিল, খেতখামার সব নষ্ট করে দিল।” স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে গলা দিয়ে একটা আওয়াজ করল হরেন। “যা যা করা যায় তার কোনওটাই বাকি রাখেনি।”

    “তা হলে কুসুম আর আমার মেসো–ওদের কী হল?”

    “ঠিক কী যে হল সেটা কেউই জানে না। তবে আমি যতটা শুনেছিলাম তা হল, একদল মেয়েকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ওরা। কুসুম তাদের মধ্যে ছিল। লোকে বলে ওদের ওপরে অত্যাচার করে তারপর নাকি নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, যাতে ভেসে যায় স্রোতের টানে। বেশ কিছু মানুষ মারা গিয়েছিল মরিচঝাঁপিতে সেদিন। সাগর টেনে নিয়েছিল ওদের সবাইকে।”

    “আর আমার মেসোর কী হল?”

    “অন্য অনেকের সঙ্গে ওনাকেও একটা বাসে তুলে দেওয়া হয়েছিল। ওই মধ্যপ্রদেশ না কোথায়, যেখান থেকে ওরা এসেছিল সেখানে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কোথাও একটা এসে নিশ্চয়ই ছেড়ে দিয়েছিল ওনাকে, কারণ শেষপর্যন্ত তো উনি ক্যানিং-এ গিয়ে পৌঁছেছিলেন।”

    এই পর্যন্ত বলে হরেন নিজের পকেট হাতড়াতে শুরু করল। বেশ খানিকক্ষণ চলল পকেটের ভেতর ওর খোঁজাখুঁজি। বিড়বিড় করে গালি দিতে লাগল নিজের মনে। অবশেষে পকেট থেকে যখন বিড়িটা বের করল, ততক্ষণে কানাইয়ের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে নির্মল আর কুসুমের প্রসঙ্গ থেকে কথা ঘোরানোর চেষ্টা করছে হরেন। খানিক পরে তাই বেশ একটা অমায়িক গলায় যখন জিজ্ঞেস করল, “কালকে তা হলে কখন রওয়ানা হবেন ভাবছেন?” কানাই আশ্চর্য হল না।

    কিন্তু হরেনকে কথা ঘোরাতে দেবে না ও ঠিক করেছে। “আচ্ছা, একটা কথা বলুন হরেনদা, আপনিই তো আমার মেসোকে মরিচঝাঁপি নিয়ে গিয়েছিলেন; মেসো ওই জায়গাটার সঙ্গে এতটা জড়িয়ে পড়েছিলেন কেন বলুন তো? আপনার কী মনে হয়?”

    “জড়িয়ে তো কমবেশি সবাই পড়েছিল তখন,” ঠোঁট ওলটাল হরেন।

    “কিন্তু ধরুন, কুসুম আর ফকির আপনার আত্মীয় ছিল। ওদের জন্য আপনার ভাবনা হতে পারে–সেটা আমি বুঝতে পারি। কিন্তু সারের ব্যাপারটা কী? ওনার কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল মরিচঝাঁপির ঘটনাটা?”

    চুপ করে বিড়ি টানতে লাগল হরেন। অবশেষে বলল, “আপনার মেসো অন্য আর পাঁচটা মানুষের মতো ছিলেন না কানাইবাবু। লোকে বলত ওনার মাথায় গণ্ডগোল ছিল। আর পাগলে কী না করে ছাগলে কী না খায়, কে বলতে পারে বলুন?”

    “একটা কথা বলুন হরেনদা,” কানাই নাছোড়বান্দা, “এরকম কি হতে পারে যে মেসো কুসুমের প্রেমে পড়েছিলেন?”

    উঠে পড়ল হরেন। নাকঝাড়া দিয়ে এমন একটা ভাব করল যে পরিষ্কার বোঝা গেল সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে ওর। বিরক্ত কাটাকাটা গলায় তারপর বলল, “দেখুন কানাইবাবু, আমি মুখুসুখু মানুষ। আপনি যা বলছেন সেসব কথা আপনারা শহুরে লোকেরা ভাবতে পারেন, কিন্তু আমার ওসব ভাবার মতো সময় নেই।”

    টান মেরে বিড়িটা দূরে ছুঁড়ে ফেলল হরেন। ঘাঁৎ করে আগুন নেভার শব্দ কানে এল। “যান, গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন এখন,” বলল হরেন। “কাল সকাল সকাল বেরোতে হবে।”

  • রবিবারের ডাকঘর

    রবিবারের ডাকঘর

    রবিবারের ডাকঘর

    সকাল সকালই শুয়ে পড়েছিল পিয়া। মাঝরাত্রে ঘুমটা চটে গেল হঠাৎ, উঠে বসে পড়ল বাঙ্কের ওপর। কয়েকটা মিনিট ধরে চেষ্টা করল যদি আবার ঘুম আসে। লাভ হল না। হাল ছেড়ে দিয়ে কম্বলটা গায়ে পেঁচিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এল ডেকের উপর। চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে চারদিক। এত ফটফটে জ্যোৎস্না, যে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে গেল ও, পিটপিট করে সইয়ে নিতে হল চোখ। একটু অবাক হয়ে দেখল কানাইও বসে আছে বাইরে। ছোট একটা কেরোসিন লণ্ঠনের আলোয় কী পড়ছে একমনে। এগিয়ে গিয়ে অন্য চেয়ারটায় বসে পড়ল পিয়া। বলল, “এখনও জেগে? মেশোর নোটবুকটা পড়ছেন বুঝি?”

    “হ্যাঁ। পড়া আসলে হয়ে গেছে, আরেকবার উলটে পালটে দেখছিলাম।”

    “আমি একটু দেখতে পারি?”

    “নিশ্চয়ই।” খাতাটা বন্ধ করে পিয়ার দিকে এগিয়ে দিল কানাই। আলগোছে নোটবইটা নিয়ে খুলে ধরল পিয়া।

    “খুব খুদে খুদে লেখা।”

    “হ্যাঁ,” বলল কানাই। “পড়া একটু কঠিন।”

    “বাংলায় লেখা, তাই না?”

    “হ্যাঁ।” সাবধানে খাতাটা বন্ধ করে কানাইকে ফিরিয়ে দিল পিয়া। “কী আছে এর মধ্যে?” মাথা চুলকোল কানাই। নোটবইয়ের বিষয়বস্তু কীভাবে বর্ণনা করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। “কী নিয়ে মানে… নানারকম বিষয় নিয়েই লেখা আছে; বিভিন্ন জায়গার কথা, অনেক সব লোকেদের কথা, এইসব আর কী–”।

    “সেসব লোকেদের কাউকে আপনি চেনেন?”

    “চিনি। আমাদের ফকিরের মাকে নিয়েও অনেক কথা লেখা আছে এই নোটবইতে। ফকিরের কথাও আছে–তবে মেসো ওকে যখন দেখেছিলেন তখন ও খুবই ছোট।”

    বিস্ময়ে চোখ গোল গোল হয়ে গেল পিয়ার। “ফকির আর ওর মা? ওদের কথা কী করে এল?”

    “আপনাকে বলেছিলাম না, যে কুসুম–ফকিরের মা–এখানকার একটা দ্বীপে বসতি তৈরির একটা চেষ্টার সঙ্গে জড়িত ছিল?”

    “তা বলেছিলেন।”

    হাসল কানাই। “মনে হয় নিজের অজান্তেই খানিকটা কুসুমের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন আমার মেসো।”

    “তাই লিখেছেন উনি এই খাতায়?”

    “না,” জবাব দিল কানাই। “কিন্তু সে উনি লিখতেনও না।”

    “কেন?”

    “উনি যেরকম ছিলেন, যে যুগের যে জায়গার মানুষ ছিলেন–তাতে এরকম কিছু লেখাটাকে বাঁচালতা মনে করতেন হয়তো,” কানাই বলল।

    নিজের ছোট ছোট কেঁকড়া চুলে আঙুল বোলাল পিয়া। “বুঝলাম না ঠিক। আচ্ছা, উনি কী ধরনের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন?”

    চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল কানাই। প্রশ্নটা ভাবতে সময় নিল একটু। তারপর বলল, “একটা সময় উনি ছিলেন প্রগতিবাদী। এমনকী এখনও যদি আপনি আমার মাসিকে জিজ্ঞেস করেন, মাসি বলবেন মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তুদের সঙ্গে মেসো জড়িয়ে পড়েছিলেন কারণ বিপ্লবের ভূতটাকে উনি মাথা থেকে কখনও তাড়াতে পারেননি।”

    “আপনি মনে হচ্ছে মাসির সঙ্গে একমত নন?”

    “না,” জবাব দিল কানাই। “আমার মনে হয় মাসির ধারণাটা ভুল। আমার চোখে মেসোর ঘাড়ে যে ভূত ভর করেছিল তা রাজনীতির নয়, শব্দবাক্য-অক্ষরের। কিছু কিছু মানুষ থাকে দেখবেন যারা কবিতার জগতেই জীবন কাটায়। আমার মেসো ছিলেন সেইরকম একজন লোক। মাসির পক্ষে এরকম মানুষকে বুঝে ওঠাটা কঠিন ছিল কিন্তু মেসোর ধরনটাই ছিল ওই। কবিতা পড়তে ভালবাসতেন উনি, বিখ্যাত জার্মান কবি রাইনের মারিয়া রিলকের কবিতা। আমাদের কয়েকজন নামকরা কবি সেসব কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। রিলকে বলেছিলেন, ‘জীবন যাপিত হয় পরিবর্তনে’, আর আমার মনে হয় কবির এই কথাটা মেসো মর্মে মর্মে গেঁথে নিয়েছিলেন–কাপড় যেমন কালি শুষে নেয়, সেইভাবে। ওঁর কাছে কুসুম ছিল রিলকের সেই পরিবর্তনের ধারণার মূর্ত রূপ।”

    “মার্ক্সবাদ আর কবিতা?” ভুরু তুলে শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করল পিয়া। “একটু অদ্ভুত কম্বিনেশন–না?”

    “তা ঠিক,” কানাই সায় দিল। “আসলে এই ধরনের পরস্পর বিরোধিতাগুলি ছিল ওঁদের প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য। যেমন, মেসোর মতো বস্তুবোধশূন্য মানুষ আমি দুটো দেখিনি, কিন্তু নিজেকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদী বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে ভালবাসতেন উনি।”

    “তার মানেটা ঠিক কী?”

    “ওঁর কাছে তার মানে হল, এ জগতে সমস্ত কিছুই পরস্পর সম্পর্কিত–গাছপালা, আকাশ, জল-হাওয়া, মানুষ-জন, কাব্য-কবিতা,  বিজ্ঞান, প্রকৃতি–সবকিছু। খুঁজে খুঁজে তথ্য সংগ্রহ করতেন মেসো সবসময়, অনেক পাখি যেমন চকচকে কিছু দেখলেই চুরি করে নিয়ে গিয়ে বাসায় জড়ো করে, তেমনি। কিন্তু সেসব তথ্য যখন উনি একসঙ্গে গেঁথে তুলতেন, সেগুলো হয়ে উঠত একেকটা গল্প–এক ধরনের কাহিনি।”

    হাতের মুঠোয় চিবুকের ভর রেখে বসল পিয়া। “যেমন?”

    মিনিট খানেক ভাবল কানাই। “মেসোর বলা একটা গল্প আমার এক্ষুনি মনে পড়ছে–কিছুতেই ভুলতে পারি না আমি গল্পটা।”

    “কী নিয়ে সেটা?”

    “ক্যানিং-এর কথা মনে আছে আপনার, গঞ্জ মতো যে জায়গাটায় এসে ট্রেন থেকে নামলাম আমরা?”

    “কেন মনে থাকবে না?” পিয়া বলল। “ওখানেই তো পারমিটটা পেলাম আমি। আমার অবশ্য জায়গাটাকে খুব একটা স্মরণীয় স্থান বলে মনে হয়নি।”

    “ঠিকই বলেছেন,” বলতে লাগল কানাই। “আমি প্রথম ওখানে যাই ১৯৭০ সালে, মেসো আর মাসির সঙ্গে লুসিবাড়ি আসার পথে। জঘন্য লেগেছিল জায়গাটা আমার মনে হয়েছিল বীভৎস কাদা-প্যাঁচপ্যাটে ছোট শহর একটা। সেইরকমই একটা কিছু বোধহয় বলেছিলাম আমি। আর মেসো তো সঙ্গে সঙ্গে খেপে আগুন। প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন আমার ওপর, একটা জায়গা কীরকম সেটা নির্ভর করে তুমি তাকে কীভাবে দেখছ তার ওপর। তারপর একটা গল্প বললেন আমাকে। এমন অদ্ভুত গল্প, যে আমি ভাবলাম সেটা বুঝি তক্ষুনি বানালেন মুখে মুখে। কিন্তু পরে যখন বাড়ি ফিরে গেলাম, সত্যি সত্যিই বইপত্র ঘেঁটে দেখেছিলাম আমি–এক বিন্দুও বানিয়ে বলেননি মেসো।”

    “কী ছিল গল্পটা?” জিজ্ঞেস করল পিয়া। “মনে আছে আপনার? আমার শুনতে ইচ্ছে করছে।”

    “বেশ। মেসো যেমন যেমন বলেছিলেন সেভাবেই আমি আপনাকে বলার চেষ্টা করছি,” কানাই বলল। “কিন্তু একটা ব্যাপার আপনাকে মনে রাখতে হবে–মেসো গল্পটা বলেছিলেন বাংলায়। আমি কিন্তু মনে মনে অনুবাদ করে সেটা বলব আপনাকে।”

    “হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন আপনি।”

    আকাশের দিকে তর্জনী তুলে বলতে শুরু করল কানাই: “ঠিক আছে তা হলে বন্ধুগণ, আমি বলছি, তোমরা মন দিয়ে শোনো। আমি এখন তোমাদের বলব মাতলা নদীর কথা, এক ঝড়ে-পাওয়া মাতালের কথা, আর ক্যানিং নামে এক লাটসাহেবের মাতলামির কথা। শোনো, কান পেতে শোনো।

    এই ভাটির দেশের অন্য আরও অনেক জায়গার মতোই ক্যানিং-এর নামও দিয়েছিলেন একজন ইংরেজ সাহেব। সে সাহেব আবার যে সে সাহেব নয়, একেবারে লাটসাহেব–ভাইসরয় লর্ড ক্যানিং। এই লাটসাহেব আর তার লেডি দেশজুড়ে যেখানে সেখানে নিজেদের নাম ছড়িয়ে বেড়াতে ভালবাসতেন। তাদের পরবর্তী প্রজন্মের রাজনীতিকরা যেমন নিজেদের ছাই ছড়াতে পছন্দ করতেন, অনেকটা সেইরকম। অদ্ভুত অদ্ভুত সব জায়গার নাম আছে এই সাহেব-মেমের নামে রাস্তার নাম, জেলের নাম, পাগলাগারদের নাম। মজার ব্যাপারও অনেক হত। যেমন, লেডি ক্যানিং ছিলেন লম্বা, রোগা, একটু বদমেজাজি, কিন্তু  কলকাতার এক মিঠাইওয়ালার মাথায় কী খেলল কে জানে, নতুন একটা মিষ্টি তৈরি করে তার নাম দিয়ে দিল মেমসাহেবের নামে। সে মিঠাই কিন্তু গোল, কালো আর রসে টইটম্বুর–মানে লেডি ক্যানিং-এর চেহারা কি স্বভাব কোনওটার সঙ্গেই কোনও মিল নেই তার। তবুও কপাল খুলে গেল মিষ্টিওয়ালার। হু হু করে বিক্রি হতে লাগল তার আবিষ্কৃত সেই নতুন মিঠাই। এত পরিমাণে লোকে সে মিষ্টি খেতে লাগল যে ‘লেডি ক্যানিং’–এই পুরো কথাটা উচ্চারণ করতে যে সময় লাগে সে সময়টাও দিতে চাইল না তারা। মুখে মুখে মিষ্টিটার নাম হয়ে দাঁড়াল ‘লেডিগেনি’।

    এখন, লোকের মুখে ভাষা এবং শব্দের পরিবর্তনের নিশ্চয়ই নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম আছে। সেই নিয়মে যদি লেডি ক্যানিং হয়ে দাঁড়ায় লেডিগেনি, পোর্ট ক্যানিং-এর নামও তা হলে আস্তে আস্তে পালটে পোটুগেনি বা পোডগেনি হয়ে যাওয়া উচিত ছিল, তাই না? কিন্তু দেখ বন্ধুগণ, এই বন্দর শহরের নাম কিন্তু অপরিবর্তিত রয়ে গেল। এখনও মানুষ ওই লাটসাহেবের নামেই চেনে ক্যানিংকে।

    কিন্তু কেন? কেন একজন লাটসাহেব তার সুখের সিংহাসন ছেড়ে এই মাতলার কাদায় এসে নিজের নামের চাষ করতে গেলেন?

    মহম্মদ বিন তুঘলকের কথা মনে আছে তো তোমাদের? সেই পাগলা বাদশা, যিনি দিল্লি শহর ছেড়ে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অজ পাড়াগাঁয়? সেই একই ভূতে ধরেছিল বিলিতি সাহেবদেরও। একদিন হঠাৎ ওরা ঠিক করল নতুন একটা বন্দর চালু করতে হবে, বাংলাদেশের একটা নতুন রাজধানীর প্রয়োজন–দ্রুত পলি জমছে কলকাতার হুগলি নদীতে, ওদের তাই মনে হল  কলকাতা বন্দরের ডকগুলি আর কিছুদিনের মধ্যেই বুজে যাবে কাদায়। যথারীতি, সব প্ল্যানার আর সার্ভেয়াররা বেরিয়ে পড়ল দলে দলে, পরচুলা আর চাপা পাতলুন পরে চষে বেড়াতে লাগল সারা রাজ্য, মাপজোক আর ম্যাপ তৈরি শুরু হয়ে গেল পুরো দমে। অবশেষে, এই মাতলার তীরে এসে একটা জায়গা পছন্দ হল ওদের। জেলেদের ছোট্ট একটা গ্রাম, তার সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নদী, আর সে নদী এমন চওড়া যে দেখলে মনে হয় সোজা সাগর পর্যন্ত বিছানো এক রাজপথ।

    এখন, এটা তো সবাই জানে যে বাংলায় মাতলা’ কথাটার মানে মত্ত। আর এ নদীকে যারা চেনে তারা ভালই জানে কেন এর এই নাম। কিন্তু নাম আর শব্দ নিয়ে মাথা ঘামানোর এত সময় কোথায় সেই ইংরেজ টাউন প্ল্যানারদের? সোজা লাটসাহেবের কাছে ফিরে গিয়ে তাঁকে জানাল কী চমৎকার জায়গা একখানা খুঁজে পাওয়া গেছে। শোনাল কেমন বিশাল চওড়া আর গভীর নদী, সোজা গিয়ে মিশেছে সাগরে, তার পাশে কেমন সুন্দর টানা সমতল জায়গা; লাটসাহেবকে তাদের প্ল্যান আর ম্যাপ-ট্যাপ যা যা ছিল দেখাল, সেখানে কী কী বানানোর পরিকল্পনা আছে শোনাল তাঁকে–হোটেল, বেড়ানোর জায়গা, পার্ক, বিরাট বিরাট প্রাসাদ, ব্যাঙ্ক, রাস্তাঘাট আরও কত কী। ওঃ, দারুণ সুন্দর একখানা শহর গড়া যাবে ওই মাতলার তীরে–কোনও কিছুর কোনও অভাব থাকবে না বাংলার সেই নতুন রাজধানীতে।

    ঠিকাদারদের ডেকে সব বুঝিয়ে-টুঝিয়ে দেওয়া হল, কাজও শুরু হয়ে গেল চটপট: হাজার হাজার মিস্ত্রি, মহাজন আর ওভারসিয়াররা এসে জড়ো হল মাতলার পাড়ে, শুরু করল খোঁড়াখুঁড়ি। মাতলার জল খেয়ে মাতালের মতো কাজ করতে লাগল তারা, সব বাধা তুচ্ছ করে–এমনকী ১৮৫৭-র বিদ্রোহের সময়ও বন্ধ হল না কাজ। তোমরা যদি তখন এই মাতলার পাড়ে থাকতে বন্ধুগণ, তোমরা জানতেও পারতে না যে উত্তর ভারতে কেমন গ্রাম থেকে গ্রামে খবর চালাচালি হচ্ছে চাপাটির সঙ্গে, মঙ্গল পাণ্ডে কখন বন্দুক ঘুরিয়ে ধরেছে তার অফিসারদের দিকে, কাতারে কাতারে কোথায় খুন হয়ে যাচ্ছে নারী শিশু, কোথায় বিদ্রোহীদের উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কামানের মুখে বেঁধে। এখানে প্রশান্ত নদীর পারে কাজ চলতে লাগল অবিশ্রাম: বাঁধ তৈরি হল, ভিত খোঁড়া হল, নদীর ধার ঘেঁষে বানানো হল রাস্তা, বসানো হল রেলের লাইন। এবং এই পুরো সময়টা ধরে শান্ত ধীর গতিতে বয়ে চলল মাতলা, অপেক্ষা করে রইল। কিন্তু নদীও সব সময় তার সব গোপন কথা আড়াল করে রাখতে পারে না। এখানে যখন বন্দর তৈরির কাজ চলছিল, ঠিক সেই সময় কলকাতা শহরে বাস করতেন এক ভদ্রলোক, স্বভাব তারও অনেকটা এই মাতলা নদীরই মতো। সামান্য একটা শিপিং ইন্সপেক্টরের চাকরি করতেন তিনি ইংরেজ সাহেব, নাম হেনরি পিডিংটন। ভারতে আসার আগে এই পিডিংটন সাহেব কয়েক বছর কাটিয়েছিলেন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। সেখানকারই কোনও এক দ্বীপে থাকার সময় প্রেমে পড়েছিলেন সাহেব। না, কোনও মহিলাকে ভালবাসেননি ভদ্রলোক, এমনকী এরকম নির্জন জায়গায় বেশিদিন কাটালে অনেক সাহেব যেমন পাগলের মতো তাদের কুকুরকে ভালবাসে, সেরকমও কিছু ঘটেনি তার জীবনে। মিস্টার পিডিংটন সেখানে ঝড়ের প্রেমে পড়েছিলেন। ওই সব দ্বীপে সে ঝড়ের নাম ছিল হারিকেন, আর সেই হারিকেনকেই ভীষণ ভালবেসে ফেললেন সাহেব। অনেক লোক যেমন পাহাড় বা আকাশের তারা ভালবাসে, পিডিংটনের ভালবাসা কিন্তু ঠিক সেরকম ছিল না। ঝড় ছিল তার কাছে বইয়ের মতো, সংগীতের মতো। প্রিয় লোক বা : গায়কের প্রতি যেরকম একটা টান থাকে মানুষের, ক্যারিবিয়ানের তুফান ঠিক সেইভাবে টানত সাহেবকে। পিডিংটন ঝড়কে পড়তেন, শুনতেন, বুঝতে চেষ্টা করতেন, ঝড় নিয়ে চর্চা করতেন। ঝড়কে এত ভালবাসতেন উনি যে নতুন একটা নামই তৈরি করে ফেললেন–‘সাইক্লোন’।

    এখন, আমাদের কলকাতা পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের মতো অতটা রোমান্টিক জায়গা হতে পারে, কিন্তু পিডিংটন সাহেবের প্রণয়চর্চার জন্য এ শহরও কোনও অংশে খারাপ ছিল না। ঝড়ের ভয়াল রূপের হিসাবে যদি বিচার করা যায়, দেখা যাবে বঙ্গোপসাগরের স্থান অন্য সব সমুদ্রের ওপরে–সে ক্যারিবিয়ান সাগরই হোক, কি দক্ষিণ চিন সমুদ্র। আমাদের এই সাগরের তুফান থেকেই তো ‘টাইফুন’ শব্দটা তৈরি হয়েছে, তাই না?

    লাটসাহেবের নতুন বন্দরের কথা একদিন কানে এল পিডিংটনের। ওঁর কিন্তু এতটুকু সময় লাগল না বুঝতে যে কী মত্ততা লুকিয়ে আছে এই নদীর মধ্যে। এই মাতলার পাড়ে দাঁড়িয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে সাহেব বললেন, “ওই সার্ভেয়ারদের তুমি কঁকি দিতে পার, কিন্তু আমার সঙ্গে তোমার ওসব চালাকি খাটবে না। তোমার কী ধান্দা তা আমার জানতে কিছু বাকি নেই। বাকিরাও যাতে জানতে পারে সে ব্যবস্থাও আমি শিগগিরই করছি।”

    মনে মনে হাসল মাতলা। বলল, “যাও না, এক্ষুনি যাও। বলো না গিয়ে। তোমাকেই সবাই বলবে মাতলা–বলবে লোকটা নাকি নদী আর ঝড়ের মনের কথা পড়তে পারে।”

     কলকাতায় নিজের বাড়িতে বসে একের পর এক চিঠি লিখতে লাগলেন পিডিংটন। প্ল্যানারদের লিখলেন, সার্ভেয়ারদের লিখলেন–কী বিপজ্জনক কাজ তারা করছে বললেন সে কথা; বললেন ভাটির দেশের এত গভীরে শহর গড়ার চিন্তা নিছক পাগলামি বই কিছু নয়; বাদাবন হল সাগরের সঙ্গে লড়ার জন্য বাংলার অস্ত্র, প্রকৃতির প্রচণ্ড আক্রমণ থেকে, দক্ষিণ বাংলাকে আড়াল করে রাখে এই জঙ্গল; ঝড়, ঢেউ, আর জলোচ্ছ্বাসের প্রথম ঝাঁপটাটা এই সুন্দরবনই সামলায়। ভাটির দেশ যদি না থাকত কবে  জলের তলায় চলে যেত বাংলার সমতলক্ষেত্র: এই বাদাবনই তো এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছে পশ্চাভূমিকে। কলকাতার দীর্ঘ আঁকাবাঁকা সমুদ্রসড়ক আসলে হল সাগরের তুমুল শক্তির হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সেই তুলনায় তো এই নতুন বন্দর ভয়ানক অরক্ষিত। কখনও যদি সেরকম জোরালো স্রোত আর হাওয়ার টান ওঠে তা হলে সামান্য একটা ঝড়েই ভেসে যাবে গোটা জায়গাটা–সাইক্লোনের টানে একটা ঢেউ ওঠার শুধু অপেক্ষা। মরিয়া হয়ে পিডিংটন ভাইসরয়কে পর্যন্ত লিখে ফেললেন একটা চিঠি: বিষয়টা আরেকবার ভাল করে ভেবে দেখতে অনুরোধ করলেন, ভবিষ্যদ্বাণীও করলেন–বললেন, সত্যি সত্যি যদি বন্দর তৈরি হয় এই জায়গায়, পনেরো বছরের বেশি সে বন্দর টিকবে না। একদিন আসবে, যখন প্রচণ্ড সাইক্লোনের সঙ্গে আছড়ে পড়বে লোনা জলের বিশাল ঢেউ, ডুবিয়ে দেবে গোটা বসতিটাকে; এর জন্য মানুষ হিসাবে এবং বৈজ্ঞানিক হিসাবে নিজের মানসম্মান পণ রাখতেও তিনি রাজি–লিখলেন পিডিংটন।

    খ্যাপা সাহেবের এসব কথায় অবশ্য কেউই কান দিল না; প্ল্যানারদের বা লাটসাহেবের কারওরই এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো সময় ছিল না। কে পিডিংটন? সামান্য একটা শিপিং ইন্সপেক্টর বই তো কেউ নয়। সাহেবদের জাতপাতের হিসেবে একেবারে নীচের দিকে তার স্থান। লোকে ফিসফাস করতে শুরু করল–আসলে মানুষটা একটু খ্যাপাটে তো, মাথায় অল্পবিস্তর গণ্ডগোল থাকাও বিচিত্র নয়। ও-ই তো কিছুদিন আগে বলেছিল না, যে ঝড় হল গিয়ে আসলে এক রকমের ‘আশ্চর্য ধূমকেতু’?

    সুতরাং কাজ চলতেই থাকল, বন্দরও তৈরি হয়ে গেল। বাঁধানো রাস্তাঘাট হল, রং-টং করা তকতকে সব হোটেল ঘরবাড়ি হল, মোটকথা যেমন যেমন ভাবা হয়েছিল ঠিক সেইভাবে বানানো হল শহরটাকে। তারপর একদিন খুব হইহল্লা করে ঢাকঢোল বাজিয়ে উৎসব হল, ভাইসরয় পা রাখলেন মাতলার পাড়ে, নতুন বন্দরের নাম দিলেন পোর্ট ক্যানিং।

    পিডিংটন সাহেবকে কিন্তু সে উৎসবে যোগ দিতে ডাকা হয়নি। কলকাতার রাস্তায় তাকে দেখা গেলেই এখন লোকজন হাসি তামাশা করে: ওই যে, ওই দেখ রে, মাতাল পিডিংটন বুড়ো যাচ্ছে। ওই লোকটাই তো নতুন বন্দরের কাজ আটকানোর জন্য জ্বালিয়ে মারছিল লাটসাহেবকে। কী একটা যেন ভবিষ্যদ্বাণীও করেছিল না? আবার নাকি মানসম্মান পণ রেখেছিল নিজের?

    অপেক্ষা করো, অপেক্ষা করো, বললেন পিডিংটন–পনেরো বছর সময় দিয়েছি আমি। মাতাল সাহেবের ওপর দয়া হল মাতলার। পনেরো বছর তো অনেক লম্বা সময়, এর মধ্যেই যথেষ্ট ভোগান্তি হয়েছে লোকটার। একটা বছর সাহেবকে অপেক্ষা করিয়ে রাখল মাতলা, তারপর আরও এক বছর, তারপর আরও এক। এই করে করে কেটে গেল পাঁচ পাঁচটা বছর। অবশেষে একদিন, ১৮৬৭ সালে, যেন শক্তিপরীক্ষার সমস্ত প্রস্তুতি নিয়ে ফুঁসে উঠল নদী। আছড়ে পড়ল ক্যানিং-এর ওপর। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভেসে গেল শহরটা–কঙ্কালটুকু শুধু পড়ে রইল।

    বিশাল কোনও তুফান নয়, পিডিংটন ঠিক যেমনটি বলেছিলেন, সেইরকম সাধারণ একটা ঝড় উঠেছিল। সেই ঝড়ের হাওয়ায় নয়, তার সঙ্গে ওঠা একটা ঢেউয়ে একটা জলোচ্ছ্বাসে–গুঁড়িয়ে গেল গোটা শহর। তার চার বছর পর, ১৮৭১ সালে, অবশেষে পরিত্যক্ত বলে ঘোষণা করা হল বন্দরটাকে। যে বন্দরের একদিন পুব সাগরের রানি হয়ে ওঠার কথা ছিল, টক্কর দেওয়ার কথা ছিল বোম্বাই, সিঙ্গাপুর আর হংকং-এর সঙ্গে, সে এখন হয়ে গেল মাতলার কেনা বাঁদী–ক্যানিং।”

    “মেশোর সব গল্পেরই শেষটা কিন্তু সবসময় রাখা থাকত সেই রিলকের জন্য,” কানাই বলল। বুকের ওপর হাত রেখে আবৃত্তি করতে লাগল:

    ‘তবু, হায়, কী-অদ্ভুত আর্তিপুরে জনপদগুলি…

    আহা, দেবদূত, তিনি কেমন পায়ের তলে ধ্বস্ত করে দেবেন ওদের

    সান্ত্বনা বাজার, যার এক পাশে তৈরি করা গির্জেটি নগদ মূল্যে

    ক্রীত হয়ে, পড়ে আছে হতাশ ও পরিচ্ছন্ন–রুদ্ধ, যেন রবিবারে পোস্টাপিস।’

    “বুঝতেই পারছেন ব্যাপারটা,” বলল কানাই। পিয়া ততক্ষণে হাসতে শুরু করেছে। “সেই ১৮৬৭ সালে মাতলা যেদিন লাটসাহেবের সাধের স্বপ্নকে গুঁড়িয়ে দিল, তারপর থেকে এভাবেই রয়ে গেছে ক্যানিং–রবিবারের ডাকঘরের মতো।”

  • একটি হত্যা

    একটি হত্যা

    একটি হত্যা

    মেঘার কেবিনগুলোর প্রত্যেকটার মধ্যেই একটা করে উঁচু প্ল্যাটফর্ম মতো জায়গা আছে, বাঙ্ক হিসাবে ব্যবহার করার জন্য। সেখানে কম্বল চাদর আর বালিশ পেতে একটা বিছানা বানিয়ে নিয়েছিল কানাই। খুব একটা শৌখিন কিছু না, তবে মোটামুটি আরামদায়ক। তার ওপরে শুয়ে বেশ ভালই ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ লোকজনের গলার আওয়াজে ঘুমটা ভেঙে গেল। মনে হল চারিদিকে অনেক লোকের হইচই। কিছু আওয়াজ দূর থেকে ভেসে আসছে, কিছু কাছ থেকে। হাতড়ে টর্চটা নিয়ে ঘড়ি দেখল কানাই–রাত তিনটে। ওপরের ডেক থেকে হরেন আর তার নাতির গলা পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে, দুজনেই মনে হল খুব উত্তেজিত।

    ঘুমোতে যাওয়ার আগে জামাকাপড় ছেড়ে শুধু একটা লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে নিয়েছিল কানাই, এখন গা থেকে কম্বলটা সরাতেই হাওয়ার ঠান্ডা ভাবটা টের পেল বেশ। কেবিন থেকে বেরোনোর আগে একটা কম্বল তুলে পেঁচিয়ে নিল গায়ে। হরেন আর তার নাতি কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল, রেলিং-এর ওপর ঝুঁকে পড়ে তাকিয়ে ছিল পাড়ের দিকে।

    “কী হয়েছে?” কানাই জিজ্ঞেস করল।

    “ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। গায়ে কিছু একটা হয়েছে মনে হচ্ছে।”

    মাঝনদীতে নোঙর করা রয়েছে বোটটা। বেশ কয়েক ঘণ্টা আগে জোয়ারও লেগে গেছে; পাড় থেকে ওদের দূরত্ব এখন কম করে এক কিলোমিটার। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তুলো তুলো মেঘের মতো হিম উঠে এসেছে  জলের বুক থেকে: ভোরের কুয়াশার মতো ঘন না হলেও দূরের পাড়ি অনেকটা আবছা লাগছে তাতে। কাঁপা কাঁপা হিমের চাদরের মধ্যে দিয়ে দেখা গেল কয়েকটা কমলা রং-এর  আলোর বিন্দু খুব তাড়াতাড়ি এদিক ওদিক নড়াচড়া করছে, যেন জ্বলন্ত মশাল নিয়ে পাড় বেয়ে দৌড়োদৌড়ি করছে কিছু লোক। কুয়াশা সত্ত্বেও এতটা দূর থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে তাদের গলার আওয়াজ। এতগুলি লোক এই মাঝরাত্তিরে কেন এভাবে ছুটোছুটি করছে সেটা হরেন আর তার নাতিও মনে হল ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।

    হঠাৎ কনুইয়ে কার একটা ছোঁয়া পেল কানাই। ঘুরে তাকিয়ে দেখল পিয়া দাঁড়িয়ে আছে পাশে, চোখ ঘষছে হাত মুঠো করে। “কী হয়েছে?”

    “সেটাই বোঝার চেষ্টা করছি। এরাও কেউ বলতে পারছে না।”

    “ফকিরকে একবার জিজ্ঞেস করুন না।”

    ভটভটির পেছন দিকটায় গেল কানাই, পিয়াও গেল সঙ্গে সঙ্গে। নীচে নৌকোর ওপর টর্চের আলো ফেলতে দেখা গেল জেগেই আছে ফকির, একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে নৌকোর মাঝখানটায় বসে আছে জড়োসড়ো হয়ে। মুখে আলো পড়তে হাত তুলে চোখ আড়াল করল। টর্চটা নিভিয়ে দিল কানাই। একটু ঝুঁকে পড়ে কী কথা বলল ফকিরের সঙ্গে।

    “ও জানে কী হয়েছে?” পিয়া জানতে চাইল।

    “না। ডিঙি নিয়ে যাবে বলছে পাড়ে। বলছে চাইলে আমরাও যেতে পারি ওর সঙ্গে।”

    “সে তো যাবই।”

    ফকিরের নৌকোয় চড়ে বসল কানাই আর পিয়া। নাতিকে ভটভটিটার দায়িত্বে রেখে হরেনও চলে এল ওদের সঙ্গে।

    পাড় পর্যন্ত যেতে প্রায় মিনিট পনেরো লাগল। এগোতে এগোতেই বোঝা যাচ্ছিল, একটা নির্দিষ্ট জায়গাকে কেন্দ্র করে হল্লাটা হচ্ছে: মনে হল হরেনের আত্মীয়রা গ্রামের যে জায়গাটায় থাকে ঠিক সেইখানটাতেই এসে জড়ো হচ্ছে সব লোকজন। ডাঙা যত কাছে আসতে থাকল ততই জোর হতে লাগল লোকের কথাবার্তা আর চিৎকার চেঁচামেচি, বাড়তে বাড়তে একসময় সমস্ত আওয়াজ মিশে গিয়ে শুধু ক্রুদ্ধ ধকধকে একটা শব্দে পরিণত হল।

    আওয়াজটা শুনতে শুনতে কেমন একটা ভয় ধরে গেল কানাইয়ের। হঠাৎ একটা ঝোঁকের মাথায় বলল, “পিয়া, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আমাদের আর এগোনোটা উচিত হবে কিনা।”

    “কেন?”

    “এই হইচই-টা শুনে আমার কী মনে হচ্ছে জানেন?” কানাই জিজ্ঞেস করল।

    “কী, একটা জটলা-টটলা কিছু?”

    “জটলা ঠিক নয়, বলা যেতে পারে ‘মব’–উত্তেজিত জনতা।”

    “মব? এইটুকু একটা গ্রামে মব?”

    “ব্যাপারটা বিশ্বাস করা কঠিন, তবে আওয়াজ যা শোনা যাচ্ছে তাতে আমার মনে হচ্ছে বড় ধরনের কোনও দাঙ্গা-হাঙ্গামা হচ্ছে ওখানে, আর দাঙ্গা আমি সামনাসামনি দেখেছি, চোখের সামনে লোক মরতেও দেখেছি। আমার মন বলছে সেইরকমই কিছু একটা হাঙ্গামার মধ্যে গিয়ে পড়তে চলেছি আমরা।”

    চোখের ওপর হাত আড়াল করে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে গ্রামটার দিকে দেখতে লাগল পিয়া। “ব্যাপারটা দেখাই যাক না গিয়ে।”

    জোয়ার শেষ হয়ে ভাটা পড়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ হল, কিন্তু নদী এখনও টইটম্বুর। খুব সহজেই ফকির ডিঙির গলুইটা পাড়ের কাদার মধ্যে নিয়ে তুলল। সামনে থেকে উঠে গেছে ভেজা মাটির ঢাল, বাদাবনের অন্ধকারে ঢাকা, তাদের শ্বাসমূল আর ছোট ছোট চারায় ভর্তি চারদিক। ভিড়টা যেখানে জড়ো হয়েছে তার কাছাকাছি নৌকোটা নিয়ে গিয়ে ভিড়িয়েছে। ফকির, ডিঙি থেকে সামনে ছায়ার মতো দেখা যাচ্ছে বাঁধটা, তার ওপর জমাট কুয়াশা–লালচে আভা ধরেছে মশালের আলোয়।

    কানাই আর পিয়া বনবাদাড়ের মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে এগোচ্ছিল সামনের দিকে, হাত নেড়ে ওদের থামিয়ে দিল হরেন। কানাইয়ের হাত থেকে টর্চটা নিয়ে পায়ের কাছে মাটিতে একটা জায়গায় আলো ফেলল। কাছে গিয়ে কানাই আর পিয়া দেখল মাটির মধ্যে একটা দাগের ওপর গিয়ে পড়েছে আলোটা। মাটিটা এখানে একটু নরম, ঠিক ভেজাও নয়, আবার শুকনোও নয়। তার ওপর স্পষ্ট হয়ে বসে গেছে ছাপটা, স্টেনসিলে আঁকা ছবির মতো। ওটা কীসের দাগ সেটা বুঝতে একটুও সময় লাগল না কানাইয়ের আর পিয়ার। রান্নাঘরের মেঝেতে বেড়ালের পায়ের ছোপ যেরকম দেখতে লাগে, এই দাগটাও খানিকটা সেইরকম–শুধু তার চেয়ে বহুগুণ বড়। এত স্পষ্টভাবে ছাপটা পড়েছে যে তার মধ্যে থাবার গোলগোল মাংসল অংশের গড়ন আর গুটিয়ে নেওয়া নখের দাগ আলাদা করে দেখা যাচ্ছিল। টর্চের আলোটা সামনের দিকে ফেলল হরেন। হুবহু একরকম ছাপ পরপর নদীর পাড় থেকে সোজা চলে গেছে বাঁধের ওপর। দাগগুলো দেখে জানোয়ারটা কোন পথে এসেছে তার একটা আন্দাজ পাওয়া যাচ্ছিল। ওপারের জঙ্গল থেকে নেমে সাঁতরে নদী পার হয়েছে, আর এদিকে এসে পাড়ে যেখানটায় উঠেছে, ঠিক সেই জায়গাটাতেই এখন ভাসছে ফকিরের নৌকো।

    “যেখান দিয়ে ওটা নদী পেরিয়েছে সেই জায়গাটা মেঘার থেকে নিশ্চয়ই দেখা যাচ্ছিল,” পিয়া বলল।

    “খুব সম্ভবত। কিন্তু আমরা সবাই যেহেতু ঘুমিয়ে ছিলাম তাই কেউ দেখে ফেলার ভয়টা মনে হয় ছিল না ওর।”

    বাঁধের মাথার কাছাকাছি পৌঁছে মাটিতে বড়সড় একটা ছাপের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাল হরেন। ইশারায় বলল এখানে বসেই গ্রামটাকে পর্যবেক্ষণ করে ওর শিকার বেছে নিয়েছিল জানোয়ারটা। মাটিতে আরেকটা দাগের দিকে দেখিয়ে বলল খুব সম্ভবত এখান থেকেই লাফ দিয়ে পড়েছিল শিকারের ওপর। বলতে বলতে উদ্বেগে অধীর হয়ে সামনের দিকে ছুটতে শুরু করল বুড়ো মানুষটা। ফকিরও দৌড়ল সঙ্গে সঙ্গে। কয়েক পা পেছনেই চলল পিয়া আর কানাই। কিন্তু বাঁধের ওপরে পৌঁছতেই যে দৃশ্য চোখে পড়ল তাতে সবাই থমকে থেমে গেল একসঙ্গে। মশালের আলোয় দেখা যাচ্ছিল গোটা গ্রামটা গায়ে গায়ে লাগা কতগুলি মাটির বাড়ির জটলার মতো। বাঁধের সমান্তরাল ভাবে পরপর চলে গেছে বাড়িগুলো। ওদের ঠিক সামনে, শখানেক মিটার দূরে, দেখা যাচ্ছিল একটা মাটির দেওয়ালওয়ালা ঘর, খোড়ো ছাউনি দেওয়া। কুঁড়েটার চারদিকে ঘিরে প্রায় একশো লোক জড়ো হয়েছে। বেশিরভাগই পুরুষমানুষ, তাদের অনেকের হাতে লম্বা বাঁশের বল্লম, সামনের দিকটা চেঁছে ছুঁচোলো করা। সেই বল্লমগুলো ওরা বারবার গেঁথে দিচ্ছে মাটির ঘরটার মধ্যে। প্রচণ্ড ভয় আর ক্রোধে বিকৃত হয়ে গেছে লোকগুলোর মুখ। ভিড়ের মধ্যে যে ক’জন মহিলা আর বাচ্চা আছে সমস্বরে তারা চিৎকার করছে:

    “মার! মার!”

    ভিড়টার একধারে হরেনকে দেখতে পেয়ে কানাই আর পিয়া সেদিকে এগিয়ে গেল। “এখানেই আপনার আত্মীয়রা থাকেন?” জিজ্ঞেস করল কানাই।

    “হ্যাঁ,” বলল হরেন। “এখানেই থাকে ওরা।”

    “কী হয়েছে? গণ্ডগোলটা কীসের?”

    “সেই যে মোষের বাচ্চা হওয়ার আওয়াজ শুনেছিলাম আমরা মনে আছে?” হরেন বলল।

    “সেই থেকেই শুরু হয়েছে ব্যাপারটা। নদীর ওপার থেকে বড়মিঞাও শুনেছে আওয়াজটা। তারপর  জল পেরিয়ে চলে এসেছে এদিকে।”

    সামনের কুঁড়েটা আসলে একটা গোয়ালঘর, বলল হরেন। কাছেই একটু বড় আরেকটা কুঁড়েতে থাকে ওর আত্মীয়রা। আধঘণ্টাখানেক আগে হঠাৎ হুড়মুড় করে একটা শব্দ আর গোরুমোষের চিৎকারে ওদের ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে তখন ঘন অন্ধকার। কুয়াশাও ছিল বেশ। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তাই কিছুই দেখতে পায়নি ওরা, কিন্তু যেটুকু শুনতে পেয়েছে তাতেই পরিষ্কার বোঝা গেছে কী ঘটেছে ব্যাপারটা: বড় একটা জানোয়ার লাফ দিয়ে এসে পড়েছে গোয়ালঘরটার ওপর, আর নখ দিয়ে খড়ের চালে গর্ত করার চেষ্টা করছে। একটু পরেই আরেকটা ধড়মড় করে আওয়াজে বোঝা গেছে জানোয়ারটা ঢুকে পড়েছে গোয়ালের ভেতরে। বাড়িতে ছয় ছয়টা জোয়ান লোক। ওরা দেখল এরকম সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। বাঘটা এ গাঁয়ে নতুন নয়, আগেও এসেছে বেশ কয়েকবার। দু’বার দুটো লোককে মেরেছে, গোরু-ছাগলও খেয়েছে অনেকগুলো। এখন গোয়ালঘরের মধ্যে ওটা যতটুকু সময় আছে তার মধ্যে ওকে কবজা করা খুব একটা কঠিন হবে না। কারণ ওখান থেকে পালাতে হলে ওকে খাড়া লাফ দিয়ে চালের ওই ঘেঁদাটার মধ্যে দিয়ে বেরোতে হবে। একটা বাঘের পক্ষেও সেটা খুব একটা সোজা কাজ নয়। আর মুখে একটা বাছুর নিয়ে ওভাবে লাফিয়ে বেরোনো তো আরও কঠিন।

    বাড়িতে যে ক’টা মাছ-ধরা জাল ছিল সবগুলো নিয়ে ওরা বেরিয়ে এল। একটার পর একটা সেগুলোকে ছুঁড়ে দিল গোয়ালঘরের চালের ওপর। তারপর কাঁকড়া ধরার নাইলন দড়ি দিয়ে শক্ত করে একসঙ্গে বাঁধল জালগুলোকে। এবার বাঘটা বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য যেই লাফ দিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে গেছে জালে; আর ফের গিয়ে পড়েছে গোয়ালঘরের ভেতর। বেরোনোর জন্য ছটফট করছে ওটা তখন। সেই সময় ছেলেদের মধ্যে একজন একটা বাঁশের বল্লম জানালা দিয়ে সোজা ঢুকিয়ে দিয়েছে ওর চোখের মধ্যে।

    হরেন যেমন যেমন বলে যাচ্ছিল, সঙ্গে সঙ্গে কথাগুলি ইংরেজিতে অনুবাদ করে যাচ্ছিল কানাই পিয়ার জন্য। কিন্তু এই পর্যন্ত শুনেই ওকে থামিয়ে দিল পিয়া। কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “তার মানে আপনি বলতে চাইছেন বাঘটা এখনও এই চালাঘরটার মধ্যে রয়েছে?”

    “হ্যাঁ,” বলল কানাই। “এখানেই আটকে রয়েছে বাঘটা এখন, অন্ধ অবস্থায়।”

    পিয়া একবার মাথাটা ঝাঁকাল, যেন একটা দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে ওঠার চেষ্টা করছে। দুর্বোধ্য একটা দৃশ্য ঘটে যাচ্ছে চোখের সামনে, কিন্তু তার প্রতিটা খুঁটিনাটি এত স্পষ্ট, যে এতক্ষণে পিয়া বুঝতে পারল এই সব তীক্ষ্ণ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এতগুলি লোক আসলে ওই আহত প্রাণীটাকে আক্রমণ করছে। পুরো ব্যাপারটা তখনও ও বোঝার চেষ্টা করছে, এমন সময় সাড়া দিল বাঘটা, এই প্রথম বার। মুহূর্তের মধ্যে গোয়ালঘরের থেকে দূরে সরে গেল লোকজন। বল্লম-উল্লম ফেলে হাত দিয়ে মুখ আড়াল করল সবাই, যেন প্রচণ্ড কোনও বিস্ফোরণ থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে। এমন তীব্রতা সে আওয়াজের যে পায়ের নীচের মাটি পর্যন্ত কেঁপে কেঁপে উঠছিল তাতে, নিজের খালি পায়ের চেটোয় সেটা স্পষ্ট অনুভব করল পিয়া। এক মুহূর্তের জন্য সকলের সব নড়াচড়া থেমে গেল। তারপর যেই পরিষ্কার হল যে বাঘটা এখনও গোয়ালঘরের মধ্যেই অসহায় বন্দি অবস্থাতেই রয়েছে, অমনি বল্লম তুলে নিয়ে দ্বিগুণ ক্রোধে সেদিকে তেড়ে গেল সবাই।

    কানাইয়ের হাতটা খামচে ধরে ওর কানের কাছে চিৎকার করে পিয়া বলল, “এক্ষুনি কিছু একটা করতে হবে, কানাই। এটা কিছুতেই হতে দেওয়া যায় না।”

    “কিছু করতে পারলে ভাল হত পিয়া, কিন্তু উপায় কিছু আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।”

    “কিন্তু একটা চেষ্টা তো করে দেখা যেতে পারে, কানাই, করা যায় না কিছু?” পিয়ার গলায় অনুনয়ের সুর।

    এর মধ্যে হরেন এসে ফিসফিস করে কী যেন বলল কানাইয়ের কানে কানে। সঙ্গে সঙ্গে পিয়ার হাতটা ধরে বাঁধের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করল কানাই। “শুনুন পিয়া, আমাদের ফিরে যেতে হবে এখন।”

    “ফিরে যেতে হবে? কোথায়?”

    “লঞ্চে ফিরতে হবে,” কানাই বলল।

    “কেন?” জিজ্ঞেস করল পিয়া। “কী হবে এখন এখানে?”

    পিয়ার হাতটা ধরে টানতে শুরু করল কানাই। “যাই হোক না কেন, এখানে দাঁড়িয়ে সেটা না দেখাই ভাল আপনার।”

    মশালের আলোয় উজ্জ্বল ওর মুখের দিকে তাকাল পিয়া। “কী লুকোচ্ছেন আপনি আমার থেকে? কী করতে চাইছে এরা?”

    মাটিতে থুতু ফেলল কানাই। একটা জিনিস বোঝার চেষ্টা করুন পিয়া–এই জানোয়ারটা বহুদিন ধরে বার বার এ গ্রামে হানা দিচ্ছে। দু-দুটো লোককে মেরেছে, গোরু-ছাগল যে কত মেরেছে তার ইয়ত্তা নেই–”

    “কিন্তু ওটা তো জানোয়ার, কানাই,” বলল পিয়া। “জানোয়ারের ওপর আপনি প্রতিশোধ নিতে পারেন না।”

    চারিদিকে উন্মত্তের মতো চিৎকার করছে গ্রামের লোকেরা, মশালের দপদপে আলোয় চকচক করছে তাদের মুখগুলো: মার! মার! পিয়ার কনুইটা ধরে ওকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল কানাই। “দেরি হয়ে গেছে পিয়া, আর কিছু করার নেই। আমাদের চলে যেতে হবে এখন।”

    “চলে যাব?” পিয়ার গলায় বিস্ময়। “কিছুতেই যাব না আমি। আমি এটা আটকাব।”

    “পিয়া, এটা একটা উন্মত্ত মব, খেপে গেলে আমাদেরও অ্যাটাক করতে পারে ওরা। আমরা এখানে বাইরের লোক।”

    “তা হলে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবেন?”

    “আমাদের পক্ষে এখানে কিছু করা সম্ভব নয় পিয়া,” প্রায় চিৎকার করে বলল কানাই। “ঠান্ডা মাথায় একটু বোঝার চেষ্টা করুন ব্যাপারটা। চলুন, চলে যাই এখান থেকে।”

    এক ঝাঁকুনি দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিল পিয়া। “আপনি যেতে চান তো চলে যান, কিন্তু আমি কিছুতেই এভাবে কাপুরুষের মতো পালাব না। আপনি যদি কিছু না করেন, তা হলে আমি করব। আর ফকির–আমি জানি ফকিরও করবে। ও কোথায় গেল?”

    আঙুল তুলে দেখাল কানাই। “ওখানে। দেখুন।”

    বুড়ো আঙুলের ওপর ভর দিয়ে ডিঙি মেরে পিয়া দেখল ভিড়টার একেবারে সামনের দিকে দেখা যাচ্ছে ফকিরকে, একটা বাঁশের বল্লম চেঁছে ছুঁচোলো করে দিচ্ছে একজনকে। এক ধাক্কায় কানাইকে সরিয়ে দিয়ে ভিড়টার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল পিয়া। ঠেলতে ঠেলতে চলে গেল ফকিরের কাছ পর্যন্ত। সঙ্গে সঙ্গে ওদের চারপাশের ভিড়টা বেড়ে উঠল, মানুষের চাপে ফকিরের পাশের লোকটার গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে গিয়ে পড়ল পিয়া। মশালের দপদপে আলোয় কাছ থেকে বল্লমটা দেখতে পেল পিয়া। ছুঁচোলো ডগাটায় রক্তের দাগ। আর বাঁশের চেঁাচের ফাঁকে ফাঁকে লেগে আছে কয়েকগুছি হলদে কালো লোম। হঠাৎ পিয়ার মনে হল ও যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে জানোয়ারটাকে–ভয়ে গুটিসুটি মেরে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে গোয়ালঘরটার ভেতরে, সরে সরে গিয়ে ছুঁচোলো বল্লমগুলোর থেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করছে, গায়ের জায়গায় জায়গায় গর্ত হয়ে গেছে মাংসের মধ্যে, সেই ক্ষতস্থানগুলি চাটছে। হাত বাড়িয়ে একটানে বল্লমটা কেড়ে নিল ও, সামনের লোকটার কাছ থেকে। তারপর পায়ের চাপে সেটাকে ভেঙে ফেলল দু’টুকরো করে।

    এক মুহূর্তের জন্য ভীষণ হতভম্ব হয়ে গেল লোকটা। তারপর হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে কী সব বলতে লাগল আর একটা হাত মুঠো করে ঝাঁকাতে থাকল পিয়ার মুখের সামনে। মিনিট খানেকের মধ্যে আরও জনা ছয়েক এসে জুটে গেল লোকটার সঙ্গে। বয়স কারওরই খুব একটা বেশি নয়, মাথায় একটা করে চাদর জড়ানো সবার। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কী যে বলতে লাগল একবর্ণও তার বুঝল না পিয়া। এমন সময় কার একটা হাত এসে ধরল ওর কনুইটা। ফিরে তাকিয়ে দেখল ফকির দাঁড়িয়ে রয়েছে ওর পেছনে। ওকে দেখে ভরসা পেল পিয়া: আশায় আর স্বস্তিতে হঠাৎ যেন অবশ হয়ে গেল মনটা। মনে হল ফকির ঠিক জানবে কী করতে হবে, এই সব পাগলামি বন্ধ করার কিছু একটা উপায় ঠিক ও বের করবে। কিন্তু সেসব কিছু করার বদলে ফকির এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল ওকে, বুকের সঙ্গে চেপে ধরে সরিয়ে নিয়ে চলল ভিড় ঠেলে। দু’পায়ে ওর হাঁটুতে লাথি মারতে লাগল পিয়া, খামচে দিল হাতদুটো। তার মধ্যেই হঠাৎ দেখতে পেল ভিড়টার মধ্যে থেকে একটা আগুনের গোলা উড়ে গিয়ে পড়ল গোয়ালঘরটার ওপর। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চালাটার ওপর গজিয়ে উঠতে শুরু করল লকলকে আগুনের শিখা। আরেকবার শোনা গেল গর্জন। তার এক মুহূর্ত পর ভিড়টা থেকে জবাব এল সে গর্জনের, উন্মত্ত রক্তলোলুপ চিৎকার–মার! মার! গোয়ালের ওপর লাফিয়ে বাড়তে লাগল আগুন, কাঠকুটো আর শুকনো খড় দিয়ে সেটাকে আরও উশকে দিতে থাকল লোকজন।

    ফকিরের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল পিয়া। চিৎকার করতে শুরু করল: “ছাড়ো আমাকে ছেড়ে দাও!”

    কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার বদলে ওকে ঘুরিয়ে ধরল ফকির, চেপে ধরল নিজের শরীরের সঙ্গে; তারপর খানিকটা হেঁচড়ে, খানিকটা পাঁজাকোলা করে বাঁধের ওপর নিয়ে গিয়ে তুলল। লাফিয়ে বাড়তে থাকা আগুনের আলোয় পিয়া দেখল কানাই আর হরেন সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে। চারপাশ থেকে ঘিরে ওকে বাঁধ থেকে নামিয়ে নৌকোর দিকে নিয়ে চলল ওরা।

    বাঁধের গা বেয়ে হোঁচট খেতে খেতে নামতে নামতে কোনওরকমে নিজেকে সংযত করে খুব ঠান্ডা গলায় পিয়া শুধু বলতে পারল, “ফকির, আমাকে ছেড়ে দাও। কানাই, ওকে বলুন আমাকে ছেড়ে দিতে।”

    হাতটা একটু আলগা করল ফকির, কিন্তু অনিচ্ছার সঙ্গে। পিয়া একটু সরে দাঁড়াতেই প্রায় লাফ দিয়ে উঠল ও, মনে হল গ্রামের দিকে ফের দৌড়তে চেষ্টা করলেই গিয়ে ধরে ফেলবে আবার।

    বাঁধের এপার থেকে ধু ধু করে জ্বলা আগুনের শব্দ কানে আসছিল পিয়ার, হাওয়ায় ভেসে আসছিল পোড়া চামড়া আর মাংসের গন্ধ। ওর কানের কাছে মুখ এনে কী যেন একটা বলল ফকির। কানাইয়ের দিকে ফিরে পিয়া জিজ্ঞেস করল, “কী বলল ও?”

    “ও আপনাকে এতটা আপসেট হতে বারণ করছে।”

    “আপসেট হব না? কী বলছেন আপনি? এরকম ভয়ংকর ব্যাপার আমি জীবনে দেখিনি–জ্যান্ত একটা বাঘকে পুড়িয়ে মেরে ফেলল?”

    “ও বলছে বাঘ যখন গ্রামে আসে তখন মরতে চায় বলেই আসে।”

    হাত দিয়ে দু’কান চেপে ফকিরের দিকে ফিরল পিয়া, “স্টপ ইট। এই নিয়ে আর কোনও কথা আমি শুনতে চাই না। লেটস জাস্ট গো।”

  • জেরা

    জেরা

    জেরা

    পিয়ারা যখন বোটে গিয়ে উঠল ততক্ষণে ভোর হয়ে এসেছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মেঘার নোঙর তুলে ইঞ্জিন চালু করে দিল হরেন। বলল, যত তাড়াতাড়ি এখান থেকে সরে পড়া যায় ততই মঙ্গল। বাঘ মারার খবর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কানে পৌঁছলেই সঙ্গে সঙ্গে ঝামেলা শুরু হয়ে যাবে। তারপর দাঙ্গা, গোলাগুলি, পাইকারি হারে গ্রেফতার–সবই হতে পারে। সেরকম অভিজ্ঞতা আগে হয়েছে হরেনের।

    ভটভটির মুখ ঘুরতে শুরু করতেই জামাকাপড় পালটানোর জন্য নিজের কেবিনের দিকে চলল কানাই। আর পিয়া, খানিকটা যেন অভ্যাসের বশে, ওপরের ডেকের সামনে ওর নিজের জায়গার দিকে এগিয়ে গেল। কানাইয়ের মনে হল কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওর ‘নজরদারি’ ফের চালু হয়ে যাবে। কিন্তু কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে কানাই দেখল ডেকের ওপর কেমন যেন গা ছেড়ে দিয়ে বসে আছে পিয়া, মাথাটা হতাশ ভাবে রেলিঙের ওপর হেলানো। ভঙ্গিটা দেখে কানাই পরিষ্কার বুঝতে পারল এতক্ষণ এখানে বসে বসে কাঁদছিল পিয়া।

    ওর পাশে গিয়ে বসল কানাই। বলল, “মিছিমিছি এভাবে কষ্ট পাওয়ার কোনও মানে হয় পিয়া। ওখানে আমাদের কিছুই করার ছিল না।”

    “একবার চেষ্টা তো করতে পারতাম।”

    “তাতে লাভ কিছুই হত না।”

    “হয়তো হত না,” হাতের পেছন দিয়ে চোখ মুছল পিয়া। “যাক গে। তবে আপনার কাছে মনে হয় একটা ব্যাপারে আমার ক্ষমা চাওয়ার আছে কানাই।”

    “ওখানে যা সব বলেছিলেন সে জন্য?” হাসল কানাই। “তাতে কিছু মনে করিনি আমি– আপনার রাগ করার যথেষ্ট সংগত কারণ ছিল।”

    মাথা নাড়ল পিয়া, “না–শুধু সে জন্যে নয়।”

    “তা হলে?”

    “গতকাল আপনি আমাকে কী বলছিলেন মনে আছে?” জিজ্ঞেস করল পিয়া। “ঠিকই বলেছিলেন আপনি। আমিই আসলে ভুল বুঝেছিলাম।”

    “আমি ঠিক বুঝতে পারছি না–কোন ব্যাপারে কথা বলছেন আপনি,” কানাই বলল। “ওই যে আপনি বলছিলেন না–সেই যে, কোনও রকমের কোনও মিলই নেই..”

    “আপনার আর ফকিরের মধ্যে?”

    “হ্যাঁ,” বলল পিয়া। “ঠিকই বলেছিলেন আপনি। আমিই আসলে বোকামি করছিলাম। মনে হয় এরকম কিছুর একটা দরকার ছিল আমার ভুলটা ভাঙার জন্য।”

    জয়ের আনন্দে প্রথমেই যে কথাটা মুখে আসছিল একটু চেষ্টা করে সেটা গিলে ফেলল কানাই। গলার স্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে জিজ্ঞেস করল, “এই গভীর উপলব্ধি আপনার কীভাবে হল সেটা জানা যেতে পারে কি?”

    “এইমাত্র যা ঘটে গেল তার থেকেই হল,” বলল পিয়া। “ফকিরের এইরকম ব্যবহার আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না।”

    “কিন্তু এ ছাড়া আর কী আশা করেছিলেন ওর কাছ থেকে আপনি, পিয়া?” কানাই জিজ্ঞেস করল। “আপনি কি ভেবেছিলেন ও আসলে মাটির থেকে উঠে আসা একজন পরিবেশবিদ? তাও নয়। ফকির একজন জেলে পেটের জন্য মাছ মারাই ওর কাজ।”

    “সেটা বুঝতে পারি,” পিয়া বলল। “ওকে দোষ দিচ্ছি না আমি। আমি জানি ছোটবেলা থেকে এই ভাবেই ও বেড়ে উঠেছে। আসলে আমি ভেবেছিলাম ও হয়তো ঠিক অন্য সকলের মতো নয়, একটু আলাদা।”

    সহানুভূতির সঙ্গে পিয়ার হাটুতে আলতো করে হাত রাখল কানাই। “বাদ দিন এসব আলোচনা এখন। সামনে অনেক কাজ পড়ে আছে আপনার।”

    মাথা তুলে তাকাল পিয়া। একটু চেষ্টার হাসি ফোঁটাল মুখে।

    ঘণ্টাখানেকের পথ পেরিয়ে এসেছে মেঘা, এমন সময় ছাই-রঙা একটা মোটরবোট সশব্দে বেরিয়ে গেল পাশ দিয়ে। পিয়া তখন দূরবিন চোখে ভটভটির সামনে দাঁড়িয়ে, আর কানাই বসে আছে ছাউনির নীচে। দুজনেই তাড়াতাড়ি পাশের দিকটায় গিয়ে উঁকি মেরে দেখল তিরবেগে ভাটির দিকে চলে যাচ্ছে বোটটা, তাতে ভর্তি খাকি পোশাক পরা ফরেস্ট গার্ড। যে গ্রাম থেকে ওরা খানিক আগে এসেছে সেইদিকেই যাচ্ছে মনে হল।

    এর মধ্যে হরেনও এসে দাঁড়িয়েছে ওদের পাশে। ও কিছু একটা বলল, তাতে হো হো করে হেসে উঠল কানাই। পিয়াকে ব্যাখ্যা করে বলল, “হরেন বলছে কারও যদি কখনও এরকম অবস্থা হয় যে একদিকে গেলে জলদস্যুর হাতে পড়বে আর অন্য দিকে গেলে ফরেস্ট গার্ডের হাতে, তা হলে জলদস্যুর দিকে যাওয়াটাই ভাল। কম বিপজ্জনক।”

    কাষ্ঠ হেসে ঘাড় নাড়ল পিয়া। ফরেস্ট গার্ডদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ল ওর। জিজ্ঞেস করল, “ওরা কী করতে যাচ্ছে ওখানে?”

    “ধরপাকড়, জরিমানা, মারধর–আরও কী কী করবে কে জানে,” কানাই বলল।

    আরও ঘণ্টাখানেক কেটে গেল। একটা মোহনা পার হতে গিয়ে বেশ কয়েকটা ছাই-রঙা মোটরবোটের একটা দল চোখে পড়ল ওদের। আগের বোটটা যেদিকে গেছে মনে হল এগুলোও সেই একই দিকে যাচ্ছে।

    “আরেব্বাস,” বলে উঠল পিয়া। “এরা তো মনে হচ্ছে সহজে ছাড়বে না।”

    “সেরকমই দেখা যাচ্ছে,” বলল কানাই।

    হঠাৎ একটা মোটরবোট মুখ ঘুরিয়ে দল ছেড়ে বেরিয়ে এল। স্পিড বাড়াতে বোঝা গেল সোজা মেঘার দিকেই আসছে ওটা।

    হরেনও দেখতে পেয়েছে বোটটাকে। সারেঙের ঘরের ভেতর থেকে মুখ বের করে ব্যস্ত ভাবে কী যেন একটা বলল কানাইকে।

    “পিয়া, আপনাকে এবার কেবিনে ঢুকে পড়তে হবে,” কানাই বলল। “হরেন বলছে যদি আপনাকে ওরা লঞ্চে দেখতে পায় তা হলে ঝামেলা হতে পারে। মানে, আপনি বিদেশি আর ঠিকমতো পারমিট-টারমিট নেই, এসব বলে ঝাট করতে পারে।”

    “ওকে।” পিঠব্যাগটা তুলে নিয়ে কেবিনে গিয়ে ঢুকল পিয়া। দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল ভেতর থেকে। বাঙ্কে শুয়ে পড়ে ক্রমশ জোরালো হতে থাকা মোটরবোটের ইঞ্জিনের শব্দ শুনতে লাগল। শব্দটা যখন থেমে গেল, ও বুঝতে পারল বোটটা মেঘার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তারপর শুনতে পেল লোকজনের কথাবার্তার আওয়াজ, বাংলায়। প্রথমটায় শান্ত ভদ্র সুরে কথা শুরু হল, তারপর সুর চড়তে আরম্ভ করল আস্তে আস্তে। অনেকের গলার মধ্যে থেকে কানাইয়ের গলাটা আলাদা করে শুনতে পেল পিয়া।

    ঝাড়া একটা ঘণ্টা কেটে গেল এই করে। যুক্তি, পালটা যুক্তি চলতে লাগল, সঙ্গে সঙ্গে ওঠানামা করতে লাগল গলার স্বর। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গুমোট বাড়ছে কেবিনের ভেতর। ভাগ্যিস একটা  জলের বোতল ছিল পিয়ার কাছে।

    আরও বেশ খানিকক্ষণ পরে আস্তে আস্তে থেমে গেল কথাবার্তার আওয়াজ। মোটরবোটটাও ফিরে চলে গেল তারপর। ধকধক শব্দ উঠল মেঘার ইঞ্জিনে, আর পিয়ার কেবিনের দরজায় কে এসে ঠকঠক আওয়াজ করল। দরজা খুলে কানাইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল পিয়া।

    “কী এত গোলমাল হচ্ছিল?”

    মুখ বাঁকাল কানাই। “যা বোঝা গেল, ওরা শুনেছে কালকে যখন বাঘটাকে মারা হয়েছে তখন একজন বিদেশি ওই গ্রামে ছিল। তাই ওরা নাকি ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেছে।”

    “কেন?”

    “বলছে যে বর্ডারের এত কাছে গার্ড ছাড়া ঘুরে বেড়ানো নাকি একজন ফরেনারের পক্ষে খুব বিপজ্জনক। কিন্তু আমার মনে হয় ওরা আসলে খবরটা বাইরে ছড়াতে দিতে চায় না।”

    “বাঘ মারার খবরটা?”

    “হ্যাঁ,” মাথা নাড়ল কানাই। “এতে করে ওদের সম্পর্কে লোকের ধারণা খারাপ হয়ে যাবে। কিন্তু একটা জিনিস যেটা বোঝা যাচ্ছে সেটা হল আপনি যে এই এলাকায় ঘোরাফেরা করছেন সেটা ওরা জানে, আর এটাও পরিষ্কার যে আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে ওরা। বারবার জিজ্ঞেস করছিল আমরা আপনাকে দেখেছি কিনা।”

    “কী বললেন আপনারা?”

    হাসল কানাই। “হরেন আর আমি তো পুরো অস্বীকার করে গেলাম। মোটামুটি মানিয়েও ফেলেছিলাম, কিন্তু তারপর ওরা ফকিরকে দেখতে পেয়ে গেল। একজন গার্ড ওকে চিনে ফেলল। বলল, ওর নৌকোতেই শেষ দেখা গিয়েছিল আপনাকে।”

    “ও মাই গড!” পিয়া বলল। “ছুঁচোমুখো একটা গার্ড?”

    “হ্যাঁ। সেরকমই দেখতে। অন্যদের ও কী বলল জানি না, কিন্তু ফকিরকে তো নিয়ে জেলে পুরে দিয়েছিল আর একটু হলে। কোনও রকমে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শেষে ওদের নিরস্ত করলাম।”

    “কী করে করলেন?”

    খুব শুকনো গলায় কানাই বলল, “কী করে আর করব? আমার দু-একজন বন্ধুবান্ধবের নাম বললাম, আর তারপর একটু গল্পগুজব করে ওরা চলে গেল।”

    পিয়া আন্দাজ করল ব্যাপারটার গুরুত্ব খানিকটা হালকা করার জন্যই এই শ্লেষের সুর কানাইয়ের গলায়। ধীর, নাগরিক স্বভাবের মানুষটার প্রতি হঠাৎ একটা কৃতজ্ঞতাবোধে ভরে উঠল ওর মন। আজকে যদি কানাই এখানে না থাকত কী হত তা হলে? খুব সম্ভবত ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের মোটরবোটে গিয়ে ওঠাই কপালে ছিল ওর।

    কানাইয়ের হাতের ওপর একটা হাত রাখল পিয়া। “থ্যাঙ্ক ইউ। আপনি যা করলেন তার তুলনা নেই। এক বর্ণও বাড়িয়ে বলছি না। ফকিরও নিশ্চয়ই খুবই কৃতজ্ঞ।”

    ঠাট্টা করে মাথা নোয়াল কানাই। “আপনাদের কৃতজ্ঞতা আমি মাথায় করে নিলাম।” তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “তবে একটা কথা আমি বলব পিয়া, ফিরে যাওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু একবার সিরিয়াসলি ভেবে দেখবেন। যদি ওরা আপনাকে খুঁজে পেয়ে যায় তা হলে কিন্তু ভীষণ ঝামেলায় পড়বেন। জেলেও যেতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আর আমার বা অন্য কারও খুব একটা কিছু করার থাকবে না। বর্ডার এলাকার হিসাব কেতাব কিন্তু অন্য সব জায়গার থেকে আলাদা।”

    দূর জলের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল পিয়া। ওর মনে পড়ল একশো বছর আগে যখন ব্লিথ কি রক্সবার্গের মতো প্রকৃতিবিদরা এই অঞ্চল চষে বেড়িয়েছেন তখন জলচর প্রাণীতে থিকথিক করত এখানকার নদীনালা। তারপরের এই এতগুলো বছরের কথা মনে পড়ল ওর কোনও না কোনও কারণে ওই সব প্রাণীদের প্রতি আর কেউ বিশেষ নজর দেয়নি; ফলে কীভাবে ওরা আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল সে খোঁজও রাখা হয়নি। এতদিন পরে ওর ওপরই প্রথম দায়িত্ব পড়েছে সরেজমিনে দেখে রিপোর্ট তৈরি করার। সে দায়িত্ব ও কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারবে না।

    “এখন ফিরে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হবে না কানাই,” পিয়া বলল। “আসলে, আমার কাজটা ঠিক কতটা ইম্পর্ট্যান্ট সেটা আপনাকে আমি বোঝাতে পারব না। আমি যদি আজকে ফিরে চলে যাই, আবার কবে একজন সিটোলজিস্ট এখানে আসতে পারবে কে বলতে পারে? যতদিন সম্ভব হয় আমাকে থাকতেই হবে এখানে।”

    ভুরু কোঁচকাল কানাই। “আর যদি ওরা আপনাকে জেলে পুরে দেয় তা হলে কী হবে?”

    কাঁধ ঝাঁকাল পিয়া। “জেলে আর কতদিন রাখবে? আবার যখন ছেড়ে দেবে, যা যা দেখেছি সেগুলো তো আমার মাথায় রয়েই যাবে, তাই না?”

    সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে এল। সূর্য গনগন করছে মাথার ওপর। কাজ থামিয়ে খানিকক্ষণের জন্য কানাইয়ের পাশে তেরপলের ছায়ায় এসে বসল পিয়া। চোখের দৃষ্টি একটু যেন ক্লিষ্ট। সেটা লক্ষ করে কানাই বলল, “আপনি কি এখনও ওই ফরেস্ট গার্ডদের কথা ভাবছেন নাকি?”

    কথাটা শুনে মনে হল যেন একটু চমকে উঠল পিয়া। “না না, সেসব কিছু নয়।”

    “তা হলে?”

    মাথা পেছনে হেলিয়ে পিয়া  ওয়াটার বটল থেকে একটু  জল খেল। মুখটা মুছে নিয়ে বলল, “ওই গ্রামটার কথা ভাবছি। কালকে রাত্রের কথা। কিছুতেই আমি ঘটনাটা বের করতে পারছি না মাথা থেকে–ঘুরে ফিরে ছবিগুলো চোখের সামনে ভেসে আসছে–ওই লোকগুলোর ছবি, আগুনের ছবি.. যেন অন্য কোনও যুগের একটা ঘটনা–ইতিহাস লেখা শুরু হওয়ার আগেকার কোনও সময়ের। মনে হচ্ছে কখনওই মন থেকে আমি দূর করতে পারব না ওই…”

    মনে মনে ঠিক শব্দটা হাতড়াতে লাগল পিয়া। শূন্যস্থান পূরণ করার জন্যে কানাই বলল: “ওই বিভীষিকা?”

    “বিভীষিকা। হ্যাঁ। জীবনে কখনও ভুলতে পারব কি না জানি না।”

    “সম্ভবত না।”

    “কিন্তু ফকির বা হরেন বা গ্রামের অন্য সব লোকেরা ওদের কাছে তো এটা রোজকার জীবনের অংশ, তাই না?”

    “আমার মনে হয় পিয়া, এইভাবেই জীবনটাকে নিতে শিখেছে ওরা। তা ছাড়া ওরা বাঁচতে পারবে না।”

    “সেই চিন্তাটাই তাড়া করে বেড়াচ্ছে আমাকে,” বলল পিয়া। তার মানে ওরাও তো এই বিভীষিকারই অংশ হয়ে গেল, ঠিক না?”

    হাতের নোটবইটা ঝপ করে বন্ধ করে দিল কানাই। “ফকির কিংবা হরেনের মতো মানুষদের প্রতি অবিচার না করে যদি পুরো ব্যাপারটা দেখতে চান পিয়া, হলে কিন্তু আমি বলব বিষয়টা ঠিক এতটা সহজ নয়। মানে, আমি বলতে চাইছি সেভাবে দেখতে গেলে আমরাও কি এক হিসেবে ওই বিভীষিকার অংশ নই? আপনি বা আমি বা আমাদের মতো লোকেরা?”

    নিজের ছোট ছোট কোকড়া চুলে আঙুল বোলাল পিয়া। “ঠিক বুঝলাম না।”

    “ওই বাঘটা দু-দুটো মানুষ মেরেছে, পিয়া, কানাই বলল। “আর সেটা শুধু একটা মাত্র গ্রামে। এই সুন্দরবনে প্রতি সপ্তাহে লোক মারা পড়ে বাঘের হাতে। সেই বিভীষিকাটার কথা একবার ভেবে দেখেছেন কি? পৃথিবীর অন্য কোথাও যদি এই হারে মানুষ মরত তা হলে সেটাকে তো গণহত্যা বলা হত। কিন্তু এখানে এই নিয়ে সেরকম কোনও কথাই ওঠে না। এইসব মৃত্যুগুলোর কথা কোথাও লেখা হয় না, খবরের কাগজওয়ালারাও এই নিয়ে কখনও হইচই ফেলে না। কারণটা কী? না, এই মানুষগুলো এতটাই গরিব যে এরা মরল কি বাঁচল তাতে কারওর কিছু এসে যায় না। এই কথাগুলো আমরা সবাই জানি, কিন্তু জেনেশুনেও চোখ বন্ধ করে থাকি। একটা জানোয়ারের কষ্ট হলে আমাদের গায়ে লাগে, কিন্তু মানুষের কষ্টে কিছু এসে যায় না সেটা বিভীষিকা নয়?”

    “কিন্তু একটা কথা আমাকে বলুন কানাই, সারা পৃথিবীতে প্রতিদিনই তো ডজন ডজন মানুষ মরছে রাস্তাঘাটে, গাড়িতে, অ্যাক্সিডেন্টে। এটা তার চেয়ে বেশি ভয়াবহ কেন বলছেন?” পালটা প্রশ্ন করল পিয়া।

    “কারণ এর পেছনে আমাদেরও হাত রয়েছে পিয়া, সেইজন্যে।”

    অস্বীকারের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল পিয়া। এখানে আমার হাত কীভাবে রয়েছে বুঝতে পারলাম না।”

    “কারণ আপনার মতো লোকেরাই এখানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য বার বার চাপ দিয়েছেন,” কানাই বলল। “আর তার জন্য মানুষকে কী দাম দিতে হবে তার তোয়াক্কাও করেননি। আর আমিও দায়ী তার কারণ আমার মতো মানুষেরা মানে আমার শ্রেণীর ভারতীয়রা–সেই দামের হিসেবটাকে কখনও প্রকাশ হতে দেয়নি, যাতে পশ্চিমি দেশগুলোর সুনজরে থাকতে পারে সেইজন্য। যে মানুষগুলো মরছে তাদের পাত্তা না দেওয়াটা খুব একটা কঠিন না, কারণ তারা গরিবস্য গরিব। একবার নিজেকেই জিজ্ঞেস করি দেখুন, পৃথিবীর আর কোনও জায়গায় কেউ এটা চলতে দেবে? মার্কিন দেশের কথা যদি ভাবেন, সেখানে বন্দি বাঘের সংখ্যা ভারতবর্ষে মোট যত বাঘ আছে তার থেকে বেশি। তারা যদি একবার মানুষ মারতে শুরু করে তা হলে কী হবে একবার বলুন দেখি?”

    “কিন্তু কানাই, বন্দি অবস্থায় কোনও প্রজাতির সংরক্ষণ আর তাকে তার নিজের জায়গায় রেখে সংরক্ষণের মধ্যে একটা বড় তফাত আছে,” পিয়া বলল।

    “তফাতটা ঠিক কী শুনি?”

    “তফাতটা হল,” ধীরে ধীরে প্রতিটা শব্দের ওপর জোর দিয়ে পিয়া বলল, “প্রাণীগুলো যে এইভাবে বাঁচবে শুরু থেকে এটাই নির্দিষ্ট ছিল। আর সেটা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল প্রকৃতি–আপনি বা আমি নই। একবার ভাবুন তো, আমরা ছাড়া আর কোনও প্রজাতি জগতে রইল কি মরল তাতে কিছু যায় আসে না–এরকম একটা ভাবনার থেকে যে কাল্পনিক রেখাটা আমাদের ঠেকিয়ে রেখেছে, সেটা যদি একবার পেরিয়ে যাই তা হলে কী হবে? কতটুকু অবশিষ্ট থাকবে তা হলে? এই ব্রহ্মাণ্ডে আমরা তো যথেষ্টই একা, কানাই। আর সেখানেই কি সবকিছু থেমে থাকবে মনে করেছেন? একবার যদি আমরা স্থির করি যে অন্য সব জীবজন্তুকে মেরে সাফ করে দেওয়ার অধিকার আমাদের আছে, তারপরে তো শেষে মানুষ মারা শুরু হবে। যে মানুষগুলোর কথা আপনি বলছেন–গরিব অবহেলিত তারাই শিকার হবে তখন।”

    “কথাগুলো বলেছেন ভালই পিয়া, কিন্তু আপনাকে তো আর প্রাণ দিয়ে তার দাম দিতে হচ্ছে না।”

    “যদি দরকার হয় সে দাম আমি দিতে পারব না মনে করছেন?” চ্যালেঞ্জ করল পিয়া।

    “মানে আপনি বলছেন আপনি মরতেও রাজি আছেন?” কানাই টিটকিরির সুরে প্রশ্ন করল। “কী যে বলেন পিয়া।”

    খুব শান্ত গলায় পিয়া বলল, “আমি একবর্ণও মিথ্যে দাবি করছি না কানাই। যদি জানতাম আমার প্রাণের মূল্যে এই নদীগুলো আবার ইরাবড়ি ডলফিনদের জন্যে নিরাপদ হয়ে উঠবে, তা হলে আমার জবাব হল, হ্যাঁ। সেরকম ক্ষেত্রে মরতেও রাজি আছি আমি। কিন্তু সমস্যাটা হল আমি বা আপনি বা এরকম হাজারটা লোক মরলেও কোনওই সমাধান হবে না এ সমস্যার।”

    “এসব কথা বলা তো খুবই সোজা–”

    “সোজা?” শুকনো বিরক্তির সুর পিয়ার গলায়। “একটা কথা বলুন তো কানাই, যে কাজগুলো আমি করি তার কোনওটাই কি আপনার খুব সোজা মনে হয়? আমার দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন তো আমার ঘরবাড়ি নেই, টাকাপয়সা নেই, জীবনে উন্নতি করার কোনও আশা নেই। আমার বন্ধুবান্ধবরা আমার থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, কপাল যদি ভাল থাকে খুব বেশি হলে বছরে একবার তাদের সঙ্গে দেখা হয় আমার। আর সেটাও তো কিছুই না। তার চেয়েও বড় কথা হল, আমি ভাল করেই জানি যে কাজটা আমি করছি শেষ পর্যন্ত তার সবটাই মোটামুটি ব্যর্থ হবে।”

    মুখ তুলে তাকাল পিয়া। কানাই দেখল ওর চোখে টলটল করছে জল।

    “সোজা কাজ এটা আদৌ নয় কানাই। কথাটা আপনাকে ফিরিয়ে নিতে হবে।”

    একটা কড়া জবাব ঠোঁটের ডগায় চলে এসেছিল, কোনওরকমে সেটা গিলে ফেলল কানাই। তার বদলে পিয়ার একটা হাত নিজের দু’হাতের মধ্যে ধরে বলল, “সরি পিয়া। এভাবে বলা উচিত হয়নি আমার। কথাটা ফিরিয়ে নিলাম।”

    হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল পিয়া। বলল, “যাই, কাজ করি গিয়ে।”

    নিজের জায়গার দিকে এগিয়ে গেল পিয়া। পেছন থেকে ডেকে কানাই বলল, “আপনি কিন্তু খুব সাহসী মেয়ে, সেটা জানেন কি?”

    অস্বস্তিতে কাঁধ ঝাঁকাল পিয়া। “আমি আমার নিজের কাজটা করছি শুধু।”