Tag: গ্রন্থনাম

  • রাজবন্দীর জবানবন্দী

    রাজবন্দীর জবানবন্দী

    রাজবন্দীর জবানবন্দী

    রাজবন্দীর জবানবন্দী কাজী নজরুল ইসলাম লিখিত একটি প্রবন্ধ। নজরূল সম্পাদিত অর্ধ-সাপ্তাহিক ধূমকেতু ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করে। সেই পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের কবিতা আনন্দময়ীর আগমনে ও নিষিদ্ধ হয়। নজরুলকে জেলে আটক করে রাখার পর তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি লিখিতভাবে আদালতে উপস্থাপন করেন চার পৃষ্ঠার বক্তব্য। তাই রাজবন্দীর জবানবন্দী নামে পরিচিত। ১৯২৩ সালের ৭ ই জানুয়ারি কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে বসে তিনি এই চার পৃষ্ঠার জবানবন্দী রচনা করেন। পরে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা যেমন, ১৩২৯ সালের ১২ই মাঘ তারিখের ‘ধূমকেতু’, ১৩২৯ মাঘের ‘প্রবর্তক’, ১৩২৯ ফাল্গুনের ‘উপাসনা’ এবং ১৩২৯ ফাল্গুনের ‘সহচর’ প্রভৃতি সাময়িকপত্রে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ প্রকাশিত হয়। ‘ধূমকেতু’র মামলায় এই ‘জবানবন্দী’ আদালতে দাখিল করা হয়েছিল। পুস্তিকাকারে এর দুটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়; কবির নূতনতম প্রতিকৃতি-সম্বলিত দ্বিতীয় সংস্করণের দাম ছিল দুই আনা।

    এই জবানবন্দীতে নজরুল বলেছেন:

    “আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।… আমি কবি,আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন, আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সেবাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়, সত্যাদ্রোহী নয়। সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায় অত্যাচার দগ্ধ করবে…।

    ‘আমার হাতের বাঁশি কেড়ে নিলেই সে বাঁশির মৃত্যু হবে না।’ কেননা আমি আর এক বাঁশি নিয়ে বা তৈরি করে তাতে সেই সুর ফোটাতে পারি। সুর আমার বাঁশির নয়, সুর আমার মনে এবং বাঁশির সৃষ্টির কৌশলে, অতএব দোষ বাঁশির নয়, সুরেরও নয়, দোষ তার, যিনি আমার কণ্ঠে তার বীণা বাজান, … সে বাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে। কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়। সত্যদ্রোহী নয়। সে বাণী রাজদ্বারে দণ্ডিত হতে পারে। কিন্তু ধর্মের আলোকে ন্যায়ের দুয়ারে তা নিরপরাধ, নিষ্কলুষ, অম্লান, অনির্বাণ, সত্যস্বরূপ। …তাকে শাস্তি দেয়ার মতো রাজশক্তি বা দ্বিতীয় ভগবান নেই। তাকে বন্দী করার মতো পুলিশ বা কারাগার আজো সৃষ্টি হয়নি। …বিচারক জানে আমি যা বলছি, যা লিখেছি, তা ভগবানের চোখে অন্যায় নয়, ন্যায়ের এজলাসে মিথ্যা নয়। কিন্তু হয়তো সে শাস্তি দেবে। কেননা সে সত্যের নয়, সে রাজার। সে ন্যায়ের নয়, সে আইনের। সে স্বাধীন নয়, সে রাজভৃত্য। তবু জিজ্ঞাসা করছি, এই বিচারাসন কার? রাজার না ধর্মের? এই যে বিচার, এ বিচারের জবাবদিহি করতে হয় রাজাকে, না তার অন্তরের আসনে প্রতিষ্ঠিত বিবেককে, সত্যকে? ভগবানকে? এ বিচারককে কে পুরস্কৃত করে? রাজা, না ভগবান? না আত্মপ্রসাদ?

    আজ ভারত পরাধীন। তার অধিবাসীবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য। কিন্তু দাসকে দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে এ রাজত্বে তা হবে রাজদ্রোহ। এত ন্যায়ের শাসন হতে পারে না, এই যে জোর করে সত্যকে মিথ্যা, অন্যায়কে ন্যায়, দিনকে রাত বলানো এটা কি সত্য সহ্য করতে পারে? এ শাসন কি চিরস্থায়ী হতে পারে? এত দিন হয়েছিল, হয়তো সত্য উদাসীন ছিল বলে। কিন্তু আজ সত্য জেগেছে, তা চুষ্মান জাগ্রত-আত্মা মাত্রই বিশেষ রূপে জানতে পেরেছে। এই অন্যায় শাসনকিষ্ট বন্দী সত্যের পীড়িত ক্রন্দন আমার কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল বলেই আমি রাজদ্রোহী?

    নজরুল সৃষ্টিকর্তাকে নিজের বিচারক হিসেবে ধরেছেন। জবানবন্দিতে সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভারতের স্বাধীনতার জন্য আকুতি ফুটে উঠেছে।

    মূলপ্রবন্ধ : রাজবন্দীর জবানবন্দী

    আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী! তাই আমি রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।

    একধারে রাজার মুকুট; আরধারে ধূমকেতুর শিখা। একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড; আরজন সত্য, হাতে ন্যায়দণ্ড। রাজার পক্ষে রাজার নিযুক্ত রাজবেতনভোগী, রাজকর্মচারী। আমার পক্ষে – সকল রাজার রাজা, সকল বিচারকের বিচারক, আদি অনন্তকাল ধরে সত্য – জাগ্রত ভগবান।

    আমার বিচারককে কেহ নিযুক্ত করে নাই। এ মহাবিচারকের দৃষ্টিতে রাজা-প্রজা, ধনী-নির্ধন, সুখী-দুঃখী সকলে সমান। এঁর সিংহাসনে রাজার মুকুট আর ভিখারির একতারা পাশাপাশি স্থান পায়। এঁর আইন – ন্যায়, ধর্ম। সে আইন কোনো বিজেতা মানব কোনো বিজিত বিশিষ্ট জাতির জন্য তৈরি করে নাই। সে আইন বিশ্ব-মানবের সত্য-উপলব্ধি হতে সৃষ্ট; সে আইন সর্বজনীন সত্যের, সে আইন সার্বভৌমিক ভগবানের। রাজার পক্ষে – পরমাণু পরিমাণ খণ্ড-সৃষ্টি; আমার পক্ষে – আদি অন্তহীন অখণ্ড স্রষ্টা।

    রাজার পেছনে ক্ষুদ্র, আমার পেছনে – রুদ্র। রাজার পক্ষে যিনি, তাঁর লক্ষ্য স্বার্থ, লাভ অর্থ; আমার পক্ষে যিনি, তাঁর লক্ষ্য সত্য, লাভ পরমানন্দ।

    রাজার বাণী বুদ্‌বুদ্, আমার বাণী সীমাহারা সমুদ্র।

    আমি কবি, অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করবার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তি দানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন। আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা, ভগবানের বাণী। সে বাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়-দ্রোহী নয়, সত্য-দ্রোহী নয়। সে বাণী রাজদ্বারে দণ্ডিত হতে পারে, কিন্তু ধর্মের আলোকে, ন্যায়ের দুয়ারে তাহা নিরপরাধ, নিষ্কলুষ, অম্লান, অনির্বাণ, সত্য-স্বরূপ।

    সত্য স্বয়ং প্রকাশ। তাহাকে কোনো রক্ত-আঁখি রাজদণ্ড নিরোধ করতে পারে না। আমি সেই চিরন্তন স্বয়ম্-প্রকাশের বীণা, যে বীণায় চির-সত্যের বাণী ধ্বনিত হয়েছিল। আমি ভগবানের হাতের বীণা। বীণা ভাঙলেও ভাঙতে পারে, কিন্তু ভগবানকে ভাঙবে কে? একথা ধ্রুব সত্য যে, সত্য আছে, ভগবান আছেন – চিরকাল ধরে আছে এবং চিরকাল ধরে থাকবে। যে আজ সত্যের বাণীকে রুদ্ধ করেছে, সত্যের বীণাকে মূক করতে চাচ্ছে, সে-ও তাঁরই এই ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র সৃষ্ট অণু। তাঁরই ইঙ্গিতে-আভাসে, ইচ্ছায় সে আজ আছে, কাল হয়তো থাকবে না। নির্বোধ মানুষের অহংকারের আর অন্ত নাই; সে যাহার সৃষ্টি, তাহাকেই সে বন্দি করতে চায়, শাস্তি দিতে চায়। কিন্তু অহংকার একদিন চোখের জলে ডুববেই ডুববে।

    যাক, আমি বলছিলাম, আমি সত্যপ্রকাশের যন্ত্র। সে যন্ত্রকে অপর কোনো নির্মম শক্তি অবরুদ্ধ করলেও করতে পারে, ধ্বংস করলেও করতে পারে; কিন্তু সে-যন্ত্র যিনি বাজান, সে-বীণায় যিনি রুদ্র-বাণী ফোটান, তাঁকে অবরুদ্ধ করবে কে? সে-বিধাতাকে বিনাশ করবে কে? আমি মরব, কিন্তু আমার বিধাতা অমর। আমি মরব, রাজাও মরবে, কেননা আমার মতন অনেক রাজবিদ্রোহী মরেছে, আবার এমনই অভিযোগ-আনয়নকারী বহু রাজাও মরেছে, কিন্তু কোনো কালে কোনো কারণেই সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হয়নি – তার বাণী মরেনি। সে আজও তেমনই করে নিজেকে প্রকাশ করেছে এবং চিরকাল ধরে করবে। আমার এই শাসন-নিরুদ্ধ বাণী আবার অন্যের কণ্ঠে ফুটে উঠবে। আমার হাতের বাঁশি কেড়ে নিলেই সে বাঁশির সুরের মৃত্যু হবে না; কেননা আমি আর এক বাঁশি নিয়ে বা তৈরী করে তাতে সেই সুর ফোটাতে পারি। সুর আমার বাঁশির নয়, সুর আমার মনে এবং আমার বাঁশি সৃষ্টির কৌশলে। অতএব দোষ বাঁশিরও নয় সুরেরও নয়; দোষ আমার, যে বাজায়; তেমনই যে বাণী আমার কণ্ঠ দিয়ে নির্গত হয়েছে, তার জন্য দায়ী আমি নই। দোষ আমারও নয়, আমার বাণীরও নয়; দোষ তাঁর – যিনি আমার কণ্ঠে তাঁর বাণী বাজান। সুতরাং রাজবিদ্রোহী আমিও নই; প্রধান রাজবিদ্রোহী সেই বাণী-বাদক ভগবান। তাঁকে শাস্তি দিবার মতো রাজশক্তি বা দ্বিতীয় ভগবান নাই। তাঁহাকে বন্দি করবার মতো পুলিশ বা কারাগার আজও সৃষ্টি হয় নাই।

    রাজার নিযুক্ত রাজ-অনুবাদক রাজভাষায় সে-বাণীর শুধু ভাষাকে অনুবাদ করেছে, তাঁর প্রাণকে অনুবাদ করেনি। তাঁর সত্যকে অনুবাদ করতে পারেনি। তার অনুবাদে রাজানুগত্য ফুটে উঠেছে, কেননা, তার উদ্দেশ্য রাজাকে সন্তুষ্ট করা, আর আমার লেখায় ফুটে উঠেছে সত্য, তেজ আর প্রাণঙ কেননা আমার উদ্দেশ্য ভগবানকে পূজা করা; উৎপীড়িত আর্ত বিশ্ববাসীর পক্ষে আমি সত্য-বারি, ভগবানের আঁখিজল! আমি রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করি নাই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি।

    আমি জানি এবং দেখেছি – আজ এই আদালতে আসামির কাঠগড়ায় একা আমি দাঁড়িয়ে নেই, আমার পশ্চাতে স্বয়ং সত্যসুন্দর ভগবানও দাঁড়িয়ে। যুগে যুগে তিনি এমনই নীরবে তাঁর রাজবন্দি সত্য-সৈনিকের পশ্চাতে এসে দণ্ডায়মান হন। রাজ-নিযুক্ত বিচারক সত্য-বিচারক হতে পারে না। এমনই বিচার প্রহসন করে যেদিন খ্রিস্টকে ক্রুশে বিদ্ধ করা হল, গান্ধিকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হল, সেদিনও ভগবান এমনই নীরবে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁহাদের পশ্চাতে। বিচারক কিন্তু তাঁকে দেখতে পায়নি, তার আর ভগবানের মধ্যে তখন সম্রাট দাঁড়িয়েছিলেন, সম্রাটের ভয়ে তার বিবেক, তার দৃষ্টি অন্ধ হয়ে গেছিল। নইলে সে তার এই বিচারাসনে ভয়ে বিস্ময়ে থরথর করে কেঁপে উঠত, নীল হয়ে যেত, তার বিচারাসন সমেত সে পুড়ে ছাই হয়ে যেত।

    বিচারক জানে আমি যা বলেছি, যা লিখেছি তা ভগবানের চোখে অন্যায় নয়, ন্যায়ের এজলাসে মিথ্যা নয়। কিন্তু হয়তো সে শাস্তি দেবে, কেননা সে সত্যের নয়, সে রাজার। সে ন্যায়ের নয়, সে আইনের। সে স্বাধীন নয়, সে রাজভৃত্য। তবু জিজ্ঞাসা করছি, এই যে বিচারাসন – এ কার? রাজার না ধর্মের? এই যে বিচারক, এর বিচারের জবাবদিহি করতে হয় রাজাকে, না তার অন্তরের আসনে প্রতিষ্ঠিত বিবেককে, সত্যকে, ভগবানকে? এই বিচারককে কে পুরস্কৃত করে? – রাজা না ভগবান? অর্থ না আত্মপ্রসাদ?

    শুনেছি, আমার বিচারক একজন কবি। শুনে আনন্দিত হয়েছি। বিদ্রোহী কবির বিচার বিচারক কবির নিকট। কিন্তু বেলাশেষের শেষ-খেয়া এ প্রবীণ বিচারককে হাতছানি দিচ্ছে, আর রক্ত-উষার নব-শঙ্খ আমার অনাগত বিপুলতাকে অভ্যর্থনা করছে; তাকে ডাকছে মরণ, আমায় ডাকছে জীবন; তাই আমাদের উভয়ের অস্ত-তারা আর উদয়-তারার মিলন হবে কিনা বলতে পারি না। না, আবার বাজে কথা বললাম।

    আজ ভারত পরাধীন। তার অধিবাসীবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য। কিন্তু দাসকে দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে এ রাজত্বে তা হবে রাজদ্রোহ। এ তো ন্যায়ের শাসন হতে পারে না, এই যে জোর করে সত্যকে মিথ্যা, অন্যায়কে ন্যায়, দিনকে রাত বলানো – এ কি সত্য সহ্য করতে পারে? এ শাসন কি চিরস্থায়ী হতে পারে? এতদিন হয়েছিল, হয়তো সত্য উদাসীন ছিল বলে। কিন্তু আজ সত্য জেগেছে, তা চক্ষুষ্মান জাগ্রত-আত্মা মাত্রই বিশেষরূপে জানতে পেরেছে। এই অন্যায় শাসন-ক্লিষ্ট বন্দি সত্যের পীড়িত ক্রন্দন আমার কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল বলেই কি আমি রাজদ্রোহী? এ ক্রন্দন কি একা আমার? না – এ আমার কণ্ঠে ওই উৎপীড়িত নিখিল-নীরব ক্রন্দসীর সম্মিলিত সরব প্রকাশ? আমি জানি, আমার কণ্ঠের ওই প্রলয়-হুংকার একা আমার নয়, সে যে নিখিল আর্তপীড়িত আত্মার যন্ত্রণা-চিৎকার। আমায় ভয় দেখিয়ে মেরে এ ক্রন্দন থামানো যাবে না! হঠাৎ কখন আমার কণ্ঠের এই হারা-বাণীই তাদের আরেক জনের কণ্ঠে গর্জন করে উঠবে।

    আজ ভারত পরাধীন না হয়ে যদি ইংলন্ডই ভারতের অধীন হত এবং নিরস্ত্রীকৃত উৎপীড়িত ইংলন্ড-অধিবাসীবৃন্দ স্বীয় জন্মভূমি উদ্ধার করবার জন্য বর্তমান ভারতবাসীর মতো অধীর হয়ে উঠত, আর ঠিক সেই সময় আমি হতুম এমনই বিচারক এবং আমার মতোই রাজদ্রোহ-অপরাধে ধৃত হয়ে এই বিচারক আমার সম্মুখে বিচারার্থ নীত হতেন, তাহলে সেই সময় এই বিচারক আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যা বলতেন, আমি তো তাই এবং তেমনি করেই বলছি!

    আমি পরম আত্মবিশ্বাসী! তাই যা অন্যায় বলে বুঝেছি, তাকে অন্যায় বলেছি, অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি, – কাহারও তোষামোদ করি নাই, প্রশংসার এবং প্রসাদের লোভে কাহারও পিছনে পোঁ ধরি নাই, – আমি শুধু রাজার অন্যায়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করি নাই – সমাজের, জাতির, দেশের বিরুদ্ধে আমার সত্য-তরবারির তীব্র আক্রমণ সমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে, – তার জন্য ঘরের-বাইরের বিদ্রুপ, অপমান, লাঞ্ছনা, আঘাত আমার উপর পর্যাপ্ত পরিমাণে বর্ষিত হয়েছে, কিন্তু কোনো কিছুর ভয়েই নিজের সত্যকে, আপন ভগবানকে হীন করি নাই, লাভ-লোভের বশবর্তী হয়ে আত্ম-উপলব্ধিকে বিক্রয় করি নাই, নিজের সাধনালব্ধ বিপুল আত্মপ্রসাদকে খাটো করি নাই, কেননা আমি যে ভগবানের প্রিয়, সত্যের হাতের বীণা; আমি যে কবি, আমার আত্মা যে সত্যদ্রষ্টা ঋষির আত্মা। আমি অজানা অসীম পূর্ণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি। এ আমার অহংকার নয়, আত্ম-উপলব্ধির আত্মবিশ্বাসের চেতনালব্ধ সহজ সত্যের সরল স্বীকারোক্তি। আমি অন্ধ-বিশ্বাসে, লাভের লোভে, রাজভয় বা লোকভয়ে মিথ্যাকে স্বীকার করতে পারি না, অত্যাচারকে মেনে নিতে পারি না। তাহলে যে আমার দেবতা আমায় ত্যাগ করে যাবে। আমার এই দেহ-মন্দির জাগ্রত দেবতার আসন বলেই তো লোকে এ-মন্দিরকে পূজা করে, শ্রদ্ধা দেখায়, কিন্তু দেবতা বিদায় নিলে এ শূন্য মন্দিরের আর থাকবে কি? একে শুধাবে কে? তাই আমার কণ্ঠে কাল-ভৈরবের প্রলয়তূর্য বেজে উঠেছিল, আমার হাতে ধূমকেতুর অগ্নি-নিশান দুলে উঠেছিল, সে সর্বনাশা নিশানপুচ্ছে মন্দিরের দেবতা নট-নারায়ণ-রূপ ধরে ধ্বংস-নাচন নেচেছিলেন। এ ধ্বংস-নৃত্য নব সৃষ্টির পূর্ব-সূচনা। তাই আমি নির্মম নির্ভীক উন্নত শিরে সে নিশান ধরেছিলাম, তাঁর তূর্য বাজিয়েছিলাম। অনাগত অবশ্যম্ভাবী মহারুদ্রের তীব্র আহ্বান আমি শুনেছিলাম, তাঁর রক্ত-আঁখির হুকুম আমি ইঙ্গিতে বুঝেছিলাম। আমি তখনই বুঝেছিলাম, আমি সত্য রক্ষার, ন্যায়-উদ্ধারের বিশ্ব-প্রলয় বাহিনীর লাল সৈনিক। বাংলার শ্যাম শ্মশানের মায়ানিদ্রিত ভূমিতে আমায় তিনি পাঠিয়েছিলেন অগ্রদূত তূর্যবাদক করে। আমি সামান্য সৈনিক, যতটুকু ক্ষমতা ছিল তা দিয়ে তাঁর আদেশ পালন করেছি। তিনি জানতেন, প্রথম আঘাত আমার বুকেই বাজবে, তাই আমি একবার প্রলয় ঘোষণার সর্বপ্রথম আঘাতপ্রাপ্ত সৈনিক মনে করে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করেছি! কারাগার-মুক্ত হয়ে আমি আবার যখন আঘাত-চিহ্নিত বুকে, লাঞ্ছনা-রক্ত ললাটে, তাঁর মরণ-বাঁচা চরণমূলে গিয়ে লুটিয়ে পড়ব, তখন তাঁর সকরুণ প্রসাদ চাওয়ার মৃত্যুঞ্জয় সঞ্জীবনী আমায় শ্রান্ত, আমায় সঞ্জীবিত, অনুপ্রাণিত করে তুলবে। সেদিন নতুন আদেশ মাথায় করে নতুন প্রেরণায় উদ্‌বুদ্ধ আমি, আবার তাঁর তরবারি-ছায়াতলে গিয়ে দণ্ডায়মান হব। সেই আজও-না-আসা রক্ত-উষার আশা, আনন্দ, আমার কারাবাসকে – অমৃতের পুত্র আমি, হাসি-গানের কলোচ্ছ্বাসে স্বর্গ করে তুলবে। চিরশিশু প্রাণের উচ্ছল আনন্দের পরশমণি দিয়ে নির্যাতিত লোহাকে মণিকাঞ্চনে পরিণত করবার শক্তি ভগবান আমায় না চাইতেই দিয়েছেন! আমার ভয় নাই, দুঃখ নাই; কেননা ভগবান আমার সাথে আছেন। আমার অসমাপ্ত কর্তব্য অন্যের দ্বারা সমাপ্ত হবে। সত্যের প্রকাশ-ক্রিয়া নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায়-অত্যাচারকে দগ্ধ করবে। আমার বহ্নি-এরোপ্লেনের সারথি হবে এবার স্বয়ং রুদ্র ভগবান। অতএব, মাভৈঃ! ভয় নাই।

    কারাগারে আমার বন্দিনী মায়ের আঁধার-শান্ত কোল ও অকৃতী পুত্রকে ডাক দিয়েছে, পরাধীনা অনাথিনি জননীর বুকে এ হতভাগ্যের স্থান হবে কিনা জানি না, যদি হয় বিচারককে অশ্রু-সিক্ত ধন্যবাদ দিব। আবার বলছি, আমার ভয় নাই, দুঃখ নাই। আমি ‘অমৃতস্য পুত্রঃ’। আমি জানি –

    ওই অত্যাচারীর সত্য পীড়ন

    আছে, তার আছে ক্ষয়;

    সেই সত্য আমার ভাগ্য-বিধাতা

    যার হাতে শুধু রয়।

    প্রেসিডেন্সি জেল, কলিকাতা
    ৭ জানুয়ারি, ১৯২৩।
    রবিবার – দুপুর

  • দোলন-চাঁপা

    দোলন-চাঁপা

    দোলন-চাঁপা

    ‘দোলনচাঁপা’ বিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধের অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি কবি কাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। ১৩৩০ বঙ্গাব্দের আশ্বিন (১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর) মাসে ‘দোলন-চাঁপা’ কাব্যগ্রন্থটি আর্য পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত হয়।

    ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের দুর্গাপূজোর আগে ধুমকেতু পত্রিকায় নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামে বিদ্রোহাত্মক কবিতাটি প্রকাশের জন্য তাকে রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযুক্ত কবিকে ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি এক বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হয়। এই সময় ‘দোলনচাঁপা’ কাব্যের কবিতাগুলি রচিত হয়। জেল কর্তৃপক্ষের অগোচরে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় ওয়ার্ডারদের সাহায্যে তার সব কবিতাই বাইরে নিয়ে আসেন। কবির নির্দেশমত আর্য পাবলিশিং হাউস এ কবিতাগুলো দিয়ে ‘দোলনচাঁপা’ প্রকাশ করে।

    ‘দোলনচাঁপা’ প্রথম সংস্করণের প্রকাশক শরচ্চন্দ্র গুহ, আর্য পাবলিশিং হাউস, কলেজ ষ্ট্রিট মার্কেট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা ৬+৫৪; মূল্য এক টাকা চার আনা। প্রথম সংস্করণ এই কাব্যগ্রন্থে ১৯টি কবিতা ছিল। সূচিপত্রের আগে মুখবন্ধরূপে সংযোজিত কবিতা “আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে” ১৩৩০ বঙ্গাব্দের (১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দ) জ্যৈষ্ঠ মাসের কল্লোল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

    ‘দোলনচাঁপা’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের আগে, আনুমানিক ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে। এর প্রকাশক গোপালদাস মজুমদার, ডি. এম লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রিট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা ৮+৫৪, মূল্য পাঁচ সিকা।

    তৃতীয় সংস্করণে (শ্রাবণ ১৩৬১ বঙ্গাব্দ) কবিতার অদলবদল করা হয়েছে। প্রথম সংস্করণের পউষ, পথহারা, অবেলার ডাক, পূজারিণী, অভিশাপ, পিছু-ডাক, কবি-রাণী কবিতাগুলি বাদ দিয়ে হংসদূতী, সে যে চাতকই জানে তার মেঘ এত কি, লাল নটের ক্ষেতে, মদালস ময়ূর-বীণা কার বাজে গান, না মিটিতে সাধ মোর বেণুকা, তোমার ফুলের মত মন, বরষা, ঐ নীল গগনের নয়ন-পাতায়, মাত্‌লা-হাওয়া, সবুজ শোভার ঢেউ খেলে যায়, বনমালি, বেদনা-অভিমান, নিশীথ-প্রতিম, অ-বেলায়, হার-মানা-হার, বেদনা-মণি, পরণ-পূজা, অনাদৃতা, নীলপরী, হে-ভীতু, অকরুণপিয়া, মরমী, মুক্তি-বার, বিরাগিনী, হারামণি, প্রিয়ার রূপ, পাপড়ি-খোলা, বিধুরা পথিক, প্রিয়া, প্রতিবেশিনী, বাদল-দিনে, মনের মানুষ, কার বাঁশি বাজিল, দহনমালা, দুপুর-অভিসার, শেষের গান, রৌদ্র-দগ্ধের গান, আলতা-স্মৃতি কবিতাগুলি সংযেজিত করা হয়েছে। এই কবিতাগুলি “ছায়ানটে”র অন্তর্গত ছিল।

    বর্তমান এডুলিচার সংস্করণে ‘বাঙলা একাডেমি’ প্রকাশিত ‘নজরুল রচনাবলী’ জন্মশতবর্ষ সংস্করণ অনুসরণ করা হয়েছে। এই সংস্করণে তৈরি হয়েছে ‘দোলন-চাঁপা’র প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণের অনুসরণে। উল্লেখ্য, প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণে উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন নেই।

    এই কাব্যের মুখবন্ধ-রূপে লেখা কবিতাটি ‘সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’ শিরোনামে ১৩৩০ জ্যৈষ্ঠে প্রথম বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যাক ‘কল্লোল’-এ প্রকাশিত হয়।

    ‘দোদুল দুল’ ১৩২৮ চৈত্রের ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত হয়েছিল এবং ‘প্রবাসী’ হতে ১৩২৯ মাঘের ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় উদ্ধৃত হয়েছিল।

    ‘পউষ’ রচিত হয়েছিল ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে। কবি তখন কলিকাতার প্রেসিডেন্সী জেলে বিচারাধীন বন্দী। ‘পউষ’ ১৩২৯ মাঘের এবং ‘পথহারা’ ১৩২৯ ফাল্গুনের ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত হয়।

    ‘ব্যথা-গরব’ ১৩২৯ চৈত্রের মাসিক ‘বসুমতী’তে এবং ‘সমর্পণ’ ১৩২৯ চৈত্রের ‘ভারতী’তে বের হয়।

    ‘অবেলার ডাক’ ১৩৩০ জ্যৈষ্ঠের ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত হয়।

    ‘অভিশাপ’ ১৩৩০ শ্রাবণের এবং ‘আশান্বিতা’ ১৩৩০ আশ্বিনের ‘কল্লোল’-এ ছাপা হয়েছিল।

  • বিষের বাঁশী

    বিষের বাঁশী

    বিষের বাঁশী

    ‘বিষের বাঁশী’ কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি কাব্যগ্রন্থ। এটি ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ১৬ই শ্রাবণ—আগষ্ট ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। কবি নিজেই হুগলি থেকে ‘বিষের বাঁশী’ প্রকাশ করেন। নামপৃষ্ঠায় এর মুদ্রণসংখ্যা ২২০০ বলে উল্লিখিত ছিল এবং লেখা ছিল, “গ্রন্থকার কর্তৃক সর্ব্বস্বত্ব সংরক্ষিত”। গ্রন্থের পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৪+৬০, মূল্য এক টাকা ছয় আনা এবং “সোল এজেণ্ট ও প্রাপ্তিস্থান— ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রিট, কলিকাতা।” এই গ্রন্থে ২৭টি কবিতা রয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের বাজেয়াপ্ত ৫টি গ্রন্থের মধ্যে এটি অন্যতম। প্রকাশের অব্যবহিত পরে তৎকালীন ভারত সরকার ২২ অক্টোবর ১৯২৪ সালে ‘বিষের বাঁশী’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয় ২৭ এপ্রিল ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে।

    ‘বিষের বাঁশী’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় নূর লাইব্রেরি, ১২/১ সারেঙ্গ লেন, তালতলা, কলিকাতা থেকে ১৩৫২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণে। বাংলা একাডেমি ‘নজরুল রচনাবলী’তে আবদুল কাদির এই সংস্করণের পাঠ অনুসরণ করেছিলেন। রচনাবলীর নতুন সংস্করণে ‘বিষের বাঁশী’র প্রথম দুই সংস্করণের পাঠ মিলিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে।

    প্রথম সংস্করণে উৎসর্গপত্রটি ছিল গ্রন্থের শুরুতে, দ্বিতীয় সংস্করণে তা কৈফিয়তের পরে আনা হয়। প্রথম সংস্করণের ‘জাগৃহী’ কবিতার শিরোনাম সংশোধিত হয়ে দ্বিতীয় সংস্করণে হয় ‘জাগৃহি’—বাংলা একাডেমি শেষেরটিই গ্রহণ করেছে। কৈফিয়তে মূলে ডি. এম. লাইব্রেরির ‘গোপাল-দা’ প্রসঙ্গে যে বাক্যটি ছিল, তা দ্বিতীয় সংস্করণে বর্জিত হয়েছে।

    ‘উৎসর্গ’ কবিতাটি মিসেস্ এম. রহমান [মুসাম্মাৎ মাসুদা খাতুন : জন্ম ১৮৮৪ খ্রি. মৃত্যু ২০শে ডিসেম্বর ১৯২৬ খ্রি.] সাহেবার উদ্দেশে রচিত। মিসেস্ এম. রহমান এদেশে নারী-অধিকার-আন্দোলনের একজন অগ্রনায়িকা ছিলেন। তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা, সওগাত, সহচর, সাম্যবাদী, ধূমকেতু, লাঙল, অভিযান প্রভৃতি সাময়িকপত্রে বহু প্রবন্ধ ও ছোটগল্প লেখেন। তাঁর ‘মা ও মেয়ে’ নাম অসমাপ্ত উপন্যাসখানি ১৩২৯ আষাঢ় হতে ধারাবাহিকভাবে মাসিক ‘সহচর’ পত্রে প্রকাশিত হয়। তাঁর ‘চানাচুর’ পুস্তকের ‘আমাদের দাবী’, ‘পর্দা বনাম প্রবঞ্চনা’, ‘নারীর বন্ধন’ প্রভৃতি প্রবন্ধগুলি তৎকালে পাঠকমহলে আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল।

    ‘ফাতেমা-ই-দোয়াজদহম : আবির্ভাব’ ১৩২৭ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে এবং ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম : তিরোভাব’ ১৩২৮ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় বের হয়।

    ‘জাগৃহি’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ৩০শে শ্রাবণ ১ম বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যক ‘ধূমকেতু’তে ‘জাগরণী’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

    ‘তুর্য-নিনাদ’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের বৈশাখে ১ম বর্ষের ১ম সংখ্যক মাসিক ‘বসুমতী’তে বের হয়।

    ‘বোধন’ ১৩২৭ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠের ‘মোসলেম ভারতে’ প্রকাশিত হয়। শিরোনামের নীচে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : “সূর—যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ।” তার পাদটীকায় লেখা ছিল : “হাফিজের ‘য়ুসোফে গুম্ গশ্‌তা বাজ্‌ আয়েদ্‌ ব-কিনান গম্ মখোর’ গজল অবলম্বনে।” কবিতাটির প্রথম (এবং পরবর্তী চারটি স্তবকের প্রত্যকটির শেষে পুনরাবৃত্ত) শ্লোকটি ছিল এরূপ—

    দুঃখ কি ভাই! হারানো য়ুসোফ কিনানে আবার আসিবে ফিরে;
    দলিত শুষ্ক এ মরুভু পুনঃ হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে।

    ‘উদ্বোধন’ গানটি ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখে ২য় বর্ষের ৬ষ্ঠ সংখ্যক ‘সওগাতে’ ছাপা হয়েছিল।

    ‘মরণ-বরণ’ গানটি ১৩২৮ বঙ্গাব্দের কার্তিকে ৪র্থ বর্ষের তৃতীয় সংখ্যক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘বন্দী-বন্দনা’ গানটি ১৩২৮ বঙ্গাব্দের মাঘে ৮ম বর্ষের তৃতীয় সংখ্যক ‘নারায়ণে’ এবং ৪র্থ বর্ষের চতুর্থ সংখ্যক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়েছিল। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকায় রচনা-স্থান ছাপা আছে : “কান্দিরপাড়, কুমিল্লা।” ‘নারায়ণে’ শিরোনামের নীচে লেখা ছিল ‘মল্লার—তেওরা’। তাতে শেষাংশ ছিল এইরূপ—

    আজি
    ধ্বনিছে দিগ্বধু শঙ্গ দিকে দিকে,
     
    গগনে কা’রা যেন চাঁহিয়া অনিমিখে
    ভারত হোমশিখা জ্বলিল জয়টিকা
     
    পরাতে ও কপালে।
    সে
    কারা মুক্তি-কারা যেখানে ভৈরব-রুদ্র-শিখা জ্বলে।
     
    কোরাস; জয় হে বন্ধন-মৃত্যু শঙ্কাজয়ী।
     
    মুক্তি-কামী জয়।
     
    স্বাধীন-চিত জয়। জয় হে॥

    ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় পঞ্চম স্তবকের শেষ চরণটি ছিল এরূপ—

    ‘সে কারা নহে কারা যেখানে ভগবান-রুদ্র-শিখা জ্বলে॥’

    ‘বন্দনা-গান’ ১৩২৮ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণের ‘সাধনা’ পত্রিকায় ‘বিজয়-গান’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। রচনা-স্থান : ‘কান্দিরপাড়, কুমিল্লা।’

    ‘শিকল-পরার গান’ ১৩৩১ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠের ‘ভারতী’তে প্রকাশিত হয়। শিরোনামের নীচে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘খাম্বাজ—দাদ্‌রা’। তাতে কবির কৃত ‘স্বরলিপি’ও ছাপা হয়েছিল।

    ‘চরকার গান’ ১৩৩১ বঙ্গাব্দের বৈশাখের ‘ভারতী’তে ছাপা হয়। বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘খাম্বাজ—কীর্তন—দাদ্‌রা’। সে সংখ্যাতে ‘চরকার গানে’র স্বরলিপিও ছাপা হয়েছিল। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে মহাত্মা গান্ধীর উপস্থিতিতে নজরুল ইসলাম ‘চরকার গান’ গেয়েছিলেন।

    ‘জাতের বজ্জাতি’ গানটি ‘জাত-জালিয়াত’ শিরোনামে ‘বিজলী’তে ছাপা হয়। পাদটীকায় লেখা ছিল : ‘মাদারীপুর শান্তি-সেনা চারণ-দলের জন্য লিখিত অপ্রকাশিত নাটক থেকে।’ ‘বিজলী’ হতে গানটি ১৩৩০ বঙ্গাব্দের শ্রাবণের ‘উপাসনা’য় ‘উদ্ধৃত’ হয়েছিল।১৩৩০ বঙ্গাব্দের শ্রাবণে ষষ্ঠ বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য়ও গানটি ‘জাত-জালিয়াত’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘বিজয়-গান’ ১৩২৮ শ্রাবণের ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়। রচনা-স্থান : ‘কান্দিরপাড়, কুমিল্লা’।

    ‘পাগল পথিক’ ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ভাদ্রের ‘মোসলেম ভারতে’ ‘গান’ শিরোনামে বের হয়েছিল। শিরোনামের নীচে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘সুর—মেঘ-ছায়ানট; তাল—দাদ্‌রা’।

    ‘বিদ্রোহীর বাণী’ ১৩৩১ বঙ্গাব্দের বৈশাখের ‘ভারতী’তে ‘এবার তোরা সত্য বল্’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘ঝড়’ [পশ্চিম তরঙ্গ] ১৩৩১ বঙ্গাব্দের আষাঢ়ে দ্বিতীয় বর্ষ তৃতীয় সংখ্যক ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত হয়েছিল।

  • ভাঙার গান

    ভাঙার গান

    ভাঙার গান

    ‘ভাঙার গান’ বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত বিদ্রোহাত্মক কাব্যগ্রন্থ— এতে কবিতা ও গান সঙ্কলিত হয়েছে। গ্রন্থটি ১৩৩১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মুতাবেক ১৯২৪ খৃষ্টাব্দের আগষ্ট মাসে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। উৎসর্গ পাতায় লেখা ছিল— “মেদিনীপুরবাসীর উদ্দেশে”। ১১ নভেম্বর তারিখে তৎকালীন বঙ্গীয় সরকার গ্রন্থখানি নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত করেন। বৃটিশ সরকার কখনও এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেননি। ‘ভাঙার গানে’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ পায় ১৯৪৯ খৃষ্টাব্দে। প্রকাশক সুরেন দত্ত, ন্যাশনাল বুক এজেন্সী লিমিটেড, ১২ বঙ্কিম চ্যাটার্জি ষ্ট্রিট, কলিকাতা—১২। পৃষ্ঠা ৪+৩৬; মূল্য এক টাকা। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় রাবার ষ্ট্যাম্পের লেখা — “সম্পূর্ণ লভ্যাংশ কবির সাহায্যে দেওয়া হইবে।” এখানে দ্বিতীয় সংস্করণের পাঠ ও ক্রম অনুসৃত হয়েছে।

    ‘ভাঙার গান’ শীর্ষক গানটি সম্পর্কে জনাব মুজফ্‌ফর আহমদ লিখেছেন—

    “আমার সামনেই দাশ-পরিবারের শ্রীসুকুমাররঞ্জন দাশ ‘বাঙ্গলার কথা’র জন্যে একটি কবিতা চাইতে এসেছিলেন। শ্রীযুক্তা বাসন্তী দেবী তাঁকে কবিতার জন্য পাঠিয়েছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তখন জেলে। … অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নজরুল তখনই কবিতা লেখা শুরু ক’রে দিলেন। সুকুমাররঞ্জন আর আমি আস্তে আস্তে কথা বলতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে নজরুল আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে তার সেই মুহূর্তে রচিত কবিতাটি আমাদের পড়ে শোনাতে লাগল। … নজরুল ‘ভাঙার গান’ লিখেছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের কোনো এক তারিখে। ‘ভাঙার গান’ ‘বাঙ্গলার কথা’য় ছাপা হয়েছিল।”

    — [ কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা ]

    ‘জাগরণী’ শীর্ষক কোরাস গানটি সম্পর্কে জনাব আফতাব-উল-ইসলাম লিখেছেন—

    “১৯২১ সনে শ্রীযুত বীরেন সেন (কাজীর এবং আমাদের সকলের ‘রাঙা দা’) তখন কুমিল্লা বিদ্যালয়ে শিক্ষক। কাজী নজরুল কান্দিরপার তাঁরই বাড়ীতে থাকেন। প্রিন্স অব ওয়েল্‌সের ভারত-ভ্রমণ উপলক্ষে কংগ্রেস-ঘোষিত হরতাল-পালনের জন্য (২১শে নভেম্বর) একটি গান লিখে দেওয়ার অনুরোধ নিয়েই প্রথম তাঁর সাথে দেখা করি ‘রাঙা দা’র বাড়ীতে। তিনি তা তো দিলেনই, অধিকন্তু কাঁধে হারমোনিয়াম বেঁধে মিছিলের সঙ্গে তিনি নিজেও গাইলেন:

    ভিক্ষা দাও। ভিক্ষা দাও

    ফিরে চাও ওগো পুরবাসী,

    সন্তান দ্বারে উপবাসী,

    দাও মানবতা ভিক্ষা দাও।”

    — [ গুলিস্তাঁ, নজরুল-সংখ্যা]

    ‘মোহান্তের মোহ-অন্তের গান’ সম্বন্ধে ডক্টর সুশীলকুমার গুপ্ত বলেন—

    “অসহযোগ আন্দোলন আরম্ভ হবার পর তারকেশ্বরের দুর্নীতিপরায়ণ অসচ্চরিত্র ধর্মব্যবসায়ী মোহান্তকে তাড়াবার নিমিত্ত একটি আন্দোলন উপস্থিত হয়। নজরুল এই সময়ে ‘মোহান্তের মোহ-অন্তের গান’ লিখে এই আন্দোলনকে সমর্থন ও শক্তিশালী করেন।”

    — [নজরুল-চরিত-মানস, ১৫৭ পৃষ্ঠা]

    ‘আশু-প্রয়াণ-গীতি’ ১৩৩১ বঙ্গাব্দের আষাঢ়ে ৩য় বর্ষের ৫ম সংখ্যক ‘বঙ্গবাণী’তে প্রকাশিত হয়।

    ‘দুঃশাসনের রক্তপান’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ১০ই কার্তিক শুক্রবার ১ম বর্ষের ১৭শ সংখ্যক ‘ধূমকেতু’তে ‘দুঃশাসনের রক্ত’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

    ‘শহিদী ঈদ’ সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’তে ছাপা হয়েছিল।

  • রিক্তের বেদন

    রিক্তের বেদন

    রিক্তের বেদন

    ‘রিক্তের বেদন’ কাজী নজরুল ইসলামের রচিত একটি গল্পগ্রন্থ। এতে মোট ৮টি গল্প রয়েছে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে। প্রকাশক ওরিয়েণ্টল প্রিণ্টার্স এণ্ড পাবলিশার্স লিমিটেড; ২৬/৯/১-এ, হ্যারিসন রোড, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪+১৬০; মূল্য দেড় টাকা। প্রকাশকের পক্ষে কবি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক ‘নিবেদন’-এ বলেন—

    “রণকোলাহলের মত্ততার মাঝে জন্মেছিল তরুণ কবির ভাবরাজ্যের দ্যোতনা-করা এই উচ্ছ্বাস। মেসোপটেমিয়ার ধূলি ঝেড়ে আমার ন্যায় অযোগ্য ব্যক্তিকেই একে কোল দিতে হয়েছিল। আমার অযোগ্যতাই এতদিন কবির হৃদয়োচ্ছ্বাসকে চেপে রেখে সহৃদয় পাঠকবর্গের সহিত তার পরিচয়ের ব্যাঘাত জন্মিয়েছে। এতে কবি এবং তার পাঠকবর্গের প্রতি অন্যায়-অত্যাচারের জন্য আমি দায়ী। অদ্য প্রায়শ্চিত্ত করলাম।”

    কলিকাতা,

    বড়দিন, ১৯২৪।

    ‘রিক্তের বেদন’ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসের ‘নূর’ পত্রিকায়।

    ‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৬ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠের ‘সওগাত’ পত্রিকায়। এই গল্পটি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত রচনা।

    ‘মেহের নেগার’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৬ বঙ্গাব্দের মাঘের ‘নূর’ পত্রিকায়।

    ‘সাঁঝের তারা’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৭ বঙ্গাব্দের মাঘের ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য়।

    ‘রাক্ষুসী’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৭ বঙ্গাব্দের মাঘের ‘সওগাত’ পত্রিকায়।

    ‘সালেক’ ১৩২৭ বঙ্গাব্দের আষাঢ়ের ‘বকুল’ পত্রিকায় ‘সালিক’ শিরোনামে প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘স্বামীহারা’ ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ভাদ্রের ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘দুরন্ত পথিক’ দৈনিক ‘নবযুগ’ হতে ১৩২৭ বঙ্গাব্দের আশ্বিনের ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় সঙ্কলিত হয়েছিল।

  • ছায়ানট

    ছায়ানট

    ছায়ানট

    ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘ছায়ানট’ আশ্বিন ১৩৩২ বঙ্গাব্দ, মুতাবিক সেপ্টেম্বর ১৯২৫ খৃষ্টাব্দে প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই কাব্যে কবিতা ও গান মিলিয়ে রয়েছে পঞ্চাশটি। গ্রন্থটি ‘ব্রজবিহারী বর্ম্মণ রায়’ কর্তৃক ‘বর্ম্মণ পাবলিশিং হাউস’, ১৯৩ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলকাতা হতে প্রকাশিত হয়। প্রথম সংস্করণে পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ১০০, মূল্য পাঁচ সিকা।

    প্রথম সংস্করণে ‘ছায়ানট’ কাব্যটি কবির শ্রেয়তম রাজলাঞ্ছিত বন্ধু মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ ও কুতুবউদ্দীন আহ্‌মদের করকমলে উৎসর্গ করা হয়েছিল, যদিও পরবর্তী সংস্করণগুলোতে ‘উৎসর্গ’ পত্রটি বর্জন করা হয়েছিল।

    ‘বিজয়িনী’ ১৩২৮ পৌষের ‘মোসলেম ভারত’ পত্রে প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘চৈতী হাওয়া’ ১৩৩২ বৈশাখের ‘কল্লোল’ পত্রে প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘নিশীথ-প্রীতম্’ ১৩২৮ মাঘে চতুর্থ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকায় এবং অষ্টম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যক ‘নারায়ণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘লক্ষ্মীছাড়া’ ১৩২৮ ভাদ্রের ‘উপাসনা’য় প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘শেষের গান’ ১৩২৯ শ্রাবণের ‘সহচর’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে প্রথম পঙ্‌ক্তিটি ছিল এরূপ—

    আমারমরণ-রথের চাকার ধ্বনি ঐ রে এবার কানে আসে।

    তৃতীয় স্তবকের প্রথম পঙ্‌ক্তি ছিল এরূপ—

    মোর কাফনের কর্পূর-বাস ভরপুর আজ দিগ্বলয়ে,

    ‘নিরুদ্দেশের যাত্রী’ ১৩২৭ চৈত্রের ‘নারায়ণ’ পত্রে প্রকাশিত হয়েছিল; শিরোনামের নীচে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘বাউল—কাশ্মিরী খেম্‌টা’।

    ‘চিরন্তনী প্রিয়া’ ১৩২৮ কার্ত্তিকের এবং ‘বেদনা-মণি’ ১৩২৯ ভাদ্রের ‘মানসী ও মর্মবাণী’তে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘অনাদৃতা’ ১৩২৮ ভাদ্রের ‘নারায়ণে’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘শায়ক-বেঁধা পাখি’ ১৩২৯ আষাঢ়ের ‘বঙ্গবাণী’তে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘হারা-মণি’ ১৩২৮ সালে নারায়ণ পত্রিকার ১২১৬ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘স্নেহ-ভীতু’ ১৩২৭ ফাল্গুণের ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল; বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘বাউল সুর—তাল লোফা’। সে সংখ্যাতেই গানটির ‘শ্রীমতী মোহিনী সেনগুপ্তা’ কৃত স্বরলিপিও প্রকাশত হয়েছিল।

    ‘পলাতকা’ ১৩২৮ বৈশাখের ভারতী’তে প্রকাশিত হয়েছিল; বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল: ‘মা-মরা খোকার মৃত্যু-শয্যায় পিতা গাচ্ছেন’ এবং ‘সুর—বৈকালী মেঠো বাউল’। গানটি ভারতী হতে ১৩২৮ আশ্বিনের ‘মোসলেম ভারতে’ উদ্ধৃত হয়েছিল।

    ‘মানস-বধূ’ ১৩২৯ শ্রাবণে প্রথম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যক মাসিক ‘বসুমতী’তে বের হয়েছিল।

    ‘দহন-মালা’ ১৩২৮ বৈশাখের এবং ‘অকরুণ প্রিয়া’ ১৩২৮ আশ্বিনের ‘নারায়ণে’ প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘দূরের-বন্ধু’ ১৩২৭ কার্ত্তিকের ‘মোসলেম ভারতে’ ‘গান’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল; বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘লাউনি—বারোঁয়া—তেওরা’।

    ‘আশা’ ১৩২৭ পৌষের ‘মোসলেম ভারতে’ ‘গান’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল এবং বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল: ‘খাম্বাজ—(টিমা) একতালা’। সেই সংখ্যাতে শ্রীমতী মোহিনী সেনগুপ্তা কৃত গানটির স্বরলিপিও প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘মরমী’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৩২৭ ফাল্গুনের ‘মোসলেম ভারতে’। ১৩৩০ অগ্রহায়ণের ‘কল্লোলে’ গানটি পুনর্মুদ্রিত হয় এবং সেই সংখ্যাতেই শ্রীমতী মোহিনী সেনগুপ্তা গানটির সুর ও স্বরলিপি প্রকাশ করেন।

    ‘প্রতিবেশিনী’ ১৩২৭ মাঘের ‘সওগাতে’ ‘বেদনা-হারা’ শিরোনামে এবং ১৩২৭ চৈত্রের ‘মোসলেম ভারতে’ ‘গান’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘দুপুর-অভিসার’ ১৩২৮ শ্রাবণের ‘ভারতী’তে প্রকাশিত হয়েছিল, বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘গৌড়—সারঙ্—দাদরা’।

    ‘ছল-কুমারী’ ১৩২৮ অগ্রহায়ণের ‘উপাসনা’য় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘বাদল-দিন’ ১৩২৮ আশ্বিনের এবং ‘কার বাঁশী বাজিল?’ ১৩২৮ ভাদ্রের ‘মোসলেম ভারতে’ প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘অকেজোর গান’ ১৩২৮ অগ্রহায়ণের এবং ‘স্তব্ধ বাদল’ ১৩২৯ শ্রাবণের ‘প্রবাসী’তে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘চির-চেনা’ ১৩২৯ শ্রাবণের ‘বঙ্গবাণী’তে প্রকাশিত হয়।

    ‘অমর কানন’ ১৩৩২ শ্রাবণে পঞ্চম বর্ষ, তেত্রিশ সংখ্যক ‘বিজলী’তে প্রকাশিত হয়।

    ‘পূবের হাওয়া’ [ঝড় : পূর্ব তরঙ্গ] ১৩৩১ শ্রাবণের, ‘আলতা-স্মৃতি’ ১৩৩০ পৌষের এবং ‘রৌদ্র-দগ্ধের গান’ ১৩৩০ চৈত্রের ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত হয়েছিল।

    পরবর্তীতে ছায়ানটের ২৬টি কবিতা সামান্য পরিবর্তন সহ ‘পূবের হাওয়া’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়। এসব কবিতায় যে-পাঠভেদ আছে, তার বিবরণ ‘পূবের হাওয়া’র গ্রন্থপরিচয়ে পাওয়া যাবে। আমরা ছায়ানটের প্রথম সংস্কণের পাঠ অনুসরণ করেছি।

    উৎসর্গ

    আমার শ্রেয়তম রাজলাঞ্ছিত বন্ধু

     মুজফ্‌ফর আহমদ

     

     কুতুবউদ্দীন আহমদ

     করকমলে –

  • চিত্তনামা

    চিত্তনামা

    চিত্তনামা

    ‘চিত্তনামা’ কাজী নজরুল ইসলাম রচিত কাব্যগ্রন্থ। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ২রা আষাঢ় ১৩৩২ বঙ্গাব্দ (১৬ জুন ১৯২৫ খৃষ্টাব্দ) মঙ্গলবার, দার্জিলিঙে পরলোকগমন করেন। দেশবন্ধুর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে নজরুল অর্ঘ্য, অকাল-সন্ধ্যা, সান্ত্বনা, ইন্দ্রপতন, রাজভিখারী নামে কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন যেগুলো সমকালীন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ১৩৩২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ (১৯২৫ খৃষ্টাব্দের আগষ্ট) মাসে কবিতাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। বেঙ্গল লাইব্রেরির তালিকা থেকে জানা যায়, গ্রন্থটি ১৮ই কার্ত্তিক ১৩৩২ বঙ্গাব্দ, মুতাবিক ৪ নভেম্বর ১৯২৫ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটির প্রথম প্রকাশের তারিখ নিয়ে সংশয় রয়েছে, কেননা, ‘ছায়ানট’ ও ‘চিত্তনামা’ কাব্যে প্রকাশকাল মুদ্রিত হয়নি, অধিকন্তু বেঙ্গল লাইব্রেরীর তালিকায় ‘ছায়ানটে’র প্রকাশকাল ২২ সেপ্টেম্বর ১৯২৫ এবং ‘চিত্তনামা’র প্রকাশকাল ৪ নভেম্বর ১৯২৫ বলে উল্লিখিত হয়েছে। এই সব তারিখ গ্রন্থপ্রকাশের প্রকৃত তারিখ নাও হতে পারে তবুও ‘বাংলা একাডেমি’ প্রকাশিত ‘নজরুল রচনাবলী’ জন্মশতবর্ষ সংস্করণে চিত্তনামার আগে ছায়ানটের স্থান দেওয়া হয়েছে। আমরাও এই ক্রম অনুসরণ করে ‘চিত্তনামা’কে ‘ছায়ানটে’র পরে স্থান দিয়েছি।

    ‘চিত্তনামা’ কাব্যের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন দীনেশরঞ্জন দাশ। কবি গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবীকে। তিনি ছিলেন খুবই স্নেহশীলা নারী। পাঠকমাত্রেই জানেন নজরুলের মধ্যে ছিল মাতৃস্নেহ পাবার আগ্রহ; কেননা, কোন বিশেষ অজ্ঞাত কারণে নিজের মায়ের সাথে তাঁর সম্পর্ক খুব একটা ভাল ছিল না। নজরুল বাসন্তী দেবীকে মা বলে ডাকতেন। কবি ‘চিত্তনামা’র উৎসর্গ পাতায় লেখেন—

    মাতা বাসন্তী দেবীর শ্রীশ্রীচরণারবিন্দে—

    ‘চিত্তনামা’ সম্পর্কে ১৩৩২ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণের ‘প্রবাসী’ বলেন—

    “৪০ পাতা বইয়ের দাম এক টাকা। … বইয়ের কবিতাগুলি পড়িয়া ভাল লাগিল। লেখকের দেশবন্ধুর প্রতি ভক্তি প্রতি ছত্রে প্রকাশ পাইয়াছে। বইখানির বাঁধান, ছাপা, কাগজ—সবই খুব ভাল।”

    ‘অর্ঘ্য’ সম্পর্কে শ্রীপ্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন—

    “দেশবন্ধুর মৃত্যু সংবাদ শুনে কবি কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে ‘অর্ঘ্য’ গানটি লেখেন ১৩৩২ সালের ৩রা আষাঢ়। দেশবন্ধুর শবাধারে রচনাটি মালার সঙ্গে অর্ঘ্য-স্বরূপ জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।”

    — [কাজী নজরুল, ৩৭ পৃষ্ঠা]

    ‘অকালসন্ধ্যা’ ১৩৩২ শ্রাবণের ‘বঙ্গবাণী’তে প্রকাশিত হয়েছিল। শিরোনামের নিচে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘জয় জয়ন্তী কীর্ত্তন—একতালা’। পাদটীকায় লেখা ছিল : ‘স্বর্গীয় দেশবন্ধুর শোকযাত্রার গান’।

    ‘সান্ত্বনা’ ১৩৩২ বঙ্গাব্দের আষাঢ় পঞ্চম বর্ষের ৩১ সংখ্যক ‘বিজলী’তে বের হয়।

    ‘ইন্দ্রপতন’ ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ১২ই আষাঢ় তারিখের ‘আত্মশক্তি’তে প্রকাশিত হয়। এ-সম্পর্কে চৌধুরী শামসুর রহমান লিখেছন—

    “‘ইন্দ্রপতন’ সাপ্তাহিক ‘আত্মশক্তি’ পত্রিকায়ই ছাপা হয়েছিল। … কবি তাঁর এ কবিতায় মহান নেতার গুণকীর্তন করতে গিয়ে তাঁকে নবীদের সাথে তুলনা ক’রে উচ্ছ্বাসের আতিশয্যে বলে ফেলেছিলেন : ‘হে মানব-আম্বিয়া।’ তা ছাড়া, কবিতাটিতে এমন আরও কতকগুলি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল, যা ইসলামী ভাবধারার অনুকূল নয়। এ সব ত্রুটির প্রতি কবির দৃষ্টি আকর্ষণ ক’রে খোলা চিঠির আকারে লেখা আমার প্রবন্ধ মফঃস্বলের কাগজ ‘বগুড়ার কথা’য় দীর্ঘ দুপৃষ্ঠা স্থান নিয়ে প্রকাশিত হয়। আমার এ প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পর মুসলমান সমাজে তৎকালে সাড়া প’ড়ে গিয়েছিল। … পরে যখন কবিতাটি তাঁর ‘চিত্তনামা’ বইয়ে প্রকাশিত হয়, কবি নজরুল তখন আপত্তিকর লাইনগুলি সংশোধন করে এবং কোনো কোনো লাইন বাদ দিয়েই তা ছেপেছিলেন।”

    — [পঁচিশ বছর, ৪২-৪৪ পৃষ্ঠা]

    কবিতাটি গ্রন্থব্ধ হওয়ার কালে ‘হে মানব-আম্বিয়া’ পদটি পরিবর্তিত হয় ‘হে মানব নবি-হিয়া’ রূপে এবং তার চারটি পঙ্‌ক্তি পরিবর্জিত হয়। যতদূর মনে পড়ে, পরিত্যক্ত পঙ্‌ক্তিগুলি ছিল এরূপ:

    জন্মিলে তুমি মোহাম্মদের আগে, হে পুরষবর!

    কোরানে ঘোষিত তোমার মহিমা, হতে পয়গাম্বর।

    যে জ্যোতি পারেনি সহিতে স্বয়ং মুসা-ও কোহ-ই-তুরে,

    সেই জ্যোতি তুমি রেখেছিলে তব নয়ন-মণিতে পুরে।

    ‘রাজভিখারী’ ১৩৩২ শ্রাবণের ‘কল্লোল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

    উৎসর্গ

    মাতা বাসন্তী দেবীর শ্রীশ্রীচরণারবিন্দে—

    নজরুল ইসলাম

  • সাম্যবাদী (কাব্য)

    সাম্যবাদী (কাব্য)

    সাম্যবাদী (কাব্য)

    কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থ ১৯২৫ সালের ডিসেম্বরে (পৌষ,১৩৩২) প্রকাশিত হয়। প্রকাশক মৌলভী শামসুদ্দীন হুসেন, বেঙ্গল পাবলিশিং হোম, ৫ নূর মহম্মদ লেন, কলিকাতা। ১৫ নং নয়ান চাঁদ [দত্ত] ষ্ট্রীট, কলিকাতা, মেটকাফ প্রেসে শ্রীমণিভূষণ মুখার্জী কর্তৃক মুদ্রিত হয়। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩২, মূল্য দুই আনা। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোয় বেশিরভাগই মানবিক বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

    ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ১লা পৌষ মুতাবিক ১৯২৫ খৃষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর তারিখে ৩৭নং হ্যারিসন রোড, কলিকাতা হতে ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়ে’র সাপ্তাহিক মুখপত্ররূপে ‘লাঙল’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রধান পরিচালক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, সম্পাদক ছিলেন কবির পল্টনের বন্ধু মণিভূষণ মুখার্জী এবং কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন মরহুম শামসুদ্দীন হুসেন। লাঙলের বিশেষ (প্রথম) সংখ্যায় ‘সর্ব্বপ্রধান সম্পদ’রূপে ‘সাম্যবাদী’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়।

    ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থে মোট ১১টি কবিতা সঙ্কলিত হয়েছিল; কবিতাগুলো হচ্ছে— ‘সাম্যবাদী’, ‘ঈশ্বর’, ‘মানুষ’, ‘পাপ’, ‘চোর-ডাকাত’, ‘বারাঙ্গানা’, ‘মিথ্যাবাদী’, ‘নারী’, ‘রাজা-প্রজা’, ‘সাম্য’ ও ‘কুলি-মজুর’। পরে ‘সাম্যবাদী’সহ এর চারটি কবিতা ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে সঙ্কলিত হয়। আমাদের এই সংস্করণে ‘সাম্যবাদী’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের পাঠ অনুসৃত হয়েছে।

    ‘সাম্যবাদী’ কাব্যের সবগুলো কবিতাতেই মানুষের সমতা নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক মানবসমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। কবির বিশ্বাস মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে পরিচিত হয়ে ওঠা সবচেয়ে সম্মানের। নজরুলের এ আদর্শ আজও প্রতিটি মানুষের জীবনপথের প্রেরণা। কিন্তু মানুষ সম্প্রদায়কে ব্যবহার করে রাজনীতি করে, দুর্বলকে শোষণ করে, এখনও একের বিরুদ্ধে অন্যকে উস্কে দেয়। একজনের প্রতি অন্যজনকে বিমুখ করার ষড়যন্ত্র করে। নজরুল এ কবিতায় মানুষের অন্তর ধর্মের ওপর জোর প্রদান করেন। ধর্মগ্রন্থ পড়ে অর্জিত জ্ঞান যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে প্রয়োজন মানবিকতাবোধ। কবি বলেছেন, মানুষের হৃদয়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন মন্দির কাবা নেই। কবি সকল মত, সকল পথের উপরে স্থান দিয়েছেন মানবিকতা। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলিম সকলকে একই মায়ের সন্তানের মত ভেবেছেন। নজরুল মানবিক মিলবন্ধনের জন্য সঙ্গীত রচনা করেছেন। বাণী ও সুরের মাধ্যমে মানবতার সুবাস ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন।

    নজরুল ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় মন্দির, মসজিদ, গির্জা বা অন্যান্য তীর্থক্ষেত্রের মত পবিত্র মনে করেছেন মানুষের হৃদয়কে। এ হৃদয় যদি পবিত্র থাকে, হৃদয়ে যদি কারো প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ না থাকে, সকলের প্রতি সমদর্শিতা থাকে তাহলে পৃথিবী হবে সুখের আবাসস্থল। সাম্যবাদ মানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নিৰ্বিশেষে রাষ্ট্রের সকল মানুষের সমান অধিকার থাকা উচিত এ মতবাদ। কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় সব ধরনের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সাম্যবাদের বাণী প্রচার করেছেন।

  • পূবের হাওয়া

    পূবের হাওয়া

    পূবের হাওয়া

    ‘পূবের হাওয়া’ প্রকাশের কালক্রমে কাজী নজরুল ইসলামের সপ্তম কাব্যগ্রন্থ। প্রথম প্রকাশকাল আশ্বিন ১৩৩২ বঙ্গাব্দ (অক্টোবর ১৯২৫)। প্রকাশক মজিবল হক, বি,কম্, ভোলা বরিশাল। মুদ্রাকর মজিবল হক, বি,কম্। ওরিয়েণ্টাল প্রিণ্টার্স লিমিটেড, ২৬/৯/১এ, হ্যারিসন রোড, কলিকাতা।  পৃষ্ঠা: ২+৫০। দাম পাঁচ সিকা। প্রকাশক ‘একটি কথা’য় বলেন—

    ‘পূবের হাওয়া’য় পঞ্চাশটি কবিতা যাওয়ার কথা। এবার সাঁইত্রিশটি গেল; পর বারে সব কটি দেওয়া যাবে।

    প্রথম সংস্করণের মোট ৩৭টি কবিতা ও গান অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ২৬টি কবিতা ও গান ‘ছায়ানট’ কাব্যগ্রন্থে পূর্বেই প্রকাশিত হয়েছিল।  নিম্নে সেগুলোর তালিকা প্রদান করা হল এবং বন্ধনীর ভিতরে ‘ছায়ানট’ কাব্যে প্রকাশিত শিরোনাম দেওয়া হল—

    শিরোনাম

    পূবের হাওয়ায়
    ছায়ানটে
    অনাদৃতা
    অভিমানিনী
    গৃহহারা
    দহন-মালা
    দুপুর অভিসার
    দূরের পথিক
    নিরুদ্দেশের যাত্রী
    নিশীথ-প্রীতম্
    পথিক-শিশু
    পুলক
    প্রণয়-হুল
    বরষায়
    বাঁশি বাজিল
    বিজয়িনী
    বিদায়-বাঁশী
    বেদন-হারা
    বেদনা মানিক
    মরমী
    রেশমী-ডোর
    শেষের ডাক
    শেষের প্রিতম্
    স্নেহতুরা
    স্নেহ-পরশ
    স্নেহ-ঋণী

    ‘ছায়ানট’ কাব্যে প্রকাশিত উল্লিখিত ২৬টি কবিতা ও গানের যেগুলো হুবহু ‘পূর্বের হাওয়া’ কাব্যে সঙ্কলিত হয়েছে সেগুলো ‘পূর্বের হাওয়া’র বর্তমান সংস্করণে বর্জন করা হয়েছে। তবে ‘ছায়ানট’ ও ‘পূবের হাওয়া’ সংস্করণে যে সকল কবিতা ও গানে পাঠভেদ আছে সেইগুলো বর্তমান সংস্করণে রাখা হয়েছে।

    ‘ছায়ানট’ কাব্যের ‘মুক্তি-বার’ কবিতাটির শেষস্তবকের প্রথম পঙ্‌ক্তি ‘তোমায় সেধে ডাকবে বাঁশি …’ ‘পূবের হাওয়া’য় হয়েছে এরূপ—

    যখন   তোমায় সেধে ডাকবে বাঁশি …’

    ‘ছায়ানট’ কাব্যের ‘পরশ-পূজা’ কবিতাটির ষষ্ঠ পঙ্‌ক্তি ‘পূবের হাওয়া’য় হয়েছে এরূপ—

    আহা পরশ তোমার জাগ্‌ছে যে গো এই সে, দেহে মম,

    কম  সরস হরষ-সম॥

    নবম পঙ্‌ক্তি হয়েছে এরূপ—

    তোমার  বাহুর বুকের শরম-ছোঁওয়ার আকুল কাঁপন আছে—

    মদির  অধীর পূলক নাচে॥

    এবং ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ পঙ্‌ক্তিদ্বয় হয়েছে এরূপ—

    আমি  চুমোয় চুমোয় ডুবাবো এই সকল দেহ মম—

    ওগো  শ্রাবণ-প্লাবণ সম॥

    ‘দূরের পথিক’ কবিতাটির প্রারম্ভ ‘পূবের হাওয়া’য় এরূপ—

    আজ অমন কর গো বারে-বারে জল-ছলছল চোখে চেয়ো চেয়ো না,

    শুধু  বিদায়ের গান গেয়ো না।

    ‘পুলক’ কবিতাটির দ্বিতীয় স্তবক ‘পূবের হাওয়া’য় এরূপ—

    তার অবুঝ বনের সবুজ সুরে

    মাঠের নাটে পুলক পুরে,

    ঐ গহন বনের পথটি ঘুরে বাজিয়ে বাঁশী আসছে দূরে

    কচি পাতা দূত ওরি॥

    ‘ছায়ানট’ কাব্যের ‘শেষের গান’ অনেক শব্দ পরিবর্তন করে ‘শেষের ডাক’ শিরোনামে ‘পূবের হাওয়া’য় মুদ্রিত হয়েছে; তাই গানটি পূবের হাওয়ার বর্তমান সংস্করণে রাখা হয়েছে।

    ‘ছায়ানটের’ ‘মুক্তিবার’ কবিতার নাম ‘পূবের হাওয়া’য় ‘অবসর’। ‘অবসর’ কবিতার দ্বাদশ চরণের পরে আছে—

    অভিমানিনীরে মোর।

    ‘মুক্তিবারে’ এ চরণটি নেই।

    ছায়ানটের ‘নিরুদ্দেশের যাত্রী’ কবিতার একবিংশ ও দ্বাবিংশ চরণ দুটি এরূপ—

    থামল বাদল-রাতের কাঁদা

    হাসলো আবার টুটলো ধাঁধা।

    পূবের হাওয়ায় ‘নিরুদ্দেশের যাত্রী’ কবিতায় চরণ দুটি এরূপ—

    থামল বাদল রাতের কাঁদা

    ভোরের তারা কনক-গাঁদা।

    ছায়ানটের ‘চিরশিশু’ কবিতার শেষ তিন চরণ—

    ওরে ও কে কণ্ঠ রুখে

    উঠছে কেন মন ভারায়ে।

    অস্ত হতে এলে পথিক উদয় পানে পা বাড়ায়ে॥

    পূবের হাওয়ায় ‘পথিক শিশু’ কবিতার শেষ দুটি চরণ এরূপ—

    ওরে ও কে কণ্ঠ রুখে? পাঁচ ফাগুনের যুঁই-চারা এ

    আজ মন-পাখি ধায় মধুরতম নাম আশীষের শেষ ছাড়ায়ে।

    ছায়ানটের ‘দহনমালা’ কবিতার দ্বিতীয় চরণের ‘বদল দিয়ে’ এবং ষষ্ঠ চরণের ‘দু’হাতে পূরে’ পূবের হাওয়ার ‘দহনমালা’ কবিতায় যথাক্রমে ‘বদল করে’ ও ‘দু’ হাত ভরে’ হয়েছে।

    ছায়ানটের ‘বিধুরা পথিক-প্রিয়া’ ও পূবের হাওয়ার ‘পথিক-বধূ’ কবিতার প্রথম একাদশ চরণের পাঠ অভিন্ন। তারপরে ‘পথিক-বধূ’ কবিতায় পাই—

    পরদেশী কোন শ্যামল বঁধূর শুনতো বাঁশি সারাক্ষণ গো?

    চুমচো কারে? ও নয় তোমার পথিক-বঁধূর

    চপল হাসির হা-হা

    তরুণ ঝাউএর কচি পাতায় করুণ অরুণ কিরণ

    ও যে আ-হা

    দূরের পথিক ফিরে নাক আর (আহা আ-হা)

    ও সে সবুজ দেশের অবুঝ পাখি

    কখন্ এসে যাচবে বাঁধন, চল পাখি ঘরকে চল!

    ওকি? চোখে নাম্‌লো কেন মেঘের ছায়া ঢল ছল॥

    ছায়ানটের ‘ছলকুমারী’র প্রথম স্তবকের শেষ দুই চরণ এবং দ্বিতীয় স্তবকের প্রথম চরণে পাঠভেদ পাওয়া যায় পূবের হাওয়ার ‘প্রণয়-ছল’ কবিতায়। সেখানে—

    আমায় দেখেই সলাজ ত্রাসে

    অনামিকায় গড়িয়ে আঁচল গাল দুটিকে ঘামায়॥

    সবাই যখন ঘুমে মগন দুরু দুরু বুকে তখন

    আমায় চুপে চুপে

    রূপান্তরিত হয়েছে—

    আমায় দেখেই সলাজ ত্রাসে

    গাল দুটিকে ঘামায়॥

    অনামিকায় জড়িয়ে আঁচল

    দুরু দুরু বুকে

    সবাই যখন ঘুমে মগন তখন আমায় চুপে চুপে।

    এই কবিতায় আরও কিছু পরিবর্তন লক্ষযোগ্য। যেমন— ‘ছলকুমারীর’র ‘সইরা হাসে দেখে তাহার’ ‘প্রণয়-ছলে’ ‘সইরা হাসে দেখে ছুঁড়ির’ এবং প্রথমোক্ত কবিতার—

    কি যে কথা সেই তা জানে

    ছলকুমারী নানান ছলে আমারে সে জানায়

    দ্বিতীয়োক্ত কবিতায়

    চলতে চাদর পরশ হানে

    আমারো কি নিতুই পথে তারি বুকের জামায়।

    ছায়ানটের ‘বাদল-দিনে’ কবিতার চতুর্থ ও পঞ্চম স্তবক এবং ষষ্ঠ স্তবকের প্রথম চরণদুটি পূবের হাওয়ার ‘বরষা’ কবিতায় নেই।

    এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত নতুন ১২টি কবিতা ও গান এবং সেগুলো সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হল—

    ‘স্মরণে’ ১৩২৭ শ্রাবণে (জুলাই-আগষ্ট ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ) ৩য় বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় ‘গান’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। শিরোনামের নীচে লেখা ছিল— “সুর—হিন্দুস্থানী—কাজরী”। তাতে দ্বিতীয় স্তবকের পঞ্চম পঙ্‌ক্তি ছিল নিম্নরূপ—

    তাই  পরাণ আমার বেড়ায় মেগে

    সে কা’র যতনে।

    ‘বাদল-প্রাতের শরাব’ আষাঢ় ১৩২৭ বঙ্গাব্দ, মুতাবিক জুন-জুলাই ১৯৩০ খৃষ্টাব্দে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। শিরোনামের নীচে বন্ধনীতে লেখা ছিল—‘হাফিজ-এর ছন্দ ও ভাব অবলম্বনে’। ‘পূবের হাওয়ায় কবিতাটির শিরোনাম দেওয়া হয় ‘নিকটে’। এই কবিতাটি সম্বন্ধে ১৩২৭ বঙ্গাব্দ ভাদ্রের ‘মোসলেম ভারতে’ শ্রীমোহিতলাল মজুমদার বলেন—

    ‘বাদল-প্রাতের শরাব’ শীর্ষক কবিতায় ইরানের পুষ্পসার ও দ্রাক্ষাসার ভরপুর হইয়া উঠিয়াছে। এ কবিতাটিতেও কবির ‘মস্ত’ হইবার ও ‘মস্ত’ করিবার ক্ষমতা প্রকাশ পাইয়াছে। বাঙ্গালি মাত্রেই ইহার উচ্ছল রসাবেশ অন্তরে অনুভব করিবে। কবির লেখনী জয়যুক্ত হউক।

    ‘মানিনী’ ১৩২৭ বৈশাখের ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় ‘মানিনী বধূর প্রতি’ শিরোনামে বের হয়েছিল।

    ‘আশা’ ১৩২৭ পৌষের ‘সওগাতে’ ‘কলঙ্কী প্রিয়’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। বন্ধনীতে লেখা ছিল— ‘গান—বাউলের সুর’।

    ‘শরাবান্ তহুরা’ [‘নার্গিস বাগ্ মেঁ বাহার কি আগ্ মেঁ’] গানটি ১৯৩০ সালে রচিত বলে শ্রদ্বেয় মুজফ্‌ফর আহমদ ১৯৬৬ সালের ২রা আগস্ট তারিখে লেখা তাঁর একপত্রে (১৩৮১ সালের নজরুল একাডেমী পত্রিকায় প্রকাশিত] উল্লেখ করেছেন।

    ‘বিরহ-বিধুরা’ ১৩২৭ মাঘের ‘মোসলেম ভারতে’ ছাপা হয়েছিল। পাদটীকায় লেখা ছিল— “কাবুলী-কবি ‘খোশহাল’-এর হিন্দুস্থানে নির্বাসন-কালীন তাঁহার সহধর্মিনীর লিখিত একটি কবিতার ভাব অবলম্বনে’।

  • ঝিঙে ফুল

    ঝিঙে ফুল

    ঝিঙে ফুল

    ‘ঝিঙে ফুল’ ১৩৩৩ সালের আশ্বিন মাসে গ্রন্থাকারে বাজারে বের হয় বলে সাপ্তাহিক ‘গণবাণী’ পত্রিকার বিজ্ঞাপন দৃষ্টে অনুমিত হয়। পক্ষান্তরে বেঙ্গল লাইব্রেরির তালিকা অনুসরণ করে আলী আহমদ দেখিয়েছেন যে, ‘ঝিঙে ফুল’ ১৯২৬ খৃষ্টাব্দের এপ্রিল (মুতাবিক চৈত্র বা বৈশাখ) মাসে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক গোপালদাস মজুমদার, ডি. এম. লাইব্রেরী, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রিট, কলিকাতা। মুদ্রাকর কান্তিক প্রেস, ২২ সুকিয়া ষ্ট্রিট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ২ + ৪২, মূল্য বারো আনা।

    ১৩২৮ বঙ্গাব্দের শ্রাবণে ‘মা’, কার্তিকে ‘খোকার বুদ্ধি’, এবং মাঘে ‘খোকার গল্প বলা’, ও ‘চিঠি’ বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘হোঁদল কুৎকুতের বিজ্ঞাপন’ ১৩২৭ জ্যৈষ্ঠের ‘অঙ্কুর’ পত্রিকায় বের হয়।

    উৎসর্গ

    বীর বাদলকে

  • দুর্দিনের যাত্রী

    দুর্দিনের যাত্রী

    দুর্দিনের যাত্রী

    ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৬শে শ্রাবণ মুতাবিক ১৯২২ খৃষ্টাব্দের ১১ই আগস্ট অর্ধসাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’র প্রথম সংখ্যা বের হয়। নজরুল ইসলাম ‘ধূমকেতু’তে যে-সকল সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ লেখেন তারই কতকগুলি সংগ্র করে ৫৪ পৃষ্ঠার পুস্তিকা ‘দুর্দিনের যাত্রী’ প্রকাশিত হয়। প্রকাশক নজরুল ইসলাম (কবি স্বয়ং)। মুদ্রাকর শ্রী অমূল্যচন্দ্র ভট্টাচার্য, ভট্টাচার্য প্রিণ্টিং ওয়ার্কস, ৪নং বৃন্দাবন পাল বাই লেন, কলিকাতা। মূল্য ছয় আনা। পুস্তিকাখানিতে প্রকাশকালের উল্লেখ নেই। নানা তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম নির্দেশ করেছেন, দুর্দিনের যাত্রী গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৬ খৃষ্টাব্দের অক্টোবরে। গ্রন্থটি বঙ্গীয় সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।

    দুর্দিনের যাত্রী গ্রন্থে প্রকাশিত সকল প্রবন্ধই ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ভাদ্র থেকে কার্তিকে প্রকাশিত ধূমকেতুর বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘আমরা লক্ষ্মীছাড়ার দল’ ৮ই ভাদ্র; ‘তবুড়ী বাঁশীর ডাক’ ১২ই ভাদ্র’; ‘মোরা সবাই স্বাধীন : মোরা সবাই রাজা’ ১৬ই ভাদ্র এবং ‘স্বাগত’ ২৮ই ভাদ্র; ‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?’ ৫ই আশ্বিন; এবং ‘আমি সৈনিক’ ১৪ই কার্তিক তারিখে ধূমকেতুতে প্রকাশিত হয়েছিল।

  • সর্বহারা

    সর্বহারা

    সর্বহারা

    ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে, মুতাবিক ১৯২৬ খৃষ্টাব্দের অক্টোবরে। প্রকাশক ব্রজবিহারী বর্মণ রায়, বর্মণ পাবলিশিং হাউস, ১৯৩ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ২+৬৪, মূল্য এক টাকা ছয় আনা। তাতে অন্তর্ভুক্ত হয়— সর্বহারা, কৃষাণের গান, শ্রমিকের গান, ধীবরের গান, ছাত্রদলের গান, কাণ্ডারী হুঁশিয়ার, সাম্যবাদী, ফরিয়াদ, আমার কৈফিয়ৎ, প্রার্থনা ও গোকুল নাগ— এই এগারটি কবিতা।

    ১৩৫৯ বঙ্গাব্দে কলিকাতার ‘নলেজ হোম’ থেকে ‘সর্বহারা’ কাব্যের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এতে ‘সাম্যবাদী’ ও ‘সর্বহারা’র কিছু কবিতা এবং গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত কিছু কবিতা সঙ্কলিত হয়। এই সংস্করণের মুখবন্ধ রচনা করেন রবীউদ্দীন আহমদ। এই সংস্করণের সঙ্কলিত কবিতাগুলি হল—কৃষাণের গান (সর্বহারা), শ্রমিকের গান (সর্বহারা), ধীবরের গান (সর্বহারা) চোর-ডাকাত (সাম্যবাদী), মিথ্যাবাদী (সাম্যবাদী), রাজা-প্রজা (সাম্যবাদী), সাম্য (সাম্যবাদী), প্রার্থনা (সর্বহারা), চাষার গান, ছাদপেটার গান, চীন ও ভারত, নারী, চাষীর গান, এই দেশ কার, বিদায় মাভৈ, জাকাত লইতে এসেছে ডাকাত চাঁদ ও শ্রীমান আবদুল মুহিত চৌধুরী স্নেহভাজনেষু। শেষের নয়টি কবিতা গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত ও বেশির ভাগই সর্বহারা প্রকাশের অনেক পরে লিখিত। এই সংস্করণের অন্তর্ভুক্ত নারী ও ‘সাম্যবাদী’ কাব্যের নারী স্বতন্ত্র কবিতা। ‘সর্বহারা’ গ্রন্থের মূল উৎসর্গপত্র বদলে দিয়ে এই সংস্করণে ‘উৎসর্গ—মুজফ্‌ফর আহমদ-কে’ মুদ্রিত হয়। ‘সর্বহারা’র বর্তমান সংস্করণে প্রথম সংস্করণের পাঠ ও ক্রম অনুসৃত হয়েছে।

    ‘উৎসর্গ’ কবিতাটি ‘সর্বহারা’ শিরোনামে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের আশ্বিনে ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

    কাব্যে গৃহিত ‘সর্বহারা’ কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ২৫শে চৈত্র সংখ্যা ‘লাঙল’ পত্রিকায়।

    ‘কৃষাণের গান’ প্রথম প্রকাশিত হয় ৮ই পৌষ ১৩৩২ সংখ্যা ‘লাঙলে’।

    ‘শ্রমিকের গান’ প্রথম প্রকাশিত হয় ৬ই ফাল্গুন ১৩৩২ সংখ্যা ‘লাঙলে’। ২৩শে মাঘ ১৩৩২ বঙ্গাব্দ, মুতাবিক ৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯২৬ তারিখে কৃষ্ণনগরে নিখিল বঙ্গীয় প্রজা-সম্মিলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে উদ্বোধনী সঙ্গীতরূপে কবি কর্তৃক ‘শ্রমিকের গান’ গীত হয়েছিল।

    ‘ধীবরের গান’ ৪ঠা চৈত্র ১৩৩২ বঙ্গাব্দ, মুতাবিক ১৮ই মার্চ ১৯২৬ তারিখে ‘লাঙল’ পত্রিকায় ‘জেলেদের গান’ শিরোনামে ছাপা হয়; পাদটীকায় মুদ্রিত ছিল: ‘মাদারিপুরে নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলনীর তৃতীয় অধিবেশনের উদ্বোধন—সঙ্গীত’। উক্ত সম্মিলনী সম্পর্কে সে সংখ্যার লাঙলে বলা হয়— ‘গত ১১ই ও ১২ই মার্চ (২৭শে ও ২৮শে ফাল্গুন) তারিখে ফরিদপুর জেলার মাদারিপুর শহরে মৎস্যজীবী সম্মিলনীর তৃতীয় অধিবেশন হয়। ১০ই মার্চ সন্ধ্যায় সভাপতি শ্রীযুক্ত হেমন্তকুমার সরকার মহাশয় ষ্টিমার যোগে আসেন। তাঁর সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম, শ্রীযুক্ত বসন্তকুমার মজুমদার ও শ্রীমতী হেমপ্রভা মজুমদার ছিলেন।”

    ‘ছাত্রদলের গান’ ১৯২৬ খৃষ্টাব্দের মে মাসে কৃষ্ণনগরে ছাত্র ও যুব-সম্মিলনের উদ্বোধন সঙ্গীত রূপে কবি কর্তৃক গীত হয়েছিল।

    ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠের ‘বঙ্গবাণী’তে বের হয়েছিল। তার পাদটীকায় লেখা ছিল— ‘কৃষ্ণনগর প্রাদেশিক সম্মিলনীতে গীত।’ ১৯২৬ খৃষ্টাব্দের ২২শে মে কৃষ্ণনগরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মিলনের উদ্বোধন সঙ্গীত রূপে কবি কর্তৃক গীত হয়েছিল। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের আশ্বিনে ‘কালি-কলম’ পত্রিকায় গানটি কবি কৃত স্বরলিপিসহ প্রকাশিত হয়।

    ‘আমার কৈফিয়ৎ’ ১৩৩২ বঙ্গাব্দের আশ্বিনে ৫ম বর্ষের ৪১ সংখ্যক ‘বিজলী’তে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘গোকুল নাগ; ১৩৩২ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণের ‘কল্লোলে’ ছাপা হয়েছিল। গোকুলচন্দ্র নাগ ১৯২২ হতে ১৯২৫ পর্যন্ত ‘কল্লোল’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক ছিলেন। তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘সোনার ফুল’ ও উপন্যাস ‘পথিক’ সুপরিচিত। তিনি ১৩৩২ সালের ৮ই আশ্বিন একত্রিশ বৎসর বয়সে দার্জিলিঙে পরলোকগমন করেন।

  • রুদ্রমঙ্গল

    রুদ্রমঙ্গল

    রুদ্রমঙ্গল

    ‘রুদ্রমঙ্গল’ প্রবন্ধ সঙ্কলনের প্রথম প্রকাশকাল জানা যায় না, কেননা মুদ্রিত পুস্তিকায় প্রকাশকালের উল্লেখ নেই। ৭৮ পৃষ্ঠার পুস্তিকা ‘রুদ্রমঙ্গলে’র মুদ্রাকর ছিলেন শ্রীঅমূল্যচন্দ্র ভট্টাচার্য্য, ‘ভট্টাচার্য্য প্রিণ্টিং ওয়ার্কস’, ২ নিবেদিতা লেন, বাগবাজার, কলিকাতা। মূল্য আট আনা।

    আলী আহমদ উল্লেখ করেছেন ‘রুদ্রমঙ্গল’ বর্মণ পাবলিশিং হাউস, কলিকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রকাশনা সংস্থা হয়ত গ্রন্থটির পরিবেশক ছিলেন। প্রকাশকাল উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৭৭— ‘রুদ্রমঙ্গল’ প্রকাশের পরে বঙ্গীয় সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল, প্রকাশকাল ১৯৭৭ হলে বৃটিশ নিয়ন্ত্রিত বঙ্গীয় সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই, কেননা, ততদিনে বঙ্গীয় সরকার বিলুপ্ত হয়েছে। তবে, স্বাধীনতা লাভের পরে ১৯৭৭ সালে গ্রন্থটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়ে থাকবে।

    ‘রুদ্রমঙ্গল’ প্রবন্ধ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ১লা ভাদ্র, ‘আমার পথ (‘ধূমকেতুর পথ’ শিরোনামে) ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৬শে শ্রাবণ, ‘মোহর্‌রম’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ১৬ই ভাদ্র, ‘বিষবাণী’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৬শে ভাদ্র, ‘ক্ষুদিরামের মা’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২রা আশ্বিন এবং ‘ধূমকেতুর পথ’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৬শে আশ্বিন তারিখের ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকাটি ছিল অর্ধসাপ্তাহিক, এর মালিক ও সম্পাদক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম স্বয়ং।

    ১৯২৬ খৃষ্টাব্দের ২রা এপ্রিল মুতাবিক ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ১৯শে চৈত্র শুক্রবার কলিকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। সেই উপলক্ষে নজরু ইসলাম ১৯২৬ খৃষ্টাব্দের ২৬শে আগষ্ট মুতাবিক ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ৯ই ভাদ্র তারিখের ‘গণবাণী’তে ‘মন্দির ও মসজিদ’ এবং ২রা সেপ্টেম্বর মুতাবিক ১৬ই ভাদ্র তারিখের ‘গণবাণী’তে ‘হিন্দু-মুসলমান’ লেখেন।

  • ফণী-মনসা

    ফণী-মনসা

    ফণী-মনসা

    ‘ফণী-মনসা’ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মুতাবিক ১৯২৭ খৃষ্টাব্দের জুলাই মাসে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ছিলেন কবি নিজেই, যদিও ঠিকানা ছাপা হয়েছিল ‘বর্মণ পাবলিশিং হাউসের’, ১৯৩ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫৪, মূল্য পাঁচ সিকা।

    ‘সব্যসাচী’ ২৩শে পৌষ ১৩৩২ মুতাবিক ৭ই জানুয়ারি ১৯২৬ তারিখে ‘লাঙলে’ প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ ১৭ই মাঘ ১৩৩২ তারিখে ৫ম বর্ষের ১০ম সংখ্যক ‘বিজলী’তে ‘বন্দিনী’ শিরোনামে বের হয়েছিল।

    ‘আশীর্বাদ’ শামসুন নাহারের ‘পুণ্যময়ী’ পুস্তকের ‘প্রশস্তি’।

    ‘সাবধানী ঘণ্টা’ ১৩৩১ কার্তিকের কল্লোলে ‘সর্বনাশের ঘণ্টা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। এ সম্পর্কে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখিয়াছেন—

    “মনে আছে এই কবিতা নজরুল কল্লোল আপিসে বসে লিখেছিল একবৈঠকে।”

    [কল্লোল যুগ, ৮৯ পৃষ্ঠা]

    ‘শনিবারের চিঠি’তে ‘আমি ব্যাঙ’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে নজরুল ইসলাম তা মোহিতলাল মজুমদারের রচনা বলে মনে করেন। তাই প্রতিক্রিয়ায় ‘কল্লোল’ পত্রিকায় (কার্তিক ১৩৩১) তিনি লেখেন ‘সর্বনাশের ঘণ্টা’।

    ‘সর্বনাশের ঘণ্টা’ অনেক স্থানে পরিবর্তিত হয়ে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে। মূল কবিতাটি নিম্নে সম্পূর্ণ উদ্ধৃত হল।

    সর্বনাশের ঘণ্টা

    রক্তে আমার লেগেছে আবার সর্বনাশের নেশা।

    রুধির-নদীর পার হতে ঐ ডাকে বিপ্লব-হ্রেষা।

    হে দ্রোণাচার্য! আজি এই নব জয়যাত্রার আগে

    দ্বেষ-পঙ্কিল হিয়া হতে তব শ্বেত পঙ্কজ মাগে

    শিষ্য তোমার, দাও গুরু দাও তব রূপ-মসি ছানি’

    অঞ্জলি ভরি শুধু কুৎসিত কদর্যতার গ্লানি।

    তোমার নীচতা ভীরুতা তোমার, তোমার মনের কালি

    উদ্‌গারো গুরু শিষ্যের শিরে, তব বুক হোক খালি।

    বন্ধু গো! গুরু! দূষিত দৃষ্টি দূর করো, চাহ ফিরে,

    শয়তানে আজ পেয়েছে তোমায়, সে যে পাঁক ঢালে শিরে!

    চিরদিন তুমি যাহাদের মুখে মারিয়াছ ঘৃণা-ঢেলা,

    যে ভোগানন্দ দাসেদের গালি হানিয়াছ দুই বেলা,

    আজ তাহাদেরি বিনামার তলে আসিয়াছ তুমি নামি

    বাঁদরেরে তুমি ঘৃণা করে ভালবাসিয়াছ বাঁদরামি।

    হে অস্ত্রগুরু! আজি মম বুকে বাজে শুধু এই ব্যথা,

    পাণ্ডবে দিয়া জয়-কেতু, হলে কুক্কুর-কুরু-নেতা।

    ভোগ-নরকের নারকীর দ্বারে হইয়াছ তুমি দ্বারী

    ব্রহ্ম-অস্ত্র ব্রহ্ম-দৈত্যে দিয়া, হে ব্রহ্মচারী!

    তোমার কৃষ্ণ-রূপ-সরসীতে ফুটেছে কমল কত

    সে কমল ঘিরি নেমেছে মরাল কত সহস্র শত।

    কোথা সে দিঘীর উচ্ছল জল কোথা সে কমল রাঙা;

    হেরি শুধু কাদা শুকায়েছে জল, সরসীর বাঁধ ভাঙা!

    সেই কাদা মাখি চোখে-মুখে তুমি সাজিয়াছ ছি ছি সং,

    বাঁদর-নাচের ভালুক হয়েছ; হেসে মরি দেখে ঢং!

    অন্ধকারের বিবর ছাড়িয়া বাহিরিয়া এস গুরু,

    হেরো দিবালোকে—বাঁদরের বেদে কেটেছে গুম্ফ ভুরু।

    মিত্র সাজিয়া শত্রু তোমারে ফেলেছে নরকে টানি,

    ঘৃণার তিলক পরাল তোমারে স্তাবকের শয়তানি।

    যাহারা তোমারে বাসিয়াছে ভাল, করিয়াছে পূজা নিতি,

    তাহাদের হানে অতি লজ্জার ব্যথা আজ তব স্মৃতি।

    নপুংসক ঐ শিখণ্ডী আজ রথের সারথি তব—

    হানো বীর তব বিদ্রূপ-বাণ, সব বুক পেতে লব

    ভীষ্মের সম, যদি তাহে শর-শয়নের বর লভি;

    তুমি যত বল, আমিই সে রণে জিতিব অস্ত্র-কবি!

    তুমি জানো, তুমি সম্মুখ-রণে পারিবে না পরাজিতে,

    আমি তব কাল যশোরাহু সদা শঙ্কা তোমার চিতে।

    রক্ত অসির কৃষ্ণ মসির যে কোনো যুদ্ধে, গুরু,

    তুমি নিজে জানো তুমি অশক্ত, তাই করিয়াছ শুরু

    চোরা-বাণ ছোঁড়া বেল্লিকপনা বিনামা-আড়ালে থাকি,

    ন্যক্কার-আনা নপুংসকেরে রথ-সম্মুখে রাখি।

    হেরো গুরু আজ চারিদিকে হতে ধিক্কার অবিরত

    ছি ছি বিষ ঢালি জ্বালায় তোমার পুরানো প্রদাহ-ক্ষত।

    আমারে যে সবে বাসিয়াছে ভাল মোর অপরাধ নহে।

    কালীয়-দমন উদিয়াছে মোর বেদনার কালিদহে।

    তাহার সে দাহ তোমারে দহেনি, দহেছে যাদের মুখ

    তাহারা নাচুক জ্বলুনির চোটে। তুমি পাও কোন্ সুখ

    দগ্ধ-মুখ সে রাম-সেনাদলে নাচিয়া হে সেনাপতি!

    শিব-সুন্দর-সত্য তোমার লভিল এ কি এ গতি?

    যদিই অসতী হয় বাণী মোর, কালের পরশুরাম

    কঠোর কুঠারে নাশিবে তাহারে, তুমি কেন বদনাম

    কিনিতেছ গুরু! কেন এত তব হিয়া-দগ্‌দগি জ্বালা?

    হোলির রাজা কে সাজাল তোমারে পরায়ে বিনামা-মালা?

    তোমার গোপন দুর্বলতারে, ছি ছি করে মসীময়

    প্রকাশিলে গুরু, এই খানে তব অতি বড় পরাজয়।

    তুমি ভিড়িও না গো-ভাগাড়ে-পড়া চিল-শকুনের দলে,

    শতদল-দলে তুমি যে মরাল শ্বেত-সায়রের জলে।

    ওঠ গুরু, বীর, ঈর্ষা-পঙ্ক-শয়ন ছাড়িয়া পুন,

    নিন্দার নহ, নান্দীর তুমি, উঠিতেছে বাণী শুন!

    উঠ গুরু উঠ, লহ গো প্রণাম, বেঁধে দাও হাতে রাখি,

    ঐ হেরো শিরে চক্কর মারে বিপ্লব-বাজপাখি।

    অন্ধ হয়ো না, বেত্র ছাড়িয়া নেত্র মেলিয়া চাহ—

    ঘনায় আকাশে অসন্তোষের বিদ্রোহ-বারিবাহ।

    দোতালায় বসি উতলা হয়ো না শুনি বিদ্রোহ-বাণী,

    এ নহে কবির, এ কাঁদন ওঠে নিখিল-মর্ম ছানি।

    বিদ্রূপ করি উড়াইবে এই বিদ্রোহ-তেতো জ্বালা

    সুরের তোমরা, কি করিবে তবু হবে কান ঝালাপালা

    অসুরের ভীম অসি-ঝনঝনে, বড় অসোয়াস্তি-কর!

    বন্ধু গো এত ভয় কেন? আছে তোমার আকাশ-ঘর!

    অর্গল এঁটে সেথা হতে তুমি দাও অনর্গল গালি,

    গোপীনাথ মলো? সত্য কি? মাঝে মাঝে দেখো তুলি জালি।

    বারীন ঘোষের দ্বীপান্তর আর মির্জাপুরের বোমা,

    লাল বাংলার হুমকানি,—ছি ছি এত অসত্য ও মা,

    কেমন করে যে রটায় এ সব ঝুটা বিদ্রোহী দল!

    সখা গো আমায় ধরো ধরো! মা গো, কত জানে এরা ছল!

    সই লো আমার কাতুকুতু-ভাব হয়েছে যে, ঢলে পড়ি!

    আঁচলে জড়ায়ে পা চলে না আর, হাত হতে পড়ে ছড়ি!

    শ্রমিকের গাঁতি বিপ্লব-বোমা, আ ম’লো তোমরা মরো!

    যত সব বাজে বাজখাঁই সুর, মেছুনি-বৃত্তি ধরো!

    যারা করে বাজে দুখভোগ ত্যাগ, আর রাজরোষে মরে,

    ঐ বোকাদের ইতর ভাষায় গালি দাও খুব করে।

    এই ইতরামি বাঁদরামি-আর্ট আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে

    হন্যে কুকুর পেট পালি আর হাউ হাউ মরি কেঁদে।

    এই শয়তানি করে দিনরাত বলো আর্টের জয়!

    আর্ট মানে শুধু বাঁদরামি আর মুখ-ভ্যাংচানো নয়!

    আপনার নাক কেটে দাদা এই পরের যাত্রা ভাঙা,

    ইহাই হইল আদর্শ আর্ট, নাকি-সুর, কান-রাঙা!

    আর্ট ও প্রেমের এই সব মেড়ো মাড়োয়ারি দলই জানে,

    কোনো বিদ্রোহ অসন্তোষের রেখা নাই কোনখানে!

    সব ভুয়ো দাদা, ও-সবে দেশের কিছুই হইবে নাকো,

    এমনই করিয়া জুতো খাও আর মলমল-মল মাখো!

    জ্ঞান-অঞ্জন-শলাকা তৈরি হতেছে এদের তরে,

    দেখিবে এদের আর্টের আঁটুনি একদিনে গেছে ছুঁড়ে!

    বন্ধু গো! গুরু! আঁখি খোলো, খোলো শ্রবণ হইতে তুলা,

    ঐ হেরো পথে গুর্খা-সেপাই উড়াইয়া যায় ধূলা!

    ঐ শোনো আজ ঘরে ঘরে কত উঠিতেছে হাহাকার,

    ভূধর প্রমাণ উদরে তোমার এবার পড়িবে মার!

    তোমার আর্টের বাঁশরির সুরে মুগ্ধ হবে না এরা,

    প্রয়োজন-বাঁশে তোমার আর্টের আর্টশালা হবে নেড়া!

    প্রেমও আছে গুরু, যুদ্ধও আছে, বিশ্ব এমনই ঠাঁই,

    ভাল নাহি লাগে, ভাল ছেলে হয়ে, ছেড়ে যাও, মানা নাই!

    আমি বলি— গুরু, বলো তাহাদেরে কোন বাতায়ন-ফাঁকে

    সজিনার ঠ্যাঙা সজনিরই মত হাতছানি দিয়ে ডাকে!

    যত বিদ্রুপই করো গুরু, তুমি জান এ সত্য-বাণী,

    কারুর পা চেটে মরিব না; কোনো প্রভু পেটে লাথি হানি

    ফাটাবে না পিলে; মরিব যেদিন মরিব বীরের মত,

    ধরা-মা’র বুকে আমার রক্ত রবে হয়ে শাশ্বত।

    আমার মৃত্যু লিখিবে আমার জীবনের ইতিহাস—

    ততদিন সখা সকলের সাথে করে নাও পরিহাস!

    ‘সর্বনাশের ঘণ্টা’ কবিতার উত্তরে পরলোকগত কবি মোহিতলাল মজুমদার ৮ই কার্তিক ১৩৩১ তারিখের সাপ্তাহিক ‘শনিবারে চিঠি’র বিশেষ বিদ্রোহ সংখ্যায় তার জবাব দেন ‘দ্রোণ-গুরু’ কবিতায়। নিম্নে কবিতাটি সম্পূর্ণ উদ্ধৃত হল—

    দ্রোণ-গুরু

    [কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধকালে দ্রোণাচার্য কুরু সেনাপতি পদে অভিষিক্ত হইলে, তিনি প্রাচীন ও অকর্মণ্য বলিয়া দ্রোহ-বিদ্বেষী কর্ণের বিদ্বেষ আরও বাড়িয়া যায়। এদিকে দ্রোণ-শিষ্য অর্জুনের কৃতিত্বও ক্রণের দুঃসহ হইয়া ওঠে। এই বিদ্বেষের কথা মহাভারতে উল্লিখিত আছে। কিন্তু নিম্নলিখিত ঘটনাটির কথা মূল মহাভারতে নাই। কর্ণাটদেশে প্রচলিত মহাভারতের তামিল-সংস্করণের একটি গাধা অবলম্বনে এই কবিতা রচিত হইয়াছে। দ্রোণাচার্যের মনে অর্জুনের প্রতি আন্তরিক স্নেহ নষ্ট করিবার জন্য, এবং তাঁহার উপর যাহাতে গুরুর নিদারুণ অভিশাপ বর্ষিত হয় এই উদ্দেশ্যে, অর্জুন কর্তৃক লিখিত বলিয়া একখানি গুরুদ্রোহসূচক কুৎসাপূর্ণ পত্র দ্রোণাচার্যের নিকট প্রেরিত হয়। বলা বাহুল্য, এই কৌশল সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হইয়াছিল।]

    কি বলিস তুই অশ্বত্থামা! আমি মরে যাই লাজে!

    আমি ব্রাহ্মণ, তবু বলিব না—ক্ষত্রিয়কুল-মাঝে

    হেন কাপুরুষ আছে কোনো ঠাঁই—ভীরু, আত্মম্ভরি—

    মিথ্যা দম্ভ গর্বের ভরে আপনারে বড় করি

    আপনার পূজা ষোড়শোপচারে মাগে যে গুরুর কাছে!

    অনুষ্ঠানের ত্রুটি পাছে হয়, সদা সেই ভয় আছে!—

    তাহারি লাগিয়া আক্রোশ করি শিষ্য হইয়া বীর

    বন্যবরাহ হনন করা সে ঘৃণ্য ব্যাধের তীর

    চিৎকার সহ নিক্ষেপ করে বাতাসের সনে রণ—

    বলে পাণ্ডব—কৌরব-গুরু আমি সে প্রিয়জন।

    পাণ্ডব সেকি? কোন পাণ্ডব? কে বা সে ছন্নমতি?

    আমার নিকটে অস্ত্রশিক্ষা!—হায় একি দুর্গতি!

    বলে, সে পার্থ!—কৃষ্ণ-সারথী! নব-অবতার নর!

    মহাবিপ্লব যুগান্তরের নবীন য]পদের সভাতলে,

    মুগ্ধ হইল লক্ষ্যভেদের অপূর্ব কৌশলে;

    যার বীরত্বে বিস্মিত নিজে শঙ্কর ত্রিপুরারি—

    দানিল দিব্য পাশুপত যারে দানবদহনকারী,

    যার প্রতিভায় ব্রাহ্মণ-দ্রোণ ব্রহ্মণ্যের চেয়ে

    মানিয়াছে বড় ক্ষাত্র-মহিমা শিষ্য যাহারে পেয়ে,

    —এই লিপি তার!—অশ্বত্থামা! হয়েছিস উন্মাদ?

    কি কথা বলিস? কে শুনালে তোরে এ হেন মিথ্যাবাদ?

    —অর্জুন?—আরে ছিছি, ছিছি ছিছি! তার হেন দুর্মতি!

    তার মুখে হেন অনার্য-বীণা!—আপন গুরুর প্রতি,

    মিথ্যা রটনা—এই অপবাদ মিথ্যার অভিনয়ে

    পটু হবে সেই! অসি ছেড়ে শেষে মসির পাত্র লয়ে

    —ছিটাইছে কালি, রণ-অঙ্গনে অঙ্গনা-রীতি ধরে!—

    রমণীর মত বাতাসে ভেজায়ে কোন্দল শুরু করে!

    বিরাটপুরীর অজ্ঞাতবাসে বৃহন্নলার কথা

    মনে আছে বটে—অকীর্তিকর!—সেথাকার বাচালতা

    পুরন্ধ্রীদের কুৎসা-কলহ, সেই নট-নটী লীলা

    স্বভাব নষ্ট করেছিল বুঝি? আজো অন্তঃশীলা

    নপুংসকের বিকৃত শোণিত কিণাঙ্ক-করমূলে

    বহিছে নাড়িতে? হায়, হতভাগ্য এখনো যায়নি ভুলে।

    গুরুনিন্দার পাতকের ভয় এতটুকু মনে নাই।

    আজ তুমি বড়! গুরুমারা চোর! তুমি মহাবীর, তাই

    এটা ক্ষুদ্র মশকের হুল সহিতে পারো না তুমি!

    —অত্যাচারীর খড়্‌গ ভাঙিবে, রাখিবে ভারত-ভূমি!

    হুলের আঘাতে, কুরুক্ষেত্রে ফেলে দিয়া গাণ্ডীব,

    রথ হতে নামি মৃত্তিকা ’পরে মাথা ঠোকে ঢিব্ ঢিব্!

    নারায়ণী-সেনা হাসিছে অদূরে, রঙ্গ দেখিছে তারা,

    আমার মাথা যে হেঁট হয়ে যায়, পশ্চিমে ঐ কারা—

    ফেরুপাল বুঝি—হর্ষিত চিতে চিৎকার করি ওঠে,

    সূর্যের মুখে অস্তমলিন হাসি বুঝি ঐ ফোটে।

    ***

    কেন তোর এই অধঃপতন বল্ দেখি, ফাল্গুনি!

    এই বিদ্বেষ ঈর্ষার জ্বালা কার তরে বল্ শুনি?

    আমি গুরু তোর, একা তোরি গুরু?—আর কেহ নাহি রবে?

    আজিকার এই সমরাঙ্গনে যদি কেউ যশ লভে—

    রণ-কৌশলে আর কেহ যদি আমারে প্রণাম করি

    দূর হতে পায় আমারি শিক্ষা-সাধনার কারিগরি—

    ধর্মক্ষেত্রে সে কি অধর্ম? তোমারি হইবে জয়?

    তোমার দর্পে আর কেহ যদি হেসে কুটি-কুটি হয়,

    সে কি তা মহা ধর্ম-দ্রোহ?—হয় যদি তাই হোক,

    তার লাগি মোর অপরাধ কিবা—কেন তায় এত শোক!

    আজ দেখিতেছি, একদিন সেই নিষাদের নন্দনে

    করেছুনু ঘোর অবিচার আমি মমতা অন্ধ মনে।—

    তোমারি লাগিয়া অঙ্গুলি তার চেয়েছিনু দক্ষিণা,

    সে পাপের সাজা কেবা দিবে আর ক্রুর অর্জুন বিনা

    আজ পুনারায় নবধানুকীর অঙ্গুলি কাটি লয়ে

    পাঠাতাম যদি তোমার সকালে—হর্ষে ও বিস্ময়ে

    গুরুদেব বলি কত বাখানিতে বৃদ্ধের বীরপনা!

    সে আর হবে না আর করিব না ধর্মের বঞ্চনা।

    এতকাল ধরি দিয়াছ যে গুরু-ভক্তির পরিচয়,

    সেই ভাল ছিল, তার বেশি এ যে হয়ে গেল অতিশয়!

    মনে ভেবে দেখো, কিবা মানে তার, কি বুঝিবে রাজগণ,—

    ধিক্কারে আজ মুখরিত হল কুরুদের প্রাঙ্গণ।

    ***

    না—না, না—না, না—না, একি এ প্রলাপ বকিতেছি বারবার!

    অশ্বত্থামা! ফের পড়, লিপি,—হয়নি পরিষ্কার!

    মোর প্রাণাধিক প্রিয়তম সেই কিরীটীর নহে লিপি,

    এ লিখেছে কোন কুলশীলহীন পরের প্রসাদজীবী!

    লেখার মাঝারে ওঠে না ফুটিয়া সেই মনোহর মুখ,

    আজানু-দীর্ঘ সেই বাহু তার, বিরাট বিশাল বুক!

    হ্রস্ব খর্ব এ কোন বামন উপানৎ পরি উঁচা

    হইবারে চায়, চুরি করা চূড়া মাথায় বেঁধেছে ছুঁচা!

    অর্জুন নিজে শ্যাম-কলেবর—কৃষ্ণের সখা সে যে!

    সে কি ঘৃণা করে কৃষ্ণবরণ? বধূ কৃষ্ণার তেজে

    বাহুতে বীর্য, বক্ষে জাগিল যৌবন-ব্যাকুলতা—

    সে করেছে গ্লানি মসীরূপ বলি? সম্ভব নহে কথা!

    এ কোন শবর কিরাতের গালি, অনার্য জাতি-চোর!

    নকল কুলীন! বর্ণ-গর্বে কুৎসা রটায় মোর!

    হয়েছে! হয়েছে! অশ্বত্থামা! জেনেছি এতক্ষণে—

    বীরকুলগ্লানি সেই নিন্দুকে এবার পড়েছে মনে!

    আমি ব্রাহ্মণ, চির-উজ্জ্বল ব্রাহ্মণ্যের শিখা

    ললাটে আমার মিথ্যা-দহন জ্বলে যে সত্যটীকা।

    রাজসভাতলে জনগণমাঝে করি না যে বিচরণ;

    পথ-কুক্কুর নীচ-সহবাস ত্যাজিয়াছি প্রাণপণ।

    তবু যে আমার ধনু নির্ঘোষে টঙ্কার-ঝঙ্গারে

    নিজে গায়ত্রী-ছন্দ-জননী আসিয়া দাঁড়ান দ্বারে।

    আমরা পর্ণ-কুটিরের তলে রাজার দুলাল বীর—

    গড্ডলিকার দল নহে—আসি মাটিতে নোয়ায় শির!

    আমি সাধিয়াছি আর্য-সাধনা-সনাতন সুন্দর!—

    যে-মন্ত্র-বলে শাশ্বতীসমা সদ্‌গতি লভে নর!

    ত্যাজি অনার্য-সৃষ্টপন্থা, অন্ত্যজ-অনাচার,

    ক্ষত্রিয় সাজি ক্ষত্রিয়ে দিছি ব্রাহ্মণ-সংস্কার।

    কর্ণপটহ বিদারণ করি, বিদারিয়া নভোতল।

    পথে পথে ফিরি ইতরের সাথে করি নাই কোলাহল

    যুগ-ধর্মের সুযোগ বুঝিয়া চির-সত্যের গ্লানি

    করি নাই কভু,—যশোলিপ্সার—স্বার্থের আপসানি!

    নিজ হৃদয়ের পুরীষ-পঙ্ক দুই হাতে ছড়াইয়া

    যুগবাণী বলি, ধ্রুব-শাশ্বত পদতলে গুঁড়াইয়া,

    যত মূর্খ ও ষণ্ডমার্কে ভক্তশিষ্য করি,

    এই দেবতার দিবারে করিনি পিশাচের শর্বরী!

    জানিস্ বৎস, কোন মহারথী—এ কোন নূতন গ্রহ,

    মোর সাথে চির-শত্রুতা মানি, বিদ্বেষ দুঃসহ

    পুষিয়াছে মনে?—বৈরী সে, যথা কৃষ্ণের শিশুপাল!—

    সত্যের এই মিথ্যা-বৈরী যুগে যুগে চিরকাল?

    আজ আসিয়াছে নূতন ছদ্মে শিষ্যের সাজ পরি—

    গুরু-শিষ্যের ভক্তি ও স্নেহ কুৎসার লবে হরি!

    চিনেছি তোমারে হে কপটচারী দাম্ভিক দুর্জন!

    বক্ষের মণি অর্জুন নও—পাদুকার অর্জুন!

    বীর সে পার্থ আর্ত হয় না স্বার্থের সঙ্কোচ,

    —গুরুহত্যার পাতকের ভয়ে ললাটের স্বেদ মোছে!

    ব্রজ-আঘাতে হয় না কাতর বীর সে সব্যসাচী—

    তারে কাবু করে গোটা দুই তিন বাতাসের মশা-মাছি!

    তাহারি কারণে উন্মাদ হয়ে করিবে সে গুরুদ্রোহ!

    একি পাপ! একি অহংকারের নিদারুণ সম্মোহ!

    সে কি পাণ্ডব! দ্রোণের শিষ্য ক্ষত্রিয়-চূড়ামণি!—

    খুলে ফেল্ তোর ক্ষত্রিয়-বেশ, ওরে পাণ্ডব-শনি!

    রাধেয় কর্ণ পরিচয় তোর। আর যাহা পরিচয়—

    গুরু ভার্গবে প্রতারণা করি সেজেছিলি শ্রোত্রিয়!

    সেই কীট তোরে ছাড়িল না আজও। সেদিন পড়িলি ধরা

    দংশন সহি।—আজ বিপরীত—হলি যে অর্ধমরা!

    জমদগ্নির অভিশাপ বহি পলায়ে আসিলি চোর!

    জাতি আপনার লুকাতে নারিলি, লজ্জা নাহি যে তোর!

    দ্রোণ-গুরু নয়, সার্থক তোর গুরু সে পরশুরাম—

    বিস্ময় মানি দম্ভে তোমার—রেখেছ গুরুর নাম!

    ***

    ওরে নির্ঘ্‌ণ! আপনি আপন বিষ্ঠার পর্বতে

    চড়ি বসিয়াছ—মনে করিয়াছ আঁধারিবে হেন মতে

    সবিতার মুখ! ঘোর যশো-রবি-রাহু হতে সাধ যায়!

    আরে, আরে, তোর সম্পর্ধায় দেখি জোনাকিও লাজ পায়!

    কেমনে আনিলি হেন কথা মুখে? যজ্ঞের হবিটুকু

    সন্তর্পণে রাখিয়াছি ঢেকে, তাও হেরি চাকু-চুকু

    করিয়া লেহন, সাধ যায়—সেথা উগারিতে একরাশি

    অমেধ্য যে সব উদরে রাজিছে—কতকালকার বাসি,

    চুরি করা যত গরহজমের!—পথে প্রান্তরে যার

    সৌরভ পেয়ে এতদিন পরে ভরিয়াছে সংসার

    লালা ও পঙ্কবিলাসীর দল—শবভুক নিশাচর,

    শকুনি, গৃধিনী, শৃগালের পাল—রসনা-তৃপ্তিকর

    পাইয়াছ ভোজ! ভাবিয়াছ বুঝি সেই রস উপাদেয়?

    দেব-যজ্ঞের আহুতি সে ঘৃত সোমরস হবে হেয়?

    উন্মাদ—তুই উন্মাদ! তাই পতনের কালে আজ

    বিষ-বিদ্বেষ উথলি উঠেছে, নাই তোর ভয় লাজ!

    আমারে করেছে কুরু-সেনাপতি কৌরব-নৃপমণি,

    তাই হিংসায় পুরীষ-ভাণ্ডে মাছি ওঠে ভনভনি!

    তাই তাড়াতাড়ি পার্থের নামে কুৎসার ছল ধরে

    তারি নামে লিপি পাঠালি আমারে কুৎসিত গালি ভরে

    আমি ব্রাহ্মণ, দিব্যচক্ষে দুর্গতি হেরি তোর—

    অধঃপাতের দেরি নাই আর, ওরে হীন জাতি-চোর!

    আমার গায়ে যে কুৎসার কালি ছড়াইলি দুই হাতে—

    সব মিথ্যার শাস্তি হবে সে এক অভিসম্পাতে,

    গুরু ভার্গব দিল যা তুহারে! ওরে মিথ্যার রাজা।

    আত্মপূজার ভণ্ড পূজারী! যাত্রার বীর সাজা

    ঘুচিবে তোমার, মহাবীর হওয়া মর্কট-সভাতলে!

    দুর্দিনের এই মুখোশ-মহিমা তিতিবে অশ্রুজলে!

    অভিশাপরূপী নিয়তি করিবে নিদারুণ পরিহাস

    চরমক্ষণে মেদিনী করিবে রথের চক্র গ্রাস!

    মিথ্যায় ভুলি যে মহামন্ত্র গুরু দিয়েছিল কানে,

    বড় প্রয়োজনে পড়িবে না মনে, সে বিফল সন্ধানে

    নিজেরি অস্ত্র নিজেরে হানিবে—শেষ হবে অভিনয়,

    এতদিন যাহা নেহারি সকলে মেনেছিল বিস্ময়!

    ‘বিদায়-মাভৈ’ ১৩৩০ চৈত্রের ‘প্রবাসী’তে এবং ‘বাংলার মহাত্মা’ ১৩৩২ জ্যৈষ্ঠে ৫ম বর্ষের ২৬শ সংখ্যক ‘বিজলী’তে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘অশ্বিনীকুমার’ ২১শে মাঘ ১৩৩২ মুতাবিক ৪ঠা জানুয়ারি ১৯২৬ তারিখে ‘লাঙল’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। রবিশালের কর্মযোগী অশ্বিনীকুমার দত্তের মৃত্যুতে এই শোক-কবিতা রচিত।

    ‘ইন্দু-প্রয়াণ’ কবিতাটির ২৪শ চরণ কবিপত্নী প্রমীলা নজরুল ইসলাম কর্তৃক প্রকাশিত সংস্করণে মুদ্রিত আছে এইরূপ—

    এবারে হে কবি করিব পূর্ণ এ চির-কবি পুরে! …

    এই পঙ্‌ক্তিটি প্রথম সংস্করণে ছিল এইরূপ—

    এবার হে কবি করিব পূর্ণ ঐ চির-কবি পুরে! …

    ‘দিল-দরদী’ ১৩২৮ আশ্বিনের ‘মোসলেম-ভারতে’ প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে কবিতার শেষ দুই চরণ ছিল এরূপ—

    বাদশা কবি! সালাম জানায় বুনো তোমার ছোট্ট ভাই!

    কইতে গিয়ে অশ্রুতে মোর যায় ডুবে যায় সব কথাই।

    কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ১০ই আষাঢ় মুতাবিক ১৯২২ খৃষ্টাব্দের ২৫শে জুন রাত্রি ২৷৷৹ (আড়াইটায়) দুরন্ত ব্রঙ্কাইটিস্ রোগে দেহত্যাগ করেন। তাঁর স্মরণে নজরুল ইসলাম ১৩২৯ শ্রাবণে দ্বিতীয় বর্ষ ৩৩শ সংখ্যক ‘বিজলী’তে লেখেন ‘সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ’ কবিতা।

    ‘সত্য-কবি’ ভারতী পত্রিকায় ‘কবি সত্যেন্দ্র’ শিরোনামে এবং ‘সত্যন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি’ মাসিক বসুমতীতে ‘প্রত্য-প্রয়াণ-গীতি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ‘ভারতী’ হতে ‘কবি সত্যেন্দ্র’ ১৩২৯ আষাঢ়ের ‘উপাসনা’য় উদ্ধৃত হয়েছিল।

    ‘অন্তর-ন্যাশনাল-সঙ্গীত’, ‘রক্ত-পতাকার গান’ ও ‘জাগর-তূর্য’ যথাক্রমে ১৩৩৪ সালের ৮ই বৈশাখ, ১৫ই বৈশাখ ও ২২শে বৈশাখ তারিখের ‘গণবাণী’তে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘যুগের আলো’ ১৩৩৩ ফাল্গুনের ‘যুগের আলো’তে এবং ‘পথের দিশা’ ‘অগ্রদূত’-এ প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘যা শত্রু পরে পরে’ ১৩৩৩ আশ্বিনে বর্ধমানের ‘শক্তি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল; ‘শক্তি’ হতে ২৫শে আশ্বিন ১৩৩৩ তারিখে ‘গণবাণী’তে উদ্ধৃত হয়েছিল।

  • বাঁধনহারা

    বাঁধনহারা

    বাঁধনহারা

    ‘বাঁধনহারা’ পত্রোপন্যাস বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত প্রথম উপন্যাস। করাচিতে থাকাকালীন তিনি ‘বাঁধনহারা’ উপন্যাস রচনা শুরু করেন। ১৯২১ খৃষ্টাব্দ মুতাবিক ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ থেকে প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় ‘বাঁধনহারা’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মুতাবিক ১৯২৭ সালের জুন মাসে ‘বাঁধনহারা’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশ করেন ডিম. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা থেকে গোপালদাস মজুমদার। মূল্য দুই টাকা।

    সংক্ষেপে উপন্যাসটির কাহিনী হচ্ছে, — নুরু মাহবুবা একে অন্যকে পছন্দ করে এবং তাদের বিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়। এই সময়ে নুরু বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগদান করে। নুরুর সেনাবাহিনীতে যোগদানের পিছনে দেশ ও জাতিকে রক্ষার কোন তাগিদ ছিল না। মাহবুবা, রাবেয়া ও সাহসিকা— তিন বাল্যসখী—তাদের মধ্যে পত্র যোগাযোগ হয়। সাহসিকা তার নামের মতই সাহসী ও প্রতিবাদী। চিরকুমারী সাহসিকা নারীদের উপর অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। মাহবুবা নুরুল হুদাকে প্রচণ্ড ভালবাসে। কিন্তু নুরুল হুদা কোন বাঁধনে জড়াতে চায় না। অবশেষে মাহবুবার বিয়ে হয়ে যায় চল্লিশোর্ধ্ব এক জমিদারের সঙ্গে। কিছুদিন বাদেই মাহবুবা বিধবা হয়ে যায়। নুরুল হুদাকে সে লেখে যে, সে মক্কা ও মদিনায় তীর্থ ভ্রমণে যাবে এবং নুরুল হুদার কর্মস্থল বাগদাদেও যেতে পারে। নুরুল হুদা মাহবুবাকে নিষেধ করে না। তাদের দুজনের দেখা হওয়ার সম্ভাবনার মাধ্যমে শেষ হয় উপন্যাসটি।

    ‘বাঁধন হারা’ উপন্যাসে মোট চরিত্রের সংখ্যা দশটি— নুরুল হুদা, মাহবুবা, রাবেয়া, সাহসিকা, আয়েশা, খুকি/আনারকলি, মা/রোকেয়া, মনুয়ার, রবিউল ও সোফিয়া। রাবেয়া ও রবিউল দম্পতির শিশুকন্যা খুকি বা আনারকলি ছাড়া প্রত্যেকেই চিঠিতে নিজেদের চরিত্র ও ভাবনা ধারণ করে।

    ‘বাঁধনহারা’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্রোপন্যাস। নজরুল ‘বাঁধনহারা’র মাধ্যমে বাঙালিদের প্রথম আধুনিক যুদ্ধ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জ্ঞাত করেছেন। উপন্যাসে নজরুলের সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতার ছাপ রয়েছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় প্রেমের আখ্যান হলেও সাহসিকার পত্রে যে বিদ্রোহিতার আভাস আছে, তাই পরবর্তীকালে ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় পূর্ণাঙ্গতা লাভ করেছে।

    ২০১৩ সালের ঢাকা রিডিং সার্কেলের একদল অনুবাদক— তানভিরুল হক, আসফা খাতুন, শিরীন হাসানাত ইসলাম, আয়েশা কবীর, জ্যাকি কবির, সায়েদা করিম খান, শাহরুখ রহমান ও নিয়াজ জামান, ‘বাঁধন হারা’ উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ করেন। ‘শহীদ কাজী’র প্রচ্ছদে অনুবাদ কর্মটি ‘আনফেটার্ড’ শিরোনামে ঢাকার নিমফিয়া পাবলিকেশন হতে প্রকাশিত হয়।

  • সিন্ধু হিন্দোল

    সিন্ধু হিন্দোল

    সিন্ধু হিন্দোল

    ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ মুতাবিক ১৯২৭ খৃষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রকাশক শ্রীগোপালদাস মজুমদার, ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। মুদ্রাকর শ্রীনিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য, সারস্বত প্রিণ্টিং ওয়ার্কস, ৬ নিবেদিতা লেন, বাগবাজার, কলিকাতা। রয়্যাল অক্টোভো আকার; ৫৮ পৃষ্ঠা; মূল্য এক টাকা ছয় আনা।

    এই কাব্যগ্রন্থে মোট ১৯টি কবিতা রয়েছে। এই গ্রন্থের কবিতাগুলো লেখা হয় ১৯২৬ খৃষ্টাব্দে, এই বছরের জুলাই মাসে হেমন্তকুমার সরকারকে সঙ্গে নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম চট্টগ্রামে আসেন। কয়েকদিন পর হেমন্তকুমার সরকার কলকাতায় ফিরে গেলেও মুহম্মদ হবীবুল্লাহ্ বাহারের আমন্ত্রণে তাঁর মাতামহ শিক্ষাব্রতী মরহুম খান বাহাদুর আবদুল আজিজ বিএ-র তামাকুমণ্ডীর বাড়িতে নজরুল কিছুকাল অবস্থান করেন। এখানেই তিনি ২৭ জুলাই থেকে ২ আগষ্টের মধ্যে ‘অ-নামিকা’, ‘গোপন-প্রিয়া’, ‘সিন্ধু—প্রথম তরঙ্গ’, উৎসর্গ-পৃষ্ঠার পূর্বে যোজিত দুটি চরণ, ‘সিন্ধু—দ্বিতীয় তরঙ্গ’, মুহম্মদ হবীবুল্লাহ্ বাহার ও তাঁর ভগ্নী শামসুন্নাহারকে উৎসর্গ-কবিতা এবং ‘সিন্ধু—তৃতীয় তরঙ্গ’, রচনা করেন। ‘সন্ধ্যা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘বাংলার আজিজ’ কবিতাটি এবং ‘বুলবুল’ গ্রন্থে সঙ্কলিত একাধিক গানও এ-সময়ে রচিত হয়। বিভিন্ন কবিতায় পাণ্ডুলিপি ও মুদ্রিত রূপের মধ্যে পাঠভেদে দেখা যায়।

    ‘সিন্ধু’ প্রথম তরঙ্গ ১৩৩৩ অগ্রহায়ণের, দ্বিতীয় তরঙ্গ ১৩৩৩ পৌষের এবং তৃতীয় তরঙ্গ ১৩৩৩ মাঘের ‘কালিকলমে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘পথের স্মৃতি’ গানটি ১৩২৭ মাঘের ‘নারায়ণ’ পত্রিকায় ‘ছায়ানট’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।

    ‘অতল পথের যাত্রী’ ১৩৩৩ কার্তিকের ‘বঙ্গবাণী’তে বের হয়েছিল।

    ‘অভিযান’ ১৩৩৩ ভাদ্রে ঢাকার মাসিক ‘অভিযান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ‘চাঁদনী রাতে’ রচিত হয়েছিল ‘জয়দেবপুরের পথে’; এটি ১৩৩৩ কার্তিকের ‘অভিযানে’ প্রকাশের জন্য দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু অভিযান অকালে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এটি ১৩৩৭ বৈশাখের ‘জয়তী’তে প্রকাশিত হয়। মূল কবিতাতে চরণ সংখ্যা ছত্রিশ; আটাশ চরণের পরে আছে নিম্নের ছয়টি চরণ—

    ছুটিতেছে গাড়ি, ছায়াবাজি-সম কত কথা ওঠে মনে,

    দিশাহারা-সম ছোটে খ্যাপা মন জলে থলে নভে বনে!

    এলোকেশে মোর জড়ায়ে চরণ কোন্ বিরহিনী কাঁদে,

    যত প্রিয়-হারা আমারে কেন গো বাহু-বন্ধনে বাঁধে!

    নিখিল বিরহী ফরিয়াদ করে আমার বুকের মাঝে,

    আকাশে-বাতাসে তাদেরি মিলন তাদেরি বিরহ বাজে।

    গ্রন্থভুক্ত কবিতাটিতে কয়েকটি চরণ কিছু পরিবর্তন করা হয়েছিল। মূল কবিতায় পঞ্চম ও ষষ্ঠ এবং নবম ও দশম চরণগুলি নিম্নরূপ—

    নীলম প্রিয়ার নীলা গুল-রুখ্ নাজুক নেকাবে ঢাকা,

    দেখা যায় ঐ নতুন চাঁদের কালোতে আবছা আঁকা।

    * * *

    নীহার-নেটের ঝাপসা মশারি; যেন ‘বর্ডার’ তারি

    দিক-চক্রের ছায়া-ঘন ঐ সবুজ তরুর সারি।

    এই কবিতা সম্পর্কে কথাশিল্পী আবুল ফজল লিখেছেন—

    ‘তিনি [নজরুল ইসলাম] সে-সময় [১৯২৬ সালে কেন্দ্রীয় আইন-সভায় নির্বাচন-কালে] একদিন আবদুল কাদিরকে সঙ্গে নিয়ে জয়দেবপুর গিয়াছিলেন। গাড়িতে বসে তার সুবিখ্যাত কবিতা ‘চাঁদনী রাতে’ রচনা করেন। রাত্রে আকাশে যখন চাঁদ উঠেছে, চাঁদের আলোয় সারা আকাশ যখন তোলপাড়, আর প্রকৃতি যখন উতলা, তখন কবির মনের ত্রিসীমানায়ও ঘেঁষতে পারেনি নির্বাচন কি গজনভী সাহেব।’—

    —[সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবন, ৪২০-৪২১ পৃষ্ঠা]

    নির্বাচনে কবির প্রতিদ্বন্ধিতা সম্পর্কে ১২ই অক্টোবর ১৯২৬ মুতাবিক ২৫শে আশ্বিন ১৩৩৩ তারিখের ‘গণবাণী’তে লেখা হয়—

    ‘বাংলার বরেণ্য কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকা বিভাগের মুসলমান কেন্দ্র হতে ভারতীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য-পদ-প্রার্থী হয়েছেন।’

    ‘মাধবী-প্রলাপ’ ১৩৩৩ জ্যৈষ্ঠের ‘কালিকলমে’ প্রকাশিত হয়। প্রথম বর্ষে ‘কালিকলমের’ সম্পাদক ছিলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও মুরলীধর বসু; কৃষ্ণনগর হতে কবি ১০-৪-২৬ তারিখের একপত্রে শৈলজানন্দকে লেখেন—

    ‘মাধবী-প্রলাপ পাঠালুম। বৈশাখেই দিও। দরকার হলে অদল-বদল করে নিও কথা—অবশ্য ছন্দ রক্ষা করে।’

    —[নজরুল-রচনা-সম্ভার, কলিকাতা সংস্করণ, ২৫৬+১৫ পৃষ্ঠা]

    ‘দ্বারে বাজে ঝন্‌ঝার জিঞ্জির’ ১৩৩৪ বৈশাখের ‘কল্লোল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

    কাজী নজরুল ইসলাম ‘সিন্দু-হিন্দোল’ কাব্যগ্রন্থটি ‘হবীবুল্লাহ্ বাহার ও শামসুননাহার’কে উৎসর্গ করেছিলেন। শামসুন্নাহার ছিলেন হবীবুল্লাহ বাহারে বোন, তিনিও কবিতা লিখে পাঠক প্রিয় হয়েছিলেন—তাঁর কবি নাম ‘শামসুন্নাহার মাহমুদ’। উৎসর্গ পাতার পূর্বে যে দুটি চরণ ছিল, তা হল—

    আলোর মতো জ্বলে ওঠো। ঊষার মতো ফোটো

    তিমির চিরে জ্যোতির মতো প্রকাশ হয়ে ওঠো!

    (তামাকুমণ্ডী)

    চট্টগ্রাম, ৩০.৭.২৬

  • সঞ্চিতা

    সঞ্চিতা

    সঞ্চিতা

    কাজী নজরুল ইসলাম রচিত নির্বাচিত গান ও কবিতার সঙ্কলন ‘সঞ্চিতা’ প্রথম প্রকাশিত হয় আশ্বিন ১৩৩৫ বঙ্গাব্দ মুতাবিক অক্টোবর ১৯২৮ খৃষ্টাব্দে। নজরুলের কাব্য-সাহিত্যের প্রতিনিধিত্বমূলক এই কাব্য সঙ্কলনটি বিশেষ সমাদৃত। বহুল পরিচিত ও প্রচলিত এই সঙ্কলনটি অনেক সংস্করণের সৌভাগ্য লাভ করেছিল।

    কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘সঞ্চিতা’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মাসাধিকাল আগে লিখিত এক পত্রে এই গ্রন্থকে ‘আমার জীবনের সঞ্চিত শ্রেষ্ঠ ফুলগুলি দিয়া রচিত পুষ্পাঞ্জলি’ আখ্যায়িত করেছেন। তিনি উক্ত পত্রে এগ্রন্থের নামকরণ প্রসঙ্গেও লিখেছেন, ‘আমার আজ পর্যন্ত লেখা সমস্ত কবিতা ও গানের সর্বাপেক্ষা ভাল যেগুলি—সেইগুলি চয়ন করিয়া একখানা বই ছাপাইতেছি ‘সঞ্চিতা’ নাম দিয়া’।

    প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, কাজী নজরুল ইসলামের ‘সঞ্চিতা’ গ্রন্থের দুটি সংস্করণ প্রায় একই সময়ে মাত্র বারো দিনের ব্যবধানে প্রকাশিত হয়। বেঙ্গল লাইব্রেরির তালিকানুযায়ী বর্মণ পাবলিশিং হাউস ‘সঞ্চিতা’ প্রকাশ করে ২ অক্টোবর ১৯২৮ তারিখে। এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ২+১৩০ এবং মূল্য ছিল দেড় টাকা। এতে ‘অগ্নি-বীণা’, ‘ঝিঙে ফুল’, ‘সর্বহারা’, ‘ফণি-মনসা’, ‘ছায়ানট’, ‘দোলন-চাঁপা’, ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ ও ‘চিত্তনামা’ গ্রন্থ থেকে কবিতা ও গান সঙ্কলিত হয়। ১৪ অক্টোবর ১৯২৮ তারিখে ডি. এম. লাইব্রেরি কর্তৃক প্রকাশিত হয় ‘সঞ্চিতা’র আরেকটি সংস্করণ। এই সংস্করণে পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৩+২২৩ এবং মূল্য ছিল আড়াই টাকা। ডি. এম. লাইব্রেরির এই সংস্করণে যে কয়টি গ্রন্থ থেকে কবিতা ও গান সঙ্কলিত হয় সেগুলো হল— ‘অগ্নি-বীণা’, ‘দোলন-চাঁপা’, ‘ছায়ানট’, ‘সর্বহারা’, ‘ফণি-মনসা’, ‘সিন্ধু-হিন্দোল’, ‘চিত্তনামা’, ‘ঝিঙে ফুল’, ‘বুলবুল’, ও ‘জিঞ্জির’। ‘সঞ্চিতা’র এই সংস্করণে আটাত্তরটি কবিতা ও সতেরোটি গান সন্নিবেশিত হয়েছে।

    ‘সঞ্চিতা’র ডি. এম. লাইব্রেরি সংস্করণ উৎসর্গ করা হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। উৎসর্গ পত্রে লেখা হয়—

    বিশ্বকবিসম্রাট

    শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    শ্রীশ্রীচরণারবিন্দেষু—

    অধুনা বাংলাদেশে ‘সঞ্চিতা’ গ্রন্থের প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে ঢাকাস্থ ‘কবি নজরুল ইন্সটিটিউট’ এর নতুন সংস্করণ প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছে। এতে ডি. এম. লাইব্রেরি প্রকাশিত ‘পঞ্চম সংস্করণে’র পাঠ অনুসরণ করা হয়েছে। এবং ক্ষেত্রে ডি. এম. লাইব্রেবি প্রকাশিত ‘সঞ্চিতা’র সপ্তপঞ্চাশৎ সংস্করণের দ্বিত্ব-বর্জিত সংশোধিত সংস্করণের বানান রক্ষিত হয়েছে।

    একই কবিতা ও গান একাধিকবার প্রকাশিত হয় বিবেচনা করে ‘সঞ্চিতা’র এডুলিচার অনলাইন (বর্তমান) সংস্করণে ‘সঞ্চিতা’য় প্রকাশিত কবিতা ও গানগুলোকে পৃথকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, বরং গ্রন্থের একটি সূচিপত্র সন্নিবেশিত করা হল যাতে পাঠক মূল গ্রন্থ থেকে কবিতা ও গানগুলো পাঠ করতে পারেন।

    সূচিপত্র

  • বুলবুল

    বুলবুল

    বুলবুল

    ‘বুলবুল’ কাজী নজরুল ইসলাম রচিত গীতিগ্রন্থ, এটিই তাঁর প্রথম গ্রন্থ যাতে শুধু গান প্রকাশিত হয়েছিল। বুলবুল প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মুতাবিক নভেম্বর ১৯২৮, প্রকাশক গোপালদাস মজুমদার, ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যাক ৮+৭০; মূল্য এক টাকা; রাজসংস্করণ পাঁচ সিকা। তাতে মোট ৪২টি গান অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই বঙ্গাব্দের চৈত্রে গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হলে তাতে ‘নূতন গান’ বিভাগে সাতটি গান সংযোজিত হয়েছিল। ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের পৌষের ‘সওগাতে’ ‘অমলেন্দু দাশগুপ্ত’ ‘বুলবুলের কবি’ শিরোনামে ‘বুলবুল’ গ্রন্থের একটি আলোচনা প্রকাশ করেন, এটি গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণের গোড়ায় সন্নিবেশিত হয়। ‘বুলবুলে’র তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ভাদ্রে; প্রকাশক গোপালদাস মজুমদার, ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যাক ৮+১৬+৮০; মূল্য এক টাকা চার আনা; রাজসংস্করণ দেড় সিকা। বাংলা একাডেমির নজরুল রচনাবলীতে এই সংস্করণের পাঠ অনুসৃত হয়েছে।

    ‘বাগিচায় বুল্‌বুলি তুই’ ১৩৩৩ মাঘের ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত হয়; রচনার স্থান কৃষ্ণনগর, রচিত হয়েছে ৮ই অগ্রহায়ণ ১৩৩৩।

    ‘আমারে চোখ ইশারায়’ ১৩৩৩ চৈত্রের ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত হয়, ১৩৩৪ আষাঢ়ে ‘কল্লোল’ হতে ‘সওগাত’ পত্রিকায় উদ্ধৃত হয়।

    ‘বসিয়া বিজনে কেন একা মনে’ ১৩৩৩ ফাল্গুনের ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘ভুলি কেমনে আজও যে মনে’ ১৩৩৪ জ্যৈষ্ঠের ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘কেন কাঁদে পরাণ কি বেদনায়’ ১৩৩৪ শ্রাবণের ‘নওরোজে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘মৃদুল বায়ে বকুল-ছায়ে’ ১৩৩৩ মাঘের ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘কে বিদেশী বন-উদাসী’ ১৩৩৪ পৌষের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয় এবং গানটির কবিকৃত স্বরলিপি ১৩৩৪ চৈত্রের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘করুণ কেন অরুণ আঁখি’ এবং ‘এত জল ও-কাজল চোখে ১৩৩৪ জ্যৈষ্ঠের ‘বঙ্গবাণী’তে প্রকাশিত হয়। এই গান দুটি কবিকৃত স্বরলিপিসহ যথাক্রমে ১৩৩৪ আষাঢ় ও আশ্বিনের ‘নওরোজে’ পুনঃপ্রকাশিত হয়।

    ‘আসে বসন্ত ফুল-বনে’ ১৩৩৩ পৌষের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়। রচনার স্থান ও তারিখ—কৃষ্ণনগর, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৩৩৩। পাদটীকায় মুদ্রিত আছে — ‘বিখ্যাত উর্দু গজল ‘কিসকে খেরামে নাজ্‌নে কবর্‌মে দিল্ হিলা দিয়া’—সুর।

    ‘দুরন্ত বায়ু পুরবঁইয়া’ ১৩৩৩ ফাল্গুনের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়। রচনার স্থান ও তারিখ—কৃষ্ণনগর, ১ পৌষ ১৩৩৩। পাদটীকায় মুদ্রিত আছে— “উর্দু গজল : ‘নাজ্‌ভি হোতা রহে হোতি রহে বে-দাদ্ ভি’—সুর।”

    ‘চেয়ো না সুনয়না’ ১৩৩৪ অগ্রহায়ণের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘নিশি ভোর হল জাগিয়া’ ১৩৩৪ চৈত্রের ‘প্রগতি’তে প্রকাশিত হয়।

    ‘এ বাসি বাসরে আসিলে কে গো’ ১৩৩৫ বৈশাখের ‘প্রগতি’তে কবিকৃত স্বরলিপি সহ প্রকাশিত হয়।

    ‘কেন দিলে এ কাঁটা’ ১৩৩৪ ভাদ্রের ‘নওরোজে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘সখি বলো বঁধুয়ারে নিরজনে’ ১৩৩৪ চৈত্রের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘নহে নহে প্রিয় এ নয় আঁখিজল’ ১৩৩৫ জ্যৈষ্ঠের এবং ‘পরদেশী বঁধূয়া এলে কি এতদিনে’ ১৩৩৪ চৈত্রের ‘কালিকলমে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘আসিলে এ ভাঙা ঘরে’ ১৩৩৪ শ্রাবণের ‘নওরোজে’ কবিকৃত স্বরলিপিসহ প্রকাশিত হয়।

    ‘আজি দোল-পূর্ণিমাতে’ ১৩৩৪ চৈত্রের এবং ‘আজি এ কুসুম-হার’ ১৩৩৫ আষাঢ়ের ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘গরজে গম্ভীর গগনে কম্বু’, ‘হাজার তারার হার হয়ে গো’, ‘অধীর অম্বরে গুরু গরজনে’, ‘চরণ ফেলি গো মরণ-ছন্দে’ এবং ‘নমো হে নমো যন্ত্রপাতি’ ১৩৩৪ শ্রাবণের ‘নওরোজে’ ‘সারা ব্রিজ’ (সেতুবন্ধ) নাটিকার গান-রূপে প্রকাশিত হয়।

    ‘ঝরে ঝরঝর কোন গভীর গোপন ধারা’, ‘হৃদয় যত নিষেধ হানে’, ‘শুকালে মিলন-মালা’, এবং ‘স্মরণ-পারের ওগো প্রিয়’ ১৩৩৪ আষাঢ়ের ‘নওরোজে’ ‘ঝিলিমিলি’ একাঙ্কিকার গানরূপে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘গহীন রাতে ঘুম কে এলে ভাঙাতে’ ১৩৩৫ ভাদ্রে ‘ধূপছায়া’য় ও ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘কোন্ শরতে পূর্ণিমা-চাঁদ আসিলে এ ধরাতল’ ৩১শে ভাদ্র ১৩৩৫ মুতাবিক ১৬ই সেপ্টেম্বর ১৯২৮ তারিখে কলিকাতা ইউনিভার্সিটি ইন্‌স্টিটিউট হলে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (জন্ম : ৩১শে ভাদ্র ১২৮৩ মুতাবিক ১৫ই সেপ্টেম্বর ১৮৭৬) জন্ম-জয়ন্তী উৎসবে শ্রীমতী সাহানা দেবী কর্তৃক গীত এবং ১৩৩৫ আশ্বিনের ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে’ ১৩৩৪ জ্যৈষ্ঠের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়; পাদটীকায় মুদ্রিত আছে— ‘উর্দু গজল “নাজ্ ভি হোতা রহে হোতি রহে বেদাদ্ ভি”—সুর।’

    ‘কেন আন ফুল-ডোর’ রচনার স্থান ও তারিখ—‘নিমতিতা, মুর্শিদাবাদ, ১৯শে অগ্রহায়ণ ১৩৩৫’ । গানটি ১৩৩৫ মাঘের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘কেমনে রাখি আঁখি-বারি চাপিয়া’ ১৩৩৫ ফাল্গুণের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়।

  • জিঞ্জির

    জিঞ্জির

    জিঞ্জির

    ‘জিঞ্জির’ ১৩৩৫ সালে মুতাবিক ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়; প্রকাশক শ্রীগোপালদাস মজুমদার, ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। মুদ্রাকর শ্রী অমূল্যচন্দ্র ভট্টাচার্য, ভট্টাচার্য প্রিণ্টিং ওয়ার্কস, ২ নিবেদিতা লেন, কলিকাতা। রয়্যাল অক্টোভো আকার, ২ + ৮০ পৃষ্ঠা, মূল্য ১৷৷৹ (দেড় টাকা)।

    ‘বার্ষিক সওগাত’ ও ‘খালেদ’ ১৩৩৩ সালের প্রথম ‘বার্ষিক সওগাত’ পত্রিকায় বের হয়েছিল। ‘বার্ষিক সওগাত’ কবিতাটির নিচে রচনার স্থান ও তারিখ মুদ্রিত ছিল— কৃষ্ণনগর, ২৫শে অগ্রহায়ণ, ’৩৩। ‘বার্ষিক সওগাত’ ১৩৩৩ মাঘের সওগাতে উদ্ধৃত হয়েছিল।

    ‘অঘ্রানের সওগাত’ ১৩৩৩ অগ্রহায়ণের ও ‘মিসেস এম. রহমান’ ১৩৩৩ মাঘের সওগাতে প্রকাশিত হয়। ‘মিসেস্ এম. রহমান’-এর পাদটীকায় বলা হয়— ‘গত ২০শে ডিসেম্বর (১৯২৬) সোমবার রাত্রি ১১টা ৪৫ মিনিটের সময় জান্নাতবাসিনী হইয়াছেন।’ মিসেস এম. রহমানের পূর্ণ নাম মুসাম্মাৎ মাসুদা খাতুন; তিনি হুগলি জজকোর্টের উকিল খান বাহাদুর মৌলভি মজহারুল আনোয়ার চৌধুরী সাহেবার জ্যেষ্ঠা কন্যা এবং শ্রীরামপুরের তদানীন্তন সাব-রেজিষ্টার কাজী মাহমুদুর রহমান সাহেবের পত্নী ছিলেন। ‘মা ও মেয়ে’ নামে তাঁর একখানি অসম্পূর্ণ উপন্যাস ১৩২৯ আষাঢ় হতে ‘সহচর’-এ ধারাবাহিকরূপে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর প্রায় ৮ বছর পরে ১৩৩৪ অগ্রহায়ণে তাঁর কন্যা মাহফুজা খাতুন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ১০টি প্রবন্ধ সংগ্রহিত করে ‘চানাচুর’ নামে ৮৩ পৃষ্ঠার একটি বই বের করেন।

    ‘নকিব’ ১৩৩২ মাঘে বরিশালের পাক্ষিক ‘নকীব’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘সুবহ্-উন্মেদ’ ১৩৩১ পৌষের ‘সাম্যবাদী’তে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘খোশ-আমদেদ’ ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে ফেব্রুয়ারি রবিবার ঢাকায় মুসলিম সাহিত্যসমাজের প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে কবি-কর্তৃক গীত এবং ১৩৩৩ চৈত্রে মুসলিম সাহিত্যসমাজের মুখপত্র প্রথম বার্ষিক ‘শিখা’য় প্রকাশিত হয়েছিল। ১৩৩৩ চৈত্রের সওগাতে উহা পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল।

    ‘নওরোজ’ ১৩৩৪ আষাঢ়ের এবং ‘ভীরু’ ও ‘চিরঞ্জীব জগলুল’ ১৩৩৪ ভাদ্রের নওরোজে বের হয়েছিল।

    ‘অগ্রপথিক’ ১৩৩৪ অগ্রহায়ণের সওগাতে প্রকাশিত হয়েছিল। পাদটীকায় স্বীকৃতি ছাপা হয়েছিল— ‘হুইটম্যানের অনুরণনে।’

    ‘ঈদ-মোবারক’ ১৩৩৪ বৈশাখের, ‘আয় বেহেশতে কে যাবি আয়’ ও ‘আমানুল্লাহ’ ১৩৩৪ মাঘের এবং ‘এ মোর অহঙ্কার’ ১৩৩৪ চৈত্রের সওগাতে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘ওমর ফারুক’ ১৩৩৪ সালের দ্বিতীয় বার্ষিক সওগাতে বের হয়েছিল।

  • চক্রবাক

    চক্রবাক

    চক্রবাক

    কাজী নজরুল ইসলামের ‘চক্রবাক’ কাব্যগ্রন্থ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে মুতাবিক ১৯২৯ খৃষ্টাব্দের আগস্টে; প্রকাশক শ্রীগোপালদাস মজুমদার; ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। প্রবাসী প্রেস, ৯১ আপার সার্কুলার রোড, কলিকাতা হতে শ্রীসজনীকান্ত দাস কর্তৃক মুদ্রিত; পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪+৭৮; মূল্য ১৷৷৹ (দেড় টাকা)।

    ১৯২৯ সালের জানুয়ারিতে কাজী নজরুল ইসলাম আবার চট্টগ্রামে আসেন এবং তামাককুণ্ডীতে অবস্থান করেন। উল্লেখ্য, এর আগে ১৯২৬ সালে জুলাই মাসে তিনি চট্টগ্রাম এসেছিলেন, সে সময়ে ‘সিন্ধু হিন্দোল’ কাব্যের কবিতাগুলো রচিত হয়েছিল। এবারের সফরে তিনি ‘চক্রবাকে’র সূচনা কবিতা ‘ওগো চক্রবাকী’, ‘বাদল-রাতের পাখি’, ‘স্তব্ধ-রাতে’, ‘বাতায়ন-পাশে গুবাক তরুর সারি’, ‘কর্ণফুলী’, ‘শীতের সিন্ধু’ এবং অন্যান্য গ্রন্থভুক্ত আরও কিছু কবিতা ও গান রচনা করেন। অধ্যাপিকা সেলিনা বাহার জামানের নিকট রক্ষিত পাণ্ডুলিপিতে দেখা যায়— ‘শীতের সিন্ধু’ কবিতাটি ‘সিন্ধু-চতুর্থ তরঙ্গ’ রূপে রচিত হয়। মনে হয়, ছন্দের পার্থক্যের কারণে পরে কবি এর ভিন্ন নাম দেন।

    ‘চক্রবাক’ কাব্যে ‘উৎসর্গ’ ও গোড়ার শিরোনামহীন কবিতাটি ছাড়া এই একুশটি কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল— ১. তোমারে পড়িছে মনে, ২. বাদল-রাতের পাখি, ৩. স্তব্ধরাতে, ৪. বাতায়ন-পাশে গুবাক তরুর সারি, ৫. কর্ণফুলী, ৬. শীতের সিন্ধু, ৭. পথচারী, ৮. মিলন-মোহানায়, ৯. গানের আড়াল, ১০. ভীরু, ১১. এ মোর অহঙ্কার, ১২. তুমি মোরে ভুলিয়াছ, ১৩. হিংসাতুর, ১৪. বর্ষা-বিদায়, ১৫. সাজিয়াছ বর মৃত্যুর উৎসবে, ১৬. অপরাধ শুধু মনে থাক্, ১৭. আড়াল, ১৮. নদীপারের মেয়ে, ১৯. ১৪০০ সাল, ২০. চক্রবাক ও ২১. কুহেলিকা।

    ‘ভীরু’ ও ‘এ মোর অহঙ্কার’ কবিতা দুটি পূর্ববর্তী ‘জিঞ্জির’ কাব্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তাই ‘বাংলা একাডেমি’ প্রকাশিত ‘নজরুল রচনাবলী’তে কবিতা দু’টি ‘চক্রবাক’ কাব্য হতে বর্জিত হয়েছে। কিন্তু কবিতা দুটির ভাব ও বিষয় ‘চক্রবাক’ কাব্যের সাথেই বেশি সাজুস্যপূর্ণ বিবেচনা করে, বর্তমান সংস্করণে কবিতা দুটিকে ‘চক্রবাক’ কাব্যভুক্ত করা হয়েছে।

    ‘জিঞ্জির’ কাব্যভুক্ত ‘এ মোর অহঙ্কার’ কবিতাটিতে ১৩টি স্তবক; কিন্তু ‘চক্রবাক’ কাব্যে এর ষষ্ঠ স্তবক বর্জিত হয়েছিল। বর্তমান সংস্করণে ‘জিঞ্জির’ কাব্যের পাঠানুসারে ১৩ স্তবকের পূর্ণাঙ্গ কবিতাটি গ্রহণ করা হয়েছে।

    ‘তোমারে পড়িছে মনে’ ১৩৩৫ ভাদ্রের ‘ধূপছায়া’য় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘স্তব্ধরাতে’ ১৩৩৫ মাঘের ‘ধূপছায়া’য় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘বাতায়ন-পাশে গুবাক তরুর সারি’ ১৩৩৫ চৈত্রের কালিকলমে প্রকাশিত হয়েছিল, রচনার স্থান ও তারিখ লেখা ছিল— ‘চট্টগ্রাম, ২৪-১-২৯।’

    ‘কর্ণফুলী’ সাপ্তাহিক ‘আত্মশক্তি’তে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘পথচারী’ ১৩৩৬ জ্যৈষ্ঠের ‘উপাসনা’য় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘গানের আড়াল’ ১৩৩৫ অগ্রহায়ণ-পৌষের ধূপছায়ায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘তুমি মোরে ভুলিয়াছ’ ১৩৩৫ বৈশাখের ‘সওগাতে’ ‘রহস্যময়ী’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। এ-সম্পর্কে কবি কলিকাতা হতে ৩১-৩-১৯২৮ তারিখের এক পত্রে ঢাকায় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন সাহেবকে লিখেন—

    “আমি আবার বিষ্যুৎবার কলকাতা ফিরে আসব। সেদিন সন্ধ্যায় Broadcusting-এ আমার গান গাইতে হবে। … আমি বিষ্যুবারে দুটো গান ও আমার নতুন কবিতা ‘রহস্যময়ী’ আবৃত্তি করব। ‘রহস্যময়ী’ চৈত্রের সওগাতে বেরুবে। এর ‘তুমি মোরে ভুলিয়াছ’ নামটা বদলে ‘রহস্যময়ী’ করেছি।

    —[নজরুল-জীবনে প্রেমের এক অধ্যায়, ৬৩ পৃ.]

    ‘হিংসাতুর’ ১৩৩৫ জ্যৈষ্ঠের ‘সওগাতে’ প্রথম প্রকাশিত হয়। এর রচনা স্থান ও তারিখ — ‘কলিকাতা, ২৯-৩-২৮।’ এই কবিতাটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেই কবি তাঁর প্রথমা (পরিত্যক্তা) পত্নীকে কলিকাতা হতে ১-৭-৩৭ তারিখে এক পত্রের শেষে P.S. (পুনশ্চ) দিয়ে লিখেছেন—

    “আমার ‘চক্রবাক’ নামক কবিতা-পুস্তকের কবিতাগুলো পড়েছ? তোমার বহু অভিযোগের উত্তর পাবে তাতে। তোমার কোনো পুস্তকে আমার সম্বন্ধে কুটক্তি ছিল।”

    —[নজরুল-রচনা-সম্ভার, প্রথম সংস্করণ, ২৩৮ পৃ.]

    ‘বর্ষা-বিদায়’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৩৫ ভাদ্রের ‘সওগাতে’।

    ‘সাজিয়াছ বর মৃত্যুর উৎসবে’ ‘প্রগতি’র বৈশাখ ১৩৩৫ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘আড়াল’ ১৩৩৬ আষাঢ়ের ‘কল্লোলে’ প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘নদীপারের মেয়ে’ ১৩৩৫ বৈশাখের ‘কালিকলমে’ প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘১৪০০ সাল’ ১৩৩৪ আষাঢ়ের ‘কল্লোলে’ ‘আজি হতে শতবর্ষ আগে’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। কল্লোল হতে এটি ১৩৩৪ আষাঢ়ের ‘নওরোজে’ উদ্ধৃত হয়েছিল। কবিতাটি ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে’র ‘১৪০০’ সাল কবিতার জবাবে লিখিত হয়েছিল।

    ‘কুহেলিকা’ ১৩৩৫ মাঘের মোয়াজ্জিনে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।