Tag: গ্রন্থনাম

  • সন্ধ্যা (কাব্য)

    সন্ধ্যা (কাব্য)

    সন্ধ্যা (কাব্য)

    ‘সন্ধ্যা’ ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মুতাবিক ১৯২৯ সালের আগস্টে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক শ্রীগোপাল দাস মজুমদার; ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা। প্রবাসী প্রেস, ৯১ আপার সার্কুলার রোড, কলিকাতা হতে সজনীকান্ত দাস কর্তৃক মুদ্রিত। পৃষ্ঠা সংখ্যা ২ + ৫৮; মূল্য ১৷৹ (পাঁচ সিকা)।

    ‘সন্ধ্যা’ কবিতাটি ১৩৩৫ আষাঢ়ের, ‘তরুণ তাপস’ ১৩৩৬ শ্রাবণের এবং ‘আমি গাই তারি গান’ ১৩৩৫ আশ্বিন-কার্তিকের ‘ছাত্র’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

    ‘ভোরের পাখী’ ১৩৩৫ পৌষের ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, রচনার স্থান ও তারিখ— ‘হরগাছা, রংপুর; ১২ অগ্রহায়ণ, ১৩৩৫।’

    ‘জাগরণ’ সাপ্তাহিক ‘জাগরণ’ পত্রিকায় এবং ‘তরুণের গান’ ১৩৩৫ শ্রাবণের মোয়াজ্জিনে প্রকাশিত হয়।

    ‘চল্ চল্ চল্’ ঢাকা মুসলিম সাহিত্য-সমাজের মুখপত্র দ্বিতীয় বার্ষিক (১৩৩৫) ‘শিখা’য় ‘নতুনের গান’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। পাদটীকায় মুদ্রিত আছে— ‘দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনের উদ্বোধন-সঙ্গীত।’ ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে উক্ত অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৩৩৫ ফাল্গুনের সওগাতে ‘নতুনের গান’ পুনর্মুদ্রিত হয়; এর পাদটীকায় মুদ্রিত আছে— ‘নিখিল-বঙ্গ মুসলিম যুবক সম্মিলনীতে এই গানটি গীত হইয়াছিল।’ শিখায় ও সওগাতে প্রকাশিত গানটিতে ১১শ ও ১২শ এবং ১৭শ ও ১৮শ চরণগুলি নিম্নরূপ—

    তাজা-ব-তাজার গাহিয়া গান

    সজীব করিব গোরস্থান

    * * *

    নয়া জমানার মিনারে মিনারে

    নব-উষার আজান।

    ‘ভোরের সানাই’ ১৩৩৫ অগ্রহায়ণের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়, এর পাদটীকায় মুদ্রিত আছে— ‘নিখিল-বঙ্গ মুসলিম যুবক-সম্মিলনের উদ্বোধন-সঙ্গীত।’

    ‘যৌবন-জল-তরঙ্গ’ ১৩৩৫ কার্তিকের ও ‘রীফ-সর্দার’ ১৩৩৫ আশ্বিনের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘বাংলার আজীজ’ (চট্টগ্রামের পরলোকগত স্কুল-ইন্‌স্পেক্টার খান বাহাদুর আবদুল আজীজ বি.এ. সাহেবের স্মরণে রচিত) ১৩৩৪ কার্তিকের মাসিক ‘মোহাম্মদী’তে ও ‘সুরের দুলাল’ (দিলীপকুমার রায়ের ইউরোপ হতে স্বদেশে প্রত্যাগমন-উপলক্ষে রচিত) ১৩৩৪ মাঘের ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘শরৎচন্দ্র’ ১৩৩৪ আশ্বিনের ‘নওরোজে’ প্রকাশিত হয়। পাদটীকায় বলা হয়— ‘স্বনামধন্য ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের দ্বিপঞ্চাশৎ বর্ষ জন্মোৎসব উপলক্ষে রচিত।’ রচনার স্থান ও তারিখ — ‘কৃষ্ণনগর, ২৯ ভাদ্র ১৩৩৪।’ শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর (১৬ই জানুয়ারি ১৯৩৮ মুতাবিক ২রা মাঘ ১৩৪৪, রবিবার) পর কবিতাটি ১৩৪৪ মাঘের ‘বুলবুলে’ পুনর্মুদ্রিত হয়।

    উৎসর্গ

    মাদারিপুর ‘শান্তি-সেনা’র

    কর-শতদলে

    বীর সেনানায়কের

    শ্রীচরণাম্বুজে

  • চোখের চাতক

    চোখের চাতক

    চোখের চাতক

    ‘চোখের চাতক’ প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মুতাবিক ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে। প্রকাশক শ্রীগোপালদাস মজুমদার; ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। মুদ্রাকর শ্রীসতীশচন্দ্র রায়, সুধা প্রেস, ১৯৮/১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪+৭৮; মূল্য এক টাকা, রাজ-সংস্করণ ১৷৹ (পাঁচ সিকা)। এতে ৫৩টি গান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, কিন্তু ‘সূচী’তে আছে ৫১টি গান। গ্রন্থটির উৎসর্গ পত্রে লেখা ছিল—

    কল্যাণীয়া বাণী-কণ্ঠী

    শ্রীমতী প্রতিভা সোম

    জয়যুক্তাসু।

    ‘আমার কোন্ কূলে আজ ভিড়ল তরী’ ১৩৩৬ আশ্বিনের ‘সওগাতে’ প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘কে তুমি দূরের সাথী’ ১৩৩৬ শ্রাবণের ‘কল্লোলে’ প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘আমার সাম্পান যাত্রী না লয়’ এবং ‘তোমায় কূলে তুলে বন্ধু’ ১৩৪৩ ফাল্গুণের ‘বুলবুলে’ ‘চট্টল-গীতিকা’ শিরোনামে উদ্ধৃত হয়।

    ‘ওরে মাঝি ভাই’ ১৩৩৫ ফাল্গুনের ‘আঁধার রাতে কে গো একেলা’ ১৩৩৬ আষাঢ়ের এবং ‘জনম জনম গেল আশা-পথ চাহি’ ১৩৩৬ অগ্রহায়ণের ‘সওগাতে’ প্রথম প্রকাশিত হয়। ‘ওরে মাঝি ভাই’ রচনার স্থান ও তারিখ— ‘চট্টগ্রাম, জানুয়ারি ১৯২৯।’

    ‘পেয়ে কেন নাহি পাই হৃদয়ে মম’ ১৩৩৫ সালে ঢাকার ‘জাগরণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং ‘জাগরণ’ হতে ১৩৩৬ অগ্রহায়ণের ‘সঞ্চয়ে’ উদ্ধৃত হয়।

    ‘না মিটিতে সাধ মোর নিশি পোহায়’ ১৩৩৬ কার্তিকের ‘সওগাতে’ প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘পর-জনমে দেখা হবে প্রিয়’ ১৩৩৭ অগ্রহায়ণের ‘উত্তরা’য় প্রকাশিত হয়।

    ‘কে ডাকিলে আমারে আঁখি তুলে’ ১৩৩৬ পৌষের এবং ‘কার বাঁশী বাজে মুলতান-সুরে’ ১৩৩৬ মাঘের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়।

  • সুকান্ত সমগ্র

    সুকান্ত সমগ্র

    সুকান্তের কবিতা আজও সমান আদরনীয়। এর প্রধান কারণ, কবিতার বিষয়বস্তু, শব্দচয়নে ও ধ্বনিসৌকর্যে তাঁর অসামান্য দক্ষতা, ছন্দ ও মিলের উপরে তাঁর অসামান্য দখল এবং ঘৃণা ও ক্রোধে সংযত অভিব্যক্তি। এই কাব্যিক গুণাবলী তাঁর কবিতাকে অমর করে রেখেছে। শুধু কবিতা নয়, সুকান্তের সমস্ত রচনার পটভূমি এক নির্মম রাক্ষসীবেলা – যুদ্ধের বিভৎসা, মন্বন্তরের ভয়ালতা, সাইরেন, ব্ল্যাক-আউট, বোমা পড়ার আতঙ্ক, কন্ট্রোল দরে খাদ্য-বস্ত্রের লাইন, আর এর প্রতিস্পর্ধী এক আন্দোলন, এক মতাদর্শ : সাম্যবাদ। ফলে তাঁর কাব্য তথা সমগ্র সাহিত্যচর্চা ‘ডিক্লাসমেন্টে’র বার্তাবহ। এটাই তাঁকে করে তুলেছে রবীন্দ্রনাথ-উত্তরকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্য স্রষ্টা। তাঁর সমস্ত কবিতা, গীতিগুচ্ছ, পত্রগুচ্ছ, মায় তাঁর ক্ষুদ্র সাহিত্য জীবনের প্রায় সমস্ত লেখা নিয়েই এই ‘সমগ্র’। পাশাপাশি, এই বইটিতে আছে সুকান্ত-পাঠের এক নাতিদীর্ঘ গাইডলাইন; লেখাটি বইটির মুখবন্ধের পরিবর্তে রচিত, যা এই বইয়ের একটি সম্পদ।

    অকালমৃত্যু ছিনিয়ে নিলেও আধুনিক বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন পেতে দেরী হয়নি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের। তরুণ বয়সের ভাবাবেগ-নির্ভর তরল জীবনবীক্ষা তাঁর রচনার প্রধান সম্বল হলেও বাংলা সাহিত্যের বিশেষ সময়ে তাঁর রচনার প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য।

    তাঁর জন্ম ১৯২৬ সালের ১৫ই আগষ্ট (৩০শে শ্রাবণ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) কলকাতার কালীঘাটে, ৪২নং মহিম হালদার স্ট্রীটের মামার বাড়িতে। তাঁর বাবা নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য, মা সুনীতি দেবী। প্রাথমিক শিক্ষা, ‘কামলাবিদ্যামন্দির’ নামে একটি স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলে। এই স্কুলেরই ক্লাস ফোরের ছাত্ররা ‘সঞ্চয়’ নামের একটা হাতে লেখা পত্রিকা সেইসময় বের করতো। শোনা যায় ‘সঞ্চয়’ নামকরণটাও নাকি সুকান্তরই করা। তিনি একটা মজার গল্প লিখেছিলেন এই পত্রিকায়। তাঁর ঘনিষ্ঠদের দাবী লেখক হিসেবে তাঁর হাতেখড়ি ঐ পত্রিকাতেই হয়েছিল।

    ১৯৩৮ সালে তাঁর মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তখন তাঁর বয়স মাত্র বারো বছর। সেইসময় তিনি দেশবন্ধু বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। যখন তিনি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র, সেই সময় সপ্তম শ্রেণি থেকে ‘সপ্তমিকা’ নামে একটি হাতে লেখা পত্রিকা বের করা হয়। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সুকান্ত স্বয়ং আর সহ-সম্পাদক ছিলেন তাঁরই সহপাঠী বন্ধু অরুণাচল বসু। ১৯৪৪ সালে সুকান্ত ভট্টাচার্য ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। কমিউনিস্ট পার্টি ‘স্বাধীনতা’ নামে একটি বাংলা দৈনিক বের করতে থাকে ১৯৪৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর থেকে। ঐ পত্রিকাতে ‘কিশোর সভা’ নামে ছোটোদের বিভাগ ছিল। এই ‘কিশোর সভা’র সম্পাদক প্রথমে ছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, পরে তার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সুকান্তকে।

    অর্থাভাব, পার্টির কাজ ও নিজের শরীরের প্রতি অবহেলা – সব মিলিয়ে সুকান্তের স্বাস্থ্য ভেঙে গেল। ১৯৪৬ সালের মাঝামাঝি সুকান্ত জ্বরে পড়লেন। বাড়িতেই তাঁর চিকিৎসা চলল, কিন্তু জ্বর সারলো না। তিনি ধীরে ধীরে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। যদিও ঐ বিধ্বস্ত স্বাস্থ্য নিয়েও সাহিত্যচর্চা বন্ধ করেন নি তিনি। ধরা পড়লো ইন্টেস্টিনাল টি বি (পেটের যক্ষা)। মৃত্যুর সাথে চলছিল তাঁর চরম লড়াই শেষ হল ১৯৪৭ সালের ১৩ই মে (২৯শে বৈশাখ ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ)। ঐ সকাল ১০টার সময় তিনি মারা গেলেন। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে শেষ হয়ে গেল এক মহীরূহের সম্ভাবনা। তবু যতটুকু রেখে গেলেন, তা বাংলা সাহিত্যের করুণ অধ্যায়ে লেখা হয়ে রইল।

  • ছাড়পত্র

    ছাড়পত্র

    ছাড়পত্র

    ছাড়পত্র সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত বাংলা কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থের কবিতাগুলো রচিত হয় ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে। মাত্র একুশ বছর বয়সে সুকান্ত মারা যাবার কিছুদিন পূর্বে এই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

    সুকান্ত যখন রোগাক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী, ঠিক সে মুহুর্তেও তার সাহিত্যচর্চার ব্যাঘাত ঘটে নি। অসুস্থ অবস্থায় নিজেদের ঘরের সিঁড়ি দেখে শোষক শ্রেণী আর শোষিতের প্রতিক বানিয়ে লিখলেন “সিঁড়ি”। এভাবে এ কাব্যগ্রন্থের “চিল”, “সিগারেট” ও “চারাগাছ” লিখলেন তিনি। যেগুলো দিয়ে এই কাব্যগ্রন্থ “ছাড়পত্র”।

    কাব্যটি উৎসর্গ করা হয়—

    শ্রদ্ধেয় মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ-কে

    প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

    সুকান্ত তার নিজের প্রথম কবিতার বই দেখে যেতে পারল না—চিরদিন আমাদের এই আক্ষেপ থেকে যাবে। সুকান্তর বই প্রকাশের ভার আমরাই গ্রহণ করেছিলাম; তাই আমাদের প্রত্যেকটা ভুলত্রুটি আজ পর্বতপ্রমাণ হয়ে স্মৃতিকে ভারাক্রান্ত করে তুলছে।

    সুকান্তর মৃত্যুর কয়েকটা দিন আগের কথা আজ বড় বেশী মনে পড়ছে। এই বইয়ের সমস্ত কবিতার ছাপানো ফাইল হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে যখন সুকান্তর হাতে দিলাম, তখন আনন্দে উঠে বসেছিল সুকান্ত। বই তাহ’লে সত্যিই বেরোচ্ছে। আসার সময় সুকান্তকে কথা দিয়ে এসেছিলাম—বই বেরোতে আর এক সপ্তাহ। সে সপ্তাহ না যেতেই সুকান্ত আমাদের ছেড়ে চলে গেল।

    নামকরণের জন্যেই বইটা বেরোতে এত দেরি হচ্ছিল। বই যখন প্রেসে দেওয়া হয়, সুকান্ত তখন শয্যাগত—বইয়ের নাম তখনও সে ঠিক ক’রে উঠতে পারেনি। পরে সে এত বেশী অসুস্থ হয়ে পড়ল যে, নামকরণের ভার আমাদেরই নিতে হয়। কিন্তু কোন নামই আমাদের পছন্দ হচ্ছিল না। কোন রকমে জোড়াতালি দিয়ে যখন নাম ঠিক হ’ল, প্রচ্ছদপটও আঁকতে দেওয়া হ’ল—তখন অকস্মাৎ বজ্রাঘাতের মত এল সুকান্তর মৃত্যুর খবর। তারপর বইয়ের নাম বদ্‌লে প্রথম কবিতার নামে বইয়ের নাম রাখা হ’ল ‘ছাড়পত্র’।

    ‘ছাড়পত্রে’র সমস্ত কবিতাই ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭-এর মধ্যে লেখা। এ ছাড়াও, বইতে নেই এমন বহু কবিতা এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়িতে গোড়ার দিকে সেগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সুকান্তর মৃত্যুর পরে তার লেখার ঝুলিতে আরও বহু অপ্রকাশিত কবিতা পাওয়া যায়। এই সংকলনের সঙ্গে সেই সমস্ত কবিতাও জুড়ে দেবার কথা হয়। কিন্তু তা করতে গেলে আরও বেশী সময় লাগবে এবং বইটাও আকারে বেশী বড় হয়ে যাবে,—এই আশঙ্কা ক’রে ‘ছাড়পত্র’কে বর্তমান আকারেই বার করা এবং অন্যান্য কবিতা নিয়ে সুকান্তর দ্বিতীয় একটি কবিতা-সংগ্রহ বার করার সিদ্ধান্ত হয়। এই অনিশ্চয়তার জন্যে বই প্রকাশে আরও বেশী বিলম্ব হয়ে গেল; ‘ছাড়পত্র’ প্রকাশের ব্যাপারে আমি গোড়া থেকে জড়িত ছিলাম বলেই এই বিলম্বের জন্য প্রকাশকদের পক্ষ থেকে পাঠকসমাজের কাছে ক্ষমা চাইছি।

    ‘ছাড়পত্রে’র কবিতাগুলি রচনার কালানুক্রমে সাজানো হয় নি। পর পর সাজানোর ব্যাপারে মোটামুটি ভারসাম্য ও ছন্দোবৈচিত্রের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তার ফলে প্রথম দিকে বহু নতুন ও শেষের দিকে বহু পুরানো কবিতাকে স্থান দিতে হয়েছে। ‘চারাগাছ’, ‘প্রার্থী’, ‘একটি মোরগের কাহিনী’, ‘সিঁড়ি’, ‘সিগারেট’ প্রভৃতি কবিতা সুকান্তর রোগশয্যায় লেখা; ‘ফসলের ডাক’, ‘কৃষকের গান’, ‘এই নবান্নে’, ‘আঠারো বছর বয়স’ প্রভৃতি কবিতা চার-পাঁচ বছর আগেকার লেখা—সুকান্তর বয়স তখন পনেরো ষোল। ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, ‘প্রস্তুত’, ‘দুরাশার মৃত্যু’, সম্ভবত তারও আগের লেখা।

    ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সাল—যুগসন্ধির এই পাঁচটা বছর ধরে ‘ছাড়পত্রে’র রচনাকাল। একদিকে মৃত্যুকীর্ণ যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষ, বন্যা আর মহামারী, অন্যদিকে জীবনপ্রতিষ্ঠার মৃত্যুপণ সংগ্রাম—জয়পরাজয় আর উত্থানপতনে, সুখদুঃখ আর আশানিরাশায় ঘেরা এই পাঁচটা বছর ‘ছাড়পত্রে’ উৎকীর্ণ হয়ে আছে। কোটি কোটি মানুষের বলিষ্ঠ আশা কবির কণ্ঠে নির্ভীক ঘোষণায় ফুটে উঠেছে।

    —সুকান্ত নতুন যুগের সার্থক কবি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে এমন একাত্মতা, সহজ কথা সোজাসুজি বলতে পারার এমন দুঃসাহসী ক্ষমতা লুকাস্তর সমসাময়িক আর কোন কবি দেখাতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ। বয়সে সর্বকনিষ্ঠ হয়েও কবিত্বশক্তিতে সুকান্ত ছিল অগ্রগণ্যদের একজন। ইস্কুলের ছাত্র অবস্থায় দেশজোড়া এত বিরাট খ্যাতি বাংলার আর কোন কবির ভাগ্যেই বোধহয় জোটেনি। এই বয়সেই বিদেশে সুকান্তর একাধিক কবিতার অনুবাদ হয়েছে, তার কবিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

    সুকান্তর কবিতা যাঁরা পড়বেন, তাঁরা একথা স্বীকার করবেন যে, সুকান্তর কবিতা শুধুই বিরাট সম্ভাবনার ইঙ্গিত নয়, তাতে আছে মহৎ পরিণতির সুস্পষ্ট পদধ্বনি। ‘ছাড়পত্র’ তাই বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন পাবে।

    কবিতার বিচিত্র কলাকৌশলে, ছন্দের আশ্চর্য দক্ষতায়, শব্দনির্বাচনের অশেষ নৈপুণ্যে এই কবি কিশোর রাজনৈতিক বিরুদ্ধবাদীদেরও অভিভূত করেছে। কিন্তু আঙ্গিকের মায়ায় সুকান্ত কখনও বাঁধা পড়েনি। ‘ছাড়পত্রে’র প্রথম যুগের কবিতার সঙ্গে পরের যুগের কবিতা মিলিয়ে দেখলে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। ‘ঠিকানা’ কিম্বা ‘বোধনে’র সঙ্গে ‘প্রার্থী’র তফাৎ অনেক। ‘প্রার্থী’তে এসে সুকান্ত সম্পূর্ণ একটা নতুন পথের সন্ধান পেয়েছে। পদ্যছন্দ বর্জন ক’রে সহজ নিরাভরণ গদ্যে সে যে আকুতি প্রকাশ করেছে, তা অন্য কোন উপায়ে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। ‘আর উত্তাপ দিও রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে’—করুণা বা অনুকম্পার কথা নয়, জ্বলন্ত বিশ্বাসের অগ্নিগর্ভ বাণী।

    সুকান্তর প্রথম দিকের কবিতায় তার জীবনদর্শন একটু বেশী রকমের প্রকট মনে হতে পারে। হয়ত অতটা স্পষ্টবাদিতা অনেকের পছন্দ হবে না। যেখানে সমাজের শত্রুদের সে নাম ক’রে ক’রে চিনিয়ে দিয়েছে, যেখানে সে সংগ্রামের অগ্নিবর্ণ পথে পাঠকদের হাত ধ’রে ডেকেছে—সেখানে কবিতার সীমানা নিয়ে মতান্তর হতে পারে। কিন্তু সুকান্তর শেষের দিকে লেখা ‘খবর’, ‘চিল’, ‘প্রার্থী’ প্রভৃতি কাউকেই মুগ্ধ না ক’রে পারে না। শেষোক্ত কবিতাগুলি যে অনেক বেশী গভীর, অনেক বেশী মর্মস্পর্শী—এ বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই।

    ‘ছাড়পত্রে’র কাব্যবিচার আমার উদ্দেশ্য নয়, সে ক্ষমতাও আমার নেই। সুকান্তর কবিতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে আমার যেটুকু পরিচয়, সেইটুকুই শুধু এখানে ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করেছি।

    সুকান্তর সেই সমস্ত অজ্ঞাতনামা বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই, যাঁরা কষ্ট ক’রে কবিতাগুলি বিভিন্ন পত্রিকা থেকে সংগ্রহ ক’রে দিয়েছিলেন। ‘ছাড়পত্রে’র প্রচ্ছদপট এঁকে দিয়েছেন খ্যাতনামা শিল্পী সত্যজিৎ রায়—তাঁকে অজস্র ধন্যবাদ। এ ছাড়াও অন্যান্য বহু বন্ধু নানাভাবে সাহায্য ক’রে বাধিত করেছেন। পরবর্তী সংস্করণ যাতে ত্রুটিহীন হ’য়ে উঠতে পারে তার জন্যে পাঠকপাঠিকাদের সহযোগিতা কামনা করি।

    সুভাষ মুখোপাধ্যায়

    দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা

    অনেকদিন আগেই ‘ছাড়পত্রে’র প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত হয়। কিন্তু নানা অসুবিধার দরুণ এতদিন প্রকাশকদের পক্ষে দ্বিতীয় সংস্করণ ছাপানো সম্ভব হয়ে উঠেনি।

    এই সংস্করণ সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলবার নেই। কয়েকটি নতুন কবিতা এই সংস্করণে দেওয়া হ’ল—‘দেশলাই কাঠি’, ‘সেপ্টেম্বর ’৪৬’ এবং পদ্য ছন্দে ‘কাশ্মীর’।

    যারা এতদিন অধীর আগ্রহ নিয়ে ‘ছাড়পত্রে’র দ্বিতীয় সংস্করণের জন্যে অপেক্ষা করেছেন, তাঁদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

    সু. মু.

    তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা

    ‘ছাড়পত্রে’র তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হ’ল—এই সানন্দ ঘোষণা ছাড়া নতুন ক’রে বলবার কিছু নেই। তৃতীয় সংস্করণে নতুন কোন কবিতা যোগ করা হয় নি; কিন্তু দুটি জায়গায় সামান্য সংশোধন করা হয়েছে। ‘কাশ্মীর’ শীর্ষক ২নং কবিতাটির শেষের দিকে ‘কাশ্মীর চঞ্চল—স্রোত লক্ষ’ বদলিয়ে ‘কাশ্মীর আজ চঞ্চল—স্রোত লক্ষ’ এবং ‘সেপ্টেম্বর ১৯৪৬’ কবিতার শেষের দিকে ‘আজকের কলকাতার প্রার্থনার’ জায়গায় ‘আজকের কলকাতার এ প্রার্থনা’ করা হয়েছে। তার কারণ, এই দুটি জায়গায় পড়তে গেলে আট্‌কায়। সুকান্তর হস্তলিখিত কপি যোগাড় ক’রে উঠতে না পারায় ছাপানো কবিতার সঙ্গে মূল লেখা মিলিয়ে দেখা সম্ভব হ’ল না। যাই হ’ক আশা করা যায় আগামী সংস্করণ বার হবার আগে কবিতাটি মিলিয়ে দেখে নিঃসংশয় হওয়া যাবে।

    কাগজ ও ছাপার দর বৃদ্ধির দরুণ বর্তমান সংস্করণটির মূল্য সামান্য বাড়াতে হ’ল। আশা করি পাঠকেরা মার্জনা করবেন।

    সু. মু.

  • ঘুম নেই

    ঘুম নেই

    ঘুম নেই

    কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অসামান্য জনপ্রিয় এবং শক্তিমান কবি ছিলেন। কৈশোর থেকেই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে। পরাধীন দেশের দুঃখ দুর্দশাজনিত বেদনা এবং শোষণ মুক্ত স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন, শোষিত মানুষের কর্ম জীবন এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম তাঁর কবিতার মূল প্রেরণা। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ছাড়পত্র (১৯৪৮) বাংলা সাহিত্যে বিষয়বস্তুর অভিনবত্বের চেয়েও প্রকাশ ভঙ্গির বলিষ্ঠতা এবং প্রতিমা নির্মাণের অভিনবত্বের জন্য পাঠক সমাজে অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছে। ঘুম নেই (১৯৫০), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠে কড়া (১৯৫২) প্রভৃতি কবির প্রতিভার উজ্জ্বল সাক্ষ্য।

  • পূর্বাভাস

    পূর্বাভাস

    পূর্বাভাস

    কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অসামান্য জনপ্রিয় এবং শক্তিমান কবি ছিলেন। কৈশোর থেকেই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে। পরাধীন দেশের দুঃখ দুর্দশাজনিত বেদনা এবং শোষণ মুক্ত স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন, শোষিত মানুষের কর্ম জীবন এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম তাঁর কবিতার মূল প্রেরণা। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ছাড়পত্র (১৯৪৮) বাংলা সাহিত্যে বিষয়বস্তুর অভিনবত্বের চেয়েও প্রকাশ ভঙ্গির বলিষ্ঠতা এবং প্রতিমা নির্মাণের অভিনবত্বের জন্য পাঠক সমাজে অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছে। ঘুম নেই (১৯৫০), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠে কড়া (১৯৫২) প্রভৃতি কবির প্রতিভার উজ্জ্বল সাক্ষ্য।

    পূর্বাভাস সুকান্ত ভট্টাচার্যের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। এতে মোট ২৯টি কবিতা রয়েছে। কবিতাগুলো হল—পূর্বাভাস, হে পৃথিবী, সহসা, স্মারক, নিবৃত্তির পূর্বে, স্বপ্নপথ, সুতরাং, বুদ্বুদ মাত্র, আলো–অন্ধকার, প্রতিদ্বন্দ্বী, আমার মৃত্যুর পর, স্বতঃসিদ্ধ, মুহূর্ত (ক), মুহূর্ত (খ), তরঙ্গ ভঙ্গ, আসন্ন আঁধারে, পরিবেশন, অসহ্য দিন, উদ্যোগ, পরাভব, বিভীষণের প্রতি, জাগবার দিন আজ, ঘুমভাঙার গান, হদিশ, দেয়ালিকা, প্রথম বার্ষিকী, তারুণ্য, মৃত পৃথিবী ও দুর্মর।

  • মিঠেকড়া

    মিঠেকড়া

    মিঠেকড়া

    বড়োরা অবাক হয় সুকান্তর কবিতা পড়ে। এবার সুকান্তর ছড়া পড়ে অবাক হবে ছোটরা। আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ির ছড়া নয়, একেবারে একালের টাট্কা হাতে-গরম ছড়া। হাসতে হাসতে হঠাৎ হাত মুঠো হয়ে যাবে রাগে, চোখ দুটো জ্বলে উঠবে লাল-টক্‌টকে সূর্য-ওঠা দিনের কথা ভেবে। এমন ছড়া বাংলা দেশে আর কেউ লেখে নি।

    কলকাতার রাস্তায় বিষম এক খেলা। বন্দুকের সঙ্গে শুধু হাতের লড়াই। আশ্চর্য! এমন এক সাংঘাতিক কাণ্ড তার মধ্যেও মজা পেয়েছে সুকান্ত। গোটা বইতে এমনি সব মিঠে রসে ভেজানো কড়া পাকের ছড়া। সুকান্তই নিজে তাই তার বইয়ের নাম দিয়েছিল ‘মিঠেকড়া’।

    ‘পৃথিবীর দিকে তাকাও’—এই ছড়াটি একটি ইংরেজি কবিতার ভাবানুসরণে লেখা। বত্রিশ পৃষ্ঠার ছবিটি একটি বিদেশী ছবির ভাবাবলম্বনে আঁকা।

    ‘মিঠেকড়া’র ছবিগুলি এঁকেছেন শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। সুকান্ত এই ছড়াগুলো লেখার পর ছবি আঁকার জন্যে তারই হাতে প্রথম দেয় এবং এ বইয়ের পরিকল্পনা দুজনে মিলে করে। এতদিন পরেও দেবব্রতবাবু সুকান্তর মনের কথা যেভাবে ছবির রেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তাতে তাকে অভিনন্দন না জানিয়ে পারছি না। সুকান্ত এ বই দেখলে কী খুশিই যে হ’ত।

    সুভাষ মুখোপাধ্যায়

  • অভিযান

    অভিযান

    অভিযান

    খুব অল্প পরিসরে হলেও ‘সুকান্ত ভট্টাচার্য’ তাঁর বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। কবিতা, গীতি, গল্প ও নাটিকা তাঁর প্রতিভার প্রমাণ রয়েছে। তবে কবিতার সংখ্যা কম হলেও গুণে ও মানে প্রতিভার যে বিস্ময়কর স্ফুরণ ঘটেছে সে জন্য আর সব খ্যাতিকে ছাড়িয়ে সুকান্ত কবি হিসেবেই সুখ্যাতি অর্জন করেছেন।

    ‘অভিযান’ বহুমুখী প্রতিভার সমাজ সচেতন কবি ‘সুকান্ত ভট্টাচার্যে’র একটি গীতিনাট্য। এই গ্রন্থ তিনি কবিতা ও গানের মাধ্যমে প্রতিবাদ ও অধিকার আদায়ের চিত্র এঁকেছেন। চরিত্রসমূহের সংলাপ, ঝগড়া-বিবাদ, চরিত্রের প্রকাশ এবং শেষে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল— সব কিছুই কাব্যিক।

    ‘কালের যাত্রা’ নাটিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন— ‘যারা এতদিন মরেছিল, তারা উঠুক বেঁচে, যারা যুগে যুগে ছিল খাট হয়ে তারা দাঁড়াক একবার মাথা তুলে।’ সুকান্ত যেন প্রাণ ভরে রবীন্দ্রনাথের কথা শুনেছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্ত করবী’তে রাজা-প্রজার কথা আছে, ধনদৌলতের কথা আছে, শোষণ-বঞ্চণার কথা আছে। সুকান্তের ‘অভিযানে’ও আছে মহারাজ, আছে কোতোয়াল, আছে শোষণ, ক্ষুধা আর বঞ্চনার জ্বালা। অভিযানের ‘সঙ্কলিতা’ আর রক্ত করবীর নন্দিনীর চরিত্র হুবহু এক নয়, কিন্তু আছে লক্ষ্যণীয় কিছু ব্যাপার। কালের যাত্রার সাথেও আছে অভিযানের খানিক মিল। কালের যাত্রায় আছে,— ‘আমরাই তো যোগাচ্ছি অন্ন তাই খেয়ে তোমরা বেঁচে আছ, আমরাই বুনেছি বস্ত্র, তাতেই তোমাদের লজ্জা রক্ষা!’ অথবা ‘দরিদ্রের রক্ত করে শোষণ বিরাট অহঙ্কারকে কর পোষণ’…।

    অভিযানের শেষ সংলাপ হল—

    ‘চলবে না অন্যায়, খাটবে না ফন্দি,

    আমাদের আদালতে আজ তুই বন্দী!’

    যুগ যুগ ধরে সমাজে যে শোষণ চলে এসেছে তার চির অবসানের আন্দোলন ও বিপ্লবের জন্য চাই সমাজ সচেতন কর্মী বাহিনী। তারা ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবে, ছিনিয়ে আনবে চূড়ান্ত বিজয়। সুকান্ত ভট্টাচার্য এই কথাটাই ভাল করে ফুটিয়ে তুলেছেন অভিযানে।

    অভিযান সাম্যবাদী প্রচারণার মোক্ষম হাতিয়ার নয়; ক্ষুধা ঘুচানোর অভিযান। এ অভিযান সমাপ্ত হলে অসহায় নারী-শিশু আর ক্ষুধায় কাতর হবে না, কাঁদবে না। অন্ধকারের চির অবসান হবে। এই জন্য চাই তাত্ত্বিক জ্ঞানে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং ব্যাবহারিক দিকে পারঙ্গম জ্ঞানী ক্যাডার। যারা শাসকের রক্তচক্ষু, কোতোয়াল ও চরকে ভয় পাবে না, নির্ভয়ে এগিয়ে যাবে। প্রয়োজনে জীবন বাজী রাখবে। অভিযানে কোতোয়ালকে লক্ষ্য করে সঙ্কলিতার উক্তি—

    ‘তোমরা দেখাও শুধু শক্তি

    তাই তো করে না কেউ ভক্তি,

    কর না প্রজার কোন কল্যাণ,

    তোমরা অন্ধ আর জ্ঞান।’

    ‘চিরদিন তরুণেরা অন্যায়ের করে নিবারণ।’ তাই সত্যকাম কোতোয়ালকে বলতে পেরেছে—

    ‘তোমার মত দুর্জনকে করতে হলে ভয়।

    পৃথিবীতে বেঁচে থাকা মোটেই উচিত নয়।’

    ইন্দ্রসেন বলছে, তলোয়ারের ভয় দেখিয়ে কোন লাভ নেই। এভাবে চিরকাল শাসন করা যাবে না। শোষকের দিন আজ গত। সঙ্কলিতা তাই আর্তনাদ করে বলছে—

    ‘দরিদ্রের রক্ত করে শোষণ

    বিরাট অহঙ্কারকে কর পোষণ,

    তুমি পশু, পাষণ্ড, বর্বর

    অত্যাচারী, তোমার ও হাত কাঁপে না থরথর?’

    এরপর যা হবার তাই হল; সঙ্কলিতার প্রাণ গেল দেশপ্রেমিক বলে। কিন্তু এতে কী মুক্তিযুদ্ধ থেমে থাকে? হাত দিয়ে যেমনি সূর্যের আলোকে রোখা যায় না, থামানো যায় না। গণজোয়ারের ঢেউ, সত্যের জন্য অবশ্যম্ভাবী। পৃথিবীতে একদিন সত্যের জয়পতাকা উড়বেই।

    ‘চলবে না অন্যায় খাটবে না ফন্দি,

    আমাদের আদালতে আজ তুই বন্দী।’

    সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন জনতার আদালতে সকল অপরাধীর বিচার হবে। বিচার হবে বিচারপতির, যিনি শাসকের স্বার্থে অন্যায় ও অবৈধ রায় প্রদান করেছেন। জনতার আদালত হবে বড় কঠিন ও নির্মম এক নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। ‘সূর্যপ্রণামে’র সমবেত গান ‘আহ্বানে’ কবি বলেছেন—

    ‘আমাদের ডাক এসেছে

    এবার পথে চলতে হবে,

    ডাক দিয়েছে গগণ-রবি

    ঘরের কোণে কেই বা রবে।

    ডাক এসেছে চলতে হবে আজ সকালে

    বিশ্বপথে সবার সাথে সমান তালে।’

    যে কথা কবি বারবার বলতে চান, সে কথা অস্তাচলের ‘প্রান্তকে’ আছে এভাবে— ‘সেথায় কাদের আর্তনাদ বারংবার বৈশাখীর ঝড়ে।/… ক্ষীণদীপ উধর আলোতে/ চিরন্তন পথের সঙ্কেত-রেখে যায় প্রভাতের কানে।’

    রবীন্দ্রনাথের ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতার সুর সুকান্তের ‘শেষ মিনতি’তে খুঁজে পাওয়া যায়—

    ‘ওকে যায় চলে কথা না বলে, দিও না যেতে

    আমি কেঁদে কই যেও না কোথাও,

    সে যে হেসে কয় মোরে যেতে দাও।’

    আর সোনার তরীর — কোন পাড়ে নিয়ে যাবে হে সুন্দরী/ কোন পাড়ে ভিড়িবে তোমার সোনার তরী’র সাক্ষাত মিলে সুকান্তের ‘আয়োজন’ বর্ণনায়—

    ‘তুমি যাবে আমাদের মথিত করে! কোন মহাদেশের

    কোন আসনে হবে তোমার স্থান?

    কতদূর তা কে জানে।’

    শেষ করছি সঙ্কলিতা ও কোতোয়ালের কিছু সংলাপ উল্লেখ করে।

    সঙ্কলিতা (আঁচল তুলে)

    ওগো রাজপ্রতিনিধি,

    তুমি রাজ্যের বিধি।

    তুমি দাও আমাদের অন্ন,

    আমরা যে বড়ই বিপন্ন।

    কোতোয়াল

    য চ’লে ভিখারী মেয়ে যা চ’লে

    দেব না কিছুই তোর আঁচলে।

    সঙ্কলিতা

    তুমি যদি না দেবে তো কে দেবে এ রাজ্যে?

    সবারে রক্ষা করা তোমাদের কাজ যে।

    কোতোয়াল

    চুপ কর হতভাগী, বড় যে সাহস তোর?

    এখুনি বুঝিয়ে দেব আমার গায়ের জোর।

    সঙ্কলিতা

    তোমরা দেখাও শুধু শক্তি,

    তাইতো করে না কেউ ভক্তি;

    করো না প্রজার কোনো কল্যাণ,

    তোমরা অন্ধ আর অজ্ঞান।

    কোতোয়াল

    চল তবে মুখপুড়ী, বেড়েছিস বড় বাড়–

    কপালে আছে রে তোর নির্ঘাত কারাগার।

  • গীতিগুচ্ছ

    গীতিগুচ্ছ

    গীতিগুচ্ছ

    সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত গানের সংকলন গীতিগুচ্ছ প্রকাশিত হল। এতে উনিশটি গান রয়েছে। নিম্নে উনিশটি গানের প্রথম পঙ্‌ক্তি উল্লেখ করা হল—

    1. ওগো কবি তুমি আপন ভোলা।
    2. এই নিবিড় বাদল দিনে।
    3. গানের সাগর পাড়ি দিলাম।
    4. হে মোর মরণ, হে মোর মরণ।
    5. দাঁড়াও ক্ষণিক পথিক হে।
    6. শয়ন শিয়রে ভোরের পাখির রবে।
    7. ও কে যায় চলে কথা না বলে দিও না যেতে।
    8. হে পাষাণ, আমি নির্ঝরিণী।
    9. শীতের হাওয়া ছুঁয়ে গেল ফুলের বনে।
    10. কিছু দিয়ে যাও এই ধূলিমাখা পান্থশালায়।
    11. ক্লান্ত আমি, ক্লান্ত আমি কর ক্ষমা।
    12. সাঁঝের আঁধার ঘিরল যখন।
    13. কঙ্কণ-কিঙ্কিণী মঞ্জুল মঞ্জীর ধ্বনি।
    14. মেঘ-বিনিন্দিত স্বরে।
    15. গুঞ্জরিয়া এল অলি।
    16. কোন অভিশাপ নিয়ে এল এই।
    17. ভুল হল বুঝি এই ধরণীতলে।
    18. মুখ তুলে চায় সুবিপুল হিমালয়।
    19. ফোটে ফুল আসে যৌবন।
  • হরতাল

    হরতাল

    হরতাল

    ‘হরতাল’ কবি সুকান্তের একটি গদ্যগ্রন্থ। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে। কবি সুকান্ত ব্যক্তি জীবনে যেমন সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন তেমন চিন্তার ছাপ রয়েছে তার রচনায়। তার প্রায় সব লেখাতেই সাধারণ মানুষের কথা, দুঃখ-কষ্টের চিত্র উঠে এসেছে। আলোচিত হয়েছে নির্যাতিত মানুষের আর্তনাদ, বিপ্লবের ভাষা ও বিপ্লবীর কণ্ঠস্বর। ‘হরতাল’ গ্রন্থটি তেমনই একটি চিন্তার ফসল। গ্রন্থটিতে তার লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত- অপ্রকাশিত গদ্য সংকলিত হয়েছে। যেখানে হরতাল, দেবতাদের ভয়, ষাঁড়-গাধা-ছাগলের কথা, লেজের কাহিনী শিরোনামের গদ্য স্থান পেয়েছে।
  • সুকান্তের পত্রগুচ্ছ

    সুকান্তের পত্রগুচ্ছ

    সুকান্তের পত্রগুচ্ছ

    সুকান্ত ভট্টাচার্য যে সকল পত্র লিখেছেন, তার মধ্যে বেশির ভাগই বন্ধু অরুণাচলকে লেখা। ‘পত্রগুচ্ছে’ অরুণাচল ও অন্যান্যদের লেখা তাঁর পত্রগুলো সন্নিবেশিত হয়েছে। সারস্বত লাইব্রেরী, ২০৬ বিধান সরণী, কলিকাতা-৬ থেকে প্রকাশিত ‘সুকান্ত সমগ্র’র ২৭১ থেকে ৩৪৩ পাতায় ঊনপঞ্চাশটি চিঠি সন্নিবেশিত হয়েছে। এবং ৩৪৫ থেকে ৩৪৯ পাতায় ‘পত্রগুচ্ছ : পরিচিতি’ শিরোনামে ৬৪টি টিকা যুক্ত করা হয়েছে। এই সকল টীকায় পত্রে উল্লেখিত ব্যক্তি ও অন্যান্য কিছুর পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। আমরা প্রতিটি পত্রের শেষে সংশ্লিষ্ট পত্রের সাথে যুক্ত টীকাটি পরিবেশন করেছি। এবং ‘পত্রগুচ্ছ : পরিচিতি’গুলোকে নিম্নে একত্রে উপস্থাপন করেছি। স্মর্তব্য, একই পত্রে একাধিক টীকা রয়েছে, আবার কোন কোন পত্র আছে টীকাবিহীন, তাই পত্রের সংখ্যা ও টীকার সংখ্যায় গরমিল রয়েছে।

    1.  কবিবন্ধু অরুণাচল বসু।
    2.  এই সময় অরুণাচল বসুর সঙ্গে অর্থহীন অথচ বেশ ভারী ভারী শব্দ বানানোর খেলা চলছিল সুকান্তর। তখন কোনো কোনো লেখক অপ্রচলিত আভিধানিক শব্দকে বাংলায় চালু করার চেষ্টা করছিলেন—তার প্রতি এটা ছিল দু’জনের কটাক্ষ।
    3.  একটি মেয়ের ছদ্মনাম।
    4.  অরুণাচলের মা শ্রীয়ুক্তা সরলা বসুর লেখা একটি গল্প। পরে এটি “ছটি ফাগুন সন্ধ্যা” নামে প্রকাশিত হয়। এই চিঠিটার মাথায় সুকান্তর হাতে আঁকা কাস্তে-হাতুড়ি আছে।
    5.  শ্রীভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। সুকান্তর মাসতুতো ভাই ও বন্ধু।
    6.  শ্রীরমেন ভট্টাচার্য। ভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের জেঠতুতো ভাই ও সুকান্তর বন্ধু।
    7.  বেলেঘাটার বন্ধু শ্রীঅজিত বসু।
    8.  সহপাঠী বন্ধু শ্রীশৈলেন্দ্রকুমার সরকার।
    9.  সহপাঠী বন্ধু শ্রীশ্যামাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
    10.  অগ্রজ শ্রীসুশীল ভট্টাচার্যের বন্ধু শ্রীবারীন্দ্রনাথ ঘোষ। এঁর সাহচর্যে সুকান্ত সাম্যবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন।
    11.  ‘শ্রীঅর্ণব’ অরুণাচলের তৎকালীন ছদ্মনাম। গৃহত্যাগ করায় কৌতুকচ্ছলে এই নামে সুকান্ত তাঁকে সম্বোধন করেছেন। এ-চিঠির প্রেরণ তারিখ ১৯৪২ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ।
    12.  সুকান্তর, অরুণাচল, ভূপেন এবং সুকান্তর সমবয়সী ছোটমামা বিমল ভট্টাচার্য—এই চারজনে ‘চতুর্ভুজ’ নামে একটি বারোয়ারী উপন্যাস লিখছিলেন। চাবুজনে লিখতেন বলে ঐ উপন্যাস-পাঠের সাপ্তাহিক বৈঠকের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘চতুর্ভুজ’। এখানে সেই উপন্যাসেরই উল্লেখ করা হয়েছে।
    13.  জেঠতুতো দাদা শ্রীমনোজ ভট্টাচার্য।
    14.  অরুণাচলের বাবার পোস্ট-কার্ডের পিছনের অংশে লেখা এই চিঠিতে অরুণাচলের অসুস্থতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুকান্ত।
    15. পূর্বোল্লিখিত ছোটমামা শ্রীবিমল ভট্টাচার্য।
    16. বৈমাত্রেয় বড়ভাই মনোমোহন ভট্টাচার্য ও তাঁর পত্নী সরস্থ দেবী।
    17. কবি শ্রীসুভাষ মুখোপাধ্যায়। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে, এই আলাপের আগে সুকান্তর জেঠতুতো দাদা ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কলেজের বন্ধু মনোজ ভট্টাচার্যের সহায়তায়, এর এক বছর পূর্বেই অবশ্ব সুকাত্তর একবার প্রাথমিক সাক্ষাৎ ও সংক্ষিপ্ত আলাপ হয়।
    18. সাহিত্যিক ও সাংবাদিক স্বর্ণকমল ভট্টাচার্য।
    19. গ্রামে থাকার সময় সেখানকার উৎসাহীদে নিয়ে অরুণাচল “ত্রিদিব” নামে পত্রিকা বার করেন। এখানে ঐ পত্রিকার উল্লেখ করা হয়েছে।
    20. সে সময় রাজনীতিতে অনুৎসাহী অরুণাচল উক্ত পত্রিকার জন্য একটি দার্শনিক বা মনস্তাত্ত্বিক কবিতা চেয়েছিলেন। প্রত্যুত্তরে সুকান্ত ‘মুহূর্ত’ কবিতাটি পাঠিয়েছিলেন।
    21. ঐ গ্রামীণ পাঠাগারের জন্য অরুণাচলের অনুরোধে সুকান্ত এই বইয়ের তালিকা পাঠান। ঐ তালিকার তলায় লেখা আছে “এই চিঠির প্রেরণ তারিখ ২৬শে ফাল্গুন, ৪৯”।
    22. এই চিঠিটিও সুকান্ত লিখেছিলেন অরুণাচলের বাবার লেখা পোস্ট কার্ডের পিছনে। অরুণাচলের বাবার ঐ-চিঠির তারিখ ইং ৪।৪।৪৩।
    23. কবি শ্রীঅরুণ মিত্র এবং কবি ও সাংবাদিক সরোজকুমার দত্ত।
    24. পূর্বোল্লিখিত ছোটমামা বিমল।
    25. সম্বোধনহীন এই চিঠিটিও অরুণাচলকে লেখা।
    26. এই চিঠিটি ১৯৪৩ সালের জুন মাসে লেখা।
    27. সুকান্তর অগ্রজ শ্রীসুশীল ভট্টাচার্যের বিয়ের দিন।
    28. সুকান্তর জেঠতুতো মেজদা শ্রীরাখাল ভট্টাচার্যের স্ত্রা রেণু দেবী।
    29. শ্রীরামকৃষ্ণ মৈত্র—তৎকালীন বিশিষ্ট রাজনৈতিক কমী ও বর্তমানে “ইণ্ডিয়ান স্টাডিস পাস্ট অ্যাণ্ড প্রেজেণ্ট’-এর ব্যবস্থাপক সম্পাদক।
    30. লক্ষ্মীবাবু চিত্রশিল্পী। ইনি কমিউনিস্ট পাটির সাংস্কৃতিক কর্মী ছিলেন।
    31. চিঠিতে সুকান্ত স্বাক্ষর ও তারিখ দিতে ভুলে গেছেন। পোস্ট অফিসের শিলমোহরে তারিখ আছে ইং ১৩।৬।৪৪।
    32. সুকান্তর অনুজ শ্রীঅশোক ভট্টাচার্য।
    33. অরুণাচলের অনুপস্থিতিতে তার বাড়িতে লিখে যাওয়া এই চিঠিটির তারিখ ইং ২৯।৭।৪৪।
    34. তৎকালীন ছাত্রনেতা অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্য।
    35. পাটিকর্মী শ্রীহৃষীকেশ ঘোষ।
    36. পরীক্ষার ঠিক আগে অরুণাচলের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ায় বাড়ি ফিরে লাঞ্ছনার ভয় করেছিলেন সুকান্ত। সহপাঠিনী হলেন সেই মেয়েটি যাঁকে সুকান্ত ভালবাসতেন। পোস্ট-অফিসের শিলমোহরে এ-চিঠির তারিখ চিহ্নিত আছে ইং ২৮।২।৪৫।
    37. বর্তমান ত্রিপুরার সাম্যবাদী নেতা শ্রীনৃপেন চক্রবর্তী।
    38. অরুণাচল স্বাধীনতা-র কিশোর সভা-য় নামের আদ্যক্ষর (অ) স্বাক্ষর করে কাটুন আঁকতেন। তার অনুপস্থিতিতে তাকে বিব্রত করবার জন্যেই সেই সই-সহ কিশোর সভা-র পাতায় একটি ছবি ছাপান সুকান্ত। তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে চিঠি লিখলে, অরুণাচলকে সুকান্ত এই উত্তর দেন। এই অহিনকুল মুখোপাধ্যায় বলতে শিল্পী শ্রীদেবব্রত মুখোপাধ্যায়কে বুঝতে হবে। কেননা ছবিটি তিনিই এঁকে দিয়েছিলেন।
    39. ডায়ালেকটিকাল আদালত বলতে সুকান্ত যাকে ভালবাসতেন তার কাছে নালিশের ভয় দেখিয়েছিলেন অরুণাচল। কারণ সুকান্তর সঙ্গে মেয়েটির সম্পর্ক ছিল ‘দ্বন্দ্ব-মধুর’।
    40. তখন অরুণাচল ও সুকান্তর ভাব আদান-প্রদানে ব্যবহৃত কয়েকটি বিশেষ শব্দের অন্যতম এই ‘মেটাফিসিকস’ শব্দটি। বেলেঘাটার শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাই বিভূতি বসু অরুণাচল-সুকান্তর সঙ্গে দেখা হলেই তার তাত্ত্বিক আলোচনায় এই কথাটি খুব ব্যবহার করতেন। অতীত জীবনে বিপ্লবী, অকৃতদার ও বেশ কিছুটা আত্মভোলা প্রকৃতির মানুষ ছিলেন এই মাস্টারমশাই।
    41. বর্তমান চিঠিটি ও ‘প্রিয় বয়স্য’ সম্বোধনমুক্ত চিঠিখানি একই পোস্ট কার্ডের উভয় পিঠে লেখা।
    42. সুকান্ত তখন সাময়িক অসুস্থ হয়ে পার্টির হাসপাতাল ‘রেড-এড কিওর হোমে’। একই শহরে থেকেও অরুণাচল দীর্ঘদিন তাঁকে দেখতে যেতে পারেন নি। তাই সম্বোধনটির মাধ্যমে তার বন্ধুবাৎসল্যকে খোঁচা দিয়ে এই ফাঁকা (ড্যাস চিহ্নিত) কার্ডের চিঠিটি লেখেন সুকান্ত।
    43. এই চিঠিটি অন্যের হাতে পাঠানো একটি হাত-চিঠি। তারিখ সম্ভবত ৩রা বা ৪ঠা ডিসেম্বর ১৯৪৬।
    44. বর্তমান চিঠিটিও ঐ একই সময়কার একটি হাত-চিঠি।
    45. অধ্যাপক শিশির চট্টোপাধ্যায়। এ-চিঠিটি সম্ভবত সুকান্ত অসুস্থ শরীরে অরুণাচলের অনুপস্থিতিতে তাঁর বাড়িতে লিখে রেখে যান।
    46. শিল্পী শ্রীদেবব্রত মুখোপাধ্যায়।
    47. জেঠতুতো দাদা শ্রীরাখাল ভট্টাচার্য।
    48. পূর্বোল্লিখিত রেণু দেবী ও সুকাত্তর বড় মাসি।
    49. অরুণাচলকে লেখা সুকাত্তর সর্বশেষ চিঠি।
    50. অরুণাচলের মা লেখিকা শ্রীমতী সরলা বসুকে লেখা চিঠি। সম্ভবত ১৩৪৮ সালের ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ তারিখে অরুণাচলকে লিখিত চিঠিটির সঙ্গে এটি প্রেরিত হয়। ভাঁজ করা এই চিঠিটির পিছনে লেখা আছে “শ্রীমতী সরলা দেবী সমীপেষু”।
    51. ১৯৪২ সালের ৪ঠা মে তারিখে অরুণাচলের বাবা অশ্বিনীকুমার বসুর পোস্ট-কার্ডের চিঠির পিছনে এই চিঠি লেখেন সুকান্ত।
    52. ১৯৪২ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে অরুণাচলকে লেখা “সৎসঙ্গ শরণমূ, শ্রীশ্রীশ্রী ১০৮ অর্ণবস্বামী গুরুজী মহারাজ সমীপেষু” সম্বোধন-যুক্ত চিঠিটির সঙ্গেই এটি প্রেরিত হয়।
    53. এ চিঠিটি সম্ভবত ১৯৪৭ সালের ৭ই মার্চ লেখা।
    54. অরুণাচলের বাবা অশ্বিনীকুমার বসুকে লেখা চিঠি। সম্ভবত ইংরেজি তারিখ ২০শে মে ১৯৪২।
    55. শ্রীভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। পরবর্তী চারটি চিঠিও একে লেখা।
    56. ছোটমামা শ্রীবিমল ভট্টাচার্য।
    57. পূর্বোল্লিখিত শ্রীরমেন ভট্টাচার্যের দিদি শ্রীমতী বিমল ভট্টাচার্যের দুই কন্যা। সুকান্ত কাশীতে এঁদের বাড়িতে ছিলেন।
    58. ভ্রাতুষ্পুত্রী শ্রীমতী মালবিকা ও পত্রলেখা এবং ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রীউদয়ন ভট্টাচার্য।
    59. জেঠাইমা।
    60. কাশীতে মেজবৌদি রেণু দেবীকে লেখা চিঠিতে সুকান্ত যে লাল কার্ডের উল্লেখ করেছেন তা হল এই চিঠি। এটিও তাঁকেই লেখা।
    61. গল্প-লেখক শ্রীকৃষ্ণ চক্রবর্তীকে লেখা চিঠি। ১৯৭১ সালের আগস্টে প্রকাশিত ’বাংলা দেশ’ পত্রিকা থেকে চিঠিটি সংগৃহীত হয়েছে।
    62. কিশোর বাহিনীর কর্মসচিব হিসাবে কিশোর বাহিনীর কোনো সদস্যকে লেখা চিঠি।
    63. পরিচিতি ৬২ দ্রষ্টব্য।
    64. হুগলীর কমিনিস্ট কর্মী শ্রীমদন সাহাকে লেখা চিঠি।
  • সুকান্তের অপ্রচলিত রচনা

    সুকান্তের অপ্রচলিত রচনা

    সুকান্তের অপ্রচলিত রচনা : পরিচিতি

    সুকান্ত ভট্টাচার্যের অগ্রন্থিত ও প্রচলিত রচনাসমূহের সঙ্কলন।

    1. ‘ক্ষুধা’ গল্পটি ২রা এপ্রিল ১৯৪৩-এর অরণি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অরুণাচলকে লেখা ২৭শে চৈত্র ১৩৪৯ তারিখের চিঠিতে এই গল্পটির উল্লেখ করেছেন সুকান্ত।
    2. ‘দুর্বোধ্য’ গল্পটি ২৮শে মে ১৯৪৩-এর অরণি পত্রিকায় চিত্র-গল্প হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে।
    3. ‘ভদ্রলোক’ গল্পটিও অরণিতে ১৪ই ফ্রেব্রুয়ারী ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে।
    4. ‘দরদী কিশোর’ গল্পটি সাপ্তাহিক জনযুদ্ধ পত্রিকায় কিশোর বিভাগে ২৮শে এপ্রিল ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত হয়।
    5. ‘কিশোরের স্বপ্ন’ গল্পটি জনযুদ্ধের কিশোর বিভাগে ৬ই অক্টোবর ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত হয়। জনযুদ্ধে প্রকাশিত গল্প দুটি শ্রীসুধী প্রধানের সহায়তায় সংগৃহীত।
    6. ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ প্রবন্ধটি ২৫শে ফেব্রুয়ারী ১৯৪৪-এর অরণিতে প্রকাশিত হয়েছে।
    7. গানটির রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪০। এটি ‘সূর্য-প্রণাম’-এর সমকালীন একটি অসম্পূর্ণ গীতিকাব্যের প্রথমাংশ বলে মনে হয়।
    8. এই গানটি শ্রীবিমল ভট্টাচার্য তাঁর স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে দিয়েছেন। গানটি গীতিগুচ্ছের গানগুলির সমকালীন বলে মনে হয়।
    9. সেপ্টেম্বর ১৯৪২-এ প্রকাশিত ‘জনযুদ্ধের গান’ সংকলন গ্রন্থটি থেকে এই গানটি সংগৃহীত।
    10. গানটি মাসিক বসুমতী, আশ্বিন ১৩৬৩-তে প্রকাশিত হয়েছে। পাণ্ডুলিপিও পাওয়া গেছে। রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪৩-৪৪ সাল।
    11. গানটির রচনাকাল ১৯শে জুলাই ১৯৪৪ সাল।
    12. ১২-১৩। ‘ভবিষ্যতে’ ও ‘সুচিকিৎসা’—এই ছড়া দুটি শ্রীভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের লেখা সুকান্ত-প্রসঙ্গ’, ‘শারদীয়া বসুমতী’, ১৩৫৪-থেকে সংগৃহীত। পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় নি! এগুলি ১৯৪০-এর আগের লেখা বলে অনুমিত।
    13. পরিচয় ছড়াটির রচনাকাল ১৩৩৯-৪০ সাল বলে মনে হয়।
    14. এই কবিতাটিও ভূপেন্দ্রনাথের ‘সুকান্ত-প্রসঙ্গ’ প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত। পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়নি, এটি ১৯৪০-এর আগের রচনা।
    15. ‘চৈত্রদিনের গান’ কবিতাটি শ্রীবিজনকুমার গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ছোটদের ‘শিখা’ পত্রিকার জন্য রচিত। রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪০।
    16. এই কবিতাটি অরুণাচলকে সুকান্ত পত্রাকারে লিখেছিলেন। রচনার তারিখ ১৩ই কার্তিক ১৩৪৮।
    17. ‘পটভূমি’ কবিতাটির রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪২-৪৩।
    18. ‘ভারতীয় জীবনত্রাণ-সমাজের মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে শোকোচ্ছ্বাস (শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য-কে)’ — এই শিরোনামায় কবিতাটি লেখা হয়েছিল। দক্ষিণ কলকাতার লেক অঞ্চলের ‘ইণ্ডিয়ান লাইফ সেভিং সোসাইটি’র সদস্য ছিলেন শ্রীশচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। লেকে যুদ্ধকালীন মিলিটারী ক্যাম্প হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে সুকান্ত এই কবিতাটি লিখেছিলেন।
    19. “নব জ্যামিতি”র ছড়া সাপ্তাহিক জনযুদ্ধের কিশোর বিভাগে প্রকাশের উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল। রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪৩।
    20. ‘জবাব’ কবিতাটি কার্তিক ১৩৫০-এর পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। কবিতাটি শ্রীঅমিয়ভূষণ চক্রবর্তীর সৌজন্যে প্রাপ্ত।
    21. ‘চরমপত্র’ কবিতাটির রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪৪।
    22. ১৯৪৪ সালে সুকান্তর মেজদা শ্রীরাখাল ভট্টাচার্য গ্রেফতার হন। তাঁর মুক্তি উপলক্ষে সুকান্ত এই কবিতাটি লেখেন।
    23. ১৯৪৫ সালে সুকান্ত মেজবৌদি রেণু দেবীর সঙ্গে কাশী বেড়াতে যান। সুকান্ত ফিরে এসে শ্যামবাজারের বাড়ি থেকে এই চিঠিটি তাঁকে লিখেছিলেন। চিঠিটি শ্রীরাখাল ভট্টাচার্য স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে দিয়েছেন।
    24. ‘মার্শাল তিতোর প্রতি’ কবিতাটির রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪৬।
    25. ‘ব্যর্থতা’ কবিতাটি আষাঢ় ১৩৫৩-এর কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কবিতাটি ‘মীমাংসা’ কবিতার প্রথম খসড়া বলে মনে হয়।
    26. ১৯৪৬ সালে রচিত এই কবিতাটি খুলনা ‘সপ্তর্ষি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। শয্যাশায়ী সুকান্ত ‘রেড-এড কিওর হোম’ হাসপাতালের রাইটিং প্যাডে লিখে এটি পাঠান। কবিতাটি শ্রীমনীশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যে প্রাপ্ত।
  • সুকুমার সাহিত্য সমগ্র

    সুকুমার সাহিত্য সমগ্র

    সুকুমার সাহিত্য সমগ্র

    উপেন্দ্রকিশোর রায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র সুকুমারের জন্ম ১৮৮৭ খ্রীষ্টাব্দে। ১৯০৬-এ পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন দুই বিষয়েই অনার্স নিয়ে বি. এস্‌সি পাশ করার পর ১৯১১-য় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গুরুপ্রসন্ন ঘোষ বৃত্তি লাভ করে মুদ্রণ বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য তিনি বিলেতে যান। লণ্ডনে ও ম্যাঞ্চস্টারে অধ্যয়ন করেন তিনি ও তাঁর গবেষণার জন্য সম্মানিত হন। ১৯১৩-য় উপেন্দ্রকিশোরের সম্পাদনায় ছোটদের সচিত্র মাসিক পত্রিকা ‘সন্দেশ’ প্রকাশিত হয়। সুকুমার দেশে ফেরার কিছু কাল পরে ১৯১৫-য় উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যু হয়। সুকুমার ইউ রায় অ্যাণ্ড সন্‌স কার্যালয়ের পরিচালনার এবং ‘সন্দেশ’ সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ‘সন্দেশ’-এর পাতাতেই তাঁর অধিকাংশ ছোটদের লেখা—গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, ধাঁধা ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে। শুধু নিজের লেখা নয়, ‘সন্দেশ’-এর অন্যান্য লেখকদের রচনার জন্যও অজস্র ছবি এঁকেছেন তিনি। ‘হ য ব র ল’, ‘আবোল তাবোল’, জাতীয় আজগুবি চালের বেঠিক বেতাল ভুলের ভবের গদ্য ও পদ্য রচনা ছাড়াও শিল্প সাহিত্য ভাষা ধর্ম বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি বিষয়ক গম্ভীর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও সক্রিয় ছিল তাঁর লেখনী।

    আড়াই বছর কালাজ্বরে ভূগে ১৯২৩-এ মাত্র ৩৬ বছর বয়সে সুকুমার রায় ১০০ গড়পার রোডের বাড়িতে পরলোকগমন করেন। মৃত্যুর কিছু দিন আগেও তিনি শুয়ে শুয়ে সন্দেশের জন্য ছবি এঁকেছেন, প্রচ্ছদ রচনা করেছেন, গল্প কবিতা লিখেছেন। ‘আবোল তাবোল’-এর ডামি কপিটিও রোগশয্যায় তৈরি করেছেন। কিন্তু বইটি ছেপে বেরোবার ন’ দিন আগে তাঁর মৃত্যু হয়।

  • রাইফেল, রোটি, আওরাত

    রাইফেল, রোটি, আওরাত

    ভূমিকা

    মানুষ এবং পশুর মধ্যে বড় একটা পার্থক্য হচ্ছে, পশু একমাত্র বর্তমানকেই দেখে, মানুষ দেখে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতকে এক সঙ্গে বিচেনা করে। যখন কোন ব্যক্তি এবং সমাজ একমাত্র বর্তমানের মধ্যেই আবর্তিত হতে থাকে তখন সর্বনাশের ইশারা প্রকট হতে থাকে।

    বাঙালির সুদীর্ঘ ইতিহাসের বোধ করি সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় হচ্ছে তার সংগ্রামের কালগুলো। এবং এক্ষেত্রে উজ্জ্বলতম ঘটনা হচ্ছে, ১৯৭১-এ পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অসাধারণ লড়াই। এ ছিল সমগ্র জাতির একতাবদ্ধ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সংগ্রাম। আমাদের পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্য, আমাদের বর্তমানের গৌরব এবং আমাদের ভবিষ্যতের প্রেরণা বাঙালির এ সংগ্রামের ইতিহাস।

    অত্যন্ত শঙ্কিত চিত্তে লক্ষ্য করার মত ব্যাপার হচ্ছে, আমরা এটাকে যেন ভুলে যেতে বসেছি। যেসব লক্ষ্য নিয়ে আমাদের লড়াই তাকে বাস্তবে রূপায়িত করার ব্যর্থতা থেকেই। এ বিস্মৃতির সূত্রপাত হচ্ছে। কিন্তু ব্যর্থ বর্তমান তো কোন জাতিরই চিরকালের সত্য ইতিহাস নয়, সত্য অনুভূতিও নয়। যে আবেগ এবং অনুভূতি চক্রান্তের ধূর্তচক্রে আচ্ছন্ন হচ্ছে, তাকে উজ্জীবিত করার জন্যই দরকার সংগ্রামের কালের মানুষের মহান ত্যাগ এবং নিষ্ঠাকে বারংবার স্মরণ করা। তার থেকেই আসবে কুশায়াকে দূর করার উজ্জ্বল সম্ভাবনা। আমাদের চিত্তের পবিত্রতা রক্ষা পাবে।

    সেকালের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের মধ্যে বসে লেখা আমাদের সমগ্র ইতিহাসে একটি মাত্র উপন্যাসই পাওয়া যায়—এ উপন্যাসই হচ্ছে “রাইফেল রোটি আওরাত”। ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাস এর রচনাকাল। লেখক শহীদ আনোয়ার পাশা নিহত হলেন ১৯৭১ সালেরই ১৪ই ডিসেম্বর। স্বাধীনতা লাভের মাত্র দু’দিন আগে তিনি যে অমর কাহিনী উপন্যাসে বিধৃত করেছেন নিজেই হয়ে গেলেন তারই অঙ্গ চিরকালের জন্য।

    আনোয়ার পাশার উপন্যাসটি একদিক দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বসে একজনের প্রতিটি মুহূর্তের কাহিনী। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে সৃষ্ট এ শিল্পকর্ম কতটা সত্যনিষ্ঠা লেখকের জীবনের পরিণতিই তার মহান সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।

    রবীন্দ্রনাথ বলেছেন–জীবনে জীবন যোগ করা না হলে, কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা।

    আনোয়ার পাশার উপন্যাস, তাঁর শেষ উচ্চারণ : নতুন মানুষ, নতুন পরিচয় এবং নতুন একটি প্রভা। সে আর কত দূরে। বেশি দূর হতে পারে না। মাত্র এই রাতটুকু তো। মা ভৈঃ। কেটে যাবে।” তার এবং আমাদের সকলের কামনা ও প্রত্যাশারই অভিব্যক্তি। শিল্পী তাঁর জীবনকে আমাদের জীবনের মধ্যে পরিব্যাপ্ত করে দিয়েছেন। ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ আনোয়ার পাশার শহীদ আত্মার আকাঙ্ক্ষাকেই যেন আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত করে চলেছে নিরন্তর এবং অম্লান।

    কাজী আবদুল মান্নান

    বৈশাখ, ১৩৯৪

    রাজশাহী।

  • পুরানো সেই দিনের কথা

    পুরানো সেই দিনের কথা

    পুরানো সেই দিনের কথা

    পুরানো সেই দিনের কথা আকবর আলি খানের আত্মজীবনী—একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের জীবনের উন্মেষ ও বিকাশের কাহিনী। এ আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে লেখক তাঁর পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে লিখেছেন আবার নবীনগরের প্রেক্ষাপট সম্পর্কেও লিখেছেন। ছোটবেলা থেকে লেখক ছিলেন বইপাগল। তবে নবীনগরে ভাল বই পাওয়া যেত না। ভাল বই পড়ার অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা মিটত ঢাকায় এলে। তিনি হন তুখোড় পাঠক। এই পাঠকই একদিন পড়তে পড়তে এবং গবেষণা করতে করতে লেখকে পরিণত হন। অবশ্য কোনো বই-ই দীর্ঘদিন গবেষণা ছাড়া তিনি লেখেন না। তাঁর প্রথম বই বের হয় ৫২ বছর বয়সে।

    নবীনগরের জলাভূমিতে লালিত সাদাসিধে বালকটি ছিলেন কল্পনাবিলাসী ও অন্তমু‌র্খী। ব্যক্তিগত জীবনে লাজুক এই লোকটি জীবিকার জন্য যোগ দেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে— মুখচোরা বালকটি হলেন মাঠপর্যায়ের প্রশাসক। সিভিল সার্ভিসের বিচিত্র কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে মুখোমুখি করে নানা চ্যালেঞ্জের। দায়িত্ব নেন আইনশৃঙ্খলা, ভূমি প্রশাসন, উন্নয়ন প্রশাসন, নির্বাচন, এমনকি চা-বাগানের মত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার। এই অভিজ্ঞতার বিবরণ পাঠকদের কাছে পড়তে ভাল লাগবে।

    লেখক মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এই বইয়ের তিনটি অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকারের ক্রিয়াকাণ্ড বর্ণনা করেছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অধ্যায়গুলোতে মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের টালমাটাল দিনগুলোর পরিস্থিতিতে লেখকের অভিজ্ঞতা সাধারণ পাঠকদের ভাল লাগবে এবং বর্তমান প্রশাসকদের কাজে লাগবে।

    পুরানো সেই দিনের কথা প্রথম প্রকাশিত হয় ফাল্গুন ১৪২৮, ফেব্রুয়ারি ২০২২।

    উৎসর্গ

    মরহুম হামীম খান

    মরহুম নেহরীন খানের স্মৃতির উদ্দেশে নিবেদিত

    কৃতজ্ঞতা স্বীকার

    যদিও বইটি আমার আত্মজীবনী, তবু এতে আমার পূর্বপুরুষদের প্রায় ২০০ বছরের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য আমাকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছেন নীলুফার আহমদ (বীণা আপা), হাবিবুল্লাহ খান (রানু ভাই), ফরহাত উল্লাহ (পেরু), জি এম জিয়াউদ্দিন খান (জসিম), কবিরউদ্দিন খান, মাসরুর আলী খান (জামিল), ফারুক খান, কায়সার খান, ওয়ারেস আলী খান (অপু), জুবায়ের আহমদ খান (লুডু), ড. আহমদ হোসেন (ফুল মিয়া), মিনু আলম, সৈয়দ নুরউদ্দিন, মো. রিয়াজুর খান (সেন্টু), তাহমিনা খান, খন্দকার গিয়াসউদ্দিন (রসুল্লাবাদ স্কুলের শিক্ষক)। সব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে, তবু ভুল থাকতে পারে। যদি কোনো ভুল থাকে, তার জন্য আমি একা দায়ী, যাঁরা তথ্য দিয়েছেন, তাঁদের কেউ নন।

    ২০০৮ সালে মেরুদণ্ডের জটিলতার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমার একটি অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারটি পুরোপুরি সফল না হওয়াতে আমার হাত-পা অচল হয়ে যায়। ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে হাত ও পায়ের কার্যকারিতা কিছুটা ফিরে পাওয়ার পর আমি নিজে টাইপ করতে পারতাম। ২০১৫ সালের পরে হাত-পায়ের কার্যক্ষমতা আবার হ্রাস পায়। এখন আমার হাতের লেখা দুষ্পাঠ্য এবং টাইপ করার ক্ষমতা প্রায় শূন্যের ঘরে নেমে এসেছে। এই অবস্থায় বাইরের সহায়তা ছাড়া আমার পক্ষে বই লেখা সম্ভব নয়।

    বর্তমানে দুটি প্রতিষ্ঠান আমাকে বই লেখার ব্যাপারে সহায়তা করছে। প্রথম প্রতিষ্ঠানটি হলো প্রথমা প্রকাশন। বইটি লেখার জন্য উৎসাহিত করেছেন প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রথমার কর্ণধার মতিউর রহমান, প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ ও প্রথমার ব্যবস্থাপক মো. হুমায়ুন কবীর। তাঁদের সবাইকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। প্রথমা প্রকাশন আমার অসুবিধা বিবেচনা করে তাদের কম্পিউটার অপারেটর মো. শহিদুল ইসলামকে আমাকে সহায়তার দায়িত্ব দেয়। মো. শহিদুল ইসলাম ও প্রথমার অন্যান্য কর্মীর স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা ছাড়া এ বই প্রকাশ করা সম্ভব হতো না। আমি তাঁদের সবাইকে জানাই ধন্যবাদ।

    দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠান যেটি আমার লেখার ব্যাপারে সহায়তা করছে, সেটি হলো ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার আমার বই লেখার জন্য ব্যবহার করতে পেরেছি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষকতা সহকারী এস এম রিফাত হাসান নানাভাবে এ বই লেখায় আমাকে সহায়তা করেছেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও রিফাত হাসানকেও জানাই ধন্যবাদ।

    বইটির পাণ্ডুলিপি পর্যালোচনা করার জন্য আমার বন্ধু ওয়ালিউল ইসলাম ও ছোট ভাই জিয়াউদ্দিন খানকে দিয়েছিলাম। উভয়েই অনেক মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছেন। আমি তাদের অধিকাংশ পরামর্শই গ্রহণ করেছি। এরপর যা ত্রুটি রইল, তার জন্য আমিই দায়ী। সিভিল সার্ভিস একাডেমির ব্যাচমেটদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে সহায়তা করেছেন ওয়ালিউল ইসলাম, আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী এবং কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ। এঁরা গত ষাট বছর ধরে আমাকে নানাভাবে সহায়তা করে এসেছেন। এঁদের কাছে আমার ঋণের সীমা নেই।

    শারীরিকভাবে আমি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। আমাকে সক্রিয় রাখার জন্য মানসিক সমর্থনের প্রয়োজন রয়েছে। আমার বড় বোন নীলুফার আহমদ ও আমার কনিষ্ঠ দুই ভাই জিয়াউদ্দিন খান ও কবিরউদ্দিন খান এবং তাঁদের সহধর্মিণী মাকসুদা ও আনোয়ারার সার্বক্ষণিক সমর্থনের ফলেই আমি শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও এখনো কাজ করতে পারছি। আমার শাশুড়ি মিসেস জাহানারা রহমান (যার বয়স ইনশা আল্লাহ কয়েক মাসের মধ্যে ১০০ পূর্ণ হবে) এবং আমার স্ত্রীর বড় ভাই ড. এহসানুর রহমান আমার যে যত্ন নিচ্ছেন, তার জন্য আমি তাদের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। এই বই লেখার সময় বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন আমার এককালের সহকর্মী জনাব আহমদ আলী, আমিন চৌধুরী, ফরহাত উল্লাহ (পেরু), স্বরূপ দে ও মোহাম্মদ ফারুক। তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

    আকবর আলি খান১ জানুয়ারি ২০২২

    পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়।

    ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

  • পলাশির অজানা কাহিনী

    পলাশির অজানা কাহিনী

    পলাশির অজানা কাহিনী
    [writer]

    পলাশির ঘটনাবলী ও যুদ্ধ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে এমন একটি বদ্ধমূল ধারণা প্রচলিত আছে যে, সিরাজদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করবার জন্য মীরজাফর, জগৎশেঠ প্রমুখ তখনকার কয়েকজন বণিক-ব্যাংকার-অভিজাত মানুষ চক্রান্ত সাজিয়েছিলেন। পেছন থেকে তাঁদের সাহায্য করেছিল ইংরেজরা। পলাশির পেছনে ইংরেজদের কোনও ‘পূর্বপরিকল্পনা’ ছিল না, তাদের বাংলাবিজয় নেহাতই ‘আকস্মি ‘ ঘটনা। এমনকী, অনেক ঐতিহাসিক এও মনে করেন, বাংলার ‘আভ্যন্তরীণ সংকট’ ই ইংরেজদের বাংলায় ডেকে আনে। এই গ্রন্থ কিন্তু ঠিক এর উল্টো কথাই বলেছে। পলাশির ষড়যন্ত্র ও প্রাক্‌-পলাশি ঘটনাবলীর বিশদ ও সূক্ষ্ণ বিশ্লেষণ করে এবং ডাচ ও ইংরেজ কোম্পানির নথিপত্র, কোম্পানির কর্মচারীদের লেখা থেকে অসংখ্য তথ্য সংগ্রহ করে লেখক সন্দেহাতীতভাবে দেখিয়েছেন যে, পলাশি চক্রান্তের মূল নায়ক ইংরেজরাই। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মদত ছাড়া ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধ কোনওভাবেই সম্ভব হত না। তারাই একদিকে ভারতীয়দের নানা প্রভোলণ ও প্রচ্ছন্ন ভয় দেখিয়ে, অন্যদিকে কাকুতি-মিনতি করে অন্যদের নিজস্ব চতুর ‘পরিকল্পনা’য় সামিল করিয়েছিল। সেই সময় ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্য নিদারুণ সংকটে পড়ে যাওয়ায়, কোম্পানির কর্মচারীদের কাছে ছলে-বলে কৌশলে বঙ্গবিজয় ছাড়া আর কোনও পথ খোলা ছিল না। পলাশির যুদ্ধ তারই পরিণতি। এই গ্রন্থের লেখক পলাশি নিয়ে বহু ধারণাকে আসার প্রমাণিত করেছেন, প্রতিষ্ঠা করেছেন আবিষ্কৃত নতুন তথ্য ও সত্যের।


    উৎসর্গ

    আমার মা স্বৰ্গতা ইন্দুবালা চৌধুরীর স্মৃতির উদ্দেশে


    ঋণ স্বীকার

    আমার স্ত্রী, মহাশ্বেতা, এ বই লেখার ব্যাপারে আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন। তাঁর সাহায্য ছাড়া আমার পক্ষে এ-বই লেখা সম্ভব হত না, যেমন হত না আমার অন্য বইগুলি লেখাও। বহরমপুরের ‘ইতিহাস পরিক্রমা’ এ বইয়ের জন্য কয়েকটি ছবি দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছেন। ন্যাশনাল লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ কয়েকটি দুষ্প্রাপ্য বই থেকে ছবি তোলার অনুমতি দিয়ে বাধিত করেছেন। কলকাতার ছবি দুটি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল-এর সৌজন্যে। আনন্দ পাবলিশার্স অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বইটি প্রকাশনার ব্যবস্থা করায় আমি আনন্দিত।

  • আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি

    আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি

    আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি

    আকবর আলি খান রচিত আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি গ্রন্থটি লেখকের অর্থনৈতিক জ্ঞান, বাস্তব অভিজ্ঞতা আর নিবিড় গবেষণার নির্যাস। প্রবন্ধ গুলোর বিষয়বস্তু কৌতুহল উদ্দীপক যা পাঠকে আগ্রহী করবে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে পৌষ ১৪১৯ (জানুয়ারি ২০১৩); প্রকাশক প্রথমা প্রকাশন, ১৯ কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫, বাংলাদেশ; প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন প্রতিথযশা শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী, তাঁর সহযোগিতায় ছিলেন অশোক কর্মকার। এই গ্রন্থে রয়েছে ১০টি প্রবন্ধ; প্রতিটিতে লেখক ভিন্ন বিষয় আলোচনা করেছেন। প্রবন্ধগুলি অর্থনীতি, সুশাসন আর সমাজ সম্পর্কে আমাদের বিদ্যমান ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করে যায় নিরন্তর। উন্মোচিত করে চিন্তার এক নতুন দিগন্ত। গভীর বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ প্রবন্ধগুলিতে যেমন লেখক নিজস্ব বিশ্লেষণ ছাড়াও বিভিন্ন পণ্ডিতদের বিশ্লেষণ গুলোকে বিন্যস্ত করেছেন নিপূণভাবে।

    হতাশাগ্রস্থ বিজ্ঞান নামে অভিহিত অর্থনীতি ছিল একদিন সমাজবিজ্ঞানের দুয়োরানি। অথচ অর্থনীতিই আজকের সমাজবিজ্ঞানের সম্রাজ্ঞী। এর আওতা শুধু চাহিদা-জোগান বা রুটি-রোজগারেরর মতো আটপৌরে সমস্যায় সীমিত নয়। অর্থনৈতিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আইনশাস্ত্র, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ইতিহাস, সংগঠন ও সিদ্ধান্ত তত্ত্বে এবং সমাজতত্ত্বের সব শাখায়। জন্ম, বিবাহ, ধর্ম, এমনকি ভাষা নিয়ে গবেষণায়ও প্রয়োগ করা হচ্ছে অর্থনীতির সূত্র। দুর্ভাগ্যবশত অর্থনীতির বিকাশমান মাত্রা ও নতুন ধারাসমূহের বৈভন এখনো বাংলা ভাষায় প্রতিফলিত হয়নি। বাংলায় অর্থনীতি এখনো মান্ধাতা আমলের পাঠ্যবিষয় ও বাম-ডানির তরজায় সীমাবদ্ধ। গতানুগতিক গণ্ডির বাইরের কিছু অর্থনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে বাঙালি পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেবে এ বই।

    প্রবন্ধগুলোর বিষয়বস্তু বিচিত্র ও কৌতূহলোদ্দীপক। একটি প্রবন্ধের শিরোনাম ‘ভেগোলজি ও অর্থনীতি।’ দুটি প্রবন্ধে অর্থনীতিতে অনভিপ্রেত পরিণাম ও মিত্রপক্ষের গুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। দুটি প্রবন্ধের উপজীব্য বিশ্বায়ন। সুখ ও অর্থনীতির সম্পর্ক নিয়ে পর্যালোচনা দেখা যাবে একটি নিবন্ধে। তথ্য অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ‘সুকতলার অর্থনীতি ও জুতার রাজনীতি’তে। একটি প্রবন্ধে জন্মদিনের অর্থনীতি ও আরেকটি প্রবন্ধে সরকারের অপচয় নিয়ে বিশ্লেষণ রয়েছে। নির্ভেজার গবেষণামূলক এই বই লেখা হয়েছে সহজ ভাষায়, বৈঠকি মেজাজে।

    বইটির অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লেখক নিজে কোন সিদ্ধান্ত দেন নি বরং নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করে গেছেন যেটা সবচেয়ে মুগ্ধ করবে পাঠককে। পরস্পর বিরোধী তত্ত্বগুলিকে বিশ্লেষণ করে গেছেন এমনভাবে যে, যে কোন একটা পড়লে মনে হয় এটাই ঠিক। এইখানেই লেখকের স্বার্থকতা। তিনি পেরেছেন, নিরপেক্ষ থাকতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভারটা পাঠককেই দিয়েছেন। একটা একটা প্রবন্ধ শেষে পাঠক উদ্দীপ্ত হয় সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আরও জ্ঞানার্জন করতে।

    আজব ও জবর আজব অর্থনীতি বইটি অর্থনীতির একাডেমিক কোনো বই নয়। বইটি গতানুগতিক গণ্ডীর বাইরের কিছু অর্থনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে বাঙালি পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেবে। অর্থনীতি সম্পর্কে ধারণা কম যেমন— সামষ্টিক অর্থনীতি, বিভিন্ন বিষয়ের উপর অর্থনীতির প্রভাব এগুলো সহজভাবে জানার জন্য বইটি মন্দ নয়।

    উৎসর্গ

    আমার পরম স্নেহের ছোট ভাই

    জি এম জিয়াউদ্দিন খান

    কবীর উদ্দিন খান

    এবং

    তাঁদের সহধর্মিণী

    মাকসুদা খান

    আনোয়ারা খান

  • নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ

    নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ

    বাংলার ইতিহাস তথা উপমহাদেশের ইতিহাসকে জানতে চাইলে মুর্শিদাবাদকে বাদ তো দেয়া যাবেই না, বরং এ শহরটার গুরুত্ব অনেক অনেক বেশি। এ শহরের পরাজয় দিয়ে বাংলা তথা ভারতবর্ষে শুরু হয়েছিল ইংরেজদের শাসন।

    মুর্শিদাবাদ নগরী। এক করুণ-রঙিন ইতিহাস লগ্ন হয়ে আছে সে নগরীর পরতে পরতে। নবাব মুর্শিদকুলি খান ১৭০৪ সালে এই নগরীর পত্তন করেন। সে হিসেবে ২০০৪ সালে মুর্শিদাবাদের তিনশো বছর পূর্ণ হল। এ উপলক্ষেই বর্তমান গ্রন্থের অবতারণা। মুর্শিদাবাদ সংক্রান্ত বেশির ভাগ প্রামাণিক গ্ৰন্থই একশো বছর বা তার আগে লেখা। গত কয়েক দশকেও এই নগরী নিয়ে বেশ কিছু বই ও কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তার সবগুলিতেই মুর্শিদাবাদের খণ্ড খণ্ড চিত্র, সামগ্রিক চিত্র ঠিক কোথাও পাওয়া যায় না।

    মুর্শিদাবাদের তিনশো বছর পূর্তি উপলক্ষে এর ইতিহাসের প্রতি, বিশেষ করে স্বাধীন নবাবি আমলে এই শহরের প্রসঙ্গে, নতুন ভাবে দৃষ্টিপাত করার প্রয়োজন আছে। লেখক প্ৰায় চার দশক ধরে ইউরোপের বিভিন্ন আর্কাইভসে যে-সব নতুন তথ্যের সন্ধান পেয়েছেন, তার ভিত্তিতে নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের এই সার্বিক ইতিহাস রচনা করেছেন। লেখক এই সত্যের প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন, নবাবি আমলই মুর্শিদাবাদের স্বর্ণযুগ। মুর্শিদাবাদে তিন বণিকরাজার কার্যকলাপ, পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব কেন হল, তার সম্পূর্ণ নতুন ব্যাখ্যা, এ নগরীর বেগমদের সম্বন্ধে আকর্ষণীয় বিবরণ এবং মুর্শিদাবাদের শিল্প, বাণিজ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের আকরভিত্তিক বিশ্লেষণ গ্রন্থটির অন্যতম আকর্ষণ।

    এ শহর, সিরাজ-উদ-দৌলা, মীরজাফর, জগৎশেঠ ইত্যাদি অনেককে নিয়ে অনেক তথ্য অনেক গুজব আছে। এমনকি এমন কিছু বইও আছে যেখানে লেখা আছে, ইংরেজরা আসলে বাংলা দখল করতে চায়নি। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে না চাইতেও সেটা হয়ে গেছে। এ বইতে অধ্যাপক সুশীল চৌধুরী সেসব গুজবকে অসংখ্য রেফারেন্স দিয়ে নাকচ তো করেছেনই সঙ্গে ইতিহাস, সমাজব্যবস্থা, মুর্শিদাবাদের উত্থান ইত্যাদি নানা দৃষ্টিকোণ দিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থাটা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।

    অধ্যাপক সুশীল চৌধুরী বাংলার স্বাধীন নবাবি আমলের রাজধানী মুর্শিদাবাদের রাজনীতি নিয়ে লিখেছেন। যে রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ পুরো ভারতবর্ষের ইতিহাসের বাঁক বদলে দিয়েছিল।

    আওরঙ্গজেব তাঁর বিশ্বস্ত দেওয়ান করতলব খাঁকে হায়দরাবাদের দেওয়ানের পদ থেকে নিয়ে এসে বাংলা সুবার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেন। তখন রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর এবং সুবাদার সম্রাট আওরঙ্গজেবের নাতি আজিম-উস-শান। রাজস্বসহ আরও নানা ইস্যুতে আজিমের সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় করতলব খাঁর। বলা হয়, করতলব খাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেন আজিম-উস-শান। চৌকস করতলব খাঁ সম্রাটের প্রিয়ভাজন ছিলেন। কারণ দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধে বিধ্বস্ত আওরঙ্গজেবের তখন পয়সার প্রধান উৎস বাংলা সুবা। সেই বাংলা থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পাঠান করতলব খাঁ।

    বুদ্ধিমান করতলব খাঁ রাজস্ব বিভাগ ও কর্মচারীদের নিয়ে মকসুদাবাদে চলে এলেন। ইতোমধ্যে সম্রাট খুশি হয়ে করতলব খাঁকে মুর্শিদকুলি খান উপাধি দিয়েছেন। বাদশাহের অনুমতিক্রমে মখসুদাবাদের নামকরণ করলেন করলেন মুর্শিদাবাদ। ১৭১৭ সালে বাংলার রাজধানী হয়ে গেল মুর্শিদকুলির মুর্শিদাবাদ।

    মুর্শিদকুলি খানের উত্থানের কাহিনি বিস্ময়কর। তিনি জন্মেছিলেন হিন্দু বামুনের ঘরে। ছোটবেলায় ক্রীতদাস হিসেবে তাকে কিনে নেন একজন ইরানি ব্যবসায়ী। এই ব্যবসায়ী রাজস্বব্যবস্থা ভালো বুঝতেন। আবারও, হাতবদল হয় মুর্শিদকুলির মালিকানা। এবার একজন ফারসি অভিজাতের অধীনস্থ হন তিনি। আরও ভাল ভাবে শেখার সুযোগ হয় খাজনা আদায়ের কাজকর্ম। এভাবেই রাজস্ব বিভাগে দক্ষতা অর্জন করেন মুর্শিদকুলি। যা পরবর্তীতে তার জীবনে চরম সৌভাগ্য বয়ে এনেছিল।

    মুর্শিদকুলি বুদ্ধিমান শাসক ছিলেন। তিনি জানতেন দিল্লির বাদশাকে নজরানা দিয়ে তুষ্ট করলেই চলবে। তিনি রাজস্বব্যবস্থাকে ঢেলে সাজান। তার আমলে বাংলার বড় বড় পদ-পদবিধারী প্রায় সকলেই ছিলেন হিন্দু। মুর্শিদকুলি মনে করতেন রাজস্ব আদায়ে মুসলমান কর্মীরা ফাঁকি দিতে পারে। তাই তিনি হিন্দুদের নিযুক্ত করেছিলেন। তার আমলে বাংলার উনিশটি বৃহৎ জমিদারির আঠারোটি ছিল হিন্দু জমিদারদের। অর্থাৎ, বাংলায় ধনাঢ্য মানুষ বেশির ভাগ হিন্দু সম্প্রদায়ের ছিল। তাহলে মুসলমানদের আর্থিক দুরবস্থার জন্য ব্রিটিশরা কতখানি দায়ি তা নিয়ে আরও আলাপ-আলোচনা হতে পারে। কারণ নবাবি আমলেই দেখা যাচ্ছে, ধন-সম্পদের মালিকানায় হিন্দু সম্প্রদায় এগিয়ে।

    মুর্শিদকুলি জাহাঙ্গীরনগর থেকে মুর্শিদাবাদে চলে আসার সময় সেখানকার কিছু সম্পদশালী বণিক পরিবারকে নিয়ে আসেন। এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিল জগৎশেঠ (এটি কোনো নাম নয়, উপাধি)। রাজস্থানের এই পরিবারটি সরকারের তথা নবাব মুর্শিদকুলির পৃষ্ঠপোষকতায় লাখ লাখ টাকা উপার্জনের সুযোগ পায়। একজন ইংরেজি ব্যবসায়ী উল্লেখ করেছেন, সেই আমলে জগৎশেঠের বার্ষিক আয় ছিল ৫৬ লাখ টাকা! পুরো উত্তর ভারতের আর্থ-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক এই পরিবারটি প্রয়োজনে বাংলার নবাবসহ দিল্লির বাদশাকে টাকা ধার দিত এবং বাংলা সরকারের টাকশালের দায়িত্বে ছিল।

    উঁমিচাদ আরও একজন ধনবান ব্যবসায়ী। ঐতিহাসিকরা এদের মার্চেন্ট কিং বা বণিক রাজা বলে অভিহিত করেছেন। এরা ব্যবসায়ী হলেও রাজার মতো জীবনযাপন করতেন। পরোক্ষভাবে সুবা এরাই পরিচালনা করতেন। যে-কোন সিদ্ধান্ত যা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রতিকূলে যেতে পারে, এমন কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার বাংলার কোন নবাবের ছিল না। মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি পর্যন্ত সকল নবাব এই বণিক রাজাদের তোয়াজ করে চলতেন। কিন্তু প্রথমবারের মত এসব বণিকরাজকে বিনা চ্যালেঞ্জে মেনে নিতে অস্বীকার করেন তরুণ নবাব সিরাজ।

    সিরাজউদ্দৌলা নবাব হওয়ার পর ইংরেজরা প্রথামাফিক নজরানা পাঠায়নি। যখন তিনি যুবরাজ, একবার কোম্পানির কাশিমবাজার কুঠি পরিদর্শনে গেলে তাকে যথাযোগ্য সম্মান দেখায়নি কোম্পানির কর্তারা। উপরন্তু, সম্রাট ফররুখশিয়ারের দেওয়া বিনা শুল্কে ব্যবসা করার ফরমানের অপব্যবহার করে ইংরেজরা কর ফাঁকি দিচ্ছিল এবং আলিবর্দির জীবদ্দশায় তারা দুর্গ নির্মাণের কাজ শুরু করে। যা ছিল নিষিদ্ধ। মোটকথা, কিছু সমস্যা আলিবর্দির আমলেই তৈরি হয়েছিল। যা তিনি সমাধান করেননি বা করতে চাননি। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়েই সিরাজ কোম্পানিকে নিজের দুশমনে পরিণত করে।

    সিরাজকে একদল ঐতিহাসিক চূড়ান্ত মন্দ লোক হিসেবে দেখাতে চান। বুঝাতে চান তরুণ সিরাজ ছিল অপরিপক্ব ও অযোগ্য। কিন্তু সুশীল চৌধুরী দেখিয়েছেন সিরাজ যথেষ্ট বুদ্ধিমান শাসক ছিলেন। তিনি বুঝতেন কোম্পানিকে শায়েস্তা করতে ব্যর্থ হলে কোম্পানি তাকে শায়েস্তা করবে। মির জাফরকে বিশেষ ভরসা তিনি করতেন না। তাই দেখতে পাই পলাশির প্রান্তরে মীর মদনের মৃত্যু হলে বাধ্য হয়ে তিনি মীর জাফরের পায়ের সাথে নিজের মুকুট রেখে তার সাহায্য চান। অনভিজ্ঞতাই হয়তো সিরাজের কাল হয়েছে।

    বহিঃস্থ শত্রু চিহ্নিত করতে সফল সিরাজ ব্যর্থ হন ঘরের শত্রু যেমন– বড় খালা ঘসেটি বেগম, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ ও জগৎশেঠের ষড়যন্ত্র বুঝতে। এমনকি ফরাসিদের সাথে মিত্রতার সর্বোচ্চ ফায়দা তুলতে সিরাজের ব্যর্থতা তার পরাজয় ত্বরান্বিত করেছে।

    মুর্শিদাবাদের বেগমদের নিয়ে লিখেছেন সুশীল চৌধুরী। তখনকার রাজনীতিতে নারীদের বুদ্ধি কীভাবে বাংলার ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিল তার কিছু বর্ণনা পেয়েছি। বিশেষত, মীর জাফরের মুন্নি বেগম তো অতুলনীয়, যাকে ক্লাইভের মতো ব্যক্তি ‘মা’ উল্লেখ করে চিঠি লিখেছিল!

    উৎসর্গ

    আমার ছোটভাই

    অকালপ্রয়াত সলিলকান্তি চৌধুরীর

    স্মৃতির উদ্দেশে

    ঋণ স্বীকার

    এই বই লেখার ব্যাপারে আমার স্ত্রী, মহাশ্বেতা, আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন। তাঁর সাহায্য ছাড়া এটা লেখা সম্ভব হত না। বহরমপুরের ‘ইতিহাস পরিক্রমা’ মুর্শিদাবাদ সংক্রান্ত অনেকগুলি ছবি দিয়ে কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। অধ্যাপক গৌতম ভদ্র কিছু তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন। তাঁকে ধন্যবাদ। এ বইয়ের জন্য ন্যাশন্যাল লাইব্রেরি ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়্যালের কর্তৃপক্ষ কিছু ছবি ব্যবহার করবার অনুমতি দিয়ে বাধিত করেছেন। শ্রীমতী সুস্মিতা দুধোরিয়া কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে আমাকে সাহায্য করায় উপকৃত হয়েছি। এই বইয়ের ব্যাপারে শ্রী শ্রীরাম সিং এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে আমার অনেক উপকার করেছেন। আনন্দ পাবলিশার্স অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বইটি প্রকাশনার ব্যবস্থা করায় আমি কৃতজ্ঞ।

    সংকেত সূচি

    BPC Bengal Public Consultations
    Beng. Letters Recd. Bengal Letters Received
    C & B Abstr. Coast and Bay Abstracts
    DB Despatch Books
    Fact. Record Factory Records
    FWIHC Fort William-India House Correspondence
    HB Hughli to Batavia
    Home Misc. Home Miscellaneous
    HR Hoge Regering van Batavia
    OC Original Correspondence
    Orme Mss. Orme Manuscripts
    Mss. Eur. European Manuscripts
    NAI National Archives of India
    VOC Verenigde Oost-Indische Compagnie
    Journals
    BPP Bengal Past and Present
    CHJ Calcutta Historical Journal
    IESHR Indian Economic and Social History Review
    IHR Indian Historical Review
    JAS Journal of Asian Studies
    J. As. S Journal of Asiatic Society
    JEH Journal of Economic History
    JESHO Journal of the Economic and Social History of the Orient
    MAS Modern Asian Studies
  • সূর্য দীঘল বাড়ী

    সূর্য দীঘল বাড়ী

    সূর্য দীঘল বাড়ী

    বাংলা সাহিত্যের সার্থক উপন্যাসগুলোর অন্যতম আবু ইসহাকের ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’; উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে।

    কুসংস্কার, দারিদ্র্যতা, সামাজিক অবহেলা ও ধনী-শ্রেণির শোষণের বিরুদ্ধে গ্রামীণ জনপদের মহিলা জয়গুণের জীবনযুদ্ধের কথা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ উপন্যাসে।

    বাংলা ১৩৫০ সনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে অবিভক্ত ভারতের বাংলায় ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে ‘পঞ্চাশের আকাল’ নামে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তাতে লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মানুষ প্রাণ হারায়। যারা কোনমতে শহরের লঙ্গরখানায় পাত পেতে বাঁচতে পেরেছিল তাদেরই একজন একালের সময় স্বামী পরিত্যক্ত জয়গুন। সঙ্গে তার মৃত প্রথম স্বামীর ঘরের ছেলে ও দ্বিতীয় স্বামীর ঘরের মেয়ে। আরো আছে মৃত ভাইয়ের স্ত্রী-পুত্র। তারা গ্রামে ফিরে এসে এমন এক খন্ড জমিতে ঘর তৈরী করে যেটি অপয়া ভিটে বলে পরিচিতি ছিল। জীবনযুদ্ধে যখন সে প্রাণপণ লড়ছে তখন তার প্রতি গায়ের মোড়লের দৃষ্টি পড়ে। দ্বিতীয় স্বামীও তাকে আবার ঘরে তুলতে চায়। সে কারো প্রস্তাবেই সায় দেয় না। কিন্তু এ দুজনের সাক্ষাত ঘটে এবং মোড়ল তার প্রতিযোগীকে হত্যা করে। ঘটনার একমাত্র দর্শক হিসেবে জয়গুনকেও মূল্য দিতে হয় অন্যভাবে।

    …এই কাহিনীর বিচিত্রতার মধ্যে মূল বিষয় একটিই; তা হচ্ছে কুসংস্কার, সম্পদ, ধর্ম, প্রতিপত্তি, সামাজিক বাধা-নিষেধ, এমনকি জাতীয়তাবোধ- এ সব কিছুকেই কাজে লাগিয়ে শ্রমজীবী ক্ষুধার্ত মানুষকে ক্রমাগত শোষণ।

    ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭৯ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, চলচ্চিত্রটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন মসিহ উদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী। সরকারি অনুদান প্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন ডলি আনোয়ার, রওশন জামিল, জহিরুল হক, কেরামত মাওলা, এটিএম শামসুজ্জামান। চলচ্চিত্রটি প্রধান চরিত্র ‘জয়গুন’– এই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রথমে ফেরদৌসী মজুমদারকে প্রস্তাব করা হয়েছিল, কিন্তু পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে তিনি অভিনয়ে অস্বীকৃতি জানান। এবং তাঁরই প্রস্তাবে ‘জয়গুন’ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ডলি আনোয়ারকে নির্বাচন করা হয়।

    চলচ্চিত্রটির শ্রেষ্ঠাংশে অভিনয় করেন– ডলি আনোয়ার – জয়গুন; রওশন জামিল – শফির মা; জহিরুল হক – গদু প্রধান; আরিফুল হক – খলিল; কেরামত মাওলা – করিম বক্স; এটিএম শামসুজ্জামান – জোবেদ ফকির; সৈয়দ হাসান ইমাম – ইমাম; ফখরুল হাসান বৈরাগী – লেদু; নাজমুল হুদা বাচ্চু – ডাক্তার রমেশ; সেতারা বেগম – লালুর মা; সুফিয়া – আঞ্জুমান; ইলোরা গহর – মায়মুন; সজিব – কাসু এবং লেনিন – হাসু।

    এই চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেন আলাউদ্দীন আলী।

    চলচ্চিত্রটি ১৯৮০ সালে পশ্চিম জার্মানীতে অনুষ্ঠিত ২৯তম ম্যানহেইম চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ফিল্ম ডুকার্ট’ স্বর্ণপদক লাভ করে। এছাড়া একই উৎসবে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্র ‘মানবিক আবেদনে’র জন্য আন্তর্জাতিক ইভানজ্যালিক্যাল (প্রোটেস্ট্যান্ট) সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ক্যাথলিক সংস্থা কর্তৃক দুটি বেশেষ পুরস্কার লাভ করে।

    পর্তুগালে অনুষ্ঠিত ১৯৮০ সালের ‘নবম ফিগুয়েরা দ্য ফজ’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের ‘প্রিক্‌স ডন কুইকজোট’ পুরস্কার লাভ করে। একই বছর ২২তম কার্লোভিভেরি (চেকোশ্লোভাকিয়া) চলচ্চিত্র উৎসবে ডিপ্লোমা লাভ করে।

    ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও শ্রেষ্ঠ পরিচালকসহ মোট আটটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। পুরস্কারগুলো হল–

    • শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র – মসিহউদ্দিন শাকের (প্রযোজক)।
    • শ্রেষ্ঠ পরিচালক – শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকের।
    • শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী – ডলি আনোয়ার।
    • শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য – শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকের।
    • শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রহণ – আনোয়ার হোসেন।
    • শ্রেষ্ঠ সম্পাদনা – সাইদুল আনাম টুটুল।
    • শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী – ইলোরা গহর ও সজিব।
    • শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী (বিশেষ শাখায়) – লেনিন।

    এছাড়া ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্র ১৯৭৯ সালে ছয়টি বিভাগে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সংস্থা (বাচসাস)’ পুরস্কার লাভ করে।

    উৎসর্গ

    বাবার স্মৃতির উদ্দেশে

  • পদ্মার পলিদ্বীপ

    পদ্মার পলিদ্বীপ

    পদ্মার পলিদ্বীপ1

    পদ্মার পলিদ্বীপ কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের দ্বিতীয় উপন্যাস এবং চতুর্থ প্রকাশিত গ্রন্থ। ‘মুক্তধারা’ গ্রন্থটি প্রকাশ করে ১৯৮৬ সালের এপ্রিলে। এই সংস্করণে প্রদত্ত ছোট্ট ভূমিকা থেকে জানা যায় লেখক এটি লিখতে শুরু করেছিলেন ১৯৬০ সালে, আর লেখা সমাপ্ত করেন ১৯৮৫ সালে। এর মাঝে উপন্যাসের ষোলটি অধ্যায় মুখর মাটি নামে বাংলা একাডেমীর ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। দীর্ঘ বিরতির পর শেষ হয়েছে এই উপন্যাস এবং প্রকাশিত হয়েছে পদ্মার পলিদ্বীপ নামে।

    উপন্যাসে যে সময়ের কথা বিধৃত হয়েছে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময়। জাপানী বাহিনী সিঙ্গাপুর দখল করে বার্মা দখল করেছে। ব্রিটিশরা আতঙ্কিত ভারতে দখল বজায় রাখা নিয়ে। ব্রিটিশ-বিরোধী ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন চলছে দেশজুড়ে। উপন্যাসে সমকালীন বিশ্বের প্রসঙ্গ বলতে গেলে এটুকুই। বাকি পুরো উপন্যাস শুধুমাত্র পদ্মার পলিদ্বীপে বসবাসরত মানুষদের নিয়ে। বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এই জনপদগুলি যুদ্ধের অভিঘাতে জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্যে ও কেরোসিন-নুনের দুস্প্রাপ্রাপ্যতায় হতচকিত হয় বটে, কিন্তু ঐ পর্যন্তই। এর বেশি যোগাযোগ তারা বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে রাখার প্রয়োজন বোধ করে না। কেননা নিজেদের নিতান্ত জৈবিক অস্তিত্ত্বটুকু টিকিয়ে রাখার জন্য তারা শুধুমাত্র কৃষিকেই উপায় বলে জানে। কৃষি মানে জমি। জমি মানে তাদের কাছে পদ্মার পলিদ্বীপ। জেগে ওঠা ও তলিয়ে যাওয়ার অবিরাম অনিশ্চয়তার মধ্যে এই পলিদ্বীপ নিয়েই তাদের চিন্তা। পলিদ্বীপে চাষ-বাস করা, দ্বীপ তলিয়ে গেলে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়া, নতুন জেগে ওঠা চর দখলে জন্য যুথবদ্ধ পশুর মতো লড়াই করা—এই নিয়েই তাদের জীবন।

    এই সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় কিছু প্রকাশিত সংবাদের কারণে হয়তো দেশের অন্য অঞ্চলের শিক্ষিত পাঠক এদের কথা কিছুটা জানতে পান, কিন্তু তাদের বা আমাদের সার্বিক ধারণাটাই যে কতটা অস্বচ্ছ ও অসম্পূর্ণ তা পদ্মার পলিদ্বীপ পাঠের আগে অনেকেরই বোধগম্য হবে না। উপন্যাসের এরফান মাতব্বর, তার পরিবার , তার পুলকী-মাতব্বর, কোলশরীকদের নিয়ে নিজেদের হারানো চর খুঁজে বেড়ায়। তাদের সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ার কারণও এই পদ্মা। কারণ- “পদ্মার অজগর স্রোত গিলে খেয়েছে, উদরে টেনে নিয়েছে সব জমি। গুণগাঁর নমকান্দি থেকে শুরু হয়েছিল ভাঙা। তারপর বিদগাঁর কোণা কেটে, দীলির আধাটা গিলে, কাউনিয়াকান্দা, ডিঙ্গাখোলা, লক্ষীচর আর মূলভাওরকে বুকে টেনে চররাজাবাড়ির পাশ কেটে উন্মাসিনী পদ্মা গা দোলাতে দোলাতে চলে গেছে পূব দিকে। তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এঁকেবেঁকে চলেছে ডানে আর বাঁয়ে।”

    এরফান মাতব্বর কথায় কথায় বলে “চরের বাড়ি মাটির হাড়ি, আয়ু তার দিন চারি”। বলে বটে, কিন্তু চর ছাড়া অন্য কোনো ভূগোল বোঝে না সে। বুঝতেও চায় না। সে অপেক্ষা করে, কবে ফের জেগে উঠবে তাদের খুনের চর। আসল নাম লটাবনিয়ার চর। সেই চরের দখল নিতে নিজের প্রথম পুত্র রশীদসহ পাঁচ পাঁচজন মানুষ খুন হয়ে যাওয়ায় চরের নাম হয়েছে খুনের চর। এরফান মাতব্বরের প্রতীক্ষার চরের জেগে ওঠা প্রথম অবিষ্কার করে তার দ্বিতীয় পুত্র ফজল। তখনই শুরু হয় উপন্যাসের সকল পাত্র-পাত্রীর সচল হয়ে ওঠা।

    তারা চরে গিয়ে ওঠে, ভাওর ঘর তোলে, নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে নেয়, সালামি আদান-প্রদান করে, জমিদারের কাছারিতে গিয়ে নায়েবকে সালামি দেয়, খাজনা দেয়, চরের মাটিতে রোপা ধান রুইতে শুরু করে। তাদের পুরনো শত্রু চেরাগ সরদার এবার চর দখল করতে আসবে না, এটা জানা ছিল। এই বিপদের আশংকাও কারো মনে ছিল না। কিন্তু বিপদ এলো। এলো সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত দিক থেকে। জঙ্গুরুল্লা দাঁড়াল তাদের পথের কাঁটা হয়ে। পঁয়তাল্লিশ বছরের জঙ্গুরুল্লার জীবনে চল্লিশ বছরই কেটেছে অবর্ণনীয় কষ্টে। সারা জীবন কাজ করতে হয়েছে। ফলে কখনো শুকায়নি শরীরের ঘাম। অথচ পেটে জ্বলছে খিধের আগুন। গরীব কৃষক গরীবুল্লার সন্তান জঙ্গুরুল্লা সাত বছর বয়সে মাতৃহারা। পদ্মা অববাহিকার প্রচলিত প্রবাদ—মা মরলে বাপ অয় তালই।’ বাবার দ্বিতীয় বিয়ে, সৎমায়ের নির্যাতন। জঙ্গুরুল্লার বয়স দশ বছর হতে না হতেই কাজ নিতে হয় হোগলাচরের এক চাষীগেরস্তের বাড়িতে। সেখানে পেটে-ভাতে রাখালি পাঁচ ছয় বছর। তারপর দুইটাকা বেতনে ঐ চরেরই আরেক বড় গেরস্তের বাড়িতে চাষের কাজ। বছর চারেক পরে বাপের মৃত্যু। সৎ মা তার ছয় বছর বয়স্কা মেয়েকে নিয়ে ‘নিকে বসে’ অন্য জায়গায়। জঙ্গু ঘোপচরে বাপের ভিটেতে ফিরে আসে। গাঁয়ের দশজনের চেষ্টায় তার বিয়েটাও হয়ে যায়। বউ আসমানী গরীব ঘরের মেয়ে। গোবরের খুঁট দেওয়া থেকে শুরু করে ধানভানা, চাল ঝাড়া, মুড়ি ভাজা, ঘর লেপা, কাঁথা সেলাই, দুধ দোয়ানোসহ সব কাজেই তার হাত চলে। আবার অভাব-অনটনে দুই-এক বেলা উপোস দিতেও কাতর হয় না।

    এর মধ্যে একটি কাণ্ড ঘটে যায়। ঘোপচরের মাতব্বর সোহরাব মোড়লের ছেলের বিয়ের বরযাত্রী হয়ে গিয়েছিল জঙ্গুরুল্লা। কনে পক্ষের বাড়ি চরে নয়। তারা ভদ্র গেরস্ত। বরযাত্রীদের বসার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছিল ধবধবে ফরাসের। সেই ফরাসের উপর জঙ্গুরুল্লা তার থ্যাবড়া পায়ের কয়েক জোড়া কাদার ছাপ ফেলেছিল। তা দেখে চোখটিপে হেসেছিল কনেপক্ষের লোকেরা। লজ্জার কান কাটা গিয়েছিল সোহরাব মোড়লের। বাড়ি ফিরে জুতো খুলে মারতে গিয়েছিল জঙ্গুরুল্লাকে। ডেকেছিল পা-না-ধোয়া শয়তান বলে। ব্যাস তখন থেকেই জঙ্গুরুল্লার নামের আগে যোগ হয়ে যায় অমোচনীয় বিশেষণ—পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লা। নামের আগে এই বিশেষণ যোগ না করলে তাকে আর চিনতে পারে না পদ্মা অববাহিকার মানুষ। খড়িশার কাছারির নায়েব শশীভূষণ দাসকে ঘটনাক্রমে পাগলা শেয়ালের হাত থেকে বাঁচিয়ে তার কৃপা লাভ করে জঙ্গুরুল্লা। নায়েব তাকে পেয়াদার চাকরিতে বহাল করে নেন। মাসিক বেতন তিন টাকা। পেয়াদার চাকরিতে বেতন বেতনই। আসল উপার্জন হচ্ছে উপরি। তার সঙ্গে ক্ষমতার সংযোগ। নায়েবের হুকুমে সে বকেয়া খাজনা জন্য প্রজাদের ধরে নিয়ে যেত কাছারিতে। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ব্যবহার করত সাড়ে তিন হাত লাঠি। কখনও তাদের হাত-পা বেঁধে চিৎ করে রেখে শুইয়ে রাখত, কখনও কানমলা , বাঁশডলা দিয়ে ছেড়ে দিত। পাঁচ বছর পরে তার চাকরী চলে যায়। ততদিনে জমি-জমা সংক্রান্ত ফন্দি-ফিকির, প্যাঁচ-ঘোচ শিখে গেছে জঙ্গুরুল্লা। বাংলা ১৩৪৬ সালে বর্ষা শেষে আশ্বিন মাসে মাঝ নদীতে একটার পর একটা চর ভাসতে শুরু করে। জঙ্গুরুল্লা সবগুলি চরই দখল করে নেয়। কুণ্ডু আর মিত্র জমিদারদের কাচারি থেকে বন্দোবস্ত এনে বসিয়ে দেয় কোলশরীক। তাদের কাছ থেকে মোটা হারে সেলামি নিয়ে সে নিজের অবস্থা ঘুরিয়ে ফেলে।

    চরপাঙ্গাশিয়ায় নতুন বাড়ি ওঠে তার। “উত্তর, পূব আর পশ্চিম ভিটিতে চৌচালা ঘর ওঠে। দক্ষিণ ভিটিতে ওঠে আটচালা কাচারি ঘর। নতুন ঢেউটিনের চালা আর পাতটিনের জোড়া দিয়ে ঘরগুলো দিনের রোদে চোখ ঝলসায়। রাতে চাঁদের আলোয় বা চলন্ত স্টিমারের সার্চলাইটের আলোয় ঝলমল করে।”

    টাকার জোর, মাটির জোর আর লাঠির জোরের সঙ্গে এখন তার চাই সম্মানের জোর। সেই সম্মানের জোর অর্থাৎ মান-সম্মান বাড়ানোর জন্য জঙ্গুরুল্লা টাকা খরচ করতেও কম করছে না। গত বছর সে মৌলানা তানবীর হাসান ফুলপুরীকে বাড়িতে এনে মস্তবড় এক জেয়াফতের আয়োজন করেছিল। যে জেয়াফতে গরুই জবাই হয়েছিল আঠারোটা। দাওয়াতী-বেদাওয়াতী মিলে অন্তত তিন হাজার লোক হয়েছিল। সে জনসমাবেশে মৌলানা সাহেব তাকে চৌধুরী পদবীতে অভিষিক্ত করে যান। সেদিন থেকেই সে চৌধুরী হয়েছে। নতুন দলিলপত্রে এই নামই চালু হচ্ছে আজকাল। চরপাঙ্গশিয়ার নামও বদলে হয়েছে চৌধুরীর চর। কিন্তু এত কিছু করেও তার নামের আগেরে পা-না-ধোয়া খেতাব ঘুচল না।

    সব কথাই জঙ্গুরুল্লার কানে যায়। রাগের চোটে সে দাঁতে দাঁত ঘষে। নিন্দিত পা দুটোকে মেঝের ওপর ঠুকতে থাকে বারবার। তার ইচ্ছা হয় এই পা দুটি দিয়ে সে লণ্ডভণ্ড করে দেয় সবকিছু, পদানত করে চারদিকের মাটি আর মানুষ। এমনি করে এক ধরনের দিগ্বিজয়ের আকাঙ্ক্ষার জন্ম নেয় তার মনে। আশেপাশে কোনো নতুন চর জাগলেই লাঠির জোরে সে তা দখল করে নেয়। এভাবে তার দৃষ্টি পড়ে যথারীতি খুনের চরের উপর। একসময় কটুবুদ্ধি ও লাঠির জোরে দখলও করে নেয় খুনের চর।

    উপন্যাসের বাকি অংশ এরফান মাতব্বরের জীবিত পুত্র ফজলের সেই চর পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের বর্ণনা। ফজল সত্যিকারের নায়ক। নবম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া জানা ছেলে, অনেকগুলি মানবীয় গুণের সমাবেশ ঘটেছে তার মধ্যে। নিজের ব্যক্তি জীবনও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। তার স্ত্রী ফুলজানকে আটকে রেখেছে তার শ্বশুর আরশেদ মোল্লা। ঘটনাচক্রে মেয়েকে তার সাথে দিয়ে দিলেও পদে পদে ফজলের জন্য বিড়ম্বনা সৃষ্টি করে চলে সে। জঙ্গুরুল্লার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফজলের ক্ষতি করার চেষ্টা করতে থাকে সে। জঙ্গুরুল্রার দৃষ্টি পড়েছে ফুলজানের উপর। নিজের জন্য নয়। ফুলজানকে তার চাই তার বৃদ্ধ পীরের সঙ্গে শাদী দেওয়ার জন্য। তার উদ্দেশ্য পরিষ্কার। পীর সাহেব বিয়ে করলে এখানেই থাকবেন। তার মৃত্যু হবে এখানেই। চরের মাটিতেই দাফন হবে তাঁর। জঙ্গুরুল্লাদের বিশ্বাস—তাহলে আর কখনোই ডুবে যাবে না তাদের ঘর। তার পীরের উছিলায় আল্লাহ রক্ষা করবেন এই চরকে। সম্পূর্ণ জাগতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতার ব্যবহার।

    অবশেষে অনেক দ্বন্দ্ব-বিরোধ, দুঃখ-কষ্ট, ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে ফজল ও তার লোকেরা নিজেদের খুনের চর পুনর্দখল করতে পারে। ফিরে পায় ফুলজানকেও। মধুরেণ সমাপয়েৎ…।

    অসংখ্য চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে পদ্মার পলিদ্বীপ উপন্যাসে। কেউ চকিতে নিজের ভূমিকা পালন করে দৃশ্যপট থেকে সরে যায়, কারও স্থায়ীত্ব একটু বেশি। কিন্তু সব চরিত্রই যেন তৈরি হয়েছে ফজলকে পরিস্ফুটিত করা জন্যই। একরৈখিক উপন্যাসের এটিই সমস্যা। তবু পার্শ্ব চরিত্রগুলির মধ্যেও নিজের অস্তিত্ব সবচেয়ে বেশি জানান দিতে পেরেছে জরিনা।

    ভাগ্য বিড়ম্বিতা নারীর সবচেয়ে করুণ এক উদাহরণ জরিনা। ভারতবর্ষে ‘সারদা আইন’ পাশের বছরে বাল্যবিবাহেরে হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। ‘সারদা আইন’ প্রচলিত হলে বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ হয়। সেই কারণে ঐ আইন হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত যেখানে যেকটি সম্ভব, বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করা হয়েছে। সেই সময়েই দশ বছরের জরিনার সঙ্গে বিয়ে হয় এগারো বছরের ফজলের। কিন্তু পুত্রের তুলনায় পুত্রবধূকে দ্রুত বেড়ে উঠতে দেখে দুঃশ্চিন্তায় পড়ে এরফান মাতব্বর। তার অনেক উচ্চাশা ফজলকে নিয়ে। তার মনে হয় বউয়ের সঙ্গে থাকলে ফজলের লেখাপড়া হবে না। সে তাই অনেক দূরের স্কুলে পাঠিয়ে দেয় নবম শ্রেণীতে পড়া ফজলকে। আর জরিনার ভাইয়ের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে জরিনাকে তালাক গ্রহণে বাধ্য করে। পরে জরিনার বিয়ে হয় দাগী চোর হেকমতের সঙ্গে, হেকমত যে কিনা বছরের অধিকাংশ সময়ই জেল হাজতে কাটায়। ফলে জরিনাকে বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে ধান ভেনে নিজের পেট চালাতে হয়। সেভাবেই সে কাজ নেয় ফুলজানের বাড়িতে। সেই বাড়িতেই ঘটনাক্রমে তার শারীরিক মিলন ঘটে ফজলের সঙ্গে। পরবর্তীতে ফজল যখন থানা-পুলিশ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে তখনো তাকে আশ্রয় দিয়ে লুকিয়ে রাখে জরিনাই। সে বোঝে সে এখন পরস্ত্রী, ফজলের সঙ্গে মেলামেশা উচিত নয়। কিন্তু অন্তরের অন্তঃস্থলে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা তাকে বার বার বাধ্য করে ফজলের সংস্পর্শে আসতে। সত্যিকার অর্থে এই উপন্যাসের সবচেয়ে জীবন-রক্ত-মাংসের সার্থক চরিত্র জরিনা।

    উপন্যাস হিসাবে কোন শ্রেণীতে ফেলা যায় পদ্মার পলিদ্বীপকেকে? এ যেন একটি ডকুমেন্টরি ছবি। আবু ইসহাকের প্রথম উপন্যাস সূর্য দীঘল বাড়ী সম্পর্কে অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন, “যদি অনুভূতি আবেগের আন্তরিকতা সাহিত্য বিচারের মানদণ্ড হয়, তবে সূর্য দীঘল বাড়ী সার্থক উপন্যাসরূপে স্বীকৃতি লাভের যোগ্য।” একই মন্তব্য এই উপন্যাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আবার সূর্য দীঘল বাড়ী সম্পর্কে যে বিরূপ মন্তব্য করেছেন হাসান আজিজুল হক, সেটিও হয়ত এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হাসান লিখেছেন,

    “কিন্তু উপন্যাস যে একটি শিল্প তা কি সূর্য দীঘল বাড়ীর বেলায় স্বীকার করে নেয়া যায়? উপন্যাসটি পড়বার সময় মনে হয় যেন একটি ক্যামেরা অতি ধীরে আমাদের গ্রাম সমাজের ভেতরে, গরিব মানুষের উঠানে, শোবার ঘরে, গোয়ালে, রান্নাঘরে চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। উপন্যাসের সমস্ত উপাদান, জীবনের সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য ও খবর শিল্পীর কল্পনা ও সৃষ্টিনৈপুণ্য কদাচ জারিত হয়ে অনন্য হয়ে উঠতে পারছে না—কোনো একটা দৃষ্টি গড়ে উঠতে পারছে না, উপন্যাস একটি জীবন্ত সত্তায় পরিণত হচ্ছে না।”

    হাসান আজিজুল হক যেসব সর্তকে সার্থক উপন্যাসের জন্য আবশ্যকীয় বলে মনে করেন, তা কোনো উপন্যাসেই পাওয়া যায় না। এমনকি হাসান-লিখিত উপন্যাসেও না। বৈয়াকরণিক সব শর্ত পূরণ না করেও অনেক উপন্যাস সত্যিকারের উপন্যাস হিসাবে চিহ্নিত হতে পেরেছে। পদ্মার পলিদ্বীপ ও এই ধরনের একটি উপন্যাস।

    হয়তো ডকুমেন্টেশনই আবু ইসহাকের আরাধ্য। তাই দেখা যায় উপন্যাসের শেষে ফুটনোট হিসেবে ১৩ পৃষ্ঠাব্যাপী উপন্যাসে ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দগুলির প্রমিত অর্থ তুলে ধরা হয়েছে। বৈয়াকরণগণ ‘আঞ্চলিক উপন্যাস’ নামক একটি বর্গ চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে বিশেষ ভৌগলিক অঞ্চলের প্রকৃতি ও মানবচরিত যখন উপন্যাসিকের শিল্প-অভিপ্রায়ে স্বতন্ত্র রূপ পরিগ্রহ করে. তখনই একটি সার্থক আঞ্চলিক উপন্যাসের জন্ম হয়। সেই অর্থে অনেকেই পদ্মার পলিদ্বীপ-কে আঞ্চলিক উপন্যাসের অভিধা দিতে চান। কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে পৃথিবীর সকল উপন্যাসই একটি নির্দিষ্ট ভূগোল ও কালখণ্ডকে আত্মস্থ করে রচিত। উপন্যাসের পটভূমি বলতে যা বোঝানো হয়, তা সবসময়ই স্থানীক ও আঞ্চলিক। কখনোই সর্বব্যাপী নয়। তবে তার আবেদন হতে পারে সর্বব্যাপী। তখনই তা ক্লাসিক। সেগুলিই সবচেয়ে সার্থক রচনা হিসাবে বিবেচিত। পদ্মার পলিদ্বীপ বাংলাদেশের পথিকৃৎ উপন্যাসগুলির একটি হিসাবে আমাদের কাছে অবশ্যই প্রাসঙ্গিক।