Tag: গ্রন্থনাম

  • শিক্ষা ও সভ্যতা

    শিক্ষা ও সভ্যতা

    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

    [book]

    প্রথম সংস্করণ আশ্বিন, ১৩৩৪। ক্যালকাটা পাবলিশার্স, কলেজ ষ্ট্রীট মার্কেট, কলিকাতা। প্রকাশক শ্রীবারিদকান্তি বসু। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮ + ১৪৮। কলিকাতা, ৩১নং সেণ্ট্রাল এভিনিউ আর্ট প্রেসে শ্রীনরেন্দ্রনাথ মুখার্জ্জি, বি-এ কর্ত্তৃক মুদ্রিত। দাম দেড় টাকা। এই গ্রন্থে শিক্ষার লক্ষ্য, অন্নচিন্তা, রোম, আর্য্যামি, বৈশ্য, সবুজের হিন্দুয়ানী, ধর্ম্ম-শাস্ত্র, চাষী, ভারতবর্ষ, তুতান্-খামেন্, গণেশ — ইত্যাদি প্রবন্ধসমূহ সংকলিত হয়েছে।


    উৎসর্গ

    ৺পিতৃদেবের স্মরণে


    মুখবন্ধ

    এ বইএর প্রবন্ধগুলির বেশীর ভাগ ‘সবুজ পত্রে’, আর বাকী কয়েকটি কয়েকখানা সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ‘সবুজের হিন্দুয়ানী’ প্রবন্ধটি নবপর্যায় ‘সবুজ পত্রের’ প্রথম সংখ্যার জন্য লেখা। উপলক্ষ্যের উপযোগী আকারটি বদলালে বক্তব্য বহাল থাকলেও রসটা ঠিক থাকে না দেখে ওর সে আকারটি আর বদলাইনি। প্রবন্ধগুলিকে পুঁথিতে গেঁথে কিছুদিন বাচিয়ে রাখার চেষ্টা উচিত হ’ল, না পুরণো মাসিক- সাপ্তাহিকের স্তূপের মধ্যে বিস্মৃতির কবর দেওয়াই সমীচীন হ’ত তাতে অবশ্য সন্দেহ আছে। তবে, “বিষবৃক্ষোঽপি সংবদ্ধ স্বয়ং চ্ছেত্ত মসাম্প্রতম্”।

    শ্রীঅতুলচন্দ্র গুপ্ত

    আশ্বিন, ১৩৩৪

  • পঞ্চতন্ত্র

    পঞ্চতন্ত্র

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book]

    ‘পঞ্চতন্ত্র’ সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত বৈচিত্রময় একটি গ্রন্থ। দুই খণ্ডে প্রকাশিত এই গ্রন্থটিকে বৈচিত্রময় বলছি, কেননা, কেউ এটিকে রম্যরচনার সঙ্কলন, কেউ গল্প সঙ্কলন, কেউ প্রবন্ধ সঙ্কলন বলে আখ্যায়িত করেছেন। মূলত, একের ভিতরে বহু, এই কারণেই হয়ত সৈয়দ সাহেব গ্রন্থটির নাম রেখেছিলেন ‘পঞ্চতন্ত্র’।

    গল্প শুনতে ও শোনাতে পছন্দ করতেন তিনি; এই কারণে, কলকাতায়, কাবুলে, প্যারিসে, বার্লিনে কিংবা কায়রোতে—যেখানেই সৈয়দ মুজতবা আলী, সেখানেই জমত গল্পের আসর, সাদামাটা কথায় আড্ডা। এই কারণেই নিশাচর শহরের প্রতি তাঁর ছিল দুর্মর পক্ষপাত; জনপরিসরে, আখড়ায় তাঁর আসর জমত নিয়মিত যাতে থাকত নানা সংস্কৃতির বহুবিচিত্র মানুষের সমাগম। আড্ডার শরিকেরা সবাই রসিক। রসের রসিক। উপভোগের রসিক। তথ্য-উপাত্ত আর পাণ্ডিত্যে তারা টইটম্বুর। কিন্তু মুজতবার আড্ডায় তথ্য আর পাণ্ডিত্য ভার হয়ে আসে না। প্রতিহত করে না। কারণ, সেখানে উপভোগের সাদর আমন্ত্রণ আছে। প্রধান শরিকদের পাশে আরও অনেকেই আছে। তারা কথা বলে না। কিন্তু আড্ডার রস উদ্যাপনে কোনও বাধা নেই। এরাই মূলত পাঠক। মুজতবার লেখা পড়া মানে আড্ডার সজীব সপ্রতিভ কথামালার অংশীদার হওয়া।

    মুজতবা এমন জমানার মানুষ, যখন কলকাতায় ‘সংস্কৃতি’ একটি উচ্চতম বর্গ হিসেবে পরম প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ওই সংস্কৃতি-ধারণায় সংকীর্ণতা ছিল, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছিল। মুজতবা এই সংকীর্ণতা ও বিদ্বেষ ভাব থেকে বেশ অনেক দূর পর্যন্ত মুক্ত ছিলেন। তখন ভারতীয়রা কেবল আর পশ্চিমের কথা শুনছিল না, পশ্চিমকে ভারতের কথাও শোনানো শুরু করেছিল। মুজতবা নিজের আবিষ্কৃত আড্ডার ফর্মে একজন ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিতেন। তাতে হীনম্মন্যতার লেশমাত্রও ছিল না। ছিল বহুজাতিক অভিজ্ঞতার মধ্যে নিজের হিস্যা উপস্থাপনের আর আদায়ের সক্রিয়তা। উদারনৈতিক ভাব-পরিসরে নিজেকে মজলিসি কেতায় উদ্‌যাপনের ভঙ্গিতে হাজির করতে পেরেছিলেন বলেই সহস্র ভ্রমণকাহিনী আর রম্য রচনার ভিড়ে মুজতবাকে সহজেই চিনে নেওয়া যায়।

    জীবনকে উদ্‌যাপনের মত যাপনের প্রতি সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রবল আগ্রহ ছিল, কিন্তু হাহাকার ছিল না। হাহাকার না থাকার কারণ, জীবন স্বয়ং উদ্‌যাপনের বিচিত্র বর্ণিল সাজে ধরা দিয়েছিল তাঁর জীবনে। তাঁর কলম ছিল সেই জীবনের বিশ্বস্ত আজ্ঞাবাহক।

    অনেক দেশ ঘুরাঘুরি একই সাথে বিভিন্ন মানুষের কাছাকাছি থেকে তাদের সাথে নিজের ভাবের আদান প্রদান করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে তা নিজের কাছে রেখেদেন নাই লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী। বিভিন্ন সময়ের ভ্রমণের সেই অভিজ্ঞতা লিখে রেখেছেন একই সাথে ভিন্ন দেশের মানুষের কাছাকাছি গিয়ে তাদের সেই গল্পও তিনি আমাদের শুনিয়েছেন।

    ‘পঞ্চতন্ত্রে’র কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর লেখা হয়নি; এর মধ্যে আছে ছোট ছোট গল্প, নিজের অভিজ্ঞতা, অন্যের কাছে শোনা কাহিনী, স্মৃতিকথা, সমসাময়িক বিষয়, ভ্রমণ কথা যাতে আছে নিজের ও অন্যদের গল্প।

  • বুদ্ধ অথবা কার্ল মার্কস

    বুদ্ধ অথবা কার্ল মার্কস

    [book-name]

    ড. বি. আর. আম্বেদকর

    অনুবাদ : অদিতি ফাল্গুনী

    প্রকাশক – ঐতিহ্য

    রুমী মার্কেট ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড

    বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০

    প্রকাশকাল – মাঘ ১৪২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

    প্রচ্ছদ – ধ্রুব এষ

    BUDDHU OTHOBA KARL MARX by Dr. B. R.Ambedkar

    Translated by Audity Falguni

    Published by Oitijjhya

    Date of Publication : February 2023

    উৎসর্গ

    শারমিন মুরশিদ

    এদেশের উন্নয়ন সংগ্রামে যিনি নিরন্তর ব্রতী

    তাপস রায়

    নিষ্ঠাবান সাংবাদিক ও প্রিয় অনুজ

  • তিতাস একটি নদীর নাম

    তিতাস একটি নদীর নাম

    অদ্বৈত মল্লবর্মণ

    [book]

    তিতাস একটি নদীর নাম অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচিত বিখ্যাত উপন্যাস। এই একটি উপন্যাস লিখে লেখক খ্যাতি অর্জন করেন। এই উপন্যাসে গ্রামের দরিদ্র মালো শ্রেণীর লোকজনের দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী ফুটিয়ে তুলেছেন। পরবর্তীকালে এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।

    ইতিহাস

    প্রথম প্রকাশ আশ্বিন ১৩৬৩

    ২০৬, বিধান সরণি, কলিকাতা-৬, পুথিঘরের পক্ষে শ্রীঅনিলকুমার ভট্টাচার্য কর্তৃক প্রকাশিত ও ৬ শিবুবিশ্বাস লেন, কলিকাতা-৬, তাপসী প্রিণ্টিং ওয়ার্কস হইতে অসিত সরকার কর্তৃক মুদ্রিত।

    দ্বিতীয় প্রকাশ আশ্বিন, ১৩৬৫

    প্রচ্ছদশিল্পী রণেন আয়ন দত্ত

    (ব্লকনির্মাতা রণজিৎ প্রসেস এ্যাণ্ড প্রিণ্টিং ইণ্ডাষ্ট্রিজ)

    ইণ্ডিয়ান ফোটো এনগ্রেভিং কোং প্রাইভেট লিঃ, ২৮ বেনিয়াটোলা লেন, কলিকাতা-৯ হইতে শ্রীদ্বিজেন্দ্রলাল বিশ্বাস কর্তৃক মুদ্রিত ও ২২ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা-৬ পুথিঘরের পক্ষ হইতে শ্রীসতীশ রায় কর্তৃক প্রকাশিত। দাম সাড়ে ছয় টাকা।

    প্রথম সংস্করণ হইতে পুনর্মুদ্রিত

    তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসটি প্রথমে মাসিক পত্রিকা মোহাম্মদীতে প্রকাশিত হয়েছিল। কয়েকটি অধ্যায় মোহাম্মদীতে মুদ্রিত হবার পর উপন্যাসটির মূল পাণ্ডুলিপি রাস্তায় হারিয়ে যায়। বন্ধু-বান্ধব ও অত্যাগ্রহী পাঠকদের আন্তরিক অনুরোধে তিনি পুনরায় কাহিনীটি লেখেন। কাঁচড়াপাড়া হাসপাতালে ভর্তির আগে এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি বন্ধু-বান্ধবকে দিয়ে যান।1 অদ্বৈত মল্লবর্মণের মৃত্যুর কয়েক বছর পর তিতাস একটি নদীর নাম শিরোনামের এই উপন্যাসটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের কাহিনীকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্রস্রষ্টা ঋত্বিক কুমার ঘটক ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে তিতাস একটি নদীর নাম শিরোনামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এ চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহের কারণ হিসেবে ঋত্বিক ঘটক বলেন:

    তিতাস পূর্ব বাংলার একটা খণ্ডজীবন, এটি একটি সৎ লেখা। ইদানীং সচরাচর বাংলাদেশে (দুই বাংলাতেই) এ রকম লেখার দেখা পাওয়া যায় না। এর মধ্যে আছে প্রচুর নাটকীয় উপাদান, আছে দর্শনধারী ঘটনাবলী, আছে শ্রোতব্য বহু প্রাচীন সঙ্গীতের টুকরো – সব মিলিয়ে একটা অনাবিল আনন্দ ও অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করা যায়। ব্যাপারটা ছবিতে ধরা পড়ার জন্য জন্ম থেকেই কাঁদছিল। … অদ্বৈতবাবু অনেক অতিকথন করেন। কিন্তু লেখাটা একেবারে প্রাণ থেকে, ভেতর থেকে লেখা। আমি নিজেও বাবুর চোখ দিয়ে না দেখে ওইভাবে ভেতর থেকে দেখার চেষ্টা করেছি। অদ্বৈতবাবু যে সময়ে তিতাস নদী দেখেছেন, তখন তিতাস ও তার তীরবর্তী গ্রামীণ সভ্যতা মরতে বসেছে। বইয়ে তিতাস একটি নদীর নাম। তিনি এর পরের পুণর্জীবনটা দেখতে যাননি। আমি দেখাতে চাই যে, মৃত্যুর পরেও এই পুণর্জীবন হচ্ছে। তিতাস এখন আবার তারুণ্যে উজ্জীবিত। আমার ছবিতে গ্রাম নায়ক, তিতাস নায়িকা।2

    কাহিনী

    উপন্যাসটি ৪টি অংশে বিভক্ত এবং প্রত্যেকটি অংশে ২টি করে উপ-অংশ রয়েছে। অর্থাৎ মোট ৮টি অংশে উপন্যাসটি বিস্তৃত।

    তিতাস একটি নদীর নাম

    তিতাস নদীর উৎপত্তি মেঘনা নদী থেকে। মেঘনার জল নদীর এক পাড় ভেঙে জঙ্গল, মাঠ, ময়দানের ভেতর দিয়ে ঘুরে আবার মেঘনায় এসে পড়েছে। মেঘনা থেকে উদভূত এই ধারাই তিতাস নদী নামে পরিচিত। কাহিনীর সুচনাকালে তিতাসকে একটি জলভরা নদী হিসেবে লেখক বর্ণনা করেছেন। সারা বছরেই তিতাসের বুকে জল থাকে। তিতাস থেকে তেরো মাইল দূরে একটি নদী আছে বিজয় নামে। বিজয় নদীতে বর্ষাকাল ছাড়া জল প্রায় থাকে না এবং সেই কারণে বিজয় নদীর তীরে বসবাসকারী মালোদের আর্থিক ও শারীরিক অবস্থা খুবই দৈন্য। এইরকমই আর্থিক অনটনে ক্লিষ্ট দুই ভাই গৌরাঙ্গ ও নিত্যানন্দ বিজয়নদীর তীরে বাস করত। গৌরাঙ্গের বউ অনাহারে মারা গিয়েছিল। নিত্যানন্দের বউ ও দুই ছেলেমেয়ে ছিল। গৌরাঙ্গ তার দাদাকে পরামর্শ দেয় নয়ানপুরের ধনী বোধাই মালোর হয়ে খাটার জন্য। অন্যদিকে জমিলা বলে একজন নববধু তার স্বামী ছমির মিয়ার সঙ্গে বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়িতে ফেরে নৌকা করে। আসবার পথে সে মালোপাড়ার ঘাটে একটি মেয়েকে দেখে এবং সই হিসেবে বন্ধুত্ত্ব পাতানোর আশা করে।

    প্রবাস খণ্ড

    বাসন্তী তার মাকে ডেকে বলে, “মা, ওমা, দেখ সুবলদাদা কিশোরদাদার কাণ্ড! আমি চৌয়ারি জলে ছাড়তে না ছাড়তে তারা দুইজনে ধরতে গিয়ে কি কাইজ্যা। এ কয় আমি নিমু, হে কয় আমি নিমু। ডরে আর কেউ কাছেও গেল না। শেষে কি মারামারি। আমি কইলাম, দুই জনে মিল্যা বানাইছ দুই জনে নিয়া রাইখ্যা দাও। মারামারি কর কেনে?”

    — “তিতাস একটি নদীর নাম”

    তিতাসের পাড়ে বসবাসী মালোদের মধ্যে একজন ছিল দীননাথ মালোর কমবয়েসী মেয়ে বাসন্তী। বাসন্তীর গ্রামেই ছিল কিশোর আর সুবল নামে দুজন ডানপিটে কমবয়েসি ছেলে। তারা দুইজনে মিলে বাসন্তীর মাঘমণ্ডল ব্রতর জন্য চৌয়ারির বানিয়ে দেয়।3 সুবলের বাবা মারা যাওয়ায় সে কিশোরের সঙ্গে নদীতে জাল বাইতো। কিশোর সুবলের থেকে তিন বছরের বড় ছিল। কিন্ত তারা ছোটবেলা থেকেই পরস্পরের বন্ধু। একদিন কিশোরের বাবা কিশোর ও সুবলকে প্রবীণ জেলে তিলকচাঁদের সঙ্গে উত্তরে শুকদেবপুর গ্রামে পাঠায়। তখন বাসন্তীর বয়স ১১ বছর। কিশোররা শুকদেবপুরের মোড়ল বাঁশিরামের বাড়ি পৌঁছায় মাছ ধরার অনুমতি আদায়ের জন্য। এর মধ্যে চৈত্র মাসের মাঝামাঝিতে দোল পূর্ণিমা এসে যায়। শুকদেব পুরের খলাতে দোল খেলার জন্য শুকদেবপুরের সকলের আমন্ত্রণ পড়ে এবং বাঁশিরাম মোড়লের গাঙের রায়ত হিসেবে কিশোর-সুবলরাও ডাক পায়। দোল খেলার সময় তরুণীরা কিশোরকে রঙ মাখায়। কিন্তু তাকে রঙ মাখাতে গিয়ে একটি অবিবাহিতা তরুণীর হাত কাঁপতে থাকে। দোলের অনুষ্ঠান চলার সময় মেয়েটির সঙ্গে কিশোরের চোখাচোখি হয়। হঠাৎই বাসুদেবপুরের লোকেরা ওখানে আক্রমণ চালায় পুরানো গন্ডগোলের রেশ ধরে। একজন আক্রমণকারী ওই তরুণীর দিকে অগ্রসর হয়, কিশোর তাকে বাঁচাবার জন্য এগিয়ে যায়। মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে গেলে কিশোর মেয়েটিকে পাঁজকোলা করে নিয়ে মেয়েটির মার কাছে নিয়ে যায়। এরপরে বাঁশিরাম মোড়লেরর বউয়ের পৌরোহিত্যে কিশোর ওই মেয়েটির সঙ্গে মালা বদল করে এবং মেয়েটির বাবা ও মা তাকে কিশোরের নৌকায় তুলে দেয়। কিশোরদের নৌকা যাত্রাপথে দুর্যোগের মধ্যে পড়ে, শেষে তারা নয়া গাঙের খাঁড়িতে নৌকা বাঁধে। সেখানে তারা রাতে ঘুমিয়ে পড়ে, কিন্তু ঘুম ভেঙে দেখে যে তাদের নৌকায় ডাকাতি হয়ে গেছে এবং ডাকাতরা কিশোরের বউকে তুলে নিয়ে গেছে। তাদের নৌকা যখন তিতাসের মোহনায় পৌঁছায় তখন কিশোর জলে একজন মহিলাকে ভাসতে দেখে এবং বুঝতে পারে যে ওটা কিশোরেরই বউ এবং তারা মনে করে যে মেয়েটি মারা গেছে। কিশোরের চোখ লাল হয়ে ওঠে; তিলক সুবলকে বলে যে কিশোর পাগল হয়ে গেছে।

    নয়া বসত

    কিশোরের জালে অনেক মাছ উঠিয়াছে। বাঁশের গোড়ায় পা দিয়া, জলের হাতায় টান মারিয়া সে বুক চিতাইল, তার পিঠ ঠেকিল বেদিনীর বুকে। বেদিনী তরুণী, স্বাস্থ্যবতী। তার স্তন দুটি দুর্বিনীতভাবে উচাইয়া উঠিয়াছে। তার কোমল উন্নত স্পর্শ কিশোরের সর্ব শরীরে বিদ্যুতের স্পর্শ তুলিল। … … বেদিনী এক হাত ডান বগলের তলায় ও অন্য হাত বাম কাঁধের উপরে দিয়া বুক পর্যন্ত বাড়াইয়া কিশোরকে নিজের বুকে চাপিয়া ধরিল। অবলম্বন পাইয়া কিশোর পড়িয়া গেল না, কিন্তু দিশা হারাইল …

    — “তিতাস একটি নদীর নাম”

    এরপর চার বছর কেটে যায়। গৌরাঙ্গ ও নিত্যানন্দ দুই বুড়ো একটি বাচ্চা ছেলে অনন্ত ও তার মাকে নিয়ে নৌকায় বের হয়। গৌরাঙ্গ স্বগতোক্তি করে যে অনন্তর মা সে পেটে থাকা অবস্থায় ডাকাতের নৌকা থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে একটা বালুচরে ওঠে এবং ঘটনাক্রমে এই দুই বুড়োর আশ্রয়ে ভবানীপুরে আসে। তারা ভাবে যে অনন্তর মার বরকে ডাকাতে মেরে ফেলেছে তাই তারা অনন্তর মাকে বিধবার পোশাকেই রাখত। কিন্তু অনন্তর মা জানত যে সে কিশোরের বউ এবং কিশোরের গ্রামের নামও তার মনে ছিল, কিন্তু সে কিশোর অথবা সুবলের নাম জানত না। তাই শেষে তারা অনন্তর মাকে সেই গ্রামে পৌঁছাতে আসে। গ্রামের ঘাটে অনন্তর মা দেখে একজন বুড়ো একটা পাগলকে জোর করে চান করানোর চেষ্টা করছে। গ্রামে অনন্তর মার সঙ্গে সুবলার বউয়ের পরিচয় হয়। অনন্তর মা তার কাছে সূতা কাটা শেখে। অনন্তর মার সঙ্গে আরেকজনের আলাপ হয় সে হল গ্রামের ধনী কালোবরণের মা। কালোর মার কথা থেকে জানা যায় সুবলার বউয়ের আসল নাম বাসন্তী, তার বিয়ে সুবলার সঙ্গে হয় এবং সুবলা মারা যাওয়ার পরে সে সুবলার বউ নামেই পরিচিত হয়। একজন বড় মাতব্বর রামপ্রসাদের পৌরোহিত্যে মঙ্গলা তার সমাজে, যার মধ্যে সুবলার শ্বশুর আর কিশোরের বাবা ছিল, তাতে অনন্তর মাকে অন্তর্ভুক্ত করে। রামপ্রসাদ একদিন রাতে ঘুরতে ঘুরতে বুড়ো রামকেশবের বাড়ি যায়, সেখানে রামকেশবের পাগল ছেলে তাকে মাটিতে গর্ত কেটে বলে “এই তোমার মেঘনা গাঙ, অইখানে খাড়ি। … জাইগ্যা দেখি মাইয়া চুরি হইতাছে।”

    জন্ম মৃত্যু বিবাহ

    গ্রামে কালীপূজা হয়, পূজোতে সবাই চাঁদা দেয়, কিন্তু রামকেশবের চাঁদা মাফ হয়ে যায় তার ছেলে পাগল বলে। রামকেশব চাঁদা না দেওয়ার জন্য সে সঙ্কোচে প্রসাদ খায় না এবং তার ছেলে কিশোরকেও ঘরে বন্ধ করে রাখে পূজোর চারদিন। উত্তরায়ণ সংক্রান্তির দিন মালোরা প্রচুর খরচ করে খাওয়া দাওয়া করে। তাতে রামকেশব ঠিক করে সেও রামপ্রসাদ, মঙ্গলা ও তার ছেলে মোহন, সুবলার শ্বশুরবাড়ির লোকজন আর গ্রামের নতুন বাসিন্দা অনন্তর মাকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াবে। সুবলার বউ অনন্তর মাকে রামকেশবের বাড়িতে রান্নাঘরে পিঠা বানাতে নিয়ে যায়। সেখানে দুজনের কথোপকথনে জানা যায় যে কিশোর পাগল হয়ে বাড়ি আসার পর, বাসন্তীর বাবা কিশোরের বদলে সুবলের সাথে বাসন্তীর বিয়ে দেয়। সুবল একদিন কালোবরণের নৌকায় জিয়লের ক্ষেপ দিতে যায়। যখন নদীতে হঠাৎ তুফান আসে তখন সবাই নৌকা থেকে ঝাঁপ দিলেও সুবলের উপর নির্দেশ আসে লগি ঠেকিয়ে নৌকা বাঁচানোর জন্য। কিন্তু তা করতে গিয়ে সে নৌকার তলায় চাপা পড়ে মারা যায়। এরপর থেকে অনন্তর মা প্রায় লুকিয়ে কিশোরকে দেখত। শীতে কিশোরের পাগলামি বেড়ে যায়। এরপর আরেক পাগলের সঙ্গে পড়ে নিজেকে জখম করতে থাকে। শেষে অনন্তর মা বাধ্য হয়ে কিশোরের সেবা করতে শুরু করে এবং কিশোর খানিকটা ভালো হয়ে ওঠে। এরপর দোলের দিন আসে; অনন্তর মা কিশোরকে রঙ মাখাতে যায়। কিন্তু রঙ মাখানোর পর কিশোর হঠাৎ অনন্তর মাকে পাঁজকোলা করে তুলে নেয় আর মূর্ছা যাওয়া অনন্তর মার আবরণ সরে যাওয়া বুকে মুখ ঘষতে থাকে। এসব দেখে গ্রামের মানুষ কিশোরকে প্রচন্ড মারধর করে। মারের চোটে কিশোর পরদিন ভোরে মারা যায়। আর তার চারদিন পরে অনন্তর মা মারা যায়।

    রামধনু

    সুবলের বউকে পাইয়া অনন্তের মা মনের আবেগ ঢালিয়া দেয়, তুমি না কইছিলা ভইন আমার একজন পুরুষ চাই! হ; চাই-ই ত। পুরুষ ছাড়া নারীর জীবনে কানাকড়ি দাম নাই।

    পুরুষ একটা ধর না।

    কই পাই?

    পাগলারে ধর।

    ধরতে গেছলাম। ধরা দিল না।

    ঠিসারা কইর না দিদি।

    আমি ভইন ঠিসারা করি না। সত্য কথাই কই। পাগলা যদি আমারে হাতে ধইরা টান দেয়, আমি গিয়া তার ঘরের ঘরনি হই। আর ভাল লাগে না।… … একলা জীবন চলে না। পাগলেরে পাইলে তারে লখ কইরা জীবন কাটাই।

    — “তিতাস একটি নদীর নাম”

    কাদির মিয়া ও তার ছেলের সকরকন্দ আলু বোঝাই নৌকা ভারী বর্ষণে ও জোড়ালো বাতাসে ডুবে যাওয়া উপক্রম হলে বনমালী ও ধনঞ্জয় তাদের ও তাদের আলু উদ্ধার করে নিজেদের জেলে নৌকাতে তুলে নেয়। বনমালী ও কাদির মিয়ার সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে। বনমালী জানায় মালোপাড়ায় তার বোনের বিয়ে হয়েছে, তার পরামর্শে সে ও কাদির মালোপাড়ায় আলু বেচতে যায়। ওখানে অনন্ত কাদির মিয়ার আলুর পসরার সামনে ঘোড়াঘুড়ি করে। বনমালী ও কাদির মিয়া দুইজনেই দেখে অনন্ত বিস্ময় দৃষ্টিতে রামধনুর দিকে তাকিয়ে আছে। বনমালীর অনন্তকে খুব পছন্দ হয়, তাকে নিয়ে একটু ঘুড়ে বেড়ায় ও তাকে একদিন নিজের সঙ্গে নিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দেয়। এদিকে সুবলার বউ অনন্তর পক্ষ থেকে অনন্তর মার শ্রাদ্ধের ব্যবস্থাদি করে। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে বনমালীর বোন তদারকি করে, তার ছড়া কাটার ভালো ক্ষমতা ছিল। একদিন ঝড়ে সুবলার বউয়ের, মানে অনন্তর মাসীর, বাবার বাড়ি ভেঙে যায়। বাড়ি পুনরায় বানাতে প্রচুর খরচ হওয়ায় তার বাবা ও মা অনন্তকে, যে ওই বাড়িতেই থাকত, তাকে বিদায় দেওয়ার ইচ্ছা করতে থাকে। কালোবরণের মাও অনন্তকে রাখতে অস্বীকার করে কারণ তাদের বড় নৌকা ঝড়ে ভেঙে যাওয়ায় খুব ক্ষতি হয়েছে। একদিন বাসন্তীর, মানে সুবলার বউয়ের, মা অনন্তকে মারতে যায়, তাই নিয়ে মায়ে মেয়েতে ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু হয়। এইসব কিছুতে বাসন্তীর মাথা গরম হয়ে যায় ও অনন্তকে বাড়ি থেকে দূর করে দেয়। অনন্ত গামছায় মাছ ধরে, একা ঘুড়ে বেড়ায়, একদিন বনমালীর বোন অর্থাৎ লবচন্দ্রের বউয়ের বাড়ি যায়, কিন্ত পরে নিজেই বেড়িয়ে যায়। কেউ জানত না সে কোথায় থাকে। শেষে বনমালী তাকে খুঁজে বার করে নিজের সঙ্গে ও বোন উদয়তারা অর্থাৎ লবচন্দ্রের বউ কে নিয়ে দেশের বাড়ি চলে যায়। অনন্ত সেখানে বনমালীর পদ্মাপুরাণ পড়া এবং অন্যান্য লোকাচার ও অনুষ্ঠান অবলোকন করে। বনমালীর গ্রামে অনন্তর সঙ্গে একটি ছোট্ট মেয়ের পরিচয় হয়, সে জানায় তার নামও অনন্ত।

    রাঙা নাও

    বিরামপুর গ্রামে কাদির তার ছেলে ছাদির, ছাদিরের ছেলে রমু ও বউ খুশিকে নিয়ে বাস করে। কাদির তার ছেলেকে জানায় যে উজানচরের মাগন সরকার তার নামে ধারের মিথ্যে মামলা লাগিয়ে জমি দখল করে নিতে চায় যদিও কাদিররা পাট বেচে ধারের টাকাটা মিটিয়ে দিয়েছিল। এরমধ্যে খুশির বাবা তাদের বাড়িতে আসে মেয়েকে বাপের বাড়ি কয়েক দিনের জন্য নিয়ে যাবার জন্য। খুশির বাবা মুহুরী ছিল, সে বলে সে মামলা জিতিয়ে দেবে কাদিরকে, কিন্ত তাদের মধ্যে বচসা হয়ে যায়। এরপর কাদির মিয়া চোখ লাল করে মাগন সরকারের কাছে যায়, কিন্ত মাগন সরকার তাকে বলে যে এই শেষ বারের জন্য যেন তাকে এই সর্বনাশ করতে দেওয়া হয়, তারপর সে ভাল হয়ে যাবে। কাদিরও হতভম্ব হয়ে মেনে নেয়। কিন্ত পরদিনই মাগন সরকার নারকেল গাছ থেকে ঝাঁপ দিয়ে মরে যায়। কাদির তা শুনে উদাস হয়ে যায়। ছাদির শ্রাবণে নৌকা দৌড়ে চালানোর জন্য বড় নৌকা বানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করে কাদিরের কাছে টাকা চাইলে কাদির দুহাত খুলে টাকা দিয়ে দেয়। দুজন মালো এসে ছাদিরের নৌকা বানিয়ে দিয়ে যায়। ভাদ্রের ১লা তারিখে সেই নৌকা জলে ভাসে। সেই দিন তিতাসে অনেক নৌকার সমাগম হয়। উদয়তারা, অনন্ত, অনন্তবালা, বনমালী একটা নৌকায় ছিল। আরেকটি নৌকা থেকে সুবলার বউ অনন্তকে দেখতে পেয়ে, তার নৌকায় গিয়ে ওঠে। কিন্ত সেখানে উদয়তারার সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয় এবং সবাই মিলে সুবলার বউকে মারধর করে।

    দুরঙা প্রজাপতি

    — কিরে গোলাম! বিয়া করবি?

    — করমু।

    — ক দেখি বিয়া কইরা কি করে?

    — ভাত রান্ধায়

    — হি হি হি, কইতে পারলি না গোলাম, কইতে পারলি না। বিয়া কইরা লোকে বউয়ের ঠ্যাং কান্ধে লয়, বুঝলি হি হি হি। … … আমারে বিয়া করবি?

    মোটাসোটা ঠ্যাং দুটির ভয়ে ভয়ে তাকাইয়া অনন্ত বলিল, না।

    — “তিতাস একটি নদীর নাম”

    উদয়তারাদের হাতে মার খাবার পর সুবলার বউ অপমানে ঘরের মধ্যেই বেশীরভাগ সময় থাকতে শুরু করে। কিন্তু বামুন কায়েতের যুবকরা তার বাড়ির দিকে উঁকি ঝুঁকি মারা শুরু করে আর তার নামে কুৎসা রটায়। সুবলার বউ এর প্রতিবাদে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে তামসীর বাবার বাড়ির সামনে, ওখানেই বামুন, কায়েতদের বেশি যাতায়াত ছিল। সুবলার বউয়ের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে অন্য মালো ছেলেরা একদিন তিনজন তবলা বাদককে মার দেয়। অন্যদিকে দৌড়ের সময় ছাদিরের নৌকাকে অন্য এক নৌকা ধাক্কা মেরে ভেঙে দেয়। বনমালী ছাদিরকে উদ্ধার করে। কাদির বনমালীকে আগেই চিনত, সে বনমালীকে আপ্যায়ণ করে। কাদিরের মেয়ে জমিলা উদয়তারাকে বলে সে তাকে শ্বশুরবাড়ি যাবার সময় দেখেছিল এবং সই পাতানোর ইচ্ছা করেছিল। অনন্ত গ্রামে ফিরে পড়াশোনায় মন দেয় ও পড়াশোনাকে ভালোবাসে। এদিকে মালোপাড়ায় যাত্রাদলের রমরমাতে মালোরা দুদলে ভাগ হয়ে যেতে থাকে তাদের সংস্কৃতির সংরক্ষণের উপর চিন্তাধারা ভিত্তিতে। সুবলার বউ মোহনকে সঙ্গে নিয়ে হরিবংশ, ভাটিয়ালি প্রভৃতি মালো সংস্কৃতির গান গেয়ে অন্য মালোদের যাত্রাদল থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে, কিন্তু সফল হয় না।

    ভাসমান

    যাত্রাদলের কাছে আত্মসমর্পণের পর মালোদের নিজস্ব সংস্কৃতি ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে এবং মেয়েদের বিলাসিতা বাড়তে থাকে। এরমধ্যে একদিন মালোরা বিস্ময়ে আবিষ্কার করে যে তিতাসের বুকে ভাসমান চর গজিয়ে উঠেছে। দূরদূরান্তের চাষিরা ওই চরের দখলের জন্য মারামারি শুরু করে। মালোরা বর্ষাকালের জলের উপরই নির্ভর করে থাকে। রামপ্রসাদ জেলেদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। নিজে চর দখল করতে গিয়ে মারা যায়। এদিকে অনন্তবালার বিয়ের বয়স হয়ে যায়, কিন্ত সে অনন্তের আশায় বসে থাকে, যে কুমিল্লা শহরে চলে গিয়েছিল। অনন্তবালার বাবার পরামর্শে বনমালী অনন্তর শহরে যায় এবং অনন্তের সঙ্গে তার দেখা হয়। বনমালী এখন মাছের পোনার মজুরি খাটে। উদয়তারা বনমালীর বাড়ি থেকে অনেকদিন পরে শ্বশুরবাড়ীতে আসে এবং এসে বাসন্তীর, মানে সুবলার বউয়ের, সঙ্গে তার পুরনো ঝাগড়া মিটিয়ে ফেলে। মালোদের অবস্থা ধীরে ধীরে আরও খারাপ হতে থাকে এবং একে একে উদয়তারার বর, বাসন্তীর বাবা-মা, মোহনের বাবা মারা যায়। সুবলার বউ অত দু:খের মধ্যেও অনন্তর খোঁজ নিত। সে জানতে পারে অনন্তের সাক্ষাৎ বিরামপুরের কাদিরের সঙ্গে হয়। সেদিন বনমালী মারা যায়, তা দেখে কাদির তার ধানের গোলা খুলে দেয় বিতরণ করার জন্য। অনাহারে সুবলার বউ সবাইকে নিয়ে চিন্তায় দিবাস্বপ্ন দেখতে থাকে এবং একসময় তার শিথিল হাত থেকে জলভরা লোটা পড়ে যায়।

  • মার্ক টোয়েন গল্পসমগ্র

    মার্ক টোয়েন গল্পসমগ্র

    [book-name]

    The Complete Short Stories Of MARK TWAIN

    মণীন্দ্র দত্তমার্ক টোয়েন

    অখণ্ড রাজ সংস্করণ

    তুলি-কলম

    ১, কলেজ রো, কলকাতা-৯

    প্রথম সংস্করণ : বৈশাখ ১৪০২, এপ্রিল ১৯৯৫

    দ্বিতীয় সংস্করণ : বইমেলা ১৪১৪, ফেব্রুয়ারী ২০০৮

    প্রকাশক : কল্যাণব্রত দত্ত॥ তুলি-কলম ॥ ১এ, কলেজ রো, কলকাতা-৯

    অক্ষর বিন্যার : এস টি লেজার ইউনিট, কলকাতা-৭৩

    মুদ্রক : এসার গ্রাফিক, ১ সি, গৌর লাহা স্ট্রিট, কলকাতা-৬

    প্রচ্ছদ: নীল দত্ত॥ অলংকরণ : রাজা দত্ত

    প্রাপ্তিস্থান : সাহিত্য তীর্থ॥ ৮/১ বি, শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কলকাতা-৭৩

    মার্ক টোয়েন প্রসঙ্গে

    আসল নাম স্যামুয়েল ল্যাংহর্ণ ক্লিমেন্স; কিন্তু যে নামে তাঁর বিশ্ব-জোড়া খ্যাতি সেটি ছদ্মনাম মার্ক টোয়েন। এই ছদ্মনাম গ্রহণের একটু ইতিহাস আছে। ১৮৬৩ খৃষ্টাব্দের গোড়ার কথা। ক্লিমেন্স তখন সাংবাদিকতা ও রস-রচনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। বিখ্যাত সংবাদপত্র “এন্টারপ্রাইজ”-এর সঙ্গে জড়িত। একদিন তাঁর মনে হল একটি ভাল ছদ্মনাম চাই। ঘটনাক্রমে ঠিক সেই সময়ই তাঁর পূর্ব-পরিচিত বৃদ্ধ নৌ-চালক ক্যাপ্টেন সেলার্স-এর মৃত্যুসংবাদ এসে পৌঁছল। ক্লিমেন্স-এর মনে পড়ে গেল, ক্যাপ্টেন সেলার্স নিজের নাম স্বাক্ষর করতেন—”মার্ক টোয়েন।” নামটি তাঁর মনে ধরল। এর একটি নিজস্ব ঐশ্বর্য আছে। কথাটার অর্থ “নিরাপদ জলরাশি।” অন্ধকার সমুদ্রের বুকে চলতে চলতে যে কোন নাবিকের কানে নামটি বড়ই শ্রুতিসুখকর। ২রা ফেব্রুয়ারি তারিখে প্রকাশিত একটি রচনাতেই ক্লিমেন্স-এর এই ছদ্মনাম সর্বপ্রথম স্বাক্ষরিত হয়েছিল। মহাকালের পথ ধরে সেই ছদ্মনাম আজ আসল নামের গণ্ডীকে অতিক্রম করে সর্বমানবের স্মৃতিতে অমর হয়ে আছে।

    স্যামুয়েল ল্যাংহর্ণ ক্লিমেন্স-এর জন্ম ১৮৩৫ খৃস্টাব্দের ৩০শে নভেম্বর, আমেরিকার ফ্লোরিডা শহরে। ছোট বেলায় সকলে তাকে ডাকত “ক্ষুদে স্যাম” বা “স্যামি” বলে। নদীতীরবর্তী ছোট শহর হ্যানিবল্-এ তার শৈশব কেটেছে। নদী, নৌকো ও স্টিমার নিয়ে সে এক আশ্চর্য সুন্দর জগৎ। ছোট্ট স্যামির চোখে স্বপ্নের অঞ্জন। পরবর্তী কালে মার্ক টোয়েন লিখেছেন: “যখন সে দেখে বাষ্পীয় যানগুলি অনবরত যাতায়াত করছে অথচ একবারও সে তাতে চড়তে পারছে না, তখন একটি ছোট ছেলের মনের অবস্থা কি রকম হয় তা কল্পনাও করা যায় না।” সেই কল্পনা কিন্তু একদিন বাস্তবে রূপ নিল। ক্ষুদে স্যামের জীবনের অন্য অনেক দুঃসাহসিক ঘটনার মধ্যে সেও একটি। তাঁর বয়স তখন সবে ন’বছর। বেশ কতকগুলি যাত্রীবাহী স্টিমার হ্যানিবল-এ এসে ভিড়ল। স্যামিও চুপি চুপি তার একটি তে উঠে পড়ল। হামাগুড়ি দিয়ে সোজা হাজির হল ডেকে। স্টিমার ছাড়ার ঘণ্টা পড়ল। ঘাট ছেড়ে স্টিমার মাঝ নদীতে পড়ল। স্যামির স্টিমারে চড়ার স্বপ্ন সফল হল। হামাগুড়ি দিয়ে ডেকের তলা থেকে বেরিয়ে এসে প্রাণভরে দেখতে লাগল প্রকৃতির অপরূপ শোভা। মুষলধারে শুরু হল বৃষ্টি। হামাগুড়ি দিয়ে ফের ঢুকল ডেকের তলায়। কিন্তু পা-জোড়া বেরিয়ে রইল। একটি খালাসি দেখতে পেয়ে হিড়-হিড় করে তাকে টেনে বের করল। আর ঠিক পরের ঘাটেই স্টিমার থেকে নামিয়ে দিল। হ্যাঁ, মার্ক টোয়েনের “দি অ্যাডভেঞ্চার্স অব টম সইয়ার” বইয়ের বেশীর ভাগ পাঠকই যা অনুমান করেন সেটাই ঠিক—স্যাম ক্লিমেন্সই টম সইয়ার—একেবারে হুবহু এক।

    ঘটনার বিপুল বৈচিত্র্যের যে নক্ষত্র-দীপ্তিতে মার্ক টোয়েনের জীবনের আকাশ ঝলমল করে, তারই প্রতিফলন আমরা দেখি তার সাহিত্য-কৃতিতে। Gilded Edge, The Adventures of Tom Sawyer, Huckleberry Fin, Life on the Mississipi, The Innocents Abroad, A Tramp Abroad, Roughing it প্রভৃতি বইয়ের পাতা ওল্টালে তার বিচিত্র রস ও রসিকতার অন্তরালে মার্ক টোয়েনের কটাক্ষ-রসায়িত হাস্যোজ্জ্বল মুখখানি কোন চক্ষুষ্মান পাঠকেরই দৃষ্টিকে এড়িয়ে যেতে পারে না।

    বিচিত্র মার্ক টোয়েনের জীবনের ইতিহাস। আট বছর ছাপাখানার শিক্ষানবীশ, চার বছর মিসিসিপি নদীতে স্টিমারের পাইলট, নেভাদার দুর্গম অঞ্চলে খনির সন্ধানে অক্লান্ত অভিযাত্রী, ভার্জিনিয়া সিটিতে সংবাদপত্রের প্রতিবেদক হিসাবে আর্থিক স্বচ্ছলতা ও প্রতিষ্ঠা লাভ, ক্যালিফোর্নিয়ার অভিজাত মহলে যাতায়াত ও সাহিত্য-রচনার পাথেয় সঞ্চয় চুয়াত্তর বছরের দীর্ঘ জীবন বৈচিত্র্যে ও সাফল্যে সমান সমুজ্জ্বল। চল্লিশ বছর ধরে তার সৃষ্টিশীল লেখনী থেকে অজস্র ধারায় ঝড়ে পড়েছে উপন্যাস, ছোট গল্প, ভ্রমণ-কাহিনী ও রম্যরচনার রসমধুর ফসল। লেখনীর মত তার রসনায়ও ছিল নিকষে কণক-দীপ্তির আশ্চর্য বিচ্ছুরণ সভাকক্ষে বক্তা হিসাবে যেমন ছিলেন জনপ্রিয়, তেমনি ছিলেন ভোজসভার বৈঠকী বাচন-ভঙ্গীতে পারঙ্গম। ছিলেন একাধারে অনেক রাষ্ট্রপ্রধানের সুহৃদ, অনেক রাজার সহচর, বিশ্বপর্যটক, খ্যাতিমান গল্পকার, প্রেমিক স্বামী ও স্নেহময় পিতা।

    অনেকের মতেই মার্ক টোয়েন আমেরিকার সাহিত্য-কুল-তিলক। “A man, a very great man, a national monument.” আমেরিকার নোবেল-পুরুস্কারপ্রাপ্ত বিখ্যাত সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেছেন, “হাবেরি ফিন” থেকেই মার্কিন সাহিত্যের যাত্রা শুরু হয়েছে। তাঁর সাহিত্য-কীর্তির সমালোচনায় অগ্রসর হবার আগে জনৈক বিদগ্ধ সমালোচকের সতর্ক-বাণী অবশ্য স্মর্তব্য: “Twain is a dangerous man to write about. Unless you approach him With a sense of humour, you are lost. You cannot dissect a humorist upon a table. Your first stroke will kill him and make him a tragedian. You must come to Twain with a smile. That is his prerogative: that he can make you do so or fail. A great American critic wrote a study of Twain which was brilliant. The only trouble With it was he thought he was describing somebody else-himself, probably. The critie did not have a sense of humour, and his error was comparable to that of the tone-deaf critic who wrote on Beethoven God forbid that I should try to dissect Mark Twain. “ঈশ্বর দয়া করুন, সে দুঃসাহসিক প্রচেষ্টায় যেন আমরাও না ব্রতী হই। তার পরিবর্তে মার্ক টোয়েনের প্রথম বিখ্যাত গল্প “কালাভেরাস জেলার কুখ্যাত লাফানে ব্যাঙ” থেকে শুরু করে “যে-মানুষ হ্যাড্‌ লিবুগ-এর চরিত্র হনন করেছিল” পর্যন্ত মোট তেতাল্লিশটি গল্পের পূর্ণাঙ্গ ভাষান্তর আমরা রসিক পাঠকদের সামনে উপস্থিত করলাম। এই সব গল্পের গুণাগুণ যার যার মনের নিকষ-পাষাণে ঘসে তারাই পরখ করে দেখুন। আমরা শুধু প্রসঙ্গত এইটুকুই বলতে পারি উল্লিখিত দুটি বিশ্ববিখ্যাত গল্প ছাড়াও “Cannibalism in the cars.” “Legend of Capitolive Venus.” “The Esquimau Maiden’s Romance” “The Death Disk.” “Was it Heaven or Hell.” ও “A Dog’s Tale”-এর মত গল্প কোন দেশের সাহিত্যের খুব বেশী লেখা হয় নি। একটি উদ্ধৃতি দিয়েই এ-প্রসঙ্গ শেষ করছি: “His stories are an important part of our literary heritage…Twain is our writer closest to folklore, our teller of fairy tales. The Jumping Frog story is a living American fairy tale acted out annually in Calaveras Country…Who are our short-story writers? Irving, Hawtharne, Poe. James, Melville, O. Henry, Bret Harte, Hemingway, Faulkner, Porter… Twain ranks high among them.

    এবার মার্ক টোয়েন প্রসঙ্গের শেষ কথা—একটি মহৎ জীবনের অবসান মুহূর্তের কথা। তাঁর জীবনীকার আলবার্ট বিজেলো পাইন-এর জবানীতেই সে বিবরণ শোনা যাক … ১৯১০ খৃস্টাব্দের ২১শে এপ্রিল সকাল বেলা। তাঁর মন তখনও পর্যন্ত বেশ পরিষ্কার। বিছানায় শুয়ে নিজের বই থেকে খানিকটা পড়লেন। আমাকে বললেন দুটি অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি ফেলে দিতে। তাঁকে সান্ত্বনা দিলাম। তিনি আমার হাতটা চেপে ধরলেন। আমার প্রতি এই তাঁর শেষ কথা। … সারাটা বিকেল তন্দ্রায় ডুবে রইলেন; ক্রমে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলন; আর কখনও আমাদের দেখলেন না। সাড়ে ছ’টা নাগাদ ডাঃ কুইণ্টার্ড লক্ষ্য করলেন, শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমেই মৃদু হয়ে আসছে। যন্ত্রণার চিহ্নমাত্র নেই। মাথাটা একপাশে হেলে পড়ল; একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস কাঁপতে কাঁপতে বাতাসে মিলিয়ে গেল— চুয়াত্তরটি ঘটনাবহুল বছর ধরে যে শ্বাস-প্রশ্বাস বইছিল তা চিরকালের মত থেমে গেল!

    পরিশেষে বলি, মার্ক টোয়েনের অনুকরণীয় তথা অসরল বাক্য-ভঙ্গীকে বাংলায় ভাষান্তরিত করতে সাধ্যমত চেষ্টা করেছি; কতটা সফল হয়েছি সে বিচার পাঠকের। ভাষান্তরের অনিবার্য ত্রুটি যেন গল্পকারকে স্পর্শ না করে, আমার শুধু এইটুকুই প্রার্থনা।

    “মার্ক টোয়েন গল্পসমগ্র” প্রকাশ প্রসঙ্গে বন্ধুবর ডক্টর বিষ্ণু বসুর সহায়তার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি; কল্যাণীয়া ঈশিতার সহায়তার কথাও এখানে উল্লেখ্য।

    —শ্রীম

    ৷৷ সুদৰ্শন ৷৷

    ৭৮/১২, আর. কে. চ্যাটার্জি রোড,

    কলকাতা-৪২

  • আদিম আতঙ্ক

    আদিম আতঙ্ক

    অদ্রীশ বর্ধন

    আদিম আতঙ্ক

    কল্পবিজ্ঞান থ্রিলার

    ফ্যানট্যাস্টিক ও কল্পবিশ্ব পাবলিকেশনস যৌথ প্রয়াস

    প্রথম প্রকাশ – জানুয়ারি ২০০১

    .

    উৎসর্গ

    গ্রন্থকীট কিশোর বন্ধু

    মেহবুব রহমানকে

    —অদ্রীশ জ্যেঠু

    ফ্যান্টাসটিকের দিনে পাশে থাকা

    সুরজিৎ দে-কে

    প্রকাশকের কথা

    বাংলায় ‘কল্পবিজ্ঞান’-এর জয়যাত্রা কিন্তু অনেকদিনের। ১৯৬৩ সালে অদ্রীশ বর্ধনের আশ্চর্যের হাত ধরে শুরু যে স্বর্ণযুগের, কালের নিয়মে তা আজ হারিয়েছে বিস্মৃতির অন্তরালে। উপযুক্ত প্রকাশক ও গবেষণার অভাবে তা দ্রুত মুছে যাচ্ছে ইতিহাসের পাতা থেকে। কল্পবিশ্ব প্রকাশনীর উদ্দেশ্য শুধু নতুন লেখক প্রতিভাকে সামনে আনাই নয়, কল্পবিজ্ঞানের ঐতিহ্যকে পাঠকের সামনে তুলে ধরা।

    ‘আদিম আতঙ্ক’ একটি শ্বাসরোধী কল্পবিজ্ঞান থ্রিলার। এটি আমেরিকান লেখক ডিন কুন্‌জ এর লেখা ‘ফ্যান্টমস’ উপন্যাস থেকে অনুপ্রাণিত। উপন্যাসটি প্রথমে ধারাবাহিক আকারে প্রকাশিত হয়েছিল শুকতারার পাতায় ১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাস থেকে ২০০০ সালের জানুয়ারি মাস অবধি। ২০০১ সালে উপন্যাসটি প্রথম বই আকারে প্রকাশিত হয়েছিল ‘আরুণি পাবলিকেশনস’ থেকে। বাংলা কল্পবিজ্ঞানের আগ্রহী পাঠকদের জন্যে প্রায় ঊনিশ বছর পরে কল্পবিশ্ব ফ্যান্টাসটিক প্রকাশনের সঙ্গে যৌথভাবে উপন্যাসটি পুনঃপ্রকাশের দায়িত্ব নিল। বইটি প্রকাশের দায়িত্ব ও অনুমতি দেবার জন্যে অদ্রীশ বর্ধন ও তাঁর পুত্র অম্বর বর্ধনের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

    আশা করি, কল্পবিশ্ব ও ফ্যান্টাসটিক এর যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘অপার্থিব সিরিজ’ এর অন্তর্গত এই কল্পবিজ্ঞান থ্রিলারটি কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাসের পাতায় যোগ্য সমাদর পাবে।

    নভেম্বর ২০১৯

    প্রকাশক

    বিশেষ কৃতজ্ঞতা

    অম্বর বর্ধন, কেয়া বর্ধন, জয়া ঠাকুর, সঞ্জীব মিত্র

    সুমিত বর্ধন, সুদীপ দেব, সৌরভ দে, সুপ্রিয় দাস

  • লিঙ্গপুরাণ

    লিঙ্গপুরাণ

    অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book-name]

    প্রথম প্রকাশ : মাঘ, ১৪২৪

    উৎসর্গ

    প্রাণপ্রিয় কবি দেবযানী দত্তকে

    সূচিমুখ

    কথামুখ

    গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়া নয়। গতানুগতিকতায় প্রথাবদ্ধ হয়ে বন্দি না-হয়ে উল্টো সুরে উল্টো পথে যা ভাবি তাই লিখি। পূর্বপুরুষের শিখিয়ে দেওয়া তোতাপাখির বুলি আওড়ানোতে আমি স্বভাবসিদ্ধ নই। ভিন্ন ভাবনায়, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথানির্মাণে আমার অক্ষরমালার চরৈবেতি। প্রচলিত বিশ্বাস ও ধারণাকে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করেছি গভীর নিবিড়তায়। উচিত-অনৌচিতের জ্ঞানবর্ষণ নয়, নিজের জীবন এবং যাপনেও এই বদলের রূপরেখা অনুসরণের চেষ্টা করি।

    জ্যোতিষীগিরি একটা লাভজনক ব্যবসা। পাড়ায় পাড়ায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে জ্যোতিষীদের রমরমা ব্যবসা আমরা সবাই দেখেছি। জেনেছি তাঁরা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, মানুষের হাত-পা-কপাল দেখে ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে। যদিও জ্যোতিষীদের কোনো বক্তব্য কোনোদিন কখনোই সত্য প্রমাণিত হয়নি, তা সত্ত্বেও জ্যোতিষীদের প্রতি মানুষের অগাধ ভক্তি। এইসব ভণ্ড জ্যোতিষীদের খপ্পরে মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। তবু জ্যোতিষীরা যেন দেবদূত, অন্তর্যামী। অথচ এই জ্যোতিষীরা অন্তরালে এক একটা পাক্কা শয়তান, যমদূত। যে যত বড়ো জ্যোতিষী, সে তত বড়ো মিথ্যা, তার চেয়ে বড়ো ভণ্ড, প্রতারক। এঁরা নাকি কেউ কেউ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। জ্যোতিষীকে কেউ বলেন শাস্ত্র, কেউ বলেন বিজ্ঞান। আসলে জ্যোতিষজ্ঞান না শাস্ত্র, না বিজ্ঞান। পাথর ধারণ করলে ভাগ্য বদলে যায় না। জ্যোতিষবিদ্যা ও জ্যোতিষীদের পর্দাফাঁস করা হয়েছে ‘জ্যোতিষ : না শাস্ত্র, না বিজ্ঞান’ প্রবন্ধে।

    ছাগল, ভেড়া, মুরগি, শুয়োরের মাংসের মতো গোরুর মাংসও খেয়ে থাকে। আসলে মানুষ খায় না এমন একটি প্রাণী এ পৃথিবীতে নেই। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে মানুষের খাদ্যাভ্যাস হয়। তবুও মাংস খাওয়াকে কেন্দ্র ঘৃণা, হত্যা ইত্যাদি। যত গণ্ডগোল গোরুকে ঘিরে। গোমাংস কি শুধু মুসলিমরাই খায়? ‘গোহত্যা, গোমাংস ও গোমাতার ইতিবৃত্ত’ প্রবন্ধে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করা হয়েছে গোমাংসের ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান। ‘সরস্বতী : বাস্তবে এবং অবাস্তবে’ প্রবন্ধে হিন্দুদের পরমপূজ্য দেবী সরস্বতীর উৎস ও বিবর্তন নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হিন্দুসমাজ ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। ভারতীয় সমাজ কীভাবে ব্রাহ্মণদের কজায় চলে এলো? এই ব্রাহ্মণ্যবাদ হিন্দুসমাজে কতটা ক্ষতি করেছে? ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং ভারতীয় সমাজ’ প্রবন্ধে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে।

    ‘মনু, মনুসংহিতা এবং হিন্দুত্ববাদের ভারতবর্ষ’ প্রবন্ধের শিরোনামই বলে দিচ্ছে ভারতবর্ষের হিন্দুত্ববাদে মনুসংহিতার প্রভাব কতখানি। বাবা সাহেব মনুসংহিতা পুড়িয়ে দিয়েছিল। কী এমন আছে মনুসংহিতায়? মনু কে? মনুর বিধান কীভাবে হিন্দুসমাজে কীভাবে বর্ণবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষের শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছে এই প্রবন্ধে সেটাই উপজীব্য।

    লিঙ্গপুরাণ প্রবন্ধে ‘লিঙ্গ’ শব্দটি থাকলেও কোনো যৌনতা নেই। তবে সমগ্র আলোচনাই হয়েছে লিঙ্গ নিয়ে। এসেছে শিবলিঙ্গ বিষয়ও। আলোচনা হয়েছে জাপানের পেনিস ফেস্টিভাল থেকে অমরনাথের প্রাকৃতিক বরফের লিঙ্গ নিয়ে। রহস্য উদ্মাটনের চেষ্টা করা হয়েছে।

    প্রসঙ্গত কয়েকটি জরুরি কথা বলে রাখা প্রয়োজন– প্রথমত, লিঙ্গপুরাণ কখনোই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গ্রন্থ নয়। অনেকেই বইয়ের নাম দেখে ভাবেন, বইটিতে অ্যাডাল্ট কনটেন্ট আছে। ১৮ অনুৰ্ধদের জন্য অপাঠ্য। ভুল ভেবে ভুল করবেন না। ইতোমধ্যে অনেকগুলি সাইট আমার চোখে পড়েছে, যেখানে আমার ‘লিঙ্গপুরাণ’ নামে বইটি অ্যাডাল্ট ক্যাটাগরিতে রেখেছেন। তাঁদের অনুরোধ করছি ক্যাটাগরি বদলে ফেলুন। বইটি অবশ্যই প্রাপ্তমনস্কদের জন্য, কখনোই প্রাপ্তবয়স্কদের নয়। সকল বয়সের পাঠকরা বইটা পড়তে পারেন। দ্বিতীয়ত, যারা এই বইটি পিডিএফ করে বিভিন্ন সাইটে রেখেছেন, তাঁরা কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করেছেন। আমি কারোকে পিডিএফ করার অনুমতি দিইনি। যত বেআইনি পিডিএফ আছে সব সাইট থেকে সরিয়ে ফেলুন। তৃতীয়ত, বিভিন্ন সাইটে ‘লিঙ্গপুরাণ’ নামে যে পিডিএফ আপনারা ডাউনলোড করে পড়ছেন, তাঁদের বলি ওই বইটার সঙ্গে এই বইটার অনেক অমিল। প্রচ্ছদ একই থাকলেও বিষয় এক নেই। বেশ কিছু নতুন প্রবন্ধ যেমন সংযোজন করা হয়েছে, কিছু প্রবন্ধ বাতিলও করা হয়েছে। আগের যে প্রবন্ধগুলি বর্তমান বইতে আছে সেগুলিতেও প্রচুর সংযোজন, সংশোধন, বর্জন, পরিমার্জন করা হয়েছে। বলা যায় সম্পূর্ণ নতুন রূপে এই বইটি আপনাদের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ এই বইয়ের আসল স্বাদ নিতে হলে পাইরেটেড পিডিএফ নয়, ই-বুক পড়ন।

    কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাবগম্ভীর বিষয় হলেও যতটা সম্ভব প্রাঞ্জল ভাষায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই সংকলনে যেসব প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে তা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। বিদগ্ধ ও অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের দাবিতে পাঠকদের কাছে সেগুলি দুই মলাটে করে বন্দি পৌঁছে দিতে পারলাম। এই গ্রন্থটির বিষয়বৈচিত্র্য নিশ্চয় পাঠকদের মন জয় করতে পারবে।

    অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

  • অনন্ত দ্রাঘিমা

    অনন্ত দ্রাঘিমা

    হলদিপোঁতা ধাওড়া একটি অখ্যাত জনপদের নাম যার বুক ছুঁয়ে চলে গিয়েছে জগৎখালি বাঁধ আর বুড়ি গাং। নির্দিষ্ট কোনও পেশা নেই ধাওড়া পাড়ার মানুষদের। এই জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ নর-নারীই শ্রমজীবী। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তারা শোষণ আর বৈষম্যের বাঘনখে আক্রান্ত। তাদের জীবনে অভাব মাঠ-কেঁচোর মতো সহজলভ্য, শিক্ষা সেখানে তেলহীন লম্ফর পোড়া সলতে। এক অসম লড়াইয়ের উত্তাপ এই সুদীর্ঘ উপন্যাসের গতিকে করেছে বেগবান মানুষ প্রকৃতি নদী ও নারী জীবনের চলমান ছবি হয়ে ঘুরে ফিরে এসেছে নানা অভিঘাতে। দু’ মুঠো ভাত কিংবা রুটির জন্য মানুষ স্বভূমি ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি দিয়েছে। ‘অনন্ত দ্রাঘিমা’য় অভাব দুষ্টক্ষত এবং অভিশাপ। আর সেই অভাব এবং বঞ্চনাকে কেন্দ্র করে গ্রামের বাতাস কেঁপে উঠছে নানা সময়মুখী আন্দোলনে। শহর অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে সেই আগুন উসকে দিতে। গ্রামের ধুলোওড়া বাতাসের ভেতর থেকে তারা অপসারিত করতে চেয়েছে অসাম্যের দানবকে। রঘুনাথ এই পোড় খাওয়া সমাজের একজন। গুয়ারাম, লুলারাম, চুনারাম কিংবা ভিকনাথ তার ব্যতিক্রম নয়। মানবিক মূল্যবোধ আর বিশ্বাসের পলিমাটি দিয়ে গড়া এই ধ্রুপদী উপন্যাস সাহিত্যিক অনিল ঘড়াইয়ের নিরপেক্ষ কলমে হয়ে উঠেছে চিরকালীন আখ্যান।

  • সোনার ঘণ্টা

    সোনার ঘণ্টা

    অনিল ভৌমিক

    [book-name]

    প্রথম প্রকাশ : শুভ দীপাবলী, ১৩৮৬; নভেম্বর, ১৯৭৯।

    অষ্টম মুদ্রণ : শুভ অক্ষয় তৃতীয়া, ১৩৯৪; মে, ১৯৮৭।

    প্রকাশনায়: সুপ্রিয়া পাল; উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির, সি-৩, কলেজ স্ট্রীট মার্কেট, কলিকাতা, ৭০০০০৭ (প্রথম তলা)। প্রতিষ্ঠাতা: শরচ্চন্দ্র পাল; কিরীটিকুমার পাল।

    মুদ্রাকর: সন্তোষী প্রিণ্টার্স, তাপস সাঁতরা; ১৪৩, গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেন, কলিকাতা-৯।

    প্রচ্ছদচিত্র : নারায়ণ দেবনাথ; পরিকল্পনায় : দিব্যদ্যুতি পাল।

    * * *

    সোনার ঘণ্টা প্রসঙ্গে

    ঘণ্টা সোনার কি রূপোর কি নেহাৎই তামার বা পিতলের, সেটা কোন বিচারের কথাই নয়। আসল যা হ’ল বিচার্য তা হচ্ছে ঘণ্টার ধ্বনি। সে ধ্বনি দিয়েই ঘণ্টার সত্যকার পরিচয়।

    ‘সোনার ঘণ্টা’ নামটির দরুণ যে কথাগুলি বলবার সুযোগ পেলাম শ্রীঅনিল ভৌমিকের সেই কিশোর উপন্যাসটি সম্বন্ধে সেগুলি বিশেষভাবে খাটে। বাংলা ভাষায় ছোটদের জন্য লেখা বই-এর সংখ্যা ইদানীং যথেষ্ট বাড়লেও সত্যিকার সার্থক লেখার দেখা খুব কমই মেলে। ‘সোনার ঘণ্টা’ তার মধ্যে একটি বিশেষভাবে সমাদর পাবার বই, একথা অসঙ্কোচে বলতে পারি। গল্পের বিষয় ও বলবার মুন্সিয়ানা সব দিক দিয়েই বইটি মনে রাখবার মত।

    প্রেমেন্দ্র মিত্র

    * * *

    ‘কসবা জগদীশ বিদ্যাপীঠ’-এর

    প্রাক্তন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

    ছাত্রদের উদ্দেশ্যে–


    নিবেদন

    একটি চিত্রকাহিনীই “সোনার ঘণ্টা” উপন্যাসটির মূল প্রেরণা। সেই কাহিনী ঢেলে সাজাতে গিয়ে ঘটনা, চরিত্র সবকিছু আমাকে নতুন ক’রে ভাবতে হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ– ইহুদী জ্যাকব, কাসেম, মকবুল, ফজল, হ্যারি প্রভৃতি চরিত্রগুলো আমারই চিন্তার ফসল। কুয়াশা, ঝড় আর ডুবো পাহাড়ের প্রতিকুলতা পেরিয়ে সোনার ঘণ্টার দ্বীপে যাওয়া ও ফেরা, দু’টো মোহরে খোদিত নক্সার কাহিনী ইত্যাদি ঘটনাগুলিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার মতো  ক’রে আমাকে সাজাতে হয়েছে। অনেকস্থলে চিত্রকাহিনীর ফাঁকও পূরণ করতে হয়েছে। এইভাবে বর্তমান উপন্যাসের পূর্ণরূপ গড়ে উঠেছে।

    সবিশেষ নিবেদন– উপন্যাসটি কিশোরদের জন্য রচিত। তাই কাহিনীর নায়ক ফ্রান্সিসকে নিচক এ্যাডভেঞ্চার বিলাসীরূপে অঙ্কন না ক’রে তাকে একটা জীবন-দর্শনের ভিত্তিভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করেছি। কিশোরদের মনে এই দৃষ্টিভঙ্গীটুকু স্বীকৃতি পেলেই “সোনার ঘণ্টা” রচনা সার্থক ব’লে মনে করবো।

    প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য–  “সোনার ঘণ্টা” প্রথমে ‘শুকতারা’ পত্রিকায় ধারাবাহিক উপন্যাসরূপে প্রকাশিত হয়েছিল।

    দীপাবলী, ১৩৮৬
    অনিল ভৌমিক

    * * *

    আজকের দিনে যেসব জাতি পৃথিবীর উপর প্রভাব বিস্তার করেছে, সমস্ত পৃথিবীর সবকিছুর উপরেই তাদের অপ্রতিহত উৎসুক্য। এমন দেশ নেই, এমন কাল নেই, এমন বিষয় নেই যার প্রতি তাদের মন ধাবিত না হচ্ছে।

  • আজাজেল

    আজাজেল

    আইজাক আসিমভ কল্পবিজ্ঞানের সুবিখ্যাত কথাশিল্পী, অসীম কল্পনাশক্তিতে তার খেয়ালী কলম মেলে। ধরেছেন রূপক কাহিনী গ্রন্থনে। আঠারােটি গল্পকে সংকলনে বন্দী করে আমাদের উপহার দিয়েছেন। যারা রূপক কাহিনী ভালবাসেন এবং আসিমভের অনুরাগী ভক্তবাহিনী, সকলকেই অভিভূত করবে। আজাজেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন, দুই সে.মি. দীর্ঘ। আগুন-লাল-রঙা এক জিন প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও চমৎকার জাদুশক্তির অধিকারী। শুধুমাত্র জর্জ। বিটারনাট, যিনি এক খামখেয়ালী ভাষাবিদ, জিন ও আত্মা আহ্বানের জাদুমন্ত্রে পারদর্শী এবং তারই ইচ্ছায় আজাজেল আবির্ভূত হয়। কিন্তু, আজাজেল তার বিস্ময়কর জাদুবিদ্যা, জর্জের ব্যক্তিগত লাভের খাতিরে ব্যবহৃত হতে অনুমতি দেবে না। জর্জের বন্ধুদের প্রয়ােজন পড়লে, তারা অনুগ্রহ পেতে পারে। কিন্তু একটাই সমস্যা। এই অন্য পার্থিব চমৎকার করিৎকর্মার, পার্থিবব্যঞ্জনা এবং মানবিক দুর্বলতা সম্পর্কে স্বল্পই জ্ঞান আর তার সদিচ্ছাপ্রসূত অবৈধ হস্তক্ষেপ যারপরনাই তামাসা ও অপ্রত্যাশিত বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত হয়। এই কাহিনীগুলির শ্রমসাধ্য সংকলন আজাজেল ও বেচারি বিটারনাটের উদ্ভট ও ব্যর্থ অভিযানসমূহ অনুসরণ করেছে, যখন তারা ভালমনেই কিছু পরিচিত দুর্ভাগাদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছিল। আসিমভের নিজস্ব ভঙ্গিতে এবং বিষমই মজা করে বর্ণিত আজাজেল ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্মল দুষ্টুমি-মাখা আনন্দ দেওয়ার দাবি রাখে। আজাজেল এর সতেরটি গল্প, প্রথম ‘দ্য ফ্যান্টাসি অ্যাণ্ড সায়েন্স ফিকশন’ ও ‘আইজাক আসিমভস সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিন’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। এই সংকলনিটর প্রথম গল্প ‘দুই সে.মি. জিন’ বিশেষ করে এই বইটির জন্যই লেখা।

    [book-name]

    অনিশা দত্তআইজাক আসিমভ

    Azazel by Isaac Asimov

    অনুবাদ : অনিশা দত্ত

    প্রথম প্রকাশ : বইমেলা, ফেব্রুয়ারি ২০০৯

    প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ

    অনুবাদকের উৎসর্গ

    সন্দেশ প্রকাশনার লুৎফর রহমান চৌধুরী প্রীতিভাজনেষু

    সূচনা

    ১৯৮০তে এরিক প্রর্টার নামে এক ভদ্রলোক আমাকে, তার সম্পাদনায় একটি পত্রিকার জন্য মাসিক রহস্য কাহিনী লিখতে অনুরোধ করেন। আমি সম্মত হই, কারণ আমি সজ্জনদের ‘না’ বলতে পারি না আর আমি এ যাবৎ যত সম্পাদকের সংস্পর্শে এসেছি, তারা যথাযথ সজ্জন।

    প্রথম কাহিনী আমি লিখি, এক ধরনের কল্পরহস্য যেখানে দুই সে.মি. লম্বা এক ক্ষুদ্র জিনের কথা বলেছি, নাম দিয়েছিলাম, ‘শঠে শাঠং।’ এরিক প্রর্টারের মনে ধরেছিল ও তিনি তা প্রকাশ করেন। এতে গ্রিসওল্ড নামে এক ভদ্রলোকের কথা বলেছিলাম যিনি ছিলেন মূল বক্তা আর সাথে ছিলেন তিন শ্রোতা। যার মধ্যে আমি নিজেও ছিলাম, যদিও নিজের পরিচয় দিইনি। চারজনে প্রতি সপ্তাহে ইউনিয়ন ক্লাবে মিলিত হতাম, আর আমি ইউনিয়ন ক্লাবেই গ্রিসওল্ডের গল্পের পরিকল্পনা করেছিলাম। যাই হোক, যখন আমি ছোট্ট জিনকে নিয়ে ‘শঠে শাঠং’ নামে দ্বিতীয় কাহিনীর সূচনার চেষ্টা করছিলাম (নতুন কাহিনীর নাম দিলাম, ‘সঙ্গীতের এক রজনী’)।

    এরিক বললেন, ‘না!’ হয়তো বা, এক বাক্যে, উদ্ভট কল্পনার আশ্রয় নিয়েছিলাম। কিন্তু সে চায়নি, আমি সেটা অভ্যাসে রপ্ত করে ফেলি।

    অতএব, আমি ‘সঙ্গীতের এক রজনী’কে এক পাশে সরিয়ে রেখে রহস্য কাহিনীর ধারাবাহিক শুরু করলাম, যাতে কোনো উদ্ভট কল্পনার মিশেলই দিলাম না। এদের মধ্যে তিনটি গল্প (যা এরিক চেয়েছিলেন দুই হাজার থেকে দুই হাজার দুশো শব্দের মধ্যে) ঘটনাক্রমে আমার বই ‘দ্য ইউনিয়ন ক্লাব মিস্ট্রি’তে (ডাবল ডে, ১৯৮৩) সংগৃহীত হয়েছিল। এর মধ্যে ‘শঠে শাঠং’কে অন্তর্ভুক্তি করিনি, কারণ ছোট্ট জিনের বিবৃতি, বাকি গল্পগুলোর সঙ্গে খাপ খেত না।

    ইতিমধ্যে আমি ‘সঙ্গীতের এক রজনী’ নিয়ে মেতেছিলাম। অপচয়কে আমি ঘৃণা করি। আমার কোনো লেখা অপ্রকাশিত থাকুক, আমার সহ্য হয় না। পরিস্থিতি সামলাতে, যাহোক করতে আমি প্রস্তুত। অতএব এরিকের দ্বারস্থ হয়ে বললাম, ‘সেই গল্পটা, ‘সঙ্গীতের এক রজনী’ যেটা তোমার পছন্দ হয়নি, আমি কি অন্য কোথাও প্রকাশ করতে পারি?’

    তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই পারেন। কিন্তু শর্ত থাকবে, চরিত্রগুলোর নাম বদলে ফেলতে হবে। আমি চাই গ্রিসওল্ড ও তার সঙ্গীসাথীরা বিশেষভাবে আমার পত্রিকাতেই বিরাজ করুক।’

    তাই-ই করলাম। গ্রিসওল্ডের নাম বদলিয়ে, ‘জর্জ’ দিলাম আর শ্রোতা হিসেবে রাখলাম একজনকেই। প্রথম পুরুষ হিসেবে, আমি নিজে। সেটা তো হল। আমি ফ্যান্টাসি ও সায়েন্স ফিকশন-এর পত্রিকাতে সেটি বিক্রি করে দিলাম। এরপর ঐ ধরনের এক কাহিনী লিখলাম, ভাবধারা হল জর্জ ও আজাজেলের কাহিনী। জিনের নাম দিলাম আজাজে। এই বইটি (যে হাসি হেরে যায়, ঐ পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমার নিজেরও কল্পবিজ্ঞানের এক পত্রিকা ছিল, ‘আইজাক আসিমভের কল্পবিজ্ঞান পত্রিকা’ আর শাওনা ম্যাককার্থি, তৎকালীন সম্পাদক ‘এফ্‌ অ্যান্ড এসএফ’ পত্রিকায় দেওয়ার বিরোধিতা করলেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন, ‘ছোট্ট জিন আর তার যাদুকে, উন্নত প্রযুক্তির অপার্থি। প্রাণীতে বদলে দিন আর সকল কাহিনী আমার কাছে বিক্রি করে দিন।

    তাই-ই করলাম। আর তখন থেকেই আমার জর্জ ও আজাজেলের কাহিনীগুলো নিয়ে খ্যাপামি ছিল। আমি লিখতে শুরু করলাম আর বর্তমানে আমি এই গল্পগুলো থেকে আঠারোটি নিয়ে ‘আজাজেল্‌’-এ সংকলিত করেছি। মোট আঠারোটি গল্পের অন্তর্ভুক্তি সম্ভব হল। কারণ গল্পগুলো আয়তনে কমাবার তাগিদ ছিল না এরিকের পক্ষে। তাই আমি জর্জ ও আজাজেলের গল্পগুলো দ্বিগুণ দীর্ঘ করতে পেরেছি।

    কিন্তু এবারেও আমি শঠে শাঠংকে এর মধ্যে ঢোকাতে পারলাম না। কারণ পরবর্তী গল্পগুলোর সঙ্গে এর সুর তাল মিলত না। দুটি বিভিন্ন ধারাবাহিকের ধারণার মূল অনুপ্রেরণা থাকায়, শঠে শাঠং-এর বিরূপ ভাগ্যে, দুটি পৃথক ধারায়, কোনোটাতেই খাপ খাওয়ানো গেল না (যাক গে, সঞ্চয়ন তো হয়েই রইল, ভবিষ্যতে কোনো না কোনো রূপে আত্মপ্রকাশ করবে। এর জন্য খুব দুঃখ করার প্রয়োজন নেই)।

    গল্পগুলো সম্পর্কে আমি কিছু যুক্তির অবতারণা করতে চাই, হয়তো আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন। কিন্তু আমি এক প্রকার বাচাল।

    1. যেমন আমি বলেছি, প্রথম গল্পটি বাদ দিই, ছোট্ট জিনের গল্পটি অন্যগুলোর সঙ্গে মিলছিল না। আমার সুন্দরী সম্পাদিকা জেনিফার ব্রেল জোর দিয়েছিলেন কিভাবে আমি ও জর্জ পরস্পরের সাথে পরিচিত হই, এবং জর্জের জীবনে কীভাে ছোট্ট জিনের অনুপ্রবেশ ঘটে। সেই প্রসঙ্গের অবতারণা আবশ্যিক।

      যদিও জেনিফার মধুর স্বভাব, তথাপি সে যখন দৃঢ় মুষ্টিবদ্ধ হয়, তখন তার সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন।

      আমি দুই সে.মি. জিনের গল্প লিখে ফেললাম এবং তার কথামতো বইটিতে প্রথম গল্প হিসাবে অন্তর্ভুক্তি ঘটল। এর পরেও কথা ছিল, জেনিফার চেয়েছিলেন, আজাজেল্‌ সংশয়াতীতভাবে জিনই হোক, অপার্থিব কোনো প্রাণী নয়। অতএব আমরা উদ্ভট রূপকথায় ফিরে এলাম। ‘আজাজেল্’ বাইবেলে উল্লিখিত এক নাম, পাঠকরা একে জিন হিসাবেই গ্রহণ করে থাকেন, যদিও বিষয়টি অপেক্ষাকৃত জটিলতর।

    2. জর্জকে খানিক বিষাদগ্রস্ত হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও আমি নির্জীব ব্যক্তি পছন্দ করি না। তবু জর্জকে আমি ভালবাসি, আপনারাও বাসবেন। প্রথম পুরুষটি (আদতে আইজাক্ আসিমভ্) প্রায়শই জর্জ দ্বারা অপমানিত হয়েছেন এবং অবধারিত কয়েক ডলার খোয়াতে হয়েছে। কিন্তু আমি কিছু মনে করি নি। প্রথম গল্পের শেষে আমি বিশ্লেষণ করেই দিয়েছি, তার গল্পগুলো উৎকৃষ্ট ছিল এবং সেগুলো থেকে আমি যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করেছি। বিশেষত জর্জকে যা দিয়েছি (অবশ্যই কল্পনায় নয়), তার থেকে অনেক বেশি।
    3. অনুগ্রহ করে সতর্ক থাকুন, গল্পগুলো একাধারে হাস্যরস-স্নিগ্ধ ও শ্লেষাত্মক। যদি গল্পের ধরন অতিরঞ্জিত ও ‘আসিমভোচিত’ না হয়, তবে তা উদ্দেশ্যমূলক। একে সতর্কবাণী মনে করবেন। অতিরিক্ত কিছুর প্রত্যাশা করে বইটি কিনবেন না ও পরে পস্তাবেন না। যাক গে, যদি পিজি উডহাউসের সামান্যতম প্রভাবও লক্ষ্য করে থাকেন, তবে বিশ্বাস রাখবেন এটি দৈবক্রমে ঘটেনি।

      আজাজেল্‌ বল খেলা দেখতে যায়।

      সে রাতে আমি বাস্কেট বল খেলা দেখতে গিয়েছিলাম আর আজাজেল্‌ ছিল আমার পকেটে। খেলা দেখার জন্য সে পকেট থেকে মাথাটি উঁচিয়ে রাখছিল, আর কেউ তাকে দেখে ফেললে, মস্ত প্রশ্ন উঠত। তার ত্বক উজ্জ্বল লাল আর তার কপালে সিং- এর দুটি ছোট্ট দলা। ভাগ্যিস, সে সবসুদ্ধ বেরিয়ে আসেনি, কারণ তার সবচেয়ে প্রকট আর সবচেয়ে বিরক্তিকর ছিল এক সে.মি. লম্বা মাংসল লেজ। খেলার শেষে সে মন্তব্য করল, ‘বিশালবপু জবরজং যাচ্ছেতাই মানুষগুলোর, খেলার মাঠে উদ্যম দেখে আমার যতদূর মনে হল, যখনই গর্তের মধ্যে দিয়ে বলটি গলিয়ে ফেলে দেওয়া যাচ্ছে, তখনই ভরপুর উত্তেজনা।

      ‘ঠিক তাই!’ আমি বলি, ‘তুমি এক বাস্কেট জিতলে।

      ‘তাহলে, এই বোকা-বোকা খেলায় তোমার এই আশ্রিত এক বীরোচিত খেলোয়াড় হতে পারত, যদি প্রতিবারই সে গর্তের মধ্যে দিয়ে বলটাকে গলিয়ে দিতে পারত।’

      ‘একদম ঠিক!’

      পরবর্তী নির্ধারিত খেলার জন্য অপেক্ষা করতে করতে, আমি খানিক উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। ছোট্ট জুনিপারকে আমি একটা কথাও বলিনি, কারণ তখনো পর্যন্ত আমি আজাজেলের দানবিক শক্তি ব্যবহার করিনি এবং তার কথাবার্তার সঙ্গে কার্যকলাপের সঙ্গতি থাকবে, সে সম্পর্কেও সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলাম না।

      তাছাড়াও, আমি তাকে চমকে দিতে চেয়েছিলাম। (এবং তার পর যা ঘটেছিল, আমরা দুজনেই যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম)