Tag: গ্রন্থনাম

  • ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়

    ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়

    জসীম উদ্‌দীন

    [book]

    ‘ঠাকুরবাড়ির আঙ্গিনায়’ পল্লীকবি জসিম উদ্দীনের স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ। গ্রন্থটির প্রকাশিকা নন্দিতা বসু; গ্রন্থপ্রকাশ, ৬-১ রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট, কলিকাতা -৯। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন কানাই পাল। মুদ্রাকর কার্তিকচন্দ্র পাণ্ডা; মুদ্রণী, ৭১ নং কৈলাসবোস ষ্ট্রীট, কলিকাতা ৬। গ্রন্থটির উৎসর্গপত্রে কবি লিখেছেলেন—

    আমার ছাত্রজীবনের বন্ধু—

    বিনয়েন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

    বীরেন ঘোষ

    বীরেন ভঞ্জের

    করকমলে

    জসীম উদ্‌দীন

    ‘ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়’ ফুটে উঠেছে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের চোখে তিন মহীরূহের চিত্র— বটবৃক্ষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তুলিতাত্ত্বিক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম, ঝর্ণার মত চঞ্চল কাজী নজরুল ইসলাম। আলোচনায় উঠে এসেছেন আরও অনেকে, এবং কবি জসিম উদ্দীনের স্ট্রাগলিং সময়ের গল্পও।

    কলিকাতায় পড়াশোনা করছিলেন জসীম উদ্দীন। এমনসময় তার সাথে পরিচয় হয় ঠাকুরবাড়ির অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র মোহনলালের। এই পরমসুহৃদ মোহনলালই তাকে নিয়ে যান রবীন্দ্রনাথেরর কাছে, পরিচয় করিয়ে দেন তাকে।

    যে কবির কবিতা, গল্প আর উপন্যাস এতকাল পড়ে এসেছেন এবার তারঁ সান্নিধ্য পাচ্ছেন তা তরুণ জসীম উদ্দীনকে আন্দোলিত করে, অনুপ্রাণিত করে সাহিত্য চর্চায়। রবিঠাকুরের শান্তিনিকেতন আর ঠাকুরবাড়িতে যাতায়াত যেন অনেকটা নিয়মিত হয়ে যায় তরুণ কবি জসীম উদ্দীনের জন্য। ঠাকুরবাড়িতে ঘরভাড়া নিয়ে দীর্ঘকাল কাটান তিনি।

    রবীন্দ্রনাথ জসীম উদ্দীনকে কাব্য রচনায় কিভাবে প্রভাবিত করেছেন তার সহজ-সরল অথচ অতিমুগ্ধকর বর্ণনা রয়েছে এই বইতে।

    ঠাকুরবাড়ির আরেক জিনিয়াস অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথেও জসীম উদ্দীনের বেশভাল সস্পর্ক গড়ে ওঠে। কবি তার সংগৃহীত পল্লীগীতি, পালাগান প্রায়শই অবনীন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ আর গগনেন্দ্রনাথকে শোনাতেন। আর তাঁরাও এই তরুণটিকে স্নেহের চোখে দেখতেন। “নকশিকাঁথার মাঠ” রচনায় অবনীন্দ্রনাথের প্রভাব জসীম উদ্দীন অবলীলায় কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন। অবন ঠাকুরের সাহচর্য জসীম উদ্দীনের অভিজ্ঞতার ঝুলিকে সুসমৃদ্ধ করেছে।

    জসীম উদ্দীন রাতারাতি কবি হিসেবে খ্যাতি পাননি। তাকেও অনেক সংগ্রাম করে নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়েছে। স্কুল ছাত্র থাকাকালে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলিকাতায় চলে এলেন জসীম উদ্দীন। উদ্দেশ্য ছিল কবি হবেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে হলেন হকার। অচেনা, অজানা কলিকাতায় পত্রিকা ফেরি করে দিন কেটেছে কবির। সেই কাব্যচর্চা, গদ্যচর্চার সংগ্রামকে জসীম উদ্দীন কখনই ভুলতে পারেননি—যার প্রমাণ সেইসব দিনগুলোর কথা অনেকবার তিনি লিখেছেন বইতে।

    ১৯৩১-১৯৩৭ সাল দীর্ঘ ৬ বছর। এই সময়ে পুরোটা বেকার ছিলেন জসীম উদ্দীন। দিনরাত এখানে সেখানে চাকরির আবেদন করে যাচ্ছেন অথচ কাজ হচ্ছে না। কলিকাতার রিপন কলেজ বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে বাংলার শিক্ষক পদে আবেদন করলেন। কিন্তু কাজ হ’ল না লবিং নেই বলে। উপায়ন্তর না দেখে গেলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। রবিঠাকুর মৃদু সুপারিশনামা লিখে দিলেও কাজ হ’ল না, কেননা যাকে জসীম উদ্দীনের বদলে নেয়া হ’ল তার পক্ষে আগেই কবিগুরু সুপারিশ করেছিলেন। যাইহোক, রবীন্দ্রনাথের সুপারিশেই তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-গবেষকের পদটা পেলেন বলা চলে।

    আমরা জানি, জসীম উদ্দীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। কিন্তু কিভাবে পেলেন সেই চাকরি?

    তখন ঢাবির ভিসি স্যার এফ রহমান। তার কাছে গেলে তিনি সরাসরি জসীম উদ্দীনকে বললেন, জসীম উদ্দীন যদি স্বনামধন্য সাহিত্যিক অধ্যাপক বা রবীন্দ্রনাথের সুপারিশ আনতে পারেন তবে কাজ হতে পারে।

    প্রথমেই, খুশি মনে তিনি গেলেন তার নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় কলিকাতায়। যে দুই নামী অধ্যাপক তাকে পছন্দ করতেন তারা তার হয়ে সুপারিশ করতে রাজি হলেন না কারণ, তাতে হিন্দু চাকরিপ্রার্থীরা ক্ষেপে যেতে পারে বলে তাদের বিশ্বাস! এবার তিনি গেলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। রবিঠাকুর সাথে সাথে সুপারিশনামা লিখে দিলেন আর তাতেই ঢাবিতে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে পারলেন জসীম উদ্দীন—রবীন্দ্রনাথ ও ঠাকুরবাড়ি কেন্দ্রীক এমনই নানা ঘটনাকে উপজীব্য করে একেবারে সাদামাটা ভাষায় অথচ অতিসুখপাঠ্য করে জসীম উদ্দীন লিখেছেন ‘ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়’।

    এবার বলি বইতে নজরুলের প্রসঙ্গে,

    জসীম উদ্দীন যখন কলিকাতায় পত্রিকা ফেরি করতেন, তখন তার সাথে পরিচয় হয় স্বভাবে চিরশিশু নজরুলের সাথে। তার ‘কবিভাই’ নজরুলকে অনেক কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল জসীম উদ্দীনের। আমৃত্যু তিনি স্বভাবে চিরশিশু নজরুলের সাহচর্যে থাকার চেষ্টা করেছেন।

    এবার আসি লেখনী প্রসঙ্গে,

    জসীম উদ্দীনের কী গদ্য, কী পদ্য সবেতেই এক সহজিয়া মনোমুগ্ধকর ছন্দে লেখা আবর্তিত হয়—তার ব্যতিক্রম ‘ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়’ও হয়নি।

    বেশ সুখপাঠ্য গ্রন্থটির প্রথম অধ্যায়ের নাম ‘রবি তীর্থে’। এই অধ্যায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লেখা। ‘রবি তীর্থে’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন, কাজ, ও ব্যক্তিত্বকে এক নতুন আলোকে দেখতে পাবেন। বিশ্বকবি কোন লেখা মনোমত হওয়ার আগে পর্যন্ত বারবার সংশোধন ও পরিবর্তন করেন, নাটক মঞ্চায়নের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সংলাপ আর কাহিনীতে পরিবর্তন করতে থাকেন সবচেয়ে ভালভাবে কাজটি করার জন্য, ভোরে উঠে সারাদিন লেখায় মশগুল থাকেন, আবার তাঁর দর্শন না পেয়ে কোনও দর্শনার্থী ফিরে গেলে মনঃক্ষুণ্ণ হন, সকলের সাথে দেখা এবং কথা বলেন, সাধ্যমত সকলের জন্য করেন, আবার কেউ উপকার পেয়ে কৃতজ্ঞতা জানাতে এলে অবাক হয়ে যান। সাহিত্যের এত দিকে তাঁর বিস্তর পদচারণা, অথচ বিশ্বভারতী আর শান্তিনিকেতনের মত বড় দুটো প্রতিষ্ঠান চালিয়ে গিয়েছেন সফলভাবে। এই বই থেকে জানা যাবে এতরকম কাজ করতে গিয়ে ঠাকুরবাড়ির বাকি সকলের এবং আরও কতজনের কত নীরব ত্যাগ এবং অবদান ইন্ধন জুগিয়েছে।

    বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের নাম ‘অবন ঠাকুরের দরবারে’ এবং তৃতীয় অধ্যায়ের নাম ‘নজরুল’।

    জানলাম অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এবং তাঁর আরও দুই ভাইয়ের সাধনার কথা; ছবি আঁকা নিয়ে তাঁদের দিন রাত পার করে দেয়ার গল্প।

    পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের লেখায় গ্রামবাংলার যে মায়াভরা রূপটা দেখতে পাই, তাঁর লেখায় যে মাটির গন্ধ পাই, সেইরকম মায়া রয়েছে এই বইটা জুড়েও। মিষ্টি সব উপমা, সহজ সরল মুগ্ধতার ভাষা, আর লেখাজুড়ে আপনজনকে নিয়ে লেখার মায়া যে মনের ভেতর থেকে আসা ভালবাসা আর শ্রদ্ধা মিলেই গড়ে উঠেছে— তাতে সন্দেহ হবার অবকাশ নেই।

    পল্লীকবি জসীম উদ্দীন এমন দরদ দিয়ে বইটা লিখেছেন যে কবির লেখনীর জোরে চোখের সামনে ভেসে উঠে শান্তিনিকেতন, রবিঠাকুর আর অবনঠাকুরের বাসভবন, তাদের সৃষ্টিকর্ম। অবনীন্দ্রনাথের জীবনের শেষদিকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির করুণ অবস্থাও কিছুটা উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। তবুও পাঠকের ভাল লাগবে অবন ঠাকুরের একাকীত্বের গল্প।

    শেষে এলেন ‘হাবিলদার কবি’ — নুরু — নজরুল ইসলাম। তাঁর সম্পর্কে জসিম উদ্দীন লিখেছেন পর্বতসম দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে রেখে, আক্ষেপ ঢেকে। বোঝা যায়, শুরুতে নজরুলের চাঞ্চল্যমাখা সব কাহিনীর সাথে বড্ড বেখাপ্পা লাগে তার জীবন্মৃত সমাপ্তি।

    ধুমকেতুর মূল শরীর যদি হয় তিরিশ কিলো লম্বা, তাহলে তার ল্যাজ নাকি বড় হয় সূর্যের ব্যাসের সমান। আমাদের বাংলা সাহিত্যের ধুমকেতু —নজরুলের ক্ষেত্রেও কথাটা খাটে বোধহয়। যা দিয়েছেন, তার তৃপ্তি অপেক্ষা; যা দিতে পারতেন, সেই সম্ভাবনার অকাল মৃত্যুর আপসোসটা অনেক অনেক বেশি। গ্রিক ট্রাজেডির নায়ক।

  • একটু পরে রোদ উঠবে

    একটু পরে রোদ উঠবে

    প্রচেত গুপ্ত

    [book]

    গ্রন্থপরিচয়

    প্রচেত গুপ্ত রচিত উপন্যাস ‘একটু পরে রোদ উঠবে’ প্রথম প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১৭; প্রকাশক পত্রভারতী। প্রচ্ছদ এঁকেছেন সৌজন্য চক্রবর্তী। উপন্যাসটির উৎসর্গ পাতায় লেখা আছে—

    পৌলোমী বসু

    ব্রাত্য বসু

    সুজনেষু

    লেখকের কথা

    এক শীত শীত সকালে ঘুম ভেঙে দেখলাম, আকাশ মেঘলা। চারপাশ ধূসর, ঘোলাটে। কেমন একটা থম মারা বিষণ্ণ ভাব। মন খারাপ হয়ে গেল। সেই মন খারাপ কাটাতে নিজেকে বোঝালাম, চিন্তা নেই, একটু পরে রোদ উঠবে। আবার চারপাশ ঝলমল করবে। কোন রূপক নয়, সরাসরি মেঘ কেটে রোদ ওঠবার কথাই ভেবেছিলাম। এই কাহিনিও তাই। আড়ালে অন্য জটিলতা কিছু নেই।

    ভেবেছিলাম, অনেক ভাবনাচিন্তা করে লিখব। পেন চিবোব, মাথার চুল ছিঁড়ব। মোটা মোটা বই থেকে উদ্ধৃতি দেব। ধারাবাহিক উপন্যাস বলে কথা। কাহিনি, চরিত্র, সবাই আমার কাছে তটস্থ হয়ে থাকবে। একটু এদিক-ওদিক করলেই ধমক খাবে। বলা বাহুল্য লেখা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সব আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে লাগল। এক সময় দেখলাম, চরিত্র থেকে গল্প পর্যন্ত সবাই হাতের বাইরে! তারা নিজেদের খেয়ালখুশি মতো চলছে, কথা বলছে, ভাবছে। শাসন করবার চেষ্টা করলাম। লাভ হল না। লেখক হিসেবে নিজেকে অসহায় লাগল। হাল ছেড়ে দিলাম। যা হয় হোক।

    মজার কথা হল, একটা সময়ের পর বুঝতে পারলাম, হাতের বাইরে চলে যাওয়ার কারণে কাহিনি, চরিত্র, গল্প বলবার ভঙ্গি নিয়ে লেখক হিসেবে অনেক বেশি আনন্দ পাচ্ছি। তারাও খুব খুশি। ফলে এই কাহিনির ভালো-মন্দর দায় আমার নয়। কাহিনির নিজের।

    কাহিনিতে মজা আরও আছে। কাহিনির নাম ‘একটু পরে রোদ উঠবে’ হলে কী হবে, মূল চরিত্রের নাম বারিধারা। এই উলটো কম্মটি আমি ভেবেচিন্তে করিনি। এটিও নিজের মতো হয়ে গেছে। লেখা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে যা হয় আর কী। ঝকঝকে এই তরুণীটির বুদ্ধি, আধুনিক চিন্তা, প্রতিবাদ, মূল্যবোধ, ভালোবাসা বারিধারার মতোই কাহিনির বিভিন্ন জায়গায় ঝরে ঝরে পড়েছে।

    একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে এই সময়ের কথা বলতে চেয়েছি। কাহিনির বিস্তার অনেকটাই। চরিত্র, ঘটনা অজস্র। চরিত্রদের বয়স একানব্বই থেকে চব্বিশ। ঘটনা ছড়িয়েছে কলকাতা থেকে সুন্দরবনের গ্রাম পর্যন্ত। এই সময়ের প্রেম, রাজনীতি, জাদু বাস্তবতা, লোভ, হিংসা, অপরাধ, মায়া-মমতা, বিশ্বাস ভঙ্গ আর বিশ্বাস গড়া নিয়ে একটা দলিল তৈরির চেষ্টা করেছি। একই সঙ্গে চেষ্টা করেছি, কাহিনিকে সময়োত্তীর্ণ করতে। কতটা পারলাম জানি না।

    অনেকের কাছে কৃতজ্ঞ। আজকাল পত্রিকার সম্পাদক অশোক দাশগুপ্ত চাপ না দিলে লেখাটা শুরুই হত না। শৌনক লাহিড়ি উৎসাহ না দিলে লেখাটা আজকাল পত্রিকার রবিবাসরের পাতায় ছিয়াত্তর সপ্তাহ ধরে চালাতেই পারতাম না। ঋণী দেবাশিস চন্দর কাছে। প্রতি সপ্তাহে ঠেলা দিয়ে লেখা বের করে নিয়েছে। কৃতজ্ঞ প্রিয় শিল্পী দেবব্রত ঘোষের কাছে।

    বই আকারে প্রকাশ করবার আগে কিছু পরিমার্জনা করলাম। জানি না, তাতে কাহিনি আরও ভালো হল কিনা।

    পত্রভারতী সংস্থার কর্ণধার ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় একটা বিস্ময়কর কাজ করতেন। রবিবার রাতে লেখা পড়ে আমাকে ফোন করতেন। একবারও বাদ যায়নি (উনি দেশের বাইরে না থাকলে)। তাঁর প্রতিক্রিয়া শুনে অবাক হতাম। মনে হত, কাহিনির বহু চরিত্রকেই উনি আমার থেকে অনেক বেশি ভালোবাসেন, অনেক বেশি চেনেন। তাদের প্রতি কোনও অবিচার সহ্য করবেন না। প্রয়োজনে আমার সঙ্গে হাতাহাতি পর্যন্ত যাবেন। এই বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পী সৌজন্যকে ধন্যবাদ। ভারী চমৎকার কাজ করেছেন। ধন্যবাদ পত্রভারতী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত সবাইকে। তারা বহু বছর ধরে আমার জ্বালাতন সহ্য করে চলেছেন। এবারও করলেন।

    দীর্ঘদিন ধরে একটা লেখা চালাতে হলে বাড়ির জোরদার সমর্থন দরকার হয়। সেই জোরদার সমর্থন আমার স্ত্রী মিত্রা, পুত্র সমুদ্র এবং আমার পিসিমার কাছ থেকে। আমার বউদি শ্রাবণী গুপ্ত অপেক্ষা করে আছেন কবে বই প্রকাশ হবে আর কবে তিনি সংগ্রহে রাখবেন। আর আমার দাদা পূষণ গুপ্তর কড়া সমালোচনা শোনবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছি আমি। আড়াল থেকে আমার ভাই পুষ্কর নিশ্চয়ই আমার লেখা-লিখির ওপর নজর রাখছে।

    সবথেকে বেশি কৃতজ্ঞ আমি আমার পাঠকদের কাছে। ধারাবাহিক প্রকাশের সময় তারা কখনও রাগ করে, কখনও প্রংশসা করে, কখনও অনুযোগ করে, কখনও ভালোবেসে আমার লেখার সঙ্গে থেকেছেন। আমার বিশ্বাস, তারা এই বইয়ের সঙ্গেও থাকবেন।

    ৩১ অক্টোবর, ২০১৬
    সল্টলেক
    প্রচেত গুপ্ত

  • অদ্ভূতুড়ে সিরিজ

    অদ্ভূতুড়ে সিরিজ

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যয়ের অদ্ভুতুড়ে চমৎকার একটা সিরিজ। ছোটদের জন্য রচিত প্রায় চল্লিশের বেশি গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘অদ্ভুতুড়ে সিরিজ’। শিশু-কিশোরদের জন্য এই লেখাগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সহজ সরল সরস বর্ণনা। প্রচুর হাস্যরস ও রহস্য মেশানো এই সিরিজের বইগুলোতে গল্পের সঙ্গে সাসপেন্সও রয়েছে। হাস্যরস ভূতের ভয় আর অলৌকিক সব ঘটনার সমন্বয়ে গল্পের প্লটগুলো শিশু মনে আলাদা দোলা দেয়। তার রচনা কৌশলে অভিভূত শিশুরা বিশ্বাস করতে শেখে, ভূত তো খারাপ হতেই পারে না, তারা থেকে থাকলে শুধু আমাদের সঙ্গে লুডো খেলার জন্যই আছে, বা আমাদের হোম টাক্স করে দেয়ার জন্য। মজার মজার ভূত, আধপাগলা সব অঙ্ক স্যার, শুচিবাই পিসিমা দিয়ে তৈরি, অদ্ভুতুড়ে সিরিজের ছোট্ট শহরগুলি শিশু মনের বড্ড কাছের এবং প্রিয়।

    শিশু কিশোরদের জন্য লেখা হলেও সিরিজটি সব বয়সী পাঠকই পড়ে বেশ আনন্দ পায়। সিরিজের গল্প গুলোর বিশেষত হচ্ছে একটা সাথে আরেকটা তেমন কোন যোগসাজ নেই। ফলে আপনি যেকোনো একটি গল্প দিয়েই পড়তে শুরু করতে পারেন। এই সিরিজের প্রতিটি বইয়ের চরিত্রগুলো বেশ অদ্ভুত ও মজার। কোন কোন বইয়ে ভিন গ্রহের এলিয়েনদের কথাও আছে।

    এডুলিচার পাঠশালায় প্রকাশিত অদ্ভুতুড়ে সিরিজের বইগুলো হচ্ছে—

  • মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি

    মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [bname]

    মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি

    [এই উপন্যাসের শেষ দিকে একটা দৃশ্য আছে, যেখানে ভজবাবু ডাকাতের দল নিয়ে রাজবাড়ি লুট করতে যাচ্ছেন, সেই দৃশ্যে ভজবাবুর মুখে কিছু গান রয়েছে। এই গানগুলি লিখে দিয়েছেন বিখ্যাত কবি শ্রীনীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।]


    ফটোটা কী করে যে মনোজদের বাসায় এল, তা কেউ জানে। ফটোটা কার, তাও কেউ বলতে পারে না। মনোজদের বাড়িতে অনেকের ফটোর মধ্যে এই ফটোটাও বরাবর আছে। অথচ কেউ ঠিক করে বলতে পারে না যে, এটা কোত্থেকে কবে এসেছিল, ফটোর ছেলেটাই বা কে?

    ফটোটা একটা ছেলের। তার বয়স হবে আট নয় বা দশ। একটা বাংলোবাড়ির সামনের বারান্দার সিঁড়িতে সে বসে আছে। সামনের বাগান থেকে বারান্দায় উঠতে মোট তিন ধাপ সিঁড়ি। ঠিক মাঝের ধাপে ছেলেটা বসে আছে, নীচের সিঁড়িতে পা, ওপরের সিঁড়িতে কনুই রেখে সে একটু পিছনে হেলে বসে আছে। তার পায়ে বুটজুতো আর মোজা, সাদা হাফপ্যান্ট, গায়ে

    ফুলহাতা সোয়েটার, আর সোয়েটারের গলার কাছে সাদা শার্টের কলার বেরিয়ে আছে। ছেলেটা দেখতে ভীষণ সুন্দর। বড় বড় চোখ, লম্বাটে মুখ, চোখা পাতলা নাক, গালগুলো ভরাট, কিন্তু লুচির মতো ফোলা ফোলা নয়। তার চুলে ডানদিকে সিঁথি, আর কপালটার অনেকখানি ঢেকে চুলগুলো পাট করা। ছেলেটা অল্প একটু হাসিমুখে চেয়ে আছে। সেই হাসি আর তাকানো এত জীবন্ত যে, যে-কোনও সময়ে ছেলেটা যেন কথা বলে উঠবে। ছবিটার মধ্যে আরও দুটো অদ্ভুত ব্যাপার আছে। ছেলেটার পিছনে যে বারান্দা, তাতে টেরছা হয়ে রোদ পড়েছে। বারান্দার পিছনে দরজা, দরজায় একটা গোলাপ ফুলের ছাপওলা পর্দা ঝুলছে। সামনে রোদ, কিন্তু পদাটা ছায়ায়, তাই পদার গায়ে গোলাপের ছাপ একটু অস্পষ্ট। আর সেই পদাটা একটুখানি সরিয়ে একটা মুখ উঁকি মেরে আছে। মুখটা খুবই অস্পষ্ট। শুধু সেই মুখে একটু হাসি বোঝা যায়। যেন কেউ হাসিমুখে ছেলেটার ছবি-তোলানো দেখছে। কিন্তু সেই মুখটা ছেলের না মেয়ের, তা বোঝা যায় না। আরও একটা মজার ব্যাপার হল, ছেলেটার বাঁ দিকে একটা কাঁচের গেলাসে তিন পোয়া ভর্তি দুধ রয়েছে। দুধ কিনা তা ঠিক করে বলা যায় না, তবে সাদামতো তরলটা দুধ ছাড়া আর কীই বা হবে। আর সেই প্রায় পৌনে এক গেলাস দুধে মুখ ডুবিয়ে দুধটা খেয়ে নিচ্ছে একটা বেশ বড়সড় মোটা বেড়াল। বেড়ালটার লেজও খুব মোটা। বোঝা যায়, ছেলেটা দুধ খাচ্ছিল, সেই সময়ে ফটো তোলাতে গিয়ে গেলাসটা পাশে রেখেছিল, আর তখন ছেলেটাকে অন্যমনস্ক দেখে বেড়ালটা চুপিচুপি এসে চুরি করে দুধ খেয়ে নিচ্ছে। ছেলেটা টের পায়নি। ছবিটার মধ্যে আরও কিছু কিছু জিনিস লক্ষ করা যায়। যেমন, বারান্দার নীচে বাগানের একটু অংশ ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বাগানে অনেক গাঁদা, ক্রিসেনথিমাম, পপি ফুল ফুটেছে। বাংলোবাড়িটার টিনের চাল। বারান্দার ওপরে টিনের চালটার একটু ঢালু অংশ দেখা যায়। বারান্দার থাম বেয়ে একটা লতানে গাছ উঠেছে চালে।

    মনোজ যে কতবার ছবিটা দেখেছে তার হিসেব নেই। ছবিটা দেখতে তার বড় ভাল লাগে। কেন ভাল লাগে তাও সে জানে না। যদি কখনও তার মন খারাপ হয়, বা কখনও কারও সঙ্গে ঝগড়া হয়, বা মায়ের ওপর অভিমান হয়, তখন সে এসে একা ঘরে ছবিটা বের করে চেয়ে বসে থাকে। ছবি থেকে ছেলেটাও তার দিকে হাসিমুখে চেয়ে থাকে। তখন মনোজের মনের মধ্যে কী যেন হয়, সে ভাবে–এই তো আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু। তখন তার মন ভাল হয়ে যায়। মনোজ খুব ছেলেবেলা থেকেই তাদের বাড়িতে ছবিটা দেখে এসেছে। আর ছবিটা বেশ পুরনো, একটু হলদে-হলদে পুরনো ছাপও পড়ে গেছে তাতে। অর্থাৎ ছবিটা অনেক আগে ভোলা হয়েছিল, এবং ছবির ছেলেটা নিশ্চয়ই এখন আর ছোট নেই। সে হয়তো অনেক বড় হয়ে এখন মনোজের কাকা বা বাবার মতো বড় মানুষ হয়ে গেছে। তবু ছবির ছেলেটাকে মনোজ বন্ধু বলেই ভাবে। ভাবতে ভাল লাগে। এই ছবিটার কোনও ঠিকানা নেই, কোথায় কবে তোলা হয়েছিল কেউ জানে না। তাই বাড়ির লোকেরা এই ছবিটা দেখলেই বেশ বিব্রত হত। বলত, এ ছবিটা যে কার কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না। আমাদের কেউ নয় নিশ্চয়ই। মনোজ তাই একটু বড় হয়ে ছবিটা অন্যান্য ছবি থেকে আলাদা করে নিয়ে এসে তার গল্পের বইয়ের তাক-এ একটা ছোটদের রামায়ণ বইয়ের পাতার ভাঁজে যত্ন করে রেখে দিয়েছে। নিজের কাছেই রাখা ভাল, নইলে কে কবে বাজে ছবি ভেবে ফেলে-টেলে দেবে।

    মনোজদের বাড়িতে অনেক লোক। ঠাকুমা, বাবার এক বুড়ি পিসি, মা, বাবা, দুই কাকা, দিদি, দাদা, দুটো ডলপুতুলের মতো ছোট ভাইবোন। এ ছাড়া বাড়িতে থাকে একটা নিরাশ্রয় বুড়ো লোক, তার বাড়ি বিহারে। একটা বাচ্চা চাকর, একটা রান্নার ঠাকুর, এক বুড়ি ঝি। তা ছাড়া বিস্তর বাইরের লোকজনের রোজ আসা-যাওয়া তো আছেই। যেমন পুরুতমশাই সতীশ ভরদ্বাজ, মাস্টারমশাই দুঃখহরণবাবু, দিদির গানের মাস্টারমশাই গণেশ ঘোষাল, এমনি আরও কত কে!

    উবু হয়ে না বসলে দুঃখহরণবাবু পড়াতে পারেন না। যদি কেউ তাঁকে আসন-পিঁড়ি করে বসিয়ে দেয়, বা চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসতে বলে, তা হলেই দুঃখহরণবাবুর বড় বিপদ। তখন তিনি অঙ্ক ভুল করেন, ইতিহাসের সঙ্গে ভূগোল গুলিয়ে ফেলেন, ইংরেজি ট্রাস্লেশন করতে হিমসিম খান। যেই উবু হয়ে বসলেন, অমনি তাঁর আঙুল দিয়ে পেনসিল বেয়ে হড়হড় করে অঙ্ক, ট্রানস্লেশন, জ্যামিতি সব নেমে আসতে থাকে, মুখে খই ফোটে ইতিহাস আর ভূগোলের।

    সকালবেলাতেই দুঃখহরণবাবুর বিপদ। সেই সময়টায় মনোজের বাবা রাখোহরিবাবু পড়ার ঘরে এসে বসে গম্ভীরভাবে খবরের কাগজ পড়েন। রাখোবাবু ভীষণ রাশভারী লোক, বাড়ির কুকুরটা বেড়ালটা পর্যন্ত তাঁকে ভয় খায়, বাড়ির লোকজনের তো কথাই নেই। কিন্তু সকালবেলাতে রাখোবাবু যে মনোজদের পড়ার ঘরে এসে বসেন তার একটা কারণ আছে। এবাড়িতে একজন মানুষ আছেন, যিনি রাখোবাবুকে মোটেই ভয় খান না, বরং উল্টে রাখোবাবুই তাঁর ভয়ে অস্থির। তিনি রাখোবাবুর পিসিমা আদ্যাশক্তি দেব্যা। বাবার পিসিকে ঠাকুমা ঠাকুরঝি বলে ডাকেন, সেই থেকে মনোজরা সবাই তাঁকে ‘ঠাকুরঝি’ ডাকে। তিনি খুব অল্প বয়সে বিধবা হয়েছিলেন, সেই থেকে উপোস-টুপোস করে করে বুড়ো বয়সে ভীষণ তেজস্বিনী হয়ে গেছেন। কারও তোয়াক্কা করেন না। তাঁর আবার ভয়ংকর শুচিবাই। সকালে কাঁচা গোবর জলে গুলে সেই জল সারা বাড়িতে ছিটিয়ে দেন। মনোজদের পড়ার ঘরটা বাড়ির বাইরে, বাগানের ধারে। একটেরে ছোট্ট একটু ঘর, তাতে এক ধারে পড়ার টেবিল চেয়ার, অন্য ধারে তক্তপোশের ওপর দুঃখহরণবাবুর বিছানাপত্র। এই ঘর অবধি ঠাকুরঝি আসতে পারেন না, খোঁড়া পায়ে বাগান পেরোতে কষ্ট হয়। তাই এ-ঘরটা গোবরজলের হাত থেকে বেঁচে যায়। রাখোবাবু তাই গোবরের গন্ধ এড়িয়ে নিশ্চিন্তে শ্বাস নেওয়ার জন্য এই ঘরে এসে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে যান, ততক্ষণে ঘরদোরের জল শুকিয়ে যায়।

    রাখোবাবু কড়া ধাতের লোক, আদবকায়দার নড়চড় দেখলে খুব রাগ করেন। তাই সেসময়টায় দুঃখহরণবাবুকে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে হয়। আর ওই এক ঘণ্টায় দুঃখহরণবাবু রাজ্যের ভুলভাল করতে থাকেন। একদিন তিনি ওই অবস্থায় ট্রানস্লেশন করতে গিয়ে তখন হলঘর ভরিয়ে গিয়াছে এই বাক্যটার ইংরেজি করলেন বাই দেন দি হল রুম ওয়াজ ফুলফিলড়। এই ইংরেজি শুনে বাবা তাঁর ইংরেজি খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে বিরক্ত হয়ে তাকালেন। ছেলেমেয়ের সামনে মাস্টারমশাইয়ের ভুল ধরলে, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা কমে যেতে পারে, সেই জন্য বললেন–”দুঃখবাবু, ইংরিজিটা ঠিকই আছে, তবে একটু কানে কেমন যেন লাগছে। আর একবার অন্যভাবে করুন।” কিন্তু দুঃখহরণবাবু পা ঝুলিয়ে বসে আছেন যে, তার ওপর রাশভারী রাখোবাবুর কথা শুনে আরও ঘাবড়ে গিয়ে খুব শক্ত ইংরেজিতে বললেন–”দি হল’স ফুলফিলমেন্ট ওয়াজ অ্যাচিভড বাই দেন।” শুনে রাখোবাবু আর মুখ তুললেন না। দুঃখহরণবাবুও গোলমালটা বুঝতে পারছেন, কিন্তু উবু হয়ে না বসলে তাঁর মুড আসে না। তাই তিনি ঠ্যাং দুটো জোর-নাচাতে নাচাতে মুখে ‘হুঁ হুঁ করে একটা শব্দ করে যেতে লাগলেন। দাদা সরোজ, দিদি পুতুল, আর মনোজ চুপিসারে হাসাহাসি করছে।

    শীতকাল। বাগানে, খুব ফুল ফুটেছে। সামনের দিকটায় মস্ত মস্ত গাঁদা ফুটে আছে, সেগুলো এত বড় যে দু হাতে মুঠো করেও বেড় পাওয়া যায় না। মোরগ ফুল, পপি, গোলাপ তো আছেই। ফটফটে রোদে প্রজাপতি আর ফড়িং উড়ছে অনেক, পোকামাকড় টি টি করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাগানের অন্য ধারে পালং খেত, ফুলকপি, ওলকপি, ধনেপাতা, বেগুন লাগানো হয়েছে। সেই সবজি খেতে দেহাতি বুড়ো মানুষ রামখিলাওন খুরপি হাতে ঘুরঘুর করছে। যদিও একটা ঠিকে মালী এসে বাগানের কাজ করে যায় রোজ, তবু রামখিলাওন কাজ দেখানোর জন্য বাগানে সব সময়ে কিছু খোঁড়াখুঁড়ি করবেই। চোখে ভাল দেখতে পায় না, অনেক সময়ে গাছের গোড়ার মাটি খুঁড়ে আলগা করতে গিয়ে শেকড়বাকড় উপড়ে ফেলে। আগাছা তুলতে গিয়ে ফুলগাছ তুলে ফেলে দিয়ে আসে। বকুনি খেলে খুব গম্ভীরভাবে থাকে, যেন এ-সব বকাবকি তার তেমন গায়ে লাগে না। গতবার ঠাকুমার চশমা পালটানো হল, আর রামখিলাওন ঠাকুমার পুরনো চশমাটা চেয়ে নিল। সেই চশমাটা এখন সব সময়ে চোখে পরে থাকে। তাতে যে সে ভাল দেখতে পায় তা নয়। কিন্তু এমন ভাব দেখায় যে খুব ভাল দেখছে। চশমা পরে ইজ্জতও বেড়ে গেছে তার। বাজারের কাছে দেশওয়ালী ভাইদের কাছে চশমা পরে যাওয়ায় সেখানে তার খাতিরও নাকি বেড়ে গেছে। বাড়ির চাকর রঘু তাকে ‘রামু বলে ডাকলে বা তুই-তোকারি করলে সে ভারী চটে যায়। রঘু তাই তাকে আজকাল রামুবাবু বলে ডেকে আপনি-আজ্ঞে করে। কিন্তু সন্ধে হলেই রঘু নানা কায়দা করে রোজ রামুকে ভূতের ভয় দেখাবেই।

    আজ দুঃখহরণবাবুর ভুলভাল কিছু বেশি হচ্ছে। দাদা সরোজকে ইতিহাস বোঝাতে গিয়ে তিনি বরাবার ওয়ার্ড মিনিং বোঝাতে লাগলেন, ইতিহাস বইতে দুটো ব্যাখ্যাও দাগিয়ে দিলেন। পুতুলকে সুদকষা বোঝাতে গিয়ে তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়ে বললেন, “মুখস্থ যেন ভুল না হয়, আর দাঁড়ি কমা সেমিকোলন সম্পর্কে সাবধানে থাকবে।” মনোজের ভুগোল বই খুলেও তিনি গোলযোগ করে ফেললেন, পশ্চিমবঙ্গের কোন্ কোন্ জেলায় ধান ও পাট জন্মায় তা বলতে গিয়ে তিনি বারবার নর’ শব্দের রূপ এনে ফেলছিলেন। তাই শুনে রাখোবাবু বিরক্ত হয়ে উঠে পড়লেন। ঘরে গোবরের গন্ধ, পড়ার ঘরে ভুলভাল পড়ানো, কোথায় আর যাবেন! তাই বাগানে পায়চারি করতে করতে দেখেন, রামু একমুঠো দুব্বো ঘাস, কয়েকটা কড়াইশুটি আর একটা গাজর বাগান থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।

    রাখোবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “ওসব কোথায় নিচ্ছিস রে রামু? দেখি, কী তুলেছিস?”

    রামু একগাল হেসে হাতের জিনিসগুলো দেখিয়ে বলল, “বুড়ি মা পাঠালেন কিছু ধনেপাতা, কাঁচা লঙ্কা আর একটা মুলো তুলে আনতে।”

    রাখোবাবু রেগে অস্থির। বললেন, “স্টুপিড, কবে থেকে বলছি হাসপাতাল থেকে চোখের ছানি কাটিয়ে আয়। কিছুতেই শুনবি না? কোন্ আকেলে তুই লঙ্কা বলে কড়াইশুটি, মুলো মনে করে গাজর আর ধনেপাতার বদলে গুচ্ছের ঘাস তুললি। আজই চল্ তোকে হাসপাতালে নিয়ে যাব, চোখ কাটিয়ে আসবি।”

    শুনে রামু ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেল। রাখোবাবু রাগারাগি করতে করতে ভিতরবাড়িতে চলে গেলেন। পড়ার ঘরে দুঃখবাবু চেয়ারের ওপর টপ করে উবু হয়ে বসতেই তাঁর চেহারা পাল্টে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তিনি ধান ও পাটের জেলা ঝরঝরে মুখস্থ বলতে লাগলেন, সুদকষা জল করে দিলেন, ইতিহাসের সন-তারিখ সুন্ধু আকবরের খুড়তুতো ভাইয়ের নাম পর্যন্ত তাঁর মনে পড়ে গেল।

    ঠাকুমা বামাসুন্দরী ডালের বড়ি দিচ্ছিলেন রোদে বসে। একটা কাক তাঁকে অনেকক্ষণ ধরে জ্বালাতন করছে। কাকটার সাহসেরও বলিহারি! এ বাড়িতে ঠাকুরঝি জেগে থাকতে বেড়াল কুকুর কাকপক্ষী ঢুকতে বড় একটা সাহস পায় না। কে কোথাকার এঁটোকাঁটা আঁস্তাকুড় টেনে আনে ঘরে, সেই ভয়ে ঠাকুরঝি লাঠিটি হাতে সারা বাড়ি খোঁড়া পায়ে ডিং মেরে-মেরে ঘুরে বেড়ান। কত কুকুর, বেড়াল, কাকপক্ষী যে তাঁর হাতে রামঠ্যাঙ্গা খেয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। ইদানীং তিনি শুধু লাঠির ওপর ভরসা না-রেখে পেয়ারা গাছের ডাল কাটিয়ে একটা গুলতি বানিয়ে নিয়েছেন। গুলতির যে চামড়ার অংশটুকুতে গুড়ল ভরতে হয়, সে-জায়গাটায় চামড়ার বদলে কয়েক পাল্লা ন্যাকড়ার পট্টি লাগিয়ে নিয়েছেন, চামড়া ছুঁতে পারেন না। গুলতি ছুঁড়ে ছুঁড়ে ঠাকুরঝির হাতের টিপও হয়েছে চমৎকার। সট সট করে গুড়ল ছোড়েন, ঠিক গিয়ে বেড়ালের লেজের লোম খসিয়ে দেয়, কাকপক্ষীর ডানার পালক ঝরে যায়, কুকুরের ঠ্যাং খোঁড়া হয়। এ বাড়িতে আদ্যাশক্তি আছেন জেনেও কাকটা ঘুরঘুর করছে। তেল-মাখানো কাঁসার থালা, টিনের টুকরো রোদে পেতে দিয়েছেন বামাসুন্দরী, ডাল ফেটাচ্ছেন। ডাল ফেটানোতে তাঁর জুড়ি নেই। বারো মাস ডাল ফেটিয়ে তাঁর ডান হাতে বেশ জোর হয়েছে। পাঞ্জা কষলে মেজকাকা ব্যায়মবীর হারাধনও ঠাকুমাকে হারাতে বেগ পাবেন। তা ঠাকুমা ডাল ফেটাচ্ছেন। কাকটা ঘুরঘুর করছে। ডালে কালোজিরে মেশাবেন বলে কালোজিরের পুরিয়াটা পাশেই রেখেছেন। কাকটা এক ছোঁ দিয়ে নিয়ে গেল।

    ঠাকুমা চেঁচালেন, “ও ঠাকুরঝি!”

    কিন্তু ঠাকুরঝি তখন কোথায়! কেউ সাড়া দিল না।

    ঠাকুমা বকবক করতে করতে উঠলেন। কাকটা পেঁপে গাছে উঠে বসে ছিল। কী খেয়ালে হুউশ করে উড়ে এসে ঠাকুমার খোঁপায় একটা ছোঁ মারল। তাতে ঘোমটা খসে গেল। ঠাকুমা ফের চেঁচালেন, “ও ঠাকুরঝি! কাকটার ভাবসাব মোটেই ভাল দেখছি না। গুলতিটা নিয়ে এসো?”

    পুরুতমশাই সতীশ ভরদ্বাজ ঘোষালবাড়ির নারায়ণ পুজো সেরে ফিরছেন। এসময়টায় মনোজদের বাড়িতে বসে তিনি খানিক খবরের কাগজ পড়ে যান, যাওয়ার সময়ে গৃহদেবতার ভোগটাও নিবেদন করে যান। এক কাপ চা, দুটো বিস্কুট আর পাঁচটা পয়সা তাঁর রোজকার বরাদ্দ। তিনি উঠোনে ঢুকে দেখেন, বামাসুন্দরী ডালের বাটি ফেলে বারান্দায় উঠে গিয়ে চেঁচামেচি করছেন, কাকটা ফেটানো ডালে নেচে বেড়াচ্ছে, সব ছয়ছত্রখান। বামাসুন্দরী তাঁকে দেখে প্রায় কেঁদে ফেললেন, “দেখেছেন ঠাকুরমশাই, দজ্জাল কাকের কাণ্ডটা?”

    সতীশ ভরদ্বাজ বড় খাইয়ে মানুষ। বেশ লম্বা-চওড়া চেহারা, বড় ভুড়ি, বয়স সত্তরের কাছাকাছি। এবয়সেও জোয়ানমদ্দরা মাছ বা রসগোল্লার কম্পিটিশনে তাঁর ধারেকাছে ঘেঁষতে পারে না। পাতে পড়তে-না-পড়তে তুলে ফেলেন। লোকে বলে তাঁর নাকি দুটো পোষা ভূত আছে, খাওয়ার সময়ে আবডাল থেকে তারাই সব তুলে খেয়ে ফেলে। নইলে ঠাকুরমশাই কি আর ওই অত চারটে মানুষের সমান খাবার খেতে পারেন? তবে সতীশ ভরদ্বাজ যে ভূত পোষেন, এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই। প্রায় সময়েই দেখা যায়, খবরের কাগজ পড়তে পড়তে হঠাৎ তিনি ‘উঁ’ বলে যেন কার নিঃশব্দ ডাকে সাড়া দেন, ঘাড় ঘুরিয়ে হঠাৎ যেন কার সঙ্গে ফিসফিস করে খানিক কথা বলে নেন, আবার কখনও হঠাৎ রাস্তাঘাটে চেঁচিয়ে ‘হাঁদু’, ‘ভুঁদু’ বলে কাদের ডাকাডাকি করেন। এইসব কারণে সবাই তাঁকে খানিকটা ভয় খায়।

    কাকের কাণ্ড দেখে সতীশ ভরদ্বাজ দাঁড়িয়ে গেছেন।

    কিছুক্ষণ দেখেটেখে একটা শ্বাস ফেলে খড়মের শব্দ তুলে বারান্দায় উঠে এলেন। তাঁর জন্য রোদে গদিওলা মোড়া পেতে রাখা আছে, তাইতে বসে বললেন, “কাক! এবাড়িতে মা আদ্যাশক্তি থাকতে কাক আসবে কোত্থেকে! তেমন সাহসী কাকই বা কই?”

    ঠাকুমা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলেন, “ওই দেখুন লক্ষ্মীছাড়া এক বাটি মাসকলাইবাটা নষ্ট করল। কত কষ্ট করে ফেটিয়েছি।”

    “ও কাক নয় মা।” সতীশ ভরদ্বাজ গম্ভীর হয়ে বলেন।

    “তবে কী?”

    সতীশ ভরদ্বাজ আবার একটা শ্বাস ছাড়েন।

    রঘু এসে খবরের কাগজ দিয়ে গেল। সতীশ ভরদ্বাজ কাগজ খুলে আইন-আদালতের খবর পড়তে-পড়তে বললেন, “চল্লিশ বছর আগে জয়দেবপুরে একবার এই রকম কাকের পাল্লায় পড়েছিল মোক্ষদা ঠাকুমা। দেখতে অবিকল দাঁড়কাক, কিন্তু তার হাবভাব আর দুষ্টুবুদ্ধিতে ঠাকুমা অস্থির। রোজ এসে সব লণ্ডভণ্ড কাণ্ড করে যায়। তীর-ধনুক, ঢিল-পাটকেল, কাকতাড়ুয়া কোনও কিছুকে গ্রাহ্য করে না। সবশেষে জ্বালাতন হয়ে ডেকে পাঠাল আমাকে। গিয়েই বুঝলাম কাকের রূপ ধরে এ কোনও আত্মা-টাত্মা এসেছে। বললাম, এ কাক তো তাড়ালে যাবে না ঠাকুমা, নারায়ণ-পুজো দাও, আর শান্তি-স্বস্ত্যয়ন করাও। সেই করতেই কাকটা যে পালাল, আর এল না। এ কাকটাকেও দেখুন না, যেন ঠিক কাক। কিন্তু কাকের মতো ব্যবহার কি? একটু লক্ষ করলেই দেখবেন, এ-পাখিটা কাকের চেয়েও কালো, ওর লাফানোটাও কাকের মতো নয়। এসব কিসের লক্ষণ সে আমি জানি। বাড়িতে একটা অমঙ্গল না হয়!”

    ঠাকুমা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। মুখে কথা নেই।

    আর এ-সময়ে গোয়ালঘরের দিক থেকে সোরগোল উঠল, রঘু আর বুড়ি কি কিরমিরিয়া চিৎকার করে বলছে, “ঠাকুরঝি পড়ে গেছে, ঠাকুরঝি পড়ে গেছে।”

    তা এরকম সোরগোল প্রায়ই ওঠে। ঠাকুরঝি সাত দিনে সাতবার আছাড় খান। লোকে বলে, ওইটাই তাঁর নেশা। তাঁর হবি। যেখানে কেউ কোনওদিন পড়ে যায় না এমন শুকনো সমতল জায়গাতেও ঠাকুরঝি তাঁর বরাদ্দ আছাড়টা খেয়ে নেন। শোনা যায়, দেশের বাড়িতে সেই ঢাকা জেলার গ্রামে থাকতেও তিনি প্রায়ই ঘরের পাটাতনে মই বেয়ে পুরনো তেঁতুল কি আমচুড় পাড়তে উঠে আছাড় খেতেন, পুকুরঘাটে পড়তেন, উঠোনে হড়কাতেন, এমন কী খোঁটায় বাঁধা গরু পর্যন্ত তাঁকে দেখলে দৌড়ে এসে দড়ির প্যাঁচ মেরে ফেলে দিত। অত সব আছাড় খেয়ে খেয়েই তাঁর পা একটু খোঁড়া, হাতও একটু বাঁকা, গ্রামদেশে তো হাড় জোড়া দেওয়ার ডাক্তার ছিল না, গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার পট্টি বেঁধে ছেড়ে দিত। ভাঙা হাড় বাঁকা হয়ে জোড়া লেগে যেত।

    ঠাকুরঝি আছাড় খেয়েছেন শুনে পড়া ভণ্ডুল হয়ে গেল। মনোজ, সরোজ, পুতুল তিন ভাই-বোন যথাক্রমে ভূগোল, অঙ্ক, ইতিহাস ফেলে দৌড়ে উঠে এল। দুঃখবাবু উবু হয়ে বসে মন দিয়ে অঙ্ক কষছিলেন। অনেকক্ষণ বাদে টের পেলেন যে, সামনে ছাত্রছাত্রীরা কেউ নেই।

    ভারী বিরক্ত হয়ে তিনি তখন গানের মাস্টারমশাই গণেশ ঘোষালের ঘরে গেলেন দুটো গল্প করতে। গিয়ে দেখেন, সেখানেও এক গোলমাল।

    গণেশবাবু আত্মহত্যা করবেন বলে চালের বিমের সঙ্গে একটা মোটা দড়ির ফাঁস ঝুলিয়ে দড়িটা টেনেটুনে দেখছেন।

    দুঃখবাবু বললেন, “এ কী?”

    দৃশ্য দেখে দুঃখহরণবাবু চমকে উঠলেন না। মাসের মধ্যে দু-তিনবার গণেশ ঘোষাল আত্মহত্যার চেষ্টা করে থাকেন। দুঃখবাবু দড়িটা দেখে বললেন, “ভাল বাঁধা হয়নি।”

    গণেশবাবু ফাঁসটা ধরে একটু ফুল খেয়ে বলেন, “না, দিব্যি শক্ত হয়েছে।“

    দুঃখবাবু মাথা নেড়ে বলেন, “দড়িটাও বেশ পুরনো, মাঝখানে ফেঁসে বেরিয়ে আছে। ফাঁস গলায় দিয়ে ঝুলবার সময়ে যদি দড়ি ছিঁড়ে যায় তো পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙবে।”

    গণেশবাবু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, “ভাঙে ভাঙুক। ভারী তো তুচ্ছ হাত-পা। মরতে গেলে হাত-পায়ের চিন্তা করলে চলে না মশাই।”

    দুঃখবাবু ভেবে চিন্তে বলেন, “সে অবশ্য ঠিক। দড়িটা কি গোয়াল থেকে আনলেন নাকি?”

    গণেশবাবু মাথা নেড়ে বলেন, “হ্যাঁ। গরুর গলা থেকে খুলে এনেছি। বদমাশ গরুটা ঢুসিয়ে দিতে এসেছিল, কোনওক্রমে বেরিয়ে এসে দরজার ঝাঁপটা টেনে দিয়েছিলাম ভাগ্যিস।”

    দুঃখবাবু চেয়ারে পা তুলে বসে বললেন, “এই সকালবেলাতেই মরতে চাইছেন কেন? সকালবেলাটা সুইসাইড করার পক্ষে ভাল না। হুটহাট লোকজন এসে পড়তে পারে। এসব গভীর রাতে করতে হয়, যখন কেউ এসে বাঁচাতে পারবে না।”

    “ঃ।” বলে গণেশবাবু দুঃখবাবুর দিকে একটু কটমট করে চেয়ে থেকে বললেন, “গভীর রাত পর্যন্ত আমি জেগে থাকতে পারি না। এত ঘুম পায় যে, মরা-টরার কথা মনেই থাকে না।”

    “আজকে কী হয়েছিল যে, মরতে যাচ্ছেন?”

    গণেশবাবু মুখখানা ভার করে চোখ ছলছলিয়ে বললেন, “আবার কী! সেই সুরে ভুল। সকালে বসে হংসধ্বনি রাগটার ওপর একটু ঘষামাজা করছিলাম, পরপর দুবার তালে লয়ে ভুল হয়ে গেল। কালু মিশিরের শিষ্য আমি, আমার ভুল হওয়ার মানে তো পৃথিবীতে প্রলয় হয়ে যাওয়া। গুরুজি তো আজ প্রায় ত্রিশ বছর হল দেহ রক্ষা করেছেন, তবু যখন সকালে রেওয়াজ করতে বসি তখন যেদিন ঠিকঠাক সুরে-লয়ে-তালে গাই সেদিন নির্ঘাত শুনতে পাই অনেক দূর থেকে যেন মৃদু একটা তবলায় ঠেকা দেওয়ার শব্দ আসছে। গায়ে কাঁটা দেয় মশাই, পরিষ্কার বুঝতে পারি স্বর্গে বসে গুরুজি আমার গান শুনছেন, আর তবলার ঠেকা দিয়ে দিয়ে সম আর ফাঁক দেখিয়ে দিচ্ছেন। কখনও কখনও তারিফ করে ‘কেয়াবাত’ বলে চেঁচিয়ে ওঠেন।”

    “ওরে বাবা, দুঃখবাবু বলে ওঠেন। অবশ্য কথাটা তিনি গণেশবাবুর গুরুজির কথা শুনে বলেননি, আসলে তাঁকে এ সময়ে কুটুস করে একটা ছারপোকা কামড়েছিল। তিনি উবু হয়ে বসেই চেয়ারে ছারপোকা খুঁজতে লাগলেন।

    গণেশবাবু চোখ মুছে বলেন, “জীবন তুচ্ছ, তালেই যদি ভুল হল, লয়ই যদি গোল পাকাল, তা হলে বেঁচে থেকে লাভ কী?”

    ছারপোকা খুঁজতে খুঁজতে দুঃখবাবু বলেন, “কাজটা ভাল করেননি।”

    “না না, বেশ করছি। আপনি আমাকে বাধা দেবেন না। মরে গুরুজির কাছে যাব, তিনি আমাকে মুখোমুখি পেয়ে পায়ের নাগরাটা দিয়ে আচ্ছাসে জুতোপেটা করবেন, তবে আমার শান্তি। একাজে আমাকে বাধা দেবেন না দুঃখবাবু।”

    দুঃখবাবু বিরক্ত হয়ে বলেন, “কে বাধা দিচ্ছে! মরতে হয় মরুন, তা বলে গোয়াল থেকে দড়িটা আনা আপনার ঠিক হয়নি। একটু আগেই গোয়ালঘর থেকে চেঁচামেচি আসছিল, বোধহয় আদ্যাশক্তিদেবী গোয়ালে গোবর আনতে গিয়েছিলেন, সেই সময়ে ছাড়া গরুটা তাঁকে বুঝি খুব টুসিয়ে দিয়েছে। ও গরুটা রামু ছাড়া কাউকে মানে না! এখন যদি সকলে গরুটা কে ছাড়ল তা খুঁজে দেখতে গিয়ে আপনার ঘরে এসে চোরাই দড়িটা পায় তো বড় লজ্জার কথা।”

    গণেশবাবুর মুখটা শুকিয়ে গেল, বললেন, “তাই তো!”

    “সব কিছুই ভেবেচিন্তে করতে হয়। গলায় দড়ি দেওয়ারও একটা ক্যালকুলেশন আছে। হু-হুঁ! পটেশ্বর ওঝা রেল লাইনে গলা দিতে গিয়েছিল তার বউয়ের সঙ্গে রাগারাগি করে। রাতে গিয়ে লাইনে গলা দিয়ে পড়ে রইল, কিন্তু গাড়ি আর আসে না। পটেশ্বরকে খাতির করতে গাড়ি তো আর আগেভাগে এসে পড়তে পারে না, তারও টাইম আছে। তা পটেশ্বর অপেক্ষা করতে করতে কখন লাইনে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। ভোরবেলা গাড়ি এল, কিন্তু অনেক দূর থেকেই ড্রাইভার সাহেব রেল লাইনে মানুষ শুয়ে আছে দেখে গাড়ি থামিয়ে ইঞ্জিনের কু দিল। সেই কু শুনে ঘুম ভাঙতেই পটেশ্বর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসে ভাবল, যাক বাবা, মরা-টরা হয়ে গেছে। ব্যথাট্যথাও খুব একটা পেতে হয়নি। এই ভেবে সে ঘাড়ে হাত দিতে ঘাড়খানা আস্ত দেখে আরও খুশি হয়ে হয়ে গেল। ভাবল, মরার পর বোধহয় কাটা ঘাড় ফের জোড়া লেগে যায়। এই সময়ে ড্রাইভারসাহেব নেমে এসে পটেশ্বরকে এই মার কি সেই মার। বলে–রেল লাইনটা তোমার মামদোগিরির জায়গা? সেই মার খেয়ে পটেশ্বর পনেরো দিন হাসপাতালে ছিল। ক্যালকুলেশনের ভুলে তার মরাও হল না, বরং মার খেয়ে হাসপাতালে পড়ে থাকতে হল। তাই বলছিলাম।”

    আদ্যশক্তিদেবী আছাড় খেয়েছেন শুনলে কেউ আজকাল আর অবাক হয় না। কেউ যদি কাউকে গিয়ে বলে, জানো, আদ্যাশক্তি দেবী আছাড় খেয়েছেন? তা হলে যাকে বলা হয় সে একটু অবাক হয়ে বলবে, হ্যাঁ, সে আর বলার কী? উনি তো প্রায়ই তো খেয়ে থাকেন। ওটাই ওঁর অভ্যাস, নেশা।

    তবু কেউ যদি আছাড় খায়ই, সে আদশ্যক্তি দেবীই হোন বা আর যে কেউ হোক, নিয়ম হল লোজন গিয়ে তাকে ধরাধরি করে তুলবে। গোয়ালঘরের চেঁচামেচি শুনে তাই সবাই দৌড়ে গেল।

    গিয়ে দেখে, গোয়ালঘরের এক কোণে যেখানে মনোজের কাকা বৈজ্ঞানিক এবং ব্যায়ামবীর হারাধন গোবর গ্যাস তৈরি করার জন্য বিশাল এক গর্তে গোবরের তাল জমিয়ে রেখে পচাচ্ছিল সেখানে আদ্যাশক্তিদেবীর অর্ধেক ডুবে আছে। তিনি নিঃশব্দে চেঁচাচ্ছেন। অর্থাৎ তাঁর মুখ নড়ছে, কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না।

    রাখোবাবু গম্ভীর মুখে বললেন, “এ নিশ্চয়ই হারিকেনের কাজ।”

    বুড়ি ঝি কিরমিরিয়ার অভ্যাস হল, বাড়িতে কোনওরকম ঘটনা ঘটলেই সে বিলাপ করে কাঁদতে বসবে। রাখোবাবু যদি মনোজকে বকেন তো কিরমিরিয়া কাঁদতে বসে। পুতুলের ড্রইং-এর খাতা হারালেও কারও কিছু নয়, কিরমিরিয়া বিলাপ করতে বসল–ও বাবাগো, খখাঁকির খাতাটা কোথায় গেল গো? খোঁকির এখন কী হবে গো! ইস্কুলের দিদিমণি এখন খোঁকিকে বকবে গো! সারাদিন তার বিলাপের জ্বালায় সবাই অস্থির। এখন বাড়িতে যাই ঘটুক, কিরমিরিয়াকে কেউ কিছু খবর দেয় না।

    প্রায় দুদিন কিরমিরিয়া বিলাপ করেনি। বিলাপ না করলে তার পেট ফেঁপে যায়, খিদে নষ্ট হয়ে মুখে অরুচি হয়। রোগাও হয়ে যায় সে। দুদিন বাদে আজ জবর ঘটনা দেখে কিরমিরিয়া গিয়ে গোবরে অর্ধেক ডুবে-থাকা আদ্যাশক্তি দেবীর মুখের সামনে উবু হয়ে বসে মনের সুখে কেঁদেকেটে বিলাপ করতে লাগল, “ও ঠাকুরঝি গো, এত জায়গা থাকতে তুমি কেন গোবরে গিয়ে পড়লে গো! উঠোনে পড়লে না, পুকুরে পড়লে না, ছাদ থেকে পড়লে, গোবরে গিয়ে পড়লে গো! এখন তোমারই বা কী হবে, গোবরেই বা কী হবে গো?”

    খবর পেয়ে পাড়ার লোকজনও সব এসে জুটেছে। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে শ্রুতিধর ঘোষ। শ্রুতিবাবুর এক অভ্যাস, কিছু দেখলে বা শুনলে তাঁর আর-একটা কিছু মনে পড়ে যায়। কিন্তু ঠিক মনে পড়ে বলেও বলা যায় না। কী যেন একটা মনে আসি-আসি করে, কিন্তু আসে না। যেমন একবার দুঃখবাবুর পেটের ব্যথা হওয়ায় তিনি এসে বললেন, “পেটের ব্যথার তিনটে খুব ভাল ওষুধ আমি জানি।”

    “কী বলুন তো!” দুঃখবাবু খুব উৎসাহের সঙ্গে বলেন।

    তখন অনেকক্ষণ চিন্তা করে শুতিবাবু বললেন, “একটা হল গিয়ে ইয়ে, মানে ওই আর কী!”

    রাখোবাবু পাশেই ছিলেন, বললেন, “আর দুটো?”

    শুতিবাবু আবার চিন্তা করে বললেন, “আর একটা যেন কী! আর তৃতীয় ওষুধটার নাম ভুলে গেছি।”

    তবু সবসময়েই শুতিবাবুর কী যেন মনে-পড়ি-পড়ি করে, এই যেন এক্ষুনি মনে পড়ে যাবে, প্রায় এসে গেছে মাথায়।

    সেই শুতিবাবু আদ্যাশক্তির অবস্থা দেখে বললেন, “গোবরে..গোবরে…কী যেন?”

    তার ভাইপো ফচকে ফটিক বলল, “গোবরে পদ্মফুল?”

    “না, না। গোবরে আর একটা কী যেন!”

    “গুবরে পোকা।”

    “দুর ফাজিল।” সুতিবাবু রেগে যান। তারপর রাখোবাবুর দিকে চেয়ে বলেন, “ব্যাপারটা কী হল মশাই? গোবরে পিসিমা কেন?”

    রাখোবাবু খুব ভেবেচিন্তে বলেন, “আমরাও তাই ভেবে মরছি। তবে মনে হয় এটা হারিকেনের কাজ।”

    “হারিকেন!” বলতে গিয়েই শুতিবাবুর আবার কী যেন মনে আসি-আসি করে। ভাবতে ভাবতে বলেন, “হারি,হারি! হারি আপ কী-একটা কথা আছে না? তার মানে বলতে চাইছেন, হারি মানে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে পিসিমার এই দশা! এখন প্রশ্ন হল কেন, কেন এই হারি! হারি কেন? তাই না?”

    রাখোবাবু বিরক্ত হয়ে বলেন, “মোটই না। আমাদের বদমাশ গরুটার নাম হারিকেন। হারিকেন হচ্ছে একরকমের সামুদ্রিক ঝড়। ও বাচ্চা ছেলেও জানে। আমাদের গরুটা ঝড়ের মতো দৌড়য়, অঁতোয়, বেড়া ভাঙে, গাছ ওপড়ায় বলে ওর ওই নাম রাখা হয়েছে। মনে হচ্ছে সেই গরুটাই পিসিমাকে গুঁতিয়ে নিয়ে গোবরে ফেলেছে। কিন্তু গরুটা তো বেশ ভাল করে বাঁধা ছিল, একটু বাদে তাকে মাঠে নিয়ে গিয়ে রঘু খোঁটা পুঁতে দিয়ে আসবে কথা ছিল। সেটা ছাড়া পেল কীভাবে?”

    এক গাল হেসে শুতিবাবু বললেন, “ওই হল। হারিকেনের গুঁতোর ভয়ে হারি করতে গিয়ে তাড়াতাড়ি পিসিমা গোবরে পড়েছেন। কিন্তু গোবর নিয়ে কী একটা কথা আছে, কিছুতেই মনে পড়ছে না।”

    এই বলে শুতিবাবু ভাবেন। ফটিক বলে, “যাঁড়ের গোবর।”

    “দূর।“

    “মাথায় গোবর।” ফটিক ফের বলে।

    শ্রুতিবাবু তার দিকে কটমট করে তাকান।

    ফটিক ফচকে হেসে বলে, “পালোয়ান গোবরবাবু?”

    কিরমিরিয়া একটু কান্না থামিয়ে কথাবার্তা শুনে নিয়ে ফের ডুকরে ওঠে, “ও বাবা গো, হারিকেনটাই বা কোথায় গেল গো! সে যে এখনও ভাল করে সকালের জাবনা খায়নি গো! সে যে না খেয়ে খেয়ে ল্যাজে গোবরে হয়ে যাবে গো!”

    “ওই!” শ্রুতিবাবু চেঁচিয়ে উঠে বললেন, “ওই মনে পড়েছে। ল্যাজে গোবরে! হেঃ হেঃ, এ যে দেখছি পিসিমার একেবারে ল্যাজে গোবরে অবস্থা!”

    আদ্যাশক্তিদেবী বুক সমান গোবরের গর্তের মধ্যে পোঁতা। ঘন গোবরের টালের ভিতর থেকে নিজে নিজে বেরিয়ে আসবেন সে সাধ্য নেই। ঘন মধুর মধ্যে পড়লে মাছি যেমন আটকে যায়, তাঁর অনেকটা সেই দশা। অনেকক্ষণ চেঁচামেচি করায় গলা বসে গেছে, বাক্য বেরোচ্ছে না। তিনি দুহাত বাড়ির সবাইকে বলতে চাইছেন, “ওরে তোরা আমাকে টেনে তোল।”

    কিন্তু সেকথায় কেউ কান দিচ্ছে না।

    দুঃখবাবু আর গণেশবাবু এসে গোয়ালঘরে ঢুকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। গণেশবাবুর চাঁদরের তলায় গরুর দড়িটা সুকোনো আছে, কিন্তু সেটা বের করতে সাহস হচ্ছে না।

    মনোজ দুঃখবাবুকে জিজ্ঞেস করল, “মাস্টারমশাই গোবরের ইংরিজি কী?”

    “কাউডাংগ।”

    “আর পিসিমা হল আন্ট, না?”

    “হ্যাঁ।”

    “তা হলে গোবরে পিসিমা কেন, এর ইংরিজি হবে হোয়াই আন্ট ইজ ইন কাউডাংগ, না মাস্টারমশাই?”

    “হুঁ।”

    “ল্যাজে গোবরের ইংরিজি কী হবে মাস্টারমশাই?”

    দুঃখবাবু বলতে পারলেন না। সন্তর্পণে একবার রাখোবাবুর দিকে তাকালেন। রাখোবাবু ভ্রূ কুঁচকে দুঃখবাবুর দিকেই চেয়ে ছিলেন। বললেন, “এরকম ছোটখাটো সব ঘটনার ভিতর দিয়ে শেখালে ছেলেদের শিক্ষা ভাল হয়। ল্যাজে গোবরের ইংরিজিটা ওকে শিখিয়ে দিন দুঃখবাবু।”

    দুঃখবাবু দুঃখের সঙ্গে মাথা চুলকোলেন। বললেন, “টেইল ইন কাউডাংগ। অ্যান্ড কাউডাংগ ইন টেইল।”

  • ডানাওলা মানুষ

    ডানাওলা মানুষ

    বিনোদ ঘোষাল

    [book]

    বাংলা আধুনিক ছোটগল্পের জগতে বিনোদ ঘোষাল পরিচিত নাম। লেখালেখির বয়স বেশি নয়, কিন্তু খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পাঠকের কাছে সাদরে গৃহীত হয়েছেন। বিনোদের গল্পের মূল উপজীব্য আলো নয়, অন্ধকার। আনন্দ নয়, আধুনিক মানুষের একাকীত্ব, অসহায়তা। সেই অর্থে বিনোদ ব্ল্যাক স্টোরি রাইটার। এই সময়ের মানুষের কথা তাঁর কলমে বড় নির্মমভাবে উঠে আসে। তাঁর লেখার সব থেকে বড় গুণ হল পাঠযোগ্যতা। পাঠক তার লেখা একবার পড়তে শুরু করলে ছাড়তে পারবেন না। এই সংকলনের গল্পগুলির মধ্যে রয়েছে আমাদের মতোই খুব সাধারণ মানুষের কথা। অথচ তার আবেদন কলমের মুন্‌শিয়ানায় হয়ে উঠেছে বিশ্বজনীন।

    প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই বইটি অর্জন করে সর্বভারতীয় সাহিত্য অকাদেমির প্রথম যুবা পুরস্কার।

    ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয় ‘ডানাওলা মানুষে’র প্রথম পত্র ভারতী সংস্করণ। এই সংস্করণের গল্প সংখ্যা পনেরটি, প্রচ্ছদ এঁকেছেন গৌতম দাশ, এবং অলংকরণ করেছেন রাজীব পাল। এই সংস্করণটি ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক পত্র ভারতী, ৩/১ কলেজ রো, কলকাতা ৭০০ ০০৯ থেকে প্রকাশিত এবং হেমপ্রভা প্রিন্টিং হাউস, ১/১ বৃন্দাবন মল্লিক লেন, কলকাতা ৭০০ ০০৯ থেকে মুদ্রিত হয়।

    গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয় ‘বাবাকে’।

    এই গ্রন্থে প্রকাশিত গল্পগুলো হল—

    লেখকের কথা

    আমাদের বাড়িতে ড্রেসিং টেবিলে বাবার একান্ত নিজস্ব একটি ড্রয়ার ছিল। তার চাবি থাকত বাবা পইতেয় বাঁধা। মাঝেমধ্যে ওটা খুলে গোপনে কী সব খুটখাট করত। আমার, মা-র, দিদির কারও অধিকার ছিল না সেই ব্যক্তিগত দেরাজে উঁকি দিই। ছোট্টবেলা থেকে আমার ভীষণ কৌতূহল ছিল দেরাজটির ভেতর কী আছে জানার। কিন্তু কোনওদিন সেই সুযোগ মেলেনি। শ্মশানে বাবার শরীর থেকে চাবি সমেত পইতেটা ছিঁড়ে নিয়েছিলাম। ঘাটকাজের দিন রাত্রে হঠাৎ চাবিটার কথা মনে পড়ল। ড্রয়ারটা খুলতে গিয়ে কেমন শিরশির করেছিল আমার গোটা শরীর, মনে হচ্ছিল এই যেন বাবা ধমকে উঠবে। খুললাম ওটা। বাবার গায়ের গন্ধ দেরাজটার ভেতর। হাত বাড়িয়ে একে একে বার করতে থাকলাম কিছু পুরোনো তামার পয়সা, ঠাকুর-দেবতার ছবি, কিছু পুরোনো চাবি যাদের তালা নেই, কয়েকশো টাকা, বাবার নিজের লেখা একটা ডায়েরি আর…আর ক্লিপে আটকানো একগাদা বিভিন্ন মাপের খাতার, ডায়েরির কাগজ।

    যে লেখাগুলো আমি লিখে অপছন্দ হত বলে দলা পাকিয়ে ঘরের এখানে-ওখানে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম—বাবা কখন যে সেগুলোকে আমার আড়ালে তুলে নিয়ে নিজের প্রিয় দেরাজে যত্ন করে রেখে দিত। সেজন্যই কি আমাকে মাঝেমধ্যে বলত, ভালো না লাগলেও ফেলিস না কোনওদিন কাজে লাগবে। কেন জানি না তারপর থেকেই বোধহয় আমি কোনও লেখা পছন্দের না হলেও ফেলি না, কোথাও রেখে দিই। নিজের বইয়ের ভূমিকা লিখতে বসে আচমকা সবার আগে কেন কে জানে এই ঘটনাটাই মনে পড়ল! আর কী লিখব ভূমিকায়?

    ছোট থেকে শখের নাটক (পরে গ্রুপ) আর ছবি আঁকতেই ভালোবাসতাম। আর একটু বয়স বাড়ার পর ছবি আঁকা কমে গিয়ে কবিতা এল। তারা স্রেফ ডায়েরির মধ্যেই থাকত। কোনওদিন সূর্যের আলো দেখেনি। কলেজ পাশ করে বন্ধুরা সব দু-বেলা পাড়ার রিকশা স্ট্যান্ডে রিকশাওয়ালাদের সঙ্গে বিড়ি টানি আর আড্ডা দিই। আমাদের এক বন্ধুর মা মারা গেল। ক্যান্সার হয়েছিল। খুব সুন্দর দেখতে ছিল কাকিমাকে। হাসপাতাল থেকে যখন বাড়িতে আনা হল তার মৃতদেহ, তাকিয়ে দেখি চেনা যাচ্ছে না। মৃত্যুর পর কাকিমার অমন সুন্দর মুখটা কেমন যেন হয়ে উঠেছে। সহ্য হয়নি আমার দৃশ্যটা। তারপর শ্মশানে গেছি। কাকিমাকে দাহ করে বাড়ি ফিরেছি। কিন্তু মাথার ভেতর কী যেন একটা ঘুরপাক খাচ্ছিল। কী সব যেন বলার জন্য ভেতর থেকে ঠেলা দিচ্ছে। ক’দিন পর গলগল করে বেরিয়ে গেছিল একটা লেখা। গল্পই। লিখে বেশ হালকা লাগল। পড়েই রইল লেখাটা। তার বেশ কিছু কাল পর আমার এক দাদা স্থানীয় সাহিত্যিকবন্ধু আমাকে নিয়ে গেল এক সাহিত্যসভায়। বলল নিজের কোনও লেখা থাকলে নিয়ে আসবি। পড়বি।

    কোনও লেখা তো নেই। মনে পড়ল ওই লেখাটা। ওটাই নিয়ে গেলাম। পড়লাম। সবার ভালো লাগল। বলল ‘দেশ’ পত্রিকায় পাঠাতে। পাঠিয়ে দিলাম। মাসে কয়েকের মধ্যে ছেপেও গেল সেটা। আমার প্রথম গল্প, ‘একটু জীবনের বর্ণনা’। যেদিন দেশ পত্রিকার চিঠি এসেছিল বাড়িতে, বাবার সে কী আনন্দ! বার বার চিঠিটা খুলে পড়েছিল। হাতে নিয়ে এ-ঘর ও-ঘর করেছিল। সেই থেকেই শুরু। সেটা দু-হাজার তিন সাল।

    কী লিখতে চাই। কেন লিখি। এই সব প্রশ্ন নিজেকে করলে উত্তর পাই না। ভেতরটা চুপ মেরে থাকে। সারা দেয় না। কাজেই ওসব প্রশ্ন থাক। শুধু এটুকু মনে হয় আসলে আর সব মানুষের মতন আমিও বড় অসহায়। আর সেই অসহায়তাটা বার বার নানাভাবে নিজের কাছে লুকোতে গিয়ে বার বারই ধরা পড়ে যাই। এই কষ্টটাই মাঝেমধ্যে লিখে ফেলি। খুব যে লিখতে পারি তা নয়। চেষ্টা করি।

    কৃতজ্ঞ থাকব সেই সব পাঠকদের কাছে, যারা একবারের জন্য হলেও আমার প্রথম বইটা হাতে নিয়ে উলটেপালটে দেখলেন, কিংবা চোখ ছোঁওয়ালেন। অথবা এসব কিছুই করলেন না।

    দ্বিতীয় সংস্করণ প্রসঙ্গে

    ডানাওলা মানুষের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের দাযিত্ব নিলেন খুব স্বাভাবিকভাবেই পত্র ভারতীর ত্রিদিবদা। ‘খুব স্বাভাবিকভাবেই’ এই কারণে বললাম, প্রকাশক এবং সুলেখক ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় আমার মতো তরুণ লেখকদের উৎসাহ দিতে সবসময় একপা এগিয়ে। সব থেকে বড় কথা একজন তরুণ লেখকের বই প্রকাশ করার আগেও সেই বই নিয়ে তার ভাবনা-চিন্তা এবং যত্ন দেখবার মতো।

    এই বইয়ের নতুন সংস্করণ নিয়েও অনেক আলোচনা পরিকল্পনা তার সঙ্গে সাক্ষাতে এবং টেলিফোনে হয়েছে। কীভাবে বইটিকে আরও সুন্দর এবং আকর্ষণীয় করা যায় সে বিষয়ে তাঁর ভাবনা আবারও আমাকে অবাক করেছে।

    বইটি নতুন চেহারায় প্রকাশিত হল। পাঠকদের ভালো লাগলে কৃতিত্ব অবশ্যই প্রকাশকের।

    কলকাতা বইমেলা ২০১৫
    নবগ্রাম, হুগলি
    বিনোদ ঘোষাল
  • রূপনগরের পিশাচিনী

    রূপনগরের পিশাচিনী

    বিনোদ ঘোষাল

    [book]

    ‘রূপনগরের পিশাচিনী’ গ্রন্থটি রচনা করেছেন বিনোদ ঘোষাল; এই গ্রন্থে একটি উপন্যাস ও পাঁচটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে। এই গ্রন্থের প্রতিটি গল্পের বিষয় বস্তু মোটামুটি প্রেম আর যৌনতা বিষয়ক। ‘রূপনগরের পিশাচিনী’র প্রথম প্রকাশ বইমেলা ২০১৯, মাঘ ১৪২৫। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে – “প্রাচীন ভারতবর্ষের সকল গণিকাকে”।

    গ্রন্থের শুরুতেই রয়েছে উপন্যাস ‘রূপনগরের পিশাচিনী’; এটির নামেই গ্রন্থের নাম। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দেব সাহিত্য কুটিরের ১৪২৫ বঙ্গাব্দের ‘শারদীয়া নবকল্লোলে’। ‘রুপনগরের পিশাচিনী’ নাম শুনে মনে হতে পারে রূপনগর নামক কোন নগরের এক পিশাচিনীর কাহিনী এটি; কিন্তু না, এটি একটি ভিন্নধারার উপন্যাস— প্রাপ্তমনস্ক রূপকথা। ‘রূপনগরের পিশাচিনী’তে লেখকের অসাধারণ লেখন শৈলীর প্রকাশ পেয়েছে।

    কলকাতার উপকণ্ঠে গড়ে উঠেছে এক অত্যাধুনিক শহর— কাল্পনিক রূপকথার শহর— রূপনগর। উপন্যাসের শুরুতে এই শহর সম্পর্কে লেখক জানাচ্ছেন— “কলকাতা শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে গড়ে উঠেছে আরেকটি শহর। নাম রূপনগর। রূপে, আভিজাত্যে সে প্রতিদিন গুনে গুনে দশ-বিশ গোল দেয় কলকাতাকে।”

    “প্রাচীন ভারতবর্ষের এক শহরের সেট তৈরি। কী নিখুঁতভাবে গড়া এই নগরী। প্রতিটি বাড়ি যেন পাথর কুঁদে গড়া। অসামান্য সব ভাস্কর্য বাড়িগুলির গায়ে, পথের দুইপাশে। সব ভাস্কর্যই নারী ও পুরুষের মিলনভঙ্গি।”

    সেই রূপনগরে রয়েছ প্রাচীন ভারতবর্ষের আদলে গড়া রূপমঞ্জরী। যার সাথে মিল আছে প্রাচীন ভারতের খাজুরাহোর। এখানে প্রতিভাময়ী গণীকাদের চাকরি দেওয়া হয়, কেননা, প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসে ‘কামকলা’ যেমন একটা শিল্প ছিল, রূপনগরেও কামকলা তদ্রূপ শিল্প। প্রথমে মনে হতে পারে কলকাতার পাশেই কেন গড়ে উঠল রূপনগর? এরপর মনে পড়বে, কলকাতার ঠিক কাছেই তো রয়েছে সোনাগাছি; সেখানে কাম জীবিকার উপায় মাত্র, সেখানে কামের কোন শৈল্পিক সুষমা নেই। কিন্তু এই রূপনগরের কাম হল একটা খেলা— একটা শিল্প।

    যাকে বলা হল ‘রূপনগরের পিশাচিনী’, যাকে নিয়ে এই কাহিনী সেও একজন গণীকা। তার নাম রূপসা যার আছে এক আশ্চর্য শক্তি যার জন্যে দেশ-দেশান্তর থেকে ছুটে আসে পুরুষের দল। সেই শ্যামবর্ণা রূপসার শরীর ভোগ করে ধর্ষকামী চেতনা শীতল করতে সারাপৃথিবী থেকে ছুটে আসা ধনকুবেরা।

    রূপনগর এমন একটি নগর যেখানে যে যখন খুশি, রাস্তা-ঘাটে, ছাদে যৌনসঙ্গম করতে পারে। তবুও পুরুষেরা কেন তার কাছেই ছুটে আসে?

    রূপসার উপকথায় লেখা আছে তার প্রেম থেকে যৌন ব্যবসায় উঠে আসার কথা; আছে দীপুদার সাথে বটতলাতে প্রথম চুম্বনের ও দীপুদার যৌনাঙ্গ শক্ত হবার কথা। আরও আছে তার দাদা বিলু তার খদ্দের নিয়ে আসার কথা। এই সব উপকথার মধ্যেই একদিন সেই রূপনগরে প্রবেশ ঘটল এক অন্যরকম পুরুষের যার স্পর্শে রূপসার জীবন গেল বদলে। কী ঘটল? কি আশ্চর্য শক্তি ছিল রুপসার? কে সেই পুরুষ?

    এইসব প্রশ্নের জবাব পেতে পড়ে ফেলুন ‘রূপনগরের পিশাচিনী’।

    শহরের ব্যস্ততা আর কোলাহল থেকে দুরে পালাতে কৌশিক নিজের বন্ধুর দাদার সাহায্যে এসে উঠেছিল উত্তরপাড়ার এক নিরিবিলি সুপ্রাচীন পোড়োবাড়িতে। সেখানে পৌঁছাতেই সে অনুভব করে এক মিষ্টি গন্ধ আর এক নারী অবয়বের। কে সেই নারী? কি ছিল সেই গন্ধে?

    ‘রূপনগরের পিশাচিনী’তে যে সকল গল্প রয়েছে—

  • দূরবীন

    দূরবীন

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [book]

    গ্রন্থকথা

    সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় দু-বছরেরও বেশি কাল ধরে ধারাবাহিকভাবে বেরিয়েছিল ‘দূরবীন’, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জোরালো, সংবেদনশীল কলমে অন্যতম মহৎ সৃষ্টি। চলমান শতাব্দীর দুইয়ের দশকের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে আটের দশক পর্যন্ত বিস্তৃত সময়ের প্ৰেক্ষাপটে সামাজিক জীবনের যাবতীয় পরিবর্তনকে এক আশ্চর্য কৌতুহলকর বিশাল কাহিনীর মধ্য দিয়ে ধরে রাখার প্রয়াসেরই অভিনন্দিত ফলশ্রুতি ‘দূরবীন’ উপন্যাস।

    তিন প্রজন্মের এই কাহিনীতে প্রথম প্রজন্মের প্রতিভূ জমিদার হেমকান্ত। এ-উপন্যাসের সূচনায় দেখা যায়, হেমকান্তের হাত থেকে কুয়োর বালতি জলে পড়ে গেছে, আর এই আপাততুচ্ছ ঘটনায় হেমকান্ত আক্রান্ত হচ্ছেন মৃত্যুচিন্তায়। বিপত্নীক হেমকান্ত ও রঙ্গময়ী নামের প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক পুরোহিত্যকন্যার, গোপন প্রণয়কাহিনী ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য পারিবারিক কাহিনী নিয়ে এ-উপন্যাসের প্রথম পর্যায়। দ্বিতীয় প্রজন্মের নায়ক কৃষ্ণকান্ত। দেবোপম রূপ ও কঠোর চরিত্রবল বালক কৃষ্ণকান্তকে দাঁড় করিয়েছে পিতা হেমকান্তের বিপরীত মেরুতে। স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ কৃষ্ণকান্তের ব্ৰহ্মচর্য-গ্রহণ ও দেশভাগের পর তাঁর আমূল পরিবর্তন—এই নিয়ে এ-উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাহিনী। তৃতীয় ও শেষ প্রজন্মের নায়ক ধ্রুব, বিশ শতকের উপান্তপর্বে এক দিগভ্ৰষ্ট, উদ্ধত বিদ্রোহী যুবা। ধ্রুবর স্ত্রী রেমি, যার সঙ্গে এক অদ্ভুত সম্পর্ক তার। কখনও ভালবাসা, কখনও উপেক্ষা, কখনও-বা প্রবল বিরাগ। অথচ রেমির ভালবাসা সাত-আঘাতেও অবিচল। একদিকে রেমির সঙ্গে সম্পর্ক অন্যদিকে পিতা কৃষ্ণকান্তের মধ্যে সেই ব্ৰহ্মচারী ও স্বদেশের জন্য উৎসর্গীকৃত প্রাণসত্তাটিকে খুঁজে না-পাওয়ার ব্যর্থতায় ক্ষতবিক্ষত ধ্রুবর আশ্চর্য কাহিনী নিয়েই শেষ পর্ব। শুধু তিন প্রজন্মের তিন নায়কের ব্যক্তিগত কাহিনীর জন্যই নয়, এ-উপন্যাসের বিশাল প্রেক্ষাপটে আরও বহু বিচিত্র ও কৌতুহলকর শাখা-কাহিনী, এবং এর চালচিত্রে স্বদেশী আন্দোলন, দেশভাগ ও স্বাধীনতা পরবর্তী উত্তাল দিনরাত্রির এক তাৎপর্যময় উপস্থাপনার জন্যও ‘দূরবীন’ চিহ্নিত হবে অবিস্মরণীয় সৃষ্টিরূপে।

    শুধুদূরকেই কাছে আনে না, উল্টো করে ধরলে কাছের জিনিসও দূরে দেখায় দূরবীন। ‘দূরবীন’ উপন্যাসের নামকরণে যেমন সূক্ষ্মতা, রচনারীতিতেও তেমনই অভিনবত্ব এনেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। দ্বিস্তর এই উপন্যাসে সেকাল ও একাল, অতীত ও বর্তমান এক অনন্য কৌশলে একাকার।

    শীর্ষেন্দুর লেখাতে সময় হচ্ছে মুখ্য বিষয়। তাঁর এই অসাধারণ কীর্তি ‘দূরবীন’ এ লেখক উনিশ শতকের ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রজন্মগত ব্যবধান (জেনারেশন গ্যাপ) খুব সাবলীল ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

    উপন্যাসটা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মূলত হেমকান্ত এবং ধ্রুবর জবানীর মাধ্যমে। কিন্তু আসলে এদের দুজনের কেউই এই উপন্যাসের মূল নায়ক নন। আসল নায়ক হচ্ছেন কৃষ্ণকান্ত। উপন্যাসটা দুইটা অংশে বিভক্ত, আর দুই অংশের বর্ণনাই লেখক চমৎকার ভাবে লিখে গিয়েছেন। শতাধিক পরিচ্ছেদের বিশাল উপন্যাস; কিন্তু কোথাও খারাপ লাগে নি। বিজোড় পরিচ্ছেদ গুলো (১, ৩, ৫…) প্রথম কাহিনীর অন্তর্গত এবং জোড় পরিচ্ছেদ গুলো (২, ৩, ৪…) দ্বিতীয় কাহিনীর অন্তর্গত। কেউ যদি প্রথম অংশ গুলো পড়ে শেষ করেন, তবে দ্বিতীয় অংশে তিনি প্রথম অংশের পর থেকে ধারাবাহিক বর্ণনা পাবেন! আর গল্পের প্রয়োজনেই এখানে রেমি এবং ধ্রুবর যে মধ্যে যে ভালোবাসার টানাপোড়েনের চিত্র আঁকা হয়েছে তার মধ্যেও অনেক সময় আবেগে ডুবে গিয়েছি। কখনো মনে হয়েছে যে রেমিই ঠিক আবার কখনও মনে হয়েছে যে ধ্রুবই ঠিক। গল্পের প্রয়োজনে অনেক চরিত্রেরই আগমন ঘটেছে যার প্রত্যেকটিই উপভোগ্য।

    এছাড়াও উপন্যাসটিতে ইংরেজদের হাত থেকে ভারতের স্বাধীনতার চিত্র খুব বড় ভাবে না হলেও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। স্বাধীন হওয়ার আগে ও পরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার একটা চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম অংশের ঘটনাস্থল আমাদের বাংলাদেশ এই এবং দ্বিতীয় অংশের ঘটনাস্থল পশ্চিমবঙ্গ। প্রথম অংশটুকুতে কৃষ্ণকান্তের সংগ্রাম এবং সাফল্য এবং দ্বিতীয় অংশে এর পরিণতি এবং কৃষ্ণকান্ত ও ধ্রুব এর মধ্যে ব্যবধান তুলে ধরা হয়েছে।

    ‘দূরবীন’ উপন্যাস প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালের বইমেলায়; মুদ্রণ সংখ্যা ৩৩০০। আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেডের পক্ষে ফণিভূষণ দেব কর্তৃক ৪৫ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা ৭০০ ০০৯ থেকে প্রকাশিত এবিং আনন্দ প্রেস অ্যাণ্ড পাবলিকেশনস প্রাইভেট লিমিটেডের পক্ষে দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু কর্তৃক পি ২৮৪ সি আই টি স্কিম নং ৬ এম কলকাতা ৭০০ ০৫৪ থেকে মুদ্রিত। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন অমিয় ভট্টাচার্য। উপন্যাসটির প্রথম বিশ্ববাণী সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৭২ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠে; প্রকাশক ব্রজকিশোর মণ্ডল, বিশ্ববাণী প্রকাশনী, ৯/১ বি মহাত্মা গান্ধী রোড, কলকাতা-৯। মুদ্রাকর পার্বতীচরণ রায়, দি গৌতম প্রিণ্টিং ওয়ার্কস প্রা. লি. ২০৯, এ বিধান সরণি, কলকাতা-৬।

    বর্তমান সংস্করণে অনুসৃত হয়েছে আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত প্রথম সংস্করণ জানুয়ারি ১৯৮৬, দ্বাবিংশ মুদ্রণ জানুয়ারি ২০২২। এই সংস্করণের প্রচ্ছদ এঁকেছেন সুব্রত চৌধুরী।

    “রা-সা”

    পূজনীয়

    শ্রীঅমরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (বড়দা)

    শ্রীচরণকমলেষু

  • গোঁসাইবাগানের ভূত

    গোঁসাইবাগানের ভূত

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    [bname]

    গোঁসাইবাগানের ভূত


    কিছু ভুতুড়ে কথা

    এই উপন্যাসটি শারদীয় ‘আনন্দমেলা’-য় প্রথম বেরোনোর পরই অনেকে প্রশ্ন তুলেছিল, রামনামকে ভূতের যদি এতই ভয় তবে ভূতের নিজের নাম কেন নিধিরাম? ভারি শক্ত প্রশ্ন। মাথাটাকে চুলকে আমি তখন বোঝালাম, নামের ‘রাম’ আর ‘রামনাম’ তো এক নয়! নিধিরামের যে রাম, তার সঙ্গে দশরথের বড় ছেলের সম্পর্ক নেই কোনো। তাছাড়া সাপের বিষ কি সাপকে লাগে? তারপর ফের প্রশ্ন উঠল, তাই যদি হবে তবে রাম কবিরাজের নাম শুনে ভূত পালায় কেন? সেও তো নাম। আমি কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, তা বটে। তবে কিনা কবিরাজ মশাইয়ের নামটা একেবারে সোজাসুজি রাম, তার আগে বা পরে কিছু যুক্ত নেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হল, ভূতের মনস্তত্ত্বও বোঝা ভার। কখনো তারা রামনাম শুনে আঁতকে ওঠে, কখনো কোনো কোনো রামকে তারা কেয়ারই করে না। আবার ধরো না কেন, কোনো ভূত যদি ভুল করে বে-খেয়ালে রাম কবিরাজের নাম করেই বসে, তাহলে আমাদের কী করার আছে? ভূতেরও তো ভুল হয়! পুরো ব্যাপারটাই ভারি গণ্ডগোলের। আমি তাই লেখাটা শোধরালাম না। রামনাম আর রামের নাম নিয়ে গণ্ডগোল সহ-ই বইটা ছাপা হল। তোমরা বরং কোনো ভাল ভূত পেলে তার কাছ থেকে সত্যি কথাটা জেনে নিও।

  • হরিদাসের গুপ্তকথা

    হরিদাসের গুপ্তকথা

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    গ্রন্থপরিচয়

    ‘হরিদাসের গুপ্তকথা’ নামের বইটি বেশ দুষ্প্রাপ্য। বইটি সম্পর্কে অনেকের ধারণা যে এটি বোধহয় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আপাত নিষিদ্ধ ধরনের কোন বই। কিন্তু বইটি এককালে বেশ জনপ্রিয় ছিল। বইটির লেখক শ্রীভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩১০ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ মোটামুটি ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে। নিঃসন্দেহে বইটি তারও আগে লেখা হয়েছিল। আর কাহিনীর ঘটনাক্রম তারও বেশকিছু বছর আগেকার। উপন্যাসটি চার খণ্ডে বিভক্ত।

    কাহিনীর নায়ক হল হরিদাস নামের একটি ছেলে। কাহিনীর আরম্ভের সময়ে তার বয়স চোদ্দ বছর। মোটামুটি হিসাব করে দেখা যায় তার জন্ম ইংরেজি ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে। হুগলি জেলার সপ্তগ্রামে চোদ্দ বছর বয়েসে হরিদাসের যাত্রা শুরু হয় এক গ্রামের পাঠশালা থেকে। সে নিজের কোন পরিচয় জানত না। পাঠশালার গুরুমশাইয়ের বাড়িতে সে লালিত। গুরুমশাইয়ের মৃত্যুর পর সে বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচিত হতে বাধ্য হয়। এরপর সাত-আট বছর নানা ঘটনার ঘনঘটার মধ্যে দিয়ে এই দরিদ্র সহায় সম্বলহীন অনাথ বালক কিভাবে নিজের পরিচয় জানল এবং পরিশেষে বিরাট ধনী জমিদারে পরিণত হল তারই রোমাঞ্চকর আখ্যান এই বই।

    উপন্যাসটিতে হরিদাসের নায়িকাও উপস্থিত। তার নাম অমরকুমারী। নানা বিপত্তি পেরিয়ে শেষ অবধি হরিদাস এবং অমরকুমারীর মিলন হয়।

    উপন্যাসটিতে প্রচুর চরিত্র। উপন্যাসের শেষপ্রান্তে এসে প্রতিটি চরিত্রেরই পরিণাম দেখানো হয়েছে। নানা রকম নাটকীয়তায় ভরপুর এই উপন্যাস। শেষে এসে সব কিছুকেই একটি বিন্দুতে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব রহস্যেরই সমাধান করা হয়েছে। বইটিকে একটি অ্যডভেঞ্চারের গল্প বললেও ভুল হয় না। প্রায় ৬৮০ পাতার বইটিতে প্রচুর রোমাঞ্চকর ঘটনার সন্নিবেশ ঘটেছে। নানা রকম চুরি, ডাকাতি, জালিয়াতি, খুন-খারাপি, আত্মহত্যা, কিডন্যাপিং, পুলিশ-দারোগা, মামলা-মোকদ্দমা, ভূতুড়ে ঘটনা এবং ষড়যন্ত্রের ঘটনায় ঠাসা। সিপাহী বিদ্রোহের চাক্ষুষ বর্ণনাও এতে স্থান পেয়েছে।

    ঊনবিংশ শতকের বাঙলি এবং ভারতীয় জীবনের নানা বিচিত্র ঘটনার বর্ণনা এতে রয়েছে। এর সাথে আরো যুক্ত হয়েছে নানা রকম কেচ্ছা এবং ব্যাভিচারের ঘটনা। এবং প্রেমের ঘটনাও কিছু কম নেই। তখনকার সমাজব্যবস্থার একটি বাস্তব চিত্র দেখা যায়। বাঙালি বাড়িতে ব্যভিচারের ঘটনা যে কত বেশি ছিল তার বর্ণনা পড়লে অবাক হতে হয়। অনেক পুরুষই কোন আত্মীয় মহিলার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক রাখতেন এবং অনেক সময়ে বিপদে পড়লে তাদের নিয়ে গৃহত্যাগও করতেন। বেশিরভাগ সময়েই তাঁরা বারাণসীর মত কোন তীর্থস্থানে গিয়ে নাম পরিচয় এবং সম্পর্ক ভাঁড়িয়ে থাকতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক সম্মানও আদায় করতেন।

    লেখক লিখছেন যে– “বাঙ্গালীদলের বেশী কলঙ্ক। জাতিতে জাতিতে, জাতিতে বিজাতিতে, সম্পর্কে সম্পর্কে, সম্পর্কে নিঃসম্পর্কে, বাঙ্গালী নর-নারী পাপলিপ্ত হলেই নিরাপদের আশাতে কাশীতে পালিয়ে আসে; মাতুলের ঔরসে ভগিনী-পুত্রী, পিতৃব্যের ঔরসে ভ্রাতৃকুমারী, ভ্রাতার ঔরসে বিমাতৃকুমারী, ভাগিনেয়ের ঔরসে মাতুলানী, জামাতার ঔরসে শ্বশ্রু-ঠাকরানী, শ্বশুরের ঔরসে যুবতী পুত্রবধূ গর্ভবতী হলেই কাশীধামে পালিয়ে আসে! গর্ভগুলি নষ্ট কোত্তে হয় না, কাশীর পবনের প্রসাদে বংশ-রক্ষা হয়।”

    মনে রাখতে হবে এই বর্ণনার সময়কাল ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহেরও আগের! খুনোখুনির ঘটনাও বেশ কিছু আছে। আর আছে সেই সময়ের ভালো-খারাপ পুলিশ এবং বিচার ব্যবস্থার বর্ণনা। উপন্যাসটিতে পুলিশকে বেশ করিৎকর্মা হিসাবেই দেখানো হয়েছে। তবে তারা যে উৎকোচ গ্রহনেও সিদ্ধহস্ত তার ঈঙ্গিতও রয়েছে।

    কাহিনীর পটভূমিকাও বদলেছে বারে বারে। তৎকালীন ভারতবর্ষের নানা তীর্থস্থানের বর্ণনাও এতে রয়েছে। পশ্চিমের গুজরাট থেকে আরম্ভ করে পূর্বের ত্রিপুরা পর্যন্ত উপন্যাসটির ব্যাপ্তি। কাহিনী ছুঁয়ে গেছে ভারতের বিভিন্ন শহর যেমন বরোদা, আমেদাবাদ, আগ্রা, মথুরা, বৃন্দাবন, পাটনা, বারাণসী, কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, ঢাকা, বর্ধমান, কানপুর, গৌহাটি। এই কাহিনী যে সময়ের সেই সময়ে ভারতে রেলপথ ছিল না বা সবে স্থাপিত হতে আরম্ভ করেছে। তাই বিভিন্ন স্থানে যাওয়াও অনেক কষ্টকর ছিল এবং তাতে বিপদের ভয়ও ছিল যথেষ্ট।

    হরিদাসের নিজের বক্তব্য ও মন্তব্য থেকে লেখকের ব্যক্তিতের বিষয়েও জানতে পারি। ইংরেজ শাসন বিষয়ে তিনি বেশ খুশি তবে সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে তিনি উভয় পক্ষেরই নৃশংসতার জন্য সমালোচনা করেছেন। রানী ভিক্টোরিয়াকে তিনি ভক্তি করতেন। তিনি ছিলেন বাল্যবিবাহ এবং জাতিভেদ প্রথার একজন সমর্থক। এবং অসবর্ণ বিবাহ প্রথার বিরোধী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সৎ এবং উপকারী।‘হরিদাসের গুপ্তকথা’ একটি উপন্যাস হলেও পড়লেই বোঝা যায় যে এটির পিছনে অনেক সত্য, লেখকের নিজের চোখে দেখা ঘটনাও রয়েছে। এটিকে একটি ঐতিহাসিক বিবরণও বলা যায়। তাই ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগের একটি চমৎকার বর্ণনা আমরা পাই।

  • উপমহাদেশ

    উপমহাদেশ

    আল মাহমুদ

    [book-name]

    গ্রন্থকথা

    ‘উপমহাদেশ’ কবি আল মাহমুদ রচিত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার জীবনচিত্রকে আশ্রয় করে লেখা উপন্যাসটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা না গেলেও যুদ্ধের ভয়াবহতা, হিংস্রতা, যুদ্ধের মাঝে প্রেম, দেশপ্রেম সব কিছুরই প্রতিচ্ছবি সত্যনিষ্ঠ ভাবে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন লেখক। এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হিসেবেই বিবেচিত।

    মুক্তিযুদ্ধের এমন একটি দিক এ উপন্যাসে উঠে এসেছে যেদিকটা নিয়ে সাধারণত আলোচনা হয় না। ইতিহাসের প্রধান স্রোতের অনালোচিত এই দিকটি তুলে ধরাই এই উপন্যাসের একমাত্র সার্থকতা।

    কবি হাদী মীর। ঢাকায় পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলের লাইব্রেরিয়ান তিনি। ঢাকা যখন পুরোপুরিভাবে পাকিস্তানিদের দখলে চলে গেছে, চারিদিকে পাকিস্তানিদের অমানবিক অত্যাচার ও লুটপাটের কারণে লোকেরা ঢাকা ছেড়ে প্রথমে গ্রামে এবং গ্রামেও না টিকতে পেরে ভারতে পাড়ি দেন। সেই দলের একজন কবি সাহেব। তিনি তার স্ত্রীর থেকে বিছিন্ন হয়ে তার জন্য বেশ কিছু দিন অপেক্ষা করে থেকে ভারতে যাবার সিদ্দান্ত নেন। কবির বোন ও ভগ্নিপতি একজন মুক্তি যোদ্ধাকে দিয়ে চিঠি লিখে দিয়ে কবিকে খুব শীঘ্র ভারতে চলে যেতে বলেন। তিনি অন্য এক মুক্তিযোদ্ধার মাধ্যমে জানতে পারেন যে কবির স্ত্রী হামিদা নিরাপদে কলকাতায় পৌঁছে গেছে।

    ভৈরব ও আশুগঞ্জে যখন পাক হানাদরেরা এসে অত্যচার শুরু করলে সেখানকার সকলে নবাবপুরে এসে পালিয়ে বাঁচে এবং সেখান থেকেই নৌকায় করে ভারতে যাবার জন্য রওয়া দেয়। এদেরই সাথে কবি আছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা আনিস এদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। নৌকায় মোট ৩০জন লোক যেতে পারে কিন্তু সেখানে ৩২ জন্য ওঠার পরেও দুটি মেয়ে সীমা ও নন্দিনী এসে কান্না কাটি শুরু করে। সীমার স্বামী ঢাকায় গিয়ে আর ফিরতে পারে নি। সীমা একটা স্কুলের শিক্ষিকা। হিন্দুদের বাড়ীতে থাকাটা এখন খুব কঠিন হয়ে যাওয়াতে স্বামীর ফেরার অপেক্ষা না করে বোন নন্দিনীকে নিয়ে সে পথে বের হয়েছে। দুই বোন এসে অনেক কান্না কাটি করার পর কবি জোর করে আনিসকে বলে তাদেরও নৌকায় তুলে নেয়।

    কিছু দূর যাবার পর গুলির শব্দ শুনে সবাই খুব ভয় পেয়ে যায়। পাকিস্তান টহলদারের তাদের নৌকাটা অন্ধকারে দেখতে না পারলেও অনুমান করতে পেরেছে। অনেক সাবধানে তারা একটা ঘাটে এসে নৌকা ভিড়িয়ে উপরে উঠলে চারিদিক থেকে কিছু লোক তাদের ঘিরে ধরে। সবার হাতে অস্ত্র থাকলেও তারা মুক্তি বাহিনীর লোক নয়। নকশাল বাহিনীর লোক। অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধা সাথে আছে জানলে বিপদ হতে পারে ভেবে আনিস পানিতে ডুব দিয়ে পালিয়ে চলে যায়। নন্দিনীকে স্ত্রী বলে পরিচয় দিয়ে এবং কাছাকাছি কোন গ্রামে কবির পরিচিত আত্মীয়ের কথা বলে তাদের হাত থেকে বেঁচে যায় তারা।

    অন্ধকারের মাঝে লাইন ধরে একজন আর একজনের কাপড় ধরে পথ চলতে চলতে সকলে একটা মাঠের কাছে এসে পৌঁছায়। কিন্তু এখানে এসে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে যায়।

    সাথে যে কয়জন মহিলা ছিল তার সবাই নিম্ন শ্রেণীর কৃষক পরিবারে। এর মাঝে সীমা ও নন্দিনী সম্ভ্রান্ত পরিবারের,  তার উপর দেখতে সুন্দরী। রাজাকারদের সাথে কবির তর্কাতর্কির ফলে সবাইকে ছেড়ে দিয়ে কবি, সীমা ও নন্দিনীকে আটকে রাখে। সীমা ও নন্দিনীর পরনের শাড়ী খুলে কবিকে খুব শক্ত করে বেঁধে নির্জন গ্রামের একটি বাড়ীর ঘরে আটকে রাখে তাদের। কবির পাশের ঘরে সীমা ও নন্দিনীকে।

    কবিকে অনেক শারীরিক অত্যচার সহ্য করতে হয় ফলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। হঠাৎ করে কবির কানে ভেসে আসে কোন নারীর আর্ত চিৎকার ও গোংরানি। এটা কি সীমা ও নন্দিনীর রাজাকারদের হাত থেকে সম্মান বাঁচানোর জন্য প্রতিবাদ না কি কবির স্বপ্ন…?

    মুক্তিযুদ্ধকে ভিত্তি করে রচিত হয়েছে অনেক উপন্যাস, সেগুলোর প্রতিটি নিজস্ব স্বকীয়তা উদ্ভাসিত। বিষয়বস্তু এক হলেও অনুভূতি সবসময় নতুন। লেখকের বর্ণনাতে চোখের সামনে চলে এসেছে সেই সময়টা। তবে লেখক ‘উপমহাদেশ’ উপন্যাসটিতে মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি দেশের সংখ্যালঘু রাজনৈতিক দলের আর্দশ ও উদ্দেশ্যকে সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। একই সাথে সেই সময় তাদের অবস্থা ও সরকার পক্ষের সাথে তাদের সম্পর্কটাও।

    আরও একটা নাড়া দেবার মত একটা বিষয় লেখক তুলে ধরেছেন, সেই সময়ের ভারতীয় কবি সাহিত্যিকদের মানসিক অবস্থা ও আমাদের দেশের পরিস্থিতি নিয়ে তাদের উদ্বেগ ও সহযোগিতা।

    পাঠক উপন্যাসটিকে প্রশংসা যেমন করেছেন তেমনি নিন্দাও করেছেন কেউ কেউ—কৃত্রিম সংলাপ, এলোমেলো বাক্য বিন্যাস, উদ্ভট ও অন্তঃসারশূন্য কাহিনী, সর্বোপরি কাঁচা হাতে জোরপূর্বক লেখা। কারও মতে ‘বাস্তবতা বহির্ভূত একেকটা ঘটনার অবতারণা’! মাত্র কয়েকদিন আগে রাজাকারদের হাতে সারারাত ধরে নির্যাতিতা নন্দিনী কী করে হাদী মীর বা তার পরিবারের সাথে এতো স্বচ্ছন্দ মেলামেশা করে অথবা হাদী মীরের স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও কী করে তাঁর সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে এত আগ্রহী হয় ‘একজন বীরাঙ্গানা’? যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন বা যারা নীলিমা ইব্রাহিমের “আমি বীরাঙ্গনা বলছি” বা শাহীন আখতারের “তালাশ” পড়েছেন, তাদের কাছে ‘উপমহাদেশে’র কাহিনী উদ্ভট এবং বাস্তবতা বহির্ভূত মনে হওয়াই স্বাভাবিক।

    অপরদিকে হাদী মীর এমন একজন দুর্বল চরিত্রের মানুষ, বোন-দুলাভাইয়ের বাসায় একটা বিবাহিত মানুষ পরনারীকে নিয়ে তাদের সামনে শুয়ে থাকছে! আদব লেহাজ বলে যদি এদের কিছু থাকে! যুদ্ধের দোহাই দিয়ে কত কিছুই না দেখালেন এই বইতে আল মাহমুদ! আর শেষটায় তো দুই নারীকে নিয়ে হাদী মীরের সংসারকেও জায়েজ করে দিলেন ধর্মের দোহাই দিয়ে। হামিদা নারী মুক্তিযোদ্ধা বলে যতটা না সম্মান আদায় করে নিয়েছিল, শেষটায় এসে ওর এই ব্যাপারটা একদমই ভাল লাগল না। বইয়ের সমাপ্তির প্রয়োজনে কত কীই না করেছেন লেখক!

    সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা কবি আল মাহমুদ, যুদ্ধের সময় কলিকাতাতে তাঁর কবিতা চর্চা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। এমন সমালোচনা একেবারে অমূলক নয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি বর্তমান থাকলেও যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। এর প্রমাণ রয়েছে ‘উপমহাদেশ’ উপন্যাসের পরতে পরতে।

    গল্পে যুদ্ধের আবহ তৈরি করতে লেখক ব্যর্থ, হয়ত সেই চেষ্টাও করেননি তিনি! বইয়ের দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে অদ্ভুত, অবাস্তব, যুক্তিহীন এক প্রেমকাহিনী। পাশাপাশি লম্বা লম্বা অসংলগ্ন সংলাপ অপ্রাসঙ্গিক লেগেছে অনেকাংশেই। মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থী নেতাকর্মীদের অবদানের যে চিত্র আল মাহমুদ ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন সেটাও ফিকে হয়ে গেছে প্রেমকাহিনীকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে!

    ‘উপমহাদেশ’ থেকে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করছি—

    ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাথে নীতিগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু স্বতন্ত্র দলের অংশগ্রহণের কথা আমরা জানি। বামপন্থী এরকম একটি দলের (সম্ভবত কাল্পনিক) কার্যক্রমের কথা উঠে এসেছে এই বইতে। ভারতের নকশাল পন্থীদের সাথে যোগাযোগ থেকে শুরু করে তাদের কিছু অপারেশনেরও কথা বইতে এসেছে। বিষয়টি একেবারে অনৈতিহাসিক।

    বইয়ের শুরুতেই একটা জায়গায় দেখা যায় জিঘাংসা বশত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা একজন রাজাকারের কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণ করছে। এটা আসলে সম্ভব ছিল? অথবা এমন ঘটনার কল্পনা করে তিনি কি মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারদের একই সারীতে দাঁড় করালেন?

    উপন্যাসের শেষের দিকে এসে— নন্দিনী যে ক্যাম্পে ট্রেইনিং নিতে যায় ওখানেও দেখা যায় ‘মেয়ে মুক্তিযোদ্ধা মানেই পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের দেহ দান করলেই কর্তব্য শেষ’ এইরকম একটা অনাচার। এই ব্যাপারগুলো কতটুকু সত্যি বলে বিশ্বাস করা যায়? এই ঘটনার কথা ইতিপূর্বে কেউ বলেছেন বা লিখেছেন কিনা আমার জানা নেই। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে এমন ঘটনার উল্লেখ আর কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই। তবে আল মাহমুদ যে খানিকটা “Devil’s Advocacy” করেছেন এদিক থেকে ব্যাপারটা ভালই লেগেছে।

    এখানে লক্ষ্য করার মত আরেকটা ব্যাপার হল, ইমাম আর পারুলের পরিবারের অবস্থা—যারা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয় নিয়েও দেখা যায় সরকারের বড় পদে চাকরী করার দরুন রাজার হালে দিনাতিপাত করছেন—তাদের টেবিলে রুটি-মাখন, মুরগী, কলের বিশুদ্ধ পানি এবং তাদের মেয়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে। এই ব্যাপারটা বেশ চোখে লাগে। তবে এই পরিবারটিতে সম্ভবত সেই পরিবারের ছায়া পড়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় আল মাহমুদ যে পরিবারে আশ্রয় পেয়ে বাবুগিরি করে কলকাতায় সময় কাটিয়েছিলেন—

    আল মাহমুদ মূলত একজন কবি। কবি হলেও কথাসাহিত্যে পারদর্শীতা কম নয়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে। তবে যতগুলো পড়েছি এই বইটা ভিন্ন মনে হয়েছে। একটা যুদ্ধ ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পর্কে কতখানি প্রভাব ফেলে তা বোঝাতে চেয়েছেন লেখক। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং তাদের সংঘাতের যে ইঙ্গিত দিয়েছেন তা বোধকরি খুব কম ঔপন্যাসিকই লিখেছেন। তবে যে জিনিসটা অন্য কোথাও পাইনি তা হ’ল মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক প্রতিশোধ স্বরূপ রাজাকার পরিবারের উপর পাশবিক অত্যাচার। এমন ঘটনা যুদ্ধের সময় ঘটেছিল কিনা জানা নেই।

    সৈয়দ হাদী মীরকে খুবই দূর্বল চিত্তের মানুষ মনে হয়েছে, যখন তিনি দুইটি নারীর দিকেই ঝুঁকেছেন তবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তবে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের বেলায় সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। হামিদা বানু ও নন্দিনী ভট্টাচার্য দুইজনই স্বাধীনচেতা নারী হলেও স্বভাবে বৈপরীত্য রয়েছে। কবির ভগ্নিপতি ও ভগ্নি— তৌফিক ইমাম ও পারুলের আরাম আয়েশের জীবন যুদ্ধকালীন কলকাতায় অবস্থানরত উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গের জীবনযাপনের চিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

    ‘উপমহাদেশ’ উপন্যাসটি উৎসর্গ করা হয়েছে “মিলন ইসলাম”কে।

    এই উপন্যাস সম্পর্কে লেখকের বক্তব্য হুবহু তুলে দিচ্ছি— “এ বইয়ের সকল চরিত্রই কাল্পনিক। তবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন কবি সাহিত্যিক, আমলা, বুদ্ধিজীবীর নাম উপন্যাসে ব্যবহৃত হয়েছে কেবল মুক্তিযুদ্ধে তাদের সম্পৃক্ততাকে সম্মানিত করতে। তারা সর্বস্ব ত্যাগ করে এই সংগ্রামে সামিল হয়েছিলেন বলেই। প্রকৃতপক্ষে উপন্যাসের কাহিনীর সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। উপন্যাস তো উপন্যাসই। —লেখক।

    আমরাও কবি আল মাহমুদের ‘উপন্যাস তো উপন্যাসই’ কথাটাকে গুরুত্ব দিয়ে মেনে নিচ্ছে, ‘উপমহাদেশ’ উপন্যাসই, এতে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা বা ইতিহাসের ছিঁটেফোটা খুঁজে দেখার প্রয়োজন নেই।

  • কর্নেল সমগ্র

    কর্নেল সমগ্র

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book]

    প্রসঙ্গত

    শুরুটা ছিল আকস্মিক এবং চটজলদি। সত্তরের দশকের গোড়ার দিকের কথা। শ্রদ্ধেয় কবি মণীন্দ্র রায় তখন সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকার সম্পাদক। একদিন ডাক দিয়ে বললেন, শিগগির একটা উপন্যাস চাই। ধারাবাহিক বেরুবে। ফিরে গিয়েই লিখতে বসো।

    তৎকালে রুজির ধান্দায় সাধ্যাতীত লিখে-লিখে মগজ খালি। অসহায় দৃষ্টে স্মৃতির দিকে তাকালাম। তারপর দেখতে পেলাম একটি মানুষকে।

    মুখে সান্টা ক্লোসের মতো সাদা গোঁফদাড়ি। টকটকে ফর্সা রঙ। পরনে প্যান্টশার্ট। পিঠে আঁটা একটা কিটব্যাগ। বাইনোকুলারে দূরের কিছু দেখছিলেন। মুখ তুলতে গিয়ে টুপি খসে পড়ল এবং রোদে চকচক করে উঠল চওড়া টাক। টুপিটা কুড়িয়ে টাক ঢেকে এগিয়ে গেলেন একটা ধ্বংসস্তূপের কাছে। সেখানে ফুলে ভরা ঝোপ। গুঁড়ি মেরে হাঁটু ভাঁজ করে তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ব্যাপারটা রহস্যজনক।

    তবে ভেবেছিলাম সায়েব-ট্যুরিস্ট। কারণ ঘটনাস্থল লালবাগের (মুর্শিদাবাদ) প্রখ্যাত নবাবি প্রাসাদ হাজারদুয়ারি। ১৯৫৬ সালের শীতকাল। আনাচে-কানাচে ‘গাইড’-রা ওত পেতে থাকে। মওকা বুঝে একজন ‘গাইড’ তাঁকে ভুলভাল ইংরিজিতে ধ্বংসস্তূপটার ইতিহাস শোনাতে গেল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তিনি মুচকি হেসে সাদামাটা বাংলায় বলে উঠলেন, এই প্রজাপতিগুলো বড্ড সেয়ানা!

    ‘গাইড’ বেচারা হকচকিয়ে গেল। আমিও।

    তো কেন জানি না মানুষটিকে ভুলতে পারিনি। এ-ও জানি না কেন তাঁকে অবসরপ্রাপ্ত কোন সামরিক অফিসার বলে মনে হয়েছিল।

    উপন্যাস লিখতে গিয়ে অতবছর পরে আমার মধ্যে তাঁর ছায়া পড়ল! পটভূমি এক ঐতিহাসিক ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু অদ্ভুতভাবে এসে গেল অন্ধকার বিশাল ঘরের মধ্যে সারবদ্ধ কবর। পাথরে বাঁধানো সব কবর। আসলে স্মৃতির ওপর স্মৃতির ছায়া। ষাটের দশকের শেষাশেষি দিল্লিতে আলাপ হয়েছিল এক সাংবাদিক এবং লেখকের সঙ্গে। ‘দরবেশ’ ছদ্মনামে তিনি লিখতেন। আলাপ থেকে বন্ধুতা। দুজনে মিলে টো টো করে ঘুরে বেড়াতাম। কুতুবমিনার যাওয়ার পথে সফদরজঙ্গ বিমানঘাঁটির কাছে তিনি আমাকে সেই ভুতুড়ে গা-ছমছম করা কবরখানায় ঢুকিয়েছিলেন।

    শুধু এটুকু মনে পড়ছে, একটা অন্ধকার কবর প্রাসাদের মধ্যে একটা টাটকা লাশ ফেলে রেখে সেই ফাদার ক্রিসমাসকে ঢুকিয়ে দুষ্টুমি করার মতলব ছিল। এবং লাশটা হবে কোনও এক যুবতীর।

    কিন্তু তখনও জানতাম না আমি ‘Whodunit’-এর ফাঁদে পড়তে যাচ্ছি। কিছুটা এগিয়েই টের পেলাম। তারপর সম্পাদককে কাঁচুমাচু মুখে জানালাম কী সাংঘাতিক কাণ্ড বাধিয়ে বসে আছি। তিনি বললেন, ঠিক আছে। এটা একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নাও।

    এভাবেই আমার প্রথম রহস্যউপন্যাস ‘ছায়া পড়ে’ ধারাবাহিক বেরিয়েছিল সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকায়। ১৯৫৬ সালের শীতকালে মুর্শিদাবাদ শহরের খণ্ডহরে দেখা সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক হয়ে উঠেছিলেন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। তাঁর সায়েবি হাবভাব বহুবছর ধরে আমার মনে একজন খ্রিস্টানের আদর্শ বহাল রেখেছিল। ক্রমশ আমার মনে হয়, তাঁর বিশেষ কোনও ধর্মপরিচয়ের দরকারটা কী? তিনি একজন প্রকৃতিবিদ এবং রহস্যভেদী, এই তো যথেষ্ট। ক্রমে ক্রমে বুঝেছিলাম, কোনও-কোনও ক্ষেত্রে রহস্যভেদীর একজন সহকারী বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দরকার হয়, যাঁর মুখ দিয়ে কাহিনীটি বর্ণনার সুবিধা আছে। তাই আনলাম সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরিকে। কর্নেলের মতো চরিত্রের আর একটা বড় সমস্যা ছিল। সেটা অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থাসংক্রান্ত সমস্যা। কর্নেলের মতো চরিত্রের মধ্যে বিশেষ করে এটি নৈতিক এবং অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাই সরকার এবং পুলিশের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে দিতে হল। বাস্তব অবস্থা যা-ই হোক, এই সম্পর্ক আমার কাছে একটি মডেল। আবার, রহস্যের জটকে আপাতদৃষ্টে জটিলতর করার জন্য পরবর্তীকালে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ কৃতান্ত কুমার হালদারের আবির্ভাব ঠেকাতে পারিনি, যিনি কে. কে হালদার ওরফে হালদারমশাই নামে পরিচিত। আসলে রহস্যের জট জটিলতর করতে গিয়ে এঁকে দিয়ে অদ্ভুত-অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়ে মজা পেয়েছি এবং উল্টে রহস্যের সব জটিলতা খুলেই গেছে। হালদারমশাই আমার রিলিফ।

    সব রহস্যভেদীরই আচরণগত কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। কর্নেলের মধ্যে আমার আগোচরে সেগুলি এসে গেছে। কফি ও চুরুটের প্রতি মাত্রাধিক আসক্তি, স্নেহভাজনদের ডার্লিং বলা, বিচিত্র উদ্ভিদ নিয়ে বাগান করা, কীটপতঙ্গ নিয়ে গবেষণা এবং বিদেশি পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখা, চোখ বুজে দাড়ি বা টাকে হাত বুলানো ইত্যাদি। আবার বলছি, আগে থেকে ভেবেচিন্তে তাঁকে তৈরি করিনি। কিন্তু তাঁর অতীত সামরিক জীবনকে কাজে লাগানোর সুবিধা পেয়েছি। তাই ছোটদের জন্য রহস্য-রোমাঞ্চ-অ্যাডভেঞ্চার লিখতে গিয়েও কর্নেলকেই ব্যবহার করেছি। ছোটদের কাছে কর্নেলের আদর কত বেশি, তার প্রমাণ এখনও পাই। একবার একটি কাহিনীতে আমার নিজের ফোন নম্বর কর্নেলের করে দেওয়ার দুর্ভোগে এখনও মাঝে মাঝে ভুগি। হঠাৎ কচি গলায় ফোন আসে, কর্নেল আছেন? দারুণ রহস্য।…

    হিতৈষী বন্ধুরা আমাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, কর্নেল তোমাকে ডোবাবে। সিরিয়াস সাহিত্য-টাহিত্য তোমার কাছে আর কেউ নেবে না।

    কে জানে! আমার কাছে রহস্যকাহিনী আসলে তাস নিয়ে পেশেন্স খেলা। গাজোয়ারি তথাকথিত সিরিয়াস সাহিত্যরচনা একটা অপচেষ্টা। তার চেয়ে বরং স্রেফ বিনোদনদান নিরাপদ এবং এতে মগজ তাজা থাকে। জটিল একটা অঙ্ক কষে ফেলতে পারলে মগজে যেমন একটা তরতাজা ভাব এসে যায়। তাই বাঘা বাঘা পণ্ডিতজনেরা রহস্যকাহিনীর গোঁড়া ভক্ত। অবাক লাগে ভাবতে, তলস্তয়ের মতো বিরাট লেখকও সম্ভবত নিজের অজ্ঞাতসারে একটি রহস্যকাহিনী লিখে ফেলেছিলেন। তবে নিজেও বুঝি, রহস্যকাহিনী (যা প্রকৃতপক্ষে গোয়েন্দাকাহিনী) লেখাটা তত সোজা নয়।

    এর সাফল্য নির্ভর করে বুদ্ধির প্রাচুর্যের ওপর। এ ব্যাপারে হৃদয় বা ভাবাবেগ একেবারে অপ্রাসঙ্গিক। অঙ্কের উপমা দিয়েছি। কিন্তু উপমা উপমাই। তা নিজে সত্য নয়, সত্যকে বোঝানোর একটা চেষ্টা মাত্র। রহস্যকাহিনীর মূল অপরাধী এবং তার অপরাধের চতুর পদ্ধতি বা Modus Operandi আগে থেকে লেখক ঠিক করে রেখে এগোলে বিপর্যয় ঘটতে পারে। কারণ যে কোনও কাহিনীর মতো রহস্যকাহিনীরও নিজস্ব গতিপথ এবং লজিক আছে, যা লেখকের ইচ্ছানিরপেক্ষ। লেখককে অসহায় হয়ে সেই পথে এগিয়ে যেতে হয়। এর ফলে, অন্তত আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, লেখক এবং রহস্যভেদী ‘whodunit’-এর গোলকধাঁধায় একাত্ম হয়ে ঘুরে বেড়ান। লেখকও গলদঘর্ম হয়ে সূত্র খোঁজেন। যুক্তি দিয়ে সূত্ৰলব্ধ তথ্যকে সাজানো ছাড়া উপায় থাকে না। সেই বিচারে রহস্যভেদী এবং লেখক মূলত একই ব্যক্তি।

    সম্ভবত এই সমস্যার জন্যই ১৯২৮ সালে S. S. Van Dine নামে এক বিখ্যাত গোয়েন্দাকাহিনীকার কুড়িটি নিয়ম বেঁধে দিয়েছিলেন। সবগুলি নিয়ম কেউ যে মানতে চাননি, তা বলা নিষ্প্রয়োজন। আমার মনে হয়েছে, অন্তত তাঁর একটি নিয়ম অংশত সর্বগ্রাহ্য : রহস্যভেদী নিজে কদাচ অপরাধী হবেন না। হওয়া উচিত নয়। হলে তাঁকে আর দ্বিতীয়বার রহস্যভেদী করা যায় না। এই মডেলটিই ক্লাসিক। কোনও লেখক প্রয়োজনবোধে একাধিক রহস্যভেদী চরিত্র সৃষ্টি করতে পারেন (যেমন আগাথা ক্রিস্টির এরকুলে পোয়ারো, মিস্ মার্পল, পার্কার পাইন)। কিন্তু তাঁদের একমাত্র কাজ অপরাধীকে সনাক্ত করা।

    রহস্যকাহিনীতে সাফল্যের দাবি আমি কদাচ করি না এবং সেই অধিকারও আমার নেই। শুধু এটুকু বলতে পারি, কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে আমি কিছুতেই ত্যাগ করতে পারব না। তিনি আমারই দ্বিতীয় সত্তা।

    একটা কথা বলা উচিত। কর্নেল চরিত্রে আমি সতর্কভাবে সব জনপ্রিয় এবং বিখ্যাত রহস্যভেদীর চরিত্রের ছায়া এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করেছি। তা সত্বেও কেউ যদি কারও ছায়া কখনও আবিষ্কার করে ফেলেন, সেটা নেহাত সমাপতন। আমি বিশ্বের সব রহস্যকাহিনী তো পড়িনি।

    এতবছর ধরে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে নিয়ে যত ছোট-মাঝারি-বড় কাহিনী লিখেছি, তা ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে ছিল নানা জায়গায়। এতদিনে তা একত্র করে খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশের দায়িত্ব নিলেন দে’জ পাবলিশিং-এর কর্ণধার স্নেহভাজন শ্রী সুধাংশু দে। এ একটা বড় রকমের ঝুঁকি। তবু তিনি দুঃসাহসী। তাঁর এই প্রকাশন সংস্থায় উন্মেষের কাল থেকেই বুড়ো বজ্জাতের মতো আমি তাঁর কাঁধে বসে আছি। দেখা যাক্।

    এই সুযোগে ধন্যবাদ জানাই সেইসব চেনা-অচেনা পাঠকদের, যাঁরা এতদিন ধরে কর্নেলের তারিফ করেছেন এবং আমাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। তাঁরা এবার কর্নেলের সবকিছু ক্রিয়াকাণ্ড একই মঞ্চে অবলোকন এবং বিচারের সুযোগ পাবেন।

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

  • শুধু গল্প নয়

    শুধু গল্প নয়

    লীলা মজুমদার

    [book-name]

    গ্রন্থপরিচয়

    প্রথম সংস্করণ সেপ্টেম্বর ১৯৮৫

    প্রকাশক

    পি. রায়

    রে অ্যাণ্ড অ্যাসোসিয়েটস্ (পাবলিশিং) এর পক্ষে

    ২ গুরু প্রসাদ চৌধুরী লেন

    কলকাতা-৭০০০০৬

    মুদ্রক

    পুলিনচন্দ্র বেরা

    দি স্বরস্বতী প্রিণ্টিং ওয়ার্কস

    ২ গুরু প্রসাদ চৌধুরী লেন

    কলকাতা-৭০০০০৬

    প্রচ্ছদ

    স্বপন রায়চৌধুরী

    অলংকলণ

    ইন্দ্রনীল ঘোষ

    ওসিআর, শুদ্ধিপাঠ

    তাহের আলমাহদী

  • অলীক মানুষ

    অলীক মানুষ

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    [book-name]

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘অলীক মানুষ’ উনিশ-বিশ শতকের মুসলিম অন্দর মহলের এক তথ্যপূর্ণ ডকুমেন্টশন। তিনি নিমোর্হভাবে তার সহজাত ভাষায় বুনেছেন অসংখ্য কাহিনী-উপকাহিনীর মধ্যে দিয়ে একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস। একশ বছরের এই লৌকিক-অলৌকিকের মন্ময় আখ্যানটি রচিত হয়েছে কোলাজ রীতিতে। কখনো সহজ বয়ানে, কখনো মিথ ও কিংবন্তী আবার কখনো ব্যক্তিগত ডায়েরী, সংবাদপত্রের কাটিং জুড়ে দিয়ে দূর সময় ও বিস্ময়কর মানুষের বৃত্তান্ত। বাঙালি হিন্দু মুসলমান জীবনে এক অনাবিষ্কৃত এক সত্যের উদ্ভাসন।

    এরকম উপন্যাস দুই বাংলায় বিরল। পাঠ অমৃতসমান। কেননা অমৃতপাঠ থেকেই জানতে পারি :

    …‘এখন ভাবি, পুরুষের জীবনে ওই যেন কঠিন নির্বাসনের কষ্ট-কাল! নারীর জরায়ু থেকে বেরিয়ে এসে নিরন্তর নারীর সঙ্গে স্পর্শে-সাহচর্যে বেড়ে উঠতে উঠতে তারপর সে ধীরে ধীরে দূরে যেতে থাকে অথবা তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় দূরে। নারীর শরীর, নারীর স্তন, নারীর ঠোঁট তাকে অচ্ছুৎ করে ফেলে। নিষিদ্ধ হয়ে ওঠে প্রিয় এক জগৎ, এবং নির্বাসিতের মতো, অচ্ছুতের মতো, তারপর দূরে সরে থাকা। আবার প্রতীক্ষায় থাকা, কবে ফিরবে প্রিয়তম ঘরে? কবে ফিরে পাবে সে নারীর শরীর, নারীর স্তন, নারীর ঠোঁট এবং নারীর জরায়ূ–শরীরের পারুষ্যের যৌবনের রক্তমূল্য দিয়ে সবল পেশীর শক্তি দিয়ে হবে তার প্রত্যাবর্তনজনিত পুনরাভিষেক? করে সে ফিরবে পুরনো কোমল ঘরে? কৈশোরের সেই প্রতীক্ষা আর নির্বাসনের কাল।’

    লেখকবৃত্তান্ত

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক। তিনি খোশবাসপুর গ্রামে ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম জীবনে বাড়ি থেকে পলাতক কিশোরের জীবন অতিবাহিত করেছেন। রাঢ় বাংলার লোকনাট্য “আলকাপের” সঙ্গে যুক্ত হয়ে নাচ-গান-অভিনয়ে নিমজ্জিত হয়ে জেলায় জেলায় ঘুরেছেন। আবার একদিন সহসা সব ছেড়ে তিনি শুনলেন নিজের নাড়ির আওয়াজ – তাঁর ভেতরে অন্তর্নিহিত লেখকসত্তার ধ্বনি। শুরু হলো সাহিত্যের সাধনা।

    তাঁর “ইন্তি, পিসি ও ঘাটবাবু”, “ভালোবাসা ও ডাউনট্রেন”, “তরঙ্গিনীর চোখ”, “জল সাপ ভালোবাসা”, “হিজলবিলের রাখালেরা”, “রণভূমি”, “উড়োপাখির ছায়া”, “রক্তের প্রত্যাশা”, “মৃত্যুর ঘোড়া”, “গোঘ্ন”, “রানীরঘাটের বৃত্তান্ত”, ইত্যাদি অসংখ্য ছোটগল্পের জন্য বিশ্বসাহিত্যের দরবারে স্থায়ী আসন পেয়েছেন।

    সিরাজের প্রথম মুদ্রিত উপন্যাস – “নীলঘরের নটী” প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকমহলে সাড়া পড়ে যায়। একের পর এক প্রকাশিত হয় “পিঞ্জর সোহাগিনী”, “কিংবদন্তীর নায়ক”, “হিজলকন্যা”, “আশমানতারা”, “উত্তর জাহ্নবী”, “তৃণভূমি”, “প্রেমের প্রথম পাঠ”, “বন্যা”, “নিশিমৃগয়া”, “কামনার সুখদুঃখ”, “নিশিলতা”, “এক বোন পারুল”, “কৃষ্ণা বাড়ি ফেরেনি”, “নৃশংস”, “রোডসাহেব”, “জানগুরু” ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁর গল্প ও একাধিক গ্রন্থ ভারতের সমস্ত স্বীকৃত ভাষায় অনূদিত হয়েছে, এমনকি ইংরেজি তো বটেই, বিশ্বের বহু ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।

    ক্ষুদে ও কিশোর পাঠকদের দাবি মেটাতে তিনি সৃষ্টি করলেন “গোয়েন্দা কর্নেল” নামে একজন রহস্যময় চরিত্র, যাঁর মাথা জোড়া টাক, ঠোঁটে চুরুট, অবসরপ্রাপ্ত মিলিটারি অফিসার, এখন প্রজাপতি ও পাখি দেখতে ভালোবাসেন। অথচ তিনি অনেক অপরাধ ও হত্যার কিনারা করে শখের গোয়েন্দাগিরি করেন। “গোয়েন্দা কর্নেল” পাঠকের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

    সিরাজ কলকাতায় পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন ষাটের দশকের শুরুতে। দীর্ঘদিন আনন্দবাজার পত্রিকায় সাংবাদিক হিসাবে চাকরি ও লেখালেখি সমানতালে চালিয়ে গেছেন। তাঁর জ্ঞান ও অধীত বিদ্যাসমূহ তাঁকে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী হিসাবে বিদ্বানসমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, পুরাতত্ত্ব, বিজ্ঞান, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব – সব বিষয়েই তাঁর বিস্ময়কর জ্ঞান ও বিদ্যার গভীরতা তাঁকে পণ্ডিত মহলে উচ্চ আসন এনে দিয়েছে।

    তিনি কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা প্রদত্ত আকাদেমি পুরস্কার, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা প্রদত্ত নরসিংদাস পুরস্কার, রাজ্য সরকার দ্বারা প্রদত্ত বঙ্কিম পুরস্কার, এছাড়া ভূয়ালকা পুরস্কার সহ আরও অনেক অনেক পুরস্কার, সম্মান, পদক প্রাপ্ত হয়েছেন। তাঁর অনেক কাহিনী চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। তাঁর “মানুষ ভূত” চলচ্চিত্র ছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে মঞ্চে ক্রমাগত অভিনীত হয়ে চলেছে…

    [book-name]

    প্রথম প্রকাশ : বৈশাখ, ১৩৫৫

    দে’জ পাবলিশিং ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০৭৩

    প্রচ্ছদ : গৌতম রায় প্রকাশক : সুভাষচন্দ্র দে।

    লেজার টাইপ সেটিং : পেজমেকার্স ২৩বি রাসবিহারী এভিনিউ, কলকাতা ৭০০০২৬

    মুদ্ৰক : স্বপনকুমার দে। দে’জ অফসেট ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০৭৩

    উৎসর্গ

    আব্দুর রউফ, প্রীতিভাজনেষু


    Hatred is one of the passions that can master a life, and there is a temperament very prone to it, ready to see life in terins of vindictive melodrarna, ready to fine stimulus and satisfaction in frightful dem onstrations of ‘justice’ and ‘revenge’.

    – H.G. wells

  • মামা সমগ্র

    মামা সমগ্র

    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

    [book-name]

    গ্রন্থকথা

    লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে সত্যজিত রায় চিঠি লিখে জানান “সন্দেশ” পত্রিকার জন্য একটি গল্প লিখে দিতে, সেই লেখার জন্য ছবি আঁকবেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। লেখা হলো “বড় মামার নারায়ণ সেবা” আর গল্প পড়ে সত্যজিৎ পছন্দ করে ফেললেন। তারপর থেকেই একে একে লেখা হয়েছে মামাদের নিয়ে গল্প ও উপন্যাস। সেই সব লেখার সংকলন এই “মামা সমগ্র”।

    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় বলেন—

    শ্রদ্ধেয় বিশ্ববরেণ্য সত্যজিৎ রায় মহোদয় স্বহস্তে আমাকে একটি চিঠি লিখলেন, ‘সন্দেশ’ পত্রিকার পূজাসংখ্যার জন্যে আপনার একটি গল্প প্রার্থনা করি। লেখাটি যথাসময়ে পাঠাবেন, কারণ ছবি আঁকব আমি।

    এই চিঠিটি পেয়ে আমি পুলকিত, বিস্মিত, স্তম্ভিত এবং ভীত। তাঁর পছন্দ হবে, এমন একটি গল্প কি আমি লিখতে পারব?

    দুর্জয় সাহসে একটি গল্প লিখলাম, ‘বড় মামার নরনারায়ণ সেবা’। আশ্চর্য! লেখাটি পড়ে অসামান্য রায়মহাশয় আর একটি চিঠি লিখে জানালেন, গল্পটি তাঁর খুব ভাল লেগেছে।

    তিনিই খুলে দিলেন দরজা। শুরু হল মামাদের পথ চলা। কল্পনা ও বাস্তবের মেলবন্ধনে একের পর এক গল্প ও উপন্যাস লেখা হল। ‘সন্দেশ’ পত্রিকাতেও প্রকাশিত হল অনেক।

    শ্রদ্ধেয় রায়মহাশয় লিখিত শেষ চিঠিটি একটি অক্ষয় স্মৃতি। লিখলেন, এবারের লেখাটি তাড়াতাড়ি চাই। আমার শরীর ভাল যাচ্ছে না। ছবি আমি নিজে আঁকব।

    এই চিঠিটি আমার বুকে লেখা আছে। আমার হৃদস্পন্দনে তাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বর চিরধ্বনিত। জনৈক প্রকাশক রায়মহাশয়ের আঁকা ছবি সহ গল্পগুলির একটি সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। আমার সংগ্রহে ছিল, এখন আর নেই। সেই সময়টা কালের পথে এখন দূর অতীত। বাস্তবের দুই মামা আর মাসিমা পৃথিবীতে নেই। তাঁদের নিয়ে লিখতে বসলে মন হুহু করে। হাসির বদলে কান্না আসে।

    অতঃপর গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা—এই সংকলন সম্ভব হত না, যদি না আমাদের দুই সাহিত্যপ্রেমী ও সংগ্রাহক, বর্ধমান নিবাসী সুহৃদ রঞ্জন মুখোপাধ্যায় আর সন্দীপ মণ্ডল তাঁদের সংগ্রহ অবারিত করতেন। এঁদের জন্যে শুধু ধন্যবাদ যথেষ্ট নয়; স্নেহের আলিঙ্গন।

    তবু, এই সদ্যোজাত প্রকাশন সংস্থাটি ‘মামা সমগ্র’ প্রকাশে উদ্যোগী হয়ে আমার ধন্যবাদার্হ। তাঁদের পথ চলায় মঙ্গলশঙ্খ ধ্বনিত হোক; তাঁরা এই পথে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হবেন, এই আমার প্রার্থনা শ্রীপদে। পাঠক-পাঠিকাদের জন্যে আমার চিরকৃতজ্ঞতা রেখে যাই এই প্রারম্ভিক বক্তব্যে। এই গল্পগুলি বড়ই স্মৃতিমেদুর। বাস্তব ভূমির ওপর রচিত কল্পনার জগত, হাসি আর আনন্দে ভরপুর।

    ১৪.১২.২০২০
    কলকাতা

    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়


    কমলা-গীতা-বীণা প্রকাশনী

    প্রথম প্রকাশ – জানুয়ারি ২০২১

    প্রচ্ছদ – সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়

    অলংকরণ – নচিকেতা মাহাতো


    উৎসর্গ

    যাঁর সঙ্গে হয়েছিল মনের সেতুবন্ধন,

    হৃদয়ের আদান প্রদান, অন্তরের অন্তরতম

    কৃতী সেই কর্মযোগী, শিক্ষাবিদ

    প্রয়াত নবারুণ দেকে আমার এই

    স্মরণাঞ্জলি।

    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

    বি.দ্র. সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে প্রকাশিত।

  • হাতপাখা

    হাতপাখা

    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

    [book-name]

    হাতপাখা

    আগ্নেয়গিরি দীর্ঘকাল বেশ শান্তশিষ্ট। ফুসফুস করে পাতলা পাতলা ধোঁয়া ছাড়ছে, কিম্বা তাও নয়। তারপর বলা নেই কও না নেই হঠাৎ একদিন বিস্ফোরণ। আমার বিখ্যাত বড়মামা, ঠিক সেইরকম। এই একবছর কোনও সমস্যা তৈরি করেননি। মন দিয়ে ডাক্তারি, চেম্বার, রুগি, হাসপাতাল। ডাক্তারদের সভায় বেশ ভালো দুটো বক্তৃতা দিলেন লিভার, জন্ডিস, আলসার, তেলেভাজা খাওয়ার কুফল, সপ্তাহে একদিন উপবাসের উপকারিতা, বেশি নুন খাওয়ার অপকারিতা, দিনে ক’লিটার জল খাওয়া উচিত। কাগজে ইন্টারভ্যু। মেজোমামা বলতে লাগলেন, ‘লোকটা একটু একটু করে ফেমাস হয়ে উঠছে। আমারও একটা কিছু করা উচিত।’ বড়মামার খোঁচা, ‘তুই আর কি করবি? অধ্যাপকদের যুগ শেষ। এখন ছাত্র-ছাত্রীরাই সব। পেটাই খা। পিঠের দিকটা শক্ত কর। এরপর তো হেলমেট পরে কলেজে ঢুকতে হবে। বই নয় ইট নিয়ে ক্লাসে আসবে ছাত্রছাত্রীরা। আমার মতো ডাক্তার হওয়ার মেধা তোর ছিল না ঠিকই, তবে অন্য কিছু হতে পারতিস। কম্পাউন্ডার হলে আমার ডাক্তারখানায় চানস পেতিস। আজ কাছা খুলে দিচ্ছে, কাল কোঁচা খুলে দিচ্ছে এই যাচ্ছেতাই অবস্থাটা হত না।’

    মেজোমামা শুধু একটা কথাই বললেন, ‘হোয়েন ঘুঁটে পোড়ে, গোবোর লাফস। সেকালে সতীদাহ হত একালে ডাক্তার দাহ। পেশেন্ট আর ডাক্তার একই চিতায়। ঘেরাও করে রেখে দিলে তিনদিন। বিপজ্জনক জীবিকা। আমার কিছু হলে, তুমি কী ভাব, তোমাকে আমি দেখাব?’

    ‘তোকে আমি দেখবই না, তোদের ডাক্তার আলাদা। তৃণভোজীদের জন্যে অন্য ব্যবস্থা।’ কথার লড়াই শুরু হলে আর রক্ষা নাই। ফটাফট চলতেই থাকল। মাসিমা আগে দুজনকে থামাবার চেষ্টা করতেন, এখন আর মাথা ঘামান না। মাঝে মাঝে বলেন, ‘দুটো শিক্ষিত দামড়া। মা যাওয়ার সময় বলে গেল, দুটোকে দেখিস, তুই ছাড়া এদের আর কেউ রইল না। হয়ে গেল। না হল বিয়ে, না হল সংসার। একটা ভালো হল, সেই ছেলেবেলা থেকে এই দুটো ছাগলের পেছনে ডাণ্ডা হাতে পড়, পড় করে ঘুরতে ঘুরতে বিরক্ত হয়ে নিজেই এম. এ-টা করে ফেললুম। একটু লেখাপড়া করলে কার কি ক্ষতি হয়, বুঝি না বাপু! ছেলেরা খুব বদমাইশ হয়। দেখিস না, গরুদের মধ্যে যারা ছেলে, মাথায় কচি কচি দুটো শিং। কোনও কারণ নেই ভোঁস করে গুঁতিয়ে দিলে। আর ছাগল সাইজে ছোট, কিন্তু বদমাইশিতে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। দুটো ছাগলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড খেয়ে ফেলতে পারি।’

    একটা পেল্লায় বাড়ি। দোতলাটা বারান্দা দিয়ে ঘেরা। বার কয়েক পাক মারলেই মর্নিংওয়াক। বাগান। সবই সুন্দর, কেবল যাঁরা থাকলে বাড়িটা জমজমাট হত, তাঁরা সব মিছিল করে স্বর্গে চলে গেলেন। মাসিমা যখন একা উদাস হয়ে বাগানে গাছতলায় বসে থাকেন, পাখিরা গান শোনায়, কাঠবেড়ালি নাচ দেখায়। সেইসময় আমাকে ডেকে কত পাশে বসিয়ে পুরনো দিনের কত কথা বলেন, ‘ভিটেটার দোষ আছে। তা না হলে পটাপট সব মরে যায়। ভাই দুটো এত ভালো না হলে এই বাড়ি, এই স্মৃতি ধ্বংস হয়ে যেত। মামলা-মকদ্দমা। বিয়ে করলে না। কী বললে জানিস, বাড়িতে দেয়াল ঢোকাবো না। মামলা না হোক। পার্টিশান। হাঁড়ি আলাদা। সুখে থাকতে ভূতে কিলোনো। আমাদের বাবা, তোর দাদুকে সবাই বলত ভগবান। অত বড় ডাক্তার। বিনা পয়সার চিকিৎসা। বলতেন মানুষের সেবা করতে এসেছি। গলা কাটতে আসিনি। লোকে বলত ডাক্তারবাবু মানে জীবন। বড়দা অনেকটা ওইরকম হয়েছে। চেহারাতেই সেই ভাবটা লেগে আছে। খুব মিল। মেজদা একেবারে মায়ের মতো। দুটো একেবারে পিঠোপিঠি। বেশ আছে দুজনে। ওরা আছে বলেই আমার দুঃখটা তেমন বুঝতে পারি না। আসে, উঁকি মেরে চলে যায়। তারপর তুই এলি। জানিস তো প্রবাদ আছে নরাণাং মাতুলক্রমঃ। ভাগনেরা মামাদের মতো হয়।’

    ‘কোথায় আর হচ্ছি! অঙ্কে ডিগবাজি।’

    মাসিমা হেসে বললেন, ‘তবে শোন, আমার বাবা, তোর দাদু অঙ্কের ভয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল। খোঁজ খোঁজ। শেষে কাশীর হাসপাতাল থেকে চিঠি এল ষাঁড়ের গুঁতো খেয়ে ওখানে বারো নম্বর বেডে পড়ে আছে। পেটের মাঝখানে দেড় ইঞ্চি ফুটো। কলকাতায় আনা হল। আশ্চর্যের ব্যাপার অঙ্কের মাথা খুলে গেল। একশোয় একশো। একেই বলে বাবার দয়া। তোর বড়মামা অনেক চেষ্টা করছিল ষাঁড়ের গুঁতো খাওয়ার। একটা ষাঁড়ও রাজি হল না। মাঝখান থেকে রামছাগলের গুঁতো খেয়ে যাও বা চল্লিশ-পঞ্চাশ পাচ্ছিল, হয়ে গেল, টায় টায় তিরিশ, তাও এক নম্বর গ্রেস। মেজোকে অঙ্ক শেখাতে এসে গৃহশিক্ষক নিজেই অঙ্ক ভুলে গেলেন।’

    বাইরের রাস্তায় একটা টেম্পো এসে দাঁড়াল। কয়েকজনের গলা শুনতে পাচ্ছি, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এই বাড়ি, এই বাড়ি। ডাক্তারবাবু, ডাক্তারবাবু।’

    পাশের বাড়ির ললিতকাকু হন্তদন্ত হয়ে এসে বললেন, ‘কে মারা গেছে, কে মারা গেছে? কই খবর পাইনি তো!’

    মাসিমা অবাক—’মারা গেছে? এই বাড়িতে?’

    ‘খাটিয়া, বাঁশ, নারকেল দড়ি, তোশক, বালিশ, সাদা চাদর, টেম্পো থেকে নামছে।’

    উত্তরটা বড়মামাই দিলেন ঢুকতে ঢুকতে—’কেউ মরেনি, জ্যান্ত মড়া খাটে তোলা হবে।’

    ‘সে আবার কি?’

    ‘বাইরের ঘরে আসুন, চা পান করতে করতে শুনবেন।’

    বৈঠকখানা। মাসিমার প্ল্যানে সাজানো। খুব সুন্দর। ললিতকাকু অনেকদিন পরে এলেন। বেশিরভাগ সময় উত্তর ভারত থাকেন। জঙ্গল আছে, আপেলবাগান আছে। ভবঘুরে মানুষ। বসার ঘরে অদ্ভুত দৃশ্য। মেজোমামা ঘরে হামাগুড়ি দিচ্ছেন। হাতে একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস। বড়মামা বললেন, ‘এ কি শার্লক হোমস কোথা থেকে এল? কে খুন হল?’

    ললিতকাকু বললেন, ‘আহা! ঠিক যেন বুড়ো গোপাল!’

    বড়মামা বললেন, ‘হাতে একটা টেনিস বল দিতে হবে।’

    ‘টেনিস বল কেন?’

    ‘গোপালের হাতে নাড়ু।’

    মেজোমামা সোফায় পায়ার কাছ থেকে বললেন, ‘গদা, তোর চোখে একবার দেখ তো।’

    ললিতকাকু বললেন, ‘কি খুঁজছ, সেটা যদি বলতে তা হলে আমরাও সাহায্য করার চেষ্টা করতুম।’

    মেজোমামা থেবড়ে বসে বললেন, ‘ছোট্ট এতটুকু একটা স্ক্রু। চশমার ডাণ্ডিটা খুলে গেল। হাই পাওয়ার। চশমা ছাড়া লেখাপড়া করব কী করে?’

    ললিতকাকু বললেন, ‘ওটা পাওয়া গেলেও লাগাবে কী করে?’

    ‘চেষ্টা করব কানখুশকি দিয়ে।’

    সোফার গদির খাঁজ থেকে জিনিসটা পাওয়া যেতেই মেজোমামা বললেন, ‘এ ছেলেটার কোনও তুলনা নেই, রিয়েল ভাগনে।’

    বড়মামা বললেন, ‘যখন ভাগ নেবে তখন বুঝবে, রিয়েল কতটা রিয়েল!’

    ‘কিন্তু চশমাটা কোথায়? কোথায় রাখলুম!’

    বড়মামা বললেন, ‘দাঁড়া দাঁড়া, আমি বোধহয় বসে আছি, পেছনে শক্ত মতো কি একটা!’

    চশমা ফ্ল্যাট। বড়মামার সে কি আনন্দের হাসি, ‘তোর চশমা, তোর চশমা!’

    ‘একবার দেখলে না? কোথায় কার ওপর বসছ?’

    ‘তুইও একবার ভাবলি না, কোথায় রাখছিস? সেই একইরকম, কেয়ারলেস। মনে পড়ে ছাতে চশমা খুলেছিলিস হনুমানে চোখে পরে চলে গেল। টুথব্রাশ নিয়ে গেল কাকে।’

    ‘কে কাকে বলছে! তুমি হ্যা হ্যা করে হেস না। ভিজে গামছার ওপর প্যান্ট করে হাসপাতালে চলে গেলে। সবাই বলতে লাগল, ভুলে হিসি করে ফেলেছে।’

    ‘তুই আর ফটফট করিস না, কল্যাণের বউকে নমস্কার করে বললি, স্টিল ইয়াং, ছেলে কিন্তু বুড়ো হয়ে গেছে।’

    ‘তুমিও আর বোলো ন, সেদিন ফটিককে কুমুদ ভেবে বলে বসলে, রোগটা আর ক’দিন আগে ধরা পড়লে তোমার বাবাকে বাঁচানো যেত।’

    বড়মামা ললিতকাকুকে দেখিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা বল তো, এই ভদ্রলোক কে?’

    মেজোমামা বললেন, ‘রাধারমণবাবুকে চেনে না, এ পাড়ায় এমন কে আছে?’

    বড়মামার ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি। খুব মিষ্টি স্বরে বললেন, ‘যা বাড়ি যা, ভালো করে রেস্ট নে।’

    ললিতকাকু বললেন, ‘স্লাইট মিস্টেক। আমি ললিত। এ পাড়ায় রাধারমণ বলে কেউ তো নেই। বৃন্দাবন অথবা নবদ্বীপে থাকতে পারে।’

    মাসিমা আর কাজলদি ঘরে ঢুকলেন। দুজনের হাতে দুটো ট্রে। চা আর গরম গরম আলুর চপ।

    মাসিমার মুখ গম্ভীর। বড়মামা লক্ষ করেছেন। হম্বিতম্বি যতই করুন, মাসিমাকে ভয় পান।

    বড়মামা বললেন, ‘কুসি, আমি তোকেই আশা করেছিলুম। একটু বসবি?’

    ‘না।’

    ‘কেন? না কেন? আমি একটা ব্যাপার একসপ্লেন করতে চাই।’

    ‘আমি শুনতে চাই না। আমি শান্তি চাই।’

    ‘এই বাড়িতে তো চির শান্তি! এমন বাড়ি কোথাও তুমি পাবে না খুঁজে। মেজোটা মাঝে মাঝে গোলমাল করে ফেলে, হট হেড, রগচটা। ওটা ওর শরীরের জন্যে। ভাল্লুকের মতো চেহারা। হজম করতে পারে না; কিন্তু খাওয়া চাই। কনস্টিপেশান।’

    ‘তুমি বকবক কর। চা-চপ ঠান্ডা হয়ে যাক। দাদা, আপনারা খান তো। শুরু করে দিন।’

    বড়মামার এইবার করুণ সুর, ‘একটু বোস। আমি এমন একটা কাণ্ড করতে চাইছি, যা হবে এই শতাব্দীর এক নম্বর নিউজ। হেডলাইন। টিভির সব কটা চ্যানেল হেরে-রেরে করে ছুটে আসবে। ঘটনাটা ঘটবে আগামীকাল বিকেল পাঁচটায়।

    ‘ঘটনাটা কি?’

    ‘যখন ঘটবে তখন জানতে পারবে। তার আগে নয়।’

    মাসিমা বললেন, ‘এই তোমার আলোচনা? এর জন্যে বসতে বললে!’

    মেজোমামার দুটো চপ খাওয়া হয়ে গেছে। তৃতীয়টাকে আক্রমণ করেছেন। সেই অবস্থায় বললেন, ‘চিরকালই বাঙলায় উইক। কোনওরকমে তিরিশ। ও ঘোষণা আর আলোচনার তফাৎটা জানে না। কাল কিছু একটা করবে। অস্বাভাবিক কিছু। সেইটাই ঘোষণা করল।’

    ‘একটা অলুক্ষণে মড়ার খাট, দুটো লম্বা বাঁশ, নারকেল দড়ি, এইসব বাড়িতে ঢুকিয়েছে। এর মানেটা কি?’

    বড়মামা বললেন, ‘দারুণ হয়েছে।’

    ‘মানে?’

    ‘আলুর চপ। ওয়ার্ল্ডস বেস্ট। রান্নাবান্নার জন্যে নোবেল পুরস্কার থাকলে আমি তোর নাম সুপারিশ করতুম।’

    মাসিমা বললেন, ‘আমি জানতে চাই।’

    ‘আমিও জানাতে চাই।’

    মেজোমামা বললেন, ‘আমি জানতে চাই না।’

    ললিতকাকু বললেন, ‘আমি জানার জন্যেই ঢুকেছি।’

    বড়মামার ঝাল লেগেছে, ‘এই লঙ্কাকাণ্ড একটা লঙ্কা থেকে এসেছে। আর ঐ কাণ্ডটা ঘটে আমাদের মুখে। প্রচুর ভিটামিন সি আছে, অ্যাপেটাইজার, রোগ প্রতিষেধক। বুদ্ধির বিকাশ ঘটায়। পোকামাকড় দমন করে।’

    মেজোমামার ঠোঁটে বাঁকা হাসি—’লঙ্কার ক্লাস নিচ্ছে। আমার বড়দা কত কি জানে! জ্ঞানের ঢিপি।’

    ললিতকাকু বললেন, ঢিপি শব্দটা চেঞ্জ করে বলুন কূপ, জ্ঞানকূপ।’

    ‘কূপ শব্দ জ্ঞানের সঙ্গে যায় না। অন্ধকার। অন্ধকূপ। জ্ঞান হল আলো, জ্ঞান-সমুদ্র।’

    বড়মামা খুব খুশি হয়ে বললেন, ‘মেজোটাকে একটা কারণে আমি ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি। গুণের কদর করতে জানে, ভেতরটা ওর মন্দিরের মতো পরিষ্কার। সামান্য ছটি আছে। সে আমাদের ফ্যামিলির সকলেরই ছিল। যারা জিনিয়াস তাদের মাথার সামান্য সামান্য গোলমাল থাকবেই। আমার পিতামহ পূর্ণিমার রাতে সারা রাত ঘুড়ি ওড়াতেন। বলতেন, উড়তে উড়তে ঘুড়িটা হয়ে যেত পরী। আকাশে গান গাইত। ঘুড়ি পরী হয়ে গান গাইছে। রাত দুটো। ব্যাপারটা হল, দাঁড়ান, আমি উদাহরণ দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করি, হনুমান যখন যেখানেই জন্মাক না কেন, ল্যাজ নিয়েই জন্মাবে। হনুমান বড় হচ্ছে ল্যাজও বড় হচ্ছে। সেইরকম এই ফ্যামিলির আমরা জ্ঞান নিয়েই জন্মেছি। কিছু করার নেই। আমরা জগতকে দিতে এসেছি।’

    ললিতকাকু ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘এ পর্যন্ত আপনারা কি দিয়েছেন?’

    ‘সে বোঝা যাবে আমরা চলে যাওয়ার পর। লোকে হায় হায় করবে। যেন আকাশের গা থেকে একজোড়া পাহাড় সরে গেল।’

    মাসিমা রেগেমেগে উঠে পড়লেন। বড়মামা বললেন, ‘এ কি, আসল কথাটা না শুনে চলে যাচ্ছিস? বোস। ফাইভ মিনিটস।’ বড়মামা খানিকটা পায়চারি করে বললেন, যেন বক্তৃতা—’মানুষ একদিন না একদিন মরবেই। জন্ম আর কিছুই নয় মৃত্যুর চক্রান্ত। মৃত্যু হল শিকারি, আমরা হলুম গিয়ে হরিণ। মৃত্যু সাঁট সাঁট করে তির ছুঁড়ছে। কারুর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, কারো বুকে প্যাঁট, হয়ে গেল, ফিনিশ। মৃত্যু বললে, পালাবি কোথায়? ব্যাটা, আজ না হয় বাঁচলি, কাল! কাল, না হয় পরশু। তাহলে?’

    মাসিমা বললেন, ‘তোমার মাথা।’

    ‘ঠিক! আমার মাথা। এ মাথা পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। বৈজ্ঞানিক মাথা। এই মাথাটা কেবল জানতে চায়। গপগপ করে গাপ্পি মাছের মতো জ্ঞান গিলতে চায়। জানবো, আরও জানবো।’

    ‘ঢাক পেটাব।’ মেজোমামার মন্তব্য।

    ‘হ্যাঁ পেটাব। একটা নয় একজোড়া। স্পর্শকাতর, ঈর্ষাকাতর, দুর্বলচিত্ত মানুষদের দাওয়াই দিতে হয়। টনক নড়িয়ে দিতে হয়। যারা অজ্ঞান তাদের এইভাবে শব্দ করে জাগিয়ে দিতে হয়।’

    মাসিমা বললেন, ‘মেজো শুনছিস?’

    ‘না, আমি এখন বিশেষভাবে ব্যস্ত আছি। প্রায় শেষ করে এনেছি। একটু গুঁড়ো পড়ে আছে।’

    ‘তার মানে?’

    ‘সোফায় বসা মাত্রই অনুভব করলুম, একটা কিছুর ওপর বসে পড়েছি। একটা কৌটো। বের করে দেখি লেখা রয়েছে ‘বাদশাহী গোলি’। দারুণ খেতে, ওয়ান আফটার অ্যানাদার।’

    বড়মামা লাফিয়ে উঠলেন, ‘নিঃশব্দে সবটা মেরে দিলি?’

    ‘বড়দা, তোমার ভালোবাসাতেই বেঁচে আছি। বলো, বলো, তুমি বলে যাও। বিভোর হয়ে বলে যাও।’

    বড়মামা বেশ ভেঙে পড়েছেন। ‘আমার এক পেশেন্ট লখনৌ থেকে এনে দিয়েছিল। আমার জন্যে একটুও রাখলি না।’

    ‘এই তো কৌটোর তলায় গুঁড়ো গুঁড়ো একটু রয়েছে। পরে টেস্ট করে দেখো। আর তোমার পেশেন্টকে দশ-বিশ কৌটো আনাতে বোলো। লোকটা মনে হয় কৃপণ। তোমার মতো এত বড় একজন ডাক্তারকে এক কৌটো? মিনিমাম দশ কৌটো দেওয়া উচিত। ডাক্তারদের লাজুক হওয়া উচিত নয়। ডাক্তার হল জীবনদাতা, নেকস্ট টু গড।’

    বড়মামা বললেন, ‘হুঁ।’

    মেজোমামা বললেন, ‘এটা একটা ইতিহাস। ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের এই ভালোবাসা। এমনটি পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যাবে না। সেই ত্রেতা যুগে রাম আর লক্ষ্মণ, আর এই কলিযুগে আমরা দুটি ভাই নাড়ু কিনে খাই, শিবের গাজন গাই। এই মানুষটাকে কেউ চিনল না। আমি ভাবছি প্রচারে বেরোবো। জ্যান্ত ভগবান!’

    বড়মামা বললেন, ‘কাটা ঘায়ে কেন নুনের ছিটে দিচ্ছিস। যত আমি ভুলতে চাইছি।’

    বৃন্দাবনকাকু আমাদের ম্যানেজার কাম দারোয়ান কাম মালী। ঘরে এসে বললেন, ‘খাটিয়াটা কি বিহারীর জন্যে আনিয়েছেন? ও জিগ্যেস করছে।’

    ‘না, ওটা আমার জন্যে।’

    ‘আপনার তো খাট আছে!’

    ‘না, আমার কিচ্ছু নেই। আমি ছাড়া আমার কিচ্ছু নেই।’

    মেজোমামা বললেন, ‘চরম বৈরাগ্য। আমি লক্ষ করেছি প্রত্যেক বছর এই শ্রাবণ মাসে, বাবার মাসে দাদার মানে এই রকম একটা ভাব আসে। পূর্ব, পূর্ব জন্মে সাধক ছিল। গভীর অরণ্যে বল্কল পরে ঘুরত। পাশের তপোবনেই থাকত শকুন্তলা। আহা! সেই ঋষিকন্যাই রোজ সকালে একটু বেলপোড়া দিয়ে যেত কচি কলপাতায় মুড়ে। গোল করে রোল করে ‘বেল রোল’। সারা দিনের আহার। সেবারেই মোক্ষলাভ হয়ে যেত। সামান্য একটু আসক্তি!’

    ললিতকাকু শেষ চপটা বেশ তারিয়ে তারিয়ে খেতে খেতে প্রশ্ন করলেন, ‘কি ধরনের আসক্তি?’

    ‘চুরি।’

    ‘সে কি চুরি?’

    ‘সোনাদানা নয়। বালকস্বভাব। দুপুরবেলা শকুন্তলার আশ্রমে বেদপাঠ করতে যেত। শকুন্তলা আবার আচার তৈরিতে সিদ্ধহস্ত ছিল। কুলের আমের, তেঁতুলের। স্বর্গে সাপ্লাই করত। সেই সব আচার আশ্রমের দাওয়ায় রোদে দিত। আমার পূর্ব, পূর্ব, পূর্ব জীবনের এই দাদা সেই সব লক্ষ করত; সেই সব আচার আশ্রমের দাওয়ায় রোদে দিত। আমার পূর্ব, পূর্ব, পূর্ব জীবনের এই দাদা সেই সব লক্ষ করত; কিন্তু কড়া নিয়ম সাধুরা টক, মিষ্টি, ঝাল, নুন ছুঁতে পারবে না এমন কি মনে ভাবতেও পারবে না। জিভে জল এলে, চোখে লোভ এলে সাধনা পণ্ড। আবার শুরু থেকে শুরু করতে হবে। প্রথম প্রথম দাদা ওসব দিকে তাকাত না। কিন্তু নানারকম মশলার গন্ধ নাকে আসছে। শকুন্তলার সখীরা মাঝে-মধ্যে আচারমাখা আঙুল চুষতে চুষতে আধবোজা চোখে টকাসটাস শব্দ করছে। কতক্ষণ আর নিজেকে ঠিক রাখা যায়। একদিন শকুন্তলা দুপুরে তার প্রিয় হরিণকে আদর করতে করতে গাছতলার ঘাসের ওপর শুয়ে পড়েছে। একটু তন্দ্রা এসেছে। দাদা তেঁতুলের আচার চুরি করে মুখে পুরেছে। আর একটু নেবে বলে হাত বাড়িয়েছে, এমন সময় খপ।’

    ললিতকাকু জিগ্যেস করলেন, ‘খপ মানে?’

    ‘সিকিউরিটি। ধরে ফেলেছে। শকুন্তলা রাগী মেয়ে। বিশ্বামিত্রের মেয়ে, তার রাগ থাকবে না! টেরিফিক রাগী। না, সে কিছু অন্যায় বলেনি। বড়দাকে বললে, মাথা নেড়া করেছ, টিকি রেখেছ, গেরুয়া পরেছ, আমাকে বললে, আমি কি তোমাকে দিতুম না! তোমার হবে না, হবে না, কিস্যু হবে না। আরও হাজার বার জন্মাতে হবে। কাঁচি বের করে টিকিটা কচাত করে কেটে, হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললে, ‘নিকালো হিঁয়াসে।’

    ললিতকাকু বললেন, ‘আপনি তখন কোথায় ছিলেন?’

    ‘নিমগাছে।’

    ‘নিমগাছে কেন?’

    ‘কাকের বাসা তো নিমগাছেই হবে। শকুদিদি রোজ বারোটা সময় আলোচালের ভাত ছড়িয়ে দিত। আমি আর আমার মিসেস খেয়ে মন্দাকিনীর তীরে চলে যেতুম। কখনো চুরি, ছিনতাই করিনি। মিথ্যে কথা বলার প্রশ্নই নেই। কারণ, আমরা ‘ক’ ছাড়া কিছুই বলতে পারি না। একটাই শব্দ বেরোয় কা। মিথ্যে কথা বলতে হলে অনেক কথা বলতে হয়। আমাদের তো একটাই সম্বল ‘কা’। সেই কারণে কাক সত্যবাদী। শ্রদ্ধেয়। আমরা তো রামায়ণে স্থান পেয়েছি।’

    ললিতকাকু সহজে কিছু মানতে চান না। এক একজন এইরকম থাকেন। ভগবানের কলে অনবরত মানুষ তৈরি হচ্ছে। কোনটা কেমন হবে, সে যতক্ষণ না হচ্ছে, আগেভাগে বলা যায় না। কতকগুলো ছাঁচ তৈরি আছে। ঝপাঝপ বেরিয়ে আসছে। সে যাক, সে আমি পরে সময় পেলে বলব। স্বপ্নে আমি ভগবানের কারখানায় এক রাত ছিলুম। ললিতকাকু বড়লোক বলে নিজেকে কি ভাবেন? মেজমামাকে যে-কথাটা বললেন, শুনতে খুব খারাপ লাগল আমার। ক্যাটক্যাটে গলায় বললেন, ‘রামায়ণে জন্তু-জানোয়ার অনেক আছে, বাঁদর-হনুমানই বেশি। আর আছে পক্ষী-রাজ জটায়ু আর এক বিরাট গরুড়। সেখানে কাক?’

    মেজোমামা বললেন, ‘আপনি ভুশুণ্ডি কাকের কথা শোনেনি। আমার এই দাদাটির তপস্যা যখন পণ্ড হয়ে গেল, নিজের টিকি হাতে নিয়ে আশ্রম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, পতিত, অধম। দয়াময়ী শকুন্তলা হাতে ধরিয়ে দিয়েছে তেঁতুলের আচারের বয়াম, ধরিয়ে দেওয়ার কারণ, এঁটো হয়ে গেছে, দেবতার ভোগে লাগবে না, তখন আমি কিন্তু আমার পোজিশানে ঠিক আছি। স্বয়ং শিব আমার প্রশংসা করছেন।’

    ‘আপনার মানে? যে আপনি আমাদের সামনে বসে আলুর চপ খাচ্ছেন?’

    ‘ধুস! আমি তো আমার পূর্ব পূর্ব জীবনের কথা বলছি। তখন আমি হরি ভক্ত, রাম ভক্ত ভুশুণ্ডিকাক। এই তো আজও বারাণসীতে গেলে শুনবেন, সাধু সমাবেশে তুলসীদাসের শ্রীরামচরিতমানস পাঠ হচ্ছে।

    ‘উত্তর দিসি সুন্দর গিরি নীলা। তই রহ কাকভুসুণ্ডি সুসীলা। পরম পবীণা। গ্যানী গুন গৃহ বহু কালীনা।’

    ‘কি বুঝলেন?’

    ‘কাঁচকলা!’

    ‘আমার সম্পর্কে প্রশংসা।’

    ‘মানে, আপনার সেই কাক জন্মের কথা।’

    ‘সাধারণ এই কা-কা করা কাক নয়। ভুশুণ্ডি কাক। হিমালয়ের উত্তরে সুন্দর একটি নীল পাহাড়, যে পাহাড়ের নাম সুমেরু, সেইখানে একটি অসাধারণ বট বৃক্ষে আমার বাসা। বাসা নয় আশ্রম। দিনের বেলা সেই গাছে তলায় আমাকে ঘিরে যত বৃদ্ধ প্রবীণ পাখিরা সরোবরের জলে স্নান করে এসে বসত। হরি নাম, রাম নাম, আর আমার ভালো ভালো জ্ঞানগর্ভ যত কথা। সেইসব কথা শুনে মানুষের দুঃখ দূর হয়ে যেত।’

    ‘একটু বোধ হয় ভুল হল, মানুষ নয়, পাখিদের দুঃখ।’

    ‘ভুল আপনার হল, লক্ষ লক্ষ কাক, হাটে-ঘাটে, গ্রামে-গঞ্জে একটি কথাই বলছে, কা-কা। কা মানে কি?’

    ‘কি মানে?’

    ‘ভুলে গেছি। ত্রেতা যুগের কথা। মনে থাকে?’

    ‘কাক থেকে মানুষ হলেন কত সালে? বিফোর খ্রাইস্ট, আর আফটার খ্রাইস্ট, আর আফটার খ্রাইস্ট?’

    ‘ও ডি এন এ টেস্ট করলেই ধরা পড়বে। এখন বিজ্ঞান এসে গেছে।’

    মাসিমা ঘুমিয়ে পড়েছেন। বড়মামা বললেন, ‘যারা খুব বেশি কথা বলে, তারা বাজে কথা বলে।’

    ‘আরে বাবা, কথা বলতে হলে জ্ঞান থাকা চাই, লেখাপড়া চাই। জানতে হবে। না জানলে জানানো যায়।’

    মাসিমা ঘুম জড়ানো গলায় বললেন, ‘কটা বাজল রে? কাক কি এখনো ডাকছে?’

    বনমালীদা ধীরে ধীরে ঘুরে ঢুকল। অসাধারণ এক মানুষ। মালকোঁচা মারা ধুতি। হাতঅলা গেঞ্জি। চওড়া বুক। লোহার মতো শক্ত শরীর। সারাদিন কাজ করে। খুঁজে খুঁজে কাজ বের করে। মাসিমা বলেন, ‘এই বাড়িটার নাম হওয়া উচিত বনমালী ভবন।’ মানুষটার অতীত নেই। মধুপুরে একটা সুন্দর বাগানবাড়ি আছে। দাদুর শখের বাগান। গোলাপ যদি দেখতে হয় শীতকালে ওই বাগানে যেতে হবে। দাদু বনমালীদাকে ওই মধুপুরেই পেয়েছিলেন। নিজের ছেলের মতো করে মানুষ করেছিলেন। ভীষণ স্মরণশক্তি। মুখে মুখে যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ। কতদিন এমনও হয়েছে, অঙ্ক আটকে গেছে—’বনমালীদা, একটু দেখ না।’ পাঁচ মিনিটে সমাধান। দাদু বলেছিলেন, ‘তোকে আমি হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট করব।’

    বনমালীদা বলেছিল, ‘আমি নামেও মালী, কাজে ওই মালী। আপনার একটা ছেলে মুখ্যুই থাক।’

    বনমালীদা ললিতকাকুকে বললে, ‘বাড়িতে ডাকছে। কি একটা আটকে গেছে।’

    ‘ওঃ, এই এক আলমারি হয়েছে। বর্ষা এল তো পাল্লা আটকে গেল। এই আসর ছেড়ে আমার যেতে ইচ্ছে করছে না। আরও তিনকাপ চা খাব। রাতের খাওয়াটাও যদি এরা বলে!’

    মাসিমা বললেন, ‘বলাবলির কি আছে? লুচি, ছোলার ডাল, মরিচের ঝাল দেওয়া শুকনো আলুর দম। পেটফুলো পটলভাজা।’

    ‘উঃ উঃ কতদিন এইসব খাইনি। বাবা বনমালী তুমি তো আমাদের সকলের বনমালী। যা না বাবা, খুলে দিয়ে আয় না। যদি না খোল লাথি মেরে ভেঙে দিয়ে আয়।’

    সে আমি যাচ্ছি। বড়দা, তুমি খাটিয়াটা কি জন্যে আনালে? দুটো বাঁশ, দড়ি?’

    ‘আমার জন্যে।’

    ‘খাটিয়ায় শোবে কেন?’

    ‘তুই ঘুরে আয়। অনেক কথা আছে।’

    মেজোমামা বললেন, ‘আমি বিকেলে রোজ মাইল চারেক হাঁটি। শরীর যদি ফিট না থাকে দেশের, দশের কাজ কি করে করব? আমরা সকলেই তো পরের জন্যে জন্মেছি। যেমন আপনি জন্মেছেন আমার জন্যে, আমি জন্মেছি আপনার জন্যে। ব্যাপারটা কি ইন্টারেস্টিং, তাই না! আমি একটা আইসক্রিম খেলুম আপনার জন্যে। আপনি একটা মোগলাই খেলেন আমার জন্যে। এই যে বলে, গিভ অ্যান্ড টেক—এটা কি বলুন তো?’

    ‘ও তো সেই জ্ঞান হওয়া তক শুনে আসছি, ফেলো কড়ি মাখো তেল। দাও, প্রথমে দিতে হবে, তারপর নেওয়ার প্রশ্ন। দুনিয়াদারি হল দোকানদারি। কত দাম? একশো টাকা কেজি। এই নাও একশো টাকা। মাল ওজন হচ্ছে। এক কেজি তো এক কেজিই। এক গ্রামও বেশি নয়। এই তো সেদিন একটা ইংরিজি গান শুনছিলুম। এই পৃথিবী তোমাকে ফ্রি লাঞ্চ দেবে না। এই ব্যবস্থা কোথাও নেই। এ যে একটা সেলুন! চুল তোমার কাঁচি আমার। সাউথে গিয়ে দেখি, বিনা পয়সায় মাথা কামিয়ে দিচ্ছে। ব্যাপারটা কী? ওই চুল বিদেশে চালান যাবে—পরচুল তৈরি হবে।’

    মেজোমামা বললেন, ‘আমার কাছে সত্তরটা বিয়েবাড়ি ঘোরা একটা শাড়ি আছে।’

    ‘সে আবার কি?’

    ‘ওই যে গিভ অ্যান্ড টেক। কনের হাতে দিয়েই বলি, এইবার আমার হাতে দাও। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাবাউট টার্ন। লেফট, রাইট, লেফট রাইট, কুইক মার্চ।’

    বড়মামা এতক্ষণ পরে একটি কথা বললেন, ‘এই জন্যেই হল না। সব গল্প ফিরে এল। সব উদ্ভট। একটাও স্বাভাবিক ব্যাপার নেই। সব চরিত্রই পাগল। একটা গল্প আমাকে শুনিয়েছিল, তখন বুঝেছিলুম অসম্ভব। হবে না। বীরেশ্বর কুণ্ডু ছাতের কার্নিশে মর্নিংওয়াক করে। সেনাবাহিনীতে ছিল কর্নেল। একটা গুলিতে তিনজন ডেড। দমবন্ধ করে চব্বিশ ঘণ্টা থাকতে পারত। খাওয়ার ব্যাপারে ভেরি স্ট্রিকট। ভোরবেলা একদলা দই-চিঁড়ে। সারাদিনে কয়েক ফোঁটা গঙ্গাজল। বছরের শেষ দিনে একবারই টয়লেটে যেত। আর শরীরে ওজন ইচ্ছেমতো কমাতে-বাড়াতে পারত। কখনো তুলো, কখনো পাহাড়। যখন হাসত, মনে হত বালক। গর্জন করলে সিংহ। নিজেকে ছড়িয়ে দিতে পারে। এক হয়ে গেল এক হাজার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কামকাটস্কাকায় এক ভারতীয় যোগীর ঘাড়ে গিয়ে পড়েছিল বিপক্ষের তাড়া খেয়ে। যোগী ওরই পায়ের বুট খুলে বেধড়ক পিটিয়ে মহাভারত মুখস্থ করালেন। মহাভারত না পড়লে বীর যোদ্ধা হওয়া যায় না জানোয়ার কোথাকার! তারপর এটা ময়ূরের পালক হাতে নিয়ে বললেন এই তোর কৃষ্ণ! এই হল ওর গল্প। কে ছাপবে, কেন ছাপাবে! সকলে কি সব কিছু পারে? কেউ বললে, আমি গাইয়ে হব। আমার গলায় সুর নেই, আমি গাইয়ে হব। আমার ভেতরে ভাব নেই, আমি কবি হব। পাগল, পাগল, সব পাগল।’

    বনমালীদা ফিরে এল, ‘বউদি জিগ্যেস করলে, কি করবে?’

    ‘কিসের কি করবে?’

    ‘তোমার বেড়াল ছটা বাচ্চা নিয়ে বিছানায় উঠেছে।’

    ‘ইচ্ছে হয়েছে উঠেছে। আমি কী করব!’

    ‘ওরা কি থাকবে?’

    বড়মামা পশুপ্রেমী। বড়মামা বললেন, ‘মা তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে কি পথের ধুলোয় পড়ে থাকবে? এটা কোনও প্রশ্ন হল?’

    ললিতকাকু বললেন, ‘কিছু মানুষ আছে নিজেকে ছাড়া কারোকে সহ্য করতে পারে না। বেড়ালটাকে দেখলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। বাসন্তী রঙের বেড়াল। আমার মনে হয় মা সরস্বতীর হাউসহোল্ড থেকে নামছে। মায়ের দেশটা যেন কোথায়? যদ্দুর জানি, মা তো মিস, মিসেস হননি, তাহলে তো বাপের বাড়ি কৈলাসেই থাকেন। এই বেড়ালটার পূর্ব পূর্ব ডট ডট ডট কম ওই কৈলাস! যেমন আমাদের মেজদা অধ্যাপক হলেও উনি কাক বংশের ক্রো। বিলেতে সায়েবদের টাইটেলে ক্রো আছে, মার্টিন ক্রো। বুল আছে। একজন নামকরা মহিলার নাম সারা বুল।’

    বড়মামা বললেন, ‘বাসন্তী আপনার বাড়িতে অনাদরে আছে। আমি বুঝতে পারছি। বাসন্তী তার ছেলে-মেয়ে নিয়ে এখানে চলে আসুক। আমি পালকি পাঠাচ্ছি। এখানে সে কন্যার আদরে থাকবে। আপনি তার পিতার মতো যখন-তখন এসে দেখে যাবেন।’

    ‘এটা বোধহয় সম্ভব হবে না। কারণ, বাসন্তী আমাদের লক্ষ্মী, ফরচুন।’

    ‘বেড়ালের সঙ্গে মা লক্ষ্মীর নয় মা ষষ্ঠীর সম্পর্ক। বেশ বাসন্তীর মেয়ের রঙও বাসন্তী হবে। আমাকে দেখেন। একটা, দুটো, তিনটে।’

    ‘অ্যায়, এইটাই হল ট্রাজেডি। একটা বাচ্চাও মায়ের দিকে গেল না।’

    ‘বাসন্তী রঙের একটাও হল না, সাদা হল, ছাপকা, সাদা-কালো।’

    খুক খুক একটা কাশি শোনা গেল। পণ্ডিতমশাই। সেই পোশাক-ধুতি, উত্তরীয়, চটি। থেকে থেকেই নাক টানেন, মুদ্রাদোষ। হাতে একটা পাঁজি থাকবেই থাকবে। একাদশী, অমাবস্যা, প্রতিপদ। গ্রহে গ্রহে ঠোকাঠুকি। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ‘এবারে তাহলে পুজো হচ্ছে না?’

    বড়মামা পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘কেন, পুজো হবে না কেন? আপনি বারণ করেছেন?’

    পণ্ডিতমশাই খুব রাগী। অনেকে রেগে গেলে ইংরিজি বলেন, মাঝে মাঝে হিন্দি। পণ্ডিতমশাই বলেন সংস্কৃত। গলগল করে সংস্কৃত বেরোতে থাকে, অনুস্বর, বিসর্গ, চন্দ্রবিন্দু। ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, ‘আমি বারণ করব কেন? কস্য ত্বং বা কৃতঃ আয়ত,—কোন ঘাটের মড়া পুজোর মাঠে প্রোমোটারি করছে, আমি জানতে চাই।’

    ‘ও আর জেনে কি হবে? সর্বং খল্বিদং প্রোমোটারং। আশ্চর্যং আশ্চর্যং ইতি মে মতি। ত্রিভুবনং প্রোমোটারেণ থিক থিকং, যত্র যত্র দৃষ্টিং পততি। বৃহৎ বৃহৎ ইমারতং দর্শতি।’

    ‘মিটিং-এ বসছ কবে?’

    ‘সে তো কমিটি জানে। পুজো এবছর কোন কোম্পানি স্পনসর করছে?’

    ‘সে তো তোমার জানার কথা, তুমি তো আজীবন প্রেসিডেন্ট।’

    ‘প্রেসিডেন্ট তো একটা নাম। মালাপাড়া পুজো কমিটির প্রেসিডেন্ট তিন বছর হল মারা গেছেন। ওরা জানেই না।’

    ‘আরে গতবার তোমাদের সেক্রেটারিকে বললুম, নদের নিমাই যাত্রাপালাটা দাও না। সে বললে, ওসব নিমাই-টিমাই চলবে না। আমাদের পুজোর একটা ঐতিহ্য আছে।’

    মাধাইদা ঘরে ঢুকল। পাড়ার সবাই বলেন, নামটা ড্যামেজিং তবে ছোলটা ভীষণ ভালো। খাঁটি। মাধাইদা প্রণাম-টনাম করে বড়মামাকে জিগ্যেস করলে, ‘কটায় বেরোবেন?’

    ‘বারোটা। তুই কি বলিস?’

    ‘রাস্তাঘাট নির্জন থাকবে, সমস্যা একটাই, কুকুর।’

    ‘ও তোরা চার-পাঁচজন থাকবি। হাতে একটা লাঠি থাকবে।’

    ‘বড়দা, লাঠি রাখব না। আজকাল সাদা-পোশাকে পুলিশ রাতবিরেতে ঘাপটি মেরে থাকে। আগে যেমন দেখলেই বোঝা যেত পুলিশের গাড়ি, এখন বোঝার উপায় নেই। আসলে ব্যাপারটা তো কিছুটা বেআইনি।’

    ‘বেআইনি বলছিস কেন?’

    ‘বডিটা তো ডেড নয়; কিন্তু সব কিছু ডেডবডির মতো। শ্মশানে ঢুকবে?’

    ‘ঢুকবে। নামাবি। কিছুক্ষণ রাখবি।’

    ‘হেভি রিস্ক। এত রাতে আর কোনও বডি না থাকলে চুল্লিতে ঢুকিয়ে দেবে। একটা ডেথ সার্টিফিকেট লিখে আমার কাছে রেখে দিন। সাবধানের মার নেই।’

    ‘এ তুই কি বলছিস, নিজের সার্টিফিকেট নিজে লিখবো?’

    ‘ও কাজে না লাগলে রেখে দেবেন, পরে একদিন না একদিন কাজে লেগে যাবে। পদ্ম আর গোলাপ এনেছি। প্রচুর গাঁদা, চার প্যাকেট চড়া গন্ধ ধূপ। অগরুও এনেছি।’

    ‘পুরো বডিটা ফুলের তলায় থাকবে। মুখটা বাদ।’

    ‘হয়ে যাবে। খই আনিনি। কুশল বললে খই আজকাল ছড়ায় না। রাস্তা নোংরা হবে। কেস খাবেন।’

    ‘তা যা, খাটিয়ায় দড়ি পরা। আর বেশি সময় নেই।’

    ‘কুশল আর মধু লেগে গেছে। বাড়ির কেউ কাঁধ দেবে?’

    ‘না, বাড়িতে কেউ নেই। একা। ওই মাধাই একটু দেখে-টেখে। রাত দশটা নাগাদ খাওয়া-দাওয়া করে বসে আছে। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। এইটাই হল কেস, স্টোরি। বুঝলি!’

    ‘তার মানে, খেয়ে-দেয়ে মরবেন।’

    ‘না খেয়ে মরব কেন?’

    ‘এই পোশাকে যাবেন?’

    ‘না না ধুতি-পাঞ্জাবি। মোটা খদ্দর। স্বাধীনতা সংগ্রামী।’

    ‘বলো হরি বলা হবে?’

    ‘খুব গম্ভীর গলায় থেকে থেকে বলবি হরি বোল, হরি বোল। শান্ত, ভদ্র।’

    মাসিমার ঘুম ছুটে গেছে। জিগ্যেস করলেন, ‘মাধাই, ব্যাপারটা কি রে?’

    ‘দিদি, আমরা ঠিক বলতে পারব না। বড়দাকে জিগ্যেস করুন।’

    বড়মামার মুখে সেই হাসি, যে হাসিকে তিনি স্বপ্নে দেখেছন। চাঁদের আলোর রাতে দোতলার বারান্দায় বেতের চেয়ারে ভগবান বসেছিলেন একা একা। বড়মামার কিছুতেই ঘুম আসছিল না। তখন ভাবলেন চাঁদের আলোয় চান করে আসি। দরজা খুলে বারান্দায়। ‘বেতের মোড়ায় কে বসে? মেজো! তোরও ঘুম আসছে না?’

    ‘আমি মেজো-সেজো নই। বড়র বড়, তারও বড়, সবার বড়, ভগবান।’

    বড়মামা অজ্ঞান হয়ে ভগবানের পায়ের কাছে পড়ে গেলেন। ভগবান জ্ঞান ফেরালেন। চোখ চাইলেন। কেউ কোথাও নেই। হাসিটা ভাসছে। ভাসতে ভাসতে এদিক যাচ্ছে, ওদিক যাচ্ছে, মুখটা নেই, হাসিটা রয়েছে। বড়ামামা বলেন, ওই যে ভগবান জ্ঞান ফেরালেন, ওটা চরম জ্ঞান। এই পৃথিবীর বিলকুল জানা হয়ে গেছে। বড়মামা বলেন, আশ্চর্য ব্যাপার। আমার এই পৃথিবীতে কোনও প্রশ্ন নেই, সব উত্তর। সে নাকি খুব মজা হয়েছিল। ডাক্তারদের সেমিনার। দেশ-বিদেশের ডাক্তররা এসেছেন, রোগা, মোটা লম্বা, বেঁটে। প্রশ্নোত্তর পর্ব। ‘ডক্টর মুখার্জি! এনি কোশ্চেন?’

    বড়মামা বললেন, ‘আমার কোনও প্রশ্ন নেই, সবই উত্তর।’

    একজন দুষ্ট প্রকৃতির আমেরিকান ডাক্তার বললেন, ‘ইজ ইট? আচ্ছা বলো তো, মানুষের মাথাটা কেন ওপর দিকে?’

    বড়মামা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘পা দুটো নীচের দিকে বলে!’

    সায়েব একটু ব্যঙ্গ করলেন। আর যায় কোথায়। বড়মামা মাইক্রোফোনে—’মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড!’ এক ঘণ্টার একটা বক্তৃতা। সাতটা আন্তর্জাতিক পত্রিকায় ছাপা হল। চিঠি এল সাতশো। বড়মামা শুরুই করলেন এইভাবে ‘সব মাথাই পায়ে পড়তে চায়, কারণ ওই জায়গাটাতেই মানুষ নিবেদন করতে চায় তার শ্রদ্ধা, তার প্রেম, তার হৃদয়েব সব ঐশ্বর্য। মাথাতেই আছে হাত, পা, দর্শন, শ্রবণ, ঘ্রাণ, অনুভূতি। মাথই হল কম্যান্ডার। বাকি সব তার অনুচর। মাথার শুরুটা পায়ের কাছেই। ইচ্ছার শক্তিতেই ওপরে ওঠে। কিন্তু মনে রাখতে হবে জ্ঞানীর উপদেশ—

    Be wise

    Soar not too high to fall, but stoop to rise.

    খুব উপরে উঠো না অনিবার্য পতন, বরং নুয়ে পড় তবেই উঠবে। পা দুটো পথিক ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করে অভিজ্ঞতা, জ্ঞান। আর মাথাটা হল ঝুলি, সব তুলে রাখে ওইখানে। তারপর নিজের মাথাই নিজের পায়ে পড়ে। পা তখন লাথি মেরে চলে যায় নতুন জীবনের দিকে।

    আমি সব সময় বলি, ‘বড়মামা ইজ বড়মামা, নো তুলনা।’

    মাসিমা খুব চড়া গলায় বললেন, ‘বড়দা! কী করতে চাইছ, বলবে?’

    ‘বলবো, কিছুক্ষণের জন্যে মরে যাব, তারপর আবার বেঁচে উঠব।’

    ‘মানে?’

    ‘একটা মানুষ মরে যাওয়ার পর কী করা হয়? তাকে খাটে তুলে ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। রাস্তা থেকে ছ’ফুট উচ্চতায় শূন্যে ভাসতে ভাসতে চলল শ্মশানে। চারটে কাঁধ থেকে তিনি মাটিতে নামলেন। বডি রেখে সবাই চলল চা খেতে। সিগারেটে টান মারতে। যখন চিতায় চাপানো হত তখন কেউ গেল কাঠের অর্ডার দিতে। ডোমেদের হেড এসে বডি দেখে বলে দেবে ক’মন কাঠ লাগবে। তারপর এটা ওটা সেটা। তিনি চিতায় চড়লেন। মুখে আগুন। এক সময় ছাই। এই যে এতসব হচ্ছে, যে মরেছে সে কিছুই জানতে পারছে না। এত বড় একটা ব্যাপার। এ তো এই নয় যে, তালাবন্ধ করে কয়েকদিনের জন্যে কোথাও বেড়াতে যাচ্ছি। আবার ফিরে আসব!’

    মেজোমামা বললেন, ‘তা তোমার প্ল্যানটা কি?’

    ‘আমার ধারণা, সে বুঝতে পারে, খুব ভালোভাবেই পারে, প্রকাশ করতে পারে না। ‘সিস্টেম ফেলিওর।’ যন্ত্র অকেজো হয়ে গেছে। অনুভূতিটা যাবে কোথায়! অনুভূতি তো কোনও যন্ত্র নয়। একটা ব্যাপার। আমি জ্যান্ত শব হয়ে আমি আগেভাগে অনুভব করে নিতে চাই শেষযাত্রাটা আমার কেমন লাগবে! এ কথা তো কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে আমি একজন বিজ্ঞানী। আত্মপ্রচার অসভ্যতা।’

    ললিতকাকু বললেন, ‘ফ্যান্টাস্টিক! আপনি জাস্ট একদিন ওয়েট করুন, আমিও আপনার সঙ্গী হব। আজ তো দশকর্মা ভাণ্ডার বন্ধ হয়ে গেছে। কি কি লাগবে? খাটিয়া, নারকেল দড়ি, পাতলা তোশক, সাদা চাদর, ইত্যাদি ইত্যাদি। এটাও একটা ব্যাপার মানে সকলেই তো একা একা মরে, একা একাই শ্মশানে যায়, এ আমরা পাশাপাশি দুজনে গল্প করতে করতে যাব।’

    ‘গল্প করতে করতে? আপনি পাগল না কি? ডেডবডি কথা বলবে? লোকে কি ভাববে? ছ্যা ছ্যা করবে। গায়ে থুথু দেবে। মুখে চুন-কালি মাখাবে।’

    ‘সরি, সরি, আমি অতটা ভেবে দেখিনি। মনে করেছি বেঁচে আছি।’

    ‘বেঁচে থাকলে কার দায় পড়েছে আপনাকে কাঁধে করে শ্মশানে নিয়ে যাবে?’

    ‘বুঝেছি, বুঝেছি, একদম চুপচাপ। মনে মনে গুন গুন করে গান গাইব, হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল, পার করো আমারে।’

    ‘সে আপনার যা ভালো লাগে করবেন। আমি চুপচাপ পড়ে থাকব শবাসনে। চোখের ওপর কালো আকাশ। আমি পাঁজি দেখে নিয়েছি। নটা তেত্রিশে অমাবস্যা লেগে গেছে। কালো আকাশ। ফুটকি ফুটকি তারা। দু’পাশে বাড়ি। দোতলার বারান্দা অন্ধকার। কেউ হয়তো দাঁড়িয়ে আছে। সিগারেট খাচ্ছে। অনেকটা উঁচুতে হ্যালোজেন বাতি…’

    ‘কি আশ্চর্য! আপনি দেখেছেন কেন? ডেডবডি দেখে না, দেখতে পায় না, পেলেও দেখা উচিত নয়। জোচ্চুরি হচ্ছে। চোখে তুলসীপাতা সেঁটে দেয়, নাকে তুলো। আমার গল্প বন্ধ করে দিলেন, এদিকে নিজে শুয়ে শুয়ে তারা দেখছেন? একে বলে পক্ষপাতিত্ব।’

    ‘একটা ডেডবডির আর একটা বডি কি করছে কখনোই দেখা উচিত নয়। এটা হল মিনিমাম সংযম, ভদ্রতা। যেমন পরীক্ষায় বসে টোকাটুকি অত্যন্ত গর্হিত কাজ। আমি কি দেখছি আপনি কি করছেন। একটা কথা মনে রাখতে হবে, আমরা মরে গেছি। বাংলা সিনেমায় দেখেননি, বড় বড় অভিনেতা, অভিনেত্রীরা কি ভাবে মরছেন। মরে পড়ে আছেন চিৎ হয়ে। সবাই ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। প্রার্থনা সঙ্গীত হচ্ছে। তারপর শবযাত্রা। চিতাও দেখানো হয়। মুম্বাই ছবিতে খুব ঘটা করে দেখানো হয়। ডেডবডি উনুনে ঢুকিয়ে দিলে সিনেমা মার খাবে। দাউ দাউ আগুন চাই। লেলিহান শিখা।’

    ‘তাহলে কি দাঁড়াল?’

    ‘আজ আমি শব। আপনারা শবযাত্রী। কাল আপনি শব আমরা শবযাত্রী। মড়ার ‘সেট’ তা তৈরিই আছে। কেনাকাটার দরকার নেই।’

    ‘এক মড়ার জিনিস আর এক মড়া ব্যবহার করবে?’

    ‘ওতে দোষ নেই, গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিলেই হবে।’

    ললিতকাকু বললেন, ‘তাহলে বাড়ি থেকে গামছাটা নিয়ে আসি। কোমরে বাঁধতে হবে তো। এই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। আগে কখনো মড়া পোড়াইনি। ভীষণ একসাইটেড লাগছে।’

    ‘সব আছে, এক ডজন নতুন গামছা। বড়, ছোট। বড়টা কোমরে, ছোটটা মাথায়।’

    মেজোমামার আবার এইসময় একটা ঢুলুনি আসে। সময়টা পেরিয়ে গেলে সারারাত জাগতে পারেন। খুটখুট করে কত কি যে করেন! লেখাপড়া তো আছেই, তা ছাড়াও অনেক কিছু। মেজোমামা মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিয়ে বললেন, ‘এইমাত্র একটা আইডিয়া এল। ভীষণ রোমান্টিক। ও বেশ খ্রিস্টান, ওকে আমরা কবর দেব। কালো একটা কফিন। মাটির তলায় সাত-আট ফুট গভীরে নামিয়ে দিয়ে মাটি চাপা দোবো।’

    ‘মরে যাবে তো!’

    ‘তা কি, বেশিক্ষণ বাঁচবে না। শুধু মরবে না, আমাদেরও মেরে যাবে। ফাঁসি হবে।’

    বড়মামা বললেন, ‘ওর কথা বাদ দিন। ছেলেটার কোনও কল্পনাশক্তি নেই। কি করে অধ্যাপক হয়েছে কে জানে!’

    ললিতকাকু বললেন, ‘সে আমি ছেড়ে দিচ্ছি। একটা কথাই ভাবছি, কেউ কি খেয়ে মরে?’

    ‘কি আশ্চর্য! খেয়েই তো মরে! আমার চার-পাঁচজন পেশেন্ট। এই তো রে বাবা, ক’দিন আগে নিতাইবাবু, আমাদের নিতাইবাবু, মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে একসঙ্গে সাতটা বাগদা চিংড়ি খেয়ে অন্ত্রিকে মারা গেল। আমি লুচি খেয়ে, গ্যাস অম্বলে হার্টফেল করলুম। আরে মশাই মরার তো একটা কারণ থাকবে। মরব বললেই মরা যায়!’

    মাধাই এসে বললে, ‘সব রেডি। একবার শুয়ে দেখে নিন, পিঠে লাগছে কি না! তাহলে আর একটু খড় ঢুকিয়ে দেব।’

    ললিতকাকু বললেন, ‘মৃত ব্যক্তির লাগে না। এত শবযাত্রা দেখেছ, কখনো শুনেছ কি, শব চিৎকার করে বলছে, ‘ওরে এত নাচাচ্ছিস কেন? আমি যে ছিটকে রাস্তায় পড়ে যাব।’

    মাধাই বিরক্তি মেশানো গলায় বললে, ‘আপনি এমন ভাবে কথা বলছেন যেন বড়দা সত্যি সত্যি মারা গেছেন!’

    বড়মামা বললেন, ‘মাধাই, আজ রাতে নো রাগারাগি।’

    খাঁটি ঘিয়ে লুচি ভাজার গন্ধ। বড়মামা বললেন, ‘আমি পোশাকটা পাল্টে আসি। রাজবেশ। পণ্ডিতমশাই আজ ভগবান আপনাকে এখানে পাঠিয়েছেন। কুসি সাজিয়ে দিচ্ছে, আপনি রাধা-গোবিন্দকে একটা ভোগ নিবেদন করে দিন।’

    বড়মামা কিছুক্ষণের মধ্যে রাজবেশ ধারণ করে নেমে এলেন। কি দেখাচ্ছে? কত সুন্দর! ওদিকে ঠাকুরঘরে ঘণ্টা বাজছে। পণ্ডিতমশাই বিশুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্রপাঠ করছেন। বড়মামা বললেন, ‘এসো, আমরা সবাই একসঙ্গে খেতে বসি। কেউ যেন বাকি না থাকে। কুসি তো আমাদের সকলের মা। কুসি! সেই ছেলেবেলায়, মনে পড়ে, ঘুমে চোখ ঢুলে আসছে, মা আমাদের তিনজনের মুখে একে একে খাবার তুলে দিচ্ছেন! তুই প্রথম গ্রাসটা আমার মুখে তুলে দে। এইটাই আমার শেষ গ্রাস। কুসি! তুই ভীষণ ভালো মেয়ে! তুই মা, তোর মধ্যে আমি আমার বিশ্বজননীকে দেখেছি। আর ওই মেজো, ও তো চির বালক! ওকে সাবধানে রাখিস। আর আমাদের এই ভাগনে, একে ডাক্তার করিস। আমার স্টেথিস্কোপটা যেন এর গলায় ঝোলে। আমাদের পরিবারের ঐতিহ্য জান-প্রাণ দিয়ে ধরে রাখিস। বনমালীদা আরও কিছুদিন থেকো, মানুষের বাগানের মালী হয়ে।’

    ললিতকাকু বললেন, ‘কেমন যেন সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে।’

    মেজোমামা স্তব্ধ। মাসিমা স্তম্ভিত।

    বড়মামা দেবতাদের প্রণাম করলেন। গৃহকে প্রণাম করলেন। পূর্বপুরুষদের ছবির সামনে দাঁড়ালেন। মনে মনে কিছু বলছেন। ঠোঁট নড়ছে সকলের দিকে হাসি হাসি মুখে তাকালেন। বনমালীদার হাত দুটো ধরে বললেন, ‘তুমি রইলে।’ পণ্ডিতমশাইকে প্রণাম করলেন। মাসিমাকে বললেন, ‘আমার কপালে ভাইফোঁটা দে।’ মাসিমা একটা চন্দনের ফোঁটা দিলেন। কি হচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, সকলেরই কথা বন্ধ। স্তব্ধ রাত। পাতায় পাতায় বাতাসের শব্দ। বড়মামা ধীরে ধীরে খাটের দিকে এগোচ্ছেন। পাশেই একঝুড়ি সাদা ফুল। বড় বড় পদ্ম। ধবধবে সাদা চাদর। শববাহকরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কোমরে বাঁধা গামছা। ধূপের ধোঁয়া অন্ধকারে সাদা সাদা চুলের মতো ঘুরে ঘুরে আকাশের দিকে উঠছে। সেই পেঁচাটা সাদা শাঁখের মতো। একেবারে ঘড়ি ধরা সময়ে এসে গেছে। চিলের ছাতের কার্নিশে। কিছুক্ষণ ধ্যান করবে। তারপর চ্যাঁ চ্যাঁ করে উড়ে যাবে গঙ্গার ধারের শিবমন্দিরের দিকে।

    খাটের কাছে এসে বড়মামা আমাদের দিকে ফিরে তাকালেন। জোড়হাতে বললেন, ‘জ্ঞানে, অজ্ঞানে যে সব খারাপ ব্যবহার করেছি, দুঃখ দিয়েছি, অবিচার করেছি, তার জন্যে আমি ক্ষমা চাইছি। আমি এসে কিছুদিন তোমাদের সংসারে থেকে গেলুম, ‘এবার পেয়েছি ছুটি বিদায় দেয় ভাই, সবারে আমি প্রণাম করে যাই।’ হ্যাঁ, একটা কথা, হঠাৎ একটা বাতাস আসবে, সব গাছে পাতা ঝপঝপ করে উঠবে, তখনই বুঝবে, আমি চলে গেলুম, চিরবিদায়। শুনতে পাবে, কোথাও যেন ঘণ্টা বাজছে, আরতি হচ্ছে, সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ শুনবে। আর কথা নয়, এবার আমাকে ধরাধরি করে শুইয়ে দাও, শবকে যেভাবে শোয়ায়। কুসি আমার বুকে একটা পদ্ম রাখবে, হৃদকমলে একটি কমল।’

    কাজলদি আঁচল দিয়েছে চোখে। বড়মামার পেছন দিকে বাগান। আলো আর অন্ধকার। হঠাৎ, বড়মামা ফুলের ঝুড়িটা হাতে তুলে নিয়ে হা হা করে হাসতে হাসতে মাসিমার দিকে এগিয়ে গেলেন। সমস্ত ফুল মাসিমার মাথায় উজাড় করে ঢেলে দিতে দিতে বললেন, ‘ওরে! তোকে ছেড়ে এত তাড়াতাড়ি আমি যে যেতে পারব না।’

    মাসিমার মাথায় একটা পদ্মফুল আটকে গেছে। পায়ের কাছে কত ফুল জমা হয়েছে। কাজলদি হাততালি দিচ্ছে, ‘সরস্বতী! আমাদের মা সরস্বতী। জয় জয় দেবি, চরাচরসারে…’

    বড়মামা জিগ্যেস করলেন, ‘কেমন হল?’

    মাসিমা বললেন, ‘অনেকদিন, অনেকদিন আমার হাতে পেটানি খাসনি। পাখাটা, সেই পাখাটা কোথায় গেল। যেটা তোর পিঠে পড়ত!’

    পণ্ডিতমশাই বললেন, ‘তালপাতার হাতপাখা এক অসাধারণ সৃষ্টি। একদিকে শীতল বাতাস, আর একদিকে কঠোর শাসন। তা ডাক্তার, তুমি করলে ভালো, পাকা অভিনেতা হে! তা এখন বলো…।’

    বড়মামা একটি ফুল তাঁর পায়ে রেখে বললেন, ‘মায়ের পুজো, হবে, হবে, হবে।’

    সেই প্যাঁচা। মা লক্ষ্মীর বাহন চ্যাঁ চ্যাঁ করে জানিয়ে দিল এই বাড়িতে আমার মা আছেন, আছেন, আছেন।

    আশ্চর্য! আজ আর উড়ে গেল না।

  • মিত্তির বাড়ি

    মিত্তির বাড়ি

    মুখবন্ধ

    মিত্তিরদের খুব নাম। প্রাচীন, বনেদী পরিবার। পিতামহ তাঁর ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতার জন্য ইংরেজ আমলে রায়বাহাদুর খেতাব পেয়েছিলেন। পিতামহী ছিলেন বিদুষী, সুন্দরী। জীব, জন্তু, পশু-পক্ষী প্রেমী। নিজের একটি আত্মজীবনী লিখেছিলেন, ‘বঙ্গললনার সংসার পরিক্রমা’। বইটির একটি মাত্র কপি মিত্তির বাড়িতে সযত্নে রক্ষিত আছে। মরক্কো লেদার বাইন্ডিং। সোনার জলে নাম লেখা, প্রমীলা মিত্র। বইটি একটি কাচের আধারে থাকে। সেবাযত্ন পায়। সেকালের সংবাদপত্রে প্রমীলা মিত্রের নাম পাওয়া যায়। স্বামী বিবেকানন্দ ও নিবেদিতার আদর্শে তিনি স্ত্রীশিক্ষার কাজে ব্রতী হয়েছিলেন। একটি বিদ্যালয় ও একটি আতুরালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রসূতি পালন, ধাত্রীবিদ্যা ইত্যাদি পুস্তিকা রচনা করে সাধারণের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করেন।

    পিতা প্রদ্যুম্ন মিত্র ছিলেন বিজ্ঞানী। তাঁর কাজের ক্ষেত্র ছিল বাষ্পের শক্তি, বয়লার টেকনোলজিস্ট। বহুকাল বিলেতে ছিলেন। স্বভাবে পাক্কা সাহেব। দৈব-দৈত্যে বিশ্বাসী না হলেও পিতৃপুরুষ ও মাতৃভক্ত ছিলেন। মিত্তির বাড়ির তিনতলার মন্দিরে তাঁরাই বসে আছেন পাশাপাশি ছবি হয়ে। নিত্যপুজা ও ভোগরাগাদির ব্যবস্থা আছে। যিনি যে আহার পছন্দ করতেন ভোগে তাই নিবেদন করা হতো। পিতামহের প্রিয় পুঁইশাক, পিতামহীর পোস্ত, পিতার স্যুপ, মাতার বড়ির ঝাল।

    সম্পদ ও সম্পত্তি পুরুষানুক্রমে বেড়েছে, যা সাধারণত হয় না। অন্নচিন্তা চমৎকারা হয়ে দেখা দেয়নি। বর্তমান বংশধরেরা সকলেই প্রতিষ্ঠিত। বড় ভাই নামকরা ডাক্তার। মেজোভাই দর্শনের সুখ্যাত অধ্যাপক। ভোজনরসিক। সামান্য খামখেয়ালী। বড়ভাই পিতামহীর পশুপ্রেমের উত্তরাধিকারী। সেজভাই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। ন’ভাই আর্টিস্ট ও ডিজাইনার, ফ্যাশান মডেলার। বোন, কুসি শিক্ষিতা। রসায়নের গ্র্যাজুয়েট। সম্প্রতি বিউটিশিয়ান। সৌন্দর্য ও গাছগাছড়া তার বিষয়। নানারকম সৌন্দর্য প্রলেপের নানা পরীক্ষা নিয়ে সে ব্যস্ত।

    মিত্তিররা পাঁচজনকে নিয়ে বেশ আছে। বাড়ি অবারিত দ্বার। মানুষ দুঃখ নিয়ে আসে, আনন্দ নিয়ে ফিরে যায়। এই শতাব্দীর শেষপাদেও যে গত শতাব্দীর আদর্শ নিয়ে মহাসুখে বাঁচা যায় এই মিত্তির পরিবারই তার প্রমাণ। প্রতিদিনই সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত একটা না একটা ব্যাপারে বাড়ি সরগরম। ভেতরের লোক আর বাইরের লোকে মিলে তৈরি হচ্ছে, মজা আর মজা। নানা চরিত্রের আগমন-নিগমনে বাড়িটি জীবন্ত এক থিয়েটার। অবিরত নাটক চলেছে।

    সবাই একডাকে বলে দেবে মিত্তির বাড়ি কোথায়। এই হিংসার যুগেও মিত্তিরদের কোনও শত্রু নেই। সকলেই ভালোবাসে। পাড়ার অভিভাবক বলে ভাবে। বলে, মিত্তির বাড়ি তো বাড়ি নয়, বিশাল একটা ছাতা। এই ছাতার তলায় আশ্রয় নেয়া যায়, আড্ডা মারা যায়, বনভোজন করা যায়। বাড়ির সবাই টগবগে জীবন্ত। কেউ হতাশায় ভোগে না। সকলের মনে আশার সঞ্চার করে, যেন বলতে চায়, তোমরাও আছ আমরাও আছি তোমাদের পাশে,

    হেসে নাও দু’দিনের বই তো নয়।অনলাইনে বেস্টসেলিং বই কিনুন

    এক

    মিত্তির বাড়ির ন’বউয়ের আজ জন্মদিন। একটা গ্রুপ ফটো তোলা হচ্ছে। মহা গুলতানি। বড় আর মেজো ভাইয়ের মহা সমস্যা। কি উপহার দেওয়া যায় যা ন’বউয়ের নেই। শেষে ঠিক হলো একটা নতুন বাথরুম দেওয়া হবে, মডার্ন স্টাইলের। আপাতত সিদ্ধান্তটাই উপহার। রাতের উৎসব জমে গেল বাচ্চাদের নাটিকা পরিবেশনে। সেই জমাট মুহূর্তে এসে হাজির হলেন পূর্বপরিচিত নিরাশ্রয় এক বৃদ্ধ। ব্যস্ত ফটোগ্রাফারের কেরামতিতে কেউ তিষ্ঠতে পারছে না। আপাতত ছবি, তারপর ধীরে ধীরে একে একে।

    ফটোগ্রাফার : একটু সরে, বড়দা একটু ডানদিকে। উঁহু, বাঁদিকে যাচ্ছেন কেন?

    বড়দা : কার ডানদিক? আমার, নাম তোমার? শোনো নির্দেশ যখন দেবে পরিষ্কার নির্দেশ। তোমার মাথায় এক বলছ আর এক। তোমার বলা উচিত ছিল, আপনার ডানদিক।

    মেজদা : শুরু হয়ে গেল। ওরে! মুখের কাছে একটা মাইক্রোফোন ধরে দে। আরও আধঘণ্টা উচিত, অনুচিতের লেকচার হোক।

    বোন কুসি : আধঘণ্টা হয়ে গেল, ঝড়ের এঁটো পাতার মতো, একবার ডান থেকে বাঁ, বাঁ থেকে ডান।

    বড়দা : আমার মনে হচ্ছে পাশাপাশি স্ট্রেট লাইনে দাঁড়ালে ভালো হতো।

    মেজদা : তোমার মুণ্ডু হতো। এত বড় একটা গ্রুপ। অর্ধচন্দ্রাকারে, ঘোড়ার ক্ষুরের নালের আকারে, কাস্তের আকারে…বাথরুম রেনোভেশন

    বড়দা : তোর মতো একটা ইডিয়েটের আকারে…

    মেজদা : তোমার মতো একটা পণ্ডিত মূর্খের নির্দেশে…

    [Flash]

    কুসি : যাঃ, মেরে দিলে!

    ফটোগ্রাফার (কুন্তল) : ঠিক এই জিনিসটাই চাইছিলুম। মিত্তির বাড়ির সব ব্যাপারটাই চনমনে। মাল্টিভিটামিন কমপ্লেক্স।

    [group photo বড় থেকে ন’ সব ভাই।

    সেজ বউ, ন বউ তাদের একটি ছেলে একটি মেয়ে। বোন কুসি।]

    [গ্রুপ ভেঙে ছড়িয়ে গেল।]

    মেজো : বড়দা তুমি এখনো মিচকি হাসি হাসছ কেন?

    বড় : অফ করতে ভুলে গেছি। ছবি তোলার সময় অন করেছিলুম। দেখবি, আলো আর হাসি, যে অন করে খুব হিসেবী না হলে অফ করতে ভুলে যায়। কুন্তল, হঠাৎ তুমি ছবি তুললে কেন?

    কুন্তল : লাস্ট ফিলম। একসপোজ করে দিলুম। এইবার রিলটা খুলে ওয়াশ করব।

    মেজো : একেই বলে, উড়ো খই গোবিন্দায় নমঃ।

    বড় : এই কথাটা অপমানসূচক।

    মেজো : কুন্তল আমার ছাত্র ছিল। ওকে একসময় আমি বাঁদর, উল্লুক, গাধা থ্রি ইন ওয়ান বলেছি। আমার সে অধিকার আছে।

    বড় : কুন্তল আমার পেশেন্ট। আত্মিক আঘাত থেকে তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমার। নার্ভাস টেনশানে ভুগছে। ঘুমের ওষুধ ছাড়া ঘুম আসে না।

    মেজো : কেন আসে না?

    কুন্তল : ভয়ে।

    মেজো : ভয়ের ওষুধ ঘুমের বড়ি নয়, একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত—

    আমি ভয় করব না ভয় করব না

    দু’বেলা মরার আগে মরব না ভাই মরব না।

    বড় : রবীন্দ্রসঙ্গীতের অডেশানে তোর পাশ সার্টিফিকেট আছে?

    মেজো : নো।

    বড় : তাহলে আর কেরামতি নাই বা করলে। ওটা বড় পবিত্র মন্দির।

    কুন্তল : স্যার! ও ভয় আর এ ভয়ে অনেক তফাৎ। অন্যের ঘুম ভেঙে যাওয়ার ভয়ে আমি ঘুমোতে পারি না।

    মেজো : সে আবার কী!

    কুন্তল : আজ্ঞে, আগে আমি ঘুমোতুম। আমার স্ত্রী সারারাত জেগে থাকত। চোখ গর্তে ঢুকে গেল। রোগা হয়ে গেল। হজমের গোলমাল। সবাই বললে, ফিমেল ডিজিজ। অনেক চিকিৎসা করালুম। শেষে জানা গেল, ওটা মেল ডিজিজ।

    মেজো : ফিমেলে মেল ডিজিজ কী ব্যাপার! ফি মেলে বলেই না ফিমেল ডিজিজ।

    কুন্তল : স্যার! লজ্জার কথা বলব কী!

    মেজো : আরে, লজ্জার কী আছে, ডিজিজ বলছ কেন? ফিমেলে ফিমেল আসতে পারে মেলও আসতে পারে। মানুষের হাতে কিছু নেই। আর ছেলেপুলেদের ডিজিজ বলাটা ঠিক নয় কুন্তল। সব মানুষেই মহামানবের সম্ভাবনা।

    ওই মহামানব আসে

    দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে

    কুন্তল : স্যার মহামানব নয় মহা নাক। শোয়া মাত্রই আমার নাকের পাঞ্চজন্য শঙ্খ বেজে ওঠে। হরেক জানোয়ারের মিলিত ডাক। শোবার ঘরে আফ্রিকার অরণ্য। প্রতিবেশীদের কমপ্লেন। আপনার বউমা ভয়ে জানলা খোলে না।

    মেজো : গাধা কোথাকার। ঘুমের ওষুধ বউকে খাওয়া, নিজে সুখে নিদ্রা যা।

    কুন্তল : সেইটাই তো করছি। প্রেসক্রিপশান আমার নামে, ওষুধ খাচ্ছে মিসেস।

    বড়দা : বাঃ, এই না হলে রুগি। এদের জন্যেই ডাক্তাররা পেটাই খায়।

    মেজো : এক কাজ করো না দাদা, নাকটা খুলে ক্লিন করে আবার সেট করে দাও।

    বড় : নাক নাকের জন্যে ডাকে না, প্রবলেমটা গলায়।

    মেজো : তাহলে গলাটা কেটে দাও।

    বড় : তারপর জেলে যাও, তারপর ফাঁসিতে লটকাও। আধহাত জিভ বের করে লাট খাও। আহারে! আমার ভ্রাতা লক্ষ্মণ রে!

    মেজো : এরা সব দাঁড়িয়ে কেন?

    বড় : আমাদের শ্রুতিনাটক শোনার জন্যে!

    মেজো : কর্তব্যে কর্মে অবহেলা। আমাদের তো এখন টি-টাইম (হাঁক) গান্ধারী!

    গান্ধারী। ইয়েস মেজদা।

    মেজো : কি করছিস!

    গান্ধারী : চাটুতে ঝাঁটা দিয়ে তেল মাখাচ্ছি।

    মেজো : এই ধরনের বদমাইশি তোকে কে করতে বলেছে।

    গান্ধারী : ন’ বউদি।

    মেজো : বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দাও।

    কুসি : কারণ?

    মেজো : চাটুতে আর ঝ্যাঁটাতে কেউ এক করে?

    কুসি : করে। ধোসা তৈরির সময়।

    বড় : কেয়া বাত! মশালা ধোসা। আমি উদ্বোধন করব।

    মেজো : আমরা দু’জনে করব। দুয়ে মিলে করি কাজ/ভুগে মরি নাহি লাজ।

    কুসি : আজ রেখার জন্মদিন। খেয়াল আছে?

    মেজো : বড়দা, তোমার আছে?

    বড় : তোর আছে?

    [ কুসি চলে গেল, বড় আর মেজো মুখোমুখি। ]

    মেজো : আমাদের মাথার অবস্থা দেখেছ? সব ভুলে যাই।

    বড় : আমি মনে রাখতে রাখতেও লাস্ট মোমেন্ট ভুলে গেলুম।

    মেজো : একটা কিছু দিতে হয়!

    বড় : অবশ্যই।

    মেজো : এক সঙ্গে, না আলাদা আলাদা।

    বড় : আলাদা আলাদা। এ তোমার বন্ধুবান্ধবের জন্মদিন নয়, যে চাঁদা তুলে একটা গামলা কিনে দিয়ে আসবে।

    মেজো : কি দেওয়া যায়? শাড়ি?

    বড় : হাজার খানেক আছে।

    মেজো : ভালো বই?অনলাইনে বেস্টসেলিং বই কিনুন

    বড় : কেউ পড়ে না। আজকাল চিঠির নীচে অলিখিত থাকে—বই না দিলে বাধিত হব। [বড় পায়চারি করতে করতে] এমন একটা কিছু, এমন একটা কিছু।

    মেজো। [উঠে দাঁড়িয়ে] এমন একটা কিছু, এমন একটা কিছু।

    দুজনে : [সমস্বরে] যা কাজে লাগে।

    দুজনে : [সমস্বরে] গান্ধারী!

    গান্ধারী : যাতা হুঁ ম্যায়।

    মেজো : তোর ন বউদির কি নেই! চিৎকার করবি না, ফিসফিশ করে বল।

    গান্ধারী। [ফিসফিস] ছেলে নেই! ছেলের খুব শখ।

    বড় : ছেলে? এত রাতে ছেলে কোথায় পাব?

    মেজো : আরে, কী যে বল? এ ছেলে সে ছেলে নয়। ভেতরের ছেলে।

    বড় : [বুঝতে পেরে] ও হোঃ সেই ছেলে। সন্তান! সন্তান। এইটুকু থেকে তোর মতো এত বড় একটা দামড়া। সে তো মানুষের হাতে নেই।

    গান্ধারী : আছে। আছে। মাদুলি। সেই মাদুলি দেশ থেকে আসার সময় তিনটে এনেছি। সেই গুণীন শ্মশানে থাকে। ভূত চতুর্দশীর রাতে তিন পহরে শেয়ালের ডাক শুনে কাজ আরম্ভ করে।

    মেজো : কী কাজ?

    গান্ধারী : সে আমরা কি জানি। এক একটা মাদুলির খরচ পড়ে যায় পাঁচশো। এর পর বাইরের সাজ। তামার মাদুলি, রুপোর মাদুলি, সোনার মাদুলি। যে যাতে ভরবে। মেয়ের মাদুলির খরচ কম, মাত্র একশো টাকা। প্রত্যেকটা মাদুলির সঙ্গে আধ হাত লাল সুতো ফিরি।

    মেজো : কী বড়দা, দেবে নাকী! তুমি একটা, আমি একটা।

    বড় : তাহলে তো যমজ হয়ে যাবে! সে কী সামলাতে পারবে? বরং আমি ভেতরটা দি, তুই বাইরেটা দে। একটা সোনার মাদুলি আর কত নেবে! হাজার বারোশো!

    মেজো : না, আমি ভেতরে তুমি বাইরে।

    বড় : না, তুই বাইরে আমি ভেতরে।

    মেজো : আমি ভেতর, তুমি বাইরে।

    বড় : বাইরে।

    মেজো : ভেতরে।

    বাইরে। ভেতরে। ভেতরে। বাইরে।

    গান্ধারী : উরেব্বাসরে। এ কী করতে লেগেছে। যাই, কুসি দিদিমণিকে ডেকে আনি।

    মেজো : আমি ভেতরে থাকায় অবিচল।

    বড় : আমি বাইরে যাব না, যাব না, যাব না।

    কুসি : তোমরা দুটোতেই বাইরে যাও। বেরোও। গেট আউট। দুটো দামড়া হুলো। মুখোমুখি হলো তো ফ্যাঁসফোঁস। যাও, যাও। রাত দশটার আগে দুজনের মুখ যেন না দেখি।

    বড় : কুসি, তুই এসেছিস! এ বাইরে সে বাইরে নয় রে। এ হলো মাদুলির বাইরে।

    কুসি : কিসের মাদুলি?

    বড় : সোনার মাদুলি।

    মেজো : আমি ভেতরে পাঁচশো। ও বাইরে বারোশো।

    বড় : না, আমি ভেতরে পাঁচশো, ও বাইরে বারোশো।

    মেজো : কান্ট বি।

    বড় : উইল বি।

    কুসি : কিসের মাদুলি? কই দেখি মাদুলিটা।

    মেজো : সে তো স্যাকরার দোকানে। আমাকে কিনতে বলছে।

    কুসি : কিনতে বলছে কেন?

    মেজো : ওর মধ্যে মন্ত্রপূতঃ গান্ধারী ঢুকবে।

    কুসি : সে আবার কে?

    বড় : ব্যাপারটা আমি ক্লিয়ার করছি। ও উত্তেজিত। মাদুলির মধ্যে থাকবে গান্ধারীর শ্মশান।

    কুসি : গান্ধারীর শ্মশান! শ্মশান থাকবে মাদুলিতে! গান্ধারীটা কে?

    মেজো : আমাদের গান্ধারী। মহাভারতের গান্ধারী নয়।

    কুসি : [গলা চড়িয়ে] গান্ধারী।

    গান্ধারী : হাঁ দিদি।

    কুসি : কি ব্যাপার!

    গান্ধারী : যত দূর বুঝেছি, এরা ন’ বউদিকে মাদুলি পরাবে।

    কুসি : কেন? এত লোককে টুপি পরিয়ে শান্তি হচ্ছে না! মাদুলি পরাবে কেন?

    [গান্ধারী কানে কানে]

    কুসি : [ভাইদের দিকে তাকিয়ে] আরে ছিঃ ছিঃ। তোমাদের লজ্জা শরম সব গেছে। সময়ে বিয়ে না করলে মানুষের এই অবস্থাই হয়। ছোঁকছোঁকে স্বভাব হ। অসভ্য, ইতর।

    দু’ভাই। [এক সঙ্গে] লে হালুয়া। আমরা কি জানি! গান্ধারীই তো বললে।

    গান্ধারী : বাঃ, আমি বললুম, না আপনারাই আমাকে বললেন, বল তো গান্ধারী ন’বউয়ের কি নেই? আমি বললুম, ছেলে নেই। যা নেই, তা নেই, সত্যিই তো নেই। আমি কি মিথ্যে বলব! সে মেয়ে আমি নই। আমার গুরু পঞ্চানন।

    ন’বউ : [চায়ের ট্রে হাতে] দিদি পুরটা হয়ে গেছে।

    কুসি : কাপ ধরে দিয়ে তুই এখুনি এখান থেকে কেটে পড়! এ দুটো অ্যান্টি-সোশ্যাল হয়ে গেছে।

    [ন’বউ ভয়ে ভয়ে চলে গেল]

    বড় : দেখলি তো মেজো, কি যুগ পড়েছে। ভালো করতে চাইলে মন্দ হয়। কলির শেষ। এই ব্যাটা গান্ধারীই বললে, আমার কাছে শ্মশানের বীজ আছে, সোনার মাদুলিতে ভরে ডান হাত বেঁধে দেন। বীজের দাম পাঁচশো, মাদুলি বারোশো। বছর না ঘুরতেই দোল দোল দুলনি/রাঙা মাথায় চিরুনি।

    গান্ধারী : ও বাবা, কি মিথ্যে কথা বলে গা!

    বড় : মেজো! তুই সাক্ষী!

    মেজো : গোছগাছ করে এতটা বলেনি।

    বড় : এখন দলত্যাগ করিসনি পাঁঠা। ফ্রন্টের ঐক্য বজায় রাখ।

    মেজো : যুক্তফ্রন্ট জিন্দাবাদ।

    কুসি : [গান্ধারীকে] যা, তুই সাম্বারটা বসা। এ দুটো পাগল। তোমাদের আমি বিয়ে দোবো। তবে যদি ঢিট হও।

    বড় : আমার একজন প্রেমিকা ছিল রে কুসি।

    মেজো : জানি। মণি পাগলি। তোমাকে দেখলেই গান ধরতো, ও দয়াল বিচার কর। আমায় গুণ করেছে, আমার খুন করেছে।

    বড় : না রে না, আমার প্রেমিকার নাম কবিতা। দুজনেই প্রতিজ্ঞা করেছিলুম, বিয়ে করে প্রেমের মতো একটা সুন্দর জিনিসকে নষ্ট করবো না। প্রেমকে মুরগী করে, জবাই করে, পালক ছাড়িয়ে চিলি চিকেন বানাবো না। বিরহী যক্ষ, বিবাগী কোকিল আমাদের আদর্শ। আমাদের আদর্শ রবি কবি। আমাদের প্রাণের মানুষ প্রাণে থাকে।

    মেজো : আমার আদর্শ তুলসীদাস। বেহা বেহা সবকোই কহে, মেরা মনমে এহি ভায়/চড় খাটোলি ধো ধো লগড়া জেহেল পর লে যয়ে। ওই দেখ বর যাচ্ছে চৌদোলায় চড়ে। বাদ্য-বাজনা। ভোঁপ্পোড়ো পোঁ। যাচ্ছে কোথায়, না জেলখানায়।

    বড় : তোর মধ্যে কোনও প্রেম নেই।

    মেজো : আমার ফ্রেমে প্রেম নেই। আছে কর্ম। কর্মযোগী আমি। স্বামীজি আমার আদর্শ। জীবে প্রেম করে যেই জন…

    বড় : কারেকসান, জীব নয় জিভ, জিভে প্রেম…

    মেজো : ফ্রন্টের ঐক্য বজায় রাখ। বলো বলো বলো সবে, আমাদের যৌথ প্রচেষ্টায় ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে।

    বড় : কুসি তুই বিয়ে করলি না কেন?

    কুসি : তোমাদের ছেড়ে থাকা যায় না বলে। এই দুটো কচি পাঁঠাকে কোথায় রেখে যাব। কার কাছে রেখে যাব, গা মাখা ঝোল করে খেয়ে ফেলবে।

    বড় : এই দেখ মেজো, একই রকমের ত্যাগ! মনে আছে অনেক কাল আগে, বাবা যখন হঠাৎ মারা গেলেন, শ্মশানে চিতার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ভাই দুটো নাবালক, বোনটার বিয়ে দিতে হবে, আমরা বিয়ে করবো না। কি জানি বাবা, কেমন বউ আসবে, কৈকেয়ী আর মন্থরা আমাদের সুখের সংসার ফ্র্যাকচার করে দেবে।

    মেজো : কুসির শাসনে আমরা কেমন সুখে আছি বলো?

    বড় : মাঝে মাঝে মনে হয় স্বর্গে আছি। উঃ পাগল করা গন্ধ আসছে রান্নাঘর থেকে। একটু টেস্ট করা না। টক, ঝাল, নুন।

    মেজ : কুসি। ন’বউকে জন্মদিনে কি দেওয়া যায় বল তো। মাদুলি তো ক্যানসেল।

    কুসি : একটা বাথরুম দাও।

    বড় : এই রাতে বাথরুম কোথা থেকে কিনব! বাথরুম কি জিনিস!

    কুসি : আরে বাথরুম জানো না! যেখানে মানুষ চান করে।

    বড় : সে তো আমাদের আছে।

    কুসি : ওর নিউ স্টাইলের একটা বাথরুমের খুব শখ। সিরামিক টাইলস, টেলিফোন শাওয়ার, বাথটব, টাওয়ার ট্যাপ!

    মেজো : ওই ইংরিজি সিনেমার মতো।

    বড় : বাথটব? আমি শুয়ে থাকবো সাবানের ফেনায়। সেলুলার ফোনে কথা বলব ভগবানের সঙ্গে।

    [এক যুবকের হন্তদন্ত প্রবেশ]

    যুবক : ডাক্তারবাবু, আবার হেঁচকি উঠছে। ননস্টপ। হিক, হিক। কোনও কাজ হলো না ওষুধে।

    বড় : কার হেঁচকি? কিসের হেঁচকি?

    যুবক : আমার স্ত্রীর।

    বড় : কি খাইয়েছিলে?

    যুবক : এক খিলি জর্দা পান।

    বড় : জর্দার অভ্যাস ছিল?

    যুবক : না। জীবনের এই ফার্স্ট জর্দা।

    বড় : দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়। ঠিক হয়ে যাবে।

    যুবক : মরে যাবে না তো! জাস্ট পনেরো দিন বিয়ে হয়েছে।

    বড় : মানুষ হেঁচকি তুলেই মরে। সেই হেঁচকি তোলার বয়েস এখনো হয়নি। এটা ছেঁচকি।

    যুবক : বিশ্বাস করুন ডাক্তারবাবু, আমি জোর করে জর্দা খাওয়াইনি। নিজের ইচ্ছেয় চেয়ে চেয়ে খেয়েছে। এ যা দিনকাল যদি মরে যায় সঙ্গে সঙ্গে আমার গণধোলাই, আমার মায়ের, আমার বোনের হাজতবাস। সতীর চিতায় পতির সহমরণ।

    বড় : সেরকম কোনও সম্ভাবনা আছে?

    যুবক : নেই কেমন করে বলি। হলেই হলো। একালে সবই সম্ভব। আমার আর একটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম ছিল।

    বড় : দয়া করে তাকে বিয়ে করলেই হতো।

    যুবক : একটু সমস্যা ছিল। সেই মেয়েটা আর একটা ছেলেকে ভালোবাসত, সেই ছেলেটা আবার আর একটা মেয়েকে ভালোবাসত, সেই মেয়েটা আবার আর একটা…

    বড় : হয়েছে হয়েছে, সবশেষে একটা ফাঁকা মাঠ, মাঠে একটা গরু। ইলু, ইলু, ইলু, ইলু।

    যুবক : আপনার কাছে এসেছিলুম, প্রয়োজন হলে বলবেন তো!

    বড় : কাকে বলব?

    যুবক : পুলিশকে, আদালতকে। ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দেবেন, হেভি ডোজে জর্দা খেয়ে মৃত্যু।

    বড় : [মেজকে] কী সব আবোলতাবোল বকছে বলতো।

    মেজো : দাঁড়াও কুসিকে কল করি। [গলা চড়িয়ে] কুসি কুসি।

    কুসি : আজ বাড়িতে একটা উৎসব। বারে বারে ডাকলে হয়।

    বড় : কি করব বল। এ কোথা থেকে এসে কি সব বকছে?

    কুসি : কোথা থেকে আসবে কেন, নিমন্ত্রণ করা হয়েছে তাই এসেছে। পল্লবকে চিনতে পারলে না! যাত্রার পালা লিখে বিখ্যাত।

    বড়, মেজ : [সমস্বরে] আমাদের দেশের গৌরব পল্লব গাঙ্গুলি! মাই গড।

    বড় : যাত্রা আমার ভালোই লাগে। ছেলেবেলায় খুব দেখেছি। এখন আর সময় পাই না।

    মেজো : যাত্রার চেয়ে যাত্রার নাম আমার ভীষণ ভালো লাগে, সতীর কোলে পতির মাথা।

    পল্লব : ওটা আমার হিট পালা।

    মেজো : জুতোর তলায় কাঁটা পেরেক।

    পল্লব : এটা আমার নয়। আমার আর একটা হিট পালা হলো পানাপুকুরে কচিসুন্দরী। আমি এখন যে পালাটা লিখছি, সেটার নাম জর্দাপান কেন খেলে কুলবধূ। ক্রাইম পালা। সেখানে এইরকম একটা প্লট আছে। একের পর এক বধূর করুণ মৃত্যু। শেষে সাহসী এক বধূ আসামীকে ধরবে। তাকে ল্যাম্প পোস্টে ঝোলাবে। তারপর সে ইলেকশানে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী হবে। আইন করবে, ক্যারেকটার সার্টিফিকেট না দেখালে কোনও মেয়ে কোনও ছেলেকে বিয়ে করবে না। আমার পরের পালা ঘরে ঘরে সিঁদুরের আগুন।

    [এক বৃদ্ধের প্রবেশ]

    বৃদ্ধ : চিনতে পারছ মিত্তির?

    বড় : আমাকে বলছেন?

    বৃদ্ধ : তোমাদের দুজনকেই।

    মেজো : চেনা চেনা মনে হচ্ছে।

    বৃদ্ধ : কালীপুজোর রাতে আমার খড়ের গোলা তোমাদের বাজির আগুনে পুড়ে গিয়েছিল।

    বড় : হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো অনেক বছর আগে? আমরা তখন ছাত্র।

    বৃদ্ধ : সেই আগুন আজও আমার বুকে ধিকি ধিকি জ্বলছে।

    বড় : এখনো জ্বলছে! নেভাতে পারছেন না!

    বৃদ্ধ : তোমাদের জন্যে আমি ধনে প্রাণে মারা গেছি। ত্রিভুবনে আমার আর কেউ নেই। একজনের আশ্রয়ে ছিলুম, সে এইমাত্র আমাকে তাড়িয়ে দিলে।

    মেজো : তাড়ালে কেন?

    বৃদ্ধ : আগুনে আমার খুব ভয়। সেই থেকে। লোকটা সংসারে আগুন ধরাচ্ছে। প্রতিবাদ করেছিলুম, বললে, নিকাল যাও। বেরিয়ে এলুম। এইবার কোথায় যাই! জানো মিত্তির, মানুষের কোনও যাবার জায়গা নেই। যার ঘর আছে তার আছে। যার নেই? হ্যাঁগো, তোমরা কী আমাকে তাড়িয়ে দেবে! তা দেবে নাই বা কেন! এই বাজারে কে কাকে দেখে!

    [কথা শেষ হতে না হতেই সবাই ঘরে ঢুকল। ভায়ের বউরা, কাজের লোকেরা,

    বাচ্চা দুটো। কুসির হাতে ‘বার্থ ডে কেক’]

    বৃদ্ধ : আজ কিছু আছে বুঝি! তাহলে আমি যাই। রাতটা শ্মশানেই কাটাই।

    [বৃদ্ধ উঠছেন]

    বড় : দাঁড়ান। যাচ্ছেন কোথায়? আমরা কি যেতে বলেছি। কুসি, চিনতে পারছিস এঁকে। না পারারই কথা, তুই তখন অনেক ছোট। ইনি আমাদের সরকার মশাই। এক সময় খুব ভালো টপ্পা গাইতেন।

    কুসি : হাত জোড়া, নমস্কার করতে পারছি না।

    বড় : আজ থেকে আমাদের বাড়িতে থাকলে কোনও আপত্তি আছে তোমাদের?

    বাচ্চা দুটো : [আনন্দে] আমাদের দাদু, আমাদের দাদু।

    [জিন্স-শার্ট পরা এক যুবক। আধুনিক বাউল। ন’ভাইয়ের বন্ধু। গান গাইতে গাইতে ঢুকছে]

    চেতন বাউল : আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে/তাই হেরি তায় সকল খানে। ঠিক সময়ে এসে পড়েছি।

    গান্ধারী : আজ কিন্তু সব নিরামিষ।

    চেতন : আমি কেবল খেতে আসি? আমি গান শোনাতে আসি।

    গান্ধারী : তুমি বাপু বড্ড খাও।

    চেতন : খিদে পায় তাই খাই। দোষটা তো কুসিদির। অত ভালো রাঁধে কেন?

    [ইতিমধ্যে কেক সাজানো হয়েছে। আলো জ্বলছে। বাতি জ্বলেছে।]

    কুসি : সবাই রেডি!

    মেজো : [গালে হাত বুলিয়ে] যাঃ আজ দাড়ি কামানো হয়নি।

    বড় : আজ রেখার জন্মদিন, তোর নয়। আজ রবিবার, মানুষ যেমন কাজে বেরোয় না, দাড়িও সেই কম বেরোয় না।

    মেজো : ঠিক বলেছ। গালটা সত্যিই তেমন খড় খড় করছে না!

    কুসি : আমাদের দীপু আর পূজা ছোট্ট একটা নাটক পরিবেশন করবে। তোমরা সবাই বোসো। মেজদা কেক কাটার জন্যে ছুরিটা এনেছি। হাত কাটার জন্যে নয়।

    মেজো : সরি।

    কুসি : স্টার্ট।

    পুজা : হ্যাঁরে হ্যাঁরে তুই নাকি কাল সাদাকে বলছিলি লাল?

    আর সেদিন নাকি রাত্রি জুড়ে নাক ডেকেছিস বিশ্রী সুরে?

    আর তোদের পোষা বেড়ালগুলো শুনছি নাকি বেজায় হুলো?

    আর এই যে শুনি তোদের বাড়ি কেউ নাকি রাখে না দাড়ি?

    দীপু : ক্যান রে ব্যাটা ইসটুপিড? ঠেঙিয়ে তোরে করব ঢিট।

    পুজা : চোপরাও তুম স্পিকটি নট, মারব রাগে পটাপট—

    ফের যদি ট্যারাবি চোখ কিংবা আবার করবি রোখ

    কিম্বা যদি অন করে মিথ্যেমিথ্যে চ্যাঁচাস জোরে

    আই ডোন্ট কেয়ার কানাকড়ি জানিস আমি স্যান্ডো করি?

    ফের লাফাচ্ছিস? অলরাইট কামেন ফাইট! কামেন ফাইট!

    দীপু : ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দেখনি টেরটা পাবে আজ এখনি

    আজকে যদি থাকতো মামা পিটিয়ে তোমার করতো ঝামা।

    আরে! আরে! মারবি নাকি? দাঁড়া একটা পুলিশ ডাকি!

    হাঁ হাঁ হাঁ হাঁ! রাগ করো না করতে চাও কি তাই বল না?

    পূজা : হ্যাঁ হ্যাঁ তাতো সত্যি বটেই আমি তো চাটনি মোটেই।

    মিথ্যে কেন লড়তে যাবি? ভেরি ভেরি সরি, মসলা খাবি?

    দীপু : শেক হ্যান্ড আর দাদা বল সব শোধ বোধ ঘরে চল।

    ডোন্ট পরোয়া অলরাইট হাউ ডুয়ুডু

    —গুড নাইট—

    বড় : বাঃ বাঃ, আর ধৈর্য্য রাখা যাচ্ছে না। এইবারে কেকে মারো ছুরি।

    সমস্বরে : হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।

    দুই
    সকালবেলা। বড়ভাই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গলার টাই বাঁধছে। কিছুতেই মাপে মিলছে না। কখনও সরু দিকটা লম্বা হয়ে ঝুলে যাচ্ছে, কখনও চওড়া দিকটা।

    বড় : ধ্যাৎ তেরিকা, এত বয়স হলো এখনও টাই বাঁধাটাই শিখতে পারলুম না। আমার বাবাকে দেখ, ওই তো ছবি। কতভাবে কত কায়দায় টাই বাঁধতে পারতেন। দিস সিম্পিল মেকানিজম ফ্রাস্কেটস অল মাই এফার্টস।

    [আয়নার সামনে থেকে বাবার ছবির সামনে গিয়ে] ‘ও ফাদার টিচ মি, হাউ টু নট এ টাই। ধ্যাৎ তেরিকা।’

    [একটান, এইবার টাই ফাঁস হয়ে মেন আটকাল আর খুলতে পারছে না তখন চিৎকার!] —কুসি-কুসি।

    কুসি : সাতসকালে কী হলো আবার!

    বড় : সেই ওল্ড প্রবলেম, লাগ লাগ লাগ… লাগিয়ে বসে আছি।

    কুসি : শোন দাদা, টাই তোমার জিনিস নয়। স্কার্ফ, মাফলার, নিদেন একটা গামছা। এই নিয়ে থাকার চেষ্টা কর না? তোমাকে কতবার দেখিয়েছি টাই-এর নট হবে আলগা ফাঁস। একটা পাশ ধরে টানবে খুস করে খুলে যাবে।

    বড় : আরে সাতটা থেকে তো সেই চেষ্টা করছি এখন ঘড়িটা দেখ। ওদিকে আবার সেমিনার আরম্ভ হয়ে গেল। প্লিজ দে ভাই, শেষবারের মতো বেঁধে।

    কুসি : [নিমেষে টাইটা বেঁধে, ঠিকঠাক করে, দাদার বুকে একটা চাপড় মেরে] নাউ ইউ আর রেডি। ইউ ক্যান গো।

    বড় : [কুসির মাথাটাকে আচমকা বুকের কাছে টেনে নিয়ে] মেরি পেয়ারি বাচ্ছে।

    কুসি : [ভয়ে চিৎকার করে উঠল] লেগে যাবে, লেগে যাবে। মাথায় জবা আর কেশুত পাতা একসঙ্গে মেখেছি। যা জামাটার সর্বনাশ হয়ে গেল বোধহয়।

    বড় : [বুকের দিকে তাকিয়ে] বাঁচ গিয়া, বাঁচ গিয়া।

    কুসি : আর একটু হলেই যেত। শেষ রাতে লাগিয়েছি তো শুকিয়ে গেছে।

    বড় : তোর নাম বদলে রাখবো ঘৃতকুমারী। আচ্ছা গুডবাই।

    [দরজার মুখে ন’ভাই, মুখটা অসম্ভব গম্ভীর]

    বড় : কিরে বদহজম!

    ন : [নাটকীয় ভঙ্গিতে] ফাইনালি ডিসাইড করলুম আমার দাম্পত্য জীবন চুরমার হয়ে গেল। আমি আজই চলে যাব যেদিকে দু’চোখ যায়। তোমরা তোমাদের আদরের বউমাকে নিয়ে থাকো। তোমাদের আদরে সে আর মানুষ নই। শি হ্যাজ বিকাম এ মাঙ্কি।

    বড় : বাংলা করলে কী দাঁড়ায়। আমাদের আদরে তোমার বউ বাঁদর হয়েছে।

    কুসি : এ স্লাইট কারেকশন সিনিয়র মিত্তির। বিপদকালে লিঙ্গ ভুল করো না। বাঁদর নয় বাঁদরী।

    বড় : এই রে মহা সমস্যায় ফেললি, মাঙ্কির স্ত্রীলিঙ্গ কী হবে রে? কারেকশনটা তো ওরই ইংরেজিতে করতে হবে। বিয়ের পর ব্যাটা লিঙ্গ তো ভুলেইছে—গ্রামারও ভুলে গেছে। আজ বাবা থাকলে এই মুর্খটার খাওয়া বন্ধ করে দিতেন। ছাত্রজীবনে সারাটা দুপুর আমাদের মুখস্থ করতে হতো ডাচ-ডাচেস, গুজ-গিজ, হর্স-মেয়ার। এই নেসফিল্ড বের করে আগে তোর ইংরেজি ঠিক কর। মাঙ্কির স্ত্রীলিঙ্গ খুঁজে বের কর। তারপর গৃহে থাকবি কী গৃহত্যাগ করবি দেখা যাবে।

    [ভাইয়ের গালে টোকা মারতে মারতে] মাঙ্কির ইংরেজি জান না মানিক, বউয়ের সঙ্গে কাজিয়া করতে গেছ! যদি গৃহত্যাগ করতে হয় তো ব্যাকরণ শিখে গৃহত্যাগ করবি। মূর্খের কোনও সম্মান নেই। কুসি সংস্কৃতটা মনে করিয়ে দে।

    কুসি : বিদ্বান সর্বত্রঃ পূজ্যতে।

    বড় : এইজন্য তোকে আমার ভালো লাগে। তুই গ্রেট। চুলে লতাপাতা চটকালেও তুই ডাচেস। তুই মিত্তির বাড়ির গাঁদাল পাতা জড়ানো সম্রাজ্ঞী। [আচমকা ন’ভাইকে এক ধমক] এক গ্লাস ফ্রুটসল্ট খেয়ে পড়তে বোস। আমি দুপুরে এসে জেন্ডার ধরব।

    মেজো : [মন্থর গতিতে প্রবেশ, ঘুম ঘুম ভাব] এত চিৎকার কীসের? কী কারণে এই চলচ্চিত্তচঞ্চরী? ভোরবেলা কাঁচা ঘুম ভেঙে গেল। একালে কে আবার গৃহত্যাগ করছে। সে তো সেকালে একবারই হয়ে গেছে। সুন্দরী বিষ্ণুপ্রিয়াকে ত্যাগ করে মহাপ্রভু সমুদ্রে ঝাঁপ মেরেছিলেন। [ন’ভাই-এর ভুঁড়িতে কুচুরমুচুর করে] শোন গোপাল, আধ্যাত্মিক কারণে গৃহত্যাগ করলে আমাদের কোনও আপত্তি নেই। পাঁচশো বছর ধরে যুগ অপেক্ষা করে আছে আর একজন শ্রীচৈতন্যর জন্য। তুমি যদি সেই আত্মচৈতন্য হতে পার, আমরা তাহলে ঢাক বাজাব। আর যদি স্ত্রীর খোঁচা খেয়ে মগ্নচৈতন্য হও, তাহলে ভেঁপু বাজাব, ব্যাটা গাধা। কুসি শ্লোকটা সাপ্লাই কর।

    কুসি : অজা যুদ্ধে, ঋষি শ্রাদ্ধে, প্রাতে মেঘডম্বরে, দাম্পত্য কলহেচৈব বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া।

    মেজো : কুসি তোকে আমি ব্যাকরণতীর্থ, স্মৃতিচঞ্চু, তর্কালঙ্কার উপাধি তিনটেই একসঙ্গে ম্যানজ করে দেব। তোমার তুলনা তুমিই ভাগিনী। [মেজ ন’ভাই-এর ভুঁড়িটা আর একবার খামচে] শুনলে নাড়ুগোপাল, প্রাতঃকালে মেঘ ডাকলে কিছুই হয় না। দেখি তোর পেট, ড্যাব ড্যাব করছে মনে হচ্ছে। এ তো বায়ুপুরাণ। কুসি এর আজ জলপথ্য। এত ভোরে উঠলে কেন আর্টিস্ট। যাও আর এক রাউন্ড নাক ডাকিয়ে এস।

    বড় : যাঃ সর্বনাশ হয়ে গেল, আধঘণ্টা লেটে চলেছি। ফাইনালি গুডবাই। [দরজা দিয়ে বেরোতে বেরোতে] শান্তি, শান্তি, শান্তি।

    মেজো : যাঃ বাড়িটা খালি করে চলে গেল রে। বড়টা না থাকলে বাড়িটা কেমন খালি হয়ে যায় দেখেছিস কুসি। ওটা কোন জাতের প্রাণী বলতো, হাতি না ভাল্লুক।

    কুসি : হাতি বোল না দাদা, সম্মান জানাতে হলে শুদ্ধ সংস্কৃতে বলতে হয়, দেখ হাতি হলো গালাগাল। কিন্তু বিশুদ্ধ ঐরাবত? একটা আলাদা ব্যাপার। বড়দা আমাদের সুঠাম ঐরাবত।

    মেজো : [উজ্জ্বল মুখে] আর আমি?

    কুসি : তুম মনে হয় জাতিতে ভাল্লুক।

    মেজো : [ফিউজ হয়ে গিয়ে] আমার মধ্যে ভাল্লুকের কী দেখলি?

    কুসি : বেশ একটা নরম নরম, কম্বল কম্বল, ভোম্বল ভোম্বল ব্যাপার।

    মেজো : বেশ ভালো লাগল। ভাল্লুকের সংস্কৃত?

    কুসি : আগে মাঙ্কির স্ত্রীলিঙ্গ বল। তারপর আমি ভাল্লুকের সংস্কৃত বলব।

    মেজো : পরীক্ষা করছিস। শোন লিঙ্গ শব্দটা খুব মজার। তার নিজের কোনও লিঙ্গ নেই। আগে একটি পুং বসালে পুংলিঙ্গ, আগে একটি স্ত্রী বসালেই স্ত্রীলিঙ্গ। সেইরকম মাঙ্কিরও কোনও লিঙ্গ নেই। বাঁদরামি ছেলেও করতে পারে, মেয়েও করতে পারে। মাঙ্কির আগে একটি ‘হি’ বসাও, হয়ে গেল বাঁদর, একটা ‘শি’ বসাও হয়ে গেল বাঁদরি। তাহলে বাঁদরির ইংরেজি হলো শি মাঙ্কি। এইবার ভাল্লুকের সংস্কৃত বলতো।

    কুসি : হারাতে পারবে না, ভাল্লুকের সংস্কৃত হলো ঋক্ষ।

    ন’ভাই : পালতোলা জাহাজের মতো এধার থেকে ওধারে গিয়ে তোমরা ব্যাপারটাকে হালকা করে ঘুরিয়ে দিতে চাইছ। এটাই প্রমাণ করে এ বাড়িতে আমার কোনও পজিশন নেই। রেখাই তোমাদের মনে রেখাপাত করেছে। তোমাদের পরিমল হলো মল।

    মেজো : সত্যি কথাটাই বললি রে। তুই হলি মল, সুন্দর একজোড়া পায়ে সেই মল ঝুমুর ঝুমুর বাজে। কিছু মনে করিসনি তুই একটু স্ত্রৈণ আছিস। অবশ্য শিল্পী মাত্রেই মেয়েদের একটু অন্য চোখে দেখে।

    ন : [ঘুরে দাঁড়িয়ে] মেজদা অ্যাডিং ইনসাল্ট টু ইনজুরি। তুমি আমার মতো এক পুরুষসিংহকে স্ত্রৈণ বললে, তোমার মনে এই ছিল!

    মেজো : শোন ভ্রাতা। কাল ছিল চাঁদের আলোর রাত। তোমার ঘরের খোলা জানালা দিয়ে চাঁদের আলো তোমাদের ঘরে লুটিয়েছিল, সেই আলোয় জানলার দিকে মুখ করে তোমরা পাশাপাশি বসেছিলে। তোমার হাতে ছিল বিলেত থেকে আনা সেই ঝকঝকে পাইপটা। সেটাতে তুমি একটা বাংলা প্রেমের গান বাজাবার চেষ্টা করছিলেন। অবশ্যই ব্যর্থ চেষ্টা। বেশির ভাগ পর্দাই লিক করছিল। তার ফলে মনে হচ্ছিল, মাঝরাতে একটা মা-হারা ছানা বাসার খড়কুটোয় চিঁ চিঁ করে ডাক ছাড়ছে। বল ভ্রাতা, ইহা সত্য না মিথ্যা। তোমার ফুঁ আছে, সেই ফুঁয়ে বাতি নিভতে পারে, কিন্তু প্রেম জাগে না। রাতের সেই প্রেম কোন কায়দায় চটকালে মানিক।

    ন : তুমি এত সব জানলে কী করে। ইউ আর এ পিপিং টম।

    মেজো : ইউ আর এ টম ক্যাট। হুলো বেড়াল।

    কুসি : তুমি এমন প্রেমের দৃশ্য দেখলে কেন? কোন আক্কেলে, ওদের প্রেমের জানলায় নাক গলাতে গিয়েছিলে? বুড়ো আইবুড়ো তুমি। তোমার ক্যারেকটারই একমাত্র কম্বল। সেইটাকে সম্বল করে তোমার জীবনপথে এগিয়ে যেতে হবে।

    মেজো : [অমায়িক হেসে] জানি, এই সন্দেহই করবি। আমি উঁকি মেরেছিলাম টেকনিক্যাল কারণে।

    কুসি : অর্থাৎ?

    মেজো : এই বিশেষ ধরণের বাঁশিতে কিঞ্চিৎ দক্ষতা আছে আমার। আমি যখন অক্সফোর্ডে ছিলাম, তখন ব্ল্যামফোর্ড সাহেব আমাকে কিছু তালিম দিয়েছিলেন। বারে বারে ওর ফুঁ যখন ফসকে যাচ্ছিল তখন আমি অস্বস্তিতে ছটফট করছিলাম। মনে হচ্ছিল বাঁশিটা কেড়ে নিয়ে আমি বাজাই, মোৎজার্ট-এর একটা কনচের্টো। জান বোধহয় ওই প্রখ্যাত শিল্পীকে বাঁশিটি উপহার দিয়েছিল—এই প্রখ্যাত পণ্ডিত [ন’কে ইঙ্গিত করে]

    [রেখার প্রবেশ, হাতে এককাপ চা ন’কে লক্ষ্য করে ঝাঁঝালো গলায়]

    রেখা : মিত্তির বাড়ির অনেক রেস্ত দেখেছ তাই না? বড়দা আর মেজদার অনেক টাকা। আর আমার দিদির রান্নাঘরটাও ভূত ভোজনের জায়গা। এই নিয়ে তিনবার চা হলো আর চা ফেলা হলো। তোমার এত রাগ কীসের। যে সকালে পরপর পঞ্চাশটা হাঁচে, হজমের ওষুধ না খেলে ঝোলভাতও হজম হয় না, যে এখনও অন্ধকারে ভূত দেখে, বিছানায় একা শুতে পারে না, তার কীসের এত মাস্তানি!

    মেজো : কুল ডাউন, কুল ডাউন। লাস্টা ওয়ার্ডটা রকে। কুসি, মাস্তানির সংস্কৃত কী হবে?

    কুসি : ওখানে পুরুষত্ব বসিয়ে দাও। ওইটাই ফিট করবে।

    মেজো : রেখা, তুমি মাইরি খুব ডিপ্লোম্যাটিক আছ।

    কুসি : মাইরিটা তুলে ফেল। ওটা বন্ধুকে বলা যায়। তুমি ওর ভাসুর।

    মেজো : এ তুই একটা, সেকালের মতো কথা বললি। সেই রাবণের যুগে ভাসুররা সব অসুর ছিল। শ্বশুররা ছিল খশুর। শাশুড়িরা ছিল বউকাটকি। একালে উই আর অল ফ্রেন্ডস। একটা সংস্কৃত সাপ্লাই কর।

    কুসি : মিত্র।

    মেজো : দারুণ, মিত্তির পরিবারে আমরা সবাই মিত্র।

    রেখা : মেজদা আমায় ডিপ্লোম্যাট বললে কেন?

    মেজো : তুই কি সুন্দর বললি, বড়দা আর মেজদার পয়সা, এককথায় তুই প্রমাণ করে দিলি। তুই আমাদের দলে। একেই বলে সলিডারিটি, একেই বলে স্ট্রেংথ। [ন’ভাইকে উদ্দেশ্য করে] মহাপ্রভু; বার বার তিনবার, এই তৃতীয় প্রচেষ্টার চাটি ওষ্ঠলগ্ন করে উদরে চালান কর। ঘড়ি দেখেছ তোমার সময় হয়েছে খাজনা জমা দেবার। যদি আটকে যায় তাহলে ত্রিফলা চূর্ণ। অতিশয় সুস্বাদু।

    রেখা : [স্বামীর সামনে দাঁড়িয়ে] এইবার যদি চা না খাও সকলের সামনে তাহলে আমি তোমার টাকে এই চা ঢালব।

    ন : [বিস্ফারিত চোখে] শুনলে, ল্যাঙ্গোয়েজটা শুনলে?

    মেজো : গাধা, এটা যে কতবড় প্রেমের ভাষা, আমি বিয়ে না করেও বুঝতে পারছি, আর তুই ব্যাটা এক মেয়ের বাপ হয়ে বুঝতে পারছিস না! এর মধ্যে লুকিয়ে আছে নারীর অধিকার বোধ। বলতে চাইছে আমার পাঁঠা আমি লেজাতেও কাটতে পারি, মুড়োতেও কাটতে পারি। [মুখভঙ্গি করে] আই লাভ ইউ। এটা হলো কেতাবী প্রেম। অ্যাই মিনসে—এটা হলো বাস্তব প্রেম।

    কুসি : মিনসে শব্দটা?

    মেজো : ওটা আমি পাল্টাতে পারছি না ভাই, ব্যাকরণ দেখ মনুষ্য থেকে মানুষ, মানুষ থেকে মিনসে, সমগ্র মানবজাতি হলো মনুষ্য, পাড়ার পকেটে তারা মানুষ। আর স্ত্রীর অঞ্চলের বন্ধনে তারা একটি গ্রাম্য শব্দ মিনসে। হেঃ হেঃ।

    ন : তুমি আমাকে পাঁঠা বললে!

    মেজো : রেগে গেলে মানুষের বুদ্ধিভ্রংশ হয়। আমি আমার পাঁঠা বলেচি? বলেচি স্ত্রীর পাঁঠা। পাঁঠা জিনিসটা উপেক্ষার নয়। একটা ভালো ওজনদার পাঁঠার দাম তোমার চেয়ে অনেক বেশি। তোর ওজন কত?

    ন : বাহান্ন কেজি।

    মেজো : একটা বাহান্ন কেজি পাঁঠার দাম হিসেব কর? বাহান্ন ইনটু একশো, লিভার যেটাকে আমরা মেটে বলি তার দাম আরও বেশি। এইবার ছাল, টোট্যাল মার। কুসি কত হলো?

    কুসি : অঙ্কে আমি কাঁচা, ক্যালকুলেটর লাগবে।

    রেখা : স্বামীকে ছাগল বলতে নেই, কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি এটা একটা মাথামোটা রামছাগল।

    মেজো : ছিঃ বৌমা, স্বামী হলো গুরু। শোন পরে একটু গোবর খেয়ে নিও।

    রেখা : ও ফুলকপি খেলেই গোবর খাওয়া হবে। এমনি গোবর নয় গোবর সার। ফুল হয়ে ফুটে আছে। নাও চাটা ধর, ওয়ান, টু, থ্রি।

    [ন চায়ের কাপটা নিয়ে নিল]

    মেজো : লেড়কা লোক তালি বাজাও।

    [দরজার বাইরে থেকে সত্যি সত্যি তালির আওয়াজ পাওয়া গেল]

    মেজো : ওরে বাঁদর দুটো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে কেন, ভিতরে আয়, ভিতরে আয়।

    [দুষ্টু দুষ্টু মুখে দুটো বাচ্চা খুশির হাওয়া নিয়ে ভিতরে ঢুকে এল এবং ঢুকেই নাচতে লাগল হারে রে রে রে তোরা দে রে আমার ছেড়ে।]

    [বাইরে ফট করে একটা শব্দ হলো। ঘরে ঢুকছেন সেই আশ্রিত বৃদ্ধ বুড়োটি।

    হাতে ট্রে, তার ওপর চায়ের কাপ।]

    মেজো। এ কী আপনি! বাইরে কিসের শব্দ হলো।

    বৃদ্ধ : জন্মদিনের বড় বেলুন ফেটে গেল।

    মেজো : তার মানে বিয়ে হলো। জন্ম হয়েছিল যার, সে আবার বড় হলো তার বিয়ে হলো, বিয়ের পর প্রেমের বেলুন ফাটল।

    [আদালতে দাঁড়ানো উকিল সাহেবের মতো মেজো বলে উঠল] মি লর্ড দ্যাটস হোয়াই আই অ্যাম ও ব্যাচেলার, আই অ্যাম এ প্রিন্স।

    কুসি : জজসাহেব বলছেন, শুনতে পাচ্ছ। ব্যাচেলার লিভস লাইক এ প্রিন্স, ডাইস লাইক এ ডগ।

    মেজো : পয়সা ফেললে সব সার্ভিসই পাওয়া যায়।

    কুসি : স্ত্রীর স্নেহ পাওয়া যায় না, স্ত্রীর সেবা পাওয়া যায় না।

    মেজো : সে তুই সেকালের স্ত্রীর কথা বলছিস। একালের মিসেসরা অন্যরকম।

    রেখা : প্রতিবাদ করছি। স্ত্রীদের সেকাল, একাল নেই। এই ছোকরা যদি চা না খেত, তাহলে আমি জলগ্রহণ করতাম না। দেখিয়ে দিতুম তোমার রোখ বেশি না আমার রোখ বেশি।

    বৃদ্ধ : চাটা গ্রহণ কর। বেড টি, এখনও নিশ্চয়ই দাঁত মাজা হয়নি?

    মেজো : আপনি চা নিয়ে এলেন কেন? আরও অনেকে আছে।

    বৃদ্ধ : আমাকে গ্রহণ করবে না! আদর করে বসিয়ে রাখলে আমি এই পরিবারের একজন হই কী করে?

    মেজো : দ্যাটস রাইট, দ্যাটস রাইট। কাল কেমন ঘুমোলেন?

    বৃদ্ধ। নরম বিছানা, নেটের মশারি, আতরের গন্ধ। প্রথমটায় একটু অস্বস্তি হচ্ছিল ঠিকই। পরে মনে হলো ভাগ্য কোথায় কখন নিয়ে যায়। পড়ে ছিলুম আস্তাকুঁড়ে, উঠে এলুম রাজপ্রাসাদে। আচ্ছা তোমরা কি দিয়ে তৈরি বলো তো।

    মেজো : হাড়, মাংস, মেদ, মজ্জা, লিভার, পিলে, ফুসফুস, হৃদয়। সব সাধারণ সাধারণ জিনিস দিয়ে তৈরি।

    বৃদ্ধ : হৃদয়টা?

    মেজো : হৃদয়টা একটা টুলু পাম্প। রক্ত তুলছে, রক্ত নামাচ্ছে। ওই গানটা মনে আছে?

    বৃদ্ধ : কোনটা?

    মেজো : কাগজে লিখো না নাম।

    বৃদ্ধ : ও প্রত্যেক পুজোয় শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে। কাগজে লিখো না নাম, কাগজ ছিঁড়ে যাবে। পাথরে লিখো না নাম, পাথর ক্ষয়ে যাবে, হৃদয়ে লেখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে।

    মেজো : লাস্ট লাইনে একালের কারেকশন, হৃদয়ে লিখো না নাম হৃদয় বাইপাস হয়ে যাবে।

    বৃদ্ধ : তোমাদের হৃদয়টা সোনার। এটা তোষামোদি নয়, এটা বৃদ্ধের অনুভূতি।

    মেজো : [চায়ে চুমুক দিয়ে] উত্তম। যথেষ্ট ফ্লেভার, কিন্তু শীতল।

    বৃদ্ধ : তোমাদের কথার চোটে ঠান্ডা হয়ে গেল। উষ্ণ এক কাপ আনব কী?

    মেজো : আপাতত থাক। আধ ঘণ্টার মধ্যে আমরা আবার মিট করব। [মেজো চলে গেল, ঘরে বৃদ্ধ, ন ও রেখা]

    রেখা : [বৃদ্ধকে] জ্যাঠামশাই, আপনি অনুগ্রহ করে একটা কাজ করবেন। গান্ধারীকে একবার বলবেন তারে কাপড়গুলো মেলে দিতে।

    [বলতে না বলতেই গান্ধারী রণচণ্ডী মূর্তিতে দরজার সামনে]

    গান্ধারী : [বৃদ্ধকে ঝাঁঝালো গলায়] সাত তাড়াতাড়ি তোমাকে চা কে আনতে বলেছে? বেশি আদিখ্যেতা। ভাবছ এইসব করলেই খাতির বেশি পাবে। বুড়োটা মহা চালাক।

    রেখা : এসব কী বলছিস গান্ধারী। তোর মুখের কোনও রাখঢাক নেই। প্রবীণ এক শ্রদ্ধেয় মানুষ। জানিস একসময় ইনি এত বড়লোক ছিলেন যে এই মিত্তির বাড়ির সবকটাকে কিনে নিতে পারতেন। তুই খুব বেড়েছিস গান্ধারী।

    বৃদ্ধ : [হাসতে হাসতে] মা ওর কোনও দোষ নেই। ও জগৎ-এর নিয়মেই চলছে। যার টাকা নেই, তার ইজ্জতও নেই। এখানে আমার এত সুখ, তার মধ্যে একটু দুঃখ না থাকলে ব্যাপারটা যে সিনেমার গল্প হয়ে যাবে। গান্ধারীর একটু ঝাঁঝ বেশি, বয়স কম তো, মেয়েটা কিন্তু ভালো। কাল রাত্রে আমার মাথার কাছে জলের গ্লাস চাপা দিয়ে রেখে গিয়েছিল। আর বলেছিল রাতে দরকার হলে আমাকে ডেকো। একা একা বেশি বাহাদুরি করতে যেও না। বুড়োরা পড়ে গেলেই কাঠামো খুলে যায়। এ আমাদের ব্যাপার মা। তোমরা কিছু মনে করো না।

    গান্ধারী : [বৃদ্ধকে] মুখে একগাদা পাটের মতো দাড়ি, যাও না গিয়ে কামাও না। লোককে আর নাইবা জানালে তোমার এত দুঃখ।

    [গান্ধারীর নাকটা নেড়ে দিয়ে বৃদ্ধ চলে গেলেন।]

    গান্ধারী : [যেতে যেতে] লোকটাকে ঠিক আমার বাপের মতো দেখতে।

    রেখা : [ন’কে] মাথামোটা, কাল রাতে তুমি যা বলেছিলে, যেটা না করায় রেগে গেল, সেটা করলে কী হতো? জানই তো মেজদা রাতে ঘুমোয় না। সারারাত আপন মনে পায়চারি করতে করতে গুনগুন করে গান গায়। আর বাইনোকিউলার দিয়ে আকাশের তারা দেখে।

    ন : আজ বুঝলুম, মেয়েরা ছেলেদের থেকে অনেক বেশি বুদ্ধিমান।

    রেখা : ফট করে রেগে যাবার আগে চিন্তা করবে। রেখা কী বলছে কেন বলছে। তার পিছনে নিশ্চয় কোনও কারণ আছে।

    ন : কেন বলেছিলাম জানো? পোশাকের ওই নতুন ডিজাইনটা বাজারে ছাড়ার আগে চাঁদের আলোর ব্যাকলাইটে তোমাকে পরিয়ে একটু দেখব। এটা একটা প্রফেশনাল ব্যাপার।

    রেখা : শোবার ঘরে প্রফেশনটা নাইবা ঢোকালে। ওর জন্য তো তোমার দামী দামী মডেলরা আছে।

    [বাইরে থেকে এক মহিলার কণ্ঠস্বর]

    মহিলা : পরিমলদা আছেন, পরিমলদা।

    পরিমল : কে?

    মহিলা : আমি সুদেষ্ণা।

    পরিমল : এসো।

    [সুদেষ্ণা ঘরে প্রবেশ করল। পাড়ার মেয়ে, কলেজে পড়ে]

    পরিমল : কী সমস্যা তোমার সুদেষ্ণা?

    সুদেষ্ণা : জাস্ট আপনার একটা সাজেশন, আকাশি নীল রঙের শাড়ির সঙ্গে কী ব্লাউজ পরা উচিত?

    রেখা : তুই এইটা জানার জন্য, এতটা হেঁটে এলি! তোর বউদি তো বলে দিতে পারত।

    সুদেষ্ণা : বৌদি বললে সাদা, পরে দেখলুম মানাচ্ছে না। তাই ভাবলুম ফ্যাশনের জগতের এতবড় একজন মানুষ পরিমলদাকে জিজ্ঞাসা করে আসি।

    পরিমল : শোন, তোমাকে শিখিয়ে দিই। রঙের জগতে দুটো কথা আছে ম্যাচিং আর কনট্রাস্ট। আকাশি নীলের সঙ্গে নীল যেতে পারে। এটা হলো ম্যাচিং, কিন্তু একঘেয়ে। এটাকে আমরা কনট্রাস্ট দিয়ে ভাঙতে পারি। নীলের কনট্রাস্ট হলো গোলাপি। রঙটা যখন আকাশি নীল তখন গোলাপিটাও হবে ফিকে গোলাপি অর্থাৎ পিঙ্ক। তোমার বৌদি যে বলেছিলেন সাদা। সাদা হলো ডেড কালার। অগতির গতি। সবেতেই যেতে পারে। বুঝতে পারলে। তোমাকে একটা কালার হুইল প্রেজেন্ট করব। তাহলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। জানবে মূল রঙ হলো তিনটে— লাল-নীল-হলদে। বাকি সব মিলেমিশে। [ন বেরিয়ে গেল।]

    [ঘরে সুদেষ্ণা ও রেখা]

    সুদেষ্ণা : [রেখার পাশে বসে] কানের দুলের পাথর দুটো কী গো? হীরে?

    রেখা : [লাজুক লাজুক মুখে] হ্যাঁরে হীরে।

    সুদেষ্ণা : মিত্তির বাড়ির বউ, হীরে তো হবেই।

    [ঘরে কুসি আর সেজবউ পরমা ঢুকল]

    কুসি : কতদিন পরে তুই এলি, সুদেষ্ণা?

    সুদেষ্ণা : [অভিমানের গলায়] তোমরা তো একবারও খবরও নাও না, মেয়েটা বেঁচে আছে না মরে গেছে। জান আমাদের বাড়িতে কি হয়েছিল? চোর এসেছিল।

    পরমা : চোর এসেছিল তো কি হয়েছে? কিছু নিতে পেরেছিল?

    সুদেষ্ণা : কিছুই নিতে পারেনি। বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল।

    কুসি : চোরের সঙ্গে হার্ট অ্যাটাকের কী আছে?

    সুদেষ্ণা : বাবার সঙ্গে চোরের পনেরো মিনিট শুভদৃষ্টি।

    রেখা : সে আবার কী? সে তো ছাঁদনাতলায় হয়।

    সুদেষ্ণা : আরে না গো। চোর বারান্দার কাচের জানলার ওপাশে, বাবা জানলার এপাশে ঘরে। মাঝখানে পাতলা কাঠের ব্যবধান। কাচে নাক ঠেকিয়ে বাবা বাইরে তাকিয়ে আছে আর ওপাশে নাক ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চোর। প্রথমটায় বাবা ভেবেছিল নিজের মুখের প্রতিবিম্ব। তারপর হঠাৎ যেই মনে হলো প্রতিবিম্বের ঠোঁটে গোঁফ আর নাকটা চ্যাপটা। বাবার গোঁফ নেই, নাকটা টিয়াপাখির ঠোঁটের মতো টিকলো। বাবা অমনি চো-চো শব্দ করে থ্যাস করে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। চোর লজ্জায় পালিয়ে গেল। আর আমাদের হইচই। লোকজন এসে পড়ল। বাবা তখনও অজ্ঞান। শ্বাস পড়ছে কী পড়ছে না। এসে গেল অ্যাম্বুলেন্স। সেই রাতেই ইনটেনসিভ কেয়ারে।

    কুসি : [উদ্বেগের গলায়] এখন কেমন আছেন?

    সুদেষ্ণা : আজকে অফিস বেরোবেন। ডাক্তার আমাকে বলেছেন তুমি বাবাকে অফিসে পৌঁছে দিয়ে আসবে, আবার তুমিই বাড়ি ফিরিয়ে আনবে।

    কুসি : আর ক’দিন ছুটে নিলে পারতেন?

    সুদেষ্ণা : ছুটি আর পাওনা নেই। বিশাল একটা প্রমোশন ঝুলে আছে। কামাই করলেই ডিমোশন। ওই উঁচু চেয়ারটায় বসার জন্য তিনজন হাঁচোড়পাঁচোড় করছে। কে ওঠে, কে ছিটকে যায়।

    কুসি : হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল একথা কেউ যেন জানতে না পারে।

    সুদেষ্ণা : আরে আমরা তো চেপে রাখার চেষ্টা করছি। আমাদের কাজের মেয়েটা ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এতদিনে বোধহয় ডালহৌসি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

    পরমা : ওরা হলো রয়টার।

    কুসি : আমি দেখেছি, যে যত বড়ই বীর হোক, চোর দেখলে চোর চোর করে চিৎকার করতে পারে না। চেষ্টা যে করে না তো নয়, কিন্তু যা বেরোয় তা হলো চো-চো।

    পরমা : এই রেখা, তোকে একটা কথা বলতে এলাম। তোর কচি কলাপাতা রঙের শাড়িটা আজ দিবি?

    রেখা : এতে বলার কি আছে! আলমারি খুলে নিয়ে নেবে। তোমাকে আগেই বলেছি। তোমার-আমার বলে কিছু নেই।

    পরমা : জানি, তবে ও শাড়িটা তুই একদিনও পরিসনি তো।

    রেখা : তোমার শরীরেই উদ্বোধন হোক সেজদি। তবে ওকে জিজ্ঞাসা করে নিও ম্যাচিং ব্লাউজ কি হবে।

    [পরমা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। গান্ধারীর প্রবেশ]

    গান্ধারী : [উত্তেজিত হয়ে] বড়দি, হয়ে গেল, আজ নিরামিষ। বড়দার সেই সাধের হুলো মুজাহিদ ওই অতবড় মাছটাকে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে নিয়ে গেছে পাঁচিলের ওপর। সেখানে বসে একটু একটু করে খাচ্ছে আর কাকের ঠোকরে কোঁক কোঁক করছে। আর গোটাকুড়ি কাক ছেঁকে ধরেছে।

    কুসি : সেকী রে? মাছ গেছে যাক, বেড়ালটাকে বাঁচা। ওকে ঘরে বসে খেতে বল।

    গান্ধারী : আমার কথা শুনবে, কোনও ব্যাটাছেলে কোনও মেয়েছেলের কথা শুনেছে কোনওদিন? কাছে যেতেই দিচ্ছে না। ফ্যাস ফ্যাস করছে।

    কুসি : চল দেখি।

    [কুসি, রেখা, সুদেষ্ণা সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল]

    গান্ধারী : [পিছনে যেতে যেতে] এইবার র‍্যাশনের দোকান থেকে একটা বস্তা আনব। তারপর গোদাটাকে ধরব। তারপর তেপান্তরে ছেড়ে দিয়ে আসব। কাল রাতে একবাটি ক্ষীর খেয়েছে। আমাকে দেখে পালালো না, উলটে জিভ দিয়ে গোঁফ চাটতে লাগল। এদের আদরে বেড়ালও বাঁদর হয়।

    [বাইরের দরজা দিয়ে, ভয়ে ভয়ে একজন উঁকি মারছে। মধ্যবয়সী একজন মানুষ। আর ঠিক সেই সময় ঘরে ঢুকছেন বৃদ্ধ জ্যাঠামশাই। দুজনে মুখোমুখি।]

    বৃদ্ধ : কী মতলব?

    মধ্যবয়সী : বাড়িতে কেউ নেই?

    বৃদ্ধ : সবাই আছে। খালি ডাক্তারবাবু নেই।

    মধ্যবয়সী : ডাক্তারবাবুকেই আমার দরকার। কম্পাউন্ডারবাবু হলেও চলবে। ভীষণ সমস্যায় পড়েছি।

    বৃদ্ধ : এখনও তো ডিসপেনসারি খোলেনি। এগারোটার সময় খুলবে।

    মধ্য : তাহলে কী হবে? ন’টা যে বেজে গেল।

    বৃদ্ধ : আর তো মাত্র দু’ঘণ্টা।

    মধ্য : [পকেট থেকে একটা ওষুধের শিশি বের করে] ডাক্তারবাবু বলেছিলেন ঠিক ন’টার সময় দু’চামচ খেতে।

    বৃদ্ধ : তাহলে খেয়ে ফেলুন। চামচে কী দেব?

    মধ্য : খাব কী করে? ছিপির প্যাঁচ ঘুরে গেছে।

    তিন
    বড়ভাই ঘরে ঢুকছেন, একজনকে আহ্বান করছেন, আসুন আসুন।

    দুটো হাত দু’পাশে ছড়িয়ে সসম্ভ্রমে ভিতরে চলুন, ভিতরে চলুন।

    বড় : আমাদের কী ভাগ্য! কতদিন পরে আপনি এলেন।

    [সৌম্য সুন্দর চেহারার এক ভদ্রলোক। পরনে ধুতি, সিল্কের পাঞ্জাবি, সোনার বোতাম। সব আঙুলে সোনার আংটি। পাঞ্জাবির বুকপকেটে দুটো সোনার কলম। পকেট ঘড়ির সোনার চেন বুকের কাছে দুলছে।]

    [ভদ্রলোক রাজকীয় ভঙ্গিতে সোফায় বসা মাত্রই বড়র চিৎকার]

    বড় : ওরে কে কোথায় আছিস?

    [ডাক শুনেই প্রথমে এল গান্ধারী। হাতে এক গ্লাস জল, গেলাসটা বড়র দিকে বাড়িয়ে দিয়ে]

    গান্ধারী : ফিল্টারের জল। গরম-ঠান্ডা মেশানো।

    বড় : তোর কাছে আমি জল চেয়েছি?

    গান্ধারী : বড়দা আপনি যে বলেন মেঘ না চাইতেই জল।

    বড় : মেঘ না চাইতেই জল আজ ওই সোফায় বসে আছেন। ডাক সবাইকে।

    [এক একজন ঢুকছে আর বিস্ময়ের উক্তি : ওমা আপনি!]

    কুসি : এত দিন কোথায় ছিলেন?

    রাজজ্যোতিষী : আর বল কেন, রাজা মহারাজারাই আমাকে শেষ করে দিল। গেছি পশুপতিনাথে, নেপালের রাজার কানে খবরটা ঠিক চলে গেছে। একেবারে হাওদা চড়ানো হাতি এসে হাজির, যেতেই হবে। নেপালে একটু ক্রাইসিস যাচ্ছে তো।

    কুসি : হাতি কেন? রাজার তো মার্সিডিজ, রোলস রয়েস সবই আছে।

    রাজজ্যোতিষী : এই দেখ ভুলে গেছ। আমি ধাতব গাড়িতে চড়তে পারি না, কাঠ ছাড়া সমস্ত কিছু অসহ্য। লোহা হলো কন্ডাকটার, আমার ভিতরের এনার্জি, আমার পাওয়ার লোহা টেনে নিতে পারে। সেই কারণে ননকন্ডাকটার হাতি, ঘোড়া, কাঠের রথ—এছাড়া আমার চলে না। বেসরকারি বাস চলতে পারে, কাঠের সিট। আগে ট্রেন চলতে পারত, কিন্তু এখন তো সব লোহার।

    কুসি : মহা মুশকিল। এখন কীভাবে এলেন?

    রাজ্যো : এই দেখ, আবার তোমার মেমারি ফেল করেছে। কলকাতায় চলাফেরা করার জন্য আমি পৈত্রিক ফিটন গাড়িটাই ব্যবহার করি। অস্ট্রেলিয়ার প্রাইম মিনিস্টার আমাকে একটা ঘোড়া প্রেজেন্ট করেছেন। আগে খুব তাগড়া ছিল। এখন বলে না দিলে কেউ বিশ্বাসই করবে না ওটা অস্ট্রেলিয়ান ঘোড়া। এদেশের জলবায়ুতে পটকে গেছে।

    বড় : আমি একটু চেঞ্জ করে আসি।

    রাজ্যো : হ্যাঁ, হ্যাঁ, ধড়াচুড়ো খুলে এস। ণ্ডবউদের দিকে তাকিয়েণ্ণ বাঃ তোমরা দুটিতে বেশ ফুটফুটে হয়েছ। ভালো সময় যাচ্ছে।

    [বাচ্চা দুটো একপাশে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়েছিল]

    রাজ্যো : [তাদের দিকে তাকিয়ে] এদেশে বেশি দিন নয়। ছেলেটা যাবে আমেরিকায়, মেয়েটা যাবে জার্মানিতে। আমি দেখতে পাচ্ছি। ওটার তুঙ্গী রবি, আর মেয়েটার তুঙ্গী চন্দ্র।

    দুই মা : [রেখা ও পরমা] [একসঙ্গে] ওরা বড় হবে তো?

    জ্যোতিষী : প্রশ্নটা ঠিক হলো না। কালের নিয়মে সবাই বড় হবে। মহাকাল ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। বড় হবে কী না জিজ্ঞাসা কোর না। জিজ্ঞাসা কর মানুষ হবে কী না? মানুষের বড় অভাব।

    বড় : [ঘরে ঢুকতে ঢুকতে] আজ্ঞে হ্যাঁ, মানুষের বড় অভাব।

    জ্যো : দুটো পা থাকলেই মানুষ হওয়া যায় না। বকেরও তো দুটো ঠ্যাং।

    কুসি : মহাভারতের বককে যে ধর্ম বলা হয়েছে?

    জ্যোতিষী : এই নাও, আর একবার গুলোলে। ধার্মিকের ধর্ম, আর বকের ধর্ম অনেক তফাৎ। বকধার্মিক হওয়াটা মোটেই ঠিক নয়। বকধার্মিকের বকাণ্ড প্রত্যাশা।

    বড় : [তাড়াতাড়ি অনুনয়ের কণ্ঠে] ওটা আর ব্যাখ্যা করবেন না, ওটা আর ব্যাখ্যা করবেন না। মেয়েরা রয়েছে, বাচ্চারা রয়েছে।

    জ্যো : তুমি আমাকে এতটা বেআক্কেলে ভাবলে কী করে অমল? সাধন-ভজনের সময় আমার পরিবেশ জ্ঞান থাকে না ঠিকই। কিন্তু এখন তো আমি সাধন-ভজন করছি না। এখন আমি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলেই আছি। রাত বারোটার সময় আমি দেহের দরজা খুলে অন্যলোকে চলে যাই। কাল মাঝরাতে দেখলুম ভারতের অবস্থা খুব খারাপ। খুব খারাপ। মানুষ আর পশুতে আর প্রভেদ থাকবে না। ভাই ভাইকে মারবে, বাপ ছেলেকে মারবে, ছেলে বাপকে মারবে। স্ত্রীরা সব ব্যাভিচারিণী হয়ে যাবে। ঘরে ঘরে কলসি থেকে মদ গড়িয়ে খাবে। বাচ্চারা ফুটপাথে পড়ে থাকবে, কুকুরে এসে শুঁকবে, কিন্তু খাবে না।

    কুসি : [ভয়ে ভয়ে] আমাদের কী হবে?

    জ্যো : ধর্ম ধরে থাক, বেঁচে যাবি। এই সবকটাকে ক্ষীরিকার মূল পরিয়ে দে। আর রোজ দুটো করে মরিচ চিবিয়ে খাবি। আচ্ছা এখন যে আমার একটু ইচ্ছে করছে…

    বড় : [সসম্ভ্রমে] আজ্ঞে কী ইচ্ছে করছে?

    জ্যো : একেবারে ঝকঝকে পরিষ্কার একটু চায়ের লিকার, এক চামচে মধু। মধুটা গোলানো হবে না। সিরসির করে মধুটা মিশে যাবে। আর এই লিকারটা করবে ন’ বউ। ওর একটা মনের বাসনা প্রবল হয়েছে না! হবে, হবে, মাদুলি ধারণ না করেই হবে।

    কুসি : [রেখাকে] নতুন স্টেনলেস স্টীলের নতুন গেলাসে তুই লিকারটা নিয়ে আয়।

    জ্যো : এই দ্যাখ মেয়েটার আমার কিছু মনে থাকছে না। কী বলেছি ধাতু আমি স্পর্শ করতে পারি না। কাঠের গ্লাস, পাথরের গ্লাস যখন নেই তখন নতুন কাচের গ্লাস।

    কুসি : পাথরের গেলাস আছে তো।

    জ্যোতিষী : নিশ্চয়ই কালো পাথর অথবা ছিটছিটে পাঁশুটে পাথর, হবে না, মার্বেল পাথর চাই।

    [ন’ বউ উঠে বেরিয়ে গেল]

    জ্যো : ইচ্ছে তো হতেই পারে। মেয়ের পর একটা ছেলে। দেখি আজ মাঝরাতে ট্রপোস্ফিয়ার থেকে একটা বীজ যোগাড় করে শক্তিচালান করে দেব।

    বড় : আহারাদি কী করবেন?

    জ্যো : সব ভুলে গেছ। আমার আহার তোমরা জান। খাঁটি গাওয়া ঘিয়ে ভাজা চারখানা ফুলকো লুচি, একটু সিজিন্যাল তরকারি। কাশী হলে বলতুম একবাটি মালাই। এখানে অভাবে একবাটি ক্ষীর। সঙ্গে একটু সন্দেশ থাকলেও হয়, না থাকলেও হয়। আমার চাহিদা খুব অল্প।

    বড় : তাহলে সেইরকম বলে দিই?

    জ্যো : না, ওই কাজের লোককে দিয়ে করালে হবে না। ওই ভোগ প্রস্তুত করতে হবে কুসিকে। গলায় একটা রুদ্রাক্ষের মালা পরে। সে মালাটি অবশ্য আমিই দেব। জান তো, সাধারণ মানুষ ভাবে আমিই আহার করছি। অজ্ঞ, তারা অজ্ঞ। আহার কর, মনে কর আহুতি দি শ্যামা মাকে। মেজোভাইকে দেখছি না কেন? তিনি তো আবার ঘোর নাস্তিক।

    বড় : এই সময়টা ও একটু বেড়াতে যায়। এখন কলেজের ছুটি চলেছে তো। তিন-চার মাইল না হাঁটলে উইক ফিল করে।

    জ্যো : নাস্তিকই হোক আর আস্তিকই হোক, তিনি তাঁর কাজ ঠিক করে যান। ওই যে সুগার হতে পারে, সে যোগ আছে কোষ্ঠীতে। কবে দেখেছি আজও আমার মনে আছে। তাই তিনি টেনে নিয়ে গেছেন বেড়াতে। তাঁর খেলার কথা যখন ভাবি তখন স্তম্ভিত হয়ে যাই। ঠিকই বলেছেন। সাধকরা ঠিকই বলেছেন। আমি যন্ত্র, তুমি যন্ত্রী। যেমন চালাচ্ছ তেমনই চলছি। জীবনের টুনি লাইট পাওয়ার হাউসের সেই শক্তিতে জ্বলে আছে। যেই কানেকশন কেটে দেবেন, সঙ্গে সঙ্গে ফিউজ। [হঠাৎ খুব তীব্র গলায়] ওরে মূঢ়, মা কুরু ধনজন যৌবন গর্বং, হরোতি নিমেষাং কাল সর্বং।

    গান্ধারী : [ধড়ফড় করে ঘরে ঢুকে] কী হলো, কী হলো?

    জ্যো : [সেইদিকে তাকিয়ে] সেই গান্ধারী না, বেশ ডাগর-ডুগুর হয়েছে, রূপ খুলেছে, আদরে আছে। পূর্বজন্মের সামান্য একটু ভুলে রাজরানী না হয়ে চাকরানি। সৎ কর্ম করে যা, সৎ কর্ম। জেনে রাখিস কর্মই ধর্ম। ফলের আকাঙ্ক্ষা করিসনি। একটি মাত্র ফলই ফল, সেটি হলো মোক্ষফল। আচ্ছা, একটু জল খেলে কেমন হয়?

    বড় : এই যে বললেন চা খাব।

    জ্যো : চায়ের আগে তো একটু জল খেতে পারি। তিনি চাইছেন। এত কথা বললেন তো। গলাটা শুকিয়ে গেছে।

    কুসি : তাহলে জল নিয়ে আসি?

    জ্যো : কীসে করে আনবে?

    কুসি : আপনার তো ধাতু চলবে না।

    জ্যো : এই। এখন শ্রুতি স্মৃতিতে বসেছে।

    [কমলের প্রবেশ। বাড়ির সেজ ছেলে। ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল। পরনে অফিসের ধড়াচূড়া।]

    জ্যো : কমল না? তুঙ্গী বৃহস্পতি। তোমাকে কোথায় নিয়ে যাবে তুমি নিজেই জান না। টাকা বিছিয়ে তার ওপর শুয়ে থাকবে। আর যশ খ্যাতি। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়বে। কী রকম হবে জান? আজ ভারতে তো কাল আমেরিকায়, কাল আমেরিকায় তো পরশু থাইল্যান্ডে। তবে বাবা, শত্রু হতে সাবধান। [উত্তেজিত হয়ে] শত্রু কোথায়? শত্রু বাইরে, না গো, শত্রু আর মিত্র দুটোই তোমার ভিতরে বসে আছে। আত্মাই আত্মার শত্রু। আত্মাই আত্মার মিত্র। একথা আমার নয়। আমি মূর্খ। একথা ভগবানের গীতায় বলেছেন। [আবার গলা চড়িয়ে] প্রলোভনে পা দেবে না, দেবে না, দেবে না। নারী হতে সাবধান।

    কমল : [ভয়ে ভয়ে] আমার জীবনে আমার স্ত্রীই একমাত্র নারী।

    জ্যো : মূর্খ, স্ত্রী নারী হলেও নারী নয়। সে হলো তোমার শক্তি। জীবনের কতটুকু দেখেছ ছোকরা যে তর্ক করছ! তোমার জীবনে নারী প্রলোভন আসবে, ধরে থাক।

    কমল : [ভয়ে ভয়ে] কাকে?

    জ্যো : শক্তিরূপিণী তোমার ওই স্ত্রীকে।

    [ছিপির প্যাঁচ ঘুরে যাওয়া সকালের সেই লোকটি কখন ঢুকে পড়েছে। ফাঁক পেয়েই বলে উঠল]

    লোক : ডাক্তারবাবু, প্যাঁচ ঘুরে গেছে।

    বড় : [অন্যমনস্ক] যাকগে ঘুরে, আবার সোজা হয়ে যাবে।

    লোক : এ প্যাঁচ সে প্যাঁচ নয়, শিশির প্যাঁচ।

    বড় : [তাকিয়ে] কী বলতে চাইছ?

    লোক : আপনি যে ওষুধটা দিয়েছিলেন সেই ওষুধের সিল করা ছিপির প্যাঁচ ঘুরে গেছে। খুলছে না, শুধু ঘুরেই যাচ্ছে। নটার ওষুধ খাওয়া হয়নি।

    বড় : বাড়িতে দরজা আছে?

    লোক : হ্যাঁ আছে। পুবদিকে একটা, পশ্চিমদিকে একটা, দক্ষিণ দিকে একটা। উত্তরে তো কোনও দরজা নেই।

    বড় : [অবাক হয়ে] তোমাকে উত্তরের দরজার কথা বলেছি। বলেছি দরজার কথা। যে কোনও একটা দরজা ও পাল্লার মাঝখানে ছিপিটাকে চেপে ধরে ঘোরাও।

    লোক : ঘুরিয়ে ছিলাম।

    বড় : তা কী হলো?

    লোক : [হতভম্ব হয়ে বলল] ভেঙে গেল, সব ওষুধ মাটিতে।

    বড় : বাঁচা গেছে।

    লোক : অনেক টাকা দাম, আর যে কেনার পয়সা নেই, একটা ফ্রি স্যাম্পেল।

    বড় : ঠিক আছে, পরে এস।

    লোক : [তবুও না গিয়ে] আমার আর একটা প্রশ্ন আছে ডাক্তারবাবু। নাভিশ্বাস কাকে বলে?

    বড় : যে শ্বাস নাভি থেকে ওঠে।

    জ্যো : এই প্রশ্নের ওই উত্তর হলো? শোন বাবা, নাভিশ্বাস দু’রকমের আছে। সাধকের নাভি থেকে যে শ্বাস ওঠে তাকে বলে প্রাণায়াম, আর সাধারণ মানুষের যে শ্বাস নাভি থেকে ওঠে তাকে বলে মৃত্যু। কার উঠেছে?

    লোক : আমার মায়ের।

    জ্যো : পুবদিকে মাথা, পশ্চিমদিকে পা। মাথার দিকের দেওয়ালে মা কালীর ক্যালেন্ডার। ডানপাশে জানালার বাইরে এটা নারকেল গাছ। বাড়িতে ঢোকার মুখে একটা নর্দমা। মাথার বালিশের ওয়াড়টা ময়লা। বিছানায় যে তোশক পাতা তার জায়গায় জায়গায় তুলো ঢেলা পাকিয়ে আছে। যে খাটে শুয়ে আছেন তার তলায় পিচবোর্ডের বাক্সে একগাদা পুজোর বাসন। ঘরের আলোর শেডে ঝুল। ঘরে ঢোকার মুখের পাপোস ছেঁড়া ছেঁড়া। বাথরুমের একটা কল ঠিকমতো বন্ধ হয় না। ফোঁটা ফোঁটা জল পড়েই যাচ্ছে। কী মিলছে?

    লোকটি : [ভয়ে ভয়ে] হ্যাঁ, সবই মিলছে।

    জ্যো : দ্বাদশীর শেষ রাতে তোমার মা পুষ্পক রথে চড়ে সপ্তম স্বর্গে প্রস্থান করবেন। বাবা দুঃখ কর না। শঙ্কর বলছেন, যাবৎ জনমং তাবৎ মরণং। জীবের ধর্মই হলো আজ আছে কাল নেই।

    লোক : আপনি কিছু করতে পারেন না? মায়ের মৃত্যুটা আমার কাছে বড় কথা নয়। সব মাই মরবেন, আমার মাও মরবেন। কথাটা হলো মা মারা গেলেই দাদা আর বৌদি আমার পিছনে লাথি মারবে।

    জ্যো : শোন, শোন, ভাগ্য বদলানো যায় না। কারুর বাবার ক্ষমতা নেই। জগৎবিখ্যাত প্রাণবল্লভ তোমার কী করবেন, যদি রাধাবল্লভ তোমায় রক্ষা না করেন? ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই করবার জন্য প্রস্তুত হও।

    লোক : কীভাবে মহারাজ?

    জ্যে : উঁহুঃ আমি রাজা নই, মহারাজও নই। আমি কৃষ্ণদাস। তোমাকে একটা উপদেশ দিই। রোজ সকালে ডন-বৈঠক মার। পঞ্চাশটা ডন, একশোটা বৈঠক। তারপর…

    লোক : [উদগ্রীব হয়ে] তারপর?

    জ্যো : দাদা ঘুষি মারার আগেই দাদাকে ঝেড়ে দাও এক ঘুষি। শোন বাবা, পৃথিবীর নিয়ম আর ভগবানের নিয়ম দুটো আলাদা। দুটো আলাদা শাস্ত্র। ভুল কোর না। ভাগ্যটাই সব নয়। পুরুষকার বলে একটা কথা আছে। মারের বদলা মার, প্রেমের বদলা প্রেম। যাও, যাও, বাড়ি যাও, আমাদের এখন একটু অন্য আলোচনা হবে।

    লোকটি : আমি একটু বসে শুনতে পারি?

    বড় : শুনতে পারবে কিন্তু কোনও প্রশ্ন করতে পারবে না।

    লোক : আমার একটাই প্রশ্ন, পাথর চাপা বরাত কী খোলা যায়?

    জ্যো : এই তো, নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিয়ে দিয়েছ। পাথরটা সরাতে হবে। কেউ সরিয়ে দেবে না। তুমি নিজে সরাবে। পাথর মানে কী? ভারী একটা জিনিস। সরাতে শক্তি চাই। তাহলে একটু আগে বলেছি ডন-বৈঠক মার। আর ভিজে ছোলা খাও।

    লোক : কোনও ধারণ-টারণ?

    জ্যো : [একটু রাগ রাগ গলায়] হীরে পরতে পারবে? হীরে! ষাট হাজার টাকা দাম।

    লোক : আজ্ঞে না।

    জ্যো : তাহলে হয়ে গেল।

    লোক : আপনি সকলকেই সব বিধান দিচ্ছেন, আর আমি গরিব বলে তাড়িয়ে দিচ্ছেন।

    জ্যো : শোন, তোমার ওই ক্যাটক্যাটে কথা না ছাড়লে তোমার ভাগ্য ফিরবে না। আসলে তুমি একটা নির্বোধ।

    বড় : তুমি যাবে?

    লোক : না গেলে কী করবেন?

    বড় : ওরে কুসি, এ যে ক্রমশ বাঁকছে।

    জ্যো : আমি এক মিনিটে সোজা করে দিতে পারি।

    বৃদ্ধ : আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি। লোকটিকে নিয়ে বাইরে চলে গেলেন।

    বড় : কতরকমের উৎপাত আছে?

    জ্যো : উৎপাত তো থাকবেই। শোন, উনুনে দুধ বসালেই ওতলাবে। জান তো ক্রোধ হচ্ছে ষড়রিপুর দ্বিতীয় রিপু। সারা পৃথিবীতে এই ক্রোধের খেলা। [হঠাৎ উঁচু গলায়] শক্তি, শক্তি। জাগো মা।

    [ন’বউ চা নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল]

    ন’বউ রেখা : এই যে চা, তলায় এক চামচে মধু, এই দেখুন রস ছাড়ছে।

    জ্যো : [কাচের গেলাসটাকে আলোর দিকে তুলে] মনটাকে করতে হবে এইরকম স্বচ্ছ। এইরকম উষ্ণ। তবেই না সেই অমৃতস্বরূপিণী মধুক্ষরণ করবেন।

    বড় : আমার কয়েকটা প্রশ্ন ছিল।

    জ্যো : বল।

    বড় : আমি এমন একটা শক্তি চাই, যাতে সমস্ত মানুষের ভিতরটা দেখা যায়। যেমন এন্ড্রোস্কোপি ছাড়াই আমি মানুষের স্টমাকটা দেখতে পাব। সিস্টোস্কোপি ছাড়াই ব্লাডারের মধ্যে ঢুকে যাব। অ্যাঞ্জিওগ্রাফি ছাড়াই হৃদয়ে প্রবেশ করব। স্ক্যানিং ছাড়াই ঢুকে যাব মানুষের খুলির তলায়।

    জ্যো : এই চাহিদাটা তো জাগতিক চাহিদা। আধ্যাত্মিক কিছু চাও।

    বড় : [ভালোমানুষের মতো] মানুষের দেহটা আধ্যাত্মিক নয়?

    জ্যো : দূর পাগল! পঞ্চভূতের এই দেহ পঞ্চভূতেই মিশে যাবে। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ [বোমা ফাটার মতো] ব্যোম।

    [ভিতরে বাসন পড়ে যাবার ভীষণ শব্দ]

    কুসি : যাঃ, সব ভেঙে শেষ করে দিল।

    গান্ধারী : মনে হয় সেই হুলোটা। জান বড়দা, তোমার মুজাহিদ আজ গোটা এক মাছ মুখে নিয়ে পাঁচিলে উঠে সাবড়েছে। তুমি যদি শিক্ষা দিতে না পার আমিই দেব।

    জ্যো : আঃ, সাংসারিক কথাবার্তা কেন রে পাগলি? কার মাছ কে খায়! সবই ভাগ্য।

    গান্ধারী : আজ্ঞে মুখ্যু মানুষ, এই যে একটু আগে বললেন ভাগ্য বলে কিছু নেই!

    জ্যো : সেটা ওই নির্বোধকে বলেছি। জানিস, সমস্ত মানুষই ভাগ্যের চাকায় বাঁধা। রবি, চন্দ্র, বৃহস্পতি, শুক্র, মঙ্গল, বুধ, শনি, কেতু, রাহু। সবসময় জানবে আমরা গ্রহের দাস। তাহলে উপায়? [আঙুল তুলে সেজভাইকে দেখিয়ে] বল টেক্সটাইল মাস্টার উপায়। [জনে জনে সকলের দিকে আঙুল তুলে বারকতক উপায় উপায় করলেন। তারপর ঠক করে কাচের গেলাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে হা হা করে হাসতে লাগলেন।]

    জ্যো : উপায় আছে রে, উপায় আছে। সর্বধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ। অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ। [আবার সকলের দিকে একে একে তাকিয়ে] মানে? [অল্প হেসে] কেউ জান না। কেউ জান না। একজন ডাক্তার, একজন ইঞ্জিনিয়ার, একজন আর্টিস্ট, একজন দার্শনিক। সেই দার্শনিকটি কোথায়?

    [মেজোভাই ঠিক সেই মুহূর্তে প্রবেশ করলেন]

    মেজো : এই যে আমি। অনেকদিন পরে এলেন।

    জ্যো : অধ্যাপক, গীতার শেষ শ্লোকটা বল তো।

    মেজো : আজ্ঞে, সেই সর্বধর্মাণ পরিত্যজ্য।

    জ্যো : হ্যাঁ, ওর মানে কী?

    মেজো : শ্রীভগবান বলছেন, তুমি সকল প্রকার ধর্ম ও অধর্ম পরিত্যাগ করে একমাত্র আমাকেই আশ্রয় কর।

    জ্যো : ব্যস, ব্যস, ব্যস ওই জায়গাটাতেই ধর। আমাকেই আশ্রয় কর। এই আমিটা কে?

    মেজো : এই আমিটা শ্রীভগবান।

    জ্যো : হুঁ, হুঁ, হলো না। এটা সেই চিরাচরিত ব্যাখ্যা। এই আমি হলো তুমি নিজে। নিজেকে ধর। চেপে ধর। নিজেকে ধরলেই দেখতে পাবে পাপও নেই, পুণ্যও নেই। কর্মও নেই, অকর্মও নেই। প্রেমও নেই, ঘৃণাও নেই। আছে শুধু ইন্দ্রিয়। ছটি ফোকর দিয়ে জগৎ আর জীবনকে দেখছ বাবাজীবন। ছটা জানলায় ছ’রকমের কাচ। একটা লাল, সেটা কাম, একটা ক্রোধ, সেটা হলো কমলালেবুর রঙ, একটা লোভ, সেটা হলো পিত্তি রঙ, একটা মোহ, সেটা হলো ধোঁয়াটে রঙ। আর একটা মদ, সেটা হলো মদের রঙ। আর একটা মাৎসর্য। সেটা হচ্ছে কুচকুচে কালো। যে জানলায় চোখ রাখবে ঠিক সেই রঙের পৃথিবী দেখবে। তাহলে উপায়? এ দেহটাকে তো নাশ করা যায় না। যায়? যায় না। বড় প্রেমের জিনিস, বড় প্রিয় জিনিস। তাহলে উপায়?

    মেজো : নিরুপায়।

    জ্যো : ধুৎস। পণ্ডিত মানুষ হয়ে এই কথা, উপায় থাকবে না? সবকিছুর উপায় আছে। তাহলে শোন শ্রীভগবান কী বলছেন—ইন্দ্রিয়াণি পরাণ্যাহুরিন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনঃ। মনসস্তু পরা বুদ্ধির্যোবুদ্ধেঃ পরতস্তু সঃ। মানেটা কী?

    মেজ : সত্যি কথা বলব। গীতা আমি তেমন পড়িনি। সংস্কৃত আমার জিভে জড়িয়ে যায়।

    জ্যো : শোন, ইন্দ্রিয় হলো শ্রেষ্ঠ। কোনও সন্দেহ নেই ইন্দ্রিয় শ্রেষ্ঠ। তুমিও জান, আমিও জানি, রামও জানে, শ্যামও জানে। সব মানুষই জানে। কারা জানে না? বল, জানে না পশুরা। তা ইন্দ্রিয় শ্রেষ্ঠ হলো তো কী হয়েছে। ইন্দ্রিয়ের ওপরে তো বসে আছে মন। আরে বেটা মনই তো ইন্দ্রিয়গুলোকে চালাচ্ছে। তুমি গাড়ি চালাচ্ছ, তোমার ফ্যাক্টরিতে তুমি মানুষ চালাচ্ছ, যন্ত্র চালাচ্ছ। সেই রকম ইন্দ্রিয়কে চালাচ্ছে মন। চালাক। চালাতে দাও। মনের মাথার ওপর তো বুদ্ধি বসে আছে। মনের চেয়ে বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ। এইবার বুদ্ধি তুমি যাবে কোথায়? বুদ্ধির মাথার ওপরে বসে আছে আত্মা। শুধু আত্মা নয় বল পরমাত্মা। যেমন তোমাদের মাথার ওপর বসে আছেন তোমাদের বড়দা। সেই পরমাত্মার সঙ্গে বন্ধুত্ব কর। তাকে সন্তুষ্ট কর। [হঠাৎ সুর ঘুরিয়ে] একটু যেন ক্ষিদে ক্ষিদে পাচ্ছে।

    কুসি : কী খাবেন বলুন?

    জ্যো : এই দেখ বোকা মেয়ে। ক্ষিদে পেলেই খেতে হবে? এটা কী মামার বাড়ি? দেহগত আত্মা অর্থাৎ জীবাত্মা যেই হুকুম করবে এইটা আমার চাই, সঙ্গে সঙ্গে সেটা দিয়ে দিতে হবে। পাগল, পাগল কোথাকার। দোব না। [চিৎকার করে] কিছুতেই দেবো না। তুমি যা চাইবে ঠিক তার উলটোটা পাবে। তোমাকে উপোস করিয়ে মারব। বুঝলে কিছু। এটা টেকনোলজির যুগ। এটাই টেকনিক। নিজের কাছে সরে আসা। এক থাপ্পড়ে, এক থাপ্পড়ে [আরও জোরে] সব ঠান্ডা।

    গান্ধারী : আপনি মাঝে মাঝে ওরকম আচমকা চেঁচিয়ে ওঠেন কেন?

    জ্যো : এই মেয়েটা ধরেছে। চমকে দেব বলেই আচমকা চেঁচাই, তা না হলে ভিতরে ভিতরে যে সব ঘুমিয়ে পড়বে। ওঠ, জাগো। কাকে বললুম? নিজে কিন্তু উঠছি না। বসে আছি, বসে থাকব। তাহলে কাকে বললুম? ভেতরে যে আছে তাকে।

    পরমা : আমার একটা প্রশ্ন ছিল।

    জ্যো : প্রশ্ন করতে হবে কেন মা? আমি তো সব জানি। এই ঘরে যারা বসে তাদের সকলের মনের কথা আমি জানি। তুমি বলতে চাইছ তোমার কর্তার শরীরটা ঠিক যাচ্ছে না। রাতে ভালো ঘুম হয় না। ভোরের দিকে একটু ঘুমোয়। তাও পাতলা ঘুম, স্বপ্নে ভরা। কেন হবে না? এ যে যুগের ধর্ম। আকাঙ্ক্ষা। আমি একটা গান গাইব।

    কুসি : গান না, গান না, হারমোনিয়াম আনব?

    জ্যো : কোনও দরকার নেই। সব বাদ্যযন্ত্র আমার গলায়, গানটা মন দিয়ে শোন, উত্তর পেয়ে যাবে। অকারণ মন আশা/কোর না কোর না/যতই করিবি আশা/মিটিবে না সে পিপাসা/অপার সে আশা নদী/তাও কি মন জান না/ভিখারি বাসনা করি/হইতে চায় লক্ষপতি/লক্ষপতি হলেও সে হইতে চায় কোটিপতি/ইন্দ্রত্ব লভিলেও সে শিবত্ব করে কামনা। [গান শেষ, দমকা কাশি]।

    সবাই সমস্বরে : কী হলো কী হলো?

    জ্যো : [কাশির ফাঁকে কোনওরকমে বললেন] ম-ম-মশা ঢুকে গেছে।

    বড় : [দুঃখের গলায়] তোরা কিছু স্প্রে করিসনি? তোদের নিয়ে আমি আর পারব না। শীগগির একটু জল নিয়ে আয়।

    জ্যো : [কোনওরকমে] গিলব না, গিলব না, ম্যা, ম্যা।

    বড় : [সঙ্গে সঙ্গে] ম্যালেরিয়া হবে না, ম্যালেরিয়া হবে না। এখানে একটা মশাও ম্যালেরিয়ার নেই। সব মেল মসকুইটো। আপনি ক্যাপসুলের মতো ঢোঁক করে গিলে ফেলুন।

    জ্যো : [মুখব্যাদান করে বারতিনেক হাঃ হাঃ হাঃ করলেন।]

    মেজো : এটা মনে হয় জীবাত্মার কাজ। পরামাত্মার গলায় মশা ঢুকতে পারে না।

    জ্যো : এই ধরেছ ঠিক। ওই যে তিনবার হাঁ করলাম, ওইটাই পরমাত্মা। এই যে একটু আগে বলছিঢ় না নাভিশ্বাস। সেই নাভির শ্বাস দিয়ে মশাটাকে অনন্তে উড়িয়ে দিলুম।

    [কোথায় ঢ্যাং করে একটা শব্দ হলো]

    জ্যো : শব্দটা শুনলে? কোথায় হলো?

    বড় : আজ্ঞে কাছাকাছি কোথায়।

    জ্যো : আরে না, শব্দটা আমি করলুম। একেই বলে অনন্তের সমাপ্তি ঘণ্টা। [কুসির দিকে তাকিয়ে] ও মেয়ে, জীবাত্মা যে এবার ফুলকো লুচি খেতে চাইছে। গাওয়া ঘিয়ের সুগন্ধ। জীবাত্মাই ওটা পরমাত্মার দিকে ঠেলে দেবে।

    গান্ধারী : [বোকার মতো] আপনার ঘোড়াটা কী খাবে?

    জ্যো : [মুচকি হেসে] ফচকে মেয়ে।

    চার
    দাবার ছক, এপাশে ঝুঁকে আছে বড়, ওপাশে ঝুঁকে আছে মেজো।

    মেজো : বড়দা, কিছু একটা কেরামতি করেছ মনে হচ্ছে? তোমার এই বোড়েটা তো এখানে ছিল না। এটা কোথা থেকে এল?

    বড় : কোথা থেকে আসবে? ওটা ওখানেই ছিল।

    মেজো : না, না, হতেই পারে না। আমি অনেকক্ষণ ধরে তাক করে আছি। ওই রুট দিয়ে ঢুকে তোমার রানীকে কব্জা করব। এটা তোমার জোচ্চুরি। তুমি কোন ফাঁকে ওটাকে তুলে এনে বসিয়েছ।

    বড় : মিথ্যে কথা বলবি না মেজ। জীবন আর খেলা—দুটোতেই সত্যকে ধরে থাকবি।

    মেজো : শোন বড়দা, এই দাবার ব্যাপারে তোমার একটা ব্যাড রেপুটেশন আছে। তোমার সঙ্গে যে খেলতে বসে সেই হারে। তুমি যদি দাবায় এত বড় চ্যাম্পিয়ান হবে তাহলে কারপভকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছ না কেন? তোমার যত কেরামতি বাড়িতে। আর সে কেরামতিটা হলো জোচ্চুরি। কুসি আমায় আগেই সাবধান করেছিল—’মেজদা চোখ বুজিয়ে থেক না, চোখ খোলা রেখ।’ আমি ওই উপদেশটাকেই একটু অ্যাডজাস্ট করে নিয়েছিলাম। চোখ বুজিয়ে মিট মিট করে দেখছিলাম তুমি কী কর। তুমি এদিক ওদিক তাকিয়ে টুক করে ওঠা ঠেলে দিলে।

    বড় : তুমি স্বপ্ন দেখেছিলে মানিক। ওই ঘুঁটিটা প্রথম থেকেই ওখানে আছে।

    মেজো : না, ওটা ছিল না।

    বড় : দাদাকে জোচ্চর বলতে তোর লজ্জা করছে না? তোর অন্তরে লাগছে না?

    মেজো : জোচ্চরকে, জোচ্চর বলব, অন্তরে লাগবে কেন?

    বড় : তার মানে আমি একটা চিট!

    মেজো : আমি ইংরেজি বলিনি। জোচ্চোর আর চিট দুটো আলাদা ব্যাপার। আকাশ-পাতাল তফাৎ। চিট অনেক বড় ব্যাপার। সে তোমার দ্বারা হওয়া সম্ভব হবে না। তুমি ছিঁচকে চোর হতে পারবে, ডাকাত কোনও দিনই নয়।

    বড় : ছিঁচকে চোর কথাটা ভালো হলো? ছিঁচকে চোর, সিঁধের চোর, ঘৃণ্য জীব। বরং ডাকাত অনেক রেসপেকটেবল।

    মেজো : ঘুঁটিটা ওখান থেকে সরাও।

    বড় : কেন সরাব?

    মেজো : ওটা ওখানে ছিল না।

    বড় : ওটা ওখানেই ছিল।

    মেজো : না, ছিল না।

    বড় : হ্যাঁ, ছিল।

    মেজো : না, ছিল না।

    বড় : কুসি, কুসি,

    [খুন্তি হাতে কুসির প্রবেশ]

    কুসি : তোমাদের জ্বালায় বাড়ি ছেড়ে পালাতে হবে। তোমরা বিয়ে কর বাপু, বেঁচে যাই।

    বড় : সে পরে দেখা যাবে। আগে তুই বল আমাকে তুই চোর বলেছিস। ছিঁচকে চোর। আমি নাকি ফ্রিজ খুলে চুরি করে মিষ্টি খাই। ছেলেবেলায় আমার জন্য মা আচারের বয়াম সিন্দুকে চাবি দিয়ে রাখত? শেষ জীবনে আমি ডাকাতি করব? আমি ব্যাগ দেখলেই খুলে টাকা সরাই, সেজ বউয়ের কানের দুল বিক্রি করে আমি বাদাম ভাজ খেয়েছি।

    মেজো : দাঁড়াও, দাঁড়াও, তুমি এসব কী বলছ?

    বড় : আরে দাঁড়া, দাঁড়া। কুসির নাম করে তুই যা বলেছিস, তারপর এইগুলোই আসে। একটা রোগের পিছনে পিছনে দশটা রোগ জোটে।

    কুসি : কী হয়েছে বলবে তো?

    মেজো : আরে সেই ওল্ড কেস। খেলতে খেলতে অন্যমনস্ক হয়েছি অমনি ঘুঁটি সরিয়েছ।

    কুসি : বড়দা, এই রোগটা তোমার আছে। তুমি যখনই আমার সঙ্গে লুডো খেলতে বসেছ তখনই আমি গোহারান হেরেছি। তুমি পাঁচ ফেলে ছয়ের চাল দাও। আঙুলের কায়দায় ছক্কা ফেলো। এ তোমার অনেক দিনের ব্যামো। তোমার ভেতর স্পোর্টসম্যান স্পিরিট নেই। তুমি হারতে ভয় পাও, খালি হারাতে চাও।

    বড় : তার মানে আমি ক্যারেকটারলেস। আমি একটা বদ লোক। তাহলে কাল থেকে তোরা আমাকে দাদা বলিস না।

    মেজো : তুমি আচ্ছা ক্রুকেড লোক তো।

    বড় : ক্রুকেড মানে?

    মেজো : বাঁকা লোক।

    বড় : আর তুমি ভারি সোজা লোক।

    [কুসি খেপে গিয়ে দাবার ছকটক সব উলটে দিল]

    কুসি : তোমরা যদি আর কোনও দিন দাবা খেলতে বসেছ তাহলে এই খুন্তি গরম করে ছ্যাঁকা দেব।

    বড় : তা তুমি দিতে পার। বড় ভাইকে যখন চোর বলতে পার, তখন ছ্যাঁকাও দিতে পার।

    কুসি : তোমার এখন এক কাপ চা খাওয়া দরকার।

    বড় : থাক, থাক, অত খাতিরে প্রয়োজন নেই। পয়সা ফেলব, মোড়ের দোকান থেকে খাব।

    কুসি : তোমার অনেক পয়সা আছে। সে আমরা জানি। তবে আমার হাতের চায়ের মতো চা কোথাও পাবে না।

    বড় : কোন হাত? যে হাত খুন্তি ছ্যাঁকা দেয়। আমি জানি যেদিন আমার মা মারা গেছেন সেদিন থেকে আমার আদরও চলে গেছে। আর এই মেজো জ্ঞানের অহংকারে একবারে ফেটে পড়ছে। অধ্যপক, অধ্যাপক!

    মেজো : বড়দা তুমি তিলকে তাল করছ।

    বড় : আজ্ঞে না। আমি তালকে তিল করছি। তোমরা যা বলেছ, অন্য কেউ হলে গৃহত্যাগ করত।

    মেজো : শোন বড়দা, এই গৃহত্যাগের কথা যখন বললে তখন আমার স্ট্যাটিসটিক্সের কথা শোন। আমি জনে জনে জিজ্ঞাসা করে দেখেছি গৃহত্যাগ করে কে কতদূর যেতে পেরেছে। ওই গেট পর্যন্ত, কিংবা গেটের বাইরে রাস্তা পর্যন্ত। একজনই একটু বেশিদূর পর্যন্ত গিয়েছিল, ওই মোড়ের মাথার ল্যাম্পপোস্ট পর্যন্ত। রাত এগারোটার সময় পান-বিড়ির দোকান বন্ধ করতে করতে দোকানদার বলল, আমি তো চললাম, আপনি কী করবেন? সে তখন কাঁদো কাঁদো হয়ে বললে, ভাই বাড়িতে একটু বলে পাঠাও না আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি, একবার ডাকলেই যেতে পারি। অতএব গৃহত্যাগ করার আগে ভেবে নাও কোথায় যাবে, কার কাছে।

    বড় : আমার যাবার অনেক জায়গা আছে।

    কুসি : ঠিক আছে জায়গাগুলো বল।

    বড় : যেমন ধর, যেমন ধর, যেমন ধর [হতাশ হয়ে] যাবার কোথাও জায়গা নেই রে। এক কাপ চাই খাওয়া।

    মেজো : পথে এসো। শোন বড়দা, আমরা যে গোয়ালে আছি সেই গোয়ালেই মিলেমিশে থাকতে হবে। তুমি হলে বড় ষাঁড়, আমি হলুম মেজো ষাঁড়, ভাইগুলো সব ষণ্ড, আর…

    কুসি : আর এগিও না মেজদা।

    [দরজার কাছে গলা] আসতে পারি?

    কুসি : আরে প্রমোদ জ্যাঠা!

    প্রমোদবাবু : [ঢুকতে ঢুকতে] অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা নিয়ে আমি তোমাদের কাছে এলাম। দেখ এ পাড়ায় আমার নাম মিঃ অ্যাংজাইটি। কিন্তু তোমরাই বল, দুশ্চিন্তা না করে থাকা যায়! এটা কী একটা দিনকাল! কোনও ভদ্রলাক এভাবে বাঁচতে পারে! [সুর করে] বসতে পারি?

    বড় : হ্যাঁ, হ্যাঁ, বসুন, বসুন। আপনার জন্ডিস হয়েছিল, কেমন আছেন?

    প্রমোদ : অ্যাই, ভালো কথা জিজ্ঞাসা করেছ। জন্ডিসে কী হয় তুমি জান?

    কুসি : আপনি চা খাবেন?

    প্রমোদ : অবশ্যই।

    বড় : তার মানে লিভার ভালো যাচ্ছে।

    প্রমোদ : ডাক্তার হয়ে এ কথাটা কী করে বললে? চায়ের সঙ্গে লিভারের কী সম্পর্ক? [কুসি এই ফাঁকে বেরিয়ে গেছে] চায়ের সঙ্গে লিভারের কি সম্পর্ক? গলায় চা ঢালবে সড়াক করে স্টমাকে পৌঁছে যাবে। সেখানে থেকে জলীয় পদার্থ তার পথ বেয়ে বেরিয়ে যাবে টয়লেটে। আর চায়ের কষটা লেগে যাবে পাকস্থলির ভিতরের দেওয়ালে। তাহলে কী হলো? চায়ের সঙ্গে আলসারের সম্পর্ক। লিভারের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। তবে হ্যাঁ, জন্ডিসের সঙ্গে লিভারের সম্পর্ক আছে।

    বড় : জল ফুটিয়ে খাচ্ছেন?

    প্রমোদ : জল ফুটিয়ে! আমার জন্য এত তদারকি কে করবে? তোমাদের জীবনের দাম আছে। আমার জীবনের কী দাম?

    মেজো : আপনি এক সময় কত ভালো বেহালা বাজাতেন?

    প্রমোদ : একালে বেহালা বাজালে লোকে মারতে আসবে। বেহালা নাকি শুধু কাঁদতে জানে। কথাটা খুব মিথ্যে নয়। যাত্রা, থিয়েটার, সিনেমায় শুধু কান্নার সিন হলেই বেহালা বেজে ওঠে।

    মেজো : বেহালায় আপনি ক্লাসিক্যাল সুর-টুর বাজাতে পারেন। সময়টা ভালো কাটবে। বিদেশি কনসার্টে একসঙ্গে পঞ্চাশটা বেহালা বাজে।

    প্রমোদ : বিদেশের সঙ্গে কেন তুলনা করছ? তোমরা শুনেছ?

    বড় : কী হলো আবার?

    প্রমোদ : কিডন্যাপিং। এপাড়ায় ঢুকে পড়েছে। সকাল থেকে সুজনের মেয়েটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বৌমাদের ডাক।

    [ডাকাডাকি। পরমা ও রেখা দুজনেই ঘরে ঢুকল]

    দুজনে একসঙ্গে : জ্যাঠামশাই।

    প্রমোদ : তোমাদের সাবধান করতে এলুম। বাচ্চা দুটোকে সাবধানে রেখ, চোখে চোখে। সুজনের বাচ্চা মেয়েটাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে। এইবার চিঠি আসবে দশ লাখ টাকা ছাড়।

    রেখা : থানায় ডায়েরি করেছে?

    প্রমোদ : আর ডায়েরি! পুলিশ কী করবে? সে কী আর এদেশে আছে?

    পরমা : কত পুলিশ, একটা থানায় গিজগিজ করছে পুলিশ, পুলিশ নেই?

    প্রমোদ : আমি পুলিশের কথা বলিনি। আমি মেয়েটার কথা বলছি। সে এতক্ষণে পাঞ্জাব কী হরিয়ানায় পাচার হয়ে গেছে। দুবাইতেও চলে যেতে পারে।

    রেখা : এইটুকু সময়ের মধ্যে দুবাই চলে যাবে?

    প্রমোদ : মডার্ন টেকনোলজির যুগে মানুষের স্পিড কী বেড়েছে। হু হু শব্দে সব ছুটছে। ও হ্যাঁ, স্পিডের কথায় মনে পড়ল। ডাক্তার তুমি কী রোজ ওই স্পিডে গাড়ি চালাও?

    বড় : কোন স্পিডে?

    প্রমোদ : ওই যে আজ হুস করে চলে গেলে আমার পাশ দিয়ে। তুমি জান কীরকম দুর্ঘটনা হচ্ছে। কালকে আমার চোখের সামনে একটা গাড়ি একটা অটোকে মারল। অটোটা ছিটকে রাস্তার ধারে গিয়ে চায়ের দোকানে বসে তিনজন খবরের কাগজ পড়ছিল তাদের ঘাড়ে। ব্যস ছটা খতম।

    বড় : ছজন কোথা থেকে এল?

    প্রমোদ : আরে তিনজন তো অটোর ভিতরে ছিল।

    মেজো : ছজনেই মারা গেল?

    প্রমোদ : সঙ্গে সঙ্গে কী গেল! যখন মেরেছে তখন ছটাই যাবে। জীবনের কোনও দাম নেই, কোনও দাম নেই। চারপাশে ফুটকড়াই-এর মতো লোক। পিলপিল করছে গাড়ি। যাবে কোথায়? এইভাবেই পপুলেশন কন্ট্রোল হচ্ছে।

    [গান্ধারী চা নিয়ে ঢুকল]

    গান্ধারী : এই নিন, গরম গরম দার্জিলিং চা।

    প্রমোদ : এই শোন, তুমি আজ সেফটিপিন দিয়ে দাঁত খুঁটছিলে?

    গান্ধারী : কখন?

    প্রমোদ : যদি না খুঁটে থাক ভালো। আর যদি ওই অভ্যাস থাকে তাহলে ছাড়। আজ আমাদের পাশের বাড়ির কার্তিকের মা হাসপাতালে গেল। দাঁতের গোড়ায় সেফটিপিন দিয়ে খোঁচা মেরেছিল। সেপটিক।

    গান্ধারী : তাই বলুন, আমি তো ভয় পেয়ে গেছি।

    প্রমোদ : [মেজোকে] শোন শোন, চা সব সময় ঠান্ডা করে খাবে। অত গরম চা খেলে পেটের লাইনিং নষ্ট হয়ে যায়।

    বড় : তা আপনার শরীর এখন কেমন আছে?

    প্রমোদ : আর শরীর! ক্যানসার কেমন হচ্ছে দেখেছ ডাক্তার? ঘরে ঘরে ক্যানসার। জান, আমার খুব অম্বল হয়। আজকাল শুনছি ডাক্তাররা অম্বলের কারণ খুঁজে পায় না। খালি অ্যান্টাসিড খাওয়ায়। একবারও ভাবে না ওটা ক্যানসার হতে পারে। এই যে আমার থেকে থেকে কাশি হয়, এই কাশিটা কী সেই কাশি?

    মেজো : কোন কাশি? বারাণসী?

    প্রমোদ : খুব অফেনডেড হলুম। আমি একজন বয়স্ক লোক। তোমাদের কাছে আসি পাঁচটা কথা বলতে। তুমি ঠাট্টা করছ?

    বড় : না, না, আমিও তো বুঝতে পারলাম না, কাশি তো কাশিই হবে।

    প্রমোদ : শোন, আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, সব কাশি কাশি নয়। কিছু কাশি হলো লাঙ ক্যানসার। তোমরা কী বলতে পার, তোমাদের কারুর ক্যানসার হয়নি বা হবে না?

    বড় : তা কী করে বলব? হতেই পারে।

    প্রমোদ : তাহলে ক্যানসার নিয়ে ঠাট্টা করছ কেন?

    বড় : কই ঠাট্টা করিনি তো।

    প্রমোদ : ঠাট্টা না করলেই ভালো, ও হ্যাঁ, ভুলে যাবার আগে জিজ্ঞাসা করে নি, আমার চোখের দৃষ্টি ক্রমশই কমছে। একটা ব্রেন স্ক্যান করানো কি দরকার?

    বড় : স্ক্যান, স্ক্যান করাতে যাবেন কেন?

    প্রমোদ : আরে শোন, আমার জ্যাঠতুতো ভাইয়ের বউয়ের এইরকম পাওয়ার ঘন ঘন চেঞ্জ হচ্ছে। শেষে ধরা পড়ল ব্লেন টিউমার। টিউমারটি তখন বিশাল হয়ে গেছে। এখন ডাক্তাররা বলছেন কিস্যু করার নেই।

    বড় : আপনার দৃষ্টিশক্তি কমছে বয়সের জন্য। একে বলে চালসে।

    প্রমোদ : কী কথাই বললে, আমাদের ফ্যামিলিতে কারুর কখনওই চালসে হয়নি। আমার বাবা আশি বছর বয়সে খালি চোখে পাখি ছুঁচে সুতো পরাতেন।

    বড় : তাহলে স্ক্যান করান। খরচটা কত জানেন তো?

    প্রমোদ : সে করাতেই হবে। আমার বাবা একটা কথা বলতেন, এ স্টিচ ইন টাইম সেভস নাইন। বাঃ চাটা বেশ ভালো হয়েছে তো। কত টাকার?

    বড় : কে জানে, কুসি আনায়।

    প্রমোদ : [একটু বাঁকা হেসে] তোমরা সংসারের কিছুই দেখ না, ওই মেয়েটার ঘাড়ে ফেলে রেখেছ। আছে অনেক তাই বুঝতে পারছ না। যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি। পরের লাইন?

    মেজো : ও কুসি জানে।

    প্রমোদ : সবই তোমাদের কুসি। মেয়েটার বিয়ে দিচ্ছ না কেন?

    মেজো : ও বিয়ে করবে না।

    প্রমোদ : আমার মাসিমাও বিয়ে করেননি। শেষকালটায় মাথার গোলমাল হয়ে গেল। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গেলেই সপাটে ঝাপটা মারবে। মারবেই মারবে। [সুর করে] এই যে এত ইউটেরাসে ক্যানসার হচ্ছে, কেন হচ্ছে? একটা রিপোর্টে পড়েছিলুম…

    বড় : অসুখের কথা থাক না জ্যাঠামশাই। ওতে মন দুর্বল হয়ে যায়।

    প্রমোদ : বাজে কথা, পুরনো কথা, জেনে রাখ প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর। আচ্ছা, তোমরা কী জুতো পর?

    বড় : জুতোয় চলে গেলেন?

    প্রমোদ : কেন গেলুম জানো। মুখ খোলা জুতো হলে ভয় নেই। শু হলেই বিপদ।

    মেজো : বিপদ কেন? কড়া পড়বে পায়ে?

    প্রমোদ : কড়াতে মানুষ মরে না। কাঁকড়াবিছের কামড়ে মানুষ মরে যেতেও পারে।

    বড় : জুতোর সঙ্গে কাঁকড়া বিছের কী সম্পর্ক?

    প্রমোদ : আছে, আছে। কিছুই জান না, জন্মে বসে আছ। ওই মুখবন্ধ জুতোর মধ্যে কাঁকড়াবিছে ঘাপটি মেরে থাকে। সেদিন সন্তোষকে অ্যায়সা মেরেছে। তিনদিন যমে-মানুষে টানাটানি। বাচ্চাদের কেডস, তোমাদের শু সবসময় ঠুকে পড়বে।

    মেজো : কাঁকড়াবিছে কোথা থেকে আসবে?

    প্রমোদ : যখন আসবে তখন বুঝবে কোথা থেকে আসে।

    বড় : কিছু আশার কথা বলুন না।

    প্রমোদ : আশার কথা থাকলে কী বলতাম না! এটা হচ্ছে নিরাশার যুগ। এই যে তোমাদের বাড়ির ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যারিং কত বছর আগে চেক করিয়েছ?

    বড় : তা পাঁচ বছর হবে।

    প্রমোদ : অদ্ভুত! তোমরা এক একটি ভূত। নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছ। প্রত্যেক ছয় মাস অন্তর চেক করানো উচিত। আমাদের ওয়েদার তো ভালো নয়। ধর তোমরা সবাই ঘুমোচ্ছ, মাঝরাতে শর্ট সার্কিট হয়ে আগুন ধরে গেল। ভোরবেলা সব ছাই।

    মেজো : তা কেন হবে?

    প্রমোদ : শিক্ষিত লোকের মুখে কী অশিক্ষিত কথা! সামান্য শর্ট সার্কিটে কতবড় থিয়েটারটা পুড়ে গেল। বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

    বড় : কোন থিয়েটার?

    প্রমোদ : আরে স্টার। স্টার-এর কথা বলছি।

    বড় : জ্যাঠামশাই, রাত হলো দিনকাল ভালো নয়, এইবার আপনি বাড়ি যান।

    প্রমোদ : বাড়ি! এত তাড়াতাড়ি আমি বাড়ি ফিরি না। যাক তোমাদের এখানে এককাপ চা খেলুম। এইবার একবার পঞ্চাননের কাছে যাই। খবর পেলুম ওদের বাড়িতে আজ মালপো হয়েছে।

    মেজো : আপনি এখানে খেয়ে যান না?

    প্রমোদ : পাগল হয়েছ? আমি কী ভখিরি যে চেয়ে চেয়ে খাব। তোমরা যদি আগে বলতে, তাহলে ভেবে দেখা যেত। আচ্ছা আসি বাবা। তোমরা ভালো থেক, সাবধানে থেক, আর ছোটদের নাগালের মধ্যে দেশলাই রেখ না। ও যে কী মারাত্মক জিনিস! বাথরুমে গিজার আছে নাকি?

    বড় : [অপরাধীর গলায়] আজ্ঞে আছে।

    প্রমোদ : হয়ে গেল। ও একদিন মারবেই। একমাত্র উপায় বাথরুমে একটা কাঠের পিঁড়ি রেখ। ওই কাঠের পিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে যা করার কোরো।

    [প্রমোদবাবু বেরিয়ে গেলেন। বড় মেজোকে জিজ্ঞাসা করলেন]

    বড় : কী বুঝলি?

    মেজো : সব কথাই শোনার মতো। মানুষকে মারার মেশিন ফিট হয়েই আছে। বেঁচে থাকাটাই আশ্চর্যের।

    [গান্ধারী ঝাঁ ঝাঁ করে ঢুকল]

    গান্ধারী : তোমার মুজাহিদ, আদরের মুজাহিদ।

    বড় : কী করেছে?

    গান্ধারী : তোমার পাখির খাঁচার মাথার ওপর উঠে বসে আছে।

    বড় : সেকী রে! নামা নামা।

    গান্ধারী : সে আমি নামিয়ে দিয়েছি। এই নিয়ে তিনবার হলো। পাখিগুলো ভয়ে চিৎকার করছে। একই বাড়িতে বেড়াল, কুকুর, পাখি, খরগোশ এমন দেখিনি বাপু। প্রত্যেকটাই প্রত্যেকের শত্রু।

    বড় : কেন জঙ্গলে? একই জঙ্গলে বাঘ, ভাল্লুক, সিংহ, হরিণ থাকে না?

    গান্ধারী : মরেও তেমনি।

    বড় : তা মরুক।

    গান্ধারী : বেশ তাহলে মরুক। কিন্তু মরার পর মেজাজ খারাপ করো না। সেদিন একটা পাখি মরেছিল, আমরাও মরতে বাকি ছিলাম।

    বড় : সব ব্যাপারটাই নির্ভর করে ট্রেনিং-এর ওপর। তোর বড় মুখ হয়েছে গান্ধারী।

    গান্ধারী : সত্যি কথা বললেই মুখ হয়ে গেল।

    [গান্ধারী বেরিয়ে গেল]

    মেজো : আর একদান বসবে নাকি?

    বড় : জোচ্চর বলবি না?

    মেজো : জোচ্চুরি না করলে, বলবো না।

    বড় : তাহলে লাগা।

    [দাবার ছক পড়ল এমন সময় টেলিফোন। বড় উঠে গিয়ে ফোনে]

    বড় : হ্যালো।

    বড় : ডঃ মিত্র বলছি।

    বড় : হ্যাঁ, কী হয়েছে?

    বড় : বার্নকেস!

    বড় : কে?

    বড় : আপনার স্ত্রী?

    বড় : ভেরি স্যাড।

    বড় : ভেরি স্যাড।

    বড় : এ তো ভাই আমি কিছু করতে পারবো না। সোজা হাসপাতালে নিয়ে যান। এ তো পুলিশ কেস হবে।

    বড় : মানবিকতা।

    বড় : না মশাই, ও কথায় আর ভুলছি না। এখন দিনকাল বড় খারাপ। সোজা হাসপাতালে কিংবা নার্সিংহোমে নিয়ে যান।

    [বড় ফোন নামালেন]

    মেজো : কী হলো?

    বড় : আগুন।

    মেজো : কোথায়?

    বড় : ওই যে প্রোমটার হয়েছে। বিষ্ণুবাবু। ওর বৌ। বলছে রান্না করতে গিয়ে…কেউ কি তা বিশ্বাস করবে? একালে মেয়েদের কিছু হলে রক্ষে নেই। হাজতবাস। তার আগে গণধোলাই, বাড়ি ভাঙচুর। আমরা বিয়ে না করে বেশ আছি বল। শুধু তোর সঙ্গে আমার যদি একটু মনের মিল হতো?

    মেজো : এটা সিরিয়াসলি বললে?

    বড় : ধ্যুর। আমাদের ভালোবাসা, অবিচ্ছিন্ন বন্ধন। একটা কথা তোকে বলি, তখন আমি ঘুঁটিটা সরিয়েছিলুম রে।

    মেজো : এই স্বীকারোক্তিতে তোমার পাপ কেটে গেল। না বলিয়া পরের দ্রব্য গ্রহণকে বলে চুরি। বলিয়া গ্রহণ করাকে বলে ছিনতাই।

    বড় : ছিনতাই বললি কেন?

    মেজো : [একগাল হেসে] দুষ্টুমি।

    বড় : [একটু চিন্তিত ভাবে] একবার যাই কী বল?

    মেজো : কোথায়?

    বড় : বিষ্ণুবাবুদের বাড়িতে। ওর বউটা আমাকে খুব ভালোবাসত রে, দাদা দাদা করত, ভারি সুন্দর মেয়ে।

    মেজো : আমিও যাই চল। তোমাকে একা ছাড়তে ভয় করছে। ওদের বাড়ির সামনে এতক্ষণ শ’দুই জমে গেছে।

    বড় : থানার ওসিকে একবার ফোন করব?

    মেজো : এতক্ষণে ওরাই ফোন করেছে?

    বড় : দাঁড়া, জুতোটা গলাই।

    মেজো : আমার তো চটি।

    [বড় জুতো পরে উঠে দাঁড়িয়েছে, দাঁড়িয়েই চিৎকার]

    বড় : ওরে ডান পাটির ভেতর কী এটা খড়খড় করছে। কাঁকড়াবিছে। বাঁচাও বাঁচাও। এ প্রমোদবাবু ছেড়ে দিয়ে গেছেন।

    [বড় ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন]

    মেজো : আর তুমি জুতোটা খুলে ফেল না।

    বড় : [দাঁতে দাঁত চেপে] দেখছিস না কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, নড়লেই কামড়ে দেবে।

    মেজো : কুসি, কুসি।

    [মেজর চিৎকারে সবাই ঘরে। বাচ্চা দুটোও এসেছে]

    কুসি : এবারে কী?

    মেজো : দাদার জুতোয় কাঁকড়াবিছে।

    কুসি : তুমি সোফায় বোস, দেখি কেমন কাঁকড়াবিছে।

    [সবাই হাঁ করে যেন সিনেমা দেখছে। কুসি টান মেরে জুতো দু’পাটি খুলে ফেলল।

    জুতো ঠুকতেই ডান পাটি থেকে বেরিয়ে এল মেয়েদের মাথার চুলের একটা কাঁটা]

    কুসি : [ওটাকে তুলে ধরে] এটা কোন বউয়ের মাথা থেকে খসেছে? সেজোকি তোর, না নকার!

    উপসংহার
    বড় মজার এই মিত্তির বাড়ি।

    চন্দন রঙের তিনতলা এই বাড়িটির নাম হওয়া উচিত ছিল ‘আনন্দ নিকেতন’। তিন পুরুষের বসবাস। সমৃদ্ধি এতটুকু কমেনি, বরং বেড়েই চলেছে। সূর্যোদয়ে সদর দরজা খুলে যায়। তারপর অবারিত দ্বার। তোমরা এস, তোমাদের সুখ, দুঃখ, সমস্যা নিয়ে। শ্রোতা পাবে, সহানুভূতি পাবে, সমাধান পাবে।

    রাত আড়াইটের আগে আলো নেবে না। কারো খেয়াল চাপলে রাত বারোটার সময় নতুন ফর্মুলায় রান্না চাপতে পারে। এইবাড়িতে যত রাত বাড়ে ততই যেন উৎসব বাড়ে। ছোটোখাটো কোনও পারিবারিক সমস্যা নেই বললেই চলে।

    সব কটা মানুষের মুখের দিকে তাকালেই পড়ে ফেলা যায় মনের কথা। অদ্ভুত, অলৌকিক এক আনন্দের রাজ্যে সবাই আছে। কোনও মনে কোনও সঙ্কীর্ণতা নেই। ভাঙা সংসারের ঘা-খাওয়া অনেকেই এই বাড়িতে সাময়িক আশ্রয় খুঁজে পায়। পরে প্রশ্ন নিয়ে ফিরে যায়, সব সংসারই কেন এমন সুখের সংসার হয় না!

    আজ বাড়ির সামনে আকাশি রঙের একটা ট্যুরিস্ট বাস দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে একটা ব্যানার লাগানো। গেরুয়া রঙের জমির ওপর বড় বড় করে লেখা মিত্তির স্পেশ্যাল। মালপত্তর সব উঠছে। গান্ধারী অতি সাবধানে একটা প্যাকিং বাক্স তুলছে। বড়ভাই জিগ্যেস করলেন, ‘কি রে ওটা?’

    গান্ধারী উদ্ভাসিত মুখে বললে, ‘সাত রকম।’

    ‘কি সাত রকম?’

    ‘আচার গো আচার।’

    বড়ভাই উচ্ছ্বসিত, ‘ইও আর গ্রেট, গান্ধারী সেই মহাভারতের আমল থেকে তুই গ্রেট। সাবধানে, একেবারে সামনে রাখ। ঝাঁকুনিতে সর্বনাশ না হয়ে যায়।’

    ‘হবে নি গো। সব প্যালেটিকে প্যাক করা!’

    মেজোভাই ড্রেসট্রেস করে বড়র পাশে দাঁড়িয়েছেন এসে। বড় জিগ্যেস করলেন, ‘হ্যাঁরে, গ্রেটের বড় কি, আরও আরও গ্রেট!’

    ‘গ্রেটেস্ট।’

    ‘আ, আওয়ার গান্ধারী ইজ গ্রেটেস্ট।’

    ‘ভুল হলো।’

    ‘কেন, ভুল হলো কেন? গ্রেট, গ্রেটার, গ্রেটেস্ট।’

    ‘একা তো আর গ্রেটেস্ট হওয়া যায় না, অনেকের মধ্যে গ্রেটেস্ট। গ্রামারে পড়নি, সুপার রিলেটিভ ডিগ্রি! অনেকের মধ্যে যে গ্রেট, সেই গ্রেটেস্ট।’

    ‘ঠিক আছে। পৃথিবীতে যত গান্ধারী আছে, তাদের মধ্যে এই গান্ধারীটা গ্রেটেস্ট।’

    পাড়া-প্রতিবেশীরা সব পথে নেমে এসেছেন। হন্তদন্ত হয়ে প্রমোদবাবু ঘটনাস্থলে প্রবেশ করলেন, এই বলতে বলতে, ‘কি ভাবে ছুটতে ছুটতে এলুম উলটো পাঞ্জাবি পরে! ভেতরের পকেটটা বাইরে। তখন থেকে ভাবছি, পকেট কি করে ছোট হয়ে যায়! এ তো সিগারেট নয়!’

    তারপর দম নিয়ে বড়কে জিগ্যেস করলেন, ‘যাচ্ছ কোথায়, হোল ফ্যামিলি?’

    ‘আমরা সব কটা মিত্তির সদলে পুরী চলেছি। জগন্নাথদেবকে দর্শন করব। সমুদ্রের ঢেউ ভাঙব। কোনারকে পিকনিক করব, সাক্ষীগোপাল দেখব, ভুবনেশ্বরে উদয়গিরি, খণ্ডগিরি।’

    প্রমোদবাবু চোখ বড় বড় করে শুনলেন, তারপর অভাবনীয় এক হুঙ্কার, ‘না, যাবে না, সব কটা মিত্তির একসঙ্গে যাবে না।’

    ‘কেন?’

    ‘এই গাড়ির সঙ্গে আর একটা গাড়ির যদি হেড-অন কলিসান হয়! ওভারটেক করতে গিয়ে স্কিড করে যদি টার্ন টার্টল হয়, সব মিত্তির একসঙ্গে খতম!’

    বড় বললেন, ‘এ সব হবে কেন?’

    প্রমোদবাবু বললেন, ‘হবে না কেন?’

    ‘হবে না এই কারণে যে আমরা আপনাকেও ধরে নিয়ে যাব।’

    ‘আমার পাঞ্জাবি যে উলটে আছে!’

    ‘এক্ষুনি সোজা করে দোবো।’

    ‘আমার মাল-পত্তর ব্যাগ-ব্যাগেজ!’

    ‘দরকার নেই। আমাদের সব আছে।’

    ‘বাড়িতে খবর!’

    ‘বাস থামিয়ে, ভ্যাঁক ভ্যাঁক হর্ন।’

    ‘তাহলে?’

    ‘উঠে পড়ুন। একেবারে সামনের সিটে জানলার ধার।’

    প্রমোদবাবু ধরা গলায়, ‘তোমরা আমার কে গো?’

    ‘আমরা আপনার একগাদা মিত্তির।’

    বাস ছেড়ে দিল। মিত্তির স্পেশ্যাল। সকলে সমস্বরে বলে উঠল, ‘তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন। পাড়া একদম খালি হয়ে গেল। দুর্গা, দুর্গা!’

  • চোখ

    চোখ

    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

    [book]

    এক

    এখনও আছে। এমন পরিবার এখনও আছে। বিরাট যৌথ পরিবার। পরিবার যখন বিশাল বাড়িটাও সেই অনুপাতে বৃহৎ। অতীতে এঁদের পূর্বপুরুষ এই কায়দার গৃহ তৈরি করেছিলেন। কতদিকে যে বিস্তার! এদিক, ওদিক, সেদিক। দালান, উঠান, বাগান। এ-কালের বাড়িতে একটা সিঁড়ি করতেই রেস্ত ফাঁক। এই বাড়িতে বড়য়, ছোটোয় মিলিয়ে সাতটা সিঁড়ি। প্রধান সিঁড়ি তরতরিয়ে তিনতলায় উঠে গেছে। এরপর সব শাখা-প্রশাখা, কোনওটা নীচে নেমেছে। কোনওটা প্যাঁচ মেরে হাজির হয়েছে কোনও গুপ্ত মহলে। রহস্যঘেরা একটি বাড়ি। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই।

    এই বাড়িতে তিনপুরুষ ধরে হেসে খেলে জীবন কাটাচ্ছেন মিত্তিররা। পূর্বপুরুষদের একজন ছিলেন নবাব-সরকারের দেওয়ান। রমরমার শুরু সেইকাল থেকে। এই পুরুষেই আর এক মিত্তির খাগড়ায় ফেঁদে বসলেন কাঁসার ব্যাবসা। জমাটি কারবার। সারা ভারতে! এক মিত্তির ঢুকলেন গালার ব্যাবসায়। ইউরোপ, আমেরিকা পর্যন্ত দৌড়। পরিবারে ঢুকে পড়ল বিলিতি হাওয়া। তিনি আবার বিলিতি মেয়ে বিয়ে করলেন। এই বাড়ির এদিকটা দিয়ে গেলে এখনও মনে হবে বিলিতি এসেছি। কাচের ঘর। বিলিতি আসবাব, এমন কী একটা ফায়ার প্লেস। পরিত্যক্ত বাবুর্চিখানা। উঁচু বেদিতে যিশুর মূর্তি বিশাল। বড়, বড় বাতিদান। এখনও পরিচর্যা হয়। সব ঝকঝকে, তকতকে। মনে হবে, এই একটু আগে প্রার্থনা হচ্ছিল। সুর ভেসে বেড়াচ্ছে।

    এরপরেই মিত্তিররা ঘুরে গেলেন শিক্ষার জগতে। সেখানেও তাঁরা অপ্রতিহত। সেই পুরুষেরই চার ভাই, এর এক বোন এক রাজত্ব করছেন। এখন তাহলে আমরা মিত্তির বাড়িতে প্রবেশ করি। সময়, সকাল ন-টা। আজ রবিবার। সব মিত্তিরই আজ বাড়িতেই। বড় মিত্তির ডাক্তার। মেজো মিত্তির অধ্যাপক। সেজো মিত্তির টেকস্টাইল ইঞ্জিনিয়ার। চতুর্থ মিত্তির ফ্যাশান ডিজাইনার। বেশিরভাগ সময় প্যারিসে থাকেন। বড় আর মেজোর পর একটি বোন। আদরের ডাক নাম কুসি। স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। বাড়ি আর ভাইদের সামলাবার জন্যে সব ছাড়তে হয়েছে। বিয়েও করা হল না। আর হবেও না। মায়ের মতো চারটে ভাইকে সামলাতে হয়। সবাই বলে একেই বলে স্যাক্রিফাইস। অতি সুন্দরী। লেখা-পড়ায় সেরা। অসম্ভব ভালো সেতার বাজায়। এক সহপাঠী ভালোবাসত। জীবন দিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিল। এমন প্রেম! শেষে বিরক্ত হয়ে বিলেত চলে গেল। এখনও মাঝে মাঝে ফোন করে। বেশি কথা বলে না। বড় বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কুসি সেই প্রেমিককেও সামলায়। পরের জন্মে মিলন হবে। আমরা দুজনে সুইজারল্যান্ডে জন্মাব নেক্সট টাইম।

    মিত্তির বাড়ির গেটটা একটা দেখবার জিনিস। অতীতের জিনিস, ঢালাই ডিজাইন। তেমনি ভারী। তেমনি বিশাল। হাতি গলে যেতে পারে। বাগানের পথ ধরে কিছুটা হাঁটতে হবে। বেশ পরিচর্যার বাগান। দুজন পার্মামেন্ট মালি আছেন। পুরনো আমলের লোক। মিত্তিরদের একটা গুণ আছে। পরকে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা।ফ্যামিলি ট্যুর প্যাকেজ

    ঢুকতে ঢুকতে বোঝা যাচ্ছে, বৈঠকখানায় ভীষণ একটা কাণ্ড হচ্ছে। বড় ভাই বিমলের গলা, ‘আহা, হাহা, অতটা উঁচু নয়। অতটা উঁচু নয়, আর একটু নীচে নামবে। তুই কি স্বর্গে টাঙাতে চাইছিস?’

    ছবি টাঙানো হচ্ছে। টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে আছে পাড়ার ইলেকট্রিসিয়ান ডাকু। মিত্তিরদের খুব প্রিয়। দাঁড়িয়ে আছে ঊর্ধ্ব বাহু হয়ে। বেশ বড়োসড়ো মাপের একটা ছবি দু-হাতে ধরে আছে। হাইট নিয়ে গোলমাল। দেয়ালের কতটা উঁচুতে ঝুলবে। বড় আর মেজোর মতের মিল হচ্ছে না। মেজো নির্মল বললে, ”দাদা, সব ব্যাপারে বাগড়া দেওয়া তোমার একটা স্বভাব।’

    ‘কী রকম?’

    ‘ছবিটা আমরা নীচে দাঁড়িয়ে দেখব, তাই তো? ছবি দেখার জন্যে টেবিলে উঠব না? অতটা টঙে তুলে দিলে ছবি দেখবে টিকটিকি।’

    ‘বেশ, তুই ছবিটা কোথায় দিতে বলছিস? মেঝের কাছে? স্কার্টিং-এর উপরে?’

    ‘আমি পাগল নই।’

    ‘অর্থাৎ, আমি পাগল!’

    ‘পাগল ছাড়া ওই কথার এই মানে করবি না।’

    ‘ছবি টাঙাতে হবে না। ডাকু, তুই নেমে আয়।’

    ‘যা বাব্বা, আধঘণ্টা ছবি ধরে দু-হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকার পর এই ডিশিসান!’

    বিমল বললে, ‘তোর টাকা পাওয়া নিয়ে কথা। টাকা নাও চলে যাও।’

    ‘আপনাদের সঙ্গে আমার টাকার সম্পর্ক?’

    বিমল বললে, ‘আমি খুব রেগে গেছি।’

    ‘রাগছেন কেন? মেজদা তো যুক্তিপূর্ণ কথাই বলছেন!’

    ‘ওর যুক্তি ওর কাছে থাক। আমি আমার যুক্তি, আমার সুপরিপক্ক বুদ্ধিতে চলব।’

    মেজোভাই অধ্যাপক নির্মল মিত্তির বললে, ‘ঠিক আছে তাই চলো, আমি চললুম। আমার সময়ের দাম আছে। দশ বান্ডিল পরীক্ষার খাতা পড়ে আছে।’

    নির্মল গটগট করে দরজার দিকে এগোচ্ছিল, এমন সময় কুসি আর সেজো ভাই কমল বকবক করতে করতে বাইরে থেকে ভিতরে এল। নানা মাপের, নানা রঙের ব্যাগ নিয়ে। প্রতি রবিবার এই জুটি বাজারে যায়। মিত্তিরবাড়ির এই প্রথা। নির্মল আটকে গেল।

    বিমল বললে, ‘তুই আমাকে ত্যাগ করে যাচ্ছিস যা। ফিরে এসে দেখবি, ছবির বদলে আমি ঝুলছি!’

    কুসি অবাক। বেপট জায়গায় তার পড়ার টেবিলটা। দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ছ-ফুট লম্বা একটা ছেলে। কুসি অবাক হয়ে জিগ্যেস করলে, ‘এ-কী প্রকাশ্য দিবালোকে কে গলায় দড়ি দিচ্ছে!’সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বই অনলাইনে কিনুন

    ডাকু বললে, ‘দিদি! আধঘণ্টা, দাঁড়িয়ে আছি টেবিলে। দড়ি পেলে নিজেই ঝুলে পড়তুম।’

    ‘ওটার উপর কে উঠিয়েছে তোকে?’

    ‘বড়দা, মেজদা। এই যে ছবি, ঝোলাতে হবে। দেখো তো দিদি, কোন হাইটে ঝোলালে ঠিক হবে!’

    ‘ছবি? দেয়ালে? ওই সদ্য রং করা সুন্দর দেয়ালে তুই পেরেক ঠুকবি? কার হুকুমে? নেমে আয়।’

    ডাকু ধাম করে লাফ মারল টেবিল থেকে।

    বিমল বললে, ‘একটা ঐতিহাসিক ছবি। অতুলনীয়, অনির্বচনীয়। সূর্য অস্ত যাচ্ছে. আকাশ লাল। এক পাল সাদা গোরু বৃন্দাবনের ধুলো উড়িয়ে ঘরে ফিরছে। বংশীধারী কৃষ্ণ মুরারী চলেছেন সঙ্গে সঙ্গে। এই ছবিতে ইতিহাস, ভূগোল, ধর্ম, সংস্কৃতি সব মাখামাখি হয়ে আছে।’

    কুসি বললে, ‘দেয়াল দাগরাজি করে ইতিহাস, ভূগোল কোনও কিছুই ঝোলানো যাবে না।’

    ‘তাহলে ছবি কিনলুম কেন?’

    ‘কেন কিনলে, সে তুমিই জানো। বাড়ি রং করাবার আগে তোমাদের প্রত্যেককে আমি বলেছি। যেখানে সেখানে ক্যালেন্ডার ঝুলিয়ে বাড়িটাকে পান-বিড়ির দোকান করা চলবে না। আর যেখানে ছবি ঝোলাবার ব্যবস্থা করে রাখা আছে, সেইখানেই ছবি ঝোলাতে হবে, তার বাইরে কোথাও নয়।’

    ‘কুসি এই দেয়ালটা একটি ছবি চাইছে।’

    ‘কার কাছে চাইছে? তোমার কাছে? আমার কাছে চায়নি।’

    ‘মেজোর কাছেও চেয়েছে।’

    নির্মল সঙ্গে সঙ্গে বললে, ‘এসব ব্যাপারে আমার কোনও মত নেই। কুসির মতই আমার মত। আমি তোমার মতো ইনডিসেন্ট কাজ কখনও করি না। করবও না। যত হাতুড়ে ব্যাপার সব তোমার।’

    বিমল রেগে গিয়ে বললেন, ‘হোয়াট ডু ইউ মিন? আই অ্যাম হাতুড়ে ডাক্তার? এর আগে তুই একবার গোরুর ডাক্তার বলে আমাকে জনসমক্ষে হেয় করেছিস।’

    কুসি হাসতে হাসতে বললে, ‘বড়দা তোমার বাংলা অনেক ইমপ্রূফ করেছে। বিভূতিবাবুর কোচিং-এ যাচ্ছ?’

    ‘যাচ্ছি মানে আই অ্যাম রাইটিং অ্যান উপন্যাস। তিনটে চ্যাপটার কমপ্লিট। ধীরে ধীরে বহিতেছে মলয় বাতাস। গগনে পূর্ণ শশী। নদী সকল জল ভারে ভারাক্রান্ত…’

    নির্মল বললে, ‘অসাধারণ! লক্ষ্মীর পাঁচালি আর কালিদাস পাঞ্চ।’

    ডাকু মেঝেতে বসে পড়েছে। ছবিটা কোলের কাছে খাড়া। সে হঠাৎ বললে, ‘এই ইতিহাস আমি ছেড়ে দিচ্ছি, আর কতক্ষণ ধরে বসে থাকব। ভূগোল চুরমার হয়ে গেলে আমি জানি না।’

    কমল বললে, ‘আমি বলি কী, ছবিটা এখন কাগজ মুড়ে রাখা হোক, পরে একটা কমিশন বসিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। আজ রবিবার, কত রকম রান্নার ব্যবস্থা! সব মাটি হয়ে যাবে!’

    বিমল ভোজন রসিক। কমল ভালো চাল চেলেছে। বিমল ডাকুকে বললে, ‘যা যা ছবিটা তুই নিয়ে যা। পৃথিবীতে কত ভালো ভালো ছবি আছে। সব ছবিই কি আর টাঙানো যায়!’

    ডাকু হাঁ হয়ে গেল। বিমল এইবার বোনকে জিগ্যেস করলে, ‘আজকের মেনুটা তাহলে কী করলি!’

    কমল বললে, ‘আমার কাছে শোনো।’

    কুসি লটরবহর নিয়ে ভিতের চলে গেল। সেখানে দুটি অসাধারণ চরিত্র আছে। মেয়েটি এই বাড়িতেই মানুষ হয়েছে। ভারি ভালো মেয়ে। তার নাম গান্ধারী। আর একজন, বিপিন। কর্তাদের আমলের। আগে বলা হতো, নায়েব। একাল বলবে, ম্যানেজার। রসিক মানুষ। সদাশিব। কুসি এদের নিয়েই এত বড় একটা সংসার ম্যানেজ করে।

    বিমল বললে, ‘মেনুটা শোনার জন্যে ভিতরটা কেমন যেন উতলা হচ্ছে।’

    কমল ভারী একটা সোফায় বসে পড়ল, ‘চা না হলে ঠিক মেজাজ আসছে না।’

    বিমল চিৎকার করল, ‘অ্যায় কে আছিস?’

    কমল বললে, ‘একেবারে বিয়ে বাড়ির মেনু। প্রথমেই হবে সেইটা, যেটা তুমি ভীষণ ভালোবাসা—ভেটকি মাছের ফিলে এনেছি। মাস্টার্ড দিয়ে ফ্রাই যা জমবে না!’

    ‘ফ্রাই!’ ডাক্তার আনন্দে চিৎকার করে উঠল।

    গান্ধারী চা নিয়ে আসছে। ডাকু যন্ত্রপাতি ব্যাগে ভরে উঠে দাঁড়িয়েছে। গান্ধারী বললে, ‘দিদি তোমাকে ভিতরে ডাকছে।’ ব্যাগটা নামিয়ে রেখে ডাকু গটগট করে অন্দরের দিকে এগোল। অনেকটা যেতে হবে। করিডর গোটা দুয়েক বাঁক নিয়ে পৌঁছেছে ভিতর মহলে। বাগান ঘেরা, রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর, খাবার ঘর। এই খাবার ঘরের নাম রাখা যেতে পারে, ‘অন্তরঙ্গ’, পারিবারিক ভোজনকক্ষ। আর একটা খাওয়ার ঘর আছে। সে খুব কেতার। কত্তাদের আমলে সায়েব-সুবোরা আসত। ইংলিশ স্টাইল। এই মহলের উত্তরদিকে কমল কায়দা করে একটা সুইমিংপুল মতো করেছে। মিত্তিররা কদাচিৎ সুইমিং করে। চারটে হাঁস সর্বক্ষণ সেখানে ভাসছে। সে এক শোভা—

    ডাকুকে কুসি বললে, ‘বোস। কথা আছে।’

    বড় একটা কিচেন টেবিল। কাঠের দু-পাশে দুটো লম্বা কাঠের বেঞ্চি। এই টেবিলে আনাজ-পত্র কাটা হয়। কুসির বিলিতি কায়দা। কাটাকুটি সব কিচেন নাইফে করে। ডাকুর দিকে এক কাপ চা এগিয়ে দিয়ে, নিজের কাপটা টেনে নিল।

    এক চুমুক চা খেয়ে বললে, ‘শোন, ছবিটা কিন্তু খুব সুন্দর। বড়দার মনে দুঃখ দিতে চাই না। তুই ওই দেয়ালেই সেন্টার করে, আলোটার এক হাত নীচে ছবিটা লাগিয়ে দে। কিচ্ছু বলবি না। ঠিক আছে? আজ দুপুরে তুই এখানে খাবি। বউকে আনবি।’

    বাইরের ঘরে তিন ভাই একসঙ্গে হয়েছে। মাছ ধরার গল্প হচ্ছে। বিমলের মাছ ধরার নেশা। ডাকু ইলেকট্রি ড্রিল হাতে টেবিলে উঠে পড়ল। ড্রিলের শব্দে তিন মিত্তিরের মাছ ধরা থেমে গেল।

    বিমল আঁতকে উঠে বলল, ‘এ কী রে? কী করছিস তুই! কুসির দেয়াল। ছাল ছাড়িয়ে নেবে। যাঃ, দেয়ালের সর্বনাশ হয়ে গেল। এ তো ছেলে নয়, সন্ত্রাসবাদী!’

    ডাকু নীরব। ঝপাঝপ ছবি ঝুলে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে কুসি ঘরে ঢুকে বললে, ‘বাঁদিকটা একটু উঠবে। খুব সামান্য। অ্যায়! ঠিক আছে।’

    বিমল বললে, ‘কুসি! তুই অনুমতি করেছিস?’

    কুসি কোনও উত্তর দিল না। ঘর ছেড়ে চলে গেল। বিমল অভিভূত, ‘ফ্যানটাসটিক! একেবারে মায়ের মতো। আমি জন্ম, জন্ম ধরে কুসির ভাই হতে চাই। তোমরা?’

    নির্মল আর কমল সমস্বরে বললে, ‘আমরাও।’

    দরজার কাছে থেকে ডাকু মুখ ঘুরিয়ে বললে, ‘আমিও’।

    কমল রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। রান্না করা তার হবি। বিমল আর নির্মল দুজনেই ‘ইমোশনাল’। লক্ষ করলেই দেখা যাবে দুই মিত্তিরের চোখে জল। ঘরে একজন এলেন। মিত্তির বাড়ির অবারিত দ্বার। যে কেউ যে কোনও সময় চলে আসতে পারে। ঘরে ঢুকলেন জগমোহনবাবু। নামকরা শিক্ষক ছিলেন। এখন উন্মাদ। একমাত্র কৃতী ছেলে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর থেকেই একটু একটু করে মস্তিষ্কের সুস্থতা হারালেন।

    ছেলেটার মৃত্যুতে পাড়ার সবাই হায় হায় করেছিল। আজও করে। যেমন রূপ ছিল তেমনি গুণ। মৃত্যু এমন এক পূর্ণচ্ছেদ কার জীবনে কখন যে পড়বে ভগবানের কলমই জানে।

    এখন বেশির ভাগ সময়ই নাটকের ডায়ালগ বলেন। ঘরে ঢুকলেন এই বলতে বলতে, ‘আওরঙ্গজেব! তোমার মাকে তুমি নিজে হাতে মারলে। ভেরি স্যাড, ভেরি স্যাড। কালমেঘ খাও, কালমেঘ। গজানন, ও গজানন পঞ্চাননকে নিয়ে গুম মেরে বসে আছ কেন? আজ খাওয়া জোটেনি? হাওয়া খাও, হাওয়া। ভোরের হাওয়া। ভোরের হাওয়ায় চোখের জল থাকে। রাতের কান্না। তারাসুন্দরীর চোখের জল। আমি জানি, সব জানি।

    There is a pleasure in the pathless woods,

    There is a rapture on the lonely shore

    এস গজানন এক হাত দাবা হয়ে যাক। সেই জোচ্চর ভগবান, I will teach you a lesson! তুমি খুব বেড়েছ। নস্ত্রাদামুস। আকাশে ওড়াও নানা রঙের ফানুস।’

    জগমোহন থপাস করে মেঝেতে বসে পড়লেন। মোটাসোটা মানুষ। সেই বলে না তপ্ত কাঞ্চন বর্ণ, গায়ের রং ঠিক সেইরকম। বসে বসে দুলছিলেন, হঠাৎ বুক ফাটা কান্না। বিমল কারো দুঃখ সহ্য করতে পারে না। তার নিজের রোগী মারা গেলে রোগীর আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে নিজেও কাঁদতে থাকে। এই সেদিন হেপাটাইটিসে একটি ছাত্রী মারা গেল, ভোজন রসিক বিমল সারাটা দিন না খেয়ে রইল। দাদার সঙ্গে পুরো পরিবারের উপবাস। গান্ধারী বললে, যে-কালে বড়দা খাবে না, সে-কালে আমি খাব! বিমল নিজের মনেই বললে, ‘এই পৃথিবীতে আর একদিনও বাঁচতে ইচ্ছে করে না!’

    জগমোহনবাবুর স্ত্রী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছেন। খুব করুণ গলায় ক্ষমা চাইছেন, ‘বাবা বিমল। তোমরা খুব বিরক্ত হচ্ছ, তাই না? কী করব বলো। একার সংসার, কতদিকে চোখ রাখব। একটু ফাঁক পেলেই ছুটে ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছেন।’

    স্বামীর হাত ধরে ওঠাতে, ওঠাতে বলছেন, ‘চলো বাড়ি চলো। তোমার রাজহাঁস ফিরে এসেছে।’ জগমোহন অনেকক্ষণ স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘তুমি কে? কোন ইয়ার?’

    রাজহাঁস বললেই জগমোহন একেবারে শান্ত, বাধ্য মানুষ। পাগলের বিশ্বাস, তাঁর ছেলে রাজহাঁস হয়ে গেছে। একদিন না একদিন ফিরে আসবেই। জগমোহন স্ত্রীর হাত ধরে ধীরে বেরিয়ে গেলেন। কোথায় কোনদিকে পা ফেলছেন, কোনও খেয়াল নেই।

    বৈঠকখানায় একটা কিছু হচ্ছে। কী হচ্ছে দেখার জন্যে কুসি চলে এসেছে। প্রতিবেশী লক্ষ্মীবাবু এসেছেন। যথারীতি ধোপ দুরস্ত, পরিপাটি সাজ-পোশাক। কড়া মাড় দিয়ে ইস্তিরি করা সাদা ফতুয়া পাঞ্জাবি। ঝুলে এক সাইজ ছোট চিনে-পাজামা। একটা অ্যাম্বার রং এর কাঁধে-ঝোলা ব্যাগ। এক মাথা সাদা চুল, অবিন্যস্ত। এইটাই স্টাইল। পাড়ায় ভদ্রলোকের নাম, ভয়ের ফেরিওয়ালা। এক একদিন এক এক রকম ভয় আমদানি করেন। দেখা যাক আজ কী বেরোয় ঝুলি থেকে।

    প্রথমেই খুব নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন, ‘ঢুকে পড়েছে।’

    মুখে যতটা সম্ভব ভয় এনে বললেন, ‘ঢুকে পড়েছে। এ-পাড়াতেও এসে গেল। কাল সন্ধেবেলা একজন আমার কাছে এসেছিল। ইয়া ভুঁড়ি। চালতার মতো মুখ। বলে দিতে হয় না, দেখলেই বোঝা যায়।

    আন্ডারওয়ার্লডের লোক। এ কে ফর্টি সেভেন। সেকেন্ড তিরিশটা। চালুনি-ঝাঁজরা। বলে কী মিত্তির বাড়িটা ম্যানেজ করে দিতে পারেন? আপনাকেও একটা এগারোশো স্কোয়্যার ফুট ফ্রি দিয়ে দেবো। ক্যাশ টাকাও পাবেন।’

    বিমল বললে, ‘সে আবার কি?’

    ‘শোনো, অনেক রকম যুগের নাম শুনেছ, সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি। এইবার আর একটা যুগের নাম শোনো, ”প্রমোটার-যুগ”। একটু সাবধানে থেকো। তোমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া খুব সহজ। হুটহাট করে এখানে সেখানে একা একা চলে যাও। কবি কবি ভাব। ঘাড় ধরে গাড়িতে তুলবে, তারপর প্যাঁচ মারবে। তোমাদের বাকি তিনটেও তো সত্যযুগের মানুষ। এটা যে কলির মনেই নেই তোমাদের। তোমরা সিকিউরিটি নিয়ে চলাফেরা করো। থানায় জানিয়ে কোনও লাভ নেই। ওদের নিয়ম হল, আগে খুন, পরে অনুসন্ধান।’

    ‘আপনি প্রথমেই খুনে চলে গেলেন?’

    ‘কি আশ্চর্য! তোমরা জেগে ঘুমোও নাকি? রোজ খবরের কাগজ খুলে কি দেখো? রক্তারক্তি। তোমাদের চারটে ভাইকে শেষ করে দিতে পারলেই মিত্তিররা ফিনিশ। আমিও বাদ যাব না।’

    ‘আপনি বাদ যাবেন না কেন?’

    ‘তোমরা অনেক কিছু পড়েছ, একটু যদি গোয়েন্দা কাহিনী পড়তে! এই দেখো, আমি বুঝিয়ে দি। ধরো, তোমরা ধরাধধড় খুন হলে। তারপর একটা ইনভেস্টিগেশন হবে। এই মেয়েটা পুলিশকে বলে দিলে, লক্ষ্মীকাকাবাবুর কাছে একজন এসেছিল। তার মানে, তোমাদের মার্ডার কেসে আমি একজন সাক্ষী। আধুনিক অপরাধীরা সাক্ষীকে খতম করে দেয়। জেমস হ্যাডলি চেজের ওই বইটা পড়ে দেখো, ‘ভালচার ইজ এ পেশেন্ট বার্ড।’

    লক্ষ্মীবাবু সবার মুখ একবার দেখে নিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘ভয় পেয়েছ?’ পাওয়ার কথা। তবে জেনে রাখ, এইরকম ঘটনা ঘটতেই পারে, এখনও ঘটেনি। প্রস্তুত থাকতে হবে। আমাদের ডাক্তারের শাস্ত্রে আছে, প্রিভেনশান ইজ বেটার দ্যান কিওর। মেঘ দেখলে আমরা যেমন ছাতা ব্যবহার করি, সেই রকম প্রোমোটার দেখলে কী বের করব? ভাবো, সবাই মিলে ভাবো, যাক, রবিবারের নৈবেদ্য গেল কোথায়? মিত্তির বাড়ির ফেমাস। মুড়ি, তেলে ভাজা আর চা—যত পারিস তত খা।’

    ‘এসে গেছে।’ গান্ধারীর গলা।

    মাঝারি মাপের দুটো ধামায় মুড়ি আর গরম তেলে ভাজা। একটা ডিশে নুন, কাঁচা লঙ্কা, আদা কুচি।

    দশ বারোটা খালি বাটি। মুড়ি তোলার জন্যে স্টেনলেস স্টিলের দুটো হাতা।

    দুই

    বড় মিত্তির বিমল এক অসাধারণ মানুষ। শিশুর মতো সরল। ডাক্তারি করার সময় রুদ্রনারায়ণ। তখন কে রুগি, কেমন রুগি, এ-সব দেখে না। তখন লড়াই। রোগের সঙ্গে বৈদ্যের লড়াই। তখন জ্ঞান, অভিজ্ঞতা আর সেবার সমন্বয়ে দীনের ভগবান। আর গভীর রাতে যোগী। বিমল সেই সময়ে কিছুক্ষণ লেখে। লেখক হওয়ার জন্য লেখে না। লেখে মনের প্রকাশের আনন্দে। কি লিখেছে দেখি। শিরোনাম ‘মান-অপমান’।

    যেদিন পৃথিবীতে প্রবেশ করলুম সেইদিন থেকে শুরু হল অপমানিত হওয়ার পালা। পদে পদে অপমান। অপমান আমাদের জীবন সাথী। পারস্পরিক ব্যাপার। হয় আমি অপমান করব, না হয় কেউ আমাকে অপমান করবে। হয় আমি কারোকে কাটা কাটা বাক্যবাণে জর্জরিত করব, না হয় কেউ আমাকে করবে। পৃথিবী থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার মুহূর্তেও শরীরে লেগে থাকবে একটা জ্বালা, মনে একটা ক্ষোভ, জীবনের হাতে কী জুতো-পেটাই না খেলুম! উঠতে কোস্তা বসতে কোস্তা।

    যখন অবোধ শিশু, কান্নার পর্যায়ে আছি তখন কেউ না কেউ বলছে, চেল্লাচ্ছে দেখ, কানের পোকা বের করে ছাড়বে। এই কে আছিস, দূর করে বাইরে ফেলে দিয়ে আয় জানোয়ারটাকে। ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে মা বলেছেন, কেঁদে না মরে গিলে মরো না। এই শয়তানটা আমার হাড়-মাস কালি কালি করে ছাড়ল। মাঝে মাঝে মনে হয় গলা টিপে শেষ করে দি! পুত্রের অপমান পিতাতেও সময় সময় বর্তাত, যেমন বাপ তার তেমন ছেলে। বাপ বকাসুর, ছেলে ঘটোৎকচ।

    জ্ঞান হল। পড়তে বসলুম। অক্ষরের জগৎ, সংখ্যার জগৎ। একই ‘ইউ’। আমব্রেলার আগে ‘অ্যান’ ইউনিভার্সিটির আগে ‘এ’। শুরু হয়ে গেল খ্যাচাখেচি, ধস্তাধস্তি। এ, অ্যান, দ্যাট, হ্যাজ, হ্যাভ, ইজ, অ্যাম, আর। বলো, পীড়িত বানান কী লেখো, স্লেটে লেখো। আহা মানিক আমার। দ্যাখ, দ্যাখ, দুটোতেই দীর্ঘ ঈ মেরে বসে আছে। একটু বেশি পীড়া। ট্রিটমেন্ট করে পরের দীর্ঘৈটা ছাড়াতে হবে। এই, উসকো কান পাকাড়কে ইধার লাও। এই ই ঈ উ ঊ-এর ঠেলায় বাঁ কানটা ডান কানের চেয়ে দু-সুতো বড় হয়ে গেল। যতদিন না গোঁফ গজাল, ততদিন প্রহরে প্রহরে প্রহার আর নির্বিচার টানাটানি। ভূপতিত আর ভূপাতিত, কি তফাত। বল গাধা! দশসের সরু চালে কুড়ি সের মোটা চাল পাইল করে পাঁচসিকে সের দরে বিক্রি করলে লাভ কত হবে? হাঁ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে ঘুড়ি দেখলে ওদের বাঁদর সারাটা জীবন যে রিকশা টানতে হবে! এবম্বিধ তিরস্কারের পর এমন অঙ্ক কষলুম, পুত্রের বয়স পিতার চেয়ে দশ বছর বেশি হয়ে গেল। শিক্ষকমহাশয় একহাতে ডাস্টার এক হাতে বেত নিয়ে রুদ্রনৃত্য শুরু করলেন। বিনীত ভাবে যেই বলেছি, স্যার! এত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন সামান্য ব্যাপার! উলটে নিলেই তো হয়, যার বয়েস বেশি সে পিতা, যার বয়সে কম সে পুত্র। সঙ্গে সঙ্গে গাধার টুপি হাতে ছুটে এল স্কুলের দারোয়ান। গাধাটার মাথায় চাপা। জিভ বের কর, কান ধর। শুরু হল স্কুল পরিক্রমা। দৃশ্য দেখে পণ্ডিতমশাই ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, ঘোর কলি! এরপর দেখবে, মেয়ের গর্ভে মা জন্মাবে!

    এরপর চাকরি। পাহাড়ের যেমন চড়াই উতরাই থাকে, মাঝে মাঝে উপত্যকা বিস্তীর্ণ। সেইরকম চাকরি জীবন হল অপমানের উপত্যকা। দশটা থেকে পাঁচটা অপমানের তাঁবুতে সার্কাসের খেলা। বড় প্রভু, মেজো, প্রভু, ছোট প্রভু, প্রভুর প্রভু, যার কাছেই যাওয়া যাক, সেই বুঝিয়ে দেবে তুমি অন্নদাস। প্রতিমুহূর্তে বোধ হবে, ওরে পেট তোর জন্যে করি আমি মাথা হেঁটে।

    তুলসীদাস একটি বাস্তব পরামর্শ আমাদের জন্যে রেখে গেছেন।

    তুলসী উঁহা যাইয়ে, যাঁহা আদর না করে কোই।

    মান ঘাটে, মন্ মরে, রামকো স্মরণ হোই।।

    হে তুলসী! যেখানে গেলে তোমাকে কেউ আদর করবে না, তুমি সব সময় সেইখানেই যাবে। কেন যাবে! সেখানে যাবে এই কারণে, উপেক্ষা আর অপমানে তোমার মন অহঙ্কার মুক্ত হবে, মরমে মরে যাবে, আর তখনই তোমার মনে জগৎ পিতার চিন্তা আসবে।

    কীভাবে মানুষকে অপমান করা যায়, তারও একটা শাস্ত্র আছে।

    সেটাও একটা আর্ট। গ্রাম্য মানুষ গোদা গোদা গালাগাল দেবে, আর বড় মানুষ, শিক্ষিত মানুষ, বুদ্ধিজীবি মানুষ, তাঁদের কায়দাটা অন্যরকম। সূক্ষ্ম, কিন্তু ভয়ঙ্কর। ছুরি মারলে রক্ত বেরোবে। সেরে গেলে স্মরণে থাকবে না। বাক্যের চোট সাংঘাতিক। মনে রক্তপাত। কোনও ওষুধ নেই। বাক্যের খোঁচা অতি ভয়ঙ্কর। তুলসীদাস বললেন, ‘মারে শব্দে সে।’

    আর্টিস্টিক অপমানের নমুনা—

    হুইস্টলার ছিলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী। ততোধিক বিখ্যাত ছিল তাঁর মুখ। ছবি আঁকার ক্লাসে এক ছাত্রীকে প্রশ্ন করলেন,

    ‘তুমি নিউইয়র্ক থেকে এসেছ?’

    ‘ইয়েস স্যার!’

    ‘দেখি কি আঁকলে?’

    মেয়েটি ক্যানভাস নিয়ে এগিয়ে এল। শিল্পগুরু দেখে প্রশ্ন করলেন, ‘হাতটা আঁকলে লাল রঙে, কনুইয়ের কাছে সবুজ ছায়া মারলে কোন আক্কেলে?’

    ‘স্যার, আমি যা দেখি, যেমন দেখি, ঠিক সেইভাবে আঁকি।’

    শিল্পী বললেন, ‘বেশ বেশ, খুব ভালো, বাট মাই ডিয়ার দি শক উইল কাম হোয়েন ইউ সি হোয়াট ইউ পেন্ট। যা দ্যাখো, তাই আঁকো, অতি উত্তম কথা, তবে নিজের আঁকা ছবি যখন দেখবে তখন ভিরমি যাবে।’ ক্লাস ভর্তি ছাত্র-ছাত্রী। মেয়েটির মাথা হেঁট!

    আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ছে। কলেজের প্রথম দিনের প্রথম ক্লাস। অধ্যাপক সকলের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন, ‘তোমার নাম?’ নাম বললুম। ‘নিবাস?’ বললুম ‘বরাহনগর’।

    অধ্যাপক রসিকতা করলেন, ‘আশা করি তোমার থেকে তোমার বন্ধুদের কোনও ভয় নেই!’ সামনের সারিতে ছাত্রীরা। তারা আমার এমত হেনস্থায় খিলখিল করে হেসে উঠল।

    সঙ্গে সঙ্গে আমার উত্তর, ‘আজ্ঞে না স্যার, বরাহরা আমার তালুকের প্রজা। আমি নগরপাল মাত্র।’

    জন ড্রাইডেন, আমাদের পরিচিত নামকরা কবি। ছাত্রজীবনে সকলেই পড়েছেন ড্রাইডেন। ড্রাইডেন খুব পড়ুয়া ছিলেন। তাঁর নিভৃত স্টাডিতে সারাদিন বই মুখে বসে থাকতেন। একদিন তাঁর ক্ষুব্ধ স্ত্রী আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘লর্ড মিস্টার ড্রাইডেন, সারাদিন ওই পুরনো পুরনো বইগুলো নিয়ে অমন মশগুল হয়ে থাকো কী করে! মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে একটা বই হয়ে যাই, তাহলে খানিক তোমার সঙ্গ পাওয়া যেত!’

    কবি উত্তরে বললেন, ‘বই হবে, তা বেশ ভালো কথা। একটাই অনুরোধ, বই যদি হও, তো একটা পাঁজি হোয়ো, তা হলে বছর পালটাতে পারব।’

    বিখ্যাত লেখক, সমালোচক কারলাইলের কথা আমরা জানি। কারলাইলের দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল না। সকলেই তা জানতেন। লাগাতার দ্বন্দ্ব। স্যামুয়েল বাটলার একদিন বলে বসলেন, ‘ঈশ্বর করুণাময়! কী ভালোই না করেছেন দু’জনের বিয়ে দিয়ে। তা না হলে চারজনের জীবন অতিষ্ঠ হতো।’

    কী ভাবে! দুজনেই সমান। কারলাইল যদি আর একটি মেয়েকে বিয়ে করতেন আর শ্রীমতী কারলাইল যদি অন্য একটি পুরুষকে বিয়ে করতেন তাহলে চারজনের জীবনেরই বারোটা বেজে যেত!

    স্যার থমাস বিচাম ছিলেন একজন বিখ্যাত বাদক ও সংযোজক। একটা কনসার্টের জন্যে বিভিন্ন বাদকের পরীক্ষা নিচ্ছেন। এক যুবতী চেলো বাজাচ্ছে। বিচাম তাকে একটি টুকরো বাজাতে দিয়েছেন। বিচাম লক্ষ করছেন, মেয়েটি অনেকক্ষণ লড়াই করে কিছুতেই বাগে আনতে পারছে না। যাই হোক কোনওরকমে শেষ করে মেয়েটি প্রশ্ন করল।

    ‘এরপর কী করব স্যার?’

    বিচাম বললেন, ‘গেট ম্যারেড!’ আর কিছু করতে হবে না। বিয়ে করে ফ্যালো।

    লুই দ্যা ফোরটিনথ-এর রাজত্বকালে ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের সম্পর্ক ভিতরে ভিতরে খুব তিক্ত ছিল, কারণ ধর্ম। ক্যাথলিক উগ্রতা, পোপের ক্ষমতা, ইংল্যান্ডের প্রোটেস্টান্টদের কাছে অসহ্য মনে হতো। এক ইংরেজ এসেছেন রাজদরবারে। রাজা লুই তাঁকে নিয়ে গেছেন রয়াল আর্ট গ্যালারিতে। অতিথিকে দাঁড় করিয়েছেন একটি ছবির সামনে। লুই জানতেন ছবির সামনে দাঁড়ালেই যে কোনও প্রোটেস্টান্ট বেশ একটু ধাক্কা খাবে, আর সেইটাই তাঁর উদ্দেশ্য।

    রাজা বললেন, ‘এই হলেন ক্রুশবিদ্ধ যিশু। আর ডানদিকের ছবিটা হল পোপের, আর বাঁদিকেরটা আমি।’

    অতিথি বললেন, ‘I humbly than you majesty for this information. আমি প্রায়ই শুনতুম, আমাদের প্রভুকে যখন ক্রুশবিদ্ধ করা হয়, তখন তাঁর দুপাশে দুটো চোর দাঁড়িয়েছিল। আমি এই ছবিটা দেখার আগে পর্যন্ত জানতুম না, সেই চোর দুটো কে, কে। এখন জানা গেল ইওর ম্যাজেস্টি। ধন্যবাদ!’

    বিখ্যাত ডঃ জনসন যে কোনও কারণেই হোক নারী-বিদ্বেষী হয়ে পড়েছিলেন। সকলেই তা জানত। তিনি মনে করতেন, মেয়েরা সব মহানির্বোধ। একদিন বিরক্তিকর রকমের বাচাল এক মহিলা জনসনকে পাকড়েছে। কিছুতেই সঙ্গ ছাড়ছে না। মহিলা এক সময় প্রশ্ন করছে—

    ‘ডকটর, শুনেছি, আপনি না কি মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের সঙ্গ বেশি পছন্দ করেন।’ জনসন বললেন, ‘ম্যাডাম। আপনার ধারণা খুব, খুব ভুল। আমি নারীর সঙ্গ খুবই পছন্দ করি, তাদের সৌন্দর্য, প্রাণচাঞ্চল্য এবং তাদের নীরবতা। আই ভেরি মাচ লাইক দেয়ার সাইলেন্স।’

    তুলসীদাসজির একটা দোঁহা আছে—

    ভাটকে ভালা বোল্না চল্না বহুড়ীকে ভালা চুপ্।

    ভেক্কে ভালা বর্ষাবাদর, অজ্কে ভালা ধুপ্।

    যারা ভাট, তারা অনেক কথা বলবে, বহু পথ চলবে। কিন্তু বধূরা স্বল্পভাষী হবে। সেইটাই শোভন। সেইটাম কাম্য। ব্যাঙের কাছে যেমন বর্ষা, ছাগলের কাছে যেমন রোদই আনন্দের কারণ। নারীর নীরবতা অন্যতম একটি সৌন্দর্য। জনসন সেইটিই বললেন,

    I like their beauty, I like their vivacity, and like their silence.

    জনসন আর ডিকেনস দুজনেই খুব মজার মানুষ ছিলেন। কথা দিয়ে কামড়াতে পারতেন মোক্ষম। এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ লেখকের পাণ্ডুলিপি ফেরত দিলেন জনসন এই মন্তব্য লিখে, your manuscript is both good and oroginal. But the part that is good is not original and the part that is original is not good. চার্লস ডিকেনসের কাছে একটি কবিতা সংকলন এল, নাম ‘Orient Pearls at Random Strung’। ঔপন্যাসিক ছোট্ট একটি চিরকুট লিখলেন কবিকে—Dear Blanchard, Too much String, Yours C.D.

    কুসি বড়দার ঘর নিজের হাতে গুছোয়। প্রয়োজন হলে গান্ধারীর সাহায্য নেয়। সেই সময় কুসি দাদার লেখা পড়ে। আর তখনই তার বাবার কথা, মায়ের কথা মনে পড়ে। যেমন গাছ, তেমন তার ফল। আর মন পড়ে তার প্রেমিকের কথা। ভীরু, দুর্বল এক যুবক। কলেজ পাড়ায় সে তার বাবার কাগজ-কলম, খাতা-পেনসিলের দোকানে বসত। মায়া মাখানো দুটি চোখ। কলকাতার মতো দানবীয় শহরে এমন মায়াময় চোখ সহসা চোখে পড়ে না। ছেলেটির নাম ছিল সমুদ্র। বড় ঘরের ছেলে। বাবার হঠাৎ প্যারালিসিস। শয্যাশায়ী। সমুদ্র তার কলেজেরই ভালো ছাত্র ছিল। দু’বছরের সিনিয়ার। লেখা-পড়া ছেড়ে দোকান সামলাতে এল। মাথায় মাথায় দুটি বোন। দুজনেই ছাত্রী। ভালো ছাত্রী। সমুদ্রর কোনও অভিযোগ ছিল না। এইরকমই তো হয়। পৃথিবী তো অনিশ্চয়তা ভরা। সমুদ্র বলত ‘লাইফ ইজ এ জার্নি। কখনও পথ ভালো, কখনও দুস্তর।’

    কুসি প্রথম যেদিন ওই দোকানে খাতা কিনতে গিয়েছিল, তখন দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে ছিল বহুক্ষণ, তারপর সেই ঘোর কেটে যাওয়ার পর দুজনেই হেসে ফেলেছিল। পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ। হরিহর ছত্রের মেলা। এরই মধ্যে ‘ঠিক একজন’ আছে ‘ঠিক আর একজনের’ জন্যে। সে বলে দিতে হয় না। সে চিনে নিতে হয় না; কিন্তু দেখা হওয়াটাই মুশকিল। হলেই যে ‘দুই দাঁড়ের নৌকো’ ভাসবে এমন কথা নেই। চল মুসাফির। অনন্ত জীবন পড়ে আছে। অদ্ভুত একটা ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল দুজনের। স্বামী-স্ত্রীর দেহগন্ধী ভালোবাসা নয়। সে কেমন? কাশফুল যেমন শরতের বাতাসে দোল খায়। সাদা মেঘ নেমে আসে সরোবরের নীল-সবুজ। সমুদ্রর কথা মনে পড়লেই কুসির মনে আসে রবীন্দ্রনাথের দুটি লাইন—

    নানা দুঃখে চিত্তের বিক্ষেপে

    যাহাদের জীবনের ভিত্তি যায় বারংবার কেঁপে,

    যারা অন্যমনা, তারা শোনো,

    আপনারে ভুলো না কখনো।

    তিন

    আজ মিত্তিরদের বৈঠকখানা—একেবারে ফুল হাউস। কয়েকদিন হল মেজর এসেছেন। সেনাবাহিনী থেকে রিটায়ার করার পর দেরাদুনে সেটল করেছেন। অনেকটা জায়গা নিয়ে অর্চার্ড অর্থাৎ ফলের বাগান। আপেল, চেরি, পিচ এইসব। বিদেশে যায়। ভারতের বিভিন্ন শহরে। মিত্তিরদের দূর-সম্পর্কের আত্মীয়। বছরে একবার, দুবার আসেন। দারুণ চেহারা। প্রায় ছ-ফুট লম্বা। সাহেবদের মতো গায়ের রং। অনেক ভাষা জানেন। তেমনি আমুদে। শরীরে রোগাবালাই নেই। অর্থের অভাব নেই। একটিমাত্র শিক্ষিতা মেয়ে। এক সাহেবকে বিয়ে করে বিলেতে থাকে। মেজর অনেক বড় বড় লড়াই করেছেন।

    কফি চলছে। মেজর হঠাৎ বললেন, ‘ফাটবে কি ফাটবে না। কি বলো তো?’

    সবাই সমস্বরে বললে, ‘বোমা’।

    ‘যে হেতু আমি বলছি, সেই হেতু, বোমা ছাড়া আর কিছু নেই আমার জীবনে! আমি বলছি পটলের দোরমার কথা।’

    ‘সে আবার কী?’

    ‘আরে ধুর এক ঘেঁয়ে পাঞ্জাবি খেতে খেতে বিরক্তি ধরে গেছে। একদিন ভাবলুম পটলের দোরমা করা যাক। পটলের পেটে পুর ঢুকিয়ে ময়দার ছিপি আটকে ছাঁকা তেলে নাড়াচাড়া করছি। গুন গুন করে গান গাইছি। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই ফটাস করে ফেটে মুখে, চোখে, বুকে। এর পরে হল কী, এক একটা কড়ায় ছাড়ি, আর দূর থেকে নাড়ি, ফাটবে কি ফাটবে না! আতঙ্ক!’

    কুসি বললে, ‘টেকনিকটা আপনি ঠিক জানেন না।’

    ‘তা হতে পারে। তা আমি বলছিলুম, আজ লাঞ্চে দোরমা হলে কেমন হয়?’

    বিমল বললে, ‘অসম্ভব ভালো হয়। এই আইটেমটা বহুদিন হয়নি।’

    কুসি বললে, ‘হবে।’

    মেজর বললেন, ‘জানি। তোমার ডিকশানারিতে অসম্ভব শব্দটা নেই। গান্ধারী আবার কফি নিয়ে ঢুকছে। মেজর এলে গান্ধারী আরও চনমনে হয়ে ওঠে, ‘কাপি, কাপি, কাপি।’

    কুসি জিগ্যেস করলে, ‘ওদিককার খবর?’

    ‘সব ঠিক আছে ম্যাডাম। কেবল!’

    ‘কেবল কী!’

    ‘দুটো ডিম, পড়ে ফ্যাট।’

    ‘কার কর্ম?’

    ‘কার আবার! অপকর্মের মাস্টার আমি।’

    বিমল মেজরকে জিগ্যেস করলে, ‘বেঁচে থাকতে কেমন লাগছে?’

    ‘ভীষণ ভালো। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে তিন-চারবার জীবনকে ছিনিয়ে আনতে পেরেছি তো, তাই জীবন আরও যেন ভালো লাগছে। সমস্যা আছে, বহু রকমের সমস্যা, বাধা-বিঘ্ন, তাতে কি হচ্ছে জানো, ড্রাইভিং স্কিল বেড়ে যাচ্ছে। জীবন হল গাড়ি চালানো। গুড ড্রাইভার সেফলি ডেস্টিনেশান পৌঁছে যায়। ডেস্টিনেশান ইজ ডেথ। গাড়ি আর চালক দুজনেই হাওয়া। আর্মিতে রেগুলেশান বুট পরতে হতো। পায়ে খানকতক মোক্ষম কড়া তৈরি হল। সেই অবস্থায় ফ্রন্টিয়ারে যুদ্ধ। কখনও আত্মরক্ষার জন্যে এক পজিশান থেকে আর এক পজিশানে ছুটছি, কখনও চার্জ করছি। তখন কোথায় কড়া, কোথায় ব্যথা। মোদ্দা কথা দুটো, দুঃখটাকে ভুলতে পারলেই সুখ, মৃত্যুটাকে ভুলতে পারলেই জীবন। আর্মির লোকরা মৃত্যুকে মৃত্যু বলে মনে করে না। একটু আগে পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, একটু পরেই মরে পড়ে গেল। আমি জানি বেঁচে থাকাটাই আমার কাজ। পৃথিবীটা বিশ্রী সুন্দর।’

    নির্মল দর্শনের অধ্যাপক। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ গান্ধারী ছিটকে ঘরে ঢুকে বস্ত্রহরণ পর্বের দ্রৌপদীর মতো মেঝেতে ভেঙে পড়ল। তার পিছনেই উগ্র মূর্তি কুসি। আঙুল উঁচিয়ে কুসি গান্ধারীকে ধমকাচ্ছে, ‘ভবিষ্যতে যদি আর কোনওদিন দেখি! তুই খেতে পাস না?’

    মেজর জিগ্যেস করলেন, ‘কী হল?’

    কুসি রাগ সামলে গলায় বললে, ‘মেঝে থেকে চামচে দিয়ে ভাঙা ডিমের কুসুম তুলে বাটিতে রেখেছে, তাতে চুল, ময়লা, চায়ের পাতা, কী নেই! কাচ ভাঙা আর পেরেক ছাড়া। উনি সেটি ওমলেট করে খাবেন। পিশাচ! তোর শ্মশানে থাকা উচিত। মিত্তির বাড়ির ফ্রিজে কি গোটা ডিম নেই।’

    এক দমে কথাগুলো বলে কুসি জোরে একটা নিশ্বাস ফেলে শান্ত হয়ে গেল। মেঝেতে বসে থাকা গান্ধারীর মাথায় হাত রেখে বললে, ‘তুই এই বাড়ির কে? জানিস আমার একটা পিঠোপিঠি বোন ছিল। তোকে আমি আমার সেই বোন বলেই মনে করি। তুই আমার সেই বোন। তুই মেঝে থেকে ডিম তুলে ওমলেট খাবি?’

    গান্ধারী বললে, ‘দিদি, ওটা মেয়েদের অব্যেস। ওই যে কাল তোমার হাত থেকে তেল পড়ে গেল। তুমি আঙুল দিয়ে একটু একটু করে তুললে। মেয়েরা পড়ে গেলেই তোলে।’

    ‘সে তেলে রান্না হবে না গান্ধারী।’

    ‘হবে না কি? আমি তো রান্না করে দিয়েছি।’

    ‘সে কি রে?’

    ‘তবে! পয়সার জিনিস ফেলে দেবো নাকি?’

    মেজর যখনই আসেন ওই কাচের ঘরটায় থাকতে ভালোবাসেন। এই মিত্তিরদের পূর্ব পুরুষের একজন খ্রিস্টধর্ম অবলম্বন না করলেও যিশুর ভক্ত ছিলেন। বাগানের এই দিকটায় ছোট্ট একটা উপাসনালয় তৈরি করেছিলেন, যার চূড়াটা চার্চের মতো। ভিতরটাও ঠিক সেইরকম। মেজর এই জায়গাটা খুব পছন্দ করেন। একা একা বেশ থাকা যায়। মিত্তির বাড়ির কোলাহল কানে আসে না।

    শুয়ে শুয়ে ফেলে আসা জীবনের কথা ভাবছিলেন। অনেক যুদ্ধ করেছেন, যুদ্ধের কারণে অনেক মানুষ মেরেছেন। জয় করেছেন অনেক শক্ত ঘাঁটি; কিন্তু নিজের ভাগ্যকে জয় করতে পারেননি। সবচেয়ে শোচনীয় কুৎসিত পরাজয় হয়েছে নিজের অন্তরঙ্গ এক বন্ধুর কাছে। নিরীহ, ভোলেভালে, সজ্জন একটি মানুষ। বহু গুণের অধিকারী। মেজর আজও বুঝে উঠতে পারেননি, সেই মানুষটি কেমন করে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। এই দুনিয়ায় সবই সম্ভব।

    নাম রেবেকা। মেজরের খুব পছন্দের নাম। প্রেমের বিয়ে। তরতরে মেয়ে। হাসতে, কইতে, গাইতে সবেতেই এক্সপার্ট। সাজতে? অমন সুন্দর করে নিজেকে সাজাতে কজন পারে। মেজর নিজের মনেই বললেন, ‘সামথিং রং ইন মি। যতটা সময় নজর তাকে দেওয়া উচিত ছিল দেওয়া হয়নি। মেয়েরা অভিমানী হয়। ক্ষণে ক্ষণে তাদের দেহ-মন পালটে যায়। মেয়েরা হল আকাশ।

    মেজর মাঝে মাঝেই নিজেকে ধমকান, এখনও তুমি তার কথা কেন ভাবো! আর তখনই অনুভব করেন, তিনি খুব ভালোবেসে ফেলেছিলেন রেবেকাকে। আর তখনই বুঝতে পারেন, রেবেকা তাকে ভালোবাসেনি। সে এমন কিছু চেয়েছিল যা মেজর দিতে পারেননি। সেটা কী? হয়তো সঙ্গ! যাক গে। এত বড় পৃথিবী, কত লোকজন, পরিবার, হাসি-কান্না, উৎসব অন্ধকার! জীবন তো থেমে থাকার নয়! মেজর জোর গলায় অর্ডার দিলেন, ‘কম্পানি ফরোয়ার্ড মার্চ!’

    সঙ্গে সঙ্গে দরজার কাছে নারীকণ্ঠ—লেফট-রাইট, লেফট-রাইট।

    গান্ধারী ঘরে ঢুকে বললে, ‘চলো, তোমার ডাক পড়েছে।’

    বৈঠকখানায় বিরাট ব্যাপার। ফোটোগ্রাফার কুন্তল এসেছে। সবাইকে নিয়ে একটা গ্রুপ ফোটো তোলা হবে। মিত্তির বাড়ির অ্যালবামে থাকবে। নির্মল বলে, যখন ‘রাইজ অ্যান্ড ফল অফ মিত্তির পরিবার’ লেখা হবে তখন ছবিগুলো কাজে লাগবে।

    মেজর এসে দেখলেন, কুন্তল ক্যামেরার স্ট্যান্ডটা একবার এদিক, একবার ওদিক করছে। স্মার্ট ছেলে। মিত্তিররা হই হই করে আহ্বান জানাল। ‘মেজর, মেজর’।

    কুন্তল একটু ফচকে আছে। সঙ্গে সঙ্গে বললে, ‘মেজরকে মাঝখানে রেখে মাইনররা যে যার জায়গা নিয়ে নেন। অ্যাডজাস্ট ইওরসেলভস। আমাদের নায়িকা কোথায় গেল? গ্রেট গান্ধারী!’ গান্ধারী মেজরের আড়ালে পড়ে গিয়েছিল। সেইখান থেকে বললে, ‘আমার দাঁড়াবার জায়গা নেই ভাই।’ মেজর তাকে টেনে সামনে আনলেন। এইবার আমরা নাটক দেখি।

    ফটোগ্রাফার : একটু সরে, বড়দা একটু ডানদিকে। উ হুঁ বাঁদিকে যাচ্ছেন কেন?

    বড়দা : কার ডানদিক? আমার না তোমার। শোনো নির্দেশ যখন দেবে পরিষ্কার নির্দেশ হওয়া চাই। তোমার মাথায় এক, বলছ আর এক। তোমার বলা উচিত ছিল, আপনার ডানদিক।

    মেজদা : শুরু হয়ে গেল। ওরে! মুখের কাছে একটা মাইক্রোফোন ধরে দে। আরও আধঘণ্টা উচিত-অনুচিতের লেকচার হোক।

    বোন (কুসি) : আধঘণ্টা হয়ে গেল। ঝড়ের এঁটোপাতার মতো, একবার ডান থেকে বাঁ, বাঁ থেকে ডান।

    বড়দা : আমার মনে হচ্ছে পাশাপাশি স্ট্রেট লাইনে দাঁড়ালে ভালো হতো।

    মেজদা : তোমার মুণ্ডু হতো। এত বড় একটা গ্রুপ। অর্ধচন্দ্রাকারে ঘোড়ার ক্ষুরের নালের আকারে, কাস্তের আকারে…

    বড়দা : তোর মতো একটা ইডিয়েটের আকারে…

    মেজদা : তোমার মতো একটা পণ্ডিত মূর্খের নির্দেশে…

    ফ্ল্যাশ : আলো চমকে উঠল।

    কুসি বললে, ‘যাঃ! মেরে দিলে। হেসেছি কি না মনে নেই।’

    কুন্তল বললে, ‘ছবি খুব পারফেক্ট হবে। যেমনটি চেয়েছিলুম, মিত্তির বাড়ির চনমনে গ্রুপ। একটাই ভয়, মেজর সাহেবের মাথাটা আসবে কি?’

    কুসি বললে, ‘সে কি? মানুষের পরিচয় তো মাথায় রে!’

    ‘ডোন্ট ওয়ারি। সে রকম হলে মাথাটা তুলে নিয়ে কেটে বসিয়ে দোবো।’

    মেজো বললে, ‘কম্পিউটারের যুগ। সবই করা যায়, রামের মাথা শ্যামের ঘাড়ে। শ্যামের মাথা রামের ঘাড়ে।’

    সবাই জায়গা মতো বসে পড়েছে। কুন্তল লটবহর গোটাচ্ছে। দুই মিত্তিরে আবার লাগল।

    মেজো : বড়দা তুমি এখনও মিচকি হাসি হাসছ কেন?

    বড় : অফ করতে ভুলে গেছি। ছবি তোলার সময় অন করেছিলুম। দেখবি, আলো আর হাসি, সে অন করে খুব হিসেবি না হলে অফ করতে ভুলে যায়। কুন্তল হঠাৎ তুমি ছবি তুললে কেন?

    কুন্তল : লাস্ট ফিলম। এক্সপোজ করে দিলুম। এইবার রিলটা খুলে ওয়াশ করব।

    মেজো : একেই বলে, উড়ো খই গোবিন্দয় নমঃ।

    বড় : এই কথাটা অপমানসূচক।

    মেজো : কুন্তল আমার ছাত্র ছিল। ওকে একসময়ে আমি বাঁদর, উল্লুক, গাধা, থ্রি ইন ওয়ান বলেছি। আমার সে অধিকার আছে।

    বড় : কুন্তল আমার পেশেন্ট। আত্মিক আঘাত থেকে তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমার। নার্ভাস টেনশানে ভুগছে। ঘুমের ওষুধ ছাড়া ঘুম আসে না।

    মেজো : কেন আসে না?

    কুন্তল : ভয়ে।

    মেজো : ভয়ের ওষুধ ঘুমের বড়ি নয়, সাহস। কারেজ। মেজরের মতো সাহসী হও।

    কুন্তল : স্যার! ও ভয় আর এ ভয়ে অনেক তফাত। অন্যের ঘুম ভেঙে যাওয়ার ভয়ে আমি ঘুমোতে পারি না।

    মেজো : সে আবার কী!

    কুন্তল : আজ্ঞে, আগে আমি ঘুমোতুম। আমার স্ত্রী সারারাত জেগে থাকত। চোখ গর্তে ঢুকে গেল। রোগা হয়ে গেল। হজমের গোলমাল। সবাই বললে, ফিমেল ডিজিজ। অনেক চিকিৎসা করালুম। শেষে জানা গেল ওটা মেল ডিজিজ।

    মেজো : ফিমেল মেল ডিজিজ কী ব্যাপার! ফি মেলে বলেই ফিমেল ডিজিজ।

    কুন্তল : স্যার! লজ্জার কথা বলব কী!

    মেজো : আরে লজ্জার কী আছে, ডিজিজ বলছ কেন? ফিমেল ফিমেলে আসতে পারে মেলেও আসতে পারে। মানুষের হাতে কিছু নেই আর ছেলেপুলেদের ডিজিজ বলাটা ঠিক নয় কুন্তল। সব মানুষেই মহামানবের সম্ভাবনা।

    ওই মহামানব আসে

    দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে

    কুন্তল : স্যার! মহামানব নয় মহা-নাক। শোয়া মাত্রই আমার নাকের পাঞ্চজন্য শঙ্খ বেজে ওঠে। হরেক জানোয়ারের মিলিত ডাক। শোবার ঘরে আফ্রিকার অরণ্য। প্রতিবেশীদের কমপ্লেন। আপনার বউমা ভয়ে জানলা খোলে না।

    মেজো : গাধা কোথাকার। ঘুমের ওষুধ বউকে খাওয়া, নিজে সুখে নিদ্রা যা।

    কুন্তল : সেইটাই তো করছি। প্রেসক্রিপশান আমার নামে, ওষুধ খাচ্ছে মিসেস।

    বড়দা : বাঃ, এই না হলে রুগি। এদের জন্যেই ডাক্তাররা পেটাই খায়।

    মেজো : এক কাজ করো না দাদা, নাকটা খুলে ক্লিন করে আবার সেট করে দাও।

    বড় : নাক নাকের জন্যে ডাকে না, প্রবলেমটা গলায়।

    মেজ : তাহলে গলাটা কেটে দাও।

    বড় : তারপর জেলে যাও, তারপর ফাঁসিতে লটকাও। আধহাত জিভ করে লাট খাও। আহা রে! আমার ভ্রাতা লক্ষ্মণ রে।

    মেজো : এরা সব দাঁড়িয়ে কেন?

    বড় : আমাদের শ্রুতিনাটক শোনার জন্যে।

    মেজো : কর্তব্য কর্মে অবহেলা। আমাদের তো এখন টি-টাইম। (হাক) গান্ধারী!

    গান্ধারী বলল, ‘চায়ের সঙ্গে সামান্য কিছু আয়োজন আছে!’

    নির্মল বললে, ‘কি অয়োজন জানতে পারি!’

    ‘গরম গরম পাকোড়া।’

    ‘ফ্যান্টাস্টিক। তাড়াতাড়ি হাজির করো।’ নির্মলের আর তর সইছে না।

    বিমল মেজরকে জিগ্যেস করলে, ‘কী হয়েছে আপনার? এত গম্ভীর?’

    ‘মাঝে মাঝে মনের যে কী হয়, ড্যাম্প লেগে যায়।’

    ‘যা বলেছেন। আমারও ওই এক সমস্যা। বেশ আছে, হঠাৎ কী হল!’

    ‘এ হল মনের স্বভাব।’

    নির্মল বললে, ‘সব সময় কাজে থাকলে মন মানুষের বাগে থাকে।’

    মেজর বললেন, ‘না রে ভাই। কাজের অভ্যাসে কাজ করি আমরা, তখন মনের দিকে তাকাই না। তাকালে দেখা যাবে বিষণ্ণতায় ভরা। এর কারণ, প্রতিদিনই আমরা একদিন করে মরে যাচ্ছি যে! মৃত্যুর উৎসবে বসে কত আর আনন্দ করা যায়! এই পৃথিবীতে একটাই আসল কথা—’যায়’।

    ‘আজ যায়, কাল যায়, শৈশব যায়, জীবন যায়।’

    গান্ধারী ঢুকতে ঢুকতে বললে, ‘গরমাগরম পাকোড়া আসে।’

    ‘তোর মন খারাপ হয়?’ বিমল জিগ্যেস করল।

    ‘দিদি রাগ করলে হয়।’

    ‘তখন কী করিস?’

    ‘দিদির কাছে ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে কাঁদি।’

    ‘দিদি রাগ করে কেন?’

    ‘ওমা, এ কি! রাগ না করলে ভালোবাসা আসবে কী করে! গরম ঘিয়ে লুচি ছাড়লে তবেই না ফুলকো হবে! ঠান্ডা ঘিয়ে হয়? নাও তো! অনেক জ্ঞান হয়েছে!’

    গান্ধারী গটগট করে চলে গেল। মেজর বললেন, ‘এরাই আনন্দে আছে। হায় ভগবান, না হয় কোনও আর্দশ মানুষের কাছে বেঁচে থাকাটা ফেলে দিতে পারলে সব সমস্যার সমাধান। শ্রীরামকৃষ্ণ এক জায়গায় বলছেন, আমি খাই, দাই, আর থাকি আর সব আমার মা জানেন। দেখো, অনেক লড়াই-টড়াই করে জীবনের তলানিতে এসে সার বুঝেছি, পৃথিবীটা ভগবানের। কে তিনি বোঝার চেষ্টা করে কোনও হদিস পাওয়া যাবে না। বুঝলেও তিনি আছেন, না বুঝলেও তিনি আছেন।’

    চার

    ভদ্রলোক বাড়ির নেমপ্লেট দেখলেন। হাঁ করে দেখলেন বৃহৎ গেটটা। বয়স্ক মানুষ। সাজপোশাক টিপ টপ। নিজের মনেই বললেন, ইয়েস দিস হাউস। বৈঠকখানা ঘরে প্রায় সবাই রয়েছে। দুর্গাপুজো এসে গেছে। প্রত্যেকবারই পাড়ার পুজো প্যান্ডেলে মিত্তিররা একটা নাটক নামায়। পরিবারের সবাই অভিনয় করে। এমন কি গান্ধারীও। বাইরের অভিনেতা মাত্র একজন। সে হল ফটোগ্রাফার কুন্তল। নাটক খুব জমে।

    সেই নাটকের রিহার্সাল চলেছে। ভদ্রলোক ঢুকলেন। বিমল বললে, ‘বসে পড়ুন বসে পড়ুন।’

    তখন ভীষণ কাণ্ড চলেছে। নাটকের ‘টাইটল-সং’ এর চড়ানো হচ্ছে। মিউজিক ডিরেকটার কমল। হারমোনিয়ামে বসে আছে। গানের বাণী সবাই মিলে লিখছে। প্রত্যেকে এক একটা লাইন দেবে।

    বিমল বললে, ‘নে, লেখ, অনেক ভাগ্য করে মাগো জন্মেছি এই দেশে।’

    নির্মল বললে, ‘কত মানুষ ঘুরে বেড়ায় কতরকম বেশে।’

    কমল বললে, ‘সেই দেশেতে সবাই মিলে আবার তুমি এলে।’

    কুসি বললে, ‘আমরা পরাই মালা, সাজাই ডালা ওরে দেনা প্রদীপ জ্বেলে।’

    নবাগত বললেন, ‘ওয়ান্ডারফুল। তুমি ভৈরবী চড়িয়ে দাও।’

    ‘আমাদের অভিনয় যে রাত্তিরে!’

    ‘তাহলে কেদারায় বসিয়ে দাও।’

    ‘ফ্যানটাস্টিক! আপনি গান জানেন?’

    ‘কী মনে হয়?’

    ‘মনে হয় তাই হয়।’

    বিমল জিগ্যেস করলে, ‘আপনি কে?’

    ভদ্রলোক একটা সুদৃশ্য কার্ড এগিয়ে দিলেন।

    বিনোদবিহারী বোস

    বি. বি. এন্টারপ্রাইজ

    ওয়ার্লডস নাম্বার ওয়ান কিউরিও ডিলার।।

    অ্যাপয়েন্টেড বাই দি কুইন অফ ইংল্যান্ড

    হেড অফিস, সেন্ট জেমস প্যালেস কোর্ট

    ক্যালকাটা অফিস, ওয়ান রিজেন্ট গ্রোভ।

    কার্ডটা হাতে হাতে ঘুরে অবশেষে মেজরের হাতে।

    বিমল বললে, ‘আপনি তো বিরাট ব্যক্তি।’

    ‘নট অ্যাট অল। ভবঘুরে লোক। পুরাতত্ত্ব, ইতিহাস আমার বিষয়। পৃথিবী চষে বেড়াই। বিলেতে আমার নাম আছে। কিছু কেনার আগে মিউজিয়ামগুলো আমাকে ডেকে পাঠায়।’

    ‘হঠাৎ আমাদের সন্ধান পেলেন কী করে?’

    ‘আমাদের ঠাকুরদা ওদেশে সলিসিটার ছিলেন। তাঁর ওল্ড রেকর্ডস ঘাঁটতে ঘাঁটতে এক ডিডস পেলুম।

    পড়ে দেখলুম, ওয়ান টি.সি. মিটার এসেক্সে তিন একর জমির ওপর একটা বাংলো কিনছেন। গেলুম সেখানে। একটা পরিত্যক্ত ভূতুড়ে বাড়ি। খোঁজখবর করে কেয়ারটেকারকে বের করলুম। তারা তিন পুরুষ ধরে বাড়িটা আগলাচ্ছে। সো অনেস্ট অ্যান্ড ডিউটি বাউন্ড। আমার কাছে দলিলের কপি দেখে, চাবি খুলে ভিতরে নিয়ে গেল। প্রচুর জিনিসপত্র অযত্নে পড়ে আছে। এটা-ওটা ঘাঁটতে ঘাঁটতে বহু মূল্যবান একটা জিনিস পেয়ে গেলুম। প্রায় চুরি করে নিয়ে এলুম ইন্ডিয়ায়। এক বছর ধরে গবেষণা করে যে-তথ্য পেলুম তাতে চমকে উঠতে হয়।

    কারো মুখে টুঁ-শব্দ নেই। রিহার্সাল মাথায় উঠল। গান্ধারীর মুখ দেখলে মনে হবে, সে এ জগতে নেই। ভদ্রলোক বুকের কাছে হাত ঢুকিয়ে ছোট একটা ভেলভেটের কৌটো বের করলেন। সামনের সেন্টার টেবিলের উপর কৌটোটা রেখে যেই ঢাকনাটা খুলবেন, একটা জ্যোতি ঠিকরে বেরলো। সকলে সমস্বরে বলে উঠল, ‘এটা কী?’

    ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বললেন, ‘হীরে। এ রেয়ার পিস অফ ডায়মন্ড। এর নাম ‘রূপমতী’। নূরজাহানের আর্মেলেটে ছিল। ঘুরতে ঘুরতে ওদেশে চলে গিয়েছিল। আমার মনে হয়, টি.সি মিটার এটা কোনওভাবে সংগ্রহ করেছিলেন। হি ওয়াজ এ বিগম্যান। প্রিন্স দ্বারকানাথের সঙ্গে তাঁর কারবার ছিল। টি.সি. মিটারের উত্তর পুরুষ আপনারা। হীরেটা আপনাদের দিতে এসেছি। এর অনেক দাম, প্রায় এক কোটি টাকা।’

    ঘর এমন নিস্তব্ধ, একটা পিন পড়লে শোনা যাবে।

    বিমল বললে, ‘আপনি তো নিয়ে নিতে পারতেন! আমরা এ-সবের তো কিছুই জানি না।’

    ‘আমি তো চোর নই ভাই। অন্যের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার কোনও ইচ্ছেই আমার নেই। আর একটা কথা, ওই প্রপার্টিটারও এখন অনেক দাম। ওটা সম্পর্কেও ভাবতে হবে তো! আমার সঙ্গে আপনাদের একজন চলুন। ওটার পজেসান নিয়ে নিন। আরও বহু মূল্যবান জিনিস বেরোবে।’

    গান্ধারী ভাবে বিভোর হয়েছিল। হঠাৎ বলে উঠল, ‘আমার মনে হয় আপনি ভগবান। আমি কফি করে আনি।’

    ‘তুমি কি ভগবানকে দেখেছ?’

    ‘মানুষই ভগবান। এই যেমন আপনি!’

    গান্ধারী বেরিয়ে গেল। সবাই হাঁ। কী কথাই বলে গেল মেয়েটা।

    ডাক্তারের চেম্বার যে ছেলেটি খোলে, পাহারা দেয়, তার নাম মদন। মদন ঘরে এল।

    মদন : একজন বলছে ডাক্তারবাবুর চামড়া ছাড়াবে।

    বিমল : কার? আমার?

    মদন : একবার চেম্বারে যাও না। তিরিশজন। কেউ কাশছে, কেউ হাঁচছে। একজন ফিলাট। একজন বললে, তোমার ডাক্তারের ঘুম ভেঙেছে?

    বিমল : আমি ডাক্তারি ছেড়ে দোবো। আগে লোকে দেবতার মতো সম্মান করত। এখন? এখন হাঙর ভেবে মারতে আসে। নিতুদাকে বলো, টেবিলে যন্ত্রপাতি সব সাজাতে।

    মদন : সে তুমি আর বলবে কি! আমরা সেই ভাবেই তো ম্যানেজ দিলুম এতক্ষণ। প্রথমে বুক ব্যথার যন্ত্রটা টেবিলে শুইয়ে দিলুম। বুক দেখার আলোটা জ্বালিয়ে দিলুম। হাওয়া। কিছুক্ষণ পরে জলের গামলায় তোমার আঙুল ডোবাবার জল। দু ফোঁটা ওষুধ। কিছুক্ষণ পরে পাটকরা তোয়ালে। তোমার বসার চেয়ারে ফটফটি। টেবিলে ডাস্টার ঘুরিয়েই হাওয়া। কিছুক্ষণ পর পেরেসার দেখার যন্ত্রটা। হাওয়া। কিছুক্ষণ পরে প্যাড, পেন। আর প্রত্যেকবারই মিষ্টি করে হেসে আসছেন, এই আসছেন। কাশির রুগিদের লবঙ্গ ধরিয়ে দিয়েছি।

    বিমল বললে, ‘নাঃ, আমাকে এইবার উঠতেই হল। দিন-কাল সুবিধের নয়। ডাক্তাররা এখন টার্গেট। আর দিন কতক পরে দেখা যাবে রুগির চেয়ে ডাক্তার মরছে বেশি। মিঃ বোস আজকের দুপুরের খাওয়াটা আমরা একসঙ্গে খাই না!’

    মিস্টার বোস বললেন, ‘অনেক কথা তো হলই না। আমি বরং একটা দিন আপনাদের সঙ্গে কাটিয়ে দিই।’

    ‘ওঃ হো! গ্র্যান্ড আইডিয়া। একটা দিন কেন, আপনি ফর-এভার এখানে থাকুন। আর কত ঘুরে ঘুরে বেড়াবেন?’

    ‘মদের নেশার মতো ঘুরে বেড়ানোটাও একটা নেশা। কথা দিচ্ছি, মাঝে মাঝে আসব।’

    ‘আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দি, আমাদের মেজর সাহেব। অনেক বড় বড় যুদ্ধ করেছেন। কাশ্মীরে, বাংলাদেশে, ইন্দো-পাক, ইন্দো-চায়না।’

    দু-জনে হাসতে হাসতে করমর্দন করলেন। বিমল চলে গেল চেম্বারে।

    মিঃ বোস বললেন, ‘এই মহামূল্য জিনিসটা তুলে রাখতে হবে।’

    কুসি বললে, ‘আপনার কাছেই থাক।’

    ‘সে কি, তোমাদের জিনিস আমার কাছে থাকবে কেন? তুমি কে?’

    মেজর বললেন, ‘ওই তো এই পরিবারের অল-ইন-অল। মিত্তিরদের বোন। আমরা ডাকি কুসি।’

    ‘বাঃ, বিউটিফুল নাম। আমিও কুসি বলব। কুসি তোমাদের চেস্টে তুলে রাখো। এক কোটি টাকা দাম। লন্ডনের অকশন হাউস সুথবিতে তুললে হয়তো আরও বেশি দাম পাবে। এর পিছনে যে একটা ইতিহাস আছে।’

    মেজর কুসিকে বললেন, ‘মিঃ বোস সাহেব মানুষ, ওঁকে আমার দিকে নিয়ে যাই। ভালো লাগবে।’ দুজনে বেরিয়ে যাওয়ার পর, কমল বললে, ‘আমরা তো বিশ্রী রকমের বড়লোক হতে চলেছি। এ রকম হয়!’

    কেন হবে না! কৌন বনেগা ক্রোড়পতি।’

    কমল হারমোনিয়ামে সুর তুলতে লাগল। নির্মল গুম মেরে গেছে। বড়লোক হওয়ার সম্ভাবনায় ঘাবড়ে গেছে। কমল কেদারায় ফিট করে গাইছে—

    অনেক ভাগ্য করে মাগো জন্মেছি এই দেশে,

    কত মানুষ ঘুরে বেড়ায় কত রকম বেশে,

    সেই দেশেতে সবাই মিলে আবার তুমি এলে,

    (আমরা) পরাই মালা, সাজাই ডালা (ওরে) দেনা প্রদীপ জ্বেলে।

    বোধ হয় পূর্ণিমা। চাঁদের আলোর ফিনিক ফুটছে। শরতের চাঁদ। তার আলাদা শোভা। কাচের ঘরে সবাই সমবেত। কুসি বললে, ‘সিন্দুকে হীরেটা ফেলে রেখে লাভ কি? আপনি বিক্রি করে দিন। আর এসেক্স-এর ওই প্রপার্টিটা বরং উদ্ধার করুন। মাঝে মাঝে আমরা সবাই ওখানে গিয়ে থাকব।’

    মেজর বললেন, ‘বিলেতে অত বড় একটা সম্পত্তি রাখার অনেক খরচ।’

    ‘তাহলে ওটাকেও বিক্রি করে দিন।’

    ‘করা শক্ত। মিস্টার মিটার মারা গেছেন। কোনও উইল করে যাননি। ওই সম্পত্তির কোনও উত্তরাধিকারী নেই। ওটা শেষে স্টেট-প্রপার্টিই হয়ে যাবে।’

    নির্মল বললে, ‘চেষ্টা করে দেখুন না।’

    ‘সে আমি চেষ্টা করব। একটা এফিডেবিট করে আমাকে দিন যে আপনারা তাঁর উত্তর পুরুষ।’

    কমল বললে, ‘বিষয়ের কথা অনেক হল। বড়লোকও হয়ে গেছি। কয়েক কোটি টাকার মালিক। মিস্টার বোস এইবার আমরা গানে বসি, এমন চাঁদের আলোর রাত। বৃষ্টি ধোয়া, মেঘ ভাসা শরতের আকাশ।’

    মেজর বললেন, ‘একটা সম্পর্কে এলে কেমন হয়! ‘মিস্টার বোস’ শুনতে আর ভালো লাগছে না।’

    বিমল বললে, ‘আপনি আমাদের নতুনদা।’

    ‘না, আমি শরৎচন্দ্রের নতুনদা হতে চাই না।’

    মেজর বললেন, ‘তাহলে আপনি আমাদের সকলের দাদা।’

    ‘আঃ সে ভালো। দাদা।’

    ‘তাহলে দাদা একটা গান।’

    ‘কমল! তুমি আগে একটু সুর লাগাও।’

    দেখতে দেখতে তৈরি হল সুরের রাত। দাদা সকলকে অবাক করে দিয়ে গাইলেন, রবীন্দ্রনাথের গান,

    আনন্দরই সাগর হতে এসেছে আজ বান।

    দাঁড় ধ’রে আজ বোস রে সবাই টান রে সবাই টান।।

    বোঝা যত বোঝাই করি করব রে পার দুখের তরী,

    ঢেউয়ের পরে ধরব পাড়ি—যায় যদি যাক প্রাণ।।

    ‘আপনি তো ভীষণ ভালো গান করেন!’

    ‘একসময় আমাদের বাড়িতে খুব গানের চর্চা হতো। তারপর উত্তপ্ত সুখ ঢুকে শান্তি-সুখকে তাড়িয়ে দিলে। উত্তপ্ত সুখ হল, অর্থ, বিত্ত, প্রতিপত্তি, শান্ত-সুখ হল সঙ্গীত, ঈশ্বর-চিন্তা। মানুষ জ্বরে-পুড়ে বড় সুখ পায়। এই ধারণা। এসেক্সে আমার বাড়িতে একটি শিব মন্দির করেছি। প্রতিষ্ঠা করেছি ছ-ফুট উঁচু শ্বেত পাথরের শিবলিঙ্গ। বুক দিয়ে জড়িয়ে ধরি—আঃ, কি শীতল কি শান্তি, কি সুগন্ধ, কি নিস্তব্ধ সঙ্গীত।

    দাদা! গান ধরে ফেললেন।

    শংকর শিব ভোলানাথ মহেশ্বর!

    মহাদেব দেব গঙ্গাধর হর।।

    পিনাকধারী পরম ভিখারী

    শ্মশানচারী শম্ভু শুভংকর।।

    এক একবার এমন সুর লাগছে কাচের শার্সিও সুরের ঝংকার দিয়ে উঠেছে। বাইরে চাঁদের আলোর প্লাবন। ভিতরে সবাই পাথর। কমল, কুসি নিয়মিত সঙ্গীত চর্চা করে। ইমন রাগের অপূর্ব বিস্তার দেখে তাদের চোখে জল এসে গেছে। ঘরের চারটে দেয়ালই প্লেট গ্লাস দিয়ে তৈরি। ঝকঝকে কাচ। বাইরেটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বকুলের বেদি। দেবদারু, পাইন, পাম, পথ চলে গেছে ঘুরে, ঘুরে। মেজর হঠাৎ ফিস ফিস করে বললেন, ‘ওকি?’

    সবাই দেখল, পরনে বাঘ ছাল, হাতে ত্রিশূল, দুধের মতো রং, বিরাটকায় এক পুরুষ বাইরে পায়চারি করছেন। মাথায় পিঙ্গল জটাজাল। গান্ধারী অবাক হয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। তখন সকলে গাইছে—শংকর শিব ভোলানাথ মহেশ্বর।

    মেজর বলছেন, ‘থামবেন না, তাহলে ওই রূপ অদৃশ্য হবে।’

    দাদা ইমন থেকে মালকোশে চলে গেছেন। মাঝরাতের রাগ,

    যোগীশ্বর ঈশ্বর বিভূতিভূষণ,

    নমো নমো আশুতোষ মানস-মোহন

    সকলেরই মনে হচ্ছে কিছু একটা হবে। এমন গান তো কখনও কেউ শোনে নি। সুর যেন থই থই করছে। চাঁদ অনেকটা পশ্চিমে নেমে এসেছে। পশ্চিমের কাচে সোজা এসে পড়ছে রুপালি বিচ্ছুরণ।

    পরিরা হয়তো এখুনি নেমে আসবে ছোট ওই সুইমিং পুলে। কাল ভোরে যেখানে অনেক পদ্ম ফুটবে। শিশিরের কাল যে এসে গেছে। হঠাৎ বাইরেটা সাদা কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। সেখানে বাতাসের ঘুরপাক। সাপের মতো। সে কি নৃত্য। মনে হচ্ছে মহাদেবের মুক্ত জটাজালে সাপ ঘুরছে কিলবিল করে।

    হঠাৎ গান থেমে গেল। মিস্টার বোসের মুখের অদ্ভুত হাসি থমকে আছে। সারা ঘর ভরে গেছে পদ্মের গন্ধে। শেষ চাঁদের আলোয় ঘরের ভিতরটা যেন বরফের টুকরো। মিস্টার বোস পাথর হয়ে গেছেন। তিনি চলে গেছেন। বাইরের রহস্যময় কুয়াশা অদৃশ্য। দিনের ঘুম ভাঙছে। মিস্টার বোসের দেহে প্রাণ নেই। তাঁর কোলের উপর সেই হীরেটা জ্বল-জ্বল করছে। হীরের মতো মানুষটি হীরেটি রেখে চলে গেলেন। অদ্ভুত।

    মিত্তির বাড়ি কয়েক দিন থম মেরে রইল। সরকার এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অনুমতি নিয়ে মিস্টার বোসকে বাগানেই সমাহিত করা হল। কলকাতার ঠিকানায় গিয়ে দেখা গেল সুদৃশ্য একটি ফ্ল্যাট। দোতলায়। বাইরে নেম-প্লেট। কিন্তু দরজা তালা বন্ধ। কেউ কোথাও নেই।

    কেয়ারটেকারস অফিসে গিয়ে জানা গেল, বেশিরভাগ সময় বিলেতেই থাকেন। মাঝে-মধ্যে আসেন। একেবারে একা। লন্ডনে জানানো হল। ডেথ সার্টিফিকেটের কপি পাঠান হল। মিত্তিরবাড়ির ঠিকানা দেওয়া হল।

    দিন-দশেক পরে এক বিদেশিনি এলেন। বেশি বয়েস নয়। খুব কাঁদলেন। সমাধির উপর পদ্মফুল সাজিয়ে দিলেন। জানা গেল মিস্টার বোস একজন নামকরা আর্কেওলজিস্ট। সাধক। অকাল্টিস্ট। মেয়েটি তাঁর পালিতা কন্যা। আর্কেওলজির ছাত্রী। মেয়েটির নাম ক্লারা। সে মিত্তির বাড়ির প্রেমে পড়ে গেল। কুসিকে তার ভীষণ পছন্দ। বড় মিত্তিরকেও। কুসি হল দিদি। বিমল হল দাদা। কিন্তু সে এসেছে মাত্র একমাসের ভিসা নিয়ে। যাবার সময় বলে গেল আপনাদের বিলেতের সম্পত্তি আমি উদ্ধার করে দোবো, আর আমাদের বাড়িটা তো আছেই। কুসিকে বললে, ‘দিদি, আমার কেউ নেই, তোমাকে আমার নিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে।’ কুসিকে বহুক্ষণ জড়িয়ে ধরে রইল। কুসি সাতদিন পরার জন্যে সাতখানি শাড়ি দিয়েছে। গলার হার দিয়েছে সোনার।

    মেজরও চলে গেলেন ক্লারার সঙ্গে। বিলেতে তাঁর মেয়ে থাকে। আর কদিন পরেই পুজো। বাইরের ঘরে রিহার্সাল চলছে পুরোদমে। কমল হঠাৎ বললে, ‘অসম্ভব। এবারে আমাদের নাটক বন্ধ করে দাও। আমার কান্না আসছে। মিস্টার বোসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। রিহার্সালের প্রথম দিনেই তিনি এসেছিলেন।’

    বড় মিত্তির বললে, ‘আমারও সেই এক অবস্থা। তিনি মনে ঢুকে গেছেন।’

    একে একে সবাই একই কথা বললে।

    কুসি বললে, ‘আমাদের একদম পালটে দিয়ে গেছেন। আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন। মিত্তিরবাড়ি এখন মহাতীর্থ। শিবক্ষেত্র।’

    কমলা মালকোশে সেই অলৌকিক রাতের গানটাই ধরল, ‘শঙ্কর শিব ভোলা নাচে নাচে রে।’

    পাঁচ

    মিত্তিরবাড়িতে হঠাৎ যেন একটা পরিবর্তন এসে গেল। অকারণ হইচই, অকারণ গাল-গল্প কমে গেল। সবাই সিরিয়াস। মেজো মিত্তির চিরকালই একটু অন্যরকম। অধ্যাপক মানুষ। প্রচুর লেখা-পড়া করতে হয়। বড় মিত্তিরই ছিল সবচেয়ে আমুদে। তার পরিবর্তনটাই চোখে পড়ার মতো। আজকাল অনেক রাত পর্যন্ত তার ঘরে আলো জ্বলে। কুসি একদিন দেখল, বড়দা শেষ রাতে ধীর পায়ে কাচের ঘরের দিক থেকে আসছে। গভীর ভাবে মগ্ন। কুসি তাড়াতাড়ি নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছিল। বাগানের ওই দিকটায় দিনের বেলাতেই গা ছমছম করে।

    কুসি সেদিন ডাক্তারের আর একটি লেখা আবিষ্কার করল। একটা বড় প্যাডে লিখেছে। লেখাটা কাচের ঘরে নিয়ে পড়ে ফেলল।

    ‘মেঘ নিয়ে, জল নিয়ে, পাতা নিয়ে, রোদ নিয়ে, পাখি নিয়ে, পাখির ডাক নিয়ে, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত নিয়ে মধ্যযুগীয় আদিখ্যেতার কাল শেষ হয়ে গেছে। আকাশ আকাশে আছে। সেখানে দিবসের দোর্দণ্ডপ্রতাপ মাতণ্ডদেব প্রখর দীপ্তিতে সব গ্রাস করে থাকেন। তাঁর ব্রেকফাস্ট হল হাফ বয়েলড চন্দ্র। লাঞ্চ হল গ্রহ নক্ষত্র। ডিনার হল অন্ধকার। রাতের আকাশ বাগানে তারাদের ফুল ফোটে, ফসল ফলে, ধুমকেতু ঝাড়ু দিয়ে সাফ হবে, ছায়াপথ যেন সেচের খাল, কোনও এক দুষ্টু ছেলে মাঝে মাঝে উল্কার পাথর ছুড়ে তারা পাড়তে যায়। শুকতারা ডাগর চোখে ভোরের আকাশে জেগে থাকে সূর্যসম্রাটের নিদ্রাভঙ্গের অপেক্ষায়। ধীরে ধীরে নদীরা সব জেগে ওঠে। হিমকূট সেজে ওঠে সোনার মুকুটে। সম্রাটের আসনের চারপাশে প্রজাপতি-বালিকারা নাচ দেখাতে আসে। পেঁচা কোটরে ঢুকতে ঢুকতে বলে, রাবিশ। বাদুড় ঝুলে পড়ে নতমুখী সাধনায়। কিরণ প্লাবিত আকাশ দেখব না। হেঁটমুণ্ডে আঁধারে প্রতীক্ষা।

    আকাশ আকাশে আছে, ভূমিতে আছে প্রজা। কোটি জঠরের ক্ষুধা নিবারণের ধরিত্রী উচ্চ উর্বরা। নদী সেখানে কবিতা নয়, সেচের বাহু, তৃষ্ণার জল, অকৃপণ আকাশে বর্ষণে বন্যার বিভীষিকা। বৃক্ষ সেখানে ছায়া নয়, জনপদের শত্রু। ইন্ধন অথবা ইমারতের আসবাব। পাখির জন্যে প্রস্তুত শত খাঁচা, ব্যাধের গুলি। মুরগি মানেই রোস্ট। দুমবা মানেই রেজালা।

    ছাগলকে বললুম, কি সুন্দর সবুজপাতা।

    ছাগল আধবোজা চোখে হুঁ হুঁ শব্দ করে বললে, ভেরি টেস্টফুল! মশ মশ করে চিবোতে লাগল।

    নিমেষে পত্রশূন্য কাণ্ড।

    বাঘকে বললুম, কী সুন্দর হরিণ!

    বাঘ উদগ্রীব হয়ে জিগ্যেস করলে, কোথায় কোথায়! একটু দাঁত বসিয়ে টেস্ট করে আসি। সে কী যুবতি। একটু আগে বৃদ্ধ একটি বলদ সেবা করে তেমন স্বাদ পেলুম না।

    ইঁদুরকে বললুম, দেখেছ জ্ঞানেশ্বরী গীতা! অপূর্ব স্বাদ!

    ইঁদুর বললে, কী ভাবে খেলে! আমি কাল রাতে একবার চেষ্টা করেছিলুম। মলাট দুটো বড় শক্ত। দেখি দাঁতে শান দিয়ে আসি।

    যা দেবী সর্বভূতেষ্ণু ক্ষুধারূপেণ সংস্থিতা।

    যা দেবী সর্বভূতেষ্ণু তৃষ্ণারূপেণ সংস্থিতা।

    আমাদের ঋষিরা উপলব্ধি করেছিলেন, সৎ, অসৎ, দয়া, হিংসা, রৌদ্রছায়ার এই পৃথিবী। শ্রীরামকৃষ্ণের উপমা অতি সুন্দর। তিনি বলছেন, ‘তাঁকে যারা পেয়েছে, তারা জানে যে তিনিই সব হয়েছেন। তখন বোধহয়—ঈশ্বর-মায়া-জীব-জগৎ। জীবজগৎসুদ্ধ তিনি। যদি একটা বেলের খোলা, শাঁস, বিচি আলাদা করা যায়, আর একজন বলে, বেলটা কত ওজনের ছিল দেখ তো, তুমি কি খোলা বিচি ফেলে শাঁসটা কেবল ওজন করবে? নাঃ ওজন করতে হলে খোলা বিচি সমস্ত ধরতে হবে। ধরলে তবে বলতে পারবে, বেলটা এত ওজনের ছিল। খোলাটা যেন জগৎ, জীবগুলি যেন বিচি। বিচারের সময় জীব আর জগৎকে অনাত্মা বলেছিল, অবস্তু বলেছিল। বিচার করবার সময় শাঁসকেই সার, খোলা আর বিচিকে অসার বলে বোধহয়। বিচার হয়ে গেলে, সমস্ত জড়িয়ে এক বলে বোধ হয়। আর বেশি হয়, যে সত্ত্বাতে শাঁস, সেই সত্ত্বা দিয়েই বেলের খোলা আর বিচি হয়েছে। বেল বুঝতে গেলে সব বুঝিয়ে খাবে।

    ‘অনুলোম বিলোম। ঘোলেরই মাখন, মাখনেরই ঘোল। যদি ঘোল হয়ে থাকে তো মাখনও হয়েছে। যদি মাখন হয়ে থাকে, তাহলে ঘোলও হয়েছে। আত্মা যদি থাকেন, তো অনাত্মাও আছে।

    ‘যাঁরই নিত্য তাঁরই লীলা। যাঁরই লীলা তাঁরই নিত্য। যিনি ঈশ্বর বলে গোচর হন, তিনিই জীবজগৎ হয়েছেন—বাপ, মা, ছেলে, প্রতিবেশী, জীবজন্তু, ভালো-মন্দ, শুচি, অশুচি সমস্ত।”

    বাজারে ভীষণ গণ্ডগোল। মাছ বিক্রেতার সঙ্গে এক ভদ্রলোকের বিষম কলহ। আমরা শ্রোতা। কাটাপোনা সাতশো ওজন করিয়েছেন। বলেছেন আঁশ ছাড়াও। ফের ওজন করো। ছ’শোগ্রাম। ভদ্রলোক ছ’শোর দাম দেবেন। আমি মাছের দাম দেব, আঁশের দাম দেব কেন? কিছুতেই বুঝছেন না, মাছ আনে, মাছ আর তার আঁশ। সম্পূর্ণ একটি ব্যবস্থা। মাছ নিলে মাছের আঁশ, আঁশটে গন্ধ সবই নিতে হবে।

    জগৎকারিণী শক্তির নানাভাবে, নানাদিকে প্রকাশ। চণ্ডীতে দেবতারা সেই শক্তির স্তব করেছেন, অতিসৌম্যতিরৌপ্রায়ৈ নতাস্তস্যৈ নমোনমঃ বিদ্যারূপে তিনি অতি সৌম্যা, অবিদ্যারূপে অতিরৌদ্রা। আগমশাস্ত্রে তিনি বিষ্ণুমায়া। বরাহপুরাণমতে এই বিষ্ণুমায়া মেঘ, বৃষ্টি ও শস্যের উৎপত্তির কারণ। জীবনের চেতনা তিনি। তিনি বুদ্ধি, নিদ্রা, ছায়া, শক্তি, ক্ষান্তি, জাতি, লজ্জা, শান্তি, শ্রদ্ধা, কান্তি, লক্ষ্মী, বৃত্তি, স্মৃতি, দয়া, তুষ্টি, মাতা। তিনি প্রান্তি। তিনি সবকিছু।

    বর্তমানকালে অবিদ্যা মায়ার খেলা চলেছে। একটা কুয়াশা নেমেছে। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। পথ হারিয়েছে। পৃথিবী হেলে গেছে। একটা কথাই বড় হয়েছে ধান্দা। কি চাই জানি না। মারছি গুঁতো, মারছে গুঁতো। এই গুঁতোগুঁতিতে অবশেষে মাথায় না শিং গজিয়ে যায়।

    শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, ‘ভোগ থাকলেই যোগ কমে যায়। ভোগ থাকলেই আবার জ্বালা। শ্রীমদভাগবতে আছে—অবধুত চিলকে চব্বিশ গুরুর মধ্যে একজন করেছিল চিলের মুখে মাছ ছিল, তাই হাজার কাকে তাকে ঘিরে ফেললে, যেদিকে চিল মাছ মুখে যায় সেই দিকে কাকগুলো পিছনে পিছনে কা কা করতে করতে যায়। যখন চিলের মুখ থেকে মাছটা আপনি হঠাৎ পড়ে গেল তখন যত কাক মাছের দিকে গেল, চিলের দিকে আর গেল না।’

    একালের মানুষকে একটা শিক্ষাই দেওয়া যায়, ভোগ করো। তুমি ভোগ করার জন্যেই এসেছ। তোমার দুটো পা। একটা ভোগ আর একটা দুর্ভোগ। হাঁটি হাঁটি পা-পা করে করবে। খেল খতম, পয়সা হজম। যে শিক্ষা তোমাকে পয়সা উপার্জনের পথ বাতলাতে পারবে না সে শিক্ষা শিক্ষাই নয়। বাড়ি, গাড়ি, লকারে সম্পদ, ক্ষমতার চেয়ার, তারপরে না হয় ছাতে উঠে একবার বললে, আহা! এমন চাঁদের আলো/মরি যদি সেও ভালো। অর্থাৎ তুমি চাঁদের আলোয় অভিভূত হওয়ায় সঙ্গতি অর্জন করেছ বেকার হাঁ করে আকাশ দেখছে কোলে পড়ে আছেন জীবনানন্দ। কবিতার এক লাইনে পুলকিত শিহরণ :

    স্বপ্নের ভিতরে বুঝি—ফাল্গুনের জ্যোৎস্নার ভিতরে

    দেখিলাম পলাশের বনে খেলা করে।

    হরিণেরা; রুপালি চাঁদের হাত শিশিরে পাতায়;

    বাতাস ঝাড়িয়ে ডানা—মুক্তা ঝরে যায়।

    বাতাস ঝাড়িছে ডানা—না, বউদি ঝাড়িয়ে শাড়ি, কর্কশ কণ্ঠ। হরিণের গাত্রা চিত্রিত; কিন্তু বহুশাখ শৃঙ্গ অতিশয় কঠিন। ‘এই যে, দাদার হোটেলে টেরি বাগিয়ে বসে আছো, একটু গতর নাড়িয়ে যাও না, গ্যাসটা লিখিয়ে এসো। একটা মানুষ কতদিন একা সামলাবে! দয়া, মায়া, লজ্জা, সব গেছে নাকি!’ দুম, দুম।

    আকাশের মতো উদাস দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইল—বেকার যুবক সাকার দাদার সহধর্মিনীর দিকে। তাঁর হাঁকাহাঁকি, ডাকাডাকিতে গৃহ উত্তাল। তিরিশটা ইন্টাভিউতে ব্যর্থ বীর বোঝে না, ভবিষ্যৎ কোথায় :

    ফুটফুটে জ্যোৎস্নারাতে পথ চেনা যায়;

    দেখা যায় কয়েকটা তারা

    হিম আকাশের গায়—ইঁদুর-পেঁচারা

    ঘুরে যায় মাঠে-মাঠে, খুদ খেয়ে ওদের পিপাসা আজও মেটে,

    পঁচিশ বছর তবু গেছে কবে কেটে!

    ঝাং। বাসন পড়ার শব্দ। কাজের মহিলার সঙ্গে প্রভাতী সংকীর্তন। কাটা ঢেঁড়স, ফালা বেগুন, রং মাখা পটল সুন্দরী, চিৎপাত একটি মাছের মৃতদেহ, খবরের কাগজ-মুখে আড় হয়ে শুয়ে থাকা গৃহের সাকার কর্তা। রুক্ষ চুল, শালোয়ার কামিজ পরা তরতরিয়ে বেড়ে ওঠা বোন, যার আর এক পরিচয় চলমান দুশ্চিন্তা, দেয়ালে ঝুলে থাকা পরিবারের নাটের গুরু পিতার ধূসর চরিত্র। তারই তলায় জ্বলজ্বলে দাদা-বউদির ছবি—মুসুরির পাহাড়ে বিয়ের পর তোলা। সে চেহারা আর এ চেহারায় মিল নেই। ক্ষয়ে যাওয়া নায়িকা এখন তিরিবিরক্ত ধূমাবতী। নায়ক মধ্যভাগ সর্বস্ব একটা পুঁটলি। নবাগত শিশুটি শৈশব হারানো ভীত এক মনুষ্যশাবক মাত্র। তেল যত পুড়ছে খেলা তত জমছে না।

    গোটা পৃথিবী কেমন যেন ভ্যাবাচেকা মেরে গেছে। আকাশ ভয়ে আর মুখ খোলে না, মেঘের আঁচল টেনে রাখে। মাঝেমধ্যে আঁচল সরিয়ে রোদ যখন তীর মারে, বড় তীক্ষ্ন, কর্কশ। ধুলো, আর ধোঁয়ার সবুজপাতা মরোমরো। ফুল ফোটে কোনওরকমে সুবাস হারা। মানুষের সংগ্রাম চলেছে অসংখ্যের জীবনধারণের জড়াজড়ির সঙ্গে। সুর ভুলে সব অসুর।

    দেবতাদের যুগ শেষ। স্নেহ এখন তৈলে। মানুষের অদৃশ্য নিরাকার মনে জোড়া জোড়া বিষাক্ত হুল। বাক্যের দংশনে বিষাক্ত তরল, বল্লমের খোঁচা। পায়ে পা রেখে তুমুল ঝগড়া। সন্দেহ, ঘৃণা। বাপ বললে, শালা। সূক্ষ্ম নির্যাতন। একদল মৃত-মন নরনারীর উপর দিয়ে অট্টহেসে মহাকাল চলেছে। পিঠে তার শূন্যঝুলি। ‘কী দিলে তোমরা জীবনের উপহার!’ বীর কোথায়, কোথায় প্রেমিক, জ্ঞানী কোথায়, কোথায় তোমাদের শঙ্কর, শ্রীচৈতন্য, বুদ্ধ, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরাম, শ্রীরামকৃষ্ণ, জননী সারদা, স্বামী বিবেকানন্দ, বিদেশিনী নিবেদিতা।

    মহাকাল ঘণ্টা বাজায়, আমরা বসে বসে বানাই ছ্যাঁচড়া। ভাবি এইটাই জীবন। নদী নদীতেই আছে, হৃদয়ে যমুনা হয়ে আসে না। যন্ত্রের ধ্বনি, শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি কানে আর আসে না। বিশ্বাসের বিশাল শবদেহের উপর বসে জীবনের বনভোজন। নীল নিদ্রায় খুলে যায় না স্বপ্নের সোনার জগৎ। কেউ কি আর প্রার্থনা করে :

    বরিষধরা-মাঝে শান্তির বারি।

    শুষ্ক হৃদয়ে লয়ে আছে দাঁড়াইয়ে

    ঊর্ধ্বমুখে নরনারী।।

    তবে সংস্কার কী সহজে মরবে! সংস্কারে আছেন কমলাকান্ত :

    যখন যেরূপে মাগো রাখিবে আমারে সেই সুমঙ্গল যদি না ভুলি তোমারে।

    বিভূতিভূষণ কিংবা রতন মণি-কাঞ্চন, তরুতলে বাস কিংবা রাজসিংহাসন

    সম্পদে বিপদে অরণ্যে বা জন-পদে মান-অপমানে কিংবা রিপুকারাগারে।।

    ‘আমি ডাক্তারি করি। কতরকমের পরিবারের একেবারে অন্দরমহলে গিয়ে ঢুকতে হয়। বড়লোকদের জন্যে বড় বড় ডাক্তার নার্সিংহোম। আমি মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের ডাক্তার। আমি বেশ দেখতে পাচ্ছি, এরা আর থাকবে না। তখন আমিও থাকব না। এরপর ডাক্তার ডাকার, ওষুধ কেনার পয়সা থাকবে না। পথ্য তো দূরের কথা। কুকুর, বেড়ালের মতো মানুষ মরবে। কেউ দেখার নেই। ধাপ্পা দিয়ে আর কতকাল চালানো যাবে। ক্রোধ জমছে। ক্রোধের উত্তাপ আণবিক উত্তাপের চেয়ে প্রবল। ঘূর্ণীঝড়ে, সাইক্লোনে সব যেমন মড় মড় করে ভাঙে, ঠিক সেইরকম একদিন সব দুমড়ে মুচড়ে যাবে। নটরাজের নৃত্য। পিনাকে বাজে টংকার। ফরাসি বিপ্লবের মতো একটা বিপ্লব হলে কেমন হয়। সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয়। আবার, আবার। একটা চাকা। শনিকে ঘিরে আছে রহস্যময় বলয়, রিং। কাল রাতে কনফুসিয়াস পড়তে পড়তে এইটা পেলুম,

    In a country well governed,

    Poverty is something to be ashmed of.

    In a country badly governed.

    Walth is something to be ashamed of.

    এইবার বিশ্বের দিকে তাকাই, সুশাসিত দেশ থেকে দারিদ্র্য লজ্জায় পালিয়েছে আমাদের এই দুঃশাসিত দেশে কলঙ্কের মতো একটি গোষ্ঠী সব সম্পদ ভোগ করছে। অপেক্ষা করা যাক। দেখা যাক কী হয়!

    কুসি সবটা পড়ে অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।

    ওই রাতে খাবার ঘরে বড় মিত্তির বললে, ‘পর পর কদিন আমি ত্রিনয়ন দেখছি।’

    একে, একে সকলকেই বললে, তারাও দেখছে। কেন দেখছে জানে না।

    বড় মিত্তির প্রশ্ন করলে, ‘কোন দেবী তাঁর চোখের জন্যে বিখ্যাত!’

    সবাই একবাক্যে বললে, ‘মা দুর্গা।’

    ‘চোখের দেবী মা দুর্গা। আমরা দুর্গাপুজো করব। আর মায়ের তৃতীয় নয়নে থাকবে ওই হীরেটা। বিসর্জনের সময় খুলে নেওয়া হবে। কি রে কুসি। পারবি তো!’

    সবাই বললে, ‘নিশ্চয় পারব। মহাদেব এসেছেন। মা আসবেন না।’

    অনেক রাত হল। কুসির ঘুম আসছে না। খোলা জানালায় উদার আকাশ। সমুদ্রের মতো। জাহাজের মতো ভেসে যাচ্ছে এক এক খণ্ডে মেঘ। তারাদের আলো ধরে। চোখ! আরও দুটি চোখ। কোন আকাশে তাকিয়ে আছে? সমুদ্র তুমি এখন কোন তটে অবিরাম ভেঙে ভেঙে পড়ছ?

  • বড়মামার বোমবাজি

    বড়মামার বোমবাজি

    এক
    বড়মামা চিঠিটা তিনবার পড়লেন। যতবার পড়ছেন ততবারই মুখের চেহারা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে। শেষবার পড়ে যখন আমার দিকে তাকালেন, তখন মুখ একেবারে উজ্জ্বলতম। আমি এখন পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে সংস্কৃত শিখছি। হাফইয়ারলি পরীক্ষায় সংস্কৃতে আমি মাত্র তিরিশ নম্বর পেয়ে কেঁদে-কক্কে পাশ করায়, বড়মামা পুরো তিনটে দিন আমার সঙ্গে কথা বলেননি। মেজোমামাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের হল গিয়ে পণ্ডিতের বংশ। আমার জ্যাঠামশাই ছিলেন বিখ্যাত তর্কচঞ্চু। মোচ্ছবতলায় নবদ্বীপের তর্কচূড়ামণিকে পরাজিত করে কৃষ্ণনগরের মহারাজের কাছ থেকে এই উপাধি পেয়েছিলেন। সেই বংশের কুলাঙ্গার হল এই কুষ্মাণ্ডটি। ইনি হলেন বাক্যচূড়ামণি। সকালে ওর মুখদর্শনে শরীরে পাপ সঞ্জাত হয়। গাত্রদাহ উপস্থিত হয়।’

    মেজোমামা বললেন, ‘দাদা, তোমার হলটা কী? পটাপট শুদ্ধ বাংলা বেরোচ্ছে। তোমার মুখে তো চিরকাল শুনে এলুম ধুর ব্যাটা, ধ্যার ব্যটা, রামছাগল, ধেড়ে ইঁদুর, পটকে দে, লটকে দে। মনে হচ্ছে, তোমার নবজন্ম হল।’

    বড়মামা বলেছিলেন, ‘আমার ওপর পূর্বপুরুষের আবেশ হয়েছে। আজকাল মাঝে-মাঝে আমার এইরকম হচ্ছে।’

    ‘তাই তুমি উলটোপালটা বকছ। ভুল বলছ। ইতিহাসকে বিকৃত করছ। তর্কচঞ্চু আমাদের জ্যাঠামশাই ছিলেন না। তিনি ছিলেন পাক্কা সাহেব, ইঞ্জিনিয়ার। সাতবার বিলেত গিয়েছিলেন। বাংলা ভুলে গিয়েছিলেন। বাঙালিকে বলতেন কাওয়ার্ড। মুম্বাইতে চাকরি করতেন। ঘোড়ায় চড়তেন। গলফ খেলতেন। জ্যাঠাইমাকে গাউন পরিয়ে ঘোড়ায় চাপা শেখাতে গিয়ে আছাড় খাইয়ে ঠ্যাং ভেঙে দিয়েছিলেন। তর্কচঞ্চু ছিলেন আমার বাবার বাবা। আচ্ছা, ডাক্তার হলে কি এমন অজ্ঞ হতে হয়! নিজের পরিবারের ইতিহাসটুকু জানো না!’ফ্যামিলি ট্যুর প্যাকেজ

    বড়মামা বলেছিলেন, ‘একটা সুযোগ পেয়েছে, এখন বলে নাও। তবে তোমার ভাষা আমি দু’জায়গায় সংশোধন করব। বাবার বাবা নয় প্রপিতামহ।’

    মেজোমামা হইহই করে হেসে উঠলেন, ‘প্রপিতামহ নয় পিতামহ। শোনো, অর্ডারটা হল এইরকম, পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, বৃদ্ধ প্রপিতামহ। ক’পুরুষ হল? চার পুরুষ। ব্যস, আর ওপরে ওঠার দরকার নেই।’

    বড়মামা বললেন, ‘অত বক্তৃতা দেবার দরকার নেই। একে বলে, স্লিপ অব টাঙ্গ। জিহ্বাস্খলন। আমি রোজ পিতৃপুরুষের তর্পণ করি। তোমার কি মনে হয়, এই ওপরে ওঠাটা আমি জানি না? বালক! শোনো, আমি এই ভাবে মনে রাখি, পি, প্রপি, বৃপ্রপি।’

    ‘হল না, একটা বাদ চলে গেল। ওটা হবে, পি, পিপি, প্রপি, বৃপ্রপি।’

    ‘কী পিপি করছিস? একি মোটরগাড়ি না কি? শ্রদ্ধা-ভক্তির প্রভূত অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে কারণে তুমি অনায়াসে, অক্লেশে বলতে পারলে, জ্যাঠাইমার ঠ্যাং। তুমি শিক্ষিত, অধ্যাপক, তোমার মুখ থেকে এ আমি আশা করিনি। তুমি মুরগির ঠ্যাং বলো, সংশোধন করব না, জ্যাঠাইমার ঠ্যাং বললেই প্রতিবাদ করব। তুমি বড় হয়েছ, লেখাপড়া শিখেছ, তোমাকে দেখে ছোটরা শিখবে, তুমি এখানে বসে-বসে ঠ্যাং নাচাচ্ছ, আর বলছ জ্যাঠাইমার ঠ্যাং। ছিঃ, ছিঃ। একে আমি বলতে পারি, তোমার অধঃপতন।’

    ‘তুমি যে ঠ্যাং বললে?’

    ‘কখন বললুম?’

    ‘এই তো বললে, বসে-বসে ঠ্যাং নাচাচ্ছ। জ্যাঠাইমার ঠ্যাংও বলেছ।’

    ‘তোমার ঠ্যাংকে ঠ্যাং বলব না তো কী শ্রীচরণ বলব। তুমি কি আশা করো, আমার কাছ থেকে?’

    ‘পুরু আলেকজান্ডারকে যেমন বলেছিলেন, ‘ভদ্রলোকের প্রতি ভদ্রলোকের মতো ব্যবহার।’

    বড়মামা বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ। এখন সমস্ত বিভেদ ভুলে ঐক্যমত হয়ে…।’

    ‘হল না বড়দা। চেষ্টা করছ বটে, হচ্ছে না। য’ফলা সরাও তিন ঘর। ঐকমত্য বলো।’

    ঠিক ওই সময় মাসিমা ঘরে ঢুকে বললেন, ‘তখন থেকে ওঘরে কাজ করতে-করতে শুনছি, তিন ঘর সরাও, য’ফলা দু’ঘর সরাও, আর কাগের ঠ্যাং, বগের ঠ্যাং, মুরগির ঠ্যাং, এদিকে সকাল ন’টা বাজতে চলল, আজ কার বাজার করার পালা শুনি? কে আজ বাজার করে আমাকে উদ্ধার করবে!’

    বড়মামা সঙ্গে-সঙ্গে বিশাল একটা দেওয়াল ক্যালেণ্ডারের দিকে এগিয়ে গেলেন। ঠিক যতটা উৎসাহ নিয়ে গেলেন, ঠিক ততটা নিরুৎসাহ হয়ে ফিরে এলেন। মাসিমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আজ আমার পালা, কিন্তু আজ আমার ভীষণ রুগির চাপ। আমি যেতে পারছি না। আমি নাতিশয় দুঃখিত।’

    মেজোমামা বললে, ‘এঃ, অকারণে একটা ‘না’ যোগ করে মানেটাই পালটে দিলে। না অতিশয়, নাতিশয়, মানে তুমি আদৌ দুঃখিত নও। তুমি ঠিক কী বলতে চাইছ! অতিশয় দুঃখিত, ভেরি সরি, তাই তো?’

    ‘হ্যাঁ, ভেরি সরি।’

    মাসিমা বললেন, ‘ও সব সরি-ফরি ছাড়ো। রুগির সঙ্গে তোমার কত যে সম্পর্ক আমার জানা আছে। আজ তিনমাস হল, তোমার স্টেথিসকোপ ঘরের দেওয়ালে ঝুলছে, যার যেদিন পালা, সে সেদিন যাবে। আমার কড়া আইন। এই নিয়ে পরে ভাইয়ে-ভাইয়ে চুলোচুলি হবে, তা আমি চাই না। আমি বিশ্বশান্তি চাই না, আমি চাই গৃহশান্তি।’

    মেজোমামা বললেন, ‘আইন ইজ আইন।’

    বড়ামামা ভেংচি কাটলেন, ‘আইন ইজ আইন! আমার জজসায়েব এলেন।’ মাসিমাকে বললেন, ‘বাজার যেতে হবে তো আগে বলিসনি কেন?’

    ‘আমি বলব? কেন তোমার একটা দায়িত্ব নেই! রোজ খেচকে-খেচকে আমাকে সব বাজারে পাঠাতে হবে!’

    বড়মামা চারটে বড়-বড় ব্যাগ হাতে বাজারে ছোটার জন্যে তৈরি হলেন। মেজোমামা বড়মামাকে শুনিয়ে-শুনিয়ে বললেন, ‘আমি এখন আরাম করে এককাপ চা খাব, খবরের কাগজের পাতা ওলটাব, এডিটোরিয়ালটা মন দিয়ে পড়ব। তারপর টুক করে দাড়িটা কামিয়ে, গায়ে আচ্ছা করে ম্যাসেজ অয়েল মেখে চান। তেল আজ মাখতেই হবে। স্কিনটা খসখসে হয়ে যাচ্ছে। আমার আবার তেল মাখার ক্যালেণ্ডার আছে। তারপর শরীরে হালকা করে পাউডার ছড়িয়ে সাদা পাজামা আর-একটা টাওয়েল গেঞ্জি চড়িয়ে দোতলার দক্ষিণের ঘরে লম্বা বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে ভারী কিছু পড়ব না, পড়ব টিনটিন ইন আমেরিকা। তারপর যদি ছোট্ট একটা ঘুম এসে যায় তো যাবে। লাইট ন্যাপ।’

    বড়মামা মাসিমার হাত থেকে বাজারের টাকা নিতে-নিতে বলেন, ‘শুনেছিস! আমাকে শুনিয়ে-শুনিয়ে কীরকম বলছে! রসিয়ে-রসিয়ে। তারিয়ে-তারিয়ে।’

    ‘বলছে বলুক। ওর মুখ আছে বলছে।’

    ‘আমার কান আছে ঢুকছে।’

    ‘ঢুকুক।’

    ‘আমার মনোবল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে।’

    ‘তুমি এ-কান দিয়ে ঢুকিয়ে ও-কান দিয়ে বের করে দাও। ভগবান তোমাকে দুটো কান কী জন্যে দিয়েছেন?’

    মেজোমামা যেন নিজের মনেই বললেন, ‘ও হ্যাঁ ভুলেই গেছি, চান করে উঠে কিছু একটা খাওয়া দরকার, তা না হলে পিত্তি পড়বে। চারটে নরম-পাক সন্দেশ বেশ বড় সাইজের, একমুঠো কাজু আর-একটু ফ্রুটজুস খাব। কে জানে বাবা, কখন বাজার হবে, কখন রান্না হবে! নিজের পেট নিজেকেই ঠান্ডা রাখতে হবে। যস্মিন দেশে যদাচার।’

    মাসিমা বললেন, ‘এই সব কথা তুমি কাকে শোনাচ্ছ?’

    ‘নিজেকে। নিজের কর্মপরিকল্পনা নিজেকে শোনাচ্ছি।’

    ‘তোমার কর্মপরিকল্পনার বারোটা আমি বাজাচ্ছি। আজ তোমার নর্দমা আর বাথরুম পরিষ্কারের ডেট। তুমি খুব মজা করে ভুলে গেলেও আমি ভুলিনি। কাল আমি অ্যাসিড আর নতুন ব্রাশ আনিয়ে রেখেছি। যাও, লেগে পড়ো।’

    ‘আমার লো-প্রেশার হয়েছে। পরিশ্রমের সব কাজ বারণ। ডাক্তারবাবু বলেছেন, ভালো-ভালো খাবে। গান শুনবে, মজার-মজার বই পড়বে আর নেহাত প্রয়োজন না হলে বিছানা ছেড়ে উঠবে না।’অনলাইনে বেস্টসেলিং বই কিনুন

    বড়মামা দরজার কাছ থেকে বললেন, ‘না, আমি বলিনি।’

    মেজোমামা বললেন, ‘তুমি ছাড়া ডাক্তার নেই না কি? তুমি হলে হাই-প্রেশারের ডাক্তার। আমি লো-প্রেশারের ডাক্তার দেখিয়েছি।’

    ‘ডাক্তারের আবার লো-হাই আছে না কি?’

    ‘অবশ্যই আছে। এ হল গিয়ে তোমার স্পেশ্যালিস্টের যুগ।’

    ‘তা হলে আমাকে প্রেশার-মাপা যন্ত্রটা বের করতে হচ্ছে। বাজারে যাবার আগে ওই কাজটাই করি।’

    মাসিমা বললেন, ‘দাদা, তুমি আর বিলম্ব কোরো না। আমার হঠাৎ মনে পড়ল, তুমি আজ শরৎবাবুকে নিমন্ত্রণ করেছ?’

    বড়মামা চমকে উঠলেন, ‘আরে তাই তো।’

    সকালে আমার মামার বাড়িতে যত গোলমালই হোক, রাতের দিকে সব ঠান্ডা। আর গোলমাল মানে কি, সবই তো মজার ব্যাপার। ঘরে-ঘরে আলো। আমার মাসিমা বলেন, ‘উঠুক ইলেকট্রিক বিল, নেভার মাইন্ড, কোনও ঘর অন্ধকারে রাখা চলবে না। মা লক্ষ্মী কখন কোন ঘরে এসে বসতে চাইবেন, কে বলতে পারে।’ রাতে দূর থেকে আমার মামার বাড়িটাকে দেখলে মনে হয় স্বপনপুরী। চারপাশ ফাঁকা। সারি-সারি গাছ দিয়ে ঘেরা বিশাল একটা তিনতলা বাড়ি। রংবেরঙের কাচের ভেতর দিয়ে আলোর রামধনু বেরিয়ে আসছে। সেকালের জমিদার বাড়ি। শুনেছি, আমি জন্মাবার আগে, অবস্থা খুব খারাপ হয়ে এসেছিল। এদিক ভেঙে পড়ছে, ওদিক ভেঙে পড়ছে। একবার ছোটমতো একটা ভূমিকম্প হল। চণ্ডীমণ্ডপ আর উত্তর দিকটা ভেঙে স্তূপমতো হয়ে গেল। ভাঙা বাড়ির ফাঁক-ফোকর থেকে শেয়াল বেরিয়ে এসে প্রহরে-প্রহরে ডেকে যেত। সেই সময় আমার বড়মামা—তিনতলার ভাঙা ঠাকুরঘরে নারায়ণের সামনে বসে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ‘আমি যদি তোমার বাচ্চা হই, তা হলে এই ধ্বংসস্তূপ ঠেলে আমি উঠবই উঠব, উঠব, উঠব। তোমার ডান হাত আমার মাথায় রাখো। আমি যদি বাঘের বাচ্চা হই, তোমাকে আমি সোনার মুকুট পরাব, হিরে সেট করা। আর যদি শেয়াল হই তা হলে ভৈরবীর ত্রিশূলের খোঁচায় বুক ফেঁড়ে মরে যাব। মাই নেম ইজ বিমল মিত্র।’

    বড়মামা যখন নারায়ণের সঙ্গে এইসব কথা বলছেন, তখন একটা নতুন মোটর-গাড়ি শাঁ-শাঁ করে এগিয়ে আসছে এই বাড়ির দিকে। গাড়ি চালাচ্ছেন সায়েবের মতো এক বাঙালি। পরনে কালো স্যুট। সাদা সিল্কের জামার ওপর কালো টাই। ঠোঁটে বাঁকা করে ধরা পাইপ। বড়মামা এসবের কিছুই জানতে পারছেন না। তিনি নারায়ণের সঙ্গে রাগারাগি করছেন। এদিকে নারায়ণের ইচ্ছায় একই সঙ্গে দুটো ঘটনা ঘটে চলেছে। ওইজন্যেই ভগবানের ওপর মানুষের এত বিশ্বাস বেড়ে যায়। একটা সাদা গাড়ি শাঁই-শাঁই করে আসছে, আর বড়মামা যে ভাঙা ঘরে বসে আছেন তার তলায় কড়ি-বড়গা থেকে চুনচুন করে চুনবালি খসে-খসে পড়ছে। নারায়ণ হাসছেন, বড়মামা রেগে-রেগে যা-তা বলছেন। আমি এখন বড়মামা বলছি বটে, বড়মামা তখন ছোট, আর মামাই হননি। কী করে হবেন! আমি না হলে, বড়মামা বড়মামা হবেন কী করে! আমার ওপর রেগে গেলে, আমি তো সেই কথাটাই বলি। মনে করিয়ে দিই।

    তখন হল কি, সাদা গাড়িটা বাড়ির সামনের মাঠে ঢুকল, আর তিনতলার ঠাকুরঘরটা ঝুপ করে ভেঙে পড়ে গেল দোতলার ঘরে। নারায়ণ, নারায়ণের বেদী, বড়মামা, পুজোর ঘট, কাঁসর, ঘণ্টা সব জড়ামড়ি করে তালগোল পাকিয়ে দোতলার শোবার ঘরের খাটের ওপর। হুম্মাড়, হুম্মাড় শব্দ শুনে যিনি যেখানে ছিলেন সবাই ছুটে এলেন। ধুলোয় চারপাশ অন্ধকার। ইট, টালি, পলস্তারা, কাঠকুটো। দরজা ঠেলে খোলা যায় না এমন অবস্থা। সাহসী যাঁরা তাঁরা ঠেলেঠুলে, টপকে-টাপকে ভেতরে দেখেন কি, ফটফট করছে রোদ। খাটের ওপর আমার বড়মামা চিত। এমনভাবে ঠাকুর তাকে ফেলেছেন, যেন মাপ করে, তাগ করে। মাথাটা বালিশে, পা দুটো তাকিয়ার ওপর, আর নারায়ণ তাঁর বুকের ওপর উপুড় হয়ে। যেন চার হাত দিয়ে বড়মামাকে জড়িয়ে ধরে রক্ষা করছেন। সকলে বড়মামাকে তুলবেন কি, হাঁ হয়ে গেলেন। সবাই সমবেত কণ্ঠে গাইতে লাগলেন, ‘জয় নারায়ণ পরম কারণ।’ নারায়ণ-নারায়ণ ধ্বনি মিলিয়ে যেতেই অনেকে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, ‘একটা ছবি তোলাবার ব্যবস্থা করো, করুণাময়ের এই করুণা ধরে রাখো, ধরে রাখো। খবরের কাগজের লোককে খবর পাঠাও।’

    বড়মামা ওঠার চেষ্টা করতেই সবাই হাঁহাঁ করে উঠলেন, ‘উঠো না, উঠো না, আমরা না বলা পর্যন্ত উঠো না।’

    আর ঠিক সেই সময় ফস করে একটা আলো চমকে উঠল। সবাই ফিরে তাকালেন। দরজার সামনে ইটের স্তূপের ওপর এক সায়েব। বুকের কাছে ক্যামেরা ঝুলছে। তিনি আদেশ করলেন, ‘গেট আপ বিমল। আমাকে তুমি চিনবে না। আই অ্যাম ইওর জ্যাঠামশাই। লং টুয়েলভ ইয়ারস গ্লাসগো থেকে পরশু ফিরেছি।’

    সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের সবাই চিৎকার করে উঠলেন, ‘প্রভু, প্রভু। কৃপা কৃপা।’

    সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে বড়মামাকে সেই বিলেত ফেরত ইঞ্জিনিয়ার জ্যাঠামশাই টেনে তুললেন। আর সেই যে তুললেন, বড়মামা ক্রমশই উঠতে লাগলেন, ওপরে আরও ওপরে, আরও আরও ওপরে। জ্যাঠামশাই বালিগঞ্জে বাংলো কিনলেন। এই বাড়িতে তাঁর যে অংশটুকু ছিল, বড়মামাকে লিখে দিলেন। দাসপাড়ায় বিশাল একটা ঝিল ছিল আমার মামাদের। সেটার নামই হয়ে গিয়েছিল, আত্মহত্যার ঝিল। কারও সঙ্গে কারও ঝগড়া হলেই যার বেশি অভিমান হত, এই ঝিলে এসে ঝুপুং করে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তারপর খোঁজ খোঁজ। কী যে সব বলত লোকে! বলত, এই ঝিলের তলায়, তোমরা জানো না ভাই, সাঙ্ঘাতিক সব কাণ্ড হয়ে আছে। বড়-বড় চেন দিয়ে মোহর-ভর্তি ঘড়া বাঁধা আছে। ঝিলের তলায় বড়-বড় সাত-আটটা কুয়ো আছে। যক্ষের কুয়ো। ঝিলে একবার ঝাঁপ মারলে তার আর উঠে আসার উপায় নেই। পা ধরে টেনে ওই কুয়োর মধ্যে নামিয়ে নিয়ে যায়। কেউ বলত ঝিলের তলায় গোটা একটা মন্দির আছে। সেই মন্দিরে মা কাত্যায়নীর সোনার মূর্তি আছে। অনেক রাতে আকাশপথে হিমালয় থেকে উঠে আসেন এক সন্ন্যাসী। তাঁর গা দিয়ে সোনালি জ্যোতি বেরোয়। তিনি ঝিলের ধারে এসে দাঁড়ালেই সব গাছ নুয়ে পড়ে। জল সরে গিয়ে দু’ভাগ হয়ে যায়। বেরিয়ে পড়ে ধাপ ধাপ সিঁড়ি। সন্ন্যাসী নেমে যান সেই সিঁড়ি ধরে। নেমে যাবার সঙ্গে-সঙ্গে জল আবার সরে আসে। মন্দিরে শুরু হয় পূজারতি। একটা আলোর রেখা উঠে নীচ থেকে ওপরে। মাঝখানে ভেসে ওঠে আলোর বিন্দু। একটা নয় অনেক। ঝিলের জলে মন্ত্র পড়তে শুরু করে। সকালে সবাই এসে দেখতে পায় রাশি-রাশি ফুল ভাসছে ঝিলের মাঝখানে। রাতে মরে গেলেও সেই জিলের ধারে কেউ যেত না। অশরীরীর ভয়ে। যারাই দুঃসাহস দেখিয়ে গেছে, তারাই পরের দিন পাগল। সেই পাগলদের লোকে বলত, ঝিল-পাগলা। তারা সারাদিন পথে-পথে ঘুরে বেড়াত আর বলত, ‘হায়, হায়, কী দেখলুম! হায়, হায়, কী দেখলুম!’ আমরা দিনেরবেলায় সেই ঝিল দেখেছি। উঃ, কী সুন্দর! কালো মিশমিশে জলে ঝিরিঝিরি ঢেউয়ের কোঁচ। যেন রুপোর টুকরো খেলছে। চারপাশে বড়-বড় গাছ। ঝুসঝুস শব্দ। ডালের আড়ালে-আবডালে কাটুম-কুটাম পাখির ডাক। টিরর-টিরর পোকার শব্দ। জায়গাটা একেবারে নির্জন, শীতল। গাছের মাথায়-মাথায় রোদ, তলায় ঘন ছায়া। ঝিলের জলের ধারে-ধারে পানিফলের চাষ। ফুটে আছে শালুক আর পদ্ম। কে কবে একটা নৌকো ভাসিয়েছিল, কোন সালে তা কে জানে। সেই নৌকোটা তখন আর ঘাটে বাঁধা ছিল না। ছাড়া ছিল। ভেসে বেড়াচ্ছিল, আপন মনে বাতাসে। কেমন মজা। কেউ কোথাও নেই, বিশাল ঝিলে রং-চটা একটা ভূতুড়ে নৌকো কখনও এই ঘাটে, কখনও ওই ঘাটে, কখনও মাঝখানে গোল হয়ে ঘুরছে। আমাদের কোনও ভয় করছিল না। ভূতের না, চোর-ডাকাতের না। কেবল মনে হচ্ছিল যদি একটা অজগর বেরোয়। যদি বেরিয়ে আসে একটা গুলবাঘ। আমরা কালীদার সঙ্গে ঝিলে যেতুম। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর। বিশেষ করে শীতকালে। ওখানে যেন আরও শীত ছিল। বর্ষাকালে কালীদা কোমর জলে নেমে ঝোপাঝোপা পানিফল তুলে আনতেন। আমি জিগ্যেস করতুম, ‘এই যে জলে নামলেন, কই আপনাকে তো পা ধরে টেনে নিয়ে গেল না!’ কালীদা বলতেন, ‘সব সময় টানার চেষ্টা করছিল, কিন্তু আমি যে মাকালীর মন্ত্র পড়ছিলুম, হুড় হুড় করে। মন্ত্রে-মন্ত্রে কোনও ফাঁক রাখিনি। ভেতর থেকে একেবারে শিকলের মতো বের করছিলুম টেনে-টেনে। তবে তোমাকে বলে রাখি, এই ঝিলটা খুব সহজ জায়গা নয়। অনেক রাতে তুমি কান খাড়া রাখলে শুনতে পাবে, টং টং, ঠং ঠং শব্দ। ঘড়া আর চেনে ঠোকাঠুকি।’

    বড়মামা জ্যাঠামশাই ঝিলটাকে বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন। বিক্রির টাকায় ভেবেছিলেন, বাড়িটাকে সরিয়ে দেবেন। না সারালে, ক্লাইভের আমলের তিনতলা প্রাসাদ একদিন পুরোটাই ভেঙে পড়ে যাবে। ঝিলটা কেউ কিনতেই চাইল না। ভয়ে! তা ছাড়া ঝিল কিনে করবেটা কী। মাছের চাষ! পাগল! ঝিলে প্রচুর মাছ এমনিই আছে। সেসব মাছ হল দেবীর মাছ। আমার মায়ের কাছে গল্প শুনেছি, ওইসব মাছের নাম ছিল। তীরে দাঁড়িয়ে নাম ধরে ডাকলে, মাছ ছুটে আসত। ‘মোহন এসো, এসো।’ জলে অমনি ঝাঁঝাঁ শব্দ। মোহন খপাং করে পায়ের কাছে মুখ তুলল। তার নাকে অমনি একটা সোনার নোলক পরিয়ে দেওয়া হল।

    ঝিল যখন বিক্রি হল না, তখন ভয় তাড়াবার জন্যে সায়েব-মানুষ বড়মামার জ্যাঠামশাই খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে সকলকে জানান দিয়ে মাছ ধরতে বসলেন। যত সব কুসংস্কার। গ্রামবাসী তোমরা দেখে যাও, আমি মাছ ধরব, সেই মাছ কেটে ফ্রাই করে, মাস্টার্ড দিয়ে খাব, তোমাদের খাওয়াব।

    মাথায় সোলার টুপি। সাদা হাফ প্যান্ট, সাদা স্পোর্টস গেঞ্জি। বড়মামার জ্যাঠামশাই মাছ ধরতে বসেছেন। বিলিতি ছিপ। বিলিতি হুইল। বিলিতি সুতো। আড়ালে-আবডালে মানুষের ভিড়। ভীষণ উৎকণ্ঠা। অবিশ্বাসী মানুষটির কী হয় কে জানে! মাছ শুধু ধরা নয়। ভেজে খাওয়া। কালীদা ছিলেন পাশে। চার, টোপ এইসব ঠিকঠাক করে দিচ্ছেন। বিশাল ফ্লাক্সে চা। বড়মামার জ্যাঠামশাই বিলেত থেকে ব্রেড বকস এনেছিলেন। তাইতে একশোটা স্যান্ডউইচ। বড়মামার জ্যাঠামশাই ছিপ ফেলতে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই কে যেন ‘ওহাহা’ করে হেসে উঠল। ‘কে হাসে?’ বড়মামার জ্যাঠামশাই ভীষণ অসন্তুষ্ট হলেন। বড়-বড় চোখে তাকালেন চারদিকে।

    কালীদা বুঝিয়ে দিলেন ব্যাপারটা। ‘মানুষে হাসেনি সাব। হেসেছে পাখি। এই পাখির নাম—উকো পাখি।’

    ‘আই সি।’ জ্যাঠামশাই সন্তুষ্ট হলেন। ‘ইফ ইট ইজ এ পাখি, আই হ্যাভ নাথিং টু সে।’

    বড়মামার জ্যাঠামশাই বাংলাটা তেমন বলতে পারতেন না। বাংলায় চলতে-চলতে হঠাৎ-হঠাৎ ইংরেজিতে হোঁচট খেতেন। ভাত, ডাল দেখলে চোখ ফেটে জল আসত। ফিস অ্যান্ড চিপস, ক্লাব স্যান্ডউইচ, ফিশফ্রাই, কাটলেট, এই সবই ছিল তাঁর খাদ্য। যাই হোক, বড়মামার জ্যাঠামশাই মাথার ওপর ছিপটাকে কায়দা করে ঘুরিয়ে জলে সুতো ফেললেন। এবার সেই উকো পাখিটা খকখক করে কেসে উঠল। বড়মামার জ্যাঠামশাই পাখিটাকে ঠিক সহ্য করতে পারছিলেন না। কিন্তু কী করবেন। শুধু বলে উঠলেন, ‘মোস্ট ডিস্টার্বিং।’

    পাঁচটা মিনিটও অপেক্ষা করতে হল না। মাছ গেঁথে গেল। কাঁইকাঁই শব্দ করে ভীষণ বেগে হুইল ঘুরতে লাগল। বড়মামার জ্যাঠামশাইয়ের চিৎকার, ‘ক্যাচ, ক্যাচ।’ সারা ঝিল একেবারে তোলপাড়। এ তো মাছ নয়, যেন বাছুর গেঁথেছে ছিপে। সাবমেরিনের মতো খেলে বেড়াচ্ছে জলের তলায়। মাঝে-মাঝে ডিগবাজি খাচ্ছে, তখন মাছের লেজটা জেগে উঠছে জলের তলায়। যেন উড়োজাহাজের লেজ। সবাই বলতে লাগল, বাঘা-ভালকোই লড়াই। হুইলের সব সুতো শেষ। তখন বড়মামার জ্যাঠামশাই মাছটাকে গুটিয়ে নিজের হাতের মুঠোয় আনার চেষ্টা করতে লাগলেন। মাছ ধরার না কি সেইটাই নিয়ম। কিছুটা টানার পরেই মাছ লাগাল টান। বড়মামার জ্যাঠামশাই ছিপসমেত সড়াক করে চলে গেলেন জলে। ছিপটা ছেড়ে দিলেই পারতেন। বড়মামার জ্যাঠামশাই বড়মামার চেয়েও একগুঁয়ে, একরোখা মানুষ ছিলেন। কথায়-কথায় বলতেন, ‘সারেন্ডার নট।’ মানে আত্মসমর্পণ কোরো না। একটু আগে তিনি মাছকে খেলাচ্ছিলেন, একটু পরে মাছই তাঁকে খেলাতে লাগল। হঠাৎ একসময় বড়মামার জ্যাঠামশাই তলিয়ে গেলেন জলের অতলে। ঝিলের মাঝখানে ফাতনার মতো ভাসতে লাগল, ‘উদ্ধার করো, উদ্ধার করো।’ কে উদ্ধার করবে! কার সাহস আছে জলে নামার? তখন সকলে সমবেত কণ্ঠে গাইতে লাগল, ‘ভব সাগর তারণ কারণ হে, গুরুদেব দয়া করো দীনজনে।’

    হঠাৎ একসময় অনেকটা দূরে বড়মামার জ্যাঠামশাই ভুশ করে ভেসে উঠলেন। হাতে ছিপও নেই, মাছও নেই। সাঁতার কেটে তীরে এসে একটা কথাই বললেন, ‘ডেনজারাস, ভেরি, ভেরি ডেনজারাস।’ ভয়ে-ভয়ে তাকাতে লাগলেন ঝিলের দিকে। গেঞ্জি ফালাফালা। মাছটা শরীরের এখানে-ওখানে আঁচড়ে দিয়েছে। একটু সামলে উঠে বললেন, ‘যা দেখে এলুম তলায়! মাথা ঘুরে গেছে আমার।’

    ‘কী দেখলেন? কী দেখলেন?’

    বড়মামার জ্যাঠামশাই বলেছিলেন, ‘আর-একবার না দেখলে আমি বলতে পারব না। অবিশ্বাস্য সব ব্যাপার হয়ে আছে।’

    ঝিল বিক্রি হবে না, এই সিদ্ধান্তই হল। বড়মামার বাড়ি তা হলে মেরামত হল কী করে। সেইটাই তো মজা। সেইজন্যেই তো বড়মামার কত হাঁকডাক। এই খাতির। সবাই বড়মামাকে এত ভালোবাসেন। সেই ছেলেবেলায় বড়মামার বাবা, মানে আমার দাদু স্বদেশী করতে গিয়ে পেঁচো-দারোগার গুলি খেয়ে ক্যান্টনমেন্টের কাছে মারা গেছেন। দিদিমা মারা গেছেন ম্যালেরিয়ার। কী মশা! কী মশা! সূর্য ডোবার পর মুখের ওপর চায়ের ছাঁকনি ধরে কথা না বললে, মুখে মশা ঢুকে চলে যেত টাগরায়। তখন কাসি আর কাসি। বড়মামার তখন কেউ নেই। ছোট-ছোট ভাইবোন। সেই অবস্থায় বড়মামার জ্যাঠামশাই এসে বসে খাট থেকে তুলেছেন। ঝিল বিক্রি হয়নি, হবে না। কোথায় টাকা, কোথায় টাকা! বাড়ি মেরামত হবে কী ভাবে! বড়মামার জ্যাঠামশাই প্ল্যানটা করে দেওয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছেন। বড়মামা মনখারাপ করে ঘুরছেন। নারায়ণকে খাটের ওপরেই প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিছানার ওপর পড়ার ফলে ঠাকুরেরও কিছু হয়নি, বেদীরও কিছু হয়নি। নারায়ণ খাটে, বড়মামা মেঝেতে।সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বই অনলাইনে কিনুন

    অনেক রাত। চিন্তায়-চিন্তায়, বড়মামা ঘুম আসছে না। চিন্তা তো হবেই। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাইবোনদের শুকনো মুখ দেখলে মনখারাপ হয়ে যায়। সকালে উঠে ছোটরা কত কী খায়! বড়মামা শুনতেন, ছোটবোন মেজোভাইকে বলছে, ‘আয় ভাই, এইবার আমরা একটু জল খাই।’ এইসব শুনলে বড়মামার বুক ফেটে যেত। রোজ রাতে শুয়ে-শুয়ে প্ল্যান করতে হত, কাল সকালে কী হবে! ভগবানই বড়মামাকে ডাক্তারির লাইনে ঠেলেছিলেন। চণ্ডীমণ্ডপের ভাঙা সিন্দুক থেকে হাতে লেখা একটা পুঁথি পেয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল, নানারকমের টোটকা ওষুধের ফর্মুলা। বড়মামা সেই পুঁথি দেখে তৈরি করেছিলেন বাতের তেল আর দাঁতের যন্ত্রণার গুঁড়ো। ওষুধ দুটোর ডিম্যান্ড হচ্ছিল একটু-একটু করে। বড়মামার কোনও লজ্জা, অহঙ্কার ছিল না। বাজারের একপাশে দাঁড়িয়ে, মুখে কাগজের চোঙা লাগিয়ে খুব বক্তৃতা দিতেন। গলা ভালো ছিল, খানিক ভজন গান গাইতেন। তারপর তুলে ধরতেন ওষুধ দুটো। বাত আর দাঁত। সকলে বলাবলি করত, জমিদারের ছেলে। দ্যাখো, দেখে শেখো। তা, বড়মামা শুয়ে-শুয়ে পরের দিন সকালের বক্তৃতা তৈরি করতেন মনে-মনে। দু’শো রকমের নাকি বাত আছে। বাবা, পৃথিবীতে এত সব আছেও বটে। বড়মামা এখন যেমন বলেন, যত না মানুষ তার চেয়েও বেশি রোগ।

    সেই রাতে বড়মামা মেঝেতে শুয়ে-শুয়ে গেঁটে বাতের বক্তৃতা মকশো করছিলেন। গেঁটেবাতে মানুষের সব শেষে কী অবস্থা হতে পারে। বাঁশের মতো গাঁট গাঁট শরীর। প্রত্যেকটা গাঁট জানান দেবে, আমি তোমার গাঁট। সব আঁট হয়ে এমন হয়ে যাবে তখন আর নড়তে-চড়তে হবে না। শোয়াও যাবে না, বসাও যাবে না, দাঁড়ানোও যাবে না। তখন যে কী হবে, যার হবে, সেই বুঝবে। পিতার নাম কাগজে লিখে পকেটে ফেলে না রাখলে মনেই থাকবে না। বড়মামা এখনও যেমন, তখনও তেমনই ছিলেন। ভয় দেখাবার একখানি। শুয়ে-শুয়ে এক বাজার লোককে গেঁটে বাতের ভয়ে যখন প্রায় অবশ করে ফেলেছেন, তখন খাটের ওপর কড়াং করে একটা আওয়াজ হল।

    এইবার বড়মামার ভয় পাবার পালা। খাটের ওপর বসে আছে নারায়ণ। তাঁর বেদীর ওপর। আওয়াজটা খাটের ওপরেই হল। তখন তো ইলেকট্রিক ছিল না। বড়মামা উঠে বাতি জ্বালালেন। ভেবেছিলেন, তীরের ফলায় চিঠি গেঁথে ডাকাতরা হয়তো ছুঁড়েছে। ‘সাবধান! কাল তোমাদের বাড়িতে ডাকাতি হবে। বিনীত বিশু।’ ঠাকুরদার আমলে এইরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল। ডাকাতরা ঠিক সময় এসেওছিল। সেই সময় ডাকাত আর বরযাত্রীদের সমান খাতির করতেন জমিদাররা। হালুইকররা এসে ভালোমন্দ খাবার তৈরি করত। কচুরি, রাধাবল্লভী, জিলিপি, কচি ভেড়ার কাবাব। শরবত। মঘাইপান। যেসব জমিদারের অনেক পয়সা, তাঁরা আবার বেনারস থেকে ওস্তাদ আনিয়ে কালোয়াতি গানের ব্যবস্থা করতেন। একদিকে ওস্তাদ আ-আ করছেন, আর একদিকে ডাকাতরা হাহা করছে। নায়েব-গোমস্তা পরিবেশন করছেন ছুটে-ছুটে। জমিদারমশাই জরির লপেটা, কাঁচি ধুতি, গিলে করা পাঞ্জাবি পরে ঘোরাফেরা করছেন। তদ্বির-তদারকি করছেন। মেয়েরা সব গায়ে গয়না চাপিয়ে, মুখে জর্দাপান ঠুসে বসে আছেন চিকের আড়ালে। সিঁড়ির মুখে হাতে দোনলা বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জমিদারের বড় ছেলে ব্রিচেস পরে।

    খাওয়া শেষ হবার পর, জমিদারমশাই জনে জনে জিগ্যেস করছেন, ‘খাওয়া প্রভূত পরিমাণে হল তো! সন্তুষ্ট তো!’ ডাকাতদের মুখে কালো তেলে-রং। চারদিকে ঝাড়লণ্ঠন জ্বললেও, মশাল ছাড়া ডাকাতি হয় না। তাই মশাল জ্বলছে এদিকে ওদিকে। ডাকাতরা যখন বলছে, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, যথেষ্ট খেয়েছি। এখন একটা চারপাই পেলেই গড়িয়ে পড়ি; কিন্তু আমাদের কর্তব্য বাকি আছে।’ তখন তাদের মুলোর মতো সাদা-সাদা দাঁতের সারি ফ্যাক-ফ্যাক করে উঠছে। এইসময় হেড-ডাকাত জিগির তুললেন, ‘হা রে, রেরে।’ তারপর জমিদার মশাইয়ের গালে ঠুস করে এক চড় মারবে। সেইটাই ছিল নিয়ম। সঙ্গে-সঙ্গে কুমারবাহাদুর আকাশের দিকে বন্দুক তুলে ব্লাম ব্লাম করে দু’বার ফায়ার করবেন। আর শুরু হয়ে যাবে মহা শোরগোল, দাপাদাপি। উঠোনে ডাকাতরা শুরু করবে ডাকাতে নৃত্য। কনসার্ট বাজতে থাকবে। মেয়েরা শাঁখে ফুঁ দেবে। ঘুমন্ত বাচ্চাদের টেনে তোলা হবে প্যাঁ-প্যাঁ করে কাঁদার জন্যে। তারপর এক সময় মশাল চিরে একে-একে সব বাড়ির আলো নিবিয়ে দেবে। শুধু জ্বলতে থাকবে মশাল। আরও কিছুক্ষণ তাণ্ডব চলার পর ডাকাতরা দেখতে পাবে জমিদারমশাইয়ের রাখা পুঁটলিটা। যেই একটা বাঁশি বাজবে অমনি ডাকাতরা পুঁটলিটা তুলে নেবে, আর ‘হে রে রেরে’ করে বেরিয়ে আসবে জমিদারের লেঠেলরা। ঠকাস ঠকাস করে তারা লাঠিতে লাঠি ঠুকতে থাকবে। উঠোন জুড়ে শুরু হয়ে যাবে তাদের লাঠি-নৃত্য। কুমারবাহাদুর এই সময় আবার দু’বার ফায়ার করবেন। ডাকাতরা তখন মাঠ-ময়দান ভেঙে ছুটতে শুরু করবে। হেড-ডাকাতের পায়ে রনপা। সে তখন অনেক দূরে; যেন একটা তালগাছ ফাঁকা মাঠের ওপর দিয়ে তীরবেগে ছুটছে। লেঠেলরা নানারকম চিৎকার করতে করতে তাদের পেছনে পেছনে কিছুদূর ছুটে মাঠে বসে পড়বে, দু-দশটা বিড়ি খাবে। লাঠিতে আচ্ছা করে তেল মাখাবে। নিজেদের গোঁফে মাখাবে মৌচাকের মোম। তারপর ‘জয় মা কালী, পাঁঠা বলি’, ‘জয় মা কালী পাঁঠা বলি’, বলতে বলতে ফিরে আসবে দেউড়িতে। রটে যাবে, অমুক জমিদারের বাড়িতে মস্ত এক ডাকাতি হয়ে গেছে। জমিদারের সম্মান বেড়ে যাবে।

    পরের দিন প্রজারা এসে পায়ের ধুলো নেবে। বাচ্চারা ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক তাকাবে আর ঝাড়লণ্ঠনের ভাঙা কাচ তুলে কোঁচড়ে ভরবে। যে যেমন পারবে জমিদারবাবুর পায়ের কাছে টাকার তোড়া রাখবে। রাখবে লাউ, কুমড়ো, মোচা, কাঁচকলা, বড়-বড় রুইমাছ। জমিদারবাবু মিছিমিছি হাতে একটা ব্যাণ্ডেজ বেঁধে হাতটা ঝুলিয়ে রাখবেন গলা থেকে বুকের কাছে। দিকে-দিকে রটে যাবে, জমিদারবাবু একা লড়াই করে সাতটা ডাকাত ঘায়েল করেছেন। তাদের লাশ পায়ে পাথর বেঁধে ফেলে দেওয়া হয়েছে আত্মহত্যার ঝিলে।

    প্রজারা চলে যাবার পর আসবেন ভবতারিণী মন্দিরের পুরোহিত। জমিদারবাবুর কপালে লেবড়ে দেবেন মায়ের পায়ের সিঁদুর। যাবার সময় তাঁর পেছন-পেছন চলবে দড়িতে বাঁধা সাতটা নধর পাঁঠা। আগে-আগে চলেছেন পুরোহিতমশাই, হাতে একটা পাতাসমেত বটের ডাল নাচাতে-নাচাতে। পেছনে নাচতে-নাচতে চলেছে সাতটা পাঁঠা, ব্যা-ব্যা করে কালোয়াতি গান গাইতে গাইতে। একটু পরেই শুরু হবে বলি। জমিদারের কল্যাণে। ওঁ ক্রীং, খ্রীং, ঘ্রীং ঘ্যাচাং। পুরোহিতমশাই নিজের জন্যে কিছুটা রেখে বাকি ঝুড়িটা পাঠিয়ে দেবেন জমিদারমশাইয়ের রান্নাঘরে। দুপুর থেকেই আসতে থাকবেন প্রতিবেশী জমিদাররা বীরত্বের খবর নিতে। সূর্য ডোবার সঙ্গে-সঙ্গে বসে যাবে খানাপিনার আসর। পশ্চিমী ওস্তাদ গান ধরবেন আর পীড়নবাঈ নাচতে থাকবে ধিতিং ধাতাং ধিতিং।

    বড়মামার তখন টর্চলাইট ছিল না। সাইকেল, মোটর কিছুই ছিল না। বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। মাথার কাছে একটা দেশলাই, একটা কুপি, একটা হাতপাখা, একটা ঝাঁটা, আর-একটা লোহার রড নিয়ে শুতেন। কুপি জিনিসটা ভারি মজার। আমাকে একটা বড় মুখঅলা শিশি দিলে এখনই করে দেখাতে পারি। কালির দোয়াতে খুব সুন্দর হয়। ঢাকনায় একটা ফুটো করব। একটা সলতে পাকিয়ে চালিয়ে দেব তার মধ্যে দিয়ে। ভেতরে থাককে কেরোসিন। হয়ে গেল কুপি। বড়মামা ছেলেবেলার সেই কুপিটা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দিয়েছেন। মাঝে-মাঝে সেটাকে বের করে বলতে থাকেন, ‘মন ভুলে যেও না, একসময় তোমার জীবনের আলো ছিল এই কুপি। আজ তোমার ফ্যান, ফোন, ফ্রিজ হয়েছে বলে মেজোর মতো অহঙ্কারে মটমট কোরো না।’ সব উপদেশেই বড়মামা মেজোমামাকে টেনে আনবে উদাহরণ হিসাবে। মাসিমা বলেন, ‘একেই বলে পায়ের ওপর পা দিয়ে ঝগড়া করা।’ বড়মামা ঝাঁটাটা রাখতেন ভূতের ভয়ে আর লোহার ডাণ্ডাটা রাখতেন সাপের ভয়ে। এখন রাতে খাওয়াদাওয়ার পর আমাদের যে গল্পের আসর বসে, সেই আসরে অতীত দিনের গল্প বলতে-বলতে বড়মামা একটা কথা প্রায়ই বলেন, ‘অর্থের চেয়ে অনর্থ আর দুটো নেই। তখন আমার বাড়ির দরজা ছিল না, জানলা ছিল না, মাথার ওপর আধ-ভাঙা ছাদ, সিন্দুক নেই, স্টিল আলমারি নেই, কিছুই নেই, চোর-ডাকাতের ভয় নেই। মনের আনন্দে ঘুম। চারপাশ দিয়ে হু-হু করে বাতাস ঢুকছে। বাতাস আবার দেওয়ালের ফুটোর মধ্যে দিয়ে আসার সময় বাঁশি বাজাত। এক-এক ফুটোর মধ্যে দিয়ে আসার সময় এক-এক সুর। সা-রে-গা-মা। চিত হয়ে শুয়ে আছি, ভাঙা ছাদে আটকে আছে আকাশের তালি। জ্বলজ্বলে তারা তাকিয়ে আছে আমার দিকে, শুক্লপক্ষে রাত বারোটার সময় মেঘের রুমাল ওড়াতে ওড়াতে আমাকে দেখতে আসত চাঁদ—হ্যালো, বিমল। আর আজ আমাদের কী অবস্থা। চোরের মতো। চারপাশে দশফুট উঁচু জেলখানার পাঁচিল। তার ওপর লোহার আল। বাড়িতে সাত-সাতটা কোলাপসিবল গেট। মাঝরাতে খুট করে কোথাও একটা শব্দ হলেই মেজো অমনি হেঁড়ে গলায় চিৎকার জুড়ে দেয়, ‘কে, কে, কৌন হ্যায়? এমন গর্দভ? ওর ধারণা চোর আর ডাকাতরা হিন্দি ছাড়া আর কোনও ভাষা বোঝে না। আরে ঘরে খিল এঁটে, ‘কৌন, কৌন’ না করে বেরিয়ে আয়। বেরিয়ে এসে দ্যাখ। ভীতু কোথাকার! আসলে তা নয়, বুঝলি তো কুসি, মানুষ যত বড়লোক হতে থাকে, ততই তার ভয় বেড়ে যায়। জীবনের ভয়, ধনসম্পত্তি হারাবার ভয়। অসুখের ভয়। অ্যাকসিডেন্টের ভয়।’

    বড়মামার এই কথায় কিছুক্ষণের জন্যে বড়মামার ছেলেবেলার গল্প ভণ্ডুল হয়ে যেত। মেজোমামা বসেন একটা দোল-দোল চেয়ারে। সামনে পেছনে হালকা চালে দুলতে-দলুতে গল্প শোনেন। পরনে সাদা ঢোলা পাজামা, পাঞ্জাবি। কোলের ওপর কালো ফ্রেমের চশমা। মেজোমামার দোল-দোল থেমে গেল। প্রতিবাদ করে উঠলেন, ‘কতবার তোমাকে বলেছি বড়দা, আমি এখন বিশাল বড় হয়ে গেছি। আমাকে গর্দভ বোলো না। আমার মান-সম্মানে ভীষণ লাগে। ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা আমাকে স্যার বলে।’

    বড়মামা অমনি তাঁর হাঃ হাঃ হাসি দিয়ে মেজোমামাকে ঠান্ডা করে দেন, ‘আরে, গাধা এ-গর্দভ তোর ধোপার গাধা, বোকা গাধা নয়, এ হল আমাদের ফ্যামিলির আদরের গাধা।’

    এরপরই আমার বড়মামার সেই এক কথা, ‘বল তো কুসি, কী করে আবার সেই পুরনো দিনে ফিরে যাওয়া যায়!’

    মাসি অমনি বলবেন, ‘আর তো সম্ভব হবে না বড়দা? তোমরা এখন পয়সার স্বাদ পেয়ে গেছ। মানুষখেকো বাঘ কি আর আলোচাল-খেকো হতে পারে!’

    বড়মামা দুঃখ-দুঃখ মুখে বলবেন, ‘কি করে যে আবার গরিব হওয়া যায় কুসি?’

    মেজোমামা অমনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবেন, ‘কতদিন যে আমার খিদে পায়নি? সেই গরিবের খিদে! কী খাই কী খাই করে সারা বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। মুড়ির টিনে মুড়ি নেই। ভাতের হাঁড়িতে ভাত নেই। কোথাও এক টুকরো শুকনো রুটি নেই। ক্ষুধার্ত বেড়ালের মতো এ-ঘরে, ও-ঘরে, সে-ঘরে। পেয়ারা গাছের ফুলকুচি পেয়ারা ফাঁক। বাসনমাজার তেঁতুল, তাই, তাই সই। পাকা তেলাকুচো। সে কী খিদে। এখন খিদের আগেই খাবার, তার ওপর খাবার, খাবারের ওপর খাবার। আর পারছি না রে কুসি। কুসি তাও দিয়ে যাচ্ছে।’

    মেজোমামা প্রায় কেঁদে ফেলেন আর কি। বড়মামা অমনি বলবেন, ‘দুঃখ, করিসনি মেজো। কী আর করবি বল, যার যেমন বরাত ভাই? এই তো দ্যাখ না, আমি কতদিন ভেলিগুড়ের গোঁদো চ্যাটচ্যাটে মুড়কি খেতে পাইনি। ছোলার পাটালি খাইনি। ছাতু খাইনি। ঠান্ডা ফুলুরি খেয়ে অম্বলে গেলাসের পর গেলাস জল খাইনি। অম্বল হলে জল খেতে কী ফ্যান্টা লাগে জানিস? কী করবি ভাই? সকালে তোকে চা খেতে হবেই। চা খালি পেটে খাওয়া যায় না। কুসি অ্যালাউ করবে না। দুটো পাউডার পাফ বিস্কুট তোকে খেতেই হবে।’

    মেজোমামা সংশোধন করে দিলেন, ‘পাউডার পাফ নয়, লেমন পাফ।’

    ‘ওই হল? তারপর ব্রেকফাস্ট তো ভাই জল খেয়ে হয় না। যার যা নিয়ম! দুটো ডিম, হয় পোচ, না হয় ওমলেট? দু’পিস টোস্ট। একটা কলা। কর্ন-ফ্লেকস। থাকবেই থাকবে। কান্ট হেল্প। যে পুজোর যা উপচার। শুধু ব্রেকফাস্ট খেয়ে পৃথিবীর কেউ বাঁচতে পারে না; তা হলে লাঞ্চ শব্দটা এল কোথা থেকে। লাঞ্চে তোমার টেবল-রাইস, মাছ, মাংস, ভেজিটেবল। ডেসার্ট থাকবেই। কান্ট হেলপ। বিকেলে তোমাকে চা নিতেই হবে। সামান্য স্ন্যাকস। রাতে ডিনার। বলো, এর হাত থেকে বাঁচার কোনও পথ আছে? কে তোমাকে বাঁচাবে ভাই?’

    এই গল্পের আসরেই বড়মামা সেই ঠাকুরঘর ভেঙে নারায়ণ বুকে নিয়ে দোতলার ঘরে খাটের ওপর পড়ে যাবার গল্পটা যে কতবার বলেছেন আমাদের। বলে-বলেও পুরনো হয়নি। যত শুনি ততই ভালো লাগে। মেজোমামা বলেন, ‘গাছে যেমন রোজ রোজ নতুন পাতা পেরোয়, বড়মামার গল্পের গাছেও সেইরকম রোজই নতুন নতুন গল্পের পাতা বেরোয়। এইটাই ইন্টারেস্টিং। সাতদিন আগে যা শুনেছি সাতদিন পরে তাইতে নতুন ফ্যাকড়া। ভদ্রলোক ডাক্তারি না করে কলম ধরলেও নাম করতে পারত।’

    মাঝরাতে কড়াং করে শব্দ। বড়মামা ভেবেছিলেন, তীরের ফলায় চিঠি ফুঁড়ে ডাকাতরা ঘরে ছুঁড়েছে। ঘুমের ঘোর কেটে যাবার পর মনে হল ধুস, রঘুডাকাত, বিশুডাকাতের যুগ কবে শেষ হয়ে গেছে। আর এই বাড়িতে ডাকাতি করার আছেটা কী। ভাঙা ইট, বালি, চুন, সুরকি! দেশলাই জ্বেলে মাথার কাছে রাখা কুপিটা জ্বাললেন। লোহার ডাণ্ডাটা হাতে নিলেন। বলা যায় না, সাপখোপ হতে পারে। কুপিটা তুলে ধরলেন খাটের দিকে। অবাক কাণ্ড, নারায়ণ ঠাকুরের পায়ের দিকের একটা অংশ খুলে পড়ে গেছে। আর সেই ফুটো গলে এক গাদা গোল-গোল সোনার চাকতির মতো কী বেরিয়ে এসে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আছে। সব মোহর। সেই রাজার আমলের চাঁদির চাকতি। পরের দিন সকালে বড়মামার সায়েব জ্যাঠামশাই এসে বললেন, ‘ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে। আত্মহত্যার ঝিল বিক্রি হল না ভেবে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। আর আমাদের পায় কে? আমার প্ল্যান রেডি, বোলাই মিস্ত্রি।’

    বড়মামার জ্যাঠামশাই বাড়িটার কিছু ঝরিয়ে, কিছু গড়িয়ে এমন একটা ব্যাপার করে দিলেন, দেখে সকলের তাক লেগে গেল। বাড়ি উঠল। বড়মামা উঠলেন। জ্যাঠামশাই বড়মামাকে ডাক্তার করে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বেরিয়ে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে। এই বাড়িতে, বসার ঘরে বড়মামার জ্যাঠামশাইয়ের বিশাল একটা তৈলচিত্র আছে। একেবারে পাক্কা সায়েব। মুখে পাইপ। পায়ের কাছে বাঘের মতো বিশাল একটা কুকুর। বড়মামা জ্যাঠামশাইকে ভীষণ শ্রদ্ধা করেন। তেমনি ভালোবাসেন। গভীর রাতে শুতে যাবার আগে ছবিটার সামনে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন স্থির হয়ে। তারপর মিলিটারি কায়দায় স্যালুট করে শুতে চলে যান। আমি আর বড়মামা একই ঘরে শুই। শুয়ে-শুয়ে বড়মামা বলতে থাকেন, ‘গাড়ি যেমন পেট্রোলে চলে, মানুষ তেমনি চলে আশীর্বাদে। পূর্বপুরুষেরা আশীর্বাদ না করলে জীবনকে চালাতে হয় ঠেলে ঠেলে।’

    আমি জিগ্যেস করলাম, ‘আমার পূর্বপুরুষ আছে বড়মামা?’

    ‘পূর্বপুরুষ ছাড়া মানুষ হয় বোকা! তোর পূর্বপুরুষ হলাম আমি। জলজ্যান্ত তোর পাশে খাটে শুয়ে আছি। তোর আরও পূর্বপুরুষ আছে, তবে একেবারে সাক্ষাৎ পূর্বপুরুষ হলুম আমি। আমাকে ভক্তিশ্রদ্ধা করবি। আমি চলে যাবার পর আমার ছবিতে মালা দিবি।’

    ‘আর আমাদের সর্বপ্রথম পূর্বপুরুষ হল বাঁদর। তাই তো?’

    ‘সেটা তোর হতে পারে, আমার নয়। আমি স্ট্রেট একেবারে ভগবানের কাছ থেকে আসছি। আমার স্বভাব-চরিত্র দেখে তাই মনে হয় না কি? আমার কী রকম একটা ভাব আছে, তাই না। তুই বুঝতে পারিস না?’

    ‘পারি তো। একেবারে খামখেয়ালি।’

    ‘তাই তো! ভগবান নিজেই তো খামখেয়ালি। কখন কী যে করে বসেন?’

    বড়মামা বাজার থেকে ফিরে এলেন প্রায় ঘণ্টাদুয়েক পরে। সে এক কাণ্ড! বড়মামা আসছেন আগে-আগে, পেছন-পেছন আসছে কীর্তনিয়ার দল। তা প্রায় সাত-আটজন হবে। আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখছি। বারান্দায় দাঁড়াবার কারণ ছিল। এত দেরি হচ্ছে দেখে আমি আর মাসিমা চটি পায়ে দিয়ে রেডি হয়েছিলুম খুঁজতে বেরোবার জন্যে। মাসিমার আবার প্রেশারটা মাঝে-মাঝে চড়ে যায়। বড়মামা আর মেজোমামাই হাই প্রেশারের কারণ। মাসিমা একেবারে রেগে ফায়ার হয়েছিলেন। নিমন্ত্রিত একজন খাবেন। এ-বাড়িতে কাউকে খাওয়াতে হলে তাকে একেবারে খাইয়ে শেষ করে দেওয়া হয়। খেতে-খেতে তিনি একসময় কেঁদে ফেলেন। হাতজোড় করে বলতে থাকেন, ‘বিশ্বাস করুন, আমি আর পারছি না। আমার পেটে আর জায়গা নেই। আমি পেট ফেটে মরে যাব।’

    বড়মামা অমনি বললেন, ‘ছিঃ ছিঃ, কী অবৈজ্ঞানিক কথা। পেট আর বেলুন এক জিনিস। যত ফোলাবেন তত ফুলবে। পেট এমন এক বেলুন, যা ফাটে না। পেটটা একটু টাইট হবে। এই আর কি। আমার পিতামহ যখন আহারাদি শেষ করে উঠতেন, পরিমাণ মতো খাওয়া হল না কি পরীক্ষা করার জন্যে একটা পদ্ধতি ছিল। পিতামহ যে খাটে শুতেন, সেই খাট থেকে মাথার দিকের দেওয়ালের মাঝে চারফুটের মতো একটা ফাঁক ছিল। আহারের পর সেই ফাঁক দিয়ে সহজে অনায়াসে গলে যেতে পারলে পরিমাণ ঠিক হয়নি। আর ভুঁড়ি আটকে গেলে পরিমাণ ঠিক হয়েছে। নিন, নিন, আর তো মাত্র তিন-চারটে আইটেম বাকি আছে। কৌটো বাঁকানোর মতো শরীরটা ঝাঁকিয়ে নিন।’ বড়মামা একদিন আমাকে একটা গল্প বলেছিলেন, রোম যখন সভ্যতার একেবারে তুঙ্গে, সেইসময় রোমান রাজপুরুষদের খাওয়ার গল্প। বিশাল টেবিলে সব খেতে বসেছেন। প্রত্যেকের পায়ের কাছে একটা করে ঢাকা পাত্র। ক্রীতদাসরা পরিবেশন করছে। একের-পর-এক আইটেম আসছে। আসছে তো আসছেই। আর সে তোমার গিয়ে আমাদের মতো ভাত, ডাল, আলুভাতে নয়। মাছ, মাংস, দুম্বা, স্নপ, সস, গোরু, ভেড়া, ছাগল, শূকর। ধপাধপ টেবিলে এসে পড়ছে। রোমান রাজপুরুষরা খেতে-খেতে কাত হয়ে পড়ছেন। আর ঢাকাপাত্রের রহস্যটা হল, পেটে চাপ পড়ার ফলে অনেকেরই বেগ এসে যাচ্ছে। তাঁরা পেটখালি করে আবার খাওয়া শুরু করছেন। কী অসভ্য কাণ্ড!

    সেই বাড়ির নিমন্ত্রণে বড়মামা গেছেন বাজারে বাজার করতে। মিনিমাম সাঁইত্রিশ পদ রান্না তো হবেই। আর সেই বড়মামা বেপাত্তা। মাসিমা বারান্দায় পায়চারি করছিলেন আর বলছিলেন, ‘দুভাই দুটি অবতার! কাণ্ডজ্ঞান নেই, সময়জ্ঞান নেই। ইরেসপনসিবল।’ আর ঠিক সেই মুহূর্তে বড়মামার আবির্ভাব। কীরকম আবির্ভাব? না নিমাই প্রভুর মতো? নদীয়ার পথ ধরে আসছেন কীর্তনে লিড করে।

    কীর্তনের দল তারস্বরে গাইছেন, ‘আমি প্রেমের ভিখারি, কে প্রেম বিলায় এই নদীয়ায়?’ আর সে কী খোলবাদ্য? কলাপ-কলাপ করে। আর কীর্তন এমন জিনিস না নেচে পারা যায় না। বড়মামা তো বড় ডাক্তার। চিকিৎসার পদ্ধতিও অদ্ভুত। কারও কোমরে বাত হলে প্রেসক্রিপশন করে, হরিসভা। রোগী ওষুধের দোকান থেকে ফিরে আসে।

    ‘ডাক্তারবাবু প্রথম ওষুধটাই তো নেই? ওর বদলে একটা কিছু…।’

    ‘ওর তো বদল হয় না ভাই। সকাল-সন্ধে হরিসভায় যাবে আর কীর্তনের সঙ্গে-সঙ্গে দু’হাত তুলে শরীর দুলিয়ে নাচবে। ফর লাইফ। বাকি জীবনটা এইভাবেই কাটাবে। বাতের বাপও তোমার কিছু করতে পারবে না।’

    বড়মামার ওই আগমন দেখে, মাসিমা বললেন, ‘সেরেছে। এ দেখি বাজার থেকে কীর্তন কিনে নিয়ে এল? নাও, এইবার বোঝো ঠ্যালা? বাবুর হাতে তো খুনজুনি। ব্যাগফ্যাগ কিছুই তো নেই।’

    ‘ওই তো?’ বলেই দেখি, সব শেষে আসছে তিনজন ঝাঁকামুটেঅলা, ‘মাসিমা, ওই দ্যাখো।’ সবশেষে বাঁক কাঁধে একজন। তার বাঁকের একদিকে ছানা, আর একদিকে দইয়ের ভাঁড়। কীর্তনের দল বাগানে এসে ঢুকল। সেখানে ঘুরে-ঘুরে নাচ হল। সঙ্গে গান, ‘যে যত চায়, সে তত পায়, আমি প্রেমের ভিখারি কে প্রেম বিলায় এই নদীয়ায়!’

    খোল আর খঞ্জনির খচাখাঁই শব্দ, সেইসঙ্গে দশজন পুরুষের সমবেত চিৎকার। মেজোমামা ভুরু কুঁচকে মারমুখী হয়ে বেরিয়ে এলেন, ‘স্টপ স্টপ। না চেঁচালেও পয়সা পাবে। পয়সা পাবে।’

    আমি জানি মেজোমামার কীর্তনে অ্যালার্জি আছে। পাড়ায় অষ্টমপ্রহর হলে, মেজোমামা বসিরহাটের বাগানবাড়িতে চলে যান। মেজোমামা বলেন, ‘কীর্তনের কামড়ের চেয়ে, মশার কামড় ঢের ভালো।’

    মেজোমামার ধমক শুনে বড়মামা বারান্দার সামনে মাথা নিচু করে এসে দাঁড়ালেন। বৈষ্ণবরা যেমন করেন, মাথায় খঞ্জনি রেখে অবিকল সেইরকম গলায় বললেন, ‘জয় নিতাই।’

    বড়মামাকে তো সহজে চেনা যাচ্ছে না। বাজার করার নরম সাদা থলিটাকে ভাঁজ ভাঁজ, পাট পাট করে টুপির মতো মাথায় পরেছেন। ঠিক মনে হচ্ছে ব্রহ্মচারী।

    দুই
    মাসিমা রেগে গেলে র‍্যাণ্ডাম ইংরিজি বলেন। কীর্তনিয়াদের দল থেকে বড়মামাকে আড়ালে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘হোয়াট ইজ দিস? আই ওয়ান্ট টু নো হোয়াট ইজ দিস?’

    বড়মামা মাসিমাকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। প্রায় জোড়হাত করে। কীর্তনিয়ার দল খ্যাংখ্যাং করে খঞ্জনিতে বিকট শব্দ তুলে নীরব হলেন। মনে হল, এইমাত্র পৃথিবীর সবাই যেন একসঙ্গে মরে গেল। মেজোমামা বললেন, ‘আঃ, কি শান্তি! সত্যিই কী শান্তি! বাতাসের শব্দ, পাখির ডাক, এমনকী নিজের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে।’

    কীর্তনদলের হেড বললেন, ‘স্বরূপ দেখে মনে হচ্ছে আপনি এই বাড়ির মেজোকর্তা। ঠিক বটে?’

    মেজোমামা বললেন, ‘ঠিক বটে।’

    ‘আর, বড়কর্তা বলছিলেন, আপনি বিধর্মী। আপনার মনের পরিবর্তন করতে হবে। মাছ, মাংস আর ডিম্ব এই তিন ম্লেচ্ছ সংসর্গ থেকে উদ্ধার করতে হবে। তা করে দেব। কী আছে! প্রভুর কৃপায় সবই সম্ভব। চব্বিশ ঘণ্টা এই নাম শুনলে মিলিটারি সায়েবও রসকলি ধারণ করে ঘোর বৈষ্ণব হয়ে যাবে, নামের এমন মাহাত্ম্য।’

    কথা শেষ করে তিনি ইশারা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে খচাখাঁই, খচাখাঁই খোলকরতাল বেজে উঠল। আর সবাই নাচতে লাগলেন, ‘প্রেমদাতা নিতাই বলে, বোল হরি হরি বোল। প্রেমদাতা নিতাই বলে।’ মেজোমামাও নাচছেন, তবে অন্য তালে। গানও গাইছেন, তবে অন্য গান। ‘চুপ চুপ। একদম চুপ। চুপ চুপ, একদম চুপ।’

    কে কার কথা শোনে। যাঁরা কীর্তন করছেন, তাঁদের কানে কিছুই ঢুকছে না। ঢোকার উপায়ও নেই। ইতিমধ্যে বড়মামার আটজাতের আটটা কুকুর বেরিয়ে এসেছে। কুকুররা দেখছি কীর্তন একেবারে সহ্য করতে পারে না। তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করছে। শ্যামাসঙ্গীত শুনলে এইরকম করে না কিন্তু। ঘাড় বেঁকিয়ে কান খাড়া করে সমঝদার শ্রোতার মতো বেশ শোনে।

    মেজোমামাকেও থামানো যাচ্ছে না। তিনি চুপ চুপ করতে শেষমেষ ‘চোপ, চোপ’ বলতে শুরু করেছেন। অবশেষে চিৎকার, ‘পোলিশ, পোলিশ।’ মেজোমামা রেগে গেটের দিকে এগোতে এগোতে বললেন, ‘আমি থানায় চললাম। কোনও ভদ্রলোকের পক্ষে এই অত্যাচার সহ্য করা শক্ত। আমি একটা ডায়েরি করে আসি।’ কিন্তু গেট পর্যন্ত যেতে পারলেন না। কীর্তনিয়ারা ঘিরে ধরল। মূল গায়েন মেজোমামার ডান হাত ধরে ওপর দিকে তুলে নিজেও নাচছেন, আর মেজোমামাকে নাচাচ্ছেন। সমানে গেয়ে চলেছেন, ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম, হরে রাম, রাম রাম হরে হরে।’

    মাসিমার সঙ্গে কথা শেষ করে, বড়মামা বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর ভাব এসে গেছে। থেকে থেকে বলছেন, ‘হরি বোল। হরি হরি বোল। হরি বোল।’ এদিকে মেজোমামা নাচের চোটে গলগল করে ঘামছেন। মেজোমামা একটু সুখী মানুষ। বেশি পরিশ্রম তাঁর সহ্য হয় না। ছোট একটা ভুঁড়ি আছে। পাঞ্জাবির তলায় সবটাই বেশি নাচছে, থলথল, ধলধল করে। মেজোমামা একসময় থ্যাস করে পড়ে গেলেন। বড়মামা চিৎকার করে উঠলেন, সমাধি, সমাধি হয়েছে, সমাধি। আমাদের বংশে এই প্রথম। ফার্স্ট টাইম ইন আওয়ার ফ্যামিলি।’

    মেজোমামা আধবোজা চোখে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘সমাধি নয়, সমাধি নয়, হার্ট অ্যাটাক। করোনারি থ্রম্বোসিস।’ বাঁকি আর ঝাঁকাঅলারা বলছে, ‘আমাদের ছেড়ে দিন বড়বাবু।’

    মাসিমাকে জিগ্যেস করলুম, ‘এটা কি হচ্ছে মাসিমা? বড়মামা তো তারা তারা করতেন। আজ হঠাৎ হরি হরি!’

    মাসিমা যা বললেন, তা একবার বড়মামার পক্ষেই করা সম্ভব। মাছের বাজারে ঢুকে দেখেন দর যাচ্ছে, পঁতাল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট। বড়মামার আটটা কুকুরে রোজ প্রায় আস্ত একটা পাঁঠা খেয়ে ফেলে। এর ওপর গোটা কুড়ি ‘গেস্ট’ বেড়াল আছে। ঠিক একটা থেকে দেড়টার মধ্যে সব লাইন দিয়ে এসে বসে। যেন মধ্যাহ্ন ভোজনের নিমন্ত্রণের কার্ড পেয়ে এসেছে। রোজ তিন কেজির মতো মাছ লাগে। সব মিলিয়ে খরচের বহর দেখে বড়মামার মাথা ঘুরে গেছে। তাই তিনি মাছের বদলে, মাংসের বদলে, ছ’রকমের ডাল কিনেছেন, চার কেজি ঘিয়ের টিন কিনেছেন। বাজার ঝেঁটিয়ে আনাজ কিনেছেন। এক বাঁক ছানা আর দই কিনেছেন। কিনে ফেরার পথে মোচ্ছবতলায় কীর্তন দলের সঙ্গে দেখা। তাঁরা খোলটোল বেঁধে, টগরটগর শব্দে রেলা নিচ্ছিলেন। বিরাটিতে বায়না ছিল আজ। বড়মামার মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। মাছ, মাংস, ডিম, পেঁয়াজ প্রভৃতি আঁশটে জিনিস ত্যাগ করলুম বললেই তো আর ত্যাগ করা যায় না, মন পালটাতে হবে। তার জন্যে একটা অনুষ্ঠান চাই। প্রস্তুতি চাই। বাড়িতে তিনদিন, লাগাতার কীর্তন লাগাও আর কাঁচকলার গুলিকাবাব, ছানার কালিয়া, দইকলার ফলার খাও। কীর্তনে কুকুরদেরও স্বভাব বদলে যাবে। তারাও ফলার খেতে শিখবে।

    মাসিমা টাকা দিয়ে ঝাঁকা মুটেদের বিদায় করলেন। ভাঁড়ারে পর্বতপ্রমাণ জিনিসপত্র। মাসিমা তার মাঝখানে বসে আছেন মাথায় হাত দিয়ে। রোজ দু’বেলা, তিনদিনে ছ’বেলা। এই কতজন লোককে রেঁধে খাওয়াতে হবে। উনুন থেকে ভাতের হাঁড়ি নামাতে কপিকল লাগবে। একা আনাজ কুটতে হলে একটা দিন চলে যাবে।

    মাসিমা আমাকে বললেন, ‘একটা ট্যাক্সি ডেকে দিতে পারিস?’

    ‘কী করবে ট্যাক্সি?’

    ‘আমি চলে যাব। অনেকদিন ধরেই ভাবছি চলে যাবার কথা। আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না এই পাগলাগারদে থাকা।’

    ‘কোথায় তুমি যাবে?’

    ‘আমার বন্ধু বাসন্তীদের বাড়িতে কিছুদিন থাকি, তারপর যা হয় ভাবা যাবে।’

    ‘তখন আমরা কী করব?’

    ‘সাপের পাঁচ পা দেখবে। যা প্রাণ চায় তাই করবে। পাগলদের পাগলামি দেখবে। তাদের তালে তাল দেবে। তোমার তো পোয়াবারো।’

    বড়মামা তখন মহা উৎসাহে কীর্তনের দলকে বসাবার ব্যবস্থা করছেন। ঘেরা বারান্দায় মোটা গালচে পড়েছে। বড়মামার ডান হাত মাসিমার কথার অপকর্মের শাগরেদ মুকুন্দ খুব তড়বড় করছে। মুকুন্দর চেহারাটা ঠিক ডাংগুলির মতো। কালো তেল চুকচুকে চেহারা। মাথায় ভীষণ মোটা, কালো কোঁকড়া চুল। মুকুন্দ চপচপে করে সরষের তেল মাখে সারা গায়ে, মাথায়। ওর ঘরে বড়মামার দেওয়া, বড় ওষুধ কোম্পানির একটা আয়না দেওয়ালে ঝোলানো অছে। মুকুন্দ চান-টান করে সেই আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আমি তখন আড়াল থেকে দেখি। বেশ লাগে দেখতে। যেমন চুল তেমনি চিরুনি। মোটা, চ্যাপ্টা বিস্কুটের মতো দেখতে। সাঙ্ঘাতিক মোটা দাঁড়া। বেলঘরের রথের মেলা থেকে কেনা। সাঁওতালি চিরুনি। আয়নার সামনে মহিষাসুরের মতো দাঁড়ায় মুকুন্দ। তারপর সে এক যুদ্ধ। চুলের সঙ্গে চিরুনির লড়াই। তেলজল ছিটকে ছিটকে আয়নার কাচ দেখতে দেখতে ছাপসা হয়ে যায়। মুকুন্দর চুল আর ঠিক হয় না। মুকুন্দ কখনও নাচছে। কখনও যোগাসন করছে। চুল আঁচড়ে, সাদা গেঞ্জি আর খাঁকি হাফপ্যান্ট পরে ঘর থেকে যখন বেরিয়ে আসত তখন ঘেমে একেবারে নেয়ে যেত।

    মুকুন্দটা মহা চালু ছেলে। যেই দেখেছে বড়মামা, হরেকৃষ্ণ দলে ঢুকেছেন, ও নিজেও অমনি গুনগুন করে গাইছে—’প্রেমদাতা নিতাই বলে গৌর হরি হরি বোল।’ কোনও কাজ নেই; কিন্তু এমন করছে, যেমন কাজের চোটে কথা বলার সময় নেই। এদিক যাচ্ছে, ওদিক যাচ্ছে। আমাকে দেখে বললে, ‘জয় প্রভু। জয় নিতাই।’

    আমি কোনও উত্তর দিলুম না। ভীষণ মিথ্যা কথা বলে আমাকে। কথায় কথায় মিথ্যে কথা। আমাকে বলেছিল, সোদপুর থেকে দশখানা ভালো একতে ঘুড়ি কিনে এনে দেবে। রোজ বিকেলে, কিনতে যাচ্ছি বলে বেরোয়, আর রোজই ফিরে আসে শুধু হাতে। এসে এমন সব মিথ্যে কথা বলে! এক একদিন এক একরকম। শেষে একদিন এসে বললে, ‘কুড়িখানা ঘুড়ি কিনে, বগলদাবা করে আসছি, বৃষ্টি সব গলে বেরিয়ে গেল।’ আমি তো অবাক। সারাটা দিন গেল রোদঝলমলে, বৃষ্টি আবার কখন হল! মুকুন্দ বললে, ‘শরৎকালের বৃষ্টি ওইরকমই হয়। কখনও এখানে, কখনও ওখানে।’ আমি বললুম, ‘কই, কোথায় তোমার কাঁপকাঠি, বুককাঠি। কাগজ না হয় গলে গেছে সেগুলো কোথায়?’ বললে, ‘কাঠিকুটি সব ফেলে দিয়েছি।’ তারপর থেকে আমি মুকুন্দর সঙ্গে একদম কথা বলি না। জোচ্চোর। আমি মিথ্যেকথার নাম রেখেছি মুকুন্দ। আমি সেদিন চোখের সামনে দেখলুম মুকুন্দ বড়মামার সবচেয়ে ফেভারিট কুকুর লাকিকে শুধুমুধু একটা সাইড-কিক করল। ও-ওরকম আজকাল প্রায়ই করে। ক্যারাটে-কুংফু শিখছে কোনও এক মস্তানের কাছে। লাকি ক্যাঁক করে উঠল। বড়মামা দোতলার বারান্দায় বসে ডিপ-ব্রিদিং করছিলেন। জিগ্যেস করলেন, ‘কী রে মকা মারলি না কি?’ মুকুন্দকে বড়মামা বলেন, মকা। মুকুন্দ অম্লানবদনে বললে, ‘কই মারিনি তো। ও আপনার বাইরের কোনও কুকুর।’ আমি বড়মামাকে ফিসফিস করে বললুম, ‘আমার সামনে মুকুন্দ লাকিকে ক্যারাটে মেরেছে।’ ও বাবা! বড়মামার উলটো চাপ! আমাকে বললেন, ‘প্রমাণ করতে পারবি? সাক্ষী আছে?’ ও মা! আমিই তো সাক্ষী। এই পক্ষপাতিত্ব করে-করেই দেশটা গেল।

    আমি বড়মামাকে বলতে এসেছিলুম, মাসিমা আমাকে ট্যাক্সি ডাকতে বলেছেন। বলব কী! কীর্তনের দল বড়মামাকে ছেঁকে ধরেছে। হেড বলছেন, ‘তা হলে, আমাদের প্রত্যেকের জন্যে একটা করে গোড়ের মালা আনান। আমার মালাটা যেন বড় হয়। আর লবঙ্গ, তালমিছরি, ডালচিনী, যষ্ঠী মধু আর বচ আনাবেন বেশি করে। বহুত চেঁচাতে হবে মালিক। আর আহারাদির ব্যবস্থা তো করবেনই। তিন চার রকমের ব্যঞ্জন। গোবিন্দভোগ চালের ভাত। গাওয়া ঘি’টা আমাদের একটু বেশিই লাগে। ওইটাই আমাদের শ্বাসের শক্তি। কণ্ঠকে নরম রাখে।’

    আমি ভাবলুম, আহা, ওই তো গলার ছিরি! তার আবার ফিরিস্তি কত! এক ফাঁকে বড়মামাকে বললুম, ‘মাসিমা ট্যাক্সি ডাকতে বলছেন।’

    কী বুঝলেন কে জানে! হাতের ঝটকা মেরে বললেন, ‘এখন আমার সময় নেই। দেখছিস, বাড়িতে এত বড় একটা উৎসব!’

    ‘আমাকে ডাকতে বলছেন।’

    ‘কাকে ডাকতে বলছেন?’

    ‘ট্যাক্সি। ট্যাক্সি ডাকতে বলছেন।’

    ‘ট্যাক্সি? ট্যাক্সি কি হবে?’

    ‘আপনার উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে, মাসিমা তাঁর বন্ধু বাসন্তীর বাড়িতে চলে যাবেন।’

    ‘বলিস কী? আমার উৎপাত? আমি আবার কার কী করলুম? চল তো! দেখি। এ এক অদ্ভুত বাড়ি! ভালো করলেও মন্দ, মন্দ করলেও মন্দ।’

    মাসিমা সেই একইভাবে বসে আছেন। কিছু দূরে মেজোমামা বসে আছে ব্যাজার মুখে। বড়মামা মাসিমাকে দেখে বললেন, ‘আরে, এ তো নার্ভাস ব্রেকডাউনের কেস! ব্লাডপ্রেশার ফল করেছে। আমি এখন একটা স্টিমুলান্ট ইঞ্জেকশান করে দিচ্ছি, সব ঠিক হয়ে যাবে।’

    মাসিমা বললেন, ‘নার্ভাস ব্রেকডাউন নয়, আমরা দু’জনে সিদ্ধান্ত করেছি, তোমার অপশাসন, তোমার স্বেচ্ছাচারিতা, তোমার স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত হয়ে আমরা কোথাও চলে যাব। মেজদা আজকের মতো কোনও হোটেলে গিয়ে উঠবে। আর আমি চলে যাব আমার এক বান্ধবীর বাড়ি। তারপর দু’জনে মিলে যা হয় একটা কিছু ব্যবস্থা করব। আর যে-ক’টা বছর বাঁচি। আমরা একটু শান্তিতে বাঁচতে চাই।’

    বড়মামা হাঃ হাঃ করে পায়রা-ওড়ানো হাসি হেসে বললেন, ‘খুব পাকাপাকা কথা শিখেছিস। আমার সব হাঁটুর বয়সী, বলে কি না, যে-ক’টা বছর বাঁচি! জীবন এখনও শুরুই হল না। শোন, তোদের এই সিদ্ধান্তকে কী বলে জানিস! রাজনীতির ভাষায় বলে, ক্যু, অভ্যুত্থান, বিদ্রোহ। তোদের ভালোর জন্যেই আমি একটা পাকাপাকি ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলুম। তা দেখছি যাদের জন্যে চুরি করি, তারাই বলে চোর। স্বার্থপরের দুনিয়ার একটাই হল নীতি।’

    মেজোমামা বললেন, ‘পাকাপাকি ব্যবস্থাটা কী? বছরের পর বছর ধরে সারা দিনরাত কীর্তন। এতে আমাদের কী ভালো হবে শুনি। আমরা কালা হয়ে যাব। পাগল-পাগল হয়ে যাব। আমাদের কাঁপুনি রোগে ধরবে। হার্ট অ্যাটাকও হয়ে যেতে পারে! আর কী ভালো হবে শুনি?’

    বড়মামা বললেন, ‘মানুষ যখন রেগে থাকে, তখন তার বুদ্ধি কীরকম বিকল হয়ে যায় দেখেছিস! কীর্তন হল বৈষ্ণব ধর্মের প্রধান অঙ্গ। মস্ত বড় একটা সাধনা। এতে শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম, প্রাণায়াম আছে। সুর আর তাল সহযোগে আত্মনিবেদন আছে। ভক্তি আছে। ঈশ্বরকে পাবার সব ব্যবস্থাই আছে। এতে মানুষের মনের পরিবর্তন হয়। আমরা খুনী। কত মুরগি, কত পাঁঠার খুনের কারণ হয়েছি আমরা। আমাদের রক্তে, আমাদের নিশ্বাসে, পেঁয়াজ, রসুনের ম্লেচ্ছ গন্ধ। ম্লেচ্ছ আহারে আমাদের লোভ বাড়ছে, হিংসা বাড়ছে। ক্রোধ বাড়ছে। নামগান ছাড়া আমাদের মুক্তি নেই। তোদের জানা নেই, মাছ, মাংস, ডিম আমাদের কত সর্বনাশ করে! শরীর বিষিয়ে দেয়। বাত হয়, হার্টের অসুখ হয়। নিরামিষ খেলে শরীর ভালো হয়। চেহারায় একটা লালিত্য আসে। মানুষ দীর্ঘজীবী হয়।’

    মাসিমা বললেন, ‘তুমি আমাদের নিরামিষ খাওয়াবে খাওয়াও; কিন্তু এই দলটাকে তুমি কোথা থেকে ধরে আনলে! শ্রাদ্ধের কীর্তন। সারা বাড়িতে মত্যুর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এদের আমি চিনি। এরা ডেডবডির পেছন পেছন গান গেয়ে ফেরে। এ-কীর্তন সে-কীর্তন নয় বড়দা। এ হল মৃত্যুর কীর্তন। এদের বাড়িতে ডেকে আনা মানে মৃত্যুকে ডেকে আনা। অলক্ষণ।’

    বড়মামা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন।

    মেজোমামা বললেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশে তুমি অগণতান্ত্রিক কায়দায় অত্যাচারী ডিকটেটারের মতো সংসার চালাচ্ছ।’

    বড়মামা সঙ্গে সঙ্গে ভাব পালটে বললেন, ‘ওই অত্যাচারী শব্দটায় আমার ঘোরতর আপত্তি। আমি স্বীকার করছি, আমার বুদ্ধিসুদ্ধি একটু কম। আমি একটু হুজুগে আছি। আমাকে তোরা আজ এতবড় একটা কথা বলতে পারলি। আমি অগণতান্ত্রিক! অত্যাচারী, ডিকটেটার! বেশ, তোদের কাউকে যেতে হবে না, আমিই চলে যাচ্ছি।’

    বড়মামা আমাকে বললেন, ‘এই, একটা ট্যাক্সি ডাক তো।’

    ‘আপনার তো গাড়ি আছে বড়মামা!’

    ‘না না, এটা গাড়ি-ঘোড়ার ব্যাপার নয়। কোথাও বেড়াতে যাওয়া নয়। এ হল গৃহত্যাগ। এদের আমি কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি। আর আজ এরাই আমাকে বলছে অত্যাচারী, স্বৈরাচারী!’

    ‘তা হলে আমি ক’টা ট্যাক্সি ডাকব?’

    ‘আমি আমারটা বলতে পারি। আর কার কী লাগবে আমি জানি না। জানলেও বলব না।’

    ঠিক এইসময় মুকুন্দ সামনে এসে দাঁড়াল। এসেই বললে, ‘জয় নিতাই।’

    বড়মামা ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘জয় নিতাই মানে?’

    মুকুন্দ ভেবেছিল, খুব বাহাদুরি নেবে। বড়মামার মেজাজ দেখে চুপসে গেল। আমতা আমতা করে বললে, ‘ওরা সব কথায় কথায়, জয় নিতাই, জয় শ্রীগৌরাঙ্গ বলছে তো, তাই আমিও বলেছি। যদি অপরাধ হয়ে থাকে, আমার গালে মারুন দুই থাপ্পড়।’

    এই হল ধড়িবাজ মুকুন্দর বিখ্যাত কায়দা। জানে এইতেই বড়মামা কাবু হয়ে যাবেন। ও আবার বড়মামাকে বড়দা বলে। বড়মামা কাবুও হয়ে গেলেন। বললেন, ‘শোন, তুই ভণ্ড নোস। কথায় কথায়, জয় নিতাই, জয়ঠাকুর বলবি না।’

    মুকুন্দ বললে, ‘বাবড়িদা আরও ফিরিস্তি বের করেছে।’

    ‘বাবড়িদা? সেটা আবার কে?’

    ‘ওই যে দলের হেড।’

    ‘কী বলছে?’

    ‘বলছে, প্রভুকে বলো, একটা মাইকের ব্যবস্থা করতে; আর দু’কেটলি চা পাঠাতে বলো। এখন সন্দেশ চাই না। গরম নিমকি দিয়ে শুরু করি। আর বলছে ভোগের ব্যবস্থা করতে।’

    ‘কার ভোগ? ওদের ভোগের জন্যে তো বাজারের পুরো ভেজিটেবিল সেকশানটা কিনে এনেছি।’

    ‘না, না, ঝোলা থেকে এতটুকু একটা জগন্নাথদেবের মূর্তি বের করে জানলার ওপর রেখে বলছে, ‘ভোগ দিতে হবে।’ একটা ফর্দ তৈরি করে আমাকে কী বিশ্রীভাবে বললে, ‘এই ছেলে, এটা তোর ডাক্তারকে দে।’ আপনার প্লাস্টিক দেওয়ালে নস্যি মুছেছে। আর উঠোনের পাশে নতুন যে তিনটে গোলাপ গাছ পুঁতেছিলেন, মাড়িয়ে মাটিতে শুইয়ে দিয়েছে। আবার বলছে, ‘কেলে কেলে আটটা কুকুর পুষছে। মানুষ খেতে পাচ্ছে না, রাজভোগ দিচ্ছে কুকুরকে। পয়সা থাকলে কী না হয়? ভূতের বাপের শ্রাদ্ধ দেয়।’

    ‘তুই বিনা প্রতিবাদে এই সব শুনে এলি!’

    ‘আপনার লোক!’

    ‘তুই কার লোক?’

    ‘আপনার লোক।’

    ‘আমার লোক হয়ে, আমার নিন্দে শুনে এলি?’

    ‘নিন্দে তো তেমন করেনি। বড়লোক বলেছে।’

    ‘বড়লোক বলাটা একটা গালাগাল। এই বুদ্ধিটুকু তোর ঘটে নেই! যা, এইবার তুই গিয়ে বৃন্দাবন দেখা।’

    ‘কী ভাবে দেখাব? ক্যারাটে, কুংফু চালিয়ে দোব? দেখব একসঙ্গে এগারোটিকে পারা যায় কি না?’

    ‘কিচ্ছু করতে হবে না, তুই একসঙ্গে আমাদের আটটা কুকুরকে একবার খেলিয়ে দে, এধার থেকে ওধার।’

    মেজোমামা বললেন, ‘বড়দা যা করবে আমাদের সঙ্গে পরামর্শ করে করবে। তোমার মনে আছে, ফুলচুরি বন্ধের জন্য তুমি একবার কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিলে। সেই কুকুর লাট্টু বলে একটা ছেলেকে কামড়েছিল। লাট্টুর বাবা দলবল নিয়ে বাড়ি চড়াও হয়েছিল। থানা, পুলিশ, শেষ পর্যন্ত পার্টি। শেষ পর্যন্ত অপমানজনক অবস্থায় তোমাকে হাজারটা টাকা দিতে হল। টুলের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাইতে হল। তোমার ভুলোমন, ভুলে যেতে পারো। তোমার অপমান আমরা ভুলিনি। বেদনার মতো বিঁধে আছে মনে। সে ব্যথা, কী যে ব্যথা!’

    বড়মামা মেজোমামার কথায় অভিভূত হয়ে বললেন, ‘অ্যাঁ বলিস কী? সেই অপমানের বেদনা কণ্টকসম খোঁচা মেরে আছে মানসমন্দিরে!’

    মেজোমামা বললেন, ‘এই আবেগের মুহূর্ত তোমার ভাষা-সংশোধনের চেষ্টা আমি করব না। এইটুকু বলতে পারি সাহিত্য তোমার লাইন নয়। তবে জেনে রাখো, আমরাই তোমার প্রকৃত আপনজন।’

    মাসিমা বললেন, ‘দাদা মনে করে, আমরা দাদার কেউ নই। দাদার যত আপনজন রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে আছে। দাদা আমাদের পরামর্শ নেবে না। দাদার যত পরামর্শদাতা হল বাইরের লোক। তুমি আমাদের যখন চাও না, আমরা তখন চলেই যাই।’

    বড়মামা বললেন, ‘চান্স পেয়েছিস এখন, আমাকে যত পারিস আঘাত কর। এমনি করে হৃদয়ে মোর তীব্র দহন জ্বালো। এই করেছ ভালো নিঠুর হে।’

    মুকুন্দ বললে, ‘আমি তা হলে আটটা কুকুরকে খেলিয়ে দিই। জিনিসটা বেশ জমে যাবে। এদের পেছনে পার্টির কোনও লোক নেই। না সি পি এম, না কংগ্রেস!’

    মেজোমামা বললেন, ‘তোমাকে পাকামো করতে হবে না। আমি দেখছি। এটা বড়দের ব্যাপার। আমাদের একটা মানসম্মান আছে’। মেজোমামা আর আমি যখন বারান্দার সামনে উঠোনে ফিরে গেলুম কখন কীর্তনিয়ারা বেশ জাঁকিয়ে বসে গেছে। তিলক মাটি বের করে সব দগদগে রসকালি করেছে। কপাল থেকে একেবারে নাকের ডগা পর্যন্ত। কপালে মেরেছে তে-দাঁড়ি।

    আমাদের আসতে দেখে দলের হেড অমনি উঁচু গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘কই, কী হল, মাইক আনতে গেছে? চা কোথায়? চা! খোকা কই, সিগারেট তো পাঠালে না।’ আর একজন অমনি পাশ থেকে আখর দিয়ে উঠলেন, ‘লবঙ্গ আর বচ?’

    কীর্তনের দল তো! কথাও বলেন সব কীর্তনের কায়দায়। একজন ছাড়েন তো আর একজন পাশ থেকে ধরে নেন। মেজোমামা সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়েই দুটো হাত মিশনারী ফাদারদের কায়দায় ওপরে তুললেন। দলের লোকেরা সব চুপ মেরে গেল।

    মেজোমামা যেন ইলেকশনের বক্তৃতা দিচ্ছেন, ‘বন্ধুগণ, অনিবার্য কারণে আজ এখানে কীর্তন হবে না। আপনারা দয়া করে শোরগোল করবেন না। আমাদের আটটা কুকুর কীর্তন একেবারে সহ্য করতে পারে না। শুনলেই খেপে গিয়ে চেন ছিঁড়ে তেড়ে যায়। তখন আর তাদের সামলানো যায় না। আষাঢ় মাসে রথের সময় একটা কুকুর ভগবানদাস বাবাজিকে এমন কামড়েছিল যে সাতটা স্টিচ করতে হয়েছে। আমার অনুরোধ আপনারা সব মালপত্র গুছিয়ে নিন। বিপদের ঝুঁকি নিয়ে হরিনাম চলে না। হরিনাম করতে হবে নির্জনে। নিরাসক্ত মনে। আপনাদের একটা লম্বা সিধে দেবার ব্যবস্থা করেছি আমরা। সঙ্গে ভালো প্রণামী। আপনারা যে-যার জায়গা শান্ত হয়ে বসুন। ছটফট করবেন না। আমাদের সবচেয়ে মেজাজি কুকুরটা চেন ছিঁড়ে বেরিয়ে গেছে। যে-কোনও মুহূর্তে ছিটকে চলে আসতে পারে।’

    মেজোমামা অন্দরমহলে ফিরে এলেন। বিজয়ীর মতো।

    মাসিমা জিগ্যেস করলেন, ‘কী ম্যানেজ করতে পারলে?’

    ‘পারব না মানে, কার ভাই দেখতে হবে তো!’

    মেজোমামা এই একটা গুণ। বড়মামার সঙ্গে লাঠালাঠি ফাটাফাটি হয়ে যাবার পর বোঝা যায় মেজোমামা বড়মামাকে কত ভক্তি শ্রদ্ধা করেন। এই যে বললেন, ‘কার ভাই দেখতে হবে তো’ শুনে বড়মামার মুখে রামচন্দ্রের মতো অদ্ভুত হাসি ফুটল। বেতের মোড়া থেকে উঠে এসে মেজোমামাকে জড়িয়ে ধরলেন।

    মাসিমা বললেন, ‘আহা! কী সব ছিরি! ক্ষণে ক্ষণে বহুরূপীর মতো রূপ পালটায়। এই তরোয়াল হাতে লড়ছে এই আবার ঈদের কোলাকুলি।’

    বড়মামা বুকপকেট থেকে একশো টাকার একটা নোট বের করে মেজোমামার হাতে দিয়ে বললেন, ‘কিছু কিনে খাস।’

    মাসিমা বললেন, ‘আমরা শুধু দেখব?’

    বড়মামা হাসি হাসি মুখে বললেন, ‘এটা একেবারে আমাদের নিজস্ব ব্যাপার। খুব ভেতরের ব্যাপার। ও যখন স্কুলে পড়ে আমি তো তখন খুব বড়। গোঁফ দাড়ি গজিয়ে গেছে। হাতে পায়ে লোম বেরিয়ে গেছে। দুই ভাইয়ের সংসার। তুই তো তখন প্যান্তাখ্যাঁচা এতটুকু একটা মেয়ে। সারা দিনরাত কেবল উঁ উঁ করে নাকে কান্না। তোর অবশ্য দোষ ছিল না। ওইটুকু একটা মেয়ে কী আর করতে পারে বল? তা ছাড়া ছোট-ছোট মেয়েদের শুঁয়োপোকার মতো খুব খিদে হয়। তোকে খাওয়ানোর মতো অত খাবার তখন আমি পাব কোথায়। সকালে ডাল-ভাত, রাতে গুড়-ছাতু এই তো তখন চলছে। অভাবে অভাবে সবসময় আমার মেজাজ ঠিক থাকত না। ভাইয়ে-ভাইয়ে মাঝেমধ্যেই ঘষাঘষি হয়ে যেত। আমারই দোষ, দাদাগিরি ফলাতে হবে তো। তখনই এইরকম রামলক্ষণের মিলন হত। আমি আবার কলার-ফাটা ছেঁড়া জামার পকেট থেকে দুটো পয়সা বের করে মেজোকে দিতুম, ও অমনি ছুটে গিয়ে কিনে আনত পাঁচটা গুলি লজেনস। আমরা তিনজনে দুপুর বেলা আমাদের ভাঙা ছাদে বসে বসে খেতুম। দূর থেকে ভেসে আসত বড়লোকদের বাড়ির রেডিওর গান। কীসব সুন্দর গান ছিল তখন, শিল্পীমনের বেদনা নিঙাড়ি, পথেই জনম, পথেই মরণ আমাদের, জীবননদীর জোয়ার ভাঁটায় কত ঢেউ উঠে পড়ে। উঃ সে সব কী টেরিফিক দিন গেছে আমাদের। সেই সব সুখের দিন আর ফিরবে না। ভাঙা মেঝেতে ফাটা কলাপাতায় ডাল ভাত। কোষো পেয়ারা শিলে থেঁতো করে নুন আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে আচার। তোকে ফ্রক কিনে দেবার পয়সা নেই, পুজো এসে গেছে। উঃ কী উত্তেজনা! কুসিটার ফ্রক হবে না। মেয়েটা পুজোয় পাবে না কিছু। শেষে কাপড় কিনে এনে পুরনো ফ্রক ফেলে ছাঁট কেটে, সারা রাত কুপির আলোয় বসে বসে সেলাই। কোথায় লাগে তোর উপন্যাস! মাই লাইফ ইজ এ উপন্যাস।’

    মেজোমামার আবার কথায় কথায় চোখে জল চলে আসে। বড়মামার কথায় চোখ ছলছলে হয়ে এসেছে।

    মেজোমামা বললেন, ‘মনে আছে, তুমি কত কষ্ট করে আমাকে স্কুলে ভর্তি করেছিলে! তারপরে সেই ফ্রি-শিপের জন্যে তোমার অপমান। দিনের পর দিন ঘুরিয়ে সেক্রেটারি তোমাকে কী বললেন?’

    ‘উঃ, সে এক জিনিস রে ভাই! রাত সাতটা অবধি বসিয়ে রাখার পর বাবু আমাকে বললেন, ‘কোন বংশের ছেলে তুমি! ভাইকে ফ্রি’তে পড়াতে তোমার লজ্জা করবে না! মান-সম্মানে লাগবে না। স্কুলের ক’টা টাকাই বা মাইনে। তুমি কি বলতে চাও সেই ক’টা টাকা তুমি জোগাড় করতে পারবে না? ফ্রি’তে পড়তে তোমার ভাইয়ের মনের অবস্থা কত হীন হয়ে যাবে একবার ভেবে দেখেছ! আহা, অন্য কেউ নয়, তোমার নিজের ভাই। তাকে কি এইভাবে তোমার ফাঁকি দেওয়া উচিত!’ আমি চেয়ার উলটে দিয়ে পালিয়ে এসেছিলুম। সেইদিন আর একবার ভালো করে বুঝেছিলুম, দূরাত্মার ছলের অভাব হয় না। তারপর আমি করলুম কী? আমার হাত আছে, পা আছে, মাথা আছে, ভাইটাকে লেখাপড়া শেখাতে পারব না! খাটালের রামখেলোয়ানকে বললুম, ‘তুমি আমাকে সাহায্য করো?’ রাম আমার খুব বন্ধু ছিল। রাম আমাকে ফ্রি দুধ খাওয়াত বলেই না, আজ আমার এই স্বাস্থ্য! রাম বললে, ‘কী সাহায্য মেরা গোপাল!’ ‘আমি তোমার কাছে গোবর কিনব। তোমাকে একটু দাম কমাতে হবে।’ রাম বললে, ‘গোবর কী করবে?’ ‘ঘুঁটে দেব।’ ‘তুমি ঘুঁটে দেবে?’ সব শুনে বললে, ‘তোমার যত লাগে ফিরি নিয়ে যাও।’ উঃ, সে কী উত্তেজনা। সারা সকাল, গোটা দুপুর পাঁচিলে পাঁচিলে ঘুঁটে দিচ্ছি থ্যাপ থ্যাপ করে। প্রথম দিন তো এমন ঘেন্না, নিজের ডান হাতে খাবার তুলে খেতে পারি না। আমাকে দাবিয়ে রাখবে ব্যাটা সেক্রেটারি! ওপর থেকে দ্যাখ—এই আমার ভাই, ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, গোল্ড মেডালিস্ট। পেরেছো আটকাতে কুচক্রী ধানগোপাল?’

    মেজোমামা হঠাৎ নীচু হয়ে বড়মামার পায়ের ধুলো নিলেন। বড়মামা কাঁধ ধরে তুললেন। মেজোমামার গাল বেয়ে জল নামছে। মেজোমামা বড়মামার দু’কাঁধ ধরে বললেন, ‘বড়দা, তুমি কত বড়! তোমার চরিত্রের একটুও যদি পেতুম!’

    বড়মামা বললেন, ‘তুই আমার গর্ব।’

    মেজোমামা বললেন, ‘তোমার একটা জীবনী লেখো।’

    ‘আমার বাংলা আসে না।’

    ‘তুমি যেমন বলো বলে যাবে, আমি লিখে যাব।’

    বিরাট সিধে আর পাঁচশো টাকা নিয়ে কীর্তনের দল চলে গেল। মুকুন্দর ভীষণ রাগ। ‘দেখ তো মাসি কী কাণ্ড! কোনও মানে হয়! কেমন টাকাটা মেরে নিয়ে চলে গেল’। মুকুন্দর সম্পর্ক পাতানোর যেমন ছিরি। বড়মামাকে বলছে বড়দা আর মাসিমাকে বলছে মাসি। আমাকে বলতে এসেছিল, আমি পাত্তা দিলুম না। সেই ঘুড়ির ঘটনার পর আমার পিত্তি চটে আছে। মুকুন্দ সেটা বুঝতে পেরেছে। আমার দুটো হাত ধরে বললে, ‘তুমি আমার সঙ্গে কথা না বললে ভীষণ খারাপ লাগে। তুমি আমার ওপর রাগ করেছ। আমি ইচ্ছে করেই তোমার জন্যে ঘুড়ি আনিনি। কেন বলো তো? ভাদ্রমাসের রোদ খুব খারাপ। তুমি সারা দিন রোদে ঘুড়ি ওড়াবে, রং কালো হয়ে যাবে, পিত্তি পড়ে চোখ হলদে হয়ে যাবে। বিশ্বাস করো আমি সেটা চাই না। তোমাকে আজ আমি কানাই মোদকের গোলাপি ছানার মুড়কি খাওয়াবো।’

    ছানার মুড়কি আমার খুব প্রিয়। মুকুন্দর সঙ্গে আবার ভীষণ ভাব হয়ে গেল। ছেলেটা ভারি ভালো। আমাকে একবার কাঁধে করে স্কুলের মাঠ থেকে এক মাইল পথ হেঁটে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। আমাদের ম্যাচ হচ্ছিল। আমি ব্যাকে খেলছিলুম। চার্জ করতে গিয়ে পা মচকে গেল। মুকুন্দ এসেছিল আমাদের টুর্নামেন্ট দেখতে। কাঁধে পা ঝুলিয়ে বসে আছি, মুকুন্দ গান গাইতে-গাইতে চলেছে। সে কত রকমের গান! গান থামিয়ে মাঝে মাঝে জিগ্যেস করছে, ‘কেমন হচ্ছে! আমার লেখা, আমার সুর।’

    বড়মামা চেম্বারে যাবার জন্য তৈরি। বড়মামা এইভাবে বেশিদিন ডাক্তারি করতে পারবেন না। চেম্বারের অবস্থা আমি দেখতে পাচ্ছি। রোগীতে ভরে গেছে। কারও জ্বর, কারও কাশি, কারও পেটব্যথা। সবাই বসে আছেন তীর্থের কাকের মতো। কম্পাউন্ডারদা সামলাচ্ছেন। বড়মামার পাত্তা নেই।

    মাসিমা মালপত্র নিয়ে বিপদে পড়েছেন। অত ছানা। অত দই। এত আনাজ!

    মেজোমামা বললেন, ‘তোরা ভুলে গেছিস ভাই, আজ আমার জন্মদিন। তোরা ভুলেছিস ঈশ্বর ভোলেননি। দ্যাখ কত আয়োজন করে দিলেন।’

    মাসিমা বললেন, ‘তুমি আবার ভাদ্রমাসে জন্মালে কবে! তুমি তো জন্মেছিলে আশ্বিনে!’

    ‘তোর কিছু মনে থাকে না কুসি। আমি এই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছি ভাদ্রে এবং ঠিক আজকের দিনটিতে। আশ্বিনে জন্মেছিস, তুই; যে কারণে তোকে ঠিক মা দুর্গার মতো দেখতে।’

    ‘তা হলে আজ তোমার জন্মদিন করে ফেলা যাক।’

    মাসিমা বললেন আমাকে, ‘মুকুন্দকে একবার ডাক তো।’

    মুকুন্দ বিশাল গালচেটা তুলছে তখন। হিমসিম অবস্থা। কম ভারী? মুকুন্দর সঙ্গে আমার ভাব হয়ে গেছে। সাহায্য করতে করতে বললুম, ‘মাসিমা ডাকছেন। আজ মেজোমামার জন্মদিন।’

    ‘বুঝেছি আমাকে মাছ আনতে বলবেন। জন্মদিনে মাছের মুড়ো খেতে হয়।’

    কথাটা সবে শেষে করেছে মুকুন্দ, গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন দুই পুলিশ অফিসার। পুরো ইউনিফর্ম। মাথায় টুপি। গেটের লোহাটাকে পুলিশি মেজাজে ঠ্যাং ঠ্যাং করে বাজালেন। ভুরু কুঁচকে তাকাতে লাগলেন।

    মুকুন্দ বললে, ‘এই রে পুলিশ!’

    আর বড়মামা ঠিক ওই সময় বেরিয়ে এলেন। হাতে ব্রিফকেস। সাদা ধবধবে শার্টের ওপর মহাদেবের গলার সাপের মতো স্টেথিসকোপ ঝুলছে। এই বুক-দেখা যন্ত্রটা বড়মামার গর্বের বস্তু। সামনেই বিশালাকার দু’জন পুলিশ অফিসার দেখে বড়মামা থতমত খেয়ে গেলেন।

    একজন জিগ্যেস করলেন, ‘আপনি ডক্টর বিমল মিত্র?’

    বড়মামা ভীষণ নার্ভাস হয়ে গিয়ে বললেন, ‘আজ্ঞে না।’

    ‘এইটাই তো ডক্টর বিমল মিত্র’র বাড়ি?’

    বড়মামা অম্লান বদনে বললেন, ‘আজ্ঞে না।’

    ‘এই যে বাড়ির বাইরে লেখা রয়েছে।’

    বড়মামা বিপদে পড়ে গেছেন। অবাক হয়ে বললেন, ‘তাই না কি?’

    পুলিশ অফিসার ব্যঙ্গের গলায় বললেন, ‘নিজের বাড়ি নিজে চিনতে পারছেন না! নিজের নাম তো ভুলেইছেন। চলুন, ভেতরে চলুন, আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।’

    বড়মামা পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছেন। পেছন পেছন বীরদর্পে আসছেন দুই পুলিশ অফিসার। একজনের হাতে গোল একটা রুলকাঠ। সেই কাঠটাকে বাঁ হাতের তালুতে পটাশ পটাশ করে মারছেন। বিশ্রী একটা গা ছমছম করানো শব্দ হচ্ছে।

    মুকুন্দ বললে আমার কানে-কানে, ‘এ ওই কীর্তনঅলাদের কাজ। সোজা থানায় গিয়ে মানহানির মামলা ঠুকে দিয়েছে। আমাদের দেশের ঘরে এইরকম প্রায়ই হয়। পুলিশ যদি বড়দাকে ধরে নিয়ে যেতে চায়, আমি ফাইট দেব। মিঠুন আমার গুরু। ওই পাঁচিলের ওপর থেকে উড়ে গিয়ে জোড়া পায়ে মারব থুতনিতে। তারপর বড়দাকে নিয়ে এসকেপ করব জঙ্গলে।’

    ‘জঙ্গল পাবে কোথায়?’

    ‘আরে ম্যান, এত বড় একটা দেশ জঙ্গল পাব না মানে!’

    আমরাও পায়ে পায়ে বসার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলুম। এই সময়টায় আমাদের বড়মামার কাছাকাছি থাকতে হবে। বাড়িতে চোর পড়লে মানুষ ‘পুলিশ, পুলিশ’ করে চিৎকার করে। আমাদের বাড়িতে পুলিশ পড়েছে বলে আমরা ‘পুলিশ, পুলিশ’ করে চিল্লে বাড়ি মাথায় করব।

    বড়মামা কিছু বলার আগেই পুলিশ অফিসার দু’জন বিরাট শব্দে চেয়ার টেনে বসে পড়লেন। যাঁর হাতে রুলকাঠ তিনি টেবিলের পাশে অকারণে শব্দ করলেন। কোনও মানে হয় না। আমার স্কুলের হেডসার হলে মাথায় ডাস্টার মেরে বলতেন, ‘এ কী অসভ্যতা!’ ও-সব পুলিশ অফিসার-টফিসার মানতেন না। আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখলুম, বড়মামার বাড়ি, বড়মামার ঘর, তাঁরই চেয়ার টেবিল, অথচ পুলিশ অফিসার প্রায় ধমক মেরেই বড়মামাকে বললেন, ‘বসুন।’

    বড়মামা ভয়ে ভয়ে চেয়ারে বসতে গিয়ে হাতলে বাধা পেলেন। বড়মামার কীর্তি তো! ভাবলেন মনে হয়, চেয়ারে বসতে দিচ্ছে না। মেঝেতেই বসতে গেলেন।

    অফিসার বললেন, ‘কী হল! চেয়ারে বসতে কি অসুবিধে হল?’

    বড়মামা বললেন, ‘চেয়ারটা বসতে দিচ্ছে না।’

    অফিসার দু’জন হা-হা হেসে বললেন, ‘চেয়ারের প্রাণ আছে বুঝি যে বসতে দিচ্ছে না! আপনি তো হাতলে বসছিলেন। চেয়ারে বসতে হলে দু’হাতলের মাঝখানে বসতে হয়। সব কিছুরই একটা হিসেব আছে, ডক্টর মিত্র। আবার চেষ্টা করুন। ট্রাই এগেন।’

    আমার খুব রাগ হল। বড়মামার মতো একজন মানুষকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা। আমি মুকুন্দকে ইংরেজিতেই বললুম, ‘হোয়াট ইজ দিস?’ আমাদের পেছনে মেজোমামা এসে দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা খেয়াল করিনি।

    মেজোমামা বললেন, ‘ব্যাপারটা কী। তোরা এখানে গুপ্তচরের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি করছিস?’

    মুকুন্দ বললে, ‘বড়দাকে পুলিশে ধরেছে। আমরা তাই অ্যাকশানের জন্যে তৈরি হচ্ছি।’

    ‘পুলিশে ধরেছে মানে!’ মেজোমামা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ‘তোরাও আয়। কার হুকুমে পুলিশ ঢুকেছে বাড়িতে!’ মেজোমামার টেরিফিক সাহস। বিদ্যাসাগরি চটির ফটাস-ফটাস আওয়াজ তুলে মেজোমামা বিদ্যাসাগরের মতোই বেপরোয়া ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকলেন। মেজোমামার পরনে ঢোলা পাজামা, পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির রং গেরুয়া। পাঞ্জাবির পকেট থেকে সোনার ঠোঁট লাগানো পাইপ বের করে দাঁতে চেপে ধরে একেবারে সায়েবদের মতো উচ্চারণে বললেন, ‘হোয়াট ইজ দিস।’ মেজোমামার সেইরকম চেহারা। বড়মামার চেয়েও অনেক সুন্দর দেখতে। পাকা পেয়ারার মতো গায়ের রং। এক মাথা হালকা বাদামি রঙের চুল। তেমনি সুন্দর স্বাস্থ্য! এতখানি বুকের ছাতি। চওড়া পিঠ। ভারী চশমার আড়ালে বড় বড় জ্বলজ্বলে দুটো চোখ।

    একজন অফিসার পায়ের ওপর পা তুলে বসেছিলেন। তাঁর বুটের ডগাটা পালিশ-করা সেক্রেটারিয়েট টেবিলের পাশে লেগে দাগ ধরিয়ে দিচ্ছিল। মেজোমামার সজাগ চোখ। হাতের ফর্সা, লম্বা তর্জনী তুলে অফিসারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, ‘সি, হোয়াট ড্যামেজ ইউ হ্যাভ ডান টু দি টেবল, উইথ ইওর আনসিভিলাইজড বুট। ছিঃ ছিঃ। ম্যানারস জেন্টলম্যান, ম্যানারস।’

    মেজোমামা আমাকে ইংরেজি শেখান। বলতে নেই, মা সরস্বতীর কৃপায়, আমি এবার ইংরেজিতে সাঙ্ঘাতিক ভালো নম্বর পেয়েছি। আমি বুঝতে পারলুম কেমন কায়দা করে মেজোমামা অফিসারকে অসভ্য বললেন—তুমি অসভ্য নও, তোমার বুট অসভ্য। সেই অসভ্য বুট চকচকে টেবিলের কী সর্বনাশ করেছে দ্যাখো।

    অফিসার দুজন মেজোমামার দিকে তাকালেন। কলকাতার সবচেয়ে নামী কলেজের নামী অধ্যাপক। তাঁর সঙ্গে চালাকি!

    মেজোমামা আরও এক ডোজ চড়িয়ে দিলেন, ‘দিস ইজ নট ইওর পুলিশ স্টেশান। বিহেভ ইওরসেলফ।’

    মেজোমামা আমাকে অনেক রকম কায়দা শেখান। এই কায়দাটা সেই কায়দারই একটা, অফেনস ইজ দি বেস্ট ডিফেনস। পুলিশ অফিসারটা একেবারে চুপসে গেলেন। তাড়াতাড়ি পা নামিয়ে নিলেন। মেজোমামা ডোজ আরও একটু চড়ালেন। একেবারে সামনে গিয়ে পাইপ নেড়ে বলেন, ‘ও নো নো, ওয়াইপ অফ দি স্ক্র্যাচ উইথ ইওর হ্যান্ডকারচিফ।’

    মেজোমামা একটা চেয়ারে রাজার মতো বসে বললেন, ‘হোয়াট ব্রিঙ্গস ইউ হিয়ার।’

    এক অফিসার দাগ পরিষ্কার করছেন, তিনি কিছু বললেন না। অপরজন বললেন, ‘আমরা একটা চুরির ইনভেসটিগেশানে এসেছি।’

    ‘চুরির ইনভেসটিগেশানে এখানে? স্ট্রেঞ্জ!’

    মেজোমামার পাইপ ধরানোর সাঙ্ঘাতিক একটা কায়দা আছে। ভেরি ভেরি আর্টিস্টিক। দেশলাই কাঠিটা জ্বেলে, বাঁ হাতে পাইপের মুখের দিকটা ধরে ডান হাতে আগুনটা ওপর থেকে নীচের দিকে নামিয়ে দেন। দেখতে ভালো লাগে। সায়েবি ব্যাপার তো। মেজোমামা সেই কায়দায় পাইপ ধরাতে ধরাতে বললেন, ‘আমরা কি চুরি করেছি বলে মনে হচ্ছে আপনাদের?’

    ‘সাইকেল।’

    ‘আচ্ছা, সাইকেল! কার সাইকেল! আপনার?’

    ‘তার আগে জানা দরকার, আপনি কে?’

    ‘আমি মেজোভাই।’

    ‘কী করেন আপনি?’

    ‘চোরাই সাইকেলের ব্যবসা করি। আপনি টেবিলের পাশের নোংরা জুতোর দাগ মুছেছেন!’

    মেজোমামা এমন মেজাজ নিয়ে বললেন, যে পুলিশ অফিসারটি ভয়ে ভয়ে বললেন, ‘এই যে স্যার, মুছে দিচ্ছি স্যার, মোছার জন্যে আমাকে যা হয় একটা কিছু দিন।’

    ‘আপনার পকেটে রুমাল নেই?’

    ‘না, স্যার, আমাদের সার্ভিসে আমরা তো রুমাল ব্যবহার করতে পারি না। অনেকে সঙ্গে রাখেন, আমি তাও রাখি না।’

    ‘আই সি। তা হঠাৎ যদি হেঁচে ফেলেন, আর সেই হাঁচির চোটে নাক দিয়ে যদি কিছু বেরিয়ে আসে, তা হলে কী করবেন? জামার হাতায়?’

    ‘আজ্ঞে, সেইরকম কেস কখনও হয়নি। হলে জামার হাতা। একটা রুমাল রাখা উচিত কী বলেন?’

    ‘যে কোনও সভ্য মানুষের একটা রুমাল রাখা উচিত। সিভিলাইজেসানের সঙ্গে রুমালের একটা যোগ আছে অফিসার।’ পুরো ব্যাপারটা এখন মেজোমামার কন্ট্রোলে এসে গেছে। বড়মামা সেই কারণে একটু সাহস পেয়ে বললেন, ‘চেম্বারে আমার রুগিরা বসে আছে, আমার তো যাওয়া উচিত।’

    প্রথম অফিসার বললেন, ‘আপনি পার্থ মুখার্জিকে চেনেন?’

    বড়মামা বললেন, ‘না, পার্থ মুখার্জি আবার কে? জীবনে নাম শুনিনি।’

    ‘জজ পার্থ মুখার্জির নাম শোনেনি? চেনেন না আপনি?’

    মেজোমামা ঠোঁট থেকে পাইপ নামিয়ে বললেন, ‘আমরা জাস্টিস পার্থ ব্যানার্জিকে চিনি।’

    ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, পার্থ ব্যানার্জি।’

    মেজোমামা বললেন, ‘স্ট্রেঞ্জ! আপনি মশাই পুলিশ অফিসার হয়েছেন জজসায়েবের টাইটেল জানেন না! এদিকে সবচেয়ে নামকরা একজন ডাক্তারকে সাইকেল চোর বলে সন্দেহ করছেন। ব্যাপারটা খোদ জজসায়েবকেই তা হলে জানাতে হয়। দেখি ফোনে পাওয়া যায় কি না!’

    মেজোমামা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘পার্থমামাকে ফোনে ধর তো।’

    অফিসার চেয়ার থেকে ক্যাঙারুর মতো লাফিয়ে এসে মেজোমামার হাত চেপে ধরে বললেন, ‘প্লিজ, প্লিজ, ডোন্ট ডু দ্যাট। আমি ধনে-প্রাণে মারা যাব। জজসায়েব ভীষণ রাগী!’

    ‘আপনি এই বাড়িতে এই মিত্র-হাউসে ঢোকার আগে অনুমতি নিয়েছিলেন? আসতে পারি বলেছিলেন? বলেছিলেন, মে আই কাম ইন?’

    ‘না স্যার।’

    ‘এই সহজ সরল, আত্মভোলা ডাক্তারটিকে নিয়ে পুলিশি কায়দায় খেলা করছিলেন?’

    ‘আজ্ঞে, আপনি আসার আগে পর্যন্ত অভ্যাসের দোষে তা একটু করে ফেলেছি। উনি ভয় না পেলে করতুম না। ভীষণ ভয় পেয়েছেন দেখে একটু মজা করে ফেলেছি স্যার। আসলে আমরা ভীষণ বিপদে পড়ে গেছি স্যার। আজ সকালে জজসায়েবের বারান্দা থেকে তাঁর নতুন সাইকেলটা চুরি হয়ে গেছে। মাত্র তিন দিন আগে কিনেছিলেন।’

    ‘স্ট্রেঞ্জ! এই সাইকেল আমরা চুরি করেছি, এইরকম একটা অসম্মানজনক ধারণা আপনার হল কী করে?’

    ‘আহা, আমি বলার আগেই তো আপনি এক একটা সিদ্ধান্ত করে ফেলছেন। আহা, আমিও তো পুলিশ অফিসার! আমার একটা পদমর্যাদা আছে কি না! সেই থেকে আপনি আমাদের সঙ্গে কী যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছেন বলুন তো!’

    ‘আপনার পায়ে কী?’

    থতমত খেয়ে গেলেন অফিসার। পায়ের দিকে তাকালেন। মেজোমামা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা একজন এগজামিনার। এমনভাবে প্রশ্ন করেন, সবাই পড়া না করা ছাত্রের মতো ভয় পেয়ে যায়। অফিসার দু’দণ্ড ভাবলেন। ভেবে বললেন, ‘পায়ে জুতো।’

    ‘জুতো পায়ে ঢুকলেন কেন? না, না, আপনি এই ঘরে জুতো পায়ে ঢুকলেন কেন? আপনি ওই নোটিসটা পড়েননি, লিভ ইওর শুজ আউট? আপনি দেখছেন না, এই ঘরটা একটা স্মৃতিমন্দিরের মতো? বাইরের জুতো পরে এই ঘরে প্রবেশ নিষেধ।’

    ‘আপনার পায়ে যে জুতো।’

    ‘এটা আমার বাড়িতে পরার চটি। বাইরের জুতো পায়ে মশমশিয়ে এসে ঢুকলেন। তার মানে আপনি শ্রদ্ধা-ভক্তি নিয়ে বিনীতভাবে আসেননি। এসেছেন পুলিশি মেজাজে, যেভাবে আপনারা গুণ্ডা-বদমাইশ-চোরদের বাড়িতে যান। আপনি কাদের বাড়িতে এসেছেন, কোনও আইডিয়া আছে? জমিদার কাশীপ্রসাদ মিত্রর বাড়িতে, যে ভদ্রলোক দেশের স্বাধীনতা-আন্দোলনের জন্য সমস্ত কিছু উৎসর্গ করেছিলেন। চোদ্দটা বছর ইংরেজের জেলে কাটিয়েছিলেন। আপনার চালচলন-ব্যবহার আমাকে ভীষণ ইরিটেট করেছে।’

    অফিসার একেবারে হাতজোড় করে বললেন, ‘আমি ক্ষমা চাইছি। আমাদের সমস্ত ব্যাপারটাই দানবীয়। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা ভদ্রসমাজে মেশার অনুপযুক্ত।’

    মেজোমামা বললেন, ‘হ্যাঁ, এইবার ঠিক আছে। এই স্বীকারোক্তিটাই আমি চাইছিলুম। এইবার আমি আপনাদের জন্যে ভুরভুরে গন্ধঅলা দার্জিলিং চায়ের ব্যবস্থা করব। নকুড়ের কড়াপাক, নরমপাক, মুচমুচে নিমকি। আর বলুন, আর কী ইচ্ছা করেন।’

    লাজুক লাজুক মুখে এক অফিসার বললেন, ‘এই যে এক রকমের মিষ্টি আছে না! গোল-গোল। রসগোল্লা, তবে ঠিক রসগোল্লা নয়। ওপরটা কড়াপাক, ভিতরটা নরম। সারা গায়ে গুঁড়ো গুঁড়ো যেন পাকা দাড়ি বেরিয়েছে।’

    মেজোমামা হাহা করে হেসে বললেন, ‘আরে মশাই ক্ষীরকদম্ব। কদম ফুলের মতো দেখতে, তাই তো?’

    ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ ক্ষীরকদম্ব। ওই নামটা আমার কিছুতেই ছাই মনে থাকে না।’

    অফিসার শরীরটাকে এতক্ষণ টানটান করে রেখেছিলেন, এইবার আলগা করলেন।

    মেজোমামা বললেন, ‘আমাদের ফ্রিজে প্রচুর ক্ষীরকদম্ব আছে। ক’টা খাবেন? এক ডজন বলি।’

    মেজোমামা মুকুন্দকে ইশারা করলেন। মুকুন্দ বুলেটের মতো ভেতর বাড়ির দিকে চলে গেল। আমি জানালার ধাপে পা ঝুলিয়ে বসে বসে মজা দেখছি। আমার ভয় কেটে গেছে। মেজোমামার হাতে পড়ে কেস একেবারে ঘুরে গেছে। এখন মনে হচ্ছে, বড়মামার বদলে পুলিশ অফিসারই না অ্যারেস্ট হয়ে যান।

    মেজোমামা ব্লপ করে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘নিন, কেসটা এইবার ক্লোজ করুন। মনে রাখবেন, ডক্টর মিত্রর সময়ের দাম আছে। টু ইজ হিম, টাইম ইজ মানি।’

    অফিসার ভদ্রভাবে প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, আপনারা আজ সকালে জাস্টিস মুখার্জির কাছে…।’

    মেজোমামা সঙ্গে সঙ্গে পাইপ উঁচিয়ে বললেন, ‘কারেকশান। কারেকশান। মুখার্জি নয় ব্যানার্জি।’

    ‘ইয়েস স্যার, ইয়েস স্যার। সরি স্যার। আমার মাথায় একবার থান ইট ছুঁড়ে মেরেছিল। সেই থেকে আমার স্মৃতিটা একটু এলিয়ে গেছে। জাস্টিস ব্যানার্জির বাড়িতে আপনারা কাউকে পাঠিয়েছিলেন কি?’

    বড়মামা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘না। কই না তো!’

    ইশ! বড়মামা আবার ভুল করলেন। বড়মামা সকালে মুকুন্দকে পাঠিয়েছিলেন, আমার সামনে। বড়মামা মুকুন্দকে কম্পাউন্ডার করবেন। সেইজন্যে একটা সার্টিফিকেট আনতে পাঠিয়েছিলেন। বড়মামার কিছুই মনে থাকে না কেন। বড়মামার সবেতেই, না।

    অফিসার বললেন, ‘আর একটু ভেবে বলুন। জজসায়েবের স্ত্রী তো মিথ্যে বলবেন না। আদালত অবমাননার দায়ে পড়ে যাবেন। তিনি বললেন, ‘ডাক্তারবাবু একজনকে পাঠিয়েছিলেন। সে চলে আসার পর থেকেই সাইকেল হাওয়া।’ তাই আমরা গন্ধ শুঁকে শুঁকে চলে এলুম আসল জায়গায়।’

    মেজোমামা বললেন, ‘বড়দা, তুমি পাঠিয়েছিলে কাউকে? মনে করে দ্যাখো।’

    বড়মামা ভুরুর ওপরে কপালে তিনবার টুসকি মেরে লাফিয়ে উঠলেন, ‘ওই যে ব্যাটা মুকুন্দ। মুকুন্দকে পাঠিয়েছিলুম।’ আর ঠিক সেই সময় মুকুন্দ বিশাল একটা ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল। মাসিমার সাজানো। সে এক দেখার জিনিস। চোর-ডাকাত মাথায় উঠে যাবার অবস্থা। সুন্দর প্লেট। সুন্দর সোনালি বর্ডার দেওয়া গেলাস। টলটলে জল। মাসিমা আবার জলে চন্দন মেশান।

    বড়মামা হঠাৎ হুঙ্কার ছাড়লেন, ‘এই ব্যাটা মুকুন্দ। ব্যাটা সাইকেল চোর।’

    মুকুন্দ অবাক হয়ে বললেন, ‘যাঃ, বড়দার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।’

    পুলিশ অফিসার বললেন, ‘তুমি আগে সাবধানে রাখো। এখন আর অন্য কোনও দিকে মন দিয়ো না।’

    মুকুন্দ ট্রেটা টেবিলের ওপর রাখার সঙ্গে সঙ্গেই এক অফিসার খপ করে তার হাত চেপে ধরে বললেন, ‘সাইকেলটা কোথায় রেখেছ?’

    মুকুন্দ বললে, ‘গোয়ালঘরের পাশে।’

    বড়মামা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘অ্যারেস্ট হিম। এখনই ওকে শ্রীঘরে পাঠান। বছর পাঁচেক ঘানি ঘুরিয়ে আসুক। ব্যাটার যেমন মর্কটের মতো চেহারা। আমি তখনই বলেছিলুম, চোরচোট্টার মতো চেহারা।’

    মুকুন্দ বললে, ‘বা রে! আপনিই তো বললেন, ‘সাইকেলটা গোয়ালের পাশে রাখ। এখন আর কুকুরের ঘরে তুলতে হবে না।’

    ‘আরে গাধা, সেটা তো আমার সাইকেল।’

    ‘আমি তো সেই সাইকেলটার কথাই বলছি।’

    ‘জজসায়েবের সাইকেলটা কোথায় পাচার করে দিয়ে এলি! ব্যাটা চোর।’

    ‘কী আশ্চর্য! জজসায়েবের সাইকেলের আমি কি জানি?’

    বড়মামা অফিসারকে বললেন, ‘লাগান, লাগান, থার্ড ডিগ্রি লাগান। সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না।’

    পুলিশ অফিসার বললেন, ‘আপনি ব্যস্ত হবেন না। ওটা আমাদের ওপর ছেড়ে দিন। হাতের কাজটা আগে ঝট করে সেরেনি। তারপর পেটে স্ক্রু চালালেই সব বেরিয়ে আসবে।’

    মেজোমামা পাইপ চিবোতে চিবোতে বললেন, ‘কত বছর চাকরি হল আপনাদের?’

    মুখে ক্ষীরকদম্ব, অফিসার জবাব দিলেন, ‘তা ধরুন, দশ-বারো বছর তো হবেই।’

    ‘কিস্যু হয়নি। একেবারে নভিশ। কোনও অভিজ্ঞতাই হয়নি। কোনও দিন শুনেছেন, কোনও দিন দেখেছেন, চোর চুরি করে পুলিশ অফিসারকে খাবার পরিবেশন করছে?’

    মুকুন্দ বলতে হবে সাহসী ছেলে। সে অমনি ফট করে বললে, ‘আমি বড়দার সাইকেলে চেপে গেলুম। সইটই করিয়ে সেই সাইকেলে চেপেই ফিরে এলুম তক্ষুনি। আমি জজসায়েবের সাইকেল চুরি করব কী করে? গরিব মানুষ বলে যা খুশি তাই বলবেন! আমি তিন বছর এই বাড়িতে চাকরি করছি, একটা জিনিস চুরি গেছে! আমি চোর?’

    মেজোমামা বললেন, ‘স্টপ। আমি ওই পয়েন্টে আসছি। তার আগে আর একটা পয়েন্ট। একজন মানুষ একসঙ্গে ক’টা সাইকেল চালাতে পারে?’

    অফিসার মুচমুচ করে নিমকি খেতে খেতে বললেন, ‘একটা।’

    ‘তা হলে দুটো সাইকেলের প্রশ্ন আসে কী করে! নেক্সট পয়েন্ট, ও যে সাইকেলটা নিয়েছে, কে দেখেছে! সাক্ষী কোথায়?’

    অফিসার ট্রের থেকে নিমকির টুকরো মুখে পুরতে পুরতে বললেন, ‘জাস্ট সন্দেহ।’

    মেজোমামা বললেন, ‘আমি মুকুন্দর হয়ে জজসায়েবের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করব। ডবল মানহানি। এক, বড়দার মানহানি হয়েছে। দুই, মুকুন্দর।’

    মেজোমামা চেয়ার থেকে উঠে সোজা এগিয়ে গেলেন ফোনের দিকে।

    অফিসার ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কাকে ফোন করছেন?’

    ‘পার্থকে।’

    ‘আপনি নাম ধরে ডাকেন?’

    ‘আমার ক্লাস-ফ্রেন্ড।’

    মেজোমামা ঘড়ি দেখলেন। নিজের মনেই বললেন, ‘ওকে এখন কোর্টেই পাব।’

    মেজোমামা ডায়াল করতে লাগলেন। অফিসার দু’জন পাথরের মূর্তির মতো বসে আছেন।

    মেজোমামা দু’বারের চেষ্টায় লাইন পেয়ে গেলেন। মেজোমামা বলছেন, ‘হ্যালো পার্থ, সকালে তোমার সাইকেল চুরি গেছে? আচ্ছা! তুমি আমাদের সন্দেহ করে থানায় ফোন করেছিলে? করোনি। কে করেছে? তোমার বউ! তিনি তো দুই পুলিশ অফিসারকে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন হামলা করতে। অ, তুমি কিছুই জানো না। তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা তো বড় বিপজ্জনক। এরপর ধরো এক রাতে তোমার বউয়ের নেকলেস চুরি হল, আর সেই রাতে তোমার বাড়ি থেকে আমরা আড্ডা মেরে ফিরে এলুম, পরের দিন পুলিশ এসে আমাদের কোমরে দড়ি বেঁধে রাস্তা দিয়ে টানটে টানতে নিয়ে চলে গেল। বাঃ ভাই বাঃ, জজসায়েব বলে, ক্ষমতা আছে বলে, যা খুশি তাই করবে। ছিঃ ছিঃ, কী অপমান। বেলা বারোটা, বড়দা এখনও চেম্বারে যেতে পারেনি, ধরে বসিয়ে রেখেছে। জেরা চলছে, জেরা। কী অপমান। ফোনটা দেব? কাকে? অফিসারকে?’

    মেজোমামা ইশারা করলেন। বড় অফিসার চায়ের কাপ ফেলে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, ‘এঃ বিশ্রীভাবে ফাঁসিয়ে দিলেন।’ জজসায়েব বোধহয় ওপাশ থেকে খুব ধাতালেন। তিনি অনর্গল হ্যাঁ সার, ইয়েস স্যার করে কুঁজো হয়ে ফিরে এলেন। এসেই টুপি আর ব্যাটনটা সোফা থেকে তুলে নিয়ে, অ্যাটেনশানের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘বলুন, কীভাবে ক্ষমা চাইতে হবে!’

    মেজোমামা নতুন করে পাইপ ধরাতে ধরাতে বললেন, ‘কেন জজসায়েব বললেন বুঝি?’

    ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, এমন ধাতানি জীবনে খাইনি। আপনি যা করলেন না!’

    ‘ক্ষমা চাইবার আগে চা-টা শেষ করে নিন। মুখের চা।’

    অফিসার দুজন একচুমুকে সব চা শেষ করে, গ্যাটম্যাট করে বেরিয়ে গেলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে খেল শুরু হল মুকুন্দর। সে গম্ভীর গলায় বললে, ‘বড়দা, মেজদা, আমি এখনই চলে যাব। আমি চোর, আমি মর্কট। আমি কালো, আমি বেঁটে। আমার মাথায় মোটামোটা চুল।’

    মেজোমামা বললেন, ‘এইবার ঠেলা সামলাও বড়দা। তুমি যখন বলতে শুরু করো, তখন তো সহজে থামতে চাও না।’

    ‘শোনো, আমি একটা সত্য কথা বলব। সত্যি কথা বলতে আমার লজ্জা করে না। পুলিশ দেখে আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম। আমার হাত-পা পেটের ভেতর ঢুকে গিয়েছিল। সেই কারণে আমি একটা দু’টো মিথ্যে কথাও বলে ফেলেছি। তোমরা লক্ষ করেছ?’

    ‘অবশ্যই করেছি। সবেতেই তুমি না বলেছিলে।’

    ‘তোরা দেখলি, পুলিশ দেখলেই নিজেকে কী রকম চোর চোর মনে হয়! সব মানুষের ভেতরেই একটা চোর থাকে, তাই না?’

    ‘শোনো, তোমার গবেষণা এখন রাখো। গণধোলাই যদি খেতে না চাও, সোজা ডাক্তারখানায় চলে যাও। আর মুকুন্দর কাছে তুমি ক্ষমা চেয়ে নাও। সত্যিই, তুমি ছেলেটাকে একেবারে বাঘের মুখে ঠেলে দিচ্ছিলে। কোথায় তুমি ওকে আগলাবে, বিপদ থেকে বাঁচাবে, তা না করে…।’

    ‘যাক ভাই, আমার অন্যায় হয়ে গেছে। এটা কিন্তু আমার ঠিক চরিত্র নয়। আমি ঘাবড়ে গিয়ে করে ফেলেছি। মুকুন্দ, তুই আমাকে ক্ষমা করে দে। পুলিশ না হয়ে বাঘ হলে দেখতিস, আমার স্বরূপ। বাঘা যতীনের মতো লড়াই করতুম।’

    মুকুন্দ বললে, ‘আমার হৃদয়ে শেল বেজেছে।’

    বড়মামা বললেন, ‘ধুর, ব্যাটা। যত আধুনিক বাংলা গানের লাইন ঝাড়ছিস। অরিজিনাল কিছু ছাড়।’

    তিন
    মেজোমামার একটা রকিং-চেয়ার আছে। আমাদের বাড়ি থেকে এই মাইলখানেক দূরে গঙ্গা। সেখানে যত বাগানবাড়ি। সুন্দর সুন্দর বাড়ি। এক সময় সুন্দরই ছিল। এখন সব ভেঙে ভেঙে ভূতের মতো চেহারা হয়েছে। মানুষের হাতে আর একদম পয়সা নেই। বড়মামা বলেন, ‘পয়সা থাকবে কী করে! বড়লোকেরা তো আর রোজগার করতে জানে না। তারা শুধু খরচটাই শিখেছে।’ বড়মামা এই গঙ্গার ধারেই এমন বড়লোক দেখেছেন, রোজ দশ-বারো হাজার টাকা খরচ করতে না পারলে, যাঁর ভীষণ মন খারাপ হত। তাঁর মা অমনি মাথার কাছে বসে চুলে হাত বোলাতে বোলাতে ছেলেকে বোঝাতেন, ‘মন খারাপ করিসনি বাবা! আজ কোনও কারণে পারিসনি, কাল ঠিক পারবি।’ নায়েব পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘হুজুর দোষটা আমারই। আমি যদি একজন নাচিয়ে না এনে এক জোড়া আনতুম তা হলে দশ ছাড়িয়ে যেত। আমি কথা দিচ্ছি, হুজুর, কাল হেসে-খেলে আমি পনেরো পার করিয়ে দেব। কাল আমি সব খাবার পেলেটি থেকে আনাব।’

    হতাশ হুজুর অমনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন, ‘একা আমি আর কত টানব! আমার নিজের পেটটা তো জালার মতো হয়ে গেল! কোনও দিক থেকে কোনও কো-অপারেশান নেই। এইভাবে চললে কবে শেষ হবে। আর কতদিন বড়লোক থাকা যায়! সবকিছুর তো একটা লিমিট আছে। শেষ আছে! পিতা-প্রপিতামহের আমল থেকে, এ যেন চলছে তো চলছেই। আর পারা যায়!’

    নায়েব বললেন, ‘কিছু দানধ্যান করে দিন না হুজুর।’

    হুজুর বললেন, ‘পাগল হয়েছেন! গরিবদের অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে না! মানুষের অভ্যাস খারাপ করতে আছে। নিজের পা কেটে নিয়ে নকল পা লাগালে তার হাঁটা-চলা ঠিক থাকবে? কী যে সব শাস্ত্রবিরোধী কথা বলেন আপনি? নিজের কাজ নিজেকেই করতে হবে। অন্যের সাহায্য নেবেন কেন আপনি? এ তো আমার দায়! আমার কর্মফলের বোঝা আমাকেই বইতে হবে। উঠে-পড়ে লাগুন, উঠে-পড়ে লাগুন।’

    বড়মামা বলেন, ‘তখন কী সুন্দর কালই না ছিল। বিশাল এক আয়রন-চেস্ট ঘরের একপাশে। ইয়া বড় এক হাতল লাগানো। এক-এক জমিদারের সিন্দুকের হাতলে এক-এক রকমের মুখ ঢালাই করা থাকত। বিলেতের ‘চাবস’ কোম্পানি এইসব সিন্দুক তৈরি করতেন। বিশাল হাতির পিঠে চাপিয়ে এইসব সিন্দুকে আনা হত। হাতির চেয়েও সিন্দুক ভারী। হাতির চারটে পা নাকি থরথর করে কাঁপত। এক মাইল যাবার পরই চারজন লোক হাতির চারটে পায়ে রসুন-তেল মালিশ করত। তা না করলে হাতি আর এক পাও হাঁটবে না। হাতির সঙ্গে আসছে ‘চাবস’ কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার, মিস্ত্রি, কুলি আর ডাক্তার। ইঞ্জিনিয়ার আর ডাক্তার দুজনেই লালমুখো সায়েব। মুখে সব ডাংগুলির মতো চুরুট। রেলের ইঞ্জিনের মতো ভসভস ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে পিড়িং পিড়িং ইংরেজি বলতে বলতে আসছে। এখন যেমন প্রধানমন্ত্রীকে দেখার জন্যে রাস্তার দু’পাশে ভিড় জমে যায়, সেকালে সেইরকম জমিদার বাড়ির সিন্দুক দেখার জন্যে ভিড় জমে যেত। সব গাছের ডালে উঠে পড়েছে। বাড়ির চালে উঠে পড়েছে সব। এ কী রে বাবা! ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের খেলা যেন। মাইলে মাইলে হাতির পায়ে তৈল-সেবা। আর সায়েব-ডাক্তার স্টেথিসকোপ দিয়ে হাতির হার্ট পরীক্ষা করছেন। হাতির হৃদয় তো বিশাল বড়। গোটা বুকটাই হৃদয়। হাতির হার্ট পরীক্ষারও একটা কায়দা ছিল। সে স্টেথিসকোপও তেমনই বিশাল। কানে দেবার নল দুটো বিশ তিরিশ ফুট লম্বা। আর বুকে লাগাবার চাকতিটা ঠিক চাটুর মতো। তেমনি তার ওজন। হাতির পেটের তলায় ঝোলায় বেঁধে একজন কুলিকে ঝুলিয়ে দেওয়া হত। সে মোটর-মেকানিকের মতো পেটের তলায় চিত হয়ে ঝুলে ঝুলে চাটুর মতো চাকতিটা বুকে ঠেকাত, আর বিশ ফুট দূরে টুলে বসে কানে নল লাগিয়ে সায়েব-ডাক্তার হৃদয়ের শব্দ শুনতেন। তিনি যেন জাহাজ চালাচ্ছেন। থেকে থেকে বলছেন, ‘থার্টি ডিগ্রি নর্থ, ফিফটি ডিগ্রি সাউথ।’ প্রায় একঘণ্টা লেগে যেত হাতির হার্ট পরীক্ষা করতে। হার্টের আবার সেইরকম শব্দ। যেন তালে তালে জয়ঢাক বাজছে। সায়েব-ডাক্তার হার্ট-পরীক্ষার পর ঝাড়া আধ ঘণ্টা আর কোনও কথা শুনতে পেতেন না। একেবারে কালা। বড়মামা গল্প করেন, ‘সাতক্ষীরের ছোট তরফের জমিদারের সিন্দুক আনার সময় হাতির হার্টের শব্দে ডাক্তারই হার্টফেল করেছিলেন। একেবারে নতুন ডাক্তার, সবে দেশ থেকে এসেছেন। দু’একটা কুকুর-টুকুরের হার্ট দেখে হাতেখড়ি। হাতির হার্ট সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না। আচমকা ধাঁই করে কানের ভেতর দিয়ে ঝেড়ে দিয়েছে তোপ। নল কানে দিয়ে যতটা দূরে বসা উচিত ছিল, ততটা দূরে বসেননি। সায়েবরাও বোকা হয়। কত সায়েব আছে অঙ্কে আমার মতো কেঁদেকক্কে পঞ্চাশ পায়। সংস্কৃতে শূন্য।’

    আমার বড়মামার কাছে শোনা এই সব কাহিনী। গল্প নয়। আমি একবার গল্প বলেছিলুম বলে, বড়মামা অসম্ভব অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। গল্প আবার কী? এসব সত্য ঘটনা। কাহিনী। এক-এক জমিদার চাবস কোম্পানিকে সিন্দুক অর্ডার দেবার সময় বলে দিতেন হাতলে কিসের মুখ ঢালাই করা হবে। সিংহ, বাঘ, মকর, সাপ, কুকুর, মড়ার মাথা, ভৈরবী, মা কালী, শিব, দুর্গা। সায়েব কোম্পানি হলে কী হবে! যা বলবে, যা ছবি সাপ্লাই করবে সব ঢালাই করে দেবে সুন্দর করে। এক-একটা সিন্দুক একেবারে মাপ-মতো লোহা গলিয়ে ছাঁচে ফেলে ঢালাই করা। এই তার পুরু চাদর। হাতির পিঠ থেকে কপিকলে করে নামিয়ে পঞ্চাশজন লোক গলদঘর্ম হয়ে খাজাঞ্চিখানায় এনে সেট করে দিয়ে যেত। আনার সময় তিন চারজন এমন আহত হত যে, একমাস বিছানায় পড়ে থাকত। কেউ কেউ চিরকালের মতো পঙ্গু হয়ে যেত। যারা পঙ্গু হয়ে যেত বিলিতি কোম্পানি তাদের সারা জীবন পাঁচ সিক্কা হাতে ভাতা দিত। ইট, সিমেন্ট আর সুরকি-বালি দিয়ে বেদী তৈরি করে সিন্দুকটাকে এমনভাবে বসানো হত, যে হাজারটা লোক শত চেষ্টা করেও সিন্দুকটাকে সরাতে পারত না। বিলিতি তালা চাবি খুলে হাতলটাকে পড়পড় করে পনেরোবার ঘোরালে তবেই সিন্দুকের দরজা খুলত। ভেতরে একেবারে তেলা সলিড লোহার সব খুপরি। হিরে রাখো, জহরত রাখো। থরে-থরে নোট সাজিয়ে রাখো। মোহর রাখো তিন মণ, চার মণ কয়েন রাখো। দলিল সাজিয়ে রাখার আলাদা ব্যবস্থা। জমিদারি মানে সিন্দুক। সিন্দুক দেখে জমিদার বড় কি ছোট বোঝা যেত।

    খাজাঞ্চিখানার চেহারা হত গুমঘরের মতো। ছোটছোট পাতলা পাতলা ইট দিয়ে বাড়ি তৈরি হত সেকালে। এই মোটা মোটা সব দেওয়াল। এত মোটা যে, দেওয়ালের মধ্যে জান্ত মানুষ ঢুকিয়ে, দেওয়াল আবার গেঁথে প্লাস্টার করে দিলে বোঝার ক্ষমতা থাকত না তার ভেতরে একটা মানুষ আছে। ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে কঙ্কালে। সেই দেওয়ালেই হয়তো মা কালীর ছবি ঝুলছে। কি কোনও সায়েব শিল্পীর আঁকা পুরনো কলকাতার দৃশ্য। খাজাঞ্চিখানায় কোনও জানলা থাকত না। নোনা-ধরা দেওয়াল। ঝুল তো থাকবেই। দেওয়াল ঘেঁষে খুব নিচু লম্বা লম্বা চৌকি। প্রজারা সব এসে সারবেঁধে পাশাপাশি বসবে। প্রজারাই তো জমিদারের সরষে। যত রগড়াবে, তত তেল বেরোবে। পাটিপাতা উঁচু চৌকির ওপর তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে আছেন নায়েবমশাই। পরনে ধুতি আর বেনিয়ান। সে বেশ মজার জামা। ফতুয়ার মতোই। পাশে ফিতে বাঁধা। যেন ফাইলকভার। নায়েবমশাইয়ের সামনে একটা ডেস্ক। দোয়াত। কলম। ব্লটিং। খেরোর খাতা। টিপসই দেওয়ার কালি। মাথার ওপর ঝুলছে টানা পাখা। দড়িটা চলে গেছে বাইরের বারান্দায়। সেখানে দরজার পাশে জড়োসড়ো হয়ে বসে একটা লোক ক্রমান্বয়ে দড়ি টেনে চলেছে। ঝালর লাগানো পাখার বাতাস একমাত্র নায়েবমশাই আর গোমস্তাদের গায়েই লাগছে। যারা পাখা টানতো তাদের সায়েবরা বলত ‘পাঙ্খা পুলার’ আর খাজাঞ্চিরা বলতেন, ‘পাখাবরদার’। পাখাবরদাররা এক গুলি আফিং খেয়ে পাখা টানতে বসত। কাজটা এত একঘেয়ে, যে তা না হলে পারা যেত না। লোকটার ঘোর লেগে যেত। মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়তে হাত বন্ধ হয়ে যেত। পাখা থেমে আসত। নায়েবমশাই অমনি ভরাট মেঘের মতো গলায় বলে উঠতেন—’ইয়াও উল্লুক’। অমনি পাখা আবার জোরে জোরে দুলে উঠত। নায়েবমশাইদের প্রিয় গালগাল ছিল, উল্লুক, মর্কট আর শয়তানের বাচ্চা। নায়েবমশাইদের বিচারে মানুষের জাত ছিল মাত্র দুটি, হুজুরের জাত আর উল্লুকের জাত। নায়েবমশাইয়ের পেছনে সেই সিন্দুক। দরজায় লতাপাতার নকশা। নায়েবমশাইয়ের বাঁ পাশে একটা ছোট ঘর। সেইঘরটাকে বলা হত রগড়ানির ঘর। কৃপণ প্রজা, যারা জমিদারমশাইয়ের সেবায় টাকা-পয়সা ছাড়ার ব্যাপারে লেজে খেলত, তাদের ওই ঘরে নিয়ে গিয়ে স্বভাব সংশোধন করা হত। সামান্য দু’একটা দাওয়াই। মেঝেতে চিত করে ফেলে বুকে বাঁশডলা। একে বলা হত বাটনা-বাটা। আর একটা দাওয়াইয়ের নাম ছিল কীচক বধ। দু’জনে দুটো পা ধরে দু’পাশে ফেঁড়ে ফেলার চেষ্টা করত। রোগীর সঙ্গে রোগীর মতোই ব্যবহার করা হত। দাঁড় করিয়ে রেখে বা বসিয়ে রেখে কষ্ট দেওয়া হত না। মেঝেতে সুন্দর করে শুইয়ে চিকিৎসা করা হত। জল চাইলে জল দেওয়া হত। জমিদারদের যত সব নিষ্ঠুরতার কথা সাতকাহন করে বলা হয়, দয়ালুতার কথা বলা হয় কই! পুলিশ-লকআপে চরিত্র-সংশোধনের সময় জল দেয়ার কোনও রেওয়াজই নেই। সে যেন জল ছাড়াই রোগারোগ্যের ক্যাপসুল গেলানো।

    বড়মামার স্পষ্ট সব মনে আছে। সকালবেলা নায়েবমশাই এসে সেরেস্তায় বসলেন। দেওয়ালের চুনকালি খসে খসে, কোথাও ফুটে উঠেছে রাক্ষসের মুখ। কোথাও বাঘের মুখ। নীচু চৌকিতে সারি দিয়ে বসে আছে ‘উল্লুকেরা।’ প্রত্যেকেরই ট্যাঁকে কিছু না কিছু আছে। নায়েবমশাই প্রথমেই একটা ঢেঁকুর তুলবেন, যেন সৌদামিনীর গোয়ালে সন্ধ্যার বাছুর ডেকে উঠল। তিনি এদিক-ওদিকে তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজছেন; সবাই একটু সচকিত হবেন। নায়েবমশাই হঠাৎ আসফাকুলকে দেখতে পেয়ে বলে উঠবেন, ‘কী রে ব্যাটা দেখতে পাচ্ছিস না, পেট গরম হয়েছে। তোর কোনও কর্তব্য জ্ঞান নেই!’

    ‘এজ্ঞে?’

    ‘এজ্ঞে! ব্যাটা ভোঁদাড়! যা এক কাঁদি নেয়াপাতি ডাব পেড়ে আন। হ্যাঁরে, তোরা কি কোনওকালে মানুষ হবি না! চিরটাকাল উল্লুকই থেকে যাবি! আমি তোদের মা-বাপ। স্বীকার করিস তো! একথা অস্বীকার করিস, আর না স্বীকার করিস! কে, কে, কোন ব্যাটা অস্বীকার করলে?’

    ‘এজ্ঞে, কেউ তো করেনি।’

    ‘তাই বল। অস্বীকার তোরা করতে পারিস। তোদের দ্বারা সবই সম্ভব। তোরা দিনকে রাত করতে পারিস। আমাদের শাস্ত্রে কী বলছেন জানিস, মানুষ অকৃতজ্ঞ জেনেও তাদের মঙ্গলের জন্যে জীবন উচ্ছন্নে দেবে। তোরা কত বড় অকৃতজ্ঞ দ্যাখ, তোরা কেউ ডাবের কথা বললি না, আমাকে বলতে হল! পেট গরম হলে কী করতে হয়? যদুগোপাল? তুমি বলো?’

    ‘আজ্ঞে উপবাস। ক্ষণে ক্ষণে জলপান আর তলপেটে ভিজে গামছা লেপন।’

    ‘প্রভু শ্রীহরি। কী হাতে আমাকে সমর্পণ করলে প্রভু! এ যে দেখি শৃগালের চেয়েও ধূর্ত। তবু বললে না পাঁচ পোয়া দই আমার দোকান থেকে এনে দিচ্ছি নায়েবমশাই। শোনো গোপাল, শাস্ত্র বলেছেন, শঠেশাঠ্যং। যা পাঁচ পোয়া পয়োধিতে হত, এখন আর হবে না মানিক। সের খানেক ছানারও প্রয়োজন। যাও বসে বসে গোঁফ না চুমড়ে গাত্রোৎপাটন করো।’

    নায়েবমশাই এদিক ওদিক তাকালে, ‘এই যে শ্রীল শ্রীযুক্ত মঙ্গল হালদার, বেশ ঘাপটি মেরে বসে আছিস তো! উঁ, আবার নতুন লুঙ্গি পরা হয়েছে। দিনকাল তা হলে ভালোই যাচ্ছে! সকালে জালে গিয়েছিলে?’

    ‘আজ্ঞে।’

    ‘আজ্ঞে, তা জানো না পেট গরম হলে কচিপাঁঠা নাস্তি! কোবরেজি বিধান হল, পেঁপে, কাঁচকলা, ডুমুর, থানকুনি পাতা সহ কুর্চিবাটার ঝোল। কাঁচালঙ্কা চলবে না। মরিচের ঝাল চলতে পারে। মরিচ পেট ঠান্ডা করে। বিকল্পে লাউ-চিংড়ি। তোমরা সব রয়েছ, এখন তোমরাই বলো দিবা-দ্বিপ্রহরে আমি কি সেবন করব! আমি নিজে থেকে কিছু বলব না। যোগ্য সন্তানেরা থাকতে পিতার কিছু বলা সাজে না।’

    জমিদারি এক মজার ব্যবসা। নায়েব আর প্রজায় কথায় কথায় বেলা বাড়ে। এদিকে সিন্দুকের হাতল ঘুরতে থাকে। ওদিকে দাওয়া ভরে ওঠে, ডাব রে, তাল রে, পেঁপে রে। মাছ আছে। আছে কচি পাঁঠা। গোবিন্দভোগ। দলিল বন্ধক পড়ে। ভিটে লাটে ওঠে। আর যিনি জমিদারমশাই, তিনি তখনও মখমলের বিছানায়। সিল্কের লুঙ্গি। নাসিকাগর্জন। রাতে সাধনভজন করেন, তাই নিদ্রাভঙ্গে বিলম্ব। তাই কথায় আছে, নায়েব জাগেন দিনে, জমিদার জাগেন রাতে।

    আমার বড়মামা এইসব এত সুন্দর করে বলেন! বড়মামাদেরও সিন্দুক ছিল। সেই সিন্দুকের হাতলে ছিল মকরের মাথা। সে এত সুন্দর কাজ, বিশ্বাসই হয় না যে বিলেতে তৈরি। সেই সিন্দুক গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। সাতচল্লিশ সালের ১৫ই আগস্ট। সিন্দুক বিসর্জন দিয়ে স্বাধীনতাকে স্বাগত জানানো হয়। আমার বড়মামাদের ফ্যামিলির নিয়ম হল, কোনও কিছু বিক্রি করা চলবে না। হয় দিয়ে দাও, না হয় ফেলে দাও। সিন্দুকটা দান করে দিতে চেয়েছিলেন, কেউ নেয়নি। জমিদারির বেশিরভাগটাই দখল হয়ে গেছে। কিছু সরকার নিয়েছেন, কিছু নিয়েছেন উদ্বাস্তুরা। বড়মামার কাছে এখনও দলিলের পাঁজা আছে। সে যে কত! পার্টিশান তৈরি করা যায়।

    গঙ্গার ধারের এক জমিদারের বাগানবাড়ি এক সায়েব কিনেছিলেন। সেই সায়েবের নাম ছিল টবিন। টবিনসায়েব সায়েব হলেও খুব ফ্রেন্ডলি ছিলেন। সাঙ্ঘাতিক ভালো ফুটবল খেলতেন। টাবিনসায়েবের গল্প শুনতে হলে মেজোমামাকে ধরতে হবে। বয়েসের অনেক পার্থক্য থাকলেও টবিনসায়েব মেজোমামার বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন। মেজোমামার ফুটবলে খুব ঝোঁক ছিল। টবিনসায়েব বাড়ির মাঠে মেজোমামাকে ফুটবল শেখাতেন। পাস, ড্রিবলিং, ডজিং। মেজোমামার দিন তো টবিনসায়েবের বাগানেই কাটত। সায়েব টেনিস খেলা শিখিয়েছিলেন। বিলিতি দাবা। ব্রিজ। আবার মেজোমামাকে সাঙ্ঘাতিক ভালো ইংরিজিও শিখিয়ে গেছেন। রান্না শিখিয়েছেন স্ট্যু, স্যুপ, ফ্রাই। টবিনসায়েবের গল্প বলতে বলতে মেজোমামার চোখ ভিজে-ভিজে হয়ে যায়। তখন বড়মামা দুঃখের সঙ্গে লড়াই করছেন। ছোলা আর ছাতু খেয়ে আর ব্যায়াম করে মেজোমামার তখন রাজপুত্রের মতো চেহারা হয়েছে। চেহারা দেখলে কে বলবে, মেজোমামার স্কুলের মাইনে আসে ঘুঁটে বেচা পয়সা থেকে। সেইসময় মেজোমামার সঙ্গে সায়েবের পরিচয় স্কুলের ফুটবল-গ্রাউন্ডে। সায়েবের আর কেউ ছিল না। মেমসায়েব বিলেতে চলে গেছেন। ইংরেজ মেয়ের সহ্য হয়নি ভারতের স্বাধীনতা। মেজোমামাকে সায়েব নিজের ছেলের মতোই ভালোবেসে ফেললেন। সায়েবের বাগানেই মেজোমামার দিন কাটত। একদিন মেজোমামা পেটে ব্যথায় ধনুক হয়ে গেলেন। টবিনসায়েব সঙ্গে সঙ্গে নিজের গাড়িতে করে নিয়ে গেলেন মেডিকেল কলেজে। অ্যাপেনডিকস। সঙ্গে সঙ্গে অপারেশান করতে হবে, নয় তো ফেটে যাবে। অ্যাপেনডিকস অপারেশান তখনও মেজর অপারেশান। সায়েব মেজোমামাকে কেবিনে রেখে, সারারাত অপারেশান-থিয়েটারের বাইরে বসে প্রার্থনা করে, ভোরে বাড়ি ফিরলেন। বড়মামা টাকার কথা তুলেছিলেন। সায়েব বলেছিলেন, ‘হি ইজ মাই সান। পৃথিবীতে টাকাটাই সব নয়।’

    সায়েব ভারতে আর থাকতে পারলেন না। যাবার আগে মেজোমামাকে তাঁর লাইব্রেরি, রকিং-চেয়ার, বিলিতি রাইটিং ডেস্ক, কলম, ঘড়ি, মাছধরার সরঞ্জাম, সব দিয়ে গেছেন। মেজোমামা এই চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছেন। কখনও পড়ছেন। কখনও একটু একটু ঘুমিয়ে পড়ছেন। ডাক্তারখানা থেকে বড়মামার ফিরতে দেরি হচ্ছে। দেরিতে গেলে যা হয়। নিমন্ত্রিত শরৎবাবু বড়ামামা না এলে বসবেন না। আমরা তো বসবই না। শরৎবাবু শুয়ে শুয়ে কাগজ পড়ছিলেন। এখন তিনি কাগজ চাপা পড়ে আছেন। মাঝারি ধরনের নাক ডাকছে। মন্দ লাগছে না। মেজোমামার দোলদোল চেয়ার দুলছে। ওই চেয়ারে বসে যত দোলা যায় ততই ঘুম আসে। মেজোমামার চোখদুটো বন্ধ। কোলের ওপর চশমা। ঠোঁটের কোণে হাসি। মেজোমামা বলেন, ‘আমি চোখ বুজলেই স্বপ্ন দেখি—শেলি, কিটস, বায়রন, শেকসপিয়ার। লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটে ঘুরে বেড়াচ্ছি। শেকসপিয়ারের বাড়ির পাশের লেকে রাজহংস দেখছি।’

    আমি একটু অন্যমনস্ক হয়েছিলুম। আমার যখন ভীষণ খিদে পায়, তখন আমি টিনটিন পড়ি। হঠাৎ মনে হল, মেজোমামা পেছন দিকে উড়ে গেলেন যেন। স্বপ্ন দেখছি না তো! না, আমি কেন স্বপ্ন দেখব! আমি তো জেগেই আছি। ধমাস করে একটা শব্দ হল। মেজোমামা চেয়ারের পিছন দিকে মেঝেতে হলাসনের ভঙ্গিতে পড়ে আছেন। খালি চেয়ারটা তিরতির করে দুলছে। মেজোমামার পা দুটো বুক-কেসে গিয়ে লেগেছিল। শরৎবাবুর ঘুম চটে গেছে। তিনি কাগজ চাপা অবস্থায় কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। তিনিও মনে হয় স্বপ্ন দেখছিলেন। কাগজের তলা থেকে চিৎকার করছেন, ‘হেল্প, হেল্প, টাইগার, টাইগার!’

    আমি কাকে হেল্প করব! মেজোমামা ৎ-এর মতো হয়ে আছেন। শরৎবাবুর শবাসন।

    মেজোমামা বললেন, ‘টুক করে আগে আমাকে তুলে দে। চেয়ারটা সরা, তা হলেই আমি সোজা হয়ে যাবো।’

    চেয়ারটাকে সরাতেই মেজোমামা উঠে পড়লেন। উঠেই চেয়ারে বসে দোল খেতে খেতে শরৎবাবুকে বললেন, ‘জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসুন সার। কাগজের জঙ্গলে, কাগজের বাঘ দেখছেন আপনি।’

    মেজোমামাকে এখন দেখলে কেউ আর বুঝতেই পারবে না, যে এই মানুষই একটু আগে চেয়ার উলটে পেছনে ডিগবাজি খেয়েছিলেন। মেজোমামার শরীর এখনও বেশ ফিট। কাগজের মোড়ক খুলে শরৎবাবুর মুখটা বের করে আনলুম। ঘেমে গেছেন ভদ্রলোক। শরৎবাবুর চোখ দুটো বেশ বড় বড়। ভারি ভালো মানুষের মতো দেখতে। বড়মামার ছেলেবেলার বন্ধু। জামালপুরে থাকেন। কলকাতায় ছোট্ট একটা একতলা বাড়ি আছে। বাড়িটা সারা বছর বন্ধই থাকে। জামালপুর থেকে বছরে একবার ছুটিতে এসে যখন দরজা খোলেন, তখন সে যেন এক দেখার মতো দৃশ্য! একেবারে কবিতা, চারপাশে ঝুলের পর্দা ঝুলছে। প্রতি সূক্ষ্ম সুতোয় বোনা ভূতের কাপড়ের মতো। আর সেই ঝুলে জড়িয়ে আছে এক বছরের সঞ্চিত ধুলোর কণিকা। রোদের আলো পড়ে চিকচিক করছে হিরের গুঁড়োর মতো। শরৎবাবু শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো বড় সাহিত্যিক না হলেও, সাহিত্যে নাম করেছেন। ভূতের গল্প আর ভ্রমণের গল্প ভালোই লেখেন। একটু আগে আমাকে দশখানা বই উপহার দিয়েছেন। আর আমি এতবড় একটা ছেলে, আমাকে উপহার দিয়েছেন কি না, ব্যাটারিচালিত একটা মোটরগাড়ি। সেটাকে আবার ইচ্ছেমতো দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। গাড়িটা নিয়ে নিজেই এতক্ষণ খেলা করছিলেন আপন মনে। বড়মামা বললেন, ‘শরৎ বড় হলেও শিশু।’ বড়মামা, খোকা বলে ডাকেন।

    শরৎবাবু উঠে বসে বললেন, ‘শুধু ঘুম নয়, বেশ বিউটিফুল একটা স্বপ্নও দেখে ফেললুম। আমার নেকস্ট বইতে কাজে লাগিয়ে দেব।’

    মেজোমামা বললেন, ‘কী জাতীয় স্বপ্ন?’

    ‘ডিটেলস বলতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে, তবে এইটুকু জেনে রাখুন ওয়াইল্ড লাইফের দিকেই যাবে।’

    ‘আপনি তো মশাই ঘুমোলেন পনেরো মিনিট আর স্বপ্নটা তা হলে বলতে তো পনেরো মিনিটই লাগা উচিত।’

    ‘না, না, স্বপ্ন সম্পর্কে আপনার পড়াশোনা আর অভিজ্ঞতা থাকলে এ-কথা বলতেন না। পনেরো মিনিটের স্বপ্ন সারাদিন বলেও হয়তো শেষ করা যাবে না। স্বপ্ন গোটানো থাকে। স্বপ্ন অনেকটা কন্ডেনসড মিল্কের মতো। তবে শেষ দৃশ্যে দেখলুম, আপনি আর আমি দু’জনে মাচা ভেঙে দমাস করে পড়ে গেলুম, জাস্ট ইন ফ্রন্ট অব এ রয়াল বেঙ্গল টাইগার। উঃ, সে কী থ্রিল। আর আপনার কী সাহস! আমি ভয়ে চিৎকার করছিল, ‘টাইগার, টাইগার, বার্নিং ব্রাইট’, আর আপনি খিল খিল করে হাসছেন আর বলছেন—’পেপার টাইগার।’ ঝাঁক করে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি আমার মুখের ওপর পড়ে আছে একটা খবরের কাগজ।’

    মেজোমামা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। আড়মোড়া ভেঙে বললেন, ‘আমি একবার সাইকেলটা নিয়ে বেরোই। দেখি বড়দার কী অবস্থা! আর এক প্যাকেট টোব্যাকো কিনে আনি। স্টক ফুরিয়ে এসেছে।’ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যাবে না কি?’

    ‘চলুন যাই।’

    গোয়ালের পাশে বেড়ার গায়ে সাইকেলটা ঠেসানো হয়েছে। মেজোমামা আর আমি সেইদিকে এগিয়ে চললুম। দিনটা ভারি সুন্দর হয়ে উঠেছে। মোমপালিশ করা নীল আকাশ। মাঝেমাঝে ভেসে আসছে সাদা মেঘের ভেলা। দুর্গাপুজো এসে গেল। কী ভালো লাগে এই সময়টা। সবুজের ফোয়ারা ছুটছে। বিশাল একটা ডাঁশা ভোমরা ভোঁ-ভোঁ করে উড়ছে। চকোলেটের যেন ডানা গজিয়েছে। বড়মামার বেতের ঝোপটা একেবারে ফাটাফাটি দেখতে হয়েছে।

    সাইকেলটা সামনে এসে মেজোমামা বললেন, ‘এ কী? এটা কার সাইকেল। এ তো আমাদের সাইকেল নয়! আমাদের সাইকেল তো এত নতুন ছিল না। এতো অন্য কোম্পানির, অন্য মডেলের।’

    মেজোমামা চিৎকার করে মুকুন্দকে ডাকলেন। মুকুন্দ সবে চান করে চুলের কেয়ারি করছিল। সেই অবস্থায় বেরিয়ে এল।

    ডোরাকাটা একটা হাফপ্যান্ট পরে। মাথার চারপাশ দিয়ে তেলজল গড়াচ্ছে।

    মেজোমামা বললেন, ‘এটা কার সাইকেল মুকুন্দ?’

    ‘কেন মেজদা, আমাদের সাইকেল?’

    ‘ভালো করে দ্যাখো।’

    মুকুন্দ গাড়ির পাশে নিচু হয়ে ভালো করে দেখে ভয়ে ভয়ে বললে, ‘মেজদা, এ সাইকেল আমাদের নয়। অসম্ভব। এ একেবারে অন্যজাতের সাইকেল। এর গায়ের রং আলাদা। এর চেহারা আলাদা।’

    ‘কোথা থেকে তুমি পেলে এটাকে?’

    মুকুন্দ বললে, ‘মেজদা, আমার কী মনে হচ্ছে বলব! আমি যখন জজসায়েবের বাড়িতে গেলুম, তখন মনে হচ্ছে বারান্দায় একটা সাইকেল ছিল। আমার যেন মনে হচ্ছে, আমার সাইকেলটা আমি পাশে রেখে, ভেতরে গেলুম। সার্টিফিকেটটা নিলুম। বাইরে এলুম। সাইকেলটা নিলুম। রাস্তায় নামলুম। সাইকেলে চাপলুম। গড়গড় করে চলে এলুম বাড়ি। এইবার কী হল বলুন তো!’

    মেজোমামা কেমন যেন হয়ে গেলেন। মাথাটাকে ঝাঁকিয়ে নিয়ে বললেন, ‘কী হল! আমার তো মনে হল ছোট সাইজের একটা বাঘ বেরিয়েছিল। এলুম, খেলুম, হালুম, হালুম।’

    ‘আপনি একটু বসুন এই জায়গাটায়, আমি আপনাকে অঙ্কটা বুঝিয়ে দিই। এর মধ্যে অল্প একটু অঙ্ক আছে।’

    গোরুর বিচুলি কাটার জন্যে ওই জায়গায় বেশ বড় একটা পাথর রয়েছে। মেজোমামা সেই পাথরটার ওপর বসলেন। আমার তো মনে হচ্ছে বড়মামার ডান হাত মুকুন্দ এখনই একটা গোয়েন্দা-কাহিনী শোনাবে। মেজোমামা বেশ গুছিয়ে বসলেন। মেজোমামার এই গুণটা আছে, যখন যেখানেই বসেন, বেশ সুন্দর করে জমিয়ে বসতে পারেন। বসেই দু’তিনবার নাক ফোঁস ফোঁস করে বললেন, ‘গোয়ালের ধারে বেশ একটা গ্রামগ্রাম গন্ধ আছে, তাই না! শুঁকলেই মনে হয় স্বাস্থ্য ভালো হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ বল, এইবার অঙ্কটা বল।’

    মুকুন্দ মেজোমামার পায়ের কাছে বসে পাশ থেকে একটা খোলামকুচি তুলে নিল, ‘মেজদা, ছবি না আঁকলে আপনি বুঝতে পারবেন না।’

    মেজোমামা সামনে দিকে ঝুঁকে পড়লেন। মুকুন্দ পায়ের কাছের জমিতে ছবি আঁকতে লাগল। আঁকছে আর বেরোচ্ছে, ‘ধরুন, এই হল জজসায়েবের বারান্দা। আর এই হল একটা সাইকেল। আমি গিয়ে আমার সাইকেলটা এই সাইকেলটার পাশে রাখলুম।’

    আমি আর মেজোমামা দু’জনেই দেখছি। আহা, মুকুন্দর কী আঁকার ছিরি। লম্বা একটা রেখা টেনেছে; তার ওপর মেরেছে দুটো ঢেরা।

    মেজোমামা বললেন, ‘তারপর?’

    ‘আমি আর ডান পাশের খোলা দরজা দিয়ে, ঘরের ভেতরে চলে গেলুম।’

    মুকুন্দ ডান পাশে ফাঁক ফাঁক করে দুটো রেখা টানল। সেই রেখা দুটো হল দরজা। মেজোমামা বললেন, ‘তারপর?’

    ‘আমি যখন ঘরের ভেতরে, জজসায়েবের সঙ্গে কথা বলছি, তখন কেউ এসে একটা সাইকেল নিয়ে চলে গেল। তার মানে এই দুটো সাইকেলের একটা হাওয়া হয়ে গেল।’

    মুকুন্দ একটা ঢেরা মুছে দিল।

    মেজোমামা বললেন, ‘তারপর?’

    ‘আমি সার্টিফিকেট নিয়ে আনন্দে লাফাতে লাফাতে বাইরে এসে এই সাইকেলটা দিয়ে একলাফে চেপে বসে সোজা বাড়ি।’ মুকুন্দ ঢেরাটা মুছে দিল।

    মেজোমামা জিগ্যেস করলেন, ‘কিসের এত আনন্দ?’

    ‘বা রে! আমি যে কম্পাউন্ডার হব।’

    ‘কম্পাউন্ডার হবি। কে তোকে কম্পাউন্ডার করবে?’

    ‘বড়দা। আমার বড়দা। বড়দা ছাড়া আমার কে আছে!’

    ‘উঃ, দেশের কি দুর্দিন। তুই হবি কম্পাউন্ডার! তোর ওই শাবলের মতো হাত আর চিমটের মতো আঙুল নিয়ে ইঞ্জেকশান দিবি? তুই ইংরেজি পড়তে জানিস, মুকুন্দ?’

    ‘আমাকে আন্ডার এস্টিমেট করবেন না মেজদা।’

    মেজোমামা চমকে উঠে বললেন, ‘অ্যাঁ, তুই আন্ডার এস্টিমেট বলতে পারলি। সত্যিই তোকে আমি আন্ডার এস্টিমেট করেছিলুম।’

    মুকুন্দ বললে, ‘ছেড়ে দিন। ওটা হল গিয়ে সাইড ইস্যু।’

    মেজোমামার হাত-ধরা পাইপটা টপ করে পায়ের কাছে পড়ে গেল। অবাক হয়ে তাকালেন মুকুন্দর দিকে। মেজোমামার মুখের চেহারা পালটে গেছে। কেউ ভালো লেখাপড়া করলে, মেজোমামা তাকে ভীষণ ভালোবাসেন। তার জন্যে সবকিছু করতে পারেন।

    মুকুন্দ বললে, ‘কিছু মনে করবেন না মেজদা, আপনার মধ্যে এখনও বেশ জমিদারি অহঙ্কার আছে। সব মানুষকেই আপনি আগে থেকে বিচার করে ফেলেন।’

    ‘তোর মাথা! আমাকে বড়দা বাতের তেল আর ঘুঁটে-বেচা পয়সায় মানুষ করেছেন। আমি ছোলা আর ছাতু খেয়ে বড় হয়েছি। তুই আমার মধ্যে দেখলি জমিদারি অহঙ্কার! তোর চালচলন দেখে আমার মনে হয়েছিল, তুই গ্রেটবেঙ্গল সার্কাসে মোটর সাইকেলের খেলা দেখাতে পারিস।’

    ‘মেজদা ধরেছেন ঠিক। আমার বাবা সার্কাসে ট্রাপিজের খেলা দেখাতেন। আমি হাফ বাঙালি, হাফ মাদ্রাজি।’

    ‘তুই সার্কাস থেকে বড়দার সার্কাসে এলি কীভাবে!’

    ‘সে মেজদা, আর এক স্টোরি! অনেক সময় লাগবে। আপনি কি সাইকেলের কথা শুনতে চান?’

    ‘অবশ্যই চাই।’

    ‘আমি একটা সাইকেল চেপে গিয়েছিলুম, আমি একটা সাইকেল চেপে ফিরে এলুম। ফিরে এসে সাইকেলটাকে বেড়ার গায়ে রেখেই, বড়দার কাজে লেগে গেলুম। এইবার বলুন তো ব্যাপারটা কী হল?’

    ‘ব্যাপারটা এই হল, তুই জজসায়েবের সাইকেলটা চুরি করলি, আর আমাদের সাইকেলটা চুরি করল অন্য কেউ।’

    ‘মেজদা, আমার কিঞ্চিৎ আপত্তি আছে।’

    ‘কিঞ্চিৎ শব্দটা তুই কোথা থেকে শিখলি?’

    ‘বড়দার কাছ থেকে। রোজ রাতে বড়দা আমাকে সংস্কৃত শেখাচ্ছেন আজকাল। আমার স্লাইট অবজেকশন আছে মেজদা, আমি চুরি করিনি। আমি চেপে চলে এসেছি। না দেখে চেপে চলে এসেছি।’

    ঠিক এই সময় বড়মামা হন্তদন্ত হয়ে এসে ঢুকলেন। মুখ চোখ লালচে দেখাচ্ছে। এতটা পথ রোদে রোদে এসেছেন তো। বড়মামা এসেই বললেন, ‘কী কাণ্ড ভাই রে! ডাক্তারিটা এইবার ছাড়তে হবে। অসম্ভব, অসম্ভব ব্যাপার। এত অসুখ বাড়লে সামলাব কী করে! আটান্নটা ইনজেকশন, একের পর এক। তার মধ্যে একডজন ইন্টারভেনাস। রোগীদের আবার আদিখ্যেতা কত! প্রেশার না দেখলে অভিমান। মুখ অমনি তোলো হাঁড়ি। বুক-পিঠ তো দেখতেই হবে, আবার পাঁজরায় তবলা বাজাতে হবে। ব্লাডপ্রেশার-মাপা চাট্টিখানি কথা! ফ্যাঁস-ফোঁস, ফ্যাঁস-ফোঁস করেই যাও। ইঃ, এতখানি বেলা হল! তোরা সব অনাহারে! শরৎ দেখি বসে বসে লজেন্স খাচ্ছে।’

    বড়মামার চোখ পড়ে গেল সাইকেলটার দিকে।

    এই পলক দেখেই বললেন, ‘নতুন কিনলি বুঝি। কত নিলো?’

    মেজোমামা বললেন, ‘এইটাই পার্থর সাইকেল।’

    ‘অ্যাঁ, বলিস কী রে! চোর এইখানে ডেলিভারি দিয়ে চলে গেছে?’

    ‘চোর ডেলিভারি দেয়নি বড়দা। তোমার মুকুন্দই চেপে চলে এসেছে।’

    ‘আর আমাদের সাইকেলটা।’

    ‘সেইটাই চুরি করেছে বড়দা।’

    ‘তা হলে তো আমাদেরই ডায়েরি করা উচিত। চলো। চলো, থানায় চলো।’

    ‘থানায় তো যাব, এইটার কী হবে? এই সাইকেলটার!’

    বড়মামা সাঙ্ঘাতিক চিন্তায় পড়ে গেলেন। আর বড়মামার মজা হল, কোনও কিছুর সমাধান খুঁজে না পেলে ভীষণ রেগে যান। এখনও তাই হল। ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, ‘এই ভাল্লুকটার জন্যে আমাকে শেষ পর্যন্ত ফাঁসি কাঠে ঝুলতে হবে। যাই, থানায় গিয়ে সারেন্ডার করি। সাইকেল চুরির দায়ে তিন বছর বেশ জম্পেশ করে ঘানি ঘুরিয়ে আসি। কুসি ঠিকই বলে, বিমল মিত্রের জীবনে আক্কেল হবে না?’

    মুকুন্দ বললে, ‘বড়দা সব ব্যাপারে আপনি ভীষণ ভয় পেয়ে যান। আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। আমি বেশ বড় মতো একটা গর্ত খুঁড়ে, সাইকেলটাকে সমাধি দিয়ে, তার ওপর নয়নতারা গাছ লাগিয়ে দিই।’

    মেজোমামা বললেন, ‘তার চেয়ে ঝপাং করে বড় পুকুরের জলে ফেলে দিলেই হয়।’

    মুকুন্দ বললে, ‘চৈত্র মাসে জল কমে এল, কঙ্কালটা বেরিয়ে পড়বে। এর মধ্যে কেউ যদি জাল ফেলে, উঠে চলে আসবে।’

    বড়মামা বললেন, ‘পুলিশ যদি কুকুরের সাহায্য নেয় তা হলে কী হবে!’

    ‘পুলিশ-কুকুর এ-বাড়িতে ঢুকতেই পারবে না। আমাদের আটটা কুকুরের সঙ্গে ফাইট লেগে যাবে।’

    শরৎবাবু এসে হাজির। এক মুখ হেসে বললেন, ‘আমি তা হলে আসি। আজ আমার আবার বাগেরহাটে কবিতা পাঠের আসর আছে।’

    বড়মামা বললেন, ‘তোমার খাওয়া হয়ে গেছে?’

    ‘আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম তো, তাই ঠিক মনে পড়ছে না। আচ্ছা আমি কি পান খেয়েছিলুম? তোমরা কেউ দেখেছিলে? আমি যদি পান খেয়ে থাকি, তা হলে আমি নিশ্চয় খেয়েছি। আমার ছেলেবেলা থেকেই এই এক রোগ, স্মৃতিরই ডিফেক্ট, ঘুম থেকে ওঠার পর আমার আর কিছু মনে থাকে না। সব ভুলে যাই, যেন এইমাত্র জন্মালুম।’

    মাসিমা এলেন। মাসিমার আগমনটা সব সময়েই বেশ ভয়ের।

    মাসিমা বললেন, ‘আমার একটাই প্রশ্ন, তোমরা মেয়েদের মানুষ বলে মনে করো?’

    কেউ কিছু বলার আগে শরৎবাবু বললেন, ‘মানুষ? মেয়েদের আমি দেবী বলে মনে করি। মা দুর্গা, মা সরস্বতী, মা লক্ষ্মী সব একসঙ্গে পেতলে ঢালই করে…’

    ‘আপনার কথা হচ্ছে না। কথা হচ্ছে এই দুই মহাপুরুষকে নিয়ে।’

    বড়মামা বললেন, ‘কী কাণ্ড হয়েছে রে কুসি! তুই আমার গলায় যা হয় একটা মালা পরিয়ে দে, আমি চলে যাই।’

    শরৎবাবু বললেন, ‘তোমাকেও সম্বর্ধনা! আমাকেও ওরা আজ সম্বর্ধনা দেবে। হাজার টাকা ডোনেশন নিয়েছে ভাই এমনি নয়।’

    মাসিমা বললেন, ‘কেসটা কী!’

    বড়মামা বললেন, ‘এই দ্যাখ সাইকেল।’

    ‘তুমি আমাদের বেলা তিনটি অবধি উপোস করিয়ে রেখে এখন সাইকেল দেখাচ্ছ!’

    ‘শুধু সাইকেল নয় ভাই, এর আগে একটা বিশেষণ আছে। চোরাই সাইকেল। এই সাইকেলের খোঁজেই একটু আগে পুলিশ চড়াও হয়েছিল।’

    ‘তুমি কি তা হলে ডাক্তারী ছেড়ে সাইকেল চুরির ব্যবসায় নামলে?’

    ‘আমি কেন নামব! এ কাজ মুকুন্দর।’

    ‘শিবঠাকুরের বদনাম হয়েছিল, তাঁর নন্দী, ভৃঙ্গি চেলার জন্যে, তোমারও তাই হবে।’

    ‘হবে কী! হয়ে গেছে। শিবঠাকুরকে জেলে যেতে হয়নি। আমাকে জেলে যেতে হবে।’

    ‘তা, এখনই যাবে, না দয়া করে কিছু মুখে দিয়ে যাবে?’

    মেজোমামা যে পাথরটার ওপর বসে ছিলেন বড়মামা সেই পাথরটার ওপর ধপাস করে বসে পড়ে বললেন, ‘ছিঃ, ছিঃ, কী অপমান! কী অপমান। আমি পার্থর কাছে মুখ দেখাব কী করে!’

    মেজোমামা ঠোঁট থেকে পাইপ নামিয়ে বললেন, ‘ছিঃ, ছিঃ, কী অপমান। আমি আবার টেলিফোনে গরমাগরম দু’চার কথা শুনিয়ে দিলুম। এখন আমি কোন মুখে গিয়ে বলব, ‘পার্থ, এই তোমার সাইকেল!’ ইশ আমার এতদিনের উঁচু মাথা একেবারে পাউডার হয়ে গেল।’

    মেজোমামা বড়মামার পাশে সেই পাথরটার ওপর বসে পড়লেন।

    বড়মামা মেজোমামার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘আয় ভাই, আয়। রাজদ্বারে আর শ্মশানে যে পাশে থাকে সে-ই হল বন্ধু। তুই-ই আমার একমাত্র বন্ধু। আর সেই নাক-কাটা রাজার গল্পটা মনে পড়ছে। রাজা বানরকে প্রহরী করে তার হাতে তরোয়াল দিয়ে চিত হয়ে ঘুমোচ্ছেন। বানর তরোয়াল হাতে বসে আছে পাশে। একটা মাছি এসে ভীষণ উৎপাত করছে।’

    মেজোমামা বললেন, ‘পড়েছে পড়েছে, আমারও মনে পড়েছে গল্পটা। মাছি বসল রাজার নাকে, বানর মারল তরোয়ালের এক কোপ। ফিনিশ! রাজার নাক খুলে পড়ে গেল।’

    ‘নীতিবাক্যটা মনে আছে?’

    ‘শিওর! দুর্জনের সঙ্গে দোস্তি করলে মানুষের বারোটা বেজে যায়। যেমন তোমার বেজেছে।’

    মেজোমামার শেষের কথায় বড়মামা একটু বিরক্ত হলেন যেন। ভুরুর কাছটা কুঁচকে গেল। মেজোমামার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বারোটা আমার একা বাজেনি, তোরও বেজেছে। পার্থ তোরই বন্ধু।’

    ‘তা হতে পারে, তবে যদি জেলে যেতে হয়, তো তোমাকেই যেতে হবে।’

    ‘কেন? পার্থ তোমার বন্ধু। তুমি যাবে। আমি তোমাকে জামিনে ছাড়িয়ে আনব।’

    ‘আজ্ঞে না! পার্থ আমার বন্ধু হলেও, তোমার নামই করেছে। পুলিশ তোমাকেই জেরা করতে এসেছিল। তুমি জেলে যাবে। আমি তোমাকে ছাড়িয়ে আনব জমিনে। উলটোটাই হবে বড়দা। আইনের চোখে তোমার গিয়ে বড়, মেজো নেই। অপরাধীই সাজা পাবে। তা ছাড়া মুকুন্দ আমার লোক।’

    ‘মুকুন্দ এখন আমার লোক হয়ে গেল! তোমাদের কেউ নয়?’

    ‘মুকুন্দকে তুমি এনেছিলে বড়দা।’

    বড়মামা অসহায়ের মতো মাসিমা’র দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখছিস কুসি, দেখছিস, কী সাঙ্ঘাতিক স্বার্থপর।’

    ‘কে স্বার্থপর নয় বড়দা? তুমি বড় ভাই মেজোভাইকে জেলে পাঠাতে চাইছ। জানো, জেলখানায় কী কষ্ট। ছারপোকা-ভরা কম্বলে শুতে দেবে। খেতে দেবে লপসি। সেলে কোনও পাখা থাকবে না। দুপুর রোদে পাথরের গাদায় বসে খোয়া ভাঙতে হবে। পরনে তোমার থাকবে ডোরাকাটা ইজের আর ফতুয়া। দ্যাকোনি তুমি। আমি একবার একটা হিন্দি সিনেমায় দেখেছিলুম। শিক্ষার জন্যে, জ্ঞানের জন্যে সব কিছু দেখতে হয়।’

    বড়মামা আবার মাসিমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘কী যুগ পড়েছে দ্যাখো, পিতৃসম বড়ভাই জেল খাটবে আর মেজোভাই বসে-বসে পাইপ টানবেন।’

    মাসিমা গালে আঙুল দিয়ে তাঁর পরিচিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। ভেতরে ভেতরে রাগে ফুটছেন; এইবার ফেটে পড়বেন।

    শরৎবাবু বললেন, ‘আমি তা হলে যাই, ভাই। তোমরা তা হলে ক’টা নাগাদ জেলে যাচ্ছ? গাড়িতে যাবে, না রিকশায়?’

    এইবার মাসিমা’র অ্যাকশন শুরু হল। রক থেকে নেমে হনহন করে এগিয়ে গেলেন গোয়ালের দিকে। হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে এলেন, একলট খালি বস্তা। এই বস্তায় আসে গরুর খাবার। কেউ বুঝতে পারছেন না, বড়মামার এইবার কী হবে! মাসিমা বড়মামার দিকে না গিয়ে গেলেন সাইকেলটার দিকে। সাইকেলটাকে বস্তা চাপা দিয়ে, দুই মামার সামনে এসে বললেন, ‘গেট আপ। গেট আপ। দুটো হুলোর মতো পাশাপাশি বসে ঝগড়া করলে গায়ে এইবার আমি জল ঢেলে দেব। গেট আপ। গেট আপ। তোমাদের একটা আক্কেল নেই। শরৎদার মতো একজন মানুষকে নিমন্ত্রণ করে এনে, তোমাদের ছেলেমানুষি হচ্ছে?’

    মাসিমা’র বকুনি খাওয়ার পর বড়মামা আর মেজোমামাকে ফাইন দেখায়। দু’জনেই একটু কুঁজো, আর ঢিলঢিলে মতো হয়ে যান। সেইভাবেই দু’জনে ভেতর-বাড়ির দিকে চললেন। পেছনে মাসিমা। মাসিমা শাড়ির আঁচলটাকে কোমরে জড়িয়ে নিয়েছেন। দেখতে তো খুবই সুন্দরী, যেন ঝাঁসির রানি। মাসিমা’র পেছনে আমরা। শরৎবাবু আমার পাশে। ধীরে-ধীরে কথা বলেন। ভালোমানুষের মতো। আপনমনেই বলতে লাগলেন, ‘যখন এলুম তখন কী আনন্দের সংসার, একটুখানির মধ্যে সব কেমন বদলে গেল। নিশ্চয় সাঙ্ঘাতিক কিছু হয়েছে, তা না হলে এমন করবে! কার্য ছাড়া কি কারণ হয়! না, কথাটা মনে হয় ঠিক হল না।’

    শরৎবাবু ঝপ করে থেমে পড়লেন। খপ করে আমার হাত চেপে ধরলেন, ‘তোমার নামটা যেন কী ভাই?’

    ‘আজ্ঞে, আমার ডাকনাম বুড়ো, আর ভালো নাম হল প্রদ্যুম্ন।’

    ‘ইশ! সর্বনাশ হয়ে গেল। দুটো নামই পালটানো দরকার। কে রেখেছিলেন জানি না। যিনিই রাখুন, তোমার কেরিয়ারটা যে ড্যাজে করে দেবে ভাই। বুড়ো হল নেগেটিভ নাম। তোমার স্পিরিটের গানপাউডার ড্যাম্প করে দেবে। আর প্রদ্যুম্ন ভালো তো, ইংরেজিতে লিখতে গেলে তোমার কলম দুমড়ে যাবে। আবার ভাবো, তুমি বড় হয়েছ। তোমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কেউ যদি তোমাকে ডাকছে, প্রদ্যুম্নবাবু বাড়ি আছেন? বাড়ি আছেন প্রদ্যুম্নবাবু? উঃ ভাবা যায় না। একটা নামে এতগুলো যুক্তাক্ষর। তারপর ধরো, এই নামটাকে তো শর্ট করা যাবে না। প্রদ্যুম্নকে তুমি কীভাবে ছোট করবে? প্রদু? দ্যুম্ন? আমি তোমার একটা ভালো নাম রাখব। বেশ কাব্যিক। ইচ্ছেমতো ছোট করা যাবে। বড় করা যাবে। ইংরেজি, বাংলা, দুটো ভাষাতেই সহজে লেখা যাবে। সে আমি পরে বইটই দেখে, তোমাকে ঠিক করে দেব। না, না, বাজে কথা নয়, আমার কথার ভীষণ দাম। আমার জীবনই, আমার বাণী। না না, এটাও মনে হয় উলটে গেল। এই কথাটা হবে—আমার বাণীই আমার জীবন। সন্দেহ হচ্ছে, ভীষণ সন্দেহ। এই প্রসঙ্গে এই কোটেশানটা যায় কি? আমার কী জানো, কথায়-কথায় কোটেশন। তোমাকেও বলে রাখি, কথায়-কথায় কোটেশন দেবে। কেন বলো তো! লোকে তোমাকে জ্ঞানী ভাববে, গুণী ভাববে, পণ্ডিত ভাববে। এই শিক্ষাটা আমাকে কে দিয়েছিলেন বলো তো। জানি না! হা হতোস্মি! মামাদের কাছে আমার জীবনী শোনোনি? আমার সম্পর্কে ঘরে-ঘরে আলোচনা হয়। তোমাদের ঘরে হয় না বুঝি। আরে, সেদিন তো আমাকে নিয়ে কোন এক ইউনিভার্সিটিতে একটা সেমিনার হয়ে গেল। কোথায় যেন পড়লুম। কোথায় যেন পড়লুম। কোথায় পড়লুম বলো তো! কোথায় ছাপা হয় এইসব সংবাদ। দৈনিকে? সাপ্তাহিকে? পাক্ষিকে? আচ্ছা, এটাও তোমাকে আমি পরে বলে দেব। কৌতূহলটা ধরে রাখো। বলে না, সেই বলে না, যাঃ ভুলে গেলুম। কী বলে বলো তো। আ-আ, মনে পড়েছে। সবুরে মেওয়া ফলে। কোটেশনটা ঠিক হয়নি। কথায়-কথায় কোটেশন। কিন্তু ঠিক জায়গায় ঠিক জিনিস লাগল কি না, রামে আর রামছাগলে হয়ে গেল। এইটা ঠিক লেগে গেছে, যাকে বলে, একেবারে ঘাটে-ঘাটে। এটাকে তুমি আর কাটতে পারবে না। আর তুমি কাটার কে? আমার হাঁটুর বয়সী। বলে কি না, আমার কোটেশন কাটবে?’

    আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলুম। ভয়ে-ভয়ে বললুম, ‘কই, আমি তো কিছু বলিনি!’

    ‘বলিনি মানে? বলবে তো! তোমার এইটুকু ভদ্রতা নেই। তুমি জানো না, কথার পিঠে কথা বলতে হয়। প্রশ্ন করতে হয়। ভালো লাগলে, বাহবা দিতে হয়। তা না হলে, বক্তাকে উপেক্ষা করা হয়। তুমি আমাকে উপেক্ষা করছ। ছিঃ, ছিঃ, তুমি না বিমলের ভাগ্নে। হবেই তো, হবেই তো। তোমরা হলে একালের ছেলে। তোমাদের কাছে মুড়ি-মিছরির এক দল। বলো, এটাও হয়নি। বলে ফেলো, বলে ফেলো।’

    ‘আজ্ঞে না, আপনার সব কোটেশনই ঠিক।’

    ‘আজ্ঞে না মানে? এটা তো দেবে আজ্ঞে হ্যাঁ।’

    ‘তা কী করে হবে। হ্যাঁ বললে তো সমর্থন করা হল।’

    ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, জিনিসটা আমি তলিয়ে দেখি। অত সহজে নয়। সব কিছুর একটা মেথড আছে। কী প্রসঙ্গে, কী কথা এল!’

    আচ্ছা প্যাঁচে পড়ে গেলুম তো! মুকুন্দটা মহাশয়তান। কেমন আমাকে ফেলে রেখে সট করে পালিয়ে গেল। মামাদের তাড়া করে মাসিমা সেই যে ভেতরে চলে গেলেন, আর দেখা নেই। শরৎবাবু বলতে লাগলেন, ‘আমি বললুম, কী বললুম?’

    ‘প্রাণে বাঁচার জন্যে স্মরণ করিয়ে দিলুম।’ শরৎবাবু মনে-মনে বিড়বিড় করলেন। ঘাড় নাড়লেন। তারপর দু’হাতে তালি মেরে বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক। না-ই হবে। কারণ আমি বলেছিলুম, বলো, এটাও হয়নি। তুমি যদি হ্যাঁ বলতে তা হলে তো হ্যাঁ-ই হত। তাই না! সব কিছু বুঝে নিয়ে নিঃসন্দেহ হওয়াই উচিত, তাতে দু’দণ্ড দেরি হয়, হোক। এ তো আর আমরা ট্রেন ধরতে ছুটছি না! অত তাড়া কিসের। সব সময় জানবে, ওয়ারি, হারি অ্যান্ড কারি, এই তিনটে হল গিয়ে আলসারের কারণ। সব সময় ধীরে-ধীরে চিবিয়ে চিবিয়ে, বসে-বসে খাবে।

    ‘আজ্ঞে।’

    ‘হঠাৎ খাওয়ার কথা এল কেন?’

    ‘তা তো জানি না। আপনি বললেন, ‘তাই বললেন?’

    এইবার আমি বেঁচে গেলুম। মাসিমা দূর থেকে ডাকলেন, ‘তোমাকে আবার কী রোগে ধরল?’

    বলতে পারলুম না, শরৎবাবু ধরেছেন।

    মাসিমা আবার চিৎকার করলেন, ‘শরৎদা, কী হল আপনার?’

    শরৎবাবু মাসিমাকে উত্তর না দিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘আমরা এখানে দাঁড়িয়ে কেন?’

    ‘ওই যে আপনি নানারকম কথা বলছিলেন।’

    ‘হ্যাঁ বলছিলুম। কথা তো বলারই জন্যে। তাতে কী এমন অপরাধ হয়েছে যে তুমি আমার নামে কমপ্লেন করছ।’

    আমি এতক্ষণে ভদ্রলোককে মোটামুটি বুঝে গেছি। বেশ একটা অপ্রকৃতিস্থ। বড়মামা বলছিলেন, ‘শরৎবাবু বেশ বড় ঘরের ছেলে ছিলেন। তারপর যা হয়। নিজে একজন গ্রন্থকীট। লেখাপড়ায় সাঙ্ঘাতিক ভালো ছিলেন। স্কুলের ফার্স্ট বয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। কলেজে পড়ার সময় মাথার সামান্য গোলমাল হয়। সেই সময় আত্মীয়রা বিষয়সম্পত্তি মেরে পথে বসিয়ে দিয়েছিল। শরৎবাবুর বড়বোন সন্ন্যাসিনী। তিনিই ভাইকে সুস্থ করেন, মানুষ করেন। চাকরি করে দেন। এখন শরৎবাবুর কেউ কোথাও নেই। শরৎবাবুর পিসিমা মারা যাবার আগে ছোট একটা বাড়ি দান করে গেছেন। চাকরিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।’

    ‘যাই,’ বলে আমি দৌড়তে শুরু করলুম। এ ছাড়া শরৎবাবুর হাত থেকে বাঁচার রাস্তা ছিল না।

    খাবার-ঘরে এলাহি আয়োজন। বড়মামা, মেজোমামা বসে পড়েছেন। উলটো দিকে শরৎবাবুর স্থান। তার পাশে আমি। শরৎবাবু মনে হয় আসছেন। তিনি কখনও কবি। কখনও বোটানিস্ট, অ্যানথ্রপলজিস্ট। কখন যে কী! তিনি পক্ষিতত্ত্ববিদ হয়ে প্রবেশ করলেন। হাতে একটা বড় পালক। কোথায় খেতে বসবেন, না পালকটা তুলে সকলকে দেখাচ্ছেন আর বলছেন, ‘এই পালকটা কোন পাখির তা আমি বলতে পারব না, তবে অবশ্যই কোনও বড় পাখির। বড় পাখির মধ্যে কী কী আছে, উটপাখি, ধনেশ পাখি।’

    মাসিমা ছোঁ মেরে পালকটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘এটা কাকের পালক। যান, হাত ধুয়ে খেতে বসুন।’

    শরৎবাবু বেসিনে হাত ধুতে-ধুতে বললেন, ‘ঠিক কাক নয়, দাঁড়কাক। জ্যাক ড।’

    ‘আচ্ছা, দাঁড়কাক, এখন আপনি দয়া করে বসে যান।’

    মুকুন্দ পনপন করে লাট্টুর মতো চারপাশে ঘুরছে। এটা ঠিক, মাসিমা’র হাতের মতো রান্না হয় না। মুকুন্দর মতো পরিবেশন। শরৎবাবু প্রথমে একটুকরো লেবু নুন মাখিয়ে চুষলেন। চুষেই টকটাক-টকটাক, বিকট শব্দ। সকলেই চমকে উঠলেন। শরৎবাবুর সেদিকে কোনও খেয়াল নেই। চোখ বড়-বড় করে বললেন, ‘বাপস, টক বটে।’

    মাসিমা বললেন, ‘শুধু শুধু লেবু খাচ্ছেন কেন?’

    ‘আপ রুচি খানা, পর রুচি পরনা।’ বলেই, আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মটকে বললেন, ‘লক্ষ করলে, কোটেশনটা কী রকম কটাস করে লাগিয়ে দিলুম। এইসব লক্ষ করবে। অ্যাপ্রিসিয়েট করবে। ভালো গান শুনতে শুনতে মানুষ যেমন ওয়া, ওয়া করে, সেইরকম করবে। লেবু কেন খেলুম বলো তো! অ্যাসিড সাইট্রিক। এই অ্যাসিড দিয়ে পেটে একটা বাতাবরণ তৈরি করলুম। শব্দটা লক্ষ করো, বাতাবরণ। মানে ক্লাইমেট। বাংলা শব্দ কীভাবে ব্যবহার করতে হয় শেখো-শেখো। শুধু হনুমানের মতো হাঁউ-হাঁউ করে খেলেই হবে। বাড়ি করতে গেলে সবার আগে যেমন এটা ফাউণ্ডেশান করতে হয়, সেইরকম এই লেবু হল খাওয়ার ফাউণ্ডেশান, এইবার যা কিছু পেটে ঢুকবে, এই অ্যাসিড একেবারে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো অ্যাটাক করবে। পেটের ভেতর চালু হয়ে যাবে একটা কেমিকেল ফ্যাকট্রি। সমস্ত খাদ্যকে ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করে একেবারে পালপ করে ফেলবে। এর ইংরেজি নাম হল কাইল।’

    শরৎবাবু বড়মামার দিকে তাকিয়ে বলনে, ‘ডাক্তার, তুমি এইসব জানো? জানো তো ছেলেটাকে শেখাও না কেন? পৃথিবীটা হল জ্ঞানের পৃথিবী। তোমাদের বাড়িটাকে কী রকম করে রেখেছ জানো, নলেজ, নলেজ, এভরি হোয়্যার নট এ ড্রপ টু ড্রিংক। মেজোবাবু কোটেশনটা কি চেনা-চেনা মনে হল? একটা শব্দ কেবল বদলে দিয়েছি। তুমি সাহিত্যের লোক হয়ে চিনতে পারছ না! আশ্চর্য!’

    মেজোমামা বললেন, ‘পারব না কেন? ওয়াটার ওয়াটার এভরি হোয়্যার। ওয়াটারের জায়গায় নলেজ।’

    ‘ওয়া, ওয়া! তা কার লেখা?’

    ‘কোলরিজ।’

    ‘ওয়া, ওয়া। এই হল নিয়ম। খাওয়ার টেবিলটাকে জ্ঞানের টেবিল করে তুলতে হয়। দেহের আহার আর মনের আহার অ্যাট এ টাইম। দেহও খাচ্ছে আর মনও খাচ্ছে। কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, হ্যারো আর ইটানে এই জিনিস হয়। ডিনরা সব ডিনার টেবিলে বসে এইরকম জ্ঞানের আলোচনা করতে করতে কী যে করে ফেলেন না! বড়-বড় থিসিসের আইডিয়া বেরিয়ে আসে। এই যেমন ধরো, করলা। এই যে সরষে-বাটা দিয়ে করলা হয়েছে। গুড আইটেম। খেলেই খাওয়া। এর মধ্যে জ্ঞান আর নলেজটা কী আছে? ভীষণ জ্ঞান আছে। করলা কেন তেতো! তিক্ত কেন করলা!’

    শরৎবাবু একা করলার টুকরো মুখে পুরে কৌতূহলী হয়ে সকলের মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন।

    মেজোমামা বললেন, ‘এটা আপনার গিয়ে কেমিষ্ট্রি-ঘেঁষা প্রশ্ন। এর উত্তর আমার জানা নেই।’

    শরৎবাবু আর-একটা করলা মুখে পুরে বললেন, ‘এইটাই হল আমার জীবনের ট্রাজেডি। সারা জীবন আমি প্রশ্ন করে গেলুম, একের পর এক। কদাচিৎ একটা দুটোর উত্তর পেলুম, বাকি সব নিজের উত্তর নিজেকেই খুঁজে বের করতে হয়েছে। তোমরা মোটেই অনুসন্ধিৎসু নও। দিনের পর দিন করলা খাচ্ছ, অথচ একবারও তোমাদের মনে প্রশ্ন হল না! আশ্চর্য! আশ্চর্য!’

    মেজোমামা বললেন, ‘জানা থাকলে, অনুগ্রহ করে বলে দিয়ে পরিস্থিতিটা একটু শান্ত করুন না।’

    ‘প্রশ্নটা আমার মগজেও আজই এল। সব সময় সব প্রশ্ন তো মাথায় আসে না। প্রশ্ন হল অর্কিডের ফুলের মতো। কোনও কোনও অর্কিডে ষাট বছরে একবারই হয়তো ফুল ফুটল। আমার মনে হয়, উচ্ছে আর করলা হল মাছের পিত্ত, কি মানুষের গলব্লাডারের মতো, ফলরূপী পিত্তথলি। এর ভেতর একটা বিটার প্রিন্সিপল আছে। যেমন আছে হপস গাছে। উত্তরটা ঠিক মনের মতো হল না; তবে একেবারে না হওয়ার চেয়ে তো ভালো।’

    মাসিমা শরৎবাবুকে থামাবার জন্যে বললেন, ‘আমাদের শাস্ত্রে আছে, খেতে বসে যত কম কথা বলবেন ততই ভালো।’

    ‘ওটা তোমার বোন, দিশি শাস্ত্র। বিদেশে অচল। বিদেশে লাঞ্চ আর ডিনার হল, খাও, গল্প করো, আলাপ-আলোচনা করো। সেদেশের নিয়ম হল, লিভ টু নট, নট ইট টু লিভ। না দাঁড়াও, গুলিয়ে গেছে। এই ধরনের কোটেশন ভীষণ ডেঞ্জারাস। মানে বাংলাটা হল, বাঁচার জন্যে খাও, খাওয়ার জন্যে বেঁচো না। এইবার ধরে-ধরে ইংরেজিটা করি, ইট টু লিভ, নট লিভ টু ইট। অ্যাঁ, এইবার হয়েছে। ইংরেজি অনুবাদ হল ইলেকট্রিক্যাল ওয়ারিং-এর মতো। এক লাইন থেকে আর এক লাইনে ধরে-ধরে এগোতে হয়।’

    শরৎবাবু কথা বললেও, আমরা সুপসাপ খেয়ে চলেছি। মাসিমা আজ মোট ষোলো রকম রান্না করেছেন। আর-একটু সময় পেলে বিশ-তিরিশ রকম তো হতই।

    বড়মামা বললেন, ‘এত সব খাওয়ার আয়োজন; কিন্তু অপরাধীর মন নিয়ে কি খাওয়া যায়! এ মনে হচ্ছে ডেডবডি ট্র্যাঙ্কে ভরে রেখে আমরা খেতে বসেছি। এ মনে হচ্ছে, সাইকেলের কবরে বসে খুনির খানাপিনা।’

    শরৎবাবু ‘ওয়া, ওয়া’ করে বললেন, ‘অসসাধারণ একটা কবিতার লাইন। শুধু সাইকেল শব্দটা হাটাতে হবে। লাইনটা হবে, গতির কবরে বসে খুনিদের খানাপিনা। কলিজার করমচা খুন পল-কাটা গেলাসে গেলাসে। / জীবন যদিও এক তিক্ত কয়লা / বসে আছি মুখোমুখি তড়িৎ-প্রবাহ ধরে।’

    শরৎবাবু মাছের মুড়ো ফেলে উঠে দাঁড়ালেন।

    মাসিমা বললেন, ‘কী হল?’

    শরৎবাবু বললেন, ‘আর কী হল? এসে গেল। কবিতার লাইন জগতের ওপার থেকে ভেসে আসে ইথার তরঙ্গে। ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কী সঙ্গীত ভেসে আসে।’

    ‘আসুক না, আপনি খেয়ে নিন।’

    ‘পাগল হয়েছো! ভেসে বেরিয়ে যাবার আগে আমার রিসিভারে ধরে রাখতে হবে। আমার ডায়েরি, আমার কলম।’

    ‘আপনি খান, আমি লিখে রাখছি।’

    শরৎবাবু শান্ত হয়ে বসলেন। মাসিমা একটা সন্দেশের কৌটোতে ফেল্ট পেন দিয়ে লিখতে বসলেন। ফ্রিজের মাথাটা হয়েছে টেবিল।

    মাসিমা বললেন, ‘বলুন।’

    ‘খুনিদের কবরে বসে। না, কিসের যেন কবর বললে।’

    আমি বললুম, ‘আমার পুরোটা মনে আছে। বলব? গতির কবরে বসে খুনিদের খানাপিনা। কলিজার করমচা-খুন পল-কাটা গেলাসে গেলাসে। জীবন যদিও এক তিক্ত করলা। বসে আছি মুখোমুখি তড়িৎ-প্রবাহ ধরে।’

    ‘ওয়া, ওয়া।’ শরৎবাবু সব ভুলে, তাঁর ঝালঝোল মাখা ডান হাত দিয়ে আমার পিঠটা বার কয়েক চাপড়ে দিলেন।

    মাসিমা সঙ্গে-সঙ্গে বললেন, ‘বুড়ো, যাও, উঠে গিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে আগে চান করে এসো।’

    চার
    শরৎবাবু এত খেলেন যে, শেষ পর্যন্ত মুকুন্দর সাহায্য নিয়ে তাঁকে খাওয়ার টেবিল থেকে উঠতে হল। তিন-চারটে বিশাল ঢেকুর তুললেন। মাসিমাকে বললেন, ‘তোমার উচিত ছিল আমাকে এক সময় থামিয়ে দেওয়া। তুমি জানো না, দুটো জিনিসে আমার জ্ঞান থাকে না। এক রেগে গেলে, আর খেতে বসলে। এত চাপ খাওয়া আমার উচিত নয়। হার্টের তো আর তেমন জোর নেই। এর মধ্যে দু’বার ধাক্কা খেয়েছে। এখন গুড আর ব্যাড, কিছু একটা হয়ে গেলে আমার আর কী, তোমরাই বিপদে পড়ে যাবে।’

    আমি আর মুকুন্দ শরৎবাবুকে ধরে-ধরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলুম। শুয়ে পড়ে বললেন, ‘আমার আবার অজগরের স্বভাব। পেটে চাপ পড়লেই, ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে। শোনো, তোমার মাসিকে বোলো, ওই যে ওই বিশ-কোর্মা, ওইটা এক বাটি সরিয়ে রাখতে; যদি মরে না যাই রাতে আবার মুখোমুখি হব। মরতে আমি ভয় পাই না। জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন, শত মাংস, শত মৎস্য আসিবে আসুক।’

    ঘাঁড়াক করে একটা শব্দ হল। শরৎবাবু নাক গর্জন করতে লাগল কামানের মতো।

    মুকুন্দ বললে, ‘বেশ মজার মানুষ, তাই না। এইরকম দু-তিনজন বাড়িতে থাকলে ড্রামা একেবারে জমে যাবে।’

    ‘তোমার আর কী বলো, আমাকে যা ধরেছিলেন না! সেই বাগান থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত। বাব্বা, এ যেন ছেলে ঘুমোল, পাড়া জুড়োল।’

    বসবার ঘরে বড়মামা আর মেজোমামা বসে আছেন, দুটো ডেক-চেয়ারে। মাসিমা এইমাত্র এলেন। মুকুন্দ বসে আছে এক পাশে। মুকুন্দ বললে, ‘এটাকে চুরি বলে না বড়দা, একে বলে বদলাবদলি।’

    বড়মামা বললেন, ‘চুপ কর। তোর, তোর, তোর…।’

    মেজোমামা শেষ করে দিলেন, ‘কথা বলার কোনও অধিকার নেই।’

    বড়মামা বললেন, ‘না, না, আমি ও কথা বলতে চাইনি। আমি বলতে চেয়েছিলুম, তোর জন্যে আজ আমার এই অবস্থা, অমন কিশমিশ-টিসমিস দেওয়া ছানার কালিয়া, মনে হল ঘুঁটের কালিয়া খাচ্ছি।’

    মেজোমামার অভিমান হল। বললেন, ‘এবার থেকে নিজের কথা নিজেই শেষ কোরো। আটকে গেলে আমি আর সাহায্য করব না। অধিকার নেই, বললে এক কথায় মিটে যায়, অত কথা এই বিপদের সময় বলার দরকার কী?’

    মাসিমা বেশ আয়েস করে বসে বললেন, ‘আচ্ছা, বাপারটা আমাকে খুলে বলো তো। তখন থেকে চলেছে।’

    মুকুন্দ এগিয়ে এল, ‘আমি আপনাকে ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিচ্ছি।’

    মাসিমা বললেন, ‘সে আবার কী, এ তোমার বাড়ির প্ল্যান না জ্যামিতি, যে ছবি আঁকতে হবে।’

    মেজোমামা বললেন, ‘ওকে আজ ছবি-ভূতে ধরেছে। আসলে কেসটা হল কীরকম জানিস, বদলাবদলি চুরি। অর্থাৎ পালটি ঘরে চুরি। মানে, আমরা পার্থর সাইকেল চুরি করেছি, পার্থ আমাদের সাইকেল চুরি করেছে।’

    বড়মামা বললে, ‘যাঃ, কী যা-তা বলছিস! কোনও একটা জিনিস ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে পারিস, না প্রফেসর হয়েছিস!’

    পাশের টেবিলের ওপর থেকে খপ করে পাইপটা তুলে নিয়ে মেজোমামা উঠে দাঁড়ালেন।

    বড়মামা বললেন, ‘কী হল? তোর আবার কী হল!’

    ‘কথায়-কথায় তোমার অপমান আমার আর সহ্য হয় না। তোমার সমস্যা তুমি সামলাও। আমারই ভুল হয়েছে তোমার ব্যাপারে নাক গলাতে যাওয়া।’

    বড়মামা বললেন, ‘আমিও লক্ষ করছি, আজকাল আমার কোনও কথাই যেন তোমাদের সহ্য হচ্ছে না। যা বলছি তাইতেই গায়ে সব বড়-বড় ফোস্কা পড়ে যাচ্ছে। ঠিক আছে, আমিও তা হলে চলে যাই। যা হয় হবে। আমার কী। চিরকাল শুনে এলুম, ডিভাইডেড উই ফল, ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড।’

    ইশ, বড়মামার গায়েও শরৎবাবুর বাতাস লেগেছে। কোটেশন উলটে যাচ্ছে।

    মাসিমা বললেন, ‘তোমরা দু’জনে যদি সাপে-নেউলে হও, তাহলে এইবার কিন্তু আমাকে লাঠিই ধরতে হবে। লাঠিই হল তোমাদের ঠান্ডা রাখার ওষুধ। বয়েস-টয়েস আমি আর মানব না। চুপ করে দু’জনে বোসো। সমাধান যদি চাও, কেসটা আমাকে খুলে বলো।’

    মেজোমামা বসলেন। বড়মামা বললেন, ‘পরে তোর প্রেশারটা আমি একবার চেক করব।’

    মেজোমামা বললেন, ‘বুঝতে পেরেছি, আমার বিবৃতিতে ভুলটা কোথায় হচ্ছিল। আমার প্রেশার নয়, আমার অহঙ্কারটা মাপা দরকার হয়েছে। আমি আবার শুরু থেকে শুরু করি। আমরা পার্থর সাইকেলটা চুরি করেছি, আর পার্থ আমাদের সাইকেলটা চুরি হওয়ায় সাহায্য করেছে।’

    বড়মামা বললেন, ‘দ্যাটস রাইট। এইবার বিবৃতিটা ঠিক হল।’

    মুকুন্দ বললে, ‘আমি একটু বলি, কারণ এটা আমার কেস।’

    মাসিমা বললেন, ‘বলো।’

    ‘এটা চুরি নয়, ভুল। আসলে আমাদের সাইকেলটাই চুরি হয়েছে; কিন্তু মনে হচ্ছে চুরি গেছে জজসায়েবের সাইকেল।’

    ‘সে আবার কী! গোয়ালের পাশে যে সাইকেলটি চট চাপা দিয়ে এলুম, সেটা তা হলে কার সাইকেল?’

    ‘ওইটাই তো জজসায়েবের সাইকেল।’

    ‘কে এনেছে?’

    ‘আমি এনেছি।’

    ‘না বলে?’

    ‘হ্যাঁ, না বলে।’

    ‘তা হলে! শোনোনি তুমি! না বলিয়া পরের দ্রব্য গ্রহণ করাকে চুরি বলে।’

    ‘আমি তো চুরি করব বলে চুরি করিনি। চুরির মতো দেখাচ্ছে।’

    ‘উঃ, বাব্বা রে! কী পাল্লায় পড়েছি রে!’

    ‘আপনি পুরোটা না শুনলে তো বারেবারেই মনে হবে। আমি জজসায়েবের বাড়ির রকে, জজসায়েবের সাইকেলের পাশে আমাদের সাইকেলটা রেখে ভেতরে গেলুম। তা হলে বাইরে পাশাপাশি রইল দুটো সাইকেল। কেমন? এইবার কী হল, সার্টিফিকেট নিয়ে আমি বাইরে এলুম। দেখলুম রয়েছে একটা সাইকেল। আমি সাইকেল চেপে চলে এলুম। গোয়ালের বাইরে সাইকেল রেখে লেগে গেলুম কাজে। তা হলে ব্যাপারটা কী হল? চুরি হল কি?’

    মাসিমা বললেন, ‘ঘোড়ার ডিম হল। এই নিয়ে এত কাণ্ড। আসলে কোনও সাইকেলই চুরি হয়নি। বদলাবদলি হয়েছে। গিয়ে দেখে এসো, তোমাদের ঝরঝরে সাইকেল আবার ফিরে এসেছে যথাস্থানে।’

    বড়মামা বললেন, ‘তা হলে ওরা থানায় রিপোর্ট করল কেন?’

    ‘করবে না! ওদের সাইকেলটা তো নেই।’

    ‘তা অবশ্য ঠিক। এখন তা হলে কী হবে?’

    ‘সোজা ব্যাপার। এই সাইকেলাট চেপে তোমরা কেউ যাও, এটা ফেরত দিয়ে ওইটা চেপে ফিরে এসো।’

    ‘কে যাবে, মুকুন্দ?’

    ‘না, তোমরা কেউ যাও।’

    মেজোমামা বললেন, ‘আমিই তা হলে যাই?’

    মেজোমামা আমাকে বললেন, ‘যাবে নাকি?’

    আমরা দু’জনে বেরিয়ে পড়লুম। বাগান থেকে জানালা দিয়ে দেখতে পেলুম শরৎবাবু কুম্ভকর্ণের মতো চিত হয়ে শুয়ে আছেন। নাক ডাকছে তুমুল শব্দে।

    মেজোমামা বললেন, ‘উঃ, মানুষের কী কষ্ট! কোথায় যেন যাবার কথা ছিল, কী হল?’

    ‘উনি তো সবই ভুলে যান, তা ছাড়া বলছিলেন খাওয়ার পর অজগর হয়ে যান। ছেড়ে দিন আপনি।’

    মেজোমামা সাইকেলে উঠে একটু লগবগ করলেন। তারপর রাস্তার একপাশে কাঁচা নর্দমার ধারে কাত হয়ে গেলেন। ভাগ্য ভালো, লম্বা মানুষ, তাই মাটিতে পা ঠেকিয়ে কোনওরকমে সামলে নিলেন। সেই কাত-অবস্থাতেই বললেন, ‘ম্যাগনেট যেমন লোহাকে টানে, সেইরকম নর্দমা টানে সাইকেলকে। দাঁড়াও আবার একবার গোড়া থেকে শুরু করি।’

    মেজোমামা অনেক কায়দায় সাইকেল থেকে নামলেন। নামতে গিয়ে অমন সাধের পাইপটা বুক পকেট থেকে ছিটকে পড়ে গেল নর্দমায়। রাগে মেজোমামার মুখটা লাল হয়ে গেল, উনুনের নিবে-আসা আগুনের মতো। ভড়ভড়ে নর্দমায় রুপোর ঠোঁটঅলা পাইপটা ভেসে রইল।

    মেজোমামা বললেন, ‘কত বড় ক্ষতিটা হয়ে গেল একবার দেখলে? এই সাইকেলটা হল অপয়া সাইকেল। সেই সকাল থেকে জ্বালিয়ে মারছে।’

    ‘মেজোমামা, আপনার যাওয়াটা মনে হয় ঠিক হবে না। বাধা পড়ে গেছে।’

    ‘সেটা অবশ্য ঠিকই বলেছ তুমি। তা না হলে আমার মতো পাকা সাইক্লিস্টের এই অবস্থা হবে কেন? চলো, ফিরেই যাই।’

    মেজোমামার কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, হুশ করে একটা মোটরগাড়ি এসে গেল। গাড়িটা আমাদের থেকে কিছু দূরে গিয়েই ঝপ করে থেমে গেল। গাড়ির পেছনের জানালা দিয়ে একটা মুখ বেরিয়ে এল। জাস্টিস পার্থ ব্যানার্জি।

    পার্থ ব্যানার্জি বললেন, ‘আরে কী ব্যাপার! চলেছ কোথায়? আমি তো তোমাদের বাড়ি যাচ্ছি, বড়দার কাছে ক্ষমা চাইতে। ছিঃ ছিঃ, কী জঘন্য কাণ্ডটাই না ঘটে গেল।’

    মেজোমামা বললেন, ‘আরে, আমি তো যাচ্ছি তোমাদের বাড়িতে! কী বিশ্রী কাণ্ড ভাই। আমাদের মুকুন্দ ভুল করে তোমার সাইকেলটা নিয়ে এসেছিল। আমাদের সাইকেল আর তোমাদের সাইকেল পাশাপাশি ছিল। খেয়াল করেনি। বয়েস কম তো, আর সব সময় তড়বড় করে।’

    ‘আমার সাইকেল? আমার সাইকেল তো আমি পেয়ে গেছি।’

    ‘পেয়ে গেছ মানে? কোথা থেকে পেলে? ওটা তা হলে আমাদের সাইকেল।’

    ‘তোমাদের সাইকেল কী করে হবে? থানা থেকে উদ্ধার করে দিয়ে গেছে।’

    ‘এটা তা হলে কার সাইকেল?’

    ‘তা তো জানি না ভাই।’

    মেজোমামা সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তাজ্জব ব্যাপার। এটা তা হলে সাইকেলের ভূত। তাই বলি, আমার মতে পাকা লোককে নর্দমায় ফেলার তাল করেছিল।’

    জজসায়েব মুখটাকে গাড়ির ভেতর টেনে নিতে-নিতে বললেন, ‘চলে এসো। আমি বাড়িতে যাচ্ছি।’

    মেজোমামা আমাকে বললেন, ‘বুঝলে কিছু। সাইকেল-রহস্য। লিখতে জানলে, একটা উপন্যাস লিখে ফেলতুম। যেখানে বড়দা, সেইখানেই যত গোলমাল। বড়দার একটা ব্যাপারও সহজ নয়। তা না হলে কেউ বাজার করতে গিয়ে কীর্তন গাইতে গাইতে ফিরে আসে।’

    মেজোমামা পাইপ খুইয়ে, ভৌতিক সাইকেল নিয়ে, আমাকে নিয়ে ফিরে এলেন। জজসায়েবের ঝকঝকে সাদা গাড়ি আমাদের বাড়ির হাতায় গরম হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ড্রাইভারের কী পোশাক। জজসায়েবের গাড়ির চালক। সাদা পোশাক, সোনালি কলার। মেজোমামা সাইকেলটাকে আবার বেড়ার গায়ে হেলিয়ে রাখলেন। রেখেই একটা লাথি মারলেন। মেজোমামার এই এক দোষ! মারার আগে চিন্তাও করলেন না, কাকে মারছেন! সাইকেল তো আর মানুষ নয়। লোহার তৈরি কঠিন বস্তু। পায়ে লেগেছে। মেজোমামা দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, ‘জানোয়ার! যেমন দেখতে তার সেইরকম ব্যবহার!’

    মেজোমামা অল্প একটু খোঁড়াতে-খোঁড়াতে বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। ঘর আলো করে বসে আছেন আমাদের জজসায়েব। উলটো দিকে বড়মামা। আমরা ঢুকতে ঢুকতে শুনলুম বড়মামা বলছেন, ‘যাক, সাইকেলটা তা হলে পেয়ে গেলে! পাবেই তো। তুমি জজসায়েব, তোমার সাইকেল সহজে হজম করা শক্ত। যাক, আমার দুশ্চিন্তা কেটে গেল। তোমরা বলো, পুলিশ চোর ধরতে পারে না, এই তো কেমন ধরে দিলে!’

    ‘পুলিশ চোর ধরেনি, ধরেছে সাইকেলটা।’

    ‘তার মানে সাইকেলটা একা-একা ঘুরছিল, আর পেছন দিক থেকে গিয়ে ঘ্যাঁক করে কলার চেপে ধরেছে?’

    ‘না না, ঠিক তা নয়, পুলিশ তিরিশ কি চল্লিশটা সাইকেল চোরাই মালের ডিপো থেকে একেবারে লাইন করে নিয়ে এল। বললে বেছে নিন। আমাদের মান্তু একটা বেছে নিলো। বাকিগুলো আবার লাইন করে ফিরে গেল।’

    ‘ফিরে গেল? ইশ, তুমি যদি একবার আমাকে ডাকতে! তা হলে আমার সাইকেলটাও ফিরে পেতুম।’

    ‘অ, আপনার সাইকেলও গেছে?’

    ‘একটা! তিন-তিনটে সাইকেল আর শ’খানেক ছাতা, পঞ্চাশ জোড়া জুতো, হাজারখানেক রুমাল, একডজন ঘড়ি। সত্তরটা কলম। ছ’টা সোনার আংটি। দেড়হাজার নস্যির ডিবে। চল্লিশটা থার্মস ফ্লাক্স। দশ থেকে বারো হাজার নগদ টাকা।’

    ‘এই লিস্টের মধ্যে বেশিরভাগই হারানো।’

    ‘আরে আমার হারানো মানেই তো আর-একজনের চুরি।’

    ‘চুরি নয়, কুড়িয়ে পাওয়া।’

    মেজোমামা একপাশে গুম মেরে বসে আছেন। মাঝে-মাঝে পায়ের আঙুল দেখছেন। বেশ লেগেছে। মুখে সেই বিখ্যাত পাইপ নেই। পাইপ এতক্ষণে নর্দমায় ডুবে গেছে। এর চেয়ে দুঃখের আর কী আছে, পকেটে সদ্য-কেনা মোটা এক প্যাকেট টোব্যাকো, অথচ ঠোঁট-হুঁকোটাই নেই।

    জজসায়েব বললেন, ‘কী হল তোমার? এমন ব্যাজার মুখে বসে আছ?’

    ‘আমার পাইপটা নর্দমায় পড়ে গেছে। আমার দীর্ঘদিনের সঙ্গী। ওই পাইপ তো আর এ-দেশে পাব না!’

    ‘এই তোমার প্রবলেম। আমি সাবধান করে দিচ্ছি। জজ হবার পর আমার ইচ্ছে হয়েছিল, সিনেমার জজ হব। একটা ড্রেসিংগাউন কিনলুম, আর বিদেশ থেকে আনালুম গোটা পঞ্চাশ ভালো-ভালো পাইপ। সবই ডানহিল। তারপর চেয়ারে বসে মাথাটা ঠিক হয়ে গেল। কাহিনীতে আর বাস্তবে অতলান্তিকের ব্যবধান। গাউনটা কেটে ঘরমোছা করা হয়েছে। আর স্ত্রী এসে ধূমপান বন্ধ। আমার সংগ্রহে বহু ভালো-ভালো নতুন পাইপ পড়ে আছে। তুমি আমার সঙ্গে চলো, পছন্দ করে নিয়ে আসবে।’

    মেজোমামার মুখে হাসি ফুটল। বড়মামা মাঝে-মাঝেই আমাকে বলেন, ‘তোমার পাইপমামার খবর কী! ওর মুখ থেকে পাইপটা খুলে নিলে, সব বোলচাল বন্ধ হয়ে যাবে।’

    মাসিমা এলেন, পেছনে পেছনে মুকুন্দ। আমাদের জজসায়েবও শরৎবাবুর মতো ভোজনবিলাসী। একসময় পার্থবাবু আমার মাসিমাকে পড়াতেন। সব বড়-বড় মানুষেরই ছোট-ছোট একটা শুরু থাকে। সেই হাফপ্যান্ট পরে স্কুল যাওয়া। পেটাই হওয়া। নিলডাউন। দু’কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড়ানো। অভাব, দুঃখ, কষ্ট কত কী খেতে ইচ্ছে করে, পয়সা নেই। কত কী পরতে ইচ্ছে করে, পয়সা নেই। তারপর টিউশনি করে পড়ার খরচ তোলা। তারপর মা সরস্বতীর কৃপায় সে-কী পরীক্ষার ফল। ফার্স্ট, ফার্স্টক্লাস, গোল্ড মেডেল। ডব্লু বি সি এস, আই এ এস। জজ, ম্যাজিস্ট্রেট, ব্যারিস্টার। এই জজসায়েব, মেজোমামার মুখে যা শুনেছি, হ্যারিকেনের আলোয়, চালাবাড়িতে রাত জেগে লেখাপড়া করেছেন, আর দিনের বেলায় কলেজ করেছেন, ছাত্র পড়িয়েছেন। মাসিমা ছিলেন তাঁর ছাত্রী।

    ক্ষীরের লুচি, মালাই চপ, নার্গিসি কোফতা, জল পাকৌড়া, অন্যদিন হলে আমার ভয়ঙ্কর লোভ হত। আজ ভীষণ বেলায় খাওয়া হয়েছে, তাই আর রান্নাঘরের দিকে ছুটে যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে না। জজসায়েবকে মাসিমা কখনও বলছেন মাস্টারমশাই, কখনও বলছেন পার্থদা। জজসায়েব বলে এতটুকু ভয় পাচ্ছেন না। যেমন সবাই বলে, তুমি জজসায়েব কি কমিশনার, সে তুমি তোমার অফিসে, বাড়িতে তুমি আমাদের ভণ্টু কি মান্তু, কি পার্থদা।

    ‘আহা! বেশ হয়েছে, বেশ হয়েছে,’ বলে পার্থবাবু গপাগপ খেতে লাগলেন। চোখে-মুখে একটা রেশমকোমল ভাবফুটে উঠল। আর ঠিক সেই সময় শরৎবাবু এলেন। ঘরের মাঝখানে এসে বিশাল একা হাই তুলে বললেন, ‘আঃ, যাকে বলে গভীর ঘুম, সেইরকম একটা ঘুমে রুপোর টাকার মতো তলিয়ে ছিলুম। আমার সিস্টেমের একটা মজা আছে, কত পরিশ্রম করলে তবে মানুষের হজম হয়, আর আমার দ্যাখো, এক ঘুম, এক হজম। মানে সিরিজটা দ্যাখো, খেলুম, ঘুমোলুম, হজম করলুম। আবার খেলুম।’

    চেয়ারে বসতে-বসতে প্রশ্ন করলেন, ‘কারও কিছু বলার আছে? আমি জানি আছে। তোমরা প্রশ্ন করবে, তা হলে লেখা-পড়াটা কখন হবে? হবে। এরই ফাঁকে-ফাঁকে হবে। খাওয়ার পর তোমরা জানো যে, মানুষ ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সেই ক্লান্তি কাটাবার জন্যে নিদ্রা। নিদ্রা থেকে উত্থান এবং আর-একটা আহারের মাঝে যদি সময় থাকে তা হলে একটু লেখা হল, একটু পড়া হল। আসলে আহারের জন্যেই বাঁচা।’

    শরৎবাবু একটা হাই তুললেন। সকলের মুখের দিকে এক-একবার তাকালেন একটু বিব্রতভাবে, শেষে প্রশ্ন করলেন, ‘কথাটা কি ঠিক বললুম? আমার আজকাল হয়েছে কী, সব ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। জানা জিনিসও গুলিয়ে যাচ্ছে। কথাটা কী ভাই, আহারের জন্যে বাঁচা, না বাঁচার জন্যে আহার। সেই যাই হোক, দুটো কথাই এক। এখন আমার প্রশ্ন হল, এই মুহূর্তে কিছু খেতে হবে কি? তা হলে আমি মোটামুটি প্রস্তুত।’

    জজসায়েবের খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন শরৎবাবুর দিকে।

    বড়মামা পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘ইনি আমার বিদ্যা-জীবনের একান্ত সুহৃদ, রায়বাহাদুর ঈশ্বর শ্রীজলধর চট্টোপাধ্যায়ের একমাত্র সন্তান লেখক শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।’

    শরৎবাবু সঙ্গে-সঙ্গে আপত্তি তুললেন, ‘দুটো কারেকশন। প্রথম নামে। আগে চন্দ্র ছিল, পাছে আর-এক বিখ্যাত কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের সঙ্গে কেউ গুলিয়ে ফেলেন, তাই চন্দ্রটা আমি অফ করে দিয়েছি। এখন, সহজ-সরল শ্রীশরৎ চট্টোপাধ্যায়। দ্বিতীয় আমি লেখক নই। আমি কবি। কবি শ্রীশরৎ চট্টোপাধ্যায় হল আমার সঠিক পরিচয়। তৃতীয় আমার পরিচয়লিপিতে একটু অসম্পূর্ণতা থেকে গেছে। আমি শুধু কবি নই, আমি শিকারি, আমি পক্ষিতত্ত্ববিদ, আমি নেচারোপ্যাথিস্ট। আরও অনেক পরিচয় আছে আমার। পরে মনে পড়লে বলব। আমি আবার আত্মপ্রচার তেমন পছন্দ করি না, তাই সব কিছু তেমন মনে রাখি না। যেমন এইমাত্র আমার মনে পড়ল, দুর্গাপুজো কমিটির আমি পার্মানেন্ট প্রেসিডেন্ট।’

    বড়মামা সঙ্গে-সঙ্গে বললেন, ‘এবার আমাকেও স্থানীয় পূজা কমিটির প্রেসিডেন্ট করেছে। আজই চিঠি পেয়েছি সকালে। আচ্ছা, প্রেসিডেন্ট হলে কি নিজের নামে আলাদা করে প্যাড ছাপাতে হবে? তুমি তো শরৎ, এইসব ব্যাপারে আমার চেয়েও অভিজ্ঞ।

    ‘অভিজ্ঞ তো বটেই। আমাকে ছাড়া, কোনও সঙ্ঘ, সংগঠন অন্য কাউকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে ভাবতেই পারে না। প্যাড তো তোমাকে ছাপাতেই হবে। আমার প্যাডের মাথাটা দেখেছ। তিন থেকে চার ইঞ্চি চওড়া পার্টির মতো পরিচয়-লিপি। চিঠি লেখার মতো সাদা জায়গা খুঁজে বের করতে হয়। উঃ, একটা মানুষের এত পরিচয়ও থাকে। এই দ্যাখো না, এখন সব মনে পড়ছে একে-একে। জামালপুর হিন্দু সৎকার সমিতির অনারারি প্রেসিডেন্ট। জামালপুর হরিসভার সহ-সভাপতি, ঘাস-সংরক্ষণ সমিতির চেয়ারম্যান। বিশ্ব বিস্মরণ সংস্থার সদস্য।’

    জজসায়েব বললেন, ‘বিস্মরণ সংস্থাটা কী?’

    ‘সেটা হল গিয়ে বেশ মজার সংস্থা। পৃথিবীতে বহু মানুষ আছে যারা ভুলে যায়। কোনও কিছু মনে রাখতে পারে না। যাকে বলে ফরগেটফুল। এই ছাতা কোথায় রাখছে, এই ব্যাগ কোথায় রাখছে, বাবার নাম ভুলে যাচ্ছে, বাড়ির ঠিকানা ভুলে যাচ্ছে। এমন কত লোক আছে এই বিশাল পৃথিবীতে হারিয়ে বসে আছে, নিজের পরিচয় ভুলে। এদের সাহায্য করাই হল বিশ্ব-বিস্মৃতি সংস্থার কাজ। আমাদের টেলিফোন নম্বর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া আছে। আমাদের ফোন করলেই আমরা সঙ্গে-সঙ্গে সাহায্য করব। হয়তো, ফোন এল, বলতে পারেন, আমার নোট-লেখা ডায়েরিটা কোথায় রেখেছি। আমরা বলব, নাম-ঠিকানা বলুন। যে-ই নাম-ঠিকানা পেলুম, সঙ্গে-সঙ্গে শাঁ-শাঁ করে আমাদের ভলান্টিয়ার পার্টি চলে গেল। তিন মিনিটে বের করে দিয়ে এল ডায়েরি। একজন বক্তৃতা করছেন। নাম ভুলে গেছেন। থিওরি অব রিলেটিভিটির প্রবক্তার। আমাদের কাছে ফোন এল। আমরা সঙ্গে-সঙ্গে বলে দিলুম, বার্ট্রান্ড রাসেল। সঙ্গে-সঙ্গে বক্তৃতা চালু হয়ে গেল।’

    জজসায়েব বললেন, ‘রাসেল নয়, আইনস্টাইন।’

    ‘অ, আইনস্টাইন। সে ব্যবস্থাও আমাদের আছে। আমাদের সাহায্যকারীরা যখন কিছু বলে, তখন তার পাশে একজন, তার পাশে আর-একজন, তার পাশে আরও একজন, পরপর সব লাইন দিয়ে বসে থাকে। এ ভুল করল তো ও সংশোধন করল, ও করল তো সে সংশোধন করল। টু ফরগিভ ইজ হিউম্যান, টু আর ইজ ডিভাইন। না, কথাটা কেমন হল। ঠিক যেন জয়েন্টে-জয়েন্টে লাগল না। অ্যাই দেখুন। একে বলে বিস্মরণ। আমাদের সংস্থার কেউ পাশে থাকলে সঙ্গে-সঙ্গে মিলিয়ে দিত। কোটেশন হল, ইলেকট্রিকের লাইন টানার মতো। কি না হলে ধরা যায়। এই যেমন আমি ধরতে পারছি, ঠিক করতে পারছি না।’

    মেজোমামা বললেন, ‘ওটা হবে, টু আর ইজ হিউম্যান, টু ফরগিভ ডিভাইন।’

    ‘অ্যাই, দেখেছ তো, এইবার খাঁজে-খাঁজে মিলে গেল!’

    বড়মামা অবাক হয়ে বললেন, ‘এত কথা হল কেন? আমরা কোথা থেকে শুরু করেছিলুম…’

    শরৎবাবু বললেন, ‘তা তো জানি না, তবে নিশ্চয় কোনওভাবে শুরু হয়েছিল। কথারও সব রুট থাকে।’

    জজসায়েব বললেন, ‘শুরু হয়েছিল প্যাড ছাপা হবে কি না—এই প্রশ্ন নিয়ে।’

    বড়মামা বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক। উত্তরটা কিন্তু পাইনি এখনও।’

    শরৎবাবু বললেন, ‘পাবে কী করে? জঙ্গলে যেমন পথ হারিয়ে যায়, কথার জঙ্গলও তো সেই রকম। ওইজন্যে কথা বলার সময় একজন গাইড রাখতে হয়। যে ঠেলে-ঠেলে বেলাইন থেকে লাইনে এনে দেবে। আমার মনে আছে, এক সভায় আমি রবীন্দ্রনাথের ওপর লেকচার দিচ্ছি, রবীন্দ্রনাথের ঋতু, বর্ষার গান, বর্ষাকাল করতে-করতে, আমার ছেলেবেলা, খিচুড়ি, শেষে খিচুড়ি কত রকমের আছে, খিচুড়ি কীভাবে রাঁধতে হয়, চাল কতটা, ডাল কতটা, ভূনি খিচুড়ি কাকে বলে। আশ্চর্য, এই, শ্রোতা যদি একবারও মনে করিয়ে দিত, এটা পঁচিশে বৈশাখ, রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন, রান্নার ক্লাস নয়।’

    বড়মামা হেঁকে বললেন, ‘প্যাড কী ছাপাতে হবে?’

    ‘কিসের প্যাড?’

    ‘আমাকে পুজো-কমিটির প্রেসিডেন্ট করেছে।’

    ‘লাইফ প্রেসিডেন্ট?’

    ‘না, এই তো, এইবার প্রথম করল।’

    ‘তা হলে এক কাজ করো, ছাপিয়ে ফ্যালো, পরে পাশে একটা একস লিখে দিও। এইবছরটা প্রেসিডেন্ট থাক, পরের বছর একস প্রেসিডেন্ট। ডাক্তারি তো চুটিয়ে করলে এতকাল, এইবার একটু সামাজিক হবার চেষ্টা করো। টাকাপয়সা দিয়েই হোক, যেভাবেই হোক, কিছু-কিছু সঙ্ঘ, সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে যাও। তোমার তো আটটা কুকুর, আঠারোটা গোরু, তিন খাঁচা পাখি, তিরিশটা বেড়াল। এখন ওয়াইল্ড লাইফটা খুব পপুলার হয়েছে। তুমি ওয়ার্লড ওয়াইল্ড লাইফের সঙ্গে জড়িয়ে যাও। দেখবে, খুব ইজ্জতদার ব্যাপার।’

    জজসায়েব উঠে পড়লেন, ‘আমি তা হলে চলি।’

    বড়মামা বললেন, ‘চলবে? যাক সাইকেলটা তুমি তা হলে পেয়েই গেলে। ভালোই হল।’

    ‘আপনার কাছে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। নিজের সাইকেলটা পাঠিয়ে দিয়ে আপনি আমাকে আরও লজ্জিত করতে চাইছিলেন। এ-সবই আমার স্ত্রীর কীর্তি। জানেন তো, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়। আমার দেখুন কোনও ডাঁট নেই। আমার স্ত্রীর সাঙ্ঘাতিক ডাঁট। জজসায়েবের বউ বলে মাটিতে যেন পা পড়ে না।’

    ‘ও তুমি ছেড়ে দাও। ও আমার মেয়ের মতো। আর সত্যিই তো, সাইকেলটা তো চুরিই হয়েছিল। সেই স্বদেশী আমলে এই বাড়িতে একবার ইংরেজ-পুলিশ এসেছিল, আর এই একবার দিশি-পুলিশ এল। আমাকে তো প্রায় হাতকড়া পরিয়েই ফেলেছিল। ভয়েই মরি। আর সত্যিই তো, সাইকেলটা তো চুরিই হয়েছিল।’

    মেজোমামাকে নিয়ে জজসায়েব বেরিয়ে গেলেন।

    মুকুন্দ বললে, ‘ব্যাপারটা কী হল?’

    বড়মামা বললেন, ‘কী আবার হবে, নেহাত খাতির ছিল বলে চুরি করেও রেহাই পেয়ে গেলুম। পুলিশ চাকরি বাঁচাবার জন্যে কার একটা সাইকেল এনে আপনার সাইকেল বলে দিয়ে গেছে। সাইকেল তো আর মানুষ নয়। সব সাইকেলই এরকম দেখতে।’

    ‘বড়দা, সেই কারণেই তো আমার ভুলটা হল।’

    ‘যা, ব্যাটা খুব বেঁচে গেলি। চোরাইমাল আর বাড়িতে রাখিসনি, রাত হয়ে গেছে, গঙ্গার জলে ফেলে দিয়ে আয়।’

    ‘হ্যাঁ, ফেলে দিয়ে আসবে। ওই তো আপনার জজের বাড়ি। দাওয়া থেকে মাল হাওয়া হয়ে গেল। জজসায়েবও চোরাই সাইকেল চাপবেন, আমরাও চোরাই সাইকেল চাপব। একেই বলে, চোরে-চোরে মাসতুতো ভাই।’

    শরৎবাবু চটাপট, চটাপট হাততালি দিয়ে বললেন, ‘তোফা, তোফা, ঠিক জায়গায়, ঠিক কোটেশন। কোটেশন ছাড়া জীবন অচল। আচ্ছা, এখন আমার কথাটা বলি, আমি কী করব, আমার তো কোনও কাজ নেই। কেউ কিছু খেতেও দিচ্ছে না। আমি কি তা হলে আবার শুয়ে পড়ব?’

    মাসিমা বললেন, ‘আপনার এখনও খাওয়ার সময় হয়নি। হলে, আপনাকে খেতে দেব। এখন শুধু এককাপ চা খাবেন।’

    ‘তোমরা দেখছি আমাকে না খাইয়ে মারবে। যাকগে, হারমোনিয়াম আছে?’

    ‘হারমোনিয়াম কী করবেন?’

    ‘বাঃ, এই সন্ধেবেলা তোমাদের একটু উচ্চাঙ্গ ভজন শোনানো আমার কর্তব্য। শুধু খেলুম-দেলুম, মরে গেলুম, এটা কোনও জীবন হল না রে ভাই। জীবনকে ক্ল্যাসিকাল সঙ্গীতের মতো খেলাতে হয়। ক’টা বাজল এখন?’

    ‘ওই তো আপনার সামনেই দেওয়াল-ঘড়ি।’

    ‘সাড়ে ছয়। তার মানে এখন ইমন চলতে পারে। তারপর বেহাগ। বেহাগের পর খাওয়া। কেমন? ভদ্রলোকের চুক্তি।’

    মুকুন্দর ভীষণ গানবাজনার শখ। সঙ্গে-সঙ্গে হারমোনিয়াম নিয়ে চলে এল। মুকুন্দ আবার তবলা বাজায়। হারমোনিয়ামটা ডিভানে রেখে বলল, ‘তবলাটা নিয়ে আসি?’

    ‘তবলা? তুমি তবলা জানো? উত্তম, উত্তম। নিয়ে এসো। তবলা ছাড়া গান হয়?’

    ‘আমি আবার গানও জানি। দক্ষিণ ভারতীয় মার্গ সঙ্গীত।’

    ‘সর্বনাশ! সে তো আবার খুব গুরুপাক। আমার যখন ম্যালেরিয়া হয়, তখন উত্তর ভারতীয় সব গান দক্ষিণ ভারতীয়ের মতো হয়ে যায়। তুমি ম্যালেরিয়া ছাড়াই ওই গান গাইতে পারো?’

    ‘আমি শিখেছি যে!’

    শরৎবাবু একপাট হারমোনিয়াম বাজিয়েই গাঁক করে গান ধরলেন। বাঘ যেভাবে মানুষ ধরে, ঠিক সেইভাবে গানটা ধরলেন। মরা মানুষও চমকে উঠবে। একলাইন গেয়ে গান থামিয়ে বললেন, ‘সব সময় গলা ছেড়ে গান গাইবে। গলা একেবারে চাপবে না। আমার গুরু বলতেন, গলা দিয়ে গান গাইবে না, গান গাইবে পেট থেকে।’

    কথা শেষ করেই তিনি আরও উঁচু পর্দায় ধরলেন। গলা ফেটে ফুটিফাটা হয়ে গেল। সেদিকে গ্রাহ্য নেই। যাকে বলে সাংঘাতিক বেপরোয়া গাইয়ে। মুকুন্দ দড়াম-দড়াম করে তবলা পেটাতে লাগল। গানের লাইনে গান চলেছে, তবলার লাইনে তবলা। কারও সঙ্গে কারও মিল নেই। মুকুন্দ যত না বাজাচ্ছে, তারও চেয়ে বেশি মাথা নাড়ছে। বড়মামা উঠে চলে গেলেন। মাসিমা বেরিয়ে গেলেন। পড়েছিলুম আমি। আমিও চুপি-চুপি বেরিয়ে এলুম এক ফাঁকে। বাইরে থেকে মনে হচ্ছে ঘরের ভেতর গজ-কচ্ছপের লড়াই হচ্ছে যেন। সেই গান শুনে বড়মামার বাঘা-বাঘা আটটা কুকুর লেজ গুটিয়ে বসে আছে জুজুবুড়ি হয়ে। একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে।

    রাতের পাট চুকে গেল। নীচের তলার আলোটালো সব নিভে গেছে। পুবের ঘরে শরৎবাবুর নাক ডাকছে গাঁক-গাঁক করে। মুকুন্দ রোজ শোয়ার আগে স্নান করে। কুয়োতলায় ছড়ছড় করে জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। মাসিমা’র একটা নিজস্ব ইজিচেয়ার আছে বারান্দায়। বিছানায় যাবার আগে সেই চেয়ারে বসে থাকেন আপনমনে। সেই সময় মাসিমা একেবারে অন্য মানুষ। এই সময় মাসিমার পাশে গিয়ে আমি বসি। মা-মরা ছেলে বলে মাসিমা আমাকে ভীষণ ভালোবাসেন। এই যে আমার মা নেই, আমার বাবা বিলেতে, আমি কিছু বুঝতে পারি না। মাঝে-মাঝে মায়ের কথা মনে পড়লে আমার চোখে জল এসে যায়। আসতেই পারে। সকলেরই কেমন মা আছে, আমার নেই। মা না থাকলে জমে? আমিও স্কুল থেকে ফিরি, আমার বন্ধুরাও ফেরে। তারা কেমন দরজার বাইরে থেকে ‘মা, মা’ বলে ডাকতে-ডাকতে বাড়িতে ঢোকে। আমি আসি গুটিগুটি, চোরের মতো। মামার বাড়ি যতই ভালো হোক, নিজের বাড়ি আর মামার বাড়িতে একটু তফাত হবেই। মাসিমা আমাকে সাঙ্ঘাতিক ভালোবাসলেও মাসিমাকে আমি ভয় পাই। ভীষণ রাগী মানুষ। অকারণে রাগেন না। কারণ থাকলে রেগে যান। তখন বড়-বড় মা দুর্গার মতো চোখ দুটো জ্বলতে থাকে। ফর্সা মুখ লাল হয়ে ওঠে। আমাকে ভালোবাসেন বলে আমি কোনও অন্যায় করি না। জানি, অন্যায় করলেও আমার ওপর রাগ করবেন না। আমার হয়েছে মহা সমস্যা। আমার ইচ্ছে করে একটু অন্যায় করি, মায়ের হাতে একটু মার খাই। মারের পর একটু আদর খাই। শুধুই ভালো ছেলে হয়ে থাকা। একটু দুষ্টুমি যদি এখন না করি, কবে আর করব! বড় হয়ে?

    মাসিমার পাশে বসে আছি। মাসিমার একটা হাত আমার মাথায়। আমি দেখেছি, মাসিমা আমার মাথায় হাত রাখলে, আমার সব বিপদে কেটে যায়। আমার জ্বর, পেট ব্যথা, মাথা ধরা, দাঁত কনকন—সব কমে যায়। স্কুলে পড়া পারি। তাই তো আমি মাসিমার পাশে এসে বসি। আরও বসি, মাসিমা ছেলেবেলার গল্প বলেন। মায়ের গল্প বলেন। মা কেমন সুন্দর গান গাইতেন। ফ্রক পরলে মাকে মেমেদের মতো দেখাত। মায়ের ভীষণ ভয় ছিল ভূত আর চোর-ডাকাতের। আবার সাপে ভীষণ সাহস ছিল। সবাই যখন ছুটছে, মা দাঁড়িয়ে আছেন। মাকে সবাই ভীষণ ভালোবাসত। মা লেখাপড়ায় একেবারে সেরা ছিলেন। প্রতিটা পরীক্ষায় প্রথম। মায়ের সঙ্গে নাকি কালীমন্দিরে ভোরবেলা মা-কালীর দেখা হয়েছিল। মা-কালী মায়ের মতোই একটা ছোট মেয়ের রূপ ধরে নাটমন্দিরে এক ঘণ্টা লুকোচুরি খেলেছিলেন। মা সেই লালপাড় শাড়ি-পরা, গাছকোমর বাঁধা মেয়েটিকে যতবার জিগ্যেস করেন, তোমার নাম কী ভাই, ততবারই মেয়েটা হেসে-হেসে পালায়। শেষে মা যখন খুব রাগ করে বললেন, যাও, নাম না বললে তোমার সঙ্গে আর খেলব না আমি। সেই থেকে তোমাকে আমি নাম ধরে ডাকতেই পারছি না। মেয়েটা তখন বললে, আমাকে তুমি এতক্ষণেও চিনতে পারলে না ভাই। আমার নাম, জগদম্বা। বলেই মেয়েটা মা-কালীর মূর্তির মধ্যে ঢুকে গেল। সেই না দেখে আমার মা অজ্ঞান হয়ে গেলেন। মন্দিরের বৃদ্ধ পুরোহিত এসে মায়ের মুখে চরণামৃত দিয়ে জ্ঞান ফেরালেন। সব শুনে বললেন, তুমি মা ভাগ্যবতী। আমি সারাজীবন পুজো করে আজও দর্শন পেলাম না। পুরোহিত হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলেন। মায়ের গল্প সারারাত হলে সারারাত আমি জেগে-জেগে শুনতে পারি। মাসিমার কাছে মায়ের অনেক অনেক গল্প আছে। এত গল্পও মা তৈরি করে রেখে গেছেন! আমার জন্যে মায়ের গল্প আছে, মা নেই।

    মাসিমা সবে গল্প শুরু করতে যাচ্ছেন, এমন সময় বড়মামা বললেন, ‘তোমরা একবার আমার ঘরে এসো, সাঙ্ঘাতিক একটা আলোচনা আছে।’

    মেজোমামা, মাসিমা আর আমি ঘরে ঢুকতেই বড়মামা সাবধানে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমার কেমন যেন ভয়-ভয় করছে। বড়মামা তো কোনও দিন এমন করেন না। কী হল আজ। বড়মামা মেঝেতে পুরু গালচেটা পাতলেন। ফিসফিসে গলায় বললে, ‘তোমরা সব বসে পড়ো।’

    মেজোমামাও যেন বেশ ভয় পেয়ে গেছেন। আস্তে-আস্তে বললেন, ‘কী ব্যাপার বলো তো!’

    বড়মামা আমাদের গা ঘেঁষে বসে, একেবারে ফিসফিসে গলায় বললেন, ‘আমার ভাই, সমূহ বিপদ। বিপদ একা আমার নয়, আমাদের সকলের বিপদ।’

    মাসিমা বললেন, ‘কী হয়েছে! কাউকে ইনজেকশান দিতে গিয়ে মেরে ফেলেছ! জাল ওষুধের কেস নয় তো?’

    ‘ওসব নয়, ওসব নয়। অন্য ঘটনা। ভয়ঙ্কর একটা ঘটনা ঘটে গেছে। আমরা শেষ হয়ে গেলুম।’

    মেজোমামা বললেন, ‘আর আমাদের টেনশন না বাড়িয়ে দয়া করে বলে ফ্যালো। তোমার বিপদটা কী?’

    ‘খুব কাছে সবে সরে এসো। আরও কাছে।’

    বড়মামা এপাশে-ওপাশে তাকালেন। জানালার দিকে তাকালেন। আমাকে বললেন, ‘ঝট করে দেখে এসো তো, জানালার বাইরে কেউ আছে কি না!’

    ডিকেটটিভ বই আমি খুব পড়েছি। জয়ন্ত, সুন্দরবাবু, ব্যোমকেশ, কিরীটি রায়। পাকা গোয়েন্দার মতো তড়াক করে লাফিয়ে উঠে জানালার কাছে গেলুম। কেউ নেই। অন্ধকার আকাশ। গাছের মাথা দুলছে বাতাসে। দরজাটা টেনে দেখলুম। বন্ধই আছে। ফিরে এসে বসলুম। বড়মামা জোড়হাত হয়ে প্রণাম করলেন দেওয়ালে ঝোলানো ঠাকুর রামকৃষ্ণ ও সারদা মায়ের ছবিকে।

    মেজোমামা বললেন, ‘উত্তেজনায় আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।’

    আর ঠিক তখনই বড়মামা বললেন, ‘আমি বিশ লক্ষ টাকা পেয়েছি।’ বলেই ভেউভেউ করে কেঁদে ফেললেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমার সর্বনাশ হয়ে গেল।’

    মেজোমামা বললেন, ‘যাঃ, তা কখনও হয়! বিশ লাখ টাকা কেউ লটারি পায়? তোমার কি সবই অদ্ভুত!’

    বড়মামা কান্না-জড়ানো গলায় বললেন, ‘কী করব ভাই, আমার বরাতটা চিরকালই একরকম রয়ে গেলে। বিপদের পর বিপদ। বিপদের পর বিপদ। টিকিটটা আমাকে একজন জোর করে গছিয়ে গিয়েছিল। আমি নেব না কিছুতেই। বলে কিনা…এই করেই আমি সংসার চালাই।’

    ‘ব্যস, আর কি, তোমার অমনি দয়ার শরীর গলে গেল! নাও, এইবার ঠ্যালা সামলাও। তাও এক-আধ লাখ হয়! এ একেবারে বিশ লাখ! একে কি বলে জানো, খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে, কাল হল তাঁতির গোরু কিনে।’

    আঃ, মেজোমামা কোটেশানটা একেবারে ঘাটে-ঘাটে লাগিয়েছেন। শরৎবাবু থাকলে তালি বাজাতেন।

    বড়মামা বললেন, ‘বিপদে পড়েছি ভাই। এখন আর তোরা আমাকে গালি দিসনি।’

    ‘এই সর্বনাশ লটারিটা কোথাকার?’

    ‘মেঘমল্লার বাম্পার।’

    ‘নাও এখন ডাক্তারি-ফাক্তারি ছেড়ে ব্যবসাদারদের মতো একটা গদি আর ছ’টা টেলিফোন নিয়ে বোসো। আর সারাদিন ভাও কেতনা, ভাও কেতনা করো। থার্ড ক্লাস ন্যাস্টি, ভাল্গার, ব্লোটিং, রিকিং মানি। তোমার গা দিয়ে বিশ্রী গন্ধ বেরোবে। তোমার মুখটা কোলাব্যাঙের মতো হয়ে যাবে। তোমার একটা ধামার মতো ভুঁড়ি হবে। তোমার সব চুল উঠে গিয়ে তেপান্তরের মাঠের মতো এতখানি একটা টাক বেরোবে।’

    ‘পাছে টাকা জমে গিয়ে কালো টাকা হয়ে যায়, সেই ভেবে আমি দু’হাত উড়িয়ে দিই, উড়নচণ্ডীর মতো। এ আমার কী সর্বনাশ হয়ে গেল!’

    ‘তুমি তো এক্ষুনি দুম করে হার্টফেল করতে পারো। তখন কী হবে। তুমি তো চলে গেলে। তোমার আর কি। আমরা যে অনাথ হয়ে যাব। অনেক ভাগ্য করলে মানুষ এমন বড়দা পায়। তোমার বুকটা এখন কেমন করছে। ধড়ফড়, ব্যথা! আমি বরং একজন ডাক্তার ডাকি। আজ সারারাত তিনি এ-বাড়িতে থাকুন।’

    ‘আমার এখনও কিন্তু সেরকম কিছু মনে হচ্ছে না।’

    ‘এখন ভয় পেয়ে আছ বলে কিছু হচ্ছে না। একটু পরেই তোমার আনন্দ হবে। তখন তোমার লাফ মারতে ইচ্ছে করবে। তারপর তোমার হার্টটা চমকে উঠেই থমকে যাবে।’

    মাসিমা বললেন, ‘কত টাকা বললে?’

    ‘কুড়ি লক্ষ।’

    ‘কোনও মানে হয়! ছোটলোকের মতো এককাঁড়ি টাকা। তা তুমি টিকিটটা ছিঁড়ে ফেলে দাও না।’

    ‘সে উপায় নেই। এর আগে তো আমি একটা দেড়লাখ টাকা ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলুম।’

    ‘তার মানে তুমি এর আগে একটা লটারি পেয়েছিলে?’

    ‘গত বছরে।’

    ‘ছিঃ, ছিঃ, তোমার কী ভিখিরির বরাত!’

    ‘সে টিকিট তো আমি ছিঁড়ে দিয়েছিলুম। লটারির টাকা আমার পেছন-পেছন তাড়া করলে আমি কী করতে পারি! এবারে আমার এজেন্টের কাছেই টিকিটটা ছিল।’

    ‘সে কী বলছে?’

    ‘খবরটা দেখে তার ছোট একটা হার্ট-অ্যাটাক মতো হয়ে গেছে। বেড রেস্টে ফেলে রেখে এসেছি। শোন, আমি ওভাবে মরব না, তবে আমি যা শুনেছি, তা আরও ভয়ানক ও ভয়ঙ্কর। ভয়াল-ভয়ঙ্কর এক অপরাধ-কাহিনী। খবরটা যখন ছড়াছড়ি হয়ে যাবে, তখন একদল ক্রিমিনাল কী করবে, আমাদের এই ছেলেটাকে তুলে নিয়ে চলে যাবে। নিয়ে গিয়ে রেখে দেবে গুম করে। সেখান থেকে চিঠি ছাড়বে, অমুক দিন অমুক জায়গায় তিরিশ লাখ টাকা নিয়ে হাজির থাকবে, হাতের কবজিতে সবুজ রঙের রুমাল জড়ানো একজন দাঁড়িয়ে থাকবে। তার সামনে দাঁড়ানো মাত্রই বলবে, জয় রাম। টাকাভর্তি সুটকেসটা তার হাতে দেবে। তখনই কিন্তু ছেলেকে ফেরত পাচ্ছ না। ছেলেকে রাত বারোটার সময় বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে যাবে, আমাদের ডেলিভারি ভ্যান। পুলিশের সাহায্য নেবার চেষ্টা কোরো না; তা হলে গোটা ছেলে আর ফিরবে না। তখন সেপারেট পার্সেলে ডাকযোগে তার পার্টস ফিরে আসবে। একবারে আসবে না, অনেকদিন ধরে একটু-একটু করে আসবে। তার মানে আমাদের জন্যে ছেলেটার ভোগান্তি আর আমাদের বেনো জল ঢুকে ঘোরো জল বেরিয়ে যাওয়া…’

    বড়মামার কথায় আমার ভয় পাওয়াটাই উচিত ছিল; কিন্তু আমাকে তো কেউ কোনওদিন কিডন্যাপ করেনি, তাই মনে হচ্ছিল রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনীতে যা পড়েছি, একেবারে মিলিয়ে দেখার সুযোগ পেলে বেশ হয়। গভীর জঙ্গলে ছোট্ট একটা গুমটি ঘরে পুরে রাখবে। একপাল হিংস্র ডোবারম্যান কুকুর চারপাশে থাকবে পাহারায়। অনেক উঁচুতে একটা ঘুলঘুলি। সেই পথে অচেনা রোদ। অজানা একটা মেয়ে খাবার আনবে। বাইরে মাঝে-মাঝে শোনা যাবে গুলি-গোলার শব্দ। ঘরের ভেতর কাঠের পাটাতন। তার ওপর কুটকুটে কম্বল। একটা লোহার গেলাস। এক কুঁজো জল। বসেই আছি। বসেই আছি। কিচ্ছু খেতে চাইব না। দাড়িঅলা ভীষণ চেহারার একটা লোক আমাকে মেরেধরে খাওয়াতে চাইবে। আমি তার হাতে কামড়ে দোব। সে আমাকে বলবে, ইবলিশের চ্যালা।

    অনেক রাত অবধি মিটিং হল। বোঝা গেল বিষম বিপদ।

    বড়মামা বললেন, ‘আমার ব্যাঙ্কের এজেন্টকে নিয়ে গিয়ে টাকাটা এখানে আমার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করতে হবে। ভাবছি এজেন্ট ভদ্রলোককে একটা গাড়ি উপহার দোব। লাখখানেক খরচ হল। টাকাটা যে-ভাবেই হোক খরচ করতে হবে তো। ধরো, বাড়িটাকে ভেঙে চুরমার করে আবার যদি তৈরি করাই তা হলেই তো সব টাকা খতম।’

    ‘আর তুমিও খতম। পালে-পালে সব আসবে, মেয়ের বিয়ে, ছানি অপারেশন, বারোয়ারি মনসাপুজো, ভোলেবাবা, দিতে না পারলেই বোমা, চাকু। শোনো, এ-খবর তুমি কিছুতেই চেপে রাখতে পারবে না। জানাজানি হবেই-হবে। এ-ও এক ধরনের স্ক্যান্ডাল। তুমি ছেলেটাকে নিয়ে বেশ কিছুদিনের জন্যে আত্মগোপন করো।’

    মাসিমা বললেন, ‘যারা কিডন্যাপ করে, র‍্যানসাম আদায় করতে পারে, তাদের আগে থেকেই টাকাটা দিয়ে দিলে কেমন হয়! আমি শুনেছি অনুপার্জিত টাকা ব্যবহার করাটাও তো পাপ।’

    ‘কে কিডন্যাপ করবে জানব কী করে? একটা দল? অনেক দল।’

    ‘শোনো, তোমার গোঁফ-দাড়ি বেশ তাড়াতাড়ি বেরোয়। তুমি সাতদিন ছাতের ঘর ছেড়ে কোথাও বেরোবে না। ছেলেটাও তোমার সঙ্গে থাকবে। আমরা অ্যানাউন্স করে দিচ্ছি, তোমার ম্যাসিভ হার্ট-অ্যাটাক। নার্সিংহোমে ইন্টেনসিভ কেয়ারে। সাতদিনে তোমার চেহারা হয়ে যাবে ওমর শেখ-এর মতো। ছেলেটার তো আর দাড়ি-গোঁফ বেরোবে না, ওর চুল আর ভুরু-টুরু সব আমরা কামিয়ে দেব। কেউ আর চিনতে পারবে না। তারপর রাত যখন গভীর হবে, একটা কালো গাড়ি এসে আমাদের খিড়কিতে দাঁড়াবে। তোমরা উঠবে। ন্যাশানাল হাইওয়ে থার্টি-ফোর ধরে সোজা কালাচিনি ফরেস্টে। সেখানে আমার বন্ধু শৈবাল ফরেস্ট-অফিসার। বিশাল বাংলো। থাকে একা। তিনটে মাস গ্যাপ। তার মধ্যে থিতিয়ে যাবে ব্যাপারটা। তখন তুমি ওমর শেখের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসবে আবার তোমার চেম্বারে।’

    ‘এ তো তোর সেই নেতাজির গ্রেট-এস্কেপের মতো।’

    ‘তিনি করেছিলেন মহাকারণে, তুমি করবে হীন কারণে। মহাপুরুষ আর পুরুষে এই তফাত ভাই।’

    ‘আমি আর আমাদের ভাগ্নে না হয় অজ্ঞাত বনবাসে গেলুম; কিন্তু তোমাদের কী হবে। ধরো, কুসিকে যদি ধরে নিয়ে যায়!’

    মাসিমা বললেন, ‘অত সহজ নয়। আমাকে ধরতে এলে তাকে আমি ধরে জালায় ভরে দেব। আমাকে তোমরা চেনো না।’

    মেজোমামা বললেন, ‘আমাকে ধরলে সেই ছেলেবেলার অভ্যাসটা ঝালাই করে নেব। মারামারিতে আমার ভীষণ নাম ছিল।’

    বড়মামা বললেন, ‘আমি ভাই একবার লুই পাস্তুর হব বলে গোঁফ-দাড়ি রাখার চেষ্টা করেছিলুম। জিনিসটা বেশ জমেও ছিল। কিন্তু ভাই, এন কুটকুট করে। আমার দাড়িতে আবার ছারপোকা হয়েছিল। তারপর চুমুক দিয়ে তরল কিছু খেতে গেলে গোঁফের বিরক্তি। ঠোঁট ঠেকার আগে গোঁফ ডুবে গেল। তারপর সর্দি হলে নাক-ঝাড়ার অসুবিধে। আমি বলি কি, বুড়োর মতো আমারও মাথা আর ভুরু কামিয়ে দাও।’

    ‘ওই ভুলটা কোরো না বড়দা। তোমার চুল পাতলা হয়ে এসেছে। বেরোতে সময় নেবে। বুড়োর চুল সাতদিনেই ঘন হয়ে উঠবে?’

    ভোর হয়ে এল। আমরা আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়লুম যে-যার জায়গায়। আমি তো বড়মামার ঘরে শুই। এপাশে-ওপাশে খাট।

    বড়মামা শুয়ে-শুয়ে বললেন, ‘কী সর্বনাশ হয়ে গেল! এখন প্রাণে বাঁচলে হয়।’

    ‘আপনি টিকিটটা ছিঁড়ে ফেলে দিন না।’

    ‘আরে, আমি তো মানুষ। লোভও তো আছে। কেবল মনে হচ্ছে, অতগুলো টাকা ছেড়ে দেব। যে কালীবাড়িতে দিদি মায়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছিল, সেই মন্দিরটার জীর্ণ দশা। খুব ইচ্ছে করে একেবারে ঢেলে সাজিয়ে দিই। আমাদের বাড়িতে যে কাজ করে লক্ষ্মীদি, তার মেয়েটার বিয়ে দেবার পয়সা নেই। মনে হচ্ছে, বিয়েটা বেশ ঘটা করে দিয়ে দিই। কত ছেলেমেয়ে পড়ার খরচ জোগাতে পারছে না। মনে হচ্ছে, যা হয় একটা কিছু করি। কিছুই করা যাবে না লোক জানাজানি হয়ে যাবার ভয়ে। এমন দেশ আমাদের, বিদেশ থেকে সব বিদেশী পাপ ধার করে আনছে। চুরি-ডাকাতি ছিল, কিডন্যাপিংটা ছিল না।’

    হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।

    বড়মামা বললেন, ‘কোনও এমার্জেন্সি কেস। ভদ্রভাবে বলে দাও, বড়মামার হার্ট-অ্যাটাক হয়েছে। নার্সিংহোমে আছেন।’

    ফোন ধরে বললুম, ‘হ্যালো।’

    ‘আঁ, কে বুলছেন?’

    ‘আমি বুড়ো। আমার বড়মামার ভাগ্নে।’

    ‘আঁ, লেকিন বিমল মিট্টির কুথায়? লেটে আছেন কি, মজেসে। লোটারি মিলিয়েছেন না, আরে ব্বাপ বহত ভারি লোটারি।’ আমি তাড়াতাড়ি ফোন নামিয়ে বড়মামার কাছে ছুটে এলুম। সর্বনাশ করেছে, এ তো গুণ্ডার গলা। লোকটা এত জোরে গাঁক-গাঁক করে কথা বলছে, নামিয়ে রাখলেও শোনা যাচ্ছে। ব্যাড় ব্যাড় করছে। হাঃ হাঃ করে হাসছে দৈত্যের মতো। ভয়ে আমার বুক ঢিপঢিপ করছে।

    বড়মামার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বললুম, ‘সেই গুণ্ডা। খবর পেয়ে গেছে। হাঃ হাঃ করে হাসছে, আর বলছে, ‘বিমল মিট্টির, মাজেসে লেটে আছে কি, বহত ভারি লোটারি মিলিয়েছে।’

    বড়মামা টেলিফোনের দিকে গুটিগুটি এগিয়ে চললেন। লোকটা আমার সাড়া না পেয়ে ‘হ্যাল্লো, হ্যাল্লো’ করছে। বড়মামা ট্যাপ করে লাইনটা কেটে দিলেন। হাত কাঁপছে তাঁর। চোখ বড়-বড় হয়ে উঠেছে। স্যান্ডো গেঞ্জি পরে আছে। পিঠের খোলা অংশে আলো পড়েছে। ঘামে চকচক করছে। আমার গলা শুকিয়ে গেছে। এমন বোকা, আমার মনে হচ্ছে, লোকটা টেলিফোনের ভেতর দিয়ে ঘরে চলে আসবে। ট্যাপ করে লাইনটা কেটে গেল। বড়মামা রিসিভারটাকে টেলিফোন টেবিলেই শুইয়ে রাখলেন, যাতে আর কল না আসে।

    আমরা দু’জনে ঢকঢক করে জল খেলুম দু’গেলাস। বন্ধ দরজায় টোকা পড়ল। বড়মামা চমকে উঠে বললেন, ‘কে, কে?’

    ‘দরজা খোলো।’ ভারী গলা।

    ‘কে তুমি?’ বড়মামা মেজোমামার গলা চিনতে পারছেন না ভয়ে।

    ‘কে মেজোমামা?’ আমার গলারও জোর গেছে।

    ‘দরজাটা খোলো।’

    মেজোমামা ঘরে ঢুকেই বললেন, ‘আর এক মুহূর্ত দেরি নয়। প্যারালাল লাইনে আমি সব শুনেছি। তুমি কতজনকে বলে বেড়িয়েছ শুনি। তোমার স্বভাব তো আমি জানি। একটা কথাও পেটে রাখতে পারো না। কতজনকে বলেছ?’

    ‘বেশি না, মাত্র তিনজন।’

    ‘ব্যস, ওই তিনজন এখন তিন লক্ষ জন হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে তোমাদের আমি পাচার করে দিতে চাই। আমরাও তোমাদের সঙ্গে যাব। মুকুন্দ আর মদনলাল বাড়ি সামলাবে। প্রয়োজনে ঝড়ু আসবে। ঝড়ু আর মদনলাল থাকলে ভয় নেই। প্রয়োজনে জান দিয়ে দেবে। গেট রেডি। গেট রেডি।’

    মেজোমামা মাসিমাকে ডেকে তুললেন।

    মাসিমা সমস্ত শুনে বললেন, ‘নাঃ, যেতেই হবে। থাকলে বিপদে পড়ে যাব। কাল সকাল থেকেই আক্রমণ শুরু হয়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা ছুটে আসবে কালো টাকা সাদা করতে। আমি শুনেছি, ওরা ওই রকমই করে। তুমি বড়দা, সর্বনাশ করে ফেলেছ। কেন তুমি তিনজনকে বলেছ। তিনজনের মধ্যে কে-কে আছে?’

    ‘ওই যে আমাকে মাসাজ করতে আসে, গোপাল হালুই।’

    ‘তুমি গোপালকে বলেছ! বাঃ, উপযুক্ত লোককেই বলেছ। গোপাল মোটামোটা ব্যবসাদার আর শিল্পপতিকে মাসাজ করে। চুল কাটার সময় আর মাসাজের সময় জানোই তো যত কথা হয়। হয়ে গেছে। নিজের সর্বনাশ তো করলেই, আমাদেরও শেষ করলে। এ-বাড়িতে আর ফিরে আসা যাবে তো! ফিরে এসে কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে তো!’

    মাসিমা কথা শেষ করে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন কি দাঁড়াননি, সদরে গাড়ি থামার শব্দ। অনেকটা বাগানে পেরিয়ে সদর। দক্ষিণের বাতাসে হর্নের শব্দ ভেসে এল। কে গেটটাকে ধরে ঝাঁকাচ্ছে। জোরে জোরে। সবাই থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। বারান্দা থেকে অনেক দূর হলেও, আমরা গেটটা দেখতে পাচ্ছি। বেশ বড় সাদা একটা গাড়ি। পাঞ্জাবি-পরা বেশ মোটা মতো এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন।

    মেজোমামা বললেন, ‘এই খেয়েছে। বড়দা, বড়দা, শুয়ে পড়ে বুকে হেঁটে ঘরে ঢুকে পড়ো। কুসি, তুই শিগগির যা। বোকা-মুকুন্দটা সব গোলমাল করে দেবে। তুই শিগগির যা। গিয়ে বল, মুকুন্দ যেন বলে, ‘বড়বাবুর হার্ট-অ্যাটাক হয়েছে। পাবলো ক্লিনিকে ইনটেনসিভ কেয়ারে আছে। বাড়ির সবাই সেইখানেই আছে।’ কোনওভাবেই যেন অন্য কথা না বলে।’

    মাসিমা তরতর করে নীচে নেমে গেলেন। আমরা গেরিলা-সৈন্যের মতো বুকে হেঁটে ঘরে ঢুকে পড়লুম।

    মেজোমামা বললেন, ‘ড্রেস আপ। ড্রেস আপ। বড়দা, তুমি বেশ ভালো করে সাজো তো। সব চেয়ে ভালো ট্রাউজার আর স্ট্রাইপড শার্ট পরো। সমস্ত চুল সামনে টেনে এনে তোমার চওড়া কাপালটা ঢেকে ফ্যালো। কোমরে চওড়া বেল্ট লাগাও। আজ গগলসটা পরো। তোমার সেই ফরেন জিনিসটা।’

    নকশাল আমলে বড়মামা আত্মরক্ষার জন্যে রিভলভার রাখার লাইসেন্স পেয়েছিলেন। এই সময় খুব কাজে লেগে গেল যা হোক। আমাদের একটা ইন্টারকম আছে। মাসিমা ইন্টারকমে কথা বলছেন নীচে থেকে। মুকুন্দর কথা ভদ্রলোক বিশ্বাস করেননি। গাড়িতে বসে আছেন। মুকুন্দকে বলেছেন, ‘ব্যবসাদার। আমি বুঝি মানুষ কোন চালে চলে! প্রয়োজন হলে সারাদিন গেট আটকে বসে থাকবেন।’ মুকুন্দ সবক’টা কুকুরকে বাগানে ছেড়ে দিয়েছে। মাসিমা জিগ্যেস করছেন, ‘শরৎবাবুর কী হবে! তিনি তো এখনও ঘুমোচ্ছেন।’

    মেজোমামা বললেন, ‘ঘুমোচ্ছেন, ঘুমোন। উঠে দেখবেন আমরা নেই।’

    আমাদের সাজ-পোশাক হয়ে গেল। নীচের স্টোররুমে বসে আমরা এক রাউন্ড চা খেয়ে নিলুম। করিডোরের আয়নায় নিজেকে দেখে অবাক। চিনতেই পারছি না নিজেকে। কেমন যেন বকাটে-বকাটে লাগছে। অন্য সময় এমন সাজলে, মেজোমামাই আমাকে বলতেন, ‘যাও, এখানে কেন? সিনেমা হলে গিয়ে ব্ল্যাকে টিকিট বিক্রি করো।’

    মুকুন্দকে একপাশে বসিয়ে পাখি-পড়ানোর মতো সব বোঝানো হল। আজই প্রথম শুনলুম, মুকুন্দ খুব ইন্টেলিজেন্ট ছেলে। মেজোমামা বললেন, ‘আর এক মুহূর্ত দেরি নয়। এরপর এমন কেউ এসে পড়বে, যার সঙ্গে দেখা করতেই হবে।’

    আমরা আমাদের গাড়িটা কী করে বের করব যখন ভেবেই পাচ্ছি না, তখন মুকুন্দই বুদ্ধিটা বের করল। আমাদের গ্যারাজ থেকে গাড়িটা বের করে খিড়কির গেট দিয়ে পেছনের রাস্তায় পড়া যায়। আর ওই রাস্তায় একবার পড়তে পারলে আমাদের আর পায় কে! কিন্তু গাড়ি স্টার্ট করার শব্দ সামনের গেট পর্যন্ত চলে যাবে।’

    মুকুন্দ বললে, ‘আপনারা যেমন আছেন, সেইরকম থাকুন, আমি গ্যারাজ থেকে গাড়িটা বের করে ঠেলে ঠেলে পেছনের রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছি। রাস্তায় নামিয়ে আমি পাখির ডাক ডাকব, তখনই আপনারা চলে আসবেন।’

    ‘কী পাখি?’

    ‘কোকিল।’

    মেজোমামা বললেন, ‘এটা বসন্ত কাল নয়। যা বলবে ভেবেচিন্তে বলবে।’

    ‘তা হলে মুরগি। ওই ডাকটা ছেলেবেলা থেকেই আমি খুব অভ্যাস করেছি।’

    ‘হ্যাঁ, মুরগি। এই তো আমার বুদ্ধিমান ছেলে!’

    মুকুন্দ বেরিয়ে গেল। আমরা বসে আছি উৎকণ্ঠা নিয়ে। কখন সেই মুকুন্দ মুরগি ডাকবে! সবাই ঘড়ি দেখছেন। মাসিমা এত সুন্দর সেজেছেন; ঠিক একেবারে আমার মায়ের মতো দেখতে হয়েছেন। এইসময় আমার বাবা যদি বিলেত থেকে একবার আসতেন!

    কোঁক-কোঁকোর-কোঁ। বিশাল এক রামপাখি তিনবার ডেকে উঠল। আমরা সঙ্গে-সঙ্গে উঠে দাঁড়ালুম সৈনিকের মতো। আমাদের তিনজনের হাতে তিনটে ব্যাগ। কৃষ্ণচূড়া, কাঁঠাল, আম আর জামরুল গাছের আড়াল দিয়ে, ম্যাগনোলিয়া আরও সবেদা গাছের তলা দিয়ে আমরা পেছনের কম্পাউন্ড পেরিয়ে রাস্তায়। কালো ঝকঝকে গাড়ির গায়ে চকচকে নিকেলের পাত। এই গাড়ি আমাদের কত দূরে নিয়ে যাবে! গাড়িটা বড়মামা সবে কিনেছেন। মেজোমামা চালকের আসনে। মেজোমামা টেরিফিক চালান। মেজোমামার পাশে বড়মামা। আমরা পেছনে। বড়মামা একটা চামড়ার ব্যাগ মুকুন্দর হাতে দিয়ে বললেন, ‘টেন থাউজেন্ড।’ বড়মামার নতুন মুখে পুরনো চোখের জল, ‘আমরা আটটা কুকুর, আঠারোটা গোরু, তিন খাঁচা পাখি, এই বাড়ি, মরিস মাইনার গাড়ি, সব, সব রইল, তুই একটু দেখিস। আমাদের সর্বস্ব।’

    মেজোমামা বললেন, ‘শক্ত হও, শক্ত হও। এটা ফ্যাঁস-ফ্যাঁস করার সময় নয়।’ মুকুন্দকে বললেন, ‘মদন আসবে একটু পরে, মাস্তানকে খবর পাঠা। দুর্গের মতো বাড়িটাকে আগলাবি। এভরিথিং তোর হাতে। লক্ষ্মীদিকে থাকতে বলিস।’

    ‘জান কবুল করে দেব মেজদা। আচ্ছা, আপনারা কি ওই কারণেই চলে যাচ্ছেন?’

    ‘কী কারণে?’

    ‘বিশ লাখ।’

    ‘তুই জানলি কি করে?’

    ‘বড়দা যে বললেন, ”কাউকে বলিসনি মুকুন্দ। আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে।” আমি কাউকে বলব না। আমার মুখে সেলো টেপ।’

    মেজোমামা বললেন, ‘গুড বাই।’

    গাড়ি ছেড়ে দিল। তিন বাঁক ঘুরেই বড় রাস্তা। সাত কিলো দূরে এন.এইচ. থার্টি ফোর। আর আমাদের পায় কে! যাচ্ছি আমরা কালাচিনি। একটু পরেই ভুটান। এত আনন্দ আমার কখনও হয়নি। সবাই মিলে একসঙ্গে, যেন ট্যুরিস্ট পার্টি। মেজোমামার ঠোঁটে সোনার ডগাওলা পাইপ। চারপাশে সদ্য-ফোটা রোদের আমেজ।

    হঠাৎ বড়মামা বললেন, ‘কালোচিনিতে হাতি পাওয়া যাবে?’

    ‘যাবে।’

    ‘তা হলে, আমার অনেক দিনের ইচ্ছে, ছোট্ট একটা হাতির বাচ্চা কিনব। সারা ঘরে ঘুরে-ঘুরে বেড়াবে।’

    মাসিমা বললেন, ‘এই তো, বিশ দিনে বিশ লাখ ওড়াবার ঠিক রাস্তা পেয়ে গেছ।’

    আমরা তো চলেছি! অজ্ঞাতবাসে। এদিকে যা হল, শরৎবাবু গেট খুলে বেরিয়ে এলেন হজমি-ভ্রমণে। সাদা গাড়ির মোটা চালক, ‘আইয়ে আইয়ে’ বলে খাতির করে তুলে নিলেন গাড়িতে। কবি হিসেবে এই খাতিরটুকুই চেয়ে এসেছেন সারা জীবন। তারপর! কে পাগল হল! একজন? না একসঙ্গে দু’জন! সে আর-এক কাহিনী!

  • মিসির আলি অমনিবাস

    মিসির আলি অমনিবাস

    হুমায়ূন আহমেদ

    [book-name]

    সমকালীন কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন, এখনও আছেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। গ্রন্থজগতের পরিসংখ্যান বিগত কয়েক বৎসর যাবৎ এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করছে। এই কথাশিল্পীর সৃজনশীলতার ক্ষমতা ইতোমধ্যেই প্রায় কিংবদন্তীতুল্য।

    কিশোর থেকে বৃদ্ধ, স্বল্পশিক্ষিত থেকে বুদ্ধিজীবী পণ্ডিত—সকলেই তাঁর উপন্যাসের আগ্রহী পাঠক, অথবা টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর কাহিনীর নাট্যরূপায়ণের বিমুগ্ধ দর্শক। কোন ক্ষমতায় এভাবে সকলকে কাছে টানেন হুমায়ূন আহমেদ? চিত্রল গতিময় সহজ ভাষাবিন্যাস। অভাবনীয় ঘটনা বিশ্বাসযোগ্যভাবে ঘটানোর মনোহারী কৌশল। কল্পনা হার মেনে যায় এমন অকল্পনীয় বিদ্যুন্নিভ সংলাপ। এবং তাঁর কাহিনীতে ছড়ানো জীবন কখনোই আমাদের চেনা মধ্যবিত্ত সমাজসত্যের বাইরে ছোটাছুটি করে না। মধ্যবিত্ত-জীবনের আশা-নিরাশা, অনিশ্চিতি এবং দোলাচলপ্রবণ মূল্যবোধ, তার সামান্য লাভ ও সামান্য ক্ষতির বন্ধনে আততিময় অস্তিত্ব। হুমায়ূন আহমেদের যে-কোন উপন্যাস ধারণ করে আছে তাঁর সৃজনীসত্তার মনন-কল্পনার এ-সকল উপাদান। সাধারণ মানুষের কাতর জীবন চূর্ণকণায় ছড়িয়ে থাকে তাঁর লেখায়।

    যখন প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ বেরোয়, তখন প্রথিতযশা অধ্যাপক ডক্টর আহমদ শরীফ লিখেছিলেন, “হুমায়ূন আহমেদ বয়সে তরুণ, মনে প্রাচীন দ্রষ্টা, মেজাজে জীবনরসিক, স্বভাবে রূপদর্শী, যোগ্যতায় দক্ষ রূপকার। ভবিষ্যতে তিনি বিশিষ্ট জীবনশিল্পী হবেন এই বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করব।” এভাবেই যাত্রা শুরু হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের। তারপর ক্রমাগত পথচলার প্রবাহে একের পর এক সাহিত্যকর্ম উপহার দিয়ে চলেছেন এ-দেশের পাঠকসমাজকে। পণ্ডিত সমালোচক ও হৃদয়বান গল্পপ্রেমিক উভয়েরই প্রত্যাশা তিনি পূরণ করে চলেছেন।

    একই সঙ্গে অতিপ্রজ অথচ শিল্পরুচিময় লেখক তাঁর মতো আর কেউ এই মুহূর্তে আছেন কিনা সন্দেহ। প্রতি বৎসর অব্যাহত গতিতে তাঁর ফসলের ডালা ভরে উঠছে।

    হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ময়মনসিংহের মোহনগঞ্জ গ্রামে, ১৯৪৮ সালের ১৩ই নভেম্বর তারিখে। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিমার কেমিস্ট্রিতে গবেষণা করে ১৯৮২ সালে পি-এইচ. ডি. ডিগ্রী অর্জন করেছেন, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রসায়নশাস্ত্রে অধ্যাপনারত। লেখক-জীবনে সাফল্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি পেয়েছিলেন অপেক্ষাকৃত নবীন বয়সে, ১৯৮১ সালে, ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’ প্রাপ্তির মাধ্যমে। এ ছাড়াও তিনি পেয়েছেন শিশু একাডেমী ও লেখক শিবির পুরস্কারসহ আরও অনেক পুরস্কার।

    ২০১১ সালের সেপ্টেম্বের মাসে তার মলাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। তিনি নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটরিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। ১২ দফায় তাকে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর তার কিছুটা শারীরিক উন্নতি হলেও, শেষ মুহূর্তে শরীরে অজ্ঞাত ভাইরাস আক্রমণ করায় তার অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায়। কৃত্রিমভাবে লাইভ সাপোর্টে রাখার পর ১৯শে জুলাই ২০১২ তারিখে তিনি নিউ ইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হয়।

    সিরিজ পরিচয়

    ‘মিসির আলি’, বাংলাদেশের প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ সৃষ্ট একটি জনপ্রিয় চরিত্র। মিসির আলি কাহিনীগুলো রহস্যমাত্রিক। মিসির আলির কাহিনীগ‌ুলো ঠিক গোয়েন্দা কাহিনী নয়, কিংবা ‘ক্রাইম ফিকশন’ বা ‘থ্রিলার’-এর মতো খুনি-পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা-ধাওয়া নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক, বিজ্ঞাননির্ভর এবং যুক্তিনির্ভর কাহিনীর বুনটে বাঁধা। অনেক ক্ষেত্রে একে রহস্যগল্প বলা চলে। চারিত্রিক দিক দিয়ে মিসির আলি চরিত্রটি হুমায়ূন আহমেদের আরেক অনবদ্য সৃষ্টি হিমু চরিত্রটির পুরোপুরি বিপরীত। তরুণ হিমু চলে প্রতি-যুক্তির (anti-logic) তাড়নায়, অপরপক্ষে বয়োজ্যেষ্ঠ মিসির আলি অনুসরণ করেন বিশ‌ুদ্ধ যুক্তি (pure-logic)। এই যুক্তিই মিসির আলিকে রহস্যময় জগতের প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটনে সাহায্য করে। সেসব কাহিনীর প্রতিফলন ঘটেছে মিসির আলি সম্পর্কিত প্রতিটি উপন্যাসে।1

    চরিত্র রূপায়ণ

    ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণের সময়ে নর্থ ডাকোটার ফার্গো শহরে স্ত্রীর সাথে গাড়িতে ভ্রমণের সময় মিসির আলি চরিত্রটির ধারণা মাথায় আসে।2 এই ঘটনার অনেকদিন পরে তিনি মিসির আলি চরিত্রের প্রথম উপন্যাস ‘দেবী’ রচনা করেন।3

    চরিত্রের স্বরূপ

    উপন্যাসের কাহিনী অনুসারে মিসির আলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের “অস্বভাবী মনোবিজ্ঞান” (Abnormal Psychology) বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক4 (খণ্ডকালীন)5। শুধুমাত্র একজন শিক্ষক হিসেবেই নন, তার অনুসারীদের কাছেও তিনি বেশ মর্যাদাবান একজন চরিত্র হিসেবে উল্লিখিত। সেজন্য উপন্যাস বা বড় গল্পে, মিসির আলিকে বোঝাতে লেখক ‘তার’ লেখার পরিবর্তে সম্মানসূচক ‘তাঁর’ শব্দটির ব্যবহার করে থাকেন।

    মিসির আলির বয়স ৪০-৫০-এর মধ্যে। তার মুখ লম্বাটে। সেই লম্বাটে মুখে এলোমেলো দাড়ি, লম্বা উসকো-খুসকো কাঁচা-পাকা চুল। প্রথম দেখায় তাকে ভবঘুরে বলে মনে হতে পারে; কিছুটা আত্মভোলা। তার হাসি খুব সুন্দর, শিশুসুলভ। মিসির আলির স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো।6

    তিনি মানুষের মন, আচরণ, স্বপ্ন এবং নানাবিধ রহস্যময় ঘটনা নিয়ে অসীম আগ্রহ রাখেন। হুমায়ূন আহমেদের নিজের ভাষ্যে7:

    “মিসির আলি এমন একজন মানুষ, যিনি দেখার চেষ্টা করেন চোখ বন্ধ করে। যে পৃথিবীতে চোখ খুলেই কেউ দেখে না, সেখানে চোখ বন্ধ করে দেখার এক আশ্চর্য ফলবতী চেষ্টা।”

    চরিত্রটির পরিচিতি দিতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বলছেন:8

    “মিসির আলি একজন মানুষ, যাঁর কাছে প্রকৃতির নিয়ম-শৃঙ্খলা বড় কথা, রহস্যময়তার অস্পষ্ট জগৎ যিনি স্বীকার করেন না।”

    মিসির আলি চরিত্রে হুমায়ূন আহমেদ, পরস্পর বিপরীতধর্মী দুটি বৈশিষ্ট্য ‘যুক্তি’ এবং ‘আবেগ’কে স্থান দিয়েছেন।9

    মিসির আলি একজন ধূমপায়ী। তিনি ‘ফিফটি ফাইভ’ ব্র্যান্ডের সিগারেট খান। তবে তিনি প্রায়ই সিগারেট ছেড়ে দেবার চেষ্টা করেন। তার শরীর বেশ রোগাটে আর রোগাক্রান্ত। নানারকম রোগে তার শরীর জর্জরিত: লিভার বা যকৃৎ প্রায় পুরোটাই অকেজো, অগ্ন্যাশয়ের কার্যকারিতা হ্রাস পেয়েছে, রক্তের উপাদানে গড়বড়, হৃৎপিণ্ড ড্রপ বিট দেয়।10 এজন্য কঠিন এসব রোগের পাশাপাশি সাধারণ যেকোনো রোগই তাকে বেশ কাহিল করে ফেলে। ফলে প্রায়ই অসম্ভব রোগাক্রান্ত হয়ে তাকে হাসপাতালে থাকতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন।

    মিসির আলি যুক্তিনির্ভর একজন মানুষ বলেই অনেক সাহসী। ভূতাশ্রিত স্থানেও রাত কাটাতে তিনি পিছপা হোন না, বরং এজন্য থাকেন যে, তাতে তিনি রহস্যময়তার ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারবেন। মিসির আলির অনেকগ‌ুলো পারঙ্গমতার মধ্যে অন্যতম হলো তিনি যে কাউকে, বিশেষ করে ঠিকানাওয়ালা মানুষকে, খুব সহজে অজানা স্থানেও খুঁজে বের করতে পারেন। এজন্য তিনি টেলিফোন ডিরেক্টরি, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর, টিভি-বেতার-এর লাইসেন্স নম্বর11, পুলিশ কেস রিপোর্ট, হাসপাতালের মর্গের সুরতহাল (পোস্টমোর্টেম) রিপোর্ট12 ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে থাকেন। মিসির আলি প্রকৃতির বিস্ময়ে বিস্মিত হলেও প্রচণ্ড যুক্তির বলে বিশ্বাস করেন প্রকৃতিতে রহস্য বলে কিছু নেই।13 মিসির আলি ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে একজন নাস্তিক। মিসির আলি সিরিজের প্রথম উপন্যাস “দেবী”-এর ষষ্ঠ অধ্যায়ে তিনি নিজেকে নাস্তিক বলে অভিহিত করেছেন। তবে কিছু জায়গায় তাকে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী অর্থাৎ একজন আস্তিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।14

    মিসির আলি মূলত নিঃসঙ্গ একজন মানুষ, মোটামুটি সব উপন্যাসে তাকে এভাবেই রূপায়িত করা হয়। কিন্তু “অন্য ভুবন” উপন্যাসে মিসির আলি বিয়ে করে ফেলেন বলে উল্লেখ আছে। তিনি বিয়ে করেন নীলুফারকে, যার প্রথম আবির্ভাব ঘটে দেবী উপন্যাসে। পরবর্তীতে “নিশীথিনী” উপন্যাসে লেখক মিসির আলির প্রতি নীলুফারের আবেগ দেখিয়েছেন। পরের অনেক উপন্যাসে এই সাময়িক আবেগ দেখা গেলেও মিসির আলি সব আবেগ, ভালোবাসার ঊর্ধ্বে নিজেকে স্থাপন করেছেন।‌ তাই পরবর্তী উপন্যাসগুলিতে আবার তাকে নিঃসঙ্গ একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এপ্রসঙ্গে লেখক নিজেই স্বীকার করেন যে, “এটি বড় ধরনের ভুল” ছিল। মিসির আলির মতো চরিত্র বিবাহিত পুরুষ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। আর সেই ভুল শোধরে পরবর্তী উপন্যাসগুলোতে আবার মিসির আলিকে নিঃসঙ্গ হিসেবে উপস্থাপন করেন লেখক। ফলে মিসির আলি চরিত্রটি যা দাঁড়ায়: মিসির আলি ভালবাসার গভীর সমুদ্র হৃদয়ে লালন করেন, কিন্তু সেই ভালবাসাকে ছড়িয়ে দেবার মত কাউকেই কখনও কাছে পান না। ভালবাসার একাকিত্বে জর্জরিত মিসির আলির নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে বিভিন্ন সময় কিশোরবয়সী কাজের লোকের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন: “আমি এবং আমরা” উপন্যাসে “বদু” নামের একটি, ১৫-১৬ বছরের কাজের ছেলের উল্লেখ রয়েছে। “দেবী” ও “নিশীথিনী” গল্পে হানিফা নামে একটা কাজের মেয়ে ছিল। এরকম কাজের লোককে মিসির আলি লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করেন। আবার “অন্য ভূবন” উপন্যাসে “রেবা” নামের একটি কাজের মেয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়।

    মিসির আলির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগত সারমর্ম করতে হুমায়ূন আহমেদই লিখেন: মিসির আলি নিঃসঙ্গ, হৃদয়বান, তীক্ষ্ণ ধীশক্তির অধিকারী।15 কাহিনী অনুসারে তিনি অকৃতদার। চরিত্রটি লেখকেরও, প্রিয় চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।

    মিসির আলি চরিত্রটি এতটাই পাঠক জনপ্রিয়তা পেয়েছে যে, অনেকেই তাকে রক্তমাংসের মানুষ ভাবতে শুরু করেছেন। হুমায়ূন আহমেদ প্রায়ই জিজ্ঞাসিত হন যে, মিসির আলি কি কোনো বাস্তব চরিত্রকে দেখে লেখা কিনা। এর নেতিবাচক উত্তর পেয়ে অনেকেই আবার মিসির আলি চরিত্রটির মধ্যে লেখকেরই ছায়া খুঁজে পান। এপ্রসঙ্গে স্বয়ং হুমায়ূন আহমেদই উত্তর করেন:16

    “না, মিসির আলিকে আমি দেখিনি। অনেকে মনে করেন লেখক নিজেই হয়তো মিসির আলি। তাঁদেরকে বিনীতভাবে জানাচ্ছি— আমি মিসির আলি নই। আমি যুক্তির প্রাসাদ তৈরি করতে পারি না এবং আমি কখনও মিসির আলির মতো মনে করি না প্রকৃতিতে কোনো রহস্য নেই। আমার কাছে সব সময় প্রকৃতিকে অসীম রহস্যময় বলে মনে হয়”

    কিন্তু এই অভয়বাণী সত্ত্বেও নলিনী বাবু B.Sc উপন্যাসে লেখককেই মিসির আলির ভূমিকায় দেখা যায়, এবং তিনি যে মিসির আলি থেকে আলাদা কিন্তু তার স্রষ্টা তার স্পষ্ট উল্লেখ করেন:

    “আমি (লেখক) এই ভেবে আনন্দ পেলাম যে, সালেহ চৌধুরী (লেখকের সফরসঙ্গী) মিসির আলিকে উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে দেখছেন না। অতি বুদ্ধিমান মানুষও মাঝে মাঝে বাস্তব-অবাস্তব সীমারেখা মনে রাখতে পারেন না।17

    গণমাধ্যমে মিসির আলি

    বাংলাদেশ টেলিভিশন

    ১৯৮৭ সালে ছোটপর্দায় মিসির আলীর প্রথম আবির্ভাব। তখন হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলীকে নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাস দেবীর বয়স হয়েছিল মাত্র দুই বছর। জনপ্রিয় চরিত্রটির ভূমিকায় আবুল হায়াত প্রথম অভিনয় করেন। অন্য ভুবনের সে এবং পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে অন্য ভুবনের ছেলেটা, মোট দুটি নাটকের মিসির আলী চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এছাড়া, প্রয়াত অভিনেতা আবুল খায়ের একবার এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

    বেসরকারি টেলিভিশন

    বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগ‌ুলোর মধ্যে, এনটিভিতে মিসির আলিকে নিয়ে অনিমেষ আইচ তিনটি নাটক নির্মাণ করেন। “বৃহন্নলা” উপন্যাস অবলম্বনে একই নামে নির্মিত প্রথম নাটকে মিসির আলির ভূমিকায় শতাব্দী ওয়াদুদ অভিনয় করেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে একই নির্মাতার পরবর্তী নাটক নিষাদ এ মিসির আলী চরিত্রে অভিনয় করেন আশীষ খন্দকার। মিসির আলীকে নিয়ে লেখা ছোটগল্প স্বপ্ন সঙ্গিনী অবলম্বনে অনিমেষ আইচের তৃতীয় নাটকে হুমায়ুন ফরিদী অভিনয় করেন। নির্মাতা রেদোয়ান রনির নাটকেও একবার মিসির আলী চরিত্রের দেখা মিলেছিল।

    বাংলা চলচ্চিত্রে

    ২০১৮ সালে মিসির আলিকে প্রথম বড় পর্দায় আনেন অনম বিশ্বাস তার দেবী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এটি হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলিকে নিয়ে প্রথম উপন্যাস দেবী অবলম্বনে নির্মিত হয়। চলচ্চিত্রটিতে চঞ্চল চৌধুরী মিসির আলি চরিত্রে অভিনয় করেন।

    প্রকাশনা

    মিসির আলি সংক্রান্ত উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ প্রথম পর্যায়ে আলাদা আলাদা বই আকারে বের হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা চরিত্রটির পাঠক সমাদর বিবেচনা করে তা সংকলিত আকারেও প্রকাশ করে। এরকম সংকলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রতীক প্রকাশনা সংস্থার “মিসির আলি অমনিবাস” নাম তিন খণ্ডে মিসির আলির সকল উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করে। এছাড়াও মিসির আলির সমস্ত উপন্যাস নিয়ে (মিসির আলি UNSOLVED, “মিসির আলি আপনি কোথায়?”, “পুফি” এবং “যখন নামিবে আঁধার” ব্যতীত) অনন্যা প্রকাশনা সংস্থা মিসির আলি সমগ্র নামে একটি বই প্রকাশ করে। বইটি ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে প্রকাশিত হয়। কলকাতার কাকলি প্রকাশনী দুই খণ্ডে সম্প্রতি মিসির আলি সমগ্র প্রকাশ করেছে।

    মিসির আলি অমনিবাস

    ক্রম

    শিরোনাম প্রথম প্রকাশ

    প্রকাশক

    দেবী জুন ১৯৮৫

    অবসর প্রকাশনা, ঢাকা

    নিশীথিনী ১৯৮৮

    প্রতীক প্রকাশনী

    নিষাদ ১৯৮৯

    প্রতীক প্রকাশনী

    অন্যভুবন ১৯৮৭

    অনন্যা প্রকাশন

    বৃহন্নলা আগস্ট ১৯৮৯

    প্রতীক প্রকাশনী

    ভয় (গল্পগ্রন্থ) মে ১৯৯১

    আফসার ব্রাদার্স, ঢাকা

    বিপদ ১৯৯১

    শিখা প্রকাশনী, ঢাকা

    অনীশ মে ১৯৯২

    অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা

    মিসির আলি অমনিবাস-১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩

    প্রতীক প্রকাশনী

    ১০

    মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬

    সময় প্রকাশন, ঢাকা

    ১১

    আমি এবং আমরা ১৯৯৩

    প্রতীক প্রকাশনী

    ১২

    হিমুর দ্বিতীয় প্রহর18 ১৯৯৭

    কাকলী প্রকাশনী

    ১৩

    তন্দ্রাবিলাস ২০০৯

    অন্বেষা প্রকাশন

    ১৪

    আমিই মিসির আলি ফেব্রুয়ারি ২০০০

    অন্যপ্রকাশ, ঢাকা

    ১৫

    বাঘবন্দী মিসির আলি জুন ২০০১

    অনন্যা

    ১৬

    কহেন কবি কালিদাস ২০০৫

    দিব্যপ্রকাশ

    ১৭

    মিসির আলি অমনিবাস-২ ফেব্রুয়ারি ২০০৬

    প্রতীক প্রকাশনী

    ১৮

    হরতন ইশকাপন ২০০৮

    ১৯

    মিসির আলির চশমা ফেব্রুয়ারি ২০০৮

    অন্যপ্রকাশ, ঢাকা

    ২০

    মিসির আলি!আপনি কোথায়? ফেব্রুয়ারি ২০০৯

    সময় প্রকাশন, ঢাকা

    ২১

    মিসির আলি UNSOLVED জুলাই ২০০৯

    কাকলী প্রকাশনী, ঢাকা

    ২২

    হিমু মিসির আলি যুগলবন্দি ২০১১

    আফসার ব্রাদার্স ঢাকা

    ২৩

    পুফি ২০১১

    অনন্যা

    ২৪

    যখন নামিবে আঁধার ২০১২

    অন্যপ্রকাশ

    ২৫

    মিসির আলী অমনিবাস-৩ ২০১৩

    প্রতীক প্রকাশনী

  • দেবী

    দেবী

    মাঝরাতের দিকে রানুর ঘুম ভেঙে গেল।

    তার মনে হল ছাদে কে যেন হাঁটছে। সাধারণ মানুষের হাঁটা নয়, পা টেনে-টেনে হাঁটা। সে ভয়ার্ত গলায় ডাকল, ‘এই, এই।’ আনিসের ঘুম ভাঙল না। বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। অল্প-অল্প বাতাস। বাতাসে জামগাছের পাতায় অদ্ভুত এক রকমের শব্দ উঠছে। রানু আবার ডাকল, ‘এই, একটু ওঠ না। এই।’

    ‘কী হয়েছে?’

    ‘কে যেন ছাদে হাঁটছে।’

    ‘কী যে বল! কে আবার ছাদে হাঁটবে? ঘুমাও তো।’

    ‘প্লীজ, একটু উঠে বস। আমার বড় ভয় লাগছে।’

    আনিস উঠে বসল। প্রবল বর্ষণ শুরু হল এই সময়। ঝমঝম করে বৃষ্টি।  জানালার পর্দা বাতাসে পতপত করে উড়তে লাগল। রানু হঠাৎ দেখল, জানালার শিক ধরে খালিগায়ে একটি রোগামতো মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটির দু’টি হাতই অসম্ভব লম্বা। রানু ফিসফিস করে বলল, ‘ওখানে কে?’

    ‘কোথায় কে?’

    ‘ঐ যে জানালায়।’

    ‘আহ্, কী যে ঝামেলা কর! নারকেল গাছের ছায়া পড়েছে।’

    ‘একটু বাতিটা জ্বালাও না।’

    ‘রানু, তুমি ঘুমোও তো।’

    আনিস শোবার উপক্রম করতেই ছাদে বেশ কয়েক বার থপথপ শব্দ হল। যেন কেউ-একজন ছাদে লাফাচ্ছে।

    রানু চমকে উঠে বলল, ‘কিসের শব্দ হচ্ছে?’

    ‘বানর। এ জায়গায় বানর আছে। কালই তো দেখলে ছাদে লাফালাফি করছিল।‘

    ‘আমার বড় ভয় করছে। একটু উঠে গিয়ে বাতি জ্বালাও না। পায়ে পড়ি তোমার।’

    আনিস বাতি জ্বালাল। ঘড়িতে বাজে দেড়টা। ছাদে আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। তবু রানুর ভয় কমল না। সে কেঁপে-কেঁপে উঠতে লাগল। আনিস বিরক্ত স্বরে বলল, ‘এ-রকম করছ কেন?’

    ‘কেন জানি অন্য রকম লাগছে আমার। একটা খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছি।’

    ‘কী স্বপ্ন?’

    ‘দেখলাম আমি যেন …’

    কথার মাঝখানে হঠাৎ রানু থেমে গেল। কে যেন হাসছে। ভারি গলায় হাসছে। রানু কাঁপা স্বরে বলল, ‘হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছ? কে যেন হাসছে।’

    ‘কে আবার হাসবে! বানরের শব্দ। কিংবা কেউ হয়তো জেগে উঠেছে দোতলায়।’ আনিস লক্ষ করল, রানু খুব ঘামছে। চোখ-মুখ রক্তশূন্য। বালিশের নিচ থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। দেশলাই জ্বালাতে-জ্বালাতে বলল, ‘কী স্বপ্ন দেখছিলে?’

    ‘দিনের বেলা বলব।’

    ‘কী যে সব কুসংস্কার তোমাদের। এখনো ভয় লাগছে?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘ভয়টা কিসের? চোর-ডাকাতের, না ভূতের?’

    ‘বুঝতে পারছি না।’

    ‘ঠিক আছে, বাতি জ্বালানোই থাক। বাতি জ্বালিয়েই ঘুমাব আজকে। এখন বল দেখি, কী স্বপ্ন দেখলে।’

    ‘দিনের বেলা বলব।’

    ‘আহ্, বল না! বললেই ভয় কেটে যাবে।’

    রানু আনিসের বাঁ হাত শক্ত করে চেপে ধরল। থেমে থেমে বলল, ‘দেখলাম, একটা ঘরে আমি শুয়ে আছি। একটা বেঁটে লোক এসে ঢুকল। তারপর দেখলাম, সে আমার শাড়ি টেনে খুলে ফেলার চেষ্টা করছে।’

    আনিস শব্দ করে হাসল।

    রানু বলল, ‘হাসছ কেন?’

    ‘হাসব না? এটা কি একটা ভয় পাওয়ার স্বপ্ন?’

    ‘তুমি তো সবটা শোন নি।’

    ‘সবটা শুনতে হবে না। পরে কী হবে তা আমার জানা। তুমি যা দেখেছ তা হচ্ছে একটা সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি। যুবক-যুবতীরা এ-রকম স্বপ্ন প্রায়ই দেখে।’

    ‘আমি দেখি না।’

    ‘তুমিও দেখ। মনে থাকে না তোমার।’

    ‘আমি স্বপ্ন খুব কম দেখি। যা দেখি তা সব সময় সত্যি হয়। তোমাকে তো বলেছি অনেক বার।’

    আনিস চুপ করে রইল। রানু এই কথাটি প্রায়ই বলে। বিয়ের রাতে প্রথম বার বলেছিল। আনিস সেবারও হেসেছে। রানু অবাক হয়ে বলেছে, ‘আপনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন না, না?’

    ‘নাহ্।’

    ‘আমি আপনার গা ছুঁয়ে বলছি, বিশ্বাস করুন আমার কথা।’

    রানু এমনভাবে বলল, যেন আনিসের বিশ্বাসের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। আনিস শেষ পর্যন্ত হাসিমুখে বলল, ‘ঠিক আছে বিশ্বাস করলাম, এখন দয়া করে আপনি-আপনি করবে না।’ রানু ফিসফিস করে বলল, ‘আপনার সঙ্গে যে আমার বিয়ে হবে, সেটাও আমি জানতাম।’

    ‘এটাও স্বপ্নে দেখেছিলে?’

    ‘হুঁ। দেখলাম, একটি লোক খালিগায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পেটের কাছে একটা মস্ত কাটা দাগ। লোকটিকে দেখেই মনে হল, এর সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। আমি তাকে বললাম, কেটেছে কীভাবে? আপনি বললেন, ‘সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছিলাম।’

    আনিস সে-রাতে দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বলতে পারে নি। তার পেটে একটা কাটা দাগ সত্যি-সত্যি আছে, এই মেয়েটির সেটা জানার কথা নয়। তবে সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে কাটে নি। জামগাছ থেকে পিছলে পড়ে কেটেছে। ব্যাপারটা কাকতালীয়, বলাই বাহুল্য। মাঝে-মাঝে এমন দু’-একটা জিনিস খুব মিলে যায়। তবুও কোথায় যেন একটা ক্ষীণ অস্বস্তি থাকে।

    বাইরে বৃষ্টি খুব বাড়ছে। ঝড় হবে বোধহয়। শোঁ-শোঁ আওয়াজ হচ্ছে জানালায়। একটি কাঁচ ভাঙা। প্রচুর পানি আসছে ভাঙা  জানালা দিয়ে, শীত-শীত করছে।

    ‘রানু, চল ঘুমিয়ে পড়ি।’

    ‘সিগারেট শেষ হয়েছে?’

    ‘হ্যাঁ।’

    বিছানায় ওঠামাত্র প্রবল শব্দে বিদ্যুৎ চমকাল। বাতি চলে গেল সঙ্গে-সঙ্গে। শুধু এ-অঞ্চল নয়, সমস্ত ঢাকাই বোধ করি অন্ধকার হয়ে গেল। আনিস বলল, ‘ভয় লাগছে রানু?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘আচ্ছা, হাসির গল্পটল্প কর। এতে ভয় কমে যায়। বল একটা গল্প।’

    ‘তুমি বল।’

    আনিস দীর্ঘ সময় নিয়ে এক জন পাদ্রী ও তিনটি ইহুদি ও তিনটি মেয়ের গল্প বলল। গল্পের এক পর্যায়ে শ্রোতাকে জিজ্ঞেস করতে হয়—পাদ্রী তখন কী বলল? এর উত্তরটি হচ্ছে পাঞ্চ লাইন। কিন্তু কিচ্ছু জিজ্ঞেস করল না রানু। সে কি শুনছে না? আনিস ডাকল, ‘এই রানু, এই!’ রানু কথা বলল না। বাতাসের ঝাপ্টায় সশব্দে  জানালার একটি পাল্লা খুলে গেল। আনিস বন্ধ করবার জন্যে উঠে দাঁড়াতেই রানু তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বলল, ‘তুমি যেও না। খবরদার, যেও না!’

    ‘কী আশ্চর্য, কেন?’

    ‘একটা-কিছু জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে।’

    ‘কী যে বল!’

    ‘প্লীজ, প্লীজ।’

    রানু কেঁদে ফেলল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, ‘তুমি গন্ধ পাচ্ছ না?’

    ‘কিসের গন্ধ?’

    ‘কর্পূরের গন্ধের মতো গন্ধ।‘

    এটা কি মনের ভুল? সূক্ষ্ম একটা গন্ধ যেন পাওয়া যাচ্ছে ঘরে। ঝন্‌ঝন্ করে আরেকটা কাঁচ ভাঙল। রানু বলল, ‘ঐ জিনিসটা হাসছে। শুনতে পাচ্ছ না?’ বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আনিস কিছু শুনতে পেল না।

    ‘তুমি বস তো। আমি হারিকেন জ্বালাচ্ছি।’

    ‘না, তুমি আমাকে ধরে বসে থাক।’

    আনিস অস্বস্তির সঙ্গে বলল, ‘তুমি ঐ জানালাটার দিকে আর তাকিও না তো!’

    আনিস লক্ষ করল, রানু থরথর করে কাঁপছে, ওর গায়ের উত্তাপও বাড়ছে। রানুকে সাহস দেবার জন্যে সে বলল, ‘কোনো দোয়া-টোয়া পড়লে লাভ হবে? আয়াতুল কুর্সি জানি আমি। আয়াতুল কুর্সি পড়ব?’

    রানু জবাব দিল না। তার চোখ বড়-বড় হয়ে উঠেছে। মুখ দিয়ে ফেনা ভাঙছে নাকি? শ্বাস ফেলছে টেনে-টেনে।

    ‘এই রানু, এই।’

    কোনোই সাড়া নেই। আনিস হারিকেন জ্বালাল। রান্নাঘর থেকে খুটখুট শব্দ আসছে। ইঁদুর, এতে সন্দেহ নেই। তবু কেন জানি ভালো লাগছে না। আনিস বারান্দায় এসে ডাকল, ‘রহমান সাহেব, ও রহমান সাহেব।’ রহমান সাহেব বোধহয় জেগেই ছিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে বেরুলেন।

    ‘কী ব্যাপার?’

    ‘আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।’

    ‘কী হয়েছে?’

    ‘বুঝতে পারছি না।’

    ‘হাসপাতালে নিতে হবে নাকি?’

    ‘বুঝতে পারছি না।’

    ‘আপনি যান, আমি আসছি। এক্ষুণি আসছি।’

    আনিস ঘরে ফিরে গেল। মনের ভুল, নিঃসন্দেহে মনের ভুল। আনিসের মনে হল, সে ঘরের ভেতর গিয়ে দাঁড়ানোমাত্র কেউ-একজন যেন দরজার আড়ালে সরে পড়ল। রোগা, লম্বা একটি মানুষ। আনিস ডাকল, ‘রানু।’ রানু তৎক্ষণাৎ সাড়া দিল, ‘কি?’

    ইলেকট্রিসিটি চলে এল তখনই। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই রহমান সাহেব এসে উপস্থিত হলেন। উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, ‘এখন কেমন অবস্থা?’ রানু অবাক হয়ে বলল, ‘কিসের অবস্থা? কী হয়েছে?’

    রহমান সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন। আনিস বলল, ‘তোমার শরীর খারাপ করেছিল, তাই ওঁকে ডেকেছিলাম। এখন কেমন লাগছে?’

    ‘ভালো।’

    রানু উঠে বসল। রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, ‘এখন আমি ভালো।’

    রহমান সাহেব তবুও মিনিট দশেক বসলেন। আনিস বলল, ‘আপনি কি ছাদে দাপাদাপি শুনেছেন?’

    ‘সে তো রোজই শুনি। বাঁদরের উৎপাত।’

    ‘আমিও তাই ভাবছিলাম।’

    ‘খুব জ্বালাতন করে। দিনে-দুপুরে ঘর থেকে খাবারদাবার নিয়ে যায়।’

    ‘তাই নাকি?’

    ‘জ্বি। নতুন এসেছেন তো! কয়েক দিন যাক, টের পাবেন। বাড়িঅলাকে বলেছিলাম গ্রিল দিতে। তা দেবে না। আপনার সঙ্গে দেখা হলে আপনিও বলবেন। সবাই মিলে চেপে ধরতে হবে।’

    ‘জ্বি, আমি বলব। আপনি কি চা খাবেন নাকি এক কাপ?’

    ‘আরে না না। এই রাত আড়াইটার সময় চা খাব নাকি, কী যে বলেন! উঠি ভাই। কোনো অসুবিধা দেখলে ডাকবেন।’

    ভদ্রলোক উঠে পড়লেন। রানু চাপা স্বরে বলল, ‘এই রাত-দুপুরে ভদ্রলোককে ডেকে আনলে কেন? কী মনে করলেন উনি।’

    ‘তুমি যা শুরু করেছিলে! ভয় পেয়েই ভদ্রলোককে ডাকলাম।’

    ‘কী করেছিলাম আমি?’

    ‘অনেক কাণ্ড করেছ। এখন তুমি কেমন, সেটা বল।‘

    ‘ভালো।’

    ‘কী রকম ভালো?’

    বেশ ভালো।’

    ‘ভয় লাগছে না আর?’

    ‘নাহ্।’

    রানু বিছানা থেকে নেমে পড়ল। সে বেশ সহজ ও স্বাভাবিক। ভয়ের কোনো চিহ্নও নেই চোখে-মুখে। শাড়ি কোমরে জড়িয়ে ঘরের পানি সরাবার ব্যবস্থা করছে।

    ‘সকালে যা করবার করবে। এখন এসব রাখ তো।’

    ‘ইস্, কী অবস্থা হয়েছে দেখ না!’

    ‘হোক, এস তো এদিকে।’

    রানু হাসি-হাসি মুখে এগিয়ে এল।

    ‘এখন আর তোমার ভয় লাগছে না?’

    ‘না।’

    ‘জানালার পাশে কে যেন দাঁড়িয়ে ছিল বলেছিলে?’

    ‘এখন কেউ নেই। আর থাকলেও কিছু যায় আসে না।’

    আনিস দ্বিতীয় সিগারেটটা ধরাল। হালকা গলায় বলল, ‘এক কাপ চা করতে পারবে?’

    ‘চা, এত রাতে!’

    ‘এখন আর ঘুম আসবে না, কর দেখি এক কাপ।’

    রানু চা বানাতে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পানি ফোটার শব্দ হল। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে ঝমঝম করে। রানু একা-একা রান্নাঘরে। কে বলবে এই মেয়েটিই অল্প কিছুক্ষণ আগে ভয়ে অস্থির হয়ে গিয়েছিল! ছাদে আবার ঝুপঝুপ শব্দ হচ্ছে। এই বৃষ্টির মধ্যে বানর এসেছে নাকি? আনিস উঠে গিয়ে রান্নাঘরে উঁকি দিল। হালকা গলায় বলল, ‘ছাদে বড় ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে।’ রানু জবাব দিল না।

    আনিস বলল, ‘এই বাড়িটা ছেড়ে দেব।’

    ‘সস্তায় এ-রকম বাড়ি আর পাবে না।’

    ‘দেখি পাই কি না।’

    ‘চায়ে চিনি হয়েছে তোমার?’

    ‘হয়েছে। তুমি নিলে না?’

    ‘নাহ্, রাত-দুপুরে চা খেলে আমার আর ঘুম হবে না।’

    রানু হাই তুলল। আনিস বলল, ‘এখন বল তো তোমার স্বপ্ন-বৃত্তান্ত।’

    ‘কোন স্বপ্নের কথা?’

    ‘ঐ যে স্বপ্ন দেখলে! একটা বেঁটে লোক।’

    ‘কখন আবার এই স্বপ্ন দেখলাম? কী যে তুমি বল।’

    আনিস আর কিছু বলল না। চা শেষ করে ঘুমুতে গেল। শীত-শীত করছিল। রানু পা গুটিয়ে বাচ্চা মেয়ের মতো শুয়েছে। একটি হাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে আনিসকে। তার ভারি নিঃশ্বাস পড়ছে। ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয়। জানালায় নারকেল গাছের ছায়া পড়েছে। মানুষের মতোই লাগছে ছায়াটাকে। বাতাসে গাছের পাতা নড়ছে। মনে হচ্ছে মানুষটি হাত নাড়ছে। ঘরের ভেতর মিষ্টি একটা গন্ধ। মিষ্টি, কিন্তু অচেনা।

    আনিস রানুকে কাছে টেনে আনল। রানুর মুখে আলো এসে পড়েছে। কী যে মায়াবতী লাগছে! আনিস ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল। ওদের বিয়ে হয়েছে মাত্র ছ’ মাস। আনিস এখনো অভ্যস্ত হয়ে ওঠে নি। প্রতি রাতেই রানুর মুখ তার কাছে অচেনা লাগে। অপরূপ রূপবতী একটি বালিকার মুখ, যাকে কখনো পুরোপুরি চেনা যায় না। আনিস ডাকল, ‘রানু, রানু।’ কোনো জবাব পাওয়া গেল না। গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন রানু। আনিসের ঘুম এল না। শুয়ে শুয়ে ঠিক করে ফেলল, রানুকে ভালো এক জন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যেতে হবে। অফিসের কমলেন্দুবাবু এক ভদ্রলোকের কথা প্রায়ই বলেন, খুব নাকি গুণী লোক। মিসির সাহেব। দেখালে হয় এক বার মিসির সাহেবকে।

    রানু ঘুমের ঘোরে খিলখিল করে হেসে উঠল। অপ্রকৃতিস্থ মানুষের হাসি শুনতে ভালো লাগে না, গা ছমছম করে।