Tag: গ্রন্থনাম

  • ঋষি রবীন্দ্রনাথ

    ঋষি রবীন্দ্রনাথ

    ঋষি রবীন্দ্রনাথ

    অমলেন্দু দাশগুপ্ত

    ‘অমলেন্দু দাশগুপ্ত’ রচিত ‘ঋষি রবীন্দ্রনাথ’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৬১ বঙ্গাব্দের শ্রীঅক্ষয় তৃতীয়ায়। প্রকাশক শ্রীসুরেশচন্দ্র দাস, এম-এ; জেনারেল প্রিণ্টার্স য়্যাণ্ড পাব্লিশার্স লি., ১১৯, ধর্মতলা স্ট্রীট, কলিকাতা। গ্রন্থটির মূল্য ছিল তিন টাকা। মুদ্রাকর শ্রীসুরেশচন্দ্র দাস, এম-এ কর্তৃক জেনারেল প্রিণ্টার্স য়্যাণ্ড পাব্লিশার্স লিমিটেডের মুদ্রণ বিভাগ—অবিনাশ প্রেস, ১১৯, ধর্মতলা স্ট্রীট, কলিকাতা থেকে গ্রন্থটি মুদ্রিত হয়েছিল। রচনাটি ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৩৬০ সালের ২৩শে শ্রাবণ হতে ২৩শে আশ্বিন ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল।

    ❀ ❀ ❀

    ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবস আজ জাতীয় উৎসবের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে। লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে যে, রবীন্দ্রনাথের বিশেষ একটি পরিচয়ই প্রাধান্য লইয়া উত্তরোত্তর পুরোভাগে আগমন করিতেছে, সে-পরিচয়টি হইল— রবীন্দ্রনাথ এ-যুগে উপনিষদের ঋষি। ঋষি শব্দটি বিশেষ অর্থ বহন করিয়া থাকে। ঋষি অর্থে সত্যদ্রষ্টাকে বুঝাইয়া থাকে। যিনি ব্রহ্মকে জানিয়াছেন, তিনিই ঋষি। রবীন্দ্রনাথকে এই অর্থেই ঋষি বলা হইয়া থাকে।

    ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবস আজ জাতীয় উৎসবের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে। লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে যে, রবীন্দ্রনাথের বিশেষ একটি পরিচয়ই প্রাধান্য লইয়া উত্তরোত্তর পুরোভাগে আগমন করিতেছে, সে-পরিচয়টি হইল— রবীন্দ্রনাথ এ-যুগে উপনিষদের ঋষি। ঋষি শব্দটি বিশেষ অর্থ বহন করিয়া থাকে। ঋষি অর্থে সত্যদ্রষ্টাকে বুঝাইয়া থাকে। যিনি ব্রহ্মকে জানিয়াছেন, তিনিই ঋষি। রবীন্দ্রনাথকে এই অর্থেই ঋষি বলা হইয়া থাকে।

    অনেকেই প্রশ্ন করিয়া থাকেন, রবীন্দ্রনাথ কি ব্রহ্মজ্ঞ? প্রশ্নটি জিজ্ঞাসার মধ্যে কোন অবিশ্বাস, সন্দেহ, প্রতিবাদ ইত্যাদি সূচিত হয় না। রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়িয়া, গান শুনিয়া সকলের মনেই এই ধারণা হইয়া থাকে যে, তিনি সত্যদ্রষ্টা ঋষি এবং তাঁহাকে ব্রহ্মজ্ঞ বলিয়াই সকলে বিশ্বাস করিয়া থাকেন। কিন্তু বিশ্বাস তো প্রমাণ নহে, তাই তাঁহাদের এই বিশ্বাসের সমর্থনে কোন প্রমাণ আছে কি না, ইহা জানিবার জন্যই উক্ত প্রশ্নটি জিজ্ঞাসিত হইয়া থাকে।

    রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ প্রভৃতি সম্পর্কে বহু পুস্তক রচিত হইয়াছে। রবীন্দ্রদর্শন সম্বন্ধে বিশ্ববিখ্যাত মনীষী ডাঃ রাধাকৃষ্ণণ এবং ডাঃ সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তও পুস্তক রচনা করিয়াছেন। উভয়েই তাঁহাকে ঋষি বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। কিন্তু তাঁহাদের এই স্বীকৃতি রবীন্দ্রনাথের মতবাদ, রবীন্দ্রনাথের রচনা ইত্যাদির ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত। রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মজ্ঞ, ইহা প্রমাণের চেষ্টা উভয়ের কেহই করেন নাই, ঋষিরূপে তাঁহাকে স্বীকার করিয়া লইয়া তাঁহারা রবীন্দ্রদর্শন ও বাণীরই ব্যাখ্যা বা ভাষ্য করিয়াছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আরও অনেকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রহিয়াছে, কিন্তু কোন গ্রন্থেই বিশেষভাবে এই প্রশ্নটিকে গ্রহণ করিয়া ইহার মীমাংসার চেষ্টা করা হয় নাই। রবীন্দ্র-জীবনীও কয়েকখানা রহিয়াছে, তাহাতেও পূর্বোক্ত প্রশ্নের কোন আলোচনা পরিদৃষ্ট হয় না।

    বলা বাহুল্য, প্রশ্নটি বস্তুতই কঠিন প্রশ্ন। কেহ ব্রহ্মজ্ঞ কি না, এ-প্রমাণ কে দিবে? তাহা ছাড়া ব্রহ্মজ্ঞ প্রমাণ-নির্ভর, এমন কথাও বলা চলে না। ব্রহ্ম আছেন, ইহাই কেহ প্রমাণ করিতে পারেন না, কারণ ব্রহ্ম প্রমাণের অতীত। যাঁহাকে প্রমাণ করা যায় না, সেই ব্রহ্মকে কেহ জানিয়াছেন কি না, ইহাও প্রমাণ করা স্বভাবতই সমান সাধ্যাতীত। সাধকগণ বড়জোর এই কথাই বলিতে পারেন এবং বলিয়া থাকেন যে, ব্রহ্মকে জানা যায়, তাঁহাকে পাওয়া যায় এবং অনেকেই বলিয়া গিয়াছেন যে, তাঁহারা তাঁহাকে জানিয়াছেন। তাঁহাদের আত্মোপলব্ধিই এই বিষয়ে একমাত্র প্রমাণ।

    কিন্তু সে-প্রমাণও একান্তভাবে তাঁহাদের ব্যক্তিগত উপলব্ধিতেই আবদ্ধ, তাঁহারাও সে-প্রমাণকে বাহিরে আনিতে পারেন নাই। কাজেই রবীন্দ্রনাথ ঋষি, রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ, ইহা প্রমাণ করা কাহারও পক্ষে সম্ভবপর নহে। শুধু ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তিই জানিতে পারেন যে, রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মজ্ঞ কি না। কিন্তু তাঁহাদের সে-জানাটাও প্রমাণ করা অসাধ্য ও অসম্ভব।

    রবীন্দ্রনাথ ঋষি, তিনি ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ, আমাদের এই বিশ্বাসের তবে কি কোন প্রমাণই পাওয়া সম্ভবপর নহে? সে-প্রমাণ পাওয়া একেবারে অসম্ভব ব্যাপার বলিয়া আমি মনে করি না। কেন, তাহাই প্রথমে সংক্ষেপে একটু আলোচনা করা যাইতেছে।

    ব্রহ্মসূত্রে ব্রহ্মের পরিচয়ে বলা হইয়াছে—“জন্মাদ্যস্য যতঃ”, এই অচিন্ত্য বিচিত্র বিশ্বের সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় যাঁহা হইতে, তিনিই সেই জিজ্ঞাসিত ব্রহ্ম। কিন্তু ইহা ব্রহ্ম সম্বন্ধে প্রমাণ নহে, শুধু লক্ষণ বা চিহ্ন। তেমনি ব্রহ্মজ্ঞ সম্বন্ধেও লক্ষণ বা চিহ্ন থাকে, তাহাই ব্রহ্মজ্ঞ সম্বন্ধে প্রমাণ বলিয়া স্বীকৃত হইয়া আসিয়াছে। ব্রহ্মজ্ঞের সে লক্ষণ বা চিহ্ন কি? ব্রহ্মোপলব্ধি বা আত্মোপলব্ধিই সেই লক্ষণ। দক্ষিণেশ্বরের পরমহংসদেব বলিয়াছেন যে, যখন নিজের উপলব্ধি এবং শাস্ত্রের বাক্য মিলিয়া যায়, তখনই সাধক সিদ্ধ হইয়াছে জানিবে। উপলব্ধি এবং শাস্ত্রবাক্য এই সঙ্কেতনির্দেশ গ্রহণ করিয়া অগ্রসর হইলেই রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত সেই প্রমাণ পাওয়া যাইতে পারে।

    কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, নিজের ব্যক্তিগত উপলব্ধি সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ অতি অল্প কথাই লিখিয়াছেন। তাঁহার আত্মজীবনীর পাঠকমাত্রেই লক্ষ্য করিয়া থাকিবেন যে, নিজের জীবনস্মৃতি রচনাতে তিনি নিজেকেই যথাসাধ্য আড়ালে রাখিয়াছেন, শুধু জীবনকেই গ্রহণ করিয়াছেন। নিজের সম্বন্ধে বলিতে তাঁহার ভদ্রমন এতই সঙ্কোচ ও দ্বিধাবোধ করিয়াছে যে, নিজের জীবনের ঘটনারও খুব কম উল্লেখই তিনি আপন জীবনস্মৃতিতে করিয়াছেন। সংযত ভদ্রমনের এতবড় পরিচয় আজ পর্যন্ত কোন আত্মজীবনীতেই দেখা যায় না এবং মনের এইরূপ আভিজাত্য লইয়া কম মানুষই পৃথিবীতে আসিয়াছেন।

    ধর্মগুরু, বা ধর্মপ্রচারকের ভূমিকা লইয়া রবীন্দ্রনাথ আসেন নাই, আসিয়াছেন কবিরূপে, তাই আপন জীবনের এই গভীরতম দিকটি তিনি নিকটতম জনের নিকট হইতেও একান্তভাবে গোপন রাখিয়াছেন। তথাপি শ্রম ও অধ্যবসায় লইয়া অগ্রসর হইলে তাঁহার ব্যক্তিগত উপলব্ধির বিবরণ কিছু কিছু সংগ্রহ যে না করা যায়, এমন নহে। কোন অধিকারী পুরুষ যদি এই বিষয়ে অগ্রসর হন, তবে রবীন্দ্রনাথের ঋষি-জীবনী এক পরম সম্পদরূপেই তিনি দেশবাসীকে দিয়া যাইতে পারেন। রবীন্দ্রনাথের ঋষি-জীবনের সামান্য একটু দিগদর্শনের চেষ্টা মাত্র এখানে করা যাইতেছে।

  • হযরত ওমর

    হযরত ওমর

    হযরত ওমর

    বিচারপতি আবদুল মওদূদ রচিত ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর জীবনী ‘হযরত ওমর’। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল পৌষ ১৩৭৪ বঙ্গাব্দ (জানুয়ারি ১৯৬৭)। গ্রন্থটির দ্বাদশ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ২০২৩ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে। প্রকাশক মেছবাহউদ্দীন আহমদ, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ৬৬ প্যারীদাস রোড, ঢাকা ১১০০। প্রচ্ছদ এঁকেছেন গোপাল মণ্ডল।

    উৎসর্গ

    বহু-ভাষাবিদ্ জ্ঞান সাগর

    ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

    শ্রদ্ধাভাজনেষু—

    ওকবাহ-বিন-আমিরের উক্তি-মতে নবী করীম (স.) বলেছিলেন–আমার পরে যদি কেউ নবী হতো, তা হলে ওমর-বিন্-খাত্তাব হতো।

    —তিরমিযি

    ভূমিকা

    ‘হযরত ওমর’ রচনা আজ শেষ হলো। এজন্যে প্রথমেই জানাই করুণাময় আল্লাহতালার উদ্দেশ্যে অশেষ শুকরিয়া।

    ওমর চরিত্রের বিশালতা উপলব্ধি করে স্বভাবতঃই আমি কুণ্ঠিত হই এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে, যদিও অনুরোধ আসে ‘কেন্দ্রীয় বাঙলা-উন্নয়ন-বোর্ডের পরিচালকের নিকট থেকে, যা আমার পক্ষে গৌরবের বিষয়। আমি আরও কুণ্ঠিত হই প্রধানত দুটি কারণে : যে পরিমাণ জ্ঞান ও অধ্যয়ন থাকা দরকার এরূপ মহৎ চরিত্র-চিত্রণে, তার কোনটাই আমার নেই; দ্বিতীয়তঃ সরকারী গুরু কর্তব্যভার যথাযোগ্য সম্পন্ন করে এরূপ বিরাট কাজে হস্তক্ষেপ করার মতো উপযুক্ত অবসর এবং মন ও মেজাজ পাওয়াও আমার পক্ষে সুদুর্লভ। তবুও এ কাজের ভার গ্রহণ করতে সাহসী হই, শ্রদ্ধেয় বন্ধুবর ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক সাহেবের আগ্রহাতিশয্যে। আমার সীমিত সামর্থের মধ্যে এ কাজে কতোটুকু সফল হতে পেরেছি, তার বিচারভার রইলো সহৃদয় পাঠক-শ্রেণীর উপর।

    আমি আগেই বলেছি, ওমর চরিত্র বিশাল ও মহৎ। এরূপ মহান চরিত্র চিত্রণকালে যে সব বিষয়ে, বিশেষতঃ খালিদ-বিন-ওলিদের পদচ্যুতি সম্পর্কিত তর্কিত বিষয়ে, যেরূপ আলোকপাত করা উচিত, আমার অক্ষম লেখনী-মুখে তা সম্ভব হয়নি, বিশাদ বা পরিচ্ছন্ন হয়নি। এ অক্ষমতাটুকুর জন্যে ওজরখাহী করে আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, কোথাও সত্য গোপন করিনি, ঐতিহাসিক তথ্যের বিপরীত কিছু আলোচনা করিনি, কিংবা আমার আজন্ম শ্রদ্ধান্বিত হিরোর’ চরিত্র-চিত্রণে অতিরঞ্জনের চেষ্টাও পাইনি। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে তথ্য-সম্বলিত সঠিক আলেখ্য তুলে ধরতে প্রয়াস পেয়েছি।

    আরও একটি বিষয়ে পাঠকশ্রেণীর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আবুবকর, ওমর, ওসমান, আলী প্রভৃতি ইসলামের পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির নামোল্লেখে আমি ইংরেজিতে ও সাধারণতঃ উর্দুতে অনুসৃত নীতি অবলম্বন করে কেবলমাত্র তাঁদের নামোল্লেখ করেছি, নামের পূর্বে ‘হযরত’ ও পরে ‘রাদিআল্লাহ্” লিখিনি। এ পন্থা অবলম্বন করেছি লেখার সুবিধার্থে ও সাহিত্যের রীতি অনুসারে। আমি ‘হযরত’ শব্দটির শুধুমাত্র নবী-করীমের উদ্দেশ্যই ব্যবহার করেছি এবং এভাবে তাঁর ও তাঁর সাহাবাদের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখিতে প্রয়াস পেয়েছি।

    রাওয়ালপিণ্ডি
    ১৫ নভেম্বর, ১৯৬৫।
    আবদুল মওদুদ

    ❀ ❀ ❀

    ওমর! ফারুক! আখেরী নবীর ওগো দক্ষিণ বাহু!

    আহ্বান নয়-রূপ ধরে এসো! -গ্রাসে অন্ধতা রাহু

    ইসলাম-রবি, জ্যোতি তার আজ দিনে দিনে বিমলিন!

    সত্যের আলো নিভিয়া-জ্বলিছে জোনাকীর আলো ক্ষীণ!

    * * *

    ইসলাম-সেত পরশ-মাণিক, তারে কে পেয়েছে খুঁজি?

    পরশে তাহারা সোনা হলো যারা, তাদেরই মোরা বুঝি।

    আজ বুঝি—কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর

    “মোর পরে যদি নবী হতো কেউ-হত সে এক উমর।”

    * * *

    হে খলিফাতুল মুসলেমীন! হে চীরধারী সম্রাট!

    অপমান তব করিবনা আজ করিয়া নান্দী পাঠ

    মানুষেরে তুমি বলেছ বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই

    তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই।

    — কাজী নজরুল ইসলাম

  • ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতে

    ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতে

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    আঁধার আঁধার! অসীম আঁধার!

    আঁখি হয়ে যায় অন্ধ!

    জাগো শিশু-রবি, আনো আলো-সোনা

    আনো প্রভাতের ছন্দ!

    হ্যাঁ, ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতের কথা বলব। প্রাগৈতিহাসিক কালে আর্যাবর্তে বিচরণ করতেন রঘু, কুরু, পাণ্ডব, যদু ও ইক্ষ্বাকু প্রভৃতি বংশের মহা মহা বীররা। তাঁদের কেউ কেউ অবতার রূপে আজও পূজিত হন। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকদের জগতে ভারতে প্রথম প্রভাত এনেছিলেন উত্তর-পশ্চিম ভারতবিজয়ী আলেকজান্ডার এবং গ্রিকবিজয়ী সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত।

    রাম-রাবণ ও কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধকাহিনির মধ্যে অল্পবিস্তর ঐতিহাসিক সত্য থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু সে সম্বন্ধে তর্ক না তুলে আপাতত এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, পুরাণ-বিখ্যাত সেই সব যুদ্ধের পরেও ভারতে এসেছিল দীর্ঘকালব্যাপী এক তমিস্রযুগ। তারই মধ্যে কেবল সত্যের সন্ধান দেয় নিষ্কম্প দীপশিখার মতো বুদ্ধদেবের বিস্ময়কর অপূর্ব মূর্তি। আজ ইতিহাস বলতে আমরা যা বুঝি, তখনও তার অস্তিত্ব ছিল না বটে, কিন্তু কি এদেশি, কি বিদেশি কোনও ঐতিহাসিকেরই এমন সাহস হয়নি যে বুদ্ধদেবকে অস্বীকার করে উড়িয়ে দেন। সেই খ্রিস্টপূর্ব যুগে মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের আবির্ভাব না হওয়া পর্যন্ত ভারতের ইতিহাস বলতে বুঝি, বুদ্ধদেবের জীবনচরিত।

    বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ এবং শিলালিপি প্রভৃতির দৌলতে বুদ্ধদেবের আবির্ভাবের পরবর্তী যুগের ভারতের কতকগুলি প্রামাণিক ছবি আমরা পেয়েছি। যদিও সে যুগের বৌদ্ধ চিত্রশালা সম্পূর্ণ নয়, তবু আলো-আঁধারের ভিতর থেকে ভারতের যে মূর্তিখানি আমরা দেখতে পাই, বিচিত্র তা—মোহনীয়!

    তারপরই সেই ছায়ামায়াময় প্রাচীন আর্যাবর্তে সমুজ্জ্বল মশাল হাতে নিয়ে প্রবেশ করলেন দিগবিজয়ী আলেকজান্ডার। যে শ্রেণির কাহিনিকে আজ আমরা ইতিহাস বলে গ্রাহ্য করি, তার জন্ম হয়েছিল সর্বপ্রথমে সেকালকার গ্রিক দেশেই। কাজেই আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান স্থানলাভ করল গ্রিক ইতিহাসেও এবং আলেকজান্ডারের পরেও প্রাচীন ভারতের সঙ্গে গ্রিসের আদান-প্রদানের সম্পর্ক বিলুপ্ত হয়নি। তাই সে যুগের ভারতবর্ষের অনেক কথাই আমরা জানতে পেরেছি গ্রিক লেখকদের প্রসাদে। সেলিউকস প্রেরিত গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস লিপিবদ্ধ করে না রাখলে আমরা মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের যুগে মগধ সাম্রাজ্য তথা ভারতবর্ষের রাজপ্রাসাদ, রাজসভা, রাজধানী, সমাজনীতি, শাসননীতি, আচার-ব্যবহার প্রভৃতির অনেক কথাই জানতে পারতুম না। এজন্যে গ্রিসের কাছে ভারতবর্ষ হয়ে থাকবে চিরকৃতজ্ঞ।

    প্রাকৃতিক জগতে যেমন কখনও মেঘ কখনও রোদের খেলা, কখনও আলো কখনও ছায়ার মেলা, প্রত্যেক দেশের সভ্যতার ইতিহাসেও তেমনই পরিবর্তনের লীলা দেখা যায়। মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত মগধের বা ভারতের সিংহাসনে আরোহণ করেন খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ কি আরও দুই-এক বছর আগে। তার কিছু কম দেড় শতাব্দী পরে মৌর্য সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়। তারপর ভারতবর্ষের ইতিহাসে দেখি সুঙ্গ, কান্ব ও অন্ধ্র প্রভৃতি বংশের কমবেশি প্রভুত্ব। ইতিমধ্যে গ্রিকরাও বারকয়েক ভারতের মাটিতে আসন পাতবার চেষ্টা করেছিল বটে, কিন্তু বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারেনি।

    কেবল গ্রিকরা নয়, মধ্য এশিয়ার ভবঘুরে মোগলজাতি তখন থেকেই ভারতবর্ষে হানা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। মোগল বলতে তখন মুসলমান বোঝাত না (নিজ মঙ্গোলিয়ায় আজও বৌদ্ধধর্মাবলম্বী মোগলরা আছে) এবং মোগল বলতে আসলে কী বোঝায় সে সম্বন্ধেও সকলের খুব পরিষ্কার ধারণা নেই। যুগে যুগে নানা জাতি মোগলদের নানা নামে ডেকেছে। এদের বাহন ছিল ঘোড়া, খাদ্য ছিল মাংস, পানীয় ছিল দুগ্ধ। গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোদোতাস এদের ডেকেছেন ‘সিথিয়ান’ বলে, পরবর্তী যুগের রোমানরা এদের ‘হুন’ নামে ডাকতেন, প্রাচীন ভারতে এদের নাম ছিল ‘শক’, এবং চিনারা এদের নাম দিয়েছিল Hiungnu। আসলে মোগল, শক, হুন, তাতার ও তুর্কিরা একরকম এক জাতেরই লোক, কারণ তাদের সকলেরই উৎপত্তি মধ্য এশিয়ায় বা মঙ্গোলিয়ায়। এই আশ্চর্য জাতি ধরতে গেলে এক সময়ে প্রাচীন পৃথিবীর অধিকাংশ সভ্য দেশকেই দখল করেছিল এবং ভারতবর্ষ তাদের অধিকারে এসেছিল দুইবার। প্রথমবারে তাদের বংশ কুষাণ বংশ বলে পরিচিত হয়। বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বিখ্যাত সম্রাট কনিষ্ক এই বংশেরই ছেলে। দ্বিতীয়বারে তারা মোগল রাজত্বের প্রতিষ্ঠা করে।

    মোগল বা শকরা ভারতে এসে ভারতীয় সভ্যতার প্রভাবে নিজেদের সমস্ত বিশেষত্ব—এমনকী ধর্ম পর্যন্ত হারিয়ে একেবারে এদেশের মানুষ হয়ে পড়েছিল। কনিষ্ক ছিলেন বৌদ্ধ, তবু তাঁর নামে বিদেশি গন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু কুষাণ বংশের শেষ সম্রাট বাসুদেবের নামই কেবল ভারতীয় নয়, ধর্মেও তিনি ছিলেন শৈব মতাবলম্বী হিন্দু। কারণ তাঁর নামাঙ্কিত প্রায় প্রত্যেক মুদ্রায় দেখা যায় শিব এবং শিবের ষাঁড়ের প্রতিমূর্তি।

    আনুমানিক ২২০ খ্রিস্টাব্দে বাসুদেবের মৃত্যু হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে হয় কুষাণ সাম্রাজ্যের পতন। যদিও তারপরেও কিছুকাল পর্যন্ত ভারতের এখানে-ওখানে কুষাণদের খণ্ড খণ্ড রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু কুষাণদের কেউ আর সম্রাট নামে পরিচিত হতে পারেননি।

    মোগল বা শকদের রাজত্বের সময়েই ভারতবর্ষের ইতিহাসের উপরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে গোধূলির ম্লান আলো। প্রাচীনতর হলেও মৌর্য যুগের ভারতবর্ষ যেন স্পষ্ট রূপে ও রেখায় আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। শক ভারতবর্ষে তেমনভাবে নজর চলে না—সেটা ছিল যেন আলো-মাখানো ছায়ার যুগ, তার খানিকটা স্পষ্ট আর খানিকটা অস্পষ্ট।

    কিন্তু কুষাণ সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতে এল সত্যিকার তমিস্রযুগ। যেন এক অমাবস্যার মহানিশা এসে সমগ্র আর্যাবর্তকে তার বিপুল আঁধার আঁচলে ঢেকে দিলে। অবশ্য, এ সময়কার হিন্দুস্থানে কোনও সাম্রাজ্য ও সম্রাট না থাকলেও ছোট ছোট রাজ্যের খুদে খুদে রাজার যে অভাব ছিল না, এ বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। নানা পুরাণে এ সময়কার যেসব বর্ণনা পাওয়া যায়, তাও ভাসা ভাসা, রহস্যময়। ওই খুদে রাজাদের কারুর ভিতরে এমন শক্তি ও প্রতিভা ছিল না যে সমগ্র ভারতের উপরে বিপুল একচ্ছত্র তুলে ধরেন। এক-এক দেশের সিংহাসন পেয়ে এবং বড়জোর প্রতিবেশি ছোট ছোট রাজাদের সঙ্গে যুদ্ধ বা ঝগড়া করেই তাঁরা তুষ্ট ছিলেন। এই গভীর অন্ধকার জগতে মাঝে মাঝে যেন, বিদ্যুৎ-চমকের মধ্যে দেখা যায় আভিরাস, যবন, শক, বল্হীক ও গর্দব্বিলাস প্রভৃতি অদ্ভুত বা বিদেশি বংশকে!

    বৃহৎ ভারতের আত্মা যখন ঘুমিয়ে পড়েছিল। অনুমানে বোঝা যায়, তখন ক্রমেই বৌদ্ধধর্মের অধঃপতন হচ্ছিল এবং হিন্দুধর্মের হচ্ছিল ক্রমোন্নতি। কিন্তু তখনকার দেশাচার, কলা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির কথা, রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক ইতিহাস জানবার কোনও উপায়ই এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। চন্দ্রগুপ্তের রাজধানী পাটলিপুত্র মৌর্য বংশ লোপ পাওয়ার পরেও এবং সেই অন্ধকার যুগেও যে একটি প্রসিদ্ধ নগর বলে গণ্য হত, এ কথা জানা যায়। কিন্তু পাটলিপুত্রের রাজার নাম পাওয়া যায় না। পাঞ্জাবে ও কাবুলে ছিলেন শকবংশীয় কোনও কোনও রাজা। এ কথাও জানা গিয়েছে যে, কাবুলের ভারতীয় শক রাজারা ছিলেন বিলক্ষণ ক্ষমতাবান (৩৬০ খ্রিস্টাব্দেও কাবুলের শক রাজার দ্বারা প্রেরিত ভারতীয় যুদ্ধহস্তী ও সৈন্যের সাহায্যে পারস্যের অধিপতি দ্বিতীয় সাপর প্রাচ্য রোম-সৈন্যদের পরাজিত করেন)।

    প্রায় এক শতাব্দী এই অন্ধকার রহস্যের মধ্য দিয়ে অতীত হয়ে যায়। এই হারানো ভারতকে আর অতীতের গর্ভ থেকে উদ্ধার করা যাবে না, বহুযুগের ওপার থেকে ভেসে আসে কেবল অন্ধকারের আর্তনাদ!

    ইউরোপের অবস্থাও তখন ভালো নয়। গ্রিস তখন গৌরবহীন এবং পশ্চিম রোম সাম্রাজ্য হয়েছে বর্বর, অন্ধকার যুগের মধ্যে প্রবেশ করতে উদ্যত। চতুর্থ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কনস্তানতাইন দি গ্রেটের মৃত্যুর পর ইউরোপীয় রোম-সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল নামে মাত্র।

    কিন্তু ইউরোপীয় সভ্যতা যখন মৃত্যুন্মুখ,  মহাভারতে জাগল তখন নবজীবনের কলধ্বনি।

    প্রায় শতাব্দীকাল পরে ঐতিহাসিক ভারতে এল আবার দ্বিতীয় প্রভাত! আমরা আজ সেই নবপ্রভাতের জয়গান গাইবার জন্যেই আয়োজন করছি।

    দীর্ঘরাত্রি শেষে প্রাতঃসন্ধ্যা এসে অন্ধকারের যবনিকা যখন সরিয়ে দিলে, তখন দেখলুম পাটলিপুত্রের সিংহাসনে বিরাজ করছেন যে রাজা, ইতিহাসে তিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত নামে বিখ্যাত (আনুমানিক ৩১৮ খ্রিস্টাব্দে) তাঁর বাপের নাম ঘটোৎকচ এবং ঠাকুরদাদা ছিলেন শুধু গুপ্ত নামেই পরিচিত।

    গুপ্তবংশের উৎপত্তি নিয়ে গোলমাল আছে। কেউ বলেন, তাঁরা ছিলেন নীচ জাতের লোক। কেউ বলেন, তাঁরা ছিলেন অহিন্দু।

    লিচ্ছবি জাতি বুদ্ধদেবের সময়েই বিখ্যাত হয়েছিল। বৌদ্ধগ্রন্থে প্রসিদ্ধ বৈশালী নগরে ছিল লিচ্ছবিদের রাজ্য। লিচ্ছবিরা আর্য না হলেও সম্ভ্রান্ত ছিল অত্যন্ত এবং তাদের শক্তিও ছিল যথেষ্ট।

    এই বংশের রাজকন্যা কুমারদেবীকে বিয়ে করে প্রথম চন্দ্রগুপ্তের মানমর্যাদা এত বেড়ে গেল যে, তুচ্ছ ‘রাজা’ উপাধি আর তাঁর ভালো লাগল না। তিনি গ্রহণ করলেন ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি এবং স্বাধীন নরপতির মতো নিজের ও রানি কুমারদেবীর নামাঙ্কিত মুদ্রারও প্রচলন করলেন।

    সঙ্গে সঙ্গে চলল রাজ্য বাড়াবার চেষ্টা। এ চেষ্টাও বিফল হল না। দেখতে দেখতে মাত্র কয়েক বৎসরের মধ্যেই তিরহুত ও অযোধ্যা প্রভৃতি দেশ হস্তগত করে প্রথম চন্দ্রগুপ্ত প্রমাণ করলেন যে সত্যসত্যই তিনি মহারাজাধিরাজ উপাধি লাভের যোগ্য। ওদিকে তাঁর রাজ্যসীমা গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমস্থল (আজ যেখানে এলাহাবাদের অবস্থান) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রাজ্যাভিষেকের পরে নিজের নামে তিনি এক নতুন অব্দও চালালেন—তা গুপ্তাব্দ বলে পরিচিত।

    প্রথম চন্দ্রগুপ্ত বেশিদিন রাজ্যসুখ ভোগ করতে পারেননি। কিন্তু ছোট্ট একটি খণ্ড রাজ্যের মালিক হয়েও তিনি যখন মাত্র দশ-পনেরো বছরের ভিতরেই নিজের রাজ্যকে প্রায় সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন, তখন তাঁর যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, অসাধারণ বীরত্ব ও যথেষ্ট যুদ্ধকৌশলের অভাব ছিল না, এ সত্য বোঝা যায় সহজেই। ম্যাসিদনের অধিপতি ফিলিপ তাঁর সমধিক বিখ্যাত পুত্র আলেকজান্ডারের জন্যে এমন দৃঢ় ভিত্তির উপরে সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছিলেন যে বিশেষজ্ঞদের মতে ফিলিপের মতো রাজনীতিজ্ঞ ও যুদ্ধকৌশলী পিতা না পেলে আলেকজান্ডার বিশ্বজয়ী হতে পারতেন কিনা সন্দেহ! গুপ্তবংশীয় চন্দ্রগুপ্তও আর এক অতি বিখ্যাত পুত্রের পিতা। অতি অল্পদিনে খণ্ড-বিখণ্ড ভারতবর্ষে তিনি এমন এক অখণ্ড ও বিপুল রাজ্য স্থাপন করে গেলেন যে অদূর ভবিষ্যতেই আকারে ও বলবিক্রমে তা প্রায় সুপ্রসিদ্ধ মৌর্য সাম্রাজ্যের সমান হয়ে উঠেছিল এবং তার স্থায়িত্ব হয়েছিল কিছু কম দুইশত বৎসর! ব্যাপকভাবে ধরলে বলতে হয়, ভারতবর্ষের উপরে গুপ্তযুগের অস্তিত্ব ছিল তিনশত পঞ্চাশ বৎসর!

    বলেছি, গুপ্তবংশীয় প্রথম চন্দ্রগুপ্তের আবির্ভাব নিশান্তকালে প্রাতঃসন্ধ্যায়। কিন্তু ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতের গৌরবময় অপূর্ব সূর্যোদয় তখনও হয়নি। প্রথম চন্দ্রগুপ্ত তরুণ সূর্যের জন্যে অরুণ আসর সাজিয়ে রাখলেন। তারপরই হল গৌরবময় সূর্যোদয়। আর্যাবর্ত তারপরে আর কখনও দেখেনি তেমন আশ্চর্য সূর্যকে। তারই বিচিত্র কিরণে সৃষ্ট হয়েছিল ভারতের যেসব নিজস্বতা বা বিশেষত্ব, আজও বিশ্বসভায় তাই নিয়ে আমরা গর্ব করে থাকি। ভারতের অমর কালিদাস গুপ্তযুগেরই মানুষ। কেবল কি কালিদাসের কাব্য? ‘মৃচ্ছকটিক’, ‘মুদ্রারাক্ষস’ প্রভৃতি অতুলনীয় সাহিত্যরত্নের সৃষ্টি গুপ্তযুগেই। প্রাচীনতম পুরাণ ‘বায়ুপুরাণ’ এবং ‘মনুসংহিতা’ও তাই। গণিতজ্ঞ ও জ্যোতিষজ্ঞ হিসাবে গুপ্তযুগের বরাহমিহির ও আর্যভট্টের নাম বিশ্ববিখ্যাত। স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় গুপ্তযুগের প্রতিভাকে প্রমাণিত করবার জন্য আজও বিদ্যমান আছে অজন্তা, ইলোরা, সাঁচী, সারনাথ, ভরহুত, অমরাবতী ও শিগিরি প্রভৃতি। দিল্লির বিস্ময়কর লৌহস্তম্ভের জন্ম গুপ্তযুগেই। সংগীতকলাও হয়ে উঠেছিল সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ। কত আর নাম করব?

    এতক্ষণ গেল ইতিহাসের কথা। পরের পরিচ্ছেদেই আমাদের গল্প শুরু হবে এবং দেখা দেবেন আমাদের কাহিনির নায়ক।

  • ওঙ্কার

    ওঙ্কার

    ওঙ্কার

    আহমদ ছফা

    কয়েকটি অভিমত

    এ গ্রন্থটি পাঠ করলে যে কোনো সহৃদয় পাঠকই মোহিত হবেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রচণ্ড আবেগ এবং অনুভূতি নিয়ে এর চাইতে উৎকৃষ্ট কিছু কোথাও লিখিত হয়েছে এমন আমার জানা নেই।

    — আবুল ফজল

    শেষে জানাই তাঁর (আহমদ ছফার) লেখা পড়ে আমি আনন্দ পেয়েছি এবং সকল পাঠক আমারই মত তাঁর গ্রন্থ পাঠে সে আনন্দের শরীক হতে পারবেন বলে আমার ধারণা।

    — দৈনিক পূর্বদেশ

    হিন্দু পুরাণ মতে ‘ওঙ্কার’ হচ্ছে আদি ধ্বনি, সকল ধ্বনির মূল। লেখক বলতে চেয়েছেন, বাহ্য কান দিয়ে আমরা ধরতে পারি না পারি, সকল চেতনে, সকল হৃদয়ে সেই আদ্য ধ্বনি বিরাজিত। এই ধ্বনি, এই হৃদয় এই চেতনা যে বোবা মেয়েতে ছিল, সে তার প্রাণ দিয়ে তা প্রমাণ করেছে। একটি সমুচ্চ বক্তব্যকে তীক্ষ্ণ ও তীব্রভাবে প্রকাশের চেষ্টা করেছেন লেখক। তার এই প্রচেষ্টা কিছুটা অভিনব। আহমদ ছফার ছোট গল্প পড়তে গিয়ে দেখেছি তিনি দুঃসাহসী পুরুষ।

    — দৈনিক ইত্তেফাক

    আহমদ ছফার বর্ণনা কৌশল চরিত্র চিত্রণ রীতি এবং অনুভুতি স্নিগ্ধ ও হৃদয়গ্রাহ্য ভাষাই মনকে গ্রাস করে। এই রচনার অন্তর্গত সংবেদনশীলতাই বক্তব্যের গভীরে টেনে নেয়। … মনে হয়, একটি মহাকাব্যের বিষয়কে যেন সনেটে বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এই গ্রন্থে।

    — দৈনিক বাংলা

    সত্যি বলতে কি আজকাল গল্পের বাজার বড় মন্দা। প্রথম পাঠে আন্দোলিত বা বিহ্বল হবার মত গ্রুপ অধুনা তেমন চোখে পড়ে না। আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’ সেদিক থেকে এক বিরল ব্যতিক্রম।

    — সাপ্তাহিক বিচিত্রা

    একজন প্রাবন্ধিক হিসেবেই আহমদ ছফাঁকে জানতাম। কিন্তু সম্প্রতি ‘বিচিত্রায় প্রকাশিত তাঁর গল্প ‘ওঙ্কার’ পড়ে তার মধ্যে একজন নিপুণ গল্পকারকে দেখতে পেয়েছি। সত্যিই ভাষায় সাবলীল সৌন্দর্যে বিদগ্ধ বর্ণনায়, তাঁর গল্পটি হয়ে উঠেছে সজীব প্রাণময়। গল্পের বিষয়বস্তুটিও নতুনতর।

    — বিচিত্রায় জনৈক পাঠকের পত্রাংশ

    সমগ্র উপন্যাসটি বড় গল্প না গদ্য কবিতা? আমাকে একটি বিদেশী উপন্যাসের কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, যদিও তার সঙ্গে বিষয়বস্তুর দিক থেকে কোনই মিল নেই। শ্রী বিষ্ণুদে অনূদিত ভের করস (ফরাসী) সমুদ্রের মৌন’ উপন্যাসটি আপনি পড়েছেন? ফ্রান্সে নাজি অবরোধের সময় লেখা।…

    ক্ষয়িষ্ণু সমাজের প্রতিনিধি বোবা বাংলা মার মুখে ভাষা ফোঁটাতে পারবে না, যে কাজ একমাত্র শক্তিমান সচেতন মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই সম্ভব। এই কথা কটি যে কতখানি সত্য তা আমরা এখানে (পশ্চিম বাংলায়) সবচেয়ে ভাল এখন বুঝতে পারছি।

    — সিদ্ধার্থ ঘোষ

    সাহিত্য ধারা। ৪/২, মহেন্দ্র রোড, কোলকাতা, ২৫ (জনৈক কোলকাতার পাঠকের পত্রাংশ)।

  • ঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র

    ঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র

    ঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র

    [writer]

    তাঁর পূর্বসূরী বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনীতে ইতিহাস বর্ণময় হয়ে উঠেছিল, আর শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে ইতিহাস গল্পময়। ঐতিহাসিক গল্প-উপন্যাসের লেখক হিসেবে শরদিন্দুর নাম বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্রের পরেই উচ্চারিত। ‘বহু দূরকালের সামান্য কয়খানা ঘটনার কঙ্কালের মধ্যে তিনি প্রতিভার মন্ত্রবলে প্রাণসঞ্চার’ করে যে-কালজয়ী আখ্যানমালা রচনা করেছিলেন তা যেন সর্বকালের ‘ঐতিহাসিক’ সম্পদ।

    ইতিহাস সম্পর্কে শরদিন্দুর আজন্ম আগ্রহ ছিল। তিনি ছিলেন ভারতের অতীত ইতিহাসের একনিষ্ঠ পাঠক। ফলে, প্রায় লেখকজীবনের গোড়া থেকেই তিনি ইতিহাসের ভেতরে গল্পের অনুসন্ধান করেছেন, ইতিহাসকে গল্পের ভেতরে বন্দি করেছেন অভিনব কৌশলে। সুকুমার সেন দেখিয়েছেন : ‘প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত শরদিন্দুবাবুর ঐতিহাসিক গল্পের কালপ্রসার। এর মধ্যে কোথাও গল্পের পরিবেশ গল্পরসের তীক্ষ্ণতার হানি করেনি। দূরের দৃশ্যপটকে নিকটে এনে দূরের মানুষকে কাছের মানুষ করতে পেরেছেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়।’

    এই বিষয়ে তিনি ছিলেন সার্থক ও সতর্ক স্রষ্টা। এক সাক্ষাৎকারে শরদিন্দু বলেছিলেন : ‘ইতিহাস থেকে চরিত্রগুলো কেবল নিয়েছি; কিন্তু গল্প আমার নিজের। সর্বদা লক্ষ্য রেখেছি কি করে সেই যুগকে ফুটিয়ে তোলা যায়। যে সময়ের গল্প তখনকার রীতি নীতি, আচার ব্যবহার, অস্ত্র, আহার, বাড়িঘর ইত্যাদি খুঁটিনাটি সব জানা না থাকলে যুগকে ফুটিয়ে তোলা যায় না। এরপর আছে ভাষা। ঐতিহাসিক গল্পের ভাষাও হবে যুগোপযোগী।’

    রহস্য সন্ধানী ব্যোমকেশ বক্সীর অমর স্রষ্টা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইতিহাস-আশ্রিত গল্প-উপন্যাসে কাহিনী ও ইতিহাস যুগপৎ ‘জীবন্ত’ হয়ে উঠেছে। বৌদ্ধযুগ, গৌড়বঙ্গ, চৈতন্যযুগ, প্রাক-মুঘল কিংবা মুঘল যুগ অথবা অদূর অতীতের পোর্তুগীজ-ইংরেজ অধিকৃত বাংলার সমকাল দুর্নিবার হয়ে উঠেছে কল্পনা ও বর্ণনার অশেষ গুণে, রচনা ও গল্পরসের অনিবার্য সৃষ্টিতে। তিনি বলতেন : ‘ইতিহাসের গল্প লিখেই বেশি তৃপ্তি পেয়েছি।’ পরিশ্রমী সম্পাদনায় দুই মলাটের মধ্যে সাজিয়ে দেওয়া শরদিন্দুর সমস্ত ইতিহাস-নির্ভর উপন্যাস (পাঁচটি) এবং গল্প (সতেরোটি) পাঠকদেরও তৃপ্তি দেবে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি।

    প্রথম সংস্করণ: জানুয়ারি ১৯৯৮

    প্রচ্ছদ: সুব্রত চৌধুরী

    অলংকরণ: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য

    প্রকাশকের নিবেদন

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমুদয় ঐতিহাসিক গল্প ও উপন্যাস ইতিপূর্বে প্রতুলচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় শরদিন্দু অম্‌নিবাস ষষ্ঠ ও তৃতীয় খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। এই কাহিনীগুলি একত্রে বর্তমানে ‘ঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র’ নামে প্রকাশিত হল।

    শরদিন্দু অম্‌নিবাস ষষ্ঠ খণ্ডে সুকুমার সেন মহাশয়ের লেখা ভূমিকার ঐতিহাসিক গল্প সম্পর্কে মন্তব্য-অংশটি বর্তমান সঙ্কলনের পরিশিষ্ট অংশে পুনর্মুদ্রিত হল।

  • ফুটন্ত গোলাপ

    ফুটন্ত গোলাপ

    ফুটন্ত গোলাপ

    কাসেম বিন আবুবাকার

    ফুটন্ত গোলাপ বাংলাদেশের কাসেম বিন আবুবাকারের লিখিত একটি রোমান্টিক উপন্যাস। লেখকের প্রথম উপন্যাস ফুটন্ত গোলাপ বইটি ১৯৮৬ প্রকাশিত হবার পরে, বইটি বাংলাদেশের প্রান্তিক গ্রামাঞ্চলের মানুষের নিকট বইটি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠে, এবং বইটি তৎকালীন সময়ে বেস্ট সেলার বই হয়ে উঠে। এরপর ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি লেখক ও এই বইটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করার পরে লেখক ও বইটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কেন্দ্রে পরিণত হয়। এমনকি বইটি কাসেম বিন আবুবাকারের লেখা কিনা, সেটা নিয়েও সন্দেহ ও বিতর্ক তৈরি হয়। তবে কিছু পাঠক বইটি নিয়ে ব্যক্তিগত ব্লগিং ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা করেছেন। ২০১১ সালে বইটি ৩০ তম সংস্করণ বাজারে বের হয়েছে, এবং বইটি সর্বমোট ১.৫ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে।

    কাহিনী সংক্ষেপ

    এই উপন্যাসটি প্রেমের সাথে ইসলামি ভাবধারার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। উপন্যাসের শুরুতেই মূল দুই ব্যক্তিত্ব নায়ক সেলিম ও নায়িকা লাইলির দেখা হয়ে যায়। গল্পে লাইলিকে একজন ধর্মপ্রান যুবতী হিসাবে দেখানো হয়েছে, লাইলির বাবা একজন কেরানি। লাইলি নিজে ভালো ইসলামি গান জানে। লাইলিদের পরিবার গরিব, অসহায় ও দুস্থভাবে জীবনযাপন করে। অপরদিকে সেলিমের পিতা একজন ধনী পরিবারের একজন সন্তান, সেলিম নিজেও ধর্মকর্ম তেমন বেশি মানেনা। সেলিম খুব ভালো ফুটবল খেলোয়ার এবং জুডো ও কারাতে পারদর্শী। সে নিজের গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করতে পারে। তবে লাইলি ও সেলিমের মধ্যে একটি বিষয়ে মিল রয়েছে, সেটি হলো তারা দুইজনই মেধাবী শিক্ষার্থী, তারা উভয়ই নিজ নিজ ক্লাসে প্রথম স্থানের অধিকারী হয়।

    উপন্যাসে লেখক গল্পের মধ্যে নানা নীতিকথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত, সেটিও লেখক তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়েছেন। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের বিষয়ে কুরআন ও হাদিসে কি ধরনের নির্দেশনা দেওয়া আছে, সেটিও বইতে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে।

    বাস্তব উপজিব্য

    লেখক মল্লিক ব্রাদার্সে চাকরি করার সময় এই উপন্যাসটি লিখেন। সেই সময়ে মল্লিক ব্রাদার্সে একটি শিক্ষিতা মেয়ে কাজের জন্য আসতো। মেয়েটি বাইরে কমদামী বোরকা পরলেও, ভিতরে দামি পোশাক পরিধান করে ছিলো। লেখক বিষয়টি বুঝতে পারলে, মেয়েটি জবাবে তাকে বলে, ইসলাম ধর্ম নারীদের নিরাপত্তা ও পর্দার বিধানের জন্য বাইরে বের হওয়ার সময় অনাকর্ষক পোশাক পরিধান করতে বলেছে। লেখক এই মেয়ের এই ধারণা শুনে অভিভূত হন, এবং এই উপন্যাসটি রচনা করেন। উপন্যাসটি লেখার পরে লেখক দৃঢ় বিশ্বাস নিয়েই বলেছিলেন, আমার এই উপন্যাস এক দিন না এক দিন সবাই গ্রহণ করবে।

    জনপ্রিয়তা

    লেখক এই বইটি ১৯৭৮ সালে লেখা শুরু করেন, এটিই লেখকের প্রথম বই হওয়ায় নানা প্রতিবন্ধকতায় বইটি ১৯৮৬ সালে ১ ডিসেম্বর তারিখে প্রকাশ করা হয়। বইটি প্রকাশের পর ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর বইটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করে। এরপর বই ও লেখককে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ইয়াহু নিউজ, যুক্তরাজ্যের মিডিয়া ডেইলি মেইল, মধ্যপ্রাচ্যের আরব নিউজ, মালয়েশিয়ার দ্য স্টার ও মালয়মেইল পত্রিকা, ফ্রান্সের দ্য ডন পত্রিকা, ফ্রান্সের ফ্রান্স টুয়েন্টি ফোর ও রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল পত্রিকাসহ আরো নানা আন্তর্জাতিক পত্রিকা বইটি ও লেখককে নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশের মধ্যেও বইটি সম্পর্কে বহু প্রতিবেদন এবং বিশাল জনপ্রিয়তা প্রকাশ পায়। বইটি গুডরিডস বুক রিভিউ ওয়েবসাইটে ২১০ রেটার ২.৬৭ রেটিংস দিয়েছে।

    সমালোচনা

    বইটির তুমুল জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অনেক সমালোচনাও রয়েছে। সমালোচকগণ বইটিকে একটি নিম্নমানের সাহিত্য বলে উল্লেখ করেছে, তারা বলেছে এই বইয়ের বাচনভঙ্গি, তুলনামূলক উদাহরণ ও বাক্য রচনায় উচ্চ সাহিত্যের ছাপ পাওয়া যায়নি। তারা উল্লেখ করেছে বইটি নিম্নমানের অর্ধ-শিক্ষিত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে রচনা করেছে। এছাড়াও কিছু ইসলামি ব্যক্তিত্বও বইটিতে ইসলামি রচনার মোড়কে অশ্লীলতা ও নগ্নতা ছড়ানোর অভিযোগ করেছে।

    গ্রন্থকথা

    ফুটন্ত গোলাপ ইসলামিক প্রেমের উপন্যাস; লেখকের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। প্রকাশক নূর-কাসেম পাবলিশার্স। প্রকাশকাল : প্রথম প্রকাশ – ডিসেম্বর-১৯৮৬ খৃঃ। প্রথম নূর কাসেম পাবলিশার্স সংস্করণ জানুয়ারি-১৯৯৭ খৃঃ। ত্রিশতম প্রকাশ : মার্চ-২০১১ খৃঃ। প্রচ্ছদ সমর মজুমদার। যুক্তরাজ্য পরিবেশক সঙ্গী লিমিটেড, ২২ ব্রিকলেন, লন্ডন, যুক্তরাজ্য। গ্রন্থস্বত্ব লেখক। নূর-কাসেম পাবলিশার্স, ৩৮/৪, বাংলাবাজার (২য় তলা), ঢাকা-১১০০, থেকে মোঃ সায়ফুল্লাহ্ খান কর্তৃক প্রকাশিত এবং সালমানী মুদ্রণ সংস্থা, ৩০/৫, নয়াবাজার, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।

    বর্ণ বিন্যাস বাধন কম্পিউটার্স ৪৭/১, বাংলাবাজার (২য় তলা), ঢাকা ১১০০।

    উৎসর্গ

    যাদের মারফত আল্লাহপাক আমাকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, সেই পুণ্যবান ও পুণ্যবতী আব্বা-আম্মার মোবারক কদমে।

    • “হে ঈমানদারগণ তোমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ কর। এবং শয়তানের অনুসারী হয়ো না। বাস্তবিকই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” –আল-কোরআন, সূরা-বাকারা, আয়াত-২০৮, পারা-২।
    • “পাঁচ ব্যক্তির সংসর্গ হইতে সর্বদা দূরে থাকিও (ক) মিথুক (খ) আহাম্মক (গ) কৃপণ (ঘ) কাপুরুষ (ঙ) ফাসেক।” –ইমাম জাফর সাদেক (রঃ)

    ভূমিকা

    বর্তমান সমাজের চরম অবনতি উপলব্ধি করে এই কাহিনী লেখার প্রেরণা পেয়েছি। আমার মনে হয়েছে এভাবে যদি দিন দিন আমরা প্রগতি ও নারী স্বাধীনতার নাম দিয়ে চলতে থাকি, তা হলে ইসলাম থেকে সমাজের মানুষ বহুদূরে চলে যাবে। শুধু মুখে, কেতাবে ও মুষ্টিমেয় লোকের কাছে ছাড়া অন্য কোথাও ইসলামের নাম গন্ধ থাকবে না।

    বিদেশী শিক্ষাকে আমি খারাপ বলছি না। পৃথিবীর যে কোনো ভাষায় আমরা জ্ঞান অর্জন করতে পারি। কিন্তু বিদেশী শিক্ষার সংগে সংগে তাদের ভালো দিকটা বাদ দিয়ে খারাপ দিকটাই অনুকরণ করে আমরা যেন “কাকের ময়ুর হওয়ার মত মেতে উঠেছি।

    অথচ আল্লাহ তায়ালা কোরআন পাকে বলিয়াছেন-”তোমরা (মুসলমানরা) উত্তম সম্প্রদায়, যে সম্প্রদায়কে প্রকাশ করা হইয়াছে মানবমণ্ডলীর জন্য। তোমরা নেক কাজের আদেশ কর এবং মন্দ কাজ হইতে নিবৃত্ত রাখ এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ।” (সূরা-আল ইমরান, ১১০ নং আয়াত, পারা-৪)।

    আর এখন আল্লাহপাকের কথিত সেই মুসলমানেরা কোরআন ও হাদিসের আদর্শ ত্যাগ করে দুনিয়ার মধ্যে সব থেকে নিকৃষ্ট জাতিতে পরিণত হয়েছে। তাই তারা পৃথিবীর সকল দেশেই উৎপীড়িত ও লাঞ্ছিত।

    আমরা যদি আল্লাহর ও রাসূলের (দঃ) বাণীকে অনুকরণ ও অনুস্বরণ করে চলি, তা হলে নিশ্চয়ই আল্লাহপাকের রহমতে আবার আমরা আমাদের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস তৈরি করতে পারব।

    যদি এই বাস্তবধর্মী উপন্যাসটি পড়ে বর্তমান যুব সমাজ সামান্যতমও জ্ঞান লাভ করে সেইমতো চলার প্রেরণা পায়, তবে নিজেকে ধন্য মনে করব।

    আমার এই প্রাণ প্রিয় উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৮৬ইং সালে এবং প্রথম সংস্করণেই বাংলাদেশ ও ভারতের পাঠক সমাজে আশাতীতভাবে সমাদৃত হয়। এ জন্য আমি আল্লাহপাকের দরবারে শতকোটি শুকরিয়া আদায় করছি এবং সেই সংগে আমার প্রিয় পাঠকবর্গের কাছে অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

    ওয়াস সালাম
    কাসেম বিন আবুবাকার
    ২০ই পৌঁষ- ১৪০৩ বাংলা
    ২৩শে শাবান- ১৪১৭ হিজরী
    ৩রা জানুয়ারী ১৯৯৭ ইং

  • সে কোন বনের হরিণ

    সে কোন বনের হরিণ

    সে কোন বনের হরিণ

    কাসেম বিন আবুবাকার

    সে কোন বনের হরিণ, ঔপন্যাসিক কাসেম বিন আবুবাকার; প্রকাশক বিশ্বসাহিত্য ভবন, ৩৮/৪ বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০।

    1. “সৎ দ্বারা অসৎ দূর কর”, এই আয়াত সম্বন্ধে (হযরত মুহাম্মদ (দঃ)) বলিয়াছেন, “ক্রোধে ধৈর্য এবং অসদ্ব্যবহারের সময় ক্ষমা কর। যখন তাহারা ইহা অবলম্বন করে, আল্লাহ তাহাদিগকে রক্ষা করিবেন এবং তাহাদের শত্রুগণকে হেয় করিবেন, যেন তাহারা পরম সুহৃদ হয়।” –বর্ণনায় : হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বুখারী
    2. “হে নফস, কথা বলাটা রূপার মতো হলেও চুপ থাকাটা স্বর্ণের ন্যায়।”–হযরত আলি (রাঃ)
    3. নীরবতা মঙ্গল না করতে পারে, কিন্তু ক্ষতি করে না।——জর্জ রিচার্ড

    এক

    আপু তোর ফোন।

    রূপা রাত দশটায় খেয়ে এসে পড়ছিল। ছোট বোন সায়মার কথা শুনে ঘড়ির দিকে তাকাল, কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে দশটা।

    তাই দেখে সায়মা বলল, ছেলেটা রোজ রোজ তোকে ডিস্টার্ব করে, তুই কিছু বলিস নি কেন?

    রূপা তার কথার জওয়াব না দিয়ে বলল, বলে দে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি।

    সায়মা অবাককণ্ঠে বলল, আমাকে মিথ্যে বলতে বলছ? তুমিই তো বলেছ কোনো কারণেই মিথ্যে বলা হারাম।

    একটা পড়া তৈরি করছিলাম, তাই বেখেয়ালে বলে ফেলেছি। তারপর ড্রইংরুমে এসে রিসিভার তুলে বিরক্তকণ্ঠে বলল, কেন প্রতিদিন ঠিক এই সময়ে। ফোন করেন? কতদিন আপনাকে বলেছি, এ সময়ে পড়াশোনা করি।

    অন্য সময়ে আপনাকে নিরিবিলি পাওয়া যায় না। তাই এই সময়ে করি। রূপা রাগের সঙ্গে বলল, কিন্তু এখন তো সবাই জেগে। তা ছাড়া ফোনটা তো আমার ঘরে নেই। ছোট বোন প্রতিদিন ফোন ধরে আমাকে ডেকে দেয়। আচ্ছা, কে আপনি?

    আমি একজন মানুষ।

    আমার তো মনে হয় অমানুষ।

    তা হতে পারি। তবে অমানুষ হলেও খুব খারাপ অমানুষ নই।

    আমার ধারণা, আপনি খুব খারাপ অমানুষই। নচেৎ প্রত্যেকদিন একজন ছাত্রীর পড়ার ডিস্টার্ব করতেন না।

    আপনার কথা কতটা সত্য জানি না। তবে কী জানেন, আমাকে অনেক রাত পর্যন্ত পড়তে হয়। খেয়ে এসে এই সময়ে কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারি না। আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপ করার পর পড়ায় মন বসে। তাই একটু ডিস্টার্ব করি।

    কিন্তু আপনার ফোন আসার পর আমি যে পড়ায় মন বসাতেপারি না। প্লীজ, আর কোনো দিন এ সময়ে ফোন করবেন না।

    তা হলে বলুন, কখন ফোন করলে আপনার ডিস্টার্ব হবে না?

    কোনো সময়েই ফোন না করলে খুশী হব।

    কিন্তু আপনার সঙ্গে কথা না বললে যে আমার পড়াশোনা একটুও হবে না। সারারাত একটু ঘুমও হবে না। পরীক্ষায় নির্ঘাৎ ডাব্বা মারব।

    আপনি আমাকে চেনেন না, জানেন না। আমিও আপনাকে চিনি না, জানি না, তবু এরকম কথা বলছেন কেন?

    আপনি আমাকে না চিনলেও, না জানলেও আমি আপনার সব কিছু জানি। কী জানেন বলুন তো?

    আপনার ভালো নাম যাবিন তাসনিম। ডাক নাম রূপা। বাবা রোকন উদ্দিন সাহেব একজন মুক্তিযোদ্ধা ও ব্যবসায়ী। বর্তমানে মন্ত্রী। দেশের বাড়ি নীলফামারী জেলার পলাশবাড়ি। ঢাকায় দু’টা বাড়ি, দু’টা গাড়ি। একটা আপনার বাবার। অন্যটা আপনাদের দু’বোনের। গাড়ি নিয়ে দু’বোন মাঝে মধ্যে ঝগড়া করেন। আপনি ইডেনে বাংলায় অনার্স করছেন। ছোট বোন সায়মা ঐ কলেজেই ইন্টারে পড়ছেন। আপনারা দু’বোনই সুন্দরী। তবে আপনি একটু বেশি।

    সবকিছু মিলে যাচ্ছে দেখে রূপা খুব অবাক হয়ে ভাবল, ছেলেটা আমাদের সবকিছু জানে। কে হতে পারে চিন্তা করে না পেয়ে অধৈর্য গলায় বলল, হয়েছে হয়েছে, আর বলতে হবে না। এবার আপনার পরিচয়টা বলুন।

    বলা যাবে না।

    কেন?

    সময় হলে বলব।

    আপনি শুধু অমানুষ নন, কাপুরুষও। এই কথা বলে রূপা রিসিভার ক্র্যাডেলে রেখে ফিরে এসে পড়তে বসল। কিন্তু কিছুতেই মন বসাতে পারল না। বই বন্ধ করে চিন্তা করতে লাগল, ছেলেটা কে হতে পারে? আমার পেছনেই বা লেগেছে কেন? ব্যাপারটা আব্বাকে জানালে কেমন হয়? আবার চিন্তা করল, ছেলেটার গলার আওয়াজ বেশ মিষ্টি। দেখতে কেমন কে জানে? অনেকের গলার আওয়াজ মিষ্টি হলেও দেখতে রোগা পেঁচকা, বেঁটে, চোখ ছোট ছোট, গায়ের রং মিশমিশে কালো। আবার কোনো গরিবের দেখতে শুনতে ভালো ছেলে নিজেকে বড়লোকের ছেলের পরিচয় দিয়ে ধন-সম্পত্তির লোভে বড়লোকের মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে করতে চায়। এই ছেলেটা সেরকম নয়তো? তা না হলে পরিচয় দিতে চায় না কেন? এদিকে তলে তলে আমাদের সব খবর জেনে নিয়েছে। আজ তিন মাস ধরে ছেলেটা পিছনে লেগেছে। যদি সত্যিই তার কোনো বদ মতলব থাকে, তা হলে আব্বাকে। বলে বাছাধনকে জেলের ভাত না খাইয়েছি তো আমার নাম রূপা নয়।

    রূপা ও সায়মা রিডিংরুমে দুটো আলাদা টেবিলে পড়ে। দু’বোন একই বেডরুমে আলাদা খাটে ঘুমায়। সেখানেও পড়ার জন্য দু’টো চেয়ার টেবিল আছে। রাত দশটায় খাওয়ার পর দু’জনে বেডরুমে পড়ে। পড়তে পড়তে ঘুম পেলে সায়মা প্রায় প্রতিদিন চোখে মুখে পানি দিয়ে বারান্দায় কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে। তাই ড্রইংরুমে ফোন বাজলে সে-ই ধরে।

    সায়মা এতক্ষণ একটা নোট করছিল। নোটটা শেষ করে রূপার দিকে তাকিয়ে বলল, আপু, এই বন্ধ করে চুপচাপ কী ভাবছিস?

    রূপা জানে কথা বললেই সায়মা ঐ ছেলেটাকে নিয়ে নানান কমেন্ট করবে। উপদেশ দিতেও ছাড়বে না। তাই তার কথার উত্তর না দিয়ে হাই তুলে বলল, আজ আর পড়তে ভালো লাগছে না, ঘুমাব বলে খাটে শুয়ে পড়ল।

    সায়মা কিছু বলল না, শুধু তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। বাথরুমের কাজ সেরে এসে শোয়ার সময় বলল, আপু তুই কী ঘুমিয়ে পড়েছিস?

    ঘুমাই নি, তবে ঘুম পাচ্ছে। তুই আর কোনো কথা বলবি না, চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়।

    আচ্ছা আপু, ছেলেটা তোকে প্রতিদিন ফোন করে কেন বলবি?

    রূপা রেগে উঠে বলল, তোকে কথা বলতে নিষেধ করলাম, তবু কথা বলছিস? বললাম না, আমার ঘুম পাচ্ছে?

    প্লীজ আপু, আমার প্রশ্নের উত্তরটা দিয়ে দে, আর একটাও কথা বলব না।

    সায়মা, তুই কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি করছিস। আর যদি একটা কথা বলিস, রিডিংরুমে গিয়ে ঘুমাব।

    সায়মা খুব ভীতু। একা ঘুমাতে ভয় পায়। রূপা যেদিন কোনো কারণে খুব রেগে যায়, সেদিন রিডিংরুমে ঘুমাতে চলে যায়। সায়মা তখন অন্যায় স্বীকার করে অনেক কাকুতি মিনতি করে তাকে এই রুমে নিয়ে আসে। তাই এখন তার কথা শুনে আর কিছু না বলে ঘুমিয়ে পড়ল।

    রূপা কিন্তু অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমাতে পারল না। চিন্তা করতে লাগল, কিভাবে ছেলেটার পরিচয় পাওয়া যেতে পারে? হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি আসার পর ঘুমিয়ে পড়ল।

    পরের দিন সকালে রূপা আব্বুকে বলল, আমাদের বেডরুমে একটা প্যারালাল ফোনের ব্যবস্থা করে দাও। পড়ার সময় ফোন এলে ড্রইংরুমে গিয়ে ফোন ধরতে খুব বিরক্ত লাগে। অনেক সময় ওখানে বাইরের লোকজন থাকে। অসুবিধে হয়।

    রোকন উদ্দিন সাহেবের কোনো পুত্র সন্তান নেই। শুধু দু’টো মেয়ে। বড় মেয়ে রূপা মায়ের সবকিছু পেয়েছে। পুত্র সন্তান না থাকায় রোকন উদ্দিন সাহেব দুই মেয়েকেই ভীষণ ভালবাসেন। তবে রূপাকে একটু বেশি। তার কথা শুনে বললেন, প্যারালাল নয়, কয়েকদিনের মধ্যে আর একটা ফোন তোদের জন্য নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেব।

    রূপা বলল, কয়েকদিন পরে যা করার করো, আজ প্যারালাল ফোনের ব্যবস্থা করে দাও।

    রোকন উদ্দিন সাহেব মৃদু হেসে বললেন, ঠিক আছে, অফিসে গিয়ে একজন লোক পাঠিয়ে দেব। সে ব্যবস্থা করে দেবে।

    আজ সন্ধ্যের পর থেকে খুব ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। রাত নটার পর বৃষ্টি একটু কমলেও দমকা দমকা ঝড় বইছে। দশটার সময় খেয়ে এসে রূপা সায়মাকে বলল, ঝড়-বৃষ্টির কারণে আজ হয়তো ছেলেটা ফোন করবে না। তবু যদি করে, তুই ফোন ধরবি। তারপর কি বলবে বুঝিয়ে বলল।

    সায়মা বলল, আজ আবার মিথ্যে বলতে বলছ?

    হ্যাঁ বলছি। বাজে ঝামেলা থেকে বাঁচার জন্য মিথ্যে বললে দোষ হয় না।

    কিন্তু উনি তো আমার গলা চেনেন।

    চিনুক, তবু যা বলতে বললাম বলবি।

    ঠিক সাড়ে দশটায় ফোন বেজে উঠতে রূপা সায়মাকে রিসিভ করতে বলল।

    সায়মা রিসিভার তুলে সালাম দিয়ে বলল, রূপা বলছি।

    অপর প্রান্ত থেকে অজানা ছেলেটা সালামের উত্তর দিয়ে বলল, আপনি রূপা নন, সায়মা।

    কী করে বুঝলেন? আমি তো রূপাই বলছি।

    শুধু শুধু মিথ্যে বলে নিজেকে ছোট করছেন কেন?

    আপনি যখন বিশ্বাসই করছেন না তখন ফোন রেখে দিচ্ছি।

    প্লীজ রাখবেন না, দয়া করে আপনার আপুকে দিন।

    আপনি তো বিশ্বাসই করছেন না, আমি রূপা। রেখে দেব না তো কী করব?

    তা হলে বলুন, “আল্লাহর কসম আমি রূপা বলছি।”

    সায়মা জানে আল্লাহর নামে মিথ্যে কসম খাওয়া কবীরা গুণাহ। তাই কিছু বলতে না পেরে চুপ করে রইল।

    কী হল? আল্লাহর কসম খেয়ে বললেন না যে?

    সায়মা মাউথপীসে হাত চাপা দিয়ে রূপার দিকে তাকিয়ে কসম খাওয়ার কথা বলে বলল, এখন কী করব?

    রূপা তার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে বলল, আমার একটা অনুরোধ রাখবেন?

    ছেলেটা আহতস্বরে বলল, ছোট বোনকে দিয়ে এভাবে ফোন রিসিভ করতে বলা আপনার উচিত হয় নি। এটা আমার আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার কাছে সায়মা কত ছোট হয়ে গেল বলুন তো?

    উচিত অনুচিতের কথা পরে, আমার একটা অনুরোধ রাখবেন কী না বলুন?

    একটা কেন, হাজারটা অনুরোধ রাখব। তবে ফোন করার ব্যাপারটা ছাড়া। তারপর বলল, বেডরুমে ফোন নিয়ে খুব ভালো করেছেন। পড়ার সময় আর ডিস্টার্ব করব না। কাল থেকে সাড়ে বারটার সময় যখন ঘুমাতে যাবেন তখন করব।

    রূপা খুব অবাক হয়ে বলল, এ রুমে ফোন নিয়েছি আপনি জানলেন কিভাবে?

    আল্লাহর ইচ্ছায় আমি অনেক কিছু জানতে পারি। শু

    ধু আমাদের অনেক কিছু জানতে পারেন, না অন্যদেরও জানতে পারেন?

    অন্যদের কোনো কিছু জানার ইচ্ছা কখন হয় নি। তাই সেকথা বলতে পারলাম না। তারপর বলল, কী যেন অনুরোধ করবেন বললেন?

    তা আর করব না। তবে একটা প্রশ্ন করব, সঠিক উত্তর দেবেন তো?

    উত্তর জানা থাকলে সঠিকই দেব। কারণ কোনো মুমীন মুসলমান মিথ্যে বলতে পারে না।

    আপনি আমার পেছনে লেগেছেন কেন?

    উত্তরটা আপনি জানেন, তবু জিজ্ঞেস করছেন কেন?

    সিওর হওয়ার জন্য।

    যা জেনেছেন সেটাই সত্যি।

    আমি কি জেনেছি, তা আপনি বুঝলেন কী করে? কারো মনের কথা তো আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানতে পারে না। এটা কুরআন পাকের কথা।

    আপনি ঠিক কথা বলেছেন। তবে আল্লাহ যাদেরকে পছন্দ করেন তাদেরকে মানুষের মনের খবর জানার জ্ঞান দান করেন।

    তারা তো আল্লাহর খাস বান্দা। আপনিও কী নিজেকে তাই ভাবেন?

    কখনই না। তাদের পায়ের ধূলোর সমান যোগ্যতাও আমার নেই।

    তা হলে ঐ কথা বললেন কেন?

    আল্লাহর মেহেরবাণীতে আমি হিকমতের দ্বারা শুধু আপনাদের সবকিছু জেনে নিই।

    বুঝলাম না।

    পরে এক সময় বুঝিয়ে দেব। অবশ্য আপনিও চেষ্টা করলে হিকমতের দ্বারা আমার সবকিছু জানতে পারেন।

    হিকমত টিকমত বুঝিও না, আর জানিও না। আমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন। কিনা বলুন?

    বললাম তো, উত্তর জানা থাকলে নিশ্চয় দেব।

    আপনার নাম বলুন।

    আব্দুস সাত্তার।

    বাবার নাম?

    বলা যাবে না।

    ঠিকানা?

    তাও বলা যাবে না।

    কেন?

    বললাম বলা যাবে না, তবু জিজ্ঞেস করছেন কেন?

    আপনি কী করেন?

    দু’তিন মাস পরে ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স দেব।

    আপনার বাবা কী করেন?

    একটা বেসরকারী কলেজে অধ্যাপনা করেন।

    আপনি যখন ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স করছেন তখন ধর্ম সম্পর্কে নিশ্চয় অনেক জ্ঞান রাখেন?

    তাতো কিছু রাখি।

    তা হলে প্রতি রাতে একজন গায়ের মহররম মেয়েকে ফোন করা যে ইসলামের পরিপন্থী, তা তো জানার কথা। তবু করেন কেন?

    আপনাকে প্রায় দু’বছর আগে থেকে ভালবাসি এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিয়ে। করব। জীবন সাথী পছন্দ করা ইসলামের পরিপন্থী নয়।

    এই আইন শুধু ছেলেদের বেলায়, না মেয়েদের বেলায়ও।

    উভয়েরই।

    আমি তো আপনাকে দেখি নি, চিনি নি, আপনাকে যদি আমার পছন্দ না হয়?

    ছেলেরা যেসব কারণে মেয়েদের পছন্দ করে, সে সব আপনার মধ্যে আছে। তাই আমি যেমন আপনাকে পছন্দ করেছি, তেমনি মেয়েরা যেসব কারণে ছেলেদের পছন্দ করে, সেসব আমার মধ্যে আছে। তাই আমি হান্ড্রেডপার্সেন্ট সিওর, আমাকে দেখলে আপনি অপছন্দ করবেন না।

    আপনার কথা সত্য হলেও সবক্ষেত্রে নয়। যেমন অনেক সুন্দরী মেয়ে অসুন্দর ছেলেকে পছন্দ করে। আবার অনেক সুন্দর ছেলে অসুন্দর মেয়েকে পছন্দ করে।

    আপনার কথা অস্বীকার করব না। আমি বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিতে বলেছি। আর আপনি যা বললেন, তা ব্যতিক্রম।

    আপনি আমাকে দেখে শুনে ও আমাদের সবকিছু জেনে পছন্দ করেছেন এবং বিয়ে করার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন বললেন। আমারও কী উচিত নয়, আপনাকে দেখে।

    ও আপনাদের সবকিছু জেনে পছন্দ করা?

    অফকোর্স।

    তা হলে বলুন, কবে-কখন ও কোথায় আপনার সঙ্গে আলাপ করব।

    কাল বলব, আজ অনেক রাত হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়ন, নচেৎ ফজরের নামায কাযা হয়ে যাবে। তারপর রূপা কিছু বলার আগেই সালাম দিয়ে লাইন কেটে দিল।

    রূপা সালামের উত্তর দিয়ে রিসিভার রেখে দিল।

    সায়মা এতক্ষণ নিজের খাটে বসেছিল। ছেলেটার কথা শুনতে না পেলেও আপুর কথায় বুঝতে পারল, সে আপুকে ভালবাসে ও বিয়ে করতে চায়। তাই রিসিভার রেখে দেওয়ার পর জিজ্ঞেস করল, ছেলেটা পরিচয় বলেছে?

    শুধু নাম বলেছে আব্দুস সাত্তার। বাবার নাম ও বাসার ঠিকানা বলে নি।

    তুই দেখা করার কথা বলতে কী বলল?

    কাল বলবে বলেছে?

    আর কী করেন জিজ্ঞেস করতে?

    ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স দেবে।

    নাম ছাড়া অন্য কিছুই যখন বলে নি, মনে হয় ছেলেটা ফ্রড। একা একা তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া তোর ঠিক হবে না।

    তোকে অত পাকামী করতে হবে না। নে এবার শুয়ে পড় বলে রূপা বাথরুম থেকে এসে শুয়ে পড়ল।

  • হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর

    হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর

    উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়

    হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর

    মহানায়ক উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা ‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর’। গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন অভীক চট্টোপাধ্যায়। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১৩; প্রকাশক স্বাতী রায়চৌধুরী; সপ্তর্ষি প্রকাশন; প্রচ্ছদ এঁকেছেন সৌরীশ মিত্র। একই বছর ফেব্রুয়ারিতে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

    উৎসর্গ

    প্রকাশকের তরফ থেকে

    উত্তমকুমার অনুরাগীদের

    ভূমিকা

    ছোটোবেলায় যখন থেকে বড়োদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাওয়ার সুযোগ ঘটল, তখন সেই বয়সেই মনের মধ্যে একটা ইচ্ছে খচখচ করত। অবশ্যই, কারোর কাছে তা প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। আসলে, চলচ্চিচত্রের পর্দায় দেখতে ইচ্ছে হত, উত্তমকুমারকে। যেসব ছবি আমাকে দেখতে নিয়ে যাওয়া হত, তার কোনোটাতেই উত্তমকুমার থাকতেন না। অথচ, বাড়ির পিসি—কাকা—দাদাদের মুখে, বাড়ির বিভিন্ন ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সিনেমার পত্রিকার পাতায় পাতায়, দেওয়ালে দেওয়ালে সাঁটা পোস্টারে— সর্বত্রই দেখতাম একজনের প্রাধান্য— উত্তমকুমার! এই মানুষটিকে নড়াচড়া অবস্থায় পর্দায় দেখার ইচ্ছেটা প্রবল হওয়াই স্বাভাবিক। অবশেষে, ইচ্ছেপূরণ হল। মায়ের সঙ্গে দেখলাম ‘জয়জয়ন্তী’। ছবিটিতে ছোটোদের ভূমিকার একটা প্রাধান্য থাকার কারণেই বোধহয়, আমাকে তা দেখতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু, আজ একথা অকপটে জানাতে দ্বিধা নেই, ওই বয়সেই ছবিতে থাকা বাচ্চচাদের পরিবর্তে উত্তমকুমার, অপর্ণা সেন এবং সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানগুলি আমার মন কেড়েছিল। এ আমি আজও স্পষ্ট মনে করতে পারি। উত্তমকুমারকে প্রথম অভিনয়রত অবস্থায় দেখে, ঐ ছোটো বয়সেই ওঁর মতো হাঁটতে, চলতে, কথা বলতে ইচ্ছে জেগেছিল। পরবর্তীকালে, দেখলাম এই অসম্ভব আকর্ষণের নামই ‘উত্তমকুমার’। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানারকম শিক্ষাদীক্ষা, পড়াশুনা, রাজনৈতিক—সামাজিক পরিবেশজাত প্রভাব থেকে সরল স্বাভাবিক ভাবনাগুলোর ওপরে যখন একধরনের সচেতন ধ্যান ধারণার আস্তরণ পড়তে লাগল, তার ফলে, সেই যুবকাবস্থায় নানারকম বিভাজনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হল। এরই ফলস্বরূপ, ‘মূলধারা’র সিনেমার রোম্যান্টিক ‘হিরো’ উত্তমকুমারের সম্বন্ধে বেশি ভাবনা—চিন্তা করার মতো কিছু নেই—এইরকম একপ্রকার মতের সমর্থক হয়ে উঠেছিলাম সেইসময়। ক্রমে, এইসব আরোপিত ঘোর যখন কাটতে শুরু করল এবং যথাযথভাবে আপন সত্তার দিকে তাকানোর অবকাশ মিলল, তখন চেতনার অনেকটাই মুক্তি ঘটার ফলে, অনেক বিষয়ের সঙ্গেই নতুন করে হৃদয়ের যোগ স্থাপিত হল, যেগুলি, এতদিন সচেতনভাবে দূরে সরিয়ে রাখা ছিল। এহেন অবস্থায় নতুন করে বুঝলাম, শক্তিশালী অভিনয় ও ‘স্টার’ অভিনেতার এক সম্পৃক্ত মিশ্রণের আদর্শ রূপ হলেন ‘উত্তমকুমার’। অনেক অর্থেই তিনি ব্যতিক্রমী। কেন? আসব সে কথায়, তবে তার আগে এই বইটার হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনি এবং গঠনপ্রণালী নিয়ে কয়েকটি কথা বলা দরকার।

    উপরে এত ব্যক্তিগত কথা দিয়ে শুরু করার একটাই অর্থ, আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার মতো চল্লিশোর্ধ্ব বাঙালির জীবনে উত্তমকুমারের আগমনের ধরন, একটু হেরফের করে আমার ধাঁচেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটেছে। এবার আসি বইটার প্রসঙ্গে। আমার এক বন্ধু দেবাশিস গুপ্ত, যিনি আমার এলাকা চন্দননগরের বাসিন্দা, তিনিই নিজ উদ্যোগে তাঁর সংগ্রহে থাকা ১৩৬৭ সালের বৈশাখের প্রথম সংখ্যা নবকল্লোল পত্রিকা থেকে, একবছর ধরে পরপর সংখ্যায় বেরোনো উত্তমকুমারের ধারাবাহিকভাবে লেখা ‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর’ শীর্ষক আত্মজীবনীমূলক রচনাটি সম্পূর্ণ ফোটোকপি করে আমার হাতে তুলে দেন। এই রচনাটি সম্বন্ধে কোনো ধারণাই আমার ছিল না। দীর্ঘদিন এটি দৃষ্টির অগোচরে ছিল। পুরোনো বই ও পত্রপত্রিকার সংগ্রাহক বন্ধু দেবাশিস গুপ্ত—র প্রতি এজন্য আমার কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা নেই। তিনি এইভাবে নিজে এগিয়ে এসে, এই রচনাটি সম্বন্ধে আমায় অবহিত না করলে, বইটিই প্রকাশিত হতে পারত না। এই ফোটোকপি হাতে আসার পর, এটিকে বইয়ের আকার দেওয়ার ইচ্ছেটা প্রবল হয়। ‘সপ্তর্ষি প্রকাশন’ —এর সৌরভকে একবার বলাতেই, সে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেল। এজন্য, তারও কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য। কিন্তু, যতটুকু রচনা পাওয়া গিয়েছিল, তার পরে আরও ছিল। পুরোটা না পেলে তো, বই হবে না। লাইব্রেরির সাহায্য নেওয়া দরকার। বিশিষ্ট সাংবাদিক—প্রাবন্ধিক ও অনেক উচ্চচমানের গ্রন্থের সম্পাদক ভবেশ দাসের স্ত্রী রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজের লাইব্রেরিয়ান শ্রীমতী এলা দাস, যাঁরা দুজনেই আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন, সেই বৌদি যোগাযোগ করিয়ে দিলেন ‘জাতীয় গ্রন্থাগার’—এ উচ্চচপদে কর্মরত জয়গোপাল সাহার (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) সঙ্গে। তিনি অসম্ভব আন্তরিকতার সঙ্গে আমাকে সাহায্য করলেন। পেয়ে গেলাম রচনাটির বাকি অংশের (নবকল্লোল ১৩৬৮ ও ১৩৬৯’ বৈশাখ) ফোটোকপি। ব্যস, সম্পূর্ণ রচনা হাতে। এরপর, এল অনুমতির প্রশ্ন। উত্তমকুমারের পৈতৃক বাড়ি যে রাস্তার ওপরে, সেই গিরিশ মুখার্জি রোডেই ‘গিরিশ ভবন’—এ আমার এক ভাইঝির বিয়ে হয়েছে। ওদের সঙ্গে দীর্ঘদিন যাবৎ উত্তমকুমারের পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা। ভাইঝির শ্বশুরমশাই শ্রীতপন মুখোপাধ্যায়ের মারফত যোগাযোগ হল, উত্তমকুমারের পুত্রবধূ শ্রীমতী মহুয়া চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ভীষণ আন্তরিক ব্যবহারসহযোগে, তিনি এককথায় লিখিত অনুমতি দিয়ে দিলেন। উপরিল্লিখিত, প্রত্যেককে আমার অন্তরের সবটুকু কৃতজ্ঞতা নিবেদন করলাম। এছাড়া, তথ্য, ছবি ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, শ্রদ্ধেয় শঙ্খ ঘোষ, সমাজতাত্ত্বিক গবেষক সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, রেকর্ড—সংগ্রাহক জয়দীপ চক্রবর্তী, উত্তমকুমারকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাতা স্বপন দাস, শ্রদ্ধেয় সংগীতব্যক্তিত্ব ডঃ দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা বেতারের শ্রদ্ধেয় মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়, কলেজ জীবনের অন্তরঙ্গ বন্ধু চলচ্চিচত্রপ্রেমী মানসকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, চলচ্চিচত্র—গবেষক দেবীপ্রসাদ ঘোষেদের মতো ব্যক্তিরা। এঁদের প্রত্যেককে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানালাম। প্রখ্যাত রেকর্ড—সংগ্রাহক সুশান্তকুমার চট্টোপাধ্যায় একটি পত্রিকায় বেরোনো তাঁর লেখা উত্তমকুমারের রেকর্ড ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাওয়া গান সংক্রান্ত অভিনব দুষ্প্রাপ্য তথ্যবহুল রচনাটি এই বইতে পুনর্মুদ্রণের অনুমতি দিয়ে কৃতার্থ করেছেন। এজন্য, তাঁর প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। অবশ্যই কৃতজ্ঞতা জানাই, আশিস পাঠককে যিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় সেপ্টেম্বর মাসে বইটি সম্পর্কে এক সুন্দর প্রতিবেদন লিখে, আগাম সবাইকে বইটি সম্পর্কে অবহিত করেছেন। এদের প্রত্যেকের অবদান বইটিকে বাস্তব রূপ দিতে সহায়তা করেছে।

    এবার, শেষে, উত্তমকুমার তাঁর এই বইতে কীভাবে উঠে এসেছেন, সে বিষয়ে কয়েকটি কথা বলে ভূমিকায় ইতি টানব। বাংলা সিনেমা সবাক হবার পর থেকে, বলা যায় আজ অবধি ঠিকঠাকভাবে যে তিনজন ‘স্টার’—এর দেখা মিলেছে, তাঁরা হলেন দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথেশ বড়ুয়া ও উত্তমকুমার। প্রথম দুজনের চেয়ে উত্তমকুমার জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘপ্রভাবের দিক থেকে যে অনেক এগিয়ে, তা অনেকেই সম্ভবত মানবেন। তাছাড়া, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় যে সময় বিরাজ করতেন, তা ছিল মূলত থিয়েটারের যুগ এবং তিনিও নিজে পছন্দ করতেন মঞ্চাভিনয়।

    তখন সেই তিন—এর দশকে নির্বাক যুগ থেকে সবাক যুগে ধীরে ধীরে উত্তরণ ঘটছে চলচ্চিচত্রের—নিতান্তই এক শৈশবাবস্থা বলা যায়। ফলে, অভিনয় জগৎ শাসিত হত মঞ্চাভিনয়ের দ্বারা। আর, প্রমথেশ বড়ুয়া অবশ্যই একশো ভাগ চলচ্চিচত্রের মানুষ হলেও খতিয়ে দেখলে, একটা বিষয় সম্ভবত পরিষ্কার হয় যে, বড়ুয়াসাহেব প্রথমে একজন চিত্র—পরিচালক তারপরে অভিনেতা। প্রযোজনা ও পরিচালনার গুণে চলচ্চিচত্রকে সাবালক তৈরির ক্ষেত্রে, উজ্জ্বল ভূমিকা নিয়েছিলেন। এর সঙ্গে অবশ্যই ছিল প্রমথেশচন্দ্রের নায়ক ভূমিকায় অভিনয়। কিন্তু, উত্তমকুমার ছিলেন একজন আদ্যোপান্ত চলচ্চিচত্রাভিনেতা। অল্প কিছু ক্ষেত্রে, মঞ্চাভিনয় বা চলচ্চিচত্র—পরিচালনা করলেও, উত্তমকুমার সকলের মনে বিরাজ করছেন একজন স্বপ্নের নায়ক ও ‘স্টার’ অভিনেতা হিসেবে, একথা আশাকরি সকলেই মানবেন। এর বীজ নিয়েই যে তিনি জন্মেছিলেন, তার পরিষ্কার আভাস তাঁর লেখা এই বইতে আছে। এই রচনা যেখানে শেষ হচ্ছে তখন ১৯৬২ সালের এপ্রিল—মে মাস। সকলেই জানেন, এ সময়ে তিনি মধ্যগগনে। ফলে, তাঁর নিজেকে গড়ে তোলার জায়গাটি অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে উঠে এসেছে এই বইতে। মনে রাখতে হবে, দুর্গাদাস ও প্রমথেশচন্দ্র দুজনেই ছিলেন কিন্তু অভিজাত বংশোদ্ভুত। অন্যদিকে, উত্তমকুমার এক ছাপোষা মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের কলমপেষা কেরানি ছিলেন। সেখান থেকে স্বপ্ন দেখতেন নায়ক হওয়ার। এ যেন, আমাদের মতো সাধারণের ভাবনায় ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে আমির হওয়ার স্বপ্ন দেখার মতো ব্যাপার। কিন্তু, যিনি আমিরত্বের সত্তা নিয়েই জন্মেছেন, ছেঁড়া—কাঁথা—টাথা তাঁর কাছে কিছু নয়। তিনি আমির হবেনই এবং হলেনও তা।

    ১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে শুরু করে, পরপর ৭ খানি ছবি ফ্লপ হওয়ার পরে, ১৯৫২ সালে ব্যতিক্রমী পরিচালক নির্মল দে— র ‘বসু পরিবার’ ছবিতে প্রথম সাফল্যের মুখ দেখলেন। এ থেকে স্পষ্ট হয়, কী পরিমাণ টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এই অন্ধকার সময়টি তিনি অতিক্রম করেছেন। কখনও লড়াই ছেড়ে তো যানই নি, উপরন্তু, প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে গেছেন তাঁর লক্ষ্যে। এইসময় একদিন একা গঙ্গার ধারে বসে থাকার সময়, হঠাৎ, এক সন্ন্যাসী কোথা থেকে উদয় হয়ে, উত্তমকুমারকে তাঁর পারিবারিক ও ছবির জীবনের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে এক অমোঘ ভবিষ্যৎবাণী করে চলে যান, যা পরে অক্ষরে অক্ষরে ফলে যায়। একদিকে গৌরী দেবীকে জীবনে পাওয়ার ব্যাপারে চিন্তা, অন্যদিকে ছবির জগতে সাফল্য পাওয়া নিয়ে চরম উদ্বেগ। সব মিলিয়ে এক অন্য উত্তমকুমার উঠে আসেন, তাঁর নিজ রচনায়। নিজের ছবির জগতে সাফল্য পাওয়ার বিষয়ে কতখানি গভীর চিন্তা—ভাবনা তিনি করেছিলেন, একটু ভাবলেই আমাদের কাছে তা পরিষ্কার হয়। ‘বসু পরিবার’—এ সাফল্য আসার পর কয়েকটি ছবি পেরিয়ে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ (১৯৫৪) ছবিতে সম্পূর্ণ এক অন্য উত্তমকুমার জেগে ওঠেন যেন। ইনিই হন আমাদের চেনা ‘স্টার’। একইসঙ্গে, এই ছবি থেকে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর রোম্যান্টিক রসায়নটিও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এই বইতেই এক জায়গায় উত্তম তাঁর প্রিয় অভিনেতা হিসেবে প্রখ্যাত হলিউড ‘স্টার’ রোনাল্ড কোলম্যান—এর নাম করেছেন। ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিতেই প্রথম দেখা যায়, উত্তমকুমারের হাঁটাচলা, পোষাক নির্বাচন, চুলের বিন্যাস, তাকানো, ক্যামেরাকে ব্যবহার—সমস্ত পালটে যায়। একধরনের হলিউডি ‘স্টার’ ঘরানার সঙ্গে যার প্রভূত মিল চোখে পড়ে। এই জায়গা থেকেই তিনি সবাইকার থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলেন। শুধু তাই নয়, ক্যামেরাকে নতুন ভাবে ব্যবহার করাও দেখা গেল তাঁর মধ্যে থেকে। যেমন, উত্তমকুমারের ক্যামেরার দিকে পিছন করে, পাশে তাকিয়ে একধরনের বিশেষ স্টাইলকে অবলম্বন করে অভিনয়, আমাদের কাছে ভীষণ প্রিয়। এর আগে, এরকম বিদেশিয়ানার ছোঁয়া—লাগা ভঙ্গিমায়, অন্য কোনো নায়ককে দেখতে অভ্যস্ত ছিল না দর্শককুল। নিজে খুবই ভালো গান গাইতে পারতেন এবং কতখানি সংগীতবোধ তাঁর ছিল, তা তো ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবিতে উত্তমকুমারের সুরারোপিত গানগুলি শুনলেই বোঝা যায়। এর ফলে, গানের সঙ্গে ঠোঁট নাড়ার ক্ষেত্রে, তিনি উচ্চচতম মানে পৌঁছেছিলেন। কী অসম্ভব নিষ্ঠা অভিনয় সংক্রান্ত বিষয়ে সারাজীবন দেখাতে পারলে, তবেই এই উচ্চচতায় পৌঁছোনো সম্ভব, তা সহজেই অনুমেয়। একটি দূরদর্শন সাক্ষাৎকারে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মান্না দে বলেছিলেন যে, একবার তাঁর সঙ্গে মুম্বইয়ের রাস্তায় উত্তমকুমারের দেখা হয়েছিল। উত্তমবাবু হাতে একটা টেপ রেকর্ডার নিয়ে ঘুরছিলেন। মান্না দে জিজ্ঞাসা করাতে, উত্তমকুমার বলেছিলেন, তখন ‘অ্যান্টনী ফিরিঙ্গি’ ছবির জন্য সদ্য রেকর্ড করা মান্না দে—র গাওয়া গানগুলি যখনই সময় পাচ্ছেন, বারবার শুনে ‘লিপিং’ প্র্যাকটিশ করছেন, যাতে স্যুটিং—এর সময়ে অভিনয়ে তা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। ভাবা যায়! অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার চরমতম নিদর্শন ছাড়া, একে আর কীইবা বলা যায়। এককথায়, ব্যক্তিগতভাবে যা মনে হয়, বাংলা ছবিতে হলিউডের ‘স্টার’ ঘরানাকে এক আদর্শ বাঙালির মোড়কে সফলতার সঙ্গে প্রথম এনেছিলেন উত্তমকুমার তাঁর অভিনয়শৈলীর মধ্য দিয়ে।

    বিশ্ববন্দিত সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘নায়ক’ ছবির মধ্য দিয়ে যেন এই হলিউড স্টার উত্তমকুমারকেই অসাধারণভাবে তুলে ধরেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের মতো চিত্র পরিচালকেরা সাধারণত চিত্রনাট্য রচনা করে তার চরিত্রোপযোগী অভিনেতা—অভিনেত্রীদেরই নির্বাচন করে থাকেন। ‘নায়ক’ ছবির ক্ষেত্রে, কিন্তু উত্তমকুমারের সব কিছু বজায় রেখে সত্যজিৎ চরিত্রটি নির্মাণ করেন। একথা, তিনি নিজেই বলেছেন। এর ফলে, দুই অসামান্য সৃষ্টিশীল প্রতিভাধরের প্রতিভার এক অপূর্ব বিনিময় ঘটে যেন ছবিতে। একইরকম বিনিময় আমরা দেখি সত্যজিৎ রায়—ছবি বিশ্বাস (‘জলসাঘর’) বা সত্যজিৎ রায়—তুলসী চক্রবর্তী (‘পরশপাথর’)—র ক্ষেত্রে। বিশেষ করে, একজন অভিনেতার কাছে, এ যে কতখানি সম্মানের তা বলে বোঝানো যায় না। এখান থেকেই বোধহয় উত্তমকুমারদের মতো অভিনেতারা বহুর মধ্যে এক হয়ে ওঠেন। মৃত্যুর ৩৩ বছর পরও, এই কারণেই বোধহয় উত্তমকুমার আমাদের মধ্যে এতখানি জীবন্ত হয়ে থাকতে পারেন। এ হেন ঈশ্বরপ্রতিম অভিনেতার আত্মজীবনীর সম্পাদনার কাজে নিজেকে যুক্ত রাখতে পেরে, সত্যিই নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে।

    সবশেষে বলি, এই বইয়ের শেষে কিছু প্রাসঙ্গিক টীকাকরণ ও উত্তমকুমারের জীবনীপঞ্জি ও কর্মপঞ্জির একটি সাধ্যমতো বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সম্পাদক হিসেবে কখনওই দাবি করছি না, যা দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ।

    একটা কথা মনে রাখতে হবে, এটি কিন্তু উত্তমকুমারের আংশিক আত্মজীবনী (১৯৬২ সাল অবধি)। সম্পাদনার ক্ষেত্রে, যেসব ত্রুটি রয়ে গেল, তার জন্য পাঠকবর্গের কাছে আগাম মার্জনা চেয়ে রাখলাম। উত্তমকুমারের পরিবারবর্গ, প্রকাশক সহ বইটি নির্মাণে সমস্ত সাহায্যকারী ও উৎসাহদাতাদের উদ্দেশ্যে পুনরায় আমার কৃতজ্ঞতা জানালাম। সবশেষে, প্রণাম জানালাম চিরভাস্বর চিরনায়ক উত্তমকুমারকে।

    ১৮.১.২০১৩
    অভীক চট্টোপাধ্যায়
  • গোচারণের মাঠ

    গোচারণের মাঠ

    অক্ষয়চন্দ্র সরকার

    গোচারণের মাঠ

    ‘গোচারণের মাঠ’ শ্রীঅক্ষয়চন্দ্র সরকার রচিত যুক্তাক্ষর বর্জিত শিশুপাঠ্য কাব্যগ্রন্থ, এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১২৮৭ বঙ্গাব্দে, ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে। কাব্যখানি চুঁচুড়া থেকে সাধারণী যন্ত্রালয়ে শ্রীনন্দলাল বসু কর্ত্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছিল; মূল্য রাখা হয়েছিল ৵৹ দুই আনা মাত্র। দুষ্প্রাপ্য এই কাব্যখানির প্রচ্ছদ ও অন্যান্য বিষয়ে তেমন কিছু জানা যায়নি।

    ভূমিকা

    শ্রীযুক্ত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, এই ‘গোচারণের মাঠ’ পড়িয়া আমাকে যে পত্র লেখেন তাহা ভূমিকা স্বরূপ প্রকাশ করিলাম, ইহাতে আর কিছু না হয়, আমার আশার এবং আক্ষেপের কথা ব্যক্ত করিবে।

    শ্রীঅক্ষয়চন্দ্র সরকার।

    আশীর্ব্বাদ বিজ্ঞাপনঞ্চ বিশেষঃ

    তোমার গোচারণের মাঠ পড়িয়াছি। ২৪ পৃষ্ঠা কাব্য খানির মধ্যে একটিও যুক্তাক্ষর নাই;—বাঙ্গালী ভাষা তোমার আজ্ঞাধীন, যদি ইহা প্রমাণ করিবার জন্য লিখিয়া থাক, তবে তোমার অভিপ্রায় সিদ্ধ হইয়াছে স্বীকার করিতে হইবে।

    তোমার উদ্দেশ্য যাহাই হউক, যুক্ত অক্ষর ছাড়িয়া দেওয়াতে একটা বড় সুফল ফলিয়াছে। অতি সরল বাঙ্গালী ভাষায় কাব্য খানি লিখিত হইয়াছে। বাঙ্গালা ভাষায় যে সকল শব্দে যুক্ত অক্ষর আছে, সে গুলি প্রায় সংস্কৃত মুলক। অতএব যুক্ত-অক্ষর পরিত্যাগ করিলে কাজে কাজেই কট মট, সংস্কৃতবহুল ভাষাও পরিত্যক্ত হয়; যে সরল বাঙ্গালায় লোকে কথা বার্ত্তা কয়, সেই ভাষা আসিয়া পড়ে। ভাষা সম্বন্ধে ইহা সামান্য লাভ নহে। যত দিন না প্রচলিত বাঙ্গালায় বহি লেখার পদ্ধতি চলিত হয়, তত দিন সাধারণ লোকে বহি পড়িবে না; সাধারণ লোকে বহি না পড়িলে, লেখার উদ্দেশ্য সফল হইবে না, আর ভাষারও প্রকৃত পুষ্টিলাভ হইবে না।

    এমন কথা বলি না, যে প্রচলিত বাঙ্গালায় যুক্ত-অক্ষর নাই; বা যুক্ত অক্ষর বিরল। যুক্ত-অক্ষর ছাড়িয়া দিলে, এমন কি অধিক ক্ষণ কথা বার্ত্তা চলে না। তবে চলিত বাঙ্গালায় যুক্ত-অক্ষর কম, কেতাবি বাঙ্গালায় বেশী। তুমি দেখাইয়াছ, যে যুক্ত-অক্ষর একেবারে ছাড়িয়া দিয়াও ভাল ভাষায় ভাল কাব্য লেখা যায়।

    যুক্ত-অক্ষর ছাড়িয়া দিয়া কবিতা লেখা, এই প্রথম নহে তাহা আমি জানি; “পাখী সব করে রব রাতি পোহাইল”—প্রভৃতি সকলেরই মনে আছে, আর তার পরও কোন কোন লেখক অসংযুক্ত বর্ণে কবিতা লিখিয়াছেন, এমনও স্মরণ হইতেছে। কিন্তু সে সকলের সঙ্গে তুলনায় “গোচারণের মাঠের” একটি বিশেষ প্রভেদ আছে। সে গুলি ছন্দোবিশিষ্ট হইলেও, কবিতা নহে।—কবিত্ব সেগুলিতে প্রায় নাই। যে সকল শিশুরা যুক্ত অক্ষর ভাল পড়িতে পারে না, তাহাদিগের কাব্য পাঠের জন্যই সে গুলি লেখা হইয়াছে। কিন্তু ছেলেদের কবিত্ব-হীন কাব্য পড়াইয়া কোন লাভ আছে কি না—আমার সন্দেহ। লোকের বিশ্বাস আছে যে ছন্দ ও মিল বিশিষ্ট রচনায় ছেলেদের মন হরণ করে, সেই জন্য গদ্য অপেক্ষা পদ্য পড়িতে ছেলেরা ভাল বাসিতে পারে। কিন্তু ফলে কি তাই? আমিত কোন শিক্ষকের মুখে শুনি নাই যে ছেলেরা গদ্যপাঠ অপেক্ষায় পদ্যপাঠে অধিক মনযোগী হয়। বোধ হয়, যত দিন ছেলেরা পাঠ্য পদ্যে কর্কশ উপদেশ, আর নীরস বর্ণনা ভিন্ন আর কিছুই পাইবে না, তত দিন গদ্যে পদ্যে তাহাদের সমান আদর বা অনাদর থাকিবে। ফলে, কবিত্ব-শূন্য কাব্য ছেলেদের পড়ান বিড়ম্বনা মাত্র। বিদ্যালয়ে কাব্য গ্রন্থ পড়াইবার উদ্দেশ্য কি? সাধারণ লোকের বিশ্বাস যে কাব্যে ভাষা শিক্ষা ভাল হয়। পোপের প্রাচীন কথার দ্বারা অনেকে এ সংস্কার সমূলক বলিয়া প্রমাণ করিতে চান। বিদেশীয় ভাষার পক্ষে ইহা সত্য হইলে হইতে পারে, দেশীয় ভাষার পক্ষে তত সত্য কি না,—আমার সন্দেহ। বালককে কাব্য পড়াইবার এক মাত্র উদ্দেশ্য—আমি স্বীকার করি—কাব্যের উন্নত ভাবের দ্বারা চিত্তশুদ্ধি। ইহা কেবল পদ্যের দ্বারা সিদ্ধ হয় না—কবিত্বের প্রয়োজন। তোমার এই “গোচারণের মাঠ” অতি সরল ভাষায় লিখিত হইলেও, কবিত্ব-পূর্ণ। অনেক স্থানে উঁচু দরের কবিত্ব ইহাতে দেখিয়াছি। ছেলেদের যদি কাব্য পড়াইতে হয়, তবে এই খানিই তাহার উপযোগী। কিন্তু তাই বলিয়া, ইহা যে এ দেশের পাঠশাল স্কুলে চলিবে এমন ভরসা আমি করি না। যদি চলে তবে আমি বিস্মিত হইব। যাহা চলিবার যোগ্য তাহা চলিবে, শিক্ষা বিভাগের এমন নিয়ম নহে। শিক্ষা বিভাগে কেন, যাহা চলিবার যোগ্য তাহা তুমি কোথায় চলিতে দেখিয়াছ?

    চুঁচুড়া,
    ২২এ বৈশাখ, ১২৮৭
    শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
  • এ ডলস হাউস

    এ ডলস হাউস

    এ ডলস হাউস

    মূল: অগাস্ট স্ট্রিনডবার্গ।
    অনুবাদ : মাহবুব সিদ্দিকী।

    এ ডলস হাউস (ইবসেনের পুতুল যেখানে ব্রাত্য হয়ে রয়)। মূল: অগাস্ট স্ট্রিনডবার্গ। অনুবাদ : মাহবুব সিদ্দিকী। প্রথম প্রকাশ : একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯ ফায়ূন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। উৎসর্গ : ডাহুক নদীকে

    মুখবন্ধ

    মুখবন্ধ

    সময়টা নারী অধিকার আন্দোলনের মোটামুটি গোড়ার দিকের। হেনরিক ইবসেনের ‘এ ডলস হাউস’(১৮৭৯) চারদিকে ভীষণ সাড়া ফেলেছে তখন। নারীনেত্রীরা এবং অতি অবশ্যই নারীবাদীরা একে যেন রাতারাতি নিজেদের আন্দোলনের ম্যানিফেস্টো বানিয়ে ফেললেন। নোরার গৃহত্যাগ যেন গোটা ইউরোপীয়-নারী-সমাজের আদর্শ হয়ে উঠল। সেই সাথে নারী অধিকার আন্দোলনেও যোগ হতে থাকল নতুন নতুন মাত্রা। সমাজ, সংসার, বিয়ে সবকিছুকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন তাঁরা; নানা অসংগতি আর জটিলতা খুঁজে বের করতে থাকলেন। কিন্তু এ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের কখন যে তাঁরা ‘এক্সট্রিমিস্ট’ হয়ে উঠলেন, তা নিজেরাও বুঝতে পারলেন না। ফলে, জগৎ সংসারের সমস্ত দোষ গিয়ে পড়ল পুরুষের ঘাড়ে! আর, নারীর অবস্থান হল যাবতীয় সমালোচনার উর্ধ্বে। ফলে, এ আন্দোলনে বস্তুত নিরপেক্ষতা বলতে কিছু রইল না, এবং স্বাভাবিকভাবেই নারী-পুরুষকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো হল। বাড়তে থাকল বিবাহ-বিচ্ছেদ আর সাংসারিক অশান্তি…

    কিন্তু আসলেই কি সব দোষ পুরুষের? কিংবা, সব দোষ নারীর বললেও কি তা যথার্থ হবে? নাকি, দোষ-ত্রুটিগুলো সম্পূর্ণ মানবিক এবং প্রাকৃতিক? এ প্রশ্নগুলোই অগাস্ট স্ট্রিনডবার্গ তুললেন তাঁর ছোটগল্পের মাধ্যমে। ঐ সময় অবশ্য কোন বই আকারে তিনি গল্পগুলো লেখেননি, বরং, প্রতিটি গল্প আলাদাভাবে প্রকাশিত। পরবর্তীতে, ১৮৮৪ সালে এরকম বেশ কতগুলো গল্পকে ‘গেটিং ম্যারেড’ নামে দু’মলাটে আবদ্ধ করা হয়। যে-কারণে কতগুলো গল্পের কাহিনিতে কিছুটা সাদৃশ্য পাওয়া যায়। অবশ্য, এর অন্য কারণও ছিল–ঐ সময়ে নারীবাদীরা উঠেপড়ে লেগেছিলেন ‘বিয়ে’ সম্পর্কটাকে ‘মালিক-দাসী’ সম্পর্ক হিসেবে দেখাতে। স্ট্রিনডবার্গের কাছে একে নিতান্ত অমূলক মনে হয়েছে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের পরিপূরক; কেউ কারো মালিক বা দাসী নয়, বরং, ক্ষেত্রভেদে একে-অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এ নির্ভরশীলতা মানে অক্ষমতা নয়, ভালোবাসার পূর্ণতা। নারী-পুরুষকে নারীবাদীরা যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামিয়েছেন, স্ট্রিনডবার্গ সেখানে খুঁজে পেয়েছেন সহযোগিতা।

    এ ডলস্ হাউস গল্পটি স্ট্রিনবার্গ লিখেছিলেন হেনরিক ইবসেন লিখিত ঐ একই নামের বিখ্যাত নাটকটির প্রতিক্রিয়া হিসেবে। যদিও অতি সাম্প্রতিককালে নাটকটির বিষয়বস্তু নিয়ে কিছুটা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে; প্রশ্ন উঠেছে–ইবসেন নিজে নোরাকে অধিকারবঞ্চিত দেখাতে চেয়েছেন, নাকি নারীবাদীরা নিজেদের মত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে নিয়েছেন? (কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের Female Power and Some Ibsen Plays ago দ্রষ্টব্য) কিন্তু ঐ সময়ের প্রচলিত ব্যাখ্যায় (নারীবাদী ব্যাখ্যা) স্ট্রিনবার্গ ভীষণ বিরক্ত হয়েছিলেন। সে-কারণেই, ঐ নামের ছোটগল্প লিখে দেখাতে চাইলেন–নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলা মানেই নারীদের প্রতি কোন অন্ধ পক্ষপাতিত্বে পৌঁছানো নয়। সংসারে ভুল-ত্রুটি সবারই থাকে, একে যেকোন একপক্ষের বিরুদ্ধে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করাটা আসলে এক ধরনের গোড়ামি।

    পরিবর্তনের প্রচেষ্টায়, দেনা-পাওনা, বিবাহিত এবং অবিবাহিত, এবং প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা গল্পগুলোতে স্ট্রিনবার্গ ঐ সময়ের তথাকথিত নারী আন্দোলনকে ব্যাঙ্গ করেছেন। নারীবাদীরা কীভাবে ভীষণ অযৌক্তিক আচরণ করেছেন সেটাই দেখাতে চেয়েছেন। ফলে, এ গল্পগুলোর কাহিনি মোটামুটি একই রকম–প্রতিটি গল্পে তিনি নারীবাদীদের ‘আদর্শ সংসার’ কে প্লট হিসেবে নিয়েছেন; অতঃপর বাস্তবতার আলোকে সে ‘আদর্শ সংসার’ ধারণার ত্রুটিগুলো দেখিয়েছেন।

    স্ট্রিনডবার্গের নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার প্রচেষ্টা ফুটে ওঠে ক্ষতিপূরণ, বিবাহ অনিবার্য এবং ফিনিক্স গল্পগুলো পড়লে। এ গল্পগুলোতে, তিনি পুরুষের দোষগুলো সামনে এনে নারীর অবস্থানের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। সেইসঙ্গে, সামনে এনেছেন এক নির্মম সত্যকে নারী-পুরুষের অবস্থানগত দ্বন্দ্ব যদি থেকেই থাকে, তবে তার দায় এককভাবে নারী বা পুরুষ কারোরই নয়, বরং, চিরায়ত এ অবস্থান তৈরিতে পরিবার এক বিরাট ভূমিকা রাখে, যেখানে নারীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রকট হয় নারীরই আরেক রূপ (বউ-শাশুড়ি, ননদ-ভাবী ইত্যাদি)। তাই, সত্যিকার পরিবর্তন চাইলে, পরিবর্তনটা আনতে হবে পরিবার সম্পর্কিত সামগ্রিক চিন্তা-ভাবনায়, শুধুমাত্র পুরুষের দিকে আঙুল তুললে সেটা অন্যায় হবে।

    অপ্রাকৃতিক নির্বাচন এবং রোমিও অ্যান্ড জুলিয়া গল্প দুটোর প্লট সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথমটিতে উঠে এসেছে শ্রেণি-বৈষম্য, এবং সেইসাথে আবারও প্রমাণিত হয়েছে, স্ট্রিনডবার্গ সবসময়ই নির্যাতিতের পক্ষে ছিলেন। তাঁর কলম সব সময় ন্যায়ের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। দ্বিতীয় গল্পটি একটি মধুর দাম্পত্য সম্পর্কের গল্প। হয়ত, এটাই স্ট্রিনডবার্গের ‘আদর্শ দাম্পত্য সম্পর্ক, যেখানে ভালোবাসা আছে, আবার ভিন্নমতও আছে; রোমন্থন আছে, খুনসুটিও আছে, এবং দিনশেষে অবশ্যই দুজনের মুখে হাসি আছে।

    যাহোক, প্রতিটি গল্পে স্ট্রিনর্গের বিশ্লেষণী ক্ষমতা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। গল্পগুলোতে হয়ত কিছু বিষয়ের পুনরাবৃত্তি লক্ষণীয়; কিংবা, কিছু গল্পে হয়ত হেনরিক ইবসেনকে একটু বেশিই খোঁচানো হয়েছে; তবু মানতেই হয়, নারী অধিকারের দোহাই দিয়ে যে ‘এক্সট্রিমিজম’ শুরু হয়েছিল তা থেকে বেরিয়ে এসে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ করে দেয় অগাস্ট স্ট্রিনবার্গের ‘গেটিং ম্যারেড’।

    “এক ভাষার সাহিত্যকর্ম অন্য ভাষায় পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলা কখনোই সম্ভব নয়” কথাটা হয়ত আংশিক সত্য। পুরো সত্যটা হচ্ছে, সাহিত্যরস আস্বাদনের ক্ষমতা যার রয়েছে তার জন্য ভাষা কোন বাধা নয়। ব্যক্তিগত জীবনে অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ মানুষটা ছিলেন ক্ষ্যাপাটে প্রকৃতির। তাঁর লেখাতেও সে ছাপ বেশ গাঢ়ভাবেই পাওয়া যায়। তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে আমি তাই দেখার চেষ্টা করেছি সেই ক্ষ্যাপাটে মানুষটাকে, বুঝতে চেয়েছি তাঁর বোধকে। গল্পগুলো অনুবাদ করতে গিয়েও এ-স্বাধীনতাটুকু আমি অক্ষুণ্ণ রেখেছি–পাঠকের সামনে স্ট্রিন্ডবার্গকে মূর্তিমান করতে তাঁর গল্পের বক্তব্যকেই অনুবাদ করেছি, লাইনকে করিনি। আশা করি, পাঠক একে সুদৃষ্টিতে দেখবেন। তবুওততা একদিনে ‘মেঘনাদবধ হয় না–গল্পগুলোর অনুবাদে কোথাও কোন অসঙ্গতি চোখে পড়লে নির্দ্বিধায় জানাবেন। পরবর্তী অনুবাদকে আরও সমৃদ্ধ করতে আপনাদের পরামর্শগুলো পথনির্দেশনা হিসেবেই গৃহীত হবে।

    মূল বইয়ের সবগুলো গল্পের অনুবাদ এখানে নেই। বাছাইকৃত দশটি গল্প নেয়া হয়েছে। ফলে মূল নামটিও–গেটিং ম্যারেড–এখানে ব্যবহার করা হয়নি। বরং বইয়ের সবচেয়ে আলোচিত–এ ডলস্ হাউস–গল্পটিই বইয়ের শিরোনাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। পাঠকের গ্রহণ/অগ্রহণই বলে দেবে অবশিষ্ট গল্পগুলোর পরিণতি কী হবে…

    ঢাকা
    ২২ আগস্ট ২০১৬ ইং
    মাহবুব সিদ্দিকী

    ভূমিকা

    ভূমিকা

    অগাস্ট স্ট্রিনবার্গ বাংলাদেশী পাঠক মহলে খুব বেশি পরিচিত না হলেও বিশ্বসাহিত্যে অত্যন্ত সমাদৃত একজন সৃজনশীল মানুষ। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক প্রভৃতি শাখায় বিচরণ থাকলেও মূলত নাট্যকার হিসেবেই তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বেশি। এ বইতে অবশ্য পাঠক তাঁর গল্পকার সত্তার সঙ্গেই পরিচিত হবেন। তবে, আমার কাছে অগাস্ট স্ট্রিনড়বার্গ সবসময়ই একজন প্রতিবাদী মানুষের প্রতিভূ। সে অর্থে আমাদের নজরুলের সঙ্গে তাঁর ভীষণ সাযুজ্য খুঁজে পাই, যিনি সকল প্রতিকূলতার মাঝেও সাম্যের গান গেয়েছেন, বলেছেন–“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” কিন্তু সাম্যের নামে যখন নারী-পুরুষকে পরস্পরের বিরুদ্ধাচারী দেখিয়ে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা, দায়িত্ব-কর্তব্য, সমঝোতাকে দাঁড়িপাল্লায় তোলা হতে লাগলো, হেনরিক ইবসেনের তথাকথিত ‘নারীবাদী নাটকগুলোর দোহাই দিয়ে সম্পর্কগুলো সংজ্ঞায়িত হতে লাগলো এককভাবে নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে, তখনই অগাস্ট স্ট্রিনবার্গ তাঁর চিরচেনা প্রতিবাদী মূর্তিতে আবির্ভূত হলেন। পাঠকের সামনে উপস্থাপন করলেন এমন কিছু সূক্ষ্মাতিসূক্ষ বিষয়কে যেগুলো এড়িয়ে গিয়ে কতিপয় গত্বাঁধা স্থূল-বিষয় নিয়ে সে সময় নারী আন্দোলন দানা বাঁধছিল। স্ট্রিনডবার্গ মনে করতেন, আন্দোলন ব্যাপারটি নিরপেক্ষ; এর শুরুতে ‘নারী বা ‘পুরুষ যেকোন শব্দ জুড়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে সেটিকে একপাক্ষিক করে ফেলা, আর এ ধরনের আন্দোলনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় পোষণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। যদিও স্ট্রিনড়বার্গের ব্যক্তিগত জীবন পর্যালোচনায় দেখা যায়, জীবনের এক পর্যায়ে তিনি ভীষণ নারী-বিদ্বেষী হয়ে গিয়েছিলেন কিন্তু এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, সেসময় তিনি পুরোপুরি মানসিক বিকারগ্রস্থ ছিলেন এবং তাঁর গল্পগুলো সে সময়ের অনেক আগে লেখা। যাহোক, আমার মনে হয় বাংলাদেশেও বর্তমানে স্ট্রিনর্গের সময়ের মত একটি একপেশে ধারা চলছে। অনেকটা বোধহয় জোর করেই নারী-পুরুষ সম্পর্কটাকে বারবার আতশি কাঁচের নিচে আনা হচ্ছে এবং পুরুষ কিংবা পুরুষতান্ত্রিক শব্দগুলোকে ঋণাত্বক হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ চেষ্টার চালিকাশক্তি হিসেবে গতানুগতিকভাবেই হেনরিক ইবসেনের নাটকগুলোকে ব্যবহার করা হয়। অথচ ইবসেনের বক্তব্য যে ভিন্ন আঙ্গিক থেকেও উপস্থাপন সম্ভব, কিংবা নাটকগুলোর সূক্ষতর বিশ্লেষণ যে অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের বিপক্ষে যেতে পারে এই চিন্তাটি কিন্তু করা হয় না। আমি অবশ্য মনে করি, কোন বিষয়ে নারী বা পুরুষ যে কারো ভুল দেখতে পাওয়া মানেই তার অবস্থান নিচু বা ঋণাত্বক হয়ে যাওয়া নয়। এতে বরং এটাই প্রমাণিত হয় যে, তারা মনুষ্যত্বের সীমার মধ্যেই রয়েছেন, কারণ, “মানুষ মাত্রই ভুল হয়।” কিন্তু এই ভুলগুলোকে যারা খুব বেশি বড় করে তোলেন তারা বুঝতে চান না–বিপরীতপ্রান্তে দাঁড়ানো মানুষটিকে ক্রমাগত অসহনীয় হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা প্রকারান্তরে নিজের অবিবেচকতাকেই প্রকট করে তোলা। তাই, সময় এসেছে ‘জেন্ডার বিষয়টিকে নতুনতর আলোকে চিন্তা করার; এবং তার অংশ হিসেবে স্ট্রিনবার্গ-পাঠ যথেষ্ট ফলদায়ী হবে বলেই আমার ধারনা। সে হিসেবে স্ট্রিনবার্গের গল্প নিয়ে বই প্রকাশ করা একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলে মনে করছি।

    আমাদের দেশে অনুবাদ-সাহিত্য দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিকাশমান মাধ্যম। বলা হয়ে থাকে, মৌলিক লেখার চেয়ে অনুবাদের ক্ষেত্রে মেধা, মনন আর শ্রমের খরচ বেশি হয়। অনুবাদ কেবলমাত্র ভাষান্তর নয়, এর সঙ্গে ভাবেরও প্রয়োজন। এজন্য অনুবাদকের সাহিত্যজ্ঞান প্রখর হওয়া আবশ্যক। অন্যথায়, এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় লেখা রূপান্তরিত হবে ঠিকই, কিন্তু লেখার মাঝে প্রাণ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠবে। একটি সার্থক অনুবাদ তার শিল্পগুণে হয়ে ওঠে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যকর্ম। তাই স্বপ্রণোদিত হয়ে অনুবাদের দীর্ঘযাত্রার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার অভিলাষে যারা উদ্যোগী হন, তাদের সাধুবাদ জানানো প্রত্যেক সচেতন বইপ্রেমির নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত। অনুবাদক শুধু বিদেশী সাহিত্যটিকে নয়, সেদেশের সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা, ব্যক্তিসম্পর্ক, প্রতিবেশের সাথে নিজ ভাষার পাঠককে পরিচিত করানোর ভূমিকাটিও পালন করেন। সে বিবেচনায় অনুবাদক আদতে একজন ভ্রমণ প্রদর্শক। পাঠকের প্রশান্তিই অনুবাদকের পরিতৃপ্তি।

    মাহবুব সিদ্দিকী বয়সে তরুণ, নিজে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন এবং পেশাগত জীবনেও তার ছাপ বজায় রাখতে শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। পেশাদার অনুবাদক তিনি নন, আমি বলবো এটি একটি শুভবার্তা। কারণ, পেশাদার অনুবাদক মানে এই কাজটির মাধ্যমেই তার জীবিকার সংস্থান হয়। ফলে, যত বেশি সম্ভব অনুবাদ তাকে করতে হয় একটি সীমিত ব্যবধিতে। সেক্ষেত্রে কোয়ালিটি বনাম কোয়ান্টিটি এর চিরন্তন সংঘাতে তাকে মধ্যবর্তী একটি সমঝোতায় আসতে হয়। মাহবুব সিদ্দিকীর সেই বাস্তবতা নেই, তিনি অনুবাদ করেছেন গভীর আন্তরিকতা থেকে। ফলে, যত্ন এবং নিষ্ঠার সমন্বয়ে গুণগত উৎকর্ষের একটি মাত্রায় পৌঁছতে তাঁর প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। আমার সুযোগ ঘটেছিল তাঁর অনুবাদের প্রাথমিক পাণ্ডুলিপিটি পড়বার। পাঠ পরবর্তীতে অনুবাদের কিছু অংশের ব্যাপারে তাঁকে মতামত দিই যেখানে আরেকটু উন্নতির সুযোগ রয়েছে। সেই পরিক্রমায় জানতে পারি, শুধু আমি একা নই, তাঁর পাণ্ডুলিপি পাঠকের তালিকায় ছিলেন আরও বেশ ক’জন সাহিত্যানুরাগী, যাদের প্রত্যেকের মতামতের ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল থেকে অনুবাদে প্রয়োজনীয় পরিমার্জনার কাজটি করা হয়েছে। একটি অনুবাদ প্রকল্পে এতজন মানুষের মতামত নিয়ে সেই অনুযায়ী সংশোধনের পদক্ষেপ নেয়া কাজটির প্রতি অনুবাদকের শতভাগ নিবেদনকেই স্বতঃসিদ্ধ করে। তাই, মাহবুব সিদ্দিকী ভবিষ্যতেও অনুবাদের কাজটি অব্যাহত রাখলে আমাদের অনুবাদ-সাহিত্য যে আরও সমৃদ্ধ হবে এ ব্যাপারে নিঃসংশয়েই অভিমত ব্যক্ত করা যায়। প্রতিক্রিয়া একজন শিল্পীর কাজের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। অনুবাদকও তো একজন শিল্পীই বটে।

    যেহেতু এটি তাঁর প্রথম কাজ, পাঠক যদি উৎসাহসূচক মতামত দেন সেটি হয়তো তাঁর অন্তর্নিহিত শিল্পচেতনাকে আরও তেজোদ্দীপ্ত করবে। আমাদের দেশে অভিযোগ করা মানুষের সংখ্যা অগণিত, তুলনায় উৎসাহ দেবার মানুষের সংখ্যা কম। এই সরলীকৃত প্রবণতার বাইরে থেকেই পাঠক তরুণ অনুবাদকের প্রয়াসকে মূল্যায়ন করুক, এটিই প্রত্যাশা। অগাস্ট স্ট্রিনর্গের প্রতি আরও একবার শ্রদ্ধা জানাই, এবং সেই সাথে মাহবুব সিদ্দিকীর জন্যও শুভকামনা রইলো।

    ড. কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়

    অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

    ইংরেজি বিভাগ

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    কৃতজ্ঞতা

    কৃতজ্ঞতা

    শ্রদ্ধেয় ড.কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় স্যার, যার সুবাদে অগাস্ট স্ট্রিনডবার্গকে চিনেছি। স্যার না-থাকলে হয়ত স্ট্রিনবার্গ আমার কাছে ‘স্ট্রেঞ্জার থেকে যেত। সেই সঙ্গে, আরও একজন মানুষের নাম না করলেই নয়–শ্রদ্ধেয় শেখ আলাউদ্দিন স্যার। গল্পগুলো ছাপার অক্ষরে পাঠকের হাতে পৌঁছানোর আগে স্যার পড়ে না-দিলে বুঝতেই পারতাম না, ‘আ-কার, ‘এ-কার’, ‘হ্রস্ব ই কার’, ‘দীর্ঘ ঈ-কার’ নিয়ে আমার দীর্ঘদিনের বিভ্রান্তি রয়েছে।

    ভাইয়া (মাহফুজ সিদ্দিকী) কে আনুষ্ঠানিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানালে সেটা ন্যাকামো হবে কি না জানি না, ভাইয়া হয়ত পাকামোও বলতে পারে; তবুও, গল্পগুলো পড়ে দিয়ে, দরকার মতো মন্তব্য করে এবং আরও নানাবিধ উপায়ে সহযোগিতা করে এগুলোর কাঠামো দাঁড় করাতে ভাইয়া যে ভূমিকা রেখেছে সেজন্য আমার পক্ষ থেকে যেকোনো রকম অনুভূতি প্রকাশ পেলে দিনশেষে তার নাম কৃতজ্ঞতা-ই হবে।

    ঢাকা
    ২৩ আগস্ট, ২০১৬
    মাহবুব সিদ্দিকী

    অগাস্ট স্ট্রিনডবার্গ

    অগাস্ট স্ট্রিনডবার্গ

    অগাস্ট স্ট্রিনডবার্গকে বলা হয় আধুনিক সুইডিশ সাহিত্যের জনক। ১৮৪৯ সালের ২২ জানুয়ারি সুইডেনের স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করা এ মানুষটি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। একাধারে তিনি নাট্যকার, গল্পকার, চিত্রকর, ঔপন্যাসিক এবং কবি। চার দশকেরও বেশি সময়জুড়ে সুইডিশ সাহিত্যাঙ্গন দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। আজও তাঁর সৃষ্টিকর্ম তাঁর সময়ের মতই প্রাণবন্ত এবং যুগোপযোগী। দাপিয়ে বেড়ানো’ কথাটা আক্ষরিক অর্থেই স্ট্রিনডবার্গের সঙ্গে ভীষণভাবে মানানসই। কারণ, প্রচলিত বিশ্বাস আর ধ্যানধারণাকে তিনি অনবরত আঘাত করেছেন তাঁর কলম আর তুলির আঁচড়ে। ব্যক্তিজীবনেও ছিলেন একগুঁয়েরকম স্বাধীনচেতা। নিজেকে প্রচলিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধাচারী ঘোষণা করে তিনি বলতেন–“জীবনের জটিলতার জালে আমরা এত বিশ্রীভাবে জড়িয়ে পড়েছি যে, এ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়া কখনোই সম্ভব নয়। সবকিছু জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুনভাবে, সুন্দর করে শুরু করতে হবে।” এ অনুভূতি থেকেই হয়তো জীবনব্যাপী সাহিত্যকর্ম নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। গল্প, নাটক আর কবিতার বিষয়বস্তুকে বিভিন্ন সময়ে ভিন্নতর আঙ্গিকে প্রকাশ করেছেন। তবে, তিনি সব সময়ই ‘প্রাকৃতিক নিয়ম’(Natural Law) কথাটায় বিশ্বাস করতেন। বিশ্বাস করতেন, আরোপিত কোন মতামত বা বক্তব্য কখনোই মানুষের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। একে উল্লেখ করেছেন ‘বৃহত্তর প্রাকৃতিকতাবাদ’ (Greater Naturalism) হিসেবে। নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাস করতেন, কিন্তু সে সমতার অর্থ এই নয় যে, নারী-পুরুষকে একই কাজ করতে হবে। নারী-পুরুষের মিলন নিয়েও প্রশংসনীয় দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাঁর। “দৈহিক মিলন কখনোই ‘কাম-নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত নয়, বরং, মানব মনের সুকুমার প্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত।” স্ট্রিনবার্গ আরোপিত নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন না। ফলে, তথাকথিত নারী আন্দোলন’ বা ‘নারী অধিকার’ শব্দগুলোর প্রতি ভীষণ বিরক্ত ছিলেন। উপরন্তু, এগুলোকে মানবজাতির মধ্যে বিভেদ-সৃষ্টিকারী মতবাদ মনে করতেন। কিন্তু মানুষ হিসেবে নারী এবং পুরুষ উভয়েরই যথাযোগ্য মর্যাদা পাওয়া উচিত বলে বিশ্বাস করতেন। এ বিশ্বাস থেকেই, ১৮৮৪ সালে সুইডিশ নারীদের ভোটাধিকার আদায়ে তিনি রীতিমত আন্দোলন করেছেন। অনেক সমালোচক স্ট্রিনবার্গকে ‘নারী-বিদ্বেষী’ বলে রায় দিলেও বাস্তবতার নিরিখে একে খারিজ করে দেওয়াই সমীচীন। কারণ, যে সময়ে তিনি নারীদের প্রতি প্রকাশ্য বিদ্বেষ প্রদর্শন করেছেন সে সময়ে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিলেন। অথচ তাঁর বিখ্যাত কাজগুলোর প্রায় সবই ঐ ভারসাম্যহীনতার আগে করা। সর্বোপরি, ‘নিরপেক্ষ অবস্থান বলে কিছু হয় না। লেখকের বক্তব্যকে কালের কষ্টিতে যাচাই করে নেওয়ার দায়িত্ব পাঠকের ওপর বর্তায়।

    স্ট্রিনডবার্গের বক্তব্যে ছিল ক্ষুরধার তীক্ষ্ণতা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কিছু বলাকে কখনোই বরদাস্ত করতে পারতেন না। ফলে, নরওয়ের বিখ্যাত নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের বর্ণনাবহুল নাটকগুলোকে ভীষণ অপছন্দ করতেন, সেগুলোর বিষয়বস্তু নিয়েও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। এ-নিয়ে দুজনের মধ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়েও শত্রুতার সৃষ্টি হয়েছিল–একে-অন্যকে খোঁচা দিলে বেশকিছু লেখালেখি করেছেন। তবে, স্ট্রিনবার্গের অনুসারীর সংখ্যাও কিন্তু নেহাত কম নয়। টেনিস উইলিয়ামস, এডওয়ার্ড অ্যালবি, ম্যাক্সিম গোর্কি, জন অসবর্নসহ অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক নিজেদের লেখালেখিতে স্ট্রিনবার্গের প্রভাব স্বীকার করেছেন। আমেরিকান নাট্যকার ইউজিন ও’নিল ১৯৩৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর স্ট্রিনডবার্গকে নিজের অনুপ্রেরণা হিসেবে স্বীকার করে তাঁকে ‘সবচাইতে প্রতিভাধর আধুনিক নাট্যকার’ (The greatest genius of all modern dramatists) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। যদিও তার বহু আগেই স্টিনডবার্গ চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। ১৯১১-তে নিউমোনিয়ায়। আক্রান্ত হন। সেরে ওঠার আগেই ‘কোলন ক্যান্সার’ ধরা পড়ে। বেশ কয়েক মাস শয্যাশায়ী থেকে ১৯১২ সালের ১৪ মে স্ট্রিনবার্গ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

    সুইডিশ সাহিত্য এবং বিশ্বসাহিত্য আজও তাঁকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

  • হৃদয়ের শব্দ

    হৃদয়ের শব্দ

    ইন্দ্রনীল সান্যাল

    [book]

    প্রথম প্রকাশ – জানুয়ারি ২০২০।

    প্রচ্ছদ ও অলংকরণ – কৃষ্ণেন্দু মণ্ডল।

    নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজের সমস্ত

    অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ

    ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষককে।

    কৃতজ্ঞতা স্বীকার

    লেখক ও চিকিৎসক দেবাঞ্জন সেনগুপ্ত, যে আমার ছোটবেলার বন্ধু। মেডিক্যালের ছাত্রী ত্বিষা চট্টোপাধ্যায় ওরফে গুঞ্জা, যে আমার আর এক বন্ধুর কন্যা। এই দুজন আমার এই উপন্যাসের পান্ডুলিপি পড়ে নানা পরামর্শ দিয়েছে। সেগুলো আমি গ্রহণও করেছি। তারপরেও যদি তথ্যগত ত্রুটি থেকে যায়, তার দায় সম্পূর্ণ ভাবে আমার। পত্রভারতী গ্রুপের সকল সদস্যকেও কৃতজ্ঞতা জানাই। তাঁদের

    সমবেত প্রচেষ্টায় এই উপন্যাস গ্রন্থায়িত হল।

    এই উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ, শঙ্খ ঘোষ, অমিতাভ দাশগুপ্ত, বীরেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং জন লেননের কবিতার পংক্তি, কবিতার নাম অথবা গানের লাইন ব্যবহার করা হয়েছে।

    তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানাই।

    অভিজ্ঞানের লেখা কবিতাগুলির রচয়িতা আমি।

    “Two souls with but a single thought—

    Two hearts that beat as one!’’

    — John Keats

    বিধিসম্মত সতর্কীকরণ

    এটা উপন্যাসে বর্ণিত চরিত্রদের নাম, পেশা, বাসস্থান; কাহিনিতে বর্ণিত রাজনৈতিক দলের নাম; চিকিৎসা সংক্রান্ত, পুলিশি এবং আইনি কার্যকলাপ লেখকের কল্পনাপ্রসূত। জীবিত বা মৃত ব্যক্তি, সংগঠন বা বাস্তব ঘটনার সঙ্গে কোনওরকমের সাদৃশ্য একান্তই কাকতালীয়।

    নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়তে ঢুকি ১৯৮৫ সালে। ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছে ছিল এমনটা নয়। আমি প্রেসিডেন্সিতে ইংরিজিতে অনার্সের ফর্ম তুলেছিলাম। যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে কমপ্যারেটিভ লিটারেচার নিয়ে পড়ার ইচ্ছেও ছিল। কারণ আমি লেখালিখির জগতে আসতে চেয়েছিলাম।

    আমার থেকে দশ বছরের বড় দাদা এবং মা মিলে ঘাড় ধরে ঢুকিয়ে দিল ডাক্তারি পড়তে। সেই যে সাহিত্য জগত থেকে নির্বাসন ঘটল, সেটা চলল ২০০৪ সাল পর্যন্ত।

    কী ভাবে? ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ডাক্তারি পড়াশুনো। পরের দু’বছর ইনটার্নশিপ ও হাউসস্টাফশিপ। কলেজ জীবনের সাত বছর আমি ছিলাম, আক্ষরিক অর্থে আউটসাইডার। পড়াশুনো করতাম, রাজনীতি করতাম, টুকটাক প্রেমও করেছি। কিন্তু জীবন সম্পর্কে আশ্চর্য এক উদাসীনতা কাজ করত। কাজ করত অন্তর্লীন বিষাদ। কলেজকে, শিক্ষকদের, সহপাঠীদের, সিনিয়র দাদা আর জুনিয়র ভাইদের দেখতাম কৌতূহল ভরে।

    ১৯৯৫ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান করলাম এবং পোস্টিং হল সন্দেশখালি ব্লকের জেলিয়াখালি নামের এক হেলথ সেন্টারে। সেটি একটি দ্বীপ। দাঁড় বওয়া নৌকো পেরিয়ে সেখানে পৌঁছতে হত। ইলেকট্রিসিটি পৌঁছয়নি। সেখানে ছিলাম পাঁচ বছর।

    ওই পাঁচটা বছর কী করে যে কাটিয়েছি সে আমিই জানি! হেলথ সেন্টারে থাকতাম। চিকিৎসা করার পাশাপাশি দিনে দশ থেকে বারো ঘণ্টা পড়তাম। প্র্যাকটিস করতাম না। বাড়ি আসতাম মাসে একবার। কাদায় হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া, তুমুল ঝড়ের সময় নদীতে নৌকা পারাপার, পালস পোলিও নিয়ে পঞ্চায়েত অফিসে মিটিং—এই সব মনে পড়ে। কলকাতা শহরের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।

    ২০০০ সালে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট এনট্রান্স পরীক্ষায় সফল হয়ে চলে এলাম কলকাতায়। পরের তিন বছর আবার অমানুষিক পড়াশুনো করতে হল। ২০০৩ সাল থেকে জীবন ছন্দে ফিরতে শুরু করল। ২০০৪ সালে তমলুক জেলা হাসপাতালে পোস্টিং হল। এবং আমার মনে পড়ে গেল, প্রায় কুড়ি বছর আগে নিজেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম—লিখব।

    তো, সেই ছিল লেখালিখির শুরু। ছোটগল্প থেকে বড় গল্প থেকে নভেলা থেকে উপন্যাস—সবই টুকটাক লিখে ফেলেছি। ২০১০ সাল নাগাদ মনে পড়ে গেল কলেজ জীবনের কথা। এবং দেখলাম, সব মনে আছে। আউটসাইডার হয়ে যে জীবন কাটিয়েছিলাম—সেটি মনের মধ্যে বুড়বুড়ি কাটছে, ফুলের মতো ফুটে উঠছে, পাখির ছানার মতো ডানা মেলতে চাইছে। মাথা ভর্তি অজস্র চেনা, অচেনা, আধোচেনা চরিত্র ঘুরপাক খাচ্ছে, স্লাইড শোয়ের মতো মনের পর্দায় আছড়ে পড়ছে একের পর এক ঘটনা।

    সত্যি কথা বলতে কি, এই উপন্যাস লেখার জন্যে আমাকে মাথা খেলাতে হয়নি। কম্পিউটারের কি বোর্ড টেপার কায়িক শ্রম ছাড়া কিছুই করতে হয়নি। লেখা নিজের আনন্দে আসত। এবং এই উপন্যাসটি লেখার সময় যে পরিমাণ আনন্দ পেয়েছি, তা আগে কখনও পাইনি। কখনও হাসতাম, কখনও ভয় পেতাম, কখনও বিষণ্ণ হয়ে বসে থাকতাম, দু’একবার কেঁদেও ফেলেছি। তাড়াতাড়ি কি বোর্ড থেকে মুছে ফেলেছি অশ্রু।

    তিন বছর ধরে উপন্যাসটি লেখার পরে পাঁচ বছর ফেলে রেখেছিলাম। মাঝেমধ্যে টুকটাক এডিট করতাম।

    পত্রভারতীর কর্ণধার শ্রী ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধায় জানতেন উপন্যাসটির কথা। তিনিই একদিন দাবি জানালেন, এটি বই করতে চান। আমি রাজিও হয়ে গেলাম। কিন্তু এই উপন্যাস শুরু হচ্ছে ২০১০ সালে। আর আমার ডাক্তারি ছাত্রজীবন ১৯৮৫ সালে শুরু। পঁচিশ বছরে ডাক্তারি পাঠক্রম আমূল বদলে গেছে।

    ইতিমধ্যে আমার বন্ধুর কন্যা ত্বিষা চ্যাটার্জি ওরফে গুঞ্জা ডাক্তারি পড়তে ঢুকেছে। এবং সে আমার বন্ধুও বটে। তাকেই নিয়মিত এই উপন্যাস পর্বে পর্বে মেল করতাম। সে সংশোধন করে দিত। মেল চালাচালি চলেছিল ছমাস ধরে। অবশেষে উপন্যাসটি রেডি হল। পান্ডুলিপি পাঠিয়ে দিলাম পত্রভারতীর দপ্তরে। বুকের মধ্যে যে পাথর জমা হয়েছিল ১৯৮৫ সাল থেকে, তা সরে গেল ২০১৯ সালে।

    আজ নিজেকে ভারমুক্ত লাগছে। আমার কাজ শেষ। প্রিয় পাঠক, এবার আপনার দায়িত্ব!

    ১লা জানুয়ারি ২০২০
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
  • কল্লোল যুগ

    কল্লোল যুগ

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    [book]

    কল্লোল যুগ

    ‘কল্লোল যুগ’ অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত রচিত কল্লোল যুগ বিষয়ে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। প্রথম প্রকাশ, আশ্বিন ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ; প্রকাশক, শমিত সরকার, এম. সি. সরকার অ্যাণ্ড সন্স প্রাইভেট লি., ১৪ বঙ্কিম চাটুজ্যে ষ্ট্রীট, কলিকাতা ৭৩। মুদ্রক, সাধনকুমার গুপ্ত, শ্রীরাধাকৃষ্ণ প্রিণ্টিং, ২১ বি, রাধানাথ বোস লেন, কলিকাতা ৬।

    উৎসর্গ

    দীনেশরঞ্জন দাস

    গোকুলচন্দ্র নাগের

    উদ্দেশে উৎসর্গ

  • ভাটির দেশ

    ভাটির দেশ

    [book]

    জল-জঙ্গলের দেশ সুন্দরবন। সে দেশে জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। আর আছে বাঘ-কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা সবহারানো কিছু মানুষ। গত শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিকে এই কাদামাটি আর বাদাবনের দেশেই এক সাহেব আদর্শ সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের সেই স্বপ্নের সূত্র ধরেই লেখা শুরু হল ভাটির দেশের নতুন ইতিহাস। অলিখিত বিধি-বাঁধনের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বাদাবনের সমাজ-সংস্কৃতি। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক পিয়ালি রয় আর দিল্লির কেতাদুরস্ত ব্যবসায়ী কানাই দত্তের সেখানে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে টলমল করে ওঠে সে পটভূমির সূক্ষ্ম ভারসাম্য। কানাইয়ের মাসি নীলিমা স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার। নীলিমার স্বামী, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নির্মল ছিল প্রগতিশীল রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী। ১৯৭৯ সালে মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তু বিতাড়নের ঘটনার ঠিক পর পরই রহস্যময় পরিস্থিতে মৃত্যু হয় তার।

    পিয়া সুন্দরবনে এসেছে সেখানকার বিরল প্রজাতির ডলফিনের বিষয়ে গবেষণার জন্য। তার পথপ্রদর্শক স্থানীয় জেলে ফকির। নদীখাঁড়িতে ঘোরাঘুরির সময় পিয়ার দোভাষীর কাজ করে দেওয়ার জন্য তাদের সঙ্গ ধরল কানাই। আর তার পরেই ঘুরতে শুরু করল কাহিনির স্রোত।

    মহাকাব্যপ্রতিম এই উপন্যাসে আঠারো ভাটির দেশের জীবন আর প্রকৃতি, ইতিহাস আর লোকপুরাণকে জীবন্ত চেহারায় উপস্থিত করেছেন অমিতাভ ঘোষ।

    অমিতাভ ঘোষের ‘The Hungry Tide’ উপন্যাসের অনুবাদ করেছেন অচিন্ত্যরূপ রায়, বাংলায় নাম রেখেছেন ‘ভাটির দেশ’। প্রথম প্রকাশ ২০০৪ সালে।

    এই উপন্যাসে ব্যবহৃত সমস্ত নাম, চরিত্র, স্থান এবং ঘটনা কাল্পনিক। কোথাও কোনওভাবে যদি কোনও বাস্তবের সঙ্গে মিল ঘটে থাকে তা নিতান্তই কাকতালীয়।

    প্রথম আনন্দ সংস্করণ নভেম্বর ২০০৯; পঞ্চম মুদ্রণ এপ্রিল ২০১৯। উৎসর্গ : লীলাকে।

  • পাঁচকড়ি দে রচনাবলী

    পাঁচকড়ি দে রচনাবলী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    সম্পাদনা : বারিদবরণ ঘোষ

    করুণা প্রকাশনী, কলকাতা

    প্রথম প্রকাশ : ১লা বৈশাখ, ১৪১৭

    প্রচ্ছদ : ইন্দ্রনীল ঘোষ

    ॥ রোমাঞ্চন ॥

    বাংলা রহস্যকাহিনির একটা পর্বের ইতিবৃত্ত লিখতে গিয়ে বড়ো ধন্দে পড়া গেছে। কাকে রহস্য কাহিনি বলা যাবে? সংস্কৃত মতে, এমনকি বাংলা মতেও ‘রহস্য’ অনেকটা ঠাট্টা বিদ্রুপের দলে পড়ে, যেমন গোপাল ভাঁড়ের রহস্য। ইংরেজি মতে আবার রহস্যের নানা ব্যাখ্যান–এডভেঞ্চার, থ্রিলার, শিকার, ক্রাইম, ডিটেকটিভ, মিস্ট্রি, স্পাই—নানান শব্দের ফাঁকে-ফোঁকরে রহস্য ছড়িয়ে আছে। আমরা এই শেষের দিকের সবধরনের রচনাকে একত্র করে ভেবে নিচ্ছি। এছাড়া উপায় নেই। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে শূদ্রকের মৃচ্ছকটিকে শর্বিলক-এর চুরি করতে যাওয়ার মধ্যে রোমাঞ্চের গন্ধ আছে—কিন্তু তাকে কোনোক্রমেই গোয়েন্দা-কাহিনি বলা যাবে না। বাংলা গোয়েন্দা কাহিনি ইংরেজি গোয়েন্দা রচনার অনুবাদের হাত ধরে এসেছে। অতএব ইংরেজি মতগুলোকে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

    ইংরেজি মতের কথা মনে হলেই এডগার অ্যালেন পো-এর কথা আগে মনে পড়ে যাবে। তাঁর The Murders in the Rue Morgue- পৃথিবীর প্রথম ডিটেকটিভ গল্প (১৮৪১ খ্রি.)। এর পরে নাম করতে হয় উইলকি কলিন্স-এর। তাঁর মুন স্টোন অথবা দি উওম্যান ইন্‌ হোয়াইট-এর ইন্সপেক্টর বাকেট ছিলেন ডিটেকটিভদের প্রথম সেরা মানুষ। তারপরে এসেছেন শার্লক হোমস্ আর ওয়াটসন নিয়ে আর্থার কোনান ডয়েল। আগাথা ক্রিস্টির এরকুল পোয়রোর কথা রসিকমাত্রেই জানেন। জেমস্ বন্ড, হ্যাডলি চেজ তো হাল আমলের ব্যাপার। নইলে Mystries of the Court of London (বাংলায় ‘লণ্ডন রহস্য’ নামে কয়েকখণ্ডে অনূদিত) পুরনো আমলে কম সাড়া জাগায়নি। এসব নামের উল্লেখ এজন্যে যে বাংলা রহস্য কাহিনি এগুলির কাছে সবচেয়ে ঋণী। পাঁচকড়ি দে মশাই কি গোবিন্দরাম বা দেবেন্দ্রবিজয় নির্মাণ করতে পারতেন, যদি না পুলিস ইন্সপেক্টর বাকেট তাঁর চোখের সামনে ঘোরাফেরা না করতেন?

    ॥২॥

    কাজেই বাংলা সাহিত্যে ডিটেকটিভ রচনার আবির্ভাব হতে দেরি হয়েছিলো। ভালো ডিটেকটিভ গল্প লেখা খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। হত্যা, খুন, রাহাজানি, জোচ্চুরি এসব কাজের মধ্যে একটা অপরাধজনক মৌজ আছে। এর গল্পকে হতে হয় ঘামছোটানো ঘুম-তাড়ানো চরিত্র। আমাদের মধ্যে গোপন অপরাধ-বোধকে জাগ্রত করে তাতে সুড়সড়ি দিতে হবে—গল্পটা হবে পো-এর ভাষায় ‘Somewhat Peculiar Narrative.’ লেখককে হতে হবে একইসঙ্গে নাট্যকার, সাংবাদিক, ঐতিহাসিক, মনস্তাত্ত্বিক, বিজ্ঞানী এবং শিল্পীও। চাই কৌতূহল শেষ অবধি জিইয়ে রাখার দুঃসাধ্য সংযম এবং আর্ট। রহস্যময়তাকে বজায় রাখতে হবে আদ্যোপান্ত। ভারতের আপাত নিস্তরঙ্গ জীবনে এতোগুলো বিপ্লব একসঙ্গে ঘটেনি। ঘটলো ইংরেজ আগমনের পর অপরাধ প্রবণতার বিচিত্র পরিবেশ সৃষ্টির ফলে। ইংরেজি সাহিত্য এবং ব্রিটিশ সরকার দুই হাত ধরে অতএব রহস্যকাহিনি বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় এসে পড়ল। এর মধ্যে ছোট গল্পের যথার্থ একটা কাঠামোর সঙ্গে বাঙালি রসিক পরিচিত হবার সুযোগ পেয়েছেন। কারণ তখনি আবির্ভূত হচ্ছেন বাংলা ছোটগল্পের জন্মদাতা, পালয়িতা এবং অভিভাবক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অভিযোগ, তাঁর রহস্যময় গল্পের পিছনে ছিলো অ্যালেন পো-র রহস্যময়তার ছায়া। রবীন্দ্রনাথকে অভিযুক্ত করবো কি, স্বয়ং কোনান ডয়েল শার্লক হোমসের চরিত্র কি আঁকতে পারতেন যদি না সামনে পোর ডিটেকটিভ Dupin প্রত্যক্ষ না থাকতেন! তাঁর প্রভাবেই ডয়েল Professor Challenger-কে নিয়ে Science fiction লেখেননি?

    অতএব সত্যেন্দ্রনাথের লাইব্রেরি থেকে পো নিয়ে রবীন্দ্রনাথ মগ্ন হলেন এবং Golden Bag এবং গুপ্তধন, The Cask of Amontillado আর The Tell – Tale-Heart ও সম্পত্তি সমৰ্পণ, Premature Burial এবং জীবিত ও মৃত ইত্যাদি মিতালি পাতিয়ে বসলো। কঙ্কাল, নিশীথে, ক্ষুধিত পাষাণ, ডিটেকটিভ গল্পগুলি অচিরে স্বকীয়তায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

    ॥৩॥

    একটু আগে যে ব্রিটিশ রাজত্বের কথা বলছিলাম। তার একটা কারণ চোর-ডাকাতের প্রাধান্য যেমন বেড়েছিল, তেমনি ধনীদের অত্যাচারও বেড়েছিলো। বেন্টিকের আমলে শ্লিম্যানের চেষ্টায় ঠগিদমন হলেও অপরাধীর সংখ্যা কমেনি। “থানাদার” স্থলে ‘দারোগা’রা এলেন। এমনি এক দারোগা ছিলেন গিরিশচন্দ্র বসু (এ পদে যোগ দেন ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে)। ডাকাতি দমনে তাঁর পটুত্ব ছিল। তাঁর চোখে দেখা অপরাধীদের অপরাধ ও তার দমনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁর ঝুলিতে ছিল। তাই দিয়ে তিনি লিখে বসলেন ‘সেকালের দারোগার কাহিনী’–বিশ্বস্ত এবং রোমাঞ্চকর আত্মজীবনীর ভঙ্গিতে। প্রকাশিত হলো ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে। সত্যি কথা বলতে বাংলার মাটিতে অপরাধ ও তার দমনের একটা বিশ্বাসযোগ্য চিত্র প্রথম পেলাম এই বইটিতে। একে গোয়েন্দাকাহিনি কেউ বলবো না—কিন্তু তার সূত্রপাত তো বলতেই পারি।

    সঠিক গোয়েন্দা কাহিনি পাবার জন্যে আমাদের আরও সাত-আট বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।১৮৯৬। তার আগেই অবশ্য আমরা ক্রাইম-এর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম বঙ্কিমচন্দ্রের বিভিন্ন রচনায়—ইংরেজি রাজমোহনস্ ওয়াইফ, কৃষ্ণকান্তের উইল প্রভৃতিতে। কিন্তু রীতিমতো রহস্য-রোমাঞ্চ নিয়ে প্রথম আবির্ভূত হলেন প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় এবং বাঁকাউল্লার দপ্তরের লেখক বরকতুল্লা (?)। দুজনকেই ব্রাকেটে প্রথম বলা যেতে পারে বই প্রকাশের দিক থেকে।

    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৫৫-১৯১৭) আদরিণী (১৮৮৭), ডিটেকটিভ পুলিস-১ম কাণ্ড (১৮৮৭) পাহাড়ে মেয়ে (১৮৮৯), বনমালীদাসের হত্যা (১৮৯১) প্রভৃতি গ্রন্থের রচয়িতা হলেও তিনি খ্যাতি পেয়েছিলেন ‘দারোগার দপ্তর’ লিখে। এটি ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে (১ম সংখ্যা) ধারাবাহিকভাবে পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হতে আরম্ভ করে। ৪০-৪৮ পৃষ্ঠার এই পুস্তিকাগুলি বিভিন্ন নামে অবশ্য প্রকাশিতহত। যেমন ১৭৯ সংখ্যার নাম ছিল ‘প্রতিশোধ’। ১৫৯ সংখ্যার নাম ছিল ‘দীর্ঘকেশী’। ১৫৭ সংখ্যার নাম (১৪ বর্ষ ১৩১৩ব.) “ভীষণ হত্যা অর্থাৎ একটি স্ত্রীলোক হত্যার ভীষণ রহস্য”। ‘দারোগার দপ্তর’ এর প্রচার সংখ্যা ছিল প্রচুর। খুব লক্ষ্য করার ব্যাপার ইংল্যান্ডে ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে শার্লক হোমস্-এর আবির্ভাবের মাত্র এক বছর পরে প্রিয়নাথের ‘ডিটেকটিভ পুলিস’ বাজার মাত করে দেয়। Indian Mirror পত্রিকা (২৫ জানুয়ারি ১৮৮৮) এর প্রশংসা করে লিখেছিল :

    We have also read with attention another book composed by the same author, and styled. ‘Detective Police’. The book has also been written by following the story of a man who was actually tried by the High Court of Calcutta on the most serious charges and is up to date undergoing the term of punishment in the criminal jail of Alipore.

    ১৪নং হুজুরি মলস্ লেন বৈঠকখানা ‘দারোগার দপ্তর’ কার্যালয় থেকে (সুকুমার সেন জানিয়েছেন ১৬২ নং বহুবাজার স্ট্রিট এর কার্যালয় ছিল। তবে কি ঠিকানার পরিবর্তন হয়েছিল?) উপেন্দ্রভূষণ চৌধুরি কর্তৃক প্রকাশিত হয়ে ‘দারোগার দপ্তর’ খণ্ডে খণ্ডে আত্মপ্রকাশ করত।

    এই সময়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল ‘বাঁকাউল্লার দপ্তর’। এর দারোগা মশায়ের নাম ছিল বরকাতুল্লা—‘শ্রীযুক্ত কোতোয়া, বরকতুল্লা নাম’। একদা সুকুমার সেন অনুমান করেছিলেন বইটির ‘সম্ভাব্য লেখক’ প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়। এই অনুমান অবশ্য তথ্যসমর্থিত নয়। তবে বরকতুল্লা নামটি লোকমুখে বকাউল্লা থেকে বাঁকাউল্লায় পরিণত হয়েছিল সম্ভবত। এর কাহিনির মূল ছিলো ইংরেজি পরে বাংলায় রূপান্তরিত হয়ে ‘বাঁকাউল্লার দপ্তর’, নাম পায়। বারোটি অধ্যায়ে বিভক্ত এর প্রতিটি অধ্যায়ের নামকরণ ছিল লোমহর্ষক। এইভাবে গিরিশচন্দ্র-বঙ্কিমচন্দ্র-প্রিয়নাথদের দিয়ে বাংলা সাহিত্যের পাঠক ফাঁড়ি-দারোগা-থানা-পুলিশের একটা রোমাঞ্চিত স্বাদ পেতে শুরু করেছিল। বাঁকাউল্লার দপ্তরের মধ্যেই নারীরা ডিটেকটিভ কাহিনীর অনিবার্য চরিত্রে পরিণত হতে শুরু করেছিল।

    এই নারী-হত্যা-নারীহরণ-ডাকিনীবিদ্যা প্রত্যক্ষভাবে এসে গিয়েছিল ‘বিলাইতি’ রহস্যরস আর দেশি কাহিনির জারজসন্তান হিসেবে ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের (১৮৪২-১৯১৯) কলম মারফৎ। রেনল্ডসের Joseph Wilmot-এর ছায়া অবলম্বনে এই এক নূতন! আমার গুপ্তকথা (১৮৭০-৭৩) নামে ৮৭০ পৃষ্ঠার এই বিশাল খিচুড়িরসের বইটির অনুক্রম হিসেবে ১৮৭৩-৭৯ সালে ছয় বছর ধরে ‘আমার গুপ্তকথা।—আশ্চর্য!!!’ নামে ধারাবাহিক প্রকাশের পর তিনখণ্ডে মোট ৪৯৬ পৃষ্ঠার ‘তুমি কি আমার’ গ্রন্থনামে পরবর্তী বইটি প্রকাশিত হল। আর ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ৬৪৪ পৃষ্ঠার আর একটি ঢাউস ‘নবন্যাস’ প্রকাশিত হল ‘আর এক নতুন! হরিদাসের গুপ্তকথা’। আসলে এই ‘গুপ্তকথা’ প্রকাশ্য করেই ভুবনচন্দ্র খ্যাতিমান হয়ে পড়লেন। অবশ্য রেনল্ডস-এর বইটির বঙ্গানুবাদ দুখণ্ডে মোট (৭৪৫+৭৮৪) ১৫২৯ পৃষ্ঠায় প্রকাশকালে নাম ছিল ‘বিলাতি গুপ্তকথা’। কিন্তু প্রত্যক্ষ ডিটেকটিভ বইগুলির মধ্যে ছিল চার খণ্ড ‘মার্কিন পুলিস কমিশনার’ (১ম খণ্ড হারাধনের অনুসন্ধান : ১৮৯৬, পৃ. ৬৪, ২য় খণ্ড মেয়ে চুরি : ১৮৯৬, পৃ. ৬০;৩-৫ খণ্ড—অপূর্ব নারী ডিটেকটিভ : ১৮৯৬, পৃ. ২৬৮ এবং ৬ষ্ঠ খণ্ড জলবিবি : ১৮৯৬, পৃ. ৬০) গুপ্তচর (১৮৯৮), ইউজিন সু রচিত ওয়াণ্ডারিং জু অবলম্বনে রচিত চারখণ্ডে ঠাকুরবাড়ীর দপ্তর। অভিশপ্ত য়িহুদী (১৯০০), নন্দনকানন সিরিজের তৃতীয় বল্লরী চন্দ্রমুখী (১৯০২), ঐ সিরিজের মারী কোরেলির Sorrows of Satan এর বঙ্গানুবাদ ‘সন্তপ্ত সয়তান’ (১৯০৩-৪), সয়তানী (১৯০৬), ডিউক তারাচাঁদ (১৯২০), গোয়েন্দার গল্প (মাইকেল মোহনচাঁদ) প্রভৃতি। তাঁর খ্যাতির অন্য আর একটি কারণ ছিলো রেনল্ডস-এর বিখ্যাত Mysteries of Court of London-এর খণ্ডশ অনুবাদ ‘লণ্ডন রহস্য’ (১৯১২-১৪)।

    এই ফাঁকে একজন কৃতী লেখকের কথা বলে নিই। ভদ্রলোক যে কেন আর রহস্য কাহিনি লিখলেন না জানিনা, লিখলে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হতো। কারণ তাঁর আগে ‘ভদ্রস্থ’ কোনো লেখক এপথে পা বাড়াননি। তিনি নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ‘তপস্বিনী’ উপন্যাস লিখে যিনি খ্যাতি-অখ্যাতি দুই-ই কুড়িয়েছিলেন। ‘ভারতী ও বালক’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পটি ছিল ‘চুরি না বাহাদুরি’। রহস্যজনক গোয়েন্দা গল্পের যথার্থ স্রষ্টা তাকে বলা চলতো যদি তিনি এপথে থাকতেন। রোমাঞ্চকর পরিবেশ সৃষ্টি, ভৌতিক আবেশ রচনা ও শেষাবধি কৌতূক নির্মাণে সিদ্ধহস্ত লেখক ট্রেনের মধ্যে দুই ভদ্রলোকের চুরি ও গোয়েন্দাদের ব্যর্থতার একটা ঠাসবুনুনিতে পাঠকদের অভিভূত করে রাখেন। শেষ অবধি চোর টাকা পয়সা দিয়ে যায় এক অদ্ভুত কৌশলে। গল্পে হয়তো চমৎকারিত্ব নেই, কিন্তু আছে পরিবেশ রচনার কৃতিত্ব। প্রিয়নাথের ‘Detective Story গুলি বঙ্গভাষায় মৌলিক Sensational novel-রূপে পরিগণিত হইবার উপযোগী’ বলে সাহিত্য সমালোচক মন্তব্য করলেও এগুলিকে সাহিত্য পর্যায়ভুক্ত করা যাবে কিনা বলা মুস্কিল। সেদিক থেকে নগেন্দ্রনাথের রচনাটি সাহিত্যরসে টইটম্বুর।

    সাহিত্যরস থাকুক না থাকুক গোয়েন্দারহস্য একালের পাঠকদের রুচি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছিল। আসলে নতুন স্বাদের এই রচনা পাঠককে অভিভূত করতে সমর্থ হচ্ছিল। শরচ্চন্দ্ৰ দেব (সরকার)-এর ক্রাইম কাহিনিগুলির বিক্রির হিসেব থেকে এটা সহজে বোঝা যায়। শরচ্চন্দ্র সরকার ‘সংকলিত গোয়েন্দা কাহিনি নামে ডিটেকটিভ গল্প মাঝে মাঝে প্রকাশিত হত। প্রত্যেক খণ্ড সপ্তাহে দুদিন করে সাময়িকপত্রের মতো ফর্মা ধরে বিক্রি হত। এ-সম্পর্কিত একটি বিজ্ঞাপনের বয়ান থেকে জানতে পারি, “গোয়েন্দা কাহিনী” এপর্যন্ত প্রায় পাঁচ লক্ষ ফর্মা বিক্রীত হইয়াছে।’ শরচ্চন্দ্র তীর্থে বিভ্ৰাট অথবা গুমখুন নামে বইপত্রও লিখেছিলেন। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, ‘ভাল ভাল লোকে ও যে গোয়েন্দা কাহিনি পড়তে শুরু করেছিলেন তার প্রমাণ লেখকেরা অনেক সময় এই সব ভালো ভালো লোককে বই উৎসর্গ করতেন। সুকুমার সেন এঁদের কয়েকজনের নাম জানিয়েছেন—মহেন্দ্ৰনাথ বিদ্যানিধি, নগেন্দ্রনাথ ঘোষ, কালীপ্রসাদ ঘোষ, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রাজনারায়ণ বসু, দামোদর মুখোপাধ্যায়, চন্দ্রনাথ বসু, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বিনয় কৃষ্ণ দেব, সারদাচরণ মিত্র প্রভৃতি। গল্পগুলির সঙ্গে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে এ সময়ে আসতে শুরু করেছিল ভালো ভালো ছবির আকর্ষণও। গোয়েন্দা কাহিনি চরিত্র হয়ে প্রকাশিত হতে আরম্ভ করেছিল প্রথমযুগের ঠিক অব্যাবহিত পরেই। ‘রঘু ডাকাত’ ছিল এদের মধ্যে অগ্রগণ্য।

    এসময়ে অনেক অকিঞ্চিৎকর লেখকের আবির্ভাব ঘটেছিল, তাদের কথা আমরা তেমন করে বলতে চাইছি না।

    ॥ 8 ॥

    বাংলা ডিটেকটিভ উপন্যাসের দ্বিতীয় ভূবন নির্মাণে এগিয়ে এসেছিলেন তিন বিখ্যাত রহস্যরসিক পাঁচকড়ি দে, দীনেন্দ্রকুমার রায় এবং সুরেন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য। আর একজনেরও নাম করতে পারি হরিসাধন মুখোপাধ্যায়।

    পাঁচকড়ি দে (১৮৭৩-১৯৪৫) এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন। বঙ্গ-বিহার- উড়িষ্যা-আসাম পর্যন্ত তিনি খ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। ছোটোগল্প লেখার তেমন চেষ্টা তিনি করেন নি—কিন্তু ছোটো আকারের রহস্য কাহিনী লিখেছিলেন। পাঁচকড়ির খ্যাতি শুধু গল্পের প্লটের জন্য নয়, তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথম দুটি গোয়েন্দাকে আমদানি করলেন ইংরেজি অনুকরণে। এঁরা হলেন দেবেন্দ্রবিজয় ও তাঁর সহায়ক-কাম-গুরু অরিন্দম। আগেই বলেছি পুলিশ ইন্সপেক্টর বাকেট সাহেব ছিলেন তাঁর আদর্শ।

    শরচ্চন্দ্র দেবের জনপ্রিয়তার কথা আগেই বলে এসেছি। কিন্তু যার বই নিয়ে প্রথম কাড়াকাড়ি প’ড়ে গেল লাইব্রেরিতে লাইন পড়লো, সংস্করণের পর সংস্করণ ছাপা হতে শুরু করলো—তিনি পাঁচকড়ি দে। তাঁর হাতের কাছে আছে শার্লক হোমস আর আছে ‘যমুনা পত্রিকা’। যমুনা পত্রিকা মানে ফণীন্দ্রনাথ পাল আর তাঁর দাদা যতীন্দ্র পাল। দুই পাল-ভাই আর পাঁচকড়ি মিলে যেন বই লেখার প্রতিযোগিতায় নামলেন। যতীনবাবু লিখলেন কুলবধূ, গৃহিণী, ঘরের লক্ষ্মী, ধর্মপত্নী নাম দিয়ে অজস্র বই। তাঁর ভাই লিখলেন ইন্দুমতী, ছোট বৌ, বন্ধুর বৌ, মধুমিলন প্রভৃতি। আর বন্ধু পাঁচকড়ি বাজার সরগরম করে ফেললেন মায়াবী, মায়াবিনী, হত্যাকারী কে? নীলবসনা সুন্দরী দিয়ে। ‘যমুনা’ আর ‘জাহ্নবী’তে জোয়ার বইতে লাগল তাই নিয়ে। পাঁচকড়ি কলকাতার তিন জায়গায় তিনটে প্রাসাদ নির্মাণ করলেন। হবেই না বা কেন? ১০০,০০০ লক্ষাধিক বিক্রি হয় তাঁর বই—মায়াবী, মনোরমা, মায়াবিনী, পরিমল, জীবনস্মৃত রহস্য, হত্যাকারী কে? লক্ষ টাকা, হত্যারহস্য, ভীষণ প্রতিশোধ, ভীষণ প্রতিহিংসা, কালসর্পী, নীলবসনা সুন্দরী, গোবিন্দ রাম, রহস্য বিপ্লব, মৃত্যু বিভীষিকা, পরিতজ্ঞা পালন, বিষম বৈসূবন, জয় পরাজয়, নরবলি, মৃত্যুরঙ্গিনী, শক দুহিতা, হরতনের নওলা, সুহাসিনী, মরিয়ম প্রভৃতি। ‘বিশেষ সুবিধা—একত্রে ৫ কিংবা তদূর্ধ্ব মূল্যের এই উপন্যাস লইলে মাশুল লাগে না।’ উপরন্তু ‘সতী শোভনা’ সঙ্গে ফ্রি। সমস্ত বই অনুবাদিত হয়ে চলেছে হিন্দি, উর্দু, তামিল, তেলেগু, ‘কেনেদী’, মারাঠি, গুজরাটি, সিংহলি, ইংরেজি—দেশি-বিদেশি ভাষায়। ছাপা ভালো, ছবিও সব মনোরম। বই পড়ে কখনও হিতবাদী লেখে “রচনাচাতুর্য চরিত্র অঙ্কনে তিনি বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করিয়াছেন, কখনও Statesman লেখে- This is a sensational Hypnotic Novel in Bengali’ তাঁর জনপ্রিয়তা রবীন্দ্রনাথকে পর্যন্ত ধাওয়া করেছে। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজের বছরে (১৯১৩) পাঁচকড়ি তাঁকে উৎসর্গ করেছেন ‘জীবমৃত-রহস্য’–’শ্রদ্ধাস্পদ কবিবর/শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/মহাশয় করকমলেষু’। সুকুমার সেন অনুমান করেছেন রবীন্দ্রনাথের ‘নিশীথে’ পড়ে তিনি ‘শ্রীমতী শোভনা’ লিখেছিলেন।

    খুব মজার একটা কাকতলীয় ব্যাপার ঘটে গেলো পাঁচকড়ির শেষ জীবনে। হঠাৎ বন্ধু যতীন্দ্রনাথ পাল মারা গেলেন। যতীন্দ্রনাথ পাল সাহিত্যিক ধীরেন্দ্রনাথ পালের পুত্র। মাত্র ৩৬/৩৭ বছর বয়সের মধ্যেই ছোটোবড়ো মিলিয়ে প্রায় ২০০ খানা বইয়ের লেখক। তাঁর মৃত্যুতে পাঁচকড়ি ‘জীবনৃত’ হয়ে গেলেন। তাঁর রহস্যকাহিনির ‘উৎস’টি গেল শুকিয়ে। বন্ধুর মৃত্যুর পর আড়াই দশকের বেশি বেঁচে রইলেন তিনি—কিন্তু আর কোনো বই লিখতে পারলেন না। কু-লোকে নানা কথা বলে। বলেন—তাঁর রচনায় নাকি শরৎচন্দ্র সরকার, ধীরেন্দ্রনাথ পাল এবং রাজানারায়ণ বসুর পুত্র মনীন্দ্রনাথ বসুর হাতের গন্ধ পান তাঁরা।

    ॥ ৫ ॥

    পাঁচকড়ি দে-র জন্ম ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে। বাবার নাম কেদারনাথ দে। বাল্য শিক্ষার সূচনা ভবানীপুরের একটি স্কুলে। খুব বেশি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনো করেছিলেন বলে বলা যায় না। দেখতে বেশ সুরুপুষ। শুধু রহস্য উপন্যাস লিখেই যা উপার্জন করে গেছেন তা তিন পুরুষে ভোগ করার উপযুক্ত। জোড়া সাঁকোর ৭নং শিবকৃষ্ণ দাঁ লেনে তাঁর একটি বইয়ের দোকান ছিল—”পাল ব্রাদার্স”। তিনি দে দোকান কেন পাল ব্রাদার্স হল ভাবতে গেলে মনে হয়- তিনি সম্ভবত ধীরেন্দ্রনাথ পাল যতীন্দ্রনাথ পালেদের বকলমা নিয়েছিলেন। একটি, ছাপাখানারও তিনি মালিক হন বাণী প্রেস।

    পাঁচকড়ির জনপ্রিয়তার একটা দৃষ্টান্ত দিই। হিতবাদী পত্রিকা সে সময়ে মন্তব্য করেছিলেন—”রচনা চাতুর্যে চরিত্র অঙ্কনে তিনি বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। আমরা দেওয়ান গোবিন্দরাম পাঠে প্রকৃতই পরম প্রীতি লাভ করিয়াছি। এই জনপ্রিয়তার মূলে ছিল তাঁর বিদেশি রোমাঞ্চ সাহিত্যের আত্মকরণ। তার প্রমাণ তিনি অনেক বইতে রেখে গেছেন। একটি বইয়ের পাদটীকায় তিনি লিখে গেছেন—”সঞ্জীবচন্দ্রই এরূপ একটা ক্ষমতাপ্রাপ্ত দেখিয়া কেহ কেহ বিস্মিত হইবেন সন্দেহ নাই। এই বিদ্যা অতিশয় ধৈর্য্য এবং বিপুল অধ্যবসায় সাপেক্ষ। ইহা আমাদিগের দেশীয় বিদ্যা নহে, ইউরোপীয়। এখন আমাদের দেশে অল্পসংখ্যক ব্যক্তি এই বিদ্যা শিক্ষা করিয়াছেন। ইহার নাম (Ventroquilism) ভেন্ট্রোকুইলিজম। কেবল অপরের স্বর অনুকরণে সক্ষম হইলে ভেন্ট্রোকুইলিস্ট হইতে পারা যায় না—শব্দকে ইচ্ছামত স্থানে উত্তেজিত করা প্রয়োজন। আমরা বৃহৎ অট্টালিকা মধ্যে, প্রান্তরে, নদীতটে, অথবা কোন নির্জন স্থানে দাঁড়াইয়া কোন শব্দ করিবামাত্র চারিদিক হইতে প্রতিধ্বনি শুনতে পাই;যিনি নিজের স্বর অব্যক্ত রাখিয়া কেবলমাত্র সেই প্রতিধ্বনিতে ইচ্ছামত দূরে সুস্পষ্টরূপে উত্তেজিত করিতে পারেন, তিনি প্রকৃত ভেস্ট্রোকুইলিস্ট।’

    তাঁর সময়ে উপন্যাস রাজত্বে সম্রাটের স্থানে আসীন বঙ্কিমচন্দ্র। সেকারণে ভাষার ভঙ্গিমায় তিনি বঙ্কিমচন্দ্রকে অনুসরণ করেছেন—’প্রভাত হইলে কাহার? বিষাদ, আনন্দ কাহার উত্তমর্ণের, তাহার একদিনের সুদ বাড়িল। আর কাহার, কয়েদী তস্করের; তাহার একদিনের মেয়াদ কমিল।’

    আমরা এই খণ্ডে পাঁচকড়ি দে-রচিত পাঁচটি রহস্য উপন্যাসের সংকলন ঘটিয়েছি। পরবর্তী খণ্ডগুলিও একে একে প্রকাশিত হবে। সেখানে পাঁচকড়ির রচনা-বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমরা আরও কথা বলবো—যেমন তাঁর রচিত গোয়েন্দা চরিত্র, সহকারী গোয়েন্দা-চরিত্র, পুলিশের ভূমিকা ইত্যাদি প্রকাশ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হবে। এখন সংকলিত উপন্যাস-পঞ্চকের মধ্যে তিনটি উপন্যাস সম্পর্কে সমসাময়িক কালের বক্তব্য তুলে দিয়ে তৎকালীন প্রতিক্রিয়ার কথা একালের পাঠকের সমীপে নিবেদন করি—

    মায়াবিনী উপন্যাসের আগে তিনি ‘মনোরমা’ উপন্যাস লেখেন। এই মায়াবী যখন ‘গোয়েন্দার গ্রেপ্তার’ সাময়িকপত্রে ধারাবাহিকভাবে বের হচ্ছিল—তখন এর নাম ছিল ‘জুমেলিয়া’। তিনফর্মা ছাপা হয়েছিল, পরে বাকি অংশটি লিখে তিনি একেবারে বই আকারে যখন প্রকাশ করলেন—তখনই নাম বদলে হয় ‘মায়াবিনী’। তিনি চেষ্টা করতেন প্রতি পুনর্মুদ্রণে বইকে পরিমার্জিত করার। যেমন দ্বিতীয়বার ছাপার সময় মায়াবিনী উপন্যাসের ভূমিকায় লেখেন—’এখানে ইহার অনেকাংশ পরিবর্ধিত হইয়াছে, অনেকাংশ পরিত্যাগ করা গিয়াছে, এবং কোন কোন স্থান পুনর্বার লিখিত হইয়াছে। মুদ্রাঙ্কণকার্যও পূর্বাপেক্ষা সুসম্পাদিত করা গেল এবং তিনখানি ছবি দেওয়া হইল।’

    মায়াবিনীর আগে যে ‘মায়াবী’ রহস্যন্যাস লেখা হয়েছিল—সেটি সম্পর্কে ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকা ২ জ্যৈষ্ঠ ১৩১২ তারিখে মন্তব্য করেছিলেন—

    “আমরা অন্যান্য অনেক লেখকের ও অনেক ডিটেকটিভ উপন্যাস পড়িয়াছি কিন্তু তন্মধ্যে কোনখানি শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বাবু লিখিত উপন্যাসের ন্যায় হৃদয়গ্রাহী নয় নাই। হয়ত সেগুলিতে নানা রকমের বীভৎস ঘটনার দ্বারা কেবল একটা গল্প তৈয়ারী করা হইয়াছে মাত্র, কিন্তু বাঁধন নাই, গল্প সাজাইবার যে একটা কৌশল থাকা দরকার তাহাও নাই। নতুবা হয়ত কোন একখানি ইংরাজি বা ফরাসী উপন্যাসের ধারাবাহিক অক্ষম অনুবাদ। ‘মায়াবী’র ঘটনা সর্ব্বাঙ্গসুন্দর। ভাষাও গ্রন্থকারের নিজস্ব; যেমন প্রাঞ্জল তেমনি মধুর। গ্রন্থকারের গল্প সাজাইবার বেশ হাত আছে—রহস্য বিন্যাসের ক্ষমতাও অতুলনীয়। একবার পড়িতে আরম্ভ করিলে শেষ পৃষ্ঠার শেষ পংক্তি পর্যন্ত পাঠককে বিপুল আগ্রহে অগ্রসর হইতে হয়।”

    এবার ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘নীলবসনা সুন্দরী’ বইটি সম্পর্কে কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন ‘জাহ্নবী’ পত্রিকায় প্রথম বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যায় যে সমালোচনাটি করেছিলেন—তা উদ্ধার করে দিই—

    “নীল বসনা সুন্দরী, হত্যাকারী কে? শ্রী পাঁচকড়ি দে প্রণীত। এই দুইখানি ডিটেকটিভ উপন্যাস আমরা স্বীকার করতে বাধ্য, আমরা সচরাচর ইংরাজি ও ফরাসীস্ লেখকদিগের রচিত যেসব ডিটেকটিভ উপন্যাস পাঠ করি, তদপেক্ষা সমালোচ্য উপন্যাস দুখানি কোন অংশে হীন নহে। ভাষা বেশ সরল, সুন্দর যেন জলধারার মত বহিয়া যাইতেছে। লেখক সুনিপুণ কৌশলে, মুন্সিয়ানার সহিত, ওস্তাদির সহিত পাঠককে গ্রন্থের প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করিতে বাধ্য করেন। কৌতূহল চরিতার্থ করিবার জন্য এক দুর্দমনীয় ব্যাকুলতা জন্মে। লেখকের পক্ষে ইহা কম বাহাদুরীর বিষয় নহে।”

    ‘বঙ্গভূমি’ পত্রিকা (১৯ মাঘ ১৩১১) পাঁচকড়ির সবচেয়ে সাড়াজাগানো রচনা ‘নীলবসনা সুন্দরী’ সম্পকে লিখেছিলেন :

    “নীলবসনা সুন্দরী বঙ্গ সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ডিটেকটিভ ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি দে প্রণীত। ইনি সাহিত্য সমাজে সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। আমরা এই পুস্তক অত্যন্ত আগ্রহের সহিত পাঠ করিয়াছি। পূর্বে বাংলায় ভালো ডিটেকটিভ উপন্যাস ছিল না, শ্রীযুক্ত পাঁচকড়িবাবু বঙ্গীয় পাঠকগণের সে অভাব পূরণ করিয়াছেন। আমরা তাঁহার ডিটেকটিভ উপন্যাসের সমাদর করি। তাঁহার ন্যায় প্রতি পরিচ্ছেদে এমন নব নব কৌতূহল সৃষ্টি করিবার ক্ষমতা কাহারও দেখি না। যদি এমন উপন্যাস পড়িতে চাহেন, যাহা একবার পড়িয়া তৃপ্তি হয় না, দশবার পড়িয়া দশ জনকে শুনাইতে ইচ্ছা করে তবে এই ‘নীলবসনা সুন্দরী’ পাঠ করুন। পড়িতে পড়িতে যেন এই উপন্যাস চুম্বকের আকর্ষণে পাঠককে টানিয়া লইয়া যায়। ঘটনা কৌতূহলজনক, ভাষাও তেমন সরল ও তরল, যেন নির্ঝরিণীর ন্যায় তরতর বেগে বহিয়া যাইতেছে। শব্দচ্ছটাও অতি সুন্দর। বঙ্গ সাহিত্যে গ্রন্থকারের ডিটেকটিভ উপন্যাস যথেষ্ট সমাদর লাভ করিবে।”

    “হত্যাকারী কে?” (দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯০৭) সম্পর্কে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় (৩ বর্ষ ১ সংখ্যা) বিখ্যাত সমালোচক চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায় মন্তব্য করেছিলেন :

    “হত্যাকারী কে? পাঁচকড়ি দে প্রণীত একখানি ডিটেকটিভ গল্প এবং সে হিসাবে ইহাতে বিবৃত ঘটনার সমাবেশ এবং অনুসন্ধানের প্রণালীতে কারিকুরীর পরিচয় পাওয়া যায়। অক্ষয়বাবু যে একজন সুদক্ষ ডিটেকটিভ ইহা গ্রন্থকার দেখাইতে সমর্থ হইয়াছেন। ভাষাও প্ৰশংসার্হ।”

    আর ১৯ ভাদ্র ১৯১০ তারিখের ‘বসুমতী’ মন্তব্য করেছিলেন—

    “গল্পটি বেশ হইয়াছে, গল্পটি আদ্যোপান্ত পাঠ করিবার পর সত্য সত্যই জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা করে হত্যাকারী কে? ইহাতে লেখকের বাহাদুরী প্রকাশ পাইয়াছে। যে পাঠকগণ ডিটেকটিভ গল্প পাঠ করিতে বিশেষ উৎসুক, এই পুস্তকখানি তাঁহাদের নিশ্চয়ই ভালো লাগিবে।”

    পাঁচকড়ির বই ইংরেজির মতও বহু ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়ে তাঁর জনপ্রিয়তার পরিসরকে বহুধাবিস্তৃত করেছিল। সেই প্রবাহকে একালেও বহমান রাখার জন্যে আমাদের খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশের এই আয়োজন।

    দোলযাত্রা ১৪১৬
    বারিদবরণ ঘোষ

    সূচি

    • নীলবসনা সুন্দরী
      ‘নীল বসনা সুন্দরী’ পাঁচকড়ি দে’র একটি সাড়া জাগানো উপন্যাস। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে। ১৩১১ বঙ্গাব্দের ১৯শে মাঘ ’বঙ্গভূমি’ পত্রিকায় উপন্যাসটি সম্বন্ধে লেখা হয়েছে— “‘নীলবসনা সুন্দরী’ বঙ্গ সাহিত্যের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ডিটেক্টিভ ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি দে প্রণীত। ইনি সাহিত্য সমাজে সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। আমরা এই পুস্তক অত্যন্ত আগ্রহের সহিত পাঠ করিয়াছি। পূর্ব্বে বাংলায় ভালো ডিটেক্টিভ উপন্যাস ছিল …
    • পাঁচকড়ি দে রচনাবলী
      সম্পাদনা : বারিদবরণ ঘোষ করুণা প্রকাশনী, কলকাতা প্রথম প্রকাশ : ১লা বৈশাখ, ১৪১৭ প্রচ্ছদ : ইন্দ্রনীল ঘোষ ॥ রোমাঞ্চন ॥ বাংলা রহস্যকাহিনির একটা পর্বের ইতিবৃত্ত লিখতে গিয়ে বড়ো ধন্দে পড়া গেছে। কাকে রহস্য কাহিনি বলা যাবে? সংস্কৃত মতে, এমনকি বাংলা মতেও ‘রহস্য’ অনেকটা ঠাট্টা বিদ্রুপের দলে পড়ে, যেমন গোপাল ভাঁড়ের রহস্য। ইংরেজি মতে আবার রহস্যের নানা ব্যাখ্যান–এডভেঞ্চার, থ্রিলার, শিকার, ক্রাইম, …
    • মায়াবিনী
      বিজ্ঞাপন প্রথম বার। গতবর্ষে “গোয়েন্দার গ্রেপ্তার” নমাক সাময়িক পত্রিকায় “জুমেলিয়া” নামে এই পুস্তকের ৩ ফর্ম্মা বাহির হইয়াছে। এক্ষণে অবশিষ্ট ফৰ্ম্মাগুলি মুদ্রাঙ্কিত করিয়া পুস্তক সম্পূর্ণ করা গেল। “জুমেলিয়া” নামের পরিবর্ত্তে “মায়াবিনী” নামে সম্পূর্ণ পুস্তক স্বতন্ত্র আকারে বাহির হইল। দ্বিতীয় বার। এক্ষণে ইহার অনেকাংশ পরিবর্তিত হইয়াছে, অনেকাংশ পরিত্যাগ করা গিয়াছে, এবং কোন কোন স্থানে পুনর্ব্বার লিখিত হইয়াছে। মুদ্রাঙ্কণকার্য্যেও পূৰ্ব্বাপেক্ষা সুসম্পাদিত করা …

    নীলবসনা সুন্দরী
    মায়াবিনী
    মায়াবী
    হত্যা রহস্য
    হত্যাকারী কে

  • নীলবসনা সুন্দরী

    নীলবসনা সুন্দরী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    ‘নীল বসনা সুন্দরী’ পাঁচকড়ি দে’র একটি সাড়া জাগানো উপন্যাস। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে। ১৩১১ বঙ্গাব্দের ১৯শে মাঘ ’বঙ্গভূমি’ পত্রিকায় উপন্যাসটি সম্বন্ধে লেখা হয়েছে— “‘নীলবসনা সুন্দরী’ বঙ্গ সাহিত্যের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ডিটেক্টিভ ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি দে প্রণীত। ইনি সাহিত্য সমাজে সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। আমরা এই পুস্তক অত্যন্ত আগ্রহের সহিত পাঠ করিয়াছি। পূর্ব্বে বাংলায় ভালো ডিটেক্টিভ উপন্যাস ছিল না, শ্রীযুক্ত পাঁচকড়িবাবু বঙ্গীয় পাঠকগণের সে অভাব পূরণ করিয়াছেন। আমরা তাঁহার ডিটেকটিভ উপন্যাসের সমাদর করি। তাঁহার ন্যায় প্রতি পরিচ্ছেদে এমন নব নব কৌতূহল সৃষ্টি করিবার ক্ষমতা কাহারও দেখি না। যদি এমন উপন্যাস পড়িতে চাহেন যাহা একবার পড়িয়া তৃপ্তি হয় না, দশবার পড়িয়া দশজনকে শুনাইতে ইচ্ছা করে তবে এই ‘নীল বসনা সুন্দরী’ পাঠ করুন। পড়িতে পড়িতে যেন এই উপন্যাস চুম্বকের আকর্ষণে পাঠককে টানিয়া লইয়া যায়। ঘটনা কৌতূহলজনক, ভাষাও তেমন সরল ও তরল, যেন নির্ঝরিণীর ন্যায় তরতর বেগে বহিয়া যাইতেছে। শব্দচ্ছটাও অতি সুন্দর। বঙ্গ সাহিত্যে গ্রন্থকারের ডিটেকটিভ উপন্যাস যথেষ্ট সমাদর লাভ করিবে।”

    নলিনী রঞ্জন পণ্ডিত সম্পাদিত ‘জাহ্ণবী’ মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে। পত্রিকাটির প্রথম বর্ষের ষষ্ঠ সংখ্যায় কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন পাঁচকড়ি দে’র দুটি উপন্যাস সম্বন্ধে লিখেছেন— “’নীল বসনা সুন্দরী’, ‘হত্যাকারী কে?’ শ্রী পাঁচকড়ি দে প্রণীত। এই দুইখানি ডিটেকটিভ উপন্যাস আমরা স্বীকার করিতে বাধ্য, আমরা সচরাচর ইংরাজী ও ফরাসীয় লেখকদের রচিত যে সব ডিটেকটিভ উপন্যাস পাঠ করি, তদপেক্ষা সমালোচ্য উপন্যাস দুখানি কোন অংশে হীন নহে। ভাষা বেশ সরল, সুন্দর যেন জলধারার মত বহিয়া যাইতেছে। লেখক সুনিপুণ কৌশলে, মুন্সিয়ানার সহিত, ওস্তাদির সহিত পাঠককে গ্রন্থের প্রথম হইতে শেষ পর্য্যন্ত পাঠ করিতে বাধ্য করেন। কৌতূহল চরিতার্থ করিবার জন্য এক দুর্দ্দমনীয় ব্যাকুলতা জন্মে। লেখকের পক্ষে ইহা কম বাহাদুরীর বিষয় নহে।”

    সাহিত্যিক ধীরেন্দ্রনাথ পালের পুত্র যতীন্দ্রনাথ পালের আকস্মিক মৃত্যুতে দীনেন্দ্রনাথ অত্যন্ত শোকগ্রস্ত হন। যতীন্দ্রনাথ ছিলেন পাঁচকড়ির বিশেষ বন্ধু। তার নামানুসারেই জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ লেনে পাঁচকড়ির বইয়ের দোকানের নাম ছিল ‘পাল ব্রাদার্স’। বন্ধুর মৃত্যুর পর তিনি আর কোন লেখা লেখেন নি। ১৯৪৫ খৃষ্টাব্দের ২০শে নভেম্বর তার মৃত্যু হয়।

    সৰ্ব্বসদ্‌গুণালঙ্ক তহৃদয়

    সুহৃদ্বর

    শ্রীযুক্ত অভয়চরণ পাল বি.এ., বি. এল.,

    বৈবাহিক মহাশয়ের নামে এই গ্ৰন্থ

    সাদরে

    উৎসর্গীকৃত হইল।

  • থানা থেকে আসছি

    থানা থেকে আসছি

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায়

    থানা থেকে আসছি

    B. Priestleyর “An Inspector Calls” নাটক-অনুপ্রাণিত

    “থানা থেকে আসছি” স্বনামধন্য নাট্যকার Mr. J. B. Priestleyর “An Inspector Calls” নাটকের অনুসরণে রচিত। ঋণ স্বীকার করবার অনুমতি দিয়ে Mr. J. B. Priestley আমাকে কৃতজ্ঞতার ঋণে ঋণী করে রেখেছেন। মুখের কথায় ধন্যবাদ জানিয়ে সে ঋণ পরিশোধ করা যায় না। তাঁর কাছে আমি ঋণী হয়েই থাকলাম। বাংলা নাটক “থানা থেকে আসছি”র যা কিছু দোষত্রুটি তার দায়িত্ব আমার। এর গুণগত বৈশিষ্ঠ্যের জন্য প্রশংসা মূল নাট্যকার Mr. J. B. Priestleyর প্রাপ্য।

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায়

    উৎসর্গ

    শ্রী উৎপল দত্ত

    সুহৃদবরেষু

    ‘থানা থেকে আসছি’ প্ৰসঙ্গে

    এ নাটক মঞ্চস্থ করতে গিয়ে নাট্য-আন্দোলনের বয়ঃকনিষ্ঠ পরিচালকরা একাধিক সমস্যার সম্মুখীন হবেন। এদিকে লিটু থিয়েটার গ্রুপও এ নাটকের মহড়া দিয়েছেন এবং প্রয়োগপদ্ধতি সম্বন্ধে আমরা কিছু চিন্তা করেছি। ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনদের কিছুটা লাভ হতে পারে এই আশায় আমাদের বক্তব্য এখানে উপস্থিত করছি।

    এ নাটকে অন্ততঃ একটি জটিল তত্ত্ব কাহিনীর মধ্যে জড়িয়ে আছে। অলাতচক্রের মত সময়ের গতি; কোনো এক মুহূর্তে মশাল নিভিয়ে দিলেও সে অলাতচক্রের আভাস অন্ধকারের বুকে কিছুক্ষণ জেগেই থাকে। একটি সুখী পরিবারের চায়ের আসরেও এমনি দপ করে কৃত্রিম আনন্দের মশাল নিভিয়ে দেওয়া যাক। কি দেখতে পাব? তাদের জীবনের বৃত্ত আরো কয়েক পাক ঘুরে গেল, প্রায় অবাস্তব আলেয়ার আলোর মত। আর সেই অস্পষ্ট আলোয় যে মুখগুলি দেখতে পাচ্ছি, সেগুলি বড় ভীষণ। আবার মশাল জ্বলতেই সেই আনন্দোচ্ছল সুখী পরিবার। “Time moves in & spiral” বলেছেন জনৈক ইংরাজ মনীষী; তাই সেই ঘুরানো সিঁড়ির যে কোনো ধাপই নিন না কেন তার থেকে একটা লম্ব মাটিতে টানলে তার তলার অসংখ্য ধাপ এক লাইনে গাঁথা হয়ে যাবে। অতএব, একই ঘটনা বার বার ঘুরে আসে সময়ের বৃত্তাকার ঊর্ধ্বারোহণে, যদিও প্রতিবারই সে আরো উন্নত রূপ পরিগ্রহ করতে থাকে। তাই বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মাঝে যে দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর আমরা কল্পনা করে থাকি, বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। অতএব ধরা যাক কোনো অভাবনীয় উপায়ে (এ ক্ষেত্রে এক পুলিস অফিসারের মাধ্যমে) আগামী ঘটনার একটা ছায়াময় পুর্বাভিনয় বর্তমানেই ঘটে গেল; অবস্থাটা কি দাঁড়ায়?

    কিন্তু নাটক মঞ্চস্থ করতে গেলে তত্ত্বের অংশটি সচেষ্ট হয়ে বাদ না দিলেও অন্ততঃ অবহেলা করা উচিত। কারণ ও তত্ত্বটা গৌণ হয়ে গেছে; মুখ্য হয়ে উঠেছে কাহিনীর বিন্যাস এবং বিষয়বস্তু। শুধুমাত্র ঐ ধরনের সুক্ষ্ম তত্ত্ব বিচারে নিমজ্জিত থাকলে নাটক নাটকই হোত না।

    তবে ইনস্পেক্টর্ কে? পুর্ববর্ণিত লম্ব বেয়ে তিনি উপরের ধাপ থেকে সময়-বৃত্তের নীচের ধাপে নেমে আসতে পারেন, কিন্তু বাস্তব জীবনের কঠিন পরিবেশে তিনি কি অবলম্বন করে আসবেন? ভৌতিক অফিসার হলে আবার প্রশ্ন থাকে তিনি এত সত্য কথা জানলেন কি করে? প্ল্যানচেটে মর্ত্যে আহুত হয়ে তিনি যে সমাজের স্তম্ভস্বরূপ ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে রিসার্চ চালাবার সময় পাবেন তা তো মনে হয় না ৷ তবে তিনকড়ি হালদার কে?

    এমনও হতে পারে তিনকড়ি হালদার চন্দ্র মাধববাবুদের বিবেক। এবং এই সকল বড়লোকদের বিবেকের গায়ে যে পুলিসের উর্দি থাকবে এটা তো সহজেই অনুমেয়। ভয় তাঁরা করেন একমাত্র পুলিসকে, কোর্টকে, সংবাদপত্রকে। আদর্শের বা প্রতিবেশী মানুষের প্রতি মমত্ব বোধের পাট তাঁরা অনেক আগেই চুকিয়ে দিয়েছেন; না দিলে হয়তো তিনকড়িবাবু আবার ক্রসে ঝুলে তাঁদের চক্ষু উন্মীলিত করতে চেষ্টা করতেন। কিন্তু পিতঃ ইহাদিগকে ক্ষমা করিলে এঁরা আজকাল হেসে বলেন—যাক ধরতে পারে নি। তিনকড়িবাবু কৌপীন পরে নদীয়ার পথে চন্দ্রমাধববাবুর ড্রয়িং রুমে পৌঁছুলে কলসির কানাই পেতেন. প্রেম দেওয়া আর হয়ে উঠত না। কিন্তু এঁরা ঢিট হয়ে গেলেন ঐ চামড়ার বেল্ট, টুপী আর খাকী পোষাকের সামনে। বাস্তব জীবনে পুলিস হিসাবের খাতা দেখতে চাইলে কয়েকটি টাকা গুঁজে দিয়ে, এবং দাতব্য হাসপাতালে কিছু দান করে হাসিমুখে চায়ে চুমুক দেওয়া যায়; কল্পনার তিনকড়িবাবু ডিউটিতে সিগারেটও খান না। এ হেন কুলিস কঠিন পুলিস অফিসারকে অনেক ধনীই রাত্রে নিভৃত দুঃস্বপ্নে দেখেন, আঁতকে ওঠেন, এবং পরদিন অনিদ্রা রোগের ঔষধের চাহিদা বাড়ে—এটা বর্তমান যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাই সেই দুঃস্বপ্নই মূর্তিমান কায়াময় হয়ে থানা থেকে এসে হাজির হয়েছে— ট্যাক্‌স্‌ ফাঁকি থেকে সুরু করে নারীহত্যা পর্যন্ত সব তাঁর নখদর্পণে। নাট্যকার এইখানেই তাঁর মননশীলতার সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ দিয়েছেন। এদিক থেকে তিনকড়ি হালদার আমাদের যাত্রার বিবেকের নব্যতান্ত্রিক রূপ, উত্তরাধিকারী, এবং সে শুধু নাটকের মূল বক্তব্যকে তুলে ধরে না, সে অভিযুক্ত করে অপরাধীদের, সে যুগধর্ম্ম পালন করে।

    এটুকু স্পষ্ট হয়ে গেলে পরবর্তী কাজ অত্যন্ত সহজ। আমরা যতদূর ভেবেছি—তাতে মনে হয়েছে একটি হঠাৎ বড়লোকের উগ্র রুচির ছাপ থাকা উচিত ড্রয়িং-রুমের দেয়ালে, পিয়ানোয়, আসবাবে, রেডিওগ্রামে। প্রথমাংশে অভিনয়ও হওয়া উচিত সাবলীল, স্বাভাবিক। তার যে মুহূর্তে ভৃত্য ঘোষণা করে— “থানা থেকে ইন্‌পেক্টরবাবু এসেছেন।”—সে মুহূর্ত থেকে আলো যেন কেমন কমে আসে, চন্দ্রমাধববাবুদের হাঁটাচলা, কথা বলায় আসে কেমন একটা মাদকতা, একটা সম্মোহিতের ভাব। তিনকড়িবাবু ভাবেভঙ্গীতে হবেন পুরোদস্তুর পুলিস অফিসার, এবং বোধহয় তাঁর বসা উচিত দর্শকের দিকে পেছন ফিরে, নীচুধরনের কোনো আসনে আর তাঁর সামনে অর্ধ বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে থাকবে অভিযুক্তের দল।

    আবার আরো স্পর্ধিত পরীক্ষা চাল। বারও অনেক সুযোগ রয়েছে, যেহেতু পুরো জিনিষটাই কয়েক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখছেন বলা চলে। অতএব অত্যন্ত রংচঙে কিছু সার্কাস-মার্কা ক্লাউন যদি একটা বিষম রঙীন পর্দার সামনে লাফাঝাঁপি করতে থাকেন, তাহলেও চন্দ্রমাধববাবুদের চায়ের আসরের প্রকৃত রূপ ধরা পড়ে না কি? আবার তিনকড়িবাবু টেনে টেনে তাঁদের এনামেল করা চকচকে মুখোসগুলো খুলে দিলে বীভৎস কঙ্কালসার কতকগুলি অবয়ব বেরিয়ে পড়লেই বা কেমন হয়?

    এক কথায় পরিচালক অনেক কিছুই করতে পারেন এ নাটক নিয়ে। উপরের কথাগুলি তাঁদের কল্পনাশক্তিকে পুর্বনির্ধারিত কোনো পরিকল্পনার গণ্ডীর মধ্যে বেঁধে ফেলার জন্যে বলা হয়নি; তাঁদের কল্পনাকে আরো উদ্বুদ্ধ করার জন্যেই বলা হোলো । এমনও হতে পারে শক্তিমান যুবক পরিচালক উপরোক্ত মন্তব্য পড়ে হেসে উড়িয়ে দিয়ে নিজস্ব ধারায় নাটকটিকে ঢালবেন। সেটাই আমাদের কাম্য। তবে প্রগতিশীল সংগঠনের কাছে আমাদের একটি আবেদন : তিনকড়ি হালদারের শেষ ক’টি লাইন অনুধাবন করুন। শ্রী অজিত গঙ্গোপাধ্যায় বহুবার প্রমাণ করেছেন যে তিনি প্রগতিশীল নাট্য-আন্দোলনের একজন শক্তিমান লেখক ৷ এ নাটকেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। যে ইংরাজি নাটক দ্বারা এ নাটক অনুপ্রাণিত, সে নাটকের প্রথম অভিনয় ইংলণ্ডে হয়নি, হয়েছিল প্রগতির যাঁরা শিখরে উঠেছেন—সেই সোবিয়েৎ ইউনিয়নে।

    — উৎপল দত্ত।

    বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে বিভিন্ন পেশাদারী নাট্যসংস্থা এই নাটকটি মঞ্চে সফল উপস্থাপনা করেছে যেমন: চতুর্মুখ, মাস থিয়েটার্স ইত্যাদি।

    এই নাটকটি দুইবার চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে।

    ‘থানা থেকে আসছি’-র প্রথমবার চলচ্চিত্র হয় ১৯৬৫ সালে।

    সুর সংযোজনা— তিমিরবরণ, পরিচালনা— হীরেন নাগ, পরিবেশনা— চণ্ডীমাতা ফিল্মস প্রাঃ লিঃ। রূপায়ণে— উত্তম কুমার, ছায়াদেবী, কমল মিত্র, দিলীপ মুখার্জী, জহর রায়, অঞ্জনা ভৌমিক ও মাধবী মুখার্জী।

    ‘থানা থেকে আসছি’-র দ্বিতীয়বার চলচ্চিত্র হয় ২০১০ সালে।

    পরিচালনা— সারণ দত্ত, পরিবেশনা— মরফিউস মিডিয়া ডেনচার।

    রূপায়ণে— সব্যসাচী, পাওলি, পরমব্রত, রুদ্রনীল, দুলাল ইত্যাদি।

    ‘থানা থেকে আসছি’-র মঞ্চে পেশাদার প্রযোজনা ১৯৭৮ সালে অগাস্ট মাসে। আলো— তাপস সেন, পরিচালনা– শ্যামল সেন, অভিনয়ে– অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃপ্তি মিত্র, এন বিশ্বনাথন, দেবরাজ রায় ইত্যাদি।

    ‘থানা থেকে আসছি’-র মঞ্চে স্বপ্ন সন্ধানীর প্রযোজনা ২০১৩ সালের মে মাসে। পরিচালনা— কৌশিক সেন। অভিনয়ে— কাঞ্চন মল্লিক, কৌশিক সেন, রেশমি সেন ইত্যাদি।

    অজিত গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা নাট্যজগতের এক স্বনামধন্য পুরুষ। জন্ম— কলিকাতায়, ২৮শে জুন, ১৯২১ । শিক্ষা— কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়– অর্থনীতির ও গণিতের ছাত্র। গভীর জীবনবোধ, কাব্যময় সংলাপ, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, বাস্তব মনস্তত্ত্বের চুলচেলা বিচার এঁর প্রত্যেক নাটকের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য মৌলিক নাটক— নচিকেতা, মৃত্যু, পোষ্টমাস্টারের বৌ, সূর্যের মত সমুদ্র, এই সব স্বগোতক্তি ইত্যাদি। বিদেশী নাটক এবং উপন্যাস অনুসরণে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান— শকুন্তলা রায় (হেড্ডা গাবলার) নির্বোধ (ইডিয়ট), আকাশ বিহঙ্গী, (সীগার্ল) মালবাজারের মা মালতী (ডি হাইলিশে ইয়োহান্না ডের সলাখট হফে), থানা থেকে আসছি (এ্যান ইন্সপেক্টর কলস) প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথের ‘যে’ ও ‘ঘরে বাইরে’ এবং বঙ্কিমচন্দ্রের ‘মুচিরাম গুড়’-এর নাট্যরূপ তাঁর বিস্ময়কর কৃতিত্ব। এই নাট্যকার কৃত শেক্সপীয়রের হ্যামলেট ও রিচার্ড দি থার্ড’-এর বঙ্গানুবাদ বিশেষ সুপ্রসিদ্ধি পেয়েছে। অজিতবাবুর নাটক সম্বন্ধে বহু বিদ্বজন বিভিন্ন সময়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এঁর হ্যামলেটের বঙ্গানুবাদকে আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘পাস্তেরনাকের’ রুশ ভাষায় অনুবাদের সঙ্গে সমতুলনা করেছেন। সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশী বলেছেন— ‘ইব সেনের হেড্ডাগাবলার অজিতের হাতে হয়ে উঠেছে সার্থক রক্ত মাংসের শকুন্তলা রায়। নাট্যবিদ উৎপল দত্ত বলেছেন— ‘নাটকে সাহিত্য রস সঞ্চরিত করার কাজে অজিত ছিলেন বর্তমান নাট্যজগতে অনন্য। প্রতিটি বাক্যের ব্যাকরণগত সঠিকতার সঙ্গে যোজিত হত ধ্বনিগত মাধুর্য। যেমন— নচিকেতা নাটক, গ্রীক নাট্যশৈলীকে, খাঁটি দেশজ ভাবের বাহন করেছে নচিকেতা।” বহুরূপী থেকে রূপকার, এলটিজি থেকে নান্দীকার, চতুর্মুখ থেকে চতুরঙ্গ— প্রমুখ নাট্যসংস্থা এঁর বিবিধ নাটক মঞ্চে সফল উপস্থাপনা করেছে। অজিতবাবুর অকাল প্রয়াণ (৫ জুলাই, ১৯৮৪)। বাংলা নাট্যজগত এক দেদীপ্যমান জ্যোতিষ্ককে হারাল।

    চরিত্রলিপি

    চন্দ্রমাধব সেন বিখ্যাত ধনী, কয়েকটি বাণিজ্য-প্রতিষ্ঠানের অংশীদার ও ডিরেক্টর
    রমা সেন চন্দ্রমাধব সেনের স্ত্রী
    শীলা সেন ঐ কন্যা
    তাপস সেন ঐ পুত্র
    গোবিন্দ ঐ ভৃত্য
    অমিয় বোস চন্দ্রমাধব সেনের বন্ধুপুত্র
    তিনকড়ি হালদার পদ্মপুকুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর
    স্থান পদ্মপুকুরে চন্দ্রমাধব সেনের ড্রয়িং-রুম
    কাল ১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহের এক সন্ধ্যা
  • অ্যাডভেঞ্চার সমগ্ৰ

    অ্যাডভেঞ্চার সমগ্ৰ

    অজেয় রায়

    [book]

    ‘সন্দেশ’ ও ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ছয়টি উপন্যাস ও দু’বড়গল্প নিয়ে সঙ্কলন করা হয়েছে ‘অজেয় রায়ে’র ‘অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র’; যদিও লেখকের আরও অনেক অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যা এই সঙ্কলনে স্থান লাভ করেনি। এই সঙ্কলনের কাহিনীগুলো মূলত কিশোর কিশোরীদের জন্যে লেখা হলেও বড়দের‌ও ভাল লাগার মত প্রতিটি কাহিনী। এই সঙ্কলনে স্থান পাওয়া উপন্যাস ও গল্পগুলো হচ্ছে—

    এগুলোর মধ্যে ৬টি কাহিনীর প্রধান তিন চরিত্র হলো গল্পকথক অসিত, অসিতের বন্ধু সুনন্দ এবং প্রাণিতত্ত্ববিদ প্রফেসর নবগোপাল ঘোষ। এই ত্রয়ীর মাধ্যমেই অভিযানের কাহিনী এগিয়ে চলে। আলাদা আলাদা উপন্যাস ও গল্পে দেশী বিদেশী অন‍্যান‍্য চরিত্ররাও যুক্ত হয়ে যায়। বাকি দু’টি কাহিনীতে এই তিনটি চরিত্র নেই। সেখানেও অন্য চরিত্রের মাধ্যমে অ্যাডভেঞ্চারের উজ্জ্বল উপস্থিতি‌।

    প্রতিটি উপন্যাস ও গল্পে দেশ বিদেশের দুঃসাহসিক অভিযানের কাহিনী তো আছেই। এর সঙ্গেই ইতিহাস, ভূগোল, নৃতত্ত্ব ও জ্ঞান বিজ্ঞানের নানা রকম তথ্য আকর্ষণীয় ভাবে পরিবেশিত হয়েছে যা কখনই একঘেয়ে মনে হয় না। আফ্রিকা, আমাজনের অদেখা বন জঙ্গল হোক কিংবা কোন অচেনা জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার কথা, অথবা খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা পশ্চিমবঙ্গে বীরভূমের ঝিলে উত্তর এশিয়া ও ইউরোপ থেকে শীতকালে আসা যাযাবর হাঁসের গল্প—সব ক’টি কাহিনীই মনোহারী। উপন্যাসের মাধ্যমে উঠে এসেছে ইনকা সভ‍্যতা, আর্মি অ্যান্ট, ফেরোমন, সরিসৃপ ও পাখির মিসিং লিংকের ফসিল, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অজানা দ্বীপ ও জঙ্গল, প‍্যারাডাইস বার্ড সম্পর্কে প্রচুর তথ্য। কিন্তু সবকিছুই লেখক পরিবেশন করেছেন সহজ সরল লেখনীর মধ্য দিয়ে। ফলস্বরূপ কাহিনীগুলি মনোগ্ৰাহী ও সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছে পাঠকের কাছে।

    ব‌ইয়ের শেষে প্রতিটি উপন্যাস ও গল্পের প্রকাশকাল ও এর মধ্যে যে যে কাহিনী আলাদা আলাদা ব‌ই হিসেবে কবে প্রকাশিত হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মুঙ্গু ও মি. বাসুর ফরমুলা এবং আমাজনের গহনে উপন্যাসের ভূমিকা লিখেছিলেন যথাক্রমে লীলা মজুমদার ও প্রেমেন্দ্র মিত্র। তাঁদের লেখা পড়লেই বোঝা যায় যে অজেয় রায় কত বড়মাপের লেখক ছিলেন। পাঁচটি উপন্যাসে অলঙ্করণ করেছিলেন সত‍্যজিৎ রায় যা এককথায় অনবদ্য। অলঙ্করণগুলি নিঃসন্দেহে এই সঙ্কলনটিকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে। বিজ্ঞান ভিত্তিক অ্যাডভেঞ্চার গল্প / উপন্যাস পড়তে হলে অবশ্যই এই ব‌ইটি পড়া উচিত।

    অজেয় রায় বাঙালি শিশুসাহিত্যিক। শিশু কিশোরদের জন্যে তিনি প্রচুর কাহিনী রচনা করেছেন। জন্ম ১৯৩৫ সালে বীরভূম জেলার শান্তিনিকেতনে। ৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৮ মারা যান।

    মুখবন্ধ

    যেদিন প্রথম ছোটদের জন্য দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প লেখা শুরু হয়েছিল, সেদিন থেকে শিশুসাহিত্যের একটা নতুন দিগন্ত খুলে গেছিল। বলা বাহুল্য, এর সূচনা হয়েছিল ইয়োরোপে। এবং সে সময়ে শিশুসাহিত্যের কয়েকটি শ্রেষ্ঠ রত্ন দিনের আলোর মুখ দেখেছিল। রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের, ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’, ‘কিডন্যাপ্‌ড’, জুল ভের্নের ছোটবড় সকলের জন্য লেখা নানান বিজ্ঞানভিত্তিক কিংবা অসমসাহসিক অভিযানের নানান বইয়ের গুণ আজ পর্যন্ত ম্লান হয়নি। পৃথিবীর অত্যাশ্চর্য বিস্ময়ের দিকটা চিরকালই ছোটদের মুগ্ধ করেছে। এ-ও তাদের বড় হওয়ার একটা বলিষ্ঠ দিক; অজ্ঞাতকে জানবার, দুর্গমকে জয় করবার, প্রতিকূল শক্তির সঙ্গে লড়বার, দেহ-মনের বল আহরণের প্রবল একটা দিক।

    অনেক দিন আগেই বাংলায় এই ধরনের কিছু কিছু বই বেরিয়েছে, লেখকদের মধ্যে হেমেন্দ্রকুমার রায়ের নাম করতে হয়। তাছাড়া আরো আছেন। এই বইখানির রচয়িতা অজেয় রায় সেই জাতের লেখক, যাঁরা দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প অতিশয় সরস ও সহজ ভাবে লিখতে পেরেছেন। এর মধ্যে অনেক জ্ঞাতব্য বিষয় সংবলিত আছে। অজেয় রায় কোনো তথ্য পরিবেষণ করার আগে, সেটি নির্ভুল কিনা সে বিষয়ে পরীক্ষা করে নিতে যত্নবান হন। এইটি তাঁর বিশেষত্ব। এমন কি দুটো একটা বিদেশী কথা ব্যবহার করতে হলেও, আগে শব্দগুলি সম্বন্ধে নিজে নিঃসন্দেহ হন, তারপর লেখেন। ছোটদের বইতে ভুল লিখলে চলে না ।

    এই ধরনের বই কোনো কোনো অভিভাবক স্রেফ রোমাঞ্চময়, নিকৃষ্ট শ্রেণীর লেখা বলে অপছন্দ করেন। তাঁরাও এই বইখানি সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হতে পারেন, এর কাল্পনিকতা তথ্যপুষ্ট বলেই এত আকর্ষণীয়। রস ও কল্পনাশক্তিই হল সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য। এ ছাড়া হাজার জ্ঞাতব্য তথ্যে পূর্ণ হলেও রচনা উরোয় না। ছোটরা আনন্দের সঙ্গে পাঠ করলে তবে না তাদের জন্য গল্প লেখা সার্থক হয়।

    অজেয় রায়ের ছাত্র-জীবনের ও কর্ম-জীবনের পটভূমিকা হল গিয়ে শান্তিনিকেতন, কল্পনায় ভরা স্থান। তাঁর বয়স চল্লিশের অনেক কম। ছোটদের আদর্শ লেখক তিনি।

    কলকাতা
    ১৫ মে, ১৯৭৫
    লীলা মজুমদার

    সূচিপত্র

  • মুঙ্গু

    মুঙ্গু

    অজেয় রায়

    [book]

    ভূমিকা

    কোনো বাঙালি ছেলের পক্ষে আফ্রিকা যাওয়াই একটা বিরাট অ্যাডভেঞ্চার। তার ওপরে সেখানে গিয়ে যদি তাকে সব লোমহর্ষক ঘটনার মধ্যে জড়িয়ে পড়তে হয়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা! ডার-এস-সালাম পৌঁছনোর কিছুদিন পর থেকেই আমার জীবনে যেসব ঘটনা ঘটেছিল, আজ ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসে সেগুলোর কথা ভাবলে স্বপ্নের মতো মনে হয়। অথচ যখন ঘটেছিল তখন সেগুলো ছিল বিস্ময় ও বিভীষিকা মেশানো এক বিচিত্র অ্যাডভেঞ্চার। কত কথাই না মনে পড়ছে আজ!…মামাবাবুর সেই আশ্চর্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মুহূর্তটা; ঢ্যাঙা উইচ ডক্টর কামাউ, টোটো, ডক্টর হাইনে, অল্পক্ষণের জন্য দেখা ডেয়ারিং বিল! আর মনে পড়ছে রুফিজি নদীর মোহনার সেই প্রলয়ঙ্করী ঝড়, যে ঝড় না হলে আমার কাহিনী একেবারে অন্য চেহারা নিত; কিংবা সে-কাহিনী হয়তো লেখাই হতো না।

    আফ্রিকা যাবার ব্যাপারটা যেভাবে ঘটেছিল সেটা অবিশ্যি তেমন চমকপ্রদ কিছু নয়। এর জন্য দায়ী আমার বন্ধু সুনন্দ। ঘটনাটা ঘটল সেপ্টেম্বর মাসে আমার শোবার ঘরে। তখন রাত এগারোটা। আমি বিছানায় শুয়ে বেশ জমিয়ে একটা ডিটেকটিভ বই পড়ছি, এমন সময় সুনন্দর আবির্ভাব। সময়টা বেয়াড়া, তবে সুনন্দর পক্ষে সেটা অস্বাভাবিক নয়। ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই সে প্রশ্ন করল, ‘কীরে অসিত—আফ্রিকা যাবি?’

    ‘কোথায়?’

    ‘ইস্ট আফ্রিকা। টাঙ্গানিকা।’

    ‘রাতদুপুরে এসে রসিকতা! কেটে পড়।’

    ‘বইটা বন্ধ কর। রসিকতা নয়। সিরিয়াসলি বলছি। সম্প্রতি মামাবাবুর বন্ধু জার্মান বৈজ্ঞানিক ডক্টর হাইনে ডার-এস-সালাম-এর মিউজিয়ামের কিউরেটর হয়েছেন। তিনি মামাবাবুকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কিছুদিনের জন্য তাঁর অতিথি হতে। ডক্টর হাইনে আফ্রিকার প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রাণী ও উদ্ভিদের অনুসন্ধান করছেন। সে-কাজে তিনি মামাবাবুর সাহায্য চান।’

    আমি হাত থেকে বই রেখে উঠে বসলাম।

    ‘কিন্তু যাতায়াতে অনেক টাকার ধাক্কা।’

    ‘তারও একটা সুরাহা হাইনে করেছেন। তিনি ব্যবস্থা করেছেন যে ডক্টর ঘোষ—মানে মামাবাবু আফ্রিকায় গিয়ে কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণাকেন্দ্রে বক্তৃতা করবেন। তাতে কিছু টাকা পাওয়া যাবে। হিসেব করে দেখেছি ওতে আমাদের তিনজনের এক পিঠের ভাড়া কুলিয়ে যাবে। সুতরাং তোর খরচ হচ্ছে সিঙ্গল ফেয়ার, ডবল জার্নি। আর থাকা-খাওয়া ফ্রি, কারণ ওখানে তুই হবি মামাবাবুর অর্থাৎ হাইনের গেস্ট।’

    প্রস্তাবটি অতি লোভনীয় সন্দেহ নেই। মামাবাবু অর্থাৎ বিখ্যাত প্রাণিবিজ্ঞানী প্রোফেসর নবগোপাল ঘোষ এবং তাঁর ভাগনে আমার বাল্যবন্ধু সুনন্দর সঙ্গে আমি দেশ-বিদেশে অনেক জায়গায় ঘুরেছি। মনে কর্তব্য স্থির করে ফেললাম, কিন্তু বাইরে কোনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ না করে একটু ভুরু কুঁচকে বললাম, ‘আচ্ছা, ভেবে দেখি।’

    পরদিন সকালে বাড়িতে ঘোষণা করলাম, ‘এবার পুজোয় আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। আফ্রিকা। সুনন্দের সঙ্গে।’

    তারপর টেলিফোনটা তুলে নিয়ে সুনন্দর নম্বরটা ডায়াল করলাম।

  • আমাজনের গহনে

    আমাজনের গহনে

    অজেয় রায়

    [book]

    ভূমিকা

    দুনিয়ায় কত জায়গাতেই তো যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সাধ থাকলেই সাধ্যে, কুলোয় না। তাই মনে মনে বেড়াতে যেতে পারি এমন সুযোগ একমাত্র যাতে পাওয়া যায় তেমন বই পেলে আর কোনো দুঃখ থাকে না। কিন্তু তেমন বই কি সহজে মেলে? যাঁর কল্পনায় ভর করে যাব, তিনি হয়তো যেখানকার কথা বলছেন, সেখানে নিজে তো যান-ই নি, ভালো করে ঠিকমতো খবরাখবরও রাখবার চেষ্টা করেননি। তিনি হয়তো উত্তর মেরুতে পেঙ্গুইন পাখি দেখিয়ে ছাড়বেন আর দক্ষিণ মেরুতে শাদা ভাল্লুক।

    তবে সে রকম বই যে বাংলায় মোটে নেই, তা কেউ যেন না বলে। এই তো আমার হাতে রয়েছে আমাজনের গহনে। যেমন তেমন জায়গায় নয়, সেই দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরের অজানা পেরু আর বলিভিয়ার যে সব অঞ্চলে আমাজন নদীর সব ধারাপথ এখনো পুরোপুরি খুঁজে বার করা হয়নি, সেইখানে যদি যেতে হয় তো আমি অজেয় রায়ের সঙ্গেই যাব। উত্তেজনা রোমাঞ্চ গা-ছমছম করা ভয় আর রুদ্ধশ্বাস উদ্বেগের খোরাক তো পুরোপুরি পাবই, সেইসঙ্গে এইটুকু নিশ্চিত মানব যে প্রাকৃতিক ভৌগোলিক যা সব বিবরণ পাচ্ছি, তার মধ্যে এতটুকু ভুল কোথাও নেই। আমাদের ছোটদের মনগুলোকে সমস্ত পৃথিবীতে সার্থকভাবে ঘুরিয়ে আনবার জন্যে এই আমাজনের গহনের মতো বই আর অজেয় রায়ের মতো লেখকের বড় দরকার।

    প্রেমেন্দ্র মিত্র

  • লৌহ কপাট

    লৌহ কপাট

    জরাসন্ধ ছদ্মনামের আড়ালে আসল মানুষটি হলেন চারুচন্দ্র চক্রবর্তী (১৯০২-১৯৮১)। অর্থনীতিতে এম.এ পাশ করে দার্জিলিং-এ ডেপুটি জেলার হিসেবে কর্মজীবন সুরু করেন। তিরিশ বছর নানা জায়গায় কাজ করার পর ১৯৬০ সালে আলীপুর সেণ্ট্রাল জেলের সুপারিন্টেনডেন্ট হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

    তাঁর লেখার বৃহত্তর অংশ জেলের বন্দীদের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। চাকরির কারণে জেল জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে লেখকের। কয়েদীদের কাছ থেকে শুনেছেন তাদের অপরাধের কাহিনী। সেসব কাহিনীর আলোকে লেখা ‘লৌহকপাট’। প্রথম তিনখণ্ড চাকরিজীবনে প্রকাশিত। শেষখণ্ডটি অবসরের পর প্রকাশিত হয়।

    এছাড়া ছোটগল্প এবং ছোটদের জন্য লেখা গল্পও তার বেশ কিছু আছে। তাঁর শিশুদের জন্য নিবেদিত কিছু বই এ প্রথমদিকে তাঁর মূল নাম প্রকাশিত হয়েছিল।

    প্রথম অখণ্ড (চার খণ্ড একত্রে) সংস্করণ – আশ্বিন ১৩৭৫

    প্রচ্ছদপট অঙ্কন : আশু বন্দ্যোপাধ্যায়

    উৎসর্গ

    লৌহকপাটের অন্তরালে যারা শেষ নিশ্বাস রেখে গেল,
    সেই সব বিস্মৃত মানুষের উদ্দেশে

     

    ফ্লাপের  লেখা

    লেখক জরাসন্ধ নিজে বলেছেন, – “এইটুকু শুধু বলতে পারি, জীবনে এমন একটা পথে আমাকে চলতে হয়েছে, যেটা প্রকাশ্য রাজপথ নয়। সে এক নিষিদ্ধ জগৎ। সেখানে যাদের বাস, তাদের ও আমাদের এই দৃশ্যমান জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে লৌহদণ্ডের যবনিকা।” এই লৌহদণ্ডের যবনিকার ওপারের কোনো কোনো প্রাণী অকস্মাৎ কোনোদিন খুলেছিল তাদের অন্তরদুয়ার, দেখা গেল তাদেরও আছে বৈচিত্র্যময় জীবনকাহিনী— সুখে সমুজ্জ্বল, দুঃখে পরিম্লান, হিংসায় ভয়ংকর, প্রেমে জ্যোতির্ময়। লৌহকপাট গ্রন্থে তাদেরই কথা লেখক বলেছেন অসীম মমতায় পরম সহানুভূতির সঙ্গে। এই গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক ক্লাসিক উপন্যাসের স্থান নিয়েছে।