Tag: গ্রন্থনাম

  • বিষাক্ত ছোবল

    বিষাক্ত ছোবল

    বিষাক্ত ছোবল

    আন নাসের ও তার সাথীরা মরুভূমিতে ঘুরতে ঘুরতে প্রখর সূর্যতাপ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল। মরুভূমির সেই জাহান্নাম থেকে তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে এলো দুই নারী। প্রথমে ওরা ভেবেছিল, এটা মরুভূমির তামাশা, এই দুর্গম প্রান্তরে মেয়ে আসবে কোথেকে। পরে মেয়েরা যখন ওদের পানি ও খাবার দিয়ে জীবন্ত করে তুললো, তখন ওরা ভাবলো, এরা মেয়ে নয়, জ্বীন বা পরী হবে।

    ছোটবেলা থেকে জ্বীন-পরীদের গল্প শুনতে শুনতে জ্বীন ও পরীর ভয় আন নাসেরের মনে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল। যদিও জীবনে কোনদিন জ্বীনপরী দেখেনি, তবু গল্প শুনতে শুনতে কল্পনায় তাদের যে ছবি খোদাই করা ছিল, এ মেয়েদের দেখে সে কল্পনা যেন বাস্তব হয়ে ধরা দিল। মরুভূমির জাহান্নামে দুই অনিন্দ্যসুন্দর মেয়েকে দেখে সে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, এরাই সে কল্পনার জ্বীন।

    মরুভূমিতে ঘুরতে ঘুরতে সে তার সাথীদের নিয়ে শেষ পর্যন্ত জ্বীনের খপ্পরে এসে পড়লো? ভাবনাটা মনে আসতেই এক অজানা ভয় ও শিহরণ ঘিরে ধরলো তাকে।

    সেই মেয়েরা পানির সাথে বিশেষ ধরনের নেশা জাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে সম্মোহিত করে ওদেরকে এনে তুললো এক দুর্গে। দুর্গে আসার পর এক সময় তাদের নেশার ঘোরে কেটে গেল। আন নাসেরের কাছে এগিয়ে এলো এক মেয়ে। তার প্রশ্নের জবাবে বললো, ‘আমরা জ্বীন-পরী কিছু নই, তোমাদের মতই রক্ত-মাংসের মানুষ।’

    আন নাসের চারদিকে তাকিয়ে দেখলো। তার অভিজ্ঞ চোখ বললো, এটা একটা দুর্গ। জ্বীন-পরীদের এমন দুর্গের প্রয়োজন হয় না। মেয়েটি তাহলে সত্যি কথাই বলেছে! এরা জ্বীন-পরী কিছু নয়! তাহলে কি ওরা মেয়েদের ফাঁদে পা দিয়ে নিজেরাই পায়ে হেঁটে এসে ঢুকে পড়েছে দুশমনের দুর্গে? এতক্ষণে আন নাসের বুঝতে পারলো, সে এবং তার সাথীরা কি ভয়ংকর জালে আটকা পড়েছে।

    কি করে এ জাল কেটে বেরিয়ে যাওয়া যায় এ নিয়েই ভাবছিল আন নাসের। তার সাথীরা তখনও ঘুমিয়ে, মেয়েটি আবার ফিরে এলো। বললো, ‘তুমি জানতে চাচ্ছিলে তোমরা এখন কোথায় এবং কেন তোমাদের এখানে নিয়ে এসেছি। কেন এনেছি এ প্রশ্নের জবাব এখন দেয়া সম্ভব নয়, তবে তোমরা এখন কোথায় তা বলে দিতে পারি।’

    আন নাসের উদগ্রীব হয়ে বললো, ‘কোথায়?’

    ‘এটা একটা কেল্লা।’

    ‘এটা যে কেল্লা তা তুমি না বললেও জানি। কিন্তু কেল্লাটি কোথায় অবস্থিত, কি এর নাম, এখানে কারা থাকে।’

    ‘এ কেল্লার নাম আছিয়াত। এটা ফেদাইনদের কেল্লা। এখানে ফেদাইন নেতা শেখ মান্নান বাস করেন। ফেদাইনদের সম্পর্কে তুমি কিছু জানো?’

    ‘হ্যাঁ জানি!’ আন নাসের উত্তর দিল, ‘খুব ভাল করেই জানি। আর এখন এটাও জানতে পারলাম, তুমি আসলে কে? আমি শুনেছিলাম, ফেদাইনদের দলে সুন্দরী মেয়েরাও কাজ করে। তুমি তাহলে সেই সুন্দরীদের একজন?’

    ‘আমার সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক নেই।’ মেয়েটি উত্তর দিল, ‘আমার নাম লিজা!’

    ‘তাদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক না থাকলে তোমরা আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে কেন? তোমার সাথে তো আরও একটি মেয়ে ছিল, সে কোথায়?’

    ‘হ্যাঁ! আমার সাথে অন্য যে মেয়েটি ছিল তার নাম কারিশমা। সেও এখানেই আছে।’ লিজা বললো, কেন তোমাদের এখানে এনেছি, সে কথা বলা যাবে না। তবে কেমন করে এনেছি, সেটা বলতে পারি। তোমাদেরকে নেশা খাইয়ে সম্মোহিত করে এখানে এনেছি।’

    সে এই পর্যন্ত বলে শেষ করেছে, এমন সময় কামরার দরোজায় এসে দাঁড়ালো কারিশমা। কারিশমা চোখের ইশারায় লিজাকে বাইরে ডাকলো, লিজা বাইরে চলে গেল। আন নাসের খাটে বসে আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলো।

    তার কাছে এখন অনেক কিছুই পরিষ্কার। মরুভূমির মহা বিস্তারে হারিয়ে যাওয়ার পর যে মেয়েরা তাদের পানি ও খাবার দিয়েছিল, ওরা আসলে জ্বীন নয়, মানুষ। ওরা তাদেরকে নেশাগ্রস্ত করে নিয়ে এসেছে চরম এক সন্ত্রাসী গ্রুপ ফেদাইনদের কেল্লায়। ফেদাইনরা বেশ সুসংগঠিত এবং তাদের সংগঠন আরবের সব কয়টি দেশে বিস্তৃত। ওদের মূল পরিচয় ওরা প্রফেশনাল গুপ্তঘাতক। পয়সার বিনিময়ে ওরা যে কাউকে যে কোন সুরক্ষিত স্থানেও অবলীলায় খুন করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পারে। কে বা কারা লোকটির হত্যাকারী সে হদিস কেউ কোনদিন বের করতে পারে না। এ ধরনের ভয়ংকর খুনীদের আস্তানা বা কেল্লা থেকে বের হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।

    ‘এখানে কি করছো?’ কারিশমা জিজ্ঞেস করলো, ‘লোকটির সাথে এমন ঘনিষ্ট হয়ে বসার সময় তোমার কি একবারও মনে হয়নি, মুসলমানরা ঘৃণার পাত্র! তুমি কি শেষে গাদ্দারী করবে নাকি?’

    লিজার মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। চেহারা ভাবলেশহীন, নির্বিকার। মুখে কোন কথা নেই। একদিন আবেগের বশে এবং অন্যের প্ররোচনায় পড়ে মুসলমান নেতাদের চরিত্র হননের যে পেশা গ্রহণ করেছিল, এখন সে কথা মনে হতেই নিজের প্রতি ঘৃণা জন্মাল।

    দিনে দিনে এই জঘন্য পেশার প্রতি তার ঘৃণা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেলো, নিজেকে এই পেশা থেকে সরিয়ে নেয়ার কথা ভাবলো সে। কিন্তু যখন মনে হলো, এ পথে আসা যায়, কিন্তু যাওয়া যায় না, তখন ঘৃণা রূপ নিল প্রতিশোধ স্পৃহায়। কিভাবে নিজের ওপর প্রতিশোধ নেবে, কোন কূল না পেয়ে সে এ পরিবেশ থেকে পালানোর পথ খুঁজতে লাগলো। এ সময়ই ওদের হাতে এসে পড়ে আন নাসেররা।

    ‘আমিও যুবতী মেয়ে!’ কারিশমা তাকে বললো, ‘আন নাসেরের মত সুদর্শন যুবক, যে কোন যুবতীর হৃদয় দখল করতে পারে। তাকে আমারও ভাল লাগে। সত্যি বলছি, এমন আকর্ষণীয় যুবককে ভাল না বেসে পারা যায় না। যদি তুমি বলো, তাকে তুমি ভালবেসে ফেলেছে, তাতে আমি আশ্চর্য হবে না। আমি বুঝতে পারছি, বুড়ো মুসলিম আমীর ও সেনাপতিদের বিরুদ্ধে তোমার মনে ঘৃণা জমে উঠেছে। কিন্তু তোমার দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা মনে করো, স্মরণ করো তোমার শপথের কথা, এই মুসলমানরা তোমার শত্রু। এদের অনিষ্ট করার শপথ নিয়েছে তুমি।’

    ‘না! তা নয় কারিশমা!’ লিজা অধীর হয়ে বললো, ‘আমার সঙ্গে তার তেমন কোন ভাব হয়নি, যে জন্য তুমি আমাকে তিরস্কার করতে পারো।’

    ‘তবে তার কাছে কেন এসেছে, কেন তার সাথে ঘনিষ্টভাবে মিশছো?’

    ‘আমি এখন সে বর্ণনা দিতে পারবো না।’ লিজা বিরক্ত কঠে বললো, ‘জানি না আমার মাথায় হঠাৎ এমন খেয়াল কেন এলো, কেন তার পাশে গিয়ে বসতে ইচ্ছে জাগলো মনে।’

    ‘তার সাথে কি কি কথা হয়েছে তোমার?’

    ‘তেমন কোন বিশেষ কথা হয়নি।’ লিজা বললো।

    ‘তুমি তোমার দায়িত্ব পালনে খুব অবহেলা করছে। কারিশমা বিরক্তি প্রকাশ করে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো, ‘এটা বিশ্বাসঘাতকতা। তুমি জাননা বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কি?‘

    ‘জানি। মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু কারিশমা, তুমি শুনে রাখো!’ লিজা বললো, “আমি ঐ বুড়োর খায়েশের খেলনা হবো না। ফেদাইনদের নেতা বলে শেখ মান্নান তোমার কাছে যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, আমার কাছে সে একজন খুনী ও সন্ত্রাসী মাত্র। যদি সে আমার ওপর শক্তি প্রয়োগ করে তবে আমি তাকে খুন করবো। নয়তো নিজেই শেষ হয়ে যাবো।’

    কারিশমা এ কথা শুনে একদম পাথর হয়ে গেল। আসলে সে উজ্জ্বল পাথরই ছিল, যার রং ও উজ্জ্বলতা সবাইকে আকৃষ্ট করে। সবাই তাকে আপন করে পেতে চায়। কিন্তু পাথরের তো কোন পছন্দ অপছন্দ নেই। কিন্তু লিজা ততদূর পর্যন্ত অগ্রসর হতে পারেনি। নারীর সহজাত কামনা-বাসনা, ভাললাগা-ভালবাসা থেকে এখনো নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে পারেনি।

    কারিশমা তাকে বললো, ‘আমি কল্পনাও করতে পারিনি, তুমি এত বেশী আবেগপ্রবণ হয়ে উঠবে। বুঝলে তোমাকে আমি এখানে আনতাম না।’

    “আমি কি তোমার পায়ে পড়েছিলাম যে, আমাকে ওখানে নিয়ে চলো!’ শ্লেষ মেশানো কণ্ঠে বললো লিজা।

    রাগ করলো না কারিশমা। বললো, ‘এ কোল্লাটাই সবচে কাছে ছিল, তাই প্রথম মঞ্জিল হিসাবে এখানে এসেছি। নয়তো এক টানে ত্রিপলী পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব ছিল না আমাদের পক্ষে। তা ছাড়া আমাদের মত দুই নারীর পক্ষে চারজন কমান্ডোকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সামাল দেয়ার ঝুঁকিও আমি নিতে চাচ্ছিলাম না।’

    ‘ কিন্তু আমাকে এক হিংস্র পশুর হাতে তুলে দেয়ার ঝুঁকি তো ঠিকই নিতে পারলে।’ লিজার ক্ষুদ্ধ কণ্ঠ।

    কারিশমা দরদভরা কণ্ঠে বললো, ‘তোমার কাছে অঙ্গীকার করছি, শেখ মান্নানের কবল থেকে তোমাকে বাঁচাতে চেষ্টা করবো।’

    ‘তাহলে এখান থেকে জলদি পালিয়ে যাওয়ার একটা উপায় বের করে।’

    ‘সে চেষ্টা আমি করছি, কিন্তু মহাপ্রভুর দোহাই, তুমি আমাকে কথা দাও, বন্দীদের সাথে তুমি আর কোন রকম দহরম মহরম করবে না।’

    ‘সত্যি কথা বলবো কারিশমা!’ লিজা বললো, ‘আমি এখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই কমাণ্ডোদের সাহায্য নেবো। কারণ শেখ মানের সাথে আমি যে ব্যবহার করেছি, তাতে আমি নিশ্চিত, সে আমাদের এখান থেকে বেরোতে দেবে না। না তুমি নিজে বের হতে পারবে, না আমাকে বের করতে পারবে। কিন্তু এরা দক্ষ কমাণ্ডো, এদের বীরত্বের অনেক বিশ্বয়কর গল্প-কাহিনী লোক মুখে প্রচলিত। এদের সামান্য সুযোগ দিলেই এরা পালিয়ে যেতে পারবে। চাই কি সে সহযোগিতার বিনিময়ে তোমাকে-আমাকেও সঙ্গে নিতে রাজি হবে। এ ছাড়া আর কোন পথ নেই।’

    ‘আমি এদের বীরত্ব ও সাহসের প্রশংসা করি। স্বীকার করি এরা কুশলীও। তোমার কথাই ঠিক, সুযোগ পেলে ওরা পালিয়ে যেতে পারবে।’ কারিশমা বললো, ‘কিন্তু তুমি কি চিন্তা করে দেখেছো, এরা আমাদের দু’জনকে বের করে নিয়ে যেতে পারলে আমাদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করবে? তুমি কি মনে করে তারা আমাদেরকে আমাদের ঠিকানায় পৌঁছে দেবে নিশ্চয়ই তারা তা করবে না, তারা আমাদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। আমার কথা শোনো! মিথ্যা আশ্রয় খুঁজতে চেষ্টা করো না।

    কারিশমা থামলো। লিজাও চুপ। কারো মুখে কোন কথা নেই। কারিশমার কথাগুলো নিয়ে ভাবছে লিজা। এক সময় কারিশমাই পূনরায় মুখ খুললো। বললো, গোসল করে পোশাক পাল্টে নাও। আজ রাতে শেখ মান্নানের খাস কামরায় খাওয়ার দাওয়াত রয়েছে। আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি, তার সাথে তোমার ব্যবহার ও আদব-কায়দা কেমন হবে। তুমি তাকে অপছন্দ করো এমন মনোভাব যেন তার সামনে বিন্দুমাত্র প্রকাশ না পায়। এটাও যেন প্রকাশ না পায়, তুমি তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি এইমাত্র খবর পেলাম, হারানের গভর্ণর গুমাস্তগীন এখানে এসেছে।

    তুমি তো ভাল করেই জানো, গুমাস্তগীন সুলতান আইয়ুবীয় ঘোরতর দুশমন। ফলে তাকেও আমরা আমাদের উৎকৃষ্ট বন্ধু মনে করি। আমরা খুব কষ্ট করে এই মুসলমান শাসকদের হাত করেছি, তাদেরকে বন্ধু বানিয়েছি। এরা সবাই আমাদের অগ্রযাত্রার একমাত্র প্রতিবন্ধক সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বিরুদ্ধে লড়ছে। ফলে এমন কোন আচরণ করো না, যাতে তারা অসন্তুষ্ট হতে পারে।

    ❀ ❀ ❀

    কারিশমার ডাকে লিজা বেরিয়ে যেতেই আন নাসের গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। তার মনের সন্দেহ দূর হয়ে গেছে। এরা যে জ্বীন-পরী কিছু নয়, আসলেই রক্ত মাংসের মানুষ, এ কথাটা বুঝতে এতো দেরী হলো কেন, তাই ভেবে আফসোস হলো তার।

    এদিকে লিজার আচরণও তাকে অধীর করে তুললো। লিজা বলেছে, নেশাগ্রস্ত করে তাদেরকে এখানে আনা হয়েছে। আন নাসের অনুভব করলো, তার এ কথায় সত্যতা আছে। কারণ মরুভূমির সব কথাই তার মনে আছে, কিন্তু ওদের সাথে সাক্ষাতের পর থেকে যা ঘটেছে তার সব স্মৃতি স্পষ্ট নয়। যদি তাই হয় তাহলে ওরা তার দুশমন। কিন্তু দুশমন হলে মেয়েটি তার প্রতি সদয় হবে কেন?

    অনেক ভেবেও এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর পেলো না আন নাসের। লিজা তাকে আরও বলেছে, আন নাসের ও তার সাথীরা এখন ফেদাইন গ্রুপের হাতে। অথচ মেয়েটি নিজে ফেদাইন নয়, তাহলে সে কে? ফেদাইন না হয়েও কেন তবে তারা ফেদাইনদের আস্তানায় এসে উঠেছে।

    সে ভাবলো, অস্বীকার করলেও এই মেয়ে দুটি কি ফেদাইন দলেরই কর্মী হতে পারে না। কারণ ফেদাইনরাই মেয়ে ও নেশা দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চেষ্টা করে। ফেদাইনদের হাতে আছে হরেক রকম নেশা জাতীয় দ্রব। এত বিচিত্র নেশার দ্রব্য আর কারো কাছে নেই। কমাণ্ডো ট্রেনিংয়ের সময় ফেদাইনদের নেশা জাতীয় দ্রব্য সম্পর্কে তাদেরকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে এবং এই নেশা থেকে বেঁচে থাকার জন্য তাদেরকে বিশেষ ভাবে সাবধান করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু কি লাভ হলো সেই সাবধান বাণীতে এই সুন্দরী মেয়েরা তো সেই নেশার অস্ত্র দিয়েই তাদের ঘায়েল করে এখানে নিয়ে এর সে তার সঙ্গীদেরকে জাগালো। তারাও জেগে উঠে দুর্গের এক কামরায় নিজেদের আবিষ্কার করে আন নাসেরের মতই বিস্মিত হলো। বিস্ময়ের ঘোর কাটাতে ওরা আন নাসেরের মুখের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে তাকালো।

    ‘বন্ধুগণ!’ আন নাসের তাদের বললো, ‘আমরা ফেদাইনদের জালে আটকা পড়ে গেছি। এই কেল্লার নাম আছিয়াত কেল্লা। এটা ফেদাইনদের হেডকোয়ার্টার। ফেদাইন নেতা শেখ মান্নানও এখানেই থাকেন।

    যে মেয়ে দুটি আমাদের ধরে এনেছে তারা জ্বীন-পরী নয়, আমাদের মতই মানুষ। আমি এখনও বলতে পারছি না, এরা আমাদের সাথে কি ব্যবহার করবে। তবে আমরা সাবধান ও সতর্ক না হলে আমাদের পরিণতি হবে ভয়ংকর।’

    আন নাসের সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে আরো বললো, ‘তোমরা সবাই জানো, ফেদাইনরা গুপ্তঘাতক। এ জন্য তারা সুহেকসহ নানা রকম বিদ্যা প্রয়োগ করে থাকে। তাদের খপ্পর থেকে বেরিয়ে যাওয়া সোজা ব্যাপার নয়। যদি আমরা কখনো এই কামরা থেকে বাইরে যাওয়ার সুযোগ পাই, তবে আমাদের প্রথম কাজ হবে এ কেল্লা থেকে পালানোর কৌশল বের করা। আপাতত তোমরা এ নিয়ে কোন কথা বলবে না, সবাই নীরব থাকবে। যদি এরা কিছু জিজ্ঞেস করে তবে সংক্ষেপে উত্তর দেবে। মনে রেখো, এই শয়তানদের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া সহজ ব্যাপার নয়।’

    ‘এরা কি আমাদের কারাগারে পাঠাবে?’ আন নাসেরের এক সাথী প্রশ্ন করলো।

    ‘যদি কারাগারে পাঠায় তবে আমাদের খুশী হওয়ারই কথা।’ আন নাসের বললো, ‘কিন্তু এরা আমাদের মন-মগজে নতুন চিন্তা ঢুকাতে চায়। হাশিশ ও নেশা জাতীয় দ্রব্য দিয়ে আমাদের বিবেক ও বুদ্ধি গুলিয়ে দিতে চায়। সুন্দরী মেয়ে দিয়ে আমাদের চিন্তা-চেতনায় ভোগের স্পৃহা জাগাতে চায়। ভুলিয়ে দিতে চায় আমাদের ধর্ম ও ঈমান।

    ‘পালানো ছাড়া আমাদের মুক্তির আর কোন পথ নেই।’ আন নাসেরের এক সাথী বললো।

    ‘পালাতে না পারলে আমরা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবো, কিন্তু ঈমান হারাতে পারবো না।’ অন্য একজন বললো।

    ‘হ্যাঁ, এ ব্যাপারে আমাদের খুবই সাবধান থাকতে হবে।’ আন নাসের বললো, “ওদেরকে আর নেশা খাওয়ানোর সুযোগ দেয়া যাবে না। আল্লাহর ওপর ভরসা করে পালানো, লড়াই অথবা মৃত্যু- এর যে কোন একটা বেছে নেবো আমরা, কিন্তু কিছুতেই তাদের মুঠোর ভিতর ঢুকবো না।’

    সারাদিন কেটে গেল। উল্লেখযোগ্য তেমন আর কিছু ঘটলো না সারাদিন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। পশ্চিম দিগন্তে হারিয়ে গেল সূর্য।

    সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসতেই এক লোক কামরার মধ্যে বাতি দিয়ে গেল। সে কারো সঙ্গে কোন কথা বলল না। প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছিল তাদের। সারাদিন তাদের কিছুই খেতে দেয়নি। তারা ভেবেছিল, বাতি যখন দিয়েছে, আবারও পাঠাবে নিশ্চয়ই। কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হলো না। বাইরে থেকে সেই যে কামরা বন্ধ করে চলে গেলো লোকটি, তারপর থেকে আর কোন লোকের দেখা নেই।

    একটু দূরে কেল্লার মধ্যে শেখ মান্নানের মহল সাজানো হয়েছে। গুমাস্তগীনের সম্মানে বাড়তি আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরা কামরার মধ্যে বসে শুনতে পাচ্ছিল নারী ও পুরুষের সম্মিলিত কলকাকলি। সেখানে উৎসব চলছিল। সমবেত অফিসারদের মধ্যে পরিবেশন করা হচ্ছিল খাবার ও মদ। উৎসব হলের পাশেই শেখ মান্নানের খাস কামরা। ওখানেও খাবার পরিবেশন করা হলো। দামী মদের বোতল সাজিয়ে রাখা হলো টেবিলে। বিভিন্ন ধরনের খাবারের সুগন্ধে কামরার পরিবেশ মাতোয়ারা।

    আহার্য সামগ্রী সামনে নিয়ে বসে আছে শেখ মান্নান। তার ডাইনে কারিশমা ও বামে লিজা। সামনে গুমাস্তগীন। শেখ মান্নান গুমাস্তগীনকে বললো, “নিন, খাওয়া শুরু করুন।’

    ওরা খাওয়া শুরু করলো। চার কমাণ্ডো তাদের কামরায় বসে সুস্বাদু খাবারের সুবাস পাচ্ছিল। এতে তাদের ক্ষুধা আরো বেড়ে গেল।

    হারান দুর্গের অধিপতি গুমাস্তগীন সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গীর ওফাতের পর নিজেকে স্বাধীন শাসক রূপে ঘোষণা করে আশপাশের অঞ্চল নিয়ে একটি রাজ্য গঠন করেছিল। সেই সুবাদে সে বিশেষ সম্মানিত মেহমান ছিল শেখ মান্নানের।

    খেতে খেতে গুমাস্তগীন শেখ মান্নানকে বললো, ‘তুমি জানো সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে আল মালেকুস সালেহ ও সাইফুদ্দিনের যে সম্মিলিত বাহিনী তুর্কমান অভিমুখে যাত্রা করেছিল, সে বাহিনীতে আমার সৈন্যও শামিল ছিল। এই সম্মিলিত বাহিনী সুলতান আইয়ুবীর বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছে। আমি নিজে আমার সৈন্যদের সাথে ময়দানে যেতে পারিনি।’ সাইফুদ্দিন বললো, ‘সম্মিলিত বাহিনীর কমাণ্ড একক হাতে না থাকলে যুদ্ধে বিশৃংখলা দেখা দেবে, তাই আমি যাইনি। ভেবেছিলাম সাইফুদ্দিন এ যুদ্ধে সফল নেতৃত্ব দিতে পারবে। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল তো জানো। এ যুদ্ধে আমাদের সম্মিলিত বাহিনী চরমভাবে পরাজিত হয়েছে।’

    ‘হ্যাঁ, বড়ই আফসোসের কথা। এমনটি আমরা আশা করিনি। যুদ্ধের কমান্ড আপনার হাতে থাকলে হয়তো এমনটি হতো না।’ গুমাস্তগীন বললো, আমি নিজেদের মধ্যে ফাটল ধরানোর জন্য তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে চাই না। কিন্তু যুদ্ধ জয়ের জন্য যেসব কৌশল ও টেকনিক ব্যবহার করা দরকার ছিল, তা তিনি করতে পারেননি। এ যুদ্ধ জয়ের জন্য প্রথম যে কাজটি করা দরকার ছিল, তা হলো খৃস্টানদেরকে ময়দানে টেনে আনা। তিনি খৃষ্টানদের সাথে বন্ধুত্ব অটুট রাখার দাবী করলেও তাদের কাছ থেকে কোন রকম সামরিক সাহায্য আদায় করতে পারেননি।’

    ‘হ্যাঁ, এটা তার বড় ব্যর্থতা।’

    “সে তাদের উপদেষ্টা ও গোয়েন্দাদের সাহায্য নেয়ার পরিবর্তে উন্নত মানের মদ, সুন্দরী মেয়ে ও নগদ মূল্য নিয়েই সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু যুদ্ধ করার জন্য দরকার অস্ত্র ও সেনা, এ দুটোই সে চায়নি ওদের কাছে।’

    গুমাস্তগীন ছিল কূটবুদ্ধিসম্পন্ন ও ষড়যন্ত্রে ওস্তাদ। শত্রুরা মাটির নিচে লুকিয়েও রেহাই পেতো না তার হাত থেকে। বন্ধুদেরকেও সে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিত না। সে ছিল চরম ক্ষমতালিপ্সু। ছলে বলে কৌশলে রাজ্যের পরিধি বাড়ানোই ছিল তার একমাত্র স্বপ্ন।

    আইয়ুবীকে সম্মুখ সমরে হারানো যাবে না জানতো বলেই সে নিজে এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি। আবার সম্মিলিত শক্তি যাতে বুঝে সে তাদেরই একজন, এ জন্য পরাজিত হবে জেনেও নিজের বাহিনী পাঠিয়েছিল সে অভিযানে।

    গুমাস্তগীন তার ক্ষমতার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক মনে করতো সুলতান আইয়ুবীকে। ফলে সে ছিল সুলতান আইয়ুবীর সবচে কঠিন দুশমন। সম্মুখ যুদ্ধ নয়, গুমাস্তগীন বিশ্বাস করতো আইয়ুবীকে ধ্বংস করতে হবে ষড়যন্ত্রের পিচ্ছিল পথে। গোপনে তাকে হত্যা করতে হবে। আর এ কাজে ওস্তাদ শেখ মান্নানের ফেদাইন গুপ্তঘাতক দল। তাই যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে সে এসেছিল শেখ মান্নানকে ভাড়া করতে, তাকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করতে।

    শেখ মান্নানও সুলতান আইয়ুবীর হত্যার ষড়যন্ত্রে খুবই উৎসাহী ছিল। তার ভাল মতোই জানা ছিল, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীই একমাত্র ব্যক্তি, যার সামরিক শক্তি ঈমানী চেতনায় পরিপূর্ণ। সমরনায়ক হিসাবে যেমন অপ্রতিদ্বন্দ্বী আইয়ুবী, ঈমানী বলেও তেমনি অতুলনীয়। এ ধরনের লোকের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে যাওয়া যেমন বিপদজনক, তেমনি এমন লোককে বাঁচিয়ে রাখাও ভয়ের। কারণ অন্যায় আধিপত্য বিস্তার আইয়ুবী কিছুতেই মেনে নেবে না।

    ফলে তুমানের সমর শেষ হওয়ার আগেই মুসলিম মিল্লাতের দুই গাদ্দার এসে মিলিত হলো একত্রে। আইয়ুবী যখন তলোয়ার দিয়ে লিখছিল নিজের ভাগ্যের ফয়সালা, তখন শেখ মান্নান ও গুমাস্তগীন আছিয়াত কেল্লায় বসে তার ভাগ্য নির্ধারণের জল্পনা কল্পনা করছিল।

    সুলতান আইয়ুবীকে হত্যার এমন কৌশল আবিষ্কার করাই তাদের এ বৈঠকের উদ্দেশ্য, যেন অন্যান্য বারের মত এবারের হত্যা প্রচেষ্টাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত না হয়।

    গুমাস্তগীন আছিয়াত দুর্গে পৌঁছে ছিল কারিশমা ও আন নাসেররা পৌঁছার একদিন আগে। তখনো সে জানতো না, সাইফুদ্দিনের নেতৃত্বে সম্মিলিত বাহিনী সুলতান আইয়ুবীর কাছে কেমন মার খেয়েছে। সৈন্যবাহিনীকে সমরাঙ্গণে পাঠিয়ে দিয়েই সে নেমে পড়েছিল ষড়যন্ত্রমূলক কাজে। আর এ কাজ শেখ মান্নানকে ছাড়া অসম্ভব ভেবেই ছুটে এসেছিল আছিয়াত দুর্গে।

    ❀ ❀ ❀

    ‘ভাই গুমাস্তগীন!’ শেখ মান্নান খাওয়া বন্ধ করে বললো, ‘তোমার বাহিনীও তো তুর্কমান সমরাঙ্গণ থেকে পালিয়েছে। তুমি শুধু শুনেছ সম্মিলিত বাহিনী পরাজিত হয়েছে, কিন্তু তাদের কি হাল হয়েছে বিস্তারিত জানো না। এ জন্যই এদেরকে এখানে ডেকেছি। সে কারিশমা ও লিজাকে দেখিয়ে বললো, এরা যুদ্ধের সময় ময়দানে ছিল। সব কিছু নিজ চোখে দেখেছে। আগে ওদের কাছ থেকে যুদ্ধের বিস্তারিত খবর শোন।’

    গুমাস্তগীন তাকালো কারিশমাদের দিকে। কারিশমা গুমাস্তগীনের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো যুদ্ধের কাহিনী। কি করে সুলতান আইয়ুবী অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে সম্মিলিত সৈন্যদলকে পরাজিত করে তাক লাগিয়ে দিল। কি করে সাইফুদ্দিন নিজের সৈন্যদেরকে ময়দানে রেখেই গোপনে পালিয়ে গেল, সবিস্তারে বললো সে।

    গুমাস্তগীন নীরবে শুনলে তার কাহিনী। ‘আমাকে আমার বন্ধুরাই লাঞ্ছিত ও অপমানিত করলো।’ গুমাস্তগীন লজ্জায় ও রাগে বলতে লাগলো, “আমি সাইফুদ্দিনকে তিন বাহিনীর হেড অব দ্যা কমাণ্ড করতে মোটেই রাজি ছিলাম। কিন্তু আমার কথা কেউ শুনলো না, জানি না আমার সৈন্যরা কি অবস্থায় আছে।’

    ‘খুবই শোচনীয় অবস্থায় আছে।’ কারিশমা বললো, ‘সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কমাণ্ডো বাহিনী পলাতক সৈন্যদের নির্বিঘ্নে ঘরে ফিরতে দিচ্ছে না। ধাওয়া করে পাকড়াও করছে তাদের।’

    ‘ ভাই মান্নান! তুমি জানো আমি এখানে কেন এসেছি।’ গুমাস্তগীন বললো।

    ‘হ্যাঁ, জানি আপনি সুলতান সালাহউদ্দিনের হত্যার পরিকল্পনা করতে এসেছেন।’ শেখ মান্নান বললো।

    ‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো।’ গুমাস্তগীন বললো, ‘এর বিনিময়ে তুমি যা চাইবে তাই আমি দিতে রাজি! সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করো ভাই!’

    ‘আমি খৃষ্টান ও সাইফুদ্দিনের অনুরোধে চারজন ফেদাইন খুনীকে আপনি আসার আগেই এ কাজে পাঠিয়ে দিয়েছি।’ শেখ মান্নান বললো, ‘কিন্তু তাকে হত্যা করা খুবই কঠিন। বার বার চেষ্টা করেও আমরা সফল হতে পারিনি। এবারও যে পারবো তার কোন নিশ্চয়তা এ মুহূর্তে আমি আপনাকে দিতে পারবো না।’

    ‘আমার কাছ থেকে পৃথক ভাবে বখশিশ নাও।’ শুমাস্তগীন বললো, ‘নতুন লোক দাও, যারা এ কাজে দক্ষ। আর তাদেরকে আমার অধীনে দাও, যেন আমি সরাসরি তাদের পরিচালনা কতে পারি।’

    ‘আমি যে চারজন খুনী পাঠিয়েছি, তারা আমার বাছাই করা চার খুনী।’ শেখ মান্নান বললো, ‘আমার কাছে খুনী গ্রুপের অভাব নেই। কিন্তু আমি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে হত্যার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে উঠেছি অন্য কারণে।’

    ‘কেন?’ গুমাস্তগীন বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আইয়ুবী কি তোমাকে কোন কেল্লা টেক্কা দিয়ে দিল নাকি?’

    ‘না!’ শেখ মান্নান উত্তর দিল, ‘কিন্তু ঐ ব্যক্তিকে খুন করার জন্য আমি আমার বহু মূল্যবান ফেদাইন খুনী শেষ করে ফেলেছি। আমার পাঠানো ঘাতকরা তাকে ঘুমন্ত অবস্থায়, খঞ্জরের আক্রমণ চালিয়েছে, কিন্তু দেখা গেছে, আইয়ুবী নয়, সে নিজেই নিহত হয়ে গেছে। তার ওপর আমার দক্ষ তীরন্দাজরা তীর বর্ষণ করেছে, কিন্তু সে তীর তাকে স্পর্শও করতে পারেনি। আমার কেন যেন মনে হয়, সুলতান আইয়ুবীর ওপর আল্লাহর রহমতের ছায়া আছে। তার মধ্যে এমন কিছু আছে, যে শক্তির বলে তিনি খঞ্জর ও তীরের আঘাত থেকে রক্ষা পেয়ে যান। আমার গোয়েন্দারা বলেছে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ওপর যতবার আক্রমণ চালানো হয়েছে, ততবারই তিনি সে আক্রমণ ব্যর্থ করে দিয়েছেন অলৌকিকভাবে। আক্রমণ হলে তিনি ভীত বা রাগান্বিত হতেন না। আক্রমণ প্রতিহত করে এমনভাবে হাসতেন, যেন কিছুই হয়নি।’

    ‘ভাই মান্নান, রাখো তো এসব প্যাঁচাল। আগে বলল, কতো চাও?’ গুমাস্তগীন বিরক্ত হয়ে বললো, ‘আমি সুলতান আইয়ুবীকে আর জীবিত দেখতে চাই না। আনাড়ী খুনীদের ব্যর্থতার কাহিনী বাদ দিয়ে কাজের কথায় আসো।’

    ‘আনাড়ী নয়, আমি যাদের পাঠিয়েছিলাম, তারা প্রত্যেকেই এ কাজে ওস্তাদ ছিল।’ শেখ মান্নান বললো, ‘আইয়ুবী ছাড়া তাদের হাত থেকে কেউ কোনদিন বাঁচতে পারেনি। তারা মৃত্যুকে ভয় করার মত লোক ছিল না। আমার কাছে এখনও এমন ওস্তাদ লোক রয়েছে, যারা বহু গুপ্তহত্যার নায়ক। তারা এমন কৌশলে হত্যাকাণ্ড চালায় যে, কাকপক্ষীও টের পায় না। কিন্তু ভাই গুমাস্তগীন, আমি আমার এত মূল্যবান ফেদাইনদের আর এমনভাবে বৃথা নষ্ট করতে পারবো না। তোমরা তিন বাহিনীর সম্মিলিত শক্তি নিয়েও তার কিছু করতে পারলে না, আর আমার মাত্র তিন-চারজন ফেদাইনকে দিয়ে কেমন করে তাকে হত্যা করাতে চাও?’

    ‘বুঝেছি, তুমি আইয়ুবীর শক্তি দেখে ভয় পেয়ে গেছ।’

    ‘না! আমি ভয় পাইনি। সুলতান আইয়ুবীর সাথে আমার কোন ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই।’ শেখ মান্নান বললো, ‘হাসান বিন সাব্বাহ পয়গাম্বর হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আমাদের এই দল পেশাদার খুনী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। বুঝলে ভাই গুমাস্তগীন! আমি এখন একটি পেশাদার খুনীচক্রের নেতা! প্রশ্নটা ভয়ের নয়, প্রশ্নটা পেশার। এখন যদি সুলতান আইয়ুবী আমাকে টাকা দিয়ে বলে তোমাকে হত্যা করতে, তবে আমি তোমাকেও হত্যা করতে পারবো।’

    ‘কিন্তু সালাহউদ্দিন আইবী কাউকে কাপুরুষের মত টাকা দিয়ে হত্যা করান না।’ লিজা বললো, ‘সেই কারণেই তিনি কাপুরুষদের আঘাতে ও ষড়যন্ত্রে মৃত্যবরণ করছেন না।’

    ‘বাহ! তুমি এই বয়সেই বুঝতে শিখেছো যে, যে কাপুরুষ নয়, তাকে কাপুরুষরা হত্যা করতে পারে না!’ শেখ মান্নান তাকে কাছে টেনে নিয়ে আদরের ছলে বললো।

    গুমাস্তগীন আশাহত হয়ে শুম মেরে বসে রইলো। শেষ মান্নান তাকে বললো, ‘ভাই গুমাস্তগীন, তুমি, সাইফুদ্দিন ও আল মালেকুস সালেহ এবং খৃষ্টানরা শুধু এই কারণে পরস্পর বন্ধু সেজে রয়েছে যে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী তোমাদের সবারই শত্রু! নতুবা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে কোন বন্ধুত্বের বন্ধন নেই। আহা, আমাকে বলো তো, আইয়ুবীকে হত্যা করে তোমরা কি লাভ করতে চাও? তিনি মারা গেলে তখন তো তোমরা নিজেরাই মারামারি করে মরবে।’

    গুমাস্তগীন চুপ। সে এসব প্রশ্নের কোনই জবাব দিল না। শেখ মান্নান আবার বললো, “ভাই গুমাস্তগীন! খুব মনোযোগ সহকারে আমার কথা শুনে নাও! আইয়ুবীকে হত্যা করতে পারলেও তোমরা নতুন করে এই সাম্রাজ্যের এক ইঞ্চি জায়গাও দখলে নিতে পারবে না। এ সাম্রাজ্য এখনো আইয়ুবীই ধরে রেখেছেন। তিনি তার সৈনিকদের মধ্যে যে জাতীয় চেতনা ও জেহাদী জযবা সৃষ্টি করে রেখেছেন, সে কারণেই এখনো খৃস্টানরা এখানে দাঁত বসাতে পারছে না। তুমি যদি কাউকে হত্যা করতেই চাও, তবে সাইফুদ্দিনকে টার্গেট নাও। সাইফুদ্দিনকে হত্যা করে মুশেলের ওপর তোমার আধিপত্য কায়েম করো। অবশ্য তাকে তুমি নিজেই হত্যা করতে পারবে, এ জন্য আমার সাহায্যের প্রয়োজন নেই। সে তোমাকে বন্ধু হিসেবে জানে এবং তোমরা উভয়েই মিত্র বাহিনীর সদস্য। তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করতে পারো অথবা সুযোগমত আক্রমণ করেও হত্যা করতে পারো।’

    শেখ মান্নানের দীর্ঘ বক্তব্য শেষ হলো। গুমাস্তগীন গভীর চিন্তায় ডুবে রইলো এ বক্তব্য শুনে। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর বললো, ‘হ্যাঁ, তুমি সাইফুদ্দিনকেই হত্যা করার ব্যবস্থা করো। বলো, এর বিনিময়ে তুমি কি চাও?’

    ‘তোমার সখের হারান দুর্গ!’ শেখ মান্নান বললো।

    ‘তোমার মাথাটা তো ঠিক আছে, মান্নান!’ গুমাস্তগীন বললো, ‘ইয়ার্কী রাখো। হীরা, জহরত, অর্থ, সম্পদ ও বিত্ত দিয়ে তোমার মূল্য চাও।’

    ‘ধন-রত্নের বিনিময়ে তোমাকে চারজন লোক দিতে পারি।’ শেখ মান্নান বললো, ‘কিন্তু এরা আমার গুপ্ত বাহিনীর সদস্য নয়। ওরা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর স্পেশাল কমাতো। তাদেরকে এই দুই মেয়ে হাশিশ পান করিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। আমার কাছে এরা খুবই মূল্যবান সম্পদ। আমি এদেরকে অন্য কারো হাতে ছেড়ে দেয়ার কথা কখনো চিন্তাও করিনি, কারণ এমন যোগ্য ও দক্ষ কমাণ্ডো কোথাও পাওয়া যায় না। কপাল গুণে ওদের পেয়ে গেছি আমি। তুমি তো জানো, ফেদাইনদের হরেক রকম নেশার দ্রব্য ও সম্মোহন বিদ্যা যে কোন মানুষকে আমূল বদলে দিতে পারে। এই পরীরা তাদেরকে হাশিশের নেশায়; তাদের রূপ-যৌবনের নেশায়, এমন যোগ্য বানিয়ে নিবে যে, এরা শেষ পর্যন্ত আপন বাবা-মাকেও হত্যা করতে পিছপা হবে না।

    এই সম্পদ আমি হাত ছাড়া করতাম না, কিন্তু আমি তোমাকে নিরাশ করতে চাই না। তুমি কষ্ট করে এবং বড় আশা নিয়ে আমার কাছে এসেছে, এ জন্যই আমি এদেরকে তোমার হাতে তুলে দিতে রাজি হলাম। তুমি ওদের নিয়ে যাও, কিছু দিন এদেরকে আমার পরীদের দিয়ে স্বপ্নের জান্নাত দেখাও। তাদেরকে তোমার মহলের রাজকুমার বানিয়ে নাও। গোপনে মাত্রানুযায়ী হাশিশ পান করাও এবং কায়দা করে মদের মধ্যে ডুবিয়ে দাও, দেখবে তোমার ইশারায় ওরা নাচবে।’

    ‘সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কমাণ্ডোরা এত কচি খোকা নয়, যেমন তুমি বুঝাতে চাচ্ছে।’ গুমাস্তগীন বললো।

    ‘তুমি তো জানো গুমাস্তগীন, আমাদেরকে ফেদাইন বলা হয়। আমরা মানুষের মনস্তত্ব নিয়ে খেলা করি।’ শেখ মান্নান বললো, ‘আমরা আমাদের শিকারকে মনভোলানো স্বপ্নের রাজ্যে নিয়ে যাই। সম্মোহিত করে তাদেরকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাই যে, তার সামনে যা বলা হয় তাকেই সে বাস্তব মনে করে নেয়। তার সামনে নারীর সুন্দর ছবি একে বলো, এ হচ্ছে বেহেশতের হুর, সে তাই বিশ্বাস করবে। হাতে পাথর দিয়ে বলো, এ হচ্ছে স্বর্ণের টুকরো, সে তার হাতে স্বর্ণের টুকরোই দেখতে পাবে। তাকে নারীর বাহুলগ্ন করে দাও, খুব কম মূল্যে তার ঈমান ও বিশ্বাস কিনতে পারবে।’

    শেখ মান্নান তাকে আরো বললো, ‘তুমি এই চারজনকে সঙ্গে করে নিয়ে যাও। একথা মনে করার কোন কারণ নেই যে, এরা তোমার উদ্দেশ্য সফল করতে পারবে না।’ শেখ মান্নান একটু হেসে বললো, ‘তুমি তোমার নিজেকে নিয়েই চিন্তা করো। নারী, মদ ও বিলাসিতা তোমাকে কোথা থেকে কোথায় নামিয়ে নিয়ে এসেছে তুমি মুসলমান হয়েও মুসলমানের শত্রু হয়ে গিয়েছে।’

    দরদাম ঠিক করে শেখ মান্নান, আন নাসের ও তার সঙ্গীদেরকে তুলে দিল শুমাস্তগীনের হাতে। বললো, ‘এদেরকে কারাগারে রেখে না বরং রাজপুত্রের মত রাখবে।’

    গুমাস্তগীন তার পরামর্শ মেনে নিল। খাওয়া দাওয়ার পর এই বলে বিদায় নিল, দু’একদিনের মধ্যেই কমাণ্ডোদের নিয়ে আমি রওনা করতে চাই।’

    ‘আপনি আমার মেহমান। যতক্ষণ খুশী থাকবেন, যখন ইচ্ছে বললেন, আমি আপনার যাত্রার ব্যবস্থা করবো।’ বললো শেখ মান্নান।

    ❀ ❀ ❀

  • খুনী চক্রের আস্তানায়

    খুনী চক্রের আস্তানায়

    খুনী চক্রের আস্তানায়

    গুমাস্তগীন তাকে ধোঁকা দিয়ে গেছে, এই রাগে জ্বলছে শেখ মান্নানের সারা শরীর। গুমাস্তগীনের পিছু নেয়ার জন্য সে যে সৈন্য পাঠিয়েছিল, তার মধ্যে মাত্র দু’জন ফিরে আসতে পেরেছে। বাকীরা লিজাকে ছিনিয়ে আনা তো দূরের কথা, নিজেদের জীবনটা পর্যন্ত বাঁচাতে পারেনি। তার সৈন্যরা এমন অথর্ব, ভাবতেই রাগ তার মাথায় উঠে যাচ্ছে। কোথায় গুমাস্তগীন, লিজা ও কারিশমাকে চিলের মত ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে আসবে উন্মুক্ত মরুভূমি থেকে, তা নয়, একজন মাথামোটা ভীতুর ডিম, যে তার কাছে এসেছিল যুদ্ধ না করে আইয়ুবীর হাত থেকে বাঁচার জন্য গুপ্তঘাতক ভাড়া করতে, তার হাতে মার খেয়ে মরে গেছে তার সৈন্যরা, এটা কিছুতেই বিশ্বাস করা যায় না। এ নিশ্চয়ই আইয়ুবীর সেই কমাণ্ডোদের কাজ, কারিশমা ও লিজা যাদেরকে পাকড়াও করে তুলে দিয়েছিল আমার হাতে, ভাবছে শেখ মান্নান। নিজের মনেই সে স্বীকার করল, সময়ের আগে এভাবে ওদের বাইরে বের করা ঠিক হয়নি। সন্ত্রাসী দলের নেতৃত্বে আসার পর এমন ভুল সে আর করেনি। এ ভুলের খেসারত দিতে হলো তাকে একদল জানবাজ অনুচর হারিয়ে।

    ফেদাইন সন্ত্রাসীদের একটা খ্যাতি আছে, তারা সাধারণত কোন কাজে হাত দিলে ব্যর্থ হয় না। অপারেশন সফল করার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেই তারা কাজে নামে। ফেদাইন খুনীদের এমন পর্যাপ্ত ট্রেনিং দেয়া হয়, যার সাথে অন্য কারো তুলনা, হতে পারে না। মৃত্যুকে তারা ভয় পায় না। তাদেরকে ভাল করেই বুঝিয়ে দেয়া হয়, মরণ সাগরে যারা ঝাঁপ দিতে পারে, মরণকে কেবল তারাই জয় করতে পারে। তাই তারা সহজে পরাজিত হয় না।

    লিজাকে উঠিয়ে আনার জন্য ওদের পাঠিয়েছিল সে। তারা লিজাকে ধরে আনতে পারেনি ঠিক, কিন্তু কারিশমাকে উঠিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছে। লিজাকে হারানোর বেদনা কারিশমাকে দিয়ে দূর করা কি সম্ভব? না কিছুতেই তা নয়, অনুভব করলো শেখ মান্নান। যদিও কারিশমা সুন্দরী, রূপসী কিন্তু লিজার চোখে যে নিবেদনের আর্তি আছে, মায়াময় মোহনীয়তা আছে, জৌলুসহীন অন্তরঙ্গতা আছে, তা কোথায় পাবে কারিশমা! তার চোখে যে মাদকতা আছে সেখানে আছে জৌলুসের সমারোহ, আছে অভিজ্ঞতার প্রলেপ ও চাতুর্যের সজীবতা। কিন্তু লিজার সহজ সরল নমনীয়তা ও ভীতিময় নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে যে নিবেদনের আর্তি ও বিহবলতা আছে তার কিছুই নেই সেখানে। দু’জনই সুন্দরী, কিন্তু সেই সুন্দরের মধ্যে কি যোজন যোজন দূরত্ব! কল্পনায় লিজার সেই বিমুগ্ধ রূপের কথা স্মরণ করে অস্থির চিত্তে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল শেখ মান্নান।

    লিজাকে মুঠোর মধ্যে পেয়েও ভোগ করতে পারেনি এর জন্য শেখ মান্নান দায়ী করল কারিশমাকে। কারিশমা বাঁধা না দিলে তার অন্তরের চাহিদা এতক্ষণ অপূর্ণ থাকতো না। লিজা নেই, লিজাকে না পাওয়ার প্রতিশোধ এখন কারিশমার কাছ থেকেই গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু কিভাবে? কি শাস্তি দিলে তার অন্তরের জ্বালা দূর হবে?

    বারান্দায় দীর্ঘক্ষণ পায়চারী করেও এর কোন ফায়সালা করতে পারল না শেখ মান্নান। তখন প্রহরীকে ডেকে বললো, ‘কারিশমাকে কারাগারে পাঠিয়ে দাও।’

    পড়ন্ত বেলা। আছিয়াত দূর্গের প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে প্রহরীরা বিকেলের মিঠে রোদের কোমল উত্তাপ উপভোগ করছে। কোন রকম ভয়ভীতি বা শঙ্কার লেশও নেই কারো চোখে। হঠাৎ তাদের নজরে পড়লো দূর দিগন্তে এক খণ্ড ধূলিঝড়, এ রকম ধূলিঝড় একাধিক কারণে সৃষ্টি হয়, কিন্তু কোন টাই সুখকর নয়। সব কারণের মধ্যেই ভয় ও আশঙ্কার বার্তা থাকে। ওরা লক্ষ্য করলো, ধূলিঝড়টি আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে এবং এদিকেই এগিয়ে আসছে। ওরা অজানা আশঙ্কা নিয়ে তাকিয়ে রইল সেই ধূলিঝড়ের দিকে।

    সময় গড়িয়ে চলল। ওরা অনুভব করল, এটা মরু সাইমুম নয়, কোন কাফেলার দূরন্ত অশ্বখুরের আঘাতে সৃষ্ট বালির সমুদ্র যেন উড়ে আসছে ওদের দিকে। প্রহরীরা এই নিয়েই কথা বলছিল। এত বড় কাফেলা এদিকে কেন আসছে? ওরা কি শত্রু, না মিত্র? ওরা এসব বলাবলি করছে আর তাকিয়ে দেখছে ঝড়ের গতি।

    তখনো ধূলিঝড় অনেক দূরে। দূর থেকেই ওরা দেখতে পেল শত শত অশ্বারোহী ছুটে আসছে কেল্লার দিকে। প্রহরীরা বিলম্ব না করে নাকারা বাজিয়ে দিল। নাকারার আওয়াজ কানে যেতেই কেল্লার কমাণ্ডাররা ছুটল উপরে। প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে ওরাও দেখলো সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য। সঙ্গে সঙ্গে ওরা আবার নিচে নেমে গেল এবং নিজ নিজ বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে হুকুম দিল।

    হুকুম দিয়েই ওরা আবার ছুটল প্রাচীরের ওপরে। ততক্ষণে ধূলিঝড় আরো অনেক কাছে চলে এসেছে। ওরা নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে কেল্লার ভেতরে ও প্রাচীরের ওপর পজিশন নিল। ছুটে আসা সৈন্য বাহিনী কেল্লার কাছে এসেই কেল্লার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল এবং কেল্লা অবরোধ করে দাঁড়িয়ে গেল।

    শেখ মান্নান মোকাবেলার আদেশ দিয়ে বলল, ‘বড় তাজ্জব ব্যাপার। ফেদাইন বাহিনীর হেডকোয়ার্টারে এসে আবার কার মরার শখ হল!’

    তার হুকুমে কেল্লার প্রাচীরের ওপর তীরন্দাজ বাহিনী পজিশন নিয়ে বসে গেল। শেখ মান্নান বলল, “এখনি তীর বর্ষণের দরকার নেই। আগে দেখে নিই কাদের এ দুঃসাহস হলো।’

    প্রাচীরের ওপর পজিশন নেয়া তীরন্দাজরা তীর বর্ষণ না করে চুপচাপ বসে রইল। তারা লক্ষ্য করতে লাগলো, আক্রমণকারীদের গতিবিধি।

    সুলতান আইয়ুবী কেল্লার ভেতরের সব রকম তথ্যই পেয়ে গিয়েছিলেন আন নাসেরের কাছ থেকে। আন নাসের নিজেও সৈন্য দলের সাথে ছিল, সে সুলতানকে জানাচ্ছিল কেল্লার কোথায় কি আছে।

    সুলতানের নির্দেশে দুটি মিনজানিক কামান সেট করা হলো। আন নাসের শেখ মান্নানের মহলটি কোথায় ও কতটা দূরত্বে দেখিয়ে দিল কামান চালকদের।

    তাঁর নির্দেশিত স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে একটা পাথর নিক্ষিপ্ত হলো মিনজানিকের সাহায্যে। পাথরটি যথাস্থানেই আঘাত হানলো, মান্নানের মহলের দেয়াল ফুটো হয়ে গেল সে আঘাতে। আর অপেক্ষা করার উপায় নেই। কারা আক্রমণ করেছে বুঝে নিয়েছে শেখ মান্নান।

    আইয়ুবীর কমাণ্ডোদেরকে গুমাস্তগীনের কাছে বিক্রি করে যে ভুল আমি করেছিলাম তার প্রায়শ্চিত্ত করার সময় হয়ে গেছে, ভাবলো শেখ মান্নান। সে তার সৈন্যদের এ হামলার জবাব দেয়ার নির্দেশ দিল।

    কেল্লার উপর থেকে শুরু হলো তীর বর্ষণ। কিন্তু সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যরা তখনো তীরের আওতার বাইরে। শেখ মান্নানের ফেদাইন বাহিনীর তীর বর্ষণ কোনই কাজে এল না, আইয়ুবীর একজন সৈন্যও আহত হলো না তাতে।

    আইয়ুবীর নির্দেশে এবার কেল্লার মধ্যে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করলো মিনজানিকের কমাণ্ডার। বোমা শেখ মান্নানের মহলের অনতিদূরে গিয়ে ফাটলো। বোমা ফেটে চারদিকে ছড়িয়ে গেল পেট্রোল। কিন্তু তাতে কেল্লার কোন ক্ষতি হলো না। শেখ মান্নান বা ফেদাইনরা বুঝতে পারল না, এ বোমা হামলার মাধ্যমে তাদের জন্য কত বড় বিপদ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে কেল্লার ভেতর।

    আইয়ুবী এবার সেখানে আগুন লাগানো তীর নিক্ষেপের হুকুম দিলেন। তীরন্দাজ মুজাহিদরা তীর ছুঁড়লো, কিন্তু পেট্রোলের কাছে নিতে পারলো না কোন তীর। তীর সেখানে নিতে হলে তাদেরকে কেল্লার আরো কাছাকাছি যেতে হবে। যেখানে এখন তারা পজিশন নিয়ে আছে সেখানে থেকে লক্ষ্যস্থলে তীর কিছুতেই পৌঁছানো সম্ভব নয়।

    আইয়ুবী পুরো বিষয়টি গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন। তিনি তীরন্দাজদের বললেন, ‚শাহাদাতের পেয়ালা পান করতে আগ্রহী এমন তিনজনকে এ মুহূর্তে আমার দরকার। কারা এ দায়িত্ব নিতে চাও?’

    সঙ্গে সঙ্গে পাশের সব ক’জন তীরন্দাজ, যারা আইয়ুবীর আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল, উঠে দাঁড়িয়ে গেল। তিনি ওদের মধ্য থেকে তিনজনকে বেছে নিলেন।

    তিনি তাদের বললেন, ‘পেট্রোল ভেজা জায়গায় তীর পৌঁছতে পারে এমন দূরত্বে এগিয়ে তীর ছুঁড়বে তোমরা। আমি আবার তীর ছোঁড়ার হুকুম দেয়ার সাথে সাথে তোমরা ছুটে যাবে পাঁচিলের দিকে। আমাদের তীর তোমাদের কাভার দেয়ার চেষ্টা করবে। দুশমনের তীর আঘাত হানলেও আশা করি তোমরা তোমাদের দায়িত্ব সফলতার সাথেই সমাধা করতে পারবে।’

    সুলতান আবার তীর ছোড়ার হুকুম দিতেই ওই তিন তীরন্দাজ ছুটল পাঁচিলের দিকে। বেশী দূর যেতে পারেনি, তার আগেই দুশমনের তীর ঝাঁপিয়ে পড়লো ওদের ওপর। হুমড়ি খেয়ে পড়ার আগে এক তীরন্দাজ তার তীরে আগুন জ্বেলে ফোন মতে ছুঁড়ে মারল। সৌভাগ্যক্রমে তাতেই কাজ হল। তীরটি দেয়াল অতিক্রম করে গিয়ে পড়ল পেট্রোলের ছিটকে পড়া কোন অংশে, তাতেই আগুন ধরে গেল সেখানে।

    সহসা সে আগুন নিকটেই পেট্রোলের মূল অংশ স্পর্শ করল। সঙ্গে সঙ্গে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। মুহূর্তে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। শেখ মান্নানের মহল ভরে গেল সে অগ্নিশিখায়। আইয়ুবী আরও কয়েকটি মিঞ্জানিক বোমা নিক্ষেপ করার হুকুম দিল। সাথে সাথে পালিত হলো সে হুকুম। বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল প্রজ্জ্বলিত আগুনের শিখা।

    আছিয়াত দূর্গে তখন চরম এক অবস্থা। শেখ মান্নানের লোকেরা গুপ্তঘাতক হিসাবে খ্যাতিমান ছিল। তাদের যত বীরত্ব সব ছিল নিঃসঙ্গ মানুষের ওপর। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে দক্ষ হলেও সম্মুখ যুদ্ধের ট্রেনিং তাদের ছিল না। তার ওপর এই অতর্কিত অগ্নির ছোবল ছিল তাঁদের ধারনার বাইরে। ফলে অচিরেই তারা অনুভব করল, কেয়ামতের বিভীষিকা শুরু হয়ে গেছে তাদের উপর দিয়ে।

    শেখ মান্নানের অবস্থা আরও করুণ। তার মনে হলো, হাবিয়া দোযখের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সে। চারদিকে দাউ দাউ আগুন। সে আগুন সবকিছু গ্রাস করে নিচ্ছে। হয়তো কিছুক্ষণ পর তাকে গ্রাস করে ফেলবে।

    তার সৈন্যদের কারো অবস্থায়ই এমন নয় যে, তারা আইয়ুবীর বাহিনীর মোকাবেলা করে। যারা পাঁচিলের ওপর ছিল তারা নেশাগ্রস্ত মানুষের মত ঘোরের মধ্যে তখনো তীর চালিয়ে যাচ্ছিল। নিচের সৈন্যরা আচ্ছন্ন হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল অগ্নিশিখার তাণ্ডব। আগুনের হাত থেকে বাঁচার জন্য ছুটে বেড়াচ্ছিল এখান থেকে ওখানে।

    শেখ মান্নান যুদ্ধের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিল। কেল্লার উপরে সাদা পতাকা উড়িয়ে দিল সে। সুলতান আইয়ুবী যুদ্ধ বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন। থেমে গেল দু’পক্ষের তীরবৃষ্টি।

    তীরবৃষ্টি থামতেই চারদিক নীরব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রোদের উত্তাপ আগেই কমে গিয়েছিল, এখন এই নীরবতার মধ্যে চুপিসারে এসে হানা দিল সন্ধ্যার অন্ধকার।

    সুলতান আইয়ুবীর নির্দেশে এক সালার সেই নীরবতা ভঙ্গ করে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করল, ‘শেখ মান্নান, সুলতান তোমাকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দিচ্ছেন। কেল্লা থেকে বেরিয়ে এসে তোমাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে।’

    কিছুক্ষণ পর। কেল্লার দরজা খুলে গেল। শেখ মান্নান দু’তিনজন সেনাপতি ও কমাণ্ডারকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে এল। সুলতান আইয়ুবী অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে তাদের স্বাগত জানালেন। সাধারণত কোন কেল্লাধিপতিকে যেভাবে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বরণ করা হয়, তেমন কোন উৎসাহ বা ঘটা দেখালেন না সুলতান। কারণ সুলতানের কাছে মান্নান কোন যোদ্ধা বা বীর ছিল না, ছিল এক জঘন্য পাপী ও খুনী।

    তারা যখন সুলতান আইয়ুবীর কাছে এল, তিনি তাদের বসতেও বললেন না। সুলতান তার তাঁবুর সামনে এক আসনে বসেছিলেন। আইয়ুবীর দুই সেনাপতি শেখ মান্নান ও তার সঙ্গীদেরকে হাজির করলো সুলতানের সামনে।

    ‘মান্নান!’ সুলতান আইয়ুবী গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘এখন তুমি কি চাও?’

    ‘প্রাণ ভিক্ষা চাই!’ শেখ মান্নান পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে উদাস ভঙ্গিতে বললো।

    “আর তোমার দূর্গ?’ সুলতান আইয়ুবী জিজ্ঞেস করলেন।

    ‘আপনার যে সিদ্ধান্ত তাই মেনে নেবো।’

    “তোমার সৈন্যসামন্ত নিয়ে এক্ষুণি বেরিয়ে যাও।’ সুলতান আইয়ুবী বললেন, “তোমরা কোন জিনিস সঙ্গে নিতে পারবে না। তোমার বাহিনীকে গুছিয়ে নাও, কোন সেনা কমাণ্ডার ও সৈন্যের কাছে অস্ত্রশস্ত্র থাকতে পারবে না। এখান থেকে সম্পূর্ণ খালি হাতে বের হয়ে যাবে তোমরা। তোমার কয়েদখানায় যেসব কয়েদী আছে, তাদের সেখানেই থাকতে দাও। আর স্মরণ রেখো, ইসলামী সাম্রাজ্যের কোন সীমানাতেই যেন তোমাকে না দেখি। সোজা খৃস্টানদের সীমানায় গিয়ে থামবে। তোমাকে এ যাত্রা মৃত্যুদণ্ড দিলাম না, কিন্তু ইসলামী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আর কোন চক্রান্ত বা অপকর্ম করলে তার যথাযথ সাজা তোমাকে ভোগ করতে হবে।’

    তিনি আরো বললেন, ‘তুমি যে চারজন ফেদাইনকে পাঠিয়ে ছিলে আমাকে হত্যা করার জন্য, তারা সবাই নিহত হয়েছে। তুমি সাদা পতাকা উড়িয়েছে বলে এবারকার মত তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। আমি কুরআনের নির্দেশের অনুসারী। আমি বলতে পারি না, খোদা তোমাকে ক্ষমা করবেন কি না। কিন্তু আমি বলছি, তুমি এবং তোমার ফোইন খুনীরা যদি নিজেদের মুসলমান হিসাবে দাবী করা ত্যাগ না করে তবে তোমাকে ও তোমার দলকে আমি ভূমধ্যসাগরে ডুবিয়ে দিতে বাধ্য হবো।’

    সূর্য ডুবতে বসেছে। সন্ধ্যার লালিমায় বিষন্নতার ছোঁয়া। মানুষের আবছা সুদীর্ঘ ছায়া মাথা নত করে দিগন্তের পাড়ে চলে যাচ্ছে। সেই ছায়া শেখ মান্নানের। মান্নান একা নয়, তার সাথে আছে তার এতদিনের সহচরবৃন্দ। নতমুখী, মানুষের দীর্ঘ মিছিল হারিয়ে যাচ্ছে দৃষ্টির অন্তরালে। সেই মিছিলের পুরোভাগে নেতৃত্ব দিচ্ছে শেখ মান্নান। পরাজিত মানুষের অভিনব এক কাফেলা। কাফেলায় শরীক হয়েছে নানা বিচিত্র অপরাধী। কেউ খুনী, কেউ মাদক ও নারীর দালাল, কেউ ছিনতাইকারীদের সর্দার, কেউ প্রতারক ও ফেরেববাজ, কেউ লুটেরাদের নেতা, কেউ সম্মোহন বিদ্যায় পারদর্শী গণক ও ভাগ্য গণনাকারী। এদেরই কেউ গুপ্তঘাতক দলের সেনাপতি, কেউ কমাণ্ডার ও সৈন্য।

    পেশাদার খুনীরা মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে। মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে অপরাধ জগতের রথী মহারথীরা। এটা স্বপ্ন না বাস্তব এই দ্বিধায় ভুগছে এখনো কেউ কেউ। তাদের এই দ্বিধার কারণ তাদের অন্তরে লুকিয়ে থাকা অপকর্মের দীর্ঘ ফিরিস্তি। কারণ তারা জানে, তারা এমন সব অপরাধ করেছে, যার কোন ক্ষমা নেই। যদি সেই অপরাধের শাস্তি দেয়ার জন্যই তাইয়বী এসে থাকে তাহলে তো তার উচিত ছিল আমাদেরকে হত্যা করা। অথচ সে আমাদের গায়ে ফুলের টোকাটি পর্যন্ত দেয়নি। আবার ভাবছিল, আমরা কি তারা, যাদের ভয়ে রাজা উজির আমীরদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়।

    এসব ভাবতে ভাবতেই সন্ধ্যার অন্ধকারে হারিয়ে গেল দুর্ধর্ষ ফেদাইন সন্ত্রাসীরা। দুর্ভাগ্য তাদের, যাওয়ার সময় তারা কিছুই সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেনি। তাদের উট, ঘোড়া, অস্ত্র, মানুষকে মোহগ্রস্ত করার নানা সরঞ্জাম, আসবাবাদি সব কিছু কেল্লার মধ্যে ফেলেই তাদের পথে নামতে হয়েছে।

    সূর্য পরিপূর্ণভাবে অস্ত যাওয়ার আগেই সুলতান আইয়ুবীর সেনাবাহিনী দূর্গের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করে নিল। কারাগার থেকে বের করে আনা হল কয়েদীদের। শেখ মান্নানের মহল ও কেল্লার গুপ্ত কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হল বেশুমার সোনা, রূপা, হীরা, জহরত ও অফুরন্ত মণিমাণিক্য।

    ❀ ❀ ❀

    সুলতান আইয়ুবী এই কেল্লাকে একজন সেনাপতির দায়িত্বে ছেড়ে দিয়ে সেই রাতেই কোহে সুলতানে যাত্রা করলেন। তিনি এখন আর বেশী দেরী করতে চান না। পরিকল্পিত অবশিষ্ট কাজগুলো যত দ্রুত সম্ভব সমাধা করে ফেলতে চান। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি নতুন অভিযানে বেরিয়ে পড়লেন। অভিযানের শুরুতেই আচমকা এক রাতে তিনি এজাজ দুর্গ অবরোধ করে বসলেন। হলবের আমীর এজাজ দুর্গকে শক্তিশালী ঘাঁটি হিসাবে গড়ে তুলেছিল। কারণ এই ঘাঁটিই হলব শহর ও প্রদেশের প্রধান প্রতিরক্ষা ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

    হলবের আমীর তার সেনাবাহিনীর মূল শক্তিকেন্দ্র হিসাবে এজাজ দূর্গকে গড়ে তোলার ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। এই ঘাটির সব সৈন্য ছিল তারুণ্যে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। সবাই ছিল ক্লান্তিহীন, সতেজ ও সবল। তিনি এই বাহিনীকে আইয়ুবীর মোকাবেলা করার জন্য উপযুক্ত ট্রেনিং ও পর্যাপ্ত রসদ সরবরাহ করে রেখেছিলেন। কিন্তু এই সৈনিকদের অধিকাংশই ছিল এমন, পর্যাপ্ত ট্রেনিং পেলেও যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি লড়াই করার অভিজ্ঞতা যাদের ছিল না।

    সুলতান আইয়ুবী জানতেন তাদের রণপ্রস্তুতির কথা। বিশেষ করে সুলতানের দূতকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়ে তারা যে দুঃসাহস দেখিয়েছিল, তাতে তাদের সাহস ও শক্তির অহংকারই মূর্ত হয়ে উঠেছিল। তাই এ কেল্লা খুব সহজেই দখল করতে পারবেন, তেমনটি সুলতান আশাও করেননি। তিনি জানতেন, এজাজ দূর্গে তিনি তুমূল প্রতিরোধের সম্মুখীন হবেন। তাই কেল্লাটি দখল করার মত পর্যাপ্ত রণপ্রস্তুতি নিয়েই তিনি এখানে এসেছিলেন।

    এ কেল্লা অবরোধ করার মধ্যে একটি সামরিক ঝুঁকি বিদ্যমান ছিল, সুলতান সে বিষয়টিও নজরে রেখেছিলেন। এই ঝুঁকি হচ্ছে, হলবের সেনাবাহিনী। তিনি কেল্লা অবরোধ করে বসে থাকলে আত্মসমর্পণ না করে কেল্লার কোন সৈনিক বাইরে আসতে পারবে না ঠিক, কিন্তু পিছন থেকে হলবের সেনাবাহিনী আক্রমণ করে বসতে পারে। তাই তিনি এমন একটি ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন, যাতে হল থেকে কোন বাহিনী এলে তাদেরও উপযুক্ত আদর-আপ্যায়নে কোন ক্রটি না ঘটে।

    সুলতান আইয়ুবীর একটা সুবিধা ছিল এই, তুর্কমান রণাঙ্গণ থেকে সম্মিলিত বাহিনীর সাথে হলবের বাহিনীও চরম পরাজয় স্বীকার করে হতোদ্যম ও ক্লান্ত হয়ে ফিরে এসেছিল। তাদের এখন যুদ্ধ করার সাহস, শক্তি ও মনোবল কিছুই অবশিষ্ট নেই।

    এজাজ দুর্গ। হলবের অনুগত বাহিনী জীবন বাজি রেখে লড়াই করে চলেছে। এজাজ দূর্গ রক্ষার সাথে জড়িয়ে পড়েছে তাদের জীবন-মরণ। পুরো একটা দিন ও রাত তারা সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যদেরকে কেল্লার কাছে আসতে দেয়নি। প্রাচীর ভাঙার জন্য যে দলটিকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন সুলতান, অনেক চেষ্টা করেও দেয়ালের কাছে যেতে পারেনি তারা। কারণ প্রাচীরের ওপর থেকে এমন প্রবল বেগে তীর বর্ষিত হচ্ছিল, জীবন বাজি রেখে চেষ্টা করেও দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব নয় কারো পক্ষে, তার আগেই তীরের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে যাবে তার বুক। তাই নিশ্চল ঝুঁকি নেয়ার মধ্যে কোন কল্যাণ খুঁজে পায়নি দলটি।

    পরের দিন। সুলতান আইয়ুবী অবরোধ তীব্রতর করার কথা ভাবলেন। তিনি তাঁর বাহিনীর অফিসার ও কমাণ্ডারদের ডেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে বললেন, কালকের চেয়ে আজকের আক্রমণ আরেকটু জোরালো করো, যাতে ওরা উপলব্ধি করতে পারে, সময় যত যাবে ততই কঠিন হবে ওদের বেঁচে থাকা। আমি ওদের হত্যা করার পরিবর্তে আত্মসমর্পণ করাতে চাই। তোমাদের টার্গেট হবে ওদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলা। সেনাবাহিনী সুলতানের নির্দেশ মোতাবেক কাজে নেমে পড়ল। শক্তিশালী মিঞ্জানিক দ্বারা ভারী ভারী পাথর নিক্ষেপ করে, পেট্রোল ভর্তি হাঁড়ি নিক্ষেপ করে এবং সেই পেট্রোলে অগ্নি তীর বর্ষণ করে আগুন ধরিয়ে দিয়ে আইয়ুবীর সৈন্যরা দুর্গ এবং দুর্গ-প্রাচীরে এক ভয়াবহ ত্রাসের পরিবেশ তৈরী করে ফেলল।

    প্রাচীরের উপরের তীরন্দাজরা অনেকেই আগুনে ঝলসে গেল। কেউ কেউ কেল্লার ভেতর লাফিয়ে পড়ে আত্মরক্ষা করল। কেল্লার ভেতর অগ্নিশিখা কতটা বিস্তৃত হলো দেখার উপায় না থাকলেও প্রাচীরের অবস্থা আইয়ুবীর সৈন্যরা সচক্ষে দেখতে পাচ্ছিল। প্রাচীরের ওপর জায়গায় জায়গায় যেসব সেন্ট্রিবক্স ছিল সেখানে থেকে তখনো কিছু তীরন্দাজ প্রাণপণে তীর ছুঁড়ে যাচ্ছিল।

    এমন সময় পেট্রোল বোঝাই একটি হাঁড়ি গিয়ে পড়ল কেল্লার একদম গেটের কাছাকাছি। কিছু পেট্রোল পড়লো পাঁচিলে, কিছু ছিটকে গিয়ে পড়ল গেটে। আইয়ুবীর তীরন্দাজরা সেই পেট্রোলে অগ্নি-তীর ছুঁড়ে মারল। সাথে সাথে সেখানে জ্বলে উঠল দাউ দাউ আগুন। পাঁচিল থেকে সে আগুন লাফিয়ে পড়ল কেল্লার গেটে; জ্বলতে শুরু করলো কেল্লার প্রধান ফটক। এই সুযোগে প্রাচীর ভাঙা বাহিনী ছুটল পাঁচিল ভাঙতে। কিন্তু সেন্ট্রিবক্স থেকে বেপরোয়া তীর বর্ষণ করে তাদের অনেককেই শহীদ করে দিল এজাজের দূর্গ রক্ষীরা।

    কেল্লার ভেতর অগ্নিগোলা নিক্ষেপের জন্য মিঞ্জানিক চালকদের কয়েকজন মিঞ্জানিক পাঁচিলের আরো কাছাকাছি নিয়ে গেল। এদের উপরও বেপরোয়া তীর চালাল পাঁচিলের ওপর থেকে কয়েকজন তীরন্দাজ। এতে বেশ কিছু মিঞ্জানিক চালক ও সৈন্য আহত এবং শহীদ হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে ওরা আবার মিঞানিক পিছনে সরিয়ে নিয়ে এল।

    সুলতান আইয়ুবী সবকিছু তদারক করছিলেন। তিনি মিঞানিক চালকদেরকে খুব সতর্কতার সাথে সেন্ট্রিবক্স টার্গেট করতে বললেন। তাই করা হলো। দেখা গেল দুটি সেন্ট্রিবক্স ভারী পাথরের আঘাতে গুড়িয়ে গেল। সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গেল ওখান থেকে তীর আসা।

    এবার আরেকদল পাঁচিল-ভাঙা সৈনিক ছুটল গেটের দিকে। শন শন করে অন্য সেন্ট্রিবক্স থেকে ছুটে এল কয়েকটি তীর। কয়েকজন মুজাহিদ লুটিয়ে পড়ল ময়দানে। বাকীরা সঙ্গীদের লাশ পেছনে ফেলেই এগিয়ে গেল সামনে। কারণ তারা বুঝে গিয়েছিল, এমন কিছু কুরবানী ছাড়া কেল্লা দখল করা সম্ভব নয়। একজন শহীদ হলে সেখানে ছুটে যেতো আরো কয়েকজন জিন্দাদীল মুজাহিদ।

    আইয়ুবী বুঝতে পারলেন, লড়াই একটি পরিণতির দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে। আক্রমণ আরেকটু তীব্রতর করতে পারলে লড়াই আগামী কালের জন্য মূলতবী করার প্রয়োজন পড়বে না।

    কেল্লার গেট তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে। লোহার ফ্রেম থেকে খসে খসে পড়ে যাচ্ছে কাঠের জ্বলন্ত টুকরা। ওদিকে সুলতানের আদেশ পেয়ে সমানে পাথর নিক্ষেপ করতে লাগল মিঞ্জানিক চালকরা। তীরন্দাজরা এগিয়ে টার্গেট স্থির করে তীর বর্ষণ শুরু করে দিল। তারপরও কেটে গেল বেশ কিছুটা সময়।

    একটু পর। আইয়ুবীর একদল জানবাজ গেটের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। তারা বন্ধুদের লাশ এবং জ্বলন্ত আগুনকে অগ্রাহ্য করে গেটের কাঠ খুলতে শুরু করে দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই গেটের লোহার ফ্রেম ছাড়া উধাও হয়ে গেল সব কাঠ। এখন অনায়াসেই পদাতিক বাহিনীর সদস্যরা দুর্গে প্রবেশ করতে পারবে।

    এ সুযোগটুকুর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন সুলতান। তিনি পদাতিক বাহিনীকে এগিয়ে যাওয়ার হুকুম দিলেন। এগিয়ে গেল পদাতিক বাহিনী।

    ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে রাতের আঁধার। থেমে গেছে পাথর ও অগ্নিগোলা নিক্ষেপ। দাউ দাউ আগুনের প্রচণ্ডতা কমে গিয়ে এখানে ওখানে যে টুকরো টুকরো অগ্নিশিখা জ্বলছে তাতে কেল্লার ভেতরের অন্ধকার যেন আরো গাঢ় হয়ে উঠল। কারণ সে আগুন সামান্য এলাকা আলোকিত করে পাশের অন্ধকারকে আরো ঘন অন্ধকারে ডুবিয়ে দিচ্ছিল।

    গেটে তখনো লোহার ফ্রেমটুকু রয়ে গিয়েছিল। যে কারণে ওখান দিয়ে অশ্বারোহীদের প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না। প্রাচীর ভাঙার যে দলটি ওখানে পৌঁছে গিয়েছিল তারা লোহার ফ্রেম সরানোর চেষ্টা করছিল। এ সময় একদল পদাতিক অন্ধকারের মধ্য দিয়ে সাঁ করে ভেতরে ঢুকে গেল। তাদের পেছন পেছন ঢুকল আরেকটি দল।

    এজাজের দুর্গ রক্ষীরা ছাদের ওপর থেকে তাদের ওপর তীর বর্ষণ করছিল। কেউ কেউ লুটিয়ে পড়ছিল সে তীরের আঘাতে। বাকীরা ঢুকে যাচ্ছিল কেল্লার অভ্যন্তরে।

    কেল্লার ভেতরে সৈনিকদের যে ব্যারাক ছিল তার সামনে সঙ্গীণ উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল একদল কেল্লা রক্ষী। আইয়ুবীর পদাতিক বাহিনী হামলে পড়লো তাদের ওপর। রক্তক্ষয়ী তলোয়ার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল সেখানে।

    পদাতিক বাহিনীর জানবাজ সৈন্যরা প্রাণপণে লড়াই করে চলেছে। ততক্ষণে গেটের লোহার ফ্রেমটি সরিয়ে ফেলতে সমর্থ হলো ওখানকার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনী। সুলতান আইয়ুবী এবার সাঁড়াশী অভিযানের জন্য অশ্বারোহী দলকে এগিয়ে যাবার হুকুম দিলেন।

    অশ্বারোহী বাহিনী খোলা গেট দিয়ে ঝড়ের বেগে ঢুকে গেল ভেতরে। এজাজ দুর্গের তীরন্দাজরা ছাদের ওপর থেকে তীরের বন্যা বইয়ে দিল। আইয়ুবীর বাহিনীর পদাতিক ও অশ্বারোহীদের লাশে ভরে গেল সামনের চত্বর। যুদ্ধের এ পর্যায়ে এসে এমন কঠোর প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হবে, আইয়ুবীর বাহিনী এতটা ধারনা করেনি। তারা চরম কোরবানী দিয়ে যাচ্ছিল। লড়াই চলছিল তীব্রতর, দু’পক্ষেই হতাহত হচ্ছিল সমান তালে। আইয়ুবীর সৈনারা লাশ ডিঙ্গিয়ে আরো ভেতরে প্রবেশ করলো।

    এ যুদ্ধ ছিল বড় রক্ত ঝরা যুদ্ধ। এজাজ দুর্গের সৈন্যরা প্রচণ্ড সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে লড়াই করছিল। গেটের লৌহ কপাট ভেঙে পড়ায় দলে দলে অশ্বারোহী বাহিনী ভেতরে প্রবেশ করলো। প্রাণপণে প্রতিরোধ করেও ওদের অগ্রযাত্রা বন্ধ করতে পারল না এজাজের দুর্গরক্ষীরা।

    সুলতান আইয়ুবী ভেতরে প্রবেশ রত অশ্বারোহীদের হুকুম দিলেন কেল্লার মধ্যে স্থানে স্থানে আগুন লাগিয়ে দিতে। তাতে অন্ধকার কিছুটা কমবে। শত্রু-মিত্র চিনতে সুবিধা হবে। আর সবচে বড় ফায়দা যেটি হবে, তা হলো, সর্বত্র আগুন ধরিয়ে দিলে কেল্লার অভ্যন্তরে আতংক বৃদ্ধি পাবে। এখন ওরা ক্ষয়ক্ষতি প্রত্যক্ষ করতে পারছে না বলে যে সাহস ও মনোবল নিয়ে লড়াই করতে পারছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমান দেখলে তাতে, ভাটা পড়বে। কেল্লার সর্বত্র আগুন জ্বলতে শুরু করলে ওরা, বুঝতে পারবে, আইয়ুবীর বাহিনী কেল্লার সবখানে অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। হয়তো এরই মধ্যে তাদের কোন কোন সাথী আত্মসমর্পণও করে ফেলেছে। এই চিন্তা একবার কারো মনে ঢুকে গেলে সে নিজেও আত্মসমর্পণের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠবে।

    সঙ্গে সঙ্গে সুলতানের নির্দেশ কার্যকর করা হলো। কেল্লার বিভিন্ন স্থাপনার ওপর আগুন লাগিয়ে দিল আইয়ুবীর বাহিনী। এতক্ষণ এজাজ দুর্গের যে সেনাদল বীরত্ব নিয়ে লড়াই করছিল, তারা দেখতে পেল, তাদের অস্ত্রাগারে আগুন জ্বলছে। আগুন জ্বলছে ঘোড়ার আস্তাবলে, খাদ্যগুদামে, তাদের থাকার ব্যারাকে, এমনকি অফিসার্স কোয়ার্টারে। পশুর জন্য রাখা শুকনো ঘাস ও খড়ের গুমাদের আগুন আকাশ, আলোকিত করে ফেলেছে।

    এ কেল্লাটি হলব শহর থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। রাতে হলববাসী দেখলো, এজাজ দুর্গের যেখানে সেখানে আগুন আর আগুন। আগুনের সেই লেলিহান শিখায় পাক খাচ্ছে ধোঁয়ার কালী। আকাশ লাল করে সে ধোঁয়া উঠে যাচ্ছে উপরের দিকে। একটার পর একটা অগ্নিশিখা কেবল বাড়ছেই। মনে হচ্ছে, এজাজ দুর্গে আগুনের রাজত্ব কায়েম হয়েছে।

    সুলতান আইয়ুবী এজাজ দুর্গ অবরোধ করেছেন, হলববাসী এ সংবাদ আগেই পেয়েছিল। এই দৃশ্য দেখে হলবের সেনাবাহিনী প্রধান চিন্তায় পড়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেনানায়কদের নিয়ে বৈঠকে বসলেন। বললেন, ‘অবস্থা ভাল মনে হচ্ছে না। আইয়ুবীর বাহিনী নিশ্চয়ই এজাজ দুর্গে ঢুকে পড়েছে। এখন তাদের সাহায্যে আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত। আমরা আইয়ুরীর বাহিনীর পিছন থেকে আঘাত করলে সে উভয় সংকটে পড়ে যাবে। দুদিক থেকে আক্রান্ত হলে তার অবস্থা হবে করুণ চাই কি সে আত্মসমর্পণও করে বসতে পারে।’

    কেউ কেউ এ প্রস্তাব সমর্থন করলেও অধিকাংশ সেনাপতি এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করল। তাদের একদল বলল, “এজাজ দুর্গ নয়, এখন আমাদের নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করা উচিত। আইয়ুবী এজাজ দুর্গ দখল করে বসে থাকবে না। সে অবশ্যই হলব আক্রমণ করবে। তার হলব প্রবেশ কি করে রোধ করা যায়, এটিই এখন মন্তু ভাবনার বিষয়।

    সেনাপতি বললো, “সে জন্যই তো আমি এই মুহূর্তে তাকে পিছন থেকে চ্যালেঞ্জ করে বসতে চাই। সে এজাজ দুর্গে পরাজিত হলে কখনো হলব আক্রমণ করতে পারবে না।’

    ‘কিন্তু আমরা শহর ছেড়ে বেরিয়ে গেলে আরো বড় বিপদ হাত পারে।’ বলল এক সেনাপতি, ‘তাঁর কোন বাহিনী এই মুহুর্তে শহরের বাইরে ওঁৎ পেতে বসে নেই, এমন নিশ্চয়তা আমরা কেউ দিতে পারবো না। সে ক্ষেত্রে আমরা শহর থেকে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে ওরা শহরে ঢুকে পড়বে। বিনা বাধায় ও বিনা যুদ্ধে ওরা এই শহর দখল করে নেবে। এমন সুযোগ আমরা ওদের কিছুতেই দিতে পারি না।’

    ‘আমি ভাবছি অন্য কথা।’ বলল আরেক সেনাপতি। ‘আমাদের বাহিনী এইমাত্র একটা রক্তাক্ত লড়াই থেকে ফিরল। আইয়ুবীর হাতে চরম মার খেয়ে পরাজিত ও বিপর্যস্ত অবস্থায় ফিরে এসেছে ওরা। তারা আহত, রক্তাক্ত ও ক্লান্ত। তাদের মধ্যে এখনো বিরাজ করছে আইয়ুবী আতঙ্ক। ওরা এখন যুদ্ধ করার যোগ্য নেই। এ অবস্থায় আমরা চাইলেও ওদেরকে এখন আইয়ুবীর বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে পারবো না। এজাজ দুর্গের তাজাদম সৈন্যরাই যদি নিজেদের ভাগ্যের বিপর্যয় রোধ করতে না পারে তবে আমাদের এ হতোদ্যম বাহিনী কি করে ওদের রক্ষা করার জিম্ম নেবে?”

    সুলতান আইয়ুবী যখন এজাজ দুর্গ অবরোধ করেন তখন আল মালেকুস সালেহের বয়স তেরো কি চৌদ্দ। এখন আর সে শিশু নয়। শৈশব থেকে কৈশোরে উত্তীর্ণ হয়েছে তার বয়স। কিছু কিছু বুঝতে শিখেছে রাজনীতির খেলা।

    হলবে নিজের প্রাসাদে বসে সে দেখলো এজাজ দুর্গের লেলিহান আগুনের শিখা। যা বুঝার বুঝে নিল সে।

    সে সময় সাইফুদ্দিন এবং গুমাস্তগীনও হলবেই ছিল। গতকালের ঘটনা মনে পড়ে গেল তার। আইয়ুবী এজাজ দুর্গ অবরোধ করেছে এ খবর যখন হলবে পৌঁছে তখন এ দুজনই দরবারে ছিল। এজাজ দুর্গের অবস্থা ও করণীয় নিয়ে দু’জনের মধ্যে তর্ক বেঁধে যায়। এই বিতর্ক এমন তিক্ত পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, গুমাস্তগীন সাইফুদ্দিনকে হত্যা করার হুমকী পর্যন্ত দেয়।

    আল মালেকুস সালেহ ওদের এ বিতর্ক গভীর মনযোগের সাথে লক্ষ্য করে। গুমাস্তগীন এবং সাইফুদ্দিনের হাব-ভাব, আচরণ, চাহনী ও প্রতিটি কথা থেকে সে বুঝতে চেষ্টা করে ওদের দু’জনকে। ঝগড়ার এক পর্যায়ে সাইফুদ্দিন সম্মিলিত বাহিনীর সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয় এবং নিজের অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে হল ত্যাগ করে চলে যাবে বলে জানায়।

    আল মালেকুস সালেহ বুঝতে পারে, সম্মিলিত বাহিনীতে থাকলেও এরা আসলে একে অপরের শত্রু। গুমাস্তগীন যে আক্রোশ দেখালো, তাতে সে অনুভব করলো, এ লোকটি সুবিধের নয়, সে আসলে বন্ধুবেশী এক ষড়যন্ত্রকারী। অবশেষে সে এই ঝগড়ায় হস্তক্ষেপ করে এবং সাইফুদ্দিনকে আশ্বস্ত করার জন্য গুমাস্তগীনকে কারাগারে বন্দী করে। বন্দী গুমাস্তগীন আল মালেকুস সালেহের বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্র পাকাতে শুরু করলে সে তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। আল মালেকুন্স সালেহ তখন তাকে কারাগারেই হত্যা করতে বাধ্য হয়।

    এজাজ দুর্গ। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত দুর্গের সৈন্যরা অসমর্পণ করতে শুরু করল। এই অবরোধ ও যুদ্ধে সুলতান আইয়ুবীর বিজয় হলো বটে, কিন্তু এ বিজয়ের জন্য তাঁকে অনেক বেশী মূল্য দিতে হল। সেনা বাহিনীর যে দলটি প্রথম কেল্লার মধ্যে প্রবেশ করেছিল, এ যুদ্ধে তাদের অধিকাংশই শাহাদাত বরণ করেছিল। এজাজের দুর্গ রক্ষীরা প্রমাণ করে দিয়েছিল, তারা কাপুরুষ বা ভীরু নয়।

    এজাজ দুর্গ জয় করার পর সুলতান আইয়ুবী বিলম্ব না করে দ্রুত হলব শহর অবরোধ করে নিলেন। হলব শহর ছিল এজাজ দুর্গের খুবই সন্নিকটে। হলব শহরেব সৈন্যরা রাতভর দেখেছে এজাজ দুর্গের বিভীষিকা। জ্বলন্ত আগুনের লেলিহান শিখা শুধু নয়, আহতদের আর্ত চিৎকারের ক্ষীণ আর্তনাদ তাদের অন্তরে ভয়ের শিহরণ বইয়ে দিয়েছে। অজানা শংকায় কেঁপেছে তাদের হৃদয়গুলো।

    যুদ্ধ করার সব প্রেরণা ও সাহস তাতেই উবে গিয়েছিল। ভোরে যখন ওরা দেখতে পেল, কাল রাতে যারা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল এজাজ দুর্গে, এখন তাই এ শহর অবরোধ করে বসে আছে, ভয়ের হীমশীতল স্রোত তাদের কণ্ঠতালু পর্যন্ত শুকিয়ে ফেলল। তারা এজ দুর্গের রাতের বিভীষিকাময় দৃশ্যের কথা স্মরণ করে। ভীতসন্ত্রস্ত হরিণীর মত পালাবার পথ তালাশ করতে লাগল।

    হলবাসীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল এ ভীতির শিহরণ। তারা আইয়ুবীর সাথে তাদের অতীত আচরণের কথা স্মরণ করে ভাবছিল আইয়ুবী না জানি তাদের জন্য কি কঠিন শাস্তি বরাদ্দ করে।

    পালাবার সব পথ বন্ধ। শহরের চারদিক আইয়ুবীর সৈন্যরা ঘেরাও করে রেখেছে। এ অবস্থায় কিছুই করার নেই দেখে জনসাধরণ ঘরের ভেতর দরজা জানালা বন্ধ করে বনে বসে আল্লাহ আল্লাহ করতে লাগল। কারণ শহরের সেনাবাহিনী যে সুলতান আইয়ুবীকে প্রতিরোধ করার শক্তি হারিয়েছে সে কথা বুঝতে কারো কোন কষ্ট হচ্ছিল না। আইয়ুবী তাদের জন্য কি শাস্তি নির্ধারণ করে তাই দেখার জন্য দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করতে লাগল শহরের প্রতিটি নাগরিক, এমনকি সৈন্যরা পর্যন্ত।

    ❀ ❀ ❀

    অবরোধের দ্বিতীয় দিন। আল মালেকুস সালেহের এক দূত এলো সুলতান আইয়ুবীর কাছে। দূত সুলতানের কাছে একটি চিঠি হস্তান্তর করল। সুলতান ভেবেছিলেন, আল মালেকুস সালেই হয়তো কোন সন্ধি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। কিন্তু চিঠি খুলে তিনি তাজ্জব হয়ে গেলেন। এটি কোন সন্ধি প্রস্তাব ছিল না, ছিল এক আবেগময় ছোট্ট চিরকুট, যা পড়ে সুলতান আইয়ুবী হতভম্ব হয়ে গেলেন।

    চিঠিটা ছিল এমন: ‘সুলতান নূরুদ্দিন জঙ্গী মরহুমের শিশু কন্যা সুলতান আইয়ুবীর সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়।’

    এই মেয়েটির নাম শামসুন নেছা। সে আল মালেকুস সালেহের ছোট বোন। বয়স মাত্র নয় কি দশ। আল মালেকুস সালেহ যখন দামেশক থেকে বিপথগামী আমীরদের প্ররোচনায় হলবে পালিয়ে আসে, তখন সে তার ছোট বোনকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তার মা মরহুম নূরুদ্দিন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রী রাজিয়া খাতুন দামেশকেই থেকে যান। কারণ তিনি বিপথগামী আমীরদের ষড়যন্ত্র ধরতে পেরেছিলেন। সুলতান আইয়ুবীই যে মরহুম নূরুদ্দিন জঙ্গীর সত্যিকার অনুসারী এবং ইসলামের একনিষ্ঠ সেবক, তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।

    সুলতান আইয়ুবী দূতকে নির্দেশ নিলেন, ‘যাও, সেই মেয়েকে নিয়ে এসো।’

    মরহুম নূরুদ্দিন জঙ্গীর কন্যা অনুমতি পেয়ে সুলতানের সামনে এসে হাজির হলো। তার সাথে এল আল মালেকুস সালেহের দুই সেনাপতি।

    সুলতান আইয়ুবী তাকে কাছে পেয়েই বুকে টেনে নিলেন। তখন তাঁর হৃদয়ে বইছে আবেগের বন্যা। তিনি নূরুদ্দিন জঙ্গীর শিশু কন্যাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবেগে কেঁদে ফেললেন। অনেকক্ষণ মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখার পর কিছুটা শান্ত হয়ে মেয়েটিকে পাশে বসিয়ে বললেন, ‘তোমরা কেমন আছো মা? তোমার ভাই ভাল আছে?’ মেয়েটি বিহবল কণ্ঠে বলল, ‘আমরা ভাল আছি মামা। ভাইয়া আপনাকে এ চিঠিটা দিতে বলেছে।’ বলে সে ওড়নার ভেতর থেকে একটি চিঠি বের করে দিল।

    সুলতান চিঠিটি নিয়ে পড়লেন। তাতে আল মালেকুস সালেহ পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে লিখেছে,

    ‘আজ থেকে আমি আপনার আনুগত্য স্বীকার করে নিলাম। বিপথগামী আমীরদের প্ররোচনায় এতদিন আপনার বিরোধীতা করে যে অন্যায় করেছি, সে জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী। আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। আমার কারণে ইসলামের অগ্রযাত্রায় যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছিল আপনার অধীনে বাকী জীবন কাজ করে আমি তার কাফফারা আদায় করতে চাই। আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি, ইসলামের দুশমন, গাদ্দার গুমান্তগীনকে হত্যা করা হয়েছে। এখন থেকে হারান কেল্লা ও তার রাজ্য আপনার অধীন। আশা করি আপনি আমাকে আমার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ দেবেন।’

    ইতি

    আপনার স্নেহের সালেহ।

  • পাল্টা ধাওয়া

    পাল্টা ধাওয়া

    পাল্টা ধাওয়া

    ত্রিপলীর খৃস্টান রাজ দরবার। বিভিন্ন খৃস্টান সম্রাটরা এসে এখানে মিলিত হয়েছেন। উদ্দেশ্য, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত ও সর্বপ্লবী হামলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা। মুসলমানদের ওপর চূড়ান্ত হামলার লক্ষ্যেই এ সম্মেলন। সম্মেলনে অতিথিদের আপ্যায়নের দায়িত্ব পালন করছে দুই বিশ্বস্ত খৃস্টান, ভিক্টর ও চেঙ্গিস।

    রাজকীয় উর্দি পরে দু’জনই মেহমানদের সামনে ঘোরাফেরা করছিল। এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছিল তাদের। মেহমানদের অনেকেই এদের আগে থেকে চেনে। ওরা মেহমানদের বিশ্বাসভাজন তো বটেই, কারো কারো প্রিয়ভাজনও।

    ক্রুসেডদের গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান হরমন। তিনিই অনেক যাচাই-বাছাই করে ওদেরকে এ চাকরীতে নিয়োগ দিয়েছেন। কিন্তু আসলে এরা দু’জনই ছিল সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দা। গোয়েন্দা হিসাবে তারা দু’জনই ছিল চৌকস। অসম্ভব বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ না হলে হরমনের মত উস্তাদ গোয়েন্দার সন্ধানী দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে তাদের পক্ষে এখানে টিকে থাকা সম্ভব ছিল না।

    দেখতে শুনতেও দু’জনই ছিল স্মার্ট। এখানে তাদের চাকরী হওয়ার এটাও একটা কারণ যে, তাদের উভয়েরই চেহারা সুন্দর, দেহ কাঠামো সুঠাম, সবল ও পৌরুষদীপ্ত। রাজকীয় মেহমানখানায় কাজ করার উপযুক্তই বটে।

    ভিক্টর তার প্রকৃত নামেই সবার কাছে পরিচিত। কারণ সে আসলেই খৃস্টান। রাশেদ চেঙ্গিস ছিল তুরস্কের নাগরিক, মুসলমান। খৃস্টানদের কাছে সে তার নিজের দেয়া খৃষ্টান ছদ্মনামে পরিচিতি ছিল। এ জন্য কোন খৃস্টানই তার আসল নাম জানতো না এবং সে যে মুসলমান তাও জানতো না।

    গভীর রাত পর্যন্ত চলল সম্মেলনের কাজ। আহারাদি, মদপান ও আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে রাত পার করে দিল সম্রাটগণ। বিশ্বস্ত খাদেমের মতই হাসি মুখে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অতিথিদের সেবা করে যাচ্ছিল।

    মাঝ রাতের পর মিটিং শেষ হলো। তখন তারা ছুটি পেল নিজ নিজ কামরায় যাওয়ার।

    ‘আমরা দুজন একই সাথে চাকরী ও ডিউটিতে অনুপস্থিত থাকতে পারি না।’ ভিক্টর বললো, ‘এ সংবাদ অন্য কাউকে দিয়ে কায়রো পাঠাতে হবে। এমন বিশ্বস্ত লোক কাকে পাওয়া যায় বলতো?’

    ‘ইমাম সাহেবের সাথে কথা বলতে হবে।’ রাশেদ চেঙ্গিস বললো, ‘তিনি ভাল বলতে পারবেন, কে দ্রুত ও বিশ্বস্ততার সাথে এ সংবাদ কায়রো পৌঁছাতে পারবে। তবে যেই যাক, তাকে বিশ্বস্ত হতে হবে।’ সে আরো বলল, ‘আমি আজই এ সংবাদ দিয়ে কাউকে পাঠানোর দরকার মনে করছি না। এখনো খৃস্টান সম্রাটরা যুদ্ধের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেনি। যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিকল্পনা ও পরিপূর্ণ তথ্য নিয়েই কায়রোতে লোক পাঠানো দরকার। অসম্পূর্ণ সংবাদ দিয়ে সুলতান আইয়ুবীকে হয়রান পেরেশান করার কোন মানে নেই।’

    ‘না, আমি এটুকুকেই অনেক বড় খবর মনে করি। ইমাম সাহেবকে বলা দরকার, ক্রুসেড বাহিনী বিশাল শক্তি নিয়ে আক্রমণের পরিকল্পনা করেছে। যাতে তিনি এ খবর কায়রো পৌঁছে দিতে পারেন।’ ভিক্টর বললো, ‘সুলতান আইয়ুবী এতে করে প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ পাবেন। এখনো যেসব দিকে তাঁর দুর্বলতা রয়েছে দ্রুত তা সংশোধন করে নিতে পারবেন। অভাবগুলো দ্রুত পূরণের জন্য সচেষ্ট হতে পারবেন। পরে যখন বিস্তারিত পরিকল্পনা পাবো তখন সে খবরও পাঠাবো।’

    ‘কিন্তু বার বার যাতায়াত করলে হরমনের গুপ্তচরদের নজরে পড়ে যাওয়ার ভয় আছে!’

    ‘আর এমন যদি হয়, কোন খবর পাঠানোর আগেই আমরা ধরা পড়ে গেলাম!’

    ‘কেন, তোমার কি নিজের প্রতি আস্থা নেই?’

    ‘নিজের প্রতি আস্থা আমার ঠিকই আছে, কিন্তু তোমার প্রতি নেই। শোন!’ ভিক্টর চেঙ্গিসকে বললো, “যে সময় মেহমানরা আক্রমণের কথা বলছিল, তখন আমি তোমাকে লক্ষ্য করে দেখেছি। তুমি মদের পিয়ালা সম্রাট রিমাণ্ডের সামনে সাজিয়ে রাখতে রাখতে একবার থেমে গিয়েছিলে। তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, তুমি তার কথার দিকে খেয়াল করছে। আমি তোমার চেহারা দেখছিলাম। খবরটি শুনে তোমার চেহারায় প্রফুল্ল ভাব ফুটে উঠেছিল। আমি জানতাম, এত দামী তথ্য পাওয়ার পর আতংক বা খুশীর ভাব ফুটে উঠাই স্বাভাবিক। কিন্তু তোমার ভুলে গেলে চলবে না, হরমনও এখানে উপস্থিত আছেন। হরমন আলী বিন সুফিয়ানের সম পর্যায়ের গোয়েন্দা। আমি তোমাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে হরমনের দিকেও তাকিয়েছিলাম। আমার তখন আশংকা হলো, তিনি তোমাকে লক্ষ্য করছেন। তাই তো বলছি, ভাই, আমাদের নিঃশ্বাসের কোন বিশ্বাস নেই।’

    ‘হরমনের কাছে আমি কোন অপরিচিত লোক নই।’ রাশেদ চেঙ্গিস বললো, ‘আমার সম্পর্কে তিনি সন্দেহ অনেক আগেই শেষ করেছেন। এখন ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’

    ‘ভয় করার কথা বলছি না, সাবধান হওয়ার কথা বলছি।’ ভিক্টর বললো, ‘আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমরা শত্রুর পেটের মধ্যে বাস করছি।’

    ‘তা ঠিক। কিন্তু ভাই, যাই বলো, আমিও তো একজন মানুষ। মানবিক ত্রুটিবিচ্যুতির উর্ধ্বে কি করে উঠি!’

    ‘সে জন্যই তো তোমাকে সাবধান করছি। তুমি তো জানো না আজ হরমনের ওপর কি নির্দেশ জারী করা হয়েছে। এখন থেকে প্রতিটি মানুষকেই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখার জন্য বলা হয়েছে তাকে। আর তাকে এই ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে, এ ক্ষেত্রে তিনি যা ভাল মনে করবেন, সেটাই আইন। তিনি কাউকে সন্দেহ করলে এবং সেই সন্দেহের বশে কাউকে খুন করলেও কেউ তার কাছে কোন কৈফিয়ত তলব করতে পারবে না।’

    ‘বলো কি! এ ব্যাপারে তার হাতে সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে দেয়া হয়েছে?’

    ‘হ্যাঁ, শোন, এসব কথা এখন থাক। আগে কাজের কথায় আসি। তুমি এখনি সোজা মসজিদে চলে যাও। সবাই এখন ঘুমিয়ে আছে। এই সুযোগে আজকের আলোচনা ইমাম সাহেবকে বিস্তারিত জানিয়ে এসো। যদি কায়রোতে যাওয়ার মত লোক পাওয়া যায়, তবে যেন দ্রুত অকে আলী বিন সুফিয়ানের কাছে পাঠিয়ে দেয়। আর যদি ওদিক থেকে কেউ এসে থাকে, তবে আমার সাথে দেখা না করে যেন ফিরে না যায়।’

    শহরের এক মসজিদের ইমাম সুলতান আইয়ুবীর গোপন সংবাদ আদান-প্রদানের মাধ্যমে পরিণত হয়েছেন। সেই সুবাদে মসজিদটিও মুসলিম গোয়েন্দাদের গোপন আড্ডায় পরিণত হয়েছে। আলী বিন সুফিয়ানের কোন গোয়েন্দা গোপন কোন খবর পেলে মসজিদে গিয়ে ইমাম সাহেবকে সে তথ্য দিয়ে আসে। ইমাম সাহেব আবার সে খবর অন্য গোয়েন্দা মারফত জায়গা মত পৌঁছে দেন।

    ভিক্টর কখনও মসজিদে যায় না। সে বলে, “আমি মুসলমানও না, নামাজ-কালামও জানি না। আর মসজিদের ইজ্জত-সম্মান বিষয়েও কোন জ্ঞান নেই আমার। আমি কেন মসজিদে যাবো?’

    তার এ কথা যেমন খাঁটি, তারচেয়ে বেশী খাঁটি, সে এক হুশিয়ার গোয়েন্দা। অযথা মসজিদে যাওয়ার ঝুঁকি সে কেন  নিতে যাবে! মসজিদে মুসল্লী বেশে ক্রুসেড গোয়েন্দা নেই, এমন তো নয়। অনেক মুসল্লীই আছে, যারা পাকা গোয়েন্দা। তারা খৃস্টানদের চর হিসাবে মুসলমানদের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। তারা মসজিদের মুসল্লীদের প্রতি কড়া দৃষ্টি রাখে এবং তাদের কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনে। এ জন্যই দেখা যায়, আইয়ুবীর প্রতি সামান্য দরদ রাখে এমন বেশীর ভাগ মুসলমানই গ্রেফতার হয়ে যায়।

    রাশেদ চেঙ্গিসও দিনের বেলা এবং প্রকাশ্যে কখনো মসজিদে যায় না। কারণ সে নিজেও খৃস্টান পরিচয়েই সবার কাছে পরিচিত। কোন খৃস্টান মসজিদে গেলে প্রথম দর্শনেই সে সন্দেহভাজনদের তালিকায় পড়ে যাবে। যে লোক খৃস্টান রাজসভায় মদ পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করে, মসজিদের তার কি দরকার? এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর সে দিতে পারবে না। তাই যখনি প্রয়োজন পড়ে, তখন গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে ইমামের সাথে দেখা করতে যায়। ইমাম সাহেবের কামরা মসজিদের সাথে লাগোয়। কামরার দরজা মসজিদের বারান্দার দিকে। বারান্দা দিয়ে উঠে দরজায় ধাক্কা দিলে দেখা যাবে, দরজাটি ভেতর থেকে ভেজানো বা আটকানো। তখন নিয়ম মাফিক সাংকেতিক টোকা দিতে পারলেই সে দরজা খুলে যাবে।

    রাশেদ চেঙ্গিস তার পোষাক পরিবর্তন করলো। গায়ে জোব্বা ও মাথায় পাগড়ী বেঁধে নিল মুখে কৃত্রিম দাড়িও লাগাল। এরপর কামরা থেকে বেরিয়ে অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেল। আদেশ অনুযায়ী তাকে সব সময় ক্লীন সেভ থাকতে হয়। গোপন মিশনে যাওয়ার সময় সে কৃত্রিম দাড়ি লাগিয়ে বের হয়, যাতে কারো চোখে পড়লেও সহজে ধরা না পড়ে।

    একজন পাক্কা হুজুর সেজে রাস্তায় নামে সে। রাজ দরবারের বাইরে তাদের থাকার জন্য নির্দিষ্ট কোয়ার্টার আছে। সেখানেই থাকে সে এবং ভিক্টর। তাই বেরোতে কোন অসুবিধা হয়নি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাতি জ্বলছে। সে যতটা সম্ভব আলো এড়িয়ে পথ চলছিল।

    রিমাণ্ডের পারিষদ এবং সেনা অফিসার ছাড়াও ওখানে জমায়েত হয়েছিল অনেক মেহমান। তারা বিভিন্ন খৃস্টান সাম্রাজ্যের সম্রাট বা সেনাপতি। সম্রাট রিনাল্ট, তার অনেক নাইট এবং অফিসারও সেখানে উপস্থিত ছিল। আরও ছিল বিভিন্ন রাষ্ট্রের সেনা কর্মকর্তাবৃন্দ।

    এইসব সম্মানিত মেহমানদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা রেখেছিলেন সম্রাট রিমাণ্ড। আলাপ-আলোচনা ও যুদ্ধের পরিকল্পনায় যেটুকু সময় ব্যয় হতো তার বাইরে বাকী সময়টুকু তারা কাটিয়ে দিত আমোদ-স্ফুর্তি ও মাতলামী করে। অধিকাংশ রাত তারা পার করতো মদ ও মেয়ে নিয়ে।

    দরবারে ছিল অভিজাত শ্রেণীর পেশাদার নিশিকন্যাদের রমরমা ভাব। উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসাররা মেতে উঠে স্ত্রী বদল খেলায়। ফলে রাতে শহর জুড়ে একটা উৎসব উৎসব ভাব চলে এলো।

    রাশেদ চেঙ্গিস তার কামরা থেকে বেরিয়ে পথে নেমেই বিপাকে পড়ল। কোথায় সে একটু নিরিবিলিতে পথ চলবে, গোপনে দেখা করবে ইমাম সাহেবের সাথে, তা নয়, পথ ভর্তি লোকজন। পথের পাশে বিভিন্ন দেশের সৈনিকরা তাঁবু টানিয়ে নিয়েছে। সেই সব তাঁবুতে, এমনকি পথের মধ্যেও অসভ্যপনা চলছিল। বেসামাল মাতাল জোড়া এমন ভাবে পথ চলছে, যেন ওটা ওদের ড্রয়িং রুম।

    সে এই সব জুটির দৃষ্টি এড়িয়ে কৌশলে রাস্তা পার হয়ে এলো। শেষ পর্যন্ত সে বিপদসীমা পার হয়ে শহরের সাধারণ আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করলো। একটু পর গিয়ে হাজির হলো সেই মসজিদের পাশে।

    মসজিদটি এক মুসলিম মহল্লার অভ্যন্তরে। এখানে কোন কোলাহল ছিল না, আশেপাশে কেউ জেগে আছে বলেও মনে হলো না তার। সে বারান্দা পেরিয়ে ইমাম সাহেবের দরজায় গিয়ে হাজির হলো। এদিক-ওদিক ভাল ভাবে লক্ষ্য করে কামরায় প্রবেশ করতে যাবে, এমন সময় কারো আলতো পায়ের শব্দ শুনতে পেল। থমকে দম আটকে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল সে। শব্দটি গলি পেরিয়ে মসজিদের মোড়ের কাছে এসে নীরব হয়ে গেল।

    রাশেদ চেঙ্গিস অনেকক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে রইল। আর কোন শব্দ নেই। সে ভাবল, তবে কি এটা মনের ধোঁকা? নাকি ভুল শুনলাম? সে বারান্দা দিয়ে হেঁটে আবার এসে গলি মুখে উঁকি দিল। না, আশেপাশে কেউ নেই।

    রাশেদ চেঙ্গিস ভাবলো, হয়তো কোন কুকুরের পদধ্বনি ছিল ওটা। সে তার মনকে শান্ত করে ইমাম সহেবের কামরার দরজায় ধাক্কা দিল। খুলে গেল দরোজা। রাশেদ চেঙ্গিস ভেতরে প্রবেশ করে ইমাম সাহেবকে সব কথা খুলে বলল।

    ‘ক্রুসেড বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য এখানে জড়ো হয়েছে।’ চেঙ্গিস বললো, ‘সবচেয়ে বড় দলটি নিয়ে এসেছে সম্রাট রিনাল্ট। ত্রিপলীর সেনাবাহিনী আগে থেকেই এখানে আছে। অন্যান্য সম্রাটরাও তাদের বাহিনী এসে পৌঁছার জন্য অপেক্ষা করছে। কায়রোতে এ সংবাদ তাড়াতাড়ি পাঠানো দরকার। সৈন্য অভিযানের আগেই এ বার্তা সুলতান আইয়ুবীর কাছে পৌঁছলে তিনি তাদের সম্বর্ধনার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে পারবেন।’

    ‘তুমি খুব গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নিয়ে এসেছো। আমি এ খবর কায়রো পাঠাবার ব্যবস্থা করছি। তুমি আর কিছু বলবে?’

    ‘আমরা যদি সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারি, তবে অভিযানের আগেই কমান্ডো হামলা চালিয়ে এই বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করা সব। বিষয়টি আপনি গভীরভাবে ভেবে দেখবেন। আর যদি এটা সম্ভব না হয় তবে তাদেরকে অভিযানের মাঝ পথে বাঁধা দেয়া যেতে পারে।’

    ‘তোমার কথার অর্থ হচ্ছে, কমান্ডোদের বলতে হবে, তারা যেন শক্রদের রসদপত্র পথেই জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দেয়।’ ইমাম সাহেব বললেন, ‘আমি এ কাজ করাতে পারবো, কিন্তু করাব না। তুমি হয়তো শুনে থাকবে, যে সব অধিকৃত শহরে আমাদের কমাণ্ডো বাহিনী ক্রুসেড বাহিনীর ক্ষতি সাধন করেছে, সেখানে নিরীহ মুসলমানদের বস্তিগুলোর কি অবর্ণনীয় দুর্দশা হয়েছে। সে এলাকার মুসলমানদের জীবন জাহান্নামের মতই কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে। ক্রুসেড বাহিনী প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে অনুসন্ধান করেছে। আমাদের পর্দানশীন নারীদের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে। আমাদের যুবতী মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে গেছে ওরা। কিশোর ও যুবকদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। বুড়োদেরকে বন্দী করে নিয়ে গিয়ে ওদের দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রমের কাজ করাচ্ছে।’

    আমি বিষয়টি সুলতান আইয়ুবীকে জানিয়েছিলাম। উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘মুসলমান নাগরিকদের জান ও মালের ক্ষতি হতে পারে এমন ভয় থাকলে সেই শহরে কমাণ্ডো অভিযান চালানো যাবে না। শত্রুদের খাদ্যসামগ্রী তাদের বাহিনীর সাথে আসতে থাকুক। সময়মত সেগুলোর ব্যবস্থা আমি করবো।’

    ‘আমি আরো বিস্তারিত রিপোর্ট আপনাকে দু’চার দিনের মধ্যেই দিচ্ছি।’ চেঙ্গিস বললো, ‘আপনি এখন আরও বেশী সাবধান থাকবেন। এখানকার গোয়েন্দা সংস্থা খুব বেশী তৎপর হয়ে উঠেছে। তারা এখন পশু-পাখীকেও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে।’

    “ঠিক আছে, এ নিয়ে ভেবো না। তুমিও সাবধানে থেকো।’ ইমাম সাহেব বললেন, ‘আগামী কাল ভোরেই আমি কাউকে কায়রো পাঠিয়ে দেবো।’

    রাশেদ চেঙ্গিস মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলো। এবার সে আর চোরের মত লুকিয়ে নয়, প্রকাশ্যেই গলি পথ ধরে হাঁটতে লাগল।

    সে যেই রাস্তার মোড় ঘুরলো, তখন আবারও কারো পায়ের চাপা শব্দ শুনতে পেল। সে পিছন ফিরে তাকালো, অন্ধকার গলিপথে কাউকে দেখতে পেল না। তবে এবারের শব্দটা এত স্পষ্ট ছিল যে, এটা আর অমূলক ধারণা রইল না, কেউ তাকে অনুসরণ করছে, এই সন্দেহ দৃঢ় তার বিশ্বাসে পরিণত হলো। সে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর পিছন ফিরে আবার গলিপথে ঢুকে বেশ কিছু দূর অগ্রসর হলো। কিন্তু না, কাউকেই দেখা গেল না।

    সে আবার ফিরতি পথ ধরলো এবং দ্রুত হেঁটে তার ঠিকানায় পৌঁছে গেল। কামরায় পৌঁছে সে তার কৃত্রিম দাড়ি খুলে পুরাতন কাপড়ের বাণ্ডিলে তা লুকিয়ে রাখলো। তারপর সে তার পোষাক পাল্টাল, যেমন পোষাক সাধারণত খৃস্টানরা পরিধান করে। এখন আর কেউ তাকে সন্দেহ করতে পারবে না।

    ভিক্টর ও চেঙ্গিস চেষ্টা করছিল, ক্রুসেড বাহিনী কোথায় আক্রমণ চালাবে এবং তাদের অভিযানের ধরণ কি হবে তা জানার জন্য।

    ত্রিপলীতে সেনা সমাবেশ বেড়েই চলছিল। গোয়েন্দাদের আনাগোনা এবং ছুটাছুটিও বেড়ে গিয়েছিল। এই দুই গোয়েন্দা চোখ কান খোলা রেখে প্রত্যেকের গতিবিধি জানার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

    সম্রাট রিমাণ্ডেরে দায়িত্ব ছিল মেহমানদের আতিথেয়তা করা। কারণ তার রাজধানীতেই এই সমাবেশ হচ্ছে।

    এক রাতে তিনি সমস্ত খৃষ্টান সম্রাট, উচ্চ সামরিক অফিসার ও অন্যান্য শাসকবৃন্দকে নৈশভোজের দাওয়াত দিলেন। এই রাতটি ছিল চেঙ্গিস ও ভিক্টরের জন্য অসম্ভব ব্যস্ততার রাত।

    সম্রাট রিমান্ড মেহমানদেরকে উত্তম আপ্যায়ন ও দামী মদ পরিবেশনের জন্য হুকুম দিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের ব্যস্ততা বেড়ে গেল। তারা জানতো, এই ব্যস্ততা ও সতর্কতার প্রয়োজন ততক্ষণ, যতক্ষণ মেহমানরা সজ্ঞানে থাকে। মেহমানরা মদের নেশায় বিভোর হয়ে গেলে সেই সতর্কতার আর প্রয়োজন পড়ে না। তখন ভোজসভার কর্মচারীদের জন্য সৃষ্টি হয় সুবর্ণ সুযোগ। এই সুযোগে অনেকেই দু’চার পেগ মদ সরিয়ে রাখে। পছন্দের খাবারটা একটু চেখে দেখে। আর কেউ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে রাজ-রাজরাদের লীলাখেলা ও অসভ্যতা।

    এই ভোজ সভা ছিল নারী-পুরুষের অবাধ মিলনকেন্দ্র। তার মধ্যে যুবতী মেয়েরা যেমন ছিল, তেমনি ছিল যুবতী সাজা বৃদ্ধারাও।

    ভিক্টর ও চেঙ্গিস উভয়েই খাবার ও মদ পরিবেশনের তদারকিতে খুবই ব্যস্ত ছিল। এক যুবতী রাশেদ চেঙ্গিসের কাছ থেকে দু’তিন বার মদ চেয়ে নিল। চেঙ্গিস প্রত্যেকবারই কোন বয়কে ডেকে মদ দিতে বললো।

    মেহমানরা অনেকেই সম্রাট রিমাণ্ডকে ঘিরে বসে বসে গল্প গুজব করছিল। কেউ বসেছিল হলরুমের ভেতর, কেউ বারান্দার খোলামেলা পরিবেশে ছোট ছোট টেবিলে জুটি বেঁধে আলাপ করছিল। কেউ আবার নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়ার আশায় বাগানে নেমে পড়েছিল।

    যে যুবতী বার বার চেঙ্গিসের কাছে মদ চাচ্ছিল, আবারও সে হাত ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। মেয়েটি ছিল খুবই সুন্দরী চেঙ্গিস তার কাছে যেতেই সে বলল, ‘আমি যতবার তোমার কাছে মদ চেয়েছি ততবারই তুমি বয়-বেয়ারা দিয়ে ত পাঠিয়ে দিয়েছে। এক যুবতীকে খুশী করার জন্য তুমি কি নিজের হাতে একবার পরিবেশন ধ্বতে পারো না?”

    ‘জী, কেন নয়। চেঙ্গিস বিনয়ের হাসি হেসে বলল, ’আমি এখুনি এনে দিচ্ছি।’

    ‘উহু, এখানে নয়।’ মেয়েটি মুচকি হেসে বললো, ’আমি বাগানে যাচ্ছি, ওখানে নিয়ে এসো।’

    চেঙ্গিস মদের একটি সুন্দর সুরাহী ও পিয়ালা নিয়ে বাগান চলে গেল। মেয়েটা আগেই ওখানে গিয়ে বসেছিল। রাতে প্রাসাদের আঙ্গিনায় চমৎকার সাজানো গুছানো বাগান সেখানেও মেহমানরা জোড়ায় জোড়ায় বসে গল্প করছি সেই সাথে চলছিল সমানে পানাহার।

    কিন্তু এই মেয়েটি বাগানের এক টেবিলে একাকীই বসেছি এতে চেঙ্গিস একটু বিষ্মিত হলো। কারণ এখানে কেউ একা নেই, সবাই ব্যস্ত আপন আপন সঙ্গীর সাথে। এতসব জুটির মাঝে তাকে বড় বেমানান লাগছিল।

    এমন সুন্দরী ও যুবতী মেয়ের তো একা থাকার কথা নয়। ভাবল চেঙ্গিস, তার চারপাশে তো এতক্ষণে ভ্রমরের ভিড় লেগে যাওয়ার কথা! সে মেয়েটির পিয়ালায় মদ ঢালতে ঢালতে বললো, ‘আপনার আর কিছু লাগবে?’

    ‚না, ধন্যবাদ।’ মেয়েটি সৌজন্য প্রকাশ করে বলল, ‘আমার আর যা লাগবে তা তুমি দিতে রাজি হবে কিনা তাই ভাবছি।’

    আরো অবাক হলো চেঙ্গিস। জিজ্ঞেস করলো, ‘বলুন, কি লাগবে আপনার?’

    ‘দেখতেই পাচ্ছো আমি একা। তোমার সাথে একটু কথা বললে অসুবিধা আছে?’

    বিনয়ের সাথে বললো চেঙ্গিস, ‘না, না। বলুন কি জানতে চান?’

    ‘তোমার দেশ কোথায়?’

    সে ইউরোপের একটি অঞ্চলের নাম বললো।

    ‘এখানে কতদিন আছো?’

    ‘বলতে পারেন শিশুকাল থেকেই। আমার বাবা ছিলেন সম্রাট রিমাণ্ডের রাজ পরিবারের কর্মচারী। এখন আমি তার সামান্য গোলাম।’

    ‘বাহ! তাহলে তো দেখছি, তুমি রাজ পরিবারেরই একজন। অন্তত এ রাজ পরিবারের যত কাহিনী তোমার জানা আছে, অনেকেরই তা নেই।’

    ‘হ্যাঁ, বলতে পারেন এ আমার পরম সৌভাগ্য।’ বিনয়ের সাথে বলল চেঙ্গিস।

    ‘তোমার এ সৌভাগ্যে সামান্য ভাগ বসানোর লোভ হচ্ছে। আমি কি তোমার কাজের ক্ষতি করছি?”

    ‘না, না। আপনাদের সেবা করাই তো আমার কাজ! বলুন, কি বলবেন।’

    ‘তাহলে তুমি আরো কিছুক্ষণ আমাকে সঙ্গ দাও।’ মেয়েটি তার পিয়ালা চেঙ্গিসের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘নাও, তুমিও সামান্য পান করে নাও।’

    ‘না, না। একি বলছেন আপনি! আমি আপনার সামান্য গোলাম মাত্র!’ তার কণ্ঠ থেকে অকৃত্রিম বিস্ময় ও বিনয় ঝরে পড়ল, ‘আপনি আমার মুনীবের মেহমান! একি করে সম্ভব!’

    ‘রাখো তো ওসব কথা! এখানে তোমার সংকোচের কিছু নেই। আমি নিজেই তো তোমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি।’ মেয়েটির কণ্ঠে অন্তরঙ্গতা। সে পাত্রটি বাড়িয়ে ধরে বলল, ‘এই মুহূর্তে কিছুক্ষণের জন্য না হয় তুমি সম্রাট হয়ে যাও, আর আমাকে তোমার দাসী মনে করো।’ মেয়েটি তার হাত ধরে তৃষ্ণার্ত হাসি হেসে বলল, ‘আমার চোখে তুমি এখন পরদেশী এক শাহজাদা! আর আমি এখানকার শাহজাদী! কই, নাও! ধরো তো এটা! আমার মেহমানকে আমি কিছু খেতে দেবো না!’

    চেঙ্গিস বিব্ৰত কণ্ঠে প্রশ্ন করলো, ‘আপনি এখানে একা কেন? আপনার সঙ্গী কোথায়?’

    ‘আমার সঙ্গী আমার পাশেই আছে।’ মেয়েটি রহস্যময় কণ্ঠে বলল, ‘আমার মন যারে চায় তাকেই তো সঙ্গী করা উচিত, কি বলো? যাদের আমি ঘৃণা করি তাদের সাথে কেমন করে হেসে খেলে বেড়াই।’ মেয়েটি উত্তর দিল। ‘আমার যাকে ভাল লাগছে, আমি তাকেই পাশে ডেকে নিয়েছি। তুমি তো আমার হাত থেকে পিয়ালা গ্রহণ করলে না?’

    ‘যদি কেউ দেখতে পায়, তবে আমাকে শুলে চড়াবে।’ চেঙ্গিস ভয়ার্ত ধরে বললো।

    ‘কিন্তু যদি তুমি আমার নিবেদন প্রত্যাখ্যান করো, তবে আমিই তোমাকে শুলে চড়াবো।’ মেয়েটি হেসে বললো, ‘পাগল! তোমাকে আমার ভাল লেগেছে বলেই না তোমাকে এখানে ডেকে এনেছি।’

    মেয়েটি উঠে দাঁড়ালো এবং তার কাঁধে হাত রেখে কানে কানে বললো, ‘তুমি আমাকে নিরাশ করো না যুবক।’ তখনও তার ঠোঁটের কোণে লেগেছিল ভূবন মোহিনী হাসি।

    “কিন্তু আমি তো এখন মদ পান করতে পারবো না। এখন যে আমি ডিউটিতে আছি!’ চেঙ্গিস আড়ষ্ট কণ্ঠে বললো।

    ‘আচ্ছা, নাই বা করলে মদ পান।’ মেয়েটি তার কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললো, ‘কিন্তু আমি যখন ও যেখানেই ডাকি, সেখানে তোমাকে হাজির হতে হবে।’

    রাশেদ চেঙ্গিস এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। সে ধারণা করলো, এই মেয়ে কোন বৃদ্ধ জেনারেলের স্ত্রী হতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, তার স্বামী অন্য কোন নারী নিয়ে মেতে আছে। তারই প্রতিশোধ নেয়ার জন্য এ মেয়ে তাকে বাছাই করেছে।

    সে ছিল এক বিচক্ষণ গোয়েন্দা। তাই মেয়েটির আচরণে সে সামান্য বিচলিতও হলো না। এমন সুন্দরী ও অভিজাত যুবতী তার বন্ধুত্বের আকাংখা করেছে, এটা তার কাছে কোন নতুন ঘটনা নয়। চেঙ্গিস এতটাই সুদর্শন ও আর্ষণীয় দেহ সৌষ্ঠবের অধিকারী যে, এর আগেও তাঁকে এমন ব্রিতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে।

    খৃস্টান সম্রাট ও অফিসারদের মাহফিলগুলো সুন্দরী ও আকর্ষণীয় মেয়েরাই সরগরম করে রাখে। এর আগেও একাধিক মেয়ে চেঙ্গিসের সাথে সম্পর্ক করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু চেঙ্গিস তার কর্তব্যের খাতিরে তাদের এড়িয়ে গেছে। সুলতান আইয়ুবী তাকে যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন, সে দায়িত্ব পালনে কোন ক্রটি ঘটতে পারে এমন কোন কিছুর সাথে সে নিজেকে জড়াতে চায় না।

    আলী বিন সুফিয়ান তাকে ট্রেনিং দেয়ার সময় তার মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন এই চিন্তা, নিজের কর্তব্যকেই সব সময় প্রাধান্য দেবে। কখনো এমন কিছুর সাথে নিজেকে জড়াবে না, যাতে দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। মেয়ে মানুষের কাছ থেকে সাবধান থাকবে। কখনো আপন বিবি ছাড়া অন্য কারো দিকে নজর দেবে না। মনে রাখবে, দুশমন তোমাদের ঘায়েল করার জন্য যেটি সবচেয়ে বেশী ব্যবহার করবে তার নাম মেয়ে। যারা অন্য নারীর প্রেমে পড়ে যায় বা নেশা ও বিলাসিতায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে; আপন দায়িত্ববোধের কথা তাদের স্মরণ থাকে না। তারা ধীরে ধীরে দায়িত্বহীন হয়ে যায়। তার মন-মগজে মদ ও নারীর মোহ এমন বিষের ন্যায় কাজ করে যে, সে ধীরে ধীরে তার ঈমানও হারিয়ে ফেলে। অতএব নেশা ও নারী থেকে সব সময় দূরে থাকবে।’

    সম্রাট রিমাণ্ডের রাজপ্রাসাদে এসে সে দেখেছে, রাজার খেয়াল কাকে বলে। এখানে সম্রাট যখন যাকে ইচ্ছা চাকরী প্রদান করে এবং যাকে ইচ্ছা চাকরী থেকে বরখাস্ত করে। রাজার ক্ষমতা ও ব্যক্তিত্ব যাদুর মত। এখানে এমন কেউ নেই, যে তাকে প্রশ্ন করতে পারে।

    এখানে এসে সে আর যে জিনিসটি দেখে অবাক হয়েছে, তাহলো খৃস্টানদের চরিত্র। এদের কাছে চরিত্র বলে কিছু নেই। নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনাকে তারা গর্বের বিষয় বলে মনে করে। তাই এখানকার মেয়েরা এমন খোলামেলা প্রেম নিবেদন করলেও সে আর অবাক হয় না।

    একজন গোয়েন্দা হিসাবে সে তখন চিন্তা করছিল, মেয়েটির কাছ থেকে তার কিছু পাওয়ার আছে কিনা। সে চিন্তা করে দেখল, এই মেয়েকে ব্যবহার করে সে এমন কিছু তথ্য পেতে পারে, যা অন্যভাবে পাওয়ার উপায় নেই। মেয়েটি যখন তাকে বলছিল, আমি যখন ও যেখানেই ডাকি সেখানে তোমাকে হাজির হতে হবে’ তার এ বক্তব্যে ধমক বা আদেশের সুর ছিল না বরং ছিল আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বের আবেদন। চেঙ্গিস এটা ভাল করে বুঝেছিল বলেই সেও মেয়েটির হাসির উত্তরে হাসি মুখেই সে প্রস্তাব কবুল করে নিয়েছিল। হাসির বিনিময়ে হাসি দিয়েই সে তার শিকারকে ফাঁদে ফেলতে চেষ্টা করেছিল।

    ‘এখন আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিন।’ চেঙ্গিস বললো, ‘আপনি বরং মেহমানদের কাছে চলে যান।’

    ‘অনুমতি দেবো, তার আগে বলো, তুমি ঠিক ঠিক আসবে তো?’

    ‘আসবো। সময় পেলেই আমি আপনার ডাকে সাড়া দেবো, কথা দিলাম।’ চেঙ্গিস বললো, ‘কিন্তু আমি তো আপনার ঠিকানা জানি না। আপনি কার স্ত্রী?’

    ‘স্ত্রী নই, আশ্রিতা!’ মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক সেনা অফিসারের নাম উল্লেখ করে বললো, ‘হতভাগার কাছে অঢেল , ধন-সম্পদ আছে। আর এই সম্পদের জোরে যে, আমার মত মেয়েদের কিনে নিয়ে তার হেরেমের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে। আমি একা নই, আরো বেশ কিছু মেয়ে আছে তার, যাদের সাথে সে দাসী-বাদীর মত ব্যবহার করে। কিন্তু কে যে তার মনের মানুষ তা আমরা কেউ জানি না।’

    ‘এত লোভ না করে ওখান থেকে চলে এলেই পারেন!’

    ‘না, তা আমরা পারি না। সে আমাকে মুক্তি দিতে নারাজ। বলে, তোমার কোন সাধ-আহলাদ আমি অপূর্ণ রাখবো না। তাহলে কেন আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? সেই গর্দভ সম্পদের দম্ভটুকুই চেনে, নারীর মন চেনার সময় কোথায় তার!

    যখন বুঝেছি এ লোকের হৃদয়ে দয়া, মায়া, প্রেম বলতে কিছু নেই তখন থেকেই তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করেছি। সেই ঘৃণা এখন আমার মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে আছে। এই চাপ সহ্য করা আমার পক্ষে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। কিন্ত যখন তোমাকে দেখলাম, কেন জানি না, তোমাকে আমার ভাল লেগে গেল। বিশ্বাস করো, তুমি আমার কাছে প্রথম পুরুষ, যাকে আমি অন্তর দিয়ে বেছে নিয়েছি। আমি তোমার কাছ থেকে শারিরীক বা দৈহিক কোন তৃপ্তির পিয়া নই। পিপাসা আমার অন্তরের, পিপাসা আমার ভালবাসার। তোমাকে দেখে চোখের পানিতে আমি সে পিপাসা নিবাবণ করতে পারবো। দোহাই লাগে, তুমি আমার দৃষ্টির আড়ালে যেও না। আমাকে পাষাণপুরীতে ফেলে রেখে দূরে কোথাও পালিয়ে যেও না। যদি এমন করো তবে আমার ওপর জুলুম করা হবে। আমি সব সইতে পারবো, কিন্তু এ অত্যাচার সইতে পারবো না। এখন যাও, তোমার অনেক সময় আমি নিয়ে ফেলেছি, আর নয়। কাল রাতে আমি নিজেই তোমাকে খুঁজে নেবো, কষ্ট করে তোমাকে আমার কাছে যেতে হবে না।’

    যে সময় রাশেদ চেঙ্গিস বাগানে মেয়েটির সাথে কথা বলছি, ভিক্টর তখন মেহমানদের মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল। সে মেহমানদের আপ্যায়ন করছিল ঠিকই কিন্তু তার কান পড়েছিল ক্রুসেড লিডারদের আলোচনায়। তারা আলোচনা করছিল, কোন দিকে অভিযান চালালে সুবিধা হবে। কোথায় আক্রমণ করলে আইয়ুবী সহজে ধরাশায়ী হবে, এইসব।

    এসব আলোচনা থেকে সে তার প্রয়োজনীয় কথা মনে মনে টুকে নিচ্ছিল। কিন্তু তখনও আলোচনা ও পরামর্শ চলছে। সেদিকে কান পেতে দ্রুত হাতে কাজ করছে ভিক্টর।

    রাশেদ চেঙ্গিস মেয়েটির কাছ থেকে ছুটি পেয়ে মেহমানদের মধ্যে এসে পড়লো। ঘুরতে ঘুরতে সে সম্রাট রিনাল্টের পাশে চলে এলো। রিনাল্ট তখন তার সাথীদের বলছে, তোমরা কোন চিন্তা করো না। এবার আমি এত বেশী সামরিক শক্তি নিয়ে এসেছি, আমার তো মনে হয়, আমি একাই আইয়ুবীকে ধরাশায়ী করে ফেলতে পারবো। ভাবতে পারো, আমার সাথে আছে আড়াইশো নাইট। যাদের প্রত্যেকের আণ্ডারে আছে আলাদা বাহিনী। এক নাইটকে পরাজিত করলে আরেক নাইট এগিয়ে যাবে তার বাহিনী নিয়ে। আইয়ুবী একা কয়টা বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করতে পারবে?’

    এভাবে রিনাল্ট শক্তির বড়াই করছিল আর বড় ধরনের সফলতা ছিনিয়ে এনে দেবে বলে দাবী করছিল সঙ্গীদের কাছে।

  • ধাপ্পাবাজ

    ধাপ্পাবাজ

    ধাপ্পাবাজ

    রমলা থেকে কায়রো, অনেক দূরের পথ। যাত্রাপথও অনেক কঠিন ও কষ্টকর। পাথুরে পার্বত্য এলাকা, ধূসর বালির বিবর্ণ প্রান্তর, মাটির অসংখ্য উঁচু-নিচু ঢিবি এসব পার হয়ে যেতে হয় কায়রো। পার হতে হয় সুদীর্ঘ বিশাল উন্মুক্ত মরুভূমি।

    এই পথে অনেক বিপদ ও ভয় হঠাৎ করেই নেমে আসে যাত্রীদের জীবনে। কখনো ভয়ংকর মরু ডাকাত তাদের পথ আগলে দাঁড়ায়। কখনো অচেনা যাত্রী এসে রক্ত ও জীবন চুষে নেয়।

    সুলতান আউয়ুবীর পরাজিত সৈন্যরা এই কঠিন পথ ধরেই যুদ্ধের ময়দান থেকে মিশরে যাত্রা করল। তারা সেই দীর্ঘ ও ভয়ংকর রাস্তা পাড়ি দিচ্ছিল, যেখানে যে কোন সময় অজানা বিপদ এসে বিপন্ন করতে পারে তাদের জীবন।

    পুরো বাহিনী একসাথ হয়ে আসবে, তেমন সময় ও সুযোগ তাদের ছিল না। তাই ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বিচ্ছিন্নভাবে পথ চলছিল ওরা।

    তাদের ফিরে আসার দৃশ্য ছিল খুবই করুণ ও ভয়ংকর। ওদের অনেকেরই মরুভূমিতে পথ চলার অভ্যাস এবং অভিজ্ঞতা ছিল না। মরুভূমির বালিতে একবার পা ডেবে গেলে সে পা আর তুলতে পারতো না এসব অনাড়ি পথিক। যুদ্ধ নয়, এই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে গিয়েই অনেকে লাশ হয়ে পড়ে রইল মরুভূমিতে। কেউ হল মরুভূমির শিয়াল ও নেকড়ে বাঘের শিকার। তাদের দেহের হাড্ডি টেনে ছিঁড়ে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছিল হায়েনার দল।

    যারা কাফেলা বেঁধে পথ চলার সুযোগ করে নিতে পারল, তারা এসব পরিণাম থেকে কিছুটা রেহাই পেল। আর যারা উট, ঘোড়া বা খচ্চরের উপর চড়ে রওনা করার সুযোগ পেল, তারা এই কষ্ট ও যাতনা থেকে কিছুটা রেহাই পেল। উত্তপ্ত বালির ওপর দিয়ে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দেয়ার শ্রম তাতে কিছুটা লাঘব হলো ওদের।

    এমনি ছোট্ট কাফেলা রমলা থেকে কায়রো ফিরছিল মরুভূমির পথ ধরে। কাফেলার সবই ছিল আইয়ুবীর পরাজিত সৈন্য। তাদের কেউ ছিল ঘোরার পিঠে, কেউ উটের পিঠে। রাস্তায় তাদের আরও দু’একজন করে যাত্রী জুটতে লাগল। এক সময় এই ছোট্ট দলটি ত্রিশ-চল্লিশ জনের এক কাফেলায় পরিণত হয়ে গেল।

    তারা এক ভয়ংকর মরু অঞ্চল পার হচ্ছিল। আজ এই কঠিন মরু অঞ্চলকে সিনাই মুরুভূমি বলা হয়। তারা সবাই এক সাথে থাকার কারণে তখনো তাদের মনোবল ছিল অটুট। কিন্তু মরুভূমির এই সুদূর বিস্তৃত দিগন্তব্যাপী চরাচরে পানির কোন চিহ্নই দেখতে পাচ্ছিল না কেউ।

    যুদ্ধের ময়দান থেকে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছে, এটাই ছিল তাদের বড় শান্তনা। কিন্তু এর চেয়ে বড় বিপদ যে তাদের সামনে আসতে পারে এ কথা কেউ চিন্তাও করেনি।

    পরাজিত সৈন্যরা পা টেনে টেনে কদম ফেলছিল আর কাফেলার সাথে তাল মিলিয়ে কোন মতে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাদের কারো অবস্থাই এমন ছিল না যে, একে অন্যকে সাহায্য করে। তবে কেউ মরে গেলে তাকে বালির নিচে দাফন করার মত অবস্থা তখনো তাদের ছিল।

    আরোহীরা চলতে চলতে এমন এক এলাকায় পৌঁছে গেল, যেখানে মাটির উঁচুনিচু টিলা এবং মস্ত বড় বড় স্তম্ভ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ একজন দূরে একটি টিলার আড়ালে এক লোকের মাথা ও কাঁধ দেখতে পেলো। কিন্তু সে কেবল মুহূর্তের জন্য। চকিতে তা আবার অদৃশ্য হয়ে গেল।

    লোকটি তার সঙ্গীকে বললো, ‘ওই টিলায় আমি একজনকে এই মাত্র দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমরা ওখানে গিয়ে থেমে যাবো? ওখানে পানি না পাওয়া যাক, একটু ছায়া তো পাওয়া যাবে।”

    কাফেলার যাত্রীদের অধিকাংশই ছিল পিপাসায় কাতর। তাদের গলা শুকিয়ে খরকরে হয়ে গিয়েছিল। মুখ দিয়ে কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছিল। মুখে পানি না থাকলেও জিভ নাড়ানো যে কষ্টের, এ কথা কেউ এতদিন ভেবেও দেখেনি। আজ বুঝলো তার মর্ম।

    প্রথম দিকে কাফেলার একজন আরেকজনের সাথে হেসে কথা বলেছিল। যুদ্ধের কথা, বাড়ীর কথা অনেক কিছুই তারা আলাপ করেছে। কিন্তু যতই এগিয়ে গেছে, ততই তাদের কথার বহর কমে এসেছে। কমতে কমতে এক সময় কথা বলা একদম বন্ধ হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে কি, এখন আর কারো মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না।

    তাদের পশুগুলোর অবস্থাও একই রকম। যদিও কোন পশু বা যাত্রী এখনও পিপাসায় মারা যায়নি, কিন্তু যে কোন সময় প্রাণ-বায়ু উড়ে যেতে পারে, এ অবস্থা অনেকেরই। মাত্র এক মাইল দূরের টিলা যেন শত মাইল দূরে মনে হচ্ছে।

    কাফেলা চলতে চলতে সেখানে পৌঁছে গেল। দু’টি টিলা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। কাফেলাটি দুই টিলার মাঝে গিয়ে টিলার ছায়ায় দাঁড়িয়ে পড়লো।

    একটু জিরিয়ে নেয়ার জন্য সকলেই সেখানে পশুগুলোর পিঠ থেকে নেমে এলো। পশুগুলোকে ছায়ায় ছেড়ে দিয়ে নিজেরাও বসে পড়লো টিলার ছায়াতে।

    ছায়ায় বসেও স্বস্তি পাচ্ছীল না কেউ। আগুনের মত গরম বাতাস বইছে। সেই বাতাস আঘাত হানছে যাত্রীদের চোখে-মুখে। তপ্ত বাতাসে ছ্যাকা খাওয়ার পর সেই যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে।

    তখনো ওরা সেখানেই বসে আছে, এমন সময় ওরা দেখতে পেল, টিলার অন্য পাশ থেকে এক লোক তাদের দিকেও এগিয়ে আসছে। লোকটি আড়াল থেকে তাদের সামনে পৌঁছেই মূর্তির মত দাঁড়িয়ে গেল।

    লোকটির মাথা থেকে পা পর্যন্ত সাদা কাপড়ে ঢাকা। গায়ে ছিল সফেদ লম্বা জোব্বা। জোব্বাটি কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত ছুলে আছে। লোকটির দাড়ি কালো এবং খাঁটো। সে দাড়ি পরিপাটি করে আঁচড়ানো।

    লোকটির হাতে একটি লাঠি। এমন লাঠি সাধারণত: পণ্ডিত ও জ্ঞাণী লোকেরাই ব্যবহার করে। মসজিদে খতিবও মিম্বরে দাঁড়ানোর সময় এমন লাঠিতে ভর করে দাঁড়ান।

    লোকটি নীরবে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। লোকটিকে দেখে কাফেলার লোকজন বেশ অবাক হলো এবং লোকটি কি করে বা বলে দেখার জন্য নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চেহারায় কোন কষ্ট বা মালিন্যের ছাপ ছিল না।

    কাফেলার কেউ একজন আস্তে করে বলল, ‘হযরত খিজির (আ:) হবেন হয়তো।’

    ‘না ইনি এই পৃথিবীর মানুষ নন!’ পাশের লোকটি প্রতিবাদ করে বলল।

    এই বিরাণ মরুভূমিতে লোকটি এমনভাবে চলা ফেরা করছিল, মনে হচ্ছিল, মরুভূমি নয়, লোকটি বিকেলের মিঠে রোদে বাগানে পায়চারী করছে। লোকটির এমন উদ্বেগহীন আচরণে কাফেলার লোকদের মনে কেমন এক ধরণের ভয় এসে জমা হতে লাগলো।

    এমনিতেই দুর্গম পথের আতঙ্ক ও ভীতি লেগেছিল তাদের চোখে, সেখানে এসে ঠাঁই নিল নতুন এক অজানা ভয়ের শিহরণ। আর সে ভয় এমনই তীব্র ছিল যে, এই রহস্যময় লোকটির পরিচয় জিজ্ঞেস করার সাহসও হলো না কারো। লোকটি কে, এই বিজন ও নিষ্ঠুর প্রান্তরে তিনি কি করছেন, কেউ এ কথাটিও জিজ্ঞেস করলো না।

    পোড়া মরুভূমির কঠিন উত্তাপ অগ্রাহ্য করে কি করে এমন উজ্জ্বল ও প্রশান্ত চেহারা নিয়ে তিনি তাদের সামনে হাজির হলেন, প্রত্যেকের মনেই এ প্রশ্ন তখন তোলপাড় করছে। লোকটির ধোপদুরস্ত পরিষ্কার পোষাক তাদের ভীতি আরো বড়িয়ে দিল। লোকগুলো হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল লোকটির দিকে।

    এ লোক যদি কোন সৈনিক হতো, তবে এই কাফেলার কেউ হয়তো তাকে দেখে ভয় পেতো না। কিন্তু এ লোক সৈনিক নয়, কোন মরু ডাকাতও নয়, খুবই শরীফ ও ভদ্রগোছের কেউ। কোন শাহী দরবারের সম্মানিত ওমরা বা সুফী দরবেশ কেউ হবেন, যাকে দেখলেই মনে শ্রদ্ধা ও ভক্তি জন্ম নেয়। তাহলে কে তিনি? এখানে তিনি কি করছেন? তিনি মানুষ, নাকি মানুষের বেশে কোন ভুত-প্রেত?

    কাফেলার লোকগুলো তখনো অনিমেষ নয়নে তাকিয়ে আছে লোকটির দিকে, তখনি ঘটলো দ্বিতীয় বিস্ময়কর ঘটনাটি। টিলার অন্য পাশ থেকে এক যুবতী এসে দাঁড়ালো লোকটির পাশ ঘেঁষে। এই দেখে লোকগুলো যখন বাকহারা এবং স্তম্ভিত তখন তৃতীয় চমক হয়ে লোকটির পাশে এসে দাঁড়ালো আরো একটি মেয়ে। এতটুকু দেখেই লোকগুলো ভয় ও আতঙ্কে একেবারে দিশেহারা হয়ে গেল।

    মেয়ে দুটিই আপাদমস্তক বোরকা পরিহিতা। তাদের মুখে নেকাব আছে, তবে তা হালকা জালের মত পাতলা কাপড়ের। সে জন্য তাদের ফর্সা চেহারা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল যাত্রীরা।

    বোরখার কারণে মেয়েদের শরীরের আর কোন অংশ দেখা না গেলেও, যেটুকু দেখতে পাচ্ছিল তাতেই লোকজন স্বীকার করতে বাধ্য হলো, মেয়ে দু’টি অসামান্য রূপসী।

    লোকটি এমন একটা ভাব করলো, যেন সে এক শাহানশাহ, সম্রাট। তার হাঁটার ভঙ্গিতে গাম্ভীর্য ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পাচ্ছিল। কয়েক কদম এগিয়ে লোকটি কাফেলার লোকগুলোর একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। দুই পর্দানসীন মহিলাও তাকে অনুসরণ করে এগিয়ে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে গেলো।

    লোকটির সম্মানে কাফেলার এক লোক উঠে দাঁড়ালো। তার দেখা দেখি অন্যরাও উঠে দাঁড়িয়ে গেলো। তাদের এ সম্মানের সাথে জড়িয়ে ছিল ভয় ও আতঙ্ক।

    লোকটি তাদের সামনে বসে পড়ল। মেয়েরাও বসলো তার পাশে। জালের মধ্য থেকে মেয়ে দু’টির পটলচেরা মায়াবী চোখগুলো জ্বলজ্বল করে জ্বলছিল। ওরা পলকহীন চোখে তাকিয়েছিল কাফেলার লোকগুলোর দিকে।

    সেই অতিমানবীয় লোকটি হাত ইশারায় সবাইকে বসতে বলল। লোকজন বসলে সে লোক কথা শুরু করল, ‘আমিও সেখান থেকেই এসেছি, যেখান থেকে তোমরা এসেছো।’ কালো দাড়িওয়ালা লোকটি বলল, ‘পার্থক্য শুধু এই, তোমরা ফিরে যাচ্ছো নিজের বাড়ীতে আর আমি আমার বাড়ী ছেড়ে চলে এসেছি।’ লোকটির কণ্ঠ থেকে ঝড়ে পড়ল বিষন্ন উদাসীনতা।

    ‘আমরা কেমন করে বিশ্বাস করবো, আপনি আমাদের মতই এক সাধারণম মানুষ?’ এক সৈনিক বললো, ‘আমরা তো আপনাকে অভিজাত ও খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেউ মনে করছি।’

    ‘না, এখন আমি তোমাদেরই মতই এক সাধারণ মানুষ! আর এ মেয়ে দু’টি আমার কন্যা।’ দরবেশ ব্যক্তিটি উত্তরে বলল, ‘আমিও তোমাদের মত রমলা থেকে পালিয়ে এসেছি। যদি আমার মুরশিদ আমার উপর দয়া না করতেন তবে খৃষ্টানরা আমাকে খুন করে ফেলতো আর আমার এই দুই কন্যাকে ধরে নিয়ে যেতো। এটা আমার মুরশিদেরই কৃতিত্ব যে, তিনি আমাদের হেফাজত ও নিরাপত্তা দিয়ে ধন্য করেছেন। আমি রমলার বাসিন্দা। শিশুকাল থেকেই ধর্ম শিক্ষার প্রতি আমার গভীর আগ্রহ ছিল। ওস্তাদের কাছ থেকে আমি অনেক এলেম হাসিলও করেছি।’

    কথা বলছে লোকটি, তন্ময় হয়ে শুনছে কাফেলার যাত্রীরা। লোকটি বলে চলেছে, ‘শিক্ষা জীবন শেষ করার পর ওস্তাদের পরামর্শে আমি মসজিদে ইমামতি শুরু করি। আল্লাহই তার রাসূল ও দ্বীনের অনুসারীদের প্রতিপালন করেন। এক রাতে আমি স্বপ্নে হুকুম পেলাম, ‘বাগদাদ চলে যাও, আর সেখানে বাগদাদের শাহী মসজিদের ইমাম সাহেবের শাগরেদ হয়ে বসবাস করতে থাকো।

    আমি পায়ে হেঁটেই বাগদাদ রওনা দিলাম। আমার কাছে টাকা পয়সা তেমন কিছু ছিল না। আমার মা বাবা ছিল খুবই দরিদ্র। ছোট একটা মশকও আমার ভাগ্যে জোটেনি যে, রাস্তায় পানি পান করবো। বিদ্যার নেশা আমাকে ঘর থেকে বের করে দিল। সবাই বললো, এ ছেলে রাস্তাতেই মারা যাবে। আমার মা অনেক কাঁদলেন, বাবাও কাঁদলেন। কিন্তু আমি বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাত্রা করলাম।

    দিনের বেলায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় আমার জান বের হয়ে যেত। সন্ধ্যার পরে আমি এই আশা নিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়তাম, যেন এভাবেই আমার মৃত্যু হয়। কিন্তু ঘুম থেকে জেগে দেখতাম, আমার পাশে এক পিয়ালা পানি ও কিছু খাবার রাখা।

    প্রথম প্রথম আমি ভয় পেতাম ও এগুলো কোন জ্বীন-পরীর কাজ মনে করতাম। কিন্তু রাতে স্বপ্নে আমাকে জানানো হলো, এসব কোন এক মুরশিদের কেরামতি। কিন্তু আমি জানতাম না, সে মুরশিদ কে ও কোথায় থাকে। আমি খেয়ে পিয়ে আবার গভীর নিদ্রায় শুয়ে পড়তাম। সকালে উঠে দেখতাম, সেখানে পিয়ালা পানি কিছুই নেই, রুটিও না।

    বাগদাদ পর্যন্ত পৌঁছতে দুইবার নতুন চাঁদের উদয় হলো। সে এক দীর্ঘ এবং কষ্টকর যাত্রা। প্রতি রাতেই আমি পানির পিয়ালা ও খাবার প্যাকেট পেতাম। বাগদাদ শাহী জামে মসজিদের ইমাম আমাকে দেখে আমার পরিচয় না নিয়েই বলতে লাগলেন, ‘আমি কত দিন ধরে তোমার অপেক্ষায় আছি।’

    তিনি আমাকে তার হুজরার মধ্যে নিয়ে গেলেন। আমি সেখানে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। দেখলাম, প্রতি রাতে যে থলে ও পিয়ালায় করে আমাকে খাবার ও পানি দেয়া হতো সেই থলে ও পিয়ালা সেখানে রাখা। খতিব সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার খাবার ঠিকমত পৌঁছতো তো?’

    আমি উত্তরে বললাম, ‘জি হ্যাঁ।’

    কিন্তু আমি এই ভেবে অবাক হলাম, প্রতি রাতে এই থলে ও পিয়ালা কে আমার কাছে বহন করে নিয়ে যেত? আর কেইবা সেগুলো এখানে ফিরিয়ে আনতো?

    তিনি বললেন, ‘আল্লাহ যখন হযরত মুসা (আ:) কে সাহায্য করতে চাইলেন, তখন তিনি নীল দরিয়াকে আদেশ করলেন, ‘রাস্তা দিয়ে দাও।’ নদীর উজানের পানি উজানে ও ভাটির পানি ভাটিতে দাঁড়িয়ে গেল আর মাঝখান দিয়ে মোটা রাস্তা অতিক্রম করে হযরত মুসা (আ:) তাঁর দলবলসহ নদী পার হয়ে গেলেন। কিন্তু ফেরাউন যখন তার অনুসরণ করে সেই রাস্তায় প্রবেশ করলো তখন দু’দিকের পানি আবার এক হয়ে গেল। নদী আবার পূর্বের মত প্রবল বেগে প্রবাহিত হতে লাগল। ফেরাউন নদীতে ডুবে মারা গেল।’

    লোকটি বলতে লাগলো, ‘সম্মানিত খতিব বললেন, আমি সেই মহান মালিকের অধীন, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি আমার কাজ শেষ হয়ে গেলে আবার তার কাছে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেবেন। তার যে বান্দা তার প্রেমে মাতোয়ারা থাকে এবং তার জ্ঞান হাসিলের জন্য পাগলপারা হয়ে যায়, যেমন তুমি হয়েছ, তাকে তিনি মরতে দেন না। কঠিন মরুভূমিতে তার খাবার ও পিপাসার পানি তিনিই সরবরাহ করেন। উত্তাল জোয়ারের সময় নদীতে পরড়ে গেলেও তিনিই তাকে রক্ষা করেন।

    করুণার আধার আমার সেই মালিক আমাকে হুকুম করলেন, ‘এক বান্দাকে আমি তোর কাছে আসতে বলেছি।’ তিনি আমাকে তোমার ছবি দেখিয়ে বললেন, ‘এই ছেলে এরই মধ্যে তোর কাছে রওনা হয়ে গেছে। হে খতিব, তোর ভেতরে যে জ্ঞান ও ইলম রয়েছে সেই জ্ঞান ঐ ছেলেটার অন্তরে দিয়ে দিবি। আর আমি তোর খেদমতের জন্য যে জ্বীনদের নিযুক্ত করে রেখেছি, তাদের বলবি, তারা যেন ছেলেটাকে নিয়মিত রোজ রাতে খাবার ও পানি পাঠাতে থাকে।

    আমি মহান আল্লাহর আদেশ পালন করেছি মাত্র। প্রতি রাতে এখান থেকে তোমার জন্য খাবার ও পানি পাঠানো হতো। আর সে খাবার যথাসময়ে পৌঁছে যেতো তোমার কাছে। ওহে বালক, অবাক হয়ো না, অধীর হয়ো না। খুব কম লোকের ভাগ্যেই এ বিদ্যার আলো জোটে। এই নূরে আলোকিত হয় অন্তর। তুমি বড় ভাগ্যবান। যে আলো আমার মাঝে আছে সে আলো তুমি পাবে। তবে তোমাকে সৎ হতে হবে, আর মনে আল্লাহকে খুশী করার ইচ্ছা থাকতে হবে। তখন জ্বীন ও মানুষ তোমার তাবেদার হয়ে যাবে।’

    ‘জ্বীনেরা কি আপনার গোলাম?’ এক সিপাই প্রশ্ন করলো।

    ‘না, তা নয়।’ লোকটি উত্তর দিল, ‘আমরা সবাই আল্লাহর গোলাম। জ্বীন ও ইনসান কেউ কাউকে গোলাম বানাতে পারে না। আমরা সবাই তাঁরই গোলামী করি, যাঁর কাছে উঁচু-নিচু, ধনী-গরীবের পার্থক্য নেই। ঈমানের দৃঢ়তা ও দুর্বলতা দ্বারাই মানুষ বড়-ছোট হয়।’

    লোকটির কথায় এমন প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি ছিল যে, সকলের মনই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেল। তারা মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনতে লাগলো।

    লোকটি বলতে লাগলো, ‘বাগদাদের খতিব আমার আত্মাকে জ্ঞান দ্বারা আলোকিত করে দিলেন। তিনি আমার বিয়েও দিয়ে দিলেন। সেখানেই আমার এ দু’টি মেয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। আমি অনেক সাধনা করে আল্লাহর মহিমার কয়েকটি গোপন রহস্য পেয়েছি।

    এক রাতে আমার উস্তাদ খতিব সাহেব আমাকে বললেন, ‘এখন তুমি এখান থেকে চলে যাও। গিয়ে সেই সব আল্লাহর বান্দার খেদমত করো, যারা আল্লাহর বান্দা হয়ে তার খেদমত করতে চায়।’

    তিনি আমাকে আমার দেশ রমলা যাওয়ার আদেশ দিলেন। দু’টি উট দান করলেন, যেন আমার সফর আরামদায়ক হয়। পথে খরচ দান করলেন আর বললেন, ‘দেখো, জীবনে আর কোন পাপ ও অন্যায়ের চিন্তাও করবে না। রমলা যখন পৌঁছবে, তখন এক রাতে তুমি তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই উঠে একদিকে যাত্রা শুরু করবে। হয়তো তোমাকে বেশী দূর যেতে হবে না। কিন্তু যেখানে তোমার পা নিজে নিজেই থেমে যাবে সে স্থানটি এক পবিত্র স্থান। তুমি সে স্থানেই তোমার আস্তানা বানিয়ে নেবে।

    কিন্তু খুব শীঘ্রই ভবিষ্যতের অন্ধকার ঢাকা এক সময় তোমার সামনে হাজির হবে। তখন তোমার পাপ ও অন্যের পাপের শাস্তিও তোমাকে ভোগ করতে হবে। অবস্থা তখন এতটাই নাজুক হয়ে যেতে পারে যে, তোমাকে সেখান থেকে হিজরত করতে হবে।’

    আমি যখন আমার স্ত্রী ও এই দুই মেয়েকে নিয়ে পথে বের হলাম, তখন সূর্যের তেজ ও প্রখরতা আমার এ ছোট্ট পরিবারের জন্য ঠাণ্ডা ও শীতল হয়ে ধরা দিল। আমরা আল্লাহর মর্জি সে স্থানেও পানি পেলাম, যেখানে বালির কণা ছাড়া এক ফোটা পানিও ছিল না।

    আমি রমলা পৌঁছে দেখলাম, ততদিনে আমার মাতাপিতা মারা গেছেন। আমার স্ত্রী সেই বিরান বাড়ীকে আবার আবাদ করে তুললো। আমি জ্ঞান সাধনার সাগরে ডুবে রইলাম। আমার মেয়ে দু’টি আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো।

    একদিন আল্লাহতায়ালা তাদের মাকেও তাঁর কাছে ডেকে নিলেন। তখন মেয়েরাই আমার দেখাশোনা ও বাড়ীর কাজ করতে লাগলো। পরে এক রাতে আমি গভীর ঘুম থেকে কারো ডাকে জেগে উঠলাম। কিন্তু কে আমাকে ডেকে তুলল বুঝতে পারলাম না।

    আমি উঠে একেবারে দাঁড়িয়ে গেলাম। বাগদাদ জামে মসজিদের খতিবের অনেক পুরানো কথা আমার মনে পড়ে গেল, ‘তুমি সহসাই জেগে উঠবে ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও যাত্রা করবে।’

    ঠিক তাই হলো। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি বাড়ী থেকে বের হয়ে এলাম এবং একদিকে হাঁটা ধরলাম।

    হাঁটতে হাঁটতে আমি আমার গ্রাম ও লোকালয় ছেড়ে এলাম। আমি থামতে চাচ্ছিলাম কিন্তু আমার পা আমাকে সামনের দিকে টেনে নিয়ে চললো। আমি চলতেই লাগলাম।

    জানি না তোমরা সে স্থানটি দেখেছো কি না। সেখানে গভীর খাদ ছিল এবং খাদের মধ্য দিয়ে নদী প্রবাহিত হচ্ছিল। খৃস্টানদের অসংখ্য সৈন্য সেই খাদের গভীরে লুকিয়েছিল। আমি শুনেছিলাম, সুলতান আইয়ুবী অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন। তিনি মাটির দেয়াল ভেদ করে লুকানো শত্রু দেখতে পারেন। কয়েক মাইল দূর থেকে শত্রুর গন্ধ পেয়ে যান। শিকারী জন্তু যেমন গন্ধ শুঁকে শিকারের কাছে চলে যায়, তেমনি তিনি শত্রুর গন্ধ শুঁকে শত্রুর কাছে চলে যেতে পারেন।

    হয়তো আল্লাহ সত্যি সত্যি আইয়ুবীকে এমন শক্তি দিয়েছিলেন। আর সেই শক্তির বলেই তিনি বার বার যুদ্ধে জিতে ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ অহংকারী মানুষ পছন্দ করেন না। বিজয়ের পর বিজয় তার মনে অহংকার জন্ম দিয়েছিল।

    তাই এবার যখন তিনি অভিযানে বের হলেন, আল্লাহর রহমত তার কাছ থেকে বিদায় হয়ে গেল। আল্লাহ তাকে যে নেয়ামত দিয়েছিলেন, তা উঠিয়ে নিলেন। তাঁর চোখের উপর আল্লাহ এমন পট্টি বেঁধে দিলেন যে, শত্রু তো দূরের কথা, তিনি নিজে কোথায় আছেন তাও জানতে পারলেন না। তাই ক্রুসেড বাহিনী তোমাদেরকে তাদের ফাঁদে ফেলে দিল। তারপর তারা খাদের ভেতর থেকে স্রোতের মত বেরিয়ে এলো এবং তোমাদের আক্রমণ করলো। তারপরের অবস্থা তো তোমরাই ভাল জানো।

    এই যুদ্ধের কয়েক বছর আগের কথা। আমি কোন অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে একদিন এই খাদের কাছাকাছি এক জায়গায় এসে পৌঁছলাম। সেখানে আমার পা হঠাৎ করেই থেমে গেল।

    তখন ছিল চাঁদনী রাত। আমি সেখানে এক মাজার দেখতে পেলাম। কবরের চারপাশ পাথরের দু’হাত উঁচু দেয়াল দ্বারা বাঁধানো। আমি পরীক্ষা করার জন্য অন্য দিকে ফিরলাম। কিন্তু আমার পা আমাকে আবার কবরের দিকেই ঘুরিয়ে দিল।

    এবার আমি কবরের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার যাওয়ার জন্য পাথরের রাস্তা বানানোই ছিল। সেই পথ ধরে আমি কবরের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত দোয়ার জন্য উঠে গেলো।

    আমার মনে হতে লাগলো, চাঁদ যেন আরও বেশী উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আমার মনে হলো, আমার ওস্তাদ মনে হয় আমাকে এই স্থানের কথাই বলেছিলেন। আমি কবরের পাশে বসে গেলাম ও করবের উপর হাত রেখে আবেদন করলাম, ‘আমার মত দাসের উপর আপনার কি আদেশ?’

    আমি এ প্রশ্নের কোন উত্তর পেলাম না। আমার মন বলল, এখানে কিছু চাইতে নেই। যে কল্যাণ ও সুবিধা তোমার পাওয়া উচিত তা স্বাভাবিক ভাবেই তার তরফ থেকে হয়ে যাবে।

    আমি রাতটা সেখানেই কাটিয়ে দেলাম। সকালে নদীতে অজু ও গোছল করতে গেলাম। তারপর কবরের কাছে এসে নামাজ পড়লাম।

    সেখান থেকে যখন বিদায় হলাম তখন মাতালের মত আমার নেশা নেশা ভাব হলো। আমার মাথা ঘুরতে লাগল। আমার মনে হলো, এটাই সে জায়গা, যেখানে আমাকে আস্তানা গাড়তে বলেছিলেন আমার ওস্তাদ।

    তারপর থেকে আমি নিয়মিত সেই মাজারে যাতায়াত শুরু করলাম। বলতে গেলে সেখানেই আমার আস্তানা বানিয়ে নিলাম। সেই কবরের পাশে দাঁড়ালে আপনাতেই আমার মনে নতুন নতুন ভাব জাগতো। তাপর সেটাই আমার বিশ্বাসে পরিণত হতো।

    আমি কবরের উপর উঁচু করে গম্বুজ বানিয়ে নিলাম। লোকজন জোর করে আমার মুরীদ হতে লাগলো। ক্রমে আমি দূর দূরান্ত পর্যন্ত সফল শুরু করলাম। হাজার হাজার মানুষ আমার মুরীদ হয়ে গেল। আমি হলব এবং মুশেলের বিভিন্ন অঞ্চলে গেলাম। এমনকি বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সফর করলাম।

    কিছুদিন থেকে আমি দিনের বেলাতেই এমন সব ইশারা পেতে লাগলাম, যা খুব ভাল নয়। মনে হলো, যে মহামানব এই মাজারে শুয়ে আছেন তার আত্মা অশান্ত হয়ে উঠেছে।

    কবরের উপর আমি সবুজ চাদর বিছিয়ে দিলাম। এক রাতে চাদরে ফড়ফড় শব্দ হতে লাগল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আমি চাদরের উপর হাত দিয়ে বললাম, ‘মুরশিদ! আমার জন্য কি আদেশ?’

    মাজারের মধ্য থেকে শব্দ হল, ‘তুমি দেখছোনা, মুসলমানরা এখন মদ পান করতে শুরু করেছে?’ এর আগে আমি আর এমন শব্দ কোনদিন শুনিনি। তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি মুসলমানদেরকে মদের অপকারিতা সম্পর্কে সাবধান করো।’

    আমি তার আদেশ অনুযায়ী কাজ শুরু করলাম। কিন্তু দেখতে পেলাম, গরীবরা কেউ মদ পান করে না। মদ পান করে বড় বড় অফিসার ও আমীররা। তাদের কান পর্যন্ত আমার সাবধান বাণী পৌঁছতো না।

    আবারও এক রাতে কবরে চাদর ফরফড় করে আমাকে জানিয়ে দিল, মিশর থেকে আসা সৈন্যরা মুসলিম এলাকায় মুসলমানদের সাথে ঠিক সেই ব্যবহার করছে, যেমন ব্যবহার ক্রুসেড বাহিনী করে থাকে। সে সময় সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবীর সৈন্য দামেশকেও ছিল।

    দামেশক থেকে হলব পর্যন্ত এবং হলব থেকে রমলা পর্য়ন্ত সৈন্যদল স্থানে স্থানে ছড়ানো ছিটানো ছিল। এই সব সৈন্যদের কমাণ্ডাররা মুসলমান বাড়ীতে ঢুকে মূল্যবান জিনিস ও নগদ অর্থ জোর করে কেড়ে নিতো। তারা পর্দানশীল মেয়েদের উপরেও হাত বাড়াল।

    তাদের দেখাদেখি সাধারণ সৈনিকরাও লুটপাট শুরু করে দিল এবং নারীদের লাঞ্ছিত করতে লাগল। এমন সংবাদও পাওয়া গেছে, সেনাপতি ও কমাণ্ডাররা মুসলমান মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে তাদের ক্যাম্পে তুলেছে।

    মাজার থেকে আমাকে আদেশ দেয়া হলো, ‘তুমি সলতান আইয়ুবীর কাছে যাও। তাঁকে বলো, এই সৈন্য তো খেলাফতে বাগদাদের বাহিনী, মিশরের ফেরাউনের বাহিনী নয়। তারা যদি এমন পাপ কর্ম চালু রাখে, তবে তাদের হাশর ফেরাউনের মতই হবে।’

    সে সময় সুলতান আইয়ুবী হলবের নিকটে ক্যাম্প করেছিলেন। আমি এত দূর রাস্তা অতিক্রম করে তাঁর সঙ্গে যখন দেখা করতে গেলাম, তখন তাঁর রক্ষীরা বললো, ‘তুমি সুলতাদের সাথে কেন দেখা করতে চাও?’

    আমি বললাম, ‘আমি রমলা থেকে এসেছি ও একটি সংবাদ এনেছি।’

    তারা জিজ্ঞেস করলো, ‘সংবাদ কে দিয়েছে?’

    আমি বললাম, ‘সংবাদ যিনি দিয়েছেন, তিনি জীবিত নন।’

    রক্ষীরা হো হো করে হেসে উঠলো। তাদের কমাণ্ডার উচ্চস্বরে বললো, ‘ওগো, তোমরা যদি পাগল দেখতে চাও তো আসো। এই লোক বলছে সে কবর থেকে সুলতানের জন্য সংবাদ এসেছে।’

    অন্য একজন বললো, ‘এ লোক নিশ্চয় শেখ মান্নানের চেলা। বেটা ফেদাইন দলের লোক, সুলতানকে হত্যা করতে এসেছে। একে, ধরো, বন্দী করো।’

    অন্য একজন বললো, ‘এ লোক খৃষ্টানদের চর! একে হত্যা করো।’

    আমি বন্দী হওয়ার ভয়ে বললাম, ‘আমি সত্যি একজন পাগল!’

    আমি সেখান থেকে পালিয়ে এলাম। আমি স্বচক্ষে দেখলাম, সুলতান আইয়ুবীর ক্যাম্প থেকে দু’টি মেয়ে মাথা বের করে পাগলের তামাশা দেখার জন্য আমার দিকে তাকিয়ে আছে।’

    ‘আমারা তাঁর কোন সৈন্যের কাছে কোন মেয়ে দেখিনি।’ এক সৈনিক বললো।

    ‘তোমরা কি সেই সময় যখন তাঁর সৈন্যরা দামেশকে গিয়েছিল, তখন তাদের সাথে ছিলে? সাদা পোষাকধারী লোকটি প্রশ্ন করলো।

    ‘আমরা তো এই প্রথমবারের মত এদিকে এসেছি।’ এক সিপাই বললো, ‘আমরা সৈন্য বিভাগে নতুন ভর্তি হয়েছি। তখন আমরা সুলতাদের বাহিনীতে ভর্তিই হইনি তো সেখানে থাকবো কেমন করে?’

    ‘আমি পুরাতন সৈন্যদের কথা বলছি।’ লোকটি বললো, ‘সেই কমাণ্ডার ও সৈন্যদের কথাই বলছি, যাদের পাপের শাস্তি তোমাদের মাথার ওপর এসে পড়েছে। তোমরা নতুন তো, সে জন্য কোন পাপের সাথে জড়াতে পারোনি। এ জন্যই তোমরা এখনো জীবিত আছো, নিরাপদে ফিরে আসতে পেরেছো। কিন্তু যারা মুসলমান হয়েও মুসলমানদের বাড়ীতে লুটপাট করেছে ও পর্দানশীন নারীদের উপর হস্তক্ষেপ করেছে, তারা সবাই মারা গেছে। আর যারা পাপী ও গোনাহগার তাদের কারো ঠ্যাং কেটেছে, কারো বাহু ও হাত কেটেছে।

    তোমরা খবর নিলেই জানতে পারবে, তোমাদের মতই অনেকে রমলা থেকে মিশরে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু পথের মধ্যে তাদের পাপের শাস্তি শুরু হয়ে যায়। তারা ময়দান থেকে জীবিত ফিরলেও পথে অজ্ঞান হয়ে যায়। পরে তাদের দেহ থেকে চোখ শকুনে টেনে বের করেছে।

    আরো একদল পাপী ছিল, তারা খৃষ্টানদের হাতে বন্দী রয়েছে। এখন সেই বন্দীখানায় তারা তাদের পাপের শাস্তি ভোগ করছে। এই বন্দীখানার শাস্তি জাহান্নামের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। সেখানে তাদের নিরন্তর শাস্তি চলতে থাকবে। তারা ক্ষুধা-তৃষ্ণায় সেখানে ধুকে ধুকে মরার মত পড়ে থাকবে, কিন্তু মরবে না। তারা মৃত্যুর জন্য দোয়া করবে, কিন্তু তাদের দোয়া আল্লাহর কাছে কবুল হবে না।’

    ‘আমাদের পরাজয়ের কারণ কি এটাই?’ এক সৈনিক প্রশ্ন করলো।

    ‘আমি দুই বছর আগেই ইশারা পেয়েছিলাম, আইয়ুবীর বাহিনী ধ্বংস হয়ে যাবে।’ লোকটি বললো, ‘তারা নিজেরা ধ্বংস হবে আর কাফেরদেকে এমন সুযোগ করে দেবে, যেন তারা ইসলামের ধ্বংস সাধন করতে পারে। কারণ এই বাহিনীর প্রতি আল্লাহ নাখোশ হয়ে গেছেন।

    ‘আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’ একজন জিজ্ঞেস করলো।

    ‘আমি আল্লাহর গজব থেকে বাঁচার জন্য রমলা থেকে পালিয়ে এসেছি। রমলায় ক্রুসেড বাহিনীর রূপ ধরে আল্লাহর গজব নেমে এসেছে। এ গজব মুসলিম বিশ্বকে তছনছ করে দেবে।’

    ‘তাহলে আপনি কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবেন?’

    ‘আমি কোথায় আশ্রয় নেবো সে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আমার নেই। আমি শুধু আমার মুরশিদের হুমুক তামিল করতে পারি। ক্রুসেড বাহিনী তুফানের মত রমলায় আঘাত হানলে মুরশিদ আমাকে জানাল, ‘আইয়ুবীর বাহিনী এ তুফান রোধ করতে পারবে না।’ তোমরা নিজেরাই এর স্বাক্ষী, ক্রুসেড সৈন্যদের তোমরা বাঁধা দিতে পারোনি।

    যদি শুধু আমার জীবনের প্রশ্ন হতো, তবে আমি আমার মুরশিদের মাজারে আমার জীবন কুরবানী করতাম। কিন্তু মুরশিদ আমাকে এই যুবতী মেয়ে দু’টির জীবন ও সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য হিজরত করতে বললেন। কারণ খৃষ্টানরা দু’টি জিনিস খুব পছন্দ করে, সম্পদ ও পর্দানশীন মেয়ে। আমার মুরশিদ আমাকে বললেন, ‘তোমরা মেয়ে দু’টিকে সঙ্গে নিয়ে মিশর চলে যাও।’

    আমি করজোড়ে বললাম, ‘এত দূরের পথ আমি কেমন করে পার হবো।’

    মাজার থেকে আওয়াজ এলো, ‘তুমি এতদিন আমার যে খেদমত করেছো, তার বিনিময়ে তোমরা মঙ্গল মতে কায়রো পৌঁছতে পারবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকবে না। সবাইকে পাপ থেকে সাবধান করবে। বলবে, যদি বাঁচতে চাও তবে পাপের কাজ ছেড়ে দাও। নইলে তোমরাও সেই শাস্তি পাবে যে শাস্তি আইয়ুবীর সৈন্যদের দেয়া হয়েছে।

    মাজার আমাকে আরও অনেক কথাই বলেছে, সে সব কথা আমি মিশরে গিয়ে বলবো।

    তোমরা একে অন্যের দিকে লক্ষ্য করে দেখো, তোমাদের চেহারা সব লাশের মত ফ্যাকেশে হয়ে গেছে। তোমাদের দেহে প্রাণের স্পন্দন আছে কি নেই, বুঝার উপায় নেই। কিন্তু আমাকে দেখো, আমি ও আমার কন্যারা পায়ে হেঁটে যাচ্ছি। আমাদের সাথে খাবারও নেই, পানিও নেই। তবু আমরা কত সতেজ ও প্রাণবন্ত।’

    ‘আপনি কি আমাদেরকে মিশর পর্যন্ত আপনার মত শান্তিতে নিয়ে যেতে পারবেন?’ এক সৈনিক জিজ্ঞেস করলো।

    ‘যদি তোমরা খালেছ মনে এই প্রতিজ্ঞা করো, তোমরা পাপের চিন্তা মন থেকে মুছে ফেলবে, আর আমি যে উদ্দেশ্যে মিশর যাচ্ছি সে ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করবে, তবে আমি তোমাদেরকে সহিসালামতে মিশর ফিরিয়ে নিয়ার চেষ্টা করবো।’

    ‘আমরা সত্য মনে অঙ্গিকার করছি।’ অনেকগুলো কণ্ঠস্বর এক সাথে বলে উঠলো, ‘আমরা অঙ্গীকার করছি, যে পর্যন্ত জীবিত আছি, আপনার সাথে থাকবো।’

    ‘আমি শুধু আমার এবং মেয়েদের জীবন ও সম্মান বাঁচানোর জন্য রমলা থেকে বের হইনি।’ লোকটি বললো, ‘আমাকে আদেশ করা হয়েছে, মিশরে গিয়ে জনগণকে সাবাধান করার জন্য।

    মিশরের মাটির একটি দোষ আছে। এই মাটিতে গোনাহের একটা প্রবণতা আছে। হযরত ইউসুফ (আ:) মিশরে নিলাম হয়েছিলেন। হযরত মুসা (আ:)-এর ওপর অত্যাচার করা হয়েছে মিশরের মাটিতে। মিশরে ফেরাউনের হাতে নির্যাতীত হয়েছে নবী, রাসূল ও পয়গম্বরগণ।’

    তিনি বললেন, ‘হে মিশরবাসী! তোমরা মাটির এই কুপ্রভাব থেকে বাঁচো এবং এর অনাচার থেকে মুক্ত হয়ে যাও। তোমরা আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো, যেন আল্লাহ তোমাদেরকে আর শাস্তিযোগ্য মনে না করেন। তাহলেই তোমরা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

    আমি মিশরবাসীকে এই বাণী শোনানোর জন্যই যাচ্ছি। যদি তোমরা এই বাণী পৌঁছাতে আমাকে সাহায্য করো, তবে তোমাদের জন্য এই পৃথিবী যেমন জান্নাত হয়ে যাবে তেমনি পরকালেও তোমাদের জন্য খোলা থাকবে বেহেশতের দরোজা।’

    ❀ ❀ ❀

  • হেমসের যোদ্ধা

    হেমসের যোদ্ধা

    হেমসের যোদ্ধা

    জাভীরা। শত হোক, সে এক মেয়ে বৈ তো নয়! একটার পর একটা ভয় ও আতংকের স্রোত জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে গেলে কয়টার মোকাবেলা করবে সে? পাহাড়ে ধ্বস নামলে যেমন ছোট-বড় অসংখ্য পাথর অনবরত ছুটে আসতে থাকে, তেমনি একটার পর একটা বিপদ ক্রমাগত ছুটে আসতে লাগল তার দিকে। সেই বিপদ দেখে ভয়, শংকা ও ত্রাসের স্রোতে হাবুডুবু খেতে লাগল জাভীরা।

    জাভীরার ঝড়ের আতংক হারিয়ে গিয়েছিল প্লাবনের বিভীষিকা দেখে। প্লাবনের ভয় হারিয়ে গেল যখন অচেনা বিধর্মী যুবকের হাতে লাঞ্ছিত হবার ভয় এসে তাকে জাপটে ধরলো। সর্বনাশা স্রোত কেড়ে নিয়েছে তার উট। তার নিরাপত্তা বিধান করার দায়িত্ব ছিল যাদের, কাফেলার সেই সঙ্গীরা হারিয়ে গেছে তার জীবন থেকে। যে গোপন ও ভয়ংকর অভিযানে যাচ্ছিল ওরা, এখন সে অভিযানের কি হবে? কেমন করে কাদের নিয়ে সেই অভিযান সফল করবে জাভীরা?

    এ সব দুশ্চিন্তা যখন ওকে দিশেহারা করে তুলছিল তখনি সেই অচেনা বিধর্মী যুবকের কাছ থেকে তার কাছে এলো নির্ভরতার আশ্বাস। সেই আশ্বাস ও ব্যবহার তাকে বলছিল, আতংক দূর করে দাও মেয়ে। একজন মুমীন কখনো অসহায় নারীর জন্য ভয় ও ত্রাসের কারণ হতে পারে না। বরং পৃথিবীর সকল অসহায় মানুষের আশ্রয় ও সহায় হয়ে দেখা দেয় একজন ঈমানদার। অতএব ভয়ের জগত থেকে বেরিয়ে এসে আবার বাঁচার স্বপ্ন দেখো। ভুলে যেওনা, এই মুসলমানরা এমন সমাজ নির্মাণ করতে পারে, যেখানে মরুভূমির দুর্গম পথে কোন নারী একাকী শত শত মাইল পাড়ি দিতে পারে সম্পূর্ণ শংকাহীন চিত্তে। এটাই ইতিহাস, এটাই সত্য এবং বাস্তবতা।’

    কিন্তু জাভীরা ভাবছিল, ‘এতই কি সহজ ভয় শূন্য হওয়া! একজন মানুষ বলল, তুমি ভয় শূন্য হয়ে যাও আর তাতেই ভীত লোকটির অন্তর থেকে সব ভয় পালিয়ে যাবে? মানুষ কি এতই বিশ্বাসযোগ্য? এই আশ্বাসের মধ্যে প্রতারণা নেই, ছলচাতুরি নেই, কে এমন নিশ্চয়তা দেবে?’

    যুবকের আশ্বাস পেয়ে ভাবছিল জাভীরা, আমার অন্তর কি এই যুবকের ভালমানুষী চেহারা দেখে সত্যি সত্যি ভয় শূন্য হতে পেরেছে? না, বরং সে অনুভব করলো, ভয় ও আতংকের একটার পর একটা ঢেউ এখনো আছড়ে পড়ছে তার জীবনে।

    মুসলিম যুবকের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার ভয় কেটে যেতেই অন্য ভয় এসে বাসা বাঁধলো তার মনে। এমন কি হতে পারে না, লোকটি বড় অর্থলোভী? অনেক টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়ার মানসেই এ যুবক আমাকে এভাবে আগলে রাখছে? এ কথা মনে হতেই জাভীরার মন বিক্রি হয়ে যাওয়ার পরবর্তী জীবনের কথা ভেবে শিউরে উঠল। সেই অনাগত ও অনিশ্চিত জীবনের পদে পদে সে অনুভব করলো হাজারো বিপদ তার জন্য ওঁৎ পেতে আছে।

    দুর্যোগের রাতটি তারা কাটিয়ে দিল পাহাড়ের এক গুহায়। জাভীরার মনে পড়লো, রাতে যুবককে হত্যা করার একটি ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিল সে। কিন্তু অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় সে চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছিল যুবক।

    জাভীরার হত্যা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর চরম উৎকণ্ঠা পেয়ে বসেছিল তাকে। ভেবেছিল, এ রাতই তার জীবনের শেষ রাত। আর কোন দিন সে এ পৃথিবীর আলো বাতাস দেখতে পাবে না। কাল ভোরেই তার এ সুন্দর দেহ আর কমনীয় শরীর খুবলে খাবে শেয়াল শকুন।

    খুনীকে কি কেউ ক্ষমা করে? কেন করবে? তাকে বাঁচিয়ে রাখার কি দায় ঠেকেছে এই মুসলিম যুবকের যে মেয়ে একবার তাকে খুন করার চেষ্টা করেছে, সুযোগ পেলে সে মেয়ে আবার তাকে খুন করার চেষ্টা করবে না, এমন নিশ্চয়তা তাকে কে দিয়েছে? যুবকের নিরাপত্তার সহজ পথ হচ্ছে প্রতিপক্ষকে নিঃশেষ করে দেয়া। যুবকটি কি শেষ পর্যন্ত তাই করবে?

    এ প্রশ্ন মনে উদয় হতেই মৃত্যু ভয় মেয়েটির চেহারা আবার বিবর্ণ করে দিল। জাভীরা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, ‘মরতে যদি হয়-ই তবে এ যুবককে ছেড়ে দিয়ে লাভ কি? ওকে সঙ্গে নিয়েই আমি মরবো।’

    তানভীরকে খুন করার অদম্য ইচ্ছা ও বাসনা নিয়েই জাভীরা চুপচাপ বসেছিল গুহার ভেতর। কিন্তু কখন ঘুম এসে তাকে কাবু করে ফেলল সে টেরই পায়নি। যখন ঘুম ভাঙল, তখন সকাল হয়ে গেছে।

    পাহাড়ের গুহায় সেই মুসলিম যুবকের সাথে তার প্রথম রাতটি শেষ হয়ে গেল। ভোরে যখন তার ঘুম ভাঙল সে এই ভেবে অবাক হলো, যুবক তানভীর তাকে তো খুন করেইনি, এমনকি তার এমন আকর্ষণীয় দেহ এবং লোভনীয় শরীরের প্রতিও কোনরূপ খেয়াল করেনি। এ কি কোন নির্বোধ আহাম্মক! নাকি অনুভূতিহীন কোন কাপুরুষ! তানভীরের কাণ্ড দেখে এ প্রশটাই প্রথম তার মনে জাগলো।

    পূর্বাকাশে রাঙা সূর্য উঠল। সূর্যের রোদ গুহায় ঢুকল না বটে, তবে তার আলোয় গুহা এবং তার আশপাশের এলাকা আলোকিত হয়ে উঠলো। ভোরের সেই স্নিগ্ধ আলোর দিকে তাকিয়ে চেতনার কোন অতল তলে হারিয়ে গেল জাভীরা, সে নিজেও তা টের পেলো না। ভোরের সেই স্নিগ্ধ আলোর দিকে তাকাতেই তার সমস্ত ক্লান্তি, অবসাদ ও অচেনা যুবকের লাঞ্ছনার ভয় সব যেন দূর হয়ে গেল। এতক্ষণ সে যাকে অনুভূতিহীন এক কাপুরুষ যুবক মনে করছিল, সেই যুবকের দিকে বিস্ময় বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো জাভীরা।

    তানভীরের ঠোঁট নড়ছে। জাভীরার মনে হচ্ছে, এ লোক সরাসরি আল্লাহর সাথে আলাপ করছে। জাভীরার মনে পড়লো, তানভীর বলেছিল, খোদা শুধু তাকেই সাহায্য করেন, যার নিয়ত ও মন পবিত্র। তাহলে কি এই সে পবিত্র লোক। নাকি এ লোক মানুষ নয়, কোন ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে এসেছে তাকে বাঁচাতে! এ সব ভাবতে ভাবতে জাভীরার অসীম মুগ্ধতা আছড়ে পড়লো তানভীরের সেই প্রার্থনারত ঠোঁটের ওপর।

    নিজের জীবনের কথা মনে পড়লো তার। ভেবে দেখলো, নিজের দেহটাই কেবল অপবিত্র নয়, অপবিত্র তার ইচ্ছা এবং নিয়তও। তাই তো তানভীরের মত সুন্দর যুবকদের প্রতারিত করার চেষ্টাতেই কেটে যায় তার সকাল ও সন্ধ্যা।

    জাভীরা রাতে এটাও চিন্তা করে রেখেছিল, যদি কোন অলৌকিক কারণে সে যুবককে হত্যা করতে না পারে বা যুবকের হাতে সে নিহত না হয় তবে সে যুবকটিকে রূপের ফাঁদে আটকে ফেলবে। যদি সকাল পর্যন্ত যুবক নিজে তার রূপের সাগরে ঝাঁপ না দেয় তবে সকালে সে নিজেই উদ্যোগ নেবে যুবককে তার প্রেমের শেকলে বন্দী করার। সে তার রূপ ও যৌবন যুবকটিকে দান করে বলবে, ‘এর বিনিময়ে আমাকে হেমসে পাঠিয়ে দাও।’

    জাভীরা জীবনে এই প্রথম তার সংকল্প পরিত্যাগ করলো। সে অনুভব করলো, তার সাথে কেবল একটা শরীর নয়, আত্মা এবং বিবেকও আছে। যদিও সে আত্মা পাপ পংকিলতায় ভরা, কিন্তু আত্মার তো একটা মানবিক চাহিদাও আছে! বিবেক তো সত্যকে অস্বীকার করতে পারে না। এই যুবক যে মহত্ব ও মহানুভবতা দেখালো তা তো মিথ্যে নয়!

    জাভীরা নিজের জীবন ও আচরণের কথা মনে করে খুবই লজ্জা অনুভব করতে লাগলো। তানভীরকে এখন সে আর দশজন মানুষের মত কোন সাধারণ মানুষ ভাবতে পারছে না। তার দৃষ্টিতে সে এখন ফেরেশতার মত মহান। সে তাদেরই একজন, যে মানুষ স্বয়ং আল্লাহর সাথে কথা বলতে পারে।

    মেয়েটি এসব ভাবছিল আর তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। যতই তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ছিল ততই সে অনুভব করছিল, তার হৃদয়ের পাষাণভার হালকা হয়ে যাচ্ছে। তার মনে হচ্ছিল, তানভীরের অস্তিত্বের মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দিতে পারলেই সে পরিপূর্ণ শান্তি ও তৃপ্তি পাবে।

    নামাজ শেষে তানভীর দোয়ার জন্য হাত উঠালো। তার ধারণা ছিল, জাভীরা ঘুমিয়ে আছে। এই নির্জন কক্ষে সে ছাড়া আর কেউ জেগে নেই। তাই সে উচ্চস্বরে বলতে লাগলো, “হে মহান প্রভূ। তুমি আমাকে পাপের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র রাখো। আমাকে পবিত্র থাকার চেতনা ও ক্ষমতা দান করো। আমার আত্মাকে পরিশুদ্ধ রাখো এবং যে আমানত তুমি আমার হাতে সোপর্দ করেছে খেয়ানত ছাড়াই তাকে ঠিকানায় পৌঁছে দেয়ার শক্তি দাও। হে আল্লাহ! আমার অন্তরে সেই ভয় পয়দা করে দাও, যে ভয় এক সুন্দরী যুবতীর রূপ ও যৌবনের প্রলোভনকে উপেক্ষা করে তোমার পথে টিকে থাকতে পারে। প্রভু হে, আমি তোমার এক অবুঝ ও দুর্বল বান্দা। তুমি আমাকে সেই শক্তি দান করো, যেনো আমি শয়তানের শয়তানী ও কুমন্ত্রণার সাথে লড়াই করে তোমার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমার মর্যাদা রক্ষা করতে পারি।’

    তানভীর ফেরেশতা নয়, সে মানুষ। মানুষের কুপ্রবৃত্তি, লোভ লালসা, মোহ, দুর্বলতা সবই তার মধ্যে ছিল। কিন্তু ঈমান এমন এক জিনিস, যা মানুষকে এসব দুর্বলতা থেকে বাঁচিয়ে রাখে। আল্লাহর ভয়, পরকালের ভয় মানুষকে পশুত্ব ও বর্বরতা থেকে রক্ষা করে। এই মোনাজাতের মধ্য দিয়ে তানভীর সেই শক্তিই সঞ্চয় করছিল। সততা ও দায়িত্বশীলতার বর্ম দিয়ে আবৃত করছিল নিজেকে।

    দোয়া শেষ করে প্রশান্ত মনে উঠে দাঁড়াল তানভীর। ঘুরে জাভীরার দিকে তাকাতেই দেখলো, জাভীরা নির্ণিমেষ নয়নে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু।

    কি কারণে মেয়েটি কাঁদছে জানে না তানভীর। সে কি পিতৃ হারানোর শোকে! অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায়! যে কারণেই কাঁদুক, তানভীর ওকে বিরক্ত না করে চুপচাপ থাকার সিদ্ধান্ত নিল।

    জাভীরাও তেমনি। অপলক চোখে কেবল তাকিয়েই রইলো, কোন নড়াচড়া করলো না। কোন কথাও বললো না। একটু পর। তানভীর জাভীরাকে বললো, বাইরে যাও। বাইরে পরিষ্কার পানির ঝরনা আছে, তাতে হাত মুখ ধুয়ে এসো।

    তানভীর তার মাথায় জড়ানো পাগড়ি খুলে জাভীরার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো, “এটা নাও। ভাল করে মুখ-হাত ধোও। তোমার চুলে এখনো কাদামাটি লেগে আছে, ওগুলো পরিষ্কার করো। আমি তোমাকে তোমার সাবেক চেহারায় তোমার আত্মীয়দের হাতে তুলে দিতে চাই, যেমনটি তুমি দুর্যোগের আগে ছিলে।’

    জাভিরা তার হাত থেকে কাপড়টা নিয়ে এমন ভঙ্গিতে বের হয়ে গেল, যেন কোন শিশু গুরুজনের আদেশ পালন করছে।

    তানভীরের কাছে খাবার ও পানীয় যা কিছু ছিল সেগুলো ঘোড়ার জিনের সাথে বাঁধা ছিল। এখন ঘোড়াও নেই, কোন খাবার বা পানীয়ও নেই। তাই সে চুপচাপ জাভীরার ফিরে আসার অপেক্ষায় বসেছিল।

    জাভীরা ফিরে এলো। তানভীরের কথামত ভাল করে মাথা ও মুখমন্ডল ধুয়ে এসেছে সে। একটু আগে জাভীরার চুল মাটি ও কাদায় জট পাকিয়েছিল। চেহারার অবস্থাও ছিল তথৈবচ। এখন শিশির ধোয়া ফুলের মতই সজীব ও প্রাণবন্ত চেহারা নিয়ে ফিরে এসেছে সে।

    তানভীর জাভীরার এ রূপের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলো, যেন তাকে চিনতেই পারছে না। মনে মনে হোঁচট খেল সে। এ যেন যাদুর চমক। এত তাড়াতাড়ি মেয়েটি শোক ও কষ্ট কাটিয়ে এমন স্বাভাবিক ও পরিপাটি হতে পারবে, ভাবতেই পারেনি তানভীর। পল্লী গ্রামের মানুষ সাধারণত এমন আকর্ষণীয় রূপ লাবন্যের অধিকারী নারীর দেখাই পায় না। কোন ধনীর দুলালীই কেবল এমন মায়াময় চেহারা ও এত আকর্ষণীয় দেহবল্লরীর অধিকারী হতে পারে। তানভীর জাভীরার এ রূপ দেখে বিস্মিত না হয়ে পারল না।

    তানভীর সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে বললো, ‘আমাদের হাতে খাওয়ার মত কিছু নেই। খালি পেটেই আমাদের রওনা করতে হবে। তাই আর দেরী করতে চাই না। চলো বেরিয়ে পড়া যাক।’

    সে উঠার উদ্যোগ করতেই জাভীরা দু’কদম এগিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে বললো, আর একটু বসো। আমি কিছু জিজ্ঞেস করতে চাই, কিছু জানতে চাই তোমার কাছে।’

    তানভীর প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে মেয়েটির দিকে তাকাল। বলল, ‘বলো, কি জানতে চাও?’

    ‘তুমি যখন তোমার আল্লাহর সাথে কথা বলছিলে, তখন কি তুমি তাকে দেখতে পেয়েছিলে?’

    ‘আল্লাহকে মানুষের এই সীমিত দৃষ্টি দিয়ে দেখা যায় না।’ তানভীর বললো, ‘আমি আলেম নই, এ জন্য বলতে পারছি না, দেখা না দিয়ে আল্লাহ কেমন করে তার অস্তিত্ব প্রকাশ করেন। আমি শুধু এতটুকু জানি, আল্লাহ আমার সব কথাই শুনতে পান। তিনি আমার দোয়া শুনেছেন এবং আমার দোয়া কবুল করেছেন, তার প্রমাণ আমি বহুবার পেয়েছি।’

    ‘তোমার কি বিশ্বাস, চেষ্টা ও শক্তির বিনিময়ে তুমি ঝড় ও স্রোতের কবল থেকে রক্ষা পাওনি বরং তোমাকে ও আমাকে মহা দুর্যোগ থেকে আল্লাহই বাঁচিয়েছেন?’ জাভীরা প্রশ্ন করলো।

    ‘একশো বার।’ দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তানভীর জবাব দিল, ‘খতিব সাহেব বলেন, যত বড় বিপদই হোক, যদি কেউ মন থেকে আল্লাহর সাহায্য চায় তবে মহা বিপদ থেকেও আল্লাহ মানুষকে রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু তার চাওয়া হতে হবে আন্তরিক ও নিষ্কলুষ।’ তানভীর বললো, যদি আমি এই আশায় তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতাম যে, তোমার মত সুন্দরীকে নিয়ে কোথাও পালিয়ে যাব, তবে কাল সেই প্লাবনের সয়লাবে তোমার সাথে আমিও ডুবে মরতাম।’

    ‘কিন্তু আমার আত্মা তো পবিত্র নয়!’ জাভীরা দুঃখভরা কণ্ঠে বললো, ‘আমাকে আল্লাহ কেন সাহায্য করবেন? আমাকে কেন বাঁচাবেন?’

    ‘এই প্রশ্নের জবাব আল্লাহই ভাল জানেন। তবে হেমসে গিয়ে খতিবকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারি তিনি এর কোন জবাব জানেন কিনা?’ তানভীর বললো, ‘আমার মধ্যে এত এলেম নেই যে, তোমাকে আল্লাহর সব মহিমা বুঝাতে পারবো।’

    ‘এই প্রশ্নের জবাব না হয় খতিবকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবে। কিন্তু এটা তো বলতে পারবে, আমার মত যুবতীর এমন নজরকাড়া সৌন্দর্য আর লোভনীয় রূপ দেখেও কেমন করে তুমি এমন নির্লিপ্ত থাকতে পারলে? কেন থাকলে?’ জাভীরা প্রশ্ন করলো।

    ‘তুমি যা বলতে চাইছো যদি আমি তাই করতে চাইতাম, তবে আমি তোমার খঞ্জরের আঘাত থেকে বাঁচতে পারতাম না। আল্লাহ আমাকে হেফাজত করার জিম্মা নিতেন না।’ তানভীর উত্তরে বলল, ‘তুমি আমার কাছে আল্লাহর এক পবিত্র আমানত। মুসলমান রিপুর তাড়নায় আমানতের খেয়ানত করতে পারে না।’

    তানভীর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে কথা বলছিল। হঠাৎ সে তার চোখ নামিয়ে নিল এবং চুপ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলল, ‘তুমি বড় বিপজ্জনক আমানত জাভীরা! তোমাকে নিয়ে আমি বড় ভয়ের মধ্যে আছি। তোমার হেফাজতের চিন্তায় আমি এমনিতেই অস্থির, দয়া করে আমাকে আর পেরেশান করো না। চলো এখন যাই।’

    সে অধীর হয়ে উঠতে চাইলো কিন্তু জাভীরা তার কাঁধে হাত রেখে বললো, ‘আরেকটু বসো। আমাকে বলো, আমাকে নিয়ে তোমার কিসের ভয়? তুমি কি ভাবছো আবার আমি তোমাকে আক্রমণ করবো।’

    ‘তাহলে তো বেঁচে যেতাম।’ তানভীর বললো, ‘তোমার শত্রুতা আমার জন্য বিপদের নয়, বিপজ্জনক হচ্ছে তোমার বন্ধুত্ব, তোমার সঙ্গ। আমাকে তোমার পাশে আর বেশীক্ষণ এভাবে আটকে রেখো না আমি ফেরেশতা নই জাভীরা, আমিও মানুষ। আমাকে এমন কঠিন পরীক্ষায় ফেলো না, যে পরীক্ষায় ফেল করলে আমার দুনিয়া আখেরাত উভয়ই বরবাদ হয়ে যাবে। আমাকে আল্লাহর কাছে নতি স্বীকার করতে দাও। তার রহমত থেকে আমাকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করো না।’

    ‘তোমার আল্লাহর কসম!’ জাভীরা বললো ‘আমাকেও তোমার মত বানিয়ে নাও। তোমার আল্লাহর কাছে লজ্জিত হওয়ার যোগ্য করে দাও আমাকে। তুমি কোন সাধারণ মানুষ নও, তুমি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক উপরে। তুমি খোদার দূত! আমি জানি আমি ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু যারা মহান তাদের ক্ষমার শক্তি যে আমার পাপের চেয়েও বিশাল।’ জাভীরা কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলল।

    ‘তুমি কাঁদছো কেন জাভীরা, কি জন্য কাঁদছো তুমি?’ জাভীরার কান্না দেখে অস্থির কণ্ঠে বলল তানভীর।

    ‘আমি জঘন্য খারাপ মেয়ে, আমি পাপিষ্ঠা। জাভীরা বললো, ‘আল্লাহ আমার প্রতি দারুণ অসন্তুষ্ট। যখন স্রোত আমাকে ভাসিয়ে নিচ্ছিল, তখনও আমার অন্তরে আল্লাহর কথা জাগেনি। আমি আমার দেহ-সম্পদের জন্য গর্ব করতাম। জানতাম, আমার দেহে আছে অমূল্য সম্পদ। এই সম্পদ যতক্ষণ আমার সঙ্গে থাকবে ততক্ষণ আমি রাজরাণী। এই দেহটাকে বাঁচাতে গিয়ে যখন আমি ব্যর্থ হলাম তখন তুমি এই দেহের ভার নিলে। আমাকে উদ্ধার করে আনলে সেই দুর্যোগের মধ্য থেকে। তাই ভয় পাচ্ছিলাম, যে কোন সময় এ দেহ তুমি দাবী করে বসতে পারো। এ ভয়েই আমি তোমাকে ছোরা নিয়ে আক্রমণ করেছিলাম। কারণ এ দেহই ছিল আমার শক্তি ও ক্ষমতার উৎস। কিন্তু আমি ব্যর্থ হলাম। স্বাভাবিকভাবেই এ ব্যর্থতার পর তুমি আমার জীবন ও দেহ চেয়ে বসলে আমার কিছুই করার ছিল না। কিন্তু তোমার আচরণ থেকে জানতে পারলাম, দেহটা মানুষ নয়, মানুষের খোলসমাত্র। আসল মানুষ বিরাজ করে অন্তরে অন্তরের সেই মানুষ মারা গেলে দেহ হয়ে যায় নিথর লাশ। তাহলে যাকে আমি অমূল্য সম্পদ জ্ঞান করতাম তা নিছক লাশ বৈ তো নয়! আমি কত মুর্খ দেখো, সামান্য একটা পচনশীল লাশের গর্বে মাটিতে আমার পা পড়তো না। কিন্তু যখন তোমার প্রার্থনা শুনলাম, তখন বুঝলাম আমি কত বড় আহাম্মক! বুঝলাম, আমি বা তুমি কিছু নই, আমাদের অতীত আমাদের নয়, বর্তমান আমাদের নয়, ভবিষ্যতও আমাদের নয়। আমরা আমাদের রক্ষা করতে জানি না। এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হয় আমাদের জীবন। কিন্তু সেই শক্তি কি? কোথায় এবং কেমন করে সেই শক্তির নাগাল পাবো আমি?’

    ‘যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই আমাদের একমাত্র রক্ষক। এ ক্ষমতা কেবল তার হাতেই নিবদ্ধ। তোমার আত্মাকে পবিত্র করো, এ শক্তি তোমার হয়ে যাবে।’

    ‘কিন্তু আমার সারাটা জীবন কেটেছে পাপের মধ্যে, কেমন করে আমি পবিত্র হবো?’

    তানভীর তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, ‘আমাকে পরিষ্কার করে বলল, তুমি কি নর্তকী? তুমি কি কোন আমীরের হেরেমের রাণী? নাকি তুমি কোন ধনাঢ্য ব্যক্তির আদরের দুলালী, জমিদারের সোহাগী কন্যা? শুনেছি এমন সব মেয়েরা খুব রূপসী হয়। তোমার মত সুন্দরী মেয়ে আমি এ জীবনে কোনদিন দেখিনি।’

    জাভীরা চুপচাপ মাথা নিচু করে শুনছিল তার কথা। তানভীরের কথা শুনে তার চোখে অশ্রু এসে গেল। সে তানভীরের আরো কাছে সরে এলো। তাকে ঘনিষ্ট হতে দেখে তানভীর একটু দূরে সরে গেল। জাভীরা বললো, ‘তানভীর, আমার খুব ভয় করছে। তুমি জানো না, সেদিন ঝড়ের রূপ ধরে আমাকে গ্রাস করতে এসেছিল আমার পাপ! তোমার পবিত্র হাতের ছোঁয়া পেয়েছিলাম বলে সে যাত্রা বেঁচে গেছি। দোহাই তোমার, আমাকে বাঁচাও। তোমার কাছ থেকে আমাকে দূরে ঠেলে দিও না। ঝড়ের সময় যেভাবে আমাকে আগলে রেখেছিলে সেভাবে আমাকে আকড়ে ধরে রাখো।’

    ‘না!’ তানভীর সচকিত হয়ে বললো, ‘তুমি এভাবে আমার ঘনিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করো না। এতে যে কোন সময় আমি বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারি।’

    ‘অ, বুঝেছি। আমি পাপী বলে তুমি আমার কাছ থেকে দূরে থাকতে চাচ্ছো, যেন বিপথগামী হয়ে না যাও। স্বীকার করছি, আমি অনেক লোককে বিপথগামী করেছি। কিন্তু তখন পাপ ও পূণ্যের কোন বোধ আমার মধ্যে ছিল না।’

    জাভীরা লক্ষ্য করলো, তানভীরের মধ্যে ঈমানী চেতনা প্রবল পরিমাণেই আছে, কিন্তু তার মধ্যে জ্ঞানের গভীরতা নেই। এ ধরনের লোককে বিভ্রান্ত করা খুব কঠিন কিছু নয়। জাভীরা জানে, যদি এ ধরনের লোককে একবার বিভ্রান্ত করা যায় তবে তারা সহজে সেই বিভ্রান্তি থেকে বেরোতে পারে না। আর যদি তাদেরকে কোন ছাঁচে ঢেলে সাজানো যায় তবে তারা সে ছাঁচেই চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

    জাভীরা তার সাথে খোলাখুলি কথা বলা শুরু করে দিল। সে বলতে লাগলো, ‘তানভীর, তুমি জানো এ জগত সংসারে এখন আমার কেউ নেই। একমাত্র সম্বল বাবাও মারা গেলেন ঝড়ের কবলে পড়ে। এখন আমি এক অসহায়া নারী। বাঁচতে হলে আমার একটি অবলম্বন দরকার। যদি আমি তোমাকে বলি, এসো আমরা সারা জীবন একসাথে কাটাই, পরম্পর জীবন সঙ্গী হয়ে যাই, তুমি কি উত্তর দেবে?’

    তানভীর তার মুখের দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞের মত একটু হাসলো। বললো, ‘সে উত্তর জানার চাইতে আগে তোমার হেমসে পৌঁছা দরকার। চলো এখন যাওয়া যাক। রোদ বেড়ে গেলে পথ চলা মুশকিল হয়ে যাবে।’

    এ জবাব ভাল না মন্দ জাভীরা ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। সে তার সঙ্গে উঠে যাত্রা করলো।

    পাহাড়ী রাস্তা ধরে পথ চলছে ওরা। তানভীরের দৃষ্টি সামনে। জাভীরা বার বার তার দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করছে তাকে। গত রাতে এ তানভীরকেই হত্যা করে হেমসে পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করেছিল সে। কিন্তু আজ? আজ দিব্বি তার সাথে দ্বিধাহীন চিত্তে হেমসের পথে হেঁটে যাচ্ছে।

    তানভীর খুব দ্রুত হাঁটছিল। তার সাথে তাল মিলাতে কষ্ট হচ্ছিল জাভীরার। সে তানভীরের হাত ধরে বললো, ‘এত তাড়া কেন, ধীরে চলো।’

    ‘আমার আস্তে চলা উচিত নয়।’ তানভীর বললো, ‘নইলে আবার রাত হয়ে যাবে।’

    ‘তা, রাত আসতে দাও না! জাভীরা বললো, ‘আমি এত দ্রুত হাঁটতে পারছি না।’

    ‘চেষ্টা করো। যখন আর হাঁটতে পারবে না তখন আমি তোমাকে আমার কাঁধে উঠিয়ে নেবো, কিন্তু চলার গতি কমাতে পারব না।’ তানভীর বললো, ‘আমার প্রচণ্ড তাড়া আছে।’

    ❀ ❀ ❀

    সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ভাই তকিউদ্দিন খৃস্টান সম্রাট বিলডনকে হিম্মত দুর্গের বাইরে শোচনীয় ভাবে পরাজিত করেন। যার দরুণ হতভম্ব হয়ে বিলডনের সৈন্যেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। খৃস্টান সম্রাট বিলডন তার বিচ্ছিন্ন সেনাদলকে অতি কষ্টে একত্রিত করেন। একত্রিত করার পর তিনি বুঝতে পারলেন, তার কি পরিমাণ সৈন্য ক্ষয় হয়েছে।

    তিনি দেখতে পেলেন, তার কাছে তখনো অর্ধেকের কিছু বেশী সৈন্য অবশিষ্ট আছে। তিনি এ বাহিনী নিয়ে এসেছিলেন দামেশক পর্যন্ত দখল করতে। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য, তার প্রায় অর্ধেক সৈন্য তকিউদ্দিনের কমাণ্ডো বাহিনীর আক্রমণে মারা গেছে, নয়তো পালিয়ে পাহাড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে।

    সম্রাট বিলডন পলাতক সৈন্যদের অবস্থা জানতেন না। তারা তখন বিচ্ছিন্ন হয়ে দিকবিদিক ছুটছিল। মুসলিম যাযাবর ও রাখালেরা ধাওয়া করছিল সেই পলাতক সৈন্যদের। এমনকি গ্রামের সাধারণ মুসলমান যুবক বুড়ো এবং ছেলে ছোকরার দল তাদের ধরে ধরে হত্যা করছিল। কেউ ছিনিয়ে নিচ্ছিল তাদের অস্ত্রশস্ত্র, কেউ হস্তগত করছিল তাদের ঘোড়াগুলো।

    সম্রাট বিলডন তার অবশিষ্ট সৈন্যদের একত্রিত করে হিম্মত দূর্গ থেকে কিছুটা দূরে এক পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান নেয়ার হুকুম দিলেন। সেখানেই তিনি খবর পেলেন তার পলাতক সৈন্যরা বিচ্ছিন্নভাবে পালাতে গিয়ে সাধারণ মুসলমানদের হাতে নিহত হচ্ছে।

    পরাজিত বিলডন পরাজয়ের কারণে এমনিতেই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েছিলেন। এ সংবাদ পেয়ে তিনি আরো দিশেহারা হয়ে গেলেন। রাগে উন্মত্ত হয়ে তিনি সৈন্যদের আদেশ দিলেন, ‘যেখানেই মুসলমানদের গ্রাম ও বস্তি চোখে পড়বে, সেখানেই নির্বিচারে লুটতরাজ চালাবে। সুন্দরী ও যুবতী মেয়েদের লাঞ্ছিত করবে। গ্রামের বাড়িঘর ও বস্তিতে আগুন ধরিয়ে দেবে।’

    আদেশ জারী করেই তিনি তার বাহিনীকে একদিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। বিলডনের পরাজিত বাহিনী ক্যাম্প গুটিয়ে রওনা হলো। পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তারা পথে যেখানেই মুসলমান বস্তি ও গ্রাম পেলো সেখানেই লুটতরাজ চালাতে লাগলো।

    মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করার পর সেই গ্রামে তারা আগুন ধরিয়ে দিতো। গ্রামের নারীদের লাঞ্ছিত করতো এবং সুন্দরী ও যুবতী মেয়েদের অনেককেই ধরে নিয়ে যেতে লাগলো বাহিনীর সাথে। এতে মুসলিম জনসাধারণ তাদের উপরও মারমুখী হয়ে উঠলো। গ্রামের যুবক ও কিশোররা সেই বাহিনীর ক্ষতি সাধন করার জন্য জোট বেঁধে হামলা চালাতে লাগল। এভাবেই বিলডনের পরাজিত সৈন্যরা পথ চলছিল।

    এক রাতে হেমস থেকে ছয় সাত মাইল দূরে এক জায়গায় গিয়ে রাত্রি যাপনের জন্য ক্যাম্প করলো ওরা।

    বিলডন মনে মনে আশা করছিলেন, কোন খৃস্টান সম্রাট হয়তো তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসবে। যদি তিনি বাইরে থেকে নতুন করে সৈন্য সহযোগিতা পান তবে তিনি ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে তকিউদ্দিনের কাছে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে রুখে দাঁড়াবেন। তিনি আশা করছিলেন, আরেক বার তকিউদ্দিনের মুখোমুখি হলে নিশ্চয়ই তকিউদ্দিন ভড়কে যাবে। চাইকি দামেশক পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তারের পথও খুলে যেতে পারে।

    রাতে ক্যাম্পে বসে এসবই তিনি ভাবছিলেন। তখনই তার মনে পড়লো সম্রাট রিনাল্টের কথা। সম্রাট রিনাল্ট ক্রুসেড রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এ যুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন। যদি সম্রাট রিনাল্টের সহযোগিতা পাওয়া যায় তবে তকিউদ্দিনকে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া তেমন কঠিন হবে না ভেবে তিনি রিনাল্টের সাথে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

    ❀ ❀ ❀

    জাভীরার কোন সন্ধান না পেয়ে নিরাশ হয়ে বৃদ্ধ খৃস্টান ও তার সাথীরা সারা রাত পথ চলে সকালে গিয়ে হেমসে পৌঁছলো। কাফেলার অন্যরাও হেমসে পৌঁছে গেলো ওদের সাথে। কিন্তু তাদের কারো কারো গন্তব্য ছিল আরো দূরে। তারা হেমসের বাসিন্দা ছিল না, ফলে তারা হেমসে না থেমে আরও অগ্রসর হওয়ার জন্য ওদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। জাভীরার সঙ্গীরা হেমসে তাদের ঠিকানায় গিয়ে উঠল। তানভীরের ঘোড়া তাদের সাথেই ছিল। তারা ঘোড়াটি এক মসজিদের ইমামের কাছে হেফাজত রেখে বললো, ‘এ ঘোড়ার মালিক হেমসের এক যুবক। সে তুফানের মাঝে ঘোড়া থেকে পড়ে ডুবে গেছে। ঘোড়াটি কোন মতে বেঁচে গিয়ে নদীর কুলে উঠে এসেছিল। আমরা ঘোড়াটি ফেলে না রেখে নিয়ে এসেছি।’

    মসজিদ থেকে ঘোড়া যখন তানভীরের বাড়ী পৌঁছলো, তখন সেখানে শোকের ছায়া নেমে এলো।

    সেখানে এক ইহুদী বণিকের বাড়ী ছিল। ইহুদী বণিকটি ছিল ধনাঢ্য লোক। জাভীরার স্বঘোষিত বাবা বৃদ্ধ খৃস্টান তার সাথীদের নিয়ে সেই ইহুদীর বাড়ী গিয়ে উঠলো।

    ইহুদী লোকটি তাদের সাদরে বরণ করে নিয়ে বলল, “তোমাদের সাথে তো একটি মেয়ে আসার কথা, ও কোথায়?’

    বৃদ্ধ শোক প্রকাশ করে আফসোসের সাথে বলল, ‘জাভীরা উত্তাল স্রোতে ডুবে মারা গেছে।’

    এ কথা শুনে সেই ইহুদী এবং উপস্থিত সকলেই আফসোস করলো। বৃদ্ধ লোকটি ইহুদীকে জিজ্ঞেস করলো, ‘হেমসের মুসলমানদের অবস্থা কি? জেহাদের পক্ষে এখানে কেমন তৎপরতা চলছে?’ ইহুদী এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগেই বৃদ্ধ আবার বলল, ‘তারা কি এখানে সংকল্পবদ্ধ ও সংগঠিত হয়েছে? অস্ত্রের ট্রেনিং নিচ্ছে?’

    ইহুদী বণিক উত্তরে বলল, ‘এখানকার অবস্থা খুবই খারাপ। এখানে মুসলমানদের তৎপরতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তারা যথারীতি অস্ত্রের ট্রেনিং ও প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এ এলাকাকে সুলতান আইয়ুবী তার কমান্ডো দলের কেন্দ্র বানিয়ে নিয়েছে। এখানকার খতিব তার জ্বালাময়ী ভাষণের মাধ্যমে মুসলমানদের উত্তেজিত করে তুলছে। লোকটাকে আমার কেবল ইমাম বলে মনে হয় না, মনে হয় এ লোক কোন সামরিক অফিসার। তার প্রতিটি কথা ও পদক্ষেপ অত্যন্ত সুপরিকল্পিত! কখন কি করতে হবে বা বলতে হবে এ কথা তিনি ভাল করেই জানেন। তিনি দক্ষ সেনা কমান্ডারের মতই প্রতিটি চাল চালছেন।’

    ‘যদি তাকে কৌশলে হত্যা করি তবে কি উপকার হবে মনে করেন?’ বুড়ো খৃস্টান বললো।

    ‘না, তাতে কোনই উপকার হবে না।’ ইহুদী বণিক বললো, বরং তাতে ক্ষতির সম্ভাবনা আছে। ‘মুসলমানরা এ জন্য আমাদের সন্দেহ করবে এবং আমাদের সকলকে ধরে ধরে হত্যা করবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এ এলাকায় এখনো তাদেরই শাসন জারী আছে।’

    ‘এখানে যেসব খৃস্টান ও ইহুদী রয়েছে তাদের মেয়েরা কি কিছুই করতে পারছে না?’ বৃদ্ধ খৃস্টান জিজ্ঞেস করলো।

    ‘আপনি তো ভাল করেই জানেন এমন কাজ করতে কি পরিমাণ ট্রেনিং ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়।’ ইহুদী বনিক বললো, ‘আমাদের মেয়েদের মধ্যে কেউ তেমন প্রশিক্ষণ পায়নি।’

    ‘আপনি কি এখানে মুসলমানের মধ্যে যুদ্ধের ট্রেনিং বন্ধ করে দিতে চান?’ বৃদ্ধ প্রশ্ন করলো।

    ‘আপনি কেন্দ্র থেকে কি নির্দেশ নিয়ে এসেছেন?’ ইহুদী পাল্টা প্রশ্ন করলো।

    ‘আমাকে বলা হয়েছে এখানে মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধানোর আয়োজন করতে। সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে। জাভীরার জন্য এ কাজ তেমন কঠিন ছিল না। কিন্তু তাকে ছাড়া তো এ কাজ করা সম্ভব নয়। এ কাজ করতে হলে এখানে তার মত আরো দুটি মেয়ে আনানো প্রয়োজন।’

    ‘কিন্তু আমাদের হাতে সময় খুবই কম।’ ইহুদী বললো, ‘আপনি তো জানেন, রমলার যুদ্ধে যে আইয়ুবীকে আমরা পরাজিত করেছিলাম, তিনি বসে থাকার লোক নন। আপনি বাস্তবতা স্বীকার করলে বলবো, এই পরাজয় সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর উদ্যম আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বাঘকে খোঁচা দিলে সে বাঘ যেমন ভীত না হয়ে আরো মারমুখী হয় তেমনি হয়েছে আইয়ুবীর অবস্থা। তিনি নিশ্চয়ই এতদিনে পরাজয়ের ধকল সামলে নিয়ে তার অদক্ষ সৈন্যদেরকে দক্ষ সৈনিকে পরিণত করে নিয়েছেন। কায়রো থেকে গোয়েন্দারা যে রিপোের্ট পাঠাচ্ছে তা মোটেই ভাল নয়। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী যে কোন মুহূর্তে কায়রো থেকে যুদ্ধ অভিযানে বের হয়ে যেতে পারেন। এখনও জানা যায়নি তিনি কোন দিকে অভিযান চালাবেন বা কোথায় আক্রমণ করবেন। কিন্তু তিনি যে শিঘ্রই অভিযানে বেরোবেন তা নিশ্চিত।

    এদিকে তার ভাই তকিউদ্দিনের কাছেও দামেশক থেকে সৈন্য ও রসদ পৌঁছে গেছে। তিনি সম্রাট বিলডনকে এমনভাবে পরাজিত করেছেন, দীর্ঘ দিন সম্রাট বিলডন তার বাহিনীকে ময়দানে পাঠাতে পারবেন কিনা সন্দেহ। ফলে অবস্থা আমাদের জন্য খুবই জটিল ও ঝুঁকিবহুল হয়ে উঠেছে।’

    ‘হ্যা, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী অতর্কিত ও কমাণ্ডো আক্রমণে অসম্ভব পারদর্শী। এবারও তিনি এ ধরনের আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনাই করবেন এটাই স্বাভাবিক। আর এ ধরনের আক্রমণ চালালে আমাদের রসদপত্র তাদের কমান্ডো বাহিনীর আক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখা খুবই কঠিন হবে। যদি হেমসের মুসলমানদের মধ্য থেকেই তারা কমান্ডো নির্বাচন করে থাকে তবে এ বিপদের মাত্রা আরো একশো গুণ বেড়ে যাবে। তখন তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আমাদের রসদপত্র অন্যত্র পাঠানো যেমন নিরাপদ নয়, তেমনি বাইরে থেকে সাহায্য আসার পথও বিপদ মুক্ত নয়।’

    ‘এ জন্যই বলছিলাম, এই অবস্থায় মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে তাদেরকে দ্রুত চক্রান্তের জালে বন্দী করাটা জরুরী হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে বিলম্ব করলে তা আমাদের জন্য কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই ডেকে আনবে। আর গুপ্তহত্যার যে চিন্তা আপনি করেছেন তা বাদ দিতে হবে। কারণ ওই পথে গেলে ব্যর্থতা গ্রাস করবে আমাদেরকে। তখন প্রমাণিত হবে আমরা এর সাথে জড়িত আছি। আর এমনটি ঘটলে এখানে যে দু’চার ঘর ইহুদী ও খৃস্টান আছে তাদেরকে মেরে টুকরো টুকরো করে ফেলবে এখানকার মুসলমানরা।’

    ‘কিন্তু মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার মত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেয়ে এখানে নেই। নতুন করে মেয়ে আনতে গেলেও অনেক সময় লাগবে। তারচেয়ে আমার যে সঙ্গীরা আছে তারা দু’চারটি অপারেশন করলে তারা একটা ঝাঁকি খাবে। অস্ত্রশস্ত্রের ট্রেনিং সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে পারে। কিছু না করে বসে থাকার চেয়ে একটা কিছু তো করা দরকার। তাদের জানান দেয়া দরকার যে, হেমসেও তোমাদের দুশমন আছে।’

    “কিন্তু তা করতে গেলে ওরা আমাদের মেরে একবারে সাফ করে দেবে!’ ইহুদী তার হাতকে তলোয়ারের মত করে ডানে বামে ঘুরিয়ে বললো, ‘এই মুসলিম এলাকা থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেবে আমাদের। এই অবস্থায় আমাদের স্ত্রী সন্তান-পরিজন ও ধন-সম্পদসহ এখান থেকে বের হয়ে যেতে হবে।’

    ‘আমি আশা করি খৃস্টান সম্রাটরা তোমাদের অন্যত্র বসতি স্থাপনে সাহায্য করবেন। অবস্থা বুঝিয়ে বলতে পারলে তারা ক্ষতিপুরণ দিতেও প্রস্তুত থাকবেন।’

    ‘ঠিক আছে, আপনি যা ভাল বুঝেন তাই করেন। আপনাকে কেন্দ্র থেকে পাঠানো হয়েছে। সবদিক বিবেচনা করে আপনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই আমাদের সিদ্ধান্ত। আমি ইহুদী, জেরুজালেমে আমাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য আমি নিজের বাড়ীঘর ধন-সম্পদ ত্যাগ করতেও রাজী আছি।’

    ‘যদি এটাই হয় তোমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত তবে বিষয়টি আমি নতুনভাবে খতিয়ে দেখতে চাই। সে ক্ষেত্রে গুপ্তহত্যার পথে না গিয়ে পুরো জনপদ ধ্বংস করে দেয়ার ব্যবস্থা করলে কেমন হয়?’ বৃদ্ধ প্রশ্ন করলো।

    ‘এ জন্য তো সেনাবাহিনীর প্রয়োজন হবে!’ অবাক হয়ে বলল ইহুদী।

    ‘সে ব্যবস্থাও আছে। সেনাবাহিনী রেডী হয়েই আছে।’ বৃদ্ধ বলল, ‘সমাট বিলডনের সৈন্য বাহিনী এখান থেকে পাঁচ ছয় মাইল দূরে ক্যাম্প করে আছে। আপনি হয়তো জানেন না, এই বাহিনী এখানে আসার পথে যত মুসলিম পল্লী পেয়েছে সব আগুন জ্বালিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তারা বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, অকাতরে লুণ্ঠন চালিয়েছে। তাদের মধ্যে যে ক্ষোভ আছে সেখানে একটু ঘি ঢাললে তাদের দিয়েই হেমস ধ্বংস করে দেয়া সম্ভব। আপনি ভাববেন না, আমি আজই সেখানে যাবো এবং সম্রাট বিলডনকে বলবো হেমস দখল করার এটাই উপযুক্ত সময়।’

    ‘কিন্তু নির্বিচারে ধ্বংসযজ্ঞ চালালে এখানকার ইহুদী ও খৃস্টানদের কি হবে? আমরা কি এলাকা থেকে সরে পড়বো?’

    ‘আরে না, আমাদের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, এলাকাটা ধ্বংস হোক।’ বৃদ্ধ বললো, ‘বরং আমাদের টার্গেট থাকবে যাতে এখানকার কোন মুসলমান জীবিত না থাকে। সৈন্যরা যে পরিমাণ সম্পদ পারে নিয়ে যাবে, বাকীটা তোমাদের। তোমরা নিজেরা তখন মুসলমানদের বাড়ীঘরগুলো দখল করে নেবে। আমি সেভাবেই অভিযান চালানোর জন্য বলে দেবো সম্রাট বিলডনকে।’

    ‘আর সুন্দরী মেয়েদেরকে?’ বুড়োর এক সঙ্গী পেছন থেকে প্রশ্নটা তুলল।

    ‘সৈন্যেরা ওদের মধ্য থেকে যাদের পছন্দ করবে উঠিয়ে নিয়ে যাবে, অবশিষ্টদের পাবে তোমরা।’

    সবাই এ প্রস্তাবে একমত হলো। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, আজ রাতেই বৃদ্ধ অতিথি সম্রাট বিলডনের ক্যাম্পে যাবেন।

    তারা যখন এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বৈঠক শেষ করে বাইরে এলো, তখন এক অশ্বারোহীকে দেখলো ছুটে আসছে গ্রামের দিকে। অশ্বারোহী গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করলো। স্থানীয় ইহুদী আগন্তুককে চিনতে পারল না। বুঝা গেল এ লোক বাইরে থেকে কোন খবর নিয়ে এসেছে। ইহুদী তাকিয়ে রইলো আগন্তুকের দিকে।

    সামনেই খতিবের বাড়ী দেখা যাচ্ছিল। অশ্বারোহী খতিবের বাড়ীর সামনে গিয়ে থেমে গেলো এবং অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে এলো। ইহুদী লোকটি দেখতে পেলো যুবক খতিবের দরোজায় করাঘাত করছে।

    খতিব বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং আন্তরিকতার সাথে আগন্তুকের সঙ্গে মুছাফেহা করলেন। তারপর দু’জনই ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলেন।

    ‘এই অশ্বারোহী দামেশক বা কায়রোর কাসেদ।’ ইহুদী বণিক বললো, “নিশ্চয়ই কোন গুরুতর খবর নিয়ে এসেছে।’

    এশার নামাজের পর সমস্ত মুসল্লীরাই চলে গেল। মাত্র পাঁচ ছয় জন লোক খতিবের পাশে বসে রইলো। তাদের মধ্যে আগন্তুক অশ্বারোহীও ছিল। খতিব কোন একজনকে বললো, ‘দরোজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দাও।’

    ‘আমার বন্ধুগণ!’ খতিব বললেন, ‘আমার এ বন্ধু সুলতান তকিউদ্দিনের কাছ থেকে এই সংবাদ নিয়ে এসেছে যে, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী খুব শিঘ্রই কায়রো থেকে যুদ্ধ যাত্রায় বের হবেন। আপনারা সকলেই কমাণ্ডো বাহিনীর একেকজন উস্তাদ। আপনাদের এখন কি করতে হবে সে কথা বলে দেয়া আমি নিষ্প্রয়োজন মনে করি। আপনাদের কাজ আপনারা ঠিক করে নিন। তবে তার আগে নিজ নিজ বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও ট্রেনিং ঠিক মত হয়েছে কিনা তা আবারো যাচাই করে নিন। তকিউদ্দিন সংবাদ পাঠিয়েছেন, খৃস্টান সম্রাট বিলডন তার সৈন্যসহ হিম্মত এলাকা থেকে পরাজিত হয়ে পালিয়ে আমাদের আশপাশে কোথাও ক্যাম্প করে আছে। যে কোন সময় সে আমাদের ওপর আঘাত হানতে পারে। তাই এদিকে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

    আজ রাতেই হেমসের বাইরে চারদিকে গোয়েন্দা পাঠিয়ে তারা কোথায় আস্তানা গেড়েছে খবর নিতে হবে। তারা কোথায় এবং কত দূরে আছে জানতে হবে আমাদের। তাদের চলাফেরা ও মতিগতির উপরে দৃষ্টি রেখে তাদের তৎপরতা সম্পর্কে তকিউদ্দিনের কাছে রিপোর্ট পৌঁছাতে হবে। তিনি আরও আদেশ দিয়েছেন, পরিস্থিতি বুঝে বিলডনের খৃস্টান বাহিনীর উপর অতর্কিত কমান্ডো আক্রমণ চালাতে দ্বিধা করবে না। তাদের উপর ততক্ষণ কমান্ডো আক্রমণ অব্যাহত রাখবে, যতক্ষণ তারা পরাজয় স্বীকার না করে বা তোমাদের সাহায্যে আমরা এসে না পৌঁছাই। যাতে তারা শান্তিতে থাকতে না পারে তার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব এখন আমাদের।

    সেই সাথে তকিউদ্দিন আরও বলেছেন, তাদের সৈন্যরা অনেক মুসলমান গ্রাম ও বস্তি ধ্বংস করে হেমসের কাছে পৌঁছেছে। তাদের মনোভাব ভাল থাকার কথা নয়। সুযোগ পেলে তারা হেমসেও আক্রমণ করে বসতে পারে। অতএব তাদের ব্যাপারে খুবই সাবধান থাকবে।

    তকিউদ্দিন আরো জানিয়েছেন, তার কাছে সৈন্য সংখ্যা কম বলে তিনি খৃস্টান সৈন্যদের পিছু ধাওয়া করেননি। তিনি বলেছেন, যদি বিলডনের বাহিনী আরও পিছনে সরে যেতে চায় তবে তাদের বিরক্ত করবে না। তাদেরকে নির্বিঘ্নে সরে যেতে দেবে। অযথা আক্রমণ করে হেমসের জনপদে হামলে পড়ার সুযোগ তাদের দেয়ার দরকার নেই।

    তিনি আমাদের প্রশিক্ষণ ও ট্রেনিং জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, এমনও হতে পারে, সুলতান আইয়ুবী অভিযান শুরু করলে বিলডন গোপনে পিছন থেকে অতর্কিত আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করতে পারে। তাই অবস্থার প্রেক্ষিতেই আমাদেরকে বিলডনের বাহিনীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজনে অতর্কিতে গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে তাদের গতিরোধ করে সেখানেই আটকে রাখতে হবে যেন কোন দিকে তারা অগ্রসর হতে না পারে।’

    খতিব বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন দিকে পাঠিয়ে দিলেন বিলডন বাহিনীর তালাশে আর অবশিষ্টদের বললেন, ‘পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় তোমাদেরকে মহল্লার চারদিকে পাহারা বসাতে হবে।’

    ❀ ❀ ❀

  • ইহুদী কন্যা

    ইহুদী কন্যা

    ইহুদী কন্যা

    ইহুদী মেয়েটিকে হারিয়ে হলবের শাসক আল মালাকুস সালেহ উন্মাদ হয়ে গেলেন। সারা রাত চাকর-বাকর ও দাস-দাসীদের নাজেহাল করে ছাড়লেন মেয়েটির জন্য। তারা তন্ন তন্ন করে খুঁজল মহলের প্রতি ইঞ্চি জায়গা। কিন্তু কোথাও তার ছায়াও পেল না।

    সারা রাত এই হাঙ্গামায় কেউ ঘুমাতে পারল না। না আল মালেকুস সালেহ, না দাস-দাসীরা। আস সালেহের তর্জন গর্জন, রক্তচক্ষু, অনাকাংখিত ধমকে তটস্থ হয়ে সারা রাত ওরা ছোটাছুটি করল।

    আস সালেহ নিজেও ছুটে বেড়ালেন চরকির মত। কিন্তু ফলাফল শুন্য। যুবক সালেহের চিত্তে উন্মাদনা সৃষ্টি করে মেয়েটি উধাও হয়ে গেছে। সেই সাথে উধাও হয়ে গেছে সম্রাট বিলডনের পক্ষ থেকে আগত বনিকবেশী তিন উপদেষ্টা।

    সময় থেমে থাকেনা। মানুষের দুঃখ কষ্ট আনন্দ অস্থিরতা কোনোটাই স্থিতিশীল নয়। সময়ের গতি প্রবাহের সাথে সঙ্গতি রেখে পালটে যায় এসবের ধরন, পাল্টে যায় অনুভূতির রং ও রূপ।

    সবাই আশা করছিল ভোরে যখন আলোর মুখ দেখবেন আস সালেহ, তখন হয়তো নেশার ঘোর কেটে যাবে। কিছুটা শান্ত হবেন তিনি।

    কিন্তু সকালে দেখা গেল পরিস্থিতি উল্টো দিকে গড়াচ্ছে। আস সালেহের চোখ আরও রক্তবর্ণ ধারন করেছে। কাউকে ঠিকমত চিনতে পারছেন বলে মনে হলো না। যাকে সামনে পাচ্ছেন তাকেই জড়িয়ে ধরতে চাচ্ছেন। অনবরত প্রলাপ বকছেন।

    দাস-দাসীরা তাকে শান্ত করতে পারছে না। তারা তার হেফাজতের জন্য রক্ষী বাহিনীর সহায়তা চাইল। একজন ছুটে গেল ইবনে খতিবের কাছে। বলল, ‘সুলতান খুবই অস্থিরতার মধ্যে আছেন। সারা রাত ঘুমাননি। কখন কি অঘটন ঘটিয়ে বসেন এই ভয়ে আমরা অস্থির। চলুন, দেখবেন সুলতানকে।’

    ইবনে খতিব মহলে প্রবেশ করল। দাসীদের সঙ্গে গিয়ে পৌঁছল আল মালেকুস সালেহের সামনে। দেখল তার বিবর্ণ দশা। এক রাতেই লোকটা যেন পাল্টে গেছে।

    তাকে দেখতে পেয়েই আস সালেহ পাগলের মত ছুটে এলেন। রক্তবর্ণ চক্ষু মেলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘একটি মেয়ে এবং বণিক তিনজনকে দেখেছ? ওদেরকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। বলতে পারো ওরা কোথায়?’

    ‘হ্যাঁ, আমি তাদেরকে অনুষ্ঠানের সময় সভায় দেখেছিলাম।’ ইবনে খতিন বললো, ‘আমি আমার বাহিনী নিয়ে প্যান্ডেলের বাইরে সতর্ক পাহারায় ছিলাম। মাঝ রাতের সামান্য আগে বণিক তিনজন বাইরে এলো। তাদের সাথে একটি খুবসুরত মেয়েও ছিল।

    আমি দেখলাম ওরা কথা বলতে বলতে ওদের বাণিজ্য কাফেলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একটু পরেই তারা অন্ধকারে হারিয়ে গেল। তারা অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার খানিক পরে আমি ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দ শুনে দ্রুত এগিয়ে দেখতে পেলাম, ওরা চারজন চারটি ঘোড়ায় চড়ে বসেছে আর ঘোড়া চারটি ওদের নিয়ে পশ্চিমের ফটকের দিকে যাচ্ছে। আমি ভাবলাম তারা হয়তো ঘুরতে বেড়িয়েছে অথবা আপনার অনুমতি নিয়ে কোথাও যাচ্ছে। তাই আমি ওদের বাধা দেয়ার দরকার মনে করিনি। কিন্তু তারা সেই যে গেছে আর ফিরে আসেনি। ফিরে এলে আমার বাহিনী তাদের অবশ্যই দেখতে পেতো।’ এ সময় সুলতানের অসুস্থতার খবর পেয়ে সেখানে ছুটে এলেন এক সেনাপতি। এ সেনাপতি সুলতান আইয়ুবীর এক বিশ্বস্ত সমর্থক ছিলেন।

    তিনি ভাল করেই জানতেন, মেয়েটি এবং তিন খৃস্টান উপদেষ্টা এখন কোথায়। তিনি আস সালেহকে বললেন, ‘আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিল এরা বণিক নয়।’ বণিক হলে তারা আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের সাথেই যোগাযোগ করতো। বণিকবেশী লোক তিনজন নিশ্চয়ই গোয়েন্দা ছিল। সম্ভবত মেয়েটিও তাদেরই সহযোগী। তারা এত সুন্দরী মেয়ে আপনার কাছে রাখতে চায়নি। আপনাকে ধোঁকা দিয়ে আপনার কাছ থেকে কোন গোপন তথ্য নিয়ে পালিয়েছে তারা।’

    ‘তারা আমার কাছ থেকে কি গোপন তথ্য নেবে?’ অনেকটা রাগের সাথেই বললেন আস সালেহ।

    ‘জানিনা। তবে গোয়েন্দারা তাদের কাজে এতই পারদর্শী হয় যে, যার কাছ থেকে তারা তথ্য সংগ্রহ করে তিনি জানতেও পারেন না কি গোপন তথ্য তিনি তাদের সরবরাহ করেছেন। হয়তো তারা এমন গোপন তথ্য নিয়ে গেছে যা আপনার ও জানা নেই।’

    এ কথা অস্বীকার করার কোন উপায় জানা ছিল না আস সালেহের। একজন শাসক হিসেবে তিনিও জানতেন গোয়েন্দাদের দক্ষতার কথা। সেনাপতির কথা শেষ হলেও তাই তিনি এর কোন জবাব দিলেন না। বরং তিনি হঠাৎ করেই একদম চুপ মেরে গেলেন। এতক্ষণ যে প্রলাপ বকছিলেন সেই প্রলাপ বকাও বন্ধ হয়ে গেল।

    তার মনে পড়ে গেল, মেয়েটা দিনের বেলায়ও তাকে মদ পান করিয়ে মাতাল করে রাখত। সেই মাতাল করা ঘোরের মধ্যে মেয়েটা কোন প্রশ্ন করেছিল কিনা তিনি মনে করতে পারলেন না। তবে মনে মনে স্বীকার করলেন, এ সময় অনেক গোপন কথা তার কাছ থেকে জেনে নেয়া সম্ভব।

    এ কথা মনে হতেই তার মনে ভীষণ দুঃখ হলো। তার মধ্যে আবার হঠাৎ করেই জাগ্রত হলো দায়িত্ববোধ। এ বোধ তার মন থেকে মেয়েটির চিন্তা দূর করে দিল। কিন্তু সেখানে জন্ম নিল গোপন তথ্য পাচারের দুশ্চিন্তা।

    সেই সাথে ভয় হলো, যদি এই কথা সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবি কোনো ভাবে জেনে যান? তার গোয়েন্দারা তো এ মহলেও থাকতে পারে! এ খবর পেলে তিনি কি ক্ষমা করবেন আমাকে? আমাকে এখান থেকে তাড়িয়ে দিলে আমি কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবো? তিনি মনে মনে এসব ভাবছিলেন আর শিহরিত হচ্ছিলেন।

    এসব ভাবনা তাকে পুরোপুরি পেয়ে বসলে ভয় ও হতাশায় তিনি একেবারে মুষড়ে পড়লেন। একটু পর তিনি সেখান থেকে উঠে আস্তে আস্তে নিজের শয়ন কামরার দিকে হাঁটা দিলেন। বিছানায় শুয়েও তিনি ঘুমোতে পারলেন না। ভয় আর দুশ্চিন্তা তাকে একেবারেই কাবু করে ফেলল।

    অনেকদিন থেকেই তিনি রাত দিন চব্বিশ ঘন্টা মদের নেশায় মাতাল অবস্থায় কাটাচ্ছিলেন। ছলনাময়ী এক নারীর পাল্লায় পরে এভাবে নিজের উপর অত্যাচার করায় দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ ছাড়াও তার মনে জন্ম নিল নিজের প্রতি ক্রোধ ও ঘৃণা। আস্তে আস্তে সেই ক্রোধ ও ঘৃণা অনুশোচনায় রুপান্তরিত হলো। অনুশোচনা যখন তীব্র আকার ধারন করলো তখনই তার মনে পড়লো বাণিজ্য কাফেলার কথা।

    বণিকরা পালিয়ে গেলেও বাণিজ্য কাফেলাটি ত আর পালিয়ে যায়নি! হঠাৎ তার মাথায় রক্ত উঠে গেল। তিনি বিছানা ছেড়ে সোজা দরবারে এসে ঢুকলেন। প্রহরীকে বললেন, ‘জলদি রক্ষী কমান্ডার ও সেনাপতিকে খবর দাও।’

    খবর পেয়ে সাথে সাথে ছুটে এলেন সেনাপতি ও ইবনে খতিব। তিনি তাদেরকে সামনে পেয়েই অভাবিত এক কড়া হুকুম জারী করে বসলেন। বললেন, ‘বণিকদের সাথে যে বাণিজ্য কাফেলা এসেছে অই কাফেলার সবাইকে বন্দী করো। বণিক তিনজন কোথায় গেছে ওরা যদি তার হদিস ও সন্তোষজনক জবাবা দিতে না পারে তবে ওদের সবাইকে হত্যা করবে। তাদের উট এবং মাল-সামান সরকারী গুদামে সরকারী মাল হিসেবে পাঠিয়ে দাও।’

    সেই সন্ধ্যাতেই আল মালেকুস সালেহের পেটে ভীষণ ব্যাথা শুরু হলো। ডাক্তার তাকে ঔষুধ ও ব্যাবস্থাপনাপত্র দিলেন কিন্তু তার বেদনা বেশেই চললো। রাত যত বাড়তে লাগল তার কষ্টও ততই বেড়ে চলল। প্রথমে তলপেটে, তারপর সে ব্যাথা ছড়িয়ে পড়ল নাভী এবং বুক পর্যন্ত।

    পরের দিন ৯ই রজব। তার রোগের অবস্থা চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। ডাক্তার সবসময় তার কাছে বসে থেকেও কিছুই করতে পারছেন না। তিনি বার বার মূর্ছা যেতে লাগলেন। রোগ বেড়েই চললো। সেই দিনটি এবং পরবর্তী রাতও এই অবস্থায়ই কেটে গেল।

    পরের দিন। তার অবস্থা আরো খারাপ হলো। তিনি বেহুশের মত পড়ে রইলেন বিছানায়। ডাক্তার তার অবস্থা দেখে শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। তিনি সেনাপতি, রক্ষী বাহিনীর কমান্ডার এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে তার আশঙ্কার কথা প্রকাশ করে বললেন, ‘সুলতানের অবস্থা খুবই সংকটপূর্ণ। অচেনা রোগে আক্রান্ত তিনি। আমার কোন ঔষধই কাজ করছেনা। খুব বেশী সময় বাঁচবেন না তিনি।’

    মসজিদের ইমাম সাহেবকে খবর দেয়া হলো। তিনি এসে আস সালেহের শিয়রে বসে কোরআন পাঠ করতে লাগলেন।

    রাতে আস সালেহের জ্ঞান ফিরে এলো। তিনি ধীরে ধীরে চোখ খুললেন। বিষণ্ণ চোখে তাকালেন ইমাম সাহেবের দিকে। ক্ষীন কন্ঠে বললেন, ‘যদি কোরআন সত্য হয়ে থাকে তবে তার বরকতে আমাকে সুস্থ করে তুলুন।’

    ইমাম সাহেব বললে, ‘কোরআনের বরকত তার উপরই বর্ষিত হয়, যিনি কোরআনের বিধান অনুসারে জীবন পরিচালনা করেন। আমাকে মাফ করবেন, কারো অসন্তুষ্টির ভয়ে সত্য কথা বলা থেকে আমি বিরত থাকতে পারিনা। একজন ইমাম হিসেবে মানুষের দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ করে দেয়াটা আমার দায়িত্ব।

    আমার বলতে দ্বিধা নেই, আপনি কোরআনের বিরুদ্ধেই আপনার সারাটা জীবন ও শাসন চালিয়েছেন। এ অবস্থায় আল্লাহর রহমত পেতে হলে আপনাকে খালেছ দীলে তওবা করতে হবে। আল্লাহ যদি আপনার গোনাহ ক্ষমা করে দেন তবেই কেবল আপনি তাঁর রহমত আশা করতে পারেন।’

    ‘আমি তওবা করবো হুজুর। আপনি আমার তওবার ব্যবস্থা করুন।’

    ‘কিন্তু তওবার ব্যাপারে আল্লাহর বিধান হচ্ছে, তিনি মানুষের সাধারন গোনাহ ক্ষমা করলেও অন্য মানুষের সাথে কৃত অন্যায় ক্ষমা করেন ন। কোন মানুষকে কষ্ট দিলে বা কারো অধিকার হরণ করলে সেই ক্ষমা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকেই নিতে হয়। ব্যক্তি মাফ করলেই কেবল আল্লাহ তাকে ক্ষমার যোগ্য বিবেচনা করবেন।

    এদিক থেকে আপনার অপরাধ যে সীমাহীন! আপনি তো আপনার মায়ের দুধেরও অপমান করেছেন! আপনি আপনার মায়ের মনে যে কষ্ট দিয়েছেন টা দূর করতে না পারলে আল্লাহ কখনোই আপনার প্রতি সদয় অবেন না।’

    এ সময় শামসুন নেছা ভাইয়ের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল আর দোয়া দরূদ পড়ছিল। ইমাম সাহেবের এ তিক্ত কথাগুলো শুনে আস সালেহের মুখ থেকে সহসা বেড়িয়ে এলো, ‘মা, মাগো! তুমি তোমার এ পাপিষ্ঠ সন্তাকে ক্ষমা করে দাও।’

    তার কাতর কণ্ঠের ধ্বনি ঘরের বাতাস বিষণ্ণ করে তুলল। শামসুন নেছা এগিয়ে ভাইয়ের মাথায় হাত রাখল।

    আস সালেহ ছোট বোনের একটি হাত আঁকড়ে ধরে বললেন, ‘শামসি! বোন আমার! আমি আর বাঁচবো না। তুই কি পারবি মাকে একটু ডেকে আনতে! আমার যে মাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে রে! শোন, আমি লোক দিচ্ছি, তুই মায়ের কাছে চলে যা। মাকে বলবি, তোমার একমাত্র ছেলে মৃত্যুশয্যায়। সে তোমাকে শেষ বারের মত দেখতে চায়! যদি মা আসেন, সঙ্গে করে নিয়ে আসবি। আর যদি মা আসতে অস্বীকার করেন, তবে তাকে বলবি, মা, তোমার একমাত্র ছেলে মারা যাচ্ছে! তুমি তার দুধের ঋণ আর পাপ ক্ষমা করে দাও।’

    ইমাম সাহেব তাকালেন শামসুন নেছার দিকে। সে তার ভাইয়ের কপালে মমতার হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘আমি এক্ষুণি দামেশকের পথে যাত্রা করছি ভাইয়া! দেখিস, আমি ঠিক মাকে নিয়ে আসবো।’

    শামসুন নেছা দ্রুত পদে কামরা থেকে বের হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সে যখন আবার কামরায় ঢুকল তখন তার বেশভূষা একদম পালটে গেছে। এক অশ্বারোহীর সাজে সজ্জিত সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী মরহুমের একমাত্র ষোড়শী কন্যা শামসুন নেছা।

    আস সালেহ চোখ বন্ধ করে শুয়েছিলেন। চেহারায় কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। শামসুন নেছা ভাইয়ের শিয়রে গিয়ে দাঁড়াল। হাত রাখল তার কপালে।

    চোখ মেলে চাইলেন আস সালেহ। শামসুন নেছা বলল, ‘চলি ভাইয়া! পথ চেনে এমন আটজন বিশ্বস্ত রক্ষী সঙ্গে নিয়েছি। তুমি কোনো চিন্তা করো না, মাকে সঙ্গে নিয়েই ফিরব ইনশাআল্লাহ।’

    আস সালেহ তাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করলেন। তার মাথায় হাত বুলিয়ে ক্ষীন কন্ঠে বললেন, ‘ফী আমানিল্লাহ!’

    ভাইয়ের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে মহল থেকে বেরিয়ে এলো শামসুন নেছা। রাতের অন্ধকারেই লাফিয়ে চড়লো ঘোড়ার পিঠে। তারপর আটজন সঙ্গী নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল দামেশকের পথে। দুর্বার বেগে ঘোড়া ছুটে চলল দামেশকের দিকে।

    ইতিহাসবিদ কাজী বাহাউদ্দিন শাদ্দাদ তাঁর বইতে লিখেছেন, ১৩ই রজব শামছুন নেছা রওনা হয়ে যাবার পর আস সালেহের অবস্থা এতই খারাপ হয়ে যায় যে, মহলের দরজা সবার জন্য বন্ধ করে দেয়া হলো। সেনাপতি গুরুত্বপূর্ণ আমীর ও উজিরদেরকে মহলে এনে বসিয়ে রাখলেন পরিস্থিতির আলোকে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহনের জন্য।

    দুপুরের পর সামান্য সময়ের জন্য আস সালেহের জ্ঞান ফিরে এলো। তিনি ইশারায় সেনাপতি ও উজিরকে কাছে ডাকলেন। ক্ষীণ কন্ঠে বললেন, ‘আমি মারা গেলে সুলতান আইয়ুবীই হবেন হলবের মূল শাসক। তিনি পরবর্তী শাসক নির্বাচনের আগ পর্যন্ত মুশেলের শাসক ইয়াজউদ্দিন মাসুদ হলবের শাসকের দায়িত্ব পালন করবেন।’

    সাইফুদ্দিনের মৃত্যুর পর ইয়াজুদ্দিন মাসুদ হলবের শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি তখন মুশেলেই ছিলেন। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে তাকে হলবেরও শাসনকর্তা নিয়োগ করা হলো।

    এটুকু করেই শান্ত হলেন না আস সালেহ। ইশারায় রক্ষী বাহিনীর প্রধানকে ডেকে বললেন সকল আমীর ও সভাসদদের ডেকে আনতে। ইবনে খতিব কালবিলম্ব না করে সমস্ত আমীর ও সভাসদদের জরুরী ভিত্তিতে আস সালেহের নিকট হাজির হওয়ার জন্য খবর পাঠালো।

    সবাই হাজির হলে আস সালেহ বললেন, ‘আমি চাই আপনারা সবাই ইয়াজউদ্দিন মাসুদের পক্ষে শপথ বাক্য পাঠ করুন। আমি আপনাদের মাঝে ঐক্য ও সংহতি দেখে মরতে চাই।’

    আস সালেহের শেষ ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে দরবারের সকল আমীর ও সভাসদগন ইয়াজউদ্দিন মাসুদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে শপথ বাক্য পাঠ করলেন। আস সালেহ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবার চোখ বন্ধ করে ফেললেন।

    ২৫ রজব। আস সালেহের তখন কোন হুশ ছিল না। অজ্ঞান অবস্থায়ই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

    তিনি মৃত্যুর আগেই মুশেলের পথে কাসেদ রওনা হয়ে গিয়েছিল। কাসেদ ইয়াজিউদ্দিন মাসুদের কাছে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল আস সালেহের শেষ পয়গাম ও ফরমান। এই ফরমানে উল্লেখ ছিল হলবের দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পণ করার কথা। আরো উল্লেখ ছিল, হলবের সকল উজির, আমীর ও সভাসদগন যে তাঁর আনুগত্যের শপথ নিয়েছে এ খবর।

    তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আরো একজন কাসেদকে মুশেলের উদ্দেশ্যে পাথিয়ে দেয়া হলো। তাকে বলা হলো, ‘তুমি গিয়ে মুশেলের বর্তমান শাসক ইয়াজউদ্দিন মাসুদকে জানাবে, সুলতান আস সালেহ মারা গেছেন। তাঁর অন্তিম ইচ্ছানুযায়ী এখন আপনিই হলবের শাসক। হলবের সকল আমীর, উজির এবং সেনাবাহিনী আপনার আনুগত্যের শপথ নিয়ে বসে আছে। তারা সবাই আপনার নির্দেশের অপেক্ষায়।’

    সে সময় শামসুন নেছা দামেশকে তার মায়ের পদতলে বসে বলছিল, ‘মা, তোমার একমাত্র সন্তান মৃত্যু শয্যায়। মরার আগে সে তোনাকে একবার দেখতে চায়। চলো মা হলবে! ডাক্তার বলেছে, সে আর বাঁচবে না।

    নূরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রী রাজিয়া খাতুন তখনো বলছিলেন, ‘যেদিন বিশ্বাসঘাতকের খাতায় নাম লিখিয়েছে আমার সন্তান, সেদিনই সে মারা গেছে। আমার কোন ছেলে আর বেঁচে নেই যাকে দেখার জন্য আমার হলবে যেতে হবে। তুমি ফিরে যাও, আমি কিছুতেই হলবে যাবো না।

    ‘মা, আপনার দুধের ঋণ আর পাপের ক্ষমা চেয়ে সে কান্নাকাটি করছে। আপনি মাফ না করলে আল্লাহও যে তাকে মাফ করবে না।’

    ‘তাকে বলিস, আমি তাঁর দুধের ঋণ ক্ষমা করে দিয়েছি। কিন্তু তার পাপের ক্ষমা আল্লাহ করবেন কিনা জানি না।’

    ‘আপনি দোয়া করুন মা। আল্লাহ যেন তাকে ক্ষমা করে দেন।’

    ‘না, কোন অপরাধীর জন্য আমি আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করতে পারবো না। গদীর লোভে যে জাতির স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে পারে, যার কারনে শত শত মুজাহিদকে পান করতে হয়েছে শাহাদাতের পেয়ালা, তাঁর জন্য ফরিয়াদ জানাব আমি! অসম্ভব, এ হতে পারে না। কাল হাশরের মাঠে আমি সেইসব মা, বোন ও স্ত্রীদের সামনে লজ্জিত হতে চাই না, যাদের ছেলে, ভাই ও স্বামীর মৃত্যুর কারন ছিল আমার সন্তান।’

    সে সময়ই আস সালেহ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। শামসুন নেছা যখন হলবে ফিরে এলো তখন তার একমাত্র ভাই আস সালেহের লাশ নিয়ে লোকজন কেল্লা থেকে বাইরে বের হচ্ছিল। ফটকের বাইরে অনেক লোক। তারা সবাই এসে শামিল হয়েছিল নূরুদ্দীন জঙ্গীর একমাত্র সন্তান আল মালেকুস সালেহের জানাজায় অংশগ্রহণের জন্য।

    ইয়াজউদ্দিন মাসুদের কাছে গিয়ে পৌঁছল আস সালেহের দূত। ইয়াজউদ্দিন মাসুদ তাঁর উজির ও পরিষদকে জানাল এ খবর।

    বৈঠক থেকে তারা তখনো উঠেনি, এ সময় পৌঁছল দ্বিতীয় দূত। আস সালেহের মৃত্যু সংবাদ শুনে উপদেষ্টাবৃন্দ বললো, ‘আপনি এখনি রওনা হয়ে যান। হলবের জনগণকে আশ্বস্ত করুন, তারা যেন নিজেদের অভিভাবকহীন না মনে করে।’ ইয়াজউদ্দিন মাসুদ আস সালেহের শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য তৎক্ষণাৎ হলবের উদ্দেশ্যে রওনা যাত্রা করলেন।

    তিনি যত দ্রুত সম্ভব হলবে পৌঁছে যেতে চাচ্ছিলেন। এ জন্য তিনি প্রশস্ত সড়ক পথ পরিহার করে দূরত্ব কমানোর জন্য বিকল্প ছোট পথ ধরলেন। এ পথ চলাচলের জন্য আরামদায়ক না হলেও রাস্তা কমে যাবে অনেক।

    আরো একটি কারণে এ পথে যাওয়া তিনি জরুরী মনে করলেন। সুলতান আইয়ুবীর চাই সুলতান তকিউদ্দিন এখন যেখানে সেনা ক্যাম্প করে আছেন সে ক্যাম্প এ পথেই পড়বে। হলবে পৌঁছার আগেই এ ব্যাপারে তিনি সুলতান তকিউদ্দিনের পরামর্শ গ্রহন করা জরুরী মনে করলেন। ইয়াজউদ্দিন মাসুদের ছোট্ট কাফেলা ও বাহিনী সুলতান তকিউদ্দিনের ক্যাম্পের কাছে চলে এলে তিনি তার বাহিনীর অগ্রগতি থামিয়ে দিলেন। ক্যাম্পের রক্ষীকে জানালেন তার আগমনের কথা। সুলতান তকিউদ্দিন নিজে এসে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। ইয়াজউদ্দিন মাসুদ হলবের পরিস্থিতি এবং আস সালেহের মৃত্যু সংবাদ তাকে জানিয়ে বললেন, ‘আস সালেহ মৃত্যুর পূর্বে আমাকে হলবের শাসক নিয়োগ করে গেছে। তাঁর সকল আমীর ও উজির এ নিয়োগ মেনে নিয়েছে। আমি এ দায়িত্ব গ্রহনের পূর্বে আপনার পরামর্শ নিতে এসেছি।’

    সুলতান তকিউদ্দিন বললেন, ‘ভবিষ্যতে গৃহযুদ্ধ বন্ধ করতে এবং হলবকে দামেশকের অধীনে রাখতে তোমার ভূমিকা রয়েছে। এক গাদ্দার মরে গিয়ে যে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে তাকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করো। হলবে যেন আর কোন গাদ্দার মাথা তুলতে না পারে সেদিকে তোমার খেয়াল রাখতে হবে। দামেশকের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধিতেও সক্রিয় হতে হবে তোমাকে।’

    ইয়াজউদ্দিন মাসুদ তাঁর এ নতুন ও কঠিন দায়িত্বের বোঝার কথা ভেবে চিন্তায় পড়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে বললেন, ‘আপনি যে দায়িত্বের কথা বললেন তা নিয়ে আমি আগেও ভেবেছি। আস সালেহের নিয়োগের খবর পাওয়ার পর থেকেই ভাবছিলাম, কিভাবে অগ্রসর হব আমি। আমি জানি দামেশকের সাধারণ জনসাধারণ এখনো মরহুম নূরুদ্দিন জঙ্গীকে অপরিসীম শ্রদ্ধা করে। তাঁর বিধবা স্ত্রী নূরুদ্দিন জঙ্গীর আদর্শ আঁকড়ে ধরে যে ত্যাগ-তিতীক্ষার সাগর পাড়ি দিয়েছেন সেজন্য দামেশকের জনসাধারণ তাকেও সমান শ্রদ্ধা করে। হলব ও দামেশকের সম্পর্ক দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করতে এই মহিলা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারবে। এই মহিলার সহযোগিতা আদায়ের ব্যাপারে আমি আপনার সাহায্য চাই।’

    ‘এ ব্যাপারে আমি আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?’

    ‘এই মহিয়সী মহিলা সম্মত হলে আমি তাকে বিয়ে করতে চাই। আমি মনে করি আমার আশা পূরণ হলে আপনার প্রত্যাশাও পূরণ হবে। মরহুম নূরুদ্দিন জঙ্গীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই এই মহিলাকে আমার পাশে প্রয়োজন।’

    ‘আমি আজই দামেশকে রওনা হয়ে যাবো তোমার এই প্রস্তাব নিয়ে। আমার বিশ্বাস, তিনি তোমার এই প্রস্তাবকে অশ্রদ্ধা করবেন না।’

    এ আলোচনার পর তকিউদ্দিন দামেশকের পথে আর ইয়াজউদ্দিন হলবের পথে রওনা হয়ে গেলেন। তকিউদ্দিন দামেশকে পৌঁছেই রাজিয়া খাতুনের দুয়ারে হাজির হলেন। রাজিয়া খাতুনকে তিনি জানালেন তাঁর ছেলের মৃত্যু সংবাদ।

    ‘আল্লাহ তাঁর পাপ ক্ষমা করুন।’ ছেলের মৃত্যু সংবাদ শুনে বললেন রাজিয়া খাতুন।

    তকিউদ্দুন বললেন, ‘আস সালেহ মরার আগেই হলবের পরবর্তী শাসনকর্তা হিসাবে মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিন মাসুদকে নিযুক্ত করে গেছেন। ইয়াজউদ্দিন মাসুদও এ দায়িত্ব পালনে সম্মত হয়েছে।’

    ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন রাজিয়া খাতুন।

    তকিউদ্দিন বললেন, ‘বর্তমান সময়ে ইয়াজউদ্দিন মাসুদকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য আমি আপনার সহযোগিতা চাই।’

    ‘আমার সহযোগিতা! কি বলছেন আপনি! আমি তাকে কিভাবে সহযোগিতা করতে পারি?’

    ‘তিনি আপনাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।’এ প্রস্তাবের কথা শুনে রাজিয়া খাতুন আকাশ থেকে পড়লেন। মরহুম নূরুদ্দিন জঙ্গীর স্থলে আর কাউকে বসানোর কথা তিনি কল্পনাও করেননি।

    তিনি প্রবল আপত্তি তুলে বললেন, ‘না, না, তা কি করে হয়! মরহুম জঙ্গীর জায়গায় অন্য কাউকে বসানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। না, এ কিছুতেই হতে পারে না। দয়া করে আপনি আপনার প্রস্তাব ফিরিয়ে নিন। আমাকে অযথা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবেন না।’

    ‘এ বিয়ে ইয়াজউদ্দিন মাসুদ ও আপনার মধ্যে নয়।’ তকিউদ্দিন বললেন, এটা হবে দামেশক ও হলবের সাথে ঐক্যবন্ধনের যোগসূত্র। এ বন্ধন গড়ে তোলা সম্ভব হলে ভবিষ্যতের জন্য গৃহযুদ্ধের দুয়ার বন্ধ হয়ে যাবে। খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত জনশক্তি গড়ে তোলা সহজ হবে। বিশেষ করে আপনার মত বলিষ্ঠ ঈমানদার মহিলা তাঁর পাশে থাকলে ভবিষ্যতে কখনো গাদ্দারির পথে পা বাড়াতে সে সাহস পাবে না। খ্রিষ্টানরা ষড়যন্ত্রে উস্তাদ এবং হলব সব সময়ই ষড়যন্ত্রকারীদের শক্ত ঘাটি হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। আমরা চাই না, ইয়াজউদ্দিন মাসুদের মত সম্ভাবনাময় যুবক দুশমনের খপ্পড়ে পড়ে শেষ হয়ে যাক।’

    রাজিয়া খাতুনের চোখে তখন টলোমলো অশ্রু। তিনি আঁচল দিয়ে চোখ মুছে সে অশ্রু মুছে নিয়ে বললেন, ‘যেই মহান সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, ইসলামের খেদমতের জন্যই আমার জীবন। ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব কায়েমের জন্য আমি যে কোন কোরবানী দিতে প্রস্তুত। যদি আমাকে দিয়ে ইসলামের কোন উপকার হবে বলে মনে করেন, তবে নির্দ্বিধায় আদেশ করবেন। আমি সে আদেশ মাথা পেতে নেবো।’

    রাজিয়া খাতুন বললেন, ‘আমার নিজস্ব ইচ্ছা ও পছন্দ বলে কিছু নেই। ইসলামের স্বার্থে আমার ব্যাপারে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা আমি আপনাদের হাতে সোপর্দ করছি। সুলতান আইয়ুবীকে আমি আমার ভাই ও নেতা মনে করি। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন। তিনি আমাকে যে সিদ্ধান্ত দেবেন আমি তাই মাথা পেতে নেবো।’

    সুলতান আইয়ুবীকে জানানো হলো ইয়াজউদ্দিন মাসুদের অভিপ্রায়। অবশেষে সুলতানের অনুমোদন নিয়ে ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারী ইয়াজউদ্দিন মাসুদ ও রাজিয়া খাতুনের বিবাহ সম্পন্ন হলো।

    ❀ ❀ ❀

    সাপটি মাত্র এক ফুট লম্বা। কিন্তু এই সাপটিই ইসহাকের তাগড়া জোয়ান ঘোড়াটিকে অচল করে দিল। ইসহাকের গন্তব্যস্থান রখনো অনেক দূরে। সিনাই মরুভূমির দুর্গম অঞ্চল পাড়ি দিচ্ছিল সে। বলা যায় মাত্র অর্ধেক পথ পাড়ি দিয়েছে, এখনও বাকি আছে আরো অর্ধেক পথ।

    ইসহাক জন্মসূত্রে তুরস্কের বাসিন্দা। তুর্কী আভিজাত্য লেপ্টে আছে তার চেহারায়। সুন্দর সুগঠিত শরীর। অটুট স্বাস্থ্য। মুখের গড়ন আর গায়ের রঙ আকর্ষণীয় ও ফর্সা। চোখ দুটো নীল। তাকে দেখে বুঝার উপায় নেই সে আরবী মুসলমান নাকি ইউরোপীয় খ্রিষ্টান। তার যেমন স্বাস্থ্য ভাল ছিল তেমনি ছিল রূপের জৌলুশ।

    কিন্তু এ জন্যই সে লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করত বলার উপায় নেই। বরং সে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করত তার ভরাট কণ্ঠস্বর আর বুদ্ধিদীপ্ত কথার জন্য।

    আইয়ুবীর একজন সতর্ক ও চালাক সৈনিক হিসেবে সে ছিল অনেকেরই প্রিয়ভাজন। সে যখন সুলতান আইয়ুবীর সৈন্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিল তখন তার বয়স ছিল মাত্র আঠার বছর।

    সৈন্য বিভাগের চাকরী সে শখের বশে বা জীবিকা উপার্জনের জন্যই কেবল গ্রহন করেনি বরং সে সৈন্য বিভাগে নাম লিখিয়েছিল ঈমানের অপরিহার্য দাবী পূরণের তাগিদে।

    তার জীবন ছিল একজন মর্দে মুমিনের বাস্তব রূপ। ক্রুসেড বাহিনীর বিরাট সংকল্পের সংবাদ পেয়ে সে ইসলামের হেফাজতের জন্য দামেশক চলে আসে এবং সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। যখন সুলতান আইয়ুবীকে মিশরের শাসক নিযুক্ত করা হয় তখন ইসহাককে পাঠানো হয় মিশরে। সে নিজেকে তুর্কী মুসলমান বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতো।

    তার মতো অনেক তুর্কী মুসলমান সুলতান আইয়ুবীর সেনাবাহিনীতে ছিল। সুলতান আইয়ুবী তাদের উপর যথেষ্ট আস্থা ও বিশ্বাস রাখতেন। তিনি যখন কমান্ডো ফোর্স গঠন করেন তখন বেশির ভাগ সৈন্যই নিয়েছিলেন তুর্কীদের মধ্য থেকে। সেই কমান্ডো বাহিনী থেকেই তিনি বাছাই করা সৈন্যদের নিয়ে গঠন করেছিলেন গোয়েন্দা বিভাগ। এই গোয়েন্দা বিভাগ গঠনের জন্য প্রথম দিকে যাদের বাছাই করেছিলেন, ইসহাক তুর্কী ছিল তাদেরই একজন।

    সে তার অসাধারন বুদ্ধি ও সাহসের জন্য অচিরেই কমান্ডো গোয়েন্দাদের মধ্যে বিখ্যাত হয়ে উঠে। এই বুদ্ধি ও সাহসের কারণে অচিরেই তাকে একটি গ্রুপের কমান্ডার বানিয়ে দেয়া হয়। পরে তাকে তার বাহিনী সহ খ্রিষ্টান এলাকায় গোয়েন্দাগিরি করার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়।

    দায়িত্বের ব্যাপারেও সে ছিল খুবই নিষ্ঠাবান। সে জীবন বাজি রেখে মাটির তল থেকেও গোপন তথ্য উদ্ধার করে আনতে পারতো।

    সিনাই মরুভূমি পার হয়ে সে যাচ্ছিল কায়রো। কিন্তু এখন এই সিনাই মরুভূমির মধ্যে সামান্য একটি সাপ তাকে বিরাট ও কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিল।

    এ সময় সুলতান আইয়ুবী কায়রো অবস্থান করছিলেন। ইসহাক তুর্কী বৈরুত থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নিয়ে কায়রো রওনা হয়েছিল। তথ্য পাওয়ার পর সে আর দেরী করেনি, সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া নিয়ে নেমে পড়েছে রাস্তায়। পথে সে অল্পই বিশ্রাম নিয়েছে। সবুজ শ্যামল এলাকা অতিক্রম করে বিশাল মরুভূমিতে ঢুকে পড়েছে নির্দ্বিধায়।

    সিনাই মরুভূমির নাম শুনলেই অনেকের পিলে চমকে উঠতো। এমন ভয়ংকর মরুভূমিতে একা পা বাড়াবার তো প্রশ্নই উঠে না, দল বেঁধে রওনা দিতেও সাহস পেতো না অনেকে। ইসহাক তুর্কী জানে, এই মরুভূমিতে একবার পথ হারালে কোন মুসাফির আর জীবিত ফিরে আসতে পারে না। এই মরুভূমি মানুষ ও প্রাণীদের জন্য জীবন্ত আতঙ্ক হয়েই বিরাজ করছিল। কিন্তু ইসহাক তুর্কী ছিল নির্ভীক। তাছাড়া মরুভূমির রহস্য সে যতটা ভাল জানে অনেকেরই তা জানা নেই।

    সে তার প্রয়োজনীয় পানি ঘোড়ার সাথে বেঁধে নিয়েছিল। রাস্তা সম্পর্কেও পূর্ণ তথ্য জেনে নিয়েছিল রওনা হওয়ার আগেই। রাস্তার দু’এক স্থানের পানির সন্ধানও জানা ছিল তার। কারণ এ রাস্তায় এর আগে একবার তার যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতাও হয়েছিল।

    হলব থেকে বের হয়ে যখন সে মরুভূমিতে প্রবেশ করে তখন তার অন্তরে কোন ভয় বা আশংকা ছিল না। যে দুটো জিনিস কখনোই তাকে ভয় দেখাতে পারেনি তার একটি হলো খ্রিষ্টান, অপরটি মরুভূমি। যুদ্ধ আর দূরযাত্রার কষ্টকে সে বরং উপভোগ করতো। সে বিশ্বাস করত, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে এ দুটোই মানুষের সহায়ক হয়।

    দুপুরের সূর্য হেলে পড়েছিল। ইসহাক তুর্কী একটানা দুপুর পর্যন্ত ঘোড়া ছুটিয়ে এক টিলার ছায়ায় এসে শুয়ে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে তার চোখে ঘুম এসে গেল। হঠাৎ ঘোড়ার বিকট চিৎকারে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে দেখতে পেল, ঘোড়াটি সামান্য জায়গাতেই চক্রাকারে দৌড়াচ্ছে। ঘোড়ার এ আচরনের কোন কারণ বুঝতে পারল না ইসহাক তুর্কী। সে শোয়া থেকে উঠে বসল।

    ঘোড়া আর বেশী দৌড়াতে পারল না, থেমে গেল। তার সারা শরীর তখন কাঁপছে। ইসহাক তুর্কী দেখতে পেল ঘোড়াটি যেখানে শুয়েছিল তার চার পাঁচ গজ দূরে এক ফুট লম্বা একটি সাপ ছটফট করছে। লেজের দিক থেকে অর্ধেক দেহ তার থেঁৎলানো। ঘোড়াটি সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল।

    ইসহাক বুঝতে পারল, ঘোড়াটিকে সাপে দংশন করেছে। পরে সাপটি ঘোড়ার পায়ের নিচে পড়ে গেছে হয়তো। ঘোড়াটির আর চলার ক্ষমতা ছিল না। ইসহাক তুর্কী তার জুতার তলা দিয়ে সাপের মাথাটি থেৎলে দিল। সাপটি মারা গেল নিঃশব্দে।

    ঘোড়াটিরও বাঁচার আশা শেষ হয়ে গেল। মরুভূমির সাপ ও বিচ্ছু এমন বিষাক্ত যে, যাকে দংশন করে সে পানি পান করার সুযোগটুকুও ও পায় না। মরুভূমির যাত্রীরা জ্বলন্ত সূর্যের তাপ তাপ এবং ডাকাত ও লুটেরার চেয়ে বেশী ভয় পায় এই সাপ ও বিচ্ছুকে। মরুভূমিতে চলতে হলে এই সাপ ও বিচ্ছুর ব্যাপারে তাই সর্বাত্মক সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। একটু অসাবধান হলেই সীমাহীন বিপর্যয় গ্রাস করতে পারে পথিককে।

    সমতল ভূমি বা পাহাড়ী সাপের মত এরা সামনে এগোয় না। বরং এরা আশ্চর্য ভঙ্গিতে পাশে অগ্রসর হয়। ইসহাক তার ঘোড়াটির দিকে তাকাল। সে চোখে লেপ্টে আছে নিরাশার ছায়া। ঘোড়াটি তখন প্রচণ্ড জোরে কাঁপছিল। তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো জিভ। ঘোড়াটি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, পা ভেঙ্গে মাটিতে শুয়ে পড়লো। তারপর দু’তিনবার পা নেড়ে এক পাশে কাত হয়ে নিরব হয়ে গেল চিরদিনের মত।

    ইসহাক ঘোড়াটিকে কোনই সাহায্য করতে পারল না। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো বোবা জানোয়ারটির করুণ মৃত্যু।

    এটা ছিল উঁচু জাতের যুদ্ধের ঘোড়া। এ জাতের ঘোড়া সবসময় সতেজ থাকতো। সহজে পিপাসায় দুর্বল হতো না। ঘোড়াটির মৃত্যু ইশাকের জন্য মহা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াল।

    এ এমন এক ক্ষতি যা পুরণ হওয়ার নয়। কিন্তু এ ক্ষতিতেও সে কাতর হতো না, যদি স্বাভাবিক সময়ে এর মৃত্যু হতো। কিন্তু ঘোড়াটি মারা গেল এমন এক সময়ে, যখন সে দুর্গম মরুভূমিতে এবং এ ঘোড়াটিই ছিল তার একমাত্র সঙ্গী ও বাহন।

    ইসহাককে এখন পায়ে হেঁটেই কায়রো যেতে হবে এবং তাকে কায়রো পৌঁছতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। সে জানতো, সে যে গোপন তথ্য তার বুকের মধ্যে করে নিয়ে যাচ্ছে, যদি তা শিঘ্রই সুলতান আইয়ুবীকে জানাতে না পারে তবে যুদ্ধের এক বিরাট ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবেন সুলতান।

  • সামনে বৈরুত

    সামনে বৈরুত

    সামনে বৈরুত

    বৈরুত।

    খৃস্টান বাহিনীর দুর্ভেদ্য দুর্গ। পর পর দু’বার মুসলমানদের কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর সম্রাট বিলডন এখনেই এসে আস্তানা গেড়েছেন। প্রথম পরাজিত হয়েছিলেন সুলতান তকিউদ্দিনের কাছে। তারপর সুলতান আইয়ুবীর বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে প্রাণ হাতে সেই যে ছুটতে শুরু করেছিলেন, বৈরুত পৌঁছার আগ পর্যন্ত আর কোথাও থামার সাহস পাননি।

    সুলতান তকিউদ্দিনের হাতে পরাজিত হওয়ার পর ছত্রভঙ্গ বাহিনীকে যতটা সম্ভব গুছিয়ে নিয়ে তিনি যখন পালাচ্ছিলেন, রাগে দুঃখে তার মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছিল। এই রাগ ও ক্ষোভ দমন করার জন্য তিনি নিরীহ মুসলমানদের ওপর অকথ্য নির্যাতনের পথ বেছে নিলেন। পালাবার পথে যেসব মুসলমান গ্রাম ও বস্তি পড়লো সেগুলোতে নির্বিচার ধ্বংস চালাতে চালাতে এগুচ্ছিলেন তিনি।

    হেমসে সীমাহীন ধ্বংসযঞ্জ চালিয়ে তিনি আরো পূর্বদিকে সরে এলেন। একদিন ইবনে লাউনের দুর্গম এক পাহাড়ের পাদদেশে বিশ্রাম নেয়ার সময় তিনি এক অযাচিত ও অভুতপূর্ব খবরে পুলকিত হয়ে উঠলেন।

    তিনি জানতে পারলেন, সুলতান আইয়ুবী অতর্কিতে এসে ইবনে লাউনের ওপর চড়াও হন এবং ইবনে লাউনকে পরজিত করেন। কিন্তু ইবনে লাউনের বশ্যতা আদায় করে তাকে আবার তার রাজ্য ফিরিয়ে দিয়ে তিনি এখন এই পাহাড়ের উল্টা পাশে নির্বিঘ্নে বিশ্রাম নিচ্ছেন।

    সুলতান আইয়ুবীর ওপর প্রতিশোধ নেয়ার এটাই মোক্ষম সুযোগ। কারন সুলতান আইয়ুবী জানেন, আশেপাশে তাকে চ্যালেন্জ করার মত আর কেউ নেই। পাহাড়ের উল্টো পাশে শত্রুর বাহিনী ওঁৎ পেতে আছে একথা তার জানার কথা নয়। যদি জানতেন তাহলে এমন অলস ভঙ্গিতে এখানে শুয়ে বসে বিশ্রাম নিতেন না।

    বিলডনের এ চিন্তায় কোন ভুল ছিল না। আসলেও সুলতান এদের সম্বন্ধে কিছু জানতেন না। কিন্তু রাখে আল্লাহ, মারে কে? খৃস্টানদেরই এক স্পাই মেয়ের প্রেমের পরিনতি যে এভাবে মুসলমানদের রক্ষা করবে কে জানতো!

    সম্রাট বিলডন মেয়েটির প্রেমিক মুসলিম যুবকটির ওপর যখন নির্যাতন চালাচ্ছিলেন তখন মেয়েটি গোপনে তাকে উদ্ধার করে বলল, ‘যাও! পালিয়ে যাও! পাহাড়ের ওপারে সুলতান আইয়ুবীর বাহিনী বিশ্রাম নিচ্ছে। তাকে গিয়ে বল, বিলডন তার বাহিনী নিয়ে আপনার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিজের জাতিকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। যাও এক্ষুনি পালাও তুমি!’

    এভাবেই সুলতান আইয়ুবী এক ভয়ংকর বিপদের হাত থেকে বেঁচে যান। তার পরের কাহিনী সংক্ষিপ্ত। সুলতান এমন ফাঁদ পাতলেন যে, তাতে অল্পের জন্য বিলডন প্রাণ নিয়ে পালাতে পারলেও তার বাহিনী পুরোপুরি তচনচ ও প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

    বৈরুত ফিরেই এ পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য পাগল হয়ে হয়ে উঠেন বিলডন। দুশ্চিন্তায় রাতে তার ঘুম হয়না। গভীর রাত জেগে পরিকল্পনার পর পরিকল্পনা করেন। নিজের শক্তিকে সুসংহত করার জন্য শুরু করেন কুটনৈতিক তৎপরতা। অল্প সময়ের মধ্যেই আস সালেহকে নিজের দলে টেনে নিতে সমর্থ হন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার, আসসালেহ তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অগ্রসর হওয়ার আগেই দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে যান।

    এদিকে সুলতান আইয়ুবীর গতিবিধি ও তৎপরতার খবর নেয়ার জন্য নতুন করে কায়রোতে জাদরেল গোয়েন্দা পাঠালেন বিলডন। ঠিক এই সময় ইসহাক তুর্কী বৈরুত পৌঁছালো।

    ইসহাক বৈরুত পৌঁছেই বিলডনের হাইকমাণ্ড পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার উপাই খুঁজতে শুরু করলো। কারন বিলডনের মূল পরিকল্পনা জানার এছাড়া আর কোন উপায় নেই।

    তুরস্কের বাসিন্দা ইসহাক তুর্কী ছিল ফর্সা চেহারার এক সুদর্শন সাস্হ্যবান যুবক। ঘোড় সওয়ারে সে যেমন পটু ছিল তেমনি তীরন্দাজী এবং তলোয়ার চালনায়ও তার সমকক্ষ লোক খুঁজে পাওয়া দুস্কর ছিল। সব রকমের কমাণ্ডো প্রশিক্ষণ ছাড়াও তার সহজাত এমন কিছু গুন ছিল যা সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। সে ছিল মিষ্টভাষী এবং লোক পটানোয় ওস্তাদ। তার বুদ্ধিদীপ্ত চোখে এক ধরনের সম্মোহনী শক্তি খেলা করতো, যে কারনে মানুষ সহজেই তার বশীভূত হয়ে যেতো।

    সে তার সঙ্গীদের বলতো ‘মানুষের মাথার চাইতে বড় কোন অস্ত্র আজো আবিষ্কৃত হয়নি। একজন মুজাহিদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তার ঈমান ও মগজ। যদি এ দুটো অস্ত্র তুমি ঠিকমত ব্যবহার করতে পারো, তবে দুনিয়ার এমন কোন শক্তি নেই যে, তোমাকে পরাজিত করে।’

    সেই ইসহাক বৈরুত এসেই মানুষের চোখে পড়ে গেল এবং নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে লাগলো। সে নিজেকে দূরের এক মুসলিম অঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা খৃস্টান বলে পরিচয় দিল। এতে লোকের সহানুভূতি আদায় করা তার জন্য সহজ হয়ে গেল।

    সে বৈরুত পৌঁছেই দেখতে পেল, সেখনে আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যপক প্রস্তুতি চলছে।নতুন সৈন্য ভর্তির জন্য মহা সমারোহে চলছে নানা ধরনের খেলা। সৈন্যরা নানা রকম শারীরিক কসরত, কুস্তি, অসির লড়াই, তীরন্দাজী, বর্শা ছোঁড়ার প্রতিযোগীতা এসব করে যুবকদের আকৃষ্ট করতো সেনাবাহিনীতে ভর্তি হতে।

    একদিন ইসহাক তুর্কী তেমনি এক খেলার মাঠে গিয়ে হাজির হল। সেখানে তখন চলছিল অশ্বারোহীদের প্রতিযোগীতা। দুই অশ্বারোহী মাঠের দুই প্রান্তে সংকেতের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। সংকেত পাওয়ার সাথে সাথেই বর্শা হাতে ছুটে যাবে একে অন্যে দিকে।

    মঞ্চে সম্রাট বিলডনের উর্ধতন সামরিক অফিসাররা বসা। মাঠের এক প্রান্তে মঞ্চ সাজানো হয়েছে।

    যথাসময়ে সংকেত প্রদান করতেই প্রতিযোগীরা পরস্পরের দিকে ছুটে এলো মুক্ত বর্শা উঁচিয়ে। কিন্তু প্রথমবার কেউ কাউকে কাঁবু করতে পারলনা।

    প্রতিযোগী দুই অশ্বারোহীই লোহার শিরস্ত্রান ও বর্ম পরিহিত। মাঠের চারপাশে লোকে লোকারণ্য। তারা রুদ্ধশ্বাসে উপভোগ করছে এক লোমহর্ষক খেলা।

    প্রথম রাউণ্ডে কেউ কাউকে ফেলতে না পেরে উভয়েই পরস্পরকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেল কিছু দূর। তারপর ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে আবার ছুটল প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে।

    এবার বর্শায় ঠোকাঠুকি হল ঠিকই কিন্তু এবারও কেউ ধরাশায়ী হলোনা।

    তৃতীয় রাউণ্ডে দু’জনেই আবার মাঠের দুই প্রান্তে চলে গেল এবং সেখান থেকে তীব্র বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে বেপরোয়া ভঙ্গিতে ছুটে এলো পরস্পরের দিকে। কাছাকাছি হতেই দেখা গেল চোখের পলকে একজন মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

    দর্শকরা প্রচণ্ড হাততালিতে মাতিয়ে তুলল মাঠ। সেনাবাহিনীর অফিসাররাও উল্লাসিত।

    দর্শকদের উল্লাস কিছুটা কমলে বিজয়ী অশ্বারোহী বর্শা উঁচিয় বলল, ‘আর কেউ আছো, যে আমাকে চ্যালেন্জ করবে?’

    লাফিয়ে মাঠে নামলো আরেকজন। কিন্তু প্রথম রাউণ্ডেই সে ধরাশায়ী হলো। এরপর একে একে আরো কয়েকজন তাকে চ্যালেন্জ করে ব্যর্থ হলো।

    এই অশ্বারোহী ছিল বিলডনের এক উচ্চাভিলাষী নাইট। এবার যখন সে তাকে চ্যালেন্জ করার জন্য আহবান জানালো, তখন কেউ আর মাঠে নামল না।

    বিজয়ীর বেশে অশ্বারোহী এগিয়ে আসছিল মঞ্চের দিকে, এ সময় এক অভাবিত ঘটনা ঘটলো। হাজার হাজার দর্শককে অবাক করে দিয়ে খালি হাতে মাঠে নেমে গেল ইসহাক তুর্কী এবং তাকে চ্যালেন্জ করে বসলো।

    অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সামরিক অফিসার এবং দর্শকবৃন্দ। তারা ভেবে পেল না, মরু বেদুঈনের পোষাক পরা এই বুদ্দু কেন মরতে যাচ্ছে।

    কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক তাকে পাগল ভেবে মাঠ থেকে সরাতে গেল, কিন্তু সে তাদের উপেক্ষা করে বুক টান করে দাঁড়িয়ে গেল সেই অশ্বারোহীর বিরুদ্ধে। দর্শকদের মধ্য থেকে কেউ কেউ চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘মরতে দাও পাগলটাকে। আমরা ওর খেলা দেখতে চাই।’

    অগত্যা স্বেচ্ছাসেবকরা ফিরে গেল। কিন্তু অশ্বারোহী তার চ্যালেন্জ গ্রহন না করেই ফিরে যাচ্ছিল। এ সময় সেই নাইটের বন্ধুদের মধ্য থেকে কোন একজন অফিসার চেঁচিয়ে বলল, ‘এক বুদ্দুর চ্যালেন্জ গ্রহন না করেই ফিরে যাচ্ছ কেন? ওকে লড়াই করার স্বাদ একটু চাখতে দাও। ওকে বর্শার আগায় গেঁথে নিয়ে এসো।’

    অন্য একজন বললো, ‘সে তোমাকে অপমান করেছে। আমরা চাই তুমি এই অপমানের প্রতিশোধ নাও।’

    ‘তুমি এক বুদ্দুকে ভয় পেলে নাকি? পালাচ্ছ কেন?’

    এবার ফিরে দাঁড়াল অশ্বারোহী। মাঠের মাঝামাঝি থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে মামুলি গতিতে ইসহাকের দিকে এগিয়ে গিয়ে বর্শা দিয়ে তাকে গাঁথতে গেল। কিন্তু একপাশে সরে গিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে নিল ইসহাক।

    দর্শকরা হাততালি দিতে গিয়েও গুটিয়ে নিল হাত। অশ্বারোহী আবার ঘোড়া ছুটিয়ে মাঠের মাঝখানে চলে গেল। এবার বেশ জোরেই ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে এলো ইসহাকের দিকে। কিন্তু এবারও অপূর্ব দক্ষতায় আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হল ইসহাক।

    অশ্বারোহী এবার ক্ষেপে গেল। সে ঘোড়া মধ্য মাঠে নিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ছুটে এল ইসহাকের দিকে। ইসহাকের কাছে এসেই সে বর্শার আঘাত হানলো ইসহাকের গায়ে। ইসহাক খপ করে বর্শা চেপে ধরে এমনভাবে ঘোড়ার সাথে দৌড়ে গেল যে, লোকজন ভাবল, বর্শাবিদ্ধ হয়েই সে ঘোড়ার সাথে ছুটছে।

    লোকজন উল্লাসে ফেটে পড়ে হাততালি দিয়ে উঠল। কিন্তু সে কেবল ক্ষনিকের জন্য। মুহূর্তেই ওরা দেখল, বর্শার হেঁচকা টান খেয়ে অশ্বারোহী মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।

    ইসহাক বর্শা মাটিত বিদ্ধ করে রেখে এগিয়ে গিয়ে তাকে টেনে তুলল। অশ্বারোহী উঠেই তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল করমর্দের জন্য। ইসহাক তার হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বললো, ‘সত্যি আমি লড়তে চাই। আমাকে একটি ঘোড়া ও বর্শা দাও।’

    অশ্বারোহীর ইঙ্গিতে এক স্বেচ্ছাসেবক তার জন্য ঘোড়া ও বর্শা নিয়ে এলো। দর্শকরা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগল খেলার চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য।

    উভয়ে খেলার নিয়ম অনুসারে মাঠের দুই প্রান্তে চলে গেল। একদিকে শিরস্ত্রান ও বর্ম পরিহত এক নাইট, অন্যদিকে আত্মরক্ষার ন্যুনতম সুবিধা বঞ্চিত এক বেদুইন। দর্শকরা নিশ্চিত ছিল, এই গ্রাম্য লোকটির আজ অবধআিত মৃত্যু ঘটবে।

    খেলা শুরু হল। সংকেত পাওয়ার সাথে সাথেই দু’জন ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। নাইট ইসহাকের কাছকাছি হয়েই তার পেট বরাবর বর্শা দিয়ে আঘাত করলো।

    ইসহাক কৌশলে ঘোড়ার ওপর শুয়ে পড়ে সে আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে সামান্য এগিয়েই ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে ফিরে এলো। নাইটও আবার হামলা করার জন্য ছুটে এল তার দিকে। কিন্তু ইসহাকের ক্ষিপ্রতার কাছে হার মানতে হলো তাকে।

    ইসহাক দ্রুত ছুটে এসে নাইটের পাঁজরে আঘাত করলো। বর্ম থাকায় নাইট তাতে বিদ্ধ হলো না ঠিক, কিন্তু বর্শার প্রচণ্ড ধাক্কা সে ঘোড়া থেকে পড়ে গেল।

    নাইটের একটি পা রেকাবে আটকা পড়ে গিয়েছিল। ফলে ঘোড়া তাকে টেনে নিয়েই ছোটে যাচ্ছিল। যদি নাইটের গায়ে বর্ম না থাকত তবে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে যেতো।

    ইসহাক চকিতে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নাইটের এ অবস্থা দেখে ছুটে গেল তার কাছে। তারপর ছুটন্ত ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে তাকে থমিয়ে দিল। এরপর ইসহাক লাফিয়ে নেমে নাইটকে টেনে তুলল।

    নাইট উঠে দাঁড়িয়েই তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। বললো, ‘সত্য করে বলো তো, তুমি কে?’

    ইসহাক বললো, ‘আমি মুসলিম এলাকা থেকে পলাতক এক খৃস্টান। নাম রবার্ট।’

    ‘তুমি কি করো?’

    ‘এখন কিছু করিনা। তবে আমি মুসলমানদের সেনাবাহিনিতে ছিলাম। আমাদের এলাকায় মুসলমানদের আধিপত্য ছিল। তারা আমাকে এবং আমার মত অন্যান্য খৃস্টান যুবকদের জোর করে সেনাবাহীনিতে ভর্তি করে নিয়েছিল।

    ট্রেনিং শেষে যখন আমাদেরকে খৃস্টান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বলা হলো তখন এক রাতে আমি সেখান থেকে পালিয়ে দেশান্তরী হলাম।

    এ ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিলা না। একজন নিষ্ঠাবান খৃস্টান হয়ে স্বজাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলনা। আবার সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে দেশে থাকারও কোন উপায় ছিল না।’

    ‘এখানে কি করছো?’

    ‘এখনো কিছ করছি না। চাকরীর সন্ধানে আছি। কোথাও রুজি-রোজগারের সামান্য ব্যবস্থা করতে পারলেই দেশ থেকে বিবি বাচ্চাদের নিয়ে আসবো ভাবছি।’

    এই নাইট ছিল সম্রাট বিলডনের সামরিক বিভাগের এক প্রভাবশালী অফিসার। খৃস্টান সামরিক বাহিনীতে নাইট একটি সম্মানিত খেতাব। যারা এই খেতাব অর্জন করে, সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে তারা পায় বিশেষ ধরনের শিরস্ত্রান ও বর্ম। সামরিক বাহিনীর অধিনায়ক তাদের মধ্য থেকেই নির্বাচন করা হয়।

    এসব নাইটরা হয় সাহসী ও বীর যোদ্ধা। সাধারন খৃস্টানরা নাইটদের যেমন অতি সম্মানিত মনে করেন তেমনি সম্রাটও তাদের যথেষ্ট মূল্য দেন। তারা কোন ব্যাপারে মতামত দিলে সম্রাট তাকে যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে নেন, এমনকি কখনো কখনো নিজের মতামত পরিবর্তন করে তাদের পরামর্শ গ্রহন করে নেন।

    ইসহাক তুর্কী বর্ম ও শিরস্ত্রান ছাড়াই এক নাইটকে পরাজিত করায় তার সামরিক যোগ্যতা সম্পর্কে নাইট উচ্চ ধারনা করতে বাধ্য হলো। পৃথিবী চিরকালই বীরভোগ্যা। তাছাড়া সে নাইটকে ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছে। তাই নাইট তাকে সহজেই বন্ধু হিসাবে গ্রহন করে বললো, ‘চলো, আজ থেকে তুমি আমার মেহমান।’

    নাইট তাকে তার বাড়ীতে নিয়ে গেল। সেখানে তার প্রচুর আপ্যায়ন হলো। খাওয়া দাওয়ার পর নাইট নতুন বন্ধুর জন্য উৎকৃষ্ট মদ ও মদের পাত্র নিয়ে হাজির হলো ইসহাকের সামনে।

    মুসলমান গোয়ন্দাদের জন্য এটা এক মহা সমস্যা। খৃস্টান অঞ্চলে গিয়ে প্রয়োজনের খাতিরেই তাদেরকে খৃস্টান সাজতে হয়। উর্ধতন সামরিক ও বেসামরিক লোকদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। সমাজের উচ্চ শ্রেণীর সাথে মেলামেশা করতে হয়। এদের কাছে মদ পানির মতই নির্দোষ পানীয়।

    খৃস্টান সমাজে মেহমানদারীর অপরিহার্য অনুসঙ্গ মদ। কিন্তু ইসলামে মদ হারাম। তাই কোন সচেতন মুসলমান মদ স্পর্শও করতে পারেনা। আবার মদ পান না করেও এমন পরিবেশে আত্মরক্ষা করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

    এমন জটিল পরিস্থিতিতে পড়ে অনেক গোয়েন্দাকেই নানা রকম টালবাহানার আশ্রয় নিতে হয়। অনেকে আবার টালবাহানা করতে গিয়ে ধরাও পড়ে যায়। কারন খৃস্টানরা জানে, নিষ্ঠাবান মুসলমানেরা কখনও মদ পান করেনা। কেউ মদ পান করতে অস্বীকৃতি জানালে ওরা সহজেই বুঝে ফেলে, এ লোক মুসলমান।

    বিষয়টি একবার সুলতান আইয়ুবীর গোচরে আনা হয়। সুলতান বললেন, কোন হারাম জিনিসকে হালাল করার সাধ্য আমার নেই। গোয়েন্দা বলেই কাউকে আমি মদ পান করার অনুমতি দিতে পারি না। একবার মদ পান করতে শুরু করলে পরে তা অভ্যসে পরিনত হয়ে যায়। মদ মানুষের স্বাভাবিক বিবেক বুদ্ধি লোপ করে দেয়। তাই গোয়েন্দাদের কঠোরভাবে মদ থেকে দূরে থাকতে হবে। তবে জীবনের আশঙ্কা দেখা দিলে সে যদি ততটুকু পান করে, যতটুকু পান করলে জীবন রক্ষা পায় তাহলে হয়তো আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিতেও পারেন।’

    ইসহাক তুর্কী এমনি এক সমস্যায় পড়ে গেল। কিন্তু সে ছিল মজবুত ঈমানের অধিকারী। তাই মদের পেয়ালা হাতে না নিয়ে সে কৌশলের আশ্রয় নিল। বললো, ‘আপনি তো আমার শক্তি ও কৌশল দেখেছেন। এর মূল কারন, আমি মদ পান করি না। আমার ওস্তাদ আমাকে বলেছিলেন, ‘যেদিন তুমি মদ স্পর্শ করবে সেদিনই এ শক্তি ও কৌশল থেকে তুমি বঞ্চিত হবে। তোমার ঘোড়া অনুভব করবে, তার ওপর বসে আছে এক দুর্বল সওয়ারী। তখন ঘোড়া তোমার আদেশ মানতে শৈথিল্য দেখাবে।’

    ইসহাক তার গলায় ঝুলানো ক্রুশটি টেনে বের করে তাতে চুমু খেয়ে বললো, ‘আমি এই ক্রুশ ছুঁয়ে সেদিন শপথ করেছিলাম, জীবনে আর কখনো মদ পান করবো না। সেই থেকে মদ পান আমি ছেড়ে দিয়েছি। দয়া করে আমাকে আমার শপথ থকে সরে দাঁড়াতে অনুরোধ করবেন না।’

    ‘তুমি কোথায় থাকো?’

    ‘এখনো কোন নির্দিষ্ট ঠিকানা জোগাড় করতে পারিনি। প্রভু সহায় হলে অচিরেই কোথাও ঠিকানা একটা জোগাড় করে নিতে পারবো আশা করি।’

    প্রভু তোমার সহায় আছেন। ঠিকানা নিয়ে আর তোমাকে ভাবতে হবে না। তোমার চাকরীর জিম্মা আমি নিচ্ছি।’

    ‘কিসের চাকরী?’ জানতে চাইল ইসহাক।

    ‘তোমাকে আমাদের সেনা বাহিনীতেই দিতে পারতাম। কিন্তু আমি তা দেব না। আমি তোমাকে আমার বন্ধু এবং রক্ষী হিসাবে চাই।’

    ‘এ তো আমার জন্য এক অভাবিত ব্যাপার! আপনার অশেষ মেহেরবানী যে, আপনি আমাকে আপনার সঙ্গ পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।’

    ‘মেহেরবানী বলছো কেন আমাদের মত নাইটদের একাধিক বডিগার্ড রাখার অনুমতি আছে। কিন্তু সজ্জন ব্যক্তির অভাবে এতদিন আমি এক বডিগার্ড দিয়েই কাজ চালিয়ে এসেছি। আমি তোমার মত গুনীর উপযুক্ত সম্মান দিতে চাই। তুমি রাজি থাকলে তুমিই হবে আমার বিশ্বস্ত সহচর ও রক্ষী।

    তোমার থাকা খাওয়া এবং উপযুক্ত বেতন ভাতার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব আমার।’

    ‘আপনার মত গুনী ব্যক্তির সান্বিধ্যে থাকতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করবো।’

    এভাবেই বৈরুতে ইসহাক তুর্কীর কাজের যাত্রা শুরু হয়।

    সে যুগটা ছিল যোদ্ধাদের। ইসহাকের মত বীর যোদ্ধার কদর ও সম্মান ছিল সর্বত্র। নাইট খুব খুশির সাথেই তার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল। তাকে দিল তেজস্বী আরবী ঘোড়া। দিল প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্র ও সরঞ্জাম। নির্ধারন করলো তার যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন-ভাতা, যেন এ নিয়ে তার মনে কোন খেদ না থকে।

    এবার ইসহাক তুর্কীর যোগ্যতা প্রদর্শনের পালা। আল্লাহ তাকে দান করেছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, দূরন্ত সাহস আর চমৎকার মেধা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা। তার অমায়িক ব্যবহার, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও দুর্বার সম্মোহনী শক্তি দু’দিনেই সেই নাইটকে ইসহাকের বিশ্বস্ত ও অনুগত বানিয়ে দিল। এবার নিজের কাজে মন দিল ইসহাক।

    ‘আমার শুধু একটিই আশা।’ একদিন রাতে কথাচ্ছলে সে নাইটকে বললো, ‘মুসলমানদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস যেমন আজ আমাদের দখলে তেমনি তাদের পবিত্র কাবাঘরও যদি আমরা দখল করে নিতে পারতাম! সারা দুনিয়া জয় করার চেয়েও এটা আমার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একবার কাবায় ক্রুশের আধিপত্য কায়েম হলে দুনিয়া হতে ইসলাম এমনিতেই বিলীন হয়ে যাবে।’

    ‘তুমি এক বিরাট স্বপ্নের কথা বলেছ বন্ধু। প্রতিটি ক্রুসেডারের মনেই হয়তো কখনো কখনো এ স্বপ্ন তার চিন্তার অগোচরেই জেগে উঠে।’ নাইট বললো, ‘কিন্তু এ স্বপ্ন সফল করা খুব সহজ নয়। মুসলমানদের পরাজিত করা কতটা কঠিন সে অভিজ্ঞতা তোমার নেই, থাকলে এমন কথ বলতে না। কাবায় ক্রুশের পতাকা উড়ুক আমিও চাই। কিন্তু কাবায় আঘাত হানা আর ভিমরুলের চাকে ঢিল ছোঁড়া একই কথা। তুমি জানো না, কাবায় আঘাত হানলে শুধু আরবের মুসলমানরা নয়, সারা দুনিয়ার মুসলমান ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে আমাদের ওপর। এমন স্বপ্ন-বিলাস থাকা ভাল, তবে তা কোথাও প্রকাশ করো না।

    আমরা সবাই মিলে যেখানে এক সালাউদ্দীন আইয়ুবীকেই পরাজিত করতে পারছিনা, সেখানে সারা দুনিয়ার মুসলিম শক্তিকে ক্ষেপিয়ে তোলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আপাতত এসব ভাববিলাস বাদ দিয়ে আইয়ুবির ব্যাপারটা ফায়সালা করো।’

    ‘আপনারা এখনো মান্ধাতার আমলের ধ্যান-ধারনা নিয়েই বসে আছেন।’ ইসহাক তুর্কী বললো, ‘মুসলমান সমাজের বর্তমান চিত্র জানা থাকলে এমন কথা বলতেন না। এখন আর মুসলমানদের মধ্যে সেই ঐক্যের বাঁধন নেই, যা তাদেরকে অপারাজেয় করে রেখেছিল। সেই ঈমানও নেই, যে ঈমান তাদের নিরাপত্তা ও জামিনের রক্ষাকবচ। আমাদের গোয়েন্দারা প্রটিতি মুসলমানের বিবেক থেকে ঈমানের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাদের বুক ঝাঝরা করে দিয়েছে। খোলস ছাড়া তার ভেতরে কোন প্রানের স্পন্দন নেই।

    কেন, হলবের শাসক ইয়াজউদ্দীন আর মুসেলের শাসক ইমামউদ্দিন কি আমাদের বন্ধু নয়? আমাদের সামান্য সহযোগিতা করার সুযোগ পেলে তারা কি নিজেদের ধন্য মনে করবে না? আমি বর্তমান মুসলিম সমাজের যে ছবি দেখে এসেছি তা যদি আপনাকে বলি আপনি তাজ্জব হয়ে যাবেন। লোভ, লালসা ও পরচর্চায় তারা এমন মশগুল যে, আপনি যদি কাউকে নিজের ভাইয়ের বুকে ছুরি চালাতে বলেন, তাতেও সে রাজি হয়ে যাবে। তাহলে শুনুন, তারা কতটা অধপাতে নেমেছে।’

    ইসহাক তুর্কী নাইটের সামনে মুসলিম সমাজের এমন এক ছবি তুলে ধরলো যে, নাইট বিস্মিত হয়ে বললো, ‘বলো কি?’

    ইসহাক তুর্কী বললো, ‘এ জন্যই তো আমি কাবাঘর দখলের স্বপ্ন দেখি। আপনি যদি আমার পরিকল্পনার কথা শোনেন তাহলে আর আমাকে পাগল ভাববেন না।’

    ‘শুনি তোমার সেই উর্বর পরিকল্পনাটা কি?’

    ইসহাক তার সামনে এক অভাবিত পরিকল্পনা পেশ করলো। এ এমন এক পরিকল্পনা, যা কেবল কোন জেনারেল পেশ করলেই মানায়।

    ইসাহকের কথায় নাইটের জবান খুলে গেল। নাইট ভাবল, যে পরিকল্পনা আমরা একদল নাইট দীর্ঘদিন বসে বসে সম্মিলিতভাবে করেছি, সেই রকম একটি পরিকল্পনা যে রক্ষী গল্প করতে করতে বলে ফেলতে পারে তাকে অবশ্যই শ্রদ্ধা জানাতে হয়।

    নাইট তার পরিকল্পনা ও পরামর্শ শুনে তাজ্জব হয়ে বললো, ‘তুমি আমাকে অভিভুত করার মত বুদ্ধি রাখো। আমরা তো এমন একটা পরিকল্পনার কথায় ভাবছিলাম, যার সাথে তোমার চিন্তা ও সংকল্প হুবহু মিলে যাচ্ছে।’

    তাহলে আর দেরী করবেন না। সালাউদ্দিন আইয়ুবীর মত কমাণ্ডো বাহিনী গঠন করুন। ইসলামের উঁচু মাথা ভোতা করে দেয়ার এটাই উপযুক্ত সময়।’

    ‘ঠিক আছে, বিষয়টি নিয়ে আমি সম্রাট বিলডনের সাথে কথা বলে দেখি।’

    ‘এখানে আর দেখাদেখির কিছু নেই। আমার কথাটা একটু গুরুত্বের সাথে বুঝার চেষ্টা করুন।’ ইসহাক বললো, ‘আমার হাতে একটি কমাণ্ডো বাহিনী দিন আমি মুসলমানদের সামরিক ঘাঁটির অবস্থান জানি। জানি কোথায় রাখে তারা যুদ্ধের অস্ত্র ও সরঞ্জাম। আমি তাদের খাদ্য গুদামের খবর জানি। ঘোড়ার আস্তাবল চিনি। এদিকে যেদিন যুদ্ধ শুরু হবে তার পরের দিন শোনবেন তাদের খাদ্য, অস্ত্রসম্ভার ও বাহনাদি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’

    ‘হ্যাঁ, এমনটিই করা হবে।’ নাইট বললো, ‘আমরা তোমাকে সুযোগ দেবো।’

    ❀ ❀ ❀

  • দুর্গম পাহাড়

    দুর্গম পাহাড়

    দুর্গম পাহাড়

    খৃস্টান সম্রাট বিলডনের দরবার। সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর মিত্র ইয়াজউদ্দিন মাসুদের দুই দূত কথা বলছিল সম্রাটের সাথে।

    ‘আপনি দেরী না করে দামেশকে অভিযান চালান। আইয়ুবী এখন দামেশক থেকে অনেক দূরে। আর দামেশক হচ্ছে আইয়ুবীর শক্তি ও ক্ষমতার মূল ঘাঁটি। আইয়ুবীর ওপর চুড়ান্ত আঘাত হানার এটাই মোক্ষম সময়।’

    দূতের পরামর্শ শুনে সম্রাট বিলডন বললেন, ‘কিন্তু যদি আমি রওনা হওয়ার আগেই সুলতান আইয়ুবী দামেশকের দিকে রওনা হয়ে যান।’

    ‘এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ইয়াজউদ্দিন মাসুদ সুলতানকে আটকে রাখার জন্য সম্ভাব্য সব কিছুই করবেন, যাতে আপনি সহজেই দামেশকে ছুটে যেতে পারেন।’

    এ কথায় সম্রাট বিলডন খামোশ মেরে গেলেন। গভীর চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো তাঁর চোখে মুখে। তিনি খানিক চিন্তা করে বললেন, ‘সুলতান আইয়ুবীর কাছে দামেশকের কর্তৃত্ব হারানো আর আত্মহত্যা করা এক কথা। এ অবস্থায় নিশ্চয়ই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি নিতেও দ্বিধা করবেন না। দুর্বলও যখন বুঝতে পারে, লড়াইটা তার জীবন মরণের প্রশ্ন তখন সে কতটা মরিয়া হয়ে উঠতে পারে, তোমরা না জানলেও আমি তা জানি। জেনে শুনে আমি সাপের ছোবল খেতে যাবো কেন?’

    দূত বললো, ‘এ ব্যাপারেও আমাদের মধ্যে আলাপ হয়েছে। ইয়াজউদ্দিন মাসুদ আপনাকে জানাতে বলেছেন, যখন সুলতান আইয়ুবী নাসিবা থেকে রওনা হবেন তখন থেকেই আমরা আমাদের কাজ শুরু করে দেবো।’

    দূত আরো বললো, ‘আমরা তার সাথে প্রকাশ্য লড়াইয়ে আপাতত যেতে পারবো না। তবে তিনি রওনা হওয়ার পর প্রতি রাতেই হলব ও মুশেলের বাহিনী তার ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালাবে। এ ব্যাপারে সতর্কতার সাথে আমরা এখনই কাজ শুরু করে দিয়েছি। আমাদের প্রস্তুতি প্রায় শেষ।’

    দূতের এ উদ্দীপনাময় বক্তব্য শুনেও সম্রাট খুব বেশী আশান্বিত হতে পারলেন না। বললেন, ‘তোমাদের ছিটেফাটা হামলায় তিনি কাবু হয়ে যাবেন এমনটি মনে করার কোন কারণ আছে?’

    ‘সম্রাট, আমরা মোটেও-ছিটেফাটা হামলা চালাবো না। আমি আপনাকে এতটুকু নিশ্চয়তা দিতে চাই, যখন তিনি দূর থেকে দামেশকের মিনারের চূড়া দেখতে পাবেন তখন তার বাহিনী আর যুদ্ধ করার মত অবস্থায় থাকবে না।’

    দূত তাকে আশ্বস্ত করে বললো, ‘তিনি দামেশক পৌঁছার আগেই আমাদের কমাণ্ডোো আক্রমণ তার কোমর ভেঙে দেবে। আপনি এমন এক শত্রুর সাথে লড়বেন, যার চোখে থাকবে আগুনের স্ফুলিঙ্গ, কিন্তু হাত দু’টো থাকবে শিথিল আর দাঁড়িয়ে থাকার জন্য তিনি তালাশ করবেন সামান্য অবলম্বন।’

    ‘হলব এবং মুশেলের অবস্থা জানলাম। কিন্তু বিভিন্ন পরগণার ছোট ছোট মুসলিম রাজ্যগুলোর অবস্থা কি? তাদের আমীররা কি লড়াই শুরু হলে আমাদের পক্ষ নেবে, না আইয়ুবীর?’

    ‘তাদেরকে আমরা এ কথা বুঝানোর চেষ্টা করছি যে, আইয়ুবীর হাত থেকে বাঁচার জন্য আমাদের সবাইকেই একজোট হয়ে চেষ্টা করতে হবে। নইলে সে আমাদের সবাইকে গিলে ফেলবে। আপনি চিন্তা করবেন না, তারা আমাদের সঙ্গেই থাকবেন।’

    সম্রাট যেন তাদের কথায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও এ প্রস্তাব মেনে নিচ্ছেন এমন একটি ভাব নিয়ে বললেন, ‘আমাদের কিছু ফৌজ কি তোমাদের সাথে দিয়ে দেবো, যাতে কমাণ্ডোো অভিযানের সময় তারা তোমাদেরকে সহায়তা করতে পারে? আমাদের দক্ষ কমাণ্ডোোরা তোমাদের সাথে থাকলে তোমাদের হামলা অনেক বেশী কার্যকর হবে। আইয়ুবী তখন চোখে সর্ষে ফুল দেখবে।’

    ‘আপনার প্রস্তাবটি উত্তম, কিন্তু এখানে একটু সমস্যা আছে। আপনার সৈন্যদের মুশেলে অবস্থান করার অনুমতি দিলে এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, আমরা আপনার সাথে কোন চুক্তিতে আবদ্ধ আছি। কিন্তু আমরা তো সুলতান আইয়ুবীকে এই ধোঁকায় ফেলে রেখেছি যে, আমরা তার বন্ধু।’

    দূতরা যখন এসব আলাপ করছিল তখন সম্রাট বিলডনের সঙ্গে তার দু’জন জেনারেল সেখানে উপস্থিত ছিল। ইয়াজউদ্দিনের এই দূতরাও ছিল সামরিক ব্যক্তিত্ব। যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে তারা ছিল অভিজ্ঞ। তারা এমনভাবে কথা বলছিল, যেন মুশেলকে নিরাপদ রেখে বিলডনকে আইয়ুবীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া যায়।

    দূতের জবাব শুনে সম্রাট বিলডন বুঝলেন, এই মুসলমানরা আইয়ুবীর বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে তার সাহায্য চাইছে। তিনি নিজেও আইয়ুবীর বিনাশ চান। অতএব এ মুহূর্তে একটি অভিযান চালালে মন্দ হয় না। কিন্তু তিনি মনের ভাব গোপন করে দূতদের কাছে এ ব্যাপারে তার শর্ত আরোপ করতে শুরু করলেন।

    ‘তোমাদের কথায় মনে হচ্ছে, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর রণকৌশল ও যোগ্যতা সম্পর্কে তোমাদের পরিপূর্ণ ধারনা নেই। তোমরা ভাবছো, কমাণ্ডোো আক্রমণ করে তোমরা তাকে নাজেহাল করতে পারবে। কিন্তু তার কমাণ্ডোো বাহিনী সম্পর্কে আমার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে।’

    তিনি বললেন, ‘আমি জানি, তারা কতটা ক্ষিপ্র ও দুর্দান্ত। তাকে রাতের অন্ধকারে হামলা করে কিছুই করতে পারবে না তোমরা। তার কমাণ্ডোো বাহিনীর জাল ভেদ করে মূল বাহিনীর কাছেও পৌঁছতে পারবে না।’

    সম্রাট বিলডন আরো বললেন, ‘আমি যদি দামেশক অবরোধ করি তবে তিনি বজ্রবেগে ছুটে এসে আমাদের ওপর আক্রমণ চালাবেন। এমতাবস্থায় দামেশকে অভিযান চালানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

    তোমরা জানো না, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কাছে হাতের তালুর মতই যুদ্ধের সমস্ত ময়দান স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। তিনি আমাদের পরিকল্পনার খবর আমরা পরিকল্পনা নেয়ার সাথে সাথেই পেয়ে যান। তিনি ঈগল ও শকুনের মত বহু দূর থেকে শিকার দেখতে পান এবং সেখানে এমনভাবে ঝাপটা মারেন যে, তখন পিছু হটাও অসম্ভব হয়ে উঠে। আমি এমন আত্মঘাতি যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে পারি না।’

    ‘কিন্তু মহামান্য সম্রাট।’ দূত মরিয়া হয়ে বললো, ‘আইয়ুবী তার জীবনের সবচেয়ে নাজুক সময় অতিক্রম করছেন এখন। এভাবে বসে থাকতে দিলে সে আবারও সিংহের ন্যায় শক্তিশালী হয়ে উঠবে। সে আমাদের জন্য যেমন বিপদের কারণ, আমরা মনে করি আপনার জন্যও সে তেমনি বিপদজনক শক্র। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে তিনি আবারও বৈরুত অবরোধ করবেন, এতে আমাদের কোন সন্দেহ নেই। আপনি কি তাকে আবারও সেই সুযোগ দিতে চান?’

    ‘না, তা চাই না।’ তিনি বললেন, ‘এ জন্য আমি আমার মত করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নিচ্ছি। তাহলে তোমাদের বলি, আইয়ুবী যেন শান্তিতে থাকতে না পারে সে জন্য আমি আমার কমাণ্ডোো বাহিনীকে নাসিবা অভিমুখে পাঠিয়ে দিয়েছি। তারা সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যদেরকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। এই বাহিনীর জন্য একটা মজবুত আশ্রয় দরকার। সেটা যদি তোমরা ব্যবস্থা করতে পারো তবে আমি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সৈন্য বাহিনীকে এই কমাণ্ডোো বাহিনী দিয়েই অস্থির করে রাখতে পারবো। তারা তখন আর যুদ্ধ করার যোগ্য থাকবে না।’

    তিনি বললেন, ‘তোমরা আমাদের বাহিনীকে আশ্রয় দান করবে, সাহায্য ও খাদ্য সরবরাহ করবে। আর আমি অস্ত্র ও যুদ্ধের সামগ্রী সরবরাহ করতে থাকবো।

    তোমরা হলবের আমীর ইমামউদ্দিনকেও বলে দেবে, সে যেন আমার উপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখে। আমার কমাণ্ডোো বাহিনীকে যেন সময় মত আশ্রয় ও সাহায্য দেয়। অন্যান্য দুর্গাধিপতি যারা আছে তাদের দিকে লক্ষ্য রাখবে যেন তারা কেউ সুলতান আইয়ুবীর সাথে গিয়ে যোগ দিতে না পারে।’

    সম্রাট বিলনের সাথে ইয়াজউদ্দিন মাসুদের দূতদের শর্ত পাকা হয়ে গেল। ইয়াজউদ্দিন মাসুদ তার দূতদের শর্ত পাকা করার সমস্ত অধিকার দিয়ে দিয়েছিল। পাঠানোর সময় সে তাদের বলেছিল, ‘যেভাবেই হোক সম্রাটের সাথে শর্ত পাকা করে আসবে। যদি ওরা কোন সুবিধা দাবী করে, মেনে নিও। এ মুহূর্তে ওদের সাহায্য আমাদের বিশেষ দরকার।’

    সম্রাট বললেন, ‘তাহলে তোমাদের সাথে কথা পাকা হয়ে গেল, কি বলো? এবার গিয়ে আনন্দ করো। আমাদের পরীরা নতুন মেহমান পেলে খুব খুশী হয়। বিশেষ করে মুসলমান মেহমানদের পেলে নাকি তাদের আনন্দের অন্ত থাকে না।’

    সুতরাং তারা তাদের ঈমান এক খৃস্টান সম্রাটের কাছে শুধু এ জন্য বন্ধক রেখে দিল, যাতে তাদের রাজ্যটা নিরাপদ থাকে।

    সম্রাটের কামরা থেকে বেরিয়ে এলো ওরা। ওদের সামনে তখন খুলে যাচ্ছিল পতনের অতল তলে হারিয়ে যাওয়ার সব দরজাগুলো।

    কামরা থেকে বেরিয়ে এলো দূত দু’জন। ওদের চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক। মিশন সফল হওয়ার আনন্দকে মধুরতর করার জন্য ওরা পা বাড়াল সেই পানশালার দিকে, যেখানে একটু আগে ডানাকাটা পরীরা তাদের মদ পরিবেশন করছিল। মদের চাইতে সেই নারীরাই যেন বেশী নেশা উদ্রেককারী।

    ‘এই মুসলমানদের উপর বেশী বিশ্বাস করবেন না!’ সম্রাট বিলডনকে তার এক জেনারেল বললো, ‘কারণ এই মুসলমানরা বিশ্বাসঘাতক। এখন যেমন আপনার সমস্ত শর্ত ওরা মেনে নিয়েছে তেমনি যখন প্রয়োজন মনে করবে আপনার অজ্ঞাতেই সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর পায়ের উপর গিয়ে লুটিয়ে পড়তেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না।’

    ‘আমার কমাণ্ডোো বাহিনীর জন্য একটা আশ্রয়স্থল প্রয়োজন ছিল।’ সম্রাট বিলডন বললেন, ‘যদি মুশেলে আমি সেই আশ্রয় পেয়ে যাই তবে ধীরে ধীরে আমার সমস্ত সৈন্য সেখানে নিয়ে জড়ো করবো। তারপর সুযোগমত ইয়াজউদ্দিনকে সেখান থেকে বিতাড়িত করে আগে মুশেল দখল করবো। এরকমই হওয়া উচিত আমাদের সকলের পরিকল্পনা। মুসলমানদের আমরা কখনো ঐক্যবদ্ধ হতে দেবো না। তাদের পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধিয়ে রাখবো এবং সুযোগ পেলেই টপ করে গিলে ফেলবো ছোটখাট রাজ্যগুলো। এভাবেই ধীরে ধীরে মুসলমানদের এলাকাগুলো অধিকার করে নিতে হবে আমাদের।’

    ‘আপনার পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে উত্তম। আমরা তো দেখতেই পাচ্ছি, মুসলমানরা সুখ সুবিধা ও আমোদ ফুর্তিতে মত্ত। শাসক হওয়ার লোভে তারা অন্ধ। তারা তাদের ব্যক্তিত্ব, তাদের ধর্ম সব আপনার পায়ের তলায় রেখে দিতে কুণ্ঠাবোধ করবে না যদি আপনি তাদের আস্থায় রাখতে পারেন। তারপর সুযোগমত তাদের গিলে ফেলা আপনার জন্য কোন ব্যাপার হবে না।

    ইয়াজউদ্দিন বলো আর ইমামউদ্দিন বা ছোট ছোট মুসলিম ওমরারা, তারা শুধু এ জন্যই সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে রয়েছে, যাতে সবাই আপন আপন এলাকার শাসক হয়ে আরাম আয়েশে দিন কাটাতে পারে। তারা ঝামেলা ও বিপদ থেকে মুক্ত থাকতে চায়।

    কিন্তু সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী আরাম আয়েশে রাজত্ব করতে অভ্যস্ত নন। তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে সবাইকে এক রণক্ষেত্রে এনে ফিলিস্তিন থেকে আমাদের বিতাড়িত করতে চান। এই পরিকল্পনা নিয়েই তিনি মাঠে নেমেছেন। কিন্তু যাদের তিনি ঐক্যবদ্ধ করতে চান তারা এত বড় যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে ভয় পায়। আমি এই ভয়কে পুঁজি করেই তাদেরকে আইয়ুবীর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবো।’

    তিনি সেই জেনারেলের দিকে ফিরে বললেন, “তোমার মত আমিও মুসলমানদের বিশ্বাস করি না। যদি বুঝি তারা আমার আশ্রয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছে, আমি তাদের সে চিন্তা সফল হতে দেবো না। ইয়াজউদ্দিন ও ইমামউদ্দিন বা তাদের কোন সাথী যদি এমন চিন্তা করে তবে আমার হাশিশ বাহিনী তাদের ফয়সালা করবে। হাশিশ বাহিনীর হাতে যে মরণ-বিষ আছে তাদের হত্যা করার জন্য তার তিল পরিমাণই যথেষ্ট।’

    বিলডন তার জেনারেলদের বললেন, ‘ইয়াজউদ্দিনের এই দূত দু’জনকে এমন খাতির যত্ন করো যেন তাদের বুদ্ধি জ্ঞান সব লোপ পেয়ে যায়। তাদের যেন স্মরণই না থাকে তাদের একটা ধর্ম আছে। জীবনকে ভোগ করার চিন্তাই হবে তাদের একমাত্র ধর্ম।’

    তিনি জেনারেলদের আরো কিছু নির্দেশ দিলেন এবং তাদের সতর্ক করে দিয়ে বললেন, ‘এসব কথা গোপন রাখবে। এই কামরায় দূতদের সাথে যে আলোচনা হলো সে কথা যেন কখনো বাইরে না যায়।

    সব সময় মনে রাখবে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর গোয়েন্দারা বৈরুতে বসে নেই। তারা নিশ্চয়ই গোপন খবরের আশায় মহলের চারপাশে ঘুর ঘুর করছে। চাই কি এই মহলেও তাদের চর থাকতে পারে, যাদের আমরা সনাক্ত করতে পারিনি।’

    দূত দু’জন তখন মদ ও মেয়েদের নিয়ে ফুর্তিতে মশগুল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তারা মদের নেশায় অজ্ঞান ও বিবেকশূন্য হয়ে পড়লো। এই বিবেকহীন দূতকে নিয়ে খেলছিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দুই তরুণী। কলের পুতুলের মতই তখন তারা দুই তরুণীর ইচ্ছা অনিচ্ছার জালে বন্দী।

    অন্যান্য মেহমানরাও এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে মদ পান করছিল। কেউবা পান করছিল যুবতীদের রূপসুধা।

    মাহফিলের নিমন্ত্রিত মেহমানরা যখন খোশগল্প ও পানাহারে মশগুল জ্যাকব তখন হন্যে হয়ে খুঁজছে সেই দূতদের। সম্রাটের দরজার সামনে বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে রক্ষীদের কাছে বিষয়টি প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়াবে ভেবে ওখান থেকে সরে এসেছিল সে। তারপর অপেক্ষা করছিল তাদের বেরিয়ে আসার। কারণ সে জানে, ওরা সম্রাটের কাছে বসে থাকতে আসেনি। মিশন শেষ করে এক সময় তাদের বেরোতেই হবে।

    দূতরা কখন সম্রাটের কামরা থেকে বেরিয়ে আসবে জানা নেই তার। তাই সে মাহফিলের সবখানেই নজর রাখার সিদ্ধান্ত নিল। মাহফিলের মূল চত্বর ছাড়াও মেহমানদের বিশ্রামের জন্য এবং অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর জন্য অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি কিছু এলাকা ছিল মহলের ভেতর দিকে। সেসব অঞ্চলের দরজার ওপর ‘সংরক্ষিত’ নোটিশ ঝুলানো থাকতো। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ ওই সংরক্ষিত এলাকায় সে এক দূতকে পেয়ে গেল।

    দূত মদ পান করছিল। পরীর মত এক নারী তার হাতে তুলে দিচ্ছিল কারুকার্য খচিত মদের পেয়ালা। জ্যাকব তাকে দেখেই তার দিকে এগিয়ে গেল এবং সামরিক কায়দায় স্যালুট দিয়ে বললো, ‘আপনি সম্ভবত মুশেলের অতিথি? আমি মুশেলবাসীদের খুব ভালবাসি।’

    ‘আমি মুশেলের শাসক ইয়াজউদ্দিন মাসুদের রাজকীয় দূত।’ দূত মদের নেশায় মাতাল ছিল। সে জড়িত কণ্ঠে যা বললো তার মানে হচ্ছে, ‘আমি জানতে এসেছি, বৈরুতের খৃষ্টানদের মনে মুশেলের মুসলমানদের প্রতি কতখানি ভালবাসা আছে?’

    দূতের ভাষা যেমন এলোমেলো ছিল তেমনি তার পা-ও টলছিল। সে এত বেশী মদ পান করেছিল যে, নিজের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না।

    সে এলোমেলো পায়ে জ্যাকবের কাছে এসে তার কাঁধ জড়িয়ে ধরে বললো, ‘মদের এমনই গুণ যে, মানুষের মন থেকে ধর্মের বিভেদ দূর হয়ে যায়। সেখানে জন্ম নেয় ভালবাসা। আমার এখন কেবল ভালবাসতে ইচ্ছে করছে।’

    দূত টলতে টলতে বললো, ‘তোমাকে মনে হচ্ছে কতদিনের অন্তরঙ্গ বন্ধু। তোমার গলায় ঝুলানো ছোট্ট এই ক্রুশটাকে ভালবাসতে ইচ্ছে করছে। তোমার এই বর্শাটাকে ভালবাসতে ইচ্ছে করছে। যেদিন এই বর্শা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বুকে বিদ্ধ হবে সেদিন আমি প্রধান সেনাপতি হয়ে যাবো।’

    সেখানে বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ ছিল না জ্যাকবের। তার ডিউটি শুধু ঘোরাফেরা করে দেখা, সন্দেহজনক কিছু দেখলে সে ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা। দূতকে টলমল অবস্থায় রেখেই ওখান থেকে সরে এলো জ্যাকব। মনোনিবেশ করলো নিজের টহল ডিউটিতে। কিছুক্ষণ পর সে দেখতে পেলো, ওই দূতকে দু’জন লোক ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে পাশের এক কামরায়। দূতের তখন বেহাল অবস্থা, কোন হুশ নেই।

    মাঝরাতে জ্যাকবের ডিউটি শেষ হলো। নাচগান তখনো চলছিল। জ্যাকব ও তার সাথীদের স্থলে অন্য লোক এলো ডিউটিতে। জ্যাকব তার কামরায় চলে গেল।

    জ্যাকব দেরী না করে ডিউটির পোষাক পরিবর্তন করে পরে নিল সাধারণ পোষাক। যদিও মধ্যরাত পর্যন্ত ডিউটি করে সে খুবই ক্লান্ত ছিল কিন্তু বিছানায় যাওয়ার কথা সে ভাবতে পারলো না। তার পরিবর্তে সে আলতো পায়ে কামরা থেকে বেরিয়ে এলো। রাতের অন্ধকার গিলে ফেললো তাকে।

    সাবধানে পা চালাচ্ছিল সে। তার গতি ছিল সেই দিকে যেখানে সব রাজকন্যার মত সুন্দরীরা থাকে। এই মেয়েরা সাধারণ মেয়েদের মত নয়। এরা সবাই ঝানু গোয়েন্দা। প্রচুর প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের গড়ে তোলা হয়েছে। তাদের শেখানো হয়েছে নানা রকম দুষ্কর্ম।

    গোয়েন্দাগিরীর কৌশল ও মানুষকে জালে আটকানোর কায়দা কানুন শেখানো হলে ওদের পাঠিয়ে দেয়া হয় কোন মুসলমান এলাকায়। সেখানকার আমীর, সেনাপতি এবং শাসকদের পেছনে লেগে থাকে তারা। তাদের ওপর থাকে খৃস্টানদের দুরভিসন্ধি বাস্তবায়নের নির্দেশ ও দায়িত্ব।

    প্রভাবশালী মুসলমানদের জালে ফাঁসানোর কাজটি তারা সম্পন্ন করে নিখুঁতভাবে। যেসব মুসলিম অঞ্চল খৃস্টানদের অধিকারে চলে গেছে সেখানেও এইসব মেয়েদের পাঠানো হয়। এসব অঞ্চলে তাদের কাজ থাকে মুসলমান গোয়েন্দাদের অনুসন্ধান করা এবং খৃস্টান স্বার্থবিরোধী কোন তৎপরতা যেন চলতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখা।

    এ ছাড়া মুসলমানদের ধর্মীয় চেতনার বিনাশ সাধনের জন্য নাচ-গান ও নানারকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা।

    মুসলিম যুবকদের নৈতিক চরিত্র ধ্বংস করার জন্য তাদের মধ্যে নানা রকম নেশার সামগ্রী বিতরণ করাও তাদের দায়িত্ব।

    এসব মেয়েরা যে বাড়িটিতে থাকতো সেটি ছিল একটি পাকা দালান। এ বাড়ীর উল্টো দিকেই থাকে নর্তকী ও গানের মেয়েরা। তাদের মর্যাদা গোয়েন্দা মেয়েদের মত না হলেও তাদের শরীরের জৌলুস এবং সৌন্দর্য গোয়েন্দা মেয়েদের চেয়ে কম নয়।

    তাদের কাজ রাজকীয় অনুষ্ঠানে মেহমানদের মধ্যে আনন্দ বিতরণ করা। প্রতি রাতেই কোন না কোন উপলক্ষে রাজকীয় অনুষ্ঠানের কোন বিরাম নেই। তবে বাইরের কোন মেহমান এলে আসর হয় জমজমাট।

    সে রাতে মুশেলের মুসলমান দূতদের সম্মানে যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল তাতেও ছিল নাচগানের ব্যাপক আয়োজন। কিন্তু সেদিন নর্তকী ও গায়িকাদের মক্ষীরানী সারা উপস্থিত ছিল না সেখানে।

    সারা ছিল ভুবনমোহিনী এক নারী। অনিন্দ্য সুন্দরী সারার চেহারায় ছিল কমনীয়তার দুর্লভ আভা। চোখে মায়ার অঞ্জন। তার চুলে ছিল মেঘমেদুর আকাশের মাধুর্য। ইউরোপীয় মেয়েদের মত স্বর্ণকেশী ছিল না সে। দেখলে যে কেউ ভাববে, এ মেয়ে মিশর কিংবা গ্রীসে জন্মগ্রহণ করেছে। তবে বৈরুতের মেয়েও হতে পারে। কিন্তু কেউ জানতো না এ মেয়ে কোথাকার বাসিন্দা।

    জ্যাকব গোয়েন্দা মেয়েদের দালানের পাশ দিয়ে সারার কামরার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল। নাচগানের আসরে সারাকে না পেয়ে তার মন উতলা হয়ে আছে। তার অনুপস্থিতির কারণ কি? সে কি অসুস্থ? নাকি এই জঘন্য পরিবেশ ও পেশা থেকে বাঁচার জন্য সে কোথাও পালিয়ে গেছে?

    কারণ জ্যাকব জানে, সারা এই কাজ ও পেশাকে খুবই ঘৃণা করে। তার অসুখী অন্তরের অনেক কথাই জানে জ্যাকব। এখানে সে স্বেচ্ছায় আসেনি। পরিস্থিতি তাকে এখানে আসতে এবং এই পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে।

    জ্যাকবের মনে পড়ে গেল সারার সাথে তার প্রথম সাক্ষাতের কথা। বরাবরই রাজকীয় অনুষ্ঠানগুলোতে তার ডিউটি থাকে। এমনি এক অনুষ্ঠানে প্রথম সে সারাকে দেখতে পায়।

    সারাকে দেখেই চমকে উঠে জ্যাকব। এত সুন্দরও মানুষ হয়! প্রথম দেখাতেই মুগ্ধতার আবেশে যেন গলে পড়ে জ্যাকব। সেই মুগ্ধতাই তাকে টেনে নেয় সারার কাছে।

    মানুষের মন ভালবাসা টের পায়। জ্যাকবের মুগ্ধ ভালবাসাও যথাসময়ে টের পায় সারা। সবাই সারাকে খুব অহংকারী মেয়ে বলেই জানতো। কারণ সে কারও সাথে কথা বলতো না, কারও সাথে তেমন মিশতোও না। কিন্তু জ্যাকবের মধ্যে সে কি পেলো সেই জানে, সে জ্যাকবকে পছন্দ করতে লাগলো।

    এক রাতে অনুষ্ঠান শেষে সারা মহল থেকে বেরিয়ে তার কামরার দিকে যাচ্ছিল, পথে জ্যাকবকে পেয়ে গেল। সারা তাকে বললো, ‘তুমি কি আমাকে আমার কামরা পর্যন্ত এগিয়ে দেবে?’

    ‘একা যেতে ভয় পাচ্ছো?’ জ্যাকব বললো, ‘এখানে তো ভয়ের কিছু নেই। তোমাকে এখানে কেউ অপহরণ করতে আসবে না।’

    ‘তা হয়তো আসবে না।’ সারা মুখ গম্ভীর করে স্বতকণ্ঠে বললো, ‘তবে আমি নিজেই যে নিজের ছিনতাইকারী হয়ে যেতে চাই।’ তারপর জ্যাকবের দিকে ফিরে বললো, ‘একা যেতে ভয় পাচ্ছি না, তবে এ পথটুকুতে তোমার সঙ্গ কামনা করছি।’

    জ্যাকবের জন্য এ ছিল এক অভাবিত পাওয়া। যার জন্য তার মুগ্ধ চিত্তের ব্যাকুল আকর্ষণ সেই সারা তাকে সঙ্গ দিতে বলছে! রাজি হয়ে গেল জ্যাকব।

    জ্যাকব নিজেকে একজন হুশিয়ার পুরুষ বলেই জানতো। নিজের পৌরুষ ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে সে যথেষ্ট সচেতনও ছিল। কত মেয়ে তাকে বন্ধুত্ব ও ভালবাসার প্রস্তাব দিয়েছে কিন্তু জ্যাকব তাতে সাড়া দেয়নি।

    সে বরাবর নিজেকে ওইসব মেয়েদের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। গায়ে পড়ে প্রেম নিবেদন করা মেয়েগুলোকে সে ভাবতো নষ্টা, অপবিত্র। যাদের মধ্যে ইজ্জত ও সতীত্ব বলে কিছু নেই তাদেরকে কেন ভালবাসতে যাবে সে?

    জ্যাকব তাদের প্রত্যাখ্যান করায় তার দাম আরো বেড়ে যায়। প্রত্যাখ্যাত মেয়েরা তার প্রতি আরো বেশী করে আকর্ষণ বোধ করতে থাকে।

    জ্যাকব যেই পরিবেশে ছিল সেখানে ব্যভিচারকে পাপের কাজ মনে না করে আনন্দ ফুর্তির বৈধ উপায় মনে করা হতো। কিন্তু জ্যাকব ছিল এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। সারাকে ভাল লাগলেও তাকে তাদেরই একজন মনে করে জ্যাকব নিজেকে গুটিয়ে নেয়। নিজের ভাল লাগাকে ভালবাসায় পরিণত করা থেকে বিরত থাকে।

    ওদিকে জ্যাকবের প্রতি সারার আগ্রহ দিন দিন বাড়তেই থাকে। যখন সারা জানতে পারে, জ্যাকব মদ পান করে না, নেশা করে না, অন্য মেয়েদের কাছে যায় না তখন তার আগ্রহ ভালবাসায় রূপান্তরিত হয়। সারা ছিল বুদ্ধিমতি এবং সেও বেলেল্লাপনা পছন্দ করতো না। চরিত্রের এই সৌন্দর্যই মনের দিক থেকে পরস্পরকে কাছাকাছি নিয়ে এলো।

    সারা চলতে চলতে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি তো আমার নাচ দেখে কিছু বললে না! অন্যরা তো এভাবে রাস্তায় আমাকে একা পেলে আমার নাচ ও শিল্প নৈপূন্যের প্রশংসা করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেলতো।’

    ‘আমার মুখ থেকে তোমার নিজের প্রশংসা কোন দিন শুনতে পাবে না।’ জ্যাকব উত্তর দিল, ‘অবশ্যই তোমার শরীরে আছে অদ্ভুত এক মাদকতা। যে রূপের বর্ণনা করা আমার সাধ্যের অতীত। যাদুর চেয়েও দ্রুত তা মানুষকে মোহগ্রস্ত করতে পারে এ কথাও আমি অস্বীকার করবো না। আল্লাহ তোমার চেহারায় আকর্ষণের যে সম্পদ ঢেলে দিয়েছেন তার কোন তুলনা আমার সামনে নেই। কিন্তু তোমার এ অপূর্ব দেহবল্লরী অন্যের অঙ্গুলি হেলনে নাচবে তা আমার ভাল লাগে না।’

    জ্যাকব আরো বললো, ‘এই সৌন্দর্য কোন বাজারের পণ্য নয়। তোমাকে এ রূপমাধুর্য দান করা হয়েছে কোন একক পুরুষের জন্য। যদি তুমি তেমন কোন পুরুষকে কবুল বলে গ্রহণ করতে পারতে এবং এই দেহ-সম্পদ তাকে দান করে নিজেকে ধন্য মনে করতে তবে সেটাই হতো শোভন। কিন্তু তুমি যা করছে তা আমার পছন্দ নয়। আমার কথায় তুমি যদি রাগ করো তাতেও আমার করার কিছু নেই। আমি নিজের অন্তরের সাথে প্রতারণা করতে পারবো না।’

    জ্যাকবের এমন অকপট ও স্পষ্ট উচ্চারণে চমকে উঠল সারা। মনে মনে বললো, আহা! আমার মনের কথাগুলো তুমি জানলে কি করে? থমকে দাঁড়িয়ে বললো, “জ্যাকব, তুমি কি সত্যি চাও না আমি রাজ দরবারে নাচি?’

    ‘আমি তো স্পষ্ট করেই আমার মতামত বলেছি। কালেমা পড়ে কারো ঘরণী হলেই তুমি তোমার প্রতি সুবিচার করতে। রূপের জৌলুস প্রদর্শন আর ভালবাসার প্রেম বিতরণ এক জিনিস নয়।

    প্রেম মানুষকে সম্মান করতে শেখায়, অন্যকে মূল্য দিতে শেখায়। যদি ভালবাসার আবরণে নিজেকে সাজিয়ে নিতে পারতে, নিজেকে নিয়ে যেতে পারতে পর্দার আড়ালে তবে তোমার এ দেহের ওপর আল্লাহর রহমত নাজিল হতো। তুমি যা করছে তাতে আল্লাহর দানকেই অপমান করছে।’

    ‘জ্যাকব!’ সারা বিস্মিত হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কোন কালেমার কথা বলছো? কোন পর্দার কথা বলছো? খৃষ্টানরা তাদের কনেকে কখনো বোরখার আবরণে নিয়ে যায় না।’

    জ্যাকব একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কিন্তু সহসাই নিজেকে সামলে নিয়ে হো হো করে হেসে উঠে বললো, ‘আমার মাথায় সব সময় মুসলমানদের শালীনতার ছবি ভাসতে থাকে। নিজে তো এখনো বিয়ে করিনি, কিন্তু মুসলমানদের বিয়ে দেখেছি। যা সুন্দর ওদের বিয়ের অনুষ্ঠান।’

    সারা তাকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। জ্যাকব আর কি বলবে কথা খুঁজে পায় না। সে মুখ ঘুরিয়ে শূন্যে দৃষ্টি মেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

    সারা অস্থির হয়ে জ্যাকবের বাহু আকড়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি তো মুসলমান নও জ্যাকব? আমার এ কথা বলার উদ্দেশ্য এ নয় যে, তুমি গোয়েন্দা।’ সারা বললো, ‘চাকরীর খাতিরে হয়তো তুমি নিজেকে খৃস্টান বানিয়ে রেখেছো, অথবা খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে, আমি এ কথাই বুঝাতে চাচ্ছি।’

    ‘জ্যাকব কখনও মুসলমান হতে পারে না সারা!’ জ্যাকব বললো, ‘আমার নাম গিলবার্ট জ্যাকব। ক্রুশের পক্ষে কাজ করার জন্য সৈনিকের খাতায় নাম লিখিয়েছি। আমি জানি মুসলমানরা আমার শত্রু।

    কিন্তু ছোটবেলায় আমাদের পড়শী ছিল এক মুসলিম পরিবার। ওই পরিবারের ছেলেমেয়েরা ছিল আমার খেলার সাথী। আমি তাদের এক বিয়ের অনুষ্ঠান দেখেছিলাম। সেই অনুষ্ঠান আমার এত ভাল লেগেছিল যে, আজো স্মৃতিতে তা অক্ষয় হয়ে আছে।’

    ‘তোমাকে একটা গোপন কথা বলবো?’ সারা বললো, ‘হয়তো কথাটা শুনলে তুমি আমাকে ভুল বুঝতে পারো। তবু তোমাকে বলি, আমারও কিন্তু মুসলমানদের আচার অনুষ্ঠান ভাল লাগে। তাদের বিয়ে, পর্দা এসবের মধ্যে একটা পবিত্রতা ও প্রাণ আছে। কালেমা পাঠ করার পর স্বামীটি স্ত্রীকে ভালবাসার সাথে সাথে তাকে যে মর্যাদা দেয়, যেভাবে স্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষায় সচেষ্ট থাকে আমাদের সমাজে তা নেই। আমাদের সমাজে নারী পুরুষের যে অবাধ মেলামেশা ও যৌনাচারের ছড়াছড়ি তা আমার মোটেও ভাল লাগে না।’ কথা শেষ করে দীর্ঘনিশ্বাস ফেললো সারা।

    ‘এটা কি তোমার মনের কথা?’

    ‘কেন, এটা কি তুমি বুঝতে পারো না, একজন নারীকে উলঙ্গ করলে তার মনের কি অবস্থা হতে পারে? তখন সে নারী অনুভব করে পর্দা ও আবরণের মধ্যে এক আধ্যাত্মিক শান্তি ও পবিত্রতা ছিল। অনুভব করতে পারে সে কি হারিয়ে ফেলেছে।’ সারা বললো, ‘যখন একজন নারীর সতীত্ব ছিনিয়ে নেয়া হয় তখন আত্মগ্লানিতে নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করে তার।’

    জ্যাকব অবাক হয় সারার কথা শোনে। বলে, ‘এসবই তোমার মনের কথা?’

    ‘হ্যাঁ জ্যাকব, লোলুপ একদল পুরুষের সামনে নাচায় কোন আনন্দ ও স্বাদ নেই। নিজের সৌন্দর্যের যাদু দিয়ে অন্যকে আঙ্গুলের ইশারায় নাচাতে যারা পছন্দ করে আমি সে ধরনের মেয়ে নই।

    আমি যখন একাকী আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াই তখন আমাকে একটি ঘৃণার পাত্রী মনে হয়। আমি নিজেকে ঢেকে রাখতে পারি না। আমার এই শরীরের ওপর কোন পর্দা চাপাতে পারি না। নাচের সময় আমার শরীর যত উন্মুক্ত হয় ততই আমার আত্মার ওপর ছড়িয়ে পড়ে গ্লানির চাদর। আর এই গ্লানিতেই কেটে যায় আমার প্রতিটি প্রহর।’

    ‘তুমি যদি এই পেশাকে এতই ঘৃণা করো তবে ছেড়ে দাও না কেন?’

  • ভণ্ডপীর

    ভণ্ডপীর

    ভণ্ডপীর

    মুশেলের এক বয়োবৃদ্ধ দরবেশ। তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। এই বয়সে মানুষের মঙ্গল ছাড়া জীবনে তার চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। এ জন্যই সবাই তাকে যথেষ্ট কামেল ও মুত্তাকী মনে করতো। লোকজন বলাবলি করতো, তার নেক নজরে পড়া সৌভাগ্যের ব্যাপার।

    নিজের এবাদত বন্দেগী নিয়েই ব্যস্ত থাকেন তিনি। সবার মাঝে এই ধারনা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত এই পীর যদি কারো জন্য দোয়া করেন তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা মঞ্জুর করবেন। এ জন্য দলে দলে লোক আসতো তার কাছে। তিনি সবার সাথে কথা বলতেন না, সবাইকে তার সাথে কথা বলার সুযোগও দিতেন না। তবে তিনি যার সাথেই কথা বলতেন সে তোক নিজেকে বড় সৌভাগ্যবান মনে করতো। লোকের ধারনা, তিনি যার সাথে কথা বলেন তার সব আশা পূরণ হয়ে যায়।

    এক লোক তাকে শহরের বাইরে একটি পর্ণকুটির দান করেছিল। সেই কুটিরেই থাকতেন তিনি। অল্পদিনের মাঝেই তার কেরামতির কাহিনী শহরের সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো। এমনকি দূর দূরান্তের গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়লো তার কেরামতির খবর। ফলে প্রতিদিনই তার ভক্তের সংখ্যা বাড়তে লাগলো।

    ক্রমে তার কুটিরের সামনে জনতার ভীড় লেগে গেলো। প্রতিদিন দূর দূরান্ত থেকে আসতে লাগলো সমস্যাগ্রস্ত লোকজন।

    তিনি একটি নির্দিষ্ট সময়ে কুটিরের বাইরে আসতেন। অবশিষ্ট সময় তিনি আপন হুজরায় বসে এবাদত ও ধ্যানে কাটিয়ে দিতেন। যখন তিনি বাইরে আসতেন তখন খাদেমরা ঘিরে রাখতো তাকে। তিনি বাইরে এসেই দু’হাত উপরে তুলে উপস্থিত জনতাকে শান্ত হতে ইশারা করতেন।

    জনতা নিরব হলে তিনি তাদের নসীহত করতেন। তারপর দু’চার জনের সমস্যার কথা শোনার জন্য তাদের নিয়ে যেতেন কুটিরের ভেতরে।

    তিনি তাদের দুঃখ কষ্টের কথা শুনে তাদের শান্ত্বনা দিতেন এবং তাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন। ভাগ্যবান এই লোক ক’জন প্রশান্ত মন নিয়ে কুটিরের বাইরে চলে যেতো।

    তার সাথে কয়েকজন সুশ্রী ও স্বাস্থ্যবান খাদেম থাকতো। তাদের গায়ের রং ছিল ফরসা। তারা আপাদমস্তক সবুজ কাপড়ে সজ্জিত থাকতো।

    একদিন তারা উপস্থিত জনতাকে বললো, ‘এই কামেল দরবেশ মুশেলবাসীর জন্য রহমত স্বরূপ। তিনি তোমাদের জন্য সুসংবাদ বহন করে এনেছেন।’

    এভাবে প্রতিদিন তারা দরবেশ সম্পর্কে নানা রকম কথা শোনাতো। এইসব কথা লোকদের অন্তরে গেঁথে যেতো।

    দরবেশ যাদের সাথে কথা বলতেন তারা সেখানে উপস্থিত হয়ে লোকদের শোনাতো নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তারা বলতো, ‘আমি অমুক বিপদে পড়ে হুজুরের কাছে এসেছিলাম। হুজুরের দোয়ায় আমার আশা পূরণ হয়েছে।’

    এইসব প্রচারণার ফলে কিছুদিনের মধ্যেই লোকজন দরবেশকে ইমাম মেহেদী বলে মনে করতে লাগলো। কেউ কেউ বলতে লাগলো, হযরত ঈসা (আ.) আবার দুনিয়ায় নেমে এসেছেন।

    একদিন লোকেরা দেখলো দরবেশ পালকিতে চড়ে মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিনের মহলের দিকে যাচ্ছেন। সাথে আছে তার খাদেমবৃন্দ।

    তারা অবাক হয়ে দেখলো, ইয়াজউদ্দিনের রক্ষী বাহিনী তাঁকে সম্বর্ধনা জানিয়ে অত্যন্ত তাজিমের সাথে মহলের ভেতরে নিয়ে গেলো। কয়েক ঘন্টা পর তিনি সেখান থেকে বের হয়ে এলেন এবং নিজের পালকি রেখে ইয়াজউদ্দিনের শাহী টাঙ্গায় চড়ে বসলেন।

    লোকজন ভাবলো তিনি নিজের আস্তানায় ফিরে যাচ্ছেন। তারা হুজুরের সাথে রওনা হলো আস্তানায় গিয়ে হুজুরের কাছ থেকে দোয়া নেবে বলে।

    খাদেমরা বললো, আপনারা হুজুরের সাথে থাকবেন না। হুজুরের আস্তানায় গিয়ে অপেক্ষা করুন। লোকজন হুজুরের আগেই তার আস্তানায় পৌঁছার জন্য যে যেভাবে পারে ছুটলো।

    হুজুরের কুঁড়েঘরের কাছে গিয়ে জড়ো হয়ে বসে রইলো লোকজন। কিন্তু কোথায় হুজুর? সন্ধ্যা নাগাদ না হুজুর ফিরল, না তার খাদেমরা। তারা সেখানে কাউকে না পেয়ে সন্ধ্যার সময় নিজ নিজ বাড়ীর দিকে রওনা হলো। অতি উৎসাহী ভক্তবৃন্দ ফিরে গেল শাহী মহলের গেটে।

    দরবেশকে মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিনের শাহী গাড়ী দূরে কোথাও নিয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যায় সেই গাড়ী ফিরে এলো শাহী মহলে। কিন্তু গাড়ীতে হুজুর নেই, সেখানে বসে আছে গাড়ীর চালক ও দু’জন রুক্ষী।

    জনতা গাড়ী থামিয়ে রক্ষীদের জিজ্ঞেস করতে লাগলো, ‘দরবেশ কোথায়?’

    ‘আমরা বলতে পারবো না তিনি কোথায় গেছেন?’ এক রক্ষী বললো, ‘তিনি আমাদেরকে এক পাহাড়ের ধারে গাড়ী রাখতে বললেন। আমরা গাড়ী থামালে তিনি আমাদের দিকে ফিরে বললেন, ‘তোমাদের আর কষ্ট করার দরকার নেই। এবার তোমরা চলে যাও।’

    আমি খাদেমদের একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দরবেশ আমাদের ছেড়ে কোথায় যাচ্ছেন?’

    তিনি বললেন, ‘হুজুর এ পাহাড়ের কোন এক উপত্যকায় গিয়ে ধ্যানে বসবেন। মুশেলের আমীরের মঙ্গলের জন্য সেখানে তিনি প্রার্থনা করবেন। যতক্ষণ দিগন্তে তিনি কোন মঙ্গল নিশানা দেখতে না পাবেন তততক্ষণ চলবে এ প্রার্থনা। তারপর তিনি পাহাড় থেকে নেমে মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিনকে বলবেন এখন তার কি করা উচিত।’

    রক্ষী আরো বললো, ‘সেই খাদেম আমাকে আরো বলেছেন, হুজুরের প্রার্থনা শেষ হলে হুজুরের দোয়া নিয়ে মুশেলের সৈন্যরা যে দিকে যাবে সেদিকের পাহাড় তাদের চলার পথকে সহজ করে দেবে। তাদের সামনে মরুভূমি পড়লে সেই মরুভূমি শস্য শ্যামল প্রান্তরে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। শক্রর সৈন্য বাহিনী তাদের মুখোমুখী হলে দুশমন ফৌজ অন্ধ হয়ে যাবে।

    মুশেলের আমীর এই বাহিনী নিয়ে যেখানে গিয়ে পৌঁছবেন সেখানেই তারা বিজয়ী হবে এবং সেখানে তার রাজত্ব কায়েম হবে। এমনকি যদি সুলতান সালাহউদ্দিনের বাহিনীও তাদের সামনে পড়ে তবে তারা আমীর ইয়াজউদ্দিনের সামনে অস্ত্র সমর্পন করতে বাধ্য হবে।’

    তিনি আরো বললেন, ‘হুজুর স্বপ্নে দেখেছেন, খৃষ্টানরা আমাদের আমীরের গোলামে পরিণত হয়েছে এবং মুশেলবাসী অর্ধ পৃথিবীর বাদশাহ হয়ে গেছে। তারা সোনাদানা ও প্রচুর সম্পদের মালিক হয়েছে।’

    লোকজন প্রশ্ন করলো, ‘তিনি কোন পাহাড়ের উপত্যকায় ধ্যানে বসবেন?’

    ‘সে কথা বলতে বারণ আছে। হুজুর চান না, তিনি যখন ধ্যান করবেন বা প্রার্থনা করবেন তখন কেউ তাতে বিঘ্ন ঘটাক। এ জন্যই তিনি জনপদ থেকে দূরে সরে গেছেন। তাই আমরা বলতে পারবো না, তিনি এখন কোন পাহাড়ের উপত্যকায় গিয়ে বসবেন।’

    মুশেল থেকে কিছু দূরের পাহাড়ী এলাকা। শহরের কাছে হলেও সেখানে কোন জনবসিত নেই। সেখানে পাহাড়ের পর পাহাড় আর টিলার সমাহার। সেইসব টিলার ফাঁকে ছোট বড় খোলা প্রান্তর। তেমনি প্রান্তরের মাঝে হঠাৎ কোথাও দু একটি কুটির চোখে পড়ে। ওতে বাস করে কোন পাহাড়ী পরিবার। তেমনি একটি প্রান্তর।

    প্রান্তরটি বেশ সবুজ শ্যামল। পাহাড়ী রাখালরা সেখানে মেষ ও উট চরাতো। একদিন রাখালদেরকে সেই প্রান্তরে আসতে নিষেধ করে দিল একদল সেনিক। এই প্রান্তরের পাশ দিয়ে যাতে কোন লোক চলাচল করতে না পারে সে জন্য মুশেলের সৈন্যরা সেখানে পাহারা বসালো। কোন পাহাড়ীও যাতে সে পথে পা না বাড়ায় সে জন্য তাদের বলা হলো দূর দিয়ে যাতায়াত করতে।

    মুশেলের সৈন্যরা সেখানে পাহারা দিচ্ছিল। পাহাড়ী রাখাল ও লোকজন দেখলো, সেই সৈন্যদের সাথে আরো কিছু লোক আছে যাদের পোশাক ভিন্ন। তাদের সাথে বাইরের অজানা এই লোকগুলো কারা চিনতে পারলো না তারা।

    পাহাড়ী এলাকার সেই বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ওদের যাতায়াত নিষিদ্ধ হওয়ায় তাদের মধ্যে জাগলো কৌতুহল। সেখানে কি ঘটে জানার জন্য তাদের আগ্রহের কোন কমতি নেই। বরং নিষেধাজ্ঞার ফলে ওইসব পাহাড়ীদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠলো সেই প্রান্তর।

    সে জায়গা সম্পর্কে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা শুনতে লাগলো তারা। শোনা গেল, সেখানে এক দরবেশ এসেছেন। তিনি মুশেলবাসীর ভাগ্য পরিবর্তন করে দেবেন।

    এ কথাও সকলের মুখে মুখে গুজবের মত ফিরতে লাগলো যে, দরবেশ আকাশ থেকে কোন এক নিদর্শন দেখতে পাবেন। তারপর তিনি মুশেবাসীদের জন্য দোয়া করবেন। তার দোয়া নিয়ে যখন মুশেলের সৈন্যরা পথে নামবে তখন তাদের চলার পথের সব বাধা দূর হয়ে যাবে। তাদের সামনে যারাই পড়বে। ধ্বংস হয়ে যাবে তারা। এভাবেই মুশেলবাসী একদিন অর্ধ পৃথিবীর বাদশাহী পেয়ে যাবে।

    মুশেল শহরেও এসব গুজব সমানে চলছিল। যেখানেই দু’চারজন লোক সমাগম হয় সেখানেই তাদের আলোচনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায় দরবেশের কেরামতির কাহিনী।

    একদিন এক রাস্তার মোড়ে চারজন লোক বসেছিল। তাদের মাঝেও দরবেশের অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে কথা হচ্ছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিল হাসান ইদরিস।

    হাসান ইদরিস সুলতান আইয়ুবীর সেই গোয়েন্দা যে বৈরুত থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিনের দুত এহতেশামুদ্দিন ও তার নর্তকী কন্যা সায়েরাকে সুলতান আইয়ুবীর কাছে নিয়ে এসেছিল। তার এই তুলনাহীন সফলতায় সুলতান খুবই খুশী হয়েছিলেন এবং ইসলামের ইতিহাসে বড় ধরনের অবদান রাখার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন।

    এহতেশামুদ্দিন সুলতান আইয়ুবীকে জানিয়েছিলেন, খৃষ্টানরা মুশেলের কাছে কোন এক পাহাড়ের গহ্বরে অস্ত্রশস্ত্র ও খাদ্য সামগ্রীর বিরাট ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। মুশলের সেই পাহাড়কেই তারা তাদের কমাণ্ডো বাহিনীরও আখড়া বানিয়েছে। এতে সুলতান আইয়ুবীর কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, তারা পাহাড়ী এলাকায় তাদের সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। তিনি এই সত্যও উপলব্ধি করতে পারলেন, যুদ্ধের আগেই যে সৈন্য বাহিনী প্রতিপক্ষের অস্ত্র ও রসদপত্র হস্তগত করতে পারে তারা অর্ধেক যুদ্ধ আগেই জয় করে নেয়।

    এ জন্যই সুলতান আইয়ুবীর কমাণ্ডো বাহিনী সব সময় খৃস্টানদের অজ্ঞাতে তাদের অস্ত্র ও রসদ ভাণ্ডারে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে তা ধ্বংস করে দিত। সুলতানের কমাণ্ডো বাহিনীর হাতে বার বার নাজেহাল হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল খৃস্টান সৈন্যদের। তাই খৃস্টান বাহিনী সব সময় এই কমাণ্ডো আতঙ্কে ভুগতো।

    সুলতান আইয়ুবীর যুদ্ধের কিছু বিশেষ কৌশল ছিল। তিনি সব সময় মরুভূমির পানির উৎসগুলো নিজ অধিকারে রাখতেন। ঘাস ও চারণভূমিগুলোও নিজ অধিকারে রাখতেন। তার কমাণ্ডো বাহিনী খৃস্টানদের অস্ত্র ও রসদের ভাণ্ডার ধ্বংস করে দিত। এমনকি পশুর খাবারও নষ্ট করে ফেলতো যাতে তাদের ঘোড়া ও উটগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া যুদ্ধের জন্য তিনি সব সময় উঁচু স্থান বেছে নিতেন যাতে তার তীরন্দাজ বাহিনী পাহাড়ের চুড়ায় বসে সহজেই দুশমনকে টার্গেট বানাতে পারে।

    সুলতান আইয়ুবী তার গোয়েন্দা প্রধান হাসান বিন আবদুল্লাহকে বললেন, ‘খৃষ্টান কমাণ্ডোরা কোথায় আস্তানা গেড়েছে তা খুঁজে বের করো।’ এরপর তিনি তার কমাণ্ডো বাহিনীর সেনাপতি সালেম মিশরীকে বললেন, ‘তাদের আস্তানা ও রসদ ভাণ্ডারের সন্ধান পেলে সাথে সাথে সেগুলো হস্তগত করবে অথবা ধ্বংস করে দেবে।’

    সুলতান আইয়ুবী বুঝতে পারছিলেন, খৃস্টানরা আরেকটি সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতিতে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেছে। তারা চাচ্ছে তিনি যেন আগে আক্রমণ করেন। কিন্তু তিনি তাদের পাতা ফাঁদে পা দিতে চাচ্ছিলেন না। তিনি এহতেশামুদ্দিনের কাছ থেকে খৃষ্টানদের পরিকল্পনার সংবাদ পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, খৃষ্টান বাহিনীকে তিনি কোথাও স্থিরভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ দেবেন না। আবার নিয়মিত যুদ্ধের সূচনাও করবেন না তিনি।

    সুলতান আইয়ুবী তার কমাণ্ডো বাহিনীকে তৎপর হতে হুকুম দিয়ে বললেন, ‘মুশেলের আশপাশের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ো এবং খোঁজ নাও কোথায় দুশমন আত্মগোপন করে আছে। খোঁজ পাওয়ার সাথে সাথে তাদের ওপর কমাণ্ডো হামলা চালাবে এবং ঝটিকা অভিযান চালিয়ে তাদের তছনছ করে দিয়ে মুহূর্তে আবার তাদের দৃষ্টির সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে।’

    এরপর তিনি তার নিয়মিত বাহিনীকে আদেশ করলেন, “তোমরা সাঞ্জারের দিকে অভিযান চালাও এবং সাঞ্জার দূর্গ অবরোধ করে নাও।’

    সাঞ্জার মুশেল থেকে কিছু দূরে একটি গুরুত্বপূর্ণ দূর্গ। মুশেলের প্রতিরক্ষার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান সাঞ্জার। এ কেল্লার অধিপতি ছিলেন শারফুদ্দিন বিন কুতুবুদ্দিন।

    একটু আগে সুলতান আইয়ুবী তাঁর সেনাপতিদের বলেছিলেন, ‘এখন আমি আর কারো সাহায্য সহযোগিতার জন্য আবেদন জানাবো না বরং তলোয়ারের খোঁচায় তাদের সাহায্য আদায় করে নেবো।’ সাঞ্জার দূর্গ অবরোধ এই সংকল্প বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ।

    তিনি জানতেন, এসব ছোট ছোট মুসলমান আমীররা স্বাধীন থাকার জন্য খুবই লালায়িত। এ জন্য তারা গোপনে খৃষ্টানদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে আছে।

    সাঞ্জারের আমীর শারফুদ্দিন সম্পর্কে সুলতান আইয়ুবী খবর পেলেন, তিনি মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিনের বন্ধু। তাদের বন্ধুত্বের ভিত্তি হলো সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে সে প্রাচীর গড়ে তুলবে।

    হাসান বিন আবদুল্লাহ তাঁর গোয়েন্দাদের দিকে তাকালেন। মুশেলে তার গোয়েন্দা অনেকেই আছে। কিন্তু তিনি অনুভব করলেন, খৃষ্টানদের রসদ ভাণ্ডারের খোঁজ পেতে হলে তাকে একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ও সাহসী গোয়েন্দাকে বৈরুত পাঠাতে হবে। এদিকে যখন খৃস্টান কমাণ্ডোদের অনুসন্ধান চলবে তখন সে চেষ্টা করবে তারা কোথায় আছে সে খবর বৈরুত থেকে সংগ্রহ করতে। তিনি হাসান ইদরিসকে এ জন্য বাছাই করলেন।

    তখনি তার মনে হলো, এটা ঠিক হবে না। সে দীর্ঘদিন বৈরুতে ছিল, আবার ফিরে গেলে খৃস্টান গোয়েন্দারা তাকে চিনে ফেলতে পারে।

    হাসান ইদরিস ছিল গুপ্ত বেশ ধারণে ওস্তাদ। বেশভূষার সাথে সাথে সে নিজের কণ্ঠও বদলে ফেলতে পারতো। হাসান বিন আবদুল্লাহর অভিপ্রায় এবং তা পাল্টে ফেলার কথা জানতে পেরে সে হাসান বিন আবদুল্লাহকে বললো, ‘আপনি আমাকে নির্দ্বিধায় বৈরুত পাঠাতে পারেন। আমি বৈরুত ফিরে গিয়ে এমন বহুরূপ ধারণ করবো যে, পরিচিত লোকও আমাকে চিনতে পারবে না।’

    কিন্তু হাসান বিন আবদুল্লাহ এই ঝুঁকি নিতে সাহস পেলেন না। তিনি তাকে বললেন, ‘তুমি বরং মুশেল যাও। ওখানে কেউ তোমাকে চেনে না। তুমি মুশেল থেকেই গোপন তথ্য বের করার চেষ্টা করো।’

    হাসান ইদরিস মুশেল রওনা হলে সুলতান আইয়ুবী তাকে ডাকলেন এবং নিজে তাকে আরো কিছু উপদেশ দিলেন যাতে সে দ্রুত সাফল্য বয়ে আনতে পারে। তিনি তাকে বললেন, ‘হে প্রিয় বন্ধু! মনে রাখবে, ইতিহাস সব সময় সুলতান আইয়ুবীর নাম মনে রাখবে। পরাজিত হলে ইতিহাস আমাকে লজ্জা দেবে এবং একজন ব্যর্থ সেনানায়ক বলে তিরষ্কার করবে। আর যদি বিজয় লাভ করি বা শহীদ হই, তবে লোকে আমার কবরে ফুল ছিটাবে। ভবিষ্যত প্রজন্ম আমার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমাকে স্মরণ করবে গর্ব ভরে। কিন্তু এটা খুবই অন্যায়।’

    তিনি হাসান ইদরিসকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘বিজয় মাল্য তো তোমাদের প্রাপ্য। প্রাপ্য তোমার সেইসব সঙ্গী সাথীদের, যারা শত্রুর দূর্গের ভেতর থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে আনে। এ তথ্যই তো আমাদের বিজয়ের পথকে সুগম করে। ইদরিস, দুনিয়া কিভাবে কাকে মূল্যায়ন করবে এটা বড় কথা নয়। আল্লাহ সব দেখছেন। তিনি জানেন এই বিজয়ের পেছনে কার অবদান কতটুকু। আমি বিশ্বাস করি, কাল কেয়ামতের মাঠে তোমাদের মাথায় আল্লাহ নিজ হাতে বিজয় মুকুট পরিয়ে দেবেন।

    আমি যদি পরাজিত হই তবে তা ঘটবে আমার ভুলের কারণে। হয়তো দেখা যাবে তোমাদের সংবাদকে আমি যেভাবে গুরুত্ব দেয়া দরকার ছিল সেভাবে দিতে পারিনি। কিন্তু যদি জয়লাভ করি সে জয় হবে তোমাদের। কারণ আমার কান ও চোখ তোমরা।’

    তিনি খানিক থামলেন। একটু পর হাসান ইদরিসের দিকে তাকিয়ে আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘যদি আমি শহীদ হয়ে যাই তবু আমার আত্মা তোমাদের কবরের উপর ফাতেহা পাঠ করতে থাকবে। আমার আত্মা তোমাদের জন্য প্রতিনিয়ত মাগফেরাত কামনা করতে থাকবে। কারণ তোমরাই জাতির মহান বীর। মনে রেখো, একটি সমৃদ্ধ গোয়েন্দা বিভাগ সেই জাতির গৌরব ও গর্বের ধন।’

    তিনি বললেন, “দেখো, এ যুদ্ধে প্রকৃত অর্থে আমার কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আমি বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে সাঞ্জার অভিযানে যাচ্ছি। আর তুমি? তুমি একা সেখানে যাচ্ছো যেখানে চারপাশে কিলবিল করছে তোমার দুশমন। আমি যদি বিজয়ী হই তা হবো আমার বাহিনীর জন্য, আর তুমি বিজয়ী হবে একা। তাহলে বলো, কার মর্যাদা বেশী হওয়া উচিত? যাও প্রিয় বন্ধু, তুমি যাও, আল্লাহ হাফেজ।’

    সূর্য ডুবেছে একটু আগে। হাসান ইদরিস এক গরীব মুসাফিরের বেশে নসিবা ক্যাম্প ত্যাগ করলো। সঙ্গে শুধু নিজের বাহন উটটি, আর কোন সঙ্গী নেই।

    অন্ধকার রাত। একাকী পথ চলছে হাসান ইদরিস। ভাবছে দায়িত্বের কথা। সুলতান আইয়ুবীর শেষ কথাগুলো এখনো তার কানে বাজছে। উট চলছে ধীর গতিতে।

    নসিবা থেকে বহু দূরে চলে এসেছে সে। রাতও গড়িয়ে গেছে অনেক। ঘুম ঘুম একটা ভাব পেয়ে বসেছে তাকে। এ সময় অসংখ্য ঘোড়ার মৃদু পদধ্বনি শুনতে পেলো সে। অনেক দূর দিয়ে কোন কাফেলা যাচ্ছে।

    এত রাতে কারা যায়? কার এ ঘোড়ার আরোহী? সুলতান আইয়ুবী কি স্বসৈন্যে সাঞ্জার দূর্গ অবরোধ করতে যাচ্ছেন? কান পেতে সে শুনলো ঘোড়ার ছুটে চলার শব্দ। এক সময় মিলিয়ে গেল সে ধ্বনি।

    সুলতান আইয়ুবী নসিবা থেকে তার ক্যাম্প উঠিয়ে নেননি। নসিবায় অবস্থিত তার হেডকোয়ার্টারে কিছু সৈন্য ও অফিসার এবং সেই সাথে তাঁর রিজার্ভ বাহিনীকে সেখানে প্রস্তুত অবস্থায় রেখে তিনি নসিবা ত্যাগ করলেন।

    এক সময় মুশেল এসে পৌঁছলে হাসান ইদরিস। সোজা গিয়ে রিপোর্ট করল মুশেলের গোয়েন্দা কমাণ্ডাবের কাছে।

    ‘তুমি এখানে জানতে এসেছো, খৃষ্টানরা তাদের সৈন্য, খাদ্য ও অস্ত্রসম্ভার পাহাড়ের কোন গুহায় লুকিয়ে রেখেছে?’ মুশেলের গোয়েন্দা কমাণ্ডার বললো, ‘আমরাও তো এখানে এ তথ্য জানার জন্যই আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

    ‘কিন্তু চেষ্টা তো সফল হতে হবে। সুলতান এ তথ্য জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন? কোন সূত্রই কি আপনারা সংগ্রহ করতে পারেননি?’

    ‘জানি না এ সূত্র কোন কাজ দেবে কিনা? এখানে এক দরবেশের আবির্ভাব হয়েছে। এতদিন তিনি শহরের কাছে এক কুটিরে বাস করতেন। এর মধ্যে এক ঘটনা ঘটলো।

    একদিন দরবেশ মুশেলের শাসক ইয়াজুদ্দিন মাসুদের মহলে গিয়ে তার সাথে দেখা করলেন। সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি এক পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি ভবিষ্যতবাণী করে বলেছেন, ‘মুশেলবাসীরা একদিন অর্ধ পৃথিবীর শাসক হবে। অগাধ সম্পদের মালিক হবে।’

    তিনি আরো বলেছেন, ‘তিনি তাদের জন্য দোয়া করবেন। একদিন আকাশ থেকে তিনি ইশারা পাবেন। তখন তিনি মুশেলের ফৌজকে অভিযানের জন্য বলবেন। তার দোয়া নিয়ে মুশেলের ফৌজ যখন ময়দানে নামবে তখন পথের সমস্ত বাঁধা তাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে।’

    ‘বলেন কি!’ হাসান ইদরিস অবাক হয়ে বললো, ‘এ লোক তো দরবেশ নয়। এ লোক খৃস্টানদের গোয়েন্দা। তাকে পাকড়াও করতে পারলেই খৃস্টান কমাণ্ডোদের হদিস বের করা সম্ভব।’

    ‘কিন্তু এ লোক তো এখন হাতের নাগালের বাইরে। পাহাড়ের কোথায় গিয়ে তিনি আসন নিয়েছেন জানা নেই আমাদের। তিনি পাহাড়ে আসন নেয়ার পর থেকে সৈন্যরা সে এলাকাটা ঘিরে রেখেছে। পাহাড়ের আশপাশ দিয়ে কারো চলাচলের অনুমতি নেই। এমনকি পাহাড়ী উপজাতিদেরও সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানকার চারণভূমিতে পশু চরাবার অনুমতিও নেই রাখালদের।’

    ‘দরবেশের নিরাপত্তার জন্য কারা পাহারা বসিয়েছে, মুশেলের সেনাবাহিনী?’

    ‘হ্যাঁ, তবে তাদের সাথে কিছু অচেনা মানুষও আছে। তারা কাউকে পাহাড়ে চড়তে দিচ্ছে না। এমন কি পাহাড়ের আশপাশেও ভিড়তে দিচ্ছে না।’

    ‘এখানে তার ভক্তের সংখ্যা কেমন?’

    ‘অনেক। কেউ কেউ তাকে ইমাম মেহেদী মনে করে। কেউ কেউ তাকে হযরত ঈসা (আ.) ভাবে। তাদের ধারনা, হযরত ঈসা (আ.) মুশেলবাসীর দুঃখ দূর করার জন্য আবার পৃথিবীতে নেমে এসেছেন।’

    কমাণ্ডার হাসান ইদরিসকে আরো বললো, ‘এই দরবেশের সুখ্যাতি শহর ও তার আশপাশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি একজন পবিত্র ও কামেল লোক এ ব্যাপারে সাধারণ মুসলমানদের মনে কোন সন্দেহ নেই। রাতের বেলা শহরের লোকেরা বাড়ীর ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। কোন তারকা ছিটকে পড়লে তারা চিৎকার দিয়ে উঠে এই সেই ইশারা। এভাবে লোকজন আল্লাহ ও তার রাসুলকে ভুলতে বসেছে।’

    ওরা চারজনই আইয়ুবীর গোয়েন্দা। বিশেষ ট্রেনিং দিয়ে তাদেরকে দরবেশের মুখোশ খোলার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাদেরকে এ কথা ভাল করে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে যে, ইসলামে আত্মপূজা হারাম। মুশেলবাসীর মন মগজ যখন দরবেশ আচ্ছন্ন করে নিয়েছে তখন এই চার গোয়েন্দা দরবেশের মুখোশ খোলার কাজে লিপ্ত হলো।

    ‘আমার প্রিয় বন্ধুগণ। আমার কথা যদি হেসে উড়িয়ে না দাও তবে বলি।’ হাসান ইদরিস বললো, ‘যেখানে দরবেশ আছে সেখানেই খৃষ্টানদের রণসম্ভার ও রসদ আছে। আর এটা কোন তুচ্ছ ভাণ্ডার হতে পারে না।

    এমনিতেই জনসাধারণকে সরিয়ে তাদের নাগালের বাইরে গিয়ে দরবেশ তার আখড়া তৈরী করেনি। আমার বিশ্বাস, এতবড় বিস্তৃত পাহাড়ী এলাকায় যতই সৈন্যই পাহারায় বসানো হোক না কেন, ভেতরে যাওয়ার সুযোগ অবশ্যই সৃষ্টি করা সম্ভব। মানুষ এই ভয়ে সেখানে যায় না, ওখানে আল্লাহর এক দরবেশ বসে আছেন! তিনি চান না, তার আশেপাশে কেউ যাক। তাই লোকজন সেদিকে তাকানোর সাহস পায় না।’

    কমাণ্ডার হাসান ইদরিসকে বললো, ‘তুমি কি শোননি চারদিকে কি গুজব রটিয়ে দেয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি সে এলাকায় যাবে এবং দরবেশকে দেখার দুঃসাহস করবে, সে লুলো হয়ে যাবে, তার সন্তানদের চোখ অন্ধ হয়ে যাবে।’

    হাসান ইদরিসের অন্য সাথী বললো, “খৃষ্টানরা সেখানে অস্ত্রের গোপন ঘাঁটি গড়ে তুলেছে এতে আমাদেরও কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সত্য মিথ্যা যাচাই না করে এ তথ্য আইয়ুবীর কাছে পাঠানোর কোন মানে হয় না। আমাদের জানা দরকার সেখানে কি আছে এবং তার পরিমাণ কেমন? সেখানে কি কেবল অস্ত্রই আছে নাকি সৈন্যও মজুদ করেছে খৃস্টানরা? এখন বলো, এ তথ্য উদ্ধারের জন্য আমরা কি করতে পারি? দরবেশ যে খৃষ্টানদের একটা সাজানো কাভার তোমার মত আমরাও তা বুঝতে পারছি?’

    ‘শুধু তথ্য আদায় নয় দরবেশকে তার সম্পদসহ ধ্বংস করতে হবে।’ হাসান ইদরিস বললো।

    ‘শুধু দরবেশকে ধ্বংস করলেই চলবে না, জনগণকেও বিভ্রান্তির হাত থেকে বাঁচাতে হবে। দরবেশের মুখোশ খুলে দিয়ে প্রমাণ করতে হবে এ লোক কোন পীর নয়, পীরের বেশ ধরে আছে মাত্র।’ অন্য সঙ্গী বললো।

    গোয়েন্দা কমাণ্ডার বললো, ‘খৃষ্টানদের বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়। তারা শুধুমাত্র একজন দরবেশকে সেখানে বসিয়েই তাদের অস্ত্র ও রসদসম্ভার জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আর সেই দরবেশ মুশেলের জনগণকে আল্লাহর ইশারার কথা বলে তাদেরকে জিহাদ থেকে ফিরিয়ে রেখেছে। মনে হয় মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিনও ছলনার শিকার। আল্লাহর ইশারার অপেক্ষায় মুসলমানদের বসিয়ে রেখে তারা প্রস্তুতি পূর্ণ করছে।’

    ‘দরবেশ সম্পর্কে মুশেলের আমীরের ধারণা কি?’ হাসান ইদরিস প্রশ্ন করলো।

    ‘দরবেশ যখন তাঁর মহলে গিয়েছিল তখন তাকে স্বসম্মানে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল ইয়াজউদ্দিনের মহলের রক্ষীরা।’ কমাণ্ডার প্রশ্নের উত্তরে বললো, ‘আর দরবেশ যখন বেরিয়ে আসে, তখন ইয়াজউদ্দিন তার ছয় ঘোড়ার শাহী পালকি দিয়েছিল দরবেশকে পৌঁছে দিতে। সেই গাড়ীতে করেই তিনি পাহাড়ী এলাকায় যান এবং সেখানে আস্তানা গাড়েন। এতেই প্রমাণ হয়, ইয়াজউদ্দিনও এই ষড়যন্ত্রের সাথে লিপ্ত।’

    ‘কিন্তু ষড়যন্ত্রটা কোন পর্যায়ের তা কিন্তু এতে পরিষ্কার হলো না। দরবেশ ও ইয়াজউদ্দিনের মধ্যে কি নিয়ে আলাপ হয়েছে। তা জানা দরকার ছিল।’

    ‘তারও ব্যবস্থা করা যাবে।’ কমাণ্ডার বললো, ‘যা কিছুই ঘটুক আমরা তা জানতে পারবো। মহলে রাজিয়া খাতুন আছেন। তিনি সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন মহলের ভেতর। তার কাছ থেকেই জানা যাবে মহলে দরবেশ কেমন খাতির যত্ন পেয়েছেন এবং তাদের মধ্যে কি নিয়ে আলাপ হয়েছিল।’

    এরা সে এলাকায় সতর্ক দৃষ্টি রাখা শুরু করলো। গোয়েন্দা তৎপরতা ছড়িয়ে দিল পাহাড়, শহর এবং শহরতলী সংলগ্ন দরবেশের সেই কুটিরের আশপাশ পর্যন্ত।

    সাঞ্জার দুর্গের প্রাচীরের উপর প্রহরীরা অলসভাবে পাহার দিচ্ছিল। যুগটা যুদ্ধের হলেও ওদের জন্য সময়টা ছিল শান্তির। কোন রকম বিপদ বা ঝুঁকির আশংকা না থাকায় পাহারায় কোন সতর্কতা ছিল না।

    তাদের এ নিশ্চিন্ততার কারণ, সাঞ্জারের আমীর শারফুদ্দিন খৃষ্টানদের উপর নির্ভরশীল ছিল। তাই খৃস্টানরা তার ওপর কোন আক্রমণ করবে না, এটা জানা কথা। এছাড়া তাদের জানা আছে, পার্শ্ববর্তী হলবের আমীর ইমামুদ্দিন ও মুশেলের আমীর ইয়াজউদ্দিনও খৃস্টানদের সাথে সমঝোতা করে নিয়েছে। তারা তাকে এ আশ্বাসও দিয়েছে, বিপদের সময় তারা একে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। ফলে প্রতিবেশী দুই অঞ্চলের সাথে এখন তার বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যাচ্ছে। এ অবস্থায় তার ভয়ের কোন কারণ নেই। এ জন্যই শারফুদ্দিন ও তার সৈন্যর ছিল নির্বিকার ও নিশ্চিন্ত। তারা কল্পনাও করেনি, সুলতান আইয়ুবী কখনো তাদের ওপর আক্রমণ করতে পারেন।

    মধ্য রাত পেরিয়ে গেছে। মানুষ ঘুমিয়ে আছে শান্তির কোলে। কিন্তু যাদের হাতে সম্পদের পাহাড় জমে যায় তারা অত সহজে ঘুমাতে পারে না। ভোগের তৃষ্ণা তাদের ঘুম ঘুম চোখগুলোকে যেন কিছুতেই ঘুমোতে দেয় না। তাই ঘুম এলেও ঘুমোতে পারছিল না শারফুদ্দিন। শরাবের নেশায় মাতাল অবস্থায় ঢুলছিল সে। খৃষ্টানরা তাকে দুটি সুন্দরী মেয়ে উপহার পাঠিয়েছিল, তারা তখনো তার হাতে তুলে দিচ্ছিল শরাবের পাত্র।

    কেল্লার উপর দিয়ে একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ তীর বেগে ছুটে গেল। একটু পরেই আরো একটা প্রহরীরা বিস্মিত হলো। তখনো তারা ধারনাই করতে পারেনি, কেউ তাদের আক্রমণ করেছে। রহস্যময় স্ফুলিঙ্গের উড়াউড়ি দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওরা একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগলো। তাদের চাহনি বলছিল, কি অবাক কাণ্ডরে বাবা! ভূতের পাল্লায় পড়লাম নাকি?

    কেল্লার প্রহরীরা এক জায়গায় জড়ো হয়ে এ নিয়েই কথা বলছিল। তাদের সবার মুখেই ভয় ও আতংকের স্পষ্ট ছাপ। তারা যেদিক থেকে ফুলিঙ্গ দুটো ছুটে এসেছিল সেদিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলো কিছু দেখা যায় কিনা। কিন্তু নাহ, সবকিছুই সুনসান, নিরব, নিস্তব্ধ।

    হঠাৎ সবাইকে ভড়কে দিয়ে আরো একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছুটে এলো এবং সেটি তাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে দূর্গের ভেতরে পড়লো! স্ফুলিঙ্গটি উড়ে গিয়ে এমন জায়গায় পড়লো যেখানে পর শুকনো খাবার গাদা করে রাখা হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো।

    গাদার পাশেই ছিল ঘোড়ার আস্তাবল। দেখতে দেখতে সেই আগুন কাঠের তৈরী আস্তাবল স্পর্শ করলো এবং মুহর্তে সেই আস্তাবল অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হলো।

  • ছোট বেগম

    ছোট বেগম

    ছোট বেগম

    একদিন বিকাল বেলা। সূর্য অস্ত যাওয়ার সামান্য আগে সুলতান আইয়ুবী ফোরাতের কূলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তার সাথে অশ্বারোহী দলের সেনাপতি ও কমাণ্ডো বাহিনীর সেনাপতি সালেম মিশরী। তারা তাদের সামনে কিছু দূরে সাদা জোব্বা পরা এক লোককে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন।

    লোকটির দু’হাত প্রার্থনার ভঙ্গিতে উপরে তোলা। সুলতান আইয়ুবী সেদিকে গেলেন এবং লোকটির কাছে পৌঁছে দেখতে পেলেন, সেখানে চারটি কবর রয়েছে।

    এই কবরগুলোর মধ্যে দু’টি কবরের মাথার দিকে একটা করে লাঠি পোতা। তার সাথে কাঠের তক্তা লাগিয়ে কবর ফলক বানানো হয়েছে। সেই ফলকের একটিতে আরবী হরফে লাল রংয়ে লেখা, “উমরুল মামলুক, আল্লাহ তোমার শাহাদাত যেন কবুল করে নেন।” –নাছরুল মামলুক।

    তার পাশের কবরের উপরেও একই ধরনের ফলক লাগানো। তাতে লেখা, “নাছরুল মামলুক, আল্লাহ আমার শাহাদাত কবুল করুন।”

    সুলতান আইয়ুবী দু’টি লেখাই পাঠ করলেন এবং সেই লোকটির দিকে তাকালেন, যে লোক কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ফাতেহা পাঠ করছিলেন। চেহারা সুরতে বেশ অভিজাত ও লেবাস পোশাকে আলেম ব্যক্তি বলে মনে হচ্ছিল। সুলতান আইয়ুবী তার দিকে তাকালে তিনি সালাম দিয়ে বললেন, ‘আমি এই গ্রামের ইমাম। যেখানেই আমি কোন শহীদের সন্ধান পাই সেখানে গিয়ে তাদের জন্য ফাতেহা পাঠ করি। আমি বিশ্বাস করি, যেখানে শহীদের রক্ত ঝরে সে জায়গা মসজিদের মতই পবিত্র।

    আমি লোকদের বলি, ‘মুজাহিদরা সেই মহান ব্যক্তিত্ব যাদের ছুটে চলা ঘোড়ার খুরের আঘাতে যে ধুলো উড়ে সে ধুলোও আল্লাহ কাছে কদর পায়। মহান আল্লাহ তার পথে জেহাদকে উওম ইবাদত বলে গণ্য করে থাকেন।’

    ‘কিন্তু আল্লাহর নামে জীবন কোরবান করা মানুষ এমন অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি যাদের পরিচয় কেউ রাখেনা। যেমন এখানে আপনি দেখছেন। ইতিহাসে তাদের নাম নয়, আমার নামই লেখা হবে। কিন্তু আমার সমস্ত গৌরবের পেছনে রয়েছে এদেরই ত্যাগ ও কোরবানী, রয়েছে অসামান্য অবদান।’ বললেন সুলতান আইয়ুবী।

    তিনি তার সেনাপতিদের দিকে তাকালেন। তারপর এগিয়ে কবরের ফলক দুটিতে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, “এই দু’টি ফলকের লেখাই লাল রংয়ের। মনে হচ্ছে একজন লেখকই নিজের আঙ্গুল দিয়ে লেখা দুটো ‍লিখেছে।”

    ‘লাল রং নয় সুলতানে মুহতারাম, এ যে রক্ত! উমরুল মামলুকের কবরের ফলক লিখেছেন নাছরুল মামলুক। তারপর নিজের রক্ত দিয়ে লিখেছেন তার কবরের ফলক এবং তিনিও শহীদ হয়ে গেছেন। আমিও প্রার্থনা করছি, আল্লাহ তাদের শাহাদাত কবুল করুন। এখানে যে চারটি কবর দেখছেন এদের চারজনই আমার কমাণ্ডো বাহিনীর সদস্য ছিল।’ বললেন কমাণ্ডো বাহিনীর সেনাপতি সালেম মিশরী।

    সুলতান বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘তাই! তুমি চিনতে তাদের?’

    ‘হ্যাঁ সুলতান। ষোল সতেরো দিন আগে এক রাতে আমরা একটি নৌকা ধরেছিলাম। এই নৌকায় শত্রুর কমাণ্ডো বাহিনী তাদের সৈন্যদের জন্য রসদপত্র ও সাহায্য সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছিল।’

    সালেম মিশরী বললেন, ‘এ খবর তখনই আপনাকে জানানো হয়েছিল। আমাদের আট জন কমাণ্ডো সেনা সেই নৌকাটিকে আটক করেছিল। কিন্তু আটক করার সময় শত্রুদের সাথে লড়াইয়ে তাদের চারজন শহীদ হয়ে যায়।’

    ‘ঘটনাটি আবার বলো তো কিভাবে কি ঘটেছিল?’ বললেন সুলতান।

    ‘আমরা আগেই গোপন সূত্র থেকে জানতে পেরেছিলাম, একটা বড় নৌকা রাতে এদিক দিয়ে যাবে। সে নৌকায় শত্রুদের রসদপত্র ও অস্ত্রশস্ত্র থাকবে। আমি আমার আটজন কমাণ্ডোকে পাঠিয়ে দিলাম নৌকাটি আটক করার জন্য। তারা একটি ছোট নৌকায় ছিল। মধ্য রাতে তারা টের পায় অপর পাড় দিয়ে একটি নৌকা যাচ্ছে। আমাদের কাছে যে তথ্য ছিল তাতে আমরা জানতাম, নৌকায় বড়জোর চার পাচঁজন দুশমন সেনা থাকতে পারে। কিন্তু অপারেশনের পর জানা গেল, তাতে বিশজন শত্রু সেনা ছিল।

    আমাদের কমাণ্ডো বাহিনী দ্রুত ওপাড়ে পৌঁছলো এবং শত্রুর নৌকাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শত্রুরা আগে টের পায়নি, পেলে তীর মেরে সহজেই তারা পালিয়ে যেতে পারতো।

    আক্রান্ত হওয়ার পর ওরা যখন রুখে দাঁড়ালো, তখন দেখা গেল সংখ্যায় তারা অনেক। আমাদের কমাণ্ডোরা শত্রুর নৌকা কিছু দুরে থাকতেই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল এবং নির্ভয়ে সাঁতরে গিয়ে চড়াও হয়েছিল শত্রুর ওপর।

    সাঁতারে তারা যথেষ্ট পটু ‍ছিল। তারা যখন দেখলো তাদের তুলনায় দুশমন অনেক তখন একজন গিয়ে নৌকার পালের রশি কেটে দিল। এরপর নৌকার ভেতর শুরু হলো এক ভীষণ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। আমাদের কমাণ্ডো বাহিনীর যুবকরা অসম সাহসিকতা প্রদর্শন করে বিজয় ছিনিয়ে আনে। আমাদের দু’জন তখনই শহীদ হয়ে যায়, বাকীরাও কম বেশী সবাই আহত হয়।

    আমাদের কমাণ্ডোরা শেষ পর্যন্ত শত্রুর নৌকাটি দখল করতে সমর্থ হয়। লড়াই শেষে তারা দেখতে পায় নৌকাটি দখল করার জন্য দুশমনের আঠারোটি লাশ তাদের ফেলতে হয়েছে। তারা শেষ মুহূর্তে দু’জনকে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেছে। ওই দু’জন সাতঁরে নদীর ওপাড়ে গিয়ে উঠলেও তাদের ধাওয়া করার মত অবস্থা ছিল না আমাদের কমাণ্ডোদের। তাই তাদের আর ধাওয়া করা হয়নি।

    আমাদের কমাণ্ডোরা দুটো নৌকাই কিনারায় ভিড়িয়ে আমাকে এই বিজয়ের খবর দেয়। সংবাদ পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে ছুটে আসি। ততোক্ষনে সকাল হয়ে গেছে।

    আমি এসে দেখতে পেলাম এক নৌকায় উমরুল মামলুক ও তার দুই সঙ্গীর লাশ। জানতে পারলাম একটু আগে উমরুল মামলুক শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছে।

    কমবেশী সবাই আহত হলেও নাছরুল মামলুকের অবস্থা ছিল সবচেয়ে শোচনীয়। তলোয়ারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত তার সারা শরীর। আমি তার কাছে গেলাম, দেখলাম তখনো তার জ্ঞান আছে। তার ক্ষতস্থানে পট্টি বাধার জন্য দ্রুত তাকে ক্যাম্পে নিয়ে আসা হলো। এরপর যখন তাকে আমি ক্যাম্পে দেখতে গেলাম, সে আমাকে বললো, ‘আমাকে দুই টুকরো কাঠ ‍দিন।’

    বললাম, ‘এই শরীরে কাঠ দিয়ে তুমি কি করবে’?

    ও বললো, ‘আমি আমার শহীদ বন্ধুর কবরে নাম ফলক লাগাতে চাই।’

    আমি তাকে কাঠ সরবরাহ করলাম। সে তার আহত আঙ্গুলের ব্যাণ্ডেজের ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে পড়া রক্ত দিয়ে উমরুল মামলুকের নাম ও এই লেখাগুলো ‍লিখলো। আমি নামফলকটি একটি লাঠির সাথে বেঁধে উমরুল মামলুকের কবরের ‍শিয়রে লাগিয়ে দিলাম।

    নাছরুল মামলুকের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছিল না। তৃতীয় দিনে তার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। আমি তাকে দেখতে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক হতাশা প্রকাশ করে বললো, ‘নাছরুল মামলুককে বোধহয় বাঁচানো গেল না।’

    নাছরুল মামলুক নিজেও অনুভব করলো, সে আর বাঁচবে না।

    সে পুনরায় আমাকে বললো, ‘আমাকে আরেক টুকরো কাঠ ‍দিন।’

    আমি তার ইচ্ছা পূর্ণ করে দিলাম। সে কাঠের টুকরোটি নিজের কাছে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। রাতে আমি সংবাদ পেলাম, ‘নাছরুল মামলুক শহীদ হয়ে গেছে।’

    আমি যখন সেখানে গেলাম এক আহত রুগী আমাকে কাঠের টুকরোটি ‍দিয়ে বললো, ‘নাছরুল মামলুক তার ক্ষত স্থানের রক্ত দিয়ে এই ফলকটি লিখেছে।’

    আমি তাকিয়ে দেখলাম তাতে লেখা আছে, ‘নাছরুল মামলুক, আল্লাহ আমার শাহাদাত কবুল করুন।

    আহত রোগীটি আমাকে বললো, ‘নাছরুল মামলুক বলেছে, তাকে যেন তার বন্ধু উমরুল মামলুকের পাশে দাফন করা হয়।’

    ‘এরা দু’জনেই মামলুক ‍ছিল সম্মানিত ইমাম। আপনি কি জানেন এই মামলুক বংশ সম্পর্কে? এরা সেই গোলামদের বংশধর, ইসলামের আগমন যাদের ‍দিয়েছিল মুক্তির স্বাদ। আমাদের প্রিয় নবী রাসূল (সাঃ) ক্রীতদাস প্রথা ‍নিষিদ্ধ ঘোষনা করলে আরবে ক্রীতদাস প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায়।’ সুলতান আইয়ুবী ইমামকে বললেন।

    মহানবী (সাঃ) বলেছেন, মানুষ মানুষের গোলাম হতে পারে না। আমরা গোলাম শুধু এক আল্লাহর। তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে যারা আমাদের দায়িত্বশীল আমরা তাদের মান্য করি।

    একটু খেয়াল করে দেখুন, একদিন যারা ছিল সামান্য গোলাম, জাতির জন্য তারা আজ কেমন ত্যাগ ও কোরবানীর নজরানা পেশ করছে। এরা মাত্র আটজন ছিল, কিন্তু বিশজনের কাছ থেকে নৌকা কেড়ে নেয়ার সাহস তারা কোথা থেকে পেল? এই শক্তি তারা পেয়েছে ইসলাম থেকে। আমার সৈন্যদের মধ্যে মামলুক ও তুর্কী সেনারা সাহস, বীরত্ব ও বিশ্বস্ততায় অনন্য।’

    ‘কিন্তু এখন মানুষ আবার মানুষের গোলামে পরিণত হচ্ছে,’ ইমাম সাহেব বললেন। ‘ক্ষমতার রাজনীতির মূল কথাই হচ্ছে মানুষকে আবার গোলামে পরিণত করা। কিন্তু মানুষ জানে না, ক্ষমতার স্বাদ বেশীদিন উপভোগ করা যায় না। ফেরাউনও মাটিতে মিশে গেছে। তেমনি প্রত্যেক জালিম শাসক, যারা ক্ষমতা ও গদি আঁকড়ে ধরে জনগনকে শোষণ ও ‍নির্যাতন করতো তাদের পরিণতি কখনো শুভ হয়নি। সাধারন মানুষের রক্তের বিনিময়ে বাদশাহী ধরে রাখতে ‍গিয়ে তারা নিজেরাই রক্তাক্ত হয়েছে।’

    সেই সন্ধায় তারা যখন ফোরাতের কূলে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন তখন সুলতান আইয়ুবীর রক্ষী বাহিনীর কমাণ্ডার এক লোককে সঙ্গে নিয়ে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছিল। লোকটির অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল সে দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত। কমাণ্ডার তাদের কাছে এসে সুলতানকে লক্ষ্য করে বললো, ‘কায়রো থেকে কাসেদ এসেছে।’

    ‘কোন খারাপ খবর?’ সুলতান আইয়ুবী তাকে বললেন, ‘কি খবর নিয়ে এসেছো তুমি?’

    ‘সংবাদ ভালো নয় সুলতান।’ কাসেদ এ কথা বলে কোমর থেকে একটি কাগজ বের করে সুলতানের হাতে তুলে দিল।

    সুলতান আইয়ুবী চিঠি হাতে নিয়ে তার তাঁবুর দিকে রওনা হলেন। সঙ্গীদের বললেন, ‘চলো।’

    তাঁবুতে বসে তিনি চিঠিটা খুললেন। চিঠিটি তার গোয়েন্দা বিভাগের সর্বাধিনায়ক আলী বিন সুফিয়ানের হাতের লেখা।

    আমাদের সবচেয়ে ধার্মিক ও বীর সেনাপতি হাবিবুল কুদ্দুস দশদিন যাবত ‍নিখোঁজ রয়েছেন। খৃস্টানদের সন্ত্রাসী তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা এখানে গোপন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বাসঘাতক গাদ্দারদের সংখ্যা ‍দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবু বলবো, এ সমস্যা ‍নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে। আমরা এখানে শত্রুদের ষড়যন্ত্র সফল হতে দেব না।

    কিন্তু আমাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে সেনাপতি হাবিবুল কুদ্দুস। তার কোন সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। তার সন্ধান না পাওয়াটাই পেরেশানীর একমাত্র কারন নয়। দুশ্চিন্তার আরো কারন আছে।

    আপনিতো জানেন, হাবিবুল কুদ্দুস তার বাহিনীর সৈন্যদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। তারা তাদের প্রিয় সেনাপতির ইশারায় জান দিতেও কুন্ঠাবোধ করবে না। যদি তিনি স্বেচ্ছায় শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়ে থাকেন তবে ভয় হচ্ছে, তার বাহিনী যার দ্বারাই পরিচালিত হোক না কেন, তার ইশারা পেলে তারা বিদ্রোহ করে বসতে পারে।

    আমি এখনো তার সন্ধান চালাচ্ছি। তার ব্যাপারে আমি পুরোপুরি ‍নিরাশ নই। তবে আমি আপনার কাছ থেকে একটি ব্যাপারে নির্দেশনা চাই। যদি তার খোঁজ পাওয়া যায় এবং তাকে হত্যা করা জরুরী হয়ে পড়ে, তবে হত্যা করবো কিনা? আপনার নিয়োজিত মিশরের আমীর এ সম্মতি দিতে নারাজ। তিনি আমাকে শুধু এই অনুমতি দিয়েছেন যে, আমি আপনার কাছে পত্র প্রেরণ করে অনুমতি নিতে পারি।

    আমি তার সন্ধান করতে ব্যর্থ হই এটা যেমন আপনি চাইবেন না, তেমনি তিনি মনে করেন, সে আমার হাতে মারা যাক এটাও আপনি চাইবেন না। কিন্তু আমাদের এক সেনাপতির শত্রুর হাতে থাকাটাও ‍বিরাট ভয়ের কারন।’

    চিঠি পড়া শেষ করে সুলতান আইয়ুবী সঙ্গে সঙ্গে কাতিবকে ডাকলেন। কাতিব এলে চিঠির উওর লিখতে বসে গেলেন তিনি। তিনি লিখলেনঃ

    প্রিয় আলী বিন সুফিয়ান, তোমার উপর আল্লাহর করুনা বর্ষিত হোক। হাবিবুল কুদ্দুসের উপর আমার আস্থা ও বিশ্বাস এমন ছিল, যেমন তোমার উপর আছে। যে ব্যক্তি বেইমানী করতে প্রস্তুত হয়ে যায় সে কখনো আল্লাহকে ভয় পায় না। আর যে আল্লাহকে ভয় পায় না সে আমার মতো একজন নগণ্য মানুষকে কেন ভয় পাবে?

    তুমি এতে বিস্মিত হয়ো না যে, হাবিবুল কুদ্দুসের মত লোকও ধোঁকা দিতে পারে। ঈমান একটি শক্তি, কিন্তু সেটা হীরা ও পান্নার মত চকচক করে না। এতে সুন্দরী নারীর মত সৌন্দর্য ও আকর্ষণও থাকে না। আর ঈমান গদি ও রাজমুকুটও নয়। যখন মানুষের মধ্যে দুনিয়ার লোভ লালসা বেড়ে যায় ও ধন সম্পদের আকাঙ্খা সৃষ্টি হয় তখন মানুষের বেঈমান হতে বেশী সময় লাগে না।

    হাবিবুল কুদ্দুসকে খুঁজে বের করতে চেষ্টা করো। যদি কখনো মনে করো যে তাকে হত্যা করা দরকার, তবে অবশ্যই তাকে হত্যা করবে। এতে আমার কোন আপত্তি থাকবে না। কিন্তু এটা জানার চেষ্টা করবে, তাকে তো ছিনতাই করা হয়নি?

    এ বিষয়টা তোমার লক্ষ্য ও দৃষ্টিপটে রাখবে। তারপর যেটা ভালো মনে করো তাই করবে। দ্বীন ও দেশের কল্যাণের বিষয়টিই সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে। একজন মানুষের জীবন বা মৃত্যুকে এ পথে বাধা হিসেবে মেনে নেয়া যায় না।

    দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য যেখানে বিপুল সংখ্যক সৈন্য অকাতরে মারা যাচ্ছে, সেখানে একজন গাদ্দারকে হত্যা করতে তোমার দ্বিধা করা উচিত নয়। যেখানে আল্লাহকে খুশি করার জন্য সৈন্যরা হাসি মুখে তাদের জীবন দিয়ে দিচ্ছে, সেখানে কোনো গাদ্দারকে দয়ামায়া দেখানোর প্রশ্নই উঠে না। সে গাদ্দার এটা নিশ্চিত হতে পারলে কালবিলম্ব না করে ফায়সালা করে ফেলবে।

    আলী, আল্লাহর কাছে পাপের জন্য ক্ষমা চাইতে থাকো, কারণ আমরা সবাই গোনাহগার বান্দা। পাক ও পবিত্র একমাত্র আল্লাহ ও তার রাসূল (সা:)। যদি তোমরা সত্যের উপরে থাকো তবে আল্লাহ তোমাদের সাথেই আছেন। শেষ পর্যন্ত তোমরাই জয়ী হবে।’

    সুলতান আইয়ুবী ‍চিঠিতে সিলমোহর মেরে চিঠিটা কাসেদের হাতে দিয়ে বললেন, ‘আজ রাতে এখানেই বিশ্রাম নাও। কাল ঘুম থেকে উঠে খুব ভোরে যাত্রা করবে।’

    সে যুগটা ছিল ইতিহাসের অশুভ যুগ। একদিকে আরবের মাটি মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, অন্যদিকে ইহুদী ও খৃস্টানরা মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্টি করছিল গাদ্দার ও ষড়যন্ত্রকারী। মুসলমানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে তাদের ধ্বংস করাই ছিল এ প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য।

    মিশরেও চলছিল দুশমনের এ তৎপরতা। ইহুদী ও খৃস্টানরা মুসলিম নেতাদের মধ্যে গাদ্দার সৃষ্টির চেষ্টা চালানোর সাথে সাথে সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলারও চেষ্টা করছিল। তারা মিশরের সৈন্য বিভাগকেও অকেজো করে দিতে চাচ্ছিল। সৈন্য বিভাগের ব্যাপারে নানারকম বদনাম ছড়িয়ে জনগনকে বিভ্রান্ত করার জন্য ওরা মরিয়া হয়ে উঠেছিল। ওরা এ কাজ করছিল অত্যান্ত গোপনে ও কৌশলে।

    আলী বিন সুফিয়ান ও কায়রোর পুলিশ সুপার গিয়াস বিলকিস শত্রুদের এসব অপতৎপরতা বন্ধ ও অপরাধীদের খুঁজে বের করার জন্য আরামকে হারাম করে চষে ফিরছিলেন মিশরের সর্বত্র। তাদের বাহিনী কেবল কায়রো নয়, মিশরের বিভিন্ন পরগনা ও শহরে ছুটে বেড়াচ্ছিল।

    সেনাবাহিনীর একজন সেনাপতির নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কোন সাধারণ ব্যাপার নয়। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, আলী বিন সুফিয়ানের প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত যে গোয়েন্দা বাহিনীর সুনাম সমগ্র আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল, তারা নিজেরাই তাদের এক সেনাপতিকে খুঁজে বের করতে পারছে না, এরচেয়ে লজ্জার বিষয় আলীর জন্য আর কিছুই হতে পারে না।

    হাবিবুল কুদ্দুস সম্পর্কে এ কথা ভাবাও মুশকিল যে, তিনি গাদ্দারদের দলে চলে যাবেন। কিন্তু এটা এমনই এক যুগ, এখন কে গাদ্দার আর কে নয় তা নির্ণয় করাই দুষ্কর হয়ে উঠেছে। গাদ্দারী এখন একটা সাধারণ ও সুবিধাজনক উপার্জনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    হাবিবুল কুদ্দুস যখন নিখোঁজ হলো তখন সবাই বলতে বাধ্য হলো, ‘তিনিও তো মানুষ, কোন ফেরেশতা তো নন।’

    হাবিবুল কুদ্দুসের স্ত্রী ছিল তিনজন। অবশ্য সে যুগে এটা কোন গর্হিত কাজ বলে গণ্য করা হতো না। তার সমসাময়িক অন্যান্য অফিসাররা বরং এ ক্ষেত্রে একটু এগিয়েই ছিল। তাদের বরং বিবি ছিল চারজন করে। যারা আরেকটু সৌখিন ছিল তাদের দু’একজন দাসীও থাকতো।

    হাবিবুল কুদ্দুসের কোন দুর্ণাম ছিল না। তার জীবনে মদ ও নাচগানের সামান্যতম প্রভাবও কেউ লক্ষ্য করেনি। তিনি নামাজ রোজার পাবন্দ ছিলেন এবং যুদ্ধের ময়দানে ছিলেন সত্যিকারের বীর মুজাহিদ। তিনি কেবল শত্রুর উপর কঠোর ছিলেন না, বরং বীরত্ব প্রদর্শন ও রণকৌশলেও ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। তিনি যুদ্ধ পরিচালনায় এতই ‍নিপুণ ছিলেন যে, সামান্য সৈন্য ‍নিয়ে বিপুল সংখ্যক শত্রু সেনার বাহিনীকেও তিনি বার বার পরাজিত ও ধ্বংশ করেছেন।

    তার সবচেয়ে বড় গুন ছিল, তিনি সবাইকে সহজেই আপন করে নিতে পারতেন। লোকেরাও তাকে ভালোবাসতো। তার অধীনস্ত সৈন্য ও কমাণ্ডাররা যখন যুদ্ধ করতো তখন তাদের আবেগ এমন হতো যেন তারা কারো নির্দেশে যু্দ্ধ করছে না, বরং নিজের ঈমানের দাবী পূরণের জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। বাহিনীর সদস্যরা তাকে বুঝতে পারতো এবং তার ইশারাকেই তারা হুকুম মনে করতো।

    সে তার বাহিনী এমনভাবে পরিচালনা করতো যে, কখনো কখনো মনে হতো যেন এটা তার একান্ত নিজস্ব বাহিনী। যেন এরা সুলতান আইয়ুবীর নয়, হাবিবুল কুদ্দুসের আদেশে যুদ্ধ করছে।

    এত যে প্রিয় লোকটি, প্রশিক্ষন বা যুদ্ধের মাঠে তার রূপ ছিল সত্যি ভয়াবহ। সৈন্যদের তিনি কঠোর প্রশিক্ষন দিতেন এবং তাদের শৃঙ্খলার প্রতিও রাখতেন কড়া নজর।

    তিনি তার সৈন্যদের এমনভাবে প্রশিক্ষন ‍দিতেন যাতে তারা অন্যদের তুলনায় ক্ষীপ্র ও কৌশলী হয়। তার সৈন্য সংখ্যা ছিল ‍তিন হাজার পদাতিক, দুই হাজার অশ্বারোহী ও দুই হাজার তীরন্দাজ। তীরন্দাজদের তিনি এমন নিপুণ তীর চালানো শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, রাতের অন্ধকারে শুধু সামান্য আওয়াজ শুনেই তার সৈন্যরা যে তীর ছুঁড়তো তা গিয়ে শব্দকারীর বুকে বিদ্ধ হতো।

    আলী বিন সুফিয়ানও ছিলেন গোয়েন্দাগিরীতে ওস্তাদ। গিয়াস বিলকিসও ছিলেন দক্ষ পুলিশ সুপার। এদের দু’জনেরই ধারনা, হাবিবুল কুদ্দুসকে শত্রুরা যেভাবেই হোক তাদের বশে নিতে সক্ষম হয়েছে, যাতে তার সাত হাজার সৈন্যকে বিদ্রোহী করে তুলতে পারে।

    সাত হাজার সৈন্য কোন তুচ্ছ ও নগন্য সৈন্য ছিল না। এ সৈন্যদের বিদ্রোহের পথ থেকে ফিরিয়ে রাখার উপায় তালাশ করছিলেন দু’জনই। গিয়াস বিলকিস বললেন, ‘এদের নিরস্ত্র করে দিলে কেমন হয়?’

    আলী বিন সুফিয়ান অনেক চিন্তা ভাবনা করে এ প্রস্তাব নাকচ করে দেন। কিন্তু তারা যে কোন সময় বিদ্রোহ করে বসতে পারে গিয়াস বিলকিসের এ আশঙ্কা তিনি উড়িয়ে দিতে পারলেন না। তারা দু’জনই একমত হলেন, আজ না হলেও ভবিষ্যতে তারা বিদ্রোহ করবে।

    আলী বিন সুফিয়ান বললেন, ‘আপাতত তাদের নিরস্ত্র না করে বাহিনীর মধ্যে কিছু গোয়েন্দা ছড়িয়ে দিই। তারা সৈন্য ব্যারাকে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াবে এবং তাদের আলাপ আলোচনা শুনবে। কমাণ্ডারদের উপরও তারা দৃষ্টি রাখবে।’

    তাই করা হলো। কড়া দৃষ্টি রাখা হলো হাবিবুল কুদ্দসের বাড়ীর উপর। তার তিন স্ত্রীর মধ্যে একজনের বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। অন্য দু’জনের মধ্যে একজনের বয়স বিশ, অন্যজনের পঁচিশ। তাদের জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘হাবিবুল কুদ্দুস কোথায়?’

    তারা বললো, ‘কয়েকদিন আগে এক সন্ধায় তার কাছে দু’জন লোক এসেছিল। হাবিবুল কুদ্দুস তাদের সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন, কিন্তু তারপর আর ফিরে আসেন নি।’

    চাকর বাকরদেরও সন্দেহমূলকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। কিন্তু তাতে কোন কাজ হলো না, কোনভাবেই তার সন্ধান পাওয়া গেল না।

    তার বিবিদের সম্পর্কেও গোপনে অনুসন্ধান করা হলো। কিন্তু তাদের ব্যাপারেও সন্দেহ করার মতো কোন তথ্য পাওয়া গেল না। শুধু এটুকু জানা গেল যে, অল্পবয়সী দুই বিবির মধ্যে একজনের প্রতি হাবিবুল কুদ্দুসের টান একটু বেশী ছিল।

    এই বিবির নাম জোহরা। জোহরা তারই অধীনস্ত অশ্বারোহী বাহিনীর এক কমাণ্ডারের মেয়ে। মেয়েটি দেখতে খুবই সুন্দরী ছিল। এ রকম সুন্দরী বিবি থাকলে তার প্রতি টান একটু বেশী থাকাই স্বাভাবিক।

    একদিন জোহরার পিতা সেই কমাণ্ডারকে তলব করা হলো গোয়েন্দা অফিসে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘কেন এত অল্পবয়সী মেয়েকে তোমার সমবয়সী লোকের সাথে বিয়ে দিয়েছো? হাবিবুল কুদ্দুস কি তোমাকে তার অধীনস্ত পেয়ে বাধ্য করেছিল?’

    ‘না। সেনাপতি হাবিবুল কুদ্দুস ইসলাম ও জিহাদের ব্যাপারে এতই আন্তরিক যে, তা দেখেই আমি তার প্রতি অনুরাগী হই।’ বললেন সেই কমাণ্ডার।

    তিনি বললেন, ‘আমি তার সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে ‍যুদ্ধ করেছি। তিনি বলতেন, মুমিনের তলোয়ার একবার উন্মুক্ত হলে সে তলোয়ার ততোক্ষণ পর্যন্ত কোষবদ্ধ হবে না, যতোক্ষন তার সামনে একজন দুশমনও বর্তমান থাকে। তিনি আরো বলতেন, ‘যতোক্ষন কাফেরদের ফেতনা শেষ না হবে ততোদিন জিহাদ চালু থাকবে।’

    তিনি দেশের গাদ্দারদের প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। যখন সীমান্ত যুদ্ধে সুদানীরা আকস্মাৎ আক্রমন চালালো, তখন আমাদের দুই অশ্বারোহী পালানোর চেষ্টা করেছিলো। তিনি টের পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাদের দু’জনকে পাকড়াও করার হুকুম দেন।

    দু’জনকে ধরে আনা হলে তাদেরকে ঘোড়ার পিছনে দু’হাত রশি দিয়ে বেঁধে দুই অশ্বারোহীকে ঘোড়া ছুটাতে বললেন। তিনি অশ্বারোহীদের বললেন, ‘ঘোড়া ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত ঘোড়া থামাবে না।’

    যখন ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে ফিরে এলো তখন ঘোড়াগুলো হাফাচ্ছিল। ঘোড়ার পেছনে বাঁধা দুই সৈন্যের অবস্থা তখন শেষ পর্যায়ে। তাদের সমস্ত শরীরের কোথাও কাপড় ছিল না। তাদের শরীরের চামড়া উঠে গিয়েছিল। শরীরের মাংসও উঠে গিয়েছিল।

    যুদ্ধে অধিকাংশ সুদানী মারা গিয়েছিল। কিছু ধরা পড়ে বন্দী হয়েছিল। অন্যরা পালিয়ে গিয়েছিল। হাবিবুল কুদ্দুস সমস্ত সৈন্যদের একত্রিত করে সেই পলাতক সৈন্যদ্বয়ের লাশ দেখালেন।

    তিনি তাদের বললেন, ‘আল্লাহর পথে যুদ্ধরত সৈন্যদের পালানোর শাস্তি দুনিয়ায় এমনই হয় আর পরকালে তাদের দেহ হবে আগুনের খোরাক।’

    হাবিবুল কুদ্দুসের শ্বশুর বললো, ‘আমরা সবাই জিহাদে শহীদ হওয়ার জন্য প্রেরনা পেয়েছি তার কাছ থেকে।’

    ‘তোমার মেয়ে সম্পর্কে বলো, কেন তুমি তাকে হাবিবুল কুদ্দুসের সাথে বিয়ে দিয়েছিলে?’

    ‘একদিন আমার মেয়ে আমার সাথে ছিল। আমি মেয়েকে সেই শিক্ষাই দিয়েছিলাম যে শিক্ষা আমার পিতা আমাকে দিয়ে গিয়েছিলেন। আমার ছেলেও সে সময় ‍সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যদলে সিরিয়াতে ছিল।

    আমি আমার মেয়েকে বললাম, ‘আমাদের সেনাপতি হাবিবুল কুদ্দুসও সুলতান আইয়ুবীর মত বীর মুজাহিদ।’

    সেদিনই তিনি আমার মেয়েকে দেখলেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ মেয়েটা কে?’ আমি বললাম, ‘এ আমার মেয়ে এবং একজন তরুণী মুজাহিদ।’

    বেশ কিছুদিন পর তিনি আমাকে জানালেন, যদি আমার আপত্তি না থাকে এবং আমার মেয়ে সম্মত হয় তবে তাকে তিনি বিয়ে করতে চান। আমি মেয়ের মাকে কথাটা বললাম। মেয়ের মা বলল, ‘মেয়ে আগে থেকেই বলে আসছে সে এমন ব্যক্তিকে বিয়ে করতে চায় যে ইসলামের খেদমতে নিজের জীবনকে বাজী রাখতে প্রস্তুত।

    আমি খুশী মনে সেনাপতির সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলাম এবং আমার মেয়েও তাকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে নিল। এখন শুনছি তিনি নিখোঁজ।

    আমি আপনাকে দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলছি, তার এই নিরুদ্দেশে যদি কেউ অন্তর থেকে ব্যাথিত হয়ে থাকে, তবে সে একমাত্র আমার মেয়ে। আমি শুনেছি, সে তাকে সবচেয়ে বেশী ভালবাসে। তার নিরুদ্দেশ হওয়ার পরও তার ভালবাসা বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি।

    তার ধারনা, দুশমনরা তাকে অপহরণ করে নিয়ে মেরে ফেলেছে বা কোথাও বন্দী করে রেখেছে। আমি এও শুনেছি, তার অন্য দুই স্ত্রী বলেছে, সে যদি মারা যায় তবে তারা অন্যখানে বিয়ে করে নেবে। কিন্তু আমার মেয়ে এ রকম চিন্তা করাও পাপ মনে করে।’

    ‘এখন আমার বিশ্বাস হচ্ছে, তাদের পরিকল্পনা আমাদের হাতে এসে গেছে।’

    এই আওয়াজ কায়রো থেকে দূরে, বহু দূরে এক ধ্বংসাবশেষে উচ্চারিত হলো। এখানে কোন ফেরাউন তার সময়ে রাজমহল তৈরী করেছিল। সে যুগে এ স্থানটি খুব সুন্দর শহর ও মনোরম বাগবাগিচায় সাজানো ছিল। অঞ্চলটি পাহাড়ী হওয়ার পরও নীল নদের তীরে অবস্থিত হওয়ার কারনে এখানে গড়ে উঠেছিল জমজমাট শহর। আর ফেরাউন সেই শহরকে এমন অপরূপ সাজে সাজিয়েছিল, মনে হতো এটি কোন রূপকথার রাজ্য।

    পাহাড়ের উপরে ও আশেপাশে ছিল সবুজ গাছপালা। নদীতে খাল কেটে শহরের ভেতরে নিয়ে আসা হয়েছিল নদীর পানি। সেই পানিতে চলতো সেচ কাজ। এভাবেই সেই রুক্ষ্ম পাহাড়কে বানানো হয়েছিল নয়নাভিরাম সবুজ উদ্যান।

    কোন এক ফেরাউন এখানে শহর ও মহল বানালেও তার মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে কমতে থাকে তার জৌলুশ। তারপর কালক্রমে একদিন তা ধ্বংশস্তুপে পরিণত হয়।

    সুলতান আইয়ূবীর আমলে এই ধ্বংসাবশেষ এক ভয়ংকর স্থানে পরিণত হয়। শহরের প্রাসাদগুলো রূপ নিয়েছিল ভূতুরে আস্তানায়। মহলের স্তম্ভগুলো জরাজীর্ণ হয়ে বুনো লতাপাতায় আচ্ছাদিত হয়ে পড়েছিল। আবর্জনায় ভরে গিয়েছিল তার কামরাগুলো।

    বাদুড়, চামচিকা ও চিলেরা বাসা বেঁধেছিল সেই ধ্বংশস্তুপে। পাহাড়গুলো এত উঁচু ছিল যে, কালো মেঘ যখন উড়ে যেত, দূর থেকে মনে হতো সেগুলো পাহাড়ের গা ছুঁয়ে যাচ্ছে।

    এই জনপদ কিভাবে ধ্বংশ হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস জানা যায় না। তবে ধ্বংসাবশেষ দেখলে মনে হয় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আকস্মিক বিস্ফোরনে শহরটি ধ্বংশপ্রাপ্ত হয়। কারন পুরাতন এই ধ্বংসাবশেষের বাইরে ও ভিতরে মানুষের মাথা ও অঙ্গ-প্রতঙ্গের হাড় হাড্ডি ছড়িয়ে আছে। অতীত যুগের অনেক অস্ত্রসস্ত্রও এদিক ওদিক পড়ে আছে।

    এখন এই ভূতুরে জায়গায় কেউ যায় না। লোক মুখে গুজব রটে গেছে, এখানে জ্বীন, ভূত ও খারাপ মানুষের প্রেতাত্মারা বাস করে। তারা এর আশেপাশে কোন জীবিত মানুষ পেলে তাকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলে।

  • রক্তস্রোত

    রক্তস্রোত

    রক্তস্রোত

    সম্রাট আরনাতের রক্ষিতা প্রিন্সেস লিলি ওরফে কুলসুম কথা বলছিল বাকারের সাথে। কুলসুম বাকারকে বললো, ‘আরনাতের সাথে আমি সুখেই ছিলাম। কিন্তু আমার অন্তরে জ্বলছিল প্রতিশোধের আগুন। সে মাঝে মাঝে আমাকে বলতো, ‘সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দারা ছদ্মবেশে এখানে আসে। তারা আমাদের গোপন তথ্য নিয়ে আবার সুযোগ মত পালিয়ে যায়।’ আরনাত আরও বলেছে, ‘খৃষ্টান ও ইহুদী সুন্দরী মেয়েরা মুসলমানদের দেশে গিয়ে সেখানকার বড় বড় আমীর ও অফিসারকে তাদের রূপের জালে বন্দী করে ফেলে। তারা আমাদের স্বার্থ উদ্ধারে আমীরদের ব্যবহার করে।’’

    কুলসুম বললো, ‘আরনাত আমাকে সেসব মেয়েদের কাহিনী প্রায়ই বলতো। তার গল্প শুনে আমার মনে হতো, ধর্মের জন্য ওই মেয়েরা কতই না ত্যাগ স্বীকার করছে! তারা এ জন্য নিজের সম্ভ্রম পর্যন্ত বিসর্জন দিচ্ছে। বাকার! আমিও এক নারী। আমি জানি নারীরা সম্ভ্রমকে কত অমূল্য সম্পদ মনে করে। সতীত্ব রক্ষা করার জন্য মেয়েরা নিজের জীবন দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। অথচ ওই মেয়েরা অকাতরে তা বিলিয়ে দিচ্ছে। এ যে কত বড় ত্যাগ তুমি তা কল্পনা করতে পারো?’

    থামল কুলসুম। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললো, ‘বাকার, আমার সম্ভ্রম তো লুট হয়েই গেছে। আমার ইচ্ছা আমি আমার ধর্মের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ ও কোরবানী স্বীকার করি। প্রয়োজনে এ জন্য আমি আমার জীবন দিয়ে দেবো। এতদিন এ ত্যাগ স্বীকারের কোন সুযোগ পাইনি আমি। আরনাত এ সম্মেলনে এসে আমার কাছে এমন গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে যে তথ্য সুলতান আইয়ুবীর কাছে পৌঁছানো জরুরী মনে করছি আমি। হয়তো এই কল্যাণকর কাজের জন্যই আল্লাহ আমাকে এই জাহান্নামের মধ্যে পাঠিয়েছে। তুমি কি মনে করো, এই সংবাদ সুলতানের কাছে পৌঁছালে তাতে কোন উপকার হবে?’

    ‘হ্যাঁ, অনেক উপকার হবে।’ বাকার বললো, ‘কিন্তু এ সংবাদ আমরা নিয়ে যাব না। আমি ও তুমি দু’জনেই যদি এখান থেকে নিখোঁজ হয়ে যাই তবে সম্রাট আরনাত বুঝে ফেলবে, আমরা দু’জনই গোয়েন্দা ছিলাম। এতে তারা তাদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ফেলবে। তখন এই খবর সুলতান আইয়ুবীর উপকারে না লেগে তা তাঁর পরাজয়ের কারণ হবে।’

    ‘তার মানে, এত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সুলতান আইয়ুবীর কাছে পৌঁছাতে পারব না?’ কুলসুমের কণ্ঠে উদ্বেগ।

    ‘অবশ্যই এ খবর সুলতানের কাছে পৌঁছবে।’ বাকার বললো, ‘আগে ক্রাকে যাই, ওখানে গিয়েই আমি এ খবর পাঠানোর ব্যবস্থা করবো।’

    ‘তুমি নিজে যাবে?’ কুলসুম জিজ্ঞেস করলো, ‘কিন্তু তুমি চলে গেলে আমি যে এখান থেকে পালাতে চাচ্ছি তার কি হবে?’

    ‘আমি যাব না, তুমিও পালাবে না।’ বাকার বললো, ‘ক্রাকে আমার সঙ্গী রয়েছে। খবর পৌঁছানোর দায়িত্ব তারাই পালন করবে। আমার দায়িত্ব শুধু তথ্য জোগাড় করা। তোমার কাজ এখনও শেষ হয়নি, সবেমাত্র শুরু হয়েছে। আমি তোমাকে জানাবো সুলতান আইয়ুবীর কেমন ধরনের সংবাদ প্রয়োজন। সে সংবাদ তুমি আমাকে জোগাড় করে দেবে আর আমি তা দামেশক পর্যন্ত পৌঁছে দেব।’

    ‘তবে আমাকে এই জাহান্নামেই থাকতে হবে?’ কুলসুম উদাস কণ্ঠে বললো।

    ‘হ্যাঁ।’ বাকার উত্তর দিল, ‘তোমাকে এই জাহান্নামে এবং মৃত্যুর মুখমুখিই থাকতে হবে কুলসুম! যদি তুমি জাতির জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে চাও তবে এরচেয়ে ভাল কোন সুযোগ পাবে না। দ্বীনের জন্য এমন কোরবানী দেয়ার সুযোগ সবার ভাগ্যে জোটে না।’

    কুলসুম শুনছিল বাকারের কথা। নতুন এবং অদেখা এক জগত যেনো তার চোখের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। সে অবাক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল বাকারের দিকে। বাকার বললো, ‘গোয়েন্দাদের ব্যাপারে সুলতান কি বলেন জানো? তিনি বলেন, একটি মাত্র গোয়েন্দা আমাদের সমস্ত সৈন্যবাহিনীর জয় ও পরাজয়ের কারণ হতে পারে। তাদের মিশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুঁকিবহুল। গোয়েন্দারা প্রতি মুহুর্তে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে। শুধু মৃত্যু নয়, মৃত্যুর অধিক বিপদ ওঁৎ পেতে থাকে তাদের জন্য। কোন গোয়েন্দা শত্রুদের হাতে ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে তাকে হত্যা করা হয় না। তথ্য আদায়ের জন্য তাদের দেয়া হয় কঠিন শাস্তি। তাদের চামড়া ছিলে তাতে লবণ মাখানো হয়। তাকে এমন কঠিন শাস্তি দেয়া হয় যে, তারচেয়ে মৃত্যু হলে সে বেঁচে যেত। কিন্তু তাদের মরতেও দেয়া হয় না, বাঁচতেও দেয়া হয় না।’

    ‘কুলসুম!’ বাকার বললো, ‘কিন্তু নিজের ধর্ম, নিজের দেশ ও আপন জাতির জন্য কাউকে না কাউকে তো এমন ত্যাগ স্বীকার করতেই হয়। সুলতান বলেন, ‘যে জাতির সন্তানদের মধ্য থেকে জাতির জন্য ত্যাগ ও কোরবানীর আবেগ নিঃশেষ হয়ে যায় অল্পদিনের মধ্যেই পৃথিবীর বুক থেকে সে জাতির অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যায়।’ তুমি যেখানে নিরুপায় হয়ে চারটি বছর কাটিয়ে দিয়েছ সেখানে আরো চারটি মাস কাটিয়ে দাও মহান এক মিশন নিয়ে, নতুন এক স্বপ্ন নিয়ে।’

    ‘তুমি বলছো, তাতে জাতির কল্যাণ হবে! আমার পাপ মোচন হবে?’

    ‘হ্যাঁ কুলসুম! আরনাত এখন আর তোমার প্রভু নয়, সে তোমার শিকার। এ শিকার যেনো হাতছাড়া না হয় সেদিকে তোমার কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। তার সাথে আগের চেয়ে অধিক ভালবাসার ভাব দেখাবে। কিন্তু মনে রাখবে, তুমি এক বিষধর সাপকে আগলে রেখেছো। এ সাপ যদি তোমার নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে যায় তবে সে মুসলিম বিশ্বের বিরাট ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’

    ‘তবে আমাকে বলো!’ কুলসুম অধীর কন্ঠে বললো, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে বলো, আল্লাহ আমার এ খেদমত গ্রহণ করবেন এবং তিনি আমাকে মাফ করে দেবেন!’

    ‘নিশ্চয়ই! আল্লাহ বান্দার কোন আমলই বিফলে যেতে দেন না।’

    ‘তাহলে বলো আমাকে কি করতে হবে?’

    বাকার তাকে বুঝিয়ে বলতে শুরু করল তার কি করণীয়। সে তাকে বলল, ‘সবার সামনে এমন ভাব প্রকাশ করো না, যাতে তোমার এবং আমার মাঝে কোন গোপন সম্পর্ক রয়েছে মানুষ এমন ধারণা করতে পারে। সব সময় মনে রাখবে, এখানে আমাদের মত গোয়েন্দাদের ধরার জন্য খৃষ্টান গোয়েন্দারাও ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর এটাও মনে রাখবে, এখানে শুধু আমরা দু’জনই নই, আমাদের সাথী আরো গোয়েন্দারা কাজ করছে। শুধু এখানেই নয়, খৃস্টানদের প্রতিটি শহরে ও গ্রামে ঘুরে বেরাচ্ছে আমাদের সাথীরা।

    কুলসুম, এ খবর শুনে অহংকারী ও বেপরোয়া হয়ে যেও না। মনে রেখো, এখানে খৃস্টান জেনারেল ও শাসকরা আছেন। তারা সব আহাম্মক এমনটি মনে করার কোন কারণ নেই। এদের মধ্যেও অনেকেই আছেন যারা সাহসী ও বুদ্ধিমান। তাদের চোখ কান খোলা। তাই যা করবে বুঝেশুনে করবে। একদিকে নিজের বুদ্ধি বিবেক কাজে লাগাবে আর সারাক্ষণ নির্ভর করবে শুধু আল্লাহর উপর। আমরা স্বেচ্ছায় এক কঠিন দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছি। এ দায়িত্ব আমাদের পালন করতে হবে পরিপূর্ণ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে। এ কাজ করতে গিয়ে যত বিপদই আসুক না কেন সবই আমাদের মাথা পেতে নিতে হবে, সহ্য করতে হবে।’

    কুলসুম তাঁবুর কাছে এসে গাড়ী থেকে নামলো। সে এখন আর কুলসুম নয়, প্রিন্সেস লিলি। আর গাড়ীর চালক বাকার বিন মুহাম্মদও এখন একজন নিষ্ঠাবান খৃস্টান, যার নাম সায়বল। কুলসুম যখন গাড়ী থেকে নামলো, সায়বল তখন বগির পাশে এক নিরীহ চাকরের মত মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলো।

    প্রিন্সেস লিলি তাঁবুতে ঢুকে দেখল সম্রাট আরনাত একটি নকশার ওপর ঝুঁকে আছেন। লিলি বললো, ‘অমন করে কি দেখছ?’

    আরনাত নকশা থেকে মুখ না তুলেই বললো, ‘খুবই জরুরী জিনিস। তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে?’

    ‘প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়েছিলাম।’ লিলি বললো, ‘সেই সাথে একটু শিকার করারও শখ চেপেছিল।’

    আরনাত নকশা থেকে মুখ তুলে হাসিমুখেই জিজ্ঞেস করলো, ‘তা কি শিকার করেছো?’

    ‘কিছুই না।’ লিলি উত্তর দিল, ‘সব তীরই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।’ তারপর মন খারাপ করে বললো, ‘তুমি তো আর আমাকে তীর চালাতে শেখাওনি যে আমি শিকার ধরতে পারবো।’

    আরনাত হেসে বললো, ‘তাই! তা আমাকে বলবে তো! ঠিক আছে রাণী, দেখবেন এক সপ্তাহের মধ্যে আপনি পাকা শিকারী হয়ে গেছেন।’

    ‘তুমি সত্যি বলছো!’ আনন্দিত গলায় বললো লিলি, ‘কখন শেখাবে, কবে শেখাবে?’ কথা বলতে বলতে সে আরনাতের পাশ ঘেঁষে বসে পড়লো।

    আরনাত আবার নকশার দিকে দৃষ্টি দিয়েছিল, সে আরনাতের পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো, ‘কিসের নকশা? অভিযানের, নাকি প্রতিরক্ষার?’

    ‘অভিযান চালাবেন সুলতান আইয়ুবী।’ আরনাত অন্যমনস্ক ভাবে বললো, ‘আর প্রতিরক্ষাও তাকেই করতে হবে। আমরা তাকে ফাঁদে ফেলতে চেষ্টা করছি। তাঁর শক্তি যখন নিঃশেষ হবে তখন আমরা অভিযান চালাবো। তখন আমাদের বাঁধা দেয়ার আর কেউ থাকবে না।’

    ‘সাংঘাতিক পরিকল্পনা তো!’ লিলির চোখে মুখে বিস্ময়।

    ‘হ্যাঁ লিলি, তুমি এখন তোমার তাঁবুতে যাও। আমাকে আরো অনেক কিছু চিন্তা করতে হবে। আজ রাতে সম্রাটদের যে কনফারেন্স হবে তাতে এই পরিকল্পনা ও নকশা পেশ করতে হবে আমাকে। আমি এমন নিখুঁত পরিকল্পনা পেশ করতে চাই যাতে কোন ভুল ত্রুটি না থাকে।’

    ‘মেয়েটির নাম কুলসুম ও তার সাথীর নাম বাকের বিন মুহাম্মদ। কুলসুমকে কোন মুসলিম কাফেলা থেকে লুট করেছিল সম্রাট আরনাত, তারপর নিজের হেরেমে ঢুকিয়ে নিয়েছে। আমাদের এজেন্ট বাকার আরনাতের গাড়ী চালক। ওখানে সে খৃস্টান পরিচয়ে আছে। মেয়েটি পালাতে গিয়ে বাকারের হাতে ধরা পড়লে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। তথ্যের মূল উৎস সেই মেয়ে। বাকার তাকে ট্রেনিং দিয়ে কাজের উপযোগী করে গড়ে নিয়েছে।’ সুলতান আইয়ুবীর কাছে এ তথ্য তুলে ধরছিল গোয়েন্দা বিভাগের উপ-প্রধান হাসান বিন আবদুল্লাহ।

    সুলতান আইয়ুবী হাসান বিন আবদুল্লাহর রিপোর্ট শুনছিলেন। তার চেহারা ক্রমেই কঠোর হয়ে উঠছিল। তিনি রক্তিম চোখে তাকালেন হাসানের দিকে। বললেন, ‘হাসান, কে বলতে পারবে আমাদের কত মেয়ে কাফেরদের কাছে এমনিভাবে বন্দী হয়ে আছে? আফসোস! আমাদের পাপের কারণে আমাদের মেয়েরা আজ কাফেরদের ভোগের সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে। আমি আরনাতকে ক্ষমা করবো না। মনে রেখ হাসান, এ মেয়েকে আমি সেখান থেকে উদ্ধার করবো। ইজ্জত বিকিয়ে দিয়ে মেয়েরা আমাকে সাহায্য করুক, এ আমি চাই না। আরে, আমি তো লড়াই করছি আমার বোন ও কন্যাদের সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য। একজন মুজাহিদের জীবন তো তখনই সফল হয় যখন সে তার এক বোনের ইজ্জত বাঁচানোর জন্য ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে।’

    ‘সুলতান! ক্রাকে আমাদের যে লোক আছে তারাই সময় মতো তাকে বের করে আনবে।’ হাসান বিন আবদুল্লাহ বললেন, ‘আক্রার পাদ্রী ও সম্মিলিত খৃস্টান রাজন্যবর্গ নসিবায় তিন দিন ধরে বৈঠক করে যুদ্ধের প্লান ও নকশা তৈরী করেছে। কুলসুম আরনাতের কাছ থেকে সেই পরিকল্পনার পুরোটাই জেনে নিয়েছে ও বাকারকে বলে দিয়েছে। এতোক্ষণ আমি বাকারের পাঠানো খবরই আপনার সামনে পেশ করলাম।’

    খৃস্টানরাও সুলতান আইয়ুবীর গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য সচেষ্ট ছিল। তাদের গোয়েন্দা মুশেল, হলব, দামেশক, কায়রোসহ মুসলিম অধ্যুষিত প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছড়িয়ে ছিল। তাদের মাধ্যমেই খৃস্টানরা জানতে পেরেছিল, মিশর থেকে সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যরা বেরিয়ে পড়েছে। তারা আরও জানতে পেরেছে, সুলতান আইয়ুবী খুব শিঘ্রই অভিযান চালাচ্ছেন। সে জন্যই তারা প্রতিরোধ ব্যবস্থা দৃঢ় করে সুলতান আইয়ুবীর চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করেছে।

    পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা বিভিন্ন স্থানে সৈন্য সমাবেশ করেছে। তারা এখনও জানতে পারেনি, সুলতান আইয়ুবী কোন দিক থেকে অভিযান চালাবেন আর সমরক্ষেত্র কোনটি হবে? তারা অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই সৈন্য সাজাচ্ছিল। তবে সুলতান আইয়ুবীর সৈন্য সংখ্যা, বিশেষ করে তাঁর কি পরিমাণ তীরন্দাজ, পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য এবার অভিযানে বের হয়েছে সে পরিসংখ্যান তারা পেয়ে গেছে বলে খুবই উল্লসিত ছিল তারা।

    কুলসুম ও বাকারের কাছ থেকে আসা গোয়েন্দার কাছ থেকে হাসান বিন আবদুল্লাহ বিস্তারিত সংবাদ নিয়ে সুলতান আইয়ুবীর কাছে সব বিবরণ তুলে ধরলেন। সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বিবরণের সাথে এ তথ্যের মিল আছে। এটা তো আমরা আগেই জানতে পেরেছি, খৃস্টানরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এখন ক্রাকের সংবাদ এর সত্যটা আরো দৃঢ় করলো। নতুন খবর যা পেলাম তা হলো, খৃস্টান রাজন্যবর্গ তাদের মতপার্থক্য ভুলে আবারো একত্রিত হয়েছে এবং তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সম্মিলিতভাবেই তারা আমাদের মোকাবেলা করবে। অর্থাৎ এবারও আমাদেরকে খৃস্টানদের সম্মিলিত বাহিনীর সাথেই যুদ্ধ করতে হবে।’

    ‘এ ছাড়া নতুন যে তথ্য পেয়েছি তাহলো, এবার আমরা তাদের সামরিক শক্তির একটি সঠিক পরিসংখ্যান পেয়েছি।’ বললেন হাসান বিন আবদুল্লাহ, ‘এবার তাদের বাহিনীতে থাকবে দুই হাজার দুইশো নাইট সৈন্য। নিঃসন্দেহে এটা এক বিরাট শক্তি। নাইটদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত থাকে লোহার পোশাক। এই পোশাকের কারণে তারা থাকে অধিক সুরক্ষিত ও নিরাপদ। নাইটদের ঘোড়াগুলোও সাধারণ সৈন্যদের ঘোড়ার চেয়ে অধিক শক্তিশালী ও দ্রুত গতিসম্পন্ন।’

    ‘এ নিয়ে আমি মোটেই উদ্বিগ্ন নই। আমি তাদের এমন সময় যুদ্ধের মাঠে নামাবো যখন প্রকৃতিতে থাকবে প্রচণ্ড উত্তাপের দাবদাহ। মাথার উপর থাকবে প্রখর সূর্য, পায়ের নিচের বালি থাকবে আগুনের হলকার মতোই উত্তপ্ত। তখন তাদের পোশাকই তাদের শত্রু হয়ে দাঁড়াবে।’

    ‘আমরা আরো জানতে পেরেছি, প্রতিটি নাইট বাহিনীর সাথে থাকবে আট হাজার অশ্বারোহী ও ত্রিশ হাজার পদাতিক।’ হাসান বিন আবদুল্লাহ বললেন, ‘সৈন্যের এ সংখ্যাটা কিন্তু বিশাল।’

    ‘এটা জানা থাকায় আমার পরিকল্পনা করতে সুবিধা হবে। তবে আমি অবাক হয়েছি যে খবরটা শুনে তা হলো, আর্মেনিয়ার শাহের সৈন্যও নাকি খৃস্টানদের সাথে যোগ দিচ্ছে।’ সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘এ সৈন্য ক্রুসেডদের সৈন্যের অতিরিক্ত। আর এদের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা আমার যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে জানে। সম্ভবত ওদের পরামর্শেই ক্রুসেড বাহিনী এবার আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

    ‘সে অনুযায়ী আপনি হাতিন এলাকা থেকে যুদ্ধ শুরু করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা খুবই সঠিক ও যুক্তিযুক্ত হয়েছে। কারণ হাতিন অঞ্চল আমাদের জন্য খুবই উপযোগী ও পরিচিত এলাকা।’

    ‘হে, আমার বন্ধুগণ! এখন আমাদের সামনে সেই সময় উপস্থিত, যখন আমাদের জীবন আল্লাহর রাহে বিলিয়ে দেয়ার ডাক এসেছে। এ পৃথিবীর আলো বাতাস ডেকে বলছে, ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ো মুজাহিদ। এ ফরজ আমাদের ওপর অর্পণ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত। তিনিই আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, দুশমন ময়দানে এলে খবরদার ঈমানদার, কখনো পৃষ্ঠ প্রদর্শন করো না। আমাদের হত্যা করার জন্য আজ জোট বেঁধেছে দুশমন। এ অবস্থায় কোরআন আমাদের ডেকে বলছে, হে আল্লাহর সৈনিকেরা, ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ো। মারো আর মরো। মানবতার দুশমনদের হাত থেকে বাঁচাও বিপন্ন মানুষকে।’

    সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী দামেশকে তাঁর বিরাট কামরায় সেনাপতি ও কমান্ডারদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘ক্ষমতা লাভের জন্য নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করা ও নিজেরাই শেষ হয়ে যাওয়ার জন্য আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেননি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরের অনেক রক্ত ঝরিয়েছি, ক্ষয় করেছি নিজেদের অনেক শক্তি। এই দীর্ঘ সময়ে শত্রুরা তাদের শক্তি আরও বহু গুণে বৃদ্ধি করে নিয়েছে। ফিলিস্তিন তারা শুধু দখলই করেনি, সেখানে তারা তাদের স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।

    জাতি আমাদের হাতে তাদের স্বার্থ ও সম্মান রক্ষার জন্য অস্ত্র তুলে দিয়েছে। আমরাও স্বেচ্ছায় এ কঠিন দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে সৈনিকের খাতায় নাম লিখিয়েছি। জনগণ এই আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে আমাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছে, যেন আমরা শত্রুদের নির্মূল করে তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপন নিশ্চিত করি। যেন আরবের পবিত্র ভূমি থেকে কাফেরদের বিতাড়িত করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের হেফাজত করি।

    আমি জানি, আপনারা কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে পরেছেন। কিন্তু আমি বলতে চাই, ওটা যুদ্ধ ছিল না, ওটা ছিল ভ্রাতিঘাতি সংঘাত। গৃহযুদ্ধ আমাদের অনেক সময় ও শক্তি নষ্ট করেছে কিন্তু তাতে জাতির কোন কল্যাণ হয়নি। আমরাই আমাদের মেরেছি আর পরস্পর নিঃশেষ হয়েছি। কতিপয় গাদ্দারের কারণে জাতির অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেলো।’

    সালাউদ্দিন আইয়ুবী বললেন, ‘বন্ধুরা, আসল যুদ্ধ সবেমাত্র শুরু হতে যাচ্ছে। আপনারা কেন এই যুদ্ধে জড়াতে যাচ্ছেন তা ভাল মতো বুঝে নিন। কোন ব্যক্তির প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা অস্ত্র হাতে নেইনি। কোন দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করাও আমাদের টার্গেট নয়। পাশবিক শক্তি আজ মানবিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। মানুষের জীবন আজ বিপন্ন হতে চলেছে। এ জমিন আল্লাহর, এখানে হুকুম চলবে আল্লাহর। কারণ আল্লাহই ভাল জানেন কিসে মানুষের কল্যাণ আর কিসে অকল্যাণ। মানুষের জীবনকে শান্তিময় করার জন্যই তিনি তাঁর রাসূলের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন ইসলাম।

    একমাত্র ইসলামই মানবতার রক্ষাকবচ। এখানে কোন অবাঞ্চিত হস্তক্ষেপ নেই। আছে শাশ্বত কল্যাণ ও মুক্তির দিকনির্দেশনা। রাসূলই আমাদের নেতা। কোরআন আমাদের সংবিধান। আমরা মানবতার স্বার্থে এই শাশ্বত জীবন বিধান গ্রহণ করার জন্যই সবাইকে আমন্ত্রণ জানাই। আমরা তাই অবিনাশী সত্য ও চির সুন্দরের আপোষহীন সৈনিক। আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সভ্যতার সংরক্ষণ ও মানবতার কল্যাণ। অতএব মনকে জীবন্ত ও সতেজ করে তুলুন। কঠোর শপথ নিন, অশুভ, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে। মানুষ বসবাস করবে স্বাধীন পৃথিবীতে, একমাত্র আল্লাহর গোলামী ছাড়া আর কারও গোলামী করতে সে বাধ্য নয়। কেবল এ পথেই মানব জাতি আপন মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে।

    বন্ধুগণ, এই লক্ষ্য হাসিলের জন্যই আমাদের পূর্ব পুরুষরা ছুটে গেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। ইসলামের বিজয় নিশান উড়িয়ে দিয়েছেন দেশ হতে দেশান্তরে। তারেক বিন জিয়াদ স্পেনের মাটিতে জ্বেলেছেন সত্যের আলো। মুহাম্মদ বিন কাসিম এই আলো নিয়েই পৌঁছেছিলেন সুদূর ভারতে। তাদের পদচিহ্ন ধরে ভবিষ্যৎ বংশধরদের দায়িত্ব ছিল আল্লাহর বাণী সেখান থেকে আরও দূরদূরান্তে পৌঁছে দেয়া। কিন্তু আল্লাহর সৈনিকরা যখন গাফলতির ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো তখন আল্লাহর রাজত্ব ক্রমশ সংকীর্ণ হতে শুরু করলো।

    আফসোস! শত্রুরা এখন আমাদের ঘরে এসে বসে আছে। এখন তারা আমাদের কাবাঘর ও নবীর (সা.) রওজা মুবারক ধ্বংস করার পায়তারা করছে। কেমন করে এমনটি সম্ভব হলো? ব্যক্তির মধ্যে যখন বাদশাহ হওয়ার খায়েশ জাগে আর মানুষের মধ্যে সংকীর্ণ জাতীয়তার উন্মাদনা সৃষ্টি হয় তখন মানবতা বিপর্যস্ত হয়। তখন ইসলামের বিকাশ না হয়ে বরং তা সংকীর্ণ হতে থাকে। শাসক তার গদী ও ক্ষমতার লোভে ইসলামই বিসর্জন দেয় না, নিজের লজ্জাবোধও বিসর্জন দিয়ে দেয়।

    আজ বিশ্বব্যাপী সভ্যতার সংকট ও সার্বিক অবনতির কারণ শাসকবৃন্দের ক্ষমতা ও গদীর নেশা এবং মানুষের সীমাহীন লোভ ও ধনরত্নের প্রতি প্রবল আগ্রহ। প্রকৃত ঈমানদার দুনিয়ার ওপর কর্তৃত্ব করে আর এখন দুনিয়া আমাদের উপর চেপে বসে আছে। দুনিয়ার মোহে আমরা পরকালের পরিণতির কথাও ভুলে গেছি। কে মানবতার প্রকৃত বন্ধু আর কে শত্রু সে বিচারের বিবেকও হারিয়ে ফেলেছে মানুষ। ফলে আমাদের বন্ধু ও শত্রুর পরিচয়ও আজ কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে।

    এবার সামরিক শক্তির প্রসঙ্গে আপনাদের কিছু বলতে চাই। জাতির ভাগ্য অস্ত্রের মুখেই নির্ধারিত হয়। যাদের হাতে অস্ত্র থাকে ইতিহাস লেখা হয় সেই সব মুজাহিদদের নামে। যতদিন মুজাহিদরা নিজেদেরকে জাতির সেবক মনে করে ততোদিন তারা থাকে অজেয়। কিন্তু যখন সেই বাহিনীর সেনাপতি নিজেকে বাদশাহ ভাবতে আরম্ভ করে আর তার মুজাহিদরা আত্মতুষ্টির ঢেকুর তুলতে শুরু করে তখন তাদের বাহুতে আর কোন শক্তি থাকে না।

    তাদের খাপ খোলা তরোয়ালগুলো ঢুকে যায় খাপের ভেতর। তাদের মন থেকে হারিয়ে যায় জাতির সম্মান ও গৌরব রক্ষার আবেগ। তাদের অধঃপতন হতে হতে এই পর্যায়ে পৌঁছে যে, অবশেষে তারা নিজের ঈমানের দাবী পূরণেও আর সক্রিয় থাকে না। ধর্মকে তখন তারা ব্যবহার করতে শুরু করে প্রজাদের ধোঁকা দেয়ার কাজে। গোপনে শত্রুর সাথে হাত মিলিয়ে স্বচ্ছন্দ বোধ করে তারা। প্রজাদের উপর নিজেদের শাসন চালাতে ব্যবহার করে আল্লাহর নাম।

    আমরা আজ ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার জন্য আপন বাড়ী ঘরের মায়া ত্যাগ করে শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য একত্রিত হয়েছি। আমরা ক্ষমতা ও সম্পদের মোহ থেকে নিজেদেরই কেবল মুক্ত করিনি, যারা ক্ষমতা ও সম্পদের পূজারী তাদের সমুচিত শিক্ষা দিয়ে জাতিকে মুক্ত করেছি তাদের কবল থেকে। এতদিন জাতির আস্তিনের ভেতর লুকিয়েছিল যে বিষধর সাপ আমরা তার মাথা গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি। এখন যদি আমরা হেরে যাই তবে তার কারণ একটাই হবে, আর তা হলো আমাদের নিয়তের ত্রুটি ও গণ্ডগোল। এ জন্যই আমি আপনাদের ময়দানে পা বাড়াবার আগে এ ব্যাপারে সতর্ক করার প্রয়োজন বোধ করছি। আমরা যদি আমাদের নিয়তকে পরিচ্ছন্ন করতে পারি, আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহর রহমাত আমাদের বিজয়ের জামিনদার হয়ে যাবে।’

    সুলতান আইয়ুবী এমন আবেগময় দীর্ঘ বক্তৃতায় অভ্যস্ত ছিলেন না। কিন্তু তিনি যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে অভিযানে বেরোতে যাচ্ছেন সে সম্পর্কে সকলকে মানসিক ও আধ্যাত্মিকভাবে প্রস্তুত করার জন্য এ ভাষণ জরুরী হয়ে পড়েছিল।

    উপস্থিত সবাই ছিলেন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত সেনাপতি ও কমান্ডার। এদের মধ্যে ছিলেন সেনাপতি মুজাফফরউদ্দিন। যিনি একজন যোগ্য ও বীর সেনাপতি হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এক সময় তিনি সুলতানের সঙ্গ ছেড়ে তার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন এবং সুলতানের বিরুদ্ধে লড়াইতেও অংশ নিয়েছিলেন। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে আবার ফিরে এসেছেন সুলতানের বাহিনীতে। এ ছাড়া ছিলেন সেনাপতি তকিউদ্দিন, আফজালউদ্দিন, ফররুখ শাহ এবং মালেক আদিলের মত বীর ও যোগ্য সেনাপতিবৃন্দ। এদের কেউ কেউ ছিলেন সুলতান আইয়ুবীর নিজ বংশের এবং রক্ত সম্বন্ধীয় আত্মীয়। আর ছিলেন সেনাপতি কাকবুরী, যিনি সুলতান আইয়ুবীর দক্ষিন হস্ত রূপে পরিচিত ছিলেন। এদের মধ্যে এমন কেউ ছিল না, যার কৌশল, দক্ষতা ও তেজস্বীতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এমনি একদল সুদক্ষ সেনাপতি নিয়ে সুলতান আইয়ুবী ফিলিস্তিন অভিমুখে অভিযান চালাতে যাচ্ছিলেন। তার চোখের সামনে তখন ভাসছিল মুসলমানদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস, যেখান থেকে আমাদের প্রিয় নবী মেরাজে গমন করেছিলেন।

    এ অভিযান ছিল খুবই বিপদসঙ্কুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। ক্রুসেডদের সামরিক শক্তি ও শ্রেষ্ঠত্বই কেবল বেশী ছিল এমন নয়, পারিপার্শ্বিক অবস্থার দিক দিয়েও ক্রুসেড বাহিনী ছিল সুবিধাজনক অবস্থানে। ক্রুসেডাররা উল্লসিত ছিল এ জন্য যে, তারা তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট মজবুত ও সংহত করে নিতে পেরেছে। তারা নিজেদের মাটিতে থেকে যুদ্ধ করবে, ফলে তাদের রসদের ঘাটতি পড়ার কোন সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সুলতান আইয়ুবী তার এলাকা থেকে বহু দূরে যুদ্ধ করতে আসবে। অনেক বাঁধা মাড়িয়ে দীর্ঘ পথ তাদেরকে রসদপত্র বহন করে আনতে হবে।

    যুদ্ধের স্বাভাবিক বিবেচনায় সামরিক কৌশলগত দিক থেকেও আক্রান্ত বাহিনীর চাইতে আক্রমণকারী বাহিনী থাকবে বেকায়দায়। এ জন্য আক্রমণকারী সৈন্য সংখ্যা আক্রান্ত বাহিনীর ছয়গুন না হলেও দ্বিগুণ তো অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু সুলতান আইয়ুবীর বাহিনী দ্বিগুন তো দূরের কথা, সমানও ছিল না। বরং খৃস্টান বাহিনীর চাইতে অনেক কম সৈন্য নিয়েই সুলতানকে যুদ্ধযাত্রা করতে হচ্ছিল।

    অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল, এ যুদ্ধ অনেক সময় নেবে। সুলতান পরাজয় মেনে না নিয়ে ঝটিকা আক্রমণ করে ব্যতিব্যস্ত রাখবেন খৃস্টানদের। আর খৃস্টানরা উন্নত অস্ত্র, বিপুল রসদসম্ভার, অধিক সৈন্য আর আপন ভুবনে যুদ্ধ করার সুবিধার কারণে পরাজয় মেনে না নিয়ে একের পর এক প্রতিহত করে যাবে সুলতানের প্রতিটি আক্রমণ। এই মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই আইয়ুবীর সৈন্যরা তৈরী হচ্ছিল। তারা ভাবছিল, হয়তো দীর্ঘ দিন আর বাড়ী ফেরা সম্ভব হবে না। হয়তো এ জীবনে আর কোন দিনই বাড়ী ফিরতে পারবে না তারা। কিন্তু তাতে কোন আফসোস ছিল না তাদের।

    সুলতান আইয়ুবীও তাদেরকে এ কথাটিই বুঝানোর চেষ্টা করছিলেন। তিনি সৈন্য ও সেনাপতিদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন, তারেক বিন জিয়াদের ইতিহাস। বলছিলেন, ‘বিজয় ছিনিয়ে আনতে হলে আমাদেরও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে সমস্ত নৌযানগুলো আগুন লাগিয়ে পুড়ে ফেলার মত সাহস ও হিম্মত রাখতে হবে। পিছু হটার সব পথ বন্ধ না করলে বিজয় আমাদের পদচুম্বন করবে না। এই অনুভূতি নিয়ে ময়দানে পা বাড়াতে হবে আমাদের, এটাই আমার জীবনের শেষ যাত্রা, আর কোন দিন আমরা কেউ স্বদেশ ও স্বজনদের কাছে ফিরে আসতে পারবো না।’

    কাজী বাহাউদ্দিন শাদ্দাদ তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘সুলতান আইয়ুবী বিশ্বাস করতেন, কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ও দুনিয়ায় আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য চেষ্টা করা এমন ফরজ, যে দায়িত্ব আল্লাহ তাকে অর্পন করেছেন। আল্লাহ মুসলমানদেরকে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার যে আদেশ দান করেছেন এটাই তার জীবনের সবচে বড় ফরজ। এ দায়িত্ব দুনিয়ার সকল কাজের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। অধিকাংশ দেশ আল্লাহর আইনের শাসনে আনয়ন করা ও মানব জাতিকে আল্লাহর আনুগত্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করাই একজন মুমিনের প্রকৃত কাজ। তিনি সমস্ত সৈন্য বাহিনীকে একত্রিত করে তাদের মধ্যে এই চেতনা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন।

    সুলতান আইয়ুবীর অন্তর দৃষ্টি ভবিষ্যতের আলো-অন্ধকার যেন পুরোটাই দেখতে পাচ্ছিলো। সেই আলোকে তিনি হাতিন অঞ্চলকেই আগামী যুদ্ধের মোক্ষম ক্ষেত্র বিবেচনা করলেন।

    ফিলিস্তিনের এক অখ্যাত পল্লী ছিল হাতিন। কিন্তু সুলতান আইয়ুবীর সংকল্প ও পরিকল্পনার কারণে এই অঞ্চলটি পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন মহিমা ও ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। খৃস্টান ঐতিহাসিকরা সুলতান আইয়ুবীর চিন্তা ও দূরদর্শিতা দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন। ক্রুসেড বাহিনীর সম্মিলিত শক্তিকে হাতিন অঞ্চলে টেনে আনা, অভাবিত চাল ও রণ কৌশলের মাধ্যমে বিশাল খৃস্টশক্তিকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে সুলতান আইয়ুবী নিজেকে এক দিগ্বিজয়ী সেনানায়ক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। খৃস্টান রাজন্যবর্গের সম্মিলিত বাহিনীর মাত্র একটি দল ছাড়া সব কয়টি দল এ যুদ্ধে পরাজয় বরণ করে এবং পরাজিত বাহিনীর অসংখ্য সৈন্য বন্দীত্ব কবুল করে নিজেদের আত্মরক্ষা করতে বাধ্য হয়।

    সামরিক বিশেষজ্ঞ ঐতিহাসিকগণ এ যুদ্ধে সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দা বিভাগ এবং তার কমান্ডো বাহিনীর বিস্ময়কর তৎপরতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে বাকার বিন মুহাম্মদ ও কুলসুমের তৎপরতা ছিল অবিস্মরণীয়। বাকার মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও প্রয়োজনীয় গোপন তথ্য সংগ্রহ করে তা সুলতান আইয়ুবীকে পৌঁছে দিয়েছিল। কুলসুম রাজকীয় বিলাসিতা ও সুখের জীবন উপেক্ষা করে আইয়ুবীর সৈন্যদের জন্য গোপন তথ্য সরবরাহ করেছে। তারা এবং তাদের মতো অসংখ্য গোয়েন্দা, যাদের নাম মানুষের দৃষ্টির অন্তরালেই রয়ে গেছে, তাদের ত্যাগ, কোরবানী ও শাহাদাতের বিনিময়ে রচিত হয়েছে নতুন ইতিহাস। আল্লাহর রাহে জীবন বিলিয়ে দেয়ার তামান্না নিয়ে যেসব মুজাহিদ হাতিনের ময়দানে রক্ত দিয়েছে তাদের ত্যাগের বিনিময়ে হাতিনের মত নগণ্য গ্রাম ইসলামের ইতিহাসে স্মৃতির নিদর্শন হয়ে আছে।

    সুলতান আইয়ুবী সর্বদা জুম্মার দিনে তার অভিযানের সূচনা করতেন। কারণ এ দিনটিকে তিনি আল্লাহর অধিক পছন্দনীয় ও পবিত্র দিন মনে করতেন। এই পবিত্র দিনে প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহর কাছে নতজানু থাকে। যখন এই দিনে সৈন্যরা অভিযানে বের হয় তখন সমগ্র জাতি আল্লাহর কাছে তাদের সফলতা কামনা করে দোয়া করতে থাকে।

    হাতিনের ময়দানে যাওয়ার জন্যও তিনি জুমার দিন বেছে নিলেন। দিনটি ছিল ১১৮৭ সালের ১৫ মার্চ। সুলতান আইয়ুবী তার বিশাল বাহিনীর মাত্র একটি ব্যাটেলিয়ান সঙ্গে নিয়ে ক্রাকের কাছে ক্যাম্প করে বসলেন।

    খৃস্টান গোয়েন্দারা দ্রুত এই খবর সম্মিলিত ক্রুসেড বাহিনীর কাছে পৌঁছে দিল। গোয়েন্দারা বললো, ‘সুলতান আইয়ুবী ক্রাকের কাছে অবস্থান নিয়েছেন। সম্ভবত তিনি ক্রাক শহর অবরোধ করবেন।’

    কিন্তু সুলতানের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। এটা ছিল হজ্জের কাফেলা যাতায়াতের সময়। মিশর ও সিরিয়ার হজ্জ কাফেলাগুলো এই পথে যাতায়াত করতো। খৃস্টান দুর্বৃত্তরা এই সব কাফেলায় আক্রমণ চালাতো। এ সব আক্রমণ চালানো হতো ক্রাকের খৃস্টান সরকারের সহায়তায়। ক্রাকের সম্রাট শাহ আরনাত কুখ্যাত লুটেরা হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিল।

    সুলতান আইয়ুবী চাচ্ছিলেন হজ্জ কাফেলাগুলো যেন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। এ জন্যই তিনি ক্রাকের কাছে গিয়ে অবস্থান নিলেন। তিনি জানতেন, তার এ উদ্দেশ্যের কথা খৃস্টানরা ধারনা করবে না। তারা ভাববে, সুলতান তাদের ওপর আক্রমণ করার জন্যই ওখানে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে মুসলিম কাফেলায় আক্রমণ করার চিন্তা যেমন বাদ দেবে তেমনি আক্রান্ত না হওয়ায় তারা থাকবে অজানা আশঙ্কা ও পেরেশানীতে। এতে দুশমনের মনোবল ভেঙ্গে পড়বে।

    ক্রাকের সন্নিকটে অবস্থান নেয়ায় সুলতানের দুটো উদ্দেশ্যই পূরণ হলো। ক্রুসেড বাহিনী সুলতানের চালাকি বুঝতে পারলো না। তারা ক্রাকের প্রতিরক্ষা জোরদার করার জন্য তাদের বাহিনীকে সদা প্রস্তুত অবস্থায় বসিয়ে রাখলো কেল্লার ভেতর। এদিকে হজ্জ কাফেলাগুলো নির্বিঘ্নে এগিয়ে গেল কাবার দিকে। সুলতান আইয়ুবী তার সেনাপতি ও কমান্ডারদের বুঝিয়ে দিলেন, কাফেলাগুলো চলে গেলে তাদের কি করতে হবে।

    সুলতানের ক্রাক অবরোধের ব্যাপারটি ছিল বেশ মজার। একদিন গভীর রাতে ক্রাকের রাজমহলে হঠাৎ যেন ভুকম্পন শুরু হয়ে গেল। শাহ আরনাতকে মাঝরাতে জাগানো হলো। তাকে বলা হলো, সুলতান আইয়ুবী ক্রাক শহর অবরোধ করে বসেছেন। শহর প্রাচীরের বাইরে সুলতানের বিশাল বাহিনী ক্যাম্প করে বসেছে। শাহ আরনাত হতচকিত হয়ে উঠে বসলেন। ভীতচকিত কণ্ঠে বললেন, ‘কি বললে? সুলতান আইয়ুবী শহর অবরোধ করেছেন?’

    কুলসুম তখন তার পাশেই ছিল। সে শাহ আরনাতের সাথে দৌড়ে শহরের মেইন গেটে গেল। সেখানে দেয়ালের উপর উঠে দেখলো প্রাচীরের বাইরে নিরাপদ দূরত্বে শত শত মশাল জ্বলছে। বেশীর ভাগ মশালই নড়াচড়া করছে, অর্থাৎ সেখানে তাঁবু টানানো হচ্ছে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে ঘোড়ার চি হি হি শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

    শাহ আরনাত আইয়ুবীর অবরোধ ঠেকাতে শহরের প্রাচীরের উপর সৈন্য সমাবেশ করলেন। শহরের মেইন গেটের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দৃঢ় করলেন। শাহ আরনাত ছুটাছুটি করে সৈন্যদের নানা রকম নির্দেশ দিচ্ছিলেন, কুলসুমের দিকে তার কোন খেয়াল ছিল না।

    কুলসুম ফিরে গেল মহলে। শাহ আরনাতের রক্ষীরা তার নির্দেশে ছুটাছুটি করছিল। মহলের পাশে দাঁড়িয়েছিল শাহী গাড়ী। এ গাড়ীতে করেই কুলসুম প্রতিদিন ভ্রমণ করতে যায়। গাড়ীর পাশে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাকার বিন মুহাম্মদ। মোট কথা, ক্রাকের রাজমহলের প্রতিটি ব্যক্তিই তখন নিজ নিজ দায়িত্বে তৎপর ছিল।

    কুলসুম আদেশের ভঙ্গিতে বললো, ‘সায়বল। গাড়ী এদিকে আনো।’

    বাকার যখন গাড়ী আনলো, তখন কুলসুম তার ওপর উঠে বসলো ও গাড়ী একদিকে চালাতে হুকুম দিল। শাহ আরনাতের অন্দর মহলের মেয়েরা সবাই ছুটে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। তারা মহলের পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল রক্ষীদের ছুটাছুটি। হঠাৎ তারা দেখতে পেলো, প্রিন্সেস লিলি গাড়ীতে উঠে গাড়ী চালককে গাড়ী চালাতে হুকুম করছে। তাদের মধ্যে এক মেয়ে রাগে দাঁত পিষে বললো, ‘এ হতভাগী কোন মুসলমানের বেটি, অথচ সে নিজেকে রাজরাণী মনে করে। তাকে শায়েস্তা করতেই হবে।’

    ‘সময় এসেছে।’ অন্য এক মেয়ে বললো, ‘সুলতান আইয়ুবীর অবরোধ খুব শক্ত ও ভয়ংকর হয়। তিনি অগ্নিবান নিক্ষেপ করবেন। মেনজানিক দিয়ে পাথর নিক্ষেপ করবেন। তখন শহরের মধ্যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়ে যাবে। সে সময় আমরা ওই মুখপোড়া ডাইনীকে শায়েস্তা করতে পারবো। দেখবে দু’দিনেই তার দেমাগ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।’

    ‘তুমি আর বাহাদুরী করো না। তুমি না বলেছিলে তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে যে জেনারেল তাকে দিয়ে ঐ মেয়ের দেমাগ ঠাণ্ডা করে দেবে? কই, কিছুই তো করতে পারলে না।’ বললো অন্য আরেক মেয়ে।

    ‘তিনি সুযোগ করে উঠতে পারেননি। এবার দেখো ঠিকই সুযোগ এসে যাবে।’ আগের মেয়েটি বললো, ‘আগামীকাল সন্ধ্যা নাগাদ শহরের কি অবস্থা হয় দেখে নিও। সম্রাট আর শাহজাদী লিলির দিকে তাকাবারও ফুসরত পাবে না।’

    কুলসুম গাড়ী নিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি এক স্থানে পৌঁছলো। গাড়ী দাঁড় করিয়ে সে বাকারকে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমাদের কোন লোক ভেতর থেকে কি ফটক খোলার ব্যবস্থা করতে পারবে?’

    ‘সময় মতো চেষ্টা করে দেখা যাবে।’ বাকার বললো, ‘এই সৈন্য বাহিনী আমাদের কিনা তা আমি নিশ্চিত নই। আমি বিস্মিত হচ্ছি এই ভেবে যে, যদি এরা আমাদের বাহিনীই হবে তবে তারা আগে কেন সংবাদ দেয়নি। সুলতান আইয়ুবী তো এমন ভুল করেন না। সকাল হলেই স্পষ্ট জানা যাবে, এ বাহিনী আসলে কার?’

    ‘যদি এরা সুলতানের বাহিনী হয় তবে কি আমরা এখান থেকে পালাতে পারবো?’ কুলসুম জিজ্ঞেস করলো।

    ‘সেটা অবস্থার ওপর নির্ভর করবে।’

    ‘এই বিশৃংখল অবস্থায় আমি আরনাতকে সহজেই হত্যা করতে পারি।’

    এমন কাজ খবরদার করবে না।’ বাকার বললো, ‘সৈন্যরা শহরে প্রবেশ করার সময় আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যেন তিনি পালাতে না পারেন।’

    ‘তাহলে আমি এখন কি করবো? এ অবস্থায় আমাদের কি কিছুই করণীয় নেই?’

    ‘আছে। তবে তার আগে দেখতে হবে এটা সুলতানের বাহিনী কিনা? আর শাহ আরনাত কোন দিক থেকে কিভাবে অভিযান চালান তাও আমাদের দেখতে হবে।’

    কুলসুম আবেগ ও উত্তেজনায় টগবগ করছিল। ঠিক কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না সে। তার অস্থিরতা লক্ষ্য করে বাকার বললো, ‘এখন অবস্থা অন্য রকম হয়ে গেছে। আমি খবর পেয়েছিলাম তিনি সৈন্যদের নিয়ে গেলিলি সাগরের দিকে যাবেন। কিন্তু…’

    ‘কিন্তু তিনি ক্রাক অবরোধ করে ঠিক কাজই করেছেন। এখন আমাদের উচিত তাকে সহায়তা করা।’

    ‘থামো। এতো উতলা হয়ো না। নিজেকে সংযত করো। কি করতে হবে সময় মতো আমি তোমাকে বলবো। চলো। এখানে আর বেশীক্ষণ দেরী করা ঠিক হচ্ছে না।’ বাকার বললো, ‘চলো ফিরে যাই।’

    এই হট্টগোলের মধ্য দিয়েই কেটে গেল রাত। প্রভাতের আলো ফুটতে শুরু করলো পূর্ব দিগন্তে। ক্রাকের প্রাচীরের উপর দূরপাল্লার কামানগুলো অগ্নিবর্ষণ করার জন্য মুখ হা করে বসেছিল। মেনজানিকগুলো প্রস্তুত হয়েছিল পাথর ও অগ্নিবান নিক্ষেপের জন্য। সৈন্যরা প্রস্তুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল সম্রাট আরনাতের নির্দেশের অপেক্ষায়।

    সম্রাট শাহ আরনাত প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে তাকিয়েছিলেন সুলতান আইয়ুবীর বাহিনীর দিকে। যখন তিনি দেখতে পেলেন ওখানে মুসলিম বাহিনীর নিশান উড়ছে তখন তিনি নিশ্চিত হলেন এটা সুলতান আইয়ুবীরই বাহিনী। কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন না, সুলতান আইয়ুবী এই বাহিনীর সাথে আদৌ আছেন কি নেই।

    তিনি বাহিনীর সজ্জা দেখে বিস্মিত হলেন। বাহিনীর সজ্জা মোটেও অবরোধের মত নয়। তারা তাঁবু টানিয়ে ক্যাম্প করেছে ঠিক, কিন্তু সৈন্যরা প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছে। হামলা করার কোন তৎপরতাই তাদের মধ্যে নেই।

    সেদিনটি কেটে গেল নির্বিঘ্নে। কোন দিক থেকেই কোন হামলা হলো না। এভাবেই কাটলো আরও পাঁচটি দিন। আরনাতের অপেক্ষা অস্থিরতায় পরিণত হলো। কিন্তু তিনি জানতে পারলেন না, রাতে সুলতান আইয়ুবী অশ্বপৃষ্ঠে আরোহন করে তার বিশ্বস্ত কমান্ডো সৈন্যদের রাস্তায় দূর দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছেন, যে রাস্তায় হাজীরা যাতায়াত করবে।

  • রিচার্ডের নৌবহর

    রিচার্ডের নৌবহর

    রিচার্ডের নৌবহর

    সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী শৈশব কালে তাঁর পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুবীর কাছ থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসের অবমাননা ও সেখানকার মুসলমানদের ওপর জঘন্য বর্বরতার কাহিনী শুনেছিলেন। তাঁর পিতা এ কাহিনী শুনেছিলেন তাঁর দাদা শাদী আইয়ুবীর কাছ থেকে।

    শৈশবের শোনা সেই নির্মমতার কাহিনী তাঁর ছোট্ট হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বয়স বাড়লেও সেই কাহিনীর কথা তিনি কোন দিন ভুলতে পারেননি। বরং সুলতান আইয়ুবী অনুভব করছিলেন, যতই তাঁর বয়স বাড়ছে ততোই তাঁর রক্তে, তাঁর শিরায় শিরায় সেই বর্বরতার তিক্ত স্মৃতি প্রচণ্ড আলোড়ন ও ঝড় তুলছে।

    শৈশবে যখন তিনি এ কাহিনী শুনেছিলেন তখনই তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বায়তুল মোকাদ্দাস তিনি একদিন মুক্ত করবেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই শপথ তাঁর দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়েছে। আজ বায়তুল মোকাদ্দাস মুক্ত করতে এসে তাঁর মনে পড়ে গেল, তিনিও তাঁর দুই সন্তানকে শৈশবেই এ কাহিনী শুনিয়েছেন। তাদের একজন এখনো কিশোর থাকলেও অন্যজন এরই মধ্যে যৌবনের সিংহ দরোজা খুলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে জেহাদের ময়দানে। কিশোর আল মালেক আল জাহেরের অন্তরেও নিশ্চয়ই এমনি প্রতিজ্ঞা দানা বেঁধে উঠতে শুরু করেছে। আর যুবক আল আফজাল তো এই সপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই যোগ দিয়েছে সেনাদলে।

    তিনি ভাবছিলেন, আজ যদি আমি সফল হতে না পারি তবে কি এ সপ্ন মুছে যাবে? না, নিশ্চয়ই আল আফজাল ও মালেক আল জাহের এই সপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আবারো কোন বাহিনী নিয়ে ছুটে আসবে জেরুজালেম। মসজিদুল আকসা মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই জিহাদ চলবে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী। মুক্তির ময়দান কখনো নিরব হবে না, হতে পারে না।

    ‘উদ্দেশ্যহীন ভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভাল’। আল আফজাল যখন সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে যাচ্ছিল তখন তিনি তাঁকে বললেন, ‘এ কথা তোমার দাদা মরহুমের। তিনি এ কথা আমাকে ঠিক সেই সময় বলেছিলেন, যখন আমি চাচা শেরকাহ-এর সঙ্গে ক্রুসেডের বিরুদ্ধে প্রথম জিহাদে যাত্রা করি।

    তিনি আরও বলেছিলেন, আমার মনে হচ্ছে, তুমি কোনদিন এ দেশের আমীর হবে। এমনও হতে পারে তুমি সুলতান হয়ে যাবে। তবে যাই হও না কেন, একটা কথা মনে রাখবে, আজ থেকে তুমি কেবল আমার বেটা নও, তুমি এক মহান জাতির সন্তান। কোরআনে বলা হয়েছে, সন্তান মা বাবার খেদমত করবে। এখন তোমার মা ও বাবা হচ্ছে তোমার দেশ ও জাতি। সন্তানের উচিত নয় মা বাবাকে দুঃখ দেয়া। আল্লাহ্‌ কঠোর ভাষায় এ ব্যাপারে সাবধান বাণী উচ্চারন করেছেন।

    তোমাকে আল্লাহ্‌ তাঁর অনন্ত সৃষ্টি ধারায় একটি বিশেষ সময়ে বিশেষ প্রয়োজনে সৃষ্টি করেছেন। সময়ের সেই প্রয়োজনটি কি তা তোমাকে বুঝতে হবে। তোমাকে খেয়াল রাখতে হবে জাতির কোন খেদমতটি তুমি সবচে উত্তম ভাবে সম্পাদন করতে পারবে। নিজের আরাম আয়েশ ও সুখ ভোগের জন্য তোমাকে সৃষ্টি করা হয়নি। তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহ্‌র অনন্ত সৃষ্টিরাজির মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য। সভ্যতার অগ্রগতি সাধনের জন্য। মানবতার কল্যাণের জন্য। আপন জাতির দুঃখ মোচনের জন্য।

    প্রিয় বেটা আমার! আপন জাতিকে দুঃখ দিও না। তাকে নিরাশ ও হতাশ করো না। জাতির পক্ষ থেকে তোমার ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয় তা সুষ্ঠু ভাবে পালন করো’।

    সুলতান আইয়ুবী তাঁর ছেলেকে বললেন, ‘হে আমার নয়নের মনি! তোমার দাদা বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য জিহাদ করতে গিয়ে শহীদ হয়ে যায় তারচে সৌভাগ্য আর কার! এমন শহীদদের কখনও ভুলে যাবে না। যে জাতি তার শহীদ সন্তানদের ভুলে যায় আল্লাহ্‌ নিজেও সে জাতিকে ভুলে যান। আর যে জাতির উপর থেকে আল্লাহ্‌র দৃষ্টি উঠে যায়, সে জাতির জন্য দুনিয়াটা জাহান্নামে পরিণত হয়ে যায়।

    তখন তাদের মসজিদ ও পবিত্র স্থানগুলো দুশমনের আস্তাবলে পরিণত হয়। তাদের কন্যাগুলো শত্রুদের বিলাসিতার সামগ্রী হয়ে যায়। দুনিয়ার কোথাও তারা একটু শান্তি ও স্বস্তির জায়গা খুঁজে পায় না’।

    বাপ আমার! মনে রেখো, এমন জাতির কিসমত থেকে সৌভাগ্য বের হয়ে যায়। তারা তখন পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যখন তোমাকে শাসন ক্ষমতায় বসানো হবে, তখন জাতিকে প্রজা ভাববে না।

    মনে রেখো, মানুষের ওপর শাসন করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ্‌ পাকের। যদি জনগণকে শাসন করতে গিয়ে আল্লাহ্‌র ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নাও তাঁর পরিণতি তোমার জন্য কখনো মঙ্গলময় হবে না। নিজেকে রাজাধিরাজ ভাবলে সেই পাপের শাস্তি পাবে মিশরের ফেরাউনদের মতো।

    ভেবে দেখো, কত শতাব্দী পার হয়ে গেছে, আজো মানুষ তাদের কথা মনে করলে ধিক্কার দেয়। আল্লাহ্‌র এমন অভিশাপ ও লানত তাদের কপালে জুটেছে যে, আল্লাহ্‌ তাদের মমি বানিয়ে রেখেছেন, যাতে তাদের কথা মানুষ কোন দিন ভুলতে না পারে। যাতে তাদের কথা মানুষ কোন দিন ভুলতে না পারে। যাতে যুগ যুগ ধরে তারা মানুষের অভিশাপ বয়ে বেড়ায়।

    যদি কখনো ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যাও, মনে করবে আল্লাহ্‌ তোমার কাঁধে কোন বিরাট বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে দেয়া এই বোঝা কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলা যেমন অন্যায়, এই দায়িত্বকে বোঝা না ভেবে একে নিজের দম্ভ প্রকাশের হাতিয়ার মনে করাও অপরাধ। মনে রেখো, ক্ষমতা দৃশ্যতঃ জাতির পক্ষ থেকে এলেও আসলে তা আসে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে।

    সরকারের সম্পদকে কখনো নিজের সম্পদ ভেবো না। বরং এসবকে ভাববে জনগণের জন্য দেয়া আল্লাহ্‌র নেয়ামত। সরকারকে হতে হবে জাতির আশ্রয়স্থল। জাতিকে যদি অর্ধাহারে রাখতে হয় সরকারী লোকজনকে থাকতে হবে অনাহারে। তাহলেই জাতির ভালবাসায় সিক্ত হবে সরকার। মসজিদের মিনারের মত সরকার প্রধানের মাথা থাকবে সবার উপরে। যেন তিনি দেখতে পান কেউ কোথাও বঞ্চিত হচ্ছে কিনা তার প্রাপ্য অধিকার থেকে।

    হে আমার প্রিয় বেটা! তোমার দাদা আরও বলেছেন, ‘সেই দিন তুমি মাথা উঁচু করে চলবে যেদিন তুমি মসজিদুল আকসা শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করতে পারবে। শান্তির ঘুম তুমি সেদিন ঘুমাবে, যেদিন তুমি মসজিদুল আকসায় বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করে নফল নামাজ পড়তে পারবে।

    আমাদের প্রিয় নবী(সাঃ) মেরাজে যাওয়ার আগে এই মসজিদুল আকসায় নফল নামাজ পড়েছিলেন। সে মসজিদের বারান্দায় যেদিন তুমি তোমার অশ্রু ঝরাতে পারবে, সেদিন ভাববে তুমি আল্লাহ্‌র রহমত পাওয়ার যোগ্য হয়েছো’।

    বাপ আমার! জেরুজালেমের অলিতে গলিতে কত যে নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করেছিল, পবিত্র মসজিদের আঙ্গিনায় জাতির কত যে আদরের কন্যা সমভ্রম হারিয়েছিল, সে কথা স্মরণ হলে আজো আমার রাতে ঘুম হয় না। যে মসজিদে আমার প্রিয় রাসুল(সাঃ)এঁর মুবারক পা পড়েছিল, যে মসজিদে আমার রাসুলের পেশানী মুবারক সিজদায় পড়েছিল, সে মসজিদের অপবিত্রতার কথা স্মরণ হলে ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। মনে হয় আমি যেন নির্যাতিতের আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছি। যেন মসজিদুল আকসার বারান্দায় মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে শিশু ও নারীরা। যেন কেউ কম্পিত কণ্ঠে সেখানে আযান দিচ্ছে। সেই আযানের মধ্য দিয়ে সে যেন আমাকেই ডাকছে।

    তোমার দাদা বৃদ্ধ বয়সে কম্পিত হাতে আমার হাত আঁকড়ে ধরে বলেছিলেন, ‘বেটা, আমার জীবন ও যৌবন শেষ হতে চললো। যে কাজ আমি সম্পন্ন করতে পারিনি সে কাজের ভার আমি তোমাকে দিয়ে যাচ্ছি। তুমি বায়তুল মোকাদ্দাসকে শত্রু মুক্ত করো। এইটিই হোক তোমার জীবনের লক্ষ্য। তুমি ক্ষমতায় গেলে শত্রুদের উপেক্ষা ও তুচ্ছ মনে করবে। তাতে তোমার সাহস ও মনোবল বৃদ্ধি পাবে। তুমি যদি আল্লাহ্‌র ওপর ভরসা করতে পারো তবে মনে রেখো, আল্লাহ্‌র চাইতে ক্ষমতাধর কেউ নেই দুনিয়ায়। তুমি আল্লাহ্‌র ওপর আস্থা রাখতে পারলে আল্লাহ্‌ তোমার নেগাহবান হয়ে যাবেন। তখন তুমি নিশ্চিন্তে জাতির উপর শান্তির শাসন চালাতে পারবে।

    হয়তো তোমার শাসন ক্ষমতার বয়স দীর্ঘ হবে না। কুচক্রীদের চক্রান্তে উল্টে যাবে তোমার সুখের মসনদ। কিন্তু কুচক্রীদের সাথে মিলে গদী রক্ষা করতে যেয়ো না। জীবনে বেঁচে থাকার একটাই উদ্দেশ্য থাকবে, আর তা হচ্ছে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জন। জীবনভর সেই পথে চলবে, যে পথ আল্লাহ্‌র প্রিয়, যে পথে চলার নির্দেশ দিয়েছে পবিত্র কোরআন’।

    সুলতান আইয়ুবী তাঁর সন্তান কে লক্ষ্য করে সেদিন বলেছিলেন, ‘হে আমার প্রিয় সন্তান! আমি আমার পৈতৃক উত্তরাধিকার তোমার উপর ন্যস্ত করছি। আমি আমার পিতার মতই বলছি, আজ থেকে তোমরা আমার নও, মুসলিম জাতি ও মিল্লাতের সন্তান।

    আমি তোমাদের মাকেও বলে দিয়েছি, তুমি ভুলে যাও তোমার গর্ভে কোন সন্তান জন্ম নিয়েছিল। যদি ভুলতে না পারো তবে সন্তানকে আল্লাহ্‌র পথে দান করে দাও। কারণ আমি জাতির জন্য তোমার দুটি সন্তানকেই কোরবানি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। তোমাদের মাকে আমি আরো বলেছি, মনে করে দেখো, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) সন্তানকে আল্লাহ্‌র পথে কোরবানী দিতে গিয়ে নিজ হাতে ছুরি চালিয়েছিলেন আপন সন্তানের গলায়।

    যদি তুমি কোন দোয়া করতে চাও তবে আল্লাহ্‌র কাছে এই দোয়া করো, তুমি যে সন্তানদের বুকের দুধ পান করিয়েছো সে দুধ যেন রক্ত হয়ে মসজিদুল আকসার পবিত্র বারান্দা ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়। প্রতিজ্ঞা করো বেটা, আমি যদি বেঁচে না থাকি তবে বায়তুল মোকাদ্দাস তোমরা দুই ভাই মুক্ত করবে’।

    সুলতান আইয়ুবীর মনে পড়ে গেল তিনি এবার বায়তুল মোকাদ্দাস উদ্ধার অভিযান শুরু করার আগে তাঁর দুই সন্তানকেই কাছে ডেকেছিলেন। তিনি ১০৯৯ সালের যুদ্ধের সেই রক্তাপ্লুত ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদের বলেছিলেন, ‘যাও বেটা। আল্লাহ্‌র সিপাই হও গিয়ে। আমি দোয়া করি, ব্যর্থতা যেনো কখনো তোমাদের স্পর্শ না করে। ভয়-ভীতি, লোভ ও অজ্ঞতা থেকে বেঁচে থাকতে চেষ্টা করবে’।

    দুই ভাই রনাঙ্গনে যাওয়ার আগে সুলতান আইয়ুবীর সাথে দেখা করে তাকে সালাম করলো। তিনি তাদের সাথে মুসাফেহা ও কোলাকুলি করলেন। বললেন, ‘হৃদয়ে শাহাদাতের তামান্না নিয়ে লড়াই করবে। আল্লাহ্‌ তোমাদের নেগাহবান হোন’। তারা বাপের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসলো। বড় ছেলে আফজাল ঘোড়ায় উঠতে উঠতে বললো, ‘মহান সুলতান! শুধু শহীদ হওয়াতে কোন কৃতিত্ব নেই। আমি শহীদ হওয়ার আগে বায়তুল মুকাদ্দাসের গলিতে শত্রুদের এত রক্ত প্রবাহিত করবো যে, আপনার ঘোড়ার পা যেন পিছলে যায়। আমরা দেখতে চাই, আপনি মসজিদুল আকসার ক্রুশ ও মূর্তি নিজ হাতে তুলে রাস্তায় খৃষ্টানদের নাপাক রক্তের মাঝে ফেলে দিচ্ছেন’।

    ‘কিন্তু সে রক্ত যেন নিরস্ত্র শহরবাসীর না হয় বেটা’। সুলতান আইয়ুবী বললেন।

    ‘সে রক্ত ক্রুসেড বাহিনীর বর্ম পরা নাইটদের হবে’। আল আফজাল বললো, ‘সে রক্ত সেই সব লৌহ পোশাকের ফাঁক গলে বের হবে, যে পোশাক পরে ক্রুসেড বাহিনী আজো গর্বের হাসি হাসে। আপনি দেখে নেবেন, ঈমানদারের অস্ত্র বেঈমান কাফেরদের লোহার পোশাক ছিন্নভিন্ন করার শক্তি রাখে’।

    ‘আল্লাহ্‌ তোমাদের কথায় বরকত দান করুন’। সুলতান আইয়ুবী বললেন। সন্তানদ্বয় পিতাকে সামরিক কায়দায় স্যালুট দিয়ে ঘোড়া হাকিয়ে দিল। এক সময় সুলতান আইয়ুবীর দৃষ্টি থেকে হারিয়ে গেল তাঁর দুই সন্তান।

    সুলতান আইয়ুবী বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে চল্লিশ মাইল দূরে ভূমধ্যসাগরের তীরে আসকালান শহরে সেই চিতা বাঘের মত বসে আছেন, যেন তিনি শিকার ধরার জন্য ওঁৎ পেতে আছেন। আবেগে তাঁর অবস্থা তখন টলোমলো। বিলম্ব না করে পারলে তিনি বায়তুল মোকাদ্দাস উড়ে যেতে চান। শিকারকে তাড়া করা বাঘের মতই জেরুজালেম ছুটে যেতে চাচ্ছিলেন তিনি। খৃষ্টানদের সাথে চূড়ান্ত বোঝাপড়া করার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে ছটফট করছিল তাঁর মন। কিন্তু যুদ্ধের নিয়ম ও কৌশলের কথা চিন্তা করে তিনি তখনো আসকালানেই অবস্থান করছিলেন।

    জেরুজালেম ওখান থেকে আর মাত্র চল্লিশ মাইল। কিন্তু এ দীর্ঘ চল্লিশ মাইল রাস্তা যেন খই ভাজা তপ্ত বালি ও পাথরে বোঝাই। এটা ছিল বায়তুল মোকাদ্দাসের প্রতিরক্ষার প্রকৃতি-প্রদত্ত সুবিধা। তাছাড়া এ শহরটি শুধু শহরের প্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত ছিল না। শহরের আশেপাশে দূর দুরান্ত পর্যন্ত ছোট ছোট কেল্লা গড়ে তোলা হয়েছিল শহরটি রক্ষার জন্য। সেই কেল্লাগুলো খৃষ্টানদের সুরক্ষিত সেনা ফাঁড়ি হিসাবে কাজ করছিল। সুলতান জানেন, শহরের প্রতিরক্ষার কাজে নিয়োজিত আছে খৃষ্টানদের টহলদার বাহিনীও। এরা শহরের বাইরে অশ্বপৃষ্ঠে চড়ে পাহারা দেয় দূর দুরান্ত পর্যন্ত। এমন কড়া ও সতর্ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বেড়াজাল ভেদ করে বায়তুল মোকাদ্দাস পৌঁছা যে কারো জন্যই এক দুঃসাধ্য ব্যাপার।

    সুলতান আইয়ুবীর আগমনের খবরে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও কঠিন করা হয়েছে। কিন্তু তাদের এমন সাহস ছিল না যে তারা অগ্রসর হয়ে সুলতান আইয়ুবীকে আসকালান শহরে বাঁধা দেয় অথবা আক্রমণ চালায়। কারণ ক্রুসেড বাহিনী হাতিন রণাঙ্গন থেকে আসকালান পর্যন্ত সুলতান আইয়ুবীর বাহিনীর হাতে যে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির শিকার হয়েছে এবং যে পরিমান রক্ত ও জান মালের ক্ষতি কবুল করেছে তাতে তাদের এ রকম সাহস করার কোন সুযোগ ছিল না।

    সুলতান আইয়ুবী বায়তুল মোকাদ্দাসের সব তৎপরতা ও খৃষ্টান জেনারেলদের গতিবিধি প্রতি মুহূর্তে অবগত হচ্ছিলেন। তিনি জানেন, বায়তুল মোকাদ্দাসের তখনকার শাসক সম্রাট গে অব লুজিয়ান হাতিনের রণক্ষেত্রে যুদ্ধবন্দী হয়ে এখন দামেশকের কারাগারে বন্দী। তারপরও খৃষ্টান নাইট ও বায়তুল মোকাদ্দাসের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত সেনাবাহিনী ও তার জেনারেলরা সহজে এ শহরটি সুলতানের হাতে তুলে দেবে না।

    হাতিনের রণাঙ্গনে গে অব লুজিয়ান যে সব সৈন্য নিয়ে গিয়েছিলেন তার কিছু মারা গিয়েছিল, কিছু যুদ্ধবন্দী হয়েছিল। কিন্তু একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পালাতে পেরেছিল, যাদের অধিকাংশই ফিরে গিয়েছিল জেরুজালেম। পলাতকদের মধ্যে সৈন্যদের চাইতে বেশী ছিল অফিসার এবং লৌহ পোশাকধারী নাইট। সুলতান জানেন, তারা অধিকাংশই আহত হয়ে বায়তুল মোকাদ্দাস এসে আশ্রয় নিলেও নাইটদের মধ্যে যে নৈতিক মনোবল (Moral courage) থাকে তা তাদেরকে আবার লড়াইয়ের ময়দানে টেনে আনবে। কারণ পদমর্যাদার সম্মান বজায় রাখতে না পারলে খৃষ্ট সমাজে তাদের বেঁচে থাকা হবে অর্থহীন।

    কিন্তু সাধারন সৈন্যদের মধ্যে এ নৈতিক মনোবল অবশিষ্ট ছিল না। তারা পালিয়ে জেরুজালেম পৌঁছেই সেখানে ব্যাপক আতংক ছড়িয়ে দিল। সেই আতংক দূর করার জন্য খৃষ্টান জেনারেল ও নাইটরা অবিরাম চেষ্টা করে যাচ্ছে।

    সুলতানের গোয়েন্দা বাহিনী যে খবর দিল তাতে তিনি জানতে পারলেন, বায়তুল মোকাদ্দাস শহরের ভেতরে খৃষ্টানদের সৈন্য সংখ্যা তখনো ষাট হাজার। তিনি আরও জানতে পারলেন, সুলতান আইয়ুবী শহরের পর শহর জয় করে বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন এ খবর ছড়িয়ে পড়লে উৎসাহী খৃষ্টানরা সুলতানকে বাঁধা দেয়ার জন্য বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলে হাজির হচ্ছে পবিত্র শহরে। এদের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। তারা এ যুদ্ধে অংশগ্রহন করে ক্রুশের জন্য জীবন দিতে চায়। ওরা যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী না হলেও ওদের আবেগই একটা বিরাট অস্ত্র। কোন জনপদের জনগণ এভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে তাদের পরাজিত করা খুব কঠিন। এদের কারণে শহরের প্রতিরক্ষা শক্তি নিঃসন্দেহে আরও মজবুত হয়েছে।

    জেরুজালেম শহরের প্রতিটি ফটকে তখন বিরাজ করছিল কড়া নিরাপত্তা প্রহরা। কিন্তু তারপরও দু’একটি ফটক খোলা রাখতে হচ্ছিল বিশেষ কারণে। কারণ যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে আসা খৃষ্টান সৈন্যরা তখনো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বা একজন দু’জন করে ফিরে আসছিল জেরুজালেম। সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দারা এসব খবরও সুলতানকে সরবরাহ করছিল। সুলতান আইয়ুবী এসব পলাতক সৈন্যদের সাথে মিশে আরো কিছু গোয়েন্দাকে শহরে ঢুকে পড়ার হুকুম দিলেন। কারণ তিনি আশংকা করলেন এমনও সময় আসতে পারে, যখন ভেতরের গোয়েন্দারা বেরোতে পারবে না। কিন্তু নির্যাতিত খৃষ্টান সৈন্য হিসাবে এই নতুন গোয়েন্দারা কিছুটা সুবিধা আদায় করতে পারবে।

    সুলতানের হুকুম পেয়ে আরো কিছু গোয়েন্দা ছদ্মবেশে শহরে প্রবেশ করলো। তারা শহরের প্রতিটি আনাচে কানাচে ঘুরে দেখলো শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধরন। শহরের প্রতিটি ফটক, প্রাচীরের অবস্থা, সৈন্যদের ব্যারাক সবকিছু তারা খুঁটিয়ে দেখলো এবং তাঁর একটি ম্যাপ হৃদয়ে গেঁথে নিয়ে বেরিয়ে এলো শহর থেকে।

    সেখানকার মুসলমানদের অবস্থা তখন গৃহবন্দী পর্যায়ের। ঘর থেকে বেরোনোই তাদের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠলো, শহর থেকে বেরোনোর তো প্রশ্নই আসে না। ফলে সুলতানের আশংকা সত্যে পরিণত হলো, মুসলিম গোয়েন্দাদের একটা অংশ আটকা পরে গেল ভেতরে।

    সুলতান বুদ্ধি করে নতুন গোয়েন্দা না পাঠালে শহর থেকে তথ্য পাচার করা লোকের অভাব দেখা দিতে পারতো। কিন্তু সুলতানের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা গ্রহনের ফলে একটি অবশ্যম্ভাবী সংকটের হাত থেকে বেঁচে গেল মুসলিম বাহিনী।

    বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে দশ বারো মাইল দূরে আসকালানের পথে খৃষ্টানদের এক ফাঁড়ি। এখানে একশোর মতো ক্রুসেড সৈন্য অবস্থান করছিল।

    ১১৮৭ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসের এক রাত। খৃষ্টান সৈন্যরা সবাই ক্যাম্পে ঘুমাচ্ছিল। বেশ কিছু তাবু দিয়ে বানানো হয়েছে ক্যাম্প। হঠাৎ ফাঁড়ির কাছে একটি বিস্ফোরণ হলো। সচকিত হলো জাগ্রত সৈন্যরা। বিস্ফোরণের শব্দে কারো কারো ঘুম ভেঙ্গে গেল।সৈন্যরা কিছু বুঝএ উঠার আগেই পর পর আরও দু’তিনটি বিস্ফোরণ ঘটলো একই রকম। সৈন্যরা তাকিয়ে দেখলো তাদের কয়েকটি তাবুতে আগুন জ্বলে উঠছে। তিন চারটি তাবু তখন জ্বলছে। হতবিহবল সৈন্যরা ভয়ে তাবু ছেড়ে এদিক ওদিক পালাতে লাগলো। সৈন্যরা চিৎকার দিয়ে যখন ছুটাছুটি আরম্ভ করলো তখনই তাদের উপর চারদিক থেকে শুরু হলো তীর বর্ষণ। প্রজ্জলিত তাবুর আলোকে সৈন্যদের ছুটাছুটি দেখা যাচ্ছিল। পেট্রোল ভর্তি হাড়ি নিক্ষেপের ফলে জ্বলে উঠেছিল আরো তাবু।

    সুলতান আইয়ুবীর এক কমাণ্ডো বাহিনী এ আক্রমণ পরিচালনা করছে। তারা মেঞ্জানিক নিক্ষিপ্ত পেট্রোল হাড়ির আলোয় তীর মেরে ধরাশায়ী করছিল ভীতসন্ত্রস্ত খৃষ্টান সৈন্যদের। খৃষ্টান সৈন্যরা তীর খেয়ে লুটিয়ে পড়ছিল। ভয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছিল। তারা বুঝতে পারলো, সুলতান আইয়ুবীর ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে গেছে তারা। এ যাত্রা বাঁচার আর কোন আশা নেই।

    হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল তীর। কমাণ্ডো বাহিনীর কেউ একজন উচ্চস্বরে ঘোষণা করলো, ‘যদি বাঁচতে চাও তবে অস্ত্র সমর্পণ করে এক দিকে সরে দাড়াও’।

    অগ্নিশিখার তাণ্ডবলীলা চলছিল তাবুগুলোর ওপর। খৃষ্টান সেনাদের বাঁচার কোন আশা ছিল না। কমাণ্ডো বাহিনীর ঘোষণা শুনে যারা তখনো বেঁচেছিল দু’হাত উপরে তুলে আত্মসমর্পণ করলো। কমাণ্ডার গুনে দেখলো, মাত্র জনাত্রিশেক সৈন্য লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে।

    কমাণ্ডোরা খৃষ্টান সৈন্যদের অস্ত্রসস্ত্র ও ঘোড়াগুলো এক জায়গায় জড়ো করলো। জড়ো করা জিনিশগুলো পাঠিয়ে দেয়া হলো পেছনে। যখন সকালের সূর্য উদয় হলো তখন সেই পুড়ে যাওয়া ক্যাম্পের পাশে এসে দাঁড়ালো সুলতান আইয়ুবী অগ্রবাহিনীর প্রথম দলটি। তারা এখানে পৌঁছেই জানতে পারলো তাদের অগ্রাভিযানের পথ আরও বহুদূর পর্যন্ত নিরাপদ হয়ে আছে। গেরিলা বাহিনী ওখান থেকে আরো সামনে এগিয়ে গিয়েছিল। তারা পথের পাশে দু’জন বা চারজনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে ভাগ হয়ে ঝোপের মধ্যে বা টিলার ওপর কোন উঁচু পাথরের পিছনে বসে ওঁত পেতে থাকতো।

    যখন কোন খৃষ্টান অশ্বারোহী বা পদাতিক বাহিনী কাছে আসতো তখন অতর্কিতে আক্রমণ করে বসতো তাদের ওপর। ওরা টের পাওয়ার আগেই বিষাক্ত তীরের আঘাতে পথের ওপর লুটিয়ে পড়তো আরোহী। কমাণ্ডোরা এগিয়ে গিয়ে সরিয়ে নিতো তার ঘোড়া।

    খৃষ্টানদের দশ বারো জনের দলকে এগিয়ে আসতে দেখলে মাত্র দু’জন কমাণ্ডোই এভাবে তীর মেরে তাদের ঘায়েল করে ফেলতো। বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতো না হামলা করতে। কারণ তারা জানে কোত্থেকে ছুটে এলো তীর তা বুঝে উঠার আগেই তাদের লাশগুলো লুটিয়ে পড়বে পথের ওপর।

    কখনো কোন হুশিয়ার দলের ওপর আক্রমণ করতে গিয়ে দু’একজন কমাণ্ডো যে শহীদ বা আহত হতো না এমন নয়। কিন্তু এরকম ঘটনা খুব কমই ঘটতো।

    এভাবেই খণ্ড যুদ্ধ চালাচ্ছিল কমাণ্ডোরা। তাদের কমাণ্ডার তাদের সাথে থাকতো না। কমাণ্ডোদের পথে পথে বসিয়ে দিয়ে তারা আরো সামনে এগিয়ে যেতো। কমাণ্ডোরা এদিক ওদিক লুকিয়ে থেকে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিত কখন আক্রমণ করতে হবে। এ ব্যাপারে কারো পরামর্শ বা সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ ছিল না তাদের, কিন্তু তাদের ট্রেনিংই ছিল তাদের পরিচালক। তাদের বুদ্ধি ও বিবেকের সবগুলো দরোজা তারা খুলে রেখেছিল। তাদের তৎপরতা বলছিল, প্রতিটি কমাণ্ডোই যেন একেকজন দক্ষ সেনাপতি।

    হাতিনের যুদ্ধের পর সুলতান আইয়ুবী যে বড় শহরটি জয় করেছিলেন, সেখানে মুসলমানদের অবস্থা তিনি সৈন্যদের দেখিয়েছিলেন। ক্ষুব্ধ চিত্তে তারা দেখছিল ধ্বংস হয়ে যাওয়া মসজিদ, কোরআনের অবমাননা। শুনছিল যুবতী মেয়েদের করুণ কান্না, শিশু ও বুড়োদের রোদনধ্বনি।

    এ সব জনপদের মুসলমানদের চোখের চাহনিই বলছিল, এ যুদ্ধ কোন রাজা বাদশার রাজ্য লাভের যুদ্ধ নয়, এটা হচ্ছে নির্যাতিত মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। এ অনুভূতি প্রতিটি সৈনিকের ঈমানকে আরো সতেজ ও তরতাজা করে দিত।

    আসকালান শহরে সুলতান আইয়ুবী রাতে তেমন ঘুমোনোর সময় পেতেন না। কারণ কমাণ্ডো বাহিনীর বিভিন্ন দলের সংবাদ নিয়ে একের পর এক কাসেদ আসতেই থাকতো। বায়তুল মোকাদ্দাস থেকেও মাঝে মাঝে আসতো সেখানকার হুশিয়ার গোয়েন্দাদের পাঠানো রিপোর্ট। এদের অধিকাংশই আসতো রাতে। সুলতান আইয়ুবীর আদেশ ছিল, যে কোন সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথেই তা পৌঁছে দিতে হবে। তা সে গভীর রাত হোক বা তিনি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় হোক।

    যেহেতু কমাণ্ডোরা রাতের বেলাতেই বিভিন্ন ফাঁড়িগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে দখল করে নিতো সে জন্য রাতের বেলাতেই কাসেদরা ছুটতো খবর নিয়ে। তারা সুলতানকে বলতো, অমুক স্থানে খৃষ্টানদের এক সেনা ফাঁড়িতে আক্রমণ চালানো হয়েছে। সেখানে এতগুলো শত্রু সেনা নিহত ও এত জন বন্দী হয়েছে। জানাতো, এই অভিযানে এতজন কমাণ্ডো হতাহত হয়েছে। রিপোর্টের আলোকে তিনি বুঝে নিতেন কতটুকু রাস্তা পরিষ্কার ও বাঁধা মুক্ত হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী সুলতান আইয়ুবী তাঁর নকশায় রেখা টেনে অভিযানের পথ চিহ্নিত করতেন এবং নিজের সৈন্যদের অগ্রাভিযানের নির্দেশ দিতেন।

    আসকালানে বসেই সুলতান আইয়ুবী সেনাপতি ও কমাণ্ডারদের এক সম্মেলন ডাকলেন। এই সম্মেলনে নৌবাহিনীর এডমিরাল আলফারেসকেও আহবান করা হলো। আল ফারেসের কাছে যখন কাসেদ গিয়ে পৌঁছলো তখন তাঁর জাহাজ আসকালান থেকে বিশ মাইল দূরে। ভূমধ্যসাগরের মাঝে অবস্থান নিয়ে তারা দৃষ্টি রাখছিল সমুদ্রের বিস্তীর্ণ এলাকায়।

    নৌকায় করে সেখানে গিয়ে পৌঁছতে কাসেদের মধ্যরাত পার হয়ে গেল। খবর পেয়ে আল ফারেস কাসেদের নৌকাতে করে রাতেই আসকালান এসে পৌঁছলেন।

    কাসেদ তাকে বললো, ‘সুলতান আইয়ুবী সমস্ত সেনাপতি ও কমাণ্ডারকেই এ সম্মেলনে ডেকেছেন’। আল ফারেস বুঝে নিলেন, বায়তুল মোকাদ্দাস আক্রমনের আগে এটাই হবে তাঁর সর্বশেষ যৌথ সভা। জাহাজ থেকে কাসেদের সাথে রওনা হওয়ার সময় তিনি মেয়ে দু’জনকে বললেন, ‘আমি একটু আসকালান যাচ্ছি’।

    ‘এত রাতে আসকালান কেন?’

    ‘সুলতান ডেকেছেন’।

    ‘কেন ডেকেছেন?’ এক মেয়ে জিজ্ঞেস করলো। ২১

    ‘আমার সরকারী দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করার তোমরা কে?’ আল ফারেস তাদের বললেন, তোমাদের কত বার বলেছি, আমার ব্যক্তিগত বিষয় ছাড়া কখনো কোন প্রশ্ন করবে না’।

    মেয়ে দু’জন হেসে ফেললো। বললো, ‘আপনার ব্যক্তিগত বিষয় ছাড়া আর কিছুর প্রতিই আমাদের কোন আকর্ষণ নেই। আপনি জাহাজে থাকলে আমরা পরম নিরাপত্তা বোধ করি। কিন্তু জাহাজ ছেড়ে আপনি কোথাও গেলেই আমাদের অন্তরে ভয় ঢুকে যায়’।

    ‘আপনি বাইরে গেলে আমরা পেরেশান হয়ে পড়ি বলেই না আপনাকে এ প্রশ্ন করি’। অন্য মেয়েটি বললো, ‘কখনো জাহাজ আক্রান্ত হলে কে আমাদের রক্ষা করবে? তার কথার খেই ধরে ওপর মেয়েটি বললো, ‘আফসোস! আমরা আপনাকে কোন সাহায্যই করতে পারছি না। নইলে আমাদের তো উচিত ছিল, আপনার অনুপস্থিতিতে এ জাহাজের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য ব্যস্ত থাকা। কখনো আক্রান্ত হলে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা। কিন্তু আমরা আপনার কোন কাজেই লাগতে পারলাম না’।

    ‘তোমরা যে কাজের যোগ্য আমি সে কাজই তোমাদের কাছ থেকে আদায় করে নেবো’। আল ফারেস বললেন, ‘লড়াই নিয়ে দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই তোমাদের। আমার অনুপস্থিতিতে অধিকাংশ সময় নিজেদের কামরাতেই থাকবে। উপরে গিয়ে মাল্লা বা সৈন্যদের বিরক্ত করবে না’।

    ‘আপনি কখন ফিরবেন?’

    ‘সম্ভবত আজ রাতে ফিরতে পারবো না’। আল ফারেস বললেন, ‘কাল সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে আসবো আশা করি’।

    আল ফারেস মেয়ে দুটির সঙ্গে গভীর অন্তরঙ্গভাবে মিশে গিয়েছিলেন। তারা কৌশলে সুলতান আইয়ুবীর পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রায়ই জানতে চাইতো। কথায় কথায় তারা জানতে চাইতো, ‘ভুমধ্যসাগরে মিশর ও সিরিয়ার নৌবহর কোথায় আছে? তারা কি বন্দরেই অবস্থান করছে নাকি সমুদ্রের গভীরে। ওদের জাহাজের সংখ্যা কত, নৌ সেনা কত?

    তারা এসব জানতে চাইতো গল্পচ্ছলে এবং আল ফারেসও অসতর্ক অবস্থায় এ সব প্রশ্নের ঠিক ঠিক জবাব দিয়ে ফেলতেন। কখনো সতর্ক থাকলে বলতেন, ‘এমন প্রশ্ন কখনো করো না আমাকে’।

    কিন্তু এই নিষেধ মানলে তাদের চলবে কেন? তারা তাদের রুপের মাধুর্য দিয়ে, প্রেমের অভিনয় দিয়ে প্রায়ই এমন সব গোপন কথা তার কাছ থেকে বের করে নিতো।এভাবে কখন যে আল ফারেস সেনাবাহিনীর অতি গোপনীয় বিষয়ও তাদের কাছে ফাঁস করে দিত টেরই পেতো না। কখনো এ ধরনের প্রশ্ন করার জন্য ওদের সামান্য ধমকও দিত।

    নেশার ঘোরে মানুষ মনের সব গোপন কথা ফাঁস করে দেয়। নেশা, সেটা মদের হোক বা ঔষধের হোক। কিন্তু আল ফারেস মদ পান করেন না। জাহাজে কোন মদ বা মাদক দ্রব্য রাখা হয় না। আল ফারেস চরিত্রহীন ব্যক্তিও নন যে, তাকে কোনভাবে ফাসিয়ে দেয়া যাবে। তার জন্য একটাই বিপদের কারণ, তিনি নিজেই নিজেকে মেয়েদের মায়ার বন্ধনে বন্দী করে নিয়েছেন। এই বন্ধন তার অবসাদ কিছুটা দূর করলেও এরই ফাঁক দিয়ে তার কাছ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল গোপন সংবাদ।

    মেয়ে দুটি ছিল এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। তারা দেখলো, আল ফারেসের মাঝে মদের নেশা নেই, কোন পশুত্বের ভাবও নেই। যদিও যৌবন আছে, সেই যৌবন শুধুই হৃদয়ের প্রেম ভালবাসায় সীমাবদ্ধ। সেখানে দেহের ভুমিকা নেই।

    তার ওপর আল ফারেস তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে এতই সচেতন ও দৃঢ় যে, দায়িত্বের তার সাথে কোন কথাই বলা যায় না। ফলে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠলো। তারা বুঝতে পারলো, নারীর নেশা জাগিয়েও তাকে কাবু করা সহজ হবে না।

    যে রাতে আল ফারেস সুলতান আইয়ুবীর ডাকে আসকালান গিয়েছিলেন সে রাতের ঘটনা। মেয়ে দুটি তাদের কেবিন থেকে বেরিয়ে উপরে চলে গেল। উপরে জাহাজের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ওরা সমুদ্রে চাঁদের আলোর প্রতিফলন দেখছিল। সমুদ্রে চাঁদের আলো পড়ে চিকচিক করছিল, তাদের মনে হচ্ছিল যেন মতি চমকাচ্ছে। এমন মনকাড়া দৃশ্যের দিকে তারা আপন মনে তাকিয়ে রইলো।

    ‘রোজী’! এক সময় এক মেয়ে অন্য জনকে বললো, ‘এখনতো আমাদের ভবিষ্যৎ একদম অন্ধকার। আল ফারেসকে আসলে মোমের মত নরম মনে হলেও দায়িত্বে সে পাথরের মত শক্ত। আমার মনে হয় আমরা এখানে কোন কাজ করতে পারবো না। এণ্ডু আসলে বরং তার সঙ্গে চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু ভাবছি, এখান থেকে বের হয়ে যাওয়া কি আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে? এণ্ডু হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে ছোট নৌকায় খাদ্য-পানীয়, ফলমূল ও প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিক্রয় করার নাম করে জাহাজের কাছে আসে এবং মেয়ে দুটির সাথে দেখা করে। এ লোক খৃষ্টান গোয়েন্দা কমাণ্ডার। ঘটনাক্রমে মেয়ে দুটির সাথে তার সাক্ষাৎ হয়ে যায়।

    সে দরিদ্র ফেরিওয়ালার বেশে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে জাহাজে ফলমূল বিক্রি করতে এসে মেয়েদের দেখে চিনে ফেলে। ছদ্মবেশের কারণে মেয়েরা প্রথমে তাকে চিনতে না পারলেও সে ইশারায় তাদের সাথে মত বিনিময় করে এবং ফলমূল বিক্রির ছলে মেয়েদের সাথে দেখা করে।

    সে মেয়েদের জানায়, এই জাহাজের পিছনে সে ছায়ার মত লেগে আছে। সুযোগ পেলেই জাহাজ ধ্বংস করে দেবে। মেয়ে দুটি তাকে জানায়, কিভাবে তারা আল ফারেসের হাতে পড়লো। খৃষ্টান গোয়েন্দা কমাণ্ডার গোয়েন্দাগিরির স্বার্থে তাদেরকে জাহাজে থাকার পরামর্শ দিয়ে প্রথম বার বিদায় নিয়েছিল।

    প্রথম সাক্ষাতের পর সে আরো দু’বার ছদ্মবেশে জাহাজে এসেছে ও মেয়েদের সাথে কথা বলেছে। মেয়েরা তাকে জানিয়েছে, ‘আল ফারেস আমাদের জালে ধরা দিচ্ছে না আর কোন গোপন তথ্যও দিচ্ছে না’।

    ‘এই জাহাজগুলো আর কতদিন এখানে ডিউটিতে থাকবে? এ জাহাজ কি টায়ারের দিকে যাবে?’ জানতে চায় এণ্ডু।

    মেয়েরা এ ব্যাপারে তাকে কোন তথ্য দিতে অপারগ হলে সে মেয়েদের বলে, ‘মনে হচ্ছে তোমরা হরমুনের শেখানো সব কৌশলই ভুলে গেছো? আরে, এ জাহাজে কেবল আল ফারেসই থাকে না, তার সহকারীরাও থাকে। আল ফারেসকে ফাসাতে না পারলে তার নিচের যে কোন একজন অফিসারকে ফাঁসিয়ে নাও। তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি করো। আল ফারেসের সহকারীদের যাদেরকে সম্ভব তার শত্রু বানিয়ে দাও। কাজের কি কোন অভাব আছে? বুদ্ধি খাটাও, কাজ করো’। সে ওদেরকে বললো, ‘তোমাদের রূপ আর যৌবনের যে অস্ত্র আছে তা ঠিক মত ব্যবহার করতে শেখো। নিশ্চয়ই যাদুর মোহে কাউকে না কাউকে অন্ধ করতে পারবেই। এত কৌশল শেখার পর এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকার কি কোন মানে হয়?

    সেই রাতেই এক মেয়ে ওপর মেয়েকে নিরাশ হয়ে বলছিল, ‘রোজী! এণ্ডু আসলে বরং তার সঙ্গে চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু ভাবছি, এখান থেকে বের হয়ে যাওয়া কি আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে?’

    ‘শোন ফ্লোরী!’ রোজী তাকে বললো, ‘এণ্ডু এখান থেকে আমাদের বের করতে পারবে না। এটা যুদ্ধ জাহাজ! তুমি দেখতে পাচ্ছো রাতেও ছাদে, জাহাজের মাস্তুলে সর্বত্র নৌ সেনারা পাহারায় থাকে। এণ্ডুর সহযোগিতায় পালানোর চেষ্টা করলে এণ্ডুই বরং ধরা পড়ে যাবে। আমাদের এখুনি নিরাশ হওয়ার দরকার নেই। বরং পালাতে হলে আমাদের অন্য পথ বের করতে হবে’।

    ‘তবে অন্য পথই বেছে নাও’। ফ্লোরী বললো, ‘বলো, তাহলে এখন কি করবো?’

    ‘কি করবে? শোন তাহলে’। রোজী বললো, ‘আল ফারেসের সহকারী ক্যাপ্টেনকে দেখেছি সে প্রায়ই ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকায় ও হাসে’।

    রোজী বললো, ‘এরা দীর্ঘদিন ধরে সাগরে পড়ে আছে। এদের মাথার উপর খেলা করছে মৃত্যু। খোদা পুরুষের মধ্যে নারী সঙ্গ লাভের যে দুর্বলতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন সে দুর্বলতা সব পুরুষের আছে। কেউ খোদার ভয়ে নিজেকে সামলে রাখে, কেউ পায় না বলে খায় না।

    সহকারী ক্যাপ্টেনের অবস্থা আমি যতটুকু বুঝতে পারছি, সে দ্বিতীয় দলের। আমার মনে হয়, শুধু ইঙ্গিতটুকু পেতে যা দেরী, সে নিজেকে আমাদের হাতে সঁপে দিতে মোটেও দ্বিধা করবে না। এখন বলো, কাজটা আমি করবো, না তুমি? তবে আমার চেয়ে এ কাজের ট্রেনিং ও দক্ষতা তোমার ভাল আছে’।

    ‘তুমি বললে কাজটা আমিই করতে পারবো’। ফ্লোরী বললো।

    ‘কিন্তু কাজের সময় এ কাজের নিয়মটা মনে রাখবে’। রোজী বললো, ‘তার কাছ থেকে গোপন তথ্য যা জানার সব জেনে নেবে কিন্তু মূল্যটা পরিশোধ করবে না। নাকের ওপর মুলা ঝুলিয়ে দিয়ে সরে আসবে, যাতে আগ্রহ ও উন্মাদনায় ভাটা না পড়ে। তুমি সে লোকের মধ্যে উষ্ণতা ও উন্মাদনা এমনভাবে জাগিয়ে তুলবে, যাতে সে তোমার ইশারায় আল ফারেসকে হত্যা করতেও পিছপা না হয়। তাকে বুঝাবে, আল ফারেস বেঁচে থাকলে এবং তোমাদের সম্পর্ক জানতে পারলে সে তোমাদের কাউকে রেহাই দেবে না।

    অতএব আল ফারেস বেঁচে থাকলে তুমি তার হওয়ার দুঃসাহস করতে পারো না। যদি সে তোমাকে সত্যি চায় তবে তা সে কেবল তখনি পেতে পারে, যখন এ দুনিয়ায় আল ফারেস থাকবে না’।

    আল ফারেসের এই সহকারীর নাম ছিল আবদূর রউফ কুর্দি। সে ছিল কুর্দিস্তানের সন্তান এবং বেশ চালাক চতুর যুবক। সে মেয়ে দুটিকে দেখলেই তাদের দিকে তাকিয়ে অন্তরঙ্গ হাসি দিত। সে জানতো, এরা আল ফারেসের স্ত্রী নয়, দাসীও নয়। এরা যাযাবর মেয়ে। আল ফারেস এদেরকে জাহাজে আশ্রয় দিয়েছেন।

    রউফ কুর্দির মনে মেয়ে দুটির জন্য এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু উরধতন অফিসারের আশ্রিতা বলে সে ওদের দিকে হাত বাড়াতে সাহস পাচ্ছিল না।

    সেই রাতে, যখন মেয়েরা জাহাজের ছাদে উঠে কার্নিশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, রউফ তখন পাহারাদারদের ডিউটি তদারক করার জন্য টহলে বেরিয়েছে। সে জানতো না, মেয়েরা ছাদে দাঁড়িয়ে রাত্রিকালীন সমুদ্রের নৈসর্গিক শোভা দেখছে।

    রউফ কুর্দি ছাদে উঠলো। দেখলো চাঁদের আলোয় জাহাজের কার্নিশ ধরে দাঁড়িয়ে আছে দুই অনিন্দ্য অপ্সরী।

    আল ফারেস সুলতান আইয়ুবীর আহবানে চলে গেছেন আসকালন। জাহাজের দায়িত্ব এখন রউফ কুর্দির ওপর। রোজী রউফ কুর্দিকে দেখেই কামরার দিকে হাঁটা ধরলো। ফ্লোরী জাহাজের ছাদে কার্নিশ ধরে তেমনি দাঁড়িয়ে রইলো। রোজী হাঁটতে হাঁটতে রউফ কুর্দির পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল, রউফ কুর্দি তার দিকে তাকিয়ে সেই অন্তরঙ্গ হাসি দিয়ে বললো, ‘রাতের সমুদ্র দেখছিলেন?’

    রোজী না থেমেই বললো, ‘হ্যাঁ’।

    রউফ কুর্দি বললো, ‘একটু দাঁড়াবেন?’

    থমকে দাঁড়ালো রোজী। রউফ কুর্দির দিকে তাকিয়ে বললো, না। আমি যদি আপনার পাশে দাঁড়াই তবে আরেকজন অসন্তুষ্ট হবে। আমি কাউকে অসন্তুষ্ট করতে চাই না’।

    রউফ কুর্দি অবাক হয়ে বললো, ‘কে অসন্তুষ্ট হবে?’

    রোজী আঙুল দিয়ে ফ্লোরীর দিকে ইঙ্গিত করে বললো, ‘ওই যে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে’।

    রউফ কুর্দি আরো অবাক হয়ে বললো, ‘কেন, অসন্তুষ্ট হবে কেন?’

    ‘সে প্রত্যেকের নিজ নিজ মনের ব্যাপার’। রোজী বললো, ‘একদিন আল ফারেস নিচে ক্যাবিনে শুয়েছিল আর আমি আপনার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সে অবস্থায় ও আমাদের দেখেছিল। পরে যখন তার কাছে গেলাম তখন সে বললো, ‘তুমি তো আল ফারেসকে দখল করে নিয়েছো। তুমি থাকলে আল ফারেসের কাছে আমার কোন দাম নেই। আমি তোমার অধিকারে কোনদিন ভাগ বসাতে যাইনি। আমার নিঃসঙ্গ জীবন আমি একজনের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিতে চাচ্ছিলাম, সেখানেও তুমি হাত বাড়াবে?’ আমি তো অবাক। বললাম, ‘কার দিকে?’ সে বললো, ‘রউফ কুর্দি’। রউফ আমার। খবরদার, আমার অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে না। তারপর থেকে আমি আর আপনার কাছে যাইনি’।

  • মহাসমর

    মহাসমর

    মহাসমর

    জেরুজালেম হাত ছাড়া হওয়ার পর পোপ দ্বিতীয় আরবানুসের আহ্বানে সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল সমগ্র খৃষ্টান বিশ্ব। তাদের নেতৃত্ব নিলেন জার্মানীর সম্রাট রিচার্ড। শুরু হ’ল যুদ্ধের এক মহাযজ্ঞ।

    প্রথমেই ময়দানে এলেন জার্মানীর সম্রাট ফ্রেডারিক। তিনি দুই লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে। তিনি এত বেশী সৈন্য নিয়ে এলেন যে, এক আইয়ুবীকে শায়েস্তা করার জন্য এরচে বেশী সৈন্যের দরকার মনে করলেন না তিনি। তাই অন্যান্য খৃষ্টান সম্রাটকে সঙ্গী বানানোরও প্রয়োজন অনুভব করলেন না। তিনি তার নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী একাই অগ্রসর হলেন এবং বীরদর্পে দামেশকের উপর আক্রমণ করে বসলেন। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য যে, তিনি সুলতান আইযুবীর যুদ্ধের টেকনিক সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তিনি দুই লক্ষ সৈন্যের দম্ভ নিয়ে সুদূর জার্মানী থেকে ছুটে এলেন আরবের মরুময় ভুখণ্ড দখল করতে। ভাবলেন, আইয়ুবীকে পরাজিত করা, এ আর এমন কি কঠিন কাজ!

    দীর্ঘ ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাসে এ আক্রমণ নিঃসন্দেহে ব্যাপক ও তীব্র ছিল। ঐতিহাসিকরা দামেশকের উপর এই আক্রমণকে ক্রুসেড যুদ্ধের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও সর্বাত্মক আক্রমণ বলে বর্ণনা করেছেন।

    সম্রাট ফ্রেডারিক তার বিপুল সৈন্যের দম্ভ নিয়ে ছুটে এলেন। প্রথমেই তিনি টার্গেট করলেন সিরিয়াকে। তিনি সিরিয়ায় এসে কালবিলম্ব না করে দামেশকের ওপর প্রবলবেগে আক্রমণ করে বসলেন। কিন্তু দামেশক কব্জা করা তো দূরের কথা, তিনি দামেশকের একটি ইটও খসাতে পারলেন না।

    সম্রাট ফ্রেডারিক তার বিপুল সৈন্য নিয়ে যখন দামেশকের কাছে এসে উপস্থিত হলেন তখন তার ধারনা ছিল, সুলতান আইয়ুবী এই বিশাল বাহিনী দেখে যুদ্ধ করার পরিবর্তে আত্মসমর্পনের জন্য ছুটে আসবেন। তাই তিনি তার আগমন জানান দেয়ার জন্য প্রথমে দামেশকের ওপর পরীক্ষামূলক আক্রমণ চালালেন। সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যরা বীর বিক্রমে সে আক্রমণ রুখে দিল।

    রাতে ফ্রেডারিকের বাহিনী বিশ্রাম নিচ্ছিল। পরদিন ভোরে নতুন উদ্যমে প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে মুসলিম বাহিনীর ওপর। তাই রাতের বিশ্রামটা ছিল তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

    দামেশকের আকাশে রাতের অন্ধকারে ছেয়ে গেল। সুলতান আইয়ুবীর কমাণ্ডো বাহিনী চুপিসারে বেরিয়ে এলো ক্যাম্প থেকে। এরপর তারা খৃষ্টান সেনাবহিনীর বিশাল ক্যাম্প অতিক্রম করে পৌঁছে গেল যেখানে এই বাহিনীর অস্ত্র, গোলাবারুদ, খাদ্যসামগ্রী ও যুদ্ধের অন্যান্য রসদপত্র রেখেছিল সেখানে। পাশেই ছিল ঘোড়ার আস্তাবল। ওখানে ছিল লক্ষ লক্ষ যুদ্ধের ঘোড়া। একদল কমাণ্ডো চলে গেল সেই আস্তাবলের পেছনে।

    খৃষ্টান সৈন্যরা ঘুমিয়েছিল তাদের তাঁবুগুলোতে। সামান্য কিছু সৈন্য পাহারা দিচ্ছিল সেই তাঁবু। রসদ এবং আস্তাবলের ওখানেও পাহারা ছিল, তবে সবকিছুই ছিল ঢিলাঢালা। এতবড় বিশাল বাহিনীর ওপর রাতের অন্ধকারে আইয়ুবীর বাহিনী হামলা করবে এমনটি তারা কল্পনাই করতে পারেনি।

    তখনও রাত তেমন গভীর হয়নি। হঠাৎ একযোগে সুলতানের কমাণ্ডোরা ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই অস্ত্রভাণ্ডার, রসদসম্ভার ও আস্তাবলের ওপর। তারা এমন তীব্র ও প্রাণপণ আক্রমণ চালোলো যে, সামান্য ক’জন পাহারাদার মুহূর্তেই ওরা গায়েব করে দিল। তারপর সেই অস্ত্রসম্ভার ও রসদপত্র তাদেরই ঘোড়ার গাড়ীতে তুলে দামেশকের সেনা ক্যাম্পে আনা শুরু করল।

    শহরের প্রধান ফটকসহ সব কয়টি ফটক খুলে দেয়া হ’ল। শত শত ঘোড়ার গাড়ী লাইন দিয়ে এসে ঢুকতে লাগলো শহরে। সুলতান আইয়ুবী তার পুরো বাহিনী শহর থেকে বের করে মোতায়েন করলেন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে, যেনো কমাণ্ডোদের সরবরাহ কাজে কোন বিঘ্ন না ঘটে।

    এ খবর সম্রাট ফ্রেডারিকের ক্যাম্পে পৌঁছাতে দেরি হ’ল না। তারা দ্রুত তৈরী হয়ে নিজ নিজ অস্ত্র নিয়ে ছুটলো গুদামের দিকে। কিন্তু সে খানে তারা পৌঁছতে পারলো না, তার আগেই সুলতান আইয়ুবীর নিয়মিত বাহিনী তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

    জার্মানীর খৃষ্টান সৈন্যদের জন্য মুরুভূমি ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। তার ওপর দামেশক ছিল তাদের জন্য অপরিচিত ও নতুন জায়গা। রাতভর তারা লড়াই করল অনিশ্চিতের মত। কোথায় শত্রু, শত্রুর পরিমাণ কত, কি তাদের অস্ত্র কিছুই জানা নেই তাদের। তারা এক দিকে এগিয়ে যেতে চায়, তখন ছুটে আসে ঝাঁক ঝাঁক তীর। সঙ্গীদের কেউ কেউ লুটিয়ে পড়ে চোখের সামনে, বাকীরা পিছু হটে আত্মরক্ষা করে।

    অন্য দল এগুতে গিয়ে দেখে তাদের সামনে তলোয়ার ও বল্লমের দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে আছে আইয়ুবীর সৈন্যরা। তারা থমকে দাঁড়িয়ে থাকে এক জায়গায়। সহসা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আইয়ুবীর কোন অশ্বারোহী বাহিনী।

    অদৃশ্য শত্রুর এই আক্রমণ ফ্রেডারিকের বাহিনীকে তছনছ করে ফেলল। সৈন্যরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সেনাপতি ও কমাণ্ডদের কাছ থেকে। কমাণ্ডাররা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে দেখলো চারদিকে কেবল অন্ধকার। আকাশের মিটিমিটি অনুজ্জল তারাগুলো হরিয়ে যাচ্ছে ছুটন্ত মেঘের আড়ালে।

    তারপরও যুদ্ধ। কারণ দুই লক্ষ সৈন্যের সামনে লিলিপুট। খৃষ্টানদের অস্ত্র ও রসদসম্ভারেরও কোন কমতি ছিল না। রাতভর লুট করেও যেন কোন কূল পাচ্ছিল না কমাণ্ডোরা। তারা নিজেদের শৃঙ্খলা অটুট রেখে গাড়ী বোঝাই করে দ্রুত এবং ক্রমাগত মালসামান শহরের অভ্যন্তরে পাঠাতেই থাকল।

    কমাণ্ডোরা বিভিন্ন গ্রুপ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিল বিভিন্ন গুদাম। যারা অস্ত্র লুট করছিলে তারা কেবল অস্ত্রই লুট করতে থাকে। যারা গোলাবারুদ তুলছিল তারা গাড়ীর পর গাড়ী বোঝাই করছিল কেবল গোলাবারুদ দিয়ে। আরেক দল খাদ্য সামগ্রী লুট করার কাজে ব্যস্ত রইলো।

    সম্রাাট ফ্রেডারিকের ঘোড়ার গাড়ীর পরিমাণ ছিল অজস্র। পরিমাণে তা এতই বেশী যে, সবকটা ঘোড়ার গাড়ীতে ঘোড়া জুড়ে চালানোর মত সৈন্যও পাওয়া গেল না আইয়ুবীর কমাণ্ডো বাহিনীতে।

    তারা গাড়ী শহরে ঢুকিয়ে দিয়ে গাড়ী রেখে খালি ঘোড়া নিয়ে ছুটে যেতো গুদামে। ওখানে নতুন গাড়ীতে আগেই মাল ভরে রাখতো অন্যরা। তারা ঘোড়া রেখে নতুন ঘোড়া ও নতুন গাড়ী নিয়ে ছুটতো শহরের দিকে।

    এই ব্যস্ততার মধ্যে কোন ফাঁকে রাত শেষ হয়ে গেল টের পেল না আইয়ুবীর বাহিনী। তারা তখনও গাড়ী বোঝাই করে অস্ত্র ও খাদ্যসম্ভার  শহরে আনছিল, দেখতে পেলো পূর্ব দিগন্তে আলোর আভাস।

    সম্রাট ফ্রেডারিকের সৈন্যরা গজবের একটি রাত পার করল। তাদের দিকে রক্তচক্ষু মেলে উঠে এলো ভোরের নতুন সূর্য। ফ্রেডারিকের বাহিনী তখন এলোমেলো, বিচ্ছিন্ন। অনিশ্চিত দুঃস্বপ্নের ঘোর তাদের চোখে মুখে। শোচনীয় পরাজয়ের কালিমা নিয়ে ফ্রেডারিক তার বাহিনীকে পিছিয়ে নিয়ে নতুন কারে সংগঠিত করলেন।

    তিনি দেখতে পেলেন, বহু সৈন্য হতাহত হওয়ার পরও বিশাল বাহিনী বলে ঘাটতিটা তেমন চোখে পড়ে না। ময়দানে এখনও তার বিপুল সংখ্যক সৈন্য রয়েছে। কিন্তু তাদের মুখে দেয়ার মত খাদ্য নেই তার হাতে।

    তিনি পিছু হটে এক স্থানে ক্যাম্প করে নতুন করে যুদ্ধের প্ল্যান করা শুরু করলেন। কিন্তু অচিরেই টের পেলেন, তার বাহিনীতে কেবল খাদ্য নয়, পানিরও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলোর নিয়ন্ত্রণ তখন মুসলিম বাহিনীর হাতে। ফলে তারা কোথাও থেকে পানি সংগ্রহ করতে পাছে না। নানা বিপদাপদ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিনটি কেটে গেল। ঝুপ করে তাদের সামনে নেমে এলো আকেটি ভয়ংকর রাত। ক্যাম্প অরক্ষিত রেখে ঘুমাতে যাওয়ার কথা ভাবতে পারলো না কেউ।

    একদল ঘুমোবে আরেক দল জেগে পাহারা দেবে ক্যাম্প, এসব যখন ভাবছিল খৃষ্টান সেনাপতি ও কমাণ্ডাররা, তখনি সৈন্যদের মাঝে হৈ চৈ পড়ে গেল। তারা শুনতে পেলো দূর থেকে ভেসে আসছে ছুটন্ত ঘোড়ার সম্মিলিত খুরধ্বনি।

    ২২ জিলহজ্জ ৫৮৬ হিজরীর দিবাগত রাত। মুসলিম কমাণ্ডোরা প্রচণ্ড বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ল সম্রাট ফ্রেডারিকের বাহিনীর ওপর। তাদের বিদ্যুৎগতির আক্রমণে তছনছ হতে লাগলো খৃষ্টান বাহিনীর ক্যাম্প। ওখানে শুরু হয়ে গেল আহতদের আর্তচিৎকার, ভীত সন্ত্রস্ত সৈন্যদের কান্নাকাটি ও শোকের মাতম।

    খৃষ্টান বাহিনী যতটা প্রতিরোধ করছিল তারচে বেশী করছিল বিলাপ। কমাণ্ডোরা কোথাও থমকে না দাঁড়িয়ে ঝড়ের বেগে ছুটছিল নাঙ্গা তলোয়ার হাতে। এবার আর তাদের নজর সম্পদ বা অস্ত্রের দিকে ছিল না। এবার তারা কচুকাটা করছিল সম্রাট ফ্রেডারিকের বীর সৈন্যদের।

    জার্মানীর সৈন্যরা ক্যাম্পের চারপাশে এবং ক্যাম্পের মাঝে মাঝে বিভিন্ন জায়গায় শুকনো কাঠের খড়ি একত্রিত করে তাতে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল। এতে সুবিধা হচ্ছিল দু’পক্ষেরই, আক্রান্ত হওয়ার আগেই ওরা দেখতে পাচ্ছিল মুসলিম কমাণ্ডোদের, আবার কমাণ্ডোরাও দেখেশুনে আঘাত হানতে পারছিল। খৃষ্টানদের জ্বালানো অগ্নিকুণ্ডগুলো দেখে বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল, সমস্ত ক্যাম্পই জ্বলছে।

    থেকে থেকে হামলা করছিল মুসলিম কমাণ্ডোরা। দ্রুতগতির ঘোড়া নিয়ে ঢকে পড়ছিল ক্যাম্পের ভেতর। কেউ বাঁধা দিতে এলেই মৃত্যু জাপটে ধরত তাকে।

    আহত খৃষ্টান সৈন্যদের চিৎকারে নরক গুলজার হয়ে উঠল ক্যাম্পের পরিবেশ। মরুভূমির রাতের বাতাস ভারী হয়ে উঠল সে কান্না ও বিলাপের ধ্বনিতে। তাদের নিয়ে চলছিল ছুটাছুট, চিকিৎসা ও ব্যাণ্ডেজ বাঁধার কাজ।

    পরদিন ভোর। জার্মান সেনাকমাণ্ড তার সৈন্যদের আরো পিছিয়ে নিলেন। তিনি তার সৈন্যদের সামলে নিয়ে সরে গেলেন বেশ খানিকটা দূরে।

    ওখানে কাছেই পাওয়া গেল ছোট্ট একটা গ্রাম। তাতে খাবার তেমন না মিললেও পানির অভাব দূর হয়ে গেল। তিনি ওখানেই ক্যাম্প করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

    তিনি জানতেন, ফ্রান্সে সম্রাট ফিলিপ অগাষ্টাস ও ইংল্যাণ্ডের সম্রাট রিচার্ড শীঘ্রই বিপুল সৈন্য নিয়ে চলে আসবেন আইয়ুবীকে শায়েস্তা করতে। তারা সমুদ্র পথে নৌবহার নিয়ে আসছেন। তিনি তার সৈন্য দামেশক থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন দূরে। অপেক্ষা করতে লাগলেন সম্রাট ফিলিপ ও সম্রাট রিচার্ডের জন্য।

    কিছুদিন পর। সম্রাট ফিলিপ ও রিচার্ডের জন্য অপেক্ষা করার ফাঁকে তিনি ক্রমেই নিজের বাহিনীকে দামেশক থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। হঠাৎ তার খেয়াল হ’ল, বসে না থেকে কাছের শহর আক্রা দখল করে নিলে কেমন হয়!

    দামেশক থেকে মুখ ফিরিয়ে তিনি নজর দিলেন ফিলিস্তিনের উপকূলীয় শহর আক্রার দিকে। ফ্রেডারিক তার বাহিনীকে আক্রার দিকে অভিযান চালানোর আদেশ দিয়ে ভাবলেন, আক্রা দখল করতে পারলে পা রাখার মত একটা নিরাপদ আশ্রয় পাওয়া যাবে।

    ফ্রেডারিক যখন দামেশক আক্রমণ করেন তখন সুলতান আইয়ুবী দামেশক ছিলেন না। তার অনুপস্থিতিতেই সেখানকার কমাণ্ডোরা তাকে পিছু হটিয়ে দিয়েছিল।

    সুলতান তখন অবস্থান করছিলেন আক্রাতে। তিনি তাঁর সেনাপতি ও সীমান্ত রক্ষীদের নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন, ‘যদি কেউ আক্রা আক্রমণ করতে আসে তবে তাকে বাঁধা না দিয়ে সামনে এগুতে দেবে। আক্রা সীমান্ত পেরিয়ে তারা যেন নির্বিঘ্নে শহরের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে।’

    সুলতানে নির্দেশ অনুসারে ফ্রেডারিকের বাহিনীকে প্রতিরোধ না করে বরং তাদের বিনা বাঁধায় সামনে এগিয়ে যেতে দিল সীমান্ত রক্ষীরা। ফ্রেডারিকের বাহিনী এগিয়ে আসছে খবর পেয়েই তারা সরে গেল পথ থেকে।

    বাঁধা না পেয়ে আক্রার সীমান্তের বেশ ভেতরে ঢুকে গেল ফ্রেডারিকের বাহিনী। সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দা বিভাগ পিছু নিল তাদের। তারা ফ্রেডারিকের বাহিনীকে অলক্ষ্যে থেকে অনুসরণ করতে লাগলো এবং ঘণ্টায় ঘণ্টায় কাসেদ পাঠাতে লাগলো সুলতানের কাছে।

    এবার শুরু হ’ল সুলতান আইয়ুবীর বিশেষ পদ্ধতির যুদ্ধ। সীমান্ত থেকে আক্রা শহর পর্যন্ত সারা রাস্তায় তিনি তার কমাণ্ডো বাহিনী ছড়িয়ে রেখেছিলেন। একাধিক কমাণ্ডো বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছিল এ পথটুকু। তাদের প্রত্যেকের জন্য ছিল নির্দিষ্ট এলাকা। সুলতানে আদেশ পায়নি বলে তারা কেউ আক্রমণ করতে পারছিল না ফ্রেডারিকের বাহিনীর ওপর, তাবে ফ্রেডারিকের প্রতিটি কদমে তারা নজর রাখছিল।

    আক্রার শহর তখনও বেশ দূরে। এক রাতের বিশ্রামের জন্য ক্যাম্প করেছে সম্রাট ফ্রেডারিকের বাহিনী। প্রতিদিনের মত রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়েছে সৈন্যরা। মাঝ রাতের দিকে তাদের ওপর আক্রমণ করে বসলো সুলতানের একদল কমাণ্ডো। আক্রমণটা তারা করেছিল ফ্রেডারিকের বাহিনীর লেজের দিকে। এই আক্রমণ লেজের দিকের একটা অংশ বিছিন্ন করে দিল মূল বাহিনী থেকে। তারপর সেই অংশটি নিঃশেষ করে দিল।

    কমাণ্ডোদের লক্ষ ছিল শত্রু বাহিনীর শেষ অংশের উপর। প্রথম রাতের পর দ্বিতীয রাতেও একই ঘটনা ঘটলো। দিনে কোন সৈন্যের ছায়াও দেখতে পায় না খৃষ্টান বাহিনী কিন্তু রাতের বেলা আক্রান্ত হয় তাদের বাহিনীর পিছন দিকটি। অদৃশ্য গেরিলারা কমাণ্ডো আক্রমণ চালিয়ে গায়েব করে দেয় সম্রাট ফ্রেডারিকের বিশাল বাহিনীর একটা নির্দিষ্ট অংশ।

    এভাবেই ঘটতে থাকল ঘটনা। রাতে যখন জার্মান বাহিনী কোথাও ক্যাম্প করতো, তখন সুলতানের কমাণ্ডো বাহিনী আক্রমণ করতো তাদের। দু’দিনেই শিক্ষা হয়ে গেল ফ্রেডারিকের। তিনি বাহিনীর পেছনের অংশ শক্তিশালী করলেন।

    কিন্তু দেখা গেল এবার বিপর্যয় আসছে অন্য দিক থেকে। কমাণ্ডোরা এবার খৃষ্টানদের তাঁবু লক্ষ্য করে ছোট মেঞ্জানিক দিয়ে পেট্রোল হাড়ি ও সলতেওয়ালা তীর বর্ষণ করতে শুরু করল। এতে জার্মান বাহিনীর সেনা ক্যাম্পে আগুন ধরে গেল। নিহত ও আহত হ’ল ঘুমন্ত সৈন্যরা।

    পরদিন ফ্রেডারিক ভাবলেন, থাক আর সামনে এগিয়ে কাজ নেই। তিনি সৈন্যদের পিছু হটার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তাদের পথ রোধ করে দাঁড়ালো আইয়ুবীর কমাণ্ডোরা।

    তিনি থেমে গেলেন, থেমে গেল আক্রমণও। আবার তিনি রওনা হতে চাইলেন পেছন দিকে, আবারও বাঁধার সম্মুখীন হলেন। এভাবে যতবার তিনি ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নিলেন ততবারই তিনি বাধার সম্মুখীন হলেন।

    এরপর তিনি পেছনে ফেরার চিন্তা বাদ দিয়ে আবার সামনে অগ্রসর হওয়া শুরু করলেন। এভাবেই জার্মান বাহিনী একদিন আক্রা শহরের সন্নিকটে গিয়ে পৌঁছলো।

    জার্মান সেনাদল যখন আক্রা পৌঁছলো তখন ফ্রেডারিক দেখতে পেলেন, তার সৈন্য সংখ্যা কমে গিয়ে বিশ হাজারে দাঁড়িয়েছে। তাদের সৈন্য বাহিনী যখন পবিত্র ভূমিতে পদার্পন করেছিল তখন তাদের সংখ্যা দুই লক্ষ। এখন তাদের মধ্য থেকে এক লক্ষ আশি হাজারই নেই।

    তবে তার একলক্ষ আশি হাজার সৈন্যের সবাই যে মারা গিয়েছিল তা নয়। প্রথমে দামেশক আক্রমণের সময় জার্মানীর বিশাল বাহিনীর বহু সৈন্য হতাহত হয়। এরপর সেখান থেকে পিছু হটার সময় ক্ষুধা পিপাসার শিকার হয়ে মারা যায় অনেকে। কিছু মারা যায় অসুখ বিসুখে। একই বিপর্যয় সৈন্যদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে। দামেশক থেকে ফেরার পথে এইসব ভীত সৈন্যদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ পালিয়ে যায় প্রাণের মায়ায়। এরপর যারা সম্রাট ফ্রেডারিকের সঙ্গে ছিল আক্রা আসার পথে সুলতান আইয়ুবীর কমাণ্ডো বাহিনীর তীর ও মেঞ্জানিকের নিক্ষেপিত পেট্রোল হাঁড়ির প্রজ্জলিত আগুনে পুড়ে মারা যায় বাকীরা।

    যে বিশাল হাজার সৈন্য আক্রা গিয়ে পৌঁছেছিল তারাও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল। তাদের চোখের সামনে ভাসছিল এক বিশাল বাহিনী, যে বাহিনীর গর্বিত অংশ মনে হতো নিজেকে। সেই বাহিনী ছোট হতে হতে এখন এমন এক ক্ষুদ্র দলে পরিণত হয়েছে, যা দেখে আশাভঙ্গের বেদনায় মুষড়ে পড়ল তাদের অন্তরগুলো। এত তাদের মন থেকে ক্রুশের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ নিঃশেষ হয়ে গেল। এমনকি ক্রুশের প্রতি তারা যে শপথ করেছিল সেই শপথের কথা স্বরণ করার কথাও ভুলে গেল তারা।

    ফ্রান্সের সম্রাট ফিলিপ অগাষ্টাস ও ইংল্যাণ্ডের সম্রাট রিচার্ড সমুদ্র পথে ধেয়ে আসছে, এ খবর আগেই সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দারা পৌঁছে দিয়েছিল সুলতানকে। তারা জানালো, ইংল্যাণ্ডের সৈন্য এরই মধ্যে সাইপ্রাসে এসে গেছে।

    এই বাহিনীর সংখ্যা কত সে কথাও গোয়েন্দাদের কাছ থেকে জেনে নিলেন সুলতান। তারা জানালো, ইংল্যাণ্ডের সৈন্য সংখ্যা ষাট হাজারের মত হবে। ফ্রান্সের সৈন্য সংখ্যাও প্রায় সমপরিমাণ। এদিকে আক্রায় অবস্থান করছিল জার্মানীর বিশ হাজার সৈন্য। জেরুজালেম ও আশপাশের খৃষ্টান সম্রাটদের সৈন্যরাও যুদ্ধ বাঁধলে তাদের সাথে শামিল হবে এতে সন্দেহ নেই। সুলতান আইয়ুবী ভেবে দেখলেন, খৃষ্টানরা চাইলে তার বিরুদ্ধে এযাবত কালের সবচাইতে বড় সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে পারবে সন্দেহ নেই।

    সুলতান আইয়ুবী আরো খবর পেলেন, গে অব লুজিয়ান, যিনি সুলতানের সঙ্গে আর কখনও যুদ্ধে শামিল হবেন না এই অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করে বন্দী অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, তিনিও কাউণ্ট কোনর‌্যাডকে সঙ্গে নিয়ে পৃথক একটি বাহিনী গড়ে তুলেছেন। ইতিমধ্যেই এই বাহিনীতে শামিল হয়েছে সাতশো দুর্ধর্ষ নাইট যোদ্ধা, নয় হাজার ফিরিঙ্গী সৈন্য ও বারো হাজার ওলন্দাজ সৈন্য। কিছু ইউরোপীয় সেনা অফিসারও যোগ দিয়েছে এই বাহিনীতে। এভাবে তার সৈন্য সংখ্যাও বাইশ হাজারে দাঁড়িয়ে গেছে।

    ছোট ছোট খৃষ্টান সম্রাটরাও আইয়ুবীর বিরুদ্ধে এটাকে চূড়ান্ত যুদ্ধ গণ্য করে তাদের বাহিনী পাঠাতে শুরু করল সম্মিলিত বাহিনীতে। মোটামুটি হিসেবে সম্মিলিত ক্রুসেড বাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা দাঁড়ালো গিয়ে ছয় লক্ষ।

    শুধু সৈন্য সংখ্যা নয়, যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র ও সাজ সরঞ্জাম সব দিক থেকেও ইসলামী সৈন্যদের তুলনায় তারা আশাতীত রকমের শ্রেষ্টত্বের অধিকারী। ফলে এবার সুলতানকে পরাজিত ও নিঃশেষ করা সম্ভব হবে এ ব্যাপারে খৃস্টানদের মনে কোন সন্দেহ রইলো না।

    অন্যদিকে চিত্র ছিল খুবই করুণ। সুলতানের সৈন্যরা অধিকাংশই ছুটিতে বাড়ী চলে গেছে। সুলতান আইয়ুবীর সাথে আছে মাত্র দশ হাজার মামলুক সৈন্য। যদিও এ বাহিনী প্রতিটি সদস্যই দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, বিশেষ করে সুলতানে কাছে যুদ্ধের ট্রেনিং পেয়ে নিজেদের ওপর ছিল তারা পূর্ণ আস্থাশীল, কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে এটা এতই অপ্রতুল যে, এরা কোন হিসাবের মধ্যেই পড়ে না। তবু এদের উপর সুলতানের পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস ছিল। তিনি মনে করতেন, নিবেদিতপ্রাণ দশ হাজার সৈন্য অনায়াসে এক লাখ সৈন্যের মোকাবেলা করে বিজয়ী হতে পারে।

    যুদ্ধের জন্য ভৌগলিক কারণে আক্রা খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। এখান থেকে স্থলপথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা যেমন সহজ তেমনি সমুদ্র পথ ব্যবহারেরও রয়েছে অবাধ সুযোগ।

    আক্রা শহরে সুলতান আইয়ুবীর সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র দশ হাজার এ সৈন্যের পরিমাণ বাড়ানোর কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। তখনকার দিনে যোগাযোগ ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না যে, ছুটি প্রাপ্ত প্রতিটি সৈনিককে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ডেকে নেবেন। তার সৈন্য বাহিনীর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ছড়িয়ে আছে বিজিত অঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে। সুলতানকে ওসব অঞ্চলে সৈন্য মোতায়েন করে রাখতে হচ্ছে এ জন্য যে, ওসব জায়গা থেকে সৈন্য সরালেই তা খৃষ্টানরা পুনরায় দখল করে নেবে।

    সুলতান আইয়ুবী বায়তুর মোকাদ্দাসে তাঁর যে বাহিনী আছে তাদের কথা স্বরণ করলেন। ওখান থেকেও কোন সৈন্য সাহায্য পাওয়ার উপায় নেই। ওখান থেকে সৈন্য সরালেই তা আবার দখল করে নেবে ক্রুসেডাররা। সুলতান খবর পেয়েছেন, ক্রুসেড বাহিনী শহরের চারিদিকে একত্রিত হচ্ছে।

    সুলতান আইয়ুবী মহা সমস্যায় পড়ে গেলেন। জেরুজালেমের পতনকে বিশ্বের খৃষ্টান সম্প্রদায় তাদের অস্তিত্বের জন্য এক মহা হুমকি বলে গণ্য করছিল। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সারা দুনিয়া থেকে খৃষ্টানরা এসে একত্রি হচ্ছিল এই মহাসমরে। সুলতানের ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ হানার জন্য যেখানে সমবেত হচ্ছে লাখ লাখ খৃষ্টান সৈন্য, সেখানে সুলতান তার নিজের কোন শহর বা কেল্লা থেকেই কোন সৈন্য সংগ্রহ করতে পারছেন না।

    অপরদিকে ধেয়ে আসছে ইংল্যাণ্ডের বিশাল নৌবহর। এ বাহিনী কেবল শক্তিশালী নয়, ভয়ংকরও। সুলতান আইয়ুবী ভালভাবেই জানেন, মিশরীয় নৌবহর দিয়ে ইংল্যাণ্ডের এ বিশাল নৌবাহিনীর সাথে কোনভাবেই মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

    সুলতান আইয়ুবীর জন্য এ মহা সমস্যা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিল। তিনি জানতেন, এ সমস্যার মোকাবেলা তাকে করতেই হবে। কিন্তু কিভাবে মোকাবেলা করবেন ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। এ যে বড় অসম সংকেত!

    অনেকগুলো বিজয় অর্জন করার পরও সুলতানের জন্য সময়টা এখন খুবই খারাপ। বিগত চারটি বছর তাঁর  সৈন্যরা একটানা যুদ্ধ করেছে। তাঁর বিস্বস্ত ও সদা তৎপর কমাণ্ডো বাহিনীও দীর্ঘদিন ধরে বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ে, মরুভূমিতে জীবন বাজি রেখে ক্রমাগত লড়াই করে আসছে। এ সব লড়াইয়ে তারা তাদের জীবন অকাতরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।

    যুদ্ধের গতি লক্ষ করলে এবং তাদের শারীরিক অবস্থা বিচার করলে তারা আর যুদ্ধ করার উপযোগী নেই। এখন তাদের প্রয়োজন একটু বিশ্রাম, একটু প্রশান্তির জীবন।

    এ মহা সমস্যায় পড়ে সুলতান আইয়ুবীর অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ালো যে, তিনি আর রাতে ঘুমাতে পারতেন না। তিনি সব সময় গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। যুদ্ধের নতুন কৌশল উদ্ভাবন, ময়দানের নতুন নকশা আঁকা এসব কাজে তিনি এত বেশী নিমগ্ন হয়ে পড়লেন যে, তাঁর শরীর ক্রমেই ভেঙ্গে পড়তে শুরু করল। দেখতে দেখতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে গেলে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক তাঁকে নিয়মিত অষুধ পথ্য দিতে লাগলেন। এবাবে কেটে গেল তিন চার দিন। চার দিন অসুখে থাকার পর তিনি ডাক্তারের সেবাযত্নে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু শরীরে আগের মত বল বা শক্তি পাচ্ছিলেন না।

    তার বয়স এখন ৫৪ বছর। কিশোর কালে তিনি যুদ্ধের ময়দানে ছুটে গিয়েছিলেন। সারাটা যৌবন তিনি কাটিয়েছেন যুদ্ধের ময়দানে। দুর্গম পাহাড়, গভীর জঙ্গল, কঠিন মুরুভূমি সর্বত্র একের পর এক যুদ্ধ করে তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন সারাটা জীবন। বিজয়ের পর বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। কিন্তু শেষ বয়সে এমন কঠিন বিপদে পড়বেন, কল্পনাও করেননি তিনি। তার মনে পড়ে গেল, কৈশোরে তিনি বায়তুর মোকাদ্দাস উদ্ধারের কসম খেয়েছিলেন। সে কসম তিনি পূর্ণ করেছেন। তারপর তিনি মসজিদুল আকসার মিম্বর ধরে শপথ করেছেন, “বেঁচে থাকতে আমি বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে ইসলামী পতাকা সরতে দেবো না”। এ শপথের কথা স্বরণ করেই তিনি এখন ঘুমাতে পারেন না। বিশ্রাম সারা জীবন তার জন্য হারাম ছিল, এখনও হারাম হয়েই রইলো।

    আমেরিকান ঐতিহাসিক এ্যান্থনী জুলিয়েট, হেরাল্ড লিম, লেনপোল, গীবন, আর্নল্ড প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, “সুলতান আইয়ুবী সামান্য সুস্থ হয়েই বললেন, ‘আমাকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে চলো’।

    তিনি তাঁর বিশ্বস্ত ও জিন্দাদীল সেনাবাহিনীর দশ হাজার সৈন্য আক্রায় রেখেই বায়তুল মোকাদ্দাসে রওনা হলেন। সঙ্গে নিলেন কেবল নিজের রক্ষী বাহিনী।

    সৈন্যদের বললেন, “আক্রার জিম্মা আমি তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছি। আমি শপথ নিয়েছিলাম, বেঁচে থাকতে বায়তুল মোকাদ্দাসের ইসলামী পতাকা আমি অবনমিত হতে দেবো না। খৃষ্টানরা তাদের সর্বশক্তি নিয়ে আমাদের সাথে মোকাবেলা করতে আসছে, আমি বায়তুল মোকাদ্দাসে তাদের সাথে চূড়ান্ত মোকাবেলা করার জন্য চলে গেলাম। বিজিত প্রতিটি অঞ্চলের হেফাজতের জিম্মা পালন করবে নিজ নিজ এলাকার মুজাহিদ বাহিনী। আক্রা যুদ্ধের কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ন স্থান তোমাদের জীবন থাকতে এখানে ক্রুশের পতাকা উড়বে এ কথা আমি বেঁচে থাকা পর্যন্ত বিশ্বাস করবো না।

    তিনি বায়তুল মোকাদ্দাস রওনা হয়ে গেলেন। কমাণ্ডো বাহিনীকে আগেই জানানো হয়েছিল, তিনি বায়তুল মোকাদ্দাস রওনা হয়েছেন। তারা তাঁর জন্য আক্রা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত রাস্তা পূর্ণ নিরাপদ করার সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিল। সুলতান আইয়ুবী নির্বিঘ্নে বায়তুল মোকাদ্দাস গিয়ে পৌঁছলেন। তিনি সোজা গিয়ে মসজিদুল আকসায় উঠলেন। সেখানে সিজদায় পড়ে ছেড়ে দিলেন চোখের পানি। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে আল্লাহর দরবারে কাতর মিনতি করে বলতে লাগলেন, “হে আমার খোদা! আমাকে এমন ভয়াবহ সংকট মুহূর্তে তোমার গায়েবী মদদ দিয়ে সাহায্য করো। তোমার সৈনিকরা আজ এক কঠিন বিপদের মুখোমুখী। আমাদের আর কোন সহায় নেই যার কাছে আমরা সাহায্য চাইতে পারি।

    তুমি আমাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করো। তুমি আমাদের এমন ক্ষমতা দাও যাতে আমরা তোমার দ্বীনের দুশমনদের রুখে দিয়ে তোমার বান্দাদের নিরাপত্তা দিতে পারি, তোমার দ্বীনকে হেফাজত করতে পারি।”

    এভাবে তিনি কেঁদে কেঁদে আল্লাহর সাহায্য চাইতে লাগলেন।  ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি সারা দিন মসজিদে পড়ে অঝোরে কান্নাকাটি করলেন। সন্ধ্যার পর তিনি যখন মসজিদ থেকে বের হলেন, তখন তার মুখে ছিল প্রশান্তি। মনে হচ্ছিল যে দৃঢ়তা ও মনোবল নিয়ে তিনি বায়তুল মোকাদ্দাস জয় করেছিলেন, তার চেহারায় আবার ফিরে এসেছে সেই দৃঢ়তা।

    রাতে সুলতান আইয়ুবী আবার মসজিদুল আকাসায় চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি সিজদায় পড়ে গেলেন এবং অশ্রু ভেজা কণ্ঠে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে কাকুতি মিনতি করতে লাগলেন। তিনি সারা রাত নফল ইবাদত ও দোয়া দরূদ পাঠ করে ফজরের নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসেন।

    সেই রাতেরই ঘটনা। রাতে তিনি যখন মসজিদে গিয়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করছিলেন তখন মসজিদের এক কোণে এক ব্যক্তি সারা শরীর কম্বলে ঢেকে ইবাদত বন্দেগী করছিল। সুলতান সারা রাত মসজিদে অবস্থান করেন এবং এবাদত বন্দেগীতে মশগুল হয়ে কাটিয়ে দেন নির্জন প্রহর। সেই লোকও সারা রাত মসজিদে অবস্থান করল এবং এবাদত বন্দেগী করে সময় কাটিয়ে দিল।

    তার ইবাদতের নিজস্ব কোন নিয়ম কানুন ছিল না। মনে হচ্ছিল লোকটি সুলতানকে অনুসরণ করছে। সুলতান সিজদায় গেলে সেও সিজদায় যায় আবার সুলতান মোনাজাতে বসে গেলে দেখা যায় সে লোকও দু’হাত তুলে মোনাজাত করছে। সুলতান নামাজে দাঁড়ালে সেও নামাজে দাঁড়িয়ে পড়তো। সুলতানকে অজিফা আওড়াতে দেখলে সেও অজিফা আওড়াতে শুরু করতো।

    লোকটা মসজিদে এসেই মুসল্লীদের থেকে দূরে গিয়ে বসেছিল। এশার নামাজের সময়ও দেখা গেল লোকটি তার চেহারা কম্বল ঢেকে মসজিদের এক কোণে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছে। এতে কৌতুহল জাগলো সুলতানের রক্ষীদের। তারা দূর থেকে লোকটির দিকে নজর রাখতে শুরু করল।

    সকালে মুয়াজ্জিন ফজরের আজান দিলেও লোকটি তার অবস্থান থেকে নড়লো না। ওখানে দাঁড়িয়েই সে ফজরের নামাজ পড়ল। তারপর সুলতান মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলে সেও নিজেকে কম্বলে জড়িয়ে রেখে মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলো। লোকটি মসজিদ থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তায় নামলো। এ সময় এক গোয়েন্দা পিছু নিল তার। লোকটি টের পেয়ে পথের ওপর থেমে গেল। দেখাদেখি থেমে গেল গোয়েন্দাটিও।

    কম্বলওয়ালা যখন নিশ্চিত হ’ল, তাকে অনুসরণ করা হচ্ছে তখন সে ঘুরে দাঁড়ালো এবং অনুসরণকারীকে দাঁড়াতে দেখে তার দিকে কয়েক কদম এগিয়ে গেল। কিন্তু কি মনে কবরে সে আবার থমকে গাঁড়ালো এবং উল্টো দিকে ফিরে দ্রুত হাঁটতে লাগলো।

    তার পিছু নেয়া লোকটিও দ্রুত হাঁটতে লাগলো। রাস্তার পাশে সামনে এক লোক দাঁড়িয়েছিল। কম্বলওয়ালা তার কাছে গিয়ে থামলো এবং তাকে কিছু বলে সামনে চলে গেল। ওই লোকটি ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলো।

    অনুসরণকারী গোয়েন্দা সে লোকটির কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘এ লোকটি কে, যার সাথে তুমি কথা বললে?’

    ‘ও তুমি!’ সে লোকটি বললো, ‘তুমি তাকে অনুসরণ করছিলে?’

    ‘আমি তার পা দেখেছি।’ অনুসরণকারী বললো, ‘এ লোক পুরুষ নয়, মহিলা। এই মহিলা কি তোমার আত্মীয়? তুমি তাকে কিভাবে চেনো?’

    দাঁড়ানো লোকটি অনুসরণকারী গোয়েন্দার পূর্ব পরিচিত ছিল। তারা পরস্পরের নামও জানতো।

    ‘বন্ধু এহতেশাম!’ সে লোক বললো, ‘আমি জানি তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করছো। প্রত্যেকের ওপর দৃষ্টি রাখা তোমার দায়িত্ব। আর বন্ধু হিসেবে আমারও কর্তব্য কোন কিছু গোপন না করে তোমাকে সব বলে দেয়া। আচ্ছা বন্ধু, বলতো, একটি মেয়ের মসজিদে যাওয়া কি পাপ?’

    ‘না, মোটেই নয়।’ এহতেমাম বললো, ‘এই মহিলা নিজেকে কম্বল ঢেকে রেখেছিল। তাই আমার সন্দেহ হয়েছিল ওর ওপর। ওর দিকে নজর রাখতে গিয়েই টের পেলাম সে পুরুষ নয়, মহিলা। তাই স্বাভাবিকভাবেই তার ওপর আমার কৌতুহল আরো বেড়ে গেল।

    শোন আল আস! সারা রাত আমরা তিনজন বায়তুল মোকাদ্দাসের আশেপাশে পাহারা দিয়েছি। কারণ কাল রাতটি সুলতান মসজিদেই কাটিয়েছেন। কিন্তু তিনি জানেন না, আমরা ছদ্মবেশে তার হেফজতের জন্য পাহারা দিয়ে যাচ্ছি।’

    এহতেশাম বললো, ‘সুলতান কাউকে কিছু না জানিয়েই মসজিদে চলে এসেছিলেন। তার ধারণাই নেই যে, তার নিজস্ব রক্ষী বাহিনী ছাড়াও, কোন লোক তাঁর হেফজতের নিযুক্ত আছে।’

    ‘এটা হাসান বিন আবদুল্লাহর ব্যবস্থা। তুমি নিজেও সেনা কমাণ্ডার এবং আমাকে ভাল করে জানো। সে জন্যই তোমাকে সব বললাম। এখন বলো তো, মেয়েটি কে?’

    ‘অবশ্যই বলবো এহতেশাম।’ আল আস উত্তরে বললো, ‘বায়তুল মোকাদ্দাসে, বিশেষ করে মসজিদুল আকসার এত কাছে দাঁড়িয়ে কোন মুসলমান মিথ্যা বলতে পারে না। হাঁ, আমি অবশ্যই তোমাকে বলবো, এ মেয়েটি কে? কিন্তু তুমি বলো তো, এ মেয়ের ওপর তোমার সন্দেহ হ’ল কেন?’

    ‘আমি রাতে তাকে বারান্দার এক কোণে বসে থাকতে দেখলাম।’ এহতেশাম উত্তর দিল, ‘সুলতানের নিরাপত্তার কথা ভেবে মনে করলাম, তাকে সেখান থেকে উঠিয়ে দেই। কিন্তু তখন এশার সময় হয়ে যাওয়ায় তাকে আর কিছু বললাম না। নামাজ শেষে সেখান থেকে তার চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু সবাই বাসায় ফিরলেও সে বাইরে বের হ’ল না।

    সে সময় সুরতান আইয়ুবী ভেতরে মিম্বরের সামনে ইবাদত বন্দেগীতে ব্যস্ত ছিলেন। আমি দেখলাম তিনি অজিফা পাঠ করছেন। কম্বলে ঢাকা লোকটি সুলতান আইয়ুবীর উপর হত্যার আক্রমণ চালাতে পারে সন্দেহ থাকলেও মসজিদ থেকে কাউকে তো বের করে দেওয়া যায় না! তাই আমি তাকে কিছু বলতে পারলাম না।

    আমি খেয়াল করে দেখলাম, লোকটার ইবাদতের নিজস্ব কোন ধরণ নেই। সে সুলতানকে অনুসরণ করে যাচ্ছে মাত্র।

    আমি আমার সাথীদেরকে তার কথা বললাম। তারাও মসজিদের ভিতরে ঢকে তাকে দেখে নিল। সাথীরা বললো, ‘এর উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।’

    রাত বাড়তে লাগলো কিন্তু সে লোক সেখান থেকে উঠল না। শেষে আমি তার পিছনে বসে গেলাম। আমি তার ক্রন্দন ও ফোঁপানোর শব্দ শুনতে পেলাম।

  • নন্দিত নরকে

    নন্দিত নরকে

    নন্দিত নরকে

    হুমায়ূন আহমেদ

    নন্দিত নরকে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস। এর রচনাকাল ১৯৭০ এবং প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে অধ্যয়নকালে হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসটি রচনা করেন। এ সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।

  • আলালের ঘরের দুলাল

    আলালের ঘরের দুলাল

    আলালের ঘরের দুলাল

    PREFACE.

    The above original Novel in Bengali being the first work of the kind, is now submitted to the publie with considerable diffidence. It chiefly treats of the pernicious effects of allowing children to be improperly brought up, with remarks on the existing system of education, on self-formation and religioni eulture, and is illustrative of the condition of Hindu society, manners, customs, de. and partly of the state of things in the Moffusil. The work has boon written in a simple style, and to foreigners desirous of sequiring an idiomatic knowledge of the Bengali language and an aoguaintance with Hindu domestic life, it will perhaps be found useful. The writer thinks it well to add that a large portion of this Tale appeared originally in a monthly publication, which met with the approval of the number of friends, at whose request he han been induced to conclude and publish it in the present form.

    Price per copy,             …            …            12 Annas, cash.

    ভূমিকা।

    অন্যান্য পুস্তক অপেক্ষা উপন্যাসাদি পাঠ করিতে প্রায় সকল লোকেরই মনে স্বভাবতঃ অনুরাগ জন্মিয়া থাকে এবং যে স্থলে এতদ্দেশীয় অধিকাংশ লোক কোন পুস্তকাদি পাঠ করিয়া সময় ক্ষেপণ করিতে রত নহে সে স্থলে উক্ত প্রকার গ্রন্থের অধিক আবশ্যক, এতদ্বিবেচনায় এই ক্ষুদ্র পুস্তক খানি রচিত হইল। ইহার তাৎপর্য্য কি পাঠ করিলেই প্রকাশ হইবে। এ প্রকার পুস্তক লেখনের প্রণালী এতদ্দেশ মধ্যে বড় প্রচলিত নাই, ইহাতে প্রথমোদ্যমে অবশ সদোষ হইবার সম্ভাবনা, পাঠকবর্গ অনুগ্রহ করিয়া ঐ দোষ ক্ষমা করিবেন। গ্রন্থের নির্ঘণ্ট দেখিলেই গল্পসকলের আভাস ও অন্যান্য প্রকরণ জানা যাইবে।

    পুস্তকের মূল্য,             …            …            ৸৹ নগদ।


    আলালের ঘরের দুলাল

    ১. বাবুরাম বাবুর পরিচয়—মতিলালের বাঙ্গালা, সংস্কৃত ও ফার্সী শিক্ষা।

    বৈদ্যাবাটীর বাবুরাম বাবু বড় বৈষয়িক ছিলেন। তিনি মাল ও ফৌজদারী আদালতে অনেক কর্ম করিয়া বিখ্যাত হন। কর্মকাজ করিতে প্রবৃত্ত হইয়া উৎকোচাদি গ্রহণ না করিয়া যথার্থ পথে চলা বড় প্রাচীন প্রথা ছিল না – বাবুরাম সেই প্রথানুসারেই চলিতেন। একে কর্মে পটু – তাতে তোষামোদ ও কৃতাঞ্জলি দ্বারা সাহেব-সুবাদিগকে বশীভূত করিয়াছিলেন এজন্য অল্পদিনের মধ্যেই প্রচুর ধন উপার্জন করিলেন। এদেশে ধন অথবা পদ বাড়িলেই মান বাড়ে, বিদ্যা ও চরিত্রের তাদৃক্ গৌরব হয় না। বাবুরাম বাবুর অবস্থা পূর্বে বড় মন্দ ছিল, তৎকালে গ্রামে কেবল দুই এক ব্যক্তি তাঁহার তত্ত্ব করিত। পরে তাঁহার সুদৃশ্য অট্টালিকা বাগ বাগিচা তালুক ও অন্যান্য ঐশ্বর্য সম্পত্তি হওয়াতে অনুগত ও অমাত্য বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা অসংখ্য হইল। অবকাশ কালে বাটিতে আসিলে তাঁহার বৈঠকখানা লোকারণ্য হইত, যেমন মেঠাইওয়ালার দোকানে মিষ্ট থাকিলেই তাহা মক্ষিকায় পরিপূর্ণ হয় তেমন ধনের আমদানি হইলেই লোকের আমদানি হয়। বাবুরামবাবুর বাটীতে যখন যাও তাঁহার নিকট লোক ছাড়া নাই—কি বড়, কি ছোট, সকলেই চারিদিকে বসিয়া তুষ্টিজনক নানা কথা কহিতেছে, বুদ্ধিমান্ ব্যক্তিরা ভঙ্গিক্রমে তোষামোদ করিত আর এলোমেলো লোকেরা একেবারেই জল উঁচু-নিচু বলিত। এইরূপে কিছু কাল যাপন করিয়া বাবুরাম বাবু পেন্‌সন লইলেন ও আপন বাটীতে বসিয়া জমিদারী ও সওদাগরী কর্ম করিতে আরম্ভ করিলেন।

    লোকের সর্ব প্রকারে সুখ প্রায় হয় না ও সর্ব বিষয়ে বুদ্ধিও প্রায় থাকে না। বাবুরাম বাবু কেবল ধন উপার্জনেই মনোযোগ করিতেন। কি প্রকারে বিষয় বিভব বাড়িবে, কি প্রকারে দশজন লোক জানিবে— কি প্রকারে গ্রামস্থ লোক-সকল করজোড়ে থাকিবে— কি প্রকারে ক্রিয়াকাণ্ড সর্বোত্তম হইবে— এই সকল বিষয় সর্বদা চিন্তা করিতেন। তাঁহার এক পুত্র ও দুই কন্যা ছিল। বাবুরামবাবু বলরাম ঠাকুরের সন্তান, এজন্য জাতিরক্ষার্থ কন্যাদ্বয় জন্মিবামাত্র বিস্তর ব্যয় ভূষণ করিয়া তাহাদের বিবাহ দিয়াছিলেন, কিন্তু জামাতারা কুলীন, অনেক স্থানে দারপরিগ্রহ করিয়াছিল— বিশেষ পারিতোষিক না পাইলে বৈদ্যবাটীর শ্বশুরবাটীতে উঁকিও মারিত না। পুত্র মতিলাল বাল্যাবস্থা অবধি আদর পাইয়া সর্বদা বাইন করিত—কখন বলিত বাবা চাঁদ ধরিব—কখন বলিত বাবা তোপ খাব। যখন চীৎকার করিয়া কান্দিতে আরম্ভ করিত নিকটস্থ সকল লোক বলিত ঐ বান্‌কে ছেলেটার জ্বালায় ঘুমান ভার! বালকটি পিতা-মাতার নিকট আস্কারা পাইয়া পাঠশালায় যাইবার নামও করিত না। যিনি বাটীর সরকার তাঁহার উপর  শিক্ষা করাইবার ভার ছিল। প্রথম প্রথম গুরু মহাশয়ের নিকটে গেলে মতিলাল আঁ আঁ করিয়া কান্দিয়া তাঁহাকে আঁচড় ও কামড় দিত—গুরুমহাশয় কর্তার নিকট গিয়া বলিতেন, মহাশয়! আপনার পুত্রকে শিক্ষা করান আমার কর্ম নয়। কর্তা প্রত্যুত্তর দিতেন—ও আমার সবেধন নীলমণি—ভুলাইয়া টুলাইয়া গায় হাত বুলাইয়া শেখাও। পরে বিস্তর কৌশলে মতিলাল পাঠশালায় আসিতে আরম্ভ করিল। গুরুমহাশয় পায়ের উপর পা, বেত হাতে, দেয়ালে ঠেসান দিয়া ঢুল্‌ছেন ও বল্‌ছেন “ল্যাখ রে ল্যাখ।” মতিলাল ঐ অবকাশে উঠিয়া তাঁহার মুখের নিকট কলা দেখাচ্ছে আর নাচ্ছে — গুরুমশায় নাক ডাকিতেছেন—শিষ্য কি করিতেছে তাহা কিছুই জানেন না। তাঁহার চক্ষু উন্মীলিত হইলেই মতিলাল আপন পাততাড়ির নিকট বসিয়া কাগের ছা বগের ছা লিখিত। সন্ধ্যাকালে ছাত্রদিগকে ঘোষাইতে আরম্ভ করিলে মতিলাল গোলে হরিবোল দিত—কেবল গণ্ডার এণ্ডা ও বুড়িকা ও পণিকার শেষ অক্ষর বলিয়া ফাঁকি সিদ্ধান্ত করিত,—মধ্যে মধ্যে গুরুমহাশয় নিদ্রিত হইলে তাঁহার নাকে কাটি দিয়া ও কোঁচার উপর জলন্ত অঙ্গার ফেলিয়া তীরের ন্যায় প্রস্থান করিত। আর আহারের সময় চুনের জল ঘোল বলিয়া অন্য লোকের হাত দিয়া পান করাইত। গুরুমহাশয় দেখিলেন বালকটি অতিশয় ত্রিপণ্ড, মা সরস্বতীকে একবারে জলপান করিয়া বসিল, অতএব মনে করিলেন যদি এত বেত্রাঘাতে সুযুত না হইল, কেবল গুরুমারা বিদ্যাই শিক্ষা করিল তবে এমত শিষ্যের হাত হইতে ত্বরায় মুক্ত হওয়া কর্তব্য, কিন্তু কর্তা ছাড়েন না—অতএব কৌশল করিতে হইল। বোধ হয় গুরুমহাশয়গিরি অপেক্ষা সরকারি ভাল, ইহাতে বেতন দুই টাকা ও খোরাক-পোষাক—উপরি লাভের মধ্যে তালপাত কলাপাত ও কাগজ ধরিবার কালে এক একটা সিধে ও এক এক জোড়া কাপড় মাত্র, কিন্তু বাজার সরকারি কর্মে নিত্য কাঁচা কড়ি। এই বিবেচনা করিয়া কর্তার নিকট গিয়া কহিলেন—মতিবাবুর কলাপাত ও কাগজ লেখা শেষ হইয়াছে এবং এক প্রস্থ জমিদারী কাগজও লেখান গিয়াছে। বাবুরামবাবু এই সংবাদ পাইয়া আহ্লাদে মগ্ন হইলেন, নিকটস্থ পারিষদেরা বলিল— না হবে কেন! সিংহের সন্তান কি কখন শৃগাল হইতে পারে?

    পরে বাবুরাম বাবু বিবেচনা করিলেন ব্যাকরণাদি ও কিঞ্চিত ফার্সী শিক্ষা করানো আবশ্যক। এই স্থির করিয়া বাটীর পূজারী ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞাসা করিলেন—কেমন হে তোমার ব্যাকরণ ট্যাকরণ পড়াশুনা আছে? পূজারী ব্রাহ্মণ গণ্ড মুর্খ—মনে করিল যে চাউল-কলা পাই তাতে তো কিছুই আঁটে না—এত দিনের পর বুঝি কিছু প্রাপ্তির পন্থা হইল, এই ভাবিয়া প্রত্যুত্তর করিল— আজ্ঞে হাঁ, আমি কুইনমোড়ার ঈশ্বরচন্দ্র বেদান্তবাগীশের টোলে ব্যাকরণাদি একাদিক্রমে পাঁচ বৎসর অধ্যয়ন করি, কপাল মন্দ, পড়াশুনার দরুন কিছুই লাভবান হয় না, কেবল আদা জল খাইয়া মহাশয়ের নিকট পড়িয়া আছি। বাবুরাম বাবু বলিলেন—তুমি অদ্যাবধি আমার পুত্রকে ব্যাকরণ শিক্ষা করাও। পূজারী ব্রাহ্মণ আশা বায়ুতে মুগ্ধ হইয়া মুগ্ধবোধ ব্যাকরণের দুই-এক পাত শিক্ষা করিয়া পড়াইতে আরম্ভ করিলেন। মতিলাল মনে করিলেন গুরুমহাশয়ের হাত হইতে তো মুক্ত হইয়াছি এখন এ বেটা চাউলকলাখেকো বামুনকে কেমন করিয়া তাড়াই? আমি বাপ মার আদরের ছেলে—লিখি বা না লিখি, তাঁহারা আমাকে কিছুই বলিবেন না—লেখাপড়া শেখা কেবল টাকার জন্য—আমার বাপের অতুল বিষয়—আমার লেখাপড়ায় কাজ কি? কেবল নাম সহি করিতে পারিলেই হইল। আর যদি লেখাপড়া শিখিব তবে আমার এয়ারবক্সিদিগের দশা কি হইবে? আমোদ করিবার এই সময়,—এখন কি লেখা-পড়ার যন্ত্রণা ভাল লাগে?

    মতিলাল এই স্থির করিয়া পূজারী ব্রাহ্মণকে বলিল—অরে বামুন, তুই যদি হ, য, ব, র, ল, শিখাইতে আমার নিকট আর আস্‌বি ঠাকুর ফেলিয়া দিয়া তোর চাউল-কলা পাইবার উপায় সুদ্ধ ঘুচাইয়া দিব— কিন্তু বাবার কাছে গিয়া একথা বললে ছাতের উপর হতে তোর মাথায় এমন এক এগারঞ্চি ঝাড়িব যে তোর ব্রাহ্মণীকে কালই হাতের নোয়া খুলিতে হইবে। পূজারী ব্রাহ্মণ হ, য, ব, র, ল প্রসাদাৎ ক্ষণেক কাল হ, য, ব, র, ল হইয়া থাকিলেন পরে আপনা আপনি বিচার করিলেন—ছয় মাস প্রাণপণে পরিশ্রম করিয়াছি এক পয়সাও হস্তগত হয় নাই, আবার “লাভঃ পরং গোবধঃ” —প্রাণ নিয়া টানাটানি—এক্ষণে ছেড়ে দিলে কেঁদে বাঁচি। পূজারী ব্রাহ্মণ যৎকালে এই সকল পর্যালোচনা করিতেছিলেন মতিলাল তাঁহার মুখাবলোকন করিয়া বলিল—বড় যে বসে বসে ভাবছিস্? টাকা চাই? এই নে—কিন্তু বাবার কাছে গিয়া বল্‌গে আমি সব শিখেছি। পূজারী ব্রাহ্মণ কর্তার নিকট গিয়া বলিল—মহাশয় মতিলাল সামান্য বালক নহে—তাহার অসাধারণ মেধা, যাহা একবার শুনে তাহাই মনে করিয়া রাখে। বাবুরাম বাবুর নিকট একজন আচার্য ছিল—বলিল, মতিলালের পরিচয় দিবার আবশ্যক নাই। উটি ক্ষণজন্মা ছেলে— বেঁচে থাকিলে দিক্‌পাল হইবে।

    অনন্তর পুত্রকে ফার্সী পড়াইবার জন্য বাবুরাম বাবু একজন মুন্‌সি অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। অনেক অনুসন্ধানের পর আলাদি দরজির নানা হবিবলহোসেন তেল কাঠ ও ১৷৷৹ টাকা মাহিনাতে নিযুক্ত হইল। মুন্‌সি সাহেবের দন্ত নাই, পাকা দাড়ি, শনের ন্যায় গোঁফ, শিখাইবার সময় চক্ষু রাঙা করেন ও বলেন, ‘আরে বে পড়’ ও কাফ গাফ আয়েন গায়েন উচ্চারণে তাঁহার বদন সর্বদা বিকট হয়। একে বিদ্যা শিক্ষাতে কিছু অনুরাগ নাই তাতে ঐরূপ শিক্ষক অতএব মতিলালের ফার্সি পড়াতে ঐরূপ ফল হইল। এক দিবস মুন্‌সি সাহেব হেঁট হইয়া কেতাব দেখিতেছেন ও হাত নেড়ে সুর করিয়া মস্‌নবির বয়েত পড়িতেছেন ইত্যবসরে মতিলাল পিছন দিগ্ দিয়া একখান জ্বলন্ত টিকে দাড়ির উপর ফেলিয়া দিল। তৎক্ষণাৎ দাউদাউ করিয়া দাড়ি জ্বলিয়া উঠিল। মতিলাল বলিল—কেমন রে বেটা শোরখেকো নেড়ে আমাকে পড়াবি? মুন্‌সি সাহেব দাড়ি ঝাড়িতে ঝাড়িতে ও তোবা তোবা বলিতে বলিতে প্রস্থান করিলেন এবং জ্বালার চোটে চিৎকার করিয়া বলিলেন—এস্ মাফিক বেতমিজ আওর বদ্‌জাৎ লেড়্‌কা কবি দেখা নেই—এস্ কাম্‌সে মুল্কমে চাস কর্ণা আচ্ছি হ্যায়। এস্ জেগে আনা বি হারাম হ্যায়—তোবা-তোবা-তোবা!!!


    আলালের ঘরের দুলাল

    ২. মতিলালের ইংরাজী শিখাবার উদ্‌যোগ ও বাবুরাম বাবুর বালীতে গমন

    মুন্‌সি সাহেবের দুর্গতির কথা শুনিয়া বাবুরামবাবু বলিলেন—মতিলাল তো আমার তেমন ছেলে নয়—সে বেটা জেতে নেড়ে—কত ভাল হবে? পরে ভাবিলেন যে ফার্সির চলন উঠিয়া যাইতেছে, এখন ইংরেজী পড়ান ভাল। যেমন ক্ষিপ্তের কখন কখন জ্ঞানোদয় হয় তেমনি অবিজ্ঞ লোকেরও কখন কখন বিজ্ঞতা উপস্থিত হয়। বাবুরাম বাবু ঐ বিষয় স্থির করিয়া বিবেচনা করিতে লাগিলেন আমি বারাণসী বাবুর ন্যায় ইংরেজী জানি—‘‘সরকার কম স্পিক নাট’’ আমার নিকটস্থ লোকেরাও তদ্রূপ বিদ্বান্, অতএব একজন বিজ্ঞ ব্যক্তির নিকট পরামর্শ লওয়া কর্তব্য। আপন কুটুম্ব ও আত্মীয়দিগের নাম স্মরণ করাতে মনে হইল বালীর বেণীবাবু বড় যোগ্য লোক। বিষয়কর্ম করিলে তৎপরতা জন্মে। এজন্য অবিলম্বে একজন চাকর ও পাইক সঙ্গে লইয়া বৈদ্যবাটীর ঘাটে আসিলেন।

    আষাঢ় শ্রাবণ মাসে মাঝিরা বৈঁতির জাল ফেলিয়া ইলিস মাছ ধরে ও দুই প্রহরে সময় মাল্লারা প্রায় আহার করিতে যায় এজন্য বৈদ্যবাটীর ঘাটে খেয়া কিম্বা চল্‌তি নৌকা ছিল না। বাবুরাম বাবু চৌগোঁপ্পা—নাকে তিলক—কস্তাপেড়ে ধুতি পরা—ফুলপুকুরে জুতা পায়—উদরটি গণেশের মত—কোঁচান চাদরখানি কাঁধে—একগাল পান—ইতস্ততঃ বেড়াইয়া চাকরকে বলছেন—ওরে হরে! শীঘ্র বালী যাইতে হইবে দুই চার পয়সায় একখানা চল্‌তি পান্‌সি ভাড়া কর তো। বড় মানুষের খানসামারা মধ্যে মধ্যে বেআদব হয়, হরি বলিল—মোশায়ের যেমন কাণ্ড! ভাত খেতে বস্তেছিনু—ডাকাডাকিতে ভাত ফেলে রেখে এস্তেচি—ভেটেল পান্‌সি হইলে অল্প ভাড়ায় হইত—এখন জোয়ার—দাঁড় টান্‌তে ও ঝিঁকে মার্‌তে মাঝিদের কাল ঘাম ছুটবে—গহনার নৌকায় গেলে দুই চার পয়সা হতে পারে—চল্‌তি পান্‌সি চার পয়সার ভাড়া করা আমার কর্ম নয়—এ কি থুতকুড়ি দিয়া ছাতু গোলা?

    বাবুরাম বাবু দুটো চক্ষু কট্‌কট্ করিয়া বলিলেন—তোবেটার বড় মুখ বেড়েছে—ফের যদি এমন কথা কবি তো ঠাস্ করে চড় মার্‌বো। বাঙালী ছোট জাতিরা একটু ঠোকর খাইলেই ঠক্ ঠক্ করিয়া কাঁপে, হরি তিরস্কার খাইয়া জড়সড় হইয়া বলিল—এজ্ঞে না, বলি এখন কি নৌকা পাওয়া যায়? এই বল্‌তে বল্‌তে একখানা বোট গুণ টেনে ফিরিয়া যাইতেছিল, মাঝির সহিত অনেক কস্তাকস্তি ধস্তাধস্তি করিয়া ৷৷৹ ভাড়া চুক্তি হইল—বাবুরাম বাবু চাকর ও পাইকের সহিত বোটের উপর উঠিলেন। কিঞ্চিৎদূর আসিয়া দুই দিগ্ দেখিতে দেখিতে বলিতেছেন—ওরে হরে! বোটখানা পাওয়া গিয়াছে ভাল—মাঝি! ও বাড়ীটা কার রে? ওটা কি চিনির কল? অহে চকমকি ঝেড়ে এক ছিলিম তামাক সাজো তো? পরে ভড় ভড় করিয়া হুঁকা টানিতেছেন—শুশুকগুলা এক এক বার ভেসে ভেসে উঠ্‌তেছে—বাবু স্বয়ং উঁচু হইয়া দেখ্‌তেছেন ও গুন গুন করিয়া সখীসম্বাদ গাইতেছেন—‘‘দেখে এলাম শ্যাম তোমার বৃন্দাবন ধাম কেবল আছে নাম।’’ ভাঁটা হাওয়াতে বোট সাঁ সাঁ করিয়া চলিতে লাগিল—মাঝিরাও অবকাশ পাইল—কেহ বা গলুয়ে বসিল, কেহ বা বোকা ছাগলের দাড়ি বাহির করিয়া চারি দিগে দেখিতে লাগিল ও চাটগেঁয়ে সুরে গান আরম্ভ করিল ‘‘খুলে পড়বে কানের সোনা শুনে বাঁশির সুর’’—

    সূর্য অস্ত না হইতে হইতে বোট দেওনাগাজীর ঘাটেতে গিয়া লাগিল। বাবুরামবাবুর শরীরটি কেবল মাংসপিণ্ড—চারি জন মাঝিতে কুঁতিয়া ধরাধরি করিয়া উপরে তুলিয়া দিল। বেণীবাবু কুটুম্বকে দেখিয়া ‘‘আস্‌তে আজ্ঞা হউক, বস্‌তে আজ্ঞা হউক’’ প্রভৃতি নানবিধ শিষ্টালাপ করিলেন। বাবুর বাটীর চাকর রাম তৎক্ষণাৎ তামুক সাজিয়া আনিয়া দিল। বাবুরাম বাবু ঘোর হুঁকারি, দুই এক টান টানিয়া বলিলেন—ওহে হুঁকাটা পীসে পীসে বল্‌ছে, খুড়া খুড়া বল্‌ছে না কেন? বুদ্ধিমান লোকের নিকট চাকর থাকিলে সেও বুদ্ধিমান্ হয়। রাম অমনি হুঁকায় ছিঁচ্‌কা দিয়া—জল ফিরাইয়া—মিঠেকড়া তামাক সেজে—বড় দেকে নল করে হুঁকা আনিয়া দিল। বাবুরাম বাবু হুঁকা সম্মুখে পাইয়া একবারে যেন ইজারা করিয়া লইলেন—ভড়র ভড়র টানছেন— ধুঁয়া সৃষ্টি করছেন—ও বিজর বিজর বক্‌ছেন।

    বেণীবাবু। মহাশয় একবার উঠে একটা পান খেলে ভাল হয় না?

    বাবুরাম বাবু। সন্ধ্যা হল—আর জল খাওয়া থাকুক্—এ আমার ঘর—আমাকে বল্‌তে হবে কেন?

    দেখ মতিলালের বুদ্ধিশুদ্ধি ভাল হইয়াছে—ছেলেটিকে দেখে চক্ষু জুড়ায়, সম্প্রতি ইংরেজী পড়াইতে বাঞ্ছা করি—স্বল্প অল্প মাহিনাতে একজন মাস্টার দিতে পার?

    বেণীবাবু। মাস্টার অনেক আছে, কিন্তু ২০/২৫ টাকা মাসে দিলে একজন মাঝারি গোছের লোক পাওয়া যায়।

    বাবুরাম বাবু। কতো— ২৫ টাকা!!! অহে ভাই, বাটীতে নিত্য নৈমিত্তিক ক্রিয়াকলাপ—প্রতিদিন একশত পাত পড়ে—আবার কিছুকাল পরেই ছেলেটির বিবাহ দিতে হইবে। যদি এত টাকা দিব তবে তোমার নিকট নৌকা ভাড়া করিয়া কেন এলাম?

    এই বলিয়া—বেণীবাবুর গায়ে হাত দিয়া হা হা করিয়া হাসিতে লাগিলেন।

    বেণীবাবু। তবে কলিকাতার কোনো স্কুলে ভর্তি করিয়া দিউন। একজন আত্মীয় কুটুম্বের বাটীতে ছেলেটি থাকিবে, মাসে ৩/৪ টাকার মধ্যে পড়াশুনা হইতে পারিবে।

    বাবুরাম বাবু। এত? তুমি বলে কয়ে কমজম করিয়া দিতে পারো না? স্কুলে পড়া কি ঘরে পড়ার চেয়ে ভাল?

    বেণীবাবু। যদ্যপি ঘরে একজন বিচক্ষণ শিক্ষক রাখিয়া ছেলেকে পড়ানো যায় তবে বড় ভাল হয়, কিন্তু তেমন শিক্ষক অল্প টাকায় পাওয়া যায় না, স্কুলে পড়ার গুণও আছে—দোষও আছে। ছেলেদিগের সঙ্গে একত্র পড়াশুনা করিলে পরস্পরের উৎসাহ জন্মে কিন্তু সঙ্গদোষ হইলে কোন কোন ছেলে বিগড়িয়া যাইতে পারে, আর ২৫/৩০ জন বালক এক শ্রেণীতে পড়িলে হট্টগোল হয়, প্রতিদিন সকলের প্রতি সমান তদারকও হয় না, সুতরাং সকলের সমানরূপ শিক্ষাও হয় না।

    বাবুরাম বাবু। তা যাহা হউক—মতিকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দিব, দেখেশুনে যাহাতে সুলভ হয় তাহাই করিয়া দিও। যে সকল সাহেবের কর্মকাজ করিয়াছিলাম এক্ষণে তাহাদের কেহ নাই—থাকিলে ধরে পড়ে অমনি ভর্তি করিতে পারিতাম। আর আমার ছেলে মোটামুটি শিখিলেই বস্ আছে, বড় পড়াশুনা করিলে স্বধর্মে থাকিবে না। ছেলেটি যাহাতে মানুষ হয় তাহাই করিয়া দিও—ভাই সকল ভার তোমার উপর।

    বেণীবাবু। ছেলেকে মানুষ করিতে গেলে ঘরে বাইরে তদারক চাই। বাপকে স্বচক্ষে সব দেখ্‌তে হয়—ছেলের সঙ্গে ছেলে হইয়া খাট্‌তে হয়। অনেক কর্ম বরাতে চলে বটে কিন্তু এ কর্মে পরের মুখেঝাল খাওয়া হয় না।

    বাবুরাম বাবু। সে সব বটে—মতি কি তোমার ছেলে নয়? আমি এক্ষণে গঙ্গাস্নান করিব—পুরাণ শুনিব—বিষয় আশয় দেখিব—আমার অবকাশ কই ভাই? আর আমার ইংরেজী শেখা সেকেলে রকম। মতি তোমার—তোমার—তোমার!!! আমি তাকে তোমার কাছে পাঠাইয়া দিয়া নিশ্চন্ত হইব, তুমি যা জান তাই করিবে কিন্তু ভাই! দেখো যেন বড় ব্যয় হয় না—আমি কাচ্ছাবাচ্ছাওয়ালা মানুষ—তুমি সকল তো বুঝতে পার?

    অনন্তর অনেক শিষ্টালাপের পর বাবুরামবাবু বৈদ্যবাটীতে প্রত্যাগমন করিলেন।


    আলালের ঘরের দুলাল

    ৩. মতিলালের বালীতে আগমন ও তথায় লীলাখেলা পরে ইংরাজী শিক্ষার্থে বহুবাজারে অবস্থিতি

    রবিবারে কুঠীওয়ালারা বড় ঢিলে দেন—হচ্ছে হবে—খাচ্ছি খাব—বলিয়া অনেক বেলায় স্নান আহার করেন—তাহার পরে কেহ বা বড়ে টেপেন—কেহ বা তাস পেটেন—কেহ বা মাছ ধরেন—কেহ বা তবলায় চাঁটি দেন— কেহ বা সেতার লইয়া পিড়িং পিড়িং করেন—কেহ বা শয়নে পদ্মনাভ ভাল বুঝেন—কেহ বা বেড়াতে যান—কেহ বা বহি পড়েন। কিন্তু পড়াশুনা অথবা সৎ কথার আলোচনা অতি অল্প হইয়া থাকে। হয় তো মিথ্যা গালগল্প কিংবা দলাদলির মোট, কি শম্ভু তিনটা কাঁঠাল খাইয়াছে এই প্রকার কথাতেই কাল ক্ষেপণ হয়। বালীর বেণীবাবুর অন্য প্রকার বিবেচনা ছিল। এদেশের লোকদিগের সংস্কার এই যে স্কুলে পড়া শেষ হইলে লেখাপড়ার শেষ হইল। কিন্তু এ বড় ভ্রম, আজন্ম মরণ পর্যন্ত সাধনা করিলেও বিদ্যার কুল পাওয়া যায় না, বিদ্যার চর্চা যত হয় ততই জ্ঞান বৃদ্ধি হইতে পারে। বেণীবাবু এ বিষয় ভাল বুঝিতেন এবং তদনুসারে চলিতেন। তিনি প্রাতঃকালে উঠিয়া আপনার গৃহকর্ম সকল দেখিয়া পুস্তক লইয়া বিদ্যানুশীলন করিতেছিলেন। ইতিমধ্যে চৌদ্দ বৎসরের একটি বালক—গলায় মাদুলি—কানে মাকড়ি, হাতে বালা ও বাজু, সম্মুখে আসিয়া টিপ করিয়া একটি গড় করিল। বেণীবাবু এক মনে পুস্তক দেখিতেছিলেন বালকের জুতার শব্দে চম্‌কিয়া উঠিয়া দেখিয়া বলিলেন, “এসো বাবা মতিলাল এসো—বাটীর সব ভাল তো?” মতিলাল বসিয়া সকল কুশল সমাচার করিল। বেণীবাবু কহিলেন—অদ্য রাত্রে এখানে থাক কল্য প্রাতে তোমাকে কলিকাতায় লইয়া স্কুলে ভর্তি করিয়া দিব। ক্ষণেক কাল পরে মতিলাল জলযোগ করিয়া দেখিল অনেক বেলা আছে। চঞ্চল স্বভাব—এক স্থানে কিছু কাল বসিতে দারুণ ক্লেশ বোধ হয়—এজন্য আস্তে আস্তে উঠিয়া বাটীর চতুর্দিকে দাঁদুড়ে বেড়াইতে লাগিল— কখন ঢেঁস্কেলের ঢেঁকিতে পা দিতেছে—কখন বা ছাতের উপর গিয়া দুপদুপ করিতেছে—কখন বা পথিকদিগকে ইট পাটকেল মারিয়া পিট্টান দিতেছে; এইরূপে দুপদাপ করিয়া বালী প্রদক্ষিণ করিতে লাগিল—কাহারো বাগানে ফুল ছেঁড়ে—কাহারো গাছের ফল পাড়ে—কাহারো মট্‌কার উপর উঠিয়া লাফায়—কাহারো জলের কলসী ভাঙিয়া দেয়।

    বালীর সকল লোকেই ত্যক্ত হইয়া বলাবলি করিতে লাগিল—এ ছোঁড়া কে রে? যেমন ঘরপোড়া দ্বারা লস্কা ছারখার হইয়াছিল আমাদিগের গ্রামটা সেইরূপ তচ্‌নচ্‌ হবে নাকি? কেহ কেহ ঐ বালকের পিতার নাম শুনিয়া বলিল—আহা বাবুরাম বাবুর এ পুত্র—না হবে কেন? “পুত্রে যশসি তোয়েচ নরাণাং পুণ্যক্ষণম্‌।”

    সন্ধ্যা হইল—শৃগালদিগের হোয়া হোয়া ও ঝিঁ ঝিঁ পোকার ঝিঁ ঝিঁ শব্দে গ্রাম শব্দায়মান হইতে লাগিল। বালীতে অনেক ভদ্রলোকের বসতি—প্রায় অনেকের বাটীতে শালগ্রাম আছেন এজন্য শঙ্খ-ঘণ্টা ধ্বনির ন্যূনতা ছিল না। বেণীবাবু অধ্যয়নানন্তর গামোড়া দিয়া তামাক খাইতেছেন— ইত্যবসরে একটা গোল উপস্থিত হইল। পাঁচ সাত জন লোক নিকটে আসিয়া বলিল—মশাই গো! বৈদ্যবাটীর জমিদারের ছেলে আমাদের উপর ইট মারিয়াছে—কেহ বলিল—আমার ঝাঁকা ফেলিয়া দিয়াছে—কেহ বলিল আমাকে ঠেলে ফেলে দিয়াছে—কেহ বলিল আমার মুখে থুতু দিয়াছে—কেহ বলিল আমার ঘিয়ের হাঁড়ি ভাঙিয়াছে। বেণীবাবু পরদুঃখে কাতর—সকলকে তুষেতেষে ও কিছু কিছু দিয়া বিদায় করিয়া দিলেন, পরে ভাবিলেন এ ছেলের তো বিদ্যা নগদ হইবে—এক বেলাতেই গ্রাম কাঁপিয়া দিয়াছে—এক্ষণে এখান হইতে প্রস্থান করিলে আমার হাড় জুড়ায়।

    গ্রামের প্রাণকৃঞ্চ খুড়ে, ভগবতী ঠাকুরদাদা ও ফচ্‌কে রাজকৃষ্ণ আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—বেণীবাবু এ ছেলেটি কে? —আমরা আহার করিয়া নিদ্রা যাইতেছিলাম—গোলের দাপটে উঠে পড়েছিলাম—কাঁচা ঘুম ভাঙাতে শরীরটা মাটি মাটি করিতেছে। বেণীবাবু কহিলেন—আর ও কথা কেনে বল? একটা ভারি কর্মভোগে পড়িয়াছি—আমার একটি জমিদার ষণ্ডা কুটুম্ব আছে—তাহার হ্রস্ব দীর্ঘ কিছুই জ্ঞান নাই—কেবল কতকগুলো টাকা আছে। ছেলেটিকে স্কুলে ভর্তি করাইবার জন্য আমার নিকট পাঠাইয়াছে—কিন্তু এর মধ্যেই হাড় কালি হইল—এমন ছেলেকে তিনদিন রাখিলেই বাটীতে ঘুঘু চরিবে। এইরূপ কথোপকথন হইতেছে—জন কয়েক চেংড়া পশ্চাতে মতিলাল— “ভজ নর শম্ভুসুতেরে” বলিয়া চিৎকার করিতে করিতে আসিল। বেণীবাবু বলিলেন—ঐ আসছে রে বাবু—চুপ কর—আবার দুই-এক ঘা বসিয়ে দেবে না-কি? পাপকে বিদায় করিতে পারিলে বাঁচি। মতিলাল বেণীবাবুকে দেখিয়া দাঁত বাহির করিয়া ঈষদ্ধাস্য করত কিঞ্চিৎ সঙ্কুচিত হইল। বেণীবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন—বাবু কোথায় গিয়েছিলে? মতিলাল বলিল—মহাশয়দের গ্রামটা কত বড় তাই দেখে এলেম।

    পরে বাটীর ভিতর যাইয়া মতিলাল রাম চাকরকে তামাক আনিতে বলিল। অম্বুরি অথবা ভেলসায় সানে না—কড়া তামাকের উপর কড়া তামাক খাইতে লাগিল। রাম তামাক যোগাইয়া উঠিতে পারে না—এই আনে—এই নাই। এইরূপ মুহুর্মুহু তামাক দেওয়াতে রাম অন্য কোন কর্ম করিতে পারিল না। বেণীবাবু রোয়াকে বসিয়া স্তব্ধ হইয়া রহিলেন ও এক-এক বার পিছন ফিরিয়া মিট মিট করিয়া উঁকি মারিয়া দেখিতে লাগিলেন।

    আহারের সময় উপস্থিত হইল। বেণীবাবু অন্তঃপুরে মতিলালকে লইয়া উত্তম অন্ন-ব্যঞ্জন ও নানা প্রকার চর্চ্য চোষ্য লেহ্য পেয় দ্বারা পরিতোষ করাইয়া তাম্বুলগ্রহণান্তর আপনি শয়ন করিতে গেলেন। মতিলাল শয়নগারে গিয়া পান তামাক খাইয়া বিছেনার ভিতর ঢুকিল। কিছু কাল এপাশ ওপাশ করিয়া ধড়মড়িয়া উঠিয়া এক-এক বার পায়চারি করিতে লাগিল ও এক-এক বার নীলু ঠাকুরের সখীসংবাদ অথবা রাম বসুর বিরহ গাইতে লাগিল। গানের চোটে বাটীর সকলের নিদ্রা ছুটে পালাইল।

    চণ্ডীমণ্ডপে রাম ও কাশীজোড়া নিবাসী পেলারাম মালী শয়ন করিয়াছিল। দিবসে পরিশ্রম করিলে নিদ্রাটি বড় আরামে হয়, কিন্তু ব্যঘাত হইলে অত্যন্ত বিরক্তি জন্মে। গানের চিৎকারে চাকরের ও মালীর নিদ্রা ভাঙিয়া গেল।

    পেলারাম। অহে বাপা রাম! এ সড়ার চিড়কারে মোর লিদ্রা হতেছে না—উঠে বাগানে বীজ গুঁড়া কি পেড়াইব?

    রাম। (গা মোড় দিয়া) আরে রাত ঝাঁ ঝাঁ কচ্চে—এখন কেন উঠ্‌বি? বাবু ভাল নালা কেটে জল এনেছে—এ ছোঁড়া কান ঝালা-পালা কল্লে—গেলে বাঁচি।

    পরদিন প্রভাতে বেণীবাবু মতিলালকে লইয়া বৌবাজারের বেচারাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাটীতে উপস্থিত হইলেন। বেচারাম বাবু কেনারামবাবুর পুত্র—বুনিয়াদী বড় মানুষ—সন্তানাদি কিছুই নাই—সাদাসিধে লোক কিন্তু জন্মাবধি গঁর্ণখাঁদা—অল্প অল্প পিট্‌পিটে ও চিড়চিড়ে। বেণীবাবুকে দেখিয়া স্বাভাবিক নাকিস্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন “আরে কও কি মনে করে?”

    বেণীবাবু। মতিলাল মহাশয়ের বাটীতে থাকিয়া স্কুলে পড়িবে—শনিবার শনিবার ছুটি পাইলে বৈদ্যবাটী যাইবে। বাবুরামবাবুর কলিকাতায় আপনার মত আত্মীয় আর নাই এজন্য এই অনুরোধ করিতে আসিয়াছি।

    বেচারাম। তার আটক কি—এও ঘর সেও ঘর। আমার ছেলেপুলে নাই—কেবল দুই ভাগিনেয় আছে—মতিলাল স্বচ্ছন্দে থাকুক।

    বেচারাম বাবুর নাকিস্বরের কথা শুনিয়া মতিলাল খিল খিল করিয়া হাসিতে লাগিল। অমনি বেণীবাবু উহুঁ উহুঁ করত চোখ টিপ্‌তে লাগিলেন ও মনে করিলেন এমন ছেলে সঙ্গে থাকিলে কোথাও সুখ নাই। বেচারাম বাবু মতিলালের হাসি শুনিয়া বলিলেন—বেণী ভায়া! ছেলেটা কিছু বেদ্‌ড়া দেখতে পাই যে? বোধ হয় বালককালাবধি বিশেষ নাই পাইয়া থাকিবে। বেণীবাবু অতি অনুসন্ধনী—পূর্বকথা সকলি জানেন, আপনিও ভুগেছেন—কিন্তু নিজ গুণে সকল ঢেকে ঢুকে লইলেন—গুপ্ত কথা ব্যক্ত করিলে মতিলাল মারা যায়—তাহার কলিকাতায় থাকাও হয় না ও স্কুলে পড়াও হয় না। বেণীবাবু নিতান্ত বাসনা সে কিছু লেখাপড়া শিখিয়া কোন প্রকার মানুষ হয়।

    অনন্তর অন্যান্য প্রকার অনেক আলাপ করিয়া বেচারাম বাবুর নিকট হইতে বিদায় হইয়া বেণীবাবু মতিলালকে সঙ্গে করিয়া শরবোরণ সাহেবের স্কুলে আসিলেন। হিন্দু কলেজ হওয়াতে শরবোরণ সাহেবের স্কুল কিঞ্চিৎ মেড়ে পড়িয়াছিল এজন্য সাহেব দিন রাত্রি উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছিলেন—তাঁহার শরীর মোটা—ভুরুতে রোঁ ভরা—গালে সর্বদা পান—বেত হাতে—এক একবার ক্লাসে ক্লাসে বেড়াইতেন ও এক একবার চৌকিতে বসিয়া গুড়গুড়ি টানিতেন। বেণীবাবু তাঁহার স্কুলে মতিলালকে ভর্তি করিয়া দিয়া বালীতে প্রত্যাগমন করিলেন।


    আলালের ঘরের দুলাল

    ৪. কলিকাতায় ইংরাজী শিক্ষার বিবরণ, শিশুশিক্ষার প্রকরণ, মতিলালের কুসঙ্গ ও ধৃত হইয়া পুলিশে আনয়ন।

    প্রথম যখন ইংরাজেরা কলিকাতায় বাণিজ্য করিতে আইসেন, সে সময়ে সেট বসাখ বাবুরা সওদাগরী করিতেন, কিন্তু কলিকাতার একজনও ইংরাজী ভাষা জানিত না। ইংরাজদিগের সহিত কারবারের কথাবর্তা ইশারা দ্বারা হইত। মানব স্বভাব এই যে, চাড় পড়িলেই ফিকির বেরোয়, ইশারা দ্বারাই ক্রমে ক্রমে কিছু কিছু ইংরাজী কথা শিক্ষা হইতে আরম্ভ হইল। পরে সুপ্‌রিম্ কোর্ট্ স্থাপিত হইলে, আইন-আদালতের ধাব্‌কায় ইংরাজী চর্চা বাড়িয়া উঠিল। ঐ সময় রামরাম মিশ্রী ও আনন্দিরাম দাস অনেক ইংরাজী কথা শিখিয়াছিলেন। রামরাম মিশ্রীর শিষ্য রামনারায়ণ মিশ্রী উকিলের কেরানিগিরি করিতেন ও অনেক লোকের দরখাস্ত লিখিয়া দিতেন, তাঁহার একটি স্কুল ছিল তথায় ছাত্রদিগকে ১৪/১৬ টাকা করিয়া মাসে মাহিনা দিতে হইত। পরে রামলোচন নাপিত, কৃষ্ণমোহন বসু প্রভৃতি অনেকেই স্কুল-মাস্টারগিরি করিয়াছিলেন। ছেলেরা তামস্‌ডিস্‌ পড়িত ও কথার মানে মুখস্থ করিত। বিবাহে অথবা ভোজের সভায়, যে ছেলে জাইন ঝাড়িতে পারিতে, সকলে তাহাকে চেয়ে দেখিতেন ও সাবাস বাওহা দিতেন।

    ফ্রেন্‌কো ও আরাতুন পিট্রস প্রভৃতির দেখাদেখি শরবোরণ সাহেব কিছু কাল পরে স্কুল করিয়াছিলেন। ঐ স্কুলে সম্ভ্রান্ত লোকের ছেলেরা পড়িত।

    যদি ছেলেদিগের আন্তরিক ইচ্ছা থাকে, তবে তাহারা যে স্কুলে পড়ুক আপন আপন পরিশ্রমের জোরে কিছু না কিছু অবশ্যই শিখিতে পারে। সকল স্কুলেরই দোষ গুণ আছে, এবং এমন এমন অনেক ছেলেও আছে যে এ স্কুল ভাল নয়, ও স্কুল ভাল নয় বলিয়া, আজি এখানে কালি ওখানে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়—মনে করে, গোলমালে কাল কাটাইয়া দিতে পারিলেই বাপ-মাকে ফাঁকি দিলাম। মতিলাল শরবোরণ সাহেবের স্কুলে দুই-একদিন পড়িয়া, কালুস সাহেবের স্কুলে ভর্তি হইল।

    লেখাপড়া শিখিবার তৎপর্য এই যে, সৎ স্বভাব ও সৎ চরিত্র হইবে—সুবিবেচনা জন্মিবে ও যে যে বিষয় কর্মে লাগিতে পারে, তাহা ভাল করিয়া শেখা হইবে। এই অভিপ্রায় অনুসারে বালকদিগের শিক্ষা হইলে তাহারা সর্বপ্রকারে ভদ্র হয় ও ঘরে বাহিরে সকল কর্ম ভালরূপ বুঝিতেও পরে—করিতেও পারে। কিন্তু এমত শিক্ষা দিতে হইলে, বাপ-মারও যত্ন চাই—শিক্ষকেরও যত্ন চাই। বাপ যে পথে যাবেন, ছেলেও সেই পথে যাবে। ছেলেকে সৎ করিতে হইলে, আগে বাপের সৎ হওয়া উচিত। বাপ মদে ডুবে থাকিয়া ছেলেকে মদ খেতে মানা করিলে, সে তাহা শুন্‌বে কেন? বাপ অসৎ কর্মে রত হইয়া নীতি উপদেশ দিলে, ছেলে তাকে বিড়াল তপস্বী জ্ঞান করিয়া উপহাস করিবে। যাহার বাপ ধর্মপথে চলে তাহার পুত্রের উপদেশ বড় আবশ্যক করে না—বাপের দেখাদেখি পুত্রের সৎ স্বভাব আপনা আপনি জন্মে ও মাতারও আপন শিশুর প্রতি সর্বদা দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। জননীর মিষ্টি বাক্যে, স্নেহে এবং মুখচুম্বনে শিশুর মন যেমন নরম হয়, এমন কিছুতেই হয় না। শিশু যদি নিশ্চয়রূপে জানে যে এমন এমন কর্ম করিলে আমাকে মা কোলে লইয়া আদর করিবে না, তাহা হইলেই তাহার সৎ সংস্কার বদ্ধমূল হয়। শিক্ষকের কর্তব্য যে শিষ্যকে কতকগুলা বহি পড়াইয়া কেবল তোতা পাখী না করেন। যাহা পড়িবে তাহা মুখস্থ করিলে স্মরণশক্তির বৃদ্ধি হয় বটে, কিন্তু তাহাতে যদ্যপি বুদ্ধির জোর ও কাজের বিদ্যা না হইল, তবে সে লেখাপড়া শেখা কেবল লোক দেখাবার জন্য। শিষ্য বড় হউক বা ছোট হউক, তাহাকে এমন করিয়া বুঝাইয়া দিতে হইবেক যে, পড়াশুনাতে তাহার মন লাগে—সেরূপ বুঝান শিক্ষার সুধারা ও কৌশলের দ্বারা হইতে পারে—কেবল তাঁইস করিলে হয় না।

    বৈদ্যবাটীর বাটীতে থাকিয়া মতিলাল কিছুমাত্র সুনীতি শেখে নাই। এক্ষণে বহুবাজারে থাকিতে হিতে বিপরীত হইল। বেচারাম বাবুর দুই জন ভাগিনেয় ছিল, তাহাদের নাম হলধর ও গদাধর, তাহারা জন্মাবধি পিতা কেমন দেখে নাই। মাতার ও মাতুলের ভয়ে এক একবার পাঠশালায় গিয়া বসিত, কিন্তু সে নামমাত্র, কেবল পথে ঘাটে—ছাতে মাঠে—ছুটাছুটি হুটোহুটি করিয়া বেড়াইত। কেহ দমন করিলে দমন শুনিত না—মাকে বলিত, তুমি এমন করো তো আমরা বেরিয়ে যাব। একে চায় আরে পায়—তাহারা দেখিল মতিলালও তাহাদেরই একজন। দুই-এক দিনের মধ্যেই হলাহলি গলাগলি ভাব হইল। এক জায়গায় বসে—এক জায়গায় খায়—এক জায়গায় শোয়। পরস্পর এ ওর কাঁধে হাত দেয় ও ঘরে-দ্বারে বাহিরে-ভিতরে হাত ধরাধরি ও গলা জড়াজড়ি করিয়া বেড়ায়। বেচারাম বাবুর ব্রাক্ষ্ণণী তাহাদিগকে দেখিয়া এক এবার বলিতেন—আহা এরা যান এক মার পেটের তিনটি ভাই।

    কি শিশু কি যুবা কি বৃদ্ধ ক্রমাগত চুপ করিয়া, অথবা এক প্রকার কর্ম লইয়া থাকিতে পারে না। সমস্ত দিন রাত্রির মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন কর্মে সময় কাটাইবার উপায় চাই। শিশুদিগের প্রতি এমন নিয়ম করিতে হইবেক যে তাহারা খেলাও করিবে—পড়াশুনাও করিবে। ক্রমাগত খেলা করা অথবা ক্রমাগত পড়াশুনা করা ভাল নহে। খেলাধুলা করিবার বিশেষ তাৎর্পয এই যে, শরীর তাজা হইয়া উঠিলে তাহাতে পড়াশুনা করিতে অধিক মন যায়। ক্রমাগত পড়াশুনা করিলে মন দুর্বল হইয়া পড়ে—যাহা শেখা যায় তাহা মনে ভেসে ভেসে থাকে— ভাল করিয়া প্রবেশ করে না। কিন্তু খেলারও হিসাব আছে, যে-যে খেলায় শারীরিক পরিশ্রম হয়, সেই খেলাই উপকারক। তাস পাশা প্রভৃতিতে কিছুমাত্র ফল নাই—তাহাতে কেবল অলস্য স্বভাব বাড়ে—সেই আলস্যেতে নানা উৎপাত ঘটে। যেমন ক্রমাগত পড়াশুনা করিলে পড়াশুনা ভাল হয় না, তেমন ক্রমাগত খেলাতেও বুদ্ধি হোঁতকা হয়। কেননা খেলায় কেবল শরীর সবল হইতে থাকে—মনের কিছুমাত্র শাসন হ্য় না, কিন্তু মন একটা না একটা বিষয় লইয়া অবশ্যই নিযুক্ত থকিবে, এমন অবস্থায় তাহা কি কুপথে বই সুপথে যাইতে পারে? অনেক বালক এইরূপেই অধঃপাতে গিয়া থাকে।

    হলধর, গদাধর ও মতিলাল গোকুলের ষাঁড়ের ন্যায় বেড়ায়— যাহা মনে যায় তাই করে— কাহারো কথা শুনে না— কাহাকেও মানে না। হয় তাস—নয় পাশা— নয় ঘুড়ি—পায়রা—নয় বুলবুল, একটা না একটা লইয়া সর্বদা আমোদেই আছে।

    খাবার অবকাশ নাই—শোবার অবকাশ নাই—বাটীর ভিতর যাইবার জন্য চাকর ডাকিতে আসিলে, অমনি বলে—যা বেটা যা, আমরা যাব না। দাসী আসিয়া বলে অগো মা-ঠাকুরানী যে শুতে পান না। তাহাকেও বলে—দূর হ হারামজাদী! দাসী মধ্যে মধ্যে বলে, আ মরি, কী মিষ্ট কথাই শিখেছ! ক্রমে ক্রমে পাড়ার যত হতভাগা লক্ষ্ণীছাড়া—উনপাজুরে—বরাখুরে ছোঁড়ারা জুটিতে আরম্ভ হইল। দিবারাত্রি হট্রগোল—বৈঠকখানায় কান পাতা ভার—কেবল হো হো শব্দ— হাসির গর্‌রা ও তামাক-চরস গাঁজার ছররা, ধোঁয়াতে অন্ধকার হইতে লাগিল। কার সাধ্য সে দিক দিয়া যায়— কার বাপের সাধ্য যে মানা করে। বেচারাম বাবু এক একবার গন্ধ পান—নাক টিপে ধরেন আর বলেন— দূঁর দূঁর।

    সঙ্গদোষের ন্যায় আর ভয়ানক নাই। বাপ-মা ও শিক্ষক সর্বদা যত্ন করিলেও সঙ্গদোষে সব যায়, যে স্থলে ঐরূপ যত্ন কিছুমাত্র নাই, সে স্থলে সঙ্গদোষে কত মন্দ হয়, তাহা বলা যায় না।

    মতিলাল যে সকল সঙ্গী পাইল, তাহাতে তাহার সুস্বভাব হওয়া দূরে থাকুক, কুস্বভাব ও কুমতি দিন দিন বাড়িতে লাগিল। সপ্তাহে দুই-এক দিন স্কুলে যায় ও অতিকষ্টে সাক্ষিগোপালের ন্যায় বসিয়া থাকে। হয় তো ছেলেদের সঙ্গে ফট্‌কি নাট্‌কি করে— নয় তো সিলেট লইয়া ছবি আঁকে— পড়াশুনায় পাঁচ মিনিটও মন দেয় না। সর্বদা মন উড়ু উড়ু, কতক্ষণে সমবয়সীদের সঙ্গে ধুমধাম ও আহলাদ আমোদ করিব! এমন এমন শিক্ষকও আছেন যে, মতিলালের মতো ছেলের মন কৌশলের দ্বারা পড়াশুনায় ভেজাইতে পারেন। তাঁহারা শিক্ষা করাইবার নানা প্রকার ধারা জানেন—যাহার প্রতি যে ধারা খাটে, সেই ধারা অনুসারে শিখা দেন। এক্ষণে সরকারী স্কুলে যেরূপ ভড়ুঙ্গে রকম শিক্ষা হইয়া থাকে, কালুস সাহেবের স্কুলেও সেইরূ্প শিক্ষা হইত। প্রত্যেক ক্লাসের প্রত্যেক বালকের প্রতি সমান তদারক হইত না—ভারি ভারি বহি পড়িবার অগ্রে সহজ সহজ বহি ভালরূপে বুঝিতে পারে কি-না, তাহার অনুসন্ধান হইত না—অধিক বহি ও অনেক করিয়া পড়া দিলেই স্কুলের গৌরব হইবে এই দৃঢ় সংস্কার ছিল— ছেলেরা মুখস্ত বলে গেলেই হইল, —বুঝুক না বুঝুক জানা অবশ্যক বোধ হইত না এবং কি কি শিক্ষা করাইলে উত্তরকালে কর্মে লাগিতে পারিবে তাহারও বিবেচনা হইত না। এমতো স্কুলে যে ছেলে পড়ে তাহার বিদ্যা শিক্ষা কপালের বড় জোর না হইলে হয় না।

    মতিলাল যেমন বাপের বেটা—যেমন সহবাস পাইয়াছিল—যেমন স্থানে বাস করিত—যেমন স্কুলে পড়িতে লাগিল তেমনি তাহার বিদ্যাও ভারি হইল। এক প্রকার শিক্ষক প্রায় কোনো স্কুলে থাকে না, কেহ-বা প্রাণান্তিক পরিশ্রম করিয়া মরে—কেহ বা গোঁপে তা দিয়া উপর চাল চলিয়া বেড়ায়। বটতলার বক্রেশ্বরবাবু কালুস সাহেবের সোনার কাটি রুপার কাটি ছিলেন। তিনি যাবতীয় বড় মানুষের বাটীতে যাইতেন ও সকলেকেই বলিতেন—আপনার ছেলের আমি সর্বদা তদারক করিয়া থাকি—মহাশয়ের ছেলে না হবে কেন! সে তো ছেলে নয় পরশ পাথর! স্কুলের উপর উপর ক্লাসের ছেলেদিগকে পড়াইবার ভার ছিল, কিন্তু যাহা পড়াইতেন, তাহা নিজে বুঝিতে পারিতেন কি-না সন্দেহ। এ কথা প্রকাশ হইল ঘোর অপমান হইবে, এজন্য চেপে চুপে রাখিতেন। বালকদিগকে কেবল মথন পড়ায়তেন—মানে জিজ্ঞাসা করিলে বলিতেন, ডিক্সনেরী দেখ। ছেলেরা যাহা তরজমা করিত, তাহার কিছু না কিছু কাটাকুটি করিতে হয়, সব বজায় রাখিলে মাস্টারগিরি চলে না, কার্য শদ্ব কাটিয়া কর্ম লিখিতেন, অথবা কর্ম শব্দ কাটিয়া কার্য লিখিতেন—ছেলেরা জিজ্ঞাসা করিলে বলিতেন, তোমরা বড় বে-আদব, আমি যাহা বলিব তাহার উপর আবার কথা কও? মধ্যে মধ্যে বড়মানুষের ছেলেদের লইয়া বড় আদর করিতেন ও জিজ্ঞাসা করিতেন—তোমাদের অমুক জায়গার ভাড়া কত—অমুক তালুকের মুনাফা কত? মতিলাল অল্প দিনের মধ্যে বক্রেশ্বরবাবুর অতি প্রিয়পাত্র হইল। আজ ফুলটি, কাল ফলটি, আজ বইখানি, কাল হাত-রুমালখানি আনিত, বক্রেশ্বরবাবু মনে করিতেন মতিলালের মত ছেলেদিগকে হাতছাড়া করা ভাল নয়—ইহারা বড় হইয়া উঠিলে আমার বেগুন ক্ষেত হইবে! স্কুলের তদারকের কথা লইয়া খুঁটিনাটি করিলে আমার কি পরকালে সাক্ষী দিবে?

    শারদীয় পূজার সময় উপস্থিত—বাজারে ও স্থানে স্থানে অতিশয় গোল—ঐ গোলে মতিলালের গোলে হরিবোল বাড়িতে লাগিল। স্কুলে থাকিতে গেলে ছটফটানি ধরে—একবার এদিগে দেখে—এবার ওদিগে দেখে—একবার বসে—একবার ডেক্স বাজায়,—এক লহমাও স্থির থাকে না। শনিবারে স্কুলে আসিয়া বক্রেশ্বরবাবুকে বলিয়া কহিয়া হাপ স্কুল করিয়া বাটী যায়। পথে পানের খিলি খরিদ করিয়া, দুই পাশে পায়রাওয়ালা ও ঘুড়িওয়ালা দোকান দেখিয়া যাইতেছে—অম্লান মুখ, কাহারও প্রতি দৃক্‌পাত নাই, ইতিমধ্যে পুলিশের একজন সারজন ও কয়েকজন পেয়াদা দৌড়িয়া আসিয়া তাহার হাত ধরিল। সারজন কহিল—তোমারা নাম পর পুলিশমে গেরেফ্‌তারি হুয়া—তোমকো জরির জানে হোগা। মতিলাল হাত বাগড়া বাগড়ি করিতে আরম্ভ করিল। সারজন বলবান—জোরে হিড় হিড় করিয়া টানায়া লইয়া যাইতে লাগিল। মতিলাল ভূমিতে পড়িয়া গেল—সমস্ত শরীরে ছড়াই গিয়া ধুলায় পরিপূর্ণ হইল, তবুও একবার ছিনিয়া পলাইতে চেষ্টা করিতে লাগিল, সারজনও মধ্যে মধ্যে দুই এক কিল ও ঘুষা মারিতে লাগিল। অবশেষে রাস্তায় পড়িয়া বাপকে স্মরণ করিয়া কাঁদিতে লাগিল, এক এক বার তাহার মনে উদয় হইল যে কেন এমন কর্ম করিয়াছিলাম—কুলোকের সঙ্গী হইয়া আমার সর্বনাশ হইল। রাস্তায় অনেক লোক জমিয়া গেল। এ ওকে জিজ্ঞাসা করে—ব্যাপারটা কি? দুই একজন বুড়ী বলাবলি কেইতে লাগিল, আহ, কার বাছাকে এমন করিয়া মারে গা—ছেলেটির মুখ যেন চাঁদের মতো—ওর কথা শুনে আমাদের প্রাণ কেঁদে উঠে।

    সূর্য অস্ত না হইতে হইতে মতিলাল পুলিশে আনীত হইল, তথায় দেখিল যে হলধর, গদাধর ও পড়ার রামগোবিন্দ, দোলগোবিন্দ প্রভৃতিকেও ধরিয়া আনিয়াছে। তাহারা সকলে অধোমুখে একপাশে দাঁড়াইয়া আছে। বেলাকিয়র সাহেব ম্যাজেস্ট্রেট—তাঁহাকে তজ্‌বিজ্‌ করিতে হইবে, কিন্তু তিনি বাটী গিয়াছেন, এজন্য সকল আসামীকে বেনিগারদে থাকিতে হইল।


    আলালের ঘরের দুলাল

    ৫. বাবুরামবাবুকে সংবাদ দেওনার্থে প্রেমনারায়ণকে প্রেরণ, বাবুরামের সভাবর্ণন, ঠকচাচার পরিচয়, বাবুরামের স্ত্রীর সহিত কথোপকথন, কলিকাতায় আগমন, প্রভাতকালীন কলিকাতার বর্ণন, বাবুরামের বাঞ্ছারামের বাটীতে গমন, তথায় আত্নীয়দিগের সহিত সাক্ষাৎ ও মতিলাল সংক্রান্ত কথোপকথন।

    “শ্যামের নাগাল পালাম না গো সই—ওগো মরমেতে মরে রই”—টক্‌—টক্‌—পটাস্‌—পটাস্‌, মিয়াজান গাড়োয়ান এক একবার গান করিতেছে—টিটকারি দিতেছে ও শালার গোরু চলতে পারে না বলে লেজ মুচড়াইয়া সপাৎ সপাৎ মারিতেছে। একটু একটু মেঘ হইয়াছে—একটু একটু বৃষ্টি পড়িতেছে—গোরু দুটা হন্‌ হন্‌ করিয়া চলিয়া একখানা ছকড়া গাড়ীকে পিছে ফেলিয়া গেল। সেই ছকড়ায় প্রেমনারায়ণ মজুমদার যাইতেছিলেন—গাড়ীখানা বাতাসে দোলে—ঘোড়া দুটা বেটো ঘোড়ার বাবা—পক্ষিরাজের বংশ—টংয়স টংয়স ডংয়স ডংয়স করিয়া চলিতেছে—পটাপট্‌ পটাপট্‌ চাবুক পড়িতেছে কিন্তু কোনোক্রমেই চাল বেগড়ায় না। প্রেমনারায়ণ দুইটা ভাত মুখে দিয়া সওয়ার হইয়াছেন—গাড়ীর হোঁকোঁচ হোঁকোঁচে প্রাণ ওষ্ঠগত। গোরুর গাড়ী এগিয়ে গেল তাহাতে আরো বিরক্ত হইলেন। এ বিষয়ে প্রেমনারায়ণের দোষ দেওয়া মিছে—অভিমান ছাড়া লোক পাওয়া ভার। প্রায় সকলেই আপনাকে আপনি বড় জানে। একটুকু মনের ক্রটি হইলেই কেহ কেহ তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে—কেহ কেহ মুখটি গোঁজ করিয়া বসিয়া থাকে। প্রেমনারায়ণ বিরক্ত হইয়া আপন মনের কথা আপনি বলিতে লাগিলেন—চাকরি করা ঝাক্‌মারি—চাকরে কুকুরে সমান—হুকুম করিলে দৌড়িতে হয়। মতে, হলা, গদার জ্বালায় চিরকালটা জ্বলে মরেছি—আমাকে খেতে দেয় নাই—শুতে দেয় নাই—আমার নামে গান বাঁধিত—সর্বদা ক্ষুদে পিঁপড়ার কামড়ের মতো ঠাট্টা করিত—আমাকে ত্যক্ত করিবার জন্য রাস্তার ছোঁড়াদের টুইয়ে দিত ও মধ্যে মধ্যে আপনারাও আমার পেছনে হাততালি দিয়া হো হো করিত। এ সব সহিয়া কোন্‌ ভাল মানুষ টিকিতে পারে? ইহাতে সহজ মানুষ পাগল হয়। আমি যে কলিকাতা ছেড়ে পলাই নাই এই আমার বাহাদুরি—আমার বড় গুরুবল যে অদ্যাপিও সরকারগিরি কর্মটি বজায় আছে। ছোঁড়াদের যেমন কর্ম তেমনি ফল। এখন জেলে পচে মরুক—আর যেন খালাস হয় না—কিন্তু এ কথা কেবল কথার কথা, আমি নিজেই খালাসের তদ্বিরে যাইতেছি। মানিবওয়ারি কর্ম, চারা কি? মানুষকে পেটের জ্বালায় সব করিতে হয়।

    বৈদ্যবাটীর বাবুরামবাবু বাবু হইয়া বলিয়াছেন। হরে পা টিপিতেছেন। এক পাশে দুই—একজন ভট্টাচার্য বসিয়া শাস্ত্রীয় তর্ক করতেছে—আজ লাউ খেতে আছে—কাল বেগুন খেতে নাই—লবণ দিয়ে দুগ্ধ খাইলে সদ্যগোমাংস ভক্ষণ করা হয় ইত্যাদি কথা লইয়া ঢেঁকির কচ্‌কচি করিতেছেন। এক পাশে কয়েকজন শতরঞ্চ খেলিতেছে। তাহার মধ্যে একজন খেলোয়াড় মাথায় হাত দিয়া ভাবিতেছে—তাহার সর্বনাশ উপস্থিত উঠসার কিস্তিতেই মাত। এক পাশে দুই-একজন গায়ক যন্ত্র মিলাইতেছে—তানপুরা মেঁও মেঁও করিয়া ডাকিতেছে। এক পাশে মুহুরীরা বসিয়া খাতা লিখিতেছে —সম্মুখে কর্জদার প্রজা ও মহাজন সকলে দাঁড়াইয়া আছে—অনেকের দেনা-পাওনা ডিক্রি ডিস্‌মিস হইতেছে—বৈঠকখানা লোকে থই থই করিতেছে। মহাজনেরা কেহ কেহ বলিতেছে—মহাশয় কাহারো তিন বৎসর—কাহারো চার বৎসর হইল আমরা জিনিস সরবরাহ করিয়াছি, কিন্তু টাকা না পাওয়াতে বড় ক্লেশ হইতেছে—আমরা অনেক হাঁটহাঁটি করিলাম—আমাদের কাজকর্ম সব গেল। খুচরা খুচরা মহাজনেরা যথা—তেলওয়ালা, কাঠওয়ালা, সন্দেশওয়ালা তাহারাও কেঁদে ককিয়ে কহিতেছে—মহাশয় আমরা মারা গেলাম—আমাদের পুঁটিমাছের প্রাণ—এমন করিলে আমরা—কেমন করে বাঁচিতে পারি? টাকার তাগাদা করিতে করিতে আমাদের পায়ের বাঁধন ছিড়িয়া গেল, —আমাদের দোকান-পাট সব বন্ধ হইল, মাগ ছেলেও শুকিয়ে মরিল। দেওয়ানজী এক একবার উত্তর করিতেছে—তোরা আজ যা, টাকা পাবি বই কি—এত বকিস্ কেন? তাহার উপর যে চোড়ে কথা কহিতেছে অমনি বাবুরামবাবু চোখ-মুখ ঘুরাইয়া তাহাকে গালিগালাজ দিয়া বাহির করিয়া দিতেছেন। বাঙালী বড়মানুষ বাবুরা দেশসুদ্ধ লোকের জিনিস ধারে লন—টাকা দিতে হইলে গায়ে জ্বর অইসে —বাক্সের ভিতর টাকা থাকে কিন্তু টাল-মাটাল না করিলে বৈঠকখানা লোকে সরগরম ও জমজমা হয় না। গরীব-দুঃখী মহাজন বাঁচিল কি মরিল তাহাতে কিছু এসে যায় না, কিন্তু এরূপ বড়মানুষি করিলে বাপ পিতামহের নাম বজায় থাকে। অন্য কতকগুলা ফতো বড়মানুষ আছে—তাহাদের উপরে চাকন চিকণ, ভিতরে খ্যাঁড়। বাহিরে কোঁচার পত্তন ঘরে ছুঁচার কীর্তন, আয় দেখে ব্যয় করিতে হইলেই যমে ধরে—তাহাতে বাগানও হয় না—বাবুগিরিও চলে না। কেবল চটক দেখাইয়া মহাজনের চক্ষে ধূলা দেয় —ধারে টাকা কি জিনিস পাইলে দুআওরি লয়— বড় পেড়াপীড়ি হইলে এর নিয়ে ওকে দেয় অবশেষে সমন-ওয়ারিন বাহির হইলে বিষয়-আশয় বেনামী করিয়া গা ঢাকা হয়।

    বাবুরামবাবুর টাকাতে অতিশয় মায়া—বড় হাত ভারি—বাক্স থেকে টাকা বাহির করিতে হইলে বিষম দায় হয়। মহাজনদিগের সহিত কচ্‌কচি ঝক্‌ঝকি করিতেছেন, ইতিমধ্যে প্রেমনারায়ণ মজুমদার আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং কলিকাতার সকল সমাচার কানে কানে বলিলেন। বাবুরামবাবু শুনিয়া স্তব্ধ হইয়া থাকিলেন —বোধ হইল যেন বজ্র ভাঙিয়া তাহার মাথায় পড়িল। ক্ষণেক কাল পরে সুস্থির হইয়া ভাবিয়া মোকাজান মিয়াকে ডাকাইলেন। মোকাজান আদালতের কর্মে বড় পটু। অনেক জমিদার নীলকর প্রভৃতি সর্বদা তাহার সহিত পরামর্শ করিত। জাল করিতে —সাক্ষী সাজাইয়া দিতে— দারোগা ও আমলাদিগকে বশ করিতে —গাঁতের মাল লইয়া হজম করিতে —দাঙ্গা-হাঙ্গামের জোটপাট ও হয়কে নয় করিতে নয়কে হয় করিতে তাহার তুল্য আর একজন পাওয়া ভার। তাহাকে আদর করিয়া সকলে ঠকচাচা বলিয়া ডাকিত, তিনিও তাহাতে গলিয়া যাইতেন এবং মনে করিতেন আমার শুভক্ষণে জন্ম হইয়াছে— রমজান ঈদ শবেবরাত আমার করা সার্থক — বোধ হয় পীরের কাছে কষে ফয়তা দিলে আমার কুদ্‌রত আরও বাড়িয়া উঠিবে। এই ভাবিয়া একটা বদনা লইয়া অজু করিতেছিলেন, বাবুরামবাবুর ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকিতে তাড়াতাড়ি করিয়া আসিয়া নির্জনে সকল সংবাদ শুনিলেন। কিছুকাল ভাবিয়া বলিলেন — ডর কি বাবু? এমন কত শত মকদ্দমা মুই উড়াইয়া দিয়েছি — এ বা কোন ছার? মোর কাছে পাকা পাকা লোক আছে — তেনাদের সাথে করে লিয়ে যাব — তেনাদের জবানবন্দিতে মকদ্দমা জিত্‌ব, কিছু ডর কর না — কেল খুব ফজরে এসবো, এজ্ চললাম।

    বাবুরামবাবু সাহস পাইলেন বটে, তথাপি ভাবনায় অস্থির হইতে লাগিলেন। আপনার স্ত্রীকে বড় ভালবাসিতেন, স্ত্রী যাহা বলিতেন সেই কথাই কথা — স্ত্রী যদি বলিতেন এ জল নয় — দুধ, তবে চোখে দেখিলেও বলিতেন এ জল নয় — এ দুধ — না হলে গৃহিণী কেন বলবেন? অন্যান্য লোকে আপন আপন পত্নীকে ভালবাসে বটে, কিন্তু তাহারা বিবেচনা করিতে পারে যে স্ত্রীর কথা কোন্ বিষয়ে ও কতদূর পর্যন্ত শুনা উচিত। সুপুরুষ আপন পত্নীকে অন্তকরণের সহিত ভালবাসে কিন্তু স্ত্রীর সকল কথা শুনিতে গেলে পুরুষকে শাড়ী পরিয়া বাটীর ভিতর থাকা উচিত। বাবুরামবাবু স্ত্রী উঠ বলিলে উঠিতেন — বস বলিলে বসিতেন। কয়েক মাস হইল গৃহিণীর একটি নবকুমার হইয়াছে — কোলে লইয়া আদর করিতেছেন — দুই দিকে দুই কন্যা বসিয়াছে, ঘরকন্নার ও অন্যান্য কথা হইতেছে, এমতো সময়ে কর্তা বাটীর মধ্যে গিয়ে বিষণ্ণভাবে বসিলেন এবং বলিলেন—গিন্নী! আমার কপাল বড় মন্দ—মনে করিয়াছিলাম মতি মানুষমুনুষ হইলে তাহাকে সকল বিষয়ের ভার দিয়া আমরা কাশীতে গিয়া বাস করিব, কিন্তু সে আশায় বুঝি বিধি নিরাশ করলেন।

    গৃহিণী। ওগো—কি—কি—শীঘ্র বলো, কথা শুনে যে আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল—আমার মতি তো ভাল আছে?

    কর্তা। হাঁ—ভাল আছে—শুনিলাম পুলিশের লোক আজ তাহাকে ধরে হিঁচুড়ে লইয়া গিয়া কায়েদ করিয়াছে।

    গৃহিণী। কি বল্লে?—মতিকে হিঁচুড়িয়া লইয়া গিয়া কায়েদ করিয়াছে? ওগো, কেন কয়েদ করেছে? আহা বাছার গায়ে কতই ছড় গিয়াছে, বুঝি আমার বাছা খেতেও পায় নাই—শুতেও পায় নাই! ওগো কি হবে? আমার মতিকে এখুনি আনিয়া দাও।

    এই বলিয়া গৃহিণী কাঁদিতে লাগিলেন—দুই কন্যা চক্ষের জল মুছাইতে মুছাইতে নানা প্রকার সান্ত্বনা করিতে আরম্ভ করিল। গৃহিণীর রোদন দেখিয়া কোলের শিশুটিও কাঁদিতে লাগিল।

    ক্রমে ক্রমে কথাবার্তার ছলে কর্তা অনুসন্ধান করিয়া জানিলেন মতিলাল মধ্যে মধ্যে বাড়িতে আসিয়া মায়ের নিকট হইতে নানা প্রকার ছল করিয়া টাকা লইয়া যাইত। গৃহিণী এ কথা প্রকাশ করেন নাই—কি জানি কর্তা রাগ করিতে পারেন—অথচ ছেলেটিও আদুরে—গোসা করিলে পাছে প্রমাদ ঘটে। ছেলেপুলের সংক্রান্ত সকল কথা স্ত্রীলোকদিগের স্বামীর নিকট বলা ভাল। রোগ লুকাইয়া রাখিলে কখনই ভাল হয় না। কর্তা গৃহিণীর সহিত অনেকক্ষণ পর্যন্ত পরামর্শ করিয়া পরদিন কলিকাতার যে স্থানে যাইবেন তথায় আপনার কয়েকজন আত্মীয়কে উপস্থিত হইবার জন্য রাত্রিতেই চিঠি পাঠাইয়া দিলেন।

    সুখের রাত্রি দেখিতে দেখিতে যায়। যখন মন চিন্তার সাগরে ডুবে থাকে তখন রাত্রি অতিশয় বড় বোধ হয়। মনে হয় রাত্রি পোহাইল কিন্তু পোহাইতে পোহাইতেও পোহায় না। বাবুরামবাবুর মনে নানা কথা, নানা ভাব, নানা কৌশল, নানা উপায় উদয় হইতে লাগিল। ঘরে আর স্থির হইয়া থাকিতে পারিলেন না, প্রভাত না হইতে ঠকচাচা প্রভৃতিকে লইয়া নৌকায় উঠিলেন। নৌকা দেখিতে দেখিতে ভাঁটার জোরে বাগবাজারের ঘাঁটে আসিয়া ভিড়িল। রাত্রি প্রায় শেষ হইয়াছে—কলুরা ঘানি জুড়ে দিয়েছে—বলদেরা গোরু লইয়া চলিতেছে—ধোবার গাধা থপাস থপাস করিয়া যাইতেছে—মাছের ও তরকারির বাজরা হু-হু করিয়া আসিতেছে, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা কোশা লইয়া স্নান করিতে চলিয়াছেন—মেয়েরা ঘাটে সারি সারি হইয়া পরস্পর মনের কথাবার্তা কহিতেছে। কেহ বলিছে, বাপ ঠাকুরঝির জ্বালায় প্রাণটা গেল—কেহ বলে, আমার শাশুড়ী মাগী বড় বৌকাঁটকি—কেহ বলে, দিদি, আমার আর বাঁচতে সাধ নাই—বৌছুঁড়ী আমাকে দু’পা দিয়া থেত্লায়, বেটা কিছুই বলে না; ছোঁড়াকে গুণ করে ভেড়া বানিয়েছে—কেহ বলে, আহা অমন পোড়া জাও পেয়েছিলাম দিবারাত্রি আমার বুকে বসে ভাত রাঁধে,—কেহ বলে, আমার কোলের ছেলেটির বয়স দশ বৎসর হইল— কবে মরি কবে বাঁচি এই বেলা তার বিয়েটি দিয়ে নি।

    এক পশলা বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে। আকাশে স্থানে স্থানে কানা মেঘ আছে। রাস্তাঘাট সেঁত সেঁত করিতেছে। বাবুরামবাবু এক ছিলিম তামাক খাইয়া একখানা ভাড়া গাড়ী অথবা পাল্কির চেষ্টা করিতে লাগিলেন কিন্তু ভাড়া বনিয়া উঠিল না—অনেক চড়া বোধ হইল। রাস্তায় অনেক ছোঁড়া একত্র জমিল। বাবুরামবাবুর রকম সকম দেখিয়া কেহ কেহ বলিল—ওগো বাবু, ঝাঁকা মুটের উপর বসে যাবে? তাহা হইলে দু-পয়সায় হয়। তোর বাপের ভিটে নাশ করেছে—বলিয়া যেমন বাবুরাম দৌড়িয়া মারিতে যাবেন অমনি দড়াম করিয়া পড়িয়া গেলেন। ছেঁড়াগুলো হো হো করিয়া দূরে থেকে হাততালি দিতে লাগিল। বাবুরামবাবু অধোমুখে শীঘ্র একখানা লকাটে রকম কেরাঞ্চিতে ঠকচাচা প্রভৃতিকে লইয়া উঠিলেন এবং খন্ খন্ ঝন্ ঝন্ শব্দে বাহির সিমলের বাঞ্ছারামবাবুর বাটীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বাঞ্ছারামবাবুর বৈঠকখানায় উকিল বটলর সাহেবের মুৎসুদ্ধি—আইন-আদালত মামলা-মকদ্দমায় বড় ধড়িবাজ। মাসের মাহিনা ৫০ টাকা কিন্তু প্রাপ্তির সীমা নাই, বাটীতে নিত্য ক্রিয়াকাণ্ড হয়। তাহার বৈঠকখানায় বালীর বেণীবাবু, বহুবাজারের বেচারাম বাবু, বটতলার বক্রেশ্বরবাবু আসিয়া অপেক্ষা করিয়া বসিয়াছিলেন।

    বেচারাম। বাবুরাম। ভাল দুধ দিয়া কালসাপ পুষিয়াছিলে। তোমাকে পুনঃপুনঃ বলিয়া পাঠাইয়াছিলাম আমার কথা গ্রাহ্য করো নাই—ছেলে হতে ইহকালও গেল—পরকালও গেল। মতি দেদার মদ খায়—জোয়া খেলে—অখাদ্য আহার করে। জোয়া খেলিতে খেলিতে ধরা পড়িয়া চৌকিদারকে নির্ঘাত মারিয়াছে। হলা, গদা ও আর-আর ছোঁড়ারা তাহার সঙ্গে ছিল। আমার ছেলেপুলে নাই। মনে করিয়াছিলাম হলা ও গদা এক গণ্ডুষ জল দিবে এখন সে গুড়ে বালি পড়িল। ছোঁড়াদের কথা আর কি বলিব? দূঁর দূঁর।

    বাবুরাম। কে কাহাকে মন্দ করিয়াছে তাহা নিশ্চয় করা বড় কঠিন —এক্ষণে তদ্বিরের কথা বলুন।

    বেচারাম। বাবুরাম যা ইচ্ছা তাই করো—আমি জ্বালাতন হইয়াছি—রাত্রে ঠাকুরঘরের ভিতর যাইয়া বোতল বোতল মদ খায়—চরস গাঁজার ধোঁয়াতে কড়িকাট কালো করিয়াছে—রূপা-সোনার জিনিস চুরি করিয়া বিক্রি করিয়াছে। আবার বলে একদিন শালগ্রামকে পোড়াইয়া চুন করিয়া পানের সঙ্গে খাইয়া ফেলিব। আমি আবার তাহাদের খালাসের জন্য টাকা দিব? দূঁর দূঁর।

    বক্রেশ্বর। মতিলাল এত মন্দ নহে—আমি স্বচক্ষে স্কুলে দেখিয়াছি তাহার স্বভাব বড় ভাল —সে তো ছেলে নয়, পরেশ পাথর, তবে এমনটা কেন হইল বলতে পারি না।

    ঠকচাচা। মুই বলি এসব ফেল্‌ত বাতের দরকার কি? ত্যাল-খেড়ের বাতেতে কি মোদের প্যাট ভরবে? মকদ্দমাটার বনিয়াদটা পেকড়ে সেজিয়া ফেলা যাওক।

    বাঞ্ছারাম। (মনে মনে বড় আহলাদ—মনে করিতেছেন বুঝি চিড়া-দই পেকে উঠিল) কারবারী লোক না হইলে কারবারের কথা বুঝে না। ঠকচাচা যাহা বলিতেছেন তাহাই কাজের কথা। দুই-একজন পাকা সাক্ষীকে ভাল তালিম করিয়া রাখিতে হইবে—আমাদিগকে বটলর সাহেবকে উকিল ধরিতে হইবে—তাতে যদি মকদ্দমা জিত না হয় তবে বড় আদালতে লইয়া যাব—বড় আদালতে কিছু না হয়—কৌন্সেল পর্যন্ত যাব,—কৌন্সেলে কিছু না হয় তো বিলাত পর্যন্ত করিতে হইবে। এ কি ছেলের হাতে পিটে? কিন্তু আমাদিগের বটলর সাহেব না থাকিলে কিছুই হইবে না। সাহেব বড় ধমিষ্ঠ—তিনি অনেক মকদ্দমা আকাশে ফাঁদ পাতিয়া নিকাশ করিয়াছেন আর সাক্ষীদিগকে যেন পাখী পড়াইয়া তইয়ার করেন।

    বক্রেশ্বর। আপদে পড়িলেই বিদ্যা-বুদ্ধির আবশ্যক হয়। মকদ্দমার তদ্বির অবশ্যই করিতে হইবেক। বেতদ্বিরে দাঁড়াইয়া হারা ও হাততালি খাওয়া কি ভাল?

    বাঞ্ছারাম। বটলর সাহেবের মতো বুদ্ধিমান উকিল আর দেখতে পাই না। তাঁহার বুদ্ধির বলিহারি যাই। এ সকল মকদ্দমা তিনি তিন কথাতে উড়াইয়া দিবেন। এক্ষণে শীঘ্র উঠুন—তাঁহার বাটিতে চলুন।

    বেণী। মহাশয় আমাকে ক্ষমা করুন। প্রাণ বিয়োগ হইলেও অধর্ম করিব না। খাতিরে সব কর্ম করতে পারি কিন্তু পরকালটি খোয়াইতে পারি না। বাস্তবিক দোষ থাকলে দোষ স্বীকার করা ভাল—সত্যের মার নাই—বিপদে মিথ্যা পথ আশ্রয় করিলে বিপদ বাড়িয়া উঠে।

    ঠকচাচা। হা-হা-হা-হা—মকদ্দমা করা কেতাবী লোকের কাম নয়—তেনারা একটা ধাব্‌কাতেই পেলিয়ে যায়। এনার বাত মাফিক কাম করলে মোদের মেটির ভিতর জলদি যেতে হবে—কেয়া খুব।

    বাঞ্ছারাম। আপনাদের সাজ করিতে দোল ফুরাল। বেণীবাবু স্থিরপ্রজ্ঞ —নীতিশাস্ত্রে জগন্নাথ তর্ক পঞ্চানন, তাঁহার সঙ্গে তখন একদিন বালীতে গিয়া তর্ক করা যাইবেক। এক্ষণে আপনারা গাত্রোত্থান করুন।

    বেচারাম। বেণীভায়া! তোমার যে মত আমার সেই মত—আমার তিন কাল গিয়েছে—এককাল ঠেকেছে, আমি প্রাণ গেলেও অধর্ম করিব না—আর কাহার জন্যে বা অধর্ম করিব? ছোঁড়ারা আমার হাড় ভাজা ভাজা করিয়াছে—তাদের জন্যে আমি আবার খরচ করিব—তাদের জন্য মিথ্যা সাক্ষী দেওয়াইব? তাহারা জেলে যায় তো এক প্রকার আমি বাঁচি। তাদের জন্যে আমার খেদ কি? তাদের মুখ দেখিলে গা জ্বলে উঠে—দূঁর দূঁর!!!

  • আমি বীরাঙ্গনা বলছি

    আমি বীরাঙ্গনা বলছি

    ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ লেখিকা নীলিমা ইব্রাহিম রচিত একটি বই। এই বইয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক ধর্ষিত হওয়া সাত জন নারীর করুণ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।

    লেখিকা বইটিতে সাত জন বীরাঙ্গনা নারীর কথা বলেছেন যারা ভিন্ন ভিন্ন পারিবারিক অবস্থা থেকে এসেছে। দর্জির মেয়ে আছে, গ্রামের বিত্তশালী কৃষকের মেয়ে আছে আবার শহরের উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা থেকে রাজনীতিবিদের মেয়ে আছে। তবে এই বীরাঙ্গনাদের মধ্যে একটি মিল হচ্ছে তারা জীবন যুদ্ধে কেউই পরাজিত হয়নি।

    মেহেরজান বলছে, “জীবনটা তো সরল সমান্তরালরেখায় সাজানো নয়। এর অধিকারী আমি সন্দেহ নেই, কিন্তু গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করেন – কি বললেন আল্লাহ, পাগল হয়েছেন! বাঙালি মেয়ের জীবন পরিচালিত হবে আল্লাহর নির্দেশে! তাহলে এদেশের মৌলবী মওলানারা তো বেকার হয়ে থাকবেন, আর রাজনীতিবিদরাই বা চেঁচাবেন কি উপলক্ষ করে? না এসব আমার নিজস্ব মতামত, অভিযোগের বাঁধা আটি নয়।”

    যে কথা তাহের (ফাতেমার স্বামী) জানে না সেই কথাই চাঁপা ডাক্তারকে বলল। সে নির্মম কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে সে নিজেও কেঁদে উঠল। ডাক্তার নিচু হয়ে চাঁপাকে প্রণাম করল। দিদি, আপনারা প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আশ্চর্য এত ত্যাগ স্বীকার করে দেশ স্বাধীন করল বাঙালিরা, আর মা বোনদের দেওয়া ত্যাগের মূল্য দিতে পারল না। দূর্ভাগ্য সে দেশের!

    আমি মাঝে মাঝে ওর ঘরে গিয়ে বসতাম। চোখ নিচু করে মিনা বেরিয়ে যেত অথবা ঘরে ঢুকত। কিছু জিজ্ঞেস করলে খুব কুণ্ঠিতভাবে জবাব দিত। বলতাম, জেরিনা এই মেয়েগুলোর বুকে আগুন জ্বেলে দিতে পারিস না, ওরা কেন মাথা নিচু করে চলে? নীলিমাদি তোমাদের এ সমাজ ওদের চারিদিকে যে আগুন জ্বেলে রেখেছে তার উত্তাপেই ওরা মুখ তুলতে পারে না। বেশি বেশি বক্তৃতা দিও না। ওদের সম্পর্কে জেরিনা খুব বেশি স্পর্শকাতর ছিল।

    ❀ ❀ ❀

    সংসারের নিয়ম এই যে, কোন কিছু পেতে হলে তার জন্য মূল্য দিতে হয়। বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে পাওয়ার জন্য আমাদের জাতিকেও বিরাট মূল্য দিতে হয়েছে। অগণিত নারী, পুরুষ ও শিশুর প্রাণ এবং বিপুল সম্পদের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই রাষ্ট্র। যারা সাধারণ মানুষ, দেশ ত্যাগ করে ভারতে যায়নি, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেনি, তারাও মুক্তিযোদ্ধাদের আহার ও আশ্রয় দিয়ে প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছে। স্বাধীনতা-যুদ্ধে জনসমর্থন এবং জনগণের সাহায্য-সহযোগিতার মূল্যও অপরিসীম। বর্তমান গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যুদ্ধকালে নির্যাতিতা কিছু নারীর মর্মান্তিক কাহিনী। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরেই, ১৯৭২ সালে, বঙ্গবন্ধু সরকার পরম মহানুভবতায় এই নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ বলে ঘোষণা করেন এবং স্বাধীনতা অর্জনে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি দেন। নানাভাবে সরকার তাঁদেরকে আর সবার মতো মর্যাদাবান মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। আমাদের সমাজ কিন্তু যথেষ্ট উদার মানসিকতার অধিকারী নয়। নানা রকম সংস্কার ও কুসংস্কার এবং ঔচিত্য-অনৌচিত্যের প্রশ্নকে আড়াল করে সামাজিক নিষ্ঠুরতাকে কেবল প্রশ্রয় নয়, প্রাধান্য দেয়। এই বৈরী বাস্তবতায় অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিম সমাজকল্যাণের মনোভাব নিয়ে সাহসের সঙ্গে রচনা করেছেন এই গ্রন্থ। তিনি সরজমিনে তদন্ত করে তথ্য নির্ণয় করেছেন এবং বীরাঙ্গনাদের অন্তর্জালা তাঁদেরই জবানিতে সুন্দর ভাষায় প্রকাশ করেছেন।

  • বাবরনামা

    বাবরনামা

    বাবরনামা

    মোগল সম্রাট জহির উদ্-দিন মুহম্মদ জালাল উদ্-দিন বাবর বিরচিত

    অনুবাদ • সম্পাদনা • ভূমিকা মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস

    প্রকাশকাল—মাঘ ১৪২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

    প্রচ্ছদ—ধ্রুব এষ

    .

    অনুবাদকের উৎসর্গ

    আমার অকাল প্রয়াত বন্ধু প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান

    তাঁর সহধর্মিণী সাহারা বানুকে

    চিরস্থায়ী বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ—

    জীবন-চলার পথ কত না বন্ধুর আর দুর্গম জানি

    সে জীবনে বাধা আছে, ব্যথা আছে, দুঃখ আছে, বঞ্চনা আছে,

    তবু সে জীবনখানি বিজয়ের আশা নিয়ে সদা জেগে আছে

    আশাহত ব্যথাহত, জীবন-যন্ত্রণা কত সব নেয় মানি।

    পতন-অভ্যুদয় বন্ধুর পথে-পথে যে জীবন চলে

    সে জীবন বাধা জয় করবেই একদিন সফল সে হবে।

    সফল জীবন-রূপে যে জীবন একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে

    চরৈবেতি চরৈবেতি, সত্য-পথে যে জীবন সদা বয়ে চলে—

    সে জীবন মরে নাকো, অমৃতস্য পুত্র রূপে চিরামর থাকে

    মহাকালচক্ররথে সে জীবন বয়ে চলে সেটাই জীবন

    অমৃতের পুত্র যারা, পৃথক সে কিছু নয় জীবনমরণ—

    ক্ষণিকের মুসাফির অমৃতের যাত্রাপথ অব্যাহত রাখে—

    ক্ষুদ্র সে জীবন তাই তার কাছে ক্ষুদ্র নয়, অসীম অনন্ত

    মহাকাল স্রোতে তাই যতই সে ভেসে যাক—নাই তার অন্ত।

    ১৫.৯.২০১৫ ঈসায়ী
    মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস
  • আনোয়ারা

    আনোয়ারা

    আনোয়ারা

    আনোয়ারা বাঙ্গালী ঔপন্যাসিক মোহাম্মদ নজিবর রহমান রচিত একটি কালজয়ী সামাজিক উপন্যাস। এটি তার রচিত প্রথম ও সর্বাধিক সার্থক উপন্যাস। এটি ১৯১৪ সালের ১৫ জুলাই (১৩২১ বঙ্গাব্দে) কলকাতা থেকে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়। বাঙালি মুসলমান সমাজে মীর মশাররফ হোসেন রচিত “বিষাদ সিন্ধু”র পর এটিই সর্বাধিক পঠিত ও জনপ্রিয় উপন্যাস। ২০১৪ সালে এ উপন্যাসের শতবর্ষ পূর্তি পালন করা হয়। এই উপন্যাসে সপ্তাদশ শতাব্দীতে গ্রামীণ বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমান সমাজের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের চিত্র ফুটে উঠে।

    চরিত্রসমূহ হচ্ছে— আনোয়ারা; হামীদা; নূর ইসলাম; উকিল সাহেব; দাদীমা; গোলাপজান (আনোয়ারার সৎমা); সালেহা; সালেহার মা প্রমুখ।

    ১৯৫৬ সালে ‘আনোয়ারা’ সম্পর্কে ড. মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (আধুনিক যুগ) এ বলেছেন,

    “জনপ্রিয়তা দিয়ে যদি কোন বইয়ের বিচার করতে হয়, তাহলে মোহাম্মদ নজিবর রহমান রচিত ‘আনোয়ারা’র দাবিই সর্বাগ্রে বিবেচ্য। ১৯১১ থেকে ১৪ সালের মধ্যে এ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৪৯ সালে এ বইটির ত্রয়োবিংশতি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে এবং এ যাবৎ ‘আনোয়ারা’র দেড়লক্ষ কপি নিঃশেষিত হয়েছে।”

    ১৯৬১ সালে (বাংলা ১৩৬৮ সনের চৈত্র মাসে) এর সাতাশতম সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং ঐ সময় পর্যন্ত এর সাড়ে পাঁচ লক্ষ কপি বিক্রয় হয় বলে জানা যায়। কলকাতা ও ঢাকা থেকে এ পর্যন্ত এ উপন্যাসের ৬০টিরও বেশি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। ‘আনোয়ারা’ এক সময় পাঠ্য-তালিকাভুক্ত ছিল।

    নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন তাঁর উপন্যাসে তাঁর সমকালীন জীবন ও সমাজকে যথাযথভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সে সময়কার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনা ও স্খলন-পতনকে তিনি বাস্তবসম্মতভাবে রূপায়িত করতে সচেষ্ট হয়েছেন। তাছাড়া মানবজীবনের কতগুলো চিরায়ত মূল্যবোধ যেমন-প্রেম, ন্যায়পরায়ণতা ও মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ ইত্যাদি তাঁর লেখায় যথাযথভাবে ফুটে উঠেছে। এসব কারণেই তাঁর রচনা সেসময়ে যেমন ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, তেমনি তা চিরকালীন মানুষের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে, বিশেষত তাঁর রচিত ‘আনোয়ারা’ উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে ক্লাসিক মর্যাদা পেয়েছে।

    ১৯১৭-১৯১৮ সালের মধ্যে ‘আনোয়ারা’ উপন্যাসের পরিশিষ্ট বা সিকুয়্যাল হিসাবে ‘প্রেমের সমাধি’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৩ সালে (বাংলা ১৩৭০ বঙ্গাব্দে) এর উনিশতম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। আনোয়ারার মত এটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

    ১৯৬৭ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক জহির রায়হান এ উপন্যাস অবলম্বনে একই নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। প্রযোজনা করেছেন ইফতেখারুল আলম। চলচ্চিত্রটিতে প্রধান চরিত্রসমূহে অভিনয় করেন রাজ্জাক, সূচন্দা, বেবী জামান, রুবিনা, রানী সরকার, আমজাদ হোসেন প্রমুখ। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ১৯৮৭ সালে এ উপন্যাসের ধারাবাহিক নাট্যরূপ সম্প্রচার করে।

    পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করেছে এই দুই নারী। তাই নিজেরা নারী হয়ে অপর নারীর প্রতি সামান্যতম ভালোবাসা বা করুণা মনে জন্ম নেয়নি। বরং প্রতিনিয়ত কিভাবে আনোয়ারাকে মানসিক অত্যাচার করা যায় সে ব্যাপারে তৎপর থেকেছে।

    উপন্যাসে শেষপর্যন্ত গোলাপজান তার লোভ, আক্রোশের জালে বন্দি হয়েছে। অতি লোভে তার ঘড়া পূর্ণ হয়। যদিও গোলাপজান আগের পক্ষের ছেলে বদসার খুনের দায় দিয়েছে স্বামীর ওপর। গোলাপজান চরিত্রের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সমাজে বহুবিবাহের কুফল। অন্যদিকে সংসারে সৎ মায়ের উপস্থিতি সন্তানের জীবনে অভিশাপ হয়ে দেখা দেয় তার চিরন্তন রূপ। জাফর বিশ্বাসের মেয়ে গোলাপজান। বাবা ছিল ডাকতের সর্দার। শেষ জীবনে পুলিশের চেষ্টায় ধরা পড়ে ৮ বছর জেল খাটে। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। বাপের মতো ডাকসাইটে স্বভাব গোলাপজানেরও। যদিও ভাই আজিমুল্লা বাপের পথে পা বাড়ায়নি। কিন্তু গোলাপজান দেখতে সুন্দরী। বিয়ে হওয়ার পর স্বামীর ঘর থেকে পালিয়ে আসে। কিন্তু অজিমুল্লা এবং মায়ের শাসনে খোরশেদের সংসারে টিকে যায়। কিন্তু আনোয়ারার বাপ খোরশেদ স্ত্রীর কাছে সর্বদাই অবহেলিত। মেয়ের প্রতি অত্যাচারেও সে নির্বিকার। নুরল এসলামের হত্যার ষড়যন্ত্র করলেও গোলাপজানের পাপেই সে নিজ সন্তানকে হত্যা করে বসে।

    অন্যদিকে আনোয়ারার সৎ শাশুড়ির অত্যাচার অভিশাপ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে কিন্তু আনোয়ারা এখানেও নির্বিকার। দুই মায়ের অত্যাচার নীরবে সয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে ঔপন্যাসিক নারী জীবনে দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দিকেই ঝুঁকেছেন। তবে উপন্যাসে তিনি সর্বোপরি দেখাতে চেয়েছেন স্বামী-স্ত্রী পরস্পর বোঝাপড়া, ঘরের সুখ বজায় থাকে নারীর ওপর, নারীর কোমল স্বভাবই সর্বত্র জয়ী, সতীত্বের গৌরব, ধর্ম জীবনের মাহাত্ম্য। আনোয়ারার দুঃখী জীবনের মাঝে স্বস্তি যেন এটুকুই নুরল এসলামের মতো পতি তার ভাগ্যে জুটেছে। নারীর অন্তঃপুরে অবস্থান এবং স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা, বিশ্বাস, আস্থা ও আনুগত্য উপন্যাসটিতে বিশেষভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

    আনোয়ারার পতিপরায়ণ স্বভাবই সংসারের সুখ-শান্তি বয়ে আনে সে লক্ষেই এগিয়েছেন লেখক। নারীর গুনেই শুধু অন্তঃপুরের শোভা বৃদ্ধি পায়। আর সে নারী যদি হয় গোলাপজান বা সালেহার মায়ের মতো তবে সংসার চির অশান্তিতে ডুবে যায়। লেখক সর্বোপরি নারীর জীবনের সঠিক দিশা দেখাতে চেয়েছেন আনোয়ারার জীবন রূপায়নের মধ্যে দিয়ে।

  • বাবরের আত্মকথা

    বাবরের আত্মকথা

    বাবরের আত্মকথা

    জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর, ভারতবর্ষের মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি তাঁর পিতার মৃত্যুর পর মাত্র বার বৎসর বয়সে ফারগানার সিংহাসনে আরোহণ করেন। পারস্যের পূর্ব সীমান্তের একটি ক্ষুদ্র রাজ্য যা বর্তমানে চীনা তুর্কিস্থানের আওতাভূক্ত। রাজধানী ছিল আন্দেজান। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ফারগানা থেকে বিতাড়িত হন। তবে ১৫০৪ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে দখল করেন কাবুল। এরপর সমরখন্দ দখলের চেষ্টা করেন। সেখানে ব্যর্থ হয়ে ভারতের দিকে মন দেন। ভারতে তখন লোদী বংশের শাসন হলেও বিভিন্ন অঞ্চল ছিল প্রায় স্বাধীন। ১৫২৪ সালে বাবর প্রথম লাহোর দখল করেন। কিন্তু ফিরে যেতে বাধ্য হন। ১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে দিল্লির সিংহাসন দখল করেন।

    জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবরের জন্ম ১৪৮৩ সালে; তিনি বেঁচে ছিলেন ৪৮ বছর, এর মধ্যে রাজত্ব করেছেন ৩৬ বছর।  রাজা হবার পর ভারতজয় পর্যন্ত মোটামুটি সব ঘটনাই আত্মচরিতে লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি।

    “রজব মাসের আঠাশে তারিখ বৃহস্পতিবার বৈকালিক নামাজের সময় আমি আগ্রাতে প্রবেশ করি। সুলতান ইব্রাহিমের প্রাসাদেই আমার থাকার ব্যবস্থা হয়।

    ১৬০৪ খ্রিস্টাব্দে আমি যখন কাবুল জয় করি, সেইসময় থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত তখনি সর্বদাই এই আশা পোষণ করে এসেছি যে হিন্দুস্থান আমি জয় করবই করব। কিন্তু কখনও কখনও আমার আমীরদের অসদাচরণ— কারণ আমার ভারত জয়ের অভিলাষ তাদের মনোঃপুত ছিল না— এবং কখনও কখনও আমার ভাইদের গুপ্ত ষড়যন্ত্র ও বিরুদ্ধতা আমাকে এই দেশ জয় করার জন্য অভিযান চালান থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করে। ফলে, হিন্দুস্থানের প্রদেশগুলি এতদিন আমার আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিল। অবশেষে এইসব বাধা দূর হল। এখন ছোট বড় ধনী নির্ধন, সাধারণ এমন কেউ নেই যে আমার এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে একটি কথাও উচ্চারণ করার সাহস রাখে।”

    তিনি আরো লিখেছিলেন, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ও বিশ্বাসই তাঁকে হিন্দুস্থান দখলে সহায়তা করেছে। “তারই কৃপায় আমি পরাক্রমশালী শত্রুকে পরাজিত করে এই বিশাল হিন্দুস্থান জয় করার গৌরব লাভ করেছি। এই কৃতকার্যতা আমার নিজ শক্তিতে হয়েছে কিংবা আমার এই সৌভাগ্য আমার নিজের চেষ্টায় লাভ করেছি একথা আমি কখনই মনে করি না।”

    ১৫২৬ থেকে পরবর্তী চার বছরে বাবর দৃঢ়ভাবে তাঁর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যার বিস্তার ছিল আফগানিস্তান থেকে বাংলা। হিমালয় থেকে গোয়ালিয়র পর্যন্ত।

    বাবর মারা যান ১৫৩০ সালে। এ সম্পর্কে প্রচলিত কাহিনি হল— তাঁর পুত্র হুমায়ুন রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। বাবর তিনবার তার শয্যা প্রদক্ষিণ করে আল্লাহর কাছে এই ফরিয়াদ করেন যেন পুত্রের রোগ পিতার ওপর বর্তায়। হুমায়ুন সুস্থ হয়ে উঠতে থাকেন, বাবর রোগাক্রান্ত হন এবং সুস্থ হয়ে তিনি আর ওঠেননি। গুলবদন এই তথ্য দিয়েছেন। তবে ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ মনে করেন, হুমায়ুন সুস্থ হয়ে ওঠার পর বাবর দু’ থেকে তিন মাস অসুস্থ ছিলেন। রামশরণ শর্মা মনে করেন, ইব্রাহিম লোদির মা তাঁকে বিষ খাইয়েছিলেন। গুলবদনও তা লিখেছেন।

    শচীন্দ্রনাথ রায় বাবরের আত্মজীবনী অনুবাদ করেছিলেন ইংরেজি ভাষ্য থেকে। ১৯৩০ খৃষ্টাব্দে কলকাতা থেকে তা প্রকাশিত হয়েছিল। শচীন্দ্রনাথ তাঁর ভূমিকায় এই আত্মজীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন যার বাবর একটি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা ১৫২৬ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত টিকেছিল।

     বাবর ছিলেন একাধারে বীর সৈনিক ও সুচতুর রাজনীতিবিদ। শুধু তাই নয়—তিনি ছিলেন দার্শনিক এবং কবি। ফারসী ভাষায় লেখা তাঁর কবিতাগুলি সুন্দর। তুর্কি ভাষাতে গদ্য ও পদ্য রচনায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন তিনি। তিনি শিকারে পারদর্শী ছিলেন। উদ্যান রচনায় তার অনেক অর্থ ও সময় ব্যয় হত। তিনি পুষ্প-বিলাসী ছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসেই অনেক সময় ফুলের বাগানে প্রবেশ করতেন এবং একেবারে অন্য মানুষ হয়ে যেতেন। তাঁর লেখায় যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনার পাশেই ফুলের বিবরণ দেখা যায়। তাঁর পরিবার পরিজনের প্রতি ব্যবহার প্রীতিপূর্ণ ছিল। বীর ছিলেন, কিন্তু নির্মম ছিলেন না তিনি।

    সুতরাং তিনি যে ভাল যোদ্ধা ছিলেন সে সম্পর্কে বিতর্ক নেই। কিন্তু তাঁর আত্মজীবনী তুজুক-ই বাবরী তাকে অমর করে রেখেছে। উল্লেখ্য, বাবর তাঁর মাতৃভাষা তুর্কিতে আত্মজীবনী লিখেছিলেন যার সাহিত্য গুণও অনন্য। মোঘলদের আর যারা আত্মজীবনী লিখেছেন, তাঁরা লিখেছেন ফার্সিতে।

    এই আত্মজীবনী ফার্সি ভাষায় প্রথম দু’বার অনূদিত হয়। অনুবাদ করেন পায়েন্দা খান ও আবদুর রহিম খানই খানান।

    তারপর ফরাসি, ওলন্দাজ, ইংরেজি ভাষায় গ্রন্থটি অনূদিত হয়। তবে বেভারিজের করা অনুবাদকে প্রামাণ্য বলে মনে করা হয়, কারণ তিনি তুর্কি থেকে অনুবাদ করেছিলেন যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২১ সালে। অন্যরা অনুবাদ করেছিলেন ফারসি থেকে।

    শচীন্দ্রলাল রায় অনূদিত ‘বাবরের আত্মকথা’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের আশ্বিনে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মিত্র ও ঘোষ, ১০ শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা ১২; প্রকাশক এস. এন. রায়। মুদ্রাকর ছিলেন শ্রীফণিভূষণ হাজরা, গুপ্তপ্রেস, ৩৭/৭ বেনিয়াটোলা লেন, কলিকাতা।

    সাড়ে পাঁচ টাকা মূল্যমানের বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন কানাই পাল, এবং প্রচ্ছদ মুদ্রিত হয়েছিল ‘ফোটোটাইপ সিণ্ডিকেট’ থেকে। গ্রন্থটি উৎসর্গ করে অনুবাদক লিখেছিলেন—

    বকু, নারায়ণকে

    —বড়দাদা

  • ঊনপঞ্চাশী

    ঊনপঞ্চাশী

    ঊনপঞ্চাশী

    ‘শ্রীউপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়’ রচিত রম্যগল্পগ্রন্থ ‘ঊনপঞ্চাশী’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৯ বঙ্গাব্দ মুতাবিক ১৯২২ খৃষ্টাব্দে। প্রকাশক শ্রীনৃপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ১২ নং রমরতন বোস লেন, শ্যামবাজার, কলিকাতা। গ্রন্থটির মূল্য ছিল ১৷৽ পাঁচ সিকা। ‘ঊনপঞ্চাশী’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে। প্রকাশক শ্রীবরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, আত্মশক্তি লাইব্রেরী, ১৫নং কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা।

    ‘উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়’ (৬ জুন ১৮৭৯—৪ এপ্রিল ১৯৫০) একজন বাঙালি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী, সম্পাদক ও লেখক। তাঁর রচিত বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ হল ‘নির্বাসিতের আত্মকথা’। অন্তঃপুরে সাধক, প্রথম গুণের লেখক এবং জন্মগত দেশপ্রেমিক ছিলেন উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯০৮ সালের ২ মে মানিকতলা গার্ডেন হাউস থেকে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও অন্যান্যদের সঙ্গে মুজাফফরপুর বোমা মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

    হুগলি জেলার চন্দননগরের গোন্দলপাড়ায় ১৮৭৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন উপেন্দ্রনাথ। অল্প বয়সে সন্ন্যাস নিয়ে ভারবর্ষের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান, পরে আবার সংসারে ফিরে আসেন। উপেন্দ্রনাথ ছিলেন প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত রমানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র। চন্দননগরের ডুপ্লে কলেজ থেকে এফ. এ. পাশ করে কলকাতা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে যোগ দিলেও ভগ্নস্বাস্থ্যের জন্য পড়া শেষ করতে পারেন নি। কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি। কলকাতার ডাফ কলেজে বি. এ. পাঠরত অবস্থায় ‘যুগান্তর’ দলের সংস্পর্শে আসেন। ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ আন্দোলনের সময় তিনি ‘যুগান্তর’ ও ‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯০৭ সালে বিখ্যাত আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় মানিকতলার বাগানবাড়ী থেকে অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কানাইলাল দত্ত, দেবব্রত বসু, হৃষিকেশ কাঞ্জিলাল ও আরও অনেক বিপ্লবীর সঙ্গে উপেন্দ্রনাথও ধরা পড়েন। তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। সেলুলার জেলে তাঁর দীর্ঘ বারো বছর কারাবাসের কাহিনী নিয়ে লেখেন নির্বাসিতের আত্মকথা বইটি। মুক্তি লাভের পরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নারায়ণ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন, বারীন্দ্রকুমার ঘোষের সঙ্গে বিজলী পত্রিকা প্রকাশ করেন। এর পর তিনি নিজ সম্পাদনায় প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক আত্মশক্তি। দেশ বিরোধী লেখার জন্য ব্রিটিশ সরকার আবার উপেন্দ্রনাথকে ৩ বছরের জন্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল। ১৯২৬-এ মুক্ত পেয়ে ফরোয়ার্ড, লিবার্টি, অমৃতবাজার পত্রিকায় সাংবাদিকতার কাজ করতেন। ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাস থেকে আমৃত্যু তিনি দৈনিক বসুমতী পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। শেষ জীবনে হিন্দু মহাসভার সাথে যুক্ত হন ও বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

    উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন, এর মধ্যে ‘নির্বাসিতের আত্মকথা’ সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হল — উনপঞ্চাশী, পথের সন্ধান, ধর্ম ও কর্ম, স্বাধীন মানুষ, জাতির বিড়ম্বনা, ভবঘুরের চিঠি, অনন্তানন্দের পত্র, বর্তমান জগত ইত্যাদি।