Tag: গ্রন্থনাম

  • হাদীছের গল্প

    হাদীছের গল্প

    হাদীছের গল্প

    গবেষণা বিভাগ, হাদীছ ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ

    প্রকাশকের নিবেদন

    গল্প, কবিতা, সঙ্গীত ইত্যাদি শিল্প ও সাংস্কৃতিক উপকরণ মানুষের স্বভাবজাত অন্তঃক্রিয়ার এক চিরন্তন অংশ। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল সমাজ ও সংস্কৃতির একটি বিরাট অংশ দখল করে রয়েছে চিত্তবিনোদনের এ সকল বিমূর্ত উপকরণ। যা মানুষকে নিরন্তর কর্মপ্রেরণা যোগায়, সভ্যতা ও মননশীলতা শেখায়, জীবনকে অনেক অর্থপূর্ণ করে তোলে। ইসলামের দুই অভ্রান্ত সত্যের উৎস পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে মানব জীবন পরিচালনার পথ ও পদ্ধতি প্রদর্শিত হওয়ার সাথে সাথে নানা সামাজিক ও সাহিত্যিক উপকরণের রসদও যোগান দেয়। তাই দেখা যায় পূর্ববর্তী জাতিসমূহের কার্যক্রম ও জীবন-যাপন পদ্ধতি সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বহু কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। যার একমাত্র উদ্দেশ্য জ্ঞান হাছিল করা ও তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করা। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এসেছে, ‘অতএব তুমি কাহিনী বর্ণনা কর, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে’ (আ‘রাফ ১৭৬)। আল্লাহ আরো বলেন, ‘তাদের এ কাহিনীগুলোতে অবশ্যই বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে শিক্ষা, এটা কোন বানানো গল্প নয়, বরং তাদের পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী এবং প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ। আর হেদায়াত ও রহমত ঐ কওমের জন্য যারা বিশ্বাস স্থাপন করে’ (ইউসুফ ১১১)। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘এতে তোমার নিকট এসেছে সত্য, মুমিনদের জন্য শিক্ষা ও স্মরণিকা’ (হূদ ১২০)। এ সকল আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, পূর্ববর্তীদের কাহিনীসমূহ জানা এবং মানুষের কাছে তা প্রচার করা কেবল প্রয়োজনীয়ই নয় বরং অপরিহার্য। এতে একদিকে যেমন চিত্তবিনোদন হয়, অন্যদিকে তেমনি খুলে যায় শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের একটি উপভোগ্য দুয়ার।

    পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে মানবেতিহাসের এমন বহু ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যাতে মানুষের জন্য অপরিমেয় জ্ঞান ও উপদেশভান্ডার লুকিয়ে রয়েছে। বাংলাভাষী পাঠকরা এসকল ঘটনা বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন গ্রন্থে হয়তবা ইতিমধ্যেই পাঠ করেছেন। কিন্তু সেসব ঘটনা অনেক সময় বিকৃত আকারে বর্ণনা করা হয়েছে অথবা জাল-যঈফ কাহিনী মিশিয়ে চটকদার রূপ দেয়া হয়েছে। এমতবস্থায় সুধী পাঠককে ছহীহ হাদীছে তথা বিশুদ্ধে সনদে বর্ণিত গল্প ও কাহিনীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য ‘হাদীছ ফাউন্ডেশন গবেষণা বিভাগ’ ‘হাদীছের গল্প’ গ্রন্থটি প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। এখানে সংকলিত ৩০টি গল্পের অধিকাংশই ইতিপূর্বে ‘মাসিক আত-তাহরীক’-য়ে প্রকাশিত হয়েছে। বলা বাহুল্য যে, হাদীছে বর্ণিত কাহিনীগুলো হুবহু অনূদিত হওয়ায় পাঠক হয়ত গাল্পিক ভাবধারায় কিছুটা ঘাটতি অনুভব করতে পারেন, তবে তা মূল উদ্দেশ্য তথা উপদেশ গ্রহণে কোন বাধার সৃষ্টি করবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। এজন্য পাঠকের সুবিধার্থে প্রতিটি গল্পের শেষেই শিক্ষণীয় বিষয়গুলো আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিন্নধর্মী এই গল্পগ্রন্থটি পাঠকের কাছে সমাদৃত হবে বলে আমরা আশাবাদী।

    বইটি প্রকাশনার সাথে জড়িত হা.ফা.বা. গবেষণা বিভাগসহ সকলকে আমরা আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং আল্লাহর নিকটে উত্তম জাযা কামনা করছি।

    প্রকাশক

    ঈমানদার যুবক ও আছহাবুল উখদূদের কাহিনী

    বহুকাল পূর্বে একজন রাজা ছিলেন। সেই রাজার ছিল একজন যাদুকর। ঐ যাদুকর বৃদ্ধ হ’লে একদিন সে রাজাকে বলল, ‘আমি তো বৃদ্ধ হয়ে গেছি। সুতরাং আমার নিকট একটি ছেলে পাঠান, যাকে আমি যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিব’। বাদশাহ তার নিকট একটি বালককে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি তাকে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিতে লাগলেন। বালকটি যাদুকরের নিকট যে পথ দিয়ে যাতায়াত করত, সে পথে ছিল এক সন্ন্যাসীর আস্তানা। বালকটি তার নিকট বসল এবং তার কথা শুনে মুগ্ধ হ’ল। বালকটি যাদুকরের নিকট যাওয়ার সময় ঐ সন্ন্যাসীর নিকট বসে তাঁর কথা শুনত। ফলে যাদুকরের নিকট পৌঁছতে বালকটির দেরী হ’ত বলে যাদুকর তাকে প্রহার করত। বালকটি সন্ন্যাসীর নিকট এ কথা জানালে তিনি বালককে শিখিয়ে দেন যে, তুমি যদি যাদুকরকে ভয় কর তাহ’লে বলবে, বাড়ীর লোকজন আমাকে পাঠাতে বিলম্ব করেছে এবং বাড়ীর লোকজনকে ভয় পেলে বলবে, যাদুকরই আমাকে ছুটি দিতে বিলম্ব করেছে।

    বালকটি এভাবে যাতায়াত করতে থাকে। একদিন পথে সে দেখল, একটি বৃহদাকার প্রাণী মানুষের চলাচলের পথ রোধ করে বসে আছে। বালকটি ভাবল, আজ পরীক্ষা করে দেখব যে, যাদুকর শ্রেষ্ঠ, না সন্ন্যাসী শ্রেষ্ঠ? অতঃপর সে একটি প্রস্তরখন্ড নিয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ্! যাদুকরের কার্যকলাপ অপেক্ষা সন্ন্যাসীর কার্যকলাপ যদি তোমার নিকট অধিকতর প্রিয় হয়, তবে এই প্রাণীটিকে এই প্রস্তরাঘাতে মেরে ফেল। যেন লোকজন যাতায়াত করতে পারে’। এই বলে প্রাণীটিকে লক্ষ্য করে সে প্রস্তরখন্ডটি ছুঁড়ে মারল। প্রাণীটি ঐ প্রস্তরাঘাতে মারা গেল এবং লোক চলাচল শুরু হ’ল।

    এরপর বালকটি সন্ন্যাসীর নিকট গিয়ে তাকে ঘটনাটি জানালে তিনি তাকে বললেন, ‘বৎস! তুমি এখনই আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেছ। তোমার প্রকৃত স্বরূপ আমি বুঝতে পারছি। শীঘ্রই তোমাকে পরীক্ষার সম্মুখীন হ’তে হবে। যদি তুমি পরীক্ষার সম্মুখীন হও তাহ’লে যেন আমার কথা প্রকাশ করে দিও না’। বালকটির দো‘আয় জন্মান্ধ ব্যক্তি চক্ষুষ্মান হ’তে লাগল, কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি নিরাময় হ’তে লাগল এবং লোকজন অন্যান্য রোগ হ’তেও আরোগ্য লাভ করতে লাগল।

    এদিকে রাজার একজন সহচর অন্ধ হয়েছিল। সে বহু উপঢৌকনসহ বালকটির নিকট গিয়ে বলল, ‘তুমি যদি আমাকে চক্ষুষ্মান করে দাও, তাহ’লে এ সবই তোমার’।

    বালকটি বলল,  ‘আমিতো কাউকে আরোগ্য করতে পারি না । বরং  রোগ ভাল করেন আল্লাহ। অতএব আপনি যদি  আল্লাহর প্রতি ঈমান আনেন, তাহ’লে আমি আপনার রোগ মুক্তির জন্য আল্লাহর নিকটে দো‘আ করতে পারি। তাতে তিনি হয়ত আপনাকে আরোগ্য দান করতে পারেন’। ফলে লোকটি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল। আল্লাহ তাকে আরোগ্য দান করলেন।

    পূর্বের ন্যায় তিনি রাজার নিকটে গিয়ে বসলে রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে তোমাকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিল’? সে বলল, ‘আমার রব’। রাজা বললেন, আমি ছাড়া তোমার রব আছে কি’? সে বলল, ‘আমার ও আপনার উভয়ের রব আল্লাহ’। এতে রাজা তাকে ধরে তার উপর নির্যাতন চালাতে থাকে। অবশেষে সে বালকটির নাম প্রকাশ করে দিল।

    অতঃপর বালকটিকে রাজদরবারে আনা হ’ল। রাজা তাকে বললেন, ‘বৎস! আমি জানতে পারলাম যে, তুমি তোমার যাদুর গুণে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্ত লোকদের রোগ নিরাময় করছ এবং অন্যান্য কঠিন রোগও নিরাময় করে চলেছ। বালকটি বলল, আমি কাউকে রোগ মুক্ত করি না। রোগ মুক্ত করেন আল্লাহ’। তখন রাজা তাকে পাকড়াও করে তার উপর উৎপীড়ন চালাতে থাকেন। এক পর্যায়ে সে সন্ন্যাসীর কথা প্রকাশ করে দিল। তখন সন্ন্যাসীকে ধরে আনা হ’ল এবং তাঁকে বলা হ’ল, তুমি তোমার ধর্ম পরিত্যাগ কর। কিন্তু সে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল। তখন রাজার আদেশক্রমে করাত নিয়ে আসা হ’লে তিনি তা তার মাথার মাঝখানে বসালেন এবং তাঁর মাথা ও শরীর চিরে দ্বিখন্ডিত করে ফেললেন। তারপর রাজার সহচরকে আনা হ’ল এবং তাকেও তার ধর্ম ত্যাগ করতে বলা হ’ল। কিন্তু সেও অস্বীকৃতি জানালে তাকেও করাত দিয়ে চিরে দ্বিখন্ডিত করা হ’ল।

    তারপর বালকটিকে হাযির করে তার ধর্ম পরিত্যাগ করতে বলা হ’ল। বালকটিও নিজ ধর্ম পরিত্যাগ করতে অস্বীকার করল। তখন রাজা তাকে তার লোকজনের নিকট দিয়ে বললেন, ‘তোমরা একে অমুক পাহাড়ে নিয়ে যাও এবং তাকে সঙ্গে করে পাহাড়ে আরোহণ করতে থাক। যখন তোমরা পাহাড়ের উচ্চশৃঙ্গে পৌঁছবে, তখন তাকে তার ধর্ম পরিত্যাগ করতে বলবে। সে যদি অস্বীকার করে, তাহ’লে তোমরা তাকে সেখান থেকে নীচে ছুঁড়ে ফেলে দিবে’। তারা বালকটিকে নিয়ে পাহাড়ের উপরে উঠলে বালকটি দো‘আ করল, ‘হে আল্লাহ! তোমার যেভাবে ইচ্ছা হয়, সেভাবে তুমি আমাকে এদের কাছ থেকে রক্ষা কর’। তৎক্ষণাৎ পাহাড়টি কম্পিত হয়ে উঠল এবং তারা নীচে পড়ে মারা গেল। আর বালকটি (সুস্থ দেহে) রাজার নিকট এসে উপস্থিত হ’ল। রাজা তখন তাকে বললেন, ‘তোমার সঙ্গীদের কি হ’ল’? তখন সে বলল, আল্লাহই আমাকে তাদের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।

    তারপর রাজা তাকে তার একদল লোকের নিকট সোপর্দ করে আদেশ দিলেন, ‘একে একটি বড় নৌকায় উঠিয়ে  নদীর মাঝখানে নিয়ে যাও। যদি সে নিজ ধর্ম পরিত্যাগ করে, তো ভাল। নচেৎ তাকে নদীতে নিক্ষেপ কর’। তারা বালকটিকে নিয়ে মাঝ নদীতে পৌঁছলে বালকটি পূর্বের ন্যায় দো‘আ করল, ‘হে আল্লাহ! তোমার যেভাবে ইচ্ছা হয়, সেভাবে তুমি আমাকে এদের হাত থেকে রক্ষা কর’। এতে নৌকা ভীষণভাবে কাত হয়ে পড়ল। ফলে রাজার লোকজন নদীতে ডুবে মারা গেল। আর বালকটি (সুস্থ দেহে) রাজার নিকটে আসলে রাজা তাকে বললেন, তোমার সঙ্গীদের কি অবস্থা? সে বলল, আল্লাহই আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এরপর সে রাজাকে বলল, ‘আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন আমাকে কোনভাবেই হত্যা করতে পারবেন না। যতক্ষণ না আমি যা বলব, আপনি তা করবেন। রাজা বললেন, ‘সেটা কি’? বালকটি বলল, ‘আপনি একটি বিস্তীর্ণ মাঠে  সকল লোককে হাযির করুন এবং সেই মাঠে খেজুরের একটি গুঁড়ি পুঁতে তার উপরিভাগে আমাকে বেঁধে রাখুন। তারপর আমার তূনীর হ’তে একটি তীর নিয়ে ধনুকে সংযোজিত করুন। তারপর  بِسْمِ اللهِ ربِّ الْغُلاَمِ (বালকটির রব আল্লাহর নামে) বলে আমার দিকে তীরটি নিক্ষেপ করুন। আপনি যদি এ পন্থা অবলম্বন করেন, তবেই আমাকে হত্যা করতে পারবেন’।

    বালকের কথামত এক বিস্তীর্ণ মাঠে রাজা সকল লোককে সমবেত করলেন এবং বালকটিকে একটি খেজুর গাছের গুঁড়ির উপরে বাঁধলেন। তারপর রাজা বালকটির তূনীর হ’তে একটি তীর নিয়ে ধনুকের মধ্যভাগে সংযোজিত করলেন। তারপর بِسْمِ اللهِ ربِّ الْغُلاَمِ বলে বালকটির দিকে তীর নিক্ষেপ করলেন। তীরটি বালকের চোখ ও কানের মধ্যভাগে বিদ্ধ হ’ল। বালকটি এক হাতে তীরবিদ্ধ স্থানটি চেপে ধরল। অতঃপর সে মারা গেল।

    এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত জনগণ বলে উঠল, ‘আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম’।

    তারপর রাজার লোকজন তাঁর নিকট গিয়ে বলল, ‘আপনি যা আশঙ্কা করছিলেন তাই শেষ পর্যন্ত ঘটে গেল। সব লোক বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনল’। তখন রাজা রাস্তাগুলির চৌমাথায় প্রকান্ড গর্ত খনন করার নির্দেশ দিলেন। তার কথা মতো গর্ত খনন করে তাতে আগুন প্রজ্জ্বলিত করা হ’ল। তারপর রাজা হুকুম দিলেন, ‘যে ব্যক্তি বালকের ধর্ম পরিত্যাগ করবে না, তাকে ঐ আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মার। অথবা তাকে বলবে, তুমি এই আগুনে ঝাঁপ দাও। রাজার লোকেরা তার হুকুম পালন করতে লাগল। ইতিমধ্যে একজন রমণীকে তার শিশুসন্তানসহ উপস্থিত করা হ’ল। রমণীটি আগুনে ঝাঁপ দিতে ইতস্ততঃ করতে থাকলে শিশুটি বলে উঠল, ‘মা ছবর অবলম্বন (করতঃ আগুনে প্রবেশ) করুন। কেননা আপনি হক পথে আছেন’।

    পবিত্র কুরআনের সূরা বুরূজে এ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস হয়েছিল গর্তওয়ালারা- ইন্ধনপূর্ণ যে গর্তে ছিল অগ্নি, যখন তারা তার পাশে উপবিষ্ট ছিল এবং তারা মুমিনদের সাথে যা করছিল তা প্রত্যক্ষ করছিল। তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু একারণে যে, তারা বিশ্বাস করত পরাক্রমশালী ও প্রশংসার্হ আল্লাহে’ (বুরূজ ৪-৮)।

    [ছহীহ মুসলিম হা/৩০০৫ ‘যুহদ ও রিক্বাক্ব’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৭, ছুহাইব বিন সিনান আর-রূমী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, আহমাদ হা/২৩৯৭৬]।

    শিক্ষা :

    ১. প্রত্যেকটি আদম সন্তান স্বভাবধর্ম ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে।

    ২. মুমিন বান্দা সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করবে ও কায়মনোবাক্যে তাঁর নিকট দো‘আ করবে।

    ৩. রোগমুক্তির মালিক একমাত্র আল্লাহ; কোন পীর-ফকীর বা সাধু-সন্ন্যাসী নয়।

    ৪. আল্লাহর পথের নির্ভীক সৈনিকেরা বাতিলের সামনে কখনো মাথা নত করে না।

    ৫. মুমিন দুনিয়াবী জীবনে পদে পদে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তার ঈমানের মযবূতী পরখ করেন।

    ৬. হক্বের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

    কুষ্ঠরোগী ,  অন্ধ ও টেকোর কাহিনী

    বনী ইসরাঈলের মাঝে তিনজন ব্যক্তি ছিল- কুষ্ঠরোগী, টেকো ও অন্ধ। মহান আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন এবং তাদের নিকট একজন ফেরেশতা পাঠালেন। অতঃপর কুষ্ঠরোগীর কাছে এসে তিনি বললেন, ‘তোমার সবচেয়ে পসন্দের জিনিস কোন্টি’? সে বলল, ‘সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। কেননা মানুষ আমাকে ঘৃণা করে’। ফেরেশতা তার শরীরে হাত বুলালেন। এতে তার রোগ দূর হ’ল এবং তাকে সুন্দর বর্ণ ও সুন্দর চামড়া দান করা হ’ল। অতঃপর তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার নিকট কোন্ সম্পদ সবচেয়ে বেশী পসন্দনীয়? সে বলল, উট অথবা গরু’। এ ব্যাপারে বর্ণনাকারীর সন্দেহ রয়েছে যে, কুষ্ঠরোগী বা টেকো দু’জনের একজন বলেছিল উট আর অপরজন বলেছিল গরু। তাকে তখন দশ মাসের গর্ভবতী একটি উটনী দেয়া হ’ল। ফেরেশতা বললেন, ‘আল্লাহ এতে তোমায় বরকত দিন’। তারপর তিনি টেকো ব্যক্তির কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার সবচেয়ে পসন্দের জিনিস কেন্টি’? সে বলল, ‘সুন্দর চুল এবং এই টাক হ’তে মুক্তি, লোকেরা যার কারণে আমাকে ঘৃণা করে’। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তার মাথায় হাত বুলালেন। এতে তার টাক ভাল হয়ে গেল এবং তাকে সুন্দর চুল দান করা হ’ল। এরপর ফেরেশতা বললেন, ‘কোন্ মাল তোমার নিকট অধিক প্রিয়’? সে বলল, গরু। বর্ণনাকারী বলেন, তখন তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দেয়া হ’ল। ফেরেশতা বললেন, আল্লাহ এতে তোমাকে বরকত দিন। তারপর ফেরেশতা অন্ধ ব্যক্তির কাছে এসে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার অধিক পসন্দের জিনিস কোনটি’? সে বলল, ‘আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিন, আমি যাতে মানুষকে দেখতে পারি’। ফেরেশতা তার চোখ স্পর্শ করলেন। এতে তার চোখের দৃষ্টি আল্লাহ ফিরিয়ে দিলেন। এরপর ফেরেশতা প্রশ্ন করলেন, ‘কোন্ মাল তোমার নিকট অধিক প্রিয়’? সে বলল, ছাগল। তাকে তখন এমন ছাগী দেয়া হ’ল, যা অধিকসংখ্যক বাচ্চা দেয়। তারপর উট, গাভী ও ছাগলের বাচ্চা হ’ল। ফলে একজনের উটে ময়দান ভরে গেল, অপরজনের গরুতে মাঠ পূর্ণ হয়ে গেল এবং আর একজনের ছাগলে উপত্যকা ভরে গেল। তারপর ফেরেশতা কুষ্ঠরোগীর কাছে তাঁর প্রথম রূপ ধারণ করে এসে বললেন, ‘আমি একজন মিসকীন। সফরে আমার সবকিছু নিঃশেষ হয়ে গেছে। আজ আল্লাহ ব্যতীত কেউ নেই, যার সাহায্যে আমি আমার গন্তব্যে পৌঁছতে পারি, তারপর তোমার সহায়তায়। যে আল্লাহ তোমাকে সুন্দর বর্ণ, সুন্দর ত্বক ও সম্পদ দিয়েছেন, সে আল্লাহর নামে তোমার নিকট আমি একটা উট চাচ্ছি, যার সাহায্যে আমি গন্তব্যে পৌঁছতে পারি’। সে বলল, ‘(আমার উপর) অনেকের অধিকার রয়েছে’। ফেরেশতা বললেন, ‘তোমাকে বোধ হয় আমি চিনি। তুমি কি কুষ্ঠরোগী ছিলে না? লোকেরা তোমাকে কি ঘৃণা করত না? তুমি না নিঃস্ব ছিলে? অতঃপর আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন’। সে বলল, ‘এই সম্পদ তো আমি উত্তরাধিকার সূত্রে পূর্বপুরুষ থেকে পেয়েছি’। তিনি বললেন, ‘তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও, তাহ’লে তোমাকে যেন আল্লাহ আগের মতো করে দেন’।

    এরপর তিনি টেকো ব্যক্তির কাছে তাঁর প্রথম রূপ ধারণ করে এসে প্রথম লোকটিকে যা বলেছিলেন তা বললেন এবং সেও একই উত্তর দিল, যা পূর্বের লোকটি দিয়েছিল। ফেরেশতা একেও বললেন, ‘তুমি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাক, তাহ’লে আল্লাহ যেন তোমাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন’। এরপর ফেরেশতা অন্ধ ব্যক্তির কাছে তাঁর আগের রূপ ধারণ করে এসে বললেন, ‘আমি একজন মিসকীন মুসাফির। আমার সবকিছু সফরে নিঃশেষ হয়ে গেছে। এখন গন্তব্যে পৌঁছতে আল্লাহ ব্যতীত আর কোন উপায় নেই, তারপর তোমার সহায়তায়। সেই আল্লাহর নামে তোমার কাছে একটি ছাগল সাহায্য চাচ্ছি, যিনি তোমাকে তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন’। এ ছাগলটি দিয়ে আমি বাড়ি পৌঁছতে পারব। লোকটি বলল, ‘আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফেরত দিয়েছেন। আমি দরিদ্র ছিলাম, আল্লাহই আমাকে ধনী করেছেন। কাজেই তোমার যত ইচ্ছা মাল তুমি নিয়ে যাও। আল্লাহর শপথ! মহান আল্লাহর ওয়াস্তে আজ তুমি যা কিছু নিবে, তার জন্য আমি আজ তোমার নিকট কোন প্রশংসাই দাবী করব না’। ফেরেশতা বললেন, ‘তোমার সম্পদ তোমার কাছেই রাখ। তোমাদেরকে শুধুমাত্র পরীক্ষা করা হয়েছে। তোমার প্রতি আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট এবং তোমার অপর দু’জন সাথীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন’

    [আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, বুখারী হা/৩৪৬৪ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫১; মুসলিম হা/২৯৬৪, মিশকাত হা/১৮৭৮ ‘যাকাত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫]

    শিক্ষা : সর্বদা আল্লাহর নে‘মতের শোকর-গুযার হ’তে হবে।

    কা ‘ ব বিন আশরাফের মৃত্যুকাহিনী

    জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন, কা‘ব ইবনু আশরাফকে হত্যা করার জন্য কে প্রস্ত্তত আছ? কেননা সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি চান যে, আমি তাকে হত্যা করি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, তাহ’লে আমাকে কিছু প্রতারণাময় কথা বলার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন, হ্যাঁ বল। এরপর মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) কা‘ব ইবনু আশরাফের নিকট গিয়ে বললেন, এ লোকটি [রাসূল (সাঃ)] ছাদাক্বা চায় এবং সে আমাদেরকে বহু কষ্টে ফেলেছে। তাই আমি আপনার নিকট কিছু ঋণের জন্য এসেছি। কা‘ব ইবনু আশরাফ বলল, আল্লাহর কসম! পরে সে তোমাদেরকে আরো বিরক্ত ও অতিষ্ঠ করে তুলবে। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, আমরা তাঁর অনুসরণ করছি। পরিণাম কি দাঁড়ায় তা না দেখে এখনই তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করা ভাল মনে করছি না। এখন আমি আপনার কাছে এক ওসাক বা দুই ওসাক খাদ্য ধার চাই। কা‘ব ইবনু আশরাফ বলল, ধার তো পাবে তবে কিছু বন্ধক রাখ। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, কি জিনিস আপনি বন্ধক চান? সে বলল, তোমাদের স্ত্রীদেরকে বন্ধক রাখ। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ বললেন, আপনি আরবের একজন সুদর্শন ব্যক্তি। আপনার নিকট কিভাবে আমাদের স্ত্রীদেরকে বন্ধক রাখব? তখন সে বলল, তাহলে তোমাদের সন্তানদেরকে বন্ধক রাখ। তিনি বললেন, আমাদের পুত্র সন্তানদেরকে আপনার নিকট কি করে বন্ধক রাখি? তাদেরকে এ বলে সমালোচনা করা হবে যে, মাত্র এক ওসাক বা দুই ওসাকের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হয়েছে। এটা তো আমাদের জন্য খুব লজ্জাজনক বিষয়। তবে আমরা আপনার নিকট অস্ত্রশস্ত্র বন্ধক রাখতে পারি। শেষে তিনি (মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ) তার কাছে আবার যাওয়ার ওয়াদা করে চলে আসলেন।

    এরপর তিনি কা‘ব ইবনু আশরাফের দুধ ভাই আবূ নায়েলাকে সঙ্গে করে রাতের বেলা তার নিকট গেলেন। কা‘ব তাদেরকে দূর্গের মধ্যে ডেকে নিল এবং সে নিজে উপর তলা থেকে নিচে নেমে আসার জন্য প্রস্ত্তত হ’ল। তখন তার স্ত্রী বলল, এ সময় তুমি কোথায় যাচ্ছ? সে বলল, এই তো মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ এবং আমার ভাই আবূ নায়েলা এসেছে। ‘আমর ব্যতীত বর্ণনাকারীগণ বলেন যে, কা‘বের স্ত্রী বলল, আমি তো এমনই একটি ডাক শুতে পাচ্ছি যার থেকে রক্তের ফোঁটা ঝরছে বলে আমার মনে হচ্ছে। কা‘ব ইবনু আশরাফ বলল, মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ এবং দুধ ভাই আবূ নায়েলা (অপরিচিত কোন লোক তো নয়)। ভদ্র মানুষকে রাতের বেলা বর্শা বিদ্ধ করার জন্য ডাকলে তার যাওয়া উচিত। (বর্ণনাকারী বলেন) মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) সঙ্গে আরো দুই ব্যক্তিকে নিয়ে সেখানে গেলেন। সুফইয়ানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, ‘আমর কি তাদের দু’জনের নাম উল্লেখ করেছিলেন? উত্তরে সুফইয়ান বললেন, একজনের নাম উল্লেখ করেছিলেন। ‘আমর বর্ণনা করেন যে, তিনি আরো দু’জন মানুষ সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন, যখন সে (কা‘ব ইবনু আশরাফ) আসবে। ‘আমর ব্যতীত অন্যান্য রাবীগণ (মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামার সাথীদের সম্পর্কে) বলেছেন যে, (তারা হ’লেন) আবূ আবস্ ইবনু জাবর, হারিছ ইবনু আওস এবং আববাদ ইবনু বিশর। ‘আমর বলেছেন, তিনি অপর দুই লোককে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেন, যখন সে আসবে তখন আমি তার মাথার চুল ধরে শুঁকতে থাকব। যখন তোমরা আমাকে দেখবে যে, খুব শক্তভাবে আমি তার মাথা অাঁকড়িয়ে ধরেছি, তখন তোমরা তরবারি দ্বারা তাকে আঘাত করবে। তিনি (মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ) একবার বলেছিলেন যে, আমি তোমাদেরকেও শুঁকাব। সে (কা‘ব) চাদর নিয়ে নীচে নেমে আসলে তার শরীর থেকে সুঘ্রাণ বের হচ্ছিল। তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, আজকের মত এতো উত্তম সুগন্ধি আমি আর কখনো দেখিনি। ‘আমর ব্যতীত অন্যান্য রাবীগণ বর্ণনা করেছেন যে, কা‘ব বলল, আমার নিকট আরবের সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাসম্পন্ন সুগন্ধী ব্যবহারকারী মহিলা আছে। ‘আমর বলেন, মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, আমাকে আপনার মাথা শুঁকতে অনুমতি দেবেন কি? সে বলল, হ্যাঁ। এরপর তিনি তার মাথা শুঁকলেন এবং এরপর তার সাথীদেরকে শুঁকালেন। তারপর তিনি আবার বললেন, ‘আমাকে আবার শুঁকবার অনুমতি দেবেন কি? সে বলল, হ্যাঁ। এরপর তিনি তাকে কাবু করে ধরে সাথীদেরকে বললেন, তোমরা তাকে হত্যা কর। তাঁরা তাকে হত্যা করলেন। এরপর নবী (সাঃ)-এর নিকট এসে এ খবর দিলেন।

    [বুখারী হা/৪০৩৭ ‘মাগাযী’ অধ্যায়, ‘কা‘ব ইবনু আশরাফের হত্যা’ অনুচ্ছেদ, মুসলিম হা/১৮০১]

    শিক্ষা :

    ১. রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি ভালবাসা ব্যতীত মুমিন হওয়া যাবে না।

    ২. পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

    পাহাড়ের গুহায় আঁটকে পড়া তিন যুবক

    একবার তিনজন লোক পথ চলছিল, এমন সময় তারা বৃষ্টিতে আক্রান্ত হ’ল। অতঃপর তারা এক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিল। হঠাৎ পাহাড় হ’তে এক খন্ড পাথর পড়ে তাদের গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তখন তারা একে অপরকে বলল, নিজেদের কৃত কিছু সৎকাজের কথা চিন্তা করে বের কর, যা আললাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমরা করেছ এবং তার মাধ্যমে আললাহর নিকট দো‘আ কর। তাহ’লে হয়ত আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর হ’তে পাথরটি সরিয়ে দিবেন।

    তাদের একজন বলতে লাগল, হে আল্লাহ্‌! আমার আববা-আম্মা খুব বৃদ্ধ ছিলেন এবং আমার ছোট ছোট সন্তানও ছিল। আমি তাদের ভরণ-পোষণের জন্য পশু পালন করতাম। সন্ধ্যায় যখন আমি বাড়ি ফিরতাম তখন দুধ দোহন করতাম এবং আমার সন্তান্দের  আগে আমার আববা-আম্মাকে পান করাতাম। একদিন আমার ফিরতে দেরী হয় এবং সন্ধ্যা হওয়ার আগে আসতে পারলাম না। এসে দেখি তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি দুধ দোহন করলাম, যেমন প্রতিদিন দোহন করি। তারপর আমি তাঁদের শিয়রে (দুধ নিয়ে) দাঁড়িয়ে রইলাম। তাদেরকে জাগানো আমি পছন্দ করিনি এবং তাদের আগে আমার বাচ্চাদেরকে পান করানোও সঙ্গত মনে করিনি। অথচ বাচ্চাগুলো দুধের জন্য আমার পায়ের কাছে পড়ে কান্নাকাটি করছিল। এভাবে ভোর হয়ে গেল। হে আল্লাহ্‌! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্যই এ কাজটি করে থাকি তবে আপনি আমাদের হ’তে পাথরটা খানিক সরিয়ে দিন, যাতে আমরা আসমানটা দেখতে পাই। তখন আল্লাহ পাথরটাকে একটু সরিয়ে দিলেন এবং তারা আসমান দেখতে পেল।

    দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ্‌! আমার এক চাচাতো বোন ছিল। পুরুষরা যেমন মহিলাদেরকে ভালবাসে,আমি   তাকে  তার চেয়েও অধিক ভালবাসতাম। একদিন আমি তার কাছে চেয়ে বসলাম (অর্থাৎ খারাপ কাজ করতে চাইলাম)। কিন্তু তা সে অস্বীকার করল যে পর্যন্ত না আমি তার জন্য একশ’ দিনার নিয়ে আসি। পরে চেষ্টা করে আমি তা যোগাড় করলাম (এবং তার কাছে এলাম)। যখন আমি তার দু’পায়ের মাঝে বসলাম (অর্থাৎ সম্ভোগ করতে তৈরী হলাম) তখন সে বলল, হে আললাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয়  কর। অন্যায়ভাবে মোহর (পর্দা) ছিঁড়ে দিয়ো না। (অর্থাৎ আমার সতীত্ব নষ্ট করো না)। তখন আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। হে আল্লাহ! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে আপনি আমাদের জন্য পাথরটা সরিয়ে দিন। তখন পাথরটা কিছুটা সরে গেল।

    তৃতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ্‌! আমি এক ‘ফারাক’ চাউলের বিনিময়ে একজন শ্রমিক নিযুক্ত করেছিলাম। যখন সে তার কাজ শেষ করল আমাকে বলল, আমার পাওনা দিয়ে দাও। আমি তাকে তার পাওনা দিতে গেলে সে তা নিল না। আমি তা দিয়ে কৃষি কাজ করতে লাগলাম এবং এর দ্বারা অনেক গরু ও তার রাখাল জমা করলাম। বেশ কিছু দিন পর সে আমার কাছে আসল এবং বলল, আল্লাহকে ভয় কর (আমার মজুরী দাও)। আমি বললাম, এই সব গরু ও রাখাল নিয়ে নাও। সে বলল, আল্লাহকে ভয় কর, আমার সাথে ঠাট্টা কর না। আমি বললাম, আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না, ঐগুলো নিয়ে নাও। তখন সে তা নিয়ে গেল। হে আল্লাহ! আপনি জানেন, যদি আমি আপনার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে পাথরের বাকীটুকু সরিয়ে দিন। তখন আল্লাহ পাথরটাকে সরিয়ে দিলেন।

    (আব্দুললাহ ইবনু ওমর  (রাঃ)  হ’তে  বর্ণিত,  বুখারী  হা/২৩৩৩,  ‘চাষাবাদ’  অধ্যায়, অনুচেছদ-১৩; মুসলিম হা/২৭৪৩, মিশকাত হা/৪৯৩৮)।

    শিক্ষা :

    ১. বান্দা সুখে-দুঃখে সর্বদা আল্লাহকে ডাকবে।

    ২. বিপদাপদের সময় আল্লাহকে ব্যতীত কোন মৃত ব্যক্তি বা অন্য কাউকে ডাকা শিরকে আকবর বা বড় শিরক।

    ৩. সৎ আমলকে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করতে হবে।

    ৪. পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে হবে এবং স্ত্রী ও সন্তানদের উপর তাদেরকে প্রাধান্য দিতে হবে।

    ৫. শ্রমিককে তার ন্যায্য পাওনা প্রদান করতে হবে।

    খোবায়েবের শাহাদাতবরণ

    রাসূল (সাঃ) একবার দশ ব্যক্তিকে গোয়েন্দা হিসাবে সংবাদ সংগ্রহের জন্য পাঠালেন এবং আছিম ইবনু ছাবিত আনছারীকে তাঁদের নেতা নিযুক্ত করেন, যিনি আছিম ইবনু ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবের নানা ছিলেন। তাঁরা রওনা করলেন, যখন তাঁরা উসফান ও মক্কার মাঝে ‘হাদআত’ নামক স্থানে পৌঁছেন, তখন হুযায়েল গোত্রের একটি প্রশাখা- যাদেরকে লেহইয়ান বলা হয়, তাদের নিকট তাঁদের ব্যাপারে আলোচনা করা হয়। তারা প্রায় দু’শত তীরন্দাজকে তাঁদের পিছু ধাওয়ার জন্য পাঠান। এরা তাঁদের পদচিহ্ন দেখে চলতে থাকে। ছাহাবীগণ মদীনা হ’তে সঙ্গে নিয়ে আসা খেজুর যেখানে বসে খেয়েছিলেন, অবশেষে এরা সে স্থানের সন্ধান পেয়ে গেল। তখন এরা বলল, এগুলো ইয়াছরিবের (মদীনা) খেজুর। অতঃপর এরা তাঁদের পদচিহ্ন দেখে চলতে লাগল। যখন আছিম ও তাঁর সাথীগণ এদের দেখলেন, তখন তাঁরা একটি উঁচু স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। আর কাফিররা তাঁদের ঘিরে ফেলল এবং তাঁদেরকে বলতে লাগল, তোমরা অবতরণ কর ও স্বেচ্ছায় বন্দীত্ব বরণ কর। আমরা তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, তোমাদের মধ্য হ’তে কাউকে আমরা হত্যা করব না। তখন গোয়েন্দা দলের নেতা আছিম ইবনু ছাবিত (রাঃ) বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি তো আজ কাফিরদের নিরাপত্তায় অবতরণ করব না। হে আল্লাহ! আমাদের পক্ষ থেকে আপনার নবীকে সংবাদ পৌঁছিয়ে দিন।’ অবশেষে কাফিররা তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। আর তারা আছিম (রাঃ) সহ সাত জনকে শহীদ করল।

    অতঃপর অবশিষ্ট তিনজন খুবাইব আনছারী, যায়দ ইবনু দাছিনা (রাঃ) ও অপর একজন তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের উপর নির্ভর করে তাদের নিকট অবতরণ করলেন। যখন কাফিররা তাদেরকে আয়ত্বে নিয়ে নিল, তখন তারা তাদের ধনুকের রশি খুলে ফেলে তাঁদেরকে বেঁধে ফেলল। তখন তৃতীয় জন বলে উঠলেন, ‘গোড়াতেই বিশ্বাসঘাতকতা! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের সঙ্গে যাব না, যাঁরা শহীদ হয়েছেন আমি তাঁদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করব’। ফলে তারা তাকে টেনে-হিঁচড়ে তাদের সাথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু তিনি যেতে অস্বীকার করলে কাফিররা তাঁকে শহীদ করে ফেলে এবং খুবাইব ও ইবনু দাছিনাকে নিয়ে চলে যায়। অবশেষে তাঁদের উভয়কে মক্কায় বিক্রয় করে ফেলে।

    এটা বদর যুদ্ধের পরের কথা। তখন খুবাইবকে হারিছ ইবনু ‘আমিরের পুত্রগণ ক্রয় করে নেয়। আর বদর যুদ্ধের দিন খুবাইব (রাঃ) হারিছ ইবনু ‘আমিরকে হত্যা করেছিলেন। খুবাইব (রাঃ) কিছু দিন তাদের নিকট বন্দী থাকেন। ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, আমাকে ওবায়দুল্লাহ ইবনু ইয়ায অবহিত করেছেন, তাঁকে হারিছের কন্যা জানিয়েছে যে, যখন হারিছের পুত্রগণ খুবাইব (রাঃ)-কে শহীদ করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিল, তখন তিনি তার কাছ থেকে ক্ষৌরকার্য সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে একটা ক্ষুর ধার চাইলেন। তখন হারিছের কন্যা তাকে একখানা ক্ষুর ধার দিল। সে সময় ঘটনাক্রমে আমার এক ছেলে আমার অজ্ঞাতে খুবাইবের নিকট চলে গেলে তিনি তাকে ধরেন এবং আমি দেখলাম যে, আমার ছেলে খুবাইবের উরুর উপর বসে রয়েছে এবং খুবাইবের হাতে রয়েছে ক্ষুর। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। খুবাইব আমার চেহারা দেখে তা বুঝতে পারলেন। তখন তিনি বললেন, তুমি কি এ ভয় করছ যে, আমি এ শিশুটিকে হত্যা করে ফেলব? কখনো আমি তা করব না। আল্লাহর কসম! আমি খুবাইবের মত উত্তম বন্দী কখনো দেখিনি। আল্লাহর শপথ! আমি একদা দেখলাম, তিনি লোহার শিকলে আবদ্ধ অবস্থায় ছড়া হ’তে আঙ্গুর খাচ্ছেন, যা তাঁর হাতেই ছিল। অথচ এ সময় মক্কায় কোন ফলই পাওয়া যাচ্ছিল না। হারিছের কন্যা বলতো, এ তো ছিল আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হ’তে প্রদত্ত জীবিকা, যা তিনি খুবাইবকে দান করেছেন। অতঃপর তারা খুবাইবকে শহীদ করার উদ্দেশ্যে হারামের নিকট হ’তে হিল্লের দিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল, তখন খুবাইব (রাঃ) তাদেরকে বললেন, আমাকে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করতে দাও। তারা তাঁকে সে অনুমতি দিল। তিনি দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করে নিলেন। অতঃপর তিনি বললেন, ‘তোমরা যদি ধারণা না করতে যে, আমি মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছি তবে আমি ছালাতকে দীর্ঘ করতাম। হে আল্লাহ! তাদেরকে এক এক করে ধ্বংস করুন।’ (অতঃপর তিনি এ কবিতা দু’টি আবৃত্তি করলেন)

    وَلَسْتُ أُبَالِىْ حِيْنَ أُقْتَلُ مُسْلِمًا * عَلَى أَىِّ شِقٍّ كَانَ لِلَّهِ مَصْرَعِىْ

    وَذَلِكَ فِىْ ذَاتِ الْإِلَهِ وَإِنْ يَشَأْ * يُبَارِكْ عَلَى أَوْصَالِ شِلْوٍ مُمَزَّعِ

    ‘আমি কোন কিছুরই পরোয়া করিনা যখন আমি মুসলিম হিসাবে নিহত হই। আল্লাহর রাহে যেভাবেই আমাকে পর্যদুস্ত করা হউক, তা কেবল আল্লাহর জন্যই করা হচ্ছে। তিনি ইচ্ছা করলে আমার বিচ্ছিন্ন অঙ্গ সমূহে বরকত দান করবেন’।

    অবশেষে হারিছের পুত্র তাঁকে শহীদ করে ফেলে। বস্ত্তত যে মুসলিম ব্যক্তিকে বন্দী অবস্থায় শহীদ করা হয় তার জন্য দু’রাক‘আত ছালাত আদায়ের এ রীতি খুবাইব (রাঃ)-ই প্রবর্তন করে গেছেন। যেদিন আছিম (রাঃ) শাহাদতবরণ করেছিলেন, সেদিন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দো‘আ কবুল করেছিলেন। সেদিনই আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাঁর ছাহাবীগণকে তাঁদের সংবাদ ও তাঁদের উপর যা যা আপতিত হয়েছিল সবই অবহিত করেছিলেন। আর যখন কুরাইশ কাফিরদেরকে এ সংবাদ পৌঁছানো হয় যে, আছিম (রাঃ)-কে শহীদ করা হয়েছে তখন তারা তাঁর কাছে এক লোককে পাঠায়, যাতে সে ব্যক্তি তাঁর লাশ হ’তে কিছু অংশ কেটে নিয়ে আসে, যেন তারা তা দেখে চিনতে পারে। কারণ বদর যুদ্ধের দিন আছিম (রাঃ) কুরাইশদের এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন। আছিমের লাশের (রক্ষার জন্য) মৌমাছির ঝাঁক প্রেরিত হ’ল, যারা তাঁর দেহ আবৃত করে রেখে তাদের ষড়যন্ত্র হ’তে হেফাযত করল। ফলে তারা তাঁর শরীর হ’তে এক খন্ড গোশতও কেটে নিতে পারেনি।

    [আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, বুখারী হা/৩০৪৫ ‘জিহাদ ও সিয়ার’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৭০, আহমাদ হা/৭৯১৫]

    শিক্ষা :

    ১. সর্বদা নেতার অধীনে সংঘবদ্ধ জীবন যাপন করতে হবে।

    ২. ওয়াদা ভঙ্গ করা কাফির-মুশরিকদের চিরাচরিত অভ্যাস।

    ৩. নারী ও শিশুর প্রতি ইসলামের সহমর্মিতা সীমাহীন। এজন্য যুদ্ধের ময়দানেও তাদেরকে আক্রমণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।

    ৪. শাহাদাত মুমিনের কাঙ্খিত লক্ষ্য।

    তওবার অপূর্ব নিদর্শন

    একদা মা‘য়িয বিন মালিক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে পবিত্র করুন’। তিনি বললেন, ‘ধিক তোমাকে! তুমি চলে যাও। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং তওবা কর’। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি চলে গেলেন এবং সামান্য একটু দূরে গিয়ে পুনরায় ফিরে আসলেন এবং আবারও বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে পবিত্র করুন’। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবারও তাকে পূর্বের ন্যায় বললেন। এভাবে তিনি যখন চতুর্থ বার এসে বললেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি তোমাকে কোন্ জিনিস হ’তে পবিত্র করব’? তিনি বললেন, ‘যেনা হ’তে’। তার কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) (ছাহাবীগণকে) জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ লোকটি কি পাগল’? লোকেরা বলল, ‘না, সে পাগল নয়’। তিনি আবার বললেন, ‘লোকটি কি মদ পান করেছে’? তৎক্ষণাৎ এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে তার মুখ শুঁকে তার মুখ হ’তে মদের কোন গন্ধ পেল না।

    অতঃপর তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি সত্যিই যেনা করেছ’? সে বলল, ‘হ্যাঁ’। এরপর তিনি রজমের নির্দেশ দিলেন, তখন তাকে রজম করা হ’ল। এ ঘটনার দু’তিন দিন পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) (ছাহাবীগণের নিকট) এসে বললেন, ‘তোমরা মা‘য়িয বিন মালিকের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। বর্ণনাকারী বলেন, তখন ছাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ মা‘য়িয বিন মালিককে ক্ষমা করুন। এরপর রাসূল (সাঃ) বললেন, ‘সে এমন তওবা করেছে, যদি তা সমস্ত উম্মতের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হয়, তবে তা সকলের জন্য যথেষ্ট হবে’।

    এরপর আযদ বংশের গামেদী গোত্রীয় এক মহিলা এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে পবিত্র করুন’। তিনি বললেন, ‘ধিক তোমাকে! তুমি চলে যাও। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং তওবা কর’। তখন মহিলাটি বলল, ‘আপনি মা‘য়িয বিন মালিককে যেভাবে ফিরিয়ে দিয়েছেন, আমাকেও কি সেভাবে ফিরিয়ে দিতে চান? আমার গর্ভের এই সন্তান যেনার’। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি (সত্যই অন্তঃসত্তা)? মহিলাটি বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, ‘যাও, তোমার পেটের বাচ্চা প্রসব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর’। বর্ণনাকারী বলেন, ‘আনছারী এক লোক মহিলাটির সন্তান হওয়া পর্যন্ত তাকে নিজের তত্ত্বাবধানে নিয়ে গেলেন। সন্তান প্রসব হওয়ার পর ঐ লোকটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর খেদমতে এসে বলল, গামেদী মহিলাটি সন্তান প্রসব করেছে। এবার তিনি (সাঃ) বললেন, ‘এ শিশু বাচ্চাটিকে রেখে আমরা মহিলাটিকে রজম (পাথর মেরে হত্যা) করতে পারি না’। কারণ তাকে দুধ পান করানোর মতো কেউ নেই। এ সময়  জনৈক আনছারী দাঁড়িয়ে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি তার দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করব’। রাবী বলেন, তখন তিনি তাকে রজম করলেন।

    অন্য এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মহিলাটিকে বললেন, ‘তুমি চলে যাও এবং সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর’। অতঃপর সন্তান প্রসবের পর যখন সে আসল, তখন তিনি বললেন, ‘আবার চলে যাও এবং তাকে দুধ পান করাও এবং দুধ ছাড়ানো পর্যন্ত অপেক্ষা কর’। পরে যখন বাচ্চাটির দুধ খাওয়া বন্ধ হয়, তখন মহিলাটি বাচ্চার হাতে এক খন্ড রুটির টুকরা দিয়ে তাকে সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর খেদমতে হাযির হ’ল। এবার মহিলাটি এসে বলল, ‘হে আল্লাহর নবী! এই দেখুন আমি তাকে দুধ ছাড়িয়েছি, এমনকি সে নিজে হাতে খানাও খেতে পারে’। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বাচ্চাটিকে একজন মুসলমানের হাতে তুলে দিলেন। পরে মহিলাটির জন্য গর্ত খোঁড়ার নির্দেশ দিলেন। তার জন্য বক্ষ পর্যন্ত গর্ত খনন করা হ’ল। এরপর জনগণকে নির্দেশ দিলেন, তারা মহিলাটিকে রজম করল।

    খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তার মাথায় এক খন্ড পাথর নিক্ষেপ করলে রক্ত ছিটে এসে তার মুখমন্ডলের উপর পড়ল। তখন তিনি মহিলাটিকে গাল-মন্দ করলেন। তা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন ‘থাম হে খালেদ! যার হাতে আমার জীবন তার কসম করে বলছি, এই মহিলা এমন তওবা করেছে, যদি রাজস্ব আদায়ে কারচুপিকারী ব্যক্তিও এমন তওবা করত, তাহ’লে তাকেও ক্ষমা করা হ’ত’। অতঃপর তিনি ঐ মহিলার জানাযার ছালাত আদায়ের আদেশ দিলেন এবং নিজে তার জানাযা পড়লেন। অতঃপর তাকে দাফন করা হ’ল।

    অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার জানাযা পড়লে ওমর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর নবী! আপনি তার জানাযা পড়লেন? অথচ সে যেনা করেছে? জবাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘এ মহিলা এমন তওবা করেছে যে, তা সত্তর জন মদীনাবাসীর মধ্যে বণ্টন করে দিলেও যথেষ্ট হয়ে যেত। তুমি কি এর চাইতে উত্তম কোন তওবা পাবে, যে ব্যক্তি স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে?’।

    [বুরায়দাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, মুসলিম হা/১৬৯৫-৯৬, মিশকাত হা/৩৫৬২ ‘দন্ডবিধি’ অধ্যায়]।

    শিক্ষা :

    বান্দার গোনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যম হ’ল তওবা। সে এর মাধ্যমে পূত-পবিত্র হয়ে মহান আল্লাহর প্রিয়ভাজন হ’তে পারে।

    মুমিনের কারামত

    বনী ইসরাঈলের জনৈক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তির নিকট এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা কর্য চাইলে কর্যদাতা বলল, কয়েকজন লোক নিয়ে আস, আমি তাদেরকে সাক্ষী রাখব। গ্রহীতা বলল, ‘আল্লাহই সাক্ষী হিসাবে যথেষ্ট’। কর্যদাতা পুনরায় বলল, তবে একজন যামিনদার উপস্থিত কর! সে বলল, ‘আল্লাহই যামিনদার হিসাবে যথেষ্ট’। তখন কর্যদাতা বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। তারপর সে নির্ধারিত সময়ে পরিশোধের শর্তে তাকে এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা ধার দিল। অতঃপর সে (গ্রহীতা) সমুদ্রযাত্রা করল এবং তার (ব্যবসায়িক) প্রয়োজন পূরণ করল। পরিশোধের সময় ঘনিয়ে আসলে সে যানবাহন খুঁজতে লাগল, যাতে নির্ধারিত সময়ে কর্যদাতার নিকট এসে পৌঁছতে পারে। কিন্তু সে কোন যানবাহন পেল না। তখন সে এক টুকরো কাঠ নিয়ে তা ছিদ্র করল এবং কর্যদাতার নামে একখানা চিঠি ও এক হাযার দীনার ওর মধ্যে পুরে ছিদ্রটি বন্ধ করে দিল। তারপর ঐ কাষ্ঠখন্ডটা সমুদ্র তীরে নিয়ে গিয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ! তুমি তো জান, আমি অমুকের নিকট এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা কর্য চাইলে সে আমার কাছ থেকে যামিনদার চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম, আল্লাহই যামিনদার হিসাবে যথেষ্ট। এতে সে রাযী হয়ে যায় (এবং আমাকে ধার দেয়)। তারপর সে আমার কাছে সাক্ষী চেয়েছিল, আমি বলেছিলাম, সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। তাতে সে রাযী হয়ে যায়। আমি তার প্রাপ্য তার নিকট পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যানবাহনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম, কিন্তু পেলাম না। আমি ঐ এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা তোমার নিকট আমানত রাখছি। এই বলে সে কাষ্ঠখন্ডটা সমুদ্রবক্ষে নিক্ষেপ করল। তৎক্ষণাৎ তা সমুদ্রের মধ্যে ভেসে চলে গেল। অতঃপর লোকটি ফিরে গেল এবং নিজের শহরে যাওয়ার  জন্য যানবাহন খুঁজতে লাগল।

    ওদিকে কর্যদাতা (নির্ধারিত দিনে) এ আশায় সমুদ্রতীরে গেল যে, হয়তবা ঋণগ্রহীতা তার পাওনা টাকা নিয়ে কোন নৌযানে চড়ে এসে পড়েছে। ঘটনাক্রমে ঐ কাষ্ঠখন্ডটা তার নযরে পড়ল, যার ভিতরে স্বর্ণমুদ্রা ছিল। সে তা পরিবারের জ্বালানির জন্য বাড়ী নিয়ে গেল। যখন কাঠের টুকরাটা চিরল, তখন ঐ স্বর্ণমুদ্রা ও চিঠিটা পেয়ে গেল। কিছুদিন পর ঋণগ্রহীতা এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে (পাওনাদারের নিকট) এসে হাযির হ’ল। সে বলল, আল্লাহর কসম! আমি তোমার (প্রাপ্য) মাল যথাসময়ে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যানবাহনের খোঁজে সর্বদা চেষ্টিত ছিলাম। কিন্তু যে জাহাযটিতে করে আমি এখন এসেছি এর আগে আর কোন জাহাযই পাইনি (তাই সময়মত আসতে পারলাম না)। কর্যদাতা বললেন, তুমি কি আমার নিকট কিছু পাঠিয়েছিলে? ঋণগ্রহীতা বলল, আমি তো তোমাকে বললামই যে, এর আগে আর কোন জাহাযই পাইনি। অতঃপর ঋণদাতা বলল, আল্লাহ পাক আমার নিকট তা পৌঁছিয়েছেন, যা তুমি পত্রসহ কাষ্ঠখন্ডে পাঠিয়েছিলে। কাজেই এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে আনন্দচিত্তে ফিরে যাও [আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, ছহীহ বুখারী হা/২২৯১, ‘যামিন হওয়া’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১]।

    শিক্ষা :

    ১. সর্বদা আল্লাহর উপর অবিচল বিশ্বাস ও আস্থা প্রকৃত মুমিনের অন্যতম গুণ।

    ২. বিনা সূদে ‘করযে হাসানা’ বা উত্তম ঋণ প্রদানের বহুগুণ প্রতিদান রয়েছে (বাক্বারাহ ২৪৫)।

    ৩. নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ পরিশোধের জন্য ঋণগ্রহীতা যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন।

    ৪. ঋণ পরিশোধের সদিচ্ছা থাকলে আল্লাহ পাক তার ব্যবস্থা করে দেন।

    সোনাভর্তি কলস

    এক লোক অপর লোক হ’তে একখন্ড জমি ক্রয় করেছিল। ক্রেতা খরীদকৃত জমিতে একটা স্বর্ণভর্তি কলস পেল। ক্রেতা বিক্রেতাকে বলল, আমার কাছ থেকে তোমার ঋণ নিয়ে নাও। কারণ আমি জমি ক্রয় করেছি, স্বর্ণ ক্রয় করিনি। জমিওয়ালা বলল, আমি জমি এবং এতে যা কিছু আছে সবই তোমার নিকট বিক্রি করে দিয়েছি। অতঃপর তারা উভয়েই অপর এক লোকের কাছে এর মীমাংসা চাইল। মীমাংসাকারী বললেন, তোমাদের কি ছেলে-মেয়ে আছে? একজন বলল, আমার একটি ছেলে আছে। অন্য লোকটি বলল, আমার একটি মেয়ে আছে। মীমাংসাকারী বললেন, তোমার মেয়েকে তার ছেলের সঙ্গে বিবাহ দাও আর প্রাপ্ত স্বর্ণের মধ্যে কিছু তাদের বিবাহে ব্যয় কর এবং বাকী অংশ তাদেরকে দিয়ে দাও।

    [আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, বুখারী হা/৩৪৭২ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫৪, মুসলিম হা/১৭২১]

    শিক্ষা :

    ১. আমানতদারিতা মুমিন চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

    ২. অন্যের জিনিসে লোভ করা সঙ্গত নয়।

    ৩. হালাল পথে জীবিকা অন্বেষণের চেষ্টা করতে হবে এবং হারাম বর্জন করতে হবে।

    ৪. বিচারককে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার অধিকারী হ’তে হবে।

    কা ‘ ব বিন মালিক  ( রাঃ )- এর তওবা

    আব্দুর রহমান বিন আব্দুল্লাহ বিন কা‘ব বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, কা‘ব বিন মালিকের পুত্রদের মধ্যে আব্দুল্লাহ তাঁর পিতা কা‘ব (রাঃ) অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সাহায্যকারী ও পথপ্রদর্শনকারী ছিলেন। আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমি কা‘ব বিন মালিককে তাঁর তাবূক যুদ্ধে পেছনে থেকে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি’। কা‘ব (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যতগুলো যুদ্ধ করেছেন, তার মধ্যে তাবূক ও বদর ছাড়া আর কোন যুদ্ধেই আমি অনুপস্থিত থাকিনি। তবে বদর যুদ্ধে যারা পেছনে থেকে গিয়েছিলেন, তাদের কাউকে তিনি ভৎর্সনা করেননি। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) শুধুমাত্র একটি কুরাইশ কাফেলার সন্ধানে বের হয়েছিলেন । অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের ও শত্রুদের মাঝে অঘোষিত এ যুদ্ধ সংঘটিত করেন। আর আকাবার রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি তখন ইসলামের উপর দৃঢ়ভাবে কায়েম থাকার জন্য আমাদের কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করেন। তাই আমি আকাবার বায়‘আতের চেয়ে বদরের যুদ্ধকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করতাম না। যদিও মানুষের মাঝে আকাবার ঘটনা অপেক্ষা বদর যুদ্ধ অধিক প্রসিদ্ধ ছিল।

    যাহোক আমার ঘটনা এই যে, আমি যখন তাবূকের যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলাম, সে সময়ের চেয়ে অন্য কোন সময়েই আমি অধিক শক্তিশালী ও সচ্ছল ছিলাম না। আল্লাহর কসম! ইতিপূর্বে আমার কাছে কখনো একসাথে দু’টো সওয়ারী ছিল না। অথচ এ যুদ্ধের সময় (যুদ্ধের পূর্বে) আমি তা সংগ্রহ করেছিলাম। আর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখনই কোন যুদ্ধের ইচ্ছা করতেন, তখন (যাতে শত্রুরা বুঝতে না পারে) সেজন্য বিপরীত পন্থা অবলম্বন করতেন। কিন্তু এ যুদ্ধের সময় যখন আসল, তখন ছিল ভীষণ গরম। পথ ছিল দীর্ঘ এবং স্থান ছিল বিশাল মরুভূমি। আর শত্রুর সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। কাজেই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যেদিকে যাত্রা করবেন, তা বলে দিলেন। যাতে তারা তাদের যুদ্ধের সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। তখন তার সাথে বিপুলসংখ্যক মুসলমান ছিলেন। তবে তাঁদের নাম কোন রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ ছিল না।

    কা‘ব (রাঃ) বলেন, ফলে যদি কেউ যুদ্ধে না যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করত, তাহ’লে সহজেই তা করতে পারত, যতক্ষণ না তার বিষয়ে অহি নাযিল হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এমন এক সময় এ অভিযান শুরু করেছিলেন, যখন ফলমূল পাকার ও গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেয়ার সময় ছিল। রাসূল (সাঃ) এবং তাঁর সাথে সকল মুসলমান যুদ্ধের প্রস্ত্ততি নিচ্ছিলেন। আমিও প্রত্যহ সকালে তাঁদের সাথে যুদ্ধের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করতে থাকি। কিন্তু ফিরে এসে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। শুধু মনে মনে বলতাম, ‘আমি তো যে কোন সময় প্রস্ত্তত হওয়ার ক্ষমতা রাখি। এভাবে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে আমার সময় কেটে যেতে লাগল। পক্ষান্তরে লোকেরা পুরোদমে প্রস্ত্ততি নিয়ে ফেলল।

    একদিন সকালে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মুসলমানদের নিয়ে রওয়ানা দিলেন। অথচ তখনো আমি কোন প্রকার প্রস্ত্ততি নেইনি। মনে মনে ভাবলাম, ‘দু’এক দিন পরে প্রস্ত্ততি নিয়েও তাঁদের সঙ্গে মিলিত হ’তে পারব’। তারা চলে যাওয়ার  পর একদা আমি মসজিদে গেলাম এবং প্রস্ত্ততি নেওয়ার পরিকল্পনা করলাম কিন্তু সিদ্ধান্তহীনভাবে ফিরে আসলাম। পরদিন সকালে যাওয়ার নিয়ত করলাম, কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত না নিয়েই ফিরে আসলাম। আমার এ দোদুল্যমনতার মাঝে মুসলিম সেনারা দ্রুত চলছিলেন এবং বহুদূর চলে গেলেন। আর আমি রওনা দিয়ে তাঁদের ধরে ফেলার ইচ্ছা পোষণ করতে থাকলাম। আফসোস! আমি যদি এমনটি করে ফেলতাম (তাহ’লে ভালই হ’ত)! কিন্তু তা আমার ভাগ্যে ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর চলে যাওয়ার পর আমি যখন বাইরে বের হ’তাম, তখন পথে-ঘাটে মুনাফিকদেরকে অথবা দুর্বল হওয়ার কারণে আল্লাহ যাদেরকে অক্ষম করে দিয়েছেন, তাদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে দেখতে পেতাম না। আর এটা আমাকে চিন্তান্বিত করে তুলত।

    রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাবূকে পৌঁছার আগে পর্যন্ত আমার কথা জিজ্ঞেস করলেন না, তবে তাবূকে পৌঁছে যখন তিনি সবাইকে নিয়ে বসলেন, তখন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কা‘বের কি হ’ল’? বনী সালামার একজন ব্যক্তি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! তাঁর বসন-ভূষণ ও অহংকারই তাঁকে বাধা দিয়েছে’। মু‘আয বিন জাবাল (রাঃ) বললেন, ‘তুমি নিতান্তই বাজে কথা বললে। আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমরা তার ব্যাপারে ভাল বৈ আর কিছুই জানি না’। এতদশ্রবণে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) চুপ করে থাকলেন।

    কা‘ব বিন মালিক (রাঃ) বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে অবহিত হ’লাম, তখন আমি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লাম। ভাবতে লাগলাম, কোন মিথ্যা তালবাহানা করা যায় কি-না? যার মাধ্যমে আগামীকাল আমি তাঁর ক্রোধ থেকে বাঁচতে পারি। এ ব্যাপারে পরিবারের কিছু বিচক্ষণ ব্যক্তির পরামর্শও চেয়েছিলাম। কিন্তু যখন বলা হ’ল যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনার একেবারে নিকটে এসে পৌঁছে গেছেন, তখন আমার মন থেকে বাতিল ধ্যান-ধারণা বিদূরিত হয়ে গেল। আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে, তাঁর নিকট মিথ্যা বলে আমি মুক্তি পাব না। সুতরাং সত্য বলার জন্য দৃঢ়প্রত্যয়ী হ’লাম।

    সকালে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনায় পৌঁছে গেলেন। আর তাঁর নিয়ম ছিল যখনই তিনি সফর থেকে ফিরে আসতেন, প্রথমে মসজিদে যেতেন এবং সেখানে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করতেন। তারপর লোকদের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য বসে যেতেন। যখন তিনি ছালাত শেষ করে (মসজিদে নববীতে) বসে গেলেন, তখন তাবূক যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে থাকা লোকেরা আসতে লাগল। তাঁরা হলফ করে নিজেদের ওযর পেশ করতে লাগল। এদের সংখ্যা ছিল আশির ঊর্ধ্বে। বাহ্যিক অবস্থার বিচারে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাদের ওযর কবুল করতঃ তাদের কাছ থেকে পুনরায় বায়‘আত নিয়ে তাদের মাগফিরাতের জন্য দো‘আ করলেন এবং তাদের মনের গোপন বিষয় আল্লাহর নিকট সোপর্দ করলেন।

    কা‘ব (রাঃ) বলেন, ‘আমিও আসলাম তার কাছে। আমি সালাম দিতেই তিনি বিরাগমিশ্রিত মুচকি হেসে বললেন, ‘এস এস’। আমি গিয়ে তাঁর সামনে বসে পড়লাম। অতঃপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি কারণে তুমি পিছনে পড়ে থাকলে? তুমি কি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বাহন ক্রয় করনি’? আমি বললাম হ্যাঁ, ক্রয় করেছি’। আরো বললাম, ‘আল্লাহর কসম! যদি আমি আপনার সামনে না বসে দুনিয়ার অন্য কোন লোকের সামনে বসতাম, তাহ’লে আমি নিশ্চিত যে, যে কোন ওযর পেশ করে তাঁর ক্রোধকে নির্বাপিত করতে পারতাম। আর আমি তর্কে পটু। কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমি জানি, আজ যদি আপনার কাছে মিথ্যা বলে আপনাকে খুশী করে যায়, তাহ’লে অচিরেই আল্লাহ আপনাকে আমার উপর ক্রুদ্ধ করে দিবেন। আর যদি আজ আপনার সাথে সত্য কথা বলে যাই, তাতে আপনি নাখোশ হ’লেও আল্লাহর ক্ষমা লাভের আশা করা যায়। আল্লাহর কসম! আমার কোন ওযর ছিল না। আল্লাহর কসম! আমি যখন (অর্থাৎ তাবূক যুদ্ধে) আপনাদের থেকে পিছনে থেকে যাই, তখনকার মত আর কোন সময় আমি ততটা শক্তি-সামর্থ্যের ও সচ্ছলতার অধিকারী ছিলাম না’। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘যদি আসলে এরূপ হয়, তবে কা‘ব সত্য বলেছে। ঠিক আছে, চলে যাও, দেখ আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কি ফায়ছালা দেন’।

    আমি উঠে পড়লাম। বনী সালামার কিছু লোক আমাকে অনুসরণ করতে লাগল। তারা আমাকে বলল, আল্লাহর কসম! ইতিপূর্বে তুমি কোন পাপ করেছ বলে তো আমরা জানি না। পেছনে থেকে যাওয়া অন্যান্য লোকদের মত তুমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট একটা বাহানা পেশ করতে পারলে না? তাহ’লে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ক্ষমা প্রার্থনাই তোমার পাপ মোচনের জন্য যথেষ্ট হয়ে যেত। তারা আমাকে এমনভাবে তিরস্কার করতে লাগল যে, একপর্যায়ে আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে ফিরে গিয়ে আমার প্রথম কথাটিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার মনস্থ করলাম। অতঃপর তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা আমার  মতো নিজের ভুল স্বীকার করেছে এমন আর কাউকেও কি তোমরা সেখানে দেখেছ’? তারা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, আরো দু’জন লোককে আমরা দেখেছি, যারা তোমার মত একই কথা বলেছে। আর তাদেরকেও তোমার মতো সেই একই কথা বলা হয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তারা কারা? লোকেরা জবাব দিল, তারা দু’জন হচ্ছেন  মুরারাহ বিন রাবী আল-‘আমরী এবং হিলাল বিন উমাইয়া আল-ওয়াকেফী। তারা আমার কাছে এমন দু’জন সৎ লোকের কথা বললেন, যাঁরা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং আদর্শস্থানীয় ছিলেন। তাঁদের দু’জনের কথা শুনে আমি চলতে শুরু করলাম।

    এদিকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের মধ্য থেকে আমাদের এ তিনজনের সাথে কথা বলা সমস্ত মুসলমানের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছেন। কাজেই লোকেরা আমাদেরকে এড়িয়ে চলতে লাগল এবং আমাদের  প্রতি তাদের আচরণ পরিবর্তন করে ফেলল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হ’তে লাগল যে, চিরচেনা দুনিয়া যেন অচেনা হয়ে গেছে। এ অবস্থায় আমরা ৫০ রাত অতিবাহিত করলাম। আমার সাথীদ্বয় নীরব হয়ে ঘরের মধ্যে বসে গেলেন এবং কান্নাকাটি করতে লাগলেন। তবে আমি ছিলাম খুব শক্তিশালী ও ধৈর্যশীল যুবক। তাই আমি বাইরে বের হয়ে মুসলমানদের সাথে ছালাতে যোগ দিতাম এবং বাজারে ঘুরাফিরা করতাম। কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলত না। আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে আসতাম। তিনি যখন ছালাতের পর মজলিসে বসতেন, আমি তাঁকে সালাম দিতাম। আমি মনে মনে বলতাম, আমার সালামের জবাবে তাঁর ঠোঁট নড়ল, কি নড়ল না? তারপর আমি তাঁর সন্নিকটে ছালাত আদায় করতাম। আমি আড়চোখে লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁকে দেখতাম। কাজেই দেখতে পেতাম যে, যখন আমি ছালাতে মশগূল থাকি, তখন তিনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আবার আমি যখন তাঁর দিকে দৃষ্টি দিতাম, তখন তিনি মুখ ফিরিয়ে নিতেন। এভাবে আমার প্রতি লোকদের কঠোরতা ও এড়িয়ে চলা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকল।

    একদিন আমার চাচাত ভাই আবূ ক্বাতাদাহর বাগানের প্রাচীর টপকে তার কাছে আসলাম। সে ছিল আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আমি তাকে সালাম দিলাম। কিন্তু আল্লাহর কসম! সে আমার সালামের জবাব দিল না। আমি তাকে বললাম, হে আবূ ক্বাতাদাহ! আল্লাহর দোহায় দিয়ে তোমাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কি জান না, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)-কে ভালবাসি? সে চুপ করে থাকল। আমি আবার আল্লাহর নামে কসম  করে তাকে এ প্রশ্ন করলাম। এবারও সে চুপ করে থাকল। আমি তৃতীয়বার তাকে একই প্রশ্ন করলাম। এবার সে জবাব দিল, ’(এ ব্যাপারে) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন’। (এতদশ্রবণে) আমার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।  অতঃপর প্রাচীর টপকে পুনরায় ফিরে এলাম।

    কা‘ব বলেন, ইত্যবসরে একদিন আমি মদীনার বাজারে হাঁটছিলাম। সিরিয়ার একজন খৃষ্টান কৃষক মদীনার বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রি করতে এসেছিল। সে লোকদেরকে জিজ্ঞেস করছিল, কে আমাকে কা‘ব বিন মালিকের ঠিকানা বলে দিতে পারে? তখন লোকেরা তাকে ইশারা করে দেখিয়ে দিল। সে আমার কাছে এসে গাস্সানের রাজার একটি চিঠি আমার হাতে অর্পণ করল। তাতে লেখা ছিল, ‘পর সমাচার এই যে, আমি জানতে পেরেছি আপনার সাথী আপনার উপর যুলুম করেছেন। অথচ আল্লাহ আপনাকে লাঞ্ছনা ও অবমাননাকর অবস্থায় রাখেননি। আপনি আমাদের এখানে চলে আসুন। আমরা আপনাকে সাহায্য-সহযোগিতা করব’। চিঠিটা পড়ে আমি বললাম, এটাও আর একটি পরীক্ষা। কাজেই আমি চুলা খুঁজে চিঠিটা আগুনে জ্বালিয়ে দিলাম।

    এভাবে ৫০ দিনের মধ্যে ৪০ দিন অতিবাহিত হয়ে গেল। এমন সময় আমার কাছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর একজন দূত এসে বললেন, রাসূল (সাঃ) তোমাকে তোমার স্ত্রী থেকে পৃথক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি বললাম, আমি কি তাকে তালাক দিব, না কি করব? তিনি বললেন, না, তালাক দিবে না। বরং তার থেকে পৃথক থাকবে এবং তার কাছে ঘেঁষবে না। আমার অন্য দু’জন সাথীর কাছেও এ মর্মে দূত পাঠানো হ’ল। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, তুমি তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও। আর আল্লাহ আমার এ ব্যাপারে কোন ফায়ছালা না দেওয়া পর্যন্ত তাদের সাথে অবস্থান কর।

    কা‘ব (রাঃ) বলেন, হিলাল বিন উমাইয়ার স্ত্রী রাসূল (সাঃ)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! হিলাল বিন উমাইয়া অতিশয় বৃদ্ধ। তার কোন সেবক নেই। যদি আমি তার সেবা করি, তবে কি আপনি অপসন্দ করবেন? তিনি জবাব দিলেন, না, তবে সে যেন তোমার কাছে না ঘেঁষে। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! তার মধ্যে এ কাজের প্রতি উৎসাহবোধ-ই নেই। আল্লাহর কসম! যেদিন থেকে এ ঘটনা ঘটেছে সেদিন থেকে অদ্যাবধি সে কাঁদছে।

    কা‘ব (রাঃ) বলেন, আমাকেও আমার পরিবারের কেউ কেউ বলল, তুমিও তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে রাসূল (সাঃ)-এর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এস, যাতে সে তোমার সেবা করতে পারে, যেমন হিলাল বিন উমাইয়ার স্ত্রী তার স্বামীর সেবা করার ব্যাপারে অনুমতি নিয়ে এসেছে। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি রাসূল (সাঃ)-এর কাছে কোন অনুমতি আনতে যাব না। জানি না যখন আমি এ ব্যাপারে অনুমতি চাইব, তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কি বলবেন। কারণ আমি একজন যুবক। এভাবে আরো দশদিন  অতিবাহিত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের সাথে কথাবার্তা বন্ধ করে দেওয়ার পর পঞ্চাশতম রাত্রিটিও অতিক্রম করল। ঐদিন সকালে ফজরের ছালাত আদায় করলাম এবং আমাদের এক ঘরের ছাদে বসেছিলাম, যে অবস্থার ব্যাপারে আল্লাহ বর্ণনা করেছেন। মনে হচ্ছিল, জীবন ধারণ আমার জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে এবং পৃথিবী যেন তার সমস্ত বিস্তীর্ণতা সত্ত্বেও আমার জন্য অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। এমন সময় আমি সাল‘ (سلع) পর্বতের উপর উচ্চৈঃস্বরে চীৎকারকারী একজনের শব্দ শুনতে পেলাম। সে চীৎকার করে বলছে, হে কা‘ব বিন মালিক! সুসংবাদ গ্রহণ কর!

    কা‘ব বলেন, আমি আল্লাহর দরবারে সিজদায় পড়ে গেলাম। আমি অনুধাবন করতে পারলাম যে, এবার সংকট কেটে গেছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ফজরের ছালাতের পর ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, আল্লাহ আমাদের তওবা কবুল করেছেন। কাজেই লোকেরা আমার ও আমার অপর দু’জন সাথীর কাছে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য আসতে লাগল। একজন তো ঘোড়ায় চড়ে এক দৌড়ে আমার কাছে আসলেন এবং আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তি দৌড়িয়ে পাহাড়ে উঠলেন। তার কথা অশ্বারোহীর চেয়েও দ্রুততর হ’ল। যার শব্দ আমি শুনেছিলাম সে যখন আমার কাছে সুসংবাদ প্রদান করতে আসল, তখন সুসংবাদ দেয়ার প্রতিদান স্বরূপ আমার পোশাক জোড়া খুলে তাকে পরিয়ে দিলাম। আল্লাহর কসম! তখন আমার কাছে ঐ পোশাক জোড়া ছাড়া আর কোন কাপড় ছিল না । তারপর আমি এক জোড়া পোষাক ধার করে নিলাম এবং তা পরিধান করে রাসূল (সাঃ)-এর সাথে সাক্ষাতের নিমিত্তে বের হ’লাম। পথে দলে দলে লোকজন আমার সাথে সাক্ষাৎ করছিল এবং তওবা কবুল হওয়ার জন্য তারা আমাকে মুবারকবাদ জানাচ্ছিল। তারা বলছিল, তোমার তওবা কবুল করে আল্লাহ তোমাকে যে পুরষ্কৃত করেছেন, এজন্য তোমাকে মুবারকবাদ। কা‘ব (রাঃ) বলেন, এভাবে আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম। সেখানে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) লোকজন পরিবেষ্টিত হয়ে বসেছিলেন। ত্বালহা বিন ওবায়দুল্লাহ (রাঃ) আমাকে দেখে দৌড়ে এসে মুছাফাহা করলেন এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন। আল্লাহর কমস! মুহাজিরদের মধ্য থেকে সে ব্যতীত অন্য কেউ এভাবে এসে আমাকে ধন্যবাদ জানায়নি। আমি কোনদিন তাঁর অনুগ্রহ ভুলব না।

    কা‘ব (রাঃ) বলেন, তারপর আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে সালাম দিলাম। তখন খুশীতে তাঁর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। রাসূল (সাঃ) বললেন, (হে কা‘ব)! তোমার মা তোমাকে জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত অতিক্রান্ত দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভাল দিনের সুসংবাদ গ্রহণ কর! কা‘ব বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! এ (ক্ষমা) আপনার পক্ষ থেকে, না আল্লাহর পক্ষ থেকে? তিনি বললেন, না, এ তো আল্লাহর পক্ষ থেকে।

    রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন খুশী হ’তেন, তখন তাঁর চেহারা এক ফালি চাঁদের মত উজ্জ্বল হয়ে উঠত। আমরা চেহারা দেখে তাঁর খুশী বুঝতে পারলাম। তারপর আমি তাঁর সামনে বসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমার তওবা কবুলের জন্য শুকরিয়া স্বরূপ  আমি আমার সমস্ত ধন-সম্পদ আল্লাহ ও রাসূলের পথে ছাদাক্বা করে দিতে চাই। রাসূলুল্লাহ সাঃ) বললেন, তোমার সম্পদের কিছু অংশ নিজের জন্য রেখে দাও। তাতে তোমার কল্যাণ হবে। আমি বললাম, তাহ’লে আমি শুধু খায়বারের অংশটুকুই আমার জন্য রাখলাম। তারপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ এবার সত্য কথা বলার কারণে আমাকে মুক্তি দিয়েছেন। কাজেই আমার এ তওবা কবুল হওয়ার কারণে আমি জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোতে সত্য কথাই বলতে থাকব। আল্লাহর কসম! আমি জানি না, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে সত্য কথা বলার কারণে সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আল্লাহ আমার প্রতি যে মেহেরবানী করেছেন, তেমনটি আর কোন মুসলমানের উপর করেছেন কি-না। আর রাসূল (সাঃ)-কে যেদিন থেকে এ কথা  বলেছি, সেদিন থেকে সজ্ঞানে মিথ্যা কথা বলিনি। জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহ আমাকে মিথ্যা থেকে বাঁচাবেন বলে আশা করি। আর আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর উপর নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেছেন, ‘আল্লাহ অবশ্যই অনুগ্রহপরায়ণ হ’লেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনছারদের প্রতি যারা তার অনুসরণ করেছিল সংকটকালে- এমনকি যখন তাদের এ দলের চিত্ত-বৈকল্যের উপক্রম হয়েছিল। পরে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। তিনি তো তাদের প্রতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু। এবং তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিনজনকেও, যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল, যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য তা সংকুচিত হয়েছিল এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়েছিল এবং তারা উপলব্ধি করেছিল যা, আল্লাহ ব্যতীত কোন আশ্রয়স্থল নেই, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন ব্যতীত, পরে তিনি তাদের তওবা কবুল করলেন যাতে তারা তওবায় স্থির থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও’ (তওবা ১১৭-১১৯)।

    আল্লাহর কসম! ইসলাম গ্রহণ করার পর এর চাইতে উৎকৃষ্ট আর কোন অনুগ্রহ আল্লাহ আমার উপর করেননি যে, রাসূল (সাঃ)-এর সামনে সত্য বলার তাওফীক্ব দান করে আমাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছে। অন্যথা অন্যান্য মিথ্যাবাদীদের মত আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম। কারণ অহি যখন  নাযিল হচ্ছিল (অর্থাৎ রাসূল (সাঃ)-এর জীবদ্দশায়), সে সময় যারা মিথ্যা বলেছিল তাদের সম্পর্কে আল্লাহ যে মারাত্মক কথা বলেছিলেন, তা আর কারো সম্পর্কে বলেননি। মহান আল্লাহ বলেছিলেন, ‘তোমরা তাদের নিকট ফিরে আসলে অচিরেই তারা আল্লাহর শপথ করবে যাতে তোমরা তাদের উপেক্ষা কর। সুতরাং তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা করবে। তারা অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ জাহান্নাম তাদের আবাসস্থল। তারা তোমাদের নিকট শপথ করবে যাতে তোমরা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হও। তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হ’লেও আল্লাহ তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের প্রতি তুষ্ট হবেন না’ (তওবা ৯৫-৯৬)।

    কা‘ব (রাঃ) বলেন, আর আমরা তিনজন সেসব লোকদের থেকে  আলাদা, যারা তাদের যুদ্ধে না যাওয়ার  জন্য রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে মিথ্যা শপথ করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাদের কথা মেনে নিয়ে তাদেরকে বায়‘আত করিয়েছিলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু আমাদের ব্যাপারটি তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন (আল্লাহর উপর)। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ যে ব্যাপারে ফায়ছালা দিয়েছিলেন, সে ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন, ‘সেই তিনজন, যারা পেছনে থেকে গিয়েছিল’ (তওবা ১১৮)। (অর্থাৎ আল্লাহ তাদেরকে মাফ করে দিয়েছিলেন)। যারা জেনে বুঝে জিহাদ থেকে পেছনে থেকে গিয়েছিল, তাদের কথা এখানে বলা হয়নি। বরং এখানে কেবল আমাদের (তিনজনের) কথা বলা হয়েছিল। আর যারা হলফ করেছিল ও ওযর পেশ করেছিল এবং তাদের ওযর রাসূল (সাঃ) গ্রহণ করেছিলেন তাদের থেকে আমাদের ব্যাপারে ফায়ছালাটি পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল।

    [ছহীহ বুখারী, হা/৪৪১৮ ‘মাগাযী’ অধ্যায়, ‘কা‘ব বিন মালিকের ঘটনা’ অনুচ্ছেদ, মুসলিম হা/২৭৬৯, ‘তওবা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৯]

    শিক্ষা :

    ১. সত্য কথা বিপদ থেকে মুক্তি দেয়।

    ২. কোন আনন্দের সংবাদে দিশেহারা না হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিৎ।

    ৩. মুমিন ব্যক্তি তার কর্তব্য পালনে অবহেলা করলে ব্যথিত-মর্মাহত হয়।

    ৪. মুমিন তার ভাইকে কখনো লাঞ্ছিত-অপদস্থ-অপমানিত করবে না; বরং তার মান-সম্মান রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট থাকবে।

    ৫. মুমিন ব্যক্তি কোন প্রলোভনে পড়ে তার দ্বীন-ধর্মকে বিকিয়ে দিতে পারে না।

    যদি মানুষ শয়তানী প্ররোচনায় পাপ করে ফেলে তাহ’লে সে তওবার মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হ’তে পারে।

    যমযম কূপ ও কা ‘ বাঘর নির্মাণের ঘটনা

    হযরত সাঈদ বিন জুবায়ের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, একদা হযরত ইবরাহীম (আঃ) শিশুপুত্র ইসমাঈল ও তাঁর মা হাযেরাকে নিয়ে বের হ’লেন এমন অবস্থায় যে, হাযেরা তাকে দুধ পান করাতেন। অবশেষে যেখানে কা‘বাঘর অবস্থিত ইবরাহীম (আঃ) তাঁদের উভয়কে সেখানে নিয়ে এসে মসজিদের উঁচু অংশে যমযম কূপের উপর অবস্থিত একটি বিরাট গাছের নীচে রাখলেন। সে সময় মক্কায় ছিল না কোন জন-মানব, ছিল না কোন পানির ব্যবস্থা। তিনি একটি থলিতে খেজুর ও একটি মশকে সামান্য পানিসহ তাদেরকে সেখানে রেখে ফিরে চললেন। তখন ইসমাঈল (আঃ)-এর  মা পিছনে চলতে লাগলেন এবং বললেন, ‘হে ইবরাহীম! এই উপত্যকায় আমাদের রেখে আপনি কোথায় যাচ্ছেন? এখানে না আছে কোন মানুষ, না আছে পানাহারের ব্যবস্থা’। তিনি এ কথাটি তাঁকে বার বার বলতে থাকলেন। ইবরাহীম (আঃ) তাঁর কথায় কান না দিয়ে চলতেই থাকলেন। অতঃপর হযরত হাযেরা জানতে চাইলেন, ‘আল্লাহ কি আপনাকে এ কাজের নির্দেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ’। তখন হাযেরা বললেন, ‘তাহ’লে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না’। অতঃপর তিনি ফিরে আসলেন। আর ইবরাহীম (আঃ) সামনে চললেন। চলতে চলতে যখন তিনি গিরিপথের বাঁকে পৌঁছলেন, যেখান থেকে স্ত্রী-পুত্র তাকে দেখতে পাচ্ছে না। সে সময় তিনি কা‘বার দিকে মুখ করে দু’হাত তুলে এ দো‘আ করলেন, ‘প্রভু হে! আমি আমার স্ত্রী ও পুত্রকে চাষাবাদহীন বিরান ভূমিতে তোমার সম্মানিত গৃহের সন্নিকটে  রেখে গেলাম। যাতে তারা ছালাত আদায় করতে পারে। তুমি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও এবং তাদেরকে ফলাদি দারা রূযী দান কর, যাতে তারা তোমার শুকরিয়া আদায় করতে পারে’ (ইবরাহীম ৩৭)।

    (এ দো‘আ করে  ইবরাহীম (আঃ) চলে গেলেন)। আর ইসমাঈল (আঃ)-এর মা  তাঁকে তার বুকের দুধ পান করাতেন আর নিজে সেই মশক থেকে পানি পান করতেন। অবশেষে মশকের পানি ফুরিয়ে গেলে তিনি পিপাসিত হ’লেন এবং তাঁর শিশুপুত্রটিও পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ল। তিনি শিশুটির দিকে দেখতে লাগলেন। তৃষ্ণায় তার বুক ধড়ফড় করছে অথবা বর্ণনাকারী বলেন, সে মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। শিশুপুত্রের এ করুণ অবস্থার প্রতি তাকানো অসহনীয় হওয়ায় তিনি সরে গেলেন আর তাঁর অবস্থানের নিকটবর্তী পর্বত ‘ছাফা’-কে একমাত্র তাঁর নিকটতম পর্বত হিসাবে পেলেন। অতঃপর তিনি উপরে উঠে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় কি-না তা দেখতে লাগলেন। কাউকে না পেয়ে ছাফা পর্বত থেকে নেমে পড়লেন। এমনকি যখন তিনি নীচু ময়দান পর্যন্ত পৌঁছলেন, তখন তিনি তাঁর কামিজের এক প্রান্ত তুলে ধরে একজন ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষের মতো ছুটে চললেন। অবশেষে ময়দান অতিক্রম করে ‘মারওয়া’ পাহাড়ের নিকট এসে তাঁর উপর উঠে দাঁড়ালেন। অতঃপর এদিকে সেদিকে তাকালেন, কাউকে দেখতে পান কি-না? কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। এমনিভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন।

    হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘এজন্যই মানুষ হজ্জ ও ওমরাহর সময় উক্ত পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে সাতবার সাঈ করে থাকে’। এরপর তিনি যখন ‘মারওয়া’ পাহাড়ে উঠলেন, তখন একটি শব্দ শুনতে পেলেন এবং তিনি নিজেকেই নিজে বললেন, একটু অপেক্ষা কর। তিনি একাগ্রচিত্তে মনোযোগ দিয়ে শুনে বললেন, ‘তুমি তো তোমার শব্দ শুনিয়েছ। তোমার কাছে কোন সাহায্যকারী থাকলে আমাকে সাহায্য কর’। অতঃপর তিনি যমযমের নিকট একজন ফেরেশতা দেখতে পেলেন। যিনি নিজের পায়ের গোড়ালি বা ডানা দ্বারা মাটিতে আঘাত করলেন, আর অমনি মাটি ফেটে পানি বের হ’তে লাগল। তখন হাযেরা (আঃ) চারপাশে নিজ হাতে বাঁধ দিয়ে একে হাউযের ন্যায় করে দিলেন এবং কোষ দ্বারা মশকটি ভরে নিলেন। কিন্তু তখনও পানি উপচে উঠতে থাকল।

    হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘ইসমাঈলের মাকে আল্লাহ রহম করুন! যদি তিনি বাঁধ না দিয়ে বা কোষে ভরে পানি মশকে জমা না করে যমযমকে ঐভাবে ছেড়ে দিতেন, তবে  উহা একটি কূপ না হয়ে প্রবাহমান ঝর্ণায় পরিণত হ’ত’। রাবী বলেন, অতঃপর তিনি পান করলেন এবং তার পুত্রকে দুধ পান করালেন।

    ফেরেশতা তাকে (হাযেরা) বললেন, ‘আপনি ধ্বংসের ভয় করবেন না। কারণ এখানে রয়েছে আল্লাহর ঘর। এ শিশুটি এবং তার পিতা দু’জনে মিলে এখানে ঘর নির্মাণ করবে এবং আল্লাহ তাঁর আপনজনকে ধ্বংস করবেন না’। ঐ সময় আল্লাহর ঘরের স্থানটি যমীন থেকে টিলার মত উঁচু ছিল। বন্যা আসার ফলে তার ডানে বামে ভেঙ্গে যাচ্ছিল। এরপর হাযেরা এভাবেই এখানে দিন যাপন করতে থাকেন।

    অতঃপর এক সময় ‘জুরহুম’ গোত্রের একদল লোক তাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিল অথবা রাবী বলেন ‘জুরহুম’ পরিবারের কিছু লোক ‘কাদা’ নামক উঁচু ভূমির পথ ধরে এদিকে আসছিল। তারা মক্কার নীচু ভূমিতে অবতরণ করল এবং একঝাঁক পাখিকে চক্রাকারে উড়তে দেখতে পেল । তখন তারা বলল, নিশ্চয় এ পাখিগুলো পানির উপর উড়ছে। আমরা এ ময়দানের পথ হয়ে বহুবার অতিক্রম করেছি। কিন্তু এখানে কোন পানি ছিল না। তখন তারা একজন কি দু’জন লোক সেখানে পাঠালো। তারা সেখানে গিয়েই পানি দেখতে পেল। তারা সেখান থেকে ফিরে এসে সকলকে পানির সংবাদ দিল। সংবাদ শুনে সবাই সেদিকে অগ্রসর হ’ল। রাবী বলেন, ইসমাঈল (আঃ)-এর মা পানির নিকট ছিলেন। তারা তাঁকে বলল, আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই। আপনি আমাদেরকে অনুমতি দিবেন কি? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ। তবে, এ পানির উপর তোমাদের কোন অধিকার থাকবে না। তারা হ্যাঁ বলে তাদের মত প্রকাশ করল।

    হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, এ ঘটনা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাকে মানুষের সাহচর্যে থাকার সুযোগ করে দিল। অতঃপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল এবং তাদের পরিবার-পরিজনের নিকটও সংবাদ পাঠাল। তারপর তারাও এসে তাদের সাথে বসবাস করতে লাগল। অবশেষে সেখানে তাদেরও কয়েকটি পরিবারের বসতি স্থাপিত হ’ল। আর ইসমাঈল (আঃ)ও যৌবনে উপনীত হলেন এবং তাদের কাছ থেকে আরবী ভাষা শিখলেন। যৌবনে পদার্পণ করে তিনি তাদের কাছে অধিক আকর্ষণীয় ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। অতঃপর যখন তিনি পূর্ণ যৌবন লাভ করলেন, তখন তারা তাদেরই একটি মেয়ের সাথে ইসমাঈল (আঃ)-এর বিবাহ দিলেন। ইতিমধ্যে হাযেরা মারা গেলেন। ইসমাঈলের বিবাহের পর ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা দেখার জন্য এখানে আসলেন। কিন্তু তিনি ইসমাঈল (আঃ)-কে পেলেন না। তিনি ইসমাঈল (আঃ)-এর স্ত্রীর নিকট তার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলেন। পুত্রবধূ বলল, ‘তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। অতঃপর তিনি তাদের জীবিকা ও অবস্থা জানতে চাইলেন। তখন ইসমাঈলের স্ত্রী দুর্দশার অভিযোগ করে বলল, আমরা অতি দূরবস্থায়, অতি টানাটানি ও খুব কষ্টে আছি’। এ কথা শুনে ইবরাহীম (আঃ) বললেন, ‘তোমার স্বামী বাড়ী আসলে আমার সালাম দিয়ে তার ঘরের চৌকাঠ বদলিয়ে নিতে বলবে’।

    এরপর  যখন হযরত ইসমাঈল (আঃ) বাড়ী আসলেন, তখন যেন তিনি কিছু আঁচ করতে পারলেন। তিনি বললেন, তোমার নিকট কোন ব্যক্তি এসেছিল কি? স্ত্রী বলল, হ্যাঁ। আমাদের নিকট এরূপ একজন বৃদ্ধ এসেছিলেন এবং আমাকে আপনার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলেন। আমি তাকে আপনার খবর দেই। তিনি আমাদের জীবন-জীবিকা কিভাবে চলছে তা জিজ্ঞেস করেন। তখন আমি তাকে বলি, আমরা খুব কষ্টে ও অভাবে আছি। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, তিনি কি তোমাকে কোন বিষয়ের অছিয়ত করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি তার সালাম আপনাকে দেয়ার নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং বলেছেন, তোমার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে নিও। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, ‘উনি আমার পিতা। তিনি আমাকে তোমাকে পৃথক করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তুমি তোমার আপনজনদের কাছে চলে যাও’। অতঃপর তিনি তাকে তালাক দিয়ে অপর একটি মেয়েকে বিবাহ করলেন।

    অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) এদের থেকে আল্লাহ যতদিন চাইলেন ততদিন দূরে থাকলেন। অতঃপর তিনি আবার তাদের দেখতে আসলেন। এবারেও তিনি পুত্রকে দেখতে পেলেন না। পুত্রবধূকে তার পুত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি উত্তর দিলেন, তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে পড়েছেন। এরপর ইবরাহীম (আঃ) বললেন, তোমরা কেমন আছ? অতঃপর তিনি তাদের জীবন যাপন ও অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, আমরা ভাল ও সচ্ছল আছি এবং তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন। ইবরাহীম (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের প্রধান খাদ্য কি? সে বলল, গোশত। তিনি আবার বললেন, ‘তোমাদের পানীয় কি? সে বলল, পানি। ইবরাহীম (আঃ) দো‘আ করলেন, ‘হে আল্লাহ! তাদের গোশত ও পানিতে বরকত দিন। রাসূল (সাঃ) বলেন, তাদের জন্য তখন শস্য ছিল না। যদি থাকত তাহলে তিনি তাতে বরকত দানের জন্য দো‘আ করতেন। রাবী বলেন, মক্কা ব্যতীত অন্য কোথাও কেউ শুধু পানি ও গোশত দ্বারা জীবন ধারণ করতে পারে না। কেননা শুধু গোশত ও পানি জীবন যাপনের অনুকূল হ’তে পারে না।

    ইবরাহীম (আঃ) বললেন, ‘তোমার স্বামী ঘরে ফিরে আসলে আমার সালাম দিয়ে তার ঘরের চৌকাঠ ঠিক রাখার কথা বলবে’। অতঃপর ইসমাঈল (আঃ) বাড়ী এসে বললেন, তোমাদের নিকট কেউ এসেছিলেন কি? স্ত্রী বলল, হ্যাঁ। একজন সুন্দর চেহারার বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং সে তাঁর প্রশংসা করল, তিনি আমাকে আপনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ জানিয়েছি। অতঃপর তিনি আমার নিকট আমাদের জীবন যাপন সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে জানিয়েছি যে, আমরা ভাল আছি। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, তিনি কি তোমাকে কোন বিষয়ের অছিয়ত করে গেছেন? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি আপনার প্রতি সালাম জানিয়ে আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি যেন আপনার ঘরের চৌকাঠ ঠিক রাখেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, ইনি আমার পিতা, আর তুমি আমার ঘরের চৌকাঠ। তিনি আমাকে তোমাকে স্ত্রী হিসাবে বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

    আল্লাহর ইচ্ছায় হযরত ইবরাহীম (আঃ) বহুদিন পর এসে দেখেন তার পুত্র যমযম কূপের নিকটে একটি বড় গাছের নীচে বসে তীর মেরামত করছেন। পিতাকে দেখে তিনি দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। অতঃপর পিতা ছেলের সাথে বা ছেলে পিতার সাথে সাক্ষাৎ হ’লে যেমন করে থাকে তাঁরা উভয়ে তাই করলেন। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) বললেন, ‘হে ইসমাঈল! আল্লাহ আমাকে একটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, আপনার প্রভু আপনাকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন করুন। তিনি বললেন, তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে? ইসমাঈল বললেন, আমি আপনাকে সাহায্য করব। ইবরাহীম (আঃ) বললেন, আল্লাহ এখানে আমাকে একটি ঘর নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। একথা বলে তিনি উঁচু টিলাটির দিকে ইঙ্গিত করলেন যে, এর চারপাশে ঘেরাও দিয়ে। তখনি বাপ-বেটা কা‘বাঘরের দেয়াল তুলতে লেগে গেলেন। ইসমাঈল (আঃ) পাথর আনতেন, আর ইবরাহীম (আঃ) নির্মাণ করতেন। পরিশেষে যখন দেওয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাঈল (আঃ) (মাক্বামে ইবরাহীম নামক) পাথরটি আনলেন এবং যথাস্থানে রাখলেন। ইবরাহীম (আঃ) তার উপর দাঁড়িয়ে নির্মাণ কাজ করতে লাগলেন। আর ইসমাঈল (আঃ) তাকে পাথর যোগান দিতে থাকেন। তারা উভয়ে আল্লাহর কাছে দো‘আ করলেন যে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এ কাজ কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাত’ (বাক্বারাহ ১২৭)। তাঁরা উভয়ে আবার কা‘বাঘর তৈরি করতে থাকেন এবং কা‘বাঘরের চারিদিকে ঘুরে ঘুরে এ দো‘আ করতে থাকেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছু শুনেন ও জানেন’ (বাক্বারাহ ১২৭; ছহীহ বুখারী হা/৩৩৬৪ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৯)।

    শিক্ষা :

    ১. আল্লাহর হুকুমকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর সন্তুষ্টির জন্য প্রয়োজনে স্ত্রী-পুত্রসহ সবকিছু ত্যাগ করতে হবে।

    ২. সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে হবে ও তাঁর উপর ভরসা করতে হবে। কোন অবস্থাতেই ধৈর্যহারা হওয়া চলবে না।

    ৩. পরিবার ও সন্তান-সন্ততির জন্য দো‘আ করতে হবে।

    ৪. একক নয়; বরং যৌথ উদ্যোগে সামাজিক কাজ সম্পাদন করতে হবে।

    ৫. হাযেরার মতো সুদৃঢ় ঈমানের অধিকারীণী হওয়ার জন্য মা-বোনদের সচেষ্ট হ’তে হবে।

    আল্লাহর আনুগত্য ও ধৈর্যের পরিণাম সর্বদা কল্যাণকরই হয়।

    দোলনায় কথা বলা তিন শিশু

    আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, (বনী ইসরাঈলের মধ্যে) তিন ব্যক্তি ছাড়া আর কেউই দোলনায় কথা বলেনি।

    (১) ঈসা ইবনে মারইয়াম। [মারইয়াম (আঃ)-এর গর্ভে ঈসা (আঃ) অলৌকিক ভাবে জন্মগ্রহণ করলে লোকজন তার ব্যাপারে সন্দিহান হ’ল। তখন মারইয়াম (আঃ)-এর ইঙ্গিতে মূসা (আঃ) তাঁর মাতার পক্ষ থেকে জবাব দিয়ে বললেন, ‘আমি আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব (ইনজীল) প্রদান করেছেন এবং আমাকে নবী করেছেন’। ‘আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে জোরালো নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন জীবিত থাকি, ততদিন ছালাত ও যাকাত আদায় করতে এবং আমার মায়ের অনুগত থাকতে। আল্লাহ আমাকে উদ্ধত ও হতভাগা করেননি’। ‘আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন জীবিত পুনরুত্থিত হব’ (মারিয়াম ১৯/২৯-৩৩)]।

    (২) ছাহেবে জুরাইজ (জুরাইজের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি বাচ্চা)। জুরাইজ একজন আবেদ বান্দা ছিলেন। তিনি নিজের জন্য একটি ইবাদতগাহ তৈরী করলেন। তিনি সেখানে থাকা অবস্থায় একদিন তার মা সেখানে আসলেন। এ সময় তিনি ছালাতে রত ছিলেন। তার মা বললেন, ‘হে জুরাইজ! তখন তিনি (মনে মনে) বলেন, ‘হে প্রভু! একদিকে আমার ছালাত আর অন্যদিকে আমার মা’। জুরাইজ ছালাতেই রত থাকলেন। তার মা চলে গেলেন। পরবর্তী দিন তার মা আসলেন । এবারও তিনি ছালাতে মগ্ন ছিলেন। তার মা তাকে ডাকলেন, ‘হে জুরাইজ’! তিনি (মনে মনে) বলেন, ‘হে প্রভু! একদিকে আমার ছালাত আর অন্যদিকে আমার মা’। তিনি তার ছালাতেই ব্যস্ত থাকলেন। এভাবে তৃতীয় দিনেও জুরাইজ একই কাজ করলে তার মা বললেন, ‘হে আল্লাহ! একে তুমি যেনাকারী নারীর মুখ না দেখা পর্যন্ত মৃত্যু দিও না’।

    বনী ইসরাঈলের মধ্যে জুরাইজ ও তার ইবাদতের কথা আলোচিত হ’তে লাগল। এক ব্যভিচারী নারী ছিল। সে উল্লেখযোগ্য রূপ-সৌন্দর্যের অধিকারিণী ছিল। সে বলল, তোমরা যদি চাও, আমি তাকে (জুরাইজ) বিভ্রান্ত করতে পারি। সে তাকে ফুসলাতে লাগল, কিন্তু তিনি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করলেন না। অতঃপর সে তার ইবাদতগাহের কাছাকাছি এলাকায় এক রাখালের কাছে আসল। সে নিজের উপর তাকে অধিকার দিল এবং উভয়ে ব্যভিচারে লিপ্ত হ’ল। এতে সে গর্ভবতী হ’ল। সে বাচ্চা প্রসব করে বলল, এটা জুরাইজের সন্তান। বনী ইসরাঈল (ক্ষিপ্ত হয়ে) তার কাছে এসে তাকে ইবাদতগাহ থেকে বের করে আনল, তার ইবাদতগাহ ধূলিসাৎ করে দিল এবং তাকে মারধর করতে লাগল। জুরাইজ বললেন, তোমাদের কি হয়েছে? তারা বলল, তুমি এই নষ্টা মহিলার সাথে যেনা করেছ। ফলে একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েছে। তিনি বললেন, শিশুটি কোথায়? তারা শিশুটিকে নিয়ে আসল। জুরাইজ বললেন, আমাকে একটু সুযোগ দাও ছালাত আদায় করে নেই। তিনি ছালাত আদায় করলেন। ছালাত শেষ করে তিনি শিশুটির কাছে এসে তার পেটে খোঁচা মেরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই শিশু! তোমার পিতা কে’? সে বলল, ‘আমার পিতা অমুক রাখাল’। উপস্থিত লোকেরা তখন জুরাইজের নিকটে এসে তাকে চুম্বন করতে লাগল এবং তার শরীরে হাত বুলাতে লাগল। আর তারা বলল, এখন আমরা তোমার ইবাদতগাহটি সোনা দিয়ে তেরী করে দিচ্ছি। তিনি বললেন, দরকার নেই, বরং পূর্বের মত মাটি দিয়েই তৈরী করে দাও। অতঃপর তারা তাই করল।

    (৩) একটি শিশু তার মায়ের দুধ পান করছিল। এমন সময় একটি লোক দ্রুতগামী ও উন্নত মানের একটি পশুতে সওয়ার হয়ে সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। তার পোষাক-পরিচ্ছদ ছিল উন্নত। শিশুটির মা বলল, ‘হে আল্লাহ! আমার ছেলেটিকে এই ব্যক্তির মত যোগ্য কর’। শিশুটি দুধ পান ছেড়ে দিয়ে লোকটির দিকে এগিয়ে এসে তাকে দেখতে লাগল। অতঃপর বলল, ‘হে আল্লাহ!  আমাকে এই ব্যক্তির মত কর না’? অতঃপর ফিরে এসে পুনরায় মায়ের দুধ পান করতে লাগল। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি যেন এখনও দেখছি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) শিশুটির দুধ পানের চিত্র তুলে ধরছেন এবং নিজের তর্জনী মুখে দিয়ে চুষছেন। তিনি বলেন, লোকেরা একটি বাঁদিকে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছিল। আর বলছিল, তুমি যেনা করেছ এবং চুরি করেছ। মেয়ে লোকটি বলছিল, ‘আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই আমার উত্তম অভিভাবক’। শিশুটির  মা বলল, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার সন্তানকে এই নষ্টা নারীর মত কর না’। শিশুটি দুধ পান ছেড়ে দিয়ে মেয়েটির দিকে তাকাল, অতঃপর বলল, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এই নারীর মত কর’।

    এ সময় মা ও শিশুটির মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেল। মা বলল, হায় দুর্ভাগা! একটি সুশ্রী লোক চলে যাওয়ার সময় আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ!  আমার  সন্তানকে এরূপ যোগ্য করে দাও’। তুমি প্রত্যুত্তরে বললে, ‘হে আল্লাহ!  আমাকে এর মত কর না’। আবার এই ক্রীতদাসীকে লোকেরা মারধর করতে করতে নিয়ে যাচ্ছে এবং বলছে, তুমি যেনা করেছ এবং চুরি করেছ। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে এরূপ কর না’। আর তুমি বললে,‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এরূপ কর’। শিশুটি এবার জবাব দিল, প্রথম ব্যক্তি ছিল স্বৈরাচারী যালেম। সেজন্যই আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ! আমাকে এ ব্যক্তির মত কর না? আর এই মহিলাটিকে তারা বলল, তুমি যেনা করেছ। প্রকৃতপক্ষে সে যেনা করেনি। তারা বলছিল, তুমি চুরি করেছ। আসলে সে চুরি করেনি। এজন্যই আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ! আমাকে এই মেয়ে লোকটির মত কর’ (বুখারী হা/৩৪৩৬ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৮, হা/২৪৮২ ‘মাযালিম’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩৫; মুসলিম হা/২৫৫০ ‘সদ্ব্যবহার ও শিষ্টাচার’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-২)।

    শিক্ষা :

    ১. আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা থাকলে কেউ পদস্খলন ঘটাতে পারবে না।

    ২. কোন হক্বপন্থী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যতই ষড়যন্ত্র করা হোক না কেন, তা একদিন সত্যরূপে প্রকাশিত হবেই এবং ষড়যন্ত্রকারীরা লজ্জিত হবে।

    ৩. আমরা যাকে ভাল মনে করি, প্রকৃতপক্ষে সে ভাল নাও হ’তে পারে। পক্ষান্তরে যাকে খারাপ মনে করি, প্রকৃতপক্ষে সে খারাপ নাও হ’তে পারে।

    ৪. সর্বদা পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে হবে।

    একজন খুনীর তওবা ও জান্নাত লাভ

    বনী ইসরাঈলের জনৈক ব্যক্তি নিরানববই জন মানুষকে হত্যা করে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ আলেমের সন্ধান করল। অতঃপর তাকে একজন খৃষ্টান পাদ্রীর কথা বলা হ’লে সে তার নিকট এসে বলল যে, সে নিরানববইজন ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। এমতাবস্থায় তার জন্য তওবার কোন সুযোগ আছে কি? পাদ্রী বলল, নেই। ফলে লোকটি পাদ্রীকেও হত্যা করল। এভাবে তাকে হত্যা করে সে একশত সংখ্যা পূর্ণ করল। অতঃপর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আলেমের সন্ধান করায় তাকে একজন আলেমের কথা বলা হ’ল। সে তাঁর নিকট গিয়ে বলল যে, সে একশ’জনকে হত্যা করেছে, এখন তার জন্য তওবার কোন সুযোগ আছে কি? আলেম বললেন, ‘হ্যাঁ, আছে। তার ও তার তওবার মাঝে কিসে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করল? তুমি অমুক জায়গায় চলে যাও। সেখানে কিছু লোক আল্লাহর ইবাদত করছে। তুমিও তাদের সাথে ইবাদত কর। আর তোমার দেশে ফিরে যাবে না। কেননা ওটা খারাপ জায়গা। লোকটি নির্দেশিত জায়গার দিকে চলতে থাকল।

    অর্ধেক পথ অতিক্রম করলে তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হ’ল। সে তার বক্ষদেশ দ্বারা সে স্থানটির দিকে ঘুরে গেল। মৃত্যুর পর রহমতের ও আযাবের ফেরেশতামন্ডলীর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। রহমতের ফেরেশতা বলল, এ লোকটি নিখাদ তওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে। পক্ষান্তরে আযাবের ফেরেশতা বলল, লোকটিতো কখনও কোন ভাল কাজ করেনি। এমন সময় অন্য এক ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে তাদের নিকট আগমন করলেন। তখন তারা তাকেই এ বিষয়ের শালিস নিযুক্ত করল। তিনি বললেন, ‘তোমরা উভয় দিকের জায়গার দূরত্ব মেপে দেখ। যে দিকটি নিকটবর্তী হবে, সে দিকেরই সে অন্তর্ভুক্ত হবে’। আল্লাহ তা‘আলা সামনের ভূমিকে আদেশ করলেন, তুমি মৃত ব্যক্তির নিকটবর্তী হয়ে যাও এবং পিছনে ফেলে আসা স্থানকে আদেশ দিলেন, তুমি দূরে সরে যাও। অতঃপর জায়গা পরিমাপের পর যেদিকের উদ্দেশ্যে সে যাত্রা করেছিল, তারা তাকে সেদিকেরই এক বিঘত পরিমাণ নিকটবর্তী পেল। ফলে তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হ’ল এবং রহমতের ফেরেশতা তার জান কবয করল (আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, বুখারী হা/৩৪৭০, মুসলিম হা/২৭৬৬, মিশকাত হা/২৩২৭ ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়, ‘ইস্তিগফার ও তওবা’ অনুচ্ছেদ)।

    শিক্ষা :

    ১. পাপী যদি পাহাড় পরিমাণও পাপ করে তবুও সে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে খালেছ অন্তরে তওবা করলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন। যেমন তিনি বলেন, ‘বল, হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ আল্লাহর অনুগ্রহ হ’তে নিরাশ হয়ো না; আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দিবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (যুমার ৫৩)। তিনি আরো বলেন, ‘তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন ও পাপ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন’ (শূরা ২৫)।

    ২. মূর্খ ব্যক্তি কোন সমস্যায় পড়লে কুরআন-সুন্নাহ্তে অভিজ্ঞ কোন আলেমের কাছে জিজ্ঞেস করে তার সমস্যার সমাধান করে নিবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা না জান তাহ’লে সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণসহ জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞেস কর’ (নাহল ৪৪)।

    ৩. কোন বিষয়ে যথাযথভাবে না জেনে সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না।

    ইবরাহীম  ( আঃ ),  সারা ও অত্যাচারী বাদশাহ

    আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবরাহীম (আঃ) তিনবার ছাড়া কখনও মিথ্যা বলেননি। তন্মধ্যে দু’বার ছিল আল্লাহর ব্যাপারে। তার উক্তি ‘আমি অসুস্থ’ (ছাফফাত ৮৯) এবং তাঁর অন্য এক উক্তি ‘বরং এ কাজ করেছে, এই তো তাদের বড়টি’ (আম্বিয়া ৬৩)। বর্ণনাকারী বলেন, একদা তিনি [ইবরাহীম (আঃ)] এবং সারা অত্যাচারী শাসকগণের কোন এক শাসকের এলাকায় এসে পৌঁছলেন। তখন তাকে খবর দেয়া হল যে, এ এলাকায় জনৈক ব্যক্তি এসেছে। তার সঙ্গে একজন সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা আছে। তখন সে তাঁর নিকট লোক পাঠাল। সে তাঁকে নারীটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল, এ নারীটি কে? তিনি উত্তর দিলেন, মহিলাটি আমার বোন। অতঃপর তিনি সারার নিকট আসলেন এবং বললেন, হে সারা! তুমি আর আমি ব্যতীত পৃথিবীতে আর কোন মু’মিন নেই। এ লোকটি আমাকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। তখন আমি তাকে জানিয়েছি যে, তুমি আমার বোন। কাজেই তুমি আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করো না। অতঃপর বাদশাহ সারাকে আনার জন্য লোক পাঠাল। তিনি তার নিকট প্রবেশ করলেন এবং রাজা তার দিকে হাত বাড়াল। সারা অযূ করে ছালাত আদায়ের জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন এবং এ দো‘আ করলেন, হে আল্লাহ! আমি তোমার উপর এবং তোমার রাসূলের উপর ঈমান এনেছি এবং আমার স্বামী ব্যতীত অন্যদের থেকে আমার লজ্জাস্থানকে সংরক্ষণ করেছি। তুমি এই কাফেরকে আমার উপর ক্ষমতা দিও না। তখন রাজা বেহুঁশ হয়ে পড়ে মাটিতে পা দ্বারা আঘাত করতে লাগল। অতঃপর সারা বললেন, হে আল্লাহ! এ যদি মৃত্যুবরণ করে তবে লোকেরা বলবে, মহিলাটি একে হত্যা করেছে। তখন সে জ্ঞান ফিরে পেল। এ ঘটনা আরো দু’বার বা তিনবার ঘটার পর রাজা তার এক দারোয়ানকে ডেকে বলল, তুমি তো আমার নিকট কোন মানুষ আননি। বরং এনেছ এক শয়তান। অতঃপর রাজা সারার খিদমতের জন্য হাজেরাকে দান করল। অতঃপর তিনি (সারা) তাঁর (ইবরাহীম) নিকট আসলেন, তিনি দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করছিলেন। তখন তিনি হাত দ্বারা ইশারা করে সারাকে বললেন, কি ঘটেছে? তখন সারা বললেন, আল্লাহ কাফির বা ফাসিকের চক্রান্ত তারই বুকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আর সে হাজেরাকে খিদমতের জন্য দান করেছে। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, হে আকাশের পানির (যমযম) ছেলেরা! হাজেরাই তোমাদের আদি মাতা (বুখারী হা/২২১৭, ৩৩৫৮ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৮, মিশকাত হা/৫৭০৪)।

    শিক্ষা :

    ১.  আল্লাহ তাঁর একনিষ্ঠ বান্দাদেরকে যাবতীয় বিপদ থেকে রক্ষা করেন।

    ২. সারার ঈমান ও চারিত্রিক দৃঢ়তা সকল মুসলিম রমণীর জন্য অনুকরণীয়।

    ৩. প্রকৃত ঈমানদারদের সংখ্যা সর্বদা কমই হয়ে থাকে। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্যের মানদন্ড নয়।

    মূসা  ( আঃ )  ও মালাকুল মঊত

    আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেন, মালাকুল মউতকে মূসা (আঃ)-এর নিকট পাঠান হয়েছিল। ফেরেশতা যখন তাঁর নিকট আসলেন, তখন তিনি তাঁকে চপেটাঘাত করলেন। এতে তাঁর একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেল। তখন ফেরেশতা তাঁর রবের নিকট ফিরে গেলেন এবং বললেন, আপনি আমাকে এমন এক বান্দার নিকট পাঠিয়েছেন যে মরতে চায় না। আল্লাহ্ বললেন, তুমি তার নিকট ফিরে যাও এবং তাকে বল, সে যেন তার একটি হাত একটি গরুর পিঠে রাখে, তার হাত যতগুলো পশম ঢাকবে তার প্রতিটি পশমের বদলে তাকে এক বছর করে জীবন দেয়া হবে। মূসা (আঃ) বললেন, হে রব! অতঃপর কি হবে? আল্লাহ্ বললেন, অতঃপর মৃত্যু। মূসা (আঃ) বললেন, তাহ’লে এখনই হোক। রাবী বলেন, তখন তিনি আল্লাহর নিকট আরয করলেন, তাঁকে যেন ‘আরযে মুক্বাদ্দাসা’ (জেরুজালেম) হ’তে একটি পাথর নিক্ষেপের দূরত্বের সমান স্থানে পৌঁছে দেয়া হয়। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন, আমি যদি সেখানে থাকতাম তাহ’লে অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পথের ধারে লাল টিলার নীচে তাঁর কবরটি দেখিয়ে দিতাম (বুখারী হা/৩৪০৭ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩১, মুসলিম হা/২৩৭২)।

    শিক্ষা : মৃত্যু চিরসত্য, অনিবার্য। এত্থেকে পালানোর কোন পথ নেই।

    সুলায়মান  ( আঃ )- এর হিকমতপূর্ণ বিচার

    আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন, দু’জন মহিলা ছিল, তাদের সাথে দু’টি সন্তানও ছিল। হঠাৎ একটি বাঘ এসে তাদের একজনের ছেলেকে নিয়ে গেল। সঙ্গের একজন মহিলা বলল, ‘তোমার ছেলেটিকেই বাঘে নিয়ে গেছে’। অন্য মহিলাটি বলল, ‘না, বরং বাঘে তোমার ছেলেটি নিয়ে গেছে’। অতঃপর উভয়ে এ বিষয়ে দাঊদ (আঃ)-এর নিকট বিরোধ মীমাংসার জন্য বিচারপ্রার্থী হ’ল। তখন তিনি ছেলেটির বিষয়ে বয়ষ্কা মহিলাটির পক্ষে রায় দিলেন। অতঃপর তারা উভয়ে বেরিয়ে দাঊদ (আঃ)-এর পুত্র সুলায়মান (আঃ)-এর নিকট দিয়ে যেতে লাগল এবং তারা দু’জনে তাঁকে ব্যাপারটি জানালেন। তখন তিনি লোকদেরকে বললেন, তোমরা আমার নিকট একখানা ছোরা নিয়ে আস। আমি ছেলেটিকে দু’টুকরা করে তাদের দু’জনের মধ্যে ভাগ করে দেই। এ কথা শুনে অল্প বয়ষ্কা মহিলাটি বলে উঠল, তা করবেন না, আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন। ছেলেটি তারই। তখন তিনি ছেলেটি সম্পর্কে অল্প বয়ষ্কা মহিলাটির অনুকূলে রায় দিলেন (বুখারী হা/৩৪২৭ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪০, মুসলিম হা/১৭২০, মিশকাত হা/৫৭১৯)।

    শিক্ষা :

    ১. সন্তানের প্রতি মায়ের ভালবাসা অপরিসীম।

    ২. সুলায়মান (আঃ)-এর বিচক্ষণতা।

    ৩. প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা ন্যায়বিচারের পূর্বশর্ত।

    খিযির ও মূসা  ( আঃ )- এর কাহিনী

    হযরত ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, হযরত উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হ’তে আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) একদা বনী ইসরাঈলের এক সমাবেশে ভাষণ দিতে দাঁড়ালে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হ’ল, কোন্ ব্যক্তি সর্বাধিক জ্ঞানী? তিনি বললেন, আমিই সর্বাধিক জ্ঞানী। জ্ঞানকে আল্লাহর দিকে সোপর্দ না করার কারণে আল্লাহ তাকে তিরষ্কার করে বললেন, বরং দু’সাগরের সঙ্গমস্থলে আমার এক বান্দা আছে, যিনি তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী। হযরত মূসা (আঃ) বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাঁর নিকট পৌঁছতে কে আমাকে সাহায্য করবে? কখনো সুফইয়ান এভাবে বর্ণনা করেছেন, আমি কিভাবে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারি? তখন বলা হ’ল, তুমি একটি থলিতে করে একটি মাছ নাও। যেখানে তুমি মাছটি হারাবে, সেখানেই আমার সে বান্দা আছে। অতঃপর হযরত মূসা (আঃ) একটি মাছ ধরলেন এবং থলিতে রাখলেন। অতঃপর মাছ নিয়ে তাঁর সঙ্গী ইউশা বিন নূনকে সাথে নিয়ে চললেন। শেষ পর্যন্ত তারা একটি পাথরের কাছে পৌঁছলেন এবং তার উপর মাথা রেখে বিশ্রাম নিলেন। মূসা (আঃ) ঘুমিয়ে পড়লেন। এ সময় মাছটি থলি থেকে বের হয়ে লাফিয়ে সমুদ্রে চলে গেল। অতঃপর সে সমুদ্রে সুড়ঙ্গের মত পথ করে নিল। আর আল্লাহ মাছটির চলার পথে পানির প্রবাহ থামিয়ে দিলেন। ফলে তার গমনপথটি সুড়ঙ্গের মত হয়ে গেল। অতঃপর তারা উভয়ে অবশিষ্ট রাত এবং পুরো দিন পথ চললেন। পরদিন সকালে হযরত মূসা (আঃ) তাঁর সাথীকে বললেন, আমরা তো সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, আমাদের খাবার নিয়ে এস।

    হযরত মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ যে স্থানে যাবার কথা বলেছিলেন, সেই স্থান অতিক্রম করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি কোনরূপ ক্লান্তিবোধ করেননি। সাথী ইউশা বিন নূন তখন বলল, আপনি কি ভেবে দেখেছেন, যে পাথরটির নিকট আমরা বিশ্রাম নিয়েছিলাম সেখানেই মাছটি অদ্ভুতভাবে সমুদ্রের মধ্যে চলে গেছে। কিন্তু আমি মাছটির কথা আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। মূলতঃ শয়তানই আমাকে এ কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, পথটি মাছের জন্য ছিল একটি সুড়ঙ্গের মত আর তাঁদের জন্য ছিল আশ্চর্যজনক ব্যাপার। হযরত মূসা (আঃ) বললেন, আমরা তো সেই স্থানটিরই অনুসন্ধান করছি। অতঃপর তারা তাদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চললেন এবং ঐ পাথরের নিকটে পৌঁছে দেখলেন, এক ব্যক্তি কাপড় মুড়ি দিয়ে বসে আছেন। মূসা (আঃ) তাঁকে সালাম দিলেন। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, এখানে সালাম কি করে এলো? তিনি বললেন, আমি মূসা। খিযির জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি বনী ইসরাঈল বংশীয় মূসা? মূসা (আঃ) বললেন, হ্যাঁ। আমি এসেছি এজন্য যে, সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে, তা হ’তে আপনি আমাকে শিক্ষা দিবেন। খিযির বললেন, হে মূসা! আমার আল্লাহ প্রদত্ত কিছু জ্ঞান আছে, যা আপনি জানেন না। আর আপনিও আল্লাহ প্রদত্ত এমন কিছু জ্ঞানের অধিকারী, যা আমি জানি না। মূসা (আঃ) বললেন, আমি কি আপনার সাথী হ’তে পারি? খিযির বললেন, ‘আপনি কিছুতেই আমার সাথে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। যে বিষয় আপনার জ্ঞানের আওতাধীন নয় সে বিষয়ে আপনি ধৈর্যধারণ করবেন কেমন করে? মূসা (আঃ) বললেন, ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আপনার কোন আদেশ আমি অমান্য করব না’ (কাহফ ৬৭-৬৯)।

    অতঃপর তাঁরা দু’জনে সাগরের কিনারা ধরে হেঁটে চললেন। তখন একটি নৌকা তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা তাদেরকে নৌকায় তুলে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। তারা খিযির-কে চিনতে পেরে বিনা ভাড়ায় তাঁদেরকে নৌকায় তুলে নিল। যখন তাঁরা দু’জনে নৌকায় চড়লেন, তখন একটি চড়ুই পাখি এসে নৌকাটির কিনারায় বসল এবং সমুদ্র থেকে এক ফোঁটা বা দুই ফোঁটা পানি পান করল। খিযির বললেন, হে মূসা! আমার ও আপনার জ্ঞানের দ্বারা আল্লাহর জ্ঞান হ’তে ততটুকুও কমেনি যতটুকু এ পাখিটি তাঁর ঠোটের দ্বারা সাগরের পানি হরাস করেছে। তখন খিযির একটি কুড়াল নিয়ে নৌকাটির একটা তক্তা খুলে ফেললেন। মূসা (আঃ) অকস্মাৎ দৃষ্টি দিতেই দেখতে পেলেন যে, তিনি কুড়াল দিয়ে একটি তক্তা খুলে ফেলেছেন। তখন তিনি তাঁকে বললেন, আপনি একি করলেন? এ লোকেরা বিনা ভাড়ায় আমাদেরকে নৌকায় তুলে নিল, আর আপনি তাদেরকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য নৌকা ছিদ্র করে দিলেন? আপনি তো একটি গুরুতর কাজ করলেন। খিযির বললেন, আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সাথে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। মূসা (আঃ) বললেন, আমার ভুলের জন্য আমাকে অপরাধী করবেন না এবং আমার এ ব্যবহারে আমার প্রতি কঠোর হবেন না। মূসা (আঃ)-এর পক্ষ থেকে প্রথম এ কথাটি ছিল ভুলক্রমে।

    অতঃপর তাঁরা যখন উভয়ে সমুদ্র পার হলেন, তখন তারা একটি বালকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, যে অন্যান্য বালকদের সাথে খেলা করছিল। খিযির ছেলেটির মাথা দেহ হ’তে ছিন্ন করে ফেললেন। হযরত মূসা (আঃ) বললেন, আপনি একটি নিষ্পাপ শিশুকে বিনা অপরাধে হত্যা করলেন? আপনি খুবই খারাপ একটা কাজ করলেন। খিযির বললেন, আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সাথে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। মূসা (আঃ) বললেন, এরপর যদি আমি আপনাকে আর কোন প্রশ্ন করি, তাহ’লে আমাকে আর সঙ্গে রাখবেন না।

    অতঃপর উভয়ে চলতে লাগলেন। চলতে চলতে তাঁরা একটি জনপদের অধিবাসীদের নিকট পৌঁছে তাদের নিকট কিছু খাবার চাইলেন। কিন্তু জনপদবাসী তাদের দু’জনের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। সেখানে তারা একটি প্রাচীর দেখতে পেলেন, যা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। হযরত খিযির প্রাচীরটি মেরামত করে সুদৃঢ় করে দিলেন। হযরত মূসা (আঃ) বললেন, এই বসতির লোকদের নিকট এসে আমরা খাবার চাইলাম। তারা মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। অথচ আপনি এদের দেয়াল সোজা করে দিলেন। আপনি তো ইচ্ছা করলে এর জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারতেন। হযরত খিযির বললেন, এবার আমার এবং আপনার মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে গেল। এক্ষণে যে বিষয়ে আপনি ধৈর্যধারণ করতে পারেননি, আমি এর তাৎপর্য বলে দিচ্ছি।

    নৌকাটির ব্যাপার ছিল এই যে, সেটি ছিল কয়েকজন দরিদ্র ব্যক্তির। তারা সমুদ্রে জীবিকা অন্বেষণ করত। আমি নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করে দিতে চাইলাম। কারণ, তাদের সামনে ছিল এক রাজা, যে ভাল নৌকা পেলেই জোরপূর্বক কেড়ে নিত। তারপর যখন এটাকে দখল করতে লোক আসল, তখন ছিদ্রযুক্ত দেখে ছেড়ে দিল। অতঃপর নৌকাওয়ালারা একটা কাঠ দ্বারা নৌকাটি মেরামত করে নিল।

    আর বালকটি সূচনালগ্নেই ছিল কাফের। আর সে ছিল তার ঈমানদার বাবা-মার বড়ই আদরের সন্তান। আমি আশঙ্কা করলাম যে, সে বড় হয়ে অবাধ্যতা ও কুফরী দ্বারা তাদেরকে কষ্ট দিবে। অতঃপর আমি ইচ্ছা করলাম যে, তাদের পালনকর্তা তাদেরকে তার চেয়ে পবিত্রতায় ও ভালবাসায় ঘনিষ্ঠতর একটি শ্রেষ্ঠ সন্তান দান করুন।

    আর প্রাচীরের ব্যাপার এই যে, সেটি ছিল নগরের দু’জন ইয়াতীম বালকের। এর নীচে ছিল তাদের গুপ্তধন। তাদের পিতা ছিলেন সৎকর্মপরায়ণ। সুতরাং আপনার পালনকর্তা দয়াপরবশ হয়ে ইচ্ছা পোষণ করলেন যে, তারা যৌবনে পদার্পণ করে নিজেদের গুপ্তধন উদ্ধার করুক। আমি নিজ ইচ্ছায় এসব করিনি। আপনি যে বিষয়গুলোতে ধৈর্যধারণ করতে পারেননি, এই হ’ল তার ব্যাখ্যা (কাহফ ৭৯-৮২; ছহীহ বুখারী হা/৩৪০১ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, ‘খিযিরের সাথে মূসা (আঃ)-এর কাহিনী’ অনুচ্ছেদ, মুসলিম হা/২৩৮০, ‘ফাযায়েল’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৬)।

    শিক্ষা :

    ১. সকল জ্ঞানের আধার আল্লাহ রাববুল আলামীন। তিনি যাকে যতটুকু ইচ্ছা প্রদান করেন।

    ২. জ্ঞান অর্জনের জন্য সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    ৩. শয়তান সর্বদা মানুষের পিছে পড়ে থাকে। সে তাকে প্রতিনিয়ত আল্লাহবিমুখ করার চেষ্টা করে।

    ৪. জ্ঞান অর্জনের জন্য ধৈর্য অবলম্বন করা যরূরী।

    ৫. অহংকার করা বা নিজেকে সবচেয়ে জ্ঞানী ভাবা ঠিক নয়।

    আবূ ত্বালিবের মৃত্যুর ঘটনা

    সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব তার পিতা মুসাইয়্যাব (রহঃ) হ’তে বর্ণনা করেন, যখন আবূ ত্বালিব মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হ’লেন, রাসূল (সাঃ) তার নিকট গেলেন। আবূ জাহলও সেখানে ছিল। নবী (সাঃ) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, চাচাজান! ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লা-হ’ কালেমাটি একবার পড়ুন, তাহ’লে আমি আপনার জন্য আল্লাহর নিকট কথা বলতে পারব। তখন আবূ জাহল ও আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়া বলল, হে আবূ ত্বালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হ’তে ফিরে যাবে? এরা দু’জন তার সাথে একথাটি বারবার বলতে থাকল। সর্বশেষ আবূ ত্বালিব তাদের সাথে যে কথাটি বলল, তা হ’ল, আমি আব্দুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপরেই আছি। এ কথার পর নবী (সাঃ) বললেন, ‘আমি আপনার জন্য ক্ষমা চাইতে থাকব যে পর্যন্ত আপনার ব্যাপারে আমাকে নিষেধ করা না হয়’। এ প্রসঙ্গে এ আয়াতটি নাযিল হল ‘নবী ও মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে মুশরিকদের জন্য যদি তারা নিকটাত্মীয়ও হয়, তবুও যখন তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামী’ (তওবা ১১৩)। আরো নাযিল হল : ‘আপনি যাকে ভালোবাসেন, ইচ্ছা করলেই তাকে হিদায়াত করতে পারবেন না’ (ক্বাছাছ ৫৬; বুখারী হা/৩৮৮৪ ‘আনছারদের মর্যাদা’ অধ্যায়, ‘আবু ত্বালিবের কাহিনী’ অনুচ্ছেদ)।

    আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত যে, তিনি নবী (সাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, যখন তাঁর সামনে তাঁর চাচা আবূ ত্বালিবের আলোচনা করা হ’ল, তখন তিনি বললেন, আশা করি ক্বিয়ামতের দিনে আমার সুফারিশ তার উপকারে আসবে। অর্থাৎ আগুনের হালকা স্তরে তাকে ফেলা হবে। যা তার পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পৌঁছবে আর এতে তার মগয টগবগ করে ফুটতে থাকবে (ঐ, হা/৩৮৮৫)।

    শিক্ষা :

    ১. হেদায়াতের মালিক আল্লাহ তা‘আলা। তিনি যাকে ইচ্ছা হেদায়াত করেন, যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। এজন্য সবসময় তাঁর কাছে হেদায়াত চাইতে হবে।

    ২. জাহান্নামের আযাব অত্যন্ত ভয়াবহ। সবচেয়ে হালকা শাস্তি হওয়ার পরেও যদি আবূ ত্বালিবের এই অবস্থা হয়, তাহ’লে অন্যদের কি অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়।

    ৩. সমাজ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা মানুষকে অনেক সময় হক গ্রহণ থেকে বিমুখ রাখে।

    ছুমামাহর প্রতি রাসূলুল্লাহ  ( সাঃ )- এর উত্তম আচরণের অনুপম নিদর্শন

    আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার রাসূল (সাঃ) নাজদের দিকে কিছু অশ্বারোহী (সৈন্য) পাঠালেন। তারা বনী হানীফা গোত্রের জনৈক ব্যক্তিকে ধরে আনল। তার নাম ছুমামাহ বিন উছাল। সে ইয়ামামাবাসীদের সরদার। তারা তাকে মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখল। রাসূল (সাঃ) তার কাছে আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহে ছুমামাহ! তুমি কি মনে করছ’? সে বলল,

    عِنْدِى يَا مُحَمَّدُ خَيْرٌ إِنْ تَقْتُلْ تَقْتُلْ ذَا دَمٍ وَإِنْ تُنْعِمْ تُنْعِمْ عَلَى شَاكِرٍ وَإِنْ كُنْتَ تُرِيدُ الْمَالَ فَسَلْ تُعْطَ مِنْهُ مَا شِئْتَ-

    ‘হে মুহাম্মাদ! আমার ধারণা ভালই। যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন, তাহ’লে অবশ্যই আপনি একজন খুনীকে হত্যা করবেন। আর  যদি আপনি অনুগ্রহ করেন

    , তাহ’লে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপরই অনুগ্রহ করবেন। আর যদি আপনি মাল চান, তাহ’লে যা ইচ্ছা চাইতে পারেন, তা আদায় করা হবে’। তার কথা শুনে রাসূল (সাঃ) তাকে (সেদিনের মত তার নিজের অবস্থার উপর) ছেড়ে দিলেন।

    অতঃপর পরের দিন নবী করীম (সাঃ) তাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহে ছুমামাহ! তোমার কি মনে হচ্ছে’? সে জবাবে বলল, ‘তাই মনে হচ্ছে, যা আমি আপনাকে পূর্বেই বলেছি। যদি আপনি আমার প্রতি মেহেরবানী করেন, তাহ’লে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপর মেহেরবানী করবেন। আর যদি আপনি হত্যা করেন, তাহ’লে একজন খুনী লোককে হত্যা করবেন। আর যদি মাল-সম্পদ চান, তাহ’লে যা ইচ্ছা চাইতে পারেন, তা দেয়া হবে’। রাসূল (সাঃ) আজও তাকে (নিজের অবস্থার উপর) ছেড়ে দিলেন। এভাবে রাসূল (সাঃ) তৃতীয় দিনে  তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহে ছুমামাহ! তোমার কি মনে হচ্ছে’? জওয়াবে সে বলল, ‘আমার তাই মনে হচ্ছে, যা আমি পূর্বেই আপনাকে বলেছি।  যদি আপনি আমার  প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন করেন, তাহ’লে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপরই অনুকম্পা করবেন। আর যদি আপনি  আমাকে হত্যা করেন, তাহ’লে একজন খুনীকে হত্যা করবেন। আর যদি আপনি মাল-সম্পদ চান, তাহ’লে যতটা ইচ্ছা চাইতে পারেন, তা দেয়া হবে’।

    অতঃপর রাসূল (সাঃ) বললেন, ‘তোমরা ছুমামাহকে ছেড়ে দাও’! (তাকে ছেড়ে দেওয়া হ’ল)। অতঃপর সে মসজিদের নিকটবর্তী একটি খেজুর বাগানে গিয়ে গোসল করল। অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করে বলে উঠল : ‘আশহাদু আল্লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়া আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহূ ওয়া রাসূলুহু’। ‘হে মুহাম্মাদ! আল্লাহর কসম! পৃথিবীর বুকে আপনার চেহারা অপেক্ষা আর কারও চেহারা আমার নিকট অধিক ঘৃণ্য ছিল না। কিন্তু এখন আপনার চেহারা আমার কাছে সবচেয়ে বেশী প্রিয় হয়ে গেছে। আল্লাহর কসম! (ইতিপূর্বে) আপনার দ্বীন অপেক্ষা অধিক অপ্রিয় দ্বীন আমার কাছে আর কোনটিই ছিল না। কিন্তু এখন আপনার দ্বীনই আমার কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয় হয়ে  গেছে। আল্লাহর কসম! (এর আগে) আপনার শহরের চেয়ে অধিক ঘৃণ্য শহর আর কোনটিই আমার কাছে ছিল না। কিন্তু এখন আপনার শহরটিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হয়ে গেছে। আপনার অশ্বারোহীরা আমাকে এমন অবস্থায় ধরে এনেছে, যখন আমি ওমরাহ করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলাম। এখন আপনি আমাকে কি করতে হুকুম দিচ্ছেন? রাসূল (সাঃ) তাকে সুসংবাদ শুনালেন এবং ওমরাহ পালনের আদেশ করলেন। এরপর যখন তিনি মক্কায় পৌঁছলেন, তখন জনৈক ব্যক্তি তাকে বলল, তুমি না কি বেদ্বীন হয়ে গেছ? তিনি জওয়াবে বললেন, ‘তা হবে কেন; বরং আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আর আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর অনুমতি ছাড়া তোমাদের কাছে ইয়ামামা হ’তে আর একটি গমের দানাও আসবে না’ (বুখারী হা/৪৬২, মুসলিম হা/১৭৬৪, আলবানী, মিশকাত হা/৩৯৬৪, ‘জিহাদ’ অধ্যায়, ‘যুদ্ধবন্দীদের বিধান’ অনুচ্ছেদ)।

    শিক্ষা :

    উত্তম আচরণ ও ক্ষমার মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। এজন্যই বলা হয়, ক্ষমাই উত্তম প্রতিশোধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মন্দকে ভাল দ্বারা মোকাবেলা কর, ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হবে’ (হা-মীম সাজদাহ ৩৪)।

    মুহাম্মাদ  ( সাঃ )- ই একমাত্র শাফা ‘ আতকারী

    হযরত আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন মুমিনগণকে (হাশরের ময়দানে স্ব স্ব অপরাধের কারণে) বন্দী রাখা হবে। তাতে তারা অত্যন্ত চিন্তিত ও অস্থির হয়ে পড়বে এবং বলবে, ‘যদি আমরা আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলার নিকট কারো মাধ্যমে সুপারিশ কামনা করি, যিনি আমাদের বর্তমান অবস্থা থেকে স্বস্তি দিবেন’। সেই লক্ষ্যে তারা আদম (আঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলবে, ‘আপনি মানবজাতির পিতা আদম, আপনাকে আল্লাহ নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, জান্নাতে বসবাস করিয়েছেন, ফেরেশতা মন্ডলীকে দিয়ে আপনাকে সিজদা করিয়েছিলেন এবং তিনিই যাবতীয় বস্ত্তর নাম আপনাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুপারিশ করুন, যেন তিনি আমাদেরকে এই কষ্টদায়ক স্থান হ’তে মুক্ত করে প্রশান্তি দান করেন’। তখন আদম (আঃ) বলবেন, ‘আমি তোমাদের এই কাজের মোটেই উপযুক্ত নই’।

    নবী করীম (সাঃ) বলেন, তখন তিনি গাছ হ’তে ফল খাওয়ার অপরাধের কথা স্মরণ করবেন, যা হ’তে তাঁকে নিষেধ করা হয়েছিল। [আদম (আঃ) বলবেন] ‘বরং তোমরা মানবজাতির জন্য আল্লাহ তা‘আলার প্রেরিত সর্বপ্রথম নবী নূহ (আঃ)-এর নিকট যাও’। তারা নূহ (আঃ)-এর কাছে গেলে তিনি তাদেরকে বলবেন, ‘আমি তোমাদের এ কাজের জন্য একেবারেই যোগ্য নই’। সাথে সাথে তিনি তাঁর ঐ অপরাধের কথা স্মরণ করবেন , যা অজ্ঞতাবশতঃ নিজের (অবাধ্য) ছেলেকে পানিতে  না ডুবানোর জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। (তিনি বলবেন) ‘বরং তোমরা  আল্লাহর খলীল হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকটে যাও’।

    রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, এবার তারা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকটে যাবে। তখন তিনি বলবেন , ‘আমি তোমাদের এ কাজের জন্য কিছুই করার ক্ষমতা রাখি না’। সাথে সাথে তাঁর তিনটি মিথ্যা উক্তির কথা স্মরণ করবেন এবং বলবেন, ‘বরং তোমরা মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও। তিনি আল্লাহর এমন এক বান্দা, যাঁকে আল্লাহ তাওরাত দান করেছেন, তাঁর সাথে বাক্যালাপ করেছেন এবং গোপন কথাবার্তার মাধ্যমে তাঁকে নৈকট্য দান করেছেন’। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, তখন তারা সকলে হযরত মূসা (আঃ) এর নিকটে আসলে তিনি বলবেন, ‘আমি তোমাদের জন্য সুপারিশের ক্ষেত্রে অপারগ’। তখন তিনি সেই প্রাণনাশের অপরাধের কথা স্মরণ করবেন, যা তাঁর হাতে সংঘটিত হয়েছিল এবং বলবেন, ‘বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা  ও তাঁর মনোনীত রাসূল, তাঁর কালেমা ও রূহ হযরত ঈসা (আঃ)-এর কাছে যাও’।

    নবী করীম (সাঃ) বলেন, তখন তারা সবাই হযরত ঈসা (আঃ)-এর কাছে গেলে তিনি বলবেন, ‘আমি তোমাদের এ কাজের উপযুক্ত নই। বরং তোমরা মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর কাছে যাও। তিনি আল্লাহ তা‘আলার  এমন এক বান্দা, যার আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘তারা আমার কাছে আসবে। আমি তখন আমার রবের কাছে তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করব। অতঃপর আমাকে তাঁর নিকট যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। আমি যখন তাঁকে দেখব, তখনই তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদায় পড়ে যাব। আল্লাহ আমাকে যতক্ষণ চাইবেন সিজদা অবস্থায় রাখবেন’। অতঃপর বলবেন, ‘হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। আর যা বলার বল, তোমার কথা শুনা হবে। শাফা‘আত কর, কবুল করা হবে। তুমি চাও, তোমাকে দেওয়া হবে’।

    রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘তখন আমি মাথা উঠাব এবং আমার রবের এমনভাবে প্রশংসা বর্ণনা করব, যা তিনি আমাকে শিখিয়ে দিবেন। অতঃপর আমি শাফা‘আত করব। তবে এ ব্যাপারে আমার জন্য একটি সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। তখন আমি আল্লাহর দরবার হ’তে উঠে আসব এবং ঐ নির্ধারিত সীমার লোকদেরকে জাহান্নাম হ’তে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাব। তারপর আমি পুনরায় ফিরে এসে আমার প্রতিপালকের দরবারে হাযির হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করব। আমাকে অনুমতি দেওয়া হবে। আমি যখন তাঁকে দেখব, তখনই তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদায় পড়ে যাব এবং আল্লাহ যতক্ষণ চাইবেন আমাকে সিজদা অবস্থায় থাকতে দিবেন’। তারপর আল্লাহ বলবেন, ‘হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। আর যা বলার বল, তোমার কথা শুনা হবে, সুপারিশ কর, কবুল করা হবে। তুমি প্রার্থনা কর, যা প্রার্থনা করবে তা দেওয়া হবে’। রাসূল (সাঃ) বলেন, তখন আমি মাথা উঠাব এবং আমার রবের এমনভাবে প্রশংসা ও গুণকীর্তন বর্ণনা করব, যা আমাকে শিখিয়ে দেওয়া হবে। এরপর আমি শাফা‘আত করব। তবে এ ব্যাপারে আমার জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। তখন আমি আমার রবের দরবার হ’তে উঠে আসব এবং ঐ নির্দিষ্ট লোকগুলিকে জাহান্নাম হ’তে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাব। অতঃপর তৃতীয়বার ফিরে আসব এবং আমার প্রতিপালক আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করব। আমাকে তাঁর কাছে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। আমি যখন তাঁকে দেখব, তখনই সিজদায় পড়ে যাব। আল্লাহ যতক্ষণ ইচ্ছা আমাকে সিজদা অবস্থায় রাখবেন’। তারপর বলবেন, ‘হে মুহাম্মাদ!  মাথা উঠাও। তুমি যা বলবে তা শুনা হবে, সুপারিশ কর, কবুল করা হবে। প্রার্থনা কর, তা দেওয়া হবে’। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘তখন আমি মাথা উঠাব এবং আমার রবের এমন হামদ ও ছানা বর্ণনা করব, যা তিনি আমাকে শিখিয়ে দিবেন’। নবী করীম (সাঃ) বলেন, ‘তারপর আমি শাফা‘আত করব। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা আমার জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দিবেন। তখন আমি সেই দরবার থেকে বের হয়ে আসব এবং তাদেরকে জাহান্নাম হ’তে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাব’।

    অবশেষে কুরআন যাদেরকে আটকিয়ে রাখবে (অর্থাৎ যাদের জন্য কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী চিরস্থায়ী ঠিকানা জাহান্নামে নির্ধারিত হয়ে গেছে) তারা ব্যতীত আর কেউ জাহান্নামে অবশিষ্ট থাকবে না। বর্ণনাকারী ছাহাবী হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কুরআনের এই আয়াতটি عَسَى أَنْ يَّبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُوْدًا ‘আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক অচিরেই আপনাকে ‘মাক্বামে মাহমূদে’ পৌঁছিয়ে দেবেন’ (বনী ইসরাঈল ৭৯) তেলাওয়াত করলেন এবং বললেন, এটাই সেই ‘মাক্বামে মাহমূদ’ যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের নবীকে দেওয়া হয়েছে (ছহীহ বুখারী হা/৭৪৪০ ‘তাওহীদ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-২৪, মিশকাত হা/৫৫৭২ ‘ক্বিয়ামতের অবস্থা ও সৃষ্টির সূচনা’ অধ্যায়, ‘হাওযে কাওছার ও শাফা‘আত’ অনুচ্ছেদ)।

    শিক্ষা :

    ১. সকল নবী-রাসূলের উপর মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব।

    ২. রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর শাফা‘আতে পরকালে কিছু জাহান্নামীকে আল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এজন্য রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবীর এমন একটি দো‘আ রয়েছে, যা (আল্লাহর নিকট) গৃহীত হয়, আর নবী সে দো‘আ করে থাকেন। আমার ইচ্ছা, আমি আমার সে দো‘আর অধিকার আখেরাতে আমার উম্মতের শাফা‘আতের জন্য মুলতবি রাখি’ (বুখারী হা/৬৩০৪, ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১)।

    ৩. কোন পীর-ওলী পরকালে শাফা‘আতের অধিকার রাখবেন না।

    রাসূলুল্লাহ  ( সাঃ )- এর মু ‘ জিযা

    মুজাহিদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলতেন, আল্লাহর কসম, যিনি ছাড়া কোন (হক্ব) ইলাহ নেই। আমি ক্ষুধার যন্ত্রণায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকতাম। আর কখনও পেটে পাথর বেঁধে রাখতাম। একদা আমি তাঁদের (রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং ছাহাবীদের) রাস্তায় বসেছিলাম, যেখান দিয়ে তারা বের হ’তেন। আবূ বকর (রাঃ) রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। আমি এ উদ্দেশ্যেই তা করলাম, যেন তিনি আমাকে কিছু খেতে দিয়ে পরিতৃপ্ত করেন। কিন্তু তিনি চলে গেলেন, কিছুই করলেন না। এরপর ওমর (রাঃ) আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁকেও সেই একই উদ্দেশ্যে কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম।  কিন্তু তিনিও চলে গেলেন, কিছুই করলেন না।

    অতঃপর আবুল কাসেম [অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)] আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, আমাকে দেখে তিনি মুচকি হাসলেন। তিনি আমার চেহারা দেখে মনের কথা বুঝতে পারলেন এবং বললেন, ‘হে আবূ হির (রাঃ)! আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমি উপস্থিত। তিনি বললেন, ‘তুমি আমার সঙ্গে চল’! অতঃপর তিনি চললেন, আমি তাঁর অনুসরণ করলাম। তিনি বাড়ীতে প্রবেশ করলেন। অতঃপর আমি ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলাম। তিনি অনুমতি দিলে আমি প্রবেশ করলাম।

    তিনি ঘরে প্রবেশ করে একটি পেয়ালায় কিছু দুধ দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ দুধ কোথা থেকে এসেছে’? বাড়ির লোকজন উত্তর দিল, ‘অমুক পুরুষ অথবা অমুক মহিলা আপনার জন্য হাদিয়াস্বরূপ দিয়েছে’। তিনি বললেন, ‘হে আবূ হুরায়রা (রাঃ)’! আমি বললাম, ‘আমি হাযির হে আল্লাহর রাসূল’! তিনি বললেন, ‘আহলে ছুফ্ফা’র লোকদেরকে গিয়ে এখানে ডেকে আন’। (রাবী বলেন) ‘আহলে ছুফ্ফা’ ছিল ইসলামের মেহমান। তাদের পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ কিছুই ছিল না। আর এমন কেউ ছিল না, যার উপর ভরসা করা যায়। যখন কোন ছাদাক্বার মাল রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট আসত, তখন তিনি তাদের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। নিজে সেখান থেকে কিছুই গ্রহণ করতেন না। আর যদি কোন হাদিয়া (উপঢৌকন) আসত, তিনি সেখান থেকেও এক অংশ তাদের জন্য পাঠিয়ে দিয়ে এতে তাদেরকে শরীক করতেন এবং নিজে এক অংশ গ্রহণ করতেন।

    (আবু হুরায়রা বলেন) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর আদেশ শুনে আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। (মনে মনে) বললাম, এতটুকু দুধ দ্বারা ‘আহলে ছুফ্ফা’র কি হবে? আমিই এ দুধ পানের বেশী হকদার। আমি তা পান করলে আমার শরীরে শক্তি ফিরে পেতাম। যখন তারা এসে গেলেন, তখন তিনি আমাকে আদেশ দিলেন, আমিই যেন তাদেরকে দুধ পান করতে দেই। আর আমার আশা রইল না যে, এ দুধ থেকে আমি কিছু পাব। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর আদেশ মান্য করা ছাড়া আমার কোন গত্যন্তর ছিল না।

    সুতরাং আমি ‘আহলে ছুফ্ফার নিকট গিয়ে তাদেরকে ডেকে আনলাম’। তারা এসে (ঘরে প্রবেশের) অনুমতি চাইলে তিনি তাদেরকে অনুমতি দিলেন। তারা ঘরে এসে নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন। তিনি বললেন, হে আবূ হুরায়রা! আমি বললাম, আমি হাযির হে আল্লাহর রাসূল! রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে বললেন, এটি তাদেরকে দাও। আমি (দুধের) পেয়ালা হাতে নিয়ে দিতে শুরু করলাম। এক ব্যক্তির হাতে দিলাম, সে পান করে পরিতৃপ্ত হ’ল এবং আমাকে পেয়ালা ফেরত দিল। অতঃপর আমি অন্য একজনকে দিলাম, সেও তৃপ্তি সহকারে পান করে পেয়ালা ফেরত দিল। তৃতীয় জনকে দিলে সেও তাই করল। এভাবে আমি (সর্বশেষে) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট পৌঁছলাম। সবাই পরিতৃপ্ত হ’ল। তিনি পেয়ালা নিলেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ‘হে আবূ হুরায়রা’! আমি বললাম, ‘আমি হাযির হে আল্লাহর রাসূল’! তিনি বললেন, ‘এখন আমি আর তুমি বাকী’। আমি বললাম, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন হে আল্লাহর রাসূল’।

    তিনি বললেন, ‘বসে পড় এবং পান কর’। আমি বসে পান করলাম। তিনি (পুনরায়) বললেন, ‘পান কর’। আমি পান করলাম। তিনি একথা বলতেই থাকলেন, অবশেষে আমি বলতে বাধ্য হ’লাম যে, ‘আল্লাহর শপথ! যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, আমার পেটে আর জায়গা নেই’। তিনি বললেন, ‘তাহলে আমাকে দাও’। আমি তাঁকে দিলে তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং বিসমিল্লাহ বলে বাকী দুধ পান করলেন (ছহীহ বুখারী হা/৬৪৫২, ‘রিক্বাক্ব’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৭, মিশকাত হা/৪৬৭০ ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায়, ‘অনুমতি’ অনুচ্ছেদ)।

    শিক্ষা :

    ১. রাসূল (সাঃ) ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ। তিনি তাঁর ছাহাবীদের মুখ দেখেই তাদের অন্তরের অবস্থা বুঝতে পারতেন।

    ২. বসে পান করা সুন্নাত।

    ৩. বিসমিল্লাহ বলে পান করতে হবে।

    ৪. আমন্ত্রিত ব্যক্তি অনুমতি না নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করবে না।

    ৫. পরস্পর ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধির জন্য হাদিয়া বা উপঢৌকন প্রদান করা সুন্নাত।

    ৬. বিপদগ্রস্ত বা অভাবগ্রস্তকে সাহায্য করা মুমিনের অবশ্য কর্তব্য।

    মদীনায় হিজরতের পথে

    বারা ইবনু আযেব (রাঃ) তাঁর পিতা হ’তে বর্ণনা করেন যে, একদা আযেব (রাঃ) আবূ বকর (রাঃ)-কে বললেন, হে আবূ বকর! যে রাতে আপনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে (হিজরতের উদ্দেশ্যে) সফর করেছিলেন, সে রাতে আপনারা কি করেছিলেন আমাকে অবহিত করুন। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আমরা একদিন এক রাত পথ চলার পর যখন দ্বিপ্রহর হ’ল এবং পথ-ঘাট এমন শূন্য হ’ল যে, কাউকেও চোখে পড়ছিল না। এমন সময় একটি লম্বা পাথর আমাদের নযরে আসল। তার পাশে যথেষ্ট ছায়া ছিল। সেখানে রোদ পড়ত না। আমরা সেখানে অবতরণ করলাম এবং আমি নিজ হাতে  রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্য কিছু জায়গা সমান করলাম, যাতে তিনি শয়ন করতে পারেন। এরপর একটি চাদর বিছিয়ে দিয়ে তাঁকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি ঘুমান। আমি আপনাকে পাহারা দিচ্ছি ও সবদিক খেয়াল রাখছি। তিনি ঘুমিয়ে পড়লে আমি বের হয়ে চতুর্দিক থেকে তাকে পাহারা দিতে থাকলাম। তাঁকে পাহারা দেওয়ার সময় হঠাৎ দেখি একজন মেষচারক আমাদের ন্যায় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য পাথরটির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বকরীগুলিতে দুধ আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, তুমি কি তা (আমাদের জন্য) দোহন করবে? সে বলল, হ্যাঁ। অতঃপর সে একটি বকরী ধরে এনে একটি পাত্রে সামান্য দুধ দোহন করল। আমার নিকট একটি পাত্র ছিল, যা আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্য এনেছিলাম, যেন তা দিয়ে তিনি তৃপ্তি সহকারে পানি পান করতে এবং ওযূ করতে পারেন। অতঃপর  আমি দুধ নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকটে এসে তাঁকে ঘুম থেকে জাগানো ভাল মনে করলাম না। কিছুক্ষণ পরে তাঁকে জাগ্রত অবস্থায় পেলাম। তখন দুধ ঠান্ডা করার জন্য তাতে পানি মিশালাম, ফলে দুধের নিম্নভাগ পর্যন্ত ঠান্ডা হয়ে গেল। অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! পান করুন। তিনি পান করলেন। এতে আমি খুব সন্তুষ্ট হ’লাম।

    অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদের রওয়ানা হওয়ার সময় হয়েছে কি’? আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’। আবূ বকর (রাঃ) বলেন, সূর্য ঢলে যাওয়ার পর আমরা রওয়ানা হ’লাম। এদিকে সুরাকা ইবনু মালেক আমাদের অনুসরণ করছিল। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমাদের নিকটে শত্রু এসে পড়েছে’। তিনি বললেন, لاَ تَحْزَنْ إِنَّ اللهَ مَعَنَا ‘চিন্তা কর না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন’ (তওবা ৪০)। এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সুরাকার জন্য বদদো‘আ করলেন, ফলে তার ঘোড়াটি তাকে নিয়ে শক্ত মাটিতে পেট পর্যন্ত দেবে গেল। তখন সুরাকা বলল, ‘আমার বিশ্বাস তোমরা আমার জন্য বদদো‘আ করেছ। তোমরা আল্লাহর নিকট আমার জন্য দো‘আ কর, আল্লাহ তোমাদের সাহায্যকারী হবেন। আমি তোমাদের নিকট অঙ্গীকার করছি যে, তোমাদের অন্বেষণকারীদেরকে (শত্রুদের) আমি ফিরিয়ে দিব’। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার জন্য দো‘আ করলে সে মুক্তি পায়। অতঃপর যার সাথেই সুরাকার দেখা হয়েছে, তাকেই সে বলেছে, ‘আমি তোমাদের কাজ সেরে এসেছি। এদিকে তারা কেউ নেই’। এমনিভাবে যার সাথেই তার সাক্ষাৎ হ’ত, তাকেই সে ফিরিয়ে দিত (বুখারী হা/৩৬১৫, মুসলিম হা/২০০৯, মিশকাত হা/৫৮৬৯ ‘ফাযায়েল ও শামায়েল’ অধ্যায়; ‘মু‘জিযা’ অনুচ্ছেদ)।

    শিক্ষা :

    ১. সর্বক্ষেত্রে যথাযথভাবে নেতার আনুগত্য করা। প্রয়োজনে জীবন দিতে প্রস্ত্তত থাকা।

    ২. বিশেষ ক্ষেত্রে মহৎ ব্যক্তিগণকে ঘুম থেকে না ডাকা বিচক্ষণতার পরিচয়।

    ৩. যে কোন বিপদে একমাত্র মহান আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা রাখা।

    ৪. আল্লাহ তা‘আলা শত্রু বা যালেমদেরকে অনেক সময় প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করে থাকেন।

    জাবের  ( রাঃ )- এর মেহমানদারী ও রাসূল  ( সাঃ )- এর মু ‘ জিযা

    জাবের (রাঃ) বলেন, খন্দকের যুদ্ধের প্রাক্কালে আমরা পরিখা খনন করছিলাম। এমন সময় একটা শক্ত পাথর দেখা দিল। তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট এসে বলল, পরিখা খননকালে একটি শক্ত পাথর পাওয়া গেছে। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা আমি নিজেই খন্দকের মধ্যে নামব’। অতঃপর তিনি দাঁড়ালেন, সে সময় তাঁর পেটে পাথর বাঁধা ছিল। আর আমরাও তখন তিনদিন পর্যন্ত কিছু খেতে পায়নি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কোদাল হাতে নিয়ে পাথরটির উপর আঘাত করলে তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকণায় পরিণত হয়।

    জাবের (রাঃ) বলেন, আমি আমার স্ত্রীর নিকটে এসে বললাম, ‘তোমার কাছে খাওয়ার কিছু আছে কি? আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে ভীষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখলাম’। তখন সে একটি চামড়ার পাত্র হ’তে এক ছা‘ পরিমাণ যব বের করল। আমাদের একটি মোটাতাজা বকরীর বাচ্চা ছিল। তা আমি যবেহ করলাম আর আমার স্ত্রী যব পিষল। অবশেষে আমরা হাঁড়িতে গোস্ত চড়ালাম। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট এসে চুপে চুপে বললাম, ‘আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমরা একটি বকরীর বাচ্চা যবেহ করেছি। আর এক ছা‘ যব ছিল, আমার স্ত্রী তা পিষেছে। সুতরাং আপনি আরো কয়েকজন সঙ্গে নিয়ে চলুন’।

    রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উচ্চৈঃস্বরে সবাইকে বললেন, ‘হে পরিখা খননকারীগণ! এস তোমরা তাড়াতাড়ি চল, জাবের তোমাদের জন্য খাবার তৈরী করেছে’। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে বললেন, ‘তুমি বাড়ী ফিরে যাও। আমি না আসা পর্যন্ত গোস্তের ডেকচি নামাবে না এবং খামির থেকে রুটিও বানাবে না’। এরপর তিনি লোকজনসহ উপস্থিত হ’লেন। তখন আমার স্ত্রী খামিরগুলি রাসূলের সম্মুখে দিলে তিনি তাতে লালা মিশিয়ে দিয়ে বরকতের জন্য দো‘আ করলেন। অতঃপর ডেকচির নিকট অগ্রসর হয়ে তাতেও লালা মিশিয়ে বরকতের জন্য দো‘আ করলেন। এরপর বললেন, ‘তুমি আরো রুটি প্রস্ত্ততকারিণীদের ডাক, যারা তোমার সাথে রুটি বানাবে। আর চুলার উপর থেকে ডেকচি না নামিয়ে তুমি তা থেকে তরকারী নিয়ে পরিবেশন কর’।

    জাবের (রাঃ) বলেন, ‘ছাহাবীদের সংখ্যা ছিল এক হাযার। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, সকলে তৃপ্তি সহকারে খেয়ে চলে যাওয়ার পরও ডেকচি ভর্তি তরকারী ফুটতেছিল এবং প্রথম অবস্থার ন্যায় আটার খামির হ’তে রুটি প্রস্ত্তত হচ্ছিল’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৮৭৭ ‘ফাযায়েল ও শামায়েল’ অধ্যায়, ‘মু‘জিযা’ অনুচ্ছেদ)।

    শিক্ষা :

    ১. কর্মীদের উৎসাহ ও প্রেরণা দানের জন্য নেতাকে তাদের সাথে যে কোন কাজে নিজ হাতে সহযোগিতা করা।

    ২. কর্মীদের অন্যতম কর্তব্য হ’ল নেতার সার্বিক বিষয়ের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা।

    ৩. রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর পক্ষ হ’তে প্রকাশিত প্রত্যেক মু‘জিযার প্রতি সুনিশ্চিত বিশ্বাস রাখা।

    ৪. দ্বীনের পথে যত কষ্টই আসুক না কেন হাসিমুখে তা বরণ করে নেওয়া।

    রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দরবারে আবূ সুফিয়ান

    সপ্তম হিজরী, ৬২৯ খৃষ্টাব্দ। মক্কার কাফেরদের কুরাইশদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যে ইসলামের নাম শুনলে জ্বলে উঠত কুরাইশদের গা, আজ সেই কুরাইশগণ স্পষ্টতঃ স্বীকৃতি দিল ইসলামকে একটি শক্তিশালী ধর্ম হিসাবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নদীর মোহনায় এসে তাঁর সাধনার স্রোতধারায় শুনতে পেলেন মহাসাগরের কল্লোল। তাই তিনি মনস্থ করলেন বিশ্বের শক্তিশালী রাজা-বাদশাহদের নিকট ইসলামের সুমহান বার্তা পৌঁছাতে।

    তৎকালীন বিশ্বের বুকে রোম ও পারস্য ছিল সবচেয়ে ক্ষমতাধর শক্তিশালী সাম্রাজ্য। রোমান সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা ছিলেন সম্রাট হিরাক্লিয়াস। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রখ্যাত ছাহাবী দেহিয়া কালবী (রাঃ)-কে ইসলামের দাওয়াতপত্র তাঁর কাছে প্রেরণ করেন। সম্রাট হিরাক্লিয়াস ঐ সময় জেরুজালেমে অবস্থান করছিলেন। এদিকে কুরাইশ নেতা আবূ সুফিয়ান (তখনও তিনি মুসলমান হননি) ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়াতে অবস্থান করছিলেন।

    আবদুল্লাহ বিন আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তাঁকে আবূ সুফিয়ান বিন হারব সংবাদ দিয়েছেন যে, একদা রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাঁকে একদল কুরাইশ সহ ডেকে পাঠালেন। তখন তাঁরা ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়াতে অবস্থান করছিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবূ সুফিয়ান ও কুরাইশদের সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ ছিলেন। সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাঁর অমাত্যবর্গ পরিবৃত অবস্থায় ঈলিয়া বা জেরুজালেমে অবস্থানকালে তাঁরা সম্রাটের দরবারে আগমন করলেন। সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাঁদেরকে স্বীয় মজলিসে ডেকে নিলেন। তখন তাঁর চতুষ্পার্শ্বে ছিলেন রোমান প্রধানগণ। অতঃপর তিনি কুরাইশগণকে এবং তাঁর দোভাষীকে আহবান জানিয়ে বললেন, যে লোকটি তোমাদের মধ্যে নবী বলে দাবী করছেন বংশগতভাকে তোমাদের মধ্যে কে তাঁর অধিক নিকটবর্তী? আবূ সুফিয়ান বললেন, তখন আমি বললাম, ‘বংশগতভাবে আমিই তাঁর নিকটতম ব্যক্তি’। সম্রাট হিরাক্লিয়াস নির্দেশ দিলেন যে, তাঁকে আমার নিকটবর্তী করো এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীগণকেও ডেকে এনে তাঁর পেছনে উপস্থিত কর। অতঃপর সম্রাট তাঁর দোভাষীকে বললেন, তুমি তাদেরকে বল, আমি এই লোকটিকে তাঁর [(রাসূল (সাঃ)] সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করব। যদি সে আমার সাথে কোন মিথ্যা কথা বলে, তবে তোমরা যেন তাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রমাণ করো। আবূ সুফিয়ান বলেন, ‘আল্লাহর কসম! লোকেরা আমার উপর মিথ্যা আরোপ করবে বলে যদি আমার লজ্জার ভয় না হ’ত, তাহ’লে তখন আমি অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলতাম’।

    সম্রাট সর্বপ্রথম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, যিনি নবী বলে দাবী করছেন তাঁর বংশ কেমন?

    আবূ সুফিয়ান : তিনি আমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশগত।

    সম্রাট : তাঁর পূর্বে তোমাদের মধ্য হ’তে কোন ব্যক্তি কখনও এমন কথা বলেছে কি?

    আবূ সুফিয়ান : না।

    সম্রাট : তাঁর পিতৃপুরুষগণের মধ্যে কেউ বাদশাহ ছিলেন কি?

    আবূ সুফিয়ান : না।

    সম্রাট : প্রভাবশালী লোকেরা তাঁর অনুসরণ করছে, না দুর্বল লোকেরা?

    আবূ সুফিয়ান : দরিদ্র ও দুর্বল শ্রেণীর লোকগুলো।

    সম্রাট : তাদের সংখ্যা কি দিন দিন বাড়ছে, না কমছে?

    আবূ সুফিয়ান : না, বরং বাড়ছে।

    সম্রাট : তাদের মধ্যে কেউ কি সেই দ্বীনে প্রবেশ করার পর তাঁর দ্বীনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তা ত্যাগ করে থাকে?

    আবূ সুফিয়ান : না।

    সম্রাট : সে নবুঅত লাভের পূর্বে কি তোমরা তাঁকে মিথ্যাবাদী বলে অপবাদ দিতে?

    আবূ সুফিয়ান : না।

    সম্রাট : তিনি কখনো কোন অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছেন কি?

    আবূ সুফিয়ান : না। তবে আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাঁর সাথে এক সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছি, জানি না এ সময়ের মধ্যে তিনি কি করবেন?

    আবূ সুফিয়ান (পরবর্তীতে) বলেন, এই কথাটি ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে অন্য কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

    সম্রাট : তোমরা কি তাঁর সাথে কোন যুদ্ধ করেছ?

    আবূ সুফিয়ান : হ্যাঁ।

    সম্রাট : যুদ্ধের ফলাফল কি?

    আবূ সুফিয়ান : তাঁর ও আমাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত যুদ্ধের ফলাফল হ’ল বালতিতে পালাক্রমে পানি তোলার ন্যায়। অর্থাৎ কোনটায় তিনি জয় লাভ করেন এবং কোনটায় আমরা।

    সম্রাট : তিনি তোমাদেরকে কি নির্দেশ দিয়ে থাকেন?

    আবূ সুফিয়ান : তিনি বলেন, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত কর। তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক কর না। আর তোমরা তোমাদের বাপ-দাদারা যা বলে বেড়াত, তা পরিত্যাগ কর। তিনি আমাদেরকে ছালাত প্রতিষ্ঠা করতে, সর্বদা সত্য কথা বলতে, অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকতে এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখতে বলেন।

    সম্রাট হিরাক্লিয়াস দোভাষীকে বললেন, তুমি তাকে বল, আমি তোমাকে তাঁর বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। তুমি উত্তরে বলেছ, তিনি তোমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশজাত। প্রকৃতপক্ষে নবী-রাসূলগণ তাঁদের কওমের সম্ভ্রান্ত পরিবারে প্রেরিত হয়ে থাকেন। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তোমাদের মধ্যে কেউ কি এ কথা (নবী হওয়ার কথা) বলেছেন? তুমি উত্তরে বলেছ, না। আমি বলতে চাই- যদি তাঁর পূর্বে কেউ এ কথা বলত, তবে অবশ্যই আমি বলতে পারতাম, তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি পূর্বের কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তাঁর পিতৃপুরুষগণের মধ্যে কোন বাদশাহ ছিলেন কি? তুমি উত্তরে বলেছ, না। আমি বলতে চাই- যদি তাঁর পিতৃপুরুষগণের মধ্যে কোন বাদশাহ থাকতে, তাহ’লে আমি বলতাম, তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধার করতে ইচ্ছুক। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তোমরা তাঁর নবুঅত লাভের পূর্বে তাঁর প্রতি কোন মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিলে কি? তুমি উত্তরে বলেছ, না। কাজেই আমি বুঝতেছি, তিনি এমন ব্যক্তি নন, যিনি মানুষের ব্যাপারে মিথ্যারোপ করবেন এবং আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করবেন। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি যে, প্রভাবশালী লোকেরা তাঁর অনুসরণ করছে, না নিরীহ-দুর্বল লোকগুলো? তুমি উত্তরে বলেছ, নিরীহ-দুর্বল লোকেরাই তাঁর অনুসরণ করছে। আসলে নিরীহ-দুর্বল লোকেরাই নবী-রাসূলগণের অনুসারী হয়ে থাকে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তারা সংখ্যায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে, না হরাস পাচ্ছে? তুমি উত্তরে বলেছ, বৃদ্ধি হচ্ছে। ঈমানের ব্যাপারটি পূর্ণতা লাভের সময় পর্যন্ত এরূপই হয়ে থাকে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, কেউ তাঁর দ্বীনে প্রবেশ করে বীতশ্রদ্ধ হয়ে আবার সে দ্বীন পরিত্যাগ করেছে কি? তুমি উত্তরে বলেছ, না। আসলে ঈমানের দীপ্তি ও সজীবতা অন্তরের সাথে মিশে গেলে এরূপই হয়ে থাকে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তিনি কোন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন কি? তুমি উত্তরে বলেছ, না। নবী-রাসূলগণ এরূপই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তিনি তোমাদেরকে কি নির্দেশ প্রদান করেন? তুমি উত্তরে বলেছ, তিনি তোমাদেরকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার ও তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক না করার নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি তোমাদেরকে মূর্তিপূজা করতে নিষেধ করেন এবং তোমাদেরকে ছালাত প্রতিষ্ঠা করার, সত্য কথা বলার ও পূত-পবিত্র থাকার নির্দেশ প্রদান করেন। তুমি যা বলেছ তা যদি সত্য হয়, তবে তিনি অত্যল্পকালের মধ্যেই আমার এ পদদ্বয়ের নিম্নবর্তী স্থানের (সিরিয়ার) মালিক হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করবেন। আমি নিশ্চিত জানতাম, তাঁর আবির্ভাব হবে; কিন্তু তিনি যে তোমাদের মধ্য হ’তে হবেন, একথা ভাবতে পারিনি। আমি যদি যথাযথভাবে তাঁর নিকট পৌঁছতে পারব বলে জানতে পারতাম, তাহ’লে আমি তাঁর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে সম্ভাব্য সর্ব প্রকার কষ্ট স্বীকার করতাম। আর আমি যদি তাঁর নিকট থাকতাম, তাহ’লে অবশ্যই আমি তাঁর পা ধুয়ে দিতাম।

    অতঃপর সম্রাট হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর পত্রখানা আনতে বললেন, যে পত্রখানা দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছাহাবী দেহিয়া কালবী (রাঃ)-কে বছরার শাসনকর্তার নিকট পাঠিয়েছিলেন। বছরার অধিপতি হারেছ পত্রখানা সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে প্রদান করলে তিনি তা পাঠ করলেন। পত্রটি ছিল নিম্নরূপ-

    ‘পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর বান্দা ও তদীয় রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হ’তে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রতি। যারা সঠিক পথের অনুসারী, তাঁদের উপর শান্তি বর্ষিত হৌক। অতঃপর, আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপদে থাকতে পারবেন। আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ পুরস্কারে ভূষিত করবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহ’লে সকল প্রজার পাপ আপনার উপর বর্তাবে। ‘হে আহলে কিতাব! ‘তোমরা একটি কথার দিকে চলে আস, যে কথাটি আমাদের ও তোমাদের মধ্যে অভিন্ন, আমরা যেন আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করি, তাঁর সাথে অন্য কোন কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ যেন আল্লাহ ছাড়া অপর কাউকে প্রভু হিসাবে গ্রহণ না করি। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তাদের বলে দাও, তোমরা সাক্ষী থাক যে, আমরা মুসলিম’ (আলে ইমরান ৬৪)।

    আবূ সুফিয়ান বলেন, যখন সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাঁর বক্তব্য ও পত্রখানা পাঠ শেষ করলেন, তখন তাঁর সম্মুখে শোরগোল ও চীৎকার চরম আকার ধারণ করল এবং আমাদেরকে বের করে দেয়া হ’ল। তখন আমি আমার সঙ্গী-সাথীদেরকে বললাম, আবূ কাবশার (মুহাম্মাদ) ছেলের বিষয় তো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, বনু আছফার (রোম)-এর বাদশাহও তাকে ভয় পাচ্ছে। তখন থেকে আমি বিশ্বাস করতাম যে, তিনি শীঘ্রই জয়ী হবেন। অবশেষে মহান আল্লাহ আমাকে ইসলাম গ্রহণের তাওফীক্ব দিলেন (ছহীহ বুখারী হা/৭, ‘অহির সূচনা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৬, মুসলিম হা/১৭৭৩, মিশকাত হা/৫৮৬১)।

    শিক্ষা :

    ১. গরীব-অসহায়রাই দ্বীনী কাজে অগ্রগামী থাকে।

    ২. আল্লাহ রাববুল আলামীন প্রত্যেক মানুষকে সত্য-মিথ্যা ও ভাল-মন্দ বুঝার অনুধাবন শক্তি দিয়েছেন।

    ৩. ক্ষমতালিপ্সা ও স্বার্থহানির ভয়ে মানুষ হক গ্রহণ থেকে বিরত থাকে।

    সৃষ্টজীবের প্রতি দয়া

    ইবনু ওমর (রাঃ) সূত্রে নবী (সাঃ) হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক নারী একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নামে গিয়েছিল, সে তাকে বেঁধে রেখেছিল। সে তাকে খাবারও দেয়নি, ছেড়েও দেয়নি, যাতে সে যমীনের পোকা-মাকড় খেতে পারত (বুখারী হা/৩৩১৮ ‘সৃষ্টির সূচনা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১১, মুসলিম, মিশকাত হা/১৯০৩)।

    আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘এক ব্যভিচারিণীকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। সে একটি কুকুরের কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। তখন সে দেখতে পেল কুকুরটি একটি কূপের পাশে বসে হাঁপাচ্ছে। রাবী বলেন, পিপাসায় তার প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত ছিল। তখন সেই নারী তার মোজা খুলে তার উড়নার সঙ্গে বাঁধল। অতঃপর সে কূপ হ’তে পানি তুলল (এবং কুকুরটিকে পানি পান করাল)। এ কারণে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হল’ (বুখারী হা/৩৩২১ ‘সৃষ্টির সূচনা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৭, মুসলিম, মিশকাত হা/১৯০২)।

    শিক্ষা : পশু-পাখির প্রতি সর্বদা সহানুভূতিশীল হ’তে হবে।

    লোক দেখানো আমলের ভয়াবহ পরিণতি

    আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে ব্যক্তির বিচার করা হবে, সে হবে একজন (ধর্মযুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী) শহীদ। তাকে আল্লাহর নিকট উপস্থিত করা হবে। অতঃপর আল্লাহ পাক তাকে (দুনিয়াতে প্রদত্ত) নে‘মতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। আর সেও তা স্মরণ করবে। এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, দুনিয়াতে তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে বলবে, আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য (কাফেরদের সাথে) লড়াই করেছি। এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ, বরং তোমাকে যেন বীর-বাহাদুর বলা হয়, সেজন্য তুমি লড়াই করেছ। আর (তোমার অভিপ্রায় অনুযায়ী) তোমাকে দুনিয়াতে তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে আদেশ দেওয়া হবে। তখন তাকে উপুড় করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

    অতঃপর সে ব্যক্তিকে বিচারের জন্য উপস্থিত করা হবে, যে নিজে দ্বীনী ইল্ম শিক্ষা করেছে এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছে। আর পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করেছে (এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছে)। তাকে আল্লাহ পাকের দরবারে হাযির করা হবে। অতঃপর তিনি তাকে নে‘মতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন এবং সেও তা স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এই সমস্ত নে‘মতের শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে বলবে, আমি স্বয়ং দ্বীনী ইল্ম শিক্ষা করেছি এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টির নিমিত্তে কুরআন তেলাওয়াত করেছি। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আমার সন্তুষ্টির জন্য নয়, বরং তুমি এজন্য ইল্ম শিক্ষা করেছ, যেন তোমাকে ‘বিদ্বান’ বলা হয় এবং এজন্য কুরআন অধ্যয়ন করেছ, যাতে তোমাকে ‘ক্বারী’ বলা হয়। আর (তোমার অভিপ্রায় অনুযায়ী) তোমাকে বিদ্বান ও ক্বারীও বলা হয়েছে। অতঃপর (ফেরেশতাদেরকে) তার সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হবে। সুতরাং তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

    অতঃপর এমন এক ব্যক্তিকে বিচারের জন্য আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে, যাকে আল্লাহ তা‘আলা বিপুল ধন-সম্পদ দান করে বিত্তবান করেছিলেন। তাকে আল্লাহ তা‘আলা প্রথমে প্রদত্ত নে‘মতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। আর সে তখন সমস্ত নে‘মতের কথা অকপটে স্বীকার করবে। অতঃপর তিনি তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এই সমস্ত নে‘মতের শুকরিয়ায় তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে বলবে, যে সমস্ত ক্ষেত্রে ধন-সম্পদ ব্যয় করলে তুমি সন্তুষ্ট হবে, তোমার সন্তুষ্টির জন্য সেসব খাতের একটি পথেও ব্যয় করতে ছাড়িনি। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আমার সন্তুষ্টির জন্য নয়; বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে দান করেছিলে, যাতে তোমাকে বলা হয় যে, সে একজন ‘দানবীর’। সুতরাং (তোমার অভিপ্রায় অনুসারে দুনিয়াতে) তোমাকে ‘দানবীর’ বলা হয়েছে। অতঃপর (ফেরেশতাদেরকে) তার সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হবে। নির্দেশ মোতাবেক তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে (মুসলিম হা/১৯০৫ ‘নেতৃত্ব’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৩; মিশকাত-আলবানী হা/২০৫, ‘ইল্ম’ অধ্যায়)।

    শিক্ষা :

    লোক দেখানো আমলের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। কাজেই সর্বদা আমাদের নিয়তকে পরিশুদ্ধ রাখতে হবে এবং প্রতিটি কাজ একমাত্র আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির জন্যই করতে হবে।

    আবু বকর  ( রাঃ )- এর মর্যাদা

    আবূদ্দারদা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (সাঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় আবূ বকর (রাঃ) পরনের কাপড়ের একপাশ এমনভাবে ধরে আসলেন যে, তার দু’হাঁটু বেরিয়ে পড়ছিল। নবী (সাঃ) বললেন, তোমাদের এ সাথী এই মাত্র কারো সঙ্গে ঝগড়া করে আসছে। তিনি সালাম করলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার এবং ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবের মাঝে একটি বিষয়ে কিছু কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে। আমিই প্রথমে কটু কথা বলেছি। অতঃপর লজ্জিত হয়ে তার কাছে মাফ চেয়েছি। কিন্তু তিনি আমাকে মাফ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এখন আমি আপনার নিকট হাযির হয়েছি। নবী (সাঃ) বললেন, আল্লাহ্ তোমাকে মাফ করবেন, হে আবূ বকর! এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। অতঃপর ওমর (রাঃ) লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আবূ বকর (রাঃ)-এর বাড়িতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আবূ বকর কি বাড়িতে আছেন? তারা বলল, না। তখন ওমর (রাঃ) নবী (সাঃ)-এর নিকট চলে এসে সালাম দিলেন। (তাকে দেখে) নবী (সাঃ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। আবূ বকর (রাঃ) ভীত হয়ে নতজানু হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমিই প্রথমে অন্যায় করেছি। এ কথাটি তিনি দু’বার বললেন। তখন নবী (সাঃ) বললেন, আল্লাহ্ যখন আমাকে তোমাদের নিকট রাসূলরূপে প্রেরণ করেছেন তখন তোমরা সবাই বলেছ, তুমি মিথ্যা বলছ আর আবূ বকর বলেছে, আপনি সত্য বলেছেন। তাঁর জান-মাল সবকিছু দিয়ে আমাকে সহানুভূতি জানিয়েছে। তোমরা কি আমার সম্মানে আমার সাথীকে অব্যাহতি দিবে? এ কথাটি তিনি দু’বার বললেন। অতঃপর আবূ বকর (রাঃ)-কে আর কখনও কষ্ট দেয়া হয়নি (বুখারী হা/৩৬৬১ ‘রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ছাহাবীদের ফযীলত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫)।

    শিক্ষা :

    ১. ক্ষমা মহত্ত্বের লক্ষণ।

    ২. রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতি আবূবকর (রাঃ)-এর ভালবাসা ও সাহায্য-সহানুভূতি ছিল প্রবাদতুল্য। এজন্যই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছিলেন, ‘আমি যদি আমার রব ব্যতীত অন্য কাউকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতাম তাহ’লে আবূবকরকে গ্রহণ করতাম’ (বুখারী হা/৩৬৫৭, ‘ছাহাবীদের ফযীলত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫)।

    আবূ যর  ( রাঃ )- এর ইসলাম গ্রহণ

    আবু জামরাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) আমাদেরকে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে আবূ যর (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বর্ণনা করব না? আমরা বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি বললেন, আবূ যর (রাঃ) বলেছেন, আমি গিফার গোত্রের একজন মানুষ। আমরা জানতে পারলাম যে, মক্কায় এক ব্যক্তি আত্মপ্রকাশ করে নিজেকে নবী বলে দাবী করছেন। আমি আমার ভাইকে বললাম, তুমি মক্কায় গিয়ে ঐ ব্যক্তির সাথে আলোচনা করে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়ে এস। সে রওয়ানা হয়ে গেল এবং মক্কার ঐ লোকটির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ফিরে আসল। অতঃপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, কি খবর নিয়ে এলে? সে বলল, আল্লাহর কসম! আমি এমন একজন ব্যক্তিকে দেখেছি যিনি সৎকাজের আদেশ দেন এবং মন্দ কাজ হ’তে নিষেধ করেন। আমি বললাম, তোমার খবরে আমি সন্তুষ্ট হ’তে পারলাম না। অতঃপর আমি একটি ছড়ি ও এক পাত্র খাবার নিয়ে মক্কার দিকে রওয়ানা হ’লাম। মক্কায় পৌঁছে আমার অবস্থা দাঁড়াল এমন যে, আমি তাকে চিনি না এবং কারো নিকট জিজ্ঞেস করাও আমি সমীচীন মনে করি না। তাই আমি যমযমের পানি পান করে মসজিদে থাকতে লাগলাম।

    একদিন সন্ধ্যা বেলা আলী (রাঃ) আমার নিকট দিয়ে গমনকালে আমার প্রতি ইশারা করে বললেন, মনে হয় লোকটি বিদেশী। আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে চল। আবূ যর বলেন, অতঃপর আমি তার সাথে তার বাড়ি চললাম। পথে তিনি আমাকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করেননি। আর আমিও ইচ্ছা করে কোন কিছু বলিনি। তাঁর বাড়িতে রাত্রি যাপন করে ভোরবেলায় আবার মসজিদে গেলাম ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য। কিন্তু ওখানে এমন কোন লোক ছিল না যে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু বলবে। তিনি বলেন, ঐদিনও আলী (রাঃ) আমার নিকট দিয়ে চলার সময় বললেন, এখনো কি লোকটি তার গন্তব্যস্থল ঠিক করতে পারেনি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, আমার সঙ্গে চল। পথিমধ্যে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, বল, তোমার ব্যাপার কি? কেন এ শহরে এসেছ? আমি বললাম, যদি আপনি আমার বিষয়টি গোপন রাখার আশ্বাস দেন তাহ’লে তা আপনাকে বলতে পারি। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আমি গোপন করব। আমি  বললাম, আমরা জানতে পেরেছি, এখানে এমন এক লোকের আবির্ভাব হয়েছে যিনি নিজেকে নবী বলে দাবী করেন। আমি তাঁর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার জন্য আমার ভাইকে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সে ফেরত গিয়ে আমাকে সন্তোষজনক কোন কিছু বলতে পারেনি। তাই নিজে দেখা করার ইচ্ছা নিয়ে এখানে আগমন করেছি। আলী (রাঃ) বললেন, তুমি সঠিক পথপ্রদর্শক পেয়েছ। আমি এখনই তাঁর কাছে উপস্থিত হওয়ার জন্য রওয়ানা হয়েছি। তুমি আমাকে অনুসরণ কর এবং আমি যে গৃহে প্রবেশ করব তুমিও সে গৃহে প্রবেশ করবে। রাস্তায় যদি তোমার বিপদজনক কোন লোক দেখতে পাই তবে আমি জুতা ঠিক করার অজুহাতে দেয়ালের পার্শ্বে সরে দাঁড়াব, যেন আমি জুতা ঠিক করছি। আর তুমি চলতেই থাকবে। আলী (রাঃ) পথ চলতে শুরু করলেন। আমিও তাঁর অনুসরণ করে চলতে লাগলাম। তিনি নবী (সাঃ)-এর নিকট প্রবেশ করলে আমিও তাঁর সঙ্গে ঢুকে পড়লাম। আমি বললাম, আমার নিকট ইসলাম পেশ করুন। তিনি পেশ করলেন। আর আমি তৎক্ষণাৎ মুসলিম হয়ে গেলাম।

    নবী (সাঃ) বললেন, হে আবূ যর। এখনকার মত তোমার ইসলাম গ্রহণ গোপন রেখে তোমার দেশে চলে যাও। যখন আমাদের বিজয়ের খবর জানতে পারবে তখন এসো। আমি বললাম, যে আল্লাহ্ আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ! আমি কাফির-মুশরিকদের সামনে উচ্চৈঃস্বরে তাওহীদের বাণী ঘোষণা করব। (ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন) এই কথা বলে তিনি মসজিদে হারামে গমন করলেন, কুরাইশের লোকজনও সেখানে উপস্থিত ছিল। তিনি বললেন, হে কুরাইশগণ! আমি নিশ্চিতভাবে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন (হক্ব) মা‘বূদ  নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। এতদশ্রবণে কুরাইশগণ বলে উঠল, ধর এই ধর্মত্যাগী লোকটিকে। তারা আমার দিকে এগিয়ে আসল এবং আমাকে এমন নির্মমভাবে প্রহার করতে লাগল, যেন আমি মরে যাই। তখন আববাস (রাঃ) আমার নিকট পৌঁছে আমাকে ঘিরে রাখলেন। অতঃপর তিনি কুরাইশদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমাদের ধ্বংস অনিবার্য। তোমরা গিফার বংশের জনৈক ব্যক্তিকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছ, অথচ তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের কাফেলাকে গিফার গোত্রের নিকট দিয়ে যাতায়াত করতে হয়? এ কথা শুনে তারা আমার নিকট থেকে দূরে সরে পড়ল। পরদিন ভোরবেলা কা‘বাগৃহে উপস্থিত হয়ে গতদিনের মতই আমি আমার ইসলাম গ্রহণের পূর্ণ ঘোষণা দিলাম। কুরাইশগণ বলে উঠল, ধর এই ধর্মত্যাগী লোকটিকে। গতকালের মত আজও তারা নির্মমভাবে আমাকে মারধর করল। এই দিনও আববাস (রাঃ) এসে আমাকে রক্ষা করলেন এবং কুরাইশদেরকে উদ্দেশ্য করে ঐ দিনের মত বক্তব্য রাখলেন। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, এটাই ছিল আবূ যর (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের প্রথম ঘটনা (বুখারী হা/৩৫২২ ‘মানাকিব’ অধ্যায়, ‘আবূ যর গিফারীর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা’ অনুচ্ছেদ, হা/৩৮৬১ ‘আনছারদের মর্যাদা’ অধ্যায়)।

    শিক্ষা :

    ১.  হক্ব অন্বেষণের জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে।

    ২. হকের পথের পথিকরা নানান মুছীবতের সম্মুখীন হন। এক্ষেত্রে তাদেরকে ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে।

    ৩. সমাজের প্রচলিত রসম-রেওয়াজের বিরুদ্ধে কথা বললে নানা বিদ্রূপাত্মক  পরিস্থিতির সম্মুখীন হ’তে হয় কিংবা নানা ব্যঙ্গাত্মক নামে ডাকা হয়। কিন্তু তাতে বিচলিত না হয়ে সত্য প্রচারে অটল থাকতে হবে।

    আবূ নাজীহ  ( রাঃ )- এর ইসলাম গ্রহণ

    আবূ নাজীহ আমর ইবনু আবাসাহ আস-সুলামী (রাঃ) বলেন, জাহেলী যুগে আমি ধারণা করতাম যে, লোকেরা পথভ্রষ্টতার উপর রয়েছে এবং এরা কোন ধর্মেই নেই। আর ওরা প্রতিমা পূজা করছে। অতঃপর আমি এক ব্যক্তির ব্যাপারে শুনলাম যে, তিনি মক্কায় অনেক আশ্চর্য খবর বলছেন। সুতরাং আমি আমার সওয়ারীর উপর বসে তাঁর কাছে এসে দেখলাম যে, তিনি আল্লাহর রাসূল (সাঃ)। তিনি গোপনে (ইসলাম প্রচার করছেন), আর তাঁর সম্প্রদায় (মুশরিকরা) তাঁর প্রতি দুর্ব্যবহার করছে। সুতরাং আমি বিচক্ষণতার সাথে কাজ করলাম। আমি মক্কায় তাঁর কাছে প্রবেশ করলাম। অতঃপর আমি তাঁকে বললাম, আপনি কে? তিনি বললেন, ‘আমি নবী’। আমি বললাম, নবী কি? তিনি বললেন, ‘মহান আল্লাহ আমাকে প্রেরণ করেছেন’। আমি বললাম, তিনি কি নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করেছেন? তিনি বললেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা, মূর্তি ভেঙ্গে ফেলা, আল্লাহকে একক উপাস্য মানা এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করার নির্দেশ দিয়ে’। আমি বললাম, এ কাজে আপনার সঙ্গে কে আছে? তিনি বললেন, ‘একজন স্বাধীন এবং একজন কৃতদাস’। তিনি বলেন, তার প্রতি যারা ঈমান এনেছিল তার মধ্যে তখন তাঁর সঙ্গে আবূ বকর ও বেলাল (রাঃ) ছিলেন। আমি বললাম, ‘আমিও আপনার অনুগত’। তিনি বললেন, ‘তুমি এখন এ কাজ কোন অবস্থাতেই করতে পারবে না। তুমি কি আমার অবস্থা ও লোকদের অবস্থা দেখতে পাচ্ছ না? অতএব তুমি (এখন) বাড়ি ফিরে যাও। অতঃপর যখন তুমি আমার জয়ী ও শক্তিশালী হওয়ার সংবাদ পাবে, তখন আমার কাছে এস’।

    সুতরাং আমি আমার পরিবার-পরিজনের নিকট চলে গেলাম এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনায় চলে এলেন। আর আমি পরিবারের সদস্যদের সাথেই ছিলাম। অতঃপর আমি খবরাখবর নিতে আরম্ভ করলাম এবং যখন তিনি মদীনায় আগমন করলেন, তখন আমি (তাঁর ব্যাপারে) লোকদেরকে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। অবশেষে আমার নিকট মদীনার কিছু লোক এল। আমি বললাম, ঐ লোকটার অবস্থা কি, যিনি (মক্কা ত্যাগ করে) মদীনায় এসেছেন? তারা বলল, লোকেরা তাঁর দিকে দ্রুত ধাবমান। তাঁর সম্প্রদায় তাঁকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিল; কিন্তু তারা তা করতে সক্ষম হয়নি।

    অতঃপর আমি মদীনায় এসে তাঁর খিদমতে হাযির হ’লাম। তারপর আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি তো ঐ ব্যক্তি, যে মক্কায় আমার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলে’। আমি বললাম, হ্যাঁ। হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন এবং যা আমার অজানা, তা আমাকে বলুন? আমাকে ছালাত সম্পর্কে বলুন’? তিনি বললেন, ‘তুমি ফজরের ছালাত পড়। তারপর সূর্য এক বল্লম পরিমাণ উঁচু হওয়া পর্যন্ত বিরত থাক। কারণ তা শয়তানের দু’শিং-এর মধ্যভাগে উদিত হয় (অর্থাৎ এ সময় শয়তানরা ছড়িয়ে পড়ে) এবং সে সময় কাফেররা তাকে সিজদা করে। পুনরায় তুমি ছালাত আদায় কর। কেননা ছালাতে ফেরেশতা সাক্ষী ও উপস্থিত হন, যতক্ষণ না ছায়া বল্লমের সমান হয়ে যায়। অতঃপর ছালাত থেকে বিরত হও। কেননা তখন জাহান্নামের আগুন উস্কানো হয়। অতঃপর যখন ছায়া বাড়তে আরম্ভ করে, তখন ছালাত আদায় কর। কেননা এ ছালাতে ফেরেশতা সাক্ষী ও উপস্থিত হন। পরিশেষে তুমি আছরের ছালাত আদায় কর। অতঃপর সূর্যাস্ত পর্যন্ত ছালাত আদায় করা থেকে বিরত থাক। কেননা সূর্য শয়তানের দু’শিং-এর মধ্যে অস্ত যায় (অর্থাৎ এ সময় শয়তানরা ছড়িয়ে পড়ে) এবং তখন কাফেররা তাকে সিজদা করে’।

    পুনরায় আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর নবী (সাঃ)! আপনি আমাকে ওযূ সম্পর্কে বলুন’? তিনি বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে কেউ পানি নিয়ে (হাত ধোয়ার পর) কুলি করবে এবং নাকে পানি নিয়ে ঝেড়ে পরিষ্কার করবে, তার চেহারা, তার মুখ এবং নাকের গুনাহসমূহ ঝরে যায়। অতঃপর সে যখন আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী তার চেহারা ধৌত করে, তখন তার চেহারার পাপরাশি তার দাড়ির শেষ প্রান্তের পানির সাথে ঝরে যায়। তারপর সে যখন তার হাত দু’খানি কনুই পর্যন্ত ধৌত করে, তখন তার হাতের পাপরাশি তার আঙ্গুলের পানির সাথে ঝরে যায়। অতঃপর সে যখন তার মাথা মাসাহ করে, তখন তার মাথার পাপরাশি চুলের ডগার পানির সাথে ঝরে যায়। তারপর সে যখন তার পা দু’খানি গিট পর্যন্ত ধৌত করে, তখন তার পায়ের পাপরাশি তার আঙ্গুলের পানির সাথে ঝরে যায়। অতঃপর সে যদি দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করে, আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর মাহাত্ম্য বর্ণনা করে, যার তিনি যোগ্য এবং অন্তরকে আল্লাহ তা‘আলার জন্য খালি করে, তাহ’লে সে ঐ দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে বেরিয়ে আসে, যেদিন  তার মা তাকে প্রসব করেছিল।

    তারপর আমর ইবনু আবাসাহ (রাঃ) এ হাদীছটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ছাহাবী আবূ উমামা (রাঃ)-এর নিকট বর্ণনা করলেন। আবূ উমামাহ (রাঃ) তাঁকে বললেন, ‘হে আমর ইবনু আবাসাহ! তুমি যা বলছ, তা চিন্তা করে বল! একবার ওযূ করলেই কি এই ব্যক্তিকে এতটা মর্যাদা দেওয়া হবে? আমর বললেন, হে আবূ উমামাহ! আমার বয়স ঢের হয়েছে, আমার হাড় দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার মৃত্যুও নিকটবর্তী। (ফলে এ অবস্থায়) আল্লাহ তা‘আলা অথবা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতি মিথ্যারোপ করার কি প্রয়োজন আছে? যদি আমি এটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট থেকে একবার, দু’বার, তিনবার এমনকি সাতবার পর্যন্ত না শুনতাম, তাহ’লে কখনোই তা বর্ণনা করতাম না। কিন্তু আমি তাঁর নিকট এর চেয়েও অধিকবার শুনেছি’ (মুসলিম হা/৮৩২, ‘মুসাফিরের ছালাত’ অধ্যায়)।

    শিক্ষা :

    ১. দ্বীনী বিষয় জানার জন্য আগ্রহ থাকতে হবে।

    ২. পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আউয়াল ওয়াক্তে আদায় করতে হবে।

    ৩. ওযূর মাধ্যমে বান্দা তার পাপরাশি মোচন করে নিতে পারে।

    উয়াইস কারনীর মর্যাদা

    উসাইর ইবনু জাবির (রাঃ) বলেন, ইয়ামানে বসবাসকারীদের পক্ষ থেকে ওমর (রাঃ)-এর নিকট সাহায্যকারী দল আসলে তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করতেন, ‘তোমাদের মাঝে কি উয়াইস ইবনু আমির আছে’? অবশেষে (একদিন) উয়াইস (রহঃ) এসে গেলেন। তাকে ওমর প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি উয়াইস ইবনু আমির’? সে বলল, হ্যাঁ। ওমর (রাঃ) আবার বললেন, ‘মুরাদ’ সম্প্রদায়ের উপগোত্র ‘কারনের’ লোক? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, ‘আপনার কি কুষ্ঠরোগ হয়েছিল, আপনি তা হ’তে সুস্থ হয়েছেন এবং মাত্র এক দিরহাম পরিমাণ স্থান বাকী আছে’? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, ‘আপনার মা জীবিত আছে কি’? তিনি বললেন, হ্যাঁ। ওমর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘ইয়ামানের সহযোগী দলের সাথে উয়াইস ইবনু আমির নামক এক লোক তোমাদের নিকট আসবে। সে ‘মুরাদ’ জাতির উপজাতি ‘কারনের’ লোক। তার কুষ্ঠরোগ হবে এবং তা হ’তে সে মুক্তি পাবে, শুধুমাত্র এক দিরহাম পরিমাণ স্থান ছাড়া। তার মা বেঁচে আছে, সে তার মায়ের খুবই অনুগত। সে (আল্লাহর উপর ভরসা করে) কোন কিছুর শপথ করলে তা আল্লাহ তা‘আলা পূরণ করে দেন। তুমি যদি তাকে দিয়ে তোমার গুনাহ মাফের জন্য দো‘আ করাবার সুযোগ পাও, তাহ’লে তাই করবে’। ওমর (রাঃ) বলেন, ‘কাজেই আমার অপরাধ ক্ষমার জন্য আপনি দো‘আ করুন’। তখন তিনি (উয়াইস) ওমরের অপরাধের ক্ষমা চেয়ে দো‘আ করলেন। ওমর (রাঃ) তাকে বললেন, ‘আপনি কোথায় যেতে চান’? তিনি বললেন, ‘কূফায়’। তিনি (ওমর) বলেন, ‘আমি সেখানকার গভর্ণরকে আপনার (সাহায্যের) জন্য লিখে দেই’? তিনি বললেন, ‘আমার নিকট গরীব-মিসকীনদের মাঝে বসবাস করাই বেশী পসন্দনীয়’।

    পরের বছর কূফার এক নেতৃস্থানীয় লোক হজ্জে এল। তার সাথে ওমরের দেখা হ’লে তিনি উয়াইস সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করলেন। সে বলল, ‘আমি তাকে এরকম অবস্থায় দেখে এসেছি যে, তার ঘরটা অত্যন্ত জীর্ণ অবস্থায় আছে এবং তার জীবন-যাপনের উপকরণসমূহ খুবই নগণ্য’। ওমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘উয়াইস ইবনু আমির নামক এক লোক ইয়ামানের সাহায্যকারী দলের সাথে তোমাদের নিকট আসবে। সে ‘মুরাদ’ জাতির উপজাতি ‘কারন’ বংশীয় লোক। তার কুষ্ঠ রোগ হবে এবং তা থেকে সে মুক্তি পাবে, শুধুমাত্র এক দিরহাম পরিমাণ স্থান ছাড়া। তার মা বেঁচে আছে এবং সে তার মায়ের খুবই অনুগত। সে (আল্লাহর উপর ভরসা করে) কোন কিছুর শপথ করলে তা আল্লাহ পূরণ করে দেন। তুমি যদি তোমার গুনাহ মাফের জন্য তাকে দিয়ে দো‘আ করানোর সুযোগ পাও, তাহ’লে তাই করবে’। লোকটি ফিরে এসে উয়াইসের নিকট গিয়ে বলল, ‘আমার অপরাধ ক্ষমার জন্য আপনি দো‘আ করুন’। তিনি (উয়াইস) বললেন, ‘এইমাত্র আপনি মঙ্গলময় সফর (হজ্জ) থেকে প্রত্যাবর্তন করেছেন; বরং আপনিই আমার অপরাধ ক্ষমার জন্য দো‘আ করুন’। তিনি বললেন, ‘আপনি কি ওমরের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন’। সে বলল, হ্যাঁ। তার জন্য উয়াইস দো‘আ করলেন। উয়াইসের মর্যাদা সম্পর্কে লোকেরা সচেতন হ’লে সেখান থেকে উয়াইস অন্য স্থানে চলে গেলেন।

    অন্য বর্ণনায় এসেছে, ওমর (রাঃ)-এর নিকট কূফার অধিবাসীরা একটি সাহায্যকারী দল পাঠায়। দলের এক লোক উয়াইসকে বিদ্রূপ করত। ওমর (রাঃ) বললেন, ‘এখানে ‘কারন’ বংশীয় কেউ আছে কি’? ঐ ব্যক্তিটি উঠে আসলে ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘ইয়ামান থেকে উয়াইস নামে এক লোক তোমার নিকট আসবে। সে তার মাকে ইয়ামানে একা রেখে আসবে। তার কুষ্ঠরোগ হবে। সে আল্লাহর নিকট দো‘আ করবে, আল্লাহ তার রোগমুক্তি দান করবেন, শুধুমাত্র এক দীনার অথবা এক দিরহাম পরিমাণ স্থান ছাড়া। তোমাদের মধ্যে যে কেউ তার দেখা পাবে, তাকে দিয়ে সে যেন তার গুনাহ মাফের জন্য দো‘আ করায়’।

    ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘পরবর্তীদের (তাবেঈ) মধ্যে উয়াইস নামে এক সৎ লোক হবে। তার মা বেঁচে আছে। তার শরীরে কুষ্ঠের চিহ্ন থাকবে। তার নিকট গিয়ে নিজের গুনাহ মাফের জন্য তাকে দিয়ে প্রার্থনা করাও’ (মুসলিম হা/২৫৪২, ‘ছাহাবীগণের মর্যাদা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫৫)।

    শিক্ষা : পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারকারী ব্যক্তি দুনিয়া ও আখেরাতে মর্যাদাবান হবেন।

    দানের ফযীলত

    আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি একটি মাঠে অবস্থান করছিল। এমন সময় সে মেঘের মধ্যে একটি শব্দ শুনতে পেল : ‘অমুকের বাগানে পানি দাও’। অতঃপর মেঘমালা সেই দিকে সরে গেল এবং এক প্রস্তরময় স্থানে বৃষ্টি বর্ষণ করল। তখন দেখা গেল, সেখানকার নালাগুলির মধ্যে একটি নালা সমস্ত পানি নিজের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। তখন সে ব্যক্তি পানির দিকে এগিয়ে গেল এবং দেখল যে, এক ব্যক্তি তার বাগানে দাঁড়িয়ে সেচযন্ত্র দ্বারা পানি সেচ দিচ্ছে। তখন সে তাকে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার নাম কি? ব্যক্তিটি জবাবে বলল, আমার নাম অমুক- যে নাম সে মেঘের মধ্যে শুনেছিল। তখন লোকটি বলল : হে আল্লাহর বান্দা! তুমি কেন আমার নাম জিজ্ঞেস করলে? সে বলল : এই পানি যেই মেঘের তার মধ্যে আমি একটি শব্দ শুনেছি যে, তোমার নাম করে বলা হয়েছে, অমুকের বাগানে পানি দাও! (হে আল্লাহর বান্দা, বল) তুমি তা দ্বারা কি কি কাজ কর? সে উত্তরে বলল, যখন তুমি এ কথা বললে তখন শুনো, এই বৃষ্টির পানিতে যা উৎপাদন হয়, তার প্রতি আমি দৃষ্টিপাত করি এবং তা ভাগ করি। এক ভাগ দান করি, একভাগ আমি ও আমার পরিবার খাই এবং অপর ভাগ জমিতে লাগাই (মুসলিম হা/২৯৮৪, মিশকাত হা/১৮৭৭ ‘যাকাত’ অধ্যায়, ‘দানের প্রশংসা ও কৃপণতার নিন্দা’ অনুচ্ছেদ)।

    শিক্ষা : অভাবগ্রস্তদেরকে দান করলে সম্পদ কমে যায় না; বরং বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।

  • নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে

    নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে

    নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে, লেখক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়; প্রচ্ছদ শিল্পী পূর্ণেন্দু পত্রী, প্রথম প্রকাশ এপ্রিল ১৯৭১; প্রথম অখণ্ড সংস্করণ : জানুয়ারী ১৯৯৯। উৎসর্গ— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এবং আমার মাকে।

    নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে হল অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত একটি জনপ্রিয় বাংলা উপন্যাস। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের দেশভাগ নিয়ে লেখা বাংলা উপন্যাসের মধ্যে অন্যতম সেরা উপন্যাস হিসাবে বিবেচিত। দেশভাগজনিত বহু সমস্যার অনবদ্য মানবিক দলিল এটি। রচনা কাল ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ। কলকাতার “করুণা প্রকাশনী” হতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে প্রথম প্রকাশিত হয়।

    প্রেক্ষাপট
    পূর্ব বাংলার বর্তমানে বাংলাদেশের এক গ্রাম এর কেন্দ্রীয় ভূগোল। সেখানকার সাধারণ মানুষ, হিন্দু মুসলমানের পারস্পরিক সম্পর্ক, জমিদার ও প্রজার সম্পর্ক আর সেই সঙ্গে সমস্ত গ্রাম্য প্রকৃতি, গাছপালা, পশুপাখি নিয়ে রূপায়িত হয়েছে গভীর মমতায়। বহু বিচিত্র চরিত্রের সন্নিবেশ, তাদের নানা বৃত্তির নানা মানসিকতা পরিস্ফুট হয়েছে। ঔপন্যাসিকের লুপ্ত অতীতের প্রতি বেদনা আর স্মৃতিমেদুর জগতের বিবরণ বর্ণিত হয়েছে চারশত বারো পৃষ্ঠার এই বইতে।

    নামকরণ
    উপন্যাসের মাঝে কয়েকবার ঘুরে ফিরে এসেছে নীলকণ্ঠ এক পাখির কথা, অবশ্যই রূপক হিসাবে। মানুষের চিরকালের না-পাওয়ার আর্তি – ওই পাখি। মানুষ তার মনের গোপন কামনাবাসনার জন্য, সুখ-দুঃখে গড়া জীবনে সবসময় এক নীল রঙে গড়া পাখির সন্ধানে ঘুরে ফেরে। উপন্যাসের চরিত্রেরা কখনো সমুদ্রের অসীম নীলে, উদ্বাস্তু কলোনির বাঁশঝাড়ে, পুকুরপাড়ের অর্জুন গাছে ক্ষণিকের জন্য সেই নীল পাখির দেখা পান। মহেন্দ্রনাথও প্রতিনিয়ত সেই নীলকণ্ঠ পাখি খুঁজে চলেন। হাতের তালি বাজিয়ে সেই পাখিকে ফেরানোর চেষ্টা করেন। পাখি ফেরে না ….. আকাশ নীল, স্বচ্ছ জল নীল, প্রকৃতির মাঝে এই রহস্যময় নীলে ঠাকুরদার আত্মাও নীল। নীলের অসীম গভীরতায়, বেদনাহত মুখও নীলবর্ণের। দেশভাগের যন্ত্রণা লেখকের সত্তাকে যে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল অনুভবী পাঠককে সেই ‘নীল সত্য’ কে উপলব্ধি করার অবসর দিয়েছে উপন্যাসটি।

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরও তিনটি মহতী উপন্যাস ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, ‘অলৌকিক জলযান’ এবং ‘ঈশ্বরের বাগান’ – প্রত্যেকটি বিষয় বৈচিত্র্যে, লিখনশৈলীর ভঙ্গিতে এবং সেই বিশ্বময় ছড়ানো সেই রহস্যময় পাখিটি খুঁজে ফেরার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসাবে বাংলা সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে। এগুলি ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ সিরিজের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্ব হিসাবে বিবেচিত।

    উপন্যাসটির প্রাপ্তি
    উপন্যাসটি কেবল বাংলা সাহিত্য জগতে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে তাই নয়,ভারতীয় সাহিত্যকেও সমৃদ্ধ করেছে। ভারতের ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট-এর উদ্যোগে এটি ক্লাসিক পর্যায়ে উন্নীত এবং বারোটি মূল ভারতীয় ভাষায় এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ‘শরৎ পুরস্কার’ এবং ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে এই উপন্যাসটির জন্য লেখক আই.আই.পি.এম প্রবর্তিত “সুরমা চৌধুরী আন্তর্জাতিক স্মৃতি পুরস্কার” লাভ করেন যার সাম্মানিক মূল্য দশ লক্ষ টাকা।

    বিদ্বজ্জনের প্রতিক্রিয়া
    সাহিত্যিক বিমল কর লিখেছেন—
    অতীনের সেরা লেখা, এর মধ্যে অতীনের সত্তা ডুবে আছে, আমরা যাকে বলি ভর পাওয়া লেখা।

    অশোক মিত্রের মতে—
    পুতুলনাচের ইতিকথা’র পর এতটা আর অভিভূত হই নি।

    সমরেশ মজুমদার ও শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে—
    এই সময়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।

  • মানুষের ঘরবাড়ি

    মানুষের ঘরবাড়ি

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    মানুষের ঘরবাড়ি

    ‘লেখক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ে’র ‘দেশভাগ সিরিজে’র প্রথম বই ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’। বইটাতে দেশ বিভাগের আগের গ্রাম বাংলার মানুষের জীবনযাত্রা, সমাজ ব্যবস্থা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, একক ও যৌথ পরিবারের সুখ দুঃখের এক অভূতপূর্ব অনুভূতির ছোঁয়া রেখে গেছে।

    ‘দেশভাগ সিরিজে’র দ্বিতীয় বই ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ প্রথম পর্বের চরিত্র গুলো আস্তে আস্তে এক অপরের থেকে ছিন্ন হয়ে গেছে এখানে এসে। যেখানে ছিন্ন মূল মানুষ গুলো আশ্রয়ের আশায় খুঁজে চলছে; মানুষের ঘরবাড়ি। সোনা চরিত্রটি এখানে এসে বিলুর মাঝে ঘুমিয়ে গেছে। সব কিছু ছেড়ে আসা মানুষ গুলো পথে পথে ঘুরে, স্টেশনে রাত কাটিয়ে একটা সময় এসে নিজেদের আবিষ্কার করে ‘মানুষের ঘরবাড়ি’র মাঝে।

    দেশভাগ হয়ে গেলে নিজেদের ভিটে ছেড়ে দেশান্তরী হতে হয়েছিল বিলু আর তার পরিবারকে। বিশাল একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে গিয়েছিল নতুন দেশে গিয়ে। অতঃপর বাবা, মা, ভাইবোনের সাথে বিলুর নতুন যাত্রা।

    বিলুরা ব্রাহ্মণ, বাবা নিজ দেশে জমিদারের সেরেস্তায় কাজ করতেন। কিন্তু নতুন দেশে এসে কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। পৌরোহিত্য করাই স্বাভাবিক কিন্তু রিফিউজিদের যে ঢল নেমেছে তার মাঝে অনেকেই নিজেকে ব্রাহ্মণ বলে দাবি করে। সুতরাং নতুন দেশের মানুষেরা সহজে কাউকে বিশ্বাস করে না। তাই বিলুদের ভেসে যাওয়া চলে। কখনও কোন দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায়, কখনও রেল স্টেশনে কেটে যায় তাদের কয়েকটা দিন। সে সময়ে বাবা তার চলে যায় কোথায়, কাউকে কিছু না বলে। সে সময় বিলুর ছোট ভাই পিলু এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। সবার জন্য খাবার চুরি করতেও দ্বিধা করে না।

    এমন অবস্থায় অজ্ঞাতবাস থেকে ফিরে বিলুর বাবা কোথায় নিয়ে এলেন তাদের। এক বনের প্রান্তে এসে বললেন সে জমি কিনেছেন তিনি। ওখানেই হবে তাদের নতুন ঘরবাড়ি।

    সে অসম্ভব সম্ভব হয়েছিল কেবল বিলুদের জন্যই নয়। সাতচল্লিশ পরবর্তী অনেক মানুষের এই একই গতি হয়েছিল। তাদের প্রাথমিক গল্পটা অনেকটা এরকম। নিজ ভিটে, স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে হঠাৎ শেকড় ছাড়া হয়ে যাওয়া। তারপর থিতু হয়ে বসার চেষ্টা। সে চেষ্টায় সফল হয়েছিলেন বিলুর বাবা। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে হয়েছিল বিলুদের নতুন ঘরবাড়ি। এ পর্যন্ত গল্পটা কেবল বিলুর না, তার মতো অনেকেরই।

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দেশভাগ’ সিরিজের দ্বিতীয় বই ‘মানুষের ঘরবাড়ি’। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসের সোনা, এখানে বিলু বা বিল্ব। দেশ ছেড়ে আসার পর কেমন করে তাদের দিন কেটেছিল, কেমন করে তাদের নতুন আবাস হলো সে গল্পই লেখক এখানে লিখেছেন। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে যেমন বিমূর্ত ছিল, এ উপন্যাস তেমন নয়। এখানে নিরেট একটা গল্প আছে, যেখানে ধীরে ধীরে একটি পরিবার বিকশিত হয়। ছিন্নমূল থেকে নিজেদের বসত গড়ে।

    সেই সঙ্গে আছে অবশ্যম্ভাবী প্রকৃতির বর্ণনা। তবে এ পর্বে সে বর্ণনা বিলুদের বাড়ি এবং তার পারিপার্শ্ব কেন্দ্রিক। বিলুর বাবার মাধ্যমে, কখনও পিলুর মাধ্যমে তা লেখায় এসেছে।

    কিন্তু মূলত এ গল্প বিলুর। ইংরেজিতে ‘কামিং অফ এজ’ বলে একটা কথা আছে যার মানে, কৈশোর থেকে কারও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। এ উপন্যাসে বিলুর সেই সময়টার চিত্র খুব সুন্দর করে ফুটে উঠেছে। ঘরবাড়ি তৈরি হওয়ার পর তার পরীক্ষা দেওয়া এবং পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ সত্ত্বেও যখন তাকে কাজে লাগানো হয় তখন বাড়ি ছেড়ে পালায় বিলু। পিতার স্বভাব বর্তেছে পুত্রে। কেবল বিলু একা না, পিলুও ঘরে থাকে না। চলে যায় এদিক সেদিক।

    বিলুর বড় হয়ে ওঠা, নিজের সাথে নিজের সংঘাত, সেই সঙ্গে পরিবার পরিবেশের সাথে ঘটে যাওয়া দ্বিধা দ্বন্দ্ব এ উপন্যাসের উপজীব্য বিষয়। আর তা পরিণতি পায় যখন উপন্যাসে লক্ষ্মীর আগমন হয়। বিলুর প্রথম টিউশন পড়ে যে বাড়িতে তা মূলত কালী মন্দির। সে বাড়িতে আশ্রিতা মেয়ে লক্ষ্মী। বিধবা মেয়েটির সঙ্গে বিলুর একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে না চাইতেই। আর লক্ষ্মীর কারণেই বিলুর সঙ্গে পরিচয় ঘটে মিমির। যে মিমির আসল নাম মৃন্ময়ী। বিলুরই কলেজের সহপাঠিনী। এক পুরুষকে দুই নারী অধিকার করতে পারে না। লক্ষ্মীর বেলায় বিলুকে পাওয়া তার সম্ভব ছিল না।

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় এ উপন্যাসে দেখিয়েছেন, ক্রমাগত দারিদ্রের মাঝে বেড়ে ওঠা একটি ছেলের মানসিক দ্বন্দ্ব। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের কাছ থেকে তার দূরে সরে যাওয়া। যাকে মনে মনে ভালোবাসে, তাকে কাছে টেনে নিতে না পারার দহন আর নিজে কিছু হয়ে ওঠার এক প্রচেষ্টা। কৈশোরের শুরু থেকে যৌবনের প্রারম্ভ পর্যন্ত তার সে টানাপড়েন তাকে ধীরে ধীরে একটা পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। মানুষের ঘরবাড়িতে বসে আমরাও সে যাত্রার সঙ্গী হই।

    লেখক-পাঠক সর্বসম্মতিক্রমে এ উপন্যাস অতীনের সিরিজের দ্বিতীয় বই হিসেবে বিবেচিত হলেও এটি লেখা হয়েছে পরে। লেখকের মনে হয়েছিল একটা অংশ বাদ পড়ে গেছে। সেটি তিনি লিখেছিলেন। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’-র মতো এ উপন্যাস বহুমুখী ও জটিল নয়। এ উপন্যাসের গল্পটা সরল। কিন্তু মানসিক জতিলতার সাথে সামাজিক অবস্থা মিলে জীবনটা সেখানে কিছুটা জটিল।

    সম্ভবত লেখক এ উপন্যাসের নানা অংশ নানা সময়ে অনেকদিন ধরে লিখেছেন। তাই পুনরুক্তি আছে অনেক জায়গায়। সিরিজের অংশ হলেও এ বই স্বতন্ত্র উপন্যাস। লেখনী সহজ সরল। তবে কৈশোরের মানসিক দ্বন্দ্ব এতোটাই গোলমেলে যে মাঝে মাঝে বিলুকে ধরে মারতে মনে চাইতে পারে পাঠকের।

    উপন্যাসের এক অসামান্য চরিত্র পিলু। বিলুর এ ছোট ভাইটির কোন ভালো নাম লেখক আমাদের বলেননি। কিন্তু পিলু নামেই সে প্রিয় হয়ে উঠবে সকলের। বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো ছেলেটির বড় মায়া। তাই সে কখনও একটা কুকুর ধরে আনে, কখনও হনুমানের বাচ্চা। আবার পরিত্যাক্ত জঙ্গলেই সে খুঁজে পায় এক বুড়ির ঠিকানা। নবমী নামে সে বুড়ি বুঝি হয়ে ওঠে ইন্দির ঠাকরুন। বিলুর মা হয়ে ওঠেন সর্বজয়া আর বিলুর বাবা হরিহর। অন্তত বিলুর বাবা চরিত্রটি কিছুটা হরিহরের মতোই। অদৃষ্টে-দেবতায় বিশ্বাসী মানুষটি কিছুটা বাউন্ডুলে স্বভাবের। অন্তত স্ত্রীর মতো তিনি বিষয়ী নন। অথচ কি মমতা দিয়েই না তৈরি করেছেন মানুষের ঘরবাড়ি। যেখানে বিলুর মতো অন্তর্মুখী ছেলের টানে ছুটে আসে রায় বাহাদুরের নাতনী মিমি। অথচ বিলু পালিয়ে বেড়ায়। পিলু খুঁজে বেড়ায় তার দাদাকে।

    উত্তম পুরুষে বর্ণিত তিন খণ্ডের এ উপন্যাসের মূল চরিত্র বিলু হলেও পুরোটা জুড়ে পিলু বুঝি তার ছায়া হয়ে থাকে। আর মাঝে মাঝে সে ডেকে ওঠে, ‘দাদারে…’। সে ডাক, যে কোন পাঠকের কলজে কামড়ে ধরবে।

    নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে সিরিজ লেখার পর অতীন বাবুর মনে হলো, জীবনের আসল পর্বটা বাদ পড়ে গেছে সিরিজ থেকে। সেই পর্বটা পরবর্তীতে লিখে সিরিজের মাঝে আনা হয়। প্রথম পর্বের চরিত্ররা এ পর্বে অনুপস্থিত। সোনা এ পর্বে ঘুমিয়ে আছে বিলুর মধ্যে।

    নামটাতেই অভিমান জড়িয়ে আছে। মানুষের ঘরবাড়ি থাকে। আমাদের তাও নেই। দেশভাগের পর ছিন্নমূল এক পরিবারের সংগ্রাম শুরু হয়। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে যাত্রা। বিনা টিকিটে। আজ এখানে, তো কাল সেখানে। এক সময় তারা দুবেলা পেটপুরে খেয়েছে, গোলাভরা ধান,‌ গাই-গরু কিছুরই অভাব ছিল না। এদেশে এসে তাদের শেষ সম্বলটুকু ক্ষুধার নিমিত্তে আহারে পরিণত করতে হয়েছে। আর বাকি সম্বল‌ এটুকুই—তারা সৎ ব্রাহ্মণ।

    পরিবারের বড় ছেলে বিলু। উপন্যাসের একটি বড় খণ্ড বিলুর ভাষ্যে বর্ণিত। বয়সন্ধিকালে আত্মসম্মানবোধ সবার মধ্যে বেশি কাজ করে। পরিবারের আর্থিক অবনতি, জলে পড়ে যাওয়া, তারা যে আত্মীয়র বাড়িতে আশ্রিত, এদেশের মানুষের কাছে রিফুজি, বারো-তেরো বছরের বিলুর মনে তা ভীষণ পীড়া দেয়।

    ঘুরেফিরে একসময় ঘরবাড়ি মেলে তাদের। দারুণ গর্বের বিষয় ছিন্নমূল পরিবারটির জন্য। থাকা খাওয়া হলে তখন বড় ছেলেটির পড়াশোনায় মন দিতে হয়। বিলুর আলাদা একটা জগত গড়ে ওঠে পরিবারের বাইরে।

    বাবা সরল মানুষ—কার বাড়িতে ঠাকুর পূজা, কোথায় বামুন ভোজের জোগাড় চাই—এসব করে তার দিন যায়। মা বড্ড সাংসারিক—বাগানের বাড়তি সবজিটুকু, গরুর দুধ, হাঁস-মুরগির ডিম বেঁচে যা সামান্য আয়, তা থেকে সঞ্চয়। একসময় সবই হয়ে যায়— ঘরবাড়ি হয়, দুটো তক্তপোশ, বাইরের ঘরে একটা জলচৌকি। বড় পুত্র মাধ্যমিকে দশটা বিষয়ের ন’টাতে পাশ। জীবনে কে কবে সব বিষয়ে পাশ করে। নিম্নবিত্ত থেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত হওয়ার আশাবাদী যাত্রা।

    শহর ঘুরে আসে বিলু। পরিবারের আচার-আচরণে যথেষ্ট সচেতন সে। বিব্রত হয় ভাইয়ের খাই খাই স্বভাবে, বাবা-মায়ের সীমাহীন পুত্রগর্বে। কৈশোর তারুণ্যের মাঝামাঝি সময়টাই বুঝি এমন। বড্ড ছোট মনে হয় তখন পরিবারের গণ্ডীটা। যে পরিবার থেকে বেড়ে ওঠা তার জন্যই বিব্রত হওয়া। ভিতরে তাদের জন্য যে গভীর টান, তা প্রকাশ করতেও কুণ্ঠা।

    ছিন্নমূল পিতার সন্তান—যেকোনভাবে পারি তার থেকে পরিত্রাণ চাইছি।

    এভাবে বিলু বড় হয়। জীবনের একটা অচেনা পর্ব তার সামনে প্রকাশ হতে থাকে। বিলুর মাথায় ঘোরে ছোড়দি, লক্ষ্মী, পরী। ভালই তো বেড়ে উঠছিল বিলু, তখনই জীবনের এই অদম্য পর্বে তার প্রবেশ। জানালায় তাকালে সে দেখে ছোড়দির নীল খাম, সাইকেলের ক্যারিয়ারে তাকে উঠিয়ে ছোড়দির দুরন্তপনা। অন্যমনস্ক হয়ে যায় বিলু জীবনের এই গোপন রহস্য অনুধাবন করতে।

    মাথার ভীষণ যন্ত্রণা কবিতায় রূপ নিতে থাকে। জীবনানন্দের সুর সেই কবিতায়।

    ভূমিকায় লেখক লিখেছেন খুব চাপ সৃষ্টি না হলে তাঁর লেখা হয় না। উপন্যাসের বিলু কি লেখক নিজেই— বন্ধুদের চাপে যে কবিতা লেখে।

  • অলৌকিক জলযান

    অলৌকিক জলযান

    ‘অলৌকিক জলযান’ দেশভাগ (নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে) সিরিজের তৃতীয় পর্ব। তবে সময়ের হিসেবে এটি ‘মানুষের ঘরবাড়ি’র আগেই প্রকাশ পেয়েছিল। সেকারণেই হয়তো নীলকন্ঠ পাখির খোঁজের সোনাকে এই বইয়ে কিছুটা হলেও খুঁজে পাওয়া গিয়েছে।

    বইতে আগের পর্বের প্রভাব খুব সামান্যই, মাঝে মাঝে শুধু প্রচ্ছন্ন আভাস রয়েছে এছাড়া এটি স্বতন্ত্র একটি উপাখ্যান। কয়লা চালিত মালবাহী জাহাজ, এস এস সিউল ব্যাংক ও এর জাহাজীদের জীবন নিয়েই গল্প এগিয়েছে। বাংলা ভাষায় জাহাজ ও সমুদ্রে নাবিকদের জীবন নিয়ে এত বিশাল কলেবরের আর কোন উপন্যাস নেই সম্ভবত। দিনের পর দিন যে মানুষেরা মাটির সংস্পর্শ পায় না, অসীম দিগন্তবিস্তৃত সাগরের নীলই যাদের বাড়িঘর, স্বভাবতই তাদের জীবন-যাপনের ধরণ আপামরজনগণের থেকে অনেক আলাদা। লেখক নিজে একসময় নাবিক ছিলেন, জাহাজের জীবন তাই তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে চেনা।

    বার বার স্ক্র্যাপ হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজ সিউল ব্যাংক নিজেই এই বইয়ের অন্যতম প্রধান চরিত্র, সেই জাহাজের নামেই বইয়ের নামকরণ ‘অলৌকিক জলযান’। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় কখনো কখনো মনে হয়েছে সিউল ব্যাংক জীবন্ত এক সত্ত্বা, সে এবং তার কাপ্তান হিগিনস যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বইয়ের ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনসের সাথে হারমান মেলভিলের, মবি ডিক উপন্যাসের ক্যাপ্টেনের অনেক মিল লক্ষ্য করেছি। সম্ভবত, দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রে জাহাজ ও তার কাপ্তান একে অপরকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকে বলেই এক জাদুবাস্তব সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে।

    মানুষের ঘরবাড়ি এবং পরবর্তীতে অলৌকিক জলযানেও লক্ষ্য করেছি অতীনবাবুর নারী চরিত্রগুলো অত্যন্ত দূর্বল। না এমন না যে গল্পে তাদের বিশেষ অবদান নেই, সেটা ভালভাবেই আছে। কিন্তু কখনই তারা শক্তিশালী চরিত্র হয়ে উঠতে পারে না। মানুষের ঘরবাড়ির লক্ষ্মী বা মৃন্ময়ী; অলৌকিক জলযানের বনি এদের ইম্প্যাক্ট মূল গল্পে বেশ ভালভাবেই আছে। কিন্তু চরিত্র হিসেবে এদের গঠন সুবিধার না। খুবই দূর্বল, মেলোড্রামাটিক এবং ‘ক্লিঙ্গি’।

    সমুদ্র ও জীবনের ছেদবিন্দুতে লেখা এক মহাকাব্য

    ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসের সোনা দেশভাগের পর চলে আসে ভারতে। কৈশোর থেকে যুবা বয়সের মাঝামাঝি সময়। নিজের যোগ্যতা দিয়ে ছিন্নমূল পরিবারের হাল ধরার ভীষণ তাগিদ। দু’বেলা পেট ভরে ভাত আর সেইলরের সাদা পোশাকে বাবা-মাকে গর্বিত করার আশা নিয়ে জাহাজে উঠে আসে সোনা। আমাদের সোনাবাবু— সোনালী বালির নদীর চর, যেখানে সে বালির মধ্যে গর্ত করে একটা মালিনী মাছ বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল, সেই নদী, সেই তরমুজ ক্ষেত পেরিয়ে সে এখন অন্তহীন সমুদ্রে এস. এস. সিউল-ব্যাংক জাহাজের নাবিক। জাহাজে সবাই তাকে ডাকে ছোটবাবু বলে। সমুদ্রের বিশালত্বে কিংবা নতুন জীবনের অভ্যস্ততায় এক সময় তার মনেই থাকে না, তার একটা দেশ আছে পৃথিবীর অপর প্রান্তে, সেখানে তার বাবা-মা, ভাইবোন কতো আলাদাভাবে জীবন কাটাচ্ছে।

    সাদা জাহাজটাকে সে কিছুতেই ভাবতে পারে না জাহাজ, আসলে সেই সৌরলোকের অন্তহীন যাত্রার মত মনে হয়, যেন চারপাশে সব গ্রহ নক্ষত্র, উপগ্রহ আর এক সৌরলোক থেকে অন্য সৌরলোকে একটা যান অনবরত ছুটছে।

    দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় বন্দরে বন্দরে বিরতি। জাহাজীরা চিঠি পায় বন্দরে পৌঁছুলে। বাদশা মিয়ার চার নম্বর বউ চিঠি লিখে পাঠায়। মৈত্রদা বাংকে শুয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বউয়ের চিঠি পড়ে। সবার চিঠি আসে। শুধু চিঠি আসে না ছোটবাবুর। রিফিউজি পরিবারটির ঠিকানা আজ এখানে, কাল সেখানে। ছোটবাবু দেখছে সমুদ্রের বিচিত্র জীবন, সমুদ্রের গর্ভে তিমি মাছের ছোটাছুটি, দেখছে জাহাজ মিসিসিপি নদীতে পড়ছে, কিন্তু জানাতে পারছে না কাউকে। বলতে পারছে না, মা, আমরা এখন মিসিসিপি নদীতে।

    এত সুন্দর কাব্যের আঙ্গিকে বাংলা সাহিত্যে কোনো পুরুষ চরিত্রের উপস্থাপন দেখিনি আগে। সোনাবাবু কিংবা জাহাজের ছোটবাবু, তাকে নিম্নস্তরের জাহাজীদের কাতারে ফেলে দেওয়া যায় না। মনে হয়, একটা সময় খুব বনেদি পরিবারের ছেলে ছিল। সেই চন্দন কাঠের সুবাস গায়ে। ছোটবাবুর শরীরের সুষমা অধীর করে দেয় বনিকে—

    যেন জীবনের এক আশ্চর্য মোহ অথবা ঘ্রাণ বলা যেতে পারে, অথবা রাজার রাজা ছোটবাবু, এবং শরীরের সর্বত্র মহিমময় ঈশ্বর কোন কৃপণতা রাখেন নি। এক আশ্চর্য মোমের শরীর, অথবা পাথরের মূর্তি। … ছোটবাবুর মুখে নীল দাড়ি। শরীরের লাবণ্য কোনো দূরবর্তী এক বনভূমির কথা অথবা কোন মরুভূমিতে একজন মুসাফিরের নিত্য হেঁটে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।

    কত রকম ব্যক্তিত্বের মানুষ এই জাহাজে। জাহাজের কাপ্তান স্যালি হিগিনস। তার একটাই দায়িত্ব—ঝড়ঝঞ্ঝা সবকিছু থেকে জাহাজকে বন্দরে পৌঁছে দেওয়া। সাদা চুল, নকল দাঁত, কাপ্তান এর সাদা ইউনিফর্ম, কাঁধে চারটে সোনালী স্ট্র্যাপ। পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে ব্যবহারের মাঝে বিরাজ করে প্রাজ্ঞতা। কাপ্তান স্যালি হিগিনস, এস.এস.সিউল-ব্যাংক‌ আন্ডার হিজ কম্যান্ড।

    দেখি ইঞ্জিন সারঙের মত বিশ্বস্ত মানুষ। কাজকর্ম শেষে সে তার কোরান খুলে বসে। আবিষ্ট মনে সূরার আয়াত পড়ে যাচ্ছে। তার পৃথিবীতে এর বেশি কিছু লাগে না।

    জাহাজে চড়ে বসে একজোড়া চড়ুই পাখি। তারাও যোগ হয় জাহাজের যাত্রী কিংবা এই উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে। যোগ হয় এক অ্যালবাট্রস যুগল। আর পুরোটা উপন্যাস জুড়ে প্রতাপশালী হয়ে রয়েছে সমুদ্র। কি মনোরম বর্ণনা—

    কেননা, সমুদ্র সেই কবে থেকে, কেউ বলতে পারে না, পৃথিবীতে অথবা সৌরজগতে বড় সে একা! একাকী সে, আছে তার মত, সে কখনও উত্তাল তরঙ্গমেলার ভেতর আকাশের নক্ষত্রদের ছুঁয়ে দিতে চায়, তার কি যে প্রলোভন তখন।

    নোনা জলে ভাসতে ভাসতে ডাঙা তখন দুর্লভ বস্তু জাহাজীদের কাছে। কোথাও একটা দ্বীপ চোখে পড়লে বা বন্দরের আবছা অবয়ব দৃষ্টিসীমার মধ্যে আসলে, জাহাজীরা সব কাজ ফেলে, ডেকে এসে দাঁড়ায়। কাজ ফেলে দূরবীন লাগিয়ে বসে থাকে ডেবিড।‌ অথবা কখনো কাজের তাড়া থাকলে ছোটবাবুকে বসিয়ে রাখে দূরবীন নিয়ে। এনি ওম্যান ছোট? সমুদ্রে নাকি জীবনধারণের জন্য ঈশ্বর সবই দিয়ে রেখেছেন। তবে আসল জিনিসটাই কিনা নেই। ওম্যান।

    একনাগাড়ে মাসাধিক শুধু জলে ভেসে থাকতে থাকতে বন্দর এলে জাহাজীরা ‘প্রকৃত জাহাজী’ হয়ে যায়। দাদার মতো শাসন করে, ছায়া দিয়ে রাখে মৈত্রদা। ‌বন্দর এলে মৈত্রদা ‘জাহাজী মৈত্র’ হয়ে যায়। এই জায়গাটায় চৌরঙ্গী বইয়ের সাথে মিল পেয়েছি। হোটেল শাজাহানে বিত্তশালীরা যেমন আদিম রিপুর তাড়নায় বেসামাল হয়ে যেতো, বন্দরে তেমনি জাহাজীরা আদিম রিপুকে ব্রেক কষাতে পারে না কোনো কিছু দিয়েই।‌

    চারিদিকে শুধু সমুদ্রের ঢেউ আর আকাশ। তার মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে সাদা জাহাজ। জাহাজের কলকব্জা, কতো রকমের মাস্তুল, ডেক—সব যার্গন এতো সাবলীলভাবে কথায় কথায় টেনে এনেছেন অতীন বাবু। চোখের সামনে চলে আসে অতিকায় পিস্টন, জাহাজের পিচিং। কিছুতেই মনে হয় না, জাহাজটা শুধু একটা জাহাজ। মনে হয় এরও প্রাণ আছে। মানুষ যেভাবে বাঁচে অক্সিজেন দিয়ে, জাহাজটা তেমনি কয়লা টেনে নিচ্ছে প্রশ্বাসে। কোথাও এর একটা আত্মা না থেকে পারে না। অন্তত এমন একটা বিশ্বাস জন্মে যায় নাবিকের মনে।

    সাড়ে চারশো পৃষ্ঠাব্যাপী এই উপন্যাস। তবুও এর ব্যাপ্তি আরো গভীর। ষাটের দশকের এস. এস. সিউল-ব্যাংক পাঠককে গোটা পৃথিবীটাই ঘুরিয়ে আনবে। ভারত মহাসাগর, আটলান্টিক, মিসিসিপি নদী হয়ে ছবির মত দ্বীপ তাহিতি। সমুদ্রের জলের নিচে ফসফরাস জ্বলে উঠলে মনে হয় নক্ষত্রপুঞ্জ ঝলমল করছে জলের নিচে। সমুদ্র ও আকাশের অসীমতায় ডুবে পরিক্রমণ করে আসা হয় ব্যক্তি-জীবনের গণ্ডিও। প্রকৃতি ও মানুষের কী অক্ষুন্ন আদিমতা। অনন্ত পারাবারকে প্রদক্ষিণ করে বয়ে চলে এই মহাকাব্য।

    অলৌকিক জলযান;  অখণ্ড সংস্করণ। প্রথম প্রকাশ – মাঘ ১৩৬৮; প্রচ্ছদ : পূর্ণেন্দু পত্রী।

    উৎসর্গ

    মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
    যিনি আমার সুখে
    আছেন, দুঃখেও আছেন।

  • আওরঙ্গজেব : ব্যক্তি ও কল্পকথা

    আওরঙ্গজেব : ব্যক্তি ও কল্পকথা

    আওরঙ্গজেব

    ব্যক্তি ও কল্পকথা

    অড্রি ট্রুসকে

    অনুবাদ

    মোহাম্মদ হাসান শরীফ

    প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২০

    বাংলা সংস্করণ উৎসর্গ

    আব্বাকে, তিনিই আমাকে প্রথম বাদশাহ আওরঙ্গজেব সম্পর্কে ধারণা দিয়েছিলেন।

    অনুবাদকের কথা

    এ বইটি পড়ার সময় শৈশবে শোনা একটি গল্প (‘কিস্‌সা’) মনে পড়েছিল। গল্পকার প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসে বলেছিলেন, “বাদশাহ আওরঙ্গজেব ছিলেন ‘জিন্দা পীর।’ ভণ্ড পীরদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। বাদশাহি পেয়েই তিনি বাহিনী নিয়ে ছুটে গেলেন কে আসল আর কে নকল পীর তা নির্ধারণ করতে। প্রতিটি মাজারের ফটকে গিয়ে তিনবার সালাম দিলেন। মাজারের প্রধান পীরের সমাধি থেকে সালামের জবাব না এলেই তিনি শ্রমিকদের হুকুম দিতেন সেটি ভেঙ্গে ফেলতে। এভাবে মাজার ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে তিনি এগিয়ে চললেন। সামনে পড়ল খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির (র.) মাজার। তিনি সেখানে গিয়েও সালাম দিলেন। প্রথমবার সালামের জবাব না পেয়ে দ্বিতীয়বার দিলেন। জবাব পেলেন না। এরপর তৃতীয়বার দিলেন। তখনো জবাব পেলেন না। তখন শ্রমিকদের বললেন, ভাঙ্গো।

    শ্রমিকরা শাবল হাতে যেই মাজারের প্রাচীরে আঘাত দিতে গেছে, সাথে সাথে সমাধি থেকে প্রচণ্ড শব্দ বের হলো : ‘থামো।’

    সবাই চমকে গেল।

    বাদশাহ তখন বললেন, ‘আমি তো আপনাকে সালাম দিয়েছিলাম। আপনি জবাব দেননি।’

    কবরের ভেতর থেকে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (র.) বললেন, ‘প্রথমবার তুমি যখন সালাম দিয়েছিলে, তখন আমি ওজু করছিলাম। দ্বিতীয়বার যখন সালাম দিয়েছ, তখন নামাজে দাঁড়িয়েছিলাম। আর তৃতীয়বার সালামের সময় আমি মুনাজাত করছিলাম। এজন্যই তোমার সালামের জবাব দিতে পারিনি।’

    বাদশাহ আওরঙ্গজেব অনুতপ্ত হলেন, ক্ষমা চাইলেন।

    খাজা মঈনুদ্দিন চিশতিও তাকে ক্ষমা করলেন। তবে বললেন, তুমি মাজারগুলো ভেঙ্গে ঠিক করোনি। যাদের মাজার ভেঙ্গেছ, তারা আমার কাছে নালিশ নিয়ে এসেছিল। তুমি সব মাজার আবার মেরামত করে দেবে।

    বাদশাহ সাথে সাথে রাজি হলেন। এ জন্যই ভারতের সব মাজারে দুটি তারিখ খোদাই করা আছে। একটিতে নির্মাণের সময়, আরেকটি বাদশাহ আওরঙ্গজেবের সংস্কারের তারিখ।

    কাহিনীটি আমার মনে গেঁথে ছিল। এ ধরনের লোক সম্পর্কে আগ্রহ থাকাই স্বাভাবিক। ফলে বইটি যখন অনুবাদ করার প্রস্তাব এলো, সাথে সাথে গ্রহণ করেছি। পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। ফলে অনুবাদটি পরিশ্রমের কাজ মনে হয়নি, শেখার একটি পর্ব বিবেচনা করেছি।

    আওরঙ্গজেব প্রবল বৈপরীত্যপূর্ণ ও ধাঁধাময় এক ব্যক্তিত্ব। অনেকে তাকেই মোগল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য দায়ী করেন। অথচ তিনিই মোগল সাম্রাজ্যকে সর্বোচ্চ মাত্রায় সম্প্রসারিত করেছিলেন। আওঙ্গজেবকে হিন্দুবিদ্বেষী মনে করা হয়। অথচ তার আমলেই হিন্দুরা মোগল মসনবে সর্বোচ্চ সংখ্যায় নিয়োগ পেয়েছিল। তাকে খাঁটি মুসলিম মনে করা হয়। অথচ তার আমলেই ইসলামি অনেক অনুষ্ঠানের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। তিনি বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন, অথচ নিজের কবরের জন্য অচিহ্নিত একটি স্থান বেছে নিয়েছিলেন।

    লেখক জানিয়েছেন, এই জীবনী রচনা করা হয়েছে ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগির সম্পর্কে আমাদের মধ্যে বিরাজমান খুবই হালকা জ্ঞানের গভীরতা বাড়ানোর জন্য। বইটি পড়লে সত্যিই আমাদের জ্ঞান বাড়বে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আওরঙ্গজেব সম্পর্কে জানার আগ্রহ নতুন করে বাড়বে।

    এ গ্রন্থটি একটি রাজনৈতিক প্রপাগান্ডাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া পরিমিত, অতিরঞ্জনহীন ভাষ্য। এ বই প্রমাণ করে যে আওরঙ্গজেব এমন মানুষ ছিলেন যিনি অবশ্যই অনেক ভুল করেছেন, তবে এমন কেউ তিনি নন যার নিন্দা করতে হবে অন্ধভাবে।

    উপমহাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি নিয়ে যারা ভাবেন, তাদের জন্য এটি একটি অমূল্য গ্রন্থ। বিশেষ করে বর্তমান ভারতে আওরঙ্গজেবকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলতে থাকায় তাকে জানার গুরুত্ব বেড়ে গেছে। বইটি বড় নয়। ছোট্ট পরিসরের মধ্যেই কেবল আওরঙ্গজেববেই নয়, মোগল ইতিহাসকেই তুলে আনা হয়েছে। আওরঙ্গজেব হয়ে ওঠেছেন মোগল ইতিহাসের মধ্যমণি।

    মুখবন্ধ

    এ বইটির লেখা সূচনা হয়েছিল একটি টুইটার বার্তার মাধ্যমে। আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে মোগল সম্রাটদের কোনো একজনের ওপর একটি সহজবোধ্য গ্রন্থ লিখব কিনা। আলোচনা শিগগিরই ইমেইলে স্থানান্তরিত হলো, আমি বিষয় হিসেবে বেছে নিলাম আওরঙ্গজেব আলমগিরকে। এই বই সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে প্রথম সূত্রবদ্ধ হওয়াই ছিল যথার্থ। কারণ আধুনিক ভারতকে ছেয়ে ফেলা আওরঙ্গজেব জ্বর প্রায়ই টুইটার ও ফেসবুকের মতো ফ্লাটফর্মে সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে। এই সংক্ষিপ্ত জীবনীতে আমি লোকরঞ্জক সংস্কৃতিতে আওরঙ্গজেব নিয়ে প্রকম্পমান ও অব্যাহত উপস্থিতির জবাব দিয়েছি। অবশ্য একজন ইতিহাসবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, আওরঙ্গজেব হলেন প্রথম ও প্রধানতম মোগল সম্রাট যার সম্পর্কে বেশির ভাগ লোক জানে দুঃখজনকভাবে কম। এই বই তার সব জটিলতা নিয়েই ঐতিহাসিক আওরঙ্গজেবকে পরিচিত করার চেষ্টা করা হয়েছে বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীর কাছে।

    তথ্যপ্রবাহ ও সহজ পাঠের জন্য বইটি পাদটীকা ছাড়াই উপস্থাপন করা হয়েছে। আওরঙ্গজেবের জীবন ও শাসন কৌশল এমনিতেই জটিল বিষয়, এতে পাদটীকা যোগ করা হলে তা আরেকটি বাধা হিসেবে আবির্ভূত হবে। যেসব পাঠক আমার সূত্রগুলো জানতে আগ্রহী, তারা সেগুলো পাবেন জীবনমূলক প্রবন্ধ ও নোটের অংশে। পুনশ্চ তাদের কাছে ভালো লাগবে যারা ইতিহাসবিদেরা কিভাবে অতীত নিয়ে চিন্তা করেন এবং প্রাক-আধুনিক সূত্রগুলো বিশ্লেষণ করেন তা জানতে আগ্রহী।

  • ঈশ্বরের বাগান

    ঈশ্বরের বাগান

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    পৃথিবীপৃষ্ঠের পাঁচ ভাগের চার ভাগই জল। অলৌকিক জলযানে চড়ে সেই জল, সমুদ্র পেরিয়ে আমাদের ছোটবাবু অবশেষে ভিড়ল সেই একাংশ ভূমিতে, যেন ঈশ্বরের বাগানে।

    শৈশবে সোনা, কৈশোরে বিলু, জাহাজী জীবনে সে সোনাবাবু, যৌবনে থিতু হয়ে গেল শেষে এক টুকরো জমিতে, অতীশ দীপঙ্কর পরিচয়ে। এই বাগানের জীবন যুদ্ধে তার নানা ভূমিকা। বাবা-মায়ের মেজ সন্তান, দুই ছেলে মেয়ের পিতা, এক নারীর স্বামী, তাছাড়াও কারখানার ম্যানেজার, এভাবে সে বিভিন্নজনের অবলম্বন।

    একটা সময়, যখন সে ছিল ছোটবাবু, বনিকে সমুদ্র পার করে ডাঙ্গায় পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল তার, এখনো মনে হয় চারিদিকে সমুদ্রের মাঝে বোট নিয়ে ডাঙার সন্ধানে হাল ধরে আছে সে, কিন্তু এবার বোটে বনি নেই, এবার ডাঙায় পৌঁছে দিতে হবে মিন্টু, টুটুল, নির্মলাকে। সে জীবনে, জাহাজের কাপ্তান ছিল স্যালি হিগিনস, এখন জাহাজের কাপ্তান সে নিজেই।

    উপন্যাসের বিভিন্ন প্লটকে জোড়া দিয়েছে অতীশ। অতীশের সংসার যুদ্ধ দিয়ে আরম্ভ, তারপর এসেছে নীতির যুদ্ধ, কখনো বা ঈশ্বরের সঙ্গে যুদ্ধ। সব যুদ্ধ সামাল দিয়ে অতীশ ফিরে গেছে সুদূর অতীতের স্মৃতিতে, আবার খুলেছে দেওয়া-নেওয়ার সেই জীর্ণ খাতাটা। মিলিয়ে দেখছে ঈশ্বরের এই বাগানে কার কতটুকু অধিকার, কারোই কি হার-জিত হয় এই যুদ্ধে?

    জীবিকার নিমিত্তে কলকাতা শহরে কারখানার ম্যানেজারের কাজ নেয় অতীশ। শৈশব কেটেছে যার সোনালি বালির নদীর চরে, অসীম সমুদ্র ও বিস্তৃত আকাশের মাঝে যার যৌবনের প্রাক্কাল, কলকাতা শহরের এই কড়ায়-গণ্ডায় জীবন তার কাছে কোলাহলের মতো লাগে। লেখার মাঝে এই কোলাহল, ফুটপাতের নোংরা আবর্জনা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ময়লার স্তুপে ঝুপড়ি গেড়ে পাগলের বাস; নগ্ন শ্বেতাঙ্গ নারী-মূর্তি, অয়েল পেইন্টিং এ সাজানো অভিজাত বসবার ঘর — দুয়ের মাঝে শুধু একটা প্রাচীর। দু’জনে বেশ আছে দিব্যি। মাঝে মাঝে যখন নর্দমার মাছি সুগন্ধে ভরা অভিজাত ঘরে প্রবেশ করে, তখন দেখা যায় খানিকটা ত্রাস।

    জীবনের গতি প্রচণ্ড এখানে। ব্যয়ের গতি যদি ছাড়িয়ে যায় আয়ের গতিকে, তবেই গণ্ডগোল। এছাড়াও আছে সন্তানকে বড় স্কুলে ভর্তি করার প্রতিযোগিতা। বাইরের ঘরে একটা তক্তপোষ, শোবার ঘরে একটা বড় আয়না— এমনই বেড়েই চলেছে জীবনে অভাবের লিস্টি। কারখানার উপার্জন সীমিত, লেখালিখি থেকে হাতে একটা অঙ্ক আসে অতীশের।

    দেশভাগের এই চতুর্থ ও শেষ উপন্যাসে লেখক যেন আরো বেশি করে ব্যক্তিসত্তার মধ্যে ডুবে গেছেন। বলে দিতে হয় না এই অতীশ দীপঙ্কর যে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। উপন্যাসের নায়ক অতীশকে তিনি যত পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন, সেসব নিজেই পার করে এসেছেন জীবনের বিভিন্ন অঙ্কে।

    বিভিন্ন নারীকে পরিক্রমণ করে আমাদের এই উপন্যাসের নায়কের জীবন। যৌবনে সেই পরিক্রমণ আরও গভীর। তার সৌম্য চেহারা, নম্র আচরণ আকর্ষণ করে চারপাশের নারীদের। বহু নায়িকা তাই তার এই জীবন নামের উপন্যাসে।

    বারবার লেখক নারী-পুরুষের কামপ্রবৃত্তিকে তুলে এনেছেন। আমাদের এই উপমহাদেশে চায়ের টেবিলে আলোচনায় সে প্রসঙ্গ আসে না, অথচ মানুষের শরীরের রন্ধে রন্ধে যে গোপন আকাঙ্ক্ষা সূচ ফুটায় লেখক বারবার বুঝিয়ে দিয়েছেন।

    অথচ এত গোপন এই কর্মধারা, জীবনের চলাফেরায় তার কোনো অস্তিত্ব আছে মনে হয় না। কিংবা মুখোশ পরে থাকা সংসারে, আসলে সেই প্রবল ইচ্ছের তাড়নাতেই মানুষের এই ধর্মশাস্ত্র, বীজ বপন এবং আবাদ।

    বড় ভাল লেগেছে এই জায়গাটা। হাওয়াকে সৃষ্টি না করলে আদম কি সেই পাপে জড়াত?

    কুম্ভবাবুর চরিত্রটা নজর কাড়ে। আমিও যেন সংসারে এমন প্রচুর মানুষ দেখলাম। কর্তাব্যক্তিদের সাথে হে হে করে আলাপ করে যারা পকেটে টাকা গোছাচ্ছে। অত্যন্ত আপনার মত ব্যবহার, কিন্তু কি, পকেটে টাকা পুরার গ্রিডি আলগরিদম ছাড়া মগজে আর কিছুই নেই।

    সংসার, দাম্পত্য ছাড়িয়ে উপন্যাস মোড় পাল্টায়। বিদেশি আলোকচিত্রের একটা প্রদর্শনী। অ আজার বালথাজার। ফরাসি চলচ্চিত্রটির কিছুই অনুধাবন করতে পারে না অতীশ। না পারলেও দর্শকসারিতে খুঁজে পায় অতীতের একটি দরজা। বর্তমানে কি অতীতের প্রশ্নের উত্তর মেলে। নাকি জীবনটাই সেই সিনেমার মতোন, অনুধাবনের অতীত।

    অ আজার বালথাজার।

    হিন্দুর বাড়িতে মুসলিমের প্রবেশ বারণ, আবার হিন্দু সম্প্রদায়কে ছাড়তে হ’ল দেশ। আমরা কি কারো প্রতি সুবিচার করতে পেরেছি? যে ঈশ্বরের জন্য আমরা পরস্পরকে ঘৃণা করেছি, কোথায় পেয়েছি তার সান্নিধ্য… ধর্মভীরু পিতার সন্তান অতীশ। যৌবন ছুঁতেই তার ঈশ্বর বিশ্বাস ফেটে চৌচির। কুম্ভ বাবু আপনার তো ঈশ্বর আছে আমার তাও নেই।

    ঈশ্বরকে আমরা নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করি, হয়ত টের পাই না কত বড় অবলম্বন সে আমাদের বেঁচে থাকার। জীবনের যাবতীয় টেনশন ঈশ্বরের কাঁধে ছেড়ে না দিলে, কত অসহায় আমরা।

    সেই ঈশ্বরই আবার আমাদের যুদ্ধের কারণ।

    ঈশ্বর আপনার জন্ম দিয়ে আমরা ঠিক করিনি। আপনি না জন্মালেই পারতেন ঈশ্বর।

    আবারও মোড় নেয় উপন্যাস। এই চূড়ান্ত মোড়ে অতীতের জালে ধরা দেয় অতীশ।

    আমি ভুলতে চেয়েছি। দেশের কথা ভাবলেই ক্ষোভে জ্বলে উঠতাম। তোরা আলাদা দেশ দাবি করলি! আমাদের মানুষ মনে করলি না। আমরা কোথায় যাব, কোথায় গিয়ে উঠব ভাবলি না। লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান। বাংলাদেশ, এমন সোনার বাংলা, তাকে পূর্ব-পাকিস্তান বানিয়ে ছাড়লি। ক্ষোভ হবে না! কেন আমাদের চলে আসতে হল। আমরা তোদের পর হয়ে গেলাম। একই জল মাটিতে নিশ্বাস ফেলেছি—বড় হয়ে উঠেছি, দেশান্তরী করে ছাড়লি!

    দেশভাগ স্তিমিত ছিল দ্বিতীয় ও তৃতীয় উপন্যাসে। এখানে অতীন বাবু সোনার শৈশবের সেই ভূখণ্ডকে আবার তুলে এনেছেন। এসেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম। হিন্দুদের তাড়িয়ে কি ভাল ছিল এ দেশ? বাঙালি ও পাকিস্তানি মুসলিমে কি ভাগাভাগি লাগেনি?

    এত ভাগাভাগি কেন মিঞা সাব! ভাগের শেষ আছে! যত ভাগ করবেন শরীর তত পঙ্গু হয়ে যাবে না?

    প্রায় শেষে চলে এসেছি আমরা। জীবনে শেষকৃত্যের কাছাকাছি হলে, সেই ঈশ্বরকে স্মরণ করি আমরা। সেই একি বাণী উচ্চারিত হয় আমাদের মগজে, যাকে পৃথক প্রমাণ করার জন্য আমরা যুদ্ধ চালিয়েছি সারাটা জীবন।

    তারপর সর্বতোভাবে ফলন্মোথ অদৃষ্ট বশত প্রথমে জলময় সমুদ্র উৎপন্ন হইল। অতঃপর সেই জলময় সমুদ্র হইতে প্রকাশমান জগতের নির্মাণে সমর্থ ব্রহ্মা আবির্ভূত হইলেন। তিনি যথাক্রমে সূর্য ও চন্দ্র কে সৃষ্টি করলেন— তাহাতে দিন রাত্রি হইতে লাগিল। দিন রাত্রি হওয়ায় সংবৎসর সৃষ্টি হইল। অনন্তর ব্রহ্মা পৃথিবী, আকাশ, স্বর্গ এবং মহঃ প্রভৃতি লোকের সৃষ্টি করিলেন।

    কেমন করে তোমরা আল্লাহতে অবিশ্বাস কর, যখন তোমরা ছিলে মৃত আর তিনি করলেন জীবিত? পুনরায় যিনি তোমাদের মৃত্যু দেবেন, আর পুনরায় জীবিত করবেন, তখন ফিরিয়ে আনা হবে তোমাদের তাঁর কাছে।

    হাউ হি মাস্ট রিজয়েস ইন অল হিজ ওয়ার্ক। দ্য আর্থ ট্রেমবেলড্ অ্যাট হিজ গ্ল্যান্স। দ্য মাউন্টেনস বার্স্ট ইনটু ফ্লেম অ্যাট হিজ টাচ। ইউ উইল সিঙ টু দ্য লর্ড অ্যাজ লঙ অ্যাজ ইউ লিভ। ইউ উইল প্রেইজ গড টু ইয়োর লাস্ট ব্রেথ।

    উপন্যাসের শুরুটা হয় পাগল হাঁকছে দু-ঘরের মাঝে অথৈ সমুদ্দুর। আবার ঠিক শেষে অতীন বাবু আমাদের এই দূরত্বের অঙ্কটা মিলিয়ে দিতে চান।

    মা তুমি বড় বৃক্ষ। দাঁড়িয়ে আছ ডালপালা মেলে। ফুল ফোটে। ফল ধরে। হাওয়ায় কে কোথায় সব বীজ উড়িয়ে নিয়ে যায়। জল পড়ে। শস্য দানার মতো তারাও মাটির নিচে শেকড় চালিয়ে দেয়। বড় দূরের হয়ে যায় সব কিছু। সারা পৃথিবী জুড়ে কত গাছপালা, ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে তারও ফুল ধরে ফল হয়। আবার ঝড়ো হাওয়ায় বীজ উড়িয়ে কোন এক সুদূরে নিয়ে যায়। আমরা তোমার সেই বীজ উড়ে গেছি।

    সোনা ট্রিলজির প্রথম পর্ব ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’। দ্বিতীয় পর্ব ‘অলৌকিক জলযান’। শেষ পর্ব ‘ঈশ্বরের বাগান’। প্রথম পর্বে যে সোনা, দ্বিতীয় পর্বে— ছোটবাবু, শেষ পর্বে— অতীশ দীপঙ্কর। তিন পর্বে একই ব্যক্তিসত্তা ভিন্নতর সত্যে উদ্ভাসিত। যেমন একই শক্তি মহাজাগতিক নিয়ন্ত্রণে নানা ব্যঞ্জনার নিত্য প্রকাশিত। তিনটি পর্বই স্বয়ংসম্পূর্ণ। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজের পটভূমি—প্রকৃতি। অলৌকিক জলযানের পটভূমি—অনন্ত অসীম সমুদ্র। আর ঈশ্বরের বাগান, নগর জীবনের এক নীরস ইট কাঠের গদ্যময় জগৎ। শৈশব, বয়ঃসন্ধিকাল পার হয়ে সোনা এখন ঈশ্বরের বাগানে অতীশ দীপঙ্কর—এক পরিণত মানুষ। পৃথিবীটা তার কাছে এখন প্রকৃতির মতো নিরন্তর সুষমামণ্ডিত নয় অথবা সমুদ্র এবং আকাশের মতো উদার নয়। নগর জীবনে সে শুভ-অশুভের দ্বন্ধে ক্ষতবিক্ষত। ঈশ্বর এবং প্রেতাত্মা দুই তাকে নিয়ত তাড়া করছে।

    ঈশ্বরের বাগানের প্রথম অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশ করেছে করুণা প্রকাশনী, অক্টোবর ২০০০এ। প্রচ্ছদ এঁকেছেন সুব্রত চৌধুরী।

    উৎসর্গ

    সমরেশ বসু

    দিব্যেন্দু পালিত

    শ্রীমান শুভাশিস ব্যানার্জী

    বামাচরণ মুখোপাধ্যায়

  • পঞ্চনদের তীরে

    পঞ্চনদের তীরে

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    গ্রন্থকথা

    ‘পঞ্চনদের তীরে’ হেমেন্দ্রকুমার রায় রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাস। প্রকাশক মহাদেব সরকার, সমবায় পাবলিশার্স, ৩৩-২, শশিভূষণ দে ষ্ট্রীট, কলিকাতা। প্রাপ্তিস্থান ছিল বুক ফোরাম, ৭২, হ্যারিসন রোড, কলিকাতা। গ্রন্থটির দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৫২ বঙ্গাব্দে, মূল্য এক টাকা আট আনা। প্রকাশক কর্তৃক গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষিত ছিল। মুদ্রাকরণ যামিনী মোহন ঘোষ, পপুলার প্রিণ্টিং ওয়ার্কস, ৪৭, মধু রায় লেন, কলিকাতা।

    উৎসর্গ

    শ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুক্ত রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়

    শ্রীচরণেষু—

    মুখপাত

    প্রাচীন ঐতিহাসিক ভারতের সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ স্বদেশভক্ত বীর ও সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত সম্বন্ধে ভারতীয় জনসাধারণের পরিষ্কার ধারণা নেই। ভারতব্যাপী দেশাত্মবোধের এই নব-জাগরণের যুগেও দেশীয় বিদ্যামন্দিরের পাঠ্য ইতিহাসে এখনকার ছেলেমেয়েদের এ-সম্বন্ধে সচেতন করবার চেষ্টা দেখা যায় না। আমাদের সত্যিকার জাতীয় জীবনের এই অসাড়তা লক্ষ করলে হতাশ হতে হয়।

    ‘পঞ্চনদের তীরে’ উপন্যাস বটে, কিন্তু এর আখ্যানবস্তু কোথাও ঐতিহাসিক ভিত্তি ছেড়ে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেনি। যে-সময়ের কথা আমি বলতে বসেছি, সে-সময়কার ঐতিহাসিক সূত্র এখনও নানা স্থানে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে, সেই কারণে স্থলবিশেষে উপন্যাসের মর্যাদা ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করবার জন্যে কিছু কিছু কল্পনার আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি, কিন্তু সে-কল্পনাও কোথাও ঐতিহাসিক সত্যকে বাধা দেয়নি।

    ধরুন, শশীগুপ্তের কথা। ওই দেশদ্রোহীর শেষ জীবন অতীতের অন্ধকারের মধ্যে চিরদিনের জন্যে লুপ্ত হয়ে গেছে, ইতিহাসও তার সম্বন্ধে নীরব। কিন্তু তার একটা পরিণাম না দেখালে উপন্যাস হয় অসম্পূর্ণ। অতএব ওখানে কল্পনা ব্যবহার করা ছাড়া উপায়ান্তর নেই এবং গোঁড়া ঐতিহাসিকরাও সে-জন্যে আপত্তি প্রকাশ করবেন বলে মনে হয় না। তারপর ধরুন, সুবন্ধু প্রভৃতি সম্পর্কীয় ঘটনাবলি। প্রাচীন ইতিহাসকে ভালো করে গল্পের ভিতর দিয়ে দেখাবার জন্যেই ওদের অবতারণা করা হয়েছে। সুবন্ধু প্রভৃতি ভাগ্যান্বেষী সৈনিক বটে, কিন্তু সেখানকার ভারতে ওদের মতন লোকের ভিতরেও যে অতুলনীয় বীরত্ব ও স্বদেশভক্তির অভাব ছিল না, Massaga নামক স্থানে আলেকজান্ডারের দ্বারা সাতহাজার ভারতীয় ভৃতক-সৈন্যের (mercenaries) হত্যাকাণ্ডেই তার জ্বলন্ত প্রমাণ পাওয়া যায়। তারা প্রত্যেকে সপরিবারে প্রাণ দিলে, তবু বিদেশি শত্রুর অধীনে চাকরি স্বীকার করলে না! অতএব কাল্পনিক হলেও সুবন্ধু প্রভৃতিকে আমরা ঐতিহাসিক ভারতীয় চরিত্র বলে গ্রহণ করতে পারি অনায়াসেই।

    পঞ্চনদের তীরে উপন্যাসে স্বাধীন ভারতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেখানোই হচ্ছে আমার মুখ্য উদ্দেশ্য। সেই কারণে, সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের পরবর্তী জীবন দেখাবার প্রয়োজন বোধ করিনি, প্রসঙ্গক্রমে সর্বশেষে দু-চারটি ইঙ্গিত দিয়েছি মাত্র।

    এই বইখানি কেবল যারা বয়সে বালক তাদের জন্যেই লেখা হল না। পরীক্ষা করে দেখেছি, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস সম্বন্ধে এদেশের বয়স্ক পাঠকরাও বালকদের চেয়ে কম অজ্ঞ নন। বইখানি লেখবার সময়ে তাঁদের কথাও বার বার মনে হয়েছে। ইতি—

    ২৩০/১, অপার চিৎপুর রোড,
    বাগবাজার, কলিকাতা।
    শ্রীহেমেন্দ্রকুমার রায়
  • মহাভারতের শেষ মহাবীর

    মহাভারতের শেষ মহাবীর

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    ‘মহাভারতের শেষ মহাবীর’ হেমেন্দ্রকুমার রায় রচিত ঐতিহাসিক কাহিনী; এটি এশিয়া পাবলিশিং কোম্পানি প্রকাশিত হেমেন্দ্রকুমার রচনাবলীর ষষ্ঠ খণ্ডের প্রথম উপন্যাস, এবং শোভন রায় সংকলিত ‘ঐতিহাসিক সমগ্রে’র তৃতীয় উপন্যাস।

    কিন্তু কে এই মহাভারতের শেষ মহাবীর?

    মহাকাব্য মহাভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কুরুক্ষেত্র। এ নাম শুনলে আজও প্রত্যেক হিন্দুর ধমনিতে চঞ্চল হয়ে ওঠে রক্তস্রোত। এ কেবল কুরু-পাণ্ডবের আত্মঘাতী যুদ্ধক্ষেত্র নয়, এখানেই প্রথমে পার্থসারথিরূপে ভগবানের অবতার শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র মুখে আত্মপ্রকাশ করেছিল গীতার মহাবাণী। এখানে একদিকে যেমন ভীমার্জুন, কর্ণ, ভীষ্ম ও দ্রোণ প্রভৃতি মহা মহা যোদ্ধারা অপূর্ব বীরত্ব দেখিয়ে অর্জন করেছিলেন অমরত্ব, আর একদিকে তেমনি নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিল আর্য-ভারতের সমস্ত ক্ষাত্র-বীর্য। এই শতস্মৃতি-বিজড়িত ভূমির উপরে গিয়ে দাঁড়ালে আজও হৃদয়ের মধ্যে অনুভব করা যায় শত মৃত পুত্রের শোকে কাতর গান্ধার-কন্যা গান্ধারীর করুণ ক্রন্দন, নিষ্ঠুর সপ্তরথীর দ্বারা আক্রান্ত বালক অভিমন্যুর নিষ্ফল সিংহনাদ, দুঃশাসনের রক্তপান করে তৃতীয় পাণ্ডবের উন্মত্ত তাণ্ডব, রক্তবন্যায় ভাসতে ভাসতে অষ্টাদশ অক্ষৌহিণীর ঊনচল্লিশ লক্ষ ছত্রিশ হাজার ছয় শত সৈন্যের চরম মৃত্যুযন্ত্রণা! এই বিরাট নরমেধযজ্ঞের ফল কী? পাণ্ডবদের মৃত্যুর পরে আর্যাবর্তে এমন কোনও ক্ষত্রিয় রইল না, বিদেশি যবনদের বাধা দেবার জন্যে সবল হস্তে যে অস্ত্রধারণ করতে পারে। তাই তারই কিছুকাল পরে উত্তর ভারতের নাট্যশালার মধ্যে প্রবেশ করতে দেখি ইরানি এবং গ্রিক দিগ্‌বিজয়ীদের। ষষ্ঠ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কুরুক্ষেত্র বা স্থানেশ্বরের সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন প্রভাকরবর্ধন। তখন গুপ্তসাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল বটে, কিন্তু গুপ্তবংশীয় ক্ষুদ্রতর রাজারা তখনও ভারতবর্ষের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত বলে গণ্য হতেন। প্রভাকরবর্ধনের রানি ছিলেন যশোমতী। তিনি গুপ্তবংশজাতা এবং সেইজন্যে তার স্বামী নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করতেন। তাদের দুই পুত্র। জ্যেষ্ঠ রাজ্যবর্ধন এবং কনিষ্ঠ হর্ষবর্ধন। রাজশ্রী নামে তাদের এক কন্যার নাম ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে। তিনি ছিলেন কান্যকুজের অধিপতি গ্রহবর্মার সহধর্মিণী।

    কিন্তু এই বইটিতে যে মহাবীরের কাহিনি বলা হয়ছে, তিনি কে? তিনি কি পৌরাণিক ইতিহাস-পূর্ব যুগের মানুষ? হ্যাঁ। কেবল প্রাচীন ইতিহাসে, ভ্ৰমণ-কাহিনিতে, কাব্যে ও নাট্য-সাহিত্যেই তাঁর নাম অমর হয়ে নেই, তাকে সত্যিকার রক্ত-মাংসের মহাবীর বলে স্বীকার করেছেন আধুনিক ঐতিহাসিকরাও। সপ্তম শতাব্দীর আর্যাবর্ত গৌরবোজ্জ্বল হয়ে আছে একমাত্র তারই নামের মহিমায়। তিনি হচ্ছেন ভারতের শেষ হিন্দু-সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। মহারাজাধিরাজ শ্রীহর্ষ। ইতিহাস তাকে হর্ষবর্ধন বলে জানে।

  • ভগবানের চাবুক

    ভগবানের চাবুক

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    প্রথম : গোড়াপত্তন

    আফগানিস্তানের উত্তরে তুর্কিস্থান। সেইখানে আছে সমরখন্দ নগর। এই সমরখন্দ কেবল প্রাচীন গৌরবের জন্যে নয়—আর এক কারণেও হতে পারে চিরস্মরণীয়।

    পৃথিবীতে তিনজন দিগবিজয়ীর তুলনা নেই। খ্রিস্ট-পূর্বাব্দের আলেকজান্ডার দি গ্রেট, ত্রয়োদশ শতাব্দীর চেঙ্গিজ খাঁ ও চতুর্দশ শতাব্দীর তৈমুর লং।

    জুলিয়াস সিজার, হানিবল ও নেপোলিয়ন প্রভৃতিও প্রথম শ্রেণির দিগবিজয়ী বটে, কিন্তু পূর্বোক্ত তিন বীরের কীর্তিকলাপ তাদের চেয়ে ঢের বেশি অসাধারণ ও বিস্ময়কর।

    আলেকজান্ডার, চেঙ্গিজ ও তৈমুর—এই তিনজনের সঙ্গেই সমরখন্দ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছিল এবং ওই তিন দিগবিজয়ীই সমরখন্দ থেকে যাত্রা করেছিলেন ভারতবর্ষের দিকে। বেশ বোঝা যায়, সেকালে সোনার ভারতে পদার্পণ করতে না পারলে কেহই নিজের দিগবিজয়-কাব্য সম্পূর্ণ হল বলে মনে করতেন না।

    আর কেবল সেকালেই বা বলি কেন সর্বকালেই ভারত দিগবিজয়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে নেপোলিয়নও আসতে চেয়েছিলেন ভারতবর্ষের দিকে। এ যুগের হিটলারও তাই চেয়েছিলেন, জাপানিদেরও প্রাণের সাধ তাই ছিল। দিগবিজয়ীদের ভারত লুণ্ঠনের পথ সর্বাগ্রে খুলে দিয়েছিলেন বোধ হয় পারস্য সম্রাট প্রথম দরায়াস।

    কিছু কম ছয় শত বৎসর আগে এক মহাবীর বসেছিলেন সমরখন্দের সিংহাসনে; কিন্তু কেবল সেই ক্ষুদ্র সিংহাসনে তাঁর স্থান সংকুলান হল না, তিনি চাইলেন পৃথিবীর রাজতন্ত্র। পৃথিবীপতি হওয়ার জন্যে তিনি বার বার রণক্ষেত্রে ছুটে গেলেন এবং প্রত্যেকবারই ফিরে এলেন রক্তাক্ত বিজয়ী রূপে! তাঁর সাম্রাজ্যের দুই সীমানা হল ইউরোপের মস্কো এবং ভারতের দিল্লি!

    স্পেন, ইংল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের রাজারা তাঁর মন রাখবার ও তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে নিরাপদ হওয়ার জন্যে দূত ও নানা উপঢৌকন পাঠাতে লাগলেন। তিনি সেসব রাজাকে নগণ্য মনে করে খাপ থেকে তরোয়াল খুললেন না, তাঁদের আশ্বাস দিয়ে বললেন, ‘ভয় নেই, সমুদ্রে খালি বড় মাছই থাকে না, ছোট মাছরাও থাকে।’

    মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি স্তিমিত দৃষ্টি তুলে দেখলেন, পৃথিবীতে তখনও তাঁর যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী আছে মাত্র একজন—মহাচিনের অধিপতি! এটা তাঁর সহ্য হল না—ঊনসত্তর বৎসর বয়সে তরবারি হাতে নিয়ে ধরলেন তিনি চিনের পথ। কিন্তু চিনের ছিল বরাত জোর—’ভগবানের চাবুক’ ফিরিয়ে নিলেন ভগবান স্বয়ং!

    এই বিচিত্র দিগবিজয়ীকে ইতিহাস তৈমুর লং বলে জানে। এঁরই বংশধর বাবর ভারতে এসে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন মোগল রাজবংশ।

    তৈমুরের বংশধরদের মোগল বলা হয় বটে, কিন্তু এখানে একটু গোলমাল আছে। উত্তর এশিয়া থেকে যুগে যুগে যাযাবর জাতীয় যেসব যোদ্ধা পঙ্গপালের মতন ভারতে, চিনদেশে, পারস্যে ও ইউরোপের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল, কোনও নির্দিষ্ট নামে তাদের পরিচিত করা সহজ নয়। গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস তাদের ডেকেছেন, ‘সিথিয়ান’ বলে, রোমানরা তাদের ‘হুন’ নামে ডেকেছে এবং চিনারা ডেকেছে ‘হিউয়াং-নু (Hiung-nu) নামে। চেঙ্গিজ খাঁ যখন ওই যাযাবরদের এনে এক পতাকার তলায় দাঁড় করান, তখন তাদের মধ্যে ছিল মাঞ্চু, তাতার, মোগল প্রভৃতি বহু জাতির লোক। পরে চেঙ্গিজের মোগল সাম্রাজ্যের মধ্যে গণ্য হয়ে ওই নানাজাতির লোককে এক ‘মোগল’ নামেই ডাকা হত। আসলে তৈমুরকে কেউ বলেন তাতার, কেউ বলেন তুর্কি।

    সমরখন্দ নগরের কাছে ওকগাছের অরণ্য। তারপর এক গিরিসঙ্কট—দুই দিকে তার ছয় শত ফুট উঁচু লাল বালি-পাথরের দেওয়াল। স্থানীয় লোকেরা ‘লৌহ-দ্বার’ বলে ডাকে এবং এর ভিতর দিয়ে দুটির বেশি উট পাশাপাশি যেতে পারে না। এখানে বর্শাদণ্ডের উপরে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পাহারা দেয় রৌদ্রদগ্ধ তামাটে বর্ণের দীর্ঘদেহ প্রহরীরা।

    এই পথ দিয়ে খানিকদূর অগ্রসর হলে একটি পাহাড়ে-ঘেরা তরু-শ্যামল ক্ষেত্রের উপরে এসে পড়া যায়। সেখানে আছে একটি নগর, নাম তার ‘সবুজ শহর’। তার চারিদিকে খাল কাটা। কাবুলি ডুমুর ও খুবানি গাছের সারির উপরে দেখা যায় সাদা সাদা গুম্বুজ বা মসজিদের বুরুজ।

    ১৩৩৫ (মতান্তরে ১৩৩৬) খ্রিস্টাব্দে এই সবুজ শহরে তৈমুরের জন্ম।

    যাত্রীর দল আসে আর চলে যায় সবুজ শহরের ভিতর দিয়ে—মুখে তাদের সর্বদাই যুদ্ধের গল্প। এই গল্প শুনতে শুনতে তৈমুর বেড়ে উঠতে লাগলেন। তৈমুর মাতৃহারা হন অল্প বয়সেই। তাঁর বাবা ছিলেন বার্লাস গোষ্ঠীর তাতার জাতীয় সর্দার, কিন্তু কোনও গ্রাম বা দুর্গ তাঁর দখলে ছিল না। তাঁর নাম তারাগাই। তিনি সংসারে উদাসীন ব্যক্তি, সর্বদাই তীর্থভ্রমণ ও ধর্মকর্ম নিয়ে ব্যস্ত। টাকাকড়ি তাঁর ছিলও না, টাকা রোজগারের চেষ্টাও তিনি করতেন না।

    তৈমুর বাজপাখি, কুকুর আর সমবয়সি সঙ্গীদের নিয়ে পথে পথে খেলা করে বেড়ান। পথ দিয়ে চলে যায় দলে দলে পারসি, আরবি, ইহুদি ও হিন্দু সওদাগর; কেউ ঘোড়ায় চড়ে, কেউ উটের পিঠে, কেউ পদব্রজে,—পণ্য তাদের কিংখাব, রেশম বা কার্পেট। তাদের দলে গিয়ে ভিড়ে তৈমুর বাইরের জগতের খবর শোনেন।

    তারাগাই বলেন, ‘বাছা তৈমুর, এই পৃথিবীটা হচ্ছে সাপ আর বিছা ভরা সোনার পাত্রের মতন। এর প্রতি আমার কোনও মায়া নেই।’

    এসব কথা তৈমুরের মনকে স্পর্শ করে না।

    তিনি ভালোবাসেন দাবা ও পোলো খেলতে এবং বনে বনে শিকার করতে। অল্পস্বল্প কোরান মুখস্থ করেছিলেন, কিন্তু লেখাপড়া খুব বেশি শেখেননি। তিনি জানতেন তাতারদের ধর্ম হচ্ছে যুদ্ধ করা, তাদের আভিজাত্য হচ্ছে তরবারির আভিজাত্য।

    সবুজ শহরের বার্লাস তাতাররা তখনও নিজেদের অতীতকে ভোলেনি। চেঙ্গিজ খাঁ তাদের চোখ ফুটিয়ে দিয়ে গেছেন। তাতাররা জানে একদিন তারা পৃথিবী জয় করেছিল।

    তাদের মধ্যে যাদের শহরের মধ্যে বাড়ি আছে, তারাও বাস করে তাঁবুর ভিতরে। আজও তারা যাযাবর ধর্ম ছাড়তে পারেনি; বলে, ‘কাপুরুষরাই দুর্গ তৈরি করে লুকোবার জন্য।’

    তাদের আজানুলম্বিত বাহু, মোটামোটা দেহের হাড়, দাড়ি-গোঁফ ভরা মুখ—তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করে, ঘোড়ার পিঠ ছেড়ে যাতে না মাটিতে নামতে হয়। যখন পায়ে হাঁটে, চলে নবাবি চালে এবং কারুকে দেখে ফিরে বা সরে দাঁড়ায় না।

    পদব্রজে তারা বাঘ শিকার করতে যায় এবং লড়ায়ে যায় হাসতে হাসতে। তাদের দলে এমন লোক খুব কম, যাদের দেহে নেই অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন। তাদের মধ্যে এমন লোকও খুব কম, ছাদের তলায় বিছানায় শুয়ে বরণ করে যারা মৃত্যুকে। ডোরা-কাটা রেশমি জামার তলায় পরে তারা ইস্পাতের বর্ম। যুদ্ধের সুযোগ না পেলে তারা সুখী হয় না। একদিকে তারা যেমন মুক্তহস্ত ও অতিথিপরায়ণ, অন্যদিকে তেমনি গোঁয়ার ও নিষ্ঠুর।

    বাবার মুখে তৈমুর শুনলেন, ‘বৎস, চেঙ্গিজ খাঁ যখন পৃথিবী জয় করলেন, তখন তাঁর ছেলে চাগাতাই পেলেন আমাদের এ অঞ্চলের শাসনভার। কিন্তু আজ চাগাতাইয়ের বংশধর বিলাসের স্রোতে হাবুডুবু খাচ্ছেন আর রাজ্যের সর্বেসর্বা হয়েছেন তাঁর আমির কাজগান।’

    আমির কাজগানের নাম সকলের মুখে মুখে। তাতাররা দলে দলে যায় কাজগানের ফৌজে ভর্তি হওয়ার জন্যে।

    তৈমুর এখন প্রথম যৌবনে পা দিয়েছেন। এই বয়সেই তাঁর দেহ হয়ে উঠেছে যেমন সুন্দর ও সুগঠিত তেমনই বৃহৎ ও বলিষ্ঠ। তীক্ষ্ণনেত্র, কঠিন চরিত্র। তিনি কথা কন কম, তাঁর কণ্ঠস্বর সুগম্ভীর ও মর্মভেদী। হাসি-ঠাট্টার ধারও মাড়ান না!

    কোনও বলবান তাতার যুবকও যে-ধনুকের ছিলা মাত্র বুক পর্যন্ত টানতে পারে, তৈমুর সেই ধনুকের ছিলা আকর্ষণ করেন কান পর্যন্ত। তরবারি ক্রীড়ায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার।

    পুত্রের ভাবভঙ্গি ব্যবহারে যোদ্ধার পূর্ণ লক্ষণ দেখে পিতা তারাগাই ছেলেকে পরামর্শ দিলেন, আমির কাজগানের সভায় যাওয়ার জন্যে। পিতার পরামর্শের মধ্যে ভাগ্যদেবীর আহ্বান শুনে তৈমুর রাজসভার দিকে যাত্রা করলেন!

    তাঁর জীবনের আসল অ্যাডভেঞ্চার আরম্ভ হল।

  • আলেকজান্ডার দি গ্রেট

    আলেকজান্ডার দি গ্রেট

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    প্রথম অধ্যায়

    গ্রিস ও ভারত

    আলেকজান্ডার হচ্ছেন পৃথিবীর প্রথম দিগবিজয়ী।

    তাঁর আগে আর কোনও বীর দিগবিজয়ে যাত্রা করেননি এমন কথা বলছি না। প্রাচীন মিশর, ব্যাবিলন, আসিরিয়া, ভারত ও পারস্য প্রভৃতি দেশের ইতিহাস পড়লে আরও কয়েকজন দিগবিজয়ীর নাম জানা যায়। কিন্তু তাঁদের দৃষ্টিশক্তি ও দিগবিজয়ের ক্ষেত্র ছিল সংকীর্ণ। তাঁদের আদর্শবাদও তেমন উচ্চ ছিল না। এবং তাঁদের দিগবিজয়ের ফলে সমগ্র পৃথিবীতে যুগান্তরও উপস্থিত হয়নি।

    তিন বা একাধিক মহাদেশের উপরে যাঁরা ধূমকেতুর মতন ছুটে গিয়েছেন এবং যাঁরা আজ পর্যন্ত মানুষের চিন্তার রাজ্যে প্রভাব বিস্তার করে আছেন—যেমন আলেকজান্ডার, হানিবল, সিজার, চেঙ্গিস খাঁ, তৈমুর লং ও নেপোলিয়ন—যথার্থ দিগবিজয়ী বলি তাঁদের। কারণ, এঁদের দিগবিজয়ের পিছনে ছিল এক-এক শ্রেণির আদর্শবাদ। এঁদের মধ্যেই সর্বপ্রথমে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন আলেকজান্ডার।

    ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা। আলেকজান্ডারের যুগে মানুষ এই তিনটির বেশি মহাদেশের নাম জানত না। এবং তিন মহাদেশেই এমন অনেক জায়গা ছিল, যা তখনও পৃথিবীর সভ্য দেশগুলির অন্তর্গত ছিল না। আজ ইংরেজ, জাপান, আমেরিকান, রোমান, জার্মান, ফরাসি ও স্পেনীয় প্রভৃতি কত জাতির কথাই শুনতে পাই। কিন্তু তখন তাদের নামকরণ পর্যন্ত হয়নি। তাদের দেশ ছিল ঘৃণ্য বর্বরদের দেশ। অনেক দেশ তখনও সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। তখনকার মানচিত্রে সেসব দেশের স্থান পর্যন্ত ছিল না।

    কিন্তু যেসব দেশ তখন সভ্যতার উচ্চতম শিখরে আরোহণ করেছিল, আলেকজান্ডারের কবল থেকে তারা কেউই মুক্তি পায়নি। এমনকী তখনকার দিনে গ্রিকদের পক্ষে অতি দুর্গম ও দূরদেশ ভারতবর্ষেও তিনি ছুটে গিয়েছিলেন। যদিও তখনকার দিনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভারতীয় রাজার (ধননন্দ) সঙ্গে তাঁর শক্তিপরীক্ষা হয়নি এবং ভীত সৈনিক ও সেনাপতিদের বিদ্রোহিতায় অধিকাংশ ভারতবর্ষকে নাগালের বাইরে রেখেই তাঁকে প্রত্যাগমন করতে হয়ছিল, তবু তিনি বিজয়পতাকা তুলে যেটুকু অগ্রসর হতে পেরেছিলেন, সে যুগের পক্ষে তাই-ই ছিল কল্পনাতীত, অসম্ভব ব্যাপার!

    আলেকজান্ডারের কাছে একটি কারণে আমরা চিরকৃতজ্ঞ থাকব। তাঁর ভারত অভিযানের ফলেই ভারতবর্ষের সত্যিকার ঐতিহাসিক যুগ আরম্ভ হয়েছে।

    আলেকজান্ডারের আগমনের অনেক আগেই ভারতবর্ষ যে সভ্যতার শীর্ষস্থানে উঠেছিল, সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ থাকতে পারে না। কিন্তু প্রাচীন ভারতবাসীরা এক বিষয়ে রীতিমতো পশ্চাৎপদ ছিলেন। লিখিত ইতিহাস বলতে আজ আমরা যা বুঝি, প্রাচীন ভারতবর্ষে কেউ তা রচনা করেনি। কাব্য, পুরাণ, নাটক বা অন্যান্য গ্রন্থে আমরা ভারতীয় ইতিহাসের অনেক মালমশলা পাই বটে, কিন্তু সেগুলি অত্যন্ত অগোছালো অবস্থায় এমন নানা বিষয়ের সঙ্গে মিশিয়ে আছে যে, তাদের ভিতর থেকে সত্যিকার মানুষকে আবিষ্কার করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের কবির কল্পনা ও অবাস্তব প্রলাপ বলে মেনে নিলে আর কোনও গোলমালই থাকে না; কিন্তু তাদের ঐতিহাসিক সত্য রূপে দেখাতে গেলেই আমাদের সহজ-বুদ্ধি বিদ্রোহী হয়ে দাঁড়ায়। রাম, রাবণ, কুম্ভকর্ণ, শ্রীকৃষ্ণ, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, ভীম ও অর্জুন প্রভৃতি নামধারী ঐতিহাসিক ব্যক্তি যে ছিলেন না, একথা কে জোর করে বলতে পারে? কিন্তু কবির আকাশচারী কল্পনা ও অবাস্তব অত্যুক্তি তাঁদের মনুষ্যত্বকে এমন ভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, ওঁদের আর সত্যিকার মানুষ বলে মনে হয় না এবং সকলেই জানেন, ইতিহাস হচ্ছে সত্যিকার মানুষদেরই কীর্তিকাহিনি।

    উপরন্তু প্রাচীন ভারতীয় লেখকরা ধরতে গেলে সাল-তারিখের কোনও ধারই ধারতেন না। সাল-তারিখ ভুললে ইতিহাস হয়ে দাঁড়ায় উপহাস। বেশিদিনের কথা নয়, স্বর্গীয় দুর্গাদাস লাহিড়ি বহু খণ্ডে বিভক্ত প্রকাণ্ড একখানি ‘পৃথিবীর ইতিহাস’ রচনা করেছিলেন। সেই গ্রন্থে প্রাচীন ভারতবর্ষের কথা বলতে গিয়ে তিনি গুপ্তবংশীয় চন্দ্রগুপ্তকে ধরে নিয়েছিলেন মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত বলে। অথচ ভারতের প্রথম সম্রাট, গ্রিকবিজয়ী মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত ও গুপ্তবংশীয় চন্দ্রগুপ্তের মধ্যে ছিল সুদীর্ঘ কয়েক শতাব্দীর ব্যবধান! এই দুই সম্রাটের মাঝখানে হয়েছে কত বংশের উত্থান ও পতন এবং ভারতবর্ষের উপরে পড়েছে একাধিকবার অন্ধ যুগের কালো যবনিকা।

    আজকাল ভারতের নানা প্রদেশে হাজার হাজার শিলা বা তাম্রলিপি ও প্রাচীন মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে বা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা তাদের পাঠ উদ্ধার করে এতকাল পরে ইতিহাসপূর্ব যুগের অনেক সাল-তারিখ ও গুপ্তরহস্য আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ওসব লিপি বা মুদ্রা প্রভৃতি ইতিহাস রচনার জন্যে প্রস্তুত হয়নি।

    আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের ফলেই ভারতবর্ষে আরম্ভ হয়েছে সত্যিকারের ঐতিহাসিক যুগ। আলেকজেন্ডারের আগেও গ্রিসের সঙ্গে যে ভারতবর্ষের সম্পর্ক একেবারেই ছিল না, তা নয়; তাঁরও অনেক আগে (খ্রিঃ পূঃ ৫১০ ) স্কাইল্যাক্স নামে এক গ্রিক ভ্রমণকারী ভারতে বেড়িয়ে গিয়েছিলেন। ভারতীয় সৈনিকরাও পারস্য সম্রাট দরায়ুসের পক্ষাবলম্বন করে গ্রিসে গিয়ে যুদ্ধ করে এসেছে। এমনিভাবে আরও কোনও কোনও দিক দিয়ে ভারতের সঙ্গে গ্রিসের অল্পস্বল্প পরিচয় সাধন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এটুকু পরিচয়ের দাম খুব বেশি ছিল না। গ্রিকরা তখনও ভারতকে নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাত না।

    কিন্তু আলেকজান্ডারের অভিযানের পরেই গ্রিকরা ভারতবর্ষকে সর্বপ্রথমে ভালো করে চিনতে পারলে। তার ফলে নানা গ্রিক-লেখক ও ভ্রমণকারী স্বচক্ষে ভারতবর্ষকে দেখে তখনকার কথা নিয়ে আলোচনা করে গিয়েছেন। এরপরে ভারতের দৃষ্টি হয়ে পড়ে সুদূর প্রসারিত। তারপর নানা যুগে নানা দেশি ভ্রমণকারী এসে ভারতের অনেক উজ্জ্বল ছবি এঁকে গিয়েছেন। এইসব ছবির ভিতর থেকেই প্রাচীন আর্যাবর্তের অখণ্ড না হোক—কতকটা সম্পূর্ণ ইতিহাস ও সাল-তারিখ উদ্ধার করা সম্ভবপর হয়েছে। মাঝে মাঝে ফাঁক থেকে গিয়েছে বটে, কিন্তু বহু স্থলেই ফাঁকগুলি পূর্ণ করতে পারা গিয়েছে প্রাচীন শিলালিপি ও মুদ্রা প্রভৃতির দ্বারা। আলেকজান্ডার এদেশে না এলে ভারতবর্ষের ইতিহাসকে এমন ভাবে পুনরুদ্ধার করতে পারা যেত না।

    আলেকজান্ডার ভারত ত্যাগ করবার পরেই সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত গ্রিকদের আর্যাবর্ত থেকে বিতাড়িত করলেন বটে, কিন্তু ভারতের সঙ্গে গ্রিসের সম্পর্ক বিলুপ্ত হয়নি। আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলিউকসের মেয়েকে চন্দ্রগুপ্ত নিজে বিবাহ করেন। তাঁর সভায় বর্তমান থাকেন গ্রিক-রাজদূত মেগাস্থিনিস। তাঁর দেহরক্ষীরূপে নিযুক্ত থাকে অনেক গ্রিকনারী! এবং বিজয়ী রূপে না হোক, বিভিন্ন কাজ নিয়ে শতশত গ্রিক যে মৌর্যযুগের ভারতবর্ষে বাস করত, এটুকু আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। চন্দ্রগুপ্তের পৌত্র সম্রাট অশোক অনেক ভারতবাসীকেও গ্রিসে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করবার জন্যে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এর কী ফল হয়েছিল জানি না, তবে এটা দেখতে পাই যে, মৌর্য-রাজশক্তির পতনেরও বহুকাল পরে (খ্রি. পূ. ২১) গ্রিসের প্রধান নগর এথেন্সে একজন ভারতীয় বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বৌদ্ধধর্মের মহিমা দেখাবার জন্যে জ্বলন্ত চিতায় স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দিচ্ছেন!

    ভারতের নাট্যশালা থেকে মৌর্য-নৃপতিরা চিরবিদায় নেবার পরে ভারতবর্ষের উপরে আবার গ্রিক প্রভাব বাড়তে থাকে। ভারতের প্রান্তদেশে এবং উত্তর ভারতে একাধিক গ্রিক নরপতি রাজত্ব করেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছেন মেনান্ডার—এঁর জয়পতাকা প্রায় পাটলিপুত্রের (বর্তমান পাটনা) কাছ পর্যন্ত এসে পড়েছিল এবং ইনি ও এঁর সমস্ত গ্রিক সভাসদ বৌদ্ধধর্ম পর্যন্ত অবলম্বন করেছিলেন (খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে)। এরই কয়েই বৎসর পরে দেখি, তক্ষশিলার (বর্তমান পেশোয়ার অঞ্চল) অধিবাসী গ্রিক-রাজদূত হেলিয়োডোরাস হিন্দুধর্ম অবলম্বন করে বাসুদেবের নামে একটি স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করছেন! ‘বেসনগর স্তম্ভ’ নাম নিয়ে সেটি আজও বিদ্যমান আছে। এইসব দৃষ্টান্ত দেখেই বোঝা যায়, আলেকজান্ডারের পরবর্তী কালে গ্রিকরা নিজেদের কেবল ভারতবাসী বলেই মনে করতেন না, তাঁরা ভারতীয় ধর্ম পর্যন্ত গ্রহণ করতে ছাড়েননি।

    বহু ঐতিহাসিকের মত হচ্ছে, গ্রিকদের আগমনের আগে ভারতবর্ষে মূর্তিপূজা ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করবার পদ্ধতি প্রচলিত ছিল না। হিন্দু ও বৌদ্ধরা নাকি মূর্তি গড়তে ও মন্দির তৈয়ারি করতে শেখেন গ্রিকদের কাছ থেকেই। অথচ এখনকার ইউরোপীয় গ্রিকদের মাথার করে রাখলেও পৌত্তলিক বর্বর বলে ঘৃণা করেন হিন্দুদেরই!

    ভারতীয় ভাস্কর্য শিল্পও এক সময়ে আশ্রয় নিয়েছিল গ্রিক শিল্পীদের কাছে। তার ফলে উত্তর ভারতের বিখ্যাত গান্ধার ভাস্কর্যের আবির্ভাব। পরবর্তী যুগে এই ভাস্কর্য কেমন করে ভারতের নিজস্ব শিল্প হয়ে উঠেছিল, এখানে সবিস্তারে তা দেখাবার দরকার নেই।

    সংস্কৃত ভাষায় আজও কিছু কিছু গ্রিক শব্দ বর্তমান আছে। সংস্কৃত নাট্য-সাহিত্যেরও উপরে অল্পস্বল্প গ্রিক প্রভাব থাকতে পারে। কেউ কেউ বলেন, নেই।

    কিন্তু যাঁরা প্রথম হিন্দু-জ্যোতির্বিজ্ঞান রচনা করে গেছেন তারা যে গ্রিকদেরই শিষ্য, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কারণ গার্গী-সংহিতায় স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে : ‘যবনরা (গ্রিকরা) বর্বর বটে, কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রথম প্রকাশ হয়েছে তাদের মধ্যেই। এবং এই কারণে তাদের দেবতা বলে ভক্তি করা উচিত।’

    আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের ফলেই আর্যাবর্তের জ্ঞান ও চিন্তার রাজ্যে এসেছে এমনি উন্নতিমূলক নানা পরিবর্তন। তিনি সাহস করে অগ্রবর্তী না হলে আর কোনও গ্রিক যে এই বিপদসঙ্কুল পথে পদার্পণ করতেন না, সে কথা নিশ্চিত রূপেই বলা যায়।

    ভারতবর্ষের উপরে রক্তাক্ত খড়গ তুলে এসে দাঁড়িয়েছেন আরও কত দিগবিজয়ী! তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হচ্ছেন তাতার তৈমুর লং, গজনীর মামুদ, পারসি নাদির শা ও আফগান আহম্মদ শা আবদালি! কিন্তু তাঁদের অভিযানের ফলে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে শুধু রক্ত-সাগরের তরঙ্গ। বারংবার ভারতের সোনার ভাণ্ডার লুণ্ঠন করে তাঁরা দস্যুর মতন অদৃশ্য হয়েছেন, কিন্তু তাঁদের কাছ থেকে ভারত পায়নি কোনও দান। তাঁরা ডাকাতি করেছেন মাত্র, মানবতার পরিচয় দেননি।

    আলেকজেন্ডার রক্তলোভী দিগবিজয়ী ছিলেন না, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নিষ্ঠুর হলেও আদর্শবাদী ছিলেন। পরে দেখাব, প্রাচ্যের সঙ্গে প্রতীচ্যের মধুর মিলন সাধন করবার জন্যে তাঁর প্রাণের আকাঙ্ক্ষা ছিল কতখানি প্রবল!

  • দিগবিজয়ী নেপোলিয়ন

    দিগবিজয়ী নেপোলিয়ন

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    এক : শৈশব ও কৈশোর

    মহাভারতের কবি বলেন, অর্জুনের পুত্র অভিমন্যু যুদ্ধবিদ্যা শিখেছিলেন মাতৃজঠরে।

    একালের কবি আর-একটি ছেলের সম্বন্ধেও ও-কথা বলেননি বটে, কিন্তু তারও পিতা ছিলেন বীরপুরুষ ও মাতা ছিলেন বীরনারী এবং তিনিও যখন মাতৃগর্ভে বাস করতেন তখন তাঁর মাতা বিচরণ করতেন রণক্ষেত্রে—পাশে নিয়ে অস্ত্রধারী স্বামীকে।

    শত্রু আক্রমণ করেছে তাঁদের স্বদেশকে এবং শত্রু হয়েছে বিজয়ী। গভীর অরণ্যের অন্ধকার ভেদ করে, নদী, প্রান্তর, পর্বত, উপত্যকা, অধিত্যকা, অতিক্রম করে হাজার হাজার পলাতকের সঙ্গে তাঁরাও চলেছেন শ্রান্তপদে কিন্তু দৃপ্তমনে দূরে—দূরে—আরও দূরে—বহু দূরে! পিছন থেকে ভেসে আসছে গুরু গুরু মেঘগর্জনের মতন ঘনঘন কামান-তর্জন—মাঝে মাঝে কানের পাশ দিয়ে সশব্দে বাতাস কেটে ছুটে ছুটে যাচ্ছে বন্দুকের প্রতপ্ত গুলি।

    ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দ। ফরাসিরা কর্সিকা-দ্বীপ দখল করলে জুলাই মাসে। পরাজিত কর্সিকাবাসীদের দুঃখের সীমা নেই।

    কিন্তু ঠিক পরের মাসেই—১৫ আগস্ট তারিখে কর্সিকার বীরনারী লেটিজিয়ার গর্ভ থেকে যে পুত্র ভূমিষ্ঠ হয়ে পৃথিবীর আলোকে প্রথম চোখ মেললে, পিতা-মাতার পরাজয়-বেদনার প্রতিশোধ নেওয়ার ভার পড়ল তারই উপরে। আজ যারা জয় করে প্রভু হতে এসেছে, তাদেরই জয় করে সর্বশক্তিমান প্রভু হবে এই পুত্র।

    ছেলের নাম হল নেপোলিয়ন। আজ তিরিশলক্ষ ফরাসি সৈনিকের ঘৃণ্য তরবারির রক্তধারার তলায় অজানা গৃহকোণে যার জন্ম, কয়েক বৎসর পরে দেখা গেল—সমগ্র ফরাসি দেশ তারই পদতলে নিশ্চেষ্টভাবে নতশির।

    নেপোলিয়ন হচ্ছে ইতালিয় নাম। ইতালির ইতিহাসে এই নামের প্রথম অধিকারী বহু শতাব্দী পূর্বেই বিখ্যাত হয়েছিলেন। ষোলো শতাব্দীতে তাঁর বংশধররা উঠে আসেন কর্সিকায়। এবং তাদের বংশ পরিচিত হয় ‘বোনাপার্ট’ নামে।

    নেপোলিয়নের বাবার নাম কার্লো বোনাপার্ট ও মায়ের নাম লেটিজিয়া র‍্যামোলিনো। সম্ভ্রান্ত বংশে জন্ম বলে কার্লো যখন ইতালিতে লেখাপড়া শিখতে গিয়েছিলেন, লোকে তখন তাকে কাউন্ট বোনাপার্ট বলে ডাকত। কিন্তু তিনি ছিলেন ভারি বেপরোয়া খরুচে—একবার একটি মাত্র ভোজ দিয়েই তিনি তাঁর দুই বছরের আয় খরচ করে ফেলতে কুণ্ঠিত হননি! সুতরাং এমন লোকের দ্বারা ভালোভাবে সংসার-চালনা করা সম্ভব নয়।

    কার্লোর পেশা ছিল ওকালতি, কিন্তু তাঁর বাড়িতে মক্কেলদের দেখা খুব বেশি পাওয়া যেত না। তিনি সাহিত্যিকও ছিলেন—যদিও বিখ্যাত হতে পারেননি। নেপোলিয়নও প্রথম বয়সে বাপের শেষ-গুণের অধিকারী হয়ে কিছু কিছু লেখনীচালনা করেছিলেন। তাঁর লেখা ছোটগল্প ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। একখানি নভেলেও তিনি হাত দিয়েছিলেন।

    কার্লো বোনাপার্টের পাঁচ ছেলে, তিন মেয়ে। জোসেফ (জন্ম ১৭৬৮), নেপোলিয়ন (১৭৬৯), লুসিয়েন (১৭৭৫), লুইস (১৭৭৮), জেরোম (১৭৮৪) এবং ক্যারোলিন, এলাইজ ও পলিন।

    অতএব বোঝাই যাচ্ছে, সংসারটি বড় সামান্য নয়। বেহিসেবি কর্তার উপরে নির্ভর করলে এ সংসার হত একেবারেই অচল। কিন্তু নেপোলিয়নের এক খুড়ো ছিলেন, তিনি ধর্মযাজক। সংসারের কতক কতক ব্যয়ভার বহন করতেন তিনিও।

    নেপোলিয়নের মা লেটিজিয়া কেবল যে বুদ্ধিমতী ছিলেন, তা নয়; যথাসম্ভব অল্প ব্যয়ে চারিদিক গুছিয়ে গাছিয়ে সংসার চালাবার ক্ষমতাও ছিল তাঁর যথেষ্ট। এবং মেজো নেপোলিয়ন ও সবচেয়ে ছোট মেয়ে পলিনকে তিনি অন্য সব ছেলেমেয়ের চেয়ে ভালোবাসতেন বেশি।

    শিশু-বয়স থেকেই নেপোলিয়ন ছিলেন অত্যন্ত একগুঁয়ে বা একরোখা ছেলে। কিছুতেই ভয় পেতেন না, কারুকেই ভয় করতেন না। বড় কম ঝগড়াটেও ছিলেন না। কারুকে ঘুসি মারতেন, কারুকে দিতেন আঁচড়ে বা কামড়ে। তাঁর হাতে পড়ে দাদা জোসেফকেই হতে হত সবচেয়ে বেশি নাকাল। দাদাকে একচোট মেরে-ধরে তিনিই আবার আগে মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে করতেন দাদার নামে নালিশ; ফলে জোসেফ বেচারাকে মায়ের হাতেও আর একদফা লাভ করতে হত উত্তম-মধ্যম।

    কিন্তু নেপোলিয়নের প্রকৃতি বন্য হলেও তিনি তাঁর মায়ের একান্ত বশীভূত ছিলেন। এবং সেই ছেলেবয়সে দৃঢ়চরিত্র মায়ের কাছ থেকে যে-সব সৎশিক্ষা পেয়েছিলেন তাই-ই যে তাঁর বিচিত্র ও অভাবিত ভবিষ্যৎ-জীবনকে গঠন করে তুলেছিল, এ-কথা তিনি নিজেই স্বীকার করে গেছেন।

    প্রথম থেকেই এই ছোট্ট ছেলেটিকে কর্সিকার সকলেই অসাধারণ বলে মনে করত। তুঙ্গ গিরিশিখর, সুগভীর পার্বত্য খাত বা নির্জন গহন অরণ্য দেখে তিনি একটুও শঙ্কিত হতেন না। দ্বীপের এক প্রান্ত থেকে অন্য পর্যন্ত ছিল তাঁর নখদর্পণে।

    এবং নিজের জন্মভূমিকে তিনি প্রাণের চেয়ে ভালোবাসতেন। বহুকাল পরে ফ্রান্সের সম্রাট ও ইউরোপের সর্বেসর্বা হয়েও তিনি আত্মচরিতে লিখেছিলেন : ‘পৃথিবীর সকল জায়গার চেয়ে কর্সিকার যা কিছু সব ভালো—এমনকী তার মাটির গন্ধটুকু পর্যন্ত। আজও চোখ মুদে সে গন্ধ আমি পাই—এমন গন্ধ আর কোথাও নেই। আজও আমি কল্পনায় নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাই সেই সুমধুর শৈশব-দিবসে—সেই খাড়া পর্বতমালার মধ্যে, সেই তুঙ্গ শিখরশ্রেণির উপরে, সেই গভীরতম খাতের অতলে!’

    সৈনিক জীবনের দিকে তাঁর প্রাণের টান ছিল এতটুকু বয়স থেকেই। বাড়ির কাছ দিয়ে যখন ফৌজের সৈনিকরা আসা-যাওয়া করত, তিনি বিপুল আগ্রহে ছুটে তাদের দেখতে যেতেন। তাঁর সবচেয়ে শখের খেলা ছিল পুতুল-সেপাইদের নিয়ে। তিনি যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুরাগী হবেন, সেটাও তাঁর শিশু-বয়স থেকেই বোঝা গিয়েছিল। তাঁর আর সব ভাইবোনরা যখন তুচ্ছ খেলাধুলো নিয়ে মেতে থাকত, তখন তিনি একলা বসে ঘরের দেওয়ালে করতেন অঙ্কের রেখাপাত।

    নেপোলিয়নের দুষ্টুমির আর একটি গল্প শোনো।

    তাঁর বুড়ি ঠাকুমা যখন বয়সের ভারে ভেঙে দুমড়ে পড়েছেন, তখন নেপোলিয়ন ও তাঁর ছোট বোন পলিন ঠাকুমাকে ঠাট্টা করে তাঁর চলা-ফেরার অনুকরণ করতেন। একদিন ঠাকুমা হঠাৎ নাতি-নাতনির কীর্তি দেখে ফেলে তাঁদের মায়ের কাছে নালিশ করে বললেন, ‘বউমা, তুমি ছেলে-মেয়েদের মানুষ করতে জানো না, তাদের অসভ্য করে তুলছ! ওরা গুরুজনদের প্রতি সম্মান দেখাতে শেখেনি।’

    মা লেটিজিয়া তাঁর এই ডানপিটে ছেলেমেয়ে দুটিকে যতই ভালোবাসুন, তাদের কোনও অন্যায়কেই ক্ষমা করবার পাত্রী ছিলেন না। পলিনের পিঠে তখনই পড়ল চটাপট চড়-চাপড়! কিন্তু চালাক নেপোলিয়ন দূরে দূরে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে লাগলেন, মা কিছুতেই তাঁকে হাতের কাছে পেলেন না। দু-চার দিন গেল। নেপোলিয়ন ভাবলেন, মা ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছেন।

    তারপর একদিন মা বললেন, ‘নেপোলিয়ন, আজ লাটের বাড়িতে তোমার নিমন্ত্রণ। যাও, পোশাক পরে এসো।’

    নেপোলিয়ন খুব খুশি হয়ে পোশাক পরবার জন্যে ঘরের ভিতরে গিয়ে ঢুকলেন। খানিক পরেই দেখা গেল, মা সেই ঘরের ভিতর এসে দাঁড়িয়েছেন দরজায় পিঠ রেখে। মায়ের গম্ভীর মুখ দেখেই নেপোলিয়ন বুঝলেন, তিনি ফাঁদে পড়েছেন—পালাবার পথ বন্ধ! তারপর তাঁর যথাস্থানে পড়ল সপাসপ বেতের ঘা! মা কিছুই ভোলেননি—মনের রাগ মনের মধ্যেই পুষে রেখে দিয়েছিলেন।

    কার্লো দেখলেন, তাঁর ছেলে নেপোলিয়নের সৈনিক-জীবনের দিকেই বেশি ঝোঁক। তিনি স্থির করলেন এ ছেলেটিকে সামরিক বিদ্যালয়েই ভরতি করে দেওয়া উচিত। বড় ছেলে জোসেফ নির্বিরোধী ভালোমানুষ, অতএব তাকে পুরুতের কাজেই মানাবে ভালো।

    ছেলেদুটিকে নিয়ে কার্লো প্যারি শহরে গিয়ে রাজা লুইয়ের কাছে নিজের আবেদন জানালেন এবং তাঁর আবেদন মঞ্জুরও হল। এই হল নেপোলিয়নের ভবিষ্যৎ-জীবনের ভিত্তি। পিতার তীক্ষ্ণবুদ্ধিই করলে এই ভিত্তিপ্রতিষ্ঠা।

    সম্ভ্রান্তবংশজাত বলে নেপোলিয়ন ফরাসিদেশের সম্ভ্রান্তদের ইস্কুলে ঠাঁই পেলেন। কিন্তু তিনি ফরাসি ভাষা জানতেন না। তাই আগে তঁকে ফরাসি ভাষা শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা হল। তাঁর বয়স তখন এগারোর বেশি নয় (১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দ)।

    স্বভাবত মৌন ও নির্জনতাপ্রিয় নেপোলিয়ন ইস্কুল-সংলগ্ন বাগানের একটি প্রান্ত বেড়া দিয়ে ঘিরে নিয়ে সেইখানে বসেই নিজের মনে লেখাপড়া করেন। যে-জমিটুকু তিনি ঘিরে নিয়েছিলেন, তার সবটাই তাঁর নিজের নয়। কিন্তু আর কেউ সেই বেড়ার ভিতরে ঢুকলেই আর রক্ষা নেই—নেপোলিয়নের হাতে বেদম মার খেয়ে পালিয়ে আসা ছাড়া তার আর কোনও উপায় ছিল না।

    শিক্ষকরা শাস্তির ব্যবস্থা করেও এ-বিষয়ে নেপোলিয়নকে রাজি করাতে পারলেন না। ‘শিক্ষক হোক, সহপাঠী হোক—আমার বেড়ার ভিতরে সকলেরই প্রবেশ নিষেধ!’

    একজন শিক্ষক বললেন, ‘ছেলেটি দেখছি গ্রানাইট পাথরে গড়া। এর ভিতরে আছে আগ্নেয়গিরি।’

    সে-ইস্কুলে পড়ত ফ্রান্সের যত সব উপাধিধারী বড় ঘরের ছেলে। তারা গা-টেপাটেপি করে বলাবলি করত—’এ কোথাকার বিদেশি পাড়াগেঁয়ে ভূত রে! ও কী অদ্ভুত বেঁটে আর ওর নামটাও কী বেয়াড়া! ওর জামাটা কী-রকম লম্বা ঝলঝলে দেখেছিস? ছোকরা হাত-খরচাও পায় না—অথচ বলতে চায় ও নাকি বনেদি বংশের ছেলে। খুদে দ্বীপ কর্সিকার বনেদি বংশ! ওরে ভাই, বন-গাঁয়ের শেয়াল-রাজা!’

    কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করত, ‘তোমাদের কর্সিকার লোকরা যদি এতই বীর, তাহলে তারা আমাদের ফরাসি সৈন্যদের মারের চোটে নাকাল হয়ে হার মানলে কেন?’

    ক্রুদ্ধ নেপোলিয়ন জবাব দিতেন, ‘দশজনের বিরুদ্ধে একজন কতদিন দাঁড়াতে পারে? সবুর কর, আমি বড় হই, তারপর ফরাসিদের দর্পচূর্ণ করব।’

    বালক নেপোলিয়ন দেশে পিতাকে চিঠি লিখে জানালেন, ‘আমার দারিদ্র্যের জন্যে জবাবদিহি করতে করতে আমি শ্রান্ত হয়ে পড়েছি। এইসব বিদেশি ছোকরার ঠাট্টা-বিদ্রুপ আমাকে সহ্য করতে হচ্ছে দিন-রাত। এদের একমাত্র শ্রেষ্ঠতা হচ্ছে টাকার দেমাকের জন্যে; মনের আভিজাত্যে এরা আমার চেয়ে ঢের নীচে। এই স্বর্ণবাহী গর্দভদের সামনে আর কতকাল আপনি আমাকে মাথা হেঁট করে থাকতে বলেন?’

    বালকের মুখে প্রৌঢ়ের উক্তি শুনে পিতা হয়তো বিস্মিত হলেন। কিন্তু উত্তরে লিখেলেন : ‘আমাদের টাকা নেই, আমরা গরিব। তোমাকে ওখানেই থাকতে হবে।’

    নেপোলিয়নকে পাঁচটি বছর ওখানেই থাকতে হল।

    কিন্তু তাঁকে নিয়ে তাঁর সহপাঠীরা যতই রঙ্গব্যঙ্গ ও ঘৃণা জাহির করুক, তাঁর সুদৃঢ় চরিত্র ও মানসিক শক্তির প্রভাবে তারা সকলেই অভিভূত না হয়ে পারলে না। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই নেপোলিয়ন হতেন দলের সরদার এবং তারা করত তাঁর হুকুম তামিল। এমনকী, শিক্ষকরা পর্যন্ত তাঁকে বশ মানাতে পারতেন না।

    একবার সামান্য কী-একটা দোষের জন্যে জনৈক শিক্ষক বললেন, ‘বোনাপার্ট, নতজানু হয়ে বোসো। নতজানু হয়েই আজ তোমাকে ‘ডিনার’ খেতে হবে।’

    নেপোলিয়ন উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, ‘মাস্টারমশাই, যদি দরকার হয় আমি এখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই ‘ডিনার’ খাব। কিন্তু আমি নতজানু হব না! কারণ আমাদের পরিবারের কেউ ঈশ্বর ছাড়া আর কারুর সামনে নতজানু হয় না।’

    শিক্ষক গায়ের জোরে তাঁকে নতজানু করতে গেলেন। বিষম ক্রোধে নেপোলিয়ন চিৎকার করে উঠলেন, তারপর অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়লেন মাটির উপরে। বলা বাহুল্য, এর পরে আর কেউ তাঁকে নতজানু করবার চেষ্টা করলেন না।

    নেপোলিয়নের প্রথম যুদ্ধে হাতেখড়ি হয় এইখানেই। যদিও এ যুদ্ধ আসল নয়, নকল। একবার শীতকালে বরফে চারিদিক আচ্ছন্ন। ইস্কুলের ছেলেরা স্থির করলে, বরফ দিয়ে কেল্লা ও গড়খাই প্রভৃতি গড়ে কৃত্রিম যুদ্ধের অনুষ্ঠান করতে হবে। এক পক্ষ করবে কেল্লা রক্ষা, আর এক পক্ষ করবে আক্রমণ। নেপোলিয়ন কখনও এ-দলের, কখনও ও-দলের হয়ে লড়তেন; বলা বাহুল্য, নেতা রূপেই। এবং যে-দলে তিনি থাকতেন, বরাবরই জয়ী হত সেই দল। কিন্তু এ যুদ্ধক্রীড়া বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ ছেলেরা প্রথম-প্রথম বরফের নরম গোলা ছুড়েই খুশি হত, তারপর বরফের গোলার ভিতরে পাথর ভরে দিতে শুরু করলে। মিথ্যা যুদ্ধে ছেলেরা যখন সত্য-সত্যই আহত হতে লাগল, বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ তখন এই বিপদজ্জনক খেলা বন্ধ করে দিলেন।

    একবার মা লেটিজিয়া নেপোলিয়নকে দেখতে এসে চিনতে পারলেন না। ভাবলেন, ভুল করে তাঁর ছেলে বলে অন্য কারুকে ডেকে আনা হয়েছে। কেবল নির্দিষ্ট পাঠের সময়ে নয়, ছুটির সময়েও নেপোলিয়ন লেখাপড়া নিয়ে এমন ভাবে নিযুক্ত হয়ে থাকতেন যে, নিজের স্বাস্থ্যের দিকে একেবারেই নজর দিতে পারতেন না। দিনে যা পড়তেন, সারারাত জেগে তাই নিয়ে চিন্তা করতেন। ফলে ক্লাসে সর্বদাই তিনি প্রথম হতেন বটে, কিন্তু তাঁর চেহারা হয়ে গিয়েছিল একেবারে শীর্ণ-বিশীর্ণ।

  • রক্ত বাদল ঝরে

    রক্ত বাদল ঝরে

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    প্রথম পরিচ্ছেদ : বোম্বেটে না বর্বর

    বোম্বেটে কাকে বলে সবাই তা জানে। বোম্বেটে বা জলদস্যু পৃথিবীর সব দেশেই সব সময়ে ছিল। এখনও আছে।

    তবে বোম্বেটে-জীবনের গৌরবময় যুগ আর নেই। আগেকার বোম্বেটের ক্ষমতা ছিল অবাধ ও খ্যাতি ছিল আশ্চর্য, এখনকার বোম্বেটেরা তাদের কাছে হচ্ছে তিমিমাছের কাছে পুঁটিমাছের মতো।

    উড়োজাহাজ, বাষ্পীয় পোত ও বেতার টেলিগ্রাফের মহিমায় আজ আর কোনও বোম্বেটেই বেশি মাথা তুলতে বা বেশিদিন কোথাও গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে পারে না। চিনে বোম্বেটেরা আজও মাঝে মাঝে মাথা চাগাড় দেয় বটে, কিন্তু তাদের জারিজুরি ওই চিনা সমুদ্রের ভিতরেই। চিনদেশের ভিতরকার অবস্থা ভালো নয়, রাজ্যবিপ্লব নিয়েই সেখানকার গভর্নমেন্ট ব্যতিব্যস্ত, সেইজন্যেই চিনে বোম্বেটেরা মাঝে মাঝে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করবার সুযোগ পায়।

    অন্যান্য দেশের আধুনিক বোম্বেটেরা উল্লেখযোগ্য জীব নয়। তারা আছে—এইমাত্র

    বাংলাদেশে ‘বোম্বেটে’ কথাটি বেশিদিনের নয়। বারো ভুঁইয়ার সময়ে বাংলাদেশে পোর্তুগিজ জলদস্যুদের বিষম উপদ্রব হয়েছিল। তখনকার রডা, গঞ্জালিস ও কার্ভালো প্রভৃতি জলদস্যুর নাম বাঙালি এখনও ভুলতে পারেনি, কারণ বর্গির অত্যাচার ও মগের অত্যাচারের মতো পোর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচারও ছিল তখনকার বাংলাদেশের নিত্য নৈমিত্তিক বিভীষিকা। ওই সময়েই ‘বোম্বেটে’ কথাটি বাংলাদেশে চলতে শুরু হয়। ইংরেজি Bombasdies-এর বাংলা হচ্ছে ‘গোলন্দাজ সৈন্য’। পোর্তুগিজ জলদুস্যরা গোলন্দাজিতে অর্থাৎ কামান-বন্দুকের ব্যবহারে দক্ষ ছিল। তাই বোধহয়, ওই ইংরেজি কথাটা থেকে বাংলা ‘বোম্বেটিয়া’ বা ‘বোম্বেটে’ কথাটির সৃষ্টি হয়, আর সাধারণভাবে জলদস্যুদেরই প্রতি ব্যবহৃত হতে থাকে।

    ‘বোম্বেটে’ কথাটি খাঁটি বাংলা কথা না হলেও খাঁটি বাঙালি বোম্বেটের অভাব বাংলাদেশে ছিল না। তবে এখানে তো সমুদ্রতীরবর্তী নগর বেশি নেই, কাজেই বোম্বেটেদের ছোট ছোট নৌকো করে নদ-নদীর ভিতরে এসেই ব্যবসা চালাতে হত। বড় বড় জাহাজে চড়ে পৃথিবীর নামজাদা বোম্বেটেদের মতো সমুদ্রের উপর বড়রকমের ডাকাতি করার সুযোগ তাদের বেশি ছিল না।

    সেকেলে বাংলার জল-ডাকাতদের সাধারণ নিয়ম ছিল এই রকম : কোনও যাত্রীনৌকো দেখলেই তারা নিজেদের নৌকো নিয়ে তার কাছে গিয়ে বলত, ‘আমাদের আগুন নিবে গেছে। একটু আগুন দেবে ভায়া?’ যাত্রীনৌকোর লোকেরা কোনরকম সন্দেহ না করে আগুন দেওয়ার জন্যে বোম্বেটে নৌকোর পাশে গিয়ে হাজির হত এবং অমনি সেই সুযোগে বোম্বেটেরা যাত্রীনৌকোর ভিতরে লাফিয়ে পড়ে সর্বনাশের সৃষ্টি করত। বারে বারে এমনি ঠকে শেষটা অচেনা নৌকো আগুন চাইলেই তারা তাড়াতাড়ি আরও তফাতে সরে পড়ে পলায়ন করত।

    বাংলাদেশে জল-ডাকাতরা প্রায়ই ছিপনৌকো ব্যবহার করত। এখানকার ডাঙার ডাকাতরা তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্যে ব্যবহার করত ‘রণপা’। রণপা হচ্ছে দুটো লম্বা বাঁশের ডাণ্ডা—মানুষের মাথার চেয়ে অনেক উঁচু। সেই ডাণ্ডার মাঝখানে পা রাখবার জায়গা থাকে। (ইউরোপেরও অনেক দেশের চাষিরা শস্যখেতে চলাফেরা করবার সময়ে এমনই রণপা ব্যবহার করে থাকে।) কিন্তু বাংলার ডাঙার ডাকাতরাও জলপথে তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্যে বোম্বেটেদেরই মতো ছিপ ব্যবহার করত।

    আইনের চোখে অপরাধী হলেও সামাজিক হিসাবে, আগেকার বোম্বেটেরা বোধহয় সাধারণ খুনি বা ডাকাতের চেয়ে উচ্চশ্রেণির জীব ছিল। কারণ, দেখা যায়, আগেকার এমন কয়েকজন লোক নৌ-যোদ্ধারূপে বিখ্যাত হয়ে প্রভূত যশ ও রাজসম্মান অর্জন করে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় অমর হয়ে রয়েছেন, যাঁদের বোম্বেটে বললে খুব ভুল করা হয় না।

    যেমন ভাস্কো ডা গামা। পোর্তুগালের এই নামজাদা যোদ্ধা-নাবিক পোর্তুগিজ অধিকৃত ‘ভারতবর্ষে’র বড়লাটরূপে কোচিতে প্রাণত্যাগ করেন (১৫২৪)। কিন্তু আফ্রিকার স্থানে স্থানে ও ভারতের কালিকটে তিনি যেসব কাজ করে গেছেন, তা বোম্বেটের পক্ষেই সাজে। পোর্তুগালের আর এক নাবিক নেতা ফার্নান ম্যাগেল্যানও স্বদেশে যথেষ্ট শ্রদ্ধা প্রীতি লাভ করেছেন, কিন্তু তিনি সাধারণ ইতর বোম্বেটের চেয়ে ভালো লোক ছিলেন না।

    ইংল্যাণ্ডকে স্পেনের ‘আর্মাডা’র কবল থেকে বাঁচিয়ে এবং অনেক নতুন নতুন দেশ আবিষ্কার ও ব্রিটিশসাম্রাজ্যভুক্ত করে স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক আজ স্বদেশভক্ত বীর বলে সুপরিচিত। সে হিসাবে সত্য সত্যই তিনি এই সম্মানের অধিকারী। কিন্তু জলদস্যুরা যে কাজ করলে নিন্দিত হয়, তাঁর অনেক অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যেই তা লক্ষ করা যায়। ড্রেক একালে জন্মালে, পৃথিবী বোধহয় তাঁকে ক্ষমা করত না। ওয়েস্ট ইণ্ডিজে গিয়ে তিনি যথেচ্ছভাবে লুঠতরাজ করেছেন, হাজার হাজার অসহায় মানুষকে হত্যা করেছেন, বড় বড় শহরকে আগুনের মুখে সমর্পণ করেছেন। সে দেশের লোকের কাছে তিনি নিশ্চয়ই বীর নামে পরিচিত হয়নি। যুদ্ধের নামগন্ধ নেই, নগর লুণ্ঠনও শেষ হয়ে গেছে, তবু হাইতি দ্বীপের রাজধানী স্যান্টো ডোমিঙ্গো শহরের নিরীহ বাসিন্দাদের উপর ড্রেক অনবরত গুলিগোলা বৃষ্টি করেছেন। নগরের চতুর্দিকে যখন ভীষণ অগ্নির তাণ্ডবলীলা, নিরপরাধ নর-নারী ও শিশুর আর্তনাদে যখন আকাশ-বাতাস পরিপূর্ণ এবং ড্রেকের সৈন্যরা যখন ক্রমাগত গুলিগোলা বৃষ্টি করে একেবারে নেতিয়ে কাবু হয়ে পড়েছে, তখনও লক্ষাধিক মুদ্রা ঘুষ না পাওয়া পর্যন্ত ইংল্যাণ্ডের এই মহাবীর তুষ্ট হতে পারেননি।

    পনেরো, ষোলো ও সতেরো শতাব্দীতে ইংল্যাণ্ডবাসীরা নৌ-যোদ্ধা ও বোম্বেটেকে যে প্রায় অভিন্ন বলে মনে করত, তার অসংখ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে। তখন সমুদ্রে ও সাগর তীরবর্তী স্থানে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করবার সময়ে, ইংরেজরা অধিকাংশ সময়েই সাধারণ বোম্বেটেদের সাহায্য গ্রহণ করত। ইংল্যাণ্ডের রাজা, রানি ও শাসনকর্তারা পর্যন্ত বেতনভুক্ত নিয়মিত নৌ-সৈন্যদের সঙ্গে বোম্বেটেদের পালন করতে লজ্জিত হতেন না—যেমন হতেন না বাংলা দেশের বারো ভুঁইয়ারাও। রাজার সাহায্য পেয়ে বোম্বেটেদেরও বুক দশহাত হয়ে উঠত, তারা রাজশত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করবার অজুহাতে নিরীহ প্রজাদের ধন-প্রাণ নির্ভয়ে লুণ্ঠন করত।

    এই শ্রেণির বোম্বেটেদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে হেনরি মর্গ্যান। এই ভীষণ বোম্বেটেকে ইংল্যাণ্ডের রাজসরকার টাকা, জাহাজ ও লোকজন দিয়ে সাহায্য করেন। তার ফলে ওয়েস্ট ইণ্ডিজের কাছাকাছি দ্বীপপুঞ্জে এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলে কারুর পক্ষে ধন-প্রাণ বজায় রেখে বাস করাই অসম্ভব হয়ে ওঠে। পানামার মতো শহরেও হেনরি মর্গ্যান হানা দিতে ভয় পায়নি, তার কবলগত হয়ে পানামার অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়ে যায় এবং যথাসর্বস্ব হারিয়েও এখানকার কত হাজার বাসিন্দা যে মৃত্যুমুখে পড়তে বাধ্য হয়, তার কোনও হিসাব নেই। ওই ওঁচা বোম্বেটেকে জলদস্যুরা পর্যন্ত ঘৃণা করত। কারণ সে কাক হয়েও কাকের মাংস খেত,—অর্থাৎ মর্গ্যান কেবল পরিচিত নির্দোষ ব্যক্তিরই ধন-প্রাণ কেড়ে নিত না, নিজের দলের লোকদেরও টাকা দু-হাতে চুরি করত। জলপথে ও স্থলপথে অসংখ্য অত্যাচার, নরহত্যা, লুণ্ঠন ও পাপকাজ এবং বোম্বেটেদেরও তহবিল তছরুপ করে, শেষটা সে সকলকে ফাঁকি দিয়ে হঠাৎ একদিন লুকিয়ে সরে পড়ে। তখন ইংলণ্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের ধর্মভাব হঠাৎ জেগে উঠল। তাঁর হুকুমে মর্গ্যানকে ধরে দেশে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু বোম্বেটে সর্দারকে স্বচক্ষে দেখে রাজার মন এত খুশি হয়ে উঠল যে, শাস্তি দেওয়া দূরে থাক, ‘স্যার’ উপাধি ও ‘কর্নেল’ পদ দিয়ে তিনি তাঁকে আবার জামাইকা দ্বীপের ছোটলাট করে পাঠালেন।

    রেমব্রাণ্ডের মতো বিশ্ববিখ্যাত ও সর্বজনমান্য চিত্রকর আঁকলেন কর্নেল স্যার হেনরি মর্গ্যানের ছবি এবং যার মরা উচিত ছিল ফাঁসিকাঠে, ছোটলাটের উঁচু, পুরু ও নরম গদিতে বসে সে সাধু-অসাধুর শাসনভার অর্থাৎ মুণ্ডপাতের ভার পেয়ে চোদ্দো বছর সুখে সম্মানে কাটিয়ে তিয়াত্তর বৎসর বয়সে পরম নিশ্চিন্তভাবে ইহলোক ত্যাগ করলে! পাপের এমন জয়ের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্য কোনও দেশের ইতিহাসে দেখা যায় না! এমনকি আজও দেখি, অনেক নামজাদা ইংরেজ লিখিয়ে এই বোম্বেটের কলঙ্ক ক্ষালনের জন্যে প্রাণপণে ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। আশ্চর্য!

    অথচ ওই সময়কার ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরা কানহোজি আংগ্রেকে জলদস্যু রূপে বর্ণনা করতে লজ্জিত হননি। ভারতে যখন ঔরংজেবের রাজত্ব, মারাঠি নৌ-বীর কানহোজি আংগ্রের নামে তখন আরবসাগরগামী সমস্ত জাহাজ ভয়ে থরহরি কম্পমান হত। স্থলপথে ছত্রপতি শিবাজির মতন জলপথে কানহোজি আংগ্রেও ছিলেন সমান অজেয়। ইংল্যাণ্ডে জন্মালে তিনি ড্রেক বা নেলসনেরই মতো পৃথিবীজোড়া অমর নাম অর্জন করবার সুযোগ পেতেন। মোগল, ইংরেজ, ওলন্দাজ ও পোর্তুগিজদের কোনও জাহাজই তাঁর কবল থেকে সহজে নিস্তার পেত না। ইংরেজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় জাতিরা একসঙ্গে অনেক যুদ্ধজাহাজ নিয়ে বারবার তাঁকে আক্রমণ করেছে, কিন্তু প্রতিবারই একাকী লড়েও জলযুদ্ধে জয়ী হয়েছেন মহাবীর কানহোজি আংগ্রেই! অথচ তখন ইউরোপের পূর্বোক্ত জাতিরা স্থলযুদ্ধের চেয়ে জলযুদ্ধেই বেশি বিখ্যাত ছিলেন। বারবার পরাজিত শত্রুদের কলমে ‘বোম্বেটে’ বলে নিন্দিত এই অসাধারণ ভারতীয় নৌ-বীরের বীরত্বকাহিনি যে আজও এখানে ঘরে ঘরে পরিচিত হয়নি, আমাদের ঐতিহাসিকদের পক্ষে এটা অল্প কলঙ্কের কথা নয়। বাংলা ভাষায় প্রায় তিন যুগ আগে পুরাতন ‘ভারতী’তে একবার কানহোজি আংগ্রে সম্বন্ধে একটি ছোট প্রবন্ধ দেখেছিলুম, তারপর আর কারুর তাঁকে মনে পড়েনি!

    সাধারণ হত্যা বা দস্যুতার মধ্যে লুকোচুরি ও কাপুরুষতা আছে যতটা, বোম্বেটের কাজে যে ততটা নেই, সত্যের অনুরোধে এ কথা স্বীকার করা চলে অনায়াসেই। সে যুগে বোম্বেটেদের প্রাধান্য ছিল খুব বেশি, তখন সমুদ্রযাত্রার সময়ে প্রত্যেক জাহাজের আরোহীরাই তাদের দেখা পাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যেতেন ও সাবধান হয়ে থাকতেন এবং বোম্বেটেদের ভয়ে অধিকাংশ সওদাগরি জাহাজেও কামান-বন্দুক ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র রাখা হত। অনন্ত সমুদ্র,—সাধারণ খুনে বা ডাকাতের মতো বোম্বেটেরা অতর্কিতে হঠাৎ এসে আক্রমণ করতে পারত না, তাদের অনেক দূর থেকেই স্পষ্ট দেখা যেত এবং আক্রান্তরাও আত্মরক্ষা করবার সুযোগ পেত যথেষ্ট। কিন্তু তবু যে তারা বাঁচতে পারত না, তার প্রধান কারণ হচ্ছে বোম্বেটেদের সাহস ও বীরত্ব।

    তবে জলদস্যুদের এত নিন্দা কেন? তাদের মূলমন্ত্র হচ্ছে, জোর যার মুল্লুক তার। এ মূলমন্ত্র সমাজের শান্তিরক্ষার পক্ষে অচল। তার উপরে সেকালকার বোম্বেটেদের নিষ্ঠুরতা ও হিংসুকতা ছিল অসম্ভব—দয়ামায়ার অস্তিত্ব পর্যন্ত তারা মানত না। অধিকাংশ সময়েই তারা কোনও জাহাজ দখল ও লুট করে সমস্ত আরোহীকেই নির্বিচারে সমুদ্রের জলে নিক্ষেপ করত। প্রাণে মারবার আগে অনেক লোককে তারা অমানুষিক যন্ত্রণা দিতেও ছাড়ত না। তারা নরপশু ছিল বলেই তাদের সমস্ত সাহস ও বীরত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভস্মে ঘৃতাহুতির মতো। যে বীরত্বে ক্ষমা নেই, দয়া নেই, মনুষ্যত্ব নেই, তা একেবারেই উল্লেখযোগ্য নয়।

    ওয়েস্ট ইণ্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের ফরাসি জলদস্যু লোলোনজের পাশবিক বীরত্বের কাহিনি আমরা পরে বিবৃত করব। ব্রেজিলিয়ানো নামে আর এক বোম্বেটের গল্পও আমরা পরে বলব, যা পড়তে পড়তে পাঠককে শিউরে উঠতে হবে। এ শ্রেণির লোকের সাহস ও বীরত্ব না থাকলেই ভালো ছিল।

    জলদস্যু হচ্ছে প্রাচীন যুগেরই জীব। গ্রিকদের সময়েও জলদস্যুদের প্রভাব ছিল যথেষ্ট। সে সময়ে সমুদ্রে বেরিয়ে এক জাহাজ যদি আর এক জাহাজকে দেখতে পেত, তাহলে সর্বাগ্রে প্রশ্ন করত, ‘তোমরা বোম্বেটে, না সওদাগর?’ রোমানদের সময়েও গ্রিক বোম্বেটেরা দলে এত ভারি ছিল যে, ভূমধ্যসাগর দিয়ে সাধারণ জাহাজ প্রায় চলাফেরা করতে পারত না বললেই চলে।

    ভূমধ্যসাগরে বোম্বেটে জাহাজের সংখ্যা তখন এক হাজারের কম ছিল না। রোমানরা শেষটা বাধ্য হয়ে বিপুল এক রণতরীর বাহিনী পাঠিয়ে এই দস্যুতা দমন করেছিল। কিন্তু এর পরেও অনেকবার জলদস্যুদের অত্যাচারে রোমকে যারপরনাই কষ্টভোগ করতে হয়েছিল। সেকালকার ইংল্যাণ্ড, ফ্রান্স, পোর্তুগাল ও স্পেনের সমুদ্রতীরবর্তী নগরগুলি নানাদেশি বোম্বেটেদের অত্যাচারে যখন তখন ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ত।

    পঞ্চদশ শতাব্দীর আরম্ভে চিনারা সিংহলদেশের উপরে কী বিষম ডাকাতি করেছিল এইবারে সেই কথাই বলি। চেং হো নামে এক চিনা-খোজা একবার জাহাজে চড়ে সিংহলদেশে গিয়েছিল। সেখানে বুদ্ধদেবের পবিত্র দাঁত আছে শুনে সে আব্দার ধরে বসল, তাকে ওই দাঁত উপহার দিতে হবে। বলাবাহুল্য, সিংহলের তখনকার রাজা অলগাক্ষোনারা (?) তার সে অন্যায় আব্দার গ্রাহ্য করলেন না। চেং হো সেবারের মতো মুখ চুন করে খালি হাতেই চিনদেশে ফিরে গেল।

    কিন্তু ১৪০৯ খ্রিস্টাব্দে বাষট্টিখানা জাহাজ নিয়ে সে আবার সিংহলদেশে আবির্ভূত হল। সিংহলের রাজার সৈন্যদের সঙ্গে চিনাদের তুমুল লড়াই লেগে গেল। সেই ফাঁকে চেং হো একদল সৈন্য নিয়ে সিংহলি সৈন্যদের চোখে ধুলো দিয়ে হঠাৎ রাজধানীতে এসে কৌশলে নগর দখল করল এবং রাজা ও রাজপরিবারের ছেলেমেয়ে ও রাজ্যের প্রধান প্রধান লোকদের বন্দি করে সটান আবার চিনদেশে গিয়ে হাজির হল। পরে রাজ্যচ্যুত রাজাকে চিনারা আবার সিংহলদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল বটে, কিন্তু তারপর, কিছুকাল পর্যন্ত সিংহল দেশকে চিনসম্রাটের অধীনতা স্বীকার করে কর পাঠাতে হত! এই বোম্বেটেগিরির পরে, ভারতসাগরে চিনাদের প্রভাব দুর্দমনীয় হয়ে উঠেছিল।

    চিনদেশেরও সমুদ্রতীরবর্তী স্থানগুলি নিরাপদ ছিল না—সেসব জায়গায় জাপানি বোম্বেটেরা সকলকে নাস্তানাবুদ করে তুলেছিল। ষোড়শ শতাব্দীর পর ইংরেজ ও ওলন্দাজ বোম্বেটেদের দৌরাত্ম্যেও চিনাদের বড় কম নাকাল হতে হয়নি।

    আগেই বলেছি, ইংরেজরাও সেকালে বোম্বেটের ব্যবসায়ে যথেষ্ট বদনাম কিনেছিল। রানি এলিজাবেথ অনেক ইংরেজ বোম্বেটেকে নিজের নৌ-সেনাদলে ভর্তি করে নিয়েছিলেন। সে সময়ে জন স্মিথ নামে এক মহা ধড়িবাজ বোম্বেটের জ্বালায় ইংরেজরা পর্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছিল এবং তাকে বন্দি করে ফাঁসিকাঠে লটকে দেওয়ার জন্যে চারিদিকে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু কেউ তাকে ধরতে পারেনি।

    এমন যে শয়তান, তারও মনে ছিল প্রচুর দেশভক্তি। হঠাৎ সে একদিন নিজেই কর্তৃপক্ষের কাছে এসে হাজির—ধরা দিলে মুক্তি নেই জেনেও। সকলেই অবাক হয়ে গেল! কিন্তু বোম্বেটে জন স্মিথ বললে, ‘দেশের বিপদ দেখেই আমি ধরা দিচ্ছি। সবাই প্রস্তুত হও। আমি স্বচক্ষে দেখে এসেছি, ইংল্যাণ্ড ধ্বংস করবার জন্যে ‘স্প্যানিস আর্মাডা’ আসছে।’ এ খবর তখনও দেশের কেউ পায়নি,—শুনেই সারা ইংল্যাণ্ডে ‘সাজো সাজো’ রব উঠল, সকলে যথাসময়ে সাবধান হওয়ার সুযোগ লাভ করলে। বলাবাহুল্য, বোম্বেটে জন স্মিথের নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণ ব্যর্থ হল না। কেবল শাস্তি থেকে মুক্তি নয়—সেই সঙ্গে সে যথেষ্ট পুরস্কারও লাভ করল।

    স্পেন থেকে মরক্কোয় বিতাড়িত হওয়ার পর ষোড়শ শতাব্দীর মূররা ভয়ংকর বোম্বেটে রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তাদের ভয়ে ভূমধ্যসাগরের ব্যাবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো হয়েছিল। সারা ইউরোপের শক্তি তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারেনি। প্রথমে উর্জ ও পরে তার ভাই খয়েরুদ্দিনের নামে তখনকার খ্রিস্টান নাবিকদের বুক ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যেত। কারণ মূর বোম্বেটেরা কেবল জাহাজ লুট করত না, উপরন্তু খ্রিস্টানদেরও ধরে নিয়ে গিয়ে আফ্রিকায় গোলাম করে রাখত এবং তাদের পথের কুকুরের মতো কষ্ট দিত। একবার আন্দ্রিয়া ডোরিয়া নামে এক নৌ-বীর বহু জাহাজ ও সৈন্য নিয়ে জলযুদ্ধে মূর বোম্বেটেদের হারিয়ে দেন এবং তাদের কবল থেকে বিশ হাজার খ্রিস্টান স্ত্রী-পুরুষকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন—তাদের মধ্যে ইউরোপের অনেক বড়ঘরের ছেলেমেয়েও ছিল। কিন্তু তবু মূর বোম্বেটেরা কাবু হয়ে পড়ল না। অবশেষে কয়েক শত বৎসরের প্রাণপণ চেষ্টার পরে, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে, মূর জলদস্যুদের প্রতাপ দূর হয়। ইংরেজ নৌ-সেনাপতি লর্ড এক্সমাউথ ওলন্দাজদের সঙ্গে মিলে মূর বোম্বেটেদের আস্তানা ভেঙে দেন এবং তারপর ফরাসিরা আলজিয়ার্স দেশ অধিকার করলে মূররা আর মাথা তুলতে পারলে না। ইউরোপে এমন বোম্বেটের বিভীষিকা আর কখনও হয়নি।

  • হন্তারক নরদানব

    হন্তারক নরদানব

    হেমেন্দ্রকুমার রায়

    [book]

    পটভূমিকা

    ইতিহাস যখন লিখিত হয়নি, জলদস্যু বা বোম্বেটের অত্যাচার আরম্ভ হয়েছে তখন থেকেই। খ্রিষ্টপূর্ব যুগেও দেখা যায় প্রাচীন মিশর, গ্রীস ও রোমের সমুদ্রযাত্রী জাহাজ বোম্বেটেদের পাল্লা থেকে রেহাই পায়নি। এমনকি, বিশ্ববিখ্যাত রোমান দিগ্বিজয়ী জুলিয়াস সিজারকে পর্যন্ত একবার বোম্বেটেরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল! ইংরেজিতে Pirate বলতে বুঝায় বোম্বেটে এবং গ্রিক Peirates থেকে ওই শব্দটির উৎপত্তি। উপরন্তু পর্তুগিজ Bombardier শব্দটি ভেঙে গড়া হয়েছে বাংলায় চলতি ‘বোম্বেটে’ শব্দটি।

    প্রাচীন ভারতবাসীরাও সাগরযাত্রায় বেরিয়ে যখন-তখন ধরা পড়ত বোম্বেটেদের ফাঁদে। তারপর অষ্টম শতাব্দীতে ভারতের মাটিতে মুসলমানরা যে প্রথম ইসলামের পতাকা রোপণ করবার সুযোগ পায়, তারও মূলে ছিল ভারত সাগরের বোম্বেটেরাই। কিন্তু সে হচ্ছে ভিন্ন কাহিনী, এখানে বলবার জায়গা নেই।

    তারপর মধ্যযুগের ইউরোপে ইংরেজ, ফরাসী, স্পেনীয়, পর্তুগিজ ও উত্তর-আফ্রিকার মুসলমান বোম্বেটেদের ভয়াবহ অত্যাচারে সমুদ্রযাত্রা অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল এবং জলদস্যুতা পরিণত হয়েছিল একটি রীতিমতো লাভজনক ব্যবসায়ে। ক্রমে ক্রমে পাশ্চাত্য বোম্বেটেদের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর অন্যান্য সমুদ্রেও। আফ্রিকা ও আমেরিকার মধ্যবর্তী অঞ্চলে বোম্বেটেদের প্রাধান্য এতটা বেড়ে ওঠে যে, তারা জল ছেড়ে ডাঙায় নেমেও দেশের পর দেশে হানা দিতে ভয় পেত না।

    বোম্বেটেদের সাহস বাড়বে না কেন? বড়ো বড়ো ইংরেজ বোম্বেটে ইংল্যাণ্ডের রাজাদের কাছ থেকেও আশকারা পেয়েছে। অনেক বোম্বেটের জন্ম আবার সন্ত্রান্ত পরিবারে। স্পেন বা ফ্রান্সের সঙ্গে যখন লড়াই চলত, ইংল্যাণ্ডের রাজারা তখন বোম্বেটেদেরও লেলিয়ে দিতে লজ্জিত হতেন না এবং তারাও প্রশ্রয় পেয়ে স্পেন বা ফ্রান্সের যে-কোনও জাহাজের উপরে হামলা দিয়ে অমানুষিক অত্যাচার করত। হেনরি মর্গ্যান ছিল সতেরো শতাব্দীর এক কুখ্যাত ইংরেজ বোম্বেটে। সে কেবল জলপথে নয়, স্থলপথেও শত শত নরহত্যা করেছে এবং নির্বিচার লুণ্ঠনের পর বহু জনপদকে করেছে অগ্নিমুখে সমর্পণ। তাকে বন্দি করে ইংল্যাণ্ডে পাঠানো হয়। কিন্তু রাজা দ্বিতীয় চার্লস তার সঙ্গে আলাপ করে এমন মুগ্ধ হলেন যে, শাস্তি দেওয়া দূরের কথা, মর্গ্যানকে স্যার উপাধিতে ভূষিত করে জামাইকা দ্বীপের শাসনকর্তার আসনে বসিয়ে দিলেন।

    জনৈক ইংরেজ বোম্বেটে একবার ভারত সাগরে এসে মোগলদের জাহাজের উপরে চড়াও হয়ে বাদশাহ আলমগীরের পরিবারভুক্ত দুইজন রাজকন্যাকেও বন্দিনী করতে ভয় পায়নি।

    সুন্দরবন ছিল আগে বর্ধিষ্ণু লোকালয়, পরে পরিণত হয়েছে বিজন জলা-জঙ্গলে। মানুষের বিচরণ-ভূমি দখল করেছে হিংস্র পশুর দল। কারণ? পর্তুগিজ ও মগ বোম্বেটেদের অত্যাচার।

    দুইজন মেয়ে-বোম্বেটেরও নাম বিখ্যাত—আন বোনি ও মেরি রিড। জাতে ইংরেজ। তাদেরও গল্প অতিশয় চিত্তাকর্ষক, কিন্তু আমরা বোম্বেটেদের ইতিহাস লিখতে বসিনি। ভূমিকার জন্য যতটুকু চাই, ততটুকু ইঙ্গিতই দিলুম, আপাতত এ সম্বন্ধে আর বেশি বাক্যব্যয় করবার দরকার নেই। এইবার মূল কাহিনী শুরু করা যাক।

    যার কথা বলব তার আসল নাম হচ্ছে এডওয়ার্ড টিচ, কিন্তু কালোদেড় ডাকনামেই সে সর্বত্র পরিচিত (যেমন কুখ্যাত মুসলমান বোম্বেটে উরুজ পরিচিত ছিল ‘লালদেড়ে’ ডাকনামে)। সে কেবল স্পেন ও ফ্রান্সের শক্রই ছিল না, নিজের জাতভাই ইংরেজদেরও সুবিধা পেলে ছেড়ে দিত না এবং সমগ্র ওয়েষ্ট ইণ্ডিজ দ্বীপপুঞ্জ তার নাম শুনলেই ভয়ে কেঁপে সারা হত। আঠারো শতাব্দীর প্রথম দিকেই তার উত্থান এবং পতন। আমেরিকায় তখন ইংরেজদেরই রাজত্ব।

  • ফেরোমন

    ফেরোমন

    অজেয় রায়

    [book]

    এক

    পূর্ব আফ্রিকার ডার-এস-সালাম শহর থেকে সমদ্রপথে লঞ্চে চেপে আমরা রুফিজি নদীর মোহনার দিকে চলেছি। আমরা মানে প্রাণিতত্ত্ববিদ নবগোপাল ঘোষ অর্থাৎ আমাদের মামাবাবু, আমার বন্ধু সুনন্দ, আমি শ্রীমান অসিত ও বিল হার্ডি। আমরা তিনজন ভারতীয় বেশ কিছুদিন ধরে ডার-এস-সালামের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের কিউরেটর ডক্টর হাইনের আতিথেয়তা ভোগ করছি। ইতিমধ্যে আমাদের একটা অ্যাডভেঞ্চার হয়ে গেছে! রুফিজি নদীর মোহনার কাছে একটা দ্বীপে মামাবাবু সরীসৃপ ও পাখির মাঝামাঝি কোনো জীবের এক দুর্লভ প্রস্তরীভূত কঙ্কাল আবিষ্কার করেন এবং ঘটনাচক্রে সেই ফসিলটা আবার সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যায়। দ্বীপের অধিবাসীরা টাঙ্গানিকার এক গ্রাম থেকে ফসিলটা দ্বীপে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের এই দ্বিতীয় অভিযানের উদ্দেশ্য হল, যে গ্রামে ফসিলটা পাওয়া গিয়েছিল, তারই আশেপাশে ওই রকম আরও অন্য ফসিলের অনুসন্ধান করা। মামাবাবুর বিশ্বাস ছিল, বিল হার্ডি ওই গ্রামে যাবার একটা সহজ রাস্তা বাতলে দিতে পারবেন, কারণ সে ওই গ্রামে গিয়েছিল। সেই রকমই অনুরোধ করে একটা চিঠি পাওয়ামাত্র বিল ডার-এস-সালামে চলে আসেন এবং তার পরদিনই আমরা রওনা হয়ে যাই। এখানে বলা দরকার–হ্যার্ডি নামক এই শ্বেতাঙ্গ শিকারী পর্যটকটি সারা পূর্ব আফ্রিকায় ডেয়ারিং বিল নামে খ্যাত। তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময়টাই তিনি আফ্রিকা মহাদেশ চষে বেড়িয়েছেন। দীর্ঘ ঋজু বলিষ্ঠ চেহারা, বয়স পঞ্চাশের উপর, কিন্তু কানের পাশে সামান্য কয়েকটা পাকা চুল ছাড়া কোথাও প্রৌঢ়ত্বের ছাপ নেই।

    মামাবাবু এতক্ষণ ডেকে বসে ভারি মনোযোগ দিয়ে জুওলজি পত্রিকা পড়ছিলেন, এখন সেটা বন্ধ করে প্রায় আপন মনেই বলে উঠলেন, আশ্চর্য আবিষ্কার…ফেরোমন!

    বিল হার্ডি কিছুদূরে ঠোঁটে পাইপ কামড়ে চোখ বুজে লঞ্চের রেলিং-এর উপর পা তুলে বসে আছেন। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সম্বন্ধে তার বিন্দুমাত্র কৌতূহল নেই। মামাবাবর সঙ্গে নানান জায়গায় নানান অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গে জড়িত থাকার ফলে আমাদের দুজনের মধ্যেই সেটা বেশ বেশি পরিমাণেই সঞ্চারিত হয়েছে, তাই জিজ্ঞেস না করে পারলাম না–

    ফেরোমন কী জিনিস, মামাবাবু?

    মামাবাবু তার চশমার কাঁচটা রুমালে মুছতে মুছতে বললেন, ফেরোমন গড়ে প্রাণিদেহ-নিঃসৃত একরকম রাসায়নিক বস্তু। অনেক প্রাণী এর সাহায্যে পরস্পরের মধ্যে। নানারকম যোগাযোগ করে।

    আমি আর সুনন্দ পরস্পর মুখ চাওয়াচায়ি করলাম।

    পরিষ্কার হল না? মামাবাবু মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “বেশ, আরো সহজ করে। বলছি। বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর দেহকোষ থেকে এক বা একাধিক রকম লালা বা রস . বেরোয়। যে জিনিসটা বেরোয়, সেটা হল কয়েকটা রাসায়নিক পদার্থের সংমিশ্রণ। এগুলোর প্রত্যেকটির গন্ধ বা স্বাদ একটা বিশেষ সংকেত বহন করে। সেই সংকেতের ভাষা কেবল ওই প্রজাতির প্রাণীরাই বুঝতে পারে। যে রাসায়নিক বস্তুর সাহায্যে এই সাংকেতিক যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে, তাকেই বলে ফেরোমন। কোনো কোনো উন্নত প্রাণী, যাদের মখের ভাষা আছে, তাদের মধ্যেও বিশেষ প্রয়োজনে ফেরোমনের ব্যবহার দেখা যায়। যেমন, হরিণের মৃগনাভি বা কস্তুরী একরকম ফেরোমন। পুরুষ কস্তুরীমৃগ এর তীব্র সুবাস বাতাসে ছড়িয়ে তার হরিণীকে ডাকে। তবে কীট-পতঙ্গ ইত্যাদি নিম্নশ্রেণির জীবের ব্যাপারে বলা চলে যে তাদের সামাজিক জীবনটা একেবারে পুরোপুরি ফেরোমন নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন পিঁপড়ে, পিঁপড়ে নিয়েই গবেষণা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। পিঁপড়েরা চোখে দেখে না সেটা জানো বোধ হয়। বিভিন্ন প্রজাতির পিঁপড়ের মধ্যে অন্তত দশ রকম ফেরোমন আবিষ্কার করা গেছে। কোনোটার গন্ধে তারা বিষাদের সংকেত দেয়, কোনোটার সাহায্যে তারা মৃত সঙ্গীকে আবিষ্কার করে। কোনোটা তাদের সার বেঁধে পথ চলতে সাহায্য করে, আবার কোনো ফেরোমনের সাহায্যে তারা সাথীকে কাছে ডাকে।

    ফেরোমনের বৃত্তান্ত শুনে সত্যিই আমাদের অবাক লাগছিল। মামাবাবু কয়েক সেকেন্ড দম নিয়ে আবার বলে চললেন, অনেক জাতের পোকা ক্ষেতের শস্য নষ্ট করে। কীটনাশক ওষুধ ব্যবহার করেও তাদের ধ্বংস করা যায় না। মনে করো, কোনো পোকা ধান নষ্ট করে। আবিষ্কার করা গেল যে ওই জাতের স্ত্রী পোকা ফেরোমনের সাহায্যে পুরুষ পোকাকে কাছে ডাকে। তারপর ল্যাবরেটরিতে ওই ফেরোমনের রাসায়নিক মিশ্রণ আবিষ্কার হল। তৈরি হল কৃত্রিম ফেরোমন। ব্যস, এইবার কৃত্রিম ফেরোমন ধানক্ষেতের একপাশে ছড়িয়ে রেখে দাও। তখন কী হবে? পুরুষ পোকারা ছুটে আসবে কৃত্রিম ফেরোমনের গন্ধ পেয়ে আর সেই সুযোগে তাদের ধ্বংস করে ফেলা যাবে। আমেরিকায় এই উপায়ে প্রতি বছর হাজার হাজার জিপসি মথ ধ্বংস করে শস্য বাঁচানো হয়।

    ফেরোমনের বর্ণনা হয়তো আরো কিছুক্ষণ চলত, কিন্তু বাধ্য হয়ে থামাতে হল। সামনেই শহর দেখা যাচ্ছে। নদীর মোহনায় ছোট্ট শহর, নাম মোহোরা। এই মোহোরা। থেকেই আমাদের হাঁটা-পথে এগোতে হবে ফসিলের সন্ধানে। আমরা উঠে পড়লাম।

    সাফারির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ডার-এস-সালাম থেকে নিয়ে এসেছিলাম। বিল একটা রাইফেল ও পিস্তল এনেছিলেন। তাছাড়া ডক্টর হাইনের বন্দুকটা আমরা চেয়ে এনেছিলাম। বিল বলেছিলেন, শিকার আমি ছেড়ে দিয়েছি। অযথা প্রাণিহত্যা করতে আর ভালো লাগে না তবে আমাদের মাংসের দরকার হবে, টাটকা মাংস। তাই মাঝে মাঝে টোটা খরচ। করব।

    মোহোরা থেকে বিল চারজন চাম্বা পোর্টার ভাড়া করলেন। এরা মালপত্র বইবে। দরকার মতো মাটি পাথর খুঁড়বে। একজন কিছুটা রান্নাও জানে। শহর ছেড়ে পরদিন আমরা উন্মুক্ত প্রকৃতির রাজ্যে পদব্রজে যাত্রা করলাম।

    বেশি তাড়াতাড়ি এগোতে পারছিলাম না। একে খারাপ পথ, তার উপর মামাবাবুর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান। পথে যেতে যেতে তিনি মাঝে মাঝে আমাদের অপেক্ষা করতে বলছিলেন। নতুন ধরনের পোকা-মাকড়, সরীসৃপ ইত্যাদি দেখে তিনি দাঁড়িয়ে পড়ছিলেন। চোখে দূরবিন লাগিয়ে গভীর মনোযোগে লক্ষ করছিলেন। কখনও স্পেসিমেনটি জীবিত বা মৃত অবস্থায় সংগ্রহ না করে ছাড়ছিলেন না। নিজেই দেরি করছিলেন, আবার তারপরই আমাদের চলো চলো, এগোও, বলে তাড়া লাগাচ্ছিলেন।

    বিল পথ চলতে চলতে আমাদের নানারকম গাছপালা চেনাচ্ছিলেন। আফ্রিকার বনভূমিতে পথ চলার কায়দা-কানুন রপ্ত করাচ্ছিলেন। ছোট-বড় জীবজন্তু দেখিয়ে বোঝাচ্ছিলেন তাদের বয়স, মেজাজ ইত্যাদি।

    প্রায় পনেরো মাইল পথ চললাম। একবার মাত্র দপরে খেতে থেমেছিলাম। তারপর টানা হন্টন। সন্ধে নাগাদ তাঁবু ফেললাম। সবাই বেশ ক্লান্ত, রান্নার জোগাড় হতে থাকে। বিল বললেন, কাল আমরা নদীর কাছ ছেড়ে বাঁ দিকে বেঁকে যাব। প্রথমে একটা? স্টেপ অর্থাৎ তৃণভূমি পড়বে। সেটা পেরিয়ে ছোট ছোট পাহাড়ের সারি। ওইখানেই সেই গ্রাম ছিল। এতদূর অবধি আসতে অসুবিধা হয়নি, তবে স্টেপের মধ্যে দিয়ে দিক নির্ণয় করা একটু কঠিন। যা হোক, মনে হয় ঠিকঠাক পৌঁছে যাব। কতগুলো চিহ্ন আমার মনে আছে।

    মামাবাবু একটা প্যাকিং বাক্সকে টেবিল বানিয়ে কিছু পোকামাকড়ের স্পেসিমেন পরীক্ষা করতে লাগলেন। আমি ও সুনন্দ বিলের কাছে বসে রইলাম গল্প শোনার আশায়।

    বিল একটা গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে আরাম করে পা ছড়িয়ে একমনে কিছুক্ষণ পাইপ টানতে টানতে দূরে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, আফ্রিকার প্রকৃতিতে মায়া আছে বুঝলে, আজ রাতে চাঁদ উঠবে। তখন দেখবে কি অদ্ভুত রহস্যময় দেশ। এই বিশাল মহাদেশের কতটুকুই বা আজ পর্যন্ত আমরা জেনেছি–এখানকার অসংখ্য জীবজন্তু, গাছপালা, এ দেশের উপজাতিদের রীতিনীতি।

    প্রশ্ন করলাম, আপনি প্রথম কবে আফ্রিকায় আসেন?

    আজ থেকে তিরিশ বছর আগে, মাত্র বাইশ বছর বয়সে।

    কী করতে এসেছিলেন? শিকার?

    দূর দূর! তখন আমি ভালো করে বন্দুক চালাতেই জানতাম না। এলাম স্রেফ খেয়ালে পড়ে।

    যাঃ! স্কটল্যান্ড থেকে এত দূরে অকারণে? সুনন্দ প্রতিবাদ জানাল।

    সত্যি বলছি, কিছু ভেবে আসিনি। এসেছিলাম নিছক অ্যাডভেঞ্চারের নেশায়। আফ্রিকা সম্বন্ধে আমার তখন ধারণা ছিল অতি সামান্য, শুধু জানতাম এ এক বিশাল অজানা। রহস্যময় দেশ। ঠিক করলাম, যেমন এ দেশের অধিবাসীরা প্রায় খালি হাতে মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়, আমিও তেমনি বেড়াব। তারপর একটু একটু করে আফ্রিকান চিনলাম। উবসক নামে আমার প্রথম উপজাতি যুবক গাইডটি হল আমার গুরু। বন্ধও বলতে পারো। জানো, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ আরম্ভ হবার দু-বছর পরও আমি জানতে পারি যে, এমন এক সর্বনাশা যুদ্ধ চলছে! মোম্বাসা থেকে কিছু দরকারি জিনিস আনতে একজন পোর্টার পাঠিয়েছিলাম। জিনিস এল খবরের কাগজের মোড়কে। সেই কাগজ পডে জানলাম ওয়ালর্ড-ওয়র লেগেছে।

    বলেন কি! কোনো শ্বেতাঙ্গের সঙ্গে আপনার দেখাই হয়নি এই দু-বছর? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

    না। কোনো শ্বেতাঙ্গের সঙ্গে দেখা হয়নি! রেডিও শুনিনি, খবরের কাগজ পড়িনি। এই বিরাট দেশের কয়েকটি শহর এবং বাঁধা পথঘাটের বাইরে বিদেশি লোক বড় একটা পা বাড়ায় না। আর আমি ঘুরতাম অজানা প্রকৃতি-রাজ্যে। পশু শিকার করে, ছাল বা দাঁত উপজাতির কারো হাতে শহরে পাঠাতাম চিঠি দিয়ে। সে দাম নিয়ে আসত কিংবা বদ জিনিস কিনে আনত। কখনও শিকারের মাংস বা ছালের বিনিময়ে উপজাতিদের গ্রাম থেকে প্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করতাম। আর আমার জীবনধারণের প্রয়োজন ছিল অতি সামান্য। শুধু ঘুরতাম, প্রাণভরে দেখতাম। শিকার করতাম।

  • মিস্টার বাসুর ফরমুলা

    মিস্টার বাসুর ফরমুলা

    অজেয় রায়

    [book]

    মুখবন্ধ

    অজেয় রায় হলেন প্রকৃত বিজ্ঞানভিত্তিক কিশোর উপন্যাসের জগতে একজন বিশিষ্ট লেখক। এঁর গল্পে সরস বাষায় প্রকৃত  বৈজ্ঞানিক তথ্য পিরবেশন করা হয়। এগুলি পাঠ্যপুস্তকের চাইতে বেশি মূল্যবান, কারণ ছেলেমানুষরা আনন্দ এবং আগ্রহের সঙ্গে পড়ে। এঁর প্রচ্ছন্ন রসিকতাগুলিও পরম উপভোগ্য। আজগুবি গল্প লেখা বরং সহজ, কিন্তু তথ্যসমৃদ্ধ আনন্দের উপাদানের অনেক বেশি দাম।

    এই বইটিকে আমি স্বাগত জানাই এবং আশা করি তরুণ পাঠকরাও পড়ে এক অন্য জগতের আস্বাদ পাবে। ইতি—

    ১৫ জুন ১৯৮৮
    আঃ লীলা মজুমদার
  • ঔরস

    ঔরস

    মলয় রায় চৌধুরী

    [book]

    গ্রন্থকথা

    তিনটি নষ্ট উপন্যাসের সংকলনের প্রথমটি ‘রাহুকেতু’ যা একটি আত্মজীবনীমুলক কাহিনি। হাংরি আন্দোলনের সময়কালের সারস্বত সমাজের উথালপাতাল পাবেন পাঠকরা, তবে বুঝে নিতে হবে কারণ নামগুলি সবই ছদ্মনামে আছে। দ্বিতীয় উপন্যাসটি ‘ঔরস’ যা আপাদমস্তক রাজনৈকিত বক্তব্যে ঠাসা। ভাগলপুরের মাফিয়া অধ্যুষিত গাংগোতা সমাজ, গঙ্গায় জেগে ওঠা চরের দখল, অন্যদিকে চার হাজার কিলোমিটার জঙ্গল ঘিরে সালোয়া জুড়ুম, মাওবাদী, আধাসেনা, মিলিটারির মাঝে পড়ে অর্ধমৃত জনজীবনের বেঁচে থাকার গল্প। ‘লবিয়ার মাকড়ি’ উপন্যাসটি জাদু বাস্তবতার এক অনবদ্য পরিবেশন। এক ভিন্ন আঙ্গিকে লেখা তীব্র রাজনৈতিক শ্লেষ, ব্যাঙ্গোক্তি, যা লাতিন আমেরিকার ম্যাজিক রিয়েলিজম নয়, এই লেখা পাঠককে তৃপ্তি দেবে। মলয় রায়চৌধুরী বাংলা সাহিত্যের একজন দ্রোহী পুরুষ। ছয়-এর দশকে বাংলা সাহিত্যকে উচ্চকোটির লেখকদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে মাটিতে নামিয়ে দিয়েছিলেন। চট্টোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায়, বসু, গুহ, মিত্রদের হাত ছেড়ে কবিতা, গল্প, উপন্যাস দাস, মণ্ডল, ধাড়াদের মতো যাদেরকে সাহিত্যের আঙিনায় ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল তাদের হাতে উঠে এসেছিল। আর, এই অসাধ্য সাধন ঘটিয়েছিলেন মলয় রায়চৌধুরী হাংরি সাহিত্য আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে।

  • মানুক দেওতার রহস্য সন্ধানে

    মানুক দেওতার রহস্য সন্ধানে

    অজেয় রায়

    [book]

    এক

    সে কীরে, ব্যাংকক! তপনের বন্ধুরা শুনে আঁতকে উঠল।

    কেন, তাতে কী? তপন দৃঢ়স্বরে জানায়, লোকে ইউরোপ—আমেরিকায় যাচ্ছে না? পড়তে যাচ্ছে, চাকরি করতে যাচ্ছে। এ—তো ঢের কাছে। ব্যাংকক চমৎকার শহর। আর। সুনীলদা বলেছে চাকরিটাও ভালো। এক পাঞ্জাবি ব্যবসাদার ও—দেশ থেকে মশলা নিয়ে। ভারতে চালান দেয়। ওর ব্যাংকক অফিসের জন্য একজন বিশ্বাসী লোক চাই। ভালো মাইনে দেবে। অনেক বাঙালি থাকে ওখানে। সাউথ—ইস্ট—এশিয়ার সঙ্গে ভারতের কদ্দিনের যোগাযোগ জানিস?

    সব শুনে বন্ধুরা ঘাড় নাড়ল, তা বটে, তা বটে। ঠিক আছে, যা দেখ কেমন লাগে। ছুটি—টুটি দেবে তো?

    অত দূরে? মা খবরটা শুনে তপনের মুখের দিকে চেয়ে বললেন। তপনের বাবা নেই। মা একটা স্কুলে পড়ান।

    তপন বলল, কিছু দূরে নয়। তুমি ভেবো না। সুনীলদা অ্যাদ্দিন রয়েছেন।

    বেশ, যা তবে। সাবধানে থাকবি। তোর বাবা থাকলেও বারণ করতেন না। খুশিই হতেন।

    বি. এ. পাস করে দু—বছর ধরে চাকরি খুঁজছিল তপন। হঠাৎ বন্ধু গুরুপদর পিসতুতো দাদা সুনীল ব্যানার্জির সঙ্গে আলাপ। সুনীলদা মালয়েশিয়ায় থাকেন। সেখানে স্কুলে পড়ান। ছুটিতে কলকাতায় এসেছেন। সুনীলদা কথায় কথায় বললেন, আমার বিশেষ পরিচিত ব্যাংককের ব্যবসায়ী গোবিন্দ সিং একজন লোক খুঁজছে। যাবে ব্যাংকক? তাহলে তোমার জন্য লিখি।

    তপন রাজি হয়ে গেছে।

    তপনের ভাই—বোন তিলু মিলু খবরটা শুনেই লাফাতে লাগল। তিলু তক্ষুনি ম্যাপ নিয়ে বসে গেল, থাইল্যান্ডের রাজধানী, তাই না? এই তো ব্যাংকক। কীসে যাবে দাদা? প্লেন, না জাহাজে?

    মিলু বলল, দাদা, ওঙ্কারভাট দেখতে যাবে না?

    তপন বলল, ইচ্ছে আছে। ব্যাংককের কাছেই তো।

    উঃ, কী লাক তোমার! গভীর বনের মধ্যে বিরাট ধ্বংসাবশেষ নগর। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মন্দির। আমি বইয়ে ছবি দেখেছি। প্রায় হাজার বছর আগে হিন্দু—রাজত্ব ছিল ওখানে। আর জানো দাদা, ওদেশের বাটিকের কাজ খুব সুন্দর। ছুটিতে আসার সময়—আমার জন্যে একটা…

    বাইরে বেপরোয়া ভাব দেখালেও প্রথমটা ভিতরে ভিতরে বেশ ঘাবড়াচ্ছিল তপন। কলকাতার বাইরে বড় একটা যায়নি সে। দিনে দিনে মনটা তার অস্থির হয়ে ওঠে। ভ্রমণ কাহিনি বা অ্যাডভেঞ্চারের গল্প পড়তে পড়তে মনে মনে বইয়ের চরিত্রদের পাশে নিজেকে কল্পনা করেছে। ওইসব অজানা দেশে বিচিত্র সব ঘটনার মধ্যে নিজেও যেন জড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই কল্পনার জগৎ যে খানিকটা বাস্তবে ফলে যেতে পারে তা কোনো আশা করেনি। এই কলকাতা, এই ভবানীপুরের এত দিনের জীবন ছেড়ে কোথায় যেতে হবে?

    মনে সে সাহস আনে। কেন, এই তো সুনীলদা গিয়েছেন? বাবা নাকি পাস করেই বর্মায় গিয়েছিলেন চাকরি নিয়ে। চার বছর ছিলেন। ওঁরা শহরের লোক ছিলেন না। আর সে খাস কলকাতায় মানুষ। কত বেশি জানে—শোনে। তার অত ভয় কী?

    ভালো মাইনে। বাড়িতে বেশ কিছু টাকা পাঠানো যাবে। সে কী কম আনন্দের কথা? তাতেই সব কষ্ট সয়ে যাবে।

    মাসখানেকের ভিতর গোবিন্দ সিং—এর চিঠি এল। চাকরি মঞ্জুর। তপনের পাসপোর্ট ভিসা ইত্যাদি হয়ে গেল। সিং ব্রাদার্সের কলকাতায় বড়বাজারের অফিস থেকে তপনকে দেওয়া হল ব্যাংকক যাবার একখানি প্লেনের টিকিট। যাওয়ার দিনও এসে পড়ল।

    মায়ের চোখ ছলছল। বন্ধুরা ঘটা করে একটা বিদায় সংবর্ধনা দিয়ে ফেলল তপনকে। তারপর সত্যি একদিন তপন রওনা দিল দমদম থেকে ব্যাংককের পথে।

    ব্যাংকক। থাইল্যান্ড বা শ্যামদেশের রাজধানী।

    তপন এক মাস হল ব্যাংককে এসে কাজে যোগ দিয়েছে।

    সিং ব্রাদার্সের মালিক গোবিন্দ সিং—এর বয়স প্রায় ষাট। শক্ত সমর্থ সর্দারজি। বহু দেশে ঘুরেছেন, অনেকগুলো ভাষা জানেন, দিলদরিয়া লোক। তপনের সঙ্গে কথা বলেন ইংরেজি বা হিন্দিতে। মেনাম নদীর কাছে রাজাবংশী রোডে সিং ব্রাদার্সের মস্ত গুদাম। দক্ষিণ—পূর্ব এশিয়ায় অগুনতি ছোট—বড় দ্বীপ। অনেক দ্বীপেই নানারকম মশলার গাছ জন্মায়। তাই ইউরোপীয়ানরা এইসব দ্বীপকে বলত স্পাইস—আইল্যান্ডস। সিং ব্রাদার্স এই অঞ্চলের নানা জায়গা থেকে লবঙ্গ, গোলমরিচ, জায়ফল, এলাচ ইত্যাদি আমদানি করে। বড় বড় নৌকো আর লঞ্চে করে নদীপথে ব্যাংককে আনে। সেগুলো জমা হয় গুদামে, তারপর চালান যায় ভারতবর্ষে। আবার ভারত থেকে সিং ব্রাদার্স আনে রেশম ও চা। মালের হিসেব রাখা, নদীর ঘাট থেকে জিনিস ছাড়িয়ে আনা। সব কাজই করতে হয় তপনকে। এসব ব্যাপারে তার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে মন দিয়ে শেখে, মশলার রকমফের চেনে।

    গোবিন্দ সিং থাকেন নিউ রোডে। গুদাম থেকে বেশি দূরে নয়। তপনের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে মহারাজ রোডে, গোবিন্দ সিং—এর বাড়ির কাছেই। খায় একটা পাঞ্জাবি হোটেলে—ভাত রুটি সবজি ডাল তরকারি। দইও মেলে।

    তপন সপ্তাহে একখানা চিঠি দেয় বাড়িতে। মাকে লেখে—কিছু ভেবো না। দিব্যি আছি। তিলু মিলুকে লেখে ওই দেশের খবর—

    ব্যাংকক বিরাট শহর, মেনাম নদীর দু—ধারে ছড়ানো। পুব পাশেই শহর বেশি জমজমাট। নদী থেকে অনেকগুলো খাল বেরিয়ে ঢুকে গেছে শহরের ভিতর। খালগুলোর ওপর দিয়ে অজস্র সাঁকো। থাইরা খালকে বলে কেলাং। বইয়ে পড়েছিস তো, ইটালির ভেনিস শহরে যেমন খাল আছে তেমনি। এই খালগুলোকে রাস্তাও বলা চলে, কারণ তাহই দিয়ে চলে অসংখ্য ছোট ছোট নৌকো, লোজন জিনিসপত্র নিয়ে। নৌকোর ওপর রীতিমতো বাজার বসে। নাম দিয়েছে—ফ্লোটিং মার্কেট। মাসখানেকে এত বড় শহরের কতটুকুই বা দেখেছি।

    কলকাতার মতোই এর কোনো অংশে আধুনিক বাড়িঘর হোটেল, চওড়া ঝকঝকে রাস্তা, আবার কোনো কোনো অংশে গলিঘঁজি বস্তি, পুরনো নোংরা ঘুপচি বাড়ি, দোকানপাট। মেনাম নদীতে নৌকো, বজরা, স্টিমার গিজগিজ করে। শ্যাম উপসাগরে পড়েছে মেনাম। বড় জাহাজ মোহনার বেশি ঢুকতে পারে না।

    এদেশে বেশিরভাগ লোকই বৌদ্ধ। সাত—আটশো বছর আগে এখানে ভারতীয় হিন্দু সভ্যতার বিস্তার হয়েছিল। তাই শহরে ছড়িয়ে আছে এই দুই ধর্মের নিদর্শন। পথের ধারে কত যে বৌদ্ধ মন্দির বা ওয়াট। ঢালু ছাদ, ছুঁচালো মাথা, প্যাগোডা চেহারার মন্দিরগুলি। মন্দিরের গায়ে কেবল বুদ্ধমূর্তি—নানান আকার, নানান ছাঁদ দেখে দেখে একঘেয়ে লাগছে।

    পথের নাম দেখে ভারি মজা লাগে। মহারাজ রোড, রাম এক, রাম দুই, এমনি সব নাম। আগে এখানকার রাজাদের নাম ছিল নাকি রাম দিয়ে। প্রাচীন রাজধানীর নাম অযোধ্যা। ঘুরতে ফিরতে বিদেশ বলে মনে হয় না।

    কত দেশের লোকের বাস। বিদেশিদের মধ্যে চিনারাই সবচেয়ে বেশি। বেশিরভাগ লোক বাইরে প্যান্ট—শার্ট পরে। তাছাড়া পাজামা লুঙ্গি কুর্তা এমনকি ধুতি—পরা লোকও দেখেছি। পথেঘাটে ঘঘারে প্রচুর হলুদ আলখাল্লা—পরা পুরুষ। এরা নাকি শ্ৰমণ অর্থাৎ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। শুনেছি প্রত্যেক বৌদ্ধ থাই অন্তত কিছু দিনের জন্য সন্ন্যাস নেয়, শ্রমণ হয়। থাইরা বেশ আমুদে। চিনা প্যাটার্নের চেহারা। জানিস, এ—দেশের টাকার নাম ভাট। প্রায় চল্লিশ পয়সার সমান এক ভাট।

    শান্ত ভদ্র তপনকে গোবিন্দ সিং—এর পছন্দ হয়েছে। গোবিন্দ সিং—এর সঙ্গে থাকেন তার। স্ত্রী এবং ছোট ছেলে। ছেলের বয়স বছর পঁচিশ। বাবার ব্যবসা দেখে। বড় ছেলে গেছে। কানাডা, কাগজ তৈরি শিখতে। ফিরে এসে এখানে কাগজের কল বানাবে।

    সময় পেলে গোবিন্দ সিং গল্প করেন। তিনি তপনকে কখনো ডাকেন তপনবাব, কখনো শুধু বাবু। বলেন, কত দেশ দেখলাম, কত কী শিখলাম, বড় ছেলে ফিরে এলে আমার ছুটি। আর দু—তিন বছর। তারপর দেশে চলে যাব, লুধিয়ানা। খেত—খামার করব। তখন ইচ্ছে হলে তুমি চলে যেও আমার কলকাতার অফিসে। ওখানে ভালো লোক দরকার।

    তিলু মিলুকে লিখল তপন—

    কয়েকটা নামকরা বৌদ্ধমন্দির দেখে ফেলেছি। যেমন ওয়াট পো, ওয়াট অরুণ ওয়াট ফ্রা—কিও। ফ্রা—কিওতে আছে বিখ্যাত এমারেল্ড বুদ্ধ। মন্দিরগুলোয় বিষ্ণু, গরুড়, কিন্নর, ড্রাগন ইত্যাদির মূর্তি। বড় বড় মন্দির সোনা আর মণি—মাণিক্যের ছড়াছডি। আর দেখেছি রাজপ্রাসাদ ও মিউজিয়াম। একটা ছুটির দিনে প্রাচীন রাজধানী অযোধ্যা দেখতে যাব। ঘোরার সময় তেমন পাই না। এত রাস্তা, ভয় হয় পথ না হারাই। পকেটে ব্যাংককের একটা ম্যাপ রাখি। হ্যাঁ, মিল ঠিক বলেছিলি, এখানে কাপড়ের ওপর বাটিকের কাজ চমৎকার। থাইরা ঘরে ঘরে বাটিক করে। নিয়ে যাব তোর জন্যে।

    এই অযোধ্যা দেখতে গিয়েই এক রবিবার তপনের সঙ্গে আলাপ হল ডক্টর ইন্দ দত্তর, ফলে তার জীবনে আর একটা চমকপ্রদ মোড় ফিরল।

    ব্যাংককের উত্তরে অযোধ্যা। সকালে ট্রেনে চড়ে রওনা দিল তপন। ঘণ্টা দুই লাগল পৌঁছতে। মেনাম নদীর ভিতর কয়েকটি দ্বীপ এবং নদীর দুই তীরে ছড়িয়ে আছে এই রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ। প্রায় দুশো বছর আগে বর্মীদের আক্রমণে এই নগর ধ্বংস হয়।

    তপন ঘুরে ঘুরে দেখছিল। আরও অনেক টুরিস্ট এসেছিল। একটি লোককে তার বিশেষ ভাবে নজরে পড়ল।

    ভদ্রলোক অন্তত ছ—ফুট লম্বা। শক্ত গড়ন, ফর্সা রং, সুশ্রী ধারাল মুখ। জুলপি ও রগের চুলে সামান্য পাক ধরেছে। পরনে ট্রাউজার্স ও ফুলশার্ট, মাথায় সাদা পানামা টুপি।

    ভদ্রলোক মোটেই পুরনো মন্দির বা প্রাসাদ দেখছিলেন না। দূরবিন চোখে লাগিয়ে গাছে গাছে পাখি দেখে বেড়াচ্ছিলেন। চারপাশের লোকজন সম্বন্ধে ভ্রূক্ষেপ নেই।

    তপনের কৌতূহল হয়। সে ভদ্রলোকের পিছু পিছু ঘুরতে থাকে। এইরকম দূরবিন দিয়ে পাখি দেখার ব্যাপারটায় তার আগ্রহ ছিল। তার এক মামার ছিল এই শখ। উনি আসামে। থাকেন। একবার কলকাতায় এসে তপনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন ঢাকুরিয়ায় পাখি। দেখতে। ইনিও বোধহয় পক্ষিবিদ।

    জায়গাটা নিরালা। ভদ্রলোক চোখ থেকে দূরবিন নামিয়ে ফিরলেন। তপন হাত কুড়ি পিছনে। তপনকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত দেখে তিনি পরিষ্কার বাংলায় বললেন, বাঙালি?

    তপন চমকে থতমত খেয়ে ঘাড় নাড়ল।

    বেড়াতে এসেছেন?

    না। মানে আমি ব্যাংককে থাকি, জবাব দিল তপন।

    ও! কী করেন?

    চাকরি।

    হুঁ। ঠিক চিনেছি বাঙালি। ভদ্রলোক হাসিমুখে এগিয়ে এলেন।

    কী করে বুঝলেন? খানিকটা চেহারায়, আর খানিকটা কথা শুনে। তখন নিজের মনে বিড়বিড় করছিলেন যে বাংলায়।

    আপনিও কি বাঙালি? তপন জিজ্ঞেস করল।

    না, তা ঠিক নয়। আমি থাই, বলেই ভদ্রলোক হো—হো করে হেসে উঠলেন।

    মানে! তপন ভ্যাবাচ্যাকা খায়।

    মানে জন্মসূত্রে বাঙালি বটে কিন্তু এই দেশের নাগরিক, এই দেশেই মানুষ হয়েছি। আমার নাম ইন্দ্র দত্ত।

    আমি তপন রায়। কলকাতায় থাকতাম।

    পাখির শখ আছে নাকি?

    নাঃ, তেমন কিছু নয়। আপনাকে দেখেই বেশি কৌতূহল হচ্ছিল।

    কফি চলবে?

    ভদ্রলোক কাঁধে ঝোলানো কফির ফ্লাস্ক নামিয়ে ঘাসে বসলেন। তপন বসল পাশে। একটু একটু করে আলাপ জমে উঠল।

    ডক্টর ইন্দ্র দত্ত ব্যাংকক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিতত্ত্বের অধ্যাপক। এই দেশেই জন্মেছেন। এদেশেই পড়াশোনা। অবশ্য ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সেও পড়েছেন কিছুকাল। বাবা বিষ্ণু দত্ত ছিলেন ডাক্তার। কলকাতায় থাকতেন। ভারতের স্বদেশি আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ফলে ইংরেজ সরকারের বিষনজরে পড়েন। জেল খাটা এড়াতে তিনি ভারত ছেড়ে পালান। বর্মা ঘরে আসেন শ্যামদেশে। ব্যাংককে বাস করতে থাকেন। ডক্টর ইন্দ্র দত্তর মা ছিলেন কা—প্রবাসী বাঙালি। ভদ্রলোকের বাংলা উচ্চারণ একটু বাঁকা বাঁকা। এদেশে মানুষ হয়েও বাংলা চর্চা করেছেন এই আশ্চর্য।

    ইন্দ্র দত্ত দিলখোলা মানুষ। তপনের সব খবর নিলেন। চট করে আপনি থেকে তুমিতে নেমে এলেন—তোমাকে আবার আপনি বলব কী হে।

    কথায় কথায় ডক্টর দত্ত বললেন, আমার বাবা বিদেশে থেকে গেলেও মনেপ্রাণে ছিলেন ভারতীয়। পুরো বাঙালি। বাংলা বই আনতেন, বাংলায় কথা বলতেন ঘরে। বাবার মনে বড় দুঃখ ছিল ভারতবর্ষ পরাধীন। তাই যেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এদেশে এলেন, আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন নিয়ে বাবা একেবারে মেতে উঠলেন। কোন্ সাল হবে সেটা? বোধহয় ১৯৪৩। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ দিকে। আমিও যোগ দিয়েছিলাম নেতাজির বাল—সেনায়। তখন আমার সাত—আট বছর বয়স।

    ভারত স্বাধীন হবার পর বাবা দুবার ওদেশে যান। আমি গেছি সঙ্গে। কলকাতায় আমার কিছু আত্মীয়—স্বজন থাকে। তবে যোগাযোগ তেমন নেই। বড় হয়ে আমি তিনবার ইন্ডিয়ায়। গেছি। সুন্দরবন আর জলদাপাড়া রিজার্ভ—ফরেস্ট দেখে এসেছি। বাংলাটা প্রায় ভুলেই গেছিলাম। আমার স্ত্রীর কল্যাণে ফের চর্চা। ও কলকাতার মেয়ে। কেমব্রিজে পড়তে গেছিল। সেখানেই আমাদের আলাপ, তারপর বিয়ে। চলো আজই তোমাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যাব। মণিকা ভীষণ খুশি হবে দেশের ছেলে দেখলে।

    দুপুরে ইন্দ্র দত্তর সঙ্গে ব্যাংককে ফিরল তপন।

    ডক্টর ইন্দ্র দত্তর সঙ্গে আলাপ হয়ে তপন বিদেশে একা থাকার দুঃখ অনেকখানি ভলে গেল। ব্যাংককে আরও কয়েকজন বাঙালির সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল বটে, তবে এমন ঘনিষ্ঠতা হয়নি।

    ডক্টর দত্তর স্ত্রীও খুব ভালো। ভারি গোপ্লে। ওঁরা থাকেন সাদার্ন রোডে। নিজেদের বাড়ি। পরিষ্কার—পরিচ্ছন্ন এলাকা। একতলা বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি, সামনে টকরো জমিতে ফুলের বাগান। তপন সপ্তাহে দু—তিনবার সাইকেলে চেপে হাজির হতে লাগল ডক্টর দত্তর বাড়ি। ওকে বাড়ির ছেলের মতনই আপন করে নিয়েছিলেন তারা। ডক্টর দত্তর ছেলেঙ্গলে নেহা একটি থাই ছেলেকে দত্তক নিয়েছেন। তার বয়স বছর পাঁচ—ছয়। ফুটফুটে দেন। নাম রেখেছেন রবি।

    ডক্টর দত্ত সন্ধের সময় সাধারণত বাড়িতেই থাকতেন। তপনের সঙ্গে নানা বিষয়ে গল্প করতেন—তার নানা দেশের অভিজ্ঞতা, নানান জীবজন্তুর কথা। কত জায়গায় ঘুরেছেন যে ঠিক নেই। জীবজন্তু সম্বন্ধে তপনের আগ্রহ ছিল। ডক্টর দত্তর সঙ্গে আলাপ হয়ে তার নতুন করে চোখ ফোটে। ডক্টর দত্তর কাছ থেকে সে জীবজন্তু ও ভ্রমণ কাহিনির বই নিত পড়তে।

    ইন্দ্র দত্তকে প্রথমে তপন ডক্টর দত্ত বলে ডাকত। ওঁর স্ত্রী আপত্তি জানালেন, তা হবে না। আমায় যখন বউদি বলেছ, ওকেও দাদা বলতে হবে।

    অতএব ডক্টর দত্তকে তপন দত্তদা বলে ডাকতে শুরু করল।

    চার মাস কেটেছে। গোবিন্দ সিং একদিন বললেন, তপনবাবু, আমার এক বন্ধুলোক ব্যাংককে বেড়াতে আসছে। ওর জন্য একটা কিউরিও কিনে এনে দিও। এই আট ডলারের মধ্যে। তোমার পছন্দ ভালো।

    রাজাবংশী রোডের গায়ে একটা রাস্তায় অনেকগুলো কিউরিও—শপ দেখেছিল তপন। বিকেলে সেখানে গেল।

    সরু গলিতে ছোট্ট দোকান। কাঁচের দরজা। ভিতরে কতরকম জিনিস সাজানো। নীলাভ আলোয় রহস্যময় লাগছে। দোকানদার কাউকে দেখা যাচ্ছে না। এটা কিউরিও—শপ। অর্থাৎ দুর্লভ জিনিসের দোকান। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল তপন।

    কাউন্টারে একটি মুখ আবির্ভূত হল। শুকনো হর্তুকির মতো মুখখানা। অজস্র ভাজ। তর্পনের দিকে চেয়ে হাসল সে। চোখ সরু হয়ে গেল। খুদে খুদে দাঁতের মাঝে একটি সোনা—বাঁধানো দাঁত ঝিলিক দিল।

    বৃদ্ধাটিকে মনে হল চিনা রমণী। চুল টান করে ঘাড়ের কাছে গিট দেওয়া। গায়ে নীল রঙের ঢোলা জামা ও পাজামা। একগাল হেসে সে দোকানের শো—কেসের দিকে আঙল। দেখিয়ে বলল—সী।

    তপন এ ধরনের দোকানে কখনো ঢোকেনি আগে। কত অদ্ভুত অদ্ভুত যে জিনিস, কতরকম মূর্তি, ছুরি, পাত্র, ছবি।

    হঠাৎ একটা শো—কেসের ওপর তার চোখ আটকে গেল। সেখানে কয়েকটা পাখি সাজানো রয়েছে। জ্যান্ত নয়, স্টাফ করা। যেমন মিউজিয়ামে থাকে। তপন শুনেছে, গোটা পাখির পালকসুন্ধু চামড়ার মধ্যে কাঠের গুঁড়ো পুরে সেলাই করে দেওয়া হয়। দেখতে মনে হয় স্বাভাবিক পাখি। স্থির অবস্থায় বসা বা দাঁড়ানো।

    শো—কেসের ওপর রয়েছে একটা বাজপাখি, একটা মস্ত কালো কাকাতুয়া, আর একটা অদ্ভুত দেখতে পাখি। কোনো পাখির পালকের এমন বাহার তপন কখনো দেখেনি, কল্পনাও করেনি। একখণ্ড কাঠের ওপর স্ট্যান্ড দিয়ে আটকে দাঁড় করানো রয়েছে পাখিটা। উঃ কী রং! গাঢ় লাল, কমলা, নীল, সবুজ, সাদা, কালো—রেশমের মতো নরম চকচকে পালকে আলো ঠিকরোচ্ছে। লাল আর নীল রঙের পালকই বেশি।

    পাখিটা ছোট। সাত—আট ইঞ্চির বেশি লম্বা নয়। খাটো ল্যাজ। সবচাইতে সুন্দর হচ্ছে তার ল্যাজ থেকে বেরনো দুটি লম্বা পালক। ঠিক যেন দুটি সরু লোহার তার লম্বা হয়ে ডগায় গিয়ে পাকিয়ে গেছে। আর তারের ডগায় সবুজ পালকের গুচ্ছ। ছোট মাথাটি উঁচু করা, ডানা ছড়ানো, যেন এখুনি উড়বে। চোখের মণির জায়গায় দুটি টুকটুকে লাল পুঁতি বসানো। বাঃ! ওই পাখি যখন উড়ে বেড়াত! তপন কল্পনা করে। ঠিক একটুকরো রামধনু যদি উড়ে বেড়ায় তেমনি দেখতে লাগত নিশ্চয়ই।

    সেয়ানা দোকানি তপনের দৃষ্টি অনুসরণ করে অমনি পাখিটাকে নামিয়ে এনে সামনে রেখে বলল, বুরং রাজা।

    তপন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। তখন দোকানি বদ্ধা আধো আধো ইংরেজিতে বলল, প্যারাদাইজ বার্ড।

    ও, এই হচ্ছে বার্ড অফ প্যারাডাইস! এ পাখির কথা পড়েছিল তপন। শুধু নিউগিনি অস্ট্রেলিয়ায় নাকি এই পাখি মেলে। পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর পাখি। এ পাখিটায় কিন্তু বেশ খুত আছে। দূর থেকে বোঝা যায় না এমনভাবে রেখেছিল। পাখির একটা ডানার পালন প্রায় উঠে গেছে, আর একটি পায়ের আধখানা কাটা।

    হঠাৎ তপনের মাথায় এল এটা দত্তদাকে প্রেজেন্ট করলে কেমন হয়? ওর বাড়িতে এমনি স্টাফ করা একটা কাঠঠোকরা পাখি আছে। এটা পেলে উনি খুশি হবেন নিশ্চয়। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে দরদস্তুর শুরু হল।

    কত দাম?

    বুড়ি মাথা নেড়ে, দাঁতের ঝিলিক দেখিয়ে দু—হাতের দশ দশ আঙুল ছড়িয়ে জানান— টুয়েন্টি ডলার।

    বাপরে থাক, অত পয়সা নেই। তাছাড়া অনেক খুঁত রয়েছে।

    অমনি দাম নেমে এল—ফিফটিন।

    নাঃ।

    কত দেবে?

    টেন।

    থার্টিন।

    নো নো টেন। তপন মাথা নাড়ল।

    বুড়ি মিটিমিটি করে দেখল খানিক। বুঝল তপন আর উঠবে না কিছুতেই। সে একটু হতাশভাবে বলল, অলরাইট, তে।

    তপন হিসেব করে দাম দিল ভাট—এ।

    দোকানি বুড়ি স্ট্যান্ড থেকে পাখিটা খুলে তার পাখা মুড়ে ছোট্ট করে ফেলল। তারপর প্লাস্টিকের থলিতে পুরে বেঁধে দিল। স্ট্যান্ডটা আলাদা দিল। আবার ইচ্ছেমতো এটাকে সাজিয়ে রাখা যাবে।

    গোবিন্দ সিং—এর বন্ধুর জন্য তপন নিল একটা কাগজ—কাটার ছুরি—পিতলের হাতলে রঙচঙে পাথর বসানো।

  • রক্তচোষা

    রক্তচোষা

    অজেয় রায়

    [book]

    রক্তচোষা

    গ্রীষ্মের ছুটির শেষ দিক। আমি আর সুনন্দ বেড়াতে গেলাম ঘাটশিলায়।

    সুনন্দর মামার একটা বাড়ি আছে ঘাটশিলায়। কেউ বড় যায়—টায় না। বন্ধই থাকে। বারোমাস। একজন মালি বাড়ি আগলায়। সুতরাং ইচ্ছে ছিল নির্বিঘ্নে আড্ডা মারব। এ বেড়াব। আমরা দুজনে কলেজে পড়ি। বেজায় বন্ধ। কলকাতার ভিড় আর হট্টগোল ছেড়ে এমন খোলামেলা প্রকৃতিরাজ্যে এসে মন আমাদের উড়তে লাগল।

    ঘাটশিলা শহরটি তকতকে পরিষ্কার। বাড়িঘর লোকজনের ঘেঁষাঘেষি নেই। শহরের বাইরে চারপাশে ধু—ধু পাথুরে মাঠ। কোথাও শাল বন। একধারে পরপর কতগুলো জঙ্গলে ঢাকা ছোট ছোট পাহাড়। শহরের পাশ দিয়ে গেছে সুবর্ণরেখা নদী। চওড়া নদীখাতের ভিতর প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পাথরের চাইয়ের ফাঁকে হু—হুঁ করে জল ছুটে চলেছে। সুবর্ণরেখা ছাড়াও কয়েকটি ছোট ছোট পাহাড়ি নদী আছে ধারে কাছে।

    সুনন্দর মামার বাড়িটা শহরের প্রায় বাইরে একটু নির্জন অংশে। ধলভূমগড় যাবার পিচ বাঁধানো চওড়া রাস্তাটা আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে গেছে। এই পথ শহর ছাড়িয়ে, প্রান্তর ভেদ করে, শালবনের গা ছুঁয়ে দূর দিগন্তে গিয়ে মিশেছে। তখন একটু একটু বর্ষা নেমেছে। গরম কমেছে। যদিও দিনের বেলা চড়া রোদ ওঠে, আমাদের কিন্তু পরোয়া নেই। দুটো সাইকেল জোগাড় করে দিনের বেলা টো—টো করে ঘুরে বেড়াই। রাতে বিছানায় শুয়ে শুনতে পাই হায়নার এ্যাক—খ্যাক হাসি। মালির বউ লছমি রান্না করে দেয়। ভাত—ডাল—তরকারি সে মোটামুটি রাঁধে। কিন্তু মাছ—মাংস নিজেরাই বানাই।

    ভোরবেলা প্রায়ই হাজির হয় বুধন মাঝি। কোনোদিন সে আনে তাজা ফলমূল, মাছ। মুরগি বা ডিম। কোনোদিন মধু। কখনও বা কলসি ভরা টাটকা খেজুর রস।

    বুধন মাঝি সাঁওতাল। মাঝবয়সী। আমাদের সঙ্গে তার বেশ ভাব হয়ে গেছে। ও থাকে মাইল তিন—চার দূরে এক গ্রামে। গ্রামের নাম মহুয়াডাঙা। বুধন ঘাটশিলার বাজারে জিনিস বিক্রি করতে যায়। পথে আমাদের বাড়িতে বসে প্রায়ই খানিক গল্প করে নেয়। লোকটি চায়ের ভক্ত। চায়ের সময় এলে আমরা ওকে চা অফার করি। বুধন লাজুক লাজক মখে চক্ষ মুদে চায়ের কাপে চুমুক দেয়।

    মোটামুটি একই ছাঁদে কাটছিল দিনগুলো। হঠাৎ ঘটনার মোড় গেল ঘরে।

    একদিন বর্ধন এল ভোরে। কয়েকটা ডিম এনেছে বিক্রি করতে। লক্ষ করলাম, তার ভারি বিষণ্ণ। সুনন্দ ঠাট্টা করল,—কি বুধন, মুখ ব্যাজার কেন, বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। বুঝি?

    বুধন মাথা নাড়ল। তারপর কেমন ঝিম মেরে বসে রইল।

    বুঝলাম, ব্যাপার কিছু গুরুতর। হয়তো ওর বাড়িতে কারো অসুখ—বিসুখ করেছে। আমি সহানুভূতি দেখাই—বুধন, বলো শুনি হয়েছেটা কী!

    বুধন মুখ তুলে করুণ সুরে বলল, বাবু, আমার ভাইটারে মেরে ফেলবে। ঠিক মেরে ফেলবে।

    সে কি! বুধনের এক ছোটভাই আছে শুনেছিলাম। তার বেশি কিছু জানতাম না। কিন্তু তাকে মারবে কে? কেন?

    একটু একটু করে বুধনের কাছ থেকে উদ্ধার করলাম সমস্ত ঘটনা। এক আশ্চর্য অবিশ্বাস্য কাহিনি। মহুয়াডাঙায় নাকি রক্তচোষার আবির্ভাব ঘটেছে। মানুষের রক্তলোভী কোনো নিশাচর প্রাণী। আর গ্রামের লোকের সন্দেহ, বুধনের ভাই হচ্ছে এই রক্তচোষা।

    ঘটনার শুরু চারদিন আগে। মহুয়াডাঙায় এক উৎসব ছিল। রাত করে সবাই নাচ গান। করেছে। তারপর যে যেখানে পারে শুয়ে পড়েছে। হঠাৎ নারী—কণ্ঠের আর্তনাদ। অনেকে ছুটে আসে। বোকামাঝির বউ জামফুল চেঁচাচ্ছে। কোলে তার চার বছরের ছেলে। সবাই .দেখল, বাচ্চাটির গলার পাশ দিয়ে টপটপ করে রক্ত পড়ছে। গলায় ক্ষতচিহ্ন। এক চিলতে চামড়া যেন গোল করে কেটে নেওয়া হয়েছে। আর তলায় মাংসের মধ্যে ছোট্ট গর্তের মত ফুটো। ক্রমাগত রক্ত বেরিয়ে আসছে ওই ক্ষত থেকে।

    জামফুল বলল যে, সে আর তার ছেলে ঘুমোচ্ছিল ঘরের দাওয়ায়। হঠাৎ ছেলের কান্না শুনে উঠে দেখে এই কাণ্ড।

    এ কীসের কামড়? সবাই পরামর্শ করল। ইঁদুর? ছুঁচো? সাপ—টাপ? উঁহু, ওসব নয়। অভিজ্ঞ লোকেরা কাটা জায়গা পরীক্ষা করে জানাল। তবে কি কোনো পোকা—মাকড়? কেউ সঠিক বুঝতে পারে না। যাহোক ন্যাকড়াপোড়া চাপা দিতে রক্ত বন্ধ হল।

    জামফুল আর একটা খবর দিয়েছিল। সে নাকি ছেলের কান্নায় ঘুম ভেঙেই দেখে বুনো। সামনে দিয়ে হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে।

    সেদিন কেউ বুনোকে নিয়ে মাথা ঘামায় নি। বুনো সম্বন্ধে গ্রামের লোকের সন্দেহ জাগল আরও দুদিন পরে। অর্থাৎ গত পরশু রাতে।

    ঢেঙ্গা মাঝি বুনোর প্রতিবেশী। ঢেঙ্গা ঘুমিয়েছিল তার খড়ের চালার নিচে খাঁটিয়া পেতে। একসময় ঘুম ভেঙে ঘাড়ে হাত দিয়ে বোঝে চটচটে কী যেন! দেশলাই জ্বেলে দেখে, রক্ত বেরোচ্ছে। গায়েও শুকনো রক্ত লেগে আছে। সেই একই রকম ক্ষতচিহ্ন। রক্ত যেন থামতে চায় না।

    গ্রামের লোক আর ব্যাপারটাকে তুচ্ছ করে উড়িয়ে দিতে পারল না। কোনো চেনা জীব—জন্তুর দাঁত বা নখের দাগ নয়। তাদের ধারণা হয়েছে এ নিশ্চয়ই কোনো পিশাচ বা দানোর কীর্তি। সে ঘুমন্ত মানুষের দেহ ফুটো করে রক্ত চুষে নিচ্ছে। কে করতে পারে একাজ? একটা বিশেষ কারণে সবার বুনোর ওপর নজর পড়ল।

    বুধনের ভাই নামে বুনো, স্বভাবেও বুনো। সে ছোটবেলা থেকে বাউণ্ডুলে। একরোখা দুর্ধর্ষ প্রকৃতির। কতবার বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। মাসের পর মাস পাহাড়ে—জঙ্গলে ঘুরেছে। কাজকর্ম চাষবাসে মন নেই। যত অদ্ভুত বিদ্যে শেখার ঝোঁক। ওঝাদের কাছে সাকরেদি করে মন্ত্র—তন্ত্র তুকতাক শিখেছে অনেক। অতি বদরাগী। কারোর সঙ্গে সদ্ভাব নেই। বুধনের সঙ্গেও নয়। ঢেঙ্গার সঙ্গে বুনোর কদিন আগে ঝগড়া হয়েছিল। দুজনের বাড়ির সীমানায় একটা কলগাছের দখল নিয়ে বুনো ঢেঙ্গাকে শাসিয়েছিল। ঢেঙ্গা বলেছে, যখন তার বউ ঢেঙ্গার ঘাড়ের রক্ত বন্ধ করতে ব্যস্ত, তখন সে দেখেছে, তার উঠোনে বুনো দাঁড়িয়ে। তার বাড়িতে এত রাতে বুনো এসেছিল কী করতে?

    গ্রামের লোক আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, রাতের বেলা বুনো নিশ্চয়ই দানো হয়ে মানুষের রক্ত চুষে খায়। গ্রামের মোড়ল বুনোকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে, সে দারুণ চটে যায়। বলে মিছিমিছি সবাই তার পিছনে লাগছে। এ ব্যাপারে তার কোনো হাত নেই। ঢেঙ্গার চিৎকার শুনে সে দেখতে গিয়েছিল ব্যাপারটা কী। কিন্তু গ্রামের লোকের বিশ্বাস হয়নি বুনোর কথা।

    ফুসফাস গুজগাজ আরম্ভ হয়েছে। বুনোই দায়ী। এ বুনোর কাজ। মহুয়াডাঙর মানুষগুলোকে সে এবার মেরে ফেলবে। ও আর মানুষ নেই। দানো হয়ে গেছে। কেউ বলছে, তাড়িয়ে দে গাঁ থেকে। কেউ বলছে মেরে ফেল, পিটিয়ে।

    গল্প শুনে আমরা থ। এমন কাণ্ড সম্ভব!

    আমি প্রশ্ন করলাম, সত্যি বুনো এরকম কাজ করতে পারে নাকি? তুই জানিস?

    বুধন বলল, আমি আড়ালে জিজ্ঞেস করেছিলাম ওকে। বুনো বলেছে, আমি করি নি। মনে হল ও মিছে কথা বলছে না।

    সুনন্দ বলল, বুধন তোর ভাইকে কিছু দিনের জন্যে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বল। একবার যখন সন্দেহ ঢুকেছে মাথায়, বারবার এরকম হলে, হয়তো মরিয়া হয়ে গ্রামের লোক বুনোকে খুন করে বসবে।

    বুধন হতাশভাবে বলল, বলেছিলাম তাই। বুনো যাবে না।

    —কেন?

    —ওই মেয়েটার জন্যে।

    —কে মেয়ে?

    বুধন বলল, বুনো বিয়ে করেছিল। বউ মরে গেছে। কিন্তু পাঁচ বছরের একটি মেয়ে আছে তার। মেয়েটি হতভাগ্য পঙ্গু। বছর দেড়েক আগে পড়ে গিয়ে তার ডান পায়ে চোট লাগে। তারপর পাটা ক্রমশ শুকিয়ে সরু হয়ে যাচ্ছে। জোর নেই পায়ে। প্রায় সব সময়। শুয়ে থাকে। বসে—বসে হাতে ভর দিয়ে হিচঁড়ে—হিঁচড়ে কোনোরকমে একটু—আধটু নড়াচড়া করে। ওকে নাইয়ে খাইয়ে দিতে হয়। এক বুড়ি তার দেখাশোনা করে।

    মেয়ের ওপর বুনোর প্রচণ্ড টান। মেয়ের জন্যই সে আজকাল বাড়ি ছেড়ে দুরে যায় না। দুনিয়ায় একমাত্র এই মানুষটিকেই সে ভালবাসে। বুনোর ভয়, সে গ্রাম ছেড়ে চলে গেলে। তার মেয়েকে মেরে ফেলবে লোকে। বুধনকেও তার বিশ্বাস নেই। আবার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে কোথাও গেলে, খোঁড়া মেয়েকে রাখবে কোথায়? সে সারাদিন মজরি খাটতে গেলে, মেয়ের যত্ন করবে কে? সুতরাং সে জেদ ধরেছে, গ্রামেই থাকবে। তাতে যা চা হোক।

    আমি ও সুনন্দ মাথা ঘামাতে শুরু করলাম।

    বুনো যতই একগুঁয়ে বা রাগী হোক, স্রেফ সন্দেহের শিকার হয়ে, তাকে মারা পড়তে দেওয়া যায় না। ওই অসহায় মেয়েটার ভাগ্যে তখন কী ঘটবে? এ কাজ কার? সত্যি কোনো মানুষ পিশাচের? না কোনো জন্তু জানোয়ারের? গ্রামের অন্য কোনো শয়তান কি এই কীর্তি করে বুনোর ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে? কেউ তো স্বচক্ষে দেখে নি বুনোকে রক্তপান করতে। এখন বুনোকে, তার মেয়েকে, বাঁচাই কী করে! দুই বন্ধু প্রাণপণে বুদ্ধি হাতড়াতে থাকি।

    আমি বললাম, পুলিশে খবর দিলে কেমন হয়?

    সুনন্দ বলল, কোনো লাভ নেই। গ্রামের ঘরোয়া ব্যাপারে পুলিশ নাক গলাবে না।

    বললাম, তবু চেষ্টা করি। যদি যায় পুলিশ, একটু ভয় দেখিয়ে আসে। তাহলে চট করে বুনোর ক্ষতি করতে অন্যেরা হয়তো সাহস পাবে না। ইতিমধ্যে রক্তচোষার ব্যাপারটা থেমে যেতে পারে।

    সুনন্দ ঘাড় নাড়ল—যাবে না পুলিশ। স্রেফ গুজব শুনে তিন—চার মাইল পথ ঠেঙিয়ে যেতে রাজী হবে না। উলটে আমাদের ঠাট্টা করবে। হ্যাঁ যাবে, যদি খুনখারাবি কিছু হয়, তারপর।

    তখন গিয়ে লাভটা কী হবে ঘোড়ার ডিম!—আমি রেগে বললাম।

    তিনজনে চুপচাপ বসে আছি। বুনোকে বাঁচাবার কোনো উপায় আমাদের মাথায় আসছে না। সুনন্দ বলে উঠল, ঠিক আছে, পুলিশ না যাক, আমরা যাব। মাঝেমাঝে ঘুরে আসব ওই গ্রামে। বুনোর খোঁজখবর করব। তাহলে গ্রামের লোক সাবধান হয়ে যাবে। কিন্তু একটা ছুতো চাই। হ্যাঁ, মুরগি। মুরগির খোঁজে যাওয়া যেতে পারে। বুধন, বুনোর মুরগি আছে?

    আছে—জানাল বুধন।

    —বেশ। আমরা দুজনে কাল মুরগি কিনতে যাব বুনোর কাছে। ওকে বলে রাখিস। আমাদের যেন আবার হাঁকিয়ে না দেয়। ওর ভালোর জন্যেই যাচ্ছি। বাইরের লোক বারবার বুনোর খোঁজে আসছে দেখলে, এখন কেউ ওকে মারবার সাহস পাবে না। কারণ জানে, বুনোর কিছু ঘটলে আমাদের তা নজরে পড়বে এবং ঘটনাটা অস্বাভাবিক মনে হলে পুলিশে খবর যাবে।

    আমাদের যুক্তি বুধনের পছন্দ হল। সে খুশিমনে বিদায় নিল।

    সুনন্দ মহা উত্তেজিত। এক রহস্যময় রোমাঞ্চের গন্ধ পেয়ে সে উৎসাহে টগবগ করতে লাগল। আমার মনেও লাগল তার ছোঁয়াচ। আর তার ফল—কী বিচিত্র এক অভিজ্ঞতা!

    দুপুরবেলা। আমি ও সুনন্দ সাইকেলে চেপে মহুয়াডাঙা গ্রামের দিকে চললাম।

    আমাদের বাড়ি থেকে শহর ছাড়িয়ে মাইল খানেক গিয়ে ধলভূমগড় যাওয়ার বড় রাস্তা থেকে ডান পাশে এক সরু মেঠো রাস্তা বেরিয়ে গেছে। ওই পথ মাইল দুই দূরে মহুয়াডাঙায় শেষ হয়েছে। পথের দু—পাশে প্রান্তরে বড় বড় পাথর পড়ে আছে। মাঠে গাছপালা খুব কম। মাঝেমাঝে কয়েকটা শুধু খেজুর তাল বা বাবলা গাছ। আর এক নিঃসঙ্গ প্রাচীন বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে অনেকখানি জায়গা জুড়ে। দূর থেকে মহুয়াডাঙা গ্রাম দেখা যায়। গ্রামে অবশ্য বেশ গাছপালা। একটা পুকুর রয়েছে। এমন অসময়ে দুই শহুরে যুবকের আবির্ভাবে গ্রামের লোক অবাক হয়ে গেল।

    বুনো মাঝির বাড়ি কোনটা?—জিজ্ঞেস করতেই একজন দেখিয়ে দিল আঙুল বাড়িয়ে। কিন্তু তার চোখের অদ্ভুত চাউনিটা আমাদের নজর এড়াল না।

    গ্রামে ঢোকার মুখেই বুনোর বাড়ি। একখানি মাত্র ছোট্ট মাটির ঘর। তাতে খড়ের চাল। তকতকে একফালি উঠোন। একটা প্রকাণ্ড শুয়োর বাড়ির সামনে মাটিতে গড়াচ্ছে। তার গায়ের ওপর চার—পাঁচটা ছানা। ঘরের বাইরে তেতুঁল গাছের ছায়ায় দড়ির খাঁটিয়াতে বুনো বসে ছিল। পাশে তার মেয়ে শুয়ে। সাইকেলটা একটা গাছে ঠেস দিয়ে রেখে আমরা কাছে যেতে বুনো উঠে দাঁড়াল। শুয়োরটা ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে পালাল। পিছনে পিছনে ছুটল তার বাচ্চারা।

    বুনোকে প্রথম দর্শনে ছ্যাঁৎ করে উঠল বুক। কী দুশমনের মতো চেহারা! রীতিমতো লম্বা। গিঁট পাকানো দেহ। মুখে অজস্র ভাঁজ। কাঁধ অবধি কালো কুচকুচে বাবরি চুল। ছোটছোট চোখ দুটো করমচার মতো লালচে। সে ঘাড় কাত করে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল আমাদের দিকে।

    আমি বললাম, তোমার নাম বুনো?

    —হ।

    সুনন্দ বলল, আমাদের বুধন পাঠিয়েছে। আমরা মুরগি কিনতে এসেছি।

    মুরগি মাঠে চরছে। এখন ধরা যাবে না।—বুনোর কণ্ঠস্বর ফাঁসফ্যাসে। ওর ভাবভঙ্গি দেখে বুঝলাম, আমাদের আগমনে মোটেই খুশি হয়নি। নেহাৎ যেন ঠেকায় পড়ে আমাদের উপস্থিতি সহ্য করছে। ওর দাঁতগুলো বড় বড়। চওড়া হাঁ। দেখলেই মনে হয়, লোকটা রাগী বেপরোয়া।

    আমি বেশ চটলাম মনে মনে। এমন খুনি চেহারার বেয়াদপ লোকটার নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত হতে ভারি দায় পড়েছে আমাদের। ফিরে যাই। ওর বরাতে যা হবার তোক। আমাদের বয়ে গেছে। কষ্ট করে এলাম এতদূর, এই ঢের। সত্যি কথা বলতে কি, লোকটাকে দেখে অবধি আমার মন বলছিল, এর দ্বারা যে কোনো ভয়ঙ্কর কাজ সম্ভব। হয়তো গ্রামের লোকের ধারণা ঠিকই। বুধন তার ভাই সম্পর্কে দুর্বল। তাই অন্যদের কথা মানতে চাইছে না।

    সুনন্দ কিন্তু বুনোর ব্যবহারে দমল না। দিব্যি খোশমেজাজে বলল, বেশ আমরা আবার পরশুদিন আসব। একটা মুরগি ধরে রাখিস। এখন একটু জল খাওয়া দিকি। বড্ড তেষ্টা পেয়েছে।

    বুনো নিঃশব্দে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। আমাদের দৃষ্টি পড়ল খাঁটিয়ায় শোওয়া ছোট্ট মেয়েটির দিকে। আহা, মুখখানি কী মিষ্টি! করুণ চোখে অবাক হয়ে দেখছে। একটি পা। তার সরু। অক্ষম। শরীরও খুব রোগা। বড় মায়া হল।

    সুনন্দ চাপা স্বরে বলল, অসিত, দেখ, অনেকে লক্ষ করছে আমাদের।

    কথাটা ঠিক। আড়াল—আবডাল থেকে অনেকে মেয়ে—পুরুষ উঁকিঝুঁকি মারছিল। তাদের চোখে কৌতূহল।

    বুনো জল আনল ঝকঝকে পিতলের ঘটিতে। খেলাম জল। যাবার সময় সুনন্দ চেঁচিয়ে বলে গেল বুনো, আমরা পরশুদিন আবার আসব।

    প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে ফিরে চলেছি। গ্রাম ছাড়িয়ে খানিক গিয়ে এক দৃশ্য দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। আসার সময় মহুয়াডাঙা থেকে প্রায় মাইল খানেক দূরে মাঠের মধ্যে প্রকাণ্ড একটা বটগাছ দেখেছিলাম। সেই গাছের নীচে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ আকৃতি। পরনে গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি ও সাদা পায়জামা। চোখে দূরবিন লাগিয়ে গাছের ডালে না জানি কী দেখছে।

    সুনন্দ বলল, প্রতাপ রুদ্র। ঝাউবাংলোতে থাকেন।

    আমাদের পাড়ার একেবারে শেষ বাড়িটা হল ঝাউবাংলো। এই নাম স্থানীয় লোকদের দেওয়া। ঝাউবাংলো অন্য বাড়িগুলোর থেকে বেশ খানিক তফাতে। বিরাট কমপাউন্ডওলা বাড়ি। উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। ভিতরে প্রচুর গাছপালা। মস্ত লোহার ফটক থেকে বসত বাডি অবধি কাঁকর—ফেলা চওড়া রাস্তা। তার দুধারে আছে দুসারি ঝাউগাছ। বোধহয় এই জন্যেই ঝাউবাংলো নামের উৎপত্তি। ও বাড়ির বাসিন্দাদের চিনিনা। শুধু জেনেছি প্রতাপ রুদ্র ওই বাড়ির মালিক। ঘাটশিলার স্থানীয় কাউকে বা কোনো চেঞ্জারকে ঝাউবাংলোয় কখনো বেড়াতে যেতে দেখিনি।

    প্রতাপ বাবুকে কয়েকবার মাত্র দেখেছি। খুব ভোরে কালো রঙের থ্যাবড়ামুখো বিশাল এক কুকুর নিয়ে মাঠে বেড়াচ্ছেন। ভদ্রলোকের নিজের চেহারাও চোখে পড়ার মতো। ছ ফুটের ওপর খাড়া শরীর। দোহারা শক্ত গড়ন। রোদে পোড়া ফর্সা রঙ। মাংসহীন লম্বাটে মুখ। চাপা পাতলা ঠোঁট। টিয়া পাখির মতো বাঁকানো নাকের নীচে পাকানো গোঁফ আর চিবুকে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। মাথায় কাঁচা—পাকা ঘন চুল। পরনে থাকে হাঁটু অবধি ঝুলের। পাঞ্জাবি ও পায়জামা। তার গম্ভীর ধরন দেখলে নিজে থেকে আলাপ করার উৎসাহ জাগে না। শুনেছি, ভদ্রলোক দু বছর হল বাড়িখানা কিনে এখানে বাস করছেন। তবে ঘাটশিলায় থাকেন না প্রায়ই। ওই বাড়িটা আগে ছিল এক জমিদারের সম্পত্তি।

    আরও শুনেছি, বাড়িটায় নাকি ছোটখাটো এক চিড়িয়াখানা আছে। কারণ প্রতাপ রুদ্রের পশু পাখির বেজায় শখ। অনেক বিচিত্র জীবজন্তুর ডাক ভেসে আসে বাড়ির ভেতর থেকে। কিন্তু কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়না ভিতরে। প্রতাপ রুদ্র সম্পর্কে আমাদের কৌতূহল জেগেছিল। কিন্তু মেটাবার সুযোগ পাইনি।

    এখানে কী করছেন ভদ্রলোক?—আমি জানতে চাইলাম।

    সুনন্দ বলল, মনে হচ্ছে বার্ড—ওয়াচার। পাখি দেখছে। যাদের এই নেশা থাকে, যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায় পাখির খোঁজে।

    —ভদ্রলোক শুনেছি নানারকম জীবজন্তু পোষেন।

    হ্যাঁ।—বলল সুনন্দ—ওর সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছে আছে। ইন্টারেস্টিং লোক।

    প্রতাপ রুদ্র একবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখলেন আমাদের, তারপর আবার দূরবিন চোখে লাগালেন।

    সাইকেলে পাশাপাশি চলেছি। বললাম, হারে সুনন্দ, বুনো লোকটাকে কেমন লাগল? নিরীহ, মানে সত্যি নির্দোষ, মনে হয় কি?

    নিরীহ মোটেই না।—সুনন্দ জবাব দিল—তবে দোষী না নির্দোষ এখুনি বলা শক্ত।

    অর্থাৎ বুনোর হাবভাবে সুনন্দরও ধোঁকা লেগেছে।

    বিকেলে খরস্রোতা নদী ধরে অনেক দূর বেড়াতে গেলাম দুজনে। ধলভূমগড়ের রাস্তাকে আড়াআড়িভাবে কেটে খরস্রোতা বয়ে চলেছে। রাস্তা গেছে নদীর ওপর সাঁকো দিয়ে।

    ক্ষীণকায় নদীর টলটলে জলে বড়জোর হাঁটু ডোবে। স্ফটিক স্বচ্ছ জলের তলায় নুড়ি—পাথর, বালি, ঝিনুক পরিষ্কার দেখা যায়। কখনো নদীর পারে পারে, কখনো বা ঠাণ্ডা জলের স্রোতে পা ডুবিয়ে অনেকটা হাঁটলাম। ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল।

    সাঁকোর কাছাকাছি পৌঁছেছি, একটি লোক দ্রুত পায়ে সাঁকো পেরিয়ে চলে গেল। প্রতাপ রুদ্র। আমাদের তিনি দেখতে পেলেন না।

    আমরা লক্ষ করলাম, প্রতাপ বাবু কিছুটা এগিয়ে ধলভূমগড়ের রাস্তা ছেড়ে মাঠে নামলেন। ওই তো মহুয়াডাঙা গ্রামে যাবার পথ। শর ঝোঁপের আড়াল থেকে দেখলাম সেই দীর্ঘকায় ঋজু দেহ ক্রমে ছোট হয়ে যাচ্ছে। কখনো বা উঁচু ঢিবির আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আলো কমে আসায় তাকে বেশি দূর অবধি নজর করতে পারলাম না।

    সুনন্দ প্রথমে কথা বলল—কী ব্যাপার! এই সময় ওই দিকে ভদ্রলোক চললেন কোথায়?

    ঠাট্টা করলাম—হয়তো নিশাচর পাখির খোঁজে যাচ্ছে। কিংবা সাঁওতাল গ্রামে হাড়িয়া খাবার অভ্যাস আছে।

    সাঁকোর রেলিংয়ে আমরা আরও ঘণ্টাখানেক বসে রইলাম। একটার পর একটা গান গাইলাম হেঁড়ে গলায়। শেষে গলা ধরে যেতে চায়ের তাগিদে উঠলাম। প্রতাপ রুদ্র কিন্তু তখনও ফিরলেন না।

    পরদিন ভোরে বুধন এল। বুধন জানাল, গতরাতে নাকি আবার রক্তচোষার আবির্ভাব ঘটেছিল মহুয়াডাঙায়। এবার সে হানা দিয়েছে ঘরের মধ্যে। তার শিকার এক যুবক। শেষ রাতে ঘুম ভেঙে দেখে বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলে অবিকল ওই রকম ক্ষত। তা থেকে রক্ত ঝরছে।

    ঘরের দরজা খোলা ছিল?—সুনন্দ প্রশ্ন করে।

    —না।

    —আর জানলা?

    —হ্যাঁ। একটা জানলা খোলা ছিল বটে।

    বুনোকে কেউ দেখেছে নাকি কাছে—পিঠে?—আমি জানতে চাইলাম।

    —উহুঁ। তবে ঢেঙা বলছে, বুনো কাল রাত অবধি জেগে বসেছিল তার উঠোনে। গাঁয়ের লোক ওকেই সন্দেহ করছে।

    বুধন বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে বসে রইল। বেচারা ভাইয়ের বিপদের আশঙ্কায় বড় মুষড়ে পড়েছে।

    সুনন্দ বুধনকে জিজ্ঞেস করল, ওই যে ঝাউবাংলো, ওর মালিককে চিনিস?

    —হুঁ। চিনি। লম্বা পারা মানুষ। কুকুর নিয়ে ঘোরে।

    —আচ্ছা, ওই বাবু কাল রাতে তোদের গ্রামে গিয়েছিল?

    —কই না তো!

    —উনি মহুয়াডাঙায় গিয়েছেন কখনো?

    —হ্যাঁ। গেছে অনেকবার।

    —কী করতে যায়?

    —চোখে নল লাগিয়ে পাখি দেখে।

    —রক্তচোষার ব্যাপারে কিছু জানেন নাকি?

    —তা তো জানিনা বাব। তবে একদিন দূর থেকে দেখেছি, ঢেঙামাঝির সঙ্গে কী সব কথা বলছিল।

    বুধন চলে যেতে সুনন্দ বলল, প্রতাপ রুদ্র কাল রাতে মহুয়াডাঙার দিকে গিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রামে ঢোকেন নি। কোথায় গিয়েছিলেন তবে? আশ্চর্য!

    আমি উত্তর দিলাম—হয়তো মাঠে মাঠে পায়চারি করেছেন। লোকটি বেশ রহস্যময়।

    হুঁ।—সুনন্দ একটু মাথা নাড়ে।

    তখনও রোদের তেজ বাড়েনি। দুজনে বেড়াতে বের হলাম। ঝাউবাংলোর সামনে দেখি, প্রতাপ রুদ্র প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফিরছেন। হাতে চেনে বাঁধা সেই বিরাট কুকুর।

    সুনন্দ সোজা এগিয়ে গেল ভদ্রলোকের দিকে। অমনি বাঘের মতো কুকুরটা গরগর করে উঠে চেনে টান দিল। থমকে দাঁড়াল সুনন্দ। প্রতাপ রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বলল, নমস্কার। আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি। আপনাকে প্রায়ই দেখি। এটা কী জাতের কুকুর জিজ্ঞেস করব ভাবি।

    রুদ্ৰ স্থির চোখে কয়েক মুহূর্ত সুনন্দের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি! আবার একটু কৌতুকের আভাস রয়েছে যেন। সুনদর অবস্থা দেখে মজা পেয়েছেন। সুনন্দ কাঠের মতো দাঁড়িয়ে। বারবার আড় চোখে কুকুরটাকে দেখছে।

    আপনি কুকুর ভালবাসেন?—ভরাট কণ্ঠস্বর।

    —আজ্ঞে হ্যাঁ।

    —এটা ম্যাস্টিফ।

    ওঃ, দারুণ কুকুর! আচ্ছা আপনি তো অনেক জন্তু—জানোয়ার পুষেছেন, দেখাবেন আমাদের? সুনন্দ আলাপ জমাবার চেষ্টা করল।

    প্রতাপ রুদ্রের মুখে কিন্তু কোনো আগ্রহ ফোটে না। আমাদের আর এক প্রস্থ আপাদমস্তক দেখলেন। তারপর বললেন, দেখাতে পারি এক শর্তে।

    —কী?

    —মাত্র একবার দেখাব এবং আর কাউকে জুটিয়ে আনা চলবে না। কাউকে এ খবর বলাও চলবে না। লোকজন এলে আমার কাজের ক্ষতি হয়।

    বেশ তাই হবে।—সুনন্দ তৎক্ষণাৎ রাজি।

    আসুন।—প্রতাপ বাবু আহ্বান জানালেন।

    নেপালি দরোয়ান গেট খুলে দিল। আমরা ভিতরে ঢুকলাম। একজন পরিচারক এসে। নীরবে প্রতাপবাবুর কাছ থেকে কুকুরটা নিয়ে বাড়ির দিকে চলে গেল। পরিচারকটি এ দেশীয় নয়। দারুণ যণ্ডামার্কা জোয়ান। কাকর—বিছানো পথ ধরে চলতে চলতে রুদ্র জেনে নিলেন আমাদের পরিচয়।

    প্রতাপবার একটু ঠাট্টার সুরে বললেন, আমাদের কালেকশনে কিন্তু বাঘ—সিংহ নেই। সবই ছোট জীবজন্তু। সাধারণত যে সব পশু—পাখি কেউ পোযে না, আমি তাদের পোষ মানাবার চেষ্টা করি। ওদের চরিত্রের খুঁটিনাটি স্টাডি করি।

    আমরা বাগানের ভিতরে চললাম। বাগানের এক জায়গায় পর পর পনেরো—ষোলটা বড় বড় খাঁচা। খাঁচাগুলো তারের জালে ঘেরা। মাথায় খড়ের চাল। কোনোটাতে রয়েছে। জন্তু, কোনোটায় পাখি। ঠিক কলকাতা চিড়িয়াখানায় যেমন দেখেছি, তেমনি করে রাখা। হয়েছে জীবজন্তু।

    প্রতাপ রুদ্র একটার পর একটা খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে চিনিয়ে দিতে লাগলেন। লোকটির চেহারা ও কথাবলার ভঙ্গিতে জোরালো ব্যক্তিত্বের ছাপ।

    এক ফাঁকে তিনি বললেন, আমি বয়সে অনেক বড়। আশা করি তুমি বললে আপত্তি নেই।

    আমরা সরবে জানালাম—না না আপত্তির কী আছে?

    প্রতাপ রুদ্র দেখাতে থাকেন, এই এক জোড়া ডিঙ্গো। অস্ট্রেলিয়ার বুনো কুকুর। কিছুতেই পোষ মানে না। তবে আমি কিছুটা বাগ মানাতে পেরেছি।

    তিনি পকেট থেকে বিস্কুট বের করে খাঁচার ভিতর ছুঁড়ে দিলেন। অনেকটা আমাদের দেশি কুকুরের মতো চেহারা। মেটে লাল রঙের ডিঙ্গো দুটো বিস্কুট খেয়ে লেজ নাড়তে লাগল। তারপর রুদ্র দেখালেন, এই হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার কোয়ালা।

    প্রাণীটি ঠিক যেন ক্ষুদে ভালুক। রুদ্র বললেন, এ ভাল্লুক নয়। ভাল্লুক স্তন্যপায়ী। এরা মারসিউপিয়ান। অর্থাৎ পেটের তলায় থলিতে বাচ্চা বয়ে বেড়ায়। যেমন ক্যাঙ্গারু।

    একটা খাঁচার সামনে দাঁড়াতেই কালো—সাদা নোমওলা বেঁজি জাতীয় দুটো জন্তু দাঁত খিঁচিয়ে উঠল। রুদ্র বললেন, উদ্ভারিন। উত্তর আমেরিকার বেঁজি। খুব হিংস্র।

    এরপর দেখলাম, মাদাগাস্কারের লেমুর ও শ্লথ। আফ্রিকার বনবিড়াল। দক্ষিণ আমেরিকার ধেড়ে ইঁদুর এগুটি ইত্যাদি নানা অদ্ভুত জন্তু।

    তারপর পাখি। কতরকম রঙবেরঙের পাখি। বেশির ভাগেরই নাম শুনিনি। কোনোটা ভারি সুন্দর শিস দিচ্ছে। গাছের ছায়ায় দাঁড়ের ওপর সরু চেন পা বাঁধা এক কাকাতুয়া বসে ছিল। তার গায়ের পালক ধবধবে সাদা মাথায় হলদে ঝুঁটি। কালো বাঁকা ঠোঁট। আমরা কাছে যেতে চোখ পাকিয়ে তড়বড় করে পরিষ্কার গলায় বলতে লাগল গুড মর্নিং, গুড মর্নিং। নমস্কার, নমস্কার।

    রুদ্র বললেন, ও তাক বুঝে মানুষের ভাষা ব্যবহার করতে শিখেছে।

    রুদ্র হাত নাড়তে কাকাতুয়া বলে উঠল, বাই বাই!

    সুনন্দ প্রশ্ন করল, মিস্টার রুদ্র, এসব পশু—পাখি আপনি যোগাড় করেন কীভাবে?

    —কিনে আনি নানা দেশ থেকে। দু—একটা নিজেও ধরেছি।

    আমাদের মাথার ওপর ছোট্ট অদ্ভুতদর্শন একটা কালো রঙের বাঁদর গাছের ডালে লেজ, পাকিয়ে মাথা নিচু করে দোল খাচ্ছিল। তার ভাঁটার মতো চোখ। মস্ত লেজ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কোন দেশি বাঁদর?

    —বাঁদর নয়। একরকম ভাম। ব্রাজিল থেকে এনেছি। নাম কিংকাজু। এমনি লেজে ঝোলার অভ্যাস একমাত্র সাউথ আমেরিকার প্রাণীদের মধ্যে দেখা যায়।

    রুদ্র একবার শিস দিতে কিংকাজুটি তড়াক করে নেমে এসে তার পিঠে চড়ে বসল। পরক্ষণেই লম্বা লাফে গাছে উঠে গেল।

    রুদ্র বললেন, আমি দু মাস আগে সাউথ আমেরিকা থেকে ফেরার সময় কতগুলো স্পেসিমেন এনেছিলাম। তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে ভাল পোষ মেনেছে।

    সুনন্দ উসখুস করছিল। এবার কথাটা পাড়ল—মিস্টার রুদ্র, সেদিন আপনাকে মহুয়াডাঙা গ্রামের কাছে দেখলাম; বায়নাকুলার দিয়ে কী যেন দেখছিলেন—

    রুদ্র জবাব দিলেন, পাখি দেখছিলাম।

    সুনন্দ বলল, জানেন, ওই গ্রামে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছে।

    কী? রুদ্র ভুরু কোঁচকালেন।

    —রাত্তির বেলা ঘুমন্ত লোককে কীসে যেন কামড়াচ্ছে। কী কামড়ায়, যখন কামড়ায়, কেউ টের পায় না ঘুম ভেঙে দেখে ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়ছে। গ্রামের লোক খুব ভয় পেয়ে গেছে।

    —কেন?

    —ওদের ধারণা অলৌকিক কাণ্ড। মানে কোনো রক্তচোষা পিশাচ বা দানোর কীর্তি।

    ও।—সংক্ষিপ্ত উত্তর। প্রতাপ বাবু বেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর অন্য কথা কয় করলেন। অর্থাৎ এ বিষয়ে আর আলোচনা করতে চান না।

    সুনন্দ উৎল্পভাবে বলল, আপনি বুঝি অনেক দেশ ঘুরেছেন?

    —হ্যাঁ, তা ঘুরেছি।

    —কোথায় কোথায়?

    —ইউরোপের সব জায়গায়। তাছাড়া মিডল—ইস্ট।

    —আপনার কাছে গল্প শুনতে আসব কিন্তু।

    সরি, এখন নয়। আপাতত কদিন আমি ব্যস্ত আছি।—অত্যন্ত ঠাণ্ডা গলায় প্রতাপ বাবু। সুনন্দর আগ্রহকে থামিয়ে দিলেন।

    প্রতাপবাবুর ব্যবহার শেষ দিকে বেশ রূঢ় মনে হল। আমাদের বসতেও বললেন না। চিড়িয়াখানা দেখা হয়ে যেতে আবার সোজা গেট অবধি আমাদের এগিয়ে দিলেন।

    ফেরার সময় জিজ্ঞেস করলাম, সুনন্দ কী বুঝলি?

    —বুঝলাম যে প্রতাপ বাবু মহুয়াডাঙার ঘটনা জানেন। কিন্তু অন্যদের কাছে ফঁস করতে রাজি নন।

    দ্বিতীয়ত উনি এখন ব্যস্ত।—আমি মন্তব্য করলাম।

    পরদিন বাজার থেকে এসে সুনন্দ বলল, বুঝলি অসিত, প্রতাপবাবু সম্পর্কে একটু খোঁজ—খবর করলাম। লোকটির অতীত সম্বন্ধে কেউ কিছু জানে না। শুধু জানলাম, উনি একজন প্রাণিতত্ত্ববিদ এবং অনেক দেশ—বিদেশে ঘুরেছেন। এখানকার লোকেদের সঙ্গে পরিচয় সামান্য। বিচিত্র স্বভাব। আগের বছর একদল বেদে এসে আস্তানা গেড়েছিল মাঠে। তারা সাপ খেলা দেখাত। নাচগান করত। জড়িবুটি ওষুধ বিক্রি করত। প্রতাপ বাবুর সঙ্গে তাদের বেশ দহরম মহরম হয়। আবার মাস ছয় আগে এক তান্ত্রিক সাধু এসে শালবনের ভিতর কিছুদিন ছিল। তার কাছেও প্রতাপ বাবুকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। তবে লোকটা নাকি পশু—পাখির বিষয়ে একজন এক্সপার্ট। কলকাতা চিড়িয়াখানার সুপারিন্টেন্ডেন্ট একবার ওর সঙ্গে কয়েকটা জন্তু নিয়ে আলোচনা করতে এসেছিলেন।

    সেদিন সন্ধ্যার ঝোঁকে দেখলাম প্রতাপবাবু ঝাউবাংলো থেকে বেরিয়ে খরস্রোতা নদীর দিকে চলে গেলেন। সঙ্গে কুকুরটা নেই। আমরা নদীর ব্রিজে গিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলাম। রাত হল। কিন্তু প্রতাপবাবু ফিরলেন না।

    সুনন্দ উঠল—চল তো একবার মাঠে।

    —প্রতাপ রুদ্রের খোঁজে?

    হুঁ—সুনন্দ মহুয়াডাঙার পথে পা চালাল। কিছুটা গিয়েই থমকে দাঁড়ালাম দুজনে। জনমানবহীন সেই বিশাল আঁধার মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে কেমন গা ছমছম করতে লাগল। চারদিক নিঝুম। থেকে থেকে কোনো রাতজাগা পাখির ক্ষীণ তীক্ষ্ণ ডাক শোনা যাচ্ছে। মাথার ওপর অগণিত তারা হিরের কুচির মতো ঝিকমিক করছে। আচমকা কতগুলো শিয়াল সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল—হুয়া—হুয়া—হুয়া।

    প্রান্তরে কোথাও আলোর চিহ্ন দেখতে পেলাম না। খানিক পরে সুনন্দকে ঠেলা মেরে বললাম, চল ফিরি।

    সুনন্দ নীরবে ফিরে চলল।

    বুধন এল তিনদিন পরে। মহুয়াডাঙায় গতকাল আবার সেই রক্তলোভী নিশাচরের উপদ্রব ঘটেছে। আবার আক্রমণ হয়েছে ঢেঙা মাঝির ওপর।

    ঢেঙা এবার শুয়েছিল ঘরের ভিতর। পাশে ছিল তার বউ। বউ—ই আবিষ্কার করে, ঢেঙার গলায় একটা কাটা জায়গা থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। ঢেঙা কিন্তু তখন অঘোরে ঘুমচ্ছে। মেঝেয় অনেক রক্ত পড়ে শুকিয়ে গেছে। বেশ অবসন্ন হয়ে পড়েছে ঢেঙা। রক্তপাতের। চেয়ে ভয়েই কাতর হয়েছে বেশি।

    বুধন জানাল যে, গ্রামের লোক ক্ষেপে উঠেছে। তাদের মতে, এ নিশ্চয়ই বুনোর প্রতিশোধ। কারণ ঢেঙা ওর নামে মোড়লের কাছে লাগিয়েছিল। বুনোকে খুন করার শলা—পরামর্শ হচ্ছে। বুধন শুনেছে। বুনোর আর নিস্তার নেই।

    সুনন্দ জিজ্ঞেস করল, ঝাউবাংলোর বাবু মহুয়াডাঙায় গিয়েছিল নাকি এর মধ্যে?

    —হ্যাঁ গিয়েছিল। তবে গাঁয়ে ঢোকেনি। মাঠে ঘুরছিল পাখি দেখতে। পাখি ধরার ফাঁদ পাতছিল গাছে।

    —রাতের বেলা গ্রামের ভিতর কোনো বাইরের লোককে দেখা গেছে? সুনন্দ জানতে চাইল।

    উঁহু।—বুধন মাথা নাড়ল।

    আমরা দুজনে সেদিন সকালে মহুয়াডাঙায় এক রাউন্ড টহল দিয়ে এলাম। বুনোর হাবভাব আরও অস্বাভাবিক মনে হল। দুর্দান্ত লোকটা কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে। আড়চোখে কেবল তাকাচ্ছে চারধারে। ছটফট করছে। বারবার তার দৃষ্টি আটকে যাচ্ছে বারন্দায় চাটাইয়ে শোওয়া তার রুগণ মেয়ের দিকে। সে মুরগি দিল। পয়সা নিল। কিন্তু কথাবার্তা বলল না। ঠিক যাবার আগে সুনন্দ তাকে বলল, বুনো তোর মেয়েকে হাসপাতালে দে। ও ভালো হয়ে যাবে।

    অমনি বুনোর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল—হবে? বেশ। আজই দিয়ে দি হাসপাতালে। তুই ঠিক করে দে বাবু।

    সুমন্দ বলল, এত তাড়াতাড়ি হবে নারে। আমি ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলে তোকে জানাব।

    বুনো যেন দমে গেল। মনে হল, মেয়েকে কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে ফেলতে পারলে ও নিশ্চিন্ত হয়।

    মহুয়াডাঙা ছেড়ে চলে আসবার সময় সুনন্দ বলল, লক্ষ করলি, বুনো ভয় পেয়েছে?

    উত্তর দিলাম, হ্যাঁ। হয়তো মেয়ের জন্যেই ওর ভাবনা বেশি। কিন্তু লোকটা সত্যি দে দোষী না  নির্দোষ আমি এখনো ঠিক বুঝছি না।

    সুনন্দ চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে বা নিরপরাধ। তবে

    সুনন্দ আর কিছু বলে না।

    বিকালে সুনন্দ বলল, মামার চেনা এক ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করে আসি। স্টেশনের কাছে থাকেন।

    আমি গেলাম না। জমাট এক ডিটেকটিভ বই শুরু করেছি। বললাম, আমি মুরগিটা বেঁধে রাখব। তুই ঘুরে আয়।

    সুনন্দর ফিরতে রাত আটটা হল। রাতে খাওয়ার পর বারান্দায় বসে গল্প করতে লাগলাম। শুক্লপক্ষ চলছে। কিন্তু একট মেঘ জমেছে। তাই চাঁদের আলো তেমন ফোটেনি। কেমন ঘোলাটে ভাব। অনেক দূরে দূরে। কয়েকটা বৈদ্যুতিক আলো ঝকঝক করছে। আকাশে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে দু—চারটে মিটমিটে তারা। এমন নিস্তব্ধ রাত কলকাতায় টের পাওয়া যায় না।

    আমি বললাম, জানিস সুনন্দ, মহুয়াডাঙার এই রহস্য নিয়ে আমার মাথায় একটা থিওরি এসেছে।

    —কী?

    —ড্রাকুলা ফিল্মটা দেখেছিস?

    —না।

    —গল্পটা শুনেছিস?

    —হ্যাঁ, শুনেছিলাম। কিন্তু—

    বললাম, আমি ড্রাকুলা ফিল্মটা দেখেছি। বইটাও পড়েছি। মনে আছে, রুমেনিয়ার এক জমিদার কাউন্ট ড্রাকুলা ছিল ভ্যাম্পায়ার। অর্থাৎ মানুষরূপী রক্তশোষক প্রেত। সে ঘুমন্ত মানুষের বা মানুষকে সম্মোহন করে তার রক্ত শুষে খেত। মহুয়াডাঙার কেসটা অনেকটা যেন সেই রকম।

    সুনন্দ ঝাঁপিয়ে উঠল, দূর—যতসব বাজে সংস্কার। তাছাড়া ড্রাকুলা—ফ্রাকুলা বিদেশি ব্যাপার। এদেশে ড্রাকুলার কথা কখনো শোনা যায়নি।

    আমি বললাম, মনে রাখিস, প্রতাপ রুদ্র বহুদিন বিদেশে কাটিয়েছে। ওর ব্যাকগ্রাউন্ড কেউ জানে না। অবশ্য ওই বুনোও ভ্যাম্পায়ার হতে পারে।

    সুনন্দ আমার দিকে তাকিয়ে গলা দিয়ে শুধু শব্দ করল, হুম্।

    আশ্চর্য ব্যাপার। এর পর সুন্দর কথাটথা কমে গেল। কিছু জিজ্ঞেস করলে হুঁ—হ্যাঁ করে দায়সারা গোছের জবাব দেয়। অন্যমনস্কভাবে মাথার চুল টানছে কেবল। ও লক্ষণ চিনি। সুনন্দর মস্তিষ্কে কোনো চিন্তা ঘুরঘুর করছে। নিশ্চয়ই আমার ডাকুলার আইডিয়াখানা লেগে গেছে। মনে মনে হাসলাম। আমি মোটেই সিরিয়াসলি ডাকুলার কথা ভাবিনি। রহস্য করেছিলাম মাত্র।

    পরদিন সকালে চা এবং কিঞ্চিৎ টা গলাধঃকরণ করেই সন হুট করে কোথায় বেরিয়ে  ফিরে এল, মিনিট পনের বাদে। জানতে চাইলাম, কোথায় গিয়েছিলি?

    —ঝাউবাংলোয়?

    —কেন?

    —প্রতাপ বাবুর সঙ্গে দেখা করতে।

    —হল দেখা?

    —না। দরোয়ান বলল, বাবু ব্যস্ত আছেন। এখন দেখা হবে না।

    কী জন্যে গিয়েছিলি?—আমার মনে একটা সন্দেহ উঁকি দেয়।

    ছিল দরকার।—সুনন্দ এর বেশি কিছু বলে না।

    —হুঁ, বুঝেছি। প্রতাপ রুদ্র সত্যি সত্যি ড্রাকুলা জাতীয় জীব কিনা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলি। ঠিক আছে, একটা বুদ্ধি দিচ্ছি। শোন এরপর যেদিন দেখা হবে, প্রতাপবাবুকে একটা চকলেট বা বিস্কুট অফার করবি। যদি খেয়ে ফেলে, তবে আমাদের থিওরি টিকল না। আর যদি না খায়, তাহলে ও নির্ঘাৎ রক্তচোষা। কারণ কাউন্ট ড্রাকুলা টাটকা রক্ত ছাড়া কিছু খেত না।

    আমার রসিকতায় সুনন্দ কিন্তু একটুও হাসল না। গোমড়া মুখে বসে রইল।

    দুপুরে খাবার পর সুনন্দ বলল, অসিত, টেনে ঘুমিয়ে নে। আজ রাতে আর ঘুম নেই বরাতে।

    কেন?—আমি চমকালাম।

    —কারণ আজ রাতে আমরা প্রতাপ রুদ্রকে ফলো করব।

    —অর্থাৎ তোর বিশ্বাস, প্রতাপ রুদ্রই হচ্ছে মহুয়াডাঙার নিশাচর আততায়ী। লোকটা পিশাচ। মানুষের রক্ত চুষে খায়। ধেৎ এই বিজ্ঞানের যুগে এসব ধারণা স্রেফ অচল। আমি তখন তামাশা করছিলাম।

    সুনন্দ গম্ভীরভাবে বলল, প্রতাপ রুদ্রের আসল পরিচয় আমি জানি না। প্রমাণ না পেয়ে। আমি কোনো সিদ্ধান্তে আসব না। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস মহুয়াডাঙার রহস্যের পিছনে ওর হাত আছে। কেন উনি প্রায়ই রাতে গ্রামের দিকে যান?

    আমি বললাম, যদি আজ রাতে উনি মহুয়াডাঙার দিকে না যান?

    —আজ নয়তো কাল যেদিনই যাবে, আমরা প্রতাপ রুদ্রকে ফলো করার জন্যে তৈরি থাকব।

    —অর্থাৎ এখন থেকে আমাদের রাতে ঘুমের দফা গয়া। আমার মেজাজ একদম বিগড়ে গেল। কিন্তু সুনন্দ যখন জেদ ধরেছে, ও ঠিক যাবেই। ও যা একরোখা আর ডানপিটে, আমি যেতে না চাইলে একাই যাবে। অথচ ওকে একা ছেড়ে দেওয়াও চলে না।

    বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। নির্জন নদীতটে কতরকম পাখির কাকলি। ঝিরঝিরে বাতাসে ঠাণ্ডা আমেজ। ভারি আরামদায়ক। আমার ও সুনন্দর কিন্তু এসব উপভোগ করার মতো মনের অবস্থা নয়। ঝোঁপের পিছনে লুকিয়ে অস্থির ভাবে অপেক্ষা করছি—কখন আসবে প্রতাপ রুদ্র।

    সহসা দেখলাম সেই দীর্ঘ ঋজু দেহ ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে এই পথে। তার গায়ে কালচে রঙের পাঞ্জাবি ও হালকা হলুদ রঙা পায়জামা।

    প্রতাপ রুদ্র ব্রিজ ছাড়ালেন। তারপর খানিক এগিয়ে মাঠে নামলেন। অর্থাৎ আজও তাঁর লক্ষ্য মহুয়াডাঙা। নজর করলাম প্রতাপ বাবুর কাঁধে ঝুলছে একটা ক্যাম্বিসের ব্যাগ।

    সুনন্দ বলল, এগিয়ে যাক। বেশ দূর থেকে ফলো করব। নইলে দেখে ফেলতে পারে।

    প্রতাপ রুদ্রের চলমান মূর্তি ক্রমে মাঠের মধ্য দিয়ে দূরে সরে যায়। তারপর ঢাল জটি নেমে চোখের বাইরে চলে গেল। তখন আমরা বেরিয়ে এলাম।

    পা টিপে টিপে এগোচ্ছি। কখনও ঢিবি বা পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে দেখে নিচ্ছি। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সমস্ত পশ্চিম দিগন্তে সিঁদুর—বরন হয়ে উঠল। অপরূপ সেই দৃশ্য। প্রতাপবাবুকে শেষবারের মতো দেখলাম মাঠের মধ্যে সেই যে বিরাট বটগাছটা, তার নীচে। তারপর অদৃশ্য হলেন।

    বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। বসে রইলাম পাথরের আড়ালে। আবার দেখলাম প্রতাপবাবু আবির্ভূত হয়েছেন।

    গাছের কাছে একটা বড় চ্যাটালো পাথর পড়েছিল। বেদির মতো দেখতে। প্রতাপবাবু তার ওপর বসলেন। তার পিঠ আমাদের দিকে। গাছের দিকে মুখ। স্থিরভাবে বসে আছেন। আমরা খানিক কাছে এগিয়ে গেলাম।

    অবাক হয়ে দেখলাম প্রতাপবাবু পাথরের ওপর সটান চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন। চুপচাপ শুয়ে রয়েছেন নিথর হয়ে। আমরা আর একটু এগোলাম। প্রায় পঞ্চাশ হাত দূরে একটা পাথরের স্কুপের পিছনে ঘাপটি মেরে বসে খাঁজের ফাঁক দিয়ে লক্ষ রাখলাম প্রতাপ রুদ্রকে।

    ক্রমে দিনের আলো একেবারে নিভে গেল। একটির পর একটি তারা জ্বলে উঠল আকাশপটে। ফিকে একটু চাঁদের আলো ফুটল। আবছা দেখা যাচ্ছে চারপাশ। সামনে বটগাছটাকে যেন ঘোর কালো পাথরে তৈরি একটা পাহাড়ের মতো দেখাচ্ছে। তার গায়ে অজস্র জোনাকি পোকার মিটিমিটে আলো ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। বাঁ পাশে দূরে মহুয়াডাঙা গ্রামখানির গাছপালার সীমারেখা আকাশের গায়ে ফুটে উঠেছে। গ্রামে কোনো আলো নেই। ভেসে আসছে না মাদলের আওয়াজ। মানুষের কণ্ঠধ্বনি বা কুকুরের ডাক। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে এক অজানা বিভীষিকায় গোটা গ্রাম যেন বোবা হয়ে গেছে। পাথরের ওপর শায়িত প্রতাপ রুদ্রকে শুধু অস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি। ঠিক একই ভাবে তিনি শুয়ে আছেন। কদের মতলব কী? বোধহয় রাত আরও গম্ভীর হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

    ঝিঁঝির একঘেয়ে রব ছাড়া অন্য কোনো শব্দ নেই। আমরা দুজনে কাঠের মতো বসে থাকি। প্রবল উত্তেজনায় বুকের ভিতর যেন হাতুড়ির ঘা পড়ছে, এবার কী ঘটবে? কী হবে এবার?

    বেশিক্ষণ কাটেনি। হঠাৎ এক চিৎকার শুনলাম। মানুষের গলা। কিন্তু অদ্ভুত আওয়াজ। বুঝি রূদ্ধ আক্রোশ এবং আর্তনাদ মিশে আছে সেই স্বরে। তারপরই চ্যাঁ চ্যাঁ করে এক অপার্থিব টানা তীক্ষ্ণ শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে গেল। মনে হল, আমাদের উলটো দিকে প্রতাপবাবুর কাছ থেকে প্রায় পঁচিশ—ত্রিশ হাত দূরে সেই শব্দের উৎপিত্তস্থ

    সঙ্গে সঙ্গে প্রতাপবাবু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে শব্দ লক্ষ্য করে বেগে ছুটে গেলেন। সুনন্দ আমার হাত ধরে টানল—আয় কুইক।

    প্রতাপ রুদ্রের হাতের জোরালো টর্চ জ্বলে উঠল। সেই আলোতে দেখলাম, একটা বড় পাথরের চাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে দানবের মতো একটা মূর্তি। কেশরের মতো ফাঁপানো চুলের রাশি তার মুখের অনেকটা ঢেকে ফেলেছে। ধড়াস করে উঠল হৃৎপিণ্ড। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। তারপর চিনতে পারলাম—বুনো। তার হাতে একটা বল্লম। বুনো মাত্র। দিকে তাকিয়ে আছে।

    প্রতাপবাবুও মুহূর্তের জন্য থেমেছিলেন। তারপরই দৌড়ে গিয়ে বুনোর সামনে বসে পড়লেন। আমরাও হোঁচটা খেতে খেতে এগোলাম।

    ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখি প্রতাপবাবু মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছেন আর তার ডান হাতের মুঠোয় ছটফট করছে কী একটা জীব। প্রতাপবাবুর বাঁ হাতের টর্চ আর ডান হাতের ওপর আলো ফেলল। আমি ভীষণ আশ্চর্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, আরে, এ যে একটা বাদুড়!

    বাদুড়টা ছোট্ট। শিয়ালের মুখের মতো দেখতে তার মুখ। দুটো চকচকে ড্যাবড্যাবে চোখ। খাড়া খাড়া কান। ছুঁচোলো কয়েকটা দাঁত হিংস্রভাবে বেরিয়ে আছে।

    প্রতাপবাবু তার ডানা দুটো চেপে ধরেছেন। সে ক্রমাগত মুণ্ডু ঘুরিয়ে কামড়াবার চেষ্টা। করছে। আমাদের দেখে বুনো কর্কশ গলায় বলে উঠল, বাদুড়টো আমার গায়ে বসেছিল।

    প্রতাপবাবু চমকে ফিরলেন। তাঁর টর্চের আলো পড়ল আমাদের মুখে—এ কী, তোমরা এখানে!

    সুনন্দ উত্তর দিল, হ্যাঁ, আমরা। আশা করি চিনতে পারছেন। একটু অসময়ে দেখা হয়ে গেল।

    তারপর প্রতাপবাবুর স্তম্ভিত দৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করে সুনন্দ বলল, অসিত, এটা কিন্তু সাধারণ বাদুড় নয়, ভ্যাম্পায়ার ব্যাট। মিস্টার রুদ্র এবার আপনি

    সুনন্দ আরও কী যেন বলতে যাচ্ছিল। রুদ্রের চাবুকের মতো প্রশ্ন তাকে থামিয়ে দিল।

    —এটা ভ্যাম্পায়ার ব্যাটু তুমি জানলে কী করে? কে বলেছে?

    —অনুমান, মিঃ রুদ্র, অনুমান। কাল অসিত আমায় ড্রাকুলার গল্প শোনাল। বলল। ড্রাকুলার মতো কোনো ভ্যাম্পায়ার নিশ্চয়ই মহুয়াডাঙার লোকের রক্ত শুষে খাচ্ছে। অমনি একটা সম্ভাবনার উদয় হল আমার মনে। ওসব ভুতুড়ে গল্প আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু একটা নতুন ক্ল মাথায় এল। ভূতপ্রেতপিশাচ নয়—বাদুড়। রক্তপায়ী বাদুড়। ভ্যামপায়ার ব্যাট। ভ্যামপায়ার ব্যাটের রক্ত পানের বর্ণনা আমি একটা বইয়ে পড়েছিলাম। মহুয়াডাঙার ঘটনাগুলোর সঙ্গে তা অদ্ভুতভাবে মিলে গেল। স্রেফ দুইয়ে—দুইয়ে চার।

    আমি বললাম যাঃ, এখানে ভ্যাম্পায়ার ব্যাটু আসবে কোথা থেকে? ইমপসিবল।

    সুনন্দ উত্তর দেয়—জানি, ভারতবর্ষে ভ্যাম্পায়ার ব্যাট নেই। একমাত্র দক্ষিণ আমেরিকার আমাজনের জঙ্গলে ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও নেই। তবে প্রতাপবাবু মাত্র দু মাস আগে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কিছু পশু—পাখি নিয়ে এসেছেন। অতএব এ প্রাণীটি নিশ্চয়ই তাঁর আমদানি। কী, ঠিক বলিনি, মিস্টার রুদ্র?

    প্রতাপবাবু স্তব্ধ হয়ে সুন্দর কথা শুনছিলেন। এবার শান্ত কণ্ঠে বললেন, কারেক্ট। তোমার অনুমানের প্রশংসা করি। এর নাম ডেসমোডাস। এক জাতীয় ভ্যাম্পায়ার ব্যাট। আমি সাউথ আমেরিকা থেকে আনিয়েছিলাম এদের ধরন—ধারণ রিসার্চ করতে।

    এরপর সুন্দর মুখ থেকে যে কথাগুলি উচ্চারিত হল, তা শুনে আমি হকচকিয়ে গেলাম।

    —মিঃ রুদ্র, আপনি কিন্তু ধরা পড়ে গেছেন। এবার আপনার নিষ্ঠুর খেলা বন্ধ করতে। হবে।

    খেলা! নিষ্ঠুর! কী বলছ যা তা?—প্রতাপবাবু রীতিমতো ধমকে উঠলেন।

    নির্বিকারভাবে সুনন্দ বলল, কেন না বোঝার কী আছে? অতি সরল বাক্য। আপনি আপনার ওই পোষা জীবটিকে রাতের পর রাত মহুয়াডাঙার নিরীহ লোকদের ওপর লেলিয়ে দিয়েছেন তার রক্ত—পিপাসা মেটাতে। খেলাটা নিষ্ঠুর বৈকি!

    রুদ্রের ঠোঁটে বক্র হাসি জেগে উঠল। ধীর স্বরে বললেন, এবার তোমার অনুমান ফেল করেছেন সুনন্দবাবু। এ বাদুড় আমার পোষ মানেনি আর আমি একে মহুয়াডাঙার মানুষদের ওপর লেলিয়ে দিইনি।

    তাহলে রাতে এখানে আসতেন কেন?—সুনন্দর কণ্ঠে অবিশ্বাস।

    —আসতাম এই পলাতক জীবটিকে ধরবার উদ্দেশ্যে। একজোড়া ডেসমোডাস এনেছিলাম। একটা মরে গেল, আর একটা খাঁচা থেকে পালাল। কয়েকদিন পরেই মহুয়াডাঙার ঘটনা কানে এল। বুঝলাম ডেস্মোডাসটি এই গ্রামের কাছে আস্তানা গেড়েছে। জায়গাটা পরীক্ষা করে ধারণা হল, এই বটগাছের কোটরে ও আশ্রয় নিয়েছে। গাছের গায়ে জাল খাটালাম। সারা রাত জেগে থাকতাম গাছের কাছে, যদি ফাঁদে পড়ে এই আশায়। অন্য বাদুড়ের মতোই ভ্যাম্পায়ার ব্যাটু সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না। দিনের বেলা অন্ধকার গুহায়, ঘন পাতার ছায়ায় বা গাছের কোটরে লুকিয়ে থাকে। কেবল রাতে বেরোয়। চারদিন আগে বুঝলাম আমার ধারণা সঠিক। কারণ সেদিন সন্ধ্যায় আমি যখন ওই পাথরে বসেছিলাম, বাদুড়টা আমার মাথার ওপর দিয়ে কয়েকবার পাক খেয়ে উড়ে গেল। বোধহয় আমার রক্ত পানের মতলবে ছিল। টর্চের আলোয় তাকে চিনতে অসুবিধা হয়নি। তারপর থেকে একটা হাতে—ছোঁড়া জাল আনতাম সঙ্গে। চুপচাপ পাথরের ওপর শুয়ে টোপ ফেলতাম।

    প্রতাপবাবু একটু দম নিলেন। আবার গম্ভীর স্বরে বলতে লাগলেন, কাল ছুঁড়েছিলাম জাল। একটুর জন্যে ফস্কে গেল। নাউ, আমার মিস্টিরিয়াস মুভমেন্টের কারণ ক্লিয়ার। ওঃ গুডলাক! স্পেসিমেনটা জীবন্ত ধরতে পেরেছি। শুধু একটা ডানা জখম হয়েছে। এই লোকটা কিছু দিয়ে মেরেছে বোধহয়।

    প্রতাপবাবু পকেট থেকে একটা ছোট জালের থলি বের করে বাদুডটাকে তার মধ্যে পুরে বন্দি করে ফেললেন ও থলির মুখ চেন টেনে বন্ধ করে দিলেন।

    সুনন্দ অপ্রস্তুত সুরে বলল, সরি, প্রতাপবাবু। কিন্তু এই বাদুডের কথা মহুয়াডাঙার লোকদের বলেননি কেন? ওরা কী ভীষণ আতঙ্কের মধ্যে আছে জানেন।

    প্রতাপবাবু বললেন, জানাইনি ভয়ে। জানলে ওরা হয়তো ক্ষেপে গিয়ে হাঙ্গামা বাঁধাত। তার চেয়ে ভয় ছিল, ওরা বাগে পেলে আমার দুর্লভ স্পেসিমেনটিকে মেরে ফেলবে। দিনের বেলা এই বিরাট বটগাছের অগুণতি কোটর হাতডে খুঁজে বাদুড়টা ধরা অসম্ভব ছিল। ওঁ বিষধর সাপ থাকতে পারে। তবে গ্রামের লোক বাদুড়কে মারতে চাইলে কোটরে টেরে বাইরে থেকে ফুটন্ত গরম জল ঢেলে দিলেই খতম। তাই চেষ্টায় ছিলাম, নিজেই। গবে কৌশলে। ও যখন রাতে বেরোবে তখন।

    —প্রতাপবাবু আপনার ওই মহামূল্যবান স্পেসিমেনটির জন্যে গ্রামের একজন লোক যে প্রাণ হারাতে বসেছে, সে খবর রাখেন? আমি বলে ফেললাম।

    সে কী! কে? কেন?—প্রতাপবাবুর চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে।

    বুনোর দিকে আঙুল দেখায় সুনন্দ—এই লোকটির বিপদ। গ্রামের লোকের সন্দেহ, ও—ই দানো হয়ে রাত্তিরে মানুষের রক্ত শুষে খাচ্ছে। ওকে খুন করার প্ল্যান হচ্ছে।

    বুনো এতক্ষণ স্থিরভাবে দাঁড়িয়েছিল। উদগ্রীব হয়ে আমাদের উত্তেজিত কথাবার্তার মর্ম গ্রহণের চেষ্টা করছিল। সে বলে উঠল, বাদুড়টো আমার গায়ে বসেছিল। এক ঝাপ্পড় দিলাম।

    আমার মনে এক প্রশ্ন জাগে। জিজ্ঞেস করি, বুনো, এখানে কী করছিলি তুই?

    বুনো বলল, পাহারা দিচ্ছিলেম। সেই রক্তখেকো দানোটাকে ধরব বলে। দেখলেম তোরা তিনজনা মাঠের মধ্যে ঘুরছিস। তাই লুকিয়ে নজর রাখছিলেম পাথরের পিছনে শুয়ে।

    সুনন্দ বলল, বুনো, দানোটাকে তুই ধরে ফেলেছিস। আসলে দানো পিশাচ নয়। এই বাদুড়টাই আসামি। ও—ই ঘুমন্ত লোকের রক্ত শুষে খায়।

    বাদুড় রক্ত খায়?—কথাটা যেন বুনোর বিশ্বাস হল না।

    সুনন্দ বলল, দেশি বাদুড় খায় না। এটা বিদেশি বাদুড়। ফল—পাকুড় খায় না। শুধু রক্ত খায়। মানুষ বা পশু—পাখির তাজা রক্ত। মানুষের চামড়া নরম। তাই এরা মানুষের গায়ে দাঁত ফোঁটাতে বেশি পছন্দ করে।

    বুনো বিস্ফারিত নেত্রে কয়েক মুহূর্ত দেখল বন্দি বাদুড়টাকে। তার সমস্ত শরীর ফলে ফুলে উঠল। বিকৃত মুখে উন্মত্তের মতো চিৎকার করে ওঠে বুনো, ওটা বাদুড় নয়, শয়তান। শয়তান। ওটাকে আমি মেরে ফেলব। শেষ করে দেব। দে, দে, ওটা দে আমায়।

    হাতের বল্লম ফেলে দিয়ে বুনো একলাফে প্রতাপ বাবুর দিকে এগিয়ে গেল। প্রতাপবাবর ডান হাতে বন্দি বাদুড়। তিনি বাঁ হাতে বুনোকে ঠেকালেন। আমি আর সুনন্দও তৎক্ষণাৎ জাপটে ধরলাম বুনোকে।

    উঃ, কী প্রচণ্ড জোর লোকটার গায়ে! ঝট্কা দিয়ে আমাদের দুজনকে প্রায় ছাড়িয়ে ফেলে সে বারবার প্রতাপবাবর হাত থেকে বাদুড়টা ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করতে লাগল। আমরা দুজন না আটকালে ও নির্ঘাৎ বাদুড়টা কেড়ে নিয়ে মেরে ফেলত। ধাক্কা খেয়ে প্রতাপবাবুর হাত থেকে টর্চ খসে পড়ে গেল। আমি তাড়াতাড়ি কুড়িয়ে নিলাম টর্চটা।

    বুনোর গলা দিয়ে গোঙানির মতো আওয়াজ বের হচ্ছে। অনেকদিনের জমা হওয়া শঙ্কা ও ক্ষোভ যেন ক্রোধের রূপ নিয়ে ফেটে পড়তে চাইছে। আমরা প্রাণপণে বোঝাই—বুনো, শোন শোন, এই বাদুড়টা আর কোনো উৎপাত করবে না। ওকে খাঁচায় আটকে রাখা হবে। ইত্যাদি।…

    তবু বুনোর রাগ পড়ে না। সে কেবলই ফুঁসছে। একটা ধস্তাধস্তি চলতে থাকে। সুনন্দ হঠাৎ বলে উঠল, বুনো শোন, ডাক্তারবাবু বলেছেন তোর মেয়ের চিকিৎসা করবেন। তোর মেয়েকে হাতপাতালে ভর্তি করে নেবেন।

    বুনোর বজ্র—কঠিন পেশীগুলি অমনি কেমন শিথিল হয়ে গেল। সব ভুলে গভীর আগ সুনন্দর দিকে চেয়ে সে বলল, আমার মেয়ে ভালো হয়ে যাবে? ডাক্তারবাবু বলেছে?

    যাবে বৈকি। নিশ্চয়ই ভাল হয়ে যাবে।—সুনন্দ আশ্বাস দিল।

    কার অসুখ?—প্রতাপবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

    —বুনোর মেয়ের। মেয়েটির একটা পা আঘাত লেগে খোঁড়া হয়ে গেছে।

    —হুঁ আমি দেখেছি মেয়েটিকে। ভেরি স্যাড কেস।

    সুনন্দ বলল, আমার মামার বন্ধু ডাক্তার চ্যাটার্জী বলেছেন, মেয়েটির ট্রিটমেন্ট করবেন। তবে হাসপাতালে রাখতে হবে। তার খরচ আছে। দেখি কী ব্যবস্থা করা যায়।

    রুদ্র বললেন, বুনোর মেয়ের চিকিৎসার সব খরচ আমি দেব। এ আমার ঋণ শোধ। তুমি বুনোকে বলে দাও।

    সুনন্দ বুনোকে বলল—শুনলি, বাবু কী বললেন?

    বুনো প্রতাপবাবুর দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এরপর সে জ্বলন্ত চোখে নিরীক্ষণ করল জালে বদ্ধ বাদুড়টিকে। বিড়বিড় কি যেন বকতে লাগল নিজের মনে। বোঝা গেল। ওই বাদুড়ের ওপর তার রাগ ও বিদ্বেষ কিছুমাত্র কমেনি। বাদুড়ের মালিক সম্বন্ধেও তার মন রীতিমতো সন্দিগ্ধ।

    আমি বললাম, বুনো, এই রক্তচোষা বাদুড়ের কথা তুই বলিস নি কাউকে। বরং গ্রামের লোককে জানিয়ে দে, তুই মন্ত্রের জোরে দানোটাকে তাড়িয়ে দিয়েছিস। তোর খুব খাতির হবে গাঁয়ে।

    হুঁ।—বুনো তার আঁকড়া চুলো মাথাখানা কঁকালো অর্থাৎ আমার পরামর্শ তার মনে ধরেছে। সে একবার ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাল গ্রামের দিকে। বলে উঠল, যাই মেয়েটা একা রইছে।

    মাটি থেকে বল্লমটা কুড়িয়ে নিয়ে বুনো সহসা দৌড়তে শুরু করল।

    ম্লান জ্যোৎস্নালোকে উন্মুক্ত প্রান্তরের বুক ছুঁয়ে বুনোর সুদীর্ঘ ছায়ামূর্তি যেন উড়ে চলল। ক্রমে সে হারিয়ে গেল দূর অন্ধকারে।

    চ্যাঁ—এ! একটা বিশ্রী চেরা আওয়াজে আমাদের চমক ভাঙল। মহুয়াডাঙার রক্তচোষা তার বন্দিদশার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

  • বাস্তেন দ্বীপে অভিযান

    বাস্তেন দ্বীপে অভিযান

    অজেয় রায়

    [book]

    এক

    সুনন্দ হঠাৎ খপ করে আমার হাতটা চেপে ধরে বলল, দাঁড়া। সামনে একটা ছিনতাই কেল মনে হচ্ছে। দেখি ব্যাপারটা? দুজনে স্তব্ধ হয়ে যাই। একটু সরে গেলাম পাশে গাছের ছায়ার আড়ালে। চুপচাপ দেখতে থাকি।

     কলকাতা শহর। রাত দশটা বাজে প্রায়। আমি আর বন্ধু সুনন্দ গিয়েছিলাম গঙ্গার ধারে বেড়াতে বেড়াতে এবং আড্ডা মারতে। ওখানে আরও কয়েকজন বন্ধু প্রায়ই জমা হই সন্ধে থেকে।

    হেঁটে ফিরছিলাম রাজভবনের গা ঘেঁষে। এসপ্ল্যানেড় অবধি হেঁটে গিয়ে বাস ধরব। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ। গরম কমেছে কলকাতায়। তবে শীত পড়েনি তেমন। ভালোই লাগছিল হাঁটতে। ফুটপাতে তখন পথচারীর সংখ্যা বেশ কম। রাস্তায় গাড়ি ছুটছে। হু হু করে মাঝে মাঝে। রাজভবনের পাঁচিলের ধারে ধারে গাছগুলোর লম্বা লম্বা ছায়া পড়েছে ফুটপাতে। এক ফালি চাঁদ আবছা আলো ছড়াচ্ছে আকাশে। স্ট্রিট লাইটগুলো অবশ্য জ্বলছে। আলো—আঁধারি মিশেল বেশ রহস্যময় পরিবেশ।

    আমাদের আগে ষাট—সত্তর ফুট দূরে একটি লোকও এগোচ্ছিল ওই ফুটপাত ধরে। গঙ্গার কাছ থেকেই সে আমাদের সামনে সামনে যাচ্ছিল। বেঁটেখাটো প্যান্টসার্ট পরা মানুষটি ধীরে সুস্থে হাঁটছিল আমাদের মতোই। দেখলাম, হঠাৎ যেন অন্ধকার যুঁড়ে দুটো লোক সামনে খাটো লোকটির পথ আগলে দাঁড়াল। মনে হয় পাচিলের ধারে লোক দুটো গাছের ছায়ায় মিশে ঘাপটি মেরে ছিল শিকারের আশায়।

    দুটো লোকের একজন বেঁটে মানুষটিকে মুঠো পাকিয়ে নিচু স্বরে বলছে কিছু। তার ভাবভঙ্গি সুবিধের নয়। দ্বিতীয় জন পাশের দিকে সরে গেল। দেখলাম যে পথ আগলানো আগন্তুক বেঁটে মানুষটির প্যান্টের পকেটে স্রেফ হাত ঢুকিয়ে দিল। হয়তো মানিব্যাগের আশায়।

    পথচারী বেঁটে মানুষটি এতক্ষণ কিছু বলছিল মৃদুস্বরে আর কেবলই ঘাড় নাড়ছিল। এবার সে তড়িৎগতিতে হাত চালাল। সঙ্গে সঙ্গে তার সামনের লোকটি উলটে পড়ল ফুটপাতে। কিন্তু পাশে থাকা দ্বিতীয়জন কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করল বেঁটে পথচারীটিকে। লোকটি বসে পড়ে মাথা চেপে। ভূপতিত ছিনতাইকারী এই সুযোগে উঠে দাঁড়িয়েছে।

    সুনন্দ বলল, ছোট। আটকাতে হবে।

    সুনন্দ দৌড়ল। পিছু পিছু আমি।

    যে লোকটা মেরেছিল সে ঝুঁকে তার শিকারের পকেট হাতড়াচ্ছে। দ্বিতীয় ছিনতাইকারীও কাছে এসে দেখছে। আমাদের পায়ের শব্দে লোক দুটো ঘাড় ফিরিয়ে দেখতে না দেখতেই সুনন্দ ঝুঁকে পড়ার পশ্চাদদেশে কষাল ভারী জুতোর প্রচণ্ড এক লাথি। লোকটা ছিটকে উলটে পড়ল ফুটপাতে। আমি দ্বিতীয় ছিনতাইকারীর মুখে মারলাম এক মোক্ষম ঘুষি। আক শব্দ করে সে মুখ চেপে টলমলিয়ে পিছিয়ে গেল।

    সুনন্দর লাথি খাওয়া লোকটা কিঞ্চিৎ সামলে উঠে দাঁড়াচ্ছে, দেখি তার হাতে একখানা ছুরি। চকচক করে ওঠে স্ট্রিট লাইটের আলোয় ছুরির সরু লম্বা ফলা। কিন্তু সুনন্দ তাকে আক্রমণের সুযোগই দেয় না। ফের এক লাথি কষায় লোকটার ছুরি ধরা হাতে কনইয়ের কাছে। ছুরি খসে পড়ে হাত থেকে। ব্যথায় কাতরে ওঠে লোকটা। তারপর ঘুরে মারল। টেনে দৌড়। তার ছিনতাইয়ের সাধ উবে গেছে। দ্বিতীয় লোকটাও প্রাণপণে অনুসরণ করল সঙ্গীকে। দুজনে রাস্তা পেরিয়ে মিলিয়ে গেল ময়দানের অন্ধকারে।

    সুনন্দ ছুরিটা কুড়িয়ে নেয়। ফলাটা আট ইঞ্চি হবে। দারুণ ধার। ইস, লাভের বদলে ব্যাটাদের লোকসানই হয়ে গেল। আমরা এবার সেই বেঁটে মানুষটির দিকে নজর দিই।

    লোকটি তখনো ফুটপাতে বসে। হতভম্ভ দৃষ্টি। এক হাতে চেপে আছে নিজের মাথার এক পাশ। লোকটিকে তুলে ল্যাম্প পোস্টের আলোয় পরীক্ষা করি। নাঃ রক্ত গড়াচ্ছে না। তবে লেগেছে খুব। ওর যন্ত্রণাকাতর মুখ দেখেই মালুম হচ্ছে। লোকটির মাথায় পরা কাউন্টি—ক্যাপ জাতীয় মোটা কাপড়ের টুপি তার মাথাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে এযাত্রা।

    পথচারীকে দেখে আমরা অবাক। লোকটি বাঙালি নয়। মনে হল ভারতীয়ই নয়। মঙ্গোলীয় ধাঁচের মুখ। চিনা, বর্মী বা মালয়িদের মতন দেখতে। গড়ন ছোটখাটো হলেও মজবুত। লোকটি খানিক সামলিয়ে বলল, থাঙ্কু মিস্তার। ইউ ছেভ মি। ওঃ। সে নিজের মাথায় হাত বোলায় টুপিটা খুলে।

    আমরা দেখলাম, কাটেনি বটে কিন্তু মাথার এক জায়গায় বেশ ফুলে উঠেছে।

    কয়েকজন পথচারী ইতিমধ্যে জুটে গেছে চারপাশে। প্রশ্ন হয়—

    —কী হয়েছে দাদা?

    —কেসটা কী?

    —ছিনতাই করছিল। জবাব দেয় সুনন্দ।

    —নিয়েছে কিছু?

    —মেরেছে বুঝি? লোকটা তো মনে হচ্ছে চিনেম্যান।

    —হুঁ বিদেশি। তাই মনে হচ্ছে। জানাই আমি।—তবে নিতে পারেনি কিছু। আমরা কয়েক ঘা লাগাতেই পালাল লোক দুটো। আমরা একটু দূরে পিছনে ছিলাম ভাগ্যিস। তবে মেরেছে মাথায়। দেখি জিজ্ঞেস করে কোথায় যাবে? পরিচয় কী? কিছু একটা ব্যবসা তো। করতে হবে।

    —হ্যাঁ হ্যাঁ তা তো বটেই। থানায় নিয়ে যান। ডায়ারি করে দিন। পুলিশই যা করবার করবে।

    —সঙ্গে টাকাকড়ি বেশ আছে বোধহয়। তাই ফলো করছিল। এই লোকগুলোও সুবিধের হয় না। থানায় জমা করে দিন।

    অন্য পথচারী কেউ কিন্তু ওই লোকটিকে থানায় নিয়ে যেতে সাহায্য করতে এগোল না। তারা সুটসাট কেটে পড়ল উপদেশ ঝেড়ে। ফের আমরা তিনজন। চারপাশ মোটামুটি ফাঁকা।

    আক্রান্ত লোকটি এতক্ষণ চুপচাপ অন্যদের কথা শুনছিল। বোধহয় বুঝতে পারছিল। বাকিরা চলে যেতে সে মাথা নেড়ে বলল, নো পুলিশ। নো পুলিশ।

    কে জানে, পুলিশে ছুঁলে আঠারো—ঘা আপ্তবাক্যটি এর জানা আছে হয়তো। যাহোক সুনন্দ তাকে ইংরেজিতে আশ্বাস দেয়, ঠিক আছে, পুলিশে রিপোর্ট করা দরকার নেই। তবে তোমার মাথায় লেগেছে রেশ। ফাস্ট—এড দেওয়া উচিত। হাঁটতে পারবে খানিকটা?

    লোকটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

    ধীরে ধীরে হেঁটে এসপ্ল্যানেডের দিকে যেতে যেতে আমরা লোকটির পরিচয় জানার চেষ্টা করি। ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করি, তুমি কয়রা কী? মানে প্রফেশন?

    উত্তর হয়, সেলার।

    জাহাজের নাবিক! বাঃ।

    —দেশ কোথায়? ইন্ডিয়ান?

    —নো। ইন্দোনেশিয়ান।

    আমি ও সুনন্দ চোখাচোখি করি। দারুণ ইন্টারেস্টিং লোক। সুনন্দ আমায় ফিসফিসিয়ে বলে বাংলায়, লোকটাকে সহজে ছাড়ছি না। ওর গল্প শুনতে হবে।

    বটেই তো। আমারও তাই হচ্ছে। সাত—সমুদ্রে ঘোরা জাহাজের নাবিকদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার হয় বিচিত্র। আমরা ডাঙার মানুষরা তার কতটুকু জানি বা দেখেছি। সব বিদ্যে বই পড়ে ঠিক জানা যায় না। এসব মানুষ তাদের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা লেখেও কদাচিৎ। তবে আগ্রহ দেখালে বলে শুনেছি।

    লোকটি দেখলাম ইংরেজিটা মোটামুটি বলতে ও বুঝতে পারে। কিছু বাংলা হিন্দিও জানে। তবে তেমন সড়গড় নয় কথায়, বোঝে বেশ। আরও নিশ্চয় অনেক ভাষাই কিছুটা জানে। যারা বন্দরে বন্দরে ঘোরে, তারা নানান দেশের ভাষা কাজ চালানোর মতো শিখে ফ্যালে। ইংরেজিতে চিনাদের মতো ট উচ্চারণটা করে ত এবং কিঞ্চিৎ আধো আধো সরে উচ্চারণ। জানলাম যে লোকটির নাম মিকি। মিকি হরতানো। থাকে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায়। বছর কুড়ি জাহাজে কাজ করছে। ওদের গ্রামের অনেকেই জাহাজি নাবিক। মিকি ধর্মে বৌদ্ধ। মিকি মালবাহী জাহাজের কাজ করে। ভারতবর্ষের নানা বন্দরে এবং  কলকাতা বন্দরে কয়েকবার এসেছে আগে। ঘুরেছে কলকাতায়। কলকাতার পথঘাট চেনে কিছুটা। ওর জাহাজ খিদিরপুর ডকে ভিড়ে আছে। মাল খালাস চলছে। দিন তিনেক বাদে ফের গান করবে। ছেড়ে যাবে কলকাতা। কয়েকদিন মিকি কলকাতাতেই রয়েছে জাহাজি মাল্লাদের এক আস্তানায়। ওয়েলিংটন স্কোয়ারের কাছে আস্তানাটা। ওখানে অনেক চেনা জানা মাল্লা জোটে। আড্ডা হয়। আজ গিয়েছিল জাহাজি অফিসে একজন এদেশি লোকের সঙ্গে দেখা করতে। গল্প করতে করতে রাত হয়ে গেল। হেঁটেই ফিরছিল ওয়েলিংটনে। রাস্তা চেনে। হাঁটতে তার খুব ভালো লাগে। জাহাজে তো বন্দি জীবন। কোনো বন্দরে নামলেই তার শখ শহরটা হেঁটে দেখে বেড়ানো। আজকের মতো উটকো ঝামেলায় আগে পড়েনি কলকাতায়। তবে অন্য দেশে পড়েছে কয়েকবার। ভাগ্যিস আজ তার পার্সটা খ— না। অনেক টাকা ছিল। আমাদের সে অনেক ধন্যবাদ জানাল এযাত্রা সেভ করার জন্য। দেশে মিকির পরিবার থাকে। স্ত্রী এবং সাত ও পাঁচ বছরের দুটি ছেলে।

    কথা বলতে বলতে এসপ্ল্যানেডে হাজির হলাম। একটা দোকান থেকে বরফ নিয়ে মিকির মাথায় আঘাতের জায়গায় লাগানো হল। বরফ লাগাতে ব্যথা কিছু কমল।

    এরপর সুনন্দ অনুরোধ করল মিকিকে, আজ তোমার জাহাজি আস্তানায় না গেলে। বরং চলো আমাদের বাড়িতে রাতটা কাটাবে। তোমার গল্প শুনব। কত দেশে ঘুরেছ। নিশ্চয় কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে।

    মিকি ইতস্তত করছে দেখে সুনন্দ জোর দেয়, আমাদের কোনো অসুবিধে নেই। আমাদের বাড়িতে থাকি শুধু আমি আর আমার এক মামা। তিনি সায়ান্টিস্ট প্রফেসর হলেও মাই ডিয়ার মানুষ। তোমার সঙ্গে আলাপ হলে খুশি হবেন। বাড়িতে শোবার জায়গা যথেষ্ট। কী খাবে বলো রাতে। দোকান থেকে কিনে নিয়ে যাই। যা যা তোমার পছন্দ।

    —অলরাইত। মিকি রাজি হয়ে যায়।

    সুনন্দ বলে, বুঝলে মিকি, শহুরে লোকের সঙ্গে তো একঘেয়ে দিন কাটাই। তোমার মতো ইন্টারেস্টিং লোকের দেখা পাই খুব কম। তুমি গেলে আমাদের সৌভাগ্য। জানো আমরা খুব বেড়াতে ভালোবাসি। অনেক বেড়িয়েছি দেশে বিদেশে। দুর্গম অঞ্চলে। অচেনা দেশ, সমুদ্র, প্রাণী, গাছপালা আমাদের ভীষণ টানে। তাই তোমায় ছাড়তে ইচ্ছে করছে না।

    সুনন্দ আমায় বলল, আজ রাতে তুই আমাদের বাড়িতে থাকবি। বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দে।

    আমি তো তক্ষুনি রাজি।

    এই ঘটনার ফলেই মিকির সঙ্গে সুনন্দর মামাবাবু প্রফেসর প্রাণিবিজ্ঞানী নবগোপাল ঘোষের যোগাযোগ হয়। আর তার ফলেই আমাদের এক নতুন রোমাঞ্চকর অভিযান ও অ্যাডভেঞ্চারের সূত্রপাত। এখন আমাদের নিজেদের পরিচয়টা কিছু জানিয়ে রাখি।

    আমি—অসিত রায়। সুনন্দ মানে সুনন্দ বোস আমার বাল্যবন্ধু। সুনন্দর মামাবাবু শুধু প্রাণিবিজ্ঞানী নয়, জ্ঞান—বিজ্ঞানের নানা শাখায় তার প্রবল আগ্রহ। সুনন্দও প্রাণিবিজ্ঞানের ছাত্র। এম. এস. সি পাস করে এখন রিসার্চ করছে। আপাতত সে কিছু দিন রয়েছে নবগোপালবাবুর বাড়িতে। তার রিসার্চের কাজে মামাবাবুর সাহায্য নিতে।

    নবগোপাল ঘোষ বিয়ে থা করেননি। একা থাকেন। সুনন্দকে পুত্রবৎ স্নেহ করেন। সুনন্দর বন্ধু হিসেবে ছোট থেকেই আমি তাকে চিনি।

    আপাতগম্ভীর দর্শন, মাঝারি স্বাস্থ্য, মাঝারি হাইট, মামাবাবুকে দেখলে আর পাঁচটা সাধারণ ছাপোষা বাঙালি গেরস্থ অধ্যাপকের থেকে আলাদা করা যায় না। কিন্তু ওই মানুষটি প্রচণ্ড অ্যাডভেঞ্চার—প্রিয়।  বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের নেশায় কত দুর্গম অঞ্চলে যে পাড়ি দিয়েছেন। অনেক সময় সুনন্দ এবং কখনো কখনো আমিও তার সঙ্গী হয়েছি।

    আমার বিষয় অবশ্য ইতিহাস। এম. এ. পাস করে গবেষণা করছি। তবে সুনন্দ ও মামাবাবর সঙ্গ পেয়ে বিজ্ঞানেও যথেষ্ট আগ্রহ জন্মেছে। নতুন দেশ দেখার সুযোগ পেলে আমিও ছাড়ি না।

    মিকিকে নিয়ে গেলাম মামাবাবুর কাছে, ভবানীপুর অঞ্চলে মামাবাবুর বাড়িতে। মামাবাবু মিকির পরিচয় জেনে খুব খুশি হলেন।

    রাতে খাবার আগে ও পরে জমিয়ে গল্প হল। প্রধানত এশিয়া মহাদেশের বন্দরগুলিতেই মিকির যাতায়াত। বন্দরে বন্দরে তার কত আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কাহিনি। কত অজানা দ্বীপ। সে দেখেছে। কত অজানা প্রাণী ও মানুষ। গাছপালা। কত বিপদে যে পড়েছে। প্রথমে কিঞ্চিৎ আড়ষ্ট থাকলেও পরে দেখলাম মিকি দিব্যি হাসিখুশি মানুষ। তার গল্প বলার ঢংও চমৎকার।

    ভালো ভালো খাবার একপেট খেয়ে মিকি মহাখুশি। জানাল যে অনেক দিন বাদে এমন খাসা ভোজ জুটল তার কপালে। জাহাজের খাদ্য তো বেজায় নীরস। কলকাতায় তার আস্তানার খাবার অতি বাজে। হোটেল রেস্তরাঁয় বেশি খরচ করে ভালো খাওয়া তার সাধ্যের বাইরে। মাইনে তো বেশি নয়। বাড়িতেও টাকা পাঠাতে হয়।

    পরদিন ভোরে উঠেছে মিকি। চা জলখাবার খেয়েছে। খানিক বাদে বিদায় নেবে। মামাবাবু তখন তার বাড়ির বাগানে গাছপালার তদারকি করছেন। মিকি বাগানে গিয়ে দাঁড়ায়। আমরাও সঙ্গ ধরি।

    ইদানীং মামাবাবুর এক নতুন শখ হয়েছে বাগান করা। মামাবাবুর বাড়ির পিছনে কাঠা দুই বাগান করার মতন জমি আছে। সেখানেই তার উদ্যানচর্চা। একটা ছোট গ্রিনহাউসও বানিয়েছেন।

    প্রথামতো চেনা ফুল—ফলের গাছ করায় মামাবাবুর উৎসাহ নেই। নানান বিচিত্র গাছ। লাগাচ্ছেন। নিজের ফর্মুলা অনুযায়ী তাদের সার দিচ্ছেন, যত্ন করছেন। ফলাফলের নোট রাখছেন। অর্থাৎ ওই গাছপালা নিয়ে গবেষণা চলছে। হয়তো সেটাই আসল উদ্দেশ্য।

    আমরা তার বাগান নিয়ে কিছু মন্তব্য করলে মোটেই আমল দেন না। নিজের তালেই। আছেন।

    মিকি ঘুরে ঘুরে বাগান দেখতে দেখতে কয়েকটি গাছের সামনে এসে বলল, এই গাছ দেখেছি একটা দ্বীপে। প্রচুর। তবে সাইজে ঢের বড় বড়। আর পাতার ঝাড় অনেক বেশি।

    —এগুলো কী গাছ জানো? প্রশ্ন করেন মামাবাবু।

    —না। মিকি মাথা নাড়ে।

    —এগুলো পোস্ত গাছ। পপি প্ল্যান্ট। যা থেকে আফিং হয়। ওপিয়াম।

    —ইজ ইত? মিকি বেশ আগ্রহ দেখায়, আপনি ওপিয়াম তৈরি করেন নাকি?

    —না বাবা। মামাবাবু হাসেন, তাহলে পুলিশে ধরবে। কয়েকটা মাত্র গাছ করেছি একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে।

    —আফিং হয় কী ভাবে? প্রশ্ন মিকির।

    —এর ফলের গা চিরে দিলে রস বেরায়। তাই শুকিয়ে আফিং হয়। আর ক্ষমত ভিতরের বিচি হল পোস্ত। বাঙালিদের প্রিয় খাদ্য। আচ্ছা তুমি কোন দ্বীপে এ গাছ প্রচুর দেখেছিলে বড় বড়? দ্বীপের লোক চাষ করে বুঝি?

    —ও দ্বীপে লোকই থাকে না কেউ। শুধু বাস্তেন সাহেব ছিল। সেই বোধহয় লাগিয়েছিল।

    —দ্বীপটা কোথায়?

    —জাভা সি—তে। ছোট্ট দ্বীপ। বনজঙ্গলে ভরা।

    —তুমি ওখানে গিছলে কেন?

    —গিয়েছিলাম বাধ্য হয়ে, প্রাণ বাঁচাতে। সাধ করে কি ও দ্বীপে যায় কেউ?

    —কী রকম? আমরা সবাই কৌতূহলী।

    —তাহলে একটা লম্বা গল্প ফাঁদতে হয়, জানায় মিকি। বোঝা গেল যে গল্পটা বলতে তার অনিচ্ছা নেই, তবে আমরা শুনব কিনা বুঝতে পারছে না।

    —বলো বলো কী হয়েছিল? আমরা তাড়া লাগাই। বাগানের বেঞ্চিতে আর বেদিতে বসি সবাই।

    মিকি বলতে শুরু করে, সে প্রায় দশ বছর আগের ঘটনা। আমাদের জাহাজ ফিলিপিনস সেলিবিস লম্বক মাদুরা হয়ে যাচ্ছিল জাকার্তায়। মাদুরা ছেড়ে যাবার কিছু পরেই হঠাৎ উঠল। ঝড়। প্রচণ্ড ঝড়। তখন শীতকাল। তখন ওখানে ঝড় কমই হয়। তবে বৃষ্টি হয় প্রায়ই। ঝড়ের দাপটে ডুবোপাহাড়ে ধাক্কা লেগে আমাদের জাহাজের তলা ফুটো হয়ে ডুবতে লাগল। সবাই প্রাণ বাঁচাতে জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল কাছাকাছি কোনো দ্বীপে আশ্রয় নেবার আশায়। একটা লাইফ—বেল্ট জোগাড় করে আমিও ঝাপালাম জলে। ওখানে ছোট বড় প্রচুর দ্বীপ। স্রোত আর বাতাসের টানে ভাসতে ভাসতে প্রথমে উঠলাম এক ছোট্ট ন্যাড়া দ্বীপে। সেখানে মানুষজনের বাস তো নেই—ই। গাছপালাও খুব কম। শুধু অজস্র সামুদ্রিক পাখির আস্তানা। পাখির ডিম খেয়ে কোনোমতে সেখানে দুটো দিন কাটালাম। জোর বৃষ্টি পড়ছে থেকে থেকে। কোনোরকমে পাথরের খাঁজের তলায় মাথা গুঁজে রইলাম। বুঝলাম যে এখানে থাকলে স্রেফ না খেয়ে বা ভিজে অসুখ করে মরব। মাইল দুই দূরে আর একটা দ্বীপ দেখা যাচ্ছিল, একটু যেন বড়। লাইফবেল্ট আঁকড়ে ফের জলে নামলাম। সাঁতরে হাজির হলাম ওই দ্বীপে। ওই দ্বীপেই দেখেছিলাম ওপিয়াম গাছের ঝাড়।

    —সে দ্বীপে মানুষ ছিল না?

    —না। ছোট্ট দ্বীপ। তবে দ্বীপে গাছপালা প্রচুর। ঝরনা রয়েছে একটা। কয়েকটা ছোট পুকুর। বড় উঁচুনিচু। সমতল জায়গা কম। মাঝখানে এক ছোট পাহাড়। গুহাও রয়েছে কয়েকটা। ঘরে দেখে আমি অবাক। কত রকম যে গাছপালা দ্বীপটায়। দেশি বিদেশি। এমন দ্বীপ জন্মে দেখিনি। রীতিমতো গা ছমছম করতে লাগল। রবার গাছ, তাল আনারস আম জাম কাঁঠাল ডুরিয়ান কফি চা পেয়ারা বাঁশ কলা তেঁতুল, আরও কত কী! কত রকম যে ফুল ফুটেছে। অনেক ফুল চোখেই দেখিনি আগে। সেখানেই এই ওপিয়াম গাছ। দেখেছিলাম।

    —পাহাড়ের গায়ে একটু সমতল জায়গায় একটা ভাঙাচোরা কাঠের বাড়ি দেখলাম। কাঠ আর বাঁশ দিয়ে তৈরি। বেশ বড়ই ছিল একসময়। বুঝলাম, মানুষের বাস ছিল সেখানে। কিন্তু তখন জনমনিয্যি নেই।

    —তবে খাবার সমস্যাটা মিটল। খাবার মতো প্রচুর ফল গাছে গাছে। মুরগি আর ছাগল চরছে। বুনো। সামুদ্রিক পাখি আর তাদের ডিমও পাওয়া গেল প্রচুর। বড় একটা ডোবায় সাঁতার কাটছে পাতি হাঁস। ওই ডোবার পাশেই দেখি মস্ত মস্ত ওপিয়াম গাছের ঝাড়।

    আমার সঙ্গে আগুন জ্বালাবার ব্যবস্থা ছিল। ওয়াটারপ্রুফ কেসের মধ্যে রাখা লাইটার। একটা গুহা খুঁজে আশ্রয় নিলাম। আগুন জ্বালালাম। ফল ও ঝলসানো মাংস খেয়ে কাটাতে লাগলাম। নজর রাখছি কোনো নৌকো বা জাহাজের দেখা যদি পাই। চারদিন বাদে দেখি দুটো বড় বড় নৌকো যাচ্ছে দ্বীপের কাছ দিয়ে। কাপড় নাড়িয়ে নানান ইঙ্গিতে ডাকলাম তাদের। ওরা সিঙ্গাপুর যাচ্ছিল। আমার তুলে নিল। নামিয়ে দিল জাকার্তায়। বেঁচে গেলাম সেযাত্রা।

    —ওই দ্বীপটা সম্বন্ধে খোঁজখবর করেছিলে? প্রশ্ন করেন মামাবাবু।

    —করেছিলাম বইকি। ওখানকার লোক ওই দ্বীপটাকে বলে—বাস্তেন সাহেবের দ্বীপ। বাস্তেন আইল্যান্ড। ফন বাস্তেন নামে এক ডাচ ওই দ্বীপটায় ছিল অনেক বছর। প্রায় পনেরো বছর। বাস্তেনই নাকি দ্বীপে অত গাছপালা লাগিয়েছিল। তার আগে দ্বীপটায় তেমন গাছপালা ছিল না। তবে নারকেল গাছ ছিল। আর বুনো ঝোঁপঝাড়।

    —বাস্তেন সাহেব ওখানে কী করত? মামাবাবু জানতে চান।

    —অদ্ভুত লোক ছিল নাকি বাস্তেন। খেয়ালি প্রকৃতির। ওখানকার লোকদের মুখে যা শুনেছি। যৌবনে এসেছিল ইন্দোনেশিয়ায়। রবার বাগানে ম্যানেজারি করতে। চার—পাঁচ বছর ছিল আন্দালুস আর জাভায়। এই সময় দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড—ওয়ার বাধল। বাস্তেন কালিমাস্তান মানে বোর্নিও গিয়েছিল কাজে। স্টিমারে জাকার্তায় ফিরতে ফিরতে খবর পায় যে জাপানিরা জাভা অধিকার করে নিয়েছে। সাউথ—ইস্ট এশিয়া আক্রমণ করেছে জাপানিরা। হুড়হুড় করে এগোচ্ছে তাদের ফোর্স। জাপদের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে বাস্তেন আর জাকার্তায় ফেরে না। জাভা সি—তে ওই একরত্তি জনমানবহীন দ্বীপে নেমে যায়। সেখানে লুকিয়ে থাকে মাসখানেক। এরপর দেশি জেলেদের নৌকায় চেপে ছদ্মবেশে হাজির হয় আন্দালাসের তীরে। তারপর স্রেফ জঙ্গলে গিয়ে লুকোয়। গভীর অরণ্যে।

    —আন্দালাস কোথায়? সুনন্দ প্রশ্ন করে।

    ইতিহাসের ছাত্র আমি পাণ্ডিত্য ফলাবার সুযোগ হারাই না।

    গম্ভীরভাবে জানাই, আমরা যাকে বলি সুমাত্রা, তারই লোকাল নেম।

    মামাবাবু ও মিকি মাথা নেড়ে সায় দেয়। বুঝি মিকি সুমাত্রা নামটা জানে।

    মিকি বলে চলে, বাস্তেন সাহেব আন্দালাসের পাহাড়—জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল বছর দই। কী করে যে বেঁচে ছিল কে জানে? জঙ্গল যা ঘন। যা বৃষ্টি। বিষাক্ত সাপখোপ। ডিম জানোয়ারও আছে। অবশ্য জঙ্গলের আদিবাসীদের ধরনধারণ ভাষা কিছুটা জানত বাজে,

    —যুদ্ধ থেমে গেলে বাস্তেন বেরিয়ে আসে শহরে। জাপানিরা হেরে গেছে তাই ভয় নেই আর। এরপর বাস্তেন চলে যায় নিজের দেশ হলান্ডে। কিন্তু ফিরে আসে আবার। জার্মানির আক্রমণে ওর অনেক নিকট আত্মীয় নাকি মারা গিয়েছিল। দেশে ওর ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দেশে ওর আর মন টিকছিল না।

    অনেকক্ষণ কথা বলেছে মিকি। মামাবাবু তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, এক কাপ কফি খাবে নাকি?

    —তা বেশ। মিকি রাজি।

    কফিতে চুমুক দিতে দিতে ফের শুরু করে মিকি, বাস্তেন বছর খানেক নানা কাজ করে। ইন্দোনেশিয়ার কয়েক জায়গায়। তারপর নাকি ওই দ্বীপে গিয়ে আস্তানা গাড়ে। চাকরি আর করেনি। বাস্তেনের গাছপালার খুব শখ ছিল। জানতও বেশ গাছপালা সম্বন্ধে। ওই দ্বীপে বাঝেন খুশিমতো গাছ পুঁততে থাকে। দেশ—বিদেশের গাছের চারা বিচি জোগাড় করে, ফুল। ফল অনেক রকম। তাই নিয়েই মেতে থাকত। সমুদ্র পেরিয়ে বড় দ্বীপের শহরে যেত। অবশ্য, তবে খুব কম। দরকার না হলে যেত না শহরে।

    —স্রেফ একা গিয়েছিল? জিজ্ঞেস করি আমি।

    —না। এক মালয়ি যুবককে সঙ্গে নিয়ে যায়। ওর খুব অনুগত ও বিশ্বাসী। দ্বীপে নিজের বাড়ি বানাতে কিছু দেশি মজুরকে নিয়ে গিয়েছিল কয়েকবার অল্প দিনের জন্য। পরেও মজুর নিয়ে গেছে গাছ কাটতে, জমি কোপাতে, এমনি নানা কাজে। তবে তারা বেশিদিন থাকেনি দ্বীপে।

    —বাস্তেন জাভায় যাওয়া—আসা করত কীভাবে? মামাবাবু জানতে চান।

    —ওদের একটা ছোট মোটর বোট ছিল তাতে। বাস্তেন এবং ওর অনুচর পো দুজনেই বোট চালাতে পারত। কখনো কখনো পো একাই ঘুরে আসত জাভায় সুমাত্রায় বোট চালিয়ে। মাঝে মাঝে জাভা থেকে নৌকা যেত ওই দ্বীপে, দরকারি খাবার—দাবার জিনিসপত্র নিয়ে। বাইরের লোক বেশি আসা পছন্দ করত না বাস্তেন। মাঝিরা যারা যেত দরকারে তাদের মুখেই লোকে শুনত বাস্তেনের নানা কথা। বাস্তেন গাছের চারা আর বীজের খোঁজে যেত জাভা সুমাত্রা আর কাছাকাছি দ্বীপে। অর্ডার দিয়ে আনাত চারা ও বীজ। দ্বীপটা তখন নাকি রীতিমতো রহস্যময় ছিল বাইরের লোকের কাছে।

    —পনেরো বছর পর বাস্তেন কোথায় যায়? প্রশ্ন করেন মামাবাবু।

    —যায়নি কোথাও। ওখানেই হঠাৎ সে মারা যায় অ্যাকসিডেন্টে। পাহাড় থেকে পিছলে পড়ে মাথায় চোট পায়। তখন কয়েকজন মাঝি গিয়েছিল ওই দ্বীপে,তারাই এসে প্রথম খবরটা দেয় জাকার্তায়। ওই দ্বীপেই বাস্তেনকে কবর দেওয়া হয়। ওর অনুচর পো বেশি দিন আর থাকেনি ওই দ্বীপে। বাস্তেনের মোটরবোট চালিয়ে, বাস্তেনের বন্দুকটা আর কিছু দামি জিনিসপত্র নিয়ে চলে যায় মালয়। আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। তারপর থেকেই দ্বীপটা জনশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। মাঝে মাঝে দেশি মাঝিরা গিয়েছে ওই দ্বীপে ফলটলের সন্ধানে। কিন্তু বাস করেনি কেউ স্থায়ীভাবে।

    —তুমি বাস্তেন দ্বীপের কথা জানতে না আগে? মামাবাবুর প্রশ্ন।

    —না। আসলে আমাদের দেশটা তো অজস্র দ্বীপের রাজত্ব। জাভা সি, ফ্লোরেস সি, বান্দা সি, চায়না সি, সুলু সি—এমনি কত সাগরে হাজার হাজার ছোট বড় দ্বীপ ছড়িয়ে আছে। বড় দ্বীপগুলোর মোটামুটি খবর রাখলেও খুব ছোটগুলো আমাদের প্রায় অচেনা। বিশেষত আমার। আমি যে কটা জাহাজ কোম্পানিতে কাজ করেছি তাদের জাহাজ যায় বেশির ভাগ পশ্চিমে বা উত্তরে। বড় পোর্টগুলোয় জাহাজ থামে। সেগুলো চিনি। বাস্তেন দ্বীপের গল্প করে শুধু জাকার্তার জেলেরা আর নৌকার মাঝিরা। তাদের সঙ্গে আমার তত মেলামেশা নেই। জাকার্তায় গেছি অনেকবার। তবে সেখানে জাহাজি নাবিকদের সঙ্গেই মিশেছি বেশি। তাই আগে জানতেম না বাস্তেন দ্বীপের কথা।

    —তুমি অনেক পোর্টে ঘুরেছ তাই না? সুনন্দ বলে।

    —ঘুরেছি বইকি। জাকার্তা, সিঙ্গাপুর, পেনাং, রেঙ্গুন, ব্যাংকক, ক্যালকাতা, কলম্বো, করাচি কতবার গেছি। এদেন ডার্বানও গেছি। ফিলিপাইনসে ম্যানিলা গেছি। ব্রিসবেন গেছি। কালিমাস্তান মানে বোর্নিওতে ম্যাকাসার পোর্টে গেছি অনেকবার। ওই সব পোর্টটাউনে ঘুরেছি। সগর্বে ঘোষণা করে মিকি। বলে, তবে বেকায়দায় পড়ে খুব ছোট বা নির্জন বসতিহীন দ্বীপেও জাহাজ নোঙর ফেলেছে কয়েকবার।

    আমরা হাঁ করে শুনি। ওঃ লোকটার জীবন বটে। কত ঘুরেছে। কত কী দেখেছে!

    মামাবাবুর পিছু পিছু মিকি বাগানে গ্রিনহাউসে ঢোকে। খড়ের চাল, দরমার দেয়াল, ছোট লম্বাটে ঘরটায় নানান অর্কিড় ঝুলছে। ঘরটা বেশ ঠাণ্ডা। তবে রোদ ঢোকে দরমার বেডা সরিয়ে দিলে। ঘরের মেঝেতে লম্বা লম্বা কয়েকটা টবে কিছু পপি গাছ দেখে মিিক বলল, এই গাছ আমি ওই দ্বীপে দেখেছি। এর চেয়ে অনেক বড় বড় সাইজের।

    —এগুলো কী ফুলের গাছ জানো? মামাবাবু প্রশ্ন করেন।

    —না।

    —এগুলোর নাম ক্যালিফোর্নিয়ান পপি। সত্যি তুমি এই গাছ দেখেছ বাস্তেন দ্বীপে? মিকি পপি গাছগুলোর পাতায় হাত দিয়ে দেখে বলল, আলবৎ এই গাছ। তবে সাইজে প্রায় ডবল। ফুল ছিল না মোটে। মাত্র দু—একটা ছোট্ট ছোট্ট ফুল ফুটেছিল এইরকম, এই রং—এর। হুঁ এই গাছই। এই পাতা। আমি তো ভেবেছিলাম লম্বা মোটা পাতার ঘাস। কী নাম বলছেন? পপি।

    —কোথায় দেখলে? মামাবাবু জানতে চান।

    —এক জায়গায় ঝরনার গা থেকে সরু নালা বেরিয়েছে, তার ধারে ধারে ছিল এই পপি গাছ। প্রচুর।

    মিকি তার সমুদ্র ভ্রমণের অ্যাডভেঞ্চার আরও বলে। এমন শহুরে শিক্ষিত শ্রোতা মুগ্ধ হয়ে তার গল্প শুনছে এ অভিজ্ঞতা তার জীবনে এই প্রথম।

    মামাবাবু কিঞ্চিৎ অন্যমনস্ক। কিছু ভাবছেন যেন? তিনি হঠাৎ বললেন, আচ্ছা মিকি ওই বাস্তেন সাহেবের চলত কীভাবে শুনেছ? মানে দ্বীপে থাকার সময় চাকরি তো করতেন না। খরচাপাতি চালাত কী করে খোঁজ পেয়েছিলে?

    মিকি থমকে গিয়ে একটু ভেবে বলে, হঁ আমিও ভেবেছি ব্যাপারটা। মাঝিদের মখে শুনে যা মনে হয়েছিল বাস্তেনের অনেক জমানো টাকা ছিল জাকার্তার কোনো বাংকে। মোটা মাইনের চাকরি করেছে তো আগে। হয়তো দেশ থেকে কিছু টাকা নিয়ে এসেছিল।

    তবে ওই দ্বীপে থাকার সময়েও বাস্তেনের অন্য রোজগারের পথ ছিল। লোকটি নাকি চমৎকার ছবি আঁকতে পারত। হাতের কাজ ছিল দারুণ। চামড়া আর কাগজের মুখোশ, নকশা আঁকা বাঁশের পাত্র, নানান ডিজাইনের বাতিকের কাজ করা কাপড়—এই সব বানিয়ে এনে কয়েক মাস অন্তর অন্তর বিক্রি করত জাভায়। ভালো ডিমান্দ ছিল ওর হাতের কাজের, শিল্প—দ্রব্যের। এই ভাবেই চালাত খরচ, আমার তাই মনে হয়। জাকার্তার মাঝিদেরও তাই ধারণা।

    —হুম। মামাবাবু ফের আনমনা হয়ে ভাবেন কিছু। এরপর একসময় জিজ্ঞেস করেন মিকিকে, তুমি দেশে ফিরছ কবে?

    —এই পনেরো—কুড়ি দিন বাদে।

    —তারপর থাকবে কিছুদিন দেশে।

    —থাকব। অন্তত মাস তিনেক। বাড়িঘর সারানো, চাষবাসের কাজ আছে।

    মামাবাবু বললেন, শোনো মিকি, মাসখানেক বাদে আমি সিঙ্গাপুর যাব একটা কাজে। আমরা তিনজনেই যেতে পারি। গেলে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই। তুমি সুমাত্রা মানে আন্দালাসে থাকো কোথায়?

    —সুমাত্রার দক্ষিণ—পুবে পালেমবাং নামে একটা ছোট শহরের কাছে আমার গ্রাম।

    —সিঙ্গাপুর থেকে তোমার সঙ্গে যোগাযযাগ করব কীভাবে? টেলিফোন বা টেলিগ্রাম করলে?

    মিকি বলে টেলিফোন তো নেই আমার বাসায়। তবে গ্রামের পোস্ট অফিসে টেলিফোন করে আমায় কোনো খবর দিতে বললে জানিয়ে দেবে আমায়। হা টেলিগ্রাম করলে পাব।

    জানতাম যে সিঙ্গাপুরে মামাবাবুর একটা কনফারেন্স আছে ডিসেম্বরের শেষে। সঙ্গে সুনন্দও যাচ্ছে। কথার ভাবে মনে হল আমাকেও হয়তো সঙ্গে নেবেন। মনে মনে আমি পুলকিত। কিন্তু এরপরেই মামাবাবুর কথা শুনে আমি ও সুনন্দ চমকাই।

    —বুঝলে মিকি, আমি ওই বাস্তেন দ্বীপে একবার যেতে চাই। দেখব ওখানকার গাছপালা। তুমি পারবে না আমাদের গাইড হয়ে নিয়ে যেতে? সেই কদিনের জন্য তোমার যা প্রাপ্য আমি দেব। কিন্তু তোমার হেল্প চাই। আমরা তো চিনি না ওদেশ। তুমিই নৌকা ভাড়ার ব্যবস্থা করবে। খাওয়া থাকা ইত্যাদি সব খরচ আমার। দ্বীপটার গাছপালা আমার দারুণ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। অত কাছে গিয়েও স্বচক্ষে ওই দ্বীপ না দেখে এলে ভারি আপশোস হবে।

    সুনন্দ চিড়বিড়িয়ে ওঠে, সিঙ্গাপুর থেকে ফিরেই যে আপনাকে গোয়ায় যেতে হবে অল ইন্ডিয়া জুওলজিকাল সোসাইটির কনফারেন্সে। একটা সেশনে আপনি প্রিসাইড করবেন। কথা দিয়েছেন।

    —যাব না গোয়া। ওদের জানিয়ে দেব। মামাবাবু নির্বিকার।

    শুনে সুনন্দ থ। আমিও। মামাবাবু তো এমন কথার খেলাপ করেন না। আমার মনে হল যে বাস্তেন আইল্যান্ড যাবার প্ল্যান মোটেই গাছগাছড়া দেখার লোভে নিছক শখের ভ্রমণ নয়। মামাবাবুর স্বভাব জানি। অন্য কোনো গোপন উদ্দেশ্য আছে। এই নিয়ে এখন প্রশ্ন করলে আসল কারণ ভাঙবেন না। পরে হয়তো নিজেই বলবেন কারণটা।

    —কি মিকি যাবে নিয়ে? মামাবাবু ফের অনুরোধ করেন সাগ্রহে।

    প্রস্তাব শুনে মিকি কেমন মিইয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলে, দশ বছরেরও আগে গিয়েছিলাম ওই দ্বীপে। আর যাইনি ওর কাছ দিয়ে। ওখানকার ছোট দ্বীপগুলো তেমন চিনি না আমি।

    মামাবার মিকির দ্বিধা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, তা লাগুক সময় খুঁজতে। দু—চার দিন নষ্ট হলে আমার ক্ষতি নেই। দ্বীপটায় পা দিলে চিনতে পারবে?

    —তা পারব। দ্বীপের কয়েকটা চিহ্ন মনে আছে।

    —ব্যস ব্যস তাহলেই হল।

    মিকি বলে, পালেমবাংয়ে আমার চেনা একজনের নৌকা আছে। লামপুং বন্দরে তার নৌকা থাকে। ভাড়া খাটে। তাকে বললে সে ঠিক রাজি হয়ে যাবে তার নৌকা ভাড়া দিতে।

  • কেল্লাপাহাড়ের গুপ্তধন

    কেল্লাপাহাড়ের গুপ্তধন

    অজেয় রায়

    [book]

    এক

    চৈত্র মাস। রতন এসে প্রস্তাব দিল, চল, কেওঞ্ঝরগড় বেড়িয়ে আসি। ছোটকাকার বাড়ি।

    রতন ও আমি ছেলেবেলার বন্ধ। ও ভতত্তের ছাত্র, আপাতত গবেষণা করছে। আমার বিষয় প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস। আমিও গবেষণা করছি একটি ফেলোশিপ পেয়ে—প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে।

    কেওঞ্ঝর উড়িষ্যার শহর এইটুকুই জানতাম, তার বেশি কিছু না। তাই প্রথমটা একটু গাঁইগুঁই করছিলাম। রতন তাড়া দিয়ে বলল, চ চ, প্রাগৈতিহাসিক! শুনেছি জায়গাটা দারুণ। যাসনি তো কখনও। দুজনেরই খোরাক মিলবে। ওখানে প্রচুর পাহাড়—জঙ্গল। ছোট বড় পুরনো মন্দির আর মূর্তির ছড়াছড়ি। আমিও ধারে—কাছের খনিগুলো দেখে নেব। আর কাকা কাকিমা দুজনেই গ্র্যান্ড লোক, বুঝলি।

    দিন কয়েকের মধ্যেই কেওঞ্ঝরগড় গিয়ে হাজির হলাম। রতনের কাকা মিস্টার দত্তকে দেখে প্রথমে একটু ঘাবড়েছিলাম। বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছর, লম্বা ভারিক্কি সুপুরুষ চেহারা, রঙ টকটকে ফরসা। মাথায় কাঁচাপাকা চুল, খুব কম কথা বলেন। নাম করা এনজিনিয়ার।

    প্রথম দিন পরিচয় হবার পর আমায় বলেছিলেন, প্রতাপাদিত্য চৌধুরী। বাঃ, বেশ নাম তো তোমার।

    কেমন ইতিহাসের গন্ধ আছে, তাই না?রতন পাশ থেকে টিপ্পনী কাটে। মিঃ দত্ত একটু হাসেন। ব্যস, আর কথাবার্তা হয়নি তাঁর সঙ্গে। খুব ব্যস্ত মানুষ, তবে সাদাসিধে।

    কাকিমা অবশ্য ভারি আমুদে। আমাদের পেয়ে মহা হৈ—চৈ জুড়ে দিলেন। চট করে জেনে নিলেন, আমি কী কী খেতে ভালবাসি। তিনি খানিক আমাদের সঙ্গে আড্ডা দেন, আর খানিক রান্নাঘরে ঢোকেন। এই চলল তার রুটিন।

    আসলে রতনকে এঁরা ভীষণ ভালবাসেন। এঁদের ছেলেপুলে নেই। রতনকে দেখেন ছেলের মতন। রতন সুযোগ পেলেই কাকার কাছে বেড়াতে আসে। তবে এবার এসেছে। অনেক দিন পরে। তাই খাতির—যত্নটা কিঞ্চিৎ বেশি।

    কেওঞ্ঝরগড় আসার পর দ্বিতীয় দিন সকালে কাকাবাবুর কোয়ার্টারের সামনে লনে পায়চারি করছি আমি ও রতন, এমন সময় হঠাৎ এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন সামনে। শ্যামবর্ণ, নাদুসনুদুস মাঝারি হাইট। গোলগাল হাসি হাসি মুখ, মাথার সামনের দিকে একট টাক। নীল সার্ট ও সাদা ফুলপ্যান্ট পরা। ঝুঁকে পড়ে রতনের হাত আঁকডে ঝাঁকিয়ে বললেন—গ্ল্যাড টু মিট ইউ। এরপরই আমার সঙ্গে একদফা হ্যান্ডশেক।

    —বস মানে দত্ত সাহেব বললেন, আপনাদের একটু ঘুরিয়ে—টুরিয়ে দেখাতে, হেল্প করতে। তারপর রতনের মুখের পানে তাকিয়ে—আপনি বুঝি দত্ত সাহেবের ভাইপো?, হুঁ ঠিক। চেহারায় ভারি মিল।

    এমন হুড়মুড়িয়ে কথা বলছিলেন ভদ্রলোক যে রতন থতমত খেয়ে বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনি?

    আমি? আমি নন্দদুলাল বোস।

    ভদ্রলোক আমাদের তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে জরিপ করতে করতে বেশ সজোরে বিড়বিড় করে চললেন—হুঁ, পঁচিশ ছাব্বিশের বেশি নয়…এ্যাট লিস্ট দশ বছরের সিনিয়ার হব…অতএব ব্রাদার এবং তুমি! কি, আপত্তি আছে?

    খানিকক্ষণ সময় লাগল হেঁয়ালি বোধগম্য হতে। তারপর বলে উঠলাম, না, না, আপত্তির কি? নিশ্চয় তুমি বলবেন। ভদ্রলোক খুশিতে উজ্জ্বল হন। রতন মিটমিটিয়ে দুষ্টু হেসে বলল, আর আমরা যদি ডাকি বোসদা, আপত্তি আছে?

    সার্টেনলি নট।

    বোসদার সঙ্গে দারুণ জমে গেল। পরে জেনেছিলাম উনি কেওঞ্ঝরগড়ে এসেছেন মাত্র দু—বছর। বিয়ে করেছেন বছর তিনেক, তবে ফ্যামিলি, মানে স্ত্রী, থাকেন দেশের বাড়ি বর্ধমানে। বোসদা এখানে থাকেন একা।

    জায়গাটা সত্যি সুন্দর। পুরনো আমলের ছোট্ট শহর। দেশীয় রাজার রাজধানী ছিল। শহরের চারপাশ পাহাড় ও জঙ্গলে ঘেরা। কলকাতা থেকে এসে ভারি আরাম লাগে।

    মিস্টার দত্তর গল্প করার ধাত নয়, তবে নজর ঠিক আছে। একদিন চা খাচ্ছি, এমন সময় সামনে এসে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কেমন বেড়াচ্ছ? বোস সব দেখাচ্ছে তো?

    বললাম, নতুন আর পুরনো দুটো রাজপ্রাসাদ দেখেছি। এবার জগন্নাথ মন্দির দেখতে যাব। ধারে—কাছে নাকি অনেক প্রাচীন মন্দির আছে?

    মিস্টার দত্ত বললেন, আছে বৈকি। উড়িষ্যা হচ্ছে মন্দির আর মূর্তির দেশ। পুরী, কোনারক, ভুবনেশ্বরের কথা ছেড়ে দিলেও আমি ঘুরতে ঘুরতে দেখেছি কত অজানা ছোট্ট গ্রামে কী সুন্দর মন্দির আর বিগ্রহ। মাঠে—ঘাটে পাওয়া যায় কত মূর্তি। বিশেষ করে পাথরে তৈরি! সামান্য দামে লোকে সে সব বেচে দেয়। আমার ড্রইংরুমে যে পাথরের যক্ষমূর্তিটা রয়েছে ওটা এক ওভারসিয়ার আমায় প্রেজেন্ট করেছে। কী সুন্দর না?

    সেই দিনই গেলাম জগন্নাথ মন্দির দেখতে। কে জানত সেখানে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে আছে এক চমক।

    আমি ও রতন মন্দির দেখছি। দেওয়ালের গায়ে মূর্তি দেখতে দেখতে ঊর্ধ্ব মুখে মন্দিরকে পাক দিচ্ছি। ঠিক একই ভাবে আর একজন ঘাড় উঁচু করে এলো উলটো দিক থেকে। তার মুখ দেখতে পাচ্ছি না। রঙ কালো। বেশ লম্বা। কেঁকড়া চুল, সার্ট ও ফুলপ্যান্ট পরনে, জোয়ান চেহারা।

    সে মখ ফেরাতেই চমকে রতনকে খোঁচা মারলাম—দেখ, ডাকু।

    আগন্তুকের কানে আমার কথা গিয়েছিল। সে পিটপিটিয়ে আমাদের দিকে চেয়ে দেখল কয়েক সেকেন্ড। তারপর লাফাতে লাফাতে এসে—অ্যাঁ, তোরা? বলে জাপটে ধরল দুজনকে।

    উঃ কী গায়ে জোর। দম বন্ধ হবার যোগাড। বলি—ছাড় ছাড। তুই এখানে কোত্থেকে?

    ডাকুর সঙ্গে এমন যোগাযোগ হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি। ওর সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার আশাই মুছে গিয়েছিল মন থেকে। ও ছিল ইস্কলে একটানা পাঁচ বছর ধরে আমাদের দুজনের সহপাঠী। পড়াশুনায় মাঝারি, কিন্তু দারুণ ফুটবল খেলত, আর ডানপিটেমিতে ছিল এক নম্বর ওস্তাদ। ক্লাস নাইনে পড়তে পড়তে ও স্কুল ছেড়ে দেয়। কারণ ওর বাবার আকস্মিক মৃত্যু। তখন ডাকুরা সব ভাইবোন মা—র সঙ্গে কলকাতা ছেড়ে ওদের দেশের বাড়ি মেদিনীপুরে চলে যায়। আর দেখা হয়নি। প্রথমে কয়েকবার চিঠিপত্র লেখালেখি হয়েছে। ক্রমে তাও বন্ধ হয়ে গেছে।

    রতন বলল, হ্যাঁ রে তুই আছিস কেমন? এখানে কী করছিস?

    ডাকু ম্লানমুখে বলল, আছি এক রকম। টিকে আছি। এখানে এসেছি চাকরি করতে।

    কী চাকরি? কদিন হল?

    সামান্য চাকরি ভাই। কেরানিগিরি। দুমাস কেওঞ্ঝরগড়ে এসেছি। উড়িষ্যায় আছি পাঁচ বছর। আগে ছিলাম জাজপুরে। এখানে কোম্পানি একটা নতুন ব্রাঞ্চ খুলেছে, তাই ট্রান্সফার হয়ে এসেছি। বুঝলি, স্কুল ফাইনালের পর আর তো লেখাপড়া এগুল না। আমার গাঁয়ের কাছে কলেজ নেই। শহরে হোস্টেলে থেকে পড়া সম্ভব নয়। তাই দেশেই ছিলাম। যা। সামান্য জমিজায়গা আছে, চাষ—বাস দেখতাম। কিন্তু তাতে কি সংসার চলে? তখন আমার এক আত্মীয় এই চাকরিটা জুটিয়ে দিল। মাইনে কম বলে দুঃখ নেই, কিন্তু বসে বসে একঘেয়ে হিসেব কষতে অসহ্য লাগে। ছোটবেলায় ভাবতাম বড় ফুটবলার হব, হল না। ভাগ্যে। স্কুল ফাইনাল পাস করে নেভিতে ঢুকতে চাইলাম, বাড়িতে কান্নাকাটি করে দিলে আটকে। এখন এই করছি।—

    বড় কষ্ট হল। জানি তো কী ছটফটে প্রাণশক্তি ভরা দুরন্ত ছেলে ছিল ডাকু। বেচারা।

    ডাকু একটু হেসে বলল, তবে একদম ঘেঁতিয়ে যাইনি। সুযোগ পেলেই শিকার করি। বাবার বন্দুকটা আছে। কয়েকটা বড় জানোয়ারও মেরেছি।

    তিনজনে ফিরলাম। বোসদা ডাকুর আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বললেন, ব্রাদার ইটি

    রতন বলল, শ্রীযুক্ত শান্তসুবোধ শাসমল ওরফে ডাকু। আমাদের ইস্কুলের বন্ধ। এখানে চাকরি করে।

    ডাকু কেন? বোসদা জানতে চাইল।

    অসম্ভব ডানপিটে ছিল কিনা, তাই স্কুলে ওই খেতাব পায়। বলল রতন।

    বোসদা ডাকুর দিকে চেয়ে বললেন, হুঁ, চেহারাটা কিঞ্চিৎ গুণ্ডে গুণ্ডো বটে। কিন্তু ব্রাদার, এ ব্যক্তি লোক খারাপ নয়। হাসিটি ভারি মিষ্টি।

    আরও দুটো দিন ডাকু আমি আর রতন প্রাণভরে আড্ডা দিলাম। মাঝে মাঝে বোসদাও যোগ দেন। পুরনো দিনের কত গল্প হয়। কত মজার ঘটনা, দুষ্টুমির কথা। কাছাকাছি কী কী দেখতে যাব প্ল্যান করি। এমনি করেই হয়ত আমাদের বাকি দিনকটা কেটে যেত, যদি না রতনের কাকা দেব—বাড়ির মিউজিয়ামের কথা শোনাতেন। কারণ সেই মিউজিয়াম দেখতে গিয়েই আবিষ্কার হল এক রহস্যের সূত্র, যার ফলে জড়িয়ে পড়লাম এক দারুণ রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারে।

    জাজপুরের কাছে দেবদের প্যালেস। লোকে বলে রাজবাড়ি, তবে ঠিক রাজা নয়—খুব বড় জমিদার, আর খুব পুরনো ফ্যামিলি। এই বাড়িতে দুটো দেখবার জিনিস আছে। এক হল অষ্টধাতুর বিগ্রহ, আরেক হল অস্ত্রশস্ত্রের এক বিরাট সংগ্রহশালা। ছোটকাকা দেবমশাইকে খবর দেওয়াতে তিনি আমাদের সাদর আমন্ত্রণ জানালেন। বলা বাহুল্য, ডাকুকেও আমরা সঙ্গে নিলাম। বোসদারও ইচ্ছে ছিল মিউজিয়াম দেখার, কিন্তু গাড়িতে জায়গা কম; তাছাড়া ব—এর সঙ্গে যাওয়াটাও একটু অস্বস্তিকর, তাই তিনি চেপে গেলেন।

    খুব ভোরে আমরা রওনা হলাম।

    জাজপুর—কেওঞ্ঝর রোড রাস্তাটি ভারি সুন্দর। পিচ বাঁধানো প্রশস্ত সড়ক। আমাদের মোটর চলেছে হু—হুঁ করে। পথের দুপাশে কখনো বিস্তীর্ণ প্রান্তর, কখনো ঝোঁপঝাড়, হালকা জঙ্গল, কখনও বা উঁচু—নিচু বনময় পাহাড়।

    ডাকু এ পথে যাতায়াত করেছে। চিনিয়ে দিল—ডানদিকে দূরে ওই যে উঁচু পাহাড়, ওর নাম টোমকা। এরপরে আসবে মহাগিরি রেঞ্জ।

    মাঝে মাঝে গ্রাম বা ছোট লোকালয় চোখে পড়ে। পথে রামচন্দ্রপুরে একবার থেমেছিলাম আড়মোড়া ভাঙতে। রামচন্দ্রপুর নাকি পুলিশ স্টেশন। কিন্তু ছোট্ট লোকালয়। দেব—বাড়ি পৌঁছলাম বেলা দশটা নাগাদ।

    জাজপুর—কেওর স্টেশন রোড ছাড়িয়ে, পিচ রাস্তা থেকে বেরিয়ে যাওয়া একটা চওডা মেঠো রাস্তা ধরে মাইল দুই ঢুকে এক গ্রামে পৌঁছলাম। দেখে মনে হয় এককালে বেশ বর্ধিষ্ণ ছিল এই গ্রাম। গাছপালার আড়াল থেকে সহসা জেগে উঠল উঁচু পাঁচিলে ঘেরা এক প্রকাণ্ড দোতলা অট্টালিকা। লক্ষ করলাম, অট্টালিকার কয়েকটি অংশ খুবই জীর্ণ। বাড়ির চার পাশে পরিখা কাটা ছিল, এখন বুজে গেছে।

    ভিতরে খবর পাঠানো হল।

    বাব খগেশ্বর দেব মহাশয় স্বয়ং বেরিয়ে এলেন আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে। সৌম্যকান্তি দীর্ঘকায় বৃদ্ধ। গায়ের রঙ টক্টকে, মাথা জোড়া টাক, নাকটি টিয়াপাখির মতন। বয়সের ভারে শরীর সামান্য নুইয়ে পড়েছে সামনে।

    কাকাবাবু বললেন একদম সময় পাই না বলে আসা হয়নি অ্যাদ্দিন। তবে মিউজিয়াম দেখার ইচ্ছে ছিল খুবই। এবার এরা ধরল, তাই এসে পড়লাম।

    কাকাবাবু আমাদের পরিচয় দিলেন। বৃদ্ধ হাসিমুখে বললেন, আপনারা এসেছেন, আমার সৌভাগ্য। চলুন ভিতরে।

    বৈঠকখানায় বসে একপ্রস্থ চা—জলখাবার হল। তারপর আমরা খগেশ্বর বাবুর পিছনে পিছনে চললাম মিউজিয়াম দেখতে। আমাদের পিছনে আসছে একজন ভৃত্য। তার হাতে একটা জ্বলন্ত পেট্রোম্যাক্স আলো। দেবমশাইয়ের হাতে এক পেল্লায় চাবি।

    বারান্দার প্রান্তে এক দরজার সামনে থামলেন খগেশ্বরবাবু। দরজায় বিশাল এক তাল ঝলছে। ঝনাৎ করে তালা খুললেন দেবমশাই তারপর ধাক্কা মেরে দরজা ফাঁক করে দিলেন। এবার তিনি পেট্রোম্যাক্সটা চাকরের কাছ থেকে নিজের হাতে নিয়ে ধীর পায়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন। পিছনে আমরা চারজন। ভৃত্যটি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

    লম্বা হলঘর, উঁচু ছাদ, ভিতরে ভ্যাপসা অন্ধকার। বোধহয় অনেক দিন খোলা হয়ান ঘর। পেট্রোম্যাক্সের তীব্র আলোয় চমকে গিয়ে কয়েকটা চামচিকে আমাদের মাথার ওপর ঘুরপাক খেতে লাগল।

    চতুর্দিকে দেওয়াল জুড়ে টাঙানো অজস্র অস্ত্র আর অস্ত্র। দেওয়াল ঘেঁষে লম্বা লম্বা কাঠের টেবিল পাতা। টেবিলগুলোর ওপরেও সাজানো বিচিত্র অস্ত্রের সম্ভার। ছুরি, ছোরা, তরবারি, ঢাল, বর্শা, বল্লম, টাঙ্গি, দাও, কুঠার, গদা, তীর—ধনুক, শিরস্ত্রাণ, বর্ম…। কত কী। ধাতু, কাঠ, হাড় প্রভৃতিতে তৈরি। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট কামান মখ উচ করে বসানো।

    এ সবই পুরনো আমলের অস্ত্রশস্ত্র। এমন বিপুল সংগ্রহ দেখব ভাবতে পারিনি। আলো পড়ে ধাতুর অংশগুলি চকচক করে উঠল।

    খগেশ্বরবাবু একটা টুলের ওপর আলোটা রাখলেন। বৃদ্ধের শরীর টান টান হয়ে উঠল। চক্ষু উজ্জ্বল। গম্ভীরস্বরে বললেন, আমার পূর্বপুরুষ ক্ষাত্রধর্মের চর্চা করতেন। যুদ্ধ ও শিকার। বাহুবলের সাহায্যে তাঁরা ধনসম্পত্তি উপার্জন করেছিলেন। এই সব অস্ত্রের অধিকাংশই আমাদের বংশের কেউ না কেউ ব্যবহার করেছেন। সবই কিন্তু সেই অতীতে। বহু স্মৃতি ও ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই অস্ত্রগুলির সঙ্গে। দেব বংশে অস্ত্রচর্চা আর হয় না, জমিদারিও আর নেই। আমার ছেলে নাতিরা বন্দুক টলুক বিশেষ পছন্দ করেন না। আসেও খুব কম। আমি বুড়ো মানুষ এই শূন্যপুরী আগলাচ্ছি। জানি না আমার পরে এ বাড়ির কী হাল হবে।

    তার কণ্ঠে সাময়িকভাবে একটা বিষণ্ণতার সুর ধরা পড়ে। কিন্তু পরমুহূর্তেই আবার স্বাভাবিক সুর ফিরে আসে, আর উৎসাহ ভরে তিনি আমাদের সব কিছু দেখাতে থাকেন।

    চমৎকার বর্ণনা দেওয়ার ক্ষমতা ভদ্রলোকের। আমরা মাঝে মাঝে প্রশ্ন করি, কখনো বা কোনো জিনিস হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখি।

    হঠাৎ ডাকু একটা ছুরি তুলে নিয়ে মন দিয়ে দেখতে লাগল। ব্যাপারটা খগেশ্বরবাবু লক্ষ করেছিলেন। বললেন, ওটা হানটিং নাইফ। দেশি কারিগরের তৈরি। খুব মজবুত জিনিস।

    এটা কতদিন আছে এখানে? ডাকু প্রশ্ন করল।

    তা অনেক দিন। আমার বাবা ছোটবেলা থেকে এটা দেখেছেন। কে এটা এনেছিল জানি না।

    এই পদ্মফুলটা কেন খোদাই করেছে বাঁটে? জিজ্ঞেস করল ডাক।

    কি পদ্মফুল? আমি ও রতন এবার কাছে গিয়ে ছুরিটা দেখি।

    বাঁটসুদ্ধ প্রায় এক ফুট লম্বা ছুরিখানা। চওড়া ফলা। হাতির দাঁতের বাঁট। বাঁটের ওপর একটা সুন্দর ছোট পদ্মফুলের নকশা খোদাই করা।

    দেবমশাই ডাকুর হাত থেকে ছুরিটা নিয়ে কারুকার্যটি দেখলেন। তারপর বললেন, খেয়াল—খুশিমতো নকশা করেছে হয়তো। কিংবা কারিগরের নিজস্ব ছাপ হতে পারে, মানে ট্রেডমার্ক।

    ও। ডাকু ছুরি রেখে দিল একটু অন্যমনস্কভাবে।

    ওই সামান্য ছুরি সম্বন্ধে আমাদের বিশেষ আগ্রহ ছিল না। কত বড় বড় অদ্ভুত আকৃতির অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে, সেগুলোর ওপরই আমাদের বেশি নজর।

    ঘণ্টা দুই পর আমাদের মিউজিয়াম দেখা শেষ হল। ঘর থেকে বেরিয়ে আসছি, এমন সময় কাকাবাবু বললেন, দেবমশাই আপনাদের মন্দিরের বিগ্রহটি একবার দেখাবেন? খুব নাম শুনেছি।

    দেবমশাই থমকে দাঁড়ালেন। তার মুখ বিমর্ষ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে বললেন, খবরটা বোধহয় আপনাদের ওদিকে পৌঁছায়নি এখনো। সমস্ত অলংকার সমেত আমাদের বিগ্রহটি চুরি গেছে।

    সে কী? কবে? কাকা বলে উঠলেন। আমরাও অবাক।

    মাত্র দ—দিন আগে। চুরি নয়, ডাকাতি। চার—পাঁচজন লোক এসেছিল রাতে। মিন্দরের প্রহরীকে অতর্কিতে আঘাত করে বেঁধে ফেলে, মন্দিরের দরজা ভেঙে ঢুকে ভিতরের যাবতীয় দামি জিনিস লট করেছে। গৃহ—দেবতা বিগ্রহ হারিয়েই বেশি কষ্ট পেয়েছি। পুলিশ অনুসন্ধান করছে। তিন হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছি শুধু বিগ্রহের জন্যে। এখন ভাগ্য।

    তিন হাজার টাকা, শুধু বিগ্রহের জন্যে? ডাকু চোখ বড় বড় করে বলে।

    হ্যাঁ। যদি কেউ উদ্ধার করে দেয়। গৃহ—দেবতাকে ফিরে পাওয়াই আমার সবচেয়ে বং কামনা।

    আমরা মনে মনে লজ্জিত হলাম। সত্যি, ভদ্রলোক একবারও বুঝতে দেনান যে এত মন খারাপ। দিব্যি হাসিমুখে সব দেখালেন।

    মিস্টার দত্ত বললেন, ছি ছি, এখন আপনাকে বিরক্ত করা উচিত হয়নি। জানতাম না কিছু।

    ভদ্রলোক যদিও কথাটা উড়িয়ে দিলেন, আমরা তার মনের আসল ভাবটা আন্দাজ করে তাঁকে আর বিরক্ত না করে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম।