Author: তাহের আলমাহদী

  • ঊনিশ

    ঊনিশ

    জরিনার বাড়িতে থাকা মোটেই নিরাপদ নয়। তার শাশুড়ি বা স্বামী যে কোনো সময়ে এসে যেতে পারে। চৌকিদার-দফাদার বা পুলিসও হঠাৎ হানা দিতে পারে হেকমতকে ধরবার জন্য।

    নিরাপদ আশ্রয় আছে অনেক। কিন্তু এখানকার বাতাসে যে স্নেহ-প্রীতি, পরিবেশে যে অন্তরঙ্গতা, তা কোথায় গেলে পাওয়া যাবে? হয়ত পাওয়া যাবে কোথাও–ফজল ভাবে। কিন্তু সকলের স্নেহ-প্রীতিতে কি আন্তরিকতা আছে? অন্তরঙ্গ পরিবেশও হয়ত পাওয়া যাবে। কিন্তু সব অন্তরঙ্গতার অন্তকরণ নাও থাকতে পারে।

    ফজলের হাতে অনেক কাজ। দূরের কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। আর ধারেকাছের কোনো বাড়িতে থাকতেও সাহস পায় না সে। কখন কে পুলিসের কাছে খবর দিয়ে ধরিয়ে দেবে তার কি কোনো ঠিক আছে? নিজের বউয়ের বাপই যখন এমন কাজটা করতে পারল, তখন আর সে কাকে বিশ্বাস করতে পারে?

    জরিনাদের বাড়ির পুবদিকে একটা ধানখেত। সেটা পেরিয়ে আরো পুবদিকে বহুদূর বিস্তৃত পাটখেত। এই পাটের অরণ্যে আস্তানা গাড়ে ফজল, লুকোবার একটা জায়গা করে নেয়। একটা ছোট চৌকির আয়তনের সমান জায়গার পাট সে উপড়ে ফেলে, বিছিয়ে দেয় সেগুলো মাটির ওপর। পাটগুলোর কয়েকটা নখ দিয়ে চিকিয়ে সে কোষ্টা বের করে! এ কোষ্টা দিয়ে দুপাশের পাটগুলোকে ধনুকের মতো বাঁকা করে জোড়ায় জোড়ায় বাঁধে। এভাবে ছই এর একটা কাঠামো তৈরি করে ফেলে সে। এবার কাঠামোর ওপর কয়েকটা আস্ত কলার ডাউগ্গা বিছিয়ে কোষ্টা দিয়ে শক্ত করে বাঁধে। ছইটা মুষলধার বৃষ্টি ঠেকাতে না পারলেও দুপুরের রোদ আর গুঁড়িগুড়ি বৃষ্টি ঠেকাতে পারবে বলেই মনে হয় ফজলের। সে বিছানার জন্য একটা ছেঁড়া মাদুর, শিথানের জন্য তুষভরা ছোট্ট একটা থলে আর একটা মাথাল নিয়ে এসেছিল জরিনার কাছ থেকে। প্রবর বর্ষণের সময় মাথালটা দরকার হবে। তখন মাদুরটা গুটিয়ে থলেটা বগলে নিয়ে, মাথালটা মাথায় চড়িয়ে গুটিসুটি হয়ে বসলে ভিজতে হবে না তেমন, আর বিছানাটাও জবজবে হবে না ভিজে।

    তুষের বালিশে মাথা রেখে মাদুরের ওপর শোয় ফজল। খুব একটা খারাপ লাগছে না। ছেঁড়া কলাপাতার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখা যায়। সাদা মেঘ, কালো মেঘ উড়ে যাচ্ছে। মেঘ সরে গেলে উঁকি দেয় রোদ। মাঝে মাঝে বাতাসের ঝাঁপটায় ফেটে যাচ্ছে ছই-এর কলাপাতা।

    দক্ষিণ দিক থেকে চিট-চিট-চিট পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। ফজল মাথা উঁচু করে। পাটগাছের ভেতর দিয়ে দৃষ্টি চলে তার। সে দেখতে পায়–কিছু দূরে পাটগাছের সাথে বাসা বুনছে বাবুই পাখি। এ পাটখেতের পরেই ধানখেত। আউশ ধান পাকার সময় হয়েছে– বুঝতে পারে ফজল।

    আউশ ধান পাকার সময় হলে আসুলি এলাকার তাল-বাবলা গাছের বাসা ছেড়ে ঝাঁক বেঁধে এগুলো আসে। দূর থেকে আসা-যাওয়ার সময় নষ্ট হয়, ডানায় ব্যথা ধরে, পেটের দানাও যায় হজম হয়ে। তাই ধানখেতের কাছাকাছি কোনো পাটখেতে এরা অস্থায়ী বাসা তৈরি করে। শুধু চর অঞ্চলেই নয়, আসুলির বিল অঞ্চলেও এরা ধান পাকার সময় এ রকম অস্থায়ী বাসা তৈরি করে।

    ফজল ভাবে, সময়ের মূল্য এ ছোট পাখিগুলোও বোঝে। তাই ওরা তাদের মতোই তৈরি করছে ভাওর ঘর।

    শুক্লা সপ্তমীর চাঁদ ডুবে গেছে। ফজল পাটখেত থেকে বেরোয়। এগিয়ে যায় নদীর দিকে। নদীর পাড়ের ধানখেতে ডুবিয়ে রাখা ডিঙিটা তুলে সে চরাটের ওপর বৈঠা নিয়ে বসে। চারদিকটা ভাল করে দেখে নেয়। টহলদার কলের নৌকার সন্ধানী আলো দেখা যায় না কোথাও। এ কলের নৌকার ভয়ে রাতে নৌকা চলাচল প্রায় বন্ধ। জেলেরাও সন্ধ্যার আগেই জাল গুটিয়ে কোনো নিরাপদ ঘেঁজায় পাড়া গেড়ে বিশ্রাম নেয়।

    ফজল নলতার খাড়ি ধরে বেয়ে নিয়ে যায় ডিঙিটাকে।

    টুকরো টুকরো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ। যেন ধোপার কাপড় শুকোবার মাঠ। মেঘের ফাঁক দিয়ে তারা উঁকি মারছে। দিনের দুপুর থেকে রাতের দুপুর পর্যন্ত দাপাদাপি করে বাতাসের ডানা এখন ক্লান্ত। ক্রান্তি নেই শুধু পানির। গা দুলিয়ে নেচে নেচে কুলকুল গান গেয়ে অবিরাম বয়ে যাচ্ছে পানি। রুপালি পানির আভাস পাওয়া যাচ্ছে অন্ধকারেও।

    উজান ঠেলে ধীরগতিতে চলছে ডিঙি। নিজের বৈঠার শব্দের সাথে তাল রেখে চলছে ফজলের হৃদস্পন্দন।

    যে কাজের জন্য সে বেরিয়েছে, তার পরিকল্পনা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। এখন ডিঙিটাকে পেছনে ফেলে তার মন পৌঁছে গেছে ঘটনাস্থলে।…উত্তর ভিটির এ ঘরে থাকে আরশেদ মোল্লা। ব্যাটা জানোয়ার! কোনো দয়ামায়া নেই তোর জন্য। বাইরে থেকে দে শিকল এঁটে দুটো দরজায়। জানোয়ারটা বেরুতে পারবে না আর। চারদিকের বেড়ায় দে কেরোসিন ছিটিয়ে। ভয় কিসের? ম্যাচবাতির কাঠি জ্বালিয়ে দে আগুন!

    ফজলের মনে দাউদাউ করে জ্বলছে ক্রোধের আগুন।

    আগুন! আগুন! বাঁচাও! বাঁচাও!!

    হঠাৎ অনেক মানুষের আর্তচিৎকার ফজল শুনতে পায় তার নিজের মনে।

    বাঁচাও! বাঁচাও!!

    এ চিৎকার শুধু আরশেদ মোল্লার নয়। রূপজানের চিৎকারও যে শোনা যাচ্ছে। আগুন কি ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমভিটি ঘরেও? হ্যাঁ তাইতো! ঘরের লাগোয়া ঘর। শ-শ করে ছড়িয়ে পড়ছে আগুন।

    রূপজান!

    একটা অস্ফুট চিৎকার দিয়ে চেতনা ফিরে পায় ফজল। তার বৈঠা টানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হাল ছেড়ে দেয়ায় ঘুরে যাচ্ছিল ডিঙিটা।

    ফজল ডিঙিটাকে ডানদিকে ঘুরিয়ে নেয়। কিছুদূর গিয়ে আরেকটা খাড়ির মধ্যে ঢোকে। ভাটির টানে এবার দ্রুত এগিয়ে যায় ডিঙি।

    সব চক্রান্তের মূলে আছে পা-না-ধোয়া জানোয়ারটা। ওকেই খতম করতে হবে আগে। ওর সাথে পুড়ে মরবে ওর বউ-ছেলে-মেয়ে সব। যাক, পুড়ে ছাই হয়ে যাক, কালসাপের বংশ নির্বংশ হোক।

    ডিঙিটাকে লটাঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে রেখে সে পা টিপে টিপে এগিয়ে যায়। চার ভিটিতে চারখানা ঘর। ঢেউটিনের চালা, পাতটিনের বেড়া। এ ঘরে আগুন লাগানো সহজ নয়। কপাট, চৌকাঠ, রুয়া-বাগা কাঠের। দরজা আর জানালার কপাটে লাগাতে হবে আগুন। গত বছর পাটের দাম কম ছিল। পাট নিশ্চয়ই বেচেনি জঙ্গুরুল্লা। ঘরে পাট থাকলে তো কথাই নেই। ফরফর করে জ্বলে উঠবে আগুন।

    জঙ্গুরুল্লা কোন ঘরে থাকে–ফজলের জানা নেই। ঘরগুলোর সবকটা দরজা বাইরে থেকে শিকল এঁটে বন্ধ করে দেয় সে। বোতল থেকে হাতের তেলোয় কেরোসিন ঢেলে ছিটিয়ে দেয় কপাট-চৌকাঠগুলোয়। তারপর ম্যাচবাতির কাঠি জ্বালায় সে। জ্বলন্ত কাঠি-ধরা হাতটা তার এগিয়ে যায় কপাটের দিকে।

    ওয়াঁ-আঁ–ওঁয়া-আঁ-আঁ।

    শিশুর কান্না। ফজলের হাতটা থেমে যায়। বুকটা কেঁপে ওঠে। হঠাৎ একটা দমকা বাতাস এসে নিবিয়ে দেয় কাঠির আগুন।

    ওয়াঁ-আঁ–ওঁয়া-আঁ-আঁ।

    অসংখ্য নিষ্পাপ শিশুর কান্না প্রতিধ্বনি তোলে তার বুকের ভেতর। সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশেই একটা জানালা।

    ঘরের ভেতর হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠে। সে কুপির আলোয় দেখতে পায় একটি তরুণী মা শিশুর ভিজে কাঁথা বদলে দিচ্ছে।

    ওয়াঁ-আঁ–ওঁয়া-আঁ-আঁ।

    আবার সেই কান্না। ফজলের অভিভূত দৃষ্টির সামনে মা ও শিশু। মা কোলে তুলে নিয়েছে শিশুকে। বুকের কাপড় সরিয়ে স্তনের বোঁটা শিশুর মুখে দিতেই তার কান্না থেমে যায়। নিষ্পাপ শিশু নিশ্চিন্ত আরামে স্তন চুষছে আর হাত-পা নাড়ছে।

    ফজল আর দেরি করে না। সে সব কটা দরজার শিকল খুলে দিয়ে নিঃশব্দে ফিরে যায় নদীর ধারে। তারপর লটা ঝোঁপের আড়াল থেকে ডিঙিটা বের করে সে বৈঠায় টান মারে।

    আক্রোশের আগুন নিবে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। এবার সে আগুন দ্বিগুণ হয়ে জ্বলে ওঠে তার মনে। প্রতিশোধ অবশ্যই নিতে হবে, কিন্তু কাপুরুষের মতো নয়।

    জোরে বৈঠায় টান মারে ফজল। তাকে অনেক উজান পানি ভাঙতে হবে। সময়টা পূর্ণিমা-অমাবস্যার মাঝামাঝি। তাই স্রোতের বেগ এখন অনেক কম। তবুও উজান ঠেলে যেতে ফজলের কষ্ট হচ্ছে খুব। স্রোত কেটে ছলচ্ছল আওয়াজ তুলে দুলতে দুলতে এগিয়ে চলছে ডিঙি।

    নিঃসীম অন্ধকার। ইচাণ্ডা খাড়ির মুখে পৌঁছতে অনেক সময় লাগবে।

    ক্ষীণ ভটভট শব্দ আসছে পশ্চিম দিক থেকে। দুরের ফুলে ছাওয়া কাশবন আর নদীর রুপালি পানি মাঝে মাঝেই ঝলমলিয়ে উঠছে সার্চ লাইটের ফোয়ারায়।

    ফজল বুঝতে পারে টহলরত গোরা সৈন্যের লঞ্চ আসছে। সে প্রাণপণ বৈঠা টেনে চর বগাদিয়ার কিনারায় চলে যায়, লটা বনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় ডিঙিটা। ওটাকে লটাবনের আঁড়ালে বেঁধে সে নেমে পড়ে ডাঙায়।

    তিন বছর আগের পয়স্তি চর এই বগাদিয়া। জঙ্গুরুল্লার বড় ছেলে জাফর ও তাদের কয়েক ঘর কোলশরিক ও বর্গাদারের বসত এ চরে। তারা টের পেলে জান-পরান হারিয়ে ভেসে যেতে হবে গাঙের স্রোতে।

    ফজল চুইন্যা ঘাসের ঝোঁপের ভেতর গুটিসুটি মেরে লুকিয়ে থাকে।

    ভটভট আওয়াজ এখন আরো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সার্চলাইটের আলোও এসে পড়ছে তার ডিঙি বরাবর নদীর মাঝখানে।

    কিন্তু হঠাৎ ভটভট আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। সার্চলাইটের আলোও আর দেখা যায় না। ফজলের মনে বিস্ময় জাগে–বিকল হয়ে গেল নাকি কলের নৌকা!

    ফজল চুপচাপ বসে থাকে ঝোঁপের ভেতর। অনেকক্ষণ পরে সে দেখতে পায় লঞ্চটা স্রোতের টানে ভেসে আসছে। বন্ধ কেবিনের জানালার খড়খড়ি গলে আলোর রশ্মি এসে পড়ছে বাইরে। সেই আবছা আলোয় দেখা যায় দু’জন গোরা সৈন্য বৈঠার খেচ মেরে লঞ্চটা পাড়ের দিকে ঠেলছে। তাদের একজন লঞ্চের ডানপাশে এসে বৈঠা দিয়ে পানির গভীরতা মেপে চলে যায় কেবিনের ভেতর। অল্পক্ষণ পরেই একটা মেয়েলোককে পাঁজাকোলা করে এনে সে নামিয়ে দেয় কোমর পানিতে। মেয়েলোকটি হুমড়ি খেয়ে পানির ওপর পড়তে পড়তে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। পানি ভেঙে কোনো মতে পা টেনে টেনে তীরে উঠে সে বসে পড়ে মাটিতে।

    ফজল ফেরারি আসামি। আর এলাকাটাও শত্রু পক্ষের। তাই রাগে ঠোঁট কামড়ানো ছাড়া ঐ বর্বরদের বিরুদ্ধে আর কিছুই করার কথা চিন্তা করতে পারে না সে।

    লঞ্চটা বৈঠার ঠেলায় ও ভাটির টানে কিছুদূর গিয়ে হঠাৎ চালু হয়ে যায়। ভটভট আওয়াজ তুলে সার্চলাইট জ্বেলে দ্রুতগতিতে চলে যায় পুব দিকে।

    ফজল ঠায় বসে থাকে। ভয়ে তার বুক দুরু দুরু করে। মেয়েলোকটা হয়ত কেঁদে চিৎকার দিয়ে উঠবে। আর সাথে সাথে বগাদিয়ার সব মানুষ হৈ-চৈ করে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু অন্ধকারে তার নড়াচড়ার কোনো আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। সে বোধ হয় বসেই আছে মাটির ওপর।

    ফজল স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। নিঃশব্দে ডিঙিটা লটা ঝোঁপ থেকে বের করে সে জোরে টান মারে বৈঠায়।

    পাটখেতে যখন ফজল ফিরে আসে তখন রাত প্রায় শেষ।

    আক্রোশের আগুনে যেন ঝলসে গেছে তার শরীর ও মন। সে মাদুরের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে শরীরটা ঢেলে দেয়। নির্ঘুম ক্লান্ত চোখ দুটো ঘুমের আক্রমণ রোধ করতে পারে না বেশিক্ষণ।

    রাতের বেলা কেন এল না ফজল বুঝতে পারে না জরিনা। তার জন্য রান্না করে অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল সে। একবার চেষ্টাও করেছিল তাকে খুঁজে বের করবার। বাড়ির পুবদিকে ধানখেত। ধান পাতার আঁচড় খেয়ে কিছুদূর গিয়েছিল সে। ফজলের অনুকরণে অপটু কণ্ঠে টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ হট্‌ ডাকও দিয়েছিল কয়েকবার। কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে সে আর এগুতে সাহস করেনি অন্ধকারে।

    ফজরের নামাজ পড়েই জরিনা রান্নাঘরে যায়। গত রাতের রান্না বেলেমাছের চচ্চড়ি গরম করে। হলুদ-লবণ দিয়ে সাঁতলানো আণ্ডালু চিংড়ি ভর্তা করে পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা ও সরষের তেল সহযোগে। তারপর একটা মেটে বাসনে পান্তা বাড়ে। তার ওপর চচ্চড়ি ও ভরতা বসিয়ে দিয়ে বাসনটাকে গামছায় বেঁধে নেয়।

    ধানখেত পেরিয়ে পাটখেতের আলে গিয়ে দাঁড়ায় জরিনা।

    গতকাল আকাশে ছিল টুকরো টুকরো মেঘের উড়ন্ত মিছিল। কখনো চোখ বুজে, কখনো চোখ মেলে সারাদিন কর্তব্য পালন করছিল সূর্য। রাতেও বৃষ্টি হয়নি। কিন্তু আজ ভোর থেকেই আকাশে জমতে শুরু করছে কালো মেঘ। উত্তর-পশ্চিম দিগন্তে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তার অস্পষ্ট গর্জন শোনা যায় কি যায় না। আকাশের দিক থেকে চোখ নামিয়ে সে এদিক ওদিক তাকায়। আলের পাশে খুঁজে পায় সে একটা মাথাভাঙা পাটগাছ। ওটায় বসান রয়েছে একটা ম্যাচবাতির খোসা–ফজলের রাখা নিশানা। নিশানা ধরে সোজা পুব দিকে এগিয়ে যায় সে। মাথা নুইয়ে যেতে হয়, কারণ পাটগাছ এখনো মাথাসমান লম্বা হয়নি। নল চারেক যেতেই পাটগাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় ফজলের তৈরি ছই-টা।

    জরিনা কাছে গিয়ে দেখে ছই-এর নিচে মাদুরের ওপর খালি গায়ে পা ছড়িয়ে চিৎ হয়ে ঘুমুচ্ছে ফজল।

    দিনের আলোয় জোয়ারে ভরা ফজলের জোয়ান শরীর দেখাবার সুযোগ পায় জরিনা এই প্রথম। গামছায় বাধা খাবার নামিয়ে রেখে সে নিঃশব্দে বসে পড়ে ফজলের পাশে।

    ঈষৎ ফাঁক ঠোঁট দুটির আড়ালে ওপরের পাটির দুটি দাঁত দেখা যায়। আলুথালু চুলের এক গোছা কপালের ওপর এসে পড়েছে। দাড়ি-গোঁফ চাচা হয়নি অনেক দিন। খোঁচা-খোঁচা দাড়ি বিষণ্ণ মুখকে বিষণ্ণতর করে তুলেছে। নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে জরিনা।

    গভীর ঘুমে অচেতন ফজল। তার প্রশস্ত রোমশ বুক ওঠা-নামা করছে শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে। লুঙ্গির গেরো শিথিল হয়ে নেমে গেছে নাভির নিচে। দুটি উরুর অনেকটা উদলা লুঙ্গি ওপরে উঠে যাওয়ায়। জরিনা লক্ষ্য করে মুখের রঙের চেয়ে অনেক ফরসা উরুর রঙ। সর্বক্ষণ কাপড়ে ঢাকা থাকার ফলে রোদে পুড়ে উরুর রঙ তামাটে হতে পারেনি। টেকির কাতলার মতো মোটা মজবুত দুই উরু।

    কপালের চুলের গোছাটি ঘুরিয়ে মাথার ওপর তুলবার জন্য জরিনার আঙুল নিশপিশ করে। কিন্তু সে সংযত করে নিজেকে।

    জরিনা একটা কাঁপুনি অনুভব করে তার বুকের মধ্যে। কাঁপুনিটা ছড়িয়ে যায় সারা শরীরে। তার মনের বন্য বাসনা পলিমাটির বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে যেতে চায়।

    জরিনা চোখ বোজে, মনে মনে কি যেন আওড়ায়। সে বুকে ফুঁ দেয়, ডানে বায়ে ফুঁ দেয়।

    ঢেউ থামে। দিশেহারা বাসনা ধীরে ধীরে উৎসে ফিরে যায়।

    কিছুক্ষণ পরে চোখ মেলে জরিনা। ফজল একই অবস্থায় শুয়ে ঘুমুচ্ছে।

    পাটগাছের আগায় আঁশ বাঁধিয়ে ঝুলছে একটা শুয়াপোকা। নিজের শরীর থেকে নির্গত আঁশের সাথে ওটা ঝুলছে, দুলছে বাতাসে আর নেমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

    কি বিশ্রী কদাকার জীব। জরিনার শরীরের রোম খাড়া হয়ে ওঠে। হলদে বিছাটা মাটিতে পড়েই শুয়াভরা শরীর দুলিয়ে চলতে শুরু করে ফজলের দিকে।

    ‘ইস্! খুশির আর সীমা নাই!’ জরিনা মনে মনে বলে। ‘অমন সোন্দর শরীলে উঠতে দিমু তোমারে!’

    তারই দেয়া কেরোসিন তেলের বোতলটা হাতের কাছেই রয়েছে। ওটার তলা দিয়ে সে পোকটাকে পিষে দেয় মাটির সাথে।

    পাটগাছের পাতায় পাতায় অসংখ্য শুঁয়াপোকা। প্রজাপতি ডিম পাড়ে পাটপাতার ওপর। ডিম থেকে ফুটে বেরোয় শুঁয়াপোকা। পাটের কচিপাতা খেয়ে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে ওরা। কয়েকটা পোকা নিজের শরীর থেকে নিঃসৃত আঁশ দিয়ে পাটপাতা মুড়িয়ে গুটি তৈরি করছে।

    স্বেচ্ছাবন্দি বয়োজ্যেষ্ঠ শুঁয়াপোকারা মুক্তির সাধনায় ধ্যানমগ্ন গুটির ভেতর। একটার মুক্তিলাভ ঘটে জরিনার চোখের সামনেই। গুটি ভেঙে একটা হলদে প্রজাপতি বেরিয়ে আসে। পাতা আঁকড়ে ধরে ওটা পাখা দোলাচ্ছে। জরিনা চেয়ে থাকে ওটার দিকে।

    আহা কি সুন্দর!

    এমনি হলদে রঙের একটা শাড়ি দেখেছিল সে রূপজানের পরনে। শাড়ির আঁচলটা বাতাসে ফুরফুর করে উড়ছিল প্রজাপতির পাখার মতোই। তার মনে হয় এই হলদে প্রজাপতিটার মতোই সুন্দরী রূপজান।

    ফজলের দিকে আবার চোখ নেমে আসে জরিনার। ঘুম তার এত গভীর যে একবারও পাশ ফিরে শোয়নি সে এতক্ষণের মধ্যে।

    তার মাথার কাছেই পিড়পিড়িয়ে হাঁটছে একটা কদাকার শুঁয়াপোকা।

    জরিনা বোতলের তলা দিয়ে এটাকেও পিষে ফেলে।

    এ পোকার শুঁয়ায় নাকি বিষ আছে। শুঁয়া শরীরের কোথাও লেগে গেলে ফুলে যায়, শেষে পেকে পুঁজ হয়।

    জরিনা একটা পাটগাছের আগা ভাঙে। মাথার পাতাগুলো রেখে বাকিগুলো ছিঁড়ে ফেলে দেয়। এবার এটাকে বোতলের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। কেরোসিন-ভেজা পাতাগুলো সে এবার বুলিয়ে দেয় মাদুরের কিনারায়। বারবার কেরোসিনে ডুবিয়ে সে মাদুরের চারপাশটা ভিজিয়ে দেয়। কেরোসিনের দুর্গন্ধে ফজলের কাছে এগুতে পারবে না কদাকার পোকাগুলো।

    স্বস্তি বোধ করে জরিনা। কিন্তু নবজাত প্রজাপতির একটা উড়ে এসে বসে ফজলের ঊরুর ওপর। ওটাকে তাড়াবার জন্য সে হাত বাড়ায়। কিন্তু হঠাৎ তার মনে হয়, রূপজানই বুঝি প্রজাপতির রূপধরে এসে বসেছে ফজলের গায়ে। সে হাত টেনে নেয়, পলকহীন চোখ মেলে চেয়ে থাকে প্রজাপতিটার দিকে। কি সুন্দর! ওটার তুলনায় নিজেকে মনে হয় একটা শুঁয়াপোকা। ফজলের গায়ে বসবার অধিকার নেই শুঁয়াপোকার।

    কদাকার শুঁয়াপোকা গুটির কবরে গিয়ে সুন্দর প্রজাপতির রূপ লাভ করে। সে যদি কবরে যায় তার কি দশা হবে? সে কি এমন সুন্দর রূপ নিয়ে আবার ফিরে আসতে পারবে? আসতে পারবে এ সুন্দর পৃথিবীতে যেখানে চাঁদ আছে, সূর্য আছে, বাতাস আছে, পানি আছে, আর আছে ফজল?

    অসম্ভব। কবর থেকে কোনো মানুষই ফিরে আসে না এ মাটির পৃথিবীতে। কবরে মাটিচাপা দেয়ার পরেই আসবে দুই ফেরেশতা মনকির আর নকির। গুনাগারের আজাব চলতে থাকবে কবরের ভেতর। তারপর আল্লার বিচার। বিচারের পর গুনাগারকে ফেলবে হাবিয়া দোজখে, জাহান্নামে।

    জরিনা আরো ভাবে, সে সবচেয়ে বড় গুনাগার। শরীরের গুনা, মনের গুনা, চোখের গুনা সে করেছে। অন্য সব গুনা মাফ হলেও হতে পারে, কিন্তু শরীরের গুনা কবিরা গুনা। এ গুনার মাফ নেই। সে শুনেছে, সারা জীবনভর আল্লার নাম জপ করলেও শরীরের গুনার শাস্তি থেকে কেউ রেহাই পাবে না। আর কি সাংঘাতিক সে শাস্তি। দুই সাপ এসে কামড়ে ধরবে দুই স্তন। ফেরেশতারা গুর্জু মারবে কুচকির ওপর।

    জরিনা আর ভাবতে পারে না। সে ফজলের দিকে তাকায়। শরীরের গুনা করেছে। ফজলও। তারও নিস্তার নেই। একই হাবিয়া দোজখে যেতে হবে দু’জনকে।

    হঠাৎ জরিনার বেদনাভারাক্রান্ত মনটা হালকা মনে হয়। ফজল হবে তার দোজখের সাথী। রূপজান সতী-সাধ্বী, নিষ্পাপ। সে যাবে বেহেশতে। আখেরাতে সে সাথী হতে পারবে ফজলের। এ দুনিয়াতেও ফজলকে আর সাথী হিসেবে পাবে না সে। তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে।

    প্রজাপতিটা এখনো বসে আছে ফজলের ঊরুর ওপর।

    নাহ, ওটার বসবার অধিকার নেই ফজলের গায়ে।

    জরিনা আঙুলের টোকা দিতেই প্রজাপতিটা নরম অপটু পাখা নেড়ে টলতে টলতে উড়ে চলে যায়।

    জরিনার মনের মেঘে উষার অরুণিমা। ফজল হবে তার দোজখের সাথী। কিন্তু এ দুনিয়ায়?

    এ দুনিয়ায় ফজল একা। তার সাথী নেই। তার নিজেরও কি সাথী আছে?

    ফজলের জন্য তার মনে রয়েছে মমতার এক গভীর সরোবর। তাতে এবার জোয়ার শুরু হয়ে গেছে। মমতা-সরোবর থেকে নির্গত হচ্ছে মোহগঙ্গা। সমস্ত বাঁধ-বাধা ভেঙে, ডিঙিয়ে দুর্বার স্রোতের অধঃপতন ঘটছে এক অন্ধকার কুহরে।

    জরিনা চেয়ে থাকে ফজলের মুখের দিকে। সে মুখমণ্ডল জুড়ে থমথমে বিষাদের ছায়া। জরিনার চোখ ছলছল করে। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। ফজলের আরো কাছে গিয়ে বসে। তার কপালের ওপর থেকে সে চুলের গোছাটি আঙুল দিয়ে তুলে দেয় মাথার ওপর। কপালে হাত বুলায়।

    ফজলের ঘুম ভেঙে যায়। সে চোখ মেলে। জরিনার মাথা ঈষৎ ঝুঁকে আছে তার মুখের ওপর। চেয়ে আছে নির্নিমেষ। মমতামাখা দুটি চোখ। চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু ঝরছে।

    ফজলের চোখও ছলছল করে ওঠে। তার পিপাসাজর্জর মন মরীচিৎকার পেছনে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত। হঠাৎ সে দেখতে পায় স্নেহ-ভালবাসার এক বিশাল সরোবর। তার পানি স্বচ্ছ কি পঙ্কিল যাচিয়ে দেখে না সে। দেখবার প্রয়োজনও বোধ করে না। সে হাত বাড়িয়ে জরিনাকে কাছে টেনে নেয়। জরিনা বাধা দেয় না।

  • কুড়ি

    কুড়ি

    বগাদিয়ার কোলশরিক কোরবান ঢালীর পুতের বউ সবুরন মোরগের বাকেরও আগে নদীর ঘাটে গিয়েছিল ফরজ গোসল করতে। অনেকক্ষণ পরে ঘুম ভেঙে বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে তার স্বামী সোরমানও যায় গোসল করতে। এত সময়ের মধ্যেও সবুরন ঘরে ফিরে আসেনি আর নদীর ঘাটেও তাকে দেখতে পায় না সোরমান। গোসলের পর পরবার জন্য যে শাড়িটা সে নিয়ে গিয়েছিল সেটা পড়ে রয়েছে পাড়ে তুলে রাখা একটা ওচার ওপর। সোরমানের বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। সবুরনকে কুমিরে নিয়ে যায়নি তো!

    তার ডাক-চিৎকারে বাড়ির ও আশপাশের লোকজন ছুটে আসে। কয়েকজন লগি মেরে মেরে নদীর কিনারায় খোঁজ করে। কয়েকটা নৌকা নিয়ে কয়েকজন খোঁজ করে এ-চর ও চর। কিন্তু সবুরনের কোনো হদিস পাওয়া যায় না। সে কোথাও কারো সাথে পালিয়ে যায়নি–এ ব্যাপারে সবাই একমত। বছর খানেক আগে বিয়ে হয়েছে। হেসে-খেলে দিব্যি ঘর-সংসার করছিল মেয়েটি।

    পালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণও ঘটেনি। আর পালিয়ে গেলে শাড়িটা নিশ্চয়ই নিয়ে যেত। সে সাঁতার জানে। সুতরাং পানিতে ডুবে মরার কথাও নয়। তবে কি সত্যি সত্যি কুমিরেই নিয়ে গেছে?

    কিন্তু একদিন এক রাত পর ভোরবেলা যখন তাকে নদীর সেই একই ঘাটে পাওয়া গেল তখন সবাই বিস্ময়ে হতবাক। সবুরন কেমন যেন সম্মোহিত, বাহ্যজ্ঞানশূন্য। তার মুখে কথা নেই। অনেক সময় ধরে ঘোমটা টেনে সে বসে থাকে এক জায়গায়। কারো প্রশ্নের উত্তর সে দেয় না। সকলের দৃঢ় বিশ্বাস মেয়েটির ওপর জিনের দৃষ্টি পড়েছে এবং জিনই তাকে নিয়ে গিয়েছিল?

    খবরটা লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে সারা চর অঞ্চলে। লোকের মুখে এ-ও শোনা যায়–সবুরনের শরীরে, শাড়ি-ব্লাউজে মন-মাতানো খোশবু। সে নাকি জিন-পরীর দেশ কোহকাফ-এর খোশবুর নহরে ডুব দিয়ে এসেছে।

    জরিনার কাছে খবরটা পায় ফজলও। সে মনে মনে হাসে আর এই ভেবে স্বস্তি বোধ করে যে নিশ্চিত বিপর্যয়ের হাত থেকে বউটির ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবন রক্ষা পেয়ে গেল।

    ফজলের মনে পড়ে যায় একদিনের কথা। মাস ছয়েক আগে সে মাছ বিক্রি করতে গিয়েছিল তারপাশা, মাছের চালানদারদের কাছে তারপাশা স্টেশনে অপেক্ষমান কয়েকজন স্টিমার-যাত্রীর মধ্যে তর্ক হচ্ছিল। ফজল মনোযোগ দিয়ে শুনছিল পাশে দাঁড়িয়ে। একজন বলছিল, ‘জিনের কথা কোরান শরিফে লেখা আছে।’ আর একজন বলছিল, ‘হ্যাঁ লেখা আছে ঠিকই। কিন্তু জিন কী, কেমন, কোথায় থাকে তার কোনো স্পষ্ট বর্ণনা নেই।’ কোরান শরিফের একজন অনুবাদক তার টীকায় লিখেছেন—‘কোরান শরিফের কোনো কোনো আয়াতে জিনের উল্লেখে যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তা থেকে মনে হয়, ‘সুচতুর বিদেশী’ বোঝাবার জন্য জিন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।’

    ফজল মনে মনে বলে, ‘ঠিকই, বউটারে জিনেই ধইর‍্যা লইয়া গেছিল।’

    ফজল আরো খবর পায়–ফুলপুরী পীরবাবাকে নিয়ে জঙ্গুরুল্লা আগামী শনিবার বগাদিয়া যাচ্ছে। জিন চালান দিয়ে জিনের দৃষ্টি থেকে পীরবাবা সবুরনকে উদ্ধার করবেন।

    কোনো সাক্ষী-সাবুদ পায়নি বলে ডাকাতি মামলাটা দাঁড় করাতে পারেনি পুলিস। তাই খারিজ হয়ে গেছে মামলা। কিন্তু জেলভাঙার অভিযোগ আছে ফজলের বিরুদ্ধে। তাকে ধরবার জন্য মাঝে মাঝে হানা দেয় পুলিস।

    পালিয়ে পালিয়ে আর কতদিন থাকা যায়? পালাবার আর জায়গাও নেই। জরিনার শাশুড়ি ফিরে এসেছে। সে বাড়িতে যাওয়া যায় না আর। তাকে ধরবার জন্য আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি ঘেরাও করে তল্লাশি চালিয়েছিল পুলিস। এভাবে বেইজ্জত হওয়ায় অনেকেই বিরক্ত হয়ে গেছে তার ওপর। তাদের বাড়িতে আশ্রয়ের জন্য আর যাওয়া যায় না। বর্ষার পানিতে ডুবে গেছে মাঠ-ঘাট। ঝপাঝপ বৃষ্টি নামে যখন তখন। এ দিনে পাটখেতে বা বনবাদাড়ে লুকিয়ে থাকবার উপায় নেই। শিকারির ভয়ে ভীত এ পশুর জীবন আর ভাল লাগে না ফজলের। জেল থেকে যে উদ্দেশ্য নিয়ে সে পালিয়েছিল তার একটাও সফল হয়নি। না পারল সে প্রতিশোধ নিতে, না পারল চরটা আবার দখলে আনতে। এভাবে পালিয়ে বেড়ালে কোনো কাজই সমাধা হবে না–সে বুঝতে পারে। অনেক ভেবেচিন্তে মেহের মুনশির সাথে পরামর্শ করে সে মহকুমার আদালতে আত্মসমর্পণ করাই সমীচীন মনে করে।

    উকিল ধরে শেষে আদালতে আত্মসমর্পণই করে ফজল।

    আবার হাজতবাস। তবে কিছু দিনের মধ্যে তার বিচার শুরু হয়। ডাকাতি মামলায় অনর্থক গ্রেফতার, বিনা অপরাধে দীর্ঘদিন হাজতবাস, স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ ইত্যাদি কারণগুলো তার জেলভাঙার অপরাধের গুরুত্ব অনেকখানি কমিয়ে দেয়। এটাও প্রমাণিত হয়–সে জেল ভাঙেনি। জেল ভেঙেছিল বিপ্লবী রাজনৈতিক দল। সে শুধু সুযোগ বুঝে পালিয়েছিল। বিচারক এসব বিবেচনা করে তার রায় দেন। মাত্র তিন মাস কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে তাকে।

    ফজলের সাজা হয়েছে শুনে আরশেদ মোল্লা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে তার।

    ফজল জেল থেকে পালিয়ে এসেছে শুনে সে খুবই দুশ্চিন্তায় পড়েছিল। রূপজানকে সে ভাগিয়ে নিয়ে যেতে পারে এই ছিল তার ভয়। মেয়ের মতিগতিও ভাল মনে হয়নি। পানি আনার নাম করে সে নদীর ঘাটে গিয়ে প্রায়ই চুপচাপ বসে থাকত। তাকে চোখে-চোখে রাখতে হতো সব সময়। ঐদিন পুলিস দিয়ে ধরিয়ে না দিলে ফজল তাকে নিশ্চিয় ভাগিয়ে নিয়ে যেত। রূপজানও তৈরি ছিল, ঘর থেকে বেরুবার চেষ্টাও করেছিল। ভাগ্যিস উঠানে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিল সে, আর ঠিক সময়ে পুলিস এসে পড়েছিল।

    রূপজান এখনো প্রায়ই নদীর ঘাটে গিয়ে বসে থাকে। তবে পালিয়ে যাওয়ার ভয় আর নেই। এবার দিন-তারিখ ঠিক করে শুভ কাজটা সমাধা করতে পারলেই সব ঝঞ্ঝাট চুকে যায়।

    ফুলপুরী পীরবাবা আরো কিছুদিন থাকবেন এ অঞ্চলে। জঙ্গুরুল্লাও তাগিদ দিচ্ছে বারবার। কিন্তু রূপজানকে কিছুতেই রাজি করানো যাচ্ছে না। সে তার মা-কে সোজা বলে দিয়েছে, আমারে বিয়া দিতে পারবা না। পারবা আমার লাশটারে বিয়া দিতে। বেশি জোরাজুরি করলে গলায় দড়ি দিমু।

    মহাভাবনায় পড়ে যায় আরশেদ মোল্লা। নিরুপায় হয়ে সে জঙ্গুরুল্লার কাছে গিয়ে সব খুলে বলে। জঙ্গুরুল্লা শুনে হো-হো করে হেসে ওঠে। বলে, ‘তুমিও যেমুন! মাইয়া রাজি অয়না ক্যান্? পীরবাবার পাকনা দাড়ি দেইখ্যা বুঝিন পছন্দ অয়না মাইয়ার?’

    ‘হ ঠিকই ধরছেন।’

    ‘আরে মিয়া, তুমি তো একটা জাহিল। রসুলে করিমের বয়স যখন পঞ্চাশের উপরে তখন তিনি হজরত আয়েশাকে বিয়া করেন। তুমি জানো, বিবি আয়েশার বয়স তখন কত?’

    ‘তেনারাতো আল্লার পিয়ারা। তেনাগো লগে আমাগো লগে তুলনা অয়?’

    ‘আরে রসুলে করিম যা কইর‍্যা গেছেন সেই মতন কাম করা তো সুন্নত–অনেক সওয়াবের কাম। পীরবাবা আল্লার পিয়ারা দোস্ত। তার লগে মাইয়া বিয়া দিলে গুষ্টিশুদ্ধ বেহেশতে যাইতে পারবা।’

    ‘কিন্তুক মাইয়ারে যে রাজি করাইতে পারলাম না। সে কয়–আমার লাশটারে বিয়া দিতে পারবা।’

    ‘সবুর করো। এট্টু বসো তুমি। আমি জিগাইয়া আসি পীরবাবারে। তিনার কাছে এই ব্যারামেরও ওষুধ আছে।’

    কিছুক্ষণ পরে জঙ্গুরুল্লা ফিরে আসে। বলে, ‘শোন, মোল্লা, তুমি বাজারে যাও। এক মূলের সোয়াসের জিলাফি আর এক শিশি সুবাসিত তেল নিয়া আসো। দরাদরি কইর‍্য না কিন্তুক। যা দাম চাইব তাই দিয়া কিনবা। তেলের নামডা যে কি কইল বাবা? হ হ মনে পড়ছে, রওগনে আম্বর। ঐ ডা না পাইলে যে কোনো সুবাসিত তেল আনলেই চলব।’

    পরের দিনই আরশেদ মোল্লা জিলাপি আর একশিশি কামিনীকুসুম কেশ তৈল নিয়ে আসে জঙ্গুরুল্লার বাড়ি।

    জঙ্গুরুল্লা ওগুলো নিয়ে যায় পীরবাবার বজরায়। তিনি মন্ত্রতন্ত্র পড়ে ওগুলোতে ফুঁ দিয়ে ফেরত দেন। উপদেশও দেন কিছু।

    জঙ্গুরুল্লা জিনিসগুলো আরশেদ মোল্লার হাতে দিয়ে বলে, ‘এই জিলাফি খাওয়াইবা মাইয়ারে। আর এই তেল সে মাথায় দিব। তারপর দ্যাখবা মিয়া, ক্যামনে নাচতে নাচতে তোমার মাইয়া আইয়া পড়ে পীরবাবার ঘরে।’

    ‘এতগুলা জিলাফি একলা মাইয়ারে দিলেতো সন্দ করব।’

    ‘না মিয়া, খালি মাইয়ারে দিবা ক্যান্? তোমার বউ-পোলা-মাইয়া বেবাকগুলারে খাওয়াইবা।’

    ‘এইডা কি কতা কইলেন চদরীসাব? হেষে আমার কবিলার উপরেও যদি টোনার আছর অয়?’

    জঙ্গুরুল্লা খিকখিক করে হেসে ওঠে। কোনো রকমে হাসি চেপে সে বলে, ‘ও তোমার বুঝিন ডর লাগছে? তুমি মনে করছ তোমার কবিলা নাচতে নাচতে আইয়া পড়ব মন্তরের ঠেলায়। উঁহু, হেইডা চিন্তা কইর‍্য না। তোমার মাইয়ার নাম লইয়া মন্তর পড়া অইছে এই জিলাফি আর তেলের উপরে। আর কোনো মাইনষের উপরে আচর অইব না।’

    ‘ঠিক কইলেন তো?’

    ‘আরে হ হ হুগনা ওলানের তন দুধ দোয়ানের কারো এমুন আহেঙ্কাত নাই। এইবার যাও। বিছমিল্লাহ বুইল্লা—থুরি না-না, বিছমিল্লাহ কওনের দরকার নাই। বিছমিল্লাহ কইয়া মোখে দিলে বেবাক বিষ পানি অইয়া যায়। জাদু-টোনার মন্তর-তন্তর ফুক্কা অইয়া যাইতে পারে, বোঝ্‌লা মিয়া?’

    আরশেদ মোল্লা জিলিপির পুটলি ও তেলের শিশি হাতে নেয়।

    ‘আর শোন, পীরবাবা আর একটা কথা কইয়া দিছেন। জিলাফি খাওনের তিনদিন পর যখন জিলাফির মন্তর গিয়া ঢুকব শরীলের মইদ্যে তখন মাইয়ারে টোনার কথা জানাইতে অইব। তোমার বিবিরে তালিম দিয়া দিও। এমুন কইরা কইতে অইব ‘পীরবাবা তোরে টোনা করছে, রাইতে খোয়বে পীরবাবার কাছে চইল্যা যাবি। তুই ঘুমাইলে তোর রুহু চইল্যা যাইব পীরবাবার কাছে। এই কথাগুলা দিনে তিনবার–ফজর, জহুর আর এশার নামাজের পর কওন লাগব। মনে থাকব তো?’

    ‘হ থাকব। এহন যাই।’

    জঙ্গুরুল্লাকে ‘আসলামালেকুম’ দিয়ে আরশেদ মোল্লা বাড়ির দিকে রওনা হয়।

    জঙ্গুরুল্লার নির্দেশমত জিলিপি খাওয়ানো হয়েছে রূপজানকে। সুবাসিত তেল মাখিয়ে রোজ চুল বেঁধে দিচ্ছে তার মা। দিনে তিনবার টোনার কথা বেশ জোর গলায় বলা হচ্ছে তার কাছে। কিন্তু তার মনের কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। সে আগের মতোই অচল অটল।

    রাতে বিছানায় শুয়ে রূপজান ঘুমের ভান করে থাকে। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে উঠে বসে থাকে। ঘুমিয়ে পড়লেই স্বপ্ন দেখার ভয় আছে। আত্মাটা দেহ ছেড়ে চলে যাবে পীরের কাছে।

    সে সারারাত জেগে থাকে। রাতের ঘুম সে পুষিয়ে নেয় দিনের বেলা ঘুমিয়ে।

    রাতের নিঃসীম অন্ধকারে রূপজানের ব্যাকুল মন খুঁজে বেড়ায় ফজলকে। জেলের ভেতর সে এখন নিশ্চয় ঘুমিয়ে আছে। সে কি তাকে স্বপ্নে দেখে এখন। টোনা করে সে যদি আনতে পারত ফজলের আত্মাটাকে। আত্মাটা পাহারা দিতে পারত তার নিজের আত্মাটাকে।

    বাড়ির সবাই তাকে বুঝিয়েছিল, ফজল ডাকাত। ডাকাতির মামলায় তার চৌদ্দ বছর জেল হবে। কেন সে তার জন্য নিজের জীবনটা নষ্ট করবে?

    রূপজান তাদের কথা বিশ্বাস করেনি। ফজল ডাকাতি করতে পারে না–সে জানত। সেটাই এখন প্রমাণিত হয়েছে। সে ওভাবে জেল থেকে না পালালেই ভাল করত। জেল পালানোর অপরাধে সাজা খাটতে হতো না। যাক, মাত্র তিন মাসেরই তো ব্যাপার। দেখতে দেখতে জেলের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। ফিরে আসবে ফজল।

    কিন্তু ফিরে এলে তার কি লাভ? সে-তো তাকে তালাক দিয়ে গেছে। আর তো সে তাকে ঘরে নিতে পারবে না।

    তবুও ফজল জেল থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে আসুক মনে মনে সে এ প্রার্থনা করে দিনরাত।

    আরশেদ মোল্লার প্রার্থনা কিন্তু তা নয়। ফজলের জেলের ভাত যত দেরিতে ফুরোয় এই তার কামনা। মাত্র কয়েক দিন হলো রূপজানকে জিলিপি খাওয়ানো হয়েছে। এর আছর হতে সময় লাগবে। কিন্তু বেশি সময় নিলে তো মহামুশকিল হয়ে যাবে। ফজল ফিরে এলে একটা কিছু গোলমাল বাঁধিয়ে দিতে পারে–এই তার ভয়।

    পদ্মার স্রোতের মতো সময় বয়ে যাচ্ছে। একমাস পার হয়ে গেছে এর মধ্যে। কিন্তু একটুকুও পরিবর্তন হয়নি রূপজানের। তার মা টোনার প্ররোচন-বাক্য উচ্চারণ করলেই সে কানে আঙুল দেয়, পা উঁচিয়ে মেঝের ওপর লাথি মারে আর বলে, ‘টোনার কপালে লাথি, টোনার মুখে লাখি।’

    ‘ছি মা, অমুন করিস না। আল্লাহ্ গুনা লেখব, চুপ কর। তোর বাজান হুনলে কাইট্যা ফালাইব।’ সোনাইবিবির কণ্ঠে অনুনয়ের সুর।

    রূপজান চুপ করে না। সে এবার বাঁ পা দিয়ে বারবার লাথি মারে মেঝের ওপর। আর দাঁত কিড়মিড় করে বলে, ‘টোনার মাজায় বাইয়া ঠ্যাঙ্গের লাথি। একশো একটা লাথি।’

    সোনাইবিবিও চায়না জাদু-টোনার আছর পড়ুক রূপজানের ওপর। কিন্তু স্বামীর আদেশ অমান্য করার সাহস নেই তার। তাই দিনে তিনবার সে টোনার কথা শোনায় রূপজানকে। প্রত্যেক বারই কানে আঙুল দেয় রূপজান। থুক ফেলে, লাথি মারে মেঝেতে। সোনাইবিবির চোখ থেকে ধারা নামে। বুক ভেঙে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস।

    পীরবাবার তুকতাকে কাজ হচ্ছে না কেন বুঝতে পারে না আরশেদ মোল্লা। এদিকে দিন যে আর বেশি বাকি নেই। কার্তিক মাস শেষ হওয়ার কয়েক দিন পরেই বেরিয়ে যাবে ষণ্ডাটা। এখন উপায়?

    আরশেদ মোল্লা পরামর্শের জন্য ছোটে জঙ্গুরুল্লার বাড়ি।

    পীরবাবার তুকতাকে রূপজানের মন টলেনি শুনে ভাবনায় পড়ে জঙ্গুরুল্লাও। আরো কড়া, আরো তেজালো বশীকরণমন্ত্র নিশ্চয়ই জানা আছে পীরবাবার। কিন্তু আর যে বেশি সময় নেই। ফজল জেল থেকে বেরিয়ে এসে গোলমাল বাঁধাবে, তার জন্য মোটেও ভাবে না সে। ফজলতো একটা পিঁপড়ে তার কাছে। খালি একটু চোখের ইশারা ব্যস এক ডলায় খতম। তার ভাবনা শুধু পীরবাবার জন্য। এই চান্দের মাসের পনেরো তারিখে তার মেয়ের শাদি-মোবারক। আর মাত্র তেরো দিন বাকি আছে। পাঁচ দিন পরে তিনি নিজের ‘ওয়াতন’ ফুলপুর চলে যাবেন। সুতরাং তিন-চার দিনের মধ্যেই শুভ কাজটা সমাধা করা দরকার।

    ‘শোন মোল্লা, মাইয়ার মনের দিগে চাইয়া থাকলে কোনো কাম অইব না।’ জঙ্গুরুল্লা বলে। ‘বিয়ার কলমা পড়লে আর পুরুষ মাইনষের হাত লাগলে সব ঠিক অইয়া যাইব।’

    ‘আমার মনে অয় চদরী সাব, মাইয়ারে কবুল করান যাইব না। আপনে জুয়ান দেইখ্যা একটা পোলা ঠিক করেন।’

    ‘দ্যাখো মোল্লা, আমার যেমুন কথা তেমুন কাম। পীরবাবারে তোমার মাইয়া দিমু বুইল্লা নিয়াত কইর‍্যা রাখছি। এই নিয়াত ভাঙতে পারমু না।’

    ‘কিন্তু চদরীসাব, মাইয়া কবুল না করলে কি করবেন?’

    ‘কবুল করাইতে অইব। যদি এই শাদি না অয় তবে আর জমির ধারে কাছে যাইতে পারবা না। কইয়া দিলাম।’

    আরশেদ মোল্লা কুঁকড়ে যায়। সে হাতজোড় করে বলে, ‘এট্টু রহম করেন, চদরীসাব। বেঢকচরের অর্ধেক জমি গাঙে খাইয়া ফালাইছে। আপনের জমিই এখন ভরসা। জমি লইয়া গেলে খাইমু কী?’

    ‘কী খাইবা, আমি কী জানি। জমি খাইতে অইলে আমার কথা মতন কাম করণ লাগব।’

    ‘হ, আপনে যা শুকুম দিবেন সেই মতন কাম করমু।’

    জঙ্গুরুল্লা হেসে বলে, ‘তুমি হুকুমরে শুর্দু কইর‍্যা শুকুম কইলা বুঝিন? আসলে হুকুম কথাডাই শুর্দু, বোঝলা মিয়া? ভর্দ লোকেরা শুকুম কয় না, হুকুম কয়। আমার এই হুকুমের কথা মনে রাইখ্য সব সময়।’

    একটু থেমে আবার বলে জঙ্গুরুল্লা, ‘পীরবাবার গায়ের রং দ্যাখছো? এক্কেরে হবরী ক্যালার মতন। তিনার লগে কি আনদুরা-বানদুরা কালাকষ্টি মাইয়ার শাদি দেওন যায়? তিনার রঙের লগে মিশ খাইব তোমার মাইয়ার রং। এহন বোঝতে পারছ–কিয়ের লেইগ্যা আমি এত তেলামাখি করতে লাগছি তোমারে?’

    ‘পীর বাবাতো বুড়া মানুষ। ওনার আবার শাদি করণের খায়েশ অইল ক্যান্?’

    ‘আরে পীরবাবার খায়েশ থাকুক আর না থাকুক, আসলে খায়েশটা অইছে আমার। পীরবাবা বুজুর্গ মানুষ। আল্লার পিয়ারা দোস্ত। তিনারে যদি আমাগ চরে রাখন যায়, তয় বালা-মসিবত আইতে পারব না। দ্যাখো না ক্যান্, রাক্কইস্যা গাঙ ক্যামনে ভাইঙ্গা রসাতল কইরা লইয়া যায় আমাগ চরগুলা। উনি যদি আমাগ লগে আমাগ চরে বসত করেন তয় কোনোদিন চর ভাঙতে পারব না। আমাগ চরডা অনেক পুরান আর বড়। দক্ষিণ-পশ্চিম দিগ দিয়া এট্টু-এট্টু ভাঙতে শুরু করছে। পীরবাবারে আইন্যা এই ভাঙন ঠেকাইতে অইব। তারপর তোমার কানে কানে কই একটা কথা। কারো কাছ ভাঙবা না কিন্তুক।’ জঙ্গুরুল্লা আরশেদ মোল্লার কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে বলে, ‘পীরবাবা যখন ইন্তিকাল করবেন তখন ওনারে কবর দিমু আমাগ চরে। তারপর আল্লায় মকসুদ পুরা করলে কবরডারে পোস্তা কইর‍্যা দিমু। তখন আল্লায়ই হেফাজত করব তার পিয়ারা দোস্তের কবর। এরপর গাঙ ক্যান্, গাঙ্গের বাপেরও পাওর’ থাকব না এই চর ভাঙনের।’

    একটু দম নিয়ে আবার বলে সে, ‘যেই মতন মনে মনে ঠিক কইর‍্যা রাখছি, হেই মতন ঠিক ঠিক যদি কামডা অইয়া যায়, তা অইলে আরো ফয়দা অইব। তোমার মাইয়ারও কপাল খুইল্যা যাইব তখন, হুঁহ্ হুঁহ!’

    ‘মাইয়ার কপাল খুলব!’ আরশেদ মোল্লার কণ্ঠে বিস্ময়। ‘ক্যামনে খুলব?’

    ‘হেইডাও এহনই জানতে চাও? কইবা না তো কাওর কাছে?’

    ‘না–না, কইমু না। আপনি কইয়া ফেলেন।’

    ‘তুমি পীর-দরবেশের মাজার দ্যাখছো?’

    ‘দেখছি।’

    ‘কত দ্যাশ-বিদ্যাশের মানুষ যায় মাজারশরিফে। কত সৰ্মান! কত পয়সার আমদানি! পীরবাবারে আমাগ চরে কবর দিতে পারলে আমারও মাজারশরিফ বানাইতে পারমু। তখন মিয়া তোমার মাইয়া ছালা ভইরা ফালাইব টাকা দিয়া।’

    আরশেদ মোল্লার চোখে-মুখে খুশি ঝিলিক দিয়ে ওঠে।

    ‘এখন তুমি কও, পীরবাবারে ক্যামনে ভুলাইয়া রাখন যায়? ক্যামনে আটকাইয়া রাখন যায় আমাগ চরে?’

    ‘সোন্দর দেইখ্যা একটা শাদি করাইয়া দিলে–’

    ‘এইতো এইবার বুইঝ্যা ফালাইছ। যেমুন-তেমুন আনদুরা-বানদুরা মাইয়ার লগে শাদি দিলে কাম অইব না। তার লেইগ্যা মাইয়া চাই বেহেশতের হুরির মতন সোন্দর, খুবসুরত। এইডা চিন্তা কইর‍্যা আমি তোমার মাইয়া ঠিক করছি। তোমার মাইয়ার মতন সোন্দর ঢক চেহারার মাইয়া আমাগ এই চরে-চঞ্চালে আর একটাও নাই। তোমার মাইয়ারে দ্যাখছে পীরবাবা, বজরা দিয়া যাইতে আছিল, হেই সময় একদিন আমারে কয়, অ্যায়ছা খুবসুরত লারকি হামি কোনোদিন দেখে নাই। হামার মুলুকেও এমুন চুন্দর লাড়কি নাই। এহন বোঝতে পারছ তো? তোমারে বুঝানের লেইগ্যা অনেক কথা খরচ করলাম।’

    ‘আমিতো বেবাক বোঝলাম। মাইয়াতো বোঝতে চায় না।’

    ‘বোঝতে চাইব একশবার। ছালা-ছালা টাকার কথা শোনলে এক কথায় কবুল কইরা ফালাইব। তুমি তোমার বিবিরে বুঝাইয়া কইও বেবাক কথা। সে যে মাইয়ার কানে কানে কয় সব।’

    ‘আইচ্ছা কইমু।’

    ‘এইবার তা অইলে তুমি শাদির ইন্তিজাম করো।’

    ‘কবে, দিন-তারিখ কইয়্যা দ্যান।’

    ‘আইজ রবিবার। তারপর সোম, মঙ্গল, বুধ। হ্যাঁ বুধবারই বিয়ার তারিখ ধার্য করলাম। আরে দ্যাখো তো কি কারবার। যার বিয়া তার দ্যাখতে মানা। আরে আসল কথাডাই ভুইল্যা গেছিলাম। যার শাদি তারে না জিগাইয়া তারিখ ধার্য করণ ঠিক না। আমি পীরবাবার লগে কথা কইয়া দেখি।’

    বাড়ির ঘাটে বাঁধ আছে ফুলপুরী পীরের বজরা। জঙ্গুরুল্লা বজরার কক্ষে ঢুকে দেখা করে তাঁর সাথে। অনেকক্ষণ পরে সে বেরিয়ে আসে। চোখে-মুখে উৎসাহের যে দীপ্তি নিয়ে সে গিয়েছিল, তা আর নেই এখন। আরশেদ মোল্লা তার অন্ধকার মুখের দিকে চেয়ে থাকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে।

    জঙ্গুরুল্লা তার কাঁঠাল কাঠের খাস চেয়ারটায় বসে বলে, ‘জবর একটা ভুল কইর‍্যা ফালাইছি। মাইয়ার মন এহনো নরম অয় নাই, এইডা কওনে সব্বনাশ অইয়া গেছে। পীরবাবা কয়–তব শাদি নেহি হোগা। তারে অনেক বুঝাইলাম–সব ঠিক অইয়া যাইব। কিন্তু কিছুতেই সে রাজি অইতে চায় না। হেষে অনেক কষ্টে রাজি করাইছি। কিন্তুক শাদি এহন অইব না। উনি যহন শীতকালে আবার তশরিফ নিব, তহন তোমার মাইয়ারে উড়াইয়া দিমু তিনার আতে।’

    ‘কিন্তু মাইয়া যদি ঐ সময়েও রাজি না অয়?’

    ‘রাজি করান লাগব। রাজি করানের দাওয়াই দিব পীরবাবা। ওনার ছিনার মধ্যে অনেক এলেম, বেশুমার মারফতি-কেরামতি, মন্তর-তন্তর। অনেক জিন তিনার হুকুমের গোলাম। তোমার মাইয়া বশ করতে জিন চালান দিব এইবার।’

    ‘ওরে ডাক্‌কুসরে। না চদরীসাব, জিন-পেরেতের দরকার নাই।’

    ‘আরে ওনারাতো পীরবাবার পোষা জিন। কোনো লোসকান করব না। এইবার মাইয়া ঠিক অইয়া যাইব। তুমি কোনো চিন্তা কইর‍্য না। কোনো ডর নাই তোমার। বাজারের বেইল অইয়া গেছে। এইবার বাড়িত যাও।’

    আরশেদ মোল্লা তার ডিঙি বেয়ে বাড়ি রওনা হয়।

    কোনো ডর নাই, কোনো চিন্তা নাই। কিন্তু যার ডরে সে অস্থির সে জেল থেকে বেরিয়ে আসছে কিছুদিনের মধ্যেই। ফজল বেরিয়ে যদি শুনতে পায়–রূপজান তার জন্য সব সময়ে কাঁদে, জাদু-টোনা করেও তাকে ভোলানো যায়নি তার কথা, তবে তো সে তুফান ছুটিয়ে দেবে। লোক-লশকর নিয়ে হাজির হবে তার বাড়ি। ধরে নিয়ে যাবে রূপজানকে।

    আরশেদ মোল্লার মাথার মধ্যে কেমন একটা দপদপানি শুরু হয়।

    ফজল নিশ্চয়ই খবর পেয়ে যাবে। রূপজান নিজেও গোপনে চিঠি লিখে জানিয়ে দিতে পারে।

    আরশেদ মোল্লা ভেবে কূল পায় না কেমন করে এ তুফান থেকে রক্ষা পাবে সে। রক্ষা করবে মান-ইজ্জত।

    ঘর-দোর, গরু-বাছুর নিয়ে খুনের চরে গেলে কেমন হয়? সেখানে অনেক মানুষ আছে চরের পাহারায়। কিন্তু ফজলের দল যদি চর দখলের জন্য হামলা করে? না, অত হিম্মত হবে না। কিন্তু খুনের চরে সবাই থাকে ভাওর ঘরে। এখনো বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে কেউ যায়নি সেখানে।

    রূপজানকে কোথাও লুকিয়ে রাখলে কেমন হয়? উঁহু, তাকে পাহারা দিয়ে রাখতে হবে। রূপজান নিজেই হয়ত পালিয়ে যাবে কোনো ব্যবস্থা করে। এক কাজ করা যায়–জঙ্গুরুল্লার বাড়ি রেখে দিলে আর কোনো ভয় থাকে না। জঙ্গুরুল্লার বাড়িতে অনেক মানুষজন। তারাই চোখে চোখে রাখবে আর ফজলেরও সাহস হবে না সে বাড়িতে হামলা করার।

    আরশেদ মোল্লা স্বস্তি বোধ করে। এতক্ষণ সে গভীর চিন্তায় ডুবে ছিল। হাতদুটো বৈঠা টানছিল যন্ত্রচালিতের মতো। আকাশের মেঘ, নদীর ঢেউ, ইলিশ ধরার ডিঙি, নানা রঙের বাদাম, সবুজ ধানখেত, লটা আর কাশবন–কিছুই তার নজরে পড়েনি। হালবৈঠার কেড়োত-কোড়োত দাঁড়ের ঝপ্‌পত্‌ঝপ, জেলেদের হাঁক-ডাক, কিছুই কানে যায়নি তার। এবার চারদিকে তাকায় আরশেদ মোল্লা। দূরে, ডিঙির মাথি বরাবর দেখা যাচ্ছে খুনের চর। নদীতে এখন ভাটা। চরের ঢালু তট জেগে উঠেছে অনেক দূর পর্যন্ত। ফজলদের ফেলে যাওয়া বানার বেড় থেকে মাছ ধরছে জঙ্গুরুল্লার কোলশরিকেরা। চরের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক সারি ভাওর ঘর–কোলশরিক আর বর্গাদারদের থাকবার ঝুপড়ি।

    পীরবাবাকে চর পাঙাশিয়ায় কবর দেয়া হবে। মাজার হবে তার।

    আরশেদ মোল্লা নূরপুর আহসান ফকিরের মাজারে গিয়েছিল কয়েকবার। প্রতি বছর মাঘ মাসে ‘উরস’ হয় সেখানে। সেই দৃশ্য এবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার মনের চোখে।

    বিরাট মেলা। হাজার হাজার মানুষের ভিড়। দূর-দূরান্তরের মানুষের সমাগম। দোকানপাট, ম্যাজিক, সার্কাস, ঘোড়াচক্কর, রাধাচক্কর। বিপুল বিশাল ডেগের মধ্যে রাতদিন রান্না হচ্ছে। পাশেই চালাঘরের নিচে কয়েকটা ডিঙি। রান্না করা ডাল-ভাত-তরকারি ঢেলে দিচ্ছে ডিঙির ডওরায়। মানুষ তুলে নিয়ে খেয়ে যাচ্ছে যার যার ইচ্ছে মতো।

    ফকিরের রওজা। লাল মখমলের গেলাপে ঢাকা কবর। রওজার চারপাশে কয়েকটা তালা দেয়া বাক্স। দর্শনার্থীরা বাক্সের ওপরের কাটা ছিদ্রপথে ফেলছে টাকা, আধুলি, সিকি।

    এ ছাড়া আরো টাকা আমদানি হয় নিশ্চয়। দোকানপাটের খাজনা আদায় হয়। চাল, ডাল, নগদ টাকা আসে মুরিদানের কাছ থেকে। মানতের গরু, খাসি, মুরগি আসে।

    জাহাজের সিটি যবনিকা টেনে দেয় তার মনে-জাত চলচ্ছবির।

    দুটো গাধাবোট টেনে নিয়ে ভাটির দিকে যাচ্ছে একটা লঞ্চ। কিছুক্ষণ পরেই গুড়গুড় আওয়াজ শোনা যায়। শব্দ ক্রমেই বাড়ছে। পশ্চিম থেকে উড়ে আসছে সাতটা উড়োজাহাজ। পুব দিকে যাচ্ছে।

    বাড়ির কাছে এসে পড়েছে আরশেদ মোল্লা ডিঙিটাকে বাঁ দিকে ঘুরিয়ে সে নলতার খাড়ির মধ্যে ঢোকে।

    ভাটির টান খুব জোর। সে শুধু হাল ধরে থাকে। অল্পক্ষণের মধ্যেই সে বাড়ির ঘাটে পৌঁছে যায়।

    ঘরে গিয়েই সে সোনাইবিবিকে বলে, ‘রূপজানরে বাড়ি রাখন ঠিক না। ষণ্ডাডা জেলেরতন আইলে কোন কাণ্ড কইর‍্যা ফালায় ঠিক নাই। ওরে জঙ্গুরুল্লার বাড়ি পাড়াইয়া দিতে চাই। হেইখা থাকব কয়ডা মাস।’

    ‘ওনারে কি শয়তানে পাইছে নি? এমুন জুয়ান মাইয়াডা মাইনষের বাড়ি রাখনের কথা ক্যামনে কইতে পারল? আর জঙ্গুরুল্লার স্বভাবও হুনছি ভাল না। পোলা জহিরডাও হুনছি লুচ্চা।’

    আরশেদ মোল্লা চুপ করে থাকে।

    সোনাইবিবি আবার বলে, ‘এমুন কথা আর কোনদিন যেন মোখ দিয়া বাইর না করে।’

  • একুশ

    একুশ

    জেল থেকে খালাস পেয়ে ফজল বাড়ি আসে। তাকে নিয়ে এক মাল্লাই কেরায়া নৌকা যখন বাড়ির ঘাটে পৌঁছে তখন সন্ধ্যার আর বেশি দেরি নেই।

    নৌকা থেকে নেমেই সে পিতার কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। নূরু ও আমিনা তাকে নৌকা থেকে নামতে দেখে ছুটে এসে তার পেছনে দাঁড়ায়। খবর পেয়ে বরুবিবি বিলাপ করতে শুরু করে। ফজল বাপের মরণ দেখতে পায়নি আবার বাপও মরণকালে ছেলেকে দেখতে পায়নি–এ দুঃখ এখনো তার বুকের ভেতর আছাড়ি-পিছাড়ি খায়।

    ফজল কবর জিয়ারত শেষ করে মৃত পিতার উদ্দেশে দৃঢ় কণ্ঠে বলে, ‘বা’জান, আপনের অকালে মরার জন্য জঙ্গুরুল্লা আর আরশেদ মোল্লা দায়ী। আমাগ চর, আমাগ হক-হালালের জমি জঙ্গুরুল্লা অন্যায়ভাবে দখল করছে। এই চর আমি দখল করমুই করমু। আপনে দোয়া কইরেন। আরশেদ মোল্লা মিথ্যা মামলায় আমারে পুলিস দিয়া ধরাইয়া দিছে। এর উপযুক্ত শাস্তি তারে দিমুই দিমু। আপনে দোয়া কইরেন।’

    নূরুর দিকে তাকিয়ে ফজল বলে, ‘নূরু, তুই মেহের মুনশির কানে কানে কইয়া আয়–আমি আইছি। সে যেন রমিজ মিরধা ও কোলশরিকগ লইয়া মাগরেবের পর চুপচাপ আইসা পড়ে।’

    সন্ধ্যার পর পুলকি-মাতব্বর মেহের মুনশি, রমিজ মিরধা, কদম শিকারি ও কোলশরিক আহাদালী, ধনু শিকদার ও আরো কয়েকজন আসে ফজলের সাথে দেখা করতে। তারা চরের অনেক খবর দেয় ফজলকে : জঙ্গুরুল্লার কোলশরিক আর বর্গাদাররা নতুন ভাওর ঘর তৈরি করেনি একটাও। তাদের তৈরি উনষাটটা ভাওর ঘরে হাত-পা ছড়িয়ে বসত করছে ওরা। হালের গরু নিয়ে গেছে চরে। সেগুলোর জন্য একচালা বানিয়েছে ষোলটা। তাদের রোপা ধানের ফলন খুব ভাল হয়েছিল। ধানের অর্ধেকটা নিয়েছে জঙ্গুরুল্লা। বাকিটা ভাগ করে দিয়েছে কোলশরিকদের মধ্যে। জমি ভাগ করে এরফান মাতব্বরের কোলশরিকরা যেভাবে আল বেঁধেছিল সে সব আল ঠিক রেখে কোলশরিকদের মধ্যে জমি বণ্টন করে দিয়েছে জঙ্গুরুল্লা। প্রতি নল জমির জন্য সেলামি নিয়েছে চল্লিশ টাকা করে। শ্রাবণ মাসে রোপা আমন লাগিয়েছে সারাটা চর জুড়ে। ফসলের খুব জোর দেখা যায়।

    চাকরিয়া প্রথমদিকে ছিল পঞ্চাশজন। ফজলকে পুলিস দিয়ে ধরিয়ে দেয়ার পরও ছিল জনতিরিশেক। এরফান মাতব্বরের মৃত্যুর পর সব চাকরিয়া বিদায় করে দিয়েছিল জঙ্গুরুল্লা। ফজল জেল থেকে পালিয়ে আসার পর তিরিশ জনকে এনে রেখেছিল কিছুদিন। ফজলের জেল হওয়ার পর আবার তাদের বিদায় দিয়েছে। ফজল জেল থেকে ছাড়া পেয়ে এসেছে শুনলে আবার চাকরিয়াদের ডাক পড়বে।

    ফজলদের তৈরি বানার বেড় দিয়ে মাছ ধরছে জঙ্গুরুল্লার কোলশরিকরা। অনেক মাছ। সেগুলো নিকারির টেঁকে নিয়ে বিক্রি করে রোজ কমসে কম কুড়ি টাকা পায়। ঐ টাকার চার আনা ভাগ দিতে হয় জহরুল্লাকে।

    টাকা আয়ের একটা নতুন পথ বার করেছে জঙ্গুরুল্লা। খুনের চরের উত্তর-পূর্ব কোণে। বিস্তৃত জায়গা জুড়ে যে ঘোঁজাটা, সেখানে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন জায়গার ছোট, বড়, খালি, মালবোঝাই নৌকা এসে পাড়া গাড়ে বিশ্রাম ও নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। জঙ্গুরুল্লা খুঁটিগাড়ি আদায়ের জন্য সে ঘোঁজা বন্দোবস্ত দিয়েছে রউজ্যা ডাকাতের কাছে। সে একশ থেকে দুশ মনি নৌকার জন্য আটআনা, দুশ থেকে চারশ-মনি নৌকার জন্য এক টাকা, চারশ-মনির ওপর হলে দুটাকা করে খুঁটিগাড়ি আদায় করে। জঙ্গুরুল্লাকে সে প্রতিমাসে দেয় তিনশ টাকা।

    ‘এত পয়সার আমদানি! এত নৌকা আসে কইতন? নৌকাতো বেশিভাগ আটক করছে সরকার।’ ফজল অবাক হয়ে বলে।

    ‘কিছু কিছু নৌকা লম্বর দিয়া ছাইড়া দিছে।’ রমিজ মিরধা বলে।

    ‘সে আর কয়ডা? ধান-চাউলের নৌকাও তো চলে না। নতুন আইন অইছে–এক জেলার ধান-চাউল অন্য জেলায় যাইতে পারব না।’

    ‘ধান-চাউলের নৌকা ছাড়া আরো তো নৌকা আছে।’ মেহের মুনশি বলে। ‘বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাস ভইর‍্যা চলছে আমের নাও আর কাঁডালের নাও। বাজে মালের নাও চলে বারোমাস। মওসুমের কতকত জিনিস—রশুন, পেঁয়াজ, হলদি, মরিচ, তেজপাতা, নারকেল, সুপারি, হাজারো মাল এক জেলারতন আরেক জেলায় যায় এই নদী দিয়া।’

    ‘আগের দিন অইলেতো টাকা দিয়া সিন্দুক বোঝাই কইর‍্যা ফেলাইত জঙ্গুরুল্লা।’

    ‘হ ঠিক কথাই কইছ।’ রমিজ মিরধা বলে। ‘আগের দিন অইলে রোজ আদায় অইত কমসে কম একশ ট্যাহা।’

    ‘কিন্তু নৌকাওয়ালারা ঐ ঘোঁজায় নৌকা বান্দে ক্যান্। আরো তো কত ঘোঁজা আছে। সেখানে বিনে পয়সায় নৌকা রাখতে পারে।’

    ‘অন্য ঘোঁজায় গেলে ডাকাতি অইতে পারে।‘ কদম শিকারি বলে। ‘এই আট-নয় মাসের মইদ্যে ছয়-সাতটা নৌকায় ডাকাতি অইছে! তারা পয়সা বাঁচাইতে গিয়া নাও রাখছিল অন্য ঘোঁজায়।’

    ‘আসলে রউজ্যাই ডাকাতি করায় ওর লোকজন দিয়া।’ রমিজ মিরধা বলে। ‘ডাকাতির ভয়ে বেবাক নৌকা খুনের চরের ঘোঁজায় আইস্যা খুঁটগাড়ি দিয়া খুঁডা গাড়ে।’

    ‘ধান-চাউলের দাম কি বাজারে?’

    ‘দাম অনেক বাইড়া গেছে। সোয়া দুই ট্যাহা মনের ধানের দাম চাইর ট্যাহা আর তিন ট্যাহা মনের চাউল ছয় ট্যাহা।’

    ‘এই বছর বাচন কষ্ট আছে।’ কদম শিকারি বলে।

    ‘ধান বেশি অয় ভাটি অঞ্চল খুলনা বরিশালে আর উজান দেশ সিলেট ময়মনসিংয়ে। উত্তর বঙ্গের দিনাজপুরেও ধান বেশি অয়। ঐ সব জেলারতন ধান-চাউল আইতে দেয় না বুইল্যাইতো দাম এত বাড়তে আছে।’

    ‘ধান-চাউল আইতে দেয় না ক্যান?’

    ‘কি জানি, ব্রিটিশ সরকারের কি মতলব। জাপান বর্মা মুলুক দখল করছে। আসামের দিগে আগাইয়া যাইতেছে। ব্রিটিশ এইবার যুদ্ধের ঘাঁটি বানাইব এই দেশে। তারা সৈন্য আর যুদ্ধের সরঞ্জাম নিয়া আসছে। আরো অনেক আসব। এই সব লক্ষ লক্ষ সৈন্যদের খাওয়ান লাগব তো! তাই মিলিটারির জন্য ধান-চাউল মজুত করতেছে ব্রিটিশ সরকার।’

    ‘হ আমিও হুনছি।’ মেহের মুনশি বলে। ‘দিঘিরপাড়ের কেরাসিন তেলের পাইকার বলাই কুণ্ডু মাল আনতে গেছিল নারায়ণগঞ্জ। মাল পায় নাই। কেরাসিন তেল বোলে আর পাওয়া যাইব না। সে দেইখ্যা আইছে–শীতলক্ষাপাড়ের আর চারগোপের পাটের গুদাম–ডেভিড কোম্পানীর ঐ সব বড় বড় পাটের গুদাম মিলিটারি দখল করছে। গাধাবোট, সুলুপ, ফেলাট, মাডুয়া নাও বোঝাই অইয়া ধান-চাউল আইতে আছে বিভিন্ন জেলারতন। মালগাড়ি ভইরা চাউল আহে দিনাজপুরতন। ওইগুলা জমা করতে আছে ঐ সব গুদামে।’

    ‘বিদেশতন গমও নাকি আসতেছে জাহাজ বোঝাই কইরা।’ ফজল বলে। ‘এইবার যে মাইনষের কপালে কি আছে, বলা যায় না। বর্মা মুলুকতন আগে চাউল আসত। মোটা পেগু চাউল। বর্মা এখন জাপানের দখলে। তাই ওইখানতন আর চাউল আসব না। সাংঘাতিক মুসিবত সামনে।’

    ‘একটা কতা জিগাই মাতবরের পো।’ ধনু শিকদার বলে। ‘আমরা হগল বচ্ছর ভাটি মুলুকে না অয় উজান দ্যাশে যাই ধান দাইতে। এইবারও মহাজন ঠিক করছি। কাতি মাসের এই কয়দিন পর ভাটি মুলুকে যাত্রা করতে চাই। দাওয়ালি নাও যাইতে দিব তো?’

    ‘খালি নাও লইয়া যাইতে পারবেন। কিন্তু আসার সময় ধান লইয়া আইতে পারবেন না।’

    ‘কষ্ট কইর‍্যা ধান কাটমু, মাড়াই করমু। হেই মিন্নতের ধানের ভাগ যদি না আনতে পারি, তয় মিন্নত কইর‍্যা লাভ কি?’ ক্ষোভ ও হতাশা ধনু শিকদারের কণ্ঠে।

    ‘আমরা ঢাকা-ফরিদপুরের দাওয়ালরা যদি না যাই তয়তো ভাটি আর উজান মুলুকের খেতের ধান খেতেই নষ্ট অইব।’ বলে আহাদালী।

    ‘তাতে অইবই। ব্রিটিশ সরকারের কি এখন এই দিগে খেয়াল আছে? তারা এখন যুদ্ধ লইয়া পেরেশান। ক্যামনে জাপানরে হটাইয়া নিজেগ রাজ্য উদ্ধার করব। ভারত ছাড় আন্দোলনের অনেক নেতা এখন জেলে। তারা আলোচনা করতে আছিল : আমাগ প্রধানমন্ত্রী হক সায়েবরে না জিগাইয়া ছোট লাট মিলিটারিগ লগে যুক্তি কইর‍্যা কয়েকটা জেলার ধান চাউল সরাইয়া দিছে বাংলার বাইরে, জাপান আইয়া পড়লে খাদ্যের অভাবে যাতে মুশকিলে পড়ে, লড়াই করতে না পারে। এই নিয়া হক সায়েবের সাথে ছোট লাটের বিরোধ চলতে আছে। রাজবন্দিরা আরো কইতেছিল–গুদামে গুদামে মিলিটারিরা ধান-চাউল জমা করতে আছে খালি তাগ খাওয়ার লেইগ্যা না। জাপান আইয়া পড়লে ওনারা বেবাক পোড়াইয়া দিয়া ভাইগ্যা যাইব। জাপানিরা খাদ্যের অভাবে আর লড়াই করতে পারব না।

    ‘কিন্তু হেই লগে আমরাও তো খাওন না পাইয়া মইরা যাইমু। আমাগ তিন-চাইর মাসের খোরাক আছে ভাটি না অয় উজান মুলুকতন। আমাগো তো বাঁচনের কোনো পথ দ্যাখতে আছি না।’

    ‘হ, বড় খারাপ দিন আইতে আছে। এখন যদি আমন ধান পাকার আগে চরটা দখল করা যায়, তয় কিছুটা বাঁচার আশা আছে।’

    ‘হ ঠিকই কইছ।’ রমিজ মিরধা বলে। ‘কিন্তু জঙ্গুরুল্লার দলরে ক্যামনে হটান যায়? আপনেরাই বুদ্ধি দ্যান, কেমন কইর‍্যা—’

    ‘আমরা তো কোনো কূলকিনারা পাইতেছি না।’ বলে মেহের মুনশি।

    ‘শোনেন, আমারে মুনশিগঞ্জ জেলেরতন পাঠাইছিল ঢাকা জেলে। আমি ঢাকা জেলেরতন খালাস পাইয়া আইছি। জঙ্গুরুল্লার দল আমার ছাড়া পাওয়ার কথা তাড়াতাড়ি জানতে পারব না। সেই জন্যই আপনেগ চুপে-চাপে আইতে কইছি। তারা তো তিনমাস হিসাব কইর‍্যা রাখছে। তাগ হিসাব মতন অগ্রাণ মাসের পাঁচ-ছয় তারিখে আমি ছাড়া পাইমু। কিন্তু আমি চব্বিশদিন আগেই ছাড়া পাইয়া আইছি। জেলখানায় ভাল মতন চললে, হুকুম মতন কাম করলে জেল মাফ পাওয়া যায়। জঙ্গুরুল্লারা তো এই খবর রাখে না। তাই চাকইর‍্যা এখন একটাও নাই চরে।’

    ‘হ, তোমার ছাড়া পাওয়ার খবর পাইলে আবার চাকইরা আইন্যা রাখব চরে।’

    ‘তখন কিন্তু চর দখল করা মুশকিল অইয়া পড়ব। আমি কাইল একটা দিন বাড়িতে আছি। পরশু দূরে একখানে চইল্যা যাইমু। জেলখানায় পালং থানার একজনের কাছে ভাল চাকইর‍্যার সন্ধান পাইছি। মেঘু আর আলেফের মতো চাকইর‍্যা দিয়া কাম ফতে অইব না। আমি দুই-তিন দিনের মইদ্য ঐ চাকইর‍্যা লইয়া আইমু। আমি যে ছাড়া পাইয়া আইছি এই কথা যেন একটা কাউয়ায়ও জানতে না পারে।’

    ‘ও মিয়ারা হোনলা নি? খবরদার! এই কথা জানাজানি অইলে কিন্তু কোনো কাম অইব না।’

    ‘বোঝ্‌লা তো মিয়ারা?’ রমিজ মিরধা বলে। ‘নিজের কপালের লগে বেবাকের কপাল পোড়াইও না। যার মোখ দিয়া এই কতা বাইর অইব সে তার বাপের জর্মের না। সে একটা জারুয়া। এই কইয়া দিলাম।’

    ‘শোনেন, অনেক টাকার দরকার।’ ফজল বলে। ‘আমি আমাগ বেবাক গয়না বন্ধক দিমু। আপনারা নিজেগ সাধ্যমত টাকা জোগাড় কইর‍্যা কাইলই নিয়া আসেন। নগদ টাকা না থাকলে গয়না বন্ধক দেওন লাগব। চর ফতে অইলে সব আবার ফিরত পাইবেন।’

    ‘হ, চরের জমি খাইতে অইলে টাকা খরচ করন লাগব।’ মেহের মুনশি বলে। ‘আপনারা সবাই রাজি তো?’

    ফজল তার কাজে-কর্মে, ব্যবহারে এদের আস্থা অর্জন করেছে। সকলের অগাধ বিশ্বাস তার ওপর। মাছ ধরার ব্যবস্থা করে গরিব কোলশরিকদের যেভাবে সে সাহায্য করেছিল তা কেউ ভোলেনি। তাই তার প্রস্তাবে সবাই রাজি হয়।

    ফজল বলে, ‘আপনারা বাড়ি যান। মুনশি ভাই, আর মির ভাই এই রাত্রের মইদ্যে টাকা অথবা গয়না যোগাড় করেন। ঐগুলা লইয়া কাইল ভোরে আমার এইখানে চইল্যা আসবেন।’

    একে একে সবাই নিজ নিজ বাড়ির দিকে রওনা হয়।

    পরের দিন। ভোরবেলা বরুবিবি রসুইঘরে চালের গুঁড়োয় পানি মিশিয়ে চিতই পিঠার গোলা তৈরি করছিল।

    ফজল দরজার মুখে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কি করতে আছ, মা?’

    ‘কয়ডা চিতই পিডা বানাইমু। তুই আবার বাইরে চইল্যা যাইস না।’

    ‘না, যাইমু না। তুমি আত ধুইয়া গয়নার পোটলাডা নামাইয়া দ্যাও তো মা।’

    ‘গয়নার পোটলা! বউর গয়নার?’

    ‘হ।’

    ‘ঐ পোটলা দিয়া তুই কি করবি?’

    ‘কাম আছে। অনেক টাকার দরকার।’

    ‘উঁহু! এই গয়না তো রূপজানের। উনি মরার সময় কইয়া গেছেন–ঐ গয়না রূপজানের মহরানার হক।’

    ‘শোন মা, আমারতন জবরদস্তি কইর‍্যা তালাক নিছে। ঐ সময় আরশেদ মোল্লা মহরানার দাবি ছাইড়্যা দিছে।’

    ‘আরশেদ মোল্লা দাবি ছাইড়া দেউক। কিন্তু উনি তো কইয়া গেছেন–গয়নাগুলা রূপজানের মহরানার হক।’

    ‘ঠিক আছে, ঐগুলো রূপজানেরই থাকব। এখন টাকার বড় দরকার। ঐগুলা বন্ধক দিয়া কিছু টাকা আনতে অইব।’

    ‘না রে বাজান, হেষে যদি ছাড়াইতে না পারস?’

    ‘ছাড়াইতে পারমু না ক্যান্? তোমারে কথা দিলাম, চাইর মাসের মইদ্যে ওগুলা ছাড়াইয়া আইন্যা যারডা তারে ফিরাইয়া দিমু।’

    ‘অনেক পীড়াপীড়ির পর বরুবিবি রাজি হয়। সে হাত ধুয়ে ঘরে যায়। সিন্দুক খুলে গয়নার পুটলি বের করে। ফজলের হাতে ওটা দিয়ে সে বলে, ‘দ্যাখরে বাজান, এইগুলা খুয়াইয়া ফেলাইলে কিন্তুক দায়িকের তলে থাকবি। মহরানার দেনা আর শোধ করতে পারবি না।’

    গয়নার পুটলি নিয়ে ফজল নিজের ঘরে যায়। চৌকির ওপর বসে সে পুটলি খোলে, একটা-একটা করে দেখে গয়নাগুলো। ওগুলো নাড়াচাড়া করার সময় গয়না পরিহিতা রূপজানের ছবি বারবার ভেসে ওঠে তার মনে।

    ফজলের মনে প্রশ্ন জাগে, রূপজান গয়নাগুলো কেন ফেরত দিয়েছিল। তবে কি সে জোর-জবরদস্তির তালাক মেনে নিয়েছে? না, অসম্ভব। এ তালাক সে মেনে নিতে পারে না। গয়না বিক্রি করে তার মামলার তদবির করার জন্য সে কাদিরকে দিয়ে ওগুলো ফেরত পাঠিয়েছিল। কাদির তো তাই বলেছিল ওগুলো ফেরত দেয়ার সময়। সে তো বানিয়ে বলেনি কিছু। রূপজান যা বলে দিয়েছিল তা-ই সে বলেছে।

    গয়নাগুলোয় হাত বুলাতে বুলাতে সে মনে মনে বলে, ‘হায় রে অভাব! এই অভাবের তাড়নায় রূপজানের শরীল খালি কইর‍্যা একবার বন্ধক দিতে অইছিল এই গয়নাগুলা। এখন আবার বন্ধক দিতে অইব।’

    কেমনে যেন সর্বস্ব হারানোর আশঙ্কায় ব্যথিয়ে ওঠে তার বুকের ভেতরটা।

    ‘মিয়া ভাই।’

    আমিনার ডাকে সংবিৎ ফিরে পায় ফজল, ‘কে রে আমিনা? আয়।’

    একটা থালায় করে চিতই পিঠা, নারকেল কোরা ও ঝোলা গুড় নিয়ে আসে আমিনা।

    ‘কিরে, তাল নাই? তালের মওসুম কি শেষ?’

    ‘এইডাতো কাতি মাস। এহন কি আর তাল পাওয়া যাইব? হাশাইলের হাটে পাওয়া যাইতে পারে দুই একটা।’

    এই বচ্ছর তাল চোখে দেখি নাই। গুড় ও নারকেল সহযোগে চিতই পিঠায় এক কামড় দিয়ে ফজল বলে, ‘চিতই পিঠার লগে তালের পায়েস! ওহ্ যা মজা!’

    ‘ভাবি তো নাই। তাল গোলাইব কে?’

    ‘ক্যান্ তুই? পারবিনা গোলাইতে?’

    ‘উঁহু। তাল গোলান কি যেমুন-তেমুন কষ্ট।’ আমিনা গান গাইত গাইতে রসুইঘরের দিকে চলে যায়–

    তাল গোলাগোল যেমুন তেমুন,

    আঁইট্যা দ্যাখলে ভয় করে,

    তার চুল-দাড়িরে ভয় করে,

    অ ভাইজান, আমি তাল খাইনা ডরে।

    ফজলের মনের চোখে ভেসে ওঠে, রূপজান সবল সুডৌল হাত দিয়ে তালের আঁটি দলাইমলাই করে ঘন গোলা বের করছে আর গুনগুন করে গান গাইছে–

    তাল গোলাগোল যেমুন তেমুন,

    আঁইট্যা দ্যাখলে ভয় করে,

    তার চুল-দাড়িরে ভয় করে,

    অ বু’জান, আমি তাল খাইনা ডরে গো,

    তাল খাইনা ডরে।

    তালের আঁইটায় চুল-দাড়ি

    খামচা দ্যাও আর দ্যাও বাড়ি

    ডলা দিয়া বাইর করগো রস

    অ বউ, বেতাইল্লারে এমনে করো বশ গো,

    এমনে করো বশ।

    হাতে-ধরা চিতই পিঠা মুখে দিতে ভুলে যায় ফজল। তার কল্পনা রূপজানকে নিয়ে আসে তার চোখের সামনে। তাল গোলাতে গোলাতে রূপজান তার দিকে চেয়ে মুচকি হাসছে আর গান গাইছে–

    তালের গোলা বেতাল করে,

    জ্বাল দিলে যে উতরে পড়ে,

    অ বু’জান, হইল কি কারবার গো,

    হইল কি কারবার।

    তাল পড়লে উত্‌রাইয়া,

    পড়িস না গো চিত্‌তরাইয়া,

    অ বউ, নিভু জ্বালে তালে তালে

    নাড়া দে বারবার গো,

    নাড়া দে বারবার।

    ‘অ দুদু।’

    নূরুর ডাকে কল্পনার ছবি মুছে যায় হঠাৎ।

    ‘কি রে নূরু, ডাক দিলি ক্যান্?’

    রমিজ মিরধা আর মেহের মুনশি আইছে।

    ‘কাছারি ঘরে বইতে দে। পান-তামুক দে। আমি আইতে আছি।’

    পিঠা খাওয়া শেষ করে গয়নার পুঁটলি নিয়ে ফজল কাছারি ঘরে যায়।

    সালাম বিনিময়ের পর মেহের মুনশি বলে নগদ টাকা অনেকেই দিতে পারে নাই। বারোজনের কাছে পাইছি দুইশ’ পঞ্চাশ টাকা। পনেরো জন দিছে গয়না। বাকি কোলশরিকরা কিছু দিতে পারে নাই।

    ‘দিব কইতন?’ রমিজ মিরধা বলে। ‘বউ-পোলাপান লইয়া ওরা বড় কষ্টে আছে।’

    ‘তাতো বুঝলাম।’ ফজল বলে, ‘কিন্তু অনেক টাকার দরকার। গয়না বন্ধক দিয়া কি অত, টাকা জোগাড় করন যাইব?’

    ‘কত টাকা লাগব, আন্দাজ করছনি?’ মেহের মুনশি জিজ্ঞেস করে।

    ‘তা প্রায় দুই হাজার টাকা লাগব।’

    ‘তা বেবাক গয়না বন্দক দিলে অইয়া যাইব মনে অয়।’ বলে রমিজ মিরধা।

    ‘কি কি গয়না আনছেন, দেখি? কারতন কোন কোন গয়না আনছেন, তার ফর্দ বানাইছেন তো?’

    ‘হ বানাইছি।’ মেহের মুনশি বলে।

    মেহের মুনশি নগদ দুশ’ পঞ্চাশ টাকা দেয় ফজলের হাতে। তারপর পুটলিবাঁধা গয়না ও ফর্দ রাখে ফজলের সামনে।

    ফজল পুটলি খুলে গয়নাগুলো ফর্দের সাথে মিলিয়ে নেয়। গয়নার মধ্যে রয়েছে করণফুল, কানপাশা, মাকড়ি, মুড়কি, চুড়ি, বাজু, দানাকবচ। সবগুলো গয়না ও রূপজানের গয়নার পুটলি মেহের মুনশির হাতে তুলে দিয়ে ফজল বলে, ‘এইগুলা লইয়া আপনারা দুইজন হাশাইল বাজারে চইল্যা যান। জগু পোদ্দারের দোকানে বন্ধক রাইখ্যা টাকা লইয়া আসেন। আমিই যাইতাম, কিন্তু জঙ্গুরুল্লার কোনো লোক দেইখ্যা ফালাইলে বেবাক গোলমাল অইয়া যাইব।’

    ‘ঠিক আছে। তোমার যাওনের দরকার নাই।’ রমিজ মিরধা বলে। ‘আমরাই ঠিকঠাক মত ওজন করাইয়া ট্যাহা লইয়া আইতে আছি।’

    ‘হ, ঠিক মতন আলাদা আলাদা ওজন করাইয়া কার গয়নার কত ওজন তা ফর্দে লেইখ্যা রাইখেন। দেড় হাজার টাকা কমে রাজি অইবেন না।’

    ‘গয়না অইব চল্লিশ ভরির কাছাকাছি।’ মেহের মুনশি বলে। ‘দেড় হাজার টাকা দিব না ক্যান?’

    ‘না দিলে বিষ্ণু পাল আছে, ছিদাম কুণ্ডু আছে। ওনাদের কাছে যাইবেন।’

    ‘ঠিক আছে, তুমি চিন্তা কইর‍্য না।’

    ‘আইজ সন্ধ্যার পর আপনাগ দুইজনরে লইয়া একটু বসতে অইব। মাইরটা কেমনে কি ভাবে চালাইতে অইব তা আপনাগ সাথে পরামিশ কইর‍্যা ঠিক করণ লাগব।’

    ‘সের দশেক মরিচের গুড়া লইয়া আইমু, কি কও?’ রমিজ মিরধা বলে। ‘ছাইয়ের লগে মিশাইয়া—’

    ‘এখনতো কার্তিক মাস। বাতাসের জোর নাই। এখন ছাই উড়াইয়া কাম অইব না।’

    ‘হ, ঠিকই।‘ মেহের মুনশি বলে। ‘মরিচের গুঁড়ায় পয়সা নষ্ট করণের দরকার নাই।’

    তাদের বিদায় দিয়ে ফজল নিজের ঘরে যায়। নূরুর হাতের-লেখার খাতা থেকে এক টুকরা সাদা কাগজ ছিঁড়ে নিয়ে সে খুনের চরের নক্সা আঁকে। কোন দিক থেকে কখন কিভাবে আক্রমণ করলে জঞ্জুরুল্লার দলকে তাড়িয়ে দেয়া যাবে তার পরিকল্পনা ঘুরতে থাকে তার মগজের মধ্যে।

  • বাইশ

    বাইশ

    জোর যার মুল্লুক তার–সর্বজনবিদিত এ প্রবচনটি পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়ে চর অঞ্চলে যে রূপ নিয়েছে তা হচ্ছে—

    জোর যার চর তার।

    জোর কার, চর কার?

    হাতিয়ার সাথী যার।

    ঢাল, কাতরা, লাঠি, শড়কি, লেজা, চ্যাঙ্গা, গুলের বাঁশ ইত্যাদি হাতিয়ারগুলো চরবাসীদের সাথী। পুলিসের ভয়ে চর ছেড়ে পালাবার সময় ফজলদের দলের অনেকেই তাদের সাথী হারিয়ে বিপাকে পড়ে গিয়েছিল। হাতিয়ার ছাড়া চরে বসত করা যায় না। তাই কয়েক মাসের মধ্যে কষ্টেসৃষ্টে তারা তাদের হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছে আবার।

    ফজলও জানে দলের সবাই হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু সে ছিল ফেরার, তারপর আবার জেলে। তাই হাতিয়ারগুলো দেখার সুযোগ পায়নি সে এতদিন। প্রত্যেকের হাতিয়ার ভাল করে পরীক্ষা করে দেখা দরকার। তার নির্দেশ মতো বিকেল বেলা নৌকার ডওরায় লুকিয়ে সবাই নিজ নিজ হাতিয়ার নিয়ে আসে ফজলের কাছে। হাতিয়ারগুলো মোটামুটি ভালই বানিয়েছে বলে মনে হয় ফজলের। তবে কয়েকটা শড়কি ও লেজার হাতলে এর মধ্যেই ঘুণ লেগে গেছে। বাবাত্তি বাঁশ দিয়ে বানিয়েছে বলেই এ অবস্থা। হাতলগুলো বদলাতে হবে। দুটো গুলেল বাঁশের টঙ্কার কানে বাজে না তেমন। এগুলো বাতিল করে তিন দিনের মধ্যে নতুন বানিয়ে নিতে হবে। ঢাল অতি আবশ্যকীয় বস্তু। আস্ত বেত দিয়ে প্রত্যেকেই তৈরি করেছে নিজ নিজ ঢাল। ছোট বড় মিলিয়ে সংখ্যায় একশ’ চৌত্রিশটা। বারোটা বাদে সবগুলোয় কষ-কুঁড়োর মাজন লাগানো হয়েছে ঠিক মত। গাব বা উইর‍্যাম গোটার কষের সাথে পরিমাণ মতো চালের কুঁড়ো মিশিয়ে তৈরি হয় এ মাজন। এ মাজন কয়েক পোচ দিতে পারলে ঢাল খুব শক্ত-পোক্ত হয়, ঘুণ বাসা বাঁধতে পারে না। মাজন লাগাবার জন্য বারোটা ঢালের মালিকদের তিনদিনের সময় দেয় ফজল। ঘন গিঁঠযুক্ত চিকন পাকাঁপোক্ত বাঁশ দিয়ে তৈরি করতে হয় যার যার নিজের হাতের পাঁচ-হাতি লাঠি। ফজল এক একটা লাঠির দু’দিক ধরে হাঁটুর সাথে চাপ দিয়ে পরীক্ষা করে। চারটে লাঠি মটমটাৎ করে ভেঙেই গেল পরীক্ষার সময়। এ লাঠিয়ালদের নতুন লাঠি বানাবার জন্য সময় দেয়া হয় দুদিন। রামদা পাওয়া গেল মাত্র ছয়খানা। রামদা নিয়ে ডাকাতি করে ডাকাতরা। তাই পরিচিত লোহারু ছাড়া কেউ এ অস্ত্র বানিয়ে দিতে রাজি হয় না। ফজল বুড়ো আঙুলের মাথা দিয়ে ধার পরীক্ষা করে রামদাগুলোর। সবগুলোতেই পাইন দেয়া দরকার। কিন্তু দিঘিরপাড় বা হাশাইলের লোহারুর দোকানে এগুলো নিয়ে যাওয়া যাবে না। গেলেই সাথে সাথে রটে যাবে তাদের প্রস্তুতির খবর। এগুলো বালিগচার ওপর ‘করাইত্যা’ বালিতে ঘষে ধার উঠাবার চেষ্টা করতে হবে। ধার না উঠলেও চিন্তা নেই। কারণ রামদা দিয়ে তো মানুষ কাটতে যাচ্ছে না তারা। দাগুলোকে ঘষে চকচকে ঝকঝকে বানাতে হবে। দেখলেই যেন বিপক্ষীয় লড়িয়েদের পিলে চমকে যায়। রামদা কম থাকলেও ফজলের ভাবনার কিছু নেই। সে তো রামদাওয়ালা চাকরিয়া আনতেই যাচ্ছে দক্ষিণপাড়।

    গুলেল বাঁশের জন্য প্রচুর গুলির প্রয়োজন। হিসেব করে দেখা যায় পয়তাল্লিশটা গুলেল বাঁশের জন্য মাত্র আটশ’ মাটির গুলি তৈরি আছে। রোদে শুকানো গুলিগুলো পুড়িয়ে নিতে হবে। আরো অন্ততঃ দেড় হাজার গুলির দরকার। দশসের টাডি সুপারি আর দশসের ঝাঁকিজালের কাঠি কিনে নিলেই দেড় হাজার গুলির অভাব পূরণ হবে।

    ফজল এবার কাগজ-কলম নিয়ে লড়াইয়ের লায়েক মানুষের হিসেব করতে শুরু করে। কোলশরিকের সংখ্যা ছাপ্পান্ন। এদের মধ্যে দু’জন বুড়োকে বাদ দিলে থাকে চুয়ান্ন জন। তাদের জোয়ান মরদ ছেলের সংখ্যা বিয়াল্লিশ। উঠতি বয়সের কিশোরের সংখ্যা ছত্রিশ। চাকরিয়া অন্তত পঁচিশ জন। মোট একশ’ সাতান্ন জন।

    এবার নৌকার হিসেব। এগারো-হাতি ডিঙি আঠারোটা। প্রত্যেকটায় চারজন করে চার আঠারং বাহাত্তর জনের জায়গা হবে। তেরোহাতি ডিঙি পাঁচখানা। প্রত্যেকটায় পাঁচজন করে পাঁচ-পাঁচে পঁচিশ। দু’খানা বড় ঢুশা নৌকা। কুড়ি জন করে কুড়ি দ্বিগুণে চল্লিশ। একটা ধূরী। এতে জায়গা হবে পনেরো জনের। ফজলের ঘাসি নৌকায় ধরবে কমপক্ষে তিরশি জন।

    ছোট বড় মিলিয়ে মোট নৌকার সংখ্যা সাতাশ। তাতে তোক ধরবে কমপক্ষে একশ’ বিরাশি জন।

    যথেষ্ট! যথেষ্ট! ফজল স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মাথা তুলে তাকায় তার লোকজনের দিকে।

    ‘কি মিয়া, কি যথেষ্ট?’ জিজ্ঞেস করে কদম শিকারি।

    ‘নাও যা আছে, যথেষ্ট। সাতাশটা নাও আছে। আমাগ বেবাক মানুষ ফারাগত মতন। বসতে পারব নায়। শোনেন শিকারির পো। সামনের ভোর রাত্রে ঘাসিটা লইয়া রওনা দিমু দক্ষিণপাড়া। চাকইর‍্যা আনতে যাইমু পালং থানার বাসুদেবপুর। ঘাসি বাইতে পাঁচজন বাইছা ঠিক করেন।’

    কদম শিকারি জোয়ান দেখে পাঁচ জনকে যাচাই করে। অনেকেই ফজলের সাথে যাওয়ার জন্য বায়না ধরে। কিন্তু ফেরার সময় চাকরিয়া বোঝাই করে আনতে হবে বলে তাদের বুঝিয়ে শুনিয়ে নিরস্ত করতে হয়।

    বেলা ডোবার আর বেশি দেরি নেই। সবাইকে চুপেচাপে হাতিয়ার ঠিকঠাক করতে হবে, তাদের প্রস্তুতির ব্যাপারটা কাকপক্ষীও জানতে পারবে না। ফজলের এসব নির্দেশ নিয়ে কদম শিকারি ও জাবেদ লশকর ছাড়া সবাই যার যার বাড়ি চলে যায়।

    কদম শিকারি ও জাবেদ লশকরকে কাছারি ঘরে বসিয়ে ফজল ভেতর বাড়ি যায়। উঠানে পা দিয়েই দেখে তার মা উত্তরভিটি ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ থমথমে, মেঘাচ্ছন্ন।

    ‘অ্যাই ফজু, এই দিগে আয়।’ বরুবিবি ডাকে।

    ‘কি মা?’

    ‘কি হুনতে আছি আঁ? তোরা আবার কাইজ্যা করণের লেইগ্যা হাজাহাজি করতে আছস?’

    ‘আমাগ হকের চর অন্যে দখল কইর‍্যা লইয়া গেছে। সেই চর রাহেলিল্লাহ ছাইড়া দিমু?’

    ‘ছাইড়া দে বা’জান। চর বড়, না জান বড়? জানে বাঁইচ্যা থাকলে–’

    ‘মা তুমি চুপ করো দেহি। বা’জান মনে এত কষ্ট লইয়া মরছে। আমারে ওরা জেলের ভাত খাওয়াইছে। ওগ এমনে এমনে ছাইড়্যা দিমু।’

    ‘কি করবি বা’জান? অদিষ্টে যা আছিল তা অইছে। আর মারামারি কাড়াকাডির মইদ্যে যাইস না।’

    ‘মা এতগুলা মানুষ, এতগুলা কোলশরিক আমারে মাতবর বানাইছে। আমার মুখের দিকে চাইয়া আছে। হকের জমি যদি এমনে এমনে ছাইড়া দেই তয়তো চরে আর বসত করণ যাইব না।’

    ‘চরে আর বসত করণের কাম নাই, বা’জান। তোর বাজানের আগে তোর বড় চাচা আছিল মাতবর। আমাগ ঘর-বাড়ি আছিল লটাবইন্যায়। এই খুনের চরেরই নাম আছিল লটাবইন্যা। এই লটাবইন্যা ভাঙ্গনের পর বউ-পোলা-মাইয়া লইয়া হেই যে ছাব্বিশ সনের বন্যার পরের বচ্ছর আসুলিতে চইল্যা গেল, হউর বাড়িতে গিয়া ওঠল, আর চরের মাড়িতে ফির‍্যা আইল না। উনিতো কত শান্তির মইদ্যে দিয়া গুঁজাইরা গেছে। তুই জেলে থাকতে তোর চাচি আইছিল তার ছোড পোলা লইয়া। তাগো কাছে হুনছি, তাগো ঐ জাগায় মারামারি নাই, কাড়াকাডি নাই। কত শান্তি! বা’জান ফজু, চল আমরাও আসুলিতে চইল্যা যাই।’

    ‘আসুলিতে কই যাইমু? সেইখানে কি আমাগ মামুর বাড়ি আছে নি? তোমার বাপের বাড়িতে আছিল ভূকৈলাশ। সেই চরও ভাইঙ্গা গেছে। মামুরা এখন পাতনা দিয়া আছে মিত্রের চরে। যাইবা সেইখানে?’

    ‘বেবাক বেইচ্যা কিন্যা চল পাইকপাড়া যাই। তোর চাচাতো ভাইরা তো আছে।’

    ‘বা’জান বাঁইচ্যা থাকতে চাচায়ই কোনো দিন জিগায় নাই। এহন চাচাতো ভাইরা কি আর জিগাইব? শোন মা, এই চর ছাইড়্যা আর যাওনের কোনো জায়গা নাই আমাগো।’

    বরুবিবির চোখের কোলে পানি চকচক করছিল এতক্ষণ। এবার দু’গাল বেয়ে দরদর ধারায় শুরু হয় অশ্রুর প্লাবন।

    ফজল শঙ্কিত হয়। মা হয়ত এখনি বিলাপ করতে শুরু করবে। তাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য সে বলে, ‘মা তুমি চিন্তা কইর‍্য না। আমিতো মাতবর। আমিতো মারামারি করতে যাইতে আছি না। চাকইর‍্যা আনতে যাইতে আছি। চাকইর‍্যারাই মাইর করব। তুমি একটুও চিন্তা কইর‍্য না।’

    বরুবিবি আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে ঘরের ভেতর চলে যায়। ফজল ফিরে আসে কাছারি ঘরে।

    সন্ধ্যার পর মেহের মুনশি ও রমিজ মিরধা আসে।

    মেহের মুনশি তার কোমরে পেঁচিয়ে বাঁধা খুতি বের করে। ফজলের সামনে সেটা উপুড় করে ঢালতে ঢালতে বলে, ‘অনেক কইয়া-বুইল্লা দেড় হাজার টাকাই আনছি। পোদ্দারের পো কি রাজি অইতে চায়!’

    ‘সুদ কি হারে নিব?’ ফজর জিজ্ঞেস করে।

    ‘শ’ তে মাসিক পাঁচটাকা।’

    ‘তার মানে পনেরোশ’ টাকার সুদ এক মাসে পঁচাত্তর টাকা! ওরে আল্লারে!’

    ‘সুদের হার তো বড় বেশি!’ কদম শিকারি বলে।

    ‘হ সুদের হার বেশিই।’ রজিম মিরধা বলে। ‘শোন ফজল মিয়া, ত্বরাত্বরিই ট্যাহা শোধ দিতে অইব। সুদের পোলা-মাইয়া নাতি-পুতি বিয়ানের সময় দেওন যাইব না। ওগুলা বিয়াইতে শুরু করলে কিন্তুক উফায় নাই। তহন গয়নাগুলা বেবাক খুয়াইতে অইব।’

    ‘হ তাড়াতাড়িই টাকা শোধ দিয়া গয়না ছাড়াইয়া আনতে অইব। দেরি করণ যাইব না।’

    মেহের মুনশির কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা গুনে নিয়ে ফজল অন্দরে যায়। সিন্দুকে টাকাগুলো রেখে আবার কাছারি ঘরে ফিরে আসে।

    অনেকক্ষণ ধরে তারা সলা-পরামর্শ করে। মেহের মুনশি, রমিজ মিরধা ও কদম শিকারি হামলা করার যে সব কায়দা-কৌশলের কথা বলে তা সবই পুরানো, বহুল ব্যবহৃত দাদা-পরদাদার আমলের পদ্ধতি। ওতে খুন-জখম এড়ানো সম্ভব নয়। খুন-জখম না করে বিপক্ষ দলকে কিভাবে নাস্তানাবুদ করে চর থেকে হটিয়ে দেয়া যায় তার ফন্দি-ফিকিরের জন্য ফজল অনেক চিন্তা-ভাবনা করেছে। জেলে থাকতে অনেকের সাথে আলোচনা করেছে। অনেক ভেবে-চিন্তে পরিকল্পনা একটা করে রেখেছে সে, গেঁথে রেখেছে মনের মধ্যে। কিন্তু এখনি, এত আগে তা প্রকাশ করা সমীচীন নয়। কারণ সে মনে করে, এদের কানাকানি থেকে বাইরে জানাজানি হবে আর জানাজানি হলেই সব আয়োজন হবে বিলকুল বরবাদ। সে শুধু বলে দুইজন বুড়া বাদে সবাইকে হাতিয়ার হাতে নিতে অইব। আমাগ মোট মানুষের সংখ্যা উঠন্তি চ্যাংড়া লইয়া একশ বত্রিশ জন। এই সব মানুষের লিস্টি তৈরি করতে অইব। পয়লা পরথম বাছাই করেন ল্যাগবেগা হ্যাংম্যাইঙ্গা গুলারে। তারপর বাছাই করেন চ্যাংড়া লেদুফেদু গুলারে। ঢাল-কাতরা, লাঠি-শড়কি লইয়া ওরা মুখামুখি লড়তে পারব না। ওগ হাতে দিতে অইব গুলাইল বাঁশ। দূরের তন ওরা গুলাইল মারব। যারা গুলাইল মারতে জানে না, এই কয় দিনের মইদ্যে তাগো শিখাইয়া লইতে অইব। কলাগাছের মাজায় চান্দের মতো গোল দাগ দিয়া চানমারির ব্যবস্থা করবেন। মাটির গুলি মাইর‍্যা মাইর‍্যা ওরা মারতে শিখব।’

    একটু থেমে ফজল আবার বলে, ‘তুরফানের কাছে যারা লাঠি খেলা শিখছিল, আলেফ সরদার আর মেঘু পালোয়ানের কাছে যারা শড়কি চালান শিখছিল, তারা এই কয়দিন খুব কইর‍্যা অভ্যাস করব। চাকইর‍্যা আইলে চাকইর‍্যাগ লগে পরামিশ কইর‍্যা ঠিক করণ লাগব। কোন ভাবে হামলা করলে কাম ফতে অইব। আপনারা—’

    ‘ক্যাডারে?’ বাইরে মানুষের চলাফেরার শব্দ পেয়ে হাঁক দেয় মেহের মুনশি।

    ‘আমরা।’

    ‘আমরা ক্যাডা?’

    ‘চান্দু, বক্কর–আমরা ঘাসি লইয়া ফজল ভাইর লগে যাইমু।’

    ‘তোমরা এই রাইতে আইয়া পড়ছ?’ ফজল জিজ্ঞেস করে।

    ‘হ, ঘুমাইয়া গেলে যদি জাগন না পাই।’

    ‘ভাল করছ। দাঁড়, বাদাম, গুন, লগি সব ঠিকঠাক মতো নায়ে উডাও। তোমরাও নায়ের মইদ্যে ঘুমাইয়া থাক গিয়া। পোয়াত্যা তারা ওডনের আগে রওনা দিতে অইব। আর তিনজন কই?’

    ‘তারা এহনই আইয়া পড়ব।’

    ‘আইচ্ছা যাও।’

    ফজল তার আগের কথার জের টেনে বলে, ‘আপনারা লিস্টিগুলা কইর‍্যা রাইখেন। আইজ আর আলোচনার দরকার নাই। চাকইর‍্যারা আইলেই ‘ফাইনাল’ আলোচনা অইব।’

    সবাইকে বিদায় দিয়ে ফজল অন্দরে গিয়ে দেখে তার মা বারান্দায় তার জন্য খাবার সাজিয়ে বসে বসে তসবি গুনছে।

  • তেইশ

    তেইশ

    ভোর রাত্রেই পাঁচজন বাইছা নিয়ে নৌকায় চড়ে রওনা হয়েছিল ফজল। বাদাম উড়িয়ে, দাঁড় মেরে, গুন টেনে, পদ্মা উজিয়ে, কীর্তিনাশা ভাটিয়ে তারা যখন পালং পৌঁছে তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। লোকের কাছ থেকে বাসুদেবপুরের পথের খবর নিয়ে তারা নৌকাটাকে একটা বড় খালের ভেতর দিয়ে বেয়ে নিয়ে যায়। মাইল দুয়েক গিয়ে একটা শুকনো সরু খালের মুখে নৌকাটাকে বাঁধে।

    চলতি নৌকায় রান্নার ঝামেলা অনেক। তাই গুড় আর কলা দিয়ে মুড়ি খেয়ে কোনো রকমে পেটকে বুঝ দিয়ে এতদূর এসেছে তারা। এসব চাকুমচুকুম আর গছানো যাবে না পেটকে। চাল, ডাল, মুরগি আলু, তেল, নুন, পেঁয়াজ, মরিচ ইত্যাদি বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল ফজল। তিনজনের ওপর রান্নার ভার দিয়ে বক্কর আর টিটুকে নিয়ে ফজল নৌকা থেকে নামে। ফজলের হাতে রশির ঝুলনায় একটা সন্দেশের হাঁড়ি।

    ফজল জেল থেকেই শুনে এসেছিল রামদয়াল সরদার খুব মেজাজি লোক। তাই তাকে খুশি করার জন্য পথে নৌকা থামিয়ে সে নড়িয়ার সুপ্রসিদ্ধ সন্দেশ কিনে নিয়ে এসেছে।

    লোকের কাছ জিজ্ঞেস করে খাল পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তারা রামদয়াল সরদারের বাড়ি পৌঁছে।

    লুঙ্গি-পরা অপরিচিত লোক এসেছে শুনে বিরক্তির সাথে রামদয়াল ঘর থেকে উঠানে নামে। আগন্তুকদের দিকে তাকিয়ে তার বিরক্তিভরা গম্ভীর দৃষ্টি হঠাৎ প্রসন্ন হয়ে ওঠে। ফজলের হাত থেকে সন্দেশের হাঁড়িটা নিতে নিতে সে বলে, ‘এগুলা আবার ক্যান্ আনছ, বাবা? হাঁড়িটা পর্শ করো নাই তো?’

    ‘না, না দড়ির ঝুলনা ধইর‍্যা আনছি।’

    উঠানে মাদুর বিছিয়ে তাদের বসতে দেয়া হয়।

    রামদয়াল সরদারের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মাথায় কাঁচাপাকা চুল। তার দোহারা পেশিবহুল মজবুত শরীরে ভাটার টান লাগলেও গায়ের কুচকুচে কষ্টিকালো রংয়ের জন্যই বোধ হয় তা চোখে পড়ে না।

    রামদয়াল সরদার তার আসল নাম নয়। তার আসল নাম পাঁচকড়ি মণ্ডল। জমি দখলের ‘কাইজ্যায়’ তার দল রামদা নিয়ে লড়াই করত। রামদাওয়ালা সরদারই লোকের মুখে মুখে বিবর্তিত হয়ে রামদয়াল সরদার হয়েছে। এই নামেই সে পরিচিত আজকাল। আসল নামে আর কেউ চিনে না তাকে। সে নিজেও বোধ হয় ভুলে গেছে তার আসল নাম।

    খুনের চরের বৃত্তান্ত শেষ করে ফজল তার এখানে আসার উদ্দেশ্য রামদয়ালকে জানায়। রামদয়ালের মুখ সমবেদনায় বিষণ্ণ। আফসোসসূচক শ্চ-শ্চ শব্দ করে সে বলে, ‘বড় অদিনে আইছ বাবা। আমার দল তো আর নাই। দল তো কবে ভাইঙ্গা গেছে।’

    ফজলের মাথায় যেন হঠাৎ বাজ পড়ে। সে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে রামদয়ালের মুখের দিকে।

    ফজলের অসহায় বিহ্বল দৃষ্টি লক্ষ্য করে রামদয়াল আবার বলে, ‘আমাগ আর কেও জিগায় না আইজকাইল। আগে বরিশাল, ভোলা, চানপুর, মেন্দীগঞ্জে, হিজলা আরো কত জায়গা থিকা লইয়া যাইত আমাগ। আড়িয়াল খাঁ আর মেঘনার কত কত চর দখল কইর‍্যা দিয়া আইছি। তোমাগ পদ্মার চরে যাই নাই কোনোদিন। এহন চরুয়ারা নিজেরা নিজেরাই লড়াই করে, দশ-পাঁচটা খুন-জখম অয়, হাজতে যায়, জেল খাডে। আমাগ আতে খুন-জখম বড় একটা অইত না।’

    একটু থেমে আবার বলে, ‘আগে আশ্বিন-কাতি মাসে বাড়ির ভাত খাইতে পারতাম না। আইজ এই চর, কাইল অই চর দখলের লেইগ্যা মাইনষে আতে-পায়ে ধরত। গেল কয়েক বচ্ছর ধইর‍্যা আর কেও নিতে আহে না। দুই একটা যা আইত, উচিত পয়সা দিত না। এমনে কি আর সংসার চলে? আমাগ অনেকেরই জমাজমি নাই। দলের মানুষ প্যাডের ধান্দায় নানান জা’গায়, নানান কাজে চইল্যা গেছে। বারো-তেরো জন তো বউ-পোলা-মাইয়া লইয়া গেছে আসাম মুলুকে। ওরা আর ফিরা আইব না কোনো দিন। চার-পাঁচ জন গেছে করাত কামে। তিনজন সইন কইর‍্যা যুদ্দে গেছে। কয়েকজন হাটে হাটে তরি-তরকারি বেচে। দুইজন এক মাল্লাই বায়। কয়েকজন করে কুড়ালের কাম। তারা গাছ কাডে, চলা ফাড়ে। কয়েকজন ওড়া-কোদাল লইয়া কই যে গেছে ভগমান জানে।’

    ‘দশ-বারো জন তো পাওয়া যাইব?’ হতাশার ধকল কাটিয়ে ফজল বলে।

    ‘নারে বাপু, তাও নাই। দুই-তিনজন যারাও আছে, তারা কেও জ্বরে কাহিল, কেও বদনা লইয়া দৌড়াদৌড়ি করে।’

    ফজল হেসে ওঠে। মেঘাচ্ছন্ন আকাশে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো সে হাসি। সে বলে, ‘দলের মানুষ তো নাই, কিন্তু রামদাওগুলাতো আছে?’

    ‘রামদাও দিয়া কি করবা?’

    ‘আমাগ রামদাও নাই। আপনাগ রামদাওগুলা বেইচ্যা ফালান আমার কাছে।’

    ‘রামদাও লইয়া পারবা না বাপু তোমরা লাড়াই করতে। খামাখা—’

    ‘আপনে যদি দেখাইয়া দ্যান, এট্টু শিখাইয়া দ্যান তয় পারমু আপনের আশীর্বাদে।’

    রামদয়াল বিস্মিত চোখে তাকায় ফজলের দিকে। তার চোখ খুঁটে খুঁটে দেখে ফজলের সিনা, বাহু, আঙুল। সে ফজলের সাথী দুজনকেও দেখে খুঁটে খুঁটে। তারাও হাতে-পায়ে গায়ে-গতরে প্রায় ফজলের মতই বলিষ্ঠ।

    রামদয়াল হঠাৎ খপ করে ফজলের ডান হাত ধরে ফেলে বলে, ‘আসো দেখি পাঞ্জা লড়ি। দেখি কেমুন জোর আছে শরীলে।’

    দু’জনে দু’জনের কব্জী ধরে মাটিতে কবজি রেখে পাঞ্জার লড়াই শুরু করে। যদিও শেষ পর্যন্ত রামদয়ালই জিতে, তবুও ফজলের হাত মাটিতে নোয়াতে তাকে গায়েব সব কুয়ত ঢালতে হয়।

    আপনেরে ওস্তাদ মানলাম, গুরু মানলাম। ফজল অনুনয় করে বলে। ‘শিখাইয়া দ্যান আমাগো।’

    ‘গুরু মানলে দক্ষিণা দিতে অয়। দক্ষিণা কই?’

    ফজল জামার পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে বাড়িয়ে দেয় রামদয়ালের দিকে।

    দশ টাকা! দেড় মণ চালের দাম! যুদ্ধের জন্য হঠাৎ দাম না বাড়লে তো তিন মণই পাওয়া যেত।

    রামদয়াল নোটটা ট্র্যাঁকে গুঁজে উঠে দাঁড়ায়। উত্তর দিকে কিছুদূর গিয়ে সে একটা জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়।

    কিছুক্ষণ পরে রামদয়াল জঙ্গল থেকে ফিরে আসে। তার একহাতে একটা লম্বা রামদা, অন্যহাতে সদ্য-কাটা একটা তল্লা বাঁশ।

    ‘এই জুয়ান, কি যেন নাম তোমার?’ রামদয়াল জিজ্ঞেস করে।

    ‘ফজল।’

    রামদয়াল রামদাটা ফজলের হাতে দিয়ে বলে, ‘এই বাঁশটা এক কোপে দুইখণ্ড করতে অইব।’

    ফজল রামদাটা নিয়ে ওটার ধার পরীক্ষা করে বলে, ‘ধার তো তেমন নাই।’

    ‘ঠিক আছে, তুমি কোপ মারো। আমি ঠিকই বোঝতে পারব।’

    রামদয়াল বাঁশটার গোড়ার দিক এগিয়ে দেয় ফজলের দিকে।

    সে লাফ মেরে ‘ইয়া আলী’ হুঙ্কার দিয়ে কোপ মারে। বাঁশটা দু’টুকরো হয়ে যায়। রামদয়ালের চোখে-মুখে বিস্ময়। সে বলে, ‘সাবাস, তুমি পারবা হে। গুরুর নাম রাখতে পারবা।’

    রামদয়াল ফজলের সাথী বকর আর টিটুরও পরীক্ষা নেয়। তারা এক কোপে বাঁশটার বারো আনারও বেশি কাটতে সক্ষম হয়।

    রামদয়াল বলে, ‘তোমরাও চেষ্টা করলে পারবা।’

    সে ঘরে গিয়ে দুটো ঢাল ও একটা শড়কি নামিয়ে নিয়ে আসে।

    একটা ঢাল ও শড়কি ফজলের হাতে দিয়ে বলে, ‘তুমি ঢাল ও শড়কি লইয়া আমারে আক্রমণ করবা। আমি ঢাল আর রামদা দিয়া তোমারে ফিরাইমু।’

    রামদয়াল ও ফজল যার যার হাতিয়ার নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায়।

    রামদয়াল ইশারা দিতেই ফজল শড়কি নিয়ে আক্রমণ করে। রামদয়াল ঢাল দিয়ে শড়কির আঘাত প্রতিহত করেই ডান দিকে সরে বাঁদিকে সামান্য ঘুরে লাফ দিয়ে ‘জয় মা কালী’ বলে কোপ মারে শড়কির হাতলে। বাঁশের শুকনো হাতল পুরোপুরি দু’টুকরো হয় না। কোপ খাওয়া হাতলের নিচের অংশের সাথে শড়কির ফলাটা লল্লুড় করে। এতেই বেশি অসুবিধেয় পড়ে ফজল। তার হাতের অস্ত্রটা এখন না-শড়কি, না-লাঠি। কোনো ভাবেই সে ওটাকে চালাতে পারে না। ওদিকে রামদয়াল রামদা উঁচিয়ে মার মার করে তেড়ে আসে। ফজল পিছু হটে দৌড় দিয়ে পালাতে বাধ্য হয়।

    রামদয়াল হাসতে হাসতে বলে, ‘এইডা অইল রামদার লাড়াই। শড়কির আতল পুরাপুরি না কাটলেই বেশি ভাল। শড়কিডা দিয়া তহন শড়কির কাম তো না-ই, লাডির কামও চলব না।’

    এবার রামদয়াল ঢাল আর শড়কি এবং ফজল ঢাল আর রামদা নিয়ে মহড়া শুরু করে।

    ফজলের সাহস শক্তি ও ক্ষিপ্রতায় মুগ্ধ হয় রামদয়াল। এমন ভাল শাগরেদ সে কখনো পায়নি। সে মনে মনে খুশি হয় এই ভেবে যে সে বুড়ো হয়ে গেছে। মরে যাবে আর কদিন পর। ফজল তার গুরুর নাম রাখতে পারবে।

    ফজলের সাথী দু’জন–বক্কর আর টিটুও একে একে যোগ দেয় মহড়ায়। তারাও মোটামুটি ভালই দেখিয়েছে ‘রামদা’র লড়াই। রামদয়াল লড়াইয়ের আরো কিছু কায়দা কৌশল সম্বন্ধে উপদেশ দিয়ে বলে, ‘তোমরা মাংস বেশি খাও, তাই শক্তি আছে তোমাগ গায়ে, পেঁয়াজ-রশুন খাও, তার তেজ আছে শরীলে। তোমরা অভ্যাস করলে আমাগতন ভাল লাড়াই করতে পারবা।’

    ‘কয়টা রামদাও দিতে পারবেন?’ জিজ্ঞেস করে ফজল। ‘ঢালও লাগব ঐ কয়টা। আপনাগ ঢালগুলা বড় আর মজবুত।’

    ‘রামদাও কুড়ি খানেকের বেশি দেওয়ন যাইব না। ঢালও কুড়িডা দেওয়ন যাইব। কিন্তু কত টাকা দিবা?’

    ‘আপনে কইয়া দ্যান?’

    ‘কুড়িখান রামদা’র দাম চাইর টাকা কইর‍্যা আশি টাকা আর কুড়িখান ঢাল তিন টাকা কইর‍্যা ষাট টাকা।’

    ‘গুরুজি, এট্টু কমাইয়া ধরেন। একটা রামদাও দুই টাকায় বানান যায়।’

    ‘হেই জিনিস আর এই জিনিসে তফাত আছে। এই জিনিস চাইর টাকার কমে বানাইতে পারবা না।’

    ‘ঠিক আছে, আপনার কথাই রাখলাম। তয় সব মিলাইয়া একশ কুড়ি টাকা দিমু।’

    রামদয়ালের দল ভেঙে গেছে। রামদা’র প্রয়োজন তাই শেষ হয়ে গেছে। তার বিশেষ প্রয়োজন এখন টাকার। সে একশ কুড়ি টাকায় জিনিসগুলো দিতে রাজি হয়ে যায়। এ টাকায় মহাজনের কাছে বন্ধক দেয়া দেড় বিঘা জমি ছাড়িয়ে নেয়া যাবে।

    ফজল আর তার সাথী দুজনকে নিয়ে রামদয়াল উত্তর দিকের জঙ্গলে ঢোকে। একটা বাঁশঝাড়ের পাশে এলোমেলো করে রাখা কঞ্চির স্তূপ। রামদয়াল কঞ্চিগুলোকে সরিয়ে একটা আয়তাকার গর্ত থেকে কাঠের একটা বাক্স উঠিয়ে আনে। বাক্সের ডালা খুলতে খুলতে সে বলে, ‘এগুলা ঘরে রাখলে বিপদ। পুলিস খানাতল্লাশি কইর‍্যা এগুলা পাইলে কি আর বাঁচনের উপায় আছে? মাজায় দড়ি লাগাইয়া হান্‌দাইয়া দিব জেলে। ঐ ডরে কব্বরের মইদ্যে গুঁজাইয়া রাখছি। নেও, গইন্যা দ্যাহো কয়ডা আছে।’

    ফজল গুনে দেখে কুড়িটা আছে রামদা।

    ‘বাক্সডা শুদ্দা লইয়া যাও। বাক্সডা দিয়া আর কি করমু? বাক্সের দাম দশটাকা দিও।’

    ‘ঠিক আছে। দিমু দশ টাকা।’

    ‘দাওগুলায় পাইন দেওয়া আছে। বালিগচার উপরে বালি দিয়া ধারাইয়া লইও।’

    সন্ধ্যার পর বাক্সটা নিয়ে নৌকায় ওঠে ফজল ও তার সাথীরা।

    রামদয়াল এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে কুড়িটা ঢাল যোগাড় করে নৌকায় দিয়ে যায়। ফজল একশ’ তিরিশ টাকা তার হাতে দিয়ে তার আশীর্বাদ প্রার্থনা করে।

    রামদয়াল তার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে, ‘ভগবান তোমার মঙ্গল করুক, তোমার জয় হোক।’

    রামদয়াল চলে যাওয়ার পর বাক্সটা ও ঢালগুলো তারা ধানখেতের মধ্যে লুকিয়ে রেখে আসে। চৌকিদার-দফাদার বা পুলিস খবর পেয়ে বা বিদেশী নৌকা দেখে সন্দেহ করে নৌকায় তল্লাশি চালালে মুসিবতে পড়তে হবে। সুতরাং সাবধান হওয়া ভাল।

    রান্না অনেক আগেই শেষ হয়েছিল। সবাই খেতে শুয়ে পড়ে। ভোর হওয়ার আগে রওনা দিলেই চলবে।

    শুয়ে শুয়ে ফজর চিন্তার জাল বুনতে শুরু করে। যাদের জন্য এত পরিশ্রম করে তারা এই দূর দেশে এসেছিল তাদের পাওয়া গেল না। তাদের হাতিয়ার নিয়ে কাম ফতে করা কি সম্ভব হবে? কেন হবে না? নিশ্চয়ই সম্ভব হবে।

    সন্দেহের দোলায় নুয়ে পড়া সংকল্প তার আত্মবিশ্বাসের মেরুদণ্ডে ভর দিয়ে এবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়।

    খুনের চর বেদখল হওয়ার পর থেকে, বিশেষ করে জেলে থাকতে ফজল শুধু ভেবেছে আর ভেবেছে। চর দখলের নতুন কায়দা-কৌশল ফন্দি-ফিকির মনে আসতেই তার চোখে ভাসে দুই দলের মারামারির দৃশ্য। অনেকগুলোর মধ্যে তিনটা কৌশল তার মনে সাফল্যের আশা জাগায়। এগুলো নিয়ে সে বাদল আর আক্‌লাসের সাথে আলোচনাও করেছিল। তারাও কৌশলগুলোর প্রশংসা করে বলেছিল, ঠিকমত কাজে লাগাতে পারলে জয় নিশ্চিত।

    চাকরিয়া যোগাড়ের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তার উদ্ভাবিত কায়দা-কৌশলগুলো এবার তার মাথার ভেতর জটলা পাকাতে শুরু করে। শুয়ে শুয়ে সে স্থির করে, ফিরে যাওয়ার পথে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো অবশ্যই সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে হবে।

    ফজলের মনের ভাবনা ধীরে ধীরে থিতিয়ে আসে। সে ঘুমিয়ে পড়ে এক সময়ে।

    একদল লোক লাঠি-শড়কি নিয়ে তাড়া করছে রূপজানকে। সে প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছে নদীর পাড় ধরে। এক পাশ থেকে সে নিজেও দৌড়াচ্ছে শড়কি হাতে। কিন্তু এগুতে পারছে না। হঠাৎ পাড় ভেঙে রূপজান নদীতে পড়ে গেল আর অমনি ঘুমটা ভেঙে গেল তার। সে কাঁপতে থাকে থরথর করে।

    একটু পরেই মোরগ বাক দিয়ে ওঠে, ‘কুউ-ক্কুরু-উ-উ–ৎ-কু-উ-উ।’

    ফজল উঠে সবাইকে জাগিয়ে দেয়। তারা তাড়াতাড়ি ধানখেত থেকে রামদা’র বাক্স ও ঢালগুলো নিয়ে আসে, রেখে দেয় ডওরায় পাটাতনের নিচে।

    আর একটুও দেরি না করে তারা পাড়া উঠিয়ে নৌকা ছেড়ে দেয়।

    খাল উজিয়ে কীর্তিনাশায় পৌঁছতে ভোর হয়ে যায়। উজান পানি। বাতাসও নেই যে পাল তুলে দেবে। দু’জন গুন নিয়ে নেমে যায় ডাঙায়। কাঁধে বেরুয়া ঠেকিয়ে তারা গুন টেনে এগিয়ে যায় নদীর পাড় ধরে।

    একটা বাঁক ঘুরতেই ফজল উত্তর দিকে তাকায়। একটা ছোট স্টিমার আসছে উত্তর দিক থেকে। ওটার পেছনে চাক্কি। পানি কমে গেছে, তাই পেছনে চাক্কিওয়ালা জাহাজ চালু হয়েছে।

    অনেক দূরে দেখা যায় একটা উঁচু তালগাছ। আশপাশের উঁচু গাছগুলোর মাথা তালগাছটার হাঁটু-বরাবর।

    ‘এই বক্কর, এই টিটু, ঐ চাইয়া দ্যাখ ভোজেশ্বরের আসমাইন্যা তালগাছটা। এমুন উঁচা তালগাছ আর দেখি নাই কোনো মুলুকে। দুফরের আগে কিন্তু ঐখানে যাওন লাগব। আইজ সোমবার, ভোজেশ্বরের হাট।’

    ‘হাটেরতন কিছু কিনবেন নি?’ জিজ্ঞেস করে বক্কর।

    ‘হ, অনেক কিছু কিনতে অইব।’

    পথে চান্দনী গ্রাম বরাবর নদীর ঢোনে নৌকা বাধে তারা। তিনজনকে নিয়ে ফজল নৌকা থেকে নামে। একটা কাটারি, একটা চাঙারি ও কিছু রশি নেয় সাথে।

    গ্রামের সরু পথ ধরে তারা হাঁটে। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে ফজল বলে, ‘তোরা চোত্‌রা গাছ চিনস? গুঁড়িচোত্‌রা? রামচোত্‌রা?’

    তিনজনের কেউ চেনে না চোত্‌রা গাছ।

    ‘চিনবি কইতন? চরে এই গাছ অয়না। তোরা নামও শোনস নাই কোনো দিন?’

    ‘হ, হুনছি।’ টিটু বলে। ‘ঐ পাতা গায়ে লাগলে চুটমুট করে, জ্বালা করে, খাউজ্যায়।’

    ‘হ, বইয়ের ভাষায় এগুলার নাম বিছুটি।’

    গ্রামের দুটো বেতঝোপ থেকে গুনে গুনে দুইশ আঁকড়ি যোগাড় করে ফজল। বেতঝোঁপের মালিককে আঁকড়ি পিছু এক পয়সা করে দিতে হয়। ওগুলোকে একখানে সাজিয়ে তারা রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধে।

    খুঁজতে খুঁজতে রাস্তার পাশের এক জঙ্গলে রামচোত্‌রাও পাওয়া যায়। হাতে রুমাল বেঁধে ফজল অনেকগুলো গাছ উপড়ে তোলে শিকড়ের মাটিসহ। চাঙারির ভেতর ওগুলো খাড়া করে সাজিয়ে চাঙাড়িটা তুলে দেয় একজনের মাথায়।

    নদীর ঢোনে ফিরে এসেই তারা নৌকা ছেড়ে দেয়। ভোজেশ্বর পৌঁছে তারা নদীর পাড়ের বাঁশহাটা থেকে সরু লম্বা ও শুকনো দেখে পঁচিশটা তল্লা বাঁশ কেনে। বাঁশগুলোকে নৌকার দুধারে পানিতরাশ বরাবর তারা রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেয়। তারপর টিটুকে নৌকায় রেখে ফজল বাকি চারজনকে নিয়ে হাটের বিভিন্ন পট্টিতে ঘোরে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য। তিন ব্যাটারীর চারটে টর্চলাইট; দশসের টাডি সুপারি; দশসের ঝাঁকিজালের কাঠি; তিনসের মাথা তামাক, কুড়ি প্যাকেট বিড়ি ও একসের সুতলি কিনে হাটের ভিড় ঠেলে তারা তাড়াতাড়ি নৌকায় ফিরে আসে। টিটুকে নৌকায় না দেখে ফজল হাঁক দেয়, ‘টিটু গেলি কইরে?’

    টিটুর কোনো সাড়া পাওয়া যায় না।

    চান্দু থলে-ভরা জালের কাঠি নিয়ে নৌকায় ওঠে সকলের আগে।

    ‘ও মাগো!’

    থলে ফেলে লাফ দিয়ে নেমে যায় চান্দু।

    ফ্যাঁক-ফ্যাঁক করে হাসতে হাসতে দৈত্যের মুখোশ-পরা টিটু ছই-এর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে।

    সবাই এবার জোরে হেসে ওঠে–কেউ খলখলিয়ে কেউ ফ্যাঁকফেঁকিয়ে। ভয়ঙ্কর বিকট চেহারার দৈত্য ভেঙচি দিয়ে রয়েছে। দাঁতাল শুয়োরের দাঁতের মতো দুটো বড় দাঁত বেরিয়ে আছে। রক্ত লেগে আছে সে দাঁতে। নওল ষাড়ের শিংএয়ের মতো দুটো খাড়া শিং-এও রক্তের দাগ।

    মুখোশটা দেখেই ফজলের মাথায় একটা নতুন বুদ্ধি খেলে যায়। সে বলে, ‘মোখাড়া পালি কই, এই টিটু?’

    টিটু মুখ থেকে শক্ত কাগজে তৈরি মুখোশটা খুলে বলে, ‘অ্যাক ব্যাডা বেচতে আনছিল। অ্যাক আনা দিয়া কিনছি।’

    ‘ও ব্যাডা গেল কই?’

    ‘হাটের কোন দিয়ে গেছে কে জানে?’

    ‘অ্যাই, তোরা পাঁচজনে পাঁচ দিকে যা ব্যাডারে হাঁটের তন বিচরাইয়া আনন চাই। ওরে কইস, পঞ্চাশটা কিনমু।’

    ফজল ভাবে, ‘মুখোশটা খুবই কাজের জিনিস। হঠাৎ দেখলে ভয় পাওয়ার কথা। মুখোশ দেখে ভয় না পেলেও মুখোশের আড়ালের মানুষকে নিশ্চয়ই ভয় পাবে। চিনতে না পেরে মনে করবে ওস্তাদ লাঠিয়ালরাই মুখোশ পরেছে তাদের পরিচয় গোপন করার জন্য। মুখোশ না থাকলে বিপক্ষদল দেখবে পাকা লাঠিয়াল একজনও নেই। সব হাঙাল-বাঙাল আর চ্যাংড়ার দল। ওদের মনের জোর বেড়ে যাবে। তখন লড়াই জেতা মুশকিল হয়ে যেতে পারে।

    কিছুক্ষণ পর মুখোশ-পরা ফেরিওয়ালাকে ওরা নিয়ে আসে। দর কষাকষি করে ফজল পাইকারী দরে ভয়াল চেহারার দৈত্য-দানবের পঞ্চাশটা মুখোশ কেনে আড়াই টাকায়।

    আর কোনো কাজ বাকি নেই পথে। তারা পাল তুলে নৌকা ছেড়ে দেয়। হাল ধরে বসে থাকে বক্কর।

    দূর থেকে একটা গানের সুর ভেসে আসে ফজলের কানে। গানের কথা কিছুই বোঝা যায় না। তবুও সুরের স্পর্শে বিহ্বল হয় তার মন।

    তাদের সামনে অনেক দূরে একটা দো-মাল্লাই নৌকা। নৌকাটা ভাটিয়ে তাদের দিকে আসছে। মনে হয়, ওটাতেই বাজছে কলের গান। দুটো নৌকার মাঝের দূরত্ব কমে আসতেই গানের কথা স্পষ্ট শোনা যায়।

    ‘ঐ যে ভরা নদীর বাঁকে,

    কাশের বনের ফাঁকে ফাঁকে,

    দেখা যায় যে ঘরখানি।

    সেথায় বধূ থাকে গো,

    সেথায় বধূ থাকে।’

    গানের কথা ও সুর গুঞ্জরণ তোলে তার মনে। তার চোখ বুজে আসে। কল্পনার পাখায় ভর দিয়ে তার মন উড়ে চলে যায় ভরা নদীর বাঁকে। মনের চোখ খুঁজে বেড়ায় তার প্রিয় মুখ।

    নৌকাটা তাদের পাশ দিয়ে ভাটির টানে অনেক দূর চলে গেছে। গান আর শোনা যায় না  এখন। কিন্তু ফজলের মনে গানটা তখনো বেজে চলেছে। তার মনের চোখ তখনো খুঁজে বেড়াচ্ছে–কখনো রূপজানের, কখনো জরিনার মুখ।

    ‘ও মিয়াভাই, বড় গাঙ্গে আইয়া পড়ছি।’

    বক্করের ডাকে সংবিৎ ফিরে পায় ফজল। সে চোখ খোলে। সূর্য ডুবে যাচ্ছে। সামনের দিকে তাকিয়ে সে বলে, ‘আল্লার নাম লইয়া পাড়ি দে।’

    সন্ধ্যার মৃতপ্রায় আলোর দিকে তাকিয়ে সে ভাবে, খুব ভাল সময়েই পৌঁছেছে তারা। রাতের অন্ধকারে কেউ দেখতে পাবে না, আর দেখলেও চিনতে পারবে না তাদের।

    ‘আল্লা-রসুল বলে ভাইরে মোমিন। আল্লা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্।’ বক্কর ও অন্যান্য বাইছারা জাকইর দেয়।

    অনুকূল স্রোত। ভাটির টানে নৌকাটা যাতে পুবদিকে জঙ্গুরুল্লার এলাকায় চলে না যায় সেজন্য পালটাকে একই অবস্থায় রেখে তারা উত্তরমুখি পাড়ি ধরে।

    পাল আর দাঁড়ের টানে উত্তর দিকে চলতে চলতে, ভাটির টানে পুবদিকে সরতে সরতে নৌকাটা ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ফজলদের বাড়ির ঘাটে পৌঁছে যায়।

  • চব্বিশ

    চব্বিশ

    পরের দিন ভোরে ফজল ঘুম থেকে উঠেই ঘাসিতে ঘুমিয়ে থাকা বক্কর ও চান্দুকে ডেকে তুলে পাঠিয়ে দেয় পুলকি মাতব্বরদের ডেকে আনতে। সে নিজে চাঙারিসহ রামচোত্‌রা গাছগুলো কলাগাছের ঝোঁপের মধ্যে ছায়ায় রেখে আসে। মাঝে মাঝে পানির ছিটে দিলে গাছগুলো তাজা থাকবে।

    ফজল এবার হাট থেকে কিনে আনা তল্লা বাঁশগুলোর আইক্কা ছাড়ায় দা দিয়ে, গিঁঠগুলো চেঁচে পরিষ্কার করে। ফজলের বাঁশ চাঁচা শেষ না হতেই মেহের মুনশি, রমিজ মিরধা, জাবেদ লশকর ও কদম শিকারি চলে আসে।

    খবরিয়াদের কাছেই তারা শুনেছিল, চাকরিয়া একজনও আসেনি। এসেই তারা বিষণ্ণ মুখে জানতে চায় চাকরিয়া না আসার কারণ।

    ‘দলটা ভাইঙ্গা গেছে।’ ফজল বলে। ‘দলের সরদার আছে। সে-ও বুড়া। দলের লোকজন এদিগে ওদিগে নানান কাজে চইল্যা গেছে।’

    ‘এহন কি করতে চাও?’ মেহের মুনশি জিজ্ঞেস করে। ‘মেঘু আর আলেফ সরদারের লেইগ্যা খবরিয়া পাঠান দরকার।’

    ‘কোনো দরকার নাই। আমরাই পারমু কাম ফতে করতে।’

    চারজন পুলকি-মাতব্বর হাঁ করে চেয়ে থাকে ফজলের দিকে।

    ‘আপনারা ঘাবড়াইয়েন না। ওগ খবর নিছেন? ওরা আমাগ সাজাসাজির খবর পায় নাই তো?’

    ‘না।’

    ‘ওরা চাকইর‍্যা আনে নাই তো?’

    ‘না। ওরা জানেই না, তুমি জেলেরতন খালাস পাইয়া আইছ।’ রমিজ মিরধা বলে। ‘তোমার অবর্তমানে আমরা চরদখলের হামতাম করতে যাইমু না, ওরা জানে। তার লেইগ্যা, ওরা খুব নির্ভাবনায় আছে। চাকইর‍্যা অ্যাকটাও নাই ওগ দলে।’

    ‘শোনেন। কাইলই হামলা করণ লাগব। আর বেশি দেরি করলে ওরা সব জাইন্যা ফালাইব। লিস্টি করছেন?’

    ‘হ।’ মেহের মুনশি নিমার পকেট থেকে কাগজ বের করে ফজলের হাতে দেয়।

    উত্তম, ভাল, মধ্যম, ল্যাগবেগা, চ্যাংড়া–এই পাঁচ শ্রেণীর ভাগ করা হয়েছে দলের একশ বত্রিশ জনকে।

    ‘উত্তম’ শ্রেণীতে আছে আঠারো জন। ফজলের সাথে ঘাসি বেয়ে গিয়েছিল যে পাঁচজন তারাও আছে এ তালিকায়।

    ফজল ‘ভাল’দের তালিকা থেকে বেছে দু’জনকে তুলে নেয় ‘উত্তম’দের তালিকায়। এই কুড়ি জনকে সে ডাকতে পাঠিয়ে দেয়।

    ভাল তেইশ জন আর মধ্যম চৌত্রিশ জন যাবে মেহের মুনশির বাড়ি। সেখানে তারা শড়কি আর লাঠি চালাবার কসরত করবে মেহের মুনশি আর জাবেদ লস্করের পরিচালনায়। গুলেল বাঁশের চাঁদমারির জন্য যাবে কদম শিকারির বাড়ি।

    পুলকি-মাতব্বরদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দিয়ে ফজল বলে, ‘কাইল ভোরে সবাই—একশ বত্রিশ জন যার যার হাতিয়ার লইয়া এইখানে হাজির অইব। দ্যাখবেন কেও যেন্‌ ভয়ে না পলায়। আমাগ লাল বড় দামড়াডা জবাই করমু। বেলা এগারোটার মইদ্যে এইখানে খাওয়া-দাওয়া সইর‍্যা তৈরি অইব। ঘড়ি লাগব দুইটা। একটা তো আছে বাজানের পকেট ঘড়ি। আর একটা পাই কই?’

    ‘আমার পোলার আছে একটা টেবিল ঘড়ি।’ রমিজ মিরধা বলে।

    ‘ঠিক আছে। এইটা দিয়াই কাম চালান যাইব।’

    ‘এই চিক্কন লম্বা বাঁশগুলান দিয়া কি করবা?’ মেহের মুনশি জিজ্ঞেস করে।

    ‘এখন আর কইমু না। কাইলই দ্যাখতে পাইবেন।’

    পুলকি মাতব্বররা চলে যাওয়ার পর ফজল নাশতা খেয়ে বাঁশের গিঠ চাঁচতে লেগে যায় আবার। তার হাতের কাজ শেষ হওয়ার আগেই উত্তম কুড়ি জন এসে হাজির হয়।

    ফজলের নির্দেশে নৌকার ডওরা থেকে রামদার বাক্স আর ঢাল নিয়ে আসে চান্দু, বক্কর আর টিটু। ফজল কয়েকটা পুরানো লগি যোগাড় করে। চান্দুর হাতে লগি আর ঢাল দিয়ে বলে, ‘মনে কর এই লগিটা একটা শড়কি। আমি ইশারা দিলেই এইটা লইয়া তুই আমারে আক্রমণ করবি। আর সব্বাই তোরা মনোযোগ দিয়া দেখবি। তোগ সব্বাইর কিন্তু শিখতে অইব রামদার লড়াই।’

    ফজল বাঁ হাতে ঢাল আর ডান হাতে রামদা নিয়ে চান্দুকে ইশারা করে আক্রমণের জন্য। চান্দু আক্রমণ করে। ফজল লগিটাকে ঢাল দিয়ে ফিরিয়ে রামদয়ালের কায়দায় লাফ দিয়ে ‘ইয়া আলী’ বলে কোপ মারে লগির ওপর। লগিটা দুটুকরো হয়ে যায়।

    ফজল বলে, ‘এইডা অইল রামদার লড়াই। শড়কির হাতল দুই টুকরো না অইলেও ক্ষতি নাই। বারো আনা কাটলেই বরং ভাল। কোপ খাওয়া শড়কির হাতল দিয়া তখন শড়কির কামও চলব না, লাঠির কামও চলব না।’

    দুপুর পর্যন্ত কুড়ি জনকে তালিম দেয় ফজল। তারা ঢাল দিয়ে কল্পিত শড়কির কোপ ফিরিয়ে রামদা দিয়ে হাওয়ায় কোপ মেরে মেরে অভ্যাস করে।

    দুপুরের খাওয়া খেয়ে কিছুক্ষণ জিরোবার পর আবার শুরু হয় মহড়া। চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। ফজল পরীক্ষা নেয় সকলের। তার মূল্যায়ন অনুসারে ছয়জন প্রথম বিভাগে, দশ জন দ্বিতীয় বিভাগে, আর চারজন তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। তাদের প্রত্যেককে একটা করে রামদা বুঝিয়ে দেয় সে। সেই সাথে ঢালও দেয় একটা করে। রামদা বালিগচার ওপর কিভাবে ধার করে নিতে হবে, তাও সে বুঝিয়ে দেয়।

    ‘কাইল বেলা ওঠার আগে তোমরা সবাই চইল্যা আসবা।’ ফজল নির্দেশ দেয়। ‘বড় দামড়াটা জবাই কইর‍্যা, কুইট্যা-কাইট্যা তাড়াতাড়ি রান্নার ব্যবস্থা করতে অইব।’

    পরের দিন ভোর বেলা। রোদ ওঠার আগেই লোকজন নৌকা আর হাতিয়ার নিয়ে হাজির হয় মাতব্বর বাড়ি। ফজলের নির্দেশে তারা বিভিন্ন কাজে লেগে যায়।

    বাড়ির পুব পাশে গরু জবাই করে দশ-বারো জন গোশত কাটাকুটি করে। তিন জন পেঁয়াজ-রশুনের চোকলা ছাড়ায়। দু’জন পালা করে মসলা বাটে। কয়েকজন মাটিতে গর্ত করে চুলো বানায়।

    কাছারি ঘরের সামনে একজন একজন করে বালিগচার ওপর বালি ছড়িয়ে যার যার রামদা ঘষছে ধার তোলার জন্য। একসাথে তিনজন একটা বড় পাথরের ওপর শড়কি, লেজা, কাতরা ঘষে চক্‌চকে ঝকমকে করে নিচ্ছে।

    নূরু ও হাশমত লগির মাথায় কাস্তে বেঁধে কলার ডাউগ্‌গা কাটে। থালা বাসনের অভাবে আর বোয়া-পাখলার ঝকমারি এড়াতে বড়-ছোট সবাইকে কলার পাতে খাবার পরিবেশন করতে হবে। পশ্চিম পাশে তিনজন হাতে গামছা জড়িয়ে লম্বা ও সরু তল্লা বাঁশের আগায় রামচোত্‌রা গাছ বাঁধছে সুতলি দিয়ে। ফজল দাঁড়িয়ে তদারক করছে।

    এগুলা বড়শি গিট্টু দিয়া শক্ত কইর‍্যা বাইন্দা ফ্যাল। ফজল নির্দেশ দেয়। ‘এগুলার উপরে আবার গইন্যা গইন্যা পাঁচটা কইর‍্যা আঁউকড়া বানতে অইব একেকটা বাঁশের লগে। আঁউকড়াগুলা কিন্তু একটু আলগা কইর‍্যা বানতে অইব। টান লাগলেই যেন খুইল্যা যায়।’

    আঁকড়ির মসৃণ গোড়ার দিক বাঁশের আগায় রামচোত্‌রার ওপর আলগা করে বেঁধে দেয়া হয়।

    রমিজ মিরধা ও জাবেদ লশকর দাঁড়িয়ে দেখছিল। জাবেদ লশকর হাসতে হাসতে বলে, ‘যত সব পোলাপাইন্যা কাণ্ড-কারখানা! তোমাগ এই চ্যাংড়ামি বুদ্ধিতে কি কাম অইব?’

    ‘আপনারা ঠাট্টা করেন আর যাই করেন, আপনাগ দাদার আমলের গোঁয়ারকিতে, সামনা-সামনি লড়াইয়ে বিপক্ষ দলেরে কাহিল করণ যাইব না। খুন-জখম অইয়া যাইতে পারে। দেখি, আমাগ চ্যাংড়ামি কায়দা-কৌশলে ওগ কাবু করতে পারি কিনা। বইতে পড়ছি–মারি অরি পারি যে কৌশলে। অরি মানে শত্রু। শত্রুরে যে কোনো কৌশলে নাস্তানাবুদ করা দরকার।’

    একটু থেমে ফজল আবার বলে, ‘পঁয়তাল্লিশটা গুলাইল বাঁশ আছে। আপনারা মাটির গুলি, টাডি সুপারি আর জালের কাঠি গুলারে পঁয়তাল্লিশটা ভাগ কইর‍্যা ফেলেন। একেক ভাগ বুঝাইয়া দিতে অইব একেক জন গুলাইলওলার হাতে।’

    সকলের খাওয়া শেষ হয়েছে। ফজল জামার পকেট থেকে ঘড়ি বের করে দেখে, সোয়া এগারোটা বাজে। সে সবাইকে বলে, তোমরা পান-বিড়ি-তামুক খাইয়া জিরাইয়া লও কতক্ষণ।

    সাড়ে বারোটার সময় ফজলের ডাকে নিজ নিজ হাতিয়ার নিয়ে লাইন করে দাঁড়ায় সবাই। ফজল তালিকা অনুযায়ী পাঁচ দলে ভাগ করে সবাইকে।

    ল্যাগবো উনিশজন আর চ্যাংড়া কিশোর ছত্রিশ জনের সবারই ঢাল আছে। ল্যাগবেগা সবার হাতে লেজা বা শড়কি আর চ্যাংড়াদের হাতে কোচের কুতু।

    ফজলের নির্দেশে রমিজ মিরধা ও কদম শিকারি ওদের ভেতর থেকে কুড়িজনকে বাছাই করে কুড়িটা গুলেল বাঁশ ওদের হাতে দিয়ে দেয়। একেক জনের জন্য ভাগ করে রাখা গুলি ঢেলে দেয় প্রত্যেকের কোঁচড়ে।

    এগারো-হাতি ডিঙি বারোখানা আর তেরো-হাতি ডিঙি দু’খানায় ওদের পঞ্চান্ন জনকে ভাল-মন্দয় মিলিয়ে চারজন পাঁচজন করে তুলে দেয়া হয়। ওদের পরিচালনার জন্য ঢাল শড়কি নিয়ে কদম শিকারি, আহাদালী ও ধলাই সরদার ওঠে ভিন্ন ভিন্ন নৌকায়।

    কদম শিকারির হাতে পকেট ঘড়িটা দিয়ে ফজল নৌকার লোকদের উদ্দেশ্যে বলে, ‘তোমরা মনোযোগ দিয়া শোন। পুবদিক তন তোমরা উজাইয়া যাইবা চরের দিকে। দূরে থাকতেই ঠিক দুইটার সময় মাইর ডাক দিবা। ওরা তখন চরের পুব কিনারে গিয়া গুলাইল মারব। তোমরাও গুলাইল মারবা। একবার উজাইয়া কিছু দূর আউগ্‌গাইবা, ঢাল দিয়া ওগ গুলি ফিরাইবা। আবার ভাইট্‌টাইয়া পাউছ্‌ছাইবা। এম্বায় আউগ্‌গাইবা আর পাউছ্‌ছাইবা–এই তোমাগ কাম। তোমরা বেশি গুলি খরচ করবা না। কিন্তু ওগ গুলি খরচ করাইবা। আমরা ঠিক তিনটার সময় পশ্চিম দিক দিয়া চরে নাইম্যা পড়মু। আমাগ মাইর ডাক হামাহামি শুইন্যা ওরা পশ্চিম দিগে ঘুরতেই ওগ পিঠে আর পাছার উপরে ফটাফট গুলি মারবা। ওরা যখন আমাগ মুখামুখি আউগ্‌গাইতে থাকব তখন তোমরা নাও লইয়া চরের উত্তর দিকে গিয়া নাইম্যা পড়বা। কিছু দূর আউগ্‌গাইয়া দূরেরতন ওগ সই কইর‍্যা গুলাইল মারবা। যা কইলাম মনে থাকে যেন। আর শোন, তোমাগ সব্বাইরে স্মরণ করাইয়া দিতেছি–বা’জান কি কইত, মনে আছে তো? এইডা কিন্তু রাজা-বাদশাগ লড়াই না যে যারে পাইলাম তারে খতম করলাম। এই লড়াই অইল বিপক্ষেরে খেদানের লেইগ্যা। নিজেরে বাঁচাইয়া চলবা। সুযোগ পাইলে আতে পায়ে বাড়ি দিবা, খোঁচা দিবা। প্যাট, বুক, আর মাথায় কিন্তু মারবা না, খবরদার! ব্যস এই কথা! যাও, বিছমিল্লা বুইল্যা, আল্লা-রাসুলের নাম লইয়া নাও ছাড়।’

    চোদ্দখানা ডিঙি পাড়া উঠিয়ে রওনা হয়ে যায়।

    উত্তম, ভাল ও মধ্যমদের নিয়ে ফজল ঘাসি, ঢুশা ও বাকি ডিঙিগুলোতে ওঠে। অনেক ঘুরে তারা নাগরার চর আর আটং-এর দক্ষিণ দিক দিয়ে বেশ কিছু দূর উজিয়ে খুনের চরের দিকে নৌকার মাথি ঘোরায়। ঘাসির হালমাচার সাথে বাধা টেবিল ঘড়িটা বারবার দেখছে ফজল।

    ঠিক দুটোর সময় মাইর ডাক শোনা যায়—

    ‘ওয়া-হ্বা-হ্বা-হ্বা-হ্বা।’

    বিপক্ষের শোরগোলও শোনা যায়—

    ‘আউগ্‌গারে, আউগ্‌গা। আইয়া পড়ছে। আউগ্‌গা, আউগ্‌গা।’

    কিছুক্ষণ পর বিপক্ষ দলের মাইর ডাক শোনা যায়।

    ‘ওয়া-হ্বা-হ্বা-হ্বা-হ্বা–’

    কাঁটায় কাঁটায় তিনটের সময় ফজল দলবল ও হাতিয়ার-সরঞ্জাম নিয়ে চরের পশ্চিম কিনারায় নামে। নামার আগে বাঁশের আগায় বাঁধা বিছুটি পাতা পানিতে ভিজিয়ে নেয়। কোনো শব্দ না করে ধানখেতের ভেতর দিয়ে পা চালিয়ে তারা পুবদিকে এগিয়ে যায় অনেক দূর।

    প্রচণ্ড রোদ। আকাশে মেঘের চিহ্নমাত্র নেই। বিপক্ষের লোকজন সবাই পুব কিনারায়। তারা গুলেল বাঁশ থেকে হরদম গুলি ছুঁড়ছে পুব দিকে। পশ্চিম দিকে ওদের একটা লোকও নেই।

    ফজল দশ-বারো জনকে অর্ধেক করে কাটা কতকগুলো আঁকড়ি দিয়ে পাঠিয়ে দেয় গরুর বাথানে। তারা গরুর লেজের আগায় পশমের সাথে দুতিনটে করে আঁকড়ি আটকে দিয়ে গরুগুলোকে ছেড়ে দেয়। তাড়া খেয়ে সেগুলো পুবদিকে দৌড়াতে থাকে। পেছনের দু’পায়ে আঁকড়ির খোঁচা আর ফজলদের দাবড় খেয়ে সন্ত্রস্ত গরুগুলো লেজ উঁচিয়ে ‘ওম্‌বা—ওম্‌বা’ রব তুলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে।

    ফজলের লোকজন তিন-চার হাত পরপর পাশাপাশি দাঁড়ায় এক সারিতে। তারা সবাই মাটির দিকে মুখ করে মুখের ওপর ডান হাত নেড়ে ডাক দেয়– ‘ওয়া-হ্বা-হ্বা-হ্বা-হ্বা-হ্বা–।’

    ফজলের নির্দেশে এবার সবাই মুখোশ পরে নেয়।

    এরফান মাতব্বর মারা গেছে, আর জঙ্গুরুল্লার দল জানে ফজল জেলে আছে। তাই তারা বেশ নিশ্চিন্ত আরামে দিন গুনছিল। আচম্বিতে এরকম হামলা করবে, তারা কল্পনাও করতে পারে নি। আজ তারা সংখ্যায় মাত্র উনসত্তর জন। পশ্চিম দিকের মাইর ডাক শুনে তাদের বুক ভয়ে কেঁপে ওঠে। শিউরে ওঠে শরীর, কাঁটা দিয়ে ওঠে গায়ের রোম।

    তারা পশ্চিম দিকে ঘোরে। চোখ-ধাঁধানো রোদ। কপালে হাত রেখে সূর্য আড়াল করে তারা দেখে তাদের গরুগুলো লেজ উঁচিয়ে ছুটে আসছে ঊর্ধ্বশ্বাসে। ‘উহ, উহ!’ করে ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে কয়েক জন। তাদের অনেকের পিঠে, পাছায়, পায়ে এসে লাগছে গুলেল বাঁশের গুলি। ধাবমান মত্ত গরুগুলোর পদদলন থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে তারা দৌড়ে গুলির পাল্লা পেরিয়ে এক জায়গায় থামে। দাঁড়িয়ে দম নেয় কিছুক্ষণ। তারপর ঢাল, কাতলা, লাঠি, শড়কি নিয়ে মাইর ডাক দিয়ে তারা এগিয়ে যায় পশ্চিম দিকে।

    সূর্যের কড়া আলো পড়ছে তাদের চোখে, কপালে। ভাল করে তারা দেখতে পায় না হামলাকারীদের। তবুও তারা ধানখেতের ভেতর দিয়ে পাশাপাশি এক সারিতে এগিয়ে যায়।

    ‘বাঁশগুলা আউগ্‌গাইয়া রাখ।’ ফজল হুকুম দেয়। জঙ্গুরুল্লার দল আরো এগিয়ে আসে। নাগালের মধ্যে এসে পড়ার সাথে সাথে ফজল হুকুম দেয়, ‘মা-র আঁউক্‌ড়া।’

    বিপক্ষীয় লোকদের দু’পায়ের ফাঁকে রামচোত্‌রা আর আঁকড়ি বাঁধা বাঁশের আগা ঢুকিয়ে টান মারে ফজলের দল। আলগা করে বাঁধা আঁকড়ি ওদের কয়েকজনের কাছামারা লুঙ্গির সাথে আটকে যায়, কারো কাছা খুলেও যায়। ফজলের দল বিছুটিপাতা সমেত বাঁশের আগা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওদের রানে, হাতে, শরীরে ঝাঁপটা মারে। দু-একটা বাঁশের আগায় আঁকড়ি শক্ত করে বাঁধা ছিল বলেই বোধ হয় আঁকড়ির টানে দু’জনের লুঙ্গি কোমর থেকে খসে যায়। তারা শড়কি-ধরা হাত দিয়ে লুঙ্গি সামলায়, দিশে না পেয়ে পিছু হটে। শেষে হাতিয়ার ফেলে আঁকড়ি জড়ানো লুঙ্গি ধরে দৌড় দেয়।

    যাদের লুঙ্গিতে আঁকড়ি আটকে গেছে তারা এগুবার চেষ্টা করে। কিন্তু আঁকড়ির আঁচড়ে ছড়ে যাচ্ছে দু’দিকের রান। ভীষণ জ্বলুনি শুরু হয়ে গেছে বিছুটিপাতার ঘষায়। এ সব অসুবিধে সত্ত্বেও কয়েকজন ঢাল-শড়কি নিয়ে এগিয়ে যায়। ফজলের রামদাওয়ালারা তাদের মুখোমুখি হয়। ওরা শড়কির কোপ মারতেই ফজলের দল ঢাল দিয়ে সে কোপ ফিরিয়ে রামদা দিয়ে কোপ মারে শড়কির হাতলে। দু’একটা হাতল দুটুকরো হয়ে যায়। বেশির ভাগ হাতল বারো আনা চৌদ্দ আনা কেটে গেছে। ওসব শড়কি দিয়ে আবার কোপ মারতেই ঢালের সাথে লেগে ফলাসহ হাতলের নিচের অংশ ভেঙে ওপরের অংশের সাথে দুলতে থাকে ললুড় করে। ফজলের দল এবার সারিবদ্ধভাবে কেউ রামদা উঁচিয়ে, কেউ শড়কি বাগিয়ে ধরে, কেউ গুলেল মারতে মারতে ‘মা-র–মা-র’ করে এগিয়ে যায়। বিপক্ষ দলের সবাই এবার পিছু হটে দৌড় দেয়। কারো কারো কাছামারা লুঙ্গিতে জড়ান আঁকড়ি লেজের মতো দুলছে, যেন লেজ নিচু করে তারা পালাচ্ছে। ফজলের পূর্বদিকের দল উত্তর দিক দিয়ে এসে গেছে। তারা জঙ্গুরুল্লার পলায়মান লোকদের লক্ষ্য করে গুলি মারে গুলেল বাঁশ থেকে।

    জঙ্গুরুল্লার দল ছত্রভঙ্গ হয়ে কেউ ঢাল ফেলে, কেউ শড়কি ফেলে, কেউ-বা সব হাতিয়ার ফেলে প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছে। ছুটতে ছুটতে কেউ লুঙ্গি থেকে আঁকড়ি ছাড়াবার চেষ্টা করছে, কেউ আঁকড়ির সামনের মাথা এক হাত দিয়ে, পেছনের মাথা আর এক হাত দিয়ে ধরে পাল্লাচ্ছে। ফজলের দল ‘মা-র–মা-র’ ছুটছে তাদের পিছু পিছু। জঙ্গুরুল্লার অধিকাংশ লোক দৌড়ে যাচ্ছে ঘোঁজার দিকে। তাদের নৌকাগুলো সেখানেই বাধা আছে। ফজলের দল ওদের পালাবার সুযোগ দেয়ার জন্য নিজেদের গতি কমিয়ে দেয়।

    জঙ্গুরুল্লার লোক হুড়মুড় করে নৌকায় ওঠে–যে যেটা সামনে পায়। কয়েকজনের হুড়োহুড়ি-ঠেলাঠেলির চোটে একটা ডিঙি ডুবেই যায়। সেটা ছেড়ে পানি ভেঙে তারা উঠে পড়ে আরেকটায়। একেকটায় চার-পাঁচজন করে উঠে আর কারো জন্য দেরি না করে নৌকা ছেড়ে দেয়। লগির খোঁচ মেরে, বৈটা টেনে তারা চলে যায় নিরাপদ দূরত্বে। যারা ঘোঁজার দিকে যেতে পারেনি তারা পুবদিকে নদীর ধারে দৌড়ে চলে যায়। সেখানে তাদের গরুগুলো ছটফট করছে, কোনোটা লাফালাফি করছে। তারা পশ্চিমদিকে চেয়ে দেখে হামলাকারীরা অনেক পেছনে। কেউ কেউ নিজেদের লুঙ্গিতে আটকানো আঁকড়ি খোলে। কেউ গরুর লেজে জড়ানো আঁকড়ি ছাড়িয়ে নেয়।

    ‘মা-র মা-র’ করে এগিয়ে আসছে ফজলের দল। জঙ্গুরুল্লার পলায়মান কিছু লোক গরুগুলোকে তাড়া দিয়ে নদীতে নামায়। গরুগুলো সাঁতার দিলে ওগুলোর লেজ ধরে একেক জন ভাটির টানে ভেসে যায় চরমান্দ্রার দিকে।

    ফজলের একটা দল ঘোঁজার কিনারায় এসে বিপক্ষ দলের নৌকা লক্ষ্য করে গুলের বাঁশ থেকে কয়েকটা গুলি মারে। আর একদল পুব কিনারায় গিয়ে দুয়েকটা গুলি মারে গরুর লেজ ধরা লোকগুলোর দিকে।

    গুলি মারার উদ্দেশ্য ভয় দেখানো। তারা বোঝে, পরাজিত পলায়মান শত্রুর পেছনে বেশি গুলি খরচ করা নিরর্থক।

    ফজলের দলের সবাই ঘোঁজার কাছে এসে জমায়েত হয়। ফজল হাঁক দেয়, ‘আল্লাহু আকবর।’

    দলের সবাই গলা ফাটিয়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার দেয়, ‘আল্লাহু আকবর।’

    ফজল দলের চল্লিশ জনকে পাহারার জন্য চরের চার কিনারায় পাঠিয়ে দেয়।

    কিছুক্ষণ পর হঠাৎ শোনা যায়, ‘ঐ গেল–গেল–গেল, ধর্‌–ধর্‌—ধর্‌‌।’

    সবাই তাকিয়ে দেখে দক্ষিণ দিকে যারা পাহারা দিতে যাচ্ছিল তারা ধাওয়া করছে দুটো লোকের পেছনে। প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছে লোক দুটো পুবদিকে।

    জাবেদ লশকর প্রকৃতির তাগিদ সেরে ঐ দিক থেকেই আসছিল। সে দেখে, দু’জনের একজন আরশেদ মোল্লা। সে মোল্লাকে তাড়া করে দৌড়ে যায় তার পিছু পিছু। নদীতে নেমে কিছুটা পানি ভেঙে মোল্লা সাঁতার দেয়। লশকরও সাঁতার দিয়ে গলা পানিতে গিয়ে তাকে ধরে ফেলে। সে মোল্লাকে চুব দিয়ে আবার টেনে তোলে।

    আরশেদ মোল্লা কাঁপছে থরথর করে। অন্য লোকটা সাঁতার কেটে ভাটি পানিতে ভেসে যাচ্ছে চরমান্দ্রার দিকে।

    ‘হালা, আমাগ বউ আটকাইছস। তোরে চুবাইয়া মাইরা ফালাইমু।’ জাবেদ লশকর আবার চুব দেয় আরশেদ মোল্লাকে। তাকে টেনে তুলে সে আবার বলে, ‘ফজলরে পুলিস দিয়ে ধরাইয়া দিছিলি, হা-লা। এহন দ্যাখ কেমুন মজা।’

    ‘ও চাচা।’ ফজলের গলা। সে তাকায় ফজলের দিকে। ফজল দূর থেকে হাত নেড়ে মানা করছে আর চুব দিতে, ছেড়ে দিতে বলছে হাতের ইশারায়।

    ফজল ধরতে গেলে তার ছেলের বয়সী। সে তাকে চাচা বলে ডাকে। তবুও ফজল মাতব্বর। সে তার আদেশ অমান্য করতে সাহস করে না। সে বিরক্তির সাথে মনে মনে বলে, ‘যেই না হালার বউর বাপ! তার লেইগ্যা দরদ এক্করে বাইয়া পড়ে। এমুন হউররে একশ একটা চুব দেওন দরকার।’

    আরশেদ মোল্লাকে টেনে তুলে সে বলে, ‘অ্যাই হালার ভাই হালা। দিমুনি আরেকটা চুব?’

    অনেকক্ষণ চুব দিয়ে ঠেসে ধরায় দম ফাপড় হয়ে আসছে আরশেদ মোল্লার। হাঁসফাস করতে করতে সে বলে, ‘আপনের আতে ধরি। আর চুব দিয়েন না?’

    ‘তোর মাইয়াখান কানে আঁইট্যা দিয়া যাইতে পারবি? ক, শিগগির। নাইলে আবার চুব দিলাম।’

    আরশেদ মোল্লা কাঁদো-কাঁদো স্বরে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ‘হ, দিয়া যাইমু।’

    ‘ওয়াদা করলি তো?’

    ‘হ, ওয়াদা করলাম।’

    ‘দ্যাখ ওয়াদা যদি খেলাপ করসরে, তয় তোর পেডের ঝুলি বাইর কইরা দিমু যেইখানে পাই।’

    ‘ওয়াদা ঠিক থাকব বিয়াইসাব।’

    ‘ওরে আমার বিয়াইরে! হালা কমজাত কমিন। তোরে বিয়াই কইতেও ঘিন্না লাগে।’

    ‘আপনের দুইডা আতে ধরি। আমারে ছাইড়া দ্যান।’

    ‘ছাইড়া দিলে হাঁতরাইয়া যাইতে পারবি?’

    ফজলের লোকজন নদীর কিনারায় এসে জড় হয়।

    কদম শিকারি বলে, ‘হালারে লইয়া আহহ। গর্দানডার উপরে দুইডা চটকানা দিয়া জিগাই, হালায় এমুন আকামের কাম ক্যান্ করছিল? ক্যান্ মাইয়া আটকাইছিল? ক্যান্ পা না ধোয়ার লগে দোস্তালি পাতাইছিল? ক্যান্ ফজলরে পুলিস দিয়া ধরাইয়া দিছিল?’

    জাবেদ লশকর হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যায় আরশেদ মোল্লাকে।

    ‘হালার লুঙ্গিতে বুঝিন আঁউকড়া লাগে নাই।’ বলে কদম শিকারি। ‘মনে অয় চোত্‌রার ঘষাও লাগে নাই। এই বক্কর, দ্যাখতো চোত্‌রা পাতা আছেনি। হালার লুঙ্গি উড়াইয়া পাছায় আর কুচকিতে ঘইষ্যা দেই।’

    একজন বলে, ‘মনে অয় এই দুই ব্যাডা আঁউকড়া লাগনে দৌড় দিয়া পলাইতে পারে নাই। ধানখেতের মইদ্যে হুতি দিয়া পলাইয়া আঁউকড়া ছাড়াইতে আছিল।’

    ‘হ, ওরা যেইখানে পলাইছিল, হেইখানে ধানখেতের মইদ্যে তিন-চাইড্‌ডা আঁউকড়া দেখছি আমি।’ আর একজন বলে।

    আরশেদ মোল্লার রান পরীক্ষা করে দেখে কদম শিকারি ও জাবেদ লশকর। সত্যি রানটা আঁকড়ির আঁচড়ে সাংঘাতিকভাবে ছড়ে গেছে।

    ফজল ছেড়ে দিতে বলেছে। সুতরাং আরশেদ মোল্লাকে আর আটকে রাখা ঠিক নয়। ওদের দলের যে নৌকাটা ডুবে গিয়েছিল সেটাকে পানি থেকে তুলে তাতে উঠিয়ে দেয়া হয় আরশেদ মোল্লাকে। নৌকার মাথি ধরে ধাক্কা দিতে দিতে জাবেদ লশকর বলে, ‘মাইয়া দিয়া যাবি, ওয়াদা করছস। ওয়াদা যেন ঠিক থাকে। নাইলে কিন্তু চউখ দুইডা ঘুইট্যা দিমু যেইহানে পাই।’

  • পঁচিশ

    পঁচিশ

    কদম শিকারি পকেট ঘড়িটা বুঝিয়ে দেয় ফজলের হাতে। সে দেখে পৌনে পাঁচটা বাজে। বেলা ডুবতে দেরি আছে এখনো।

    পাহারারত চল্লিশজন ছাড়া আর সবাই জড় হয় ফজলের চারপাশে। তারা মাটিতে গামছা বিছিয়ে বসে। সবার মনে খুশির প্লাবন। হাসিতে ঝলমল করছে সবার চোখ-মুখ।

    ‘কই চাচা লস্করের পো? আমাগ পোলাপাইন্যা কাণ্ড-কারখানা কেমুন দ্যাখলেন?’ হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে ফজল।

    ‘হ মিয়া, একখান খেইল দেহাইছ।’ জাবেদ লশকর বলে।

    ‘আমাগ শরীলে একটা আঁচড়ও লাগে নাই। বিপক্ষের কোনো মানুষও খুন-জখম অয় নাই।’

    ‘রক্তারক্তি ছাড়া এমুন মারামারি আমার জীবনে কোনোদিন দেহি নাই।’ রজিম মিরধা বলে।

    ‘শোনেন, আঁউকড়াগুলা বেবাক টোকাইয়া রাখেন। চোত্‌রাগাছ গুলারে লাগাইয়া দ্যান এক জায়গায়। ভবিষ্যতে এগুলা কামে লাগব।’

    ‘আমাগ নায়ের মইদ্যে ওগ বিস্তর গুলি পইড়া রইছে।’ কদম শিকারি বলে।

    ‘হ, ওগুলা টোকাইয়া একখানে করেন। আরো কিছু গুলি যোগাড় করতে অইব। ওরা কিন্তু দখলে আসার চেষ্টা করব। চাকইর‍্যা লইয়া হামলা করব। ওগ নাও দ্যাখলেই আমাগ নৌকার দল গুলাইল লইয়া ওগ এক পাশে গিয়া গুলি মারতে শুরু করব। আমরাও চরেরতন গুলি ছাড়মু। দুই দিগের গুলি ওরা ঢাল দিয়া ফিরাইতে পারব না। চাকইর‍্যারা কিন্তু বেশির ভাগ বইস্যা বইস্যা আউগ্‌গায়, হাতিয়ার চালায়। ওগ কাবু করণের লেইগ্যা আঁকড়ার ঝাঁপটা মারতে অইব ওগ মাথায় আর পিঠে।’

    ‘আমাগ কিছু চাকইর‍্যা আইন্যা রাখন দরকার।’ রমিজ মিরধা বলে। ‘ট্যাহাতো আছেই।’

    ‘না। আর চাকইর‍্যা আননের দরকার নাই।’ ফজল বলে। ‘খামাখা টাকা খরচ করতে যাইমু কোন দুকখে? আমরা নিজেরাই ওগ হটাইয়া দিতে পারমু। কি কও জুয়ানরা পারবা না?’

    ‘হ, পারমু।’ সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে কিশোর ও জোয়ানরা। জয়ের জোশে তারা উদ্দীপ্ত।

    ‘আপনারা আগে চাকইর‍্যার পিছে বেশুমার টাকা ঢালছেন। আর আমরা? আমরা অল্প খরচে কাম ফতে করছি।’

    ‘কত ট্যাহা খরচ অইছে?’ জাবেদ লশকর জিজ্ঞেস করে।

    ‘খুব অল্প। রামদাও, ঢাল, টর্চলাইট আর এইডা ওইডা কিনতেই যা খরচ অইছে। কাইলই জগু পোদ্দারের দোকানে যাইবেন। গয়নাগুলা বেবাক ছাড়াইয়া লইয়া আইবেন।’

    ‘হ, এইডা একটা কামের কাম অইব।’ মেহের মুনশি বলে।

    ‘হ, সুদ বড় জোর এক মাসের নিতে পারে।’ রমিজ মিরধা বলে।

    ‘এক মাসের সুদ আর আসল দিয়া গয়নাগুলা ফর্দের লগে মিলাইয়া ওজন কইর‍্যা লইয়্যা আইবেন।’ ফজল বলে।

    ‘হ, কাইলই গিয়া লইয়া আইমু।’ মেহের মুনশি বলে। ‘বউ-ঝিগ দায়-দাবির তলে আর থাকন লাগব না।’

    ‘কিন্তু মিয়া, এই চরে থাকতে গেলে খরচ লাগব না? ট্যাহা পাইবা কই?’ রমিজ মিরধা বলে।

    ‘টাকার লেইগ্যা ভাবনা নাই।’ ফজল বলে। ‘আমাগ বানাগুলা তো আছেই। সবাইরে লাগাইয়া দ্যান মাছ ধরতে। বেড়ের মাছ বেইচ্যা খরচ চালাইতে অইব। আমাগ চাঁই, দোয়াইর, খাদইন, পারন, ঝাঁকিজাল, ধর্মজাল, ইলশাজাল, মইজাল–মাছ ধরনের যত সরঞ্জাম ঐবার থুইয়া গেছিলাম, ওগুলা ওরা এই চরেই থুইয়া গেছে। বেবাক বিচরাইয়া বাইর করেন। এগুলা দিয়া মাছ ধরনের ব্যবস্থা করেন?’

    ‘তুমি কি আমাগ বেবাকটিরে জাউল্যা বানাইয়া দিতে চাওনি?’ শ্লেষ-মেশানো কণ্ঠে জাবেদ লশকর বলে।

    ‘কি যে কথা কন! পা-না-ধোয়ার কোলশরিকরা মাছ বেচে নাই? ওরাও তো বেড়ের মাছ বেইচ্যা সংসার চালাইছে। জঙ্গুরুল্লাও তো ঐ টাকার ভাগ নিছে। জাইত যাওনের ভয় খালি আপনাগ!’

    ফজলের সমর্থনে প্রায় সবাই গুঞ্জন করে ওঠে।

    ফজল আবার বলে, ‘আর শোনেন, ওরা কি কি জিনিস থুইয়া গেছে তার লিস্টি করেন। ঐগুলার মধ্যে আমাগ জিনিস, আমাগ হাতিয়ারও পাওয়া যাইব–যেগুলা আমরা ঐবার ফালাইয়া গেছিলাম। ঐগুলা আর ওগ তামাম হাতিয়ার আমরা রাইখ্যা দিমু। থালা-বাসন, লোটা-বদনা যা কিছু থুইয়া গেছে, সেগুলা কিন্তু রাখন যাইব না।’

    ‘ক্যান্? ওরাতো আমাগ জিনিস ফিরত দেয় নাই।’ কোলশরিকদের কয়েকজন প্রতিবাদ করে।

    ‘ঐগুলার মালিকতো আপনাগ মতন গরিব কোলশরিকরা। ঐগুলা যদি জঙ্গুরুল্লার অইত, তয় ফিরত দেওনের কথা কইতাম না। আমরা খুদ খাইয়া পেট নষ্ট করতে যাইমু ক্যান? ঐগুলা একখানে কইর‍্যা রাইতের আন্ধারে ওগ চরে ফালাইয়া দিয়া আইবেন। আপনারা কয়েকজন চইল্যা যান। আন্ধার হওয়ার আগে সবগুলা ভাওর ঘর তালাশ কইর‍্যা দেখেন, কোন ঘরে কি আছে। পোলাপানরা তালাশ করুক ধানখেতে। ওগ হাতিয়ার, আমাগ আঁউকড়া–বেবাক বিচরাইয়া লইয়া আসুক। মারামারির সময় ধানের গাছ কিছু নষ্ট অইছে। আর যেন নষ্ট না হয়।’

    মাগরেবের নামাজের পর আবার সবাই জড় হয় ফজলের ভাওর ঘরের সামনে। তারা বিপক্ষ দলের ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র নিয়ে আসে।

    হারিকেনের আলোয় ফজল ও আরো কয়েকজন মিলে ফেরতযোগ্য জিনিসগুলো বেছে বেছে আলাদা করে। চাল-ডাল ইত্যাদি খাবার জিনিস ফেরত দেয়ার প্রয়োজন বোধ করে না তারা। কারণ তারাও পুলিসের ভয়ে পালাবার সময় অনেক খাবার জিনিস ফেলে গিয়েছিল এ চরে। চাল-ডাল-মশলাদি–যা ওরা রেখে গেছে তাতে বেশ কয়েকদিন চলে যাবে সকলের।

    চর দখলের আনন্দে সবাই মেতে ছিল এতক্ষণ। খাবার কথা কারো মনেই হয়নি। চাল ডাল দেখে হঠাৎ খিদের তাড়না অনুভব করে সবাই। এক সাথে এত লোকের রান্না করার মতো বড় ডেগ নেই এখানে। ফজল দশটা চুলোয় দশ পাতিল খিচুড়ি রান্নার ব্যবস্থা করে দিয়ে আবার এসে আলোচনায় বসে।

    জাবেদ লশকর বলে, ‘জঙ্গুরুল্লার মতন খুঁটগাড়ি আদায় করণ লাগব।’

    ‘হ, ঘোঁজায় নানা মুলুকের নাও আইস্যা পাড়া গাড়ে।’ ধলাই সরদার বলে। ‘খুঁটগাড়ি আদায় করতে পারলে অনেক ট্যাহা আমদানি অইব।’

    ‘উঁহু। আমরা খুঁটগাড়ি আদায় করমু না।’ ফজল বলে।

    ‘ক্যান। এত বড় একখান আয়ের সুযোগ—’

    ‘ঘোঁজায় নৌকা রাখে আশ্রয়ের লেইগ্যা। আশ্রয়ের বদলে কিছু আদায় করা ঠিক অইব না। আমরা যদি খুঁটগাড়ি আদায় করতে শুরু করি, তয় নৌকা আর একটাও এই ঘোঁজায় আসব না। মাঝিরা অন্য চরের কোনা-কাঞ্ছিতে গিয়া নাও রাখব। আপনাগ কাছেই তো শুনছি। রউজ্যার কাণ্ড। যদি ওর মতন ডাকাতি করতে পারেন, তবে ডাকাতির ভয়ে কিছু নৌকা আসতে পারে এই ঘোঁজায়।’

    হঠাৎ একটা শোরগোল শোনা যায়।

    সবাই সচকিত হয়ে এদিক ওদিক তাকায়। তারা দেখতে পায়, চরমান্দ্রার অনেক পুবে, কোনো একটা চরে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনের লেলিহান জিভ লকলক করে উঠছে আকাশে।

    ‘তোমরা বোঝতে পারছনি, ব্যাপারখান কি?’ জাবেদ লশকর বলে। ‘কী মনে অয় তোমাগ?’

    ‘এইডা জঙ্গুরুল্লার কারসাজি।’ রমিজ মিরধা বলে। ‘নিজেগ ঘরে আগুন লাগাইয়া আমাগ বিরুদ্ধে থানায় ইজাহার দিব।’

    ‘তুমি ঠিকই ধরছ।’ জাবেদ লশকর বলে। ‘জঙ্গুরুল্লা ঐবার নাহক ডাকাতি মামলায় আমাগ আসামি দিয়া চর দখল করছিল। এইবার আবার ঘর পোড়নের মামলা দিয়া পুলিস সুলাইয়া দিব আমাগ ধরতে।’

    জাবেদ লশকর নিচু গলায় বলে, ‘একটা কাম করলে অয়। কিন্তু বেবাকের সামনে কওন যাইব না।’

    চলেন ঘরে গিয়া বসি।

    ‘ও মিয়ারা তোমরা গিয়া পাত পাইত্যা বস। মনে অয় খিচুড়ি এতক্ষণে রান্দা অইয়া গেছে।’

    ‘হ, তোমরা যাও। আমরা আইতে আছি।’

    ফজল একটা হারিকেন হাতে করে পুলকি মাতব্বরদের নিয়ে তাদের ভাওর ঘরে গিয়ে বসে।

    ‘বলেন, কি বলতে চাইছিলেন?’ ফজর উৎসুক হয়ে তাকায় জাবেদ লশকরের দিকে।

    সে চাপা গলায় বলে, ‘আমরাও একটা ঘরে আগুন লাগাইয়া ওগ নামে ইজাহার দিমু।’

    ‘উঁহু, এইডা ঠিক অইব না।’

    ‘কী যে কও তুমি! জানো না, বিষ দিয়া বিষ মারতে অয়? কাডা দিয়া কাডা খুলতে অয়?’

    ‘তা তো জানি। কিন্তু ডাহা মিথ্যারে সত্য বইল্যা প্রমাণ করতে পারবেন?’

    ‘ক্যান্ পারমু না? ওগ পিঠে আমাগ গুলির দাগ আছে না?’

    ‘হ, কিছু লোকের শরীরে গুলিতো লাগছিলই।’

    ‘হোন, আমরা এই বুইল্যা ইজাহার দিমু—অমুক, অমুক, অমুক, আরো দশ বারোজন আমাগ ঘরে আগুন লাগায়। আমরা টের পাইয়া যখন গুলাইল মারতে শুরু করি তখন ওরা দুইডা শড়কি ফালাইয়া ভাইগ্যা যায়। আমাগ গুলির দাগ আছে ওগ শরীলে।’

    ‘ওরা দিব ঘর পোড়ার ইজাহার, আমরাও যদি ঘর পোড়ার পাল্টা ইজাহার দেই তা দারোগা বিশ্বেস করব না।’ রমিজ মিরধা বলে। ‘তার চাইয়া ডাকাতির মামলা সাজাও। জঙ্গুরুল্লার দুই পোলা ও আরো দশ বারোজন রামদাও শড়কি লইয়া ডাকাতি করতে আইছিল। আমাগ গুলাইলের গুলি খাইয়া একটা রামদাও আর দুইডা শড়কি ফালাইয়া ওরা ভাইগ্যা যায়। ওগ শরীলে আমাগ গুলির দাগ আছে।’

    ‘ইজাহার দেওয়া সোজা।’ ফজল বলে। ‘সাক্ষী-সাবুদ দিয়া প্রমাণ করা বড় কঠিন। জোরে কচ্‌লান দিলে কোন্‌টা সত্য, কোটা মিথ্যা বাইর অইয়া পড়ে। মাইনষে কইতেই কয়–সাচ্চা গুড় আন্ধার রাইতেও মিডা।’

    ‘তা অইলে কী করতে চাও? আমাগই খালি পুলিস দিয়া অয়রান করব আর আমরা চুপ কইর‍্যা সইজ্য করমু।’

    ‘আমাগ হয়রান করতে ওরাও হয়রান অইয়া যাইব, ওগ টাকার শেরাদ্দ অইব। আমরা এত টাকা খরচও করমু না, আর মাইনষের নাহক হয়রানির মইদ্যেও ফেলমু না। শোনেন, আমাগ কোলশরিক যারা পাতনা দিয়া আছে অন্যের জাগায়, তারা এই রাইতের মইদ্যে বউ পোলাপান, হাঁস-মুরগি, গিরস্থালির বেবাক মাল-সামান লইয়া আইব এই চরে। ভাওর ঘরে গিরস্তালি শুরু করব। যার যার গরু-বাছুর কাইল সকালের মইদ্যে আইন্যা বাইন্ধা থুইব ঐ বাথানে। দারোগা-পুলিস আইলে যেন বুঝাইয়া দিতে পারি, এই চর আমাগ। আমরা ধান লাগাইছি, কলাগাছ লাগাইছি। বাপ-দাদার আমলতন এই জা’গার চর আমাগ। এইখানে কতবার চর জাগছে, কতবার ভাঙছে। কিন্তু আমরা সব সময় খাজনা চালাইয়া আইছি। আমাগ পর্চা-দাখিলা আছে। জঙ্গুরুল্লার কি আছে? পারব কোনো কাগজ দেখাইতে?’

    ‘না, ওরা কাগজ দেহাইব কইতন?’ মেহের মুনশি বলে। ‘হুনছি বিশুগাঁয়ের রায়চদরীগ তিন বচ্ছরের খাজনা দিয়া আমলদারি নিছে জঙ্গুরুল্লা। দেহাইলে ঐ আমলদারি আর খাজনার দাখিল দেহাইতে পারে। কিন্তু আগের আমলের কোনো কাগজ দেহাইতে পারব না।’

    ‘রায়চৌধুরীগ কান্দার চর তো আছিল অনেক দক্ষিণ-পশ্চিমে। সেই চর তো ভাইঙ্গা গেছে ছয়-সাত বছর আগে। জমিদারগ শয়তানি দ্যাখেন না। নিজেগ চরের নাম-নিশানা নাই। তবু তারা আমলদারি দিছে জঙ্গুরুল্লারে। সে এখন আমাগ চর খাবলা দিয়া নিতে চায়।’

    ‘হ, জমিদাররা এম্বায়ই যত আউল-ঝাউল লাগায় আর আমরা মারামারি কইর‍্যা মরি।’

    ‘শোনেন, দারোগা-পুলিস কাইল পরশুর মইদ্যে আইসা পড়ব মনে হয়। খবরদার কেও যেন চর ছাইড়া না পালায়। কয়জনরে আর ধরব!’ ফজল বলে।

    ‘কিন্তু মিয়া, পুলিস আইলে তুমি এট্টু সইর‍্যা থাকবা।’ কদম শিকারি বলে। ‘তোমারে ধইর‍্যা নিলে এই চর রাখন যাইব না। তুমি পরে আদালতে আজির অইয়া জামিন লইয়া আইতে পারবা।’

    কদম শিকারির প্রস্তাবে সায় দেয় সবাই। কিন্তু ফজল আমতা আমতা করে। সে বলে, ‘আপনাগ পুলিসে ধইর‍্যা লইয়া যাইব আর আমি পলাইয়া থাকমু?’

    ‘হ, পুলিস আইলে তুমি সইর‍্যা থাকবা।’ জাবেদ লশকর বলে।

    ‘লড়াইয়ের সময় সেনাপতি থাকে বেবাকের পিছনে। তারে রক্ষা করে সিপাই লশকররা। তুমি আমাগ সেনাপতি। তোমারে রক্ষা করণ আমাগ ফরজ।’

    ‘হ, তুমি রক্ষা পাইলে আমরাও রক্ষা পাইমু।’ মেহের মুনশি বলে।

    ‘দারোগার পানসি দূরের তন দ্যাখলেই চিনা যায়। চাইরদিগে আমাগ পাহারাদার থাকব। তারা নজর রাখব সব সময়।’

    ‘হ দারোগার নাও দ্যাখলেই চিক্কইর দিব।’ রমিজ মিরধা বলে। ‘ষাঁড়েরে যেমুন কইর‍্যা মাইনষে ডাক দেয় তেমুন কইর‍্যা ডাক দিব–মোল্লাকে ডাক্ কুরুত্। আবার গামছা উড়াইয়া ইশারাও দিব।’

    ‘হ, ইশারা ধরনের লেইগ্যা পালা কইর‍্যা এক জনের পর আরেক জন ভাওর ঘরের কাছে বইয়া চউখ রাখব চাইরদিগে।’

    ‘হ, এইডাই ঠিক।’ জাবেদ লশকর বলে। ‘জমিরদ্দির দাঁড়াইশ্যা ডিঙিখান তৈয়ার থাকব সব সময়। পাঁচজন বাইছাও ঠিক কইর‍্যা রাখন লাগব।’

    ‘আচ্ছা, আপনাগ রায় মাইন্যা নিলাম।’ ফজল বলে। ‘আর শোনেন, ভাটিকান্দি ছাইড়্যা আমি চইল্যা আসমু এই চরে। তিন-চারদিনের মইদ্যে ঘর-দরজা ভাইঙ্গা মাল-সামান লইয়া এই চরে আইস্যা বসত করমু। আর কেও যদি এই চরে আইতে চান, আইতে পারেন। দারোগা-পুলিস আসার ইশারা পাইলেই হাতিয়ারগুলা ধানখেতের ভিতর গুঁজাইয়া রাখতে অইব।’

    অন্য চরে যাদের জমাজমি নেই তারা সবাই এই চরে এসে বসত করাই উচিত কাজ মনে করে। তারাও কয়েক দিনের মধ্যেই ঘর-দরজা ভেঙে বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে চলে আসবে।

  • ছাব্বিশ

    ছাব্বিশ

    আগুন দেখে ফজলের দল ঠিকই অনুমান করেছিল–ওটা জঙ্গুরুল্লার কারসাজি। খুনের চর থেকে বিতাড়িত হয়ে কোলশরিকরা জঙ্গুরুল্লার বাড়ি গিয়ে হাজির হয় সন্ধ্যার পর। ওদের দেখে কিছু বলার আগেই সে বুঝতে পারে, খুনের চর বেদখল হয়ে গেছে। রাগের তীব্রতায় তার মুখ দিয়ে কথা বেরোয় না। তার ক্রুদ্ধ ঘূর্ণায়মান চোখ দুটোয় আগুন জ্বলছে। সে চোখের দিকে তাকিয়ে ভয়ে মিইয়ে যায় সবাই। তাদের বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করতে থাকে।

    কিছুক্ষণ পরে খেঁকিয়ে ওঠে জঙ্গুরুল্লা, ‘হারামজাদা শুয়রের বাচ্চারা, চরের দখল ছাইড়া দিয়া আইছস? খুন কই? জখম কই? একটা হারামজাদার গায়েও তো একটা কোপের দাগ নাই। কিরে লাশ ফালাইয়া থুইয়া আইছস?’

    দবির গোরাপি ঢোক গিলে ভয়ে ভয়ে বলে, ‘না হুজুর, কেও খুন অয় নাই।’

    ‘খুন অয় নাই! তয় তোরা মাইর করস নাই? ওগ দেইখ্যা ডরে চর ছাইড়্যা পলাইয়া আইছস?’

    ‘না, হুজুর, মাইর করছি।’

    ‘মাইর করলে খুন-জখম তো অইত? তার আলামত কই? দুই চাইডারে খুন কইর‍্যা, লাশ লইয়া থানায় গিয়া ইজাহার দেই।’

    সাহস সঞ্চয় করে দবির গোরাপি ও মজিদ খালাসি মারামারির বিস্তারিত বিবরণ দেয়। জঙ্গুরুল্লা প্রথমে শুনতে চায় না তাদের কথা। প্রতিপক্ষের অভিনব কায়দা-কৌশলের কথা শুনেই সে মনোযোগ দেয়। তাদের বিবরণ শেষ হলে জঙ্গুরুল্লা বলে, ‘হুনছি রামদাওয়ালা চাকইর‍্যা আছে দক্ষিণে, ভাটির মুলুকে। কিন্তু আঁউকড়া আর চোর্‌তাপাতা দিয়া এম্বায় লবজান করার কথা তো শুনি নাই কোনো কালে। চাকইর‍্যাগ চিনতে পারছনি?’

    ‘না, ক্যামনে চিনমু।’ মজিদ খালাসি বলে। ‘কইলামতো, চাকইর‍্যারা আর দলের অনেকেই মোখা লাগাইয়া আইছিল।’

    ‘ফউজ্যারে দ্যাখছ নি? ওকি জেলের তন ছাড়া পাইয়া আইছে?’

    ‘তারে দেহি নাই।’ দবির গোরাপি বলে।

    ‘তোমরা কেও দ্যাখছ নি মিয়ারা?’ কোলশরিকদের দিকে চেয়ে বলে মজিদ খালাসি।

    ফজলকে কেউ দেখেনি। তবে দু’-তিন জন নাকি তার গলার আওয়াজ শুনেছে।

    ‘তোমরা খোঁজ খবর নেও।’ জঙ্গুরুল্লা বলে। ‘গোরাপি আর খালাসি এইখানে থাইক্য, কথা আছে। তোমরা কয়েকজনরে পাড়াইয়া দ্যাও খবর আনতে–ফউজ্যা জেলেরতন আইছে, না আহে নাই? রাইত দুফরের আগে পাক্কা খবর চাই। আর বাকি সবাই বাড়িত যাও। চর দখলের ব্যবস্থা কইর‍্যা তোমাগ খবর দিমু।’

    দবির গোরাপি ও মজিদ খালাসি ফজলের খবর সংগ্রহের জন্য দুখানা নৌকায় ছ’জনকে পাঠিয়ে দেয় দুদিকে। তারা বুঝতে পারে প্রতিপক্ষের জোয়ান পুরুষরা আজ বাড়িতে নেই কেউ। সবাই গেছে খুনের চরে। একদল ঘটক সেজে ফজলের বোনের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে সোজা চলে যাবে ভাটিকান্দি–ফজলদের বাড়ি। কথায় বের করে আনবে ফজলের খবর। অন্য দলটি যাবে জাবেদ লশকরের বাড়ি। মিথ্যা পরিচয় দিয়ে কোনো অছিলায় ফজলের খবর বের করে আনবার চেষ্টা করবে।

    দবির গোরাপি ও মজিদ খালাসি ফিরে এসে দেখে জঙ্গুরুল্লা হুঁকোর নল মুখে দিয়ে চোখ বুজে কি যেন ভাবছে। তার পা টিপছে চাকর। তার থমথমে গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে সাহস হয় না তাদের।

    জঙ্গুরুল্লা হুঁকোয় টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে। চোখ মেলে গোরাপি আর খালাসিকে দেখতে পেয়ে বলে, ‘ফউজ্যার খবর আনতে মানুষ পাডাইছ?’

    ‘হ, দুইদল দুইখানে পাডাইছি।’ দবির গোরাপি বলে।

    ‘শোন, তোমরা আমার ইজ্জতটা এক্কেরে গরবাদ কইর‍্যা দিছ। চর দখলের মাইরে আমার দল কোনোদিন হারে নাই। আমার দখল করা চরে কোনো ব্যাডা আইতে সাহস করে নাই। আর এইবার কি কারবারডা অইয়া গেল!’

    ‘এহন কি করতে চান হুজুর?’ মজিদ খালাসি বলে ।

    ‘ওরা মনে অয় বাছাবাছা চাকইর‍্যা আনছে ভাটি মুলুকতন। আমরা আর মাইর দাঙ্গার মইদ্যে যাইমু না। কলে কলে চাবি দিয়া কল ঘুরাইতে অইব। শোন, ওগ বিরুদ্ধে ঘর পোড়নের মামলা দিমু।’

    ‘ঘর পোড়নের মামলা!’

    ‘হ, ঘর পোড়নের মামলা। দশ-বারো জনরে দিমু আসামি। ফউজ্যা জেলেতন আইলে ওরে দিমু এক লম্বর আসামি। তোমরা একটা ঘর ঠিক কর। ঐ ঘরে আগুন দিয়া ঘরের মালিক ডাকচিক্কইর দিব। ঐ ডাক-চিক্কইর শুইন্যা তোমরা এই চর ওই চরের কয়েকজন দেখবা– ঘরে আগুন দিয়া নাও বাইয়া পলাইয়া যাইতেছে ওগ দশ-বারো জন। ইজাহারে আরো কইতে অইব, ঘরে পাট আছিল।’

    জঙ্গুরুল্লার পরামর্শে তারই কুমিরডাঙার কোলশরিক তালেবালী নিজের কুড়েঘরে আগুন দেয়।

    ফজল জেল থেকে খালাস পেয়ে এসেছে, খবরটা পেলেই জঙ্গরুল্লা রাত দুপুরের পর তালেবালীর সাথে তার বড় ছেলে জাফর ও দবির গোরাপিকে পাঠিয়ে দেয় থানায়।

    তারা থানায় পৌঁছে বেলা ন’টারও পরে। থানার বড় দারোগা জাফরকে দেখেই চিনতে পারেন। বলেন, ‘কি মিয়া নতুন চর জেগেছে বুঝি? কারা দখল করেছে? নাম বলো। সব ক’টার মাজায় রশি বেঁধে নিয়ে আসি।’

    ‘না হুজুর, চর দখলের ঘটনা না।’

    ‘তবে ঘটনাটা কি?’

    ‘হুজুর, এই তালেবালীর ঘরে আগুন লাগাইছে।’

    ‘আগুন লাগিয়েছে! কারা লাগিয়েছে, দেখেছ তোমরা?’

    ‘হ, হুজুর।’

    ‘আচ্ছা।’

    বড় দারোগা দু’জন সেপাই ডাকেন। দবির গোরাপি ও জাফরকে দেখিয়ে বলেন, ‘তোমরা দুজন এদের নিয়ে যাও। একজন যাও পুকুরের উত্তর পাড় আর একজন যাও দক্ষিণ দিকে পুলের ওপর। এদের সাথে গপ্‌সপ্ করো গিয়ে। আমি একজন একজন করে ডাকব।’

    বড় দারোগা ঘটনার বিবরণ শোনেন তালেবালীর কাছ থেকে। তাকে জেরা করেন অনেকক্ষণ ধরে। তারপর জাফর ও দবির গোরাপিকে এক এক করে জেরা করেন। জেরা শেষ হলে তিনি বলেন, ‘কি মিয়ারা, মামলাটা ঠিকমত সাজিয়ে আনতে পারোনি? বাদী বলছে তার পশ্চিম-ভিটি ঘরে বগি পাট ছিল পাঁচমন। ঘর আর সব পাট পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সে ফজল ও আরো চারজন আসামির নাম বলেছে। আরো চার-পাঁচ জন ছিল, তাদের চিনতে পারেনি। সে দুটো নৌকায় আসামিদের পালিয়ে যেতে দেখেছে। তার কাছে টর্চলাইট ছিল না। রাতের অন্ধকারে সে আসামিদের চিনল কেমন করে? দবির গোরাপি বলছে–তালেবালীর ঘরে দশমন নালতে পাট ছিল। সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ডাক চিৎকার শুনে সে টর্চ নিয়ে বেরিয়েছিল। সে একটা নৌকায় আসামিদের পালিয়ে যেতে দেখেছে। সে ফজল ও আরো চারজন আসামির নাম বলেছে। কি তাজ্জবের কথা! তালেবালী যাদের দেখেছে দবির গোরাপিও ঠিক তাদেরই দেখেছে। আর কাউকে চিনতে পারেনি। দুজনের চোখ যেন পরামর্শ করেই ঐ কয়জন আসামিদের ওপর দৃষ্টি ফেলেছিল। তালেবালী বলছে–নয়-দশ জন আসামির মধ্যে দু’জনের দাড়ি ছিল। অথচ দবির গোরাপি বলছে–চারজনের দাড়ি ছিল। তালেবালী যে আউশ ধান পেয়েছিল তা ভাদ্র মাসেই খেয়ে শেষ করেছে। ভাদ্রমাস থেকেই সে চাল কিনে খাচ্ছে। আর দবির গোরাপি যে আউশ ধান পেয়েছিল তা এখনও খেয়ে শেষ করতে পারেনি। অথচ দবির গোরাপি পাট বেচে দিয়েছে ভাদ্র মাসেই। তার ঘরে পাট নেই। অন্য দিকে তালেবালীর টানাটানির সংসার। সে পাট মজুদ রেখেছে বেশি দাম পাওয়ার জন্য। ব্যাপারটা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। তারপর জাফর বলছে ঘটনার বিবরণ ও সাতজন আসামির নাম সে তালেবালীর কাছে শুনেছে। বাড়তি দু’জনের নাম জাফর পেল কোথায়? তালেবালী তো কুল্লে চিনেছে পাঁচজনকে। কী মিয়া জাফর, দু’জনের নাম পেলে কোথায়?’

    ‘হুজুর, তালেবালী আমার কাছে সাতজনের নামই কইছিল। ভয়ে জাফরের গলা কাঁপছে। তার শরীর যেন অবশ হয়ে আসছে।’

    বড় দারোগা হাঁক দেন, ‘অ্যাই কে আছ?’

    দু’জন সেপাই এসে স্যালুট দিয়ে দাঁড়ায়।

    বড় দারোগা নির্দেশ দেন, ‘এই তিনজনকে হাজতে ঢুকাও। মিথ্যা এজাহার দিতে আসার মজাটা দেখাচ্ছি।’

    জাফর হাতজোড় করে, ‘হুজুর, কী কইতে কী কইয়া ফালাইছি–’

    ‘আমিও কী করতে কী করে ফেলি, টের পাবে এবার। মিথ্যাকে খোলস পরিয়ে সত্য বানানো যায় না। অ্যাই, তোমরা দাঁড়িয়ে আছ কেন? নিয়ে যাও এদের হাজতে।’

    জাফর ও দবির গোরাপি হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারা ভয়ে কাঁপছে থরথর করে।

    তালেবালী বড় দারোগার পা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘হুজুর মাপ কইরা দ্যান। মাইনষের কথায় আর কান দিমু না, আর কোনো দিন থানায় আইমু না।’

    পা ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য বড় দারোগা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। বলেন, ‘আরে ছাড়ো, ছাড়ো, পা ছাড়ো। এই সেপাইরা, দাঁড়িয়ে দেখছ কি?’

    সেপাই দু’জন তালেবালীর হাত ধরে টেনে তোলে।

    ‘যাও, এই শয়তানের বাচ্চা তিনটাকে আমার চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে যাও। গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দাও থানা থেকে।’

    গলাধাক্কা দেয়ার আর প্রয়োজন হয় না। তিনজনই দ্রুত থানা থেকে বেরিয়ে যায়।

  • সাতাশ

    সাতাশ

    চর অঞ্চলের লোক যা কোনোদিন করেনি, করতে সাহস পায়নি, তাই করছে জঙ্গুরুল্লা চৌধুরী। সে চৌধুরীর চরে নিজের বাড়ি থেকে অল্প দূরে দক্ষিণ দিকে তার পীরবাবার জন্য দেয়াল ঘেরা তিন কামরার পাকা বাড়ি তৈরি করছে। দেয়ালের বাইরে তৈরি করছে খানকাশরিফ।

    প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নিজের জন্য সে কোনো দিনই ইটের বাড়ি বানাতে সাহস করেনি। সে প্রায়ই বলত, ‘ইট মানেই মাটি। এই মাটির ঘরেরতন টিনের ঘর অনেক ভাল। রাক্কইস্যা গাঙ থাবা দিলে টিনের ঘর ভাইঙ্গা-চুইর‍্যা আরেক খানে গিয়া আবার বসত করণ যায়। আর ইটের ঘর? ইটের ঘর ভাঙলেই বেবাক মাটি। ভাঙ্গন শুরু অইলে এই মাটির ঘর চিৎ-কাইত অইয়া রসাতল অইয়া যাইব।’

    পীরবাবা বুজুর্গ আদমি, আল্লার খাস বান্দা, পিয়ারা দোস্ত। তার খানকাশরিফ, তার মহল খোদ আল্লাই হেফাজত করবেন–এই দৃঢ় বিশ্বাসই জঙ্গুরুল্লার বুকে হিম্মত দিয়েছে ইটের বাড়ি তৈরি করবার। পীরবাবাকে তো আর তাদের মতো টিনের ঘরে মাটির মেঝেতে বাস করার কথা বলা যায় না।

    তার আরো বিশ্বাস-পীরবাবা এ চরে বসত করলে রাক্ষুসে নদী এ চরের ওপর তার সর্বনাশা থাবা দিতে সাহস করবে না।

    বিকেল বেলা সূর্যের দিকে পিঠ দিয়ে জলচৌকির ওপর বসে জঙ্গুরুল্লা রাজমিস্ত্রিদের কাজ দেখাশুনা করছিল আর হুঁকো টানতে টানতে ভাবছিল অনেক কিছু।

    খুনের চর হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই কার্তিক মাসের পরেই অগ্রহায়ণ মাসের শেষ নাগাদ এই চরের ধান পাকবে। তার আগেই কলে-কৌশলে চরটা আবার দখল করতে হবে। যুদ্ধের দরুন ধান-চালের দাম লাফ দিয়ে দিয়ে বাড়ছে। গোলার ধান আরো কয়েক মাস রেখে দিলে ভাল দাম পাওয়া যাবে। আমনের মরশুমে দুই-তিন হাজার মণ চাল কিনে রাখলে অনেক মুনাফা হবে। চাল রাখার জন্য একটা গুদামঘর বানানো দরকার। কিন্তু টিন পাওয়া যাচ্ছে না। টাটা কোম্পানী এখন নাকি যুদ্ধের সরঞ্জাম তৈরি করতে ব্যস্ত। টিন আর তৈরি করছে না। অনেকে অভাবে পড়ে ঘর বিক্রি করছে। দু-চারটে ঘর কিনতে পারলে গুদামের জন্য প্রয়োজনীয় টিন পাওয়া যাবে। পীরবাবা আর মাসখানেক পরেই এসে পড়বেন। তাই বাড়ি তৈরির কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। আরশেদ মোল্লার মেয়ের সাথে পীরবাবার শাদিমোবারক সহি-সালামতে সম্পন্ন করতে পারলেই তার মনে লালিত অনেক দিনের আরজু পুরো হয়। কিন্তু তার আগে ফজলকে আবার জেলে ঢোকাতে হবে। গুলি-খাওয়া বাঘ খাঁচায় ঢুকাতে না পারলে স্বস্তি নেই। ও বাইরে থাকলে চর দখল করা কঠিন হবে। আর শুভ কাজের সময় সে কী যে করে বসে বলা যায় না।

    হঠাৎ আরশেদ মোল্লা ও তার মেয়ের খোঁজ খবর নেয়ার প্রয়োজন বোধ করে জঙ্গুরুল্লা। মোল্লাকে সে দেখেনি অনেকদিন। খুনের চর থেকে বিতাড়িত কোলশরিকদের মাঝেও তাকে দেখেছে বলে মনে পড়ে না তার। কোরবান ঢালী তার সামনেই বসে ছিল। তাকেই জিজ্ঞেস করে সে, ‘মাইরের দিন আরশেদ মোল্লা কি চরে আছিল?’

    ‘হ আছিল। ভ্যাদাডা পলাইতে পারছিল না? ওরে চুবাইয়া এক্কেরে আধামরা কইর‍্যা ফালাইছিল।’

    ‘অ্যাঁ, কও কি! এই কথাডাতো আমারে কয় নাই কেও।’

    আমি ও জানতাম না হুজুর, ‘আইজই হুনছি।’

    ‘কে চুবাইল? জামাই বুঝিন হউরের লাগুড় পাইয়া শোধ নিছে? চুবাইয়া হ্যাঁ-দফা ঘড়াইয়া দিছে?’

    ‘কে চুবাইছে, হুনি নাই।’

    ‘ভ্যাবলাডা কই এহন? বাইন্দা রাখে নাই তো?’

    ‘না ওগ আতে পায়ে ধইর‍্যা, মাইয়া দিয়া আহনের ওয়াদা কইর‍্যা ছাড়া পাইছে।’

    ‘অ্যাঁ, কও কি! ওয়াদা কইর‍্যা আইছে?’

    ‘হ, আমার কানে কানে কইছে। আপনের কাছে কইতে মানা করছে।’

    ‘ক্যান্? মানা করছে কিয়ের লেইগ্যা? মাইয়া কি দিয়া আইব নি?’

    ‘হেইডা কয় নাই। তয় ওয়াদা যহন করছে–’

    ‘ওয়াদা করছে তো জান বাঁচানের লেইগ্যা। তালাক দেওয়া মাইয়ারে দিয়া আইব ক্যামনে? তুমি শিগগির যাও। আরো পাঁজ-ছয়জন লইয়া যাও। মোল্লারে ধইর‍্যা উঁচ্‌কাইয়া লইয়া আইবা আমার কাছে। আর শোন, ওর মাইয়াডারেও লইয়া আহো।’

    কোরবান ঢালী চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই মজিদ খালাসি আসে।

    ‘কি ও খালাসি, কি খবর লইয়া আইছ?’

    ‘হুজুর, থানায় ইজাহার নেয় নাই।’

    ‘ইজাহার নেয় নাই!’ জঙ্গুরুল্লা রাগে ও উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ায়।

    ‘তুমি খবর পাইলা কই? তোমারে তো থানায় পাই নাই।’

    ‘ওনারা ডরে আপনের কাছে আহে নাই। আমারে খবর দিয়া পাডাইছে।’

    ‘ইজাহার নেয় নাই ক্যান?’

    ‘বড় দারোগা বিশ্বেস করে নাই।’

    ‘ক্যান বিশ্বেস করে নাই?’

    ‘তাতো কিছু ভাইঙ্গা কয় নাই। মনে অয় ঠিকমত মিল দিয়া কইতে পারে নাই।’

    রাগান্বিত জঞ্জুরুল্লা দাঁতে দাঁত ঘষে। বলে, ‘এই হারামজাদারা কোনো কামের না। এই সামান্য কামডা ঠিক মতন কইর‍্যা আইতে পারল না। ইচ্ছা করে ওগ ভরতা বানাইয়া খাই। হারামজাদারা–’

    মাগরেবের আজান শোনা যায়।

    জঙ্গুরুল্লা রাগে গরগর করতে করতে বাড়ির দিকে রওনা হয়।

    রাতের খাওয়া সেরে জঙ্গুরুল্লা যখন শোয়ার আয়োজন করছিল তখন বাইরে কোরবান ঢালীর গলার আওয়াজ পাওয়া যায়। ‘হুজুর, ঘুমাইয়া পড়ছেন নি? আমরা আইছি।’

    জঙ্গুরুল্লা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘মোল্লারে লইয়া আইছ?’

    ‘না হুজুর, আরশেদ মোল্লা বাড়ি নাই। কোথায় গেছে বাড়ির কেও কইতে পারে না।’

    ‘কবে আইব?’

    ‘তাও কেও কইতে পারে না।’

    ‘তার মাইয়া লইয়া আইছ?’

    ‘না হুজুর। আরশেদ মোল্লা নাই, এমুন অবস্থায় তার মাইয়া আনি ক্যামনে?’

    ‘আইচ্ছা বাড়ি যাও। কাইল সকাল বেলা আমার লগে দেখা কইর‍্য।’

    জঙ্গুরুল্লা পালঙ্কের বিছানায় শুয়ে পড়ে।

    ‘আরশেদ মোল্লার মাইয়ারে আনতে কইছিল কিয়ের লেইগ্যা?’ পাশে শোয়া দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী শরিফন জিজ্ঞেস করে।

    ‘তুমি ওই সব বোঝবা না।’

    ‘বুঝমু না ক্যান্? সুখের গাঙ্গে বুঝিন রসের জোয়ার লাগছে, রঙ্গের ঢেউ উথালপাথাল করতে আছে?’

    ‘উঁহু, নাগো, দুখের গাঙ্গে এখন বড় তুফান। ঐ সব কথা বাদ দ্যাও। তুমি আমার রান দুইডারে টিপ্যা দ্যাও জোরে জোরে। রানের মইদ্যে বড় চাবাইতে শুরু করছে।’

    শরিফন ওঠে। স্বামীর পা টিপতে টিপতে বলে, ‘মাইয়াডা বোলে পরীর মতন খবসুরত?’

    শরিফনের কথা কানে যায় না জঙ্গুরুল্লার। তার মনে তখন নানা দুশ্চিন্তার ভিড় জমতে শুরু করেছে।

    আরশেদ মোল্লা কি সত্যি ওয়াদা পালন করবে? ফজলের ঘরে দিয়ে আসবে তার মেয়েকে? তা কি করে হয়! তালাক দেয়া মেয়ে আগের স্বামীর ঘর করবে কেমন করে? এটা যে শরিয়তের বরখেলাপ।

    পীরবাবার জাদু-টোনার কি কোনো আছর পড়েনি মেয়েটার ওপর? ফজলকে জেলে ঢুকাবার একটা বড় সুযোগ নষ্ট হয়ে গেল। ওকে কি ভাবে আবার জেলে ঢোকানো যায় ।

  • আটাশ

    আটাশ

    সে দিনের সে গানটি ফজলের মনে গেঁথে রয়েছে। সে একাকী বসে থাকলে বা শুয়ে জেগে থাকলে সমস্ত ভাবনা-চিন্তা ছাপিয়ে গানটির গুঞ্জরণ শুরু হয় তার মনের মধ্যে। দেহের সমস্ত তন্ত্রী নেচে ওঠে সুরের ঝঙ্কারে। সে নিজেও গুনগুন করে গায় গানের কয়েকটা কলি। কখনো কলাগাছের ফাঁক দিয়ে রূপজানের বিষণ্ণ মুখ, কখনো কাশবনের ফাঁক দিয়ে জরিনার অশ্রুসজল চোখ ধরা পড়ে তার মনের চোখে। দুজনই তাকে ভালবাসে। দুজনই তার চোখে এক ও অভিন্ন, যেন এক দেহে লীন হয়ে গেছে দুটি নারী।

    ভাওর ঘরে শুয়ে আছে ফজল। তার পাশে ঘুমিয়ে আছে নূরু। পাশের আরেকটা ভাওর ঘরে বরুবিবি ও আমিনা ঘুমিয়ে আছে।

    সারাটা দিন খুবই খাটুনি গেছে। ভাটিকান্দি থেকে ঘর-দরজা ভেঙে সে নিয়ে এসেছে খুনের চর। কাল ভোরেই আবার শুরু হবে ঘর তৈরির কাজ। এক দিনের মধ্যে ঘরগুলো খাড়া করতে হবে। এজন্য তিনজন মিস্ত্রি ঠিক করেছে সে। জন চল্লিশেক কোলশরিকও কাজ করবে মিস্ত্রিদের সাথে।

    রাত অনেক হয়েছে। গতদিনের খাটা-খাটুনিতে ফজল ক্লান্ত, অবসন্ন। ঘুমে তার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। কিন্তু তবুও তার মনের ভেতর চলছে গানের গুঞ্জরন, ‘—সেথায় বধূ থাকে।’

    এক সময়ে গানের গুঞ্জরণ থেমে যায়। ফজল ঘুমিয়ে পড়ে।

    …কাশবনের ভেতর দিয়ে কলসি কাঁখে এক যুবতী নারী ললিতগতিতে এগিয়ে আসছে নদীর পাড়ে। তার পরিধানে কমলা রঙের শাড়ি। কে এ নারী? রূপজান, না জরিনা? দূর থেকে চিনতে পারছে না ফজল। সে ডিঙির মাথিতে বসে বৈঠা টানছে। কলসিটা পাড়ে রেখে যুবতীটি কোমরে জড়িয়ে নেয় শাড়ির আঁচল। কলসিটা বাঁহাতে তুলে সে পানিতে নামে। কলসিটায় বুকের ভর দিয়ে সে এবার পা ছড়িয়ে সাঁতার কাটতে শুরু করে। হঠাৎ তার চিৎকার শুনতে পায় ফজল। সে দেখতে পায়, যুবতীটি কলসির গলা জড়িয়ে ধরে ভেসে থাকবার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কিসে যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। নিশ্চয়ই কুমির টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ফজল জোরে জোরে বেঠা টেনে এগিয়ে যায়। কলসিটা একদিকে কাত হয়ে ছুটছে মাঝনদীর দিকে। মাঝে মাঝে ওটা ডুবে যাচ্ছে। যখন ভেসে উঠছে তখন ওটার গলা জড়িয়ে ধরা কনুই ও একগোছা চুল শুধু দেখতে পায় ফজল। সে বৈঠাটা দু’হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে কুমিরের সম্ভাব্য অবস্থানের দিকে তাগ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে পানিতে। প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি লাগে ফজলের সারা দেহে। তার মাথাটা ধপ করে পড়ে বালিশের ওপর।

    ‘আল্লাহু আল্লাহ! কী দ্যাখলাম!’ ঘাড়টা ব্যথা করছে ফজলের। বালিশের ওপর ঘাড়টা এ-কাত ও-কাত করে সে চিৎ হয়ে পড়ে থাকে বিছানায়। পিপাসায় তার গলা শুকিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর ফজল বিছানা ছেড়ে ওঠে। অন্ধকারে হাতড়ে সে খুঁটির সাথে ঝুলিয়ে রাখা টর্চলাইটটা হাতে নেয়। ওটা জ্বালিয়ে ঘরের এক কোণে রাখা মাটির কলসি থেকে ঢেলে পুরো এক গ্লাস পানি খায়।

    রাত আর কতক্ষণ আছে, কে জানে? বেড়ায় সাথে ঝোলানো আছে ঘড়িটা। ফজল টর্চের আলো ফেলে ঘড়ি দেখে। বারোটা বেজে ওটা বন্ধ হয়ে আছে। গত পরশুর পর নানা ঝামেলার জন্য ওটায় আর দম দেয়ার কথা মনে হয়নি।

    ফজল ঝাঁপ সরিয়ে খালি পায়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। পায়ের নিচে ভিজে মাটি। মাথার ওপর খোলা আকাশ। লক্ষ কোটি তারা মিটিমিটি জ্বলছে। সন্ধ্যায় দেখা শুক্লপক্ষের আধখানা চাঁদ আর আকাশে নেই। সে আদমসুরত খুঁজে বের করে। আদমসুরতের অবস্থান দেখে সে বুঝতে পারে, রাত পোহাতে ঘণ্টা তিনেক বাকি আছে।

    ‘কী একটা খারাপ স্বপ্ন দেখলাম!’ ফজল মনে মনে বলে। রূপজানের কোনো বিপদ হয় নাই তো! জরিনা কোনো দুর্ঘটনায় পড়ে নাই তো!

    ওরা কেমন আছে, জানতে প্রবল ইচ্ছে জাগে তার মনে। জেলে যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাদের কোনো খবরাখবর সে পায়নি। চোখ দুটো তার আপনা থেকেই একবার উত্তর পুবমুখি নলতার দিকে আর একবার দক্ষিণ-পুব বরাবর নয়াকান্দির দিকে দৃষ্টি ফেলে। ঘন কালো অন্ধকার। কয়েকটা বাতি ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। জেলেরা মাছ ধরছে নদীতে। বাতি জ্বলছে তাদের নৌকায়।

    ফজল দুদিকেই টর্চের আলো ফেলে। সে আলো চরের সীমানা ছাড়িয়ে খুব বেশি দূর এগোয় না। সে জানে টর্চের আলো নলতা বা নয়াকান্দির অর্ধেকের অর্ধেক দূরত্ব অতিক্রম করতে পারবে না। তবুও অযথাই সে ঐ দুদিকে টর্চের আলো ফেলে বারবার। ফজলের দিকে টর্চের আলো আসছে পুবদিকে থেকে। চরের পাহারায়রত তারই লোক তার আলোর জবাবে আলো ফেলছে।

    ফজল চরের উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকেও টর্চের আলো ফেলে। সেদিক থেকেও টর্চ মেরে জবাব দেয় পাহারাদাররা।

    ফজল ধানখেতের আল ধরে এগিয়ে যায় পুবদিকে। পায়ের নিচে প্যাঁচপেচে কাদা। কিছুদূর কাদা মাড়িয়ে, তারপর তিরতিরে পানি ভেঙে সে পুব কিনারায় চলে যায়। অনেকক্ষণ নদীতে ভাটা শুরু হয়েছে। কিন্তু জোয়ারের পানি এখনো পুরোপুরি নেমে যায়নি।

    ‘এখানে কারা আছে পাহারায়?’ ফজল জিজ্ঞেস করে।

    ‘আমি লালু আর সাবু।’ উত্তর দেয় একজন পাহারাদার। অনেক লটাঘাস বিছিয়ে একটা ঢিবির মতো করা হয়েছে। তারই ওপর দাঁড়িয়ে আছে দু’জন পাহারাদার।

    ‘তোরা সাবধানে থাকিস। গাঙ্গে কিন্তু কুমির আছে।’

    ‘আমাগ কাছে কুমির আইব কি মরতে? ট্যাটা দিয়া এক্কেরে গাঁইথ্যা ফালাইমু।’

    ‘টিপির উপরে তোগ টঙ বানাইয়া দিতে অইবরে। শীতকাল আইসা পড়তেছে। ছই না থাকলে মাথায় ওস পড়ব। আমাগ বেড়য়ালারা কই? ফাঁকগুলা বানা দিয়া বন্ধ করছে?’

    ‘হ, ভাটার টান লাগনের আগেই জাগাইয়া দিছিলাম।’ সাবু বলে। ‘তারা ফাঁক বুজাইয়া ঘুমাইয়া রইছে ডিঙির মইদ্যে।’

    জোয়ারের সময় মাছ যাতে কিনারায় আসতে পারে সেজন্য বেড়ের কিছু বানা তুলে দেয়া হয়। ভাটার টান শুরু হওয়ার আগেই সে ফাঁক গুলো আবার বানা দিয়ে বন্ধ করতে হয়। যাতে পানি কমার সাথে সাথে মাছ বেরিয়ে যেতে না পারে।

    ‘মোরগের বাকের আগে পানি নামব না। ফজল বলে। পানি বেবাক সইর‍্যা যাওনের আগেই ওগ জাগাইয়া দিস আবার।’

    ‘আইচ্ছা।’

    ‘আর শোন, মাছ বেচতে যারা তারপাশা যাইব, তাগো মনে করাইয়া দিস, তারা যেন খবরের কাগজ আনতে ভোলে না।’

    ফজল টর্চের আলো ফেলে কিনারা ধরে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যায়। কোথাও পায়ের পাতা সমান, কোথাও আধহাঁটু পানি। সে পুরোটা চরে ঘোরে। পাহারাদাররা সবাই সজাগ, সতর্ক।

    সে তাদের সাবধান করে দেয়, ‘কুমির আছে কিন্তু গাঙ্গে। সাবধান!’

    ফজল ভাওর ঘরে ফিরে আসার কিছুক্ষণ পর শোনা যায় ভোরের আজান।

    বসত ভিটা উঁচু করা প্রয়োজন। উঁচু না করলে ভরা বর্ষার সময় জোয়ারের পানি ঢুকবে ঘরের মধ্যে। তাই চল্লিশ জন কোলশরিক অন্ধকার থাকতেই ওড়া-কোদাল নিয়ে কাজে লেগে গেছে। ফজলের বাড়ির জন্য নির্ধারিত চৌহদ্দির দক্ষিণ পাশে পুকুর কেটে তারা বসত ভিটায় মাটি ফেলছে। কিন্তু পুকুরটা বেশি গভীর করা যাচ্ছে না। পানি উঠছে নিচে থেকে।

    আকু মিস্ত্রি ভোরেই এসে কাজ করতে শুরু করেছে। তার তদারকিতে কাজ করছে। আরো দু’জন মিস্ত্রি।

    দক্ষিণ ভিটিতে উঠবে তিরিশের বন্দের কাছারি ঘর। উত্তর ভিটিতে সাতাশের বন্দের ও পশ্চিম ভিটিতে পঁচিশের বন্দের দুটো থাকবার ঘর উঠবে। ঘরগুলোর ঢেউটিনের চালা, পাতটিনের বেড়া আর খুঁটি-খাম্বা সবই তৈরি। এখন মাপ-জোখ নিয়ে, বন্দ ঠিক করে, খুঁটি খাম্বা পুঁততে হবে। খুঁটির ওপর চালা বসিয়ে বেড়াগুলো গজাল মেরে আটকে দিতে হবে। পুবের ভিটিতে চাড়ার দো-চালা ঘর উঠবে। ওটার একদিকে চেঁকিঘর আর একদিকে রসুইঘর হবে।

    ফজল বসে বসে মিস্ত্রিদের কাজ দেখছে আর নিজেদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছে পুলকি মাতব্বরদের সাথে।

    ‘ওরা কি থানায় গেছে?’ জিজ্ঞেস করে ফজল।

    ‘গেছে, এডুক খবর পাইছি।’ মেহের মুনশি বলে। ‘কারে কারে আসামি দিছে, খবর পাই নাই।’

    ‘আপনারা খবর নেন। যাদের এই চরে আসার কথা, তারা কি সবাই আইস্যা পড়ছে?’

    ‘হ, সবাই বউ-পোলাপান লইয়া আইছে।’ বলে জাবেদ লশকর। ‘গরু-বাছুর, হাঁস মুরগি সব লইয়া আইছে।’

    ফুঁত-ফুঁত।

    চাটগাঁ মেল আসছে। সকলেই সেদিকে তাকায়। স্টিমারটা এ চরের উত্তর দিক দিয়ে চলে যায়। তারপাশা, ভাগ্যকুল, টেপাখোলা ধরে যায় গোয়ালন্দ।

    ‘জাহাজটা অনেক দেরিতে যাইতে আছে আইজ।’ কদম শিকারি বলে।

    ‘চর মাথাভাঙ্গার উত্তর চর পড়তে আছে।’ জাবেদ লশকর বলে। ‘তার লেইগ্যা ঘুইর‍্যা আইতে জাহাজের দেরি অইয়া যায়।’

    ‘শোনেন, একটা প্রাইমারি ইস্কুল খুলতে অইব।’ ফজল বলে। ‘শুরুতে নিজেগই মাস্টারি করণ লাগব।’

    ‘তা করণ যাইব।’ মেহের মুনশি বলে।

    ‘বাজারের বেইল অইয়া গেছে।’ রমিজ মিরধা বলে। ‘ট্যাহা লইয়া আহো। আমি আর মুনশি হাশাইল যাইমু। গয়নাগুলা বেবাক ছাড়াইয়া লইয়া আইমু।’

    ‘লাগবতো আসল দেড় হাজার আর এক মাসের সুদ পঁচাত্তর টাকা। তাই না?’ ফজল বলে।

    ‘হ। এই কয়দিনের লেইগ্যা পুরা এক মাসের সুদ চাইতে পারে।’

    ফজল উঠে ভাওর ঘরে যায়। লোহার সিন্দুক এনে সেখানেই রাখা হয়েছে। সিন্দুক খুলে টাকা নিয়ে সে কিছুক্ষণ পরে ফিরে আসে। মেহের মুনশি টাকা গুণে নিয়ে রমিজ মিরধার সাথে হাশাইল রওনা হয়।

    রোদের তেজ বাড়তে শুরু করেছে। ফজল সবাইকে নিয়ে তাদের ভাওর ঘরের ছায়ায় গিয়ে বসে।

    ঘোঁজার দিক থেকে চারজন লোক আসছে। তাদের সাথে করে নিয়ে আসছে উত্তর দিকের একজন পাহারাদার।

    ‘এই লোকগুলা আইছে আপনের লগে দ্যাহা করতে।’ ফজলকে বলে পাহারাদার বাচ্চু।

    ‘হ, মাতবরের পো, আপনের কাছে একটা আরজু লইয়া আইছি। আমরা আছিলাম ধানকুনিয়ার চরে। আমাগ চর ভাইঙ্গা গেছে। আমার নাম তোবারক। অনেকদিন ধইর‍্যা পাতনা দিয়া আছি ডাইনগাঁয়। আর ওনারা চর ভাঙনের পর আসাম মুলুকে চইল্যা গেছিল। আবার ফিরত আইছে। আমাগ কিছু জমি দ্যান।’

    ‘জমি দিব কইত্যন?’ কদম শিকারি বলে। ‘জমিতে বেবাক ভাগ-বণ্টন অইয়া গেছে।’

    ‘এই মিয়া মাতবরের পো ইচ্ছা করলে দিতে পারে। আমাগ বাঁচনের একটা রাস্তা কইর‍্যা দিলে আমরা না খাইয়া মইরা যাইমু।’

    ‘না মিয়ারা, জমি দেওনের কোনো উপায় নাই।’

    ‘দয়া কইর‍্যা আমাগ বাচনের একটা পথ কইরা দ্যান।’ তোবারকের সাথের একজন বলে। ‘আমরা এই তিনজন চর ভাঙ্গনের পর গেছিলাম আসাম মুলুক।’

    ‘আসামে তো অনেক মানুষ যায়।’ ফজল বলে। ‘গেলেই কি জমি পাওয়া যায়?’

    ‘পাওয়া যাইব কইতন? জমিতো কেও দ্যায় না। বন-জঙ্গল সাফ কইরা জমি বানাইতে অয়। আমরাও জমি আবাদ করছিলাম। কিন্তু কালাজ্বরে থাকতে দিল না। কালাজ্বরে আমার মা, দুইডা লায়েক পোলা মরছে। ওনাগ পোলাপানও মরছে। হেষে মরণের মোখেরতন আমরা পলাইয়া আইছি।’ হঠাৎ লোকটির গলা ধরে যায়। তার চোখ ছলছল করে।

    ফজলের মনে সহানুভূতি জাগে। সে জাবেদ লশকর ও কদম শিকারির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আপনারা কি কন?’

    ‘কী আর কইমু।’ জাবেদ লশকর বলে। ‘এতে কষ্ট কইর‍্যা আমরা চর দখল করলাম। আর ওনারা আসমানতন আইয়া কয়, জমি দ্যান।’

    ‘না মিয়ারা, জমি দেওন যাইব না।’ কদম শিকারি দৃঢ় কণ্ঠে বলে।

    ‘আমাগ বাঁচনের একটা রাস্তা কইর‍্যা না দিলে বউ-পোলাপান লইয়া দপাইয়া মইর‍্যা যাইমু।’ তোবারক বলে। ‘সাড়ে তিন ট্যাহা মনের চাউল দশ ট্যাহা অইয়া গেছে।’

    আকু মিস্ত্রি হুঁকো টানতে টানতে এসে দাঁড়িয়ে শুনছিল এদের কথা। সে বলে, ‘হ, কাইল ট্যাহায় চাইর সের ভাও গেছে দিঘিরপাড়। হোন মাতবরের পো, আমাগ কিন্তু এহন আষ্ট আনা রোজ দিয়া পারবা না। আমাগ এহন অ্যাক ট্যাহা কইর‍্যা দিতে অইব।’

    ‘ওরে আমার আল্লারে, আষ্ট আনারতন এই লাফে অ্যাক টাকা!’

    ‘চাউলের দামও তো লাফ দিয়া তিন দুনা অইছে, কি কও, দিবা, না দিবা না? না দিলে থাকুক পইড়া তোমার কাম। আমরা বাড়িত্ চল্‌লাম।’

    ‘না, না, কাম করতে থাকেন। বিবেচনা কইরা দিমু আপনাগ।’

    আকু মিস্ত্রি গিয়ে আবার কাজে লেগে যায়।

    লোকগুলো আবার অনুনয় করে।

    ‘জমি দিতে পারমু না।’ ফজল বলে। ‘তয় তোমাগ বাঁচনের একটা পথ কইর‍্যা দিতে পারি।’

    ‘হ, একটা পথ কইরা দ্যান।’ তোবারক বলে। ‘আল্লায় আপনের ভাল করব।’

    ‘শোন, বাড়ির কাছে এত বড় গাঙ থাকতে তোমরা না খাইয়া মরবা ক্যান? এই গাঙ আমাগ যেমন ভোগায়, তার চেয়ে বেশি খাওন যোগায়। আমাগ কোলশরিকরা বেড় দিয়া মাছ ধরে। সেই মাছ বেইচ্যা তারা সংসার চালায়। পারবা তোমরা মাছ ধরতে?’

    ‘পারমু, মাতবরের পো। তোমরা কি কও, পারবা?’

    ‘হ, পারমু।’ আসাম-ফেরত তিনজন বলে।

    ‘যদি পার, চইল্যা আসো এই চরে। থাকনের লেইগ্যা ঘর উঠানের জায়গা আমি দিমু। তোমরা বাঁশ, বেত, নারকেলের কাতা কিন্যা আনো। চাঁই বানাও, দোয়াইর বানাও, চালি বুনাও। দাউন বড়শি বাইন্দা লও। অবসর সময়ে জাল বোন ইলশা জাল, মই জাল, টানা জাল, ধর্মজাল, ঝাঁকি জাল। আমাগ কোলশরিকরা পুব-দক্ষিণ আর পশ্চিমের ঢালে বেড় পাতছে। বেড় পাতনের আর জায়গা নাই। উত্তর দিকটা ঢালু না, খাই বেশি। ঐ দিগে তোমরা চাই পাতো, দোয়াইর পাতো, দাউন বড়শি পাতো। আরে, ইচ্ছা থাকলে মানুষ পারে না কোন কাম? না খাইয়া মরে কারা? যারা আত-পাও থাকতে হায়-হুঁতাশ করে। বাঁশ, বেত, সূতা কিনতে টাকা লাগলে কর্জ নিও আমারতন।’

    ফজলের প্রস্তাবে রাজি হয়ে তারা চলে যায়।

    জাবেদ লশকর বলে, ‘বড় খারাপ দিন আইতে আছে। মানুষ চেষ্টা করলেও কি বাইচ্যা থাকতে পারব?’

    ‘চেষ্টাতো করতে অইব। ইতিহাসে পড়ছি ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে এই দেশের তিনভাগের এক ভাগ মানুষ মইর‍্যা গেছিল। সেই সময়েও ব্রিটিশ আছিল। দেশের ফসল মাইর গেছিল। মানুষের টাকা থাকলেও চাউল পাওয়া যায় নাই। সেই সময় তো জাহাজ আছিল না, রেলগাড়ি আছিল না। অন্য দেশের সাথে যোগাযোগ আছিল না। এখন তো একখানের ফসল মাইর গেলে আরেকখানতন আনতে পারা যায়। সরকার কী করতে আছে? এক জেলারতন আরেক জেলায় ধান-চাউল আনতে দেয় না। জাপানিরা বর্মা দখল করছে। ওই খানের পেগু চাউল আর আসব না। আবার মিলিটারির লেইগ্যা ধান-চাউল গুদামে ভরতে আছে। সরকার যদি দেশের মানইনষের দিগে না চায় তয় সেই সরকার থাকন না থাকন সমান। শোনেন, এই বিদেশী সরকার খেদান লাগব। ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন শুরু অইছে। ব্রিটিশ আর বেশিদিন এই দেশে থাকতে পারব না। শোনেন বিদেশী সরকারের উপর ভরসা কইর‍্যা থাকন যাইব না। এই চরের ধানে কিন্তু বেবাকের সাত-আট মাসের বেশি চলব না। আপনারা চীনা আর কাউনের বীজ যোগাড় করেন। উঁচা জায়গায় ঐ লতা লাগাইয়া দিবেন। যার যার বাড়িত লপ্তে।’

    গুড়গুড় আওয়াজ ভেসে আসছে দূর থেকে। সবাই মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকায়। পাঁচটা উড়োজাহাজ আসছে দূর থেকে। তার পেছনে আসছে আরো পাঁচটা।

    ‘যুদ্ধ এইবার লাগছে জবর।‘ জাবেদ লশকর বলে। ‘ওগুলা কই যাইতাছে?’

    ‘ওগুলা যাইব আসামের কোনো ঘাঁটিতে।’ ফজল বলে। ‘সেইখানতন পেট্টল ভইর‍্যা যাইব বর্মা মুলুকে, জাপানিগ উপরে বোমা মারতে।’

    ভয়ঙ্কর বিদঘুঁটে শব্দ করে উড়োজাহাজগুলো মাথার ওপর দিয়ে চলে যায় উত্তর পুবদিকে।

    ফজল তার অসমাপ্ত কথার জের টেনে বলে, ‘আপনারা যার যার বাড়ির লপ্তে কদু, কুমড়া, বেগুন, মরিচ, নানান জাতের তরিতরকারির গাছ লাগাইতে শুরু করেন। বাড়ির চুতর্দিগে বেশি কইর‍্যা, ঘন কইর‍্যা কলাগাছ লাগান। এতে বাড়ির পর্দাও অইব, কলাও খাওয়ন যাইব। যদি আকাল লাগে, তয় চীনা-কাউনের ভাত, মিষ্টি আলু, কলার বারালি পেটের জামিন দিয়াও বাঁচন যাইব।’

    ‘ও মিয়া মাতবরের পো।’ আকু মিস্ত্রি ডাকে ফজলকে। ‘দ্যাহো দেহি ভাল কইর‍্যা। ব্যাকাত্যাড়া অইয়া গেলনি আবার।’

    জাবেদ লশকর, কদম শিকারি ও আহাদালীকে নিয়ে ফজল ঘরের কাজ দেখে। খুঁটি খাম্বা ঠিকমত বসানো হয়েছে। মিস্ত্রিদের কাজে কোনো খুঁত পাওয়া যায় না। বসত ভিটায় ও ঘরের ভিটির মাটি ফেলা শেষ হয়েছে। তক্তা দিয়ে পিটিয়ে দুরমুশ করে সমতল ও মজবুত করে মাটি বসাচ্ছে কয়েকজন কোলশরিক।

    ‘মিস্ত্রি চাচা, সব ঠিক আছে। এইবার চালগুলা উড়াইয়া খিলাইয়া ফেলেন। বেড়াগুলা লাগাইয়া ফেলেন। চাল উড়াইতে আমাগ ধরন লাগব?’

    ‘না, বহুত মানুষ আছে। তোমাগ ধরন লাগব না।’

    পুলকি-মাতব্বরদের নিয়ে ফজল আবার এসে বসে ভাওর ঘরের ছায়ায়।

    ‘গতকাল দারোগা-পুলিস আসার কথা ছিল। আসে নাই ক্যান্, কে জানে! আজ কিন্তু আসতে পারে। পাহারাদাররা সতর্ক আছে তো?’

    ‘হ আছে।’ আহাদালী বলে।

    যারা মাছ নিয়ে তারপাশা গিয়েছিল তারা ফিরে আসে। ফজলের জন্য খবরের কাগজ নিয়ে এসেছে তারা।

    আনন্দবাজার পত্রিকাটা হাতে নিতে নিতে ফজল বলে, ‘আজাদ পাইলা না?’

    ‘না, এইডাই শুধু পাওয়া গেল।’ কোলশরিক জমিরদ্দি জবাব দেয়।

    ‘কত পাওয়া গেছে আইজ?’

    ‘বড় মাছে আঠারো ট্যাকা। আর গুড়া মাছে আট টাকা।’

    ‘ভালইতো পাইছ।’

    ‘হ, মাছের দাম কিছু বাড়ছে।’

    ‘কিন্তু চাউলের দামের মতন তো বাড়ে নাই।’

    ‘তারপাশায় চাউলের দামের খোঁজ নিছিলা?’

    ‘হ, ট্যাহায় চাইর সের। মাইনষে কওয়া-কওয়ি করছিল–দর আরো বাড়ব। হেষে পাওয়াই যাইব না।’

    জেল থেকে খালাস পেয়ে আসার পর ফজল খবরের কাগজ পড়ার সুযোগ পায়নি। আর খবরের কাগজ হাতে পেয়েই তার পিপাসার্ত চোখ খবরের শিরোনামগুলোর ওপর ঝুঁকে পড়ে।

    ‘কি লেখছে মিয়া?’ জাবেদ লশকর উন্মুখ হয়ে জিজ্ঞেস করে। ‘জোরে জোরে পড়লে আমরাও কিছু জানতে পারি।’

    ‘উত্তর আফ্রিকায় মিত্রবাহিনীর সাঁড়াশী আক্রমণ। রোমেলের দুর্ধর্ষ বাহিনীর পশ্চাদপসরণ।’ ‘ব্রিটিশ বিমান হামলায় আকিয়াবের জাপানি ঘাটি বিধ্বস্ত।’ ‘স্তালিনগ্রাডে প্রচণ্ড যুদ্ধ।’

    ফজল জোরে জোরে শিরোনামগুলো পড়তে থাকে।

    দুপুরের কিছু পরে রমিজ মিরধা ও মেহের মুনশি হাশাইল থেকে ফিরে আসে। তারা গয়নাগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে।

    ‘একটা কামের মতো কাম অইছে।’ জাবেদ লশকর বলে। ‘এহন ছাড়াইয়া না আনলে গয়নাগুলা আর কোনোদিন ছাড়ান যাইত না।’

    ‘এই গয়নাগুলা নেওনের সময় কত বউ-ঝিরে কান্দাইছি।’ রমিজ মিরধা বলে। ‘আইজ তাগ মোখে আবার হাসি ঝলমল করব।’

    ‘ফর্দের সঙ্গে মিলাইয়া গয়নাগুলা আলাদা আলাদা সাজাইয়া নেন।’ ফজল বলে। ‘তারপর একজন একজন কইর‍্যা বোলাইয়া যার যার গয়না ফিরত দিয়া দ্যান। পয়লা আমারে দিয়াই শুরু করেন।’

    রূপজানের গয়নাগুলো বুঝে নিয়ে ফজল সেগুলোকে রুমালে বাঁধে। রুমালের পুটলিটা বুকের সাথে চেপে ধরে সে ভাওর ঘরে যায়। তার মা সেখানে আলগা চুলোয় রান্না করছে।

    ‘মা এই নেও গয়না। আইজই মহাজনের ঘরতন টাকা দিয়া ছাড়াইয়া লইয়া আইছি।’

    ‘গয়নাতো আনছস। কিন্তু গয়নার মানুষটারে তো আনতে পারলি না।’ গয়নার পুটলিটা হাতে নিয়ে বলে বরুবিবি।

    ফজল মাথা নিচু করে সরে যায় সেখান থেকে।

    দুপুরের খাওয়া সেরে ফজল মিস্ত্রিদের কাজ দেখতে চলে আসে। পুলকি-মাতব্বররা বাড়ি চলে গেছে যার যার। শেষ বিকেলের আগে তারা আর আসবে না।

    ফজল খবরের কাগজের মধ্যে ডুবে যায়।

    ‘ফজল।’

    ফজল মুখ তুলে তাকায়। ‘আরে জাহিদ ভাই! তুমি কইতন আইলা?’

    ‘আইলাম বাড়িত্‌ন। গেছিলাম ভাটিকান্দি। শোনলাম, তোমরা ঘর-দরজা ভাইঙ্গা এই নতুন চরে আইসা পড়ছ।’

    ‘বাড়ির সব কেমন আছে? চাচি, শহিদ-ভাই, তওহিদ, সেতারা?’

    ‘সব্বাই ভাল আছে। আমিই খালি ভাল নাই।’

    ‘ক্যান্, কি অইছে?’

    ‘এই নানান ঝামেলা। চাচি কই?’

    ‘ঐ খানে ভাওর ঘরে। চলো যাই। তোমার তো খাওয়া হয় নাই।’

    ‘না।’

    জাহিদকে ভাওর ঘরে নিয়ে যায় ফজল। তাকে দেখে খুশি হয় বরুবিবি। তার খাওয়ার ব্যবস্থা করে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে তাদের বাড়ির সকলের কথা।

    এরফান মাতব্বরের বড় ভাই এমরান মাতব্বর। সে-ই ছিল এ এলাকার বড় মাতব্বর। বাংলা ১৩২৬ সনের বন্যার পরের বছর যখন লটাবুনিয়া ভেঙে যায় তখন সে তার সব কিছু নিয়ে চলে যায় তার শ্বশুরবাড়ি–দক্ষিণপাড়ের পাইকপাড়া গ্রামে। তার স্ত্রী শরিফ ঘরের মেয়ে। সে বেঁকে বসেছিল, সে আর কোনো দিন চর অঞ্চলে যাবে না। উপায়ান্তর না দেখে সেখানেই সে জমাজমি কিনে বাড়ি-ঘর করে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যায়। তারপর লটাবুনিয়া কয়েকবারই জেগেছে, আবার ভেঙেছে। নাম বদলে হয়েছে খুনের চর। কিন্তু এমরান মাতব্বর আর চরে ফিরে আসেনি কোনো দিন। স্ত্রীর জেদের কাছে তাকে নতি স্বীকার করতে হয়েছিল। বছর সাতেক আগে সে কলেরায় মারা যায়। জাহিদ তারই মেজো ছেলে।

    জাহিদকে নিয়ে ফজল আবার চলে আসে মিস্ত্রিদের কাজের জায়গায়।

    ‘জাহিদ ভাই, তুমি না মিলিটারিতে গেছিলা?’

    ‘হ, না জাইন্যা ঢুকছিলাম পায়োনিয়ার ফোর্সে। আমাগ নিয়া গেছিল চাটগাঁর অনেক দক্ষিণে জঙ্গল সাফ কইর‍্যা রাস্তা বানাইতে। এমুন সব কাম করতে হুকুম দেয় যা গুষ্ঠীর কেউ কোনোদিন করে নাই। অইসব জাগায় জাপানিরা বোমা মারতে পারে। আমি আইয়া পড়ছি, আর যাইমু না।’

    ‘পলাইয়া আইছ?’

    ‘না পলাইমু ক্যান্। ছুটি লইয়া আইছিলাম। আর যাইমু না।’

    ‘আমাগ কোলশরিক কিতাবালীর পোলা বোরহান পড়ত ক্লাস এইটে। মিলিটারিতে ‘টপ্যাস’ অইয়া ঢুকছিল। সে মনে করছিল রাইফেল-বন্দুক হাতে লইয়া লড়াই করব। আমরা যেমন লড়াই করি ঢাল-শড়কি লইয়া। ও গিয়া দেখে, টপ্যাসের কাজ ঝাড়ু দেওয়া। সে-ও পলাইয়া আইছে। তারে নাকি পলাতক ঘোষণা করছে। তার নামে ওয়ারেন্ট বাইর অইছে।’

    জাহিদ গলা খাদে নামিয়ে বলে, ‘শোন ফজল, আমার নামেও ওয়ারেন্ট অইছে। সেই জন্যই আইছি তোমাগ বাড়ি। এইখানে তো আমারে কেও চিনে না। আমি এইখানেই থাকমু কিছুদিন।’

    ‘থাকো, যদ্দিন তোমার মনে লয়। কিন্তু পুলিস আমাগ ধরতে আইব। আইজও আইতে পারে, কাইলও আইতে পারে। আমাগ বিরুদ্ধে ঘর পোড়ানের মামলা আছে।’

    ‘তয় তো বড় মুসিবত। আমি তাইলে এখনি চইল্যা যাই।’

    ‘না, যাইবা ক্যান্। পুলিস আইলে আগেই খবর পাইমু। আমি ধরা দিমু না। সইর‍্যা যাইমু। নাও-বাইছা সব তৈয়ার। তুমিও আমার লগে সইর‍্যা পড়বা।’

    জাহিদ আশ্বস্ত হয়। কিছুক্ষণ পরে সে বলে, ‘আইচ্ছা, এই চরের অর্ধেক মালিকানা তো আমার বাজানের আছিল। তার অবর্তমানে এখন আমরা মালিক। দূরে আছিলাম বুইল্লা দাবি করি নাই। এহন দাবি করলে আমাগ অংশের জমি দিবা?’

    ‘নেও না। আমার ভাগের অর্ধেক জমি দিমু তোমারে। চাচিরে, ভাবিসাবরে লইয়া আহো গিয়া।’

    ‘মা তো আইব না। তোমার ভাবিসাবরে লইয়া আইমু।’ একটু থেমে সে আবার বলে, ‘আইজ হাঁটতে হাঁটতে জান সারা। আমি ভাওর ঘরে গিয়া একটু বিশ্রাম নেই।’

    সবগুলো ঘর উঠে গেছে। কাজ আর বেশি বাকি নেই। দিনের শেষে কাজেরও শেষ হবে বলে মনে হয় ফজলের।

    আজও পুলিস আসেনি। ফজল মনে মনে ভাবে, খুবই ভাল হলো। কাল এসে পুলিস প্রমাণ পাবে, এ চরের সত্যিকার মালিক কে?

    আকু মিস্ত্রি চালার ওপর উঠে চালার জোড়ায় টুয়া লাগাচ্ছে। এক সময়ে সে গানে টান দেয়:

    যেই ঘর আমি বানাইলাম

    মনের মতন সাজাইলাম

    সেই ঘরেতে হবে না মোর ঠাঁই রে,

    হবে না মোর ঠাঁই।

    সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরে

    থাকতে হবে চিরতরে

    সেই ঘরেতে আলো বাতাস নাই রে,

    আলো বাতাস নাই।

  • ঊনত্রিশ

    ঊনত্রিশ

    পাঁচদিন পর ফজল খবর পায় প্রতিপক্ষ ঘর পোড়ানোর এজাহার দিতে পারেনি, কারণ তাদের মিথ্যা কারসাজি বড় দারোগার জেরার চোটে ধরা পড়ে গিয়েছিল।

    গত কয়েকদিন বড় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটিয়েছে ফজল ও তার দলের লোকজন। মস্ত বড় একটা বিপদ কেটে যাওয়ায় তারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে, আনন্দে উল্লসিত হয়। কারো মুখে গালাগালির তুবড়ি ছোটে জঙ্গুরুল্লার উদ্দেশে। দিঘিরপাড় ছিল ফজলের চিত্তবিনোদনের একমাত্র স্থান। সেখানে দেখা হত তার খেলার সাথী আর স্কুলের বন্ধুদের সাথে, পেত নানা ঘটনার, বিভিন্ন জন-স্বজনের খবরাখবর। বন্ধু-বান্ধবদের সাথে গল্প গুজব করে মনটাকে তাজা করে, হাট-সওদা নিয়ে সে বাড়ি ফিরত। অন্যদিন না হলেও হাটের দিন সেখানে না গিয়ে সে থাকতে পারত না। অথচ গত আট-নয় মাসের মধ্যে সে একদিনও সেখানে যায় নি, যাওয়ার সুযোগ পায়নি।

    বিপদ কেটে যাওয়ার পর থেকেই তার মনটা ছটফট করতে থাকে দিঘিরপাড় যাওয়ার জন্য। কিন্তু জঙ্গুরুল্লার দল কখন যে হামলা করে, ঠিক নেই কিছু।

    দুদিন পরে দিঘিরপাড়ের হাট। এ দুদিনের ভেতর জঙ্গুরুল্লার সম্ভাব্য হামলার সংবাদ সংগ্রহ করতেই হবে তাকে।

    সংবাদ পেয়েও যায় ফজল। প্রতিপক্ষের প্রস্তুতির কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। সে আরো খবর পায়, চালের দর বেড়ে যাওয়ায় চরের গরিব চাষীদের মধ্যে হাহাকার পড়ে গেছে। তারা সাহায্যের জন্য যাচ্ছে জঙ্গুরুল্লার কাছে। সাহায্য করার নামে জঙ্গুরুল্লা তাদের দাদন দিচ্ছে। আমন ধান উঠলেই পাঁচ টাকা মন দরে তাকে ধান দিতে হবে দাদনের বিনিময়ে।

    আজ দিঘিরপাড়ের হাট। প্রয়োজনীয় সওদাপাতির ফর্দ তৈরি করে চান্দু ও বক্করকে ডেকে নিয়ে সে ডিঙিতে উঠে।

    চান্দু পাছায় আর বক্কর গলুইয়ে বসে বৈঠা টানছে।

    ‘এই চান্দু, আমার হাতে বৈঠা দে।’ ফজল বলে। ‘অনেকদিন নৌকা বাইনা। মাঝে মইদ্যে না বাইলে নৌকা বাওয়া ভুইল্যা যাইমু।’

    ‘এইখান দিয়াতো উজান। এট্টু পরেই ভাটির জাগায় গিয়া আপনের আতে–।’

    ‘আরে না, তুই এখনি দে। ভাটি পানিতে তো বেশি টানতে অয় না। হাইল ধইরা বইস্যা থাকলেই অয়।’

    চান্দুর হাত থেকে বৈঠা নিয়ে জোরে জোরে টানতে থাকে ফজল।

    কিছুদূর গিয়েই সে বাঁ দিকের খাড়িতে ঢুকিয়ে দেয় ডিঙিটা।

    ‘ঐ দিগে যান কই?’ চান্দু বলে। ‘ঐডা দিয়া গেলে তো বহুত ঘোরন লাগব। দাত্রার খড়ি দিয়া যান।’

    ‘একটু ঘুইর‍্যাই যাই। নলতার খাড়িতে শুনছি কুমির আছে। খাঁড়ির পশ্চিম দিগের চরে দুইডা কুমির বোলে রউদ পোয়াইতে আছিল।’

    ‘আমরা তো কোনো দিন হুনি নাই।’ বক্করের কথার ভেতর ঘোলাটে সন্দেহ।

    ‘আরে সব খবর কি সবার কানে আসে। তোরা পশ্চিম দিগের চরটার দিগে চউখ রাখিস।’

    ‘এহন তো শীতকাল না। আর রউদের তেজও খুব। কুমির কি এহন এই ঠাডা রউদে বইয়া রইছে?’

    ‘তবুও চউখ রাখিস তোরা। দ্যাখ্যা যাইতেও পারে। যদি দ্যাখ্যা যায় রে! দ্যাখা গেলে কি করমু জানস?’

    ‘কি করবেন?’ চান্দু জিজ্ঞেস করে।

    ‘ফান্দে আটকাইমু। কুমিরের ফান্দা ক্যামনে পাতে, তোরা দ্যাখছস কোনো দিন?’

    ‘উঁহু দেহি নাই।’

    ‘যেইখান দিয়া কুমির রউদ পোয়াইতে উপরে ওডে, সেইখানে তিন কাঁটাওলা বড় বড় অনেকগুলা গ্যারাফি বড়শি শন সুতার মোটা দড়িতে বাইন্দা লাইন কইর‍্যা পাততে অয়। দড়িগুলারে মাটির তল দিয়া দূরে উপরের দিগে নিয়া শক্ত খুঁডার লগে বাইন্দা রাখতে অয়। তারপর যখন কুমির রউদ পোয়াইতে চরের উপরে ওডে, তখন উলটাদিক তন দাবড় দিলে কুমির হরহর কইর‍্যা বড়শির উপর দিয়া দৌড় মারে পানির দিগে। ব্যস কুমিরের ঠ্যাঙ্গে, প্যাডে বড়শি গাঁইথ্যা যায়। আমি কুট্টিকালে দেখছি, বা’জান একবার ফান্দা পাতছিল। একটা বড় আর একটা বাচ্চা কুমির বড়শিতে গাঁথছিল। বড়ডার ঠ্যাংঙ্গে আর ছোড্ডার প্যাডে।’

    চান্দু ও বক্করের চোখ যখন পশ্চিম দিকের বালুচর, লটাবন, আর কাশবনে কুমিরের সন্ধানে ব্যস্ত তখন ফজলের চোখ জরিপ করছে সামনে পুবদিকের একটা বাড়ি। কলাগাছ ঘেরা বাড়িটা এখনো অনেক দূরে।

    তার মনে আবার সেই গানের গুঞ্জরন শুরু হয়।

    হলুদ শাড়ি-পরা এক তরুণী কলসি কাঁখে নদীর ঘাটে আসছে। দূর থেকে তাকে চেনা না গেলেও ফজল বুঝতে পারে, সে রূপজান ছাড়া আর কেউ নয়।

    ফজল জোরে জোরে বৈঠায় টান মারে। কিন্তু ডিঙিটা অনেক দূরে থাকতেই তরুণীটি কলসিতে পানি ভরে বাড়ি চলে যায়। অদৃশ্য হয়ে যায় কলাগাছের আবডালে।

    ইস্! আর কিছুক্ষণ আগে যদি সে রওনা দিত! ফজল নিজের ওপর বিরক্ত হয়। আর দশটা মিনিট আগে রওনা দিলেই ঐ বাড়ির ঘাটের কাছে পৌঁছতে পারত সে। দেখা হয়ে যেত রূপজানের সাথে।

    কিন্তু দেখা হলেই বা কি করত ফজল? কি বলত রূপজানকে? রূপজানই বা তাকে কি বলত? ফজল বুঝতে পারে–শুধু চোখে চোখে কথা বলা যেত। চাতক-চোখের পিপাসা কি তাতে কমত, না বাড়ত?

    ঠিকমত হাল না ধরায় ডিঙিটা হঠাৎ ঘুরে যাচ্ছিল। ফজল সংবিৎ ফিরে পেয়ে বৈঠার টানে ডিঙিটা সোজা করে। হাল ঠিক রেখে বেয়ে যায় সামনের দিকে।

    ‘তোরা কুমিরের সন্ধান পাইছসনিরে?’ ফজলের মনে কৌতুক, কিন্তু গলার স্বরে কপট গাম্ভীর্য।

    ‘না, এহন কি আর দ্যাহা যাইব।’ বক্কর বলে।

    ‘একটা হাঁস আইন্যা কিনারে বাইন্দা থুইলে কেমন অয়? হাঁসের প্যাক-প্যাক শোনলে কুমিরগুলা ভাইস্যা ওঠব খাওনের লেইগ্যা।’

    ফজল আর বৈঠা টানছে না এখন। শুধু হাল ধরে বসে থাকে। তার আশা প্রবল বাসনা হয়ে রূপজানের প্রতীক্ষা করে। কিন্তু সে আর নদীর ঘাটে আসে না।

    ডিঙিটা রূপজানদের ঘাট ছাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ফজল বৈঠা না টানলে কি হবে। আগা গলুইয়ে বসে বক্করতো টেনেই চলেছে তার বৈঠা। তাকে তো আর বৈঠা টানতে মানা করা যায় না।

    ফজল কিছুক্ষণ পর পর ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে দিকে তাকায়। তাকাতে গিয়ে তার ঘাড়ে ব্যথা ধরে যায়। কিন্তু রূপজানকে আর ঘাটে আসতে দেখা যায় না।

    দিঘিরপাড় পৌঁছতেই পরিচিত লোকজন, বন্ধু-বান্ধব ফজলকে স্বাগত জানায়। কেউ কেউ তাকে আবেগভরে বুকে জড়িয়ে ধরে। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ডাকাতি মামলার এজাহার দিয়ে তাকে হাজতে পাঠানো, জোর করে তালাকনামায় তার টিপ নেয়া, খুনের চরের দখল বেদখল-পুনর্দখলের ঘটনাবলি, তার বিরুদ্ধে ঘর-পোড়ানো মামলা সাজানোর কারসাজি সবই তারা শুনেছে। শুনে তাদের মনে সমবেদনা ও সহানুভূতি জেগেছে। কে একজন বলে, ‘পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লা বড় বাইড়া গেছিল। মানুষেরে মানুষ বুইল্লা গিয়ান করে নাই। এইবার ফজল মিয়া ওর মিরদিনা ভাইঙ্গা দিছে। ঘোলাপানি খাওয়াইয়া ঠাণ্ডা করছে।’

    দিঘিরপাড়ে চর আর আসুলির জেদাজেদির হা-ডু-ডু খেলার দিন দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে ছিল উত্তেজনা-উৎকণ্ঠা। তার খেলা দেখে সেদিন তারা চমকৃত হয়েছিল। বহুলোক, বিশেষ করে চরের কিশোর-তরুণ-যুবকের দল তার ভক্ত। সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়ায়। কুচক্রী জঙ্গুরুল্লার হাত থেকে খুনের চর উদ্ধার করার জন্য সবাই তার ওপর খুশি। তারা তার বাহাদুরির প্রশংসা করে। উত্তরের প্রত্যাশা না করে নানা প্রশ্ন করে।

    আক্কেল হালদার বাইরে কোথাও গিয়েছিল। এসে ফজলের পরিচয় পেয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, সমাদরের সাথে তার গদিতে নিয়ে যায়। থালা ভরে হরেক রকম মিষ্টি এনে তাকে আপ্যায়ন করে। খেলার তারিখ দিয়ে কেন সে অনুপস্থিত ছিল তার বৃত্তান্ত সে ফজলকে বলে : দক্ষিণপাড় থেকে পাঁচজন নামকরা খেলোয়াড় নিয়ে নৌকা করে ফিরছিল আক্কেল হালদার। পথে তারা গাঙডাকাতের হাতে পড়ে। ডাকাতের ছোরার আঘাতে সে নিজে ও তিনজন খেলোয়াড় আহত হয়।

    বিকেল হয়ে গেছে। ফজল চান্দুকে নিয়ে প্রয়োজনীয় সওদাপাতি কিনে নৌকাঘাটায় আসে।

    তাদের ডিঙির কাছে দাঁড়িয়ে বক্করের সাথে কথা বলছে একটা লোক। তার মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। চুল উষ্কখুষ্ক বিমর্ষ মলিন মুখ। চোখে অসহায় দৃষ্টি। ফজলকে দেখেই লোকটা ডান হাত কপালে ঠেকায়, ‘আস্‌সালামালেকুম মিয়াভাই, আমারে চিনছেন নি?’

    ‘কে? তুমি হেকমত না?’

    ‘হ, মিয়াভাই। কেমুন আছেন?’

    ‘ভালই আছি। তুমি কেমন আছ? কইতন আইলা?’

    ‘আমাগ থাকন আর না থাকন হমান কথা। এহন তো আইলাম হাটেরতন। থাকি অনেক দূরে।’

    ‘কই যাইবা?’

    ‘বাড়ি যাইমু। বাড়ির কাছের একটা নাও-ও পাইলাম না। আমারে এট্টু লইয়া যাইবেন আপনাগ নায়?’

    ‘তোমার বাড়িতে অনেক দক্ষিণে। আমরা তো ঐ দিগ দিয়া যাইমু না।’

    ‘বেশি দূর যাওন লাগব না। আমারে ধলছত্রের কোণায় নামাইয়া দিলে যাইতে পারমু।’

    ‘আইচ্ছা ওঠ নায়।’

    ফজল ও চান্দু নৌকায় ওঠে। তাদের পেছনে ওঠে হেকমত।

    ‘এই চান্দু, এই বক্কর, নাও ছাইড়া দে তাড়াতাড়ি।’ ফজল তাগিদ দেয়। ‘আইজ বাড়িত যাইতে রাইত অইয়া যাইব।’

    ‘হ, উজান বাইয়া যাইতে দেরি তো অইবই।’ চান্দু বলে।

    উজান স্রোত ভেঙে ছলচ্ছল শব্দ করে ডিঙিটা এগিয়ে চলে।

    ‘মিয়াভাই, আইজ হাটে আপনের খুব তারিফ হোনলাম।’ হেকমত বলে। ‘মাইনষে কইতে আছিল–অ্যাকটা মর্দের মতো মর্দ। বাপের ব্যাডা। জঙ্গুরুল্লা ওনার বাপ-দাদার সম্পত্তি খাবলা দিয়া গিল্যা ফালাইছিল। কিন্তু ওরে ঐ সম্পত্তি আর অজম করতে দেয় নাই। প্যাডের মইদ্যেরতন টাইন্যা বাইর করছে।’

    কেউ কোনো কথা বলে না অনেকক্ষণ।

    নীরবতা ভেঙে এক সময়ে ফজল জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কি করো এখন?’

    ‘কী আর করমু। হগলেই তো জানে আমি কী করি। আপনেওতো জানেন। জানেন না?’

    ‘হ, শুনছিলাম। কিন্তু এই কাম ছাইড়া দিতে পারো না? হালাল রুজি কইর‍্যা খাওনা ক্যান?’

    ‘হালাল রুজি করনের কি আর উপায় আছে? আমি এক মহাজনের কাছে বান্দা।’

    ‘মহাজন! কিসের আবার মহাজন?’

    ‘থইলতদার। কাপড়ে-চোপড়ে ভর্দ লোক, গেরামের সর্মানী লোক। তারেই আমরা কই মহাজন। বড় দাপটের মহাজন?’

    ‘তার কাছে বান্দা ক্যান্?’

    ‘সে অনেক বিত্তান্ত। আমাগ মালপত্র সে সামলাইয়া রাখে। বেইচ্যা যা পায় আমাগ কিছু দ্যায় আর বেবাক ওনার প্যাডে যায়। একবার ধরা পইড়া অনেকদিন হাজতে আছিলাম। উনি বলে ছয়শ ট্যাহা খরচ করছিল আমারে ছাড়াইয়া আনতে। আপনের কাছে গোপন করমু না। হেরপর কত কত চুরি করলাম, কত কত মাল-মাত্তা আইন্যা দিলাম। কিন্তু ঐ ট্যাহা বলে শোদই অয় না। দুই-দুই বার পলাইছিলাম। দুইবারই তার পোষা গুণ্ডা দিয়া ধইর‍্যা নিছে। নিয়া হেইযে কী যন্ত্রণা দিছে কি কইমু আপনেরে। পিঠমোড়া বান দিয়া শরীলে বিছা ছাইড়া দিছে, শুঁয়াসম্বল ডইল্যা দিছে, পিডের উপরে বিড়ি নিবাইছে। এই দ্যাহেন।’

    হেকমত গেঞ্জি খুলে পিঠ দেখায় ফজলকে। সারা পিঠে কালো কালো পোড়া দাগ।

    ‘এই দিগে বাড়িত গিয়াও শান্তি নাই। চকিদার-দফাদার খবর পাইলেই দৌড়াইয়া আহে। কয়-ফলনা মারানির পুত, অমুক বাড়িত চুরি করছস। চল থানায়। আমি চর অঞ্চলে এহন চুরি করি না। অথচ কোনোহানে চুরি অইলেই মাইনষে কয়–আর কে করব? হেকমইত্যার কাম। হের লেইগ্যা বাড়িতেও যাইতে ইচ্ছা করে না। মহাজনও বাড়িত যাইতে দ্যায় না। যদি ফির‍্যা না যাই। চুরির খোঁজ-খবর আননের নাম কইর‍্যা মিছা কতা কইয়া অনেকদিন পরপর বাড়িত যাই। অ্যাকদিনের বেশি থাকি না।’

    হেকমত কোমরে লুঙ্গির প্যাঁচে গোঁজা একটা পুটলি বের করতে করতে বলে, ‘আমার শরীলের অবস্থাও ভাল না। শুলবেদনায় বড় কষ্ট পাই। বেদনা উঠলেই প্যাডেরে ঘুস দিতে অয়।’

    হেকমত পাঁচ আঙ্গুলের মাথা দিয়ে পুঁটলি থেকে এক খাবলা সোডা তুলে বলে, ‘এইডা অইল ঘুস। প্যাডেরে ঘুস না দিলে ছাড়াছাড়ি নাই। এক্কেরে কাবিজ কইর‍্যা ফালায়।’

    সে সোডা মুখে দিয়ে নদী থেকে আঁজলা ভরে পানি খায়।

    ফজল নিবিষ্ট মনে শুনছিল হেকমতের সব কথা। যে হেকমতের কথা মনে এলে ঘৃণায় তার সমস্ত শরীর কুঁচকে উঠত, সেই হেকমতের জন্য তার বুক ব্যথায় ভরে ওঠে, তার হৃদয়ে দরদ ও সহানুভূতি জাগে। সে বেদনা-বিহ্বল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে হেকমতের দিকে। কথা বলতে পারে না।

    অনেকক্ষণ পরে সে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার মহাজন কোথায় থাকে? কী নাম তার?’

    ‘নাম দিয়া কি করবেন? উদ্দার করতে পারবেন আমারে?’

    ‘দেখি পারি কি না।’

    ‘কিন্তুক বাড়িত্ আইয়া করমু কি? অ্যাক নল জমিও তো নাই। পারবেন আমারে কিছু জমি দিতে?’

    ‘তুমি যদি ভাল অইয়া যাও, তয় আমি কথা দিলাম, এই পদ্মার উপরে বইস্যা কথা দিলাম, তোমারে আমি জমি দিমু। এইবার কও কী নাম তোমার মহাজনের।’

    ‘আইজ থাউক, মিয়াভাই। দুই-অ্যাক দিনের মইদ্যে আপনের বাড়িত গিয়া কানে কানে কইয়া আইমু।’

    ‘তোমার থলির মইদ্যে কী?’

    ‘কয় সের চাউল। চাউল এত মাংগা অইয়া গেল ক্যান, মিয়াভাই? ট্যাহায় তিন সের। তা-ও আবার চাউলের মইদ্যে ধান আর আখালি।’

    ‘ধলছত্রের কাছে আইয়া পড়ছি।’ বক্কর বলে। ‘আপনে কোহানে নামবেন?’

    ‘ঐ সামনের ঢোনে নামাইয়া দ্যান।’

    ‘আন্দারের মইদ্যে যাইতে পরবা তো?’ ফজল জিজ্ঞেস করে।

    হেকমত হেসে উঠে বলে, ‘আমরাতো আন্দারেরই মানুষ। রাইতের আন্দারই আমাগ পথ দ্যাহায়।’

    হেকমতকে নামিয়ে দিয়ে ডিঙিটা খুনের চরের দিকে এগিয়ে যায়। ফজল তাকিয়ে থাকে পেছনের দিকে, যেদিন দিয়ে যেতে যেতে হেকমত মিশে যায় রাতের অন্ধকারে।

  • ত্রিশ

    ত্রিশ

    চার-পাঁচ দিন আগে কাজের সন্ধানে চরদিঘলি গিয়েছিল জরিনা। সেখানেই সে খবর পায়, জঙ্গুরুল্লার দলকে বিতাড়িত করে এরফান মাতব্বরের দল খুনের চর আবার দখল করেছে।

    জরিনার মন নেচে ওঠে আনন্দে। তবে কি ফজল জেল থেকে খালাস পেয়ে এসেছে? জরিনার মনে হয়, সে খালাস পেয়ে এসেছে। সে না হলে চর দখলের এত সাহস আর কার হবে?

    কয়েকদিন ধরে জরিনা কাজের সন্ধান করছে। খেয়া নৌকায় পার হয়ে সে ঘুরছে এ চর থেকে সে চর। কিন্তু কোথাও কাজ পায়নি। অধিকাংশ গেরস্তের ঘরে খোরাকির ধান নেই। কেউ বেশি দামের আশায় ‘রাখি’ করা পাট বেচে, কেউ নিদানের পুঁজি ভেঙে ধান-চাল কিনছে। অনেকেই হাঁস-মুরগি, খাসি-বকরি বিক্রি করে চাল কিনে খাচ্ছে। চাল তো নয় যেন রূপার দানা। চারদিন কামলা খেটে এক টাকা পাওয়া যায়। সেই এক টাকা বেরিয়ে যায় তিন সের চাল কিনতে। যাদের ঘরে পুরো বছরের খোরাকির ধান আছে, তারাও টিপে টিপে হিসেব করে চলছে আজকাল। তাদের বউ-ঝিরাই এখন ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে ধান ভানছে। ধান-ভানুনিদের আর প্রয়োজন হয় না তাদের। বেহুদা খরচের দিন আর নেই।

    কাজ পাবে না জেনেও জরিনা আজ ভোরেই আবার বেরিয়েছিল। গিয়েছিল বিদগাঁও। বাড়ি বাড়ি ঘুরেও সে কাজ পায়নি। প্রায় সকলের মুখে ঐ এক কথা, ‘ধান পাইমু কই? এহন তো চাউল কিন্যা খাইতে আছি। তোমারে কাম দিমু কেম্বায়?’

    বিদগাঁও থেকে ধু-ধু দেখা যায় খুনের চর। সেখানে বড় বড় কয়েকটা টিনের ঘরও দেখা যায়। একজনকে জিজ্ঞেস করে জরিনা জেনে নেয়, ‘ফজল মাতব্বর ভাটিকান্দি ছেড়ে খুনের চরে বাড়ি করেছে।’

    ঠিকই অনুমান করছিল জরিনা, ফজল জেল থেকে খালাস পেয়ে এসেছে। সে-ই আবার দখল করেছে খুনের চর।

    জরিনা বিদগাঁর উত্তর-পশ্চিম দিকে গিয়ে দাঁড়ায়। নদীর কিনারায় বসে থাকা এক জোড়া মানিকজোড় ভয় পেয়ে উড়ে যায়।

    জরিনা পলকহীন চোখে চেয়ে থাকে খুনের চরের দিকে। সেদিকে কোনো খেয়া নৌকা যায় না। খেয়া থাকলে একবার ঘুরে আসতে পারত সে। ফজলের মা এখনো আদর করে তাকে বসতে দেয়। এখনো তাকে বউ বলে ডাকে। ভাল-মন্দ কিছু তৈরি থাকলে খেতে দেয়। অনেক দুর বলে সে-ই যেতে পারে না। এরফান মাতব্বরের মৃত্যুর খবর পেয়ে গিয়েছিল সে। তারপর আর একবারও যাওয়া হয় নি।

    মানিকজোড় দুটো সোজা খুনের চরের দিকে উড়ে যাচ্ছে।

    আহা রে! তার যদি পাখা থাকতো পাখির মতো!

    হঠাৎ জরিনার মনে হয়, আল্লার দুনিয়ায় পাখিই সর্বশ্রেষ্ঠ জীব। সবচেয়ে সুন্দর প্রাণী। পাখি হাঁটতে পারে, উড়তেও পারে। কে বলে সব সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি মানুষ। মানুষ পাখির মতো উড়তে তো পারেই না, দৌড় দিয়ে ইঁদুরের সাথেও পারে না।

    জরিনা বাড়ির দিকে রওনা হয়। খালি হাতে সে যখন বাড়ি ফিরে আসে তখন বিকেল হয়ে গেছে। শাশুড়ি উঠানে হোগলার ওপর শুয়ে আছে। তার মাথার পাশে পড়ে আছে একটা ছোট কাঁথা। তার ওপর সুই আর সুতা। সে কাঁথা সেলাই করছিল।

    জরিনার ঠোঁটের কোণে কৌতুকের হাসি ফুটে ওঠার সাথে সাথেই আবার মিলিয়ে যায়। একটা নিঃশব্দ বেদনা ঘা দেয় তার বুকে। একটা বংশধরের জন্য শাশুড়ির কত যে আকুতি! তার বিয়ের পর থেকেই নাজুবিবি অধীর প্রতীক্ষায় দিন গুনছে। তার বহু দিনের আশা পূর্ণ হবে এবার। কিন্তু সে যদি জানত তার আশার বাসায় কোন পাখির ডিম!

    জরিনার পায়ের শব্দ পেয়ে নাজুবিবি ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। তার দিকে তাকিয়ে সে কিছুটা ক্ষোভের সাথে বলে, ‘দিন কাবার কইর‍্যা এহন ফিরছস আবাগীর বেডি! নিজের প্যাটটা বুঝিন তাজা কইর‍্যা আইছস?’

    ‘কী যে কন আম্মাজান! এই আকালের দিনে কে কার লেইগ্যা রাইন্দা থোয়?’ উষ্মা মেশানো জবাব দেয় জরিনা। সে বুঝতে পারে, খিদের জ্বালায় মেজাজ ঠিক নেই শাশুড়ির। খিদেয় পেট জ্বলছে তারও, মাথা ঘুরছে, ঝাঁপসা দেখছে চোখে।

    কিন্তু ঘরে যে একটা দানাও নেই!

    জরিনার কথায় রাগের আভাস পেয়ে নাজুবিবি একটু দমে যায়। সে আবার সুই-সুতা নিয়ে কাঁথা সেলাই করতে বসে যায়। জরিনা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে আছে দেখে সে বুঝতে পারে জরিনার রাগ পড়েনি। শেষে সে-ই যেচে কথা বলে, ‘ও মা, মাগো, রাগ অইছস? তুই রাগ অইলে আমি কই যাইমু? যেইডারে প্যাডে রাখলাম, বুকের দুধ খাওয়াইলাম, হেইডা তো গেছে অদস্থালে। হেইডায় না দেখল মা-র কষ্ট, না বুঝল বউর দুষ্ক। তোরে তো প্যাডে রাহি নাই, বুকের দুধ খাওয়াই নাই। তুই তো আমারে ফালাইয়া যাইতে পারস নাই। তুই কাম কইর‍্যা খাওয়াইতে আছস। তুই না থাকলে কোন দিন মইর‍্যা মাডির লগে মিশ্যা যাইতাম। নিজের মা-ও এতহানি করত না। তুই আমার মা-জননী। আমার কতায় রাগ অইস না, মা। প্যাডের জ্বালায় কি কইতে কি কইয়া ফালাইছি।’

    নাজুবিবির কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। তাকে স্নেহময়ী মায়ের মতোই মনে হয় জরিনার। তাই এ নিঃসহায় শাশুড়িকে তার দেখতেই হয়। সে নিজেও নিঃসঙ্গ, নিঃসহায়। শাশুড়ির ওপর মাঝে মাঝে তার রাগ হয়। কিন্তু অসহায় বুড়ির জন্য তার হৃদয়ে যে মমতা সঞ্চিত হয়ে আছে, তার স্পর্শে সে রাগ পানি হয়ে যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই।

    ‘ও মা, মাগো, কতা কস না ক্যান?’ নাজুবিবি কাতর কণ্ঠে আবার বলে।

    ‘কী কইমু? আইজও কাম পাই নাই। না খাইয়া থাকতে অইব আইজ।’

    হঠাৎ জরিনার মনে পড়ে, একটা ডিব্বার ভেতর কিছু খুদ আছে। মুরগির বাচ্চার জন্য সে রেখে দিয়েছিল। কিন্তু বাচ্চা ফুটবে আর কার উমে? মোরগ-মুরগি যে একটাও নেই! খোপসহ সব ক’টা সে বিক্রি করে দিয়েছে অভাবের তাড়নায়।

    জরিনা ঘরে গিয়ে ডিব্বাটা বের করে আনে। পোয়াখানেক খুদ আছে তাতে। কিন্তু ছাতকুরা পড়ে সেগুলো কালচে হয়ে গেছে।

    ডিব্বা খোলার শব্দ পেয়ে উৎসুক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকায় নাজুবিবি। ব্যগ্রতার সঙ্গে সে জিজ্ঞেস করে, ‘কিছু পাইছস, মা?’

    ‘হ, দুগ্‌গা খুদ আছে। জাউ রাইন্দা ফালাই।’

    ‘হ, যা রান্দনের ত্বরাত্বরি রাইন্দা ফ্যাল্। প্যাডের মইদ্যে খাবল খাবল শুরু অইয়া গেছে।’

    জরিনা খুদ কটা ধুয়ে চুলো ধরায়। ঘরের চাল থেকে সে গোটা কয়েক লাউয়ের ডগা কেটে নেয়, গাছ থেকে ছিঁড়ে নেয় কয়েকটা কাঁচা লঙ্কা। তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করে সন্ধ্যার আগেই খেয়ে নিতে হবে। বেশ কিছুদিন ধরে কেরোসিন পাওয়া যাচ্ছে না। তাই কোনো বাড়িতেই বাতি জ্বলে না আজকাল। সন্ধ্যার পর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা, নয়তো বিছানায় গড়াগড়ি দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়া–এ ছাড়া অন্ধকারে আর কিছুই করার উপায় নেই।

    খাওয়া শেষ করে থালা-বাসন মাজা শেষ না হতেই বেলা ডুবে যায়। দোর-মুখে দাঁড়িয়ে দেশলাই জ্বালে জরিনা। কুপির শুকনো সলতেয় আগুন দিয়ে সে ঘরে সাঁঝ-বাতি দেয়। সন্ধ্যার পরই কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার জমাট বাঁধতে শুরু করে।

    মাগরেবের নামাজ পড়ে বউ ও শাশুড়ি হোগলার বিছানায় বসে থাকে। কিন্তু অন্ধকারে কতক্ষণ আর বসে থাকা যায়। আবার মশার উৎপাত শুরু হয়েছে।

    ‘মশা গাঙ পাড়ি দিয়া আহে ক্যামনে?’ বিস্মিত প্রশ্ন নাজুবিবির। ‘আগেতো চর-চঞ্চালে এত মশা আছিল না!’

    ‘মশা আহে মাইনষের লগে লগে।’ জরিনা বলে। ‘পয়লা পরথম দুই-চাইড্‌ডা আহে গায়ে বইস্যা, নায়ে চইড়া। হেরপর চরেই পয়দা অয় হাজারে হাজার।’

    ‘না গো মা, মশার জ্বালায় আর বইস্যা থাকন যায় না। তুই ত্বরাত্বরি মশারি টাঙাইয়া দে, হুইয়া পড়ি।’

    মশারির দুই কোনা টাঙানোই ছিল। অন্ধকারে হাতড়ে জরিনা বাকি দুই কোনা টাঙিয়ে ফেলে। তারপর কপাটে খিল লাগিয়ে সে মশারির ভেতর ঢোকে।

    ‘চাউলের খবর কি, অ্যা মা? দাম কি কমছে?’

    ‘না, দাম আর কমব না।’ বসে বসেই জবাব দেয় জরিনা। ‘যুদ্দ যদ্দিন আছে, দাম বাড়তেই থাকব। কয়দিন আগে আছিল ট্যাহায় চাইর সের। আইজ হুনলাম তিন সের ভাও।’

    ‘যুদ্দূর লগে চাউলের কোন এমুন দোস্তালি! চাউল ভইর‍্যা কি কামান দাগায় নি?’

    ‘হ কামানই দাগায়।’ জরিনা হাসতে হাসতে বলে। ‘কামান ফুডাইতে যদি চাউল লাগত আর চাউল ভইরা একটা কামান যদি মারত আমাগ বাড়ি, হে অইলে কী মজাই না অইত!’

    ‘হ, হে অইলে চাউল টোকাইয়া খাইয়া বাঁচতে পারতাম।’

    ‘হোনেন, চাউলের কাহাত পড়ছে ক্যান্। যুদ্দু অইলে অ্যাক দ্যাশের চাউল অন্য দেশে যাইতে পারে না। আগে দ্যাখছেন না পেগু চাউল? আমাগ দেশে চাউলের আকাল পড়লে বর্মা মুলুকতন ঐ চাউল আইতো।’

    ‘হ, খালি দেখমু ক্যান্, খাইছিও। ঐ চাউল ভাত অয় গাবের দানার মতন মোড়া মোডা।’

    ‘এ পেগু চাউল আর আইতে পারব না।’

    ‘ক্যান?’

    ‘বর্মা মুলুক হুনছি জাপান দখল করছে।’

    জরিনা শাশুড়ির পাশে অন্য একটা বালিশে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে।

    ‘এই যুদ্দু কি আর থামব না! কী তাম্‌শা শুরু করছে মরার যুদ্দু। চাউল মাংগা, কেরাসিন পাওয়া যায় না।’

    ‘হুনছি, কয়দিন পর চাউলও পাওয়া যাইব না।’

    ‘তয়তো মানুষ মইর‍্যা সাফ অইয়া যাইব!’

    ‘হ বাঁচনের আর আশা ভস্‌সা দেহি না।’

    ‘আমাগ কি অইব? আরেকজন আইতে আছে। তারে ক্যামনে বাঁচইমু।’

    জরিনা কোনো কথা বলে না।

    ‘অ্যা মা, চুপ কইর‍্যা আছস ক্যান্? কতা কস না ক্যান?’

    ‘কতা কইতে আর ভাল্‌লাগে না।’

    ‘তয় ঘুমাইয়া থাক। আমিও দেহি ঘুমাইতে পারি নি।’ নাজুবিবি চোখ বুজে ঘুমুবার চেষ্টা করে।

    শরীর ভারী হওয়ার পর থেকেই একটা দুশ্চিন্তা জরিনার মনে বাসা বেঁধেছে। একা থাকলে, বিশেষ করে অন্ধকারে শুয়ে থাকলে দুশ্চিন্তাটা সজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে ওঠে। বিঁধতে থাকে তার হাড়-পাঁজরায়। শাশুড়ি তো আসমানের চাঁদ ধরবার জন্য ‘ডিলকি’ দিয়ে রয়েছে। কিন্তু আর একজন? তার ছেলে? সে-তো জানে, অমাবস্যা রাতে চাঁদ উঠতেই পারে না।

    জরিনা কি করবে ভেবে পায় না। এ বিপদের কথা শুধুমাত্র একজনকেই বলা যায়। সে-ই দিতে পারে পরামর্শ। কিন্তু পরামর্শ দিয়ার আছেই বা কি? তবুও তার কাছে ভেঙে বললে সে হয়ত একটা কিছু বুদ্ধি দিতে পারে। এই সময়ে, এই মুহূর্তে যদি শোনা যেত হট্টিটির ডাক।

    ‘বাড়িডা দেহি আন্দার! বাড়ির মানুষ কি মইরা গেছে নি?’

    হেকমতের গলা। জরিনা আঁতকে ওঠে। কাঁটা দিয়ে ওঠে তার সারা শরীর। তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যায় একটা ঠাণ্ডা কাঁপুনি। সে পায়ের কাছ থেকে কথাটা টেনে নিয়ে শরীরটা ঢেকে দেয়।

    খট-খট-খ। কাঠের দরজায় ঘা দিচ্ছে হেকমত।

    নাজুবিবি কাশি দিয়ে গলা সাফ করে বলে, ‘ক্যাডারে? হেকমত আইছস নি?’

    ‘হ, তোমরা হাউজ্যা বেলায় বাত্তি নিবাইয়া হুইয়া পড়ছ!’

    ‘কি করমু? বাত্তিতে তেল নাই।’ নাজুবিবি উঠে অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে গিয়ে কপাট খুলে দেয়।

    ‘কে, মা? তুমি উঠছ ক্যান্, আরেকজন কই?’

    ‘হুইয়া রইছে। ও মা, ঘুমাইয়া পড়ছস নি?’

    জরিনা চোখ বুজে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকে।

    ‘ওঠতে কওনা ক্যান্? বাত্তি জ্বালাইতে কও।’ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে হেকমত বলে।

    ‘বাত্তি জ্বালাইব ক্যামনে? কইলাম তো কুপিতে তেল নাই।’

    ‘তেল নাই!’

    ‘না, কেরাসিন যে পাওয়া যায় না!’

    ‘কিন্তুক রান্দন তো লাগব। চাউল আনছি।’

    ‘আর কি আনছস?’

    ‘আর কিছু তো আনি নাই।’

    ‘তয় খাবি কি দিয়া?’

    ‘ক্যান, ঘরে নাই কিছু? আণ্ডা তো আছে দুই-একটা।’

    ‘নারে বা’জান, আণ্ডা আইব কইত্তন? মোরগ-মুরগি তো বেবাক বেইচ্যা খাইছি।’

    ‘ডাইল নাই?’

    ‘ডাইলও বুঝিন নাই। অ বউ, ডাইল আছে নি?’

    ‘না। ডাইল তো অনেক দিন ধইর‍্যা নাই। পয়সা পাইমু কই?’ জরিনা শুয়ে শুয়েই জবাব দেয়।

    ‘এহনও হুইয়া রইছে! ওডে না ক্যান্? চাউলের মইদ্যে ধান আর আখালি। এগুলারে বাছতে অইব।’

    ‘আন্দারে ক্যামনে বাছমু?’

    ‘ক্যান্! আন্দারে চুলের জঙ্গল আতাইয়া উকুন বাছতে পারে, আর চাউলের আখালি বাছতে পারব না!’ দিনের বেলা হলে হেকমতের মুখ ভ্যাঙচানো দেখতে পেত জরিনা।

    ‘হ পারমু।‘ নাজুবিবি বলে। ‘কিন্তু ভাত খাবি কি দিয়া? কদুর ডোগা সিদ্দ কইর‍্যা দিলে খাইতে পারবি?’

    ‘দুৎ, দুৎ! খালি কদুর ডোগা কি খাওন যায়! ওরে উঠতে কও দেহি। আঁকিজালডা নামাইয়া দিতে কও। দুইডা খেও দিয়া আহি।’

    ‘জাল তো নাই।’ জরিনা বলে।

    ‘নাই! বাড়িত আইয়া খালি হুনতে আছি নাই আর নাই।’ হেকমত রেগে ওঠে। ‘জাল গেল কই?’

    ‘দফাদারে লইয়া গেছে। অ্যাকদিনের লেইগ্যা কইয়া নিছিল। অ্যাক মাস পার অইয়া গেছে। এহনও দিয়া যায় নাই।’

    ‘হায়রে আল্লাহ! কিয়ের লেইগ্যা বাড়িত আইলাম?’

    একটু থেমে হেকমত বলে, ‘মাছ রাহনের জালিডা আছে তো? না হেইডাও নাই?’

    ‘হেইডা আছে।’

    ‘বাইর কইর‍্যা দে জলদি। দেহি, আতাইয়া কয়ডা গইদ্যা বাইল্যা ধরতে পারি নি।’

    ‘এই আন্দার রাইতে ক্যামনে যাবি, বা’জান?’

    ‘আমাগ আন্দারে চলনের আদত আছে। আন্দারে কি আমাগ আটকাইতে পারে? আর একটু পর চানও ওড্‌ব। দুই রাইত আগেইতো গেছে পূন্‌নিমা।’

    জরিনা অন্ধের মতো হাতড়াতে মাছ রাখার জালটা খুঁজে পায়।

    ‘এই যে ধরুক।’ জরিনা হাত বাড়িয়ে জালটা হেকমতের হাতে দেয়।

    জালের সাথে লাগানো লম্বা সুতলির অন্য প্রান্ত কোমরের তাগায় বাঁধতে বাঁধতে হেকমত বলে, ‘আমি গেলাম। চাউল বাইচ্ছা ভাত চড়াইয়া দে।’

    ‘ত্বরাত্বরিই আইয়া পড়িস, বা’জান।’ নাজুবিবি বলে।

    কোনো কথা না বলে আবছায়ার মতো সরতে সরতে হেকমত আঁধারে মিশে যায়। থলে থেকে কুলায় অল্প অল্প করে চাল ঢেলে অন্ধকারে ধান আর কাঁকর বাছতে শুরু করে বউ আর শাশুড়ি।

    ‘ধানের খুইর মইদ্যে কি আখাইল ভইর‍্যা থুইছিল নি আল্লায়?’ নাজুবিবি বলে।

    জরিনা অন্য কিছু ভাবছিল। শাশুড়ির কথার শেষটুকু শুধু তার কানে যায়। সে বলে, ‘আম্মাজান কি কইলেন?’

    ‘কইলাম, আল্লায় কি ধানের খুইর মইদ্যে আখালি ভইরা থুইছিল? হেইয়া না অইলে চাউলের লগে আখালি আইল কইত্তন?’

    ‘আল্লায় ভরব ক্যান? চাউলের দাম তো বেশি। হের লেইগ্যা ধান আর আখালি মিশাইয়া ওজন বাড়াইছে।’

    ‘দ্যাখ, মানুষ কেমুন জানোয়ার অইয়া গেছে।’

    ‘এক জানোয়ার কি আরেক জানোয়াররে এম্বায় ঠকাইতে পারে?’

    ‘উঁহু না তো! ঠিকই ধরছস। জানোয়ারের মইদ্যে ঠকাঠকির কারবার তো নাই! মানুষ তো দ্যাখতে আছি জানোয়ারেরও অধম অইয়া গেছে।’

    ‘আমার বা’জান কইত, ভাল মানুষ হগল জানোয়ারের থিকা ভাল। আর খারাপ মানুষ খারাপ জানোয়ারের থিকাও খারাপ।’

    ‘হ, কতাডা ঠিকই কইত তোর বাজান। নে মা, ত্বরাত্বরি আত চালা। ও আবার আইয়া পড়ব।’

    জরিনা হাত চালাতে চালাতে আবার অন্যমনস্ক হয়ে যায়। তার আজ মহাবিপদ। রাত পোহালে কি হবে? রাতের অন্ধকারে তাকে দেখতে পায়নি হেকমত। কিন্তু রাত পোহালেই তাকে দেখে সব বুঝতে পারবে সে।

    ‘ও বউ, ও মা, ও আইলেই কুন্তু সুখবরডা দিতে অইব। ও হুনলে যা খুশি অইব!’

    দুশ্চিন্তার অথই দরিয়ায় ডুবে আছে জরিনা। শাশুড়ির কথা সে শুনতে পায় না।

    ‘ও বউ, চুপ মাইরা রইছস ক্যান?’ নাজুবিবি হাত দিয়ে ঠেলা দেয় জরিনার হাতে। ‘কী কইছি, হোনছস? ওরে সুখবর দিলে ও যা খুশি অইব!’

    জরিনার দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে যায়। সে বলে, ‘না, এত হবিরে কওনের দরকার নাই। চান ওঠলে দ্যাখতেই পাইব।’

    ‘উঁহু ওরে কইতেই অইব। তুই এহন আর ঢেঁকির কাম করতে পারবি না। তোরে আর ঐ কাম করতে দিমু না। ওরে কইমু বেশি কইর‍্যা ট্যাহা দিয়া যাইতে।’

    ‘কত ট্যাহাই দ্যায় আপনের পোলা! মনে করছেন ট্যাহার থলি বুঝিন লইয়া আইছে।’

    নাজুবিবি লজ্জিত হয়। সে কথা বলার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।

    জরিনা আবার বলে, ‘আপনের কওনের কোনো দরকার নাই। যা কওনের আমিই কইমু। আপনে গিয়া হুইয়া থাকেন। চাউল আর বাছন লাগব না। আমি রাইন্দা-বাইড়া আপনেরে ডাক দিমু।’

    ‘আবারও খাইতে ডাক দিবিনি? খাইছি তো অ্যাকবার।’

    ‘ঐ খাওন কি প্যাড ভরছে? আবারও খাইবেন আপনের পোলার লগে।’

    ‘আইচ্ছা, আমি তয় হুইয়া থাকি গিয়া। ভাত-সালুন রান্দা অইলে আমারে ডাক দিস।’

    নাজুবিবি ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। জরিনা চুলা ধরিয়ে তার ওপর পানি সমেত ভাতের পাতিল বসিয়ে দেয়। চুলার ভেতর ঘাস-পাতা জ্বলছে। সামান্য সে আলো তার কাছে ভয়ঙ্কর বলে মনে হয়। সে দুজনের ভাতের চাল মেপে, সেগুলো তাড়াতাড়ি কলসির পানিতে ধুয়ে ঢেলে দেয় পাতিলের মধ্যে।

    চুলার কাছে আলোয় বসে থাকতে তার কেমন ভয় ভয় লাগে। সে ঘরে গিয়ে একটা ছেঁড়া শাড়ি নিয়ে আসে। সেটাকে ভাল করে গায়ে জড়িয়ে সে আবার বসে চুলার ধারে। এবার সে অনেকটা স্বস্তি বোধ করে।

    জরিনা ভাবে, ‘হেকমতকে কোনো রকমে খাইয়ে তাড়াতাড়ি বিদায় করা যেত!’

    এই রাতের অন্ধকারেই তাকে যে করে হোক বিদায় করতে হবে। সঙ্কল্পের দৃঢ়তায় তার চোলায় শক্ত হয়, মুষ্টিবদ্ধ হয় দুটি হাত।

    কৃষ্ণ তৃতীয়ার চাঁদ পূর্বদিগন্ত ছেড়ে অনেকটা ওপরে উঠে গেছে। ফিকে হয়ে এসেছে অন্ধকার।

    জরিনা হঠাৎ চিৎকার দিয়ে ওঠে, ‘কে, কে, কেডা অইখানে? কতা কয় না ক্যান?’

    ‘কে, কেডাগো? ও বউ।’ নাজুবিবি চমকে উঠে জিজ্ঞেস করে।

    জরিনা মশারির কাছে গিয়ে নিচু গলায় শাশুড়িকে বলে, ‘টচলাইট জ্বালাইয়া কারা যেন আইতে আছিল। আমি কে কে করছি পর টচ নিবাইয়া দিছে। চইল্যা গেছে না হুতি দিয়া আছে কইতে পারি না। টচের আলোতে দ্যাখলাম তিন-চার জোড়া ঠ্যাঙ। ঠ্যাঙ্গে বুটজুতা। আবছা মতন পাগড়িও দ্যাখলাম মাতায়।’

    ‘তয় কি পুলিস?’

    ‘পুলিস ছাড়া আর পাগড়ি মাতায় দিব কে? আপনের পোলা বাড়িত্ আইছে, এই খবর পাইছে। মনে অয় ধরতে আইছে।’

    ‘ও আল্লাহ্, কী অইব এহন! শান্তিতে দুইডা ভাতও খাইতে দিব না।’

    ‘এহনরি আইল না। আইলে কাইশ্যা বনে পলাইয়া থাকতে কইমু। রান্দা অইলে আমি গিয়া খাওয়াইয়া আইমু।’

    ‘হ, এইডাই ভাল বুদ্ধির কাম। ওইখানতনই চইল্যা যাইতে কইয়া দিস।’

    ‘হ কইয়া দিমু।’

    ভাত রান্না হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। নাজুবিবি লবণ আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে গরম গরম ভাত খেয়ে হেকমতের জন্য কিছুক্ষণ হা-হুঁতাশ করে আবার গিয়ে শুয়ে পড়ে।

    হেকমত এখনো আসছে না কেন, বুঝতে পারে না জরিনা। সত্যিই কি পুলিস এসে গেছে খবর পেয়ে? ওত পেতে আছে কোথাও? তাই দেখেই কি পালিয়ে গেছে হেকমত?

    সে আর আসবে না আজ—জরিনার মনে এ বিশ্বাস চাড়া দিয়ে উঠতেই তার দুশ্চিন্তা কেটে যায়, বন্য খুশিতে নেচে ওঠে মন।

    ঈষৎ ক্ষয়ে যাওয়া গোলাকার চাঁদটা এখন ঠিক মাথার ওপর। রাত দুপুর পার হয়ে গেছে। নাজুবিবি এক ঘুম দিয়ে উঠে বাইরে আসে। চার দিকে তাকায়। জোছনার ঘোলাটে আলোয় দূরের গাছ-পালা বাড়ি-ঘর অস্পষ্ট দেখা যায়। সে ডাকে, ‘ও বউ, ও মা, কই তুমি?’

    জরিনা রসুইঘরের বেড়ার সাথে হেলান দিয়ে ঝিমুচ্ছিল। শাশুড়ির ডাকে ধড়মড়িয়ে উঠে সে বলে, ‘এই তো আম্মাজান, আপনের পোলাতো এহনো আইল না।’

    ‘ওর কি অইল, আল্লা মালুম। মনে অয় পুলিস দেইখ্যা পলাইয়া গেছে।’

    একটু থেমে সে আবার বলে, ‘ও মা, ওরে পুলিসে ধইরা লইয়া যায় নাই তো? তোর কি মনে অয়?’

    ‘কিছুই তো বোঝতে পারলাম না।’

    ‘আইচ্ছা, গাঙ্গে তো কুমির থাকে।’

    হঠাৎ নাজুবিবি ডুকরে কেঁদে ওঠে। ইনিয়ে-বিনিয়ে রুদ্ধ কণ্ঠে বিলাপ করতে শুরু করে, ‘ও আমার বা’জান রে। তোরে না জানি কুমিরে খাইয়া ফালাইছেরে। ও আমার বাজান রে, এ-এ!’

    নাজুবিবির কান্নায় শেষ রাত্রির নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে যায়। জরিনার বুকটাও হঠাৎ বোবা বেদনায় মোচড় দিয়ে ওঠে। বুকটায় তোলপাড় তুলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। তার দুচোখ থেকে অশ্রু ঝরে দরদর ধারায়।

  • একত্রিশ

    একত্রিশ

    খুনের চরের মারামারিতে হেরে যাওয়ায় জঙ্গুরুল্লার সম্মানের হানি হয়েছে অনেক। ফজলের বিরুদ্ধে ঘর পোড়ানো মামলার কারসাজি বানচাল হয়ে যাওয়ায় আরো খোয়া গেছে তার মান-সম্ভ্রম। সে খেলো হয়ে গেছে, মিথ্যাচারী বলে প্রমাণিত হয়েছে আইনের মানুষদের কাছে। স্রোতের তোড়ে তলা ক্ষয়ে যাওয়া নদীর পাড়ের মতো তার প্রভাব-প্রতিপত্তির ভিত ক্ষয়ে গেছে। তার নামের শেষের স্বনির্বাচিত সম্মানসূচক পদবি আর কারো মুখে উচ্চারিত হয় না আজকাল। বরং সহাস্যে উচ্চারিত হয় তার নামের আগের বিশেষণটি।

    জঙ্গুরুল্লা তার কীর্তিধর পা দুটোকে পরিচর্যার জন্যই শুধু একটা চাকর রেখেছে। সে লোকজনের সামনে কাছারি ঘরে গিয়ে বসলেও চাকরটি গিয়ে তার পা টিপতে শুরু করে। লোকজনকে সে বোঝাতে চায় তার পায়ের মূল্য। এ পা সোনা দিয়ে মুড়ে রাখবার ক্ষমতা আছে তার। ফরমাশ দিয়ে এক জোড়া সোনার জুতা বানিয়ে পরলে কেমন হয়? জঙ্গুরুল্লা মাঝে মাঝে ভাবে। তা হলে ‘সোনা-পাইয়া’ বা ও রকম সুন্দর একটা বিশেষণ তার নামের আগে যুক্ত হয়ে যাবে।

    জঙ্গুরুল্লা চেয়ারে বসে পদসেবার জন্য পা দুটো চাকরের কোলের ওপর রেখে আজকাল প্রায়ই চিন্তার অলিগলিতে বিচরণ করে। ভাবে ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের কথা :

    …খুনের চরটা আবার দখল করতে হবে। মাসখানেক পরে তার কোলশরিকদের রোপা আমন ধান পাকবে। তার আগেই ওটা দখল করতে হবে। ব্যর্থ হলে তার হারানো প্রভাব প্রতিপত্তি আর ফিরে আসবে না। পীরবাবার খানকাশরিফ আর বাড়ির কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। পীরবাবা এলে নতুন বাড়িতে তার বসবাসের সুব্যবস্থা করতে হবে। আরশেদ মোল্লার সাথে কথা বলে শুভ দিন ধার্য করে শুভ কাজটা সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু আরশেদ মোল্লাকেই তো পাওয়া যাচ্ছে না। খুনের চর থেকে চুবানি খেয়ে সে যে কোথায় চলে গেছে, তা কেউ বলতে পারে না। বাড়িতে সে নাকি কিছু বলে যায়নি। জামাইর হাতের চুবানি খেয়ে লজ্জায় আত্মহত্যা করেনি তো? আত্মহত্যা করলেও অসুবিধে নেই। ওর বিধবাকে আরো সহজে পথে আনা যাবে। আর কিছুদিন পরেই আসতে শুরু করবে দাদনের ধান। ঐ ধান মজুদ করার জন্য গুদাম তৈরি করতে হবে। দুটো টিনের ঘর কেনা হয়েছে। ওগুলোর টিন দিয়ে তৈরি করতে হবে গুদাম। বড় দারোগা বড় কড়া লোক। সে তার ওপর বড় খাপ্পা। তাকে কিছুতেই বশ করা গেল না। তাকে যদি অন্য থানায় বদলি করানো যেত। থানার দারোগা হাতে না থাকলে কোনো কিছুতেই সুবিধে করা যায় না, কোনো কাজে সফল হওয়া যায় না।

    জঙ্গুরুল্লার সব চিন্তার বড় চিন্তা কি ভাবে ফজলকে জব্দ করা যায়। তার সব কাজের বড় কাজ–কোন্ ফিকিরে ওকে আবার জেলে ঢোকানো যায়।

    হঠাৎই একটা সুযোগ পেয়ে যায় সে। সুযোগ নয়, সে এক মহাসুযোগ। এ যেন রূপকথার মোহরভরা কলসি। হাঁটতে হাঁটতে তার ঘরে এসে হাজির।

    পীরবাবা ভাগ্যকূল এসেছেন–খবর পায় জঙ্গরুল্লা। তাকে আবার কোন মুরিদ দখল করে ফেলে তার কি কোনো ঠিক আছে? এটাও চর দখলের মতোই দুরূহ কাজ।

    খবর পাওয়ার পরেই দিনই মোরগের বাকের সময় সে পানসি নিয়ে ভাগ্যকূল রওনা হয়। পানসি বাওয়ার জন্য তিনজন বাঁধা আছে–একজন হালী ও দু’জন দাঁড়ী। এছাড়াও অতিরিক্ত দু’জন দাড়ী সে সাথে নেয়। যাওয়ার সময় উজান ঠেলে যেতে হবে। বছরের এ সময়ে বাতাস কম। তাই পাল না-ও খাটতে পারে। হয়ত সবটা পথ দাঁড় বেয়ে, গুন টেনে যেতে হবে।

    পানসিতে উঠেই জঙ্গুরুল্লা ওজু করে ফজরের নামাজ পড়ে। নামাজের শেষে হাত উঠিয়ে সে দীর্ঘ সময় ধরে মোনাজাত করে। মোনাজাতের মধ্যে সে আল্লার কাছে অনেক কিছু প্রার্থনা করে। অনেক কিছুর মধ্যে দুটো ব্যাপারে সে বারবার পরম দয়ালু আল্লার সাহায্য প্রার্থনা করে, ‘…ইয়া আল্লাহ, এরফান মাতব্বরের পোলা ফজলরে শায়েস্তা করার বুদ্ধি দ্যাও, শক্তি দ্যাও, সুযোগ দ্যাও। ইয়া আল্লাহ, থানার বড় দারোগা আমার উপরে বড় রাগ, বড় খাপ্পা। ইয়া আল্লাহ, তারে অন্য থানায় বদলি কইর‍্যা দ্যাও। রাব্বানা আতেনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখেরাতে হাসানাতাও ওয়াকেনা আজাব আনার। আমিন।’

    জঙ্গুরুল্লা খাস খোপ থেকে বেরিয়ে ছই-এর সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়।

    ফরসা হয়ে গেছে চারদিক। রক্তরাঙা গোলাকার সূর্য দিগ্বলয় ছাড়িয়ে উঠে গেছে। শিশির ভেজা ধানের শিষ আর কাশফুল মাথা নুইয়ে ভোরের সূর্যকে প্রণাম করছে, স্বাগত জানাচ্ছে। ঝিরঝিরে বাতাসের স্পর্শে শিহরিত রূপালি পানি কুলকুল শব্দে বয়ে যাচ্ছে। উজান ঠেলে, ভাটি বেয়ে বিভিন্ন মোকামের ছোট বড় নানা গড়নের খালি বা মালবোঝাই নৌকা চলাচল করছে। দুটো গাধাবোট টেনে নিয়ে একটা লঞ্চ উত্তরের বড় নদী দিয়ে পুবদিকে যাচ্ছে।

    জঙ্গুরুল্লার পানসি গুনগাঁর খাঁড়িতে ঢোকে। কেরামত হাল ধরে আছে। বাকি চারজন টানছে দাঁড়। কুলোকেরগাঁও বাঁয়ে রেখে, ডাইনগাঁও ডানে রেখে পানসিটা উত্তর-পশ্চিম কোনাকুনি বড় নদীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

    জঙ্গুরুল্লা ডান দিকে তাকায়। ডাইনগাঁয়ে ভাঙন শুরু হয়েছে। সে আবার বাঁ দিকে তাকায়। কুলোকেরগাঁও বড় হচ্ছে পলি পড়ে।

    সামনে ডানদিকে বেশ কিছু দূরে দুটো চিল শূন্যের ওপর মারামারি খামচাখামচি করতে করতে নিচে পড়ে যাচ্ছে। ও দুটো পানিতেই পড়ে যাবে মনে হয়। কিন্তু গায়ে পানি লাগার আগেই একটা চিল রণে ভঙ্গ দিয়ে উড়ে পালায়। তার পিছু ধাওয়া করে অন্যটা। কিছুদুর পর্যন্ত তাড়া করে বিজয়ী চিলটা ফিরে যায় পাড়ের কাছের সেই জায়গাটায়।

    কেরামতের চোখের সামনেই ঘটছে চিলের মারামারি। সে উৎসুক দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছে চিল দুটোর গতিবিধি।

    চিলটা পানির ওপর তীক্ষ্ণ লোলুপ দৃষ্টি ফেলে চক্কর দিচ্ছে আর ছোঁ মারার জন্য তাওয়াচ্ছে। মনে হয় এখনি ছোঁ মারবে। হটে যাওয়া চিলটা ওখানেই যাচ্ছে আবার। বিজয়ী চিলটা আবার ওটাকে দূরে তাড়িয়ে দিয়ে ফিরে যায় সে জায়গায়।

    কেরামত ঠিক বুঝতে পারে না, নদীতে এত জায়গা থাকতে দুটো চিলেরই রোখ ঐ এক জায়গায় কেন? মাছের খনি আছে নাকি ওখানে?

    জায়গাটার কাছাকাছি পশ্চিম দিক দিয়ে এখন যাচ্ছে পানসিটা।

    চিলটা ছোঁ মারে হঠাৎ। নখরে বিঁধিয়ে কী নিয়ে উঠছে ওটা? আরে, একটা জাল যে! জালের একটা মাছও তো বিঁধে আছে নখরে!

    ‘হুজুর দ্যাহেন দ্যাহেন চাইয়া দ্যাহেন চিলের কাণ্ড!’ বিস্মিত কেরামত এক নিশ্বাসে বলে।

    জঙ্গুরুল্লা দেখে, একটা চিল জালের মাছ নখরে বিঁধিয়ে জালসহ ওপর দিকে পাখা ঝাঁপটিয়ে উঠবার চেষ্টা করছে। জালের এক প্রান্তে বাঁধা সুতলির কিছুটা ওপরে উঠে গেছে জালের সাথে। সুতলির আর এক প্রান্ত নিশ্চয়ই পানির নিচে কোনো কিছুর সাথে বাঁধা আছে–ভাবে জঙ্গুরুল্লা। তাই জালটা ওপরে টেনে তুলতে পারছে না চিলটা। জালের ভেতর কয়েকটা মাছও দেখা যাচ্ছে। বিতাড়িত চিলটা এদিকে আসছে আবার। ওটা জালের মাছের ওপর থাবা দেয়ার উপক্রম করতেই দখলদার চিলটা জালসহ মাছ ছেড়ে দিয়ে ওটার পেছনে ধাওয়া করে। জালটা ধপ করে পানিতে পড়ে যায়।

    ‘এই কেরা, নাও ভিড়া জলদি। জালডা কিয়ের লগে বান্দা আছে, দ্যাখন লাগব।’

    কেরামত ও দাড়ীরা সবাই বিস্মিত দৃষ্টিতে জঙ্গুরুল্লার দিকে তাকায়।

    ‘আরে চাইয়া রইছস ক্যান? ত্বরাত্বরি কর।’

    কেরামত নৌকা ঘুরিয়ে কিনারায় জালটার কাছে নিয়ে যায়।

    স্রোতের টানে জালটা ডুবে যাচ্ছে, আবার ওটার এক প্রান্ত ভেসে উঠছে কিছুক্ষণ পরপর। কয়েকটা মরা পেট-ফোলা মাছ চিৎ হয়ে আছে জালের মধ্যে।

    ‘এই কেরা, কিনারে নাও বাইন্দা রাখ। ভাল জাগায় বান্দিস। পাড় ভাইঙা যেন না পড়ে।’

    কেরামত পাড়া গেড়ে নৌকা বাঁধে কিনারায়।

    ‘এই কেরামত, পানিতে নাম। জালের সুতলি ধইর‍্যা ডুব দেয়। দ্যাখ জালডা কিয়ের লগে বান্দা।’

    কেরামত গামছা পরে পানিতে নেমে বলে, ‘এই ফেকু, তুইও আয়। একলা ডর করে।’

    ‘কিয়ের ডর, অ্যা ব্যাডা! এহন ভাটা লাগছে। বেশি নিচে যাওন লাগব না।’

    ফেকুও গামছা পরে পানিতে নামে। জালের সুতলি ধরে দুজনেই ডুব দেয়। একটু পরে গোতলাগুতলি করে দু’জনই ভেসে ওঠে। ভীত সন্ত্রস্ত কণ্ঠে কেরামত বলে, ‘একটা মানুষ!’

    জঙ্গুরুল্লা এটাই অনুমান করেছিল। সে বিস্মিত কণ্ঠে বলে, ‘মানুষ! কেরে মানুষটা? মাথাডা উড়াইয়া দ্যাখ দেখি।’

    ‘আমার ডর লাগে।’ কেরামত বলে।

    ‘দুও ব্যাডা। কিয়ের আবার ডর?’

    নৌকার বাকি তিনজন তাজু, মেছের ও দূরবক্সকে নাম ধরে ডেকে বলে, ‘তোরা তিনজনও পানিতে নাম। বেবাকে মিল্যা মাথাডা উপরে উড়া। কিন্তু সাবধান। লাশটা যেমুন অবস্থায় আছে তেমুনই রাইখ্যা দিতে অইব। বেশি লাড়াচাড়া দিলে স্রোতে টাইন্যা লইয়া যাইব গা।’

    দাঁড়ী তিনজন পানিতে নামে।

    ‘মাথাডা কুনখানে আছে আগে আতাইয়া ঠিক কইর‍্যা ল।’

    কোমর-পানিতে দাঁড়িয়ে তারা আলগোছে লাশের মাথাটা উঁচু করে।

    ‘আরে! এইডা দেহি হেকমইত্যা চোরা!’ তিন-চারজন এক সাথে কলবল করে ওঠে।

    ‘হেকমইত্যা চোরা! ওর বাড়ি কই?’ জঙ্গুরুল্লা জিজ্ঞেস করে।

    ‘এইতো কাছেই পুবদিগে, নয়াকান্দি।’ নূরবক্স বলে।

    ‘ওর বাড়িতে কে আছে?’

    ‘আছে ওর মা আর বউ। আর কেও নাই। কাইল বিয়ালে ওরে দিঘিরপাড় দেখছিলাম। ফজল মাতবরের লগে তার নায় উইট্টা বাড়িত গেল।’

    জঙ্গুরুল্লার মনে হঠাৎ খুশির বান ডাকে। আনন্দের আতিশয্যে তার মুখ দিয়ে কথা বেরোয় না। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। আর মনে মনে আল্লার শোকরগুজারি করে। আজই ভোরে মাত্র কিছুক্ষণ আগে আল্লার সাহায্য প্রার্থনা করে সে মোনাজাত করেছিল। যে ওজু করে সে মোনাজাত করেছিল সে ওজু নষ্ট হওয়ার আগেই তার মোনাজাত কবুল হয়েছে পরম দয়ালু আল্লার দরবারে। এত তাড়াতাড়ি এত তনগদ আল্লা তার মকসেদ পুরা করবে সে তা ভাবতেই পারেনি।

    জঙ্গুরুল্লা তার মনের উল্লাস মনেই চেপে রেখে বলে, ‘এই নূরবক্স, তুই ঠিক দ্যাখছস তো? ঐ নায় আর কে কে আছিল?’

    ‘আর আছিল নাগরার চরের চান্দু। আর একজনরে চিনি নাই।’

    ‘ওগ আর কে কে দ্যাখছে?’

    ‘ঐ সময় দিঘিরপাড় নৌকা ঘাডে যারা আছিল, অনেকেই দ্যাখছে।’

    ‘তোরা বোঝতে পারছস ঘটনাডা কি?’

    সবাই তার মুখের দিকে তাকায়।

    ‘ঘটনাডাতো আয়নার মতন পরিষ্কার। খুন কইর‍্যা ঐখানে ফালাইয়া গেছে।’

    ‘খুন! কারা খুন করছে।’ বিস্মিত প্রশ্ন সকলের।

    ‘হেইডাও বুঝলি না? নূরবক্স কি কইল? কারা ওরে নায়ে কইর‍্যা লইয়া গেছিল?’

    ওরা পানি থেকে নৌকায় উঠতেই জঙ্গুরুল্লা বলে, ‘আরে তোরা উইট্যা গেলিনি। এই ফেকু, তুই আবার পানিতে নাম। জালডা মনে অয় কোমরে বান্দা আছে। জাল খুইল্যা আন। মাছগুলা ফালাইয়া দে।’

    ফেকু ডুব দেয়। জালের সুতলি ধরে ধরে নিচে যায়। কিন্তু সুতলিটা যেখানে গিঠ দিয়ে বাঁধা সেখানে তার হাত যায় না। গিঠটা উপুড়-হয়ে-পড়ে-থাকা লাশটার পেটের দিকে তাগার সাথে। ভয়েই সে আর ওদিকে হাত বাড়ায় না। সে ওপরে উঠে দম নিয়ে আবার ডুব দেয়। দাঁত দিয়ে সুতলিটা কেটে সে জালটা তুলে নিয়ে আসে। মাছগুলোকে জঙ্গুরুল্লার নির্দেশ মতো সে স্রোতে ভাসিয়ে দেয়।

    জঙ্গুরুল্লা চারদিকে তাকায়। দূর দিয়ে দু-একটা নৌকা যেতে দেখা যায়। ধারে কাছে কেউ নেই। একটু পরেই লোকজনের ভিড় জমে যাবে।

    ‘ও তাজু, ও ফেকু, তোরা পাড়ে নাইম্যা থাক।’ জঙ্গুরুল্লা নির্দেশ দেয়। ‘তোরা পাহারা দিবি। আরেকটু পরে খবর পাইয়া মানুষজন আইস্যা ভিড় জমাইব। খবরদার, কাউরে পানি নামতে দিবি না। আমরা থানায় খবর দিতে যাইতে আছি। পুলিস আইয়া লাশ উডাইব।’

    গলা খাদে নামিয়ে সে আবার বলে, ‘তোরা শোন, চিলের কথা, জালের কথা কিন্তু কারো কাছে কইবি না, খবরদার!’

    তাজু ও ফেকু নৌকা থেকে কিছু মুড়ি ও বাতাসা নিয়ে নেমে যায়। পানসিটা রওনা হয় হেকমতের বাড়ির দিকে। পথ চিনিয়ে নিয়ে যায় দূরবক্স।

    রাত না পোহাতেই জরিনাকে নিয়ে নাজুবিবি হেকমতের খোঁজে এলাকার চৌকিদারের কাছে গিয়েছিল। কিন্তু চৌকিদার কোনো খোঁজই দিতে পারেনি। ফিরে এসে ঘরে ঢুকতেই হঠাৎ গলা খাকারি শুনে তারা হকচকিয়ে যায়।

    ‘কে আছে বাড়িতে?’ অপরিচিত ভারী গলায় জিজ্ঞেস করছে কেউ।

    ‘এইতো আমরা আছি। কেডা জিগায়?’ নাজুবিবি পাল্টা প্রশ্ন করে।

    নূরবক্স পা চালিয়ে নাজুবিবির কাছে যায়। নিচু গলায় সে জঙ্গুরুল্লার পরিচয় দেয়।

    ‘ও, পা-না-ধোয়া…’

    ‘চুপ, চুপ!’ নূরবক্স মুখে আঙুল দিয়ে সতর্ক করে দেয় নাজুবিবিকে। ‘কও চদরী সাব।’

    ‘আহেন চদরী সাব।’ নাজুবিবি সাদর আহ্বান জানায়।

    জঙ্গুরুল্লা এসে উঠানে দাঁড়ায়।

    জরিনা পিড়ি এনে শাশুড়ির হাতে দেয়। সে ওটা পেতে দিয়ে বলে, ‘গরিবের বাড়ি হাতির পাড়া। বহেন চদরী সাব।’

    ‘না বসনের সময় নাই। তুমিই হেকমতের মা?’

    ‘হ, হেকমতের কোনো খবর লইয়া আইছেন?’

    ‘হ।’

    ‘কি খবর? জলদি কইর‍্যা কন। আমরা তো চিন্তায় জারাজারা অইয়া গেছি।’

    খবর শোনার পরের পরিস্থিতিটা আঁচ করতে পারে জঙ্গুরুল্লা। সে বলে, ‘খবর পরে অইব। তুমি আর তোমার পুতের বউ চলো আমাগ লগে নৌকায়। থানায় যাইতে অইব।’

    ‘থানায়! ওরে কি থানায় বাইন্দা লইয়া গেছে?’

    ‘পরেই শুনতে পাইবা। এহন তোমরা তৈরি অইয়া লও জলদি।’

    তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাজুবিবি ও জরিনা জঙ্গুরুল্লার পানসিতে উঠে বসে।

    সরু একটা সোঁতা দিয়ে কিছুদূর ভাটিয়ে পানসিটা গুনগাঁর খাঁড়িতে গিয়ে পড়ে। জঙ্গুরুল্লার নির্দেশে ডানদিকে মোড় নিতেই বাঁদিকে লোকজনের ভিড় দেখা যায়।

    দুঃসংবাদটা আর চেপে রাখা ঠিক নয় ভেবে জঙ্গুরুল্লা বলে, ‘হেকমতের মা, তোমরা মনেরে শক্ত করো। যা অইয়া গেছে তার লেইগ্যা কান্দাকাডি করলে আর ফায়দা অইব না।’

    ‘ক্যান, কি অইছে? আমার হেকমত বাঁইচ্যা নাই? ও আমার বা’জানরে।’ নাজুবিবি ডুকরে কেঁদে ওঠে।

    ‘শোন, কাইন্দ না। তোমার পোলারে মাইর‍্যা পানির মইদ্যে ঔজাইয়া থুইয়া গেছে।’

    নাজুবিবি এবার গলা ছেড়ে বিলাপ করতে শুরু করে দেয়, ‘ও আমার হেকমতরে বা’জান। তোরে কোন নির্বইংশায় মাইরা থুইয়া গেছে রে, বা’জানরে আ-মা–র।…’

    জরিনা স্তব্ধ হয়ে গেছে। সে ফুকরে কাঁদতে পারে না। মাথায় লম্বা ঘোমটা না থাকলে দেখা যেত তার দুগাল বেয়ে অশ্রুর ধারা গড়িয়ে তার গলা ও বুক ভিজিয়ে দিচ্ছে।

    ‘শোন হেকমতের মা, আর কাইন্দা কি করবা? কাইন্দা কি আর পুত পাইবা?’ নাজুবিবির বিলাপ মাঝে মাঝে থামে। আর থামার সাথে সাথেই এক সাথে অনেক অশ্রু ঝরঝর করে ঝরে পড়ে। কিছুক্ষণ পর বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে ওঠে। বুকের ব্যথা অসহ্য হতেই সে আবার শুরু করে দেয় বিলাপ।

    জঙ্গুরুল্লা তার বিলাপের বিরতির অপেক্ষায় থাকে। তার বিলাপ থামতেই জঙ্গুরুল্লা বলে, ‘কে মারছে আমরা জাইন্যা ফালাইছি। সাক্ষীও পাইছি।’

    ‘ও আমার বেসাতরে, আমা-া-ার। তোরে না যেন্ কে না যেন্ মাইরা থুইয়া গেছেরে, তার কইলজা ভরতা কইর‍্যা খাইমুরে বাজা-া-ান আমা-া-ার। বংশের চেরাগ প্যাডে থুইয়া ক্যামনে চইল্যা গেলি, বা’জানরে আমা-া-র।…’

    পানসিটা ঘটনাস্থলে এসে থামে। লোকজন নৌকার মাথির কাছে এসে ভিড় করে। তারা নানা প্রশ্ন করে জঙ্গুরুল্লাকে। কারো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু বলে, ‘নয়াকান্দির হেকমতরে খুন কইর‍্যা ঐখানে পানির মইদ্যে জাইয়া থুইয়া গেছে।’

    ‘কে? কে? কে খুন করছে?’ এক সাথে অনেক লোকের প্রশ্ন।

    ‘হেইডা পুলিসে বাইর করব। তোমরা কিন্তু পানিতে নাইম্য না। লাশে আত দিও না। পুলিস আইয়া লাশ উডাইব। আমরা থানায় যাইতে আছি। তোমরা দুইজন দাঁড় টানার মানুষ দিতে পারবানি? ত্বরাত্বরি যাওন লাগব। উচিত পয়সা দিমু, খাওন দিমু। আবার বকশিশও দিমু।’

    ভিড়ের মাঝ থেকে চার-পাঁচজন হাত উঁচিয়ে নৌকায় কাজ করার ইচ্ছে প্রকাশ করে। তাদের মাঝ থেকে দু’জনকে বেছে নেয় জঙ্গুরুল্লা।

    সে নাজুবিবির দিকে ফিরে বলে, ‘ও হেকমতের মা, ঐ যে দেইখ্যা লও। তোমার পোলারে মাইর‍্যা ঐ খানে গুঁজাইয়া থুইছে। পুলিস আইয়া না উড়াইলে দ্যাখতে পাইবা না।’

    নাজুবিবি বিলাপ করতে করতে দাঁড়ায়। তার হাত ধরে দাঁড়ায় জরিনাও। পানির নিচে যেখানে লাশ রয়েছে সেদিকে তাকিয়ে নাজুবিবি আরো জোরে বিলাপ করতে শুরু করে।

    আর দেরি করা ঠিক নয়। জঙ্গুরুল্লার নির্দেশে পানসি দিঘিরপাড়ের দিকে রওনা হয়। সেখান থেকে আরো সাক্ষী যোগাড় করে যেতে হবে থানায়।

    ভাটি পানি, তার ওপর চার দাড়ের টান। পানসিটা ছুটে চলে।

    হেকমতের মা ও বউকে তার খাস খোপে বসিয়ে জঙ্গুরুল্লা তালিম দেয়, থানায় গিয়ে কি বলতে হবে।

    অল্প সময়ের মধ্যেই তারা দিঘিরপাড় নৌকাঘাটায় গিয়ে পৌঁছে। খাস খোপ থেকে বেরুবার আগে জঙ্গুরুল্লা নাজুবিবি ও জরিনাকে আর একবার সাবধান করে দেয়, ‘কি কইছি, কানে গেছে তো? যেম্বায় যেম্বায় কইয়া দিছি, হেম্বায় হেম্বায় কইবা। আমিতো ওয়াদা করছিই, ঠিকঠিক মতন কাম ফতে অইলে কুড়ি নল জমি দিমু তোমাগ। কুড়ি নলে অনেক জমি, পরায় এগারো বিঘা। তোমরা ঠ্যাঙ্গের উপরে ঠ্যাঙ দিয়া রাজার হালে থাকতে পারবা। আর যদি উল্ট-পাল্টা কও, বোঝলানি, তয় আর তোমায় আড্ডি অ্যাকখানও বিচরাইয়া পাওয়া যাইব না, কইয়া দিলাম।’

    জঙ্গুরুল্লা পানসি থেকে নামে। ঘাটের পুবদিকে একটা লঞ্চ দেখা যায়। ওটার পাশেই রয়েছে একটা পানসি। ঘাটের এক পান-বিড়ির দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে সে জানতে পারে, ঐ ‘কুত্তা জাহাজে’ জেলার পুলিস সাব গতকাল দিঘিরপাড় এসেছেন। মূলচরের এক বাড়িতে কয়েক দিন আগে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতদের হাতে তিনজন খুনও হয়েছে। সেই মামলার তদন্তের তদারক করতে এসেছেন জেলার পুলিস সাব। থানার বড় দারোগাও এসেছেন।

    এটাও আল্লার মেহেরবানি বলে মনে করে জঙ্গুরুল্লা। থানা পর্যন্ত তাকে আর কষ্ট করে যেতে হবে না।

    জঙ্গুরুল্লা ঘাটমাঝির সাথে কথা বলে। সে-ও মাতব্বরের সাথে ডিঙিতে চড়ে হেকমতকে যেতে দেখেছে গতকাল বিকেল বেলা। খোঁজ করে এরকম আরো দু’জন সাক্ষী পাওয়া যায়।

    ব্যস। আর দরকার নেই। জঙ্গুরুল্লা তিনজন সাক্ষীর নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা একজনকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়।

    গতকাল দুপুরের পর থেকেই তদন্তের তদারক শুরু করেছেন জেলার পুলিস সুপারিনটেনডেন্ট। মামলার দু’জন প্রধান সাক্ষীকে গতকাল পাওয়া যায়নি। আজ ভোরেই তাদের জবানবন্দি শুনে তিনি তার তদারকের কাজ শেষ করেন।

    বেলা প্রায় দশটা। সশস্ত্র পুলিস-প্রহরী-বেষ্টিত পুলিস সুপার এবং তার পেছনে বড় দারোগা ও স্থানীয় কিছু গণ্যমান্য লোক লঞ্চের দিকে আসছেন। তারা লঞ্চের কাছে আসতেই নাজুবিবি হাত জোড় করে কান্না-জড়ানো কণ্ঠে বলে, ‘হুজুর আমি ইনসাফ চাই। আমার পোলারে খুন কইর‍্যা ফালাইছে।’

    সে আর কিছু না বলে বিলাপ করতে শুরু করে দেয়। বড় দারোগা এগিয়ে এসে নাজুবিবিকে বলেন, ‘এই বুড়ি সরো, সরো, সরে দাঁড়াও সামনে থেকে। আমিই তোমার নালিশ শুনব একটু পরে।’

    পুলিস সুপার বাধা দিয়ে বলেন, ‘ওয়াজেদ, লেট হার স্পীক। ও বুড়ি, কি হয়েছে বলো।’

    নাজুবিবি কাঁদতে কাঁদতে কি বলছে সবটা বুঝতে পারেন না পুলিস সুপার। জঙ্গুরুল্লা নাজুবিবির পাশেই ছিল জরিনাকে নিয়ে। সে নাজুবিবির হয়ে কথা বলতেই পুলিস সুপার বলেন, ‘হু আর ইউ? আপনি কে?’

    ‘আমার নাম জঙ্গুরুল্লা চৌধুরী। আমি চরের মাতব্বর।’

    ‘আচ্ছা, বলুন কি হয়েছে?’

    জঙ্গুরুল্লা ঘটনার বিবরণ দিতে শুরু করে।

    জঙ্গুরুল্লার কাছ থেকে কিছুটা শুনেই পুলিস সুপার বুঝতে পারেন—হেকমত নামের একটা লোককে ফজল নামের কোনো লোক বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করেছে এবং তার লাশ পানির নিচে লুকিয়ে রেখে গেছে। তিনি বড় দারোগাকে ডাকেন, ‘ওয়াজেদ, দিস ইজ আ কেস অব কাপ্যাল হোমিসাইড। তুমি এদের নিয়ে লঞ্চে ওঠো। লঞ্চের কেবিনে বসেই এজাহার নেবে। আমি কেসটা সুপারভাইস করে ওখান থেকেই চলে যাব। তোমার নৌকা লঞ্চের সাথে বেঁধে দাও।’

    মাঝিকে তার পানসিটা লঞ্চের সাথে বাঁধবার নির্দেশ দিয়ে নাজুবিবি ও জরিনাকে নিয়ে বড় দারোগা লঞ্চে ওঠেন।

    জঙ্গুরুল্লা হাতের ইশারায় কেরামতকে ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে নিজে তিনজন সাক্ষী নিয়ে লঞ্চে ওঠে। তাদের দেখে বড় দারোগা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস কনে, ‘এরা কারা?’

    ‘ওরা সাক্ষী।’

    বড় দারোগা জঙ্গুরুল্লার কার্যকলাপ সম্বন্ধে ভাল করেই জানেন। এ ব্যাপারটায় তার উৎসাহ-উদ্যোগ দেখে তার সন্দেহ জাগে। তিনি বলেন, ‘ওদের আমার পানসিটায় উঠিয়ে দিন। আর আপনি সারেং এর কাছে গিয়ে বসুন। তাকে আপনিই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন।’

    শিকলে-বাঁধা উত্তেজিত কুকুরের মতো। ‘ঘঁউ-ঘঁউ-ঘঁউৎ’ শব্দে সিটি বাজিয়ে লঞ্চ রওনা হয়।

    এজাহার নেয়ার আগে বড় দারোগা লঞ্চের দু’নম্বর কেবিনে বসে প্রথমে নাজুবিবি ও পরে জরিনাকে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ঘটনার বর্ণনায় মৃত হেকমতের মা যে বিবরণ দিচ্ছে, তার সাথে একেবারেই মিল খাচ্ছে না মৃতের স্ত্রীর বিবরণ। তিনি পুলিস সুপারের কেবিনে গিয়ে বলেন, ‘স্যার আসল ঘটনাটা কী, বুঝতে পারছি না। শাশুড়ি বলছে এক রকম আর বউ বলছে আর এক রকম। দু’রকম ঘটনা পাচ্ছি।’

    ‘কি রকম?’

    ‘মা বলছে–গতকাল সন্ধ্যার কিছু পরে সের কয়েক চাল নিয়ে হেকমত বাড়ি যায়। তার কিছুক্ষণ পরই এরফান মাতব্বরের ছেলে ফজল মাতব্বর ও আরো দু’জন হেকমতকে ডেকে নিয়ে যায়। ছেলের জন্য ভাত রান্না করে সে আর তার ছেলের বউ সারারাত জেগে প্রতীক্ষা করে। কিন্তু সে আর ঘরে ফেরেনি। ভোরে লোকজনের কাছে খবর পায়, গুনগাঁর খাঁড়ির মধ্যে হেকমতের লাশ পড়ে আছে। আর বউ বলছে–হেকমত গতকাল সন্ধ্যার কিছু পরে সের তিনেক কাঁকর-মেশানো চাল নিয়ে বাড়ি আসে। ঘরে ভাতের সাথে খাওয়ার কিছু না থাকায় সে একটা মাছ রাখার জাল নিয়ে শুধু হাতে গর্তের বেলে মাছ ধরার জন্য নদীতে যায়। বউ আর শাশুড়ি চালের কাঁকর বেছে ভাত রান্না করে বসে থাকে সারা রাত। কিন্তু হেকমত আর ঘরে ফিরে আসে না। ভোরে জঙ্গুরুল্লা এসে বউ আর শাশুড়িকে তার পানসিতে তুলে গুনগাঁর খাঁড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে সে একটা জায়গা দেখিয়ে বলে, হেকমতকে কারা খুন করে ঐ জায়গায় লুকিয়ে রেখেছে।’

    ‘হেকমতকে কে মার্ডার করেছে সে সম্বন্ধে কিছু বলছে বউটা?’

    ‘না স্যার। সে জানে না, এমন কি সন্দেহও করে না, কে তার স্বামীকে মার্ডার করেছে।’

    ‘ঐ যে চৌধুরী, কি চৌধুরী যেন নাম?’

    ‘জঙ্গুরুল্লা চৌধুরী। কিন্তু লোকে বলে, পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লা।’

    ‘পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লা! সেটা আবার কি রকম নাম?’

    ‘চৌধুরী খেতাব নিজে নিয়েছে। আগে নাকি সে অন্যের জমিতে কামলা খাটত। সে সময়ে এক বিয়ের মজলিসে পা না-ধুয়ে ফরাসের ওপর গিয়ে বসেছিল। আর তাতে পায়ের ছাপ পড়েছিল ফরাসে। সেই থেকে তার নাম হয়েছে পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লা।’

    ‘ভেরী ইনটারেস্টিং। পা-না-ধোয়া লঞ্চে এসেছে তো?’

    ‘হ্যাঁ স্যার। লোকটা মিথ্যা মামলা সাজাতে ওস্তাদ।’

    ‘ডাকো তাকে।’

    জঙ্গুরুল্লা এসে পুলিস সুপার জিজ্ঞেস করেন, ‘কি মিয়া চৌধুরী, মামলাটা সাজিয়ে এনেছেন, তাই না?’

    ‘না হুজুর, সাজাইয়া আনমু ক্যান!’

    ‘শাশুড়ি বলছে—হেকমতকে ফজল মাতব্বর ঘর থেকে ডেকে নিয়ে মার্ডার করেছে। আর বউ বলেছে, সে হাতিয়ে মাছ ধরতে গিয়েছিল। সে বলতে পারে না, কে তার স্বামীকে মার্ডার করেছে।’

    তালিম দেয়ার সময় বউটা চুপচাপ ছিল। এত সাবধান করা সত্ত্বেও, এত ভয় দেখানো সত্ত্বেও সে তার নিজের ইচ্ছে মতো যা-তা আবোল-তাবোল বলেছে। জঙ্গুরুল্লার ভেতরটা জ্বলে ওঠে রাগে। মনের আক্রোশে মনেই চেপে সে বলে, ‘হুজুর, ঐ ফজল আছিল বউডার পরথম সোয়ামি। তার লগে এখনো ওর পিরিত আছে। ওর লগে যুক্তি কইরাই ফজল হেকমতরে খুন করছে।’

    ‘অ্যাঁ তাই?’

    ‘হ, হুজুর, ঐ মাগিডারেও অ্যারেস্ট করন লাগব। ফজলের নৌকায় কাইল হেকমতরে দ্যাখা গেছে। সাক্ষীও আছে।’

    ‘কোথায় সাক্ষী?’

    ‘হুজুর, এইখানেই আছে। ডাক দিমু তাগো?’

    ‘হ্যাঁ, তাদের ডেকে নিয়ে আসুন।’

    সারেংকে পথের নির্দেশ দিয়ে ঘাট-মাঝি ও আরো দু’জন সাক্ষীকে জঙ্গুরুল্লা এনে হাজির করে।

    এক এক করে সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন পুলিস সুপার নিজে। তিনজন সাক্ষীই বলে, তারা ফজল, চান্দু ও বক্করের সাথে হেকমতকে নৌকায় করে বাড়ির দিকে যেতে দেখেছে। তারা আরো বলে— হেকমত সিঁদকাটা দাগি চোর। সে যে দাগি চোর তা থানার রেকর্ডে আছে বলে বড় দারোগাও জানান।

    পুলিস সুপারের মনে আর কোনো সন্দেহ নেই। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারেন, বাড়ি যাওয়ার জন্য হেকমত দিঘিরপাড় থেকে ফজলদের নৌকায় ওঠে। পথের কাঁটা সরাবার এটাই সুযোগ মনে করে ফজল ওকে চুরির বা অন্য কিছুর প্রলোভন দেখায়। হেকমত রাজি হয়ে চাল রেখে আসার জন্য বাড়ি যায়। ওর ফিরে আসতে দেরি দেখে ফজল ওর বাড়ি গিয়ে ওকে ডেকে নিয়ে আসে। তরপরই এ হত্যা। তিনি বড় দারোগাকে নাজুবিবির কথা মতো এজাহার নেয়ার আদেশ দেন।

    লঞ্চ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। পুলিস সুপার ও বড় দারোগা কেবিন থেকে বেরিয়ে দেখেন, পাড়ে বহু লোকরে ভিড়। এ-চর ও-চর থেকে বহুলোক হেঁটে, নৌকা করে জমায়েত হয়েছে।

    ভিড়ের মাঝ থেকে কয়েকজন বলে ওঠে, ‘উই যে পাও দ্যাহা যায়।’

    এখন পুরো ভাটা। লাশের দুটো পায়ের পাতা জেগে উঠেছে।

    ঐ হানে ধানখেতের মইদ্যে একটা কালা গঞ্জি পইড়া রইছে। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে কয়েকজন।

    বড় দারোগা দু’জন সেপাই নিয়ে পাড়ে নামেন। জঙ্গুরুল্লাও নামে তাদের সাথে। ধানখেতের এক ধানছোপের ওপর পাওয়া যায় দলামুচড়ি করা একটা কালো গেঞ্জি। ওটার প্যাঁচ ছাড়িয়ে কাগজের একটা ছোট পুটলিও পাওয়া যায়। পুটলির ভেতর কিছু সাদা গুঁড়ো।

    বড় দারোগা গুঁড়োর কিছুটা দুই আঙুলে তুলে ডলা দিয়ে চেনবার চেষ্টা করছেন জিনিসটা কি। তার চেনার আগেই ভিড়ের মাঝ থেকে কয়েকজন বলে, ‘ওগুলা খাওইন্যা সোড়া। শূলবেদনার লেইগ্যা হেকমত খাইত।’

    ওগুলো দেখে পুলিস সুপারের ঠোঁটের কোণে কৌতুকের মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। তিনি তার কথায় রসান দিয়ে বলেন, ‘খুবই ভাল আলামত। খুনিদের তো বেশ বিবেক-বিবেচনা আছে হে। কি বলো ওয়াজেদ?’

    ‘জ্বী স্যার। গেঞ্জি আর সোডা ভিজে নষ্ট হতে দেয়নি খুনিরা। কষ্ট করে গেঞ্জিটা খুলে যত্ন করে রেখে দিয়েছে।’ কৌতুকের হাসি তারও মুখে।

    ‘এ বিবেক-বিবেচনার জন্য খুনিদের পুরস্কার পাওয়া উচিত, কি বলো?’

    ‘জ্বী স্যার, অবিশ্যি পাওয়া উচিত।’

    বড় দারোগার নির্দেশে দু’জন কনস্টেবল ও একজন মাঝি পানিতে নামে। কোমর সমান পানি। পা, বুক ও পেটের তলায় হাত দিয়ে তারা লাশটা ওপরে তুলবার চেষ্টা করে। পা থেকে বুক পর্যন্ত সহজেই ওপরেই উঠছে। কিন্তু মাথার দিকটা বেশি উঠছে না। হাত দিয়ে হাতড়াতে হাতড়াতে তারা বুঝতে পারে, একটা হাত পাড়ের মাটির ভেতর ঢুকে আছে। পানিতে জাবড়ি দিয়ে একজন পা ধরে ও দু’জন হাত ধরে জোরে টান দিতেই হাতটা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে। লাশটা ওপর দিকে তুলতেই দেখা যায়, ওর দৃঢ়মুষ্টির ভেতর একটা পেট-গলে-যাওয়া মরা বেলে মাছ।

    ‘খুন অইছে ক্যাড়া কয়? ব্যাডাতো গদে আত দিছিল।’ ভিড়ের মাঝ থেকে একজন বলে।

    ‘আরে হ খুনই অইছে। আজরাইলে খুন করছে।’ আর একজন বলে।

    ‘হ ঠিকই, গদের মইদ্যেরতন আজরাইলে আত টাইন্যা ধইর‍্যা রাখছিল।’ অন্য একজন বলে।

    ‘আহারে, বাইল্যা মাছ ধরতে আইয়া ক্যামনে মানুষটা মইর‍্যা গেল। কার মরণ যে ক্যামনে লেইখ্যা থুইছে আল্লায়, কেও কইতে পারে না।’ আফসোস করে আরো একজন বলে।

    পুলিস সুপার বড় দারোগাকে নিয়ে পানসিতে নেমে কাছে থেকে লাশ ওঠানো দেখছিলেন। লোকজনের কথাবার্তা তার কানে যায়। তিনি মনে মনে বলেন, লোকগুলো ঠিকই বলছে, সঠিক রায়ই দিয়েছে।

    লাশটাকে তুলে পানসির আগা-গলুইয়ে পাটাতনের ওপর রাখা হয়।

    দু’জন পুলিস অফিসারই তন্নতন্ন করে দেখেন লাশের কোথাও আঘাতের চিহ্ন আছে কিনা। কিন্তু আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না।

    হঠাৎ কোমরের তাগায় বাঁধা এক টুকরো সুতলি দেখতে পান বড় দারোগা।

    ‘স্যার এই দ্যাখেন। এইটের সাথে বাঁধা ছিল মাছ রাখার জালটা। বউটা ঠিকই বলেছিল, মাছ রাখার জাল নিয়ে হেকমত হাতিয়ে বেলে মাছ ধরতে গিয়েছিল।’

    ‘ইয়েস, ইউ আর রাইট। বেলে মাছের জন্য লোকটা গর্তে হাত দিয়েছিল। পানি আর বাতাসের চাপে ‘চোক্‌ড’ হয়ে যাওয়ায় সে আর হাতটা টেনে বার করতে পারেনি। ভেরি ভেরি আনফরচুনেট! মনে হয়, ও যখন জোর করে হাত বার করার চেষ্টা করছিল তখন মুঠোর চাপে মাছটার পেট গলে যায়। মরা মাছটা ‘ডেথক্লাচ’-এর ভেতর আটকে থাকে ডিউ টু ক্যাডাভেরিক স্প্যাজম্।’

    ‘জ্বী স্যার। মেডিক্যাল জুরিসপ্রুডেন্স-এ পড়েছি।’

    বড় দারোগা নিচুস্বরে আবার বলেন, ‘স্যার এইবার জালটা উদ্ধারের চেষ্টা করতে হয়। মনে হয় সুতলিটা কেটে জালটা কেউ নিয়ে নিয়েছে বা ফেলে দিয়েছে।’

    ‘হ্যাঁ, তাই মনে হয়। ডাকো চৌধুরীকে। তাকে এবার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করো।’

    ‘চৌধুরী গেলেন কোথায়? বড় দারোগা হাঁক দেন। এদিকে আসুন জলদি।’

    সবাই এদিক-ওদিক তাকায়।

    ‘আরে! পা-না-ধোয়া চৌধুরী গেল কোথায়?’ বড় দারোগা চারদিকে তাকান।

    ভিড়ের লোকজন এতক্ষণে বুঝতে পারে, বড় দারোগা কোন লোকের খোঁজ করছেন। তারা সবাই জঙ্গুরুল্লার খোঁজ করে। কিন্তু তাকে আর ধারে-কাছে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

    ভিড়ের ভেতর থেকে দু-একজন গালাগাল দিয়ে বলে, ‘হালার ভাই হালায় পলাইছে।’

    ততক্ষণে জঙ্গুরুল্লার পানসি এসে পৌঁছে। বড় দারোগা পানসি তল্লাশি করে ডওরার এক খোপ থেকে মাছ রাখার জালটা উদ্ধার করেন।

    পুলিস সুপার বলেন, ‘এটা পরিষ্কার ইউ. ডি. কেস। অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে লোকটার। তুমি সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করো। কিন্তু পোস্ট মর্টেম না করে মাটি দেয়া যাবে না। পা না-ধোয়া চৌধুরীকে ২১১ ধারায় প্রসিকিউট করার ব্যবস্থা করো। এ কেসের জন্যই লাশাটার ময়না তদন্ত হওয়া দরকার। নয় তো লাশটা মাটি দেয়ার অর্ডার দিয়ে যেতে পারতাম। তুমি লাশটা সাবডিভিশনাল হসপিটালে পাঠাবার ব্যবস্থা করো।’

    একটু থেমে তিনি আবার বলেন, ‘চৌধুরীর মাঝি-মাল্লা আর ঐ বুড়িকে ভাল করে জিজ্ঞাসাবাদ করো। ওদের ধমক দিয়েই জঙ্গুরুল্লার সব কারসাজি বেরিয়ে পড়বে।’

    পুলিস সুপার লঞ্চে ওঠেন।

    লঞ্চটা ‘ঘঁউ-ঘঁউ-ঘঁউৎ’ সিটি বাজিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

  • বত্রিশ

    বত্রিশ

    খুনের চর থেকে অপমানের বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরেই বিছানা নিয়েছিল আরশেদ মোল্লা। অপমানের গ্লানির চেয়ে ভবিষ্যতের ভাবনা তাকে আরো বেশি মুসড়ে দিয়েছিল।

    বেচকচরে বিঘা সাতেক জমি ছিল তার। গত বর্ষার আগের বর্ষায় বিঘা তিনেক পদ্মার জঠরে বিলীন হয়ে গেছে। বাকি চার বিঘা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে গত বর্ষায়। খুনের চরে জঙ্গুরুল্লা তাকে কুড়ি নল–প্রায় এগারো বিঘা জমি দিয়েছিল। অনেক আশা নিয়ে সে রুয়েছিল কনকতারা ধান। সেই চরও বেদখল হয়ে গেছে। বসতভিটা ছাড়া আর এক কড়া জমিও তার নেই। এদিকে চালের দাম দিন দিন বেড়েই চলেছে। বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে সে যে কোথায় যাবে, কি করবে, কি খাবে তার কুল-কিনারা করতে পারছিল না, বাঁচবার কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছিল না সে।

    সোনাইবিবিই শেষে তাকে একটা পথের সন্ধান দেয়। তার সাবেক মনিব ল্যাম্বার্ট সায়েব হয়ত এখনো আছেন নারায়ণগঞ্জে। তাঁর কাছে গেলে তিনি হয়ত তাঁর কুঠিরে বা পাটের গুদামে কোনো একটা কাজে লাগিয়ে দিতে পারেন।

    আশা-নিরাশায় দ্বিধাগ্রস্ত মন নিয়ে আরশেদ মোল্লা নারায়ণগঞ্জ চলে গেছে আজ দশ দিন। এখনো সে ফিরে আসছে না কেন বুঝতে পারে না সোনাইবিবি।

    সন্দেহের দোলায় দুলছে তারও মন। সায়েব কি তাদের এ দুর্দিনে মুখ ফিরিয়ে থাকবেন? কোনো সাহায্যই কি করবেন না?

    সায়েব ও মেমসায়েব দু’জনই তাকে খুব স্নেহ করতেন। মালীর মেয়ে বলে এতটুকু ঘৃণা বা অবজ্ঞা করতেন না। তাঁদের চোখের সামনেই সে বড় হয়ে উঠছিল। খঞ্জন পাখির মতো সে লাফিয়ে বেড়াত সারা বাড়ি। দোলনায় দোল খেত। তাদের পোষা ময়নার সাথে কথা বলত। ফুল-পাতা ছিঁড়ে ফুলদানি সাজাত। কলের গান বাজাত। তার বিয়েতে তাঁরা অনেক টাকা খরচ করেছিলেন। বরকে যৌতুক দিয়েছিলেন নগদ দু’হাজার টাকা।

    সোনাইবিবির স্পষ্ট মনে আছে, চাঁদ রায়-কেদার রায়ের কীর্তি রাজবাড়ির মঠ যেদিন পদ্মার উদরে বিলীন হয়ে যায়, তার ঠিক চারদিন আগে আরশেদ মোল্লা তাকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছিল বেহেরপাড়া। তার চোখের সামনেই সে মঠটা কাত হয়ে নদীতে পড়তে দেখেছে। পড়ার সাথে সাথে বিশাল উত্তাল ঢেউ উঠেছিল। মঠবাসী হাজার হাজার পাখি উড়ছিল আর আর্তচিৎকার করছিল।

    তার বছর তিনেক পর তার মা চন্দ্রভানের মৃত্যুর খবর পেয়ে সে স্বামীর সাথে নারায়ণগঞ্জ গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে শুনতে পায় ল্যাম্বার্টদের একমাত্র সন্তান স্টিফেন বাপ মায়ের সাথে রাগ করে উড়োজাহাজে চাকরি নিয়েছিল। উড়োজাহাজ চালিয়ে সাগর পাড়ি দেয়ার সময় সে সাগরে ডুবে মারা গেছে। একটা অব্যক্ত বেদনায় সোনাভানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল।

    দুবছরের রূপজানকে কোলে নিয়ে সোনাভান মেমসায়েবের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। তিনি শিশুটির দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে চেয়েছিলেন কিছুক্ষণ। তারপর ওকে সস্নেহে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। তক্ষুনি ড্রাইভার পাঠিয়ে ওর জন্য দোকান থেকে দামি কাপড় ও খেলনা আনিয়েছিলেন। ওর মুখে শরীরে পাউডার লাগিয়ে দিয়েছিলেন। নিজের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে দিয়েছিলেন। নতুন ফ্রক পরিয়ে তাকে কোলে নিয়ে গিয়েছিলেন সায়েবের ঘরে। অনেকক্ষণ পর ফিরে এসে বলেছিলেন, ‘মা, সোনাই, তোর মেইয়াটা আমাকে দিয়া দে। আমি পালবো। আমার তো আর কেউ নাইরে, মা!’

    সোনাভান চুপ করে ছিল। শোকার্ত মায়ের অন্তরের আকুতিকে সে মুখের ওপর ‘না’ বলে রূঢ় আঘাত হানতে পারেনি। মেমসায়েব তার মুখ দেখে ঠিকই বুঝেছিলেন, তার মৌনতা সম্মতির বিপরীত লক্ষণ। তাই এ সম্বন্ধে আর কিছু না বলে তিনি শুধু বলেছিলেন, ‘তোর সোয়ামিরে লইয়া কাল ভোরে আমার সঙ্গে দেখা করিস।’

    সোনাভান আশঙ্কা করেছিল, আগামীকালও এই একই প্রস্তাব আসতে পারে। প্রস্তাবের সাথে আসতে পারে অনেক টাকার প্রলোভনও। আরশেদ মোল্লা যে রকম টাকার লোভী, সে কিছুতেই এ সুযোগ পায়ে ঠেলে দেবে বলে তার মনে হয়নি। তাই সে স্বামীর কাছে কিছুই বলেনি। তাকে তাড়া দিয়ে সেদিনই রাতের স্টিমারে রওনা দিয়ে পরের দিন তারা রাজবাড়ি স্টেশনে এসে নেমেছিল।

    মেমসায়েব তার এ অবাধ্য আচরণে নিশ্চয়ই খুব রুষ্ট হয়েছিলেন, বুঝতে পেরেছিল সোনাভান। তার মনে পুষে রাখা সে রাগ কি এতদিনেও মরে যায়নি।

    তারও সাত-আট বছর পর আর একবার সে স্বামীকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ গিয়েছিল তার বাপের মৃত্যুর সময়। সেবার সে রূপজানকে সাথে নিয়ে যায়নি। এমন কি সায়েবের কুঠিতেও যায়নি। যেমন চুপিচুপি গিয়েছিল তেমনি চুপিচুপি তারা আবার ফিরে এসেছিল। তার মনে সব সময় একটা ভয় ছিল–মেমসায়েব হয় তো রূপজানকে নিজের কাছে রাখার জন্য জোরাজুরি করবেন।

    তারপর অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। সেদিনের সোনাভান বয়সের ভারে এখন সোনাইবিবি হয়েছে। সে হিসেব করে দেখে রূপজানকে নিয়ে মেম সায়েবের কাছ থেকে চলে আসার পর ষোল বছর পার হয়ে গেছে। সায়েব-মেম বেঁচে আছেন, না মরে গেছেন, নারায়ণগঞ্জে আছেন, না বিলেত চলে গেছেন–কোনো খবরই তারা রাখে না।

    স্বামীর ফিরে আসতে দেরি দেখে সোনাইবিবিরি মনে হয়, সায়েব ও মেম দু’জনই বা তাদের একজন অন্তত বেঁচে আছেন এবং নারায়ণগঞ্জেই আছেন। তাঁদের কেউ না থাকলে আরশেদ মোল্লার এত দেরি হওয়ার কথা নয়। সে তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরে আসত।

    এদিকে জঙ্গুরুল্লা রোজ দু’বার সকালে ও বিকেলে তোক পাঠিয়ে খবর নিচ্ছে, আরশেদ মোল্লা ফিরে এসেছে কিনা। প্রথম দিন কোরবান ঢালী এসেছিল চার-পাঁচজন লোক নিয়ে। তাদের সে কি হম্বি-তম্বি। তারা আরশেদ মোল্লাকে না পেয়ে জঙ্গুরুল্লার হুকুমে তার মেয়েকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু সোনাইবিবি ঘোমটার আড়াল থেকে কথার আঘাত মেরে তাদের এমন ধুনে দিয়েছিল যে তারা মা-বোনদের মর্যাদাহানিকর কোনো কথা বলতে আর সাহস পায়নি তারপর।

    জঙ্গুরুল্লার লোক রোজই জানতে চায়, আরশেদ মোল্লা কোথায় গেছে। একমাত্র সোনাইবিবিই জানে সে কোথায় গেছে। কিন্তু সে একই কথা বলে তাদের বিদেয় করে, ‘কই গেছে বাড়িতে কিছু কইয়া যায় নাই।’

    দুদিন আগে এদের কাছেই সোনাইবিবি শুনেছে–জঙ্গুরুল্লা ভাগ্যকূল গেছে। সেখান থেকে পীরবাবাকে নিয়ে সে দু-এক দিনের মধ্যেই ফিরে আসবে। পীরবাবা এসে গেলেই রূপজানের সাথে তার বিয়ের শুভকাজটা সম্পন্ন করার জন্য জঙ্গুরুল্লা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠবে।

    কিন্তু পীরবাবার জাদু-টোনায় কোনো কাজই যে হয়নি, কোনো আছরই যে পড়েনি রূপজানের ওপর! পীরের কথা সে শুনতেই পারে না। ফজল জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি এসেছে এবং খুনের চর আবার দখল করেছে শুনে সে যে কী খুশি হয়েছে, তা তার চলনে বলনে স্পষ্ট বোঝা যায়। সে আজকাল বিনা সাধাসাধিতেই খায়-দায়-ঘুমায়, মাথা আঁচড়ায়, সাজগোজ করে।

    বারো দিন পর বাড়ি ফিরে আসে আরশেদ মোল্লা। আসে সারা মুখে খুশির জোছনা মেখে। সায়েব-মেম দুজনেই বেঁচে আছেন এবং ভাল আছেন, কিন্তু বেশ বুড়িয়ে গেছেন। সে নারায়ণগঞ্জে গিয়ে শোনে, সায়েব-মেম দুজনেই কলকাতা গেছেন। তাদের আসার অপেক্ষায় ছিল বলেই তার বাড়ি ফিরতে এত দেরি হয়েছে। কুঠিতে আগেকার বাবুর্চি-খানসামারাই কাজ করছে এখনো। তাদের সাথেই সে ছিল এ কদিন। নিতাইগঞ্জের দুটো গুদাম ছাড়া ল্যাম্ব্যার্ট জুট কোম্পানীর সবগুলো গুদাম এখন মিলিটারির দখলে। তারা সেগুলোর মধ্যে যুদ্ধের রসদ মজুদ করেছে। সোডা-ওয়াটার কারখানাটা দেড় বছর ধরে বন্ধ। ম্যানেজার নাকি অনেক টাকা মেরে নিয়ে উধাও হয়েছে।

    ‘আমারে দেইখ্যা, সায়েব-মেম পরথর চিনতেই পারে নাই।’ আরশেদ মোল্লা বলে।

    ‘চিনব ক্যামনে?’ সোনাইবিবি বলে। ‘তহনতো ওনার দাড়ি আছিল না। দাড়ির লেইগ্যা চিনতে পারে নাই।’

    ‘হ ঠিকই। নাম বললাম পর তারা এত খুশি অইছে যে কি কইমু! জানো, আমাগ বিচরাইতে সায়েব মানুষ পাডাইছিল বেহেরপাড়া। তারা ফিরত গিয়া সায়েবরে কইছে, বেহেরপাড়া নামে একটা গেরাম আছিল। হেই গেরাম এহন পদ্মার প্যাডের মইদ্যে। গেরামের মানুষ কে যে কুনখানে গেছে কেউ কইতে পারে না।’

    ‘হ, ঠিক অইত, বেহেরপাড়ারতন গেলাম চাঁচরতলা, হেইখানতন চাকমখোলা। তারপর আইলাম এই নলতা। এতবার গাঙ্গে ভাঙলে মাইনষে বিচরাইয়া পাইব ক্যামনে?’

    ‘তারা রূপুর কথা বারবার জিগাইছে। রূপু কত বড় অইছে। যহন বললাম, ওর বিয়া দিয়া দিছি, তহন দুইজনের কী রাগ! মেমসাহ কয়–আমারে এই খবরও দিলি না, নিমকহারাম। কার লগে বিয়া দিছস? যহন কইলাম, বড় একজন মাতবরের পোলার লগে বিয়া দিছি। জামাই নিজেই এহন মাতবর, তহন রাগটা এট্টু কমছে। মেমসাব আরো কইছে– বিয়ার খবর পাইলে ওর বিয়ার খরচ-পাত্তি সোনা-গয়না আমিই দিতাম। রূপুরে আর জামাইরে বেড়াইতে যাইতে কইছে। ওগ যাওনের ভাড়া দুইশ ট্যাহা দিয়া দিছে। ওরা গেলে মনে অয় অনেক ট্যাহা-পয়সা দিব, সোনা-গয়না দিব।’

    ‘ইস। মাইনষের কী লোভ। কিন্তুক মিথ্যা কতা কইয়া আইছে ক্যান? মাইয়ার তালাক লইছে, হেই কতা ক্যান্ কয় নাই?’

    ‘হোন রূপুর মা, তোমারে তো কই নাই। রূপুরে মাতবর বাড়ি দিয়া আইমু–এই ওয়াদা কইর‍্যা আইছিলাম খুনের চর ছাইড়া দিয়া আহনের সময়। তুমি কাইল ওরে লইয়া যাইও মাতবর বাড়ি। বিয়াই বাইচ্যা থাকলে আমিই যাইতাম।’

    ‘কিন্তুক তালাক লওয়া মাইয়া ক্যামনে আবার দিয়া আইমু?’

    ‘হোন, জোর কইর‍্যা তালাক নিছিলাম। ঐ তালাক জায়েজ অয় নাই। আমি মুনশি মৌলবিগ জিগাইছিলাম।’

    ‘কিন্তু পা-না-ধোয়া গোঁয়ারডা কি এমনে এমনে ছাইড়া দিব! হে পীরবাবারে আনতে গেছে। লইয়াও আইছে মনে অয়। দিনের মইদ্যে দুইবার ওনার খবর লইতে আছে তার মানুষজন। আরেটু পরেই আবার আইয়া পড়ব।’

    ‘হোন, আমি ঘরের মইদ্যে পলাইয়া থাকমু। ওরা আইলে কইও উনি এহনো আহে নাই। তারপর কাইল রাইত থাকতে তুমি রূপুরে সাথে লইয়া দিয়া আইও মাতবর বাড়ি। তুমি ফির‍্যা আইলে ঘরে তালা দিয়া আমরা কাইলই চইল্যা যাইমু নারায়ণগঞ্জ। জঙ্গুরুল্লা আর আমাগ কিছু করতে পারব না।’

    ‘নারায়ণগঞ্জ যাইব, কিন্তুক কাম-কাইজের কতাত কিছু হুনলাম না।’

    ‘কাম ঠিক অইয়া গেছে। ঐ সোডা-ওয়াটার কারখানা আমারে চালু করতে কইছে সায়েব। উনিই টাকা-পয়সা দিব। এহন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ বিদেশী সৈন্যে ভইরা গেছে। তাগো সরাব খাইতে সোডার পানি লাগে, সায়েব কইছে সোডারপানি এহন খুব চলব। সায়েব কইছে লাভের অর্ধেক আমার। আমাগ থাকনের লেইগ্যা ঘরও ঠিক কইরা দিছে। যাওনের খরচ দিছে তিনশ ট্যাহা। আরো দুইশ দিছে রূপু আর জামাইর যাওনের খরচ।’

    ‘তয় আর দেরি করণের কাম নাই। ঐ দিগে খবর হুনছে? মোখে কাঁপোড় বাইন্দা তিনডা ব্যাডা হেকমইত্যা চোরার বউরে বাড়িরতন জোর কইরা ধইর‍্যা লইয়া গেছে। বউডার আর কোনো খোঁজ-খবর নাই। মাইনষে কয় জঙ্গুরুল্লার লোক বউডারে কাইট্যা গাঙ্গে ফালাইয়া দিছে।’

    ‘ক্যাঁ?’

    ‘ও, উনিতে হুইন্যা যায় নাই! হেকমইত্যা চোরা আতাইয়া বাইল্যা মাছ ধরতে গেছিল। গদে আত দিয়া আত আর টাইন্যা বাইর করতে পারে নাই। মইর‍্যা রইছিল পানি তলে। জঙ্গুরুল্লা ঐ লাশ দ্যাহাইয়া খুনের মামলা দিতে চাইছিল ফজলের বিরুদ্ধে। কিন্তু বউডা সত্য কতা কইছে। জঙ্গুরুল্লার কতা মতন দারোগা-পুলিসের কাছে সাক্ষী দেয় নাই বুইল্যা মামলা টিকাইতে পারে নাই। এই রাগে।’

    ‘এই কয়দিনের মইদ্যে এত কিছু অইয়া গেছে! হোন রূপুর মা, আর দেরি করণ যাইব না। রূপুরে মাতবর বাড়ি দিয়া কাইলই আমরা নারায়ণগঞ্জ চাইল্যা যাইমু।’

    ‘হ, কাইলই যাওন লাগব। উনি এহন আফারে উইট্যা পলাইয়া থাকুক গিয়া।’

    সন্ধ্যার একটু পরেই সাতজন গাট্টাগোট্টা লোক নিঃশব্দে গিয়ে হাজির হয় আরশেদ মোল্লার বাড়ি। তাদের মাথার ফেটা ভুরু পর্যন্ত নামানো। চোখ বাদ দিয়ে সারা মুখ গামছা দিয়া বাঁধা। একজনের মুখমণ্ডল গামছার বদলে সাদা রূমাল দিয়ে বাঁধা। তাদের তিনজনের হাতে ঢাল-শড়কি, দুজনের হাতে ঢাল-রামদা আর দুজনের হাতে লাঠি ও টর্চলাইট। তারা পা টিপে টিপে উত্তর ভিটি ঘরের সামনের দরজার কাছে গিয়ে হাতিয়ারগুলো ঘরের পিড়ার নিচে নামিয়ে রাখে আলগোছে।

    ঘরের দরজা বন্ধ। লাল গামছায় মুখ-বাঁধা দলের একজন ডাক দেয়, ‘মোল্লার পো ঘরে আছেন নি?’

    ‘ক্যাডা?’ ভেতর থেকে সাড়া দেয় সোনাইবিবি।

    ‘জঙ্গুরুল্লা চদরী সাব আমাগ পাডাইছে।’

    ‘উনিতো এহনো বাড়িত আহে নাই।’

    ‘কই গেছে?’

    ‘কই গেছে, কিছু কইয়া যায় নাই।’

    ‘হোনেন, আমাগ পাইছে আপনেগ নেওনের লেইগ্যা। পীরবাবা আইয়া পড়ছে। আইজ বোলে ভাল দিন আছে। আইজই কলমা পড়ান লাগব।’

    ‘উনিতো বাড়ি নাই।’

    ‘উনি বাড়ি নাই, আপনে তো আছেন। আমাগ কইয়া দিছে, মোল্লার পো না থাকলে আপনেরে লইয়া যাইতে। মাইয়া লইয়া, পোলাপান লইয়া চলেন শিগগির।’

    ‘না, আমরা যাইতে পারমু না।’

    ‘হোনেন চাচি, আমরা হুকুমের গোলাম। আমাগ কইছে ভালয় ভালয় না গেলে ধইর‍্যা উকাইয়া লইয়া যাইতে।’

    ‘গোলামের ঘরের গোলামরা কয় কি। তোগ ঘরে কি মা-বইন নাই?’

    ‘দ্যাহেন, গালাগালি দিয়েন না। ভাল অইব না।’

    ‘এক শত্ বার দিমু। তোগ মা-বইনের নিয়া নিকা দে পীরের লগে। আরেক জনের বিয়াতো বউরে ক্যামনে আবার বিয়া দিতে চায় পা-না-ধোয়া শয়তান।’

    ‘আরেকজন তো তালাক দিয়া দিছে।’

    ‘না, জোর কইর‍্যা তালাক লইছে। ঐডা তালাক অয় নাই।’

    ‘আমরা কিছু হুনতে চাই না। মাইয়া বাইর কইর‍্যা দ্যান। আপনেও চলেন পোলাপান লইয়া। পীরবাবা বিয়ার পাগড়ি মাতায় দিয়া বইয়া রইছে।’

    ‘না, আমরা যাইমু না।’

    ‘শিগগির দরজা খোলেন। নাইলে লাইথ্যাইয়া দরজা ভাইঙ্গা ফালাইমু।’

    লাল গামছাধারীর নির্দেশে নিজ নিজ হাতিয়ার হাতে নেয় সবাই।

    পশ্চিম ভিটি ঘরের বাতি নিবে যায় হঠাৎ—

    সবুজ গামছাধারী একজন দরজায় লাথি মেরে দরজা খুলে ফেলে। কয়েকটি ছোট ছেলে-মেয়ে কেঁদে ওঠে ভয়ে।

    একজন টর্চ হাতে আর একজন রামদা হাতে ঘরে ঢোকে। টর্চ মেরে তারা রূপজানের খোঁজ করে।

    সোনাইবিবি বলে, ‘মাইয়া নাই। জামাই আইয়া লইয়া গেছে।’

    ‘মিছা কথা কওনের আর জায়গা পাওনা বেডি!’

    ‘মিছা কতা কিরে।’ রামদা দেখেও সে ঘাবড়ায় না এতটুকু। তার ঘোমটার ভেতর থেকে গালাগালের ভিমরুল ছুটে আসে। কিন্তু লোকগুলো তা গ্রাহ্যের মধ্যেই নেয় না। তারা টর্চ মেরে চৌকির তলা, ধানের ডোল ইত্যাদি খুঁজতে থাকে।

    হৈ-চৈ শুনে ডাকাত পড়েছে মনে করে আশপাশের লোক এগিয়ে আসছে এদিকে। যারা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল তারা চারদিকে টর্চের আলো ফেলে। একজন চিৎকার দিয়ে বলে, ‘খবরদার! এই দিগে আইলে গুলি মাইরা দিমু। যার যার বাড়ি যাও। দরজা বন্দ কইর‍্যা হুইয়া পড় গিয়া।’

    আফারে উঠবার ফাঁকা জায়গা দিয়ে টর্চের আলো ফেলতেই আরশেদ মোল্লা বুঝতে পারে, আর লুকিয়ে থাকা সম্ভব নয়। সে আফার থেকে বলে, ‘খবরদার মাইয়া লোকের গায় আত দিও না। আমি আইতে আছি।’

    সে নিচে নেমে বলে, ‘মাইয়া বাড়িত নাই। জামাই আইয়া লইয়া গেছে। আইছেন যহন বিচরাইয়া দ্যাহেন।’

    সবুজ গামছাধারী টর্চ মেরে তন্নতন্ন করে খোঁজে। আফারে উঠে তালাশ করে, কিন্তু রূপজানকে পাওয়া যায় না।

    বাইরে থেকে লাল গামছাধারী বলে, ‘আরে তোরা আইয়া পড়। কুনখানে আছে বোঝতে পারছি।’

    তারা পশ্চিমভিটি ঘর ঘিরে ফেলে। ঘরের দুটো দরজাই ভেতর থেকে বন্ধ। ‘ঘরে কে আছে, দরজা খোলো।’

    কেউ দরজা খুলছে না দেখে লাল গামছাধারী দমাদম লাথি মারে দরজার ওপর। অর্গল ভেঙ্গে দরজা খুলে যায় আর অমনি ভেতর থেকে শিশি, বোতল, খোঁড়া, বাটি ছুটে আসে লোকগুলোর দিকে। তারা ঢাল দিয়ে সেগুলো ফিরিয়ে আত্মরক্ষা করে। টর্চের আলোয় দেখা যায় রূপজান মরিয়া হয়ে হাতের কাছে যা পাচ্ছে তাই ছুঁড়ে মারছে।

    ‘আরে বোবা মিয়াভাই, ধরেন শিগগির।’ লাল গামছাধারী বলে। ‘আমাগো মাথা ভাইঙ্গা ফালাইব।’

    মুখে সাদা রুমাল-বাঁধা লোকটা ঢাল দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে এগিয়ে যায়।

    রূপজান চিৎকার দিয়ে ওঠে, ‘খবরদার আউগ্‌গাইস্ না। দাও দ্যাখছস্, জবাই কইরা ফালাইমু।’

    বোবা লোকটি এগিয়ে যায়। অন্য একজন লাঠির বাড়ি দিয়ে রূপজানের হাত থেকে দাটা ফেলে দেয়। সে এবার পেছনের দরজা খুলে নদীর দিকে দৌড় দেয়।

    টর্চের আলো অনুসরণ করছে রূপজানকে। সাতজনই এবার তার পেছনে ধাওয়া করে।

    শাড়ির আঁচলে পা আটকে রূপজান মাটিতে পড়ে যায়। তার ওপর টর্চের আলো ফেলে। সবুজ গামছাধারী বলে, ‘ও বোবা মিয়াভাই, ধরেন জলদি। আমাগ তো আবার ধরন মানা।’

    বোবা লোকটি রূপজানকে ধরে ফেলে।

    ‘অ্যাই গোলামের ঘরের গোলাম, খবরদার আমার গায়ে আত দিস না।’

    ‘আরে বাবা মিয়াভাই, পাতালি কোলে কইর‍্যা উড়াইয়া ফালান।’

    বোবা লোকটা রূপজানকে পাঁজাকোলা করে নদীর দিকে এগিয়ে যায়।

    রূপজান হাত-পা ছুঁড়ছে, গালাগাল দিচ্ছে, আর দুহাত দিয়ে খামচে দিচ্ছে বোবা লোকটার শরীর। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে সে এগিয়েই যাচ্ছে। যেতে যেতে সে আঁ-আঁ আঁ শব্দ করে মাথা নেড়ে কিছু একটা ইশারা দেয়।

    ইশারার ভাষা বুঝতে পেরে লাল গামছাধারী বলে, ‘আপনেরা নায় উইট্যা বহেন। আমি আরশেদ মোল্লারে দাওয়াত দিয়া আহি।’

    রূপজানকে কোলে নিয়ে বোবা লোকটা নৌকায় ওঠে। কিন্তু রূপজানের আর সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না এখন। সে মূৰ্ছিত হয়ে পড়েছে।

    লোকটা তাকে শুইয়ে দেয় পাটাতনের ওপর। স্খলিত আঁচল টেনে শরীর ঢেকে দেয়।

    কিছুক্ষণ পর লাল গামছাধারী ফিরে এলে দুটো ডিঙি তাদের নিয়ে রওনা হয়।

    অন্ধকারের মধ্যে কে একজন বলে ওঠে, ‘অ্যাই তোরা এইবার মোখের কাপড় খুইল্যা ফ্যাল। আন্ধারে আর কেও দ্যাখব না। তারা তো ঢাল নিতে চাস্ নাই। ঢাল না নিলে আইজ উপায় আছিল না।’

    ‘হ, শিশি-বোতল যেমনে উদ্দ মারতে আছিল, মাথা একজনেরও আস্ত থাকত না।’ আর একজন বলে।

    ‘হ মাথা ফাঁইট্টা চৌচির অইয়া যাইত।’ অন্য একজন বলে।

    অন্ধকার কেটে ডিঙি দুটো এগিয়ে যায়। বোবা লোকটা সস্নেহে হাত বুলায় রূপজানের গালে, ‘কপালে, মাথায়।’

    অল্প সময়ের মধ্যেই ডিঙি দুটো গন্তব্যস্থানে পৌঁছে যায়। বোবা লোকটা রূপজানকে কোলে নিয়ে নৌকা থেকে নেমে এগিয়ে যায় একটি বাড়ির দিকে। ঘরের কাছে গিয়ে বোবাটা হঠাৎ কথা বলে ওঠে, ‘ও মা, কই তুমি? শিগগির দরজা খোল। তোমার গয়নার মানুষটারে লইয়া আইছি।’

    বরুবিবি দরজা খুলে দেয়। ফজল রূপজানকে শুইয়ে দেয় চৌকির বিছানায়।

    ‘আরে, এক্কেরে মাইরা লইয়া আইছস দেহি।’ ভীত কণ্ঠ বরুবিবির।

    ‘ও কিছু না। বেশ অইয়া গেছে। মোখে পানির ছিডা দ্যাও।’

    ‘ও আমিনা, জলদি পানি আন, দাঁত লাইগ্যা গেছে। ও আমার সোনার চানরে, তোর কি অইলরে!’

    ‘কোনো চিন্তা কইর‍্য না। আমরা অ্যাকটা ফুলের টোকাও দেই নাই। ও-ই আমাগ মারছে।’

    ‘ক্যান, আইতে চায় নাই?’

    ‘জঙ্গুরুল্লার বাড়ি যাইতে চায় নাই। আমরাতো পা-না-ধোয়ার বাড়ি লইয়া যাইতে চাইছিলাম।’

    নূরুর দিকে ফিরে সে বলে, ‘কয়েকটা লটার ডাণ্ডি লইয়া আয় গরুর বাথান তন।’

    নূরু বেরিয়ে গেলে গলা খাদে নামিয়ে সে আমিনাকে বলে, ‘তুই লটা হেঁইচ্যা রস বাইর কর। ঘায়ে লাগইতে অইব। তোর ভাবিসাব আমারে খামচাইয়া কিছু রাখে নাই।’

    বেশ কিছুক্ষণ পর রূপজানের জ্ঞান ফিরে আসে। চোখ খুলেই তার মাথার কাছে উবু হয়ে বসা বরুবিবিকে দেখে সে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর মাথা উঠিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে সে জড়িয়ে ধরে শাশুড়িকে।

    রাত অনেক হয়েছে। ফজলের শিথিল বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে রূপজান বিছানা ছেড়ে ওঠে। বেশ-বাস ঠিক করে। হারিকেনের আলো বাড়িয়ে দেয়।

    ‘আমি বাইরে গেলাম।’ রূপজান বলে। ‘দরজা কিন্তুক খোলা রইল।’

    ‘যাও, আমি চাইয়া রইছি।’ ফজল বলে। ‘গাঙ্গের ঘাটে কিন্তু যাইও না, জিনে ধইর‍্যা লইয়া যাইব।’

    কিছুক্ষণ পর রূপজান ফিরে এসে দেখে, ফজল চিত হয়ে শুয়ে আছে।

    ‘ঐ তাকের উপরে দ্যাখো বাটির মইদ্যে লটার রস আছে।’ ফজল বলে। ‘ঐ রস ঘায়ে লাগাইয়া দ্যাও দেখি।’

    রূপজান বকের পালক ভিজিয়ে ফজলের হাত ও গলার নখের আঁচড়গুলোয় রস লাগাতে লাগাতে বলে, ‘ইস! খামচি লাইগ্যা কি অইছে! তোমারে যদি চিনতে পারতাম, তয় কি এমুন কইর‍্যা খামচাইতাম!’

    ‘খামচিতো আমারে দ্যাও নাই। খামচি দিছ জঙ্গুরুল্লার মানুষরে। তোমার খামচি খাইতে তখন এমুন মজা লাগতে আছিল, কি কইমু তোমারে। তোমার গালাগালিগুলাও বড়ই মিঠা লাগতে আছিল।’

    ‘খামচি বোলে আবার মজা লাগে! গালাগালি বোলে আবার মিঠা লাগে!’

    ‘হ, আমিতো তখন জঙ্গুরুল্লার মানুষ। তখন মনে অইতে আছিল, আরো জোরে খামচি দ্যায় না ক্যান, কামড় দ্যায় না ক্যান? আরে গালাগালি দ্যায় না ক্যান?’

    একটু থেমে ফজল আবার বলে, ‘জোরজবরদস্তি কইর‍্যা তালাক নেওনের সময় তোমার বাপ, জঙ্গুরুল্লা, পুলিসের হাওয়ালদার আর ঐ সাক্ষী হারামজাদারা কইছিল–তুমি আমার ঘর করতে রাজি না। সেই কথা যাচাই করণের লেইগ্যা জঙ্গুরুল্লার মানুষ সাইজ্যা গেছিলাম। তুমি যদি বুইড়্যা পীরের লগে বিয়া বইতে রাজি অইয়া আমাগ নায় উঠতা, তয় কি করতাম জানো?’

    ‘কি করতা?’

    ‘মাঝ গাঙ্গে নিয়া ঝুপপুত কইর‍্যা ফালাইয়া দিতাম পানিতে।’

    রূপজান ফজলের বুকের ওপর ঢলে পড়ে। ফজল তার দুই সবল বাহু দিয়ে তাকে অপার স্নেহে, পরম প্রীতিতে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘আমরা জোড়াবান্দা কইতর-কইতরি। এই দুনিয়া জাহানের কেও আমাগো জোড়া ভাঙতে পারব না, কোনো দিন পারব না।’

  • শব্দ পরিচিতি

    শব্দ পরিচিতি

    সঙ্কেত

    অব্য. — অব্যয়

    আ. — আরবি

    ইং — ইংরেজি

    উ. — উর্দু

    ওল. — ওলন্দাজ

    ক্রি. — ক্রিয়া

    ক্রিবিণ. — ক্রিয়াবিশেষণ

    তা. — তালিম

    তু. — তুরকীয় ভাষা

    প. — পর্তুগীজ

    প্র. — প্রত্যয়

    প্রা. — প্রাকৃত

    প্রা. বাং — প্রাচীন বাংলা

    ফা. — ফারসি

    বি. — বিশেষ্য

    বিণ. — বিশেষণ

    বিপ. — বিপরীত শব্দ

    ম. বাং — মধ্যযুগীয় বাংলা

    লেখ্যরূপ (সাধু) :

    লেখ্য ও কথ্যরূপ (চলিত)

    সং — সংস্কৃত

    সর্ব. — সর্বনাম

    হি. — হিন্দি

    [ ] তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে শব্দের ব্যুৎপত্তি বা জাতি নির্দেশ করা হয়েছে।


    অইব — হইবে : হবে। ক্রি

    অইয়া — হইয়া : হয়ে। ক্রি

    অও — হও। ক্রি

    অওনে — হওয়ায়। ক্রি

    অজম — হজম, পরিপাক। বি আ. হদ্‌ম]

    অদস্থালে — অধঃস্থলে, অধঃপাতে, উৎসন্নে। বি

    অদিষ্ট — অদৃষ্ট, ভাগ্য। বি

    অমুন — এমন। ক্রিবিণ

    অ্যাক মূল্যের — এক মূল্যের।

    অ্যাদে — এই দ্যাখ।

    আইক্‌কা — বাঁশ থেকে কঞ্চি কেটে ফেলার পর কঞ্চির গোড়ার যে অংশ বাঁশের গিঁঠের সাথে থেকে যায়। বি

    আইচ্ছা — আচ্ছা, বেশ। অব্য.

    আইছ — আসিয়াছ : এসেছ। ক্রি

    আইছি — আসিয়াছি : এসেছি। ক্রি

    আইছে — আসিয়াছে : এসেছে। ক্রি

    আইজ — অদ্য : আজ। অব্য.

    আইব — আসিবে : আসবে। ক্রি

    আইলো — আসিল : এল। ক্রি

    আইয়া — আসিয়া : এসে। ক্রি

    আউগ্‌গান — অগ্রসর হওয়া, আগাইয়া যাওয়া : এগিয়ে যাওয়া; আগাইয়া আসা : এগিয়ে আসা।

    আউগ্‌গা — আগাইয়া আয় : এগিয়ে আয়; আগাইয়া যা : এগিয়ে যা। ক্রি

    আউগ্‌গায় — আগাইয়া আসে : এগিয়ে আসে: আগাইয়া যায় : এগিয়ে যায়। ক্রি

    আউত্যা — হাতুয়া, পূর্বের স্বামীর ঔরসজাত যে পুত্র বা কন্যাকে হাতে ধরে কোনো বিধবা বা পরিত্যক্তা স্ত্রী পুনরায় বিয়ে করে নতুন স্বামীর বাড়ি যায়। বিণ

    আউলাপাতালি — এলোপাতাড়ি। বিণ. ক্রিবিণ.

    আওড় — আবর্ত, পাক-খাওয়া নদীর স্রোত বি

    আঁইট্যা — হাঁটিয়া : হেঁটে। ক্রি

    আঁইট্যা — আঁটি, আঁঠি। বি

    আঁউক্‌ড়া — আঁকড়ি, বেতের কাঁটাযুক্ত লতা। বি

    আক্ কইর‍্যা — হাঁ করিয়া : হাঁ করে; মুখ ব্যাদান করে। ক্রি

    আকাম-কুকাম — অপকর্ম ও কুকর্ম; খারাপ ও অন্যায় কাজ। বি

    আক্কল — আক্কেল, বুদ্ধি-বিবেচনা। বি [আ. আক্‌ল্]

    আখালি — কাঁকর, পাথরের বা ইটের ছোট কুচি। বি

    আখেরাত — পরকাল। বি [আ.]

    আছর — জিন, ভূত বা মন্ত্রতন্ত্রের প্রভাব। বি [আ.]

    আছিল — ছিল। ক্রি [প্রা. বাং ও ম. বাং]

    আছোনি? — আছ নাকি?

    আজার — হাজার। বি. বিণ. [ফা. হযার]

    আটকাইছে— আটকাইয়াছে : আট-কিয়েছে। ক্রি

    আটি — বাঁশের শলা দিয়ে তৈরি মাছ ধরার ফাঁ।

    আঁঠাই — অথৈ, গভীর। বিণ.

    আড্‌ডি — হাড্‌ডি, হাড়, অস্থি। বি

    আতিয়ার — হাতিয়ার, অস্ত্রশস্ত্র। বি [হি. হথ্‌থিয়ার]

    আতে — হস্তে, হাতে। বি

    আদমসুরত — কালপুরুষ, নক্ষত্রপুঞ্জ-বিশেষ। বি

    আন্তেশা পিডা — আন্তরসা বা আঁদরসা পিঠা; চালের গুঁড়ি ও গুড় মিশ্রিত তেলে-ভাজা একরকম গোল পিঠা। বি

    আন্দাকুন্দি — অন্ধের মতো।

    আনদুরা-বানদুরা — আঁধার কালো ও বাঁদরমুখো। বিণ

    আফার — খড় বা টিনের চালের নিচে তৈরি পাটাতন বা মাচান। বি

    আবাত্তি — অপরিণত, কচি। বিণ

    আম্মক — আহাম্মক, বোকা, নিরেট মূর্খ। বি. বিণ. [আ. আহমক]

    আমুনে — আমন ধানের গাছ যেমন ধীরে ধীরে বাড়ে ও আউশ ধান গাছের মত ফল দিয়ে তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায় না এমন। বিণ. [বিপ. আউশে]

    আরজু — আকাঙ্ক্ষা প্রার্থনা। বি [আ. আরদ]

    আরেট্টু — আর একটু। বিণ

    আলইকর — হালুইকর। বি [আ. হ’লবাই; হালুয়ায়ী]

    আলাঝিলা — ঝাপসা ছায়া। বি

    আলামত — চিহ্ন, নিদর্শন। [আ.] বি

    আলৈয়াদানা — আলেয়া। বি

    আসুলি — চর নয় এমন সাবেক অর্থাৎ প্রাচীন মাটির স্থান বা লোক। বি

    আহিস — আসিস। ক্রি

    আহেঙ্কাত — আকাঙ্ক্ষা। বি

    ইদ্দত — স্বামীর মৃত্যুর বা তালাক দেওয়ার পরের মুসলমান শাস্ত্র-নির্দিষ্ট তিন মাস দশ দিনের মেয়াদ যা শেষ না হলে পুনর্বিবাহ হতে পারে না। বি

    ইযারি — কাঠের চামচ। বি

    ইসাব — হিসাব : হিসেব। বি [আ. হিসাব]

    উইট্যা — উঠিয়া : উঠে। ক্রি

    উইর‍্যাম — এক প্রকার গাছ যাতে ছোট ছোট কষযুক্ত ফল হয়। এর পাকা ফল হরিয়ালের প্রিয় খাদ্য। বি

    উচকাইয়া — উঁচু করিয়া। ক্রি

    উজাইয়া — উজাইয়া : উজিয়ে। ক্রি

    উডাইতে — উঠাইতে : উঠাতে। ক্রি

    উডাইয়া — উঠাইয়া : উঠিয়ে। ক্রি

    উডানে — উঠানে। বি

    উড়ুক — উঠুক। ক্রি

    উড়কি — নারকেলের মালা দিয়ে তৈরি হাতা। বি

    উধার — ধার, কর্জ। বি [সং উদ্ধার]

    উফায় — উপায়, অভীষ্ট লাভের বা কার্যসাধনের পন্থা বা প্রণালী। বি

    উম — ওম, উষ্ণতা। বি [সং উষ্ণ]

    উরুস — পীরের দরগায় বা পীরের নামে ধর্মোৎসব। [আ. উরস]

    উল্ডাপাল্ডা — উল্টাপাল্টা। বিণ.

    উল্লাগুল্লা — প্রচণ্ডভাবে ওলটানো বা ঘোলানো। বি

    এইডার — এইটার : এটার। সর্ব.

    এইহানে — এইখানে: এখানে। বি

    এট্টুখানিক — একটুখানি। বিণ.

    এডুক — এইটুকু : এটুকু। বিণ.

    এম্বায় — এমনভাবে : এমনিভাবে। ক্রি বিণ.

    এহন — এখন। ক্রি বিণ.

    ঐহানে — ঐখানে। বি

    ওচা — বাঁশের চটা দিয়ে তৈরি মাছ ধরার ত্রিভূজাকৃতি ফাঁদ। বি

    ওডো — উঠ : ওঠ। ক্রি

    ওতঘাত — ওত পেতে আঘাত হানবার কায়দা-কৌশল : ফন্দি-ফিকির। বি

    ওন্‌রা — ওনারা, তাঁরা। সর্ব.

    ওলান — বাঁট, গবাদি পশুর স্তন। বি

    ওস — হিম, শিশির। বি [সং অবশ্যায়, প্রা. ওসাঅ]

    ক’ — বল, বলে ফেল। ক্রি

    কইতন — কোথা হইতে : কোত্থেকে।

    কইত্তন — কোথা ইহতে : কোত্থেকে।

    কইমু — কহিব : কইবো, বলবো। ক্রি

    কইর‍্য — করিও : কোরো। ক্রি

    কইর‍্যা — করিয়া : করে। ক্রি

    কতা — কথা। বি

    কদমবুসি — পায়ে হাত দিয়ে সালাম করা [আ. কদম (পা) + ফা. বুসা (চুম্বন) =পদচুম্বন]

    কবিরা — বড়। বিণ [আ.]

    করণফুল — কানের ফুল। বি [করণ—কর্ণ সং]

    কলকাডি — চাবিকাঠি, সমস্যা সমাধানের উপায়। বি

    করাইত্যা বালি — করাতের দাঁতের মতো বালি অর্থাৎ মোদা দানার বালি।

    কাইজ্যা — ঝগড়া, মারামারি। বি [আ কাদীয়া]

    কাইট্যা — কাটিয়া : কেটে। ক্রি

    কাইন্দা — কাঁদিয়া : কেঁদে। ক্রি

    কাঁজির ভাত — পানিতে গাঁজানো চালের ভাত [সং কাঞ্জিক]

    কাঁডা — কাঁটা। বি

    কাডাকাডি — কাটাকাটি। বি

    কাতলা — যে দুই মোটা খুঁটির মাঝে আড়শলা দিয়ে ঢেঁকি পাতা হয়। বি

    কানাভুলা — যে কল্পিত ভূত পথ ভুলিয়ে অন্য স্থানে নিয়ে যায়। বি

    কান্দাকাডি — কান্নাকাটি, কাঁদাকাটা, বিলাপ।

    কাপড়িয়া — কাপুড়িয়া : কাপুড়ে। বি. বিণ.

    কাফাল — খাদ, গভীর স্থান। বি

    কাবার — শেষ, খতম বি [প. Acaber]

    কাবিজ — কাহিল। বিণ [আ. কাবিয]

    কামে-কাইজে — কাজে-কর্মে।

    কায়ামরা — মৃতকায়, মরার মতো কায়া-বিশিষ্ট। বিণ. [সং কায়, কায়া — শরীর।]

    কালাকষ্টি — কষ্টিপাথরের মতো কালো। বিণ.

    কালামাডি — কালো মাটির স্থান, টাটানগর।

    কিনমু — কিনিব, ক্রয় করিব : কেনব। ক্রি

    কিন্যা — কিনিয়া : কিনে। ক্রি

    কিয়ের লেইগ্যা — কিসের জন্য।

    কুইট্যা — কুটিয়া : কুটে। ক্রি

    কুদাকুদি — লম্ফঝম্প, লাফঝাঁপ। ক্রি [সং কুর্দন]

    কুচ্ছু — কিছু [হি. কুছ]

    কনখানে — কোনস্থানে, কোনখানে, কোথায়। অব্য.

    কুন্তু — কিন্তু। অব্য.

    কুয়ত — শক্তি। বি [আ. কবৎ —বল]

    কুলুপ — দু’হাত দিয়ে ইসক্রুপের (স্ক্রু) মতো দৃঢ়ভাবে চেপে ধরা [ওল. Schroef – স্ক্রু]

    কেরায়া — ভাড়াটে। বিণ. [আ. কিরায়া—ভাড়া]

    কোচের কুতু — কোচের শলা যার মাথায় লোহার সরু ধারালো আচ্ছাদন থাকে।

    কোট — মাটিতে দাগকাটা খেলবার স্থান; চৌহদ্দি, আয়ত্তের স্থান। বি [ইং Court]

    কোলশরিক — শরিকের অধীন শরিক। বি

    কোহানে — কোনখানে। অব্য.

    ক্যাঁ, ক্যান — কেন। অব্য.

    ক্যাডা — কে ওটা। সর্ব.

    ক্যাদা — কর্দম, কাদা। বি

    ক্যামনে — কেমন করিয়া : কেমন করে। অব্য.

    ক্যামবায় — কেমনভাবে, কেমন করে।

    ক্যালার ড্যাম — কলার চারা। বি

    ক্বাজা — বিলম্ব, নামাজ পড়ার নির্দিষ্ট সময় পার হওয়া। [আ. ক্বয়া]

  • অবিশ্বাস্য

    অবিশ্বাস্য

    ‘অবিশ্বাস্য’ তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী রচিত একটি ভৌতিকগল্প সঙ্কলন। গ্রন্থটিতে এগারটি ভৌতিক গল্প রয়েছে। প্রতিটি গল্প পৃথক হলেও কোন গল্পেরই শিরোনাম নেই। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় শ্রাবণ, ১৩৬৯ বঙ্গাব্দে। প্রকাশক : প্রবীর মিত্র। সাহিত্য প্রকাশ, ৫/১, রমানাথ মজুমদার ষ্ট্রীট, কলিকাতা – ৭০০০০৯। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন শতদল ভট্টাচার্য, যদিও সে প্রচ্ছদটি এখন আর পাওয়া যায় না। মুদ্রাকর: গোপাল পাল, স্টার প্রিন্টিং প্রেস, ২১/এ, রাধানাথ বোস লেন, কলিকাতা-৬। এই সংস্করণে গল্পগুলোকে এক থেকে এগারো পর্যন্ত ক্রমিক দিয়ে সাজানো হয়েছে। আমরাও এই দ্বিতীয় সংস্করণটি অনুসরণ করলেও প্রতিটি গল্পের কাহিনী অনুযায়ী আলাদা শিরোনাম প্রদান করেছি অনলাইন পাঠকদের সুবিধার্থে।

    উৎসর্গ

    ৺গিরীন্দ্র সিংহ

    সুদূরতমেষু

  • বলদেওরামের ডেরা

    বলদেওরামের ডেরা

    দিনের বেলায়ও রাতের অন্ধকার নেমে রয়েছে জায়গাটায়। বাইরে থেকে বুঝতে পারা যায় নি অত। অন্য গাঁয়ের ভিতর দিয়ে এখানে আসবার সময় অনেকেই গাড়োয়াল হিমালয়ের এই সিনচুরি বনভূমির অনেক কথাই শুনিয়েছে। এটা রাক্ষুসে অরণ্য। এখানকার রডোডেনড্রন, পাইন আর চীর গাছগুলো একেবারে মানুষখেকো দানবদের বংশধর। গাছ সেজে ঘন জঙ্গলের ফাঁদ পেতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সব। এখনো কত নর-কঙ্কাল এখানে ওখানে পড়ে রয়েছে ভিতরে।

    গ্রামবাসীরা আমাদের—আমি আর আমার সঙ্গী তিনজন বন্ধুর হাত ধরে ধরে অনুরোধ করেছে—দূর পথের ব্যবধান ঘোচাতে এ-জায়গাটা বেছে নেওয়া যেন না হয় মোটে। নিলে বাবুসাবদের বিপদ অনিবার্য। এ বনটা আশ্চর্যভাবে সবুজের নেশা ধরায় পথিকের দু’চোখে। ভিতরে আসবার অদম্য বাসনা উন্মত্ত করে তোলে তাকে। সংযত করে রাখতে পারে না কিছুতেই নিজেকে। নিজের অজান্তেই অরণ্যের ভিতরে চলে আসে পথিক। তারপর চোখের সামনে দেখতে থাকে বেরোবার শত-সহস্র পথ। যে পথেই পা বাড়াক, সেই পথই টেনে নিয়ে যায় ভিতরে—অনেক ভিতরে। অরণ্যের গহন থেকে আরো গহনে।

    গাঁয়ের লোকদের ভীতু ভেবে ওদের কোন কথাই বিশ্বাস করি নি। বরং উপেক্ষা করেছিলুম আমরা। ওদের কথাতেই জায়গাটা দেখবার কৌতূহল জেগে উঠেছিল আরো আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে।

    আমরা এসেছি গ্রামবাসীদের সেই রাক্ষুসে জায়গাটায়। গাছের ফাঁক দিয়ে দিয়ে প্রবেশ করেছিল ভিতরে। চতুর্দিকে সবুজের সমারোহ দেখে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি সকলে। এখানে না এলে, প্রকৃতি শিল্পীর নিপুণ হাতে গাছগাছালি সাজানোর সুন্দর ছবি দেখার একটা অনাস্বাদিত আনন্দ উপভোগ করতে পারতুম না আমরা। যত চারদিক দেখছি তত যেন নিজেদেরই ভুলে যাচ্ছি। দাঁড়িয়ে আছি তত দাঁড়িয়েই আছি সবাই।

    আচমকা চমক ভাঙল আমাদের রেফারীর হুইসিলের মত তীব্র আওয়াজ কানে এসে বাজতে। একটানা আওয়াজটা সকলের কানের পাশে পাশে ঘুরছে। কিসের আওয়াজ এ বনভূমির নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান করে দিল, বুঝে উঠতে পারলুম না কেউ।

    বেরোবার জন্য প্রস্তুত হয়ে, বেরোবার পথে পা বাড়ালুম সবাই। চলছি ত চলছিই। হঠাৎ খেয়াল হল, অরণ্যের অন্ধকার রাজ্যের গহনে তলাতে শুরু করেছি যেন আমরা ধীরে ধীরে।

    টর্চের আলো ফেললুম, বেরুবার অগুণতি পথ দেখতে পেলুম চোখের সামনে। বেছে নিলুম অন্য পথ। এখানেও আগের ভুলই করলুম। টর্চ নিবোতে ঘন অন্ধকারই দেখলুম শুধু। বাইরের আলো নজরে পড়ল না কারো। ছেড়ে ছিলুম এপথও। ধরলুম আর একটা পথ আবার।

    এইভাবে এক এক করে বেশ খানিকক্ষণ পথ পরিবর্তনের পালা চলল আমাদের। এপথ ওপথ সেপথ ধরে বেরুবার বৃথা চেষ্টায় ক্লান্ত হয়ে শেষে বসে পড়লুম চীরগাছ তলায়।

    অরণ্যের অন্ধকূপে বসে আছি চার জনে বেশ বুঝতে পারছি। গ্রামবাসীদের কথা মনে পড়ছে এবার। ওদের সাবধানবাণী বেজে উঠছে আমাদের নিশ্বাসেপ্রশ্বাসে।

    খানিক থেমে থাকার পর হুইসিলের মত আওয়াজটা কানের পরদা ফাটিয়ে তুলতে লাগল আবার।

    কিছুক্ষণ আগের দেখা বনভূমির সৌন্দর্যের নেশা কেটে গেছে আমাদের চোখ থেকে। তার বদলে বনভূমির বিভীষিকার রূপটাই ফুটে উঠছে কেবল চোখের সুমুখে। বেরুবার ব্যর্থ চেষ্টাটাই হতাশা এনে দিয়েছে বেশী করে। হতাশার বোবা যন্ত্রণা স্নায়ুগুলোকে নিস্তেজ করে ফেলছে ক্রমে। মনোবল হারিয়ে ফেলছি আমরা। একটা অজানা আশঙ্কা পেয়ে বসছে সকলকে।

    বসে বসে ভাবছি আমি। অনন্তকাল ধরে এখানে—এই গাছতলায় বসে বসে ভাবলে, কেউ আসবে না। উদ্ধার করে পথ দেখিয়ে নিয়েও যাবে না কেউ। সঙ্গের খাবার ফুরিয়ে যাবে ক’দিন বাদে। নতুন করে খাবার যোগান দিতে আসতে দেখতে পাব না এখানে কাউকে।

    এইভাবে আত্মীয়-স্বজন থেকে চিরবিচ্ছিন্ন হয়েই দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে হবে হয়তো আমাদের একদিন। প্রিয়জনরা নিরুদ্দেশের ডায়েরীতে আমাদের নাম ক’টা লিখে রাখবে শুধু।

    গ্রামের লোকের কথাগুলো মনে-কানে ঘা মারছে থেকে থেকে। মনের ভয় চোখে ছেঁকে ধরেছে কিনা—জানিনে। তবে মনে হচ্ছে সত্যিই যে দেখছি চারপাশের গাছগুলো এক একটা নর-কঙ্কাল। ওদের হাড়ের হাতগুলো উঁচু থেকে আমাদের গলার দিকে এগিয়ে আসছে আস্তে আস্তে।

    রুদ্ধনিশ্বাসে দেখছি আমি—আমি কেন—আমরা চারজনেই এই দৃশ্য দেখছি একসঙ্গে। অসহায় মনে অসহ্য মৃত্যুযন্ত্রণা অনুভব করছি আমরা প্রত্যেকে। এমনই অবস্থা আমাদের যে, হাতের কাছে টর্চ থাকা সত্ত্বেও জ্বালতে পারলুম চারজনের একজনও। অবশ হাত নড়াচড়া করতে পারল না একটুও।

    চার বন্ধুর ঠিকুজি-কুষ্ঠিতে নাকি জাতকের নির্ভীক-দুঃসাহসী প্রকৃতির বর্ণনা করা হয়েছে প্রতি ছত্রে ছত্রে। তবে এ ভয় এ দুর্বলতা কেন? নিজের কাছে নিজেকেও বিস্ময় ঠেকছে। আলো জ্বালবার শেষ চেষ্টা করেও পাথরভারী হাত দু’খান তুলতে পাবলুম না একটুও আমি।

    টর্চের আলো জ্বলল না বটে, কিন্তু সেই মুহূর্তে দূরে লণ্ঠনের আলো চোখে পড়ল আমাদের। অবাক চোখে দেখছি আমরা লণ্ঠনটা এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। মাঝে মাঝে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, আবার দৃষ্টিপথে ভেসে উঠছে। লণ্ঠনটা যেন উঁচুনীচু হয়ে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসছে।

    অদ্ভুত কাণ্ড! শূন্যে ভাসতে ভাসতে লণ্ঠন আসছে। এল। একেবারে সামনা-সামনি এসে থামল। ছাইরঙের সালোর-মির্জাই পরী পাহাড়ী লোকটা লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে আমাদের দিকে চেয়ে। এতক্ষণ লোকটার পরনের পোশাকের রঙ অন্ধকারে মিশে ওকে আমাদের চোখে অদৃশ্য করে রেখেছিল।

    এসময় এই ভাবে এই নিরালা জায়গায় আগন্তুক এল কি করে, কেন এল? প্রশ্ন দুটো জিবের ডগায় এসে থমকে গেল আগন্তুকের স্পর্শে। প্রত্যেককে হাত ধরে ধরে সযত্নে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে হাতের ইঙ্গিতে তাকে অনুসরণ করতে বলল।

    আগন্তুককে অনুসরণ করে চলেছি আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মত।

    মানুষটাকে প্রথমে দেখে কেমন একটা সংশয় জেগে উঠেছিল মনে। শরীরী, অশরীরী? ওর উষ্ণ স্পর্শে সংশয়ের মেঘ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছল নিমেষে। রক্তমাংসের মানুষকেই কাছে পেয়েছিলুম। মনে সাহস এসেছিল। কিন্তু মানুষটাকে দেবতা-প্রেরিত ভাবতে গিয়েও, ভাবতে পারি নি। বিশ্বাস করতে পারি নি ঠিক মত। কেবলি মনে হতে লাগল, এক বিপদ থেকে উদ্ধার হতে গিয়ে আর এক বিপদের ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছি না তো আমরা শেষে! লোকটা হয়তো বনে ঢোকার আগে দেখে থাকবে আমাদের। কাছে কিছু লামসাম আছে ভেবে নিজের খপ্পরে নিয়ে গিয়ে ফেলছে বুঝি। বনের মধ্যে সুযোগ পেয়েও কোন হামলা করতে সাহস করে নি। ঢোকবার মুখে ওকেও নিশ্চয় দেখেছে কেউ—সেই ভয়ে।

    অবিশ্বাসের ওপর অবিশ্বাস আর নানা রকমের অকাট্য যুক্তি তোলপাড় করছে ভিতরে আমার। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি, লোকটার এমনই একটা প্রবল আকর্ষণ যে, মনের মধ্যে যাই হোক না কেন—ওকে অনুসরণ করে আমরা ঠিকই এগিয়ে চলেছি। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে পড়তে পারছি নে, থামতে পারছি নে। আমরা থামতে না পারলে কি হবে—লোকটা নিজেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ চলতে চলতে। লণ্ঠনটা পাশে ঘোরাল। মৌন মুখ খুলল, বলল, এরকম কঙ্কাল এপাশ ওপাশ খুঁজলে পাওয়া যাবে আরো।

    সর্বশরীর শিউরে উঠল আমার। বন্ধুদেরও অবস্থা আমারই মত। লোকটার বিশেষ করে কঙ্কাল দেখানোর উদ্দেশ্য কি—বুঝলুম না। সন্দিগ্ধ মন আমার আরো সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল। মনে হল, স্নায়ু গুলো সতেজ হয়ে উঠেছিল— নিস্তেজ করে দেবার জন্য—মনোবল ফিরে পাচ্ছিলুম—ভেঙে দেবার জন্য নিশ্চয়ই এই পন্থা অবলম্বন। শিকারকে দুর্বল করে রাখলে শিকার করা সহজসাধ্য চতুর শিকারীর।

    চলতে শুরু করল আবার আগন্তুক।

    এবারে পা চলার সঙ্গে মুখ চলাও আরম্ভ হল তার।

    —জায়গাটা ভয়ানক। অনেকেই এখানে এসে ফিরে যেতে পারে নি আর। এসব জানত না শঙ্করলাল। সরল প্রাণেই এসেছিল এলাহাবাদ থেকে পূর্বপুরুষদের গাড়োয়ালের জন্মভিটে দেখতে।

    বাধা দিয়েছিলেন তার বাবা। মা-হারা ছেলেকে মায়ের কথা তুলে বাঁধতে চেষ্টা করেছিলেন। তিমলিগাঁও দেখতে যাবার জিদ থেকে সরাতে চেষ্টা করেছিলেন। মৃত মা-ঠাকুমার ফটোর সামনে ছেলেকে দাঁড় করিয়ে অতীত কাহিনী শুনিয়েছিলেন নতুন করে।

    ঠাকুর্দার রক্তের কণায় কণায় অজানাকে জানবার আহ্বান ছুটোছুটি করে বেড়াত। বাঁধা-ধরার মত ঘরে বেশীদিন স্থির হয়ে থাকতে পারতেন না একদম। সবার অজান্তেই একা নতুন পাহাড় নতুন বনভূমি দেখবার জন্য নিশুতি রাতে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতেন।

    এই ভাবেই একদিন অজানা পথে পাড়ি দিয়ে নিরুদ্দেশ হলেন তিনি। বছরের পর বছর ঘুরল, তবু কোন খোঁজ-খবর পাওয়া গেল না। দেখা মিলল না তাঁর আজ অবধি।

    হয়তো আর এ জগতে নেই তিনি—একথা মৃত্যু অবধি মেনে নেন নি ঠাকুমা। বেঁচে আছেন—এই ধারণা মনে পুষে, এয়োতির চিহ্ন ছিন্ন না করে সধবার সাজেই সেজে থাকতেন তিনি দিনরাত। ওই সাজেই চলে গেলেন।

    বাবাকেও বাইরে বেরুবার নেশা থেকে নিবৃত্ত করেছিল শঙ্করলালের মা। মরণের সময় প্রতিশ্রুতি করিয়ে নিয়েছিলেন তিনি স্বামীকে ছেলেকে বাইরে যেতে দেওয়া যেন না হয়। শ্বশুরের কথা মনে করেই এটা করিয়েছিলেন তিনি।

    মাথা নীচু করে বাবার কথা গুলো শুনল শঙ্করলাল। সংসারের এসব ইতিহাস আগে থেকেই জানা। দশ বছর বয়সে শুনেছে ঠাকুমার কাছে, তারপর মায়ের কাছে। তারপর পূর্ণ যৌবনে এই বাইশ বছর বয়সে শুনল আবার বাবার মুখে।

    বাবার ছলছলে চোখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল বার কয়েক। মন ট লল না, গলল না। জাগল না কোন মমতা। নির্ভীক গলায় জানাল, এটা তো নিছক অ্যাডভেঞ্চার নয়—এটা আদি পুরুষদের জন্ম-ভিটে দেখা। দুটোকে এক করে দেখা ঠিক নয়।

    শঙ্করলালের কাছে বাবার সিদ্ধান্তটা ঠিক নয় মনে হতেই, রাত-দুপুরে চুপিসারে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল ঠাকুর্দার মতই পথে।

    একনাগাড়ে কথাগুলো বলে, একটু থামল আগন্তুক। দম নিল বোধহয়। এবারে আমাদের দিকে মাঝে মাঝে তাকাতে লাগল বলতে বলতে। আগন্তুক বলছে আর চলছে।

    আমরা চলছি আর শুনছি। শুনতে ইচ্ছা করছে না। তবুও কথাগুলো কানে যাচ্ছে আপনা হতেই। মনে হচ্ছে, এসব অপ্রাসঙ্গিক। স্রেফ ভয় ধরানোর জন্যই বানিয়ে বানিয়ে কাহিনীর মালা গাঁথছে লোকটা।

    উত্তেজনায় কেঁপে কেঁপে উঠছে আগন্তুকের কণ্ঠস্বর।

    —সামনের এই নদীটা তখনো বয়ে চলেছিল এইভাবে। তখনো এর বুকের ওপর ওই রকমেরই বড় বড় গাছ দুটো লম্বালম্বি ভাবে পড়েছিল। গাছের সাঁকোর ওপর দিয়ে পা টিপে টিপে বনভূমিতে এসে পৌঁছেছিল শঙ্করলাল।

    ঘুরতে ঘুরতে এ-জায়গাটার কাছ বরাবর আসতেই যে উদ্দেশ্যে আসা ভুলে গেছল একেবারে। তার বদলে এই জায়গাটার মোহই পেয়ে বসেছিল তাকে।

    বনের ভিতর প্রবেশ করে, শোভা দেখতে দেখতে আত্মহারা হয়ে গেছল। হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি শুরু হতে সচেতন হয়ে উঠল, প্রমাদ গণল। গাছের পাতা বেয়ে বেয়ে বৃষ্টির বরফজলের বড় বড় ফোঁটা পড়ছে মাথায় গায়ে। বাতাস বইছে শন শন করে, থরথরিয়ে কেঁপে উঠছে বনভূমি। মনে হচ্ছে মহাকালের কবলে পড়ে নাকানি-চুবানি খাচ্ছে। নাভিশ্বাস উঠছে।

    স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না কোন গাছের তলাতেই শঙ্করলাল। কেবলি এটা ছেড়ে ওটা, ওটা ছেড়ে সেটার তলায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। আকাশের তলায় গাছের ছাদ নড়ছে বড় বেশি। গাছ গুলোর মাথা ভেঙে ভেঙে ছাদের জোড় খুলে গিয়ে শঙ্করলালের মাথায় পড়ে বুঝি এখুনি।

    মৃত্যুত্রাসে বুদ্ধিভ্রম হল শঙ্করলালের। দিশেহারা হয়ে ছুটতে লাগল চতুর্দিকে। বনভূমি থেকে বেরিয়ে যাবে প্রাণ বাঁচাতে। নদীর ধারে এসে দাঁড়াল। খরস্রোতা নদী তখন ভীষণ মূর্তি ধরেছে। ওর দুর্দান্ত বেগ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে কোথায় গাছদুটোকে। উধাও হয়েছে গাছের সাঁকো। বিচ্ছিন্ন হয়েছে দুপারের সংযোগ। ছুটল বিপরীত দিকে। বিস্মিত চোখে দেখল, বিরাট ধস নেমেছে। যাবার পথ বন্ধ।

    ছুটল অন্যদিকে। এবারে বনভূমির মায়াজাল-বিছানো ভয়ঙ্কর পথে পা বাড়াল। পথের পর পথ পরিবর্তন করে করে ভুলের পর ভুলই করতে লাগল শঙ্করলাল। বাইরে বেরুতে গিয়ে ভিতরের দিকেই এগুতে লাগল। অন্ধকারের মৃত্যুগহ্বরে এসে হাজির হল শেষে।

    পা টলছে, মাথা ঘুরছে। বসে পড়ল ঘাসের ওপর। সাইরেন পোকাগুলো হুইসিলের মত তীব্র তীক্ষ্ণ আওয়াজ তুলতে লাগল।

    সপসপে ভিজে পোশাক পরে বসে বসে বৃষ্টির জলে ভিজছে শঙ্করলাল। কাঁপুনি ধরছে সর্বশরীরে। এইভাবে যন্ত্রণাভোগ চলল ঘণ্টাখানেক—বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত। এক যন্ত্রণাভোগ শেষ হতে না হতে নতুন যন্ত্রণাভোগ শুরু হল আবার। বুকে হাঁটু গুজে জড়সড় হয়ে বসেছিল। বসতে পারল না আর এক মুহূর্তও। ঘাসের ওপরই শুয়ে পড়তে বাধ্য হল প্রবল জ্বরের আক্রমণে। দুদিন ধরে চলল এই জ্বরের দাপট শঙ্করলালের ওপর। জোটেনি ওষুধ, জোটেনি সেবা, জোটেনি কোন পথ্য। অর্ধচেতন অবস্থায় শঙ্করলাল দুচোখ বুজে-বুজেই দেখেছে অতীত, শুনেছে অতীতের কথা।

    ছোটবেলায় একবার এই রকম জ্বর হয়েছিল তার। তখন মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে দেবতার কাছে প্রার্থনা করতেন মা—শঙ্করলাল তাঁই বাঁচাই দেঁও।—ঠাকুর, শঙ্করলালকে রক্ষে কর। বাঁচিয়ে তোল। এ ধরনের প্রার্থনা ঠাকুমাকেও করতে শুনেছে। বাবাকেও করতে শুনেছে।

    জনমানবহীন জায়গায় আজও যেন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে শঙ্করলাল ওদের তিনজনের মিলিত কণ্ঠস্বরের প্রার্থনা। তিনজনের দুজন নেই—মা-ঠাকুমা! আছেন কেবল বাবা। কিন্তু মৃত জীবিত-সকলেরই কথা কানে বাজছে থেকে থেকে—বাঁচাই দেঁও।

    যে দুজন নেই পৃথিবীতে, তাঁদের কথা শুনছে কেমন করে! যিনি রয়েছেন তিনিও ত এখান থেকে অনেক দূরে। তবে? হয়তো তার বাঁচবার প্রবল ইচ্ছে’ই অতীতের প্রার্থনার সুরে কথা কয়ে উঠছে। প্রার্থনায় কথা কয়ে উঠলেও কে শুনবে, কে-বাঁচাবে তাকে এ-যাত্রা? বাঁচাবার কেউ নেই। শোনবার কেউ নেই।

    শঙ্করলাল যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। মনের চোখে দেখছে শুধু মৃত্যুর উদ্যত খড়্গ। এগিয়ে আসছে তার দিকে ধীরে ধীরে। এই সময়টায় তার পরমায়ু শেষের কথা নিশ্চয় লেখা আছে বিধির বিধানে। অসাড় হয়ে আসছে সমস্ত দেহটা শঙ্করলালের। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে বুঝি এখুনি। দু’চোখ খুলতে শেষ চেষ্টা করছে। পারছে না। ভিতরে অন্ধকার, বাইরে অন্ধকার। ডুবছে অন্ধকারের অতল তলে শঙ্করলাল। ডুবছে ডুবছে ডুবছে—

    বলদেওরামের দরজায় কে যেন ধাক্কা দিল জোরে। চারপাইয়ে শুয়েছে কিছুক্ষণ বলদেওরাম। আধ-ঘুমন্ত অবস্থা তখন। ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ল। দরজার কাছে এল। খুলল। দেখল একটা লোক চলে যাচ্ছে পিছু ফিরে তাকাতে তাকাতে।

    লোকটার যন্ত্রণাকাতর দুচোখ ডাকছে তাকে। চলতে চলতে ও দুমড়ে পড়ছে। কুঁকড়ে যাচ্ছে। একটু থেমে ওই অবস্থাতেই আবার চলছে আর চোখের ইশারায় বলদেওরামকে ডাকছে। যে দিকটায় যাচ্ছে সেটা বনভূমির পথ। চকিতের মধ্যে ঘরে গিয়ে লণ্ঠন নিয়ে এল বলদেওরাম। তার মনে হতে লাগল, নিশ্চয় বনভূমির ভিতর কিছু একটা ঘটেছে। লোকটার সঙ্গীর কোন বিপদ আপদ হয়ে থাকবে হয়তো। ওর চলনের ধরন-ধারণ দেখে মনে হয় অসুস্থ। অসুস্থ হয়েও তাকে ডাকতে এসেছে সঙ্গীর জন্যই। কথা কইবার দাঁড়াবার একটুও অবকাশ নেই তাই। দ্রুত পায়ে এগিয়েই যাচ্ছে।

    অনুসরণ করে চলেছে বলদেওরাম।

    বনভূমির মধ্যে প্রবেশ করল লোকটা। প্রবেশ করল বলদেওরামও। বেশ খানিক এগুবার পর লণ্ঠনের আলোয় পরিষ্কার দেখতে পেল, সামনের মানুষটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল একটু দূরে। ছুটে এল কাছে সে। দেখল পড়ে রয়েছে ঘাসে মুখ গুঁজে। গায়ে হাত দিয়েই চমকে উঠল। পুড়ে যাচ্ছে গা জ্বরে।

    সেবা-শুশ্রুষায় ওকে সুস্থ-সচেতন করে তোলবার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল সে। কিছুক্ষণ বাদে ঘাড় উঁচু করে মুখ তুলতে দেখল। দেখল চোখ খুলে তাকাতে। দু’চোখের কাতর আকুতি দেখে বলদেওরাম জানতে চাইল, কার জন্য ডেকে এনেছে তাকে এখানে। বিস্মিত ক্ষীণ কণ্ঠের জবাব শুনল—উত্থানশক্তিরহিত আজ ওর দুদিন ধরে।

    আশ্চর্য হয়ে গেল বলদেওরাম। এই চোখ-জোড়াই ডেকেছে তাকে বার বার…এটা অতি সত্যি। অথচ মানুষটা কিছুই জানে না। এ এক অজ্ঞাত রহস্য।

    বলদেওরাম উদ্ধার করে নিয়ে এল লোকটাকে নিজের শ্লেটপাথরের ঘরে। যাকে নিয়ে এল ঘরে—সে-ই শঙ্করলাল।

    পরিষ্কার হিন্দীতে শঙ্করলাল-কাহিনী শোনাতে শোনাতে শ্লেটপাথরের ডেরায় এনে চারপাইয়ের ওপর বিশ্রাম করতে বলল আমাদের চারবন্ধুকে আগন্তুক। মৃদু হেসে জানাল—এটাই বলদেওরামের ডেরা। নিজের পরিচয় দিয়ে অবাক করে দিল আমাদের—সে-ই বলদেওরাম।

    এরপর বনে আটকে পড়া মানুষের উদ্ধার করার বাকি কাহিনীটুকু শোনাতে লাগল বলদেওরাম আমাদের সামনে কাঠের বড় বাক্সটার ওপর পা ঝুলিয়ে বসে।

    আগে অনেকেই বনের ভিতর আটকে পড়ে মরেছে। তাদের কঙ্কাল এখনো দেখতে পাওয়া যায়। আগে যেত না কোনদিন কাউকে উদ্ধার করতে বলদেওরাম বনভূমিতে। শঙ্করলালের ব্যাপার নিয়েই বনের মধ্যে যাওয়া শুরু তার।

    শঙ্করলালের পর থেকে আজ অবধি যে-কেউ বনের ভিতর আটকে পড়েছে—দেখেনি সে কাউকে শঙ্করলালের মত আগে। দেখেনি কোন বিপন্ন লোকের করুণ চোখের আহ্বান। শুধু একটা দারুণ অস্বস্তি অনুভব করেছে ভিতরে। বনভূমি প্রবল আকর্ষণ করেছে যেন তাকে। ঘরের বার করে ছুটিয়ে নিয়ে গেছে যেখানে গভীর অরণ্যে আটকে পড়েছে পথহারা কোন হতভাগ্য মানুষ।

  • কান্নার সুর

    কান্নার সুর

    জায়গাটার কাছ বরাবর আসতেই রোমাঞ্চিত হয়ে উঠতে লাগল আমার সর্বাঙ্গ।

    মোটর চলছে। খাড়াইয়ের পর খাড়াইয়ে উঠছে। গাছপালা ভরা সবুজ পাহাড়ের গা কেটে কেটে আঁকা-বাঁকা উঁচু-নীচু রাস্তা করা হয়েছে গাড়ি যাবার। সেই পথ ধরেই এগুচ্ছে আমাদের গাড়ি। যত এগুচ্ছে, বুকের ভিতর ঢিপঢিপও করছে তত আমার। দু’জনের উষ্ণ নিশ্বাস পড়ছে আমার দু’দিকে। ডাইনে-বাঁয়ে। ডানদিকে বসে আছে তরুণীটি, বাঁদিকে তরুণ। ওদের দুজনের মাঝখানে আমি।

    মেয়েটি বলছে যখন, ছেলেটি থেমে যাচ্ছে। চুপচাপ একেবারে। আবার ছেলেটি যখন মুখ খুলতে শুরু করছে, মেয়েটি নির্বাক হয়ে যাচ্ছে তক্ষুণি। পালা করে বলছে দু’জনে। আমি নিবিষ্ট মনে শুনছি ওদের কথা। শুনছি আর ভাবছি!

    আমার ভাবনার সঙ্গে এক একবার এক একটা দৃশ্য ভেসে উঠছে যেন চোখের সামনে স্পষ্ট। আমি দেখছি, একটা গাড়ি পাহাড়ী ঘোরানো পথ বেয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে ক্রমে। গাড়িটার ভিতর শিরাণে। কি নিদারুণ অবস্থা ওর। কি করুণ চাউনি ওর দু’টি নীল চোখের। ও চোখ জোড়া আর্তনাদ করছে। ডাকছে সকলকে তাকে বাঁচাবার জন্য। ইয়াসোর খপ্পর থেকে মুক্ত করবার জন্য।

    শিরাণের হাত-পা নাড়বার উপায় নেই একটুও। ইয়াসো পিছমোড়া করে বেঁধে রেখেছে তাকে। শক্ত দড়ি কেটে কেটে বসে গেছে হাতে-পায়ে। মুখ বেঁধেছে রুমালে, যাতে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে না পারে। কেন কে জানে, শুধু চোখ-নাকের ওপর হামলা করেনি।

    নাকটা বন্ধ করে দিলে হয়তো দম আটকে মরে যাবে, তাই খোলা রেখেছে। তার কর্মফলের সাজা পাক অন্তত খানিকটা, দগ্ধে দগ্ধে মরুক। দু’চোখ খুলে মেলে দেখুক, কি অবস্থা হতে চলেছে তার! আতঙ্কে আতঙ্কে অস্থির হয়ে পড়ুক।

    অস্থির হয়ে পড়ছে শিরাণে। ভীতি বিহ্বল চোখে তাকাচ্ছে চতুর্দিকে। ড্রাইভারের পাশের লোকটার দু’চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে। এই দিকেই মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। পলকহীন চোখে তাকে দেখছে। একটু নড়বার চেষ্টা করলে লোকটার উঁচিয়ে ধরা ছোরাটাও নড়ে উঠছে। পালাবার চেষ্টা করেছ কি, নির্ঘাৎ মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাবে না জেনো, হুঁশিয়ার!

    এক পাশে ইয়াসো একপাশে তার বন্ধু। ওদের দুজনের ছুরির ফলার মতো সতর্ক দৃষ্টি ওর দু’চোখে বিঁধে বিঁধে ক্ষতবিক্ষত করছে। এদের তিনজনের একজনের কাছ থেকেও উদ্ধার হবার—বাঁচবার কোন সাহায্যই পাওয়া যাবে না।

    তবুও চোখের অসহায় আবেদন জানাচ্ছে এদেরই তিনজনের চোখে সুন্দরী শিরাণে। শিরাণের চোখের মোহে বুঝি ইয়াসোর মন টনছিল, গলছিল। তাই বন্ধুর পকেটে খপ করে হাত পুরে দিয়ে রুমালটা টেনে বার করে নিল। মোটা রুমালটা আরো পুরু করল দু’পাট করে। শিরাণের দু’চোখ ঢেকে দিয়ে, কোণা দু’টো পিছনের দিকে টেনে নিয়ে জোর করে গিঁট বাঁধল।

    নিশ্চিন্ত হল ইয়াসো। কোন রকমের দুর্বলতা আর আসতে পারবে না কারো শিরাণের ওপর। সমস্ত কার্য সমাধা করতে পারবে ইয়াসো নির্বিঘ্নে।

    নির্বিঘ্নেই সব কিছু করতে পারত যদি না সুরজিত সিং গাড়ি নিয়ে অনুসরণন করত তাদের গাড়ির। এ-পথে এ-সময় সুরজিত সিংয়ের আসবার কথা নয়। সব জেনেশুনে ভালোভাবে বিচার আচার করা হয়েছে ক’দিন ধরে। তারপর এই ভোরের দিকে শিরাণেকে গাড়িতে তোলা হয়েছে। একথা সুরজিত সিংকে বলবার—জানাবার কেউ নেই ত্রিভুবনে একজন ছাড়া। সে বলতে পারে না জীবন থাকতে। একাজের সে-ই প্রধান হোতা। তারই স্বার্থ বেশী। শিরাণেকে নিয়ে ব্যথা বেদনা তারই বেশী। ধরা পড়লে যেন সুরজিত সিংয়ের হাতে শিরাণেকে ছেড়ে দেওয়া না হয় কিছুতেই। ওর প্রাণ থাকতে নয়। এ কড়া নির্দেশ দিয়েছে সে-ই।

    তবে বলল কে?

    শিরাণে নিজে? না, তার হাত-পা-মুখ বাঁধার আগের মুহূর্তেও জানতে পারে নি সে এসব ষড়যন্ত্রের কোন ব্যাপারে। ঘুমন্ত অবস্থাতেই হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়া হয়েছে তার ওপর। ঘুম ভেঙেছে। একটু ধস্তাধস্তি করাই সার হয়েছে তার। মুখ দিয়ে কথা ফুটতে দেওয়া হয় নি একটাও। আগে থেকেই হাত দিয়ে মুখ চেপে রাখা হয়েছিল।

    তিনজনের সঙ্গে কোন রকমেই পেরে ওঠে নি সে। তবু প্রাণপণে যুঝেছিল। দু’চোখের কোণ দিয়ে বড় বড় জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়েছিল টসটস করে। যারা কাছে ছিল, মমতা জাগে নি তাদের অন্তরে। জেগেছিল ভয়। প্রাণের নয়, কাজ পণ্ড হয়ে যাবার। দেরী হলে, কেউ এসে পড়লে, কেউ জানতে পারলে সমূহ বিপদ তাদের। যে টাকা খেয়েছে, সে তো খেয়েছেই। যে টাকা পেয়েছে ফেরৎ দিতে হবে। যা পাবার কথা, তা আর পাবে না। সুতরাং ওদের ভয় পাওয়া স্বাভাবিক, তাড়াহুড়ো করা স্বাভাবিক।

    এই দলের ইয়াসোও। তার পাথর-কঠিন মনের আর দুর্দান্ত প্রকৃতির খ্যাতি চতুর্দিকে। তার কাছে আইন-কানুনের কোন বালাই নেই। নেই কোন ধর্মাধর্মের জ্ঞান বিচার। তাকে দেখলে একশো হাত দূর থেকে সরে পড়ে মানুষ, সামনে আসা তো দূরের কথা। তার অপরাধের সাক্ষী দেয় না কেউ। তাকে বাঁধবার কেউ নেই। আটকাবার কেউ নেই।

    ইয়াসো নির্মম-নির্দয়।

    ইয়াসো নামটা ছুটে বেড়ায় বাতাসে বাতাসে অহর্নিশি। বুক কাঁপানো ত্রাস ধরায় ছেলে-বুড়ো, সকলের মনে। এতে ইয়াসোর গর্ব বাড়েই যেন। সময় সময় একান্তে বসে ভাবে ইয়াসো, তার জুড়ি নেই কেউ। তার মতো হতে অনুগতদের এখনো অনেক-অনেক দেরী।

    ইয়াসো লোকের নির্যাতন দেখলে, আনন্দে ফেটে পড়ে। বিশাল শরীর নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নাচতে থাকে। রক্ত জল করা এক অদ্ভুত আওয়াজ বেরুতে থাকে মুখ দিয়ে সে-সময়। কারো কান্না দেখলে হেসে গড়িয়ে পড়ে একেবারে। থামতে বেশ সময় লাগে।

    এহেন ইয়াসো থেকে থেকে যেন কেমন হয়ে যাচ্ছিল শিরাণের চোখের জল দেখে। নিষ্ক্রিয় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। শিরাণেকে গাড়িতে তোলা পর্যন্ত এ অবস্থার পরিবর্তন হয়নি কোন। ওর গুণমুগ্ধ বন্ধু আর অনুগত, দু’জনেই ওকে দেখে অবাক হয়েছে। তারা নাচতে দেখল না হাসতে দেখল না এই প্রথম ইয়াসোকে। বরং ইয়াসোর দু’চোখ চিকচিক করে উঠতেই দেখল যেন। ওস্তাদের মুখের ওপর কোন কথা বলার কোন সাহস নেই ওদের। তাই নির্বাক মুখে ওস্তাদের পূর্বের নির্দেশ পালন করল ওরা। ইয়াসোর সঙ্গে গাড়িতে উঠে বসল।

    গাড়ি চলছে, সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই ইয়াসোর। লক্ষ্য কেবল শিরাণের দিকে। শিরাণের চোখের জলের ক্ষীণধারা বোধহয় ওর পাথুরে বুকের মাঝখানে খাঁজ কেটে কেটে বয়ে চলেছে। শিরাণেকে মুক্তি দেবার একটা প্রবল ইচ্ছে পেয়ে বসছে মাঝে মাঝে। নিজেকে সংযত করে নিচ্ছে তখুনি। টাকা খেয়েছে জান কবুল করেছে। কাম বরবাদ হতে দিতে পারবে না ইয়াসো কখনো। খুনে রক্ত মাথার ভিতর টগবগ করে ফুটে উঠছে নতুন করে আবার। শিরাণেকে উদ্ধার করতে আসে যদি কেউ, ধড়ে মাথা থাকবে না তার আর। এ-ভাবটা ধরে রাখবার চেষ্টা করেও পারছিল না। কাল হয়েছিল শিরাণের মায়াবী চোখ।

    চোখ বেঁধে দিয়ে ভেবেছিল নিশ্চিন্ত হল। কিন্তু পারল না। পিছন থেকে গাড়ির আওয়াজ কানে আসতেই চমকে উঠল। মুখ ফিরিয়ে গাড়ি আসতে দেখে রাগে সর্বশরীর রি-রি করে উঠল। শিরাণের ওপর থেকে মোহ-মমতা চলে গেল নিমেষে। মনে হল চেনা গাড়িই অনুসরণ করছে। সুরজিত সিংয়ের গাড়ি।

    চিঠি দিয়ে বা লোক পাঠিয়ে কোন খবরই যে দিতে পারে না সুরজিত সিংকে শিরাণে, এটা ভালো ভাবে জেনেও, ইয়াসোর সমস্ত আক্রোশ গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল শিরাণের ওপর। মনে হল মেয়েটাকে শেষ করে দেয় এখুনি। ডান দিকের খাদে দিফু নদীর বুকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিষ্কৃতি পায়। সুরজিতের চোখের সামনেই এই কাজ করবে সে। এক ঢিলে দুই পাখী মারবে। একজন মরবে, আর একজন মরে বেঁচে থাকবে।

    পিছনের মোটরটা এগিয়ে আসছে। গতি বাড়িয়ে দিয়েছে সুরজিত। ইয়াসোদের গাড়ির গতিও বাড়িয়ে দেওয়া হল। দুটো গাড়ির দূরত্বের ব্যবধান রইল খুব সামান্যই। নিঃসন্দেহ হবার জন্য পিছনের কাচে চোখ রেখে ভালো করে দেখে নিল ইয়াসো, সত্যিই সুরজিত গাড়িতে আছে না চোখের ভ্রম। কোন মানুষই আজ পর্যন্ত তার সামনা-সামনি হতে দুঃসাহস দেখায় নি—সুরজিত তো নগণ্য লোক।

    দারুণ ধাক্কা খেল যেন একটা ইয়াসো। সত্যিই সুরজিত। সঙ্গে নেই কেউ। একলাই গাড়ি চালিয়ে আসছে। ভয়-ডর নেই প্রাণে। ইয়াসোর শক্তির মর্যাদাকে অপমান করার জন্য, অবহেলা করার জন্য দুঃসাহস দেখাতে আসছে একলা। ঠিক আছে। উচিত মতো শিক্ষা পাবে ও। মর্মান্তিক শিক্ষা দিয়ে দেবে ওকে ইয়াসোই। বিদ্যুৎ চমকের মতো শিক্ষা দেবার মতলব খেলে গেল মাথার ভিতর চকিতে। ঘনঘন উষ্ণ নিশ্বাস পড়ছে ইয়াসোর। বুকখানা ফুলে উঠছে। মাথায় খুন চেপেছে বুঝি ওর। মাথার রক্ত চোখেও নেমেছে। রক্তজবা চোখদুটো চক্কর দিয়ে বেড়াচ্ছে বার বার শিরাণের আপাদমস্তকে।

    এগিয়ে আসছে সুরজিতের গাড়ি। আগের দ্বিগুণ গতি বাড়িয়েছে এবার সুরজিত।

    মস্ত সুযোগ এসে গেছে ইয়াসের কাছে। পাহাড ফাটানো পৈশাচিক অট্টহাসি হাসল ও। হাসি থামল। রাস্তার বাঁ দিকটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে নিল একবার। চোখের ইশারায় ড্রাইভারকে কি যেন নির্দেশ দিল। মন্থর গতি হয়ে এল গাড়ির। ইয়াসোর চোয়াড়ে মুখখানা বীভৎস হয়ে উঠল। দু’ধারের চোয়ালের হাড় উঁচু হয়ে উঠল আরো। সুরজিতের গাড়িখানা হুমড়ি খেয়ে পড়বেই এ-গাড়িটার ওপর। রুখতে রুখতেই ঘটে যাবে এই কাণ্ড। চক্ষের নিমেষে ঘটে যাবে অপ্রতিরোধ্য দুর্ঘটনা।

    শিরাণেকে গাড়িতে রেখে দিয়ে বাঁদিক ঘেঁষে লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে পড়ল ইয়াসোর সঙ্গে সকলে।

    চালকবিহীন গাড়িটা নিয়ে চলেছে অসহায় শিরাণেকে। শিরাণে বুঝতে পারল না, জানতে পারল না কোথায় গাড়িখানা নিয়ে যাচ্ছে তাকে। যাচ্ছে নিশ্চিত মৃত্যুগহ্বরের দিকে—এটাও না।

    প্রথম থেকেই অসম্ভব ভয়ে ভয়ে সমস্ত স্নায়ু তার অবসন্ন। অর্ধ-অচেতন অবস্থায় পড়েছিল। মৃত্যুর চিন্তা ছিল না মোটে। বাঁচবার আকাঙ্ক্ষাই ছিল প্রবল। তাই মৃত্যুর চিন্তাটা মাথার মধ্যে আসে নি একদম। নিজের অজ্ঞাতেই যে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষাকষি করতে চলেছে, তা-ও তার অনুভূতিতে জেগে উঠছে না একবারের জন্য।

    কারো ভাবা না-ভাবার ওপর নির্ভর করে অপেক্ষা করে না কোনদিন দুর্ঘটনা। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম দেখা গেল না। দুর্ঘটনা ঘটল! ভয়ানক ভাবেই ঘটল।

    পিছন থেকে এ-গাড়িটার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল সুরজিতের গাড়ি।

    প্রথম গাড়িটা ধাক্কা খেয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উল্টেপাল্টে গড়াতে গড়াতে দিফু নদীর বুকে গিয়ে পড়ল। আর দ্বিতীয়টা ঘুরে গিয়ে ধারের গামাড়ি গাছটায় ধাক্কা খেতেই দরজা খুলে গেল আপনা থেকেই। বাঁদিকে ছিটকে পড়ল সুরজিত।

    গাছ-গাছালির আড়াল থেকে হাসতে হাসতেই বেড়িয়ে এল ইয়াসো। মনস্কামনা সিদ্ধ হয়েছে তার। ব্যর্থ হয় না তার কোন চেষ্টা। তার কোন মতলব ভুল করেও বিশ্বাসঘাতকতা করে নি আজ অবধি তার সঙ্গে।

    এক ঢিলে দুটো পাখি মরেছে। নিজেকে নিঃসন্দেহ করার জন্য দু’জনকে দেখার স্পৃহা জেগে উঠল। শিরাণেকে সুরজিতকে। শিরাণে তো বেঁচে নেই নিশ্চয়ই। সুরজিত? যেভাবে আঘাত লেগেছে, ছিটকে পড়েছে, তাতে দেহে প্রাণ না থাকারই কথা। থাকলে ওর মুমূর্ষ অবস্থাতেই ধড় থেকে শির নামিয়ে শেষ করে দেবে একেবারে নিজে হাতেই ইয়াসো।

    ইয়াসো এগিয়ে এসে সুরজিতের শিয়রে দাঁড়াল। দেখে মনে হচ্ছে মৃত। অভ্রান্ত দৃষ্টি তার। বাঁ দিকের বুকের ওপরটা কাঁপছে না একটুও। হৃৎপিণ্ডটা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।

    সুরজিতকে ঘিরেই শিরাণের মায়ের চিন্তার অন্ত ছিল না।

    নিজের জীবনে নিদারুণ ঘা খেয়েছিল মা। সে ক্ষত শুকোয় নি তার। ক্ষতের যন্ত্রণা ভোগ করছে সর্বক্ষণ। মেয়ের মুখের দিকে তাকালে যন্ত্রণাটা চতুর্গুণ বেড়ে যায়। একান্ত মনে চায় নি মা—সারাজীবন ধরে তার নিজের মতো যন্ত্রণা ভোগ করুক মেয়ে। তার মতো অভিশপ্ত জীবন যেন মেয়ের না হয় কখনো। এইটাই চেয়েছিল। তাই সুরজিতের চোখের বাইরে মনের বাইরে সরিয়ে রাখতে বলেছি ইয়াসোকে। মেয়েকে সরানোর মূলে মা নিজেই। কোহিমায় নিয়ে যেতে মতলবও দিয়েছিল ইয়াসোকে। মেয়ের সুখের জন্য যা করতে চেয়েছিল—তাতে কৃতকার্য হতে না পারলে—মা হয়েও বলেছিল—ভবিষ্যতে দুষ্টক্ষতের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য ওকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে কোন দ্বিধা বোধ করা যেন না হয়।

    মিটেছে শিরাণের মায়ের আশা। সরেছে শিরাণে, সরেছে সুরজিত। দ্বিগুণ ইনাম পাবে ইয়াসো শিরাণের মায়ের কাছ থেকে।

    ইয়াসোর মনের আনন্দ মুখের হাসিতে উপচে পড়ছে। পাশের সঙ্গীরা ওর হাসি দেখে ওর মনোভাব আঁচ করে তারাও হাসছে।

    হাসবে সব শুনে শিরাণের মা-ও। তার ভিতরের আগুন-জ্বলা ক্ষত ঠাণ্ডা হবে এবারে কিছুটা। ইয়াসোকে তারিফ করবে ওর কাজ হাসিল করার পন্থা শুনে, গৃঢ় রহস্য জেনে। মেয়েটার মুখ আর দেখতে হবে না তাকে কোন দিন।

    মেয়ের মুখ দেখলেই বেশী করে মনে পড়ত বিদেশী সেনাবিভাগের অফিসারের কথা। মুখ-চোখ অবিকল তারই মতো তারই সঙ্গে অবাধ মেলামেশার ফসল মেয়েটা।

    অফিসার এসেছিল এক সন্ধ্যেয় দেশী মদ মধু কিনতে। সন্ধ্যের সেই বিকিকিনির সময় আলাপ হল তার সরল ক্রীশ্চান নাগা যুবতীর সঙ্গে। যুবতী মধু বিক্রি করছিল কাঠের ঘরটায় বসে। যুবতীর মিষ্টি আচার-ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছিল অফিসার। এরপর থেকে আসতে শুরু করেছিল রোজ সন্ধ্যেয়। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েই মেলামেশা আরম্ভ করেছিল। মেয়ে কোলে আসতে আনন্দে করেছিল ওর নামকরণ—শিরাণে।

    বড় হয়ে উঠতে লাগল শিরাণে দিন দিন। কিন্তু শত অনুরোধ উপরোধ সত্ত্বেও এগিয়ে আসে নি আর শিরাণের মায়ের কুমারী নাম খণ্ডন করতে। নিজের প্রতিশ্রুতি পালন করে নি। শেষ পর্যন্ত শিরাণের মাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল একদিন বিশ্বাসঘাতক। সেই থেকে কোন খোঁজ খবর নেয় নি আমরা-মেয়ের।

    মা বেশ বুঝতে পেরেছিল, মেয়ের জীবন তার দুর্ভোগের খাতেই বইতে শুরু করেছে। বুঝতে পারছে না মেয়ে। প্রত্যেক সন্ধ্যেয় আসছে সুরজিত। শিরাণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠছে। শিরাণেকে বিয়ে করবেও নাকি বলেছে ছেলেটা। সুরজিতের মধ্যে দেখেছে অফিসারকে মা। দেখতে পেয়েছে মেয়ের মধ্যে নিজেকে। তাই আঁতকে উঠেছে ভয়ে মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে।

    নিজের জীবন কাহিনী শুনিয়েছে, বাপের কীর্তিকলাপের কথাও জানিয়েছে। তবু সুরজিতের দিক থেকে প্রেমের উজান ঘোরাতে পারে নি মেয়ের মনের। সেনাবিভাগের অফিসার নয় সুরজিত। ব্যবসায়ী। মেয়ের এই বক্তব্য যুক্তি মেনে নেয় নি মা। সুরজিতের ভিতর অফিসারকে দেখার অভ্যাস ছাড়ে নি। তলায় তলায় সুরজিতের কাছ থেকে শিরাণেকে বিচ্ছিন্ন করার পথ বার করতে চষ্টা চলেছিল প্রাণপণে। পথের নিশানা পেয়েছিল। জানিয়ে দিয়েছিল ইয়াসোকে।

    মায়ের কথামত কার্য সমাধা করেছে ইয়াসো। সুরজিতের দেহটাকে ফেলে রেখেই সঙ্গীদের নিয়ে চলল অদম্য কৌতূহলে শিরাণের মৃতদেহ দেখে মাকে খবর দিতে।

    শিরাণের গাড়ির কাছে এসে বিস্মিত হতবাক হয়ে গেল ইয়াসো। চোখকে অবিশ্বাস করতে, ইচ্ছে করছে। যা দেখছে সত্যি নয়। সত্যি হতে পারে না।

    বার চারেক দু’চোখ রগড়ে নিয়ে দেখছে তো দেখছেই। দু’চোখের পাতা নড়ছে শিরাণের। আস্তে আস্তে চোখ খুলছে। গাড়িটার সীটে যে ভাবে ফেলে রাখা হয়েছিল, ঠিক সেইভাবেই পড়ে আছে শিরাণে। তারতম্য হয় নি একটুও।

    শিরাণে দেখেছে তোবড়ানো গাড়িটার ভিতর থেকে ইয়াসোকে। ওর উদভ্রান্ত দৃষ্টি। কি হয়েছে ওর ও দু’চোখে জানে না। বোঝে নি।

    অগভীর নদীর জলে একটা বিরাট পাথর খণ্ড গাড়িটার চাকা চারটেকে আটকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। আর সেই গাড়ীটার ভিতর অক্ষত দেহে বেঁচে পড়ে রয়েছে শিরাণে।

    এ কেমন করে হল?

    ইয়াসোর অস্থি থেকে, মজ্জা থেকে, দেহের প্রতিটি রোমকূপ থেকে এই একই প্রশ্ন উঠতে লাগল বারবার। কোন লোক এসে পড়ার আগেই সঙ্গী বন্ধু শিরাণেকে নিঃশেষ করে ফেলবার জন্য এগুচ্ছিল তাড়াতাড়ি, বাধা দিল ইয়াসো। ধারালো চকচকে ছোরাটা কেড়ে নিল হাত থেকে। মরণের মুখে পড়েও যে মরল না তাকে কেউ মারতে গেলে বাধা দেওয়াই উচিত ইয়াসোর।

    ইয়াসো যেন কিরকম হয়ে যাচ্ছে। ওর পাথুরে বুকে ভাঙন ধরছে। ভেঙে টুকরো হয়ে যাচ্ছে। উদ্ধার করল শিরাণেকে। নিজে কঠিন বাঁধন খুলে দিল শিরাণের। সঙ্গীরা অবাক চোখে দেখল ওকে। দেখল ও নতুন মানুষ। নতুন কাজ করল।

    এরপর সুরজিতের দেহটার কাছে আসতে বিস্ময়ের পর বিস্ময় ঘিরে ধরেছে ইয়াসোকে। যাকে মৃত ভেবেছিল, সে মৃত নয়, অচেতন। আগে যা দেখেছিল ভুল। বাঁ দিকের বুকের কাছটায় মৃদু কম্পন দেখতে পাচ্ছে স্পষ্ট। ইয়াসোর প্রথমের দৃষ্টিভ্রমই ওকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

    ‘অনেক চেষ্টা করে জ্ঞান ফিরিয়ে এনেছিল ইয়াসো সুরজিতের’ স্টিয়ারিং ধরে ঘাড় ফিরিয়ে হাসতে হাসতে কথা বলল ইয়াসো এতক্ষণ বাদে। জানাল সুরজিতের তাদের পিছনে আসার অদ্ভুত ব্যাপারটাও।

    শিরাণেকে ইয়াসো সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে একথা সুরজিত শোনে নি কারো মুখে। এ সম্বন্ধে সে কোন কিছুই জানে না। রেডিওর প্রভাতী অনুষ্ঠান আরম্ভ হয়েছে তখন। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। কাপটা ঠোঁটে ঠেকিয়েছে সবে। এমন সময় রেডিওর গানটায় যেন শিরাণের কান্নার সুর শুনতে পেল। পরে কান্নার সুরটা যেন বাইরের দিক থেকে ভেসে আসতে লাগল। বাইরে বেরিয়ে কান্নাটা আবার আরো দূর থেকে আসছে মনে হল। মোটরে উঠে বসল ও-কান্নার সুরের অনুসন্ধান করবে বলে। শিরাণের কান্নার সুর শুনে শুনেই সে এগুচ্ছিল।

    শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেছিল ইয়াসো। তাদের গাড়িতে মুখ বাঁধা অবস্থায় পড়ে রয়েছে তখন শিরাণে। অথচ কান্নার সুর শুনতে পাচ্ছিল সুরজিত।

    আমি তাকালুম আমার ডান পাশে শিরাণের মুখের দিকে। মৃদু মৃদু হাসছে ও। এবারে বাঁ পাশে চোখ ফিরল। সুরজিতের চোখ-মুখও হাসছে।

    গাড়ি চলছে আমাদের। দুর্ঘটনার জায়গাটা অতিক্রম করল ধীরে ধীরে।

    গাড়ির গতি বাড়ছে আবার একটু একটু করে। আমাদের চারজনেরই মুখ বন্ধ এখন। শিরাণে সুরজিতের পর ইয়াসোও বলেছে। সম্পূর্ণ হয়ে গেছে কাহিনী।

    ওরা মনে মনে কোন কথা কইছে কি না তা আমি জানিনে। দেখে বুঝতে পারছিনে কিছু। আমি কিন্তু মনে মনে কথা কইতে লাগলুম। ভালো লাগছিল খুব আমার। সেদিনের ঘাতক আজ দেহরক্ষী চালক। সেদিনের মরণ পথের যাত্রী দু’জন আজ স্বামী-স্ত্রী।

  • মিলিণ্ডা

    মিলিণ্ডা

    মিলিণ্ডা! মিলিণ্ডা! মিলিণ্ডা! মিলিণ্ডা!

    একসঙ্গে নামটা মুখ থেকে মুখে কান থেকে কানে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। অনেকগুলো চাপা গলার ফিস ফিস আওয়াজ সাপের মতো হিসহিস গর্জন করে উঠছে যেন। শুনছি আমরা। আমরা বলতে আমি আর ডেভিড সাহেব।

    ডেভিড সাহেব তখন অফিস ঘরে বসে। টেবিলের এদিকে ওর সামনা-সামনি চেয়ারে আমিও বসে আছি। মুক্তো তোলা সম্বন্ধে বেশ আলাপ আলোচনা চলছিল দু’জনের মধ্যে। ছেদ পড়ল হঠাৎ মিলিণ্ডা নামটা কানে আসতে। সাহেব দাঁড়িয়ে পড়ল চেয়ার ছেড়ে। আমিও কিছু না বুঝেই ওর দেখাদেখি উঠে দাড়ালুম।

    অবাক বিস্ময়ে দেখলুম সাহেবের লাল মুখখানা সাদাটে হয়ে গেছে নিমেষে। দু’চোখে ভয়ের ছায়া। দুর্দান্ত দু’দে মানুষটা যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। পায়ে পায়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। সঙ্গে সঙ্গে এলুম আমিও। বাইরে পাতায় ছাওয়া দালানটায় দাড়িয়ে উত্তর দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে। আমি ওর দৃষ্টি অনুসরণ করলুম।

    মিলিণ্ডা আসছে। মিলিণ্ডার দৃষ্টি সাহেবের ওপরেই। সাহেবের আপাদমস্তক দেখতে দেখতে এই দিকেই এগিয়ে আসছে মন্থরগতিতে। পাশে দাঁড়িয়ে আমি। কোন লক্ষ্য নেই তার আমার ওপর।

    আশপাশের মাঝি-ডুবুরিরা যে যেখানে যে অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল, যার মতো সেই অবস্থাতেই সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সন্ত্রাসে একবার সাহেবের দিকে আর একবার মিলিণ্ডার দিকে তাকাচ্ছে ঘন ঘন। আমার চোখ জোড়া সাহেব থেকে শুরু করে উপস্থিত সকলের মুখের ওপর চক্কর দিয়ে আসছে এক একবার।

    যত কাছাকাছি এগিয়ে আসছে মিলিণ্ডা তত সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো বুকটা ওঠানামা করছে প্রত্যেকের। মায় সাহেবের পর্যন্ত। দ্রুত থেকে দ্রুত, আরো দ্রুত হয়ে উঠছে ক্রমশ। মানুষগুলোর ভিতরে একটা সর্বনাশের আশঙ্কার ঝড়-তুফানের তাণ্ডব চলছে যেন। ওদের মুখ-চোখ দেখে মনে হচ্ছে তাই। ভিতরের তুফানটা বেরিয়ে আসতে চাইছে বাইরে।

    আচমকা তুফানটা যেন থেমে গেল চোখের পলকে। রুদ্ধ নিঃশ্বাস সবার। রুদ্ধবাক সবার। সাহেবের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মিলিণ্ডা।

    মিলিণ্ডা সম্বন্ধে অনেক কথাই শুনেছি আমি সাহেবের মুখে আর এই দক্ষিণ ভারতের তুত্তিক্কোডি বন্দরের স্থানীয় লোকদের মুখে। মিলিণ্ডা রহস্যময়ী কুহকিনী ডাইনী। ওর অসাধ্য নেই কিছু। সমুদ্রের রাক্ষুসে হাঙরগুলোর মতো ওরও ভিতরটায় ওই রকম অজস্র হাঙর কিলবিল করে বেড়াচ্ছে অহর্নিশি। তাদের খাদ্য জোগাড় করতে আসে ও এখানে মুক্তো তোলার সময়। ওর পেটের মধ্যে কখন যে কাকে যেতে হবে হাঙরের খোরাক হয়ে তা বিধাতাই বলতে পারেন একমাত্র।

    ওর দু’চোখে কি সর্বনেশে যাদু আছে কে জানে। দূরের মানুষকে অজগরের নিঃশ্বাসের আকর্ষণের মতো কাছে টানে। তারপর চোখেরই মায়াজাল বিস্তার করে এমন ভাবে আটকে ফেলবে মানুষকে যে ওর কাছ থেকে দূরে পালানো তো দূরের কথা-নড়াচড়া করবার ক্ষমতা থাকবে না একটুও কারো। বক্তাদের এই বক্তব্যটা অন্তত মিলেছে আমার কাছে। প্রমাণ পাচ্ছি। স্বচক্ষে দেখছি। সত্যিই অতগুলো মানুষ নজরবন্দী মিলিণ্ডার কাছে।

    আমি অবশ্য সাহেব ছাড়া একবারের জন্যও মিলিণ্ডাকে অন্য কারো দিকে তাকাতে দেখছি নে। তাকিয়েও অন্যদের বিনা হাতকড়া শেকলে, বিনা লোকলস্করে পুতুলের মত চুপচাপ দাঁড় করিয়ে রাখতে পারে যে মেয়ে, সে মেয়ে যে সে নয়, বেশ বুঝতে পারলুম।

    বোঝার সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও একটা অনাগত বিপদের আশঙ্কা ঘিরে ধরল। মিলিণ্ডার বিষয়ে সব কটা শোনা কথা যদি এইভাবে ফলে যায় তাহলে তো ভয়ঙ্কর ব্যাপার ঘটবে। বিপদের সীমা-পরিসীমা থাকবে না আর কারো। প্রাণ নিয়েও টানাটানি হতে পারে কারো না কারো। প্রমাদ গণলুম আমি। কি কুক্ষণে না এসে পড়েছি গোঁয়ার্তুমি করে, সমস্ত মিথ্যে ভেবে।

    সাহেবের সামনে দাড়িয়ে আছে মিলিণ্ডা। চাউনির ধরন দেখে মনে হচ্ছে, ওর দু’চোখ কোন একটা প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব চাইছে সাহেবের নিষ্পলক নীল চোখ দুটোর কাছে। মিলিণ্ডার কপালে বিরক্তির রেখা ফুটে উঠছে। ভুরু কুচকে বার বার দেখছে সাহেবকে।

    সাহেবের দু’চোখে প্রাণের সাড়া নেই যেন। একেবারে পাথুরে চোখ। খরখরে হয়ে উঠছে মিলিণ্ডার দৃষ্টি। ওর তীক্ষ্ণদৃষ্টির ফল বিঁধছে পাথুরে চোখ দুটোয়, ঘা মারছে। ঘা মেরে মেরে খানখান করে ভেঙে ফেলবে বুঝি এখুনি। ভিতরটা দেখতে চাইছে। গোপন রহস্যের সত্যি হদিস পেতে চাইছে। ডুবুরির মতো সাহেবের মনের গহনে নেমে একটা সত্যিকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে বার করে নিয়ে আসতে চাইছে। দেখবে, তাকে বিশ্বাস করতে পেরেছে কিনা সাহেব এতদিনেও।

    সেদিনে যা ঘটেছিল, তার সত্যি ব্যাপার সাহেবের না জানার কথা নয়। মিলিণ্ডাই জানিয়ে দিয়েছিল সমস্ত। বোঝবার সুবিধের জন্য বলেছিল ভাঙা ভাঙা হিন্দীতে। তবুও সাহেব বলেছিল, আই ডোণ্ট নো ডোণ্ট বদার মা এগেন। বুট জুতোয় শক্ত পায়ের দুম দুম আওয়াজ তুলে সমুদ্রেব ধার থেকে অফিস ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছিল।

    সেদিনও এই দৃষ্টি মেলে ধরেছিল মিলিণ্ডা সাহেবের চলার পথে। ইংরিজী কথা বুঝতে না পারলেও মুখ দেখে ধরতে পেরেছিল, বিরক্ত হয়ে উঠেছে সাহেব তার ওপর, উদ্দেশ্য সফল হয়নি তার।

    সাহেবের এই দুর্ব্যবহারে অগ্রাহ্যে মিলিণ্ডার কিন্তু নিজের বদ্ধমূল ধারণা মন থেকে সরেনি এক চুলও। নিজের ধারণাটাকে যথার্থ প্রতিপন্ন করতে পরদিন ভোর না হতেই সাহেবেব অফিসের সামনে এসে দাড়িয়েছিল।

    ঘর থেকে বেরুবার মুখে দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিল সাহেবকে, টমাস অন্দয়াল…। টমাসই সেই লোক। সব শুনেও আমাকে এত অবিশ্বাস করছ তুমি কেন?

    তামিল কথা সাহেব যে না বোঝে তা নয়, কিন্তু মিলিণ্ডার কোন কথাই কানে নেয়নি। গম্ভীর মুখে গটগট করে বেরিয়ে গেছিল পাশ কাটিয়ে।

    ফিরে এসেছিল মিলিণ্ডা নিজের ডেরায়। সে বছরে আর কোন বিপত্তি ঘটেনি বন্দরে, ঘটেনি সমুদ্রের জলে। ঘটেছিল অসম্ভব কাণ্ড বছর ঘুরতে, মুক্তো তোলার সময় আবার ফিরে আসতে।

    মিলিণ্ডার অন্য রূপ দেখে চমকে গেছিল সকলে। ভয়ে আঁতকে উঠেছিল। নিকষ কালো মেয়েটার সব কিছুই কালো। সাক্ষাৎ মৃত্যুবিষের একটা ঘড়া যেন ও। সমুদ্র মন্থনে রত্ন উঠেছিল আর বিষ উঠেছিল শোনা যায়। মেয়েটা সমুদ্রতীরে জন্মেও রত্ন হয়ে উঠতে পারে নি। সমুদ্রের অপগুণ, যত বিষ সমুদ্র ছেকে শুষে নিয়েছিল বুঝি ওর সর্বশরীরে। ঘন নীল বিষই ওর রংটাকে কালচে করে দিয়েছে বোধ হয় তাই।

    এমন ভয়ঙ্কর মেয়ে এর আগে ভূ-ভারতে দেখেনি কেউ কখনো। এ মেয়ের চোখে আগুনের গুনের ফুলকি। নিশ্বাসে আগুনের হলকা। বেশীক্ষণ দাঁড়ানো যায় না সামনে। ইস্পাত কঠিন মানুষও গলতে থাকে যেন। অসহ্য জ্বালা ধরতে থাকে সমস্ত দেহে।

    এহেন মিলিণ্ডার সামনে দাঁড়িয়ে ডেভিড সাহেব।

    সাহেবের মুখের ওপর থেকে চোখ ফেরাল মিলিণ্ডা সমুদ্রের দিকে। কি যেন কি ভাবল খানিক। তারপর নিজের মনেই কি সব বিড়বিড় করে বলতে বলতে চলে গেল।

    চেতন হয়ে উঠল সকলে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচল। পাথর মূর্তির সাহেবকে আবার রক্তমাংসের মানুষ মনে হতে লাগল। একটু আগের ভীরু সাহেব বরাবরের দুঃসাহসী রাশভারী লোক হয়ে উঠল আবার। আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, পাগলীটা দু’বছর ধবে নাস্তানাবুদ করছে আমাদের।

    কি নাস্তানাবুদ করছে, তা আমি জানি। মুক্তো তোলা বন্ধ করে দেয় সমুদ্রের জলে একটা বিভীষিকার রাজ্য তৈরি করে। বন্দুক, ডিনামাইট, সেপাই, কোন কিছুই বাগ মানতে পারে না তার নির্মম খেলাকে।

    এ খেলার রহস্য ভেদ করতে এসেছে গুণিন। এসেছে যাদুকর জ্ঞানী-বিজ্ঞানী আর সাধু সন্ত ওঝা। আরো কত রকমের কত কিছু জানা লোকের যে আবির্ভাব ঘটেছে সমুদ্রের উপকুলে তার ইয়ত্তা নেই। অনেক রকম করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেও মিলিণ্ডাকে একটা সাধারণ মেয়ে ছাড়া অন্য কিছু বলার সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি আজ পর্যন্ত কেউ। নির্মম খেলার কোন রহস্যই ভেদ করতে পারেনি। সকলেই এই সাধারণ মেয়েটাকে সমুদ্রের উপকূলে এলে কেমন হয়ে যেতে দেখেছে। দেখেছে কি বীভৎস মূর্তি হয়ে ওঠে ওর। দেখা যায় না চোখে। অতি অবিশ্বাসী অতি নির্ভীকের মনেও ভয় ধরে। মেয়েটা যেন সম্পূর্ণ পাল্টে যায় একেবারে। প্রকৃতিতে তো বটেই, আকৃতিতেও মনে হয়। মুখ-দেহ সব যেন অন্য মানুষের। গলার স্বরটাও কি রকম শোনায় কানে। বুকের ভিতরটা কেঁপে ওঠে।

    সব চেয়ে বেশী আশর্য লাগে যখন মানুষ-খেকো হাঙরগুলোর ওপরই ঝাপিয়ে পড়ে জলে। আবার হাসতে হাসতেই অক্ষত দেহে উঠে আসে নৌকোয়। এ দৃশ্য দেখে প্রথমে আনেকেই ভেবেছে—এটা নিছক মায়াবিনীর মায়া বিস্তার। জলে হাঙরের ভয় দেখিয়ে মন দুর্বল করে দেয়। সম্মোহিত করে ফেলে সবাইকে। যেটা দেখা যায়—সেটা মনের ভুল চোখের ভুল ছাড়া অন্য কিছু নয়।

    কিন্তু এ যুক্তি খাটল না শেষ অবধি। ডেভিড সাহেব ডাইনীর কারচুপি ধরার কম চেষ্টা করেছে নাকি। নাজেহাল হয়ে গেছে সাহেব। তীরে খুঁটি পুঁতে তাতে ছাগলটার দড়ি শক্ত করে বেঁধে রেখে জলে নামিয়ে দিয়েছে। করুণ আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গে দড়ি ধরে টেনে তুলেছে ছাগলটাকে। বিস্ফারিত চোখে দেখেছে সাহেব, শুধু সাহেব কেন অন্য দর্শকেরাও ছাগলটার পিছনের দু’পা কেটে নিয়ে গেছে হাঙর ধারালো দাঁতে।

    হো-হো করে হেসে উঠেছে মিলিণ্ডা। সাহেবের দিকে কটমট করে তাকিয়েছে। তবুও হাল ছাড়েনি সাহেব। একবার দু’বার, বারবার, এই ভাবে পরীক্ষা করে শেষে হার মেনেছে।

    সাহেব হার মানল বটে, কিন্তু মিলিণ্ডার আক্রোশ বাড়ল সাহেবের ওপর দ্বিগুণ। ও যেন মুক্তো তোলা বন্ধ করার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে উঠল।

    সে আশা পূরণ হয়েছে মিলিণ্ডার। ওর দৌরাত্মে মুক্তো তোলা বন্ধ আজ বছর দুয়েক ধরে। জব্দ হয়েছে সাহেব। অসম্ভব লোকসান হচ্ছে ব্যবসায়। ঠিকাদারদেরও সাহেবের অবস্থা। ডুবুরি মাঝিদের অন্ন জুটছে না পেটে। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে দিন গুজরান করা দায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু মিলিণ্ডার দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে পারছে না কেউ। ওকে দেখার আগে দুর থেকে অনেক বীরপুরুষ হম্বিতম্বি করেছে—তারা এসেই এক মুহূর্তে জব্দ করে দেবে মিলিণ্ডাকে। হাতের পেশী ফুলিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, সে ক্ষমতা রাখে তারা।

    দম্ভ-দক্ষতা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে তাদের মিলিণ্ডার চোখে চোখ পড়তে। এগুতে পারে নি, পা পাথর-ভারী। বাড়াতে পারে নি হাত—অবশ। খুলতে পারেনি মুখ-হতবাক। একেবারে নিষ্প্রাণ-নিম্পন্দ হয়ে গিয়েছে তারা। মিলিণ্ডার ব্যাপারটা সত্যিই অদ্ভুত। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা দুষ্কর। এ অলুক্ষুণে কাণ্ড দেখার কোন সাধ নেই আমার। এরকম কোন সাধ থাকাও উচিত নয়, নিজের মনকে বোঝাতে লাগলুম বার বার। কেন জানিনে বিপরীত ফল হল। অদম্য কৌতুহল জেগে উঠল মিলিণ্ডার এই ব্যাপার দেখার। তবুও বদ ইচ্ছেটাকে শেষবারের মতো মন থেকে সরাবার জন্য সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নেব ঠিক করলুম।

    ‘গুডবাই’ কথাটা জিভের ডগায় এসে আটকে গেল। সঙ্গ ছাড়তে চাইছি, মুখ দেখে আঁচ করতে পেরেছিল বোধহয় সাহেব। কিন্তু কেন সঙ্গ ছাড়তে চাইছি, সেটা যে বোঝেনি একদম জানা গেল তার কথায়।

    সাহেবের মতে ভাগ্য সুপ্রসন্ন এবার। হাওয়া যেন অনুকূলে বইতে শুরু করেছে! মিলিণ্ডা মুক্তো তোলার দিনে এভাবে আসেনি কখনো। এসেছে হঠাৎ সমুদ্রের ধারে ঝড়ের বেগে। এসেছে ঠিক ডুবুরিদের জলে নামবার মুখে। এসে আজ ফিরে গেছে। তাই মনে হচ্ছে সমুদ্রের দিকে যাবার সম্ভাবনা নেই আর ওর। সুতরাং ভয়ের কোন কারণ নেই আমার। মুক্তো তোলা দেখতে এসেছি যখন—সুবর্ণ সুযোগও পাওয়া গেছে যখন, তখন দেখে ফেরাই ভালো, অনুরোধ করল আমায় সাহেব।

    সাহেবের সঙ্গে সমুদ্রতীরে এসে হাজির হলুম আমি।

    আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। সাহেব আঙুল দেখিয়ে ইঙ্গিত করল মাঝিদের নৌকো ছাড়তে। ডুবুরিদের দিকে চেয়ে হাসল। সাহেবের এ হাসির অর্থ বোঝে তারা। সমুদ্রে নামবার জন্য পাথর, দড়ি, ব্যাগ, সমস্ত সাজসরঞ্জাম গুছিয়ে নিয়ে নৌকোর ওপর উঠে বসল ওরা।

    কি যে হল বুঝতে পারলুম না। হঠাৎ যেন একটা আতঙ্ক নেমে এল সবার চোখে মুখে। পিছন ফিরে তাকাতেই চমকে উঠলুম। মিলিণ্ডা! কি ভীষণ মূর্তি! সাক্ষাৎ দানবী যেন। কিছুক্ষণ আগে দেখা মিলিণ্ডার সঙ্গে এ মিলিণ্ডার কিছু মিল নেই।

    ত্বড়িৎগতিতে এগিয়ে এল মিলিণ্ডা নৌকোর কাছে। উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তড়াক কবে টমাস নৌকো থেকে লাফিয়ে পড়ল তীরে। ছুটে পালাতে যাচ্ছে, ডাকল মিলিণ্ডা। তীব্র তীক্ষ্ণ কণ্ঠ। দাঁডিয়ে পড়ল টমাস। শক্তসমর্থ জোয়ানটার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল টমাস মন্ত্রমুগ্ধের মতো। উঠল নৌকোয়।

    সামনে দাঁড়িয়ে আছে মিলিণ্ডা। ওর চোখের আগুন ঠিকরে পড়ছে টমাসের চোখে।

    হতভম্ব হয়ে দেখছি সকলে—নৌকোর চারপাশে হাঙর ছেয়ে যাচ্ছে। বাতাস ভারী হয়ে উঠছে মনে হচ্ছে। অচমকা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল মিলিণ্ডা।

    রুদ্ধনিশ্বাসে দেখছি আমরা। দেখলুম অক্ষত দেহে হাসতে হাসতে মিলিণ্ডা নৌকোর ওপর উঠল আবার। একটাও হাঙর দেখা যাচ্ছে না জলে আর।

    গম্ভীর গলায় মিলিণ্ডা আদেশ করল টমাসকে—জলে নামো। ঝিনুক তুলে নিয়ে এসো। হাঙরের ভয় নেই। ডিনামাইট বন্দুকের শব্দে হাঙর তাড়াতে হয় নি। ওরা আপনা হতেই চলে গেছে।

    ডান হাতে বড় ভারী পাথর বাঁধা দড়িটা ধরল টমাস। ডান পা পাথরটার ওপর রেখে নিশ্বাস টেনে নিল জোর করে। তারপর, পাশের দড়ির বা দিকটায় ঝিনুক তোলবার থলে দুটো ঠিক বাঁধা আছে কিনা, চোখ বুলিয়ে নিল একবার।

    নামছে টমাস। নামছে নামছে নামছে। ওকে আর দেখতে পাচ্ছিনে আমরা। জলের অনেক তলায় চলে গেছে মনে হচ্ছে। যেখানে ঝিনুক সেই মাটিতে দাঁড়িয়েছে নিশ্চয়ই। হাতড়ে হাতড়ে ব্যাগ ভর্তি করছে ঝিনুক। দড়ি ধরে ইঙ্গিত করেছে সমুদ্রের অগভীর মাটির বুকে পা ফেলতেই। দড়ি নাড়িয়ে ওপরের লোকের হাতে টান দিয়ে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। তাই লোকটা পাথর বাধা দড়িটা গুটিয়ে নিয়েছে টেনে টেনে। পাথরটাকে তুলে রেখেছে নৌকোয়।

    বা হাতের রিস্টওয়াচটা দেখছে ডেভিড সাহেব। মিনিট গুণছে। এক দুই তিন — আট। অস্থির হয়ে পড়ল সাহেব। এমনি ডুবুরিবা জলের তলায় দম বন্ধ করে দু’মিনিটের বেশী থাকতে পারে না। জন পারত চার মিনিট। টমাস তার দেখাদেখি অভ্যেস করে করে, সাত মিনিট অবধি দম বন্ধ করে থাকতে পারত জলের তলায়।

    আট মিনিট হয়ে গেল, অথচ নীচের লোকের কোন সঙ্কেত এসে পৌঁছল না ওপরের লোকের হাতের দড়িতে। মহা ভাবনায় পড়ল সাহেব। জন-টমাসের জলে থাকার নির্দিষ্ট মিনিটের কথা জানাল সাহেব আমায়। আবার রিস্টওয়াচের দিকে চোখ ফিরিয়ে দেখার সঙ্গে সঙ্গে মুখে উচ্চারণ করতে লাগল জোরে জোরে।—নয় —দশ —এগারো —বারো।

    আর গুণতে পারল না সাহেব। গুণতে চাইলও না। যথেষ্ট সময় অপেক্ষা করা গেছে। সাতের জায়গায় বারো মিনিট—পাঁচ মিনিট বেশী। একটা অশুভ আশঙ্কায় সাহেবের গলা কেঁপে উঠল। কাঁপা গলায় নির্দেশ করে দিল অন্য ডুবুরিদের জলে নেমে টমাসকে তুলতে। তাকাল মিলিণ্ডার দিকে। নৌকো থেকে ঝুঁকে নিবিষ্ট মনে মিলিণ্ডা যেন কি দেখতে চেষ্টা করছে। জলের গভীরে ওর প্রখর দৃষ্টি পৌঁছবার চেষ্টা করছে বুঝি। মনে হল, কি যেন দেখতে পেল ও। মুখ তুলতেই মালুম হল। মিলিণ্ডার ভয়ানক রূপটা নেই। সে উগ্রভাব আর দেখা যাচ্ছে না, কমনীয় ভাবটা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। হাসছে মিলিণ্ডা পরিতৃপ্তির হাসি। সাহেবের চোখে চোখ পড়তে নৌকো থেকে নেমে পড়ল। সাহেবেরই পাশে এসে দাঁড়াল চুপচাপ। তোলা হল টমাসকে। আমাদের সামনে এনে রাখল ডুবুরিরা টমাসের প্রাণহীন দেহটাকে। সাহেবের কানের কাছে মুখ এনে মিলিণ্ডা বলল, নম্বীনায়া…বিশ্বাস হল সাহেব তোমার এবার?

    দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে মাখা মাটিতে নোয়াল ডেভিড সাহেব। মৃদুস্বরে মিলিণ্ডার কথারই প্রতিধ্বনি বেরিয়ে এল তার মুখ দিয়ে, নম্বীনায়া। বিশ্বাস হল।

    অফিসে এসে বিশ্বাস অবিশ্বাস হওয়ার এক অভিনব কাহিনী শুনলুম সাহেবের কাছে। টমাসের মতো জনেরও মৃত্যু হয় জলের তলায়। টমাস আর জন, দুই বন্ধুতে হাসতে হাসতে নেমেছিল জলের তলায় ঝিনুক কুড়ুতে। মুক্তো পাবে। চার মিনিট হয়ে গেল তবুও উঠল না ওপরে জন। হাতে ধরেছে, পায়ে ধরেছে সাহেবের মিলিণ্ডা। কেঁদে বুক ভাসিয়ে অনুরোধ করেছে, কালবিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি তুলে ফেলতে জনকে।

    কর্ণপাত করেনি সাহেব ওর কথায়। ভেবেছিল, জন হয়তো মিনিট বাড়ানোর অনুশীলন করছে তলায়। সাত মিনিটের মুখে টমাস উঠে এল একা। সাহেবের প্রশ্নের জবাবে জন সম্বন্ধে কিছু জানে না বলল। আর বলল, ক’দিন ধরে আমার চেয়ে মিনিট বাড়াবার কথা বলছিল জন। মিনিট বাড়লে ঝিনুক তুলতে পারবে বেশী। টাকা পাবে বেশী। তাই দমবন্ধ করে থাকার অভ্যেসটা বাড়াতে হবে। নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত ছিলুম। ও কি করছে না করছে, লক্ষ্য রাখিনি অত।

    টমাসের এই ধরনের জবাবদিহি মেনে নেয়নি মিলিণ্ডা। ওর অত কথার একবর্ণও বিশ্বাস করেনি। সাহেবের কাছে গোপন কথা গোপন করেনি সে। টমাস রোজ আসত মিলিণ্ডাদের খুবরিতে। ওকে একলা পেলেই রাণী বানাবার কথা শোনাত। জন দু’মিনিটের জায়গায় চার মিনিট দম বাড়িয়েছে। সে-ও ওর চেয়ে তিন-চার মিনিট বাড়াবে। তখন? তখন জনের চেয়ে তার উপায় হবে বেশী। আর মিলিণ্ডা তো জনকে ছেড়ে আসতে বাধ্য হবে তার কাছে রাণী হবার জন্য।

    কথা শুনে পা থেকে মাথা অবধি জ্বলে উঠেছে মিলিণ্ডার। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে ওকে। দাঁত বার করে হাসতে হাসতে চলে গেছে টমাস। আবার এসেছে, আবার গেছে। জনের মৃত্যু হবার আগের দিনেও এসে জানিয়েছে এবার তাড়াতে পারবে না আর ওকে সে। নিজে হতেই ঘরে ডেকে তুলবে।

    মিলিণ্ডার জন্যই টমাস উন্মত্তের মধ্যে জনকে পৃথিবী থেকে যে সরাতে চেয়েছিল এটা অবিশ্বাস করেছিল সাহেব। অবিশ্বাস করেছিল, মিলিণ্ডার মুখে শোনা জন-হত্যার কাহিনীটাও। জনের দম বন্ধ রাখার সময় উতরে যাওয়ার পরও ওকে জোর করে জলের তলায় আটকে রেখে মরতে বাধ্য করেছে টমাস। সে-দৃশ্য স্বপ্নে দেখেছে মিলিণ্ডা, জনের কবরের ওপর মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল যখন হঠাৎ জেগে উঠে আবার কান্নায় ভেঙে পড়েছে। সে কান্না থামতে চায়নি তার কিছুতেই। কাঁদতে কাঁদতেই শুনেছে, ভিতরে কে যেন কথা কয়ে উঠছে জোরে জোরে। সাহেব কোন প্রতিকার করতে না পারলে ব্যবসা নষ্ট হবে। জনের মতো টমাকেও মরতে হবে একদিন নিশ্চয়ই। কেউ রক্ষে করতে পারবে না, পারবে না—পারবে না।

    পাগলেরই প্রলাপ বটে। মিলিণ্ডা কিছু বলতে এলে শুনত না সাহেব। ওকে দূরে দেখলে পালাতে চেষ্টা করত। পাগলীর উপদ্রব থেকে বাঁচবার জন্য। কিন্তু বাঁচতে পারেনি সাহেব ওর কোপ থেকে। দিন দিন ভীষণ হয়ে উঠতে লাগল মিলিণ্ডা। এই ভীষণ ভাবটা মুক্তো তোলার সময়েই হত ওর। অন্য সময় স্বাভাবিক। স্বাভাবিক অবস্থাতেই ওর ডেরায় গেছে সাহেব ব্যবসায় ক্ষতি না করবার জন্য বোঝাতে। গেছে টমাসের ওপর ভুল ধারণা থেকে অনুরোধ করে নিবৃত্ত করতে। টমাসের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ নেই। স্বপ্ন স্বপ্নই। সত্যি নয়। গোড়া থেকে টমাসকে অন্য চোখে দেখার ফলই এই দুঃস্বপ্ন।

    ধীর-স্থির হয়ে শুনেছে মিলিণ্ডা সমস্ত। তারপর বলেছে, সাহেব! বিশ্বাস কর! আমি যে কি করি কিছুই জানি না নিজে।

    টমাসের মৃত্যুর পরও দেখেছি মিলিণ্ডাকে সমুদ্রের ধারে। ঝিনুক তোলবার সময় এসে দাঁড়িয়েছে রোজ। কপনি পরা হৃষ্টপুষ্ট কালো মানুষগুলোকে জলে নামতে উৎসাহ দিয়েছে হাসি মুখে। জল থেকে রাশি রাশি ঝিনুক তুলে, ব্যাগ ভর্তি করে ওপরে এসে উঠেছে ডুবুরিরা নির্বিঘ্নে। দেখে, আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠেছে মিলিণ্ডার স্নেহস্নিগ্ধ দু’চোখ।

  • সুদর্শনের চিতাগ্নি

    সুদর্শনের চিতাগ্নি

    সিঁড়ির ধাপে ধাপে পায়ের শব্দ—একসঙ্গে অনেক লোক উঠছে যেন। ভীতসন্ত্রস্ত চোখে খোলা দরজার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সুদর্শন। একটু আগে আচমকা ঘুম ভেঙে গেছে। চোখ খুলে ঘরের চতুর্দিকে চেয়ে অবাক হয়ে গেছে। রামভকত নেই। দক্ষিণদিকে চারপাইটা খালি। মানুষটা কখন দরজা খুলে নিঃসাড়ে পা টিপে টিপে বেরিয়ে গেছে ঘর থেকে সুদর্শন টের পায়নি একটুও। মরণ ঘুম ঘুমিয়েছিল যেন। উত্থানশক্তি রহিত সুদর্শন উঠতে চেষ্টা করছে। দু’হাতের কনুইয়ে ভর দিয়ে ব্যর্থ চেষ্টা করল খানিক। চিৎকার করে যে কাউকে ডাকবে, সে উপায়ও নেই। মাস দুয়েক হল গলার স্বর উচ্চগ্রামে ওঠে না আর। কমতে কমতে এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, এখন তো পাশের লোকও একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়লে কথা বুঝতে পারে না তার। ফিসফিস করে নিঃশ্বাসের আওয়াজে কথা কয় সে। প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া অন্য কথা কয় না আর। কইতেও পারে না।

    গলায় যতটা জোর দেওয়া যায়, ততটা জোর দিয়েই রামভকতকে ডাকল বারতিনেক। শুনল না কেউ, সাড়া দিল না কেউ। সুদর্শন নিজের কানেই শুনল স্রেফ। আর শুনল বোধহয় ঘরের বাঁ কোণের প্রদীপের শিখাটা। ওটা একটু জোরে কেঁপে উঠল বারতিনেক।

    ঘরে ঢুকল পরপর ক’জন। ক’জন গোনবার সময় ছিল না তখন সুদর্শনের। দেখেছিল কতকগুলো কালো ছায়া ঘরময় ঘোরাফেরা করছে। ঘোরফেরা করছে তার চারপাশে। বুকের ভেতরটা ঢিপ ঢিপ করছে। মৃত্যুর আগে নিজের মৃত্যু দেখছে। কালোছায়াগুলো তার চারপাইয়ের চতুর্দিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাত না তুলেও তাকে স্পর্শ না করেও যেন একসঙ্গে বহু হাতে তার আপাদমস্তক সজোরে চেপে ধরছে। হিম হয়ে আসছে সর্বশরীর। ক্ষীণ হয়ে আসছে নিঃশ্বাস। দম আটকে যাচ্ছে। অসহ্য যন্ত্রণা।

    পিলসুজসুদ্ধ, প্রদীপটা নিয়ে এস এদিকে। বজ্রগম্ভীর স্বরে আদেশ করল একজন অন্যজনকে। ঘরটা কেঁপে উঠল। প্রদীপের শিখাটা কাঁপছে থরথর করে। ছায়ার কথায় কায়ার কণ্ঠস্বর শুনে বুকের ভারবোধ কমল অনেকখানি সুদর্শনের। ঘরটারও ঘন বাতাস পাতলা হয়ে এল। যে ক’টা এসেছে, মানুষ ভিন্ন অন্য কেউ নয় তারা। ভূত-প্রেত অশরীরী নয় কেউ। কঙ্কালসার চেহারায় ভিতরে সাহস ফিরে পাচ্ছে সুদর্শন। মানুষকে ভয় করেনি জীবনে। ভয় করতে শেখেনিও কখনো। একা একটা লোকের মহড়া নিয়েছে এক সময় ভরাযৌবনে। সুদর্শনের লাঠির সামনে সাহস করে এগিয়ে আসতে পারেনি কেউ কোনদিন। দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি এক মুহূর্তও।

    যৌবনের সুদর্শন লাঠিয়াল জেগে উঠছে যেন মৃত্যুপথের যাত্রী সুদর্শনের ভিতর। চোখ দুটো জ্বলে উঠছে দপ দপ করে। সাদা ফ্যাকাশে চোখে অত রক্তের লাল এসে গেল হঠাৎ কোত্থেকে কে জানে। সুদর্শন নিজেও জানে না। আগন্তুকদেরই একজন সামনে আনা প্রদীপটা পিলসুজ থেকে তুলে, মুখের কাছে আরতির মতো দু’চারবার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কি যেন দেখতে চেষ্টা করল। তারপর সরোষে বলে উঠল, রক্তচক্ষু দেখিয়ে কোন লাভ হবে না। যা করতে এসেছি, তা তোমাকে করাতে হবেই।

    প্রদীপের আলোয় চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লোকগুলোর পা থেকে মাথা অবধি একবার করে দেখে নিল সুদর্শন। প্রত্যেকের সর্বাঙ্গ কালো আলখাল্লায় ঢাকা। মুখ কালো মুখোশে ঢাকা। এই মিশমিশে কালো আবরণ ভেদ করে শরীরের কোন অঙ্গ দেখবার উপায় নেই কারো। চেনা-অচেনা নিশানা জানবার উপায় নেই কারো।

    হাতের প্রদীপ নামিয়ে রাখল লোকটা পিলসুজের ওপর। মুখ না ফিরিয়েই পাশের লোকের সামনে হাত বাড়াল। ও মানুষটা চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল এতক্ষণ পাথর মূর্তির মত। এবারে নড়ল একটু। বুকের কাছে, আলখাল্লার নীচে থেকে একখানা কাগজ বার করে হাতে দিল।

    বুকের মধ্যে ঝড় বইছে সুদর্শনের। এ কী দেখছে। এ কী দেখল! কাগজ দেবার সময় যার হাত দেখল, যে আঙুল দেখল—অচেনা নয়, অজানা নয়। ফর্সা হাতটায় কালি মাখিয়েও চোখে ধোকা লাগাতে পারেনি সুদর্শনের। আংটিটা আঙুল থেকে খুলতে ভুলে গেছিল হয়তো ও। আংটিই চিনিয়ে দিয়েছে ভালো করে সুদর্শনকে—ও কে।

    নামটা উচ্চারণ করতে যাচ্ছিল মুখ দিয়ে—থমকে গেল। ওরা সকলে মিলে উচ্চারণ করতে দিল না তাকে। চারদিক থেকে চোখ ধাঁধানো চকচকে ছোরা উঁচিয়ে ধরেছে। চোখের ওপর, মাথার ওপর বুকের ওপর।

    সুদর্শন বিস্মিত ক্রুদ্ধ নির্বাক নিরুপায়।

    কাগজটা হাতে পেতে সুদর্শনের দিকে এগিয়ে দিয়ে তীব্র তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, শীগগির সই করে দাও। না দিলে, পরিণতিটা আঁচ করতে পারছ নিশ্চয়। জোর করে সুদর্শনের ডান হাতে কলম ওঁজে দিল লোকটা।

    একবার সবার দিকে তাকিয়ে দেখল সুদর্শন। তারপর ব্যর্থ ক্ষোভ ঝরে পড়ল মৃদুনিঃশ্বাসে। দুর্বল হাতে পুরো নামটা সই করে দিল।

    কার্যসিদ্ধি হয়ে গেছে। আর এক তিলও দাঁড়াবার প্রয়োজন নেই কারো এ ঘরে। ত্বরিৎগতিতে উধাও হয়ে গেল সকলে ঘর থেকে।

    খানিক পরে আবার সিঁড়ির ধাপে ধাপে অনেক গুলো পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে সুদর্শন। যাবার সময় হয়তো ওকে শেষ করে যেতে ভুলে গেছে বলে ফিরে আসছে ওরা।

    সুদর্শনের ভুল ধারণা ভাঙল আগন্তুকদের দেখে। যারা এসেছে, তারা রামভকতের লোক। এই রকম যে ঘটবে, এটা রামভকত বুঝতে পেরেছিল বাইরের লোকের কানাঘুষো থেকে। সকালেই বুঝেছিল। তার লোকদের বলাও ছিল এদের প্রতিরোধ করবার জন্য। উচিতমত শিক্ষা দিয়ে শায়েস্তা করবার জন্য। ওদের আসবার আগে রাতে উঠে নিজের লোকদের আনতে গেছিল তাই ও। আপসোসের অন্ত নেই তার। তারা পৌঁছবার আগেই কাজ সমাধা করে সরে পড়েছে ওরা।

    রামভকতের কথা শুনে মুখে কিছু বলল না সুদর্শন। কিছুক্ষণ ধরে একদৃষ্টে দেখল শুধু ওকে। দেখল আর ভাবল। কি দেখেছে রামভকতকে এতদিন ধরে? কি ভেবেছে ওর সম্বন্ধে? জয়রাজের সমস্ত কথাই কি ফলবে শেষ পর্যন্ত? যুক্তিতর্কের তলোয়ার দিয়ে কেটে কুচি কুচি করে দিয়েছে জয়রাজের অনেক যুক্তিতর্ক। তবুও হার মানেনি জয়রাজ। হার মেনেছিল সে-ও কি তার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে? না, সেখানে সে অটুট অবিচল।

    দৌড়ে কাছে এসে, সুদর্শনের বুকের ওপর বাচ্চা ছেলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল রামভকত। চাচা—ক্ষমা কর! দেরী হয়ে গেছে। এসে যে তোমায় প্রাণে বেঁচে থাকতে দেখেছি—এটাই পরম ভাগ্য আমার।

    নির্বাক মুখে রামভকতের মাথায় হাত বুলোতে লাগল সুদর্শন শীর্ণ হাতে। বুকের ওপর থেকে উঠে পড়ল রামভকত। সুরাই থেকে জল গড়িয়ে গেলাস ভর্তি করে নিয়ে এল–চাচা! এতক্ষণে বুকের ভিতর শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে নিশ্চয়। ভিতরটা ভিজিয়ে নাও একটু একটু করে।

    সুদর্শনের দু’চোখে ভয়। ঘাড় নাড়ল। খাবে না, ঠোঁট টিপে রইল জোর করে। দিনে রাতে যে কোন সময় জল খাওয়াতে গেলে এই রকমই করে সে। ভিতরটা জ্বলে যায় তার হু হু করে।

    সব জানে রামভকত। সব শুনেছে সুদর্শনের কাছ থেকে। তবুও রামভকত সব সময় ওকে জল খাওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যুক্তি দেখায়, ডাক্তাররা বলেছেন। জোর করে খেতে হবে। পেটের ভিতর বুকের ভিতর ঘায়ের জন্য কষ্ট একটু হবে। শীগগির ভালো হয়ে যাবে। এ কষ্ট থাকবে না তখন আর।

    ঠোঁট ফাঁক করে, জোর করে জল ঢেলে দিল গলায় রামভকত। ফেলতে পারল না সুদর্শন। মুখে হাত চেপে ধরল রামভকত। ঢোক গিলল সুদর্শন অতি কষ্টে। মুখখানা যন্ত্রণাকাতর বিবর্ণ হয়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। দু’চোখের কোণ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল দু’গাল বেয়ে।

    এই অবধি পড়ার পর আমার যেন কেমন মনে হতে লাগল। হঠাৎ টওসা নদীর ঠাণ্ডা বাতাস উত্তপ্ত হয়ে উঠল যেন। পশ্চিমের খোলা জানালা দিয়ে ছুটে আসছে ঘরের ভিতর। আছড়ে আছড়ে পড়ছে আমার গায়ে। ভিতর বার জ্বলে যাচ্ছে আমার। দারুণ জ্বলুনি। খাতাটা চারপাইয়ের ওপর রেখে দিয়ে জানালার ধারে এসে দাঁড়ালুম আমি। টওসা নদীর তীরে আগুন জ্বলছে দাউদাউ করে। কার মৃতদেহ পুড়ছে কে জানে। চিতার আগুনটা আকাশ ছুঁতে চাইছে বুঝি।

    সুদর্শনের ভিতরটা জ্বলতে জ্বলতে শেষে দেহটাও জ্বলে উঠেছিল একদিন নিয়তির টানে ওই চিতায়, ওই শ্মশানে। প্রাণহীন দেহটা জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গেছিল। পৃথিবী থেকে নিঃশেষ হয়ে গেছিল চিরদিনের মতো মানুষটা।

    সুদর্শনের চিতার আগুন পুরোমাত্রায় জ্বলে ওঠবার সময়, যে মর্মন্তুদ দৃশ্য বিভীষিকা দেখেছিলুম ভুলতে পারিনি। নতুন করে চোখের সামনে সেই সব ভেসে উঠছে আমার। দু’চোখে হাত চাপা দিলুম আমি। সরে এলুম চারপাইয়ের কাছে। বসলুম। তুলে নিলুম খাতাটা আবার হাতে।

    সন্ধ্যা নামছে বাইরে। আলো-আঁধারি হয়ে আসছে ঘরের ভিতরটা। আলোর দিকটায় খাতা রেখে সুদর্শনের কাঁপা হাতের টেড়া-বাঁকা লেখাগুলো পড়তে চেষ্টা করছি আমি। কানে বাজছে মর্মভেদী করুণ আর্তনাদ একটা। তবু পড়ার দিকে মনটাকে ধরে রাখবার চেষ্টা করছি আমি। পাতা ওল্টাচ্ছি, লেখা পড়ছি।

    এই সোঢরী গাঁওয়ের মানুষ নিরীহও যেমন ভয়ঙ্করও তেমন। অতি বড় মিত্র অতি বড় শত্রু হয়ে ওঠে নিমেষে এক ইঞ্চি জায়গার দখল নিয়ে। একজন আর একজনকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করে না একটু। জমিজমা রক্ষার তাগিদে, দুশমনদের মারাত্মক আক্রমণের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য, প্রত্যেক ঘরের ছেলেকে সুদক্ষ লাঠিয়াল হয়ে ওঠবার চেষ্টা করতে হয় বাচ্চা বয়েস থেকেই—তার সামর্থ্য থাকুক আর না থাকুক।

    সুদর্শনের সামর্থ্য ছিল। সুদক্ষ লাঠিয়ালের মর্যাদার আসন লাভ করতে বেশী বেগ পেতে হয়নি তাকে। এর জন্য অনেকের ঈর্ষার পাত্র যে হয়নি সে তা নয়। হয়েছিল। মৌখিক হৃদ্যতা দেখালেও অন্তরে বিষের ছুরি নিয়ে ঘুরত বহু লোক। সুযোগ সুবিধে পেলেই ওর নিপাত হওয়ার মারণাস্ত্র প্রয়োগ করতে কালবিলম্ব করবে না তারা।

    বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল সুদর্শন—পাশের বাড়ির জ্ঞাতি ভাই বিহুলাল ওই দলের প্রধান পাণ্ডা। সুদর্শন জানে বিহুলাল তার কাছে অতি নগণ্য। তার হাতের দুটো আঙুলের ডগায় বিহুলালের প্রাণবায়ু। তাই যতটুকু সম্ভব এড়িয়ে চলত বিহুলালকে। নিজের মনকে সব সময় বিশ্বাস করা অনুচিত। কখন কি কুমন্ত্রণা দিয়ে বসে কে জানে।

    সুদর্শনের এড়িয়ে চলাটাকে মহা দুর্বলতা ভেবে নিয়েছিল বিহুলাল। সকল বিষয়ে হাঙ্গামা বাধাবার জন্য ভীষণ তৎপর হয়ে সুদর্শনের পিছু পিছু ঘুরে বেড়াত ছায়ার মতো।

    স্বতন্ত্র ছিল বিহুলালের সম্বন্ধী রামভকত। পিতৃ-মাতৃ হারা রামভকত ওই বাড়ির একটা ছেলে যেন। ছোটবেলা থেকে মানুষ ও ওখানে। বিহুলালের স্নেহপুষ্ট হয়েও ও যেন অন্য ধরণের। দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ। ও-বাড়ির চেয়ে এ-বাড়ি পছন্দ তার বেশী। বিহুলালের চেয়ে সুদর্শনকেই তার ভালো লাগে খুব। অনেকটা তার চাচার মতোই দেখতে বলে এই আকর্ষণ। চাচা পৃথিবীতে নেই আজ।

    দাদা ডাকা উচিত হলেও সুদর্শনকে চাচা বলেই ডাকত রামভকত। জোয়ান রামভকত অনেক সময় অনেক কিছু এসে বলেছে বিহুলালের বিরুদ্ধে। বলেছে দেওয়ালীর দিনে তার জমি দখলের ষড়যন্ত্রের কথা। বলেছে ওই দিনেই নেশায় মাতোয়ারা করে বরাবরের মত চাচার নিশ্বাস বন্ধ করে দেবার কথা। চাচাকে বাইরে বেরুতে বারণ করছে। হুঁশিয়ার হয়ে চলতে অনুরোধ করেছে পায়ে ধরে বারবার। দু’চোখ ছল ছল করে উঠেছে। মৃত চাচার কথা মনে পড়েছে তার।

    দেওয়ালীর দিন সুদর্শনকে আগলে থেকেছে দিনরাত। একবারের জন্যও বাড়ির বাইরে পা বাড়াতে দেয় নি। আঁকা-বাঁকা টওসা নদীর পূর্ব কিনারের জায়গাটাকে কেন্দ্র করে দু’দলের মধ্যে লাঠালাঠি হয়ে গেছে। মাথা ফাটাফাটি হয়েছে। রক্তগঙ্গা বয়েছে। হেরেছে বিহুলালের দল। জিতেছে সুদর্শনরা। জিতলেও এ দলের দু’একজনের যে প্রাণহানি হয় নি, তা নয়। হয়েছে। রামভকত জানিয়েছে, চাচারই বিপদ হবার কথা ছিল। ভুল করেই ও-দু’জনের জীবন নিয়েছে ওরা। ঈশ্বরকে অশেষ ধন্যবাদ। বাড়ি থেকে না বেরুনোয় চাচা রক্ষা পেয়েছে।

    রামভকতকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে সুদর্শন। বড় ছেলে পরাশরের হাতে ওর হাতটা টেনে নিয়ে এসে মিলিয়ে দিয়েছে। বলেছে, আজ থেকে জানবে এও তোমার আর এক ভাই।

    পরের দিন সকালে রামভকত বাড়ি ফিরতে বিহুলালের ক্রুদ্ধ গর্জন ভেসে এসেছে সুদর্শনের কানে। জানালার কাঠের রেলিং ধরে দেখেছে ও-বাড়ির ঘরের ভিতরের ব্যাপার। রামভকতকে দেওয়ালে চেপে ধরে গলা টিপে ধরেছে বিহুলাল। বাড়িসুদ্ধ, সকলে এসে ছাড়াতে চেষ্টা করেছে। রাগে ফুসছে আর চিৎকার করে বলছে বিহুলাল—নিমকহারাম বিশ্বাসঘাতকদের স্থান হবে না এবাড়িতে একদণ্ডও!

    রামভকতকে বার করে দিয়েছে বিহুলাল বাড়ি থেকে। সাদা বালির রাস্তায় বসে বসে হাপুস নয়নে কেঁদেছে রামভকত। এ বাড়িতে আসেনি। পরাশরকে পাঠিয়ে জোর করে সুদর্শন নিয়ে এসেছে ওকে। সেই থেকে রামভকত এ বাড়িতেই রয়েছে। বছর খানেকের ভিতর হর্তাকর্তা বিধাতা হয়ে উঠেছে সে। বিষয় দেখাশোনা থেকে কোন কাজই সে ছাড়া গতি নেই কারো। সুদর্শনের প্রাণের প্রাণ সে। পরাশরের বিশ্বাসী বন্ধু! সুদর্শনের ছোট ছেলে মনোহরের অভিভাবক।

    সকলের কাছে ভালো রামভকত কিন্তু একজনের দু’চক্ষের বিষ কেবল। এ-বাড়িতে আসার শুরু থেকে কোন দিন সুনজরে দেখেনি ওকে সে। সুদর্শনের বাল্যবন্ধু বিশেষ অন্তরঙ্গ লোক জয়রাজ। জয়রাজ অনেক কিছু কানে কানে বলে কান ভারী করতে চেয়েছে সুদর্শনের। ফল ফলেনি। সুদর্শন বন্ধুর ওপর বিরক্ত হওয়া ছাড়া সন্তুষ্ট হতে পারেনি। বন্ধু কিন্তু তার পথ থেকে সরেনি একচুলও। রামভকত শত্রুপক্ষের লোক। শত্রু যখন মিত্র হয়ে ঘরে ঢোকে তখন শিয়রে মৃত্যু আসারই সামিল মনে করতে হবে। বিষয়-আশয় নিয়ে রেষারেষি দু’বাড়ির লোকের রক্ত-মজ্জায়। এটা পূর্বপুরুষ থেকেই চলে আসছে। রামভকতকে দিয়ে নানা অভিনয়ের জাল বিস্তার করে, অনেক কৃত্রিম ঘটনা ঘটিয়ে সুদর্শনের মনের কোণে রামভকত সম্বন্ধে দৃঢ়বিশ্বাস আনিয়েছে বিহুলাল। বাইরের শত্রু ঘরে ঢুকেছে। প্রতিশোধ-স্পৃহা চরিতার্থ করবে বিহুলাল শীগগির রামভকতকে দিয়ে।

    বন্ধুর সতর্কবাণী হেসে উড়িয়ে দিয়েছে সুদর্শন। সাবধান তো হয়ইনি, বরং বন্ধুর গোপন উপদেশ-পরামর্শ—সমস্ত বলে দিয়েছে রামভকতকে। পিঠে হাত চাপড়ে সস্নেহে বলেছে, তুমি কিছু মনে কর না। জয়রাজটা বদ্ধ পাগল। কাকে বিশ্বাস করতে হয়, কাকে অবিশ্বাস করতে হয় কিছু জানে না।

    এরপর থেকে কালরোগ ধরল সুদর্শনের। পেটের ভিতর জ্বালা। ডাক্তার বৈদ্যরা রোগ ধরতে পারল না। রোগ সারাতে পারল না হাজারো চেষ্টা করেও। রোগের ব্যাপার নিয়েও জয়রাজ বলেছে, ওর যত্ন নিতে, ওর হাতে কিছু খেতে কতবার মানা করেছি। নিশ্চয় কিছু জিনিস খাইয়েছে ও তোমায়।

    ঘৃণা এসেছে বন্ধুর ওপর। খুব নীচমন জয়রাজ। যে লোকটা নাওয়াখাওয়া ত্যাগ করে দিনরাত জেগে, প্রাণ দিয়ে, সেবা করছে, সুস্থ করে তোলবার চেষ্টা করছে, তার নামে এই দুর্নাম দিতে জিভে বাঁধল না জয়রাজের।

    সুদর্শনের কিছু হলে ছেলেটা পথে বসবে। নিজের দুই ছেলের মতো ধর্মছেলে রামভকতকেও বিষয়ের সমান অংশ উইল করে দিয়েছে। উইলের সময়ও বিশ্বাসের ভিত টলেনি সুদর্শনের একবারের জন্য। টলল পরাশর খুন হয়ে যেতে, টওসা নদীর ধারে জমি দখলের ব্যাপার নিয়ে। দখলের সময় পরাশরকে জায়গাটায় যেতে বার বার প্ররোচনা দিয়েছে রামভকত। পরাশরের যাবার প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও। এ সময়ও পরাশরকে পাঠাতে নিষেধ করেছিল জয়রাজ।

    বড় ছেলে যাবার পর ছোটকেও তৈরি করবার জন্য অস্থির হয়ে উঠল রামভকত। ভীতু হয়ে ঘরে বসে থাকার কোন মানে হয় না। মনোহরকে যেতেই হবে অন্য জমি দখল করতে। ভাইয়ের খুনের বদলে খুন নিতে হবে তাকে। জয়রাজ সুদর্শনের হাত ধরে অনুনয় বিনয় করে বারণ করল মনোহরকে যেতে দিতে। মনোহর চলে গেলে বংশে বাতি দিতে থাকবে না আর কেউ। কথাটা দাগ কাটল সুদর্শনের মনে। ভিতরটা অব্যক্ত ব্যথায় টনটন করে উঠল। বড় ছেলে যাবার পর থেকে ও-বাড়ির জানালা দিয়ে ভেসে আসে বিহুলালের পৈশাচিক উল্লাসের অট্টহাসি। কি জল খাওয়ায় কে জানে রামভবত। অন্যের হাতে খেলে ভিতর জ্বলে না। ওর হাতে খেলেই ভীষণ জ্বলে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে।

    সম্পূর্ণ রামভকতের কজায় চলে গেছে সুদর্শন। ও তার নিয়তি, ও তার মৃত্যু। রেহাই নেই ওর হাত থেকে বেরুবার আর এ-জীবনে। তার শেষ হোক দুঃখু নেই। মনোহর বাঁচুক। বংশ রক্ষা পাক।

    গোপনে জয়রাজের সঙ্গে মনোহরকে শহরে পাঠিয়ে দিয়েছে সুদর্শন। মনোহরকে বাড়ির ত্রিসীমানায় না দেখতে পেয়ে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে উঠেছে রামভকতের দু’চোখে। মোহ কেটেছে তাই এ আগুন দেখতে পেয়েছে সুদর্শন। ভয়ে শিউরে উঠেছে। জয়রাজের পরামর্শ মতো আগের উইল ছিড়ে ফেলেছে টুকরো টুকরো করে। এসে পডেছে ঘরে রামভকত। ঘরময় ছেড়া কাগজের টুকরো দেখে চমকে উঠেছে। কাগজ কুড়িয়ে ভালো করে দেখে বুঝতে পেরেছে, উইল ছিঁড়ে বিষয়ের অধিকার থেকে নাকচ করে দিয়েছে তাকে সুদর্শন। রামভকতের মুখখানা রাগে রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে।

    এর পরের ঘটনা—সেই রাতেই লোকলস্কর নিয়ে এসে ভয় দেখিয়ে সুদর্শনকে সই করিয়ে নিয়েছে। ওর হাতের আংটিটা দেখে চিনেছিল সুদর্শন ওকে। সমস্ত বিষয়টা নিজের নামে রাখবে বলে যে সই করিয়ে নিয়েছে, এটা বেশ বুঝতে পেরেছিল সে।

    নতুন উইলে লিখেছে, আগেকার যত উইল, জ্ঞানে-অজ্ঞানে যেখানে যা সই করেছে, সমস্ত বাতিল, সব সম্পত্তি মনোহরের।

    পাতা ওল্টাচ্ছি আমি। খাতার খানতিনেক পাতা একেবারে সাদা। কালির আঁচড় পর্যন্ত পড়েনি। চতুর্থ পাতায় সুদর্শন লিখেছে আবার। খুব ছোট্ট লেখা। এইটাই শেষ লেখা তার।

    মনোহর কোনদিন ফিরে এসে যদি রামভকতকে বেঁচে থাকতে দেখে, একটুও দেরী না করে তখুনি যেন শহরে মামার বাড়িতে চলে যায়।

    খাতাটা সুদর্শনের বিশ্বস্ত বন্ধু জয়রাজ দিয়েছিল পড়তে।

    বাপ মারা যাবার খবর পেয়ে আমার সঙ্গে গাঁওয়ে এসেছিল মনোহর।

    …তখন চিতা জ্বলছে। শুনলুম, সুদর্শন না কি দুটো হাত ধরে বিশেষ অনুরোধ করে বলে গেছে রামভকতকে, মারার পর ও ছাড়া অন্য কেউ যেন তার মুখাগ্নি না করে। করলে তার আত্মা তৃপ্তি পাবে না।

    আমি আর মনোহর শ্মশানে বসে আছি। কাঁদছে মনোহর। চিতা থেকে একটু দুরে রামভকতও বসে আছে। কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। নজর পড়ল মনোহরের দিকে। ভিজে গলায় রামভকত চিৎকার করে বলে উঠল, চাচাজী চল গ্যয়েরে মনোহর। উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে আসছে মনোহরের দিকে।

    আচমকা কি ঘটে গেল, বুঝে উঠতে পারল না শ্মশানসুদ্ধ কেউ। চিতার আগুনটা লাফিয়ে উঠে, সজোরে ঝাঁপিয়ে পড়ল যেন রামভকতের ওপর। মুহূর্তে জ্বলে উঠল রামভকতের সর্বশরীর। বাঁচবার জন্য রামভকতের কি আকুলিবিকুলি! বুক ফাটানো কি করুণ আর্তনাদ! যে দিকেই ছুটে পালাতে যাচ্ছে—আগুনটা যেন সেদিকের পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে। টানছে চিতার দিকে। নিয়ে এল চিতার পাশে একেবারে। একজন দু’জন নয়, বহুজন স্বচক্ষে দেখলুম সে নির্মম দৃশ্য। নিমেষে একটা দমকা বাতাস এসে রামভকতকে সজোরে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল জ্বলন্ত চিতার মাঝখানে। লাল গনগনে আগুনটা আকাশ ছোয়া হয়ে উঠল ঠিক সেই সময়।