» » একত্রিশ

বর্ণাকার

খুনের চরের মারামারিতে হেরে যাওয়ায় জঙ্গুরুল্লার সম্মানের হানি হয়েছে অনেক। ফজলের বিরুদ্ধে ঘর পোড়ানো মামলার কারসাজি বানচাল হয়ে যাওয়ায় আরো খোয়া গেছে তার মান-সম্ভ্রম। সে খেলো হয়ে গেছে, মিথ্যাচারী বলে প্রমাণিত হয়েছে আইনের মানুষদের কাছে। স্রোতের তোড়ে তলা ক্ষয়ে যাওয়া নদীর পাড়ের মতো তার প্রভাব-প্রতিপত্তির ভিত ক্ষয়ে গেছে। তার নামের শেষের স্বনির্বাচিত সম্মানসূচক পদবি আর কারো মুখে উচ্চারিত হয় না আজকাল। বরং সহাস্যে উচ্চারিত হয় তার নামের আগের বিশেষণটি।

জঙ্গুরুল্লা তার কীর্তিধর পা দুটোকে পরিচর্যার জন্যই শুধু একটা চাকর রেখেছে। সে লোকজনের সামনে কাছারি ঘরে গিয়ে বসলেও চাকরটি গিয়ে তার পা টিপতে শুরু করে। লোকজনকে সে বোঝাতে চায় তার পায়ের মূল্য। এ পা সোনা দিয়ে মুড়ে রাখবার ক্ষমতা আছে তার। ফরমাশ দিয়ে এক জোড়া সোনার জুতা বানিয়ে পরলে কেমন হয়? জঙ্গুরুল্লা মাঝে মাঝে ভাবে। তা হলে ‘সোনা-পাইয়া’ বা ও রকম সুন্দর একটা বিশেষণ তার নামের আগে যুক্ত হয়ে যাবে।

জঙ্গুরুল্লা চেয়ারে বসে পদসেবার জন্য পা দুটো চাকরের কোলের ওপর রেখে আজকাল প্রায়ই চিন্তার অলিগলিতে বিচরণ করে। ভাবে ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের কথা :

…খুনের চরটা আবার দখল করতে হবে। মাসখানেক পরে তার কোলশরিকদের রোপা আমন ধান পাকবে। তার আগেই ওটা দখল করতে হবে। ব্যর্থ হলে তার হারানো প্রভাব প্রতিপত্তি আর ফিরে আসবে না। পীরবাবার খানকাশরিফ আর বাড়ির কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। পীরবাবা এলে নতুন বাড়িতে তার বসবাসের সুব্যবস্থা করতে হবে। আরশেদ মোল্লার সাথে কথা বলে শুভ দিন ধার্য করে শুভ কাজটা সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু আরশেদ মোল্লাকেই তো পাওয়া যাচ্ছে না। খুনের চর থেকে চুবানি খেয়ে সে যে কোথায় চলে গেছে, তা কেউ বলতে পারে না। বাড়িতে সে নাকি কিছু বলে যায়নি। জামাইর হাতের চুবানি খেয়ে লজ্জায় আত্মহত্যা করেনি তো? আত্মহত্যা করলেও অসুবিধে নেই। ওর বিধবাকে আরো সহজে পথে আনা যাবে। আর কিছুদিন পরেই আসতে শুরু করবে দাদনের ধান। ঐ ধান মজুদ করার জন্য গুদাম তৈরি করতে হবে। দুটো টিনের ঘর কেনা হয়েছে। ওগুলোর টিন দিয়ে তৈরি করতে হবে গুদাম। বড় দারোগা বড় কড়া লোক। সে তার ওপর বড় খাপ্পা। তাকে কিছুতেই বশ করা গেল না। তাকে যদি অন্য থানায় বদলি করানো যেত। থানার দারোগা হাতে না থাকলে কোনো কিছুতেই সুবিধে করা যায় না, কোনো কাজে সফল হওয়া যায় না।

জঙ্গুরুল্লার সব চিন্তার বড় চিন্তা কি ভাবে ফজলকে জব্দ করা যায়। তার সব কাজের বড় কাজ–কোন্ ফিকিরে ওকে আবার জেলে ঢোকানো যায়।

হঠাৎই একটা সুযোগ পেয়ে যায় সে। সুযোগ নয়, সে এক মহাসুযোগ। এ যেন রূপকথার মোহরভরা কলসি। হাঁটতে হাঁটতে তার ঘরে এসে হাজির।

পীরবাবা ভাগ্যকূল এসেছেন–খবর পায় জঙ্গরুল্লা। তাকে আবার কোন মুরিদ দখল করে ফেলে তার কি কোনো ঠিক আছে? এটাও চর দখলের মতোই দুরূহ কাজ।

খবর পাওয়ার পরেই দিনই মোরগের বাকের সময় সে পানসি নিয়ে ভাগ্যকূল রওনা হয়। পানসি বাওয়ার জন্য তিনজন বাঁধা আছে–একজন হালী ও দু’জন দাঁড়ী। এছাড়াও অতিরিক্ত দু’জন দাড়ী সে সাথে নেয়। যাওয়ার সময় উজান ঠেলে যেতে হবে। বছরের এ সময়ে বাতাস কম। তাই পাল না-ও খাটতে পারে। হয়ত সবটা পথ দাঁড় বেয়ে, গুন টেনে যেতে হবে।

পানসিতে উঠেই জঙ্গুরুল্লা ওজু করে ফজরের নামাজ পড়ে। নামাজের শেষে হাত উঠিয়ে সে দীর্ঘ সময় ধরে মোনাজাত করে। মোনাজাতের মধ্যে সে আল্লার কাছে অনেক কিছু প্রার্থনা করে। অনেক কিছুর মধ্যে দুটো ব্যাপারে সে বারবার পরম দয়ালু আল্লার সাহায্য প্রার্থনা করে, ‘…ইয়া আল্লাহ, এরফান মাতব্বরের পোলা ফজলরে শায়েস্তা করার বুদ্ধি দ্যাও, শক্তি দ্যাও, সুযোগ দ্যাও। ইয়া আল্লাহ, থানার বড় দারোগা আমার উপরে বড় রাগ, বড় খাপ্পা। ইয়া আল্লাহ, তারে অন্য থানায় বদলি কইর‍্যা দ্যাও। রাব্বানা আতেনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখেরাতে হাসানাতাও ওয়াকেনা আজাব আনার। আমিন।’

জঙ্গুরুল্লা খাস খোপ থেকে বেরিয়ে ছই-এর সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়।

ফরসা হয়ে গেছে চারদিক। রক্তরাঙা গোলাকার সূর্য দিগ্বলয় ছাড়িয়ে উঠে গেছে। শিশির ভেজা ধানের শিষ আর কাশফুল মাথা নুইয়ে ভোরের সূর্যকে প্রণাম করছে, স্বাগত জানাচ্ছে। ঝিরঝিরে বাতাসের স্পর্শে শিহরিত রূপালি পানি কুলকুল শব্দে বয়ে যাচ্ছে। উজান ঠেলে, ভাটি বেয়ে বিভিন্ন মোকামের ছোট বড় নানা গড়নের খালি বা মালবোঝাই নৌকা চলাচল করছে। দুটো গাধাবোট টেনে নিয়ে একটা লঞ্চ উত্তরের বড় নদী দিয়ে পুবদিকে যাচ্ছে।

জঙ্গুরুল্লার পানসি গুনগাঁর খাঁড়িতে ঢোকে। কেরামত হাল ধরে আছে। বাকি চারজন টানছে দাঁড়। কুলোকেরগাঁও বাঁয়ে রেখে, ডাইনগাঁও ডানে রেখে পানসিটা উত্তর-পশ্চিম কোনাকুনি বড় নদীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

জঙ্গুরুল্লা ডান দিকে তাকায়। ডাইনগাঁয়ে ভাঙন শুরু হয়েছে। সে আবার বাঁ দিকে তাকায়। কুলোকেরগাঁও বড় হচ্ছে পলি পড়ে।

সামনে ডানদিকে বেশ কিছু দূরে দুটো চিল শূন্যের ওপর মারামারি খামচাখামচি করতে করতে নিচে পড়ে যাচ্ছে। ও দুটো পানিতেই পড়ে যাবে মনে হয়। কিন্তু গায়ে পানি লাগার আগেই একটা চিল রণে ভঙ্গ দিয়ে উড়ে পালায়। তার পিছু ধাওয়া করে অন্যটা। কিছুদুর পর্যন্ত তাড়া করে বিজয়ী চিলটা ফিরে যায় পাড়ের কাছের সেই জায়গাটায়।

কেরামতের চোখের সামনেই ঘটছে চিলের মারামারি। সে উৎসুক দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছে চিল দুটোর গতিবিধি।

চিলটা পানির ওপর তীক্ষ্ণ লোলুপ দৃষ্টি ফেলে চক্কর দিচ্ছে আর ছোঁ মারার জন্য তাওয়াচ্ছে। মনে হয় এখনি ছোঁ মারবে। হটে যাওয়া চিলটা ওখানেই যাচ্ছে আবার। বিজয়ী চিলটা আবার ওটাকে দূরে তাড়িয়ে দিয়ে ফিরে যায় সে জায়গায়।

কেরামত ঠিক বুঝতে পারে না, নদীতে এত জায়গা থাকতে দুটো চিলেরই রোখ ঐ এক জায়গায় কেন? মাছের খনি আছে নাকি ওখানে?

জায়গাটার কাছাকাছি পশ্চিম দিক দিয়ে এখন যাচ্ছে পানসিটা।

চিলটা ছোঁ মারে হঠাৎ। নখরে বিঁধিয়ে কী নিয়ে উঠছে ওটা? আরে, একটা জাল যে! জালের একটা মাছও তো বিঁধে আছে নখরে!

‘হুজুর দ্যাহেন দ্যাহেন চাইয়া দ্যাহেন চিলের কাণ্ড!’ বিস্মিত কেরামত এক নিশ্বাসে বলে।

জঙ্গুরুল্লা দেখে, একটা চিল জালের মাছ নখরে বিঁধিয়ে জালসহ ওপর দিকে পাখা ঝাঁপটিয়ে উঠবার চেষ্টা করছে। জালের এক প্রান্তে বাঁধা সুতলির কিছুটা ওপরে উঠে গেছে জালের সাথে। সুতলির আর এক প্রান্ত নিশ্চয়ই পানির নিচে কোনো কিছুর সাথে বাঁধা আছে–ভাবে জঙ্গুরুল্লা। তাই জালটা ওপরে টেনে তুলতে পারছে না চিলটা। জালের ভেতর কয়েকটা মাছও দেখা যাচ্ছে। বিতাড়িত চিলটা এদিকে আসছে আবার। ওটা জালের মাছের ওপর থাবা দেয়ার উপক্রম করতেই দখলদার চিলটা জালসহ মাছ ছেড়ে দিয়ে ওটার পেছনে ধাওয়া করে। জালটা ধপ করে পানিতে পড়ে যায়।

‘এই কেরা, নাও ভিড়া জলদি। জালডা কিয়ের লগে বান্দা আছে, দ্যাখন লাগব।’

কেরামত ও দাড়ীরা সবাই বিস্মিত দৃষ্টিতে জঙ্গুরুল্লার দিকে তাকায়।

‘আরে চাইয়া রইছস ক্যান? ত্বরাত্বরি কর।’

কেরামত নৌকা ঘুরিয়ে কিনারায় জালটার কাছে নিয়ে যায়।

স্রোতের টানে জালটা ডুবে যাচ্ছে, আবার ওটার এক প্রান্ত ভেসে উঠছে কিছুক্ষণ পরপর। কয়েকটা মরা পেট-ফোলা মাছ চিৎ হয়ে আছে জালের মধ্যে।

‘এই কেরা, কিনারে নাও বাইন্দা রাখ। ভাল জাগায় বান্দিস। পাড় ভাইঙা যেন না পড়ে।’

কেরামত পাড়া গেড়ে নৌকা বাঁধে কিনারায়।

‘এই কেরামত, পানিতে নাম। জালের সুতলি ধইর‍্যা ডুব দেয়। দ্যাখ জালডা কিয়ের লগে বান্দা।’

কেরামত গামছা পরে পানিতে নেমে বলে, ‘এই ফেকু, তুইও আয়। একলা ডর করে।’

‘কিয়ের ডর, অ্যা ব্যাডা! এহন ভাটা লাগছে। বেশি নিচে যাওন লাগব না।’

ফেকুও গামছা পরে পানিতে নামে। জালের সুতলি ধরে দুজনেই ডুব দেয়। একটু পরে গোতলাগুতলি করে দু’জনই ভেসে ওঠে। ভীত সন্ত্রস্ত কণ্ঠে কেরামত বলে, ‘একটা মানুষ!’

জঙ্গুরুল্লা এটাই অনুমান করেছিল। সে বিস্মিত কণ্ঠে বলে, ‘মানুষ! কেরে মানুষটা? মাথাডা উড়াইয়া দ্যাখ দেখি।’

‘আমার ডর লাগে।’ কেরামত বলে।

‘দুও ব্যাডা। কিয়ের আবার ডর?’

নৌকার বাকি তিনজন তাজু, মেছের ও দূরবক্সকে নাম ধরে ডেকে বলে, ‘তোরা তিনজনও পানিতে নাম। বেবাকে মিল্যা মাথাডা উপরে উড়া। কিন্তু সাবধান। লাশটা যেমুন অবস্থায় আছে তেমুনই রাইখ্যা দিতে অইব। বেশি লাড়াচাড়া দিলে স্রোতে টাইন্যা লইয়া যাইব গা।’

দাঁড়ী তিনজন পানিতে নামে।

‘মাথাডা কুনখানে আছে আগে আতাইয়া ঠিক কইর‍্যা ল।’

কোমর-পানিতে দাঁড়িয়ে তারা আলগোছে লাশের মাথাটা উঁচু করে।

‘আরে! এইডা দেহি হেকমইত্যা চোরা!’ তিন-চারজন এক সাথে কলবল করে ওঠে।

‘হেকমইত্যা চোরা! ওর বাড়ি কই?’ জঙ্গুরুল্লা জিজ্ঞেস করে।

‘এইতো কাছেই পুবদিগে, নয়াকান্দি।’ নূরবক্স বলে।

‘ওর বাড়িতে কে আছে?’

‘আছে ওর মা আর বউ। আর কেও নাই। কাইল বিয়ালে ওরে দিঘিরপাড় দেখছিলাম। ফজল মাতবরের লগে তার নায় উইট্টা বাড়িত গেল।’

জঙ্গুরুল্লার মনে হঠাৎ খুশির বান ডাকে। আনন্দের আতিশয্যে তার মুখ দিয়ে কথা বেরোয় না। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। আর মনে মনে আল্লার শোকরগুজারি করে। আজই ভোরে মাত্র কিছুক্ষণ আগে আল্লার সাহায্য প্রার্থনা করে সে মোনাজাত করেছিল। যে ওজু করে সে মোনাজাত করেছিল সে ওজু নষ্ট হওয়ার আগেই তার মোনাজাত কবুল হয়েছে পরম দয়ালু আল্লার দরবারে। এত তাড়াতাড়ি এত তনগদ আল্লা তার মকসেদ পুরা করবে সে তা ভাবতেই পারেনি।

জঙ্গুরুল্লা তার মনের উল্লাস মনেই চেপে রেখে বলে, ‘এই নূরবক্স, তুই ঠিক দ্যাখছস তো? ঐ নায় আর কে কে আছিল?’

‘আর আছিল নাগরার চরের চান্দু। আর একজনরে চিনি নাই।’

‘ওগ আর কে কে দ্যাখছে?’

‘ঐ সময় দিঘিরপাড় নৌকা ঘাডে যারা আছিল, অনেকেই দ্যাখছে।’

‘তোরা বোঝতে পারছস ঘটনাডা কি?’

সবাই তার মুখের দিকে তাকায়।

‘ঘটনাডাতো আয়নার মতন পরিষ্কার। খুন কইর‍্যা ঐখানে ফালাইয়া গেছে।’

‘খুন! কারা খুন করছে।’ বিস্মিত প্রশ্ন সকলের।

‘হেইডাও বুঝলি না? নূরবক্স কি কইল? কারা ওরে নায়ে কইর‍্যা লইয়া গেছিল?’

ওরা পানি থেকে নৌকায় উঠতেই জঙ্গুরুল্লা বলে, ‘আরে তোরা উইট্যা গেলিনি। এই ফেকু, তুই আবার পানিতে নাম। জালডা মনে অয় কোমরে বান্দা আছে। জাল খুইল্যা আন। মাছগুলা ফালাইয়া দে।’

ফেকু ডুব দেয়। জালের সুতলি ধরে ধরে নিচে যায়। কিন্তু সুতলিটা যেখানে গিঠ দিয়ে বাঁধা সেখানে তার হাত যায় না। গিঠটা উপুড়-হয়ে-পড়ে-থাকা লাশটার পেটের দিকে তাগার সাথে। ভয়েই সে আর ওদিকে হাত বাড়ায় না। সে ওপরে উঠে দম নিয়ে আবার ডুব দেয়। দাঁত দিয়ে সুতলিটা কেটে সে জালটা তুলে নিয়ে আসে। মাছগুলোকে জঙ্গুরুল্লার নির্দেশ মতো সে স্রোতে ভাসিয়ে দেয়।

জঙ্গুরুল্লা চারদিকে তাকায়। দূর দিয়ে দু-একটা নৌকা যেতে দেখা যায়। ধারে কাছে কেউ নেই। একটু পরেই লোকজনের ভিড় জমে যাবে।

‘ও তাজু, ও ফেকু, তোরা পাড়ে নাইম্যা থাক।’ জঙ্গুরুল্লা নির্দেশ দেয়। ‘তোরা পাহারা দিবি। আরেকটু পরে খবর পাইয়া মানুষজন আইস্যা ভিড় জমাইব। খবরদার, কাউরে পানি নামতে দিবি না। আমরা থানায় খবর দিতে যাইতে আছি। পুলিস আইয়া লাশ উডাইব।’

গলা খাদে নামিয়ে সে আবার বলে, ‘তোরা শোন, চিলের কথা, জালের কথা কিন্তু কারো কাছে কইবি না, খবরদার!’

তাজু ও ফেকু নৌকা থেকে কিছু মুড়ি ও বাতাসা নিয়ে নেমে যায়। পানসিটা রওনা হয় হেকমতের বাড়ির দিকে। পথ চিনিয়ে নিয়ে যায় দূরবক্স।

রাত না পোহাতেই জরিনাকে নিয়ে নাজুবিবি হেকমতের খোঁজে এলাকার চৌকিদারের কাছে গিয়েছিল। কিন্তু চৌকিদার কোনো খোঁজই দিতে পারেনি। ফিরে এসে ঘরে ঢুকতেই হঠাৎ গলা খাকারি শুনে তারা হকচকিয়ে যায়।

‘কে আছে বাড়িতে?’ অপরিচিত ভারী গলায় জিজ্ঞেস করছে কেউ।

‘এইতো আমরা আছি। কেডা জিগায়?’ নাজুবিবি পাল্টা প্রশ্ন করে।

নূরবক্স পা চালিয়ে নাজুবিবির কাছে যায়। নিচু গলায় সে জঙ্গুরুল্লার পরিচয় দেয়।

‘ও, পা-না-ধোয়া…’

‘চুপ, চুপ!’ নূরবক্স মুখে আঙুল দিয়ে সতর্ক করে দেয় নাজুবিবিকে। ‘কও চদরী সাব।’

‘আহেন চদরী সাব।’ নাজুবিবি সাদর আহ্বান জানায়।

জঙ্গুরুল্লা এসে উঠানে দাঁড়ায়।

জরিনা পিড়ি এনে শাশুড়ির হাতে দেয়। সে ওটা পেতে দিয়ে বলে, ‘গরিবের বাড়ি হাতির পাড়া। বহেন চদরী সাব।’

‘না বসনের সময় নাই। তুমিই হেকমতের মা?’

‘হ, হেকমতের কোনো খবর লইয়া আইছেন?’

‘হ।’

‘কি খবর? জলদি কইর‍্যা কন। আমরা তো চিন্তায় জারাজারা অইয়া গেছি।’

খবর শোনার পরের পরিস্থিতিটা আঁচ করতে পারে জঙ্গুরুল্লা। সে বলে, ‘খবর পরে অইব। তুমি আর তোমার পুতের বউ চলো আমাগ লগে নৌকায়। থানায় যাইতে অইব।’

‘থানায়! ওরে কি থানায় বাইন্দা লইয়া গেছে?’

‘পরেই শুনতে পাইবা। এহন তোমরা তৈরি অইয়া লও জলদি।’

তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাজুবিবি ও জরিনা জঙ্গুরুল্লার পানসিতে উঠে বসে।

সরু একটা সোঁতা দিয়ে কিছুদূর ভাটিয়ে পানসিটা গুনগাঁর খাঁড়িতে গিয়ে পড়ে। জঙ্গুরুল্লার নির্দেশে ডানদিকে মোড় নিতেই বাঁদিকে লোকজনের ভিড় দেখা যায়।

দুঃসংবাদটা আর চেপে রাখা ঠিক নয় ভেবে জঙ্গুরুল্লা বলে, ‘হেকমতের মা, তোমরা মনেরে শক্ত করো। যা অইয়া গেছে তার লেইগ্যা কান্দাকাডি করলে আর ফায়দা অইব না।’

‘ক্যান, কি অইছে? আমার হেকমত বাঁইচ্যা নাই? ও আমার বা’জানরে।’ নাজুবিবি ডুকরে কেঁদে ওঠে।

‘শোন, কাইন্দ না। তোমার পোলারে মাইর‍্যা পানির মইদ্যে ঔজাইয়া থুইয়া গেছে।’

নাজুবিবি এবার গলা ছেড়ে বিলাপ করতে শুরু করে দেয়, ‘ও আমার হেকমতরে বা’জান। তোরে কোন নির্বইংশায় মাইরা থুইয়া গেছে রে, বা’জানরে আ-মা–র।…’

জরিনা স্তব্ধ হয়ে গেছে। সে ফুকরে কাঁদতে পারে না। মাথায় লম্বা ঘোমটা না থাকলে দেখা যেত তার দুগাল বেয়ে অশ্রুর ধারা গড়িয়ে তার গলা ও বুক ভিজিয়ে দিচ্ছে।

‘শোন হেকমতের মা, আর কাইন্দা কি করবা? কাইন্দা কি আর পুত পাইবা?’ নাজুবিবির বিলাপ মাঝে মাঝে থামে। আর থামার সাথে সাথেই এক সাথে অনেক অশ্রু ঝরঝর করে ঝরে পড়ে। কিছুক্ষণ পর বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে ওঠে। বুকের ব্যথা অসহ্য হতেই সে আবার শুরু করে দেয় বিলাপ।

জঙ্গুরুল্লা তার বিলাপের বিরতির অপেক্ষায় থাকে। তার বিলাপ থামতেই জঙ্গুরুল্লা বলে, ‘কে মারছে আমরা জাইন্যা ফালাইছি। সাক্ষীও পাইছি।’

‘ও আমার বেসাতরে, আমা-া-ার। তোরে না যেন্ কে না যেন্ মাইরা থুইয়া গেছেরে, তার কইলজা ভরতা কইর‍্যা খাইমুরে বাজা-া-ান আমা-া-ার। বংশের চেরাগ প্যাডে থুইয়া ক্যামনে চইল্যা গেলি, বা’জানরে আমা-া-র।…’

পানসিটা ঘটনাস্থলে এসে থামে। লোকজন নৌকার মাথির কাছে এসে ভিড় করে। তারা নানা প্রশ্ন করে জঙ্গুরুল্লাকে। কারো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু বলে, ‘নয়াকান্দির হেকমতরে খুন কইর‍্যা ঐখানে পানির মইদ্যে জাইয়া থুইয়া গেছে।’

‘কে? কে? কে খুন করছে?’ এক সাথে অনেক লোকের প্রশ্ন।

‘হেইডা পুলিসে বাইর করব। তোমরা কিন্তু পানিতে নাইম্য না। লাশে আত দিও না। পুলিস আইয়া লাশ উডাইব। আমরা থানায় যাইতে আছি। তোমরা দুইজন দাঁড় টানার মানুষ দিতে পারবানি? ত্বরাত্বরি যাওন লাগব। উচিত পয়সা দিমু, খাওন দিমু। আবার বকশিশও দিমু।’

ভিড়ের মাঝ থেকে চার-পাঁচজন হাত উঁচিয়ে নৌকায় কাজ করার ইচ্ছে প্রকাশ করে। তাদের মাঝ থেকে দু’জনকে বেছে নেয় জঙ্গুরুল্লা।

সে নাজুবিবির দিকে ফিরে বলে, ‘ও হেকমতের মা, ঐ যে দেইখ্যা লও। তোমার পোলারে মাইর‍্যা ঐ খানে গুঁজাইয়া থুইছে। পুলিস আইয়া না উড়াইলে দ্যাখতে পাইবা না।’

নাজুবিবি বিলাপ করতে করতে দাঁড়ায়। তার হাত ধরে দাঁড়ায় জরিনাও। পানির নিচে যেখানে লাশ রয়েছে সেদিকে তাকিয়ে নাজুবিবি আরো জোরে বিলাপ করতে শুরু করে।

আর দেরি করা ঠিক নয়। জঙ্গুরুল্লার নির্দেশে পানসি দিঘিরপাড়ের দিকে রওনা হয়। সেখান থেকে আরো সাক্ষী যোগাড় করে যেতে হবে থানায়।

ভাটি পানি, তার ওপর চার দাড়ের টান। পানসিটা ছুটে চলে।

হেকমতের মা ও বউকে তার খাস খোপে বসিয়ে জঙ্গুরুল্লা তালিম দেয়, থানায় গিয়ে কি বলতে হবে।

অল্প সময়ের মধ্যেই তারা দিঘিরপাড় নৌকাঘাটায় গিয়ে পৌঁছে। খাস খোপ থেকে বেরুবার আগে জঙ্গুরুল্লা নাজুবিবি ও জরিনাকে আর একবার সাবধান করে দেয়, ‘কি কইছি, কানে গেছে তো? যেম্বায় যেম্বায় কইয়া দিছি, হেম্বায় হেম্বায় কইবা। আমিতো ওয়াদা করছিই, ঠিকঠিক মতন কাম ফতে অইলে কুড়ি নল জমি দিমু তোমাগ। কুড়ি নলে অনেক জমি, পরায় এগারো বিঘা। তোমরা ঠ্যাঙ্গের উপরে ঠ্যাঙ দিয়া রাজার হালে থাকতে পারবা। আর যদি উল্ট-পাল্টা কও, বোঝলানি, তয় আর তোমায় আড্ডি অ্যাকখানও বিচরাইয়া পাওয়া যাইব না, কইয়া দিলাম।’

জঙ্গুরুল্লা পানসি থেকে নামে। ঘাটের পুবদিকে একটা লঞ্চ দেখা যায়। ওটার পাশেই রয়েছে একটা পানসি। ঘাটের এক পান-বিড়ির দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে সে জানতে পারে, ঐ ‘কুত্তা জাহাজে’ জেলার পুলিস সাব গতকাল দিঘিরপাড় এসেছেন। মূলচরের এক বাড়িতে কয়েক দিন আগে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতদের হাতে তিনজন খুনও হয়েছে। সেই মামলার তদন্তের তদারক করতে এসেছেন জেলার পুলিস সাব। থানার বড় দারোগাও এসেছেন।

এটাও আল্লার মেহেরবানি বলে মনে করে জঙ্গুরুল্লা। থানা পর্যন্ত তাকে আর কষ্ট করে যেতে হবে না।

জঙ্গুরুল্লা ঘাটমাঝির সাথে কথা বলে। সে-ও মাতব্বরের সাথে ডিঙিতে চড়ে হেকমতকে যেতে দেখেছে গতকাল বিকেল বেলা। খোঁজ করে এরকম আরো দু’জন সাক্ষী পাওয়া যায়।

ব্যস। আর দরকার নেই। জঙ্গুরুল্লা তিনজন সাক্ষীর নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা একজনকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়।

গতকাল দুপুরের পর থেকেই তদন্তের তদারক শুরু করেছেন জেলার পুলিস সুপারিনটেনডেন্ট। মামলার দু’জন প্রধান সাক্ষীকে গতকাল পাওয়া যায়নি। আজ ভোরেই তাদের জবানবন্দি শুনে তিনি তার তদারকের কাজ শেষ করেন।

বেলা প্রায় দশটা। সশস্ত্র পুলিস-প্রহরী-বেষ্টিত পুলিস সুপার এবং তার পেছনে বড় দারোগা ও স্থানীয় কিছু গণ্যমান্য লোক লঞ্চের দিকে আসছেন। তারা লঞ্চের কাছে আসতেই নাজুবিবি হাত জোড় করে কান্না-জড়ানো কণ্ঠে বলে, ‘হুজুর আমি ইনসাফ চাই। আমার পোলারে খুন কইর‍্যা ফালাইছে।’

সে আর কিছু না বলে বিলাপ করতে শুরু করে দেয়। বড় দারোগা এগিয়ে এসে নাজুবিবিকে বলেন, ‘এই বুড়ি সরো, সরো, সরে দাঁড়াও সামনে থেকে। আমিই তোমার নালিশ শুনব একটু পরে।’

পুলিস সুপার বাধা দিয়ে বলেন, ‘ওয়াজেদ, লেট হার স্পীক। ও বুড়ি, কি হয়েছে বলো।’

নাজুবিবি কাঁদতে কাঁদতে কি বলছে সবটা বুঝতে পারেন না পুলিস সুপার। জঙ্গুরুল্লা নাজুবিবির পাশেই ছিল জরিনাকে নিয়ে। সে নাজুবিবির হয়ে কথা বলতেই পুলিস সুপার বলেন, ‘হু আর ইউ? আপনি কে?’

‘আমার নাম জঙ্গুরুল্লা চৌধুরী। আমি চরের মাতব্বর।’

‘আচ্ছা, বলুন কি হয়েছে?’

জঙ্গুরুল্লা ঘটনার বিবরণ দিতে শুরু করে।

জঙ্গুরুল্লার কাছ থেকে কিছুটা শুনেই পুলিস সুপার বুঝতে পারেন—হেকমত নামের একটা লোককে ফজল নামের কোনো লোক বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করেছে এবং তার লাশ পানির নিচে লুকিয়ে রেখে গেছে। তিনি বড় দারোগাকে ডাকেন, ‘ওয়াজেদ, দিস ইজ আ কেস অব কাপ্যাল হোমিসাইড। তুমি এদের নিয়ে লঞ্চে ওঠো। লঞ্চের কেবিনে বসেই এজাহার নেবে। আমি কেসটা সুপারভাইস করে ওখান থেকেই চলে যাব। তোমার নৌকা লঞ্চের সাথে বেঁধে দাও।’

মাঝিকে তার পানসিটা লঞ্চের সাথে বাঁধবার নির্দেশ দিয়ে নাজুবিবি ও জরিনাকে নিয়ে বড় দারোগা লঞ্চে ওঠেন।

জঙ্গুরুল্লা হাতের ইশারায় কেরামতকে ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে নিজে তিনজন সাক্ষী নিয়ে লঞ্চে ওঠে। তাদের দেখে বড় দারোগা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস কনে, ‘এরা কারা?’

‘ওরা সাক্ষী।’

বড় দারোগা জঙ্গুরুল্লার কার্যকলাপ সম্বন্ধে ভাল করেই জানেন। এ ব্যাপারটায় তার উৎসাহ-উদ্যোগ দেখে তার সন্দেহ জাগে। তিনি বলেন, ‘ওদের আমার পানসিটায় উঠিয়ে দিন। আর আপনি সারেং এর কাছে গিয়ে বসুন। তাকে আপনিই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন।’

শিকলে-বাঁধা উত্তেজিত কুকুরের মতো। ‘ঘঁউ-ঘঁউ-ঘঁউৎ’ শব্দে সিটি বাজিয়ে লঞ্চ রওনা হয়।

এজাহার নেয়ার আগে বড় দারোগা লঞ্চের দু’নম্বর কেবিনে বসে প্রথমে নাজুবিবি ও পরে জরিনাকে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ঘটনার বর্ণনায় মৃত হেকমতের মা যে বিবরণ দিচ্ছে, তার সাথে একেবারেই মিল খাচ্ছে না মৃতের স্ত্রীর বিবরণ। তিনি পুলিস সুপারের কেবিনে গিয়ে বলেন, ‘স্যার আসল ঘটনাটা কী, বুঝতে পারছি না। শাশুড়ি বলছে এক রকম আর বউ বলছে আর এক রকম। দু’রকম ঘটনা পাচ্ছি।’

‘কি রকম?’

‘মা বলছে–গতকাল সন্ধ্যার কিছু পরে সের কয়েক চাল নিয়ে হেকমত বাড়ি যায়। তার কিছুক্ষণ পরই এরফান মাতব্বরের ছেলে ফজল মাতব্বর ও আরো দু’জন হেকমতকে ডেকে নিয়ে যায়। ছেলের জন্য ভাত রান্না করে সে আর তার ছেলের বউ সারারাত জেগে প্রতীক্ষা করে। কিন্তু সে আর ঘরে ফেরেনি। ভোরে লোকজনের কাছে খবর পায়, গুনগাঁর খাঁড়ির মধ্যে হেকমতের লাশ পড়ে আছে। আর বউ বলছে–হেকমত গতকাল সন্ধ্যার কিছু পরে সের তিনেক কাঁকর-মেশানো চাল নিয়ে বাড়ি আসে। ঘরে ভাতের সাথে খাওয়ার কিছু না থাকায় সে একটা মাছ রাখার জাল নিয়ে শুধু হাতে গর্তের বেলে মাছ ধরার জন্য নদীতে যায়। বউ আর শাশুড়ি চালের কাঁকর বেছে ভাত রান্না করে বসে থাকে সারা রাত। কিন্তু হেকমত আর ঘরে ফিরে আসে না। ভোরে জঙ্গুরুল্লা এসে বউ আর শাশুড়িকে তার পানসিতে তুলে গুনগাঁর খাঁড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে সে একটা জায়গা দেখিয়ে বলে, হেকমতকে কারা খুন করে ঐ জায়গায় লুকিয়ে রেখেছে।’

‘হেকমতকে কে মার্ডার করেছে সে সম্বন্ধে কিছু বলছে বউটা?’

‘না স্যার। সে জানে না, এমন কি সন্দেহও করে না, কে তার স্বামীকে মার্ডার করেছে।’

‘ঐ যে চৌধুরী, কি চৌধুরী যেন নাম?’

‘জঙ্গুরুল্লা চৌধুরী। কিন্তু লোকে বলে, পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লা।’

‘পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লা! সেটা আবার কি রকম নাম?’

‘চৌধুরী খেতাব নিজে নিয়েছে। আগে নাকি সে অন্যের জমিতে কামলা খাটত। সে সময়ে এক বিয়ের মজলিসে পা না-ধুয়ে ফরাসের ওপর গিয়ে বসেছিল। আর তাতে পায়ের ছাপ পড়েছিল ফরাসে। সেই থেকে তার নাম হয়েছে পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লা।’

‘ভেরী ইনটারেস্টিং। পা-না-ধোয়া লঞ্চে এসেছে তো?’

‘হ্যাঁ স্যার। লোকটা মিথ্যা মামলা সাজাতে ওস্তাদ।’

‘ডাকো তাকে।’

জঙ্গুরুল্লা এসে পুলিস সুপার জিজ্ঞেস করেন, ‘কি মিয়া চৌধুরী, মামলাটা সাজিয়ে এনেছেন, তাই না?’

‘না হুজুর, সাজাইয়া আনমু ক্যান!’

‘শাশুড়ি বলছে—হেকমতকে ফজল মাতব্বর ঘর থেকে ডেকে নিয়ে মার্ডার করেছে। আর বউ বলেছে, সে হাতিয়ে মাছ ধরতে গিয়েছিল। সে বলতে পারে না, কে তার স্বামীকে মার্ডার করেছে।’

তালিম দেয়ার সময় বউটা চুপচাপ ছিল। এত সাবধান করা সত্ত্বেও, এত ভয় দেখানো সত্ত্বেও সে তার নিজের ইচ্ছে মতো যা-তা আবোল-তাবোল বলেছে। জঙ্গুরুল্লার ভেতরটা জ্বলে ওঠে রাগে। মনের আক্রোশে মনেই চেপে সে বলে, ‘হুজুর, ঐ ফজল আছিল বউডার পরথম সোয়ামি। তার লগে এখনো ওর পিরিত আছে। ওর লগে যুক্তি কইরাই ফজল হেকমতরে খুন করছে।’

‘অ্যাঁ তাই?’

‘হ, হুজুর, ঐ মাগিডারেও অ্যারেস্ট করন লাগব। ফজলের নৌকায় কাইল হেকমতরে দ্যাখা গেছে। সাক্ষীও আছে।’

‘কোথায় সাক্ষী?’

‘হুজুর, এইখানেই আছে। ডাক দিমু তাগো?’

‘হ্যাঁ, তাদের ডেকে নিয়ে আসুন।’

সারেংকে পথের নির্দেশ দিয়ে ঘাট-মাঝি ও আরো দু’জন সাক্ষীকে জঙ্গুরুল্লা এনে হাজির করে।

এক এক করে সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন পুলিস সুপার নিজে। তিনজন সাক্ষীই বলে, তারা ফজল, চান্দু ও বক্করের সাথে হেকমতকে নৌকায় করে বাড়ির দিকে যেতে দেখেছে। তারা আরো বলে— হেকমত সিঁদকাটা দাগি চোর। সে যে দাগি চোর তা থানার রেকর্ডে আছে বলে বড় দারোগাও জানান।

পুলিস সুপারের মনে আর কোনো সন্দেহ নেই। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারেন, বাড়ি যাওয়ার জন্য হেকমত দিঘিরপাড় থেকে ফজলদের নৌকায় ওঠে। পথের কাঁটা সরাবার এটাই সুযোগ মনে করে ফজল ওকে চুরির বা অন্য কিছুর প্রলোভন দেখায়। হেকমত রাজি হয়ে চাল রেখে আসার জন্য বাড়ি যায়। ওর ফিরে আসতে দেরি দেখে ফজল ওর বাড়ি গিয়ে ওকে ডেকে নিয়ে আসে। তরপরই এ হত্যা। তিনি বড় দারোগাকে নাজুবিবির কথা মতো এজাহার নেয়ার আদেশ দেন।

লঞ্চ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। পুলিস সুপার ও বড় দারোগা কেবিন থেকে বেরিয়ে দেখেন, পাড়ে বহু লোকরে ভিড়। এ-চর ও-চর থেকে বহুলোক হেঁটে, নৌকা করে জমায়েত হয়েছে।

ভিড়ের মাঝ থেকে কয়েকজন বলে ওঠে, ‘উই যে পাও দ্যাহা যায়।’

এখন পুরো ভাটা। লাশের দুটো পায়ের পাতা জেগে উঠেছে।

ঐ হানে ধানখেতের মইদ্যে একটা কালা গঞ্জি পইড়া রইছে। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে কয়েকজন।

বড় দারোগা দু’জন সেপাই নিয়ে পাড়ে নামেন। জঙ্গুরুল্লাও নামে তাদের সাথে। ধানখেতের এক ধানছোপের ওপর পাওয়া যায় দলামুচড়ি করা একটা কালো গেঞ্জি। ওটার প্যাঁচ ছাড়িয়ে কাগজের একটা ছোট পুটলিও পাওয়া যায়। পুটলির ভেতর কিছু সাদা গুঁড়ো।

বড় দারোগা গুঁড়োর কিছুটা দুই আঙুলে তুলে ডলা দিয়ে চেনবার চেষ্টা করছেন জিনিসটা কি। তার চেনার আগেই ভিড়ের মাঝ থেকে কয়েকজন বলে, ‘ওগুলা খাওইন্যা সোড়া। শূলবেদনার লেইগ্যা হেকমত খাইত।’

ওগুলো দেখে পুলিস সুপারের ঠোঁটের কোণে কৌতুকের মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। তিনি তার কথায় রসান দিয়ে বলেন, ‘খুবই ভাল আলামত। খুনিদের তো বেশ বিবেক-বিবেচনা আছে হে। কি বলো ওয়াজেদ?’

‘জ্বী স্যার। গেঞ্জি আর সোডা ভিজে নষ্ট হতে দেয়নি খুনিরা। কষ্ট করে গেঞ্জিটা খুলে যত্ন করে রেখে দিয়েছে।’ কৌতুকের হাসি তারও মুখে।

‘এ বিবেক-বিবেচনার জন্য খুনিদের পুরস্কার পাওয়া উচিত, কি বলো?’

‘জ্বী স্যার, অবিশ্যি পাওয়া উচিত।’

বড় দারোগার নির্দেশে দু’জন কনস্টেবল ও একজন মাঝি পানিতে নামে। কোমর সমান পানি। পা, বুক ও পেটের তলায় হাত দিয়ে তারা লাশটা ওপরে তুলবার চেষ্টা করে। পা থেকে বুক পর্যন্ত সহজেই ওপরেই উঠছে। কিন্তু মাথার দিকটা বেশি উঠছে না। হাত দিয়ে হাতড়াতে হাতড়াতে তারা বুঝতে পারে, একটা হাত পাড়ের মাটির ভেতর ঢুকে আছে। পানিতে জাবড়ি দিয়ে একজন পা ধরে ও দু’জন হাত ধরে জোরে টান দিতেই হাতটা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে। লাশটা ওপর দিকে তুলতেই দেখা যায়, ওর দৃঢ়মুষ্টির ভেতর একটা পেট-গলে-যাওয়া মরা বেলে মাছ।

‘খুন অইছে ক্যাড়া কয়? ব্যাডাতো গদে আত দিছিল।’ ভিড়ের মাঝ থেকে একজন বলে।

‘আরে হ খুনই অইছে। আজরাইলে খুন করছে।’ আর একজন বলে।

‘হ ঠিকই, গদের মইদ্যেরতন আজরাইলে আত টাইন্যা ধইর‍্যা রাখছিল।’ অন্য একজন বলে।

‘আহারে, বাইল্যা মাছ ধরতে আইয়া ক্যামনে মানুষটা মইর‍্যা গেল। কার মরণ যে ক্যামনে লেইখ্যা থুইছে আল্লায়, কেও কইতে পারে না।’ আফসোস করে আরো একজন বলে।

পুলিস সুপার বড় দারোগাকে নিয়ে পানসিতে নেমে কাছে থেকে লাশ ওঠানো দেখছিলেন। লোকজনের কথাবার্তা তার কানে যায়। তিনি মনে মনে বলেন, লোকগুলো ঠিকই বলছে, সঠিক রায়ই দিয়েছে।

লাশটাকে তুলে পানসির আগা-গলুইয়ে পাটাতনের ওপর রাখা হয়।

দু’জন পুলিস অফিসারই তন্নতন্ন করে দেখেন লাশের কোথাও আঘাতের চিহ্ন আছে কিনা। কিন্তু আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না।

হঠাৎ কোমরের তাগায় বাঁধা এক টুকরো সুতলি দেখতে পান বড় দারোগা।

‘স্যার এই দ্যাখেন। এইটের সাথে বাঁধা ছিল মাছ রাখার জালটা। বউটা ঠিকই বলেছিল, মাছ রাখার জাল নিয়ে হেকমত হাতিয়ে বেলে মাছ ধরতে গিয়েছিল।’

‘ইয়েস, ইউ আর রাইট। বেলে মাছের জন্য লোকটা গর্তে হাত দিয়েছিল। পানি আর বাতাসের চাপে ‘চোক্‌ড’ হয়ে যাওয়ায় সে আর হাতটা টেনে বার করতে পারেনি। ভেরি ভেরি আনফরচুনেট! মনে হয়, ও যখন জোর করে হাত বার করার চেষ্টা করছিল তখন মুঠোর চাপে মাছটার পেট গলে যায়। মরা মাছটা ‘ডেথক্লাচ’-এর ভেতর আটকে থাকে ডিউ টু ক্যাডাভেরিক স্প্যাজম্।’

‘জ্বী স্যার। মেডিক্যাল জুরিসপ্রুডেন্স-এ পড়েছি।’

বড় দারোগা নিচুস্বরে আবার বলেন, ‘স্যার এইবার জালটা উদ্ধারের চেষ্টা করতে হয়। মনে হয় সুতলিটা কেটে জালটা কেউ নিয়ে নিয়েছে বা ফেলে দিয়েছে।’

‘হ্যাঁ, তাই মনে হয়। ডাকো চৌধুরীকে। তাকে এবার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করো।’

‘চৌধুরী গেলেন কোথায়? বড় দারোগা হাঁক দেন। এদিকে আসুন জলদি।’

সবাই এদিক-ওদিক তাকায়।

‘আরে! পা-না-ধোয়া চৌধুরী গেল কোথায়?’ বড় দারোগা চারদিকে তাকান।

ভিড়ের লোকজন এতক্ষণে বুঝতে পারে, বড় দারোগা কোন লোকের খোঁজ করছেন। তারা সবাই জঙ্গুরুল্লার খোঁজ করে। কিন্তু তাকে আর ধারে-কাছে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

ভিড়ের ভেতর থেকে দু-একজন গালাগাল দিয়ে বলে, ‘হালার ভাই হালায় পলাইছে।’

ততক্ষণে জঙ্গুরুল্লার পানসি এসে পৌঁছে। বড় দারোগা পানসি তল্লাশি করে ডওরার এক খোপ থেকে মাছ রাখার জালটা উদ্ধার করেন।

পুলিস সুপার বলেন, ‘এটা পরিষ্কার ইউ. ডি. কেস। অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে লোকটার। তুমি সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করো। কিন্তু পোস্ট মর্টেম না করে মাটি দেয়া যাবে না। পা না-ধোয়া চৌধুরীকে ২১১ ধারায় প্রসিকিউট করার ব্যবস্থা করো। এ কেসের জন্যই লাশাটার ময়না তদন্ত হওয়া দরকার। নয় তো লাশটা মাটি দেয়ার অর্ডার দিয়ে যেতে পারতাম। তুমি লাশটা সাবডিভিশনাল হসপিটালে পাঠাবার ব্যবস্থা করো।’

একটু থেমে তিনি আবার বলেন, ‘চৌধুরীর মাঝি-মাল্লা আর ঐ বুড়িকে ভাল করে জিজ্ঞাসাবাদ করো। ওদের ধমক দিয়েই জঙ্গুরুল্লার সব কারসাজি বেরিয়ে পড়বে।’

পুলিস সুপার লঞ্চে ওঠেন।

লঞ্চটা ‘ঘঁউ-ঘঁউ-ঘঁউৎ’ সিটি বাজিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।