Author: তাহের আলমাহদী

  • দশ পরিচ্ছেদ

    দশ পরিচ্ছেদ

    দশ পরিচ্ছেদ

    এমন দিন পড়েছে, এক মুহূর্তের জন্যেও সূর্যের মুখ দেখা যায় না। সারাদিন টিপিরটিপির বৃষ্টি পড়ে। হাসু ঘরের বার হয় না। শরীরটাও ভালো নেই। শরীরের সমস্ত গিঁঠে গিঁঠে বিশেষ করে ঘাড়ে টনটনে ব্যথা হয়েছে।

    হাসু মা-কে বলে—গর্দানডায় বেদনা করেগো, মা। শীত শীত লাগে।

    হাসুর গায়ে হাত দিয়ে জয়গুন শঙ্কিত হয়। ছেলেটা জ্বরে পড়লে উপায় নেই আর। বৃষ্টি-বাদলের মধ্যে ছেলেটাকে যে ভাবে সে কাজে পাঠায় তাতে এই ছোট শরীরটার ওপর জুলুমই করা হয়। কচি ঘাড়টার ওপরেই জুলুমটা হয় বেশী। অথচ এই ঘাড়টা তাদের জীবন-মরণের কল-কাঠি। তিনটি প্রাণীর জীবনের বোঝা মাথায় নিয়ে হাসুর এই কাঁচা ঘাড়টা মাঝে মাঝে ব্যথাকাতর হয়ে পড়ে।

    জয়গুন নিষেধ করে থাউক, আইজ আর কামে যাওন লাগব না। কথা গায়ে দিয়া হুইয়া থাক। তোরে পইপই কইর‍্যা নিযুধ করি ভারী পোঝা মাতায় নিস না। তা হুনবি না।

    বেশী লোভ করার জন্য মাঝে মাঝে নিজেকে ধিক্কার দেয় জয়গুন। তের বছরের এতটুকু ছেলে কামাই করে খাওয়ায় এই ত বেশি।

    রোজগার করে সব পয়সা তার হাতে এনে দেয়। একটা পয়সাও এদিক-ওদিক করে না। এমন কি এক পয়সার চিনেবাদাম খেলেও তার হিসেব দেয় তার কাছে।

    জয়গুন সর্ষের তেলের শিশি থেকে একটু তেল নিয়ে হাসুর ঘাড়ে মালিশ করতে করতে বলে—পায়ে তুঁইত্যার পানি দিছিলি কাইল?

    –উহুঁ।

    —হেইয়া দিবি ক্যান। দেহি কেমুন অইছে?

    জয়গুন পায়ের ওপর থেকে কাঁথা সরিয়ে বলে— দ্যাখ, ক্যাদায় চামড়া খাইয়া ঝাঁজরা কইরা দিছে।

    একটা নারকেলের মালায় তুঁতে গোলা নিয়ে আসে জয়গুন। হাঁসের পালক ভিজিয়ে হাসুর পায়ের তলায়, আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে এঁতের পানির পো দেয়।

    হাস উ-হু-হুঁ করে ওঠে। বলে—আর দিও না, মা। বড় পোড়ায়।

    —না দিলে চামড়া পইচা যাইব এক্কেরে। আঁটতে পারবি না। রাস্তা-ঘাটে যেই ক্যাদা।

    জয়গুন নিজের পায়েও পুঁতে গোলা দিয়ে প্রলেপ লাগায়। মায়মুনের পায়েও লাগিয়ে দেয়। বাড়ীর উঠানে পর্যন্ত কাদা হয়েছে। পায়ের পাতা অবধি ডুবে যায় কাদায়। তুঁতের প্রলেপ দিলে পায়ের তলা অত হেজে যেতে পারে না।

    পরের দিন চমৎকার রোদ ওঠে। জয়গুন হাসুর কপালে ও বুকে হাত দিয়ে দেখে। তার মুখের ওপর থেকে সমস্ত দুশ্চিন্তার মেঘ কেটে যায়। প্রভাতী রোদের মত তার মুখ আনন্দে চিকচিক করে। হাসুকে ডেকে সে বলে—ওঠ, দ্যাখ আইজ কেমুন রউদ ওঠছে!

    হাসু উঠে বসে।

    জয়গুন বলে—আমার ত ডরেই ধরছিলো। কাইল যেই রহম গরম আছিল শরীল। জ্বর ওডে নাই কপালের ভাগ্যি। কেমুন লাগছে রে শরীল?

    —ভালা। আইজ কামে যাইমু, মা?

    —আত-মুখ ধুইয়া আয়। খাইয়া তারপর চল যাই। আমিও যাইমু। চাউল ফুরাইছে। আহজ চাউল না আনলে ওই বেলা চুলা জ্বলব না।

    হাসু, হাসুর মা কাজে বের হয়। হাসুর মা বার বার হাসুকে নিষেধ করে দেয়, খবরদার, ভারী পোঝা মাতায় নিবি না কিন্তুক। গর্দান ভাইগা যাইব।

    কিন্তু হাসু দু’দিনের কাজ একদিনে করার সঙ্কল্প নিয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়েছে। কাল কাজ হয়নি। আজ বেশী কাজ করে অন্তত কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া তার চাই-ই।

    হাসু নারায়ণগঞ্জ স্টেশনে আসে।

    আজকাল যাত্রীর সংখ্যা খুবই বেড়েছে। বাইরের থেকে যেমন বহুলোক আসছে, আবার বাইরেও যাচ্ছে তেমনি। বিশ্রামঘরে গাদাগাদি হয়ে আছে লোক। জাহাজে গাড়ীতে জায়গা হয় না। অনেক যাত্রীকেই দু-তিন দিন স্টেশনে পড়ে থাকতে হয়। ছেলেমেয়ে মা-বউ নিয়ে আবার অনেক বিদেশী আশ্রয় নিয়েছে স্টেশনের চালা ঘরে।

    হাসু মোটের সন্ধানে এদিক ওদিক ঘোরে আর এদের দিকে চায়। তার অদ্ভুত লাগে এদের পোশাক। এদের কথাও বোঝা যায় না—হাসু কাছে দাঁড়িয়ে শুনেছে! এক জায়গায় একটি স্ত্রীলোক রুটি সেঁকতে শুরু করেছে। দুটি ছেলেমেয়ের লোলুপ দৃষ্টি তার ওপর। রেল লাইনের পাশেও এক জায়গায় সে এরকম আরো অনেক লোক দেখেছে আজ। হাসুর মনে পড়ে দুর্ভিক্ষের বছরের কথা। এরকম ভাবে মায়ের সাথে সাথে গাছ তলায় কত রাত কেটেছে। বৃষ্টির মধ্যে আশ্রয় নিতে গিয়ে কত লোকের তাড়া খেয়েছে। হাসু অনুমান করে, নিশ্চয় ওদের দেশে আকাল এসেছে।

    যাত্রীর সংখ্যা বাড়লেও হাসু সুবিধা করতে পারে না। নম্বরী কুলিদের জন্যে মোট ধরবার যো নেই। যাত্রী বেড়ে যাওয়ায় বরং অসুবিধা হয়েছে। ভিড়ের জন্যে ঘাটে জাহাজ। ধরবার আগেই জেটির গেট বন্ধ হয়ে যায়। নশ্বরী কুলি ছাড়া অন্য কুলিরা ঢুকতে পারে। না। সে পানি সাঁতরে স্টীমারে ওঠে। কিন্তু নম্বরী কুলিরা দেখতে পেলে মাথার ওপর গাট্টা মারে। হাসু এই কুলিদের খুবই ভয় করে।

    ট্রেন ও স্টীমারের সময় হাসুর মুখস্থ হয়ে গেছে। একটা ট্রেন আসবে দশটায়। দশটা বাজবার এখনো দেরী। হাস রিক্সা স্ট্যান্ডের দিকে যায়। এগারোটার জাহাজে যারা যাবার তারা সাধারণত এখানেই নামে রিক্সা থেকে।

    এক ভদ্রলোকের মালপত্র নিয়ে দু’জন নশ্বরী কুলির মধ্যে বচসা শুরু হয়েছে। হাসু দুরে দাঁড়িয়ে দেখে।

    একটা কুলি বলেছোড়দে। আপনি কিসকো লিবেন, বাবুজি?

    আর একটা রিক্সা এসে থামে। চড়নদার ভদ্রলোকের সাথে ছোট একটা স্যুটকেস ও বিছানা। বোঝাটা বেশী ভারী হবে না। হাসুর মাথার পক্ষে উপযুক্ত বোঝাই। হাসু এগিয়ে যায়। সুটকেস ধরে জিজ্ঞাসা করে—কলি লাগব নি, বাবু?

    ঝগড়ায় রত কুলিদের একজন তার প্রতিদ্বন্দ্বী কুলিকে বোঝাটা ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে আসে। হাসুকে হাত দিয়ে সরিয়ে বলে—ভাগ ব্যাটা।

    হাসু নিঃশব্দে সরে যায়। একটা লাইটপোস্টে পিঠ ঠেকিয়ে সে রাস্তার দিকে চেয়ে থাকে। রিক্সায় কোন যাত্রী এলে সে আগেই আন্দাজ করে, ঘাডে কুলাবে কিনা। তার উপযোগী মোট না হলে সে এক পা নড়ে না, লাইট পোস্টের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে সে দাঁড়িয়েই থাকে। অনেকক্ষণ পরে যদি বা মোট পাওয়া যায়, তাও নম্বরী কুলিদের ফাঁকি দিয়ে লওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

    দুরে হুইসিল শোনা যায়। একটা ট্রেন আসছে। হাসু স্টেশনে ঢোকে। ট্রেনেই যা কিছু সুবিধা করা যায়। এখানে নশ্বরী কুলিদের ফাঁকি দেওয়া যায়। পেছনের দিকের গাড়ীগুলোর থেকে মোট নিয়ে সরে পড়লে তারা দেখতে পায় না। কিন্তু এখান থেকে মোট বয়ে রিক্সায় তুলে মোট পিছু দু’আনার বেশী পাওয়া যায় না। পথ কম বলে দু’আনার বেশী আশাও করা যায় না। জাহাজের মোটে পয়সা বেশী। মোট পিছ চার আনা। এখানকার দুই মোটের সমান। কিন্তু খাটুনিও ডবল।

    ট্রেন থামতেই হাসু চটপট উঠে পড়ে পেছনের একটা গাড়ীতে। একটা মোট দু’আনায় ঠিক করে। যাদের মালপত্র কম তারা এ রকম ছোট কুলিই খোঁজে। এদের দু’আনা দিলেই খুশী হয়। বড় কুলিরা চার আনার কমে রাজী হয় না।

    হাসু গাড়ী থেকে নেমে দেখ-না-দেখ সরে পড়ে।

    বারোটার মেল ও একটার স্পেশাল জাহাজ ধরে হাসু রোদে এসে দাঁড়ায়। তার সমান আকারের আরো পাচ-ছ’টি কুলিও গামছা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে আসে। ওভারব্রিজের রেলিং-এ সকলে সারি সারি গামছা রোদে দেয়।

    গামছা পরে সাঁতার দিয়ে স্টীমারে উঠতে হয় তাদের। নশ্বরী কুলি ছাড়া জেটির দরজা দিয়ে অন্য কুলিরা ঢুকবার সুযোগ পায় না। তারা সাঁতার দিয়েই অনেক সময় স্টীমারে ওঠে।

    হাসু ও অন্যান্য খুদে কুলিরা বসে বসে গল্প করে। একজন একটা বিড়ি ধরায়, কয়েকজন তার দিকে হাত বাড়িয়ে চেয়ে থাকে, কে কার আগে নিয়ে টানবে। একজন বলে—শীত লাগছেরে। দে দেহি বিড়িডা, একটা টান দিয়া লই।

    আর একজন বলে-ওয়াক থু ওর মুখের বিড়ি টানিস না। ছি! ও মেথরের পোলা।

    —মেথর বুঝি মানুষ না? রমজান বলে।—পয়সা পাইলে মেথর-গিরিও করতে পারি চাই পয়সা। রমজান হাতে তুড়ি দিয়ে দেখায়।

    জনপ্রতি দুটো করে টান দেয়ার পর ফেলে দেয়া হয়েছিল বিড়িটা। যে ছেলেটা মেথর বলে থুক ফেলেছিল, সে এবার বিড়িটা তুলে টানতে আরম্ভ করে।

    একটা ছেলে গলা ছেড়ে সিনেমার গানে টান দেয়–মালতী লতা দোলে—

    রমজান হাসুকে ডাকে—ও দোস্ত খুব ভালা একটা সিনেমা আইছে। যাইবেন নি আইজ?

    হাসু বলেনা দোস্ত মা রাগ করব।

    —চলেন না আইজ। তিন আনার পয়সা মোডে। আমার গাঁটের পয়সায়ই না অয় দেখবেন।

    –উহুঁ।

    রমজান আর পীড়াপীড়ি করে না।

    রমজান হাসুর বন্ধু ও খুদে কুলিদের সরদার। রমজানকে সবাই ভয় করে। তার কথামত সবাইকে চলতে হয়। তবে হাসুকে খুবই খাতির করে সে।

    রমজান বলে—তরশুর তন তোরা আমার লগে এক জায়গায় কামে লাগবি।

    হাসু জিজ্ঞাসা করে—কোনখানে দোস্ত?

    —হোসেন দালালের নাম হোনছেন? নতুন ধনী হোসেন দালাল?

    একজন বলে—হ্যাঁ হ্যাঁ, চিনছি। পাডের দালালি কইর‍্যা বস্তাবস্তা ট্যাকা করছে ব্যাডা।

    রমজান বলে–হ্যাঁ, হেই হোসেন দালাল! খানপুরে তেতলা দালান খিঁচব এইবার। হেই জায়গায় কাম আছে।

    —ইট ভাঙ্গবি, ইট টানবি, পানি তুলবি। এক ট্যাকা কইর‍্যা রোজ।

    সবাই রাজী হয়।

    রমজান আবার বলে—আমারে মাথা পিছু সরদারি দিবি এক আনা কইর‍্যা। দ্যাখ, যদি মনে খাডে লাইগ্যা যা তোরা সবাই।

    এখানে সারাদিনে দশ বারো আনার বেশী পাওয়া যায় না। কোনোদিন তার চেয়েও কম পাওয়া যায়। সুতরাং কেউ অমত করে না।

    ছয়টার ট্রেন ধরে হাসু পয়সার হিসাব করে। মাত্র তেরো আনা হয়েছে। একটা টাকার কাজও হল না। কোমরে বাঁধা জালির মধ্যে পয়সাগুলো খুঁজে সে এক জায়গায় বসে। হাসুর সাথীরা সব চলে গেছে। রোজ এমন সময় সেও বাড়ীর দিকে পথ নেয়। কিন্তু আজ সাতটার স্টীমারটা দেখেই যাবে সে। মা হয়তো বসে থাকবে তার জন্যে। দেরী হলে রাগ করতে পারে। কিন্তু একটা টাকা পুরিয়ে নিলে রাগ না করে সে হয়তো খুশীই হবে।

    ছড়ি হাতে এক ভদ্রলোক হাসুর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হাত থেকে সিগারেটের শেষাংশ ছুঁড়ে ফেলতেই হাসু মাটি থেকে তা কুড়িয়ে নিয়ে টানতে আরম্ভ করে। দোস্তের পাল্লায় পড়ে কয় দিন হয় সে বিড়ি টানতে শিখেছে। ঠাণ্ডার মধ্যে বিড়ি টানতে মন্দ লাগে না হাসুর।

    সাড়ে সাতটার পরে স্টীমার আসতে দেখা যায়। হাসু তিন নম্বর জেটির দিকে দৌড়ায়। গেট বন্ধ হয়ে গেছে। হাসু ফিরে এসে গামছা পরে লুঙ্গিটা বেঁধে নেয় মাথায়।

    স্টীমারটা ঘাটে ধরতেই সে তার দেয়। আজ একা একা তার ভয় করে। অন্য সময় ছয় সাত জন মিলে নদীর পানি তোলপাড় করতে করতে তারা জাহাজে ওঠে।

    যে ফ্লাটের গায়ে স্টীমারটা ধরেছে তার একটা কাছি বেয়ে বেয়ে সে আগে ফ্লাটের ওপর ওঠে। লুঙ্গি পরে গামছার পানি নিঙরে সে শরীরটা মুছে নেয়। তারপর ফ্লাটের কিনারার সরু পথ ধরে ধরে স্টীমারে উঠবার সিঁড়িতে যায়। ভিড় গলিয়ে এবং নম্বরী কুলিদের চোখ এড়িয়ে সে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে।

    এক মোটা ভদ্রলোক কুলির সাথে দরাদরি করছেন—চার আনায় যাবে? অল্প মাল আমার, সব শুদ্ধ দশ সেরও হবে না।

    —ছয় আনা রেট আছে সাব। কমে অইব না।

    —না, যাও। চার আনার বেশী দেব না আমি। কুলিটা চলে যেতেই হাসু এগোয়—কুলি লাগব নি, বাবু।

    লাগবে ত। কত নিবি? —আপনে খুশী অইয়া যা দ্যান।

    —তবে মাথায় নে। চল জলদি।

    মোট মাথায় নিয়ে হাসু অনুমান করে—কোথায় দশ সের? স্যুটকেসটার ওজনই বিশ সেরের কাছাকাছি হবে। যেন সীসা ভরা আছে স্যুটকেসটায়। তার ওপর বিছানা। হাসুর মাথায় ভারী লাগে বোঝাটা। ভদ্রলোক এবার ওপর থেকে খবরের কাগজ ও একটা হাতব্যাগ নিয়ে হাসুর হাতে চাপিয়ে দেন।

    জেটি পার হবার সময় একজন ডাকেন—আরে রশীদ, তোর জন্যে সাড়ে ছ’টা থেকে অপেক্ষা করছি। তোর বাড়ীতে খবর নিয়ে জানলাম তুই আজ আসছিস।

    দু’জনের করমর্দন ও কুশলবার্তার পরে আলম সাহেব বলেন—তোর জন্যে অপেক্ষা করছি কেন জানিস?

    —আরে হ্যাঁ—হ্যাঁ। কোথায় বল দেখি?

    প্যারাডাইসে, হজ্জতুল্লা আর নির্মল বসে আছে। তুই না হলে যে জমেই না।

    রশীদ সাহেব বলেন—যে রকম দেখছি তাতে পাকিস্তানে সোমরস পান বুঝি আর সম্ভব হবে নারে।

    সব বে-রসিক।

    আলম সাহেবের সাথে রশীদ প্যারাডাইস ক্যাফেতে গিয়ে ওঠেন।

    হাসুকে বলে যান—তুই বোস এখানে বাইরে।

    হাসু মোট নামিয়ে বসে থাকে। ক্যাফের ঘড়িতে ন’টা বাজে। কিন্তু সাহেবের বের হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা যায় না। বসে থাকতে থাকতে হাসুর বিরক্তি ধরে যায়। একবার মনে হয়—স্যুটকেসটা নিয়ে ভেগে গেলে কেমন হয়? কিন্তু তারপরই সে নিজেকে শুধরে নেয়।

    রশীদ সাহেব বাইরে এসে চলতে আরম্ভ করেন। হাসু অনুসরণ করে। ওভারব্রিজের কাছে আসতে হাসুর পা আর চলতে চায় না। বোঝা মাথায় সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা খুবই কষ্টকর। ক্ষুধায় হাসুর শরীর দুর্বল। তার ওপর এমন ভারী বোঝা।

    হাসু বলে—একটু ধরেন, জিরাইয়া লই।

    —চলে আয়। এতটুকুর জন্যে জিরিয়ে কাজ নেই, বাবা। বেশী দূরে নয়, কাছেই আমার বাড়ী-রশীদ সাহেবের মুখ দিয়ে জড়িয়ে জড়িয়ে বের হয় কথাগুলো।

    রশীদ সাহেব না থেমে ওভারব্রিজের ওপর দিয়ে এগিয়ে যান। হাসু এক সিঁড়ি দুই সিঁড়ি করে উঠতে থাকে। তার পা কাঁপে। ঘাড়টা চাপ খেয়ে মচকে যাবার মত হয়।

    রশীদ সাহেবের আগমনে তার ছেলেমেয়েদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেছে। তাদের আনন্দ কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে বাড়ীখানা। ছোট ছেলেটিকে কোলে তুলে নিয়ে অন্য দুটির হাত ধরে তিনি অন্দরে ঢোকেন। একটি চাকরাণী এসে হাসুর মাথার মোট নামিয়ে নেয়। হাসু দাঁড়িয়ে থাকে বাইরে!

    রাত হয়ে যাচ্ছে অনেক। কিন্তু তাকে পয়সা দেয়ার কথা বোধ হয় মনে নেই কারো।

    অনেকক্ষণ পরে হাসু সাহস করে বলে—আমারে বিদায় করেন সা’ব।

    রশীদ সাহেবের ছেলে মজিদ হাসুকে ডেকে নিয়ে যায় ভেতরে।

    রশীদ সাহেব তখন বিরাট বপু বিস্তার করে শুয়েছেন। মজিদকে বলেন, পকেট থেকে তিন আনা বের করে দিতে।

    হাসু আপত্তি করে—তিন আনা কম অইয়া যায় সা’ব।

    —কম! বলিস কী, অ্যাঁ!

    —জাহাজের তন রিকসায় উড়াইয়া দিলেই ত চাইর আনা দেয়। আর এইডা ত অনেকখানি দূর। আবার দেরী অইল কত!

    —নে তোল পয়সা।

    —না সাব, পাঁচ আনার কম নিমু না।

    মজিদ বলে—বাপরে! এখান থেকে এখানে পাঁচ আনা! এক মিনিটের পথ না, এত পেলে ত রাজা হয়ে যাবি।

    হাসু নাছোড়বান্দা।

    রশীদ সাহেব এবার ডাকেন—এই ছোঁড়া, আয় পাঁচ আনাই দেব। তবে হাত-পাগুলো টিপে দে ত আমার। ভালো করে তেল মালিশ করে দে।

    –না সাব আমি পারতাম না। আমার দেরী অইয়া গেছে।

    –অ্যাঁ, পারবিনে? গর্জে ওঠেন রশীদ সাহেব। বিছানার ওপর মেদবহুল শরীরখানা দুলিয়ে তিনি বলেন—এমনি এমনি তোমাকে পাঁচ পাঁচ গণ্ডার পয়সা দেব? আমি কন্ট্রাক্টর। কড়ায় গণ্ডায় কাজ আদায় করে পয়সা দিই। হ্যাঁ—হ্যাঁ—হ্যাঁ।

    ইসু রশীদ সাহেবের পায়ের কাছে বসে তার পায়ে তেল মালিশ করতে শুরু করে।

    তেল-মালিশ নেওয়া রশীদ সাহেবের অনেক দিনের অভ্যাস। শোবার আগে রোজ হাত পা টিপিয়ে না নিলে তাঁর ঘুম হয় না। কালকাতা থাকতে এ ব্যাপারে সুবিধে ছিল অনেক। চার আনা দিলে অব ঘটা বেশ হাত-পা বানিয়ে নেয়া যেত। রাত ন’টার সময় বাসার দরজায় এসে রোজ চীৎকার করে উঠত-মালিশ, তেল মালিশ। বাড়ীতে সে সুবিধে না। থাকায় কি-চাকর দিয়েই চলে সে কাজ।

    দশটা বাজে। পা টিপতে টিপতে হাস অন্যমনস্ক হয়ে যায়। মা-র কথা মনে পড়ে। রেল-রাস্তার ধারে মা তার পথ চেয়ে আছে। এতক্ষণ এ লোকটার ব্যবহারে তার মনটা বিষিয়ে উঠেছিল। তাই ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথা তার মনেই ছিল না। কিন্তু এখন ক্ষুধায় তার হাত-ল অবশ হয়ে আসে। পেটটা ব্যথা করতে আরম্ভ করে।

    মা-র কথা ভাবতে ভাবতে পাটেপা এক সময়ে বন্ধ হয়ে যায়।

    রশীদ সাহেব বলেন—কিরে, থামলি কেন? কি টেপা টিপিস? গায়ে কী জোর নেই বাপ? খোট্টারা এ কাজে ভারী ওস্তাদ। কলকাতায় ভুলুয়া বলে একটা খোট্টা রোজ আসত আমার বাসায়। চমৎকার টিপতে পারত সে। আর তুই টিপিস, আমার গায়েই লাগে না। মনে হয় পিপড়ে হাঁটছে শরীর বেয়ে।

    কতক্ষণ পরে আবার বলে—এবার হাতের দিকে আয়।

    রশীদ-গৃহিণী চা হাতে থমকে দাঁড়ান। তিনি রুক্ষস্বরে বলেন—ওঃ সব কাজেই ঠিকাদারী! আচ্ছা কি আক্কেল তোমার! কার ছেলেকে তুমি এ রকম করে আটকে রেখেছো?

    রশীদ সাহেব বলেন—আমার নাম রশীদ কন্ট্রাক্টর। কড়াক্ৰান্তি পর্যন্ত আদায় করা চাই আমার। এই ছোড়া, এবার হাতগুলো টিপে তারপর যাবি।

    চায়ের কাপটা রেখে রশীদ-গহিণী বলেন—থাক আর হাত টেপাতে হবে না। কেন তুমি পরের ছেলেকে কষ্ট দেবে?

    হাসুর দিকে ফিরে আবার বলেন—আয় ত বাবা। আহা! কার ছেলে গো! তোর কি মা-বাপ নেই?

    সহানুভূতির কথায় এবার হাসুর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি ঝরে।

    রশীদ—গৃহিণী হাসুর মুখ দেখে বিস্মিত হন। নিজের আঁচলে চোখ মুছিয়ে তিনি বলেন—দুপুরে খাসনি কিছু? আহা! মুখখানা শুকিয়ে কেমন হয়েছে।

    মায়ের মন ক্ষুধাতুর সন্তানের জন্যে ব্যথিত হয়। তার চোখও শুকনো থাকে না।

    তিনি হাসুকে খাবার ঘরে নিয়ে যান। একটা থালায় ভাত ও দুটো পেয়ালায় তরকারী দিয়ে হাসুর সামনে দেন।

    ভাতের দিকে চেয়ে হাসর চোখে ভাসে—মা তার আশায় সন্ধ্যা থেকে বসে আছে। মায়মুন বাড়ীতে ক্ষুধায় কাতরাচ্ছে। বাড়ী গেলে রান্না হবে। তারপর খাওয়া হবে সকলের। হাসুর চোখ দিয়ে এবার বেশী করে পানি ঝরতে থাকে।

    রশীদ-গৃহিণী বলে চলেন—খেয়ে নে বাছা আমার। কাঁদিস নে আর।

    হাসু জোর করে এক মুঠো ভাত মুখে দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ভেতরে ক্ষুধার তাগিদ চাপা পড়ে গেছে।

    সে হাত ধুয়ে উঠে পড়ে। বলে—আমি যাই।

    —কিছুই তো খেলিনে। শান্ত হয়ে খেয়ে এখানেই থেকে যা আজ।

    —উহুঁ, আমি যাই।

    –বাড়িতে কে আছে তোর?

    হাসু কোন উত্তর দিতে পারে না।

    রশীদ-গৃহিণী একটা টাকা এনে হাসুর হাতে দেন। অনেক দ্বিধার সঙ্গে টাকাটা নিয়ে সে বেরিয়ে যায়। রশীদ-গৃহিণী চেয়ে থাকেন ছেলেটার মুখের দিকে। তার মেজ ছেলের কিছুটা ছাট আসে ওর মুখে। তখন কলকাতায় দাঙ্গা। ছেলেটি একদিন তার সাথে রাগ করে সামনের ভাত ফেলে বেরিয়ে গেল রাস্তায়। আর ফিরল না…

    হাসু সিঁড়ির গোড়ায় নেমে একবার ফিরে তাকায়। রশীদ—গৃহিণীর চোখ থেকে দু ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

    ঢং-ঢং, ঢং-ঢং–এগারোটার ঘণ্টা। পথে আসতে আসতে হাসু শোনে।

    যেখানটায় রোজ কোষা রাখা হয়, সেখানে এসে দেখে, মা বসে নেই। কোষাটাও নেই।

    মা তার উপর রাগ করেই চলে গেছে, সে বুঝতে পারে।

    হাসু অন্ধকারের মধ্যে হাত কচলাতে শুরু করে। রাতটা কোথায় কাটান যায়? দোস্তের বাড়ী অনেক দূরে, তাও আবার নদীর ওপারে। এত রাতে খেয়া পাওয়া যাবে না।

    নিরুপায় হয়ে হাসু কয়েক পা হেঁটে ছোট রেলস্টেশনটার চালা ঘরে গিয়ে ওঠে। রাতটা এখানে কাটান যাবে। কিন্তু ক্ষুধা পেয়েছে খুব। এত রাত্রে খাবার কিছু পাবার যো নেই। দু’মাইল হেঁটে চাষাড়া পর্যন্ত গেলে কিছু কিনে খাওয়া যেত। কিন্তু তার এক পা হাটতেও আর ভালো লাগে না।

    হাসু বসে পড়ে। যখন বসতেও খারাপ লাগে তখন এক সময়ে গামছা বিছিয়ে সে শুয়ে পড়ে। শুয়ে শুয়ে সে বাড়ীর কথা মনে করে।

    মায়মুনকে খাইয়ে মা নিজে না খেয়ে শুয়ে শুয়ে তার কথাই ভাবছে। তাকে না খাইয়ে সে কোনদিন একমুঠো ভাত মুখে দেয়নি, আজও দিতে পারে না। মায়ের কথা ভাবতেই আরো একজনের কথা তার মনে পড়ে। মায়ের মুখের পাশে, মায়ের মর্যাদা নিয়ে যে একখানা মুখ। তার চোখের সামনে ভাসে, সে মুখখানা রশীদ-গৃহিণীর।

    রাত বারোটার পরে আর কোনো ট্রেন নেই। ট্রেনটা চলে যাওয়ার পর স্টেশনে লোক দেখা যায় না।

    সব নিস্তর। মাঝে মাঝে দুর থেকে সমবেত চিৎকার ভেসে আসে—আল্লা আল্লা বল ভাইরে মোমিন

    কোথাও কলেরা-বসন্ত লেগেছে। তার জন্যেই খোদাই শিরণী হচ্ছে, হাসু বুঝতে পারে। চিৎকার শুনে তার শরীরের লোম কাটা দিয়ে ওঠে।

    জয়গুন সন্ধ্যার পরেই এসেছিল। পথ চেয়ে চেয়ে তার মেজাজ গরম হয়ে ওঠে ছেলের ওপর। ন’টার সময় সে নিজেই কোষাটা বেয়ে বাড়ী চলে যায়। কিন্তু বাড়ীতে পা দিয়েই তার ধারণা পাল্টে যায়। হাসু তার সে ছেলে নয়! তার কাছে না বলে কোথাও সে যায় না। দোস্তের বাড়ী গেলে তার কাছে বলেই যেত।

    জয়গুনের মাথার মধ্যে নানা রকমের দুশ্চিন্তা তাল পাকাতে আরম্ভ করে।

    কাল শরীর গরম ছিল, আজ হয়তো জ্বর হয়ে কোন গাছতলায় পড়ে আছে। পানি সাঁতরে স্টীমারে উঠতে হয়। তবে কি স্রোতে ভেসে গেল? নদীতে কুমীর থাকে। কুমীরেও টেনে নিয়ে যেতে পারে। কিছুই অসম্ভব নয়।

    জয়গুন কুপি জ্বালে। মায়মুন ভূতের ভয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে আছে।

    জয়গুন কাঁথা সরিয়ে দেখে মায়মুন ঘুমিয়ে আছে। সে আর মায়মুনকে ডাক দেয় না। এখন ওকে তুললেই ভাতের জন্যে কাঁদবে। ঘুমিয়ে থাক, সেই ভালো। আজ জয়গুনের চুলো ধরাবার শক্তিটুকুও নিঃশেষ হয়ে গেছে। খাঁচার নিচে বড় ইসি দুটোও দেখা যায় না। বর্ষার দিনে পাতিশিয়ালে নেওয়ার কথাও নয়। বোধ হয়, কেউ ধরে রেখেছে কিম্বা জবাই করে খেয়েছে।

    জয়গুনের কাছে সমস্ত দুনিয়াটা এলোমেলো মনে হয়।

    মায়মুনের পাশ দিয়ে সে শুয়ে পড়ে। এবার দুশ্চিন্তার দুর্বার স্রোত মাথায় ঢুকবার সুযোগ। পায়। জয়গুন ভাবে—তবে কি গাড়ী চাপা পড়ল? হয়তো কিছু চুরি করায় পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে।

    এমনি আরো অনেক চিন্তা তার মনে আসে। একটা কিছুক্ষণ ভাবার পর সেটাকে সরিয়ে আর একটা নতুন দুশ্চিন্তা এসে আঁকিয়ে বসে মনে।

  • এগার  পরিচ্ছেদ

    এগার পরিচ্ছেদ

    এগার পরিচ্ছেদ

    কুউ—কুরু—ত—কু—উ–

    মোরগের ডাক শুনে জয়গুন আর বিছানায় পড়ে থাকে না। তাড়াতাড়ি উঠে আগে ফজরের নামাজ পড়ে, তারপর মায়মুনকে ডাকে—গা তোল, মায়মুন। আত-মোখ ধুইয়া জলদি কইর‍্যা চুলা জ্বাল।

    —মিয়াভাই আহে নাই, মা?

    –উহুঁ।

    জয়গুন আর কিছু না বলে কোষায় ওঠে। অনভ্যস্ত হাতে লগি বেয়ে সে রেল-রাস্তার পাশে আসে।

    বিলের শেষ প্রান্তে গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্য উকি দিচ্ছে।

    আবছা আলোয় দুর থেকে জয়গান দেখতে পায় স্টেশনের চালাঘরে হাসু চোলি হয়ে শুয়ে আছে। কাছে গিয়ে হাত রাখতেই হাসু ধড়ফড়িয়ে ওঠে। মা-কে সামনে পেয়ে তাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে।

    জয়গুন দেখে, হাসুর সারা মুখে মশার কামড়ের দাগ। চোখ দুটোও লাল। মুখে ভয়ের সুস্পষ্ট ছায়া! সে বলে—ডরে ধরছিল, অ্যাঁ?

    হাসু মাথা নেড়ে স্বীকার করে।

    —ডরে ধরছিল! কিছু দেখছিলি নি?

    —হ। কি দুড়দুইডা আন্ধার গো মা! একটা মাইনষের আলয় নাই। এইহানে ওইহানে। এটটু পরে পরে কিয়ের জানি খচখচানি। বিলের মধ্যে কিয়ের যেন বাত্তি—এই জ্বলে, এই আবার নিবে। আবার কিয়ের বিলাপ হুনলাম। মাইনষের মন কান্দে। ডরে আমি এক্কেরে মাডির লগে মিশ্যা আছিলাম। এই আলোগুলা আলৈয়া, না মা?

    —যাউক, অই হগল কওয়ন ভাল না। তোর অহনও ডর করে অ্যাঁ?

    হাসু হাঁ-সুচক মাথা নাড়ে।

    —না—না, ওগুলা কিচ্ছু না।

    পথে আসতে আসতে হাসু কালকের সমস্ত ঘটনা মা-র কাছে বলে। রশীদ—গৃহিণীর দেয়া টাকাটা মা-র হাতে তুলে দেয়।

    বাড়ীর ঘাটে কোষ ভিড়ার শব্দ পেয়ে মায়মুন দৌড়ে আসে। শফি, শফির মা-ও আসে।

    শফির মা জিজ্ঞেস করে—কোনখানে পাইলি গো?

    —ইস্টিশনে হুইয়া আছিল।

    —ইস্টিশনে আছিল! একলা! তুই বড় নিডুর গো! মা অইয়া কেমুন কইর‍্যা পেডের বাচ্চারে ফ্যালাইয়া চইলা আইছিলি!

    শফি বলে—দ্যাহ মা, মোখটা কেমুন দরমা-দরমা অইয়া গেছে।

    —দরমা দরমা অইয়া গেছে!

    হাসু বলে—মশার কামড়। সারা রাইত—

    বাধা দিয়ে শফির মা বলে—মশার কামড়, না আর কিছু! তোরা দ্যাখ দেহি ভাল কইরা চউখ লাগাইয়া। আমি আবার চউখে দেহি না।

    জয়গুন ভালো করে দেখে বলে—মশার কামড়ই।

    —নালো, আমার কিন্তুক ভালা ঠেকে না। দিনকাল খারাপ। শেখপাড়ায় এক ঘরও বাদ নাই। মোল্লাপাড়ায়ও দয়া অইছে। আমি এই ডরেই আর খরাত করতে ঠ্যাং বাড়াই না ওই মুখি। হোনলাম ছয়জন পাড়ি দিছে।

    হাসু শিউরে ওঠে ভয়ে। সে নিজের কানেও শুনেছে খোদাই শিরনি দেয়ার চিৎকার।

    জয়গুন চিন্তিত হয়। বলে রাইতে ডরেও ধরছিল, ভাজ। আমারও চিন্তা লাগে।

    —ডরে ধরছিল!

    শফির মা চমকে ওঠে। সে আবার বলে—তোরা কি কথা কস! আমার এক্কেরেই ভালা ঠেকে না।

    —অহন কি উপায় করি, বইন?

    —এক কাম কর। গোসল না করাইয়া ওরে ঘরে নিস না। সোনা-রূপার পানি দিয়া গোসল করাইয়া তারপর ঘরে লইয়া যা।

    হাসুর মা হাসুকে বলে—তুই অহন বাইরে থাক। গোসল কইর‍্যা তারপর ঘরে গিয়া ভাত খাবি। এতক্ষণই যহন থাকতে পারলি, এডুকে আর কি অইব? তারপর শফির মা-কে উদ্দেশ করে বলে—তোমার ঘরে রূপা আছে নি ভাজ? সোনা ত নাই জানি।

    —নালো, বইন। রূপাও নাই। কবে বেইচ্যা খাইছি। আকালে কি আর কিছু রাইখ্যা গেছে? বেবাক ছারখার কইরা লইয়া গেছে, খালি শফিরে রাইখা গেছে। শফিই আমার সোনা, শফিই আমার রূপা, ও-ই সব। এখন খোদায় মোখ চাইলে অয়।

    —খাড়ুজোড়া, হেইও খাইছ? আহা কেমুন সোন্দর জল-তরঙ্গের খাড়ু আছিল তোমার। আমার এতডি বয়স অইল, ওই রহম খাড় আর চউখে দ্যাখলাম না।

    —কত আশা আছিল দিলে। শফিরে বিয়া করাইলে ওর বউরে দিমু খাড় জোড়া। কিন্তু উদরের টানে তাও দিলাম বেইচ্যা। সোয়ামীর চিহ্ন একটা ভাতের কাড়িও রইল না আর।

    শফির মা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে।

    জয়গুন বলে—অখন কোথায় পাই সোনা-রূপার পানি। মোড়ল বাড়ীর বউ-ঝিগ গায়ে রূপার গয়না আছে। কিন্তু সোনার গয়না ধারেকাছে কার ঘরে আছে আমার ত চউখেই পড়ে না।

    —ক্যান, যার আছে হের আছেই। আমাগ মতন পোড়াকপাল কি আর বেবাকের! খোরশেদ মোল্লার বাটীতে আছে। কিন্তুক হেই বাড়ীর লাগা পরের বাড়ীতেই গুডির ব্যারাম। হ, এক কাম কর। গদু পরধানের বাড়ীতে গেলেই পাবি। গদু পরধানের বউগ শরীল গয়নায় ঝিল্লিক মারে। তুই আমার কথা হুনলে তোর শরীলও আইজ সোনা-দানায় ভরা থাকত। আইজগা আর বিচরান লাগত না।

    জয়গুন বিরক্ত হয় শফির মা-র ওপর। সে বলে—চান্দের মইদ্যে ফান্দের কথা ক্যান আনো? কেরামতের বউর একজোড়া সোনার কানফুল দেখছিলাম।

    —ইস! সোনা না আরো কিছু! ক্যামিকল, হুনছি আমি! হেই যে আমার দাদী কইত কথা—দড়ি যদি হাপ অইত আর অজা যদি রাজা অইত! হ, সোনার এক জোড়া মুড়কি আছিল জালালের বউর। হেদিন গিয়া দেহি বউর কান খালি। জিগাইলাম, তোর কান যে খালি বউ? হে কইল-মুড়কি বেইচ্যা কাপড় কিনছি। কাপড় আগে না গয়না আগে? হাচা কথাই ত। কাপড় না থাকলে কি গয়না ধুইয়া পানি খাইব মাইনষে?

    জয়গুন বলে—গদু পরধানের বাড়ীত আমি যাইতে পারতাম না। তোমার শফিরে পাড়াইয়া দ্যাও। মায়মুনও যাইব লগে।

    শফির মা বলে—যা শফি চিল-সত্বর চইল্যা আবি। কোনখানে দেরী করিস না কিন্তুক।

    একটা মেটে ঘটের মধ্যে সোনা ও রূপার গয়না-ধোয়া পানি নিয়ে কয়েক পা এসেই মায়মুন বিস্ময়ের স্বরে বলে—দ্যাখলা শফি ভাই? এমুন মোট্টা মোট্টা রূপার গয়না বেডিগো গায়ে! আবার সোনার গয়নাও আছে!

    —তোরে এই বাড়ীতে বিয়া দিমু। এই রহম মোট্টা মোট্টা গয়না পরতে পাবি। কেমুন?

    মায়মুন দাঁত বের করে ভেঙচি কাটে, জবাব দেয়—তোমার বউ নিমু এই বাড়ীততন। ঐযে হেঁড়ি কোদালের মতন দাঁত–

    মায়মুন হাঁসের ডাক শুনে পাশের দিকে চেয়ে দেখে খাঁচায় বাঁধা দুটো হাঁস তাদের দিকে চেয়ে প্যাঁক-প্যাঁক করে ডাকছে। মায়মুন চিনতে পারে—তাদেরই হাঁস যে! হাঁস দুটোও মায়মুনকে চিনতে পেরে খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

    মায়মুন আস্তে শফিকে বলে—শফি ভাই, দ্যাখছো? আমাগো আঁস দুইডা বাইন্দা থুইছে।

    শফি চোখ দুটো বড় বড় করে বলে—আঁ, সত্যই নি!

    —কাইল রাইতে ওইগুলা বাড়ীত যায় নাই।

    –বাড়ীত যায় নাই! তুই পানির ঘটটা লইয়া কোষায় গিয়া ব’। আমি ফাঁক বুইঝ্যা ছাইড়া দিয়া পলাইমু।

    শফি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে সুযোগের সন্ধানে! গদু প্রধানের শেষ পক্ষের স্ত্রী ওকে দেখতে পেয়ে বলে কি চাসরে ছেঁড়া ঐহানে?

    —কিছু না। সোনা-রূপার পানি নিতে আইছিলাম।

    সে চোখের আড়াল হতেই শফি এক টানে খাঁচাটা উল্টে দিয়ে পালায়। হাঁস দুটো দৌড়ে গিয়ে পানিতে নামে।

    শফি কোষাটাকে জোরে বেয়ে নিয়ে যায়। চকের মাঝে গিয়ে কোষা থামিয়ে মায়মুন ডাকে—চঁই-চঁই-চঁই।

    পরিচিত কণ্ঠের ডাক অনুসরণ করে হাঁস দুটোকে ধানখেতের আল দিয়ে আসতে দেখা যায়। মায়মুনের ডাক শুনে গদু প্রধানের বাড়ীতে হাঁস দুটোর খোঁজ পড়েছে। সেই বাড়ীর কুড়ি খানেক ছেলেমেয়ে বাড়ীর নিচে পানির কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। একটি ছোট মেয়ে চেঁচিয়ে বলে-কতগুলা ধান খাইছে আমাগ! আবার ধরতে পারলে গলা কাইটা খাইমু।

    শফি লগি উঁচু করে চীৎকার করে–তোগ গলা কাটমু।

    মায়মুন বলে—হেই ছেঁড়ি। ঐ যে কোদালের মতন দাঁত। তোমার বউ।

    মায়মুনের কথায় কান না দিয়ে শফি বলে—আইজ ব্যাডাগুলা বাড়ীতে নাই, থাকলে আমাগ গলাই কাইট্যা ফেলাইত রে!

    কাছে এলে হাঁস দুটোকে কোষায় তুলে নিয়ে হাত বুলিয়ে আদর করতে থাকে মায়মুন।

    শফি কোষ বেয়ে বাড়ী যায়।

    নিছক মশার কামড় ছাড়া আর কিছুই ছিল না হাসুর মুখে! দুদিন বাদেই রমজানের ব্যবস্থা মত সে কাজে লেগে যায়।

    বিরাট জায়গা নিয়ে দালান উঠছে। হাসুর আনন্দ হয়। কারণ, অনেকদিন এখানে কাজ করা যাবে। এখানে কাজ বেশী। ইট ভেঙে সুরকি করা, ইটের বোঝা টানা, পানি তোলা—এইসব কাজ করতে হয়। ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত খাটতে হয়। এক মুহূর্তও বসে কাটাবার উপায় নেই। কিন্তু তবুও হাসুর খারাপ লাগে না। স্টেশনে টো-টো করে ঘোরার চেয়ে এ কাজ অনেক ভালো। এখানে ইচ্ছে মতো বোঝা নেওয়া যায়। কেউ ভারী বোঝা মাথায় চাপিয়ে দেয় না। কিন্তু স্টেশনের যাত্রী বাবু-সাহেবরা মাঝে মাঝে এত ভারী বোঝা মাথায় চাপিয়ে দেয় যে ঘাড় ভেঙ্গে যাবার উপক্রম হয়। স্টেশনে কাজেরও কোন ঠিকানা নেই, পয়সারও কোন ঠিক নেই।

    বারো আনা পয়সা প্রায় দিনই হয়ে ওঠে না। কিন্তু এখানে একদিন কাজ করলেই বাধা। এক টাকা। এক পয়সাও কম না। বন্ধুত্বের খাতিরে এক আনা করে সরদারি দিতে হয় না। রমজানকে! স্টেশনের কাজে আরও কত ঝকমারি। বাবুদের সাথে দরাদরি, ভিড় ঠেলে পথ চলা, সাঁতার কেটে স্টীমারে ওঠা, এইসব। এগুলো সহ্য হলেও নম্বরী কুলিদের অত্যাচার একেবারেই অসহ্য।

    হাসুদের দলের সব ছেলেই এখানে কাজে যোগ দিয়েছে। হাস শফিকে এনে এখানে কাজে ভর্তি করে দেয়।

    শফি একদিন মা-কে বলে—মা, তুমি আর খরাত কইর‍্য না। মাইনষে মন্দ ক০০

    ছেলের মুখের কথা লুফে নিয়ে মাথা নেড়ে শফির মা বলে—মাইনষে কয় খরাতনীর পুত? হেইয়াতে কি গায়ে ঠোয়া পড়ে? দশ-দুয়ার মাইগ্যা আইন্যা তোরে এতখানি ডাঙ্গর করছি।

    জয়গুন বলে—পোলা তোমার উচিত কতাই কয় গো। ও অহন যাইডের বড় অইছে। রোজগারও করছে। ওর শরম লাগনের কতাই।

    —ও রুজি-রোজগার করলে আর আমার ভাবনা কি! আমি খরাত করি কি আমার আমোদে? ঠ্যাঙ্গের জোরও গেছে। শরীলেও তাকত নাই। অহন সারাদিন এক ও’কত খাইয়া আর বইস্যা খোদার শুকুর ভেজতে পারলে বাঁচি।

  • বার পরিচ্ছেদ

    বার পরিচ্ছেদ

    বার পরিচ্ছেদ

    বিকেল বেলা ঘুরে ঘুরে জয়গুন অনেক গন্ধভাদাল পাতা যোগাড় করে আনে। শহরের গিন্নিরা এ জংলী শাকের বড়া খেতে ভালবাসে। পাতাগুলো শুকিয়ে ওঠে বলে রাত্রিবেলা ওগুলো সাজিয়ে ঘরের চালার ওপরে রেখে দেয়া হয়।

    রাত্রির শিশির-ভেজা হয়ে ভোর বেলায় পাতাগুলো সতেজ ও সজীব হয়ে ওঠে। রোদ উঠবার আগে জয়গুন চালার ওপর থেকে চাঙারিটা নামিয়ে নেয়। তারপর বসে বসে চার পয়সায় কতটা, তা আলাদা করে সে চাঙারির ভেতর সাজিয়ে নেয়।

    খাওয়া সেরে জয়গুন তুষের হাঁড়ির থেকে আটটা ডিম নিয়ে গন্ধভাদাল পাতার মাকে বসিয়ে দেয়। তারপর চাঙ্গারিটা কাঁধে নিয়ে হাসু ও শফির সাথে কোষায় এসে বসে।

    সবুজ মাঠের মাঝ দিয়ে কোষা চলে। ধান খেতের দিকে চেয়ে জয়গুনের চোখ জুড়ায়। নতুন শীয় মাথা বের করেছে। শীষের ভাবে ঈষৎ নুয়ে পড়েছে ধানগাছগুলো। মাঝে মাঝে ঝিরঝিরে বাতাস এসে সবুজ খেতে ঢেউ খেলিয়ে দিয়ে যায়।

    জয়গুন বলে—-এই বচ্ছর খোদায় দিলে পান অইব খুব। আর না খাইয়া মরতাম না। এই সময় বিষ্টি রইয়া-সইয়া আইলে অয়। শীষমোখে বিষ্টি পাইলে বরবাদ অইয়া। যাইব।

    হাসু বলে—কেমন মোটা মোট্টা ছড়া বাইর অইছে, দ্যাহ মা। বেবাক জায়গায় এইবার ভালা ধান অইব। উজান দেশেও হুনছি খুব বরাদ্দ দ্যাহা যায়।

    —অউক। বরাদ্দ অইলেই খাইয়া বাঁচতে পারমু। এইবার পরা ফসল না অইলেও, বারো আনা ফসল অইব, অহন যেই রহম ভাওবরাদ্দ দাহা যায়। গেল বছর আধা ফসলও অয় নাই।

    শফির হাতে লগি। সে একটা ধানখেতের ভেতর কোষা চালাতেই জয়গুন বাধা দেয়—এই কি করস, শফি? এমন ভরা খেতের মইদ্যে দিয়া নাও বাইতে আছে?

    —ক্যান? এইডা তো আর আমাগ খেত না।

    -অলক্ষ্মী ছেঁড়ার কথা হোন। আমাগ খেত নাই বুইল্যা তুই অমন ফুলে ভরা ধানের উপর দিয়া কোষা চালাবি? যা খাইয়া মানুষ বাঁচে, হেইয়া লইয়া খেলা! খেতের আইল। দিয়া যা।

    ——আইল দিয়া গেলে, কিন্তুক দেরী অইব।

    —অউক দেরী। ধানের ছড়া বাইর অইছে। খেতের মাঝ দিয়া আর যাওন যাইব না। এট্ট টোক্কা লাগলেই কাইত অইয়া পড়ব, আর মাথা খাড়া করতে পারবো না।

    শফি খেতের আল ধরে কোষা চালায়।

    যে খেতে পাট ছিল সেগুলো কচুরিপানায় ছেয়ে গেছে। চার পাশের ধানখেতগুলোরও অনেকটা জায়গা গ্রাস করেছে কচুরীপানায়। কচুরির ঝাড়ে বিচিত্র ফুলের মেলা।

    দু’একজন নিরলস কৃষক খেতের চারপাশে বাঁশের বেড়া দিয়ে কচুরিপানার আক্রমণ ঠেকিয়েছে।

    দু’একটা জলা-খেতে যেখানে কচুরিপানার উৎপাত নেই, সেখানে আধবোজা শাপলার ল। রোদের তেজ বাড়লে বুজে যাবে।

    যেতে যেতে জয়গুন বলে কয়েকটা শাপলা তুইল্যা লইয়া যাই। উকিল বাবুর বউ। হেদিন কইয়া দিছিল।

    শাপলা তুলে গোটা কয়েক তাড়া বেঁধে নেয় জয়গুন।

    একটা ট্রেন সবেমাত্র যাচ্ছে স্টেশন থেকে। হাসু ও শফি দৌড়ে গিয়ে চলতি গাড়ীর হাতল ধরে লাফিয়ে ওঠে পাদানের ওপর। হাসু চেঁচিয়ে বলে—তুমি ধীরে-হস্তে আহ মা। আমরা গেলাম।

    জয়গুন শাপলার তাড়া কয়টা কুনইর সাথে ঝুলিয়ে, চাঙারি কাঁধে নারায়ণগঞ্জের দিকে যায়।

    মসজিদের মৌলবী সাহেব আসছেন। তার মুখোমুখি হওয়ায় সঙ্কুচিত হয় জয়গুন। তার হাত দু’খানাই আটকা থাকায় সে মাথার কাপড়টাও টেনে দিতে পারে না। পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে যায় সে। আড়চোখে চেয়ে মৌলবী সাহেব অস্পষ্ট স্বরে বলে ওঠেন—তওবা তওবা!

    জয়গুনের প্রথম স্বামী জব্বর মুন্সী এই মৌলবী সাহেবের খুবই প্রিয়পাত্র ছিল। তার স্ত্রী সদর রাস্তায় হাঁটে তা তিনি বরদাস্ত করতে পারেন না। কতবার লোক পাঠিয়ে তিনি জয়গুনকে বাইরে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু জয়ন তা শোনেনি।

    ডিম ও গন্ধ ভাদাল পাতা বেচতে বেশী সময় লাগে না। উকিলপাড়ায়ই আজ সমস্ত কাবার হয়ে যায়। ঝাকা নামান মাত্র চিলিবিলি করে নিয়ে যায় সব।

    জয়গুন বাজারে গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় লবণ, মরিচ, গরীবের বিলাসদ্রব্য পান-সুপারি এবং আরো কয়েকটা প্রয়োজনীয় সওদা কেনে। রাস্তার এক জায়গায় আখ বিক্রি হচ্ছে। গাছের সাথে বাঁশ বেঁধে উচ্চতা ও দামের ক্রমানুসারে সারি সারি আখ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। মায়মুন কতদিন মাকে বোম্বাই আখ নিতে বলেছে। কিন্তু সে ইচ্ছে করেই এতদিন নেয় নি, অযথা পয়সা খরচ হবে বলে। মায়মুনকে ফাঁকি দিয়ে সে বলেছে—উখের কি খায়? অহনো মিড়া অয় নাই। পানসে উখ খাওয়ন আর ঘাস খাওয়ন সমান কথা।

    কিন্তু আজ সারি সারি আখ দেখে তার মনে ব্যথা লাগে। সে ভাবে-মওসুমের একটা জিনিস কার না মুখে দিতে ইচ্ছে হয়? আর মায়মুন ত নেহায়েত কচি মেয়ে।

    জয়গুন তিন আনা দিয়ে একটা আখ কেনে।

    রাস্তায় রাজার মা-র সাথে দেখা হয়। রাজার মা জয়গুনের উত্তরে চাল কিনতে যাওয়ার সাথী। সে জিজ্ঞেস করে—কত দিয়া কিনলাগে! উখখান?

    —বা-রো পয়সা।

    রাজার মা মাথায় হাত দেয়। সে আবার বলে—তিন আঙুল উখ না, দাম তিন আনা! উহতু না—অষুধ। আস্তা পয়সা চাবাইয়া খাওয়ান।

    -এই রহমই বইন। আমাগ ঘরের জিনিসের দর নাই। আমরা যা বেচতে যাই-হস্তা। এক্কেরে পানির দাম। বাজারে একটা আদনা চিজ কিনতে গিয়া দ্যাহ, গহটের পয়সায় কুল পাইবা না। একটু থেমে আবার বলে—এই চাঙারির এক চাঙারি শাক, এক্কেরে তরতাজা বেচলাম চাইব আনা। আর দ্যাহ, আষ্ট আনার বেহাতি কোন নিচে পইড়্যা আছে।

    —দেখছি বইন। এই দশা। এহন যাই গো। দেহি চাউলেরনি যোগাড় করতে পারি। আইজ গাড়ীতে ওঠতে পারলাম না। যা ভিড়। মাগগো মা!

    —পুরুষ মাইনষেই ওঠতে পারে না গাড়ীতে। আমরা ত মাইয়া মানুষ। কাইল পরশু আবার যাইবা নি গো? গেলে লইয়া যাইও আমারে। দ্যাশের চাউলে প্যাট ভরে না। চাউলের দাম যেন রোজ রোজ ওঠতেই আছে।

    রাজার মা এতক্ষণে কয়েক পা এগিয়ে গেছে। জয়গুন হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, আর বুঝি উত্তরে যাওয়া হয় না। লোকের ভিড়ে গাড়ীতে ওঠবার যো নেই। কত লোক হাতল ধরে পা-দানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। গাড়ীর ছাতে বসে যায় কত লোক। সেদিন তার চোখের সামনে একটা লোক গাড়ীর পা-দানের ওপর থেকে পড়ে গেল।

    টিকেটর জন্যেও আবার খুব কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। বিনা টিকেটে লুকিয়ে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সয়ে আর কত দিন যাওয়া যায়? জয়গুনদের গ্রামের জহিরুদ্দিন বিনা টিকেটে গাড়ী চড়ায় তিনদিন ফাটক খেঠে এসেছে।

    পথে আসতে একটা উদলা নৌকার ওপর জয়গুনের দৃষ্টি পড়ে। রেল-রাস্তার পাশে গাছের সাথে বাধা ছোট নৌকাটি। একটি ছোট ছেলে বসে আছে নৌকার ওপর। যে কোন ছোট ছেলে হাতের কাছে পেলেই সে কোলে তুলে নেয়। তার মুখে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে। কাসুর নাক, কাসুর চোখ, তার কপাল, যুগল গায়ের রঙ কেমন ছিল আজও জয়গুনের চোখের সামনে ভাসে। কারও ছোট ছেলে কোলে নিয়ে তার মুখের দিকে স্থিরদৃষ্টি নিক্ষেপ করে সে মন্তব্য করে—ওর নাকটা আমার কাসুর নাকের মতন। আমার কাসুরও এই রহম জোড়-ভুরু। জোড়-ভুরু ভাইগ্যমানের লক্ষণ। কিন্তু অইলে কি অইব? যে দশ মাস দশ দিন উদরে রাখল, তার বুক খালি।

    একটা নিশ্বাস ছেড়ে সে আবার বলে—থাক আমি শাপ দিমু না কাউরে। আমার কাসু। “জান-ছালামতে বাঁইচ্যা থাউক-খোদার কাছে দিন-রাইত চবিবশ ঘটা এইডাই আরজ করি।

    নৌকায় বসা ছেলেটার দিকে চেয়ে দ্রুয়গনের মনে হয়, তার কাসুও এতদিনে হয়তো এতটা বড় হয়েছে।

    নৌকাটার দিকে আর একবার চেয়ে দেখে জয়গুন। এ রকম একটা নৌকা করিম বকশেরও ছিল। নৌকার মাঝে একটা কোঁচও দেখা যায় ঠিক করিম বকশের কোঁচটার মতই। সে ভালো করে দেখে। তাইত! করিম বকশের কোঁচটাই। কোন ভুল নেই।

    জয়গুন থমকে দাঁড়ায়। তার মনে আনন্দ ও আবেগের মিলনসংঘাত আবর্তের সৃষ্টি করে। সে ভুলে যায়, আসমানে না জমিনে, স্বপ্নে না জাগরণে কোথায় কোন অবস্থায় সে আছে।

    মুহূর্ত পরে নিজেকে সামলে নিয়ে কাখের ঝাকাটা রাস্তার ওপর ফেলে সে নৌকার দিকে ছুটে যায়।

    নৌকায় পা দিতেই ছেলেটি বলে—উইট্য না আমাগ নায়।

    জয়গুন উত্তর না দিয়ে নৌকায় ওঠে। ছে

    লেটি বলে—ক্যাদা মাইখ্যা দিল যে! বাজান আমারে মারব।

    জয়গুনের খেয়াল নেই। সে কাদা পায়েই উঠে পড়েছে।

    জয়গুন ছেলেটির কাছে গিয়ে বসে। তার চিবুক ধরে বলে—তোমার নাম কি?

    ছেলেটি ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে তার দিকে। মুখ না নামিয়ে আস্তে বলে—কাসু।

    –কাসু! কাসু! আমার কাস! জয়গুন পাগল হয়ে গেল বুঝি। সে দুই হাতে কাসুকে জড়িয়ে ধরতে যায়। কাসু সে হাত সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে।

    জয়গুন ভাবে—আজ সে পেটের সন্তানের কাছে পর হয়ে গেছে।

    জয়গুন কাসুকে কোলে নেয়। কিন্তু কাসু কোস্তাকুস্তি করে কোল থেকে নেমে যায়।

    জয়গুন আখ খেতে দেয় কাসুকে। নিজের দাঁত দিয়ে চোকলা ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরো করে তার মুখে দেয়। কাসু চিবোয়। জয়গুন অশেষ তৃপ্তির সাথে তার দিকে চেয়ে দেখে।

    এক সময়ে জয়গুন বলে—তোমার বাজান কই?

    —দুধ বেচতে গেছে।

    —তোমার মুখখানা হুকনা যে? তোমার মায় তোমারে খাইতে দেয় নাই?

    —আমার মা নাই, মইরা গ্যাছে।

    জয়গুন সহ্য করতে পারে না। সে তাকে কোলে তুলে নেয়। আখ খেতে দেয়ায় কাসু বশ হয়েছে। এবার সে কোলে উঠতে আপত্তি করে না। জয়গুন পরম স্নেহে তার কপালে চুম্বন করতে থাকে। তার চোখের পানি কাসুর মুখখানা সিক্ত করে দেয়।

    কাসুকে কোলে নিয়ে জয়গুনের অনেক সময় কাটে। করিম বক্‌শ দুধের হাঁড়ি মাথায় নৌকার কাছে এসে কখন দাঁড়িয়ে আছে জয়গুনের হুঁশ নেই। করিম বকশের ডাকে তার আবেশ ভেঙে যায়। মুখ তুলে দেখে—করিম বক্‌শ। তার চোখ দুটো রাঙা–জ্বলছে।

    জয়গুন মাথার কাপড় আরো টেনে দিয়ে দাঁড়ায়। নৌকা থেকে নেমে শিথিল বিবশ পা দুটোয় স্বাভাবিক শক্তি ফিরিয়ে আনবার আগেই করিম বকশের গম্ভীর গলা শোনা যায়—খাড়, কথা আছে।

    জয়গুন দাঁড়ায়। করিম বক্‌শ বলে—আমারে আর সুখে-শান্তিতে থাকতে দিবি না, দেখতে আছি। মায়ে-পুতে জোট কইর‍্যা আমারে পাগল বানাইয়া ছাড়বি তোরা। হাসুয়া হারামজাদা কদ্দিন জালাইছে, আবার তুইও–

    জয়গুন নীরব।

    —আমার সুখ তোগ চউখে সয় না? সাত সাতটা বচ্ছর দুধ ভাত খাওয়াইয়া ওরে অত ডার করছি। এহন চাও তৈয়ার আণ্ডায় উম দিতে।

    জয়গুনের ইচ্ছে হয় বলে—আণ্ডা তুমি পাড় নাই। আমার আণ্ডায় আমি উম দিলে তোমার এত পোড়ানি কিয়ের লেইগ্যা? ওরে দশ মাস দশ দিন পেডে রাখছি, তিন বচ্ছর বুকের দুধ খাওয়াইছি। তুমিই তৈয়ার আণ্ডায়–

    কিন্তু মুখ ফুটে একটি কথাও সে বলতে পারে না।

    করিম বক্‌শ আবার বলে—তোগ ডরে ওরে বাড়ীতে রাইখ্যা আহি না। লেজুড়ে লেজুড়ে বাইন্দা রাখি সব সময়। নাওডা চোরে লইয়া যায় এই ডরে ওরে না বহাইয়া বাজারে যাই। এদিগেও তোগ উৎপাত শুরু অইছে! আমি এহন কোথায় যাই? তোগ যন্তন্নায় মুল্লুক ছাইড়্যা বনবাসে গেলে পারি অহন।—করিম বক্‌শ গুমরে ওঠে।

    জয়গুন চলতে আরম্ভ করে।

    করিম বক্‌শ বলেই চলে—দোহাই খোদার। ওরে ফুসলি দিস না আর। আমার পোলারে ফুসলি দিলে আল্লার কাছে ঠেকা থাকবি। রোজ কেয়ামত তক দাবী থাকবো তোর উপরে।

    জয়গুন বেশ কিছু দূর এগিয়ে গেছে।

    করিম বক্‌শ জোরে বলে—আবার যদি ফেউ-এর মতন আমার পিছু লাগস, আখেরি কথা হনাইয়া দিলাম, তয় তোরই একদিন কি আমারই একদিন।

    জয়গুন কোনো দিন কাসুকে ফুসলি দেয়নি, আর দিবেও না—সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা।

  • তের পরিচ্ছেদ

    তের পরিচ্ছেদ

    তের পরিচ্ছেদ

    মেয়ে লোকটি কে?

    কাসুর মনে বারবার এই প্রশ্নটাই আনাগোনা করতে থাকে। তাকে কোলে নিয়ে কত আদর করলো! আখ খেতে দিলো। দরদর করে পানি পড়ছিল তার চোখ বেয়ে! কে সে?

    একবার তার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হয়েছিল। কিন্তু করিম বকশের মুখ-চোখের দিকে চেয়ে প্রশ্নটা চাপা পড়ে যায়।

    করিম বকশের রাগ তখনও থামেনি। জয়গুন সে রাগ থেকে কোন রকমে বেঁচে গিয়েছিল। একত্র ঘর-সংসার করার পুরাতন স্মৃতি করিম বকশের মেজাজকে চরমে উঠতে দেয়নি। কিন্তু তারপর লগির উপর দিয়ে তার রাগের জের চলে সমানভাবে। লগির জোর গুঁতোয় ধানখেতের মাঝ দিয়ে যেন তীরের মত ছুটছিল তার ডিঙি। ডিগির গলুইয়ে পানি উঠছিল ছলাৎ ছলাৎ! কিন্তু বাড়ীর কাছাকাছি এসে লগিটা মটাৎ করে ভেঙে দু’ভাগ হয়ে যায়। করিম বকশের রাগ কিন্তু এতক্ষণে থামে। লগি ভাঙার আফসোসে নয়, তার রাগের জয়লাভ। তার রাগ জয়ী হয়েছে লগিটা ভেঙে দিয়ে। এমনি কোনো মাশুল না পেলে তার রাগের কোনো মতেই শান্তি আসে না। লগিটা না ভাঙলে বাড়ী পর্যন্ত পৌছে আঞ্জুমনের সাথে খুব এক চোট ঝগড়া হওয়ার সম্ভাবনা হয়ত ছিল।

    বাপের থমথমে মুখের দিকে চেয়ে কাসুর কথা বলার সাহস হয় না। চুপ করে সে বসেই থাকে আর ভাবে—মেয়েলোকটি কে হতে পারে?

    প্রশ্নটার মীমাংসায় সেদিন থেকে সে অনেকটা সময় নিয়োজিত করেছে। কিন্তু তার কাঁচা মাথা কোন সন্তোষজনক হদিস খুঁজে বার করতে পারেনি।

    হদিস শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়।

    আঞ্জুমন একদিন হাশরের ময়দানের কিচ্ছা বলছিল। শুনে কাসু হঠাৎ জিজ্ঞেস করে—হাশরের ময়দানে এত মাইনষের মধ্যে মারে চিনতে পারা যাইব? আমি ত মা-রে দেহি নাই। তুমি মা-রে চিনাইয়া দিবা?

    আঞ্জুমন কাসুর অভিলাষ বুঝতে পেরে ব্যথিত হয়। কাসুর প্রশ্নটা তাকে খুব পীড়া দিতে আরম্ভ করে আজ। সে ভাবে কাসুকে এমন করে মিথ্যার জালে জড়িয়ে রাখার কোন অর্থ হয় না। অন্তত তার তো কোনই লাভ নেই লোকসান ছাড়া। কাসু ওর মা-র কাছে চলে গেলেই ভালো হয় যেন। করিম বকশা ফুলিকে মোটেই আদর করে না। এমন কি বাজান বাজান বলে কেঁদে খুন হয়ে গেলেও কোলে তুলে নেয় না। আরো গলাগাল দেয়—মেকুরের বাচ্চাড়া কান্দে ক্যাঁ? এইডারে ছালা ভইরা জঙ্গলে ফ্যালাইয়া দিয়া আয়। কাসুই করিম বকশের কাছে সব। ফুলি যেন তার কেউ নয়।

    ভাবতে ভাবতে তার মন বিরক্তিতে ভরে ওঠে। সে স্থির করে—আজ কাসুক ওর মা-র কথা বলে দেবে। জয়গুনের বাড়ী দেখিয়ে দেবে কাসুকে। করিম বকশের ইঙ্গিতে সে এতদিন কাসুকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রেখেছিল। মা-র কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে সাজিয়ে বলতে হত অনেক কথা। কাসু একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, তার মা-র কবরের কথা। আঞ্জুমন কোন দ্বিধা না করে মেহেরনের কবরটাই দেখিয়ে বলেছিল—এই যে এইডা তোর মা-র কবর।

    কাসু বিশ্বাস করেছিল, নিশ্বাস ফেলেছিল আর চেয়েছিল একদৃষ্টে কবরটার দিকে।

    মা-র কথা শুনতে শুনতে সে তন্ময় হয়ে যেত। আর ভাবত আহা—মা থাকা কত সুখের! সঙ্গে সঙ্গে তার মনে জাগত সমবয়সীদের কথা। হামিদের মা হামিদকে কত স্নেহ করে। সেলিমের মা কত আদর করে সেলিমকে। কিন্তু তাকে আদর করবার কেউ নেই।

    তারপর থেকে সে প্রায়ই কবরটাকে দেখতে আসতো। মাঝে মাঝে করিম বকশের কাছ থেকে পয়সা চেয়ে মোমবাতি কিনে কবরে দিত।

    আঞ্জুমন এবার বলে—আমি একটা কথা কইতে পারি। কেওর কাছে না কইতে পারস? কাসু মাথা নাড়ে।

    —খবরদার, তোর বাজান হোনলে আমারে কাইট্যা দুই খণ্ড কইর‍্যা ফ্যালাইব। তয় হোন। অই কবরডা তোর সতাই মা-র! আমি যেমুন সতাই মা, তেমন।

    —কে আমার মা? কাসু উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তুমিই ত কইছিলা ঐডা আমার মা-র কবর।

    —ওহোঁ, মিছা কথা। তোর মা অহনো বাঁইচ্যা আছে।

    কাসু বিশ্বাস করতে পারে না। সে বলে ফাঁটকি দ্যাও তুমি।

    —ফাঁটকি দিমু ক্যাঁ? বিশ্বাস না করলে আর কইমু না। থাউক। আঞ্জুমন চুপ করে।

    কিন্তু কাসুর শোনার আগ্রহ এবার বেড়ে যায়। সে বলে, আইচ্ছা, এইবার বিশ্বাস করমু,

    –কইলে কি দিবি আমারে?

    —তুমি যা চাও হেইয়া দিমু।

    –আমি চাই :

    আসমানী বিরিক্ষর ফল,
    তল নাই দীঘির জল,
    যা খাইলে হয় অসুরের বল। পারবি দিতে?

    কাসু বিপদে পড়ে। কোথায় পাবে সে এসব? আসমানে গাছ হয়, সেই গাছে ফল হয়। কি তার নাম? সে বুঝতেই পারে না কিছু। আর তল নাই দীঘি—সেটাই বা কেমন? হতাশায় কাসুর মুখ অন্ধকার হয়ে যায়। তার ধারণা, এগুলো দিতে না পারলে তার সৎসা তাকে তার মা-র কথা বলবেই না।

    আঞ্জুমন খলখলিয়ে হেসে ওঠে। কাসুর পিঠ চাপড়ায়। কাসু এবার ভরসা পায়।

    অঞ্জুমন আরম্ভ করে—তোর বয়স তহন তিন বচ্ছর। তোর বাপ তোর মারে ছাইড়া দেয়। তোরে তোর ফুফুর কাছে, পাড়াইয়া দায়। তোর একটা বইন আছে, মায়মুন তার নাম।

    কাসুর সন্দেহ দূর হয় না। কিন্তু সে মনোযোগ দিয়ে শোনে সব কথা।

    আঞ্জুমন আবার বলে—ঈদে টুপিখান দিছিল কে? তোর মা দিছিল না? অই যে কানা বুড়ি দিয়া গেল, ঐ কানা বুড়ি তোর মামানি।

    কাসুর সমস্ত সন্দেহের অবসান হয় এবার। সৎমায়ের আচরণে কাসু কোন দিনই সদিচ্ছার পরিচয় পায়নি। তার হাব-ভাব দেখলে তার ভয়ই হত। আজ সৎমায়ের মমতায় সে বিস্মিত হয়। তাকে খুব ভালো লাগে। আঁচল ধরে আবদার করতেও এখন বাধে না কাসুর।

    সে বলে—যাইমু মা-র কাছে। আমারে লইয়া যাও না মা-র কাছে।

    —আমি লইয়া যাইমু কোতায়? সর্বনাশ! তোর বাজান জানতে পারলে আমারে মাইরা কাহটা গাঙে ফ্যালাইয়া দিব। খবরদার। জানতে যেন না পারে।

    কাসু মাথা নাড়ে।

    আঞ্জুমন বলে—চল, তোরে দেহাইয়া দেই। বাড়ীর উত্তর ধারে গেলে দ্যাহা যায় বাড়ীখান।

    কাসুকে নিয়ে আঞ্জুমন বাড়ীর উত্তর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

    সূর্য-দীঘল বাড়ীর তালগাছটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সে বলে—ঐ যে দুইখান বাড়ীর ফাঁক দিয়া দ্যাহা যায় একটা বড় তালগাছ। ঐ বাড়ী, অই হানেই থাকে তোর মা।

    কাস পলকহীন দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার মন এই মুহূর্তে ছুটে যেতে চায়। কিন্তু নিচে মাঠের দিকে চেয়ে নিরুপায় বলে মনে হয় নিজেকে। আশ্বিনের শেষাশেষি, পানি শুকিয়ে আসছে। জমির উঁচু আল দেখা যায়। সমস্ত মাঠ কাদায় দৈ-দৈ হয়ে আছে। পায়ের পথও নয়, নায়ের পথও নয়।

    করিম বখ্‌শ যখন বাড়ী থাকে না, তখন কাসু প্রায়ই বাড়ীর উত্তর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। নৌকার মাঝে দেখা মা-র মুখখানা চিন্তা করে।

    এখান থেকে তালগাছটা স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু মাঠের কাদা আর পানি কাসুর সাথে আড়ি ধরেছে যেন। রোজ এখানে এসে এসে তার রাগ ধরে পানির ওপর। কেন পানি শুকাতে দেরী করছে এত?

    দু’একটা লোককে কাদা ভেজা পথ চলতে দেখে তার মনে হয়, সে যদি একটু বড় হত, তবে সে-ও যেতে পারত অনায়াসে। মাঝে মাঝে কারো কাঁধে চড়ে যাওয়ার ইচ্ছে হয় তার। কিন্তু কে এমন দরদী যে তাকে কাঁধে করে নেবে?

    তালগাছটার দিকে দু’একটা পাখীকে উড়ে যেতে দেখে তারও উড়বার স্পৃহা জাগে। ঐ শাখীগুলোর মত দুটো পাখা যদি তার থাকত!

    মাঠের কাদা যতই শুকিয়ে আসতে থাকে, কাসুর মনও ততই উড়-উড় করতে থাকে। কার্তিক মাসের শেষে মাঠের মাঝে পথ পড়ে। এমনি সময়ে একদিন শফির মা আসে এ বাড়ীতে। কাসুর আনন্দ আর ধরে না। এ রকমই একটা সুযোগের অপেক্ষা করছিল সে।

    এক প্রহর বেলা। করিম বক্‌শ গোয়াল থেকে গাইটা বের করে উঠানে কাঠাল গাছের সাথে বাধে। আঞ্জুমন ঝিনুকে করে সর্ষের তেল এগিয়ে দেয়।

    করিম বক্‌শ হুকুম করে—হাম্বাডা লইয়া আয়। বাজারের বেইল অইয়া গেছে।

    —আমার ঘিন করে। তুমিই যাও।

    করিম বক্‌শ গোয়ালের এক পাশে ঝুলানো হাম্বাটা নিয়ে আসে।

    গাইটার বাছুর মরেছে অনেক দিন। দুধ-চোর গাই বাছুর না দেখলে দুধ ছাড়ে না। কোথায় লুকিয়ে রাখে। বাছুর না দেখলে বাটে হাত দেওয়াও মুস্কিল। ঠ্যাং দিয়ে লাথি মারে। এসব অসুবিধার জন্যে এই অদ্ভুত ব্যবস্থা। মরা বাছুরটার চামড়ার খোলসে খড়-বিচালি ভরে নকল বাছুর তৈরী করা হয়েছে।

    করিম বক্‌শ হাতে সর্ষের তেল নিয়ে বাঁটে মাখিয়ে দেয়। তারপর নকল বাছুরটার মুখ বাটের কাছে নিয়ে বাছুরের অনুকরণে গুঁতো মারে। এ রকম করলে যখন বাটে দুধ নেমে আসে, তখন দুই হাঁটুর মাঝে হাঁড়ি রেখে করিম বক্‌শ দুইতে আরম্ভ করে।

    -বাছুর কবে মরল ভাই?

    করিম বক্‌শ চেয়ে দেখে—শফির মা। নিতান্ত অনিচ্ছার সাথেই সে উত্তর দেয়—মাস তিনেক অইল।

    —অনেক দিন ত অইল। কেমুন কইর‍্যা মরল? দুধে পানি মিশাও বুঝিন? দুধে পানি মিশাইলে বাছুর মইরা যায়। এইডা হাচা কতা। শফির মা ঠাট্টার সুরে বলে।

    জয়গুন করিম বকশের সংসারে থাকতে এ রকম ঠাট্টা-মশকরা প্রায়ই মূলত তাদের মধ্যে। বহুদিন বহু ঘটনার তিক্ততার পরেও আজ কেমন করে যে এ ঠাট্টাটুক জিভ থেকে পিছলে বেরুল, শফির মা নিজেই বুঝতে পারে না। কথাটা বলেই সে লজ্জিত হয়। করিম বক্‌শ আপন মনে এ-বাঁট থেকে ও-বাঁটে হাত চালিয়ে দুধ নামাতে থাকে। তার মুখেও ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায়।

    গাইটা নিষ্প্রাণ নিষ্পন্দ নকল বাছুরটার গা চাটতে থাকে শুধু শুধু।

    আঞ্জুমন পিঁড়ে এনে বসতে দেয় শফির মাকে। শফির মা-র কথার উত্তর সে-ই দেয় এবার—পানি মিশাইব কোন দুখে? পানি মিশান বোধ করি ভাল আছিল। বাছুররে দুধ খাইতে না দিলে বাঁচব কেমন কইর‍্যা, কও? ঘাস না চিনতেই দুধের বাছুরের সামনে দিয়া রাখত ঘাস। আর সমস্ত দিন ভ্যা-ভ্যা করত বাছুর। বাছুরেরে দুধ খাইতে দিলে যে আঁড়ি উনা থাকে, বোঝলা নি বইন?

    করিম বক্‌শ খেকিয়ে ওঠে-থাম মাগি বেজাত। কুড়ুমের কাছে বিত্তান্ত শুরু করছে। বেশী বকরবকর করলে দুধের আঁড়িডা তোর মাথার ‘পর ভাওমু, কইয়া রাখলাম।

    শফির মা বলে—থাউক, বিহান বেলা কাইজ্যা কইর‍্য না গো তোমরা। হাশ্বাড়া কিন্তু খুব কসই অইছে। আমি তো ভাবছিলাম জিত বাছুরই। কে বানাইছে? মায়মুনের বাপ, তুমি?

    অনেকদিন পরে ‘মায়মুনের বাপ’ ডাকটা শুনে চমকে ওঠে করিম বক্‌শ। শফির মা এই বলেই তাকে ডাকত। এ পাড়ার সবাই ডাকে ‘রহির বাপ’ বলে। আঞ্জুমনের বাপের বাড়ীতে ডাকে ‘ফুলির বাপ’। শেষের দুটোই চলছে আজকাল। আগের নামটা ঘুমিয়ে গেছে তার মনে। করিম বক্‌শ মাথা নাড়ে।

    —হ। কারিগরিতে, তোমার মত ওস্তাদ আর নাই এই আশে-পাশে।

    করিম বকশের দুধ দোহন শেষ হয়েছে। শফির মা-কে কথা বলবার অবসর না দিয়ে সে দুধের হাঁড়ি হাতে উঠে পড়ে।

    শফির মা বলে—আদত কথাডা হোন এইবার। তোমার কাছে আইছি একটা কথা লইয়া।

    করিম বক্‌শ দাঁড়ায়। বলে—কি কতা?

    —মায়মুনের সম্বন্ধ ঠিক অইছে। আমি কত চেষ্টা-তদবির কইর‍্যা তয় ঠিক করলাম। অইলে এমুন সম্বন্ধ কপাল কুটলেও জুটত না।

    —কোথায় সম্বন্ধ!

    —সোলেমানের পোলা, সদাগর খার নাতি ওসমানের লগে।

    –কবে বিয়া?

    —এই মাসের এই কয়দিন পর। অগ্রাণ মাসের নয় তারিখ। তোমার কিন্তু যাইতে অইব।

    —আমি যাইতে পারতাম না।

    —এ তুমি কেমুন কথা কও! তোমার মাইয়া, তুমি না গেলে চলব কেমনে?

    তোমার মাইয়া!

    করিম বকশের মনের দুয়ারে ধাক্কা খেয়ে বারবার প্রতিধ্বনি করে কথা দুটি। কিন্তু উমর মনে বারিপাতের চেষ্টা বৃথা। কাসুকে ফুসলি দেয়ার ষড়যন্ত্রের কথা মনের ভেতর টেনে এনে সে নিজেকে কঠিনতর করে তোলে। এবার স্বরটা কঠিন করেই সে বলে—যেদিন থেইকা ও বিদায় দিছি, হেদিন থেইকা ওরা আমার কেউ না।

    -তুমি কি কও ভাই! তোমার মাইয়া, তুমি না গেলে কেমুন দ্যাহা যায়? কাসুও যাইব তোমার লগে।

    –কাসু যাইব!

    —ক্যাঁ, দোষ কি? আবার তোমার লগেই লইয়া আইবা।

    –বাহার কথা কইছ! কেও যাইব না। কাসু যাইব না, বাড়ীর একটা পোনাও যাইব না। কাসু এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল। আঞ্জুমনের ইশারায় এবার সে চুপি চুপি সরে যায়।

    —কেউ না? কফির মা আবার বলে।

    –হ, হ, কেউ না। বিয়া দিয়া দ্যাও, চাই কাইট্যা গাঙ্গে ভাসাইয়া দ্যাও, হেতে আমার কি? আমি হুঁ-হাঁ কিচ্ছু কইমু না।

    শফির মা আর কথা বাড়াবাড়ি করতে সাহস করে না। সে আগেই জানত, মায়মুনের বিয়েতে করিম বক্‌শকে পাওয়া যাবে না। তবু সে এসেছিল যাতে পরে দূষতে না পারে।

    পাশ থেকে কঞ্চির লাঠিটা হাতে নিয়ে শফির মা ওঠে।

    আঞ্জুমন বলে—পান খাইলা না বইন?

    —নালো বইন। আমি আবার বিনে ছেঁচা মোখে দিতে পারি না। ছেঁচতে দেরী অইয়া যাইব।

    শফির মা পথ নেয়। খেতের আলের ওপর কাসু দাঁড়িয়ে আছে। শফির মা যেতেই তার একখানা হাত ধরে সে বলে—আমি যাইমু, মামানি।

    —আমি তোর মামানি, কে কইছে?

    —আমি হুনছি।

    কাসু আবার বলে—আমি যাইমু, তোমার লগে।

    —কই যাবি?

    কাসু কোন উত্তর দেয় না।

    শফির মা বলে—নারে বাজান। তোরে নিলে আমি দোষের ভাগী অইমু। শিগগির বাড়ীতে যা। তোর বাপ মাইরা খুন কইর‍্যা ফ্যালাইব।

    —উহুঁ, জানতে পারব না। বাজান দুধ বেচতে যাইব।

    —ফুলির মা কইয়া দিব তোর বাজানের কাছে।

    —ওহোঁ, কইব না। হে-ই ত আমারে চিনাইয়া দিছে ঐ তালগাইছ্যা বাড়ীডা।

    শফির মা একটু চিন্তা করে বলে—আইচ্ছা চল। আবার তাড়াতাড়ি ফিরা আইতে অইব। তোর বাপ জানতে পারলে কিল এট্টাও জমিনে পড়ব না।

    কাসু বলে—বাজার তন ফিরতে দেরী অইব। তার আগেই ফিরা আইমু আমি।

    শফির মা-কে পেছনে ফেলে কাস এগিয়ে যায়। শফির মাও জোরে পা ফেলে। কিন্তু। কাসুর সাথে সে হেটে পারে না। সে কতদূর এগোয়, আবার পেছনে ফিরে তাকায়।

    করিম বকশের বাড়ী ছাড়িয়ে অনেক দূর এসে পড়েছে তারা। এবার পেছন দিকে তাকাতেই শফির মা দেখতে পায়-করিম বক্‌শ উর্বশ্বাসে ছুটে আসছে এদিকে। কোণাকুণি ধানখেত মই দিয়ে যেন আসছে সে। কাসু শফির মা-কে ছাড়িয়ে নল খানেক এগিয়ে গিয়েছিল।

    শফির মা ডাকে কাসু। ভয়ে তার গলা দিয়ে আর কথা বেরোয় না।

    কাসু পেছন দিকে তাকিয়ে ‘থ’ হয়ে যায়।

    শফির মা বলে—ভালা চাসত বাড়ীমুখি পথ দে। নইলে আড্ডি গুড়া কইর‍্যা ফ্যালাইব।

    কাসু এসে শফির মা-কে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে। তারা দু’জনেই ভয়ে কাঁপতে থাকে। শফির মা-র কাঁপুনি অনুভব করতে পেরে তার ভয় আরো বেড়ে যায়।

    করিম বক্‌শ এসে পড়েছে। দুই হাতে কাসুকে ধরতেই সে আত-চীৎকার করে ওঠে। সে। শফির মা-র আঁচল জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু করিম বক্‌শ তার রাক্ষুসে থাবায় ছাড়িয়ে নেয় কাসুকে। শফির মা-কে ধাক্কা মেরে বলে—তুই মাইয়ালোক। নইলে আইজ–

    রাগের অতিশয্যে করিম বকশের মুখ দিয়ে কথার শেষটা বের হয় না। এবার সে কাসকে বাম কাঁধে ফেলে ডান হাত দিয়ে এক একটা থাপ্পড় মারে আর বলে—আর এই মুখি পাও ফেলবি? দ্যাখ, কেমুন মজা।

    কাসু কাঁধের ওপর থেকেই হাত পা ছুঁড়ে চিৎকার করতে থাকে।

    করিম বকশের ধাক্কা খেয়ে শফির মা বসে পড়েছিল মাটির ওপর। সে অবস্থায়ই সে জিরিয়ে নেয় আর চেয়ে দেখে করিম বকশের কাণ্ড।

    কিছু দূর যাওয়ার পর আর করিম বকশকে দেখা যায় না। পানি খেতের আড়ালে পড়ে গেছে সে এখন। সোজা হয়ে দাঁড়ালে করিম বক্‌শের কীর্তি দেখা যেত। কিন্তু শফির মা তখনও বসে হাঁপাচ্ছে।

  • চৌদ্দ পরিচ্ছেদ

    চৌদ্দ পরিচ্ছেদ

    চৌদ্দ পরিচ্ছেদ

    ৯ই অগ্রহায়ণ। আজ মায়মুনের বিয়ে। লতিফ মিয়ার বাড়ী গিয়ে এই শুভ দিনটি জেনে এসেছিল শফির মা।

    লতিফ মিয়া তার পকেট পঞ্জিকা বের করে। একটা পাতার ওপর নজর দিয়ে সে আপন মনেই বলে—চন্দ্র রাজ্জা বুধ মন্ত্রী। তারপর শুভকার্যের নির্ঘণ্ট দেখে বলে দেয়—অগ্রাণ মাসের ১ তারিখে একটা শুভদিন আছে। আর একটা আছে শেষাশেষি-২৭ তারিখ। এছাড়া অগ্রাণ মাসে আর দিন নেই।

    লতিফ মিয়া তার পঞ্জিকা বন্ধ করে। পঞ্জিকার ওপরের রাশিচক্র অঙ্কিত মলাটের দিকে তাকিয়ে লতিফ মিয়ার গণনায় শফির মার মনে একটু সন্দেহ জাগে না। সে ভাবে—এমন বই-এর গণনা কখনও ভুল হতে পারে না। লতিফ মিয়াকে দাওয়াত করে শফির মা বিদায় হয়। পথে আসতে আসতে সে শুভদিনটি মনে মনে ইয়াদ করে।

    গণনা নির্ভুল সন্দেহ নেই। কারণ, এই তারিখে আশেপাশে আরো অনেক বাড়ীতে বিয়ের ধুম লেগেছে। গায়ের জমিদার বাড়াতেও আজ বিয়ে। বাজারে দুধ কিনতে গিয়ে তা টের পাওয়া যায়। দুধের সর ছয় আনা থেকে বেড়ে এক টাকা হয়। মাছের দর চড়ে হয় দ্বিগুণ। বাজারের অর্ধেক দুধ, ঝাকায় ঝাকায় বাছা-বাছা রুই কাতলা মাছ যায় জমিদার বাড়ী।

    হাসু ও শফি আসে বিয়ের বাজার করতে। চার সের দুধ, দুটো শোল মাছ, দুটো লাউ আর চাল-ডাল এবং আরো কিছু সওদা নিয়ে তারা বাড়ী আসে।

    বাজার-ফেরত তিন টাকা ও কয়েক আনা হাসু মা-র কাছে ফেরত দেয়।

    জয়গুন বলে বারো টাকা যে খতম করলি, আরো ত অনেক খরচ আছে।

    শফির মা বলে—থুইয়া দ্যাও। অতহত দরকার নাই। পনেরো টাকা দিছে মোট্টে। ওয়াগ ট্যাকা দিয়া ওয়াগ খাওয়াই। আমরা খরচ করতে যাইমু কোন্‌ দুক্‌খে?

    —গোশত অইলে ভালা অইত।

    থুইয়া দে, আবার গোশত। আরো পাঁচখান ট্যাকা দিবার কইছিলাম, হেইয়া দিল না, কিরপিন।

    —দিছে পনেরো টাকা। আইব ত ভেড়ার পালের একপাল।

    —আহনের কত দশ জনের। কয়জন আহে, আল্লা মালুম।

    -তাইত আমি আগেই কইছিলাম, মায়মুনের বিয়াতে টাকা নিমু না। পান-শরবত খাওয়াইয়া বিদায় করমু।

    —হেইডা ভালা আছিল।

    —কিন্তু কেও হোনলা না আমার কথা। অহন ট্যাকা নিয়া বদনামের ভাগী অই।

    —তুমি কিছু চিন্তা কইর না, হাসুর মা। শইল মাছ আর কদু দিয়া একটা ঘণ্ড, ডাইল। আর দুধ-বাতাসা, ব্যস! আবার কি! এ খাইয়া তোর বেয়াই সোলেমান খাঁ তার বউর কাছে, গল্প ছাড়বো! তারিফ করবো তোর রান্দার।

    জয়গুলোর হাসি পায়।

    নওশা আসবে সন্ধ্যার পরে। বিকেল বেলায় হাসু ও শফি পাড়ার থেকে হোগলা যোগাড় করে এনে পেতে দেয় অতিথিদের বসবার জন্যে। উঠানের এক পাশে পা ধোয়ার জন্যে পানি ভরা কলসী ও বদনা রেখে দেয়। তার পাশে রাখে জলচৌকি ও খড়ম।

    সময়টা ভালো। বৃষ্টি-বাদলের ভয় নেই।

    সন্ধ্যার পর বরযাত্রীরা আসে। দুলাও আর সকলের মত পায়ে হেঁটেই আসে। গরীবের বিয়েতে পাল্কীর কথা কেউ কল্পনা করতেও পারে না। পাল্কীর ভাড়ায় একটা পুরোদস্তুর বিয়ে স্বচ্ছন্দে হয়ে যেতে পারে।

    বেড়ার ফাঁক দিয়ে জয়গুন জামাই দেখে নেয়। গোলাপী মাদ্রাজী লুঙ্গি পরনে, গায়ে বেগুনী রঙের পাঞ্জাবী আর মাথায় লাল টুপি। তার মুখের বসন্তের কালো কালো দাগ আর ছাগলে দাড়ি কয়গাছা জয়গুনের কাছে বিশ্রী ঠেকে। বয়স পঁচিশের ওপরে হবে, জয়গুন অনুমান করে। মেয়েকে নদীতেই ভাসিয়ে দেয়া হচ্ছে। তা ছাড়া আর কি!

    দুলা এবং আর যে দু’এক জনের পায়ে জুতো আছে, তারা উঠে গিয়ে বিছানায় বসে। বাকী সবাই এক এক করে জলচৌকির ওপর বসে পা ধোয়। তারপর বিছানার পাশে আর একজনকে খড়ম ছেড়ে দিয়ে মজলিশে এসে বসে।

    সকলের শেষে জুতো পায়ে থপথপ শব্দ করতে করতে আসে গদু প্রধান। বেঢপ চটি জোড়া বিছানার পাশে রাখতে ভরসা হয় না তার। শফিকে কাছে পেয়ে জিজ্ঞেস করে—এই হানে রাখলে থাকবো ত? না চুরি যাইব?

    মজলিশের মাঝ থেকে একজন বলে—গেলই বা চুরি। পুরান গেলে নতুন আনবেন।

    —তোমরা এহনও নাবালক। জানো, পুরান জোতা আর পুরান চাদরের মর্ম? পুরান জোতা আর পুরান চাদরের সর্মান বেশী।

    জুতো জোড়া হাতে করে যেতে যেতে আবার বলে—নতুন জোত পায়ে দিয়ে মজলিশে গেলে মাইনষে কি মনে করে, জানো? মনে করে, নতুন হিখছে জোতা পায় দিতে।

    মৃদু হাসির গুঞ্জন শোনা যায়।

    গদু প্রধান মসজিদের মৌলবী সাহেবের পাশে জায়গা বেছে নেয়। বসবার আগে জুতো জোড়া পেছনে হোগলার নিচে রেখে দেয়।

    গদু প্রধান এসে জুতো চুরির যে প্রসঙ্গ তুলে দেয়, তা আর থামতে চায় না। কার বিয়েতে কার জুতো চুরি গিয়েছিল, কার চামড়ার জুতো কার রবারের জুতোর সঙ্গে বদল হয়েছিল—এসব গল্প।

    সবাই যখন গল্পে মেতে আছে, তখন হাসু এক ফাঁকে লোক গুণে যায়। জয়গুনকে গিয়ে বলে বেবাকে তেইশ জন, মা।

    জয়গুন মাথায় হাত দেয়। সব শুদ্ধ পনেরো জনের আয়োজন করা হয়েছে। এখন কি উপায় করা যায় সে ভেবে উঠতে পারে না।

    শফির মা-কে ডেকে বলে—তুমি সামলাও। আমি আর পারি না, বইন।

    —কোন চিন্তা নাই। এক কাম কর। চাইর সের চাউলের ভাত চাপাইয়া দে। আমি ডাইলে দুই বদনা আর দুধে এক বদনা পানি মিশাইয়া দেই। যেমুন মাছ, তেমুন বড়ি না অইলে কি দুইন্যাই চলে? পালবরাদ্দে আইছে যেমুন, খাইব তেমুন ঝড়া পানি।

    জুতো চুরির চাপ ছেড়ে কার জমিতে কি রকম ধান হবে, কোন বিলের ধানে পোকা। ধরেছে, কার বছরের খোরাকি হবে, কার হবে না—এ সব আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে।

    একজন বলে—পরধানের চিন্তা নাই। কম কইরাও পাচ-ছয় হাজার টাকার ধান বেচতে পারব।

    গদু প্রধান চুপ করে থাকে। মজলিসের মধ্যে তার টাকার তারিফ করলে সে খুশীই হয়।

    এবার দুলার বাপ সোলেমান খাঁ অন্য প্রসঙ্গে গিয়ে পড়ে। সে বলে, স্বাদীন যে অইল হের কোন নমুনাই যে পাইলাম না আইজও। দিন দিন যে খারাপের দিগেই চুলল। মওসুমের সময়ই চাউলের দর এত, শেষে না জানি কি অয়!

    শেষে যদি কিছু হয়, তবে গদু প্রধানের পোয়াবারো। চালের দর চড়ক—মনে মনে সে তাই কামনা করে।

    একজন বলে—দ্যাখছ, কাপড় পাওয়া যায় না বাজারে। খালি জোলইরা কাপড়। তাও কুড়ি-বাইশ টাকা জোড়া। একি কিনতে পারে?

    গদু প্রধান বলে—আর কিছু দিন পর এও পাইবা না। বউ-ঝিরা ঘরের বাইর অইতে পারব না।

    দুলার চাচা লোকমান বলে—কত আশা-ভসসা আছিল। স্বাদীন অইলে ভাত কাপড় সাইয্য অইব। খাজনা মকুব অইব। কিন্তু কই? বেবাক ফাঁটকি, বেবাক ফাঁকি। আবার রেল গাড়ীর ভাড়াও বাইড়া গেল।

    —আরো কত দ্যাখা মিয়া, মাত্র বিছমিল্লা।—মৌলবী সাহেব বলেন। তারপর গদু প্রধানের কানে কানে কি বলেন।

    গদু প্রধান বলেন—দশটার মইদ্যে বিয়া পড়াইতে অইব। কই সোলেমান? শোন এদিগ। সোলেমান খাঁ এলে আস্তে আস্তে গদু প্রধান বলে—তোমার বেয়ানরে আগে তোবা করাইতে অইব।

    —ক্যাঁ?

    —ক্যাঁ আবার! হায়ানের মত যেইখানে হেইখানে ঘুইরা বেড়ায়, দ্যাখতে পাও না? ভাল মাইনষের মাইয়া। বিয়াও অইছিল ভালা ঘরে। ভালা জাতের মাইয়া এই রকম বেজাত বেপর্দা অইলে আমাগই বদনাম। তোবা করাইয়া দিতে অইব। পরচাতে আর যেন বাড়ীর বাইর না অয়।

    —হেইডা ত ভালা কথাই।

    —তুমি কথাডা মজলিশে উড়াও। জোরে কইও যেন ঘরের তন তোমার বেয়ান হোন্‌তে। পায়। আমি আছি তোমার পিছে।

    —না, আপনেই উড়ান। আমার শরম করে।

    গদু প্রধান বলে বেশ জোরের সাথেই–বিয়ার আগে বৌর মারে তোবা করাইতে অইব। তোবা না করাইলে মৌলবী সাব কলমা পড়াইব না। আর হে ছাড়া কে কলমা পড়ায় আমি দেইক্যা লইমু।

    মৌলবী সাহেবের মুখের ওপর মজলিশের সমস্ত চোখ একযোগে এসে পড়ে। মৌলবী সাহেব এবার একজন বেপর্দা স্ত্রীলোক ও তার স্বামীর কেচ্ছা শুরু করেন।

    জয়গুন মায়মুনের চুলের জট ছাড়াতে শুরু করেছিল। গদু প্রধানের কথা তার কানে। আসতেই সে লাফ দিয়ে ওঠে। শফির মা-র কাছে গিয়ে বলে—হোনলা নি শফির মা?

    —হ, হোনলাম। তার কি করতে চাও?

    —কি করতে চাই? তোবা আমি করতাম না। আমি কোন গোনা করি নাই। মৌলবী সা’ব বিয়া না পড়াইলে না পড়াউক। আমার মায়মুনের বিয়া দিমু না।

    —এইডা কি কথার মতোন কতা। ট্যাকা দিছে তারা।

    —ট্যাকা দিছে, পেড় ভইরা খাইয়া ট্যাকা ওসুল কইরা যাউক। আমি ত আর টাকা সিন্দুকে ভইরা থুই নাই।

    —না, না। ওই হগল কথা রাখ। এমুন ঘর আর পাবি না। আর আইজ এই রহম কইর‍্যা ফিরাইয়া দিলে বদনামী অইব কত! তোর বাড়ীতে আর কেও থুক ফেলতেও আইব না। আবার গদু পরধান আছে এর পিছে। ওকি যেমুন তেমুন গোঁয়ার! ও যদি মনে করে, উর মাডি চুর করে।

    জয়গুন চিন্তিত হয়। তার মুখে কালো ছায়া। সে ভাবে—তওবা করলে ঘরে বদ্ধ হয়ে থাকতে হবে। ঘরে বন্ধ হয়ে থাকার অর্থ না খেয়ে তিলে তিলে শুকিয়ে মরা। জয়গুনের চোখ ঘৃণায় কুঞ্চিত হয়। সে তীব্র কণ্ঠে বলে—না, আমি তোবা করতাম না।

    মজলিশে মৌলবী সাহেবের গলা শোনা যায়। তিনি গল্প বলছেন—ঐ লোকটা তার বেপর্দা স্ত্রীকে কিছুতেই তালাক দিল না। তখন একজনের ওপর হুকুম অইল—ওরে কতল কর। লোকটাকে কাইট্যা ফেলা অইল। আর তার লহু থেইকা পয়দা অইল কি? না, একটা হারাম জানোয়ার–খিঞ্জির—শুয়োর। এইবার আপনারা দ্যাখেন, পর্দা কি চীজ। পর্দা না মানলে চল্লিশ বছরের এবাদত কবুল হয় না খোদার দরগায়। সব বরবাদ অইয়া যায়। বেপর্দা স্ত্রীলোক আর রাস্তার কুত্তী সমান।

    জয়গুন চমকে ওঠে।

    শফির মা কেরামত ও জহিরুদ্দিন মোড়লকে ডেকে আনে।

    জহিরুদ্দিন বলে—মৌলবী সা’ব ঠিক কথাই কইছে হাসুর মা। তোবা কইরা ফ্যাল।

    কেরামত সায় দিয়ে বলে—হ চাচি, তোবা কর।

    জয়গুন জ্বলে ওঠে—তোবা কইরা ঘরে বইস্যা থাকলে আমারে খাওয়াইতে পারবি?

    শান্ত হয়ে আবার বলে—তোমরা ইনসাফ কইর‍্যা কও, তোবা করলে কে আমারে ঘরে আইন্যা খাওয়াইব? হাসু যা রোজগার করে ও দিয়া দুই পেট চলে না। মায়মুনেরে আইজ বিদায় দিলেও ওরে নাইয়র আনত অইব। ও অহনতরি শিশু। মাসের মইদ্যে দশদিন ও আমার বাড়ীতেই থাকব। এতগুলা পেট কেমন কইর‍্যা চালাই, তোমরাই কও।

    জহিরুদ্দিন বলে—খোদায় খাওয়াইব। মোখ দিছে যে, আহার দিব সে।

    জয়গুন হাসে শ্লেষের হাসি।

    কেরামত বলে—আইজকার দিনডার লেইগ্যা তোবা কইর‍্যা নেও। তারপর–

    —তোবা তো’বা-ই। একবার করলে তা আর ভাঙতে পারতাম না।

    বাইরে দু প্রধানের গলা শোনা যায়—অনেক রাইত অইল। কই কেরামত? চালাক কর।

    —করতাছি মিয়া সাব।

    কেরামত মজলিশে যায়। মৌলবী সাহেব দোর গোড়ায় এসে তার মাথার লম্বা পাগড়িটা খুলে তার এক প্রান্ত কেরামতের হাতে তুলে দিয়ে অন্য প্রান্ত নিজের কাছে রাখেন।

    কেরামত ঘরের ভেতর গিয়ে বলে—ধইর‍্যা থাক, চাচি। হুজুর যা যা কইবেন, খেয়াল কইর‍্য। দিলের মইদ্যে গাইথ্যা রাইখ্য সব।

    দ্বিধার সাথে জয়গুন পাগড়ির মাথাটা দুই হাতে চেপে ধরে। তার মনের মধ্যে তখনও দ্বন্দ্ব চলছে।

    মৌলবী সাহেব টানা সুরে থেমে থেমে কি বলে যান তার একটা কথাও তার কানে ঢোকে না। কেরামত যখন আবার তার হাত থেকে পাগড়ির প্রান্তটা নিতে আসে, তখন তার সম্বিত ফিরে আসে।

    এবার খাওয়ার পালা।

    জয়গুন তওবা করায় আজ মৌলবী সাহেবেরও খেতে আপত্তি নেই। একদিন তিনি জয়গুনের দেয়া হাঁসের ডিম ফেরত দিয়েছিলেন। কিন্তু সেইদিনের সেই জয়গুন আর এখনকার জয়গুনে তফাত অনেক। একটু আগেও সে মৌলবী সাহেবের কাছে ছিল রাস্তার কুকুরের সামিল।

    গদু প্রধান সামনের সারির একটা ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে—কিরে আদেল, ভাত সামনে কইর‍্যা বইস্যা আছস ক্যান? খাইতে পারস না বুঝি?

    —পারমু না ক্যাঁ? দুধ দিয়া মাইর‍্যা দিমু।

    সাদত আলী বলে—আইজ কাইলকার ছেঁড়ারা পোয়া চাউলের ভাত খাইতে পারে না। এই বয়সে আমরা লোয়া খাইয়া লোয়া অজম করছি। খাইতে খাইতে মাজার কাপড় যে। কয়বার ঢিলা করতে অইত তার শুমার নাই।

    গদু প্রধান বলে—জোয়ান বয়সের কালে এক সের চাউলের ভাত অজম করছি আমি।

    সাদত আলী বলে—পরধানের মনে আছে? হেই মধু আলইকরের দোকানে তুমি আর আমি বাজী রাইখ্যা রসোগোল্লা খাইছিলাম। তুমি আমার তন ছয়খান বেশী খাইছিল। আমি খাইছিলাম একচল্লিশটা, আর তুমি–

    —আর আমি সাতচল্লিশটা। সাদত আলীর কথা শেষ না হতেই গদু প্রধান বলে।

    লেদু পাশ থেকে বলে রাইখ্যা দ্যাও ওই হগল কিচ্ছা। আইজ কাইলকার ডোরা খাইতে পারে না? খাইতে পারে, মিয়াভাই কিন্তু খাওয়ায় কেডা? খাইতে না পারলে ভালই আছিল। খোদা খোরাক কমাইয়া দিলে ত খুশী অইতাম। শুকুর ভেজতাম খোদার দরবারে। মসজিদে শিন্নি দিতাম!

    লেদুর মাথায় ছিট আছে। কিন্তু তার স্পষ্টবাদিতার জন্য অনেকে তাকে পছন্দ করে। গদু প্রধান কিছু বুঝতে না পেরে বলে—কি রহম?

    —বোঝলা না, মিয়াভাই? তোমার গোলাভরা ধান আছে। এক সেরের বদলে দুই সের খাইলেও তোমার গোলা ঠিক থাকব। কিন্তু আমি সারাদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলাইয়া রুজি করি পাঁচ সিকা। এই টাকা পেড়ে দিমু, কাপোড় পিল্ম, না এর তন রাজার খাজনা দিমু? ঘরে পরিবার আছে। তিনডা বাচ্চা আছে। আমার পেড যদি তোমার মতন এক সের খাইতে চায়, তয় উপায়খান অইব কি? সারাদিন খাইট্যা সোয়া সের চাউল গামছায় বাইন্দা ঘরে ফিরি। সাধে কি আর আইজকাইলকার ছেঁড়ারা খাইতে পারে না। খাইতে পারে না, না, খাইতে পায় না, কও। মাইনষের পেড ছোড অইয়া যাউক খোদার কাছে আরজ করি। বেবাকের পেড়ে মাজায় লাইগ্যা এক অউক। এক ছড়াকের বেশী যেন খাইতে না অয়। এইডা অইলে আর আকাল অইব না দ্যাশে।

    অনেকক্ষণ ধরে থাকা গ্রাসটা এবার মুখে দেয় লেদু।

    তার কথা সবারই ভালো লাগে। শুধু দাদু প্রধানের কাছে ভালো লাগে না। সে এবার। হক দেয়–আরে, এই খানে ভাতের গামলা লও। ডাইল লও। কেমুন খাদেম, অ্যাঁ! খানেওয়ালা চিন না?

    থালার ওপর ঝুঁকে পড়া নিব্জদেহ বৃদ্ধ নাজিমুদ্দিন মাথা উঠিয়ে বলে—লেদুরে আমরা। পাগল কই আর ছাগল কই, ওর কথা কাডায় কাডায় সত্য। মাইনষের পেডটা না থাকলে আমি খুশী অইতাম। পেডের জ্বালাই বড় জ্বালা মাইনষের। নানা জনের নানা কথার মধ্য দিয়ে খাওয়া শেষ হয়। সোলেমান খাঁ মজলিশের মধ্যে একটা জায়গায় নিজের কাঁধের গামছাটা বিছিয়ে দেয়। তার চারপাশে কন্যাপক্ষের কেরামত ও জহিরুদ্দিন এবং বরপক্ষের প্রায় সমস্ত লোক কাঁধে কাঁধে মেশামেশি হয়ে বসে। প্রথম সারির পেছনে অল্প বয়সী ছেলেরা হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে তাকায় উৎসুক হয়ে।

    সোলেমান খাঁ একটা টিনের পুরাতন সুটকেস খুলে গয়নাগুলো গামছার ওপর আলাদা করে জোড়ায় জোড়ায় সাজিয়ে রাখে। গয়নার মধ্যে বয়লা, গোলখাড়, নাকফুল, নোলক। এগুলো হাত দিয়ে নেড়ে প্রথমেই আপত্তি করে কেরামত—আপনের গয়নার জোখা নেন নাই? এত বড় গয়না কে পরব?

    —বড় অওয়ন ভালা। বউ আমাগ অহন ডেগা অইলে কি অইব? এক বচ্ছর পর যহন। সিয়ানা অইব তহন ঠিক কাপাকাপা অইব। ভাঙা-গড়া করলে রূপা আর রূপা থাকে না। ফুক্কা আইয়া যায়।

    আসলে গয়নাগুলো ছিল ওসমানের প্রথমা স্ত্রীর। সে মারা যাওয়ার পর চোখা রূপার এই গয়নাগুলোকে মেজে ধুয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।

    জহিরুদ্দিন গয়না হাতে নিয়ে ভালো করে পরখ করে। নাকের নোলক ও নাকফুল ছাড়া আর কোনটাই তার কাছে রূপার বলে মনে হয় না। সে কেমিক্যালের কানফুল জোড়া এক দিকে সরিয়ে হাত দিয়ে আর গুলো চোখের কাছে নিয়ে দেখে। কিন্তু বরপক্ষের এত লোকের সামনে কথা বলতে তার সাহস হয় না। সত্যিই যদি রাপার জিনিস হয়ে থাকে তবে মজলিশের এত লোকের সামনে লজ্জায় কান কাটা যাবে। কেউ হয়ত বলেও বসতে পারে—বাপের বয়সে রূপা দ্যাহ নাই কোন দিন?

    ওসমানের প্রথমা স্ত্রীর পাটের শাড়ী, একখানা লাল পেড়ে শাড়ী ও গয়নাগুলো ঘরে নিয়ে যায় কেরামত। হাতের বয়লা ও পায়ের গোলখাড় সুতো দিয়ে বেঁধে পরিয়ে দেওয়া হয় মায়মুনকে। পাটের দশ হাত শাড়ীটা এমন পেঁচিয়ে সামলান হয় যে, দূর থেকে মায়মুনকে দেখে বোঝা যায় না। মনে হয় একটা কাপড়ের পুটলি।

    মায়মুন আবদারের সাথে তার মা-কে বলে—মা, তুমি যাইবা না আমার লগে?

    —আমি যাইমু কি করতে মা?

    —আমি তোমারে ছাইড়্যা কেমনে থাকতাম?

    —ক্যাঁ? হাসু যাইব, শফি যাইব।

    মায়মুন নিশ্চিন্ত হয়।

    জয়গুণ আবার বলে—তোর চিন্তা নাই। দুই দিনের বেশী রাখতাম না তোরে পরের বাড়ী। পরশু লইয়া আইমু আবার। এই বার আঁইট্যা যা দেহি দুয়ার তক, দেহি কেমুন দাহা যায়।

    মায়মুন উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু এত বড় শাড়ীটা সামলান তার পক্ষে কষ্টকর। শাড়ীটা বারবার পায়ের নিচে পড়ে তার হাঁটায় বাধার সৃষ্টি করে।

    মায়মুনকে দেখে জয়গুনের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। এ চোখের পানি সুখের না দুঃখের বলা শক্ত।

    সাক্ষী ও উকিল যখন ঘরে আসে, তখন মায়মুন বসে বসে ঝিমুচ্ছে। জয়গুন মাথার কাপড়টা একটু টেনে মায়মুনকে হাত দিয়ে আকষর্ণ করে—একি মায়মুন! ওঠ দ্যাখ কারা আইছে!

    উকিল তখন বলতে শুরু করে—তোমারে সোলেমানের ব্যাটা ওসমানের লগে পঞ্চাশ টাকা দেন মোহরে নিকাহ দিলাম। তুমি রাজী আছ?

    জয়গুন মায়মুনকে বুকে চেপে ধরে। বলে—কও মায়মুন, হ রাজী আছি।

    একথা বোঝার বা বলার মধ্যে কোন নতুনত্ব নেই মায়মুনের কাছে। কথা কয়টা তার অনুভূতিকে একটুও নাড়া দেয় না। তোতা পাখীকে শিখিয়ে দিলে সে যেমন বলে, মায়মনও তেমনি মা-র কথা অনুসরণ করে।

    —রাজী আছি।

    সাক্ষী ও উকিল পরস্পরের দিকে একবার তাকিয়ে মুচকি হাসে। জয়গুন একগ্লাস শরবত মায়মুনের হাতে দিয়ে বলে—নে লক্ষী, এক চুমক খাইয়া গেলাসটা দিয়া দে।

    উকিল সরবতের গ্লাস নিয়ে সাক্ষীর সাথে বিয়ের মজলিশে চলে যায়।

    এক সঙ্গে অনেকগুলো বিয়ে হচ্ছে বলে একটা ভুলিও পাওয়া যায়নি। বিয়ের পর তাই সোলেমান বা তার ছেলে-বৌকে কোলে তুলে নিয়ে সকলের সাথে বাড়ীর দিকে পথ নেয়। মায়মুনের ছোট ও পাতলা শরীরের ওজনে সোলেমান খ বিস্মিত হয়। একটা তুলো ভরা বালিশের মত মনে হচ্ছে তার কাছে। সে মনে মনে চিন্তিত হয়। জোয়ান ছেলের জন্যে এতটুকু মেয়ে নেয়া ঠিক হল না বুঝি। আরো তিন তিনটি বছর পুষতে হবে ভাত-কাপড় দিয়ে, তবে ছেলের উপযুক্ত হবে বউ। কিন্তু এ তিন বছর–

    সোলেমান খাঁ জোর করে চিন্তাটাকে সরিয়ে দেয়। ভবিষ্যতের ভাবনা ভেবে সে আজকের বিয়ের আনন্দটা মাটি করে দিতে চায় না।

    ভোর রাত্রের দিকে বেশ শীত পড়ে। জয়গুন বাইরে চুলোর পাশে গিয়ে বসে। চুলোর মধ্যে বিয়ের রান্নার আগুন তখনও নিবে যায়নি। জয়গুন ঠাণ্ডা হাত দুটো চুলোর ওপর মেলে ধরে। মাথাটাও ঝুঁকে পড়ে সামনের দিকে। তার চোখ-ঝরা পানি চুলোর আগুনে পুড়ে অস্পষ্ট ছ্যাং-ছ্যাৎ শব্দ করে আর সাথে সাথে বাষ্প হয়ে মিশে যায় বাতাসে।

  • পনের পরিচ্ছেদ

    পনের পরিচ্ছেদ

    পনের পরিচ্ছেদ

    আজকাল করিম বক্‌শ কাসুকে কড়া নজরে পাহারা দেয়। যত দিন মাঠ-ভরা পানি ছিল ততদিন কালাপানির বন্দীর মত ছিল কাসু। কিন্তু মাঠে পথ পড়ার সাথে সাথে করিম বক্‌শ চিন্তিত হয়। তার মনে আশকা জাগে—কাসু হয়তো একদিন ফুড়ুত করে ওর মা-র কাছে চলে যাবে। সেদিন আর একটু আগে দুধ বেচতে বেরিয়ে গেলে সর্বনাশ হয়েছিল আর কি!

    করিম বক্‌শ আঞ্জুমনকে সতর্ক করে দেয়—কানা বুড়ী আমার বাড়ীতে পাও বাড়াইলে ঠাগা মাইর খোড়া কইরা দিবা। আমার তিরিসীমানায় দ্যাখতে পাইলে, ওর আর এট্টা চোখ কানা কইর‍্যা ছাইড়া দিমু। আমার তুমড়ীবাজি অহনও দ্যাহে নাই বুড়ী!

    আঞ্জুমন করিম বকশের হৃদয় জয় করার মতলব নিয়ে বলে—বুড়ীরে দ্যাখলে ভাল। মানুষ বুইল্যা মনে হয়। কতাও কয় যেন মিছরির শরবত। দিলের মধ্যে এত কালি কে জানে!

    কানা বুড়ীর দোষকীর্তন করায় আমনের ওপর করিম বক্‌শ মনে মনে খুশী হয়। কিন্তু সে তাকে বিশ্বাস করে না। সন্দেহ হয়—কাসুর মাথাটা হয়ত ইতিমধ্যেই আঞ্জুম বিগড়ে দিয়েছে। ঘরে-বাইরে এ রকম ষড়যন্ত্র অসহ্য। কোন রকমে মনের গোস্বা মনে চাপা দিয়ে সে কাসুকে পাহারা দেয়। বাইরে গেলেও সে কাসুকে সাথে করে নিয়ে যায়। যেদিন সাথে নেয়া সম্ভব হয় না, সেদিন গরুর দড়ি দিয়ে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে কাসুকে।

    কয়েকদিন ধরে ধান কাটার ধুম পড়েছে। করিম বকা তার নারকেলের কোটা কাসুর হতে দেয়, আর আগুনের মালসাটা নিজের হাতের তালুতে বসিয়ে অপর হাতে দুটো কাস্তে নিয়ে মাঠে রওয়ানা হয়।

    কাসুর হাতে একটা কাস্তে দিয়ে বলে—আমার লগে থাইক্যা ধান কাটতে হিগ। বড় অইলে এই কইর‍্যা খাইতে অইব।

    কাসু তার ডান হাতের ছোট্ট মুঠোর মধ্যে কাস্তের মোটা হাতল ভালো করে সামাল দিতে পারে না। কোন রকমে হাতলটা চেপে ধরে সে দু’একটা করে ধানের ছড়া কাটতে আরম্ভ করে।

    মাঠে আরো অনেক জমিতে ধান কাটা শুরু হয়েছে। দুরের একটা জমি থেকে কৃষাণদের সমবেত গান ভেসে আসে–

    কচ-কচ কচ কচ-কচা-কচ

    ধানরে কাটি,

    মুঠা মুঠা ধান লইয়া বান্দি আঁটি-রে।

    (ও ভাই) ঝিঙ্গাশাইলের হুড়ুম ভালা

    বাঁশফুলেরই ভাত,

    লাহি ধানের খইরে ভালা,

    দইয়ে তেলেসমাত—রে।

    কস্তুরগন্ধী চাউলরে আলা,

    সেই চাউলেরি পিঠা ভালা,

    সেই না পিঠায় সাজিয়ে থালা

    দাও কুটুমের হাত—রে।

    আল্লাদি বউ কোটে চিড়া

    মাজায় রাইখ্যা হাত,

    সেই না চিড়ায় কামড় দিয়া

    বুইড়ার ভাঙে দাঁত—রে।

    মিয়া বাড়ী ঘটক আসে

    কন্যা-বিয়ার কথার আশে,

    বোরো ধানের ভাত খাওয়ানে

    মিয়ার গোল জাত—রে।

    পাশের একটা জমিতে আলোচনা হচ্ছে। একজন বলে—আমরা হেদিন বৈঢকে ঠিক করলাম, সাতভাগা অইলে কেও ধান কাটতাম না। কিন্তুক দ্যাখ, ছমিরদ্দির দল সাতভাগায় গদু পরধানের ধান কাটতে শুরু করছে।

    আর একজন বলে—আবার গানও লাগাইছে ফূর্তির ঠেলায়।

    —হেইয়া করব না! বেয়াক্কেলরা এড়কও বোঝে না, এই বারের যেই প্রান, তা সাত ভাগের এক ভাগ নিয়া কি ওগ বাপ-মার ফত্তা করব?

    —এই বচ্ছর যে ধানের অবস্থা, এই রহম অইব কে কইছিল? জুইতের ধান অইলে না অয় সাত ভাগায় কিছু অইত। কিন্তু একটা ধানের ছড়ার মধ্যে চাইর আনাই মিছা।

    বর্ষার সময় ধানগাছের রকম দেখে অনেকেই অনেক আশা করেছিল। কিন্তু সবুজ ধান যখন সোনালী রঙ ধরতে শুরু করে, তখন চাষীরা ধানের ছড়া দেখে মাথায় হাত দেয়। এক একটা ছড়ার মধ্যে চার আনা ধানই অপুষ্ট—চালশূন্য চিটে। এখানে সেখানে ধানগাছ মরে যাওয়ায় জমিগুলো টাক পড়া মাথার মত হয়ে আছে।

    করিম বক্‌শ কয়েক ‘ঘোপ কেটে আলের ওপর এসে পা ছড়িয়ে বসে। পাশের জমি থেকে ধানকাটা রেখে লেদু মিয়া আলের দিকে আসতে আসতে বলে—ভালা কইর‍্যা তামুক সাজ, চাচা। একটা দম দিয়া যাই।

    করিম বক্‌শ বাশের ডিবা হতে তামাক নিয়ে সাজতে থাকে। অদূরে বসে কাসু ধানগাছের ডগা দিয়ে বাশী তৈরী করার চেষ্টা করছে। সুর্য-দীঘল বাড়ীর তালগাছটা বেশী দুরে নয় এখান থেকে। গাছটা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে।

    লেদু বলে—কাসুরে এই মাথা-ফাড়া রউদের মইদ্যে লইয়া আইছ কাঁ, চাচা? ওরে বাড়ীতে রাইখ্যা আইলেই পার।

    —এহন এন্টু আধটু রউদ মাথায় না নিলে অইব ক্যাঁ? নোয়াব সাইজ্যা বইয়া থাকলে ত কাম অইত না। আর এই শীতের মিডাম রউদে তেজ নাই।

    —তেজ নাই। তয় বড় হুকনা রউদ। দ্যাই না, চউখ-মোখ টানতে শুরু করছে। কাসুর হাত থেকে ধানগাছের নলটা নিয়ে লেদু বলে—দে, বানাইয়া দেই। বাশী তৈরী করতে করতে লেদু বলে—মাইয়ার বিয়াতে গেলা না যে চাচা? তোমার পরাণ কি দিয়া বানাইছে খোদায়? পাথর না পোড়া মাড়ি দিয়া কও দেহি? মায়া-দয়া কি এক্কেরেই নাই তোমার পরাণে? কাসুর মা–

    করিম বশের ভ্রূকুটি ক্ষণেকের জন্য লেদুর মুখ বন্ধ করে রাখে। সে কাসুর দিকে বাঁশীটা ছুঁড়ে দিয়ে আবার শুরু করে—তুমি অমুন কর ক্যাঁ, চাচা? কাসু বড় অইয়্যা ওর মা-রে বিচরাইয়া–

    করিম বক্‌শ সাজানো কল্কেটা হুঁকোর মাথায় না বসিয়ে ছুড়ে মারে লেদুর দিকে, চচিয়ে ওঠে—চুপ কর শয়তানের বাচ্চা! মশকারির জাগা পাস না? মানুষ চিনস না তুই?

    লেদু ঘাড় নিচু করে আত্মরক্ষা করে। তার মাথার ওপর দিয়ে শো করে কল্কেটা ধানগাছের ঝোপের মধ্যে গিয়ে পড়ে।

    আশেপাশের জমি থেকে কুষাণরা ছুটে আসে—কি অইল? কি অইল?

    লেদুই বলে–কিছুই না। যাও তোমরা।

    লেদু কল্কেটা তুলে গামছা দিয়ে মুছতে মুছতে বলে—রাগ করলা নি, চাচা? আর কোনোদিন কিছু কইমু না। এই কান ডলা খাইলাম দশবার।

    করিম বক্‌শ তখনও রাগে গর গর করছে।

    লেদু নিজেই এবার তামাক সেজে হুঁকোটা করিম বকশের হাতে দেয়। তারপর বলে—তোমার জমিনে এইবার ধানে বরাদ্দ নাই। আমাগ লগে ধান কাটতে যাইবা? খুরশীদ মোল্লার বটতলার ক্ষেতে ধান মন্দ অয় নাই। দিবও ছয় ভাগা।

    করিম বকশের রাগ থামে। তার বদমেজাজের জন্য কেউ তাকে দলে নিতে চায় না। লেদুর এ প্রস্তাবে সে খুশী হয়। বলে—কবে যাইবা তোমরা?

    —এই জমিনের ধান কাডা অইলে। তুমিও তোমার জমিনের ধান কাইট্যা কাবার কর।

    –কাবার আমার কাইল অইব। পাতলা পাতলা ধান কাটতে দেরী লাগে না। এইবার তিন মাসের খোরাকীও অইব না। গেল বছর ছয় মাসের ধান পাইছিলাম। এহন তোমরা যদি দলে নেও, তয়ই না বাঁচতে পারমু।

    —তোমারে দলে নিতে ত আপত্তি নাই! আপত্তি কিয়ের লেইগ্যা জানো? তোমার মেজাজের লেইগ্যা দলের কেউ রাজী হয় না। যাউকগ্যা, আমি বেবাকেরে বুঝাইয়া ঠিক কইর‍্যা নিমু। তুমি তোমার মেজাজ খান ঠাণ্ডা কর। আর একটু অইলে আইজ আমার। মাথাডা ফাড়াইয়া দিছিলা আর কি!

    করিম বকশের নিজের জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। খুরশীদ মোল্লার বটতলার খেতে ধান কাটতে যাবে সে। কিন্তু কাসুকে আর পেছনে টানতে ভাল লাগে না। বটতলার খেত অনেক দূরে। রোদের মধ্যে এত দূরে নিয়ে ছেলেটাকে বসিয়ে কষ্ট দেয়া তার ইচ্ছে নয়। এ কয় দিনে ছেলেটা শুকিয়ে গেছে। তার চোখ-মুখের দিকে তাকালে মায়া হয়। আর যে ভয়ে সে কাসুকে সাথে সাথে নিয়ে বেড়ায়, সে ভয় সব জায়গায়ই দেখা দিয়েছে। কাসূকে ওর ফুফুর বাড়ী থেকে নিয়ে আসার পর যতগুলো ঘটনা ঘটেছে তাতে কাসু হয়তো অনেক কিছুই বুঝতে পেরেছে। তবুও সে সাধ্যমত চেষ্টা করে। বাজার থেকে বিস্কুট, জিলিপি, কদমা, এনে কাসুকে খেতে দেয়। নিত্য-নতুন খেলনা দিয়ে তাকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করে। কোনো লোককে ওর কাছে ঘেঁষতে দেয় না, পাছে কেউ ওর মা-র কথা বলে দেয়।

    কাল পান্তা ভাত খেয়েই করিম বক্‌শ ধান কাটতে যাবে। কিন্তু কাসকে বাড়ীতে রেখে যেতে তার মন সরে না। আবার তাকে সাথে নিয়ে গিয়েও কোন লাভ নেই। সেখানে উস্কানি দেয়ার লোক আছে যথেষ্ট। জয়গুনের বাড়ীর কাছের কেরামত আছে লেদুর দলে। কে কখন কোন তাল দিয়ে বসে বলা যায় না। সে ভাবে–তাল দিতে পারে সব্বাই,মিডাই দিতে পারে না কেউ।

    মহাসমস্যা করিম বকশের সামনে। চিন্তা করে সে কোন সমাধান খুঁজে পায় না। আমন তামাক দিয়ে যায়। তামাক টানতে টানতে সে চিন্তা করে। তার চিন্তা তামাকের ধোয়ার সাথে কুণ্ডলি পাকাতে আরম্ভ করে।

    এক সময়ে হুঁকোয় টান দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায় করিম বক্‌শ। তারপরই তার চোখে-মুখে হাসি ফুটে ওঠে।

    হুঁকোটা বেড়ার সাথে ঠেকিয়ে রেখে সে এক লাফে বেরিয়ে পড়ে। পাশের বাড়ীর হারুনকে ডেকে চুপি চুপি যুক্তি করে দু’জনে।

    হারুন বলে—সাদা চুল পাইমু কই?

    —আমি যোগাড় কইরা দিমু। তুই এট্টা সাদা কাপড় যোগাড় করিস। আর খবরদার, কেও যেন না জানে। তুই আর আমি, বুঝালি কথা? তিন কান অইলেই সর্বনাশ।

    একটু থেমে আবার বলে—আমার কাম যদি ফতে অয়, তয় তোরে একখান গামছা কিন্যা দিমু!

    করিম বক্‌শ সন্ধ্যার সময় কাসুর কোমরের দড়ির বন্ধন খুলে দেয়। কড়া পাক-দেওয়া গরুর দড়িটার দাগ বসে গেছে কোমরে। করিম বক্‌শ আদর করে ডাকে—কাসু অ-কাশেম! চল্ বাজান, তোরে টিয়াপক্ষীর বাচ্চা ধইরা দিমু। ওই তেঁতুল গাছে টিয়ার বাসা আছে।

    কাসু উৎফুল্ল হয়ে ওঠে।

    —চল আমার লগে।

    করিম বক্‌শ কাসুর হাত ধরে তেঁতুল গাছের দিকে নিয়ে যায়। পথে যেতে যেতে করিম বক্‌শ বলে—আমারে বাজান কইয়া ডাক দে।

    দীর্ঘ চার বছর কাসু ফুফুর বাড়ীতে কাটিয়েছে। কেউ তাকে ঐ নামে ডাকতে শেখায়নি! অনভ্যস্ত বলে এখন বাজান ডাকতে কাসুর লজ্জা হয়। বাপের কাছে এসে সে আদর-স্নেহ যা পেয়েছে, তার চেয়ে মারধর খেয়েছে ঢের বেশী। করিম বক্‌শ ছেলের কাছে পিতার উপযোগী কোন ভক্তি-শ্রদ্ধাই অর্জন করতে পারেনি। সে যা অর্জন করেছে তা ভয়। কিছুটা ভয় আর বেশীর ভাগই লজ্জায় কাসু বাজান বলে ডাকতে পারে না। এ জন্য কতদিন মারও খেয়েছে। মার খেয়ে অনিচ্ছায় উচ্চারণ করেছে কয়েক বার। কিন্তু মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফুর্ত হয়ে শব্দটি কোনদিন বের হয়নি।

    করিম বক্‌শ আবার বলে…কিরে, ক। না কইলে টিয়াপক্ষীর বাচ্চা দিম না।

    এত লোভ দেখানো সত্ত্বেও কাসু মুখ বুজে থাকে। কোন কথাই বের হয় না মুখ দিয়ে। করিম বক্‌শ আর পীড়াপীড়ি করে না।।

    তেঁতুল গাছের কাছাকাছি যেতেই কি রকম এক গোঙানির শব্দ শুনে কাসু থমকে দাঁড়ায়।

    করিম বক্‌শ বলে—কিরে, কি অইল?

    —অইডা কি দোহা যায়? তেতুল গাছের টিকিতে বইয়া রইছে! করিম বক্‌শ কৃত্রিম বিস্ময় প্রকাশ করে বলে—সত্যই ত! পাকনা চুল ছাইড়া বইয়া রইছে! আবার গোঙায়!

    করিম বক্‌শ চোখ দুটো বড় করে বলে-খাড়া, দেইখ্যা লই।

    কাসু এবার করিম বকশের হাত ধরে তার গায়ের সাথে মিশে দাঁড়ায়। করিম বক্‌শ কাসুকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে।

    —কাসু, শিগগির আমার কোলে ওঠ। বাপরে বাপ! এইডা ত আর কিছু না! এইডা যে। গোঙাবুড়ি! গলা টিপ্যা ধরব! আল্লা! আল্লা, বাঁচাও! আল্লা, আল্লা! কাসু, আল্লার নাম কর। আল্লা, আল্লা।

    কাসু করিম বকশের বুকের মধ্যে মুখ লুকায়। ভয়ে চোখ বন্ধ করে। কাঁপে থরথর করে। করিম বক্‌শ কাসুকে কোলে নিয়ে দৌড় দেয়। বাড়ী এসেও কাসু চোখ খোলে না।

    রাত্রে শুয়ে শুয়ে করিম বক্‌শ বলে—কাসু, আমারে বাজান কইয়া ডাক দে। বা’জান না ডাকলে গোঙাবুড়ী বোলাইমু।

    অন্ধকারের মধ্যে শিউরে ওঠে কাসু। করিম বক্‌শকে জড়িয়ে ধরে দুই হাতে। তার চোখের সামনে তখনও যেন সে দেখছে গোঙাবুড়ীর বিকট মূর্তি।

    করিম বক্‌শ কাসুকে দূরে সরিয়ে দেয়ার ভান করে বলে—সইর‍্যা যা আমার কাছতন। আমারে বাজান না কইলে এহনি গোঙাবুড়ী ডাক দিমু।

    কাসুর ভীত-কম্পিত কণ্ঠ অস্ফুট শব্দ করে–বাজান।

    করিম বক্‌শ সাড়া দেয়। তারপর বলে—কাসু, বাড়ীর বাইরে যাইস না কিন্তুক, খবরদার! ঐ গোঙাবুড়ী গলা টিপা ধরব! তেঁতুল গাছে আরো একটা পিচাশ আছে! হেইডার নাম ছালাবুড়ী। ছালার মইদ্যে ভইরা তোর মতন ডেগা পোলা পাইলে লইয়া যায়। তারপর তেঁতুল গাছে বইস্যা রক্ত খায়।

    কাসু করিম বকশের বুকের মধ্যে শিউরে ওঠে। তার কাঁপুনি করিম বক্‌শও অনুভব করতে পারে।

    সে আবার বলে—খরদার! কানাবুড়ীর সুরত ধইর‍্যা ছালাবুড়ী ধইরা লইয়া যাইব।

    করিম বক্‌শ তার অদ্ভুত ফন্দির সফলতায় মনে মনে খুশী হয়। কাসুকে বাড়ীতে রেখে এখন নিশ্চিন্তে কাজ করা যাবে। কাসু ভুলেও জয়গুনের বাড়ীর দিকে পা বাড়াবে না। কারণ পথের ওপরেই তেঁতুল গাছ। আবার ছালাবুড়ীর চেহারা নিয়ে কানা বুড়ীও এসে আর সুবিধে করতে পারবে না।

    করিম বকশের মতলব হাসিল হয়েছে। কাসু এখন আর বাড়ী থেকে বের হয় না। আগে বাড়ীর উত্তর পাশটায় গিয়ে দাঁড়াত সে। সূর্য-দীঘল বাড়ীর তালগাছটার দিকে চেয়ে চেয়ে সে

    অনেক সময় কাটিয়ে দিত। রোজ ঐ তালগাছটা দেখে দেখে সে তার মা-র চিন্তাটাকে তাজা করে নিত মনের মধ্যে। মা-র অভাব তাতে অসহনীয় হয়ে উঠত। তেতুল গাছে গোঙাবুড়ী দেখার পর সে আর কোনো দিকে পা বাড়ায় না।

    সে কখনও ফুলির বিছানার পাশে, কখনও উঠানে, কখনও বা রান্না ঘরে তার সৎমার পাশে বসে কাটিয়ে দেয়। এমন কি গোয়াল ঘরের পাশে যেতেও এখন তার সাহস হয় না।

    মা-র মধুর চিন্তা তার মনে বার বার যে ছাপ রেখে গেছে, তা কখনও মুছবার নয়। সে স্থায়ী ছাপকে এখন ভুতের বীভৎস মূর্তি যেন রাহুর মত গ্রাস করছে। গোঙাবুড়ীর গোঙানি, ছালাবুড়ীর ছালা, তাদের নখর ও দাতের এলোমেলো কল্পনা কাসুকে সব সময়ে সন্ত্রস্ত করে রাখে। কোনো ঠুংঠাং শব্দ শুনলেই সে ভয়ে অস্থির হয়। রাত্রে ঘুমের ঘোরে সে চিৎকার করে ওঠে। করিম বক্‌শ সে চিৎকারে সজাগ পেয়ে কাসুকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে–কিরে কাসু, অমুন করস ক্যান?

    কাসু কোন উত্তর দেয় না। করিম বকশের বুকের মধ্যে গিয়েও সে কাঁপে থরথর করে।

    হঠাৎ একদিন কাসুর জ্বর হয়। প্রথম দিন-দুই করিম বক্‌শ মোটেই গা করে না। তিন দিনের দিন বেশ তোড়জোড়ের সাথে জ্বর ওঠে। বিছানায় পড়ে পড়ে কাসু প্রলাপ বকে।

    করিম বক্‌শ দাওয়ায় বসে মাটির ওপর আঁচড় কেটে বাকী খাজনার হিসেব করছিল। সে ঘরের মাঝে উঠে এসে বলে-কাসু, অ কাসু! কি অ্যাঁ? অমন করস ক্যাঁ?

    —ছালাবুড়ী আইল! উঃ-উঃ-উঃ! না—না, বাজান কইতাম না।

    করিম বক্‌শ কাসুর মাথায় কপালে হাত দিয়ে দেখে। হাত রাখা যায় না। মনে হয়, পুড়ে যাবে হাত।

    —মা, মা, মাগো মা।

    করিম বক্‌শ বলে—ম্যাও ম্যাও করস ক্যাঁ? আল্লা আল্লা কর। আল্লায় রহম করব।

    কাসুর হুঁশ নেই। সে কখনও বিড় বিড় করে, কখনও বা টানিয়ে টানিয়ে প্রলাপ বকতে থাকে।

    করিম বক্‌শ উদ্বিগ্ন হয়। সে তাড়াতাড়ি করে ফকির বাড়ী যায়। গ্রামের সেরা ফকির দিদার বক্‌শ এসে হাতের লাঠিটা বেড়ার সাথে ঠেকিয়ে রেখে কাসুর বিছানার পাশে বসে।

    কাসু প্রলাপ বকছে—ওইডা কি? তেঁতুল গাছ!

    কিছুক্ষণ বসে থেকে দিদার বক্‌শ চোখ বুজে ওপরের দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটে চাপ দিয়ে বিজ্ঞের মত কয়েকবার মাথা নাড়ে। তারপর গাম্ভীর্যের সাথে বলে—আর দ্যাখতে অইব না। মোখ দেইখ্যা আগেই আমি বোঝতে পারছি।

    করিম বক্‌শ উদ্বেগভরা কণ্ঠে বলে-কি, পাগল ভাই?

    দিদার বক্‌শকে সবাই পাগলা দিদার বলে।

    সে বলে—আবার কি! কথা হুইন্যাও মালুম করতে পার না? দ্যাহ না কেন বিলকি-ছিলকি কয়?

    —আমিও আগেই মালুম করছি কিছু। সব সময় খালি কয় গোঙাবুড়ী আইল। গলা টিপ্পা ধরল। আল্লা খোদার নাম নাই মোখে। আর কেবল ম্যাও ম্যাও করে। আমার দাদার মোখে হুনছি, ভূতে পাওয়া মানু আল্লার নাম ভুইল্যা যায়। এহন কি করা যায়, পাগল—ভাই?

    —কিছু চিন্তা নাই! হোন, একখান ন্যাকড়া লইয়া আহ। আর এক চামুচ কডুতেল।

    ফকিরের নির্দেশ মত করিম বক্‌শ ন্যাকড়া ও সর্ষের তেল নিয়ে আসে। ন্যাকড়া দিয়ে। দড়ি পাকিয়ে ফকির তার এক প্রান্ত ডুবিয়ে ধরে তেল-ভরা ঝিনুকের মধ্যে। তারপর বাতির শিখার ওপর দড়ির তেল-মাখন মাথাটা পোড়া দেয়। দড়ির প্রান্ত থেকে যখন ধোঁয়া বেরুতে শুরু করে, তখন ফকির কুণ্ডলায়িত ধোঁয়াসহ গরম প্রান্তটা কাসুর নাকের মধ্যে বারবার প্রবেশ করিয়ে দেয়। কাসু যন্ত্রণায় উঃ করে ওঠে প্রত্যেক বার। তার কোমরটা বিছানা ছেড়ে উঁচু হয়ে ওঠে। শক্তি নিঃশেষ করে হাঁচি দেয় কয়েক বার।

    মুখে হাসি টেনে ফকির বলে—আঁচি দিছে, আর চিন্তা নাই। এই অ্যাঁচির ঠেলায় আলাই-বালাই পলাইব। যদি একে না-ই পলায়, তয় মাগরিবের ওক্তে একবার খবর দিও। আইজ রাতেই বৈডক দিমু। হেইখানে বোলাইয়া ওর চৌদ্দ-গোষ্ঠির ছেরাদ্দ করুম। ভালয় ভালয় যদি না যায় তো ওস্তাদ শেখ ফরিদের নাম লইয়া এমুন মন্তর ঝাড়, যার তেজে সুড় সুড় কইর‍্যা আমার বোতলের মইদ্যে ঢুকব। আমি তহন চট কইর‍্যা বোতলের মোখ বন্ধ কইরা দিমু। তারপর আমার শিথানের নিচে মাড়িতে গর্ত কইর‍্যা বোতলডা উপড় কইর‍্যা বহাইয়া মাড়ি দিয়া ঢাইক্যা দিমু। আমার শিথানের নিচে কি একটা দুইডা! এই রহম কত ভূত-পেত্নী, দানা-পিচাশ জিন-আত কবর দিয়া থুইছি, লেখাজোখা নাই। কিন্তুক জাহিলগুলার মউয়ত নাই। রাইতে যহন বালিশে মাথা রাখি, তহন কত কান্দা-কাড়ি! কয়—আর কোন দিন আদমজাতের ক্ষেতি করতাম না। একবার ছাইড়্যা। দ্যাও। তোমার গোলাম অইয়া থাক। তোমারে পাকিস্তান জয় কইরা দিমু, পাকিস্তানের রাজা বানাইমু। আমিও কই—আমি রাজা অইতে চাই না। তোরা রোজকিয়ামত পর্যন্ত বোতলের মইদ্যে থাকবি। গোলমাল করলে উফায় নাই।

    করিম বক্‌শ শোনে মনোযোগ দিয়ে। ফকিরের গল্প শুনে সে বিস্ময়ে হতবাক। একটা কুলোয় করে সে সোয়া সের চাল আর সোয়া পাঁচ আনা পয়সা এনে ফকিরের পায়ের কাছে রেখে দেয়।

    রাত বারোটার পর বৈঠক। মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালিয়ে লোকজন ও শাগরেদসহ দিদার বক্‌শ ফকির ‘ভারানে’ বসে!

    আগেই সে জিজ্ঞেস করে—কার উপরে চালান দিমু, করিম বক্‌শ? তোমার উপরে?

    —আমার উপরে! না—না—না খবরদার ভাই, খবরদার! আমার ডর করে।

    —ভর করলে চলব ক্যাঁ? তোমার উপরে ত আর চিরজনম ভর অইয়া থাকব না। আমার কাম অইয়া গেলে আবার নামাইয়া দিমু।

    —না! আর কেওরে কইয়া দ্যাহেন।

    —কে আছে আর? রুস্তম, তুমি? সাদেক? হারুন? কিছু ভর নাই। এক্কেরে পান্তাভাত।

    সবাই মাথা নেড়ে অস্বীকার করে! শেষে ফকির তার এক শাগরেদকে ঠিক করে। তার ওপরেই ভর করবে ভূত।

    দিদার বক্‌শ মোমবাতি নিবিয়ে দিয়ে সবাইকে সাবধান করে দেয়— খবরদার, কেও চউখ উপর দিক কইর‍্য না! ভূতের চউখে চউখ পড়লে তোমাগ চউখ গইল্যা পানি অইয়া

    ফকির এবার বাবরি চুল নাচিয়ে গলার মধ্যে কেমন ফাস ফাস শব্দ করে ‘জিকির’ আরম্ভ করে।

    এক সময়ে ঘরের চালার ওপর ঢিল পড়তে শুরু করে।

    ফকির বলে—চাইশা মারস ক্যাঁ? পিড়পিড়াইয়া ঘরে আয়। ঘরে আইতে অইবই।

    কিছুক্ষণ পরে ঘরের চালাটা কড়কড় করে ওঠে। সাথে সাথে ফকিরের চেলাটিও দুলতে আরম্ভ করে আর গলার ভেতর অদ্ভুত ফ্যাঁস ফ্যাঁস শব্দ করে—হ্যাঁরে—হাঁই—হুম।

    সবাই বুঝতে পারে, ওর ওপরে ভূত ভর করেছে। দিদার বক্‌শ এবার টানা সুরে বলতে আরম্ভ করে–

    আমার নাম দিদার বক্‌শ শুইন্য মন দিয়া

    আমার নামে ভূত-পত্নী সবাইর কাঁপে হিয়া!

    শেখ ফরিদের নাম লইয়া যদি মন্তর ঝাড়ি,

    হাজার গণ্ডা ভূত-পেত্নী ভেন্টাইবার পারি।

    হ্যাঁরে—হাঁই-হুম-হাঁই-হুম-হাঁই।

    তোমার লেইগ্যা বইস্যা আছি, কও তোমার নাম।

    কিবা জাত, কিবা গোত, কোন খানেতে ধাম?

    হ্যাঁরে—হাঁই-হুম-হাঁই-হুম-হাঁই।

    শাগরেদের ওপর চালান-দেওয়া ভূত বলে—

    আমার নাম ল্যাজফটকা থাকি ডালে ডালে,

    কাচ্চা-বাচ্চা পাই যদি ভরি দুই গালে।

    সিয়ানা অইলে তার কান্ধে চইড়্যা বসি,

    লহু মাংস শুষে খাই সারা দেহ চষি।

    হাঁরে—হাঁই-হুম-হাঁই-হুম-হাঁই।

    রুস্তম অন্ধকারের মধ্যে বাম হাত চালিয়ে পাশের সাদেকের পিঠে চাপ দেয়। উদ্দেশ্য, সাদেকের মনে এ ব্যাপারে আরো বেশী বিস্ময় জাগিয়ে তোলা। সাদেক কাঁপছে থরথর করে। তার রক্তও বুঝি হিম হয়ে যায়।

    পাশের ঘরে কাসু থেকে থেকে প্রলাপ বকছে। ফকির আবার বলে—

    শোনরে ভাই ল্যাজফটকা, রাখ বাজে কথা,

    বাঁচতে চাইলে উড়াল দে যথা ইচ্ছা তথা।

    হাঁরে—হাঁই-হুম-হাঁই-হুম-হাঁই।

    এই বাড়ী ছাইড়া যদি না যাস চলে,

    লোয়া পুইড়্যা লাল কইর‍্যা ছেঁকা দিমু গালে।

    হাঁরে—হাঁই-হুম-হাঁই-হুম-হাঁই।

    ভূত বলে—

    তোর মতন ফকিরের রাখি কিরে ডর?

    কত ফকির ভাইগ্যা গেল খাইয়া থাপ্পর।

    হাঁরে—হাঁই-হুম-হাঁই-হুম-হাঁই।

    বিছানার ওপর দুই হাতের থাপ্পড় মেরে ফকির বিকট চিৎকার করে–

    তয়রে হারামজাদা বইস্যা থাক সোজা,

    পাগলা দিদার মন্তর ঝাড়ব বুঝবি এহন মজা।

    কই গেলিরে ল্যাৰা ভূত, কই গেলিরে ট্যাবা,

    কই গেলি কাইল্যা ঠ্যাড়া, কই গেলিরে খ্যাবা,

    সমদ্দুরের ফেনা আইন্যা–

    ভূত এবার ভয়ে আর্তনাদ করে ওঠে। দুই হাতে ফকিরের পা জড়িয়ে ধরে বলে—না, না, না। আমি এহনি চইল্যা যাই। সব্বনাশ কইর‍্য না আমার। বাপ্পুস রে!

    —হ, অহনি চইল্যা যা। দেরেং করলে বোতলের মইদ্যে আটকাইয়া ফ্যালাইমু, কইয়া। দিলাম হেই কতা।

    —তুমি আমার মনিব। আমি তোমার নফর। যাওনের আগে একটা ভোগ দ্যাও।

    –কিয়ের ভোগ?

    —আড়াই গণ্ডা শবরীকেলা, মিহিন চাউলের ভাত

    সেরেক পাঁচেক মাইপ্যা দিও কাইট্যা কেলার পাত।

    ঝাল-ছাড়া নুন-ছাড়া পোড়া গজার মাছ,

    রাইখ্যা দিও এইগুলা যেথায় তেঁতুল গাছ।

    ফকির বলে—আইচ্ছা, আইচ্ছা, দিমু। তুই অহন পলা।

    অন্ধকারের মধ্যে ঘরের চালাটা আবার কড়কড় করে ওঠে।

    বাতি জ্বালাতেই দেখা যায়, ফকিরের শাগরেদ বিছানার ওপর বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে। ফকির ও তার অন্যান্য শাগরেদ ছাড়া আর সবার মুখ ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে ওঠে।

    ফকির এবার পানিতে হাত ভিজিয়ে শাগরেদের গায়ের ওপর ছিঁটিয়ে দেয়। শাগরেদ লাফ দিয়ে ওঠে।

    ফকির আড়ামোড়া ভেঙে শাগরেদকে জিজ্ঞেস করে—কিরে, কই আছিলি এতক্ষুণ?

    —ঘুমাইয়া পড়ছিলাম।

    ফকির মাথা নাড়ে আর গোঁফের তলা দিয়ে হাসে।

    করিম বক্‌শ বলে—ঘুমাইছিলা! আর তোমার উপরে এত তফরখানা গেল!

    ফকির অভিভাবকের মত বলে—থাউক, থাউক, ওয়া নিয়া আর মাথা ঘামাইয়া কাম নাই। হোন করিম বক্‌শ, কামডা খুব সহজে অইয়া গেল। ওরে ওই হগল খাইতে দিলেই ও চইল্যা যাইব। কাইলই বাজার তন গজার মাছ, কেলা আর চিনিগুড়া চাউল আইন্যা আমার কাছে দিও। তেতুল গাছের গোড়ায় আমিই রাইখ্যা আসমু ঠিক রাইত দুপুরের সুময়। তোমাগ যেই ডর! তোমার উপরে এই কাম ছাইড্যা দিতে ভস্‌সা পাই না।

    একটু থেমে আবার সে বলে—ভুত ছাইড়া গেলে কাসুরে গোসল করাইয়া পাক-সাফ করতে অইব।

    —গোসল! এই জ্বরের মইদ্যে?

    –-হ, হ। জ্বর কুথায় দ্যাখছ তুমি? এইডাও জান না, ওরা আগুনের তৈয়ারী? আমাগ মতন মাডির তৈয়ারী না। ঘেড়ির উপরে চাইপ্যা থাকলে শরীল গরম না অইয়া যায়? পরশু বিহানে মোরগের বাকের আগে কাসুরে রাস্তার তেমাথায় নিয়া গোসল করাইতে অইব। তুমি সাত পুকুরের পানির যোগাড় রাইখ্য। সাত ঘাডের না কিন্তুক। এক পুকুরেরও সাতখান ঘাড থাকতে পারে। সাত পুকুরের পানি অওয়ন চাই।

  • ষোল পরিচ্ছেদ

    ষোল পরিচ্ছেদ

    ষোল পরিচ্ছেদ

    মায়মুন শ্বশুর বাড়ী থেকে চলে এসেছে। জয়গুন রাগে ফেটে পড়ে। কঠিন স্বরে জেরা করতে আরম্ভ করে—না কইয়া পলাইয়া আলি ক্যাঁ? এহন মাইনষে হুনলে ঝাটা মারব মোখে।

    —পলাইয়া আহি নাই মা। খেদাইয়া দিছে।

    —খেদাইয়া দিছে!

    —হ, দ্যাহ না আমার নাক-কান খালি। গয়নাগুলা খুইল্যা নিছে। পিন্দনের কাপড় রাইখ্যা এই ছিঁড়া কাপড় দিছে।

    কৈফিয়তে জয়গুনের রাগ নামে। ব্যাপারটার কিছু কিছু সে হাসুর কাছে শুনেছিল সেদিন। কিন্তু তার শাশুড়ীর এরূপ আচরণের কোন কারণ হাসু বলতে পারেনি। সেও ভেবে পায় না। জয়গুন আবার জেরা করে–কি দোষ করছিলি? ক’ শীগগীর।

    —কিচ্ছু দোষ করি নাই, মা। মায়মুনকে শ্বশুর বাড়ীর কেউ পছন্দ করেনি। সোলেমান খাঁও না। কিন্তু অপছন্দের কথা সে কখনও মুখ ফুটে বলতে পারেনি। কারণ সে নিজেই দেখেশুনে ছেলের জন্যে বউ পছন্দ করেছিল।

    মায়মুন যেদিন প্রথম শ্বশুর বাড়ী আসে, সেদিনই তার শ্বশুর-শাশুড়ীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।

    শাশুড়ী বলে—তুমি কি চউখের মাথা খাইয়া বউ দেখছিলা? এই রহম জালি বউ দেইখ্যা-হুইন্যা আনে কেও? এহন ভাত কাপড় দিয়া পালতে অইব।

    —জালি কোহানে দ্যাখছ তুমি? এক্কেরে ঝুনা নাইকল।

    —হ, ঝুনা না আরও কিছু। ও না পারব ওসমানের ঘর করতে, না পারব এক কলসী পানি আনতে। দুই ঠ্যাং লইয়া টেকির উপরে ওঠলেও কথা হোন না ঢেঁকি! দুই সের চাউলের ভাতের আঁড়ি উডাইতে গেলে ফেলাইয়া দিব। তহন ভাতও যাইব, আঁড়িও যাইব।

    সোলেমান খাঁ কথাগুলোর গুরুত্ব বুঝতে পারে। কিন্তু নিজের কৃতকর্মের জন্যে স্ত্রীর কাছে সে হার মানতে রাজী নয়। সে স্ত্রীকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বলে—তুমি কিছু চিন্তা কইর না। হবায় বিয়ার পানি পাইছে। দুই মাসের মইদ্যেই দ্যাখবা বউ আমাগ লায়েক অইছে।

    কিন্তু দিন পেরিয়ে যাচ্ছে। মায়মুন তার শ্বশুর-শাশুড়ীর চোখের সামনে তাদের ইচ্ছেমত বড়সড় হয়ে উঠল না। যেমন ছিল, তেমনটি রয়ে গেল। শাশুড়ীর রাগ ধরে—কেন সে ভোমরায় আল দেওয়া কদুর মত ঝিম ধরে থাকল, কেন হাতে-পায়ে বড় হয়ে উঠল না।

    সোলেমান খাঁর এজলাসে প্রায়ই এ ব্যাপারে শুনানি হতে থাকে। একদিন সোলেমান খাঁর স্ত্রী বলে—ভাত খাইতে ত কম খায় না। আমাগ দুনা ভাত খায়। যদি জিগাই আর নিবি বউ? তয় কোন দিন ‘না’ করব না। আঁসের মতন গলা–সমান খাইয়া টাববুস অইয়া তারপর উঠব। এত খাওয়া ত’ বড় অয়নের নাম নাই। আর অইবই বা কেমনে। সুর্য-দীগল বাড়ীর মাইয়া। পরাণ লইয়া বাঁইচ্যা আছে, এই কালের ভাইগ্য। তোমারে হেইসুম কত কইর‍্যা যে কইলাম, সূর্য-দীগল বাড়ীর মাইয়া আননের কাম নাই। হেইয়া হোনলা না। মাইয়ার উপরে পেত্নীর দিষ্টি না আছে ত কি কইলাম।

    সোলেমান খাঁ মনোযোগ দিয়ে শোনে। তারপর বলে মানুষ ত তিন আঙুল। এত ভাত রাখে কই?

    কে জানে কই রাখে? আমার মনে অয় গলার তন পাও পর্যন্ত বেবাকখানি ওর প্যাট। এমুন হাবাইত্যা ঘরের মাইয়া বেশী দিন ভাত-কাপোড় দিয়া রাখলে তোমারে আর বিচরাইয়া পাওয়া যাইব না—তালুক-মুলুক বেচতে অইব।

    সোলেমান খাঁ নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে চেপে ধরে। গালে হাত দিয়ে গভীর মনোযোগের সঙ্গে মাথা নেড়ে বলে—আমার মনে লয়, তোমার কথাই খাডি। পেত্নীর দিষ্টি আছে। পেত্নী ওর লগে খায় বুইল্যাই না এত ভাত লাগে।

    সোলেমান খাঁ-র স্ত্রী আবার বলে—হোন কই, এই রাকস রাহনের কাম নাই। হেদিন ওসমানের ঘরে দিছিলাম। শরমেরও কত। রাইতে হেই কি চিক্কইর! আর এট্ট অইলে চৌদ্দ বাড়ীর মানু একখানে কইরা লইত? ছিঃ ছিঃ! অ-ঘিন, অ-ঘিন। বোঝলাম, এইডা জুয়ান অইতে অইতে আমার ওসমান ঠণ্ডা অইয়া যাইব। আর এদ্দিন তক্ত বহাইয়া। খাওয়াইলে ফউত অইয়া যাইবা, কইয়া রাখলাম। কমসে কম তিন খান বচ্ছর ত লাগব লায়েক অইতে।

    -কি করতে চাও ত?

    –আমি কই, ওরে ওর মা-র কাছে পাইয়া দ্যাও। মা-রড খাইয়া বড় অউক। জেরে দাহা যাইব।

    সোলেমান খাঁ সব শুনে এবার রায় দেয়——ওরে ওর মার কাছেই পাড়াইয়া দ্যাও। আমি আবার ওসমানের শাদী দিমু।

    —গয়নাগুলা?

    —খুইল্যা রাখবা। ওসমানের বিয়া দিতে লাগব তো। আবার জোড়ায় জোড়ায় গয়না বানাইমু, ট্যাকা কই? টাকা কি গাছের গোড়া যে, ঝুল দিলেই পড়ে? খালি গয়না কী, কাপোড় দুইডাও রাইখ্যা দিবা। কয়মাস আগে কিনছি। অহনও দুই ধোপ পড়ে নাই। এই কাপোড় আর গয়না দিয়া হাজাইয়া নতুন বউ ঘরে আনমু।

    তারপর একদিন হাসু ও শফি আসে মায়মুনকে দেখতে। মায়মুনের শাশুড়ী, দুটি ননদ ও ছোট্ট একটি দেবর একটা চাঙারির চারপাশে চক্রাকারে বসে কাঁচা মটরশুটি ছাড়াচ্ছিল। মানুষ আসার শব্দ পেয়ে মায়মুনের শাশুড়ী একবার তাকায়। তারপর মাথায় আঁচল টেনে আবার মটরের দানা বাছতে শুরু করে।

    হাসু ও শফি পরস্পর মুখের দিকে তাকায়। এ রকম অবজ্ঞা ও অবহেলার কি কারণ থাকতে পারে, তারা ভেবে পায় না। হাসু জিজ্ঞেস করে–কেমুন আছেন মাঐ সা’ব? মায়মন কই?

    উত্তর দেয় মায়মুনের ছোট ননদ, গাঙ্গের ঘাডে পানি আনতে গেছে। তার মুখের কথা। শেষ না হতেই মায়মুন আসে। কাঁখের কলসীটা ছোট। তবুও তার ভারে মায়মুন সোজা হয়ে হাঁটতে পারে না। কোমর বেঁকিয়ে খোড়ার মত পা ফেলতে ফেলতে সে আসে। হাঁসু ও শফিকে দেখতে পেয়ে খুশীতে ভরে ওঠে। সে পানির কলসীটা রান্না ঘরে রেখে ছুটে আসে। হাসুর একটা হাত ধরে বলে—মিয়াভাই গো, কোনসুম আইলা?

    –এইত আইলাম।

    –আমি যাইতাম তোমার লগে।

    জরিনা বিবি অথাৎ মায়মুনের শাশুড়ী এবার ফোঁস করে ওঠে—হ, যাও ভাইর লগে অহনই চইলা যাও। হ হাশেম মিয়া, তোমায় আললাদি বইনগারে আইজই লইয়া যাও। আমরা আর রাখতে চাই না।

    –কি অইছে মাত্র? কোন দোষ করছে মায়মুন?

    —না বাপু, অমুন ঝিরকুইট্যা বউ দিয়া আমাগ চলব না। কই গেলি ওসমান? কি কইছিলাম?

    জরিনা বিবি ঘরে যায় ওসমানের কাছে। আস্তে আস্তে বলে—গয়না গুলা খুইল্যা রাখ। পিন্দনের কপোড়ডা রাইখ্যা এট্টা ছিঁড়া কাপোড় দিয়া দে! ওড়া পিন্দা কোন রহমে শরম বাঁচাইয়া আতে পায়ে যাউকগা ভাইর লগে।

    ওসমানের চোখে-মুখে অক্ষমতা ফুটে ওঠে। হাসু ও শফির উপস্থিতিতে এ কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে বলে—তুমি দ্যাও গিয়া। আমার শরম করে।

    —আহা, আমার নতুন বউ রে! অত যদি শরম, তয় ঘোমডা দিয়া ঘরে বইয়া থাক। তোরা মরদ অইছিলি কোন দুকখে? আমি মাইয়া মানুষ। পারি কিনা-পারি দ্যাখ চউখ মেইল্যা!

    জরিনা বিবি দুই গোত্তা দিয়ে দু’পা এগুতেই ওসমান বাধা দেয়—মা, মা, হোন। ওরা আইজ যাউকগা। পরশু তরশু আইয়া যেন লইয়া যায়।

    জরিনা বিবি দরজার ওপর দাঁড়িয়ে যায়। ওসমানের দিকে ফিরে বলে—আইচ্ছা, কইয়া দেই।

    তারপর ঘর থেকে নিচে নেমে হাসু ও শফির দিকে চেয়ে বলে—হোন বাপু। কাইল পরশু আইয়া তোমাগ বইনেরে লইয়া যাইও।

    হাসু বলে—বিষয় কি? কি অইছে মাঐ?

    —কিচ্ছুই অয় নাই মিয়া। যা কই মনে থাকে যেন।

    শফি হাসুর দিকে চেয়ে বলে—আইজই মায়মুনেরে লইয়া যাই।

    —না, আইজ থাউক। মা-র কাছে জিগাইয়া দেহি, যদি নিতে কয়, তয় লইয়া যাইমু। হাসুর কথা শুনতে পেয়ে জরিনা বিবি বলে—মা-র কাছে আর হোনতে অইব না বাপু। তোমার মা মানা করত না। কাইল আইয়া লইয়া যাইও।

    -আইচ্ছা।

    এই ‘আইচ্ছা’ বলে যে হাসু চলে গেল আর হাসুর দেখা নেই। জরিনা বিবি নিজেই মায়মুনের গায়ের গয়না খুলে একটা ছেঁড়া কাপড় পরিয়ে তাকে তৈরী করে রেখেছে। তিন দিনের দিনও যখন কেউ এসে নিয়ে গেল না, তখন তার পরের দিন ভোরবেলা জরিনা বিবি নিজেই মায়মুনের হাত ধরে বাড়ীর নিচের মটর খেতের পাশে এনে ছেড়ে দেয়।

    তাদের পেছনে মায়মুনের দুটি ননদও এসে দাঁড়ায়।

    দূরে সুর্য-দীঘল বাড়ীর তালগাছটা দেখিয়ে জরিনা বিবি বলে—ঐ তালগাছটা বরাবর চইল্যা যাও। খোদায় যদি তোমার কপালে এই বাড়ীর ভাত লেইখ্যা থাকে তো আবার আইও, অহন মা-র বুকের দুধ খাইয়া মোটা তাজা অও গিয়া।

    —আমি একলা যাইমু? মায়মুন জরিনা বিবির মুখের দিকে তাকায়।

    —একলা যাইবা না তো দোকলা পাইবা কই? যাও। তোমার রূপ বাইয়া বাইয়া পড়ে না সোনা। পথের মাইনষে ধইর‍্যা লইয়া যাইব না।

    মায়মুন যেন কারাগার থেকে খালাস পেয়ে এল। তার আনন্দই হয়। আর সে আনন্দ বেড়ে যায় প্রত্যেক পদক্ষেপে। পেছনে তাকাতেও তার ভয় হয়।

    কিন্তু বাড়ীতে পা দিয়ে মা-র কর্কশ জেরার মধ্যে পড়ে তার বুক দুরু দুরু করতে থাকে।

    জয়গুন আবার জিজ্ঞেস করে–কি দোষ করছিলি?

    —কিচ্ছু দোষ করি নাই মা।

    —দোষ-ঘাইট না করলে অম্বায়ই খোদাইয়া দিল? হাসুকে দিয়া অহনই আবার পাড়াইয়া দিমু।

    শফির মা আসে। কথার আগা-গোড়া না শুনেই শুরু করে—পুরুষের ঘরতন পলাইয়া আহে কেও? পুরুষের ঘরই মাইয়ালোকের হাপন ঘর। হেইখানে জিন্দিগী কাড়াইতে অইব। হউর-হাউরীর খেদমত করতে অইব। মরলেও হেই মাড়ি বুকের উপুর লইয়া থাকতে অইব। হেই মাড়ি ছাড়তে আছে? হেই মাড়ি কামড় দিয়া পইড়্যা থাকতে অয়।

    মায়মুনের মুখের দিকে চেয়ে দেখে জয়গুন। আসহায় চোখ দুটো টলটল করছে, করুণা ভিক্ষা করছে তার কাছে।

    এবার মায়মনের ওপরের সমস্ত রাগ জয়গুন শফির মা-র ওপর ঢালে। সে বলে—থাউক, থাউক। আর বকরবকর কইর‍্য না। তুমি বুড়া অইছ বাতাসে। তোমার কথায় মাডি খাইছি আমি। অমন বুইড়া জামাইর কাছে মাইয়া না দিয়া কুচি কুচি কইর‍্যা কাইট্যা গাঙ্গে ভাসাইয়া দেওয়ন ভাল আছিল। আমার বাড়ী থাকতে ও এমুন আছিল? প্যাট ভইরা ভাত খাইতে না পারলেও, এই রকম হকনা কাষ্ট আছিল না।

    শফির মা মায়মুনকে জিজ্ঞেস করে—তোর হাউরী প্যাট ভইর‍্যা তোরে খাইতে দেয় নাই, মায়মুন?

    —এই দুই মুঠ ভাত দিয়া কইত—নে, খাইয়া ওঠ বউ। দিনকাল ভালা না। প্যাট উনা থাকলে কোন ব্যারাম-আজার আইতে পারে না।

    —অ্যাঁহ-হ্যাঁ-হ্যাঁ। কাসুর মা বাড়ীতে আছ?

    গলা খাঁকারি দিয়ে সাদেক মিয়া সকলের সামনে এসে দাঁড়ায়।

    জয়গুন মাথায় কাপড়ের আঁচল টেনে দেয়। শফির মা জিজ্ঞেস করে—কি খবর সাদেক মিয়া?

    —খবর বেশী ভালা না। কাসুর খুব অসুখ। যহন-তহন অবস্থা।

    জয়গুন চমকে ওঠে। তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। দুনিয়াটা অন্ধকার ঠেকছে চোখে। ঘোমটার নিচে অস্ফুট প্রতিধ্বনি হয়-কাসুর অসুখ! যহন-তহন অবস্থা।

    —বেহাল অবস্থা। করিম ভাই আমারে পাড়াইয়া দিছে, তোমারে নিতে। দেরী অইলে–

    সাদেক মিয়ার মুখ দিয়ে কথার শেষটা বের হয় না।

    কাসুর শয্যা-পার্শ্বে দু’জন মৌলবী অনর্গল দোয়া-কালাম পড়ে চলেছেন। মাঝে মাঝে করিম বকশের কথার নিচে তাদের স্বর চাপা পড়ে যায়। তার আকুল আবেদন কান্নার মত বেরিয়ে আসে—আল্লা, তুমি আমার কাসুরে বাঁচাও। তুমি জান-মালের মালিক। ওর জানের বদলে দুইডা জান সদকা দিমু। তুমি ওরে বাঁচাও ওর জানের বদলে দুইডা খাসি সদকা দিমু। আল্লা, আল্লা, তুমি রহমান, তুমি রহিম। তুমি বাঁচানেওলা। তুমি–

    লম্বা ঘোমটা টেনে জয়গুন দরজার পাশে এসে দাঁড়ায়। তার পিছনে হাসু ও শফির মা-কে দেখে করিম বক্‌শ বুঝতে পারে, জয়গুন এসেছে। করিম বক্‌শ মৌলবী দু’জনকে ইশারায় সরে যেতে বলে নিজেও বেরিয়ে যায়।

    জয়গুন কাসুর বিছানার পাশে বসে ডাকে—কাসু, কাসু আমার সোনামণি।

    শফির মা, শফি, হাসু ও মায়মুন বিছানার দুই পাশে বসে। আঞ্জুমনও আসে। তাদের সকলের মাথা ঝুঁকে থাকে কাসুর মুখের ওপর।

    শফির মা বলে—চাইয়া দ্যাখ কাসু। তোর মা আইছে।

    কাসু কোন সাড়া দেয় না। চোখ দুটো আধবোজা। মাথাটা কখনও সোজা হয়, কখনও এ-পাশে ও-পাশে হেলে পড়ে। তার নিশ্চল হাত পা ছড়িয়ে আছে লম্বা হয়ে। অনিয়মিত নিশ্বাস-প্রশ্বাসে বুকের ওপরের কথাটা দুলে ওঠে। বুকের ওপর কান পেতে কফের ঘ্যাড় ঘ্যাড় শব্দ শোনা যায়।

    জয়গুন আবার ডাকে—কাসু, বাজান একবার চউখ মেইল্যা দ্যাখ।

    করিম বক্‌শ ডেকে বলে–কাসু, চাইয়া দ্যাখ তোর মা আইছে।

    কাসুর মাথাটা বাম কাত থেকে ডান কাত হয় শুধু। কোন সাড়া পাওয়া যায় না।

    আঞ্জুমন বলে—দুই দিন আগেও টাস টাস কতা কইছে। দুই দিন ধইরা জব বন্ধ। কত ফকির-কবিরাজ, কত কত পানি পড়া, তাবিজ-তুমার! কিছুতেই কিছু অইল না। যে যা কইছে কোন তিরুডি অয় নাই। অহন আল্লার আতে সপর্দ। অউয়ত-মউয়ত আল্লার আত। আল্লায় যদি মোখের দিকে চায়। – করিম বক্‌শ দোর গোড়া থেকে বলে—আল্লা যদি কাসুরে দুইন্যায় রাইখ্যা যায়, তয় আমি জমিনের উপরে খাড়াইয়া মানতি করলাম, কাসুর একটা জানের বদলে দুইডা খাসি জবাই কইর‍্যা তার গোশত গরীব মিসকিনরে বিলাইয়া দিমু। কাসুরে আজমীরশরীফ খাজা বাবার দরগায় লইয়া যাইমু।

    জয়গুনের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে অবিরল ধারায়। হৃদয়ভেদী কান্নার বেগ চেপে রাখতে গিয়ে তার স্বর ভেঙে যায়। ভাঙা গলায় সে আমিনকে বলে—দুইডা দিন আগেও যদি আমারে খবর দিত। ওর মোখের কথা হুইন্যা মনেরে বুঝ দিতে পারতাম। ওর ‘মা-মা’ ডাক হুইন্যা পরাণ শীতল করতাম।

    একটু থেমে আবার বলে—তোমরা ডাকতর দেহাইছিলা?

    —ডাকতর কি করব? কত ফকির হট খাইয়া গেল!

    অন্ধকারের মধ্যে জয়গান আলো খুঁজে বেড়ায়। নিরাশার মধ্যেও আশা চেপে ধরে বুকে। ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যেও সে হাল ছেড়ে দেয় না।

    হাসুকে সে নির্দেশ দেয়—হাসু, যা। জগদীশ ডাকতর না অয় আর কোনো ডাকতর জলদি কইর‍্যা লইয়া আয়। পথে দেরী করিস না। বলেই সে মনে মনে চিন্তা করে, ডাক্তার এলে টাকা দিতে হবে। কিন্তু কোথায় টাকা?

    জয়গুন এবার শফিকে বলে—তুই বাড়ীত যা। বড় আঁস দুইডা বাজারে লইয়া যা। বেইচ্যা টাকা লইয়া চালাক কইরা আবি। কিন্তু দুইডা আসে কত পাওয়া যাইব! বড় জোর দুই টাকা।

    মায়মুন বলে—আমার আঁস দুইডাও লইয়া যাইও, শফি ভাই। আমাগ কাসু বাঁচলে কত আঁস পাওয়া যাইব আবার।

    জয়গুন বলে—হ, চাইড্যা আঁসই লইয়া যায়।

    শফির মা শফিকে সাবধান করে দেয়—জলদি কইর‍্যা যা। তোর কিন্তুক আবার শামুকের চলতি। দেরী করলে উফায় রাখতাম না।

    নিয়মের দুনিয়ায় অনেক অনিয়ম আছে। ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’ তাই সব সময়ে পাওয়া যায় না।

    মাথার ঘাম পায়ে ফেলা সারাদিনের কর্মফল বড় সামান্য। পরোপকার প্রায়ই বিফলে যায়। সে কর্মে যদিও ফল ফলে, তা তিতো, বিষাক্ত।

    এটা অনিয়ম বৈকি।

    গ্রামের বুড়ো ডাক্তার রমেশ চক্রবর্তীর বেলায়ও এ অনিয়মটা নিয়মিত ভাবে বিদ্যমান। বিশ বছর রোগী দেখে, ওষুধ ঢেলে-গলে তিনি হাত পাকিয়েছেন। কিন্তু এই পর্যন্তই। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলেও অর্থ সঞ্চয় করেননি কিছুই। অসহায় রোগীর চিকিৎসার বোঝাই ঘাড়ে নিয়েছেন শুধু। টাকার সিন্দুক বোঝাই হল না কোনদিন।

    সাধারণভাবে গ্রামের লোকের আস্থা নেই অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার ওপর। তাদের ধারণা—অ্যালোপ্যাথিকের তেজালো ওষুধ পেটে গেলে রোগী যা–ও দুঘণ্টা বাঁচত, তাও শেষ হয়ে যায় দুঘণ্টা আগেই। গ্রামে তাই ফকির-কবরেজদের পসার বেশী। ওষুধ মেশানো পানির চেয়ে বেশী কদর মন্ত্রপূত পানির। সোয়া সের চাল আর সোয়া পাঁচ আনা পয়সা দিয়ে যেখানে ফকির বিদায় করা যায়, সেখানে টাকা খরচ করে ডাক্তার বড় কেউ ডাকে না।

    ধরাবাধা কয়েক ঘর লোক আছে রমেশ ডাক্তারের। ঘুরে ফিরে তারাই আসে। দু’টাকা দেয়, মাসখানেক ধরে চিকিৎসা করিয়ে নেয়। ওষুধ খেয়ে খেয়ে টাকার দাম তোলে। চিকিৎসায় টাকা খরচ করবার মত বড়লোক যারা, তারা এখানে আসে না। তারা যায় বড় ডাক্তার জগদীশবাবুর কাছে। দিনমজুরের কাছ থেকে দিন-মজুরী নিয়ে রমেশ ডাক্তারের দিন চলে টেনেটুনে।

    রমেশ ডাক্তারের বাইরের ঘরটা একাধারে ডাক্তারখানা ও বৈঠকখানা দুই-ই। ঘরের এক পাশে দুটো আলমারী। তার মধ্যে নানা আকারের শিশি-বোতল সাজানো। ওগুলোর অধিকাংশই খালি। সুদিনে যখন ওষুধ পাওয়া যেত অপর্যাপ্ত, তখনও ওগুলো পুরোপুরি ভরা ছিল না।

    আলমারীর একটা তাকে ভারী ভারী কয়েকখানা ডাক্তারী বই। ঘরের মাঝখানে একটা টেবিল। তার এক পাশে ডাক্তারের বসবার জন্যে একখানা কাঠের চেয়ার, অন্য তিন পাশে টিনের চেয়ার তিনখানা। এক পাশে একটা লম্বা টুল। দেয়ালে পিঠ ঠেস দিয়ে আরাম করে বসবার জন্যে টুলটাকে দেয়ালের কাছ ঘেঁষে রাখা হয়েছে। অপর পাশে দেয়ালের সাথে ঠেকানো একটা কাঠের চেয়ার। তার পেছনের একটা পায়া ভাঙা। আসন গ্রহণে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের হুশিয়ার করার জন্যে পায়া-ভাঙা চেয়ারটায় কে একজন একটা কাগজ এঁটে দিয়েছে। তাতে লেখা—খোঁড়া।

    এত হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও নিরক্ষর গদু প্রধান একদিন চেয়ারটা নিয়ে পড়ে গিয়েছিল।

    ডাক্তারের চোখের সামনে একটা দেয়াল ঘড়ি। বহু দিন ধরে অমেরামত পড়ে আছে। কোন রসিক লোক ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে ঘড়িটার কাচের উপর একটা কাগজ এঁটে দিয়েছে। কাগজটিতে লেখা ‘কলেরা রোগী।‘

    লেখাটা দেখে রমেশ ডাক্তার হেসে ফেলে বলেছিলেন-কলেরা নয়, কলেরা নয়। হৃদ-বন্ধ। কলেরা হলে এমন ওষুধ খাইয়ে দিতাম–

    —কলেরার আবার চিকিৎসা আছে নি? ডাক্তারের কথা শেষ না হতেই জাফর মিয়া বলে।

    —নেই কেন? নিশ্চয় আছে। জীবনে কত কলেরা রোগী ভাল করলাম এই হাতে।

    —তয় হেইডা আসল কলেরা না। পেডের অসুখ। আসল কলেরা বসন্তু অইলে আবার মানুষ বাঁচে?

    —বাঁচে না মানে? একশোবার বাচে। এবারও কত রোগী বেঁচে গেল আমার হাতে।

    নিত্যানন্দ বলে—তুমি আবার মানুষ বাঁচাতে পার নাকি, ডাক্তার?

    –নিশ্চয়ই পারি।

    ডাক্তারের কথায় সবাই হেসে ওঠে। অনেকে মনে করে ডাক্তারের ক্ষ্যাপামিটা আজ আবার বেড়ে গেল।

    —এ কি! তোরা হাসছিস? মানুষ যদি বাঁচাতে না পারি, তবে তোরা আসিস কেন? আমার ওষুধ খাস কেন? ডাক্তার টেবিলের ওপর চাপড় মারেন।

    কালিপদ বলে তোমার কাছে আসি মনের শান্তির জন্যে, মনেরে বুঝ দিতে। তা ছাড়া কি! তুমি বাঁচাতেও পার না, মারতেও পার না। মরা-বাঁচা ঈশ্বরের হাত।

    কালিপদ ওপর দিকে আঙুল দেখিয়ে ঈশ্বরের অবস্থান নির্দেশ করে।

    মুখ বিকৃত করে রমেশ ডাক্তার বলেন—মরা বাঁচা ঈশ্বরের হাত! তবে দেব এক ফোটা পটাশিয়াম সায়নাইড? দেখি কে বাঁচায়?

    নিত্যানন্দ বলে—তোমার ঐ বাজে কথা রাখ ডাক্তার। মাথাটা তোমার আজ আবার গরম হয়েছে, বুঝলাম। জগদীশ সেন এত বড় ডাক্তার, সেও এত বড় কথা বলতে সাহস করে না। ঈশ্বরের ওপর ভরসা করে সে। সেদিন অজিত চৌধুরীর ছেলে মারা গেল। জগদীশ ডাক্তার চৌধুরীকে বল—আমরা ওষুধ দিতে পারি, জীবন তো আর দিতে পারি না।

    —ও সব ফাঁকা কথা বুঝলে? অজ্ঞতা ঢাকবার পথ ওটা। লোককে সান্ত্বনা দেওয়ার বুলি। আসলে ও কথার কোন অর্থ হয় না। এমন অনেক রোগী আছে, যার বাবার ভরসা ছিল না, আমাদের ওষুধ খেয়ে সে হয়তো বেঁচে যায়। যখন বেঁচে ওঠে তখন নাম হয় উপরওয়ালার। তার গুণকীর্তন হয়। মসজিদে শিরনি দেওয়া হয়। হরিলুট দেওয়া হয় মন্দিরে। আমাদের নামও নেয় না মুখে। জালাল শেখের টাইফয়েড হয়েছিল, জানো তোমরা। দুই মাইল পথ হেঁটে রোজ সকালে বিকালে হাজিরা দিয়েছি, ওষুধ দিয়েছি। আমার কাছে ক্লোরোমাইসিটিন ছিল না। জগদীশের কাছ থেকে নিজের টাকায় কিনে দিয়েছি। যখন বেঁচে গেল, তখন একদিন দেখাও করলে না এসে। আমাকে দিয়েছিল কত জানো? তিন টাকা। শুনেছি, আজমীরের দরগায় জালাল পাঁচ টাকা মানত পাঠিয়েছে।

    একটু দম নিয়ে আবার তিনি আরম্ভ করেন—আমাদের হাতে সব লোকই যে বাঁচবে তা তো বলছি না। এর কারণ অনেক। একটা কারণ হচ্ছে–চিকিৎসাবিজ্ঞানে আমাদের অজ্ঞতা। আমার হাতে যে রোগী মারা গেল, আর একজন ভালো ডাক্তারের কাছে সে হয়তো মরত না। তা ছাড়া রোগ নির্ণয়ে, ওষুধ-নির্বাচনে ভুল-ভ্রান্তি, ওষুধের অভাব, যন্ত্রপাতির অভাব—নানা কারণ আছে। এ ছাড়াও আছে রোগীর গাফিলতি। সময় থাকতে আসবে না। আসবে তখন যখন টলমল অবস্থা। ঐ অবস্থায় ডাক্তার ডেকে কোন কাজ হয় না। ডুবন্ত নৌকা উদ্ধার করা সোজা ব্যাপার নয়। কথায় বলে—মরণকালে লক্ষ্মীবিলাসের বড়ি কোন কাজ দেয় না। মানুষ মরবে, এতে সত্য কথা। তবে অকালমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে হবে তো। বাতির তেল ফুরালে তেল দিতে হবে। ঝড়ে নিবে না যায়। তার জন্য ঢাকনা লাগাতে হবে। বাতিটা যে-দিন ফুটো ঝাঁজরা হয়ে ভেঙে যাবে, সে দিনের কথা আলাদা। অবশ্য সমস্ত লোককে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবার মত চিকিৎসা এখনও আবিষ্কার হয়নি। তবে চিকিৎসাশাস্ত্রের উন্নতি হচ্ছে দিন দিন।

    সবাই বিরক্ত হয় ডাক্তারের ওপর। তারা মনে করে—আজ মাথাটা একটু বেশীই খারাপ হয়েছে ডাক্তারের।

    কালীপদ বলে রাখ তোমার বক্তিমা। এইবারে বিদায় কর। ডাক্তার বলেন—একটু সবুর কর। ওদের আগে বিদায় করি। ওরা দূরের লোক। এসো দেখি দিল মহম্মদ। ক’দিন থেকে জ্বর?

    —আইজ চাইর দিন।

    ডাক্তার নাড়ী দেখেন। বুক পরীক্ষা করেন। তারপর বলেন—দেখি জিভ। হা করো, আ—এমন করে।

    দিল মহম্মদ হা করে। তার নিশ্বাসের সাথে এক ঝলক দুর্গন্ধ এসে ধাক্কা মারে ডাক্তারের নাকে। তিনি মুখটা একপাশে সরিয়ে বলেন—কোষ্ঠ পরিষ্কার হয়নি।

    একটা কাগজে ‘ব্যবস্থা’ লিখে ডাক্তার বলেন—কোন ভয় নাই। এ কাগজটা কম্পাউডারকে দাও। ওষুধটা দিনে তিনবার খাবে। ঠাণ্ডা লাগিও না। শিশি এনেছো?

    –হ্যাঁ।

    –আচ্ছা যাও। পরশু এসো আবার। আলাউদ্দিন, তুমি এসো। কি তোমার?

    —প্যাটটা ফুইল্যা রইছে দুই দিন ধইর‍্যা। একবার খাইলে আর খাইতে ইচ্ছা করে না।

    ভাত দেখলে বমি আহে। খোয়াবে খাইলে হুনছি এই রহম অয়।

    —অ্যাঁ, কি বল্লি?

    –মা কইছে, খোয়াবে যারা খায়, তাগ প্যাট ভার অইয়া থাকে এই রহম। অজম অয় না।

    বুড়ো ন’কড়ি বলে—ডাক্তারের কাছে এগুলা কইস না। এই সব ভূতের ব্যামোর কিছু ডাক্তার বুঝবও না, বিশ্বাসও করব না। আমিও কত দিন স্বপ্নে খাইছি—রসগোল্লা, সন্দেশ, জিলাফি, কচুরী, পানতুয়া—ন’কড়ি মিষ্টির নামের শিকলি ছাড়তে শুরু করে।

    মুচকি হেসে ডাক্তার বলেন—খেতে কেমন লাগে?

    —কেমন লাগবে আবার! ভালা। ঠিক হালুইকরের মিষ্টির মতন। কিন্তুক অজম অইতে চায় না। অজম অইলে কি আর কথা আছিল?

    ডাক্তার রহস্য করে বলেন—সত্যি, হজম হলে আর কোন কথা ছিল না। বাজারে যখন রসগোল্লা সন্দেশ পাওয়া যায় না আজকাল, তখন স্বপ্নে বিনে পয়সায়—

    —বেশ মজা কাইরা খাওয়ন যাইত। ডাক্তারের মুখের কথা লুফে নিয়ে ন’কড়ি বলে।

    ডাক্তার এবার গর্জন করে ওঠেন—হুঁহ্‌, যত সব আহম্মক নিয়ে কারবার। যা এখন থেকে। স্বপ্নে রসগোল্লা খা গে। ওষুধ খেতে হবে না।

    আলাউদ্দিন দাঁড়িয়ে থাকে। ডাক্তার হাত বাড়িয়ে তাকে একটু কাছে টেনে নেন। জামাটা তুলে রাগের সাথে জোরে জোরে তার পেট টিপতে শুরু করেন।

    বাধা-ধরা একঘেয়ে জীবন ডাক্তারের এমনি করেই চলে। চলে ঘড়ির কাঁটার মত একই পথে। কিন্তু তার কাছে বৈচিত্র্যহীন একঘেয়ে বলে মনে হয়নি কোনদিন। মুর্খ লোকের কার্য-কারণহীন আজগুবি কথাবার্তা শুনে তিনি যত বিরক্ত হন, তাদের অজ্ঞতার জন্যে তার চেয়েও বেশী সহানুভূতি জাগে তার মনে। এ সমস্ত লোকের নাড়ী দেখে দেখে তাদের ওপর কেমন একটা নাড়ীর টান জন্মে গেছে ডাক্তারের। ভোর বেলা এদের মুখ দেখলে তবেই তার ভালো লাগে। তাজা হয়ে ওঠে দেহ-মন।

    কিন্তু কিছুদিন ধরে ডাক্তারের দিনগুলো আর চলতে চায় না। যেন হুঁচোট খেয়ে চলছে দিনগুলো। স্বাধীনতা অর্জনের পরে বাস্তুত্যাগের হিড়িক পড়েছে দেশে। ভারত ও পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের চোখে লেগেছে আলোর ধাঁধা। ডাক্তারের স্ত্রীর চোখেও তাই লেগেছে। পাকিস্তান ছেড়ে যাওয়ার জন্যে তিনি অধীর হয়ে উঠেছেন। কিন্তু ডাক্তারের পাকা চোখে দূরের সে আলো নেশা জাগাতে পারে না। পারে না মায়ার সৃষ্টি করতে। স্বামী-স্ত্রীর এই বিরুদ্ধ মনোভাব সংসারের সমস্ত শান্তি নষ্ট করেছে। এই একই প্রসঙ্গ নিয়ে কথার প্যাচাল শুরু হয় দু’জনের মধ্যে। সহজে তা থামতে চায় না। স্ত্রী নানারকম যুক্তিতর্কের অবতারণা করেন, বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দৃষ্টান্ত দেখিয়ে স্বামীকে প্ররোচিত করেন। কিন্তু আদম তার সংকল্পে হল। সে জানে, নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার অর্থ স্ব-ভ্রষ্ট হওয়া। ঈভ তাই নিষিদ্ধ ফলের সাজি নিয়ে ব্যর্থ হয় বারবার।

    আজও ডাক্তার রোগী দেখা শেষ করে সবে আঙিনায় উঠেছেন অমনি গিন্নী আরম্ভ করেন—ওগো শুনছো? আর তোমাকে বলেই বা কি হবে?

    অন্যমনস্কভাবে ডাক্তার এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু গলা চড়িয়ে গিন্নি বলেন—জগদীশ ডাক্তার আজ যাচ্ছে, শুনেছো?

    —তাতে হয়েছে কি?

    —হবে আবার কি? সবাই একে একে চলে যাচ্ছে। আর আমরা এখানে জপমালা নিয়ে বসে থাকি আর কি!

    –হ্যাঁ, মালা জপতেই শুরু কর। তাই ভালো। দেখো ঈশ্বর যদি কিছু ব্যবস্থা করেন। চাও তো পুষ্পক রথও পাঠিয়ে দিতে পারেন তোমার জন্যে।

    বিরক্তির মধ্যেও নিজের রসিকতায় হেসে ওঠেন ডাক্তার। তার হাসি গিন্নীর অন্তরে ঘা দেয়। তিনি বলেন—তা তুমি যেয়ে।

    —আমি যাব! উহুঁ! এখান থেকে আমি একচুলও নড়ছিনে। এমন সাজানো বাগিচা ছেড়ে নরকে যেতে পারবো না।

    কথায় সুবিধা করতে না পেরে গিন্নী বলেন—তা বেশ। এখানে থেকে মুসলমানের হাতে যদি কচুকাটা না হও তো কি বল্লাম।

    —ওসব বাজে কথা রাখ। এখানে কে তোমাকে মারছে শুনি? কতগুলো পশুর প্ররোচনায় যা হয়েছিল, তা আর হবে না দেখে নিও। ভাইয়ের বুকে ছুরি বসিয়ে আনন্দ পাওয়া যায়

    —সবাই বুঝতে পেরেছে। ভাইয়ের বুকের রক্তে যে করুণ অভিজ্ঞতা হল, হিন্দুমুসলমানের মন থেকে তা সহজে মুছে যাবে না। আর যদি একান্ত মুছেই যায়, তবে বুঝব তার পেছনে কাজ করেছে স্বাথান্ধ হিংস্রতা। শুধু এখানেই নয়। সব জায়গায় এ হিংসতা দেখা দিতে পারে। যেমন আসামে ‘বঙ্গাল খেদা’ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ধুতিবালাদের বিরুদ্ধে মুখারা কুকরি শান দিচ্ছে। বিহারে কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে বাঙালীকে। এখন এক গণ্ডগোলের ভয়ে পালিয়ে আর এক গণ্ডগোলের মুখে গিয়ে পড়তে হবে। এখানে আমাদের কিসের অভাব? কোন দুঃখে যাব আমরা ঘর-বাড়ী ছেড়ে? জানো না, এখানে আমরা মার কোলে আছি।

    হাসু এসে ডাক্তারের উঠানে দাঁড়ায়।

    ডাক্তারের খোঁজে সে এ-গাও ও-গাও ঘুরেছে। জগদীশ ডাক্তারকে পাওয়া গেল না। তিনি পাততাড়ি গুটিয়েছেন। আজই চলে যাচ্ছেন দেশ ছেড়ে। হরেন ডাক্তারও নেই। তিনি অনেক দিন আগেই চলে গেছেন। তার শূন্য ভিটা তচনচ হয়ে আছে ঘাস-লতা-পাতায়।

    রমেশ ডাক্তার তখনও বকে চলেছেন—এখন হুজুগে মেতে অনেকেই বাড়ী-দরি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। যাদের টাকা নেই তারাও যাচ্ছে। অনেকে বাড়ী-ঘর বিক্রি করে যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারি না কিসের নেশায় যাচ্ছে এরা। কিন্তু দেখবে, আবার এরা ফিরে আসবে। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ক্ষুধা ও রোগে আধমরা হয়ে আবার এরা ফিরবে। কিন্তু তখন আর মাথা খুঁজবার ঠাঁই মিলবে না। আমাদের পূর্বপুরুষ হিন্দু-মুসলমান আপনজনের মত কত যুগ ধরে কাটিয়েছে এ মাটিতে। একের ওপর নির্ভর করে বেঁচে উঠেছে আর একজন। একজন যুগিয়েছে ক্ষুধার অন্ন, আর একজন দেখিয়েছে আলো।

    ডাক্তার পাশের দিকে দেখেন–গিন্নী নেই। কখন তিনি বেরিয়ে গেছেন। উঠানে হাসু দাঁড়িয়ে। দেখতে পেয়ে ডাক্তার বলেন—কিরে বাপু, কি চাই।

    —আমার ভাইয়ের খুব অসুখ।

    স্ত্রীর ওপর এতক্ষণ বক্তৃতা ঝেড়ে রমেশ ডাক্তারের মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। তিনি বলেন—আমি যেতে পারব না।

    কথাটা বলে তখনি ভাবেন—আর তো কেউ নেই। হরেন অনেক দিন আগেই চলে গেছে। জগদীশও আজ যাচ্ছে। এ তল্লাটে এ তিন হন ছাড়া আর কে আছে? ডাক্তার যাবার মনস্থ করেন। বাড়ীতে থাকলে আবার স্ত্রীর কথায় কান ঝালাপালা হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং রোগী দেখতে যাওয়া ভালো।

    জামা গায়ে চড়িয়ে স্টেথসকোপ ও ‘এমারজেন্সী ব্যাগ’ নিয়ে ডাক্তার বের হন। পেছন থেকে স্ত্রী বাধা দেন—এই দুপুরে রোদ মাথায় করে কোথায় চল্লে আবার?

    উত্তর না দিয়ে ডাক্তার এগিয়ে যান।

    —চান করে খাও-দাও। বিকেলে যেও। স্ত্রী তাগাদা দেন।

    স্ত্রীর কথাগুলোকে শ্লেষের আঘাত করে ডাক্তার বলেন—চান করব আবার খাব। এদিকে মানুষ মরে যাচ্ছে।

    পেছন ফিরে ডাক্তার আবার বলেন—এখন দেখো, আমরা চলে গেলে এদের কি উপায় হবে। এতগুলো গ্রামের মধ্যে আমরা তিনটে ডাক্তার ছিলাম। দু’জন তো চলেই গেল।

    আমিও যদি চলে যাই, তবে এরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

    ডাক্তারের ব্যাগটা হাসু হাতে করে নেয়।

    ডাক্তার রোগী দেখে চিন্তিত মুখে বলেন—ডবল নিমোনিয়া। এত দিন ছিলে কোথায়?

    করিম বক্‌শ বলে—ফকির দেখছিল এতদিন।

    —নাকের ওর ঘা হয়েছে কেমন করে?

    –দড়ি-পড়া দিছিল ফকির।

    ডাক্তার দাতে দাঁত চেপে বলেন—ফকির! দড়ি পড়া! দেশের শাসন ক্ষমতা আমার হাতে থাকলে ব্যাটাদের কুরবাজি দেখিয়ে ছাড়তাম। ফাঁসি দিতাম ব্যাটাদের। এ নরহত্যা ছাড়া কিছু নয়।

    ডাক্তার আসায় জয়গুন বড় করে মাথায় কাপড় টেনে পেছন ফিরে বসেছিল। তার বুকের ভেতর কে যেন হাতুড়ি পিটছে অবিশ্রান্ত। সে এবার ঘুরে ডাক্তারের পা ধরে করুণ মিনতি জানায়—ডাক্তার বাবু, আমার কাসুকে বাঁচাইয়া দ্যান। আপনে আমার ধর্মের ব্যাপ।

  • সতের পরিচ্ছেদ

    সতের পরিচ্ছেদ

    সতের পরিচ্ছেদ

    জয়গুন আহার-নিদ্রা ভুলে দিনের পর দিন ছেলের শয্যা-পার্শ্বে কাটিয়ে দেয়। মায়মুনও থাকে মা-র কাছে। প্রত্যেক দিন খাবার সময়ে করিম বক্‌শের ইঙ্গিতে আঞ্জুমন জয়গুনের হাত ধরে টানাটানি করে খাওয়ার জন্যে। বলে—এই রহম পেডে পাথর বাইন্দা থাইক্য না। দুইডা দানাপানি মোখে দ্যাও বুজান, নালে শরীল তোমার ভাইঙ্গা যাইব।

    জয়গুন খেতে যায় না। সে ভাবে, এ বাড়ীর ভাত তার কপাল থেকে অনেক আগেই উঠে গেছে।

    হাসু রোজ খাবার নিয়ে আসে। রেখে যাওয়া সে খাবার সে মায়মুনকে দেয়। নিজেও খাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তার খাওয়া আসে না। দু’এক মুঠো জোর করে গিলে এক মগ পানি খেয়ে একদিন কাটিয়ে দেয়।

    দিনের বেলা যেমন তেমন কেটে যায়। কিন্তু রাত্রি বেলা জয়গুনের আর দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই সে রাত্রির জন্যে প্রস্তুত হয়। বাতির তেল না থাকলে মায়মুনকে পাঠিয়ে পাশের বাড়ী থেকে কুপি মেপে তেল ধার আনে। একটা মালসাতে তুষ সাজিয়ে আগুন দিয়ে রাখে।

    রাত্রে জয়গুনের কাছে থাকার জন্যে শফির মা আসে। সে ‘বুড়া মানু’ তাই তার ঘুম কম। রাত্রের যে কোন সময়ে ডাক দিলে তার সাড়া পাওয়া যায়। সে কাছে থাকলে মনে বল পাওয়া যায়। হাসুও দুই রাত্রি ছিল। কিন্তু ও ছেলে মানুষ। সন্ধ্যার পরেই ঘুমিয়ে পড়ে। সারা রাত্রির জন্যে আর তাকে সজাগ পাওয়া যায় না। শফির মা-র জন্যে জয়গুন। সন্ধ্যার আগেই বেশী করে পান ঘেঁচে রাখে, যাতে কাসুর কানের কাছে ঠনর ঠনর করতে না হয়।

    শফির মা অনেকক্ষণ বসে থাকে জয়গুনের পাশে। তারা মুখোমুখি বসে। আগুনের মালসার ওপর হাতগুলোকে গরম করে। মাঝে মাঝে কান মুখ ও অন্যান্য অঙ্গে গরম হাত বুলিয়ে শীত তাড়াবার চেষ্টা করে। শফির মা কখনও পান চিবোতে চিবোতে পিচ ফেলে মালসার মধ্যে। তুষের আগুন থেকে ধোঁয়া বের হয়। নানা কথায় সে জয়গুনকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করে। তার নিরাশ মনে আশা জাগিয়ে তোলে। থানার ঘন্টা যখন জোড়ায় জোড়ায় বাজে, তখন সে গুণতে আরম্ভ করে সাথে সাথে। বলে—বারোখান বাজল। এইবার এট্ট কাইত অই। আত দিয়া দ্যাখ, কাপড় ভিজা প্যাচপেইচ্যা অইয়া গেছে।

    শফির মা কাঁথা উঠিয়ে মায়মুনের পাশ দিয়ে শুয়ে পড়ে। তার শীতল শরীরের ছোয়া লেগে মায়মুন একবার নড়াচড়া করে ওঠে। শফির মা বলে—চুপ কইর‍্যা থাক বেডি, অহনি উম অইয়া যাইব।

    শফির মা গরম হাত দুটো মায়মুনের গায়ে বুলিয়ে এবার ক্ষতি পূরণের চেষ্টা করে। জয়গুনকে বলে—আমারিক্ত ঠাণ্ডা অইয়া গেছে। খাড়াকাড়ি গরম অয় না। ওগ রক্ত গরম। আমার শফিরে বুকে লইয়া হইলে মুহতুকের মইদ্যে উম অয়। তা না অইলে পৌষ মাইস্যা শীতে ঠকঠক করতে করতে জান কবচ অওনের জোগাড়। মাইনষে কইতেই কয়—

    পৌষের হিমে ভীম দমন,
    মাঘের শীতে বাঘের মরণ।

    শফির মা শুয়ে শুয়ে গল্প আরম্ভ করে—ভীম একদিন তার মা-রে জিগায় ‘মা, আমার তন বড় জোয়ান কে? তার মা কয়—‘আছে একজন। গাঙ্গের পাড় দিয়া আঁটলেই তার দ্যাহা পাইবা। তহন পৌষ-মাইস্যা রাইত। ভীম কতক্ষুণ পর শীতে ঠকঠক করতে করতে বাড়ীতে আহে। মায় জিগায়—দ্যাহা পালি বাজান? ভীম কয় ‘হ গো মা।’

    জয়গুন কাঠি দিয়ে তুষের আগুন ঘেঁটে তাতিয়ে নেয়। আগুনে হাত-পাগুলোকে গরম করে।

    ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে উত্তুরে হিমশীতল বাতাস ঢোকে। জয়গুনের শরীরের রক্ত জমে ওঠে যেন!

    বাতাসে নিবুনিবু করে কুপিটা। জয়গুন উঠে সলতে উস্কিয়ে দেয়। এক প্রস্ত কাঁথা এনে আগুনে গরম করে গায়ের ঠাণ্ডা স্যাঁতসেঁতে কাঁথাগুলো পালটিয়ে দেয়।

    করিম বক্‌শ এক সময়ে ডাকে—কাসু কি ঘুমাইছে?

    বার দুই ডেকে করিম বক্‌শ ক্ষান্ত হয়। শফির মা ঘুমিয়ে পড়েছে। জয়গুন ডান হাত বাড়িয়ে তাকে ধাক্কা দেয়। শফির মা ধড়ফড় করে ওঠে। দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলে—আল্লা-রছুল! কি কাসুর মা? সারা রাইত এম্বায় বইস্যা থাকবি? তুই আয়, আমার বালিশে মাথা রাইখ্যা এটু ক্যাইত অইয়া থাক। ও এহন চুপ মাইর‍্যা আছে।

    করিম বক্‌শ আবার ডাকে—ও কি ঘুমাইছে?

    —হ ভাই, এহন ঘুমেই আছে।

    নিঝুম রাত। কোন দিকে সাড়া-শব্দ নেই। অনেকক্ষণ পরে পরে পাখীর কলবল এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। তারপর আবার নিস্তব্ধ। এমন নিস্তব্ধতার মধ্যে ঘরে শোয়া করিম বক্‌শের নিশ্বাস পতন পর্যন্ত গণনা করা যায়। কানের কাছে কাসুর বুকে কফের ঘ্যাড়-ঘ্যাড় শব্দ এবং তার অনিয়মিত হ্রস্ব দীর্ঘ শ্বাস-প্রশ্বাস জয়গুনের আশঙ্কাঘন মনে উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। ঘন কালো অন্ধকার যেন চারদিক থেকে গিলে ধরবার জন্যে হা করে আছে।

    শেষ রাতে ভয়ঙ্কর শীত নেমে আসে। জয়গুন আর একবার কাঁথা বালিশ গরম করে কাসুর বিছানা বদলে দেয়। নিজের হাত-পা শরীর তুষের আগুনের তাপে গরম করে। তারপর কাসুর কাঁথার নিচে শুয়ে তাকে নিজের বুকের তাপ দিয়ে গরম করবার চেষ্টা

    সপ্তাহ খানেক পরে একদিন ডাক্তার বলেন—আর চিন্তা করো না, মা। ভয় কেটে গেছে। তোমার ছেলে এবার ভালো হয়ে উঠবে!

    জয়গুনের মুখের ওপর থেকে নৈরাশ্যের মেঘ কেটে যায়। আশার আলোয় মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার। ডাক্তারের ওপর কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে বুক। কিন্তু তাকে কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা তার জানা নেই। সে বলে–বাবা—তুমিই আমার কাসুরে বাঁচাইল। মরণঘর তন তুমিই ওরে ফিরাইয়া আনছ।

    ডাক্তার আশ্চর্য হন। তার সমস্ত জীবনে এমন সহজ সোজা কথা কোন নিরক্ষরের মুখে তিনি কখনও শোনেন নি। ডাক্তার মানুষ বাঁচাতে পারে, এ-কথা বিশ্বাস করে না কেউ।

    ডাক্তার বলেন—আমার চিকিৎসা ছাড়াও তোমার শুশ্রূষা অনেক সাহায্য করেছে। তুমি কাছে না থাকলে, সময় মত ওষুধ-পথ্য না দিলে এ রোগী বাঁচান এত সহজ ছিল না।

    কাসু ভালো হয়ে ওঠার সাথে সাথে জয়গুনের কর্তব্যও যেন ফুরিয়ে যায়। একদিন ভোর রাত্রে কাসুকে ঘুমে রেখে সে মায়মুনকে নিয়ে হাসর সাথে বাড়ী চলে আসে।

    জয়গুনের এমনি করে চলে আসার কারণও ‘ঘটেছিল।

    শফির মা সেদিন আসে নি। জ্বর হয়েছিল তার। রাত্রে মা-র কাছে থাকবার জন্যে হাসু এসেছিল।

    গভীর রাত্রি। হাসু ও মায়মুন ঘুমে অচেতন। কাসুও কতক্ষণ ছুটফট করে কিছু আগে। মুমিয়ে পড়েছে। তার শিয়রে আগুনের মালসার ওপর হাত রেখে জয়গুন ঝিমোচ্ছে।

    করিম বক্‌শ অন্ধকারে বালিশ থেকে মাথা উঁচিয়ে ঘর ও বারান্দার মাঝের বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাকায়। কয়েকদিন ধরে তাকিয়ে তাকিয়ে তার কেমন নেশা ধরে গেছে। কুপির অস্পষ্ট আলোকে জয়গুনের মুখখানা বড়ই সুন্দর লাগে তার চোখে। চোখ দুটো ঘুমে ঢুলুঢুলু, কখনও বুজে আসে। সারা মুখে বেদনার ছাপ যেন সুন্দরতর করেছে তার মুখখানা।

    করিম বক্‌শ আস্তে আস্তে বারান্দায় নেমে আসে। আওয়াজ পেয়ে জয়গুন গা ঝাড়া দিয়ে বসে। তাড়াতাড়ি মাথার কাপড় লম্বা করে টেনে দেয়।

    করিম বক্‌শ এসে কাসুর মাথায় হাত দিয়ে শরীরের তাপ দেখে। জয়গুন বুঝতে পারে, কথা বলার ভূমিকা ছাড়া এ আর কিছু নয়। সে একটু দূরে সরে বসে হাসু ও মায়মুন যেখানে শুয়ে আছে।

    করিম বক্‌শ বলে—আমারে দেইখ্যা তুমি ঘুমডা দ্যাও ক্যাঁ?

    বার তিনেক হল এই একই অভিযোগ।

    জয়গুন উত্তর দেয় না।

    —আমারে আবার শরম কিয়ের? এত বচ্ছর আমার ঘর করলা, আর এহন আমারেই শরম! মাথার কাপড় উডাও, লক্ষ্মী। হোন আমার কথা।

    জয়গুনের বুকের ভেতর টিপটিপ করতে শুরু করে।

    করিম বক্‌শ বলে—আমার কথা যদি রাখ, তয় একটা প্রস্তাব করতে চাই।

    জয়গুন নিরুত্তর।

    -আইচ্ছা, আমি যদি আবার—

    জয়গুন শক্ত একটা কিছু বলার জন্যে মনে মনে মুসাবিদা করে কিন্তু মুখ দিয়ে কিছু বের হয় না।

    —তোমারে আবার আমি ঘরে আনতে চাই।

    কম্পিত কণ্ঠে জয়গুন বলে–না।

    -ক্যাঁ? আমি শরা-শরিয়ত মতই করতাম।

    শরিয়ত মত আগে একজনের লগে সাঙ্গা বইয়া হেইখান তন তালাক লইয়া তারপর? ওহোঁ।

    —ওয়াতে দোষ কি? লক্ষ্মী, তুমি রাজী অও। তহন কি আম্মুকি করছি ঘরের লক্ষ্মী ছাইড়্যা দিয়া। শরিয়তে আইন আছে এই রহম নিকার।

    —শরিয়তে থাকলেও আমি পারতাম না।

    —ক্যাঁ? সতীনের ঘর বুইল্যা? যদি একবার মোখ ফুইট্যা কও ‘সতীনের ঘর করতাম না’ তয় ফুলির মা-রে রাইত পোয়াইলেই খেদাইয়া দিতে পারি। তুমি একবার একটু–

    —ওহোঁ।

    —ক্যাঁ? ঘরের লক্ষী তুমি। করিম বক্‌শ জয়গুনের একটা হাত ধরে আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। জয়গুন ঝাড়া দিয়ে সে হাত ছাড়িয়ে নেয়। পাশে হাসুকে হাত দিয়ে ধাক্কা দেয়—হাসু হাসু ওঠ।

    করিম বক্‌শ চোরের মতো সরে যায়।

    বাকী রাতটা জয়গুন বসে কাটিয়ে দেয়। প্রথম মোরগের বাকের সময়, সে হাসু ও মায়মুনকে ডেকে তোলে। কাসু ঘুমিয়ে আছে। তার রোগ-শীর্ণ পাণ্ডুর মুখের দিকে চেয়ে জয়গুন চোখের পানি রাখতে পারে না। কাসুর গালে একটা চুমো দিয়ে তার গালের সাথে নিজের গাল ঠেকিয়ে রাখে কিছুক্ষণ।

    সে আঞ্জুমনকে ডেকে কাসুর কাছে রেখে যায়। আঞ্জুমন কিছু বুঝতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করে—আইজ যাইবা ক্যাঁ?

    —যাইমু না কি করমু আর? এহন ও ভাল অইয়া উডব। তুমি এটু নজর রাইখ্য বইন। তোমার ত পোলা নাই। মনে কইর‍্য এইড়া তোমার প্যাডের।

    জয়গুন বাড়ী এসে প্রথমেই শফির মার বিছানার পাশে গিয়ে বসে।

    শফির মা বলে—চইল্যা আলি ক্যাঁ? তোরে দ্যাখতে না পাইলে যদি ও চিল্লায়?

    —চিল্লাইলে কি করতাম, বইন? যার পোলা হে-ই রাখব। আমার কি! সখেদে বলে জয়গুন।

    —আমার ত মনে অয় না করিম বক্‌শ ওরে রাখতে পারব। ঘুমের তন উইঠ্যাই যখন তোরে দ্যাখব না, তহন করিম বকশের দিল-কইলজাডা খুইল্যা খাইয়া ফ্যালাইব না!

    —তার আমি কি করতাম! হেদিন কইছিলাম—ওরে আমার কাছে আইন্যা কিছু দিন রাহি। তারপর ভালা অইয়া গেলে যার পোলা হে-ই লইয়া যাইত। ব্যারাম তন ওঠলে এট্টু আবদার করব। হেইয়া সইজ্য আইলে তয় ত! কিন্তু তুমি মত করলা না।

    –কেমন কইর‍্যা করি? আমাগ সূর্য-দীগল বাড়ী। এই বাড়ীতে মানুষ উজাইতে পারে না। আবার এক বছর ধইর‍্যা পাহারা নাই। এমন সোনার চান মানিকরে এইখানে আনলে যদি এটটু উনিশ-বিশ অয়, তয় বদনাম অইব তোর।

    —ক্যাঁ। আমরা তো কতদিন ধইরা আছি। আমাগ কি অইছে?

    আমাগ কতা আলাদা। আমাগ সইয়া আইছে। আর এতদিন বাড়ীর পাহারা আছিল। পাহারা যেই দিন তন নাই, হেই দিন তন আমার জ্বর যেন ঘন ঘন ওঠতে আছে! আবার মায়মুনেরও পরের বাড়ীর ভাত ওঠল। এইগুলা কি কম চোট?

    সূর্য-দীঘল বাড়ীর অমঙ্গল আশঙ্কা করে জয়নুন সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করে। তবুও তার মন মানে না। তার অন্তর কেঁদে ওঠে। রোগশীর্ণ কাসুর কান্না শুনতে পায় সে তার অন্তরে। স্পষ্ট দেখতে পায়, ঘুম থেকে জেগে কাসু মা-মা বলে কাঁদছে।

    অসুখ ভালো হয়ে আসার পর প্রথম চোখ মেলেই সে মা-কে চিনতে পেরেছিল। তারপর যতক্ষণ সে জেগে থাকত, কখনও জয়গুনের বুকে মাথা রেখে, কখনও হাত আকড়ে ধরে থাকত। তার বিছানা ছেড়ে জয়গুনের কোথাও যাওয়ার উপায় ছিল না। সে কোথাও গেলে কাসু কান্না জুড়ে দিত। দুর্বল হাত-পা দিয়ে কাঁথা বালিশ ছুঁড়তে আরম্ভ করত। আজও জয়গুন তার মনের চোখে দেখতে পায়—কাসু পায়ের লাথি মেরে গায়ের কাঁথা ফেলে দিচ্ছে। করিম বক্‌শ বা আমন কেউ তাকে শান্ত করতে পারছে না।

    আসলেও তাই ঘটেছিল। করিম বক্‌শ নানা রকম লোভ দেখিয়েও কাসুর কান্না থামাতে পারে নি।

    রমেশ ডাক্তার জয়গুনকে আনবার জন্যে লোক পাঠাতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি করিম বক্‌শের কাছে জানতে পারেন, জয়গুন আর আসবে না।

    ডাক্তার তার সুন্দর থার্মোমিটারটা কাসুর হাতে দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেটা সে মাটির ওপর ছুঁড়ে ভেঙে দেয়।

    ডাক্তার করিম বক্‌শকে ভৎর্সনা করেন—শিগগির ওকে ওর মা-র কাছে পাঠিয়ে দাও। এভাবে একে রাখতে পারবে না। এখনও শরীর দুর্বল। এক্ষুণি নিয়ে যাও। দেরী করো না। আমি ওখানে গিয়ে দেখে আসব। ঐ তালগেছো বাড়াটা তো? হ্যাঁ, চিনেছি। ওর মা-র কাছে ভালো থাকবে।

    করিম বক্‌শ কাচুমাচু করে। ডাক্তারের আদেশ লঙ্ঘন করার সাহস তার হয় না। সে যখন কাসুকে কোলে করে নিয়ে যায়, তখন রোদের তেজ বেড়েছে। মাঠের আধা-পাকা মশুর, কলাই ও সর্ষের গাছে শিশির তখনও ঝলমল করছে।

    করিম বক্‌শ কাসুকে এনে জয়গুনের ঘরের দরজার ওপর ছেড়ে দেয়। হাসু ও মায়মুন এসে কাসুর হাত ধরে ঘরে নিয়ে যায়। জয়গুন বসে আছে নিশ্চল। চোখের পানি শুকিয়ে তার দুই গালে দুটি রেখা স্পষ্ট হয়ে আছে। জয়গুন কাসুর দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় না, বলেও না কিছু মুখে। কাসু দু’হাত দিয়ে তাকে ধরতেই জয়গুন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। হাসু ও মায়মুন পাশে বসে কাসুর পিঠে ও মাথায় হাত বুলায়।

    উঠানে করিম বক্‌শ দাঁড়িয়ে আছে। মায়মুনকে উঠানে একখানা পিঁড়ে দিয়ে আসতে বলে জয়গুন।

    মায়মুন সসঙ্কোচে পিঁড়ে হাতে বাপের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। করিম বক্‌শের মমতাহীন লাল চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। হাত বাড়িয়ে মায়মুনকে ধরতে যায়। কিন্তু তার হাত কাঁপছে কেন? মেহেরনকে হত্যা করার সময় যে হাত কাঁপেনি, মায়মুনসহ জয়গুনকে মেরে তাড়িয়ে দেয়ার সময় যে হাত তার বিচলিত হয় নি, আজ সেই হাত কাঁপছে কেন? সেই হাতের শক্তি কোথায়? নিজের মেয়েকে স্পর্শ করার শক্তিও যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। মায়মুনকে স্পর্শ করার অধিকার যেন হারিয়েছে সে।

    করিম বকশের হাতটা আপনার থেকেই নেমে আসে। মাথা নিচু করে সে বাড়ীর দিকে পথ নেয়।

    শফির মা জ্বরের শরীর নিয়ে লাঠি ভর দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে আসে। বলে—আহা, হুকাইয়া এক্কেরে কাষ্ট অইছে মানিক। খালি আড়গুলা আছে।

    —আড় বাঁইচ্যা থাকলে মাংস একদিন অইবই। কাসুর চুলে আঙুল চালাতে চালাতে জয়গুন বলে।

    —হ, আল্লায় বাঁচাইয়া রাখুক। আমার যত গাছ চুল আছে, তত বচ্ছর আয়ু যেন খোদায় ওরে দ্যায়।

    করিম বক্‌শ এখন রোজ আসে কাসুকে দেখতে। কোনদিন মাঠের মাঝ দিয়ে তাকে আসতে দেখে কাসু আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ঝোপের আড়ালে বসে থাকে যতক্ষণ না করিম বক্‌শ চলে যায়। তার ভয়—করিম বক্‌শ তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্যেই আসে। তার এ বিশ্বাসে ইন্ধন যোগায় মায়মুন। রোজ ভোরে সে পথের দিকে চেয়ে থাকে। করিম বক্‌শকে দেখতে পেলেই সে হুশিয়ারী সঙ্কেত দেয়। করিম বক্‌শ ব্যর্থ হয়ে শফির মা-র ঘরে গিয়ে কথাবার্তা বলে। তার ছেঁচা পানে ভাগ বসায়।

    –কি করলা, ভাজ? পরস্তাবডা করছিলা? করিম বক্‌শ জিজ্ঞেস করে।

    —করছিলাম। কিন্তুক রাজী অয় না। বহুত দিন ধইর‍্যা আমিও চেষ্টা করতে আছি। চক-চেহারায় তো কম না। মাইনষে দ্যাখলে এহনও এক নজর চাইয়া দ্যাহে। ষাইডের বান্দে ছান্দেও ঠিক আছে। এহনও নিকা দিলে গণ্ডায় গণ্ডায় বাচ্চা-কাচ্চা অয়। আমি এত কইর‍্যা বুঝাই, আমার কথা কানেই নেয় না। গদু পরধান কত ঘুরাঘুরি করে! দুই কানি জমিন আর একখান ঘর লেইখ্যা দিতে চাইছিল।

    —আমি ভালার লেইগ্যা কইছিলাম। আমার সংসারও চলত, আর আমার পোলা মাইয়াও সুখে থাকত। আমার তিন কানি জমিন ওর নামে দলিল রেজেষ্টি কইর‍্যা লেইখ্যা দিতাম। তুমি আর একবার কইয়া দেইখ্য না। যদি সতীনের ঘর করতে রাজী না অয়, তয় আঞ্জুমনরেও তালাক দিয়া দিতে পারি। এর বেশী আর কি চায়?

    —কিন্তুক ও যে কিছুই চায় না। আমার মোখের উপরে কইয়া দিছে,—’যেই থুক একবার মাডিতে ফ্যালাইছি, তা মোখ দিয়া চাটতে পারতাম না।’

    করিম বক্‌শ এবার ফতুয়ার পকেট থেকে একটা পান বের করে শফির মা-র হাতে দিয়ে বলে-খবরদার কেও যেন না জানে। তোমার ঘরে ডাক দিয়া এই পানডা খাওয়াইয়া দিও। নাগর বাইদ্যার আতে পায়ে ধইর‍্যা এইডা যোগাড় করছি। বান্দরের নউখের কলম আর মানিকজোড়ের রক্ত দিয়া এই পানের উপরে লেইখ্যা দিছে আর কইয়া দিছে,—’সাত রোজের মইদ্যে যদি ও তোমার লেইগ্যা পাগল না অয় তো আমার নামে কুত্তারে ভাত দিও।’

  • আঠার পরিচ্ছেদ

    আঠার পরিচ্ছেদ

    আঠার পরিচ্ছেদ

    –কারা ওইখানে? কেডা, কেডারে? শফির মা চেঁচিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।–খবরদার, ফলগাছে কোপ দিলে আজগাই ঠাডা পড়ব মাতায়, কইয়া রাখলাম।

    কে একজন বলে—আমরা কিনছি এই গাছ। জিগাও গিয়া হাসুর মা-রে।

    শফির মা রাগে গরগর করতে করতে আসে—অ্যাই হাসুর মা, টিয়া-ঠুঁইট্যা আমগাছটাও বেচ্‌ছস?

    —হ, গফুর শেখ নিছে ওডা, দশ টাকায় লাকড়ির লেইগ্যা।

    —ওহুঁ, যেই নেউক, ওই গাছ আমি কাটতে দিতাম না।

    —ক্যাঁ? ওই গাছ তো আমার ভাগের।

    —ওই গাছ তোর তা মুল্লুকের মাইনষে জানে। কী সোন্দর আম অইছে গাছটায়। জষ্টি মাসে পাকব। তুই এই গাছ বেচ্‌লি কোন আক্কেলে? বাচ্চা-কাচ্চারা কি মোখে দিব?

    এক সঙ্গে অনেকগুলো কথা চেঁচিয়ে বলে শফির মা হাঁপিয়ে ওঠে।

    –কি মোখে দিব আবার? আগে ভাত খাইয়া বাঁচলে তারপর তো আম-জাম।

    শফির মা ভেঙচিয়ে ওঠে—তারপর ও আম-জাম! আমের দিনে বেবাকে আম খাইব, আর ওরা মাইনষের মোখের দিক চাইয়া থাকব। কর যা তোর মনে লয়। তুই গলায় দড়ি দিলেও আর আমি না করতাম না।

    দুইদিন বাদে গলায় দড়িই দিতে অইব। কি করতাম আর! তোমরাই হে-সুম ধইরা-বাইন্দা তোবা করাইলা। ঠ্যাং ভাইগা কতদিন ধইরা বইস্যা আছি। একটা না, দুইডা না, চাইরখান প্যাডের ভাত আহে কই তন?

    শফির মা ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। বাড়ীর দক্ষিণ পাশ থেকে গাছ কাটার শব্দ আসে। জয়গুনের বুকের ভেতরেও যেন কুঠারের আঘাত পড়ছে বারবার।

    টিয়াঠুঁটে আম গাছটায় আম ধরেছিল এবার খুব। আমও জাতের আম। দুধে মেশালে দুধ নষ্ট হয় না, এত মিষ্টি আমের তলার দিকটা টিয়ার ঠোঁটের মত বাকা। আর পাকলে ঐ ঠোঁটটাই শুধু লাল হয়।

    হাসু ও মায়মুন গাছে বোল দেখে কত খুশী হয়েছিল! আর একটা মাস রয়ে সয়ে বেচলে ওরা খেতে পারত। কিন্তু এদিকে পেট তো আর ক্ষুধার জ্বালায় ‘র’ মানবে না।

    করিম বক্‌শ দুধের হাঁড়ি মাথায় উঠানে এসে ডাকে–কাসু!

    কাসু ততক্ষণে পিছ-দুয়ার দিয়ে পালিয়েছে।

    আরো দু-তিন ডাক দিয়েও যখন কাসুর সাড়া পাওয়া যায় না, তখন সে মায়মুনকে ডাকে—একটা ঘড়ি লইয়া আয় মায়মুন।

    জয়গুনের একবার বলতে ইচ্ছে হয়—আমরা দুধ খাই না। লইয়া যান দুধ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই বলা হয় না।

    মায়মুন ঘটি নিয়ে আসে।

    করিম বক্‌শ এক সের দুধ টিতে ঢেলে দিয়ে বলে—রোজ এমুন সুম আমি দুধ দিয়া যাইমু। আমাগ ধলা গাইড বিয়াইছে। কাসুর ভাগ্যে একটা দামড়ি বাছুর অইছে। বাছুর ঘাস ধরলে কাসুরে দিয়া যাইমু। কাসু কই গেছে রে?

    মায়মুন উত্তর দেয়—পালাইছে।

    করিম বক্‌শ আর দাঁড়ায় না। যেতে যেতে একবার পেছনে তাকায়। জয়গুনের চোখে চোখ পড়তে লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নেয়।

    জয়গুন ধমক দেয় মায়মুনকে—দুধ রাখলি, খাইব কে?

    —ক্যাঁ? আমরা।

    —হ, তোরা-ই খা। আমি ইতাম না ওই দুধ।

    সকলকে চমকে দিয়ে টিয়া-ঠুঁটে আম গাছটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। দু’একটা পাখীর আর্ত চিৎকার ভেসে আসে পাশের ঝোপ থেকে।

    নাবিক সিন্দাবাদের ঘাড়ের ওপর এক দৈত্য চেপে বসেছিল। বাঙলা তেরোশ’ পঞ্চাশ সালের ঘাড়েও তেমনি চেপে বসেছিল দুর্ভিক্ষ। হাত-পা শেকলে বাঁধা পরাধীন সে বুভুক্ষু তেরো’শ পঞ্চাশের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে, তার পরের আরো চারটি উত্তরাধিকারীর। কিন্তু দুর্ভিক্ষ আর ঘাড় থেকে নামেনি। ঘাড় বদল করেই চলেছে একভাবে। হাত-পায়ের। বন্ধনমুক্ত স্বাধীন তেরোশ’ পঞ্চান্নে এসেও সে আকাল-দৈত্য তার নির্মম খেলা খেলছে। তাকে আর ঘাড় থেকে নামান যায় না।

    দেশে চালের দর কড়ি টাকার নিচে নামে না বছরের কোন সময়েই। ফালগুন মাস থেকে সে দর আরো চড়ে যায়। চড়ে যায় লাফিয়ে লাফিয়ে। চল্লিশ টাকায় গিয়ে ঠেকে। আউশ ধান ওঠার আগে এই দর আর নামে না। ফলে যারা টেনেটুনে দু’বেলা খেত, তারা এক বেলার চালে দু’বেলা চালায়। ফেনটাও বাদ দেয় না, ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে দুধ-ভাতের মত করে খায়। যারা দুবেলা আধপেটা খেয়ে থাকত, এ সময়ে তারা শাক-পাতার সাথে অপি চাল দিয়ে জাউ রেধে খায়। মুধিতের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যায়। পেটের জ্বালায় ভিক্ষার ঝলি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে অনেকে। আশা—দশ দুয়ারে মেগে এক দুয়ারে বসে খাবে। কিন্তু দশের দশা শোচনীয়। সমস্ত দেশ দিশেহারা। দুর্ভিক্ষে কে দেয় ভিক্ষে?

    এ পৌনঃপুনিক দুর্ভিক্ষ শুধু কি ভাতের? কাপড়েরও। শত কপাল কুটলেও সরকার-নিয়ন্ত্রিত মূলের দ্বিগুণ দিয়েও একখানা কাপড় পাওয়া যায় না। অনেকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটিয়ে দেয় একই কাপড়ে। তালি খেয়ে খেয়ে ময়লা জমে জমে ভারী হয়ে ওঠে সে কাপড়। বৃষ্টি ও ঘামে ভিজে বিদঘুটে বোটকা গন্ধ ছড়ায়।

    জয়গুন অনেক ভেবেছে ভাল কাপড়ের ভাবনা। কিন্তু হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে বসে এ ভাবনার অর্থ নেই, সে হাড়ে হাড়ে বুঝেছে। মায়মুনের বিয়ের সময়, ছমাস আগে তওবা করে সেই যে ঘরে ঢুকেছে, আজ পর্যন্ত সেই তওবারর অমর্যাদা সে করেনি।

    —কিন্তু এমনি করেই কি আর দিন চলবে? এমনি করেই কি পেটের জ্বালা জুড়োবে? কাপড় জুটবে পরনের? জয়গুন প্রশ্ন করে নিজেকে।

    পেটের জ্বালা এদিকে বেড়েই চলছে দিন দিন। দুই দিন এক রকম কিছুই খাওয়া হয়নি।

    কাল রাত্রে খাওয়ার সময় কাসু জিজ্ঞেস করেছিল—তুমি খাইবা না, মা?

    —আমি রোজা আছি। তোরা খাইয়া ওঠ। তোর ব্যারামের সময় মানতি করছিলাম তিনড়া রোজা রাখতাম বুইল্যা।

    —রাইতেও খাইবা না তুমি? মায়মুন বলে।

    —এই রোজায় দিন-রাইত না খাইয়া থাকতে অয়।

    কাসু বিশ্বাস করলেও হাসু ও মায়মুন বিশ্বাস করে নি সে কথা। নিজের পাতের কয়েক মুঠো ভাত হাঁড়িতে তুলে রেখে হাসু উঠে গিয়ে বলেছিল—আইজ ভুখ নাই মা।

    হাসুর দেখাদেখি মায়মুনও থালার ভাত রেখে বলে–আমারও ভুখ্‌ নাই। দু’দিনের মধ্যে সে ভাত ক’টাই পেটে দিয়ে আছে জয়গান।

    বাড়ীর আমগাছ, তেঁতুলগাছ, কাডের বাঁশ কেটে ছাপ্পোনছাড়া’ করে দেয়া হয়েছে। চারটে ‘আণ্ডালু’ হাস বিক্রি করে দিয়েছে। বিক্রি করবার মত আর কিছুই নেই।

    বিকেল হলেই কাসু খেলা ছেড়ে মা-র আঁচল ধরে তার পিছু পিছু ঘুরতে থাকে, তাগিদ দেয়—ভাত রানবা না, মা? আমার ভুখ লাগছে। এই দ্যাই না প্যাটটা কেমুন ছোড অইয়া গেছে।

    কাসু হাত দিয়ে পেটটা দেখায়। জয়গুন দেখে, সত্যি পেটটা নেমেই গেছে। সে ফাঁকি দিয়ে বলে—তার মিয়াভাই মাছ আনলে তারপর পাক করমু। নিত্যি নিত্যি শাক পাতা ভাললাগে না।

    —কি মাছ, মা? ইলশা মাছ?

    —হ, ইলশা মাছ।

    কাসু খুশী হয়।

    সন্ধ্যা হয়ে আসে। হাসু এখনও এলো না। জয়গুন কাসুকে ভুলিয়ে রাখবার জন্যে মায়মনকে বলে—মায়মন, ওরে লইয়া যা। ঝিঁঝিঁ ধইর‍্যা দে গিয়া। ঐ দ্যাখ, হেন কেমুন ডাকে।

    দুটো নারকেলের আঁইচা যোগাড় করে কাসুকে নিয়ে মায়মুন শফিদের ঘরের ছাঁচতলায় যায়। দু’হাতে আঁইচা দুটো নিয়ে ঠুকতে আরম্ভ করে—ঠর্‌র্‌ ঠর্‌র্‌।

    এ রকম শব্দে ঝিঁঝিঁ পোকা আকৃষ্ট হয়! জঙ্গল থেকে বেরিয়ে শব্দকে কেন্দ্র করে উড়তে থাকে। যখন হাতের কাছের কোন কিছুর উপরে বসে, তখন ধরতে বেগ পেতে হয় না।

    নিজের অসামর্থ্যের জন্য অবুঝ ছেলের কাছেও লজ্জিত হয় জয়গুন। পেটের ছেলে, তবুও নিজেদের দৈন্য ঢেকে রাখবার চেষ্টা করে সে সব সময়। হাসু ও মায়মুনকে কম করে খেতে দিলেও কাসুকে খেতে দিতে হয় পুরো। যেন সে অভাবের কথা জানতে না পারে।

    কাসু হাঁড়ির খবর জানে না। জাবার বয়সও তার নয়। তা ছাড়া জানবার মত কোন কারণও জয়গুন ঘটতে দেয়নি আজ পর্যন্ত।

    জয়গুন শুনতে পায় নারকেলের আঁইচা বাজিয়ে মায়মুন ও কাসু ঝিঁঝি ধরার ছড়া গাইতে শুরু করেছে?

    ঝিঁঝি লো, মাছি লো,

    বাঁশতলা তোর বাড়ী,

    সোনার টুপি মাথায় দিয়া

    রূপার ঝুমুর পায়ে দিয়া

    আয়-লো তাড়াতাড়ি।

    ঝিঁঝি ঝিঁঝি করে মায়,

    ঝিঁঝি গেছে সায়বের নায়,

    সাতটা কাউয়ায় দাঁড় বায়,

    ঝিঝিলো তুই বাড়ীত আয়।

    ঝিঝির বাপ মরছে

    কুলা দিয়া ঢাকছে,

    ঝিঁঝির মা কানছে,

    আয়-লো ঝিঁঝি বাড়ীত্ আয়।

    কিন্তু এ রকম ফাঁকি দিয়ে আর কত দিন? কাল রাত পোহালেই যখন এক মুঠো ভাত দিতে পারবে না ছেলের মুখে, তখন কি এ অভাবের কথা গোপন থাকবে ছেলের কাছে? ক্ষুধায় অস্থির হয়ে যখন সে ‘ভাত ভাত করে চিৎকার করবে, তখন মা হয়ে কি জবাব দেবে সে? জবাব না পেয়ে সে কি তখন বুঝবে না যে, তার মা অপদার্থ, খেতে দিতে পারে না। জয়গুন ভাবে এসব কথা। এ ভেবে আরো ব্যথিত হয় যে পেট ভরে খেতে দিতে না পারলে কাসুর কাছে তার বুকভরা স্নেহের কোন দামই আর থাকবে না। ছেলের আস্থা থাকবে না মা-র ওপর। মা-র স্নেহের ছায়ায় আসার জন্য একদিন সে অস্থির হয়ে উঠেছিল। এবার ক্ষুধার তাড়নায় করিম বুকশের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্যে সে অস্থির হয়ে উঠবে আবার।

    সন্ধ্যার পর তিনপো চাল গামছায় বেঁধে হাসু বাড়ী আসে।

    জয়গুন চোখ টিপে হাসুকে জিজ্ঞেস করে—মাছ কই হাসু? তোরে না কইছিলাম, ইলশা মাছ আনতে?

    হাসু কথার ধরন বুঝতে পেরে বলে—ইলশা কাতলা কোন মাছই পাইলাম না বাজারে। মাছ মোডে নাই।

    দু’দিনের না-খাওয়া জয়গুনের বুকের ভেতর ধড়ফড় করে। পেটের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে মাঝে মাঝে, যেন নাড়ি-ভুড়িগুলোও হজম হয়ে যাচ্ছে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। গামছায় বা ধা চাল দেখে তার ক্ষুধা আরো বেড়ে যায়।

    জয় গুন সমস্তটা চাল নিয়ে হাঁড়ি বসায় আজ। ভোরের জন্যে রেখে দেয় না কিছুই। এই বেলা খেয়ে কিছু যদি বাঁচে তবে ছেলে-মেয়েরা পান্তা ভাত খেতে পাবে ভোরে। কিন্তু সে আশা কম। তার মনে হয়, একাই সে তিনপো চালের ভাত খেতে পারবে এখন।

    কচুর লতির চচ্চড়ি ও ডাটা শাক দিয়ে পরম তৃপ্তির সঙ্গে ভাত খায় সকলে। অনাহারে শুকনো বুকে ভাত ঠেকে জয়গুনের। বাবার পানি খেয়ে সে বুক ভিজিয়ে নেয়।

    জয়গুন বলে হাসুকে-কি চাউল রে! ফেনা যে ঘাডের পানি মতন। আবার চুকা। দেইখ্যা আনতে পারস না?

    —চাউল পাওয়া যায় না বাজারে, তার আবার দেইখ্যা আনুমু। কত কষ্টে এই চাউল যোগাড় করলাম। বারো ছটাক বারে অনা। কাইল বাজারে ঢোল দিছিল ম্যাজিস্টর সাব—নয় আনার বেশী এক সেরের দাম নিলে জরিমানা অইব। এই-এর লেইগ্যা বাজারে চাউল নাই। মহাজনরা গোলায় গুঁজাইয়া থুইছে চাউল।

    খাওয়া শেষে হাঁড়িতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

    ছেলে-মেয়েরা মুমিয়ে পড়েছে সকাল সকাল। দু’দিনের অনাহারের পর ভাত খেয়ে জয়গুন আরো শ্রান্ত হয়ে পড়েছে। আজ তার শরীর ঝিমঝিম করে। চোখ দিয়ে পানি ঝরে

    জয়গুন বসে বসেই এশার নামাজ শেষ করে। প্রতিদিনের মত তসবীহ নিয়ে জপতে আরম্ভ করে। কিন্তু সকাল কাজের মধ্যে ঐ এক চিন্তা–কাল রাত পোহালে ছেলে-মেয়েরা মুখে কী দেবে? হাসু কী খেয়ে কাজে যাবে? কার কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার কিছু নেই।

    জয়গুনের উত্তরে চাল কিনতে যাওয়ার সাথী লালুর মা দু’দিন এসেছিল। অনেক সাধাসাধি করেছিল ফতুল্লার ধান কলে কাজ করার জন্যে। কিন্তু জয়গুন তওবার কথা ভেলে নি। হাতে পায়ে যে শিকল সে পরেছিল সেদিন, তা খুলবার সাহস তার নেই। শক্তি পায় না। নিতান্ত অসহায়ভাবে সে লালুর মা-র প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আজ লালুর মা-র বলা কয়েকটি কথা বারবার তার মনে আসে। সে বলছিল-না খাইয়া জানেরে কষ্টে দিলে খোদা ব্যাজার সয়। মরলে পরে খোদা জিগাইব, তোর আত-পা ও দিছিলাম কিয়ের লেইগ্যা? আত দিছিলাম খাটবার লেইগ্যা, পাও দিছিলাম বিদ্যাশে গিয়া টাকা রুজি করনের লেইগ্যা।

    লালুর মা কথায় কথায় গ্রাম্য গীতের কয়েকটা লাইনও গেয়ে উঠেছিল সেদিন:

    আত আছিল, পাও আছিল,

    আছিল গায়ের জোর,

    আবাগী মরল ওরে

    বন্দ কইর‍্যা দোর।

    কথাগুলো আজ তার নতুন অর্থ, নতুন ব্যাখ্যা নিয়ে জনের চিন্তাকে নাড়া দেয়। লালুর মা-র প্রস্তাবকে সে বারবার বিবেচনা করে দেখে। ধান কলের কাজ এমন কিছু নয়। ধান ঘাটা, ধান রোদে দেয়া, চাল ঝাড়া—এই সব কাজ। রোজ পাচসিকা করে পাওয়া যায়। তা ছাড়া খুদ-কুড়াও পাওয়া যায় চেয়ে-চিন্তে।

    মনের দুই বিরোধী চিন্তার সংঘর্ষের মধ্যে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে।

    মশার কামড় খেয়ে মায়মুন হাত-পা নাড়ছে। জয়গুন তাকায় ঐ দিকে। হাসু বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। সারাদিন খেটে তার আর হুঁশ নেই। মশার কামড়েও তার ঘুমের ব্যাঘাত হয় না। কাসু তার মিয়াভাইর গলা ধরে তার গায়ের ওপর একখানা পা চড়িয়ে দিয়ে ঘুমুচ্ছে। কুপির অস্পষ্ট আলোকে ছেলেমেয়েদের দিকে সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তাদের কচি মুখ জয়গুনকে তার পথের সন্ধান বাতলে দেয়, তওবার কথা সে ভুলে যায়। লালুর মা-র। প্রস্তাব মাথায় নিয়ে কাল যাবে সে ধান কলে কাজ করতে। হাতে পায়ে তাকত থাকতে কেন সে না খেয়ে মরবে? ক্ষুধার অন্ন যার নেই, তার আবার কিসের পর্দা, কিসের কি? সে বুঝেছে, জীবন রক্ষা করাই ধর্মের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ মূলমন্ত্র। জীবন রক্ষা করতে ধর্মের যে কোন অপ-আক্রমণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে সে প্রস্তুত। উদরের আগুন নিবাতে দোজখের আগুনে ঝাপ দিতেও তার ভয় নেই।

    জয়গুন সুঁই-সুতো নিয়ে কাপড় সেলাই করতে বসে। কাপড়টা অনেক জায়গায় ছিড়ে গেছে। এ কাপড় নিয়ে বেরোবার উপায় নেই। হাসুর গামছা বুকে জড়িয়ে গায়ের আঁচলটা আগে সেলাই করে। সেটা শেষ হলে বাকী আঁচলটা সেলাই করে তারপর।

    ভোর হয়। ঘুম থেকে জয়গুন ওঠে নতুন প্রাণ, নতুন উদ্যম নিয়ে।

    শফির মা-র কাছ থেকে চাল ধার করে রান্না হয়। ছেলেমেয়েকে খাইয়ে, নিজে খেয়ে জয়গুন বেরিয়ে পড়ে।

    ধানখেতের আল ধরে পথ চলে জয়গুন। হাঁটু-সমান উঁচু ধান গাছে ভরা মাঠ। যেন সবুজ দরিয়া। ঝিরঝিরে বাতাস ঢেউ-এর নাচন তোলে। ছড়িয়ে দেয় মাঠের এক প্রান্ত হতে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত। দূরপ্রসারী মাঠের দিকে তাকিয়ে জয়গুনের চোখ জুড়ায়।

    খেতের কাজে ব্যস্ত চাষীরা তাকায় জয়গুনের দিকে। কিন্তু তার ভ্রূক্ষেপ নেই। গদু প্রধান তার খেত তদারক করছিল। সকলের অলক্ষ্যে সে মাথা নাড়ে আর বলে—তোরে শাসন করতে পারতাম না! আমার নাম গদু পরধান। এটু সবুর কর।

  • ঊনিশ পরিচ্ছেদ

    ঊনিশ পরিচ্ছেদ

    ঊনিশ পরিচ্ছেদ

    সূর্য-দীঘল বাড়ীর ভূত ক্ষেপেছে।

    রাতে জয়গুনের ঘরের বেড়া ও চালের ওপর ঢিল পড়তে শুরু করে। হাসু, কাসু ও মায়মুন চিৎকার করে ওঠে, শেষে গলা দিয়ে চিৎকারও বের হয় না। ভয়ে তারা মা-কে জড়িয়ে ধরে।

    ওদিকে শফির মা-র চিৎকার শোনা যায়।

    পরের দিন ভোরে সে বলে–হেসুম কইছিলাম পাহারা বদলাইতে। অখন দ্যাখ কি দশা অয়! গাছগুলা কাটতে মানা করছিলাম। কোন্ গাছে কি আছিল, কে জানে? ওগ বাসা ভাইঙ্গা দেওনে রাগ অইছে।

    পরের রাত্রেও এমনি ঢিল পড়ে। গ্রামে এই নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেছে। সূর্য-দীঘল বাড়ীর কাছ দিয়ে আর কেউ হাঁটে না।

    গ্রামের বুড়ো সোনাই কাজী বলে—সূর্য-দীগল বাড়ীর ভূত ক্ষেপছে, আর উফায় নাই। সূর্য-দীগল বাড়ীতে মানুষ উজাইতে পারে না, বুড়া-বুড়ীর কাছে হুনছি। সূর্য-দীগল হাটেরও উন্নতি অয় না। আমার চাউথেই দ্যাখলাম, জলধর কুণ্ডু, কুণ্ডেরচরে হাট মিলানোর লেইগ্য কত টাকা খরচ করল। কত হরিলুট দিল। ব্যাপারীগ মিডাই খাওয়াইল, নট্ট কোম্পানীর যাত্রা গানেও দুই এক আজার টাকা খরচ করছিল। কিন্তু কই? হাট আর মিলাইতে পারল না।

    থুথুরে বুড়ী হনুফা বিবি বলে আমার মামু একবার সূর্যুদীগল মৌপোকের বাসা ভাঙছিল। আমার মনে আছে। গাছের তন নামতে না নামতে আঁড়ির তলা ভাইঙ্গা মধু পইড়া গেল। কী তেজ! বাপ্পুসরে!

    জয়গুন ছেলে-মেয়েদের নিয়ে রাত্রে শফির মা-র ঘরে আশ্রয় নেয়। ছেলে-মেয়েদের বুকে নিয়ে সারারাত ‘আল্লা আল্লা’ করে।

    অমাবস্যার রাত। করিম বক্‌শ গালে হাত দিয়ে কুপির সামনে বসে ভাবছে। তার মরে চোখে ভাসে—জয়গুনের ঘরে ঢিল পড়ছে দাডুম-দুড়ুম। তার বুকে কাসু ও মায়মুন ভয়ে মিইয়ে গেছে। হাসু পাশে বসে বসে কাঁপছে চোখ বন্ধ করে। জয়গুন আর একা এদের সামলাতে পারছে না। করিম বশের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সে। তার চোখের অব্যক্ত ভাষায় সে যেন সাহায্য চাইছে তার কাছে।

    করিম বক্‌শ গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। তাকের ওপর থেকে চারটে গজাল নিয়ে গামছায় বাঁধে। জোবেদ আলী ফকিরের নির্দেশমত আজ এই অমাবস্যার দুপুর রাতে সূর্য-দীঘল বাড়ীর চার কোণে মন্ত্রসিদ্ধ গজাল ক’টা পুঁতে আসতে হবে তাকে।

    সূর্য-দীঘল বাড়ী ঠিক-ঠাক কারে জোবেদ আলী ফকির সেই যে একটি পেতলের কলসী দাবী করেছিল, আজ পর্যন্ত তাকে দেয়া হয় নি সে কলসী। বছর বছর পাহারা বদলাবার কথাও সে বলেছিল। তাতেও কান দেয়নি জয়গুন ও শফির মা। এ জন্যে গোস্বা হয়ে সে করিম বক্‌শকে জানিয়েছিল—এইবার দেখুক মজাখান। সাত দিনের মধ্যে বেবাক মিস্মার অইয়া যাইব। করিম বক্‌শ একটা পেতলের কলসী কিনে দিয়ে এবং অনেক হাতে-পায়ে ধরে জোবেদ আলী ফকিরের রাগ মাটি করেছে।

    ফকির গজাল কয়টায় ফুঁ-ফাঁ দিয়ে তুকতাক করে করিম বকশের হাতে দিয়ে বলে-পরশু অমাবইস্যা। রাইত দুফরের পর–। চাইর কোণে চাইড্ডা—

    –আমার ডর করে যে! একলা যাইতে সাবাসে কুলায় না। করিম বক্‌শ বলে।

    —ডর করে! কও কি?

    একটু চিন্তা করে ফকির বলে—আইচ্ছা, হেই দাওয়াইও আছে। করিম বকশের কাঁধে দুই হাত রেখে ফকির টানা সুরে মন্ত্র পড়ে–

    খাটো কাপড় উলট বেশে

    বাণ মারলাম হেসে হেসে।

    সেই বাণে মেদিনী কাঁপে,

    জল কাঁপে, থল কাঁপে,

    চান কাঁপে, তারা কাঁপে,

    পাতালের বাসুকী কাঁপে,

    আগে ভাগে ভূত-পেরেতে,

    জিন ভাগে শেষে।

    কালা বাণে ভূত মারলাম,

    পেত্নী বানলাম কেশে।

    মন্ত্র পড়ে করিম বক্‌শের বুকে ও চোখে সাতবার ফুঁ দিয়ে ফকির এবার বলে-ডরের মাজা ভাইঙ্গা দিছি। যাও এইবার, আর ডর নাই। পরশু রাইত দুফরের পর, মনে থাকে যেন। চাইর কোণায় চাইড্ডা–

    চারটি গজাল—বাড়ীর চার পাহারাদার। ঠিক-ঠাকে বসিয়ে আসতে পারলে ভূত-পেত্নীর দৌরাত্ম আর থাকবে না।

    কুপি নিবিয়ে করিম বক্‌শ লাফ দিয়ে ঘর থেকে বেরোয়। সে পা ফেলে জোরে, আরো জোরে। কালো রাত্রির জমাট অন্ধকার যেন ভয় পেয়ে তার চলার পথ ছেড়ে দেয়।

    ঈশান ও বায়ু কোণে দুটি গজাল পুঁতে সে পশ্চিম দিকে চলে আসে। ঘন অন্ধকার। তার মাঝেও দৃষ্টি চলে করিম বক্‌শের।- তিনটা ছায়ামূর্তি! ভয়ে তার গায়ের রোম কাটা দিয়ে ওঠে। সূর্য-দীঘল বাড়ীর তাল গাছের তলায় সে থমকে দাঁড়ায়। কাঁপতে কাঁপতে বসে পরে মাটিতে।

    ছায়ামূর্তিগুলো ঢিল ছুঁড়ছে আর তারই দিকে সরে সরে আসছে। করিম বক্‌শ একটা শব্দহীন চিৎকার করে ওঠে। বার কয়েক টিপটিপ করে যন্ত্রটা যেন বন্ধ হয়ে যায়। একটা মূর্তি আরো কাছে সরে আসে তার। করিম বক্‌শের গায়ে ধাক্কা লাগে লাগে। এবার করিম বক্‌শ চিনতে ভুল করে না। হৃদযন্ত্রটা আবার বার দুই ঢিপঢিপ করে চালু হয়ে যায়। হঠাৎ ঘাম দিয়ে তার ভয়ও কেটে যায়। সে দাঁড়ায়। পাশ থেকে খপ করে ছায়ামূর্তির একটা হাত চেপে ধরে- গদু পরধান! তোমার এই কাম!!…!!!

    সূর্য-দীঘল বাড়ীর তালগাছের তলায় করিম বক্‌শের মৃতদেহ টান হয়ে পড়ে আছে। আশ-পাশ গ্রামের লোক ছুটে আসে দেখ্‌তে। মৃতের শরীরে কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। সকলেই একমত— সূর্য-দীঘল বাড়ীর ভূত তার গলাটিপে মেরেছে।

    যে হিম্মত বুকে বেধে জয়গুন এত দিন সূর্য-দীঘল বাড়ীতে ছিল, তা আজ খান্‌ খান্‌ হয়ে যায় এ ঘটনার পরে।

    আজ বারবার করিম বকশের কথাই মনে পরে জয়গুনের। বেদনায় বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। দরদর ধারায় পানি ঝরে গাল বেয়ে। আহা বেচারা! জীবনে কাউকে ভালোবাসেনি। কারো ভালোবাসা পায়ও নি সে।

    শফির মা আগে আগে গাইরি-বোচকা বাঁধে। জয়গুন জিজ্ঞেস করে—বাড়ী ছাইড়া কই যাইবা?

    —আগেত সোনার মানিকগো লইয়া বাইর অ। খোদার এত বড় দুইন্যায় কি আর এট্টু জা’গা পাইতাম না আমরা?

    ছেলে-মেয়েদের হাত ধরে জয়গুন ও শফির মা বেরিয়ে পড়ে। মনে তাদের ভরসা খোদার বিশাল দুনিয়ায় মাথা গুঁজবার একটু ঠাঁই তারা পাবেই।

    চলতে চলতে আবার জয়গুন পেছন ফিরে তাকায়। সূর্য-দীঘল বাড়ী! মানুষ বাস করতে পারে না এ বাড়িতে। দু’খানা ঝুপড়ি। রোদ বৃষ্টি ও অন্ধকারে মাথা গুঁজবার নীড়। দিনের শেষে, কাজের শেষে মানুষ পশু-পক্ষী এই নীড়ে ফিরবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে।

    ঐ উঁচু তালগাছ অনেক কালের অনেক ঘটনার নীরব সাক্ষী এটা। তারা এগিয়ে চলে।

    বহুদূর হেঁটে শ্রান্ত পা-গুলোকে বিশ্রাম দেয়ার জন্যে তারা গাছতলায় বসে। উঁচু তালগাছটা এত দূর থেকেও যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

    আবার তারা এগিয়ে চলে…….

  • শব্দ-পরিচিতি

    শব্দ-পরিচিতি

    সঙ্কেত

    অ-ক্রি – অসমাপিকা ক্রিয়া

    অব্য – অব্যয়

    আ. – আরবি

    ইং – ইংরেজি

    উ. – উর্দু

    ক্রি – ক্রিয়া

    ক্রিবিণ – ক্রিয়া-বিশেষণ

    তা. – তামিল

    তু. – তুর্কীয় ভাষা

    দ্র – দ্রষ্টব্য

    দেশী – দেশীয় ভাষা

    প্রা. – প্রাকৃত

    ফা. – ফারসি

    বি – বিশেষ্য

    বিণ – বিশেষণ

    সং – সংস্কৃত

    সর্ব. – সর্বনাম

    হি – হিন্দি

    লেখ্য রূপ (সাধু) : লেখ্য ও কথ্য রূপ (চলিত)

    [ ] তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে শব্দের ব্যুৎপত্তি ও জাতি নির্দেশ করা হয়েছে।


    অইডা সর্ব. ঐটা : ওটা।

    অইব ক্রি হইবে : হবে।

    অইবা ক্রি হইবে : হবে।

    অইলা ক্রি হইলে : হলে।

    অইলাম ক্রি হইলাম : হলাম।

    অইলেও ক্রি হইলেও : হলেও।

    অউয়ত বি হওয়া, জন্মানো।

    অউয়ত-মউয়ত বি জন্ম-মৃত্যু [আ. মওত থেকে মউয়ত]

    অউক ক্রি হউক : হোক।

    অখুনি ক্রিবিণ এইক্ষণে : এখনি, এক্ষুণি এই মুহূর্তে।

    অজম বি হজম, পরিপাক। [আ. হদ্‌ম্]।

    অড়কল বি গলার অলঙ্কার-বিশেষ।

    অতশত বিণ ক্রিবিণ অতপ্রকার।

    অম্বায় ক্রিবিণ অমনভাবে। ঐভাবে : ওভাবে।

    অয় ক্রি হয়।

    অর সর্ব. উহার : ওর।

    অলক্ষী বিণ অলক্ষুণে : কুলক্ষণযুক্ত, অপয়া।

    অহন ক্রিবিণ এইক্ষণ : এখন।

    আইচ্ছা বিণ আচ্ছা, বেশ, ভাল, উত্তম।

    আইজ অব্য অদ্য, আজ।

    আইছি ক্রি আসিয়াছি : এসেছি।

    আইজগা অব্য অদ্য : আজকে।

    আইচা বি নারকেলের মালা।

    আঁইট্যা ক্রি হাঁটিয়া : হেঁটে।

    আইতে অ-ক্রি আসিতে : আসতে।

    আইন্যা অ-ক্রি আনিয়া : এনে।

    আইয়া অ-ক্রি আসিয়া : এসে।

    আইল ক্রি আসিল : এলো।

    আইলে অ-ক্রি আসিলে : এলে।

    আক্কল বি আক্কেল, বুদ্ধি, বিবেচনা । [আ. আক্‌ল্]

    আকাল বি দুর্ভিক্ষ, দুঃসময়। [সং অকাল]

    আঁড়ি বি হাঁড়ি। [সং হণ্ডী]

    আঁস বি হংস, হাঁস।

    আঁসা বি হংস : হাঁসা, হাঁস।

    আঁসী বি হংসী : হাঁসী।

    আক্রা বিণ অক্রেয় : আক্রা। দুর্মূল্য।

    আখা বি উনান, চুলা, চুলো। [তু. সং উখা = হাঁড়ি]

    আছিল ক্রি ছিল।

    আজগাই বিণ অদৃশ্য থেকে হঠাৎ আগত [ফা. + আ. আজগায়েব]

    আজাব বি শাস্তি। [আ.]

    আঁটি বি গুচ্ছ। [দেশী]

    আড্ডি বি হাড্ডি, হাড়, অস্থি। [সং হড্ডি]

    আণ্ডা বি ডিম্ব, ডিম। [সং অণ্ড]

    আণ্ডালু বিণ ডিম্ববতী, ডিম পাড়ে এমন।

    আত বি হস্ত, হাত।

    আদত বিণ আসল। [সং আদিত, আ. আদদ]

    আদনা বিণ সামান্য। [ফা.]

    আবডাল বি আড়াল, অন্তরাল। [সং অন্তরাল]

    আ’বি ক্রি আসিবি : আসবি।

    আলয় বি ঘর-বাড়ী, আশ্রয়।

    আলাই-বালাই বি আপদ-বালাই, বিঘ্ন, বিপদ। [আ. ৱলা]

    আ’লি ক্রি আসিলি : এলি।

    আলীশান বিণ জবরদস্ত, শক্তিশালী। [আ. ফা.]

    আল্লাদি বিণ আহ্লাদী, আদুরী : আহ্লাদে, আদুরে।

    আলৈয়া বি আলেয়া।

    আষ্ট বি বিণ আট, আট-সংখ্যক। [সং অষ্ট]

    আসমাইন্যা বিণ আকাশ-চুম্বী [ফা. আসমান + বা. ইয়া]

    আস্তা বিণ আস্ত, অভগ্ন, গোটা।

    আহাল বি আকাল, দুর্ভিক্ষ। [সং অকাল]

    আঁচি বি হাঁচি। [সং হঞ্ছি]

    অ্যারে অব্য ওরে (সম্বোধনসূচক)।

    ইসাব বি হিসাব হিসেব।

    ইসাব-কিতাব বি হিসাব-নিকাশ : হিসেব-নিকেশ। আয়-ব্যয়ের বিবরণপত্র : বিচার-বিবেচনা।

    উইটা সর্ব. ঐটা : ওটা।

    উইট্যা অ-ক্রি উঠিয়া : উঠে।

    উখ বি ইক্ষু : আখ।

    উর মাডি বি উর্বর মাটি।

    উনা বিণ ন্যূন, ঊনা : উনা, উনো। [সং ঊন]

    উন্নিশ-বিশ বিণ উনিশ-বিশ, সামান্য পার্থক্য।

    উফায় বি উপায়, অভীষ্ট লাভের বা কার্যসাধনের প্রণালী।

    উম বি ওম, উষ্ণতা। [সং উষ্ণ]

    উলডা বিণ উলটা : উলটো। [তু. হি. উল্লাট, প্রা. অল্লটে]

    একপদ বিণ এক প্রকার, এক রকম।

    এক্কই চোডে ক্রিবিণ একই চোটে, একই বারে, একই দফায়।

    এক্কেরে ক্রিবিণ একেবারে, সম্পূর্ণরূপে।

    এট্টু বিণ একটু, সামান্য।

    এডুক বিণ এইটুকু : এটুকু।

    এতনা বিণ এতটা [হি.]

    এম্বায় ক্রিবিণ এমনভাবে : এমনিভাবে।

    ওইডা সর্ব, ঐটা।

    ওড ক্রি উঠ : ওঠ।

    ওয়াতে অব্য সর্ব. উহাতে, তাহাতে : তাতে।

  • পদ্মার পলিদ্বীপ

    পদ্মার পলিদ্বীপ

    পদ্মার পলিদ্বীপ1

    পদ্মার পলিদ্বীপ কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের দ্বিতীয় উপন্যাস এবং চতুর্থ প্রকাশিত গ্রন্থ। ‘মুক্তধারা’ গ্রন্থটি প্রকাশ করে ১৯৮৬ সালের এপ্রিলে। এই সংস্করণে প্রদত্ত ছোট্ট ভূমিকা থেকে জানা যায় লেখক এটি লিখতে শুরু করেছিলেন ১৯৬০ সালে, আর লেখা সমাপ্ত করেন ১৯৮৫ সালে। এর মাঝে উপন্যাসের ষোলটি অধ্যায় মুখর মাটি নামে বাংলা একাডেমীর ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। দীর্ঘ বিরতির পর শেষ হয়েছে এই উপন্যাস এবং প্রকাশিত হয়েছে পদ্মার পলিদ্বীপ নামে।

    উপন্যাসে যে সময়ের কথা বিধৃত হয়েছে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময়। জাপানী বাহিনী সিঙ্গাপুর দখল করে বার্মা দখল করেছে। ব্রিটিশরা আতঙ্কিত ভারতে দখল বজায় রাখা নিয়ে। ব্রিটিশ-বিরোধী ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন চলছে দেশজুড়ে। উপন্যাসে সমকালীন বিশ্বের প্রসঙ্গ বলতে গেলে এটুকুই। বাকি পুরো উপন্যাস শুধুমাত্র পদ্মার পলিদ্বীপে বসবাসরত মানুষদের নিয়ে। বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এই জনপদগুলি যুদ্ধের অভিঘাতে জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্যে ও কেরোসিন-নুনের দুস্প্রাপ্রাপ্যতায় হতচকিত হয় বটে, কিন্তু ঐ পর্যন্তই। এর বেশি যোগাযোগ তারা বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে রাখার প্রয়োজন বোধ করে না। কেননা নিজেদের নিতান্ত জৈবিক অস্তিত্ত্বটুকু টিকিয়ে রাখার জন্য তারা শুধুমাত্র কৃষিকেই উপায় বলে জানে। কৃষি মানে জমি। জমি মানে তাদের কাছে পদ্মার পলিদ্বীপ। জেগে ওঠা ও তলিয়ে যাওয়ার অবিরাম অনিশ্চয়তার মধ্যে এই পলিদ্বীপ নিয়েই তাদের চিন্তা। পলিদ্বীপে চাষ-বাস করা, দ্বীপ তলিয়ে গেলে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়া, নতুন জেগে ওঠা চর দখলে জন্য যুথবদ্ধ পশুর মতো লড়াই করা—এই নিয়েই তাদের জীবন।

    এই সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় কিছু প্রকাশিত সংবাদের কারণে হয়তো দেশের অন্য অঞ্চলের শিক্ষিত পাঠক এদের কথা কিছুটা জানতে পান, কিন্তু তাদের বা আমাদের সার্বিক ধারণাটাই যে কতটা অস্বচ্ছ ও অসম্পূর্ণ তা পদ্মার পলিদ্বীপ পাঠের আগে অনেকেরই বোধগম্য হবে না। উপন্যাসের এরফান মাতব্বর, তার পরিবার , তার পুলকী-মাতব্বর, কোলশরীকদের নিয়ে নিজেদের হারানো চর খুঁজে বেড়ায়। তাদের সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ার কারণও এই পদ্মা। কারণ- “পদ্মার অজগর স্রোত গিলে খেয়েছে, উদরে টেনে নিয়েছে সব জমি। গুণগাঁর নমকান্দি থেকে শুরু হয়েছিল ভাঙা। তারপর বিদগাঁর কোণা কেটে, দীলির আধাটা গিলে, কাউনিয়াকান্দা, ডিঙ্গাখোলা, লক্ষীচর আর মূলভাওরকে বুকে টেনে চররাজাবাড়ির পাশ কেটে উন্মাসিনী পদ্মা গা দোলাতে দোলাতে চলে গেছে পূব দিকে। তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এঁকেবেঁকে চলেছে ডানে আর বাঁয়ে।”

    এরফান মাতব্বর কথায় কথায় বলে “চরের বাড়ি মাটির হাড়ি, আয়ু তার দিন চারি”। বলে বটে, কিন্তু চর ছাড়া অন্য কোনো ভূগোল বোঝে না সে। বুঝতেও চায় না। সে অপেক্ষা করে, কবে ফের জেগে উঠবে তাদের খুনের চর। আসল নাম লটাবনিয়ার চর। সেই চরের দখল নিতে নিজের প্রথম পুত্র রশীদসহ পাঁচ পাঁচজন মানুষ খুন হয়ে যাওয়ায় চরের নাম হয়েছে খুনের চর। এরফান মাতব্বরের প্রতীক্ষার চরের জেগে ওঠা প্রথম অবিষ্কার করে তার দ্বিতীয় পুত্র ফজল। তখনই শুরু হয় উপন্যাসের সকল পাত্র-পাত্রীর সচল হয়ে ওঠা।

    তারা চরে গিয়ে ওঠে, ভাওর ঘর তোলে, নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে নেয়, সালামি আদান-প্রদান করে, জমিদারের কাছারিতে গিয়ে নায়েবকে সালামি দেয়, খাজনা দেয়, চরের মাটিতে রোপা ধান রুইতে শুরু করে। তাদের পুরনো শত্রু চেরাগ সরদার এবার চর দখল করতে আসবে না, এটা জানা ছিল। এই বিপদের আশংকাও কারো মনে ছিল না। কিন্তু বিপদ এলো। এলো সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত দিক থেকে। জঙ্গুরুল্লা দাঁড়াল তাদের পথের কাঁটা হয়ে। পঁয়তাল্লিশ বছরের জঙ্গুরুল্লার জীবনে চল্লিশ বছরই কেটেছে অবর্ণনীয় কষ্টে। সারা জীবন কাজ করতে হয়েছে। ফলে কখনো শুকায়নি শরীরের ঘাম। অথচ পেটে জ্বলছে খিধের আগুন। গরীব কৃষক গরীবুল্লার সন্তান জঙ্গুরুল্লা সাত বছর বয়সে মাতৃহারা। পদ্মা অববাহিকার প্রচলিত প্রবাদ—মা মরলে বাপ অয় তালই।’ বাবার দ্বিতীয় বিয়ে, সৎমায়ের নির্যাতন। জঙ্গুরুল্লার বয়স দশ বছর হতে না হতেই কাজ নিতে হয় হোগলাচরের এক চাষীগেরস্তের বাড়িতে। সেখানে পেটে-ভাতে রাখালি পাঁচ ছয় বছর। তারপর দুইটাকা বেতনে ঐ চরেরই আরেক বড় গেরস্তের বাড়িতে চাষের কাজ। বছর চারেক পরে বাপের মৃত্যু। সৎ মা তার ছয় বছর বয়স্কা মেয়েকে নিয়ে ‘নিকে বসে’ অন্য জায়গায়। জঙ্গু ঘোপচরে বাপের ভিটেতে ফিরে আসে। গাঁয়ের দশজনের চেষ্টায় তার বিয়েটাও হয়ে যায়। বউ আসমানী গরীব ঘরের মেয়ে। গোবরের খুঁট দেওয়া থেকে শুরু করে ধানভানা, চাল ঝাড়া, মুড়ি ভাজা, ঘর লেপা, কাঁথা সেলাই, দুধ দোয়ানোসহ সব কাজেই তার হাত চলে। আবার অভাব-অনটনে দুই-এক বেলা উপোস দিতেও কাতর হয় না।

    এর মধ্যে একটি কাণ্ড ঘটে যায়। ঘোপচরের মাতব্বর সোহরাব মোড়লের ছেলের বিয়ের বরযাত্রী হয়ে গিয়েছিল জঙ্গুরুল্লা। কনে পক্ষের বাড়ি চরে নয়। তারা ভদ্র গেরস্ত। বরযাত্রীদের বসার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছিল ধবধবে ফরাসের। সেই ফরাসের উপর জঙ্গুরুল্লা তার থ্যাবড়া পায়ের কয়েক জোড়া কাদার ছাপ ফেলেছিল। তা দেখে চোখটিপে হেসেছিল কনেপক্ষের লোকেরা। লজ্জার কান কাটা গিয়েছিল সোহরাব মোড়লের। বাড়ি ফিরে জুতো খুলে মারতে গিয়েছিল জঙ্গুরুল্লাকে। ডেকেছিল পা-না-ধোয়া শয়তান বলে। ব্যাস তখন থেকেই জঙ্গুরুল্লার নামের আগে যোগ হয়ে যায় অমোচনীয় বিশেষণ—পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লা। নামের আগে এই বিশেষণ যোগ না করলে তাকে আর চিনতে পারে না পদ্মা অববাহিকার মানুষ। খড়িশার কাছারির নায়েব শশীভূষণ দাসকে ঘটনাক্রমে পাগলা শেয়ালের হাত থেকে বাঁচিয়ে তার কৃপা লাভ করে জঙ্গুরুল্লা। নায়েব তাকে পেয়াদার চাকরিতে বহাল করে নেন। মাসিক বেতন তিন টাকা। পেয়াদার চাকরিতে বেতন বেতনই। আসল উপার্জন হচ্ছে উপরি। তার সঙ্গে ক্ষমতার সংযোগ। নায়েবের হুকুমে সে বকেয়া খাজনা জন্য প্রজাদের ধরে নিয়ে যেত কাছারিতে। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ব্যবহার করত সাড়ে তিন হাত লাঠি। কখনও তাদের হাত-পা বেঁধে চিৎ করে রেখে শুইয়ে রাখত, কখনও কানমলা , বাঁশডলা দিয়ে ছেড়ে দিত। পাঁচ বছর পরে তার চাকরী চলে যায়। ততদিনে জমি-জমা সংক্রান্ত ফন্দি-ফিকির, প্যাঁচ-ঘোচ শিখে গেছে জঙ্গুরুল্লা। বাংলা ১৩৪৬ সালে বর্ষা শেষে আশ্বিন মাসে মাঝ নদীতে একটার পর একটা চর ভাসতে শুরু করে। জঙ্গুরুল্লা সবগুলি চরই দখল করে নেয়। কুণ্ডু আর মিত্র জমিদারদের কাচারি থেকে বন্দোবস্ত এনে বসিয়ে দেয় কোলশরীক। তাদের কাছ থেকে মোটা হারে সেলামি নিয়ে সে নিজের অবস্থা ঘুরিয়ে ফেলে।

    চরপাঙ্গাশিয়ায় নতুন বাড়ি ওঠে তার। “উত্তর, পূব আর পশ্চিম ভিটিতে চৌচালা ঘর ওঠে। দক্ষিণ ভিটিতে ওঠে আটচালা কাচারি ঘর। নতুন ঢেউটিনের চালা আর পাতটিনের জোড়া দিয়ে ঘরগুলো দিনের রোদে চোখ ঝলসায়। রাতে চাঁদের আলোয় বা চলন্ত স্টিমারের সার্চলাইটের আলোয় ঝলমল করে।”

    টাকার জোর, মাটির জোর আর লাঠির জোরের সঙ্গে এখন তার চাই সম্মানের জোর। সেই সম্মানের জোর অর্থাৎ মান-সম্মান বাড়ানোর জন্য জঙ্গুরুল্লা টাকা খরচ করতেও কম করছে না। গত বছর সে মৌলানা তানবীর হাসান ফুলপুরীকে বাড়িতে এনে মস্তবড় এক জেয়াফতের আয়োজন করেছিল। যে জেয়াফতে গরুই জবাই হয়েছিল আঠারোটা। দাওয়াতী-বেদাওয়াতী মিলে অন্তত তিন হাজার লোক হয়েছিল। সে জনসমাবেশে মৌলানা সাহেব তাকে চৌধুরী পদবীতে অভিষিক্ত করে যান। সেদিন থেকেই সে চৌধুরী হয়েছে। নতুন দলিলপত্রে এই নামই চালু হচ্ছে আজকাল। চরপাঙ্গশিয়ার নামও বদলে হয়েছে চৌধুরীর চর। কিন্তু এত কিছু করেও তার নামের আগেরে পা-না-ধোয়া খেতাব ঘুচল না।

    সব কথাই জঙ্গুরুল্লার কানে যায়। রাগের চোটে সে দাঁতে দাঁত ঘষে। নিন্দিত পা দুটোকে মেঝের ওপর ঠুকতে থাকে বারবার। তার ইচ্ছা হয় এই পা দুটি দিয়ে সে লণ্ডভণ্ড করে দেয় সবকিছু, পদানত করে চারদিকের মাটি আর মানুষ। এমনি করে এক ধরনের দিগ্বিজয়ের আকাঙ্ক্ষার জন্ম নেয় তার মনে। আশেপাশে কোনো নতুন চর জাগলেই লাঠির জোরে সে তা দখল করে নেয়। এভাবে তার দৃষ্টি পড়ে যথারীতি খুনের চরের উপর। একসময় কটুবুদ্ধি ও লাঠির জোরে দখলও করে নেয় খুনের চর।

    উপন্যাসের বাকি অংশ এরফান মাতব্বরের জীবিত পুত্র ফজলের সেই চর পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের বর্ণনা। ফজল সত্যিকারের নায়ক। নবম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া জানা ছেলে, অনেকগুলি মানবীয় গুণের সমাবেশ ঘটেছে তার মধ্যে। নিজের ব্যক্তি জীবনও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। তার স্ত্রী ফুলজানকে আটকে রেখেছে তার শ্বশুর আরশেদ মোল্লা। ঘটনাচক্রে মেয়েকে তার সাথে দিয়ে দিলেও পদে পদে ফজলের জন্য বিড়ম্বনা সৃষ্টি করে চলে সে। জঙ্গুরুল্লার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফজলের ক্ষতি করার চেষ্টা করতে থাকে সে। জঙ্গুরুল্রার দৃষ্টি পড়েছে ফুলজানের উপর। নিজের জন্য নয়। ফুলজানকে তার চাই তার বৃদ্ধ পীরের সঙ্গে শাদী দেওয়ার জন্য। তার উদ্দেশ্য পরিষ্কার। পীর সাহেব বিয়ে করলে এখানেই থাকবেন। তার মৃত্যু হবে এখানেই। চরের মাটিতেই দাফন হবে তাঁর। জঙ্গুরুল্লাদের বিশ্বাস—তাহলে আর কখনোই ডুবে যাবে না তাদের ঘর। তার পীরের উছিলায় আল্লাহ রক্ষা করবেন এই চরকে। সম্পূর্ণ জাগতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতার ব্যবহার।

    অবশেষে অনেক দ্বন্দ্ব-বিরোধ, দুঃখ-কষ্ট, ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে ফজল ও তার লোকেরা নিজেদের খুনের চর পুনর্দখল করতে পারে। ফিরে পায় ফুলজানকেও। মধুরেণ সমাপয়েৎ…।

    অসংখ্য চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে পদ্মার পলিদ্বীপ উপন্যাসে। কেউ চকিতে নিজের ভূমিকা পালন করে দৃশ্যপট থেকে সরে যায়, কারও স্থায়ীত্ব একটু বেশি। কিন্তু সব চরিত্রই যেন তৈরি হয়েছে ফজলকে পরিস্ফুটিত করা জন্যই। একরৈখিক উপন্যাসের এটিই সমস্যা। তবু পার্শ্ব চরিত্রগুলির মধ্যেও নিজের অস্তিত্ব সবচেয়ে বেশি জানান দিতে পেরেছে জরিনা।

    ভাগ্য বিড়ম্বিতা নারীর সবচেয়ে করুণ এক উদাহরণ জরিনা। ভারতবর্ষে ‘সারদা আইন’ পাশের বছরে বাল্যবিবাহেরে হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। ‘সারদা আইন’ প্রচলিত হলে বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ হয়। সেই কারণে ঐ আইন হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত যেখানে যেকটি সম্ভব, বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করা হয়েছে। সেই সময়েই দশ বছরের জরিনার সঙ্গে বিয়ে হয় এগারো বছরের ফজলের। কিন্তু পুত্রের তুলনায় পুত্রবধূকে দ্রুত বেড়ে উঠতে দেখে দুঃশ্চিন্তায় পড়ে এরফান মাতব্বর। তার অনেক উচ্চাশা ফজলকে নিয়ে। তার মনে হয় বউয়ের সঙ্গে থাকলে ফজলের লেখাপড়া হবে না। সে তাই অনেক দূরের স্কুলে পাঠিয়ে দেয় নবম শ্রেণীতে পড়া ফজলকে। আর জরিনার ভাইয়ের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে জরিনাকে তালাক গ্রহণে বাধ্য করে। পরে জরিনার বিয়ে হয় দাগী চোর হেকমতের সঙ্গে, হেকমত যে কিনা বছরের অধিকাংশ সময়ই জেল হাজতে কাটায়। ফলে জরিনাকে বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে ধান ভেনে নিজের পেট চালাতে হয়। সেভাবেই সে কাজ নেয় ফুলজানের বাড়িতে। সেই বাড়িতেই ঘটনাক্রমে তার শারীরিক মিলন ঘটে ফজলের সঙ্গে। পরবর্তীতে ফজল যখন থানা-পুলিশ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে তখনো তাকে আশ্রয় দিয়ে লুকিয়ে রাখে জরিনাই। সে বোঝে সে এখন পরস্ত্রী, ফজলের সঙ্গে মেলামেশা উচিত নয়। কিন্তু অন্তরের অন্তঃস্থলে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা তাকে বার বার বাধ্য করে ফজলের সংস্পর্শে আসতে। সত্যিকার অর্থে এই উপন্যাসের সবচেয়ে জীবন-রক্ত-মাংসের সার্থক চরিত্র জরিনা।

    উপন্যাস হিসাবে কোন শ্রেণীতে ফেলা যায় পদ্মার পলিদ্বীপকেকে? এ যেন একটি ডকুমেন্টরি ছবি। আবু ইসহাকের প্রথম উপন্যাস সূর্য দীঘল বাড়ী সম্পর্কে অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন, “যদি অনুভূতি আবেগের আন্তরিকতা সাহিত্য বিচারের মানদণ্ড হয়, তবে সূর্য দীঘল বাড়ী সার্থক উপন্যাসরূপে স্বীকৃতি লাভের যোগ্য।” একই মন্তব্য এই উপন্যাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আবার সূর্য দীঘল বাড়ী সম্পর্কে যে বিরূপ মন্তব্য করেছেন হাসান আজিজুল হক, সেটিও হয়ত এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হাসান লিখেছেন,

    “কিন্তু উপন্যাস যে একটি শিল্প তা কি সূর্য দীঘল বাড়ীর বেলায় স্বীকার করে নেয়া যায়? উপন্যাসটি পড়বার সময় মনে হয় যেন একটি ক্যামেরা অতি ধীরে আমাদের গ্রাম সমাজের ভেতরে, গরিব মানুষের উঠানে, শোবার ঘরে, গোয়ালে, রান্নাঘরে চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। উপন্যাসের সমস্ত উপাদান, জীবনের সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য ও খবর শিল্পীর কল্পনা ও সৃষ্টিনৈপুণ্য কদাচ জারিত হয়ে অনন্য হয়ে উঠতে পারছে না—কোনো একটা দৃষ্টি গড়ে উঠতে পারছে না, উপন্যাস একটি জীবন্ত সত্তায় পরিণত হচ্ছে না।”

    হাসান আজিজুল হক যেসব সর্তকে সার্থক উপন্যাসের জন্য আবশ্যকীয় বলে মনে করেন, তা কোনো উপন্যাসেই পাওয়া যায় না। এমনকি হাসান-লিখিত উপন্যাসেও না। বৈয়াকরণিক সব শর্ত পূরণ না করেও অনেক উপন্যাস সত্যিকারের উপন্যাস হিসাবে চিহ্নিত হতে পেরেছে। পদ্মার পলিদ্বীপ ও এই ধরনের একটি উপন্যাস।

    হয়তো ডকুমেন্টেশনই আবু ইসহাকের আরাধ্য। তাই দেখা যায় উপন্যাসের শেষে ফুটনোট হিসেবে ১৩ পৃষ্ঠাব্যাপী উপন্যাসে ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দগুলির প্রমিত অর্থ তুলে ধরা হয়েছে। বৈয়াকরণগণ ‘আঞ্চলিক উপন্যাস’ নামক একটি বর্গ চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে বিশেষ ভৌগলিক অঞ্চলের প্রকৃতি ও মানবচরিত যখন উপন্যাসিকের শিল্প-অভিপ্রায়ে স্বতন্ত্র রূপ পরিগ্রহ করে. তখনই একটি সার্থক আঞ্চলিক উপন্যাসের জন্ম হয়। সেই অর্থে অনেকেই পদ্মার পলিদ্বীপ-কে আঞ্চলিক উপন্যাসের অভিধা দিতে চান। কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে পৃথিবীর সকল উপন্যাসই একটি নির্দিষ্ট ভূগোল ও কালখণ্ডকে আত্মস্থ করে রচিত। উপন্যাসের পটভূমি বলতে যা বোঝানো হয়, তা সবসময়ই স্থানীক ও আঞ্চলিক। কখনোই সর্বব্যাপী নয়। তবে তার আবেদন হতে পারে সর্বব্যাপী। তখনই তা ক্লাসিক। সেগুলিই সবচেয়ে সার্থক রচনা হিসাবে বিবেচিত। পদ্মার পলিদ্বীপ বাংলাদেশের পথিকৃৎ উপন্যাসগুলির একটি হিসাবে আমাদের কাছে অবশ্যই প্রাসঙ্গিক।

  • উৎসর্গ ও অভিমত

    উৎসর্গ ও অভিমত

    উৎসর্গ

    বড় ভাই মোহাম্মদ ইসমাইল-এর স্মৃতির উদ্দেশে

    অভিমত

    …একখানা উচ্চাঙ্গের উপন্যাস। ইহার অনেক জায়গা একাধিকবার পড়িয়াছি। বিষয়বস্তুর অভিনবত্ব ছাড়িয়াই দিলাম।…এত ব্যাপক, বিস্তৃত, জটিল অথচ সুসংহত এবং স্বচ্ছন্দ কাহিনী কমই পড়িয়াছি।…এই উপন্যাসে নানা কাহিনীর সুষম সমাবেশ হইয়াছে, পদ্মার বিধ্বংসী লীলার যথাযথ বর্ণনা আছে,…। এই বর্ণনা প্রত্যক্ষ, পুঙ্খানুপুঙ্খ অথচ সংযত, অশ্লীল কাহিনীতে কোথাও শ্লীলতার অভাব দেখা যায় না। জরিনা-ফজলের যৌনমিলনের যে চিত্র আঁকা হইয়াছে তাহার মধ্যে জরিনাই অগ্রণী। তাহার ধর্মবোধ তীক্ষ্ণ। সে জানে সামাজিক রীতি ও ধর্মীয় নীতির দিক দিয়া সে পাপিষ্ঠা, কিন্তু মাইকেল মধুসূদনের ভাষায় বলা যাইতে পারে, পর্বত গৃহ ছাড়ি বাহিরায় যবে নদী সিন্দুর উদ্দেশে, কার সাধ্য রোধে তার গতি। ব্যভিচারের এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ, অথচ সংযত বর্ণনা আর কোথাও পড়িয়াছি বলিয়া মনে হয় না।

    ইতিহাস মানুষের কাহিনী বলে, যে কাহিনী ঘটিয়া গিয়া স্তব্ধ হইয়া গিয়াছে। সাহিত্য জীবন্ত, তাহার প্রধান গুণ উধ্বমুখী অভীপ্সা এবং তাহার প্রাণ আইডিয়া। চরের প্রজারা জমিদার ও তাহার সাঙ্গোপাঙ্গোদের দ্বারা অপমানিত হয়। হেকমত সমস্ত জীবন মহাজনের ঋণ শোধ করিতেই চুরি করিয়া বেড়ায়। ফজল ছেলেমানুষ, কিন্তু জমিদারের নায়েব যে তাহার পিতাকে যথেষ্ট মর্যাদা দেয় নাই তাহার যথাযোগ্য প্রত্যুত্তর সে দিয়াছে। রূপজান কিছুতেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে পীরসাহেবের বিবি হইতে চায় নাই। জরিনা ধর্মভীরু। কিন্তু যে শাস্ত্র তাহার হৃদয়ের অন্তরতম সত্যকে উপলব্ধি করে নাই তাহাকে সে মানে নাই আর আদর্শবাদী বিপ্লবী এই উপন্যাসকে নূতন আলোকে উদ্ভাসিত করিয়াছে।

    ড. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত, প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ইংরেজী বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা।

    ১৯ জুন, ১৯৯১ তারিখে আবু ইসহাককে লিখিত তাঁর পত্রের কিছু অংশ।

    সম্পূর্ণ পত্রটি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র-এর মাসিক মুখপত্র ‘বই’ নভেম্বর, ১৯৯১-এ প্রকাশিত।

    …পদ্মার পলিদ্বীপ প্রতিভার সৃষ্টি। …এই উপন্যাসের জরিনার মত চরিত্র এক শরচ্চন্দ্র আঁকিতে পারিতেন। একাধিক বার পড়ার পরও আমি এই চরিত্রটির রহস্য অনুধাবন করার চেষ্টা করি। বারংবার প্রশ্ন জাগে–যদি হেকমত জীবিতাবস্থায় ফিরিয়া আসিত তাহা হইলে এই ধীর স্থির অবিচলিত রমণী কি উত্তর দিত।

    আবু ইসহাক-এর নিকট ২৮ জুলাই, ১৯৯১ তারিখে ড. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত-এর লিখিত পত্র থেকে উদ্ধৃতি।

    তাঁর প্রথম উপন্যাসের মতো এটাও পল্লীজীবন ভিত্তিক, এখানেও জীবনবোধ তীক্ষ্ণ, বাস্তব জীবনের পরিবেশন অকৃত্রিম ও সত্যনিষ্ঠ। তবে সূর্য-দীঘল বাড়ী–র চাইতে বর্তমান উপন্যাসের পরিমণ্ডল বৃহত্তর, জীবন সগ্রামের চিত্র এখানে আরো দ্বন্দ্বমুখর ও তীব্র নাটকীয়তা তা অধিকতর উজ্জ্বল। এবং কাহিনীর পটভূমি-পরিবেশও ভিন্নতর।…উপন্যাসটিতে লেখক একই সঙ্গে গভীরতা ও বিস্তার এনে একে এপিকধর্মী করার প্রয়াস পেয়েছেন।

    দীর্ঘদিন পরে তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস প্রকাশিত হলেও আবু ইসহাক ‘পদ্মার পলিদ্বীপ উপহার দিয়ে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর পূর্বখ্যাতিকে শুধু অমলিন রাখেননি, আমার বিবেচনায় তাকে আরো সম্প্রসারিত করেছেন।

    অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : বেতার বাংলা, ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭.

    আবু ইসহাকের এই উপন্যাসটিও সাহিত্য-রসাস্বাদক। প্রতিটি ব্যক্তির কাছে চ্যালেনজ রাখার সাহস রাখে। টানাপোড়েন সমাজ-জীবনের জলজ্যান্ত নিখুঁত ছবিতে উপন্যাসটি ভরিয়ে তোলায় লেখক আরেকবার প্রমাণ করলেন নিছক কাহিনী নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পারিপার্শ্বিক সমাজব্যবস্থা, জীবনসগ্রাম, প্রেম, যা আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে ভাবায়, প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, কাদায়, সেগুলোই সাহিত্যের আসল মূলধন। এই মূলধনকে সাহিত্য করে তোলায় আবু ইসহাকের ক্ষমতা অপরিসীম। তাই এই রচনা সমাজের রসকষহীন প্রিনটেড ডকুমেন্ট হয়ে ওঠেনি।

    … একথা স্বীকার করতেই হয়, আবু ইসহাক পাঠককে টেনে রাখার জাদু জানেন। গ্রাম্য সেন্টিমেন্টের সঙ্গে ত্রিকোণ প্রেম, ত্রিকোণ প্রেমের সঙ্গে বাস্তব বোধ, বাস্তব বোধের সঙ্গে গ্রাম্য রাজনীতি সব মিলিয়ে একটি আদর্শ উপন্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    চতুরঙ্গ : কলকাতা : এপ্রিল, ১৯৮৭.

    প্রাণবন্ত, যথাযথ আঞ্চলিক ভাষার বলিষ্ঠ ব্যবহার উপন্যাসকে খুবই আকর্ষণীয় করেছে; বলাবাহুল্য, পড়তে শুরু করলেই বই শেষ না করে থাকা সম্ভব নয়’–কথাটা আক্ষরিক অর্থেই সত্য। একই কারণে বইয়ের প্রতিটি চরিত্রই বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে।…জরিনার চরিত্রটি নায়ক ফজল ও নায়িকা রূপজানের চরিত্রের চাইতেও বেশি জীবন্ত মনে হয়েছে। যেন টলস্টয়ের বিখ্যাত নায়িকা আনা কারেনিনার গ্রাম-বাংলার চর অঞ্চলের অতি চেনা সংস্করণ।

    দীপঙ্কর : মাসিক সাহিত্য পত্রিকা, ঢাকা : বৈশাখ, ১৩৯৪.

    কিন্তু এই মিলনান্ত নাটকীয়তার সঙ্গে মিশেছে একটা বলিষ্ঠ আধুনিক চেতনা। এটাও এ উপন্যাসের একটা বৈশিষ্ট্য বটে, এ কালের আধুনিকতার সেই মেরুদণ্ডহীন শিল্পাদর্শ থেকে যা ভিন্ন। বিবাহ, তালাক ইত্যাদিকে ঘিরে ধর্মীয়-সামাজিক সংস্কার মনের অন্ধকার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাস করে, এই গল্পের নায়ক সেটিকে পদ্মার জলে ভাসিয়ে দিয়েছে।

    দৈনিক বাংলা : ঢাকা :১১ আষাঢ়, ১৩৯৪.

    …’পদ্মার পলিদ্বীপ’ ব্যতিক্রমী চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, ভাষা বাকভঙ্গী নিয়ে এক অনবদ্য সৃষ্টি। সূর্য-দীঘল বাড়ীতে যে আবু ইসহাক অপরিমেয় অভিজ্ঞতায় সমতলের সাধারণ মানুষের জীবন-সগ্রামের নিবিড় কাহিনী তুলে ধরেছিলেন; পদ্মার পলিদ্বীপে তিনি হয়েছেন আরো বেশি জীবনঘনিষ্ঠ, চরের সংগ্রামী মানুষের ব্যথা বেদনায়, ক্রোধ-মমতায় আরো বেশি নিবিষ্ট। তাই ‘পদ্মার পলিদ্বীপে’ জীবন ধরা দিয়েছে কোন তন্ত্র কিংবা দর্শন নির্ভর করে নয়। এই উপন্যাসে চিত্রিত জীবন-সগ্রামে নদীনালা-নির্ভর বাংলাদেশের এক উপেক্ষিত অথচ বৃহত্তর পরিধির আকাশ-বাতাস, ঘাস-জমিন, মাছ-ফসল, প্রকৃতি আবহাওয়া যেন কথা কয়ে গেছে একান্ত নির্লিপ্তভাবে।….

    দৈনিক ইত্তেফাক : ঢাকা : ২৯ অক্টোবর, ১৯৮৭.

    ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’-এ চিত্রিত হয়েছে পদ্মার চরাঞ্চলের জীবন, এই জীবনের সঙ্গে আবু ইসহাক ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত।…তিনি একটি জটিল জীবনের চিত্র এঁকেছেন, এই জটিলতা সূর্য-দীঘল বাড়ীতে নেই ।…আবু ইসহাক পল্লীজীবনকে ঘনিষ্ঠভাবে জানেন। পদ্মার পলিদ্বীপে পল্লীজীবনের একটা বিশেষ দিক, চরাঞ্চলের সংঘাতময় জীবনের কথা নিয়ে লিখেছেন। এই বিশেষ দিকটির সঙ্গে তিনি উত্তমরূপে পরিচিত। বিশেষ আঞ্চলিক ভাষার জগৎকে তিনি জানেন এবং তার অনেক চিত্র দিয়েছেন।

    উত্তরাধিকার : বাংলা একাডেমীর সাহিত্য-পত্রিকা, অকটোবর-ডিসেম্বর, ১৯৮৭.

    সবশেষে ঔপন্যাসিক যে ভাবেই শেষ করুন না কেন ফজল-জরিনার মানবিক সম্পর্ককে সত্যিকারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং সামাজিকতা, ধর্মীয় অন্ধতা, বিবেকের উত্তেজনা সবকিছুকে ছাপিয়ে কিভাবে দুটি কাক্ষিত হৃদয় পরস্পর কাছাকাছি নিবিড় আলিঙ্গনে যায় তার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। পটভূমি গ্রাম কিন্তু বিশ্লেষণটা আধুনিক এখানেই আবু ইসহাকের শিল্পের সার্থকতা।

    দৈনিক বাংলা : ঢাকা : ৩ জুন, ১৯৯৪.

    … Though the total context and plot of Ishaq’s second novel Padmar Palidwip is a different one, here the indomitable human spirit is also present as a theme as experienced in the first novel. The vast canvas encompassing the whole populace of the story’s locality, their thoughts and feelings, love and hatred, their invincible zeal and their defeat, gives the book and epic disposition.

    Weekend Magazine of the Independent:

    Dhaka, dated May 28, 1999.

  • ফেরারী

    ফেরারী

    লিফটের সামনে বিরাট লাইন। পাশাপাশি দুটো লিফট, কিন্তু একটার বুকে আউট অফ অর্ডার-এর লকেট ঝোলানো। ফলে লাইন লম্বা হয়েছে। স্বপ্নেন্দু রুমালে মুখ মুছতে মুছতে গেট পেরিয়ে থমকে দাঁড়াল। যাঃ শালা!

    এখন ঘড়িতে এগারোটা বাজতে দশ। পৌনে এগারোটায় মিসেস বক্সী দেখা করতে বলেছেন। অলরেডি পাঁচ মিনিট লেট! যেভাবে বাসে ঝুলে আসতে হয়েছে তাতে আটতলায় হেঁটে ওঠা অসম্ভব ব্যাপার। সে চোখ বুলিয়ে লাইনের লোক গুনতে লাগল। আটজনের বেশি যদি না হয় তাহলে তার সুযোগ আসবে চতুর্থ দলে। কী করা যায় বুঝে উঠছিল না স্বপ্নেন্দু। এই সময় ইন্দ্রিয় লাফিয়ে উঠল। হেনা সেন! মুহূর্তেই এই একতলাটা যেন বিয়েবাড়ি হয়ে গেল। হেনা সেন ধীরে সুস্থে লাইনের শেষে দাঁড়াতেই স্বপ্নেন্দু চট করে তার পেছনে দাঁড়াল!

    হেনা সেন এই আটতলা অফিসের সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা। সুন্দরী বললে কম বলা হবে, মহিলার শরীরে যেন ঈশ্বর মেপে মেপে জাদু মাখিয়ে দিয়েছেন। অমন সুন্দর গড়নের বুক এবং নিতম্ব এবং তার সঙ্গে মেলানো অনেকটা উন্মুক্ত কোমর দেখলেই কলজেটা স্থির হয়ে যায়, মহিলা যখন কথা বলেন তখন আফসোস হয়, কেন শেষ হল। হেনা সেনের সঙ্গে স্বপ্নেন্দুর আলাপ নেই। এতদিন হেনা বসত তিনতলায়। সেখানকার বড় অফিসারের সঙ্গে কী একটা গোলমাল হয়ে যাওয়ায় ট্রান্সফার নিয়ে গত পরশু আটতলায় এসেছেন। পদমর্যাদায় স্বপ্নেন্দু অনেক ওপরে কিন্তু এই বাড়িতে হেনাকে চেনে না এমন কেউ নেই, কিন্তু তাকে?

    স্বপ্নেন্দু বাতাসে অসম্ভব মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছিল। সেটা যে সামনের শরীরটা থেকে আসছে তা অন্ধও বলে দিতে পারবে। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জামার কলার ঠিক করল। মুখটা অকারণে রুমালে মুছল। যদিও হেনা সেনের চোখ এখন লিফটের দিকে তবু সে নিজেকে স্মার্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছিল। মহিলার মাখনরঙা ভরাট পিঠ আর ঘাড় দেখে স্বপ্নেন্দুর মনে হল ওর শরীরে যেন অজস্র ফগ চাপ বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুর্ধর্ষ! লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন না ফুলের বাগানে— ভঙ্গি দেখলে ঠাওর করা মুশকিল। এখনও পর্যন্ত এই অফিসের কোনও রাঘব বোয়াল ওঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। মহিলার নাকি আত্মসম্মান বোধ খুব।

    স্বপ্নেন্দু মিসেস বক্সীর মুখটা মনে করল। আজ ঠিক চিবিয়ে খাবে তাকে। আটতলার সুপ্রিম বস মিসেস বক্সী। পাঁচ ফুটি ফুটবল। গায়ের রঙ অসম্ভব ফরসা কিন্তু শরীরে কোনও খাঁজ নেই, মুখটা বাতাবি লেবুর কাছাকাছি। সেই মুখে সিগারেট গুঁজে ইংরাজিতে ধমকান। জরুরি মিটিং ছিল। হেনা সেনের কোমরের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নেন্দু বলল, থাক মিটিং। লিফটে লাইন পড়লে সে কী করবে। সঙ্গে সঙ্গে তার খেয়াল হল। মিসেস বক্সী ইচ্ছে করলে তাকে বদলি করে দিতে পারেন।

    স্বপ্নেন্দু ঠোঁট কামড়াল। ঠিক সেই সময় হেনা সেন পেছন ফিরে তাকালেন। স্বপ্নেন্দু হাসবার চেষ্টা করল। আহা, কি বুক। হেনা সেন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি কিছু বললেন?’

    ‘আমি? না তো।’ কলজেটা যেন লাফে গলায় উঠে এসেছে।

    ‘মনে হল!’ হেনা সেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন।

    ‘না! মানে এই লাইনটার কথা ভাবছিলাম।’ স্বপ্নেন্দুর খেয়াল হল মিসেস বক্সীর বিরুদ্ধে জেহাদটা বোধহয় কিছুটা ঠোঁট ফসকে বেরিয়েছে।

    ‘লাইন? লাইনের কথা কেউ আবার শব্দ করে ভাবে নাকি?’ হেনা সেন ততক্ষণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। স্বপ্নেন্দুর খুব ইচ্ছে করছিল কথা বলতে। তার পেছনে এখন আরও দশ-বারো জন দাঁড়িয়ে গিয়েছে।

    সে বলল, ‘আপনি তো আটতলায় এসেছেন।’

    ‘হ্যাঁ। আমি ওখানকার ডি.ও। আমার নাম স্বপ্নেন্দু সোম।’

    ‘স্বপ্নেন্দু? বেশ সুন্দর নাম তো?’

    কথাগুলো তার মুখের দিকে না তাকিয়ে বলা। তবু স্বপ্নেন্দুর মনে হল তার নামটাকে এমন সুন্দর করে আজ পর্যন্ত কেউ উচ্চারণ করেনি। লাইনটা টুকটুক করে এগোচ্ছিল মাঝে মাঝে। এবারে ওদের সুযোগ এসে গেল। হেনা সেনের হাঁটা দেখে স্বপ্নেন্দুর মনে হল দুটো জমাট ঢেউ পাশাপাশি দুলে গেল। লিফটে জায়গা ভরাট। হেনা সেন ওঠার পর লিফটম্যান দরজা বন্ধ করে দিতে যাচ্ছে দেখে স্বপ্নেন্দু একচিলতে জায়গায় পা রেখে শরীরকে সেঁধিয়ে দিল। ফলে তাকে এমনভাবে দাঁড়াতে হল যে হেনা সেনের শরীরের অনেকটাই তার শরীরে ঠেকেছে। এত নরম আর এত মধুর কিন্তু এত তার দাহিকাশক্তি যে স্বপ্নেন্দুর মনে হল সে মরে যাবে। আর এই লিফটটা যদি অনন্তকাল চলত। যদি আটতলা ছাড়িয়ে একশ আটতলায় উঠে যেত। কিংবা এই মুহূর্তে লোডশেডিং-ও তো হতে পারত। মাঝামাঝি একটা জায়গায় লিফটটাকে বেশ কয়েক ঘণ্টা আটকে থাকতে হত তাহলে। কিন্তু এসোব কিছুই হল না। বিভিন্ন তলায় যত লোক নামছে তত হেনা সেনের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ছে। সাততলায় যখন লিফট, তখন একহাত ব্যবধান।

    স্বপ্নেন্দুর মনে হল তার শরীরে যেন হেনা সেনের বিলিতি গন্ধ কিছুটা মাখামাখি হয়েছে। সে গাঢ় গলায় বলল, ‘যদি কোনও প্রয়োজন হয় তাহলে আমাকে বলবেন মিস সেন।’

    ‘ওমা আমাকে আপনি জানেন?’

    ‘চিনি কিন্তু জানি না।’ কথাটা খুব নাটকীয় ভঙ্গিতে বলতেই লিফটের দরজা খুলে গেল। হেনা সেন এমন অপাঙ্গে তাকালেন যে স্বপ্নেন্দু রুমাল মুখে তুলল।

    দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসতেই হরিমাধব ছুটে এল, ‘আপনাকে ম্যাডাম আধঘণ্টা ধরে খুঁজছেন। খুব খেপে গেছেন।’

    ‘খেপে গেছেন?’

    ‘হ্যাঁ। ইংরেজিতে গালাগাল দিচ্ছিলেন একা বসে।’

    স্বপ্নেন্দু দেখল চলে যেতে যেতে হেনা সেন আবার অপাঙ্গে তাকালেন। কিন্তু এবার তার ঠোঁটে যে হাসি ঝোলানো তার মানেটা বড় স্পষ্ট। মনে মনে হরিমাধবের ওপর প্রচণ্ড চটে গেল স্বপ্নেন্দু। একদম প্রেসটিজ পাংচার করে দিল বুড়োটা। সে গম্ভীর মুখে নিজের ঘরে এসে বসল।

    এই অফিসে সে দুই নম্বর। তার নিচে অন্তত আশিজন কর্মচারী। কিন্তু সবচেয়ে খারাপ অবস্থা তার। ওপর তলা কারণে অকারণে তাকে ধমকাচ্ছে আবার নিচের তলার লোকজন সুযোগ পেলেই চোখ রাঙিয়ে যায়। নিচের তলার কর্মচারীদের ইউনিয়ন আছে। সে না ঘাটকা না ঘরকা। হরিমাধবকে ডেকে এক গ্লাস জল দিতে বলে স্বপ্নেন্দু ট্রান্সফার অ্যাণ্ড পোস্টিং-এর ফাইলটা খুলে বসল। হেনা সেনকে দেওয়া হয়েছে স্ট্যটিসটিকে। কোনও কাজ নেই সেখানে। মাসে দুবার রিপোর্ট পাঠালেই চলে। তাছাড়া বুড়ো হালদার আছে চার্জে। লোকটা কাজ পাগল মানুষ। ওর সেকশনের সবাই ওর কাঁধে কাজ চাপিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এই অফিসে একটা কথা চালু আছে। স্ট্যটিসটিক হল পানিশমেণ্ট সেল। কোনও পার্টি ওই টেবিলে কোনদিন যাবে না। সবাই পোস্টিং চায় সেকশনে। হেনা সেনকে ইচ্ছে করেই স্ট্যাটিসটিকে দেওয়া হয়েছে। মিসেস বক্সীর কাণ্ড এটা। এই সময় টেলিফোন বাজল।

    ‘সোম স্পিকিং।’

    ‘হোয়াট ডু য়ু ওয়াণ্ট?’ মিসেস বক্সীর গলা।

    ‘মানে?’

    ‘কাম শার্প। এক্ষুণি আসুন।’

    জলটা খেয়ে তড়াক করে উঠে দাঁড়াল স্বপ্নেন্দু। পকেট থেকে চিরুনি বের করে চুলে বুলিয়ে নিল। তারপর দ্রুত পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

    মিসেস বক্সীর ঘরটা বিশাল। কার্পেটে মোড়া। ঘোরানো চেয়ার এবং টেবিল ছাড়াও এক কোণে কালো ডেকচেয়ার রয়েছে বিশ্রাম নেবার জন্যে। দরজা খুলে ভিতরে পা দিতেই মিসেস বক্সীর মুখের সিগারেট দুলতে লাগল, ‘এই রকম দায়িত্বজ্ঞানহীন অফিসার পেলে আপনি কী করতেন?’

    ‘মানে?’

    ‘আপনার কটায় আসার কথা ছিল?’

    ‘ট্র্যাফিক জ্যাম ছিল ম্যাডাম! তার ওপর লিফট খারাপ।’

    ‘এইসব সিলি বাহানা কেরানিরা দেয়। আপনি কি ডিমোশন চান?’

    স্বপ্নেন্দু মাথা নিচু করল, ‘সরি, কিন্তু এটা অনিচ্ছাকৃত।’

    ‘আই অ্যাম ফেড আপ। আপনারা কী ভেবেছেন? এটা অফিস না অন্য কিছু? দশটায় অ্যাটেণ্ডেন্স। আমি সাড়ে দশটা পর্যন্ত প্রত্যেককে গ্রেস দিয়েছি। কিন্তু এগারোটায় অ্যাটেণ্ডেন্স টোয়েণ্টি পার্সেণ্ট। আপনি ডি. ও. হয়েও ঠিক সময়ে আসছেন না। এক্সপ্লেইন।’

    ‘আমি দুঃখিত।’

    ‘দ্যাটস দি অনলি ওয়ার্ড য়ু নো। দিস ইজ লাস্ট ওয়ার্নিং।’ সিগারেটটা অ্যাসট্রেতে গুঁজে মিসেস বক্সী বললেন, ‘বসুন।’

    চেয়ারটা টেনে সন্তর্পণে বসল স্বপ্নেন্দু। মহিলা চেয়ারে এমন ডুবে গেছেন যে শুধু মুখ আর বুকের অর্ধাংশ টেবিলের ওপর দৃশ্যমান। বুকের কোনও আদল নেই, যেন দুটো মাংসের তাল এক করে রাখা। স্বপ্নেন্দুর মনে চট করে হেনা সেনের শরীর ভেসে উঠল। মিসেস বক্সী এবার একটা ফাইল খুললেন, ‘আমার কাছে ক্রমাগত কমপ্লেন আসছে। এই অফিসে এখন ঘুষের ফেস্টিভ্যাল চলছে।’

    ‘ফেস্টিভ্যাল?’

    ‘ইয়েস। প্রকাশ্যে যখন ঘুষ নেওয়া হচ্ছে তখন ফেস্টিভ্যাল ছাড়া আর কি বলব? ডি. ও. হয়ে আপনি সেসব খবর জানেন?’

    ‘অনুমান করতে পারি।’

    ‘কোনও স্টেপ নিয়েছেন?’

    ‘স্পেসিফিক কমপ্লেন না থাকলে স্টেপ নেওয়া মুশকিল।’

    ‘বাট আই ওয়াণ্ট টু স্টপ ইট। তোমরা চাই চাই বলে ইউনিয়ন করবে আবার ঘুষ ছাড়া কোনও কাজ করবে না, এটা হতে পারে না। কী ভাবে স্টপ করা যায়?’

    ‘এটা খুব জটিল ব্যাপার। এই অফিস ব্যবসায়ীদের জরুরি ব্যাপার নিয়ে কাজ করে। বিভিন্ন সেকশনে তাদের আসতে হয়। দ্রুত কাজ কিংবা কিছু বিপদমুক্ত হবার জন্য তারা পয়সা খরচ করে। কেরানিদের যেটা হাতে নেই তার জন্যে অফিসাররা আছেন। দশজন অফিসার। তাঁরা যেসব কেস নিয়ে ডিল করেন সেখানে মোটা টাকার ব্যাপার। বেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আছে এ ব্যাপারে। অফিসাররা কখনও কমপ্লেন করে না তার অধস্তন কেরানি ঘুষ নিচ্ছে। এটা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সবার ধারণা যে কোনও কাজ করলেই পার্টিরা টাকা দিতে বাধ্য। এমন কি তার রুটিন ডিউটি করলেও।’

    স্বপ্নেন্দু ডি. ও। অফিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, মাইনেপত্র এবং রিপোর্টস সঠিক রাখার দায়িত্ব তার ওপর। পার্টিদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। সে লক্ষ্য করেছে হরিমাধব তার পিওন হওয়ায় খুব অখুশি। প্রায়ই সে অনুরোধ করে বদলির জন্য। তার সমান মাইনের অফিসাররা গাড়িতে অফিসে আসেন, প্লেন ছাড়া বেড়াতে যান না। মনে মনে বেশ ঈর্ষা বোধ করে স্বপ্নেন্দু। কিন্তু এসোব করা যায় কী করে?

    ‘বোবা হয়ে থাকবেন না। ব্যাচেলাররা যে এমন—!’ কাঁধ নাচালেন মিসেস বক্সী। ‘কিছু বলুন।’

    ‘দেখুন।’ একটু কাশল স্বপ্নেন্দু। ‘এটা খুব জটিল ব্যাপার। অভ্যেসটা নিচ থেকে ওপরে সর্বত্র। কাকে বাদ দিয়ে কাকে ধরবেন।’

    ‘ওপর মানে?’

    ‘আমি শুনেছি অফিসাররাও একই দোষী।’

    ‘দ্যাটস নট আওয়ার বিজনেস। ওদের জন্যে আরও ওপরতলায় লোক আছেন। কিন্তু দশপাঁচ একশ টাকার হরির লুট বন্ধ করা ডি. ও. হিসেবে আপনার কর্তব্য।’

    ‘আমার?’

    ‘হ্যাঁ। আপনি অফিস বস।’

    ‘বলুন, কী করতে হবে?’

    ‘আপনি ট্রান্সফার করুন। আজকেই একটা লিস্ট দিন আমাকে। একটা সেকশনে যে ছমাস আছে তাকে স্ট্যাটিস্টিক কিংবা এস্টাব্লিশমেণ্টে পাঠিয়ে দিন। আর নোটিস বোর্ড ঝুলিয়ে দিন কোনও পার্টি অফিসের ভেতর ঢুকতে পারবে না। তাদের যদি কোনও প্রয়োজন থাকে তাহলে রেসপেকটিভ অফিসারের সঙ্গে দেখা করবে। প্রথমে এটা করুন তারপর দেখা যাবে।’ মিসেস বক্সী আবার সিগারেট ধরালেন। স্বপ্নেন্দু তখনও ইতস্তত করছিল, ‘এ নিয়ে খুব ঝামেলা হবে।’

    ‘ঝামেলা? চাকরিতে ঢোকার সময় তাদের কি বলা হয়েছিল যে যত ইচ্ছে ঘুষ নিতে পারবে? তাছাড়া আপনি ব্যাচেলার মানুষ, আপনার ভয় কীসের? বোল্ড হন মশাই, চিরকাল মিনমিন করে গেলে কোনও লাভ হবে না।’

    নিজের ঘরে ফিরে এল স্বপ্নেন্দু। ব্যবস্থাটা তার ভাল লাগছিল না। সে নিজে কখনও ঘুষ নেয়নি। হয়ত ঘুষ নেবার বড় সুযোগ তার আসে নি বলে নেয়নি কিংবা এখনও মনে কিছু রুচি এবং নীতিবোধ কটকট করে বলে নেওয়ার প্রবৃত্তি হয় নি। কিন্তু এই হুকুমটা কার্যকর করতে গেলে ভিমরুলের চাকে ঘা পড়বে। তাছাড়া কেরানিদের চোখ রাঙাব আর অফিসারদের আদর করব, এ কেমন কথা।

    ঠিক তখনই টেলিফোনটা শব্দ করল। ওপাশে তিন নম্বর অ্যাসেসমেণ্ট অফিসার মুখার্জি, ‘সোম। বক্সীর বাক্সের চাবিকাঠি তোমার হাতে, আমাকে উদ্ধার করো ভাই।’

    ‘কী হয়েছে?’

    ‘একটা মোর দ্যান লাখ কেসে ওঁর অ্যাপ্রুভাল দরকার ছিল। ফাইলটা চেপে রেখেছেন। একবার বলেছিলাম, কোনও কাজ হয়নি। পার্টি বলল উনি পঞ্চাশ চেয়েছেন, আমি অ্যাসেসমেণ্ট অফিসার, কষ্ট করে মাছ জালে ঢোকালাম উনি তার ঝোল খাবেন। বোঝো?’

    ‘দেখি।’ বলে রিসিভার নামিয়ে রাখল স্বপ্নেন্দু। মিসেস বক্সীর বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে এ ধরনের অভিযোগ হাওয়ায় ভাসে। পাঁচশো হাজার নয়, হঠাৎ বিশ পঁচিশের কারবারী উনি। পঞ্চাশ এই প্রথম শুনল স্বপ্নেন্দু। এখন সেই মহিলা তাকে নির্দেশ দিচ্ছেন দশ টাকা বিশ টাকা যারা নেয় তাদের থামাতে হবে।

    হরিমাধবকে হুকুম করল সে, ‘বড়বাবুকে পাঠিয়ে দাও।’

    বড়বাবু চাকলাদার খুব ভাল মানুষ। সাতে-পাঁচে থাকেন না। আর মাত্র তিনমাস বাকি আছে অবসরের। স্বপ্নন্দুর ধারণা লোকটা সৎ। ঘরে ঢোকামাত্র সে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি ঘুষ নেন?’

    হাঁ হয়ে গেলেন চাকলাদার। তারপর কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, ‘নিতাম কিন্তু এখন নিই না।’

    ‘কেন নিতেন, কেন নেন না?’

    চাকলাদার নুইয়ে পড়লেন, ‘তখন অভাবের তাড়নায় না নিয়ে পারিনি। কিন্তু ভিক্ষে নিচ্ছি বলে ঘেন্না হয়। তাছাড়া আজ বাদে কাল চলে যাব, এখন আর নোংরা হওয়ার প্রবৃত্তি হয় না।’

    স্বপ্নেন্দু লোকটিকে দেখল। মনে হল মিথ্যে বলছেন না। তারপর নিচু গলায় বলল, ‘এই অফিসের যে সমস্ত কেরানির ঘুষ নেয় তাদের ট্রন্সফার করতে হবে। ম্যাডামের অর্ডার। আপনি লিস্ট করুন।’

    ‘সে তো ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে।’

    ‘হোক।’

    ‘আর তিন মাস আছি। কেন আমাকে বিপদে ফেলছেন স্যার।’

    ‘কেউ জানবে না। খুব গোপনে করুন। অর্ডারটা আমি এখানে টাইপ করাব না। যান।’

    চাকলাদার চলে যেতে স্বপ্নেন্দু চোখ বন্ধ করল আর সঙ্গে সঙ্গে হেনা সেনের শরীরটা ভেসে উঠল। সে বিয়ে-থা করেনি। মাত্র তিরিশ বছর বয়স। সরাসরি অফিসার হয়ে ঢুকেছে পরীক্ষা দিয়ে। সামনে ব্রাইট ক্যারিয়ার। কিন্তু হেনা সেন তাকে গুলিয়ে দিল। মহিলার মধ্যে অদ্ভুত মাদকতা আছে। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে সে আবার হরিমাধবকে ডাকল, ‘শোন স্ট্যটিস্টিক থেকে মিস সেনকে ডেকে আনো।’

    ‘উনি এখন অফিসে নেই স্যার।’

    ‘নেই? তুমি জানলে কী করে?’

    ‘উনি যে এসেই ক্যাণ্টিনে যান বিশ্রাম করতে।’

    স্বপ্নেন্দু অবাক হয়ে গেল। আচ্ছা ফাঁকিবাজ মহিলা তো! সে বিরক্ত গলায় বলল, ‘ক্যাণ্টিন তো এই বাড়িতেই। সেখান থেকে ডেকে নিয়ে এসো।’

    হরিমাধব চলে যাওয়ার পর স্বপ্নেন্দুর মনে হল না ডাকলেই হত। হয়ত মহিলা অসুস্থ, বাইরে থেকে ঠাওর করা যায় না। তাছাড়া ওরকম সুন্দরী মহিলাদের একটু-আধটু সুবিধা দেওয়া দরকার। দশটা-পাঁচটা কলম পিষলে কি ওই শরীর থাকবে? কিন্তু সেই সঙ্গে স্বপ্নেন্দুর ভেতরটা খুব চঞ্চল হয়ে উঠল। সে চট করে চুলটা আঁচড়ে রুমালে মুখ ঘষে নিল। কাল থেকে দুটো রুমাল নিয়ে বেরোতে হবে। একটা খুব দ্রুত ময়লা হয়ে যায়।

    আবার টেলিফোন বাজল। ওপাশে সুজিত। ফিল্মে অভিনয় করে বেশ পরিচিত হয়েছে। একসঙ্গে কলেজে পড়ত এবং এখনও যোগাযোগ আছে। সুজিত জিজ্ঞাসা করল, ‘কাল বিকেলে কী করছ?’

    ‘কিছুই না।’

    ‘চলে এসো। আমার বাড়িতে সন্ধে সাতটায়। ফিল্মের কিছু মানুষ আসবে। একটা গোপন খবর ঘোষণা করব।’

    ‘কী খবর?’

    ‘উঁহু এখন বলব না। ওটা সারপ্রাইজ থাক। এসো কিন্তু। শুধু বলছি আমি বিয়ে করছি। দারুণ, দারুণ এক মহিলাকে।’ কট করে লাইনটা কেটে দিল সুজিত। রিসিভারটার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন ঈর্ষাবোধ করল সে। এমন কিছু ভাল দেখতে নয় কিন্তু সুজিত আজ বিখ্যাত। প্রচুর টাকা পাচ্ছে এবং সেই সঙ্গে দারুণ মহিলাকে বিয়ে করছে। আর সে একটা ভাল স্টুডেণ্ট হয়েও কলা চুষছে। রাস্তাঘাটে কোনও মেয়ে তার দিকে তেমনভাবে তাকায় না। কলেজ লাইফে সুজিতের থেকে তার সম্ভাবনা অনেক বেশি ছিল।

    এই সময় দরজায় শব্দ হতেই মুখ তুলে তাকাল স্বপ্নেন্দু। মনে হল দম বন্ধ হয়ে যাবে তার। হেনা সেনের মুখ থমথমে, ‘ডেকেছেন?’

    উঠে দাঁড়াতে গিয়ে খেয়াল হল সে অফিসার। হাত বাড়িয়ে চেয়ারটা দেখিয়ে বলল, ‘বসুন। আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে।’

    হেনা সেন এগিয়ে এল রাজহাঁসের ভঙ্গিতে। ‘কী ব্যাপার?’

    ‘আগে বসুন, দাঁড়িয়ে কথা বলা শোভন নয়।’

    ব্যাপারটা যেন হেনা সেনের মনঃপূত হচ্ছিল না। তবু চেয়ারখানা সামান্য টেনে নিয়ে থমথমে মুখে বসলেন। স্বপ্নেন্দু সেটা লক্ষ্য করল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘এই অফিসের পরিবেশ আপনার কেমন লাগছে?’

    ‘ভালই।’

    ‘কিন্তু আমার ওপরওয়ালা মনে করেন পরিবেশ আদৌ ভাল নয়। তিনি চান অবস্থার উন্নতি করতে। আপনি সেকশনে আসতে চান?’

    ‘সেকশনে? না না। ওখানে ঝামেলা। আমি বেশ আছি।’

    ‘কিন্তু মিসেস বক্সী আপনাকে সেকশনে পাঠাতে বলেছেন।’

    এবার হাসলেন হেনা সেন, ‘উনি আমাকে সহ্য করতে পারেন না। আপনি নিশ্চয়ই কারণটা বুঝতে পারছেন। সেকশনে যাওয়ার যাদের ইণ্টারেস্ট আছে তাদের পাঠান। আমি চলি।’

    ‘একটু বসুন।’ স্বপ্নেন্দু খুব অসহায় বোধ করছিল, ‘একটা কথা, এই সব আলোচনার কথা অফিসে গিয়ে বলবেন না।’

    ‘কেন?’

    ‘এটা টপ সিক্রেট।’

    ‘তাহলে আমাকে জানালেন কেন?’

    ঠোঁট কামড়াল স্বপ্নেন্দু, ‘আমার মনে হয়েছিল আপনাকে বিশ্বাস করা যায়।’

    ‘ধন্যবাদ।’ হেনা সেন সামান্য মাথা দুলিয়ে ঘর ছেড়ে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়ালেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আপনি আমাকে এক্সপ্লেন করতে বলবেন কেন আমি অফিসে এসেই ক্যাণ্টিনে যাই।’

    ‘আপনি জানেন আমি সেটা পারি না।’

    ‘আমি জানি?’

    ‘জানা উচিত।’

    এবার হাসিটা মিষ্টি হল। তারপর বেরিয়ে গেলেন সেন। কয়েক মুহূর্ত বাদে স্বপ্নেন্দুর খেয়াল হল, একি করল সে। একজন অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে চরম অন্যায় হয়ে গেল। শুধু একজন সুন্দরী মহিলার শরীর দেখে সে মাথা খারাপ করে ফেলল? এখন উনি যদি অফিসে বলে বেড়ান তাহলে ম্যাডাম তাকে চিবিয়ে খাবে। অথচ এখন আর কিছু করার নেই।

    বিকেলে অফিসে হইচই পড়ে গেল। হেনা সেন নয়, কী করে যে খবর ফাঁস হয়ে গেছে তা কেউ জানে না। হয়ত হরিমাধব কিংবা বক্সীর বেয়ারা অথবা বড়বাবু, সোর্সটা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু অফিসের সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেল। ঝেঁটিয়ে ট্রান্সফার হচ্ছে এই খবরটা আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ল; বিকেল চারটেয় জানতে পারল স্বপ্নেন্দু। একজন ছাপ্পান্ন বছরের প্রৌঢ় এসে হাত জোড় করে দাঁড়ালেন, ‘স্যার, আমাকে ধনেপ্রাণে মারবেন না।’

    ‘কী হয়েছে।’

    ‘আমার তিনটে মেয়ে। সেকশন থেকে সরিয়ে দিলে ওদের বিয়ে দিতে পারব না। একদম ভরাডুবি হয়ে যাবে স্যার।’ কেঁদে ফেললেন ভদ্রলোক।

    ‘আপনি জানলেন কী করে?’ স্বপ্নেন্দু সোজা হয়ে বসল।

    ‘সবাই জানে স্যার।’

    তারপর একটার পর একটা অনুরোধ। কারো মেয়ের বিয়ে হয় না, কারো সংসার চলবে না। অফিস থেকে চিৎকার চেঁচামেচি ভেসে আসছিল। স্বপ্নেন্দু টেলিফোন করল মিসেস বক্সীকে। বেজে গেল টেলিফোন। হরিমাধব খোঁজ নিয়ে জানাল ম্যাডাম ঘণ্টাখানেক আগে অফিস থেকে বেরিয়ে গেছেন।

    স্বপ্নেন্দুর মাথায় কিছুতেই ঢুকছিল না কী করে খবরটা ফাঁস হয়ে গেল। সে চাকলাদারকে ডেকে পাঠাল, ‘আপনি স্টাফদের বলেছেন?’

    ‘না স্যার। তত শুনেছি ম্যাডাম নাকি ওঁর পিওনকে বলেছেন।’

    ‘ম্যাডাম?’ স্বপ্নেন্দু হাঁ হয়ে গেল। ঠিক সেই সময় দল বেঁধে স্টাফরা তার ঘরে প্রবেশ করল। একসঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচি অভিযোগ এবং গালাগালের বন্যা বয়ে যেতে লাগল। তাকে ঘিরে অনেকগুলো উত্তেজিত মুখ। স্বপ্নেন্দু বলার চেষ্টা করল, ‘আপনারা আমার কাছে এসেছে কেন? মিসেস বক্সীর কাছে যান। তিনিই অল ইন অল।’

    একজন বলল, ‘সে শালী পালিয়েছে।’

    ‘ঠিক আছে একজন বলুন। এনি অফ ইউ।’

    ‘শুনুন। অ্যাদ্দিন ধরে আমরা সেকশনে কাজ করছি, এখন এক কথায় সরাতে পারেন না। এতগুলো লোকের ভাতে হাত দেবার কোনও রাইট আপনার নেই।’

    ‘ভাতে হাত!’

    ‘নিশ্চয়ই।’

    ‘কিন্তু এটা তো বেআইনি।’

    সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার উঠল অজস্র অশ্লীল শব্দ। একজন চেঁচিয়ে বলল, ‘অফিসাররা যখন মাল কামান তখন বুঝি আইন থাকে?’

    এই যুক্তির কাছে নরম হতেই হয়। স্বপ্নেন্দু মিসেস বক্সীকে একথাই সকালে বলেছিল। সে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি। বিশ্বাস করুন আমি এসোব কিছুই জানি না। মিসেস বক্সী এলে আমি নিশ্চয়ই আলোচনা করব।’

    ‘আপনি জানেন না?’

    ‘না।’ স্বপ্নেন্দু স্রেফ অস্বীকার করল।

    ‘মিথ্যে কথা। তাহলে স্ট্যাটিস্টিক থেকে মিস সেনকে ডেকে পাঠালেন কেন? মিস সেনকে সেকশনে দিতে চান?’

    ‘মিস সেন?’ ধক্ করে উঠল স্বপ্নেন্দুর বুক। মহিলা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন নাকি? ওফ, কি বোকামিই না করেছিল সে। একটা মেয়েছেলের সুন্দর চেহারা দেখে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল!

    ‘কি, চুপ করে আছেন কেন?’

    ‘ওর সঙ্গে আমার কী কথা হয়েছে আপনারা জানেন?’ শেষ চেষ্টা করল সে। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার বাড়ল কেউ একজন হেনা সেনকে ডেকে আনতে। তারা সামনাসামনি ভজিয়ে নিতে চায়। স্বপ্নেন্দু ঘামতে লাগল এই লোকগুলোকে তার ক্ষিপ্ত নেকড়ের মত মনে হচ্ছিল। তার ঘরে হামলা হচ্ছে অথচ কোনও অফিসার এগিয়ে আসছেন না তাকে উদ্ধারের জন্যে।

    কিছুক্ষণের মধ্যে মিস সেনের আবির্ভাব হল। ঘরে ঢুকে বললেন, ‘কী ব্যাপার? আমায় কেন?’ যেন তিনি কিছু জানেন না।

    নেতা গোছের একজন প্রশ্ন করল, ‘মিস সেন, আজ সকালে উনি কি ট্রান্সফার পোস্টিং নিয়ে কিছু বলেছিলেন আপনাকে?’

    ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন হেনা সেন। ‘হ্যাঁ।’

    আর গলা শুকিয়ে গেল স্বপ্নেন্দুর। নিজেকে চড় মারতে ইচ্ছে করছিল তার। সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ল মিথ্যুক লায়ার।

    ‘কী বলেছিলেন?’

    ‘আমি অফিসে এসে রেস্ট নিতে ক্যাণ্টিনে যাই বলে উনি আমাকে বলেছিলেন এটা নাকি অন্যায়। প্রয়োজন হলে আমাকে ট্রান্সফার করে দেবেন। আমার আবার একটু রেস্ট না নিলে চলে না।’ হেনা সেন হাসলেন।

    আর স্বপ্নেন্দুর মনে হল সে গভীর কুয়োর তলা থেকে ভুস করে ওপরে উঠে এল। স্পষ্টতই আক্রমণকারীদের মুখে এখন হতাশা। কেউ কেউ হেনা সেনের দিকে অবিশ্বাসী চোখে তাকাচ্ছে। এবার হেনা সেন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি জানতে পারি কি কেন এঁদের ট্রান্সফার করা হচ্ছে?’

    ‘আমি জানি না, মিসেস বক্সী বলতে পারবেন।’

    ‘এঁদের বিরুদ্ধে কী প্রমাণ আছে যে এরা পার্টির কাছে ঘুষ নেন? যদি না থাকে তাহলে এরকম অ্যাকশান নেওয়া মানে এঁদের অপমান করা। অনুমানের ভিত্তিতে আপনারা কিছুই করতে পারেন না।’

    হেনা সেন হেসে হেসে কথাগুলো বলাতেই সোচ্চারে তাকে সমর্থন করল সবাই।

    যাওয়ার আগে স্টাফরা বলে গেল যদি এইরকম অর্ডার বের হয় তাহলে কাল থেকে কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। ঘর ফাঁকা হয়ে গেল। রুমালে মুখ মুছল স্বপ্নেন্দু। খুব জোর বেঁচে গেল সে আজ। হেনা সেন তাকে বাঁচিয়ে দিল। মহিলা তাকে নাও বাঁচাতে পারতেন! সঙ্গে সঙ্গে আর একটা চিন্তা মাথায় আসা মাত্র উৎফুল্ল হল সে। মেয়েরা যাকে একটু নরম চোখে দ্যাখে, তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করে, কোথায় যেন পড়েছিল সে। এত ঝামেলার মধ্যেও এটুকু ভাবতে পেরে মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেল তার। খুব ইচ্ছে করছিল হেনা সেনকে ডেকে কৃতজ্ঞতা জানায় কিন্তু সাহস হল না তার। সঙ্গে সঙ্গে স্টাফদের মনে অন্যরকম প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তবে মহিলা খুবই বুদ্ধিমতী। তাকেও যেমন বাঁচাল তেমনি স্টাফদেরও চটাল না। চমৎকার।

    স্বপ্নেন্দু ঠিক করল মিসেস বক্সীর ওপর ব্যাপারটা ছেড়ে দেবে। তিনি যা করেন তাই হবে। সে আর এই ব্যাপারে থাকবে না। যদি মিসেস বক্সী চোখ রাঙান তাহলে হেড অফিসে বিস্তারিত জানাবে।

    ছুটির পর বেরিয়ে এসে বাসস্ট্যাণ্ডে কিছুক্ষণ দাঁড়াল স্বপ্নেন্দু। এই সময়টায় তার কিছুই করার থাকে না। মা মারা যাওয়ার পর থেকে বাড়ির কোনও আকর্ষণ তার কাছে নেই। হাঁটতে হাঁটতে ধর্মতলায় চলে এল সে। আর তখনই আত্রেয়ীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। স্বপ্নেন্দু এড়াতে চাইছিল কিন্তু পারল না। আত্রেয়ী তাকে ডাকল, ‘কী ব্যাপার, কেমন আছ?’

    স্বপ্নেন্দু মাথা নাড়লো, ‘ভাল। তুমি?’

    ‘আর থাকা। তুমি তো কোনও খোঁজখবর নাও না।’

    ‘কী হবে নিয়ে। তাছাড়া তোমার স্বামী তো সেটা পছন্দ করেন না।’

    ‘ওঃ স্বপ্নেন্দু! এই কথাটা শুনতে শুনতে আমি পাগল হয়ে গেলাম। আমার সব কাজেই যদি ওর মতামত নিতে হয় তাহলে—!’ বলতে বলতে কথা ঘোরালো সে, ‘কোথায় যাচ্ছ?’

    ‘কোথাও না। বেকার মানুষ।’

    ‘তুমি আবার বেকার। এখনও বান্ধবী পাওনি?’

    ‘সে কপাল কোথায়?’

    ‘চলো আমাদের ওখানে চলো।’

    ‘মাথা খারাপ। স্ত্রীর বন্ধুকে দেখলে কোনও স্বামী সুখী হয় না।’

    ‘আমি আর পারছি না স্বপ্নেন্দু। এই লোকটার সঙ্গে একসঙ্গে বাস করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

    স্বপ্নেন্দু রাস্তাটার দিকে তাকাল। অজস্র মানুষ এই সন্ধেবেলায় যাওয়া আসা করছে। অথচ আত্রেয়ী এই পরিবেশকে ভুলে গিয়ে নিজের মনের কথা স্বচ্ছন্দে বলে যাচ্ছে। স্বপ্নেন্দু তবু বোঝাবার চেষ্টা করল, ‘এভাবে বলো না, তুমি নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছ। অতীতটাকে ভুলে যেও না।’

    ‘ভুল করেছিলাম।’ তারপরেই যেন খেয়াল হল আত্রেয়ীর, ‘কোথাও বসবে?’

    ‘তোমার দেরি হয়ে যাবে না?’

    ‘আই ডোণ্ট কেয়ার। তোমাকে এতদিন বাদে দেখলাম। তোমার অফিসের টেলিফোন নাম্বারটা যে কাগজে ছিল সেটাও ছিঁড়ে ফেলেছে, কী রকম ব্রুট!’

    ‘আজ নয় আত্রেয়ী। আমার মন ভাল নেই।’

    ‘একদিন কিন্তু আমার কাছে এলে তোমার মন ভাল হয়ে যেত।’

    ‘সে অনেক দিন আগের কথা। তখন আমরা ছাত্র—।’

    ‘তোমার নাম্বাটা দাও তাহলে।’

    স্বপ্নেন্দু টেলিফোন নাম্বারটা বলতে আত্রেয়ী তিন চারবার নানান রকম করে মনে গেঁথে রাখল তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি এখনও সেই পুরোনো বাড়িতেই আছ?’

    ‘আর কোথায় যাব? মা চলে যাওয়ার পর আমি আগলাচ্ছি।’

    হঠাৎ ব্যাগ খুলল আত্রেয়ী। তারপর কী ভেবে সেটা বন্ধ করে বলল, ‘তুমি হয়ত আমার কথা আজকাল আর ভাবো না কিন্তু আমার বড় মনে পড়ে তোমাকে। আমি ভুল করেছি স্বপ্নেন্দু, বিরাট ভুল।’

    আত্রেয়ী চলে গেলে আরও আনমনা হয়ে গেল সে। ছাত্রজীবনে কি তার সঙ্গে আত্রেয়ীর প্রেম হয়েছিল? না, ঠিক প্রেম বলে না ওটাকে। তবে আত্রেয়ীর কাছে যেতে ভাল লাগত তার। আর আত্রেয়ীর নজর ছিল আরও ওপরের দিকে। ভাল চাকুরে, প্রচুর পয়সা এবং ক্ষমতাবান মানুষের জন্যে তার লোভ ছিল। তাই সেই বয়সে ওরকম একটা মানুষকে পেয়ে সে স্বচ্ছন্দে স্বপ্নেন্দুদের ভুলে যেতে পেরেছিল। কষ্ট হয়েছিল অবশ্যই কিন্তু সেটা ভুলে যেতে সময় লাগেনি। প্রেম হলে কি তা সম্ভব হত। শরীরে যৌবন নেই। সেই চাপল্য নেই, আকর্ষণ করার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। এই আত্রেয়ীর সঙ্গে নবীন প্রেম হয় না, পুরনো বন্ধুত্ব রাখা যায় মাত্র। কথাটা মনে হওয়ামাত্র হেনা সেনের শরীরটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে দম বন্ধ হয়ে গেল তার। হেনা সেনকে কৃতজ্ঞতা জানানো হল না। কাল এবং পরশু ছুটি। সোমবারে ঘরে ডেকে ওটা জানাতে গেলে হয়ত নানান কথা উঠবে। তাছাড়া সেদিন অফিসের আবহাওয়া কী রকম থাকবে তাও সে জানে না।

    আত্রেয়ীর সঙ্গে দেখা না হলে হয়ত বুকের ভেতর হেনা সেনের জন্যে এতটা আনচান শুরু হত না। আত্রেয়ীর যন্ত্রণাটা যেন তার মনে ছুঁইয়ে চলে গেল। স্বপ্নেন্দুর মনে হল হেনা সেনের বাড়িতে গিয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এলে কেমন হয়? অফিস থেকে বের হবার আগে সে ওর ফাইল থেকে বাড়ির ঠিকানাটা জেনে এসেছে।

    পরমুহূর্তেই চিন্তাটাকে বাতিল করল সে। হেনা সেনের বাড়িতে যাওয়া একজন অফিসারের পক্ষে সম্মানজনক হবে না। হেনা যদি বিরক্ত হয় তাহলে অফিসে ঢি ঢি পড়ে যাবে। স্টাফরা তো বটে মিসেস বক্সী খড়্গহস্ত হবে। তাছাড়া হয়ত গিয়ে দেখবে ওর কোনও সহকর্মী সেখানে বসে আছে। তাহলে? বেইজ্জতের একশেষ। না, এটা অত্যন্ত ঝুঁকি নেওয়া হয়ে যাবে।

    এক কাপ চা খেয়ে হাঁটছিল স্বপ্নেন্দু। এই সময় একটা বাচ্চা ছেলে পেছনে লাগল। ধর্মতলায় এদের প্রায়ই চোখে পড়ে। একগাদা টাটকা ফুল নিয়ে এরা অনুনয় করে কিনতে। স্বপ্নেন্দু শুনেছে এই সব ফুলের অতীত নাকি ভাল নয়। কবরস্থান থেকে তুলে নিয়ে এসে নাকি বিক্রি করা হয়। তাছাড়া ফুল নিয়ে সে কী করবে? বাড়িতে যার ফুলদানি নেই তার ফুলের কী প্রয়োজন। ছেলেটাকে হটিয়ে দিলেও সে পিছু ছাড়ছিল না। ফুলগুলোর প্রশস্তি করতে করতে আকুতি জানাচ্ছিল কেনবার জন্যে। প্রায় বাধ্য হয়ে স্বপ্নেন্দু এবার ফুলগুলোর দিকে তাকাল। আর তখনই তার নজরে পড়ল একটা আধফোটা বড় রক্তগোলাপ কী রকম নরম সতেজ চেহারা নিয়ে তাকিয়ে আছে। পুরো ফোটেনি ফুলটা কিন্তু এমন ডাঁটো এবং উদ্ধত ভঙ্গি, পাপড়ির গায়ে জলের ফোঁটা যে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। সে ছেলেটাকে বলল, ‘ঐ ফুলটার দাম কত?’

    ‘আট আনা সাব।’ হাত বাড়িয়ে তুলে দিল সে গোলাপটিকে। লম্বা ডাঁটি এবং তাতে দুটো পাতা। দর করল না স্বপ্নেন্দু। দাম মিটিয়ে দিয়ে নাকের সামনে ধরতেই অদ্ভুত জোরালো অথচ মায়াবী গন্ধ পেল। এবং তখনই মনে হল এই গন্ধটা তার খুব চেনা। চোখ বন্ধ করতেই হেনার শরীর ভেসে উঠল। আজ সকালে লিফটে হেনা সেনের শরীর থেকে সে এই রকম গন্ধ পেয়েছিল। আদুরে চোখে ফুলটাকে দেখল স্বপ্নেন্দু আর তারপরেই মনে হল হেনা সেনের শরীরের সঙ্গেও এই ফুলের মিল আছে। এইরকম তাজা, উদ্ধত, অহঙ্কারী এবং মহিমাময়। শেষ শব্দটা ভাবতে পেরে খুব ভাল লাগল তার। মহিমাময়।

    ফুলটার দিকে তাকিয়ে স্বপ্নেন্দুর দ্বিতীয়বার মনে হল তার উচিত একবার হেনা সেনের বাড়িতে যাওয়া। সে তো কখনও ফুল কেনেনি। কোনও ফুলওয়ালা তার পেছনে জোটেনি কোনদিন। আজ কেন হল?

    আর ওই ছেলেটার কাছে এই ফুলটাই বা থাকবে কেন যা দেখলে হেনা সেনকে মনে পড়ায়! হেনা সেন থাকে ফুলবাগানের সরকারি ফ্ল্যাটে। তেমন বুঝলে একটা মিথ্যে ওজর দিতে অসুবিধে হবে না। তাছাড়া যে মেয়ে তাকে বাঁচাতে অতগুলো সহকর্মীর সামনে কথা সাজাল সে নিশ্চয় অফিসে গিয়ে নালিশ করবে না। এইসব ভেবে স্বপ্নেন্দু একটা ট্যাক্সি ধরল। পারতপক্ষে শেয়ারে ছাড়া সে ট্যাক্সিতে চড়ে না। কিন্তু আজ মনে হল এই ফুলটাকে নিয়ে বাসে ওঠা যায় না। ভেতরে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সে। ঘাম জমছিল কপালে।

    সরকারি ফ্ল্যাটের কাছে এসে ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে স্বপ্নেন্দুর মনে হল এই লাল গোলাপটাকে হাতে ধরে পথ হাঁটা উচিত হবে না। এটাকে দেখলে মানুষের কৌতূহল হবেই। অথচ পকেটে রাখলে ফুলটা নষ্ট হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত সে রুমাল বের করে সযত্নে তাতে ফুলটাকে ঢেকে ঝুলিয়ে নিল এমন করে যে কেউ দেখলে চট করে বুঝতে পারবে না।

    নম্বর খুঁজে খুঁজে ফ্ল্যাটটা পেতে মিনিট পনেরো লাগল। তিন তলায় দরজার গায়ে লেখা আছে মিস্টার এসো কে সেন। এই লোকটা কে হতে পারে? হেনার বাবা? মেয়ের অফিসার বাড়িতে এসেছেন শুনলে ভদ্রলোক কী মনে করবেন? কিন্তু এখন ফিরে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। একটু মরিয়া ভাব এসে গেলে স্বপ্নেন্দু কলিং বেলে আঙুল রাখল। আর আশ্চর্য, দরজা খুলল হেনা নিজে।

    ‘ওমা, আপনি?’ খুব অবাক গলায় প্রশ্ন করল হেনা।

    স্বপ্নেন্দু দেখল লালশাড়ি লাল ব্লাউজে হেনাকে ঠিক রক্তগোলাপটার মত দেখাচ্ছে। অফিস থেকে ফিরে স্নান করেছে নিশ্চয়ই কারণ লাবণ্য ঢলঢল করছে সারা অঙ্গে। স্বপ্নেন্দু কোনরকমে বলতে পারল, ‘এলাম।’

    ‘হ্যাঁ আসুন।’ হেনা সরে দাঁড়াতে স্বপ্নেন্দু ঘরে ঢুকল। সুন্দর সাজানো আধুনিক ঘর। দরজাটা ভেজিয়ে হেনা জিজ্ঞসা করলেন, ‘কী ব্যাপার বলুন তো?’

    স্বপ্নেন্দুর খেয়াল হল রুমালটার কথা। ওটা এখনও হাতে ঝোলানো। যতটা সম্ভব ওটাকে আড়াল করে সে কথা বলল, ‘আমি না এসে পারলাম না। আজ আপনি আমাকে অফিসে বাঁচিয়েছেন। আমি যে কী বলে আপনাকে–’

    শব্দ করে হেসে উঠলেন হেনা সেন। তাঁর শরীরে পুরীর ঢেউগুলোকে চকিত দেখতে পেল স্বপ্নেন্দু। হেনা সেন হাসতে হাসতে বললেন, ‘বলিহারি আপনি! ওই জন্যে বাড়ি বয়ে ধন্যবাদ জানাতে এলেন! এখন যদি খবরটা অফিসে জানাজানি হয়ে যায়? আরে মুখটা অমন করেছেন কেন? বসুন বসুন।’

    স্বপ্নেন্দু মাথা নাড়ল, ‘না বসব না। রাতও তো হল।’

    ‘রাত এমন কিছু হয়নি। দাঁড়ান, আমার মায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।’ কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে হেনা সেন ভেতরে চলে গেলেন। স্বপ্নেন্দু আড়ষ্ট হয়ে বসল। রুমালটাকে সে সন্তর্পণে সোফার ওপর রেখে দিল। তিনঘরের ফ্ল্যাট। অথচ অন্য মানুষের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে না।

    একটু বাদেই এক প্রৌঢ়াকে নিয়ে হেনা সেন ফিরে এলেন, ‘আমার মা।’

    স্বপ্নেন্দুর ইচ্ছে করছিল প্রণাম করতে কিন্তু সেটা বাড়াবাড়ি হবে মনে হওয়ায় নমস্কার করল। সে। মহিলা বললেন, ‘বসুন।’

    ‘আমাদের অফিসার! খুব জাঁদরেল লোক।’ হেনা সেন জানালেন। মহিলা বললেন, ‘আপনি কি এদিকেই থাকেন?’

    ‘না। মানে আমার এক বন্ধুর কাছে এসেছিলাম, ভাবলাম দেখা করে যাই।’

    ‘ওর পুরনো অফিসে পরিবেশ ভাল ছিল না। একজন তো খুব বিরক্ত করতেন। শেষ পর্যন্ত আমি তাকে নিষেধ করলাম বাড়িতে আসতে। আসলে বাবা, এখানে কোনও পুরুষ মানুষ যদি ঘন ঘন আসে তাহলে নানান কুকথা উঠবে। আমরা মায়ে মেয়েতে থাকি তো।’

    ‘সে তো নিশ্চয়ই!’ স্বপ্নেন্দু ঢোঁক গিলল।

    ‘ওর বাবা যা রেখে গিয়েছেন তাতে মেয়ের চাকরি করার দরকার হয় না। কিন্তু মেয়ে কথা শুনলে তো! এখন একটা ভাল ছেলে পেলে বেঁচে যাই।’

    হেনা চাপা গলায় বললেন, ‘আঃ মা! তুমি আবার আরম্ভ করলে!’

    প্রৌঢ়া স্বপ্নেন্দুকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ওই দ্যাখো, বলতেই আপত্তি। কিন্তু—!’

    ‘কোনও কিন্তু নয়। এখন ভেতরে গিয়ে রামের মাকে বল কফি করতে।’

    ‘কিন্তু স্বপ্নেন্দু উঠে দাঁড়াল, ‘মাফ করবেন! আমি কফি খাব না! মানে একটু আগে চা খেয়েছি তো!’

    ‘ও অন্য জায়গায় চা খেয়ে আমার কাছে এসেছেন?’

    ‘না। মানে, ঠিক আছে আর একদিন খাব।’

    ‘আর একদিন খাবেন মানে? শুনলেন না মা একটু আগে কি বলল। ঘনঘন এ বাড়িতে এলে পাঁচজনে কুকথা বলবে।’ হেনা সেন আবার হাসিতে ভেঙে পড়লেন। স্বপ্নেন্দু ঠোঁট কামড়াল! তাকে স্পষ্ট বলে দেওয়া হচ্ছে আর কখনও এই বাড়িতে এসো না!

    প্রৌঢ়া অবশ্য বলে উঠলেন, ‘ছিঃ ওভাবে ঠাট্টা করতে হয়।’

    ‘আমি যে ঠাট্টা করলাম তা উনি বুঝতে পেরেছেন। সত্যি চা কফি খাবেন না?’

    স্বপ্নেন্দু মাথা নাড়ল, ‘চলি আবার দেখা হবে।’

    ‘আপনার রুমাল পড়ে রইল ওখানে।’

    স্বপ্নেন্দুর খেয়াল হল। সে কয়েক পা ফিরে এসে রুমালটাকে তুলে নিল। এতসব সত্ত্বেও তার খুব ইচ্ছে করছিল হেনা সেনের হাতে টাটকা লাল গোলাপটা তুলে দিতে। কিন্তু এইসব কথাবার্তা আর প্রৌঢ়া মহিলার সামনে সেটা দেয়া অসম্ভব। ওঁরা দরজা পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিলেন। সিঁড়িতে পা দেবার আগে স্বপ্নেন্দু শুনল হেনা বলছেন, ‘ঝামেলাটা নিজের কাঁধে না রেখে মিসেস বক্সীর ওপর চাপিয়ে দিন। আপনার কি দরকার যেচে অপ্রিয় হওয়ার।’

    নির্জন রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে স্বপ্নেন্দু টলমল হল। হেনা সেন তার সঙ্গে যতই রসিকতা করুক না কেন শেষ সময়ে যে কথাটা বলল তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় ওর প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতি আছে। কোনও কোনও মানুষের একটা বাহ্যিক স্বভাব থাকে পরিহাস করার কিন্তু ভেতরের আন্তরিকতা যখন বেরিয়ে আসে তখন বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না। হেনা সেই রকমের মেয়ে।

    বুঁদ হয়ে হাঁটছিল স্বপ্নেন্দু। লাল জামা লাল শাড়ি সাদা নিটোল ডানার মত কাঁধ থেকে হাত নেমে এসেছে যার সেই মেয়ে তার চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছিল। রুমালটাকে নাকের নিচে নিয়ে আসায় সে আবার হেনা সেনের শরীরের ঘ্রাণ আবুক নিতে পারল।

    বাড়ি ফিরে স্বপ্নেন্দুর খেয়াল হল আজ রান্না-বান্না বন্ধ। ওর রাতদিনের কাজ করে যে লোকটা সে দেশে গেছে কার অসুখের খবর পেয়ে। সামনে দুদিন ছুটি বলে স্বপ্নেন্দু আপত্তি করেনি। সন্ধ্যেটা এমন ঘোরে কেটে গেল যে এসোব কথা মনেও আসেনি। এখন রাত্রে হরিমটর।

    দরজা খুলে সে শোওয়ার ঘরে এল। একটা ফুলদানি নেই যেখানে গোলাপটাকে রাখা যায়। টেবিলে একটা সুন্দর কাচের বাটি ছিল, স্বপ্নেন্দু তার মধ্যে ফুলটাকে বসিয়ে দিল। একটুও টসকায়নি সেটা, তেমনি উদ্ধত এবং আদুরে। আর কি টকটকে লাল। কি খেয়াল হতে বাটিটাকে উল্টো করে বসিয়ে দিতে স্বপ্নেন্দু আবিষ্কার করল ফুলের রঙ কাচের আস্তরণ ভেদ করে বেরিয়ে আসছে। আরও রহস্যময় দেখাচ্ছে। সামান্য দূরে সরে কাঁচ চাপা ফুলটাকে দেখল সে। ঠিক মধ্যিখানে গর্বিত ভঙ্গিতে রয়েছে।

    এক কাপ কফি আর কয়েকটা বিস্কুট খেয়ে শুয়ে পড়ল স্বপ্নেন্দু। আজ সারাদিন অনেক ঘটনা ঘটে গেল। চারদিকে শুধুই নোংরামো, একমাত্র ব্যতিক্রম হেনা সেন। কিন্তু তার কাছে আগের অফিসের কোনও অফিসার প্রায়ই যেত! লোকটাও কি হেনার প্রেমে পড়েছিল? মনে মনে খুব জেলাস হয়ে উঠল সে। হেনা লোকটাকে বাড়িতে এলাউ করত কেন? হেনারও কি দুর্বলতা ছিল? স্বপ্নেন্দুর অস্বস্তি শুরু হল। তার খেয়াল হল হেনা স্বইচ্ছায় ট্রান্সফার চেয়ে এই অফিসে এসেছে। দুর্বলতা থাকলে নিশ্চয়ই তা করত না।

    কিন্তু অফিসের পরিবেশটা জঘন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর চেয়েও কোনও কলেজে মাস্টারি নিয়ে অনেক বেশি আরামে থাকা যেত। আসলে এখন মানুষের লোভের কোনও সীমানা নেই। চাই আরও চাই। যেমন আত্রেয়ী। একসময় যেটাকে সুখ বলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এখন সেটা থেকে মুক্ত হতে চাইছে। সে সুখের মালা যেন ফাঁস হয়ে বসেছে গলায়। আসলে সেখানেও একটা অতৃপ্তি, যা অন্য লোভ থেকে মনে জন্মেছে। স্বপ্নেন্দু শুয়ে শুয়ে হাসল। আজ পৃথিবীর সমস্ত মানুষ কোনও না কোনও লোভের শিকার। কাকে দোষ দেবে। এই নিয়ে মানিয়ে গুছিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে। সে নিজেও তো লোভার্ত হয়ে হেনা সেনের বাড়িতে ছুটে গিয়েছিল। অথচ যাওয়ার আগে কতকগুলো বাহানা তৈরি করতে হয়েছিল নিজের কাছে কৈফিয়ত দিতে। নিশ্বাস ফেলেছিল মৃদু তালে স্বপ্নেন্দু। তার তিনতলার ঘরে অল্প অল্প হাওয়া আসছে। মাথার ওপর ফ্যানটা ঘুরছে না। কলকাতা শহর কখন যে বিদ্যুৎহীন হয়ে গেছে তা টের পায়নি। স্বপ্নেন্দুর চোখের সামনে লাল শাড়ি লাল জামা। শিশুর মত ঘুমিয়ে পড়ল তাই নিয়ে।

  • কালোচিতার ফটোগ্রাফ

    কালোচিতার ফটোগ্রাফ

    এ যেন স্বর্গের সিঁড়ি, উঠছে তো উঠছেই, শেষ আর হয় না। এই পাহাড়ি শহরটার নিচ থেকে ওপরে শর্টকাট পথ তৈরি করতে এমন বেশ কয়েকটা সিঁড়ি ছড়িয়ে আছে এখানে ওখানে। বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে বড় প্যাকেটে পুরে সেটা বুকের ওপর চেপে ধরে তার একটা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিল মতিলাল। আজকাল টানা উঠতে বুকে হাঁপ ধরে। হঠাৎ তার নজরে পড়ল একেবারে ওপর থেকে একটি মানুষ তরতরিয়ে নিচে নেমে আসছে। এ নিশ্চয়ই কোনও ডানপিটে তরুণ, নইলে ওই গতিতে নামার কথা চিন্তা করত না। ওভাবে নামতে হলে রীতিমত অভ্যস্ত হওয়া দরকার। মতিলাল সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। সিঁড়িটা চওড়া নয়, একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে খাদ। কিন্তু সে ভাল করে সরে যাওয়ার আগে ছেলেটি তাকে মৃদু ধাক্কা মেরে নিচে চলে গেল একটুও গতি না কমিয়ে। আর ওই সামান্য ধাক্কাতেই মতিলালের হাতের প্যাকেট ছিটকে পড়ল মাটিতে। বেরিয়ে এল চিনি-চায়ের ছোট্ট প্যাকেটগুলো, দুটো ম্যাগাজিন।

    চাপা গলায় গালাগালি করতে করতে উবু হয়ে বসে সে প্যাকেট দুটো এবং ম্যাগাজিন তুলছিল। যৌবনের শুরুতে মানুষ নিজেকে কী না কী মনে করে। ভাগ্যিস এই প্যাকেটগুলো ছিঁড়ে যায়নি। উঠে দাঁড়াবার আগে সে যে জিনিসটাকে দেখতে পেল সেটা তার নয়। একটা সেলোফেন কাগজে মোড়া বস্তু পড়ে আছে পায়ের কাছে। হাত বাড়িয়ে তুলেই বুঝতে পারল জিনিসটা বেশ ভারী। মতিলাল নিশ্চিত যে ওই অতি স্মার্ট ছেলেটি ধাক্কার সময় টের পায়নি জিনিসটা পড়ে গেছে। সে নিচের দিকে তাকাল। ছেলেটি এবার সিঁড়ি থেকে নেমে বাজারের দিকে যাচ্ছে। পরনে নীল জিনস্ এবং ওপরে চামড়ার জ্যাকেট, মাথায় একটা সাদা টুপি। সে চিৎকার করে ডাকার চেষ্টা করল কিন্তু ছেলেটা মুখ তুলল না। মতিলাল জিনিসগুলো নিয়ে যতটা সম্ভব জোরে নিচে নামতে লাগল। আজকাল ধীরেসুস্থে হাঁটাচলায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। কিন্তু ছেলেটাকে ধরতে হবে বলে সে জোরে নামছিল। বেচারা হয়ত এখন টের পাবে না জিনিস পড়ে গেছে। যখন পাবে তখন আফসোস করবে। তাই এখন ওটা ওকে ফেরত দিয়ে কিছু কথা শোনানো যেতে পারে।

    নিচে নামার পর সে ছেলেটাকে দেখতে পেল না। ওপর থেকে সে দেখেছে ছেলেটি গিয়েছে বাজারের দিকে। অতএব সেদিকেই চলল সে। সাদা টুপি চামড়ার জ্যাকেট পরা মানুষের চেহারা খুঁজে খুঁজে একসময় ক্লান্ত হয়ে গেল মতিলাল।

    এখন কী করা যায়? অন্যের জিনিস বাড়ি বয়ে নিয়ে যাওয়া কোনও মানে হয় না। আবার যেখানে পেয়েছিল সেখানে ফেলে রেখে যেতেও ভদ্রতায় লাগছে। এই দোকানদারদের কাছে দেওয়ার চেয়ে সবাইকে জানিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত। সে সেলোফেনের মোড়কটা ধীরে-ধীরে খুলছিল। কী জমা দিচ্ছে তা দেখেই জমা দেবে। হঠাৎ মোড়কের ফাঁক দিয়ে একটা সরু কালো নল বেরিয়ে আসামাত্র সে চমকে উঠল। হায় ভগবান! এটা একটা পিস্তল! সে তাড়াতাড়ি মোড়কটা জড়িয়ে এপাশ-ওপাশ তাকাতেই দেখল এক মাঝবয়সি গোঁফওয়ালা লোক চট করে চোখ সরিয়ে নিল। লোকটা কি পিস্তল দেখতে পেয়েছে? বুকের মধ্যে হাতুড়ি পিটছিল কেউ। মতিলাল বুঝতে পারছিল না তার কী করা উচিত। এই পিস্তল আইনি না বেআইনি তাই বা কে জানে। যদি ছেলেটা এটা আইনসঙ্গত মনে করত তা হলে কি ওভাবে ফেলে যেত! এত ভারী জিনিস যখন পড়েছিল তখন কোনও আওয়াজ কানে যায়নি তো? আচ্ছা, এমন হতে পারে ছেলেটা এই পিস্তলের কথা জানেই না, তার হাত থেকে কিছু পড়েনি ওখানে। পিস্তল অনেক আগে কেউ রেখে গিয়েছিল ওখানে। না হলে পড়ার সময় নিশ্চয়ই আওয়াজ পেত সে। অন্য কারও পিস্তল সে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে। পুলিশকে গিয়ে এই কথা বলে পিস্তল জমা দিলে ওরা বিশ্বাস করবে? গত কয়েক মাস ধরে উগ্রপন্থীদের ধরার জন্য পুলিশ মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই পাহাড়ি শহরে এখন সামান্য গোলমাল হলে ব্যাপক ধরপাকড় হয়। কিছুদিন আগে উগ্রপন্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে কারও-বা কারও মৃত্যু খুব স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। এখন অবস্থা কিছুটা শান্ত হলেও পুলিশ সহজে তার কথা বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এই বাজারের রাস্তায় পিস্তল হাতে কেউ যদি তাকে ধরে তা হলেও তো কৈফিয়ত দেওয়ার কিছু থাকবে না। মতিলাল আর ভাবতে পারছিল না। মোড়কটাকে বড় ব্যাগের ভেতরে চালান করে দিয়ে সে মুখ তুলতেই দেখল গোঁফওয়ালা লোকটা আবার তার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিল। তার মানে ওই লোকটা তাকে লক্ষ করছে। কেন? পা-দুটো হঠাৎ দুর্বল হয়ে গেল ওর। লোকটা কী করে জানল তার কাছে পিস্তল আছে? সে এই প্রশ্নের জবাব না পেয়ে নিজেকে বোঝাল হয়ত অন্য কারণে লোকটা তাকে লক্ষ করছে। এখন সর্বত্র পুলিশের লোক ছড়ানো। বাজারে ফিরে এসেও কেনাকাটা না করে ব্যাগ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে ওর সন্দেহ হতে পারে।

    মতিলাল পা চালাল। কিছুটা যাওয়ার পর মুখ ফিরিয়ে পেছনে তাকিয়ে সে আর গোঁফওয়ালা লোকটাকে দেখতে পেল না। ওর মন একটু হালকা হল। খাড়াই সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এল সে। লোকজন অবশ্য ওঠানামা করছে কিন্তু সন্দেহ করার মত কাউকে তার চোখ পড়ল না।

    একপাশে ঢালু পাহাড়, অন্যপাশে সুন্দর বাড়িগুলো। দুপুর গড়ালেই রোদ এসে পড়ে এখানে আবহাওয়া ভাল থাকলে। মতিলাল একটু দ্রুত হাঁটছিল। রাস্তা থেকে কয়েক ধাপ উঠে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে সে নিজের বাড়ির দরজার সামনে পৌঁছে গেল। তালা খুলে ভেতরে ঢুকে আগে বড় প্যাকেটটাকে টেবিলের ওপর রাখল। দরজাটা ভাল করে বন্ধ করে সে প্যাকেট থেকে সেলোফেনের মোড়কটাকে বের করে সন্তর্পণে খুলতে লাগল। হ্যাঁ, সত্যি-সত্যি এটা একটা পিস্তল। পিস্তলটা রাখা হয়েছে একটা রবারের খাপের মধ্যে। মতিলালের মনে হল এই কারণে সিঁড়ির ওপর পড়া সত্ত্বেও কোনও আওয়াজ কানে আসেনি। পিস্তলকে রবারের খাপে রাখার নিয়ম কি না তার জানা নেই। সে দেখল অস্ত্রটির বুকের ভেতর গুলি ভরা আছে। অর্থাৎ এখনই ব্যবহার করতে চাইলে কোনও অসুবিধে নেই।

    পিস্তলটা হাতে নিয়ে চেয়ারে বসে সে বাইরের দিকে তাকাল। কাচের জানলার বাইরে তখন কাঞ্চনজঙ্ঘা ঝকঝক করছে। দেখলেই মন ভাল হয়ে যায়। মতিলাল পৃথিবীর সবাইকে এখন ক্ষমা করে দিল। যারা তার শত্রুতা করেছে, যাদের সে সহ্য করতে পারে না তার লিস্ট তৈরি করতে হলে প্রথমে সুভদ্রার নাম লিখতে হয়। সে একা থাকে। এই ছোট্ট বাড়িটায় একা থাকতে তার খারাপ লাগে না আজকাল। তবু সুভদ্রা তাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। পিস্তলটা যদি কারও ওপর ব্যবহার করতে সে বাধ্য হয় তা হলে প্রথমে সুভদ্রা। মতিলাল চোখ বন্ধ করল। তার বন্ধ চোখের পাতায় এখন সুভদ্রার মুখ! ফোলা-ফোলা চোখ, সবসময় কিছু একটা ভেবে চলেছে। বিশ্বাস শব্দটি ওর অভিধানে নেই। গুলিটা ছুড়লে ঠিক কোথায় গিয়ে লাগলে সুভদ্রাকে কেমন দেখাবে তা ভেবে পাচ্ছিল না মতিলাল। ধীরে-ধীরে মুখটা তার কাছে অন্যরকম হয়ে গেল। যতই ঝগড়া করুক, গালমন্দ দিক, আলাদা থাকুক, যে মুখে এককালে সে আদর করেছে, যদিও খুবই গোনাগুনতি ব্যাপার, তবু সেই মুখ গুলিতে ক্ষতবিক্ষত করতে পারবে না। সুভদ্রার জন্যে তার ক্রমশ মায়া হতে লাগল। আর তখনই বেল বাজল।

    কে এল! উঠে দরজা খুলতে গিয়ে খেয়াল হল। পিস্তলটা তার হাতে দেখতে পেলে যে আসবে তারই চোখ বড় হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে গুজব তৈরি হবে। কোথায় রাখা যায় এটা? দ্বিতীয়বার বেল বাজাতেই মতিলাল তড়িঘড়ি করে দেওয়ালে ঝোলানো একটা তিব্বতি ব্যাগের ভেতর মোড়কসমেত পিস্তলটা ঢুকিয়ে দিল। সুভদ্রা চলে যাওয়ার পর থেকে ওই ব্যাগে হাত দেওয়া হয়নি। যতটা পারে শান্ত মুখে দরজা খুলেই হকচকিয়ে গেল সে। গম্ভীর মুখে সুভদ্রা দাঁড়িয়ে আছে। দরজা খোলামাত্র তাকে ঠেলে সরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল সুভদ্রা।

    কে আছে, অ্যাঁ? এতক্ষণ কার সঙ্গে ফুর্তি করা হচ্ছিল। বেল টিপতে টিপতে হাতে কড়া পড়ে গেল আর বাবুর খোলার নাম নেই? দুমদুম শব্দ করে ভেতরে ঢুকে চারপাশ দেখে নিল সুভদ্রা।

    দরজাটা বন্ধ করে প্রায় চোরের মত খানিকটা দূরত্বে এসে দাঁড়াল মতিলাল।

    এতক্ষণ কী করছিলে?

    কিছু না।

    তা হলে দরজা খুলছিলে না কেন?

    এমনি।

    এমনি? উত্তর শুনে শরীর গুলিয়ে ওঠে। শুধু এই কারণে তোমার সঙ্গে আমি ঘর করতে পারিনি, বুঝলে? শোনো, তোমাকে এবার টাকা বাড়াতে হবে।

    টাকা?

     আকাশ থেকে পড়লে কেন? যা টাকা দিচ্ছ তাতে কোনও ভদ্রমহিলার মাস চলে না।

    আমি কী করতে পারি? মিনমিন করে বলল মতিলাল।

    কী করতে পারি মানে? ইয়ার্কি? তোমার বউ-এর খাওয়া-পরা চলছে না আর তুমি বলছ কী করতে পারি? অন্য কেউ হলে মুখ ভেঙে দিতাম আমি। গজগজ করে উঠল সুভদ্রা, একেই দুর্নাম রটাচ্ছ আমি নাকি মুখরা, খারাপ ব্যবহার করি, তার ওপর মুখ ভেঙে দিলে আর দেখতে হবে না। এখন থেকে প্রত্যেক মাসে দুশো টাকা করে বেশি দেবে।

    আমি কোত্থেকে পাব? আমি যা রোজগার করি তা তো জানো!

    আমি কিছুই জানি না। কেন, যেসব মেয়েছেলের সঙ্গে দিনরাত ফুসুর-ফুসুর করতে তাদের গিয়ে বলো না। অকম্মের বাদশা।

    ঠিক আছে, কিন্তু আমারও তো একটা কথা ছিল।

    তোমার কোনও কথা থাকতে পারে না।

    কিন্তু ছিল, বিশ্বাস করো।

    ল্যাঙটের আবার বুক পকেট। বলো, বলে ফেলো।

    ইয়ে, তুমি তো আমাকে ছেড়ে গেছ–।

    হ্যাঁ। গেছি। ওরকম মাদিমুখো পুরুষের সঙ্গে কেউ থাকতে পারে না।

    ঠিক আছে। এখন তুমি যার কাছে আছ–।

    তার মানে? তুমি আমাকে চরিত্রহীনা বলছ?

     না, না, এখন তো তোমার সঙ্গে বলরাম থাকে; থাকে না?

    তাতে কী এল-গেল। সে কি আমার মন্ত্রপড়া স্বামী? বিয়ে করেছি তাকে? আমি কি নিতান্তই উল্লুক? বিয়ে করলে তোমার কাছ থেকে টাকা-পয়সা পাওয়া যাবে নাকি?

    ও। তা হলে বিয়ে না করে এমনি-এমনি আছ?

    হ্যাঁ। সাহেব-মেমরা যেমন থাকে। তা তোমার এখানেও বুড়ি-বুড়ি মেয়েছেলেরা যাতায়াত করে বলে শুনেছি। যদি কাউকে দেখতে পাই! সুভদ্রা ঘুরে দাঁড়িয়ে সদ্য কিনে আনা প্যাকেটগুলো দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ওগুলো কী?

    চা, চিনি।

    আমি নিয়ে যাচ্ছি। কীসে নিই! চোখ ঘুরল সুভদ্রার। তারপর এগিয়ে গিয়ে দেওয়াল থেকে তিব্বতি ব্যাগটা টেনে নামিয়ে প্যাকেটগুলো তাতে ফেলে দিল। হাঁ-হাঁ করে উঠল মতিলাল, আরে, আরে করছ কী? ওই ব্যাগটা নিও না!

    কেন? এটা তোমার বাবার সম্পত্তি? আমি কিনেছিলাম না? আমার জিনিস নিতে আমাকেই নিষেধ করা হচ্ছে। যদি বিয়ে করতাম তবে এবাড়ির সব জিনিসই নিয়ে যেতে হত আমাকে। আজ যাচ্ছি। সামনের মাস থেকে দুশো টাকা বেশি দেবে। যেমন এসেছিল তেমনি ঝড়ের মত চলে গেল সুভদ্রা।

    দরজা বন্ধ করে ধীরে-ধীরে কিচেনে গেল মতিলাল। গ্যাস জ্বেলে এক কাপ কফি বানিয়ে বসার ঘরে এল। সামনের জানলা দিয়ে পাহাড়ের অনেকটা দেখা যায়। সেদিকে তাকিয়ে কফিতে চুমুক দিল সে। বেতের চেয়ারে বসে পাহাড় দেখতে-দেখতে সময় কাটানো ওর প্রিয় অভ্যেস। সুভদ্রা চলে গেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু মনে হচ্ছে ওর কথাগুলো এই ঘরে ভাসছে। জীবনের একটা ভুল অনেক দাম দিয়ে গেল। বলরাম তারই বন্ধু। কণ্ট্রাক্টরি করে। কঁচা পয়সা হাতে। সুভদ্রার শরীরের দিকে নজর ছিল অনেকদিন। এখন সে সুভদ্রার কাছেই থাকে। অথচ সুভদ্রা নাকি ওর কাছ থেকে একটা পয়সাও নেয় না। অভাবে থাকবে, তবু সাহায্য নেবে না। প্রয়োজন হলে এ বাড়িতে এসে সে ঝামেলা করবে। মানুষের চরিত্র বোঝা মুশকিল।

    মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স তার। চাকরি করে ব্যাঙ্কে। সুভদ্রা চলে যাওয়ার পর কোনও মেয়েমানুষের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি হয়নি। এই বয়সে বন্ধুরা রুমাল পালটানোর মত মেয়েমানুষ পালটায়। তার উৎসাহ হয় না। আজ রবিবার। ব্যাঙ্ক বন্ধ। কোনও কাজ নেই। দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নিয়ে চা খাবে। সন্ধে থেকে হুইস্কি। রাত বাড়লে একটা চমৎকার ঘুম। এইভাবেই বাকি জীবন যদি কাটিয়ে দিতে পারত। সে কফি শেষ করে নিজের ঘরে এল। বিছানার ওপরে একটা সিনেমার পত্রিকা। মাধুরী দীক্ষিতের মুখ। এখনকার নায়িকারা বেশি সুন্দরী না মধুবালা, মালা সিনহারা? বিষয়টা নিয়ে ভাবতে বসলে বেশ ভালভাবে সময় কেটে যায়। অড্রে হেপবার্ন, সোফিয়া লোরেন না প্রিটি ওম্যানের সেই মেয়েটা। কী যেন নামটা?

    এইসময় দরজার বেল বেজে উঠল গাক-গ্যাক করে। লোকটা রসকষহীন। বেল বাজানোর ধরনের ওপর মানুষের চরিত্র অনেকটা বোঝা যায়। মতিলাল এগিয়ে গেল দরজা খুলতে। নিশ্চয়ই সুভদ্রা ফিরে আসেনি। এমনভাবে বেল ও বাজায় না।

    দরজা খুলতেই হকচকিয়ে গেল মতিলাল। এক জিপ পুলিশ সামনে দাঁড়িয়ে। থানার ওসি থাপাকে সে চেনে। দয়া মায়া স্নেহ বলে বোধগুলো ঈশ্বর ওর জন্মের সময় দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। থাপার হাতে রিভলভার। সেটা মতিলালের নাকের ডগায় নাচিয়ে থাপা বলল, হ্যাণ্ডস আপ। চালাকির চেষ্টা করলে গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেব।

    কোনওরকমে দুটো হাত মাথার ওপর তুলতেই ধমক খেল সে, ‘ঘরে চলো’।

    অতএব ঘরে ঢুকতেই হল। পুলিশ বাহিনীকে সদর দরজায় রেখে থাপা দুজনকে নিয়ে ভেতরে এল, ‘বাড়িতে আর কে-কে আছে?’

    ‘কেউ নেই।’ মাথার ওপর হাত তুলেই রেখেছিল সে।

    ‘কী কী বেআইনি অস্ত্র আছে বাড়িতে?’

    ‘অস্ত্র? অস্ত্র থাকবে কেন?’ করুণ গলায় পালটা প্রশ্ন করল সে।

    ‘মারব মুখে এক থাবড়া, আমাকেই প্রশ্ন করা হচ্ছে। বের করো পিস্তলটা।’

    ‘আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না, বিশ্বাস করুন!’ ককিয়ে উঠল সে।

    ‘তোমার কাছে কোনও পিস্তল নেই?’ ছোট-ছোট চোখে তাকাল থাপা।

    ‘না নেই।’

    ‘আজকে একজন তোমাকে পিস্তল পাচার করেনি?’

    ‘না। বিশ্বাস করুন!’

    ‘অ্যাই সার্চ করো। সব খুঁজে দ্যাখো। নো মার্সি।’ থাপা আদেশ দেওয়ামাত্র বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল তল্লাশি করতে। মতিলাল দেখল ওরা ঘর লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। দুটো কাচের প্লেট ভাঙল। সব গেল।

    ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যে করেন। চিনি, দুধ, চা যা ইচ্ছে সুভদ্রা নিয়ে যাক, আর কোনওদিন সে বাধা দেবে না। ভাগ্যিস ও আজ এসেছিল এবং তিব্বতি ব্যাগে পিস্তলটাকে রাখায় ব্যাগের সঙ্গে আপদটাকেও নিয়ে গিয়েছে সুভদ্রা।

    ‘হাত নামাও।’ থাপার গলা।

    আদেশ শুনে চোখ খুলে ধীরে-ধীরে হাত নামাল মতিলাল।

    ‘কোথায় রেখেছ?’

    মতিলাল চোখ ঘুরিয়ে দেখল বাহিনী হতাশ মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

    ‘আমি কিছুই জানি না।’

    সঙ্গে-সঙ্গে থাপার হাত এগিয়ে এল। তার সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে দেখল লোকটা। শেষে তাকে বলল, ‘যদি প্রমাণ পাই মালটা তোমার কাছে ছিল তা হলে তোমার চামড়া ছাড়িয়ে নেব। এই, ডাক তো লোকটাকে। আজ ওর একদিন না আমার, দেখি?’

    সেপাইরা বাইরে থেকে যাকে ধরে নিয়ে এল তাকে দেখে মতিলাল অবাক। সেই মাঝবয়সি গোঁফওয়ালা লোকটা। থাপা এগিয়ে গিয়ে ওর জামার কলার এমনভাবে মুঠোয় ধরল যেন দম আটকে গেল, ‘অ্যাই শালা। এই খবর এনেছিস? কোথায় পিস্তল?’

    লোকটা হাউমাউ করে উঠল, ‘মাইরি বলছি ওর প্যাকেটে ছিল। আমি দেখেছি।’

    ‘থাকলে কোথায় যাবে?’

    ‘ও ওই প্যাকেট নিয়ে এ বাড়িতে ঢুকেছে।’

    ‘ঢুকে আর বের হয়নি?’

    ‘তা বলতে পারব না। মাঝখানে আমি কিছুক্ষণের জন্যে আপনাকে ফোন করতে গিয়েছিলাম। প্যাকেটটা পেয়েছেন?’ লোকটা সেই অবস্থায় বলল।

    ‘এখানে কোনও প্যাকেটই নেই। শোন, এবার থেকে ইনফরমেশন কারেক্ট না হলে,—’ প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ঠেলে ফেলে দিল লোকটাকে। তারপর সদলবলে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। জিপের চলে যাওয়া শব্দ কানে যাওয়ার পর মতিলাল দেখল লোকটা চেষ্টা করছে উঠে বসতে। পড়ে যাওয়ার সময় নিশ্চয়ই প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে লোকটা।

    মতিলাল একটা চেয়ার টেনে বসল। ওঠার চেষ্টা করে লোকটা হাঁটু মুড়ে বসে বলল, ‘আমাকে দেখে খুব মজা লাগছে, না?’

    মতিলাল বলল, ‘পিস্তলটা পাওয়া গেলে আমার অবস্থা তোমার চেয়ে খারাপ হত।’

    দৃশ্যটা কল্পনা করে লোকটা যেন নিজের কষ্ট একটু কম করে দেখল, ‘আচ্ছা, মালটা কোথায় হাওয়া করে দিলে ভাই? তাজ্জব ব্যাপার?’

    ‘কী মাল?’

    ‘ইয়ার্কি? আমি স্পষ্ট দেখেছি তুমি প্যাকেটটা কুড়িয়ে নিলে। ওটা যে তোমার নয় সেটা বুঝতে পেরেই পেছনে লাগলাম। বাজারের মধ্যে কাউকে খুঁজে না পেয়ে তুমি যখন মোড়ক খুলছিলে তখন স্পষ্ট পিস্তলের নলটা দেখতে পেয়েছি।’

    ‘তুমি তা হলে পুলিশের লোক?’

    ‘তোমার ঘটে একটুও বুদ্ধি নেই। পুলিশের লোক হলে থাপা আমার গায়ে হাত তুলতে সাহস পেত? আমার কাজ হল গোপন খবর ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিয়ে কিছু কামাই করে নেওয়া। তুমি আমাকে আজ বোকা বানালে। আমি জানি পিস্তলটা এই বাড়িতেই আছে।’ লোকটা উঠে দাঁড়াল।

    মতিলাল দার্শনিকের মত বলল, ‘খুঁজে দ্যাখো, ওরাও তো খুঁজল।’

    লোকটা যেন আদেশের অপেক্ষায় ছিল। সঙ্গে সঙ্গে জিনিসপত্র সরিয়ে দেখতে লাগল। দেখতে-দেখতে বলল, ‘তুমি কি বিবাহিত? বউ কোথায়?’

    ‘পিস্তলটা আগে খোঁজ তারপর খেজুরে আলাপ করো।’ মতিলাল খেঁকিয়ে উঠল।

    খুঁজতে খুঁজতে লোকটা কিচেনে পৌঁছে গেল। একটু বাদে তার গলা ভেসে এল, ‘খুব খিদে পেয়েছে। তোমার রুটি আর সবজি খেতে পারি?’

    ‘দুটোর বেশি নেবে না। প্লেটে করে নিয়ে এখানে চলে এসো।’

    মতিলাল হুকুম করল। লোকটা প্লেট নিয়ে রুটি চিবোতে চিবোতে এগিয়ে এসে বলল, ‘ওঃ বাঁচলাম।’

    ‘লোকটা কে?’ মতিলাল এখন যেন কর্তৃত্বে।

    ‘কোন লোক?’

    ‘যে সিঁড়ি বেয়ে ওপর থেকে নামছিল। যার প্যাকেট পড়ে যেতে তুমি দেখেছিলে?’

    ‘আমি কি পৃথিবীর সব মানুষকে চিনি?’ মুখ ঘুরিয়ে নিল লোকটা।

    ‘তুমি মিথ্যে কথা বলছ।’

    ‘বিনা পয়সায় আমি খবর দিই না।’

    ‘পুলিশকে তো নাম বলেছ। একই খবর বিক্রি করে কবার পয়সা নেবে।’

    ‘মাইরি আর কী? পুলিশকে ওর কথা বলতে যাব কেন? বলেছি তুমি বাজারের মধ্যে পিস্তল নিয়ে ঘুরছিলে। ছেলেটার কথা ভুলেও পুলিশকে বলিনি।’

    ‘তুমি তো আচ্ছা শয়তান!’ মতিলাল অবাক।

    ‘শয়তান বলো আর যাই বলো আমার তাতে কিছু যায় আসে না। বিজনেস ইজ বিজনেস, আমার বউ তো পৃথিবীর সব গালাগাল শিখে ফেলেছে আমাকে দেবে বলে। তাতে কোন কাজটা হয়েছে শুনি? এখন তুমি জিগ্যেস করতে পারো কেন আমি পুলিশকে ছেলেটার কথা বলিনি। প্রথম কথা, যদি তুমি কুড়িয়ে পেয়েছ তা হলে তোমার অপরাধ কমে যাবে, পুলিশের কাছেও তেমন গুরুত্ব থাকবে না। দ্বিতীয়ত, যদি তুমি পুলিশের চোখ এড়িয়ে পিস্তলটা রেখে দিতে পারো তা হলে আমি ওই ছেলেটার কাছে গিয়ে বলতে পারি তার পিস্তল কোথায় আছে এবং টাকা খিচতে পারি।’ লোকটা খাওয়া শেষ করে হাসল।

    ‘যে পিস্তল মাটিতে ফেলে দিয়ে যায় সে কেন তোমার কাছে খবর পেয়ে সেটা নিতে আসবে?’

    ‘অনেক সময় বাধ্য হয়ে ফেলে। বিপদ এড়াবার জন্যে ফেলতে হয়। তা হলে পিস্তলটাকে তুমি এ বাড়ি থেকে পাচার করে দিয়েছ। দারুণ ঘোড়েল মাল তুমি।’

    ‘অনেকক্ষণ থেকে গালাগাল দিচ্ছ তুমি!’

    ‘দেব না? আজ তোমার জন্যে কামাই বন্ধ, উলটে মার খেতে হল!’

    ‘কী নাম তোমার?’

    ‘শানবাহাদুর।’

    ‘থাকো কোথায়?’

    ‘বোটানিক্যাল গার্ডেনের রাস্তায়।’

    ‘মাঝে-মাঝে এসো। মন ভাল থাকলে গল্প করা যাবে।’

    ‘মন খারাপ হয় নাকি খুব?’

    ‘তা তো হয়ই। একা মানুষ।’

    ‘ও। তা হলে চলো। আমার বউ-এর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিচ্ছি, তোমার মন একদম ভাল হয়ে যাবে।’ শানবাহাদুর হাসল।

    ‘এই বললে তোমার বউ গালাগালির এক্সপার্ট।’

    ‘তাই তো নিয়ে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ গালাগালি শুনলে দেখবে মনটা আর মনে থাকে না। কেমন উদাস হয়ে যায়।’

    ‘মাপ করো ভাই। তুমি গিয়ে তোমার চেনা সেই ছেলেটাকে খবর দাও। তাতে যদি কিছু রোজগার হয় তোমার।’ মতিলাল প্রায় জোর করে শানবাহাদুরকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

    চেয়ারে বসতেই তার সুভদ্রার কথা মনে এল। পিস্তলটা দেখতে পেয়েও নিশ্চয়ই চেঁচিয়ে উঠবে। এখনও যে দ্যাখেনি তার প্রমাণ দেখলে এতক্ষণে ছুটে আসত। কিন্তু পুলিশ যদি জানতে পারে ওর কাছে পিস্তল আছে তা হলে আর দেখতে হবে না। মেরে কিমা বানিয়ে দেবে সুভদ্রাকে। বিনা দোষে কষ্ট পাবে বেচারা।

    মতিলালের মনে হল এখনই সুভদ্রার বাড়িতে গিয়ে ওকে সাবধান করে দেওয়া উচিত। সে উঠল। কিন্তু তারপরই মনে পড়ল শানবাহাদুরের কথা। লোকটা যদি বাইরে গিয়ে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। তা হলে নিশ্চয়ই ওর পিছু নেবে। সুভদ্রার কাছে গেলে দুই-এ দুই চার করে নিতে অসুবিধে হবে না ওর। এমনিতে হয়ত কিছু হত না, সে আগ বাড়িয়ে বিপদ ডেকে আনবে।

    মতিলাল নিজের বিছানায় চলে এল। জুতো খুলে মোজা-পায়েই শুয়ে পড়ল সে। আঃ কী আরাম! একটু ঘুমিয়ে নিয়ে বিকেল নাগাদ সুভদ্রার খোঁজে গেলেই হবে, ততক্ষণ শানবাহাদুরের ধৈর্য থাকবে না দাঁড়িয়ে থাকার। চোখ বন্ধ করল সে। চোখের পাতায় হেমা মালিনী, রেখা অথবা জিনাতের শরীর ঘুরে-ঘুরে আসত লাগল। এইভাবে কল্পনা করা ওর দীর্ঘদিনের অভ্যেস।

  • এক

    এক

    পুর্বের আকাশ ফরসা হয়ে এসেছে। টুকরো টুকরো মেঘের ওপর লাল হলুদের পোঁচ। দপদপ করে জ্বলছে শুকতারা। ঐদিকে তাকিয়ে ফজল বলে, ‘ধলপহর দিছেরে নূরু, পোয়াত্যা তারা ওঠেছে। আরো জলদি করণ লাগব।’

    দুজনেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে। সূর্য ওঠার আগেই কাঁকড়ামারির মুখে পৌঁছতে হবে তাদের। আলো দেখার সাথে সাথে মাছ তাদের রাতের আস্তানা ঢালু কিনারা ছেড়ে সরে যাবে গভীর পানিতে।

    নদীর ঢালে জাল দিয়ে মাছ ধরছে চাচা। দশ বছরের ভাইপো ডুলা নিয়ে ফিরছে তার পিছু পিছু। চাচা জাল ঝেড়ে মাছ ফেলে। ভাইপো কুড়িয়ে নিয়ে রাখে ডুলার ভেতর। চিংড়ি আর বেলে মাছই বেশির ভাগ।

    ফজল আবার জালটাকে গোছগাছ করে তার একাংশ কনুইর ওপর চড়ায়। বাকিটা দু’ভাগ করে দু’হাতের মুঠোয় তুলে নেয়। তারপর পানির দিকে এগিয়ে গিয়ে ঝাঁকি মেলে ছুঁড়ে দেয় নদীর পানিতে। দূরে গিয়ে অনেকটা জায়গার ওপর ওটা ঝপ করে ছড়িয়ে পড়ে।

    ঝাঁকি জাল। কড়া পাক দেয়া সরু সুতোয় তৈরি। পানিতে ভিজে ভিজে সুতো পচে না যায় সেজন্য লাগানো হয়েছে গাবের কষ। কষ খেয়ে খেয়ে ওটা কালো মিশমিশে হয়েছে। জালের নিচের দিকে পুরোটা ঘের জুড়ে রয়েছে ‘ঘাইল’–মাছ ঘায়েল করার ফাঁদ। ঘাইলগুলোর সাথে লাগান হয়েছে লোহার কাঁঠি।

    এ লোহার কাঠির কাজ অনেক। কাঠির ভারে ভারী হয় বলেই জালটাকে দূরে ছুঁড়ে মারা সম্ভব হয়। আর ওটা তাড়াতাড়ি পানির তলায় গিয়ে মাটির ওপর চেপে বসতে পারে। জাল টেনে তুলবার সময় আবার কাঠির ভারের জন্য ফাঁদগুলো মাটির ওপর দিয়ে ঘষড়াতে ঘষড়াতে গুটিয়ে আসে। গুটিয়ে আসে চারদিক থেকে মুখ ব্যাদান করে। জালের তলায় আটকে পড়া মাছ পালাবার পথ পায় না।

    জালটা স্রোতের টানে কিছুটা ভাটিতে গিয়ে মাটির ওপর পড়েছে। ফজল তার কবজিতে বাঁধা রাশি ধরে ওটা আস্তে আস্তে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে টেনে তোলে। যেন কোনো জলরাক্ষসীর উপড়ে তোলা একমাথা চুল।

    জালের মধ্যে ছড়ছড় আওয়াজ। চকচকে সাদা মাছগুলো অন্ধকারেও চেনা যায়। কয়েকটা টাটকিনি। নূরু খুশি হয়ে ওঠে।

    ফজল মাছগুলো জাল থেকে ঝেড়ে ফেলে। নূরু চটপট হাত চালিয়ে ডুলায় তোলে গুনে গুনে, এক-দুই-তিন—। বড় একটা টাটকিনি তার হাত থেকে পিছলে লাফ দিয়ে গিয়ে পানিতে পড়ে। ওটা ধরবার ব্যর্থ চেষ্টায় ওর কাপড় ভিজে যায়। কাদা মেখে যায় শরীরে।

    জাল ফেলতে ফেলতে তারা উজানের দিকে এগিয়ে যায়। রাত তিন প্রহরের সময় তারা মাছ ধরতে এসেছে। ডুলাটা মাছে ভরে গিয়েছিল একবার। ফজল সেগুলো গামছায় বেঁধে নিয়েছে। ডুলাটা আবারও ভরভর হয়েছে। ওটা বয়ে নিতে নূরুর কষ্ট হচ্ছে খুব।

    পশু-পাখির ঘুম ভেঙেছে। জেগে উঠেছে কাজের মানুষেরা। গস্তি নৌকার হালে গুঁড়ি মারার শব্দ আসছে কেড়োত-কোড়োত। ঝপ্‌পত্‌ঝপ্‌ দাঁড় ফেলছে মাঝিরা। অনুকূল বাতাস পেয়ে নৌকায় পাল তুলে দিয়েছে কেউ বা। রাত্রির জন্য কোনো নিরাপদ ঘোঁজায় তারা পাড়া গেড়ে ছিল। বিশ্রামের পর আবার শুরু হয়েছে যাত্রা। অন্ধকার মিলিয়ে যেতে না যেতে অনেক পানি ভাঙতে হবে তাদের।

    আলো আর আঁধারের বোঝাপড়া শেষ হয়ে এসেছে। আঁচল টেনে আঁধার ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে দূরে। চরের লটা আর কাশবন মাথা বের করেছে। স্পষ্ট হয়ে উঠছে ঘোলাটে পানি।

    আশ্বিন মাস। পদ্মা এখন বিগতযৌবনা। তার ভরা যৌবনের তেজ আর দুরন্তপনা থেমেছে। দুর্দম কাটালের কলকলানি আর নেই। পাড়ের দেয়ালে নিয়ন্ত্রিত তার গতি। শ্রান্ত শিথিল স্রোত কুলুকুলু ধ্বনি তুলে বয়ে যাচ্ছে এখন।

    ‘দুদু, অ দুদু!’

    ‘কি রে?’

    ‘শিগগির আহো। ঐখানে একটা বড় মাছে ডাফ দিছে।’

    ‘দুও বোকা! ডাফ দিয়া ও কি আর অইখানে আছে!’

    ফজল তবুও জাল ফেলে। পায় দুটো বড় বেলে মাছ। বেশ মোটাসোটা। সে নিজেই এ দুটো ডুলায় তুলে দেয়। নূরুর ছোট হাতের মুঠোয় এ দুটোকে সামাল দেয়া সম্ভব নয়।

    ফজল চারদিকে চোখ বুলায়। তরতর করে উজিয়ে যাচ্ছে পালতোলা নৌকা। মাঝনদীতে চেরা চিচিঙ্গের মতো লম্বা জেলে নৌকা মৃদু ঢেউয়ের দোলায় দুলছে এদিক ওদিক। জগতবেড় জাল ফেলে রাতভর প্রহর গুনছিল জেলেরা। রাতের অন্ধকার মিলিয়ে যাওয়ার আগেই জাল টানতে শুরু করেছে তারা।

    পুব আকাশে সোনালি সূর্য উঁকি দিয়েছে। কালো রেখার মতো দিগন্তে গাছের সারির আভাস ফুটে উঠেছে।

    ফজল এগিয়ে গেছে কিছু দূর। চটপট পা চালিয়ে নূরু ধরে ফেলে চাচাকে। সে সামনের দিকে তাকায়। কাঁকড়ামারির মুখ এখনো দেখা যায় না। তাদের ডিঙিটা কাঁকড়ামারির খাড়িতে লটাখেতের আড়ালে বেঁধে রেখে এসেছে তারা। সামনের বাঁকটা পার হলেই সেই খাড়ির মুখ দেখা যাবে। নদীর এ সরু প্রশাখাটি উত্তর-পশ্চিম থেকে চরের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে নদীর দক্ষিণ শাখায় গিয়ে মিশেছে।

    ‘ও-ও-ও-দুদু, দুদু…!’

    ‘কিরে কি…কি?’

    ফজল জালের মাছ ঝেড়ে রেখে কিছুদূর এগিয়ে গিয়েছিল। নূরুর ভীত কণ্ঠের ডাক শুনে ছুটে আসে সে।

    মাছ কুড়াবার সময় নূরুর ডান হাতে একটা কাঁকড়া লেগেছে। দুই দাঁড়া দিয়ে চেঙ্গি দিয়েছে ওর বুড়ো আর কড়ে আঙুলে।

    ফজল দাঁড়া দুটো ছিঁড়ে ফেলে কাঁকড়াটাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় পাড়ের দিকে। দাঁড়া দুটো খসে পড়ে আঙুল থেকে।

    ‘ইস্, রক্ত ছুটছে রে! তুই নায় যা গিয়া নূরু। লটা চাবাইয়া ঘায়ে রস লাগাইয়া দেগা। আমি এডুক শেষ কইর‍্যা আইতে আছি।’

    নূরু ডুলাটা রেখে রওনা হয়। ওর লুঙ্গি থেকে পানি ঝরছে। পানিতে ভিজে শিটে মেরে গেছে পা দুটো। ভোরের বাতাসে শীত-শীত করছে, খাড়া হয়ে উঠেছে শরীরের রোম। হাঁটতে হাঁটতে সে কাঁকড়ামারির মুখে চলে যায়। লটাখেতের ভেতর দিয়ে পানি ভেঙে নৌকায় গিয়ে ওঠে।

    দূরে স্টিমারের সিটি শোনা যায়। চাটগাঁ মেল বহর এসে ভিড়ল।

    নূরু একটা লটা ভেঙে দাঁতের তলায় ফেলে। চিবিয়ে রস দেয় ঘায়ে। রসটা মিষ্টি মিষ্টি লাগছে। সে লটা চিবিয়ে চিবিয়ে রস চুষতে শুরু করে দেয়।

    জালের খেপ শেষ করেছে ফজল। দূর থেকে সে দেখতে পায়, নূরু লটা চিবোচ্ছে। তার হাসি পায়। সে ডেকে বলতে যাচ্ছিল, ‘কিরে নূরু, গ্যাণ্ডারি পালি কই?’ কিন্তু বলতে পারে না সে। লটা চিবোতে দেখে হাসি পায় বটে, আবার একই সঙ্গে মায়াও লাগে। নিশ্চয় খিদে পেয়েছে ওর। ভোর হয়েছে। ভোরের নাশতা চিড়ে-মুড়ি নিয়ে এতক্ষণে বসে গেছে সব বাড়ির ছেলে-মেয়েরা।

    ফজল নৌকার দিকে আসছে। শব্দ পেয়ে নূরু চট করে লটাটা ফেলে দেয় পানিতে। চাচা দেখে ফেলেনি তো!

    মুখ থেকে লটার রস নিয়ে সে ঘায়ে লাগাতে থাকে। চাচাকে বোঝাতে চায়, ঘায়ে রস লাগাবার জন্যই সে লটা চিবুচ্ছিল।

    ফজলের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। হাসি গোপন করার জন্য সে তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, ‘এই নূরু, আরো পাঁচটা ছাডা ইচা পাইছি রে! মুগুরের মতন মোট্টা এক-একটা।’

    ফজল নৌকায় ওঠে। ডুলায় আর গামছায় বাঁধা মাছগুলো সে ঢেলে দেয় নৌকার ডওরায়।

    বেলে বা অন্য কোনো মাছ দেখে নয়, বড় বড় গলদা চিংড়ি দেখে খুশি হয় নূরু। সে একটা একটা করে গুনতে শুরু করে।

    গলদা চিংড়ি আঠারোটা, বেলে মাছ ছোট-বড় মিলিয়ে তিন কুড়ি চারটা আর কিছু টাটকিনি আর গুড়োগাড়া মাছ।

    ‘নাও ছাইড়্যা দে নূরু। এইবার দাউন কয়ডা উড়াইয়া ফালাই।’

    দু’জনেই বৈঠা হাতে নেয়। নূরু পাছায়, ফজল গলুইয়ে। কিছুদূর উজিয়ে তারা দাউন বড়শি তুলতে শুরু করে। লম্বা ডোরের সাথে খাটো খাটো ডোরে পরপর বাঁধা অনেকগুলো বড়শি। টোপ গেঁথে তিন জায়গায় পাতা হয়েছে এ বড়শি।

    ফজল একটা একটা করে দাউন তিনটে তুলে নেয়। প্রথমটায় বেঁধেছে একটা শিলন। আর একটা ছোট পাঙাশ মাছ। দ্বিতীয়টা একদম খালি। তৃতীয়টায় বেঁধেছে বড় একটা পাঙাশ মাছ। তেলতেলে মাছটা চকচক করছে ভোরের রোদে।

    ফজল বলে, ‘মাছটা খুব বুড়ারে। তেল অইছে খুব। এইডার পেডির মাছ যে গালে দিব, বুঝব মাছ কয় কারে! মাইনষে কি আর খামাখা কয়–পক্ষীর গুড়া আর মাছের বুড়া, খায় রাজা আঁটকুড়া।’

    মাছ ধরা শেষ হয়েছে। এবার বেচবার পালা। নূরুকে বলতে হয় না। সে নৌকার মাথা ঘুরিয়ে দেয় নিকারির টেকের দিকে। ভাটির টানে ছুটছে নৌকা। নূরু হালটা চেপে ধরে বসে থাকে মাথিতে। ফজল তার হাতের বৈঠা রেখে মাছগুলো বাছতে শুরু করে। আকার অনুযায়ী সে হালি ঠিক করে রাখে। গোটা দশেক টাটকিনি আর ছ’টা গলদা চিংড়ি বাদে সবগুলোই বেচে দিতে হবে। বড় পাঙাশ মাছটা নিজেদের জন্য রাখবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তা হলে বাকিগুলোয় আর কটা পয়সাই আসবে। সের চারেক ওজনের পাঙাশ মাছটায় কমসে কম বারো গণ্ডা পয়সা পাওয়া যাবে। ঘরে চাল নেই। তেল-নুন আরো অনেক কিছুই কিনতে হবে। শুধু মাছ খেয়ে তো আর পেট ভরবে না। মাছটার দামে কেনা যাবে দশসের চাল– সংসারের চারদিনের খোরাক।

    গত তিন বছর ধরেই টানাটানি চলছে সংসারে। ডিঙ্গাখোলা আর লক্ষ্মীচর ভেঙে যাওয়ার পরই শুরু হয়েছে এ দুর্দিন। এই দুই চরে অনেক জমি ছিল তাদের। বছরের খোরাক রেখে অন্তত পাঁচশ টাকার ধান বেচতে পারত তারা। প্রতি বছর পাট আর লটা ঘাসে আসত কম করে হলেও হাজার টাকা। পদ্মার অজগরস্রোত গিলে খেয়েছে, উদরে টেনে নিয়েছে সব জমি। গুণগার নমকান্দি থেকে শুরু হয়েছিল ভাঙা। তারপর বিদগাঁও কোনা কেটে, দিঘলির আধাটা গিলে, কাউনিয়াকান্দা, ডিঙ্গাখোলা, লক্ষ্মীচর আর মূলভাওরকে বুকে টেনে চররাজাবাড়ির পাশ কেটে উন্মাদিনী পদ্মা গা দোলাতে দোলাতে চলে গেছে পুব দিকে। তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এঁকেবেঁকে চলেছে ডানে আর বাঁয়ে।

    চরের বসত আজ আছে, কাল নেই। নদীর খেয়াল-খুশির ওপর নির্ভর করে চরের আয়ু। তার খুশিতে চর জাগে। তারই খেয়ালে ভেঙে যায় আবার। এ যেন পানি আর মাটির চুক্তি। চুক্তি অনুযায়ী পাঁচ, দশ, বিশ বছরের মেয়াদে বুকের ওপর ঠাই দেয় পানি। মেয়াদ ফুরালেই আবার ভেঙেচুরে নিজের জঠরে টেনে নেয়। চরবাসীরা তাই স্থায়ী হয়ে বসতে পারে না কোনো দিন। তাদের বাপ-দাদার ভিটে বলতে কিছু নেই। বাপ-দাদার কবরে চেরাগ জ্বালবার প্রয়োজন হয় না তাদের কোনো দিন। ফজলের বাবা এরফান মাতব্বর প্রায়ই একটা কথা বলে থাকে, চরের বাড়ি মাটির হাঁড়ি, আয়ু তার দিন চারি।

    এরফান মাতব্বরের বাড়ি ছিল লক্ষ্মীচরে। এগারো বছর কেটেছিল সেখানে। এ এগারো বছরের আয়ু নিয়েই জেগেছিল চরটা। মেয়াদের শেষে পদ্মা গ্রাস করেছে। এই নিয়ে কতবার যে লক্ষ্মীচর জেগেছে আর ভেঙেছে তার হিসেব রাখেনি এরফান মাতব্বর। সে ঘর-দোর ভেঙে, পরিবার-পরিজন, গরু-বাছুর নিয়ে ভাটিকান্দি গিয়ে ওঠে। দুটো করে টিনের চালা মাটির ওপর কোনাকুনি দাঁড় করিয়ে খুঁটিহীন কয়েকটা দোচালা তৈরি হয় মামাতো ভাইয়ের বাড়ির পাশে। মাতব্বরের সংসার এভাবে ‘পাতনা’ দিয়ে ছিল বছর খানেক। তারপর ঐ চরেই জায়গা কিনে বছর দুয়েক হলো সে আবার বাড়ি করেছে।

    ফজল আগে শখ করে মাছ ধরতে যেত। মাছ ধরাটা ছিল তখন নেশার মতো। এখন অনেকটা পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ উপজীবিকার আশ্রয় না নিয়ে উপায় ছিল না। সংসারে খাবার লোক অনেক। সে তুলনায় এখন জমির পরিমাণ সামান্য। চরদিঘলিতে মাত্র কয়েক নল জমি আছে তাতে যে ধান হয় তাতে টেনেটুনে বছরের চারমাস চলে। বাকি আটমাসের পেটের দায় ছাড়াও খাজনা রয়েছে। চর থাকুক আর না থাকুক জমিদারের নায়েবরা খাজনার টাকা গুনবেই। নয়তো তাদের কোনো দাবিই থাকবে না যদি আবার কখনো চর জেগে ওঠে সে এলাকায়।

    ফজল লুকিয়ে-চুরিয়ে মাছ বেচে। গেরস্তের ছেলের পক্ষে মাছ-বেচা নিন্দার ব্যাপার। আত্মীয়-কুটুম্বরা জানতে পারলে ছি-ছি করবে। হাসাহাসি করবে গাঁয়ের লোক। দুষ্ট লোকের মুখে মুখে হয়তো একদিন মালো বা নিকারি খেতাব চালু হয়ে যাবে।

    দিনের পর দিন অভাব অনটনের ভেতর দিয়ে সংসার চলছিল। মাছ বেচার কথা কোনো দিন স্বপ্নেও ভাবেনি ফজল। শখ করে একদিন সে লেদ বড়শি নিয়ে নদীতে গিয়েছিল। বড়শিতে উঠেছিল একটা মস্ত বড় আড় মাছ। পাশ দিয়ে যাচ্ছিল নিকারি-নৌকা। মাছ দেখে ডাক দেয় মাছের ব্যাপারি, ‘ও ভাই মাছটা বেচ্‌বানি?’

    ফজল কৌতুক বোধ করে। মজা করবার জন্য উত্তর দেয় সে, ‘হ বেচুম। কত দিবা?’

    ‘তুমি কত চাও?’

    ‘এক টাকা।’

    ‘এক টা–কা! মাছখানের লগে নাওখান দিবা তো?’

    ‘উঁহু, বৈডাখান দিমু।’

    ‘বোঝলাম, বেচনের মত নাই তোমার। বেচতে চাও তো উচিত দাম কইয়্যা দ্যাও।’

    ‘তুমিই কও।’

    ‘আটআনা দিমু।’

    ‘আট আনা!’

    পয়সার অঙ্কটা মধুর লাগে ফজলের কানে। লোভ হয় তার। পয়সার অভাবে তিনদিন ধরে একটা বিড়ির মুখ দেখেনি সে।

    সে এদিক ওদিক তাকায়। না, ধারে কাছে কেউ নেই। নিকারি-নৌকাটা ভাটিয়ে গিয়েছিল কিছুদূর। ফজল ডাক দেয়, ‘ও ভাই, আইও লইয়া যাও।’

    নিকারি নৌকায় মাছটা তুলে দিয়ে আট আনা গুনে নেয় ফজল। তার মাছ বেচার বউনি হয় এভাবে।

    সেদিন কয়েকটা ছোট ছোট শিলন, ট্যাংরা মাছও পেয়েছিল ফজল। সেগুলো নিয়ে যখন সে বাড়ি আসে তখন মা চেঁচিয়ে ওঠে, মাছ খাইলেই দিন যাইব আঁ? এতদিন বীজ-ধান ভাইন্যা খাওয়াইছি। দেহি আইজ খাওয়ন আহে কইতন।

    মাছগুলোকে ধপাৎ করে মাটিতে ফেলে ফজল ডিঙিতে উঠেছিল আবার ডিঙি ছুটিয়ে হাশাইলের বাজার থেকে মাছ-বেচা পয়সায় কিনে এনেছিল ছয় সের চাল।

    তারপর থেকে মাছ বেচা পয়সায় সংসারের আংশিক খরচ চলছে। ফজলের বাবা-মা প্রথম দিকে আপত্তির ঝড় তুলেছিল। অভাবের তাড়নায় সে ঝড় এখন শান্ত হয়ে গেছে।

    মাছের গোনা-বাছা শেষ করে ফজল। মাছের গায়ের লালায় তার হাত দুটো চটচট করে। হাত ধুয়ে সে গামছায় মোছে। তারপর গলুইয়ে গিয়ে মাথির চরাট সরিয়ে বের করে বিড়ি আর ম্যাচবাতি।

    ‘অত কিনার চাপাইয়া ধরছস ক্যান্ নূরু? সামনে ফিরা আওড়। আরো মাঝ দিয়া যা।’

    নুরুকে সাবধান করে দেয় ফজল। কিনার ঘেষে কিছুদুর গেলেই আবর্ত। সেখানে স্রোত বইছে উল্টোদিকে। ওখানে গিয়ে পড়লে নৌকা সামলানো সম্ভব হবে না ছোট ছেলেটির পক্ষে। এক ঝটকায় তাদের নৌকা বিপরীত দিকে টেনে নিয়ে যাবে অনেক দূর।

    নূরু নৌকা সরিয়ে নিয়ে যায় কিনারা থেকে দূরে। মাঝের দিকে সোতের টান বেশি তরতর করে এগিয়ে যায় নৌকা।

    ফজল এবার বিড়ি ধরিয়ে মাথিতে চেপে বসে। সে বিড়িতে লম্বা টান দেয় আর মুখ ভরে ধোয়া ছাড়ে।

    দূরে নদীর মাঝে সাদা সাদা দেখা যায়, কি ওগুলো?

    ফজল চেয়ে থাকে। তার চোখে পলক পড়ে না। ঐখানেই বা ওর আশেপাশে কোথাও ছিল তাদের খুনের চর।

    নূরুকে সরিয়ে বৈঠা হাতে নেয় ফজল। জোর টানে সে নৌকা ছোটায় পুব-উত্তর কোণের দিকে।

    কিছুদূর গেলেই সাদা বস্তুগুলো স্পষ্ট দেখা যায়।

    কি আশ্চর্য! নদীর মাঝে হেঁটে বেড়াচ্ছে অনেকগুলো বক।

    ফজল বৈঠা হাতে দাঁড়িয়ে যায়। কিছু দেখবার জন্য সে উত্তর দিকে তাকায়। হ্যাঁ ঐ তো, ঐ-তো বানরির জোড়া তালগাছ!

    উল্লসিত হয়ে ওঠে ফজল। বলে, ‘চর জাগছেরে নূরু, চর জাগছে!’

    ‘কই, কই?’

    ‘ঐ দ্যাখ, ঐ যে ঐ।’

    বকগুলো আঙুল দিয়ে দেখায় ফজল।

    আনন্দে লাফিয়ে ওঠে নূরু। সে দেখতে পায় হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে আছে বকগুলো। মাছ ধরার জন্য গলা বাড়িয়ে আছে। লম্বা ঠোঁট দিয়ে ঠোকর মারছে মাঝে মাঝে।

    ‘এইডা কি আমাগ চর, দুদু?’

    ‘হরে হ। আমাগ খুনের চর। ঐ দ্যাখ, ঐযে দ্যাখা যায় বানরির জোড়া তালগাছ। ছোডকালে আমরা যখন ঐ চরে যাইতাম তখন সোজা উত্তরমুখি চাইলে দ্যাখা যাইত আসুলির ঐ উঁচা তালগাছ দুইডা।’

    ফজল বকগুলোর দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, ‘নূরু, তুই বৈঠা আতে ল। টান দে জোরে, বকগুলোরে খেদাইয়া দেই।’

    ‘ক্যান্ দুদু?’

    ‘এখনো কেও টের পায় নাই। বক দেখলেই মাইনষে টের পাইয়া যাইব, চর জাগছে।’

    চাচা-ভাইপো বৈঠা টেনে এগিয়ে যায়। কিছুদূর গেলেই বৈঠা ঠেকে মাটির সাথে।

    ‘আর আউগান যাইবনারে নূরু, চড়ায় ঠেইক্যা যাইব নাও। মাডিতে নাও কামড় দিয়া ধরলে মুশকিল আছে। তখন দুইজনের জোরে ঠেইল্যা নামান যাইব না।’

    বৈঠাটানা বন্ধ করে দুজনেই। বকগুলো এখনো বেশ দূরে। ফজল পানির ওপর বৈঠার বাড়ি মারে ঠপাস-ঠপাস। কিন্তু বকগুলো একটুও নড়ে না। ওরা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছে, এত দূরের শত্রুকে ভয় করবার কিছু নেই।

    ফজল আরো কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যায় নৌকা। কিন্তু কিভাবে তাড়াবে বক? মারবার মতো একটা কিছু পেলে কাজ হত।

    হঠাৎ ফজলের নজর পড়ে বেলে মাছগুলোর ওপর। সে ডওরা থেকে একটা বেলে মাছ নিয়ে জোরে বকগুলোর দিকে ছুঁড়ে মারে। বকগুলো এবার উড়াল দেয়। কিন্তু কিছুদূর গিয়েই আবার নেমে পড়ে চরে।

    ‘বকগুলোতো বড় বজ্জাতরে। এইখানে মাছ খাইয়া জুত পাইয়া গেছে। অত সহজে যাইব না।’

    ‘দুদু, পানি তো এটটু খানিক, আমি নাইম্যা গিয়ে খেদাইয়া দিয়া আহি?’

    ‘নারে, তুই পারবি না। কাফালের মইদ্যে পইড়া যাবি।’

    ‘ফুঁৎ-ফুঁৎ।’

    স্টিমারের ফুঁ শুনে ফজল ও নূরু তাকায়। চাটগাঁ মেল আসছে। সামনে নৌকা পড়েছে বোধ হয়। তাই ফুঁৎ-ফুঁৎ শব্দ করল দু’বার।

    ফজল বলে, ‘খাডো চুঙ্গার জাহাজ। শুয়োরের মতোন ‘গ’ দিয়া আইতে আছেরে! শিগগির টান দে নূরু। নাওডা সরাইয়া লইয়া যাই। চড়ার উপর ঢেউয়ে আছাড় মারব।’

    নৌকা নিয়ে সরে যায় তারা। তাদের অনেক দূর দিয়ে নতুন চরেরও উত্তর পাশ দিয়ে স্টিমার চলে যায়। তার চলার পথের আন্দোলিত পানি ঢেউ হয়ে ছুটে আসছে। ফজল ঢেউ বরাবর লম্বিয়ে দেয় নৌকা, শক্ত হাতে হাল ধরে। নূরুকে বলে, ‘তুই বৈডা থুইয়া দে নূরু। শক্ত কইর‍্যা পাডাতন ধইর‍্যা থাক। উজান জাহাজে ঢেউ উঠব খুব।’

    ডলে-মুচড়ে উঁচু হয়ে ঢেউ আসছে। বিপদ বুঝে বকগুলো এবার উড়াল দেয়।

    ‘দ্যাখ দ্যাখ নূরু। ঐ দ্যাখ, বকগুলো উড়াল দিছে।’

    বকগুলোর অবস্থা দেখে নূরুর হাসি পায়। সে বলে, ‘এইবার। এইবার যাও ক্যান্? ঢেউয়ের মইদ্যে ডুবাইয়া ডুবাইয়া মাছ খাও এইবার।’

    বকগুলো ওপরে উঠে দু-একবার এলোমেলো চক্কর দেয়। নিচে ঢেউয়ের তাণ্ডব দেখে নামবার আশা ছেড়ে দেয় ওরা। তারপর ঝাক বেঁধে পশ্চিম দিকে উড়ে চলে যায়।

    ঢেউয়ের বাড়িতে ওঠানামা করছে নৌকার দুই মাথি। এক মাথিতে ফজল, অন্য মাথির ঠিক নিচেই পাটাতন ধরে বসে আছে নূরু। ফজল বলে, ‘নূরু, সী-সঅ, সী-সঅ, কিরে ডর লাগছে নি? সী-সঅ, সী-সঅ।’

    ঢেউ থামলে নূরু বলে, ‘সী-সঅ কি দুদু?’

    ‘সী-সঅ একটা খেইল। বাচ্চারা খেলে। নারাণপুর চৌধুরী বাড়ি খাজনা দিতে গেছিলাম। সেইখানে দেইখ্যা আইছি।’

    একটু থেমে সে আবার বলে, ‘আইজ আর নিকারির টেঁকে যাইমু নারে।’

    ‘ক্যান?’

    ‘ক্যান্ আবার! বাড়িতে খবর দিতে অইব না! মাছ বেচতে গেলে দেরি অইয়া যাইব অনেক। তুই বৈডা নে শিগগির। টান দে।’

    দু’জনের বৈঠার টান, তার ওপর অনুকূল স্রোত। নৌকা ছুটছে তীরের মতো।

    ফজল নলতার খাড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় নৌকা। নতুন চর দখলের এলোমেলা ভাবনায় আচ্ছন্ন তার মন।

    খাঁড়ির পুবপাড়ে ঢোনের মধ্যে বাঁধা একটা নৌকা। ওটার ওপর চোখ পড়তেই ফজলের চিন্তার সূত্র ছিঁড়ে যায়। নৌকাটা তার চেনা।

    নূরু সামনের দিকে চেয়ে বৈঠা টেনে যাচ্ছে। ফজল একবার দেখে নেয় তাকে। তারপর সে চরাটের ওপর নিঃশব্দে দাঁড়ায়, তাকায় পুবদিকে।

    কিছুদূরে কলাগাছে ঘেরা একটা বাড়ি। কলাগাছের ফাঁক দিয়ে বাড়ির উঠানের একাংশ দেখা যায়। আর দেখা যায় একখানা লাল শাড়ি হাওয়ায় দুলছে।

    ফজলের বুকের ভেতরটা দুলে ওঠে। সে বসে পড়ে। নূরুকে বলে, ‘মোল্লাবাড়ি চিন্যা যাইতে পারবি নূরু?’

    ‘হ্যাঁ, নূরু ঘাড় কাত করে।’

    ‘কোনমুখি ক দেখি?’

    নূরু দাঁড়ায়। পুবদিকে তাকিয়ে বলে, ‘ও-ই তো দ্যাখা যায়।’

    ‘ঠিক আছে। কয়েকটা মাছ দিয়া আয় গিয়া। এতগুলো মাছ আমরা খাইয়া ছাড়াইতে পারমু না।’

    ফজল পুবপাড়ে নৌকা ভিড়ায়। ডওরায় রাখা মাছগুলো হাত দিয়ে নাড়তে নাড়তে সে জিজ্ঞেস করে, ‘কোনডা দিমুরে নূরু? ইচা, না পাঙাশ?’

    ‘বড় পাঙাশটা দ্যাও।’

    ‘আইচ্ছা, পাঙাশ মাছটাই লইয়া যা। আর তোর নানাজানরে আমাগ বাড়ি জলদি কইর‍্যা আইতে কইস। জরুরি কাম আছে। আমার কথা কইলে কিন্তু আইব না। তোর দাদাজানের কথা কইস।’

    ‘আইচ্ছা।’

    নূরু চরাটের নিচে দলা-মুচড়ি করে রাখা জামাটা পরে নেয়।

    ফজল একখণ্ড রশি মাছটার কানকোর ভেতর ঢোকায়। মুখ দিয়ে সেটা বের করে এনে দু’মাথায় গিঠ দিয়ে ঝুলনা বাঁধে।

    মাছটা হাতে ঝুলিয়ে পাড়ে নেমে যায় নূরু। ফজল নৌকা ছেড়ে দেয়। বৈঠায় টান দিতে দিতে সে ডেকে বলে, ‘শোন্ নূরু, চর জাগছে–এই কথা কই না কারোরে, খবদ্দার! তোর নানার লগে আইয়া পড়িস। ইস্কুলে যাইতে অইব কিন্তু।’

    ‘আইচ্ছা।’

    বড় মাছ। হাতে বুঝিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে নূরুর। সে হাতটা উঁচু করে নিয়েছে। তবুও মাছের লেজের দিকটা মাটির ওপর দিয়ে ঘষড়াতে ঘষড়াতে যাচ্ছে।

    বাড়ির ঘাটে নৌকা ভিড়ায় ফজল। শব্দ পেয়ে ছোট বোন আমিনা ছুটে আসে।

    ‘নূরু কই, মিয়াভাই?’

    ‘ও মোল্লাবাড়ি গেছে। তুই মাছগুলোরে ডুলার মইদ্যে ভইরা লইয়া আয়।’

    ফজল লাফ দিয়ে নৌকা থেকে নামে। থালা-বাসন নিয়ে বরুবিবি ঘাটের দিকে আসছিল। ফজল জিজ্ঞেস করে, ‘বাজান কই, মা?’

    ‘ঘরে হুইয়া রইছে। শরীলডা ভালো না।’

    ঘরের দরজায় পা দিয়ে ফজল ডাকে, ‘বাজান।’

    ‘কিরে?’ শুয়ে শুয়ে সাড়া দেয় এরফান মাতব্বর।

    ‘চর জাগছে।’

    ‘চর জাগছে!’

    ‘হ, আমাগ খুনের চর।’

    ‘খুনের চর!’

    এরফান মাতব্বর বিছানা থেকে লাফ দিয়ে ওঠে। ‘কার কাছে হুনলি?’

    ‘হুনি নাই। দেইখ্যা আইছি। এক ঝাঁক বক বইছিল চরে।’

    ‘খুনের চর ক্যামনে বুঝলি?’

    ‘উত্তরমুখি চাইয়া দ্যাখলাম, বানরির জোড়া তালগাছ।’

    এরফান মাতব্বর চৌকি থেকে নেমে বেরিয়ে আসে। কিছুদিন থেকেই ভালো যাচ্ছিল না তার শরীর। মাঝে মাঝে জ্বর হয়। আজও ভোর বেলায় শীত-শীত করছিল। কাঁপুনি শুরু হয়েছিল শরীরে। জ্বর আসার পূর্বলক্ষণ। তাই সে বিছানায় বসে বসে কোনো রকমে ফজরের নামাজ পড়েই আবার শুয়ে পড়েছিল। কিন্তু এ মুহূর্তে খবর শুনে শীত আর কাঁপুনি কোথায় পালিয়ে গেছে! বার্ধক্যে নুয়ে পড়া শরীরটা সোজা হয়ে উঠেছে। পাকা জ্বর নিচে বড় বড় হয়ে উঠেছে ঘোলাটে চোখদুটো। মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে শিথিল হাত।

    ‘ফজু, শিগগির মানুষজনরে খবর দে। দ্যাখ, জমিরদ্দি, লালুর বাপ, রুস্তম, আহাদালী, মেহের মুনশি কে কুনখানে আছে। মান্দ্রায় আর শিলপারনে কারুরে পাডাইয়া দে। কদম শিকারি, ধলাই সরদার, জাবেদ লশকর আর রমিজ মিরধারে খবর দে। নাশতা খাইছস?’

    ‘না, পরে খাইমু।’

    ‘আইচ্ছা, পরেই খাইস। তুই বাইর অইয়া পড়। ঢোলে বাড়ি দিস না কিন্তু। চর জাগনের কথা কানে কানে কইয়া আহিস। দুফরের মইদ্যে বেবাক মানুষ আজির অওয়ন চাই। যার যার আতিয়ার যে লগে লইয়া আহে।’

    ফজল রওনা হয়।

    ‘ফজু, হোন। ভাওর ঘরের বাঁশ-খুঁড়া নাও ভইরা লইয়া আইতে কইস যার যার।’

    একটু দম নিয়ে হাঁক দেয় মাতব্বর, ‘নূরু…নুরু কইরে? তামুক ভইর‍্যা আন।’

    ‘নূরুরে মোল্লাবাড়ি পাডাইছি। মোল্লার পো-রে আইতে খবর কইয়া আইব।’ ফজল বলে।

    ‘আইচ্ছা যা তুই, আর দেরি করিস না।’

    মাতব্বর মনে মনে বলে, ‘মোল্লা কি আর আইব? মাইয়া আটকাইছে। চোরামদ্দি এহন কোন মোখ লইয়া আইব আমার বাড়ি।’

    ফজল চলে গেলে বিড়বিড় করে বলতে থাকে মাতব্বর, ‘আইব না ক্যান্? আইব– আইব। চর জাগনের কথা হুনলে শোশাইয়া আইব, হুহ। না আইয়া যাইব কই? কলকাডি বেবাক এই বান্দার আতে। দেহি, এইবার আমার পুতের বউ ক্যামনে আটকাইয়া রাহে।’

    মাতব্বর ঘরে যায়। আফার থেকে ঢাল-কাতরা, লাঠি-শড়কি নামিয়ে উঠানে নিয়ে আসে।

    থালা-বাসন মেজে ঘাট থেকে ফিরে আসে বরুবিবি। স্বামীকে হাতিয়ার নাড়াচাড়া করতে দেখে সে অবাক হয়। কিছুক্ষণ আগেই যে মানুষটিকে সে শুয়ে শুয়ে কাঁপতে দেখে গেছে, সে মানুষটিই কিনা এখন বাইরে বসে ঢাল-কাতরা-শড়কি নাড়াচাড়া করছে। সে বলে, ‘এই দেইখ্যা গেলাম ওনারে বিছানে। কোনসুম আবার এগুলা লইয়া বইছে? ওনারে কি পাগলে পাইল নি?’

    ‘হ, পাগলেই পাইছে। তুমি হোন নাই, ফজু কয় নাই কিছু?’

    ‘কই, না তো!’

    ‘আরে, আমাগ চর জাগছে।’

    ‘চর জাগছে! কোন চর?’

    ‘খুনের চর!’

    ‘খুনের চর?’

    বরুবিবির বুকের ভেতর কে যেন চেঁকির পাড় দিতে শুরু করেছে। তার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। কোনো রকমে রান্নাঘরে গিয়ে সে বসে পড়ে। তার মনের আবেগ, তার বুকের ঝড় বিলাপ হয়ে বেরোয়, ‘ও আমার রশুরে, বাজান। কত বচ্ছর না যে পার অইয়া গে-ল, রশু-রে-আ-মা-র। তোরে না-যে ভোলতে না-যে পা-রি, মানিকরে-আ-মা-র।’

    দশ বছরের পুরাতন শোক। সংসারের পলিমাটিতে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। সে মাটি এখন কাঁপতে শুরু করেছে। মাতব্বরের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। তার দুচোখের কোলে পানি জমে। ঝাঁপসা দৃষ্টি মেলে সে চেয়ে থাকে হাতিয়ারগুলোর দিকে।

  • দুই

    দুই

    খুনের চর।

    দশ বছর আগে একবার জেগেছিল এ চর। তখন নাম ছিল লটাবনিয়া। এ চরের দখল নিয়ে মারামারি হয়েছিল দুই দলে। দুই দলের দুই প্রধান ছিল এরফান মাতব্বর আর চেরাগ আলী সরদার। দুই দলের পাঁচজন খুন হয়েছিল। এরফান মাতব্বরের দলের দু’জন আর চেরাগ আলীর দলের তিনজন। এরপর থেকেই লোকের মুখে মুখে লটাবনিয়ার নাম হয়ে যায় খুনের চর।

    এরফান মাতব্বরের বড় ছেলে রশিদ চরের এ মারামারিতে খুন হয়েছিল।

    বাইশ বছরের জোয়ান রশিদ। গায়ে-পায়ে বেড়ে উঠেছিল খোদাই ষাঁড়ের মতো। মাত্র বিশজন লোক নিয়ে সে চেরাগ সরদারের শ’খানেক লোকের মোকাবেলা করেছিল।

    সেদিন ছিল হাটবার। চরের পাহারায় যারা ছিল তাদের অনেকেই সেদিন দিঘিরপাড় গিয়েছিল হাট-সওদা করতে। সত্তরটা ভাওর ঘরের অর্ধেকের বেশি ছিল সেদিন ঝাঁপবন্ধ। একটানা দুমাস ধরে পাহারা দিতে দিতে তাদের মধ্যে একটা অবহেলার ভাব এসে গিয়েছিল। তাদের কাছে ফুরিয়ে এসেছিল পাহারা দেয়ার প্রয়োজন। বিপদের কোনো আশঙ্কা নেই ভেবে কেউ কেউ আবার ভাওর ঘরে বউ ছেলে-মেয়ে এনে ঘর-সংসারও পেতে বসেছিল। চেরাগ সরদার যে এমনি একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি তারা।

    দুপুর তখন গড়িয়ে গেছে। ভাওর ঘরের ছায়ায় বসে ইলশা জাল বুনছিল রশিদ। আর পাশে বসে গল্প করছিল তার দোস্ত রফি। হঠাৎ তাদের নজর পড়ে নদীর দিকে।

    ষোলটা নৌকা বোঝাই লোক এ চরের দিকে আসছে।

    তারা দুজনেই লাফ দিয়ে দাঁড়ায়, রশিদ গলার সবটুকু জোর দিয়ে হাঁক দেয়, ‘আইছে রে-এ-এ, আইছে, শিগগির বাইর-অ-আউগ গা…আউগ গা-আ-আ-আ…’

    রফিও গলা ফাটিয়ে হাঁক দেয়, ‘তোরা কইরে—? আউগ্ গা–শিগগির আউগগা।’

    এদিকে-ওদিকে যারা ছিল তারা যার যার ভাওর ঘর থেকে বেরোয়। চারদিকে চিৎকার আর শোরগোল।

    রশিদ আর রফি গুলেল বাঁশ আর লুঙ্গির টোপর ভরে মাটির গুলি নিয়ে নদীর দিকে দৌড় দেয়। তাদের পেছনে আসে বাকি আর সবাই। কারো হাতে ঢাল-কাতরা, কারো হাতে শুধু শড়কি, কারো হাতে লম্বা লাঠি।

    রশিদ আর রফি গুলির পর গুলি মারে নৌকার লোকদের ওপর। কিন্তু তারা বেতের ঢাল দিয়ে ফিরিয়ে দেয় সে গুলি। দুই বন্ধু বুঝতে পারে, এভাবে ওদের ঠেকানো যাবে না। তারা দৌড়ে গিয়ে ভাওর ঘর থেকে নিজেদের ঢাল-শড়কি নিয়ে আসে।

    নৌকাগুলোর দশটা কিনারায় এসে ঠেকে। বাকি ছয়টা বড় নৌকা। ভাটা-পানিতে এগোতে না পেরে সেগুলো মাথা ঘোরায় পাশের চলপানির দিকে।

    আধ-হাঁটু পানিতে নামে চেরাগ সরদারের লোকজন। ঢাল-কাতরা, লাঠি-শড়কি নিয়ে তারা মার-মার করতে করতে এগিয়ে আসে।

    চরের কাইজ্যায় একদল চায় অন্য দলকে হটিয়ে তাড়িয়ে দিতে। বেকায়দায় না পড়লে খুন-খারাবির মধ্যে কেউ যেতে চায় না। খুন-জখম হলেই থানা-পুলিসের হাঙ্গামা আছে, মামলা-মোকদ্দমার ঝামেলা আছে, জেল-হাজতের ভয় আছে।

    চেরাগ সরদারও তাই খুনাখুনি এড়াবার জন্য হাটের দিনটি বেছে নিয়েছিল। সে ভেবেছিল, তাদের এত লোকজন ও মারমার হামাহামি শুনে এরফান মাতব্বরের গুটিকয়েক লোক চর ছেড়ে ভেগে যাবে। তখন সহজেই দখল করা যাবে চর।

    কিন্তু অত সহজে চরটা দখল করা যায়নি।

    রশিদ তার লোকজন নিয়ে রুখে দাঁড়ায়। চেরাগ সরদারের দল ডাঙায় উঠতে না উঠতেই শুরু হয়ে যায় মারামারি।

    দলের একজনকে খুন হতে দেখেই রশিদ খেপে যায়। মারমার ডাক দিয়ে এগিয়ে যায় সে। তার শড়কির ঘায়ে একজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে তিরতিরে পানির মধ্যে।

    প্রথম দশটা নৌকা থেকে দলটি নেমেছিল, রশিদ ও তার দল তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যায়। আরো একটা লাশ ফেলে তাদের অনেকেই পিছু হটে নৌকার দিকে। কিন্তু আরো ছ’খানা নৌকায় করে যারা এসেছিল তারা অন্য দিক দিয়ে নেমে এসে রশিদ ও তার লোকদের ঘিরে ফেলে। আর সকলের মতো নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লে রশিদও বাঁচতে পারত। সাঁতার দিয়ে নাগরারচরে গিয়ে উঠতে পারত। কিন্তু সে ঘুরে দাঁড়ায়। আরো একজনের জান নিয়ে নিজের জান দেয় সে।

    তারপর থানা-পুলিস, তদন্ত-তল্লাশ, ধর-পাকড়, হাজত। আদালতে দুই দলের বিরুদ্ধেই মামলা ওঠে খুন আর হাঙ্গামার। এক মামলায় আসামি চেরাগ সরদার ও তার দলের বিশজন; অন্য মামলায় এরফান মাতব্বরের দলের তেরো জন।

    আসামিরা সবাই দিশেহারা। তারা বুঝতে পারে, ফাঁসির দড়ি না হোক, ঘানির জোয়াল ঝুলে আছে সবারই ঘাড়ের ওপর।

    এখন কি করা যায়?

    চেরাগ সরদার নিজেই এক মামলার আসামি। তাই প্রথমে সে-ই আপোসের প্রস্তাব পাঠায় এরফান মাতব্বরের কাছে।

    আপোসের কথা শুনেই রাগে সর্বাঙ্গ জ্বলে ওঠে মাতব্বরের। তার জানের টুকরো ছেলেকে যারা খুন করেছে, তাদের সাথে আপোস!

    প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল এলাকার দফাদার সামেদ আলী। মাতব্বরের দলেরও জনকয়েক এসেছিল তার পিছু পিছু।

    ক্রোধে মাতব্বরের মুখ দিয়ে কিছুক্ষণ পর্যন্ত কোনো কথা বেরোয় না। শেষে নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তেজিত স্বরে সে বলে, ‘না, কিছুতেই না। ওর সাথে কোনো আপোস নাই। ওরে জেলের ভাত না খাওয়াইয়া ছাড়মু না–ছাড়মু না, কইয়া দিলাম। তুমি যাও, কও গিয়া তারে।’

    মাতব্বরের দলের আহাদালী বলে, ‘হে অইলে জেলের ভাত তো আমাগ কপালেও লেখা আছে, মাতব্বরের পো।’

    তার কথায় সায় দিয়ে জমিরদ্দি বলে, ‘মিটমাট কইর‍্যা ফালানডাই ভালো। কেবুল ওগই জেলের ভাত খাইয়াতে পারতাম তয় এক কথা আছিল। ওগ সাথ সাথ যে আমাগও জেলে যাইতে অইব।’

    মাতব্বর এ কথা ভাবেনি তা নয়। কিন্তু আপোসের কথা ভাবলেই তার প্রতিশোধকামী মনে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে আগুন। ক্রোধে ফুলে ওঠে সারা শরীর। তার কাছে আপোস মানেই পরাজয়, মৃত ছেলের স্মৃতির অবমাননা।

    শেষ পর্যন্ত দলের লোকজনের অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারে না এরফান মাতব্বর। চেরাগ সরদার আর চরের দাবি করবে না, এই শর্তে আপোস করতে রাজি হয় সে। এ সিদ্ধান্ত নিতে দশ দিন লেগেছিল তার।

    কিন্তু আপোস করলেই তো আর চুকে গেল না সব। মামলা থেকে রেহাই পাওয়ার উপায়? খুনের মামলা। এ তো ছেলেখেলা নয় যে, চায় মন খেলোম, না চায় মন চলোম।

    দফাদার সে বুদ্ধিও দেয়, তার লেইগ্যা চিন্তা নাই। আদালতে উল্ট-পাল্ডা, আবোল তাবোল সাক্ষী দিলেই মামলা ঢিশমিশ অইয়া যাইব। কোন সওয়ালের পিডে কি জওয়াব দিতে অইব তা উকিলরাই ঠিক কইর‍্যা দিব।

    শেষে সে রকম ব্যবস্থাই হয়েছিল। দুই বিবাদী পক্ষের দুই উকিল মিলে সাক্ষীদের ভালো করে শিখিয়ে পড়িয়ে দেন। সরকার পক্ষের উকিলের প্রশ্নের জবাবে সাক্ষীরা সেই শেখানো বুলি ছেড়ে দেয়। একজনের জবানবন্দির সাথে আর একজনেরটার মিল হয় না। ঘটনা চোখে দেখেছে এমন সাক্ষীরাও বিনা দ্বিধায়, কোনো রকম লজ্জা-শরমের ধার না ধেরে বলে যায়, তারা নিজের চোখে দেখেনি, অমুকের কাছে শুনেছে। সাক্ষীদের কয়েকজনকে বিরুদ্ধাচারী ঘোষণা করা হয়। কিন্তু কোনো ভাবেই সরকারবাদি মামলা টেকে না। যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে দুটো খুনের মামলার আসামিরাই খালাস পেয়ে যায়।

    খুনাখুনির পরই চরটাকে ক্রোক করে সাময়িকভাবে সরকারি দখলে রাখার হুকুম দিয়েছিল আদালত। ভবিষ্যতে যাতে আবার শান্তিভঙ্গ না হয় সে জন্যই থানার পুলিস এ ব্যবস্থার জন্য সুপারিশ করেছিল। পরে যে পক্ষ মামলায় জিতবে, সে-ই হবে চরের মালিক।

    আপোসের শর্ত অনুসারে চেরাগ সরদার আর চরের দাবি করেনি। তাই আদালতের রায়ে এরফান মাতব্বরই চরটা ফিরে পায় আবার।

    খবর পেয়ে আটিগাঁর পাঞ্জু বয়াতি বখশিশের লোভে এরফান মাতব্বরের বাড়ি গিয়ে হাজির হয়। দোতারা বাজিয়ে সে নিজের বাধা পুরাতন একটা গান জুড়ে দেয়–

    লাঠির জোরে মাটিরে ভাই

    লাঠির জোরে মাটি,

    লাঠালাঠি কাটাকাটি,

    আদালতে হাঁটাহাঁটি,

    এই না হলে চরের মাটি

    হয় কবে খাঁটি…রে।

    পাঞ্জু বয়াতির এ গান এখন চরবাসীদের কাছে আপ্ত বাক্যের মর্যাদা লাভ করেছে। তাদের মুখে মুখে ফেরে এ গান। তাদের অভিজ্ঞতার থেকেও তারা বুঝতে পেরেছে, নতুন চর জাগলে এসব ঘটনা ঘটবেই। লটাবনিয়ার বেলায়ও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল। লাঠালাঠি হলো, কাটাকাটি হলো। আদালতে হাঁটাহাঁটিও হলো প্রায় দু’বছর। তারপর ফিরে এল শান্তি। খাঁটি হলো চরের মাটি।

    এরফান মাতব্বর তার বর্গাদার ও কোলশরিকদের মধ্যে চরের জমি ভাগ-বাটোয়ারা করে দেয়। চরের বুকে গড়ে ওঠে নতুন বসতি। শুরু হয় নতুন জীবন।

    কিন্তু এত কাণ্ডের পর খাঁটি হলো যে মাটি, তা আর মাত্র তিনটি বছর পার হতে না হতেই ফাঁকি হয়ে গেল। পদ্মার জঠরে বিলীন হয়ে গেল খুনের চর।

    সেই খুনের চর আবার জেগেছে।

    এরফান মাতব্বর গামছায় চোখ মোছে। বরুবিবির বিলাপ থেমেছে কিন্তু হায়-মাতম থামেনি। থেকে থেকে তার বক্ষপঞ্জর ভেদ করে হাহাকার উঠছে–‘আহ্ বাজান, আহ সোনা-মানিক!’

    এরফান মাতব্বর উঠে দাঁড়ায়। রান্নাঘরের দিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে নিজে নিজেই বলে, ‘আর কাইন্দা কি করমু! কান্দলেই যদি পুত পাইতাম তয় চউখের পানি দিয়া দুইন্যাই ভাসাইয়া দিতাম।’

    তারপর রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে সে বলে, ‘অ্যাদে ফজুর মা, আর কাইন্দ না। আল্লার বেসাত আল্লায় লইয়া গেছে। কাইন্দা আর কি করমু। ওডো এইবার। মানুষজন আইয়া পড়ল বুইল্যা। তুমি চাইলে-ডাইলে বড় ডেগটার এক ডেগ চড়াইয়া দ্যাও শিগগির।’

    বরু বিবি কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘কাইজ্যা করতে ওনরাই যে যায়। আমার ফজুরে চরের ধারেকাছেও যাইতে দিমু না।’

    ‘আইচ্ছা না দ্যাও, না দিবা। অখন যা কইলাম তার আয়োজন কর। আমি মাডি খুইদ্যা চুলা বানাইয়া দিতে আছি উডানে।’

    বরুবিবির বুকের ঝড় থামতে অনেক সময় লাগে। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে সে মসলা বাটে, চুলো ধরায়। তারপর চাল-ডাল ধুয়ে এনে খিচুড়ি বসিয়ে দেয় এক ডেগ। চুলোর মধ্যে শুকনো লটা গুঁজতে গুঁজতে তার কেবলই দীর্ঘশ্বাস পড়ে।

  • তিন

    তিন

    মান্দ্রা আর শিলপারনে ‘খবরিয়া’ পাঠিয়ে আশপাশের লোকজনকে খবর দিয়ে ফজল বাড়ি ফিরে আসে। এসেই সে নূরুর খোঁজ করে।

    তার মনটা চাতকের মতো তৃষ্ণার্ত হয়ে রয়েছে। নূরু ফিরে এলে শোনা যাবে মোল্লাবাড়ির খবরাখবর। ওকে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করলে, কথার জাল পাতলে রূপজানের কথাও কিছু বের করা যাবে।

    স্কুলের বেলা হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও তার ফেরবার নাম নেই। সে আন্দাজ করে, নূরু ঠিক রূপজানের পাল্লায় পড়েছে। আদর দিয়ে দিয়ে সে ছেলেটার মাথা খেয়ে ফেলবে।

    এজন্য রূপজানের ওপর কিন্তু রাগ হয় না ফজলের। বরং প্রসন্নই হয় তার মন। বাপ মার স্নেহ বঞ্চিত ছেলেটাকে সে নিজেও বড় কম আদর করে না। পড়াশুনার জন্য মাঝে মাঝে সে একটু তয়-তম্বি করে। ব্যস, ঐ পর্যন্তই। ওর দাদা-দাদির জন্য ওর গায়ে একটা ফুলের টোকা দেয়ার যো নেই।

    নূরুর বয়স যখন পাঁচমাস তখন তার বাবা রশিদ চরের কাইজ্যায় খুন হয়। কোলের শিশু নিয়ে বিধবা হাজেরা তিন বছর ছিল মাতব্বর বাড়ি। দু’মাস-তিন মাস পরে সে বাপের বাড়ি মুলতগঞ্জে বেড়াতে যেত। দশ-বারো দিন পার হতে না হতেই এরফান মাতব্বর নিজে গিয়ে তাকে নিয়ে আসত আবার। বলত, ‘নাতিডা চউখের কাছে না থাকলে ভালো ঠেকে না। পরানডা ছনিবনি করে।’

    এমনি একবার বাপের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল হাজেরা। তার বাবা শরাফত দেওয়ান। জোর করে আবার তার নিকে দিয়ে দেয়। মেয়ের কোনো রকম আপত্তিই সে শোনেনি। নূরুর কি হবে ভেবে সে অনেক কেঁদেছিল। কাঁদতে কাঁদতে ফুলিয়ে ফেলেছিল চোখ-মুখ। স্বামীর বাড়ি গিয়েও তার চোখের পানি শুকোয়নি। অবস্থা দেখে পরের দিনই তার স্বামী জালাল মিরধা দেওয়ানবাড়ি থেকে নূরুকে নিয়ে যায়। তাকে হাতুয়া পোলা হিসেবে রাখতে রাজি হয় সে।

    এ নিকেতে এরফান মাতব্বরকে দাওয়াত দেয়া দূরে থাক, একটু যোগ-জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করেনি শরাফত দেওয়ান। সম্বন্ধের যোগাড়যন্ত্র সবই খুব গোপনে সেরেছিলো সে। তার ভয় ছিল, খবরটা কোনো রকমে মাতব্বরের কানে গেলে সে হয়তো গোলমাল বাঁধাবে।

    তিন দিন পর এরফান মাতব্বরের কাছে খবর পৌঁছে। শুনেই সে রাগে ফেটে পড়ে।

    অনেক আরজু নিয়ে দেশ-কুলের এ মেয়েকে ছেলের বউ করে ঘরে নিয়েছিল মাতব্বর। আসুলির ‘ভাল মাইনষে’র সাথে একটা প্যাঁচ দেয়ার জন্য সে পানির মতো টাকা খরচ করেছিল। মেয়ের বাপকে রাজি করাবার জন্য তিনশ একটাকা শাচক দিতে হয়েছিল। মেয়েকে সোনা দিতে হয়েছিল পাঁচ ভরি।

    হাজেরার নিকে দিয়েছে, মাতব্বরের রাগ সে জন্য নয়। ছেলের মৃত্যুর পরই সে বুঝতে পেরেছিল, এ মেয়ের ওপর তার আর কোনো দাবি নেই। কাঁচা বয়সের এ মেয়েকে বেশি দিন ঘরে রাখা যাবে না, আর রাখা উচিতও নয়। তবু তিন-তিনটে বছর শ্বশুরবাড়ির মাটি কামড়ে পড়েছিল হাজেরা। দুধের শিশুকে সাড়ে তিন বছরেরটি করেছে। তার কাছে এর বেশি আর কি আশা করা যায়?

    কিন্তু রাগ হয়েছিল তার অন্য কারণে। শরাফত দেওয়ান তার মেয়ের নিকে দিয়েছে। দিক, তাকে যোগ-জিজ্ঞাসা করেনি, না করুক। কিন্তু তার নাতিকে তার হাতে সোপর্দ করে দিয়ে যায়নি কেন সে? সে কি মনে করেছে মাতব্বরকে?

    রাগের চোটে তার মনের স্থৈর্য লোপ পায়। বিড়বিড় করে সে বলে, ‘আসুলির হুগ্‌না ভাল্ মানুষ। হালার লাগুর পাইলে দুইডা কানডলা দিয়া জিগাইতাম, কোন আক্কেলে ও আমার নাতিরে আউত্যা বানাইয়া মাইনষের বাড়ি পাডাইছে।’

    একবার সে ভাবে, যাবে নাকি লাঠিয়াল-লশকর নিয়ে মিরধা বাড়ি? পয়লা মুখের কথা, কাজ না হলে লাঠির গুতা। তার বিশ্বাস, লাঠির গুতা না পড়লে নাতিকে বের করে আনা যাবে না। কিন্তু ফৌজদারির ভয়ে শেষ পর্যন্ত সে নিরস্ত হয়।

    ফজলের বয়স তখন সতেরো বছর। সে এক বাড়িতে জায়গীর থেকে নড়িয়া হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ত। মাতব্বর তাকে গোপনে খবর পাঠায়, ভুলিয়ে-ভালিয়ে, চুরি করে বা যেভাবেই হোক নূরুকে যেন সে বাড়ি নিয়ে আসে।

    মুলফতগঞ্জ ও নড়িয়া পাশাপাশি গ্রাম। ফজল সুযোগ খুঁজতে থাকে। হাজেরা বাপের বাড়ি নাইয়র এলে সে একদিন দেওয়ানবাড়ি বেড়াতে যায়। নূরুকে জামা কিনে দেয়ার নাম করে মুলতগঞ্জের হাটে নিয়ে যায় সে। সেখান থেকে নৌকা করে দে পাড়ি! নূরুকে বুকের সাথে জাপটে ধরে সে বাড়ি গিয়ে হাজির হয়।

    সেদিন থেকেই সে দাদার আবদার, দাদির আহ্লাদ আর চাচার আদর পেয়ে বড় হয়ে উঠছে। বাপ-মার অভাব কোনোদিন বুঝতে পারেনি। সে এতখানি বড় হয়েছে, এখন পর্যন্ত দাদির আঁচল ধরে না শুলে তার ঘুম হয় না। দাদার পাতে না খেলে পেট ভরে না। আর চাচার সাথে হুড়োকুস্তি না করলে হজম হয় না পেটে ভাত।

    ফজল ঘরের ছাঁচতলা গিয়ে পুবদিকে তাকায়। না, নূরুর টিকিটিও দেখা যায় না।

    সে তামাক মাখতে বসে যায়। এত লোকের কল্কে সাজাতে অল্প-স্বল্প তামাকে হবে না। সে দেশী তামাকের মোড়া মুগুরের ওপর রেখে কুচিকুচি করে কাটে। তলক হওয়ার জন্য কিছু মতিহারি তামাক মিশিয়ে নেয় তার সাথে। শেষে মিঠাম করার জন্য রাব মিশিয়ে হাতের দাবনা দিয়ে ডলাই-মলাই করে।

    লোকজন মাতব্বর বাড়ি এসে জমায়েত হতে হতে দুপুর গড়িয়ে যায়। প্রত্যেকেই ভাওর ঘরের জন্য বাঁশ-খোটা, দড়াদড়ি যে যা পেরেছে নৌকা ভরে নিয়ে এসেছে। নিজ নিজ হাতিয়ারও নিয়ে এসেছে সবাই।

    ধারে-কাছের কিছু লোক আগেই এসেছিল। এরফান মাতব্বর তাদের বিভিন্ন কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। দুজন গেছে চুলার ধারে তাদের চাচিকে সাহায্য করতে। তিন-চারজন জং ধরা শড়কি আর কাতরা ঘষতে লেগে গেছে পাথরের ওপর। একজন বালিগচার ওপর কোপা দা আর কাটারিতে ধার দিচ্ছে।

    কয়েকজন গেছে কাশ আর চুইন্যা ঘাস কাটতে। ভাওর ঘর তুলতে দরকার হবে এসব ঘাস-পাতার। এগুলোর গোড়ার দিকটা দিয়ে হবে বেড়া আর আগার দিকটা দিয়ে ছাউনি। খুঁটির বাঁশে টান পড়বে। তাই কয়েকজন চলে গেছে নদীর উত্তর পাড়। বানরি ও হাশাইল গ্রাম থেকে বাঁশ কিনে তারা সোজা গিয়ে চরে উঠবে।

    লোক এসেছে একশরও বেশি। এত লোকের জন্য থালা-বাসন যোগাড় করা সোজা কথা নয়। ফজল কলাপাতা কাটতে লেগে যায়। কঞ্চির মাথায় কাস্তে বেঁধে সে কলাগাছের আগা থেকে ডাউগ্গা কাটে। তারপর এক একটাকে খণ্ড করে চার-পাঁচটা।

    খেতের আল ধরে নূরু আসছে। ধানগাছের মাথার ওপর দিয়ে ওর মাথা দেখা যায়।

    ওকে দেখেই ফজলের পাতা কাটা বন্ধ হয়ে যায়। তার বুকের ভেতরটা দুলে ওঠে।

    ‘ইস, আবার টেরি কাটছে মিয়াসাব।’ নূরুর দিকে চেয়ে অস্ফুট স্বরে বলে ফজল।

    কাছে এলে সে আবার লক্ষ্য করে, শুধু পরিপাটি করে চুলই আঁচড়ায়নি নূরু, তেলে চকচক করছে চুল। চোখে সুরমাও লাগিয়েছে আবার। গায়ের জামা আর লুঙ্গিটাও তত বেশ পরিষ্কার মনে হচ্ছে। তার বুঝতে বাকি থাকে না, এসব কাজে কার হাত লেগেছে।

    বাড়ির কাছে আসতেই ফজল ডাক দেয়, ‘এই নূরু, এই দিগে আয়।’

    কাছে এলে সে কপট রাগ দেখায়, ‘কিরে তোরে না বারহায় বারহায় কইয়া দিছিলাম জল্‌দি কইর‍্যা আইয়া পড়িস। ইস্কুলে যাইতে অইব।’

    ‘চাচি আইতে দিল না যে।’

    ফজলের অনুমান ঠিকই হয়েছে। সে আবার জিজ্ঞেস করে, ‘আইতে দিল না ক্যান্?’

    ‘চাচি কয়, এদ্দিন পরে আইছস, না খাইয়া যাবি কই?’

    ‘ও তুমি প্যাট তাজা কইর‍্যা আইছ?’

    ‘না খাইয়া আইতে দিল না যে! আবার কইছিল, আইজ থাইক্যা কাইল যাইস।’

    ‘ইস্ আদরের আর সীমা নাই। কি খাওয়াইলরে?’

    ‘বেহানে গিয়া খাইছি কাউনের জাউ আর আন্তেশা পিডা। দুফরে পাঙাশ মাছ ভাজা, পাঙাশ মাছের সালুন, ডাইল। হেষে দুধ আর ক্যালা।’

    ‘ক্যালা কস ক্যারে? ইস্কুলে পড়স, কলা কইতে পারস না?’ মুচকি হেসে আবার বলে সে, ‘কলা কইতে পারে না, জাদু আমার ট্যাড়া সিঁথি কাটছে, হুঁহ!’

    নূরু লজ্জা পেয়ে হাতের এক ঝটকায় চুলগুলো এলোথেলো করে দিয়ে বলে, ‘আমি বুঝি কাটছি, চাচি আঁচড়াইয়া দিছে।’

    ফজল নূরুকে হাত ধরে পরম স্নেহে কাছে টেনে নেয়। আঙুলের মাথা দিয়ে বিস্রস্ত চুল দু’দিকে সরিয়ে সিঁথিটা ঠিক করতে করতে বলে, ‘তোর চোখে সুরমা লাগাইয়া দিছে কে রে?’

    ‘চাচি।’

    ‘লুঙ্গি আর জামাডাও বুঝি তোর চাচি ধুইয়া দিছে?’

    ‘হ।’

    ‘তোর চাচি কিছু জিগায় নাই?’

    ‘হ জিগাইছে, তোর দাদা কেমুন আছে? তোর দাদি কেমুন আছে?’

    ‘আর কারো কথা জিগায় নাই?’

    ‘হ জিগাইছে, তোর চাচা কেমুন আছে?’

    ‘তুই কি কইছস?’

    ‘কইছি বেবাক ভালো আছে।’

    ‘আর কি কইছে?’

    ‘আর কইছে তোগ লাল গাইডা বিয়াইছে নি?’

    ‘আর …?’

    নূরু তার পকেট থেকে একটা ছোট মোড়ক বের করে। কাগজের মোড়কটা ফজলের হাতে দিয়ে সে বলে, ‘চাচি কইছে, এইডার মইদ্যে একখান তাবিজ আছে। পীরসাবের তাবিজ।’

    ‘হ তোমারে এইডা মাজায় বাইন্দা রাখতে কইছে।’

    ‘ক্যান?’

    ‘চাচি কইছে, বালা-মসিবত আইতে পারব না। আর অজু না কইর‍্যা এইডা খুলতে মানা করছে চাচি।’

    ‘ক্যান, খুললে কি অইব?’

    ‘খুললে বোলে চউখ কানা অইয়া যাইব।’

    ফজল মনে মনে হাসে। রূপজানের চাল ধরে ফেলে সে। নূরু যাতে খুলে না দেখে, সে-জন্যই সে চোখ কানা হওয়ার ভয় দেখিয়েছে।

    ফজল মোড়কটা পকেটে পুরে বলে, ‘আইচ্ছা যা তুই।’

    নূরু কিছুদূর যেতেই ফজল ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কিরে তোর নানাজান আইল না?’

    ‘হে বাড়িতে নাই, গরু কিনতে মুনশিরহাট গেছে।’

    নূরু চোখের আড়াল হতেই ফজল কলাগাছের ঝাড়ের মধ্যে গিয়ে ঢোকে। পকেট থেকে বের করে মোড়কটা। সুতা দিয়ে ওটাকে আচ্ছামতো পেঁচিয়ে দিয়েছে রূপজান। সুতার প্যাঁচ খুলে সে মোড়কটার ভেতরে পায় একটা সাদা রুমাল আর ভাঁজ করা একটা কাগজ। রুমালটার এক কোণে এমব্রয়ডারি করা ফুল ও পাতা। তার নিচে সুচের ফোর দিয়ে লেখা, ‘ভুলনা আমায়।’

    ফজল রুমালটা গালের সাথে চেপে ধরে। তারপর ওটাকে পকেটে রেখে সে ভাঁজ করা কাগজটা খুলে পড়ে।

    প্রাণাধিক,

    হাজার হাজার বহুত বহুত সেলাম পর সমাচার এই যে আমার শত কোটি ভালবাসা নিও। অনেক দিন গুজারিয়া গেল তোমারে দেখি না। তোমারে একটু চউখের দেখা দেখনের লেইগ্যা পরানটা খালি ছটফট করে। তুমি এত নিষ্ঠুর। একবার আসিয়া আমার খবরও নিলা না। বাজান তোমার উপরে রাগ হয় নাই। সে রাগ হইছে মিয়াজির উপরে। সে আমার গয়না বেচিয়া খাইছে। সেই জন্যই বাজান রাগ হইছে। কিন্তু আমি গয়না চাই না। তুমিই আমার গয়না, তুমিই আমার গলার হার। তুমিই আমার পরানের পরান। যদি তোমার পরানের মধ্যে আমারে জায়গা দিয়া থাক তবে একবার আসিয়া চউখের দেখা দিয়া যাইও। তোমার লেইগ্যা পথের দিগে চাহিয়া থাকিব।

    নূরুর কাছে শোনলাম, খুনের চর জাগছে। তোমার আল্লার কিরা, চরের কাইজ্যায় যাইও না। ইতি।

    অভাগিনী

    রূপজান

    ফজল কাগজটা উল্টে দেখে, সেখানে একটা পাখি আঁকা। তার নিচে লেখা রয়েছে, ‘যাও পাখি বলো তারে, সে যেন ভোলে না মোরে।’

    তারও নিচে লেখা আছে একটা পরিচিত গানের কয়েকটা লাইন–

    যদি আমার পাখারে থাকত,

    কে আমারে ধরিয়া রাখত,

    উইড়া যাইতাম পরান বন্ধুর দ্যাশেরে ॥

    ফজল চিঠিটা আবার প্রথম থেকে পড়তে শুরু করে।

    ‘ফজু কই রে? অ ফজু…’

    ‘জ্বী আইতে আছি। পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে ফজল তাড়াতাড়ি চিঠিটা পকেটে পোরে। সে আরো কিছু কলাপাতা কেটে বাড়ির উঠানে গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে লোকজনের সাথে কথাবার্তা বলছে এরফান মাতব্বর।’

    খিচুড়ি রান্না শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ।

    মাতব্বর বলে, ‘এই হানে খাওনের হেঙ্গামা করলে দেরি অইয়া যাইব। এক কাম করো, খিচুড়ির ডেগটা নায় উড়াইয়া লও। নাও চলতে চলতে যার যার নায়ের মইদ্যে বইয়া খাইয়া লইও।’

    রমিজ মিরধা বলে, ‘হ এইডাই ভালো। খাইতে খাইতে যদি দিন কাবার অইয়া যায় তয় কোনো কাম অইব না।’

    লোকজন খিচুড়ির ডেগটা ধরাধরি করে মাতব্বরের ছই-বিহীন ঘাসি নৌকায় তোলে। কলাপাতাগুলো লোক অনুসারে প্রত্যেক নৌকায় ভাগ করে দেয় ফজল। বাঁশ-খোঁটা, লাঠি শড়কি, ঢাল-কাতরা আগেই নৌকায় উঠে গেছে। এবার লোকজনও যার যার নৌকায় উঠে যায়।

    নূরু এসে ফজলকে ডাকে, ‘ও দুদু, দাদি তোমারে বোলায়।’

    ফজল উঠানে গিয়ে দেখে, ‘তার বাবা আর মা ঝগড়া লাগিয়ে দিয়েছে।’

    মাতব্বর বলে, ‘জুয়ান পোলা দশজনের লগে যাইব না, এইডা কেমুন কথা! মাইনষে হুনলে কইব কি? বাঘের ঘরে মেকুর পয়দা অইছে।’

    ‘কইলে কউক। আমার পোলা আমি যাইতে দিমু না।’

    ‘যাইতে দিবা না, তয় কি মুরগির মতন খাঁচায় বাইন্দা রাখতে চাও?’

    ‘মাইনষের কি আকাল পড়ছে নি? দুইডা না, তিনডা না, একটা পোলা আমার। ও না গেলে কি অইব?’

    ‘কি অইব, তুমি বোঝ্‌বা না। আমার দিন তো ফুরাইয়া আইল, আমি চউখ বুজলে ও-ই অইব মাতব্বর। আপদে-বিপদে মাইনষের আগে আগে চলতে না হিগলে মাতবরি-সরদারি করব কেমন কইর‍্যা?’

    ‘থাউক, আমার পোলার মাতবরি-হরদারি করণ লাগব না।’

    ফজল এগিয়ে গিয়ে মা-কে বাধা দেয়, ‘তুমি চুপ অওতো মা। কি শুরু করছ?’

    তারপর সে তার পিতার দিকে চেয়ে বলে, ‘বাজান, বেবাক জিনিস নায়ে উইট্যা গেছে। আপনে ওঠলেই এখন রওনা দিতে পারি।’

    বরুবিবি এবার ফজলকে বলে, ‘অ ফজু, বাজানরে তুই যাইস না।’

    ‘ক্যান যাইমু না?’

    ‘ক্যান্ যাইমু না, হায় হায়রে আবার উল্ডা জিগায় ক্যান্ যাইমু না। তয় যা-যা তোরা বাপে পুতে দুইজনে মিল্যা আমার কল্ডাডা কাইট্যা থুইয়া হেষে যা।’

    মাতব্বর কাছে এসে ধীরভাবে বলে, ‘ও ফজুর মা, হোন। আমরা তো কাইজ্যা করতে যাইতে আছি না। এইবার আর কাইজ্যা অইব না। চেরাগ আলী ঐ বচ্ছর যেই চুবানি খাইছে, এই বচ্ছর আর চরের ধারে কাছে আইতে সাহস করব না।’

    ‘তয় ফজুরে নেওনের কাম কি?’

    ‘ও না গেলে মানুষ-জনেরে খাওয়াইব কে? আর হোন, কাইজ্যা লাগলে ওরে কাইজ্যার কাছে যাইতে দিমু না। তুমি আর ভাবনা কইর‍্য না। চলরে ফজু, আর দেরি করণ যায় না।’

    বাপের পেছনে পেছনে ছেলে রওনা হয়। নূরু বরুবিবির কাছেই দাঁড়ানো ছিল। তাম্‌শা দেখবার জন্য সে-ও নৌকাঘাটার দিকে রওনা হয়। বরুবিবি খপ করে তার হাত ধরে ফেলে। তারপর তাকে কোলের মধ্যে নিয়ে সে বিলাপ করতে শুরু করে দেয়, ‘ও আমার রশুরে, বাজান তোরে না যে ভোলতে না যে-পা-আ-আ-রি, সোনার চান ঘরে থুইয়া কেমনে চইল্যা গে-এ-এ-লি, বাজানরে-এ-এ-এ, আ-মা–র।’

    এরফান মাতব্বর নৌকায় উঠেই তাড়া দেয়, ‘আর দেরি কইর‍্য না। এইবার আল্লার নাম লইয়া রওনা দ্যাও।’

    লোকজন যার যার নৌকা খুলে রওনা হয়। মেহের মুনশি হাঁক দেয়, ‘আল্লা-রসুল বলো ভাইরে ম-মী-ঈ-ঈ-ন…’

    ‘আল্লা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ মুনশির কথার শেষ ধরে বাকি সবাই ‘জাক্কইর’ দেয়।

    মাতব্বরের ঘাসি নৌকার আগে-পিছে তেইশখানা নৌকা চলছে। কোনোটায় চারজন, কোনোটায় বা পাঁচজন করে লোক। কিছুদূর গিয়েই ফজল খিচুড়ি পরিবেশন করতে লেগে যায়। সে ইযারি হাতে ডেগের কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। চলতে চলতে এক একটা ডিঙি এসে নৌকার সাথে ভিড়ে। ফজল লম্বা হাতলওয়ালা কাঠের ইযারি দিয়ে ডেগ থেকে খিচুড়ি তুলে কলাপাতার ওপর ঢেলে দেয়।

    এরফান মাতব্বর লোকজনদের উদ্দেশে চেঁচিয়ে বলে, ‘যার যার প্যাট ভইরা খাইও মিয়ারা। রাইতে কিন্তু খাওয়ার যোগাড় করণ যাইব না।’

    এরফান মাতব্বর সকলের ওপর দিয়ে গাছ-মাতব্বর। তার সাথে ঘাসি নৌকায় বসে আলাপ-আলোচনা করছে পুলকি-মাতব্বর রমিজ মিরধা, জাবেদ লশকর, মেহের মুনশি আর কদম শিকারি। পুলকি অর্থাৎ সদ্য উদ্গত গাছের শাখার মতোই তারা কচি মাতব্বর। তাদের চারপাশে বসেছে সাত-আটজন কোলশরিক।

    তারা পরামর্শ করে ঠিক করে, চরের উত্তর দিকটা পাহারা দেয়ার জন্য জাবেদ লশকর ও তার লোকজন ভাওর ঘর তুলবে। এভাবে দক্ষিণদিকে কদম শিকারি, পশ্চিমদিকে রমিজ মিরধা আর পুবদিকে মেহের মুনশি তাদের লোকজন নিয়ে পাহারা দেবে। যদি কেউ চর দখল করতে আসে তবে পুবদিক দিয়ে আসার সম্ভাবনাই বেশি। তাই এরফান মাতব্বর ও তার আত্মীয়-স্বজন পুবদিকটায় ভাওর ঘর তুলবার মনস্থ করে।

    সবগুলো ডিঙির লোকজন খাওয়া শেষ করেছে। এবার মাতব্বর ঘাসি নৌকার সবার সাথে খেতে বসে। খেতে খেতে সবাই তারিফ করে খিচুড়ির। রমিজ মিরধা বলে, ‘চাচির আতের খিচুড়ি যে খাইছে, হে আর ভেলতে পারব না কোনোদিন।’

    রান্নার প্রশংসা শুনে মাতব্বর খুশি হয়। কিন্তু সবার অজান্তে সে একটা দীর্ঘশ্বাসও ছাড়ে। আর মনে মনে ভাবে, ‘এ তারিফ যার প্রাপ্য সে আর মাতব্বর বাড়ি নেই এখন।’

    আসুলির ভাল মাইনষের ঘরের মেয়ে ক’টা বছরের জন্য এসে মাতব্বর বাড়ির রান্নার ধরনটাই বদলে দিয়ে গেছে। হাজেরা এই বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর বরুবিবি তার হাতেই রসুইঘরের ভার ছেড়ে দিয়েছিল। হাজেরা বাপের বাড়ি নাইয়র গেলে মুশকিল বেঁধে যেত। স্ত্রীর হাতের রান্না খেয়ে মাতব্বর মুখ বিকৃত করে বলত, ‘নাগো, ভাল্ মাইনষের মাইয়ার রান্দা খাইতে খাইতে জিব্বাডাও ভাল মানুষ অইয়া গেছে। তোমাগ আতের ফ্যাজাগোজা আর ভাল লাগে না।’

    নিরুপায় হয়ে বরুবিবিকে শেষে পুতের বউর কাছে রান্না শিখতে হয়েছিল।

    এরফান মাতব্বর তার লোকজন নিয়ে যখন নতুন চরে পৌঁছে, তখন রোদের তেজ কমে গেছে।

    মাতব্বর সবাইকে নির্দেশ দেয়, যার যার জাগায় ডিঙ্গা লইয়া চইল্যা যাও। আমরা ‘আল্লাহু আকবর’ কইলে তোমরা ঐলগে আওয়াজ দিও। এই রহম তিনবার আওয়াজ দেওনের পর ‘বিছমিল্লা’ বুইল্যা বাঁশগাড়ি করবা।

    একটু থেমে সে আবার বলে, ‘তোমরা হুঁশিয়ার অইয়া থাইক্য। রাইতে পালা কইর‍্যা পাহারা দিও এক একজন।’

    লোকজন নিজ নিজ নির্ধারিত স্থানে ডিঙি নিয়ে চলে যায়।

    আছরের নামাজ পড়ে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মাতব্বর। তারপর লোকজন নিয়ে নৌকা থেকে নামে। বাঁশের খোটা হাতে এক একজন হাঁটু পানি ভেঙে মাতব্বরের নির্দেশ মতো দূরে দূরে গিয়ে দাঁড়ায়।

    ফজলকে ডেকে মাতব্বর বলে, ‘অ ফজু, এইবার আল্লাহু আকবর আওয়াজ দে।’

    ফজল গলার সবটুকু জোর দিয়ে হাঁক দেয়, ‘আল্লাহু আকবর।’

    চরের চারদিক থেকে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে আওয়াজ ওঠে, ‘আল্লাহু আকবর।’

    তিনবার তকবির ধ্বনির পর একসাথে অনেকগুলো বাঁশ গেড়ে বসে চরের চারদিকে। দখলের নিশান হয়ে সেগুলো দাঁড়িয়ে থাকে পলিমাটির বুকে।

  • চার

    চার

    উত্তরে মূলভাওড়, দক্ষিণে হোগলাচর, পুবে মিত্রের চর আর পশ্চিমে ডাইনগাঁও–এই চৌহদ্দির মধ্যে ছোট বড় অনেকগুলো চর। চারদিকে জলবেষ্টিত পলিদ্বীপ। এগুলোর উত্তর আর দক্ষিণদিক দিয়ে দ্বীপবতী পদ্মার দুটি প্রধান স্রোত পুব দিকে বয়ে চলেছে। উত্তর দিকের স্রোত থেকে অনেকগুলো শাখা-প্রশাখা বেরিয়ে চরগুলোকে ছোট বড় গোল দিঘল নানা আকারে কেটে-হেঁটে মিশেছে গিয়ে দক্ষিণদিকের স্রোতের সঙ্গে।

    চরগুলোর বয়স দুবছরও হয়নি। এগুলো জেগেছে আর জঙ্গুরুল্লার কপাল ফিরেছে। প্রায় সবগুলো চরই দখল করে নিয়েছে সে। আর এ চরের দৌলতে নানাদিক দিয়ে তার কাছে টাকা আসতে শুরু করেছে। কোলশরিকদের কাছ থেকে বাৎসরিক খাজনার টাকা আসে। বর্গা জমির ধান-বেচা টাকা আসে। আসে ঘাস-বেচা টাকা।

    কোলশরিক আর কৃষাণ-কামলারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে, ‘ট্যাহারা মানুষ চিনে। ওরা বোঝে, কোন মাইনষের ঘরে গেলে চিৎ অইয়া অনেকদিন জিরাইতে পারব।’

    ‘হ, ঠিক কথাই কইছ। আমরা তো আর ট্যাহা-পয়সারে এক মুহূর্তুক জিরানের ফরসত দেই না। আইতে না আইতেই খেদাইয়া দেই।’

    টাকারা জঙ্গুরুল্লাকে চিনেছে মাত্র অল্প কয়েক বছর আগে। ভালো করে চিনেছে ধরতে গেলে চরগুলো দখলে আসার পর। আজকাল টাকা-পয়সা নাড়াচাড়া করার সময় বিগত জীবনের কথা প্রায়ই মনে পড়ে তার। জঙ্গুরুল্লার বয়স পয়তাল্লিশ পার হয়েছে। গত পাঁচটা বছর বাদ দিয়ে বাকি চল্লিশটা বছর কি দুঃখ কষ্টই না গেছে তার। জীবনের সবচেয়ে ভালো সময়টাই কেটেছে অভাব-অনটনের মধ্যে। পেটের ভেতর জ্বলেছে খিদের আগুন। অথচ তার শরীরের ঘামও কখনো শুকোয়নি।

    সাত বছর বয়সের সময় তার মা মারা যায়। বাপ গরিবুল্লা আবার শাদি করে। জঙ্গুর সৎমা ছিল আর সব সৎমাদেরর মতোই। বাপও কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। অতটুকু বয়সেই সে বুঝতে পেরেছিল–গাঁয়ের লোক শুধু শুধুই বলে না, মা মরলে বাপ অয় তালুই।

    ঘোপচরে গরিবুল্লার সামান্য কিছু জমি ছিল। সেই জমি চাষ করে আর কামলা খেটে কোনো রকমে সে সংসার চালাত। জঙ্গুর বয়স দশ বছর হতে না হতেই সে তাকে হোগলাচরের এক চাষী গেরস্তের বাড়ি কাজে লাগিয়ে দেয়। সেখানে পাঁচ-ছবছর পেটে-ভাতে রাখালি করে সে। তারপর দুটাকা মাইনেয় ঐ চরেরই আর এক বড় গেরস্তের বাড়ি হাল চাষের কাজ জুটে যায়।

    বছর চারেক পরে তার বাপ মারা যায়। সৎমা তার ছবছরের মেয়েকে নিয়ে নিকে বসে অন্য জায়গায়। জঙ্গু ঘোপচরে ফিরে আসে। গাঁয়ের দশজনের চেষ্টায় তার বিয়েটাও হয়ে যায় অল্পদিনের মধ্যেই। গরিব চাষীর মেয়ে আসমানি। গোবরের খুঁটে দেয়া থেকে শুরু করে ধান ভানা, চাল ঝাড়া, মুড়ি ভাজা, ঘর লেপা, কাঁথা সেলাই, দুধ দোয়া ইত্যাদি যাবতীয় কাজে তার হাত চলে। আর অভাব-অনটনের সময় দু-এক বেলা উপোস দিতেও কাতর হয় না সে। কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে গুছিয়ে নেয় সে গরিবের সংসার।

    জঙ্গুরুল্লা বাপের লাঙ্গল-গরু নিয়ে চাষ-বাস শুরু করে। মাঝে মাঝে কামলা খাটে অন্যের জমিতে। সারাদিন সে কি খাটুনি! পুরো পাঁচটা দিন কামলা খেটে পাওয়া যেত একটিমাত্র টাকা। টাকাটা নিয়ে সে মুলফতগঞ্জের হাটে যেত। দশ আনায় কিনত সাত সের চাল আর বাকি ছ’আনার ডাল-তেল-নুন-মরিচ ও আরো অনেক কিছু।

    এ সময়ের একটা ঘটনার কথা মনে পড়লেই তার কপাল কুঁচকে ওঠে। চোখদুটো ক্রুর দৃষ্টি মেলে তাকায় নিজের পা দুখানার দিকে। দুপাটি দাঁত চেপে ধরে নিচের ঠোঁট।

    ঘোপচরের মাতব্বর ছিল সোহরাব মোড়ল। তার ছেলের বিয়ের বরযাত্রী হয়ে জঙ্গুরুল্লা দক্ষিণপাড়ের কলুকাঠি গিয়েছিল। আসুলির ভাল্ মানুষ। মেহমানদের জন্য সাদা ধবধবে ফরাস বিছিয়েছিল বৈঠকখানায়। সেই ফরাসের ওপর জঙ্গুরুল্লা তার থেবড়া পায়ের কয়েক জোড়া ছাপ ফেলেছিল। তা দেখে চোখ টেপাটিপি করে হেসেছিল কনেপক্ষের লোকেরা। তাদের অবজ্ঞার হাসি বরপক্ষের লোকদের চোখ এড়ায়নি। রাগে সোহরাব মোড়লের রক্ত গরম হয়ে উঠেছিল। কোনো রকমে সে সামলে নেয় নিজেকে।

    কিন্তু বাড়ি ফেরার পথেই সে পাকড়াও করে জঙ্গুরুল্লাকে জুতা খুলে মারতে যায়। আর সবাই না ঠেকালে হয়তো জুতার বাড়ি দু-একটা পড়ত জঙ্গুরুল্লার পিঠে।

    সোহরাব মোড়ল রাগে গজগজ করে, ‘শয়তান, ওর কি এট্টু আক্কেল-পছন্দ নাই? ও আধোয়া পায়ে ক্যামনে গিয়া ওঠল অমন ফরাসে। দেশ-কুলের তারা আমাগ কি খামাখা নিন্দে? খামাখা কয় চরুয়া ভূত?’

    দুলার ফুফা হাতেম খালাসি বলে, ‘এমুন গিধড় লইয়া ভর্দ লোকের বাড়িতে গেলে কইব না কি ছাইড়া দিব? আমাগ উচিত আছিল বাছা বাছা মানুষ যাওনের।’

    ‘ঠিক কথাই কইছ, এইবারতন তাই করতে অইব।’

    ‘আইচ্ছা, ওর ঘাড়ের উপরে দুইটা চটকানা দিয়া জিগাও দেহি, ওর চরণ দুইখান পানিতে চুবাইলে কি ক্ষয় অইয়া যাইত?’

    বরযাত্রীদের একজন বলে, ‘কারবারডা অইছে কি, হোনেন মোড়লের পো। জুতা তো বাপ-বয়সে পায়ে দেয় নাই কোনো দিন। নতুন রফটের জুতা পায়ে দিয়া ফোস্কা পড়ছে। নায়েরতন নাইম্যা খোঁড়াইতে খোঁড়াইতে কিছুদূর আইছিল। হেরপর খুইল্যা আতে লয়। বিয়াবাড়ির কাছে গিয়া ঘাসের মইদ্যে পাও দুইখান ঘইষ্যা ত্বরাত্বরি জুতার মইদ্যে ঢুকাইছিল।’

    ‘ছিঃ-ছিঃ-ছিঃ! জাইতনাশা কুত্তা! ওর লেইগ্যা পানির কি আকাল পড়ছিল? কই গেল পা-না-ধোয়া শয়তানডা?’

    একটা হাসির হল্লা বরযাত্রীদের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সবাই খোঁজ করে জঙ্গুরুল্লার, ‘কইরে পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লা? কই? কই গেল পা-না-ধোয়া গিধড়?’

    জঙ্গুরুল্লাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি সেখানে। অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে সে পেছন থেকে সরে পড়েছিল।

    কিন্তু সরে পড়লে কি হবে? দশজনের মুখে উচ্চারিত সেদিনকার সেই পা-না-ধোয়া বিশেষণটা তার নামের আগে এঁটে বসে গেছে। নামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিরাজ করছে সেদিন থেকে। নামের সঙ্গে এ বিশেষণটা যোগ না করলে তাকে চেনাই যায় না আর।

    পা-না-ধোয়া বললে প্রথম দিকে খেপে যেত জঙ্গুরুল্লা। মারমুখী হয়ে উঠত। কিন্তু তার ফল হতো উল্টো। সে যত বেশি চটত তত বেশি করে চটাত পাড়া-প্রতিবেশীরা। শেষে নিরুপায় হয়ে নিজের কর্মফল হিসেবেই এটাকে মেনে নিতে সে বাধ্য হয়।

    চার বছর পর ঘোপচর নদীতে ভেঙে যায়। জঙ্গুরুল্লা চণ্ডীপুর মামুর বাড়ি গিয়ে আশ্রয় নেয়। এ কাজে সে কাজে সাতঘাটের পানি খেয়ে সে যখন জীবিকার আর কোনো পথ পায় না তখন ঘড়িশার কাছারির নায়েবের কথা মনে পড়ে তার।

    চণ্ডীপুর আসার মাস কয়েক পরের কথা। ঘড়িশার কাছারির নায়েব শশীভূষণ দাস স্টিমার ধরবার জন্য নৌকা করে সুরেশ্বর স্টেশনে গিয়েছিলেন। খুব ভোরে অন্ধকার থাকতে তিনি প্রাতঃকৃত্যের জন্য নদীর পাড়ে কাশঝোঁপের আড়ালে গিয়ে বসেছিলেন। ঐ সময়ে জঙ্গুরুল্লা ঝকিজাল নিয়ে ওখানে মাছ ধরছিল। জালটা গোছগাছ করে সে কনুইর ওপর চড়িয়েছে এমন সময় শুনতে পায় চিৎকার। জালটা ঐ অবস্থায় নিয়েই সে পেছনে ফিরে দেখে একটা পাতিশিয়াল খ্যাঁকখ্যাঁক করে একটা লোককে কামড়াবার চেষ্টা করছে। লোকটা চিৎকার করছে, পিছু হটছে আর লোটা দিয়ে ওটাকে ঠেকাবার চেষ্টা করছে। জঙ্গুরুল্লা দৌড়ে গিয়ে জাল দিয়ে খেপ মারে পাতিশিয়ালের ওপর। পাতিশিয়াল জালে জড়িয়ে যায়। লোকটার হাত থেকে লোটা নিয়ে সে ওটার মাথার ওপর মারে দমাদম। ব্যস, ওতেই ওর জীবনলীলা সাঙ্গ হয়ে যায়।

    ডাক-চিৎকার শুনে বহু লোক জমা হয়েছিল সেখানে। তাদের কাছে জানা যায়–আগের দিন ঐ এলাকার পাঁচ জনকে পাগলা শিয়ালে কামড়িয়েছে। সবাই বুঝতে পারে–ওটাই সেই পাগলা শিয়াল।

    জঙ্গুরুল্লার বুদ্ধি ও সাহসের প্রশংসা করে সকলেই। নায়েব তাকে দশ টাকা বখশিশ দিয়ে বলেন, ‘যদি কখনো দরকার পড়ে, আমার ঘড়িশার কাছারিতে যেও।’

    দুঃসময়ে নায়েবের কথা মনে পড়তেই সে চলে গিয়েছিল ঘড়িশার কাছারিতে। নায়েব তাকে পেয়াদার চাকরিতে বহাল করে নেন। মাসিক বেতন তিন টাকা। বেতন যাই হোক, এ চাকরির উপরিটাই আসল। আবার উপরির ওপরে আছে ক্ষমতা যাকে জঙ্গুরুল্লা বলে ‘পাওর’। এ কাজে ঢুকেই জঙ্গুরুল্লা প্রথম প্রভুত্বের স্বাদ পায়। সাড়ে তিন হাত বাঁশের লাঠি হাতে সে যখন মহালে যেত তখন তার দাপটে থরথরিয়ে কাঁপত প্রজারা। নায়েবের হুকুমে সে বকেয়া খাজনার জন্য প্রজাদের ডেকে নিয়ে যেত কাছারিতে। দরকার হলে ধরেও নিত। কখনো তাদের হাত-পা বেঁধে চিৎ করে রোদে শুইয়ে রাখত, কখনো কানমলা বাঁশডলা দিয়ে ছেড়ে দিত।

    একবার এক প্রজাকে ধরতে গিয়েছিল জঙ্গুরুল্লা। লোকটা অনেক কাকুতি-মিনতি করে শেষ সম্বল আট আনা এনে দেয় তার হাতে। কিন্তু কিছুতেই জঙ্গুরুল্লার মন গলে না। শেষে লোকটা তার পা জড়িয়ে ধরে।

    চমকে ওঠে জঙ্গুরুল্লা। অনেকক্ষণ থম ধরে দাঁড়িয়ে থাকে সে। শেষে বলে, ‘যা তোরে ছাইড়া দিলাম। পাট বেইচ্যা খাজনার টাকা দিয়া আহিস কাছারিতে।’

    তারপরেও এ রকম ঘটনা ঘটেছে কয়েকবার। প্রত্যেকবারই মাপ করে দেয়ার সময় তার অন্তরে আকুল কামনা জেগেছে, সোহরাব মোড়লরে একবার পায়ে ধরাইতে পারতাম এই রহম!

    শুধু কামনা করেই ক্ষান্ত হয়নি জঙ্গুরুল্লা। সোহরাব মোড়লকে বাগে পাওয়ার চেষ্টাও অনেক করেছে সে। তার চেষ্টা হয়তো একদিন সফল হতো, পূর্ণ হতো অন্তরের অভিলাষ। কিন্তু পাঁচটা বছর–যার বছর দুয়েক গেছে ওত-ঘাত শিখতে–পার হতে না হতেই তার পেয়াদাগিরি চলে যায়। প্রজাদের ওপর তার জুলুমবাজির খবর জমিদারের কানে পৌঁছে। তিনি জঙ্গরুল্লাকে বরখাস্ত করার জন্য পরোয়ানা পাঠান নায়েবের কাছে। জমিদারের পরোয়ানা না মেনে উপায় কি? নায়েব জঙ্গুরুল্লাকে বরখাস্ত করেন বটে, তবে কৃতজ্ঞতার প্রতিদান হিসেবে নতুনচর বালিগাঁয়ে তাকে কিছু জমি দেন।

    জঙ্গুরুল্লা বালিগাঁয়ে গিয়ে ঘর বাঁধে। লাঙ্গল-গরু কিনে আবার শুরু করে চাষ বাস। আগের মতো হাবা-গোবা সে নয় আর। একেবারে আলাদা মানুষ হয়ে ফিরে এসেছে সে। আগে ধমক খেলে যার মূৰ্ছা যাওয়ার উপক্রম হতো, সে এখন পানির ছিটে খেলে লগির গুঁতো দিতে পারে।

    জমিদারের কাছারিতে কাজ করে নানা দিক দিয়ে তার পরিবর্তন ঘটেছে। সে দশজনের সাথে চলতে ফিরতে কথাবার্তা বলতে শিখেছে। জমা-জমি সংক্রান্ত ফন্দি-ফিকির, প্যাঁচগোছও শিখেছে অনেক। তাছাড়া বেড়েছে তার কূটবুদ্ধি ও মনের জোর। যদিও প্রথম দিকে গায়ের বিচার-আচারে তাকে কেউ পুছত না, তবুও সে যেত এবং সুবিধে মতো দু-চার কথা বলতো। এভাবে গায়ের সাদাসিধে লোকদের ভেতর সে তার প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই সে গাঁয়ের অন্যতম মাতব্বর বলে গণ্য হয়।

    তারপর আসে ১৩৪৬ সাল–জঙ্গুরুল্লার ভাগ্যোদয়ের বছর। বর্ষার শেষে আশ্বিন মাসে মাঝ-নদীতে একটার পর একটা চর পিঠ ভাসাতে শুরু করে। পদ্মার প্রধান স্রোত দু’ভাগ হয়ে সরে যায় উত্তরে আর দক্ষিণে। জঙ্গুরুল্লা বালিগাঁয়ের লোকজন নিয়ে কয়েকটা চরই দখল করে নেয়। তারপর কুণ্ডু আর মিত্র জমিদারদের কাছারি থেকে বন্দোবস্ত এনে বসিয়ে দেয় কোলশরিক। তাদের কাছ থেকে মোটা হারে সেলামি নিয়ে সে তার অবস্থা ফিরিয়ে ফেলে।

    চরগুলো দখল করার পর জঙ্গুরুল্লা চরপাঙাশিয়ায় নতুন বাড়ি করে। উত্তর, পুব আর পশ্চিম ভিটিতে চৌচালা ঘর ওঠে। দক্ষিণ ভিটিতে ওঠে আটচালা কাছারি ঘর। নতুন ঢেউটিনের চালা আর পাতটিনের বেড়া নিয়ে ঘরগুলো দিনের রোদে চোখ ঝলসায়। রাত্রে চাঁদের আলোয় বা চলন্ত স্টিমারের সার্চলাইটের আলোয় ঝলমল করে।

    ঘরগুলো তুলতে অনেক টাকা খরচ হয়েছিল জঙ্গুরুল্লার। সে নিজের পরিবার-পরিজনের কাছে প্রায়ই বলে, ‘গাঙ অইল পাগলা রাক্‌কস। কখন কোন চরের উপ্‌রে থাবা মারে, কে কইতে পারে? এইডা যদি চর না অইত, তয় আল্লার নাম লইয়া দালানই উডাইতাম।’

    যত বড় পয়সাওয়ালাই হোক, পদ্মার চরে দালান-কোঠা তৈরি করতে কেউ সাহস করে না। দালান মানেই পোড়া মাটির ঘর। মাটির ওপর যতক্ষণ খাড়া থাকে ততক্ষণই এ মাটির ঘরের দাম। ভেঙে ফেললে মাটির আর কী দাম? তাই চরের লোক টিনের ঘরই পছন্দ করে। চর-ভাঙা শুরু হলে টিনের চালা, টিনের বেড়া খুলে, খাম-খুঁটি তুলে নিয়ে অন্য চরে গিয়ে ঠাঁই নেয়া যায়।

    বিভিন্ন চরে জঙ্গুরুল্লার অনেক জমি আছে। কোলশরিকদের মধ্যে জমির বিলি-ব্যবস্থা করে দিয়ে নিজের জন্য বাছাবাছা জমিগুলো রেখেছে সে। নিজে বা তার ছেলেরা আর হাল চাষ করে না এখন। বর্গাদার দিয়ে চাষ করিয়ে আধাভাগে অনেক ধান পাওয়া যায়। সে ধানে বছরের খোরাক হয়েও বাড়তি যা বাঁচে তা বিক্রি করে কম সে-কম হাজার দুয়েক টাকা ঘরে আসে। নিজেরা হাল-চাষ না করলেও জমা-জমি দেখা-শোনা করা দরকার, বর্গাদারদের থেকে ভাগের ভাগ ঠিকমতো আদায় করা দরকার। এ চর থেকে দূরের চরগুলোর দেখাশোনা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই সে কিছুদিন আগে কুমিরডাঙ্গা আর বগাদিয়ায় আরো দুখানা বাড়ি করেছে। কুমিরডাঙ্গায় গেছে প্রথমা স্ত্রী আসমানি বিবি তার সেজো ছেলে জহিরকে নিয়ে। ঘরজামাই গফুর আর মেয়ে খায়রুনও গেছে তাদের সাথে। বড় ছেলে জাফর বগাদিয়ায় গিয়ে সংসার পেতেছে। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী শরিফন আর মেজো ছেলে ও ছেলে বউ রয়েছে বড় বাড়িতে। জঙ্গুরুল্লা বেশির ভাগ সময় ও বাড়িতেই থাকে। মাঝে মাঝে নিজের পানসি নিয়ে চলে যায় কুমিরডাঙ্গা, না হয় বগাদিয়া।

    টাকার জোর, মাটির জোর আর লাঠির জোর–এ তিনটার জোরে জোরোয়ার জঙ্গুরুল্লা। এখন ‘সর্মানের’ জোর হলেই তার দিলের আরজু মেটে। সম্মানের নাগাল পেতে হলে বিদ্যার জোরও দরকার–সে বুঝতে পারে। বড় তিন ছেলেতো তারই মতো চোখ থাকতে অন্ধ। তারা ‘ক’ লিখতে কলম ভাঙে। তাই সে ছোট ছেলে দুটিকে স্কুলে পাঠিয়েছে। তারা হোস্টেলে থেকে মুন্সীগঞ্জ হাইস্কুলে পড়ে।

    মান-সম্মান বাড়াবার জন্য জঙ্গুরুল্লা টাকা খরচ করতেও কম করছে না। গত বছর সে মৌলানা তানবীর হাসান ফুলপুরীকে বাড়িতে এনে মস্ত বড় এক জেয়াফতের আয়োজন করেছিল। সে জেয়াফতে গরুই জবাই হয়েছিল আঠারোটা। দাওয়াতি-বে-দাওয়াতি মিলে অন্তত তিন হাজার লোক হয়েছিল। সে জনসমাবেশে মৌলানা সাহেব তাকে চৌধুরী পদবিতে অভিষিক্ত করে যান। সেদিন থেকেই সে চৌধুরী হয়েছে। নতুন দলিলপত্রে এই নামই চালু হচ্ছে আজকাল। চরপাঙাশিয়ার নামও বদলে হয়েছে চৌধুরীর চর। কিন্তু এত কিছু করেও তার নামের আগের সে পা-না-ধোয়া খেতাবটা ঘুচল না। তার তাবে আছে যে সমস্ত কোলশরিক আর বর্গাদার, তারাই শুধু ভয়ে ভয়ে তার চৌধুরী পদবির স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু তা-ও সামনা-সামনি কথা বলার সময়। তার অগোচরে আশপাশের লোকের মতো এখানে তারা পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লাই বলে।

    কিছুদিন আগে তার সেজো ছেলে জহিরের বিয়ের সম্বন্ধের জন্য সে ঘটক পাঠিয়েছিল উত্তরপাড়ের ভাটপাড়া গ্রামের কাজিবাড়ি। শামসের কাজি প্রস্তাব শুনে ‘ধ্যুত ধ্যুত’ করে হাঁকিয়ে দেন ঘটককে। বলেন, ‘চদরি নাম ফুডাইলে কি অইব! সাত পুরুষেও ওর বংশের পায়ের ময়লা যাইব না।’

    এ সবই জঙ্গুরুল্লার কানে যায়। রাগের চোটে সে দাঁতে দাঁত ঘষে। নিন্দিত পা দুটোকে মেঝের ওপর ঠুকতে থাকে বারবার। তার ইচ্ছে হয়, পা দুটো দিয়ে সে লণ্ডভণ্ড করে দেয় সবকিছু, পদানত করে চারদিকের সব মাটি আর মানুষ। এমনি করেই এক রকমের দিগ্বিজয়ের আকাক্ষা জন্ম নেয় তার মনে। তাই আজকাল আশেপাশে কোনো নতুন চর জাগলেই লাঠির জোরে সে তা দখল করে নেয়। জমির সত্যিকার মালিকেরা উপায়ান্তর না দেখে হাতজোড় করে এসে তার কাছে দাঁড়ায়। দয়া হলে কিছু জমি দিয়ে সে তাদের কোলশরিক করে রাখে।

    চরদিঘলির উত্তরে বড় একটা চর জেগেছে–খবর পায় জঙ্গুরুল্লা। চরটা তার এলাকা থেকে অনেক দূরে, আর কারা নাকি ওটা দখল করে বসেছে। এসব অসুবিধের কথা ভেবেও দমে না সে। নানা প্রতিকূল অবস্থার ভেতর পরপর অনেকগুলো চর দখল করে তার হিম্মত বেড়ে গেছে। তাই কোনো রকম অসুবিধাই সে আর অসুবিধা বলে মনে করে না। চর আর চরের দখলকারদের বিস্তারিত খবর আনবার জন্য সে তার মেজো ছেলে হরমুজকে দু’জন কোলশরিকের সাথে নতুন চরের দিকে পাঠিয়েছিল। তারা ফিরে এসে খবর দেয়–চরটার নাম খুনের চর, দখল করেছে এরফান মাতব্বর, ভাঙর ঘর উঠেছে ঊনষাটটা।

    সেদিনই জঙ্গুরুল্লা তার বিশ্বস্ত লোকজন ডাকে যুক্তি-পরামর্শের জন্য। তার কথার শুরুতেই শোনা যায় অনুযোগের সুর, ‘কি মিয়ারা, এত বড় একটা চর জাগল, তার খবর আগে যোগাড় করতে পার নাই?’

    কোলশরিক মজিদ খালাসি বলে, ‘ঐ দিগেত আমাগ চলাচল নাই হুজুর।’

    ‘ক্যান্?’

    ‘আমরা হাট-বাজার করতে যাই দিঘিরপাড় আর হাশাইল। হাশাইলের পশ্চিমে আমাগ যাওয়া পড়ে না।’

    ‘যাওয়া পড়ে না তো বোঝলাম। কিন্তুক এদিকে যে গিট্টু লাইগ্যা গেছে।’

    ‘গিট্টু! কিয়ের গিট্টু?’ দবির গোরাপি বলে।

    ‘হোনলাম, এরফান মাতব্বর চরডা দখল কইরা ফালাইছে।’

    ‘হ, আগের বার আট-দশ বচ্ছর আগে যহন ঐ চর পয়স্তি অইছিল তহন এরফান মাতব্বরই ওইডা দখল করছিল।’

    ‘হ, তার বড় পোলা ঐ বারের কাইজ্যায় খুন অইছিল।’ মজিদ খালাসি বলে।

    প্রতিপক্ষ খুবই শক্তিশালী, সেটাই ভাবনার কথা। জঙ্গুরুল্লার কথা-বার্তায় কিন্তু ভাবনার বিশেষ কোনো আভাস পাওয়া যায় না।

    সে স্বাভাবিক ভাবেই বলে, ‘খবরডা আগে পাইলে বিনা হ্যাঁঙ্গামে কাম ফতে অইয়া যাইত। যাক গিয়া, তার লেইগ্যা তোমরা চিন্তা কইর‍্য না। চর জাগনের কথাডা যখন কানে আইছে তখন একটা উল্লাগুল্লা না দিয়া ছাইড়্যা দিমু!’

    ‘কিন্তু হুজুর, রেকট-পরচায় ঐ চরতো এরফান মাতব্বরের নামে আছে।’ মজিদ খালাসি বলে।

    ‘আরে রাইখ্যা দ্যাও তোমার রেকট-পরচা। চরের মালিকানা আবার রেকট-পরচা দিয়া সাব্যস্ত অয় কবে? এইখানে অইল, লাডি যার মাডি তার।’

    ‘তবুও কিছু একটা….।’

    ‘সবুর করো, তারও ব্যবস্থা করতে আছি। ঐ তৌজিমহলের এগারো পয়সার মালিক বিশুগাঁয়ের জমিদার রায়চৌধুরীরা। আমি কাইলই বিশুগাঁও যাইমু। রায়চৌধুরীগ নায়েবরে কিছু টাকা দিলেই সে আমাগ বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ করব।’

    ‘নালিশ করব!’

    ‘হ, কয়েক বচ্ছরের বকেয়া খাজনার লেইগ্যা নালিশ করব। আমরাও তখন খাজনা দিয়া চেক নিমু। তারপর এরফান মাতব্বরও যেমুন রাইয়ত, আমরাও তেমুন।’

    ‘কি কইলেন হুজুর, বোঝতে পারলাম না।’ মজিদ খালাসি বলে।

    ‘থাউক আর বেশি বুঝাবুঝির দরকার নাই। যদি জমিন পাইতে চাও, তবে যার যার দলের মানুষ ঠিক রাইখ্য। ডাক দিলেই যেন পাওয়া যায়। কারো কাছে কিন্তু ভাইঙ্গা কইও না, কোন চর দখল করতে যাইতে লাগব। এরফান মাতব্বরের দল খবর পাইলে কিন্তু হুঁশিয়ার অইয়া যাইব।’

    ‘কবে নাগাদ যাইতে চান হুজুর?’ দবির গোরাপি জিজ্ঞেস করে।

    ‘তা এত ত্বরাত্বরির কি দরকার? আগে নালিশ অউক, খাজনার চেক-পত্র নেই, আর ওরাও ধান-পান লাগাইয়া ঠিকঠাক করুক। এমুন বন্দোবস্ত করতে আছি, দ্যাখবা মিয়ারা, তোমরা ঐ চরে গিয়া তৈয়ার ফসল ঘরে উডাইতে পারবা।’

    লোকজন খুশি মনে যার যার বাড়ি চলে যায়।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    আশ্বিন মাসের শেষ পক্ষ। চরটার কোনো কোনো অংশ ভাটার সময় জেগে ওঠে। জোয়ারের সময় সবটাই ডুবে যায় আবার। এ পানির মধ্যে বাঁশের খুঁটি ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি ঝুপড়ি। টুঙ্গির মতো অস্থায়ী ঐ ঝুপড়িগুলোরই নাম ভাওর ঘর। মাতব্বরের জন্য উঠেছে তিনখানা ভাওর ঘর। চরের চারপাশ ঘিরে ভাওর ঘরগুলো পাহারা দিচ্ছে, চোখ রাখছে চারদিকে।

    জোয়ারের সময় ঝুপড়ির মধ্যে এক বিঘত, আধা বিঘত পানি হয়। পানির সমতলের হাতখানেক ওপরে বাঁশের মাচান বেঁধে নেয়া হয়েছে। যারা মাচান বাঁধতে পারেনি, তারা অন্য চর থেকে নৌকা বোঝাই করে নিয়ে এসেছে লটাঘাস। পানির মধ্যে সে ঘাসের স্থূপ সাজিয়ে উঁচু করে নিয়েছে। এরই ওপর হয়েছে শোয়া-থাকার ব্যবস্থা। শরীরের ভারে পিষ্ট হয়ে ঘাস যখন দেবে যায় তখন পানি উঁকি দেয়। তাই কয়েকদিন পর পরেই আরো ঘাস বিছিয়ে উঁচু করে নিতে হয়।

    প্রথম কয়েকদিন এরফান মাতব্বরের বাড়ি থেকে সবার জন্য খিচুড়ি এসেছিল। এক গেরস্তের পক্ষে এত লোকের খাবার যোগাড় করা সম্ভব নয়। তাই শরিকরা নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই করে নিয়েছে। যাদের বাড়ি ধারেকাছে, তাদের খাবার আসে বাড়ি থেকে। বাকি সবাই ছোট-ছোট দলে ভাগ হয়ে ভাওর ঘরেই রান্নার ব্যবস্থা করেছে। আলগা চুলোয় একবেলা রেঁধে তারা দুবেলা খায়। নিতান্ত সাদাসিধে খাওয়া। কোনো দিন জাউ আর পোড়া মরিচ, কোনো দিন ভাত আর জালে বা বড়শিতে ধরা মাছভাজা। আর বেশির ভাগ সময়েই ডালে-চালে খিচুড়ি।

    চরের বাগ-বাটোয়ারা এখনো হয়নি। হবে পুরোটা চর জেগে উঠলে। কারণ তখনই জানা যাবে কোন দিকের জমি সরেস আর কোন দিকেরটা নিরেস। তবে এর মধ্যেই এরফান মাতব্বর চরটার মোটামুটি মাপ নিয়ে রেখেছে। পুব-পশ্চিমে দৈর্ঘ্য দুহাজার ষাট হাত। আর উত্তর-দক্ষিণে প্রস্ত আটশ চল্লিশ হাত। উত্তর-পূর্ব কোণের অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে একটা ঘোঁজা। সেখানে আঁঠাই পানি। মাতব্বর মনে মনে ঠিক করে রেখেছে–কিভাবে ভাগ করা হবে জমি। চরটাকে মাঝ বরাবর লম্বালম্বি দুভাগ করতে হবে। তারপর টুকরো করতে হবে আটহাতি নল দিয়ে মেপে। এভাবে উত্তর অংশে ঘোঁজা বাদ দিয়ে দুই শত পয়তাল্লিশ আর দক্ষিণ অংশে দুই শ সাতান্ন–মোট পাঁচ শ দুই নল জমি পাওয়া যাবে। এক নল প্রস্থ এক ফালি জমির দৈর্ঘ্য চরের মাঝখান থেকে নদীর পানি পর্যন্ত চার শ বিশ হাতের কাছাকাছি। মোট শরিকের সংখ্যা ছাপ্পান্ন। প্রত্যেককে আট নল করে দিয়ে বেঁচে যাবে চুয়ান্ন নল। নিজের জন্য তিরিশ নল রেখে বাকিটা ভাগ করে দিতে হবে পুলকি-মাতব্বরদের মধ্যে।

    ভাগ-বাটোয়ারা না হলেও কোলশরিকরা যার যার ভাওর ঘরের লপ্তে সুবিধামতো বোরো ধানের রোয়া লাগাতে শুরু করেছে।

    চর দখল হয়েছে। এবার খাজনা-পাতি দিয়ে পরিষ্কার হওয়া দরকার। দুবছরের খাজনা বাকি, নদী-শিকস্তি জমির খাজনা কম। কিন্তু জমিদার-কাছারির নায়েব ওসবের ধার ধারে না। সে পুরো খাজনাই আদায় করে। কখনো দয়া হলে মাপ করে দেয় কিছু টাকা। কিন্তু চেক কাটে সব সময় শিকস্তি জমির। বাড়তি টাকাটা যায় নায়েবের পকেটে। এজন্য মাতব্বর কিছু মনেও করে না। সে ভাবে–নায়েব খুশি থাকুক। সে খুশি থাকলে কোনো ঝড়-ঝাঁপটা আসতে পারবে না।

    এখন জমি পয়স্তি হয়েছে। চেক কাটাতে হবে পয়স্তি জমির। তাই এক পয়সাও মাপ পাওয়া যাবে না। তাছাড়া নায়েবকে খুশি করার জন্য সেলামিও দিতে হবে মোটা টাকা।

    এরফান মাতব্বর তার পুলকি-মাতব্বরদের ডেকে আলোচনায় বসে। বৈঠকে ঠিক হয়–এখন নলপিছু দশটাকা করে খাজনা বাবদ আদায় করা হবে কোলশরিকদের কাছ থেকে। পরে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে গেলে নলপ্রতি তিরিশ টাকা সেলামি দিতে হবে এরফান মাতব্বরকে। জমির আসল মালিক সে-ই।

    প্রায় সকলের কাছ থেকে টাকা আদায় হয়। বারো জন টাকা দিতে পারে না। তারা এত গরিব যে একবেলা দুমুঠো ভাত জোটানো মুশকিল হয় তাদের।

    মাতব্বর কয়েকদিন তাগাদা দিয়ে বিরক্ত হয়ে যায়। শেষে একদিন তাদের ডেকে সাফ কথা বলে দেয়, ‘যদি জমি খাইতে চাও, টাকা যোগাড় করো। আরো দুইদিন সময় দিলাম। না দিলে আমি অন্য মানুষ বোলাইয়া জমি দিয়া দিমু। জমির লেইগ্যা কত মানুষ ফ্যা-ফ্যা কইর‍্যা আমার পিছে পিছে ঘোরতে আছে।’

    নিরুপায় হয়ে আহাদালী, জমিরদ্দি ও আরো কয়েকজন ফজলকে গিয়ে ধরে।

    জমিরুদ্দি বলে, ‘কোনো রহমেই আমরা ট্যাহা যোগাড় করতে পারলাম না। কেউ কর্জও দিতে চায় না। আপনে যদি মাতব্বরের পো-রে কইয়্যা দ্যান।’

    ‘উঁহু, আমার কথা শোনব না বাজান। জানো তো, কত বছর ধইর‍্যা খাজনা চালাইতে আছি আমরা?’

    আহাদালী বলে, ‘তিন মাসের সময় চাই, খালি তিন মাস।’

    ‘তিন মাস পরেই বা দিবা কইতন?’

    ‘তা যোগাড় কইরা দিমু, যেইভাবে পারি। ধান লাগাইছি, দেহি—’

    ‘ধানতো প্যাটেই দিতে অইব। ওতে কি আর টাকা আইব?’

    ‘আইব। প্যাডেরে না দিয়া বেইচ্যা ট্যাহা যোগাড় করমু।’

    ফজলের চোখে-মুখে অবিশ্বাসের হাসি! সে কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে যায়। কি যেন চিন্তা করে।

    টাকাপয়সার টানাটানি চলছে এরফান মাতব্বরের সংসারেও। এ চরে আসার পরই ফজল পয়সা আমদানির একটা সম্ভাবনার কথা চিন্তা করেছে। এতদিন কথাটা সে কাউকে বলেনি আজ এদের দুর্দশা দেখে সে আর থাকতে পারে না। বলে, ‘একটা কাজ যদি করতে পারো তবে টাকার যোগাড় অয়। পারবা করতে?’

    ‘পারমু না ক্যান, পারমু। কি কাম?’ জমিরুদ্দি বলে।

    ‘জোয়ারের সময় চরের উপরে মাছ কেমন ডাফলা-ডাফলি করে, দ্যাখছ?’

    ‘হ দেখছি।’ একজন কোলশরিক বলে।

    ‘যদি বানা বানাইতে পার তবে এই মাছ বেড় দিয়া ধরা যায়।’

    ‘বেড়ওয়ালা মালোগ মতন?’ আহাদালী জিজ্ঞেস করে।

    ‘হ।’

    ‘মাছ ধইর‍্যা হেষে–?’

    ‘শেষে আবার কি?’

    ফজল এমন করে হাসে যার অর্থ বুঝতে কষ্ট হয় না কারো।

    জমিরদ্দি বলে, ‘ও, আপনে মাছ বেচনের কথা কইতে আছেন!’

    ‘তাতে দোষ কি?’

    ‘দোষ না! ছিঃ ছিঃ ছিঃ! তোবা তোবা তোবা! মাইনষে হোনলে কইব কি?’

    ‘কি কইব?’

    ‘জাউল্যা কইব। ছাই দিব মোখে।’

    কোলশরিকদের একজন বলে, ‘মাছ বেচলে পোলা-মাইয়ার বিয়া দেওয়ন কষ্ট আছে।’

    ‘আরে ধ্যাত! হালাল রুজি খাইবা, চুরি-ডাকাতি তো করবা না।’

    ‘কিন্তু জাইত গেলে যে আর জাইত পাওয়া যাইব না।’

    ‘প্যাটে ভাত জোটে না, তার আবার জাত। যাও জাত ধুইয়া পানি খাও গিয়া। আমার কাছে আইছ ক্যান্? আমি তোমাগ জন্যই কইলাম। নইলে আমার ঠ্যাকাডা পড়ছে কি?’ ফজল রেগে ওঠে।

    আহাদালী বলে, ‘রাগ করেন ক্যান? মাইনষে তো আর দ্যাখব না প্যাডে ভাত আছে, নাই। তাগ টিটকারির চোডে—’

    ‘যে টিটকারি দিব তার গলায় গামছা লাগাইয়া কইও, চাউল দে খাইয়া বাঁচি। টাকা দে জমিদারের খাজনা দেই।’

    একটু থেমে আবার বলে ফজল, ‘কামলা খাইলে যদি জাত না যায়, ধান-পাট বেচলে যদি জাত না যায়, তবে মাছ বেচলে জাত যাইব ক্যান, অ্যাঁ?’

    জমিরদ্দি বলে, ‘আপনেত কইতে আছেন। আপনে পারবেন মাছ বেচতে?’

    ফজল মনে মনে হাসে। মুখে বলে, ‘হ পারুম। তোমরা মনে করছ, তোমাগ কুয়ার মধ্যে নামাইয়া দিয়া, আমি উপরে বইস্যা আতে তালি দিমু। উঁহু, আমিও আছি তোমাগ লগে।’

    জমিরদ্দি : ‘আপনেও আছেন!’

    আহাদালী : ‘অ্যাঁ, আপনেও থাকবেন আমাগ লগে!’

    ফজল : ‘হ-হ-হ, আমিও থাকমু।’

    আহাদালী : ‘মাতবরের পো জানে এই কথা?’

    ফজল : ‘এখনো জানে না। তারে জানান লাগব।’

    আহাদালী : ‘উনি কি রাজি অইব?’

    ফজল : ‘তারে রাজি করানের ভার আমার উপর।’

    জমিরদ্দি : ‘উনি যদি রাজি অয়, আর আপনে যদি আমাগ লগে থাকেন, তয় আর ডরাই কারে! কি কও তোমরা?’

    সকলে : ‘হ, তাইলে আর ডর কি?’

    ফজল : ‘আমি এখনি বাড়ি যাইতেছি। জমিরদ্দি আর আহাদালী চলো আমার সাথে।’

    এরফান মাতব্বর বিষম ভাবনায় পড়ে যায়। আর সবার মতো তারও সেই একই ভয়। ফজল মাছ বিক্রি করে লুকিয়ে-চুরিয়ে। কাজটা একা করে বলে কেউ জানবার সুযোগ পায় না। কিন্তু যেখানে দশজন নিয়ে কারবার, সেখানে ব্যাপারটা গোপন রাখা কোনো রকমেই সম্ভব নয়।

    মাতব্বর বলে, ‘নারে, পরের দিনই মুলুকের মানুষ জাইন্যা ফালাইব।’

    ‘জানুক, তাতে কী আসে যায়।’ ফজল বলে।

    ‘কী আসে যায়! তখন মাইনষেরে মোখ দেখান যাইব?’ মাতব্বরের কণ্ঠে রাগ ও বিরক্তি।

    ‘একজন তো না যে মুখ দ্যাখাইতে শরম লাগব। বইতে পড়ছি–দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ। যখন এতজনে একসাথে কাজটা করতে চাই তখন আর লজ্জা-শরম কিসের? এত মাইনষের বদনাম করতে মুখ বেদনা অইয়া যাইব না মাইনষের!’

    অনেক ভেবে-চিন্তে মাতব্বর শেষে নিমরাজি হয়। ফজল আশ্বাস দেয়–‘রোজ ভোর রাত্রে মাছ নিয়ে তারা চলে যাবে তারপাশা। সেখানে কেউ তাদের চিনবে না। কেউ জানতে পারবে না মাছ বেচার কথা।’

    দশজন যোগ দিয়েছে ফজলের সাথে। দুজন কেটে পড়েছে। তারা বলে দিয়েছে–‘না খেয়ে শুকিয়ে মরবে তবু তারা ইজ্জতনাশা কাজ করতে পারবে না।’

    নৌকা নিয়ে পরের দিনই ফজল হাটে যায়। সাথে যায় দলের কয়েকজন। তারা মাকলা আর তল্লা বাঁশ কেনে গোটা চল্লিশেক। আর কেনে সাত সের নারকেলের কাতা।

    কাতা আর বাঁশগুলো ভাগ করে নেয় সবাই। প্রত্যেককে চারহাত খাড়াই আর পাঁচহাত লম্বাই ছ’খানা করে বানা তৈরি করতে হবে।

    মাত্র দুদিন সময় দিয়েছিল ফজল। কিন্তু কাজ অনেক। বাঁশগুলোকে খণ্ড করা, খণ্ডগুলোকে ফেড়ে চটা বের করা, চটাগুলো চেঁচেছুলে এক মাথা চোকা করা, শেষে একটার পর একটা কাতা দিয়ে বোনা। এত ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার তৈরি হয় বানা আর তার জন্য লেগে যায় পুরো চারটে দিন।

    বানা তৈরি করতেই যা ঝঞ্ঝাট। ও দিয়ে মাছ ধরা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। ভরা জোয়ারের পর ভাটার টান লাগার কিছুক্ষণ আগে বানা পুঁতে বেড় দিতে হয়। ধনুকের আকারে সে বানা ঘিরে থাকে অনেক জায়গা। ভাটার সময় পানি নেমে যায় আর মাছ আটকা পড়ে বেড়ের ভেতর। আড়, বোয়াল, বেলে, বাটা, ট্যাংরা, টাটকিনি, পাবদা, চিংড়ি ইত্যাদি ছোট-বড় নানা রকমের মাছ। রাত্রের বেড়ে দু-চারটে রুই-কাতলা-মৃগেল-বাউসও পাওয়া যায়। পানির মাছ ডাঙায় পড়ে লাফালাফি ছটকাছটকি করে।

    ফজল আর তার সঙ্গীরা হৈ-হুঁল্লোড় করে হাত দিয়ে ধরে সে মাছ। অনেক সময় পানি নেমে যাওয়ার অপেক্ষাও করে না তারা। অল্প পানির মধ্যে গোলাগুলি করে, আছাড় পাছাড় খেয়ে মাছ ধরায় আনন্দ বেশি, উত্তেজনা, বেশি। এজন্য অবশ্য মাঝে মাঝে বাতাশি, বজুরি আর ট্যাংরা মাছের কাঁটার জ্বলুনি সইতে হয়, চিংড়ি আর কাঁকড়ার চেঙ্গি খেয়ে ঝরাতে হয় দু-চার ফোঁটা রক্ত।

    একবার দিনের বেলা প্রকাণ্ড এক রুই মাছ আটকা পড়েছিল বেড়ে। এত বড় মাছ দিনের বেলা তো দূরের কথা, রাত্রেও কদাচিৎ আসে অগভীর পানিতে। বোধহয় শুশুকের তাড়া খেয়ে কিনারায় এসেছিল মাছটা। ভাটার সময় বেড়ে বাধা পেয়েই ওপর দিয়ে লাফ মেরেছিল। লাফটা কায়দা মতো দিতে পারলে বানা ডিঙ্গিয়ে বেরিয়ে যেতে পারত। আরেকবার লাফ দেয়ার আগেই ফজল সবাইকে নিয়ে ওটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারপর সে যে কি পাছড়া পাছড়ি! পানির জীবকে পানির ভেতর কাবু করা কি এতই সোজা! ধস্তাধস্তির সময় মাছের গুঁতো খেয়ে কয়েকজনের শরীরে জায়গায় জায়গায় কালশিরা পড়ে গিয়েছিল।

    পঁচিশ সের ওজন ছিল মাছটার। বেচার সময় মাপা হয়েছিল। দাম পাওয়া গিয়েছিল আট টাকা।

    রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টায় জোয়ার-ভাটা খেলে দু’বার। এ দু’বারই শুধু বানা পুঁতে বেড় দিয়ে মাছ ধরা যায়। দিনের জোয়ারে খুব বেশি সুবিধে হয় না। সুবিধে হয় রাত্রের জোয়ারে।

    দিনে বেড় দিয়ে যে মাছ পাওয়া যায় তার কিছুটা খাবার জন্য ফজল ও তার সাথীরা ভাগ করে নেয়। মাঝে মাঝে চরের আর শরিকদেরও দেয়া হয় কিছু কিছু। বাকিটা বড় বড় চাই-এর মধ্যে ভরে পানির ভেতর জিইয়ে রাখে। রাত্রে ধরা মাছের সাথে সেগুলো নিয়ে তারা ভোর রাত্রে চলে যায় তারপাশা।

    চিংড়ি আর বড় মাছ কেনে মাছের চালানদাররা। তারা কাঠের বাক্সে ভরে বরফ দিয়ে সে মাছ চালান দেয় কলকাতায়। এদের কাছ থেকে ভালো দাম পাওয়া যায়। ছোট মাছগুলো সস্তায় বেচে দিতে হয় নিকারি-কৈবর্তের কাছে।

    মাছ বিক্রি করে তারা ভোর আটটা-সাড়ে আটটার মধ্যে ফিরে আসে। জমিরদ্দিন সরু ডিঙি সাত বৈঠার টানে ছুটে চলে বাইচের নৌকার মতো। উজান ঠেলে মাত্র ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তারা পৌঁছে যায় তারপাশা। সেখান থেকে ভাটি পানিতে ফিরে আসতে আধঘণ্টাও লাগে না। রোজ পনেরো-বিশ টাকা আসে মাছ বেচে। এভাবে আরো পনেরোটা দিন চালাতে পারলে যোগাড় হয়ে যাবে দশ জনের খাজনার টাকা।

    টাকার গন্ধে অনেকেরই লোভ জাগে, ভিড়তে চায় দলে। কিন্তু ফজল তাদের পাত্তা দেয় না। যে দুজন মান-ইজ্জত নিয়ে সরে-পড়েছিল, তারা এসে যোগ দিতে চায়।

    ফজল রেগে ওঠে। তাদের মুখের ওপর বলে দেয়, ‘ওঃ, এখন জুইতের নাও বাইতে আইছ। তোমরা। উঁহু, তোমরা তোমাগ জাত-মান লইয়া থাক গিয়া। আমাগ দলে জায়গা নাই।’

    কিন্তু ফজলের রাগ মাটি হয়ে যায় দুদিনেই। সে তাদের ডেকে বলে, ‘যদি আসতে চাও তবে আর সবাইর মতন বানা তৈরি করো।’